Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Jatikatha Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
জাতিকথা
শ্রীমৎ স্বামী সমাধি প্রকাশ অগ্রণী
প্রাপ্তিস্থান :-
১। মণীন্দ্র ব্রহ্মচারী, প্রকাশক ও সম্পাদক সগ্রন্থ
প্রচার সমিতি। গ্রাম-বহরপুর, পােঃ বহরপুর,
জেলা ফরিদপুর।
| প্রভাস চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বি, এ,
গ্রাম-নলিয়া, পােঃ নলিয়া, জেলা ফরিদপুর।
৩। গােপাল দাস মজুমদার, ডি, এম, লাইব্রেরী,
৬১নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
৪। খাদি প্রতিষ্ঠান, ১৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
সাহায্য পাঁচ আনা মাত্র।
এই সমস্ত সদ্গ্রন্থ বিক্রয়ের দ্বারা যে অর্থ লাভ হইবে তাহা স্বামীজীর
আদেশে ও উপদেশে সৎকার্য্যে এবং সজ্জন সাহায্যে ব্যয়িত হইবে।
এ বিষয়ে জনসাধারণের উৎসাহ ও সাহায্য পাইলে আমরা শীঘ্রই
স্বামীজীর লেখা অন্যান্য সমস্ত গ্রন্থগুলি প্রচার করিয়া লােক সমক্ষে দিতে
পারিব।
বিনীত নিবেদক
মণীন্দ্র ব্রহ্মচারী,
প্রকাশক,
সম্পাদক-সংগ্রন্থ প্রচার সমিতি
গ্রাম-বহরপুর, পাে-বহরপুর,
(ফরিদপুর)
লেখকের নিবেদন প্রায় আট দশ বৎসর পূর্বে গােয়ালন্দ পল্লীমঙ্গল সম্মিলনীর অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতিরূপে যে অভিভাষণ দেই তাহারই অঙ্গরূপে এই জাতি কথা ছােট আকারে জন্মলাভ করে। পরে ইহা আরও বর্ধিত হইয়া আমার লিখিত “পল্লী বােধন” নামক গ্রন্থের “দশম প্রস্তাব”রূপে সন্নিবিষ্ট হয়। সন্ন্যাস লইয়া অন্যত্র সাধন স্বাধ্যায়াদিতে নিমগ্ন থাকায় উহা এতদিন প্রকাশিত হয় নাই। সাময়িক প্রয়ােজনে সম্প্রতি ফরিদপুর অঞ্চলে আসিয়া পড়ায় অনেক সদাশয় ও সজ্জনগণের অনুরােধে বহু স্থানে বক্তৃতায় ধর্মকথা প্রসঙ্গে অস্পৃশ্যতা বর্জন কথাও চলিতে থাকে। প্রায় কুড়ি বৎসর পূর্বে তথাকথিত অস্পৃশ্যদিগের সহিত তাহাদেরই মত হইয়া প্রাণ খুলিয়া মেলা মেশার ফলে তাহাদের জীবন-বেদনার ভাগী হই। সেই হইতে জাতির এই বেদনা দূর করিবার একটা বাসনাও মনে জাগিয়াছিল। সম্প্রতি ফরিদপুর জেলা অস্পৃশ্যতা বর্জন সমিতির সভাপতি করিয়া ইহারা আমার উপর যে সেবার গুরুদায়িত্ব দিয়াছেন তাহার জন্যও ‘জাতি কথা’র প্রয়ােজন বােধ করি। সাধনার কথা জানিবার জন্য বহু ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করিতে যাইয়াই সঙ্কীর্ণ জাতিভেদ বা বর্ণভেদের বিরুদ্ধে আৰ্য শাস্ত্রের বিশাল উদার মতের সঙ্গে পরিচিত হই। তাই জাতির ব্যথা দূর করিতে পূৰ্বলেখা বর্ধিতায়তন করিয়া ‘জাতি কথা’তে তাহাদের স্থান দিয়াছি। বহু সভা সমিতিতে আমার প্রাণের ব্যথা মনের কথা নিবেদন করিবার সময় এই ‘জাতি কথা হইতে আমি অনেক কথাই বলিতাম। তাহাতে অনেকের মনে ইহা ছাপিবার জন্য পিপাসা জাগে। তঁহাদিগের আগ্রহে এবং তাহাদিগের প্রদত্ত অর্থ সাহায্যে ‘জাতি কথা প্রন্থাকারে প্রকাশিত হইয়া লোেক-কল্যাণ সাধনে প্রবৃত্ত হইতেছে। আশা করিতেছি যে ইহার বিক্রয় গন্ধ অর্থ সাহায্যাদি দ্বারাও লােক কল্যাণ সাধন করিতে পার বাইবে। আমি ধৰ্ম্মের দিক দিয়া জাতির চিত্ত শুদ্ধির দিক্ দিয়াই অকপটে ‘জাতি কথ্য লিখিয়াছি। প্রাণের গাভীর বেদনাতেই আমাকে আমাদেরই কঙ্ক কাহিনী রটনা করিতে হইয়াছে সত্যের খাতিরে। তাহাতে হয়তো কেহ কেহ ব্যথিত হইতে পারেন। এই জন্য বলিতে হইতেছে যে আমিও রাঢ়ীয় কুলীন চট্টোপাধ্যায় এবং মুখােপাধ্যায় ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম লইয়াছিলাম। সত্যের মর্যাদা রক্ষার্থে আমারই কুলকলঙ্কের ‘অপ্রিয় সত্য আমাকেই বলিতে হইয়াছে। আমার সান্ত্বনা এই যে আমি লোক প্রিয় হইবার লােভেও প্রিয় মিথ্যা বলি নাই এবং সত্যের মানহানি করি নাই। উচ্চ ধম্মভাবের প্রেরণায় আত্মশুদ্ধির দিক দিয়াই ‘জাতি কখা রচিয়াছি জাতির ব্যথায় ব্যথিত হইয়া। এই কথা মনে করিয়া পাঠক পাঠিকারা যেন আমার দোষ ত্রুটী বিবেচনা ও মাৰ্চ্চনা করেন। সর্ব জাতির ভিতর যদি ইহাতে কিছু মনের পরশ লাগে এবং চেতনা জাগে তবেই আমার পরিশ্রম ও সেবা সার্থক হইবে। পূজারীরূপে নানাগ্রন্থের নানা ফুল দিয়া বিশ্বদেবকে পূজা করিয়াছি। বড় তাড়াতাড়িই পূজার উপকরণ সংগ্রহ করিতে হইয়াছে যথেচ্ছ ফুল 1 তুলসী বিশ্বদল চয়ন করিয়া। বাগান স্বামী গ্রন্থকারগণের অনুমতি বইতে পারি নাই এবং এত বহু গ্রন্থকারের অনুমতি লওয়া সম্ভবও নহে; কারণ তাহাদের খুজিয়া বাহির করিতে আমার পূজার সময় চলিয়া যাইবে। এইজন্য তাঁহাদের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিতেছি। আর হরিজনদের এই পূজায়ােজন যে তাহাদেরও। “হরিকো হরিজন বহুৎ হৈ হরিজনকে হরি এক।” ‘জাতি কথা প্রকাশের মুলে রহিয়াছে প্রেম যােগাদি গ্রন্থলেখক মরী ভক্ত শ্ৰীযুক্ত যােগেল কুমার সরকার কবির কবিরাজ, হৃদয়বান উদার কর্মী ফরিদপুর ডিষ্ট্রক্ট বাের্ডের ‘টিউবঃল ইন্সপেক্টর’ শ্ৰীযুক্ত অতুল চন্দ রায় চৌধুরী, উচ্চপ্রাণ ত্যাগব্রতী শ্ৰীমন মণী ব্ৰহ্মচারী প্রভৃতির ঐকান্তিক চেষ্টা, উদ্যোগ ও যত্ন। খাদি প্রতিষ্ঠানের ব্ধ প্রতিষ্ঠ দেশবরেণ্য নায়ক ত্যাগী ভক্ত শ্ৰীযুক্ত সতীশ চন্দ্র দাসগুপ্ত মহাশয় এবং খাদি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মহাশয়েরা ছাপিবার খরচ সম্বন্ধে অনেক আনুকুল্য করাতেই ‘জাতি কথা সহজেই ছাপা হইল। এইজনু ইহারা সকলেই আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদাহ। পাঠক পাঠিকাদিগের আহ, উৎসাহ ও সাহায্য পাইলে এইরূপ আরও কতকগুলি গ্রন্থ জন সেবার্থে ছাপাইয়া প্রকাশিত করা যাইবে। ‘জাতি কথা’র অধিকাংশ বিখ্যাত দৈনিক ‘নায়ক’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হইয়াছে। অসম্পূর্ণ কেবল তাহা দেখিয়াই যেন পাঠক পাঠিকারা জাতি কথার বিচার না করেন। পাঠক পাঠিকারা এই জাতি কথা সম্বন্ধে তাহাদের সমালোচনা বা মতামত আমাকে লিখিয়া জানাইলে তাহা সাদরে গৃহীত হইবে এবং তদনুযায়ী দ্বিতীয় সংস্করণে ইহার সংশােধন,
রিবর্তন বা পরিবর্ধন করিবার ইচ্ছা রহিল। ইচ্ছামত জাতিকথাকে
ছাপার ভুল হইতে মুক্ত করিতে পারি নাই। পাঠক-পাঠিকাগণ অনুগ্রহ
করিয়া পড়িবার পূর্বে শুদ্ধিপত্র দেখিয়া লইবেন। ওম্।
নলিয়া (ফরিদপুর)
১লা বৈশাখ, ১৩৪ ০
সমাধি প্রকাশ আরণ্য
{}০ প্রভাস চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গ্রাম--নলিয়া, পােঃ-নলিয়া (ফরিদপুর)
শুদ্ধি-পত্র পৃঃ পংক্তি পৃঃ পংক্তি অশুদ্ধি শুদ্ধি অশুদ্ধি শুদ্ধি ৩- ৭ pertaking partaking ২৩ ১২ বৃহস্পতি বৃহস্পতি ৩ ৭ festivitives festivities ২৪ ১৩ ব্রহ্ম ব্রাহ্ম ৪-১২ অনাচারণীয় অনাচরণীয় ৭১১ ৭।১১ ”-২০-২১ vide- ৫পৃঃ৩য়পং reports ২৭-১৬ স্বীয় 1354-70 এর পরে বসিবে ২৮- ৩ যজ যজ ৫-১৩ বংলায় বাংলায় রূপিনে রূপিণে ৬১৪ পােল পণি ২৯= ৯ স্বভাবপ্রমে ৯-১১ তাহা তাহ ১০=১০ মালে মালা ৩২-২০ কসংবােগাৎ ১৬-১৮ গঠিত গর্বিত ফণসংবােগাং ১৮১৪ ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্মঃ ৩৩-১৫ ১২৬ ১৯ ৫ কল্যাণ কল্যাণে ৩৪. ৪ ৬ শারীরিক শারীরক বিন্দনাত বিনাভ *. ১৭ বিজুগুপসতে বিজুগুপ সতে জাতি ২১- ৬ মহদাদি মহাত্মা ৩৬১১ অধৰ্ম্মচৰ্যায়া অধৰ্ম্মচর্যায় *.38 letilitaria- Utilitaria -২২ লুজ্জো লুক্কো nism nism ৩৭ দংকু ১৮ মুথায় স্নান সুখায়•••সানম্ ৩৯-১৫ ঋগ জাতিঃ পৃঃ পংক্তি অশুদ্ধি পৃঃ পংক্তি অশুদ্ধ শুদ্ধি ৪২- ৮ মহাভারতের মহাভারতে ৪২. ১৫ বৈচ ৪৩= ৬ পুরুরাজাকে পুরূরবাকে ৪৩- ২১ লােহৰ্ষণ লােমহর্ষণ বৈব ৪৪-১১ তপােবন পােধন ৪৬-২০ উপবস্তি উপবন্তি ৬১. ৪ শােন মােণ রমণ দাস রমণচরণ দাস ৬৭-১৫ পাহয়া পহেয়া পােরা পারদ ৭১-১৮ ক্ষীনী ক্ষীণী বাচসুতি বাচস্পতি ৭ ৪১৪ কনিষ্ঠে। কামষ্ঠে ৭৮-২০ গাঙ্গুল গাঙ্গুর . ২১ গড়গড়গ্রাম গড়গড় (বীর- =২২ ভূমের গড়গড়গ্রাম) বাড়া বােড়। ৪৭-১৩ ১৩ "- ১৪ সম্ভত ৪৮•১২ সূক্ষপং স্বপক্ষ ৪৯= ১ প্রবসন্নো প্রসঙ্গে - ২২ মৃগীজ মৃগীজ ৫০ ৬ দর্শণ मोन ২-১৪ ৩৮-৪৯ ৩৮-৪৫ ৫২-১৯,২• ব্রহ্মায় ব্ৰহ্মায়ু, ৫৭ ৩ নং মং বমনিং ". ৪ অকৃথরতি অকৃথষতি . ২২ (মহাভারত ইহা উঠিয়া •••দ্রষ্টব্য) যাইবে ৫৮-২০ সুনীতা সুনীত ৫৯-২১ উচ্চার উব্বিরি ৬০-১৪ পাতক জাতক বৰ্ম্মকঃ কর্মক -১৩ উপরিভাগ কুৰ্ম্মপুরাণম্ উপ- ১৭১৭ বিভাগ১৭১৭-১৯ ৮৩২২ দ্রাস माम ৮৪. ৫ শূদ্রবর্ণে শূদ্রবর্গে ৮৫১৪ গ্রাম্যং গ্রামং ৮৬- ৮ বক্তব্য: বক্তব্য ৮৭- ৩ পৃষ্ঠা পৃষ্ট। ১৪ নিবেদিতা নিবেদিত ১. ১৮ মুক্তা
১. ১৩ যুক্ত
পৃঃ পংক্তি অশুদ্ধি শুদ্ধি
পৃঃ পংক্তি অশুদ্ধি
৯৩= ৮ ভােজন ভােজন
৯৮১৯ ব্রহ্মোতি ব্রহ্মেতি
”. ১২ সন্ততি
সন্ততিঃ
১০০-১২ বিষ্ণবীশ বিষ্ণীশ
১৪-১১ প্রিয়
প্রিয়
সর্গস্তিত্যন্ত সস্থিত্যন্ত
যুক্তঃ
১০৩ ৭ উদাহরণ উদাহরণে
''- ২ তাহাকেই তাহাকেই ১০৬-২০ আকৃতিঃ আকৃতিঃ
৯৬-১৩ চান চান
৩১ পৃষ্ঠায় ৭ম পংক্তির “বিকার” এর পরে বসিবে—“অস্তিত্ব, জন্ম,
বৃদ্ধি, পরিণাম, ক্ষয়, নাশ”-বরাহােপনিষদ, ৮)।
৮৩ পৃষ্ঠায় ১১শ পংক্তির আছে :-”এর পর বসিবে—আর্জিকঃ কুলমিশ্চ
গােপালেদাস নাপিতো। এতে শূদ্রে ভােজ্যান্না যশ্চাত্মানং নিবেদয়েৎ।
৮৩ পৃষ্ঠায় ১৩শ পংক্তির উপরিভাগ ১৭১৭-১৯’এর পর বসিবে
অর্থাৎ বর্গাহত ( যাহারা অর্ধেক ফসল দেয় ), কুলমিত্র, গােপাল,
দাস, নাপিত ও যে আত্মনিবেদন করিয়াছে, শূদ্রের মধ্যে ইহাদের অন্ন
ভােজন করা যায়। কুশীলব (বাদ্যকার, নট) কুম্ভকার, ক্ষেত্ৰকৰ্ম্মক
{ কৃষক) শূদ্রের মধ্যে ইহাদিগকে অল্প মূল্য দিয়া ইহাদের অন্ন ভােজন
করা যায়। পায়স, তৈল, বা ঘৃতপক্ক দ্রব্য, গােরস (দুগ্ধ ) শক্ত
( ছাতু) পিনাক (পিঠা) ও তৈল এই সকল বস্তু দ্বিজাতিগণ শূদ্র হইতে
গ্রহণ করিতে পারেন।
?
সুভীপত্র
১
২
৪
বিষয়,
পৃষ্ঠা
(১) ভারতে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে মহাত্মা গান্ধী
(২) সামন্ত রাজ্যে ও বাঙ্গলায় মুসলমান আমলে হিন্দু-মুসলমানে সেরূপ
ভেদ বিবাদ ছিল না-
(৩) ফরিদপুরে ও বাঙ্গলায় অস্পৃশ্যতার বিপুলতা
(৪) নানা প্রয়ােজনে শূদ্রের অভ্যুত্থান বাঞ্ছনীয়
(ক) শূদ্রযুগের প্রয়ােজন—৯ পৃঃ। (খ) রাষ্ট্রনৈতিক প্রয়ােজন
-১২ পৃঃ। (গ) সামাজিক প্রয়ােজন-১৪ পৃঃ। (ঘ) ধর্মনৈতিক
প্রয়ােজন-১৮ পৃঃ।
(৫) যুক্তিযুক্ত শাস্ত্রমতই গ্রহণীয়
(৬) শাস্ত্রের সাম্যবাদ
(৭) গুণ কর্ম ধর্মের দ্বারা জাতি নির্দেশ
(৮) মহাজন মত
(৯) শাস্ত্রীয় উদাহরণ
(১০) বুদ্ধধর্মের আত্ব
(১১) বুদ্ধদেব জাতিবাদ মানিতেন না
ক) ক্ষত্রিয়ের গুরুত্ব’-৫২ পৃঃ। (খ) ব্রাহ্মণত্ব জাতিতে নহে
৫৩ পৃঃ। (গ) বৌদ্ধযুগে বর্তমান জাতিভেদ ছিল না—৫৩পৃঃ। (ঘ)
জাতিবাদ ত্যাগের উচ্চ আদর্শ বুদ্ধদেবের সময়ে এবং পূর্বেও ছি— ৫৪ পৃঃ ।
২৪
৩৪
৪১
৬৪
৭১
( ৬ ) সন্ন্যাসে জাতিবাদ তিরােহিত-৫৬ পৃঃ । (চ) ত্রিপিটকে
উদাহরণ-৫৭ পৃঃ।
(১২) শঙ্করাচার্যদেবও বর্তমান জাতিভেদ মানিতেন না
(১৩) গৌরাঙ্গদেবও বর্তমান জাতিভেদ মানিতেন না
(১৪) বিখ্যাত মহাপুরুষেরাও জাতিবাদ ও অস্পৃশ্যতার বিরােধী
(১৫) মিশ্রিত হিন্দুজাতি
(১৬) বিবাহে জাতিভেদ অন্তহিত
(১৭) বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ অস্পৃশ্য সস্তৃত
(১৮) মরণ পারে শূদ্র জল-চল; আর এ পারে ?
(১৯) আহারে অস্পৃশ্যতা বর্জন
( ২০ ) উচ্চবর্ণকে শূদ্রের অন্নদান
(২১ ) শদ্রের ব্রাহ্মণত্ব
(২২) ব্ৰহ্মদর্শন আত্মসাক্ষাৎকার ও প্রণব সাধনার শূদ্রের অধিকার ৯৫
(২৩) মিশ্রিত হিন্দু দেব-দেবী
( ২৪ ) জাতিবাদের তিরােভাবে জাতীয় জীবন
(২৫) একটা উপায়
(২৬) জাতি কোথায় ?
- ২৭) ব্রাহ্মণাদির প্রতি নিবেদন
( ১৮) মিলন মন্ত্র
১০৪
No text on this page.
জাতি কথা জাতি সমস্যা মীমাংসার প্রয়োজন। আৰ্য শাস্ত্রের উদার মত। ধৰ্ম্ম দীক্ষায় চরিত্রের উন্নতিতে শূদ্র অশূদ্রের প্রকৃত ব্ৰাহ্মণত্ব বিধানে ভারত উদ্ধার। (১) ভারতে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে মহাত্মা গান্ধী। পল্লীর, ভারতের অবনতির একটা প্রবল কারণ হইতেছে তথাকথিত নিম্নবর্ণের বা অস্পৃশ্য’ ও ‘অনাচরণীয়’ জাতিদিগের প্রতি তথাকথিত উচ্চবর্ণের বা উজাতির উদাসীনতা, অবজ্ঞা ও অত্যাচার। সমগ্র ভারতের লােক সংখ্যা ৩৫ কোটীর মধ্যে প্রায় ৭ কোটি মুসলমান এবং তিন কোটীর অধিক শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, খৃষ্টানাদি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা। বাকী প্রায় ২৪ কোটী হিন্দুর মধ্যে প্রায় ৪ কোটাই অস্পৃশ্য ও ‘অনাচরণীয়। হিন্দুর এই ষষ্ঠাংশকে বাদ দিলে হিন্দুধৰ্ম্ম ও হিন্দুজাতি একেবারেই পঙ্গু হইয়া পড়িবে। বাংলায় এই অস্পৃশ্যতা ও অনাচরণীয়তার প্রভাব তীব্রতায় অনেক কম বটে, কিন্তু ব্যাপকতায় কম মান্দ্রাজ অঞ্চলে ইহা আরও ভীষণ প্রবলতা ধারণ করিয়াছে। বর্ণের অস্পৃশ্য পঞ্চমেরা সে দেশে যে রাস্তা, ঘাট, জলাশয় বা গান নহে; পঞ্চম জাতি কথা রিবে তাহা অপবিত্র হইবে। কি ভীষণ! শৃগাল কুকুরকেও -ঘৃণা করে না। হিন্দুর নিকট মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন প্রভৃতিও অস্পৃশ্য এবং অনাচরণীয়। হিন্দুরা যদি তাহাদের প্রায় অর্ধাংশকে এইরূপ অস্পৃশ্য ও অনাচরণীয় করিয়া রাখেন তবে দেশের মঙ্গল সাধন কেমন করিয়া হইবে? মহাত্মা গান্ধী এই অস্পৃশ্যতা পাপ দূর করিবার জন্য এবং হিন্দুতে হিন্দুতে ও হিন্দু মুসলমান প্রভৃতিতে প্রীতি স্থাপনের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করিতেছেন। হিন্দুমুসলমানের একতার জন্য তিনি একুশ দিন ব্যাপী জীবন সঙ্কটাপন্ন উপবাসও করিয়াছিলেন এবং অনুন্নত ও উন্নত শ্রেণীর হিন্দুর অখণ্ড মিলনের জন্যও মণপণ পূর্বক সপ্তাহাধিক উপবাসও কিছু পূৰ্ব্বে করিয়াছেন। অস্পৃশ্যতা দূর করিবার জন্য দেশ নায়কগণের মীমাংসা ও প্রতিশ্রুতিবশতঃ তিনি উপবাস ভঙ্গ করেন। কিন্তু দেশবাসী সকলে তাঁহার প্রাণের কথা শুনিতেছে কই ? সমগ্র হিন্দু তাহার প্রাণের ব্যথা বুঝিতেছে কই ? ঘুমের নেশায় বিভাের হইয়া আমরা কি ওড়, উদাসীন, নিশ্চেষ্ট থাকিব ? (২) সামন্ত রাজ্য ও বাঙ্গালায় মুসলমান আমলে হিন্দু মুসলমানে সেরূপ ভেদ বিবাদ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় এই যে হিন্দুসলমানে যত মনােমালিন্য, দাঙ্গা- হাঙ্গামা তাহা এই ব্রিটিশ ভারতে; হিন্দু বা মুসলমান সামন্ত নৃপতি- দিগের রাজ্যে ( Native States এ) এরূপ ছিল না। বর্তমানে স্থানে কানে ইহার বিপরীত ব্যতিক্রম যাহা কিছু হইতেছে তাহা অন্যের প্ররােচনায় কূটনীতিবশতঃ। স্বাধীন মুসলমান রাজ্য আফগানিস্থানের দৃষ্টান্তও প্রত্যক্ষ। ভারতীয় নৃপতিদিগের রাজ্যে ( Native States এ) যে জাতি কথা হিন্দুমুসলমান মনের প্রীতিতে বাস করেন তাহার সাক্ষ্য ভারত গভর্ণমেন্টের সংবাদ বিভাগের কর্তা (Director of Information) মিঃ রাশব্ৰুক উইলিয়ম ( Mr. Rush brook Williams ) ও দিয়াছেন—“At an era when in British India communal disturbances are lamentably frequent, all creeds and castes contrive to dwell in amity under Princely rule............. To find a Hindu Princa pertaking in the particularfestivitives of his Mahomedan subjects ini rice versa, is the rule and not the exception.” অর্থ", যে যুগে, যখন ব্রিটিশ ভারতে সাম্প্রদায়িক বিরােধ শোচনীয়ভাবে সদা ঘটিতেছে তখন (ভারতীয়) রাজন্যবর্গের শাসনাধীনে সমস্ত জাতি ও বর্ণ মিত্রতায় বাস করিতে পারিতেছে। একজন হিন্দু রাজাকে তঁাহার মুসলমান প্রজার বিশিষ্ট উৎসব সমুহে যােগদান করিতে এবং মুসলমান রাজাকেও হিন্দু প্রজার উৎসব সমূহে যােগদান করিতে যে দেখা যায় তাহা নিয়মই, নিয়মের ব্যতিক্রম নহে। স্থানে স্থানে বর্তমানে যে ব্যতিক্রম হইতেছে তাহাও ঐ নিয়মেই ব্যতিক্রম। ইংরা আগমনের ঠিক পূৰ্বেও আলীবর্দী খাঁর সময়ে (১৭৫৬ খৃষ্টাব্দের পূর্বে) সরকারী কর্ম বিভাগেও হিন্দু মুসলমান তুল্যভাবে বিবেচিত হইত। ষ্টিওষুট সাহেব বলিয়াছেন :-“Such was the state of Bengal when Alivardy Khan... assuined its Government. Under his rule the country was improved, merit and good conduct were the only passports to his favour. He placed Hindus . জাতি কথা on an equality with Mussalmans, in choosing ministers and nominating them to high military and Civil Command."-Stewart quoted in India Reform Pamphlet No. 9, P. 22. * অর্থাৎ আলীবর্দী খাঁ যখন শাসন ভার গ্রহণ করিলেন তখন বাঙ্গলার অবস্থা এইরূপ ছিল—তাহার শাসনাধীনে দেশটি উন্নত হয় ও তাহার অনুগ্রহ লাভে গুণ ও সচ্চরিত্রতাই এক মাত্র অনুমতি পত্র ছিল। মন্ত্রী নিয়ােগে এবং উচ্চ সামরিক বা রাজ্য পালন সম্বন্ধীয় পদে মনােনীত করিতে তিনি হিন্দুদিগকে মুসলমানদিগের সহিত সমপদে রাখিতেন। কিন্তু ইংরাজ আমলে তাহা অনুরূপ হইয়াছে। অদূরদর্শী শাসন কর্তা তাহার শাসন দণ্ড অব্যাহত রাখিবার জন্য ভেদনীতির প্রবর্তন করিবেনই; কিন্তু আমরা মহা মূথ সেই কুহক জালে বন্ধ হইতে চাই কেন? এই কুহকজাল ছিন্ন করিতে হইলেই হিন্দু মুসলমান আচরণীয় অনাচারণীয়, স্পৃশ্য অস্পৃশ্য সকলের মধ্যেই এই সঙ্কীর্ণ ভাব দূর করিয়া উদারতাব আনিতে হইবে; নতুবা পল্লীর ভারতের উন্নতি সুদূর পরাহত। ভারতবাসীর মহা মিলনের এই একটি প্রবল অন্তরায়কে জাতীয় একতা সানায় বিদূরিত করিতে হইবেই। (৩) ফরিদপুরে ও বাংলায় অস্পৃশ্যতার বিপুল। আমাদের বাঙ্গালা দেশে বিশেষত পূর্ববঙ্গে সংখ্যা হিসাবে হিন্দু ; ; * এই পুস্তিকা ৩৭ জন পালমেন্টের মেম্বর বিশিষ্ট Indian Reform Socieiy কর্তৃক প্রচারিত। Vide the Calcutta Gazette. July, 14, 1932 PP 1354-70.
জাতি কথা মধ্যে নমঃশূদ্রের স্থান অনেক উপরে। কোন কোন স্থানের হিন্দুর চাৰি ভাগের তিন ভাগ ইহারা। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দের আদম শুমারীর গণনায় (Census Reports) ফরিদপুরে নমঃশূদ্রের সংখ্যা ৪,২৭,৬৯৮। আর ফরিদপুরে ব্রাহ্মণ ৫৫,৪৪৩; কায়স্থ ৯৪,৫৯১ ও বৈদ্য মাত্র ৫,৫১৬। অর্থাৎ উচ্চবর্ণের এই তিন জাতি একত্রে কেবল নমঃশূদ্রের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। আর ফরিদপুরে এক মুসলমানের সংখ্যাই ১৫,০৭,১৫৭। ফরিদপুরে ৮,৪৭,৬৪ জন হিন্দুর মধ্যে প্রায় ২,১৮,৩৯১ জন স্পৃশ্য ; সুতরাং ৬,২৮,৬৭৩ জন অস্পৃশ্য বা ফরিদপুর হিন্দুর শতকরা ৭৪ জন বা প্রায় ৪ ভাগের ৩ ভাগ অস্পৃশ্য এবং সমগ্র ফরিদপুর বাসীর প্রায় ২৪ লক্ষ লােকের মধ্যে মুসলমানদিগকে লইয়া ২১,৩৫,৮৩০ জন অস্পৃশ্য। অর্থাৎ :- ফরিদপুর বাসীর প্রায় ৮ ভাগের সাত ভাগ তারও বেশী অস্পৃশ্য বা শতকরা প্রায় ৯০ জন অস্পৃশ্য। বংলায় অস্পৃশ্য অনাচরণীয় জাতির সংখ্যা যে কত প্রবল তাহা ১৯৩১ খৃষ্টাব্দের আদমসুমারীর গণনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হইবে। আমরা যে সমস্ত জাতি সংখ্যায় খুব কম তাহাদিগকে বাদ দিয়া উচ্চ নীচ প্রায় সমস্ত বর্ণ বা জাতিরই সংখ্যা দিলাম। ইহা হইতে বাংলায় অস্পৃশ্যত বর্জনের গুরুত্ব বােধগম্য হইবে এবং জাতিবাদের ভরকেন্দ্র কোন্ দিকে তাহাও সবিশেষ উপদ্ধ হইবে। (১৯৩২ খৃষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই তারিখের কলিকাতা গেজেটের ১৩৫৪–১৩৭০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য) নং জাতি লােক সংখ্যা লােক সংখ্যা ১। ব্রাহ্মণ ১৪,৪৭,৬৯১ ১,১০,৭৩৯ ২। কায়স্থ ১৫,৫৮,৪৭৫ ৪। রাজপুত ১,৫৬,৯৭৮ নং জাতি ৩। বৈদ্য জাতি কথা নং জাতি লোক সংখ্যা জাতি লােক সংখ্যা ৫। গােয়ালা ৫,৯৯,২৮৩ ১৬। বাণী ১,৩৭,৫৭০ ৬। নাপিত ৪,৫১,৩৬৮ ২৭। বাউবি ৩,৩১,২৬৮ ৭। কুম্ভকার ২,৮৯,৮১৩ ২৮। চামার ১,৫৪৫ ৮। মাহিষ্য ২৩,৮১,২৬৬ ২৯। মুচী ৪,১৪,২২১ ৯। বারুজীবী ১,৯৫,১৩৯ ৩০। কাপালি ১,৬৫,৫৮৯ ১০। সদ্গােপ ৫,৭১,৭৭২ ৩১। ডােম (মুফরাস) ১,৪০,৬৭ ১১। পােদপৌণ্ড) ৬,৬৭,৭৩১ ৩২। মেথর ২৩,২৮১ ১২। পুণ্ডরী (পুণ্ড) ৩১,২৫৫ ৩৩। ভুইমালী ৭২,৮৪ ১৩। সাহ ৪,২০,৯৯ ৩৪। ভুইয়া ৪৯,৩৭০ ১৪। শুড়ী ৭৬,৯৯০ ৩৫। ভুমি ৮৪,৪৪৭ ১৫। তিলি ২,৭,৮৮৩ ৩৬। কুৰ্ম্মি ১,৯৪,৬৫২ ১৬। তেলি ও কলু ২,৯৫,৩০৬ ৩৭। মালী (মালাকার) ১৭। ধােপা(রজক) ২,২৯,৬৭২ ৩৮। পলিয়া (পােল ৪৩,১৬৩ ১৮। কৰ্ম্মকার ২,৬৫,৫৩১ ৩৯। পাটনী ৪৩,৭৬৬ ১৯। নমঃশূদ্র ২০,৯৪,৯৫৭ ৪০। বাইতি (চুনিয়া) ৮,৮৮৮ ২৬। রাজবংশী ১৮,০৬,৩৯০ ৪১। মাণ ১,১১,১৬৭ ২১। ঝলােমলাে ১,৯৮,৩৯৯ ৪২। ২৬,২৫৪ ২২। জালি কৈবৰ্ত্ত ৩,৫২,৭' ১৮,৯৫ বা আদি কৈবর্ত ২৩। আঁতি ও তাতেআ৩,৩০,৫১৩ ৪৪। বৈষ্ণব বৈরাগী বােষ্ট৩,৩৭,৭৭১ ২৪। যােগী বা যুগী ৩,৮৪,৬৩৪ ৪৫। সাঁওতাল হিন্দু ৪,৩৩,৫০২ ২৫। হাড়ি ১,৩২,৪০১ ইত্যাদি ৭৯,৮৪ ঃ জাতি কথা ৭ ইহা ছাড়া বাংলায় মুসলমান ২,৭৮,১০,১০০; বৌদ্ধ ১,২৩,৪৯৭; শিথ ৭,২৬৪ ; জৈন-৮,৪৩২ ; ভারতীয় খৃষ্টীয়ান—১,০০,৭৭৭; ইঙ্গ- ভারতীয় (Anglo Indians)-২৭,৫৭৩ প্রভৃতিও আছেন। ইহারাও হিন্দুর নিকট অস্পৃশ্য বা জল অনাচরণীয়। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে আদমসুমারীর গণনায় বাংলার মােট লােক সংখ্যা ৫,১০,৮৭,৩৩৮। ইহার মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ, রাজপুত, গােয়ালা, নাপিত, কুম্ভকার ও মাহিষ্যকে মাত্র স্পৃশ্য বা জল আচরণীয় বলিলে (ইহা বাদে যে আর ২৪টা জাতি জলচল আছেন তাহারা সংখ্যায় নগণ্য এবং এবারকার আদমশুমারীর গণনায় তাঁহাদিগের পৃথক সংখ্যা দেওয়া হয় নাই ; যেমন—গন্ধবণিক, সুবৰ্ণবণিক, ময়রা ইত্যাদি) তাহাদের সংখ্যা দাড়ায়—৬৯,৯৫,৩১০। অর্থাৎ শতকরা প্রায় ১৩ জন বাঙ্গালী মাত্র জল আচরণীয় বা শৃশ্য। মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, খৃষ্টান, জৈন প্রভৃতি ও হিন্দুর নিকট অস্পৃশ্য বা জল অনাচরণীয়। জাতির অংশকে এইরূপ অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয় করিয়া রাখার ন্যায় বিরাট সামাজিক পাপ জগতে খুব কমই আছে। সমাজের এত বড় বৃহত্তম অঙ্গটা যদি অচল হয় তবে সমগ্র সমাজ দেহটা যে স্থাণুর ন্যায় পঙ্গু, অচল হইবে তাহাতে আর আশ্চর্য কি? হায় উচ্চবর্ণ, ‘দুবাই’তে আপনার সমাজ দেহটাই নষ্ট, মরণােন্মুখ করিতে বসিয়াছ। সমগ্র ভারতে প্রায় ২৪ কোটি হিন্দুর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয়; আর বাংলায় ২কোটী *এই মাহিয়্যরা কেবৰ্ত্ত বলিয়াও খ্যাত। ইহারা প্রথমে জল অনাচরণীয় ছিলেন পয়ে বল্লাল সেনের কৃপায় ইহার জল আচরণীয় হন।-গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ২৫৪ পৃঃ। ইহারা এখনও অনেক স্থলে জল আচরণীয় নহেন।
৮ জাতি কথা ১১ লক্ষ হিন্দুর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪১ লক্ষ অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয় ৩৫ কোটী ভারতবাসী হিন্দু মুসলমানাদির মধ্যে প্রায় ১৫ কোটা অস্পৃশ্য ৰা জল অনাচরণীয়। অর্থাৎ ভারতীয় হিন্দুর ষষ্ঠাংশ (ঙ) বা ভারতবাসীর প্রায় ৩ অংশ অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয়; আর বাঙ্গালী হিন্দুর অংশ বা সমগ্র বাঙ্গালীর অংশই অস্পৃশ্য বা অনাচরণীয়। বাঙ্গলার পাপ ভারত হইতেও বেশী। বাঙ্গালী, এত বড় পাপ, এতবড় জটিল ব্যাধিটা লইয়া তুমি জাতীয় জীবন যাত্রা নির্বাহ করিবে কিরপে, কোন্ আশায়, কোন্ বলে ? ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ বাদ দিরা আর সমস্তকেই নিম্নবর্ণের গণ্ডীর মধ্যে ফেলিলে এই গণ্ডীটা এত বৃহদায়তন হইবে যে উচ্চবর্ণদিগকে এক ঘরে’র মতই দেখাইবে। অস্পৃশ্য ও অনাচরণীয়দিগের সমস্যা ও মূল্য যে কত গুরুতর তাহা এই উপরােক্ত বিবরণই স্পষ্ট নির্দেশ করিতেছে। ইঁহাদিগের অধিকাংশই (শতকরা প্রায় ৮৯ জন) আবার পল্লীবাসী। মুষ্টিমেয় সহরবাসীর নিকট এই সমস্যা শিথিল হইলেও বিপুল পল্লীবাসীর নিকট ইহা জটিলই রহিয়াছে। এই অবনতদিগকে শিক্ষায় দীক্ষায়, ধৰ্ম্মে কৰ্ম্মে, জ্ঞান গরিমায় সমুন্নত করিতে না পারিলে পল্লী মঙ্গল এবং ভারত উদ্ধার কোন ক্রমেই সংসাধিত হইবে না। জাতির এই ‘শুচি বারু’ রােগ দূর না করিলে জাতির মস্তিষ্ক বিকৃত হইবে। ভারতের কল্যাণ মানে ভারতবাসীর কল্যাণ, ভারতবাসীর কল্যাণ মানে ভারতের অধিকাংশ লােকের কল্যাণ ; আর ভারতের অধিকাংশ লােক যখন এই তথাকথিত অস্পৃশ্য সম্প্রদায়, তখন এই অস্পৃশ্য ব্যক্তিদিগের কল্যাণে, জাগরণে ভারতের মহাকল্যাণ নিহিত।
জাতি কথা (৪) নানা প্রয়ােজনে শুদ্রের অভ্যুত্থান বাঞ্ছনীয় । (ক) শুদ্র মুগের প্রয়ােজন। জগতের ইতিহাস আলােচনা করিলে আমরা দেখিতে পাই যে ব্রাহ্মণ বা intellectual class দিগের প্রাধান্য চলিয়া গিয়াছে। প্রকৃত ব্রাহ্মণ ঋষি বা Spiritual classএর প্রাধান্য জগতে চিরদিন থাকিতেছে ও থাকিবে। সে ব্রাহ্মণত্ব দিব্য ত্যাগে, মহান্ চরিত্রে এবং জীবন্ত ধৰ্ম্মে । ক্ষত্রিয় বা military classএর প্রাধান্তের যুগও অতীত হইয়াছে । বর্তমানে জগত সভায় যে বৈশু বা commercial classএর প্রাধান্য আছে তাহাও টলায়মান। ইউরােপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, আফগানিস্থান, পারস্য, তুরস্ক প্রভৃতি স্থানে শূদ্রের বা নিম্নবর্ণ শ্রমিকদিগের অভ্যুত্থান হইতেছে। তাহার ফলে ‘বলশেভিজ’ (Bolshevism) সােস্যালি’ (Socialism) বস্মনিজম্' (Communism) লোরিজম্ (Labourism), 'faatia affas' (Republicanism), 'fsafafasar (Sien Feinism) ফ্যাসিজম্ (Facism) প্রভৃতিতে নিম্নবর্ণের অভুথান দেখিতেছি। ভারতের নিম্নবর্ণের ‘Sleeping Leviathan' বা অতিকায় জানােয়ারের মত ঘুমাইয়া আছে। তাহারা যদি জাগ্রত হইয়া সঙ্গবদ্ধ হইয়া উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে দাড়ায় বা তাহাদিগকে বয়কট করে, তবে এই উচ্চবর্ণের অবস্থা যে ভীষণ সঙ্কটাপন্ন হইবে, তাহাতে অনুমাত্রও সন্দেহ নাই। অত্যাচারে, অবিচারে, হেলায়, অবজ্ঞায় উচ্চবর্ণ ইহাদিগকে বহুদিন পদদলিত করিয়া আসিয়াছেন, তাহার ফলে প্রকৃতির প্রতিশােধ শীঘ্রই আসিতেছে। কুম্ভকর্ণের ন্যায় এই ঘুমন্ত নিম্নবর্ণ বদ যথাকালে জাগে তবে সে নর, অমর, সুরাসুর সকলেরই অজেয় হইবে। ভারতের উচ্চবর্ণেরা প্রায় মৃত ; নিম্নবর্ণের ভিতরেই কেবল জীবনী শক্তি ধিকি ধিকি জাতি কথা স্পন্দিত হইতেছে। জলদ গম্ভীর স্বরে স্বামী বিবেকানন্দ বলিতেছেন :- ‘তােমরা উচ্চবর্ণের। কি বেঁচে আছ ? তােমরা হ’ দশ হাজার বছরের মমি + যাদেব ‘চলমান শ্মশান” বলে তােমাদের পূর্বপুরুষেরা ঘৃণা করেছেন ভারতে যা কিছু বর্তমান জীবন আছে তা তাদেরই মধ্যে। আর ‘চলমান অশান হ’চ্চ তোমরা।••••••এ মায়ার সংসারের আসল প্রহেলিকা, আসল মরু-মরীচিকা তােমরা—ভারতের উচ্চবর্ণেরা। ভূত ভারত শরীরের রক্তমাংসহীন কঙ্কালকুল তােমরা কেন শীঘ্র শীঘ্র ধূলিতে পরিণত হয়ে বায়ুতে মিশে যাচ্ছ না?••••••তােমরা শূন্তে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক। বেরুক্ লাঙ্গল ধরে, চাষার কুটীর ভেদ করে, জেলে, মালে', মুচি, মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে। বেরু মুদির দোকান থেকে—ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে। বেরু কারখানা থেকে, হাট থেকে, বাজার থেকে। বেরুক ঝােড়, জঙ্গল, পাহাড়, পর্বত থেকে। এ সংস্র সহস্র বৎসর অত্যাচার স’য়েছে, নীরবে স’য়েছে-তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। সনাতন দুঃখ ভােগ করেছে-তাতে পেয়েছে অটল জীবনী শক্তি। এরা একমুঠা ছাতু খেয়ে দুনিয়া উল্টে দিতে পারবে, আধখানা রুটী পেলে ত্রিলােকেও এদের তেজ ধরবে না; এরা রক্তবীজের প্রাণ সম্পন্ন। আর পেয়েছে অদ্ভুত সদাচার বল, যা ত্রিলােকেও নাই। এত শাস্তি, এত প্রতি, এত ভালবাসা, এত মুখটী চুপ করে দিন রাত খাটা এবং কাৰ্যকালে সিংহের বিক্রম। অতীতের কঙ্কালচয়! এই সানে তােমার উত্তরাধিকারী ভারত।” পরিব্রাজক, ৫০-৫১ পৃষ্ঠা। • মমি = ইজিপ্ট মিশর দেশে রাজা বা রাজকীয় বা সম্রান্ত ব্যক্তিদিগের যে মৃত দেহ তেল মশলাদি দ্বারা বহুকাল রক্ষিত করা হয় তাহাকে মমি বলে।
