Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ramakrishner Nutan Galpo
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শিশুতােষ মারও
শিশিয় কুমার ৪a,বি.এ
মপাদক
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যা।
খি মিরপাবলিশা ইউম
ঐশিশিরকুমার মিত্র বি, এ
শিশির পাবলিশিং হাউস
কলেজ স্ট্রীট, মার্কেট,
কলিকাতা।
শিশুতােষ সিরিজ-বার্ষিক মূল্য ৪,
ষান্মাসিক মূল্য ২
প্রতি খণ্ড y০
প্রতি মাসে একখানি করিয়া বাহির হয়
জ্যৈষ্ঠ-১৩২৯।
টের কুলচন্দ্রদে
गाँडजस्म
Rদুদাদির লেন
রামকৃষ্ণের নূগুণ গল্প
বাঘের বাচ্ছা
এক মাঠে এক পাল ছাগল চরিতেছিল। সেই
সময় এক বাঘিনী আসিয়া সেই ছাগলের পালের
উপর লাফাইয়া পড়িল। ছাগলগুলা ভয়ে অস্থির
হইয়া চারিদিকে ছুটাছুটি আরম্ভ করিয়া দিল।
বাঘিনী একটা ছাগল ধরিতে যাইতেছে সেই
সময় এক শিকারী বাঘিনীটাকে গুলি করিল।
গুলি খাইয়া বাঘিনীর আর ছাগল ধরা হইল না-
সেই খানেই পড়িয়া প্রাণ ত্যাগ করিল। এখন
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
বাঘিনীর পেটে বাচ্ছা ছিল। গুলি খাইয়া প্রাণ
ত্যাগ করিবার পূর্বে বাঘিনী একটা বাচ্ছা প্রসব
করিয়া ফেলিল। শিকারী বাঘিনীটাকে লইয়া
চলিয়া গেল। বাচ্ছাটা ছাগলের পালেই রহিয়া
গেল—এবং সেই ছাগলের পালের ভিতর থাকিয়া
দিন দিন বড় হইয়া উঠিতে লাগিল। বাঘের
বাচ্ছাটা ছাগলের দুধ খাইয়া মানুষ হইল এবং
ছাগলের সঙ্গে থাকিয়া ঘাস খাইতে শিখিল ।
ছাগলদের সঙ্গে থাকিয়া বাঘটার চলন চালন—
কতকটা ছাগলের মত হইল—এমন কি সে
ছাগলের মত ভ্যা ভ্যা করিয়া ডাকিতেও শিখিল ।
এইভাবে কিছুদিন যাইবার পর সেই ছাগলের
পালে আবার এক বাঘ আসিয়া উপস্থিত হইল।
কিন্তু সেই ছাগলের পালের ভিতর একটি বাঘের
বাচ্ছা দেখিয়া সে একেবারে অবাক হইয়া গেল।
ছাগলের সহিত সেই বাঘের বাচ্ছাটাও ঘাস
খাইতেছিল। বাঘ দেখিয়া ছাগলগুলাও যেমন
ভয়ে অস্থির হইয়া পলাইতেছিল, সেই বাঘের
गोल বিকট স্বরে বলিল-জলের ভিতর দেখ,আমিও যা, তুইও তাই।
No text on this page.
বাঘের বাচ্ছ বাচ্ছাটাও তেমনি পলাইবার চেষ্টা করিতেছিল। সেই প্রকাণ্ড বাঘটা এই ব্যাপার দেখিয়া ছাগল- দের আর কিছু বলিল না—সে ছুটিয়া গিয়া একে- বারে যেই ঘাসখেগাে বাঘটার কাণ কামড়াইয়া ধরিল। সেই বাঘের বাচ্ছাটা ভ্যা ভ্যা করিয়া উঠিল এবং পলাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু সেই বড় বাঘটা সেই ঘাসখেগাে বাঘটাকে কিছুতেই ছাড়িল না। তাহাকে টানিতে টানিতে জলের ধারে আনিয়া উপস্থিত করিল ও বিকটম্বরে বলিল,-“জলের ভিতর দেখ। দেখ আমারও যেমন মুখ, তােরও তেমন মুখ। আমিও যা, তুইও তাই।” কিন্তু বাঘের বা খাটা তখনও কঁপিতেছিল। বড় বাঘটা খানিকটা মাংস আনিয়া তাহার মুখে পুরিয়া দিল । ঘাসখেগাে বাঘটা প্রথমে কিছুতেই মাংস খাইতে চাহিতেছিল না। দায়ে পড়িয়া মাংসের আস্বাদ পাইয়া একটু একটু খাইতে আরম্ভ করিল। তাহার ভয় ঘুচিল—এতক্ষণে সে বুঝিল
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
৪
যে, হঁা, সেও বাঘ। তখন সেই বড় বাঘটা
যেই ঘাসভেগাে বাঘটার কাণটা আচ্ছা করিয়া
নাড়িয়া দিয়া বলিল,-“তুই বাঘের বাচ্ছা হয়ে
ছাগলের সঙ্গে ছিলি—আর ঘাস খাইতেছিলি।
ধিক তােকে।”
এই বলিয়া সেই বড় বাঘটা সেই ঘাসভেগাে
বাঘটার কাণ ছাড়িয়া দিয়া মন্থর গমনে চলিয়া
"গেল। বড় বাঘটার কথায় সেই ঘাসখেগাে
বাঘটার জ্ঞান হইয়াছিল। সেও বাঘ; কাজেই
লজ্জায় আর সে মুখ তুলিতে পারিল না! সে
সেইখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিবার পর
বাঘের মত একটা বিকট গৰ্জন করিয়া বনের
ভিতর ঢুকিল। আর সেই ছাগলের পালে গেল
। পৃথিবীতে মানুষ ঠিক এইরূপ অজ্ঞান হইয়া
থাকে-গুরুর কৃপায় তাহার জ্ঞান লাভ করে ও
নিজেকে বুঝিতে ও চিনিতে শেখে। গুরুর কৃপা
হইলে অতি অল্প কারণেই অজ্ঞানতা দূর হয়।
কার্তিক ও গণেশ
কৈলাসে ভগবতী কার্তিক ও গণেশকে লইয়া
বসিয়াছিলেন। সে দিন মায়ের গলায় গজমুক্তার
হার দুলিতেছিল। কার্ত্তিক গণেশ দুই জনেরই
মায়ের গলার হারটি গলায় দিবার বড় সাধ হইল।
দুইজনেই ভগবতীকে বলিল,-“মা তােমার হারটা
আমাকে দাও—আমি গলায় পরিব।”
কার্তিক গণেশের এই আব্দারে ভগবতী বড়
মুস্কিলে পড়িলেন। দুই ছেলেই হার চায় অথচ
তাহার গলায় একটি মাত্র হার। তিনি একটু
চিন্তা করিয়া কহিলেন,—তােমাদের মধ্যে যে
ব্ৰহ্মাণ্ড মাঝে ঘুরিয়া আসিতে পারিবে, আমি
তাহাকে এই হার পরাইয়া দিব।”
ভগবতীর কথা শুনিয়া কার্তিক মনে মনে
ভাবিল—এই কথা ! আমি এখনি ব্রহ্মা ও প্রদক্ষিণ
করিয়া আসিতেছি। কার্তিক আর ভগবতীকে
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
কোন কথা না বলিয়া তখনি ব্রহ্মাণ্ড প্রদক্ষিণ
করিতে বাহির হইয়া গেল। কিন্তু গণেশ তাহা
করিলেন না—তাহার জ্ঞান ছিল—তিনি জানি-
তেন মায়ের ভিতরই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। তাই তিনি
ভগবতীর চারিপাশে ঘুরিয়া জননীকে প্রণাম
করিলেন। ভগবতা সমস্ত বুঝিতে পারিলেন ও
বুদ্ধিমান পুত্রের গলায় নিজের গলা হইতে হার
খুলিয়া লইয়া পরাইয়া দিলেন। এদিকে কার্তিক
ব্ৰহ্মাণ্ড ঘুরিয়া ফিরিয়া আসিয়া দেখিল-মায়ের
গলার হার গণেশের গলায় দুলিতেছে। কার্তিক
ব্যাপার কি প্রথমে ভাল বুঝিতে পারিল না। দাদা
এত শীঘ্র কেমন করিয়া ব্ৰহ্মাণ্ড ঘুরিয়া আসিল।
কিন্তু জননীর মুখে যখন সমস্ত শুনিল তখন আর
লজ্জায় কথা কহিতে পারিল না। গণেশের মত
জননীর ভিতরই ব্রহ্মাণ্ড আছে—এ বিশ্বাস যে
সন্তানের আছে, সেই যথার্থ সন্তান!
