Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Haji Mahammad Mahasin

Bhattacharyya, Debendranath · 2010/02/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

,,,,,
হাজি
,,
*** ৯৮ - ৯৯
মহম্মদ মহসীন
* - * - ক্ষণ
- শা, সে
•৫৯১০-২০%A... :
**
X
ভট্টগ্য এণ্ড ১
An:

No text on this page.

তিন আনা সংস্করণ “কল্পতরু এৰিলী নং ১২
হাজি মহম্মদ মহসীন
বিদ্যাসাগর, মাইকেলমধুসূদন, সম্রাট পঞ্চম জর্জ প্রভৃতি প্রণেতা
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য প্রণীত
ভাৰ্য্য এণ্ড সম্
কলিকাতা ও ময়মনসিংহ
মূল্য তিন আনা

কলিকাতা
১০৭ নং মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, স্বর্ণপ্রেসে
দ্বিজেন্দ্রনাথ দে কর্তৃক মুদ্রিত
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন্এর পুস্তকালয় হইতে
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত।

No text on this page.

No text on this page.

হাজি মহম্মদ মহীন প্রথম পরিচ্ছেদ দেশের কোটী কোটী মানুষের ভিতরে কোন্‌খান দিয়া কাহার মনুষ্যত্ব ফুটিয়া উঠিয়া যে একদিন তাহাকে সকল মানুষের উপরে তুলিয়া দেবতার আসনে বসাইয়া দেয়, তাহা কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারে না। ভগবানের এই বিশাল বিশ্ব-রাজ্যে প্রাণী-জগতের মধ্যে মানব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলিয়া পরিচিত। যে সকল সৎ ও মহৎ গুণের জন্য দেবতারা “দেবতা” নাম পাইয়া সকলের ভক্তি শ্রদ্ধা ও পূজা পাইয়া থাকেন মানুষের ভিতরেও ভগবান কম বা বেশী পরিমাণে সেই সকল গুণ দিয়া সংসারে পাঠাইয়াছেন। অন্য কোন প্রাণীর ভিতরে তাহা দেন নাই। এই কারণেই ভগবানের বিশ্ব-সাম্রাজ্যে মানব সৰ্বশ্রেষ্ঠ। ভগবানের সর্বপ্রধান সৃষ্টি এই মানবের মধ্যে আবার যাহারা সেই সকল গুণরাশি নিজের জীবনে অন্যের অপেক্ষা বেশী রকম ফুটাইয়া তুলিয়া মানব-সমাজের কোন না কোন প্রকার মঙ্গল সাধন করিয়া যাইতে পারেন, তাহারাই-মানুষ হইয়াও—এ সংসারে দেবতার মত ‘মহাপুরুষ নাম পাইয়া চিরকাল জগৎ-সংসারে সকলের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও পূজা লাভ করিয়া থাকেন। এ সংসারে মানুষের কাৰ্য্য অনেক, এ সংসার মানবের কর্মক্ষেত্র। এ সংসারে আসিয়া মানবকে অনেক কাৰ্য্য করিতে হয়, পদে পদে নানা কর্তব্য সম্পাদন করিতে হয়—তাই ভগবান তাহাদিগকে সেই হাজি মহম্মদ মহসীন সৰু কাৰ্যসম্পন্ন করিবার জন্য, নানাপ্রকার গুণরাশিতে মণ্ডিত করিয়া পাঠাইয়া দেন। এই সব গুণরাশির বিকাশকেই মনুষ্যত্ব বলে, এবং এই মনুষ্যত্ব যাঁহার ভিতরে যত অধিক পরিমাণে ফুটিয়া উঠে, তিনিও সেই পরিমাণে জগতে অমর নাম এবং অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া লােক- সমাজে চিরকাল দেবতার মত পূজা পাইয়া থাকেন। ইহাতে জাতি বিচার নাই, ইতর ভদ্র নাই, ধনী দরিদ্র নাই, ছােট বড় নাই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানব-মাত্রেরই ভিতরে কিছু না কিছু মনুষ্যত্বের উপযােগী সদগুণ বিরাজিত আছে এবং সেই জন্যই মানুষ’ নাম। কিন্তু যিনি হেলায় তাহা অগ্রাহ্য করিয়া নষ্ট করিয়া ফেলেন তাহাকে এ সংসারে সকলের নীচে নামিয়া গিয়, সকলের ঘৃণা ও বিরাগভাজন হইয়া যেমন মনােকষ্টে কাল কাটাইতে হয়, পরলােকেও তেমনি শান্তিও বড় কম ভােগ করিতে হয় না। এই কর্তব্যে অবহেলার নামই—পাপ, সুতরাং পাপের যে সাজা তাহা ইহকাল এবং পরকাল, উভয়কালেই সমানভাবে ভােগ করিতে হয়। আর এই কর্তব্যপালনের নামই-পুণ্য। সুতরাং যিনি মানুষ হইয়া, যেমন ভাবে, যতটুকু তাহার কর্তব্যপালন করিয়া যাইতে পারেন, তিনি সেই রকমই পুণ্যের অধিকারী হইয়া উভয়কালেই সেইরূপ পুরস্কার পাইয়া থাকেন। এই জন্যই সকল দেশে সর্বকালেই যাহারা সংসারে অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া, আপন নাম চিরস্মরণীয় করিয়া গিয়াছেন, এবং কি দেশে কি বিদেশে সমগ্র মানবজাতির শ্রদ্ধা-ভক্তির পূজা লাভ করিতেছেন, তাহারা সকলেই যে একসময়ে সাধারণ মনুষ্যরূপে জন্মিয়া শেষে মানুষের সকল প্রকার কর্তব্য সম্পাদন পূর্বক যথার্থ মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়া-সেরূপ দেবতার সমান হইয়া গিয়াছেন, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

প্রথম পরিচ্ছেদ তাই “হাজি মহম্মদ মহসীন”ও সামান্য মানবরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া আজ “মহাপুরুষ” নামে সমগ্র মানব-সমাজে দেবতার মত উচ্চ আসন লাভ করিয়া সকলের ঐকান্তিক শ্রদ্ধা-ভক্তির পূজা লাভ করি- তেছেন, এবং যতদিন দেশে মানুষ থাকিবে, মানুষের ইতিহাস থাকিবে ততদিন যে তাহার নামও চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে, একথা পয়সা থাকিলেই যে লােকে যথার্থ বড়লােক হয় তাহা নহে। ধনকুবের তাে এ সংসারে অনেকেই হইয়া থাকেন, কিন্তু তাহাদের মধ্যে কয়জন লােক এসংসারে প্রকৃতপক্ষে “বড় লােক” হইয়া দেশে অক্ষয়- কীর্তি এবং ইতিহাসে চিরস্মরণীয় নাম রাখিয়া যাইতে পারেন? মানুষ যথার্থ বড় লােক হইতে পারে কেবল প্রবৃত্তির গুণে। যাঁহার প্রবৃত্তি উচ্চ তিনিই বড় মানুষ। নতুবা হীন-প্রবৃত্তি লইয়া কোটীপতির ঐশ্বৰ্য্য থাকিলেও, তিনি কখনও বড় লােক হইতে পারেন না। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তি উচ্চ থাকিলে তাহার চরিত্র ক্রমে মহৎ এবং উদার হইয়া উঠে এবং চরিত্র উদার, উচ্চ এবং মহৎ হইলে তাহা হইতে যখন আপনা আপনি তাহার মনুষ্যত্ব ফুটিয়া উঠে—তথনই তিনি কেবল “বড় লােক” হইতে পারেন। হাজি মহম্মদ মহসীনও এইরূপ মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া বড় লােক হইয়া গিয়াছেন বলিয়া, আজ তিনি সংসারে আদর্শস্থল হইয়াছেন এবং মানব-সমাজে এইরূপ উচ্চ আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন বলিয়াই চিরকাল সংসারে তিনি যেরূপ অমর হইয়া রহিয়াছেন, সেরূপ অমরত্ব দেবতাদিগের পক্ষেও দুল্লভ। তাই মহম্মদ মহসীনের পুণ্যময় জীবন-চরিত আলােচনা করিলে, ধৰ্ম পুণ্য, মনুষ্যত্ব —সমস্তই লাভ হয়। সকল জাতির সকল শান্ত্রেই সকল প্রকার ' ধর্মপুস্তকেই “দানকে শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম বলা হইয়া থাকে। সুতরাং মনুষ্যের হৃদয়ে যে হাজি মহম্মদ মহসীন প্রবৃত্তি বলবান হইয়া জাগিয়া উঠিলে এই দান-ধর্মের প্রতি অনুরাগ জন্মে সেই প্রবৃত্তিই মানবের শ্রেষ্ঠ গুণ। এই শ্রেষ্ঠ গুণের নাম ‘দয়া”। কারণ এই ‘দয়া-প্রবৃত্তি হইতেই মানুষের মনে সর্বপ্রকার দানের ইচ্ছা জাগিয়া উঠে, এবং একমাত্র দানের দ্বারা যেরূপ দেশের, সমাজের, সংসারের এবং মানবের উপকার সাধিত হইয়া থাকে, এমন আর কিছুতেই হয় না। আর এই পরােপকার হইতেই সর্বকালে, সৰ্ব্বদেশে সমগ্র মানবসমাজের যথার্থ উন্নতি সাধিত হয়। যিনি এইরূপে দেশের, সমাজের ও মানবজাতির অশেষ কল্যাণ ও উন্নতি বিধান করিয়া যাইতে পারেন, তিনি মানুষ হইলেও যে যথার্থই দেবতার মত কাৰ্য্য করিয়া “নরদেবতা” রূপে পূজিত হইবেন—তাহার আর আশ্চর্য কি ? সুতরাং দয়া-গুণই মানবের সৰ্বশ্রেষ্ঠ গুণ এবং দান-ধৰ্ম্মই সর্বশ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম। এই দয়া যাহার হৃদয়ে যে পরিমাণে জাগিয়া উঠে তিনিও মনুষ্যসমাজে সেই পরিমাণে মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া অবশেষে দেবত্ব প্রাপ্ত হন। তখন সমগ্র মানবজ্ঞাতি ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ে সেই নর-দেবতার পূজা করিয়া থাকেন। হাজি-মহম্মদ মহসীন ও আমাদের ভারতবর্ষে সেইরূপ নরদেবতা বলিয়া পূজিত হইয়া আসিতেছেন। কারণ লােকসমাজের উপকারের জন্য দয়ায় বিগলিত হইয়া মহাপুরুষ মহসীন যেরূপ নিঃস্বার্থ- ভাবে অকাতরে দান করিয়া গিয়াছেন, সেরূপ দৃষ্টান্ত সংসারে বিরল। তাই হাজি মহম্মদ মহসীন—দানবীর, তাই তিনি এ সংসারে যথার্থই সরদেবতা।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ এ শুধু এই এদেশ এখন যেমন-পূৰ্ব্বকালে তেমন ছিল না। বিশেষতঃ দুইশত কি একশত বৎসর পূর্বে এই ভারতবর্ষ সৰ্ব্বপ্রকারে, সর্ববিষয়েই সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের ছিল। তখনকার কালের এদেশ সম্বন্ধে সমস্ত বিবরণ শুনিলে এখন তাহা গল্পের মত বােধ হয় । সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, মানুষেরও যেমন আচার- ব্যবহার, রীতি-নীতি, স্বভাব-চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে—দেশেরও তেমনি সকল বিষয়ে সকল রকমের পরিবর্তন ঘটিয়া থাকে। ভারতবর্ষ বলিয়াই নয়, সকল দেশেই সমান। বর্তমানকালে “হুগলীর নাম সকলেই শুনিয়াছেন। এই “হুগলী” একটি বড় জেলা। কিন্তু এই জেলার এই “হুগলী নগর এখনকার কালে যেরূপ শ্রীহীন হইয়া পড়িয়াছে-পূৰ্বকালে তেমন ছিল । বর্তমান সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে “কলিকাতা” একটি শ্রেষ্ঠ ও সমৃদ্ধিশালী মহানগর বলিয়া বিখ্যাত। কিন্তু আমরা যখনকার কথা বলিতেছি, সে কালে এই “কলিকাতার নাম বড় কেহ জানিতও না। এমন কি কলিকাতা তখন বন জঙ্গল জলাভূমিতে পূর্ণ একটি সামান্য নগণ্য স্থান ভিন্ন অন্য কিছুই ছিল না। তখন, এই “হুগলী” নগর অতি প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধিশালী স্থান ছিল ।) এই নগর গঙ্গার তীরে অবস্থিত থাকায়, তখন ইহা বাণিজ্যের একটি প্রধান স্থল এবং শ্রেষ্ঠ বন্দর ছিল। এই হুগলীর গঙ্গা তখন সর্বদাই নানা দেশের নানা প্রকার বাণিজ্য পােত সকলে পূর্ণ থাকিত এবং সহরও সৰ্ব্বদাই নানা প্রকার লােকের লীলাভূমি ছিল। ব্যবসায়-বাণিজ্যে মানুষের যেরূপ উন্নতি হইয়া থাকে, এমন আর অন্য কিছুতে হয় না, আর মানবসমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হাজি মহম্মদ মহসীন দেশেরও শ্রীবৃদ্ধি হইয়া থাকে। সুতরাং “হুগলী” নগর সে সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যের একটি শ্রেষ্ঠ স্থান এবং উৎকৃষ্ট বন্দর ছিল বলিয়া সর্বপ্রকারেই উন্নত এবং শ্ৰীসম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছিল, এবং এই “হুগলী” বন্দরের নাম, একটি প্রসিদ্ধ স্থান বলিয়া, দেশদেশান্তরে ঘোষিত হইত। যে জায়গায় ব্যবসায়-বাণিজ্য চালাইবার সুবিধা হয়, যে জায়গায় সর্বপ্রকার কারবার ভাল রকম চলিতে পারে, সেই জায়গাতেই নানা দেশ-দেশান্তর হইতে সর্বপ্রকারের বণিক জাতি আসিয়া আপনাদের কাৰ্য্যক্ষেত্ৰ খুলিয়া বসেন। সুতরাং সেকালে ইংরাজ, ফরাসী, ওলন্দাজ, পর্ট গীজ, সিনেমার প্রভৃতি বিদেশী বণিকগণ দলে দলে আসিয়া হুগলী নগরে আপন আপন কারবার চালাইবার জন্য দোকান খুলিয়া বসিলেন, এবং অনেকে সুবিধা বুঝিয়া সেখানে জাগয়া জমী কিনিয়া, ঘরবাড়ী করিয়া স্থায়িরূপে বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। সুতরাং দেখিতে দেখিতে হুগলীনগর নানাদেশীয় লােকে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল, সৰ্ব্বদাই জনকোলাহলে মুখরিত এবং অর্থে ও সম্পদে সর্বপ্রকারেই অশেষ শ্ৰীসম্পন্ন হইয়া উঠিল। দিন দিন হুগলীর সমৃদ্ধির পরিচয় দেশ-বিদেশে যতই ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল, ততই নানা দেশের নানা প্রকার লােক, নানা শ্রেণীর বণিকদল, আসিয়া হুগলী পরিপূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। তখন হইতেই দেশ-বিদেশের ইতিহাসে হুগলী একটি সৰ্বশ্রেষ্ঠ বন্দর ও সুন্দর সমৃদ্ধিশালী নগর বলিয়া পরিচিত হইতে লাগিল। হুগলীনগর তখন যেরূপ ব্যবসাবাণিজ্যের শ্রেষ্ঠস্থান হইয়া উঠিয়াছিল—গঙ্গাতীরবর্তী মুর্শিদাবাদ ও তেমনি হুগলীর অপেক্ষা কোন অংশে হীন ছিল না। সে স্থানও হুগলীর মতই একটি শ্রেষ্ঠ ও সমৃদ্ধিশালী সুন্দর নগর ছিল। সুতরাং সেস্থানও সর্বপ্রকার সর্বশ্রেণীর বণিকজাতি ও অন্য নানা প্রকারর ললাকে ভরিয়া গিয়াছিল। এইরূপে বঙ্গদেশের মধ্যে হুগলী ও মুর্শিদাবাদ সেকালে দুই শ্রেষ্ঠ নগর হইয়া উঠিয়াছিল ।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সেই সময়ে ইউরােপীয় বণিকগণ বাণিজ্য-ব্যবসায়ের জন্য যেরূপ হুগলী ও মুর্শিদাবাদে আসিয়া বসতি করিতেন, সেইরূপ আরব এবং পারস্য প্রভৃতি দেশ হইতেও নানা শ্রেণীর বণিক-জাতি আসিয়া হুগলী ও মুর্শিদাবাদে বসতি করিতে আরম্ভ করেন। এইরূপে প্রায় দুইশত বৎসর পূৰ্ব্বে, সেইকালে “আগাফজলুল্লা” নামে পারস্যদেশীয় একজন সম্রান্ত বণিক এদেশে আগমন করিয়া ব্যবসায়- বাণিজ্য করিতে আরম্ভ করিলেন। ক্রমে তাহার উপযুক্ত পুত্র “হাজি ফয়জুল্লা”ও কারবার করিবার অভিপ্রায়ে এদেশে আসিয়া “হুগলীতে” বাস করিলেন এবং হুগলী ও মুর্শিদাবাদ এই উভয় স্থানেই দোকান খুলিয়া কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় অধ্যাবসায়ের সহিত কারবার করিতে আরম্ভ করিলেন। যেখানে সততা, যেখানে ন্যায়পারতা, যেখানে কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়, সেইখানেই লক্ষ্মীদেবী সদয় হইয়া থাকেন। হাজি ফয়জুল্লার সাধনা ও বিফল হইল না। তিনি যেরূপ সততা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও পরিশ্রমের সহিত হুগলী ও মুর্শিদাবাদে দুই জায়গাতেই সমান ভাবে ব্যবসা চালাইতে লাগিলেন, সেরূপ অনেকে পারেন না, সুতরাং ভাগ্য- লক্ষ্মীই বা সদয় না হইবেন কেন ? দেখিতে দেখিতে হাজি ফয়জুল্লার দুই স্থানের কারবারেই খুব উন্নতি হইতে লাগিল এবং তাহার যথেষ্ট অর্থাগম আরম্ভ হইল। অল্প কালের মধ্যেই তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়া একজন প্রধান ধনী বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিলেন। কিন্তু লক্ষ্মীদেবী সর্বদাই চঞ্চলা-বেশীদিন একস্থানে স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে পারেন না। আজ যিনি ধনকুবের হইয়া হাজার হাজার লােকের উপরে কর্তৃত্ব করিয়া গাড়ী-ঘােড় চড়িয়া বেড়াইতেছেন কাল হয়ত তাহাকে একমুষ্টি অন্নের সংস্থান করিবার জন্য মাথার ঘাম পায়ে হাজি মহম্মদ মহসীন ফেলিয়া, পথে পথে ঘূরিয়া বেড়াইতে হয়। আবার আজ যিনি নিতান্ত দরিদ্র, নগণ্য ক্ষুদ্র ব্যক্তি-সংসারে কেহ একবার ডাকিয়াও জিজ্ঞাসা করে , ভাগ্যলক্ষ্মীর কৃপায় দুইদিন পরেই তঁাহাকে ধনকুবের হইয়া সমাজের হর্তাকর্তা ভাগ্যবিধাতা হইতে দেখা যায়। হাজি ফয়জুল্লার ভাগ্যেও কিছুদিন পরে সেইরূপ এক ঘােতর পরিবর্তন ঘটিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা কেহই জোরের সহিত নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারেন না। আজ বাজারে যে জিনিষের যে দর; কাল হয়ত তাহা দশ গুণ বাড়িয়া দোকানদারগণকে বড়মানুষ করিয়া দিয়া গেল। আশায় আশায় ব্যবসাদারগণ আরও দর বাড়িবার প্রলােভনে সেই দ্রব্য বহুল পরিমাণে কিনিয়া সঞ্চয় করিয়া রাখিলেন, কিন্তু পরে সহসা একদিন হয়ত সেই দ্রব্যের বাজারদর আবার এমন কমিয়া গেল—এবং আর মােটেই বাড়িবার সম্ভাবনা রহিল না-যে সেই সব ব্যবসাদারগণই আবার লােকসান দিতে দিতে একেবারে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। সুতরাং বাণিজ্য-ব্যবসায় অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। ইহাতে বড়মানুষ হইতে যতক্ষণ, আবার ফকির হইয়া পড়িতেও তার চেয়ে বেশী সময় লাগে না। হাজি ফয়জুল্লাও সেইরূপে, যে দুই স্থানের কারবারে অত্যন্ত ধনী হইয়া উঠিয়াছিলেন, আবার সেই কারবারেই, সেই সমস্ত ধন-সম্পত্তি হারাইয়া দরিদ্র হইয়া পড়িলেন। সে অবস্থায় আর তাহার স্বদেশে ফিরিয়া গিয়া আত্মীয় বন্ধুগণের সমাজে হীন হইয়া বাস করিবার প্রবৃত্তি হইল না। মানুষ যে মাটীতে পড়িয়া যায়, আবার সেই মাটীতে ভর করিয়াই উঠিয়া দাড়ায়- ইহা ভাবিয়া তিনি—ভবিষ্যতের আশায়--অতি সামান্য ভাবে কারবার চালাইতে লাগিলেন। কিন্তু পূর্বের মত আর হুগলী এবং মুর্শিদাবাদ দুই জায়গাতেই কারবার রাখিতে পারিলেন না। তিনি এখন মুর্শিদা- দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১ বাদের কারবার তুলিয়া দিয়া, হুগলীতেই সামান্য রকম দোকান খুলিয়া বসিলেন এবং সেইখানেই স্থায়ীভাবে বাস করিতে লাগিলেন। সেই সময়ে ভারতবর্ষের সম্রাট ছিলেন-বাদশাহ ঔরঙ্গজেব। “আগা মতাহর” নামে পারস্য দেশের অন্য একজন সন্ত্রান্ত বণিক বাদশাহের সরকারে কৰ্ম্ম করিয়া তখন সম্রাটের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিয়াছিলেন। সেকালে যাহারা আপন কর্মদক্ষতা কিম্বা স্বভাবের গুণে কোন রকমে একবার বাদশাহদের সুনজরে পড়িতে পারিতেন, তাহাদের আর কোন বিষয়ে কোন প্রকার অভাব থাকিত না। অর্থ, সম্পদ, জায়গীর, জমীদারী, সম্মান, সন্ত্রম, খেতাব প্রভৃতি সকল বস্তুই বর্ষার বারিধারার মত তাহাদের উপরে বর্ষিত হইত এবং অতি শীঘ্রই তাঁহারা দেশের মধ্যে ক্ষমতাবান্ বড় লােক হইয়া লােকসমাজে মান্য গণ্য এবং সম্রান্ত ওমরাহ হইয়া উঠিতেন এরূপস্থলে, সম্রাটের প্রিয়পাত্র যিনি তিনি যে অসামান্য বড় লােক হইবেন তাহার আর আশ্চৰ্য্য কি ? এই পারস্যদেশবাসী বণিক “আগা মতাহর” সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিয়াছিলেন, সুতরাং সংসারে বড় হইতে তাহারও আর বিলম্ব ঘটিল না। “আগা মতাহর” আপন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবলে সম্রাটকে পরম সন্তুষ্ট করিয়া তাহার নিকট হইতে যশােহর প্রভৃতি বঙ্গদেশের কয়েকটি ভাল ভাল স্থান জায়গীর প্রাপ্ত হইয়া শীঘ্রই এ দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য সম্রান্ত বড় লােক হইয়া উঠিলেন। যিনি, যেখানেই বাস করুন না কেন, তাহার পূর্ব অবস্থা ঘুচিয়া গিয়া বড়লােক হইলে, তখন তাহার কোনও সমৃদ্ধিশালী নগরের বুকের উপর আসিয়া বাস করিতে ইচ্ছা প্রবল হইয়া উঠে। আগা মতাহর সম্রাটের অনুগ্রহে যখন জায়গীরদার হইয়া উঠিলেন, তখন তাহারও সেইরূপ ইচ্ছা প্রবল হইল।