জাতি কথা ১১ আৰ্য প্রতিনিধি সভার সভাপতি পণ্ডিত শঙ্কর নাথও বলিতেছেন :-Now if the Hindus, out of their stupidity hesitate to show sympathy with the legitimate aspirations of the socalled Low class Hindus and do not remove their untouchability etc. then these people are not ready to wait any longer and suffer the indignities, degradation and disgrace from the hands of those who in many cases are no way superior to them in learning and education and hence they are sure to lose not only the sympathy and material help from those people, but will turn them as the worst enemies of the race. -Hindu Sangathan and our Depressed Brethren, P. 23. অর্থাৎ :—এখন যদি হিন্দুরা তাঁহাদিগের নির্বুদ্ধিতা বশতঃ এই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদিগের যথার্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলির প্রতি সহানুভূতি দেখাইতে ইতস্তত করেন এবং তাহাদিগের অস্পৃশ্যতা প্রভৃতি দূর না করেন তাহা হইলে এই সমস্ত লােকেরা আর অধিককাল অপেক্ষা করিতে প্রস্তুত নহে এবং যাহারা অনেক ক্ষেত্রে তাহাদিগের অপেক্ষা বিদ্যা ও শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ নহে, তাহাদিগের হস্ত হইতে অপমান, হীনতা এবং হেয়ত্ব ভােগ করিতে প্রস্তুত নহে এবং এই জন্য তাহারা এই সমস্ত লােকদিগের সমবেদনা ও আর্থিক সাহায্যই যে কেবল নিশ্চয় হারাইবেন তাহা নহে, তাহারা ইহাদিগকে জাতির নিকৃষ্টতম শত্রুতে পরিণত করিবেন। এই অবনত অতিদিগকে শূদ্র যুগের প্রাধান্য কালে ১২ জাতি কথা যদি আমরা সমুন্নত না করি তবে যুগধর্মের পশ্চাতে আমরা পিছাইয়া পড়ি। তাই এই অবনত জাতিদিগকে সমুন্নত করিবার জন্য রাষ্ট্রনৈতিক সামাজিক এবং ধৰ্ম্ম-নৈতিক প্রয়ােজনও আসিয়া পড়িয়াছে। (খ) রাষ্ট্রনৈতিক প্রয়ােজন। রাজকার্যে সাম, দান, ভেদ ও দণ্ড এই চারি রাজনীতির আশ্রয় সাধারণত গ্রহণ করা হইয়া থাকে। বিপক্ষ পক্ষকে ভেদনীতির দ্বারা দুৰ্বল ও প্যাজিত করা চিরশুন রাজনৈতিক প্রথা। সর্বদেশে সর্বকালেই ইহা শত্রুপক্ষের সংহতি শক্তি ভঙ্গ করিবার জন্য অবস্থিত হইয়াছে । ইংরাজ রাজও ইহা করিতেছেন এবং যতদিন পারিবেন করিবেন। মুষ্টিমেয় ইংরাজ যে এই কোটি কোটি ভারতবাসীকে অঙ্গুলি হেলনে বিতাড়িত করিতেছেন তাহার মূলসূত্র এই হিন্দু-মুসলমানের এবং উন্নত ও অবনত সম্প্রদায়ের মনােমালিন্যে এবং সংহতি শক্তির অভাবে। বঙ্গভঙ্গের সময় তদানীন্তন বাঙ্গলার ছােট লাট স্যর ব্যামফল্ড ফুলার প্রকাশ্যে হিন্দুদিগকে ‘দুয়াে’ ( দুঃখী ) রাণী এবং মুসলমানকে ‘সুয়’ ( সুখী ) রাণী বলিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ইংলণ্ডের বর্তমান প্রধান মন্ত্রী রাজে ম্যাকডােনাল্ড বলিয়াছেন - "Sinister influences have been and are at work on the part of the Government ; that Mahammedan leaders have been and are inspired by certain Britishi officials and that these officials have pulled and continue to pull, wires at Simla and in London, জাতি কথা '১৩ = and malice afore thought sow discord between the Mahammedans and the Hindu communities by showing to the Mahammedans special favours."--The Awakening of India by Ramsay Macdonald, p, 283. অর্থাৎ সরকার পক্ষ হইতে অসাধু প্রভাব নিযুক্ত হইয়া আসিয়াছে ও হইতেছে; কতকগুলি ব্রিটিশ রাজপুরুষ দ্বারা মুসলমান নেতাগণ অনুপ্রাণিত হইয়া আসিয়াছেন ও আসিতেছেন; ঐ সব রাজপুরুষেরা সিমলায় ও লণ্ডনে তার নাড়িতেছেন এবং মুসলমানদিগের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ দেখাইয়া হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় সমূহের মধ্যে পূর্বচিন্তিত বিদ্বেষ- বিবাদের বীজ বপন করিতেছেন। সাইমন কমিশন’ ইহাতে আর এক নূতন তােদ-সুর যােজনা করিয়াছেন। ইহারা অবনত সম্প্রদায়ের বন্ধু সাজিয়াছেন। হিন্দু উন্নত ও অবনত সম্প্রদায়ে যে মন কষাকষি চলিতেছে তাহা ইহারা আরও ঘষাঘষি করিয়া দিতেছেন। (onnmunal Award” বা সাম্প্রদায়িক ভােটদান ব্যাপারে ইহাকে আরও জটিল করিয়া হিন্দু-সমাজকে ছিন্নভিন্ন করিয়া ঐ পূর্বোক্ত বাক্যের লেখক প্রধান মন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড প্রমুখ কর্তারাই কাজ হাসিল করিতেছেন। সামন্ত নৃপতিদিগকেও আয়ল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে আষ্টারের (ulster) ন্যায় ব্রিটিশ ভারতের বিরুদ্ধে খাড়া করিবার চেষ্টাতেও তাহারা আছেন। আমাদের ভিতর যখন এই জাতীয় দুর্বল বর্তমান তখন তাহার সুযোেগ বিপক্ষ পক্ষ লইবে না কেন? জাতীয় মহামিলনে রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রে সবল হইলেই আমাদের এই দুর্বলতা দূর হইবে। আমাদিগের রাষ্ট্র- নতিক ধুরন্ধরদিগের প্রধান কর্তব্য এখন এই অবনত সম্প্রদায়কে ১৪ জাতি কথা তাহাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবী দিয়া তাহাদিগের সহিত প্রেমের অচ্ছে নিবিড় বন্ধন রচনা করা। অবনত সম্প্রদায়ের প্রধান কর্তব্য চির শত্রু বিদেশীর ক্রীড়া-পুত্তলিক হইয়া সােদরে সােদরে ঝগড়াঝাটি মারামারি না করিয়া আপনাদিগের ঘরােয়া বিবাদ আপনারাই মিটান। মুসলমান ভাইদিগেরও ইহাই কর্তব্য। প্রীতির ভিতরেও আদান-প্রদান, দান-প্রতিগ্ৰহণ আছে। দায়ে ঠেকিয়া এক পক্ষকে কেবল যদি দাতাই সাজিতে হয়, তবে সেই দায় উদ্ধার হইয়া গেলেই প্রেমের বন্ধনও শিথিল হইয়া পড়ে। উচ্চবর্ণকে যেমন নিম্নবর্ণের এবং হিন্দুকে যেমন মুসলমানের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও দাবীদাওরা স্বীকার করিতে হইবে, নিম্নবর্ণ ও মুসলমানদিগকেও তদ্রুপ অসঙ্গত ও অন্যায্য অধিকার ও দাবীদাওয়া ত্যাগ করিতে হইবে। উচ্চবর্ণকে সঙ্কীর্ণতা ও গোড়ানী ত্যাগ করিয়া উদার হইয়া সমতল ভূমিতে আসিয়া ইহাদিগের সহিত বিজয়ালিঙ্গন করিতে হইবে এবং নিম্নবর্ণকে নিম্নভূমি হইতে সমুন্নত হইয়া উচ্চে সমতল ভূমিতে আসিয়াই এই বিজয়ালিনের বাহুডােরে নিবদ্ধ হইতে হইবে। এই রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক প্রয়ােজন স্বীকার পূর্বক তাহাকে মূর্ত বিগ্রহে পরিণত করিতে পারিলেই জাতীয় শক্তি দুর্জয় ও অমােঘ হইয়া আঁড়াইবে। ভাবী স্বরাজের ইহাই ভিত্তিভূমি। নিখিল ভারতের মিলন- মন্ত্রই স্বরাজ-যুদ্ধের বিজয়-ভেরী, তুৰ্য-নিনাদ। (গ) সামাজিক প্রয়ােজন। সামাজিক প্রয়ােজনে এই অবনত সম্প্রদায়দিগকে সমুন্নত করিবার এখােন আসিয়াছে। সমাজ-দেহের নিম্নাঙ্গকে ক্ষীণ ও দুর্বল করিয়া জাতি কথা ফেলিলে পরিণামে সমগ্র দেহটাই স্থাণুর ন্যায় অচল হইয়া পঙ্গু হইবে । এদিকে আবার গুণ ও কর্ম, চরিত্র ও ধর্মানুযায়ী নিম্নবর্ণের অনেকে সমাজদেহের উচ্চাঙ্গ স্বরূপ। তাহাদিগকে নিম্নাঙ্গের কাৰ্য্যে নিয়ােজিত করিয়া রাখিলে তাহাতে যে সামাজিক অপচয় হয় তাহা খুবই বেশী । শূদ্রজাত বশিষ্ঠ, ব্যাস, শুক, কনদ, নাভাজী, রুইদাস, হরিদাস প্রভৃতিকে যদি শূদ্র কৰ্ম্মেই নিয়ােজিত থাকিতে হইত তবে যে বিপুল intellectual wastage a atafi 994637 42* spiritual wastage at আধ্যাত্মিক অপচয় হইত তাহার সামাজিক ক্ষতিটা কি সাংঘাতিকই না হইত! আনন্দের বিষয় যে প্রাচীন সামাজিকের তাহা করেন নাই। তদ্রুপ নিষ্ঠুর কসাই-প্রতিম গােয়ালাকে দুগ্ধ দান করিব না বলিয়া যদি গাভী নিত্য একাদশী আরম্ভ করে তবে কুলপাংশন গগয়াকুলের ধ্বংস, যুত হউক বা না হউক, তাহার নিজের ভবলীলা সাঙ্গর উপক্রম অতি আশুই হইবে। সমাজ-বিধানে নিঃজাতিরা জাতির অন্ন-বস্ত্র বিধান, রক্ষণ-পােষণটাই কেবল করবেন আর ধনবলে মদমত্ত ধনিক বা উচ্চবর্ণের কেবল দণ্ডবিধান এবং মাথার-'ঘাম-পায়ে-ফেলাটাই আদায় করিবেন- ইহা অন্যায্য এবং অসঙ্গত। যে বলদ লাঙ্গল বহে তাহার স্বাস্থ্য ও দানাপানির ব্যবস্থা এবং বিশ্রামের কর্তব্যতা অস্বীকার করিলে গৃহস্থের কেবল অলক্ষ্মী লাভই হইবে। ধর্মশাল, বুদ্ধিমান চাষীর গাভী নিত্য পূজা পাইয়াই মাতার ন্যায় কল্যাণ হয়। উচ্চবর্ণ যদি নির্ণের প্রভু হন তবে নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণের প্রভু-পালক-পিতা। তাঁহাদিগের শ্রমলব্ধ বিত্তেই উচ্চবর্ণের ধনাগম। মা লক্ষ্মীর আন যে ধানের সেরে সে ধান চাষার কোল ভরিয়াই জন্মে তাহার মাথার ঘামে রস পাইয়া। সমগ্র .১৬ জাতি কথা জাতির দেহে বল সঞ্চয় ও রসায়ন করিতে হইলে শিল্পী হস্তপদাদিকেও তাহাদিগের প্রাপ্য বলি, পূজা ও নমস্কার দিতে হইবে। সমাজ-যন্ত্রের দুই এক চক্রে চক্রান্ত করিয়া কেবল তৈল মর্দন করিতে থাকিলে, অন্যান্য চক্রগুলি তৈলাভাবে মরিচাযুক্ত ও জীর্ণ হইয়া পড়িবে। ইহার পরিণাম সমগ্র যন্ত্রটাই অচলতা ও বিকলতা। ভারত-হিন্দু-সমাজ-যন্ত্রের অধঃপতন শুরু হইয়াছে, সেই কুক্ষণ হইতে, সেই ‘কাল বেলা হইতে যখন অভিজাত ব্রাহ্মণেরা বিধিনিষেধের জটিল জালে মূৰ্থ কৈবর্তের ন্যায় জলাশয়ের সমস্ত মৎস্যই শিকার করিয়া তাহাদিগকে ওঁ গর্তের পঙ্কিল ডােবায় জিয়াইয়া রাখিয়াছেন। নবীন তৃণের তৃষাহরা বর্ষাকাবের বিপুল ধারা যখন অজস্র নামিয়াছে তখন এই নিখিল বন্যায়, হে মূখ ব্রাহ্মণ জালিক, উহাদিগকে মুক্ত করিয়া দাও। বর্ষাশেষে উহারা আপনিই তােমার • জলাশয় পূর্ণ করিয়া বিরাজমান থাকিবে। কিছুকাল শাস্ত্রমতেও মৎস্য ভক্ষণে বিরত থাকিলে (যথা কার্তিক, মাঘ, চৈত্র, বৈশাখ, আষাঢ় মাসে) পরিণামে মৎস্য বংশের বৃদ্ধিতে তাহাদিগেরও লাভ, তােমারও লােলুপ সনার লাভ। মহাখ ভােগীরা ভােগের মর্ম জানে না। প্রচুর ভােগ করিতে হইলেও যে যােগের দরকার, অজস্র ব্যয় করিতে হইলেও যে প্রচুর সঞ্চয়ের প্রয়ােজন তাহা অটুট সত্য সর্বনৈতিক দিক দিয়াই। নিম্নস্তরের সুদৃঢ় শক্তির উপরই উচ্চস্তরের গঠিত গিরিশৃঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হইয়া অভ্রংলিহ হইবার স্পর্ধা রাখে। দাম্ভিক গিরিশিখর যদি পর্বত- কোলকে অবহেলা করিয়াই বাড়িতে থাকে তবে তাহার শেষ-শয্যা পৰ্ব্বতের প্রদেশেই রচিত হইবে। সমাজের এই স্তর বিভাগ রচনা শুণ, কৰ্ম্ম ও ধর্মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রচলিত না হইলে তাহা ভেদ জাতি কথা ১৭ বিবাদ বৈষম্যের মৃত্যুলীলাই প্রকট করিবে। এই তথ্য বা রহস্য অবগত হইয়াই সমাজতান্ত্রিককে সমাজ-যন্ত্র চনা করিতে হইবে। সমাজের নিম্নস্তরই দাবা খেলার ‘ব’ড়ে বা পদাতিক। যে রাজার পদাতিক বা সাধারণ সৈন্য যত শক্তিশালী, কৌশলী এবং বহুল, বিজয়লক্ষ্মী সেই রাজারই অঙ্কশায়িনী। প্রজাশক্তির উপরই রাজশক্তির দুর্ভেদ্য দুর্গ প্রতিষ্ঠিত। শূদ্র-শক্তির উপরই উচ্চবর্ণের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত। এই পদাতিক বা প্রজাশক্তিই শূদ্রশক্তি। মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্যে সমাজ হয় না। সমাজ’ অর্থ সমুহ বা গণ। নিম্নবর্ণেরাই এই সমূহ বা গণ। এই বিশাল সমাজকে হীন, দুৰ্বল, পদানত করিয়া সমাজপতি ব্রাহ্মণ দিগের সম্মানও যে জগৎসভায় ক্ষুঃ ও-ক্ষীণ হইয়াছে তাহা কি তঁাহার। দেখিয়া ও দেখিতেছেন না? পারিবারিক নাবালকত্ব, নিম্নত্ব আঠার বৎসরের গণ্ডী পার হইলেই শেষ হয় আর সাম্প্রদায়িক নাবালকত্ব বা নিম্নত্ব, রাজনৈতিক নাবালকত্ব বা দাসত্বের ন্যায় কি চিরকাল অখণ্ড, অব্যয়, অক্ষয় হইয়া থাকিবে কেবল গুড় যুক্তির { Argumentum ad baculinum) বলেই ? শুদ্র নাবালককে সাবালক না করিলে সাবালক অশূদ্র সংখ্যা যে শূঙ্গে বিলীন হইবে ক্ৰমশঃ কমিতে কমিতে! তাই শূদ্রশক্তির অভ্যুথানই তরুণ ভারতের সমাজ সংগঠন। শূদ্ররূপী অধিকাংশ জনগণের ব্রাহ্মণত্ব বিধানই সমাজের ব্ৰহ্মত্ব বা বৃহত্ব বিধান। হিন্দুর সহিত মুসলমানের সংঘর্ষ যখন মহামূর্থ দুই জাতিই চালাইতেছে, তখন মুসলমানের সহিত সংঘর্ষে হিন্দুর টিকিয়া থাকিতে হইলে এই নিম্নবর্ণের সাহায্যেই হইবে। উচ্চবর্ণেরা ভীরু, দুর্বল ও কাপুরুষ হইয়া ২ ১ জাতি কথা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় নামের অযােগ্য হইয়াছেন। ব্রাহ্মণ-বীৰ্য্য ও ক্ষাত্র- শক্তির প্রকাশ নিম্নবর্ণের মধ্যেই যাহা কিছু দেখা যায়। বর্তমান কালে ইহারাই প্রকৃত গুণে ও কর্মে ক্ষত্রিয়। নিম্নবর্ণের সহায়তা ব্যতিরেকে উচ্চবর্ণের বর্তমানে এরূপ ক্ষমতা নাই যে, দুর্ধর্ষ মুসলমান গুণ্ডার ( মহাত্মা গান্ধীর ভাষায় ''bullies”) নিৰ্যাতন হইতে তাহাদিগের জননী, ভগিনী, পত্নী, কন্যা প্রভৃতিকে রক্ষা করেন। নিম্নবকে এই ক্ষাত্ৰ মৰ্য্যাদা এখন না দিলে পরে দায়ে ঠেকিয়া দিতে হইবে। সামাজিক এই প্রয়ােজনেও শূদ্রশক্তিকে পাদ্য-অর্ঘ দিবার আহ্বান আসিয়াছে। (ঘ) ধর্মনৈতিক প্রয়ােজন। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রয়ােজন ধৰ্মনৈতিক প্রয়ােজনেও এই অচলায়তনের পাথুরে গণ্ডী ভাঙ্গিবার আবশ্যক হইয়াছে। অনাৰ্য-কন্যা উলুকীর গর্ভজাত মহর্ষি কণাদ তঁাহার বৈশেষিক দর্শনের প্রথম অধ্যায়ের প্রথমাহ্নিকে বলিয়াছেন ‘যতেহভুদয় নিঃশ্রেয়স সিদ্ধিঃ স ধৰ্ম্ম।” অর্থাৎ যাহা হইতে উন্নতি এবং মােক্ষাভ সিদ্ধ হয় তাহাই ধৰ্ম্ম। এই উন্নতি এবং দুঃখ হইতে আত্যন্তিকী নিবৃত্তি * ব্রাহ্মণদিগের যে এক চেটিয়া ব্যবসা বা monopoly হইতে পারে —ইহা ব্রাহ্মণেরাও স্বীকার করিবেন। ব্যষ্টি ও সমষ্টি উভয় দিক দিয়াই যখন এই উন্নতি এবং দুঃখ নিবৃত্তি জাতিকে আশ্রয় করে তখনই জাতির প্রকৃত কল্যাণ। ভারতের বহু ব্যক্তি ধৰ্ম্মরাজ্যের খুব উন্নতস্তরে প্রতিষ্ঠিত “নিঃশ্রেয়সত্যন্তিকী দুঃখ নিবৃত্তিঃ”-মহামহােপাধ্যায় শঙ্কর মিশ্রকৃত উলঙ্কারটাকা।' ।
জাতি কথা ১৯ হইলেও তাহার জন-সমষ্টির অবস্থা অতীব শশাচনীয়। ভারতের ধর্ম “বহুজন মুখায় বহুজন হিতায় আজকাল কোথায়? উপনিষদ ও বৌদ্ধযুগেই কেবল ভারতের ধর্ম বহুজন সুখ ও হিতসাধন করিয়াছিল। তাহার পরে শঙ্কর, রামানুজ, চৈতন্যদেব ভারতবাসীর ধর্মকে জনগণ কল্যাণ নিয়ােজিত করিলেও তাহা সমগ্র ভারত কল্যাণসাধন তত দীর্ঘকাল করিতে পারে নাই। শঙ্করাচাৰ্য্যদেব তাহার শারীরিক মীমাংসা ভাষের ১ অধ্যায় ৩য় পাদে বলিয়াছেন—“প্রাণিনাঞ্চ সুখ প্রাপ্তয়ে ধৰ্ম্মো বিধীয়তে।” অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর সুখ-প্রাপ্তির জন্যই ধর্মের বিধান। এত বড় বিরাট, মানব সমষ্টির সুখবিধান যে ধৰ্ম্ম করিতে পারে, তাহাই প্রকৃত ভূমার ধৰ্ম্ম, অন্য ধর্ম অল্প ধৰ্ম্ম। “য বৈভূমা তৎ সুখং নাল্পে সুখমন্তি”-ছান্দোগ্য উপনিষদের এই সুখ তাে অল্পের ভিতর নাই, তাহা ভূমা বা বৃহতের মধ্যেই। বৃহৎ ভারতের কল্যাণ সাধনই প্রকৃত ধৰ্ম্ম। গোঁড়া ব্রাহ্মণেরাও যে বলিয়া থাকেন “সৰ্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” (ছান্দোগ্য, ৩১৪১১) সেই সৰ্বের মধ্যে কি নিম্নবর্ণের, অস্পৃশ্য অনাচরণীয় জাতির স্থান নাই? এই সৰ্বের বেশীর ভাগটা যে উহারাই। ঈশােপনিষদ বলিতেছেন—“যস্তু সৰ্বাণি ভূতনি আত্মন্যেবাদুপশ্যতি। সৰ্ব্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপসতে!”—৬। অর্থাৎ যিনি আত্মাতে সৰ্ব্বভূত দেখেন এবং সৰ্ব্বভূতে আত্মাকে দেখেন, তিনি সেই কারণে কাহাকেও ঘৃণা করেন না। এই সৰ্ব্বভূতের মধ্যে কেবল কি ব্ৰহ্মণাদি ভূতেরাই আছেন ? শুদ্রকে সহস্র বিধি নিষেধের জঞ্জাল জালে নাগ পাশে বান্ধিয়াছেন যে মনু বা ভৃগুমুনি, অথবা তাহাদের নামের দোহাই দিয়া যে ব্রাহ্মণ সেই তিনিই বলিতেছেন—“সৰ্ব্বভূতেষু চাত্মানং সৰ্ব্ব- ২০ জাতি, কথা ভূতানি চাত্মনি। সমং পশ্যাত্মজী স্বরাজমধিগচ্ছতি। যথোপি কৰ্ম্মাণি পরিহায় দ্বিজোত্তম। আত্মজ্ঞানে শমে চ স্যাদোভ্যাসে চ যত্নবান্। এতদ্ধি জন্মসাফল্যং ব্রাহ্মণস্য বিশেষতঃ। প্রাপৈতং কৃতকৃত্যো হি দ্বিজ ভবতি নাথা।”—মনুসংহিতা ১২৯১-৯৩। অর্থাৎ আত্ম- যাজী সকল ভূতে আত্মাকে সমভাবে দেখিয়া এবং আত্মাতে সৰ্ব্বভূতের অবস্থিতি জানিয়া স্বরাজ্য লাভ করেন। দ্বিজশ্রেষ্ঠ শান্ত্রোক্ত যাবৎ কৰ্ম্ম- ত্যাগ করিয়াও আত্মজ্ঞান, ইন্দ্রিয়জয় এবং বেদাভ্যাসের জন্য যত্ন করিবেন। অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত ত্যাগ করা ভাল, তবু আত্মজ্ঞানাদিতে অযত্ন করা ভাল নয়। আত্মজ্ঞানাদিই মুক্তির প্রধান উপায়। এই সকলই দ্বিজাতির বিশেষতঃ ব্রাহ্মণের জন্ম-সাফল্যের শীভূত; অন্য লাভে দ্বিজের কৃতকৃত্যতা নাই। পরন্তু এই আত্মজ্ঞান লাভেই তিনি কৃতকৃত্য হন। প্রতি মানবে, সৰ্ব্বভূতেই আত্মা আছেন, ইহা যিনি সত্যসত্যই দেখেন, তিনিই ধৰ্মনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বরাজও লাভ করিবার যােগ্য হন। এই স্বরাজ বা ব্ৰহ্মত্ব লাভের পথে, শান্ত্রের সমস্ত বিধি নিষেধ অন্তরায় হইলে তাহ দূর করিতে মনুমহারাজই উপদেশ দিলেন। ব্রাহ্মণ ! বিজ! নিম্ন- বর্ণের প্রতি ব্যক্তিতে যদি তুমি ব্ৰহ্ম বা আত্মাকে দেখিতে না পার, তবে তুমি ব্রাহ্মণ, দ্বিজ নহ। ব্রাহ্মণ! নিম্নবর্ণের প্রতিব্যক্তিতে, সর্বভূতে এই আত্মদর্শন ভুলিয়াই আজ তােমার এত শােক, এত দুঃখ, এত দুর্গতি বাহজগতের দিক দিয়াও। গীতাও বলিতেছেন-“বিদ্যা বিনয় সম্পয়ে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি। শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতঃ সমদর্শিন-১৮; ব্ৰহ্মপুরাণ, ২৩৬২৯। পণ্ডিতেরা বিদ্যা বিন সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাে, হস্তী, কুকুর ও চণ্ডালে সমদর্শী। যাহারা উচ্চবর্ণে নিম্নবর্ণে, পৃশ্য, অস্পৃশ্যে জাতি কথা সমদর্শন করিতে না পারেন, তাঁহারা যেন পণ্ডিত বলিয়া বড়াই করেন না; তাঁহারা যেন মূখতালিকা ভুক্ত হন। ঠোপনিষদ ষষ্ঠী বল্লীতে বলিতেছেন -“ইন্দ্রিয়েভ পরং মনো মনসঃ সত্ত্বমুত্তমম্। সত্ত্বাধি মহাত্মা মহতাে- হব্যক্তমুত্তমম্ ॥ ৭। অব্যক্তা, পরঃ পুরুষাে ব্যাপকোহলি এব চ। যং জ্ঞাত্বা মুচ্যতে অমৃতত্বঞ্চ গচ্ছতি ॥ ৮। অর্থাৎ-ইন্দ্রিয় সমূহ হইতে মন শ্রেষ্ঠ, মন হইতে অহঙ্কার শ্রেষ্ঠ, অহঙ্কার হইতে মহদাদি বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ এবং মহৎ হইতে অব্যক্ত প্রকৃতি শ্রেষ্ঠ। অব্যক্ত হইতে ব্যাপক এবং অশরীর পুরুষ শ্রেষ্ঠ, যাহাকে জানিয়া জীব মুক্ত হয় ও অমৃতত্ব পায়। এই ইন্দ্রিয়, মন, অহংকার, বুদ্ধি ও পুরুষ বা আত্মাসম্পন্ন জন্তু কি কেবল ব্রাহ্মণাদি উচ্চবর্ণের? বেদ, উপনিষাংখ্য, যােগ, বেদান্তাদি শাস্ত্র মুক্তির এই মহামন্ত্র উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সকলকেই দিয়াছেন। বহুজনের, জনগণের সুখ শান্তি বিধান এই মহাধর্মসাধনাতেই। ধর্মযুগে, সত্যযুগে, উপনিষদঘুগে, বৌদ্ধযুগে ইহা ভারতে সাধিত হইয়াছিল। বহুজন সুখকর, বহুজন হিতকর এই letilitarianism' বা “The greatest happiness of the greatest number,' ভারতবাসী! তােমাদেরই নিজস্ব ধন ! যীশুখৃষ্টের জন্মের ছয়শত বৎসর পূর্বেও আগৌতম বুদ্ধদেব বলিতেছেন –“চরথ ভিক্ষবে চারিকং বহুজন হিতায় বহুজন-মুখায় লােকানুকম্পায় অস্থায় হিতায় সুখায় দেবম-স্নান।” সংযুক্ত নিকায়, ৪|১৫| অর্থাৎ হে ভিক্ষুগণ, তােমরা দেবমনুষদিগের অর্থ, হিত ও সুখের নিমিত্ত বহুজন হিতার্থে বহুজন সুখার্থে, লােকানুকম্পার জয় চৰ্য্যায় চরণ কর। ইটালীয় দার্শনিক বেকারিয়া (Beccaria) পাশ্চাত্যে ইহার পরিকল্পনা করিলে পর বেথাম ও মিল (Jeremy ।
জাতি কথা Bentham ও John Stuart Mill) তাহাকে বিগ্রহবা করেন এবং . হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer) তাহাতে উচ্চভাবের ব্যঞ্জনা দান করেন। পাশ্চাত্য জগতে যে ধৰ্ম্মনৈতিক তত্ত্ব রাজনৈতিক আসরে আনিয়া জনগণের বা mass এর কল্যাণসাধন করিতেছেন, হে ব্রাহ্মণ, হে উচ্চবর্ণ, তােমরা সেই তত্ত্বকে ‘অচলায়তনের’ গণ্ডীর মধ্যে, অব্যবহৃত পুথির পাতার মধ্যে না রাখিয়া বিশ্বের উদার আসরে নামাইয়া দাও। তাহাতে ভারতেরও কল্যাণ, জগতেরও কল্যাণ। বিশ্বহিতে বিশ্বহােরই প্রয়ােজন। ব্রাহ্মণ, সমস্ত জাতির ব্রহ্মত্ববিধানে তুমি যদি সেই বিশ্বােেতা ব্ৰহ্মযাজক স্বরাজী ব্রাহ্মণ হইতে না পার তবে তােমার আসন অন্যে দখল করিবে। তােমরা যে শন্ত্রের দোহাই দিয়া থাক সেই শান্তই নিম্নবর্ণের স্বপক্ষে জাতিভেদের সংকীর্ণ মতের বিপক্ষে বহু ‘ভােট দিয়াছেন। ধৰ্ম্মবস্তুটী কতকগুলি মতবাদরূপ খােসাভূষার জঞ্জাল নহে। ধর্ম চিরদিন সারবস্তুকে দেশ, কাল ও পাত্র অনুযায়ী ব্যবস্থাবেশে সজ্জিত করিয়া থাকে। বর্তমান দেশ, কাল ও পাত্রানুযায়ী ধৰ্ম্মদেবতাকেও ‘নবকলেবর ধারণ করিতে হইবে। দেশের বর্তমান প্রয়ােজনও এই নববেশ চাহে। এক সময়ে যে বেশ উজ্জ্বল, মনােহারী ও প্রয়োজনীয় ছিল, তাহাই কালে মলিন, অশোভন, ও নিষ্প্রয়ােজনীয় হয়। তখনই নববেশের প্রয়ােজন। আমাদিগের সারগর্ভ ন্যায় যুক্তি ও তাহাই উপপাদন করে। ৫) যুক্তিযুক্ত শাস্ত্রমতই গ্রহণীয়। এখন দেখা যাউক শাস্ত্রীয় বচন এই জাতিভেদের সংকীর্ণতা ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে কিরূপ আদেশ ও নির্দেশ করেন। অবশ্য এই শাস্ত্র সম্বন্ধেও জাতি কথা ২ নানা মুনির নানা মত। “তর্কোহপ্রতিষ্ঠা তয়ো বিভিন্ন নৈকো ঋষষস্থ অতং প্রমাণম্। ধৰ্ম্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনে যেন গতঃ স পন্থঃ ॥”—মহাভারত, বনপর্ব, ৩১২১১৭। অর্থাৎ:-তর্ক অপ্রতিষ্ঠ; তিসকল বিভিন্ন ; ঋষ একজন নহেন যে তাহার মতই প্রমাণ ; ধর্মের তত্ত্ব গুহায় নিহিত অর্থাৎ নিগূঢ় ; অতএব মহাজন যে পথে গিয়াছেন, সেই পথই পথ। আমরা শাস্ত্রের মধ্যে যে সব শাস্ত্র মহাজন, তাহাদের মতই গ্রহণ করিব এবং ধৰ্ম্মরূপ আচরণে যাহারা মহাজন তাঁহাদের মতও গ্রহণ করিব। কুটিল তর্কের স্থিত না থাকিলে ও ন্যায়সঙ্গত যুক্তি বিচার দ্বারাই আমাদিগকে শাস্ত্র-মৰ্ম্ম উদঘাটন করিতে হইবে। শাস্ত্রের মধ্যে যাহা যুক্তিপূর্ণ তাহাই গ্রাহ। “কেবলং শাস্ত্রমাশ্ৰিত্য ন কর্তব্যে বিনির্ণয়ঃ। যুক্তিহীন বিচারে তু ধৰ্ম্মহানিঃ প্ৰজায়তে ।”-(মনুসংহিতা ১২ ১১৩ শ্লোকের টীকায় কুলুকটুত বৃহস্পতি বচন।) কেবল শাস্ত্র আশ্রয় করিয়া কর্তব্য বিনির্ণয় করিবে না। কারণ যুক্তিহীন বিচারে ধৰ্ম্মহানি হইয়া থাকে। যােগবাশিষ্ঠ বলিয়াছেন—“বিচারাৎ তীক্ষ্ণতামেত্য ধীঃ পশ্যতি পরং পদং। দীর্ঘসংসারবােগ বিচার হি মহৌষধ।” বােগবাশিষ্ঠ, মুঃ ১৪২। অর্থাৎ:-বিচার দ্বারা তীক্ষ্ণতা লাভ করিয়া বুদ্ধি পরম পদ দর্শন করে। বিচারই দীর্ঘসংসার রােগের মহৌষধ। যােগবাশিষ্ঠ আরও বলিতেছেন—“বরং কর্দম ভেকত্বং মলকীটতা বরং বরমন্ধগুহাহিতত্বং ন নস্যাবিচারতা। -যােত বাঃ, মুঃ ১৪ ৪৬। অর্থাৎ কর্দমতেকত্ব, মলকীটতা, এবং অন্ধগুহায় থাকা বরং ভাল তথাপি নরের বিচার-শূন্যতা ভাল নহে। সুতরাং আমরা যুক্তিপূর্ণ বিখ্যাত সৎশাস্ত্রই গ্রহণ করিব এবং মহাজনের পথ অনুসরণ করিব।
২৪ জাতি কথা (৬) শাস্ত্রের সাম্যবাদ। যাহারা চরিত্রে ও ধৰ্ম্মে সমুন্নত, যাহারা ব্ৰহ্মবিদ্যার, আত্মজ্ঞানের অধিকারী, যাহার। ব্রহ্মচারী, সন্ত্রাসী, সাধু, ভক্ত, পণ্ডিত, তাহাদিগের ভিতর যে জাতিভেদের ও অস্পৃশ্যতার বন্ধন নাই, তাহ। প্রায় অধিকাংশ শান্ত্রই এবং সাধুমহাপুরুষেরা প্রচার করিয়াছেন। শাস্ত্রে দেখিতে পাই নিম্নবর্ণে বা নীচকুলে জন্মিয়াও অনেকে ব্রাহ্মণ, ঋষি, সাধু, মহাপুরুষ, ভক্ত বলিয়া গণ্য হইয়াছেন। শাস্ত্রকারগণ এ বিষয়ে যথেষ্ট বিধি দিয়াছেন। সৃষ্টির আদিতে বর্ণভেদ বা জাতিভেদ ছিল না; সকলেই ব্রাহ্মণ বা সমবর্ণের ছি।ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র যে একই পিতামাতা সম্ভত তাহা রামায়ণ ও বলিতেছেন। “মহাত্মা কশ্যপের অন্যতর পত্নী মনু, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই সকল মনুষ্য প্রসব করেন।”—বাল্মীকি রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড ১৪ সর্গ। মহাভারতে ও পদ্মপুরাণে আছে -“ন বিশেষাে- হস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রহ্মমিদং জগত। ব্ৰহ্মণা পূৰ্ব্বসৃষ্টং হি কৰ্ম্মভির্ণতাং গত ।”—মহাভারত, শান্তিপৰ্ব্ব মােক্ষধৰ্ম্মপর্ব, ১৮৮১ ০ ও পদ্মপুরাণ, স্বর্ণখণ্ড, ২৫। অর্থাৎ-ইহলোকে বস্তুতঃ বর্ণের ইতর বিশেষ নাই। সমুদয় জগত ব্রাহ্মণময়। মনুষ্যগণ পূৰ্বে ব্রহ্মা হইতে সৃষ্ট হইয়া ক্ৰমে ক্ৰমে কাৰ্য্য দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে পরিগণিত হইয়াছে। @মদ্ভাগবত আরও বলিতেছেন :-“যস্ত বল্লক্ষণং প্রােক্তংপুংসাে বভিব্যঞ্জক। যুদন্যত্রাপি দৃশ্যেত তত্তেনৈব বিনির্দিশেৎ, পঞ্চলক্ষণ সম্পন্ন ইদৃশীয়াে ভবেদুিজ। তমহং ব্রাহ্মণং ক্ৰয়া শেষ। শূদ্রাঃ যুধিষ্ঠির।” শ্রীমদ্ভাগবত, ৭১১৩৫-৩৬। অর্থাৎ কোন বর্ণ-বিশেষের লক্ষণাদি যদি অন্য বর্ণের ব্যক্তিতে দৃষ্ট হয় তবে তাহাকে সেই বর্ণেরই নির্দেশ জাতি কথা ' করিবে। হে যুধিষ্ঠির, এইরূপ পঞ্চাক্ষণ এইরূপ পঞ্চলক্ষণ সম্পন্ন ব্যক্তিরা ব্রাহ্মণ, অন্য সকলে শূদ্র। এই বচন অনুসারে অনেক ব্রাহ্মণকেই শূদ্র হইতে হয়, অনেক শূদ্রই ব্রাহ্মণ হন। Categoria ( Max Mullar ) বলেন বৃবু নামক এক সূত্রধর বংশ কাৰ্য বা ধৰ্ম্মগুণে ঋত্বিক হইয়াছিলেন। তাঁহারা ভরদ্বাজ ঋসির অনেক সহায়তা করিয়াছিলেন। [ Vide Chips from a German workshop, vol. II ( 1867 ),. p. 188. ] ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের ১১২ সূক্তের ৩য় ঋকে স্তোত্রকারের ( ব্রাহ্মণের) পুত্রকে ভিষক বা চিকিৎসকরূপে পাওয়া যায় এবং কন্যাকে ময়দাওয়ালীর নিম্নকার্যে নিযুক্ত দেখা যায়। কারুরহং ততে। ভিষগুপন প্রক্ষিণী ননা। নানা ধিয়াে•••••* ইত্যাদি। “দেখ আমি স্তোত্রকার, পুত্র চিকিৎসক ও কন্যা প্রস্তরের উপর যব অর্জনকারিণী। আমরা সকলে ভিন্ন ভিন্ন কৰ্ম্ম করিতেছি।”-রমেশ দত্তের অনুবাদ। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৭১ সুক্তে পাওয়া যায় যে ধৰ্ম্মক্রিয়াদি সাধনে অসমর্থ ব্যক্তিরা কৃষক বা তন্তুবায় হইতেন। যথাঃ-ইমে যে নাৰ্বাঙ ন পরশ্চরংতি ন ব্রাহ্মণ সে ন সুতে কাসঃ। ত এতে বাচমভিপদ্য পাপ। সিবী শুংত্রং তন্বতে অপ্ৰজজ্ঞয়ঃ ।*--ঋগ্বেদ ১০৭১৯ অর্থাৎ এই যে সকল ব্যক্তি যাহারা ইহকাল বা পরকাল কিছুই পৰ্যালোচনা করেনা, যাহারা স্তুতি-প্ৰয়ােগ বা সােমবাগ কিছুই করে না, তাহারা থাপযুক্ত, অর্থাৎ দোষাশ্রিত ভাষা শিক্ষা করিয়া নির্বোধ ব্যক্তির ন্যায় কেবল লাঙ্গল চালনা করিবার উপযুক্ত হয়, অথবা তন্তুবায়ের কাৰ্য্য করিবার উপযুক্ত হয়।”—রমেশ দত্তের অনুবাদ। রমেশচন্দ্র দত্ত তাহার ঋগ্বেদের অষ্টম অষ্টকের ভূমিকায় (on Board the Nuddea.