অর্জুনের লক্ষ্যভেদ শিক্ষা । গুরু দ্রোণাচার্যের 'নিকট কৌরব ও পাণ্ডব- গণের যখন ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা শেষ হইল তখন দ্রোণাচাৰ্য তাহারা কিরূপ শিক্ষালাভ করিয়াছে তাহারই পরীক্ষা করিবার জন্য একটী বৃক্ষের উপর একটী কৃত্রিম পক্ষী রাখিয়া শিষ্যগণকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। শিষ্যের আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি বৃক্ষের উপরিস্থিত পাখীটীকে তাহাদের দেখা- ইয়া বলিলেন ঐ পাখীর চক্ষু ভেদ করিতে হইবে। তাহার পর একে একে ডাকিয়া পরীক্ষা আরম্ভ করিলেন। যেই ধনুর্বাণ লইয়া চক্ষু ভেদ করিতে আইসে অমনি তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, “কি দেখিতেছ ?” সকলের মুখেই এক উত্তর,—“গাছের উপর পাখী দেখিতেছি। তাহার উপর আকাশ দেখিতেছি।”
রামকৃষ্ণের নৃতন গল্প
অমনি দ্রোণাচাৰ্য্য বলেন,-“যাও তােমাকে
ভেদ করিতে হইবে না।”
এই ভাবে একের পর একজনের পরীক্ষা শেষ
হইবার পর অর্জুনের পালা আসিল। অৰ্জ্জুন
গুরুর চরণে প্রণাম করিয়া পাখীর চক্ষু ভেদ
করিবার জন্য ধনুর্বাণ তুলিয়া লইলেন। দ্রোণাচাৰ্য
জিজ্ঞাসা করিলেন,-“কি দেখিতেছ ?”
অর্জুন উত্তর দিল,-“পাখীর চক্ষু।”
দ্রোণাচাৰ্য তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
“আমাকে দেখিতে পাইতেছ ?”
অৰ্জ্জুন বলিল,-“না।”
দ্রোণাচাৰ্য জিজ্ঞাসা করিলেন,-“গাছটা
দেখিতে পাইতেছ ?”
অর্জুন ঘাড় নাড়িল। দ্রোণাচাৰ্য আবার
বলিলেন,-গাছের উপর পাখীকে নিশ্চয়ই
দেখিতে পাইতেছ ?”
অর্জুন ঘাড় নাড়িয়া পূর্বের মত বলিল,-
“না।”
তুৰ্জ্জুনের লক্ষ্যভেদ শিক্ষা
দ্রোণাচাৰ্য তখন জিজ্ঞাসা করিলেন,-“তবে
তুমি কি দেখিতেছ ?”
অৰ্জ্জুন গম্ভীরশ্বরে উত্তর দিল,-“কেবল পাখীর
একটা চক্ষু।”
দ্রৈাণাচাৰ্য শিষ্যকে আশীর্বাদ করিয়া বলি-
লেন,-“তুমিই
যথার্থ লক্ষ্যভেদ
শিখিয়াছ।
তােমারই শিক্ষা সার্থক।”
গুরুর বাক্য শেষ হইতে না হইতেই অর্জুন
পাখীর চক্ষু ভেদ করিলেন যাহার শিক্ষায়
অর্জুনের মত একাগ্রতা থাকে--সেই যথার্থ
শিক্ষার অধিকারী হয়। যে বিষয় শিক্ষা করিবে
তাহাতেই সমস্ত মনটুকু নিয়ােজিত হওয়া চাই।
নতুবা যথার্থ শিক্ষা লাভ করা যায় না।
হুনুমান সিং।
এক দেশে হুনুমান সিং বলে এক মস্ত বড়
পালােয়ান ছিল। হুনুমান সিং যে একজন মস্ত
বড় পালােয়ান সে কথা দেশ বিদেশে রাষ্ট্র হইয়া
পড়িয়াছিল। দেশ বিদেশ হইতে নানা পালােলায়ান
আসিয়া প্রায়ই হুনুমান সিংএর সহিত কুস্তি
লড়িত। একবার
একবার এক মুসলমান পালােয়ান
হুনুমান সিংএর সহিত কুস্তি লড়িবার জন্য পাঞ্জাব
হইতে আসিয়া উপস্থিত হইল। গ্রামের লােক
সকলেই সেই মুসলমান পালােয়ানকে দেখিতে
আসিল। পাঞ্জাবী পালােয়ানকে দেখিয়া সকলেই
বলিল,-“হ্যা পালােয়ান বটে।
হুনুমান সিংএর সহিত সেই পালােয়নের
কুস্তির দিন স্থির হইল। নানা দেশ হইতে দলে
দলে লােক তাহাদের কুস্তি দেখিবার জন্য আসিয়া
জুটিতে আরম্ভ করিল। আর পনাের দিন বাকী
হমান সিং পনাের দিন পরে হুনুমান সিংএর সহিত সেই পাঞ্জাবী পালােয়ানের কুস্তি হইবে। পাঞ্জাবী পালােয়ান কুস্তি হইবার পনাের দিন থাকিতে খুব ঘি দুধ মাংস খাইতে আরম্ভ করিল। সকলেই ভাবিল—পাঞ্জাবী পালােয়ানই জিতিবে। এদিকে কুস্তির দিন যতই আগাইয়া আসিতে লাগিল- পাঞ্জাবী তাহার আহার ততই বাড়াইয়া দিতে লাগিল—আর হুনুমান সিং ততই তাহার আহার কমাইতে লাগিল। যে দিন কুস্তি হইবে সেই দিন হুনুমান সিং একেবারে উপবাস ছিল। যথা সময়ে কুস্তি আরম্ভ হইল। হুনুমান সিং মহাবীরের নাম স্মরণ করিয়া কুস্তি আরম্ভ করিয়াছিল। ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি কিছুক্ষণ চলিল, কিন্তু লােকে যাহা ভাবিয়াছিল হইল কিন্তু তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত। আর অল্পক্ষণেই হুনুমান সিং সেই পাঞ্জাবী পালো- য়ানকে চিৎ করিয়া দিল। হুনুমান সিংএরই জিত হইল। লােকে এই ব্যাপার দেখিয়া একেবারে অবাক হইয়া গেল।
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
কেবল কতক গুলা আহার করিলেই শক্তি
বৃদ্ধি হয় না ! শক্তি বৃদ্ধি করিবার একমাত্র উপায়
সংযম অভ্যাস। যিনি সংযমী তিনি শক্তিশালী
কবিরাজ ও রােগী
এক দেশে এক কবিরাজ ছিলেন—তাহার
পসার যথেষ্ট। দিন রাত রােগীর ভিড়ে তাহার
গৃহ পূর্ণ থাকিত। একদিন তাহার নিকট একটা
রােগী আসিয়া উপস্থিত হইল—তিনি তাহার রােগ
পরীক্ষা করিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করিলেন ও বলি-
লেন,-কাল একবার আসিও সেই সময় তােমার
পথ্যাপথ্যের সম্বন্ধে বলিব।”
রােগী ঔষধ লইয়া চলিয়া গেল এবং পর দিন
আবার কবিরাজের কথামত কবিরাজের বাড়ী
আসিয়া উপস্থিত হইল। কবিরাজ তাহাকে ব:ি-
fil
in
// // //
কবিরাজ বলিলেন-কাল তােমার প্যাপত্যের মধ্যে বলিব
No text on this page.
