Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Aparajita
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পাজি,
eE
শ্ৰীষতীন্দ্রমােহন বাগচী
প্রকাশক
শ্রীসুবােধচন্দ্র দত্ত
৪, চৌরঙ্গী; মানসী আপিস, কলিকাতা
কলিকাতা
১১৫ নং আমহাষ্ট্রীট, একমি প্রেসে
নারায়ণচন্দ্র ঘােয দ্বারা মুদ্রিত
অপরাজিতার কতকগুলি রচনা ইতিপূর্বে
মানসী প্রবাসী ভারতী প্রভৃতি বঙ্গীয় মাসিকে
প্রকাশিত হইয়াছিল ; বাকী কবিতাগুলি নূতন।
যমশেরপুর :
১লা আশ্বিন ১৩২০
গ্রন্থকার
No text on this page.
বন্ধুবর
শ্ৰীযুক্ত বটুকৃষ্ণ ঘােষ এম. এ, বি. এল,
বি. এল, বার-এট-ল
করকমলেষু
No text on this page.
সূচী বিষয় পৃষ্ঠা ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ অপরাজিতা আগমনী কোজাগর-লক্ষ্মী বিধবা জীবন ও মৃত্যু বাসনা ৫০০ ০ ০ ০ ৫০০ ••• মঞ্জুর সন্তান :: ০ ০ ০ ••• ০ ০ ০ ২১ মায়ের মন ২৪ ১. ৫ ২৫ | . . . :: ০৮০ ফানে কাঞ্চন সন্ধ্যামণি নববর্ষা পূজাগৃহে ময়না বাতায়নের দীপ ৩ঃ • . ০ ০ ৫০ ৫ । প্রেম ও মৃত্যু ত্যক্ত গৃহ ৫ ০ ০ ০ ০ ০ ০ * ০ ০ . . . রাজকুমারী দল ও পরিমল । । । ০০০ ৩০০ [ ৩ ] ••• ৩ . . ০ ০ ০ ০ ০ ও । ••• ৭৪ ০ ০ ০ ••• ••• নিবেদন অভিশাপ কটাই শুকনাে পাহাড়ে ফুল সাত্বনা নিরুপায় চকিত পত্র-পরিচয়। রবীন্দ্রনাথ অভ্যর্থনাসঙ্গীত '... ৭৮ ••• : ৮১ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৩ ৩ ০ ০ ০ ০ ঘুম-হারা ••• ০ ০ ০ কালাে অভিমান 'বরাত মুরুব্বি লীছেলে ১৪ ০ ০ ০ ৫০ ৮ : ০ ৩ ০ ০ ০ ০ ০ ৮ পাণ্ডা ০ ০ ০ ••• ••• • ৩ | / দ্বিজেন্দ্র-বিয়ােগে বিরাগী ১০১ ৫০০ ৪ ০ ০
অপরাজিতা
অপরাজিতা
পরাজিত তুই সকল ফুলের কাছে,
তবু কেন তাের অপরাজিতা নাম ?
গন্ধ কি তাের বিন্দুমাত্র আছে—
২, সেও ত নয় নয়াভিরাম ।
ক্ষুদ্র শেফালি, তারাে মধু সৌরভ,
ক্ষুদ্র অতসী, তারাে কাঞ্চন-ভাতি ;
গরবিনি, তাের কিসে তবে গৌরব
রূপ 'গুণহীন বিড়ম্বনার খ্যাতি।
কালো আঁখিপুটে শিশির-অশ্রু ঝরে
ফুল কহে, মাের কিছু নাই-কিছু নাই ;
তােমরা যে নামে ডাকিয়াছ দয়া করে,
আমি শুধু ভাই, তাই--আমি শুধু তাই !
২
অপরাজিতা
ফুলসজ্জায় লজ্জায় যাইনা,
পুষ্পমালায় নাহিক আমার স্থান;
প্রিয়-উপহারে ভুলেও কি মােরে ডাক ?
বিবাহ-বাসরে থাকি আমি ম্রিয়মান।
মাের ঠাই শুধু দেবের চরণতলে,
পূজা-শুধু পূজা জীবনের মাের ব্ৰত ;
তিনিও কি মােরে ফিরাবেন আঁখিজলে-
ট, তিনিও তােমারি মত ।
আগমনী আজি, রজনী না হ’তে ভাের, শিশির-আর্দ্র বাতাসের মুখে বারতা পেয়েছি তাের; তবু ছিল মনে সংশয় পাগল হাওয়ার এমন কথাটা বুঝি-বা সত্য নয় ! শুভ্র রােদের সাদা আলিপনা উঠানে পড়িতে ধীরে, বুঝি জননি, সন্তান-গৃহে আবার এলি মা ফিরে ; তবে, কোথায় লুকালি ব- এতদিন পরে এলি যদি মাগাে, কোথা শিখে এলি ছল ? সারা দিনমান আর পাইনিক আমি খুজে-খুজে-খুজে’ কোন সন্ধান মার! শুধু, বারেক দুপুর বেলা, যৰে রােদে আর মেঘে নদীসৈকতে খেলাইতেছিল খেলা,
৪
অপরাজিতা
এক বার যেন চখার কণ্ঠে পেয়েছি তার সাড়।
মন্দিরে-ঘরে মিছা খুজিলাম, ঘুরিলাম সারা পাড়া।
ওগাে, কেমন যে তুই মা--
এই তােরে পাই, নয়ন পালটি' এই আর পাই না।
এইবার পেনু তােরে,
সন্ধ্যা-রঙীন শিউলির আড়ে লুকাবি কেমন করে ?
আবার লুকাতে চাস?
ঐ যে দুলিল পুষ্পিত শাখা, ঐ যে পড়িল শ্বাস!
আঁধার ঘনায়, তবু দেখা যায় দোপাটির ফাকে-ফাকে
মা তাের সাড়ীর পাড়ের প্রান্ত—আর ফাঁকি দিবি কাকে ?
ঘুরিতে বেড়ার ঘের,
টরের মুখে হাসিটি রাপিয়া কোথায় লুকালি ফের !
তাের—রক্ত-চরণতল
মনে হল যেন ছুইলাম বৃঝি, মুদিল কমলদল !
ব্যথায় ফিরাব মুখ
সন্ধ্যা-হাওয়ায় পরশিলি গায় জ্যোৎস্না-চীনাংক ;
অমনি উর্ধে চাহিয়া হেরিনু পঞ্চমী-রাকা-চাঁদে
মা তোর মুখের মােহন ভঙ্গী আধ-ঢাকা বাঁকা ছাদে ;
তারা-ঘেরা কেশভার
মেঘের গা দিয়া গড়য়ে পড়েছে দূর দিগন্তপার !
-
আগমনী
মা তাের একি এ ভাব।
এই হেরি তাের রূপ, ফিরে দেখি অরূপ আবির্ভাব ।
অরূপ লুকায় রূপে,
রূপ ও অরূপ মিলায় আবার অপূৰ্ব্ব অপরূপে !
দশদিকে তাের হেরি রূপরাশি, কোন দিকে নাহি পাই।
স্বৰূপের মাঝে মন ও চক্ষু ডুবে যায়-ডুবে যায়।
একবার কাছে আয়,
দেখা দে মা আজ-দেখা দে মা আজ মুক্তির মহিমায়।
95)
কোজাগর-লক্ষী
শঙ্খধবল আকাশ-গাঙে স্বচ্ছ মেঘের পাটি মেলে
জ্যোৎস্না-তরি বেয়ে তুমি ধরার ঘাটে কে আজ এলে ?
ক্ষীরােদ-সাগর-ছেচা চাঁদের টীপটি দেখি ললাটপটে,
কুমুদমালার বরণডালা লুটায় তব চরণতটে,
কাশের কোলে চামর দোলে, ছত্র শােভে ছাতিম ফুলে,
আসন তােমার পাতা দেখি শুক্তি-গাঁথা নদীর কূলে
তুমি কি মা লক্ষ্মী আমার পঁড়ালে মাের কুটীর-দ্বারে,
জ্যোৎস্না-তরি বেয়ে এসে মুক্তা-ধবল ধরার পারে ?
কে বলে রূপ নাই দেবতার-কে বলে তার মূর্তি নাহি ?
যে বলে সে নয়ন মেলে আজকে রাতে দেখুক চাহি’।
দেখুক এসে অবিশ্বাসী আমার মায়ের রূপটি কিবা,
চরণে তাঁর লুটায় কিনা লক্ষ ঈদের রৌপ্য-বিভা ।
কোজাগর-লক্ষ্মী
কোজাগরের লক্ষ্মী হের—এলেন আজি মূর্তিমতী,,
চন্দনে ও আলিম্পনে অর্ঘ্য রচ’ ভাগ্য-তি;
গাঁথ মালা শুভ্র ফুলে সাজাও ডালা লাজের রাশে;
শ্বেতপাথরের থালা ভরাও নারিকেলের শুক্ল শাঁসে ;
শর্করা আর ছানার যােগে ভােগের খালা পূর্ণ কর,
শঙ্খপরা গৌর হাতে ধৃতের দীপটি তুলে ধর;
আত্মা ‘পরে দৃষ্টি রাখ, মনের মলা ফেল ধুয়ে-
শুভ্র প্রাণে ও বাসে প্রণাম কর চরণ ছুয়ে।
প্রণাম কর—উর্ধে হের বিশ্বভুবন সিক্ত করে
মায়ের আণীষ-কিরণ-ধারা মাথার ‘পরে পড়ছে ঝরে’ ;
চক্ষুমনের তৃপ্তিভরা দীপ্তিমতী মূর্তিখানি
দেখরে চেয়ে অবিশ্বাসী কোজাগরের লক্ষ্মীরাণী ।
বিধবা
আঁচলোপা দীপের মত তনুটি বেড়ি দুকূলে,
রুক্ষ্ম কেশ এলায়ে পিঠে-ঘক্ষে-
কে তুমি দেবি, দেখাও আলাে তুলসীবেদীদেউলে
নিত্য সাঁঝে নীরব নত চক্ষে ?
নামায়ে দীপ যুক্তকরে কিসের তব মিনতি,
চাওয়ার তব কি আর হেথা আছে গাে-
কষ্ট বেড়ি টানিয়া বাস কাহারে কর প্রণতি,
দেষতা নিজে তােমারি কৃপা যাচে গাে ।
•
ক
: তুলসীতরু শিহরি’ উঠে তােমার কপরশে,
দীপের শিখা কাপে তােমার দৃষ্টিতে ।
সন্ধ্যাতারা তোমারে হেরে 'জলে সে হের হরষে,
মন্দ বায়ু মুরছি মরে সৃষ্টিতে;
দিলৰ হের তােমারি গেরুয়াবাসে সজ্জিত,
আকাশ হের করুণকম কান্ত,
মুখরা ধরা মৌন তব হেরিয়া হের লজ্জিত,
স্যাদেবী তোমারি মত শান্ত।
-
“কণ্ঠ বেড়ি’ টানিয়া বাস কাহারে কর প্রণতি,
দেবত। নিজে তােমারি কৃপা যাচে গো !”
জীবন ও মৃত্যু
জন্মের মাঝে মৃত্যুর বাস,
সুখের মাঝারে দুখ ;
ওরে মন, তুই জেনে-শুনে’ তবু
কেন বিষন্ন মুখ ?
ফুলের কোরকে ফলটি হেরিয়া
ব্যথা পেয়েছিস কবে ?
জীবনের মাঝে মরণে দেখিয়া
নয়ন মুছিতে হবে!
চন্দ্র সূর্য অস্ত যায় সে,
আবার ফিরিয়া উঠে;
ফলটি ফলায়ে ফুল ঝরে যায়,
সেই ফলে ফুল ফুটে।
অপরাজিতা
১১
দিবসের শেষে রাত্রি আসেই
দিন আর ফিরেনা কি ?
তােরি সে মৃত্যু-রাত্রির শেষে
দিবস রহিবে বাকী।
মৃত্যুর মানে শেষ নয় শুধু--
নব-জীবনের সূত্র ;
দুঃখের কোল ভরি’ দেখা দেয়
আনন্দবপুত্র!
রে অবিশ্বাসী, সৃষ্টির বিধি
তােরি তরে হবে ভিন্ন ?
বিশ্ববিধানে চুনে-চুনে’ নে রে
এক-ই সে চরম-চিহ্ন।
জীবন-মৃত্যু সঁহারি সে দান,
তারি দান সুখ-দুখ ;
ওরে মন, তুই সেই বিশ্বাসে
বেঁধে নেরে আজ বুক।
সুখ ও দুঃখ-চড়া আর খাদ
উঠে নামে ঘুরে-ঘুরে’
বেজে উঠে তায় পূর্ণ রাগিণী
জীবন-যন্ত্রস্বরে !
বাসনা
এই বাসন্তী বাতাসের মতন
প্রাণ কেন মাের হয় না ;
কেন এপার হতে ওপার, সারা
ভুবন ভরি’ বয় না ?
এই মনােৰনের পুষ্পগাছে
যা কিছু মাের গন্ধ আছে—
সবার কাছে বিলিয়ে দিবার
ভার কেন সে লয় না !
*
ধনীর যেথা বিরাম-ভবন
ভক্ত যেথায় পূজে,
দুঃখী যেথা বিছায় শয়ন
প্রণয়ী প্রেম খুজে
সেই সবার সেবার সেবক হয়ে
সফল কেন রয়না !
কেন উদারতায় উদাস হয়ে
সকল বাধা সয় না ।
৮
মঞ্জুর
বৃদ্ধা পৌষ শীত-জর্জর, শিরে কুহেলির জটা,
মিটমিট করি’ মেলিয়া আকাশে ঝাপসা দৃষ্টি কটা ;
প্রভাতে প্রদোষে লতা-পাতা-ঘাসে শিশিরের জাল বােনে-
কভু উদাসীন রােদে পিঠ দিয়া বসি’ রয় আনে।
বিড়বিড়, বকি’ লাঠি ঠকঠকি’ কভু ঘন নাড়ে মাথা,
খস্থ করি’ অমনি খসিয়া পড়ে সে গাছের পাতা ;
কভু ক্রোধে সারা যেন জ্ঞানহারা, নাসিকায় শ্বাস পড়ে-
বিশ্বজগৎ উত্তরবায়ে থরথর করি নড়ে।
'এল শীতকাল-খেজুরের গাছে ভাঁড়টি হয়েছে বাঁধা,
আঙিনার কোল ভরিয়া ফুটেছে গৃহের দুলাল গাঁদা;
সকালে কুয়াসা বৈকালে ধোঁয়া, সাথে উত্তর বায়,
মাথার উপরে সারি দিয়া সাঁঝে হাঁসেরা উড়িয়া যায়।
'১৪
মধুর
এ হেন সময়ে গ্রামের প্রান্তে বেদেদের ছাউনিতে
সংসা উঠিল মহা কোলাহল, কেহ নামে থামাইতে;
রাজার পাইক নায়েছে আসি’ বেজায় হুকুম কঙ্গ,
বর্বরদল তাই চঞ্চল, কষ্ট হয়েছে চড়া!