জাতি কথা ৫ e forın London, 26th May' 1886 লিখিয়াছেন—“সমস্ত ঋগ্বেদের মধ্যে জাতি” বিভাগের কোনও নিদর্শন নাই। ঋগ্বেদ সংহিতার অন্যতম প্রকাশক জাৰ্ম্মাণ পণ্ডিত মােক্ষমূলার সাহেবও বলিয়াছেন—“If then, with all the documents before us, ask the question, does caste, as we find it in Manu and at the present day, part of the ancient religious teaching of the Vedas ? We can answer with a decided No. There is no authority whatever in the hymns of the the Veda for the Complicated system of castes, no authority for the offensive privileges claimed by the Brahmin, no authority for the degraded position of the Sudras. There is no law to prohibit the different classes of people from living together, from eating and drinking together; no law to prohibit the marriage of people belonging to different castes ; no law to brand the offspring of such marriages with an indelible stigma.-Max Muller's Chips from a German workshop, vol. II (1867), pp 307, 30৪. অর্থাৎ আমরা যে সমস্ত দলিল পাইয়াছি তাহাতে যদি আমরা জিজ্ঞাসা করি যে, মনুতে এবং বর্তমান কালে যে জাতি আছে, তাহা , কি বেদের অতি প্রাচীন ধৰ্ম্ম শিক্ষার অন্তর্গত । ইহার উত্তরে আমরা জাতি কথা ২৭ নিশ্চিত ‘না’ বলিতে পারি। বেদের স্তোত্র সমূহে জটিল জাতিভেদ প্রথার কোন রূপই প্রমাণ নাই; ব্রাহ্মণদিগের দাবীকৃত অসন্তুষ্টিকর অধিকারের কোনও বিধান নাই; শূদ্রদিগের হীন অবস্থার কোন প্রমাণ নাই; ভিন্ন ভিন্ন জাতির একত্র বাস, আহার ও পানাদির নিষেধক কোনও নিয়ম নাই। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের লােকদিগের মধ্যে বিবাহ নিষেধক কোনও আইন নাই। এইরূপ বিবাহের সন্ততিবর্গকে দুরপনেয় কলঙ্কে কলঙ্কিত করিবার কোনও বিধান নাই। শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতার অন্যতম প্রকাশক মিঃ ওয়েবারও (Mr. weber) বেদের সময়ের জাতি সম্বন্ধে বলেন -“There are no castes as yet ; the people is still one united whole, and bears but one name, that of Visas." Indian Literature ( Translation ), P. 38. অর্থাৎ:-তখনও জাতি সমূহ হয় নাই; তােক সমূহ তখন পর্যন্তও এক একত্রিত সমষ্টি এবং কেবল এক ‘বিশ’ নামেই ছিল। যজুৰ্বেদ বলেন যে, বেদে ব্রাহ্মণাদির ন্যায় শূদ্রেরও সমান অধিকার। যথাঃ-“যথেমাং বাচং কল্যাণীমবদানি জনেভ্যঃ। ব্রহ্মরাজন্যাভ্যাং শূদ্রীয় চাৰ্য্যায় চ স্বীয় চারণায়। শুক্ল যজুৰ্বেদ, মাধ্যদিনীয় শাখা, ২৬ অ, ২য় মন্ত্র। অর্থাৎ:-আমি যেরূপ এই কল্যাণ দায়িনী বেদবাণী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং অন্যান্য সকলকেই প্রদান করিয়াছি, তােমরাও তদ্রুপ প্রদান কর। শূদ্রের কেবল যে বেদে অধিকার আছে তাহা নহে, যে শূদ্র ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়াছেন, তাঁহাকে ব্রাহ্মণত্ব দিতেও শাস্ত্ৰ কুষ্ঠিত হন নাই। জন্ম, জাতি, বর্ণ, দেহাদি যে ব্রাহ্মণ নহে তাহাও. শাস্ত্র বহুস্থলে বলিয়াছেন। প্রকৃত ব্রাহ্মণ কাহাকে বলে, তাহা বজ্র 'সূচিকোপনিষদ্ জ্বলন্ত ভাষায় ২৮ জাতি কথা পরিস্কার ব্যক্ত করিয়াছেন। যুক্তিযুক্ত শ্রুতিবাক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলিয়া ইহার সমগ্ৰটাই উদ্ধৃত করিলাম। এই ব্রাহ্মণত্বের মাপকাঠিতে জাতিভেদ ‘বর্ণভেদ তিরােহিত হইয়াছে। “যজজ্ঞানা যান্তি “জজ্ঞানদ যান্তি মুনয়াে ব্রাহ্মণ্যং পরমাদ্ভূত। তৎত্রৈপদ ব্ৰহ্মতত্ত্বমহমশ্মীতি চিন্তয়ে । ১। ও আপ্যায়তি শান্তিঃ। চিৎসদানন্দ রূপায় সর্বধী বৃত্তিসাক্ষিণে। নমো বেদান্তবদ্যায় ব্ৰহ্মণেহনরূপিনে। ও জুসূচীং প্রবক্ষ্যামি শামজ্ঞানভেদনম্। দূষণং জ্ঞানহীনানাং ভূষণং জ্ঞানচক্ষুযাম্। ১। ব্ৰহ্ম ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র। ইতি চত্বরে বর্ণাস্তেষাং বর্ণানাং ব্রাহ্মণ এব প্রধান ইতি বেদ বচনানুরূপং স্মৃতি- ভিরপুক্ত। তত্র চোদ্যমন্তি কে বা ব্রাহ্মণ নাম কিং জীবঃ কিং দেহঃ কিং জাতিঃ কিং জ্ঞান কিং কৰ্ম্ম কিং ধার্মিক ইতি। তত্র প্রথমােজীব ব্রাহ্মণ ইতি চেন্ন অতীতানাগতানেক দেহানাং জীবস্যৈকরূপ তাৎ একস্থাপি কৰ্ম্মবশাদনেক দেহসং ভবাৎ সর্বশরীরাণাং জীবস্যৈকরূপবাচ্চ। তস্ময় জীবে ব্রাহ্মণ ইতি। ত িদেহে ব্রাহ্মণ ইতি চেন্ন আচাণ্ডালাদি পর্যন্তণাং মনুষ্যণীং পাঞ্চভৌতিকত্বেন দেহস্যৈকরূপজ্জরামরণ ধৰ্মধৰ্ম্মাদি সামৰ্শনা ব্রাহ্মণ শ্বেতবর্ণ ক্ষত্রিয়াে রক্তবর্ণো বৈশঃ পীতবর্ণ ঐশূঃ কৃষ্ণবর্ণ ইতি ইতি নিয়মাবাৎ। পিত্রাদি শরীর দহনে পল্লাদীনাং ব্ৰহ্মহত্যাদি দোষসংভবাচ্চ। তম্মা দেহ ব্ৰাহ্মণ ইতি। তহি জাতি ব্রাহ্মণ ইতি চেত্তন্ন তত্র অত্যন্তর ধনেক জাতি সংভবা মহর্ষয়াে বহবঃসন্তি । ঋষ্যশৃঙ্গোমৃগঃ কৌশিক: কুশাৎ। জাম্বুকো জম্বুকাৎ। বাল্মীকে বল্মীকাৎ। ব্যাসঃ কৈবর্তকলকায়। শশপৃষ্ঠাৎ গৌতমঃ। বশিষ্ঠ উর্বশ্যাম্। অগস্ত্য কলশেজাত ইতি তত্বাৎ। এতেষাং জাত্যা বিনাপ্যগ্রে জ্ঞান প্রতিপাদিত ঋষয়েবহবঃ সন্তি। তম্ময় জাতি ব্রাহ্মণ ॥
জাতি কথা ২১ ইতি ॥ তহিঁ জ্ঞানং ব্রাহ্মণ ইতি চেত্তন্ন ক্ষত্রিয়াদয়ােহপি পরমার্থদর্শিনাে- হভিজ্ঞা বহবঃ সস্তি। তম্মন্ন জ্ঞানং ব্রাহ্মণ ইতি । তহি কৰ্ম্ম ব্রাহ্মণ ইতি চেত্তন্ন সর্বেষাং প্রাণিনাং প্রাসংচিতাগামি কর্মসাধ্যদর্শনাৎ কৰ্মাতি- প্রেরিতাঃ সন্তো জনাঃ ক্রিয়াঃ কুন্তীতি তম্ময় কৰ্ম্ম ব্রাহ্মণ ইতি। তহি ধার্মিকে ব্রাহ্মণ ইতি চেত্ত ক্ষত্রিয়াদয়ো হিরণ্যদাতারে বহবঃ সন্তি। তন্ন ধার্মিকে ব্রাহ্মণ ইতি । তহিঁ কে বা ব্রাহ্মণে নামঃ। যঃ কশ্চি- দাত্মানমন্দ্বিতীয়ং জাতিগুণক্রিয়াহীনং যড়ৰ্ম্মিষড়ভাবেত্যাদি সৰ্ব্বদোষরহিতং সত্যজ্ঞানানন্দানন্তস্বরূপং স্বয়ং নির্বিকল্পমশ্যে কল্পাধারমশেষ ভূতান্তর্যামিনে বর্তমানমন্তবহিশ্চাকাশ বদনুস্তম-খণ্ডাৰস্বভাব প্রমেয়মনুর্ভবেকবে পরােক্ষতয়াভাসমানং করতামলকবৎ সাক্ষাদপরােক্ষী কৃত্য কৃতার্থতা কামরাগাদি দোষ রহিত শম দমাদি সংগমে মাৎসৰ্য্য তৃষ্ণাশা মােহদি রহিতাে দম্ভাহংকারাদিতি- রসংশৃষ্ঠচেতা বৰ্ত্ততে। এবমুক্তলক্ষণাে চ স এব ব্রাহ্মণ ইতি শ্রুতিস্মৃতি পুরাণেতিহাসানামভিপ্রায়। অন্যথা হি ব্রাহ্মণত্ব সিদ্ধি ন স্তেব। সচ্চিদানন্দমাত্মানমন্বিতীয়ং ব্রহ্ম ভাবয়েদাত্মানং সচ্চিদানন্দং ব্রহ্ম ভাবয়ে দিত্যুপনিষৎ । ও আপ্যায়ভৃিতি শান্তিঃ।” অর্থাৎ-মুনিরা যাহার জ্ঞান হইতে পরমাদ্ভূত ব্রাহ্মণ্য প্রাপ্ত হন সেই ত্রিপদ (সত্য জ্ঞান অনন্ত) ব্ৰহ্ম তত্ত্বই ‘আমি’ ইহা চিন্তা করি। চিপ, সদানন্দরূপ, সর্বজ্ঞানবৃত্তির সাক্ষী, বেদান্তবদ্য অনন্ত-রূপ ব্ৰহ্মকে নমস্কার। জ্ঞানহীনদিগের দূষণ স্বরূপ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভূণ স্বরূপ এবং অজ্ঞান-ভেদক বজ্ৰী নামক শাস্ত্র বলিতেছে—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণ; তন্মধ্যে ব্রাহ্মণই প্রধান ইহা বেদোক্ত বচনের অনুরূপ এবং স্মৃতিতেও উক্ত জাতি কথা হইয়াছে। ইহাতে এই প্রশ্ন উঠে যে কে ব্রাহ্মণ ? জীব কি ব্রাহ্মণ ? অথবা দেহ? বা জাতি বা জন্ম? বা জ্ঞান ? কিংবা কৰ্ম্ম ? কিংবা ধার্মিকই ব্রাহ্মণ। তন্মধ্যে প্রথমতঃ যদি বল যে জীবই (অন্তরাত্মা) ব্রাহ্মণ ; না তাহা নহে, কারণ অতীত এবং অনাগত বহু দেহাশ্রিত জীব একই থাকে এবং সেই এক জীবেরই কৰ্ম্ম হেতু অনেক প্রকার (ব্রাহ্মণেতর) দেহ উৎপন্ন হয় বলিয়া সেই নানা বিধ শরীরস্থ জীব একই থাকে; অতএব জীব ব্রাহ্মণ নহে। তবে কি দেহই ব্রাহ্মণ ? না, কারণ (ব্রাহ্মণ হইতে) চণ্ডালাদি জাতি পর্যন্ত সমস্ত মনুষ্য দেহই পঞ্চভূতের দ্বারা নিৰ্ম্মিত বলিয়া তাহারা এক জাতীয় বলিয়া এবং সকলেরই জরা মরণাদি ধর্মাধর্মাদি সমধৰ্মক বলিয়া এবং ব্রাহ্মণ শ্বেতবর্ণ, ক্ষত্রিয় রক্তবর্ণ, বৈশ্য পীতবর্ণ এবং শূদ্র কৃষ্ণবর্ণ এরূপ কোন (দৈহিক ভেদজ্ঞাপক) নিয়ম নাই বলিয়া। পরন্তু (ব্রাহ্মণ) পিত্রাদির শরীর দাহন করার জন্য পুত্রের ব্ৰহ্মহত্যা পাপও সম্ভব হয় ; অতএব দেহ ব্ৰাহ্মণ নহে। তবে কি জাতি ব্রাহ্মণ ? না, কারণ পশু আদি অন্য অনেক জাতি হইতে সম্ভত বহু মহর্ষি আদি হইয়াছেন, যেমন ঋষ্যশৃঙ্গ মৃগী হইতে, কৌশিক কুশ হইতে, জাম্বুক শৃগাল হইতে, বাল্মীকি বল্মীক হইতে, ব্যাস কৈবর্ত কুমারী হইতে, গৌতম শশপৃষ্ঠ হইতে, বশিষ্ঠ উৰ্বশী হইতে, অগস্ত্য কলসে জাত। ইহাদের জাতি না থাকিলেও অগ্রে আনযুক্ত বহু ঋষি হইয়া গিয়াছেন; অতএব জাতি ব্রাহ্মণ নহে। যদি বল জ্ঞানই ব্রাহ্মণ, না কারণ পরমার্থ জ্ঞান সম্পন্ন বহু ক্ষত্রিয়াদি আছেন; অতএব জ্ঞান ব্রাহ্মণ নহে। তবে কি কৰ্ম্ম ব্রাহ্মণ? না, কারণ সমস্ত প্রাণীদেরই প্রারব্ধ, সঞ্চিত ও আগামী কর্মের সাধ (এই সাধারণ নিয়ম) দেখা যায় এবং সেই কর্মের দ্বারা প্রেরিত জাতি কথা হইয়াই (কর্ম সংস্কার বশেই) সকলে কৰ্ম্ম করিতে থাকে (অর্থাৎ কর্মের এমন ভেদ দেখা যায় না যারা ব্রাহ্মণ বলিয়া কাহাকেও পৃথক করা যায়) ; অতএব কৰ্ম্ম ব্রাহ্মণ নহে। তবে কি ধাৰ্ম্মিকই ব্রাহ্মণ ? না তাহা নহে, কারণ ক্ষত্রিয়াদি বহু ধনদা ধার্মিক আছেন; অতএব ধাৰ্মিক ব্রাহ্মণ নহে। তবে ব্রাহ্মণ কে ? যিনি আত্মাকে বা গ্রহীতাকে (সর্বেশ্বরূপ সত্ত্ব প্রধান বিশ্বাত্ম অক্ষর ব্রহ্মের মত) অদ্বিতীয়, জাতিগুণ ক্রিয়াহীন, বড়ম্মি (ক্ষুধা, পিপাসা, শো, মােহ, জরা, মৃত্যু) ষড়ভাব বিকার ইত্যাদি সর্বদোষরহিত ; সত্য জ্ঞান-অনল-অনন্ত-স্বরূপ স্বয়ং বিকল্পহীন কিন্তু শ্যে বিকল্প আদির আধার (বা গ্রহীতা) সৰ্বজীবের অন্তৰ্য্যাশীরূপে বর্তমান, অন্তর্বাহ সৰ্বত্ৰ আকাশবৎ অনুষ্যত, অখণ্ডনস্বভাব, অপ্রমেয়, অনুভবের দ্বারাই, (যাহার অস্তিত্ব) বেদ্য । করলামলবৎ সাক্ষাৎ অপবােক্ষ করিয়া সেই আত্মাকে অপরােক্ষরূপে ভাসমান করিয়াছেন, যিনি কৃতার্থত্বহেতু কামরাগাদি দোষহীন, শমমাদি সম্পন্ন, যিনি ভাব (চিত্তবিকার) মাৎসর্য্য তৃষ্ণা, আশা, মােহ আদি রহিত, বিনি দম্ভ, অহংকারাদির দ্বারা অস্পৃষ্ট চিত্তযুক্ত হইয়াছেন, তিনিই তিস্মৃতি পুরাণ-ইতিহাসের অভিপ্রেত ব্রাহ্মণ; অন্যথা ব্রাহ্মণত্ব সিদ্ধ হয় না। নিজেকে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মভাবনা করিবে, নিজেকে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম ( অক্ষর ব্ৰহ্ম) ভাবনা করিবে। ইতি উপনিষৎ। ও আপ্যায়ন্তু মমাঙ্গানি ইত্যাদি শান্তিপাঠ। এইরূপ বিশিষ্ট গুণ এবং বিশিষ্ট কৰ্ম্ম ও ধৰ্ম্ম দ্বারা প্রকৃত ব্রাহ্মণ হয়। প্রকৃত ব্রাহ্মণ বলিতে এইরূপ নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ব্রহ্মজ্ঞকেই বুঝায়। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলিতেছেন—“চাতুৰ্বৰ্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশ।”—৪১৩ এবং কর্মের বিভাগবশতঃই চারি বর্ণ সৃষ্ট হইয়াছে। মহাভারতের শাস্তি জাতি কথা “পর্বে ভৃগু ভরদ্বাজকে বলিতেছেন—“ব্ৰহ্মণ পূৰ্ব্বসৃষ্টং হি কৰ্ম্মভিবর্ণতাং গত।”-১৮৮১০। অর্থাৎ :-মনুষ্যগণ পূৰ্বে ব্রহ্মা হইতে সৃষ্ট হইয়া ক্রমে ক্রমে কাৰ্য্য দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে পরিগণিত হইয়াছে। মহাভারত আরও বলিতেছেন -"ইত্যৈতৈঃ কৰ্ম্মভিব্যস্তা দ্বিজা বর্ণান্তর গতাঃ। ধৰ্ম্মো যজ্ঞক্রিয়া তেষাং নিত্যং ন প্রতিষিধ্যতে।”—ঐ, শান্তিপর্ব, ১৮৮১৪ অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণ এইরূপ কাৰ্য্য দ্বারাই পৃথক পৃথক বর্ণ লাভ করিয়াছেন, অতএব সকল বর্ণের নিত্যধৰ্ম্ম ও নিত্যযজ্ঞে অধিকার আছে।”--কালীসিংহ। মৎস্য পুরাণও ১৪২ অধ্যায়ে বলিতেছেন :- উঃ সমুদিতা বর্ণাস্ত্ৰেতামাং ধৰ্ম্মশালিনঃ।” অর্থাৎ তাহার পরে ত্রেতাযুগে ধৰ্ম্মশালী চতুৰ্বর্ণ সমুদিত হইয়াছে। শ্রীমদ্ভাগবতেও (১১০১৭। ১০-১১) আছে, “আদিতে সত্যযুগে মনুষ্যগণের একমাত্র বর্ণ ছিল।” এই সমস্ত হইতে আমরা বেশ বুঝিতে পারি যে, যে কোন জাতি হইতে প্রকৃত ব্রাহ্মণ সমুদিত হইতে পারেন এবং পূর্বে সকলেই ব্রাহ্মণ ছিলেন বলিয়া ব্রাহ্মণেরাই গুণকৰ্ম্মের তারতম্য অনুসারে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র হইয়াছেন। মহাভারতে হনুমান ভীমকে বলিতেছেন -“ব্রাহ্মণাঃ ক্ষত্রিয়া বৈশ্যা শূদ্রাশ্চতলক্ষণাঃ। কতেযুগে সমভব স্বকৰ্ম্মনিরতাঃ প্রজাঃ ॥ ১৮। সমাএয়ং সমাচারং সমজ্ঞানঞ্চ কেবলম্। তদাহি সমকৰ্মাণাে বর্ণা ধৰ্মা নবা প্ৰব৷ ১৯। এক দেব সমাযুক্ত এক মন্ত্র বিধিক্রিয়া। পৃথগ- ধৰ্ম্মাত্ত্বেবেদা ধৰ্ম্মমেকমনুব্রতাঃ । ২০। চাতুরাশ্রম্যযুক্তেন কৰ্ম্মণা কাল যােগিনা। অকাম কলসং যােগাৎ প্রাবন্তি পরং গতিম্। ২১।”- মহাভারত, বনপর্ব ( তীর্থযাত্রা পৰ্ব্ব ), ১৪৮১৮-২১। অর্থাৎ তৎকাল সত্যযুগে স্বতঃসিদ্ধ শমদম প্রভৃতি গুণসম্পন্ন স্বকৰ্ম্মনিত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, জাতি কথা বৈশ্য ও শূদ্র ইহারাই প্রজা ছিলেন। সমান কৰ্ম্মবিশিষ্ট এই বর্ণ চতুষ্টয় ( ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) ব্ৰহ্মাশ্রয়ী, ব্রহ্মগতি ও ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন এবং একমাত্র ব্রহ্মকে অবলম্বন করিয়া ধৰ্ম্মাপাৰ্জন করিতেন। তঁাহারা এক দেব পরমাত্মা, এক প্রণবরূপ মন্ত্র, এক বেদান্ত শ্রবণাদিরূপ বিধি ও এক ধ্যানাদিম্বরূপ ক্রিয়ার অনুসরণ করিয়াছিলেন। তাহারা পৃথক ধৰ্ম্মসম্পন্ন হলেও এক বেদ ও এক প্রকার কৰ্ম্মে নিয়তব্রত ছিলেন এবং কাম-ফলবর্জিত হইয়া আশ্রম চতুষ্টয় সমুচিত, কালােপযােগী কৰ্ম্ম দ্বারা পরমগতি প্রাপ্ত হইতেন। ধৰ্ম্মযুগ ও সত্যযুগের এই মহা সাম্যবাণী যে- দিন ব্রাহ্মণ ভুলিয়াছেন সেই দিন হইতেই সঙ্কীর্ণ জাতিভেদ আরম্ভ হইয়াছে। শূদ্রেরও ব্রাহ্মণের তুল্য প্রণব জপে, পরমাত্মা ধ্যানে, বেদ- বেদান্ত পাঠে পূর্ণ অধিকার যে প্রাচীন যুগে ছিল, তাহা ভুলিয়াই আজ আমাদের এই দুর্দশা। আদি পুরাণ ব্ৰহ্মপুরাণও বলেন :“দত্ত প্রেতােদপিণ্ডা সৰ্বে বর্ণাঃ কৃতক্রিয়াঃ । কুধুঃ সমগ্রাঃ শুচিনঃ পরত্রেহ চ ভূতয়ে। অধ্যেতব্যায়ী নিত্যং ভবিতব্যং বিপশ্চিত। ধৰ্ম্মতো ধনমাহাৰ্য্যং -যষ্টব্যং চাপি যত্নতঃ।”—ব্ৰহ্মপুরাণ, ২২১১২৬-১৬৪। সমস্ত বর্ণের সকলেই শুচি হইয়া প্রেতের তর্পণ ও পিণ্ড দানাদি "করিয়া ইহ ও পরলােকের হিতজনক কাৰ্য্য করিবে। তাঁহাদের নিত্যত্রয়ী ( তিন বেদ) অধ্যয়ন করা কর্তব্য পরিণামদর্শী হইয়া তাহারা ধৰ্ম্মতঃ ধন উপার্জন করিয়া যত্ন পূৰ্ব্বক যজ্ঞ করিবেন। বিষ্ণুপুরাণও অর্থাৎ :- In “ঝগ, যজুঃ সাম সংজ্ঞেয়ং ত্রয়ী বর্ণাবৃতি দ্বিজ । এতামুজঝতি যে মােহাৎ স নগ্নঃ পাতকী স্মৃতঃ ।
•8 জাতি কথা এয়ী সমস্ত বর্ণানাং দ্বিজ সংবরণং যতঃ। নগ্ন। ভব ত্যুজঝিয়ামতস্তস্যাম সংশয়ম্।” -বিষ্ণুপুরাণ, ৩১৭৬ অর্থাৎ :-(পরাশর কহিলেন মৈত্রেয়কে)-“দ্বিজ ! বর্ণের আবরণ স্বরূপ ঋগ, যজুঃ, সামসংজ্ঞক এয়ীকে যে ব্যক্তি মােহবশতঃ পরিত্যাগ করে, মেই পাতকীর নাম নগ্ন। হে দ্বিজ ! এয়ীই সমস্ত বর্ণের সংবরণ ; অতএব এই ত্রয়ীরূপ সংবরণ পরিত্যাগ করিলে নগ্ন হয়, ইহাতে সংশয় নাই। শূদ্রদিগকেও পুনরায় এই বেদে, বজ্ঞে, প্রণবে অধিকার দিয়া তাঁহাদের ব্রহ্মত্ব বা ব্রাহ্মণত্বকে জাগরিত করিতে হইবে। জাতিভেদের তিরােভাবে সমগ্র বর্ণ বা জাতির এই ব্রহ্মভাবে পুনরনয়নই ধর্মযুগ ও সতাযুগ প্রতিষ্ঠা। সত্যযুগ-তুল্য সকলের ব্রাহ্মণত্ব বিধানেই জাতি-সম পূরণ হইবে । (৭) গুণ কর্ম ধর্মের দ্বারা জাতি নির্দেশ। কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের সন্তান হইলেই যে ব্রাহ্মণ হইবেন এরূপ বিধান প্রাচীন শাস্ত্র-সম্মত নহে। বংশ এবং কুলেরই কেবল প্রাধান্য দিয়া হিন্দু-শাস্ত্রকার এবং আৰ্য সাধু মহাপুরুষের বহুস্থলেই মহােচ্চ গুণ, কৰ্ম্ম ও ধৰ্ম্মের দ্বারাই শ্রেষ্ঠ জাতিত্বের বিধান দিয়াছেন । নিম্নতম বর্ণে বা জাতিতে জন্মিয়াও যে কেহ গুণে কৰ্ম্মে এবং ধৰ্ম্মে যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ হইতে পারেন তাহার সাক্ষ্য নিম্নে দিতেছি। শ্রীমদ্ভাগবত বলিতেছেন- “ বিদ্বিষড়গুণ যুতাদর বিন্দনাত পদারবিন্দ বিমুখাৎ শপচং বরিষ্ঠ।”- ৯. অর্থাৎ :-শ্রীভগবান বিমুখ দ্বাদশ গুণযুক্ত বিপ্র হইতে চণ্ডাল জাতি কথা ( কুকুর ভক্ষণকারী) বরিষ্ঠ। গরুড় পুরাণ বলিতেছেন—“অষ্ট বিধাহেষা ভক্তি যস্মিন্ স্নেচ্ছেহপি বৰ্ত্ততে। ৯। স বিপ্রেম্রো মুনি শ্ৰীমান্ স যতিঃ স চ পণ্ডিত। তস্মৈদেয়ং ততত গ্রাহং স চ পূজ্যো যথা হরিঃ ১০।—গরুড় পুরাণ, ২৩১৯১০। অর্থাৎ এই অষ্টবিধা ভক্তি যে স্নেচ্ছে বর্তমান তিনিই বিপ্ৰে, মুনি, শ্ৰীমান্, যতি ও পণ্ডিত। তাহাকেই দান করিবে এবং তাহার নিকট হইতেই গ্রহণ করিবে (দান ও প্রতিগ্ৰহণ ব্রাহ্মণ-কৰ্ম) এরূপ শ্লেচ্ছ হরির ন্যায় পূজ্য। পদ্মপুরাণ বলিতেছেন :-“চণ্ডালােহপি দ্বিজ শ্রেষ্ঠো হরিভক্তি পরায়ণঃ বিষ্ণুভক্তি বিহীনস্তু দ্বিজোহপি শপচাধমঃ।” অর্থাৎ-হরিভক্ত চণ্ডালও ব্রাহ্মণ বিষ্ণুভক্তিহীন ব্রাহ্মণাদি দ্বিজেরাও চণ্ডবিধিম। পাদ্মে আরও আছে -“ন শূদ্রা ভগবদ্ভক্তাস্তে তু ভাগবত মতা। সৰ্ববর্ণেষু তে শূদ্র। যে ন ভক্তা জনার্দনে।” অর্থাৎ :- তাহারা কেবল ভগবদ্ভক্ত, শূদ্রগণ নহে, তাহারাই ভাগবত বলিয়া মান্য। সৰ্ববর্ণে তাহারাই শূদ্র যাহারা জনার্দন ভক্ত নহে। ইতিহাস সমুচ্চয় বলিতেছেন :—“ন মে প্রিয়শ্চতুর্বেদী মদ্ভূক্তঃ শপচঃ প্রিয়। তস্মৈ দেয়ং ততে গ্রাহং স চ পূজো যথাহহম্।” অর্থাৎ :চতুর্বেদী ব্রাহ্মণ আমার প্রিয় নহে কিন্তু মদ্ভূক্ত চণ্ডালও আমার প্রিয়। এইরূপ চণ্ডালকেই দান করিবে এবং তাহার নিকট হইতে প্রতি গ্রহণ করিবে (যেমন ব্রাহ্মণ- গণের নিকট হইতে করা হয়); আমি যেরূপ পূজ্য তিনিও তদ্রুপ পূজ্য। বাল্মীকি রামায়ণের অঘােধ্যাকাণ্ডে নবাধিক শততম সর্গে রামচন্দ্র মহর্ষি জাবালিকে বলিতেছেন :-“বৈদিক সদাচার অবলম্বনে অনাৰ্যও আৰ্য সদৃশ, অশুচিও শুচি, অলক্ষণও লক্ষণযুক্ত এবং দুঃশীলও শীলবান হয়।” জাতি পূীয় নহে; কল্যাণকারক গুণই পূজনীয় ; দেবগণ গুণবান্ জাতি কথা চণ্ডালকেও ব্রাহ্মণ বলিয়া জানেন—ইহা যে হিন্দু শাস্ত্রই বলিয়াছেন। যথা :-“ন জাতি পূজ্যতে রাজন্ গুণাঃ কল্যাণ কারকা। চণ্ডালমপি বৃত্তস্থং তং দেবা ব্রাহ্মণং বিদুঃ।”—গৌতম সংহিতা। কদাচারী ব্রাহ্মণ আর সদাচারী চণ্ডাল—এই উভয়ের মধ্যে শাস্ত্র সদাচারী চণ্ডালকেই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছেন; আর হিন্দু সমাজ তুমি তাহা দিবে না? মহানিৰ্বাণ তন্ত্র ৩য় উল্লাসে ১৪২ শ্লোকে ব্রহ্ম-সাধনায় সকলেরই সমান অধিকার দিয়াছেন। যথা:-“শাক্তাঃ শৈব-বৈষ্ণবাশ্চ সৌর গাণপতাস্তথা। বিপ্রা বিপ্রেতর- শ্চৈব সৰ্বেহপ্যত্ৰাধিকারিণঃ ॥” অধৰ্ম্মচৰ্য্যা দ্বারা উচ্চবর্ণ যেমন নীচ হন তদ্রুপ ধৰ্ম্মচৰ্য্যা দ্বারা নিম্নবর্ণও উচ্চবর্ণ হন—ইহা আপস্তম্বসূত্র (শ্রৌত সুত্র) বলিতেছেন :—“ধৰ্ম্মচৰ্য্যয়া জঘন্যো বর্ণঃ পূৰ্ব্বং পূৰ্ব্বং বর্ণমাপদ্যতে জাতি পরিবৃত্তে । অধৰ্ম্মচৰ্য্যায় পূৰ্ব্বো বর্ণো জঘন্যং জঘন্যং বর্ণমাপতে জাতি পরিবৃত্তৌ ।” শুক্রনীতিতে শুক্রাচাৰ্য্যও বলিয়াছেন যে জন্ম দ্বারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, ম্লেচ্ছ হয় না। গুণ এবং কর্মের ভেদ বশতঃই হইয়া থাকে। যথা :-“নজাত্যা ব্রাহ্মণশ্চাত্র ক্ষত্রিয় বৈশ্য এব ন। ন চ বৈ স্নেচ্ছে ভেদিতঃ গুণ কৰ্ম্মভিঃ ॥”–শুক্ৰনীতি, ৩৮১ শাস্ত্র আরও বলিয়াছেন—“জন্মনা জায়তে শূদ্রো সংস্কারাদ্বিজোচ্যতে।” জন্ম দ্বারা যখন সকলেই শূদ্র হইলেন তখন প্রকৃত সংস্কার কয়জন দ্বিজের হইয়া থাকে ? গলায় সূতার badge বা চিহ্ন ধারণ করিলেই যদি দ্বিজ হওয়া যায় তবে গলায় সূত বাধা শূদ্রের হুকাটাও ব্রাহ্মণ বা দ্বিজ। অতিসংহিতার বচন অনুসারে আজি কালিকার অধিকাংশ ব্রাহ্মণকেই নিষাদ, ম্লেচ্ছ, চণ্ডাল প্রভৃতি হইতে হয়। অত্রিসংহি বলিতেছেন-“চৌরশ্চ তঞ্চরশ্চৈব শূচকো দংশকস্তথা। মৎস্য মাংসে সদা লুজ্জো বিপ্রাে নিষাদ উচ্যতে ॥৩৭ ন শূদ্রো জাতি কথা ৩৭৩। ব্ৰহ্মতত্ত্বং ন জানাতি ব্ৰহ্মসূত্ৰেণ গর্বিত। তেনৈব স চ পাপেন বিঃ পশুরুদাহৃতঃ ॥ ৩৭১। বাপী কূপতড়াগানামারামস্য সরঃ চ। নিঃশঙ্কং রােধকশ্চৈব স বিপ্রো ম্লেচ্ছ উচ্যতে। ৩৭২। ক্রিয়াহীনশ্চ মুখশ্চ সৰ্ব্বধৰ্ম বিবর্জিতঃ। নির্দয়ঃ সৰ্ব্বভূতেষু বিপ্ৰশ্চণ্ডাল উচ্যতে। অর্থাৎ:-“চৌর, তস্কর ( বলপূর্বক পরধনাপহারী ), সূচক (কুপরামর্শদাতা), দংশকু (কটুভাষী) এবং সর্বদা মৎস্য মাংস লােভী ব্রাহ্মণ ‘নিষাদ” বলিয়া কথিত। যে ব্ৰহ্ম (বেদ এবং পরমাত্মা) তত্ত্ব কিছুই জানে না অথচ কেবল যজ্ঞােপবীতের বলেই অতিশয় গর্ব প্রকাশ করে, এই পাপে সেই ব্রাহ্মণ পশু” বলিয়া খ্যাত। যে নিঃশঙ্কভাবে (পাপের ভয় না করিয়া) কূপ, তড়াগ, সরােবর এবং আরাম (সাধারণ ভােগ্য উপবন) রুদ্ধ করে (তত্তস্থলের ব্যবহার বন্ধ করে সেই ব্রাহ্মণ “চ্ছে” বলিয়া কথিত হয়। ক্রিয়াহীন (সল্ক্যাদি নিত্য নৈমিত্তিক কৰ্ম্মহীন ), মুখ, সৰ্ব্বধৰ্ম্ম (সত্যবাদিতা প্রভৃতি) রহিত, সকল প্রাণীর প্রতি নির্দয় ব্রাহ্মণ “চণ্ডাল” বলিয়া গণ্য। শাস্ত্রের এই বিধান অনুযায়ী বিচার করিতে গেলে পুলিশ কর্মচারী, জমিদার কৰ্ম্মচারী হইতে আরম্ভ করিয়া বড় বড় ঘুষ-খাের, বড় বড় রাজ-কর্মচারীরা এবং সুদ-খাের ব্রাহ্মণ মহাজনেরা চৌর তস্কর” পৰ্যায়ভুক্ত হন। ব্রাহ্মণ উকীল, মােক্তার, মুহুরী, ব্যারিষ্টার, এটর্ণি প্রভৃতি “ক” (কু-পরামর্শ দাতা) পৰ্য্যায়ভুক্ত হন। বাঙ্গালার “মছলি-খাের” এবং বলি দিয়া বা বিনা বলিতেই মহামায়ার “মহাপ্রসাদ-খাের” পুরােহিত ব্রাহ্মণ হইতে আরম্ভ করিয়া প্রায় শতকরা ৯৯জন বাঙ্গালী ব্রাহ্মণই “নিষাদ” হন। ব্রহ্মতত্ত্ব আদৌ জানেন , অথচ ব্ৰহ্ম-সূত্রের গর্ব প্রায় সকল ব্রাহ্মণই করিয়া থাকেন। অত্রি ৩, জাতি কথা মুনি তাহাদিগকে “প” বলিতেছেন। আর মাত্রা অঞ্চলে এবং আমাদের দেশেও যে সব ব্রাহ্মণেরা ‘পঞ্চম’দিগকে বা নিম্নবর্ণকে কূপ, তড়াগ, আরামাদির ব্যবহার হইতে বঞ্চিত করিয়াছেন, অত্রি মুনি তাঁহাদিগকে “ম্লেচ্ছ” বলিতেছেন। আর যে সব ব্রাহ্মণ সন্ধ্যাদি নিত্য কৰ্ম্ম করেন না, মুখ, মিথ্যাবাদী এবং শূদ্রাদি মানুষের প্রতিও নির্দয় তাঁহারা “চণ্ডাল” বা উড়াল। আজিকালিকার এই সব “ম্লেচ্ছ” “চণ্ডাল” “নিষাদ” “পশু ব্রাহ্মণেরা কি অতি মুনির নামে Defamation case বা মানহানির মােকর্দম করিবেন ? (৮) মহাজন মত অতঃপর এ সম্বন্ধে আমরা কয়েকজন অবতার ও মহাপুরুষের মত উদ্ধত করিতেছি। শ্রীমদ্ভাগবত (১৩২৪, ১০/৪০২২), গরুড়পুরাণ ( ৮৬১০), মৎস্যপুরাণ ( ৪৭২৪৭ }, বরাহপুরাণ (৪৩, ১১৩২৭), বায়ুপুরাণ (একলিঙ্গ মাহাত্ম ১২৪৩, ১৪৩৯ ), নৃসিংহপুরাণ (৩৬২৯), কল্কিপুরাণ ( ২৩২৯), শ্রীগীতগােবিন্দ (১ম সর্গ) প্রভৃতি যাহাকে নারায়ণের অবতার বলিয়াছেন, সেই গৌতম বুদ্ধদেব ধৰ্ম্মপদে বলিয়াছেন - “ন জাহিন গােত্তেহি ন জচ্চা হােতি ব্রাহ্মণাে, যহি সচ্চঞ্চ ধৰ্ম্মো চ সাে সুচী সাে চ ব্রাহ্মণ।।”-ব্রাহ্মণ বগগাে, ১১। অর্থাৎ —জটা দ্বারা, গােত্রের দ্বারা বা জাতির দ্বারা ব্রাহ্মণ হয় না; যাহাতে সত্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠিত, তিনিই শুচি, তিনিই ব্রাহ্মণ। বুদ্ধদেব উদানেও (সুপিটকের অন্তর্গত খুদ্দক নিকায়ে) বলিয়াছেন—“যহি সচ্চঞ্চ ধৰ্ম্মো চ সাে সুচী সাে চ ব্রাহ্মণো’ তি।”—উদান, ১৯ (৬পৃঃ) (cf. মহাবগগগা ১১•২৫)। ** জাতি কথা ঐ উদানে বুদ্ধদেব আরও বলিয়াছেন—“বাহেত্বা পাপকে ধৰ্ম্মে যে চরস্তি সদা সত্য ও সংযােজনা বুদ্ধ। তেবে লােকস্মিং ব্রাহ্মণ’ তি” —উদান, ১৫ (৪) অর্থাৎ যাহারা পাপকর্ম অতিবাহিত করিয়া সর্বদা বিচরণ করেন, সেই ক্ষীণ বন্ধন শান্ত বুদ্ধগণই ইহলােকে ব্রাহ্মণ। জাতি বা জন্ম. পাপ যদি রহিয়াই গেল, তবে আর ব্রাহ্মণত্ব কি করিয়া সম্ভব? তাই বুদ্ধদেব বলিতেছেন –পূৰ্বে নিবাসং যে বেদী গগ গাপয়ঞ্চপতি। অথে। জাতিথয়ং পত্তো অভিঞ ঞা বােসিতো মুনি । এলাহি তীহি বিজ্জাহি তেবিজ্জো হােতি ব্রাহ্মণে।”—অঙ্গুত্তর নিকায়, ৩৫৮৬। ( ১১৬৫ পৃঃ ), সংযুক্তনিকায়, ৬১৮৫। অর্থাৎ:-পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব জন্ম যিনি জানেন, সৃষ্টি ও লয় বা জন্ম ও মৃত্যু, যিনি দেখেন বা জানেন, যিনি জাতিক্ষয়প্রাপ্ত এবং যিনি অভিজ্ঞ-ভাবিত মুনি তিনিই এই ত্রয়ী বিদ্যার দ্বারা ত্রয়ী বিঃ, ব্রাহ্মণ হন। ত্রিবেদী ব্রাহ্মণেরা জাতির বড়াই করিলে আর যেন ত্রিবিদ্যার বড়াই না করেন। শ্রীভগবানের পূর্ণ অবতার বলিয়া খ্যাত, ব্রাহ্মণ শিরােমণি শ্রীগৌরাঙ্গ দেব বলিতেছেন ? “কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কোন নয়। যেই কৃষ্ণবেত্তা সেই গুরু হয়। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলিতেছেন :–“মুচি হয়ে শুচি হয় যদি কৃষ্ণ ভজে। শুচি হয়ে মুচি হয় যদি কৃষ্ণ ত্যজে। শ্রীচৈতন্য মঙ্গলে লােচনদাস ঠাকুর বলিতেছেন :- “কৃষ্ণ না ভজিলে দ্বিজ নহে কদাচিত। পুরাণে প্রমাণ এই শিক্ষা আছে নীত।” বৃন্দাবন দাস শ্রীচৈতন্য ভাগবতে বলিয়াছেন—“জাতিকুল ক্রিয়াধনে কিছু নাহি করে। প্রেমধন আৰ্ত্তিবিনে না পাই কৃষ্ণেরে। যে-তে-কুলে বৈষ্ণবের জন্ম কেনে নহে। তথাপি সৰ্বোত্তম সর্বশাস্ত্রে কহে ॥ – জাতি কথা ভালবাসার রাজ্যে, প্রেম কাননে, ভক্তি নিকেতনে জাতিভেদাদি- কোথায় ? পিরীতির কথায় পাড়াগাঁয়ে সকলে বলিয়া থাকে—“যা’র সঙ্গে যা’র মজে মন, কিবা হাড়ি কি বা ডােম।” কথাগুলি সাধারণতঃ কদর্ধে ব্যবহৃত হইলেও ইহার ভিতর মূল্যবান্ উপদেশ আছে। কবিকঙ্কনও বলেন—“যে যারে মনে ভায় সেজন ভজে তায়।” ভক্তি-প্রীতির রাজ্যে কোন ভেদই নাই—অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, বর্ণভেদাদি ত দূরের কথা। এই ভক্তি-প্রীতির প্রকৃত ভাব যদি আমরা বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারি, তবে সৰ্ব্বসমস্যারই সমাধান সহজে হইবে। তাই দেখিতে পাই ভক্তিপ্রধান বৈষ্ণবধৰ্ম্মে জাতিভেদ বড় একটা নাই। বৈষ্ণব- শাস্ত্র হইতে আরও বলিতেছি। চৈতন্য ভাগবতে হরিদাস ঠাকুর (যিনি জাতিতে মুসলমান ছিলেন, কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ-পূজ্য ‘ঠাকুর’ হইয়াছেন) বলিতেছেন-“নামমাত্র ভেদ করে হিন্দুয়ে যবনে। পরমার্থে এক কহে কোরাণে পুরাণে। একশুদ্ধ নিত্য বস্তু অখণ্ড অব্যয়। পরিপূর্ণ হই বৈসে সভার হৃদয়।” শ্রীচৈতন্য ভাগবত, আদি, ১১। প্রকৃত বৈষ্ণব বা ভগবদ্ভক্তের কাছে অতীব হীন জাতীয় বৈষ্ণবও বন্দনীয় পূজাৰ্হ। সাধক কণ্ঠহার বৈষ্ণব বন্দনায় বলিতেছেন-“পুলিন্দ পুশ ভীল কিরাত যবনে। আভীর কঙ্ক আদি করি সকলে সমানে। সুভােগ শবর শ্লেচ্ছ আদি করি যত। ব্রহ্মা আদি চারি বেদ সবার আরাধ্য। যত যত হীন জাতি উদ্ভবে সবারে বলিব সবে জগত দুর্লভ। ২৩ পৃঃ। বৈষ্ণবশাস্ত্র আরও বলিতেছেন :-“ব্রাহ্মণ আচণ্ডাল কুকুরান্ত করি। দণ্ডবৎ করিবেক বহুমা করি। এই সে বৈষ্ণবধর্ম সবারে প্রণতি। সেই ধৰ্ম্মধ্বজী যার ইথে নাহি মতি।” শ্রীনরােত্তম ঠাকুর (দাস) পাষণ্ডদলন’ গ্রন্থে বৈষ্ণব।