কবিরাজ ও রােগী লেন,—“দেখ, বাপু গুড়টা খাইও না, গুড় খাওয়া একেবারেই ভাল নয়।” রােগী চলিয়া গেল। সেইখানে অপর একটী লােক বসিয়াছিলেন। রােগী চলিয়া গেলে তিনি কবিরাজকে বলিলেন, “আচ্ছা এই লােকটীকে আজ আবার আসিতে বলিয়াছিলে কেন? কালই ততা ও কথাটা অনায়াসেই বলিয়া দিতে পারিতে।” সেই লােকটার কথায় কবিরাজ মৃদু হাসিয়া বলিলেন,—শুধু শুধু মানুষ মানুষকে কোন কথা বলে না। কাল এই ঘরে আমার কয়েকটা গুড়ের নাগরী ছিল। কাল যদি আমি উহাকে বলিতাম গুড় খাওয়া ভাল নয়—সে কথা ও কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিত না। তাহার নিশ্চয় মনে হইত, কবিরাজ মহাশয়ের গৃহে যখন এত গুড়ের নাগরী তখন গুড়টা খারাপ হইতেই পারে না।” ববিরাজের কথার অর্থ সেই নােকটী এতক্ষণে বুঝিলেন ! নিজে ভাল না হইয়া পরকে ভাল হই- বার উপদেশ দেওয়া একেবারে চলে না।
থােপার ছেলে এক দেশে এক ধােপার ছেলে ছিল। ছেলে বেলা থেকেই তার বাপ তাহাকে কাপড় কাচিতে ঘাটে লইয়া যাইত। তাহাকে সারাদিন রােদে পুড়িয়া কাপড় কাচিতে হইত। ধােপার ছেলে কাপড় কাচিত আর ভগবানকে বলিত,-“ভগবান আর কাপড় কাচিতে পারি না। পরজন্মে আর যেন আমার বােপর ঘরে জন্ম না হয়।” ধােপর ছেলের আকুল ডাক ভগবানের কাণে গিয়া পেছিল। ধােপার ছেলে মরিয়া রাজার ঘরে গিয়া জন্ম লইল। রাজার ঘরে ধােপর ছেলের জন্ম হইল বটে কিন্তু স্বভাব তাহার রাজার ছেলের মতন হইল না। রাজার ছেলেরা যেরূপ খেলা ধূলা ভাল- বাসে ধােপর ছেলের সে সব খেলা একেবারেই ভাল লাগিত না। একদিন সে খেলা করিতে গিয়া তাহার সমবয়সীদিগকে বলিল,-“ভাই তােরা যে
ধােপার ছেলে
সকল খেলা করি, সে খেলা খেলিতে আমার
একেবারেই ভাল লাগে না। তার চেয়ে আমি যে
খেলা বলি, আয় ভাই, সেই খেলা করি, আয়।
আমি উপুড় হইয়া শুই আর তােরা সকলে
মিলিয়া আমার পিটের উপর হুহু করিয়া কাপড়
কাচিতে আরম্ভ কর।”
রাজার ছেলের এই কথায় তাহার সমবয়সীরা
একেবারে হাে হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, তাহারা
সকলে মিলিয়া বলিয়া উঠিল,-“না-না—ও
আবার কি খেলা ভাই।”
তাহারা ত বুঝিল না রাজার ছেলে কেন এমন
কথা বলিতেছে। সংসার বাস মানুষের একজন্মে
যায় না। সংস্কার মানুষের সঙ্গে আইসে—তাই
এক এক মানুষের এক একরূপ স্বভাব হয়।
রণজীৎ রায় ভগবান পুত্র কন্যারূপে যে ভক্তের গৃহে জন্ম- গ্রহণ করিয়া থাকেন-তাহার প্রমানের অভাব নাই। এক দেশে রণজীৎ রায় নামে এক জমি- দার ছিলেন। তিনি কালীর বড় ভক্ত ছিলেন। তিনি উহার তপস্যার জোরে মহানায়াকে কন্যা- রূপে পাইয়াছিলেন। রণজীৎ রায় কন্যাঢ়ীর নাম রাখিয়া ছিলেন—ভগবতী। তিনি কন্যাটীকে বড়ই স্নেহ করিতেন ও সৰ্ব্বদাই কাছে কাছে রাখিতেন। রণজীৎ রায়ের স্নেহের গুণে ভগবতী ভঁহার গৃহে আটুকাইয়া পড়িয়াছিলেন। কিছুতেই আর রণজীৎ রায়ের স্নেহের বাঁধন ছিড়িতে পারিতেছেন না। একদিন সকালে রণজীৎ রায় তাহার জমী- দারীর হিসাব পত্র দেখিতে ছিলেন—আর মেয়েটী তাহার পার্শ্বে বসিয়া বাবা ওটা কি—বাবা ওটা কি করিয়া মহা ব্যস্ত করিয়া তুলিতেছিল। রণজীৎ
১৭
রণজীৎ রায়
রায় কন্যার জন্য কাজে মন দিতে পারিতেছিলেন
, তিনি কন্যাকে বার বার মধুর বচনে বলিতে
ছিলেন,—“মা-এখন আমায় বিরক্ত করিস নি
আমায় এই কাজগুলা শেষ করিতে দে।” কিন্তু কন্যা
সে কথা একেবারেই কাণে তুলিতেছিল না। শেষ
রণজীৎ রায় মহা বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “তুই,
এখান থেকে দূর হইয়া যা।”
ভগবতী সেই ছুতাটি খুঁজিতেছিলেন রণজীৎ রায়
যেমনই বলিলেন, তুই এখান হইতে দূর হ’ অমনি
তিনি রণজীৎ রায়ের বাড়ী হইতে বাহির হইয়া
পড়িলেন। পথে বাহির হইয়াই তাহার সহিত
একজন শাঁখারীর দেখা হইল—তিনি তাহার
নিকট হইতে শাখা পরিলেন। শাখা পরিয়া
শাঁখারাকে বলিলেন,-“আমার ঘরের কুলুঙ্গীতে
টাকা আছে—তুমি আমাদের বাড়ী গিয়া সেই
টাকা লওগে যাও।”
শাঁখারী ভগবতীকে চিনিত—সে ভঁহাকে আর
কোন কথা না বলিয়া শাঁখার মূল্য লইবার জন্য
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প ১৮ রণজীৎ রায়ের বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া শাখার দাম চাহিল। তখন মেয়ের কথা সকলের মনে পড়িল, মেয়ে বাড়ীতে নাই—মেয়ে কোথায় গেল চারিদিকে খোঁজ খোজ পড়িয়া গেল। চারিদিকে লােক ছুটিল। রণজীৎ রায়—“মা তুই কোথায় গেলি” বলিয়া ক্রমাগত চোখের জল ফেলিতে লাগিলেন। শাঁখারীর মুখে সমস্ত শুনিয়া সকলে আসিয়া দেখিল,—সত্যই কুলুঙ্গীতে টাকা রহি- য়াছে। তখনই সেই টাকা হইতে শাঁখারীর শাখার দাম চুকাইয়া দেওয়া হইল। রণজীৎ রায়ের বাড়ীতে যখন লােকের ক্রন্দনে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল—সেই সময় কয়েকজন লােক আসিয়া