Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Maharshi Bhuban-mohan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহৰি
ভুবন-মােহন
শ্রীপ্রমদাকিশাের সরকার,
No text on this page.
মহর্ষি ভুবন মােহন। ১
শ্রীপ্রমদাকিশাের সরকার
প্রণীত।
প্রথম মুদ্রাক্ষণ
এক টাকা আট আনা।
বাঁধাই পৌণে দুই টাকা।
শ্রীপ্রমাকিশাের সরকার।
গ্রাম ও পােঃ অ-নটা কোলা
ঢাকা।
প্রিন্টার—শ্ৰীভূতনাথ সরকার
ভিক্টোরিয়া প্রপ”
২১এ, মহেন্দ্র গােস্বামী লেন, কলিকাতা
উৎসর্গ
পরমারাধ্যম
রামকিশাের সরকার পিতৃদেব
শ্রীশ্রীচরণ কমলেষু।
পিতঃ !
এই হতভাগ্য পুত্রের প্রবন্ধাদি দেখিয়া আপনি
অনেক সময় প্রীতি লাভ করিয়াছেন; তাই আজ
এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি আপনার পুণ্যনামে উৎসর্গ
করিলাম, আশা করি মেহগুণে অকৃতী পুত্রের এই
অকিঞ্চিৎকর উপহার গ্রহণ করিয়া তাহাকে
আশীর্বাদে অনুপ্র ণিত করিয়া চরিতার্থ করিবেন।
ইতি ১৮ই শ্রাবণ ১৩৩০ সাল।
নট, কোলা
সেবক
প্রমদাকিশোর সরকার।
কা
No text on this page.
মুখবন্ধ ধৰ্ম্মপ্রাণ, আদর্শ ভক্ত ও দীনাৰ্ত্তের বন্ধু দিনাজপুরের স্বর্গীয় মহর্ষি ভুবন মােহন করের নাম অনেকেই অবগত আছেন। আজ তিনবৎসর হইল তিনি পরলােক গমন করিয়াছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ পর্যন্ত তাহার আদর্শ জীবন সাধারণে প্রকাশিত হয় নাই ! দিনাজপুরের স্বনামধন্য মহাত্মা কর্ণেল পিটার তঁাহার সম্বন্ধে সংক্ষেপে একটি ইংরাজী প্রবন্ধ লিখিয়াছেন। ১৩২২ সালের ভাদ্র মাসে মালদহের “গম্ভীরা” • নামক দ্বৈমাসিক পত্রেও একটি প্রবন্ধ বাহির হইয়াছিল। এতদ্ব্যতীত দিনাজপুর পত্রিকায়ও কয়েকটি প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু ইহার কোনটিতেই তাঁহার পবিত্র জীবনের ঘটনাবলী সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় নাই। যাহার জীবন পৰ্য্যালােচনা করিলে, আমরা ধৰ্ম্ম ও নীতি সম্বন্ধে বহুমূল্য উপদেশ লাভ করিতে পারি ; পাপ-পঙ্কিল নংসারে থাকিয়া, কিরূপে ধৰ্মপথে অগ্রসর হওয়া যায় তাহা শিখিতে পারি ; কিরূপে মানুষ দেবত্ব লাভ করিতে পারে, তাহা জানিতে পারি,—সেই আদর্শ চরিত্র, লােক সমাজে অপ্রকাশিত থাকা কাহারই বাঞ্ছনীয় নহে। তাই কতিপয় বন্ধুর আগ্রহে, মহর্ষির পুণ্যময় জীবন- চরিত পুস্তকাকারে প্রকাশ করিতে অগ্রসর হইলাম ; নিজের অযােগ্যতা বুঝিয়াও নিরস্ত থাকিতে পারিলাম না। এই জীবন-চরিত সংগ্রহ করিতে বহু আয়াস স্বীকার করিতে হইয়াছে। মহর্ষি তাহার জীবন-চরিত প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি কাহারও নিকট তাহার অতীত জীবনের ঘটনা বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করেন নাই। দিনাজপুর জিলা-স্কুলের শিক্ষক শ্ৰীযুক্ত মনােমােহ [ ১ ] পাল মহাশয় তাহার বাসায় দীর্ঘকাল ছিলেন। তিনি তাহার নিকট কখনও কখনও দুই একটি কথা জানিয়া একখানা খাতায় লিখিয়া রাখিতেন। মহর্ষি কখন কখনও ডাইরী লিখিতেন, কিন্তু তাহাও ধারাবাহিকরূপে লিখেন নাই। যাহাহউক উল্লিখিত মনােমােহন বাবুর নােট ও মহর্ষির ডাইরী হইতে অনেক সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছি। মহর্ষির সুযােগ্য ভ্রাতুস্পুত্ৰ শ্ৰীযুক্ত জগদীশ চন্দ্র কর মহাশয়ও তাহার সম্বন্ধে অনেক সংবাদ প্রদান করিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিয়াছেন। এই পাপপঙ্কিল হস্তে মহর্ষির পবিত্র জীবন-চরিত অঙ্কনে কতদুর কৃতকার্য হইয়াছি বলিতে পারি না। এক্ষণে সহৃদয় পাঠকগণ প্রীতি লাভ করিলেই সমুদয় শ্রম সফল জ্ঞান করিব। আমি সুদূর মফঃস্বলে নানাস্থানে নানা কাষে ব্যাপৃত থাকিয়া প্রুফ দেখিয়াছি, প্রেসের অধ্যক্ষ ও পুনঃ পুনঃ পরিবর্তিত হইয়াছেন, এজন্য উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়নের অভাবে পুস্তকের নানাস্থানে ভ্ৰম-প্রমাদ রহিয়া গিয়াছে। বারান্তরে উহা সংশােধন করিতে ইচ্ছা থাকিল ; আশা করি সহৃদয় পাঠকগণ নিজগুণে সমুদয় ক্রটি মার্জনা করিবেন। উপসংহারে কৃতজ্ঞতা সহকারে প্রকাশ করিতেছি যে, দিনাজপুরে। উজ্জ্বল রত্ন শ্ৰীযুক্ত বরদাকান্ত রায় বি, এল বিদ্যারত্ন, শ্রীমান্ ধরণী ধর কুণ্ডু বি এল এবং ক্রমান্ সুরেন্দ্র নাথ গুহ আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। 1, ; বিনয়াবনত গ্রন্থকার।
ভূমিকা ‘‘ত্যক্তা সুখভােগেচ্ছাঃ সৰ্বসত্ত্ব খৈষিণঃ। ভবড়ি পরদুঃখেন সাধবাে নিত্যদুঃখিতাঃ।” ১। এতল্লক্ষণ সংযুক্তঃ সজ্জনােহতীব দুলভঃ । একন্তু লেভিরে ভাগ্যা দিনাজপুর বাসিন॥ ২॥ মাতা রাসমণিশুন্য পিচ পদ্মলােচনঃ। শাক্তা জন্মধরিত্রীচ ঢাকা মণ্ডল বাৰ্ত্তিণী ॥ ৩। গুণৈরিব বভূবয়ং নান্না ভূবনমোহনঃ। দয়ারতলা গুণগ্রামৈ বিদ্যারত্ন তেনচ। ৪। কায়েন বাচা মনসা সুনির্মলাে জ্ঞানেন ভক্ত্যাচ মনােহরদ্যুতিঃ। সদা পরেব্রহ্মণি সুপ্রতিষ্ঠিত মহর্ষিকল্পশ্চ বভৌ সুপণ্ডিতঃ ॥ ৫॥ গীতাভাগবত প্রিয়ােহতি মুদিত রামলীলামৃতে সর্বেষাং প্রিয়দর্শনাে মধুরয়া বাচা নাহলদিকৃৎ। ধৃত্যুৎসাহ যুতঃ পরােপকৃতয়ে জীবে পরপ্রেমিক সর্বত্রৈব নতিং বিধায় বিনয়ে দৃষ্টান্ত ভূতত মহান্ ৬
( ২ )
সমপথাখ্য বিধান চিকিৎসা
প্রতিদিনং শতরােগিণ আব স।
চিরকুমারতয়া নিরপত্যকে।
হযুত দরিদ্র পিতা সতু ধৰ্ম্মতঃ ॥ ৭।
স বাহুবেদাত্রি শশাঙ্কমানে
শাকে সমুদ্রেম সিংহভানো।
হি জরাজীর্ণবপুঃ কৃতার্থং
স্বপুণ্য কম্মোচিত লােকমাপ । ৮।
লােকান্তরগতে তস্মিন্ হীনঃ সজ্জন সম্পদ।
অস্মাকং দুর্গতত দেশে গতত ভূয়ােহপিদীনতাম্ ।৯
বয়ন্তু তদ্দর্শন পুণ্য ভাজো
ভূয়শ্চ তৎসংস্মৃতি পুণ্যকামঃ।
তদাশিয বীমলাঃ সমেত
স্তৎপ্রীতয়ে বিশ্বপতিং নমামঃ। ১০।
তস্যাত্যুদার চরিতস্য সুগীত কীৰ্ত্তে
ভক্ত্যা তননাতি চরিতং প্রমদাকিশাের।
তস্মিন্ প্রসীতু সদা জগদন্তরাত্মা
তৎপাঠকা বিগত পাপমলা ভবন্তু। ১১।
সবিনয়নিবেদমিদং
শ্রীবরদাকান্তরায় বি এ
বিদ্যারত্নস্য।
No text on this page.
**ক্ষণ,
';}
।
* * *
স্বীয় ও মহনি ভুবন মোহন কর।
মহমি ভুবন মােহন প্রথম অধ্যায় ইতিহাস বিশ্রুত ঢাকা নগরীর ছয় মাইল দক্ষিণে শাক্তা নামে একটি গণ্ডগ্রাম আছে। গ্রামখানি আম্র, পনস, সুপারী, খঞ্জুর, কদলি ও নারিকেল প্রভৃতি বৃক্ষে সুশােভিত। গ্রামের বাহিরে নানা শস্যরাজি সমন্বিত প্রান্তর। বঙ্গীয় এয়ােদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এই গ্রামে পদ্মলােচন কর নামে একজন বঙ্গজ কায়স্থ ভদ্রলােক বাস করিতেন। কর মহাশয়ের সাংসারিক অবস্থা বেশ সচ্ছল ছিল। তিনি সেখানে লগ্নী কারবার করিতেন, কিন্তু তাই বলিয়া কখনও কুসীদজীবিগণের নীচতা অবলম্বন করেন নাই। দরিদ্রের দুঃখে তাহার হৃদয় দ্রবীভূত হইত, তিনি তাহাদের অনেক সুদ পরিত্যাগ করিতেন। তাহার নিকট হইতে টাকা ধার করিয়া কত দরিদ্র কন্যাদায় হইতে মুক্ত হইয়াছে,-কত দরিদ্র পিতৃমাতৃ শ্রাদ্ধ করিয়াছে,কত লােক কত বিপদ হইতে উদ্ধার পাইয়াছে, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। ইহার পর তিনি গ্রামের দীন দুঃখী- দিগকেও যথাসাধ্য সাহায্য করিতেন। তিনি ধনবান হইলেও অমায়িক ও পরােপকারী ছিলেন। তাঁহার সদ্ব্যবহারে গ্রামের আপামর সাধারণ তাহাকে অত্যন্ত ভক্তি করিতেন। তাহার সহধর্মিণী রাসমণি দেবীও পরমা সাধ্বী, দয়াবতী ও গুণবতী ছিলেন। প্রতিবেশিগণের মধ্যে কাহারও কোন পীড়া হইলে তিনি মহর্ষি ভুবন মােহন । তাহার শুশ্রষার ব্যবস্থা করিতেন, কাহারও কোন অভাব হইলে তিনি তাহার অভাব মােচনে যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন। এজন্য পাড়ার সকলেই তাঁহাকে জননীর ন্যায় ভক্তি করিতেন। কর মহাশয়ের তিনটি পুত্র ও চারিটা কন্যা। তাঁহার লক্ষ্মীরূপিণী পত্নী তাহাদিগকে লালন পালন করিতেন,-কর মহাশয়ের বিশাল সংসারের সমস্ত গৃহকাৰ্য্য ও তাহার সেবা শুশ্রুষা তিনিই করিতেন, এতদ্ব্যতীত অতিথি অভ্যাগতের অভ্যর্থনা, বার মাসে তের পার্বণ ও তাদি ছিল। এ সকল করিয়াও তিনি প্রতিবেশিগণের সেবা করিতে কটা করেন নাই। বঙ্গীয় ১২৩২ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে আবার তাঁহার গর্ভের সঞ্চার হইল। এইবার তঁাহার অষ্টম গর্ভ। কয়েক মাস পরে আবার যখন গর্ভের লক্ষ্মণগুলি প্রকটিত হইয়া উঠিল, তথন গ্রামে কতরূপ সমা- লােচনাই হইতে লাগিল। আবার কেহ কেহ বলিতে লাগিল, এবার কন্যা জন্মিবে, কারণ কর মহাশয়ের দ্বিতীয় পুত্র জয়চন্দ্রের জন্মের পর দুইটি কন্যা জন্মে। এরপর তৃতীয় পুত্র আনন্দ চন্দ্র জন্ম গ্রহণ করেন। আনন্দ চন্দ্রের জন্মের পর মাত্র একটী কন্যা জন্মিয়াছে, সুতরাং এ গর্তে কন্যা ব্যতীত পুত্র জন্মিতে পারে না। আবার কেহ কেহ বলিলেন, প্রথম পুত্ৰ ঈশান চন্দ্রের পর এক কন্যা জন্মিয়াছে তার পরেই ত জয় চন্দ্র ! সুতরাং এবার কন্যা কিছুতেই হইবে না—পুত্ৰই হইবে। এই লইয়া পাড়ায় সময় সময় বাগ বিতণ্ডা চলিত, অনেক সময় বাজি ধরা পৰ্যন্তও হইত। রাসমণি দেবীর সম্পর্কিত ভ্রাতা বা ভ্রাতৃবধূ কেহ পুত্র হইবে বলিলে বিরুদ্ধ পক্ষের বালিকাগণ ঠাট্টা করিয়া শ্রীকৃষ্ণের সম্বন্ধে ঈঙ্গিত করিয়া বলিত, “তবে এবার তােমরা সাবধান-* পরশ্রীকাতর পুরুষগণ মহষি ভুবন মােহন পরােক্ষে বলিত “এবার কর মহাশয়ের পুত্র জন্মিলেই ভাল হয়, তাহা হইলে যদি তাহা দ্বারা যদুবংশ ধ্বংশ হয়।” এইরূপ গ্রামে নানাপ্রকার সমালােচনা চলিতে লাগিল। কর মহাশয়ের বৈঠকখানায় অনেক সময় অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও সাধু সন্ন্যাসী আসিতেন, তাহাদের অনেকেই বলিলেন “এই গর্ভে এক মহাপুরুষ জন্ম গ্রহণ করিবেন।” দ্বিতীয় অধ্যায় ক্ৰমে মাসের পর মাস চলিয়া গেল; মধুর মলয়ানিল-সেৰিত চৈত্র মাস আসিয়া উপস্থিত হইল। বন উপবন নানা ফল পুষ্পে সুশােভিত হইয়া প্রকৃতির অপূৰ্ব শােভা উৎপাদন করিল। আম্র পল্লবের শীতল ছায়ায় বসিয়া মধুর কণ্ঠ কোকিল সৃষ্টি কর্তার অপার মহিমা কীৰ্ত্তন করিতে লাগিল। রাত্রিতে নিৰ্মলাকাশ নক্ষত্ররাজিসমন্বিত চন্দ্রের উদয়ে অতি অনির্বচনীয় শােভা ধারণ করিতে লাগিল। মৃদু মন্দ বায়ু নব কিশলয়গুলিকে সঞ্চালিত করিয়া শরীর সুশীতল করিতে লাগিল ; সেই অনির্বচনীয় শােভা সন্দর্শন করিয়াই যেন পাপিয়া প্রেমে মাতাে- যারা হইয়া ভগবানের গুন গান করিতে লাগিলেন। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি পদ্মলােচন কর মহাশয়ের বাড়ীতে বার মাসে তের পার্বন লাগা ছিল। এবার এই চৈত্র মাসের ১ই তারিখ বৃহস্পতিবার দোলযাত্রা। দোলে কর মহাশয়ের বাড়ীতে প্রতি বৎসরেই খুব ধুম ধাম হয়। অন্যান্য বৎসরের গ্যার এবারও মহর্ষি ভুবন মােহন আয়ােজন উদ্যোগ হইতে লাগিল। চারিদিক হইতে আত্মীয় স্বজন কুটুম্ব ও কুটুম্বিনীগণ কর মহাশয়ের বাটীতে আসিতে লাগিলেন। এই আত্মীয় সমাগমে কর মহাশয় ও তাহার পত্নী সুখী হইলেন বটে, কিন্তু তাহাদের মুখে এক চিন্তার মলিন ছায়া প্রকটিত হইল। রাসমণি দেবী এখন দশ মাসের গর্ভবতী, তাই তাঁহাদের ভয় পাছে দোলের পূর্বে সন্তান হইয়া অশৌচে দোলের বিঘ্ন ঘটায়। যথাকালে নির্বিঘ্নে ১২৩২ সালের ১১ই চৈত্রের প্রাতঃসূৰ্য নবােদগত অশ্বত্থ পত্রে সুবর্ণ ঢালিয়া হাসিতে হাসিতে উদিত হইলেন। কর মহাশয়ের গৃহে আনন্দস্রোত প্রবাহিত হইল। যথাকালে দোল আরম্ভ হইল,বাদ্য ভাণ্ড ও লােকজনের কোলাহলে সমগ্র গ্রামখানি মুখরিত হইল। বালক বালিকা ও রমণীগণ নানা বস্ত্রালঙ্কারে সুশােভিত হইয়া দোল দেখিতে ছুটিল। আবির কুঙ্কুমে বাড়ী ঘর রাস্তা ঘাট সমুদায় লাল হইয়া গেল। কর মহাশয়ের উচ্চ দোল বেদিকা একটা আবিরের স্ত,প বলিয়া বােধ হইতে লাগিল । অতঃপর নিমন্ত্রিত ও অভ্যাগতগণের আহারের ব্যবস্থা হইল। এই লােকের সংখ্যা সহস্রাধিক হইবে। কর মহাশয় করযােড়ে প্রত্যেকের পাতের নিকট গিয়া অনুনয় বিনয় করিতে লাগিলেন। অন্দরে রাসমণি দেবী সেই পূর্ণ গর্ভাবস্থায়ও অকাতরে অভ্যাগতা ও নিমন্ত্রিতাদিগকে পরিতােষ সহকারে ভােজন করাইলেন। ক্রমে দিবা অবসান হইল, সূৰ্য্যদেব অস্তমিত হইলেন। বসন্তের পূর্ণ চন্দ্র হাসিতে হাসিতে পূর্ব দিক উদ্ভাসিত করিয়া উদিত হইলেন; শুভ্র জ্যোৎস্নালােকে প্রকৃতি হাসিতে লাগিল,-নারিকেল পত্রে 2 ;
মহর্ষি ভুবন মােহন ও সরসীর জলে অনির্বচনীয় স্বর্ণচ্ছটা বিকীর্ণ হইল। মধুর মলয় হিল্লোলে জগং শীতল হইল। দোল যাত্রা সেদিন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইল দেখিয়া করদম্পতী বড়ই আনন্দিত হইলেন, এবং ভগবানের অনুগ্রহেই এই কাৰ্য সুসম্পন্ন হইতে পারিবে বলিয়া ভক্তি গদগদ চিত্তে সর্বাঙ্গে মদনমােহনকে প্রণাম করিয়া প্রেমা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। অতঃপর মধুর সঙ্কীৰ্ত্তন আরম্ভ হইল। পূর্ণগর্ভা রাসমণি দেবী সারাদিন পরিশ্রমে অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন, আহার করিতে বসিলেন কিন্তু খাইতে পারিলেন না,-তাহার প্রসব বেদনা উপস্থিত হইল। তাড়াতাড়ি ধাত্রী ডাকান হইল। কর মহাশয়, প্রসব বেদনার কথা শুনিয়া উদ্বিগ্ন মনে বাহির বাটীতে বন্ধু- গণ সহ সঙ্কীৰ্ত্তন শুনিতেছিলেন; সহসা অন্দর হইতে সাতটি হুলুধ্বনি তাঁহার কর্ণে প্রবিষ্ট হইল ; সঙ্গে সঙ্গে একজন পরিচারিকা গিয়া আনন্দ সহকারে তাহাকে তঁাহার একটি সুন্দর পুত্র জন্মিয়াছে বলিয়া সংবাদ জানাইল। বন্ধুগণসহ করমহাশয় সে সংবাদে পরম আনন্দিত হইলেন। সেখানে যে সকল বৈষ্ণব সাধু উপস্থিত ছিলেন, তঁাহারা বলিলেন, “আজ বড় ভাল দিন, এইদিনেই মহাপ্রভুর আবির্ভাব হইয়াছিল। আপনার পুত্ৰ নিশ্চয়ই একজন সাধু হইবেন।” পরদিন প্রাতে কর, মহাশয়, ধাত্রী প্রভৃতিকে পারিভােষিক দিয়া, গ্রহাচাৰ্য্যকে ডাকাইলেন। আচাৰ্য মহাশয়, কর মহাশয়ের পুত্র জন্মি- আছে শুনিয়া আনন্দে তাহার নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কর মহাশয় তাহাকে নবজাত শিশুর কোষ্ঠী প্রস্তুতের ভার দিলেন। আচার্য্য মহাশয় অতি আনন্দ সহকারে সে ভার গ্রহণে সম্মত হইয়া বলিলেন, ;
মহর্ষি ভুবন মােহন “মােটামুটি আমি যাহা দেখিতেছি তাহাতে এমন একজন আদর্শ পুরুষ হইবেন। ইনি চৈত্র মাসে জন্মিয়াছেন সুতরাং বিনয়ী, ভােগী, সুখী, সৎ- কৰ্মান্বিত ও দেবদ্বিজে ভক্তিপরায়ণ হইবেন তারপর ইহার জন্ম ও নক্ষত্র ভালই দেখা যাইতেছে সুতিকা-ষষ্টীর পর ইহার একখানা কোষ্ঠী আমি যথাসাধ্য পরিস্কার করিয়া লিখিব। আপাততঃ আমি ইহার একখানা ঠিকুজি লিখিয়া দিতেছি, তাহা দেখিয়াই পরে কোষ্ঠী প্রস্তুত করা যাইবে। অতঃপর গ্রহাচাৰ্য মহাশয় একটী ঠিকুজি লিখিয়া কর মহাশয়কে রাখিতে দিলেন। কর মহাশয় ভঁহাকে কিছু পারিশ্রমিক দিয়া বিদায় করিলেন। সাধু হউন, মহাপুরুষ হউন, কেহই দৈবের হাত হইতে এড়াইতে পারেন না। বালকের জন্মের তিন দিন পর দৈবাৎ এক প্রতিবেশীর গৃহে আগুণ লাগিল। চৈত্র মাসের দুই প্রহর বেলা, পবন প্রবল বেগে সূৰ্য্য রশ্মির অগ্নিকণা ছড়াইতেছিল। গৃহে আগুণ জ্বলিয়া উঠিবামাত্র পবন দ্বিগুণ বেগে বহিতে লাগিল। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে অগ্নি ভীষণ হইতে ভীষণতর মুর্তি ধারণ করিয়া সৃষ্টি ধ্বংশের জন্যই যেন বদ্ধপরিকর হইল। দেখিতে দেখিতে সে আগুন কর মহাশয়ের গৃহে আসিয়া লাগিল, বহু চেষ্টায়ও সে আগুন কেহ নিবাইতে পারিল না। রাসমণি দেবীঅনন্যোপায়া হইয়া নবজাত শিশুকে লইয়া জঙ্গলে গিয়া নিজের ও শিশুর প্রাণ রক্ষা করিলেন। কর মহাশয়ের মূল্যবান্ গৃহ, জিনিষ পত্র, বস্ত্রালঙ্কার এবং দলিল পত্র ইত্যাদি মুহূৰ্ত্ত মধ্যে ভস্মীভূত করিয়া অনল দেৰ নিৰ্বাপিত হইলেন, এই সঙ্গে ঠিকুজিখানাও ভস্মীভূত হইয়া গেল। রাসমণি দেবীকে একটা বৃক্ষ মূলে কুটার প্রস্তুত করিয়া দেওয়া হইল, তাহাতেই তিনি সপ্তাহ কাল অবস্থিতি করিলেন। এই ঘটনার জন্য দৈব দায়ী হইলেও মহর্ষি ভুবন মােহন নব জাত শিশুর পারিবারিক নােক ও প্রতিবেশিগণের নিকট তিনি ঘর পােড়া নামে অভিহিত হইলেন। অতঃপর যথাকালে অন্নপ্রাশন হইল, তখন তাহার নাম রাখা হইল ভুবন মােহন। অগ্নিকাণ্ডে কর মহাশয়ের বিস্তর ক্ষতি হইলেও কর মহাশয়কে বিশেষ কষ্টে পড়িতে হয় নাই, জ্যেষ্ঠ পুত্র ঈশান চন্দ্র মুক্তাগাছার রাজ সরকারে একটী উচ্চ পদ লাভ করায় অচিরকাল মধ্যেই তাহার অভাব দূরীভূত হইল। তৃতীয় অধ্যায় ভূবন মােহন সবে চতুর্থ বৎসরে অতিক্রম করিয়াছেন। বালক শ্যামবর্ণ, সুঠাম কান্তি, মুখখানি লাবণ্যময়, চক্ষু দুটা আয়ত, উজ্জ্বল ও করুণাব্যঞ্জক। তাঁহার মুখখানি দেখিলেই তাহাকে ভালবাসিতে ইচ্ছা হইত। পিতামাতা আত্মীয় স্বজনের ত কথাই নাই, অপরিচিত কেহও যদি বালককে দেখিত সেও তাহাকে সােহাগ না করিয়া থাকিতে পারিত না। তারপর বালকের কণ্ঠস্বর অতি মধুর। একে “অমৃতং বালভাষিতং” তারপর আবার মধুর কণ্ঠস্বর, সুতরাং মধুরে মধুর মিশিয়া স্বর্গীয় অমৃততুল্য হইত। যে একবার তাঁহার কথা শুনিত, সে আর ভুলিতে পারিত না, আবার শুনিতে চাহিত। এ জন্য কর মহাশয়ের বাড়ীতে কেহ আসিলে সে বালকের সঙ্গে আলাপ না করিয়া,বালকের কথামৃত পান না করিয়া যাইত না। বালক অনেককে নাচিয়া নাচিয়া হরির গানও শুনাইতেন। কর দম্পতীও তাঁহাদের অন্যান্য সন্তান অপেক্ষা ।
মহর্ষি ভুবন মােহন ভুবন মােহনের অধিকতর পক্ষপাতী হইলেন। তাঁহার জন্মের পর গৃহ- দাহ হইয়াছে বলিয়া কোন প্রসঙ্গ উঠিলে কর মহাশয় বলিতেন গৃহ দাহের আগুণ যেরূপ উজ্জল হইয়াছিল, ভুবনও সেইরূপ এই বংশ সমুজ্জল করিবে, উত্তরকালে পিতার এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলবতী হইয়াছিল। বালক ভূবন মােহন, শ্রীমা ও মধুর ভাষী হইলেও অতিশয় চঞ্চল ছিলেন। ঘাটে গিয়া স্ত্রীলােকগণ স্বামী শাশুড়ী ননদীর নিন্দা করিতেছে ভূবন মােহন তাহাদিগকে ঢিল মারিয়া দৌড়াইয়া পলায়ন করিতেন। কেহ কোন মিথ্যা কথা বলিলে, তিনি তাহাকে ঢিল মারিয়া পলাইতেন। তারপর পাড়ার বালক বালিকারাও তাহাকে অনেক সময় অস্থির করিয়া তুলিত। তাহার জন্মের পর গৃহ দাহের প্রসঙ্গ লইয়া তাহারা- ভঁহাকে অনেক সময়ই “ঘর পাড়া ছাই খা কেচো হয়ে উড়ে যা” বলিয়া ক্ষেপাইত। ভুবন মােহন এই ছড়া শুনিলে ক্ষেপিয়া উহাদিগকে মারিতে যাইতেন। শরীরেও বেশ বল ছিল, সম্মুখে কাহাকে পাইলে তাহাকে ভালরূপ উত্তম মধ্যম দিতেন সমবয়স্কগণের কেহই তাহার সঙ্গে পারিয়া উঠিত না। এজন্য তাহার এ কথা দূর হইতে বলিয়াই পলায়ন করিত, ভুবন মােহন তাহাদিগকে ধরিতে না পারিয়া মায়ের কাছে আসিয়া নালিশ করিতেন। শান্তিময়ী মাতা সাদরে কোলে লইয়া মুখচুম্বন করতঃ সাত্বনা করিয়া বলিতেন, “তুমি ক্ষেপ তাই ওরা ক্ষেপায়, না ক্ষেপিলে ওরা আর ওকথা বলবে না। তােমার জন্মের পর বাড়ী পুড়িয়াছিল এটাত সত্য কথা, সত্য কথায় কি ক্ষেপিতে আছে ? আমি যদি খোড়া হই তবে লােকে আমাকে খাড়া বলিবে না কেন?” মায়ের কথায় বালক শান্ত হইতেন।
মহর্ষি ভুবন মােহন ভূবন মােহন পিতাকে অত্যন্ত ভয় করিতেন। একদিন প্রতিবেশী বালকগণকে ঘুড়ি উড়াইতে দেখিয়া তাহারও সখ হইল। তিনি গােপনে ঘুড়ি প্রস্তুত করিয়া গােশালায় রাখিলেন, কিন্তু পিত। সৰ্ব্বদা বাড়ী থাকেন, সুতরাং তাহার আর ঘুড়ি উড়াইবার সুযােগ ঘটিল না। ঘুড়িখানি সেই খানেই নষ্ট হইয়া গেল। সেই সময়ই তাহার লেখা পড়া শিক্ষার ঝোঁক বেশ ছিল, পাঠ- শালায় ছেলেরা যে সকল পাতা লিখিয়া ফেলিয়া দিত, ভুবন মােহন তাহা কুড়াইয়া আনিয়া—তাহার উপর দিয়া হাত ঘুরাইতেন, এবং “ক”, “খ” ইত্যাদি পড়িতেন। তাহার ফলে তাহার হাতে খড়ি দেওয়ার পূর্বে তাহার অনেকটা অক্ষর পরিচয় হইয়া গেল। অতঃপর যথাকালে কর মহাশয় তাহার হাতে খড়ি দিয়া তাহাকে গ্রাম্য পাঠশালায় ভর্তি করিয়া দিলেন। পাঠশালায় যাইতে ভুবন মােহনের স্ফুর্তি দেখে কে? তিনি প্রত্যহ সকলের আগে পাঠশালায় যাইতেন,-একদিনও অনুপস্থিত থাকিতেন না। গুরুমহাশয় যাহা শিখাইতেন তাহা অতি আগ্রহের সহিত শিক্ষা করিতেন। এজন্য গুরুমহাশয়ও তাহাকে বড় ভাল বাসিতেন। তিনি পাঠশালা হইতে বাড়ীতে আসিয়া সৰ্ব্বদাই পাঠ অভ্যাস করিতেন সন্ধ্যার কিছু পূর্বে প্রতিবেশী বালকদিগের সহিত ব্যায়ামজনক খেলা খেলিতেন। কিন্তু কেহ মিথ্যা কথা বলিলে কি প্রবঞ্চনা করিলে আর তাহার রক্ষা ছিল না। বলশালী বালক অমনি তাহাকে আক্রমণ করিত, এজন্য ভয়ে কেহ তাহার সমক্ষে মিথ্যা প্রবঞ্চনা ব্যবহার করিত না।