জাতি কথা ৪১: বলিয়াছেন -“শূদ্র নহে কৃষ্ণের ভজন যেই করে । সেইজন ভাগবত জানিহ সংসারে। সৰ্ব্ববর্ণে সেই শূদ্র যে না ভজে হরি। সৰ্ব্বশাস্ত্রে এই কথা কহিছে ফুকারি। নিষাদ পচ শূদ্র হরির ভকতে। নীচ করি মানে যেই যায় নরকেতে। বিদ্বিষড় গুণযুত শ্রীচরণে বিমুখ। শপচ হইতে নীচ শাস্ত্র অনুরূপ। বৈষ্ণব দেখিয়া যে জাতিবুদ্ধি করে। তাহার সমান পাপী নাহিক সংসারে।” জাতিভেদ সম্বন্ধে কথা উঠিল। ঠাকুর ( শ্রীভগবানের অবতার বলিয়া খ্যাত রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব) বলিলেন :- এক উপায়ে জাতিভেদ উঠে যেতে পারে। সে উপায় ভক্তি। ভক্তে জাতি নাই। ভক্তি হইলেই দেহ, মন, আত্মা সব শুদ্ধ হয়। গৌরনিতাই হরিনাম দিতে লাগলেন আর আচণ্ডালে কোল দিলেন। ভক্তি না থাকলে ব্রাহ্মণ নয়। অস্পৃশ্য জাতি ভক্তি থাকলে শুদ্ধ পবিত্র হয়।”-শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত (শ্রীম) ৫ম ভাগ, ১ম খণ্ড, ৪র্থ পরিচ্ছেদ। মহাত্মা তুলসীদাস, কবীরদাস প্রভৃতি মহাপুরুষেরাও বলিয়াছেন-“জাতপাত ন পুচ্ছত কোই। জো হরিকো ভজে সেই হরিকো হই।” জাতিপাতি কেহই জিজ্ঞাসা করে না। যে হরিকে ভজনা করে সেই হরির ভক্ত হয়। হরিজন, হিজড়া, হুর, সতী, শূরমাদি জোই। ন যহ সব জাঁতােমে উপজে ইন্কে জাতন কোই।* হরিজন, নপুংসক, পলাতকা কন্যা, সতী, নূর ইহাদের কোন বিভিন্ন জাতি নাই। সব জাতি বা বর্ণে ই ইহারা জন্মলাভ করিয়া থাকে। (৯) শাস্ত্রীয় উদাহরণ। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারতাদি প্রাচীন শাস্ত্রে জাতির কোনও কোনও নাগবন্ধন না থাকিলেও, অপ্রাচীন স্মৃতি, সংহিতা, পুরাণাদিতে ৪২ জাতি কথা একদিকে যেমন অনেক স্থানে জাতির নাগবন্ধন রচিত হইয়াছে, অন্যদিকে তদ্রুপ বহুস্থলে এই বন্ধন পাশ কাটিয়া মুক্তির মহামন্ত্র উচ্চারিত হইয়াছে। আমরা এখন তাহার প্রাচীন ও অপ্রাচীন উদাহরণ দিব। পূর্বযুগে আমরা দেখিতে পাই, নিম্নবর্ণে নীচকুলে জন্মিয়াও অনেকে ঋত্বিক, ব্রাহ্মণ, ঋষি প্রভৃতি হইয়া অনেক উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণাদিরও পূজণীয় হইয়াছেন। বৈদিকযুগে দাসী-পুত্র কক্ষীবান্, পরাশর শূদ্র, শূদ্র ওলন্দ্য, বন্দ্য এবং সংস্কৃতি বেদমন্ত্র রচনা করিয়া ঋষি হইয়াছিলেন।-মৎস্য পুরাণ, ১৩২ অধ্যায়। মহাভারতের, মৎস্য পুরাণে ও বায়ুপুরাণে কক্ষীবনের গল্প আছে। দীর্ঘতমা মুনির ঔরসে দাসী উষিজের গর্ভে কক্ষীবান জন্মগ্রহণ করেন। কক্ষীবান ঋগেদের প্রথম মণ্ডলের ১১৮-১২১ সূক্তের রচয়িতা ঋষি। কবজ ঐলুষ ঋষ শূদ্র ; তিনি ঋগদের ১০৩০-৩৪ সূক্তের চরিতা। ছান্দোগ্য উপনিষদে (৪৪৫) আছে—শূদ্রসত্যকাম জাবাল জারজ ও দাসীপুত্র হইলেও মহষি গৌতম তাহাকে ব্ৰহ্মবিদ্যা দান করিয়া ব্রাহ্মণ করিয়াছিলেন। শূদ্র জনশ্রুতি পৌত্রায়ণকে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছিল। ইহার শ্রুতি প্রমাণ—“অহ হারে ত্ব। শূদ্রং তবৈচসহ গােভির” ইত্যাদি। রামায়ণের অরণ্যকাণ্ড চতুঃসপ্ততিতম সর্গে আছে যে ব্যাধ-রমণী “তপঃ সিদ্ধ” শবরী মতঙ্গাশ্রমের পরমষিগণকে পরিচর্যা করিতেন এবং তাঁহাদিগের পরিচারিকা ও শিষ্যা ছিলেন। রামচন্দ্রের পরিচর্যার জন্য তিনি অনেক অরণ্যখাদ্য সঞ্চস্ত করিয়া রাখেন। রামায়ণে আমরা আরও দেখিতে পাই যে, এক সুবিখ্যাত ব্রাহ্মণ বংশ ক্রমে এক সুবিখ্যাত ক্ষত্রিয় বংশে পরিণত হয়। ব্রহ্মার পুত্র মরীচি, মরীচির পুত্র কশ্যপ, কশ্যপের পুত্র বিবস্বান, বিবস্বানের পুত্র মনু, মনুর পুত্র ইক্ষাকু জাতি কথা ৪৩ ইনিই অযযাধ্যার আদিম নৃপতি। এই ইক্ষাকুর বংশেই পুত্র-পৌত্রাদি ক্ৰমে রঘু, অজ, দশরথ এবং রামের জন্ম। (বাল্মকী-রামায়ণ, আদিকাণ্ড সপ্ততিতমসর্গ।) ইক্ষাকুর পিতা, পিতামহাদি ব্রাহ্মণ, কিন্তু তাহা হইতে অধস্তন পুরুষগণ ক্ষত্রিয়, ঐরূপ চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়গণেরও মূল ব্রাহ্মণ বংশ। ব্রহ্মার পুত্র অত্রি, অত্রির পুত্র চন্দ্র, চন্দ্রের পুত্র বুধ, বুধ মনুর কন্যা ইলার গর্ভে পুরুরাজাকে জন্ম দেন ; ইহাদের হইতেই ক্ষত্রিয় চন্দ্র বংশের উৎপত্তি। বিষ্ণুপুরাণ, ৪৬২০ ; ব্রহ্ম পুরাণ, ৯১১• অধ্যায়।) বিষ্ণুপুরাণে উদ্ধত একটি প্রাচীন গাথায় পাওয়া যায় যে এই চন্দ্রবংশে বহু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় উৎপন্ন হইয়াছেন। “ব্রহ্ম ক্ষত্রস্ত যাে যােনিবংশাে রাজর্ষি সৎকৃতঃ।”—বিষ্ণু পুরাণ, ৪২১৪; ভাগবত, ৯ ২২ অর্থাৎ :-রাজর্ষি সৎকৃত এই (চন্দ্র) বংশ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের উৎপত্তিস্থান নিষাদপতি গুহক রামের প্রাণতুল্য প্রিয় সখা ছিলেন। গুহক “চ চোষ, লেহ, পেয় এই চতুব্বিধ অন্নব্যঞ্জনাদি” রামচন্দ্রকে প্রদান করেন, এবং রামচন্দ্র তাহা স্বীকার করেন । কিন্তু তিনি তখন ফল-মূল ভােজ, তাপসধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছেন বলিয়া উহা “এতিগ্ৰহ করিতে পারিলেন না।-(বাল্মীকি-রামায়ণ, অযযাধ্যাকাণ্ড, ৫• সর্গ।) গুহক-চণ্ডালের হাতে দেওয়া ভাত, ডাল, তরকারী, প্রভৃতি যে রামচন্দ্র খাইতেন তাহা ইহা হইতে পরিষ্কার অনুমান করা যায়। তির্যগজাতি গৃধ্রুরাজ শূদ্র জটায়ুর মৃতদেহের অগ্নি-সৎকার করিয়া রামচন্দ্র তাহার পিণ্ডদান এবং তর্পণ পৰ্য্যন্ত করেন। (ঐ, অরণ্যকাণ্ড, ৬৮ সৰ্গ।) বিহুর ও যুযুৎসু শূদ্র ছিলেন। সূতজাতীর শূদ্র লােহর্ষণ, সৌতি, সঞ্জয়, বণিক তুলাধার এবং অতীব নীচজাতীয় ধৰ্ম্মব্যাধ ব্ৰহ্মবিদ্যা পর্যন্ত লাভ করিয়াছিলেন। “রােমহর্ষণিক ৪৪ জাতি কথা সংহিতা” প্রণেতা ঐ শূদ্র রােমহর্ষণের বা লােমহর্ষণের ব্রাহ্মণ শিষ্য ছিলেন। বিষ্ণুপুরাণ ৩৬১৮-১৯। লােমহর্ষণ “বেদাদি মােক্ষশাস্ত্রে সর্বজ্ঞ ছিলেন।” ব্ৰহ্মপুরাণ, ১৯১৭ সূতজাতীর ঐ রােমহর্ষণ ব্যাসশিষ্য ছিলেন। সুতপ্রণীত ঐ রােমহর্ষণিকা সংহিতা এবং রােমহর্ষণের অপর তিন ব্রাহ্মণ শিষ্য কাশ্যপ বংশায় অকৃতব্রণ, সাবণি ও শংশপায়নকৃত তিন সংহিতা লইয়া বিষ্ণু- পুরাণ সংহিতা রচিত হয়।-বিষ্ণুপুরাণ, ৩৬১৮-২০। হিন্দুর সুবিখ্যাত ব্রহ্মবিদ্যারূপ যােগশাস্ত্র শ্রীমদ্ভগবদগীতা উপনিষদের বক্তা বা রচয়িতা যে নিম্নবর্ণের সঞ্জয় তাহা কি উচ্চবর্ণের চোখে পড়ে ? (গীতা, ১৮৭৪-৭৫ দ্রষ্টব্য।) কাশীতে বৈশ্য বণিক তুলাধার, জাজলি ঋষিকে ব্রহ্মবিদ্যা ও মােক্ষোপদেশ প্রদান করেন।-(মহাভারত, মােক্ষধৰ্ম্মপৰ্ব্ব, ২৬০-২৭৩ অধ্যায়।) ধৰ্ম্মব্যাধ তপােবন কৌশিক ব্রাহ্মণকে মােক্ষধৰ্ম্ম সম্বন্ধে উপদেশ পর্যন্ত দিয়াছিলেন। ঐ, বনপৰ্ব্ব, মার্কণ্ডেয় সমস্যপৰ্ব্ব, ২০৫-২১৫ অধ্যায়। এই কৌশিক ব্রাহ্মণই ধৰ্ম্মব্যাধকে বলিতেছেন—সাম্প্রতঞ্চ মতাে মেহসি ব্রাহ্মণে না সংশয়ঃ! ব্রাহ্মণ পতনীয়েষু বর্তমান বিকৰ্ম্মসু। দাম্ভিকো দুষ্কতঃ শূদ্রেণ সদৃশশা ভবেৎ। বস্তু শূদ্রো দমে সত্যে ধৰ্ম্মে চ সততােথিতঃ 1. তং ব্রাহ্মণমহং মন্তে বৃত্তেন হি ভবেজি। কৰ্ম্মদোষেণ বিষমাং গতিমাগ্নেতি দারুণাম্।”—মহাভারত বনপর্ব, ২১৫ অধ্যায়, ১৩১৫ শ্লোক। অর্থাৎ :-“সম্প্রতি তােমাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া আমার বােধ হইতেছে ; পাতিত্যজনক, কুক্ৰিয়াসক্ত, দাম্ভিক ব্রাহ্মণ প্রাজ্ঞ হইলেও শূদ্র সদৃশ হয়। আর যে শূদ্র সত্য, দম ও ধৰ্ম্মে সতত অনুরক্ত তাহাকে আমি ব্রাহ্মণ বিবেচনা করি; কারণ ব্যবহারেই ব্রাহ্মণ হয়। মনুষ্যেরা কৰ্ম্ম- জাতি কথা "দোষ বশতঃ দুর্গতি লাভ করিয়া থাকে।”—কালী সিংহের অনুবাদ। হায় আধুনিক ব্রাহ্মণগণ, তােমরা যদি কৌশিক ব্রাহ্মণের মত, চরিত্রবান ও ধৰ্ম্মশীল ব্যাধকে পৰ্যন্ত ব্রাহ্মণত্ব ও গুরুত্ব দিতে পারিতে, সমগ্র হিন্দুসমাজের এই জাতিগত দুর্দশা হইত না। বাল্মীকি রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে অষ্টাদশ সর্গে আছে-‘তখন পবনকুমার সেই শেষ রাত্রিতে ষড়ঙ্গ বেদবিদ উৎকৃষ্ট অগ্নিহোত্রজী ব্ৰহ্মজ্ঞ রাক্ষসদিগের বেদধ্বনি শ্রবণ করিতে লাগিলেন।” রাক্ষসেরাও ধড়ঙ্গ বেদবি ব্ৰহ্মজ্ঞ হইতে পারে, আর শূদ্রের হইলে দোষ হইবে? কখনই নয়। রাক্ষসেশ্বর রাবণও “বেদবিদ্যা এবং ব্রহ্মচর্য সমাপন পূৰ্ব্বক কর্মের অধীন হইয়া গৃহশ্রমে প্রবেশ করেন।”— বাল্মীকি রামায়ণ, লঙ্কাকাণ্ড, ৯৩, সর্গ)। ক্ষত্রিয় অরিষ্ট সেন, রাজর্ষি সিন্ধু দ্বীপ, দেবাপী এবং বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন।—(মহাভারত, শল্যপৰ্ব্ব, ৪০)। ক্ষত্রিয় বিশ্বামিত্র মহষি ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন— বাল্মীকি রামায়ণ, আদিকাণ্ড, ৬৫ সৰ্গ)। বিশ্বামিত্র ঋগ্বেদের বহু সূক্তের রচয়িতা। তাঁহার পুত্র ঋষভ ঋষি, কত ঋষি, প্রজাপতি ঋষি, মধুচ্ছ। ঋষ, মধুছন্দার পুত্র জেতৃঋষি ঋগ্বেদের অনেক সূক্তের রচয়িতা। এখানে ক্ষত্রিয় বংশ ব্রাহ্মণ ঋষি বংশে পরিণত হইয়াছে। বৃষাগিরের পুত্রগণ ঋজাশ্ব রাজর্ষি অম্বরীষ, সহদেব, ভযমান ও সুরাধা ক্ষত্রিয় ধর্মাবলম্বী যােদ্ধা ছিলেন। ইহারা ঋগ্বেদের ১ম মণ্ডলের ১০০ সূক্তের ঋষি। রাজা ভাবয়ব্যও ১ম মণ্ডলের ১২৬ সূক্তের ঋষি। ক্ষত্রিয় রাজর্ষি সদস্য ৪র্থ মণ্ডলের ৪২ সুক্তের ঋষি। ত্রিবৃষ্ণের পুত্র রুণ রাজর্ষি, ভরতের অপত্য অশ্বমেধ রাজর্ষি ও পুরুকুৎসের অপত্য রাজর্ষি এস এম মণ্ডল, ২৭ সূক্তের ঋষি। বৈদিক বা ঔপনিষদিক যুগে ক্ষত্রিয়ের ৪৬ জাতি কথা কেবল যে ঋষি হইতেন তাহা নহে, তাহারা যথাবিধি ব্রাহ্মণকে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করাইয়া ব্ৰহ্মবিদ্যা দান পৰ্য্যন্ত করেন। সুপ্রাচীন বৃহদারণ্য- কোপনিষদে ইহার পরিষ্কার উদাহরণ আছে। বৃহদারণ্যকের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১ম ব্রাহ্মণের ১১৪ ও ১৫ বচনে আছে যে, কাশীরাজ অজাতশত্রুর নিকট বালাকি (বলাকার পুত্র) গাৰ্গ ব্ৰহ্মতত্ত্ব বলিতে অক্ষম হইয়া বলিলেন—আমি ব্ৰহ্মতত্ত্ব জানিবার জন্য তােমার নিকট উপস্থিত হইতেছি। “স হােবাচ গাৰ্গ উপত্বায়ানীতি ॥” অজাতশত্রু বলিলেন যে, ব্রাহ্মণ যে ক্ষত্রিয়ের নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে ‘ব্রহ্ম উপদেশ করুন’ বলেন তাহা প্ৰতিলােম অর্থাৎ বিপরীত আচার। “স হােবাচাজাতশত্রু প্রতিলােমং চৈত মদ ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়মুপেয়াদ ব্ৰহ্ম মে ব্যতীতি।” বৃহদারণ্যক, ২১১১৫। ঐ বৃহদারণ্যকের ৬ষ্ঠ অধ্যয়ে, ২ ব্রাহ্মণে আছে যে, আরুণের ( অরুণভনয়) শ্বেতকেতু পাঞ্চালরাজ জৈবলি (জীবল পুত্র। প্রবাহণের প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম হইয়া তাহার পিতা গৌতমকে তাহা জাননি। গৌতমও তাহা না জানায়, ঐ রাজার নিকট ব্রহ্মচর্য্য লইয়া ঐ বিদ্যার প্রার্থী হন। রাজা বলিলেন-“গৌতম, আপনি তীর্থমত অর্থাৎ “শাস্ত্রবিহিত ন্যায়ে” (শঙ্করাচাৰ্য) আমার নিকট বিদ্যাগ্রহণে ইচ্ছা করুন।” “হাঁ, আমি যথাবিধি আপনার নিকট উপস্থিত হইতেছি”- এই বলিয়া উপগমন কীর্তন দ্বারা পূর্বে যেরূপ ব্রাহ্মণেরা যাইতেন, তদ্রুপ তাহাকে গুরুত্বে বরণ করিলেন। “স বৈ গৌতম তীর্থেনেচ্ছাস। ইত্পৈম্যহং ভবস্তমিতি বাচা হ স্ম বৈ পূৰ্ব্ব উপবন্তি স হােপায়নকীত্তো বাস। বৃহদারণ্যক, ৬২৭। পাঞ্চালরাজ প্রবাহণ অতঃপর গৌতমকে ব্ৰহ্মবিদ্যা দান করেন। ক্ষত্রিয় রাজর্ষি জনক, গৃৎসমদ এবং বীতহব্যও জাতি কথা ৪৭ ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন।-(শতপথ ব্রাহ্মণ, রামায়ণ, আদিকাণ্ড, ১৮৫৫, মহাভারত অনুশাসন পৰ্ব্ব, ৩০ অধ্যায়।) মহাভারতের অনুশাসন পর্বে আছে যে, গৃৎসমদ হৈহয়দিগের রাজা বীতিহব্যর পুত্র। বীতিহ্য ক্ষত্রিয় ছিলেন; কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন। তঁাহার পুত্র গৃৎসমদ ঋষি ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলের প্রথম তিন সূক্তের রচয়িতা। এব্যাকাণ পুষ্করিণ এবং কবি, বা কপিল পরে ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। ( ভাগবত, ৯২১, বিষ্ণুপুরাণ, ৪১৯১১•) ধাষ্ট নামে প্রসিদ্ধ ক্ষত্রিয় জাতি অবনী- মণ্ডলে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন (ভাগবত, ৯।} শিনির পুত্র গার্গ ক্ষত্রিয় হইয়াও ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। সতিমানের পুত্র কৃতী ক্ষত্রিয় হইয়াও হিরণ্যনাভের নিকট যােগ প্রাপ্ত হইয়া প্রাচ্য সামের ছয়খানি সংহিতা বিভাগ পূৰ্ব্বক অধ্যাপন করেন। ক্ষত্রিয় হৰ্য্যশ্ব পুত্র মুদগল হইতে জাত ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়া মোগল্য নামে অভিহিত হন। --বিষ্ণুপুরাণ, ৪১৯১৩। ক্ষত্রিয় ভাশ পুত্র হইতে ব্রাহ্মণ জাতির মৌল্য গোত্র সম্ভত হয় । ভাগবত, ৯১১) নাগরিষ্টের দুই পুত্র বৈশ্য ছিলেন, পরে তাহারা ব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন ( ব্রহ্মপুরাণ, ৭৪২, হারবংশ, হরিবংশপর্ব, ১১৯)। হরিবংশের ৩১ অধ্যায়ে ৩৩|৩৫ শ্লোকে আছে যে, যযাতিপুত্র পুরু হইতে অধঃস্ত দ্বাবিংশতি পুরুষ মহারাজ বলি, অঙ্গ, বঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড, এবং কলিঙ্গ নামক পাঁচজন ক্ষত্রিয় পুত্র পরে ব্রাহ্মণ হইয়াছিমেন।-ব্রহ্মপুরাণ, ১৩৩৩|৩১ শ্লোকেও ঐরূপ আছে। অন্ধমুনি বৈশ্য ছিলেন, তাহার শূদ্রানী স্ত্রীর পুত্র সিন্ধুমুনি ব্রহ্মবাদী মুনি হইয়াছিলেন ( বাল্মীকি রামায়ণ, অযযাধ্যাকাণ্ড, ৬৩ সৰ্গ, ৫১ ও ৬৪ সর্গ ২৪)৫৫)। জীবন্মুক্ত পক্ষিরাজ ভুষুণ্ড কাক শূদ্র ছিলেন। তিনি বিদ্যাধরকে ৪৮ জাতি কথা ব্রহ্মবিদ্যা দান করেন এবং মহর্ষি বশিষ্ঠকেও মােক্ষোপদেশ দান করেন, { যােগবাশিষ্ঠ, রামায়ণ, নিৰ্ব্বাণ প্রকরণ, উত্তর ভাগ, ১৬সর্গ এবং পূর্বভাগ ১৮২৭ সর্গ )। ঐ যােগবাশিষ্ঠে আরও আছে যে, “ব্রহ্মার রথবাহী হংসগণ ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা করিয়াছে, সৰ্ব্বদাই বেদমন্ত্র প্রণব উচ্চারণ করে এবং সামগান করে” (পঞ্চানন তর্করত্নকৃত ঐ বঙ্গানুবাদ, নিৰ্বাণ প্রকরণ, পূৰ্বভাগ, ১৫ সৰ্গ)। ব্রহ্মার রথ বহিয়া পক্ষীরা পৰ্য্যন্ত বেদে এবং প্রণবে অধিকার পাইতে পারে, আর ব্রাহ্মণদিগকে এত রকমেও বহিয়া বহিয়া যদি শূদেরা বেদে এবং প্রণবে অধিকার না পায়, তবে ব্রাহ্মণদিগের গৌরব এবং ময্যাদা কোথায় থাকে? যােগবাশিষ্ঠ রামায়ণে নিশাচর বেতাল পর্যন্ত ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া সমাধিস্থ হন ( ঐ নিৰ্ব্বাণ প্রকরণ, পূৰ্বভাগ, ৭২সর্গ )। আর শূদ্রের বেলায় যত অপরাধ? স্কন্দ পুরাণে আছে : অব্রাহ্মণ্যে তদা দেশে কৈবৰ্ত্তান্ প্রেক্ষ্য ভার্গবঃ। সূক্ষপং প্রবলং কং যজ্ঞসূত্রমকল্পয়ৎ। স্থাপয়িতা স্বকীয়ে স ক্ষেত্রে বিপ্ৰান্ প্রকল্পিতা। জামদগ্ন্যস্তদোবাচ সুপ্রীতেনান্তরাত্মনা ॥” অর্থাৎ:-ভাগব ব্রাহ্মণহীন সেই ম্লেচ্ছ। দেশে কৈবর্ত সকলকে দেখিয়া পক্ষ প্রবল করিবার জন্য যজ্ঞসূত্র সৃষ্টি করিলেন এবং সেই সমস্ত প্রকল্পিত বিদিগকে স্বকীয় ক্ষেত্রে স্থাপন করিয়া সুপ্রীত অন্তরাত্মা জামদগ্ন্য তখন বলিলেন। পরশু রামের কৃপায় কৈবর্তেরা ব্রাহ্মণ হইলেন। আবার করে কৃপায় স্নেচ্ছে শূদ্র, বৈশ্য ও ক্ষত্রিয় হইলেন। যথা :---সরস্বত্যাজ্ঞয়া কম্বো মিশ্রদেশমুপা- ঘযৌ। ম্লেচ্ছান্ সংস্কৃতমাভাস্য তদা দশ সহস্ৰকান্ বশীকৃত্য স্বয়ং প্রাপ্তে ব্ৰহ্মাবর্তে মহােত্তমে। তে সৰ্বে তপসা দেবীং তুষ্টবুশ্চ সরস্বতী। সপত্নী- কাংশ্চন্ ম্লেচ্ছা শূদ্ৰবৰ্ণায় চাকরােৎ। কারুবৃত্তিকারা সর্বেবহুবুহু- জাতি কথা a, = পুত্রকাঃ ॥ দ্বিসহস্রাস্তদা তেষাং মধ্যে বৈশ্যা ববিরে। উদা, প্রবসন্নে ভগবান্ কম্বো বেদবিদাং বরঃ । তেষাং চকার রাজানং রাজপুত্র পুরং সদৌ।”—ভবিষ্যপুরাণ, প্রতিসর্গ, পূৰ্ব্বখণ্ড, ৪২১। অর্থাৎ : --সরস্বতীর আজ্ঞায়, কঃ মি দেশে ( মিশরে) গিয়াছিলেন। তথায় দশ সহস্র গ্নেকে সংস্কৃত শিখাইয়া বশীভূত করিয়া মহােত্তম ব্ৰহ্মাৰৰ্ত্তে স্বয়ং তাহাদিগকে আনেন। তাহারা সকলে তপস্যা দ্বারা দেবী সরস্বতীকে তুষ্ট করে। তিনি সপত্নক সেই চ্ছেগণকে শূদ্ৰবৰ্ণ করিয়াছিলেন। কাবুত্তি সম্পন্ন তাহাদের বহুপুত্র হইলে তাহাদের মধ্যে দ্বিস বৈশ্য হইয়া!ছলেন। তাহার পর বেপজ্ঞদিগের শ্রেষ্ট গবান কম্ব প্রসন্ন হইয়া তাহাদাকে রাজার পুত্র করিয়া পুরী দান করিয়াছিলেন । অনেক শত্রা নিম্নবর্ণের ব্যক্তিগণ সরস্বতীদেবীকে তপস্যা দ্বারা সংষ্ট করিয়া বিদ্যাত কবিয়াছেন ও করিতেছেন। করে ন্যায় এমন ব্রাহ্মণ কি নাই যিনি ইহাদিগকে উন্নত, বর্ণে স্থাপিত করিতে পারেন? আজ আবার ব্রাহ্মণদিগকে তাহাই করিতে কইৰ প্লেচ্ছঞ্চেও এহ্মণধে উন্নীত করা। ঐ ভবিষ্যপুরাণেই আছে যে, মহধি কাশ্যপ তাহাও করিয়াছিলেন। যথা :-“শিদেশাঃবাঃ ম্লেচ্ছা কাপেন সুশাসিতাঃ। সংস্কৃত শবর্ণেন এহ্মবর্ণমুপাগ। শিখাসূত্র সমাধায়ঃ পঠিত্ব। বেদমত্তমম্।”-- বন্যপুরাণ, প্রতিসর্গ পূৰ্বখণ্ড, ৪২১। অর্থাৎ কাশ্যপের প্রচেষ্টায় মিশ্রদেশের এ মিশরের, ইজিপ্টের) অনেক শ্লেচ্ছ শিখাসূত্ৰধারণ ও বেদ পাঠ করিয়া ব্রাহ্মণ হন। প্রাচীনকালেও এইরূপ অনেকে শূদ্রজাত হইয়াও মহাব্রাহ্মণ হইয়াছিলেন। যথা-“জাতে ব্যাস্তু কৈবর্তাৎ শপাকাচ্চ পরাশরঃ। শুক্যাঃ শুকঃ কণাদাখ্যঃ তথােকা তােহভবৎ। মৃগী ঋষ্যশৃঙ্গোহপি বশিষ্ঠো গণিকাত্মজঃ। মপালাে ৫০ জাতি কথা মুনিশ্রেষ্ঠো নাবিকাপত্যমুচ্যতে । মাগুবা মুনিরাজন্তু মঞ্জুকীগর্ভসম্ভব। বহবােহহেপি বিপ্রত্ব প্রাপ্ত। যে শূদ্রযােনয়।”—ভবিষ্যপুরাণ, ব্রাহ্মপৰ্ব্ব, ৪২ শ ; মহাভারত, দ্রোণপ, ৫২৭-২৮। অর্থাৎ :-কৈবর্ত কন্যার গর্ভে ব্যাস, পাক (ব্যাধ বা কুকুর ভক্ষণকারী চণ্ডাল। গর্ভে পরাশর, ম্লেচ্ছ। শুকীর গর্ভে শুকদেব, অনার্খাকন্যা উলুকীর গর্ভে কণাদ (বৈশেষিকদর্শণ প্রণেতা ), শূদ্রকন্যা মৃগীর গর্ভে ঋষ্যশৃঙ্গ, গণিকা গর্ভে বশিষ্ঠ, নাবিককন্যার গর্ভে মনপাল, এবং হীনজাতীয় মণ্ডুকীর গর্ভে মুনিরাজ মাণ্ডব জন্ম গ্রহণ কবেন। এইরূপ আরও অনেকে শূদ্রাণী গর্ভজাত হইলেও ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। “বাৎস্যায়ন অকুতােভয়ে বলিয়াছেন যে, এই ঋত্বি ঋষির বংশধরগণের, আৰ্য অনাৰ্য্য এমন কি ম্লেচ্ছগণের পর্যন্ত সাধারণ সম্পত্তি।--ভারতে বিবেকানন ১৫ '৩ পৃঃ। বাৎস্যায়ন আরও বলেন যে, যিনি যথাবিহিত সাক্ষাতকৃতধৰ্ম্ম। তিনি মুচ্ছ হইলেও ঋষি হইতে পারেন। ভারতে বিবেকানন্দ, ৬৪৪ পৃঃ । (১০) বুদ্ধধর্মের আত্ব নারায়ণের অবতার বলিঃ। প্রখ্যাত (পূৰ্ব্বে লিখিত মগবতাদিতে আৰ্য্য বা হিন্দু গৌতম বুদ্ধদেব জাতিভেদ মানিতেন না। অনেকে বুদ্ধদেবকে অহিন্দু বলিয়া থাকেন। এই জন্য এ স্থলে সংক্ষেপে বুদ্ধদেব যে সম্পূর্ণ হিন্দু এবং বৌদ্ধধৰ্ম্ম যে সম্পূর্ণ হিন্দুধৰ্ম্ম হা একটু বলিয়া লই। *। আৰ্য বৌদ্ধধৰ্ম্ম খৃষ্ট পূৰ্ব্ব ৫০০/৬০০ বৎসর হইতে খৃষ্টীয় ৫৬ শত * সঁহারা বুদ্ধদেবের ও বৌদ্ধধর্মের আখ্যত্ব বা হিন্দুত্ব সম্বন্ধে আরও তথাগবেষণা জানিতে চাহেন, তাঁহারা আমার লিখিত “বুদ্ধ চরিতের অভিশ” পড়িবেন।-লেখক।
জাতি কথা = বৎসর পর্যন্ত ভারতীয় প্রধান ধৰ্ম্মরূপেই বিরাজমান ছিল। বৌদ্ধধর্মের সহিত হিন্দুধর্মের প্রায় সর্বস্থলেই মিল। বৌদ্ধধর্ম সম্পূর্ণ আৰ্য্যধৰ্ম্ম ; পালি ত্রিপিটকে ইহাকে বহু-বহুস্থলেই “অরিয়ে ধৰ্ম্মো” বলা হইয়াছে। বৌদ্ধধৰ্ম্ম উপনিষদ ব্রাহ্মণ ধৰ্ম্মেরই রূপান্তর। বিদেশী জাৰ্ম্মাণ পণ্ডিত cat**ata e aforat(59-"it has been rightly said, without Brahmanism no Buddhism"-The six systems of Indian Philosophy by Max Muller, P. 237. অর্থাৎ :- ইহা সত্য সত্যই বলা হইয়াছে যে ব্রাহ্মণধৰ্ম্ম ছাড়া বুদ্ধধৰ্ম্মের অস্তিত্ব নাই। শঙ্করাচাৰ্য্যদেব (তাহার মায়া বাদে) ও তাহার পরমগুরু গৌড়পাদ আচাৰ্য্য ( ‘মাণ্ডুক্য কারিকাতে) বৌদ্ধধৰ্ম্মকে হিন্দুধৰ্ম্মের পরমােদার বিপুল কোলে মিশাইয়া লইয়াছিলেন। নাগার্জুনের মাধ্যমিক কারিকাতে এবং গৌড়পাদ আচার্যের ‘মাণ্ডুক্য কারিকা’তে বহুস্থলে ভাবসাম্য ও ও ভাষা-সাম্য দেখা যায়। বৌদ্ধ মাধ্যমিক এবং শঙ্কর বৈদান্তিকদের মায়ার লক্ষণ প্রায় একরূপ। বুদ্ধদেব নিজেও যােগে (যম, নিয়ম, আসন প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধিতে) অভিজ্ঞ ছিলেন, এবং তাহার ছিলেন সাংখ্য আরাড় কালাম আর এক গুরু ছিলেন যােগী রুদ্রক রামপুত্র। { মজ ঝিমনিকায়ের অরিয়- পরিয়েসনা সুত্ত (১১৬৩ ১৬৬ পৃঃ); অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত মহাকাব্য ( ১২শ সর্গে ) ইত্যাদি দ্রষ্টব্য ] এই বৌদ্ধধৰ্ম্ম শৈব বৈষ্ণবাদি ধর্মের ন্যায়। হিন্দুধর্মের অন্তর্গত থাকিলে আজ হিন্দুধর্ম প্রায় জগদ্ব্যাপী হইত। এই আৰ্য বৌদ্ধধর্মে আমরা জাতিভেদের সঙ্কীর্ণতা পাই না। এই আৰ্য-বৌদ্ধযুগেও (প্রায় সহস্রাধিক বৎসর) আমরা ভারতে ৫২ জাতি কথা প্রথা বা অস্পৃশ্যতা ৩ অনাচরণীয় বর্তমানের জাতিভেদ প্রথা পাই না। (১১) বুদ্ধদেব জাতিবাদ মানিতেন না- (ক) ক্ষত্রিয়ের ‘গুরুত্ব। ব্রাহ্মণেরা যে ‘গুরুত্ব’ দাবী করেন তাহা বুদ্ধযুগে পাই না। বুদ্ধদেব ক্ষত্রিয় বংশােদ্ভব হইলেও তাহার প্রধান তিন শিষ্য সারিপুত্র, মৌল্যান ও মহাকাশ্যপ ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইহা ছাড়া তদানীন্তন কালের বহু প্রথিতনামা ব্রাহ্মণ, গৃহস্থ, সমাজহুরূপেই বুদ্ধদেবের ‘উপাসক বা গৃহীশিষ্য হন। যথা :-‘জানুসােণি ব্রাহ্মণ” (মজ ঝিমনিকা, ১৩৭ বা ১১৮৪ পৃঃ); “পিঙ্গলকোচ্ছ ব্রাহ্মণ” (মজ,, ১৩১০ বা ১২০৫পৃঃ ); ‘সালেব্যক ব্রাহ্মণ” গৃহপতিগণ (মজ, ১৫১ বা ১২৯০ পৃঃ); “দোণ” (দ্রোণ) “সঙ্গরিবাে” “কারণপালী” ও “পিঙ্গিয়ানি” বাহ্মণ- গণ ( অঙ্গুত্তরনিকায়, ৫১৯২-১১৪ নং ); “সােণদণ্ড ব্রাহ্মণ” (দীঘনিকায়, সােণদণ্ড সুত্ত, ৪২৪ বা ১৫১ ৫ পৃঃ); “কূটদণ্ড ব্রাহ্মণ” (দীঘ, কুটদণ্ড সুত্ত, ৫২৮ বা ১১৪০ পৃঃ); “বাশেঠ (বশিষ্ট ) ব্রাহ্মণ” (দীঘ, তেবিজ্জ সুত্ত, ১৩৮২ বা ১১৫২ পৃঃ); সপরিবারে সপরিষদে অমাত্যগণসহ বিখ্যাত ‘পােখরসাদি ব্রাহ্মণ” বুদ্ধশিষ্য হন (দী, অম্বটুঠ, ৩১২১ বা ১১১০ পৃঃ); বিখ্যাত মৈথিলী ব্রাহ্মণ গৃহপতি ‘ব্রহ্মায়” ব্রাহ্মণও বুদ্ধ- শষ্য হন । দীঘ, ব্ৰহ্মায়, ২৫১ বা ১৪৫ পৃঃ); “অগগিক ( অগ্নিক) ভারদ্বাজ ব্রাহ্মণ”ও বুদ্ধের উপাসক (গৃহীশিষ্য) হন (সুনিপাত, ১৭ বা ২০ পৃঃ)। ইহারা সকলেই গৃহস্থ ব্রাহ্মণরূপে সমাজে থাকিয়াই ;
জাতি কথা ক্ষত্রিয়কুলজাত বুদ্ধদেবের গৃহীশিষ্য হন। করিলাম না। বাহুল্য ভয়ে আর উদ্ধত (খ) ব্রাহ্মণত্ব জাতিতে নহে। সুত্তনিপাতে জাতি সম্বন্ধে বুদ্ধদেবের একটি চমৎকার উপদেশ আছে - “ন জচ্চা বসলো হােতি ন জচ্চ: হােতি ব্রাহ্মণ্যে। কম্মুনা বসলে হােতি কমুনা হােতি ব্রাহ্মণণা ।”—সুনিপাত, ১.৭২১, ১৩৬ বা ১৯২ পৃঃ। অর্থাৎ :-জাতির দ্বারা কেহ বৃষল । পতিত জাতি) বা ব্রাহ্মণ হয় না । কৰ্ম্ম দ্বারাই বৃষল বা ব্রাহ্মণ হয়। কাৰ্য্যত ও বুদ্ধদেব তাহাই করিয়াছেন। (গ) বৌদ্ধযুগে বর্তমান জাতিভেদ ছিল না। খৃষ্টপূর্ব ৬০০ অবে ঔপনিষদিক যুগের পরেই বুদ্ধদেবের সময়ে আমরা যে ‘বর্ণভেদ পাই তাহাতে বর্তমান ‘াতিভেদ ছিল না। পালিত্রিপিটক হইতে আমরা ইহার অনেক সাক্ষ্য পাই। অঙ্গুত্তরনিকায়ে (১১৬২) ব্রাহ্মণাদি চারিবর্ণ ছাড়া চণ্ডাল ও পুরুশ নামক দুইটি পৃথক বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। সুবিভঙ্গে নতকার, কুম্ভকার, পেসকার” ( তন্তুবায়), চৰ্ম্মকার, নাপিত, বেণ, বথকার, চণ্ডাল, নিষাদ ও পুশ এই অন্ত্যজ জাতিগুলির নাম আছে। ইহাদের মধ্যে প্রথম পাঁচটি হীন শিল্পী ও শেষের পাঁচটি হীন জাতি বলিয়া উল্লিখিত আছে। ইহার শূদ্র হইতে পৃথক্। কিন্তু মাদির মতে নাহার বর্ণসঙ্কর তাহারাই এখন শূদ্র বলিয়া খ্যাত। জাতিতে শূদ্র যে প্রাচীন কালে ও অপ্রাচীন কালে কাহারা ছিল তাহা সম্যক নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। মজ,ঝিম- ৫৪ জাতি কথা নিকায়ের অল্পলায়নসুত্তে ( ১৩ সুত্তন্ত, ২১৪৭-১৫৭ পৃঃ), অঙ্গুত্তর- নিকায়ে ( ২৮৫), সংযুত্তনিকায়ে (১৯৩), বিনয়ে ( ৪৬-১০) প্রভৃতিতে বেণ, নিষাদ ও রথকার নামক তিনটি জাতি ও চণ্ডাল ও পুক্কশের সঙ্গে পাওয়া যায়। ইহারা হীনজাতীয় বলিয়া খ্যাত ছিল। ইহারাই কি শূদ্র ? তাহা হইলে নমঃশূদ্র, রাজবংশী প্রভৃতিকে তাে আর শূদ্র বলা যায় না। ইহা ছাড়া ‘দাস’ বলিয়া অন্য সম্প্রদায়ও ছিল। [ দীঘনিকায়, ১৫,৬০,৭২,৯৩,১৪১; অঙ্গুত্তরনিকায় ১১৪৫, ০২৬; ২৬৭,৩৩৬,১৩৩। ২১৭; বিনয় ১১১৯১, ৪২১৪; জাতক ১০০; সুমঙ্গল বিলাসিনী { বুদ্ধঘােষের টীকা), ১১ ৫৮ ইত্যাদি দ্রষ্টব্য]। ; (ঘ) জাতিবাদ ত্যাগের উচ্চ আদর্শ বুদ্ধদেবের সময়ে এবং পূর্বেও ছিল। অনেকে বলেন যে, বুদ্ধদেবই জাতিভেদ নিজ সম্প্রদায় হইতে তুলিয়া দেন। ইহা সম্পূর্ণ ভুল। তাহার সময়ে বা তাহার পূৰ্বে বর্তমান জাতিভেদ ছিল না। মজ বিমনিবারে অসলাযুনসুত্ততে (১৩ নং) আছে যে, ব্রাহ্মণের গৌতমকে ব্রাহ্মণাদি চারিবর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠ বলেন কারণ তাঁহারা ব্রহ্মার মুখজাত। তাহাতে উত্তরে বুদ্ধদেব যে অতীব চমৎকার যুক্তিযুক্ত বিবরণ দেন তাহা সংক্ষেপে দিলাম। বুদ্ধদেব বলেন :-(১) ব্রাহ্মণ কর্তৃক ব্রাহ্মণীর গর্ভে যে সব ব্রাহ্মণের জাত হন তাহারাই ঐরূপ বলেন। (২) “যােন কম্বােজে অক্ৰেসু চ পচ্চন্তিমে জনপদেসু দেব বা অয্যো চ এব দাসে চ; অয্যাহুত্ব। দাসে হােতি ; দাসস হুত্ব অয্যো হােতীতি।”- ঐ, ২১৪৯ পৃঃ) জাতি কথা (৪) অর্থাৎ :-যবন কম্বােজদেশে এবং অন্য পশ্চিম জনপদে আৰ্য ও দাস এই দুই বর্ণ মাত্র আছে; আৰ্য্য হইয়া দাস হয় ও দাস হইয়া আৰ্য হয়। ব্রাহ্মণ অশ্বপায়ণও ঐরূপ শুনিয়াছিলেন বলেন। ( সুতরাং বুদ্ধদেবের সময়েও অনেক স্থলে, যেমন কম্বােজে বা নেপালে, আৰ্য ও দাস এই দুইটি মাত্র বর্ণ ছিল। এই ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের মূল্য অনেক বেশী।)। ৩) প্রাণহত্যাদি মিথ্যা দৃষ্টি দ্বারা চারি বর্ণ ই নরকে যায়। প্রাণহত্যাদি হইতে বিরত সম্যক্ দষ্টি দ্বারা চারি বর্ণই স্বর্গে যায়। (৫) কোশলদেশে (বর্তমানে সংযুক্ত প্রদেশ) চাবি বর্ণই বৈরীন মৈত্রীভাবাপন্ন। ( এই কোশলদেশ আবার কবে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হইবে ? }। (৬) বাহ্মণাদি চাবি বর্ণ ই নদীতে স্নান করিয়া স্বস্তিবােধ (1) ক্ষত্রিয়কুলের, ব্রাহ্মণকুলের, রাজনু ফুলের, চণ্ডালকুলের, নিষাদকুলের, বেণকুলের, রথকারকূলের, পুরুশকুলের যে কেহ অগ্নি জ্বালিলে তাহার অচি ( শিখা ) বর্ণ ও প্রভাযুক্ত হয়। (৮) ক্ষত্রিয়- কুমার এবং ব্রাহ্মণ কন্যা হইতে উৎপন্ন পুত্র মাতার সদৃশ বা পিতার সদৃশ হইলে তাহাকে ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণ বলা হয়। এখানে পিতামাতার সাদৃশ্যায়ী একই বংশােদ্ভব ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় পাইতেছি)। (৯) অশ্ব ও গর্দভের শাবক মাতা বা পিতার সাদৃশ্যানুসারে অশ্ব বা গর্দভ বক্তব্য (১০) সহােদর দুই ভাইয়ের মধ্যে যে অধ্যাপকের নিকট শিক্ষিত সেই শ্রাদ্ধ-যজ্ঞাদিতে আদৃত অপরটি শিক্ষিত নহে)। { ১১) এই অশিক্ষিত সহােদর যদি শীলবান্ কল্যাণ-ধৰ্ম্মযুক্ত হয় তবে সে দুঃশীল পাপধযুক্ত শিক্ষিত সহােদর অপেক্ষা শ্রাদ্ধ-যজ্ঞাদিতে আদৃত। { এইরূপে গৌতম বুদ্ধদেব চারি বর্ণেরই শুদ্ধি জ্ঞাপন করেন)।-(মজ- জাতি কথা ঝিমনিকায়, অস্লায়নসুত্ত, ২৫৩ (৯৩) বা ২১৪৮-১৫৪ পৃঃ) ইহার পরে বুদ্ধদেব এক প্রাচীন কাহিনী উল্লেখ করিয়া বলেন যে, ঋষি অসিতদেবল সপ্তব্ৰহ্মর্ষিকে গর্ভস্থ ভ্রুণের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যত্ব বা শূদ্র জানা যায় না বলিয়া তাহাদের “জাতিবাদ” দূর করেন ( ৬, ২০১৫৭ পৃঃ)। সুতরাং ঐরূপ উদার ও যুক্তিযুক্ত গুণকৰ্মচরিত্র ধৰ্ম্মানুযায়ী উচ্চ জাতিবাদ বুদ্ধদেবের নিজস্ব সৃষ্টি নহে। বুদ্ধদেবের ন্যায় অনেক ঋষিও তৎকালে ঐরূপ উদার মত পােষণ করিতেন এবং সমাজেও ইহার প্রাধান্ত ছিল। বুদ্ধদেব দীঘনিকায়ের অট্ঠসুত্তে বলিতেছেন :-“পায় খাে অম্বট্ঠ জাতিবাদ বিনিবন্ধঞ্চ গেবাদ বিনিবন্ধঞ্চ”। ( অর্থাৎ হে অম্বষ্ঠ, জাতিবাদ বন্ধন ও গােত্রবাদ বন্ধন ত্যাগ করিয়াই ) অনুত্তর বিদ্যাচরণসম্পদ সাক্ষাৎ করা যায়। (দীঘ, অট্ঠ- সুত্ত, ৩২১ বা ১১০০ পৃঃ)। নিৰ্বাণ বা মােক্ষসাধনা বুদ্ধদেবের পূর্বেও প্রচলিত ছিল। মােক্ষ বা নিৰ্ব্বাণ পথে জাতিবাদ বন্ধন ও গােত্রবাদ বন্ধন অন্যান্য সমস্ত বন্ধনের ন্যায় যে ত্যাগ করিতে হয়, ইহা ভারতের সু- সম্প্রদায়ের নির্বাণ বা মােক্ষ সাধকদিগের উপলব্ধ মত। এই জন্য ব্রহ্ম ও সন্ন্যাদ বা ভিক্ষু-আশ্রমে জাতিভেদ ভারতে কোন দিনই নাই। (ঙ) সন্ন্যাসে জাতিবাদ তিরােহিত দীঘনিকায়ের অগগঞসুত্তে ( ২৭৭ বা ৩৮-৩ পৃঃ ) এবং মঝিম নিকাষের মধুসুত্তে (৮৪ বা ২৮৪-৮৯ পৃঃ) বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূৰ্ব্বেও ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের ন্যায়, বৈশ্যের এবং শূদ্রেরও শ্রমণ বা সন্ন্যাসী হইবার পরিস্কার উল্লেখ পাই। “স্বধৰ্ম্মনিরত ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, ও শূদ্রের ভৈক্ষ্যধৰ্ম্ম জাতি কথা গ্রহণে অধিকার আছে।”