হাজি মহম্মদ মহসীন হুগলীনগরের তখন খুব নামডাক। যত বড় বড় সম্রান্ত লােকের বাস তখন হুগলীতে। সুতরাং আগা মতাহরেরও হুগলীতে আসিয়া বাস করিতে ইচ্ছা হইল। সেই ইচ্ছার বশবর্তী হইয়া তিনি স্বদেশ ছাড়িয়া, হুগলীতে জায়গাজমী কিনিয়া ঘরবাড়ী করিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে তখন “হাজিফয়জুল্লা” এবং “আগা মতাহর” এই দুই জন সম্ভ্রান্ত পারস্য দেশীয় বণিকের হুগলীনগরে প্রথম বসবাস ঘটিল। দুইজনেই সম্রান্তবংশীয়, দুইজনেই পারস্যদেশবাসী সুতরাং তাহাদের দুই ঘরে আলাপ-পরিচয় এবং বন্ধুত্ব জন্মিতে বিলম্ব হইল না । তৃতীয় পরিচ্ছেদ সংসারে এমন এক একজন লােক দেখিতে পাওয়া যায় যাহাদিগকে সংসারে চারিদিক হইতে শত শত স্নেহের বন্ধন আসিয়া বাঁধিয়া ফেলিবার সুযােগ পায় না। তাহাদের হয়ত এই বিশাল বিশ্বসংসারে একটি কিম্বা দুইটি ভিন্ন আর অন্য মেহের বন্ধন নাই। সুতরাং লােকে তাহাকে হয়ত দুঃখী বলিয়া মনে করিতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে লােক মােটেই দুঃখের ধার ধারেন না। যাঁহাদের সংসার-কাননের চারিদিকে শত শত হাসিভরা মুখগুলি রাশি রাশি ফোটা ফুলের মত নিয়তই বেষ্টন করিয়া হাসিতে থাকে, যাহাদের চারিদিক হইতে শত শত কোমল বাহু স্নেহের শিকলে বাঁধিয়া সংসারের দুঃখ-জ্বালা ভুলাইয়া দেয়, যাহাদের প্রয়ােজনের সময়ে সারি সারি প্রিয় বস্তুগুলি চারিদিকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া কাৰ্য্য সম্পন্ন করিয়া দেয়, তাহারা এই অগাধ গভীর স্নেহের গণ্ডীর ভিতরে দাঁড়াইয়া মনে মনে সুখ ও তৃতীয় পরিচ্ছেদ সৌভাগ্যের কল্পনা করিতে করিতে ভাবেন যে—এ সংসারে যাহাদের স্নেহ-ভালবাসার সামগ্রী বেশী নাই তাহারা কি দুঃখী ? কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তাহা নহে। সংসারে ঘঁহার ভালবাসিবার জিনিষ একটি কি দুইটি ভিন্ন আর নাই, তিনি সেই একটি কি দুইটি মাত্র মেহের বস্তুকেই সমস্ত প্রাণ ঢালিয়া এত বেশী ভালবাসিয়া থাকেন যে, সে ভালবাসার তুলনা হয় না এবং তাহাদের স্নেহে ডুবিয়া এত বেশী সুখী হইয়া থাকেন যে সংসারে তাঁহাদের মত সুখী অতি অল্প লােকই দেখিতে পাওয়া যায়। আগা মতাহরেরও তেমনি এই বিশাল জগৎ-সংসারের মধ্যে কেবল একটি মাত্র স্নেহের বন্ধন ছিল,—সেটি, তাহার একমাত্র কন্যা- সন্তান, নাম-“মনুজান”। এই মন্নুজান ভিন্ন তাহার আর সন্তান সন্ততি ছিল না। ) তা না থাকুক, সেজন্য আগা মতাহরের মনে কখনও একটি দিনের জন্যও কোনপ্রকার ক্ষোভ বা দুঃখের উদয় হয় নাই। লােকের উপযুক্ত সন্তান সন্ততি বেশী থাকিলে তাঁহাদের মনে যেরূপ সুখ ও গর্বের উদয় হইয়া থাকে, কেবলমাত্র এই একটি কন্যারত্ন লাভ করিয়াই তিনি মনে মনে সেইরূপ সুখ ও গর্ব অনুভব করিতেন। বাস্তবিকপক্ষে সে কন্যাও ছিল একটি অমূল্য রত্ন বিশেষ। তেমন কন্যা লাভ করা অল্প পুণ্যের ফলে ঘটে না। মন্নুজান যেমন রূপবতী, তেমনি গুণবতী, আবার তেমনি পিতৃবৎসলা। যে পিতার পুণের ফলে তেমন কন্যা লাভ হয়, তিনি দরিদ্র হইলেও রাজ-রাজেশ্বর, অভাগা হইলেও পরমসৌভাগ্যবান্ বলিতে হইবে। মজান “বাপ” বলিতে অজ্ঞান হইতেন, ছায়ার মত সৰ্ব্বদাই বাপের সঙ্গে সঙ্গে থাকিতেন। কিসে তাহার পিতা সুখী হইবেন, কিসে তিনি সর্বদা আনন্দিত থাকিবেন—বাল্যকাল হইতেই এই চেষ্ট ১২ হাজি মহম্মদ মহসীন ছিল তাঁহার প্রধান লক্ষ্য ও জীবনের একমাত্র ব্রত। বাপের পায়ে কাটাটি ফুটিলে মেয়ের বুকে যেন শেল বিধিত, নিজে দাঁতে করিয়া সে কাটা তুলিয়া দিতেন। বাপের মুখ একটুখানি মলিন দেখিলে মেয়ের বুক ফাটিয়া যাইত—দশদিক অন্ধকার দেখিতেন। বাপই ছিল এসংসারে মেয়ের ধ্যান, জ্ঞান, প্রার্থনা, কামনা-বাপই ছিল এ সংসারে মেয়ের একমাত্র জগৎপতি জগদীশ্বর। সুতরাং এমন মেয়ে লাভ করিয়া বাপই বা আপনাকে মহা সুখী ও নিতান্ত সৌভাগ্যবান মনে না করিবেন কেন ? একদিকে মতাহর যেমন অগাধ ধন-সম্পত্তি এবং মান-সম্ভ্রমের অধীশ্বর, অন্যদিকে আবার তেমনি সেই দুর্লভ কন্যা-রত্ন লাভ করিয়া তিনি অসীম সুখ- সৌভাগ্য উপভােগ করিতেন। মেয়েও যেমন বাপ-অন্ত-প্রাণ, বাপও তেমনি এক দণ্ড মেয়েকে চক্ষের আড় করিয়া থাকিতে পারিতেন না। কিসে মন্নুজান সুখী হইবে, কিসে মনুজান সৰ্ব্বদাই ফোটফুলটির মত প্রফুল্ল হইয়া থাকিবে, কিসে মনু জানের মনে একটি দিনের জন্যও কখন কোন প্রকার অভাবের উদয় হইবে না, অবিরত সেই চেষ্টা করিতেন। মতাহরের অর্থের অভাব ছিল না। সুতরাং অর্থ এবং স্নেহে যতদূর করিতে পারা যায়, তিনি কন্যার জন্য তাহার কিছুই বাকী রাখিতেন না। এমন কি, এই কন্যাটিকে তিনি এমনই ভালবাসিতেন যে তাহার স্নেহে নিমগ্ন হইয়া তিনি সংসারের আর কোনদিকে দৃষ্টিপাত করিবার অবসর পাইতেন না এবং আর কোনদিকে কি অন্য কাহারও প্রতি দৃষ্টি করিবার আবশ্যকও বিবেচনা করিতেন না। গাছ এবং লতা পরস্পর পরস্পরকে আশ্রয় এবং অবলম্বন করিয়া যেমন বাঁচিয়া থাকে, এই পিতা এবং কন্যা তেমনি পরস্পর পরস্পরকে আশ্রয় এবং অবলম্বন করিয়াই এ সংসারে দিন কাটাইতেছিল।