মহর্ষি ভুবন মােহন একদিন প্রাতে একটা প্রতিবেশী বালক তঁাহার নামে মিথ্যা কথা বলায় ভুবন মােহন তাহাকে প্রহার করিলেন, সে কাদিতে দিতে গিয়া কর মহাশয়কে জানাইল। কর মহাশয় পুত্রকে যথেষ্ট শাসন করি- লেন। বিচারে মিথ্যাবাদীরই জয় হইল দেখিয়া ভুবন মােহন ক্রোধে ও অভিমানে সারাদিন কিছুই খাইলেন না। লুকাইয়া লুকাইয়া থাকিতে লাগিলেন। মাতা কত করিলেন, কিছুতেই কিছু হইল না। সন্ধ্যার সময় আর থাকিতে পারিলেন না। ক্ষুধায় অধীর হইয়া উঠিলেন, শরীর অত্যন্ত দুর্বল হইল, তখন ধীরে ধীরে মায়ের নিকটবর্তী হইলেন, মনে করিলেন এখন মা একবার খাইতে বলিলেই খাইবেন। ফলেও তাহাই হইল বালকের মলিন মুখ দেখিয়া স্নেহময়ীর হৃদয় বিগলিত হইতেছিল, কিন্তু তিনি ধরা না দেওয়ায় এ পর্যন্ত তাহাকে খাওয়াইতে পারেন নাই। এক্ষণে নিকটে পাইয়া তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিয়া সস্নেহ মধুর বচনে খাইতে বলিলেন। বালক আর দ্বিরুক্তি না করিয়া তােজনে বসিলেন। বালক ভুবন মােহন এই দিন হইতে বুঝিলেন রাগ ও অভিমান খারাপ জিনিষ ; উহাতে নিজেরই কষ্ট হয়। সেই হইতে তিনি ও অভিমান পরিত্যাগ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। সেই সময় হইতে আর তাহাকে ক্রোধাভিমানের বশবর্তী হইতে দেখা যায় নাই। হরি সঙ্কীর্তনে তাহার বিশেষ আগ্রহ ছিল। পাড়ার কোন স্থানে হরি সঙ্কীৰ্ত্তন হইলে তিনি তথায় না যাইয়া ছাড়িতেন না। মনােযােগ ও অধ্যবসায়ে ভুবন মােহন পাঠশালার ছাত্রগণের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া ছিলেন। এইরূপে তিন বৎসর কাটিয়া গেল, বালক ভুবন মােহন ১০ মহর্ষি ভুবন মােহন নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষার সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া উত্তীর্ণ হইলেন এবং মাসিক দুই টাকা করিয়া বৃত্তি প্রাপ্ত হইলেন। চতুর্থ অধ্যায় বালক ভুবন মােহন ত নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় বৃত্তি পাইলেন, এখন তিনি কোথায় পড়িবেন ইহাই এক সমস্যার বিষয় হইয়া দাঁড়াইল। কারণ গ্রামে আর উচ্চতর শ্রেণীর বিদ্যালয় নাই। এখন যেমন উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর বিদ্যালয় যেখানে সেখানে হইয়াছে, তখন তেমন ছিল না। আট বৎসরের ছেলেকে ঢাকায় পরের কাছেই বা কেমন করিয়া রাখা যাইতে পারে ? তাহাকে স্থানান্তরে রাখিয়া মাতা রাসমণি দেবীই বা কিরূপে তাহাকে ছাড়িয়া থাকিতে পারেন ? মাতা যে তাহাকে না দেখিলে, দশদিক অন্ধকার দেখেন,-ভুবন সঙ্গে না খাইলে যে তাহার খাওয়া হয় না। আবার মায়ের সঙ্গে না খাইলে যে ভুবনেরও পেট ভরে না। তিনি হাজার খাইলেও মায়ের সঙ্গে একবার খাইতে বসেন। শাক্তার অনুমান ৫ মাইল দূরে একটা মধ্য বাঙ্গালা বিদ্যালয় ছিল। শাক্তা হইতে ঢাকা যতদুর, মধ্য বাঙ্গালা বিদ্যালয়টী তদপেক্ষা কিছু নিকটবর্তী এবং কোন নদী পার হইতে হয় না, আর ঢাকার পথে সুপ্রসিদ্ধ বুড়ী-গঙ্গা পার হইতে হয়। কিন্তু গ্রামের কোন বালক এই মধ্য বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে পড়ে না। তথায় পড়িতে হইলে এই অষ্টম বর্ষীয় বালককে একাকী সেই অঙ্গলাকীর্ণ গ্রাম্য পথে এতদূর প্রত্যহ মহর্ষি ভুবন মােহন যাতায়াত করিতে হইবে। এই দুধের বালক এত হাঁটিতেই বা পারিবে কেন? কত দম্পতী ও অন্যান্য সকলে এইরূপ নানাপ্রকার আশঙ্কা করিতে লাগিলেন। অষ্টম বর্ষীয় বালক ভুবন মােহনের তখন বিদ্যা শিক্ষার জন্য অদম্য উৎসাহ জন্মিয়াছে। তিনি তাহাদিগকে আশ্বস্ত করিয়া বলিলেন, “আপনারা অনর্থক ভয় করিতেছেন কেন? এই রাস্তাটুকু আর আমি যাইতে পারিব না? ইহার অধিক দূরে গেলেও আমার কষ্ট হইবে না। আমি অনায়াসে এই পথটুকু যাইতে পারি। দিনের বেলায় যাইব, পথে বিস্তর লােক যাতায়াত করে, তখন আর ভয় কি? তবে বাড়ী হইতে একটু সকালে বাহির হইতে হইবে। নতুবা স্কুলে পৌছিতে বিলম্ব হইতে পারে।” বালকের কথা শুনিয়া সকলে বিস্মিত হইলেন। অতঃপর কর মহাশয় তাহাকে সেই বিদ্যালয়েই ভর্তি করিয়া দিলেন। ভুবন মােহন নিয়মিতরূপে বিদ্যালয়ে যাইতে লাগিলেন। তিনি বেল। নয়টার মধ্যে বাড়ী হইতে রওনা হইতেন। অত সকালে সকলের পাক হইত না। মাতা প্রাতে উঠিয়া ভুবন মােহনের জন্য পাক করিয়া দিতেন। শীতের দিনে বাসী তরকারীও বরং থাকিত। ভুবন তাহা খাইয়াই সারাদিনের মত বিদ্যালয়ে রওনা হইতেন। এই দীর্ঘ পথে যাতায়াতে তিনি কিছুমাত্র ক্লান্তি বােধ করিতেন না। সন্ধ্যাকালে হাসিতে হাসিতে মায়ের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইতেন। তখন আবার কোথাও হরি সঙ্কীর্তনের খবর পাইলে তথায় ছুটিতেন। কিম্বা মাতা তখন পুকুরে জল আনিতে যাইতেছেন, দেখিলে ভুবন মােহন তঁাহার সঙ্গে গিয়া জলের কলসী নিজে মাথায় মহর্ষি ভুবন মােহন করিয়া আনিয়া দিতেন। এতদ্ব্যতীত মায়ের গৃহকাৰ্যে যথাসাধ্য সাহায্য করিতেন। বাড়ীর সকলের খাওয়ার পর মাতা খাইতে বসিলে, তখন ভুবন মােহন মাতার সহিত খাইতেন। আহারান্তে পড়িতে বসিতেন, পড়া ভালরূপ শিক্ষা না হওয়া পর্যন্ত তিনি শয়ন করিতেন না। তা রাত্রি থাক আর প্রভাত হউক, তাহাতে লক্ষ্য করিতেন না। কোন কঠিন বিষয় সহজে মুখস্থ করিতে না পারিলে, তিনি তাহা শ্লেটে বা কাগজে লিখিতে থাকিতেন, তাহাতে সহজে মুখস্থ হইত। কোন বিষয়টা একবার না বুঝিলে,বারংবার চেষ্টা করিতেন এবং যে পর্যন্ত তাহা তাহার হৃদয়ঙ্গম না হইত, সে পর্যন্ত তাহা পরিত্যাগ করিতেন না। যে যে স্থান একেবারে বুঝিতে পারিতেন না,কিম্বা যে যে স্থানে তাহার সন্দেহ থাকিত, স্কুলে গিয়া শিক্ষক মহাশয়ের নিকট তাহা ভাল করিয়া বুঝিয়া লইতেন এবং খাতায় লিখিয়া রাখিতেন ও তিনি এইরূপ লিখিয়া মক্স করিয়া হাতের লেখাও অতি সুন্দর করিয়াছিলেন। তাঁহার অপরিসীম অধ্যবসায়, মনােযােগ, সৌজন্য, বিনয়, পাঠ-নৈপুণ্য এবং সচ্চরিত্রতায় তিনি অচিরেই শিক্ষক ও ছাত্রগণের অতীব প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিলেন এবং শ্রেণীর সর্ব- প্রথম ছাত্র বলিয়া গণ্য হইলেন। তিনি শ্রেণীর প্রথম ছাত্র হইলেও কখনও তিনি ঐ স্থানে গিয়া বসেন নাই। তাহাপেক্ষা বয়ােবৃদ্ধ ছাত্র- দিগকে তিনি জ্যেষ্ঠ সহােদরের ন্যায় মান্য করিতেন। তিনি তাহা- দিগকে উপরের দিক বসিতে দিয়া নিজে তাহাদের নীচে গিয়া বসিতেন। ছাত্রগণের মধ্যে কেহ কোন বিষয় তাহার নিকট বুঝিতে আসিলে তিনি নিতান্ত সঙ্কুচিত হইয়া অতীব বিনীতভাবে বলিতেন “আমি আপনা- দিগকে বুঝাইতে পারি এমন ক্ষমতা আমার নাই, তবে আপনারা দয়া মহর্ষি ভুবন মােহন করিয়া যখন জিজ্ঞাসা করিতেছেন তখন আমি যাহা বুঝিতে পারিতেছি তাহাই বলিতেছি।” তিনি যাহাকে যাহা বুঝাইতেন, তাহা তাহার হৃদয়ে অঙ্কিত হইয়া থাকিত। শিক্ষক মহাশয়েরও বড়ই হৃদয়গ্রাহী হইত। এজন্য অনেক ছাত্রই তঁাহার নিকট সাহিত্য ও গণিত বুঝিয়া ইত। এইরূপে কয়েক মাস কাটিয়া গেল ; নিদারুণ বর্ষাকাল আসিয়া উপস্থিত হইল। পূর্ববঙ্গে বর্ষাকালে পল্লীগ্রামের রাস্তাঘাটের যে দুরবস্থা ঘটে তাহা বর্ণনাতীত। স্কুলে যাওয়ার পথের কতকাংশ কর্দমাকীর্ণ হইল। কতক বা পিচ্ছিল হইয়া গেল, আর কোন কোন স্থান বা বন্যায় প্লাবিত হইয়া স্রোতস্বিনীর অভিনয় করিতে লাগিল। ভুবন মােহন একখানা গামছা পরিয়া কাপড় চোপড় ও বইগুলির একটা পুটলী করিয়া সেই দুর্গম পথে ছাতা লইয়া কতদিন বৃষ্টিতে ভিজিয়া আছাড় খাইয়া স্কুলে গিয়াছেন, কতদিন তাঁহার সম্মুখে বজ্রপাত হইয়াছে, তিনি তাহাতেও ভ্রুক্ষেপ করেন নাই। এইরূপে দুই বৎসর অতীত হইল। ভুবন মােহন উচ্চ প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া বৃত্তি প্রাপ্ত হইলেন। পিতা মাতা আত্মীয়-স্বজন সে সংবাদে যারপরনাই আনন্দিত হইলেন। ভুবন মােহনের উৎসাহ ও উদ্যম চতুগুণ বাড়িয়া উঠিল। তাঁহার জ্ঞান পিপাসাও উত্তরােত্তর বৰ্ধিত হইতে লাগিল। অতঃপর দ্বাদশ বৎসর বয়সে তিনি মধ্য বাঙ্গালা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হইলেন। বালক ভুবন মােহনের কঠোর সাধনা ফলবতী হইল, চারিদিকে ভুবন মােহনের প্রশংসা প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। ১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন যে এক্ষণে ভুবন মােহনকে কি পড়ান হইবে ইহা লইয়া পিতাও ভ্রাতৃগণ পরামর্শ করিতে লাগিলেন, এবং তাহাকে ঢাকায় রাখিয়া ইংরাজী পড়ান স্থির করিলেন। কিন্তু তিনি যে সত্ব শুদ্ধ নিৰ্ম্মল জ্ঞানের আলোেক চাহেন তাহা কোথায় ? তাহার আত্মা যাহা চায়, তাহা যে ইংরাজী ভাষায় নাই। তিনি শুনিয়াছিলেন ইংরাজী ভাষা কেবল জড় জগৎ লইয়াই ব্যস্ত-জগৎ-কারণ চিদানন্দ পুরুষ ইংরাজী শিক্ষার বিষয়ীভূত নহেন। তিনি জানিতেন একমাত্র ভগবানই জীবের জ্ঞেয়। শিক্ষায় তাহাকে জানা যায় না, তাই শিক্ষাই নহে। তারপর তিনি মাতৃভাষায় বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু ইংরাজী, বিজাতীয় ভাষা। যাহা হউক পিতা তাহাকে, তাহা পড়িবার ব্যবস্থা করিয়াছেন—অতএব আর দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহাতেই সম্মত হইলেন। তিনি জানিতেন, পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতাহি পরমস্তপঃ। পিতরি প্রতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সৰ্ব্ব দেবতা। পূজার অবকাশের পর স্কুল খুলিলেই ঢাকায় গিয়া ইংরাজী স্কুলে ভর্তি হইবেন ইহাই স্থিরীকৃত করিয়া ঈশান চন্দ্র বিদায়ান্তে পুনরায় মুক্তা- গাছা চলিয়া গেলেন। পঞ্চম অধ্যায় জগৎ নশ্বর বা পরিবর্তনশীল। আজ তুমি পুত্র কন্যা লইয়া সুখের সাগরে ভাসিতেছ, কাল হয়ত তুমি তাহাদিগকে হারাইয়া দুঃখের মহষি ভুবন মােহন অতলে ডুবিবে। আজ তুমি রাজা, কাল হয়ত ফকির! আজ তুমি ধনী-কতলােক তােমার নিকট ঋণ গ্রহণ করিতেছে, কাল হয়ত তুমি অন্নের কাঙ্গাল হইয়া দ্বারে দ্বারে ফিরিবে। ইহাই জগতের নিয়ম। এ নিয়মের ব্যতিক্রম কেহই ঘটাইতে পারে নাই বা পারিবে না। আর্থিক অবস্থাও যদি মানুষের আয়ত্তাধীন থাকিত তবে অর্থনীতি বিশারদ মিতব্যয়ীগণ অবশ্যই ধনকুবের হইয়া চিরসুখী হইতে পারিতেন। এই জন্যই কবি বলিয়াছেন, “নারিকেলের জলের ন্যায় লক্ষ্মীর আগমন কেহ দেখিতে পায় না ; আবার হস্তী ভক্ষিত কয়েথবেলের ন্যায় তাহার প্রস্থানও কেহ দেখিতে পায় না। সাধারণতঃ লােকে ভাগ্যলক্ষ্মী চঞ্চলা বলিয়া এই সকল প্রশ্নের সমাধান করিয়া থাকেন। পদ্মলােচন কর মহাশয় তঁাহার গৃহদাহের ক্ষতি একরূপ ভুলিয়া গিয়াছেন। পারিবারিক লােক বৃদ্ধির সঙ্গে খরচও বাড়িয়াছে, তাহার নিজ ব্যবসায়ে তাহা নিৰ্বাহিত হওয়া কষ্টকর হইলেও তাহার কোন কষ্ট নাই। উপযুক্ত পুত্র ঈশান চন্দ্র বিস্তর টাকা উপার্জন করেন, সুতরাং তাহার সংসার পূর্বাপেক্ষা বরং স্বচ্ছল ভাবেই চলিতেছে, তিনি মনে করিতেছেন, পুএ আনন্দ চন্দ্রকে এক্ষণে ওকালতি পাশ করাইয়া কোন স্থানে বসাইতে পারিলে তাহার অবস্থা আরও উন্নত হইবে। তারপর ভুবনমােহনকে ইংরাজী পড়াইতে দেওয়া যাইতেছে, সে যেরূপ ছেলে তাহাতে সে নিশ্চয়ই ইংরাজী ভাষায় পারদশী হইয়া একজন বড়দরের হাকিম হইতে পারিবে। তাহা হইলেই ত তাহার বংশ উজ্জ্বল হইবে। তিনি এইরূপ কতই সুখের স্বপ্ন দেখিতেছেন, এমন সময় অকস্মাৎ তাহার ভাগ্য লক্ষ্মী চঞ্চলা মহর্ষি ভুবন মােহন হইয়া উঠিল। ঈশান চন্দ্র মুক্তাগাছায় ফিরিয়া যাইবার কয়েক দিন পরেই কঠিন জর বিকারে আক্রান্ত হইয়া নৌকা পথে বাড়ী রওনা হইলেন। মুক্তাগাছা হইতে শাক্তা প্রায় চারি দিনের পথ। পথিমধ্যে নৌকায় কোন সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত হইল না। অধিকন্তু ঠাণ্ডা লাগিয়া পীড়া উত্তরােত্তর বাড়ীতে লাগিল। নৌকাখানি খরস্রোতা শীতলাক্ষীর বক্ষে ভাসিতে ভাসিতে একডালার নিকট পৌছিলে, ঈশান চত্রের জীবন-লােত রুদ্ধ হইয়া গেল। মাল্লাগণ শব লইয়া শােকা, হৃদয়ে কর মহাশয়ের ঘাটে আসিয়া নৌকা লাগাইল। কর মহাশয় পূর্বে তাঁহার পুত্রের পীড়ার সংবাদ জানিতে পারেন নাই, অকস্মাৎ এই সংবাদ পাইয়া তাহার ও তাঁহার পরিবারবর্গের মধ্যে বিনামেঘে বজ্রাঘাত হইল। বিলাপের করুণ ধ্বনিতে গ্রামখানি মুখরিত হইয়া উঠিল। এতিবেশিগণ সান্ত্বনা করিতে গিয়াও অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিলেন না। যাহা হউক প্রতিবেশিগণের চেষ্টায় শব-সৎকার হইল। কর মহাশয়ের আশা ভরসা সুখ শান্তি সেই চিতানলে ভস্মীভূত হইয়া গেল। শশানের চিতা নিবিলেও কর মহাশয়ের হৃদয় চিতা নিৰিল না, সে চিতা দিবানিশি অলিতে লাগিল, ঈশান চন্দ্রের যুবতী ভাৰ্য্যা তাহার ইন্ধন হইলেন। কর মহাশয় যখনই সেই হতভাগিনীর বৈধব্য-মূর্তি দর্শন করিতেন তখনই তাহার সেই শােকানল দ্বিগুণ বেগে জ্বলিয়া উঠিত। সে বেগ আর তিনি অধিক দিন সহ্য করিতে পারিলেন না; নিদারুণ শােক সন্তাপে তাঁহার স্বাস্থ্য হইল এবং বৎসরান্ত না হইতেই তিনি পরিবারবর্গকে শােক ও দুঃখের সাগরে ভাসাইয়া শােকতাপময় ম- অগৎ পরিত্যাগ করতঃ শান্তিধামে প্রস্থান করিলেন।
মহর্ষি ভুবন মােহন এই সময়ে কর মহাশয়ের পুত্রগণ মধ্যে কেহই সংসারাভিজ্ঞ ছিলেন না। তাঁহার মৃত্যুর কয়েক দিন পরই দলে দলে গ্রামস্থ ব্রাহ্মণগণ আসিয়া তাহার পুত্রদিগকে শ্রাদ্ধের উপদেশ দিতে লাগিলেন। ইহারা কেহ পুরােহিত, কেহ তন্ত্রধার, কেহ বৈদিক সুতরাং এই সময়ই ইহাদের উপদেশ বিতরণের প্রকৃত সময়। নচেৎ পাছে ঠকিতে হয়! কেহ বলিলেন, জ্যেষ্ঠপুত্র রূপার দান সাগর করুন, স্ত্রী ও অপরাপর পুত্রগণ যােড়শ করুন। কেহ বলিলেন, দানের কাপড় ও জিনিষপত্র যেন ভাল হয়, তাহারা কর মহাশয়ের ন্যায় একজন ধনবানের শ্রদ্ধে সামান্য খেলো জিনিষের আশা করেন না। কেহ বা তাহার দুর সম্পর্কিত একজন অতনামা পণ্ডিতকে নিমন্ত্রণ করার জন্য অনুরােধ করিলেন। এইরূপ দিন দিনই উপদেশের স্রোত বাড়িতে লাগিল। জয়চন্দ্র ও আনন্দচন্দ্র দেখিলেন পিতা একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার শ্রাদ্ধ একেবারে যেন তেন প্রকারে করিলে সম্মান থাকে না। তখন তাহারা যথাসাধ্য সচ্ছল ভাবেই শ্রাদ্ধ করা স্থির করিলেন, যথাকালে সুশৃঙ্খল ভাবে শ্রাদ্ধ নিৰ্বাহিত হইল। এই শ্রদ্ধে কর মহাশয়ের সঞ্চিত অর্থ সমুদায়ই ব্যয় হইয়া গেল। ঘরে আর এক কপর্দকও থাকিল না। জয়চন্দ্র মনে করিয়াছিলেন আপাতত অরক্ষণীয় শ্রাদ্ধের ব্যয় সঞ্চিত অর্থে নিৰ্বাহ করিয়া সন্ত্রম বজায় রাখিবেন, পরে অদৃষ্টে যাহা থাকে তাহাই হইবে। তখন লগ্নী প্রায় দুই হাজার টাকা ছিল। তাঁহার এ আশাও ছিল যে ঐ টাকা উঠাইয়া অতঃপর সাংসারিক ব্যয় নির্বাহ করিবেন। কর মহাশয়ের শ্রাদ্ধ নিৰ্বিয়ে সম্পন্ন হইয়া গেল। জয়চন্দ্র খাতক- ১৮ মহর্ষি ভুবন মােহন গণের নিকট হইতে টাকা আদায়ের চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু বিশেষ কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। কেহ দেনার ভয়ে সম্পত্তি বেনামী করিল, কেহ দেউলিয়া সাজিল, কেহ বা টাকা নেয় নাই বলিয়া সাফ জবাব দিল। এই সময় তাহার মাতা, বিধবা ভাতৃবধূ, তিনটি ভ্রাতা, দুইটি ভগিনী তাহার পােয় ছিলেন। পরিবার মধ্যে কেহ উপার্জন- কারী নাই। জয় চন্দ্রের নিজেরও বাড়ী ছাড়িবার উপায় নাই। আনন্দ চন্দ্রের তখন কোন স্থানে কোন চাকুরীর সুবিধা হয় নাই। ভুবন মােহন ও বাদব চন্দ্র তখন বালক। সুতরাং তখন তাহাদের গ্রাসাচ্ছাদন চলাই দুষ্কর হইয়া উঠিল। কিছুদিন জিনিষ পত্র বন্ধক ও বিক্রয় করিয়া চালাইলেন, ক্রমে তাহাও প্রায় অচল হইয়া উঠিল। তখন আনন্দ চন্দ্র পেটের দায়ে ওকালতির আশা বিসর্জন দিয়া ঢাকা জজ কোর্টের একজন নকলনবিশ হইয়া অতি কষ্টে পরিবারের ভরণ- পােষণ করিতে লাগিলেন। মনে করিয়াছিলেন নিজে উকিল হইবেন, ভুবন মােহনকেও ইংরাজী পড়াইয়া হাকিম করিবেন, কিন্তু দারিদ্র্যের প্রবল স্রোতে তাঁহার সেই উচ্চ আশা ভাসিয়া গেল। তিনি ভুবন মােহনকে ইংরাজী পড়ানোর সঙ্কল্প একবারে পরিত্যাগ করিলেন। পরম ভগবদ্ভক্ত ভুবন মােহন ইহা ভগবানের করুণ মনে করিয়া বিস্মিত হইলেন। শাক্তা গ্রামে ত্রিলােচন তর্কালঙ্কার নামে একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। তাহার একটি টোল ছিল। সে টোলে কলাপ, ব্যাকরণ ও কাব্যাদি শিক্ষা দেওয়া হইত। ভুবন মােহনের অনেক দিন হইতে আধ্যাত্ম বিদ্যার আকর সংস্কৃত শিক্ষার ইচ্ছা বলবতী হইয়া ছিল।
মহর্ষি ভুবন মােহন এক্ষণে তিনি এই টোলে সংস্কৃত শিথিতে অভিলাষী হইলেন। কিন্তু তিনি জানিতে পারিলেন কলাপ, ব্যাকরণ তিন বৎসরের কমে শেষ করা যায় না। তাই তিনি তর্কালঙ্কার মহাশয়ের নিকট মুগ্ধবােধ পড়িবার প্রস্তাব করিলেন। তর্কালঙ্কার মহাশয় কখনও মুগ্ধবােধ পড়েন নাই , সুতরাং তাহা পড়াইতে সম্মত হইলেন না। তখন ভুবন মােহন সবিনয়ে তাহাকে বলিলেন,—“আমার বাঙ্গালা ব্যাকরণ পড়া আছে, আপনি অনুগ্রহ পূর্বক মুগ্ধবােধের সূত্রগুলি বাঙ্গালায় বুঝাইয়া দিলেই আমি বুঝিয়া লইতে পারিব।” ভুবন মােহনের নির্বাতিশয়ে তর্কালঙ্কার মহাশয় তাহাতে অগত্যা সম্মত হইলেন। অতঃপর ভুবন মােহন প্রত্যহ টোলে গিয়া মনােযােগ সহকারে পড়িতে লাগিলেন। তর্কালঙ্কার মহাশয় কুটুম্ব বাড়ী বা কোন স্থানে নিমন্ত্রণে গেলে, টোলের ছাত্রগণ কত কাণ্ডই করিত, কেহ গাইত, কেহ বাজাইত, কেহ কেহ তাস দাবা পাশা খেলিত, কিন্তু ভুবন মােহন কাহারও সঙ্গে মিশিতেন । তিনি এক কোনে বসিয়া নিবিষ্ট মনে আপন পাঠাভ্যাস করিতেন, এইরূপে দুই বৎসরে মুগ্ধবােধ ব্যাকরণ শেষ করিয়া রঘুবংশ, কুমারসম্ভৰ ও ভট্টিকাব্য পড়িতে আরম্ভ করিলেন। এক বৎসর কাল কাব্য পাঠ করিয়া বিশেষ ব্যুৎপন্ন হইলেন কিন্তু অর্থাভাবে পরীক্ষা দিতে পারিলেন না। পণ্ডিত তর্কালঙ্কার মহাশয় বলিতেন, তিনি এ পর্যন্ত অনেক ছাত্র পড়াইয়াছেন কিন্তু ভুবনের মত ছাত্র তিনি আর পান নাই। অমন বিনয়ী, সচ্চরিত্র, মনােযােগ ও মেধাবী ছাত্র আর দেখেন নাই। তিনি তাহাকে দেখিয়া যেরূপ আনন্দ লাভ করিয়াছেন তেমন আনন্দ আর তাহার অধ্যাপক জীবনে পান নাই। শেষ বৎসর মহর্ষি ভুবন মােহন তিনি অনেক সময় ভুবন মােহনকে অধ্যাপনার ভার দিয়া পরীক্ষা করি- তেন এবং ভূবন মােহনের ব্যাখ্যা শুনিয়া যার পর নাই সন্তুষ্ট হইতেন। ভুবনমােহন বাড়ীতে থাকিয়া টোলে পড়িতেছেন, আর দারিদ্রের নিদারুণ পীড়া অনুভব করিতেছেন। তাঁহার যে মাতা ও ভ্রাতৃবধূ এক- দিন মুল্যবান্ বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিত ছিলেন আজ তাহাদের পরিধানে শত- গ্রন্থিযুক্ত ঘেটে মার্কিণের মলিন বস্ত্র। যাহাদের পাতে একদিন কত উপাদেয় সামগ্রী পড়িয়া থাকিত,-আর দাস দাসীগণ সেই পরিত্যক্ত সামগ্রী পাইবার জন্য লালায়িত হইত, এক্ষণে তাঁহাদের একবেলা এক মুষ্টি শাকায় পর্যন্তও অনেক দিন জুটিয়া উঠে না। যে ভ্রাতা- ভগিনী প্রত্যহ কত বড় বড় মাছ, দধি দুগ্ধ ও মিঠাই খাইত, কত নূতন নূতন মূল্যবান্ বেশভূষা পরিধান করিত, আজ তাহারা সময়মত দুটি অল্প পান না। তাহাদের পরিধেয় বস্ত্র পর্যন্তও নাই ; যে বাড়ী একদিন অধমর্ণ ও আত্মস্বজনের কোলাহলে মুখরিত হইত, আজ সেখানে দারিদ্র্যের হা হুতাশ ! প্রত্যহ বহু লােক যাহাদের নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করিতে আসিত, আজ তাহারাই আবার ঋণের জন্য পরদ্বারে গিয়া অকৃতকার্য হইয়া ক্ষুন্ন মনে গৃহে ফিরিতেছে। আনন্দ চন্দ্র সামান্য যাহা কিছু পাইতেন তারা নিজের ব্যয় নির্বাহ করিয়া বাড়ীতে অতি সামান্যই দিতে পারিতেন। তাহা তপ্ত কটাহে জলবিন্দুবৎ অল্প সময় মধ্যেই নিঃশেষ হইয়া যাইত। এই সকল দেখিয়া পারিবারিক দুরবস্থা দুরীকরণ জন্য ভুবন মােহন বড়ই চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এমন সময় একদিন তিনি সংবাদ পাইলেন ঢাকা নাল স্কুলে সংস্কৃত জানা বাঙ্গালা ছাত্রবৃত্তি পাশ ছাত্রভর্তি হইলে মাসিক পাঁচ মহর্ষি ভুবন মােহন টাকা বৃত্তি পাইতে পারে। এই সংবাদ পাইয়া তাহার মনে এক আশার সঞ্চার হইল। তিনি দেখিলেন নর্মাল স্কুলে পড়িলে যদি বৃত্তি পাওয়া যায় তবে তিনি বাড়ীতে খাইয়া প্রত্যহ স্কুলে পড়িবেন, তাহাতে বাড়ীরও একটু সাহায্য হইবে, এবং পরিণামে পাশ করিতে পারিলে একটা স্কুলে শিক্ষকতাও মিলিবে। এই মনে করিয়া ভ্রাতৃগণের সঙ্গে পরামর্শ করতঃ নৰ্মাল স্কুলে ভর্তি হওয়াই স্থির করিলেন। অতঃপর সবিনয়ে অধ্যাপক তর্কালঙ্কার মহাশয়ের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ বরিয়া মাতৃপদধূলি মস্তকে লইয়া ভুবনমােহন ঢাকা রওনা হইলেন। তখন সুপ্রসিদ্ধ নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণ ঢাকা নর্মাল স্কুলের হেড, পণ্ডিত, এবং মিঃ সিঃ এরাটুস স্কুলের অধ্যক্ষ। ভুবন মােহন প্রথমে হেড, পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট গিয়া তাঁহার প্রার্থনা জানাইলেন। পণ্ডিত মহাশয় তাঁহাকে পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন সংস্কৃত সাহিত্য ও ব্যাকরণে তাহার বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। তখন তিনি অধ্যক্ষ সাহেবকে বলিয়া ভুবন মােহনের মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তি নির্ধারণ করিয়া দিলেন, এবং তাঁহাকে স্কুলে ভর্তি করিয়া লইলেন। ভুবন মােহন বৃত্তির আদেশ পাইলেন। বিনা ব্যয়ে স্কুলে পড়িবার অনুমতি পাইয়া স্কুলে ভর্তি হইলেন, কিন্তু অধ্যক্ষ সাহেবের আদেশে তঁাহার বাড়ীর সাহায্যের অন্ত- রায় ঘটিল। সাহেব আদেশ দিলেন, ভুবন মােহনকে স্কুলের বিধানানু- সারে ছাত্ৰাশ্রমে থাকিতে হইবে। তখন তিনি বড় বিপদে পড়িয়া বিপদভঞ্জন ভগবানের নাম স্মরণ করিতে করিতে পুনরায় বিদ্যা- ভুষণ মহাশয়ের নিকট যাইয়া বিনয় করুণ বাক্যে সাংসারিক অবস্থা ও আন্তরিক ইচ্ছা নিবেদন করিলেন। বিদ্যাভূষণ মহাশয় একজন সদাশয় ২২ মহর্ষি ভুবন মােহন পুরুষ ছিলেন। ভুবন মােহনের দুরবস্থার কথা শুনিয়া তাঁহার হৃদয় দ্রবীভূত হইল। তিনি ভুবনমােহনকে আশ্বাস দিয়া অধ্যক্ষ সাহেবের নিকট গেলেন। সাহেব তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন। তিনি তাহাকে' ভুবনমােহনের অবস্থা জানাইয়া তাহার ছাত্রাবাসে থাকার আদেশ রহিত করিতে অনুরােধ করিলেন। পণ্ডিত মহাশয়ের অনুরােধে অধ্যক্ষ সাহেব ভুবনমােহনের সম্বন্ধে বিশেষ ব্যবস্থা করিলেন। ভুবন- মােহন ছাত্রাবাসে থাকার দায় হইতে মুক্ত হইলেন। ষষ্ঠ অধ্যায় অতঃপর ভুবনমােহন প্রত্যহ বাড়ী হইতে গিয়া নৰ্মাল স্কুলে বিশেষ মনােযােগের সহিত পড়িতে লাগিলেন। দূরের স্কুল, তাহাতে আবার খেয়া পার হইতে হয় ; এজন্য ভুবনমােহন প্রাতে উঠিয়া স্কুলে যাওয়ার যােগাড় করিতেন। মাতা সিদ্ধপােড়া কিছু পাক করিয়া দিতেন, তিনি তাহা খাইয়াই স্কুলে রওনা হইতেন। কখনও কখনও বা চাউল অভাবে সে সিদ্ধ পােড়াও জুটিত না, চিড়ামুড়ি খাইয়া স্কুলে যাইতেন। বৃত্তির টাকা পাইলেই মাতৃচরণে অৰ্পণ করিতেন, তাহা হইতে খেয়া ঘাটের পাটনীকে দিয়া যাহা থাকিত মাতা তাহা সংসারে খরচ করিতেন। তাহাতেও সাংসারিক অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন ঘটিল না। ঘটিবেই বা কিরূপে? নদী শুকাইলে তাহার চিঃ বিলুপ্ত হয় না। কর-পরিবার দারিদ্র্যের কঠোর পেষণে নিষ্পেষিত মহর্ষি ভুবন মােহন হইতেছে, কিন্তু এখনও তাহাদের বাড়ী হইতে সামাজিক ক্রিয়া- কলাপ ও ব্ৰতাদি একেবারে তিরােহিত হয় নাই। তঁাহারা দুরবস্থার চরম সীমায় উপনীত হইলেও তাহাদের পূর্ব সংস্কার একেবারে অন্তহিত হয় নাই, এখনও তাহারা অত্মিসম্মানে জলাঞ্জলি দিতে পারেন নাই, এখনও তাহারা সাধ্য থাকিতে ফকির বৈষ্ণবকে বিমুখ করেন না। এখনও অতিথি অভ্যাগতের অভ্যর্থনায় তঁাহারা বিমুখ হয়েন না। সুতরাং এই সামান্য আয়ে তাহাদের অভাব মােচন হইবে কেন ? আনন্দচন্দ্র ও ভুবনমােহনের কয়েকটী টাকায় মাসে কয়েক দিন মাত্র চলিত, তারপর আবার যে অনাটন সেই অনাটন। অনেক সময় ধার কর্জও মিলিত না। অভাবগ্রস্থকে কেহ সহজে ধারও দিতে চাহে । একদিন ঘরে চাউল চিড়া বা মুড়ি কিছু ছিল না ভুবন- মােহন না খাইয়া স্কুলে গেলেন। মাতা প্রতিবেশিগণের দ্বারে