সংবাদ দিল,-“দীঘিতে কি—যেন ভাসিতেছে।” রণজীৎ রায় কঁদিতে কাদিতে তখনই দীঘির ধারে উপস্থিত হইলেন। সকলে দীঘির ধারে উপ- স্থিত হইয়া দেখিল, -“শাঁখা পরা হাতখানি তিন- বার জল হইতে উপর দিকে উঠিল। তাহার পর বারুণী স্নান আর কিছুই দেখা গেল না। রণজীৎ রায় লােক নামাইয়া সমস্ত দীঘি তােলপাড় করিয়া ফেলিলেন কিন্তু মেয়ের কোনই সন্ধান পাওয়া গেল না। ভগ- বান কখন যে কি মূর্তিতে মানুষের নিকট আইসেন তাহা কেহই বলিতে পারে না। তাই সন্তানদের দূর ছাই করিতে নাই। রণজীতের নিকট হইতে ভগ- বতী যেদিন চলিয়া যান সেদিন বারুণী—তাই আজ সেই দীঘির ধারে বারুণীর দিন প্রকাণ্ড মেলা বসে ও ভগবতীর পূজা হইয়া থাকে। বারুণী স্নান শিব দুর্গ। কৈলাসে দাবা খেলিতে বসিয়াছিলেন সেদিন বারুণী যােগ। হঠাৎ মা দুর্গা শিবকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“প্রভু আজ বারুণী যােগ। এই যােগে মানুষ গঙ্গা স্নান করিলে নিস্পাপ হয়। আজ তে লক্ষ লক্ষ লােক গঙ্গা স্নান করিবে তাহারা কি সকলেই নিস্পাপ হইবে ?”
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
মা দুর্গার কথায় মহাদেব মৃদু হাসিলেন।
বলিলেন,—নিশ্চয় যাহার এ বিশ্বাস আছে বারুণী
যােগে স্নান করিলে নিস্পাপ হইবে—সে নিশ্চয়
নিস্পাপ হইবে।”
মা দুর্গা আবার বলিলেন,-“সে বিশ্বাস না
থাকিলে মানুষ কেন গঙ্গা স্নান করিতে ছুটিবে।
নিশ্চয় যাহারা আজ স্নান করিবে তাহাদের সে
বিশ্বাস আছে।”
মহাদেব ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন,—“না, সে
বিশ্বাস একজনেরও নাই। যদি আমার কথায়
বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পার।”
পরীক্ষা না করিয়া দুর্গার মন সে কথা বিশ্বাস
করিতে চাহিল না। তিনি পরীক্ষা করিতে চাহি-
লেন। তখন মহাদেব দুর্গাকে লইয়া :ত্রিবেণীতে
আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ত্রিবেণীতে আসিয়া
গঙ্গার কূলে তিনি মুমুয়ু বৃদ্ধের মূর্তি ধরিয়া ভগ
বতীর জানুর উপর মাথা রাখিয়া শয়ণ করিলেন।
ভগবতীও বুড়ির মূর্তি ধরিয়া নয়নজলে ভাসিতে
বারুণী স্নান
লাগিলেন। সেই পথে লক্ষ লক্ষ লােক বারুণী
যােগে গঙ্গা স্নান করিতে ছুটিয়াছে। ভগবতী
একে একে সকলকেই ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন,
—“ওগো আমার স্বামীর মৃত্যুকাল উপস্থিত
তােমরা যদি একটু ধর, তাহা হইলে—আমি
তাহাকে বারুণী যােগে একবার গঙ্গার স্নানটা
করাইয়া দিতে পারি।”
বুড়ির কথায় সকলেই তাহার স্বামীকে একটু
ধরিবার জন্য অগ্রসর হইল কিন্তু বুড়ি-বেশী ভগবতী
কহিলেন,—“কিন্তু আমার স্বামীর আদেশ যে ব্যক্তি
নিস্পাপ নহে সে যেন তাঁহাকে স্পর্শ না করে ।
তােমাদের মধ্যে নিস্পাপ যে—সেই একবার
আবার স্বামীকে একটু ধর।”
ভগবতীর এই কথায় সকলই পিছাইয়া গেল
সকলই বলিতে লাগিল, পৃথিবীতে আমি নিস্পাপ
কি করিয়া বলি। বুড়ি আমরা নিপাপ
নই।”
লক্ষ লক্ষ লােক গঙ্গাস্নান করিতে গেল কিন্তু
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
কেহই বুড়ির কথায় সম্মত হইল না—কেহই সাহস
করিয়া বলিতে পারিল না যে সে নিস্পাপ। শেষে
এক চাষার ছেলে গামছা মাথায় বাঁধিয়া স্নান
করিতে যাইতে ছিল, দুর্গা তাহাকেও সেই কথা
বলিলেন। দুর্গার কথা শুনিয়া সেই চাষার ছেলে
বলিল, “এর জন্যে আর ভাবনা কি। আজ বারুণী
যােগ, তুমি মা একটু অপেক্ষা কর, আমি গঙ্গায়
একটা ডুব দিয়া নিস্পাপ হইয়া আসি।”
চাষার ছেলে আর কোন উত্তরের অপেক্ষা
করিয়াই গঙ্গায় ডুব দিতে ছুটিল। মহাদেব
দুর্গাকে বলিলেন, “দেখিলে এই এত লােক গঙ্গায়
স্নান করিতেছে—তাহাদের মধ্যে কেবল এই একটা
লােক নিস্পাপ হইবে। ইহারই কেবল বিশ্বাস
আছে—আজ বারুণী যােগে গঙ্গা স্নান করিলে
নিস্পাপ হওয়া যায়।”
মহাদেবের কথা দুর্গ। এইবার বুঝিলেন।
কেন মানুষ নিস্পাপ হইতে পারে না আর কেনই
বা মানুষ নিস্পাপ হয়। সব বিষয়েই বিশ্বাস চাই।
ব্ৰহ্ম বিদ্যা
বিশ্বাস ব্যতীত মানুষের কোন কাজই সফল হইতে
পারে না।
ব্ৰহ্ম বিদ্যা
এক ব্রাহ্মণের দুইটি ছেলে ছিল। ছেলে
দুইটী বড় হইলে ব্রাহ্মণ তাহাদের ব্ৰহ্ম বিদ্যা
শিখাইবার জন্য এক আচার্যের নিকট পাঠাইয়।
দিলেন। পুত্র দুইটি আচার্যের নিকট থাকিয়া
ব্ৰহ্ম বিদ্যা শিক্ষা করিতে লাগিল। কয়েক বৎসর।
আচার্যের নিকট থাকিয়া তাহাদের ব্ৰহ্ম বিদ্যা শিক্ষা
শেষ হইলে-তাহারা আবার বাড়ী ফিরিয়া
আসিল। পুরাে বাড়ী ফিরিয়া আসিলে ব্রাহ্মণ
একদিন তাহাদের নিকটে ডাকিয়া-বড় ছেলেটীকে
জিজ্ঞাসা করিলেন, “এত দিন তাে তােমরা
আচার্যের গৃহে থাকিয়া ব্ৰহ্ম বিদ্যা শিখিয়া
আসিলে—আচ্ছা বল দেখি ব্ৰহ্ম কি
পিতা প্রশ্ন করিবা মাত্র বড় ছেলে তখনই বড়
বড় শাস্ত্র হইতে বড় বড় শ্লোক তুলিয়া ব্ৰহ্ম কি
?