। তৃতীয় পরিচ্ছেদ ইহার ফলে কিন্তু আর একদিকে যে আর এক বিভ্রাট ঘটিবার সূচনা হইতেছিল, তাহা এই স্নেহময় পিতা এবং পিতৃবৎসল কন্যা একদিনের জন্যও ঘুণাক্ষরে বুঝিতে পারেন নাই আগামহর সম্রাটের প্রিয়পাত্র, বিপুল ধন-সম্পদ এবং মান-সম্ভ্রমের অধীশ্বর। সুতরাং সংসারের অনেক লােকই মনে মনে বিস্তর আশা লইয়া তাঁহার মুখের পানে চাহিয়া থাকিত। অনেকেই তাহাকে হস্তগত করিয়া টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি করিয়া লইবে মনে করিয়া সৰ্ব্বদাই তাহার মনােরঞ্জনের চেষ্টায় ফিরিত । বিশেষ এ বিষয়ে সৰ্ব্বদাই অগ্রগামিনী ছিলেন, মনুজানের মাতা—তাহরের পত্নী। তিনি অতবড় ধনকুবেরের স্ত্রী হইয়া স্বামীর মৃত্যুর পর যে অর্থশূন্য ভিখারিণী হইয়া পড়িবেন—এ ভাবনা সহ করিতে পারিতেন না। ইহার দুইটি কারণ ছিল। প্রথমতঃ, মুসলমানের আইন অনুসারে, পুত্রসন্তানের মত কন্যা- সন্তানও সমানভাবে পিতার বিষয়ের অধিকারিণী হইয়া থাকেন। এরূপ- স্থলে স্বামী যদি বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতে হাত তুলিয়া স্ত্রীকে কিছু দিয়া যান অথবা মৃত্যুকালে উইল করিয়া তাহাকে বিষয়ের ভাগ না দেন, তাহা হইলে মনুজানই যে মতাহরের সমস্ত বিষয় বিভবের একমাত্র অধিকারিণী হইবে তাহা নিশ্চয়, এবং বিবাহের পর সে যখন স্বামী-গৃহে চলিয়া যাইবে, তখন সেই বিপুল বিষয়-সম্পত্তিও সে লইয়া পর হইয়া যাইবে—তাহার নিজের কিছুই থাকিবে না। এই গেল এক কথা। আর এক কথা এই যে, তখনকার দিনে মুসলমানদের ভিতর বহুবিবাহ করা এবং কৃতদাসীকে বিবাহ করিবার রীতি ছিল, এবং প্রভু ইচ্ছা করিলে তাহাকে ত্যাগ করিয়া তাড়াইয়া দিতেও পারিতেন। এরূপস্থলে স্বামীর উপর কিম্বা পুত্র- কন্যার উপর অগাধ স্নেহ না জন্মিয়া বরং স্ত্রীলােকদিগের আপনার ১ হাজি মহম্মদ মহসীন স্বার্থের প্রতিই বেশী নজর থাকিত। এরূপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ, পুত্রকন্যা জন্মিবার পরে স্বামী বা প্রভু দূর করিয়া দিলে, তখন তাহাদের আর আশ্রয় বা অবলম্বন থাকিত না, কাজেই তাহারা আবার অন্য ব্যক্তিকে নিকা করিয়া পূর্বের সকল সম্বন্ধু ঘুচাইয়া দিত। এরূপ অবস্থায় যে স্ত্রীলােকদিগের নিজের স্বার্থের প্রতি অধিক দৃষ্টি স্বভাবতঃই থাকিবে তাহা আশ্চর্যের কথা নহে। মতাহরের পত্নী মন্ন জানের মাতার প্রকৃতি সেইরূপ ছিল। কিন্তু হইলে হইবে কি, মতাহর একমাত্র কন্যা মনুজান ভিন্ন অন্য কাহারও প্রতি বিশেষ নজর রাখিতেন না। সুতরাং লােকে তাহাকে হাত করিয়া যতই নিজেদের স্বার্থসাধনের চেষ্টা করুক না কেন, সে সমুদমই ব্যর্থ হইত। মতাহরের পত্নীরও তাহাই হইল। মতাহর কন্যাকে একটি বড় সােণার পদক গড়াইয়া দিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার মৃত্যু হইলে মন্নুজান যেন সেই পদক ভাঙ্গিয়া তাহার ভিতরে যাহা আছে তাহা লয়। কিন্তু তিনি যতদিন বাঁচিয়া থাকিবেন, মনুজান ততদিন সে কবচ ভাঙ্গিতে পারিবে না। যথাকালে আগামতাহরের মৃত্যু হইলে, মনুজান সেই পদকটি সকলের সম্মুখে ভাঙ্গিয়া দেখিলেন যে তাহার ভিতরে একখানি ক্ষুদ্র কাগজে মতাহরের উইল রহিয়াছে। উইলের লেখা পড়িয়া সকলে চমকিত হইল এবং মতাহরের স্ত্রী মনুজানের মাতার মস্তকে বজ্রাঘাত হইল। সেই উইলে দেখা গেল, যে, মতাহর, অন্য কাহাকেও কিছুমাত্র দিয়া তাহার বিপুল বিষয়-সম্পত্তি, ঘর-বাড়ী, টাকা-কড়ি, স্থাবর- অস্থাবর সমস্তই একমাত্র মন্ন জানকে দিয়া গিয়াছেন। তখন মতাহরের পত্নী নিরাশ হইয়া একেবারে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। এতদিনে তিনি যথার্থই পথের ভিখারিণী হইলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ কিন্তু এ অবস্থা তিনি সহ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। মনের ক্ষোভে ও দুঃখে তিনি তখন সমস্ত পূৰ্ব্বসম্পর্ক ছেদন করিয়া পুনরায় আবার হাজি ফয়জুল্লাকে বিবাহ করিলেন। ইংরাজী ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে তাঁহাদের এক পুত্র সন্তান জন্মিল। এই পুত্ৰই মহাপুরুষ—হাজি মহম্মদ মহসীন। . চতুর্থ পরিচ্ছেদ। মহম্মদ মহসীন যখন হুগলীতে জন্মগ্রহণ করিলেন, সেই কালে এদেশে বিলাসিতার স্রোত প্রবলভাবে বহিতেছিল। বিলাসিতার সঙ্গে সঙ্গে পাপের মাত্রাও দিন দিন অত্যন্ত বৃদ্ধি পাইয়া সমস্ত সম্রান্ত ভদ্রসমাজে ঘােতর স্বেচ্ছাচারিতা ও উচ্ছলতার প্রসার বাড়াইয়া দিয়াছিল । এমন কি, যে সম্রান্ত মুসলমান রাশি রাশি বাদী ও কৃতদাসী বেষ্টিত হইয়া, সৰ্ব্বদাই, নৃত্য-গীত, পান-ভােজনে মগ্ন না থাকিতেন, লােকে তাঁহাদিগকে ভদ্র ও সম্রান্ত বলিয়া মনে করিত না। সুতরাং সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের ঘরে—যাহার যেরূপ আয় ও শক্তি, তিনি সেই অনুসারেই সর্বদা আমােদ-প্রমােদে ডুবিয়া থাকিতেন। সমাজের এরূপ অবস্থায়, বাল্যকাল হইতেই মহম্মদ মহসীনও যে সেইরূপ হইয়া উঠিবেন তাহা অস্বাভাবিক নহে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, তিনি বাল্যকাল হইতেই বরং সর্বপ্রকারে সম্পূর্ণ বিপরীত হইয়া উঠিলেন। মহসীন বাপ-মায়ের আদরের পুত্র। হুগলীতে “আগামতা- হরের বাড়ীর কাছেই তাঁহাদের বাড়ী। এরূপ অবস্থায় মুতাহরের বিধবা পত্নী কন্যাকে ফেলিয়া আসিয়া মনের ক্ষেদে যখন হাজি ফয়জুল্লাকে বিবাহ করিয়াছিলেন, তখন তাহার মনে সৰ্ব্বপ্রকারে আনন্দ ও শান্তি হাজি মহম্মদ মহসীন দিবার জন্য হাজি ফয়জুল্লাও সৰ্ব্বদা চেষ্টিত ছিলেন। সুতরাং তাহাদের সংসারেও শক্তি ও সাধ্যমত বিলাসের স্রোত নিতান্ত কম বহিত না। সেরূপ অবস্থায় যখন মহসীন জন্মগ্রহণ করিলেন, তখন বাপ-মা সেই পুত্রের প্রতিপালনে যে কোনপ্রকার আদর-যত্ন এবং যথাসাধ্য অর্থব্যয়ের ত্রুটি করেন নাই, তাহা বলাই বাহুল্য। সুতরাং মহসীন শৈশব হইতেই নানাবিধ সুখ-বিলাসের মধ্যেই প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন। কিন্তু বালক যতই বড় হইতে লাগিল, ততই সকলে দেখিয়া আশ্চৰ্য্য জ্ঞান করিল যে, সুখ-বিলাসের দিকে তাহার মােটেই দৃষ্টি নাই, বরং তাহাতে তিনি বিরক্তবােধ করেন। বালক সৰ্ব্বদাই আপনার মনে যেন কি ভাবে, নির্জনে থাকিতে ভালবাসে, গােলমালের ধারে ঘেঁসিতেও ভয় পায়। নৃত্য-গীত, আমােদ-প্রমােদের কলরব শুনিলে সেখান হইতে দূরে সরিয়া গিয়া যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচে। এদিকে এমন, কিন্তু ওদিকে আবার ভগবানের স্তোত্রগান শুনিলে আলাদে আটখানা হয়। সুর করিয়া কোরাণ পাঠ করিলে বালক একমনে কান খাড়া করিয়া শুনে, সকলে মিলিয়া একসঙ্গে উচ্চকণ্ঠে যখন নমাজ পড়ে, তখন তাহা শুনিয়া আনন্দে নাচিতে থাকে, ভিখারীদের মুখে ‘গজল গান শুনিলে, সেখানে ছুটিয়া গিয়া দাঁড়ায়। এইরূপে দিন দিন বালক যতই বড় হইতে লাগিল, ততই সুখ-বিলাস, আমােদ-প্রমােদের উপর হাড়ে হাড়ে চটিয়া গিয়া অন্য রকম হইয়া উঠিতে লাগিল। ছােট ঘােট ছেলেমেয়েরা সৌখিন জিনিষ দেখিলে ছুটিয়া লইতে ল্প, রঙ্গিন কাপড়-চোপড় পাইলে আহলাদে মাতিয়া উঠে, এটা ওটা লইবার জন্য সর্বদাই কত আবদার করে, কিন্তু মহসীনের সবই বিপরীত। তাহার মনে কোন দ্রব্যের আকাঙ্ক্ষা নাই—কখনও কোন কিছুর জন্য আবদার করিতে জানেন না,--নিতান্ত সহজ সাদাসিধা চতুর্থ পরিচ্ছেদ অবস্থাতেই সৰ্ব্বদা সন্তুষ্ট। ভাল ভাল কাপড় জামা পরাইয়া দিলেও তাহার মনে কোন রকম বেশী আহলাদ বা সখের উদয় হয় না, এবং নিতান্ত সাধারণ পোষাক পরিচ্ছদ পরিয়া থাকিলেও কোনরকম দুঃখ বা অভাব জানিতে পারেন না। বরং ভাল ভাল কাপড় জামা পরাইয়া দিলে প্রায়ই দেখা যায় যে, কোন ভিক্ষুক আসিয়া চাহিলে তৎক্ষণাৎ সে সব তাহাকে দান করিয়া আহলাদে হাসিতে হাসিতে হাততালি দিতেছেন। হাতে খাবার পাইয়া খাইতে যাইতেছেন, এমন সময়ে যদি কোন গরীবের ছেলেপুলেকে সম্মুখে দেখিতে পাইলেন, কিম্বা কেহ তাহার খাবারের পানে চাহিয়া রহিয়াছে—দেখিলেন, অমনি সে সমস্তই অম্লানবদনে তাহাকে খাইতে দিলেন। এইরূপ সৰ কাৰ্যে তাহার মনে যে আহলাদ হয়, তাঁহার মুখখানি যেমন প্রফুল্ল হইয়া উঠে—এমন আর কিছুতে হয় না। এইরূপে সেই অদ্ভুত বালক জনক-জননীর ক্রোড়ে শৈশবে দিন দিন বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। ক্রমে একটু বড় হইলে, সকলেই আরও আশ্চৰ্য্য হইয়া দেখিল যে লেখাপড়ার উপরে—কে জানে, কেমন করিয়া—আপনা-আপনি তাহার একটা আন্তরিক টান আসিয়া জন্মিয়াছে। বালক বই দেখিলেই ছুটিয়া লইতে যায়। একটা সুন্দর পুতুল বা খেলনা এবং একখানা পুস্তক একস্থানে থাকিলে, সে সেই খেলনা বা পুতুলের প্রতি, হৃক্ষেপ পর্যন্ত না করিয়া, আগে হইতে তাড়াতাড়ি বইখানা তুলিয়া লইয়া দখল করিয়া বসে। তারপরে একবার বই খুলিলে তো আর রক্ষা নাই। সেই নিতান্ত নুতন, নিতান্ত অজানা কালির আঁচড় গুলির ভিতরে সেই অদ্ভুত বালক-যাদুকরের ভেল্কির মতকে জানে কি মহারহস্যের সন্ধান পায়, সে, আর তাহা ছাড়িতে চায় না। একখানি চকচকে, রঙ্গিন, সুন্দর ছবি হাতে পাইলে বালক f ১৮ হাজি মহম্মদ মহসীন বালিকারা যেমন খেলা-ধূলা ভুলিয়া সেখানি নানারকম করিয়া দেখিতে দেখিতে মাতিয়া উঠে, বালকও তেমনি সেই পুস্তকের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উলটাইয়া—সেই কালির দাগগুলি একেবারে বিভাের হইয়া দেখিতে থাকে। তখন তাহার আর অন্য কোন কথা মনে থাকে না-খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত ভুলিয়া যায়। কোন কারণে বালকের মনে কষ্ট লাগিয়া কচি মুখখানি বিষঞ্জ ভার ভার হইয়া উঠিলে, সম্মুখে একখানি পুস্তক আনিয়া ধরিয়া দিলে, অমনি তৎক্ষণাৎ সে ভাব দূর হইয়া মুখখানি প্রফুল্ল হইয়া উঠে-কচি ঠোট দুখানিতে মধুর হাসির ঢেউ খেলিতে থাকে। একখানা বই হাতে দিয়া সারাদিন বসাইয়া রাখিলেও, সে আর সেখান হইতে নড়িতে চায় না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনগণ বালককে আপনাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী কোন কিছু করাইতে চাহিলে, একখানা বই হাতে দিয়া, সে কাজ করাইয়া লইতে পারেন। তাহা ছাড়া বালক কান্না কেমন জানে না—চীৎকার করিয়া দিতে পারে না। মনে ব্যথা লাগিলে কেবল মাত্র মুখখানি ভার করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। যেখানে ছেলের দল দৌড়াদৌড়ি, চেঁচাচেঁচি করিয়া খেলা করিতেছে, বালক সেখান হইতে সরিয়া যায়। যেখানে তাহারা মারামারি হুড়াহুড়ি করিতেছে দূর হইতে দেখিয়া তফাৎ হইতেই সরিয়া পড়ে। যেখানে তাহারা উ কলরবে হাট বসাইয়াছে-ভয়ে সে ধারের ছায়াও মাড়ায় না। এইজন্য যে কোন বালকের সঙ্গে মিশিতে পারে না, অন্য কোন বালকও তাহার কাছে আসিতে চাহে না। তবুও তাহাতে বালকের কিছুমাত্র কষ্ট বা অভাব বােধ হয় না, সে আপনার ভাবেই আপনি মগ্ন হইয়া পরম সুখে দিন কাটাইয়া দেয়। তা বলিয়া যে কারও সঙ্গে শত্রুতা, কি কারও উপর রাগ চতুর্থ পরিচ্ছেদ কি ঘৃণা—তাও নাই। অন্য বালকদের সঙ্গে দেখা হইবামাত্রেই এমন সরল, এমন মধুর ভাবের প্রাণ-খােলা একটু হাসি সেই কচি ঠোঁট দুখানি ভরিয়া উছলিয়া উঠে যে অন্য বালকেরা তাহাতেই মুগ্ধ হইয়া যায়—সাধিয়া সাধিয়া তাহার সঙ্গে কথা কহিতে ও ভাৰ করিতে আসে। শৈশব হইতেই সেই সকল অস্বাভাবিক, অদ্ভুত লক্ষণ দেখিয়া কত লােকে উপহাস করে, কত লােকে সুখ্যাতি করে, আবার কত লােকে অন্য কত রকম কথা বলে যে, সে সব শুনিয়া শুনিয়া বাপ মায়ের প্রাণ কখনও বা আনন্দে অধীর হইয়া উঠে, কখনও দুঃখে কাঁদিয়া উঠে, আবার কখনও বা ভয়ে কঁপিতে থাকে। সেইজন্য তাঁহারা সর্বদাই চেষ্টা করেন যাহাতে তাহাদের মহসীনও আর পাঁচজনের ছেলের মত হয়। এই চেষ্টাতে তাহারা মহসীনকে সর্বদাই আমােদ-প্রমােদ ভােগ, বিলাসের ভিতরে ডুবাইয়া রাখিতে চাহেন। সর্বদাই ভাল ভাল পােষাক-পরিচ্ছদে সাজাইয়া সৰ্ব্বদাই নানারকম খেলার জিনিষ দিয়া, সর্বদাই অশেষ প্রকারের রসনা- তৃপ্তিকর ভাল ভাল খাবার জিনিষ খাইতে দিয়া উহার স্বভাব পরিবর্তন করিয়া তুলিবার চেষ্টা করেন। কিন্তু হায়! সে সমস্তই ভন্মে ধৃত ঢালিবার মত হইয়া পড়ে। বালকের গাম্ভীর্ষ ঘুচে না—চঞ্চলতা আসে না—মনে সখের উদয় হয় না। এই জন্য লােকেও আপন আপন মনের মত মহসীনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে—নানা কথা বলিতে ছাড়ে না, বাপ-মায়ের মনের ভয়- ভাবনাও ঘুচে না। তাহারা অনবরত ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন, এবং দেবতাদের কাছে সিন্নি মানসিক করেন যে, মহসীন যেন মানুষের মত মানুষ হয়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ এইরূপে ক্রমে উপযুক্ত বয়স হইলে মহসীনের বিদ্যাশিক্ষার সময় আসিল। এখনকার মত এদেশে তখনকার কালে হিন্দু সন্তানগণের লেখাপড়া শিখিবার জন্য এরূপ ইস্কুল, পাঠশালা এবং মুসলমানগণের বিদ্যাভ্যাসের জন্য এরূপ মত বা মাদ্রাসা প্রভৃতি ছিল না। কাজেই ভদ্র এবং সম্রান্ত মুসলমানগণের বালকদিগের বিদ্যাভ্যাসের ভার পড়িত শিক্ষিত মেলবী বা সেই প্রকারের ব্যক্তিগণের উপরে। মহসীনকেও লেখাপড়া শিখাইবার ভার পড়িল সেই শ্রেণীর এক ব্যক্তির উপরে- তাহার নাম “সিরাজী। এই “সিরাজী” সেই সময়ের একজন মহাপণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। আরবী ও পারসী ভাষায় তাহার যেমন অসামান্য পাণ্ডিত্য ছিল- সাংসারিক সকল বিষয়ে তেমনি তাহার বহুদর্শিতাও যথেষ্ট ছিল। তিনি নিজে নানা দেশ ভ্রমণ করিয়া সকল বিষয়েই যথেষ্ট জ্ঞানলাভ করিয়া- ছিলেন। এদিকে শিক্ষা সম্বন্ধে যেমন, ওদিকে আবার তাহার চরিত্রও তেমনি পরম পবিত্র ও মহৎ ছিল। যে লােক একবার তাহার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করিতেন তিনিই মুগ্ধ হইয়া তাহার সুখ্যাতি না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। তখনকার মহাবিলাসী সম্রান্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সতত থাকিয়াও সিরাজীর চরিত্র কলুষিত হইতে পারে নাই। তিনি অর্থ, সম্পত্তি প্রভৃতি পৃথিবীর যাবতীয় ঐশ্বৰ্য্য-সম্পদকে অতিশয় তুচ্ছ ভাবিতেন, এবং যাহাতে লােকের উপকার হয় সেইরূপ কাৰ্য্যে সর্বদাই জীবন-পাত করিতেন, সেই জন্য অনেকে তাহাকে সাধু দরবেশ ভাবিয়া সেই প্রকার ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতে বিরত হইত না। আগা মতাহরের 1 পঞ্চম পরিচ্ছেদ প্রাণ-সমা কন্যা মনুজানও বাল্যকালে এই সাধু, পণ্ডিত সিরাজীর নিকট বিদ্যাভ্যাস করিয়াছিলেন। সিরাজীর নিকট বাল্যকাল হইতেই শিক্ষালাভের ফলে মহসীন যত বড় হইতে লাগিলেন, ততই দিন দিন তাহার স্বাভাবিক লেখাপড়া শিখিবার প্রবৃত্তি আরও বাড়িতে লাগিল এবং শিক্ষকের মত নিজেও যাহাতে সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানবান হইতে পারেন, সেই ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠিল। সিরাজী আপনার শিষ্য ও ছাত্রের কাছে সর্বদাই তাহার নিজের ভ্ৰমণ-কাহিনী বলিতেন। নানা দেশ-বিদেশের নানা প্রকার গল্প করিতেন। সেই সব গল্প শুনিয়া শুনিয়া মহসীনের মনে সেই বাল্যকাল হইতেই দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল। শুধু তাহাই নহে, সিরাজীর শিক্ষাদান ও সঙ্গলাভের ফলে তাহার চরিত্রের এবং অন্তরের মহৎগুণ সকলও ছাত্রের চরিত্রে দিন দিন ফুটিয়া উঠিতে আরম্ভ করিল। মহসীন শিক্ষকের মত আরবী ও পারসী উত্তমরূপে শিক্ষা করিবার জন্য যেমন লালায়িত হইয়া পড়িলেন, তেমনি তাহার সাংসারিক ভােগ-মুখের প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়িতে লাগিল, ধন-সম্পদের উপর বিরাগ জন্মিতে লাগিল—পরােপকার করিবার বাসনা প্রবল হইতে লাগিল এবং ভগবানের উপর দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তি জন্মিতে আরম্ভ হইল। এইরূপে সুশিক্ষকের হাতে পড়িয়া মহসীনের ভবিষ্যৎ জীবন সেই বাল্যকাল হইতেই উজ্জ্বল উচ্চ আদর্শে গঠিত হইয়া উঠিতে লাগিল। (যথাকালে সিরাজীর নিকট শিক্ষা শেষ হইলে, মহসীন মুশি- দাবাদের মক্তবে অধ্যয়ন করিতে গেলেন। এই মুর্শিদাবাদের মতবই ছিল সে সময়ে এদেশের মুসলমান ছাত্রগণের সর্বশ্রেষ্ঠ শেষ বিদ্যাশিক্ষার স্থান। তখনকার কালে যে সকল মুসলমান ছাত্রগণ উচ্চশিক্ষা লাভ হাজি মহম্মদ মহসীন করিয়া পণ্ডিত হইতেন—তাহাদিগকে এই বিদ্যালয়ের শেষ পড়া পড়িয়া তাহা সম্পূর্ণ করিতে হইত। মহম্মদ মহসীনও সেই মুর্শিদাবাদের মক্তবে শেষ পড়া সম্পূর্ণ করিয়া এখানকার লেখাপড়া সমাধা করিলেন। লেখাপড়া শেষ করার পরে লােকের সংসারে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা হয় এবং সকলে তাহাই করিয়া থাকে। কিন্তু মহসীনের তাহার বিপরীত হইল। এখানকার পাঠ সম্পূর্ণ করিয়াও তিনি তৃপ্তিলাভ করিতে পারিলেন না। মুর্শিদাবাদের মক্তবে পড়িয়া তিনি যখন তখনকার কালের উচ্চশিক্ষা লাভ করিলেন, তখন আরও বেশী পড়িবার, জানিবার ও জ্ঞানলাভ করিবার ইচ্ছা প্রবল হইয়া উঠিল বিশেষতঃ আরবী ও পারসী উত্তমরূপে শিখিবার জন্য তাঁহার একান্ত অনুরাগ এবং দেশভ্রমণ করিবার ইচ্ছাও অত্যন্ত প্রবল। তিনি শুনিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন যে দেশভ্রমণ না করিলে নানা বিষয়ে জ্ঞানলাভ হয় না–সুতরাং পড়াশুনারও শেষ হয় না। অতএব তিনি এক্ষণে সেই চেষ্টা করিতে লাগিলেন। মহসীন উত্তমরূপে লেখাপড়া শিক্ষা করিয়া পাণ্ডিত্য লাভের জন্য বিদেশে যাইতে চাহেন শুনিয়া একদিকে পিতামাতার মনে যেমন অত্যন্ত আনন্দ হইতে লাগিল অন্যদিকে তঁাহার ভবিষ্যৎ বিচ্ছেদ আশঙ্কায় তাহারা তেমনি কাতর হইয়া পড়িলেন। কিন্তু পণ্ডিতবর সিরাজী যখন তাহাদিগকে বুঝাইয়া ভরসা দিলেন, তখন তাহারা আর পুত্রের মহৎ ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যে বাধা দিতে পারিলেন না বরং সর্বপ্রকারে সহায়তা করিতে লাগিলেন। তখন মহসীন অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া বঙ্গদেশ পরিত্যাগ করিয়া গেলেন। এইরূপে আবর ও পারস্য দেশে গিয়া মহসীন আরবী ও পারসী দুই ভাষাতেই পরম পাণ্ডিত্য উপার্জন করিলেন। এই দুই কঠিন ভাষাতেই তঁহার এরূপ অগাধ ব্যুৎপত্তি ও জ্ঞান জন্মিল যে, মহাপণ্ডিত পঞ্চম পরিচ্ছেদ বলিয়া সেই দুই ভাষার মাতৃস্থানেই তঁাহার অত্যন্ত খ্যাতি ও যশ প্রচার হইয়া পড়িল। ইহা ছাড়া সেই মুর্শিদাবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া, বছর কতক ধরিয়া দেশে-বিদেশে ক্রমাগতঃ পণ্ডিত, মৌলবী ও সাধু দরবেশ- গণের সহবাসে থাকিয়া থাকিয়া মহম্মদ মহসীন সর্ববিষয়ে সম্পূর্ণরূপে আদর্শ-চরিত্র হইয়া উঠিলেন। ) বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইহা উত্তমরূপে বুঝিয়াছিলেন যে সংসারের ভােগ-বিলাসে সুখ নাই, কারণ তাহাতে দিন দিন কামনা আরও বাড়িতেই থাকে, সে কামনা জীবনে কাহারও কখনও মিটে না এবং মিটিতেও পারে না। সুতরাং মনের ভিতরে সৰ্ব্ব- দাই কামনার আগুন জ্বলিতে থাকিলে লােকে সুখী হইবে কেমন করিয়া ? সংসারে যদি যথার্থই সুখ কিছু থাকে তবে তাহা-মনের শান্তি ও তৃপ্তি। এই মনের শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করিতে হইলে শরীরের স্বাস্থ্য বিশেষ প্রয়ােজন কিন্তু সংসারের ভােগ-বিলাসে মত্ত হইলে সেই অমূল্য স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়া শরীরে নানাবিধ ব্যাধি প্রবেশ করে এবং তাহাতে শরীর ক্রমেই ভাঙ্গিয়া দেয়। অতএব মনের শান্তি ও তৃপ্তি পাইতে হইলে শরীরের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে এবং শরীর নষ্ট করিবার যাহা প্রধান হেতু সেই ভােগ-বিলাসকে মন হইতে একেবারে দূর করিয়া দিতে হইবে। ইহা বুঝিতে পারিয়া তিনি তােভােগ-বিলাসের কামনা মন হইতে একেবারেই দূর করিয়া দিয়াছিলেন, তাহা ছাড়া নানাবিধ ব্যায়া- মের চর্চায় শরীরকে সুস্থ ও সবল করিয়া তুলিয়াছিলেন। তিনি লেখাপড়ায় যেমন পণ্ডিত, চরিত্রেও তেমনি সাধু, আবার শারীরিক স্বাস্থ্যেও তেমনি অসামান্য হইয়া উঠিয়াছিলেন। সুতরাং সুস্থ শরীরের ভিতরে থাকিয়া মনও সুস্থ, সবল, শান্ত ও পবিত্র হইয়া উঠিয়াছিল। এইরূপে লেখাপড়া শেষ করিবার সঙ্গে সঙ্গে মহসীন একজন তা/ভােগ- २8 হাজি মহম্মদ মহসীন ভাল কুন্তীগীর পালােয়ান, উত্তম অশ্বারােহী, বিলক্ষণ সন্তরণপটু, সুদক্ষ তরবারিক্রীড়ক এবং অসাধারণ পরিশ্রম-নিপুণ হইয়া উঠিলেন। তাহার মস্তিষ্কের শক্তি এবং জ্ঞানবুদ্ধি যেমন আশাতীত প্রকারে বর্ধিত হইল, সর্বপ্রকারে শারীরিক শক্তি এবং স্বাস্থ্যও তেমনি বাড়িল । সৰ্ব্ব বিষয়েই তিনি একজন প্রকৃত বীর এবং পুরুষের যােগ্য পুরুষ হইয়া উঠিলেন। সুতরাং এরূপ বীরের কাছে কি কখনও বিলাসিতা, ভীরুতা, কাপুরুষতা হীনতা প্রভৃতি ঘেঁসিতে পারে ? কাজেই দেখিতে দেখিতে মহম্মদ মহসীন সংসারে একজন অদ্বিতীয় আদর্শপুরুষ হইয়া উঠিলেন। ক্রমে আরব ও পারস্য দেশে বাস করিয়া আরবী ও পারসী ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তথাকার লােকের রীতি নীতি, আচার ব্যবহার, শিক্ষা দীক্ষা প্রভৃতি সৰ্ব্ববিষয়ে জ্ঞান অর্জন করিয়া লইয়া মহসীন ক্রমে ক্রমে আরও অগ্রসর হইয়া তুরস্ক ও মিশরদেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করিতে গেলেন। তুরস্ক ও মিশরদেশে কিছুকাল কাটাইয়া তথাকার লােকের ভাষা, পাণ্ডিত্য, সাংসারিক রীতি-নীতি এবং ঈশ্বর-বিশ্বাস ও ধৰ্ম্মসম্বন্ধে যাহা কিছু দেখিবার, জানিবার, বুঝিবার ও শিখিবার বিষয় থাকিতে পারে, সে সকল বিষয়ে উত্তমরূপে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া, শেষে ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিলেন। ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিয়া ও কয়েক বৎসর ধরিয়া এস্থান হইতে ওস্থান, ওস্থান হইতে সেস্থান ঘূরিয়া নানাদেশ, নানাদৃশ্য, নানাপ্রকারের লােক জন দেখিয়া দেখিয়া নানা প্রকারের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়া লইতে লাগিলেন। এইরূপে নানা ভাষায় জ্ঞানলাভ ও নানা বিষয় দেখিয়া শুনিয়া শিখিতে শিখিতে পৃথিবীর সর্ববিষয়ে যেমন অগাধ পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতা জন্মিতে লাগিল, সংসারের সকল প্রকার কাৰ্যেই যেরূপ সুদক্ষ হইয়া উঠিলেন, তাহার চরিত্রও তেমনি মহৎ, উদার, পরদুঃখকাতর, ও পবিত্র হইয়া উঠিল।