দ্বারে ঘূরিয়াও সারাদিনে কাহারও বাটীতে একসের চাউলও ধার পাইলেন । তখন আষাঢ় মাস। আমও ফুরাইয়াছে, সুতরাং খাওয়ার কোন যােগাড় হইল না। সন্ধ্যার সময় ভুবনমােহন অনাহারক্লিষ্ট শরীরে বাটীতে ফিরিয়া মাতা-ভ্রাতাভগিনী প্রভৃতির অনাহার-- বদন দর্শন করিয়া ব্যথিত হইলেন, এবং মনে মনে অগতির গতি দীনবন্ধু ভগবানের নিকট তাহাদের দুঃখ মােচনের জন্য সকাতরে প্রার্থনা করিলেন। কি আশ্চর্য! সে প্রার্থনা যেন তৎক্ষণাৎ দয়াময়ের পাদপদ্মে গিয়া পৌছিল। সন্ধ্যার পর ভুবনমােহন ঘরে গিয়া পড়িতে বসিয়াছেন, হঠাৎ তাহার নাকে সুপক্ক কঁঠালের ঘ্রাণ আসিল, তখন তিনি জননীকে উহা জানাইলেন। জননী কহিলেন, ২৪ মহর্ষি ভুবন মােহন “ঘরেত পাকা কাঠাল নাই, তবে যদি বাগানে থাকে তাহা বলিতে পারি না।” এই কথা শুনিয়া তিনি আলাে লইয়া বাগানে গিয়া একটি গাছে পাকা কঁঠাল পাইলেন। তখন ভুবনমােহনের আনন্দ দেখে কে? তিনি কঁঠাল লইয়া মাতাকে আসিয়া বলিলেন, দেখুন মা ভগবানের কি দয়া ! তিনি আজ আমাদিগকে অনাহার ক্লিষ্ট দেখিয়া বায়ু যােগে পাকা কঁঠালের সংবাদ পাঠাইয়া ছিলেন। আমরা বুঝি , তাই এমন দয়ময়কে ভুলিয়া থাকি।” এই কথা বলিতে বলিতে তাহার চক্ষে জল ও কণ্ঠস্বরে জড়তা আসিল । অতঃপর জননী কঁঠাল ভাঙ্গিয়া সকলকে দিলেন। ভুবনমােহনের অনুরােধে জননীও খাইলেন ; তারপর ভুবনমােহনও খাইয়া সে দিনের ক্ষুধানল নিৰ্বাপিত করিলেন। ক্রমান্বয় সাতদিবস মধ্যে আর কোন টাকা পয়সা পাইলেন না, কিন্তু বাগানে প্রত্যহই কঁঠাল পাকিতে লাগিল। সেই কাঠাল খাইয়াই সপ্তাহকাল জীবনধারণ করিলেন। এইত গেল আহারের কষ্ট, পরিধেয়ের কষ্টও বর্ণনাতীত। ভুবনমােহনের মাত্র দুইখানা পরিধেয় বস্ত্র তাহাও জীর্ণ ও মলিন, চাদরখানিও তদনুরূপ। তিনি সেই ধূতি চাদর লইয়াই নিদাঘের প্রচণ্ড রৌদ্র ও ঝড় সহ্য করিয়া এবং বর্ষার জল ও কাদা পায়ে ঠেলিয়া শীলা বৃষ্টি ও বজ্রপাতে দৃকপাৎ না করিয়া প্রত্যহ যথানিয়মে স্কুলে যাইতে থাকিলেন। এ সকল কষ্টের উপর তাহার আর এক কষ্ট, তিনি অর্থাভাবে সমুদয় পাঠ্যপুস্তক কিনিতে পারিলেন না। স্কুলের পর সমপাঠিগণের কাহারও পুস্তক হইতে নকল করিয়া আনিয়া পাঠ অভ্যাস করিতে লাগিলেন। এই পুস্তক নকল করার জন্য তাহার অনেক দিন বাড়ী ফিরিতে অনেক রাত্রি হইয়া যাইত মহর্ষি ভুবন মােহন কতদিন তিনি কত ভয়াবহ অবস্থায় পতিত হইয়াছেন। এস্থলে আমরা তাহার একটা কথা উল্লেখ করিতেছি। একদিন ছুটির পর পুস্তক নকল করিয়া সন্ধ্যার সময় ঢাকা নগরীর পাশ্ববর্তিনী বুড়ীগঙ্গা পার হইলেন, সে দিন অমাবস্যা, আকাশও মেঘাচ্ছন্ন ছিল, বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি পড়িতেছিল। দেখিতে দেখিতে অন্ধকার গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইয়া উঠিল, দুই চক্ষে কিছু দেখা যায় না। ভুবনমােহন সেই অন্ধকারে একাকী দ্রুতপাদবিক্ষেপে বাডী পানে ছুটিয়াছেন। যখন তিনি জনমানবশূন্য একটি সুবিস্তৃত শ্মশানক্ষেত্রে আসিয়া পৌছিলেন, তখন সহসা একটা বিকট হাস্যধ্বনি তাহার কর্ণগােচর হইল। ভুবন- মােহন চমকিয়া কিছুক্ষণের জন্য দাডাইলেন, আর কিছুই শুনিতে পাইলেন না। তখন তিনি মনে মনে মঙ্গলময়ের নাম স্মরণ করিয়া চলিতে লাগিলেন। আবার সেই বিকট হাস্যধ্বনি শ্মশানের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া অনয়ে মিশিয়া গেল। ভুবনমােহন এবার “কে ও?” “কে ও বলিয়া চেচাইতে লাগিলেন, কিন্তু আর কোন সাড়াশব্দ পাইলেন না। এবার তাহার হৃদয়েও কিঞ্চিৎ ভয়ের সঞ্চার হইল। তিনি মনে করিলেন, এই নির্জন শ্মশানে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারে এই দুর্যোগের মধ্যে কি কোন মানব এখানে আসিতে পারে ? আর যদি আমার মত কোন হতভাগ্য আসিয়াও পড়ে, তবে এরূপ বিকটহাসি হাসিবে কেন? এ নিশ্চয়ই শ্মশানবিহারী প্রেত। আবার মনে করিলেন, কৈ অনেক শিক্ষিত লোেকই ত প্রেতের অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন না। তাহারা ত বলেন উহা দুৰ্বল হৃদয়ের কল্পনাপ্রসূত প্রহেলিকা মাত্র। এইরূপ চিন্তা করিয়া যেমনই আবার পদ সঞ্চালন করিয়াছেন অমনি মহর্ষি ভুবন মােহন আবার সেই বিকট হাস্যধ্বনি তাহার নিকটেই উখিত হইল। এবার হাসিতে তিনি বুঝিলেন এটি মানুষের হাসি। তখন তিনি যেদিকে হাসি শুনিয়াছিলেন সেই দিকে অগ্রসর হইলেন। সহসা বিদ্যুৎ চমকিল, এবং সেই আলােকে অদূরে একটা নারীমূর্তি দেখিতে পাইলেন। তখন ভুবনমােহন বুঝিলেন এই নারীই সেই বিকট হাস্যকারিণী । তখন তাহার হৃদয়ে আবার সাহস আসিল। তিনি তৰ্জন করিয়া বলিলেন, “কে তুমি? বল নচেৎ এখনই তােমার মাথা গুড়া করিব।” নারী মূর্তি উত্তর করিল, “আমি।” ভুবনমােহন পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে?” কিন্তু তাহার আর উত্তর পাইলেন না। মুর্তি আবার *হি হি করিয়া উচ্চ হাসি হাসিল। এই সময় আবার বিদ্যুৎ চমকিল,- ভুবনমােহন সেই আলােকে দেখিলেন তাহার পরিচিত এক পাগলিনী কতকগুলি হাঁড়িপাতিল লইয়া বসিয়া কখনও উচ্চ হাসি হাসিতেছে, কখনও বা বির বির করিতেছে। তখন তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে তথা হইতে রওনা হইলেন। এদিকে পুত্রের প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব দেখিয়া জননী রাসমণি দেবী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছেন। একে অমাবস্যার অন্ধকার, তাহাতে আবার মেঘাড়ম্বর ! তারপর আবার রাস্তায় নানা ভয়ের কথা শুনা যায় । তাই তিনি ব্যাকুলা হইলেন । প্রতি নিমেষে তাহার ব্যাকুলতা বাড়িতে লাগিল। ক্রমে পরিবারস্থ সকলেই নিতান্ত চিন্তিত হইয়া উঠিলেন ; এমন সময় ভুবনমােহন আসিয়া মায়ের পদধূলি গ্রহণ করিলেন। অতঃপর সহাস্য বদনে রাস্তার সেই ভীষণ কাণ্ড বর্ণনা করিলেন। সকলে শুনিয়া অবাক, হইলেন এবং ভুবনমােহনের অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করিলেন। জননীর মনে মহর্ষি ভুবন মােহন সন্দেহ হইল, ভুবনমােহন নিশ্চয়ই ভয় পাইয়াছেন। তিনি তাহাকে জলপড়া ইত্যাদি খাওয়ানাের জন্য ব্যস্ত হইলেন। ভুবনমােহন বলিলেন, “মা ! আমি ভয় পাই নাই। পাগলীকে দেখিয়া ভয় পাইব কেন মা? শ্মশানে মশানে, সাগরে পর্বতে, অন্তরে ও বাহিরে ভবভয়হারী ভগবান যে সৰ্ব্বদাই বিদ্যমান আছেন। তিনি থাকিতে ভয় কি ? তিনি যে বরাভয়দাতা। তাহার উপর যাহার বিশ্বাস নাই সেই দুর্বল-হৃদয়ই ভয়ে অভিভূত হয়। মা! আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন, আমি কিছুমাত্র ভয় পাই নাই। আপনি আর জলপড়ার চেষ্টা করিবেন না।” পুত্রের কথায় জননী সন্তুষ্ট হইলেন, ভুবনমােহনকে আর জলপড়া খাইতে হইল না। তিনি আরও একদিন এক সাহসিকতার পরিচয় প্রদান করিয়া ছিলেন। একদিন পড়িতে পড়িতে রাত্রি দুইটা বাজিয়াছে। জগৎ নিস্তদ্ধ। হঠাৎ বাহিরে হাসির শব্দের ন্যায় শব্দ শুনিতে পাইলেন। কিছুক্ষণ কাণ পাতিয়া রহিলেন, কিন্তু আর কিছু শুনিতে না পাইয়া তিনি বাতি নিবাইয়া শয়ন করিলেন। এইবামাত্র আবার সেই শব্দ শুনিতে পাইলেন, তখন পুনরায় কাণ পাতিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে আবার সেই শব্দ তাহার শ্রুতিগােচর হইল। এবার বুঝিলেন এ কোন মানুষের হাসির শব্দ নহে, নিকটবর্তী কলা গাছের ঝােপ হইতে ঐ শব্দ উখিত হইতেছে । তখন তিনি একাকী ধীরে ধীরে তথায় গিয়া দেখিলেন একটি শুষ্ক কালি পত্রের সহিত মৃদু মন্দ সমীর সঞ্চালনে অপর একটি শুষ্ক পত্রের সংঘর্ষণ হওয়ায় এরূপ শব্দ হইতেছে। তিনি ভীতিব্য কোন কিছু দেখিলে বা শুনিলে তাহার কারণ অনুসন্ধান করিয়া বাহির ২৮ মহর্ষি ভুবন মােহন করিতেন। তিনি বলিতেন, অনুসন্ধান করিলে নিশ্চয়ই কারণ পাওয়া কারণ পাওয়া গেলে আর ভয় থাকে না। এইরূপ ক্লেশ ও বিপদের সহিত যুদ্ধ করিয়াও ভুবন মােহন অতুল অধ্যবসায় সহকারে পড়িতে লাগিলেন। অল্পদিন মধ্যে তাহার চরিত্রে ও পাঠনৈপুণ্যে শিক্ষকগণ তাহাকে বড়ই স্নেহ করিতে লাগিলেন, সমপাঠিগণও তাহার বিশেষ অনুরক্ত হইয়া উঠিল। সপ্তম অধ্যায় সুখ ও দুঃখ জগতে রথচক্রের ন্যায় ঘুরিতেছে, কেহই জগতে চির- দুঃখী বা সুখী থাকিতে পারে না। রাত্রির পর দিন অবশ্যই হয়। জ্যোতিষিগণ, গ্রহ-সঞ্চারই এই পরিবর্তনের কারণ বলিয়া নির্দেশ করেন। কর পরিবার গ্রহবৈগুণ্যে, দুঃখ অমানিশার গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া ছিলেন। সহসা যেন উষার শুভ্র জ্যোতিঃ সে অন্ধকার নাশ করিতে উদ্যত হইল। কর পরিবারের অদৃষ্ট আকাশের ঘাের ঘনঘটা বিদূরিত হইবার লক্ষণ লক্ষিত হইল, আনন্দচন্দ্র ফরিদপুরে ডিক্রিজারীর মহুরী নিযুক্ত হইলেন। আনন্দচন্দ্রের চাকরিতে অর্থাভাব অনেকটা ঘুচিল কিন্তু কর- পরিবার গ্রামের পরশ্রীকাতরগণের চক্ষু শূল হইয়া পড়িলেন। তাহারা দেখিল আনন্দচত্রের পিতা এক সময়ে গ্রামে প্রভুত্ব করিয়া গিয়াছেন, তাহার মৃত্যুর পর তাহারাই প্রভুত্ব পাইয়াছিল, এখন আবার যদি ইহাদের অবস্থা ভাল হয় তবে আবার তাহাদের প্রভুত্বের লাঘব হইবে। তারপর জয়চত্র অনেক দুবৃত্ত খাতকের নিকট ন্যায্য প্রাপ্য তাগাদা করিতে মহর্ষি ভুবন মােহন যাওয়ায় তাহাদের বিরাগ ভাজন হইয়াছিলেন। অর্থাভাবে যে সকল খাতকের টাকা আদায়ের জন্য এতদিন আদালত অবলম্বন করিতে পারেন নাই, তাহারা এক্ষণে অনিন্দচন্দ্রের চাকুরী হওয়ার সংবাদে বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। ইহার। সকলেই এক্ষণে কর পরিবারের বিরুদ্ধাচরণ করিতে লাগিল, জয়চন্দ্র তখন ভ্রাতৃগণের সহিত পরামর্শ করিয়া স্থানত্যাগেন দুর্জনঃ এই নীতির অনুসরণ করিলেন। তিনি বিক্রমপুরের অন্তর্গত পাউলদিয়া গ্রামে বাসস্থান পরিবর্তন করিলেন। পাউলদিয়া, ঢাকা হইতে প্রায় বার মাইল দূরে। সুতরাং এতদুর হইতে প্রত্যহ স্কুলে যাতায়াত ভুবন মােহনের পক্ষে অসম্ভব হইল! তখন জ্যেষ্ঠদ্বয় তাহাকে স্কুল বােডিঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করিলেন। এক্ষণে তাহার সকল অভাব দুরীকৃত হইল। তিনি পড়িবার সময় পাইলেন, শিক্ষকগণের সাহচর্য লাভের সুবিধা ঘটিল, আবশ্যক পুস্তকগুলিও কিনিতে পারিলেন। তিনি অতুল উদ্যমে ও অসীম উৎসাহে দিবা- রাত্রি পাঠাভ্যাসে নিরত থাকিতেন। সন্ধ্যার সময় দলে দলে ছাত্রাবাসের ছাত্রগণ বেড়াইতে বাহির হইত; কত সময় বােডিঙ্গে তাস দাবা পাশার শ্রাদ্ধ হইত, কিন্তু ভুবন মােহন কোন দলেই মিশিতেন না। প্রেধান শিক্ষক বিদ্যাভূষণ মহাশয়, তাহার অতুল অধ্যবসায়, অপরিসীম উদ্যম, পাঠনৈপুণ, ধৰ্ম্মনিষ্ঠা ও সচ্চরিত্রতার জন্য তাহাকে বই স্নেহ করিতেন। তিনি সকল বিষয়েই স্কুলের সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র বলিয়া গণ্য হইলেন। শনিবার স্কুলের পর অনেক ছাত্র বাড়ী যাইত, কিন্তু পড়ার ক্ষতি হইবে মনে করিয়া অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ দিনের অবকাশ ভিন্ন তিনি বাড়ী যাওয়া বন্ধ করিলেন ।
হষি ভুবন মােহন বৈশাখ মাসে একদিন জননীর এক পত্র পাইয়া দেখিলেন মাতা তাহাকে বাড়ী যাইতে লিখিয়াছেন। ভুবন মােহন পরবর্তী শনিবার স্কুল ছুটির পর বাড়ী গিয়া তাহার শ্রীচরণ দর্শন করিবেন বলিয়া উত্তর দিলেন। অতঃপর শনিবার স্কুল ছুটির পর বােডিঙ্গে আসিয়া বাড়ী রওনা হইলেন। ঢাকা নগরীর পাশ্ববর্তিনী বুড়ী গঙ্গা পার হইয়া কিছুদূর গেলে শিংধর নামে একটী নদ পাওয়া যায়। ভুবন মােহন সেই নদের কূলে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন বেলা বেশী নাই। এই সময় আকাশের পশ্চিম কোণে একটুকু মেঘও দেখা দিল। শিংধর নদ অতিক্রম করিয়া একটি চর পাওয়া যায়। তারপর ধলেশ্বরী নদী। ধলেশ্বরী পার না হইলে আর মানুষের আশ্রয় পাওয়ার উপায় নাই। লক্ষণ দেখিয়া নাবিকেরা নিজ নিজ নৌকা নিরাপদ স্থানে লইয়া চলিল। ভুবন মােহনের সঙ্গে যাহাদের আলাপ হইল তাহারা তাহাকে আরও অগ্রসর হইতে নিষেধ করিল। সত্যনিষ্ঠ মাতৃভক্ত ভুবন মােহন তাহাদের কথা শুনিলেন না। তাহা হইলে যে তাহাকে মিথ্যাবাদী হইতে হইবে; জননী যে তাহাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুলা হইয়াছেন তিনি না গেলে জননী যে মনে বড় ব্যথা পাইবেন। প্রাণ থাকিতে যে তিনি জননীর মনে ব্যথা দিতে পারিবেন না। তাই তিনি কাহারও কথায় কর্ণপাত না করিয়া ভগবানে অত্ম সমর্পণ করতঃ শিংধর নদ পার হইলেন এবং দ্রুত পাদবিক্ষেপে চর অতিক্রম করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। একে বালুকাময় চর, তাহাতে স্থানে স্থানে নল খাগরের জঙ্গল। ভুবন মােহন আশানুরূপ অগ্রসর হইতে পারিলেন না। এদিকে সেই ক্ষুদ্র মেঘখণ্ড দেখিতে দেখিতে বৃহদাকার ধারণ করিয়া গাঢ় কৃষ্ণবর্ণে আকাশ মহর্ষি ভুবন মােহন আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। মেঘের গুরু গম্ভীর গর্জন ক্রমেই অধিকতর ভয়প্রদ হইয়া উঠিল। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিকাশে জগৎ সন্ত্রাসিত হইতে লাগিল। ভুবন মােহন একাকী ভগবানের পাদপদ্মে নির্ভর করিয়া মাতৃচরণ দর্শনে ছুটিয়াছেন, তিনি আর কোন দিক দৃকপাত করিতেছেন না। অনতিকাল মধ্যেই তিনি ধলেশ্বরী তীরে পৌছিয়া দেখিলেন খেয়া নৌকা নাই, অন্য কোন নৌকাও পাইলেন না। তখন কিরূপে পার হইবেন কিছুই স্থির করিতে পারিতেছেন না, এমন সময় প্রবল বেগে ঝড় বহিয়া বালুকারাশি উড়াইয়া ভুবন মােহনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। সে চরে বাড়ী ঘর বৃক্ষাদি কিছুই ছিল না, সুতরাং ভুবন মােহন আশ্রয় লইবার কোন উপায় দেখিলেন না। দেখিতে দেখিতে প্রবল বেগে বৃষ্টি ও মুহুর্মুহু বজ্রপাত হইতে লাগিল। ভুবন মােহন কেবল নিরা- শ্রয়ের আশ্রয়-ভগবানকে প্রাণ ভরিয়া ডাকিতে থাকিলেন ও ছাতা ধারা অতিকষ্টে বারিধারা নিবারণ করিতে লাগিলেন। অকস্মাৎ একটি ঘুর্ণিবায়ু আসিয়া তাহাকে উড়াইয়া লইয়া কিছুদূরে ধলেশ্বরীর বেলাভূমিতে নিক্ষেপ করিল। সেই সময় তাহার হাত হইতে ছাতাটিও চুর্ণ বিচূর্ণ হইয়া ছুটিয়া ধলেশ্বরীর গর্ভে নিমজ্জিত হইল। ঐ স্থানে পাড় সাত আট হাত উচ্চ, খাড়া ভাজনি, সুতরাং সহজে তীরে উঠিবার উপায় নাই। ভূবন মােহন সেই উচ্চ পাড়ের কোলে ঠেস দিয়া দাড়াইলেন। বেলা প্রায় অবসান হইয়াছে, জগৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইতে উদ্যত। উপরে ঘােরঘনঘটাচ্ছন্ন আকাশে বিদ্যুৎ চমকিতেছে, মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে, নীচে ধলেশ্বরীর কৃষ্ণবর্ণ জলরাশি ভীষণ গর্জনে তাণ্ডব-নৃত্য করিতেছে। ভুবন মােহনের মাথায় সেই বৃষ্টির মুষলধারা পড়িতেছে আর নিম্নদেশ মহর্ষি ভুবন মােহন । অবিরাম ধলেশ্বরীর তরঙ্গাভিঘাতে আড়ষ্ট করিয়া ফেলিতেছে। তাহার উপর আবার প্রবল ঝটিকায় তাহাকে অারও অবসন্ন করিয়া ফেলিতেছে, ভুবন মােহন ক্রমে অর্ধমৃতবৎ হইয়া পড়িলেন। ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল; ঝড় বৃষ্টির বেগও অনেক পরিমাণে হ্রাস হইল। ভুবন মােহন এতক্ষণ চক্ষু মুদিয়া একাগ্ৰমনে ভগবানকে ডাকিতে ছিলেন। এক্ষণে চক্ষু মেলিলেন এবং পাড়ে উঠিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সেই অবসন্ন শরীরে অত উচু পাড়ে উঠিতে পারিলেন না, এমন সময়ে অদূরে একটি কুমীর “ভুস” করিয়া উঠিল । ভুবন মােহন বুঝিলেন, এইবারই তাহার জীবনলীলা সাঙ্গ হইল, আর পরমারাধ্যা মাতৃচরণ দর্শন তাহার ভাগ্যে ঘটিল না। তিনি সর্বমঙ্গলময় ভগবানূকে পরিত্রাহি ডাকিতে লাগিলেন। যিনি ভক্ত প্রহ্লাদকে আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন, যিনি সাধুগণের পরিত্রাতা, সেই লীলাময়ের লীলা কে বুঝিবে? যেমনই নিকটে কুমীর ভাসিয়া উঠিল, অমনই ভুবন মােহনের দুই পার্শ্বে ধলেশ্বরীর উচ্চ পাড় বসিয়া পড়িল। ভগবান্ বুঝি ভক্ত ভুবন মােহনের প্রাণ রক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা করিলেন, ভুবন মােহন সেই বিধ্বস্ত পাড়ে ভর দিয়া পুনরায় চরের উপরে উঠিলেন। তাহার বস্ত্রাদি সব ভিজিয়া গিয়াছিল, তারপর আবার শীতল বাতাস বহিতেছিল, তখন তিনি দুই হাঁটু বুকে দিয়া শীতে কাঁপিতে কাপিতে একান্ত মনে ভগবান্কে ডাকিতে লাগিলেন। ক্রমে সন্ধ্যা অতীত হইল। অন্ধকার গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইতে লাগিল। নিবিড় ঘনঘটাচ্ছন্ন অনন্ত আকাশতলে সেই গাঢ় তমসাচ্ছন্ন রজমীতে ভীষণ শব্দায়মানা উত্তাল তরঙ্গায়িতা ধলেশ্বরী-তটে একাকী ভুবন মােহন ঝন্ধাবাতক্লিষ্ট অবসন্ন দেহে সিত বস্ত্রে বসিয়া মহর্ষি ভুবন মােহন ভগবচ্চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রাকৃষ্ট হইলেন, এবং সেই বালুকার উপর শয়নকরিয়া গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হইলেন। এইরূপে সে রাত্রি অতিবাহিত হইল। শেষ রাত্রেই আকাশ সুপ্রসন্ন হইয়াছিল। পরদিন প্রত্যুষে বালয্যের স্বর্ণচ্ছটা ভুবন মােহনের বদন চুম্বন করিলে, তিনি নিদ্রা হইতে উঠিয়া দেখিলেন, আর সেদুৰ্যোগ নাই, প্রকৃতি হাস্যময়ী, আকাশ নির্মল, ধলেশ্বরী আর তরঙ্গায়িত নহে,—সে এখন প্রসন্নসলিলা প্রশান্তা! তখন তিনি ধীরে ধীরে খেয়াঘাটে গেলেন। পূৰ্ব্বদিন বৈকালে খেয়া নৌকার মাঝি ঝড়ের লক্ষণ বুঝিতে পারিয়া নৌকা লইয়া চলিয়া গিয়াছিল, এক্ষণে সেও নৌকালইয়া আসিল। ভুবন মােহন তাহাতে ধলেশ্বরী পার হইলেন। এদিকে জননী বাড়ীতে বড়ই চিন্তিত হইয়াছেন। ভুবন মোহনের শনিবার রাত্রি বাড়ী যাইবার কথা; কিন্তু বৈকাল বেলা ঝড় বৃষ্টি দেখিয়া তাহার প্রাণ, উড়িয়া গেল। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, হয়ত ভুবন ঝড় বৃষ্টিতে পড়িয়াছে। যদি পথে কোন মানুষের বাড়ীতে আশ্রয় লইয়া থাকে, তাহা হইলে রক্ষা, নতুবা যে দারুণ বিপদ ; পথও দীর্ঘ, তাহাতে আবার তিনটী নদী পার হইতে হয়, নদীর মধ্যে তুফানে পড়িলে কি আর রক্ষা আছে ? তখন তিনি ভুবন মােহনের কল্যাণ-কামনায় ভগবাকে কতই ডাকিলেন। কতই হরির লুট, শাল গ্রামের ভােগ, মঙ্গল চণ্ডী ও উদ্ধার চণ্ডীর পূজা, ইন্দ্র বৈষ্ণবকে দৈ থৈ ও মা গঙ্গাকে লবণ মানসা করিলেন। সন্ধ্যার পর ঝড় বৃষ্টি থামিয়া গেল। মাতা পথের দিকে চাহিয়া রহিলেন এবং প্রতি মুহূর্তেই ভুবন মােহনের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। একটী পত্ৰপাত-শব্দও তাহার নিকট ভুবন মােহনের পদ- শব্দ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। যে কোন একটুকু শব্দ পাইলেই ; ৬৪ মহর্ষি ভুবন মােহন সে যে “ঐ বুঝি আমার ভুবন আসিতেছে বলিয়া বাতি লইয়া ঘরের বাহির হইতে লাগিলেন। বাটীস্থ সকলেই ভুবন মােহনকে না দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া পড়িল। জয়চন্দ্র একবার রাস্তা ধরিয়া অনেকদূর পর্যন্ত গেলেন। জননী মনে করিলেন জয়চন্দ্র এবার ভুবনকে সঙ্গে লইয়া ফিরিবেন। কিছুক্ষণ পরে জয়চন্দ্র নিরাশ মনে একাকী বাড়ী ফিরিলেন। তখন জননীর হৃদয় আরও ব্যাকুল হইয়া উঠিল। ক্রমে রাত্রি যতই অধিক হইতে লাগিল ব্যাকুলতা ততই বাড়িতে লাগিল। এইরূপে রাত্রি অতিবাহিত হইল। পরদিন প্রাতেও ভুবন মােহনের দেখা নাই। জননী একবার মনে করিলেন “হয়ত ভুবন কাল ঝড় বৃষ্টি দেখিয়া রওনা হয় নাই। আবার মনে হইল তাহা কখনই হইতে পারে না। আমার কাছে কখনও মিথ্যা কথা বলে না। যখন সে আমার কাছে লিখিয়াছে, শনিবার দিন বাড়ী আসিবে, তখন সে নিশ্চয়ই রওনা হইয়াছিল ; বুঝি পথে তাহার কোন অমঙ্গল ঘটিয়াছে। তিনি এই বলিয়া কান্দিতে লাগিলেন। প্রতিবেশিগণ তাহাকে নানারূপ সান্ত্বনা করিয়া কহিল, “তুমি কান্দিও না, তােমার ভুবন অবােধ নয়, হয়ত সে ঝড় বৃষ্টি দেখিয়া আদৌ রওনাই হয় নাই, অথবা পথে কোন স্থানে রাত্রে ছিল, আজ হয়ত আসিবে।” জয়চন্দ্রও তাহাই মনে করিয়া ভাবিলেন, বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত দেখিয়া তিনি ভুবনের খোঁজে ঢাকা রওনা হইবেন। বেলা প্রায় দুই প্রহর হইয়া আসিয়াছে, জয়চন্দ্র ঢাকা রওনা হইবার উদ্যোগ করিতেছেন, মাতা বিষন্ন মনে পথের দিকে চাহিয়া কত কি ভাবিতেছেন, তাহার বুক ফাটিয়া কান্না আসিতেছে, এমন সময় বালুকা মহর্ষি ভুবন মােহন ও কর্দমাক্ত বস্ত্রে ভুবন মোহন আলিয়া মাত্রণে প্রণাম করিলেন। জননীর হৃদয়ে অপার আনন্দ উথলিয়া উঠিল। অতঃপর জননী ঝড়- বৃষ্টির সময় ভুবন মােহন কোথায় ছিলেন? তাঁহার গায়ে ও কাপড়ে কাদা ও বালু লাগিয়াছে কেন? ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি পথের যাবতীয় দুর্ঘটনা একে একে বর্ণন করিলেন। মাতা ভুবন মােহনের নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া আশীর্বাদ করতঃ বলিলেন, “বাবা আমি সর্বনাশই তােমার এই বিপদের মূল। আমি কেন মাটা খাইয়া তােমাকে আসিতে লিখিয়াছিলাম। আমি না লিখিলে তুমি আসিতেও না, তােমার এ বিপদও হইত না। আমি তােমার জন্য কত দেবতাকে মানসা করিয়াছি। ভুবন মােহন কহিলেন, “মা, তুমি কেন এত দুঃখ প্রকাশ করিতেছ? অমন দৈব দুর্বিপাক অনেক সময়ই ঘটিয়া থাকে। তাহার জন্য দুঃখ করিয়া ফল কি? তােমার আশীর্বাদ থাকিলে আর ভয় কি ? আমি তোমার আশীর্বাদেই এবার বাঁচিয়া আসিয়াছি, মা।” অতঃপর ভুবন মােহনকে মাতা স্নানাহার করাইয়া নিজে স্নানাহার করিলেন। পর দিন প্রত্যুষে ভুবন মােহন মাতৃচরণ বন্দনা করিয়া পুনরায় ঢাকা রওনা হইলেন। ইহার কিছুদিন পর অধ্যক্ষ মিঃ এরাটুন্ একদিন পণ্ডিত নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণ মহাশয়কে বলিলেন, তাহার কন্যা ফিবি বাঙ্গালা পড়িবে, তাহার জন্য ছাত্রগণের মধ্য হইতে একজন চরিত্রবান, বিনীত এবং ভাষাভিজ্ঞ ছাত্রকে তিনি শিক্ষক নিযুক্ত করিতে চাহেন। বিদ্যাভূষণ মহাশয় ভুবন মােহনকেই এই সকল গুণান্বিত দেখিয়া তাহাকে মহর্ষি ভুবন মোহন এ কার্যে নিযুক্ত করার জন্য সাহেবকে অনুরােধ করিলেন। ভুবন মােহন মিস ফি বর শিক্ষক নিযুক্ত হইয়া তাঁহাকে প্রত্যহ প্রাতে এক ঘণ্টা করিয়া পড়াইতে লাগিলেন। তাঁহার সদ্ব্যবহার, সচ্চরিত্রতা ও শিক্ষাদান-প্রণালী দেখিয়া মিঃ এরাটুন অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি অধ্যক্ষ সাহেবের কন্যার শিক্ষক হইয়াছেন, সাহেব তাহাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন, ইহাতে অনেক ছাত্রেরই ঈর্ষা জন্মিল। এইরূপে কিছুদিন গত হইল। একদিন মিঃ এরাটুন ক্লাশ পরিদর্শন করিতে গিয়াছেন, একটি ছাত্র তাঁহাকে দেখিয়া মুচকি হাসিতেছিল, হঠাৎ তিনি তাহা দেখিতে পাইয়া তাহাকে সারাদিন বেকের উপর দাড় করাইয়া রাখিলেন। এই কঠোর দণ্ডবিধানে ক্লাশের ছাত্রবৃন্দ ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত হইল। মূহুৰ্ত্ত মধ্যে অন্যান্য ক্লাশেও সেই সংবাদ বিদ্যুৎ বেগে প্রচারিত হইল। তখন ছাত্রগণ মধ্যে একতা ও সহানুভূতি যথেষ্ট ছিল। এই সংবাদে নর্মাল স্কুলের ছাত্র-সমাজে দারুণ ক্ষোভের স্রোত প্রবাহিত হইল। যথাকালে স্কুল ছুটি হইলে ছাত্রগণ, বােডিজে গিয়া এক বৈঠক করিল। তাহাতে স্থিরীকৃত হইল আর কেহ বাের্ডিংএ থাকিবে না। ভুবন মােহন এ সিদ্ধান্তে একমত হইতে পারিলেন না। তিনি বলিলেন, যাহার মত হয় তিনি বরং যাউন কিন্তু অন্যকে যাইতে বাধ্য করিবেন না। কিন্তু তাহার কথা কেহ শুনিল না। বরং নেতৃদলের কেহ কেহ তীব্র হলাহল উদগীরণ করিয়া বলিল, “ তুমি যাইবে কেন? তুমি যে অধ্যক্ষের প্রিয় ছাত্র, তাঁহার প্রিয়তমা কন্যার শিক্ষক।” এই বলিয়া নেতৃগণ বাের্ডিং পরিতাগ করিতে উদ্যোগী হইল এবং যে সকল ছাত্র ইতস্তত মহর্ষি ভুবন মােহন করিতেছিল তাহাদিগকে বলপূর্বক, টানিয়া লইয়া বােডিজের বাহির হইল। তাহারা বাহির হইবার সময় ভুবন মােহনকে বলিয়া গেল, “দেখ ভুবন! তুমি যদি আমাদের সঙ্গে না আইস তবে তােমার সহিত আমাদের আর সম্বন্ধ থাকিবে না, কেহ আর তােমার সহিত কথাও বলিব না।” সকলে বাহির হইয়া গেলে, ভুবন মােহন বিষম সমস্যায় পড়িলেন। তিনি একাকী সেই নির্জন গৃহে থাকিবেন কিরূপে? আর সমপাঠিগণের সহানুভূতিতে বঞ্চিত হওয়াও অতীব দুঃখের বিষয়। এই সকল বিষয় চিন্তা করিয়া পরিশেষে স্থির করিলেন “অন্যেরও যে গতি আমারও সেই গতি।” তখন তিনিও বাের্ডিং পরিত্যাগ করিয়া অপর ছাত্রগণের অনুবর্তী হইলেন। অতঃপর ছাত্রগণ একটা মেস করিয়া থাকিল। ছাত্রগণ বােভিং ছাড়িয়া আসিবামাত্রই সে সংবাদ তড়িদ্বেগে অধ্যক্ষ সাহেবের কর্ণগােচর হইন। পরদিন স্কুলে তিনি ছাত্রগণকে ডাকাইয়া তাহাদের বাের্ডিং ছাড়িয়া আসিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। সকলেই বলিল, বাের্ভিঙ্গে খাওয়া দাওয়ার কষ্ট হয়, তাই তাহারা বাের্ডিং ছাড়িয়াছে। সাহেব বলিলেন –“আচ্ছা আমি তােমাদের ভাল বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি, তােমরা বাের্ভিঙ্গে ফিরিয়া আইস।” ছাত্রগণ কহিল,-“আপনি শত ভাল বন্দোবস্ত করিলেও আর আমরা বাের্ভিঙ্গে যাইব না। আমাদের বন্দোবস্ত আমরাই করিয়া লইব।” ছাত্রগণের এই উত্তরে সাহেব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়া থােষকষায়িত লােচনে রুক্ষ্মস্বরে কহিলেন, “তােমরা এখনও বল কেন বাের্ডিং ছাড়িয়াছ ? নতুবা সকলেই ইহার জন্য বিশেষ শাস্তি ভােগ করিবে।* এইবার মহর্ষি ভুবন মােহন ছাত্রগণের হৃদয় কাপিয়া উঠিল, হৃদয়ের বল বিদূরিত হইল; যিনি 'ছাত্রাবাস পরিত্যাগে ছাত্রগণকে উত্তেজিত করিয়াছিলেন, সেই নেতা মহাশয় অগ্রবর্তী হইয়া সাহেবের সম্মুখস্থ বাইবেল স্পর্শ করিয়া বলিলেন, “আমি এই বাইবেল স্পর্শ করিয়া বলিতেছি আমি ইহার কিছুই জানি না। গত কল্য স্কুল ছুটির পর বাের্ডিঙ্গে গিয়া দেখি কয়েকজন ছাত্র বােডিং পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছে, তাহারা বলিতেছে তাহারা মেস করিয়া থাকিবে। এই বলিয়া তাহারা বাহির হইয়া পড়িল ; সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ছাত্রগণও তাহাদের অনুগামী হইল। আমি একাকী বােডিঙ্গে থাকিতে না পারিয়া অগত্যা বাসায় চলিয়া গেলাম।” সাহেব ভাবিলেন বালকটি খুব সত্যবাদী ও ধাম্মিক, নহিলে পবিত্র বাইবেল স্পর্শ করিয়া কথা কহিবে কেন ? বালকটি যে মনে করিয়াছিল, সে হিন্দু,-বাইবেল তাহার ধর্মশাস্ত্র নহে এবং সেই জন্য সে সাহেবকে প্রতারিত করিবার নিমিত্ত এই উপায় অবলম্বন করিয়াছিল তাহা কিন্তু সাহেব বুঝিলেন না। সাহেব আর কয়েকজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন , তাহারা কহিল, “অমুক অমুকে আগে বাহির হইয়াছিল আমরা তাহাদের কথায় বাহির হইয়াছিলাম।” অতঃপর সাহেব ভুবন মােহনকে ডাকাইয়া বলিলেন, “আমি তােমাকে সত্যনিষ্ঠ ও সাধু-প্রকৃতি বলিয়া জানি। তুমি কেন ইহাদের সঙ্গে যােগ দান করিলে?” সত্যনিষ্ঠ ভুবন মােহন বলিলেন, “আমি বিদ্রোহী-দলে যােগদান করিয়াছিলাম বটে, কিন্তু বিদ্রোহের সূচনা করা আমার অভিপ্রেত ছিল না। আমি সকলকে বাের্ডিং ছাড়িতে নিষেধ করিয়াছিলাম কিন্তু কেহই আমার কথায় কর্ণপাত করে নাই।
মহর্ষি ভুবন মােহন সকলে চলিয়া গেলে আমি একাকী কিরূপে থাকি, তাই অগত্যা আমিও তাহাদের সঙ্গে অন্যত্র গিয়াছিলাম।” অধ্যক্ষ। কাহার কথায় বাের্ডিং ছাড়িলে? ভুবন। ব্যক্তি বিশেষের কথায় না। সমুদায় ছাত্র পরামর্শ করিয়াই বােডিং পরিত্যাগ করিয়াছে। অধ্যক্ষ। এখন বল দেখি কি জন্য বােডিং ছাড়িলে ? কেহই কোন উত্তর দিল না। তখন নির্ভীক ভুবন মােহন বলিলেন, “আগনি অসন্তুষ্ট না হইলে বলিতে পারি।” সাহেব বলিলেন, তখন ভুবন মােহন কহিলেন, “বাহার দু'দিন পরে শত শত ছাত্রের উপর প্রভুত্ব করিবে, শিক্ষক বলিয়া বরণীয় হইবে, আপনি গত কল্য তেমন একটা বয়স্ক ছাত্রের প্রতি অপমান সূচক দণ্ড বিধান করিয়াছিলেন তাহাতেই এই ঘটনা ঘটিয়াছে।” অধ্যক্ষ সাহেব, এই তেজোগৰ্ভ বাক্যে তাহার প্রতি রুষ্ট হইলেন এবং তাঁহাকেই বিদ্রোহিগণের অধিনায়ক বলিয়া স্থির করিলেন। এবং সেই বাইবেলস্পর্শকারী সাহেবের সত্যবাদী ছাত্র ব্যতীত, ভুবন মোহন প্রমূখ সমুদায় ছাত্রকে জরিমানা করিলেন। ভুবন মােহনের প্রতি তাঁহার যে স্নেহ ছিল তাহা অন্তর্হিত হইল। তিনি ভুবন মােহনকে বিদ্বেষের চক্ষে দেখিতে লাগিলেন। সাহেবের চক্ষে তিনি মিথ্যাবাদী হইলেও, শিক্ষক ও ছাগণের নিকট, এই ব্যাপারে সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক বলিয়া বরণীয় হইলেন। বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাহাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। ও মহর্ষি ভুবন মােহন অধ্যক্ষ সাহেবের কোপদৃষ্টিতে কিছুমাত্র ভীত না হইয়া ভুবন মােহন পূর্বের ন্যায় মনোেযােগ সহকারে পড়িতে লাগিলেন। এখন তিনি দ্বিতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে ছিলেন। বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাহার শিক্ষা-নৈপুণ্যে মুগ্ধ হইয়াছিলেন। অনেক সময় তাহাকে প্রথম বা দ্বিতীয় বার্ষিক শ্রেণীর সাহিত্য পড়াইতে দিয়া পরীক্ষা করিতেন। ভূবন মােহনের অপুৰ্ব্ব শিক্ষা-দান-প্রণালী এবং সুললিত হৃদয়গ্রাহী, ব্যাখ্যা শুনিয়া বিদ্যাভূষণ মহাশয় ও ছাত্রগণ মুগ্ধ হইতেন। কোন স্থানে আধ্যাত্মিক ভাবের কথা থাকিলে নিজেও ভগবৎ-প্রেমে ডুবিয়া যাইতেন এবং ব্যাখ্যায় ছাত্রগণের হৃদয়েও ভাবের স্রোত প্রবাহিত করিতেন। অতঃপর যথাসময়ে তিনি দ্বিতীয় বার্ষিক শ্রেণীর পরীক্ষায় অতি কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হইলেন।
অষ্টম অধ্যায় ভুবন মােহন এক্ষণে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে পড়িতেছেন। এইবার তঁাহার শেষ পরীক্ষার বৎসর। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিলে তাহার বিদ্বেষ্টা এরাটুনের হস্ত হইতে অব্যাহতি পাইয়া পারিবারিক সাহায্যের চেষ্টা করিতে পারেন। মনােযােগী ভুবন মােহন অধিকতর মনােযােগ সহকারে পড়িতে লাগিলেন। তাহার খেলা-বেড়ান কিছুই ছিল না, ছিল কেবল পড়া আর ধর্মনিষ্ঠা। অন্যান্য ছাত্রগণ কোন স্থানে নর্তকীর নৃত্যগীত হইতেছে শুনিলে তথায় ছুটিত, ভুবন মােহন যাইতেন না। কিন্তু তিনি যদি শুনিতেন অমুক স্থানে ভাগবত কি মৌলদসরিফ পাঠ হইবে, কি ব্রাহ্ম বা খৃষ্ট ধর্মের বক্তৃতা হইবে, তখন আর স্থির থাকিতে পারিতেন না। তিনি সর্বাগ্রে সেখানে উপস্থিত হইতেন এবং বক্তৃতা বা পাঠ শেষ না হইলে উঠিতেন না। তাহার সমপাঠিগণ তাহাকে অনেক সময় উপহাস করিত। একদিন তিনি শুনিতে পাইলেন, ব্রজসুন্দর ব্রাহ্ম বিদ্যালয়ের উপদেষ্টা সাধু অঘাের নাথ গুপ্ত শুভ-সমিতি” নামে একটী ছাত্র সমিতির প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। প্রতি শনিবার উহার অধিবেশন হয়, এবং সাধু তাহাতে গীতা ও উপনিষদের মর্মানুসারে ব্রাহ্ম ধর্মের বক্তৃতা করেন। ইহা শুনিয়া ভুবন মােহন শনিবার স্কুল ছুটির পর, “শুভ-সমিতিতে গিয়া যােগদান করিলেন। সাধু অঘাের নাথের প্রাণস্পর্শী বক্তৃতায় এজ ৪ মহর্ষি ভুবন মােহন ৫ তাহার হৃদয় দ্রবীভূত হইল। তিনি ব্রহ্মভাবে বিভাের হইয়া সভা- ভঙ্গের পর বােডিঙ্গে প্রত্যাগত হইলেন। আজ তাঁহার মুখখানি গম্ভীর, কাহারও সহিত তেমন বাক্যালাপ করেন না। মন যেন কোন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। নেত্ৰদ্বয়ে প্রেমা ছল ছল করিতেছে। ছাত্রগণের অনেকেই তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিল, কিন্তু তিনি কাহাকেও কিছু কহিলেন না। কেহ কেহ অনুমান করিল, তিনি বাড়ীর কোন অমঙ্গলসূচক সংবাদ পাইয়াছেন, কেহ অন্যরূপ ব্যাখ্যা করিল। কিন্তু তাহার হৃদয়সিন্ধু যে আজ ভগবৎ-প্রেমে বিক্ষোভিত হইয়াছে তাহা আর কেহ বুঝিতে পারিল না। ব্রহ্মের স্বরূপ কি? কিরূপে তাহাকে পাওয়া যায় ? কিরূপে সেই অব্যক্ত অচিন্ত্য ব্রহ্মের পাদপদ্ম লাভ করা যায় ? এই সকল চিন্তায় তিনি আত্মহারা হইলেন। সাধু অঘাের নাথের অমুল্য উপদেশগুলি প্রতি মুহূর্তে তাঁহার কর্ণে অমৃত বর্ষণ করিতেছিল। আবার কখন্ সে উপদেশ শুনিতে পাইবেন, আবার কখন্ সে ব্ৰহ্মামৃত পান করিবেন, ইহাই সতত চিন্তা করিতে লাগিলেন। পরদিন ব্রাহ্মসভায় সাধু অঘােরনাথ বক্তৃতা করিবেন শুনিয়া, ভুবন মােহন সর্বাগ্রে সেখানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দলে দলে ব্রাহ্ম ও ব্রাহ্মিকাগণ সভাগৃহে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে সভাগৃহ লােকে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। প্রথম কয়েকটি কীত্তন হইল; তারপর সাধু অঘােরনাথ উপাসনা করিলেন। ভুবন মােহন স্তিমিত নেত্রে ও নিষ্পন্দভাবে ব্ৰহ্মানন্দ উপভােগ করিতেছিলেন। তাহার চক্ষে প্রেমধারা প্রবাহিত হইল, ক্ষণে ক্ষণে শরীর রােমাঞ্চিত হইতে লাগিল।
মহর্ষি ভুবন মােহন সাধু অঘােরনাথ নবীন যুবকের এই প্রেমভাব দর্শন করিয়া যারপরনাই বিস্মিত ও পুলকিত হইলেন। অতঃপর সভা ভঙ্গ হইল, সকলে প্রস্থান করিলেন। ভুবন মােহন একেবারে প্রেমে আত্মহারা হইয়া গিয়াছিলেন, বাহজ্ঞান তখন তাহার লােপ পাইয়াছিল, সভ্যগণ যে চলিয়া গেলেন, ভুবন মােহন তাহা কিছুই জানিতে পারিলেন না। তিনি বহ্মভাবে বিভাের হইয়া অনবরত প্রেমা বিসর্জন করিতে লাগিলেন। সাধু অঘােরনাথ, ব্রহ্মানন্দ ভুবন মােহনের প্রেমােন্মাদনা দেখিয়া চিত্ৰাপিতের ন্যায় বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পর ভুবন মােহনের বাহজ্ঞান হইল। তিনি দেখিলেন, সেখানে আর কেহ নাই, আছেন কেবল সাধু অঘাের নাথ। তিনি এতক্ষণ সুদুলভ ব্রহ্মানন্দ ভােগ করিতেছিলেন, কোন কথা কহিলে তিনি সে আনন্দে বঞ্চিত হইবেন, এজন্য সাধু এতক্ষণ তাহাকে কিছু বলেন নাই। এক্ষণে তাহরে বাহজ্ঞান হইয়াছে দেখিয়া বলিলেন, “সকলে চলিয়া গিয়াছে তুমি এতক্ষণ রহিয়াছ কেন?” ভুবন মােহন সজল নয়নে বলিলেন, “আপনার নিকট আমার কিছু নিবেদন, আছে, যদি কৃপা করিয়া এ অধমের কথায় কর্ণপাত করেন তবে বলিতে পারি। সাধু কহিলেন, “কি ? ভুবন মােহন বলিলেন, “অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে ব্ৰহ্মজ্ঞান উপদেশ করুন।” এই কথা শুনিয়া সাধু আঘার নাথ তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, “তােমার কথায় আমি প্রকৃতই সন্তোষ লাভ করিলাম। কিন্তু আমি ব্ৰহ্মতত্বের কি জানি যে তােমাকে সে সম্বন্ধে উপদেশ দিব? তবে যথাসাধ্য দুই একটি কথা বলিতেছি, শুন, “দীক্ষা দুই প্রকার ; আন্তর দীক্ষা ও বাহ দীক্ষা। আন্তর দীক্ষা হয় প্রাণে, ৰাহ দীক্ষা হয় কাণে। মানুষের মন স্বভাবতই বহিম্মুখ-মনের সেই ৪৪ মহর্ষি ভুবন মােহন অবস্থা ফিরাইয়া অন্তর্মুখ করাই দীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। ধর্মভাব প্রণাদিত হইলেই মন শুদ্ধ ও স্বচ্ছ আকার ধারণ করে, তখন সেই নিৰ্ম্মল হৃদয়ে ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ প্রতিভাত হয়। ধর্ম-ভাষাজ্জল পবিত্র হৃদয়ে ব্ৰহ্মজ্যোতির যতই স্ফুরণ হইতে থাকে, ততই মন সেই জ্যেতির্ময়ে মিশিবার জন্য আকুল হইয়া উঠে। ইহাই মনের অন্তর্মুর্থ অবস্থা। মন অন্তর্মুখী হইলে ইন্দ্রিয়গণ বাহ চঞ্চলতা পরিত্যাগ করিয়া মনেতে বিলীন হইয়া যায়। বাহ্যজ্ঞান রহিত মন আত্মলীন হইয়া জ্ঞানের আকারেই বিভাত হইতে থাকে, তখন অন্তর্যামী পরমাত্মা মানবকে প্রাণে প্রাণে দীক্ষিত করিয়া আপনার চিদানন্দ রসের আভাস প্রদান করেন। যেমন ফুলের গন্ধে আকুলিত হইয়া ভ্রমর ধাবিত হয়, অনলের জ্যোতিঃ দেখিলেই পতঙ্গ যেমন তাহাতে মিশিতে চায়, সেইরূপ সচ্চিদানন্দ রসের আভাস পাইলেই মনও তাহাতে মিশিবার জন্য ব্যাকুল হয়। পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার মিলনের জন্য মনের এই ব্যাকুলতার নামই প্রেম। হৃদয়ে প্রেমের সঞ্চার হইলে তাহার আর আত্মদর্শনের বিলম্ব থাকে না। তােমার লক্ষণাদি দেখিয়া বুঝিলাম তােমার প্রাণের দীক্ষা হইয়া গিয়াছে, সুতরাং আর কাণের দীক্ষার প্রয়ােজন নাই। তােমার হৃদয়ে প্রেমের সঞ্চার হইয়াছে অতএব অবি- লম্বেই আত্মদর্শন করিবে সন্দেহ নাই। পরমাত্মারূপী ভগবান্ সৰ্ব্বদাই জীবাত্মাকে উপদেশ দিতেছেন, ইহাই মনীষী আৰ্য ঋষিদের মত। মানবের মন স্বভাবতঃ বহির্মুখ বলিয়া তাহা শুনিতে পায়না। মন ন্যায়ের বিধি লঙ্ঘন করি যখন পাপানুষ্ঠানে রত হইবার জন্য কুপথে ধাবিত হয় তখন প্রথম প্রথম, “এরূপ আচরণ করিওনা, ইহা অন্যায়, ৪৫ মহর্ষি ভুবন মােহন এইরূপ অন্তর হইতে একটা নিষেধাজ্ঞা বা ভয়ের ভাব আসিয়া থাকে। সৎকার্যে রত হইবার জন্য স্বভাবতঃ মনে উৎসাহ ও আনন্দের উদয় কে যেন বলিয়া দেয়, “ইহা তােমার অবশ্য কর্তব্য কৰ্ম্ম।” যাহা হইতে ধৰ্ম্মপথে চলিবার প্রবৃত্তি এবং অধৰ্ম্ম হইতে নিবৃত্তির জন্য জ্ঞান সঞ্জাত হয় তিনিই পরমাত্মা। এবং ধর্মে প্রবৃত্তি ও অধর্মে নিবৃত্তির জ্ঞানকেই ঈশ্বরবাণী বা বিবেকবাণী বলিয়া জানিবে। অন্তর্মুখ হইয়া যতই আত্মধ্যান পরায়ণ হইবে, ততই উহা পরিস্ফুট রূপে উপলব্ধি করিতে পারিবে। বাহবিষয়ে অনাসক্ত থাকিয়া, সৰ্ব্বদা আত্মস্মরণ ও ধ্যানযােগে এই বিবেককে জাগ্রত রাখিবে। এই বিবেকই ব্ৰহ্মাগ্নি উদ্দীপিত করিয়া অজ্ঞান-মহান্ধকার বিনাশ করতঃ আত্মজ্ঞানের স্ফুরণ করিয়া থাকে। আত্মজ্ঞানে হৃদয় প্রবুদ্ধ হইলেই পরমাত্মা লাভের জন্য ব্যাকুলতা উপস্থিত হয়। তখন এক পরব্রহ্ম পরমাত্মা ব্যতীত সংসারের কোন বিষয়েই তাহার আর আকাঙ্খ থাকে না। সকল কামনা পরিত্যাগ করিয়া মন নির্বিকারত্ব লাভ করিলেই প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিত বিবেক-নেত্রে হৃদয়- মন্দিরেই প্রেমার প্রিয়তম পরমাত্মার সাক্ষাৎকার লাভ হয়, সতত হৃদয়ে ব্ৰহ্মাগ্নি-শিখা জ্বলিতে থাকে। তােমার অন্তঃকরণে সেই ব্ৰহ্মাগ্নি প্ৰধুমিত হইয়াছে, সুতরাং বা দীক্ষায় তোমার প্রয়ােজন কি? যখন বহুভাগ্য-বলে, বাসনা ক্ষয়ান্তে, পরমাত্মার দর্শন ঘটে, জীবাত্মার ক্ষুদ্র জ্যোতি পরমাত্মাতে বিলীন হইয়া যায়, তখন মন ও আত্মা এক হইয়া যায়, আমিত্ব ডুরিয়া যায়, তখনই মানুষের সমাধি হয়। ১৬ মহষি ভুবন মােহন আত্মা ও পরমাত্মার মিলনই সমাধি। সেই ভাব কিরূপ, তাহা কেহ বলিয়া প্রকাশ করিতে পারে না। আত্মা এক অখণ্ড সচ্চিদানন্দ-রসে নিমগ্ন হইয়া, আনন্দাকারে প্রতিভাত হইতে থাকে। হৃদয়ে অখণ্ড আনন্দ- সিন্ধু উচ্ছ সিত হইতে থাকে। সর্বাঙ্গে কেবল পুলক-লহরী থেলিতে থাকে, হৃদয়ের আনন্দোচ্ছাসে প্রেম বিগলিত হয়, এবং ব্রহ্মজ্যোতি ফুটিয়া মুখকান্তি সমুজ্জল করিয়া তুলে। এই অবস্থায় পৌছিলে মানুষ ব্রহ্ম দর্শন বা আত্মদর্শন করে। বহির্মুখ মনে কখনও ঈশ্বতত্ত্ব স্থান পায় না। সময় সময় চঞ্চল বিজলীর মত ব্ৰহ্ম-ভাবের আলােককণা দেখা দিলেও আবার তখনই তাহা অন্তর্হিত হয়, আবার মােহান্ধকারে হৃদয় আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, তখন সেই তমসাচ্ছন্ন হৃদয়ে, বিবিধ বিষয়-বাসনা উপস্থিত হইয়া, বিষয়- ভােগের জন্য মনকে চঞ্চল করিয়া তুলে। চঞ্চল মনে ভগবদ্ভক্তি স্থান পায় , ঈশ্বরচিন্তাপরায়ণ হইলেও সেদিকে মন ধাবিত হয় না। নানা সন্দেহ আসিয়া মনকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলে। আপনা হইতে মনের সন্দেহ ঘুচে না। সন্দিগ্ধ মনে ঈশ্বরে বিশ্বাস বা আত্মজ্ঞান জন্মে না। তাই মনের এই সন্দেহ ভঞ্জন করিয়া বহির্মুখ ফিরাইয়া অন্তর্মুখ সম্পাদনের জন্য সৎসঙ্গ বা গুরু গ্রহণ পূর্বক দীক্ষার প্রয়ােজন। “সবহি ঘটমে হরি বৈসে ফেঁও গিরি মুতলে জ্যোতি জ্ঞান গুরু চকমক বিনা কৈসে প্রকটহােতি।” যেমন চকমকি প্রস্তর মধ্যে, প্রচ্ছন্ন ভাবে অগ্নি থাকে, সেইরূপ হরি ৪৭ মহর্ষি ভুবন মােহন আত্মরূপে সৰ্ব্বভূতে গৃঢ়ভাবে বিরাজমান আছেন। চকমকি পাথরে যেমন আঘাত না করিলে অগ্ন বাহির হয় না, সেইরূপ জ্ঞান গুরুর উপদেশ ব্যতীত ভগবান্ প্রকাশিত হন না। “সদ্গুরু পাওয়ে ভেদ বাওয়ে জ্ঞান করে উপদেশ, তব কয়লাকি ময়লা ছুটে, যব আগ করে পরবেশ। অঙ্গার সম্ভবতঃ মলিন,-শত চেষ্টাতেও তাহার মলিনত্ব দূর হয় না, একমাত্র অগ্নি তাহাতে প্রবিষ্ট হইলেই তাহার মলিনত্ব ঘুচিয়া যায়, সেই রূপ মানুষের মনও বিষয়-বাসনায় মলিন হইয়া থাকে, কেবল সদগুরুর জ্ঞানােপদেশে তাহার মলিনত্ব দুর হয়,—মনের সকল সন্দেহ, ভেদ-বুদ্ধি ও অজ্ঞানতা দুরীভূত হইয়া যায়। তখন জ্ঞানলােক লাভ করিয়া মন উজ্জ্বল হইয়া উঠে। “অনেক-জন্ম-সংস্কারাং শ্রীগুরুবােশ্চ কৃপাবশা। প্রত্যক্ষ পরােক্ষ বিবেকপ্রাপ্যতে বুধৈঃ । ভিততে হৃদয় গ্রন্থিছিদ্যন্তে সৰ্ব্বসংশয়া। ক্ষীয়ন্তে চান্য কর্মানি তস্মিন দৃষ্টে পরাবরে।” অনেক জন্মের সংসিদ্ধি লাভ করিয়া উপদেষ্টা শুরুর কৃপায় বুধগণই একমাত্র পরােক্ষ ও অপরােক্ষ জ্ঞান লাভ করিয়া থাকে। আত্মজ্ঞান লাভের পরই ব্ৰহ্মদর্শন। সেই পরম ব্রহ্মের স্বরূপ পরপর পরমাত্মাকে দর্শন মাত্র মানবের হৃদয়-গ্রন্থি বিচ্ছিন্ন হয়। সকল সংশয় দূরে যায় এবং কর্মবন্ধন হইতে মানব মুক্তি লাভ করে। আন্তর দীক্ষা বা প্রাণের দীক্ষা বিষয়াসক্ত মানবের ঘটা অসম্ভব। ০৮ মহর্ষি ভুবন মােহন বাল্য হইতে যাহার মন বিষয়ে অনাকৃষ্ট ও সর্ববিধ দোষ মল-পরিশূন্য থাকে, তাহার সেই পবিত্র হৃদয়েই সতত জ্যোতির্ময় আত্মার জ্যোতি প্রতিফলিত হয়; এবং তাদৃশ অপাপবিদ্ধ মহাত্মাদেরই প্রাণের দীক্ষা হইয়া থাকে। যাহাদের মন বহির্মুখ ও বিষয়াসক্ত,-ধৰ্ম্মপথে প্রবর্তিত হয় না,-তাহাদের উপদেষ্টার প্রয়ােজন। ব্ৰহ্মতত্ত্বদশী ব্ৰহ্মজ্ঞানীদিগের উপদেশে তাহার বিষয়াসক্তি বিনিবৃত্ত হইলে মন অন্তৰ্ম্মর্থ হইয়া আত্মানুসন্ধানে রত হয়, এবং অচিরকাল মধ্যে বিবেক লাভে সমর্থ হইয়া থাকে। তখন সে বিবেকবলে জানিতে পারে এক অনাদ্যন্ত পরমব্রহ্মই নিত্য ও সত্য, তদ্ব্যতীত সমস্তই মিথ্যা ও অনিত্য। পুনঃ পুনঃ শাস্ত্রাভ্যাস ও তত্ত্বালােচনা দ্বারা সকল সন্দেহ দূরীভূত হইলে ব্রহ্মে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে। কাহারও বা একমাত্র জ্ঞানীর উপদেশই বিশ্বাস দৃঢ় হইয়া থাকে। তখন ভােগ-বিলাসের উপকরণ উপস্থিত হইলেও ক্ষণিক ও অনিত্য বােধে সে তাহাতে আসক্ত হয় না। ব্ৰহ্মই একমাত্র অবলম্বন মনে করিয়া সতত ব্ৰহ্ম-তত্ত্বানুশীলনেই রত থাকে। পরিশেষে ব্ৰহ্ম জ্ঞান লাভ করিয়া আপনার আত্মাতেই ব্রহ্মের সচ্চিদানন সত্ত্বার উপলব্ধি করিতে পারে। সর্বজীবে একই সচ্চিদা- নন্দ পরব্রহ্ম বিরাজিত আছেন, দেখিতে পায়। তখনই তাহার হিংসা, দ্বেষ, আত্মপর ভেদজ্ঞান তিরােহিত হয় এবং আত্মপ্রীতি বিশ্ব প্রীতিতে পরিণত হয়। তখনই জানিতে পারে আমার আত্মা এই ক্ষুদ্র মাংস- পিণ্ড মধ্যে আবদ্ধ নহে,—তিনি বিরাট বিশ্বের ব্যষ্টি দেহে অনন্ত জীবরূপে বিচরণ করিতেছেন। সেই বিশ্বপ্রাণ বিরাট ব্রহ্মের প্রীতি ও সন্তোষ সম্পাদন করিতে পারিলে পরব্রহ্মের প্রীতি সাধন করা হয়। ৪৯ ৪ মহর্ষি ভুবন মােহন ইহারই নাম পরা-প্রীতি। ইহা দ্বারা ব্ৰহ্মগতি প্রাপ্ত হওয়া যায়। প্রথমে দৃঢ় বিশ্বাসসহকারে আপনার আত্মাতে তাহার অন্বেষণ করিতে হয়, তৎপর বিবেক ব্ৰহ্মদর্শন সংঘটিত হয়। সর্ব জীবে ব্ৰহ্মভাব উপলব্ধিই প্রকৃত ব্ৰহ্মদর্শন। ব্ৰহ্ম লাভের তিনটি পন্থা প্রধান,-কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তি; কিন্তু তিনটিরই মূল মন্ত্র ত্যাগ। বাহ বস্তুর ত্যাগকে ত্যাগ বলা যায় না। মন হইতে সর্বতােভাবে বিষয়াসক্তি বা বাসনার ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ, আর সব ভাণ। যাহা দ্বারা পরব্রহ্মে যুক্ত হওয়া যায়, তাহাই যােগ। উক্ত ত্রিবিধ যােগেই ত্যাগের প্রয়ােজন। কৰ্ম্মযােগিগণ ক্রমশঃ অভ্যাস ও সংযম দ্বারা ত্যাগ অবলম্বন করেন। জ্ঞানীরা জ্ঞান দ্বারা,ব্ৰহ্ম ভিন্ন সমস্তই অনিত্য ভাবিয়া ব্ৰহ্মতেই আসক্তি স্থাপন করেন,-হ্ম ব্যতীত ভ্রমেও বিষয়-বাসনা মনে স্থান দেন না। আর ভক্তগণ, ভগবানই সচ্চিদানন্দ স্বরূপ, তদ্ব্যতীত আনন্দের বস্তু দ্বিতীয় নাই, এই দৃঢ় বিশ্বাস করিয়া কেহ তাহাকে প্রভুভাবে, কেহ মাতৃভাবে, কেহবা পিতৃভাবে তদগত হইয়া আপনার প্রাণ, মন, আশা, বাসনা ও দেহাদি সমস্ত তাহাতে অৰ্পণ করিয়া তাহারই উপাসনায় রত থাকে। অতএব ত্যাগই ব্রহ্ম লাভের একমাত্র উপায় । ভােগেই আসক্তি ;-ভােগেই বিরক্তি। ভােগাসক্ত মহাপাপীরাও বিষয় ভােগে আসক্ত হইলে মুক্তি পদারূঢ় হইয়া থাকে। আত্মা, সদাচিদানন্দময়। আত্মার লক্ষ্য, আনন্দ। বিষয়ে আনন্দ আছে ; আত্মায়ও আনন্দ আছে। বিষয়ের আনন্দ অনিত্য, আপাতমধুর, পরিণামে বিরস ; আর আত্মার আনন্দ অনন্তকাল স্থায়ী। বিষয়ের অাকর্ষণ আছে, ?