—মহাভারত শান্তিপর্ব, ৬৩ অধ্যায়। অগগঞ- সুত্তে (দীঘ, ২৭৭ বা ৩৮৩ পৃঃ) আমরা আরও পাই “ইমেলং হি বাসেটুঠ চতুঃং মানং যাে হােতি ভিখু অহং খীণাসবাে••••••সাে তেসং অগগং অকৃথরতি ধৰ্ম্মেন’এব নাে অধৰ্ম্মেন।” (২৭৭ বা ৩৮৩ পৃঃ)। অর্থাৎ-হে বাশিষ্ঠ (জনৈক বশিষ্ঠবংশজ ব্রাহ্মণ, এই চাবিবর্ণ হইতেই যিনি ভিক্ষু অহৎ ক্ষীণাসবহন তিনিই সকলের অগ্র বা শ্রেষ্ঠ আখ্যাত হন, ধর্মের দ্বারাই, অধর্মের দ্বারা নহে। দীঘনিকায়েয় সামঞফলমুত্তে (৬০/৬১) আছে যে একজন দাসও যদি শ্রমণ বা সন্ন্যাসী হন, তবে তিনি ক্ষত্রিয় রাজা অজাত শক্ররও সম্মানাই ও পূজ্য। মজুঝিম নিকায়ের মধুরসুত্তে (২৪৪ (৮৪) বা ২৮৯ পৃঃ) পরিষ্কার আছে যে, যে কোনও বর্ণের ব্যক্তি শ্রমণ বা সন্ন্যাসী হইলে তিনি সর্বলােকের তুল্যভাবে সম্মানাই এবং পূজ্য। দীঘ, অম্বট্ঠসুত্তে (৩১২৮ বা ১৯৯ পৃঃ) বুদ্ধদেব আর ও বলিতেছেন যে, যেমন রাজার সেবক (শূদ্র) বা তাহার দাস আসিয়া যদি কোনও রাজবাক্য নিবেদন করে বা বলে, তবে সে যেমন রাজা বা রাজকর্মচারী বলিয়া বিবেচিত হয় না, তদ্রুপ বামদেব, বিশ্বামিত্র, অঙ্গিরস, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, ভণ্ড প্রভৃতি ঋষির মন্ত্র কণ্ঠস্থ করিয়া ঋষি হয় না। ব্ৰহ্ম বা আত্মার “দর্শনদৃষিঃ” সুপ্রাচীন ভারতীয় মত বৰ্ণজাতির গণ্ডী পার হইয়াই প্রচারিত হইয়া আসিয়াছে। (চ) ত্রিপিটকে উদাহরণ। দীঘনিকায়ের অম্বটুঠ-সুত্তে (৩১২৮ বা ১৯৯ পৃঃ) মজু (১৩৪৮) সংযুক্ত (১১১৫৩,২২৮৪) দীঘ (৩৯২-৯৩) (মহাভারত ৩১৮৪ ও দ্রষ্টব্য) •৫৮৮ জাতি কথা -ক্ষত্রিয়দিগকে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি অন্য তিন বর্ণ হইতে শ্রেষ্ঠ ও প্রথমােৎপন্ন বলা হইয়াছে। মহাভারত বলেন -ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম আদিদেব হইতে সর্বাগ্রে উৎপন্ন হইয়াছে। ঐ ধৰ্ম্মের পশ্চাৎ অন্যান্য ধর্মের সৃষ্টি হইয়াছে। -ঐ শান্তিপৰ্ব (রাজধৰ্ম্মানুশাসনপৰ্ব্ব,) ৬৪ অধ্যায়। জাতকে (৫২৫৭) এক রাজা এক ব্রাহ্মণকে আপনাপেক্ষা “হীন জচো” (হীনজাতীয়) বলিয়াছেন। দীঘ, অম্বটুঠমুত্তে (৩১২৩ বা ১৯৬-৯৭) আরও আছে যে, রাজা ইক্ষাকুর ‘দিসা নামক একদাসী কন্যার গর্ভে কৃষ্ণবর্ণ ঋষি কহ (কথ বা কৃষ্ণ) জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি ইক্ষাকুতনয়া খুরূপী বা মুদ্দরূপীর পাণিগ্রহণ করেন। এই ‘ক’ হইতে ব্রাহ্মণ কন্হায়ণ (কথায়ণ বা কৃষ্ণায়ণ) গােত্র সমুদ্ভূত হয়। অম্বঠত্তের ব্রাহ্মণ অস্বষ্ঠ এই কন্হায়ণ গােত্র সম্ভত। আমরা দেখিতে পাই কপিলবাস্তুর রাজকুলের নাপিত ‘উপালি’ বিনয়ধরদিগেব মধ্যে শ্রেষ্ঠ। “বিনয়ধরানং উপালি”-(অন্দুত্তর, ১১৪১৪ বা ১২৫ পৃঃ)। বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পরেই রাজগৃহের নিকটবর্তী সপ্তপর্ণীগুহায় প্রথম ধৰ্ম্ম-সঙ্গীতিতে এই নাপিত উপালির সাহায্যেই বিনয় পিটকের সঙ্কলন হয়।-( বিনয়, চুল্লবগগ, ১৩১,১২; ৭১১৪ ইত্যাদি)। খুদ্দকনিকায়ের অন্তর্গত থেরগাথা ও থেরীগাখার স্থবির ‘স্থবির ভিক্ষু ভিক্ষুণীদিগের মধ্যে অনেকেই নিম্নকুলােদ্ভূত বা নীচজাতিতে ছিলেন; কিন্তু চরিত্র, তপস্যা ও ধর্মের দ্বারা তাহার বহু ব্রাহ্মণাদিরও পূজ্য বা পূজণীয়া হইয়াছিলেন। থেগাথার কয়েকটা গাথার রচয়িতা সুনীতা পুকশ ছিলেন ; নন্দগােপাল ছিলেন ; মহাপন্থক ও চুল (ছােট) পন্থক শ্রেষ্ঠিকন্যার গর্ভে এক দাসের ঔরসে জন্মলাভ করেন। দস্যু অঙ্গুলিমাল ( যিনি নরহত্যা করিয়া তাহাদের অঙ্গুলি দিয়া মালা জাতি কথা ধারণ করিতেন) ভিক্ষু অহৎ হন। মজুঝিম নিকায়ের মহাতহুসংখয় সুতে আছে যে অন্য এক ধর্মমতের প্রবর্ভয়িতা শ্ৰমণ সাতি ধীবর পুত্র ছিলেন। কেবল পুরুষের নহে, নিকৃষ্ট জাতীয় নারীরও যে ‘থেরী বা উচ্চতমা সন্ন্যাসিনী হইবার অধিকার ছিল, ইহাতে জাতি- ভেদের অস্তিত্বই কি বিড়ম্বিত হয় নাই ? যে দিন যে কুক্ষণে ভারতে নারীর মর্যাদা শূদ্রের আসনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সেই দিন হইতেই ভারতের অধঃতপন সুরু হইয়াছে। তাই আমরা গৌরবময় বৌদ্ধযুগে ভারতের নারীগণকে সন্ন্যাস সজ্জায় জাতিবর্ণ নির্বিশেষে লােক-কল্যাণ সাধনে প্রবৃত্ত দেখিতে পাই। থেরী গাথার ৭১জন থেরী’ বা ‘স্থবিরা নারী সকলেই বিখ্যাত সন্ন্যাসিনী। ইহাদের মধ্যে অনেকে নিকৃষ্ট জাতীয় ছিলেন। থেরী অশ্বপালী পূৰ্বে বেশ্যা ছিলেন ; ইনি থেরী গাথার ২৫২২৭• নিপাতের বা শ্লোকের রচয়িত্রী। থেরী উপ্পল বন্না (উৎপল বর্ণ ) শ্ৰেষ্ঠী দুহিতা ছিলেন। প্রথম স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া ইনি পরে না জানিয়া আপন জামাতার সহিত বিবাহিত হন। ইনি ঐ ২২৪ শ্লোকের রচয়িত্রী। থেরী অনােপমা শ্রেষ্ঠ কন্যা (থেরী গাথা ১৫১ ইত্যাদির রচয়িত্ৰী)। থেরী সুজাতা বণিককুমারী ছিলেন। (ঐ ১৪৫ ইত্যাদির রচয়িত্রী)। থেরী পটাচারা কুলত্যাগিনী শ্রেষ্ঠ কন্যা ছিলেন (ঐ ২১২ ইত্যাদির রচয়িত্রী)। এই পটাচারার উপদেশে ৫০০ থেরী এক সময়ে দীক্ষিত হন (ঐ ১২৭ ইত্যাদি)। থেরী বিমলা গণিকা ছিলেন (ঐ ৭২ ইত্যাদি) বণিকদুহিতা শুক্কা ( শুক্লা ) ৫০০ ভিক্ষুণীর গুরু ছিলেন ( ঐ ৫৪ ইত্যাদি) থেরী উত্তমা দাসী ছিলেন (ঐ, ৪২)। থেরী উচ্চরি বণিক কন্যা ছিলেন (ঐ, ৫১ থেরী অভয়মাতা উজ্জয়িনী নগরে পতিতা জাতি কথা রমণী ছিলেন (ঐ, ৩৩৩৪)। থেরী অড়চকাসী ( অৰ্দকাশী ) কাশীর ( প্রায় অর্ধকাশীরমহাধন শালিনী বেশ্যা ছিলেন (ঐ, ২৫, ২৬) থেরী সুমঙ্গলের মা নলকার বা ছাতা নির্মাতার পত্নী ছিলেন (৫, ২৩২৪)। থেরী পুন্না বণিকদুহিতা (ঐ, ৩) এবং পুঞ্জিকা অনাথ পিণ্ডকের গৃহদাসী তনয়া ছিলেন। (ঐ, ২৩৬)। চাপা ব্যাধের কন্যা ছিলেন (ঐ, ২৯১।৩১১ নিপাতের রচয়িত্রী)। “সুভা কস্তার ধীতা থেরী” (তা কৰ্ম্মকারকন্যা স্থবিরা) থেরী গাথার ৩৩৮৩৬৫ শ্লোকের রচয়িত্রী। খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত ‘জাতক’ হইতেও আমরা জানিতে পারি যে, অনেকে নিম্নজাতীয় হইয়াও উত্বেলাভ করিয়াছিলেন। জাতকের ৩৩৮১তে একজন কুম্ভকারের এবং ৪৩৯২তে একজন চণ্ডালের শ্রমণ (বৌদ্ধ নহে) বা সন্ন্যাসী হওয়ার উল্লেখ আছে। কৈবর্ত্য কুলজাত লােসক লােশকজাতক ৪১ নং) ও দাসের ঔরসে শ্রেষ্ঠিকন্যা পুত্র মহাপন্থক ও চুলপন্থক অৰ্হত্ব লাভ করেন ( চুলশ্রেষ্টিজাতক, ৪নং)। ব্রাহ্মণের ঔরসে গণিকাগৰ্ভজাত উদ্দালক ব্রাহ্মণত্ব পাইয়াছিলেন (উদ্দাক পাতক, ৪৮৭নং)। কোশলরাজ প্রসেনজিৎ মালাকর কন্যা মল্লিকাকে বিবাহ করেন, (কুন্মাষপিৎজাতকৃ ৪১৫ নং)। বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের এক কাষ্ঠহারিণ মহিষী ছিলেন, (কাষ্ঠহারিজাতক, ৭ নং)। মহানামা শাকের উরসে, এবং নাগমুক্তানাম্নী দাসীর গর্ভে কোশলরাজ প্রসেনজিৎপন্ন বাসবক্ষত্রিয়া জন্ম ল’ন। তাঁহার পুত্র বিরূচক পরে কোশলরাজা হন, (কাষ্টহারি- জাতক, ৭ং)। পর্ণিক (পুণ্ডরীক বা পুড়ো শাকসবজীর উৎপাদক ) কুদ্দাল পণ্ডিত সন্ন্যাসী হন, (কুদ্দালজাতক, ৭০ নং)। সন্ন্যাসী মাতঙ্গ (৪৯৭ নং), চিত্ত ও সদ্ভূত (৪৯৮ নং) চণ্ডাল ছিলেন। সন্ন্যাসী দুকূলক জাতি কথা শ্যাম, ৫৪ ০ নং) নিষাদ ছিলেন। জাতকে নারীরাও সন্ন্যাস গ্রহণ করিতেন, জানা যায় [ গ্রাধ মৃগজাতক (১২ নং), অনুশােচনীয় (৩২৮ নং) কুম্ভকার s০৮ নং), চুলবােধি (৪৪৩), হস্তিপাল, (৫০৯), শােননন (৫৩১), স্যান (৫৪), ইত্যাদি জাতক।] “গঙ্গা, বমন, অচিরাবতী, সরভু ও মহীনদী যেমন সমুদ্রে পতিত হইয়া নামজাতি ত্যাগ করে, তদ্রুপ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই এই চারিবর্ণ শাক্যপুত্ৰীয় শ্রমণ বা সন্ন্যাসী হইয়া তথাগতধৰ্ম্মে প্রবেশ করিয়া নাম জাতি ত্যাগ করেন।–বিনয়, চুল্লবগগ, ৯১৪ আমরা বলি –গঙ্গা, মুনা, সিন্ধু, ব্ৰহ্মপুত্ৰাদি নদনদী যেমন সমুদ্রে পড়িয়া নাম জাতি ত্যাগ করে তােপ সমস্ত বর্ণ, সমস্ত জাতি, সমস্ত সম্প্রদায় সনাতন আর্য্য ধর্মে পতিত হইয়া নাম জাতিবর্ণ গােত্র ত্যাগ করিয়াছে, করিতেছে এবং ভবিষ্যতেও করিবে। (১২) শঙ্করাচাৰ্য্য দেবও বর্তমান জাতিভেদ মানিতেন না । খৃষ্টীয় ৬৬ বা ৭ম শতাব্দী হইতেই বৌদ্ধ ধর্মের অবনতির উপরে মারিল ভট, গৌড়পাদ আচাষ্য ও শঙ্করাচার্য প্রমুখ ব্রাহ্মণগণ যখন আবার বৌদ্ধধৰ্ম্মকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে মিশাইয়া লইয়া ‘নব ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মের (Neo Brahmanism) পুনরভুত্থান (Renaissance) আনয়ন করিলেন, তখনই বর্তমান জাতিবাদের অঙ্কুরােদ্গম হইতে লাগিল। ইহারই পরে ক্ষুদ্রচেত ব্রাহ্মণগণ স্ত্রী ও শূদ্রের অধিকার খর্ব করিয়া তাহাদের গলায় নাগপাশ বাধিলেন এবং এই কাৰ্য হাসিল করিবার জন্য অনেক পুরাণ সংহিতাদি নূতন রচনা করিলেন বা পুরাতনগুলির মধ্যে ৬২ জাতি কথা অনেক নূতন কথা প্রক্ষিপ্ত করিলেন। পালি সাহিত্য হইতে আমরা বেশ পরিষ্কারই বুঝিতে পারি যে খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত নিম্নবর্ণ বা নীচ জাতীয়ের চরিত্র ও সাধন বলে উন্নত হওয়ার প্রথা ছিল। নীচবর্ণ বা জাতির স্ত্রী পুরুষ সকলেরই উচচতম শাস্ত্র ও উচ্চতম সাধনায় অধিকার ছিল। বৌদ্ধ জাতকাদি গ্রন্থ রচিত হইবার শেষ কাল পর্যন্তও (অর্থাৎ খৃষ্টীয় ৫ম বা ৬ষ্ঠ শতাব্দী) এবং কুমারিল ভট্ট, গৌড়পাদ আচাৰ্য্য ও শঙ্করাচাৰ্য- দেবের আবির্ভাবকাল পর্যন্তও বর্তমান জাতিভেদের গোঁড়ামী ছিল না। অর্থাৎ বর্তমান জন্মগত জাতিভেদও অস্পৃশ্যতাদি ১৩ বা ১৪ শত বৎসর পূৰ্ব্বেকার। যাহারা ইহাকে “স্মরণাতীত কাল (হিন্দুর নব জাগরণ, ঐদিগিন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচাৰ্য কৃত, ৪ পৃঃ; জাতিভেদ, ঐ কৃত, ১৩৬, ২৪৭ পৃঃ ইত্যাদি); “শত শত বৎসরের” (হিন্দুর নবজাগরণ, ৬ পৃঃ), “শত শত শতাব্দীর” (ঐ, ১০২ পৃঃ; জাতিভেদ, ঐ কৃত, ২৪৪ পৃঃ); “যুগযুগান্তরের (ঐ, ১০৯ পৃঃ; জাতি ভেদ, ১৩৬ পৃঃ), “সহস্র সহস্র বৎসর” (জাতিভেদ, ২৪৭ পৃঃ); “যুগ যুগ হইতে” (মহাত্মা গান্ধী-হরিজন ( বালা), ১৬১১১৩৩৯ (১ম ও ২য় সংখ্যা), ১২ পৃঃ], সহস্র সহস্র বৎসর'—( বিবেকানন্দ, পরিব্রাজক, ৫১ পৃঃ)-বলিয়া ঘােষণা করিতেছেন তাহারা ঐতিহাসিক ভ্রমবশতঃ না জানিয়া অতিরঞ্জন করিয়াছেন। শঙ্করাচার্যদেবের উক্তি বলিয়া খ্যাত কিন্তু যাহা প্রক্ষিপ্ত বলিয়া মনে হয় সেই সমস্ত বাদ দিলে, শঙ্করাচার্য্যদেব নিজে যে বড় একটা জাতিভেদ বা অস্পৃশ্যতা মানিতেন তাহা মনে হয় না। শঙ্করাচাৰ্যও দলকে দল জেলে লইয়া তাহাদিগকে ব্রাহ্মণ করিয়া ফেলিয়াছিলেন।-(ভারতে বিবেকানন্দ, ৩৩৩ পৃঃ)। শঙ্করাচাৰ্য্যদেবও তঁাহার শিষ্যগণ বহু বৌদ্ধকে শুদ্ধ করিয়া জাতি কথা যে ব্রাহ্মণাদিতে পরিণত করেন ইতিহাস তাহার সাক্ষ্য দেয়। শঙ্কর দিগ্বিজয় এবং শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য জগদ্গুরু মঠামার গ্রন্থে আছে যে, পুরীর জগন্নাথ মন্দির পূর্বে বৌদ্ধ মন্দির ছিল। শঙ্করাচাৰ্য্য দেবই বৌদ্ধ দেবতা ও তাহার সেবাইত দগকে পরিষ্কার হিন্দু করিয়া বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দিরে পরিণত করেন। ফাহিয়ানের ভ্রমণ বৃত্তান্তের তৃতীয় অধ্যায়ে (The Pilgrimage of Fahian, PP. 19–20.) ফাহিয়েন তাতারের অন্তর্গত খােটান (Khotan) প্রদেশে এক রথযাত্রা উৎসবের বর্ণনা করিয়াছেন। রথস্থ প্রধান মূৰ্ত্তির (বুদ্ধদেবের) দুই পার্শ্বে দুই বােধিসত্ত্বের মূৰ্ত্তি এবং চারি পার্শ্বে অনেক দেবমূর্তি ছিল—ফাহিয়েন এইরূপ উল্লেখ করিয়াছেন। ঐ বৌদ্ধ রথযাত্রাও আবঢ় মাসে হইত। খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগে খােটানের বৌদ্ধ মহাযান সম্প্রদায়ের এই বৌদ্ধ রথযাত্রাই কি বিখ্যাত জগন্নাথের রথযাত্রায় পরিণত হয় নাই ? অথবা বৌদ্ধ রথযাত্রা বা মূৰ্ত্তিযাত্রা, হিন্দু রথযাত্রা বা মুত্তিযাত্রা হইতে বিভিন্ন বিবেচিত হয় নাই। ইহাতে তখনকার গোঁড়া ব্রাহ্মণেরা কোনও আপত্তি করেন নাই এবং এখনকার গোঁড়া ব্রাহ্মণেরও কোনরূপ আপত্তি করেন না। জাতিভেদের ও অস্পৃশ্যতার গণ্ডী যে শঙ্করাচার্যদেব ও তাহার শিষ্য প্রশিষ্যগণ মানিতেন না, এই পুরীমন্দিরই তাহার বিপুল উজ্জ্বল সাক্ষ্য। শ্ৰীশঙ্করাচার্য জগদ্গুরু মঠান্নায় বলেন ( ৯-১০ পৃঃ) যে, পুরীর এই জগন্নাথ মনির এবং অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ ও উৎকল পুরীর গগাবর্ধনমঠ ও তাহার প্রথমাচাৰ্য শঙ্করশিষ্য পদ্মপদ আচার্যের অধীন ছিল। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ ও উৎকলবাসীরা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে যে জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা বর্জন করিয়াছিলেন শঙ্করাচাৰ্য্যদেব ও পদ্মপান ৬৪ জাতি কথা আচাৰ্য্যদেবাদির সময়ে তাহা হিন্দু তুমি, বাঙ্গালী উড়িয়া তুমি, ভুলিলে কোন্ পাপে, কোন্ মহাপরাধে ? (১৩) গৌরাঙ্গদেবও বর্তমান জাতিভেদ মানিতেন না। শঙ্করাচার্যদেবের তিরােভাবের অনেক পরে তাহার দিগ্বিজয়কে সাধন- হীন ব্রাহ্মণেরা জাতিবাদের জয়ে পরিণত করিয়া গোড়ামী আরম্ভ করিলেন। জীবনবেদের সর্বভূতে ব্রহ্মদর্শন পুথির পাতায় আটকাইয়া গেল। এই পাপ, মহাপ্রভু ব্রাহ্মণ শিরােমণি গৌরাঙ্গদেব আসিয়া আবার সংস্কার করিলেন। চৈতনু-প্রেমে গলিয়া সমস্ত জাতিবর্ণ একাকার হইল। জাতি- ভেদের তিরােভাবেই গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রতিষ্ঠা। শ্রীরাখালদাস বন্দ্যো- পাধ্যায় মহাশয়ও বলেন-“বৈষ্ণব সম্প্রদায় সমূহের মধ্যে সমগ্র ভারতবর্ষে এই নূতন সম্প্রদায় (চৈতন্য প্রতিষ্ঠিত—লেখক) সর্বাপেক্ষা অধিক প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছে, ইহার কারণ এই সম্প্রদায়ে সকল জাতির সমান অধিকার এবং দুর্বোধ্য জটিল দার্শনিকতার অভাব।”—বাঙ্গালার ইতিহাস, ২য় ভাগ, ২৮৯-২৯০ পৃঃ। গৌরাঙ্গদেব বহু নীচ জাতি ও বৌদ্ধকে বৈষ্ণব- ধর্মে দীক্ষিত করেন। গৌরাঙ্গদেব “বগুলা নামক অরণ্যে পন্থীল নামক একজন দস্যুকে দীক্ষাপ্রদান করিয়াছিলেন।”—ঐ ৩০১ পৃঃ; গােবিন্দদাসের কড়চা, ৬৮-৭০ পৃঃ। জিজুরী নগরে “খাণ্ডবাদেবের মন্দিরে দেবদাসী মুরারীগণকে উদ্ধার করিয়া চৈতন্য চোর নন্দীবনে গমন করিয়াছিলেন।” ঐ, ৩০৪ পৃঃ; গােবিন্দদাসের কড়চা, ১৪২-১৪৩ পৃঃ। “তথায় নাৱােৰ্জী নামক একজন দস্যু সদলে দীক্ষিত হইয়াছিলেন।”-ঐ, ৩০৪ পৃঃ; গােবিন্দদাসের কড়চা, ১৪৪-১৪৮ পৃঃ। “ঘােঘাগ্রামে গমন করিয়া চৈতন্যদেব জাতি কথা ৩৫ বারমুখীনাম্নী এক বেশ্যাকে উদ্ধার করিয়াছিলেন।’-ঐ, ৩০৫ পৃঃ; ঐ কড়চা, ১৬৫-৭• পৃঃ, রাখালবাবু আরও বলিতেছেন-“নব প্রচলিত ধর্মে ( চৈতদেবের—লেখক) বর্ণাশ্রম বিচার ছিল না। পূৰ্বে সমাজভ্রষ্ট ও জাতিভ্রষ্ট নরনারী প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়া বৌদ্ধসবে আশ্রয় লাভ করিত। বৌদ্ধধৰ্ম্ম লুপ্তপ্রায় হইলে এই সকল নরনারী নিরুপায় হইয়াছিল। ইহার খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ও ষােড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাঙ্গলা- দেশে নেড়ানেড়ী নামে পরিচিত ছিল। নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচাৰ্য এই সকল ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীগণকে নবীন বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত করিয়া উদ্ধার করিয়াছিলেন।”—বাঙ্গলার ইতিহাস, ২ভাগ, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত, ৩১৫-৩১৬ পৃঃ; Dinesh Sen's History of the Bengali Language and Literature P. P. 566-567 ও দ্রষ্টব্য। গৌরাঙ্গ দেবের মহােৎসবে সৰ্ব্বজাতির একত্রে বসিয়া প্রসাদ ভােজনে জাতিভেদেরই কি শ্রদ্ধোৎসব যজ্ঞ পূর্ণ হয় নাই ? চৈতদেবের জাতিভেদবাদ তিলো- ভাবের প্রভাব বাঙ্গলায় প্রায় দুই শত আড়াই শত বৎসর ছিল। তাহার পরই আসল হিন্দু, বাঙ্গলার জাতিভেদের বিপুল বৈষম্য, উচ্চতা নীচতার সংকীর্ণ দলাদলি, সমাজ ধ্বংসলীলা, যাহার সুযােগ ও সুবিধা লইয়া বাঙ্গায় ইংরাজ রাজত্বের ভূমি পত্তন হইল। মাদ্রাজ হইতে অস্পৃশ্য পারিয়াকে সেপাই করিয়া ক্লাইভ দাসত্বের শেল উচ্চবর্ণের বুকেও 3912694 | "The Pariahs supplied a notable proportion of Clive's Sepoys." -The Encyclopædia Britanica, vol. 20. p: ৪০৪. অর্থাৎ-পারিয়াগণ ক্লাইভের সেপাইগণের বিশিষ্ট অংশই ছিল। উচ্চবর্ণ, তুমি যাহাকে নীচবর্ণ বলিয়া পড়িয়া রাখিলে জাতি কথা সেই ‘পারিয়াই তােমাকে শূদ্র’ বা ‘দাস’ করিল রাষ্ট্রের দিক দিয়া, কী ভয়ঙ্কর প্রকৃতির প্রতিশােধ। (১৪) বিখ্যাত মহাপুরুষেরাও জাতিবাদ ও অস্পৃশ্যতার বিরােধী। বিখ্যাত বিখ্যাত অবতার, মহাপুরুষ, সাধু, মহাত্মা, আচাৰ্য, গুরু প্রভৃতির মধ্যে আমরা এই জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও অনাচরণায়তা প্রভৃতি সঙ্কীর্ণতা পাই না। জনক, পরশুরাম, রাম, বাল্মীকি, বেদব্যাস, কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম, গৌতমবুদ্ধ, শঙ্কর, রামানুজ, রামানন্দ, তুলসীদাস, কবীর, নানক, গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ, জাহ্নবদেবী, মীরাবাঈ, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বিজয়কৃষ্ণ, রামমোহন, ত্রৈলঙ্গস্বামী, ভাস্করন, দয়ানন্দ বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী, ফরিদপুরের প্রভু জগদ্বন্ধু, নবদ্বীপের রাধারমণ দাস বাবাজী প্রভৃতি শত শত সাধু মহাপুরুষের যাহাকে কাষক্ষেত্রে বর্জন করিয়া হিন্দু বা আৰ্য্য ধর্মকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন সে পথ হইতে হিন্দু তুমি পরিভ্রষ্ট হইবে? সে পথকে কণ্টকাকীর্ণ ও সঙ্কীর্ণ করিয়া সনাতনী তুমি ক্ষুদ্ৰত্বের গণ্ডীবদ্ধ হইবে? চার রুইদাস, শবন হরিদাস, কামার গগাবিন্দ, ধুনী দাত, ডােম নাভাজী, গোলা কবীর প্রভূত সাধু মহাপুরুষ বলিয়া বহু বহু ব্রাহ্মণাদি কর্তৃক পূজিত হইয়া থাকেন। এইদাস বা রৈদাস বা রবিদাস জাভিতে চামার ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ রামানন্দের শিষ্য এবং জেলা কবীরের গুরুভাই ছিলেন। এইদাল চিতােরের মহারাণা কুন্তের ক্ষত্রিয়া রাণী, পরে পরম বৈষ্ণবী মীরাবাঈয়ের দীক্ষা গুরু ছিলেন। গুজরাট প্রদেশে রুইদাসের লক্ষ লক্ষ শিষ্যপ্ৰশ্যিাদির ধারা এখনও বর্তমান জাতি কথা ৬৭ তাহারা “রবিদাসী” বলিয়া খ্যাত। ভারতে “কবীর পন্থী হিন্দুও বহু আছেন। মহারাষ্ট্র-তিলক ছত্রপতি শিবাজীর অন্য গুরু তুকারাম শূদ্র বণিক ছিলেন। অস্পৃশ্য তিরুমল্ল তামিল ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও উপদেষ্টা হইয়াছিলেন। অস্পৃশ্যা নারী আবেয়া তামিল ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও উপদেষ্টা ছিলেন। ধৰ্ম্মরাজ্যে জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও অনাচরণীয়তা ভারতে চিরদিনই একাকার হইয়াছে। সময়ে সময়ে তাহার যে ব্যতিক্রম হইয়াছে সেই ব্যতিক্রম জাতিবাদ বর্জনের নিয়মকেই প্রতিষ্ঠিত করে। (১৫) মিশ্রিত হিন্দুজাতি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বা আৰ্য, অনাৰ্য্য বলিয়া কোনও খাটা অবিমিতি জাতি বা বর্ণ আজকাল ভারতবর্ষে নাই। হিন্দুরূপ মহাসাগর সঙ্গমে সৰ্ব্বদেশের প্রায় সৰ্বজাতি আসিয়া মিশিয়া গিয়াছে। ইতিহাস এইরূপ সাক্ষ্য দেয়। গ্রীক, যবন, দ্রাবীড়, চীন, মঙ্গোলীয়,' কিরাত, শক, ফুণ, কুশল, পারদ, পলব, তক্ষক, আভীর, গুর্জর, তুরাণ, পারসীক, জাঠ, আহােম, তার, বেলুচী, আরব, গণ্ড, মণ্ড, কোল, ভীল, বিদ্যা, চুটিয়া, কাছাড়, কোচ, পাহাড়ী, পালামাের, পাহয়া, সারগুজার, কিসা, বুনো, বাণী, মুসলমান, ইহুদী, খৃষ্ঠান প্রভৃতি শত শত জাতির সংমিশ্রণ ফলে এই হিন্দুজাতি বৰ্তমান অবস্থায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। মীরাট প্রদেশের তাগা ও ভার্গবজাতি প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন না। কিন্তু ১৮৯১ খৃষ্টাব্দের সেন্সাস গণনায় তাহাদিগকে ৰাহ্মণ বলিয়া লেখায় তাহারা ব্রাহ্মণ হইয়া গিয়াছেন। নব্য ভারত, ১৩২৮, ২৯৩ পৃঃ)। উড়িষ্যার কোন কোন নীচ জাতি ব্রাহ্মণ হইয়াছেন। এখনও হিমালয় প্রদেশে জাতি কথা নীবণ ব্রাহ্মণ হইতেছেন। (.. L. B, 33. Madras, p. 39)। ১৯৩১ এর আমমারীতে (Census Reportsএ) অনেক নিম্নতি উচজাতিতে পরিণত হইয়াছেন। যথা :- বৈদ্যেরা ব্রাহ্মণ বৈ”, বাগীরা “ব্যাগ্র ক্ষত্রিয়, ভুহমালিরা “বৈশ্যমালা”, ঝালােমালাে “মল্লক্ষত্রিয়” হাড়িরা বীরবংশী কাপালিরা “বৈশ্য সাহা, বাজীবী প্রভৃতিরা বেশ” চামারেরা রবিদাসী” প্রভৃতি হইয়াছেন। (vide the Calcutta Gazette, July, 14, 1932, p. p. 1354-1370.)। নমঃশূদ্র এবং রাজবংশীরা তাহাদের ক্ষত্রিয়ত্বের দাবী করতেছেন। ৩০/৩৫ বৎসর পূর্বে কয়স্থের “শূদ্র ছিলেন। এখন তারা “ক্ষত্রিয়’ হইয়াছেন। লেফটেনান্ট কর্ণেল ডেস্ টড, (James Tod) হু কারণ দর্শাইয়া বলিয়াছেন—হয় বা অশ্বজাতি, তক্ষক, জাত, চন, ৩৩, মােগল, শক ও হিন্দু সম্ভবত এই জাতি হইতে উৎপন্ন হইয়াছে।- [ The Annals and Antiquities of Rajasthan, Vol. 1. ( 1899), p. 60 ] টড সাহেব আরও বলেন যে, রাজস্থানের ৩৬টী রাজবংশের পূর্ধ্বপুরুষ হ্রণ, আভীর বা তক্ষকাদি ছিলেন (ঐ, ৬০-৮৫ পৃঃ)। টড আরও বলেন- "Hence the inference of a common origin between the Rajpoot and early races of Europe." ( ঐ, ৬৩ পৃঃ) অর্থাৎ এতুে রাজপুত এবং ইউরােপের প্রাচিন জা গণের যে এক সাধারণ উৎপত্তি, এই সিদ্ধান্তই ইসে। এখনও ৬ ঞ্জা গােত্রের হিন্দু আছেন ( Modern Review, 1917, Feb, p. 224.।। মনুসংহিতায় {১০৪৩-৪৪) এবং মহাভারতে (৩৩২১-৬) অছে ২ যবন, শক, চীন, পারদ, দরদ, থশ, কিরাত প্রভৃতি জাতি পূৰ্ব্বে ক্ষত্রিয় ছিলেন; কিন্তু পরে জাতি কথা পতিত হইয়াছেন। “শনৈক ক্রিয়া পােপাদিমাঃ ক্ষত্রিয় জাত। বৃষলং গত লােকে ব্রাহ্মণাদর্শনেন চ। পৌণ্ডকাশৌড্র ঐবিড়াঃ কাদােজা জবা শকা। পােয়দা লবংশীল কি দরদা খশাঃ ॥”—মনুসংহিতা, ১০৪৩-৪৪। অর্থাৎ ক্রমশঃ ক্রিয়াদি সােপহেতু এবং উপনয়নালি সংস্কারভাবে এবং যঞ্জনধ্যয়নাদির অভাবে লােকে নিম্নজাতিগুলি বৃষল বা পতিত জাতি হইয়াছে। যথা—পৌণ্ডুক, ঔড্র, বিড়, কাম্বােজ, জবন, শক, পারদ, পহল, চীন, কিরাত, দরদ এবং খশ। মহাভারতে আরও আছে যে, “মেকল, দ্রাবিড়, লাট, প্টে. কোশির, শৌণ্ডীক, দরদ, দৰ্ব্ব, চৌল, শবর, বর্বর, কিরাত ও যন্ত্র প্রভৃতি ক্ষত্রিয়গণ ব্রাহ্মণের কোপেই শূদ্রতা প্রাপ্ত হইয়াছে।”-ঐ, অনুশাসন পর্ব, ৩৫ অধ্যায়। শক, যবন, কাজে, পারদ ও পহলবগণ ক্ষত্রিয় ছিলেন কিন্তু তাহাদিগকে স্বাধ্যায় ও বষট্কার- বিহীন করায় তাহারা ম্লেচ্ছত্ব প্রাপ্ত হন।-(বিষ্ণুপুরাণ, ৪৩-১৮-২১; ব্ৰহ্ম- পুরাণম্ ৮৩৫-৪৯। ক্ষত্রিয় রাজা যযাতির ব্রাহ্মণকন্যা দেবযানী স্ত্রীর গর্ভে যদু ও তুৰ্বসু নামক দুই পুত্র হয় এবং অসুরকা শর্মিষ্ঠার গর্ভে হ্য, অনু ও পুরু এই তিন পুত্র জন্মলাভ করেন। দুর বংশে যাদবগণ, হুর বংশে তােজগণ, পুরুর বংশে পৌরবগণ, পুর্বসুর বংশে যবনগণ এবং অনুর বংশে শ্লেচ্ছগণ জন্মগ্রহণ করেন।-মহাভারত, আদিপর্ব, ৭৫১৩; ৮৫৩৪-৩৫। স্লেচ্ছ যবনগণও যে হিন্দুর খুড়তুতাে ভ্যাঠতুতাে ভাইভগনী। বিজলী সাহেবের মতে বাঙ্গালীর মধ্যে দ্রাবিড় ও মজলীয় বক্ত আছে। (Tribes and castes, Ancient India, p. 21.)। “নৃতত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণ আধুনিক বঙ্গবাসিংণের নাসিকা ও মস্তক পরীক্ষা করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, তাঁহারা ঐবিড় ও মমঙ্গোলীয় জাতির সংমিশ্রণে উৎপন্ন।••••••বঙ্গবাসি- ৭০ জাতি কথা . গণকে আতিনিৰ্বিশেষে দ্রবিড় ও মমঙ্গোলীয় জাতির সংমিশ্রণের ফল বলা বলা যাইতে পারে।—বাঙ্গলার ইতিহাস, ১ম ভাগ (১ম সং) শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত, ২৩ পৃঃ। ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন যে, ব্রাহ্মণদিগের মধ্যেও নানা জাতির রক্ত আছে। ( Early History of India by Vincent Smith, p. 404, footnote)। বঙ্কিমচন্দ্র তাহার বিবিধ প্রবন্ধে বাঙ্গালীর উৎপত্তি সম্বন্ধে ৭ম পরিচ্ছেদে লিখিতেছেন—“প্রথমে কোলবংশীয় অনাৰ্য, তারপর দ্রাবীবংশীয় অনাৰ্য তারপর আৰ্য এই তিনে , মিশিয়া আধুনিক বাঙ্গালীজাতির উৎপত্তি হইয়াছে।” বাঙ্গলার পুরাবৃত্তের ১ম ভাগের ৪১ পৃষ্ঠে আছে, “বাঙ্গালীতি আৰ্য্য এবং অনাৰ্যজাতির বিভিন্ন শাখার সংমিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে এবং বঙ্গসমাজে নানাবিধ সঙ্করবর্ণ বিদ্যমান রহিয়াছে।” ব্রাহ্মণ শ্ৰীযুক্ত রাধাকমল মুখােপাধ্যায় মহাশয় বলেন যে, বাঙ্গলার অধিকাংশ অস্পৃশ্যজাতিই বিস্মৃত বৌদ্ধগণের বংশাবলী। (Modern Review, 1912, August. p. 129. footnote.) মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় লিখিয়াছেন—“আমাদের দেশে যাদের অনাচরণীয় জাত মনে করি, তারা বােধহয় এককালে বৌদ্ধ ছিল। সেইজন্য অনাচরণীয় হয়েছে ; তখন তারা আমাদের সঙ্গে মিতে চেষ্টা করেনি, তারা প্রবল ছিল ; পাল রাজগণের সময় (একাদশ শতাব্দী) তারা প্রবল ছিল, তারা ব্রাহ্মণদের ঢুকতে দিতনা।”— (প্রবর্তক, কার্তিক, ১৩৩০)। হরপ্রসাদ আরও বলেন, “পালবংশের রাজারা (১০ম-১১শ খৃষ্টাব্দ) বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁহাদের সময় জাতিবিচার ছিল না। (Sastri's History of India, p. 39. প্রবর্তক, কার্তিক, ১৩৩৩)। “প্রাচীন গুপ্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস করিয়া হূণজাতি যখন আৰ্যাবর্তে উপনিবেশ জাতি কথা ৭১ স্থাপন করিল, তৃণ বৰ্ব্বর যখন ম্লেচ্ছাচার শ্লেচ্ছ ভাষা পরিত্যাগ করিয়া আৰ্য্যধৰ্ম্ম ও আর্যভাষা অবলম্বন করিল, তখন প্রাচীন প্রাচ্য কিছুকালের জন্য বিশ্রাম লাভ করিল।-বাঙ্গলার ইতিহাস, শ্রীবাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত, ২য় ভাগ, ২ পৃঃ। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দের আদমশুমারীর গণনায় বাঙ্গলায় হিন্দুদের ১৩৯টী পৃথক্ জাতির জনসংখ্যা বাহির হইয়াছে। খৃষ্টাব্দের গণনায় প্রদত্ত ২ ৪টী হিন্দু জাতিব পৃথক্ জনসংখ্যা ১৯৩১এর গণনায় দেওয়া হয় নাই। ঐ ১৪টী জিন জাতির মধ্যে গন্ধবণিক, সুবর্ণবণিক, মম্বর, - তাম্বুলী, চাষাবােপা ইত্যাদি নাই। (১৩২এর ১৪ই জুলাই তারিখের কলিকাতা গেজেট, ১৩৫৪-১৩৭৩ পৃঃ দ্রষ্টব্য) এই ২৪টী জাতি কি হইলেন? তাঁহারা নিশ্চয়ই সব সমাজে লুপ্ত হন নাই; লুপ্ত অকার (২) রূপে সন্ধিতে তাঁহারা অন্য জাতিতে ঢুকিয়াছেন, অথবা গণক- কাদের ভুলেই জাতিহীন, নামহীন হইয়াছেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিটী বর্ণ বা জাতি ভাঙ্গিয়া চুরিই “উর্দ্ধগ লঘুকরণ” বা “নিমগ লনুকরণ” দ্বারাই কি ঐ ১৩৯টা জাতিতে পরিণত হয় নাই ? ১৯২১এর গণনায় হিন্দুজাতির সংখ্যা ছিল ১০২। দশ বৎসরে ৩৭টী জাতি বাড়িল কি করিয়া? এই ১৩৯টী জাতির মধ্যে কাহারা ‘নির্জলা খাটী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র ? এই “হােমিওপ্যাথিক ডাইলুশনে” বা ক্ষীনীকরণে আসল বর্ণ বা জাতি তো খুজিয়াই পাওয়া যায় না। বাঙ্গলায় কালসাগরে নিত্য নূতন জাতি বুদবুদের মত ফুটিতেছে ও মিশিতেছে। বাঙ্গালীর জাতিবাদের বড়াই যখন বুদবুদের মতােই ক্ষণিকস্থায়ী তখন তাহা লইয়া আর শৃশ্য অস্পৃশ্য, আচরণীয় অনাচরণীয় ভে কেন ? ই ৭ জাতি কথা * (১৬) বিবাহে জাতিতে অশুহিত। ভারতে হিন্দু বা আর্যজাতির মধ্যে অনুলােম প্রতিলােম বিবাহ বা অসবর্ণ বিবাহ প্রচলিত থাকায় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটী ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণে, শূদ্র অশূদ্রে, পৃশ্য অস্পৃশ্যে, আচরণীয় অনাচরণীয়ে যে বৈবাহিক আদান প্রদান হইয়াছে তাহাতে হিন্দুজাতির যদি জাত’ না যাইয়া থাকে, তবে দেবমন্দিরে প্রবেশ বা অন্নজল আহারেই বা তাহা এখন কেন যাইবে? এই বৈবাহিক বা যৌনব্যাপারে হিন্দুজাতির মধ্যে যে কত জাতির রক্ত আসিয়া মিশিয়াছে তাহা খুব প্রাচীনকাল হইতে আধুনিককাল পর্যন্ত আলোচনা করিতে গেলে এক বৃহৎ গ্রন্থ হইয়া পড়িবে। এইজন্য তাহাতে বিরত হইয়া আমরা কেবল বাঙ্গলার রাঢ়ী বারে ব্রাহ্মণ কুলের কথাই একটু আললাচনা করিব। (১৭) বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ অস্পৃশ্যসস্তুত। বৌদ্ধপ্লাবনে বাঙ্গলার বর্ণ বা জাতি বিভাগ এরূপ বিমিশ্রিত হইয়া গিয়াছিল যে, আদিশূরকে ( ৯৬৪ খৃষ্টাব্দে ( রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মত) বা ১০৩২ খৃষ্টাব্দে (বাচসুতিমিশ্রকৃত ‘কুরমার মতে) বা এই সময়ের কিছু পূর্বে বা পরে] কান্যকুজ হইতেপুত্ৰেষ্ঠী যজ্ঞের জন্য পাঁচ জন বেদজ্ঞ যজ্ঞকারক আনিতে হয়। আদিশূর যখন গৌড়াধিকার করেন, তখন গৌড়দেশে সাগ্নিক এবং বেবেত্তা ব্রাহ্মণের অভাব ছিল, তাহাতেই আদিশূর কান্যকুজ দেশ হইতে সাগ্নিক এবং বেদ পারগ ব্রাহ্মণ আনিয়া গৌড়ে বসতি করান।”—গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ৫১ পৃঃ। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের “কারিকায় আছে যে, রাজা লিখিতেছেন—“বঙ্গদেশে ন বিহেস্তি বেদ যজ্ঞকারক। পরাশরাণিক জাত কথা ; শক্তি কথং যজ্ঞ ভবিষ্যতি ॥ বাঙ্গলায় বেদজ্ঞ ও যজ্ঞকারক ব্রাহ্মণ নাই; আছে কেবল পরাশর ও অণিক নামক (পতিত) ব্রাহ্মণ। শান্তি ও যজ্ঞ হইবে কি করিয়া ? আদিশূর কান্যকুজরাজ বীরসিংহের নিকট হইতে বলপূর্বক (কারণ তিনি পতিত বাঙ্গলায় ব্রাহ্মণ পাঠাইতে অস্বীকার করেন) ব্রাহ্মণ আনিবার জন্য সাতশত অস্পৃশ্য জাতিকে ব্রাহ্মণ বানাইয়া গরুতে চড়াইয়া যুদ্ধযাত্রায় পাঠাইলেন ; কারণ বীরসিংহ গাে-ব্রাহ্মণ ভক্ত ছিলেন বলিয়া ইহাদের বধসাধন করিতে পারিবেন না। “ততঃ সপ্তশতাঃ গা অস্পৃশ্যা হীন সম্ভব। বিপ্রবেশং সমান্থায় গবাঢ়া ধৰ্দ্ধরা। নৃপাদেশেন তে সৰ্ব্বে নানা সজ্জাসমন্বিতা। আজগ্ম সমরং কং সিংহনাদৈনিরে ।*-বানন্দমিশ্রের কারিকা। অস্পৃশ্য ও হীন সম্ভব। সেই সপ্তশত ধনুর্দ্ধর বিপ্র বেশ ধারণ করিয়া গরুতে চড়িয়া নানা সজ্জাতে সাজিয়া রাজাদেশে সিংহনাদ পূৰ্ব্বক যুদ্ধ করিতে গেলেন। কান্যকুজরাজ গাে-ব্রাহ্মণ বধের আশঙ্কায় পাঁচ জন সাগ্নিক ব্র হ্মণ পাঠাইয়া সন্ধি করেন, এবং এই সাতশত সৈন্যকে ‘সপ্তশতী” ব্রাহ্মণ করেন। বরং সপ্তশতভাে্যাহসে : সৈনিকেভ দৌমুদা। সপ্তশতীতি বিখ্যাত হেনিকা প্রাভব, জা।”--ঐ, কারিকা। তিনি আনলে ঐ সপ্তশতী সৈনিকদিগকে বর দান করিলেন; এইরূপে ঐ সৈন্যগণ ‘সপ্তশতী বলিয়া বিখ্যাত হইল। অষষ্ঠ আদিশূরের কপটতা ও কাপুরুষতার ক লইয়া রাঢ়ী বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের পূর্বপুরুষ এই ‘সপ্তশতী’ ব্রাহ্মণেরা সৃষ্ট হইলেন। বীরসিংহেব আদেশে ক্ষিতীশ, মেধাতিথি, বীতরাগ, সৌরভি ও সুনিধি এই পাঁচজন ‘সাগ্নিক ব্রাহ্মণ (সম্বন্ধনির্ণয় লালমােহন বিদ্যানিধিকৃত, ২১২ পৃঃ; দেবীবর ঘটকও ইহাই বলেন) এবং তাহাদের সঙ্গে দাশরথি বসু, } ৭৪ জাতি কথা মকরন্দ ঘোষ, বিরাট গুহ, কালিদাস মিত্র ও পুরুষোত্তম দত্ত নামক পাঁচজন ‘কায়স্থ’ বা ‘শূদ্রও (শব্দকল্পদ্রুম, কায়স্থশব্দ, ৭২১৩) আসেন * তাঁহারা স্বদেশে ‘পতিত’ বলিয়া গণ্য হওয়ায় বঙ্গদেশে ফিরিয়া আসিয়া সপ্তশতীদিগের কন্যা বিবাহ করিয়া এ দেশে থাকিয়া যান। { গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ৭৩ পৃঃ)। বৌধায়ন ধৰ্মসূত্রের কালে ও বাঙ্গালী অশুচি ও পতিত বলিয়া গণ্য ছিল। “বৌধায়ন ধৰ্ম্মসূত্রে (১১২-লেখক দেখিতে পাওয়া যায় যে, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌবীর প্রভৃতি দেশে গমন করিলে শুদ্ধিলভার্থে যজ্ঞ বিশেষের অনুষ্ঠান করিতে হইত।”—বাঙ্গলার ইতিহাস, ১ম ভাগ, শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কৃত, ২৪ পৃঃ। সুতরাং ঐ কনােজীয়া ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ব্যক্তিগণও যে ‘পতিত হইবেন, ইহাতে বিচিত্রতা কি? বল্লাল চরিতকার লিথিয়াছেন, “তৈরূঢ়। নৃপতিবাক্যাৎ সপ্ত সপ্তশতা- ত্মজা। তদৈববশতাে জাতাস্তা সপ্ত সুতাবনা। বরং গতঃ পঞ্চ কনিষ্ঠে রাঢ়সংস্থিতে।”—বল্লালচরিত, পূৰ্বখণ্ড, ২২/২৩। রাজার বাক্যে ৭ জন ব্রাহ্মণ ৭টী সপ্তশতী-কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়া ৭টা পুত্ৰ দৈব- বশে জন্ম দেন। ইহাদের ৫ জন বন্দর বা বরেন্দ্র দেশেও ২ জন রাঢ়দেশে থাকেন। আদিশূরের মৃত্যুর পর তঁাহার পুত্র ভূশূর বৌদ্ধ কর্তৃক পরাজিত হইয়া পাচজন ব্রাহ্মণসহ রাঢ়দেশে বাস করেন। তাহাদিগের নাম ভট্ট নারায়ণ (ক্ষিতীশের পুত্র), দক্ষ (বীতরাগের বংশধর), ছাড় (সুধানিধির বংশধর) হর্ষ (মোতিথির পুত্র) ও বেদগর্ভ সৌভরির অন্বয়ে জাত।গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ৬৯ পৃঃ। ইহাদের ৫৬ বা ৫৯ পুত্র হইতেই বঙ্গীয় রাঢ়ী ব্রাহ্মণের * ইহাদের নাম সম্বন্ধে মতভেদ আছে।