কয়দিন হ’ল এসেছে ইহারা, ছাউনি ফেলেছে মাঠে,
সেই হ’তে ভয়ে মেয়েরা একেলা চলেনা দীঘির ঘাটে
গৃহী-গৃহস্থ শশব্যন্ত ঘটি-বাটি সাবধানে,
জননীরা ভয়ে আগলায় শিশু প্রমাদ গণিয়া প্রাণে।
পুরুষ ও নারী-সতেরটি লােক বুড়-বেদিয়ার ফলে
সতেরটি লােক মাথা গুজি’ রয় তিনটি তাবুর তলে ;
সাতটি অধ, নটি গর্দভ, বানােটি ছাগল, আর
‘বন্ধু’ বলিয়া ছাগশিশু এক সঙ্গের সাথী তার ।
জাতিতে বেদিয়া, পেষা সে ভ্রমণ—ভ্রমণই জীবনযাত্রা,
দেশে দেশে ফিরে, যতদিনে যার ফুরায় আয়ুর মাত্রা ;
গৃহধনজন—যা কিছু সঙ্গে, হাতিয়ার শুধু সাথী
দীর্ঘ বরষা, তারি ভরসায় কাটায় দিবসতি।
ক্ষুধার খাদ্য বনের জন্তু, অন্নের নাহি ঠিক,
কভু মিলে কভু মিলেনাক যাহা-গণেনা তা নির্ভীক।
চিরবারমাস সদা যার বা অরণ্য মাঝখানে,
হাতের লক্ষ্য মিলায় ভক্ষ্য, অধু তাই তারা জানে।
AA
১
My -R
.
জাতিতে বেদিয়া, পেষা সে ভ্রমণ-প্রমণই জীবনযাত্রা,
দেশে দেশে ফিরে, যতদনে যার ফুরায় আয়ুর মাত্রা :
চিত্রকর-অসিতকুমার হালদার
No text on this page.
অপরাজিতা ১৫ সবে দুবছর ঘােরেনি এখনাে, ফিরে এই গ্রামে আসা, শানের পারে বাতাড়ের ধারে তেমনি বাঁধিয়া বাসা; পল্লী যুড়িয়া শঙ্কিত হিয়া-সন্দেহ-কাণাকাণ, জমীদার ভাবে—এ আবার কি পাপ এল মা জানি। বিশেষতঃ সেই বহুবাল্যের স্মৃতি মনে পড়ে ঘুরি’- পিতার চিন্তা মাতার কান্না-বাড়ী হতে ছেলে-চুরি ; সেই খোজ সেই খানাতাসি, সন্দেহ কত-মত- বহুদিন ধরি’ পুলিশের সেই শান্তি-শাসন যত । সে ত বহুকাল ; আধশতাব্দি গিয়াছে তাহার পরে, সেকালের লোক বিলুপ্তশােক গিয়াছে লােকাকারে ; তবু সেই হ'তে সন্দেহ এক আছে সবাকার প্রতি সাধু সন্ন্যাসী বেদিয়া ফকির-ভেদ নাই এক রতি। আরাে সে কারণ, বুদ্ধের দলে ‘ঘুণী বলে যে মেয়ে ছাগল নাচিয়ে পথে-পথে ফিরে তুর্কী গজল গেয়ে জমীদারতা ঝরণা’র সাথে মিল আছে নাকি তার! দুজনে যাহারা দেখেছে, তাহারা তাই বলে বারবার। যাউক সে কথা—নাহি যার মাথা, নিকাশ যাহার নাই, সে স এব ভাবিয়া কি হবে ? এখন যাহা উপায়- কোনমতে সৰ দূর করে দেওয়া আপন এলাকা হতে ; আজই দরবারে উপায় তাহার হইবেই কোনমতে।
১৬
মঞ্জুর
সূর্য তখন অস্তে ব্যস্ত ঝাপসা মেঘের পারে,
ইক্ষুর আটি লইয়া কৃষক ফিরিছে বনের ধারে ;
সারি-দেওয়া-দেওয়া লঙ্কার ক্ষেতে আঁধারে লুকায় লাল,
হিমে-ভিজা-ধূল পল্লীর পথে ফিরিছে গরুর পাল।
শিকার সারিয়া পুরুষ যােয়ান ফিরিছে বেদের ঘরে,
রমণীরা ফিরে ডালা-কুলা বেচি’ ‘বাথানপাড়’র চরে ;
কেহ বা ফিরিছে ‘বাত ভাল করি’, কেহ-বা মন্ত্র পড়ি
প্রণয়-রােগের ওষুধ বিলায়ে, বিকায়ে শিকড়-জড়ি।
‘দড়াবাজি’ সেরে ছােকরার দল ফিরে কাধে বহি’ বাঁশ,
‘ধনেশ পাখীর তেলের বদলে আনি’ বসনের রাশ;
শেয়ালের শিং, বাদুড়ের জিভ, কালাে-নেউলের দাত
বিক্রয় সারি’ প্রৌঢ়া জনৈক ফিরিল—তখন রাত।
ঘাগরাটি আঁটা, কেশে বাঁধা জটা, কঁাচলিটি কসা বুকে,
হিল্লোলে-ভরা দেহবল্লরী নােয়ায়ে সকৌতুকে
ঘূর্ণী তাহার ঘুন্টির হার বাঁধিছে ছাগের গলে-
বুড়া মঞ্জুর—আঁখি স্নেহাতুর, হেরে বসি’ ভূমিতলে।
এমনি সময় জমীদারদূত চারিজন লাঠিহাতে
আসিয়া দাঁড়াল-রাজার হুকুম যাইতে হইবে সাথে
কড়া আঁখি আর চড়া কথা ক্রমে বিবাধ বাধা’ল শেষে
বুঝয়ে-থামায়ে উঠিল বৃদ্ধ-লাঠি হাতে মৃদু হেসে।
অপরাজিত ১৭ রাজা মহাশয় যেথা বসি রয় সন্ধ্যার দরবারে, বুড়ারে লইয়া হাজির করিল, প্রহরী দাড়াল দ্বারে ; বুড়া মঞ্জুর বিস্ময়াতুর নােয়ায়ে পলিত শির মৃদু হাসি ধীরে কুর্ণিশ করে দাড়ায়ে রহিল স্থির। চিবায়ে তখন রাজা ধীরে কন—মঞ্জুর তব নাম? বেদিয়ার দলে কতদিন বাস, কোথায় আদিম ধাম ? প্রতি বৎসরই আস হেথা দেখি-মৎলােভথানা কি? চুরি পেশা বটে ? দলেবলে সব পুলিসে ধরায়ে দি। কি বলিবে বল, নতুবা শিকল পড়িবে এখনি পায় ; তবু কথা নাহি, নতমুখে চাহি’ বুড়া রহে নিরুপায় ! নির্বাক দেখি রাজা কহে, একি? ত্বরিৎ জবাব চাই- পুলিস কিন্তু আনিব এখনি—সত্য যদি না পাই। জীবনে কখনো মিথ্যা বলিনি, আজি বা বলিব কেন? তমা চেয়ে রাজা আমার বয়স কম নয় তাহা জেন; তবু আজ যেন সত্য বলিতে কণ্ঠ উঠিছে কাপি’ কেন অকারণ শুধাও রাজন, আমিও তা রাখি চাপি। শুধু এইটুকু বলিবারে পারি, নাহি কোন অপরাধ ; আজি গৃহহীন, ছিল একদিন বিধাতা সেধেছে বাদ । | ভালই হয়েছে সব দেশ দিয়ে এক দেশ নিল কাড়ি’ যে ক’দিন বাঁচি, যেখানেই থাকি—সেই মাের ঘর-বাড়ি।
১৮ মঞ্জুর পাকা জুয়াচোর হবে নিশ্চয়, তত্ত্বের কথা বলে- প্রশ্ন যা করি জবাব দেয় না, আর এক পথে চলে । দুটি সােজা কথা চাহি শুধু আমি—বল তুই শুধু কে- ছাগল নাচিয়ে পথে-পথে ফিরে, কে বা হয় তাের সে ? শােন তবে আজ, শােন মহারাজ যে কথা বলিনি কারে, বিচারের ভয় করিনা তােমার-সে হবে আরেক দ্বারে ; শুনেছি যা কাণে, বলি তাহা এখানে-আমি তােরি বড় ভাই- বেদিয়ার দলে চুরি গিয়াছিনুকবে তাহা মনে নাই ! সর্দার বলি’ মানিতাম যারে,-তারি মুখে এক দিন শুনেছি এ কথা ; সত্য-মিথ্যা জানেন ভাগ্যহীন । ঐ মাঠে আর এই শীতকালে, দশটি বছর আগে শুনিয়াছি ইহা ; গিয়াছে সে চলি’-কথা তার মনে জাগে ! ; নিজ পরিচয় কি যে বিস্ময় বেদনা জাগাল প্রাণে, আমি জানি আর অন্তরযামী যদি কেউ থাকে জানে। তারি পর থেকে লুকাইয়া দেখে’ শিখিয়াছি লেখাপড়, আর তা কি হবে? জীবন-নদীতে জাগিছে মরণ-চড়া। এই বাড়ীঘর লােকলঙ্কর আমারও পারিত হতে, তা’না হয়ে কিনা বৰ্বর হয়ে চলিয়াছি কোন্ পথে ! সেই হ’তে ভাই, মনে সুখ নাই; তবু ঘুরে-ঘুরে’ আসি- দূরে থেকে তবু অজানা আপনে দেখি—তাই ভালবাসি।
অপরাজিতা আর কটা দিন ? চুকিয়াছে ঋণ-যাব আর এক দেশে, মনে হয় সেই সন্ধ্যার হাওয়া লাগিছে ললাটে এসে। এ জীবনে ভাই, কভু কোন দিন দাড়াইনি তাের পথে এক অনুরােধ-প্রথম ও শেষ, রাখ ভাই কোনমতে। সহসা সেথায় কোথা হতে এল পরীর মতন মেয়ে ছাগশিশু নিয়ে ঘাগরা ঘুরিয়ে ঘুর্ণী সে, দেখি চেয়ে ! কঁদি কয় বুড়া—ছিল একজন, সেও ছেড়ে গেছে মােরে, যাবার সময় বেঁধে রেখে গেছে-ঐটুকু মায়াডােরে। খামিল যখন, রাজার তখন জ্ঞান এল যেন ফিরে’ বেদের দুহিতা মাঝে যেন হেরি’ আপন দুহিতাটিরে ! তাড়াতাড়ি উঠি’ কাছে এল ছুটি’—পুনরায় গেল ফিরে’! রাজ-দরবার হ’ল চুরমার-কবাট পড়িল ধীরে ! সেদিন রাত্রে ভারি দুৰ্যোগ, জলঝড় সারারাতে; একে শীতকাল, তায় ককনে উত্তর বায়ু সাথে । ভীষণ আঁধার-ঢাকা চারিধার নিরঙ্ক কালাে মেঘে, বজ্রের ডাক-প্রলয়ের শাক মেঘেতে উঠেছে জেগে। বুড়া জমীদার করে হাহাকার, নিদ্রা নাহিক চোখে। থেকে-থেকে কয়—আর কিছু নয়, কি বলিবে সব লােকে। ঘুরে-ফিরে আসে ঝরণার পাশে, চুপ করে দেখে মুখ- কন্যা বলিয়া কেঁদে উঠে হিয়া, গুরুগুরু করে বুক।
২০
মঞ্জুর
রাত্রি তখনাে রয়েছে—যখন বাহিরিলা একা পথে,
প্রহরীরা সব সাথে যেতে চায়, ফিরাইলা দ্বার হ'তে।
ঝটিকা তখনাে হাঁকে ঘনঘন-ধরিয়া এসেছে জল ;
বিদ্যুতালােকে পড়িল সে চোখে অদূরে শ্মশানতল!
অতি দ্রুত পায়ে উতরিল বয়ে, প্রান্তর-পরপারে-
দাদা বলি’ জোরে চীৎকার করে ডাকিল বনের ধারে—
-কেবা কোথা হায়! চিহ্নও নাই ! আবার আসিল জল ;
মাথার উপরে হাসি হা-হা করে’ উড়িল হাঁসের দল ।
>
সন্তানক
সেদিন সাঁঝে ছিলনা কাজ হাতে,
জানালাপথে বাহিরে ছিনু চেয়ে ;
প্রাঙ্গনেতে মালীর ছেলে সাথে
খেলিতেছিল আমারি ছােট মেয়ে।
দুইটা সাথী-বয়স প্রায় সমান,
ঐ টুকুনই দুটির মাঝে মেলে ;
তফাৎ সবি, হয়না দিতে প্রমাণ
আমার মেয়ে—আর সে, মালীর
ছেলে!
হােগে যাক্, খেলা বই ত নয়,
অন্য লােকে জানবে বা কি করে?
সন্ধ্যা হলেই ভাবে পরিচয়,
মালীর ছেলে ফিরবে তাদের ঘরে।
সন্তান কিন্তু দেখি, এও ত লাগে বেশ দুটি যেন আপন ভায়ে-বােনে খেলায় মেতে, নাইক ভেদ-লেশ- সকল ভুলে’ খেলে আপন মনে! - ভালবেসে এ ওর ঘাড়ে চড়ে, মধুর হেসে ও এরে টানে কোলে, ইহার কেশে ঘাসের মালা পড়ে, বক্ষদেশে উহার হার দোলে। বড় মধুর শিশুর ছেলেখেলা- বড় মধুর কাচা-মুখের হাসি ! কেন ফুরায় এমন সুখের বেলা কেন শুকায় এমন ফুলের রাশি? চাইতে চক্ষু আর্দ্র হয়ে আসে- কে মিলালে অমিলের এই মিল । ধনীর ছেলে গরীব ভালবাসে, কে খুলিল অসম্ভবের খিল ? এ কি! আবার মারামারি এ কি ? ও কি ! আমার খুকীর গায়ে লাথি! সে অপমান আমি চেয়ে দেখি- খেলিস বলে তুই কি তাহার সাথী ?
অপরাজিতা
বিষম রেগে ডাকিয়া দয়ােয়ানে,
হুকুম দিনু ধরিয়া আন্ ওরে ;
নিমেষ মাঝে বাঁধিয়া তারে আনে
দাড়াল আসি’ মুখটি নীচু করে।
চাবুক লয়ে মারিতে গেনু যেই,
খুকী—সে আসি’ আছাড়ি’ পড়ি’ পায়ে
কহিল কাদি’--উহার দোষ নেই,
আমিই আগে মেরেছি ওর গায়ে।
ভুলি রােষ কন্যাপানে চেয়ে
স্বর্গ যেন উঠিল ফুটি চোখে ।
অশ্রু এল নয়নপরে ছেয়ে,
বাক্যহীন রহিল যত লােকে।
নিমেষে ভুলি’ মান ও অপমান,
দুজনে টানি’ নিলাম দুই কোলে
আমারি চোখে চাহিল ভগবান,
আমারি বুকে ‘সন্তানক’ দোলে?
মায়ের মন
দক্ষিণাগত সুমন্দ বনবাতে
সৰু-সৰু-সৰু কঁপে যথা বেণুবন,
পথিক-নয়ন মােহি’ শ্যাম সুষমাতে
তেমনি আবেগে কাপে সদা মার মন !
দক্ষিণবাহী আকুল মলয়বায়
বেণুবনশাখা যেমন অধীরে কাপে,
পুত্রে যদি সে সুপুত্র নাহি পায়—
শঙ্কাদোলায় মা তেমনি দিন যাপে।
গিরি-নিঝর-বারণ সে মানেনা যে,
যত ছুটে—তত আবিলতা আরাে জোটে;
যত সন্তান ধরে সে ধরণীমাঝে-
মার আকুলতা তত আরাে বেড়ে ওঠে।
গায় বুলবুল-সুস্বরে ফেলে ছেয়ে,
সুরের সুধায় ভরিয়া তুলে সে কান ;
সহগুণে সুমধুর তারাে চেয়ে
মার কাছে তার পুত্রের যশােগান
(চীনা কৰিত
ফাল্গুনে গ্রীষ্ম গিয়েছে ঠাণ্ডা জল আর পাখা নিয়ে, বর্ষা—সে গেল ছাতা আর জুতা ছিড়ে; পূজার মাসটা কি করে যে গেল কোথা দিয়ে, অঘ্রাণ গেল বিবাহসভার ভিড়ে ; দারুণ শীতটা কোথা দিয়ে সে যে হল কাবার- হাজারাে হুজুগ রেখেছিল যেন ঘিরে, একটু সময় পেতে না পেতেই একি আবার চেয়ে দেখি ফের ফাগুন এসেছে ফিরে’! | সারা বছরটা গিয়েছে নানা ত্রুটীতে, নানা হাঙ্গামে, নিজেরে অনেক দোষে ; সময় করিয়া পারিনিক ভাই জুটিতে তা বলে কি মুখ বাঁকায়ে রহিবে যােষে ? এসেছে ফাগুন, এসেছে আবার মধুমাস, আম্রমুকুলে আঙিনা যে গেল ভরে ; জগতের মুখে হেরিছনা, ফুটে সুধাহাস এ সময়ে কেহ থাকে মুখভার করে ?