রাম: ষ্ণের নূতন গল্প
এবং
তাহাই তাহার পিতাকে বুঝাইতে লাগিল।
বলিতে লাগিল,-“ব্ৰহ্ম এত বড়-ব্ৰহ্ম তত বড়।”
ব্রাহ্মণ কোন কথা বলিলেন না। তিনি তাহার
ছােট ছেলেকে ডাকিয়া কহিলেন,-“বাপু তুমি
ব্ৰহ্ম সমন্ধে কি শিখিয়াছ বলাে দেখি শুনি?”
ছােট ছেলে পিতার প্রশ্নে একবার পিতার
মুখের দিকে চাহিল,—তাহার পর ব্ৰহ্ম কি তাহাই
পিতাকে বুঝাইবার জন্য দুই তিনবার হাঁ করিল
কিন্তু কোন কথাই বলিতে পারিল না। ছােট
ছেলের এই ভাব দেখিয়া ব্রাহ্মণ বলিলেন,-“আমি
তােমার ভাব বেশ বুঝিতে পারিয়াছি। তুমি
কতক ব্ৰহ্ম কি বুঝিতে পারিয়াছ ! সত্যই ব্ৰহ্ম যে
কি তাহা মুখে বলা যায় না।”
ভগবানকে বুঝিয়ছি—যাহারা বলে, তাহার
একেবারেই বুঝিতে পারে নাই, বুঝিতে হইবে।
কারণ ভগবান এমন জিনিষ যে তাহাকে একবার
বুঝিলে আর বাক্য ক্ষরিবে না।
দুই বেয়ান
এক বেয়ান আর এক বেয়ানের সঙ্গে দেখা
করিতে গিয়াছিল। বেয়ান যখন গিয়া বেয়ানের
বাড়ী উপস্থিত হইল তখন দেখিল তাহার বেয়ান
চরকায় সূতা কাটিতেছে। নানা রংএর রেশমের
সূতা—আর সূতাগুলি কাটা হইয়াছেও বড় সুন্দর।
বেয়ানকে আসিতে দেখিয়া যে বেয়ান সূতা
কাটিতেছিল, সে বলিল,-“বেয়ান তুমি যে কষ্ট
করিয়া আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছ সে
জন্য আমার আনন্দ ধরিতেছে না। তা ভাই তুমি
বােস তােমার জন্য একটু জলখাবার লইয়া
আসি।”
বেয়ান এই বলিয়া
তাহার
বেয়ানকে বসিতে একখানি আসন দিল। বেয়ান
সেই আসনে বসিলে তিনি তাহার জন্য জলখাবার
আনিতে সেখান হইতে চলিয়া গেলেন। এদিকে
যে বেয়ান দেখা করিতে আসিয়াছিল—নানা রং
সূতা কাটা
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
.
বেরংএর সূতা দেখিয়া তাহার একটু লইতে তাহার
ভারী ইচ্ছা হইতে লাগিল। সে কিছুতেই তাহার
ইচ্ছাটা আর দমন করিতে পারিল না-খানিকটা
সূতা লইয়া বগলের মধ্যে লুকাইয়া রাখিল।
তাহার পর তাহার বেয়ান তাহার জন্য জল খাবার
লইয়া আসিলও খাও খাও করিয়া তাহাকে
জল খাবারগুলি খাওয়াইতে লাগিল। বেয়ানের
জলখাবার শেষ হইলে তিনি জল
তিনি জল খাবারের
রেকাবীখানা সরাইয়া রাখিতে গিয়া দেখিলেন,
তাঁহার চরকা কাটা একতাড়া সূতা নাই।
বেয়ানের আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, তাহার
বেয়ানই সূতা সরাইয়াছে। তখন তিনি সূতাটা
তঁাহার বেয়ানের নিকট হইতে আদায় করিবার
জন্য একটি ফন্দি মনে মনে আঁটিলেন। সেই
রেকাবী খানা রাখিয়া আসিয়া বলিলেন,-“বেয়ান
তুমি অনেক দিনের পর আসিয়াছ—আজ ভারি
আনন্দের দিন। এস ভাই আজ আমরা দুইজনে
একটু নাচি।”
দুই বেয়ান
যে বেয়ান দেখা করিতে আসিয়াছিল সেও
তাহাতে সম্মত হইল। তখন দুই বেয়ানে নাচিতে
আরম্ভ করিল। সেই চরকা কাটা বেয়ান দেখিল,
তাহার বেয়ান হাত না তুলিয়াই নাচিতেছে।
তাহাকে বলিল,-“অমন করে কি বেয়ান নাচা
হয় ?—এস হাত তুলিয়া নাচি।“
কিন্তু যে বেয়ানের বগলে সূতা রহিয়াছে—সে
দুই হাত তুলিয়া নাচে কেমন করিয়া—কাজেই সে
তাহার কথায় এক হাত তুলিয়া নাচিতে লাগিল।
তখন তাহার বেয়ান আবার বলিল,-“বেয়ান এক
হাত তুলিয়া কি নাচা হয় ? দুই হাত তুলিয়া
নাচ।”
কিন্তু সেই বেয়ান ঘাড় নাড়িয়া বলিল,-
এ যে ভাই তােমার অন্যায় কথা ! দুই হাত তুলিয়া
কি আর সকলে নাচিতে পারে—্যার যেমন
অভ্যাস।”
সত্যই দুই হাত তুলিয়া নাচিতে কয়জনে
পারে ? লােভ মােহ সমস্ত ত্যাগ করিতে না
২৮
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
পারিলে মানুষ আর দুই হাত তুলিয়া নাচিতে
পারে না। যদি দুই হাত তুলিয়া নাচিতে যাও
তাহা হইলে আগে নিঃস্বার্থ হইবার চেষ্টা কর।
লাগ ভেল্কী লাগ,
একজন বাজীকর এক রাজার বাড়ীতে ভেলী
দেখাইতে গিয়াছিল। সে রাজার সম্মুখে নানা রকম
খেলা দেখাইতে ছিল আর মাঝে মাঝে চীৎকার
করিয়া বলিতেছিল,-“লাগ ভেল্কী লাগ। রাজা
টাকা দাও--কাপড় দাও”
সেই সময় হঠাৎ কেমন করিয়া সেই বাজীকরের
জীব তালুর মূলের কাছে আটকাইয়া গেল।
সঙ্গে কুম্ভক
যােগ হইয়া
গেল। তাহার
কথা নাই, শব্দ নাই—ম্পন্দন নাই। সকলে এই
ব্যাপার দেখিয়া ভাবিল বাজীকরটা মরিয়া
গিয়াছে। তখন তাহাকে রাজার হুকুমে তাহাকে
माम
লাগ ভেল্কি লাগ একটা ইটের কবর করিয়া তাহার ভিতর তাহাকে ধরাধরি করিয়া লইয়া গিয়া পুঁতিয়া ফেলিল। তাহার পর হাজার বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। সেই সময় কে একজন মাটী খুঁড়িতে খুড়িতে দেখিল, একজন লােক মাটীর ভিতর সমাধিস্থ হইয়া বসিয়া রহিয়াছে। তখন সকলেই ভাবিল, এ নিশ্চয়ই কোন বড় সাধু। সকলে তখন নানাভাবে সাধুর পূজা করিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু নাড়াচাড়া করিতে করিতে বাজীকরের জীব, আবার তালু থেকে সরিয়া গেল। যেমন জীব তালু থেকে সরিয়া গেল অমনি তাহ'র চৈতন্য হইল—সে চীৎকার করিয়া উঠিল,—“লাগ ভেল্কী লাগ, রাজা টাকা দাও-কাপড় দাও- এই ব্যাপার দেখিয়া সকলেই একেবারে হতভম্ব! কুম্ভক যােগ করিলেই ভগবান লাভ হয় গবান মানুষের মন দেখিয়া থাকেন। যাহা মনে করিয়া সাধন করে তাহার তাহাই লাভ হইয়া থাকে।
জল
কাকের ভক্তি
রাম লক্ষণ চম্পক সরােবরে স্নান করিতে
গিয়াছিলেন। সরােবরের তীরে উপস্থিত হইয়া
লক্ষণ দেখিলেন, একটি কাক অতি ব্যাকুল ভাবে
বার বার জল খাইতে যাইতেছে কিন্তু
খাইতেছে না—বার বার ফিরিয়া আসিতেছে।
এই ব্যাপার দেখিয়া লক্ষণের বড় কৌতুহল হইল।
তিনি রামকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“দাদা এই
কাকটা জল খাইতে যাইয়া বার বার ফিরিয়া
আসিতেছে কেন ?