৭৫ জাতি কথা উৎপত্তি। বৌদ্ধ রাজাদের অধীনে যাহারা বরেন্দ্রে থাকিলেন, তাঁহারাই বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ হইলেন।-কুলতব্দার্ণব, ৯৬৯৭। “এক বাপের দুই বেটা দুই দেশেতে বাস। বুদ্ধ পাইয়া জাত খাইয়া করিল সর্বনাশ। 'পৈতা ছিড়ি পৈতা চায় বৈদিকে দেয় পাতি। কৰ্ম্ম পাইয়া ধৰ্ম্ম খাইল বারেন্দ্র অখ্যাতি।”—দিগ, শূল নিবাসী আনন্দ চন্দ্র ঘটক রাজের সংগৃঙ্গীত প্রাচীন কারিকা”—বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস। রাঢ়ী বারেন্দ্র ব্রাহ্মণেরা কেবল বে অস্পৃশ্য সাতশতী সম্ভত ভাতা নহে; তাহারা অস্পৃশ্য বৌদ্ধ সম্ভতও। উক্ত পঞ্চ ব্রাহ্মণের কানেজীয়া পত্নীগণের পুত্রের বরেন্দ্র দেশে আসিয়া ঐ সপ্তশতীদের কনাই বিবাহ কবেন। ফলে রাঢ়ী বারেন্দ্র ব্রাহ্মণেরা পতিত পঞ্চ ব্রাহ্মণাদিরই সন্তান। ‘আদিশূরের সময় যে পঞ্চ ব্রাহ্মণ পশ্চিম দেশ হইতে আগমন করেন তঁাহাদের সন্তানগণই বাঢ়ী ও বারেন্দ্র নামে পরিচিত।”—বাঙ্গলার পুরাবৃত্ত, ৯৭ পৃঃ। এক পিতার দুই পুত্রের মধ্যে একজন রাঢ়ী, একজন বারেন্দ্র-ইহাও আমরা পাই। “ভবাননের দুই পুত্র গােবিন্দ এবং নারায়ণ, তন্মধ্যে গােবি বারেন্দ্র, নারায়ণ রাঢ়ী।” গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ১৫১ পৃঃ; লঘু ভাগবত, ২য় খণ্ড, ১৪৩ পৃঃ। সােমাচার্যের দুই পুত্র অনিরুদ্ধ এবং গুণাব। অনিরুদ্ধ বারেন্দ্র, গুণার্ণব রাঢ়ী।”— গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ১৫২ পৃঃ; সম্বন্ধ নির্ণয়, ২২১ পৃঃ। সম্বন্ধ নির্ণয় আরও বলেন (২০৪,২৯০, ৩৬৫,৪০৫ পৃঃ প্রভৃতিতে ) যে রাঢ়ী, বারেন্দ্র, উত্তর বারেন্দ্র, সাতশতী ও বৈদিক ব্রাহ্মণগণের মধ্যে পূৰ্বে পরস্পরের বিবাহ ইহারা সকলেই অস্পৃশ্য সাতশতীদের কন্যাদি বিবাহ করেন। আদিশূরের প্রপৌত্র ধরার প্রথমে রাঢ়ীয়দিগের মধ্যে কৌলীন্য প্রথা স্থাপিত করেন। পরে বলাল সেন যখন বারেদিগের মধ্যে কৌলীন্ত ছিল;
৭৬ জাতি কথা প্রথা স্থাপন করিতে উদ্যত হন তখন তিনি মাত্র ১৯ জন রাঢ়ীয় কুলীন পান। গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ১৯৬ পৃঃ; বাচস্পতি মিশ্র কৃত কুলমা। চরিত্র ও গুণগত এই কৌলীন্য প্রথা শেষে লক্ষ্মণ সেনের পরে বংশগত ও বিবাহগত হইয়াই যত অনর্থের সৃষ্টি করিয়াছে। কুলজ করণ’ বা ‘পরিবর্ত’ দ্বারা এবং অনেক সময় ধনবলে বা প্রভুত্ববলে অকুলীন কুশীন হইয়াছেন। “পূর্বে কুশময় কুলীন বানাইয়া তাহাতে কা সমৰ্পণ করিয়া কুলরক্ষা করা হইত। সেই কন্যা অন্য পূর্বা বলিয়া দুষ্ট হওয়াতে পরে জঘন্য কষ্ট শ্রোত্রিয়ে সেই কন্যার বিবাহ হইত।”—গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ১৫৮ পৃং, ১। পাদটীকা। হিন্দুর রাষ্ট্রীয় অধঃপতন যুগে কেবল যে এইরূপ জঘন্য কুপ্রথা প্রচলিত হইয়াছিল তাহা নহে; বারেন্দ্র কুলে ‘ী’ ( শাখা) বন্ধন এবং রাঢ়ীয়, শ্রেণীতে ‘মেল বন্ধন তখনকার ব্রাহ্মণ মহলে নানা জঘন্য দোষের পরিচয়ও প্রদান করে। বারে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ে “চাতালী অবসাদ” “ভূষণ। পঠী” “কুতুবখানী পঠ” “বেণী পঠী “আলিয়া খনি পঠী” নীচজাতি সংশ্রব ও ব্যভিচার দুষ্ট। বারেন্দ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁহারা “পাঁচুড়িয়া অবসাদ” দুষ্ট (ব্ৰহ্মহত্যা, সুরাপান, চৌর্য ও গুরুপত্নী গমন, এই পঞ্চ মহাপাতক দুষ্ট) তাহাদের বংশধরেরা স্বচ্ছন্দে সমাজে চলন আছেন।”—গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ১৩৬ পৃঃ। তাহার পরে ১৪৮০ খৃষ্টাব্দে দেবীবর ঘটক করিলেন রাঢ়ীয় কুলীনের মধ্যে মেল বন্ধন, তাহাদের কুল দোষ, জাতি দোষ ৩৬ ভাগের উদঘাটন করিয়া। “দোষাম্মেলয়তীতি মেলঃ।” অর্থাৎ যাহারা দোষে মিলিত তাহারাই মেলবদ্ধ কুলীন। “দেবীর কৃত ৩৬ ভাগের সকল কুলীনই দোষ যুক্ত।”—গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ২০৭ পৃঃ। শ্রীহরিলাল চট্টাপাধ্যায় কৃত ব্রাহ্মণ ইতিহাস ৭৩ পৃঃ ও দ্রষ্টব্য। যবন সংসর্গ, বলাৎকার, অগম্যাগমন,বেশ্যাগমন, জাতি কথা ৭৭ ব্ৰহ্মহত্যা, কুলত্যাগ, মদ্যপান, কোচ-পােদ-রজক-কলু-হাড়ী যবন-অত্যজ প্রভৃতি নীচ জাতিতে বিবাহদি কদৰ্য দোষের জঘন্য কলঙ্ক লইয়া মেল বন্ধন সৃষ্ট হইয়াছিল।-ব্রাহ্মণ ইতিহাস হরিলাল চট্টোপাধ্যায় কৃত, ৭৩ ১০১ পৃঃ; গৌড়ে ব্রাহ্মণ, ২১১-২২০ পৃঃ দ্রষ্টব্য। রাঢ়ী বারেন্দ্রের মেলপঠা বন্ধন চারি পাঁচ শত বৎসর পূর্বেকার জঘণ্ঠ জাতীয় ও সামাজিক অধঃপতনই তারস্বরে ঘােষণা করে। আজ আমাদের নিজের এই সব কলঙ্ক কালিমা ঢাকিয়া ভণ্ডামির কুঙ্কুটিকা রচিবার চেষ্টা ব্যর্থ। আমাদের নিজেদের কলঙ্ক নিজেরাই সংশোধন করিব, অকপটে সরল সত্য স্বীকার করিয়া। ব্রাহ্মণের এই ঘৃণ্য কলঙ্ক ব্রাহ্মণেরাই দূর করিবেন ধর্ম, কর্ম, চরিত্র, সাধনা বলেই। গৌড়ীয় ব্রাহ্মণদিগের এই কুল কলঙ্ক লইয়া উচ্চবর্ণে আর নিম্নবর্ণে তফাৎ কি? উচ্চবর্ণে নিম্নবর্ণে প্রভেদ হইবে পুণ্য চরিত্র, সদাচার, প্রকৃত বিদ্যা লইয়া। তথাকথিত ব্রাহ্মণকে আজ প্রকৃত ব্রাহ্মণ হইতে হইবে শূদ্রান্ত সকলকেই ব্ৰহ্মাশ্রয়ী, ব্রাহ্মীস্থিতিযুক্ত করিবার চেষ্টা করিয়া। পূর্বোক্ত ঐ পঞ্চ ব্রাহ্মণ সঙ্গী পাঁচজন কায়স্থ বাঙ্গালী কায়স্থের আদি পুরুষ। ঐ পঞ্চ কায়স্থ’গণ অনেক স্থলে আবার ‘শূদ্র’ বলিয়া উল্লিখিত। শব্দকল্পদ্রুম ধৃত দক্ষিণ রাঢ়ীয় ঘটক কারিকা, শব্দকল্পদ্রুম ৭১১ পৃঃ ধৃত অগ্নি পুবাণীয় জামিল, শব্দ গল্পদ্রুম ৭১৩ পৃঃ (২য় সং), রামানন্দ শৰ্ম্ম ঘটক কৃত বঙ্গজ কাস্থ কুলদীপিকা, কাশীদাস কৃত বারেন্দ্র কায়স্থগণের ‘ঢাকুর’ নামা কুগ্রন্থ ঐ পঞ্চ ‘কায়স্থ’দিগকে ‘শূদ্র বলিয়াছেন। গৌড়ে ব্রাহ্মণ বলেন (২৪৩ পৃঃ)-“কায়স্থগণের ৪টী শ্রেণীতেই এ দেশীয় আদিম শূদ্র প্রবেশ করিয়াছেন।” বাঙ্গলায় নানাপ্রকার জাতিবর্ণ লইয়া যে ৭৮ জাতি কথা ‘পাঁচ মিশাল’ বা ‘ছত্রিশ মিশাল খিচুড়ী পাক করা হইয়াছে তাহার মধ্যে কে ব্রাহ্মণ, কে ক্ষত্রিয়, কে বৈশ্য, আর কে শূদ্র তাহা নির্ণয় করিবার কোনই পথ নাই। খাঁটি কথা বলিতে গেলে বাঙ্গলায় এখন কেবল মাত্র একজাতি ; তাহার নাম ‘বাঙ্গালী জাতি। রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের অবস্থিতি স্থান ৫৬ বা ৫৯ গ্রামের নাম হইতে তাহাদের গােত্ৰীয় ৫৬ গাঞি’র নাম বা উপাধি সমূহ সৃষ্টি হইয়াছে ; যথা :–চট্টোপাধ্যায়, মুখােপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায়, ঘােষাল, গড়গড়ী, বড়াল ইত্যাদি *; আর দেশের নাম হইতে ‘বাঙ্গালী-জাতি’ বা ‘ভারতী-জাতি’ কেন হইতে পারিবে না ? বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ কায়স্থেরা যেন আর জাতির বড়াই করেন না, অস্পৃশ্য- তাকে যেন আর পাপ বা দোষ বলেন না। তাঁহাদের ব্রাহ্মণত্ব, কায়স্থত্ব মূলে অস্পৃশ্যতাসম্ভত ইহা তাহারা কোন্ প্রাণে, কোন্ মুখে ভােলেন ? বিক্রমপুর, ঢাকা আদি অঞ্চল হইতে অনেক সময় নমঃশূদ্র, জেলে, মুচি, প্রভৃতির কন্যা আসিয়া ফরিদপুর, যশোহর, খুলনা, নদীয়া প্রভৃতি স্থানে ব্রাহ্মণ বন্ধু হইয়াছেন। ইহাদিগকে ‘ভড়ের মেয়ে’ বলিত। নৈকষ বা ভকুলীনের গৃহে অনেক স্থলেই কুলীন প্রবরের পিতা ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য জাতীয়ও আছেন। আমি অনেক ব্রাহ্মণ সন্তানকে জানি যাহারা কায়স্থ, নমঃশূদ্র, রাজবংশী, যুগী প্রভুতির ঔরস জাত। তাহারা ব্রাহ্মণ বলিয়া ‘চাটতি, (বর্ধমান জেলার অন্তর্গত বৰ্তমান চাটতি এম গাঞির চট্টোপাধ্যায় মুখটা ( বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত বর্তমান মুকুট) গাঞির ‘মুখােপাধ্যায়’ গাঙ্গুল (বর্ধমানের অন্তর্গত বৰ্তমান গাঙ্গুল গ্রাম) গাঞির গঙ্গোপাধ্যায় বন্ধ ( বর্ধমানের বর্তমান গ্রাম বাড়) গাঞির বন্দ্যোপাধ্যায়' ঘোষ (বীরভূমের বর্তমান দেরি গ্রাম) গাঞির ‘ঘোষাল গড়গড় গ্রাম) গাঞির ‘গড়গড়ী, বড়। (বাকাের অন্তর্গত বৰ্তমান (বা) গাণির ‘বড়াল’ ইত্যাদি।
জাতি- কথা সমাজে বেশ স্পৃশ্য ও আচরণীয় আছেনও নিশ্চয়ই তাহারা উচ্চ ব্রাহ্মণ সমাজে বিবাহও করিয়াছেন। স্বয়ং বল্লাল সেন ডােমকন্যা পদ্মিনীকে বিবাহ করিয়া তাহার দ্বারা পাকস্পর্শ করাইয়া বহু ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়কে আহার করাইয়া ছিলেন।--Tribes and castes, I, pp. 47 153, 154; বিক্রমপুরের ইতিহাস, ৩৫পৃঃ; সম্বন্ধ নির্ণয় ২১৭ পৃঃ; বাঙ্গলার পুরাবৃত্ত, ২৬৮ পৃঃ ইত্যাদি)। কম্বলের লােম বাছিলে আর থাকে কি? শালগ্রামের আর শেয়া, বসা দাড়ান কি ? তাই হিন্দুজাতি লােবস্ত্রের ন্যায় সর্বত্রই শুচিশুদ্ধ ; শালগ্রামের ন্যায় ক্ষুদ্রেরও অধিগত; গােবর্ধন শিলার ন্যায় সৰ্বজাতিরই আরাধ্য। (১৮) মরণ-পারে শুদ্র জলচল ; আর এ পারে ? সমস্ত তথাকথিত শূদ্র যে চিরকাল হইতে জলচল তাহার একটা প্রমাণ প্রাচীনতার কঙ্কালমাত্রে আজও দাড়াইয়া আছে। হিন্দুতর্পণে বৈদিক বিধি অনুসারে শূদ্রের জলাঞ্জলি সমস্ত উচ্চবর্ণ-ই তৃপ্তির সঙ্গে বরাবর গ্রহণ করিয়া আসিতেছেন। বৈদিকতর্পণে প্রদত্ত শূদ্রের জলাঞ্জলি “মনুষ্যতর্পণে” সনক সনন্দাদি গ্রহণ করিতেছেন। ঋষিতর্পণে” “ওমরীচ প্যতাং, ও অস্তৃপ্যতাং ইত্যাদি বলিয়া শূদ্র যে অঞ্জলি ভরা তর্পণ- জল প্রদান করেন, তাহা মৰীচি, অত্রি, বশিষ্ঠ, ভৃগু, নারদ প্রভৃতি সকলেই তৃপ্তির সঙ্গে গ্রহণ করেন। স্বয়ং যমরাজ এবং ক্ষত্রিয় প্রবর ভীষ্ম ও শূদ্রের জলাঞ্জলি পাইয়া তৃপ্ত। আর ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়াদি তথাকথিত উচ্চবর্ণেরাই কেবল মরণের এ-পারে অতৃপ্ত থাকিবেন? তাহারা যখন ভবলীলা সাঙ্গ করিবেন, তখন ওই শূদ্রই যে দিব্যোদারকণ্ঠে তাহাদিগকে জাতি কথা জলাঞ্জলি প্রদানপূর্বক বলিবেন, ও আব্ৰহ্মভুবল্লোকা দেখি পিতৃমানবাঃ। তৃপ্যত্ত পিতর সৰ্ব্বে মাতৃমাতামহাদয়। অতীত কুল কোটীনাং সপ্তদীপ নিৰসিং। ময়া দত্তেন তােয়েন তৃপান্তু ভুবন। ও আব্ৰহ্মপৰ্য্যন্তং জগৎ তৃপ্যতু।” অর্থাৎ-ব্ৰহ্মলােক হইতে ভুবনের সমস্ত লােক, দেবর্ষিগণ, পিতৃগণ, মানবগণ, পিতৃকুল, মাতৃকুল, মাতামহকুল এবং সপ্তদ্বীপ নিবাসী অতীত কোটী কোটা কুলের সকলে, ত্রিভুবনের সকলেই আমার দত্ত জলের দ্বারা তৃপ্তি লাভ করুন। প্রণব- স্বরূপ ব্ৰহ্ম হইতে তৃণ-গুচ্ছ পর্যন্ত জগত তৃপ্ত হউক। বিষ্ণুপুরাণও (৩১১ ৩২-৩৬) অনুরূপ তর্পণের বিধান দিয়াছেন। এই সমস্ত পিত্ত্যাদি কর্ম যে শূদ্রেরাও করিতে পারেন, ব্রহ্মপুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণ তাহাও বলিয়াছেন, “পিত্রাদি বৈ সৰ্ব্বং শূদ্রঃ কুব্বাত তেন বৈ।”—বিষ্ণুপুরাণম্ ৩৮ ৩৩ ; ব্ৰহ্মপুরাণ, ২২২১৪। অর্থাৎ :-শূদ্র তাহার দ্বারা পিত্রাদি সমস্ত যজ্ঞ করিবেন। বিষ্ণুপুরাণ আরও বলিয়াছেন—ষত্র কন সংস্কানাং ‘ক্ষুষ্ণেপহতাত্মনাম্। ইদমপ্যক্ষয়ঞ্চাস্তু ময়া দত্তং তিলােদ’ঐ, অর্থাৎ :--যে কোনও স্থানে সংস্থিত ক্ষুধাতৃষ্ণা পীড়িত আত্মাদিগকে আকর্তৃক প্রদত্ত এই লিলাদক অক্ষয় হউক। চারিব রই পিতৃগণ উদ্দেশ্যে, শূদ্ৰন্ত চারিব ই শ্রদ্ধা দান পর্যন্ত করিতে পারেন। –(মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ১৬১৯-২৩; ৯৬৩৪-৩৮)। মও এনেন, “কুৰ্যাদহরহঃ শ্রাদ্ধমন্নাঙ্গেনােদকেন বা।'—মনুস,হিত, ৩৮২। অথাৎ :- অন্নাদি বা জলের দ্বারা অহরহ শ্রাদ্ধ দিবে। ব্রাহ্মণ শূদ্রেব পরস্পরের হিতার্থে তৃপ্তির নিমিত্ত এই তিলােকান, শ্ৰাদ্ধা দান কি সকল বর্ণেরই প্রেমময় প্রাবনের মিলনরাখি রচনা করে না? ১১৩৬।
জাতি কথা বিশ্বমানবতার এইরূপ দেবভাব লইয়া হিন্দু যে জলচল মহাব্রত করিয়াছিলেন “তর্পণ” নাম দিয়া, সে কি কেবল মরণ-পারের ওই পরলােকের জন্যই ? কিন্তু তর্পণ তো ইহলােকের লােকই করিতেছে, ইহলােকের হিতার্থেই। মরণের ওপারে যে শূদ্র জলচল, আজ মরণের এপারে তাহাকে জল অচল করিয়া, হে হিন্দু, তােমার তর্পণের পথ, তৃপ্তির পথটাকেই কি সংকীর্ণ, নষ্ট করিয়া ফেলিতেছ না ? দেব মানব ঋষি প্রভৃতি চতুর্দশ ভুবনের সকলকেই তাহার পুত্রের ন্যায় অঞ্জলি ভরা জলদান করিয়া তৃপ্ত করিতে পারিতেছেন, আর জীবনে মৃত যাহারা, তাঁহারাই কি তাহা প্রত্যাখ্যান করিতেছেন না? ব্রাহ্মণ, তােমার আসল আত্মার জন্য শূদ্রদিগকে যে জলচল অধিকার দিয়াছ, আজ তােমার নকল আত্মার জন্য সে অধিকার দিবে না? শূদ্রকে দিলে তােমার “মনােময় প্রাণ শরীর নেতা” কে জলদান করিতে প্রাণভরা প্রতি ঢালিয়া, আর দুর্মুখের ন্যায় বদনবিবরটা চাপিয়াই তাহা রুদ্ধ করিবে চাতকের হাহাকারে ? (১৯) আহারে অস্পৃশ্যতা বর্জন যে আৰ্য্য বা হিন্দু জাতির ভিতর সমস্ত বর্ণের ও জাতির এত বহুভাবে সমন্বয় ও সামঞ্জস্য রহিয়াছে তাহার ভিতর এত অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ লইয়া মারামারি কাটাকাটি কেন? ইহা কি আমাদের মুখ ও অজ্ঞতার পরিচায়ক নহে? হিন্দু শাস্ত্রকারগণ অস্পৃশ্যতার উপরে উঠিয়া বহু স্থলেই বিভিন্ন বর্ণের পরস্পরের সহিত অন্নাহারের বিধান পৰ্যন্ত দিয়াছেন। অথৰ্ব্ববেদ ৬ষ্ঠ কাণ্ড, ৩০ মুক্তে বলিতেছেন :-“ও সমানী প্রপা সহবােহ- ৮২ জাতি কথা ভাগঃ সমানে যােক্তে সহবাে যুনজমি।” “একতার জন্ধ তােমরা সকলে। একস্থান বা জলাশয় (প্রপা) হইতে জলপান করিবে। পরস্পরের সহিত একত্রে অন্ন ভােজন করিবে।” সায়ণাচাৰ্য তাঁহার ভাষ্যে বলিতেছেন :- সহবােহভাগা অভাগশ্চ সহ এব ভবতু পরম্পরানুরাগ বশেন একত্র- বস্থিতমন্নানাদিক যুগ্মভিরূপভুজতামিত্যর্থ।” অর্থাৎ তােমাদের অন্নভােজন একসঙ্গে হউক অর্থাৎ পরস্পর অনুরাগ বশতঃ একত্র অবস্থিত অন্নপানাদি তােমরা ভােজন কর। রামায়ণ উত্তরকাণ্ডে, ১০৪ ও ১০৫ সর্গে আছে যে নিষাদপতি গুহ, রাক্ষস বিভীষণ, বানর সুগ্রীব হনুমান, ভালুক জাম্বুবানাদি নিম্নবর্ণের সকলে রামের অশ্বমেধ যজ্ঞে ব্রাহ্মণ ও ঋষিগণকে পরিচৰ্যা এবং অব্যঞ্জনাদি পরিবেশন পর্যন্ত করিয়াছিলেন। নিন্দিত গােপাল বংশীয় # শ্রীকৃষ্ণ ও ব্রজবাসী গােপগণ ‘গিরিবজ্ঞ” নূতন প্রবর্তিত করিয়া “ধি পায়স ও মাংসাদি” দ্বারা “শৈলবলি” দিয়া নিজেরাই সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণাদি দ্বিজগণকে ভােজন করান। (ব্রহ্ম পুরাণ, ১৮৭। ৫১-৫৮; বিষ্ণু পুরাণ, ৫১৩৩৮-৪৯। ( শ্রীমদ্ভাগবতেও ১০২৪। ২৩-৩৩) অনুরূপ বৃত্তান্ত আছে। ব্রহ্ম পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও শ্রীমদ্ভাগবত হইতে আমরা ব্রাহ্মণের একচেটিয়া শালগ্রাম পূজার পাল্টা জবাবে গােপাদি নিম্ন বর্ণ পুজিত গােবর্ধন শিলা পূজার জন্ম কথাই কি পাই না? আপস্তম্ব (১ম প্রশ্ন, ১৯ কাণ্ড) জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “কাহার অন্ন গ্রহণ করা যায় ?” ক কহিতেছেন, “যিনি আপন ইচ্ছায় অন্ন দেন তাহারই অন্ন আহার করা যায়। আপস্তম্ব নিজ মতও দিতেছেন—“যে কোন ব্যক্তি অযাচিত ভাবে অন্ন দেয় তাহারই অন্ধ ভক্ষণ করা যায়। বার্ষাণি * “গােপাল জুষ্পিত”--বিষ্ণুপুরাণ, ১৩৩। ;
জাতি কথা বলিয়াছেন—“যে কোন ব্যক্তি অন্ন দিতে চায় তাহার অনুই ভােজন করা যায়।” বশিষ্ঠ, গৌতম ও বৌধায়ণেরও এই মত। (Modern Review March 1909, p. 268 দ্রষ্টব্য) অত্রিসংহিতাও বলিতেছেন :- আরনালং তথা ক্ষীরং কন্দুকং দধি শক্তবঃ। স্নেহপঞ্চ তক্রঞ্চ শূদ্ৰত্যাপি ন দুষ্যতি ॥”—১২৪৬। অর্থাৎ:-আরনাল (কাজি, মণ্ড বা ভাতের ফেন) ক্ষীর (উত্তর পশ্চিম ভারতে পায়সাকে ক্ষীর বলে) ও কড়াই বা তাওয়ায় প্রস্তুত দ্রব্য প্রভৃতি, দধি, শক্ত, (ছ), তৈল বা ঘৃত পক দ্রব্যাদি ও তক্র (ঘােল-দধিতে জল দিয়া তৈরী) শূদ্র কৃত হইলেও তাহা ভক্ষণ করিলে ব্রাহ্মণাদির দোষ হইবে না। গরুড় পুরাণ পূৰ্বখণ্ড, ৯৫৬৬ এবং কুৰ্ম্ম পুরাণ উপরিভাগ ১৭১৭তেও আমরা ইহার প্রতিধ্বনি. পাই। কুৰ্ম্ম পুরাণে আছে :-“পায়সং স্নেহপং য গােসশ্চৈব শক্তক। পিণ্যাকঞ্চৈব তৈলঞ্চ শূদ্রা গ্রাহং দ্বিজাতিভিঃ। কুশীলব কুম্ভকারঃ ক্ষেত্ৰবৰ্ম্মকঃ এব চ। এতে শূদ্রে ভােজ্যান্না দত্ত্বা স্বল্পং পণং বুধৈঃ ॥”-উপরিভাগ, ১৭১৭। পায়স, পিষ্টক (পিণ্যাক), লুচি, পােলাউ (স্নেহপ) খাওয়ার ব্যবস্থা বেশ রহিল। শাক ভাত, ডাইল তরকারী ব্রাহ্মণী প্রায়ই রান্ধেন ; সেগুলিতে অরুচি হওয়াতেই কি এই ব্যবস্থা হইল? কুমাের, কৃষক (নমঃশূদ্রাদি কৃষক ত আছেই; মুসলমান কৃষকদিগকেও ত ধরা যায়) এবং বাউতির ( বাকার কুশীলব) উল্লেখে সব শূদ্রই কি বােঝায় না? মনুসংহিতা (৪২৫৩), যমসংহিতা (১২০), বিষ্ণুসংহিতা (৫৭১৬), যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা (১১৬৮), ব্যাসসংহিতা (৩৫১-৫২), পরাশরসংহিতা (১১২০) প্রভৃতি সংহিতায় একটু অদল বদল করিয়া আমরা নিম্নলিখিত শ্লোকটি পাই : “আদ্ধিক কুলমিত্ৰঞ্চ গােপালো জ্বাসনাপিতো। এতে শূদ্রে ভােজ্যায়া ৮৪ জাতি কথা যশ্চাত্মানং নিবেদয়েৎ।”—মনুসংহিতা, ৪২৫৩। অর্থাৎ :-“দ্বিজ, যে ব্যক্তি কৃষি কাৰ্য্য করিয়া ফসল দেয়, কুলের মিত্র, গােয়ালা বা রাখাল, দাস (চাকর), নাপিত ও আত্মসমর্পণকারী শূদ্রজাতির প্রস্তুত অন্নাদি গ্রহণ করিতে পারেন, “মনুর ন্যায় স্কন্দ পুরাণও বলিতেছেন :—“দাস নাপিত গােপাল কুলমিত্ৰাৰ্দ্ধসীরিণঃ। ভােজান্নাঃ শূদ্রবর্ণেহমী তথাত্মনিবেদকঃ॥”- স্কন্দপুরাণ, ব্ৰহ্ম খণ্ডে ধৰ্মাৱণ্য খণ্ড, ৬১০৩। অর্থাৎ দাস, নাপিত গােপাল, কুলমিত্ৰ, বৰ্গাইত (যে কৃষক অর্ধেক শস্য দেয়) এবং আত্ম- নিবেদক—শূদ্র জাতির মধ্যে ইহাদের ভােজ্যান্ন সমূহ গ্রহণ করা যায়। গৌতম সংহিতাও বলিতেছেন :-“প্রশস্তানাং স্বকর্ম দ্বিজাতীনাং ব্রাহ্মণণা ভুঞ্জীত।•••••••••পশুপাল ক্ষেত্ৰকৰ্ষক কুলসঙ্গতকার পিতৃপরিচারকা তােজান্না।”—১৭। নিজ কর্মে প্রশস্ত দ্বিতীয়দিগের গৃহে ব্রাহ্মণের ভােজন করিবে। পশুপালক, ক্ষেত্ৰকৰ্ষক, কুলপরম্পরা বন্ধুভাবাপন্ন এবং পিতৃপরিচারক, ইহা শূদ্র হইলেও ইহাদিগের অন্ন ভােজন করা যাইতে পারে। আর অন্যান্য শূদ্রদের অপরাধ কি ? ব্রহ্মপুরাণ বলেন যে, উহাতে কোন অপরাধ ত নাইই, বরং ব্রাহ্মণাদিকে শূদ্রের অনুদান পুণ্যজনক যথা :-“অনুং দত্ত্বা দ্বিজাতিভ্যঃ শূদ্রঃ পাপৎ প্রমুচ্যতে।” ব্রহ্মপুরাণ, ২১৮২১। অর্থাৎ :—দ্বিজাতিগণকে অন্নদান করিয়া শূদ্র পাপ হইতে মুক্ত হন। মনুও অন্যত্র ব্যবস্থা দিয়াছেন যে জল ও অন্ন সৰ্ববর্গেরই নিকট হইতে প্রতি গ্রহণ করা যায়। “এধােদকং মূলফলমমভদ্যতঞ্চ যৎ। সৰ্বতঃ প্রতিগৃহীয়ান্মধ্বথাভয় দক্ষিণা।-মনুসংহিতা, অর্থাৎ-কাষ্ঠ, জল, মূল, ফল, অন্ন এবং যাহা কিছু অযাচিতভাবে আপনা আপনি উপস্থিত হয় এই সকল, মধু, অভয় এবং দক্ষিণ সর্বলােকের ৪২৪৭।
জাতি কথা ৮৫ নিকট হইতে প্রতিগ্রহ করা যায়। বৈদ্য বা কায়স্থ বল্লাল সেন ভােম কন্যা পদ্মিনীকে বিবাহ করিয়া তাহার দ্বারা পাকস্পর্শ করাইয়া যখন বহু ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থদিগকে আহার করাইয়াছিলেন, তখন শূদ্রের অস্পৃশ্যতা বা অনাচরণীয়তা কোথায় ছিল? (২) উচ্চ বর্ণকে শুদ্রের অনুদান। চারি বর্ণের ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারিণী সন্ন্যাসিনীরা সনাতনকাল হইতে চিরদিনই পক.ন্ন ভিক্ষা করিয়া খাইয়া আসিতেছেন। প্রাচীনকাল হইতেই নিয়ম ছিল এবং এখনও ভারতের অনেকস্থলে এই নিয়ম প্রচলিত আছে যে, চারি বর্ণেঃ গৃহস্থেরাই প্রতিদিন কিছু বেশ অন্ন পাক করিবেন কারণ ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীরা তাহাদের গৃহে আসিয়া ঐ রান্না অন্ন ভিক্ষা লইতেন। তাই হিন্দুশাস্ত্র বলিয়াছেন- “সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারী চ পান্ন স্বামীনাবুভে।” অর্থাৎ :-সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারী উভয়েই পাল্প গ্রহণ- কারী। মনুও বিধান দিয়াছেন যে ব্রহ্মচারীরা গ্রামে সৰ্ব্ব বর্ণের নিকটই অন্ন ভিক্ষা চাইতে পারেন। “সৰ্ব্বং বাপি চরেৎ গ্রাম্যং”-মনুসংহিতা, ২০১৮৫। এই ব্রহ্মচারীদিগের মধ্যে যাহার “উপকুৰ্বানক” তাহারা আবার সংসার আশ্রমে প্রবেশ করিয়া দারপরিগ্রহ করিতেন। সর্বজাতির পান্ন গ্রহণ করিয়া তাহাদের জাতি যাইত না বা এখনও যায় না। এখনও বহুস্থানে তাহারা মাধুকরী করিয়া মধুকরের ন্যায় নানা গৃহস্থের পায় গ্রহণ করিয়া থাকেন। ব্রহ্মচারীর মাধুকরী করিয়া সৰ্ববর্ণের বাধা অয় গ্রহণ করিয়া সংসারী হইলে তাহাদের কোন দিন জাতি দোষ বা অস্পৃশ্যত দোষ বা অনাচরণীয়তা দোষ ঘটে নাই। বৈষ্ণব সাধু বৈরাগী মহলে এই জাতি কথা মাধুকরী বৃত্তি এখনও সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত আছে। এই মাধুকরীরূপ ‘রাষ্ট্রপিণ্ডে’ জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা এখনও বহু স্থানে নাই। ভারতবাসী ওই শােন তােমার শাস্ত্র কি বলিতেছেন ‘ভিক্ষা-ভুজ যে কেচিৎ পরিব্রাড়, ব্রহ্মচারিণঃ। তেহপ্যত্রৈব প্রতিষ্ঠন্তে গার্হ তেন বৈ পরম্ ॥ ১১। বেদাহরণ কাৰ্য্যেন তীর্থয়ানায় চ প্রতে। অটন্তি বসুধাং বিঃ পৃথিবী দর্শনায় চ। ১২। অনিকেতা হ্যনাহারা যে তু সায়ং গৃহা তে। তেষাং গৃহস্থঃ সর্বেষাং প্রতিষ্ঠা যােনিরেব চ। ১৩। তেষাং স্বাগতদানাদি বক্তব্যঃ মধুরং নৃপ। গৃহাগতানাং দঘাচ্চ শয়নাসন ভােজনম্ ॥ ১৪। অতিথির্যন্ত ভগ্নাশো গৃহৎ প্রতিনিবৰ্ত্ততে। স তন্মৈ দুস্কৃতং দত্বা পুণ্যমাদায় গচ্ছতি ! ১৫।-বিষ্ণুপুরাণ ৩৯১১-১৫, ব্ৰহ্মপুরাণম্ ২২২৩২-৩৬। অর্থাৎ যে সকল পরিব্রাজক বা ব্রহ্মচারী ভিক্ষা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করেন, গৃহস্থই তাঁহাদের আশ্রয় ; সেইজন্য গার্হস্থ্য আশ্রমই শ্রেষ্ঠ। বিপ্রের বেদ সংগ্রহের জন্য, তীর্থ-স্নানের জন্য অথবা পৃথিবী দর্শনের জন্য বসুধাতে বিচরণ করেন। গৃহহীন, অনাহারী, তাঁহারা সায়ংকালে যে গৃহে উপস্থিত হন, তাহাই তাহাদের গৃহ। এই সকল ব্যক্তির গৃহস্থই আশ্রয় কারণ। রাজন্ ! গৃহাগত ইহাদিগকে গৃহস্থ স্বাগতানাদি মধুর বাক্য বলিবেন এবং শয্যা, আসন, ও আহার দান করিবেন। অতিথি হতাশ হইয়া যাহার গৃহ হইতে ফিরিয়া বান, সে ব্যক্তি অতিথির দুস্কৃতি গ্রহণ করে এবং অতিথি গৃহস্থের পুণ্য লইয়া যান। মনুও বলেন-“যজ্ঞ শিষ্টাশনং হেতং সমম্নং বিধীয়তে।”—মনুহিত, ১১৮; বিষ্ণুসংহিতা, ৬৭৪৩। অর্থাৎ :-যজ্ঞের অবশিষ্ট অরই সাধু- দিগের লােজনের জন্য বিহিত হইয়াছে। সাধু-সন্ন্যাসী ভক্ত ভারত, জাতি কথা ১৭ অতিথিবৎসল ভারত, জাতিবর্ণ নির্বিশেষে যে সাধুপূজা অতিথি-পূজার বিধান দিয়াছে, তাহাতে জাতিবাদের, কুলবাদের, গােত্ৰবাদের সংকীর্ণতা নাই। ওই বিষ্ণুপুরাণই তাই বলিতেছেন-“স্বাধ্যায় গােত্রচরণম পৃষ্ঠা চ তথা কুলম্। হিরণ্যগর্ভবুদ্ধ্যাতং মতােভ্যাগতং গৃহী।”—ঐ, ৩১১৬১। অর্থাৎ গৃহী অভ্যাগতের স্বাধ্যায় (বিদ্যা), গােত্র, চরণ ও কুল জিজ্ঞাসা না করিয়া তাহাকে হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্মা, বিষ্ণু বা শিব) বিবেচনা করিবে। শূদ্রও যদি ব্রাহ্মণের গৃহে অতিথি হন, তবে ব্রাহ্মণ যেমন তাঁহাকে ঈশ্বর জ্ঞানে অন্নভােগাদি দ্বারা পূজা করিবেন, তদ্রপ ব্রাহ্মণও যদি শূদ্রের গৃহে অতিথি হন, তবে শূদ্রও তাঁহাকে ঈশ্বরজ্ঞানে অল্পতভাগাদি দ্বারা পূজা করিবেন। আর ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীর তাে কথাই নাই; অন্নহীন তাঁহাদের অন্ন ত চারিবর্ণের গৃহীই যােগাইবেন। “ভিক্ষাঞ্চ ভিক্ষবে দদ্যাৎ পরিব্রাড়, ব্রহ্মচারিণে। অকল্পিতায়মুগ্ধত্য সব্যঞ্জন সমন্বিতাম্।”—হারীতসংহিতা, ৪৬০। অর্থাৎ পরিব্রাজক ও ব্রহ্মচারী ভিক্ষুকে ব্যঞ্জন সমন্বিত অকল্পিত (অঙ্গের নিবেদিতা নহে) অন্ন ভিক্ষা দিবে। পাছে এই সব পূজ্য অতিথিদের জাতিকুল গােত্রাদি জানিলে মনে দ্বিধা বা সঙ্কোচ আসে, এই জন্য তাহা জানান বা জানাও নিষিদ্ধ হইল। চারিবর্ণের জন্যই যে “নিতা- ক্রিয়া” “পঞ্চষজ্ঞের” বিধান আছে, তাহার মধ্যে একটা হইতেছে এই নৃ-যজ্ঞ বা অতিথিযজ্ঞ। ভারতবাসী, তােমরা এই “রাষ্ট্রপিণ্ডের “পিণ্ডদান করিবার যদি ব্যবস্থা কর, তবে ভারত সাধু বৈরাগী, ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীর “ধৰ্ম্মদান” হইতে বঞ্চিত হইবে। সনাতনী হিন্দু, এই সনাতন হিন্দুপ্রথারও কি মূলােচ্ছেদ করিতে চাও জাতিবাদের কুঠারে ?