অপরাজিতা
। পলাশের বন ফুলে-ফুলে হের ফুলন্ত,
বুলবুল তায় বুলে’-বুলে’ হ’ল সারা;
চৈতালি ক্ষেতে রূপের আগুন জলন্ত,
সৌরভে হ’ল মৌমাছি মাতােয়ারা;
শুষ্ক শিমুল-সেও আননে মসগুল,
রাঙা হাসিধারা ঝরিতেছে শাখা বেয়ে ;
ভাঙা বেড়াখানি—তারা গায়ে উঠে ঝিঙাফুল
মঞ্জরী দিয়ে জীর্ণতা দিল ছেয়ে ! v
দোষ হয়ে থাকে—দখিণে বাতাসে ক্ষমা কর,
উদারতা আজি স্বাভাবিক সারা ভুবনে,
গত অপরাধ নিয়ে যদি মিছে দোষ ধর
আজিকে সে টা কলঙ্ক রবে জীবনে।
আকাশ বাতাস—সবি হের আজ প্রসন্ন,
বসন্ত আজ এল আনন্দ নিয়ে ;
সে আনন্দেরে করােনাক বঁধু বিষয়,
আপন মনের কালিমার ছায়া দিয়ে ।
কাঞ্চন গােলাপ যখন বিদায় নিয়েছে শীতের বাসর থেকে, কুসুমকুঞ্জে ভেঙেছে মাছের মেলা ; চৈত্রের সভা পাঠায়নি যবে পুষ্পবালারে ডেকে গরবী করবী, বিরহিনী বন-বেলা;- ফাল্গুন-সাঁঝে ধীরে আসে-ও সে কে ? সঙ্কোচে নত রাঙা কাঞ্চন যে ! আসনিক তুমি রাণীর গরবে কুঞ্জ-সিংহাসনে, গন্ধে আননা পথিকেরে কাছে ডাকি; চম্পা-গরিমা নাহিক তােমার মুকুলিত স্মিতাননে, তীব্র মদিরা পরাগে রাখনা ঢাকি; তুমি শুধু কহ—আর কেহ যবে নাই- শ্রান্ত পথিক, তবু আমি আছি ভাই।
২৮ অপরাজিতা রূপটি তােমার উজ্জ্বল নহে আঁখি ভুলাবার মত, –তরুণী কিশােরী মুদিত বাসররাতে ; মৃদু সৌরভ বহি’ আনে মনে অতীতের কথা যত, অশ্রুবাষ্প ছেয়ে আসে আঁখিপাতে; ফিরে আন’ মনে হারাণ’ হৃদয়ধন- নাসিকার আগে ভরে’ উঠে মাের মন। মনে পড়ে সেই শান্ত প্রভাতে করেতে শূন্য সাজি, ব্যাকুলা বালিকা তাকায়ে তােমার পানে; লুব্ধ হৃদয়, সাধ্য নাহিক আহরিতে ফুলবাজি, মৌন মিনতি আঁকা যেন দুনয়ানে; তাড়াতাড়ি তুলি’ দিতে গেনু যেই ফুল, ছুটিয়া পালাল দুলায়ে কর্ণ-দুল। আরাে একদিন--স্তব্ধ দুপুর, ঝাঁঝ করে চারিধার, পল্লব তব দুলিছে তপ্ত বায়ে ; ধূলামাখা শিশু তরুপরে বসি’, কানে গোঁজা ফুল তার, নামিতে জানেনা-ঠেকেছে বিষম দায়ে ! নীচে মা তাহার, ভয়েতে আত্মহারা; নামায়ে দিলাম—জননী কঁদিয়া সারা।
কাঞ্চন
২৯
এইমত কত ছােটখাটো যত শৈশব-অভিনয়,
ভুলেছিনু যাহা-অথবা ভুলিতে বাকী ।
মৃদু বাসে তাের সেই সব কথা ফিরে-ফিরে’ মনে হয়,
পার-হওয়া পথে ঘুরে’ মরে মনেপাখী।
ফুল নস্ তুই-রঙীন স্মৃতির আলাে
তাই তােরে আজি আরাে সে বেসেছি ভালাে।
কোনাে কবি তোর নাম করেনাক, রে চির-অনাদৃতা,
অনাস্বাদিত চিরদিন তাের মধু;
তুই থাকু মাের পূজারি প্রাণের সুগােপন-বন্দিতা
বঙ্গগৃহের অন্তঃপুরিকা বধূ ;
মৃদু সৌরভে ভরি’ অঙ্গনতল,
চিরগৌরবে থাক্ চির উজ্জ্বল।
সন্ধ্যামণি যবে ঝিল্লীমুখর সন্ধ্যাধুসর পল্লী-প্রাঙ্গনে, ফিরে তরুণী বাজায়ে জলতরঙ্গ কলসে-কঙ্কণে ; যবে দিনান্তপরে গাভী ফিরে ঘরে ক্লান্ত রাখাল সাথে, স্নান দিগন্ত-আলাে নিবে’ আসে যবে ধরণীর আঁখিপাতে; আমি সেই সন্ধ্যার সন্ধ্যামণি গাে, আঁধারে ফুটাই ফুল- এই গন্ধহীনার জন্মদীনার জীবনের দুটি ভুল!
সন্ধ্যামণি
পাশে মধুমালতীর নববল্লরী-
হরষে ফুল্লা সে;
পুর লক্ষ্মীর কর-পরশ আশায়
কাপে সে উল্লাসে।
সে যে হােথা তারি পাশে কতবার আসে
কত ছলে কত বেশে
সােহাগে আদরে বুকে তারে ধরে
পরি’ লয় তুলি’ কেশে;
অার আমি হেথা তার ত্বরিত-চকিত
চলে’-যাওয়া হাওয়া লাগি’--
সেই লজ্জা-বেদনা বক্ষে চাপিয়া
সারারাত কেঁদে জাগি।
ওগাে তােমরা যে কেহ বুঝিবেনা মাের
মরম-যন্ত্রণা
কি যে চির-বিধবার শয্যার পাশে
প্রণয়-মন্ত্রণা!
আমি কি দুখে যে জাগি বিরহী রাধার
হিয়ার বেদনা নিয়া,
যবে বঁধুয়া তাহার আন-ঘরে যেত
ঘরেরই আঙিনা দিয়া।
অপরাজিতা
ওগো
আঁধার-সাঁঝের আধার, তুমি যে
তেমন আঁধার নও!
কোথায় লুকাই, কেমনে লুকাই ?
তাহার উপায় কও।
আমি
==
Marrণ
তুমি
সন্ধ্যা আমার সঙ্গী—কেন না
প্রলয়-অন্ধকার
এই মুকুলিকা নব কলিকা-জীবনে
গন্ধ বন্ধ যার।
কালাে সন্ধ্যার কোলে জন্ম, তাই সে
নামটি সন্ধ্যামণি
ভালাে মণি-কল ভালে লেখা তার,
বুকে যার কালফণী ।
হায় বিশ্বভুবনে কোথা কোন্ খানে
আছে মাের দুখ-সাথী-
আমি কেমনে কাটাব তীব্র বেদনা-
দীর্ঘ জীবন-রাতি ?
-
: ওকে। ছায়ার মতন আনত-আনন,
কে তুমি কুষ্ঠিত
: কেও! তুলসীর মূলে দীপটি রাখিয়া
ধূলায় লুষ্ঠিতা ?
সন্ধ্যামণি
তুমি মােরই মত বুঝি জন্মদুখিনী,
বেদনার দরদিয়া-
বুঝি
বঙ্গ-বিধবা তুমি সে বন্ধু,
আমার পরাণ-প্রিয়া ।
আঁধার আকাশে ঘনায় রাত্রি,
দিক্ নাহি যায় দেখা
এস
এ ঘন-তিমিরে কেঁদে জাগি রাত,
তুমি আর আমি একা।
নববর্ষা
বৎসরে আজি প্ৰথম বৃষ্টি, আয় তােরা নরনারী,
নবীন মেঘের মুক্ত দুয়ারে দাড়া আজি সারি-সারি ;
এ বৃষ্টি শুধু বর্ষণ নয়
এ যে আনন্দ-ধারা মধুময়,
ধরণীর শুভ-অভিষেকে আজি ঝরিছে নীরদ-ঝারি-
বৎসরে আজি প্রথম বৃষ্টি-ছুটে আয় নরনারী।
মৃত্তিকা মার বুকের দুলাল, কৃষাণেরা তােরা আয়,
মেঘের কণ্ঠে বাজিছে বিষাণ, শুনিতে কি পাস্ নাই ?
কৃষক-বধূরা কোথা তাের আজি কুটীর বাহিরে ছুটে আয় সাজি
তােদেরি ডাকিয়া উঠে বাজি’ মেঘ মল্লার-বেদনায়,
আভরণ-হীনা, শিশু-আভরণে সাজি’ আয় আঙিনায়।
গােহাল আজিকে শূন্য করেদে, ধেনুদের দেরে ছাড়ি,
পুণ্য লাঙলে বৃষ্টি লাগারে গৃহকোণ হতে পাড়ি
অন-কোণে ছাগশিগুলি এখনাে তাদের দি নাই খুলি
মুক্ত করেদে—মাতিয়া তাহারা বেড়া সকল বাড়ি
উৎসবদিনে বন্ধন কেন ? সবারে দে আজ ছাড়ি'।
=
নববর্ষ
শিশুদের আজ কে করে রুদ্ধ? জননীর নহে কাজ ;
জগৎ-জননী নিজে যে তাদের খেলায় ডেকেছে আজ।
বৃষ্টির ধারা অঙ্গের সাথী
নয়ন মাতায় বিদ্যুৎপাতি,
পাগল পবনে মন উঠে মাতি’, কর্ণের সাথী বাজ—
বিশ্বজননী আপনি তাদের খেলায় ডেকেছে আজ।
রে পুরললনা, ছাড়িয়া দিওনা, প্রিয়জনে বাঁধ বুকে ;
বাহুতে বাহুতে বাঁধিয়া আজিকে দাঁড়াও উৰ্দ্ধমুখে।
নববরষার মিলনের গান
ভরিয়া তুলুক উৎসুক কাণ,
এক হয়ে যাক দুখানি পরাণ অপূৰ্ব্ব মহাসুখে,
ঝরিয়া পড়ক পবিত্র ধার মিলন-মুদিত মুখে।
‘মালাকাটা’ বেড়ি’ ঐ যে মালতী, ওরে কি বলিল কে?
নীরস অঙ্গ সহসা ভরিল যৌবনগরবে।
যুথী-বিধবার রুখু এলােচুলে
কে ঢাকিয়া দিল শ্যামল দুকূলে,
কেলিকদম্ব লাবণ্যময়ী কাহার ইঙ্গিতে
কাননের কোল ভরি’ কে তুলিল বরষা-সজীতে ?
দুলিয়া-ফুলিয়া চলিয়াছে নদী সিন্ধু দরশ আশে,
ঝঝরশ্বরে নিঝর আসি মিশিছে তাহারি পাশে;
বাতাসের মুখে শুধু কলগান,
আকাশে উড়িছে মিলন-নিশান,
বিশ্বসাগরে জেগেছে তুফান আনন্দসাভাসে,
গিরিরে চুমিতে নেমেছে অভ্র ধারে ধরিতে পাশে।
অপরাজিতা
। সৃষ্টির মহাপ্রাঙ্গনে আজ বৃষ্টির হােরিখেলা,
আকাশে বাতাসে মিলি’, আজি মহামিলন-দোলের মেলা।
ঝরে অফুরাণ’ ধারা-পিচিকারী নরনারী, সবে দাড়া সারি-সারি,
ওরে অভাগ্য, মানিবি কি হারি, ছুটে আয় এইবেলা
সৃষ্টির মহাপ্রাঙ্গনে আজি বৃষ্টির হােরিখেলা!
আজি বৎসরে প্রথম বৃষ্টি—ছুটে আয় নরনারী,
অন্তবিহীন মেঘমণ্ডপে দাড়া আজি সারি-সারি
এ বৃষ্টি শুধু বর্ষণ নয়
এ যে অমৃতের ধারা মধুময়,
মর্তের তৃষা মিটাতে আজিকে ঝরিছে স্ববারি-
মাথা নত করে সঁাড়া আজি সবে তৃষার্ত নরনারী।
পূজা-গৃহে
সন্ধ্যা আরতি-আজি অষ্টমী-পূজা ;
ভক্তের ঘরে এসেছেন দশভুজা।
বাজিছে ঘণ্টা, বাজিছে সঘনে শাক ;
কাসর ঝাঁঝর বাজিতেছে ঢেলঢাক ;
গুমরি-গুমরি’ শানায়ে উঠিছে তান,
গলায়ে-গলায়ে নীরস পাষাণ প্রাণ ;
ধূপের ধোঁয়ায় নিব-নিব’ ঝাড়বাতি,
অগুরুগন্ধে শিহরে শারদ-রাতি।
জোড় করে যত সহস্র নরনারী
ভক্তি-বিড়ােল দাড়াইয়া সারি-সারি।
পশিলাম গৃহে দেখিতে মায়ের পূজা
ভক্তের ঘরে এসেছেন দশভুজা।
বহু চেষ্টায় লভিনু যেথায় ঠাই,
সেখান হইতে প্রতিমার দেখা নাই
ঈষৎ সরিয়া যেমনি ফিরাব মুখ,
চোখে পড়ে গেল দুটি আঁখি উৎসুক
অপরাজিতা ; করুণ শান্ত স্নিগ্ধ অচঞ্চল- নীরব পূজার যেন দুটি উৎপল ; অনিমেষ—তবু কামনার লেশ নাই, লালসার শিখা জ্বলেনা যেন সে ঠাই ; নাহি আকাঙ্ক্ষা, নাহি করে কোন আশা, ভরা আঁখি যেন শুধু কহে ভালবাসা; সমবেদনায় উঠিল কঁদিয়া প্রাণ, নিমেষে যেন সে নিজেরে করিনু দান। অপলক চোখ, ঘুরিলনা আর ঘাড়, চোখের উপরে নিবে’ গেল বাতি-ঝাড়, কাসর ঘন্টা থেমে গেছে সে কখন, অগুরুগন্ধ আর না বহে পবন। —এ কি ধিক্কার, এ কি হায় লাঞ্ছনা, এ কিরে ভ্রান্তি-এ কিরে বিড়ম্বনা পূজামন্দিরে পশিং যে গৃহ ছাড়ি’ ভক্তি-অর্ঘ্য প্রেম নিল পথে কাড়ি। ক্ষণেকের পরে মন এল যবে ফিরে অপরাধভার হানি’ অবনত শিরে, অনুশােচনার অনল জালিয়া প্রাণে অপরাধী আঁখি ফিরা প্রতিমাপানে- পূজা-গৃহ যাচি মার্জনা তিতিয়া অশ্রুজলে- সঙ্কোচে ধীরে চাহিৰু চরণতলে ; সজল নয়ন তুলি আননপানে, কম্পিত হৃদি,-বিশ্বাস এল প্রাণে ; নাহি রােষ মার নয়ন ইন্দীবরে— পুণ্যপ্ৰসাদে মেহেরই মহিমা ঝরে। কিরীটি-আলােক ঠিকরি’ আসিয়া ছুটে আশীষের মত শিরে পল যেন লুটে ! আবার নয়নে নিবে এল বাতি-ঝাড়, শিহরি’ উঠিমুনােয়ায়ে পড়িল ঘাড়। কহিল কে যেন কাণে-কাণে–বাছা মম, প্রেমে মাের পূজা জানিস্ শ্রেষ্ঠতম ; পূজার অর্ঘ্য লয় নাই প্রেম কাড়ি, বহিয়া আগিয়ে দিয়াছে আমারি বাড়ী করেছিস্ দুয়ে ভিন্ন ভাবি’ যে পাপ, ক্ষমিলাম তাহা-মুছে ফেল অনুতাপ । চেয়ে দেখি-শেষ আরতির কলরব, প্রণিপাতে নত নরনারী যত সব ; নমিলাম ভুয়ে; পুলকাঞ্চিত দেহ- দুরুদুরু হিয়া বহিয়া ফিরিঃ গেহ।
ময়না
তোমার তখন জন্ম হয়নি-বারশ’-সাতাশি সাল—
উৎকল দেশে অন্নকষ্ট আনিল পঙ্গপাল ;
সারাদেশ ঘুড়ি শুধু হাহাকার, চাল নাই কারাে ঘরে,
জনক জননী ছেলেমেয়ে বেচি’ পারে যদি পেট ভরে ।
তাও শেষে যায়, কিনিবে কে হায়! ধনী নাই সারা দেশে-
যে যেখানে পায় পালাইয়া যায়—প্রাণ দেয় পথে শেষে ;
ছাগ মেষ গরুহিল না কিছু ; ক্ষুধা-পৈশাচী ক্ষুধা
মানেনাক কিছু; লতা-পাতা-ঘাস-তাই ক্ষুধাহরা সুধা!