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ এইরূপে ভারতবর্ষ ভ্রমণকালে তাঁহার সংসারে এক ঘটনা ঘটিল। তাহাতে তাহাকে আর বিদেশে বিদেশে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইবার অবসর দিল না। এই খানেই তাঁহার দেশভ্রমণ শেষ করিয়া ঘরে ফিরিয়া আসিয়া সংসার লইয়া বসিতে হইল। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ আগামতাহরের কন্যা মনুজান এবং হাজি ফয়জুল্লার পুত্র মহম্মদ মহসীন দুই বিভিন্ন পিতার সন্তান হইলেও, এক মাতৃগর্ভেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং ভগবানের বিধান অনুসারে এই দুইটি ভাইবােনের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের স্বাভাবিক স্নেহ, ভালবাসা এবং আন্তরিক টান যাইবে কোথা ? মহসীন জন্মগ্রহণ করিবার পর হইতেই রাজরাণীর মত ঐশ্চৰ্য্যশালিনী মন্নুজান সেই ছােট ভাইটিকে আপনার প্রাণের মত ভালবাসিতে আরম্ভ করিলেন। ঐশ্বর্যশালিনী কন্যার প্রতি সেই সকল ঐশ্যৰ্য্য সম্পদ হইতে বঞ্চিত মাতার মনে মনে হয়ত একটু বিরাগ থাকিলেও থাকিতে পারি, কিন্তু স্নেহময়ী মজানের মনে সৰ্ব্বদাই স্নেহ-ভালবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি ভিন্ন অন্য কোন ভাব দেখিতে পাওয়া যাইত । বিশেষ এই ছােট ভাইটিকে পাইয়া তিনি যেন একটি অমূল্য রত্ন কুড়াইয়া পাইয়াছেম এমনি আদর যত্নেই তাহাকে কোলে করিতেন এবং নাড়াচাড়া করিতেন । মহসীনও শৈশব হইতে সে ভালবাসা এবং আদর-যত্ন বুঝিতে পারিতেন এবং দিন দিন যতই বড় হইতে লাগিলেন, স্নেহময়ী দিদির প্রতি তাঁহারও তেমনি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও প্রাণের টান দিন দিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল। শেষে এমন হইল যে এই দুটি ভাই বােন যেন পরস্পরের হাজি মহম্মদ মহসীন A , প্রতি পরস্পরের স্নেহ-ভালবাসায় এবং আদর-যত্নে সংসারে আদর্শ স্থল হইয়া উঠিলেন। অনুজান মহসীনের চেয়ে বয়সে আট বছরের বড়, সুতরাং মহসীন দিদির চক্ষের মণির মত আদরের ধন হইয়া উঠিলেন। মজানও ভ্রাতা মহসীনের মত সেই পণ্ডিতবর সিরাজীর নিকটে বাল্যকালে বিদ্যা এবং অন্যান্য সকল সাংসারিক বিষয়ে সুশিক্ষা লাভ করিয়া অত্যন্ত তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালিনী হইয়া উঠিয়াছিলেন, ধর্মের প্রতি তাহার আন্তরিক অনুরাগ এবং দান-ধ্যান প্রভৃতি নানাবিধ সৎকর্মে সর্বদাই তাহার আসক্তি প্রকাশ হইয়া পড়িত। সুতরাং রূপে- গুণে এবং ধন-সম্পদে সকল বিষয়েই মগ্ন জান আদর্শ রমণী-রত্ন হইয়া উঠিয়াছিলেন। এরূপ স্ত্রী লাভ করা অত্যন্ত ভাগ্যের কথা। মন্ন জানকে বিবাহ করিবার জন্য বহু ব্যক্তি পাগল হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু তিনি সে সকল ব্যক্তির মধ্যে কাহাকেও বিবাহ করিলেন না। এই কারণে নিরাশ হইয়া তাহাদের মধ্যে অনেকেই মনে মনে তাহার ঘােতর শক্ত হইয়া উঠিল এবং সর্বদা তাহার অনিষ্ট চিন্তা করিতে লাগিল। ইহার পূর্বে মনুজানের আরও একদল শত্রু হইয়াছিল। অল্প বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় মনুজানের উপর যখন মতাহরের বিপুল বিষয়- সম্পত্তির অধিকার আসিল, তখন অনেকেই তাঁহার চক্ষে ধূলা দিয়া নিজ নিজ স্বার্থ-সাধন করিয়া লইবার জন্য বিবিধ প্রকার চেষ্টার ত্রুটি করে নাই। কিন্তু তীক্ষ্ণ বুদ্ধিশালিনী মন্নুজান নিঃসহায় স্ত্রীলোক হইয়াও এমন সুন্দররূপে সেই সকল বিষয়-বিভবের ব্যবস্থা ও বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন যে দুষ্টগণের কোন অভিসন্ধিই সিদ্ধ হইল না। কিন্তু তিনি যখন বিবাহার্থী যুবকগণকে নিরাশ করিয়া একে একে সকলকেই প্রত্যাখ্যান করিলেন তখন তাহারা সেই সকল দুষ্টগণের সঙ্গে মিলিত হইয়া, দল পাকাইয়া একযােগে মনুজানের যে শত্রুতা ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ সাধিতে লাগিল এবং অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল তাহা ভয়ানক। এমন কি, এক সময়ে সুযােগ বুঝিয়া তাহারা মনুজানের প্রাণসংহার পর্যন্ত করিবার প্রয়াস পাইয়াছিল। তখন মহসীনের পাঠ্যাবস্থা—গৃহে থাকিয়া সিরাজীর নিকটে পড়িতেন। ঘটনাক্রমে তিনি দুষ্টগণের এই চক্রান্ত টের পাইলেন। তাহার ভগ্নীর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালবাসা, সুতরাং তিনি আর স্থির থাকিতে পারি- লেন না। আপনার তীক্ষ্ণবুদ্ধি প্রভাবে তাহাদের সকল ষড়যন্ত্রের কথা জানিতে পারিয়া, তখনি গিয়া দিদিকে সকল কথা বলিয়া সাবধান করিয়া দিলেন। এই উপায়ে দুষ্টগণের চক্রান্ত বিফল হইয়া গেল—মনুজানেরও প্রাণরক্ষা হইল। তদবধি ভ্রাতার প্রতি তাঁহার স্নেহ-ভালবাসা আরও শতগুণে বাড়িয়া গিয়াছিল। মনুজান যে ইচ্ছা করিলে ইহাদের কাহাকেও বিবাহ করিতে পারিতেন না এমন নয়। তিনি তখন স্বাধীন-অগাধ বিষয়ের মালিক, তাঁহার ইচ্ছায় বাধা দিবার কেহ ছিল না। কিন্তু পিতৃবৎসল কন্যা মৃত পিতার আদেশ পালন করিবার জন্যই তাহা করেন নাই। আগামতাহরের ইচ্ছা ও আদেশ ছিল যে পারস্য দেশবাসী তাহার ভাগিনেয় সলাউদ্দীনের সঙ্গে মন্নুজানের বিবাহ হইবে। মরিবার সময়েও এ কথা বলিয়া যাইতে ভুলেন নাই। এই জন্যই পিতৃবৎসলা কন্যা যে দিন হইতে পিতার মনের এই অভিলাষ জানিতে পারিয়াছিলেন সেই । দিন হইতেই চক্ষে না দেখিলেও, সাউদ্দীনকে মনে মনে পতিত্বে বরণ করিয়া রাখিয়াছিলেন, এবং কেবলমাত্র এই কারণের জন্যই মনুজান অন্য কাহাকেও বিবাহ করিতে সম্মত হন নাই। ) ক্রমে যথাসময়ে মনু জানের বিবাহের কাল উপস্থিত হইলে পারস্যদেশে সলাউদ্দীনের কাছে হার পরলােকগত মাতুলের ইচ্ছা ২ হাজি মুহম্মদ মহসীন , ও আদেশ জানাইবার জন্য লােকে প্রেরিত হইল। সেখানে সকলেই শুনিয়াছিল যে আগামহর ভারতবর্ষের বাদশাহের প্রিয়পাত্র হইয়া যথেষ্ট ধন-সম্পদ এবং ভূসম্পত্তি প্রভৃতি করিয়া বঙ্গদেশে মহাসম্রান্ত হইয়া উঠিয়াছেন। তাহার যে একমাত্র কন্যা ভিন্ন আর অন্য সন্তানাদি নাই এবং সেই কন্যাই যে মৃত পিতার পরিত্যক্ত বিপুল ঐশ্বর্যের অধি- কারিণী হইয়াছেন এ কথাও কাহারও অজ্ঞাত ছিল না। সুতরাং মনু জানের সহিত বিবাহের প্রস্তাবে সলাউদ্দীন অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া পারস্যদেশ হইতে বঙ্গদেশের হুগলীতে আসিলেন এবং মন্ন জানের পানি গ্রহণ করিলেন । যশােহর, খুলনা প্রভৃতি স্থানে আগামতাহরের বিস্তর জমী জমা, তালুক মুলুক ছিল, তাহা পূৰ্বেই বলা হইয়াছে। তাহার মৃত্যুর পর কন্যা মনু জান সেই সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হইয়াছিলেন এবং সাংসারিক সকল বিষয়ে সুশিক্ষা ও তীক্ষ্ণবুদ্ধির প্রভাবে এতদিন একাই সেই বিষয়-সম্পত্তির তত্ত্বাবধারণ করিয়া আসিতেছিলেন। এক্ষণে তাহাকে বিবাহ করিয়া সলাউদ্দীন সেই সকলের অধিকারী হইয়া উঠিলেন। ইতিমধ্যে মহম্মদ মহসীন শিক্ষালাভের জন্য বঙ্গদেশ ছাড়িয়া আরব ও পারস্যদেশে চলিয়াগিয়াছিলেন। এবং তথাকার শিক্ষা শেষ করিয়া তুরস্ক, মিশর, তাতার প্রভৃতি দেশে ভ্রমণ করিতে- ছিলেন। তখনকার কালে, এখনকার কালের মত এরূপ, ডাকঘর, টেলিগ্রাফ, রেলওয়ে প্রভৃতি ছিল না, সুতরাং মহসীনের সংবাদ কচিৎ, কালেভদ্রে দেশে আসিয়া পহুছিত। তিনি যে কতদিন কোন্ দেশে থাকিয়া আবার কোথায় যাইতেছেন, কতদিন কোথায় থাকিতেছেন, সে সকল সংবাদ তাহার বাড়ীর লােক সঠিক জানিতে পারিত না, সুতরাং তাহা মনুজানও জানিতেন না। তবুও স্নেহময়ী দিদি সর্বদা ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ছােট ভাইটির সংবাদ জানিবার জন্য প্রাণপণে যথাসাধ্য চেষ্টা করিবার ক্রটি করিতেন না। মনুজান পিতৃস্নেহ এবং বিষয়-সম্পত্তি ও ধন-ঐশ্বৰ্যে যেরূপ ভাগ্যবতী ছিলেন দাম্পত্য জীবনে সেরূপ সৌভাগ্য লাভ করিতে পারেন নাই। বিবাহের বছর কতক পরেই ভাগ্যদোষে তিনি বিধবা হইলেন। এইরূপে অল্প বয়সে সউদ্দীনের মৃত্যু হইলে, সেই সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির ভার আবার মজানের স্কন্ধেই আসিয়া চাপিয়া পড়িল।). কিন্তু এবারে সে সকলের উপর তাহার আর তেমন স্পৃহা বা মন ছিল না। প্রথমতঃ, স্বামী-শােকে তাঁহাকে বড়ই কাতর করিয়া ফেলিল, সে অবস্থায় বিষয়-সম্পত্তি, ধন-ঐশৰ্য্য লইয়া নাড়াচাড়া করিতে তাহার আর ভাল লাগিল না। দ্বিতীয়তঃ, পিতৃহীন হওয়ার পর কঠোর পরিশ্রমে তিনি সে সকল রক্ষা করিয়া আসিয়াছেন। বিবাহের পর স্বামীর উপর সকল ভার ছাড়িয়া দিয়া একটু বিশ্রাম পাইয়া যেন নিশ্বাস ছাড়িয়া বাঁচিয়াছিলেন। এক্ষণে, সেই সকল যখন আবার আসিয়া তাহার ঘাড়ের উপর চাপিয়া পড়িল তখন তিনি বড়ই বিরক্তি বােধ করিলেন । অথচ না করিলেই বা উপায় কি ? এদিকে দিন দিন তাহার বয়সও বাড়িয়া বার্ধক্যের দিকে চলিয়াছিল, তিনি আর কতকাল সে কঠোর পরিশ্রমের কাৰ্য্য করিতে পারিবেন ? তখন তাহার ইচ্ছা হইল যে, ভ্রাতা মহসীনের উপরে সেই সব ভার চাপাইয়া দিয়া তিনি নিশ্চিন্ত হইবেন। কিন্তু মহসীন যে তখন কোথায় কি করিতেছিলেন তাহা তাহার কিছুই জানিবার উপায় ছিল না। তবু তিনি ভ্রাতার উদ্দেশে চারিদিকে নানাস্থানে পত্র লিখিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতে কোনও ফল ফলিল না। মহসীন যেরূপ অজ্ঞাতবাসে কাটাইতেছিলেন হাজি মহম্মদ মহসীন সেইরূপই রহিলেন, সুতরাং মন্ত্র জানের ইচ্ছা কার্যে পরিণত হইতে পারিল না। এইরূপে আরও কিছুকাল কাটিয়া গেল। মনু জান, ক্রমে বৃদ্ধা হইয়া পড়িলেন, দেহের শক্তি ও মনের বল সমস্তই কমিয়া আসিতে লাগিল। তখন আর যে পূৰ্ব্বেকার মত পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের সহিত বিষয়-সম্পত্তি দেখা শুনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করিতে পারিবেন না তাহা বুঝিলেন। সুতরাং ভ্রাতার উদ্দেশ করিবার জন্য ক্রমাগত নানাস্থানে পত্রাদি লিখিতে এবং লােকজন পাঠাইতে লাগিলেন। তাহার ফলে, এবার অনেক কষ্টে তাহার সন্ধান মিলিল। মহসীন ভগ্নীর পত্র পাইলেন এবং তাহার মনের ভাবও বুঝিলেন। কিন্তু নানা দেশ-দেশান্তরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নানা বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানলাভ করিয়া বিষয়-সম্পত্তির উপরে তাহার ঘােরর বিরাগ জন্মিয়াছিল। অনবরত সাধুসঙ্গে থাকিয়া ধৰ্ম্মকর্মে প্রগাঢ় অনুরাগ জন্মিয়াছিল। সুতরাং তিনি আর বিষয়-সম্পদের ভিতরে জড়িত হইতে চাহিলেন না এবং এইজন্যই ভগ্নীর পত্র পাইয়াও তিনি প্রথমতঃ দেশে কিরিলেন না। এদিকে মনু জানের শরীর ও দিন দিন দুৰ্বল হইয়া পড়িতে লাগিল, তিনি যে আর বেশীদিন বাঁচিবেন না তাহা বুঝিতে পারিলেন। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে তঁাহার সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির বন্দোবস্ত করিয়া ফেলিবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। তিনি ভ্রাতাকে আপনার শরীরের অবস্থা জানাইয়া দেশে ফিরিবার জন্য পুনঃ পুনঃ পত্র লিখিয়া অনুরােধ করিতে লাগিলেন। তখন মহসীন স্নেহময়ী ভগ্নীর বারম্বার সেই কাতর অনুরােধ আর উপেক্ষা করিতে পারিলেন না, গৃহে ফিরিতে সম্মত হইলেন। বিদেশে মহসীনের অনেকগুলি ধৰ্ম্ম-বন্ধু জুটিয়াছিল। অবশেষে, সপ্তম পরিচ্ছেদ ভগ্নীর নিতান্ত পীড়াপীড়িতে তাঁহাদের মধ্যে রজবআলি ঘাঁ” ও “সাকের আলি খাঁ নামক দুইজন ধর্মবন্ধুকে সঙ্গে লইয়া মহসীন গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তখন মনুজান ভ্রাতা মহসীনকে তাঁহার সমস্ত বিষয়-বিভবের উত্তরাধিকার দান করিয়া ইংরাজী ১৮০৩ খৃষ্টাব্দে ইংলােক পরিত্যাগ করিলেন। সপ্তম পরিচ্ছেদ সংসারে স্পৃহাশূন্য, বিষয়-সম্পদ, ধন-ঐশ্বর্যের প্রতি ঘােরর উদাসীন মহম্মদ মহসীন ভগবানের ইচ্ছায় অতুল সম্পদের অধিকারী হইলেন সেই সময়ে এই সকল সম্পত্তির আয় পঞ্চাশ হাজার টাকারও বেশী।) একজন উদাসীন ফকির যে বিনা ক্লেশে, বিনা চেষ্টায়, বিনা উপার্জনে এরূপ ধনকুবেরের যথাসৰ্বশ্বের মালিক হইয়া উঠিলেন- ইহা অনেকের প্রাণেই সহ্য হইল না। অনেকেই এ ব্যাপারে মহসীনের উপরে অকারণে বিরক্ত হইয়া মনে মনে তাহার ঘােরর শত্রু হইয়া উঠিল এবং কেহ কেহ প্রকাশ্যভাবে তঁাহার শত্রুতাচরণ করিতেও ছাড়িল না। “বালা আলি খাঁ নামক এক ব্যক্তি হঠাৎ একদিন উপস্থিত হইয়া কহিল-এ সব কাহার বিষয়-সম্পত্তি আপনি জোর করিয়া দখল করিয়া বসিয়াছেন ? সকলে অবাক হইয়া তাহার মুখের পানে চাহিয়া রহিল। মহসীন মিষ্টভাষে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, সে সকল বৃত্তান্ত শুনিয়া তাহার লাভ কি? তখন সে ব্যক্তি অত্যন্ত ক্রোধে চক্ষু লাল করিয়া উচ্চকণ্ঠে তর্জন গর্জন পুৰ্ব্বক কহিল- হাজি মহম্মদ মহসীন “জানেন, এ সকলই আমার ? আমার মাতা মৃত মনু জান বিবি আমাকে পােষাপুত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার পরিত্যক্ত সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির আমিই একমাত্র আইন সঙ্গত উত্তরাধিকারী। এক্ষণে এ সব আপনি আমাকে ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছেন কি না ? সহজে না দিলে আমি রাজদ্বারে নালিশ করিয়া আইনের আশ্রয় গ্রহণ করিব।” শুনিয়া সকলেই অবাক্ ! মনু জানের এমন কোন বিষয় বা এমন কোন গােপনীয় কথা ছিল না, যাহা মহসীন জানিতেন না। মেহের ভাইটিকে দিদি তাহার সকল কথাই বলিয়া গিয়াছিলেন। সুতরাং যদি তিনি পােষ্যপুত্র গ্রহণ করিতেন, তাহাও মহসীনকে বলিয়া যাইতেন এবং তদনুযায়ী বন্দোবস্ত করিয়া যাইতেও ভুলিতেন না। সুতরাং মহসীন বুঝিলেন এবং তাহার আত্মীয়-স্বজন ও ধৰ্ম্মবন্ধুগণ ও বুঝিল যে—এ ব্যক্তি খােতর জুয়াচোর। বিষয় সম্পদের উপরে মহসীনের কোন প্রকার আকর্ষণ নাই। তিনি পূৰ্ব্বেও যেমন ফকির হইয়া দিন কাটাইতেছিলেন, এখনও সেই ভাবেই কাটাইতেছেন। অতুল বৈভব পাইয়া ও তাহার এক কপর্দক নিজের জন্য ব্যয় করেন নাই ) সুতরাং তিনি অনায়াসেই সে সমস্তই ওই ব্যক্তিকে ছাড়িয়া দিতে পারিতেন। কিন্তু যাহার সম্পত্তি তিনি যখন মৃত্যুকালে একমাত্র তাঁহার উপরেই বিশ্বাস করিয়া সমস্ত অর্পণ করিয়া গিয়াছেন, তখন তিনি যদি তাহা উপযুক্ত কাৰ্য্যে সদ্ব্যয় না করিয়া একজন জুয়াচোরকে ধরিয়া দেন, তাহা হইলে তাহার ঘােরর অধৰ্ম্মের কাৰ্য্য করা হইবে। সুতরাং তিনি তাহা করিলেন না। “বান্দআলী খাঁ” ও সহজ লোক নহে, বিশেষ তাহার পৃষ্ঠবল যথেষ্ট ছিল। সুতরাং সে ব্যক্তি ও সহজে ছাড়িল না, মহসীনের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়া নালিশ করিল। সুতরাং মহসীন বড়ই বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ কিন্তু তখন তাহাকে বাধ্য হইয়া আত্ম-সমর্থন করিবার জন্য আদালতে যথারীতি লড়িতে হইল। এই ব্যাপারে সংসারের উপরে তাঁহার অশ্রদ্ধা আরও বাড়িয়া গেল। মােক অনেক দিন ধরিয়া চলিল, শেষে ধৰ্ম্মেরই জয় হইল। মহসীন মােকদমায় জিতিয়া- মন্ন জানের সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি, স্থাবর-অস্থাবরের একমাত্র উত্তরাধিকারী বলিয়া আদালতে সাব্যস্ত হইলেন। তখন শত্রুপক্ষ একেবারে নিরাশ হইয়া পলাইল, আর অন্যকেহ সেই বিষয়-সম্পত্তির দাবী করিতে সাহসী হইল না। এইরূপে ভগবানের ইচ্ছায় সংসার-ধৰ্ম্মে বিরাগী, ফকির মহসীন ধনকুবের হইয়া পড়িলেন। স্ত্রীলােকের প্রতি মহসীনের কোন কালেই কোন প্রকার আসক্তি ছিল না। বিশেষতঃ সেই কালের উচ্চ শ্রেণীর মুসলমান সমাজের বিলাসিতা ও উচ্ছজ্জ্বলতা প্রভৃতি নানা দোষ দেখিয়া তিনি মনে মনে সংসার ধর্মের প্রতি অনুরাগশূন্য হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহার পর যখন দুষ্টগণের ষড়যন্ত্রে তাহার স্নেহময়ী হিতৈষিণী ভগ্নী মনু জানের জীবন যাইবার উপক্রম হইয়াছিল তখন হইতে সংসারের উপরে তিনি হাড়ে হাড়ে বিরক্ত হইয়া একেবারে স্পৃহাশূন্য হইয়া পড়িয়াছিলেন। সুতরাং বিবাহ করিয়া সংসারী হইবার ইচ্ছাও কখনও মহসীনের মনে স্থান পায় নাই। এক্ষণে সেই এক দায় উপস্থিত হইল। তাহাকে বিবাহ করিবার জন্য আত্মীয়-স্বজনগণ পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল, বন্ধুবান্ধবের বুঝাইতে আরম্ভ করিল, কত লােক কন্যা দিবার জন্য নিত্য যাতায়াত করিতে লাগিল। তিনি বিব্রত হইয়া পড়িলেন। সৰ্ব্ববিষয়ে জ্ঞানলাভ করিয়া, দেশ দেশান্তরে নিরন্তর ভ্রমণ এবং সাধুসঙ্গে দিন যাপন করিয়া তাহার অন্তরে ধৰ্ম্মের যে মধুর আলোেক জ্বলিয়া উঠিতেছিল, তাহাতে তিনি সেই পথই সব্বাঙ্গসুন্দর দেখিয়াছিলেন। সে পথ ছাড়িয়া আর অন্য পথে হাজি মহম্মদ মহসীন আসিতে প্রবৃত্তি হইল না। তিনি সকলকে মিষ্টভাষায় নানা প্রকারে বুঝাইয়া সে চেষ্টা হইতে বিরত করিলেন এবং সর্বপ্রকারে সর্ববিষয়েই আসক্তিশূন্য হইয়া সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে, সংসারে বাস করিতে লাগিলেন। দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণকালে তিনি যেমন ফকির—যেমন উদাসীন ছিলেন, গৃহে বাস করিয়াও তিনি তেমনই রহিলেন। সংসারের কোন প্রলােভন কি কোন আকর্ষণই তাহাকে টলাইতে পারিল না। কিন্তু সংসার কাৰ্য্যস্থল, পৃথিবীতে সকলেই কাৰ্য্য করিবার জন্য আসিয়াছে। সকলকেই কার্য করিতে হইবে, নচেৎ ধৰ্ম্মহানি হয়। তাই মহসীন নিজে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকিয়াও কৰ্ম্মস্রোতে গা ভাসাইয়া দিলেন। পৃথিবী যেমন বড়—সংসারে কৰ্ম্মও তেমনি অনন্ত। লােকে আপন আপন সংসারের কতকগুলি নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম করিয়াই বিশ্রামলাভের জন্য আকুল হইয়া পড়ে, ভাবে যে‘থাটিয়া খাটিয়া মরিয়া গেলাম। কিন্তু মহসীনের সেরূপ হইল না। তিনি বিবাহ করিয়া যখন আপনার ক্ষুদ্র-সংসার পাতিয়া বসিলেন না-আপনার সাংসারিক কোন প্রকার স্বার্থেরই বন্ধন রহিল না, অথচ সংসার ছাড়িয়াও ফকির হইয়া বাহির হইলেন না, তখন সমস্ত বিশ্বসংসার আপনা হইতেই আসিয়া তাহার চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া ধরিল। সকলেই তাহাকে পরমাত্মীয় বান্ধব ভাবিয়া অাপনাদিগের শােক-দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণার বােঝা তাহার ঘাড়ের উপর চাপাইয়া দিল। মহসীনও তাহা আনন্দিত মনে বহন করিলেন। সুতরাং তাঁহার আর কার্য্যের অন্ত রহিল না এবং বিশ্রামেরও অবসর রহিল না। রাগী রােগের যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে,-মহসীন সেখানে ঔষধ, পথ্য এবং সেবা-শুশ্রুষার ব্যবস্থায় ব্যস্ত হইয়া ফিরিতেছেন। শােক কাতর ব্যক্তি বুক-ফাটা ব্যথায় ক্রন্দন করিতেছে—মহসীন রােগী সপ্তম পরিচ্ছেদ সেখানে জ্ঞানের অবতাররূপে অবতীর্ণ হইয়া মধুর বচনে তাহাদের প্রচণ্ড শশাকে শান্তিবারি ঢালিয়া দিতেছেন। দুঃখে জরজর হইয়া, দারুণ নিরাশায়, যেখানে লােকে অকাল মৃত্যুকে ইচ্ছা করিয়া ডাকিয়া আনিতেছে—মহসীন সেখানে দেবদূত রূপে উপস্থিত হইয়া, তাহাদের দুঃখ কষ্ট দূর করিয়া দিয়া আশার আলাে জ্বালাইয়া দিতেছেন। এইরূপে, যখন যেখানে যাহার যে কোন বিশেষ প্রয়ােজন উপস্থিত হইতেছে-মহসীন কোনও না কোনও বেশে সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহার যথাবিহিত বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছেন। শুধুই কি তাই ? মহসীনের হস্তাক্ষর অতি সুন্দর ছিল। তিনি প্রতিদিন যথানিয়মে কোরাণের ভাল ভাল শ্লোক অনেকগুলি করিয়া নিজহস্তে কাগজে লিখিতে আরম্ভ করিলেন এবং এইরূপ অনেক- গুলি কাগজ লিখিয়া সে সকল ভিক্ষুকগণকে বিলাইতে আরম্ভ করিলেন তাহারা সেই সকল কাগজ লােকের বাড়ী বাড়ী, বেচিয়া—ভিক্ষার অপেক্ষা ঢের বেশী উপার্জন করিতে লাগিল। এইরূপে ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তি কমিয়া গেল। এ সকল ছাড়া মহসীনের আর এক অদ্ভুত কাৰ্য্য আরম্ভ হইল। প্রতিদিন রাত্রে যথানিয়মে তিনি নগরের পথে পথে ভ্রমণ, করিতে আরম্ভ করিলেন। তঁাহার মনের ধারণা ছিল যে, সংসারে আমােদ-প্রমােদের উচ্ছাস যতই বহিতে থাকুক না কেন—এখানে দুঃখ কষ্টের অন্ত নাই এবং তাহার অধিকাংশই যে কোথায় কি ভাবে ঘটিতেছে, তাহা সৰ্ব্বদা লােকের নজর পড়ে না। সেইজন্য তিনি প্রতিদিন রাত্রিকালে পথে পথে—দ্বারে দ্বারে ফিরিয়া লােকের অবস্থা জানিতে লাগিলেন এবং সাধ্যমত তাহার প্রতিকার করিতে আরম্ভ করিলেন। একদিন ঐরূপ নিশাভ্রমণে বাহির হইয়া তিনি এক বৃদ্ধার হাজি মহম্মদ মহসীন A চীরের নিকটে উপস্থিত হইলেন। বৃদ্ধা দরিদ্র, কিন্তু তাহার পুত্রকন্যা অনেকগুলি। উহাদের প্রতিপালন কবিবার সাধ্য বৃদ্ধার ছিল না এবং অন্য উপায়ও ছিল না। বালক বালিকগণ ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হইয়া চীৎকার করিতেছিল এবং তাহাদের নিরুপায় জননী নিদারুণ দুঃখে কাতর হইয়া তাহাদের সঙ্গে কাদিতেছিল। এ দৃশ্য দেখিয়া মহসীনের করুণহৃদয় গলিয়া গেল। তিনি আর মুহূৰ্ত্তমাত্রও সেখানে বিলম্ব না করিয়া এবং কোন কথাবার্তা জিজ্ঞাসা না করিয়াই সেই দণ্ডে আপনি গিয়া সকলের জন্য খাদ্যদ্রব্য আনিয়া দিলেন এবং সেই দিন হইতে তাহাদের সকলের নিত্য প্রতি- পালনের ভার গ্রহণ করলেন। আর একদিন রাত্রিকালে ভ্রমণ করিতে করিতে এক কুটীর দ্বারে অসিয়া দেখিলেন যে গৃহস্বামী অন্ধ । সে যে যথারীতি উপার্জন করিয়া আনিয়া পরিবার প্রতিপালন করিবে তাহার সে ক্ষমতা নাই। এইজন্য তাহার স্ত্রী অত্যন্ত রাগিয়া স্বামীকে প্রহার করিতেছে। এই দৃশ্য দেখিয়া, সেই দণ্ডেই মহসীন গৃহের জানালা দিয়া কতক গুলি রৌপ্যমুদ্রা ঘরের ভিতরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। টাকার শব্দে উভয়েই চমকিয়া উঠিল এবং দেখিয়াই অন্ধের স্ত্রী মহা আল্লদে সে সকল কুড়াইয়া লইল। মহসীন ততক্ষণে সেখান হইতে সরিয়া পড়িয়া- ছিলেন। তারপর তিনি তাহাদের ভবিষ্যতের বাঁধা বন্দোবস্ত করিয়া দিতেও কুটি করিলেন না। এইরূপে প্রতিদিন মহসীন যে কত দরিদ্র লােকের কত রকমে কত উপকার করিতে লাগিলেন, তাহার সীমা-সংখ্যা রহিল না। হিন্দু-মুসলমান ভেদ রহিল না, ইতর-ভদ্র ভেদ রহিল না—যেখানে দরিদ্র সেইখানেই মহসীন নানারূপে মুক্তহস্তে কল্পতরু হইয়া দান করিতে লাগিলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ . কিন্তু তিনি এ সকল দানের কাৰ্য ঘুনাক্ষরেও কাহাকেও জানিতে দিতেন না। এমন কি, তঁাহার ডান হাত কি দান করিতেছে তাহা বাঁ হাত পর্যন্ত জানিতে পারিত না—এমনি ভাবে নিজে লুক্কায়িত থাকিয়া দান করিতেন। কিন্তু ভগবানের এমনি মহিমা যে সাধুপুরুষের সেই মহৎকাৰ্য্য সংসারে কারও কাছে চাপা থাকিল না। ধর্ম নিজে ঢাক বাজাইয়া ধাৰ্ম্মিককে লােকসমাজে পরিচিত করিয়া দিলেন। । মহসীন যে হঠাৎ লােকের দুঃখ দেখিয়া গলিয়া গিয়া সেই সময়ে ইচ্ছাবশতঃ দান করিতেন—তাহা নহে। তাহার স্বভাবই-পরম দয়ালু। দানশীলতা তাহার একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এই মহৎ গুণেই তিনি সর্বদা—সকল অবস্থাতেই দুঃখীর দুঃখ মােচন করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িতেন) তাহার দাসদাসী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব যে যেখানে ছিল- তাহাদের সকলের সঙ্গেই মহসীন নিতান্ত মিষ্ট ও সদয় ব্যবহার করিতেন। কোন কারণেই কখনও কাহারও উপর বিরক্ত হইয়া বা রাগ করিয়া তিনি কঠিন বা কর্কশ ব্যবহার করেন নাই। এই কারণে সমস্ত সংসার আপনা হইতেই তাহার পরম অনুগত হইয়া পড়িয়াছিল। অষ্টম পরিচ্ছেদ মহম্মদ মহসীন নিজে উচ্চশিক্ষা লাভ করিয়া পরম পণ্ডিত হইয়া শিক্ষা- লাভের গুণ বুঝিয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, দেশের লােক যতই উত্তমরূপে শিক্ষালাভ করিতে পারিবে, ততই তাহাদের নিজের জীবনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের সমাজের এবং দেশের উন্নতি করিতে পারিবে। এইজন্য তিনি হুগলীতে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া বিদ্যালাভের পথ খুলিয়া দিলেন। সে বিদ্যালয়ে জাতিবিচার হাজি মহম্মদ মহসীন । - রহিল না, কি হিন্দু, কি মুসলমান—সকল ছাত্রগণই সমানভাবে বিদ্যা- লাভ করিতে লাগিল। তাহা ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশােহর প্রভৃতি স্থানে মাদ্রাসা- গুলির উন্নতি করিবার জন্য তিনি মুক্তহস্তে যথেষ্ট দান করিতে লাগিলেন।, এইরূপে এদেশে মুসলমান ছাত্রগণের শিক্ষালাভের পথ বিস্তৃত হইয়া পড়িল।2- সর্বদা চারিদিকে এত প্রকারে এত দান করিয়াও দানবীর মহসীন তৃপ্তিলাভ করিতে পারিলেন না। যিনি দয়ার অবতার হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, ফোয়ারার জল-ধারার মত সৰ্ব্বদাই যাহার দানের ইচ্ছা আপনা হইতেই উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছে--তিনি দান করিয়া শেষ করিবেন কেমন করিয়া ? অবশেষে ইংরাজী ১৮০ খৃষ্টাব্দে তিনি এক উইল করিয়া তাহার সেই বিপুণ সম্পত্তি সমস্তই ধৰ্ম্মকার্যের জন্য উৎসর্গ করিয়া দিলেন তাহার এই মহাদানের ব্যাপার দেখিয়া সমস্ত সংসারের লােক একেবারে অবাক হইয়া গেল। সকলেই আশ্চর্য্য হইয়া ভাবিতে লাগিল- মহম্মদ মহসীন মানুষ না দেবতা ? যিনি এই কুবেরের সম্পদরাশির একমাত্র অধিকারী হইয়া, নিজের জন্য এক কপর্দক ও না রাখিয়া যথা- সৰ্বস্ব ধৰ্ম্মের জন্য—পরােপকারের জন্য দান করিতে পারেন, তিনি যে আমাদেরই মত মানুষ ইহা কেহই বিশ্বাস করিতে পারিল না। মহম্মদ মহসীনের কাছারিতে—বহুলােক কৰ্ম্ম করিত। তাহার মধ্যে হিন্দুর সংখ্যাই বেশী। আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতে মহসীন ও অনেকটা হিন্দুদের মত ছিলেন। তিনি মাথা মুড়াইয়া, গোঁফদাড়ি ফেলিয়া পরম শুদ্ধ শান্তভাবে কর্মচারীগণের মধ্যে বসিয়া যখন বিষয়- কর্মের আলােচনা করিতেন, তখন দেখিলে কেহই তাঁহাকে হিন্দু ভিন্ন অন্য কোন জাতি মনে করিতে পারিত না।