জাতি কথা তাহার পরে হিন্দুর পঞ্চষজ্ঞের ( মনু, ৩৮১; বিষ্ণুসংহিতা, ৫৯২০-২৫ ; যাজ্ঞবল্কাসংহিতা, ১১ ০২ ) মধ্যে “বিশ্বদেববলি” রূপ মহাযজ্ঞের বিধানের মধ্যেও আমরা অস্পৃশ্যতা, জল অনাচরণীয়তা বা অন্ন অনাচরণীয়তাও পাই । আর্ঘ্য হিন্দু বিশ্বমানবতা সমস্ত জাতি বা বর্ণের মধ্যে, নিখিল ভুবনের সমস্ত প্রাণীর মধ্যে অন্তরতম কোনও ভেদবৈষম্য দর্শন করে নাই। ‘বিশ্বদেববলি’তে বিশ্বমানবতার পূজারী আৰ্য হিন্দু সকলকেই পান্ন { “অন্নস্য সিদ্ধস্য মনুসংহিতা, ৩১২১; “পাকযজ্ঞৈঃ”-ব্রহ্মপুরাণ, ২২২১৪) প্রদান করিয়া পূজা করিতে বলিয়াছেন। উচ্চবর্ণ-হিন্দু “বিশ্বদেব বলি” মহাযজ্ঞ ত্যাগ করিয়া তাহার স্থলে তুমি যে “শূদ্ৰবলি” র শূদ্রমেধষজ্ঞ” সৃষ্টি করিয়াছ তাহা কি অজমাতা জগন্মাতার পূজায় ‘ছাগ বলি’রই রূপান্তর নহে? ছাগ বলির ছাগটাকেও তুমি মন্দিরে প্রবেশের এমন কি মন্দিরের গর্ভাগারে প্রবেশের অধিকার দিয়াছ, আর শূদ্রকে তুমি মন্দিরে পদার্পণ পৰ্য্যন্ত করিতে দাও না! ওই শােন তােমার শাস্ত্র বিশ্বদেব বশির কি মহামন্ত্র উচ্চারণ করিতেছেন?—“যেং ন মাতা ন পিত ন বন্ধু নৈবান্নসিদ্ধিন তথাঃমস্তি। তত্ত্বগুয়েইনুং ভুবিদত্তমেতৎ প্রয়ান্তু তৃপ্তিং মুদিতা ভবন্তু ॥ ৫১। ভূতানি সৰ্বাণি তথায়মেতদহঞ্চ বিষ্ণুন যতােহনুদস্তি। তস্মাদহং ভূত নিকায় ভূতমঃং প্রযচ্ছামি ভবায় তেষাম্ ॥ ৫২। চতুর্দশ ভূতগণো এষ শুত্ৰস্থিতে। যেহখিল 'ভূতসদ্য। তৃপ্তর্থিমনুং হি ময়া বিসৃষ্টং তেষামিদং তে মুদিতা ভবন্তু ॥ ৫৩। ইত্যুচ্চাৰ্য- নয়ােদদ্যাদঃ শ্রদ্ধাসমন্বিত। ভুবিভূতােপকানায় গৃহী সৰ্বায়ােবতঃ ৫৪। -বিষ্ণুপুরাণ, ৩১১৫১-৫৪। অর্থাৎ :—যাহাদের মাতা নাই, পিতা নাই, বন্ধু নাই, অন্ন প্রস্তুত করিবার সাধ্য নাই এবং ওন্নও নাই, আমি জাতি কথা ৮৯ তাঁহাদের তৃপ্তির জন্য পৃথিবীতে এই অন্ন প্রদান করিলাম ; তাঁহারা এই অম্নে তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করুন। সৰ্বভূত, এই অন্ন এবং আমি সকলই বিষ্ণু; কারণ বিষ্ণু ছাড়া অন্য কিছুই নাই। এই জন্য সমুদয় ভূতসমূহ আমা হইতে ভিন্ন নহে; সুতরাং আমি সমুদয় প্রাণিবর্গের তৃপ্তির জন্য অন্ন প্রদান করিলাম। চতুর্দশ প্রকার ভূতগণের অন্তর্গত যে এবং যাহারা অখিল-ভূত-ঘের, তাহাদের তৃপ্তির জন্য আমার প্রদত্ত এই অল্প দিলাম । তাহারা আনন্দিত হউন। ইহা উচ্চারণ করিয়া নর পৃথিবীতে ভূতােপ কারের নিমিত্ত শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া অনুদান করিবেন; যেহেতু গৃহী সকলের আশ্রয়। সমস্ত গৃহী নরেরই এই যজ্ঞে অধিকার। ব্ৰহ্মপুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ বলিয়াছেন—“শূদ্রোহপি-পাকবজ্ঞৈজেত চ। ব্রহ্মপুরাণ ২২২১১৪ ; বিষ্ণুপুরাণ, ৩৮৩৩। অর্থাৎ শূদ্রও পাকযজ্ঞের দ্বারা বৈশ্যদেব যজ্ঞ করিবেন। নিখিল বিশ্বের নিখিল ভূতগণকে অনুদানের এই মহাযজ্ঞে জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার আছে। বিশ্বষজ্ঞের পূজারী শূদ্র ও ব্রাহ্মণকে অনুদান, বিশ্বদেব বলির এই রান্ধাভাত দান করিতেন এবং করিতে পারেন। ব্রাহ্মণ, বিশ্বদেব বলিতে শূদ্রকে যে কান্নদানের বিধি দিয়াছে, সমস্ত উচ্চবর্ণকে সে যে শ্রদ্ধা, অনুস্বরূপ বিষ্ণু। শূদ্রদত্ত এই “বিষ্ণু অয়” আজ যদি তুমি গ্রহণ না কর, তবে তােমার শাস্ত্রীয় বিধান কেবল কপটতা ও প্রবঞ্চন মাত্ৰে পৰ্যবসিত হইবে; অথবা তুমিই শাস্ত্রহস্তা হইবে। আজ যদি শূদ্রাদির কেহ যথার্থ ধৰ্ম্মপিতা, ধৰ্ম্মমাতা, ধর্মবন্ধু, ব্রাহ্মণাদি না থাকেন, তবে ওই বিশ্বযজ্ঞের বিশ্বদেবতাকে অস্বীকার করা হইবে। আর উচ্চবর্ণ, তােমাদের প্রকৃত পিতা, মাতা, বন্ধু, অসিদ্ধি- দাতা কে, তাহা কি একবার ভাবিয়া দেখিয়াছ? আজ ওই তথাকথিত জাতি কথা • নিম্নবর্ণ শূদ্রকৃষক-কুলই তােমাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া অনুদান করিতেছেন, মন্ত্রে নহে, কর্মে। ওই শূদ্রই তােমার অনুদা পালক পিতা, মিষ্ট কথায় চিড়া ভিজাইয়া নহে, সত্য সত্যই তাহার ব্যবস্থা করিয়া প্রাণ ঢালিয়া সেবা করিয়া শূদ্র আজ তােমার সেবাপ মায়ণ-মাতা কৰি কল্পনায় নহে, জীন নাটকের গরিমায়। বিপদে এই শূদ্রই তােমার একমাত্র বন্ধু, যুদ্ধ বিগ্রহে রাষ্ট্রবিপ্লবে তাহার জীবন দিয়া তােমার জীবন বাঁচাইতে। আর তােমার অসিদ্ধি? শূদ্রের মুখের গ্রাস ছিনাইয়া লইয়া আজ তুমি তোমার নধরকান্তি পুষ্ট করিতেছ ; তাহার কুঁড়ে ঘরের জীর্ণ কঙ্কালের উপর তুমি বিরাট সৌধ রচনা করিতেছ। বিশ্বদেবতার যথার্থ পূজারী, এই তথাকথিত শূদ্রকে আজ তুমি জীবনে-মরণে স্বীকার করিয়া আছ , কেবল তুচ্ছ লোকাচারে, দেশাচারে স্বীকার করিবে না? শুধু বাংলার নহে, ভারতের নহে, নিখিল ভুবনের সকল প্রাণীকেই এমন করিয়া শ্ৰন্ধার সঙ্গে বিষ্ণুবােধে পানুদানের মহাষজ্ঞ যে ঋষ যে সাধক প্রচলিত করিয়াছিলেন, তাহা অপ্রচলিত হইল, রুদ্ধ হইল, মৃত হইল, কোন্ দানবের কুলিশ প্রহারে ? শূদ্রের পক্ষে উচ্চবর্ণকে পরােক্ষে অনুদানের ব্যবস্থা যদি প্রত্যক্ষভাবে নিষিদ্ধ হয়, তবে তাহার তুল্য মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, কপটতা আর কি হইতে পারে? ব্রাহ্মণাদির পূত অন্তরাত্মা পরম তৃপ্তি ও আনন্দের সঙ্গে যে শূদ্র প্রদত্ত পান্ন গ্রহণ করিতেছেন, শুধু অস্থিমাংস লালাক্লেদময় মুখখানাই কি তাহা প্রত্যাখ্যান করিবে বিকৃত মুখভঙ্গী করিয়া ? বিশ্বনাথ, বিশ্বম্ভর, পরম পিতা বা জগদ্ধাত্রী জগন্মাতাকে যখন রূপ, রাগ, রস, মাধুরী দিয়া প্রাণে বরণ করিয়া লইতে পারি না, তখনই তাহার প্রতীক, প্রতিমা পরিকল্পনা করি। আমাদের প্রাণের প্রাণদ ঠাকুরের জাতি কথা জন্যই এই দেহদান’, মূর্তি নির্মাণ। সেই প্রাণের ঠাকুরকে অস্বীকার করিলে এই প্রতিমাটার মূল্য যে কাঠ, খড়, মাটি, ধাতুর বেশী কিছু নয়। সেইরূপ বিশ্বদেব পূজার ওই অনুদানটাকে যদি সাক্ষাৎভাবে অস্বীকার করি, তবে প্রাণহীন সে মন্ত্রে, রাগিণীহীন সে যন্ত্র, চৈতন্যহীন সে জড় প্রতিমার মূল্য কি? বিশ্বের নিখিল মানবকে, নিখিল প্রাণীকে আমরা সকলেই যদি নিত্য ঘােড়শােপচারে ভােগ-নৈবেদ্য নিবেদন করিতে পারিতাম, তবে কতই না ধন্য হইতাম। তাহা পারি না। প্রত্যক্ষভাবে স্বহস্তে প্রস্তুত অম্নভােগ নিবেদনে ; তাই অনুকল্প বিধানে স্বল্প অন্নে তাহাদিগকে জন্ম নিবেদন করি প্রাণের বিশালতা বিপুলতা লইয়া, অন্তরে পুষ্পপাত্ৰভরা কুসুমদাম লইয়া। শ্লেচ্ছ, যবন, চণ্ডালেরও প্রাণঢালা প্রীতিরস মাখা পূত এই প্রত্যক্ষ অনুভােগ ব্রাহ্মণাদি যদি আজ না নিতে পারেন, তবে যে এই বিশ্বদেব্যজ্ঞ ধর্মসঙ্কর, ধৰ্ম্মের ব্যভিচার, কদাচার মাত্রে পর্যবসিত হইবে, দেবত্বহীন ছেলে খেলার পুতুলের মত, অথবা রঙ্গমঞ্চে অপরিপক্ক বিদূষকের রসহীন ভাঁড়ামীর মত। , না ব্রাহ্মণ, দেবতার বরাভয়হস্তে, প্রাণভরা আশীর্বাদে তুমি যে বিশ্বমঙ্গল রচনা করিয়াছ, সেই “বিশ্বদেব বলিকে, সেই ভুবনমঙ্গল যজ্ঞকে আজ তুমি জাতিবাদের খগাঘাতে জহলাদের ন্যায় বলি দিও না, কষাইয়ের ন্যায় হত্যা করিও না, রাক্ষসের ন্যায় গ্রাস করিও না। (২১) শুজের ব্রাহ্মণত্ব। এই সমস্ত হইতে আমরা বেশ দেখিতে পাই যে, ভারতে প্রকৃত আৰ্য বা হিন্দুধর্মে, শাস্ত্রে এবং সনাতন আচরণে দৃঢ়বদ্ধ তথাকথিত জাতিভেদ, ১২ জাতি কথা অস্পৃশ্যতা বা অনাচরণীয়তা নাই। ইহা ভুইফোড়ের ন্যায় হিন্দুর অবনতির যুগে অর্থাৎ বৌদ্ধ ও শ্রোতসূত্রের পরে মনুসংহিতাদির যুগে বা খৃষ্টীয় ৪র্থ, ৫ম শতাব্দীর পরে সৃষ্ট হয় এবং কালে লােকাচারে বা দেশাচারে পরিণত হয়। বৈদিক, ঔপনিষদিক ও বৌদ্ধ যুগে যখন বর্তমানের তথাকথিত জাতিভেদাদি ছিল না তখন তাহা লইয়া এত মারামারি, কাটাকাটি কেন ? সাময়িক দেশাচার বা লােকাচারে যাহার অল্প দিনের জন্ম ও বিকাশ তাহার পরিবর্তন লােকাচার ও দেশাচার পরিবর্তন দ্বারা সহজেই সাধ্য। বল্লাল সেন যেমন প্রথমে যে সমস্ত ব্যক্তিতে আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থ- দর্শন, নিষ্ঠা শান্তি ( বা আবৃত্তি), তপ ও দান এই নয় লক্ষণ দেখিয়াছিলেন, তাহাদিগকে কুলীন করিয়াছিলেন, * কিন্তু উত্তরকালে মহারাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় হইতে ঐ প্রথা গুণগত না হইয়া কুল বা বংশগত হওয়ায় । বর্তমানে অধিকাংশ কুলীন কু-লীন (কু-তে লীন) হইয়াছেন, তদ্রুপ প্রথমে গুণ এবং ধৰ্মকৰ্ম্মানুযায়ীই বর্ণভেদ, জাতিভেদ সৃষ্ট হয়। বিশ্বকর্মার পুত্র যখন ছুচো হয়, বিদ্যাসাগরের পুত্র যখন অদ্যিা ভােব হয় এবং পঙ্কে যেমন পদ্ম হয়, কয়লার খনিতে যখন হীরক জন্মে তখন প্রকৃত ব্রাহ্মণ বা শূদ্র কে, কোথায় হয়? এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে আমরা শাস্ত্রানুযায়ীই বলিব :-“যােবা এতদক্ষরং গাৰ্গবিদিত্বশ্মল্লোকাৎ প্রতি স কৃপণােহথ য এতদক্ষরং গার্গি বিদিত্বাশ্মল্লোকাৎ প্রৈতি স ব্রাহ্মণঃ।”-বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ৩৯/১০। অর্থাৎ হে গা!ি যে ব্যক্তি সেই অক্ষর পুরুষ বা আত্মাকে না জানিয়া পরলােকে গমন করেন তিনি কৃপণ বা দাস বা * “ভাদুড়িকুলের বংশাবলী"--“গৌড়ে ব্রাহ্মণ’এর ১• পৃঃ তে উদ্ভূত। । ব্রাহ্মণ ইতিহাস, শ্রীহরিলাল চট্টোপাধ্যায় কৃত, ৭৩ পৃঃ।
জাতি কথা শূদ্র (“পণক্রীত ইব দাসাদিঃ”-শঙ্করভাষ) হন'; আর যিনি তাহাকে জানিয়া পরলােক গমন করেন তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। এইরূপ আত্মজ্ঞানহীন ব্রাহ্মণও শূদ্র হন ; আর এইরূপ আত্মজ্ঞানযুক্ত শূদ্রও ব্রাহ্মণ হন। বৃহদারণ্যকের এই পরমােদার দিব্যমত কি কেবল পুথিতেই নিবদ্ধ থাকিবে ? আমাদের আচরণে জীবনে কি তাহার চৰ্য্যা পালন থাকিবে না? সমস্ত পুরাণের আদি * ব্ৰহ্মপুরাণ বলিয়াছেন—“এতৈঃ কৰ্ম্মফলৈদেবি নূনজাতি কুলােদ্ভবঃ ॥ ৫২। শূদ্রোহপ্যাগমসম্পন্নো দ্বিজো ভবতি সংস্কৃতঃ। ব্রাহ্মণাে বাপ্যসবৃত্তঃ সৰ্বসঙ্করভােজন। ৫৩। স ব্রাহ্মণং সমুজ্য শূদ্রো ভবতি তাদৃশঃ। কৰ্ম্মভিঃশুচিভিদেবি শুদ্ধাত্মা বিজিতেন্দ্রিয়ঃ । শূদ্রোহপি দ্বিজবৎ সেব্য ইতি ব্ৰহ্মাব্রবীৎ স্বয়ম্। স্বভাব কৰ্ম্মণা চৈব যশ্চ শূদ্রোহ- ধিতিষ্ঠতি ৫৫। বিশুদ্ধঃ স দ্বিজাতিভ্যো বিজ্ঞেয় ইতি মে মতিঃ। ন যােনিনাপি সংস্কারো ন শ্রুতিন চ সন্ততি ॥ ৫৬। কারণানি দ্বিজত্বস্ত বৃত্তমেব তু কারণম্। সৰ্বোহয়ং ব্রাহ্মণণা লােকে বৃত্তেন তু বিধীয়তে । বৃত্তেস্থিতশ্চ শূদ্রোহপি ব্রাহ্মণত্বঞ্চ গচ্ছতি। ব্ৰহ্মস্বভাবঃ সুশ্রোণি সমঃ সর্বত্র মে মতঃ ॥ ৫৮। নিগুণং নিৰ্ম্মলং ব্ৰহ্ম যত্র তিষ্ঠতি স দ্বিজঃ এতে চ বিমলা দেবি স্থানভাব নিদৰ্শকাঃ ৫৯-ব্ৰহ্মপুরাণ, ২২৩৫২-৫৯। মহাভারত, অনুশাসন পৰ্ব্ব, ১৪২ অধ্যায় শেষে। অর্থাৎ :- মহাদেব উমা বা পার্বতীকে বলেন) হে দেবি ! নীচ কুলােদ্ভব শূদ্রও যথাবিধি সংস্কার যুক্ত ও আগমজ্ঞান সম্পন্ন হইলে এই সকল কর্মের ফলে দ্বিজত্ব প্রাপ্ত হয়। অসদ্বৃত্ত, বিবিধ সঙ্কর কর্মের অনুষ্ঠাতা ব্রাহ্মণও স্বীয় ব্রাহ্মণ্য * “আদ্যং সৰ্বপুরাণানাং পুরাণং ব্রাহ্মমুচ্যতে।”—বিষ্ণুপুরাণ, অ৬২১ অর্থাৎ সমস্ত পুরাণের আদিপুরাণ ব্ৰহ্মপুরাণ।
৯৪ জাতি কথা ধর্মচ্যুত হই শূদ্রত্ব লাভ করে। দেবি! (উম) শুচিকর্ম দ্বারা শুদ্ধাত্মা, বিজিতেন্দ্রিয় শূদ্রও দ্বিজবৎ সেব্য—ব্রহ্মা স্বয়ং এ কথা বলিয়াছেন। যে শূদ্র স্বাভাবিক কর্ম দ্বারা অধিষ্ঠিত, সে সাধারণ দ্বিজাতিগণ অপেক্ষা বিশুদ্ধ -এইরূপই আমার মত। দ্বিজজের কারণ যােনি, সংস্কার শ্রুতি বা সন্ততি নহে; একমাত্র বৃত্ত বা চরিত্রই উহার কারণ। জগতে যত ব্রাহ্মণ দেখা যায় সকলেই সদাচারের দ্বারা স্থিত। সদাচারে স্থিত শুদ্রও ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে। হে সুশ্রোণি ! ব্ৰহ্মস্বভাব সর্বত্রই ( সকল বর্ণের পক্ষেই সমান-ইহাই আমার মত। যাহাতে নির্মল নিণ ব্ৰহ্মজ্ঞান আছে তিনিই দ্বিজ। হে বিমলাদেবি! এই বর্ণবিভাগ স্থানভাৰ নিদৰ্শক। মহাভারত আরও বলেন—“শৌচাচারস্থিত? সমগ, বিঘসাশী গুপ্রিয়। নিত্যব্রতী সত্যপরঃ স বৈ ব্রাহ্মণ উচ্যতে।” মহাভারত, মােক্ষধর্মপর্ব, ১৮৯৩। “জীবিতং যস্য ধার্থং ধর্মোহৰ্যর্থমেবচ। অহােরাত্রং চ পুণ্যার্থং তং দেব ব্রাহ্মণং বিদুঃ শৌচেন সততং যুক্ত সদাচার সমন্বিত। সানুক্রোশশ্চ ভূতেষু তদ্বিজাতিষু লক্ষণ।” “সর্বভক্ষ্য- রতিনিতং সর্বকৰ্মকৰােহশুচিঃ। ত্যক্তবেদস্বনাচারঃ স বৈ শূদ্র ইতি স্মৃতঃ। শূদ্রেচৈতদ্ভবেল্লক্ষ্যৎ দ্বিজে চৈতন্ন বিদ্যতে। ন বৈ শূদ্রো ভবেছুদ্ৰো ব্ৰাহ্মণণা ব্রাহ্মণাে ন চ ।”—মহাভারত, মােক্ষধৰ্ম্মপর্ব, ১৮৯৭-৮। অর্থাৎ :- যিনি শৌচাচারে স্থিত, সম্যক্ বিঘসাশী (গৃহের ভূত্যাদি সমস্তকে আহার করাইয়া পরে যিনি আহার করেন , যিনি গুরুপ্রিয়, নিত্যব্রতী ও সত্যপরায়ণ, তিনিই ব্রাহ্মণ বলিয়া কথিত হন। যাহার জীবন ধর্মের জন্য, ধৰ্ম্ম ঈশ্বরের জন্য, অহােরাত্র যাহার পুণ্যাচরণের জন্য তাহাকেই দেবতারা ব্রাহ্মণ বলেন। সতত শৌচ | জাতি কথা যুক্ততা, সদাচার সমন্বিতত্ব এবং সর্বপ্রাণীতে দয়ালুত। ইহা দ্বিজাতির লক্ষণ। যাহারা নিত্য সর্বক্ষ্যনিরত, সৰ্ব্বকৰ্মকর, অশুচি বেদত্যাগ ও অনাচারী এইরূপ মনুষ্যই শূদ্র। শূদ্রে এবং দ্বিজে যদি উপরােক্ত গুণের ব্যতিক্রম দেখা যায় তবে শূদ্র শূদ্র হন না এবং ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ হন না। ব্রাহ্মণ শূদ্রের এই গুণ-কৰ্ম্ম-ধৰ্ম্মগত ভেদ আজকাল কোথায় ? প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব ও শূদ্রত্ব এইরূপ উচ্চ ও দিব্য আদর্শে পরিচালিত না। হইয়া কেবল বংশগত, জন্মগত হইয়াই যত অর্থের সৃষ্টি করিয়াছে ও করিতেছে। যাহারা এই বংশগত, জন্মগত অন্যায্য অধিকার পুত্র পৌত্রাদিক্রমে ভােগদখল করিয়া আসিতেছেন তাহাদিগকে সে অধিকার হইতে বঞ্চিত ও বিতাড়িত বা বিচ্যুত করিবার প্রস্তাব আমরা করিতেছি । তাহারাও গুণে শীলে, চরিত্রে ও ধৰ্ম্মে সমুন্নত হইয়া প্রকৃত ব্রাহ্মণ- পদ বাচ্য হউন এবং যাহারা ধর্মে-কর্মে, শিক্ষা-দীক্ষায়, আচারে- বিচারে, গুণে-চরিত্রে শ্রেষ্ঠ তাহারা যে বর্ণ বা জাতিরই হউন না কেন, তাঁহাদিগকে শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য ও বর-মৰ্যাদা দান করুন, তাহাদিগকেও ব্রাহ্মণত্বের পূর্ণ অধিকার দান করুন-ইহাই আমাদিগের প্রার্থনা। (২২) ব্ৰহ্মদর্শন, আত্মসাক্ষাৎকার ও প্রণব সাধনায় শুদ্রের অধিকার। ছান্দোগ্য উপনিষদ্ বলিয়াছেন—“মিত্যেদক্ষরমুদগীথমুপসীত।” ১১১১। ও এই উদগীথ অক্ষর স্বরূপকে উপাসনা করিবে। ছান্দোগ্য এই উপাসনা স্ত্রীলােকেরা ও শূদ্রের করিতে পারিবেন না—ইহা কোথায়ও বলেন নাই। পক্ষান্তরে, ঋগ্বেদে বাগাণী, বৃহদারণ্যকোপনিষদে গাগী জাতি কথা । ও মৈত্রেয়া, কেনােপনিষদে উমা হৈমবতী ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞ ছিলেন ; বেদে শূত্র কক্ষীবান, কবজলুষ, ছান্দোগ্যোপনিষদে সত্যকাম জাবাল, পুরাণে সূত নােমহর্ষণ প্রভৃতি শূদ্রগণ ব্ৰহ্মতত্ত্বজ্ঞ ছিলেন। মুণ্ডকোপনিষদ বলিয়াছেন “ও মিতত্যবং ধ্যায়থ আত্মান’-২২৬। শঙ্করাচাৰ্য দেবও বলিলেন- “ও মিত্যাত্মনং যুঞ্জীত”—মাণ্ডকোপনিষভাষ্য, ১। অর্থাৎ আত্মাকে ‘ও এইরূপে ধ্যান করিবে। শূদ্রের ও স্ত্রীলােকের যে আত্মা নাই ইহা তাে কোনও হিন্দুশাস্ত্র বলেন না। শঙ্করাচাৰ্যদেবের পরম গুরু গৌড়পাদ আচাৰ্যও বলিলেন-“প্রণবং হীশ্বরং বিদ্যাৎ সৰ্বস্ত হৃদি- সংস্থিত।”—গৌড়পাদ কারিকা, আগম প্রকরণ, ২৬২৮। অর্থাৎ :- প্রণবকেই সকলের হৃদয়ে স্থিত ঈশ্বর বলিয়া জানিবে। স্ত্রী-শূদ্রে যে হৃদয় নামক পদার্থ হন তাহা তাে কোনাে গোড়া ব্রাহ্মণও বলেন না। অথচ এই প্রণবরূপী ‘ও’এর সাধনা হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করা হইল। “ও মণিপদ্মে হুম্” ( তিব্বতে ‘চষ্টান’ নামক মন্দির-প্রাচীরে লেখা।), “ওঁ নমো বুদ্ধায়” (প্রজ্ঞারমতি কৃত বােধিচৰ্য্যাবতার পঞ্জিকায় ), ‘ও নমঃ সৰ্বজ্ঞায়” (অশ্বঘােষ কৃত বুদ্ধচরিত মহাকাব্যের প্রারম্ভে ) বলিয়া বৌদ্ধেরাও প্রণব উচ্চারণে অধিকারী হইলেন; অথচ হিন্দু স্ত্রী-শূদ্রেরাই তাহাতে অধিকারী হইলেন? আত্মাতে, হৃদয়ে স্ত্রী-শূদ্রাদি সকলেই তাঁহাকে অন্তরতমরূপে প্রাণনাথ প্রাণেশ্বররূপে পাইল, অথচ মন্দির নামধেয়, দেবালয় নামক ঐ ইট-পাথরের স্তুপের অন্তর হইতে তাঁহারা বিতাড়িত হইলেন, সেখানে তাঁহাদের প্রবেশ পৰ্যন্ত রুদ্ধ হইল। দেহে, মনে, প্রাণে, জীবনে, মরণে যাহাকে স্পর্শ করিয়া আছি, স্পর্শ করিতেছি-ই, যাহার প্রেমময় স্পর্শ অন্তর্হিত হইলে জাতি কথা এই সজীব দেহ মৃত জড়পিণ্ড মাত্র হয়, সেই প্রাণের ঠাকুরের মুক্তি বা প্রতিমাকে দেবালয়ে, মন্দিরে বাইয়া প্রণাম করিতে পারিব না, তাহার চরণ স্পর্শ করিতে পারিব না ! জগন্নাথের পূজাঞ্জলি হইতে এতগুলি মানুষকে অনাথ করার ন্যায় আধ্যাত্মিক হত্যা জগতে আর কি আছে ? প্রাণের ক্ষুধাকে অস্পৃশ্যতার শুচিবায়ু দ্বারা কেবল ভরিয়া রাখা, ক্ষুধিতের মুখের গ্রাসটুকু কাড়িয়া লওয়ার চেয়েও কি জঘন্যতর পাপ নহে ? গােমেধ, অশ্বমেধ, নরমেধ যজ্ঞের দারুণ হিংসা “অহিংসা পরমােধ দ্বারা নিবারিত হইয়াছিল; কিন্তু মনমেধ, প্রাণমেধ, আত্মামেধ যজ্ঞের এই নৃশংস জহাদ লীলা ভারতের বুকে এখনও আসন পাতিয়া বসিয়া আছে। আমরা স্বচক্ষে দেখিতেছি তৈলপায়িকা, ইন্দুর, উচ্চিঙ্গে, পােকা- মাকড় প্রভৃতি হাজারে হাজারে যাইয়া দেবদেবীর অঙ্গ চাটতেছে, তাহাদের সর্বাঙ্গের উপর মলমূত্র ত্যাগ করিতেছে ; তাহাতে দেবদেবীর জাত যায় নাই, অস্পৃশ্যের স্পর্শপাপে দেবদেবী অশুদ্ধ, দুষ্ট হন নাই ; আর শ্রীভগবানের রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম জীব মানুষ সে অঙ্গ, সে চরণ স্পর্শ করিলে তাহাদের জাত যায়, তাহারা অশুদ্ধ, দুষ্ট হন। এতবড় আধ্যাত্মিক পাপ হিন্দুসমাজ যে সহিতেছে ইহাই হিন্দুসমাজের দুর্বলতার, দুর্দশার এক প্রবল কারণ। মহাভারত বলিয়াছেন-“সৰ্ব্বলােকে চ মাং ভক্তাঃ পূজয়স্তি চ সৰ্ব্বশঃ।”-বনপর্ব, ১৮৯৩৭। অর্থাৎ সকল ভুবনেই আমার ভক্তসকল আমাকে পূজা করিতেছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে ও চণ্ডীতে আমরা পাই যে, ক্ষত্রিয় সুরথ রাজা এবং বৈশ্য সমাধি উভয়ে সেই নদীতটে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করিয়া নিজেরাই পূজা করিয়াছিলেন। “তে? তস্মিন্ পুলিনে দেব্যাঃ কৃত্বা মূর্তিং মহীময়ী।
১৮ জাতি কথা . “কৃষ্ণ অণাং চতুস্তস্যাঃ পুষ্পধুপাগ্নিতর্পণৈঃ ॥” (মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৯৩৭;- শ্রীচণ্ডী, উত্তমচরিত্রে, ১৩শ মাহাত্ম্য, ১০-১১। অর্থাৎ:-বৈশ্য এবং রাজা সেই পুলিনে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গঠন করিয়া পুষ্প, ধূপ এবং হােমাদি দ্বারা পূজা করিলেন। ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য স্বহস্তে স্বয়ং দেবীর পূজা করিতে পারেন ; আর শূদ্রই কি পারেন না? নিশ্চয়ই পারেন। ব্রজের শ্রীকৃষ্ণ প্রমুখ শূদ্র গােপালকগণ তাহাও করিয়াছিলেন। স্তেনৈবরূপেণ গােপৈঃ সহ গিরে শিরঃ। অধিরুচ্চয়ামাস দ্বিতীয়মাত্মন শুকুম।”—ব্রহ্মপুরাণ, ১৮৭৬০ ; বিষ্ণুপুরাণ, ৫|১০|৪৮। অর্থাৎ :- কৃষ্ণ সেইরূপেই গােপগণসহ গিরিশিরে আরােহণ পূর্বক স্বকীয় দ্বিতীয় মুকে ভ না করিলেন। এই যজ্ঞপূজার প্রথম ব্যবস্থাপক পণ্ডিত আবার শুদ্র গােপাল কৃষ্ণই। তিনি গােপগণকে এই বলিয়া ‘পাতি দিয়াছিলেন—“ভবঙিৰ্বিবিধাণৈঃ অচ্চতাং পূজ্যতাং” (ব্রহ্মপুরাণ, ১৮৭৫১; বিষ্ণুপুরাণ, ৫১৩৩৮। অর্থাৎ আপনার বিবিধ উপহার লইয়া অর্চনা এবং পূজা করুন। এই “গিরিগােবজ্ঞ” পূজার প্রবর্তন শূদ্রের পূজাধিকারের এক নব অধ্যায়, নব অভুদয় ( Renaissance ) 2521 46311 কোন পাপে হিন্দু তুমি এই মহৎ উদার মত ভুলিলে ? ওই শােন তােমার হিন্দুশাস্ত্র উদার কণ্ঠে বলিতেছেন :-“বং শৈবা সামপাসতে শিব ইতি ব্রহ্মোতি বেদান্তিনো। বৌদ্ধ। বুদ্ধ ইতি প্রমাণ পাটকঃ কর্তেতি নৈয়ায়িকা। অমিত্যৰ্থ জৈন শাসন রতাঃ কৰ্ম্মতি মীমাংসকা। সো ইয়ং বাে বিদধাতু বাঞ্ছিতফলং ত্রৈলােক্যনাথাে হরিঃ।” অর্থাৎ :- শৈৰের যাহাকে শিব বলিয়া উপাসনা করেন, বেদান্তীরা যাহাকে ব্রহ্ম জাতি কথা ১১ ; বলেন, বৌদ্ধেরা যাহাকে বুদ্ধ বলেন, নৈয়ায়িকেরা যাহাকে প্রমাণপাটব কর্তা বলেন, জৈনেরা যাহাকে নিত্য অহৎ বলেন, মীমাংসকেরা যাহাকে কৰ্ম্ম বলেন সেই এই ত্রৈলােক্যনাথ হরি তােমাদিগকে বাঞ্ছিত ফল প্রদান করুন। অস্পৃশ্যদের প্রাণমন ছাইয়া যে বাঙ্গাফল ভাবরসে পূর্ণ হইতে চাহিতেছে তাহা স্পর্শ-মণির স্পর্শ। হরিজনগণের হরি হরিজন- দিগকে সে বাঞ্ছা ফল প্রদান করিতেছেন ; কেবল হরির দুয়ারের এই জয় বিজয়ই তাঁহাদিগকে আটকাইয়া রাখিতেছে। না জানি তাহার এই পাপে আবার কোন্ রাক্ষসের ঘরে যাইয়া জন্মিবেন ! ব্রাহ্মণ । শ্রীহরির মন্দির দ্বার রুদ্ধ করিয়া জয় বিজয়ের ন্যায় বৈকুণ্ঠভ্রষ্ট হইও না। জাতিবাদের অস্পৃশ্যতা, অনাচরণীয়তা দূর করিয়া আজ নিম্নতম শূদ্রকেও ডাকিয়া বল—“তােমার আধ্যাত্মিক অধিকার, ব্রহ্মরাজ্যে তােমার ব্রাহ্মণত্বের অধিকার গ্রহণ কর। বল বল উচ্চবর্ণ হিন্দু,-“খণ্ড খণ্ড হিন্দুজাতিকে এই অখণ্ড ব্রাহ্মণত্বের ভিতর দিয়া একমন একপ্রাণ করিব আমরা সকলেই জাতিবাদ দূর করিয়া।” (২৩) মিশ্রিত হিন্দু দেবদেবী। হিন্দু ব্রাহ্মণ, তােমার দেবদেবী শাস্ত্র অনুযায়ী তােদর নিজস্ব সম্পত্তি নহে। গায়ের জোরে, ধনের বলে, লাঠির চোটে তুমি তোমার দেবদেবীর মূর্তি বিগ্রহগুলি তােমার এক চেটিয়া সম্পত্তি বলিয়া যে ঘােষণা করিতেছ তাহ যে নানা জাতি দ্বারা সৃণ্ড হইয়া পূজিত হইয়া আসিতেছে তাহার খবর তুমি কি রাখ? সংক্ষেপে তােমাকে সেই কথা একটু বলি :- সুপ্রাচীন সাংখ্য যােগাদির মূল। প্রকৃতি ত্রিগুণময়ী। এই সত্ত্ব, রজঃ ও ১০০ জাতি কথা তমােণ প্রাধান্য লইয়া স্থিতি, সৃষ্টি এবং প্রলয় কাৰ্য্য চলিতেছে। কালক্রমে এই শক্তিই অধিষ্ঠাতা দেবতা বিষ্ণু, ব্রহ্মা এবং শিবে পরিণত হইয়াছেন। বৈদিক যুগে আৰ্য অনাৰ্য্যের, ব্রাহ্মণ শূদ্রের ত্রিমূর্তি ছিলেন, অগ্নি, বায়ু বা ইন্দ্র এবং সূৰ্য্য। কালক্রমে ইহারা ও মধ্যবর্তী হইয়া অ, উ, ম অনুযায়ী ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবে দাড়াইয়াছেন। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে ব্রহ্মা, শিব এবং হরি বা ইন্দ্রকে পরমাত্মার সহিত এক বলা হইয়াছে, (১০১৩১২)। মৈত্ৰায়নী উপনিষদে একদিকে যেমন ব্রহ্মা বিষ্ণু ও রুদ্রকে পাইতেছি অন্যদিকে ইহাদিগকে তদ্রুপ সত্ব, রজঃ ও তমােগুণরূপেও পাইতেছি। মৈত্ৰায়নী উপনিষদ্ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রকে পরমাত্মার তনু বলিয়াছেন। ৪৫৬)। নৃসিংহােত্তর তাপনীয় ও রামােন্তর তাপনীয় উপনিষদেও এই ত্রিমূৰ্ত্তির একত্ব উল্লিখিত হইয়াছে। তথা স সংজ্ঞামায়াতি ব্রহ্ম বিষ্ণবীশকারিণী ॥১৬। ব্ৰহ্মত্বে সৃজতে লােকান্ রুদ্ৰত্বে সংহত্যপি। বিষ্ণুতে বাদাসীন স্তিস্রোবস্থাঃ স্বয়ম্ভুবঃ ॥১৭। রজো ব্রহ্মা তমে রুদ্রে। বিষ্ণুঃ সত্ত্বং জগৎপতিঃ। এত এব এয়াে দেব। এত এব ত্রয়ে গুণাঃ ॥১৮। অন্যোন্য মিথুনাহেতে, অন্যোন্যাশ্রয়িণ স্তথা। ক্ষণং বিয়ােগােন হেষাং ন ত্যজস্তি পরস্পরম্ ॥১৯।-মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৪৬১৭-১৯। অর্থাৎ :- সেই ঈশ্বর ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর আখ্যা প্রাপ্ত হন। তিনি ব্রহ্মত্বে যাবতীয় লােকের সৃজন, রুদ্রত্বে নিধন এবং বিষ্ণুত্বে উদাসীন হইয়া অবস্থান করেন অর্থাৎ পালন করেন। স্বয়ম্ভর এই তিন অবস্থা। ব্রহ্মা রজ: রুদ্র তমঃ এবং জগৎপতি বিষ্ণু সত্ত্ব ; এই প্রকারে এই দেবতায় গুণত্রয়রূপে পরস্পর নিপুণভাবে পরস্পরকে আশ্রয় পূৰ্ব্বক বিরাজ করিতেছেন। ক্ষণমাত্রও ইহাদের বিয়ােগ নাই এবং মুহুৰ্তমাত্রও পরস্পর কেহ কাহাকে জাতি কথা পরিত্যাগ করেন না। ব্ৰহ্মপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণ একবাক্যে বলিতেছেন :- “নমাে হিরণ্যগর্ভায় হরয়ে শঙ্করায় চ। বাসুদেবায় তারায় সর্গস্তিত্যন্ত কারিণে।