;
পথে-ঘাটে-মাঠে, কে করে সংখ্যা—শুপাকার শবরাশি,
জীবতেরা তারি পাশে মিলি’ টানাটানি করে আসি;
কাড়াকাড়ি-শেষে মারামারি করে বাড়ায় মৃতেরি দল,
মারিভয় আসি যােগ দিয়া সাথে জ্বালায় প্রলয়ানল!
শুধু হায় হায়, শুধু হাহাকার, মৃত্যু, মৃত্যুশঙ্কা ;
শূন্য নগরে ঘরে-ঘরে-ঘরে মরণ বাজায় ডঙ্কা;
কঙ্কালসার প্রেতের আকার জীবন বেড়ায় ঘুরে,
আঁধারপূর্ণ ভীষণ শুন্য পুরবাসিহীন পুরে!
ময়না
৪১
বসন্ত এল শূন্য পুরীতে দক্ষিণ জানালায়,
হাওয়ার পরশে ‘আহা’টি বলিতে কোনখানে কেহ নাই;
নাহি সে প্রকাশ, মাঠে নাই ঘাস—শ্বেত কঙ্কালে ঢাকা,
লতা-পাতা নাই, ফুল ফুটে কোথা—পাখী নাই, কোথা পাখা ?
ভীষণ বন্যা ঠিক সেইবারে যােগ দিল সাথে আসি’–
ধুয়ে-মুছে যেন করিবে লুপ্ত প্রকৃতি সর্বনাশী
নাশিয়ে-ভাসিয়ে সমস্ত দেশ শ্রাবণ-প্লাবন চলে
বিনাশ-বিষাণ বাজায় ঈশান বন্যার কলকলে !
বিশ্বের যত বিধি ও বিধান—শেষ আছে সবাকার,
অন্তবিহীন মহাকাল শুধু ধারেনা কাহারাে ধার ;
জীবন-মৃত্যু কাহারাে ভৃত্য নহে সে কোনদিন,
কালসিন্ধু—সে কল্লোলি’ চলে আনমনা উদাসীন।
নগরকণ্ঠে ‘ঝিন্টি'র ধারে ‘মাটিয়া পাহাড় পরে
একটি কষ্ঠ কঁদিছে ক’দিন সাপুড়িয়াদের ঘরে ;
তিনদিন হ’ল ‘ওস্তাদ’ সেই গিয়াছে যে বাড়ী থেকে,
ফিরে নাই আর ; হেন লােক নাই-আসে একবার দেখে!
গিয়াছে বলিয়া-পেটের উপায় না করে ফিরিবেনাক—
সাপের মাংসে যে ক’দিন পার’, কোনমতে বেঁচে থাক !
হায়রে অভাগি ! সত্য ভাবিয়া কেম গেলিনেক সাথে,
সঙ্গে থাকিলে এমন বর্জ পড়িত কি কভু মাথে?
৪২
অপরাজিতা
বিরলবসতি পল্লীপ্রান্তে পূর্ণ-কাতর হিয়া
লুটিতে লাগিল দুয়ারের পাশে শূন্য জঠর নিয়া ;
মাচার উপরে একডালি সাপ গরজিছে নিশ্বাসে,
শতেক-ছিদ্র লাউয়ের বাঁশরী লুটায় তাহারি পাশে।
দ্বারের অদূরে মাদার গাছের কণ্টকে বুক রাখি’
থেকে-থেকে-থেকে উঠিতেছে ডেকে অজানা পাহাড়ে পাখী
স্তব্ধ দুপরে দূরে
গিরিপরে উঠে
গরজায় হাওয়া লুপ্ত করিয়া সর্পের গরজনি।
গুগুম্ ধ্বনি ;
;
চালের উপরে রােদ আসে পড়ে, গিরিশিরে আসে সন্ধ্যা,
হৃদয়রক্ত ফুটাইয়া মেঘে নামে নিশীথিনী বন্ধ্যা;
ঘনায়ে আঁধার আসে চারিধার বাদুড়ের কালাে-পাখা,
চীৎকার করি’ পেঁচায় চেঁচায় ঝটপটি বটশাখা।
শেষ-সহচরী বাঁশীটি লইয়া সঙ্গের শুধু সাথী,
বাহিরিলা ধীরে সাপুড়িয়া নারী—তখনাে রয়েছে রাতি ;
জগতে যাহার যােড়া নাহি আর, নাহি যার পরাজয়
ক্ষুধার তাড়ন-না মানে শাসন, ভুলায় সকল ভয়।
দেশের প্রান্তে বলরামগড়--সিদ্ধ তীর্থ-ষ্ঠাই -
বৎসর ধরে’ দেবমন্দিরে যাত্রীর শেষ নাই ;
পাঁচ রশি ঘিরি’ নাটমন্দির, শতেক পান্থাবাস,
পঞ্চাশ মণ অষের ভােগ নিত্য সে বারমাস।
ময়না
৪৩
সাধু সেবায়েৎ যাত্রী পথিক-নানাদেশ হতে আসি’
পায় পরসাদ, নাই প্রতিবাদ ; শতাধিক দেবদাসী
রঞ্জন করে চিত্ত সবার নিত্য নৃত্যে-গানে,
তীর্থের নামে আত্মবিকায়ে বিভের প্রতিদানে।
এবারের এই অন্নকষ্টে যদিও গিয়াছে ঢের,
বিংশতি মণ দৈনিক ভোেগ তবুও গােবিন্দের
অসীম বিত্তে বাঁধা দেবার্থ-সেবার্থ বহু ধন,
কণিকামাত্র পায় তবু, কভু ফিরেনা অতিথিজন।
চত্বমাঝে পান্থ-আবাসে, নিশীথ দ্বিপ্রহরে--
দীপালােকহীন আর্ভ-মলিন নিভৃত একটি ঘরে,
ফিসূফিস্ স্বরে প্রহরেক ধরে’ চলিতেছে জল্পনা ;
তিনটি ব্যক্তি-বয়স কাহারাে তিরিশের অল্প না।
মন্ত্রণা এই-গগাবিন্দজীর মন্দিরচুড় হতে
স্বর্ণচক্র সরাইতে হবে কালি রাতে কোনমতে ;
কাৰ্য যাহার—অর্ধেক তার অর্জিত অর্থের,
বাকী দুইজনে তুল্য অংশ—বাকী বিত্তাৰ্দের ।
আঁধার ঘরের কপাট খুলিয়া সঙ্কোচে-সাবধানে,
বাহির হইয়া পরস্পরের কহিলা কি কাণে-কাণে ;
পা-টিপিয়া ধীরে বাহিরি’ চলিল প্রাঙ্গন-পরপারে,
স্পন্দিত বুকে আসিয়া দাড়াল দেবমন্দিরদ্বারে।
অপরাজিতা নিম্নকণ্ঠে কহিলা জনৈক, দেবপীঠ পরশিয়া, চন্দ্র সাক্ষী, করহ শপথ মন্দিরে হাত দিয়া- জগতে একথা তিনজন ছাড়া জানিবেনা কেহ আর- প্রতিজ্ঞাশেষে তিনজনে ভুয়ে করিলা নমস্কার। স্নিগ্ধপরশ চন্দনরসে সিক্ত করিয়া বিশ্ব চন্দ্র তখন মন্দির-আড়ে হইলা বিগতদৃশ্য ; কলঙ্ক শুধু সঙ্কোচসম রহি' শশাঙ্কক্ষে মর্ত্যের সেই মহাকলঙ্ক শিহরি হেরিলা চক্ষে। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত অঙ্গন-পথে ফিরিতে বন্ধুত্রয়, সহসা চমকি' চাহিল ; অদূরে ছায়া বলি’ মনে হয় ! সরি’ গেল ছায়া মন্দিরপাশে—স্তম্ভ-আঁধার পথে, নর্তকীবেশী মূর্তিটি যেন মিলাইলা দূর হতে। নিশি-অভিসার--কহিলা ‘চণ্ডা’--‘ওস্তাদ’-দলপতি ; সঙ্গীরা হাসি’ কহিলা অমনি, দ্রুততর করি’ গতি - দেখাই যাক না—ফিরাইলা দোহে কুটি-তিরস্কারে; চক্রীর দল ফিরি’ গেল ধীরে আপন গােপনাগারে। পূণিমা আজি ; মন্দিরে কিছু আরতির ধূমধাম, নাটমন্দিরে নৃত্য ও গীত চলিতেছে অবিরাম ; আরতি-অন্তে ভক্তের ভিড় বাড়িল তাহারি ধারে- মণ্ডপ-পাশে দাড়াল শ্রোতারা ঘিরি’ মণ্ডলাকারে।
ময়না
৪
তিনজন শুধু পাঠকের চেনা-গত রাত্রির দল,
সন্ধ্যা হইতে সীধুপানে কিছু উচ্ছল-চঞ্চল ;
গভীর নিশীথ-কার্য্যের আগে হৃদয়ে আনিতে ঘূর্তি,
নৃত্যসভায় যােগ দিল তাই পরিচিত কয় মূর্তি !
;
দুইজন করি’ নর্তকীদল-পুষ্পিত দেহসজ্জা ;
প্রতি অঙ্গের লীলা-ভঙ্গীতে লজ্জারে দিয়া লজ্জা,
নুপুরের তালে গাহে গােপী-গান রাসরসে মন মাজি’-
মহাজনে-রচা পুষ্পমালায় সাজায়ে কণ্ঠ-সাজি।
কেহ বলে ‘আহা, কেহ দেয় ‘বাহা’, কেহ সুস্বর সাথে
গুণগুণস্বরে কণ্ঠ মিলায়, তাল দেয় কেহ হাতে ;
গীত অবসানে বংশীর স্বরে রাসমণ্ডলী-নৃত্যে
সমবেত নটী কম্পিত-কটি মােহিল নিখিল চিত্তে।
জানা বা অজানা নাহি যায় চেনা; শুধু ছন্দ ও যতি-
ঘুরিয়া-ঘেরিয়া মােহন নৃত্য-দ্রুত-লীলায়িত গতি ;
চকিত চরণ দোলা দেয় মন, প্রাণ উঠে যেন গাহি';
ওস্তাদ শুধু বারেক সহসা চমকি’ উঠিল চাহি’!
নামিল বংশী—থামিল নৃত্য; ফিরি’ গেল নটীল,
ওস্তাদ যেন সেই হ’তে কিছু উন্মনা-চঞ্চল!
যে যাহার ঘরে ফিরিল নগরে ; চক্রীরা নিজবাসে
মন্দিরতলে ক্ষান্তি আসিল কোলাহলে উচ্ছাসে ।
৪৬
অপরাজিতা
থমথম করে গভীর রাত্রি-নির্মল নিষ্কল,
তরল জ্যোৎস্না পিছলিয়া পড়ে চিক্কণ-পিচ্ছল
মন্দির-গায়ে, অঙ্গণতলে প্রস্তর-চত্বরে
চন্দ্র যেন সে গােবিন্দজীর মৌন আরতি করে।
প্রাচীরের ছায়ে গুটিগুটি পায়ে-ও কে যায়, কোথা যায় ?
মন্দিরচূড়ে স্বর্ণচক্র চমকায় জ্যোছনা ;
তারি তলে আসি’ চারিদিকে চাহি’ উঠিতে ভিত্তি পরে,
পিছন হইতে কাহার পরশে চমকি’ উঠিল ডরে
চকিতে ফিরিয়া চাহিতে হেরিল-নর্তকী সে যে ময়না!
সম্মুখে বাজ পড়িলে মানুষ স্তম্ভিত বেশী হয়না।
ছয়মাস আগে ঝিরি ধারে—মন্বন্তরমুখে,
যে গিয়াছে মরে’, সে আজ সমুখে চাহিয়া সকৌতুকে!
বলরামগড়-দেবনৰ্তকী—তৃতীয় প্রহর রাত্রি ।
প্রেতিনী নয়ত ? সহসা স্মরিয়া সেই বিস্ময়দাত্রী-
রাসনৃত্যের সেই মুখখানি-মস্তক গেল ঘুরি’ ;
সেই অবসরে হাতখানি তার কার হাতে গেল চুরি!
}
ভাল, ভালবাসা! চিনিলেনা মােরে? ময়না তােমারি আমি ;
কষ্ট যা দেছ থাক্ তাহা মনে; কি করিছ এবে স্বামি ?
দেবগৃহে চুরি ! মহাপাতকেও করে কভু হেন কাজ?
তার আগে কেন উভয়ের মাথে পড়িল না এসে বাজ?
CATE:
1
উঠিত ভি ি'রে,
পছন হইতে কাহন পরশে চমকি' উর্টিল রে
ENGRAVIO & PRINTED BY
ACME PRINTINC & PROCESS WORKS,
No text on this page.