অষ্টম পরিচ্ছেদ , উইলে তিনি এই সকল কর্মচারীকেও বাদ দিলেন না। তাহার কাছারীর খরচ ও কর্মচারীগণের বেতন প্রভৃতি বাবদ মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা স্থির করিয়া দিলেন। তাহার সংসারের ব্যয়ের খরচের জন্যও ব্যবস্থা রহিল। তা ছাড়া মহসীনের বিস্তর মাসিক বৃত্তি- দান ছিল। বহু দরিদ্ৰব্যক্তি যথানিয়মে মাসে মাসে মাসােহারা পাইয়া স্বচ্ছলে সংসার চালাইত। উইলে তিনি সেই সব মাসােহারাও বজায় রাখিলেন। এইরূপে সর্ববিষয়ে সুবন্দবস্ত করিয়া, উইল লিথিয়া সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি ধৰ্ম্মকাৰ্যে দান করার পর হইতে মহসীনের মুখে এক দিব্য শান্তির আলো ফুটিয়া উঠিল। দানবীর সেই মহৎ দান-যজ্ঞ সম্পাদন করিয়া যে তৃপ্তি ও শান্তি লাভ করিলেন তাহা এ জগতে দুর্লভ। মহম্মদ মহসীন বড় সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু তা বলিয়া বিলাসিগণের বৈঠকের খেয়াল, টপ্পা প্রভৃতি গীতে কখনও তাহার প্রবৃত্তি জন্মিত না, বরং সে সকলের নাম শুনিলেও তিনি মনে মনে ঘৃণা করিয়া দূরে সরিয়া যাইতেন। কিন্তু যেখানে কেহ ধৰ্ম্ম-সঙ্গীত গাহিতেছে, কেহ দেবতার উদ্দেশে সুর করিয়া স্তোত্র পাঠ করিতেছে—কেহ মধুকণ্ঠে কোরাণের বা হিন্দু শাস্ত্রের কবিতা আবৃত্তি করিতেছে-সেখানে তিনি বিভাের হইয়া শুনিতেন। শুনিতে শুনিতে এমনি আত্মহারা হইয়া ভগবানের উপরে মন-প্রাণ ঢালিয়া দিতেন যে, তখন তাহার দুই চক্ষু বাহিয়া শত ধারায় আনন্দাশ্রু গড়াইয়া পড়িত। ভােলানাথ সিংহ নামক যশােহরের এক ব্যক্তি খুব ভাল ধৰ্ম্ম- সঙ্গীত ও কীৰ্ত্তন প্রভৃতি গাহিতে পারিত। মহসীন তাহাকে আনাইয়া পরম সমাদরে আপনার কাছে রাখিয়াছিলেন। বিষয়-কর্মের অবসানে অবসর পাইলেই একমনে নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া ভােলানাথের গান শুনিতেন। শুনিতে শুনিতে ঈশ্বরের প্রেমে তন্ময় হইয়া ডুবিয়া যাইতেন। তখন ডাকিয়াও সাড়া পাওয়া যাইত না।