মহর্ষি ভুবন মােহন আত্মার আছে মহাকর্ষণ। উভয় আকর্ষণের মধ্যবর্তী,মন। বিষয়াকর্ষণের নাম,-আসক্তি ; আত্মার আকর্ষণের নাম-ভক্তি। বিষয়ের আনন্দ সন্নিধিমাত্রই অনুভূত হয় ; আত্মার আনন্দ আরাধনা- সাপেক্ষ। অনাদি অনন্তকাল হইতে জীব আনন্দের জন্য লালায়িত। মন ও ইন্দ্রিয়গণ বহির্মুখ। শব্দম্পৰ্শাদি বিষয়ের সহিত ইন্দ্রিয়সংযােগ হইলেই মন বিষয়ের ক্ষণিক সুখস্পর্শে মােহিত হইয়া ভােগাসক্ত হইয়া পড়ে। সম্মুখে বিষয় বিভব,—ভােগবিলাসের অশেষ উপকরণ দেখিতে পাইয়া, মুখের আশায় তাহার আকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া সেইদিকে ধাবিত হয়। ভােগে আসক্তি, তাহার পরই বিরক্তি। দেশ কাল পাত্র ভেদে একই বিষয়ে কখন আসক্তি কখন বা বিরক্তি উপস্থিত হয়। বাল্যে যাহা রুচিকর, যৌবনে তাহাতেই বিরক্তি ; যৌবনে যাহাতে আসক্তি, বার্ধ্যকে তাহাতে বিরক্তি ; অস্থা- বস্থায় যাহা প্রীতিকর, রুগ্নাবস্থায় তাহা বিরক্তিকর ; শীতে যাহা প্রীতিকর, গ্রীষ্মে তাহাই বিরক্তিকর ; এমন কি এখন যাহা প্রীতিকর, পরক্ষণেই তাহা বিরক্তিকর হইয়া পড়ে। মন যতদিন বহির্মূখ থাকে, ততদিনই সুখের অন্বেষণে লালায়িত হইয়া এটা ওটা নানা বিষয়ে বিচরণ করিতে থাকে, কিন্তু কোনটাতেই প্রকৃত সুখ পায় না। মােহ বশতঃ আবার তাহাতেই লিপ্ত হইয়া এক একটী গ্রহণ করে এবং পরক্ষণেই বিরক্ত হইয়া ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়, কিছুতেই সুখের আশা মিটেনা। এইরূপ সুখের জন্য অবিরত ছুটাছুটি করিয়া, সংসারে অশেষ লাঞ্ছনা ও যাতনা ভােগ করিয়া পুনঃপুনঃ আশায় বঞ্চিত হইতে থাকে,অবশেষে শ্রান্ত, ক্লান্ত ও অবসন্ন হইয়া পড়ে। তখন সেই আপাত, • মহর্ষি ভুবন মােহন মধুর বিষয়ের প্রতি বিদ্বেষ ও বিরক্তি আসিয়া পড়ে; তখন একে একে বিষয়-সংস্রব ত্যাগ করিতে থাকে। সুখের আশায় বঞ্চিত হইলে নিৰ্বেদ ও বৈরাগ্য উপস্থিত হয়। বৈরাগ্য দ্বারা মন বিষয়াসক্তি-শূন্য নির্বিকার হইলেই বিবেকের উদয় হয়। ভােগ-বাসনা ত্যাগই শান্তির কারণ, গীতা বলিয়াছেন, “আপূৰ্য মাণমচল প্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশক্তি যদ্বৎ। তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে স শান্তিমাপ্লেতি নকামকামী। ‘নদী প্রবাহ সমুদ্রে পতিত হইলে যেমন জল পূর্ণ হইয়া স্থির ও অচঞ্চল ভাবে অবস্থান করে, সেইরূপ কামনা সকল যাহাতে প্রবেশ করিয়া স্থির ভাবে থাকে তিনিই শান্তি লাভ করেন। ভােগাভিলাষী ব্যক্তি শান্তি লাভ করিতে পারেন না। কামনা দ্বারাই হৃদয় অস্থির ও বিচলিত হয়। কামনা ত্যাগ করিতে না পারিলে হৃদয় শান্ত হয় না। অশান্ত ও অস্থির হৃদয়ে বিবেক আসিতে পারে না, সুতরাং বিষয় বাসনা ত্যাগ করিতে পারিলেই বৈরাগ্য এবং তাহা হইতেই হৃদয় শান্ত হয়। শান্ত ও সুস্থির হৃদয়েই বিবেকের উদয় হয়। মানব যখন বিবেক-বলে নিত্যানিত্য বিচার দ্বারা বুঝিতে পারে, বিষয় অনিত্য ও দুঃখের মূল, এবং আত্মাই একমাত্র নিত্য শান্তির আলয়, তখন বিষয়-লালসা পরিত্যাগ করিয়া তাহারই শরণাপন্ন হয়। বিষয়ের আকর্ষণ হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিলেই, আত্মার মহাকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া মন আত্মাতেই যুক্ত হইয়া যায়। আত্মার এই আকর্ষণই তাহার কৃপা বা ভক্তি। তাহার কৃপা মহর্ষি ভুবন মােহন ভিন্ন ভক্তি হয় না, এবং ভক্তি ভিন্ন তদীয় ধামে সত্বর প্রবেশ করা যায় । মন বিষয়ে আকৃষ্ট হইলে বিষয়ে প্রবেশ করে, আবার আত্মায় আসক্ত হইলে আত্মাতেই প্রবিষ্ট হয়। যাহার প্রতি যাহার যত আকর্ষণ, আসক্তি-ভালবাসা আছে, সে তত আপনার হইয়া যায়। সুতরাং ভক্তিতেই ভগবান আপনার হন। কেহ তাহাকে প্রভুভাবে, কেহ পিতৃ ভাবে, কেহ বা মাতৃভাবে ভক্তি করিয়া শান্তি ও আনন্দ লাভ করে। বিষয়-বাসনা ত্যাগ করিয়া ভক্তি দ্বারাই তাহার দ্বারে উপস্থিত হইবার সহজ উপায়। সুতরাং তােমার যখন সেই ভক্তির উদয় হইয়াছে তখন আর তােমার দীক্ষার প্রয়ােজন কি ? তােমাকে পূর্বে ত্যাগের কথা বলিয়াছি, এক্ষণে আর একটি কথা বলিয়াই আমার বক্তব্য শেষ করিব। “ব্রহ্মচর্যং তপােমূলং ধৰ্ম্মমূলং দয়াস্তৃতা। তস্মাৎ সর্ব প্রযত্নেন দয়া ধম্মং সমায়েৎ ॥” ‘ব্রহ্মচৰ্য্যই তপস্যার মূল, এবং দয়াই ধর্মের মূল, অতএব সর্ব প্রযত্নে দয়া- ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করিবে। কামনা ও হিংসাই পাপের মূল। এই দুইটা সৰ্ব্বততভাবে ত্যাগ করিবে। ব্রহ্মচর্য্য ও দয়া এই দুইটা গ্রহণ করিবে, তাহা হইলেই হৃদয়ে ধর্ম ও ব্রহ্ম প্রতিষ্ঠা করতে পারিবে।” ভুবন মােহন যে জ্ঞানের জন্য এতদিন ব্যাকুল ছিলেন, সাধু অঘাের নাথের উপদেশে আজ তাহার সে আশা মিটিল। জীবনের সার ব্রহ্মচর্য্য, ধর্মের সার দয়া এবং ব্রহ্মই একমাত্র উপাস্য জানিয়া ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করিলেন, এবং নিয়মিত রূপে ব্রাহ্ম-মন্দিরে গিয়া উপাসনায় যােগ দান করিতে লাগিলেন। সাধু অঘাের নাথের সৌম্য মুর্তি দর্শনে ও তাহার অমূল্য ধর্মোপদেশ মহর্ষি ভুবন মােহন শ্রবণে ভুবন মােহন এতই মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে অবসর পাইলেই তাহাকে দেখিতে যাইতেন,-তাহার নিকট গিয়া তত্ত্বকথা শুনিতেন। সাধুর উপদেশ গুলি তিনি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করিতে প্রয়াসী হইলেন। ক্রমে সাধনা বলে তাহার হৃদয়ে ধৰ্ম্ম-ভাব যতই বদ্ধমূল হইতে লাগিল, ততই ধৰ্ম্ম-চর্চায় তিনি লালায়িত হইয়া উঠিলেন। ব্রাহ্ম সভা ব্যতীতও খ্ৰীষ্টানের গির্জায়, মুসলমানের কোরাণ পাঠে ও হিন্দু পুরাণ পাঠে তিনি উপস্থিত হইয়া পূর্বাপেক্ষা অধিকতর আগ্রহের সহিত তত্ত্বকথা শুনিতে লাগিলেন। বাল্যকাল হইতে ভুবন মােহনের হৃদয়ে দয়ার মন্দাকিনী প্রবাহিতা ছিল,-দরিদ্রের দুঃখে, রােগীর আর্তনাদে ও বিপন্নের হাহাকারে তাহার হৃদয় সর্বদাই ব্যথিত হইত,—কোন সমপাঠী বা প্রতিবেশী পীড়িত হইলে তিনি গিয়া তাহার পরিচর্যা করিতেন। ওলাউঠা-বসন্ত প্রভৃতি যে সকল রােগে আত্মীয় স্বজনেরাও রােগীর নিকট যাইতে চাহে না, তিনি অম্লান বদনে সেই সকল রােগীর সেবা-শুশ্রুষা করিতেন। কেহ কোন বিপদে পড়িলে তিনি প্রাণপণে তাহার সাহায্য করিতেন। অন্ধ, খঞ্জ, আতুর বা দরিদ্রের দুঃখ মােচনের জন্য তিনি তাহার শেষ সম্বল পৰ্যন্ত দান করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। এক্ষণে অঘাের নাথের উপদেশে তাহার সেই দয়া-মন্দাকিনীতে বান ডাকিল। ব্ৰহ্মচর্যেও তাহার পূর্ব হইতেই অনুরাগ জন্মিয়াছিল। তিনি বাল্যকালে মাছ মাবিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন, এবং মাছ না হইলে এক বেলাও খাইতে পারিতেন না। কিন্তু বয়ােবৃদ্ধি ও মান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহার সে প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিতে থাকে। ৫০ মহর্ষি ভুবন মােহন তাঁহার পিতার মৃত্যুর পর সহানুভূতির বশবর্তী হইয়া তিনি মাতার সঙ্গে নিরামিষ ভােজন ও একাদশী করিতে আরম্ভ করেন। মাতা তঁাহাকে একাদশী ত্যাগ ও আমিষ ভােজনের জন্য অনুরােধ করিলে, পরম মাতৃ ভক্ত ভুবন মােহন মাছ ছাড়িতে পারিলেন না। একাদশী সম্বন্ধে মাতাকে বলিলেন, “একাদশী করিলে শরীর সুস্থ থাকে ও দীর্ঘায়ু হওয়া যায় ইহাই অনেক মুনি ঋষি ও বৈজ্ঞানিকের মত, দ্বিতীয়তঃ তুমি মরিলে আমাকে ত একাদশী করিতেই হইবে, তা এখন হইতে অভ্যাস করিলে তখন ততটা কষ্ট হইবে না। আর তখন একাদশী করিলেও তুমি দেখিতে পাইবে না, এখন দেখ, তােমার ভুবন একাদশী করিতে কাতর নহে। মা! আমি তােমার জন্য আর কিছু করিতে পারিব না, তবে তােমার একাদশী ও নিরামিষাহার পালন করিব।* একাদশী কৰিলে ভুবনের আয়ু বাড়িবে শুনিয়া, মাতা আর তাহার একাদশীতে বাধা দিলেন না; তিনি সেই হইতে বার একাদশী পালন করিয়া আসিতে লাগিলেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাহা পালন করিয়া গিয়াছেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে যখন মুম্ষু অবস্থায় কলিকাতায় চিকিৎসিত হইতেছিলেন তখনও তিনি একাদশী পালন করিয়াছেন, চিকিৎসকগণও তাঁহাকে যথা সাধ্য অনুরোধ করিয়া পথ্য খাওয়াইতে পারেন নাই। অঘােরনাথের উপদেশের পর হইতে তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিরূপে জীব-হিংসা-মূলক আমিষাহার পরিত্যাগ করিবেন ? কি প্রকারে চৰ্য-মূলক নিরামিষ আতপান্ন ভােজী হইবেন? কিরূপে কৌমার ব্রত গ্রহণ করিয়া ব্রহ্মচর্য বৃক্ষা করিবেন? জননী যে তাহা কিছুতেই করিতে দিবেন না। অননীর আজ্ঞা অমান্য করিয়া তাবলম্বন করা মহর্ষি ভুবন মােহন শ্রেয়ঙ্কর মনে করিলেন না। তখন তিনি এই দুইটি অবলম্বনের সুযােগানুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তাহার বাল্যকালের সেই প্রিয় খাদ্য মৎস্যের প্রতি একেবারে অশ্রদ্ধা জন্মিল। বাড়ীতে গেলে জননী মা আনাইয়া, নিজে মাছের ঘরে গিয়া, তাহার জন্য কত প্রকারের ব্যঞ্জন পাক করিতেন এবং খাওয়ার সময় নিজে গিয়া সম্মুখে বসিতেন, কিন্তু ভুবন মােহন কিছুই খাইতে পারিতেন না। মাতার অনুরােধে এক আধ টুকরা মাছ মুখে দিয়াই খাওয়া শেষ করিতেন, বলিতেন, মাছ ভঁহার ভাল লাগে না। ইহাতেও মাতা তঁহাকে মাছ খাওয়াইয়া ছাড়িতেন না। অনেক সময় তিনি তাহাকে মাছ ধরিতেও অনুমতি করিতেন। ভূবন মােহন মাতৃ আজ্ঞা প্রতিপালন সৰ্ব্ব ধৰ্ম্মাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া তাহা প্রতিপালন করতেন। তিনি যখন দিনাজপুর মডেল স্কুলে শিক্ষক ছিলেন, তখন একবার বড়দিনের বন্ধে বাড়ী গিয়াছেন ; মাতা তাহাকে সন্ধ্যার সময় পুকুর হইতে কয়েকটি মাছ ধরিতে বলেন। ভুবন মােহন এক গাছ ক্ষেপলা জাল ও একটি হাড়ী লইয়া মাছ ধরিতে গেলেন। হাড়ীটি পুকুরপাড়ে এক স্থানে বসাইলেন, এবং পুকুরের বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরিয়া হাড়ীতে আনিয়া রাখিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুক্ষণ গত হইলে, কৃষ্ণ পক্ষের গাঢ় অন্ধকারে জগৎ আচ্ছন্ন হইল। তখন তিনি একবার মাছ রাখিতে হাড়ীর নিকট আসিয়া দেখেন একটা বাঘ আসিয়া হাড়ীর মাছ গুলি খাইতেছে। তাহা দেখিয়া তিনি সে স্থান হইতে পলায়ন করিলেন। আর একদিন বৈকালে তিনি মাতৃ আজ্ঞায় মাছ ধরিতে গেলেন, সন্ধ্যার প্রাক্কালে হঠাৎ তাহার জাল একটী খুটায় এরূপ ভাবে বাধিয়া গেল যে মহর্ষি ভুবন মােহন সেই জাল ছাড়াইতে তাহাকে জলে ডুবিতে হইল। অতি কষ্টে জাল ছাড়াইলেও জাল গাছ ছিড়িয়া গেল। এদিকে পৌষ মাসের সন্ধ্যা বেলায় জলে ডুবিয়া তিনি শীতে একেবারে আড়ষ্ট হইয়া পড়িলেন। অদূরে একটি বাড়ীতে আগুন জ্বলিতেছিল দেখিয়া সেখানে গিয়া দাডাইলেন। শীতে তাহার সর্বাঙ্গ এরূপ অবশ হইয়াছিল যে, আগুনের তাপ কিছুই বােধ করিতে পারিতেছিলেন না। আগুনের নিকট দাড়াইয়া হাত পা সেকিতে লাগিলেন, সেইসময় অগ্নিশিখা তাহার হাটুতে লাগায় ফোস্কা পড়িয়া উঠিল। পরে সই ফোস্কা গলিয়া ঘা হইল ; তিনি অনেকদিন সেই ঘায়ে কষ্ট পাইলেন। তিনি তখন বলিলেন প্রথমে ভগবান্ তাহাকে বুঝাইয়া ছিলেন, মৎস্য-মাংস, ব্যাঘ্রাদি হিংস্র জন্তুরই খাদ্য, কিন্তু তাহাতেও তিনি প্রাণী-হিংসায় নিবৃত্ত না হওয়ায় ভগবান্ তাহাকে এই শাস্তি প্রদান করিয়াছেন। এবং প্রাণী- হিংসার যন্ত্র সেই জাল গাছটাও ছিড়িয়া দিয়াছেন। সেই অবধি মাতা আর কখনও তাহাকে মাছ ধরিতে বলেন নাই, কিম্বা আমিষ ভােজনের জন্য ও বিশেষ অনুরােধ করেন নাই। এইরূপে তিনি জীব হিংসার দায় হইতে মুক্তিলাভ করিলেন বটে, কিন্তু আতপায় ভােজী একাহারী হইতে পারিলেন না। তাঁহার সে সংঙ্কল্প জননী জীবিত থাকিতে সিদ্ধ হইতে পারে নাই। ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে জননী পরলােক গমন করার পর তাঁহার সে সংকল্প সিদ্ধ হইয়াছিল। একবার তিনি প্রাণ-সংশয়-কাতর হইলে চিকিৎসকগণ তাহাকে জীবিত মৎস্যের ঝােল খাইতে বলিলেন; কিন্তু তিনি কিছুতেই তাহা গ্রহণ করিলেন না,-তিনি বলিলেন, “আমি যাহা প্রতিজ্ঞা পূৰ্ব্বক ছাড়িয়া'ছ তাহা ;
মহর্ষি ভুবন মােহন নাই। খাইলে যদি মৃত্যু হয় তাহাও ভাল, তথাপি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়া ভগবানের নিকট দায়ী হইতে পারিবনা”। আমিষভােজন প্রাণীহিংসা ত্যাগ করিতে তাহার যে সময় লাগিয়াছিল, কৌমার ব্ৰতাবলম্বনে তত সময় লাগে ভগবানের কৃপায় তিনি সে সুবিধা সহজেই লাভ করিয়াছিলেন। অতি অল্প কাল মধ্যেই তাঁহার গ্রামে তাঁহার ব্রাক্ষ ধর্ম গ্রহণের কথা প্রচারিত হইল। গ্রামের লােক প্রায় প্রত্যহই মামলা মােকর্দমা তদ্বির করিবার জন্য ঢাকায় আসিত। তাহারা শুনিতে লাগিল, ভুবন মােহন ব্রাহ্ম সভা ও খ্রীষ্টানের গির্জা প্রভৃতি বিধর্ষিগণের ধর্মশালায় সতত যাতায়াত করেন। তাহারা সেই কথা নানারূপ রঞ্জিত করিয়া গ্রামে গিয়া গল্প করিত। কেহ বলিত, ভুবন মােহন ব্রাহ্ম হইয়াছেন; কেহ বলিত, তিনি খ্রীষ্টান হইয়াছেন। কেহ বলিত, তিনি বাঙ্গালী বিবি বিবাহ করিয়া ঢাকায় থাকিবেন ; আবার কেহ বলিত, তিনি মেম বিবাহ করিয়া বিলাত যাইবেন। কেহ মিঃ এরাটুনের কন্যা ফিবির সহিত তাহার বিবাহের দিন পর্যন্ত স্থির করিয়া দিত, কেহ বা পাদরী সাহেবের কন্যাকে তাহার ভাবী সহধর্শিণী বলিয়া কল্পনা করিত। কেহ সাধু অঘােরনাথের কন্যা বা আত্মীয়ার সঙ্গে তাহার বিবাহের কথা স্থিরীকৃত হইয়াছে বলিয়া ঘােষণা করিত। এই সময় ভুবন মােহন বাটীতে গেলে সমবয়স্কগণ তাহাকে “ব্ৰহ্মদৈত্য বলিয়া নানারূপ উপহাস করিত। ভুবন মােহন তাহাদের কথায় কোন উত্তর করিতেন না। কেবল ঈষৎ হাসিতেন এবং নির্বিকার চিতে ভগবানের পাদপদ্ম ধ্যান করিতেন। c মহর্ষি ভুবন মােহন সে সময় অনেক উচ্ছ অল-মতি যুবক, আহার-বিহারে অসংযত হইয়া ব্রাহ্ম সভাকেই আপনাদের খামখেয়ালির স্থান বলিয়া স্থির করিয়াছিল ব্রাহ্ম সভায় ধর্মের নামে অধর্মের প্রবল বন্যা বহিতেছিল। প্রাচ্যের শিক্ষা, দীক্ষা, সংযম, তিতীক্ষা ও ভক্তি তাহাতে তেমন ছিল । তাহাতে ছিল কেবল পাশ্চাত্যের বিলাসিতা বিজড়িত সভ্যতার অনুকরণ। সমগ্র ব্রাহ্ম সমাজে দুই চারটি লােক ব্যতীত প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মহাত্মা পাওয়া দুষ্কর ছিল, ইন্দ্রিয়পরায়ণ পাশব বৃত্তি সম্পন্ন তত্ত্বজ্ঞানহীন বিলাসীর সংখ্যাই অধিক ছিল। এজন্য সাধারণ লােকে ইহাকে ঘৃণা করিত এবং উহা খ্ৰীষ্টান সমাজের দ্বিতীয় সংস্করণ বলিয়া মনে করিত। ভুবন মােহন এই বক-সমাজে হংস হইলেও সাধারণে তাহাকে বক বলিয়াই মনে করিত। বাল্যের সেই চঞ্চল বালক যে এত অল্প দিনেই ধর্মের উচ্চ সােপানে আরােহণ করিয়াছে,বক মধ্যে যে হংস থাকিতে পারে, তাহা কেহ বুঝিতে পারিল না। তখন তাহার সম্বন্ধে গ্রামে বেশ একটুকু আন্দোলন চলিতে লাগিল। তাহাকে লইয়া সামাজিক আহারাদি করিতেও অনেকে অসম্মত হইল। কিন্তু কোন কিছুতেই ভুবন মােহনের লক্ষ্য নাই; তাহার লক্ষ্য কেবল সেই ভগবানের পাদপদ্মে। লােকের নানা কথায় তাহার জননী কিন্তু বড়ই ক্ষুন্ন হইলেন। ভুবন মােহন ছুটি পাইলেই বাড়ী আসেন, এবং বাড়ীতে আসিলে প্রাণপণে জননীর সেবা শুশ্রুষা করেন। একবার তিনি বাড়ী আসিয়া মাতৃসেবায় নিযুক্ত হইয়াছেন, এমন সময় মা বলিলেন, “তুই এখন আমাকে ভক্তি করিতেছি, খ্ৰীষ্টান মতে বিবাহ করিলে আর এ কি মহর্ষি ভুবন মােহন খাকিবে না। তখন ত তাের ছােওয়া জলটুকুও খাওয়া যাইবে না, জানি আমার ভাগ্যে কত বিড়ম্বনাই আছে। মায়ের এই কথায় তাহার কৌমার ব্রত গ্রহণের সুবর্ণ-যােগ উপস্থিত হইল, তিনি তৎক্ষণাৎ মায়ের চরণে প্রণত হইয়া বলিলেন “মা! বিবাহ করিলে যদি তােমার প্রতি ভক্তির ব্যতিক্রম হয় মনে কর, তবে আমি এই তােমার পাদ স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি, এ জীবনে আর বিবাহ করিব না। আজ হইতে রমণী মাত্রই আমার মা। আজ হইতে সকল রমণীকেই তােমার মত দেখিব, সকলকেই ‘মা’ বলিয়া ডাকিব ও সকলকেই বলিয়া প্রণাম করিব।” পুত্রের মুখে এই কঠোর প্রতিজ্ঞা শুনিয়া জননী একে- বারে স্তম্ভিত হইলেন, এবং বলিলেন, “ছিঃ! ছিঃ! তুই একি কথা বলিলি?” ভুবন মােহন আর কোন কথা কহিলেন না। ভগবানের অনুগ্রহে তাহার সংঙ্কল্প সিদ্ধ হইল দেখিয়া তাহার হৃদয় ভক্তি ও আনন্দে পূর্ণ হইল, তাহার মুখ মণ্ডল অপূৰ্ব্ব এ ধারণ করিল। কয়েক বৎসর পর তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা যাদব চন্দ্র যখন বয়ােপ্রাপ্ত হইলেন তখন তাঁহার বিবাহের প্রতিবন্ধক ঘটিল, জ্যেষ্ঠ ভুবন মােহন বিবাহ করেন নাই ; তাঁহার বিবাহ না হইলে কনিষ্ঠ যাদব চন্দ্রের বিবাহ হইতে পারে না। তখন মাতা, আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবগণ তাহাকে বিবাহের জন্য কত অনুরােধ করিলেন, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতগণ কত বুঝাইলেন, কত শাস্ত্রীয় যুক্তি দেখাইলেন, কিন্তু কিছুতেই তাহাকে বিবাহে সম্মত করিতে পারিলেন না। তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, “আপনারা আমা অপেক্ষা বিজ্ঞ, আশা করি আপনারা আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করিবেন। আমি মাতৃ চরণ স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, জীবনে বিবাহ করিব না। রমণী মাত্রেই মহর্ষি ভুবন মােহন আমার জননী। আমি সেই অবধি অন্তরে জগতের যাবতীয় রমণীকে পূজা করিয়া আসিতেছি। এক্ষণে সেই জননীকে কিরূপে পত্নীরূপে গ্রহণ করিব? যদি রমণী ভিন্ন জগতে অন্য কোন জাতি থাকে, তবে আমি আপনাদের আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে পারি। অতএব আপ- নারা দয়া করিয়া আমাকে ক্ষমা করুন। আমি অনুমতি দিতেছি, যাদব বিবাহ করুক, আপনারা তাহা দেখিয়া সুখী হউন।” এই কথা শুনিয়া সকলে চিন্তিত হইয়া তাঁহার মুখপানে চাহিলেন, দেখিলেন,-সরলতা, গাম্ভীর্ষ ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাহার বদনমণ্ডলে প্রতিভাত হইতেছে! তখন সকলেই অবাক্ হইয়া রহিলেন। অতঃপর তাহার অনুমতিক্রমে বাদল চন্দ্রের বিবাহ সুসম্পন্ন হইল। ভুবন মােহন কৌমার ব্রত পালন করিতে লাগিলেন। ভুবন মােহন ধর্মানুরাগী হইলেও তাহার শিক্ষানুরাগের হ্রাস হই। । তিনি জানিতেন, জ্ঞানই ব্ৰহ্মলাভের প্রশস্ত উপায়। সুতরাং ধৰ্ম্মানুরাগের সহিত তাহার শিক্ষানুরাগও প্রবর্ধিত হইতে লাগিল। সেই সঙ্গে অন্যান্য গুণও প্রকটিত হইয়া উঠিল। পণ্ডিত বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাহার অপরিসীম অধ্যবসায়, অতুলনীয় শিক্ষানুরাগ, দয়া, মেধা বুদ্ধি-প্রাথৰ্য, গাম্ভীর্য, শিক্ষাদান-প্রণালী, সত্য-নিষ্ঠা, সচ্চরিত্রতা ও ধৰ্ম্মানুরাগ দর্শন করিয়া একদিন বলিয়াছিলেন, “ভুবনে যাহা আছে, ভুবনে তাহা আছে।” স্কুলে তিনি পূর্বাপরই সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র বলিয়া পরিগণিত ছিলেন। তাঁহার সরলতা ও অমায়িকতায় ছাত্রগণ তাহার অনুরাগী হইয়াছিল। তিনি বয়ােজ্যেষ্ঠ ছাত্রগণকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ন্যায় ভূক্তি করিতেন, বয়ঃ কনিষ্ঠগণকে কনিষ্ঠ ভ্রাতার ন্যায় স্নেহ করি- মহর্ষি ভুবন মােহন তেন এবং সম-বয়স্কগণকে বন্ধুর ন্যায় ভাল বাসিতেন। অন্যান্য শিক্ষক গণও তাঁহাকে যথেষ্ট প্রশংসা করিতেন। তাঁহাদের প্রশংসাবাদে ভুবন মােহন গর্বিত হইয়া পাঠাভ্যাসে অমনােযােগিতা প্রদর্শন করেন বরং তাহাতে উত্তরােত্তর ভঁহার উৎসাহ সমধিক বদ্ধিত হইতে লাগিল, তিনি পাঠাভ্যাসের জন্য কঠোর হইতে কঠোরতর পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। অতঃপর কয়েকমাস পরে তৃতীয় বার্ষিক পরীক্ষা হইয়া গেল। এই পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চস্থান অধিকার করিলেন। নাই ; নবম অধ্যায় তৃতীয় বার্ষিক পরীক্ষার ফল বাহির হইবার কয়েকদিন পর ঢাকা নর্মাল স্কুলে একটী শিক্ষকের পদ শূন্য হইল। অধ্যক্ষ মিঃ এরাটু নয়াল পরীক্ষাত্তীর্ণ কৃতী ছাত্রগণের কাহাকেও ঐ পদে নিযুক্ত করিবেন বলিয়া বিজ্ঞাপন দিলেন। ভুবন মােহন প্রমুখ সাতজন ছাত্র ঐ পদের জন্য দরখাস্ত করিলেন। সাহেব, প্রধান শিক্ষক বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের মত চাহিলেন। বিদ্যাভূষণ মহাশয় ভুবন মােহনের গুণাবলি উল্লেখ করিয়া তাহাকেই নিযুক্ত করিবার জন্য দরখাস্তের পৃষ্ঠে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করিলেন। এই সংবাদে অপর প্রার্থিগণ নিতান্ত ভগ্নোৎসাহ হইয়া মহর্ষি ভুবন মােহন পড়িল। সকলেই মনে করিল এই পদ ভুবন মােহনই গাইবেন। তিনি নর্মাল স্কুলের পূর্ণচন্দ্র,এবার পরীক্ষায় সর্বোচ্চস্থান অধিকার করিয়া তিনিই ঢাকা নর্মাল স্কুলের গৌরব রক্ষা করিয়াছেন, তারপর প্রধান শিক্ষক বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের তীব্র অনুকূল মন্তব্য। এতদ্ব্যতীত তিনি অধ্যক্ষ কন্যা মিস্ ফিবির পূর্বতন শিক্ষক। এই সকল চিন্তা করিয়া অপর প্রার্থিগণ যেমন ভগ্নোৎসাহ হইতে লাগিল, আবার ছাত্র বিদ্রোহের সময় মিঃ এরাটুন ভুবন মােহনকে যাহা বলিয়া ছিলেন, তাহা স্মরণ করিয়া আশার ক্ষীণালােক বিদ্যুৎচমকের রায় গণেকের জন্য কখনও কখনও তাহাদের হৃদয়ে দেখা দিতে লাগিল, আবার পরক্ষণেই বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের তীব্র মন্তব্য, সাহেব সেই সামান্য কারণে উপেক্ষা করিতে পারিবেন না। মনে করিয়া নিরাশার অন্ধকারে হৃদয় আচ্ছন্ন হইতে লাগিল। বিজ্ঞাপনের নির্ধারিত দিনে, নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পূৰ্বেই ছয় জন প্রার্থী গিয়া নৰ্ম্মাল স্কুলের বারান্দায় পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। আজ সাহেব প্রার্থী দিগকে দেখিয়া উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিবেন। কাহার ভাগ্য প্রসন্ন হইবে তাহা অনিশ্চিত। সকলেই সন্দেহ-দোলায় দোদুল্যমান। তখনও অধ্যক্ষ সাহেব স্কুলে আইসেন নাই। প্রাখিগণ পুনঃ পুনঃ তাঁহার আগমনপথ নিরীক্ষণ করিতেছে। দূরে একজন পাগড়ী বান্ধা দপ্তরী বা চাপরাসীকে ঐ পথে দেখিলেই তাহারা তাহাকে সাহেব ভ্রমে স্বীয় পরিচ্ছদের পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষা করিতে লাগিল। সকলের মুখে সেই এক নিরাশ বাক্য, কেবল একমাত্র ভরসা সাহেবের সেই ছাত্র বিপ্লবের সময়ের কথা। এমন সময় ভুবন মােহন তাহাদের মহর্ষি ভুবন মােহন সহিত আসিয়া মিলিত হইলেন। তাঁহাকে দেখিয়া সকলেই শুষ্ক হাসি হাসিয়া বলিল, “এ কাজ তুমিই পাইবে,—আমাদের আইসা কেবল বিড়ম্বনা মাত্র।” ভুবন মােহন কহিলেন, “আমিই পাইব তাহা কে, বলিবে ? আপনাদের অপেক্ষা আমি অধিকতর গুণবান্নহি।” এইরূপ কথা বার্তা হইতেছে এমন সময় ঘড়িতে এগারটা বাজিতে লাগিল, অধ্যক্ষ সাহেব আসিয়া স্বীয় কক্ষে প্রবেশ করিলেন। প্রার্থিগণ এক দৃষ্টে সেই কক্ষের দিকে তাকাইয়া রহিল, এবং প্রতি নিমিষে চাপরাশীর ডাক অপেক্ষা করিতে লাগিল। এইরূপে প্রায় আধঘণ্টা অতীত হইলে একজনের ডাক পড়িল। তিনি কয়েক বৎসর পূর্বে ঢাকা নর্মাল স্কুল হইতে কৃতিত্বের সহিত পাশ করিয়া একটি মধ্য বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করিতে ছিলেন, ডাক শুনিয়া দুর্গানাম জপিতে জপিতে সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করিয়া অভিবাদন পূর্বক দাড়াইলেন। সাহেব আর কখনও তাহাকে দেখেন নাই, একবার তাহার আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ করিয়া, “বয়স কত? এখন কি কর?” এই দুইটি কথা মাত্র জিজ্ঞাসা করিয়াই অমানুষিক সাহেবী প্রতিভাবলে তাহাকে অযােগ সাব্যস্ত করিয়া বিদায় দিলেন। প্রার্থী নিরাশ মনে শুষ্ক মুখে কক্ষ হইতে বহির্গত হইল,অমনি ভুবন মােহনের ডাক পড়িল। ভুবন মােহন কক্ষে প্রবেশ করিয়া অভিবাদন পূর্বক দণ্ডায়- মান হইলে, সাহেব বলিলেন, “তুমি এই বিদ্যালয়ের একজন ভাল ছাত্র এবার তুমি তৃতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হইয়াছ, প্রধান শিক্ষক বিদ্যাভূষণ মহাশয়ও তােমাকে নিযুক্ত করার জন্য তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন, এই সকল কারণে এই পদে তোমার দাবী সর্বাপেক্ষা ৬৪ মহর্ষি ভুবন মােহন । অধিক হইলেও তুমি ইতঃপূৰ্বে ছাত্র বিদ্রোহের নেতা হইয়াছিলে এবং তুমি আমার নিকট মিথ্যা কথা বলিয়াছিলে, এনিমিত্ত আমি অতীব দুঃখের সহিত প্রকাশ করিতেছি যে আমি তােমাকে এই পদে নিযুক্ত করা উচিত বােধ করিলাম না।” ভুবন মােহন সাহেবের ভ্রম ধারণা অপনােদন জন্য দুই একটি কথা বলিতে চাহিলেন, সাহেব তাহা শুনিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়া তাহাকে বিদায় দিলেন। তখন তিনি নিরাশ- ব্যঞ্জক মলিন বদনে বাহিরে আসিলেন। কমধ্যে তাহার অপেক্ষাকৃত বিলম্ব হইতেছে দেখিয়া অপর প্রার্থিগণ মনে করিতেছিল নিশ্চয়ই ভুবন মােহনের চাকুরী হইল, এক্ষণে তাহাকে ম্লান বদনে বহির্গত হইতে দেখিয়া তাহাদের সে ভাবনা দূরীভূত হইল ; সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তির ডাক পড়িল । প্রার্থী কক্ষে প্রবেশ করিয়া অভিবাদন করিবা মাত্র সাহেব তাহাকে চিনিলেন এবং সহাস্য বনে কহিলেন, “বেশ, ছাত্র বিদ্রোহে তুমি 'বাইবেল স্পর্শ করিয়া আমার নিকট যে ধৰ্ম্মানুরাগ ও সত্যবাদিতার প্রমাণ দিয়াছিলে আজ তাহার পুরস্কার স্বরূপ এবং ধৰ্ম্ম ও সত্যের সম্মান প্রদর্শন জন্য এই পদে তােমাকে অতীব আনন্দের সহিত নিযুক্ত করিলাম। আশা করি তুমি ছাত্রগণকে ধৰ্ম্ম ও সত্যপথে চালিত করিয়া এই পদের মর্যাদা রক্ষা করিবে। তুমি এক্ষণে বাহিরে অপেক্ষা কর অদ্যই নিযুক্তি-পত্ৰ পাইবে।” প্রার্থী, “আপনি ধর্মাবতার, সত্যের প্রতিমূর্তি, নিঃসহায়ের সহায়, এবং দরিদ্রের পিতা মাতা,” এই বলিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূৰ্ব্বক সাহেবকে পুনরায় অভিবাদন করিয়া স্মিত মুখে বাহিরে আসিলেন ; তাহার প্রফুল্প বদন দেখিয়াই সকলে মনে করিল তাহার ভাগ্য প্রসন্ন হইয়াছে,-সঙ্গে সঙ্গেই চাপরাশী আসিয়া, তাহাকে মহষি ভুবন মােহন ব্যতীত অন্যান্য প্রার্থীদিগকে সাহেব চলিয়া যাইতে বলিয়াছেন, প্রকাশ করিল। তাহারা ভগ্ন মনে গৃহাভিমুখী হইয়াছে, এমন সময় বিদ্যা- ভূষণ মহাশয় ভুবন মােহনকে ডাকাইলেন। তিনি বিদ্যাভূষণ মহা- শয়ের নিকট গিয়া তাহার চরণ বন্দনা করিলে, তিনি তাঁহাকে বলিলেন, “ভুবন ! দুঃখিত হইও না। ইহা যুগধর্ম। এযুগে ধৰ্মই অধৰ্ম্ম, আর অধৰ্মই ধৰ্ম্ম। সত্যই মিথ্যা, আর মিথ্যাই সত্য। তার পর আবার আমাদের বিচার ! বিচার ! সরলতা ও স্পষ্টবাদিতা আমাদের পরম শক্ত ;-কপটতা ও কৌটিল্যই আমাদের আদরের সামগ্রী। সুতরাং এপদে তুমি নিযুক্ত না হওয়ায় আমি বিস্মিত হই নাই। বিশেষতঃ যাহার নিকট সত্যের সম্মান নাই,-গুণের আদর নাই, তাহার অধীনে চাকুরী করিয়া তােমার মনুষ্যত্ব লােপ করা বােধ হয় ভগবানের অভিপ্রেত নয় বলিয়াই তুমি এপদে বঞ্চিত হইয়াছ। যাও, এখন বাড়ী যাও। ভগবান্, তােমার ন্যায় ধর্মপ্রাণ সুশীল কৃতী পুরুষের অবশ্যই মঙ্গল করিবেন। ভুবন মােহন, বিদ্যাভূষণ মহাশয়কে প্রণাম করিয়া চলিয়া আসি- কয়েক দিন পরে তিনি ঢাকা জেলার অন্তঃপাতী মিরপুর মধ্য- বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ প্রাপ্ত হইলেন। তখন তঁাহার বয়স একবিংশ বৎসর মাত্র। তঁাহার নবীন বয়স দেখিয়া গ্রামবাসিগণ প্রথমে নানারূপ আশঙ্কাই করিয়াছিল, কিন্তু অল্পদিন মধ্যে তাহার অসীম ধৰ্ম্মানুরাগ, দয়াদাক্ষিণ্য, বিনয়, সরলতা, সত্যনিষ্ঠা, সহৃদয়তা, সচ্চরিত্রতা, অধ্যপনা-নৈপুণ্য ও মধুর বাক্যে সকলেই তাহাকে ভক্তি করিতে লাগিল। তিনি ছাত্রগণকে অপত্যনির্বিশেষে স্নেহ লেন।