P
চুপ কর প্রিয়, সকলি যে জানি-কালিকার মন্ত্রণা;
দেবতা জানেন, সেই হ'তে বুকে কি দারুণ যন্ত্রণা
সহি পলে-পলে ; আমিও শপথ কবেছি তােমাবি সাথে-
ভাঙিব তোমাৰ পাপ-প্রতিজ্ঞা প্রাণ দিয়া আজি রাতে।
;
ত্যাগ কবিয়াছনাহিক দুঃখ, সহিছি হাসিমুখে,
ক্ষুধার যাতনা, মনের বেদনা--সকলি সয়েছি সুখে ,
অসহায় নারী-পথে-পথে ফিবি, তাতেও দুঃখ নাই,
দীর্ঘ দিনের দুঃখের কথা বলিতেও নাহি চাই।
যাত্রী সঙ্গে এসেছি কেমনে এই দেব-মন্দিবে,
দিন পাই যদি, একে-একে সব দেখাব বক্ষ চিবে,
দব হ’তে যবে হেরিনু ও মুখ সন্ধ্যা-আরতি-ভিড়ে,
শিকারী বাজেব উদ্দাম ক্ষুধা পুষেছি বক্ষ-নীড়ে।
সন্দেহময় সঙ্গীব দল দেখিয়াছি দূর হতে,
বুঝিয়াছি ঠিক ভাসিয়াছ কোন্ অজানা পাপের স্রোতে
সেই হ'তে সদা সন্ধানে আছি, সুযােগ পাইনি কভু,
কোনো দিন কোথা একেলা পাইনা—আঁখি রেখে ফিরি তবু।
সন্দেহ পাছে কবে কে, তাই সাজিয়াছি দেবদাসী,
ইচ্ছামত সে ভিতরে-বাহিরে—যেথা খুসি যাই-আসি,
পাপের সঙ্গ সৰ্ব্ব, তবু ধৰ্মই এক লক্ষ্য
তুমিই আমার ধর্ম, প্রাণেশ, তুমিই আমার মােক্ষ।
৪৮ অপরাজিতা কাল রাত্তিরে তিনজনে যবে বন্দ করিলে দ্বার, জান, ভালবাসা ! জানালার পাশে কাণ ছিল জেগে কার ? শুনিনু যেমনি পাপ-কল্পনা—পাষাণে বাঁধিয়া বক্ষ, করিনু শপথ, যা করিয়া পারি- হারাইব তব লক্ষ্য। আজ সন্ধ্যায় মন্দিরে দেখি’ চমকিলে দূরে থাকি- ভেবেছ কি বঁধু, তােমার সে ভাব এড়ায়েছে মাের আঁখি? ভুলেছ কি প্রিয় বিবাহ-রাতের নৃত্য সে, রাত জাগি'- সেই অভ্যাস সাধিয়াছি ফিরে তােমারে পাবার লাগি। দেবদাসী বটে, তুমিই কিন্তু গােপন-দেবতা মাের, সেই দেবতা কি দেব-দেব দ্বারে আজিকে হইবে চোর ? তার চেয়ে প্রিয় মৃত্যু যে ভাল-নাই বিষাক্ত সাপ- ছুরি—সেও সখা, চুরি চেয়ে ভাল-ঘুচে যাক অভিশাপ। অভাবে বন্ধু মৃত্যু হয় না, আমিও যে আছি বাঁচি’- জগৎনাথের চরণে তাইতে কৃতকৃতজ্ঞ আছি। যেমন করেই চলনাক, নাই অদৃষ্ট ছাড়া পথ, দেবের দুয়ারে হেন অপরাধে পূরিবে কি মনােরথ ? অন্নের ভার জানিও তাহার,—বিশ্বাস রাখ ধরি তুচ্ছ রমণী আমিই না-হয়, লইং তা শিরে করি, যতদিন বাঁচি—যা করিয়া পারি, যােগাইব আমি ভার, জন্মদুখীর ভিক্ষায় বঁধু, কিবা আছে লজ্জার?
ময়না
৪১
তবু যদি চাও, বধ করি’ যাও, নাই তায় কোন দুখ ;
সুখের মৃত্যু-দেখিতে হবে না কলঙ্কী পতি-মুখ ।
ক্ষুদ্র জীবন আনন্দে দিব এ মহাপাপের আগে
তােমার যা তাহা তােমাকেই দিব—এই সে ভিক্ষা মাগে।
হতাশ প্রাণের গভীর আঘাতে-ভাঙিল পাষাণ-বাঁধ,
একে-একে মনে ঘা দিয়া ফিরিল সহস্র অপরাধ ;
হুহু করে জোরে, চক্ষুর দ্বারে ছুটিল রুদ্ধবান--
চন্দ্রকিরণে তারে-তারে তুলি’ নীরব বেদনা-গান।
ময়নার কোলে মাথাটি রাখিয়া মুদিল চক্ষু দুটি-
গােবিজীর চরণে যেন সে পূজার পুষ্প দুটি !
অনুশােচনার মধু-বেদনার পবিত্র হােমানলে
পুণ্য হইল দেব-মন্দির-পাতকীর আঁখিজলে।
নীরব
ভুবন
নীরব গগন, স্থির মন্দিরতল,
বক্ষের সাথে মিলিত বক্ষ, চক্ষে অশ্রুজল ;
অতন্দ্র-আঁখি চন্দ্র তা দেখি’ লভিল। বিদায় ধীরে,
উষার বাতাস আশীষ লইয়া পরশিল দুটি শিরে!
TE
murs
বাতায়নের দীপ
ঐ জানালায়
দীপটি উঠিত জলি’ এমনি সন্ধ্যায়
কেশের সুগন্ধ সনে ধূপের সুবাস
তুলিত উতলা করি’ সায়াহ্ন-বাতাস।
বাতায়ন-নিম্নে কুঞ্জে ফুটন্ত চামেলা
নিসি’ ভাবিত—মােরে করে অবহেলা ;
বিস্মিত চন্দ্রমা ভাবে অতন্দ্র আকাশে
কে এরা প্রদীপ জ্বালি’ মােরে পরিহাসে !
আপনার শাস্তি দিয়া, রচিয়া মন্দির
সন্তোষ হাসিত বসি ন চাহি’ বাহির।
বাতায়নের দীপ ৫১ হাসি’ খিলখিল- ছােট দুটি ছেলে-মেয়ে ভরিত নিখিল। অফুটন্ত গল্প-গাথা অফুরন্ত কথা নিঃশেষ করিত যেন বিশ্বের বারতা। প্রাচীরের জন্ধুশাখে কূজন্ত কোয়েল। সহসা থামিত ভাবি’—মােরে অবহেলা ; সনি শতশাখা গরবে অধীর খর্জুর ভাবিত—এরা হবে বা বধির ! আপন সৌভাগ্য-গর্বে আপনি বিভাের হাসিত দীপের রশ্মি সারানিশি-ডাের ! স্তব্ধ অর্ধরাতে- দীপটি উঠিত অলি’ দ্বিগুণ প্রভা-তে। অস্ফুট গুঞ্জন সাথে মৃদু কলস্বর গৃহটি তুলিত করি’ আনন্দমুখর। বাহিরে প্রকৃতি যেন বহি’ দুঃখভার বিস্ময়ে রহিত মৌন হেরি ব্যবহার। অনন্ত আকাশ, উর্দ্ধে বাতায়ন খুলি ইঙ্গিত করিত মেলি’ তারকা-অঙ্গুলি। ক’টি অন্ধ প্রাণী একি করে ছেলে-খেলা- উদাস বিশ্বের প্রতি--এ-কি অবহেলা।
অপরাজিতা ! ভেঙে গেল হাট- আঁধার টানিয়া দিল অদৃষ্ট-কবাট বন্ধ হ’ল বাতায়ন-অন্ধ যেন চোখ, মুহূর্তে নিয়ে দিয়ে প্রদীপ্ত আলােক। ফুরাতে খেলা-ঘরে উৎসবের রাত রুষ্ট প্রকৃতির যেন অব্যর্থ আঘাত। চামেলী ফুটিয়া ঝরে, চন্দ্র রহে চাহি, শিহরে খর্জুর-কুঞ্জ, পিক উঠে গাহি’; বাহিরে বৃহৎ বিশ্ব তেমনি চঞ্চল শুধু ঐ দীপখানি জ্বলে না কেবল !
প্রেম ও মৃত্যু চন্দ্র যখন সঞ্চয়ে রত আলােক-ভাণ্ড তার, সন্ধানী দুটি চক্ষু-তারকা সঞ্চারি’ চারিধার— প্রেম—সে আসিয়া দাঁড়াইল ধীরে নন্দন-ফুলবনে; সন্তানকের অবকাশ-পথে নেহারিল সেই ক্ষণে মন্দগমনে ভ্ৰমিছে মৃত্যু দেবদারুতলে একা, গুঞ্জরি কি-যে আপনার মনে—চারি-চোখে হ’ল দেখা ? মৃত্যু কহিল-- ‘দূরপর’—জাননা এ ভূমি কার ? স্বচ্ছ পাখাটি মেলি দিয়া প্রেম, উদ্যোগি উড়িবার- কহিল কাদিয়া-জানি, তব কাল ! ছায়া তুমি জীবনের ; তপন-আলােকে পাদদেশে যথা ছায়া পড়ে পাদপের, সেই মত এই অনন্তলােকে জীবন পঁাড়ায়ে আছে- মৃত্যু তাহার ছায়াখানি হয়ে লুটায় পায়ের কাছে ; তরু যবে যাবে—ছায়াও মিলাবে, এমনি সে পরাধীন মাের প্রভুত্ব সবার উপরে রহিবে সে চিরদিন। টেনিসন
ত্যক্ত গৃহ
প্রাণ ও চিন্তা--একই সাথে দেহে ছেড়ে গেল বাগার,
মুক্ত রাখিয়া দ্বার-বাতায়ন--অদ্ভুত ব্যবহার !
জালায়নে দীপ জ্বলেনা, ভিতরে নিশীথ-অন্ধকার ;
যে দ্বারের কভু বিরাম ছিল না—শব্দটি নাই তার ।
বাতায়ন-দ্বার বন্দ করে দে, নহিলে যে ফঁাক দিয়া
ত্যক্ত-গৃহের রিক্ত আঁধার আসিবে সে বাহিরিয়া ।
আয় চলে, আর আনন্দধ্বনি উঠিবেনা গৃহ ঘিরে’-
মাটি দিয়ে যাহা গড়া হয়েছিল, মাটিতে মিশেছে ফিরে।
চলে’ আয় সবে, প্রাণ ও চিন্তা গিয়াছে আবাস ছাড়ি’!
দূরে, কোন্ দূরে-সুবিপুল পুরে বিরাট প্রাসাদ-বাড়ি
পেয়েছে সে আজ ; কোন ক্ষতি ক্ষয় নাহি যার নিরবধি;
হায়, তারা আজি আমাদের মাঝে থাকিতে পারিত যদি !
টেনিসন
রাজকুমারী
রাজকুমারি, রাজার মেয়ে ! হাজার তুমি মান্য পাও,
আমি তােমার খ্যাতির নহি ভক্ত ;
তুমি শুধু খেলার ছলে পরের মনটি জিতে চাও
প্রেমের পায়ে না হয়ে অনুরক্ত।
মেলিয়াছিলে আমার পরে কুহক-ভরা মুগ্ধ চোখ,
জানিয়া তাই সরিয়াছিনু বাহিরে ;
রাজকুমারি, বংশ তব লক্ষ খ্যাতি যুক্ত হােক,
আমি ত তবু তোমারে নাহি চাহিরে।
অপরাজিতা
রাজকুমারি, রাজার মেয়ে ! মহতী তব মহিমা,
জানিগাে তব উচ্চ কুল গৰ্ব ;
নিজে যে বহে নিজের নাম, নিজের গুণগরিমা
তাহার কাছে নিখিল খ্যাতি পর্ব
হৃদয় মাের বিরহে তব ভাঙিবে কভু ভেবােনা আর,
এ হৃদি আরাে খাটি ধনের সন্ধানী ;
তরুণী যদি সরলা হয়, অনেক বেশী মূল্য তার,
অযুত মান চরণে তার বন্দিনী ।
রাজকুমারি, রাজঝিয়ারি, যশের খ্যাতি—সব দিয়ে,
বাছিয়া লও হীন কোন ভক্ত;
দিন-দুনিয়া-মালিক হলেও, তবু আমার মন নিয়ে
অমন মনে হয় না অনুরক্ত।
বাসতে ভাল জানি কি না, তুমি শুধু জানতে চাও,
উত্তরে তার ঘৃণাই আমার বলতে হয় ;
পাথর-গাঁথা মােটা ভােমার থামের মাথার সিংহটাও
আমার চেয়ে তােমার প্রতি শক্ত নয় ।
রাজকুমারি, রাজদুলালি ! হাজার মানের সিঁদুকটি,
আজকে ফিরে’ অনেক কথাই হয় স্মরণ ;
তিনটি বছর পেরােইনিক, ও-পাড়ার ঐ যুবকটি
মরল কেন-নয় কি তুমি তার কারণ?
রাজকুমারী মদির তব কটাক্ষটি, মধুর তােমার কণ্ঠস্বর, মােহন তব মন ভুলাবার মন্ত্রটি। কণ্ঠে তাহার দাগটি কিসের, কোথায় হতে মৃত্যুশর- বলেনি কি গােপন হৃদয়-যন্ত্রটি ? : রাজকুমারি, রাজঝিয়ারি! শ্রদ্ধা রাখ অন্তরে, উদ্ধপানে চেয়ে দেখ মেঘধারে ; তােমার আমার—সবার পূর্ধ্ব-পুরুষ যিনি তিনিই যে হাসেন তব বনিয়াদির আবদারে । যাহােক তাহােক, শােন আমার সরল মনের অহঙ্কার, মহত্ত্ব--সে থাকে নিজের অন্তরে; চিত্তে যদি দয়া থাকে, মুকুট চেয়ে মূল্য তার, সরল নিষ্ঠা খ্যাতির সেরা মন্ত্র রে ! রাজকুমারি, রাজদুলালি ! দৃঢ় আমার বিশ্বাস এ- প্রাসাদ-শিরে ক্লেশের তব অন্ত নাই; গরবী ও আঁখির জ্যোতি নিবছে প্রতি নিশ্বাসে, পুষ্প-শেজে লুটছ দারুণ যন্ত্রণায় ! স্বাস্থ্যে ভরা রূপটি তব, বাক্স ভরা বিত্তেতে, তবু সে কোন্ নিত্য-ব্যাধি সঙ্গিনী কেমন করে সময় কাটে--চিন্তা সদ। চিত্তেতে, তাইতে অমন খেলার রঙে রঙ্গিনী !
৫৮
অপরাজিতা
রাজকুমারি, রাজকুমারি! গুণছ বসে’ খ্যাতির ঢেউ,
সময় যদি কোনমতেই কাটছে না ;
বিস্তৃত এ রাজ্যে তব দরিদ্র কি নাইক কেউ,
দ্বারে তােমার ভিক্ষুকও কি যুটছে না ?
অনাথ ছেলে-তাদের ডেকে যত্নভরে শিক্ষা দাও,
অনাথ মেয়ে, গৃহকৰ্ম্ম শিখাও তায় ;
পরমেশের পরম পদে নারী-হৃদয় ভিক্ষা চাও,
পরাণ নিয়ে খেলা হ’তে লও বিদায়।
টেনিসন
দল ও পরিমল
ওগো গন্ধ, তােমায় কেমন করে বন্দ করে রাখি,
ভাবছি বসে মনে ;
পরাগমাঝে লুকিয়ে তােমায় কেশর দিয়ে ঘিরে
পাতার আবরণে,
অন্ধ হয়ে থাকব, আমি ফুটবনাক তবু,
যতক্ষণ না ঝরি-
মুগ্ধ জনের সে অনুরাগ সইতে পারবে তুমি,
হৃদয়-সহচরি ?
পাপড়ি-ঘেরা মৰ্ম্মকোষের রক্ত এবং রেণু,
যা আছে তাই নিয়ে,
তৃষ্ণা তােমার মিটবে কি তায়, থাকতে পারবে তুমি,
হে মাের পরাণ-প্রিয়ে ?
৬০
অপরাজিতা
d
গন্ধ কহে নিসিয়া, ওগাে আমার স্বামি,
এ অনুযােগ কেন?
তুমি ছাড়া কোথায় আমি! তােমার মাঝে শুধু
গৰ্ব আমার জেন’।
আমি যদি তােমার মাঝে বন্দ থাকি, তবে
তুমিই কি তা পাবে ?
বন্দ করে রাখতে গিয়ে অন্ধ হয়ে তােমার
আনন্দ যে যাবে।
পর্ণ তােমার ফুটাও বন্ধু, গন্ধ ছুটাও লােকে,
বর্ণে ওঠ ভরি’
মৃত্যু যখন আসবে তখন তােমার কোলে শুয়ে
পড়ব ভুয়ে ঝরি।
নিবেদন
আমি শুধু জানাব আজ
তােমায় আমি ভালবাসি;
তা’তে তােমার ক্ষতি কিসের,
সর্বনাশি, সর্বনাশি!