লক্ষণের এই প্রশ্নে রাম বলিলেন, “ভাই এই
কাক বড়ই ভক্ত। দিন রাত রাম নাম জপ,
করিতেছে ! জল তৃষ্ণায় উহার বুক ভাঙ্গিবার মত
হইয়াছে তাই জল পান করিতে আসিয়াছে কিন্তু
জল পান করিবার সময় রাম নাম ফাঁক পড়িয়া
যাইবে সেই আশঙ্কায় জলও পান করিতে পারি-
তেছে না।”
রামের ধনুক
ভক্ত হওয়া সােজা নহে। যে ভগবানকে এই
ভাবে দিন রাত ডাকিতে পারে সেই কেবল ভগবান
লাভ করিতে পারে।
রামের ধনুক
বনে বনে ঘুরিতে ঘুরিতে পরিশ্রান্ত হইয়া স্নান
করিবার জন্য রাম লক্ষণ একদিন পদ্মা সরােবর
তীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সরােবরে নামি-
বার পূর্বে শ্রীরাম চন্দ্র তাহার ধনুকটা সরােবরের
তীরে মাটীতে গুজিয়া রাখিলেন। স্নান শেষ
করিয়া দুই ভাইতে উপরে উঠিয়া আসিলেন ও
শ্রীরামচন্দ্র তাহার ধনুকটা মাটী হইতে আবার তুলিয়া
লইলেন। শ্রীরাম চন্দ্র ধনুক তুলিবা মাত্র লক্ষণ
দেখিল শ্রীরামচন্দ্রের ধনুকের ধারটুকু রক্তাক্ত
হইয়া গিয়াছে। এই ব্যাপার দেখিয়া লক্ষণ একে-
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
বারে অবাক হইয়া গেলেন। শ্রীরাম চন্দ্রের ধনুকে
রক্ত কোথা হইতে আসিল ?
শ্রীরাম চন্দ্র ধনুক
দেখিয়া বলিলেন, “লক্ষণ, লক্ষণ, একি ব্যাপার ?
দেখ দেখ নিশ্চয়ই কোন জীব হত্যা হইয়াছে।
লক্ষণও রক্ত দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিলেন,
তিনি শ্রীরামের আদেশে তখনই মাটি খুড়িতে
আরম্ভ করিলেন, মাটি খুঁড়িয়া দেখিলেন একটা
ব্যাঙ, মুমুর্ষ অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ব্যাঙের
অবস্থা দেখিয়া করুণাময় শ্রীরামচন্দ্রের প্রাণ কাঁদিয়া
উঠিল, তিনি অতি করুণ স্বরে বলিলেন, “ব্যাঙ,
কেন তুমি শব্দ কর নাই তাহা হইলে আমরা
নিশ্চয়ই তােমাকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিতাম।
এমন ভাবে তােমার প্রাণ বিয়ােগ হইত না।
যখন সাপে তােমাকে ধরে তখন যে তুমি আকণ্ঠ
চীৎকার করিতে থাক—তবে এখন চুপ করিয়া
রহিলে কেন?
শ্রীরাম চন্দ্রের কথার উত্তরে ব্যাঙ বলিল, শ্রীরাম
চন্দ্র, যখন সাপে আমাকে ধরে তখন আমি রাম
‘অমুক বড়য্যের বাড়ী কোথায় বলিতে পারেন?
No text on this page.
মাছ ধরা
রক্ষা কর—রাম রক্ষা কর বলিয়া চীৎকার করি।
কিন্তু যখন দেখিলাম স্বয়ং শ্রীরাম চন্দ্ৰই আমাকে
বধ করিতেছেন তখন আর কি বলিয়া চীৎকার
করিব, তাই চুপ করিয়াছিলাম।
ব্যাঙের এই কথায় শ্রীরাম চন্দ্রের মুখ হইতে
আর কোন কথা বাহির হইল না।
করিয়া রহিলেন।
মানুষ বুঝিতে পারে না তাই
সর্বদাই হাঁকু পাকু করিয়া মরে। ভগবান যখন
মারেন তখন হাঁকু পাঁকু করা বৃধা।
তিনি চুপ
মাছ ধরা
একটি লােক একজনের পুকুরে মাছ ধরিতে
গিয়াছিল। বহুক্ষণ ছিপ ফেলিয়া বসিয়া থাকিবার
পর ফাতনাটা একটু একটু নড়িতে লাগিল। সে
ভাবিল, এইবার চারে মাছ আসিয়াছে। তারপর
ফাতনাটা মাছে মাঝে কাৎ হইতে লাগিল—তখন
সে উপযুক্ত সময় বুঝিয়া টান দিবার জন্য ছিপ
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
গাছটা হাতে করিয়া ধরিল। সেই সময় সেই
পুকুরের ধার দিয়া এক ব্যক্তি যাইতেছিল, সে সেই
ছিপ ধরা লােকটার কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “অমুক বাঁড়ুয্যের বাড়ী কোথায় বলিতে
পারেন ?”
তখন যে লােকটি মাছ ধরিতেছিল সে টান
মারিবার অপেক্ষা করিতেছে-এই লােকটার
প্রশ্নে কোনও উত্তর দিল না। লােকটা বার বার
তবুও জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, “অমুক বাঁড়ুয্যের
বাড়ী কোথায় বলিতে পারেন ?”