হাজি মহম্মদ মহসীন উপরের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিতেন আর বুক বাহিয়া জলধারা পড়িত। মহসীন মুসলমান হইলেও হিন্দুদের শাস্ত্র অত্যন্ত মান্য করিতেন এবং সে সকলের উপদেশ অমূল্য বলিয়া ভাবিতেন এবং সকলকে কহিতেন। নিজে তিনি বরাবর নিরামিষ আহার করিতেন এবং সর্বদা শুদ্ধাচারে থাকিতেন। জীবনে কখনও কোন অন্যায় কৰ্ম্ম করিতেন না, এবং আপনার অধীনস্থ কাহাকেও করিতে দিতেন না। এইরূপে তাহার চারিদিক বেড়িয়া সৰ্ব্বদাই নম্রতা, সব্বদাই সততা, সৰ্ব্বদাই সাধুভাব এবং শান্তি বিরাজ করিত। মহম্মদ মহসীনের আর এক মহৎ গুণ যে, তিনি হিন্দু ও মুসল- মানগণকে কখনও ভিন্ন ভাবে বা ভিন্ন চক্ষে দেখিতেন না। তাহার কাছে সকলেই সমান, সকলেই সেই এক জগৎপিতার সন্তান, সকলেই ভাই-ভাই ছিল। সুতরাং তিনি হিন্দু ও মুসলমানগণকে সর্বদাই এক প্ৰেমসূত্রে বাঁধিয়া রাখিতেন এবং যাহাতে পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব বর্ধিত হয়, পরস্পরের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা ও সহানুভূতি জন্মে তাহারই চেষ্টা করিতেন। তাঁহার শিক্ষার গুণে, তাহার অধীনস্থ সমস্ত হিন্দু ও মুসলমান কর্মচারী সকলেই পরস্পরের প্রতি বিশেষ স্নেহবান ও সহানুভূতিসম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছিল। মহম্মদ মহসীনের দানের কথা এবং মহত্ত্বের কথা একমুখে বলিয়া শেষ করা যায় না। দরিদ্রের দুঃখে তাহার অন্তরে যে প্রকার বজ্রশেল বিধিত, দুঃখীর রােদনে তাহার চক্ষু ফাটিয়া যে প্রকার শতধারা ছুটিত, ব্যথিতের বেদনায় তিনি যে প্রকার কাতর হইয়া পড়িতেন- সে রকম আর কাহারও শুনিতে পাওয়া যায় না। সেইজন্য, নিবিচারে ভেদাভেদ শূন্য হইয়াকি হিন্দু, কি মুসলমান, কি ইতর কি ভদ্র, সকলেরই দুঃখ দূর করিবার জন্য তিনি যেরূপ স্ব-ইচ্ছায় আপনার নবম পরিচ্ছেদ ৪১ যথাসর্বস্ব দান করিয়া গিয়াছেন, সেরূপ দৃষ্টান্ত এ সংসারে বােধ হয় আর দ্বিতীয় নাই। মনুজান মৃত্যুর পূৰ্ব্বে-ভ্রাতাকে বহুচেষ্টায় বিদেশ হইতে ঘরে আনাইয়া যখন তঁাহার সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের ভার অৰ্পণ করিয়াছিলেন, তখনও সেই মহাপুরুষ নিজে যেমন সম্পূর্ণ স্পৃহাশূন্য থাকিয়া কেবল পরােপকারকেই জীবনের একমাত্র মহাব্ৰত বলিয়া অবলম্বন করিয়াছিলেন, পরে ইংরাজী ১৮০৩ সালে মন্নজানের মৃত্যু হইলে মহসীন যখন স্বয়ং সেই অগাধ-সম্পদরাশির একমাত্র উত্তরাধিকারী হইলেন-তখনও তিনি নিজে সেই রকম স্পৃহাশূন্য থাকিয়াই কেবল পরােপকারেই তাহার যথাসর্বস্ব অর্পণ করিয়া দিয়াছিলেন। ইহাই প্রকৃত মহত্ত্ব। এরূপ মহত্বের কাছে দেবত্বও মাথা নোয়াইয়া দাঁড়ায়। কিন্তু শুধু পরােপকারী, দানবীর, মহাপুরুষ বলিলেই মহসীনের যথার্থ পরিচয় দেওয়া হয় না। অগাধ ঐশ্বর্যের অধিপতি হওয়ার পর হইতে মহসীন আর আপনার ছিলেন না—আপনাকে পরের হাতে বিলাইয়া দিয়া, সম্পূর্ণরূপে পরেরই হইয়া গিয়াছিলেন। তাই এ সংসারে যাহা কিছু তাঁহার আপনার বলিবার ছিল, যাহা কিছুর উপরে তাহার নিজের অধিকার ছিল সে সমস্তই পরকে বিলাইয়া, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেবল পরের কাৰ্য-পরের সেবা করিয়া গিয়াছেন। এরূপ নিঃস্বার্থ আত্মদানের কাহিনী জগতের ইতিহাসে বিরল। নবম পরিচ্ছেদ উইল করিয়া আপনার যথাসর্বস্ব ধম্মকাৰ্যে পরের সেবায় বিলাইয়া দিবার পরে মহসীন কেবল ছয় বৎসর মাত্র জীবিত ছিলেন। এই ছয় বৎসর ধরিয়া তিনি নিজেই আপনার উইলের বিধান অনুসারে কাৰ্য্য ১২ হাজি মহম্মদ মহসীন করিতে লাগিলেন। দীন দুঃখী, আতুর কাঙ্গাল, পীড়িত, ব্যথিত, শােকতপ্ত—সকলেই সংসারে সুখের মুখ দেখিলেন, সকলেই সেই মহা- পুরুষকে স্নেহবান পিতারূপে পাইয়া আপনাদের সকল অভাব পূর্ণ করিয়া লইল। দুঃখীর সংসারে আনন্দের স্রোত বহিল, মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল । সংসার হইতে দুঃখ-কষ্ট, শােক-তাপের চিহ্ন যেন মুছিয়া গেল। কিন্তু ভগবান বেশী দিন তা রাখিলেন না। ইংরাজী ১৮১২ সালে সেই দয়ার অবতার, নরদেবতা, সংসারের সকলকে কঁদাইয়া চিরকালের জন্য চক্ষু মুদ্রিত করিলেন। হুগলীতে মনুজানের মৃত দেহ যেখানে কবর দেওয়া হইয়াছিল—তাহার পার্শ্বে মহাপুরুষ মহসীনের কবর-শয্যা স্থাপিত হইল। তাহার মৃত্যুতে হুগলীনগরে যে শােকের ঝড় বহিল তাহা আর শীঘ্র থামিল না, সমস্ত হুগলী যেন অন্ধকার হইয়া গেল। মহসীন যখন দেশে ফিরিয়া আসেন, তখন রজব আলি খা ও সাকের আলি খাঁ নামক যে দুইজন ধৰ্ম্মবন্ধুকে সঙ্গে করিয়া আনিয়া- ছিলেন, তাঁহাদিগকেই তিনি উইলে তাহার মৃত্যুর পরে সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। উইলে তাহাদের প্রতি এই আদেশ রহিল যে তাহারা দুইজন একসঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া সদ্ভাবে এই বিষয়- সম্পত্তি দেখাশুনা করিবেন এবং যথারীতি বছর-বছর গবর্ণমেন্টের খাজান দিয়া বাকী টাকার নয় ভাগ করিবেন। এই নয় ভাগের দুই ভাগ তাহারা দুইজন আপনার পারিশ্রমিক স্বরূপ গ্রহণ করিবেন। বাকী সাত ভাগের তিন ভাগ ইমামবাড়ী ও মসজিদ সকলের সংস্কার ও উন্নতির জন্য এবং মহরম প্রভৃতি উৎসবে ও অন্যান্য ধর্মকাৰ্য্য উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হইবে। বাকী যে চার ভাগ থাকিবে, তাহা হইতে তাহার কর্মচারীগণের মাসিক বেতন, তাঁহার সংসারের খরচপত্র এবং তিনি যে সকল লােকের মাসিক বৃত্তি বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছিলেন—সেই সকল দেওয়া হইবে।