রাত্রি-দিবা মৰ্ম্মতলে
যে অনন্ত বহ্নি জ্বলে ;
পতঙ্গ যে সে অনলে
জীবন তাহার ঢালে হাসি’
মরণ-কথা বলবে না সে ?
সর্বনাশি, সর্বনাশি!
৬২
অপরাজিতা
কেন তবে নয়ন-হরা
পাগল-কর। রূপটি তােমার !
নয়ন যদি ভুলে তাতে
সে অপরাধ শুধু কি তার?
যদি তােমার ওষ্ঠপুটে
কইতে কথা পদ্ম ফুটে,
ভ্রমর-চক্ষু যদি জুটে
নিন্দা করা যায় কি তাহার ?
আঁখির যদি দোষ-ই থাকে,
কিছু সে দোষ-নয় কি তােমার ?
চুম্বকেতে লােহ টানে,
লােহার স্বভাব ধরা দেওয়াই;
লােহা নিজে নরম ত নয়,
তবু তাহার ধরম তাহাই;
এ সব সত্য মেনেও তবে
মুখটি নীচু করতে হবে ?
মনের ব্যথা থাকুক তবে
আপন মনেই—বলতে না চাই;
তা’তেই যদি
হয় অপরাধ,
কি করবে সে—উপায় কোথায় ?
নিবেদন
৬
সিদুরে-আম টকটকে লাল
অস্ত-রবির আবির মাখি’,
ওষ্ঠে তােমার লজ্জা পেয়ে
সরম রাখে পাতায় কি;
মঞ্জরিত খেজুর-কঁদে
অলক হেরে লুটিয়ে কাঁদে।
জোড়া-ভুরুর বেড়া-ফাঁদে
বাঁধা পড়ে আঁখি-পাখী;
তােমার মাঝে কি যে আছে—
নিজে তুমি জান তা কি ?
গােপন তব মরমতলে
যে কথাটি লুকিয়ে থাকে,
থাকুক না সেজাতে কে চায়,
কোথায় কে কি ঢেকে রাখে!
তবু মনে ঠিকই জানি,
স্বচ্ছ যাহার আনন খানি
হৃদয় তাহার তেমনি মানি’
হৃদয় দেওয়া যায় গাে তাকে?
দিয়েছি তাই পরাণ আমার
সে কলঙ্ক আর কি ঢাকে ?
৬৪
অপরাজিতা
তবু যদি ব্যথা তােমায়
দিয়ে থাকি, কর ক্ষমা
তুমি থাক কল্পলােকের
আলােকলতা মনােরমা !
জানি-কভু ফুটবে না ফুল,
ফলবে না ফল ; তবু আকুল
এ জীবনের সে মহাভুল
মনের খাতায় থাকুক জমা
হিসেব-নিকেশ চুবে যে দিন
সে দিন এস প্রিয়তমা !
১
অভিশাপ তুই নদী, আমি অরণ্যানী- তােরে যে আমারি বলে জানি! আমারি বুকের পাশে বয়ে যাস কলহাসে তরল রজতধারাখানি; তােরে যে আমারি বলে’ মানি। তলতল-ছলছলছল- খেলা করে তাের ক্ষ্যাপা জল ; আমি থাকি চেয়ে-চেয়ে, বুঝি না কেমন মেয়ে একেবারে আপন-বিল- ছুটে চলে তাের ক্ষ্যাপা জল।
অপরাজিতা
শুষ্ক রুক্ষ্ম কাঠিন্যের সারি
আমি তােরে কিবা দিতে পারি ?
কূলের সীমাটি রাখি
আমি শুধু চেয়ে থাকি,
শিরে তাের ছায়াটি বিথারি’
কিবা আছে, কিবা দিতে পারি ?
পরাজি,
যাহা আছে, দিই উপহার ;
বিহঙ্গের কণ্ঠ দিয়া
পাঠায় এ মুগ্ধ হিয়া-
মরমের মৌন সমাচার ;
দীন আমি-দীন উপহার!
তাের কথা—কি কহিব আর ?
জানি তুই জীবন আমার ;
পুষ্প-পত্ৰ-বিটপী-বল্লরী
তােরি তরে প্রাণে উঠে ভরি’,
ধরি’ নবনব শােভাভার ;
তাের কথা কি বলিব আর?
অভিশাপ সখি, তােরে বাঁধি কিসে বল- রে চপল, রে চিরচঞ্চল! রাতদিন হেলাফেলা, এ কি প্রেম ছেলেখেলা- শুধু মন ভুলাবার ছল; রে নিলাজ, আপনা-বিহ্বল। দিন যায়, রাত্রি ফিরে আসে, হাসে গদ অগাধ আকাশে ; দক্ষিণের সমীরণ জাগায় পাগল মন শাখায়-শাখায় হাহাসে ; রাত্রি দিন—যায় আর আসে। প্রাণপণ প্রণয়ে উদাসী- এ কি ভালবাসা, সৰ্ব্বনাশি। আশাহীন শূন্যপ্রাণে, চেয়ে থাকি তাের পানে- চলে যাস তুই কলহাসি- প্রাণপণ প্রণয়ে উদাসী ।
৬৮ অপরাজিতা স্বতন্তরা, বুঝেছি ব্যাভার- সাগর সে বাঞ্ছিত তােমার। অর্থহীন এ জীবন হােক তবে সমাপন; তােরি মাঝে হােক একাকার- ভেঙে যাক স্বপন আমার। কিন্তু নদি, অভিশাপ মাের, এ দিন রবেনা কভু তাের ; পরিশুল্ক পরিক্ষীণ হবি তুই একদিন, গলে পরি’ বন্ধনের ভাের, গরবের নিশি হবে তাের। অস্থিরূপে বালুকার রাশি বক্ষ ভেদি’ উঠিবে বিকাশি’ ; হইয়া দুকূল-হারা মজিবে আকুল ধারা, কলহাসি কোথা যাবে ভাসি’ তপ্ত বুকে ধূ ধূ বালিরাশি।
hp
s
জটাই
কসাড়-ঘেরা কুটীর খানি কাসাই নদীর বাঁকে ;
দুধের মত রোেদটি আসে সাতটি শালের ফাকে,
দক্ষিণেতে রাঙা মাটির বাঁধটি গেছে ঘুরে’
মাথায় তারই নীলের রেখা—তালের সারি দূরে।
=
গাঙশালিখের কোটর-বেড়া বাঁধের বাকা পারে
একটি শুধু খেয়ার ডিঙি—বাঁধ, ঘাটের ধারে।
কুটীরবাসী ‘নবীন’-মাঝি খেয়া-তরির নেয়ে ;
শূন্য গৃহ; সরম’ বলে একটি শুধু মেয়ে।
ও-পারেতে আখের ক্ষেতে শরের কুঁড়ে-ঘর,
চখাচখীর চিহ্ন-আঁকা পাশেই বাঁকা চর;
বিজন-বাঁধা শরের কুঁড়েয় কামঠা-বাটুল হাতে-
জটাই বলে’ বন্য যুবা পাহারা দেয় রাতে।
৭০
অপরাজিতা
পাথর-কাটা নিটোল যােয়ান, ভয়-ভীতি নাই জানে
ঝাঁকড়া চুলে পালক আঁটা, মাড়ি পরে কাণে,
গলার মােটা পলার মালা বুকটি আছে ঘিরে’
কাঠা হাতে বজ্রডাকে হাঁক দিয়ে সে ফিরে।
.
দীর্ঘ ছায়া ফেলে’ যখন ঘুরে বেড়ায় চরে
ঘাটের ধারে মেয়েরা সব দেখায় পরস্পরে;
সরম যে দিন প্রথম তারে দেখল চেয়ে ভয়ে,
কাখের কলস্ পড়তে-পড়তে গেল তাহার রয়ে
এ-পারে সে চিৎ আসে—শুধু হাটের দিনে,
কড়ি গুণে’ একলা-ঘরের জিনিষ নে’ যায় কিনে;
মাঝির মেয়ের মাছের কাছে যে দিন পড়ে পা-
আঁচড়-খড়ি যায় সে ভুলে’-ছমকে উঠে গা !
রাতে শুয়ে স্বপন দেখে কাঁসাই নদীর চর ;
তারি মাঝে একটি শুধু শরের কুঁড়ে-ঘর,
পাশেই তাহার কাঠা-হাতে দীঘল ছায়া ফেলে
ঝাড়া মাথায় ঘুরে বেড়ায় সাঁওতালেদের ছেলে।
বর্ষা নামে কসাই-গাঙে রাঙাজুলের রথে
এপার-ওপার এক্সা করে’ ঘাটে-মাঠে-পথে;
বাধের উপর জল উঠিয়ে বেণাঝাড়ের তলে,
পারের চড়া ডুবিয়ে দিয়ে সাতার-পাথর জলে।
-
No text on this page.
জটাই কাখ-বরাবর ডুবে গেছে সাঁওতালদের কুঁড়ে, পাশেই তাহার উচু মাচান উঠে পাথার খুঁড়ে; কড়কড়িয়ে দেৰতা ডাকে, বৃষ্টি পড়ে রে'- ঝাপসা পারে তালের ভােঙায় জটাই বেড়ায় ঘুরে। এমন দিনে একলা সে যে, ভয় কি তাহার নাই ? সরম ভাবে, মাঝির ঘরে হয় না কি তার ঠাই ? ঝাঁকড়-চুলের লােকটা কিন্তু থাকবে বাহির ঘরে আজো তারে দেখুলে যে তার বুকটা কেমন করে। বর্ষাশেষে শরৎ আসে জাগিয়ে বালির চর, জল-বাথান’ ডােবার ধারে বাঁধিয়ে হাঁসের ঘর; শাদা রােদে কাশের মাথায় খেলিয়ে দুধের বাণ- তারি মাঝে জাগিয়ে চোখে শরের কুঁড়ে খান। সে দিন মাছে—ভিড় ভেঙেছে কসাই-ডাঙার হাটে, নবীন-মাঝি গরুর খোঁজে গিয়েছে কোন্ মাঠে ; সরম তাহার মাছের কড়ি গুণছে দাওয়ার পরে- ঝাঁকড়া চুলের লােকটা এল কাঠা হাতে করে। এমন দীঘল যােয়ান গড়ন-এমন কচি মুখ। শিশুর মতন কয় যে কথা-কাপল তবু বুক। নবীন-মাঝি নাইক ঘাটে, ফিরব আমি চরে সরম, তুমি একটু উঠে দেবে কি পার করে?
৭২
অপরাজিতা
কতদিন সে চালিয়েছে যে নবীন মাঝির ‘না’,
একটু উঠে পার করাতে বাধাও ছিল না ;
শিশুর মত সরল চাওয়া, সহজ মুখের কথা-
তবু কেন মুসড়ে যাওয়া-লজ্জাবতী লতা।
ত্বরিৎপদে ফিরল যুবা বারেক নাহি চাহি,
শীতের নদী সাঁতরে তীরে উঠল অবগাহি;
কাঠের মত রইল সরম-সরম-ভাঙা বুকে,
পার করে দাও-বাজে কেবল শিশু-সরল মুখে !
‘অজানা সেই অতিথ-গীতি ভীষণ-মধুর সুরে,-
সারারাত্রি ঢেউ খেলাল বক্ষ-সাগর যুড়ে;
ভােরের নিদে স্বপন দেখে-কাঠ-বাঁটুল ফেলে
তারি পানে তাকিয়ে আছে সাঁওতালেদের ছেলে !
ভাদর মাসের বানের মত বয়স উঠে বেড়ে;
মনে পড়ে, কোন্ কালে সেই স্বামী গেছে ছেড়ে।
খুটিনাটি ঘরের কাজে সময় কি সে কাটে ?
জানে না কি নালিস আছে, তবু হৃদয় ফাটে।
বছর ঘুরে গেছে দু’বার কসাই নদীর বাঁকে,
দুধের মত রােটি আজো আসে শালের ফাকে ;
দক্ষিণেতে রাঙা মাটির বাঁধখানি সেই আছে,
গাশালিখে তেমনি ডাকে নাওয়া-ঘাটের কাছে।
জটাই
৭৩
সবই আছে তেমনি—শুধু একটি কেবল নাই!
ঝাঁকড়া চুলের দীঘল যােয়ান-কোথায়, সে কোথায় ?
বালির চরে আখের ক্ষেত আর শরের কুঁড়ে ফেলে’--
কোথায় সে আজ, কোথায় সে আজ সাঁওতালদের ছেলে ?
কত বছর গেছে কেটে কঁসাই নদীর বাঁকে
কে জানে বােদ আসে কিনা সাতটি শালের ফাঁকে!.
সরম শুধু চেয়ে থাকে থমথমে মাঝ-রাতে-
আসবে কখন দীঘল-গড়ন কাঠা-বাটুল হাতে !
শুকনো পাহাড়ে ফুল
শুকনাে পাহাড়ে’ ফুল, ওগো-ঝরা
পাহাড়ে মাঠের ফুল,
একদিন তুই সারা পাহাড়টি
করেছিলি মসগুল !
তারা চেয়ে আজ প্রিয়
আজকার ফোটা মল্লিকা চেয়ে
শতগুণে রমণীয় !
সারা ধরণীর বসন্ত-ভরা
সুষমার চেয়ে বড়,
যদিও তােমার শোভা-ভাণ্ডার
ধূলায় আজিকে জড়’!
শুকনাে পাহাড়ে ফুল ৭৫ তাের ঝরা দলবাজি - তবুও জাগিছে অতুল শােভায় আমার নয়নে আজি ! পাহাড়ের ফুল, পাহাড়ের ফুল, পাহাড়ে মাঠের ফুল- ঝরা-দলে তাের অন্তর মাের সৌরভ-সমাকুল ! টেনিসন --- - সান্ত্বনা দুইটি প্রেমের পান্থ-পৌষের রাত- সঙ্গে কেহ নাহি; কুয়াশায় জলা-মাঠে চলেছে আঁধারে সম্মুখে না চাহি’। কাকপক্ষ অন্ধ নিশি; হারায় দুজনে- পুন কাছে আসে; দুইটি প্রেমের পান্থপথ দেখাইতে কেহ নাই পাশে। ; দিবালােক নিবে’ গেছে-হারাই পথ আমি আছি কাছে । কোথা পথ, কে দেখাবে—ভয় নাই প্রিয়, রব আমি পাছে।
সান্তনা
৭৭
কোথায়, কোথায়-ওগাে, নদী মাঝখানে,
বুঝি নদী মাঝখানে
সকল হারায়ে মােরা দুটী অন্ধ প্রাণী
হারাব সেখানে !
চিরদিন তরে সে কি ? নয় কভু নয়--
নয় তা হবার ;
যদিও হারাই, পুন ফিরে এসে দোহে
মিলিব আবার!
টেনিসন
নিরুপায়
লজ্জা করে না-রবীন,
লজ্জা করেনা ছেড়া ?
ছি ছি! চুমাে খেয়ে গেলি-
গাই-দু’তে হাত ঘােড়া!
কামিনী ফুটেছে ডালে,
করবী সুরভি ঢালে ;
চুরি করে রি ফাকে
চুমাে খেয়ে গেলি গালে।
পিছু হ’তে এসে চুপে
চুমিয়া পালা’ল ছোড়া;
কি করিব আমি, বল’
দুটি হাত ছিল যােড়া!