-ব্রহ্মপুরাণ, ১২২; বিষ্ণুপুরাণ, ১২২ অর্থাৎ :-হরি, হিরণ্যগর্ভ ও শঙ্কর নামে অভিহিত সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কারী বাসুদেবকে নমস্কার। বিষ্ণুপুরাণ আরও বলেন “কর্তাপহর্তা পাতা চ ত্রৈলােকে ত্ব অধীময়।”—ঐ, ৫৭৩৫ অর্থাৎ :—এই ত্রৈলােকে তুমি কর্তা অপহর্তা ও পাতা এই ত্রয়ীময়। শ্রীমদ্ভাগবত, (৪৭৪৮), দেবী-ভাগবত (৯৩) এবং সূতসংহিতাও (৩৪৮) তাহাই বলেন। এই ত্রিমূৰ্ত্তি বৌদ্ধদিগেরও। তাহারা ইহাকে ত্রিরত্ন বলেন। ইহাদের ত্রিরত্ন বুদ্ধ, ধৰ্ম্ম ও স্য। মহাযান মতে বুদ্ধের ত্রিমূৰ্ত্তি হইলেন বুদ্ধ, ধ্যানী বুদ্ধ এবং ধ্যানী বােধি সত্ত্ব অথবা ধর্মকায়, নির্মাণকায় ও সম্ভোগকায়। এই ধৰ্ম্মকায়ের পরিকল্পনা সত্ত্বগুণময় বিষ্ণুর সহিত, নির্মাণকায় রজোগুণময় ব্রহ্মার সহিত এবং সম্ভোগকায় তমােগুণময় রুদ্রের সহিত মিলিয়াছে। তিব্বতের অনেক মন্দিরে বুদ্ধ গৌতমের মূর্তি প্রায়ই দৃষ্ট হয় না এবং উহাতে প্রলয় কারক বেশে শিব, কালী, ভূত, প্রেত, পিশাচ প্রভৃতির মূর্তি সংরক্ষিত দেখা যায়। বৌদ্ধ অবলােকিতেশ্বর, লােকেশ্বর, প্রজ্ঞাপারমিতা, বজ্রযােগিনী, আৰ্যতারা, বাগীশ্বরী, মঞ্জুশ্রী, হেব, হারীতি, মারীচি, অক্ষোভ্য, পর্ণশবরী প্রভৃতি অনেক সুলেই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বাসুলী, শীতলা, মঙ্গলচণ্ডীতে পরিণত হইয়া পূজা গ্রহণ করিতেছেন। ভারতের বহু তীর্থে বহু মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি এবং বৌদ্ধমূর্তি রূপান্তরিত হইয়া হিন্দু দেব-দেবীরূপে পূজিত হইতেছেন। গয়া, প্রয়াগ, কাশী, বৈদ্যনাথ, পুরী প্রভৃতি বহু তীর্থে বৌদ্ধ মূর্তির কাঠামের উপর ১২ জাতি কথা হিন্দু তাহার দেবদেবীর ‘নবকলেবর সাধন করিয়াছে। ব্রিরত্নের ধর্ম বাঙ্গলায় ধর্মঠাকুররূপে পরিণত হইয়াছেন। ইহা শ্রীহরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ অনেকেই প্রমাণিত করিয়াছেন। জামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণের শূন্যমূর্তি ধৰ্ম্মঠাকুর বৌদ্ধ মহাযান ভাবাপন্ন হইলেও লাউসেনের ধর্মঠাকুর বেমালুম সূৰ্য্যে পরিণত হইয়াছেন। ত্রিপিটক ব্ৰহ্মা, ইন্দ্র, যম, চারিদিকপাল হইতে আরম্ভ করিয়া বাস্তুদেবত, বনদেবতা, এমন কি লক্ষ্মী অলক্ষ্মী পর্যন্ত গ্রহণ করিয়াছেন। । চণ্ডীদাসের বাশুলী বৌদ্ধ বাগীশ্বরীরই রূপান্তর। চণ্ডীদাসের ‘সহজিয়া মতও কি বৌদ্ধ তান্ত্রিক সহজযান হইতে আসে নাই? অনেকেই মনে করেন মঙ্গচণ্ডীতে ও শীতলাতে বৌদ্ধ সংশ্রব আছে। শীতল হারীতির রূপান্তর। পুরীর জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকে অনেকেই বৌদ্ধ ত্রিরত্নের রূপান্তর বলিয়া মনে করেন। সুদর্শনচক্র, বৌদ্ধধর্মচক্র ইহাও অনেকে বলেন। পুরীর থ- যাত্রাও কি বৌদ্ধ রথযাত্রার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধযুক্ত নহে? এ সম্বন্ধে ফাহিয়েনের কথা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। চৈত্র পূজায় শিবঠাকুরের আসন ‘পাটবান’ পূজা কি ‘বুদ্ধাসন’ পূজার হিন্দু সংস্করণ নহে? রমেশনােক্ত সত্যনারায়ণ ব্রতকথার “সত্যপীরের সিনি” “মঃ সত্যপীরায়” বলিয়া হিন্দুই নিবেদন করিতেছেন এবং হিন্দু সত্যনারায়ণের ন্যায় সত্যপীরের পূজা করিতেছেন। স্কন্দপুরাণের রেখণ্ডের সত্যনারায়ণ সত্যপীরে পরিণত হইয়াছেন। মােটকথা হিন্দুদের দেবী বলিয়া যে সমস্ত মূর্তি বিগ্রহাদি আজকাল খ্যাত তাহাদের জাতিগােত্র প্রভৃতির ঠিক নাই। অথচ এই * এ সম্বন্ধে আনুপূর্বিক ত্রিপিটক মত ঘঁহারা জানিতে চাহেন, তাহারা আমার লিখিত “সুদ্ধচরিতের আভাষ” পড়িবেন।—লেখক।
জাতি কথা ১০০ সব দেবদেবীর মন্দিরেই তথাকথিত অস্পৃশ্যদের প্রবেশ নিষেধ। এই সব দেবমন্দিরের অধিকাংশ মন্দিরে তাহার পূর্বকালে প্রবেশ করিতেন, পূজা দিতেন, স্পর্শ করিতেন, এবং এখনও অনেক স্থলে করিয়া থাকেন। এখনই কি ইহা যত দোষের, যত পাপের হইল ? হিন্দু, তােমার জাতির সেরূপ নিতা, তােমার দেবদেবীরও তদ্রুপ মিশ্রতা। এস এখন এই অস্পৃশ্যদিগকে এই মিশ্রণে আনন্দে মিশ্রিত হইতে দাও, মিশ্রপুত্ৰ গৌরাঙ্গ- দেবেরই মিশ্র উদাহরণ। ২৪) জাতিবাদের তিরোভাবে জাতীয় জীবন। এত বড় একটা বিরাট জনসমষ্টিকে পায়ের তলায় উৎপীড়িত করিতে থাকিলে আমাদিগের জাতীয় উন্নতি কিরূপে সম্ভব হইবে? পল্লীতে পল্লীতে -যদি এই অস্পৃশ্য জাতির। অজ্ঞ, নিরক্ষর, মুখ, চরিত্রহীন, ধর্মহীন, অবনত হইয়া থাকিল, তবে পল্লীমঙ্গল কেমন করিয়া সম্ভব হইবে ? যথেচ্ছাচারিতা দ্বারা এই মিলন সম্ভব হইবে না, হিংসা বিদ্বেষ দ্বারা সম্ভব হইবে না; হইবে প্রকৃত মহানুভবতা, মহাপ্রাণতা এবং সার্বজনীন উদার ধর্মভাবের প্রেরণায়। সার্বভৌমিক সাৰ্বজনীন ধর্মের বিজয় বৈজয়ন্তী আবার পল্লীতে পল্লীতে উড়াইতে হইবে। সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা আবার গ্রামে গ্রামে দেশে দেশে গাহিতে হইবে। রামকৃষ্ণপরমহংসদেব নিজ জীবনে সাধনার দ্বারা এই আদর্শ আমাদের সম্মুখে ধরিয়াছেন। মহাত্মা গান্ধীও আজ জীবণ-পণ করিয়া সর্বধর্মের ভিতর ঐক্য ও সংহতির প্রচার করিতেছেন। স্থানীও এই সাম্যের সামগান গাহিতেছেন। জাতিভেদ সম্বন্ধে ভাস্বানী ১৯২৫ এর ডিসেম্বর মাসে কানপুরে ৩য় নিখিল ভারত আৰ্য স্বরাজ্য ১০৪ জাতি কথা কনফারেন্সে সভাপতিরূপে বলিয়াছিলেন -"Historically caste is not Aryan.” অর্থাৎ-ইতিহাসের দিক দিয়া আৰ্যদিগের জাতি ভেদ নাই। রবীন্দ্রনাথও বিশ্বভারতীর এই মহামিলন বাণী ছন্দ-বন্দনায় মূৰ্ত করিয়া তুলিতেছেন। জগদীশচন্দ্রও বিশ্বপ্রাণ ধারার এই স্পন্দন বৈজ্ঞানিকের গবেষণায় যন্ত্রপাতিতে প্রস্ফুট করিয়া তুলিতেছেন। ইহাদের মহামিলনের এই chorus বা একতানের মধ্যে অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদের তার স্বরও একতান গানে সুসঙ্গত হইয়া পড়ুক। সৰ্ব্ব বিচিত্রতার ভিতর দিয়া যে এক পরিপূর্ণ, অখণ্ড ব্রহ্মানন্দ ব্যক্ত, বিকশিত ও ভিন্ন ভিন্ন দেহে বিগ্রহবান্ হইয়া উঠিতেছে, তাহার ভিতর অস্পৃশ্যতা, বর্ণভেদ, জাতিভেদ কোথায় ? (২৫) একটি উপায় হরিনাম সঙ্কীৰ্ত্তন, মহােৎসবাদির সাহায্যে অস্পৃশ্যতাদি দূর করিবার প্রকৃষ্ট পন্থা বাঙ্গালা দেশে এখনও আছে। এইগুলিকে জাগ্রত ও প্রাণবান্ করিতে হইবে। পুরীতে জগন্নাথ ক্ষেত্রে জাতি বিচার নাই। বৃন্দাবনাদি বৈষ্ণবতীর্থে জাতিভেদ নামমাত্র। ফরিদপুরে প্রভু জগদ্বন্ধুর ঐ অঙ্গনে, নবদ্বীপে রাধারমণ চরণ দাস বাবাজীর সমাজ বাড়ীতে, বেলুড়ে রামকৃষ্ণমঠে, মধুপুরে কপিলমঠে সৰ্ব্ববর্ণ, সৰ্বজাতি একত্র বসিয়া অন্নহার করিয়া থাকেন বা করিতে পারেন। সৰ্ব্বজাতির সম্মিলনীরূপ এইসব স্থানের মহােৎসবের ন্যায় মহােৎসবাদি দেশে যত বেশী প্রচলিত হইবে ততই সৰ্ববর্ণ একসঙ্গে মিশিবার অধিকার পাইবে। সমস্ত হিন্দু যদি এইসব প্রকারে একত্র সজ্ঞাবদ্ধ হইতে পারেন, তবে হিন্দু-মুসলমান মিলনও জাতি কথা খুব সহজসাধ্য হইবে। এই অস্পৃশ্যতা সমাধানে হিন্দু-মুসলমান সমস্যারও সমাধান হইবে। জাতির মিলন কথায় জাতিবাদের হেদ বিবাদ বিদূরিত হইবে। (২৬) জাতি কোথায় ? তরুণ ভারতের নব্যতন্ত্রের শিক্ষিত মহলে প্রকারান্তরে জাতিভেদ ব্যক্তিগতভাবে প্রায় উঠিয়া গিয়াছে। এই তিরোভাবকে এখন পারিবারিক ও সামাজিকভাবে স্বীকার করিলেই হইল। রেল, ষ্টীমার, মেস’, ‘হােটেল, ভেজাল খাদ্যাদির কৃপায় জাতি এখন ‘ঐতিহাসিক যৎকিঞ্চিত’এ পরিণত হইয়াছেন। এই অকিঞ্চিৎকর যৎকিঞ্চিতের আর advertisement বা বিজ্ঞাপন বড়াই কেন ? (২৭) ব্রাহ্মণাদির প্রতি নিবেদন। ব্রাহ্মণাদির ব্রাহ্ম বা মহৎ জাতি যদি লজ্জাবতী লতার ন্যায় দুর্গে মৃতপ্রায় হন, অথবা কূপােদকের ন্যায় নষ্ট হন, তবে তাহাকে ক্ষুদ্রই বলিতে হইবে। বৃহৎ বনস্পতি কিছুতেই সঙ্কুচিত হয় না; গঙ্গোদক চণ্ডাল স্পৃষ্ট হইলেও পূর্ণ পবিত্র থাকে ; শতদল পদ্মপুষ্প, বিল্বপত্র ম্লেচ্ছ কর্তৃক আহৃত হইলেও দেবপূজায় ব্রাহ্মণ তাহা সাদরেই গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণত্ব যদি মহৎ, বৃহৎ, পবিত্র ও মনােহর হয়, তবে তাহা কিছুতেই নষ্ট হইবে না। মহৎ দেবতা স্পর্শে শূদ্র যদি ক্ষুদ্র হইয়া যায়, তবে দেবতার ক্ষুদ্রত্বই প্রমাণিত হয়। অমৃতের স্পর্শে বিষও অমৃতে পরিণত হয়। স্পর্শমণির স্পর্শে লােহাও সােণা হয়। আর ভূদেব ব্রাহ্মণ ! পূত, পবিত্র, হোমানলে শুভ্র, জাঁতি কথা শুচি ব্রাহ্মণ ! যজ্ঞার্থে ধৰ্ম্মার্থে উৎসর্গীকৃত জীবন ব্রাহ্মণ ! তােমার পূত স্পর্শে অশুচি শুচি না হইয়া, তুমিই অশুচি, অপবিত্র হইয়া যাইবে? তােমার আলিঙ্গনে শূদ্রের ক্ষুদ্রত্ব কাটিয়া না যাইয়া তুমিই হীন, ক্ষুদ্র হইবে ? তােমার এই ভ্রান্তি, তােমার এই মায়া, তােমার এই অবিদ্যা দূর করিয়া এস প্রকৃত ব্ৰহ্মণ ! তােমার উদার ভাস্বর তেজঃপুঞ্জে নীচজাতিত্বের নীচতা, মলিনত্ব, পূতিময়ত্ব, বিদূরিত করিয়া দাও, মহাদ্যুতি ধ্বান্তারি সর্বপাপঘ্ন সূর্যের বিশ্বপ্লাবী অজস্র ধারায়, গরলাভরণ নীলকণ্ঠের বিপুল মহিমায়, আর পতিতােদ্ধারিণী ভাগীরথীর করুণা বিগলিত মহাবস্যায়। (২৮) মিলন মন্ত্র। এস ভাই ভগিনী সব, আমরা সমস্ত তথাকথিত ‘স্পৃশ্যতা, অস্পৃশ্যতা, আচরণীয়তা, অনাচরণীয়তা, ভেদ, জাতিভেদ, বর্ণভেদ প্রভৃতি ভেদবাদ এক অখণ্ড ব্ৰহ্মভাবের ব্রাহ্মণত্বে পরিণত করিয়া ঋষিকণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া মহাসামাের সামগান গাই। এস আমরা মহামিলনের সাম্যমন্ত্র দিয়া জীবন মন প্রাণ অনুরঞ্জিত, অনুপ্রাণিত করি। বল ভাই, বল ভগিনী সব - “সংগচ্ছধবং সংবদধ্বং সংবে। মনাংসি জানতাং । দেবা ভাগং যথা পূর্বেসংজানানা উপাসতে । ২। সমানাে মংক্র সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহচিত্তমেম্। সমানং মংত্ৰমভিমংয়ে বঃ সমানেন বাে হবিষা জুহােমি। ৩। সমানী ব আকৃতিঃ সমানা হৃদয়ানি বা সমানমস্তু বাে মনাে য ব সুসহাসতি। ৪।* -ঋগ্বেদ, ১০ম মণ্ডল, ১৯১ সূক্ত, ২৪ । = জাতি কথা ১৫৭ তােমরা মিলিত হও, একত্রে স্তব উচ্চারণ কর, তােমাদিগের মন পরস্পর একমত হউক। অধুনাতন দেবগণ প্রাচীন দেবতাদিগের ন্যায় একমত হইয়া যজ্ঞভাগ গ্রহণ করিতেছেন। ২। ইহাদিগের মন্ত্র সমান হউক, সমিতি সমান হউক, ইহাদিগের মনসহ চিত্ত এক হউক। আমি তােমাদিগের একই মন্ত্রে মন্ত্রিত করিতেছি, তােমাদিগের সর্বসাধারণ হবির দ্বারা হােম করিতেছ। ৩। তােমাদিগের অভিপ্রায় এক হউক, অন্তঃকরণ এক হউক, তােমাদিগের মন এক হউক, তােমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও। ৪। সমাপ্ত জাতিকথা সম্বন্ধে কয়েকজন মহাপ্রাণ মনীষী ভক্তের অভিমত I have just gone through the nianuscript of the Bengali Pamphlet "Jati Katha" written hy Sreemat Swami Samadhi Prakash Aranya. It is a remarkable production and a n-table contribution to the mass untouchable literature. I am simply struck with wonder at the scholarship the author has evinced in every page of the pamphlet. He has surveyed the whole field of the Hindu Shastras from the Vedic times downwards and the skill with which he has marshalled his authorities and advanced his arguments is well calculated to elicit admiration from all lovers of learning. The paniphlet is a feat which would have done honour to a Ph. D. of any University of the world. Yet there is nothing dull or stodgy about it. It holds the reader spell-bound from start to finish and leaves hin thoroughly convinced at the end. But great as is the author's learning, greater still is his quality of heart. He feels for the untouchables passionately and conclude with an २ appeal that thrills our souls. The author is a young man, a Graduate of our University, who has renounced the world at the call of his country. I wish him every success and recommend his treatise to the leading public with all the earnestness I can command. KAMAKHYA NATH MITRA, M. A., B, L. PRINCIPAL. Rajendra College, Faridpur. 5. 2. 33. (২) শ্ৰীমৎ স্বামী সমাধি প্রকাশ আরণ্য মহাশয় অস্পৃশ্যতা দূর করার কার্য্যে ব্রতী হইয়াছেন। অস্পৃশ্যতা যে পাপ, উহা যে শাস্ত্র বিরােধী, উহা যে হিন্দুধর্মের মূল তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত সেকথা বুঝাইবার জন্য তিনি জাতি কথা’ নামক পুস্তিকা লিখিয়াছেন। বাংলায় যে সকল ব্রাহ্মণ কায়স্থ আছেন, তাহাদের আদি পুরুষ কাহারা, কি ভাবেই বা বাংলার বিভিন্ন জাতি সৃষ্ট হইয়াছে, ইহা দেখাইয়া তিনি জাতি অভিমান ত্যাগ করার অকাট্য যুক্তি দিয়াছেন। মহাভারত, সংহিতা, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রগ্রন্থ হইতে তিনি এই কথাই প্রমাণ করিয়াছেন যে, ঐ সকল শাস্ত্র অস্পৃশ্যতঃ সমর্থন করে না। তিনি বৌদ্ধ সাহিত্য হইতে তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়া দেখাইয়াছেন যে, অস্পৃশ্যত বৌদ্ধযুগেও সমাজে প্রবেশ করে নাই। পরবর্তী পতনের কালে অস্পৃশ্যতা বর্তমানরূপে হিন্দুধর্মে প্রবেশ করিয়াছে এবং নানা অপ্রামাণ্য গ্রন্থে উহার সমর্থন লাভ করিয়াছে। যে জিনিষটা জাতির পতনের কারণ অথবা পতনের জন্যই দেখা দিয়াছে তাহা ক্লেদজ্ঞান করিয়া পরিত্যাগ করিতে হয়। ক্ষুদ্র পুস্তিকা খানিতে গ্রন্থকারের হিন্দু সাহিত্য ও দর্শনের সহিত পরিচয়ের আভাষ পাওয়া যায়। যে সকল বিদেশী পণ্ডিত হিন্দুশাস্ত্র পড়িয়া উহার সমালােচনা করিয়াছেন, গ্রন্থকার তাহাদের সহিত সুপরিচিত এবং তাহাদের মতগুলি উদ্ধার করিয়া দেখাইয়াছেন যে, অস্পৃশ্যতা বা বর্তমান আকারের জাতিভেদ হিন্দুধর্মের অঙ্গ নহে। বর্ণ-ধৰ্ম্ম কি, তাহার স্বরূপ ও আদর্শ বিষয় আলােচনা জাতিবিচারে আপনা আপনিই আসিয়া পড়ে। ব্রাহ্মণ শূদ্রাদির শব্দের সংজ্ঞা স্বামীজী যে প্রকার দিয়াছেন আমি তাহা হইতে ভিন্ন প্রকার বুঝি। আমার মতে ব্রাহ্মণাদি বর্ণ জন্মগত ও উহা জীবিকার জন্য নির্দিষ্ট কাহার কি বৃত্তি তাহাই সূচনা করিতেছে। শূদ্র অর্থে হন, হেয় বা অজ্ঞান ইহা আমি বুঝি না। শূদ্রের প্রয়ােজন সমাজে আছে। তাহাদের বৃত্তি সবৃত্তি ও ব্রাহ্মণের মতই শূদ্রও মন পাইবার যােগ্য। এই দিক্ দিয়া গ্রন্থকারের কি নত তাহা পরিস্কারভাবে এই পুস্তিকাতে ব্যক্ত না হইলেও, আমার সহিত মতে মিলে দেখিতেছি। কিন্তু তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। অস্পৃশ্যতা যে বর্জনীয় একথা শাস্ত্রদির দ্বারা প্রমাণিত হইলে যাহারা সন্তুষ্ট হইবেন এই ও - পুস্তিকাখানি তাহাদিগকে সন্তোষ দিবে এবং অস্পৃশ্যত নিবারণের সহায়ক হইবে বলিয়া বিশ্বাস করি। [ ‘শূদ্র’ শব্দ সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রে হীন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। এইজন্য আমি উহা তুলিয়া দিতে চাহি শূদ্রকে ব্রাহ্মণত্বে বরণ করিয়া। আমার বর্ণবাদ’ পুস্তকে সতীশবাবুর কথার যুক্তিযুক্ত উত্তর দেওয়া হইয়াছে। ‘বর্ণবাদ’ এখনও প্রকাশিত হয় নাই।—সমাধি ( গ্রন্থকার)।] স্বামীজী আরো অনেক কয়খানি পুস্তক লিখিয়াছেন। ইনি পূৰ্বাশ্রমে অনেকদিন পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের পদে থাকিয়া যশলাভ করিয়াছেন। এক্ষণে সন্ন্যাস জীবন লইয়া লােক শিক্ষার যােগ্যতা আরো বাড়াইয়াছেন এবং সমাজ হিতার্থে কতকগুলি গ্রন্থ লিখিয়া প্রকাশ করিতে যাইতেছেন। পুস্তক বিক্রয় লব্ধ আয় হইতে তিনি যে সকল সেবার কাজ লইয়াছেন তাহার সাহায্য হইবে। তাহার পুস্তকগুলি জনসেবায় লাগিলে—অসত্য ও হিংসার পথ হইতে লােকের মন ফিরাইয়া আনিতে সাহায্য করিতেছে দেখিলে, সুখী হইব। ৫ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৩ সতীশচন্দ্র দাসগুপ্ত (৩) শ্রীহরিশরণং পরম পূজনীয় শ্ৰীযুক্ত সমাধি প্রকাশ আরণ্য মহােদয় কর্তৃক লিখিত জাতি কথা নামক গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাঠ করিয়া আজ অভূতপূর্ব আনন্দ লাভ করিলাম। যদিও আমরা চিরদিনই উদার মত পােষণ করিয়া থাকি, তথাপি শাম্রালােচনার অভাবে জানিতাম না প্রাচীন আর্যঋষিযুগের হিন্দুশাস্ত্রে এমন সাম্প্রদায়িক গােড়ামী বজ্জিত গুণগ্রাহিতা জাতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্রম্বরূপ বর্তমান ছিল। আজ জাতির বহু প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্র হইতে উদ্ধৃত বহু শাস্ত্রবাক্য পাঠ করিবার সৌভাগ্য ও সুযােগ লাভ করিয়া প্রাণে যে শান্তি ও প্রেরণা লাভ করিয়াছি তাহা বর্ণনাতীত। আশাকরি, প্রত্যেকে এই অমূল্য গ্রন্থ পাঠ করতঃ জাতীয়ভাবে প্রভাবিত হইয়া ঋষিযুগের উদারভাবে জাতীয় জীবন গঠনের দৃঢ়সঙ্কল্প গ্রহণ করিবেন। এই জাতি কথা যে প্রত্যেকের কুসংস্কার বিদূরিত করিয়া সাম্যমন্ত্রের দীক্ষায় উদার প্রাণ প্রতিষ্ঠার সাহায্য করিবে, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। ইতি ২৫শে পৌষ, ১৩৩৯ সন। শ্ৰীযােগেন্দ্রকুমার সরকার কবিরাজ রাজবাড়ী (ফরিদপুর) (৪) জয় জগদ্বন্ধু হরি শ্রীশ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন বান্ধব বরেণ্য, ফরিদপুর প্রাণধন দাদু! ১৯শে মাঘ, ১৩৩৯ তােমার পূত লেখনী প্রসূত ‘জাতি কথা পড়িয়া মনে হল-এত শুধু জাতি কথা নয় এ যে মধুর প্ৰেমমৈত্রীগাথা! মরি! নরি !! এমন নন্দন পারিজাত মাল বসুর গলে দোবার যোগ্যই বটে! আশাকরি এর মাধুবী গন্ধে অস্পৃশ্যতারূপ দুর্গন্ধ বিষ্ঠা দূর হয়ে তাপিত জগত শীতল করবে।
৬
শ্রীশ্রীবন্ধুহরির কৃপায় ধ্যান মগ্ন গৌতমের বােধিসত্ত্ব ভাব সিদ্ধির ন্যায়
তােমার সমাধিপ্রকাশ নাম আজ সার্থক। ভক্তি শাস্ত্রে পড়েছি
মহ ভগবতগণ
স্থাবর জঙ্গম দেখে না দেখে তার মুক্তি।
যাহা যাহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণ স্ফুর্তি ।
এই পরম প্রেমের দিব্য নেত্ৰ দিয়া যখন আপামর সকলকে বুকে করে
ভালােবাসতে শিখেছ ও নিতাই-ননন নীতি অবলম্বন করতঃ অবিচারে
আচণ্ডালের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়াইতেছ তখন তােমার ন্যায় পরম বন্ধুর
জীবহিতাকাঙ্ক্ষী আর ক’জন মেলে? হে মহামিলন মন্দিরের মহাপূজারী!
প্রভু বন্ধুসুন্দর তােমায় জয়যুক্ত করুন। ঐ যে-
উপধৰ্ম আসি যুগ ধৰ্ম্ম নাশি আঁধারে ডুবাল দেশ।
প্রলয়ের ভেরী বাজিয়া উঠিল সৃষ্টি বুঝি হয় শেষ।
ভক্তি গন্ধহীন হেরিয়া সংসার আবার ভাবিলা হরি।
শপথ রয়েছে গৌরাঙ্গ লীলায় পুনরায় অবতরি।
ব্রহ্মাণ্ড ভরিয়া কৃষ্ণকীর্তন করিব এবার যেয়ে।
অনুপরমাণু স্বরূপান্থাদিবে মহা উদ্ধারণ পেয়ে।
গৌরাঙ্গ বাঞ্ছা করিব পূরণ মহা সম্মিলনে মিলি।
মহা নাম রত্ন জগতে বিলাব ভাবের ভাণ্ডার খুলি।
প্রলয় হইতে রক্ষিব সৃষ্টি গুরু তত্ত্ব প্রকাশিব।
এক বিশ্ব ধৰ্ম্মে নিখিল মানবে প্রেমে সবে মিলাইব।
প্রকট করিব লীলার রহস্য ত্রিলােকী জানে না যাহা।
গৌরাঙ্গ রূপেতে যাহা প্রবর্তি পূরণ করিব তাহা ।
৭
হেন বাঞ্ছা লয়ে চন্দ্র পুত্র হয়ে পুষ্পবন্ত যােগে প্রভু।
মহা উদ্ধারণে আইলা গাে হেন জগতে হয়নি কভু ।
চারি হস্ত দেহ হিমগিরি প্রায় জানু স্পর্শি ভুজ দেখি।
তিল ফুল নাশা শশধর ভাল আকৰ্ণ বিশ্রান্ত আঁখি।
গৃধিনী গঞ্জিত কর্ণ সুললিত বঁধুলী বাঞ্ছিত ওষ্ঠ
পদতলে ধ্বজ বজ্রাঙ্কুশ রেখা অঙ্কিত রয়েছে স্পষ্ট।
পাণি পদতল কমল কোমল কোকনদ আভা নিলে।
কুলকুসুম দশন সুষমা হেরিয়া বিষাদে কান্দে ।
চম্পক কলি চারু অঙ্গুলি ভুরু কাম গুণ ভঙ্গ।
ঠাম সুবলিত গতি সুললিত নবনী কোমল অঙ্গ।
অমিয় মধুর বচন বঁধুর বিভু আভা জিনি হাস ।
পতিত পামর পাষণ্ডরে কত ডাকিয়া করিল দাস।
হরিপুরুষ জগদ্বন্ধু নাম লয়ে জগদুগ্ধারণ লাগি।
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বন্ধু করে উদ্ধারণ ভাগী ।
পতিত বলিয়া বঞ্চিত হইয়া সমাজে ছিল গো বারা।
বন্ধু কৃপাগুণে মহাউদ্ধারণে মোহান্ত হইল তার।
যবন খৃষ্টান সবে পেলে স্থান বন্ধুর চরণ তলে।
মহা অবতারী জগতের হরি অবতীর্ণ ভূমণ্ডলে ।
(চক্ষুদান)
তােমার চির স্নেহের
মতিচ্ছন্ন মহেন্দ্র
সদ্গ্রন্থ প্রচারে সহায়তা করিয়া লােক-কল্যাণ সাধন করুন সুপ্রসিদ্ধ ধৰ্ম্মপ্রচারক এবং সমাজ সংস্কারক আচাৰ্য শ্রীমৎ স্বামী সমাধিপ্রকাশ আরণ্য “জাতিকথা” নামে একখানি বহুতথ্য সমন্বিত মূল্যবান্ পুস্তক লিখিয়াছেন। পুস্তকখানি বর্তমান অস্পৃশ্যতাবর্জন আন্দোলনের দিনে সকল শ্রেণীর হিন্দুকে স্ব স্ব কর্তব্য নির্ধারণে প্রভূত সাহায্য করিবে। বাংলায় বহু মনীষী ব্যক্তি পুস্তকখানির ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠভক্ত বঙ্গ গৌরব শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র দাস- গুপ্ত মহােদয় ঐ পুস্তিকা সম্বন্ধে লিখিয়াছেন—“বাংলায় যে সকল ব্রাহ্মণ কায়স্থ আছেন তাঁহাদের আদি পুরুষ কাহারা, কি ভাবেই বা বাংলার বিভিন্ন জাতি সৃষ্টি হইয়াছে ইহা দেখাইয়া তিনি জাতি অভিমান ত্যাগ করার অকাট্য যুক্তি দিয়াছেন। মহাভারত, সংহিতা, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রগ্রন্থ হইতে তিনি এই কথাই প্রমাণ করিয়াছেন যে, ঐ সকল শাস্ত্র অস্পৃশ্যতা সমর্থন করে না” ইত্যাদি। স্বামীজীর পূর্বাশ্রমের নাম শ্রীনরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রাচ্য, পাশ্চাত্য উভয় শাস্ত্রে সুপণ্ডিত। বহুদিন তিনি বালিয়াকান্দি উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে সম্মানের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কাৰ্য করেন। পরে সন্ন্যাস অবলম্বন পূর্বক বহুবৎসর নির্জনে সাধন ভজন করেন। এক্ষণে বহু সজ্জনের ঐকান্তিক আগ্রহে লােক কল্যাণব্রতে আপনাকে নিয়ােজিত করিয়াছেন। “জাতিকথা” ব্যতীত, ১ “পল্লীবােধন” বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্মশিক্ষা” “বুদ্ধচরিতের আভাষ” “বিদ্যাশিক্ষা ও সাধনা” প্রভৃতি আরও কয়েকখানি পুস্তক লিখিয়াছেন। ঐগুলিতে তিনি বর্তমানের অনেক সমস্যার আলােচনা এবং তাহার সমাধান করিয়াছেন। পুস্তকগুলি মুদ্রিত করিয়া প্রকাশ করিতে পারিলে সমাজের অশেষ কল্যাণ সাধিত হইবে, ইহা বহু মনীষী ব্যক্তির অভিমত। আমাদেরও ঐরূপ বিশ্বাস। পুস্তকবিক্রয়লব্ধ আয় স্বামীজী যে সমস্ত লােক কল্যাণ ব্রতে আত্মনিয়ােগ করিয়াছেন তাহার সাহায্য কল্পেই ব্যয়িত হইবে। আমরা সহৃদয় ভাই ভগিনীগণকে স্বামীজীর আর এই কাৰ্য্যে মুক্ত হস্তে অর্থ সাহায্য প্রদান করিয়া তাহার ব্রতকে সাফল্যমণ্ডিত করিতে অনুরোধ জানাইতেছি। যিনি যাহা দিতে পারেন নিম্ন ঠিকানায় পাঠাইয়া বাধিত করিবেন। ইতি-৬৩৩৩ বিনীত নিবেদক ১। শ্রীকামাখ্যানাথ মিত্র, এম,এ, বি,এল, প্রিন্সিপ্যাল রাজেন্দ্র কলেজ (ফরিদপুর)। ২। সতীশচন্দ্র মজুমদার, বি,এল, (ফরিদপুর)। ৩। সুবােধচন্দ্র সরকার, এম,বি, (ফরিদপুর)। ৪। শ্ৰীঅবনীমােহন চক্রবর্তী, এম,এ, ভাই প্রিন্সিপ্যাল রাজেন্দ্র কলেজ (ফরিদপুর)। ৫। শ্ৰীঅভয়কুমার সরকার, এবি, ডি, পি, এইচ, ডিষ্ট্রিক হেলথ অফিসার (ফরিদপুর)। ৬। শ্রীইন্দুভূষণ সরকার, বি,এ, (ফরিদপুর)। ৭। শ্রী প্রমােদলাল চৌধুরী, এল, এম, এ, (ফরিদপুর)।
৮। ডাঃ শ্ৰীরিণীচরণ রায়, (আরকান্দি)।
৯। শ্রীসুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, বি,এল, প্রেসিডেন্ট, বার এসােসিয়েসন,
(রাজবাড়ী)
১০। কবিরাজ যােগেন্দ্রকুমার সরকার করিব, (রাজবাড়ী)।
১১। ডাঃ কেদারনাথ ভট্টাচাৰ্য, (রাজবাড়ী)।
১২। শ্ৰীঅতুলচন্দ্র রায় চৌধুরী, (ডিষ্ট্রিক বাের্ড, ফরিদপুর)।
১৩। করিবাজ শ্রীনিবারণচন্দ্র দে, ভিষগত্ন, অয়ুৰ্বেদশাস্ত্রী (বহরপুর)
১৪। শ্ৰীআদ্যনাথ সরকার, (শালবরাট)।
১৫। শ্ৰমণীন্দ্র ব্রহ্মচারী, সম্পাদক সদ্গ্রন্থ প্রচার সমিতি।
১৬। শ্ৰী আশুতােষ চক্রবর্তী, সেরেস্তাদার (বালিয়াকান্দি কাছারী)।
অর্থসাহায্য পাঠাইবার ঠিকানা
শ্ৰীমণীন্দ্র ব্রহ্মচারী, সদগ্রন্থ প্রচার সমিতি সম্পাদক।
পােঃ ও গ্রাঃ বহরপুর,
জিলা ফরিদপুর।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.