ছিপ ধরা লােকটার সে কথায় সই নাই।
তখন তাহার হাত কঁপিতেছে-দৃষ্টি কেবল ফাতনার
দিকে। লােকটা বার বার এক কথা জিজ্ঞাসা
করিয়া শেষে নিরস্ত হইয়া তথা হইতে চলিয়া
গেল।
সেই সময়
বড়শীতে টান ধরিল
ফাতনা ডুবিল-একটা মাছ সেই টানে
একেবারে পুকুরের পাড়ে আসিয়া পড়িল।
তখন সেই ব্যক্তি গামছা দিয়া মুখ মুছিয়া স্থির
মাছ ধরা
হইয়া দাঁড়াইল। সে স্থির হইয়া দাঁড়াইবা মাত্র
তাহার দৃষ্টি সেই লােকটীর উপর পড়িল। তখন
সেই লােকটা অনেক দূর চলিয়া গিয়াছিল।
বড়শী হইতে মাছটী খুলিতে খুলিতে খুলিতে সেই
লােকটাকে চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল,-
“ওহে মহাশয়-শােন শােন।”
মাছধরা লােকটার চীৎকারে সেই লােকটা
ফিরিয়া দাড়াইল। ও নিকটে আসিয়া বলিল,
“আবার ডাকিতেছেন কেন?”
সেই লােকটি বলিল, “তুমি আমায় কি
জিজ্ঞাসা করিতেছিলে ?”
লােকটী বিরক্তস্বরে বলিল,-“তখন অতবার
করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম কোন উত্তর দিলে না,
আর এখন জিজ্ঞাসা করিতেছ—কি জিজ্ঞাসা
করিতেছিলে ?”
লােকটা একটু কিন্তু হইয়া বলিল,-“মহাশয়
মাপ মরিবেন—তখন সত্যই কিছু শুনিতে পাই
নাই। তখন যে আমার ফাতনা ডুবিতেছিল।”
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প এইরূপ একাগ্রতা না হইলে ভগবান লাভ করা যায় না। ধ্যানে মানুষের এইরূপই একাগ্রতা আইসে। হীরার দর এক বড় লােকের একখানা খুব মূল্যবান হীরা, ছিল। তিনি তাঁহার সেই হীরা খানা বিক্রয় করিবার জন্য তাঁহার সরকারকে প্রদান করিলেন। সরকার বাবুর হীরাখানা লইয়া প্রথম এক বেগুণ- ওয়ালার নিকট উপস্থিত হইল। বেগুণওয়ালা হীরাখানা বারকতক নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিয়া বলিল, —ভাই আমি এই পাথরখানার পরিবর্তে তােমাকে নয় সের বেগুণ দিতে পারি।” সরকার বলিল,ভাই দরটী অত্যন্ত কম হইয়া যাইতেছে—আর একটু উঠিলে আমি এই পাথর- খানি তােমায় দিয়া যাইতে পারি। দশ সের বেগুণ দাও
হীরার দর
বেগুণওয়ালা ঘাড় নাড়িরা বলিল,আমি
দরের
চেয়ে অনেক বেশী বলিয়া
ফেলিয়াছি—ইহাতে তােমার যদি পােষায় তবে
আমায় দাও—নতুবা অন্য কোন যায়গায় চেষ্টা
কর।”
.
সরকার তখন সেখান হইতে এক কাপড়-
ওয়ালার নিকট গিয়া উপস্থিত হইল। কাপড়ওয়ালা
হীরাখানাকে নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিয়া বলিল,-
“ জিনিষটা মন্দ নয়—আমি এর দাম নয় শত
টাকা দিতে পারি।”
সরকার বলিল,-“ভাই আর একটু বাড়-
পুরাপুরি হাজার টাকা দাওআমি হীরাখানা
তােমায় দিয়া যাই।”
কাপড়ওয়ালা বলিল,-“নয় শত টাকার অধিক
আর একটি টাকাও দিতে পারি না। নয় শত
টাকাই আমি বেশী দাম বলিয়া ফেলিয়াছি।”
সরকার তখন সেখান হইতে এক জহুরীর
নিকট উপস্থিত হইল। জহুরীও হীরাখানা
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
একবার নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিল-তাহার পর
একবারেই বলিল,-“দাও এ হীরাখানা আমাকে
দিয়া যাও—আমি ইহার দাম একলাখ টাকা
দিব।”
সরকার বলিল,-“না ভাই, আর কিছু বাড়।”
জহুরী বলিল,-“বল আর কত দিতে হইবে—
এ হীরাখানা আমার চাই।”
সরকার তখন উপযুক্ত দর পাইয়া হীরাখানা
জহুরীর নিকট বিক্রয় করিল। যাহার যেরূপ
পুজি সে সেইরূপ মূল্যই দিয়া থাকে। ভগবান যে
কি বস্তু যে তাহা বুঝে সেই তাহার উপযুক্ত
মূল্য দিতে পারে।
গুরু শিষ্য
একজন সাংসারিক লােক এক গুরুর নিকট
হইতে মন্ত্র লইতে গেল। গুরু তাহাকে বলিলেন,
গুরু শিষ্য
—“আমি তােমাকে মন্ত্র দিতে পারি কিন্তু তাহা
হইলে তােমাকে সংসার ছাড়িতে হইবে।”
শিষ্য গুরুর এই কথা শুনিয়া বলিল,-“প্রভু
সংসার কেমন করিয়া ছাড়িয়া যাই বলুন। আমার
মা বাপ স্ত্রী সকলেই আমাকে ভালবাসে—তাহাদের
ছাড়িয়া আমি কেমন করিয়া যাইব।”
শিষ্যের কথা শুনিয়া গুরু বলিলেন,-“আমার
আমার বলিতেছ বটে—আর বলিতেছ, তাহারা
তােমাকে ভালবাসে কিন্তু সে ভালবাসা সত্য নহে।
তাহার সত্যাসত্য বিষয়ে যদি তুমি পরীক্ষা করিতে
যাও—তাহারও উপায় আমি তােমাকে বলিয়া
দিতে পারি।”
শিষ্যের পরীক্ষা করিতে ইচ্ছা হইল এবং সে
কথা গুরুকে জানাইল। তখন গুরু তাহাকে
বলিলেন,-আমি তােমাকে একটি ঔষধের বড়ি
দিতেছি—এইটী খাইলে তােমার দেহ মড়ার মত
অসাড় হইয়া পড়িবে কিন্তু তােমার জ্ঞান লােপ
হইবে না—লােকে তােমাকে মৃত ভাবিবে বটে
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
কিন্তু তুমি সকলই দেখিতে ও শুনিতে পাইবে।
তারপর আমি গিয়া তােমায় আবার পূর্ব অবস্থা
করিয়া দিব।”
শিষ্যটীর গুরুর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ছিল সে
গুরুর কথা মত বাড়ী গিয়া সেই ঔষধের বড়িটি
খাইয়া ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার দেহ অসাড়
হইয়া মৃতের মত হইয়া পড়িল। কিন্তু গুরু
তাহাকে যাহা বলিয়াছিলেন তাহাই হইল, তাহার
জ্ঞান সম্পূর্ণ ই রহিল। তাহার এই ভাব দেখিয়া
বাড়ীতে একেবারে কান্নাকাটি পড়িয়া গেল। মা-
স্ত্রী একেবারে কাঁদিয়া কাটিয়া আছাড় বিছাড়
খাইতে লাগিল। সেই সময় তাহার গুরু আসিয়া
তথায় উপস্থিত হইলেন ও সকলকে জিজ্ঞাসা
করিতে লাগিলেন,—“কি হইয়াছে ?”