নবম পরিচ্ছেদ ৪৩ যদি এই অভিভাবক দুইজনের কেহ কোন কারণে এই কাৰ্য্য সম্পন্ন করিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হন, তাহাহইলে তিনি অন্য একজন যােগ্য ব্যক্তিকে তাঁহার স্থলে নিযুক্ত করিয়া নিজে অবসর লইতে পারিবেন। মহসীনের মৃত্যুর পর তিনবৎসর ধরিয়া ইংরাজি ১৮১৫ খৃষ্টাব্দ পৰ্যন্ত রজবআলি খাঁ ও সাকেরআলি খ উইলের আদেশ অনুযায়ী কর্ম করিলেন। কিন্তু অর্থ ই মানুষের যত অনর্থের মূল, ইহাই ভাল মানুষকে ও বিগড়াইয়া দেয়। সেই সময়ে ঐ দুইজন অভিভাবকের নামে নানারূপ কপা রটিতে লাগিল, এমনকি অনেকে সন্দেহ করিলেন যে মহসীনের উইন্সের আদেশ মত ঠিক কাৰ্য্য হইতেছে না। যখন এরূপ কথা রটিল, তখন গবর্ণমেণ্ট সে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করিতে বাধ্য হইলেন এবং উক্ত রজবআলি ও সাকের আলি ঠিক উইলের আদেশ মত কাৰ্য্য করিতেছেন কি না তাহা দেখিবার জন্য ইংরাজী ১৮১৫ সালে সৈয়দ আকবরআলি খাঁ নামক এক ব্যক্তিকে পরিদর্শক নিযুক্ত করিলেন। আকবর আলি খাঁর পরিদর্শনের গুণে রজবআলি ও সাকের- আলির কতকগুলি বিশেষ দোষ ও কাৰ্য-সম্পাদনে অনেক রকম গােলমাল এবং বিশৃঙ্খলা বাহির হইয়া পড়িল। পাছে সরকার বাহাদুর এ বিষয়ের জন্য তাহাদিগকে জবাবদাহিতে ফেলেন, সেই ভয়ে উক্ত রজবআলি এবং সাকের আলি দুইজনই কিছুকালের জন্য কাৰ্য ফেলিয়া সরিয়া পড়িলেন। কাজেই তাহাদিগকে পদচ্যুত করিয়া সরকার বাহাদুর সেই আকবৰআলি খাঁকেই সেই পদে নিযুক্ত করিয়া সম্পত্তির অভিভাবক করিলেন। তখন রজবআলি ও সাকেরআলি আর গা ঢাকা দিয়া থাকিতে পারিলেন না। তাহারা দুইজনে একযােগে গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ রুজু করিলেন।