মহর্ষি ভুবন মােহন করিতে লাগিলেন। ছাত্রগণও তাঁহার স্নেহ-মধুরবাক্যে তাহার বিশেষ অনুরাগী হইয়া উঠিল। মিরপুর গ্রামখানি বই অস্বাস্থ্যকর। ছাত্র ও প্রতিবেশিগণ প্রায়ই অনাদি পীড়ায় অনেক সময় কষ্ট পাইত। পণ্ডিত ভুবন মােহন কাহারও কোন পীড়ার সংবাদ পাইলে অমনি তথায় গিয়া তাহার শুশ্রুষায় নিযুক্ত হইতেন। এজন্য গ্রামবাসী সকলেই তাহার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিত। এইরূপে পাঁচ বৎসর তথায় থাকার পর দুরন্ত ম্যালেরিয়া তাহাকে এরূপ আক্রমণ করিল যে তিনি আর তথায় টিকিতে পারিলেন না,প্রাণ-সংশয় কাতর হইয়া বাটিতে আসিলেন ; এবং দীর্ঘকাল কাতর থাকায় চাকুরী পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। দশম অধ্যায়। প্রায় এক বৎসর চিকিৎসিত হইবার পর ভুবন মােহন সুস্থ হইয়া পুনরায় চাকুরীর অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দুই এক স্থানে খোজও পাইলেন, কিন্তু স্থান স্বাস্থ্যকর নয় বলিয়া তাহার জন্য কোন চেষ্টা করিলেন না। কিছু দিন পরে পাবনা জেলার সাহাজাদপুর থানার অন্তর্গত পােৰ্জনা মধ্যবাঙ্গালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ খালি আছে জানিতে পারিলেন। শুনিলেন, স্থানটি স্বাস্থ্যকর ও তথায় বিস্তর ভদ্রলােকের বাস। তিনি ঐ কার্যের জন্য দরখাস্ত করিলেন। অনতি মহর্ষি ভুবন মােহন বিলম্বেই তথা হইতে তাহার নিযুক্তিপত্র আসিল, তিনি অগৌণে পাের্জনা গিয়া কাৰ্যভার গ্রহণ করিলেন। স্থানীয় জমিদার মুকুন্দ চন্দ্র ভাদুড়ী মহাশয়ের যত্নেই স্কুলটি চলিতে- ছিল। তিনি ভুবন মােহনের হস্তে নিজ পুত্রদ্বয়ের শিক্ষার ভার অর্পণ করিয়া নিজ বাড়ীতেই তাঁহার বাসা দিলেন এবং নিজেই তাঁহার আহারের ভার গ্রহণ করিলেন । পণ্ডিত ভুবন মােহন স্কুলে কাজ করেন, আর দুইবেলা ছেলে দুইটিকে পড়ান, আর অবকাশ পাইলেই হয় কোন ধর্মগ্রন্থ পড়েন, না হয় ভগবচ্চিন্তায় নিযুক্ত হন। জমিদার মহাশয়ের বহির্বাটীর কোন স্থানে তা, দাবা বা পাশা চলিতেছে, কোথাও বা কত গল্প গুজব হইতেছে, তাহাতে কত আদিরসের ছড়াছড়ি হইতেছে, কোথাও বা সন্ধ্যার পর ভাদুড়ী মহাশয়ের অজ্ঞাতে কেহ মদ খাইয়া গড়াগড়ি দিতেছে। ভুবন মােহন ইহাদের কোন দলেই মিশিতেন না, তিনি আপনার নির্দিষ্ট কৰ্ম্মগুলি সম্পাদন করিতেন, আর ভগবচ্চিচন্তায় বিভাের থাকিতেন। এ জন্য ঐ সম্প্রদায়ের লােকের নিকট তিনি নিতান্ত অসামাজিক ও অরসিক বলিয়া গণ্য হইলেন। তাহারা তাহাকে কেহ বৈরাগী, কেহ বা তাহাকে ব্রাহ্ম জানিয়া ‘ব্রহ্মদৈত্য বলিয়া উপহাস করিত। কেহ কেহ বলিত, “পণ্ডিত আবার ৰাহ্ম কিসের ? মাছ মাংস খায় না, মদ খায় না, সে আবার ব্রাহ্ম?” ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্ম-প্রধান পাের্জনার মুকুন্দ বাবু প্রমুখ ভদ্রমণ্ডলী প্রথমে যখন শুনিয়াছিলেন, পণ্ডিত মহাশয় ব্রাহ্ম, তখন তাহারা সকলেই তাহাকে একটুকু অশ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন, পরে যখন মহষি ভুবন মােহন তাহারা দেখিলেন, পণ্ডিত মহাশয় হিন্দুর অখাদ্য দূরে থাকুক, মৎস্য- মাংস পর্যন্ত খান না, তিনি ব্রহ্মচারীর ন্যায় কৌমার ব্ৰতাবলম্বী, তঁাহার হৃদয় স্বচ্ছ স্ফটিকবং নিৰ্ম্মল, সরল, পর-দুঃখ-কাতর ও ভগবৎপ্রেমে ডগমগ, তন সকলেই তাহাকে ভক্তি করিতে লাগিলেন। তাহার অধ্যাপনা-নৈপুণ্যে স্থানীয় ভদ্রমণ্ডলী যেরূপ প্রীত হইলেন, ছাত্রগণও সেইরূপ তাহার স্নেহ-মধুর বচনে তাহার অনুরক্ত হইল। অনন্ত জ্ঞান-ভাণ্ডার সংস্কৃত ভাষার প্রতি ভুবন মােহনের বিশেষ অনুরাগ ছিল, ইহা পূৰ্বেই বর্ণিত হইয়াছে। তিনি পাের্জনায় আসিবার কিছুদিন পর জানিতে পারিলেন, পাের্জনার প্রায় চারি মাইল দুরে ভূতরিয়া গ্রামে রাজীবলােচন তর্কপঞ্চানন নামে একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত আছেন ; তাহার টোলে অনেক ছাত্র পড়ে। তিনি প্রত্যহ সন্ধ্যার পর গিয়া তর্কপঞ্চানন মহাশয়ের নিকট পুনরায় মুগ্ধবােধ ব্যাকরণ ও সাহিত্য পড়িতে আরম্ভ করিলেন। পাঁচ বৎসরের মধ্যে মহাকবি কালিদাসের গ্রন্থাবলী সমাপ্ত করিয়া উপাধি পরীক্ষা দিলেন এবং তাহাতে কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হইয়া বিদ্যারত্ন উপাধি প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু তিনি কখনও নিজ নামের সহিত ঐ উপাধি যােগ করেন নাই। পারিবারিক আত্মীয়গণ মধ্যেও তাহার এই উপাধির কথা অনেকে জানিতে পারেন নাই। তিনি আত্মগৌরব বৃদ্ধির চেষ্টা না করিয়া আত্মগােপনের চেষ্টাই অধিকতর করিতেন। কেহ তাহার জীবনী সংগ্রহ করিবার জন্য তাহাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি বলিতেন, “আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনের জীবনী লিখিয়া কি হইবে? তিনি বাস্তবিকই আপনাকে তৃণাদপি ক্ষুদ্র মনে করিতেন। ছােট বড় মহর্ষি ভুবন মােহন সকলকেই অগ্রে নমস্কার করিয়া বসিতেন। আমরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিয়া তাহাকে অনেক সময় অগ্রে নমস্কার করিতে পারি নাই। তাহার জ্ঞান-পিপাসার কিছুতেই নিবৃত্তি হইত না। মাসান্তে বেতন পাইলে জননী ও বিধবা ভ্রাতৃবধুর জন্য বাড়ীতে কিছু পাঠাই- তেন, তৎপর দীন-দুঃখীর সাহায্য করিয়া যাহাকিছু থাকিত তারা গীতা, উপনিষদ ও সংহিতা প্রভৃতি ধর্ম গ্রন্থকানাইয়া পাঠকরিতেন। আরবী ও উর্দ শিক্ষা। ও আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, যেখানে যে কোন ধর্মালােচনাই হউক কেন, ভুবন মােহন তাহার সংবাদ পাইলেই, মধুলােলুপ ভূঙ্গের ন্যায় জ্ঞানামৃত লাভের আশায় তথায় ছুটিতেন। তিনি কোন ধর্মকেই অশ্রদ্ধা করিতেন না। তিনি জানিতেন, সকল ধর্মের উদ্দেশ্যই ভগবানের আরাধনা, কেবল সম্প্রদায় ভেদে উপাসনার প্রণালী ভেদ মাত্র। একদা তিনি শুনিতে পাইলেন একজন পশ্চিম দেশীয় মৌলবী পাের্জনার নিকটবর্তী গ্রামে আসিয়াছেন, তিনি মুসলমান ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা ও কোরাণ সরিপ পাঠ করিবেন। চারিদিক হইতে মুসলমানগণ তাহা শুনিতে ছুটিল, তিনিও তাহাদের সঙ্গী হইলেন। কোরাণ আরবী গ্রন্থ, মৌলবী সাহেব তাহা ব্যাখ্যা করিলেন উর্দতে । ভুবন মােহন আরবী জানিতেন না, উর্দতেও তাহার তেমন অধিকার ছিল না। সুতরাং কোরাণ ব্যাখ্যা তেমন ভালরূপ বুঝিতে পারিলেন না। তখন তাঁহার আরবী ও উর্দ, শিখিবার বাসনা বলবতী হইল। তিনি অনেক ৭ মহর্ষি ভুবন মােহন মৌলবীর নিকট স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন, কিন্তু কেহই তাহার শিক্ষারভার গ্রহণ করিলেন না। অবশেষে একজন সদাশয় বৃদ্ধ মৌলবীর নিকট উপস্থিত হইলেন। মৌলবী কহিলেন, “দিনে আপনি ও আমি উভয়েই অনবসর, রাত্রেও আমার অবসর নাই। সন্ধ্যা লাগিলেই আমাকে গিয়া বাঙ্গী ক্ষেত পাহারা দিতে হয়, নহিলে শূকরের দৌরাত্ম্যে বাঙ্গী থাকে না। তবে আপনি যদি সন্ধ্যার পর সেইখানে আসিতে পারেন তবে আমি আপনাকে যথাসাধ্য শিখাইতে পারিব।” তিনি তাহাতে সম্মত হইয়া প্রত্যহ সন্ধ্যার পর ক্ষেতে গিয়া উপস্থিত হইতেন। দলে দলে বন্য শূকর আসিয়া ক্ষেতে উপদ্রব করিত, তিনি তাহাদিগকে তাড়াইয়া মৌলবীর সাহায্য করিতেন। যে টুকু সময় পাইতেন তাহার মধ্যে তিনি আরবী, পার্শী ও উর্দ, শিখিতে লাগিলেন। মৌলবীও তঁাহার কার্যে সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে বিশেষ মনোেযােগ সহকারে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। অসাধারণ অধ্যবসায় ও মেধাবলে তিনি অল্পদিন মধ্যেই উক্ত তিন ভাষায় ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন। তিনি মৌলবীর নিকট সমগ্র কোরাণ পানি পাঠ করিয়া প্রাণের আশা মিটাইলেন। কোরাণে তাহার বিশেষ বুৎপত্তি জন্মিয়াছিল। অনেক বড় বড় মৌলবী তাহার মুখে কোরাণের ব্যাখ্যা শুনিয়া আনন্দ লাভ করিয়াছেন। মহর্ষি মিলন। পাের্জনার অনতিদুরে সহাজাদপুর গ্রাম। কলিকাতার প্রসিদ্ধ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রামের জমিদার। সেখানে তার একটি কাছারীও আছে। একবার মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে মহর্ষি সে মহর্ষি ভুবন মােহন কাছারীতে আসিয়াছেন,-তাহার শুভাগমন সংবাদ চারিদিকে পরিব্যাপ্ত হইয়াছে,-দলে দলে প্রজাগণ তাহার নিকট গিয়া আপনাদের অভাব- অভিযােগ জানাইতেছে,কত লােক নিস্পাপ হইবার আশায় তাহাকে গিয়া দশন করিতেছে। এই সকল লােকের মুখে পণ্ডিত ভুবন মােহনের ধর্মানুরাগ ও সহৃদয়তার কথা মহবির কর্ণগোচর হইলে, তিনি তাহাকে দেখিবার জন্য সুযােগ খুজিতে লাগিলেন। ১১ই মাঘ মাঘােৎসব, সুতরাং দিন নিকটবর্তী ; মহর্ষি এই উৎসব এবার সাহাজাদপুর কাছারীতেই সম্পন্ন করিবেন,আর কলিকাতায় যাইবেন না,--স্থির করিলেন। তাহার আদেশে উৎসবের আয়ােজন হইতে লাগিল। নায়েব, আমলা, বরকন্দাজ কাহারও এক মুহূর্তেরও বিশ্রাম নাই,দিবা রাত্রি পরিশ্রম করিয়া সভামণ্ডপ, উপাসনার বেদিকা, কাছারীর সংস্কার, নিমন্ত্রিত ভদ্রলােক গণের বাসস্থান নির্মাণ ও দরিদ্র ভােজনের ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। এই উপলক্ষে মহর্যি, পণ্ডিত ভুবন মােহনকে নিমন্ত্রণ করিলেন। মহষির সাহাজাদপুরে আগমন সংবাদ ভুবন মােহন পূৰ্বেই জানিয়া ছিলেন। তিনি অনেকদিন হইতেই মহর্ষির গুণগ্রাম শুনিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তৎপর তাহার সাহাজাদপুরে আগমন সংবাদ জানিয়া তাহাকে দেখিবার জন্য অভিলাষী হন; কিন্তু তাহার সে বাসনা চরিতার্থ করিবার সুযোেগ ঘটে নাই। তারপর তাহার আর একটি কথাও মনে উদিত হইয়াছিল, তিনি মনে করিয়াছিলেন, মহর্ষি একজন দেশ-প্রসিদ্ধ জমিদার; তিনি এখানে জমিদারী শাসন করিতে আসিয়াছেন, এখানে তাহার সঙ্গে আলাপ করিয়া প্রাণের আশা মিটিবে কি? এইরূপ মহর্ষি ভুবন মােহন চিন্তা করিয়া একটুকু ইতস্ততঃও করিতে ছিলেন। আজ মহর্ষির নিমন্ত্রণ পত্র পাইয়া তাহার সে সকল চিন্তা দূরীভূত হইল, তাহার হৃদয়ে অপার আনন্দ উথলিয়া উঠিল। তিনি প্রতিমুহূর্তে সেই শুভদিনের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। পর দিনই সেই ১১ই মাঘ। ভুবন মােহনের এ বিলম্ব টুকুও যেন অসহ্য হইয়া উঠিল। পরদিন প্রত্যুষে উঠিয়াই সাহাজাদপুর রওনা হইলেন । কাছারীতে পৌষ্টিয়া দেখিলেন, কাছারীখানি কদলী বৃক্ষে ও নানা পুষ্প-পতাকায় সুশােভিত হইয়া অপূৰ্ব্ব শোভা বিস্তার করিয়াছে। সভামণ্ডপ নানা কারুকার্যে সুশােভিত হইয়াছে। নানা পুষ্প পত্রে শােভিত সুরম্য বেদিকায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বৃহস্পতির ন্যায় শােভ পাইতেছেন। তাহার প্রশান্ত ও প্রস বদনে অনুপম ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ যেন প্রতিভাত হইয়া দশকগণের ভক্তি আকর্ষণ করিতেছে। বিস্তর উপাসক ও দর্শক উপস্থিত হইয়াছেন, সুমধুর কীৰ্ত্তন চলিতেছে। এমন সময় গিয়া ভুবন মােহন উৎসবে যােগদান করিলেন। অহোরাত্র ব্যাপিয়া উৎসব চলিল। মহর্ষি ভক্তি গৰ দি কণ্ঠে কখন বা ব্ৰহ্ম নাম কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন, কখন বা ব্রহ্ম- তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন, আবার কখন বা হৃদয়ের আবেগে শিহরিয়া উঠিতে লাগিলেন। উপাসনান্তে একটি সঙ্গীত হইল। মহর্ষি বেদিকা হইতে অবতরণ করিয়া প্রত্যেকের সহিত আলিঙ্গন ও প্রীতি সম্ভাষণ করিলেন। অতঃপর ভুবন মােহনের সঙ্গে তাহার আলাপ হইল। উভয়ে ব্ৰহ্মানন্দে বিভাের হইয়াকত আলাপ করিলেন, যেন কতদিনের পরিচিত, -কত দিনের বন্ধুতা। মহর্ষি তাহার অসীম ধৰ্ম্মানুরাগ ও ভগবৎপ্রেম দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন, এবং তাঁহাকে ভূয়সী প্রসংসা করিতে লাগিলেন। - মহর্ষি ভুবম মােহন উৎসবের পরদিন কাঙ্গালী-ভােজনের আয়ােজন হইল। সহস্র সহস্র কাঙ্গালী কাছারী প্রাঙ্গনে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের কোলাহলে চারিদিক মুখরিত হইয়া উঠিল। মহর্ষি নিজে তাহাদের আহারের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হইলেন। কাঙ্গালিগণ সুবৃহৎ প্রাঙ্গনে সারি ধরিয়া বসিল, তাহা দেখিয়া মহর্ষির দুই চক্ষে আনন্দা প্রবাহিত হইল। তখন তিনি বলিলেন, “আজ আমার এতগুলি কাঙ্গাল ভ্রাত এখানে বসিয়া খাইবে, আর আমি পৃথক খাইব, তাহা হইবে না। আমি ইহাদের সঙ্গেই বসিব।” এই বলিয়া তিনিও তাহাদের সঙ্গে পাতা লইয়া বসিয়া গেলেন। নায়েব, আমলা ও দর্শকগণ তাহা দেখিয়া অবাক হইল। তাহারা ভাবিল ইনি কি মানুষ, না দেবতা ? এমন উদার প্রেম কি মানুষে সম্ভব ? ভুবন মােহনও মহর্ষির এই দেব-ভাব দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। তিনি বলিয়াছেন, এরূপ দীন-বাৎসল্যও সমপ্রাণতার ভাব তিনি জীবনে আর কখনও দেখেন নাই। সেই অবধি তাহার হৃদয়ে মহর্ষির এই অপূর্ব দৃষ্টান্ত অঙ্কিত হইয়া রহিল, তিনি সততই তাহার অনুসরণ করিতেন। তিনি বলিতেন, আত্মাভিমান বিদূরিত হইয়া সৰ্ব্ব- জীবে সমভাব ও প্রকৃত দৈন্য বা অমানিতা না আসিলে ব্ৰহ্ম পথের পথিক হওয়া যায় না। অতঃপর এই ভাব, তাহাঁর জীবনেও প্রতি- ফলিত হইয়াছিল। তাই তাহাকেও লােকে মহষি বলিয়া ভক্তি কাঙ্গালী ভােজনের পর ভুবন মােহন মহর্ষির নিকট হইতে বিদায় লইয়া পাের্জনায় ফিরিয়া আসিলেন, উভয়ে পরস্পর চক্ষের অন্তরালে অবস্থিত হইলেও, অনুরাগের দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। কিছুদিন পর ৭৫ মহষি ভুবন মােহন মহর্ষি সাহাজাদপুর হইতে যাইবার সময়, আবার ভুবন মােহনকে সংবাদ দিলেন,ভুবন মােহন আবার তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন-আবার উভয়ে প্রেম-তরঙ্গে ডুবিলেন। অবশেষে মহর্ষি তাহাকে কহিলেন, *তােমার মত ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসী প্রেমিক ভক্তের সঙ্গ লাভ করিয়া এখানে বড়ই আনন্দ উপভােগ করিলাম ; তুমি কলিকাতায় গেলে আমার সহিত দেখা করিতে ভুলিও না।” এই বলিয়া মহষি সাহাজাদপুর হইতে রওনা হইলেন, ভুবন মােহন পাের্জনায় প্রত্যাগত হইলেন। অতঃপর দিনাজপুর থাকা কালে একবার তিনি কলিকাতায় গিয়া মহষির দর্শনলাভার্থে, তাহার বাটীতে গেলেন। বাহিরে একজন ভদ্রলােককে পাইয়া তাহাকে স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। ভদ্রলােকটি মহর্ষির সম্পর্কিত। তিনি বলিলেন, “মহর্ষির শরীর অসুস্থ, ডাক্তারের তাহাকে অন্য লােকের সহিত সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা বলিতে নিষেধ করিয়াছেন, সুতরাং আপনার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইবে না।” এই বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। ভুবন মােহন ভগ্ন মনে ঐ স্থানে বসিয়া পড়িয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এতদূর আসিয়াও পুণ্যাত্মা মহর্ষির সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হইলাম, ইহা অপেক্ষা পরিতাপের বিষয় আর কি হইতে পারে ?” এইরূপ চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় একজন ভৃত্য সেখানে আসিল, তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহর্ষি কেমন আছেন?” ভৃত্য বলিল, “তাহার খুব অসুখ হইয়াছিল এখন একটুকু ভাল আছেন,কোথাও বাহির হন না।” তখন তিনি তাহাকে বলি লেন, “আমার একখানি খুব দরকারী পত্ৰ তুমি মহর্ষিকে দিতে পারিবে?”
মহর্ষি ভুবন মােহন সে তাহাতে সম্মত হইলে তিনি একখানি পত্র লিখিয়া তাহার হস্তে দিলেন। সে পত্র লইয়া ভিতরে চলিয়া গেল। একটুকু পরে সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “মহষি আপনাকে ডাকিয়াছেন। আপনি আমার সঙ্গে ভিতরে আসুন।” তিনি ভিতরে গিয়া মহর্ষিকে অভিবাদন করিবামাত্র মহষি তাহাকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, “ভুবন আজ তােমার সাধু জীবনের পবিত্র সঙ্গ লাভ করিয়া আমার বহুকালের প্রাণের জালা বিদূরিত হইল।” উভয়ে প্রেমাশ্রুতে পরিপ্লুত হইলেন। অবশেষে নানা কথা বার্তার পর ভুবন মােহন মহর্ষির নিকট হইতে বিদায় লইয়া নিজ বাসায় প্রত্যাগত হইলেন। সেবাব্রত ও হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসা। পূৰ্বে ছাত্র বা প্রতিবেশিগণ মধ্যে কেহ পীড়িত হইলেই পণ্ডিত ভুবন মােহন গিয়া শুশ্রুষার ভার গ্রহণ করিতেন। এক্ষণে তঁাহার সেই সে ব্ৰত সম্প্রসারিত হইল। তিনি, যে কাহারই পীড়ার সংবাদ পাইতে লাগিলেন, অমনি তথায় গিয়া শুশ্রুষার জন্য আত্ম-নিয়ােগ করিতে আরম্ভ করিলেন। অতঃপর তাহাতেও তাহার মনের তৃপ্তি হইল না। তিনি দেখিলেন, শুধু শুশ্রুষায় মানুষের জীবন রক্ষা করা যায় না;- জীবন রক্ষা করিতে হইলে চিকিৎসার প্রয়ােজন; কিন্তু অনেক দরিদ্র অর্থাভাবে চিকিৎসা করাইতে পারে না, তাই তিনি তাহাদের চিকিৎ সার ব্যবস্থা করিতে কৃতসংকল্প হইলেন। অনেক চিন্তা করিয়া দেখিলেন, একমাত্র হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসায়ই দরিদ্রের উপযােগী। তখন তিনি হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসার একখানা বাঙ্গালা বহি ও কিছু মহষি ভুবন মােহন ঔষধ অনাইলেন। প্রথমে কয়েকটি সামান্য রােগীকে ঔষধ দিয়া বেশ ফল পাইলেন,-তাহাতে তাহার উৎসাহ বৰ্দ্ধিত হইল। তিনি আরও মনোযােগ সহকারে হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসাশাস্ত্র পড়িতে লাগিলেন এবং পরম উৎসাহে দরিদ্রগণের চিকিৎসা ও শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। বিনাব্যয়ে সুচিকিৎসা ও শুশষ। পাইয়া সর্ব সাধারণে তাহাকে বিশেষ ভক্তি ও আশীর্বাদ করিতে লাগিল। তঁাহার সুচিকিৎসার প্রশংসা চারিদিকে পরিব্যাপ্ত হইল। গ্রামান্তর হইতেও লােক তাঁহার নিকট চিকিৎসার জন্য আসিতে লাগিল। তাহার আর অবসর রহিল না, প্রাতে ও স্কুলের পর রােগী-সেবায়ই তাহার অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হইতে লাগিল। অগ্নি পরীক্ষা পণ্ডিত ভুবন মােহন, যুবক, হৃষ্ট-পুষ্ট, বলিষ্ঠ, মধুর-কান্তি ও মধুর-ভাষী, আজ পর্যন্তও তিনি বিবাহ করেন নাই। তিনি জীবনে কখনও বিবাহ করিবেন না বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পাের্জনার ভাদুড়ী মহাশয় প্রভৃতি প্রবীণগণ তাহার কার্যকলাপ ও সংস্বভাবে তাহাকে মহাপুরুষ মনে করিতে লাগিলেন ; কিন্তু যে সকল নীচাশয় দুয়ািসক্ত যুবকের সহিত তিনি মিশিতেন না, তাহারা তাহাকে বিষনেত্রে দেখিতে লাগিল। তিনি আরবী পার্শী শিক্ষার জন্য রাত্রে মৌলবীর বাণী ক্ষেতে পাহারা দিতেন ; তাহার সেই অনুপস্থিতিতে নানা অলঙ্কার দিয়া তাহারা নানা কুৎসা গাহিত, কিন্তু নিস্পাপ ভুবন মােহন তাহাতে হৃক্ষেপও করি- তেন না।
মহর্ষি ভুবন মােহন তিনি ব্রহ্মচর্য রক্ষার জন্য দার গ্রহণে অসম্মত থাকিলেও স্ত্রীজাতীর প্রতি তাহার বিদ্বেষ ছিল না। তিনি বলিতেন, *হ্মচর্যের প্রতিষ্ঠা তখনই হয় যখন রমণীতে জননী জ্ঞান প্রদীপ্ত হইয়া উঠে। মহাজনগণ বলিয়াছেন :- “দিনকা মােহিনী রাতকা বাঘিনী পল পল লহু চোষে, দুনিয়া সব, বাউরি হােকে ঐসা বাঘিনী ঘর ঘর পােব।” নারীর মােহজাল হইতে অজিতেন্ডিয় পুরুষের আত্মরক্ষার উপায় দুষ্কর বলিয়া মহাজনগণ বলিয়াছেন, কামিণী মােহিনীরূপে দিনে, ও বাঘিনীরূপে রাত্রে শােণিত শােষণ করে। তথাপি পৃথিবীর নােক এমনই বাতুল, যে জানিয়া শুনিয়া এই বাঘিনীরূপিণী কামিনী পুষিয়া থাকে। রমণীর মােহা- কৰ্ষণ হইতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় রমণীকে জননীত্বে প্রতিষ্ঠা করা। তাহা করিতে না পারিলে যােগী হউন, তপস্বী হউন, বা নির্জন গিরি- গহ্বর-বাসীই হউন, পতন হইতে আত্মরক্ষা, বা ব্রহ্মচর্য রক্ষা দুষ্কর হইয়া পড়িবে। অনেকে বলেন স্ত্রীমুখ-দর্শন মহাপাপ, কিন্তু সেটা ভুল। স্ত্রীজাতি ব্ৰহ্মেরই সাক্ষাৎ করুণার মূর্তি। তঁাহার করুণাই মূর্তিমতী মাতারূপে অবতীর্ণ হইয়া জগৎ পালন করিতেছেন। কীটামুকীট হইতে মানব পৰ্যন্ত, সকল মাতৃ হৃদয়েই একই করুণার স্রোত প্রবাহিত হইয়া জগতের সন্তাপ হরণ করিতেছে। ইন্দ্রিয় স্ববশে থাকুক, আর নাই থাকুক, তাহাতে কিছু আসে যায় না, কামিণীর এমনই আকর্ষণ শক্তি যে, দর্শন মাত্র মনের বিকার ঘটাইতে পারে। তাই ভক্ত তুলসী ৭৮
মহষ ভুবন মােহন
স
ক
।
দাস সংসার-দুঃখ-দায়িনী ও ভক্তি পথের কণ্টক-রূপিণী কামিনীর দর্শন,
ষড়রিপু অপেক্ষা প্রবল বলিয়াছেন;-
“কাম ক্রোধ লােভাদি মদ প্রবল মােহকে ধারি,
তিন মই অতি দারুণ দুঃখ মায়ারূপী নারী।
‘প্রবল মােহ বল, কাম ক্রোধ লােভাদি মদ রিপুগণই বল, সৰ্ব্বা
পেক্ষা মায়ারূপিণী কামিণীগণই নিদারুণ দুঃখদায়িনী।
মহাত্মা সাধক কবিরাও বলিয়াছেন;-
‘নারী সংস্মৃতি মূলিকা অর্গলসুর পুরকের,
চিমপি নাই দেখাই বুদ্ধি মন্ত মনের।
‘স্ত্রীলােকগণই সংসার বন্ধনের একমাত্র কারণ এবং স্বর্গ-পথের
অবরােধকারিণী। এই জন্য বুদ্ধিমাগণ স্ত্রীলােকের চিত্রও দর্শন
করেন না। কেননা তাহাতে চিত্তের চাঞ্চল্য জন্মিয়া থাকে।
চৈতন্যদেব, ছােট হরিদাসকে বলিয়াছিলেন
কাষ্ঠের রমণী দেখি কামের বিকাশ,
কেমনে রাখিবে চিত্ত রমণীর পাশ ?