সকলে উত্তর দিল—“এই
লােকটি মারা
গিয়াছে।”
গুরু তাহার শিষ্যের দিকে একবার চাহিলেন
—তাহার পর বলিলেন,-“কই না- এ লােকটী
গুরু শিষ্য
তে মারা যায় নাই--আমি একটী ঔষধ দিতেছি
সেই ঔষধটী খাওয়াইলেই ইহার সমস্ত রােগ ভাল
হইয়া যাইবে।
গুরুর কথায় যেন শিষ্যের সমস্ত পরিবার
একেবারে হাতে চাদ পাইলেন,—সকলেই
বলিতে লাগিলেন,-দিন, দিন—ঔষধ দিন।”
গুরু একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন,-
“তবে ইহার মধ্যে একটু গােল আছে। ঔষধটি
প্রথমে একটি লােককে চিবাইয়া দিতে হইবে—
তাহার পর সেই ঔষধ রােগীকে খাওয়াইতে
হইবে। যে ব্যক্তি প্রথম চিবাইয়া দিবে তাহার
কিন্তু মৃত্যু হইবে। এই টুকুই যা গােল।
এই লােকটীর যা দেখিতেছি অনেক আত্মীয় স্বজন
রহিয়াছেন—তাহাদের মধ্যে একজন না একজন
নিশ্চয়ই চিবাইয়া দিতে পারেন। মা কিংবা স্ত্রী
ইহারা নিশ্চয়ই পারেন।”
গুরুর এই কথা শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই
সকলের কান্না থামিয়া গেল। শিষ্যের মা তাড়া-
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
১২
তাড়ি বলিলেন,—“তাই তাে, আমার এই বৃহৎ
সংসার আমি মরিলে এ সকল কে দেখিবে,
শুনিবে। বৌমা, তুমিই হয় ওটা চিবাইয়া দাও।”
স্ত্রী অমনি বলিয়া উঠিল, “অদৃষ্টে যা ছিল তাই
হইয়াছে। আমি কি মরিতে পারি ? আমার দুই
তিনটী নাবালক ছেলে ; আমি মরিলে তাহাদের
কে দেখিবে।”
শিষ্য এতক্ষণ চুপ করিয়া পড়িয়া সমস্তই
দেখিতে ছিল, শুনিতে ছিল-সে আর স্থির থাকিতে
পারিল না—একেবারে ঝাড়া দিয়া দাড়াইয়া উঠিয়া
বলিল,-“গুরুদেব আপনি যা বলিয়াছিলেন সেই
কথাই সত্য।
আর আমি সংসারে থাকিতে,
চাহি না।” শিষ্য আর কাহাকেও একটীও কথা
বলিয়া সেই দিনই গুরুর সহিত সংসার ত্যাগ
করিয়া চলিয়া গেল।
মানুষের সহিত মানুষের একেবারে নিঃস্বার্থ
ভালবাসা হয় না। নিঃস্বার্থ ভাল বাসা এক মাত্র
ভগবানের সহিতই হওয়া সম্ভব।
লক্ষী নারায়ণ।
বৈকুণ্ঠে নারায়ণ শুইয়া আছেন লক্ষমী তাহার
পদসেবা করিতেছেন। হঠাৎ নারায়ণ উঠিয়া দাড়া-
ইলেন। নারায়ণকে হঠাৎ উঠিতে দেখিয়া লক্ষী
জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঠাকুর, কোথায় যাইতেছ ?”
নারায়ণ বিশেষ চিন্তিত স্বরে বলিলেন;
“আমার একটা ভক্ত বড় বিপদে পড়িয়াছে। তাই
তাহাকে রক্ষা করিতে যাইতেছি।”
লক্ষীকে এই কথা বলিয়া নারায়ণ বাহির
হইয়া গেলেন। কিন্তু অতি অল্পক্ষণ পরে ফিরিয়া
আসিলেন। নারায়ণকে এত শীঘ্র ফিরিতে দেখিয়া
লক্ষনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঠাকুর, এত শীঘ্র ফিরিলে
কেন ?”
নারায়ণ হাসিয়া উত্তর দিলেন, “আমার ভক্তটী
প্রেমে বিহ্বল হইয়া পথ দিয়া যাইতেছিল, পথের
মধ্যে ধােপারা কাপড় শুকাইতে দিয়াছিল।
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
০৪
বেহুস হইয়া তাহার উপর দিয়া মাড়াইয়া চলিয়া
ছিল তাই দেখিয়া ঘােপারা লাঠি লইয়া তাহাকে
মারিতে যাইতে ছিল। তাই আমি তাহাকে রক্ষা
করিবার জন্য যাইতেছিলাম।”
লক্ষনী বিসিত স্বরে বললেন, “তবে আবার
ফিরিয়া আসিলে কেন?
নারায়ণ হাসিতে হাসিতে বলিলেন, সেই ভক্তটী
ধােপাদের মারিবার জন্য ২ তুলিয়াছে দেখিলাম
কাজেই আর আমি যাইলাম না।”
নারায়ণের কথার ভাব লক্ষনী বুঝিলেন।
ভগবানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে—ভগবান
তাহাকেই কেবল রক্ষা করেন।
যে নিজেকে
নিজেই রক্ষা করিব ভাবে ভগবান হার নিকটেও
যান না। ইহাই ঈশ্বরের নিয়ম।
পাখী
এক পাখী জাহাজের মাস্তুলের উপর বসিয়া
ছিল। জাহাজ গঙ্গা পার হইয়া
সমুদ্রের
ভিতর
আসিয়া পড়িল-পাখীটা যেমন মাস্তুলে বসিয়াছিল
তেমনি বসিয়া রহিল। জাহাজ যে সমুদ্রে আসিয়া
পড়িয়াছে পাখীর সে দিকে একেবারে সই ছিল
। যখন পাখীর চমক ভাঙ্গিল তখন দেখিল
চারিদিকে কোথাও কুল কিনারা নাই। যে দিকে
চায় সেই দিকেই জল। পাখী ডাঙ্গায় ফিরিবার জন্য
আর এক মুহূর্তও দেরী না করিয়া উত্তর দিকে
উড়িয়া গেল। কিন্তু বহু দূর গিয়াও কুল পাইল না ;
সে শ্রান্ত হইয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া মাস্তুলে
বসিল ; আবার কিছুক্ষণ জিরাইয়া লইয়া দক্ষিণ দিকে
উড়িয়া গেল ; সে দিকেও বহু দূর গিয়া কোন কুল
কিনারা পাইল না। আবার শ্রান্ত হইয়া ফিরিয়া
আসিয়া মাস্তুলে বসিল। তাহার পর ক্রমে ক্রমে
রামকৃষ্ণের নূতন গল্প
পূৰ্ব্ব পশ্চিম এক এক বার করিয়া সকল দিকেই
ঘুরিয়া আসিল কিন্তু কোন দিকেই কোন কুল
কিনারা পাইল না। চারি দিকেই অকুল পাথার।
শেষে চারিদিক ঘুরিয়া আসিয়া পাখী যখন
বুঝিল কোন দিকেই কোন কুল কিনারা নাই তখন
সে সেই যে মাস্তুলের উপর বসিল আর উড়িল না।
তখন তাহার আর কোন ব্যাকুলতা রহিল না ;
সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া রহিল। যতক্ষণ আশা
থাকে ততক্ষণই মানুষ নিশ্চিন্ত হইতে পারে না,
তখন হাঁকু পাকু করিতে থাকে। সমস্ত আশা শেষ
হইলেই মানুষ নিশ্চিন্ত হয় ও ভগবান লাভ করিয়া
থাকে।
সম্পূর্ণ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.