নিরুপায় কোয়েল উড়িছে ডেকে, দোয়েল-সে শিষ শেখে ; চুমাে খেয়ে গেল সে যে লুকিয়ে পিছন থেকে। আয়, আয় তুই রবীন, চুমাে দেরে-আয় কাছে; কেমনে যে দিব বাধা- দুটি হাত যােড়া আছে । ঘুঘু-সে ডাকিছে ডালে, সবাই পাগল একালে-- পিছু থেকে এসে, রবীন- চুমাে দিয়ে যারে গালে ! টেনিসন
চকিত
ফিফি কথা-নিকুঞ্জে
গােলাপেরই ঠিক প্রান্তে ;
মৌমাছি যেন—না গুঞ্জে
ঐ-বুঝি পেল জাতে !
চুম্বন দেরে পিয়ারিরে-
কে আসিবে হেথা গুণতে ;
ফড়িং—দুৰ্বাবিহারী যে-
ঐবুঝি পেল শুনূতে !
চুম্বন দেরে—নিকুঞ্জে
কেবা আছে-গাছে লিখতে?
বিহঙ্গ যেন-না গুঞ্জে
ঐ-বুঝি পেল দেখতে।
টেনিসন
পত্র-পরিচয়
পত্র-পথে বারেক দেখা--আঙুল চারেক জমীর পরে -
মসীমাখা মােহর-আঁকা চৌকা সাদা খামের ঘরে।
কোকিল নহে—ডাকের ডাকে, আখর-আঁটা বেড়ার ফাঁকে,
একটি কেবল কথার হাওয়ার আভাষ শুধু তিলেক তরে-
স্পর্শে যাহার মনের বনে ভাবের গাছে মুকুল ধরে।
বসন্তে নয়, নয় বরিষায়-বৈশাখী এক দ্বিপ্রহরে,
নিম্ব-শাখার পাতায়-ঢাকা কেউ-না-থাকা একল-ঘরে ;
এ পরিচয়--কি পরিচয়। মিলন-রসের কোন্ অভিনয় ?
চমকে-চাওয়া, থম্কে-যাওয়া কোন্ না-পাওয়া পাবার তরে;
একটি নাম আর একটি কথায় না জানি কোন্ শক্তি ধরে !
৮২
অপরাজিতা
মূৰ্ত্তি কোথায়—রূপটি কি তার, কেমন করে’ জান্ব তারে—
কল্প-গাঙে জালটি ফেলে কি ধরে’ আজ টান্ব পারে ?
ছত্ৰ-দুয়েক পত্র-লেখা,
সেই কি তাহার চিত্র-রেখা।
চোখটি তাহার, চুলটি তাহার--জ্বলছে যাহার অন্ধকারে ;
নামটি তাহার ফুলটি কি সে–মুগ্ধ করে গন্ধভারে !
পত্র-পথে সেই সে দেখা, তাও সে শুধু বারেক তরে-
আজো তাহার দাগটি আছে গােপন মনের বিজন ঘরে;
কত জনের কতই আলাপ, হয়ত তাহার নাই কোন ছাপ ;
মায়ার মােহের কত বাঁধন-কেটেছি এই আপন করে
তারি মাঝে একটি কোথায় রয়ে গেছে কেমন করে ।
রবীন্দ্রনাথ
আরাে আলো, আরাে আলােকঁদে সদ্যসুপপাখিত দেশ,
প্রাচীর তিমির টুটি যবে নব উষার উন্মেষ ;
নিমেষ-নিহত নেত্র চাহে ঊর্ধে পুণ্যরশ্মি পানে-
কে মিটাবে ক্ষুধা তার—তার তৃষ্ণা, তৃপ্তি সে কি মানে ?
ত্রিযামা যামিনী গত ; জাগিয়াছে অরুণ-আলােকে,
অযুত মুদিত নেত্ৰ-আকাক্ষার অপূৰ্ব্ব পুলকে ;
যত পায়, যত পায়--প্রাণ তার জেগে উঠে তত,
বত জাগে-যত চাহে, তৃষ্ণা তার বাড়ে অবিরত ;
আলােকে পেয়েছে সে যে ত্রিলােকের নব পরিচয়,
আলােকে জেগেছে তার আঁধারের ভয়ঙ্কর ভয়,
আলাে জানায়েছে তারে বিস্ময়ের নব নব লােক,
'আলাে জাগায়েছে তার প্রবুদ্ধের পরম পুলক ;
তাই তার আকাঙ্ক্ষার সীমা নাই, নাহিক কিনারা
আরাে চায়—শুধু চায় অবিচ্ছেদ আলােকের ধারা ।
হে সকল আলােকের পরম আলােক-হে সবিতা,
বিশ্ব-মহাগ্রন্থ তব আলােকের আনন্দ-কবিতা।
৮৪ অপরাজিতা অনন্ত রহস্য-ভরা, আদি-অন্ত পরিমাণ-হারা; রূপসশগন্ধস্পর্শরূপে মহাদীপ্তিধারা স্পন্দিত বিপুল বিশ্বে ; সিন্ধুবক্ষে বিরামবিহীন মর্মরিত তব গাথা ; বহে বায়ু চিরনিশিদিন পরম পরশ তব ; জ্বালে বহ্নি তব রুদ্র জ্যোতি, তােমারি করুণরসধারে স্নিগ্ধ মাতা বসুমতী লয়ে তার লক্ষকোটি সন্তানসন্ততি-সৃষ্টিধারা, মহাকাশে তব মহাকাব্য লেখে চন্দ্রগ্রহতারা; তােমারি গায়ত্রী-মন্ত্র উঠেছিল আদিম প্রভাতে এ পুণ্য ভারতবর্ষে, জ্ঞানের প্রথম রশ্মিপাতে; শতাব্দির অনভ্যাসে ভুলিতে কি পারিয়াছে লােক- তােমার সে জয়বাৰ্তা? অনির্বাণ আত্মার আলােক নিবে নাই, নিবে নাই—নিবিবেনা কভু কোনাে দিন- লুপ্ত নহে—শতাব্দির ভস্মপুঞ্জে শুধু দীপ্তিহীন। •হে রবীন্দ্র, হে কবীন্দ্র, হে বঙ্গের বরিষ্ঠ সন্তান, তুমি আনিয়াছ বহি’ সেই আলােকের মহাগান- তন্দ্রাতুর বঙ্গভূমে সঞ্চারিয়া অপূৰ্ব্ব চেতনা, জাগাইয়া সুপ্ত প্রাণে জীবনের নব উন্মাদনা ; সাহিত্যের সূৰ্য্য তুমি-প্রতিভার সহস্র কিরণে সাজাইয়া তুলিয়াছ মণিমুক্তারজতেহিরণে, রবীন্দ্রনাথ ৮৫ বঙ্গভাষা-বাগেবীর বিশ্বারাধ্যা বরমূর্তিখানি দরিদ্রা মাতারে তুমি সাজায়েছ রাজরাজেন্দ্রাণী । তােমার কিরণপাতে পূর্ণশােভা বিকশিত আজি, বঙ্গের মানস-সরে স্বর্ণকান্তি শতদলবাজি- অপূর্ব লাবণ্যে ভরা, ভাবগন্ধে মুগ্ধ দিকদশ, প্রজাপতি উড়ে বসে, মধুব্রত হরষে বিবশ ! সত্যের আলােক সাথে মিশাইয়া বিচিত্র কল্পনা, অপরূপ সপ্তবর্ণ ইন্দ্রধনু করেছ রচনা বঙ্গের সাহিত্যাকাশে-স্বর্গে-মর্ত্যে সেতু মনােহর- পার হয়ে কল্প-লােকে যায় যাওয়া—ভাবে মুগ্ধ নর! শােভা হেরি’ বই তুলি’ নেচে উঠে কল্পনাশিখিনী, ভাবের কদম্ব ফুটে, ছুটে চলে ভাষা-কল্লোলিনী। ভিড়াও ‘সােনার তরি’ দরিদ্র এ দেশের কিনারে শ্ৰীমন্তের শত ডিঙা—পরিপূর্ণ ভাবের ভাণ্ডারে ; ‘মানসী’র মূর্তিরূপে দেখা দাও সাধনার চোখে, ‘চিত্রা’র বিচিত্র পক্ষে স্বর্গ-সুধা বহি মর্ত্যলােকে; ‘ক্ষণিকা’র দীপ্তালােকে লুপ্ত কর দুঃখ-অমারাত- ‘কল্পনার কুঞ্জবনে ফুটায়ে স্বর্গের পারিজাত; ‘খেয়া’র কাণ্ডারী হয়েহে নাবিক, পার কর সবে সত্যের অমৃত-তীরে-অমরার আনন্দ-উৎসবে;
অপরাজিতা
অপূৰ্ব ‘নৈবেদ্য-ডালা সাজালে যে-হে কবি-পূজারি,
বাণীর মন্দিরতলে -চিত্তে ভরি’ গীতাঞ্জলি’-বারি,
প্রসাদ লভিয়া জারি, সারা বিশ্ব হউক অমর
সাহিত্যের ধর্মরাজ্য সংগঠিত হউক সুন্দর।
ঘুচে যাক সৰ্বভেদ মিলনের মহান মাঝে-
তব গীতে বাজে যাহা--সার্থক হউক তাহ| কাজে।
-
বাজাও বাজাও, কবি-সপ্তম্বরা স্বর্ণ-বীণা তব,
তারে-তারে ধ্বনি’ তেল বিচিত্র রাগিণী নব নব--
আনন্দবেদনাভরা বিশ্বসাহিত্যের মহাগান,
মাক সে সঞ্জীবনী মানবের অর্ধমুপ্ত প্রাণ।
বহাও এ ম্লান মর্ত্যে সাহিত্যের পুণ্য-ভাগীরথী-
সঙ্গীতের শঙ্খস্বরে—ভগীরথ পুরাণে যেমতি।
অগাধ অবাধ মুক্ত উদার সে প্লাবনের ধারে,
পল্বলের পঙ্করাশি যা ভাসি’ জীবন-জুয়ারে।
স্নান করি’ পান করি’, শিরে ধরি’ পবিত্র মানব
সার্থক সাধনা তব—কীর্তি তব বিশ্বের বিভব।
কবিবর, আজি তব ‘পঞ্চাশিকা’ শুভ অবসরে
কি কহিব, কি বলি, কি গাহিব—কথা নাহি সরে !
মােরা শুধু মুগ্ধনেত্রে চেয়ে থাকি, বিস্ময়ে পুলকে
অন্তরের কথা-কবি, লহ পড়ি' আপন আলােকে।
সাহিত্য-সম্রাট রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশত্তম বৎসর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে
অভ্যর্থনা-সঙ্গীত
=
বাণীবরতনয় ! আজি স্বাগত সভা মাঝে-
অযুত-চিত-কমলে যেথা আসন তঘ রাজে।
কাব্য-গীত-চিত্র-গাথা-সপ্তম্বর-তারে,
মুখর করি’ নিখিল লােক হরষ-রস-ধারে,
বিশ্ববীণাযন্ত্রে তব বিজয়বাণী বাজে!
আষাঢ়-মেঘমন্দ্ৰ কঁপে গভীর তব ছন্দে,
সরস শােভ পরশে রসি’ চরণ তব বলে,
মধুররে মাধবীসখা কোয়েলা মরে লাজে ।
ঘনায়ে আসে গহন মেঘ অতুল তুলি স্পর্শে,
সুখের আলাে উজলি’ জ্বলে গভীরতর হর্ষে
শান্তি দিয়া সান্ত্বনায়, শক্তি দিয়া কাজে।
}
অপরাজিতা বঙ্গভাষা ডাকিছে তােমাশত সেবক-কণ্ঠে, বঙ্গ আজি মিলিত—তব মিলন-সুধা বন্টে; . বাজায়ে শুভ-শঙ্খ আজি ডাকিছে নিজে মা যে ! এস হৃদয়বন্ধু, এসএস হে কবিসূৰ্য্য, মায়ের ঘরে বাজিছে তব অভিবাদন-তুৰ্য্য- স্বাগত কবিরাজ-অধিরাজ বরসাজে । কবি-সম্বর্ধনা উপলক্ষে কলিকাতা টাউনহল’-মহাসভায় গীত
***
।
ঘুম-হারা
তুমি আমায় বক্ছ কেন, মা !
আজকে আমার ঘুম যে আছে না-
ঘুমাই কেমন করে ?
কি সব কথাই মনে যে-মা, আসে-
এইখানেতে বাবা তেন পাশে,
গলাটি মাের ধরে’!
আচ্ছা-মা, ঐ কালাে ঘােড়ায় চড়ে
কোথায় গেলেন ? যদি, মাযান পড়ে
ঘােড়া যে বজ্জাত !
বনা মাগাকসনে কেন কথা ?
খেলেন কোথায়, লেনই বা কোথা-
এখন যে, মারাত!
১২
৯০
অপরাজিতা।
( বাহির-দোরে কে ঠেলে ঐ আগল--
এরি মধ্যে ফিরে আসবে? পাগল!
—বতে আমি পারিনি রাত-তাের,
পােড়া চোখে ঘুম কেন নাই তাের ?
আচ্ছা, মা-ঘুম কোথায় থেকে আসে?
দিনে বুঝি লুকিয়ে থাকে—মা, সে
কোথায় ঘুমের বাড়ী ?
সবাই রাতে ঘুমায়—ঘুম ত মেলা!
কাদের সাথে তাদের মা আজ খেলা-
আমার বুঝি ‘আড়ি’!
ঝিঝিদেরও আড়ি, তাইতে ডাকে,
সারারাত মা জেগে তারা থাকে—
শুধু বাজনা বাজায়!
জোনাক্-পােকাও ঘুমায় না মা, রাতে,
রােজই বিয়ে হয় মা, কাদের সাথে-
রােজই আলাে সাজায় ?
-তাের সাথে আর বকুতে পারিনি
পােড়া চোখে ঘুমের হ’ল কি?
-তােরও, মা-আজ কি হয়েছে যেন!
রােজ কথা ক’-আজকে এমন কেন ?
*** কালাে - মা-তুই আমায় বলি কেন ‘কালাে? তা’লে আমায় বাসিস্ ত ভালল- মা তুই তবে যা! তাের কাছে মা আনাক-আর, খুজে” যখন করতে যাবি বার- কথাই কনা! হেসে মাতা কহেন—পাগল ছেলে- পারিস কেমন—যা না দেখি, ফেলে । আবার যদি ডাকিস কালো বলে— সত্যি কিন্তু যাব এবার চলে দিদির শ্বশুরবাড়ী ! দিদি গেলে’ কঁদিস্ যেমন করে, দেখব, তেমনি কাদিস কিনা পড়ে— পাঠাস কিনা গাড়ী। তুইও যাবি দিদির মতন হ'লে— কহেন মাতা-অশ্রু-ভাঙা বােলে।
অপরাজিতা আচ্ছা, মাগাে, বাবাও ত সে কালাে, তারেও তবে বাসবি না ত ভালল- তুই মা একা তবে ; তিনটি জনে থাকূব আমরা ঘরে, দেখব মা-তুই থাকিস কেমন করে’ কেমন মজা হবে। বক্ষে টানি’ চক্ষু মুদে খানিক- কহেন মাতা-আমার ‘কালাে মাণিক’!
অভিমান বাবা নাকি -যাবেন চলে আবার ? কলকাতাতে কি আছে মা বাবার সেখানে যান কেন? লুকিয়ে থাকূব এনি খাটের তলে, বাবা যখন ডাবে ‘ভুলাে’ বলে— দিসনে বলে’ যেন! খুঁজতে যখন রাত্তির হয়ে যাবে , ঘাটে তখন নৌকো কোথায় পাবে? - তবু যদি যান মা—তিনি চলে, এমনি কেবল কাদব, বাবা বলে’ এম্নি সে জ্বর হবে; কিছু ওষুধ-খাবনা মা তখন, বাবা ফিরে’ ডাকবে এসে যখন- উঠব আমি ভবে! আমায় কেন যানা নিয়ে সাথে? শুনব কথা, কাদব না মা রাতে।
-কি বলি, মা ? ক’রতে পূজোর বাজার ।
আমার কিন্তু পােষাক চাই মা, রাজার
আর একটা সেই ছাতা ;
কাজ নাই মা এবার কাপড়-জামার,
একটা শুধু বন্দুক চাই আমার
আর একখানা খাতা ;
কিছু জিনিষ চানা মা তুই কেন ?