সুতরাং যাহাদের মন বশীভূত হয় নাই, হৃদয়ে পবিত্র ধর্ম-ভাব
জাগে নাই,—যাহারা ষড় রিপু ও ইন্দ্রিয়গণকে অবশে আনয়ন করিতে
পারে নাই, তাহাদের মন-ভৃঙ্গ অনল-রূপিণী কামিনীতে ঝম্প প্রদান
করিয়া দগ্ধীভূত হইয়া আত্ম বিসর্জন করে। সে দোষ অনল-রূপিণী
কামিনীর নহে,-পতঙ্গরূপী মানবেরই বলিতে হইবে। মনে ব্ৰহ্মাপ্তি
প্রজ্জলিত করিয়া লইলে, আর দাহন ভয় থাকিবে না। মঙ্গলময়
বিধাতা সর্ব দোষের নিলয় করিয়া রমণী সৃষ্টি করেন নাই। রমণী
মহর্ষি ভুবন মােহন । পবিত্র স্নেহের নিঝরিণী, সংসার-তাপানল-দগ্ধ জীবের শান্তিদায়িণী। এক মুহূৰ্ত্ত এই মাতৃ জাতির অভাব হইলে, এই সুখের সংসার ভীষণ মরুময় শ্মশান-ভূমিতে পরিণত হয়। বিধাতার করুণাই মূর্তিমতী প্রীতিরূপে রমণীতে অধিষ্ঠান করিতেছে। নারীতে যে মােহের আকর্ষণ আছে, তাহা সেই প্রীতিরই আকর্ষণ। পবিত্র প্রীতি-প্রফুল্ল হৃদয়ে, প্রীতির চক্ষে তাহাকে না দেখিতে পারিলেই পাপের সঞ্চার হয়, এবং পাপ হইতেই পতন অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং এমন পবিত্র স্নেহের মূর্তির প্রতি আমাদের অশ্রদ্ধা বা দোষারােপ করা কখনই বিধেয় নহে। যাহাতে বিধাতার প্রেমময়ী মূর্তি বিরাজ করিতেছে, তাহার নিন্দা বা অবমাননা করিলে প্রকারান্তরে বিধাতারই নিন্দা করা হয়। রমণীত্বে, জননীত্ব স্থাপন করিয়া, তাহাকে প্রীতির নেত্রে জননী ভাবে দেখিলে এবং জননী বলিয়া ডাকিতে পারিলেই, মােহ-পাপ হইতে পরিত্রাণ লাভ করা যায় । যখন রমণী দর্শনেই জননী-ভাব জাগিয়া উঠিবে তখনই প্রকৃত ব্ৰহ্মচর্যের প্রতিষ্ঠা হইবে;-হৃদয় পবিত্র প্রীতির আলােকে পুলকিত হইবে। তখনই দেখবে বিধাতার একই করুণ। বাহিরে মাতৃরূপিণী নারী মুর্তিতে এবং অন্তরে আনন্দময়ী প্রতি ব। ভক্তি রূপে বিরাজ করিতেছে। হৃদয়ের প্রীতি, এই প্রীতি রূপিণী মাতৃ মূর্তিতে ঢালিয়া, যিনি জগজ্জননীর আরাধনা করিতে পারেন, তাহারই জীবন ধন্য, তাহারই আরাধনা সার্থক। আৰ্য শাস্ত্রে পশু বলিদান মাতৃ পূজায় বিধান আছে। সেই বলিদান, হিংসামুলক প্রাণী-হনন নহে; কাম, ক্রোধ, লােভ, হিংসা, মদ, মাৎসৰ্যাদি অজ্ঞানমূলক অহঙ্কাররূপ পশু ভাবের বলিদান করাই মহর্ষি ভুবন মােহন প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই কামাদি জঘন্য বৃত্তিরূপ পশুত্বের বলিদান না করিতে পারিলে, মাতৃপূজার অধিকারী হওয়া যায় না; মহাশক্তির পূজা করিয়াও শক্তি লাভে সমর্থ হওয়া যায় না। যতদিন আর্য-সমাজে পশুভাব বলিদান করিয়া শক্তি পূজার বিধান ছিল, ততদিন যাগ- যজ্ঞাদিতে সর্বত্র এই মাতৃজাতির সম্মাননা ও সম্বর্ধনা হইত। যতদিন এই মাতৃজাতির পূজা প্রতিষ্ঠিত ছিল, ততদিন ভারতে আৰ্য-শক্তিও অক্ষুন্ন ও অব্যাহত ছিল, মাতৃজাতির অবমানাই জাতীয় পতনের অন্যতম কারণ। সীতার অবমাননায় রাক্ষসকুল, দ্রৌপদীর অবমাননায় কুরুকুল এবং হেলেনার অবমাননায় সুরক্ষিতা ট্রয় নগরীর পতনই ইহার জ্বলন্ত নিদর্শন। আমার বিশ্বাস মাতৃজাতির প্রতি সম্মান আছে বলিয়া পাশ্চাত্য জাতি জগতে এত উন্নতি লাভে সমর্থ হইয়াছে। এই প্রীতির প্রতিমূর্তি মাতৃজাতির উন্নতিতে জগতের স্ত্রী ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। এই জন্য শাস্ত্রকারগণ, এই নারী-জাতিকে গৃহলক্ষ্মী বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন।” একদিন সন্ধ্যার পর নীচাশয়গণের আড্ডায় ভুবন মােহনের উল্লিখিত কথার সমালােচনা আরম্ভ হইল। একজন বলিল, “পণ্ডিত তবে কি বাস্তবিকই সাধু? অন্য একজন বলিল, “মুখে অমন সাধু অনেকেই হইতে পারে, কাজে হয় তবে ত?” তৃতীয় ব্যক্তি কহিল, “পণ্ডিত যদি অত সাধু তবে রাত্রে ঘরে থাকে না কেন ? প্রঃ বাঃ। সে নাকি আগে আরৰী পাশি পড়তে যেত? দি ব্যঃ। পড়ে কি সারা রাত ? আমি যে একদিন শেষ রাত্রে চুপি চুপি ফিরে আসতে দেখেছি।
মহর্ষি তুবন মােহন তৃতীঃ ব্যঃ। আরে ডুব দিয়া জল খেলে একাদশীর বাবাও জানেনা। আমাদের মুকুন্দ বাবু হচ্ছেন সােজা লােক। পণ্ডিত ভয়ানক চালাক, তাই সে ঐরূপ দুই চারটি বােল চাল দিয়ে তাকে ভুলিয়ে ফেলেছে। প্রঃ ব্যঃ। রমণী মাত্রে মা,-এর উপর আর কথা কি ? দ্বিঃ ব্যঃ। আরে দাদা! এ কথাটা বুঝলে না? ঐটিই ত চাল। ও যে ব্রাহ্ম! ব্রাহ্মদের এতদিন সকল স্ত্রীলােকই ভগিনী ছিল। ইনি এখন ‘ভগিনী’ পালটিয়া ‘মা’ বুলি ধরেছেন। আচ্ছা, সে যে সকল স্ত্রীলােককে “মা” বলে তাহারা বৃদ্ধা। কোনও যুবতীকে মা বলিয়া ডাকতে দেখেছ কি ? তখন সকলেই বলিল, “না, তাত দেখি নাই।” বাস্তবিক পক্ষে কখনও কোন যুবতীর সহিত ভুবন মােহনের কথা বলিবার কোন কারণ কোথাও ঘটে নাই। তৃতীয় ব্য। আজকাল পণ্ডিত আবার আর এক ঢং ধরেছে। এক ঔষধের বাস করেছে, তাই নিয়ে বাড়ী বাড়ী ঘুরে ঔষধ বিতরণ করে। পণ্ডিত মানুষ, বাড়ীর অবস্থাও তেমন ভাল নয়। আবার ঔষধ বিতরণ কেন? প্র: ব্যঃ। হাঁ, তাও একটা কথা বটে! তা যাক, না হয় প্রথম প্রথম শিক্ষার সময় দুই এক ফোটা ঔষধ দিলেই বা। কিন্তু যেচে বাড়ী বাড়ী গিয়া চিকিৎসা করা কেন? আর চিকিৎসাই বা করলে, তার পর আবার রােগীর শুশ্রুষার জন্য তার বাড়ীতে পড়ে থাকার মানে কি? বাড়ীর লােকে কি ওষ। জানে না? না,সে বাড়ীর লােকের চেয়ে ভাল শ্ৰষা করে ?
মহর্ষি ভুবন মােহন এইরূপ কথােপকথনের পর সে আড্ডায় সৰ্ববাদী-সম্মতিক্রমে স্থিরীকৃত হইল পণ্ডিত ভুবন মােহন একজন বক-ধার্শ্বিক । তারপর কথা উঠিল,-“তা হলে বিবাহ করে না কেন ?" তাহার সিদ্ধান্ত হইল, পণ্ডিত চালাক লােক, বিবাহ করিলে স্ত্রীকে ভরণ পােষণ করিতে হইবে, আর ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বিধান মত স্ত্রী যার তার সঙ্গে বেড়াবে, পণ্ডিতের তাহা ভাল লাগিবে না, তাই সে বিবাহের বন্ধনে বদ্ধ হইতে অনিচ্ছুক। সে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াবে, কোন খানে বন্ধ হবে না, আর এদিকে লােকেও তাঁহাকে সাধু বলিবে, এই তার ইচ্ছা। অতঃপর প্রথম ব্যক্তি বলিল, “আচ্ছা পণ্ডিত কতদূর সাধু একবার পরীক্ষা করিয়াই দেখা যাউক না কেন?” তখন সৰ্ববাদী-সম্মতিক্রমে তাহাকে পরীক্ষা করাই অবধারিত হইল। দ্বিতীয় ব্যক্তি এই পরীক্ষার ভার গ্রহণ করিয়া তৎক্ষণাৎ সেখান হইতে রওনা হইল। আডডা ভাঙ্গিল। ক্রমে রাত্রি দশটা বাজিল, সকলে আহারান্তে শয়ন করিল। জন- কোলাহলপূর্ণ মুকুন্দ বাবুর বহিৰ্ব্বাটী ক্ৰমে নীরব হইয়া গাঢ় অন্ধকারের ক্রোড়ে যেন বিলীন হইল। কেবল একটী কক্ষে তখন মিটি মিটি আলাে জ্বলিতেছিল, তাহার ক্ষীণ রশ্মী বাহিরে পড়িয়া সেই গাঢ় অন্ধ- কারের তত কিছুই করিতে পারিতেছিল না। এই কক্ষে ভুবন মােহন একান্ত মনে পড়িতে ছিলেন, তিনি আহারান্তে প্রত্যহই অনেক রাত পৰ্য্যন্ত পড়িয়া থাকেন। ক্রমে অন্যান্য কক্ষের সকলে নিদ্রিত হইল। রাত্রি দুই প্রহর অতীত হইয়াছে, তখন তিনি পড়া শেষ করিয়া শয়ন করিতে যাইতেছেন, এমন সময় নিঃশব্দ-পদ-সঞ্চারে এক অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতী তাহার কক্ষে প্রবেশ করিল। যুবতীর বয়স প্রায় অষ্টাদশ বর্ষ ।
মহর্ষি ভুবন মােহন শরীরের বর্ণ কষিত কাঞ্চনের ন্যায় উজ্জ্বল। মুখখানি ঈষৎ দীর্ঘচ্ছন্দ, চক্ষু দুইটি আয়ত ও ভাসা, তাহার উপর বাঁকা যুগল মুখ খানির শােভা বৃদ্ধি করিয়াছে। সেই যুগলের মধ্যস্থলে একটি কাল টিপ পরিয়া যুবতী সেই মুখের শ্ৰী বৰ্দ্ধন করিয়াছে। তাহার তিলকুলােপম নাসিকার অগ্রভাগে একটি নলক দোদুল্যমান। তাহার গণ্ডস্থল ঈষৎ স্ফীত ও লােহিতাভ। মুখখানি লাবণ্যময়, তাহাতে দীপালােক প্রতিফলিত হইয়া অপূৰ্ব্বশােভা বিস্তার করিতেছিল। ক্ষীণ বিধর তাম্বুলরাগে রঞ্জিত হইয়া সেই শােভার গুরুত্ব বদ্ধিত করিতেছিল। তাহার বাহু- যুগল মৃণালের ন্যায় গােল। হস্তে কারুকার্যখচিত রঞ্জিত কাচের চুড়ি। ভ্রমরকৃষ্ণ কেশকলাপে মনােহর ক্ষেপা বান্ধা। সীমন্তে সিন্দুর-বিন্দু মেঘে স্থিরা সৌদামিনীর ন্যায় শােভা পাইতেছিল। ক্ষীণ কোটিতটের নিম্নে সুপ্রশস্ত নিতম্বে একগাছি চন্দ্রহার ঝুলিয়া নিতম্বের শােভা বর্ধন করিতেছিল। উরুদ্বয় কদলী বৃক্ষের ন্যায় স্কুল। যুবতী সেই তপ্তকাঞ্চনাভ দেহখানি একখানি নীলাম্বরী সাড়ীতে সুশশাভিত করিয়া মুখখানি ও পীনােত স্তনযুগল অৰ্দ্ধাবৃত করতঃ ভুবন মােহনের সম্মুখীন হইল। এত রাত্রে তাহার শয়ন কক্ষে সেই যুবতীকে দেখিয়া তিনি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে ? কিজন্য এত রাত্রে এখানে আসিয়াছ?” যুবতী তাহার প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া ঈষৎ মধুর হাসি হাসিয়া অপােবদনে গণ্ডদেশে হস্ত স্থাপন করিয়া, পদাঙ্গুষ্ঠে মাটী খুঁড়িতে খুঁড়িতে লজ্জা-বিজড়িত কণ্ঠে কহিল, “আমি আপনার নিকট আসিয়াছি। আমার স্বামী আমাকে দেখিতে পারে না।”-যুবতীর মনােভাব বুঝিতে পারিয়া তিনি একেবারে স্তম্ভিত হইলেন,তিনি ৮৪ মহর্ষি ভুবন মােহন ; ভাবিলেন, হায় এ আবার কি? তখন তিনি প্রাণ ভরিয়া ভগবাকে ডাকিলেন, “প্রভো! এ আবার তােমার কেমন লীলা, পিতঃ ! মঙ্গল- ময়। আজ এই অধম সন্তানকে এই দারুণ প্রলােভনের হস্ত হইতে রক্ষা কর। তুমি যে এ দুৰ্বল হৃদয়ের একমাত্র বল, তুমি রক্ষা না করিলে এসময়ে আর কে রক্ষা করিবে ?” এইরূপ চিন্তা করিয়া তিনি একবার মাতৃচরণ স্মরণ করিলেন, হৃদয়ে মাতৃভাবের উদয় হইল ;-অমনি যুবতীকে কহিলেন, “মা! এত রাত্রে কেন এসেছ মা? আমি যে তােমার সন্তান মা।” এই বলিয়া তিনি “মা” “মা” বলিয়া কান্দিয়া ফেলিলেন। তাঁহার মুখ হইতে দিব্য জ্যোতিঃ বিকীর্ণ হইতে লাগিল, সে জ্যোতি রমণীর নিকট অগ্নিশিখাবৎ বােধ হইতে লাগিল। সে ভীতা হইয়া সাষ্টাব্দে ভুবন মােহনকে প্রণাম করিয়া, “বাবা, আমাকে ক্ষমা করুন, আমি অন্যের অনুরােধে আপনার নিকট আসিয়াছিলাম।” এই বলিয়া তথা হইতে দ্রুতপদে প্রস্থান করিল। বাহিরে অদূরে সেই ষড়যন্ত্রকারিগণ অপেক্ষা করিতেছিল,তাহারা ভুবন মােহনের “মা” “মা” বলিয়া উচ্চ বােদন শুনিতেছিল, সেই সময় যুবতী ক্ষুন্ন মনে তাহাদের নিকট আসিয়া সমুদায় বিষয় বিবৃত করিল। তাহারা শুনিয়া অবাক হইয়া রহিল। এইরূপে ভুবন মােহন দারুণ অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া বিশুদ্ধ স্বর্ণের ন্যায় শােভা পাইতে লাগিলেন। পাষণ্ডগণও তাহাকে বিশেষ ভক্তি করিতে লাগিল। সেই হতভাগিণী রমণী পাের্জনার এক সূত্রধরের কন্যা ছিল। কতিপয় নীচাশয়ের পরামর্শে স্বামী গৃহ ত্যাগ করিয়া পিত্রালয়ে থাকিয়া পাপ পথ অবলম্বন করিয়াছিল। এই ঘটনার পর তাহার মনে ধিক্কার জন্মিল, সে পাপপথ পরিত্যাগ করিয়া মহষি ভুবন মােহন স্বামীর অনুগামিনী হইল। দিনাজপুরেও কয়েকজন পাষণ্ড তাহাকে এইরূপ পরীক্ষা করিয়াছিল। জিতেন্দ্রিয় ভুবন মােহন তাহাদের নিকটও এই রূপ অতুল চরিত্রবলের পরীক্ষা প্রদান করিয়া তাহাদের ভক্তি ভাজন হইয়াছিলেন। পোর্জনা পরিত্যাগ । পণ্ডিত ভুবন মােহন পরহিতব্রত ও ধর্মপরায়ণতায় যেরূপ সাধারণের ভক্তি-ভাজন হইয়াছিলেন সেইরূপ আবার কর্তব্য-নিষ্ঠা ও অধ্যাপনা-নৈপুণ্যে শিক্ষা বিভাগের কর্তৃপক্ষের চিত্তাকর্ষণে সমর্থ হইয়া ছিলেন। তাহার আগমনের পর হইতেই পাের্জনা স্কুল প্রতি বৎসর রাজশাহী বিভাগের মধ্য-বাঙ্গালা বিদ্যালয় সমূহের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করিয়া আসিতেছিল। তাহার অগাধ সংস্কৃত-জ্ঞান ও বিদ্যারত্ন উপাধি প্রাপ্তির কথা বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ অবগত হইয়া তাহাকে পদোন্নতির আশা দিয়াছিলেন। ১২৭২ বঙ্গাব্দে (ইং ১৮৬৫ খৃঃ অঃ) দিনাজপুর জেলা স্কুলের হেড পণ্ডিতের পদ শূন্য হইলে তিনি ঐ পদের জন্য আবেদন করিলেন। কর্তৃপক্ষ তাহাকেই ঐ পদে নিযুক্ত করিয়া গুণের সম্মান প্রদর্শন করিলেন। মফঃস্বলের সাহায্যকৃত মধ্য- বাঙ্গালা স্কুলের শিক্ষকতা হইতে একেবারে জেলা স্কুলের হেডপণ্ডিতের পদ প্রাপ্তি স্বপ্নাতীত উন্নতি বলিতে হইবে। অন্য কেহ এরূপ আশা- মহর্ষি ভুবন মােহন তীত উন্নতি লাভ করিলে হয়ত অহঙ্কারে আত্মহারা হইয়া যাইত; কিন্তু ভুবন মােহন যেমন তেমনই থাকিলেন। তিনি চিরদিনই, *দুঃখেধনুদ্বিগ্নমনা সুখে বিগতস্পৃহঃ।” তাই তাহাকে দিনাজপুর-বাসী ঋষি বলিয়া পূজা করিত। তাঁহার এই পদোন্নতিতে পােৰ্জনা স্কুলের শিক্ষক, ছাত্রগণ ও সর্ব সাধারণ হরিষ-বিষাদে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল। পণ্ডিত মহাশয়ের ন্যায় মহাত্মার পদোন্নতিতে তাহারা সকলে যার পর নাই আনন্দিত হইল; কিন্তু তিনি তাহাদিগকে ছাড়িয়া যাইবেন, কে আর তাহাদিগকে অমন মধুর স্নেহ-বাক্যে সন্তুষ্ট করিবে? কে আর তাহাদিগকে বিনামূল্যে ঔষধ দিয়া বচাইবে? কে আর তাহাদের রােগ-শয্যার পার্শ্বে বসিয়া মধুর বচনে আশ্বাস দিয়া অক্লান্ত ভাবে পরিচৰ্য্যা করিবে ? তাই ভাবিয়া তাহারা দুঃখের সাগরে ভাসিল। প্রতিদিন দলে দলে গ্রাম ও গ্রামা- স্তরের লোেক তীর্থযাত্রীর ন্যায় তাহার সহিত আসিয়া দেখা করিতে লাগিল। তিনি সস্নেহ বচনে সকলের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া পাের্জনাবাসিগণকে কঁাদাইয়া নিজেও তাহাদিগের সহিত কাদিয়া পনর বৎসর পর জন্মের মত পাের্জনা পরিত্যাগ করতঃ দিনাজ পুর রওনা হইলেন। ৮ একাদশ অধ্যায়। দিনাজপুর। ব্রাহ্ম-সমাজ ও ব্রাহ্ম-মন্দির প্রতিষ্ঠা। সে সময় দিনাজপুর আসিতে রেল হয় নাই; নৌকা পথে ও পদ- ব্ৰজে বা গাে গাড়ীতে আসিতে হইত। পণ্ডিত ভুবন মােহন এই সুদীর্ঘ দুর্গমপথ অতিক্রম করিয়া আসিতে লাগিলেন তখন তাহার মনে নানা চিন্তা উদিত হইল। তিনি চির দিন মধ্যবাঙ্গালা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিয়া ছাত্রগণকে বাঙ্গালা পড়াইয়াছেন,কিন্তু সংস্কৃত ভাষা কখনও শিক্ষা দেন নাই। তিনি এই প্রথম সংস্কৃত শিক্ষা দিতে চলিলেন, কৃতকার্য হইতে পারিবেন কি ? আবার ভাবিতে লাগিলেন দিনাজপুর কখনও দেখেন নাই, শুনিয়াছেন স্থানটা অস্বাস্থ্যকর, শরীর টিকিবে কি না, এইরূপ নানা চিন্তা করিতে লাগিলেন। অবশেষে মঙ্গলময়ের পাদ-পদ্মে সমস্ত ভার অর্পণ করিয়া যথাকালে দিনাজপুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন দিনাজপুরের অবস্থা অত্যন্ত শশাচনীয় ছিল। সহরে লােক- সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশই খড়ের ঘর। অনেক আফিস আদালত পৰ্য্যন্ত খড়ের ছিল । তখন এমন একটী হােটেল ছিল না, যেখানে কোন ভদ্রলােক আসিয়া থাকিতে পারে। ভুবন মােহনের নর্মাল স্কুলের সহাধ্যায়ী চন্দ্রমােহন সেন বালুবাড়ীতে ছিলেন। তিনি ট্রেনিংস্কুলের শিক্ষকতা করিতেন। ভুবন মােহন তাহার বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলেন। বহুদিন পরে দুই বন্ধুর মিলন হওয়ায় উভয়েই ৮৮ মহর্ষি ভুবন মােহন পরম আনন্দিত হইলেন, উভয়ের কত আলাপ হইল, কত প্রাণের কথা হইল। ভুবন মােহন সেই বাসায়ই পরম সমাদরে বাস করিতে লাগিলেন। কিছুদিন পর কয়েকটী ছাত্র ও অফিসের আমলা লইয়া তনি বালুবাড়ীতে একটা মেস খুলিলেন। এক্ষণে যে স্থানে রজনী বাবু মােক্তারের বাসা হইয়াছে, ঐ স্থানেই ভুবন মােহনের মেস প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। পরে ১৮৬৭ খৃঃ অব্দে বর্তমান বাড়ী ক্রয় করিয়া বাস করিতে লাগিলেন। মধ্যম ভ্রাতা আনন্দচন্দ্র ইতঃপূৰ্বেই ফরিদপুরের কাব্য পরিত্যাগ করিয়া রংপুর পুলিশের দারােগা হইয়াছিলেন। একটা ডাকাতি মােকদ্দমা তদন্ত কালে তাহার জীবন শঙ্কটাপন্ন হওয়ায় ভুবন মােহন তাহাকে আনাইয়া ওকালতি পাশ করলেন এবং ঠাকুরগাঁ মহকুমায় উকিল করিয়া দিলেন। দিনাজপুরে কোন ব্রাহ্ম-মন্দির ব্রাহ্ম-সমাজ ছিল না। জেলা স্কুলের হেড মাষ্টার বাবু কৃষ্ণ কুমার সেন ব্রাহ্মধর্ম বিশ্বাসী পরম ভক্ত ছিলেন, তদ্ভিন্ন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী লােকের সংখ্যা বেশী ছিল না। কৃষ্ণকুমার বাবু দিনাজপুর আসিয়া কাহারও সহিত ধর্মালােচনা করিয়া এপৰ্যন্ত সুখী হইতে পারেন নাই। তিনি প্রতি শনিবার ছুটির পর ছাত্রদিগকে নীতি ও ধর্ম সম্বন্ধে উপদেশ দিতেন। ভুবন মােহনকে তিনি প্রথমে চিনিয়া উঠিতে পারেন নাই। তাঁহার আগমনের পরবর্তী শনিবার যখন হেড মাষ্টার বাবু ছাত্রগণকে উপদেশ দিতে লাগিলেন, পণ্ডিত মহাশয়ও তথায় উপস্থিত হইলেন। কৃষ্ণকুমার বাবুর অনুরােধে পণ্ডিত মহাশয় দুই একটা কথা বলিলেন। তাহার সেই নীতিজ্ঞান-পূর্ণ উপদেশে হেড মাষ্টার বাবু ও ছাত্রগণ পরম মহর্ষি ভুবন মােহন পরিতৃপ্তি লাভ করিলেন। তাঁহার ধর্মোচ্ছাস দেখিয়া কৃষ্ণকুমার বাবু তাহাকে একজন পরম ভক্ত বলিয়া জানিলেন। সেই হইতে তিনি তাহার সহিত ধৰ্ম্মালােচনা করিয়া শান্তি লাভ করিতে লাগিলেন। ভুবন মােহনের একটী একতারা ছিল; তিনি তাহা লইয়া রাত্রে একাকী প্রেমময়ের নাম কীৰ্ত্তন করিতেন। কিন্তু তাহাতে তাহার প্রাণের আকাঙ্ক্ষা মিটিত না। একদিন কথায় কথায় তিনি কৃষ্ণকুমার বাবুকে কহিলেন, “সকলের সমবেত সুললিত সংকীৰ্ত্তনে প্রাণ যেমন মাতােয়ারা হয় একাকী ঘরে বসিয়া তাহার নাম কীর্তনে সেরূপ আনন্দ হয় না। আমার ইচ্ছা হয় উপাসনার জন্য স্বতন্ত্র একটা গৃহের ব্যবস্থা করি, কিন্তু অর্থাভাবে তাহা ঘটিতেছে না।” কৃষ্ণকুমার বাবু তাহার এই যুক্তিপূর্ণ বাক্যের যাথার্থ্য উপলব্ধি করিলেন এবং উপাসনার জন্য মালদহি-পটীতে একটা কোঠাঘর ভাড়া করিয়া লইলেন। ১৮৬৬খ্রষ্টাব্দে এই ঘরেই সর্বপ্রথম ব্রাহ্ম সভার প্রতিষ্ঠা হইল। সভা প্রতিষ্ঠিত হইলেও কিন্তু সভ্য তেমন জুটিল না। হেড মাষ্টার ও হেড পণ্ডিত মহাশয় আর তাহাদের দুই এক জন ছাত্র এখানে সমবেত হইয়া উপাসনাদি করিতেন। উপাসনার ভার হেড মাষ্টার বাবুর উপর ছিল, কিন্তু তিনি তাহা অনেক সময় ভক্ত ভুবন মােহনকেই অৰ্পণ করিতেন । তখন সহবাসীর ধারণা ছিল ব্রাহ্মধর্ম বিলাত-প্রত্যাগত জাতি-ভ্রষ্ট পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণশীল বিলাসিগণ ও তাহাদের পদাঙ্কানুসারী অসংযামগণের খাম-খেয়ালের রঙ্গভূমি ; উহা খ্ৰীষ্ট ধর্মেরই রূপান্তর মাত্র। কিন্তু যখন তাহারা পণ্ডিত মহাশয়ের সত্বগুণের পরিচয় পাইলেন, যখন তাঁহার মুখে শুনিতে পাইলেন উহা আৰ্য ঋষিগণের মহর্ষি ভুবন মােহন অবলম্বিত আরণ্য ধৰ্ম্ম, তখন অনেকেই আসিয়া সেই সভায় যােগ দান করিতে লাগিলেন। পণ্ডিত মহাশয় এই সভার সহকারী সম্পাদক হইলেন। তাহার যত্নে সাধু অঘােরনাথ বৎসরে দুই তিনবার দিনাজপুর আসিয়া ব্রাহ্ম সভায় বক্তৃতা করিতে লাগিলেন। একবার তিনি মালদহ হইয়া দিনাজপুর আসিতেছেন। তখনও রেল হয় নাই। রাস্তাও জঙ্গলাকীর্ণ। পথিমধ্যে একদল ডাকাইত তাহাকে আক্রমণ করিল। সাধু তাহাদিগকে বলিলেন, “আমার সঙ্গে কিছু নাই, কেন তােমরা আমাকে আক্রমণ করিতেছ?” ডাকাইতগণ কহিল, চুপরাও, আভি তােমকো জান নেকাল দেগা।” তখন সাধু বলিলেন, “যদি একান্তই তােমরা আমাকে বধ করিবে তবে একটুকু অপেক্ষা কর, আমি একবার প্রাণ ভরিয়া জন্মের মত ভগবানকে ডাকিয়া লই।” এই বলিয়া তিনি ভূমিতলে বসিয়া ধ্যানমগ্ন হইয়া অতি সুললিত স্বরে নাম কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন, ডাকাইতগণের কঠিন হৃদয়ও সে কীৰ্ত্তনে ক্ষণেকের জন্য দ্রবীভূত হইল, তাহারা তাহার প্রাণনাশের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিল। তাহারা তাহার প্রাণনাশ করিল না বটে, কিন্তু তাহাদের আরব্ধ কাৰ্য্য নিষ্ফল হইতে দিল না,—তাহারা তাহার পরিহিত বস্ত্র ও উত্তরীয় খানি কাড়িয়া লইল। সাধু, ভগবানকে ধন্যবাদ দিতে দিতে মাজায় কতকগুলি লতা পাতা জড়াইয়া দিনাজপুরাভিমুখে চলিতে লাগিলেন। পথে একজন কৃষক তাহার ঐ অবস্থা দেখিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি তাহাকে দুর্ঘটনার কথা বলিলেন। তঁাহার কথা শুনিয়া কৃষকের হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হইল। দরিদ্র কৃষক তাহাকে একখানি শত গ্রন্থিযুক্ত মলিন বস্ত্র আনিয়া দিল, সাধু পরমা মহর্ষি ভুবন মােহন নন্দে তাহা পরিয়া দিনাজপুর আসিলে, কৃষ্ণকুমার বাবু তাহার দুরবস্থা দেখিলেন এবং দুর্ঘটনার কথা শুনিলেন । তিনি তৎক্ষণাৎ বাজার হইতে এক জোড়া কাপড় আনাইয়া সাধুকে পরিতে দিলেন। সাধু একখানা নূতন কাপড় পাইয়া কৃষক-দত্ত জীর্ণ বস্ত্রখানি সযত্নে রাখিয়া দিলেন। কৃষ্ণকুমার বাবু তাহা ফেলিয়াদিতে চাহিলেন, সাধু বলিলেন, “উহা ফেলিবার জিনিষ নহে, উহা বড় আদরের বস্তু, দুঃসময়ে ভগবান দরিদ্র কৃষকের হস্ত দিয়া ঐ বস্তু আমাকে দান করিয়াছেন।” এই বলিয়া তিনি বস্ত্রখানি ফেলিতে দিলেন না। কৃষ্ণকুমার বাবুর প্রদত্ত অপর বস্ত্রখানি তিনি একজন অন্ধকে দান করিলেন এবং বললেন, “তিন খানি কাপড়ে আমার কোন প্রয়ােজন নাই। সাধু অঘাের নাথের এই কথা শুনিয়া দিনাজপুরবাসী সকলেই তাঁহাকে দেখিবার জন্য ব্যাগ্র হইল। সকলেই তাহাকে ভক্তি করিতে লাগিল। তার পর তাঁহার ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি সম্বন্ধে উপদেশ-পূর্ণ ওজস্বিনী বক্তৃতা শুনিয়া দিনাজপুর-বাসীর ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ কমিয়া গেল। দলে লােক ব্রাহ্মসমাজে গিয়া যােগদান করিতে লাগিল। তখন মালদহ-পট্টীর সেই ক্ষুদ্র গৃহে আর স্থানসঙ্কুলন হইল না। তখন ভুবন মােহন বালুবাড়ীতে নিজ বাসার সম্মুখেই ব্রহ্ম-মন্দির নির্মাণের জন্য একটি স্থান মনােনীত করিলেন। আদর্শ হিন্দু স্বর্গীয় সার মহারাজ গিরিজা নাথ রায় বাহাদুর ঐ স্থানটী ব্রাহ্মসভার জন্য দান করিয়া উদারতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন। সভার জন্য একখানি খড়ের ঘর নিৰ্ম্মিত হইল। এই সময় আচাৰ্য বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী দিনাজপুরে শুভাগমন দলে ।