৪১ হাজি মহম্মদ মহসীন ঘােরর মােকদমা বাধিয়া উঠিল। এখানকার আদালতের বিচারে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইল না-বিলাতে পর্যন্ত মােকদ্দমা চলিতে লাগিল। এইরূপে সতের বৎসর পর্যন্ত মােকদ্দমা চলিয়া বিলাতের “প্রিভি কাউন্সিলে তাহার নিষ্পত্তি চূড়ান্ত হইয়া গেল। তাহার ফলে রজব আলি ও সাকের আলি সম্পূর্ণরূপে হারিলেন। গবর্ণমেন্ট সমস্ত সম্পত্তির দেখাশুনা ও বন্দোবস্ত করিবার ভার পাইলেন। এই দীর্ঘকাল ধরিয়া মােক দমার সময়ে সম্পত্তির আয় হইতে সমস্ত খরচ-পত্র বাদে তহবিলে প্রায় নয়লক্ষ টাকা জমিয়া গেল। নয়লক্ষ টাকা বড় সহজ টাকা নহে। উহা ওইভাবে জমাইয়া রাখিলে মৃত মহাপুরুষের ইচ্ছা এবং উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। সুতরাং ওই টাকা গবর্ণমেণ্ট এ দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের সাহায্যে ব্যয় করিতে চাহিলেন । স্থির হইল যে, ঐ টাকায় হুগলীতে উপযুক্ত জায়গা জমী ও বাড়ী করিয়া একটি প্রথম শ্রেণীর উচ্চ কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হইবে। সরকার বাহাদুরের এই মহৎ উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে চারিদিক হইতে নানা প্রকার আপত্তি উঠিতে লাগিল। সকলে কহিল যে— মহসীন যখন কেবল ধর্মকাৰ্যে ব্যয় করিবার জন্য ঐ সম্পত্তি দিয়া গিয়া- ছেন তখন তাহাতে কালেজ করা হইতে পারে না, উহা কেবল ধৰ্ম্ম- কাৰ্য্যেই ব্যয় করা হউক। শেষে বহু তর্ক ও বিচারের পর স্থির হইল যে, পরসেবা ও দেশের সেবা পরম ধৰ্ম্মকাৰ্য্য। স্বয়ং মহসীন দেশে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া গিয়াছেন এবং দেশের, সকলেই যাহাতে সুশিক্ষা লাভ করে, সে চেষ্টা তিনি প্রাণপণে করিয়াছেন। সুতরাং ঐ টাকায় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইলে তাহার ইচ্ছাই পূর্ণ করা হইবে। অবশেষে তাহাই হইল। সেই টাকায় হুগলীতে প্রকাণ্ড জমী ও বাটী ক্রয় করিয়া সেই স্থানে ইংরাজী ১৮৩৬ খৃষ্টাব্দে এখনকার এই দশম পরিচ্ছেদ ৪৫ “হুগলী কালেজ” সর্বপ্রথম স্থাপিত হইল। সেই সঙ্গে সঙ্গে মহাপুরুষ মহসীনের নাম ও স্বদেশ ও বিদেশবাসীর অন্তরে অঙ্কিত হইয়া গেল । দশম পরিচ্ছেদ নাই। মন্ন জানের পিতা আগামতাহর হুগলীতে একটি ইমামবাড়ী প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার বিশেষ কোন উন্নতি করিয়া যাইতে পারেন নাই। তাহার মৃত্যুর পরে, তাহার ভাগিনেয় ও জামাতা মনুজানের স্বামী-সলাউদ্দীন কিছু অর্থ ব্যয় করিয়া তাহার কতকটা উন্নতি বিধান করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তখনও তাহার প্রকৃত শ্রীবৃদ্ধির অনেক বাকী ছিল । মহসীনের একান্ত ইচ্ছা ছিল যে, সেই ইমামবাড়ী এরূপ করিবেন যেন উহা বঙ্গদেশের মধ্যে সর্ববিষয়ে আদর্শস্বরূপ হইয়া উঠে। কিন্তু তাহার জীবনকালে তিনি ইচ্ছামত সে কাৰ্য্য করিয়া যাইতে পারেন তাহার মৃত্যুর পরে, উইলের অভিভাবক রজব আলি এবং সাকেরআলি তাে তাহাতে হাতই দেন নাই, সরকার বাহাদুরও মহসীনের সম্পত্তির বিলি-ব্যবস্থার নানা গোেলােযােগে এবং মামলা- মােকদ্দমার জন্য মৃত মহাপুরুষের সে মহৎ ইচ্ছা পূরণ করিয়া উঠিতে পারেন নাই। অবশেষে ‘হুগলীকালেজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পরে সে কাৰ্য্য আরম্ভ হইল। অনেক দিন ধরিয়া বিস্তর অর্থব্যয়ে ইমামবাড়ীর সংস্কার, পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন প্রভৃতি হইয়া ইংরাজী ১৮৬১ সালে সেই অট্টালিকার সম্পূর্ণ নির্মাণকার্য শেষ হইল। তখন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই দেখিয়া একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেল। সে সুদৃশ্য, সুন্দর, কারুকাৰ্য্যশশাভিত প্রকাণ্ড ইমামবাড়ীর আর তুলনা রহিল না সেই :

৪৬ হাজি মহম্মদ মহসীন হইতে “হুগলীর ইমামবাড়ী” ইতিহাসে চিরপ্রসিদ্ধ হইয়া চিরকালের জন্য হাজি মহম্মদ মহসীনের নাম, মহত্ত্ব এবং আদর্শ দানের কথা দেশ-বিদেশে কীৰ্ত্তন করিতে লাগিল। প্রকৃতপক্ষে “হুগলীর ইমামবাড়ী” এক অপূৰ্ব বিস্ময়কর ব্যাপার। যিনি স্বচক্ষে তাহা না দেখিয়াছেন তাহাকে বর্ণনা করিয়া বুঝানাে অসম্ভব। . সম্মুখে সুন্দর রাজপথ, ও রাজপথ, ও পশ্চাতে নৃত্যশীল গঙ্গা, এই ইমামবাড়ীর প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য যেমন শতগুণে বাড়াইয়া তুলিয়াছে, তেমনি ভিতরের সৌন্দর্য্যে কোনখানে কোন অংশে ইহা কম নহে। ইহার সিংহদ্বারের দুইপার্শ্ব হইতে দুইটি বৃহৎ উচ্চ চূড়া যেন আকাশ স্পর্শ করিতে ছুটিয়াছে—তাহাদের উপরে এক প্রকাণ্ড ঘড়ি। দ্বারে প্রবেশ করিলেই সম্মুখে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের সম্মুখেই নানা কারুকাৰ্য্যশােভিত প্রকাণ্ড ভজনালয় এবং তিন দিকে উচ্চ দ্বিতল অট্টালিকা। প্রাঙ্গণের মাঝখানে একটি জলাশয়ে নানাবিধ মৎস্য মনের সুখে থেলিয়া বেড়াইতেছে এবং তাহার মধ্যে সুন্দর ফোয়ারা হইতে জলধারা উপরে উঠিয়া আবার জলাশয়েই পড়িতেছে । চারিদিকের সমস্ত অট্টালিকার প্রাচীরের গাত্রে শত শত কোরাণের শ্লোক এবং মহসীনের অদ্ভুত দান-যজ্ঞের কথা খােদিত রহিয়াছে। ভজনালয়টি আবার মার্বেল পাথরে প্রস্তুত। সেথানে সাদা, লাল, নীল, সবুজ, হরিদ্রা প্রভৃতি নানা বর্ণের দীপাধার সজ্জিত। সেই আলােকসকল প্রজ্জ্বলিত হইলে, সে গৃহে যেন শত শত বিচিত্র বর্ণের রামধনুর হাট বসিয়া যায়। সেই বিচিত্র আলােরাশির তরঙ্গের মধ্যে বসিয়া যখন, শত শত উপাসক একমনে ভগবানের আরাধনায় নিযুক্ত থাকেন-তখন সেখানে এক অপূৰ্ব শান্তির ছটা যেন আপনা হইতেই চারিদিক উজ্জল করিয়া তােলে। মনে হয়, ভগবান স্বয়ং তাহার সমস্ত দশম পরিচ্ছেদ ৪৭ স্বর্গের ঐশ্বৰ্য্যরাশি লইয়া বুঝি সেইখানে আসিয়া-শান্তির রাজ্য পাতিয়া বসিয়াছেন। শুধুই কি তাই? সেই সুন্দর ইমামবাড়ীর ভিতরের অট্টালিকা সকলের মধ্যে, কোথাও বা তিথিশালা, সেখানে শত শত ক্ষুধার্ত ব্যক্তি প্রত্যহ অন্ন পাইতেছে, কোথাও মুসাফীরখানা—সেখানে শত শত বিদেশী লােক আশ্রয় পাইতেছে, কোথাও আতুরাশ্রম—সেখানে প্রত্যহ শত শত দরিদ্র আতুর সর্বপ্রকারে সাহায্য পাইয়া বাঁচিয়া যাইতেছে, আবার কোথাও বা, জ্ঞানবৃদ্ধ পণ্ডিতগণ কোরাণপাঠ এবং ধর্মচর্চা করিয়া সংসারের শােকতাপ দূর করিবার চেষ্টা করিতেছেন। এইরূপে হুগলী সহরের একদিকে উচ্চশিক্ষাদানের জন্য প্রথম শ্রেণীর বিদ্যালয় “হুগলীকালেজ” স্থাপিত হইয়া দেশবাসীকে যেমন নিত্য নিত্য জ্ঞানের উজ্জ্বল আলােকে আলােকিত করিয়া তুলিতেছে, অন্যদিকে সেই সঙ্গে আবার তেমনি ধৰ্ম্মের উজ্জ্বল মহিমায় মণ্ডিত করিয়া দিয়া, তাহাদিগকে মহিমান্বিত করিয়া তুলিবার জন্য প্রকাণ্ড ভজনালয়, দীন, দুঃখী, আতুরের সেবাস্থল, ধর্মশিক্ষা দিবার প্রশস্ত বেদী প্রভৃতি সম্বলিত অতুলনীয় ইমামবাড়ী মহসীনের কীর্তিগাথা প্রতিনিয়ত প্রচার করিতেছে। প্রকৃতপক্ষে মানবজীবনে উন্নতি সাধন করিয়া মানুষ হইবার যে দুইটি সর্বোচ্চ এবং সর্বোৎকৃষ্ট উপায় ও পথ-মহাত্মা মহসীনের অপূৰ্ব্ব দানের ফলে সেই দুই পথই দেশবাসীর সম্মুথে প্রশস্তভাবে মুক্ত হইয়া রহিয়াছে। ইহার অপেক্ষা মানবসমাজের অধিক উপকার কি দেবতারাও করিতে পারেন? এই মহৎ উপকারের একমাত্র উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং আদর্শ উপকারী মহাপুরুষই সেই হাজি মহম্মদ মহসীন। মহসীনের অসীম দানের ফলে শুধু যে এই দুইটিমাত্র মহৎ কাৰ্য্য সাধিত হইয়াছে, তাহা নহে। সংসারে কত দিকে, কত বিষয়ে, ৪৮ হাজি মহম্মদ মহসীন কত প্রকারে যে নিয়ত প্রভূত উপকার সাধিত হইতেছে তাহার সীমা- সংখ্যা নাই। মহসীনের সম্পত্তির আয় হইতে দেশে মুসলমান বালকগণের নানাপ্রকারে শিক্ষার সাহায্য হইতেছে, কত শত ধৰ্ম্মশালার উন্নতি হইতেছে, ধর্মচর্চার উপায় বৃদ্ধি হইয়াছে, শত সহস্র দীন দুঃখী গৃহহীন পথের কাঙ্গাল রক্ষা পাইতেছে। তাহা ছাড়া হুগলীর প্রকাণ্ড দাতব্য চিকিৎসালয় এবং হাসপাতাল তাহার অর্থেই স্থাপিত হইয়া দেশবাসীর যে নিত্য কি অসীম উপকার সাধন করিতেছে তাহা একমুখে বলিয়া শেষ করা যায় না। বস্তুতঃ হুগলীতে যে কোন প্রকার মানবের হিতকার্যের অনুষ্ঠান হইয়াছে—সে সকলই মহসীনের দানের ফলে। হাজি মহম্মদ মহসীন, মুসলমান সমাজের পরম গৌরবস্থল, বঙ্গদেশের পরম গৌরবস্থল, সমগ্র বঙ্গবাসীর পূজার দেবতা। যে দেশে এরূপ মহাপুরুষের জন্ম হয় সে দেশ ধন্য-দেশবাসী ধন্য । সামান্য মানব- রূপে জন্মগ্রহণ করিয়া তিনি যে অসীম যশঃ, অক্ষয় কীর্তি, ও অমর নাম দেশের ইতিহাসে চিরকালের জন্য উজ্জ্বল অক্ষরে অঙ্কিত রাখিয়া গিয়াছেন তাহা দেবতারাও পারেন কিনা সন্দেহ। যতদিন দেশে মানুষ থাকিবে, যতদিন মানুষের ইতিহাস থাকিবে, ততদিন হাজি মহম্মদ মহসীনের পুণ্যময় নাম বিলুপ্ত হইবে না। সম্পূর্ণ

No text on this page.

তিন-আনা-সংস্করণ গ্রন্থাবলী।
১। বিদ্যাসাগর
মাইকেল মধুসূদন
বঙ্কিমচন্দ্র
৪।
রাজা রামমােহন
কেশবচন্দ্র
ঠাকুর রামকৃষ্ণ
৭।
নেপােলিয়ন
রমেশচন
রামদুলাল সরকার
১০ ।
মহর্ষি দেবেন।
কৃষ্ণদাস পাল
১২।
সংবাদ মহসীন
আনন্দমোহন
ভট্টাচাৰ্য এও সন্
ভট্টাচায্য এও সম্
৬৫ নং কলেট, কলিকাতা।
ময়মনসি লাইব্রেরী, ময়মনকি

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Haji Mahammad Mahasin

Author
Bhattacharyya, Debendranath
Title
Haji Mahammad Mahasin
File name
Haji Mahammad Mahasin
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2010/02/13
Publisher
Sri Debendranath Bhattacharyya , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
64
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Bhattacharyya, Debendranath
DLI number
511082
Barcode
4990010018262.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
0CDX1McoYVQ
Download PDF

Haji Mahammad Mahasin