বনা গিয়ে—চিঠির কাগজ এনাে’!
=
হাঁসের মতন দোয়াত যে সেই আছে,
তেমনি একটা চা’ না মা, তার কাছে
বনা গিয়ে তাঁকে।
লিখতে—তখন কাকার কলম নেন!
ব গিয়ে—একটা ইসক্লি’-পেন
এনে দিয়ে মাকে ?
তুই যে, তাকে বলিস নে মা, কিছু
পঁড়িয়ে থাকিস মুখটি করে’ নিচু !
মুরুব্বি
মা, মা–ওমা, বাবা এলেন মস্ত গাড়ী চড়ে-
তাড়াতাড়ি দেখতে গিয়ে এমনি গেছি পড়ে।
দিদি গেছে, ক্ষুদী গেছে—দেখতে বাবার গাড়ী-
তুইও ও কেন—আয়না দেখে বাহির-দালান-বাড়ী।
ওকি, মা—তাের অমন করে উঠল কেন চোখ
বুঝতে আমি পারি না—তুই কেমন যে মা লােক।
সারাদিন আর, মাগো তােমার সময় হয় না আর?
এই দেখ মা-কে এসেছেন, করুনা' নমস্কার!
আমরা সবাই করেছি ত; কেমন দিদি, নয় ?
গুরুজন কেউ এলে, তাঁকে প্রণাম করতে হয়।
ওকি, মা-তুই চুপটি করে বইলি চেয়ে কেন ?
বাবার সঙ্গে কোনকালেই কন্না কথা যেন!
অপরাজিতা কত রকম জিনিষ যে, মা-এনেছেন যে সাথে- বলেছেন-কাল দেবেন খুলে’ সক্কাল-বেলাতে; তােমার জন্যে কিছুই না মা-সত্যি, কেমন নয় ? তুই যে বলে’ দিসনি কিছু, যাবার—সে সময় ! দাড়িয়ে, মা-তুই হাসি কেন? মা, তুই কি যে লােক- বাবার কাছে নে না চেয়ে-একটা কিছু হােক।
লক্ষীছেলে কাল যে দেবে বলেছিলে—আজ ত এখন কাল ঐ দেখনা-নােঙ্গুরেতে ভরে গেল চাল ! ওঠ—আর কখন্ দেবে? অনেক হ’ল বেলা এক্ষুণি যে পড়বে এসে’ বন্ধু আমার মেলা! হারু এসে’ বলবে যখন-কি পেলি ভাই দেখি- তখন আমি কি দেখাব, বলব তাদের যে কি ? মুখ-ধােওয়া সে পরে হবে; বাক্স আগে খােল’-- চাবির থােকা দেও মা, তােমার চুলের দড়ি তােল। খো আমার দেখে সবার—ইচ্ছে কেবল পাওয়ার- হাবা ত তার বাবার সাথে কথাই কবে না আর! পারুর মুখটি দেখে আমার এমনি পেল হাসি- বাবা, তােমায় আজকে হতে খুবই ভালবাসি। রােদূরে আর বেড়াবনা, বই দেবনা ফেলে, দুষ্টমি আর করবনাক-মাষ্টারমশায় এলে, পুকুর-ভাসা নতুন জলে পাড়ব না আর ডুব- মারামারি করব না আর, লক্ষ্মী হব খুব।
মাগাে, তােমার আজকে নাকি চুল-বাঁধার ‘একজামিন’-
আরসি নিয়ে আছ বসে’ সেই হ’তে সারাদিন।
চুল বাঁধা—সে পরে হবে, কাপড় দে বা’র করে,
বাবার সঙ্গে বেরােব আজ ভাল কাপড় পরে;
খেতে সবাই ডাতে এলে, বলি তাদের, মা-
শালবনীতে গেছে সে আজ, খেলতে যাবে না।
আজকে ফিরে আসতে বাড়ী, আসব মা সেই রাতে--
* কিছু তুমি ভেবােনা মা, বাবা যে আজ সাথে !
আজকে তাঁকে দেখাব সেই বুলবুলীদের বাসা ।
ছােট্ট -কেমন ফুটকি-দেওয়া ডিমগুলি সে খাসা।
তিনটে ডিমের একটা-মা, কাল হয়ে গেছে ছানা-
ঠোঁটটি কেমন ফাক করে সে নড়াচ্ছিল ডানা;
পাণ্ডিা, সন্ধ্যাবেলায় হিম পড়ে যে, শীত লাগে তার-নয় ? খুকীর ছেড়া কঁাথাটা তায় দিয়ে এলে হয় ! দেখুঁতে কিছু পায় না সে যে—ফুটবে—মা, চোখ কবে? একটু বড় হলেই কিন্তু নিয়ে আসতে হবে। আরাে কত-কি-যে জিনিষ দেখিয়ে আনব তাকে মৌচাক-সেই গােয়াল-পাড়ার চিতে-বেড়ার ফাঁকে; বেদের চিতে-সাপের মতন আস্তে-আস্তে নড়ে- মধু কোথায় পায় তারা—চাক কেমন করে গড়ে? কাউকে আমি বলিনি তা, উড়িয়ে দেবে বলে, তােমার জন্যে আম্ব পেড়ে অনেক মধু হলে ; নিজে কিন্তু যাবনা-যে কামড়ে দেয়-মা, নাকে- সে দিন যে সেই কামড়েছিল মথুর দাদার মাকে ? দূরে থেকে বলব-বাবা, যেওনা আর কাছে ; চুপটি করে যাব আগে, রাখব তাকে পাছে। ছাতিমতলার কমি-পুকুর-দেখাব আজ তাও দুটো ফুল, মা, আব তুলে’-বল’ যদি চাও; কেমন মজার ফুল যে মা, তার-কি যে চমৎকার- ঠিক যেন সে তাকিয়ে থাকে খুকীটি তােমার ।
অপরাজিতা
জলেতে ফুল, ডাঙাতে ফুল—সব ঠায়ে তার ফুল,
জল আর ডাঙা—একই বলে হয় যেন-মা, ভুল!
ঘাটের ধারে অনেকগুলো ভােঙা আছে বাঁধা,
তার উপরেও জল উঠেছে, তাতেও ফুলের গাদা!
ঐ-মা, বাবা ডাকছেন আবার, দে না মা চট করে,
পকেট-ওল পিরানটা দি-ফুল আনব তাই ভরে।
দ্বিজেন্দ্র-বিয়ােগে সমুদ্রমন্থনদিনে দেবাসুরে নিল ভাগ করি’ সিন্ধুর যা-কিছু রত্ন; বেলাভূমে ছিল সেথা পড়ি একখানি শুক্তি শুধু; বিধাতা দিলেন তাহা নরে- হাসি-অশ্রু যুগ্ম-মুক্তা গাঁথা যার গােপন গহ্বরে। ছল-ছল স্বচ্ছশােভ অশ্রুমুক্তা স্বভাব-কোমল- মানবের চক্ষে-চক্ষে ফিরিতে লাগিল ভূমণ্ডল ; হাস্য ছিল সঙ্গোপনেল-টল লাবণ্যসম্ভার। তুমি কবি, আহরিয়া সুদুর্লভ সেই উপহার, সমর্পিলে মহা হবে মর্ত্যবাসী আর্বজন লাগি’- হাসিল তমসাতীরে অকলুষা উষা যেন জাগি’ ; সাহিত্যের কুঞ্জে-কুঞ্জে কণ্টকে ফুটিল পুষ্পরাশি, বঙ্গবাসী প্রাণ পেল হাসি’ সেই বঙ্গভরা হাসি।
১০২ অপরাজিতা কিন্তু হায়! কে মুছিবে নিয়তির অব্যর্থ লিখন- দরিদ্র বাঙালী-ভাগ্যে আনন্দ যে ঐশ্বৰ্য্য-স্বপন। তাই আজি বঙ্গাকাশে সহসা নিবিল ধ্রুবতারা, আনন্দের পূর্ণচন্দ্র অকস্মাৎ হ’ল জ্যোতিহারা; বসন্তে জাগায়ে দিয়া কোকিল কোথায় গেল চলি’, ‘গৃহস্থের থােকা হাে’-কাদিল সে ‘চোখ গেল’ বলি’! এ যেন কৌতুক-নাট্যে প্রথমাঙ্কে যবনিকা টানি’ নিবাইল দীপালােক, শুনাইল অন্তিমের বাণী । রঙ্গরসে সারা বঙ্গ মাতাইয়া যেন অর্ধপথে – বঙ্গ-বৃন্দাবন-চন্দ্র আবােহিলা অকুরের রথে ! যে দিয়াছে এত সুখ—সেও এত দুঃখ দিতে জানে— হায়রে দুর্ভাগা দেশ! আনন্দ কি সহে তাের প্রাণে ! ঐ শোন, লক্ষ কণ্ঠ তােমারে ডাকিছে ফিরে আজি- ঐ দেখ, লক্ষ চক্ষু বরষিছে তপ্ত অরাজি। আপনি স্বদেশ-লক্ষ্মী—হের, আজি শূন্য কোল নিয়া, কবিবর, তােমাপানে অনেত্রে আছেন চাহিয়া ! এরি মাঝে মর্ত্যে তব কর্তব্যের হইল কি শেষ? সকল দেশের রাণী’ আজিও যে চিনিলন। দেশ। ‘স্বর্গ আমার’ বলি’-গর্বভরে ডাকে কয় জন ‘মানুষ হ’বার লাগি’ গৃহে-গৃহে কৈ আয়ােজন ?
দ্বিজেন্দ্র-বিয়ােগে ১০৩ ‘শিখিয়া বিলাতি বুলি, বাঙলা ভুলি’তে আজো সাধ, গণ্ডমু চণ্ডী করে লণ্ডভণ্ড হিন্দুধর্মবাদ ! এখনাে এ দগ্ধদেশে ছদ্মবেশে ফিরে ‘নন্দলাল’ ফিরে’ এস, ফিরে’ এস-সাহিত্যের আনন্দ-দুলাল। শতাব্দির দুঃখদৈন্যে জর্জরিত যাহার হৃদয়, হাস্য যে অমৃত তার-অবসন্ন আত্মার অভয়! তুমি সেই অমৃতের কবি, ঋষি, মহাপ্রচারক, দেশভক্ত মহাকৰ্মী, জননীর অক্লান্ত সাধক ; তুমি শুধু কৰি নহ, কবিরাজ তুমি ধন্বন্তরি - মুমু বাঙালীদেহে তুমি দিলে জীবনী সঞ্চুরি সঞ্জীবনী হাস্যমন্ত্রে ; পাংশুমুখে ফুটি’ উঠে হাসি, উঠি বসে শীর্ণ রােগী–গৃহে বাজে আনন্দের বঁাশী ! কিন্তু কবি, অসমাপ্ত রয়ে গেল সমারব্ধ কাজ- এমন চাদের আলাে, মরি যদি’—তাই সত্য আজ ! ও তবে কবিবর, সুরধামে’-মহাসিন্ধুপারে; তােমারি অমৃত-গীতি শাস্তি দিক আজি সবাকারে । ৪ কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অকাল মৃত্যুতে।
s
বিরাগী
গােলাপের বাগ, কেয়ার কেয়ারি
ভাগ করে নিক কবিরা মেলি ;
আমার সেথায় নাহি আর ঠাই,
সে সকলে তাই এসেছি ফেলি।
বুলবুল মাের গিয়াছে উড়িয়া,
সখের সারস গিয়াছে মরি’,
ভ্রাক্ষশাখায় রহিল টাঙানাে
সাধের সেতার হেলায় পড়ি।
তোমরা সে সব ভােগ কর ভাই—
তোমাদের আজো রয়েছে আশা
আমার সুখের নেশা কাটিয়াছে-
চিড়িয়া উড়েছে—কি হবে বাসা !
বিরাগী
খােদা নিজে যারে ফকির করেছে,
মজুলি তারে সাজে কি আর ?
অন্ধ নয়নে সুৰ্ম্মা কে আঁকে,
তারহীন—কে সে রাখে সেতার ?
সংসার-নেশা কেটেছে আমার
বন ভাল তাই আমার কাছে ;
বন্ধু আমার, শান্তি আমার
হেন অরণ্য কোথায় আছে ?
নিবিড় আঁধার দূর দুর্গম
বৃক্ষের পরে বৃক্ষশ্রোত,
সুর্যের আলাে পশেনাক ভয়ে,
বাতাসের হয় কণ্ঠরােধ
৩।
কণ্টক যেথা বাঁকা কটাক্ষে
পান্থজনারে পথে ফিরায়,
সুস্বর পাখী পলায় তরাসে,
বাদুড়েরা শুধু ঝােলে শাখায় ;
।
চীকার করে পেঁচা উড়ে যায়,
পাখা ঝটপটি’ শিকার ধরে,
হিংস্র শ্বাপদ তাহারি তলায়
হানাহানি করে পরস্পরে!
অপরাজিতা সেই মাের ঠাঁই -সেই আশ্রয়, সেই হবে মাের নূতন বাসা- তােমরা হেথায় সুখে থাক ভাই, তােমাদের আজো রয়েছে আশা!” চন্দন যেথা গন্ধ দেয় না- ঘর্ষণে শুধু আগুন জ্বালে, বেতস যেথায় কুঞ্জ রচে না, সর্ধেরে রাখে জড়ায়ে ডালে ; . ফল যেথা শুধু মাকাল নিম্ব- কটু ও তিক্ত-কুরসে ভরা, কাল-কাসন্দা কুসুম কেবল নিশ্বাস যার চেতনা-হরা ; নাহি নদনদী, পল্ল শুধু গলিত-পত্ৰ পঙ্কময়, গঙুষে যার-মৃত্যু সে ধ্রুব, অন্ততঃ নর পাগল হয়; হেন ঠাঁই—যাহা দুরধিগম্য, রম্য এখন আমার কাছে ; সংসার-ভােগ তােমরা মিটাও তােমাদের আজো পিপাসা আছে !
বিরাগী ক ছেড়ে দাও মােয়র, কেন রাখ ধরে কি বলিছ—কেন বিরাগ হেন- ভাবিওনা কিছু, শােন বলি তবে প্রম যখন করেছ-কেন ; তােমরা যাহারে সংসার বল, বুঝিয়াছি তাহা বিষের খনি ; অরণ্য বলি’ ভয় কর যায়, তার তুলনায় স্বর্গ গণি! কবিত্ব কাছে বিদায় নিয়েছি সত্যের আমি পেয়েছি দেখা, সংসার-পাঠ সাঙ্গ করেছি- ঐ পাঠশালে আমারাে শেখা; তােমাদের আজো নেশা আছে প্রাণে তাই, তােমাদের রয়েছে আশা; সংসার-মধু-স্বাদ পাবে যবে আমারি মতন ভাঙিযে বাসা ! = tিs শেষ শেষ অলি নিঃশেষ আজি শেষ সাজি যাহা ভরিবার ; পরাজিত এই অপরাজিতার সময় হয়েছে ঝরিবার। অন্তরযামী দেবতা, পুষ্পজীবন বৃথা গেল বহি’- কেমনে ভুলিব সে কথা! কুঞ্জ ভরিয়া ধ্বনিয়া উঠিল অপরাজিতার পরাজয় ; সুদূরে—আঁধারে কে অপরিচিতা হাসিয়া দেখায় বরাভয় ! সে অভয়ে আর কিবা ফল? মুদিয়া এসেছে আঁখি-পল্লব- ধূলায় লুটায় ঝরা-দল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.