মহর্ষি ভুবন মােহন করিলেন। তঁাহার হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতায়, দিনাজপুর মাতিয়া উঠিল। বহু ভদ্রলােক আসিয়া ব্রাহ্ম-ধর্মে দীক্ষিত হইলেন। কৃষ্ণকুমার বাবু তখন বদলী হইয়া গিয়াছেন। সকলেই তখন পণ্ডিত ভুবন মােহনের প্রাণস্পর্শী-উপাসনায় মােহিত হইয়াছেন। স্বয়ং বিজয় কৃষ্ণ তাহার অপূর্ব প্রেমােন্মাদনা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। সভ্যগণ তাঁহাকে ব্রাহ্ম সভার সম্পাদক ও আচাৰ্য পদে মনােনীত করিলেন এবং তাহাকে যথারীতি দীক্ষিত করিবার জন্য গােম্বামী মহাশয়কে অনুরােধ করিলেন । গােস্বামী মহাশয় বলিলেন, “উহাকে আমি কি দীক্ষা দিব? ইনি দীক্ষার সীমা অতিক্রম করিয়া অতি উচ্চতর স্তরে আরােহণ করিয়া- ছেন। হৃদয়ে ব্রহ্মভাব উদ্দীপিত করাই দীক্ষার প্রয়ােজন। যাহার ব্ৰহ্মভাব স্বতঃ উদ্দীপিত, তাহার দীক্ষার আবশ্যকতা কি? যাঁহার জীবন ব্ৰহ্ম-ভাবে উদ্ভাসিত, যাহার জীবন ব্ৰহ্মপ্রেমে বিগলিত, তাহার নিকট সকলেই দীক্ষিত হইতে পারে। দিবা- লােকে যেমন মশালের প্রয়ােজন হয় না, সেইরূপ ব্ৰহ্ম-জ্ঞানালােকে যাহার হৃদয় আলােকিত তাহারাও দীক্ষার আবশ্যক করে না। পরম পিতা পরমেশ্বরই ইহার দীক্ষা- দাতা। ইহার হৃদয়ের বাঁধ ছিড়িয়াছে, মােহের আঁধার ঘুচিয়াছে ,-ঘুমের ঘাের ভাঙ্গিয়াছে। এখন ইনি যে তত্ত্বজ্ঞ, তত্ত্বদর্শী ও প্রবুদ্ধ তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।” গােস্বামী মহাশয়ের কথায় সভ্যগণ অসঙ্কুচিত চিত্তে অদীক্ষিত ভুবন মােহনকেই সমাজের সম্পাদক ও আচাৰ্য্যরূপে বরণ করিলেন। তিনি আমরণ এই পদে প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া, সমাজের কল্যাণ সাধন করিয়া গিয়াছেন। তিনি অঘােরনাথের বা বিজয় কৃষ্ণের ন্যায় সুবানা হইলেও তাঁহার । ৯৩ মহর্ষি ভুবন মােহন ভক্তি-ভাববাদ্দীপক কথাগুলি কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিত, আর তাহাতে পাষাণ-হৃদয়ও গলিয়া যাইত। অঘাের নাথ ও বিজয় কৃষ্ণের বক্তৃতায় সহরবাসী ধৰ্ম্ম-পিপাসায় অধীর হইয়াছিলেন, পণ্ডিত ভুবন মােহন তাঁহাদিগকে ধর্মামৃত দানে পরিতুষ্ট করিতে লাগিলেন। দিন দিন ব্রাহ্মসমাজের শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল,—উত্তরােত্তর সভ্য সংখ্যা বাড়িতে লাগিল। সহরের নানা স্থান হইতে নানা শ্রেণীর লােক আসিয়া ব্রাহ্মসমাজে যােগদান করিতে লাগিলেন। বালুবাড়ীর সেই ঘরে স্থান সঙ্কুলন হওয়া কঠিন হইয়া উঠিল। স্থানাভাবে উৎসবাদি মােকার রজনী বাবুর বাসায় চলিতে লাগিল। এতব্যতীত অনেক সভ্য, সভাগৃহ সহরের কেন্দ্রস্থানে না হওয়ায় অনেকের যাতায়াতের অসুবিধা বলিয়া আপত্তি উত্থাপন করিলেন। তখন সেই অসুবিধা দূরীকরণ অন্য ভুবন মােহন কৃতসঙ্কল্প হইলেন এবং সহরের মধ্যস্থানে গনেশতলায় বর্তমান ব্রাহ্মসভার স্থানটি ক্রয় করিয়া বঙ্গীয় ১২৯১ সনের ১১ই মাঘ ব্রাহ্ম-সভ্যগণের চান্দা দ্বারা অদম্য উৎসাহ ও অক্লান্ত পরিশ্রমে বর্তমান ব্রাহ্ম-মন্দির স্থাপন করিলেন। এই মন্দিরের সম্মুখেই তাহার চিতাভস্ম প্রােথিত করিয়া তদুপরি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হইয়াছে। বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী ও সাধু অঘাের নাথ প্রভৃতি মহাত্মাগণের সংসর্গে ও প্রতিনিয়ত ধর্মালোচনায় পণ্ডিত ভুবন মােহন উত্তরােত্তর ধৰ্ম্মের উচ্চতর সােপানে আরােহণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার হৃদয়ে প্রেমের বন্যা দিন দিন প্রবলতর হইতে লাগিল। উপাসনার সময় প্রেমে অধীর হইয়া কান্দিয়া ফেলিতেন,তখন সে প্রেমের বন্যা ১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন তাহাকে ভাসাইয়া সভ্যগণের দিকে ছুটিত, সভ্যগণও কান্দিয়া আকুল হইতেন। নিতান্ত শয্যাশায়ী না হইলে উপাসনার দিন কখনও তিনি অনুপস্থিত থাকিতেন না। যদি তেমন অবস্থায় কোন দিন না যাইতে পাড়িতেন তবে কত দুঃখই প্রকাশ করিতেন,-বলিতেন, “বােধ হয় কোনও অজ্ঞাত পাপে আমার উপাসনার ব্যাঘাত ঘটিল,-ভক্তগণের সঙ্গ লাভে বঞ্চিত হইলাম।” আবার এদিকে তিনি অনুপস্থিত থাকিলে সভ্যগণ যুথপতিহীন মাতঙ্গ দলের ন্যায় নিতান্ত নিরুৎসাহ হইয়া পড়িতেন। ফলতঃ তিনিই ব্রাহ্মসমাজের প্রাণ এবং ব্রাহ্মসমাজই তাঁহার প্রাণ ছিল। সৰ্ব্ব ধৰ্ম্মের সম্মান। পণ্ডিত ভুবন মােহন ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ সেবক হইলেও অন্য ধর্মের কখনও নিন্দা করেন নাই। তিনি সকল ধর্মেরই সম্মান করিতেন। একবার কলিকাতা হইতে জনৈক ব্রাহ্মধৰ্ম্ম-প্রচারক দিনাজপুর আসিয়া ব্রাহ্মমন্দিরে দুই দিন বক্তৃতা করিলেন। তৃতীয় দিবস রেলওয়ে ষ্টেসনের নিকট একটা বৃহতী সভার আয়ােজন হইল । তথায় ভারতের আদি ধৰ্ম্মসম্বন্ধে বক্তৃতার জন্য প্রচারক মহাশয় অনুরুদ্ধ হইলেন। পণ্ডিত ভুবন মােহন ও তথায় নিমন্ত্রিত হইয়া গিয়াছেন। প্রচারক মহাশয় সুললিত কণ্ঠে ও ভাষার পারিপাট্যে শ্রোতৃ বৃন্দের শ্রুতি-সুখােৎপাদন করিয়া বক্তৃতা শেষ করিলেন। বক্তৃতান্তে পণ্ডিত মহাশয়ের নির্দেশানুযায়ী শাস্ত্রালােচনা হইবার কথা ছিল। পণ্ডিত মহাশয় শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাঠের প্রস্তাব করিলেন।
মহর্ষি ভুবন মােহন শুনিয়া প্রচারক মহাশয় অবাক্ হইয়া পড়িলেন। তিনি নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া, ব্রাহ্মসভায় হিন্দু-শাস্ত্ৰালােনার অযৌক্তিকতা দেখাইয়া এক আপত্তি উত্থাপন করলেন। ধর্ম প্রাণ ভুবন মােহন, প্রচারকের ভিত্তি হীন আপত্তিতে বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “এই বিবিধ বৈচিত্রপূর্ণ বিশ্ব- জগতের শ্রষ্ঠা যদি, একমাত্র পরম পিতা বিধাতা হন, আমার বিশ্বাস, সকল ধর্মের স্রষ্টা বিধাতাও তিনি। বিভিন্ন ধর্ম সমূহ, সেই পরাৎপর পরম পিতার চরণ-প্রান্তে পৌঁছিবার পথ মাত্র। কোন স্থানে পৌছিবার নিমিত্ত যেমন নানা দিকে পথ থাকে,তাহার কোনটি বক্র, কোনটি সােজা, কোনটি জলময়, কোনটি বন্ধুর বা অরণ্যময়, যে কোনটি অবলম্বন করিলেই সেই গন্তব্য স্থানে গমন করা যায়, সেইরূপ যে কোন ধর্মাবলম্বন কর, অন্তিমে সকলেই পরম পিতার পদ-প্রান্তে মিলিত হইতে পারিবে, ইহা আমার প্রাণগত ধারণা ও বিশ্বাস। ভগবানই ধর্ম স্বরূপ। যার যে ধর্মে বিশ্বাস তিনি সেই ধর্মেই তাহাকে প্রাপ্ত হইবেন সন্দেহ নাই। সুতরাং ধর্মের নিন্দা করিলে প্রকারান্তরে ভগবানেরই নিন্দা করা হয়। সকল ধর্মেরই মূলাধার, ব্রহ্ম। মূলধৰ্ম অব্যক্ত,-তাহ। আত্মার নিকেতনে নিহিত। আত্মা দ্বারা আত্মাকে জানিলে সেই সর্ব- জনীন,বিশ্বজনীন ধর্মকে জানা যায়। তাই মহা যােগ মহাদেব জ্ঞান-সঙ্কলিনী তন্ত্রে পার্বতীকে উপদেশ দিয়াছেন, “উচ্ছিষ্টং সৰ্ব্ব শাস্ত্ৰানি সর্ব বিদ্যা মুখে মুখে নােচ্ছিষ্টং ব্ৰহ্মণে জ্ঞানমব্যক্ত চেতনাময়। যাবর্ণং কুলসৰ্ব্বং তাবৎজ্ঞানম্ ন জাতে ব্রহ্মজ্ঞানং পদং জ্ঞাহ সব বর্ণ বিবর্জিত।
মহর্ষি ভুবন মােহন সৰ্ব্ব-শাস্ত্রই উচ্ছিষ্ট হইয়াছে, এবং সকল বিদ্যাই মুখে মুখে রহিয়াছে। অর্থাৎ অধ্যয়নাদি দ্বারা সকলেই শাস্ত্র-জ্ঞান লাভ করিতে পারে ; কিন্তু সেই ব্রহ্মজ্ঞান অব্যক্ত,-তাহা ভাষায় ব্যক্ত হইতে পারে না।—শুদ্ধ চেতনা ময়,-কেবল চেতনা বা বিবেক ; ধ্যান-ধারণাদি আত্মজ্ঞান দ্বারাই উপলব্ধ হইতে পারে। এজন্য তাহা এপর্যন্ত উচ্ছিষ্ট হয় নাই। সেই ব্ৰহ্মজ্ঞান না হওয়া পর্যন্তই জাতিকুল-ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে ভেদ-জ্ঞান থাকে, ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করিলে সকল ভেদ-বুদ্ধি তিরােহিত হইয়া যায়। যে দেশের যে সাধকগণ যখন যে ভাবে ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি করিয়াছেন, তাঁহাকে সাধনালব্ধ জ্ঞানরাশিই বিবিধ ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। “বদন্তি তত্ত্ববিদ স্তত্বং মজজ্ঞানমদ্বয় ব্রহ্মোতি, পরমাতঅতি ভগবানিতি শব্দতে সত্য জ্ঞানমনস্তমানন্দং ব্রহ্মেতি।” ‘তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিগণ সেই অদ্বয় অখণ্ড জ্ঞানকেই কেহ আত্মা, পরমাত্মা, ব্ৰহ্ম বা ভগবান্ শব্দে অভিহিত করিয়া থাকেন। সেই গুন পরমা- আতে নিহিত। তাহা অব্যক্ত, একমাত্র উপলব্ধির বিষয়। জীবাত্মা সংসারের সহিত সংশ্লিষ্ট বলিয়া সংসার সম্বন্ধীয় ইন্দ্রিয় ঘটিত যাবতীয় জ্ঞানই জীবাত্মার আশ্রিত। এবং ইন্দ্রিয়-ব্যাপার ঘটিত বলিয়া মন ও বাক্য দ্বারা তাহা ব্যক্ত হইতে পারে। কিন্তু পরমাত্মা অবাঙ-মনােগােচর, -পরমাত্মা, মন, বাকা ও ইন্দ্রিয়গণের অগােচর বলিয়া তাহা অব্যক্ত, একমাত্র আত্মদ্বারা উপলব্ধির বিষয়। সেই পরাৎপর পরমাত্মা পর- ব্ৰহ্ম কে আৰ্য ঋষিগণ যিনি যে ভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন, সেই অব্যক্তকে ব্যক্ত করিবার জন্য,-অল্প বুদ্ধি মানবের বােধগম্যের জন্য, ১৭ মহর্ষি ভুবন মােহন ভাবে অসামান্য শক্তি বিশিষ্ট ভগবান্ প্রভৃতি আখ্যা দিয়া উপন্যাস- কারে চিত্রিত করিয়াছেন। একই ব্ৰহ্ম-তত্ত্ব রূপক-ভাবে বুঝিলে হিন্দু-শাস্ত্র, আর রূপক-ভাব বাদ দিয়া সারটুকু-আধ্যাত্মিক ভাব গ্রহণ করিলেই পরব্রহ্মতত্ত্ব। সুতরাং ব্রাহ্মসভায় হিন্দুশাস্ত্রের আলো- চনায় কি আপত্তি আছে তাহা জানিনা। সৰ্ব্ব জ্ঞানের সারই ব্ৰহ্মজ্ঞান, এবং সকল ধর্মের সারই ব্রাহ্মধৰ্ম্ম। সকল ধৰ্ম্ম আলােচনা করিয়া, সেই জ্ঞানের অধিকারী হইতে হয়, নতুবা হওয়া যায় না। ব্রাহ্মধৰ্মই সৰ্বধৰ্ম্ম- সামঞ্জসীভূত সার ধর্ম, বিশ্বজনীন ধৰ্ম্ম। অতএব ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্ম-সভায় সকল ধৰ্মই আলােচ্য ও বিবেচ্য। কিন্তু সকল ধৰ্ম্মের সার সত্যটুকুই গ্রাহ। গীতায় পরমাত্মারূপী ভগবান জীবাত্মা-রূপী অর্জুনকে উপদেশ দিতেছেন, আমরা গীতাকে সেই ভাবেই গ্রহণ করিব।” অতঃপর সভ্যগণ পণ্ডিত মহাশয়ের এই যুক্তিপূর্ণ বাক্যের সমর্থন করিলেন,-সভায় শ্রীমদ্ভগবদগীতার ব্যাখ্যা হইল। বিক্রমপুর বাটীতে তাঁহার স্বহস্ত লিখিত একখানা পুরাতন ডাই- রীতেও তাহার এই উদার ধৰ্ম্ম-মতের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি লিখিয়াছেন, “আজ ষষ্ঠী,-মঙ্গলময়ী জগজ্জননীর জন্য তাঁহার সন্তান মাতােয়ারা। -মা আসিবেন,-ভারতব্যাপী এক মহানুষ্ঠান,-মহােৎসবের আয়ােজন হইয়াছে। মা আসিবেন, মঙ্গলময়ীর আবির্ভাবে সকল দুঃখ যাতনা ‘ঘুচিয়া যাইবে, তাহার ভক্ত সন্তান প্রাণ মন দিয়া পূজা করিবে। কিন্তু আমরা তাঁহার প্রকৃত পূজার অধিকারী কি না। আমাদের পূজার উপহার কিছু নাই,-হৃদয়ে ভক্তি নাই, প্রীতি নাই, সেই ভাবে হৃদয়কে ১৮ মহর্ষি ভুবন মােহন প্রস্তুত করি নাই, কি করিয়া তাহার পুজার অধিকারী হইব? তাহাকে আমাদের হৃদয়াসনে বসাইতে পারি কৈ ? তবে কিরূপে তাহার মাঙ্গল্য লাভ করিব ? কিরূপে আমাদের দুঃখ-দৈন্য ঘুচিবে? প্রতি বৎসর শারদীয়া মা আসিতেছেন, কেবল আমোদ-উৎসবেরই মহাড়ম্বর মহাঘটা। চারিদিকে আনন্দ-কোলাহল শুনিতেছি, কিন্তু তাহার প্রকৃত পূজা করিতেছি কি ? প্রকৃত পূজাও হইতেছে না, আমাদের দুঃখ- দৈন্যও ঘুচিতেছে না; হৃদয় বলীয়ান হইতেছে না ! সপ্তমী ২৭শে মঙ্গলবার মঙ্গলময়ীর পূজার দিন উপস্থিত। মা আজ ভক্ত-হৃদয়ে জননী রূপে দেখা দিয়াছেন, তাই আজ কত আনন্দ- ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত। আমি আজ এই শুভ দিনে মহাজনগণের গঞ্জনা, পরিবারের গঞ্জনা সহ্য করিয়া, দুঃখের বােঝা বুকে করিয়া মায়ের মঙ্গল কর নাম স্মরণ করিব তিনি সমস্ত অমঙ্গল বিনাশ করিবেন। তাহার বালুবাড়ী বাসায় উত্তর দিকে একটি ভাঙ্গা মজিদ ছিল, একদিন তিনি দেখিলেন সেই মসজিদে একজন ব্রাহ্মণ বাহে করিতেছে, তিনি তাহাতে নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইলেন, এবং ব্রাহ্মণটি মসজিদ হইতে বাহির হইলে, তাঁহাকে কহিলেন, “ঠাকুর মহাশয় আপনি না হিন্দুর ধর্মগুরু ? আপনি সেই বর্ণ-গুরু ব্রাহ্মণ হইয়া এরূপ একটি অধ্যায় কাজ করিলেন? আপনার ন্যায় সুবােধ লােকদ্বারা ধৰ্ম্মস্থানের মর্যাদা- লঙ্ঘন দেখিয়া বড়ই দুঃখিত ও মর্মাহত হইলাম। যে স্থানে একদিন বিশ্বপূজ্য বিশ্ব-বিধাতার উদ্দেশে ‘আল্লাহহা আকবর! খােদা তালা’! বলিয়া তাঁহার প্রিয় সন্তানগণ তাহার নাম করিয়া, নমাজ উপাসনা করিত, যে স্থানে বিশ্ব-দেবের পীঠস্থান বলিয়া আপনার অপেক্ষা মহা-
.নালান, পীর-দরবেশ, নবাব-বাদসাদেরও,
ইত, যেস্থান ঈশ্বরের সাক্ষাৎ আবির্ভাবস্থান
ণ প্ৰীতি-উপহার ঢালিয়া দিত,আপনি আজ
হসে,—সেই পবিত্র তীর্থে মল ত্যাগ করিয়া
নুযের কাজ?-ঈশ্বরের ন্যায়, ঈশ্বরাধিষ্ঠিত,
এবং পূজ্য।
ঈশ্বরাধিষ্ঠিত স্থানের অবমাননা
না করা হয়। যে স্থানে উপস্থিত হইলে মন
ল হয়, তাহাই তীর্থ ;---
দর, তীর্থং তুলসীকাননং”।
অবমাননা দেখিয়া আপনাকে কটুক্তি প্রয়ােগ
হইবেন না । আপনাকে মন্দ বলি নাই,
ললাম।" ব্রাহ্মণ এই কথা শুনিয়া অবাক
তান্ত লজ্জিত হইয়া বাসায় চলিয়া গেলেম।
বাগদান করিয়া মাড়ােয়ারীগণকে উৎসাহিত
সৰ্ব্ব ধৰ্ম্মানুরাগ ও ভগবদ্বিভূতির উপলব্ধি, কে
ন জানিনা । আমরা তাহাকে কিন্তু এই সকল
গী বলিয়াই ভক্তি করিব। ভগবান্ গীতায়
পশ্যতি সৰ্বত্ৰ সৰ্ব্বঞ্চময়ি পতি।
ন প্রণখামিসচ ন মে প্রণতি।”
ইআমরা তঁাহার সাযুজ্যলাভের স্থির সিদ্ধান্তে
এ কট । শ • নথ উপনীত হইতে পারিয়াছি এবং এই জন্য মহাষ বলিয়া পূজিত হইয়াছেন। ধর্ম সম্বন্ধে উদারত যীশু, মহম্মদ প্রভৃতি ধর্ম প্রচারকগণও ব্যতীত উদ্ধারের অন্য পথ নাই বলিয়াছে, সম্বন্ধে উদার। হিন্দুর বেদ বলিয়াছেন, “একংসৎ, বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি গীতায় আবার ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তাহাই বি শাও এ ', ''ন, "যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাং স্ত মম বত্মানুবর্তন্তে মনুয়াং পাং এ ভুবন মােহন এই উদার মতই হৃদয়ে দে ই তিনি ব্ৰহ্মধৰ্ম্মকে জগতের শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম বলিয়া বিশ্বা , •• ও ধর্ম- বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়েন নাই। যে, যে + সে তাহা যাজন না করিলে তিনি বরং অসন্তুষ্টই হইতেন বালুবাড়ীর স্বর্গীয় রসিক বাবু মােক্তারের :: • ১/২ নিয়ােগী মহাশয়ের একবার ওলাউঠা হইল, একজন ল • 1sউটির নাম জাদা ডাক্তার ও একজন কবিরাজ তাহার অব দ খ বার দিলেন। আমরা অগত্যা অগতির গতি পণ্ডিত মহাশকে শণাপন্ন হইলাম। তিনি তাহার হােমিওপ্যাথিক মতে চিকি?অ! ৪ করিলেন। রােগীর যখন যে অবস্থা হইতে লাগিল তাহাই পণ্ডিত ১হাশয়কে জানানর ব্যবস্থা হইল। বেলা দুই প্রহরের সময় রােগী কালীমূর্তির মহর্ষি ভুবন মােহন বিভীষিকা দেখিয়া প্রলাপ বকিয়া উঠিল। পণ্ডিত মহাশয় তাহা জানিতে পারিয়া কহিলেন, “বাবা! আপনারা সন্ধ্যা বেলা উহার নিকট বসিয়া শ্যামা বিষয়ক গান শুনাইবেন। কারণ ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসে লােককে সঞ্জীবিত করে। বােধ হয় উহার মনে কালী বিষয়ের কোন কল্পনা তখন উদয় হইয়াছিল তাই তিনি এইরূপ বিভীষিকা দেখিয়া ছিলেন। ব্রাহ্মাচার্যের মুখে শ্যামা-সঙ্গীতের উপদেশ শুনিয়া অবাক হইলাম। সন্ধ্যা বেলায় রােগীকে শ্যামা-সঙ্গীত শুনান হইল, অতঃপর পণ্ডিত মহাশয়ের সুচিকিৎসায় সেই ডাক্তার-কবিরাজ-পরিত্যক্ত মুমূয়ু- রােগী আরােগ্য লাভ করিল। একদিন দিনাজপুরের সুপ্রসিদ্ধ ধর্মপ্রাণ জমিদার রায় রাধা গােবিন্দ রায় সাহেব বাহাদুর পণ্ডিত মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এক্ষণে কোন ধৰ্ম ভারতে জাগ্রত মনে করেন?” ব্রাহ্মাচাৰ্য্য পণ্ডিত মহাশয় এস্থলে স্বীয় ধর্মের মান বাড়াইবার জন্য অনায়াসে ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্মকেই জাগ্ৰত ধৰ্ম বলিতে পারিতেন, কিন্তু তিনি তাহা করিলেন না! তিনি অসংঙ্কোচে বলিলেন, “আমার বিবেচনায় মুসলমান-ধৰ্ম্মই এক্ষণে জাগ্রত, কারণ তাহাদের আমীর ওমরাহ ও নবাব হইতে দরিদ্র এবং মৌলবী হইতে নিরক্ষর কৃষক পর্যন্ত সকলেই যথাসময়ে যথারীতি উপাসনা করে, বালকগণ পর্যন্তও রােজা করে ও নমাজ পড়ে। এমন ধর্মনিষ্টা আর কোন সম্প্রদায়ে দেখা যায় না। রায় বাহাদুর পণ্ডিত মহাশয়ের এই নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত শুনিয়া পরম সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি বিশিষ্ট দ্বৈতবাদী বৈষ্ণব হইলেও পণ্ডিত মহাশয়কে প্রকৃত ভগবদ্ভক্ত জানিয়া তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন, পণ্ডিত মহাশয়ও তাহাকে যার পর নাই শ্রদ্ধা মহর্ষি ভুবন মােহন করিতেন। পণ্ডিত মহাশয়ের সম্মতি মতে, ১৮৯৫ সনে তিনি কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিলে, রায় সাহেব বাহাদুর প্রত্যহ তাহার জন্য গগাবিন্দ জীউর ভােগ পাঠাইয়া দিতেন। তিনি ভক্তি সহকারে তাহাই খাইতেন। তিনি অন্তিম কাল পর্যন্ত এই প্রসাদ পাইয়া আসিতে ছিলেন। অপৈশুন্য। গীতায় ভগবান বলিয়াছেন, দৈবী সম্পদ লাভ না করিলে কেহ ভগবদ্ভুক্ত হইতে পারে না। অপৈশুন্য সেই দৈবী সম্পদের একটা সােপান, পণ্ডিত ভুবন মােহন এই গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি কখনও কাহারও নিন্দা করেন নাই। এবং পরনিন্দা তিনি কখনও শুনিতে ভাল বাসিতেন না। একদিন কতিপয় ভদ্রলােক তাহার সমক্ষে দিনাজপুর সহরের একজন দুশ্চরিত্র ভদ্র-সন্তানের নিন্দা করিলেন। তিনি তাহাদের কথায় বিরক্ত হইয়া চুপ করিয়া থাকিলেন। পরে কহিলেন, “আপনারা তাঁহার যে সকল দোষের কথা বলিলেন তাহার সে দোষ থাকিতে পারে কিন্তু আপনাদের নিন্দা করা পাপ। আমি জানি তিনি একজন পরােপকারী মহাপ্রাণ।” বাস্তবিক পক্ষে সেই ভদ্রলােকের দোষরাশির মধ্যে পরােপকারিতা গুণটি বেশ ছিল। ভদ্রলােকগণ তাহা স্বীকার করিলেন এবং পরনিন্দা করার জন্য লজ্জিত হইলেন। সংসার ত্যাগে বাধা। তিনি অনেক দিন হইতেই সংসার বিরাগী হইয়াছিলেন তাহা তাহার মহর্ষি ভুবন মােহন ; বিক্রমপুরস্থ ভবনে লিখিত ডাইরী দৃষ্টেই বুঝা যায়। তিনি লিখিয়া- ছিলেন, “সংসার কেবলই বিষাদের। আমি সংসারের উন্নতির জন্য যে প্রকার চেষ্টা যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া থাকি তাহার একাষ্টমাংশও পরম পুরুষাৰ্থ ধৰ্ম্মার্জনে নিয়ােগ করিলে, সুখশান্তির প্রস্রবণে ভাসমান থাকিতে পারিতাম, অতএব অন্তর্যামী পরমাত্মন ! তােমার নিকট আমার, সর্বান্তঃ- করণে প্রার্থনা যে, আমি যেন তােমার এই মায়াময় সংসার-কণ্টকের যন্ত্রণা সহ্য না করি। অর্থাৎ সংসারে লিপ্ত না হই। হে বিভাে! এইটি আমার অন্তরের কথা। ধৰ্ম্ম ও বিশ্বাসানুযায়ী আচরণ করিলে, যদি জগৎসংসার, আমার আপন বা আমার উপর খড়গহস্ত হয় তাহা যেন আমি সহ্য করিতে পারি। হে পরমেশ! হে পরমেশ! আমাকে ইহা হইতে রক্ষা কর ; আমি বড়ই প্রবল স্রোতে নিপতিত, তােমা ভিন্ন আর আমার অন্য উপায় নাই।” আর তাহার পরদিনের ডাইরীর একস্থানে লিখিয়া- ছেন,-“হে বিভাে। আমার যেন সংসারে মতি না হয়, তােমার চরণে আমার এইমাত্র প্রার্থনা।” এই ভাব লইয়া এত দিন ভুবন মােহন নিলিপ্ত সংসারী হইয়া সংসারে অবস্থিতি করিতেছিলেন। ১৮৮০খৃঃ অব্দে একদিন বালুবাড়ী বাসগৃহে বসিয়া ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতেছেন, এমন সময় উপর হইতে একটি বিড়ালী তাহার স্কন্ধে পতিত হইল। তখন তাহার মনে বৈরাগ্যের স্রোত প্রবল হইয়া উঠিল। তিনি মনে করিলেন, গৃহাশ্রমে থাকিলে ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের এইরূপ নানা বাধা-বিঘ্ন ঘটে বলিয়াই আর্যঋষিগণ অরণ্যে আশ্রয় লইতেন। এই ভাবিয়া তিনিও বনগমনের অভিলাষী হইলেন। সেই কথা ঠাকুর গায়ে তাহার মধ্যমাজ আনন্দ চন্দ্র শুনিতে পাইলেন। এদিকে তাহারও এক বিপদ ঘটিল, তাঁহার ১০৪ মহর্ষি ভুবন মােহন সহধর্মিণী নয় দিনের একটি বালক রাখিয়া পরলােক গমন করিলেন। একদিকে পত্নীর শােক, অপরদিকে শিশু সন্তানের রক্ষা ও ভ্রাতা ভুবন মােহনকে সংসার ত্যাগে নিবৃত্ত করার জন্য তিনি নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন । তাহার বাসায় আত্মীয়-স্বজন কেহ ছিল না, যে সেই মাতৃ হীন শিশুকে প্রতিপালন করিতে পারে। ভুবন মােহনের বাসায় তাহার মাতা ও বিধবা ভাতৃবধূ থাকিতেন। কিন্তু ঠাকুর গাঁ হইতে দিনাজপুর ৩৫ মাইল পথ। গো-গাড়ীই যাতায়াতের একমাত্র উপায়। এই দীর্ঘ পথ সেই অপগণ্ড শিশুকে লইয়া আসাও নিরাপদ নহে। নিতান্ত নিরু- পায় হইয়া আনন্দ চন্দ্র সেই শিশু ও অপর পুত্রকন্যাগণ সহ অবিলম্বে বালুবাড়ী আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং ভুবন মােহনকে কহিলেন, “ভুবন! আমি শুনিলাম তুমি নাকি সংসার পরিত্যাগ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছ। আমি তােমার ধৰ্ম্ম-কার্যে বাধা দিব না, কিন্তু আমার একটি অনুরােধ তােমাকে শুনিতে হইবে,—আমি এই সদ্যোজাত শিশু ও বালক বালিকাগণ লইয়া বিপদ-সাগরে ভাসমান ; ইহাদিগের লালন পালন ও শিক্ষাদান করিবার ক্ষমতা আমার নাই। ইহারা অশিক্ষিত হইয়া পাপাচারী হইলে পিতৃপুরুষগণ নিরগামী হইবেন, আমরাও লােক- সমাজে নিতান্ত নিন্দনীয় হইব। এবং কর্তব্যাবহেলার জন্য আমাদিগকে পাপী হইতে হইবে। আমি আজ ইহাদিগকে তােমার হস্তে অর্পণ করিলাম, এক্ষণে যাহা ভাল বিবেচনা হয় কর।” ভুবন মােহন তখন অনন্যোপায় হইয়া সংসার ত্যাগের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিয়া সেই মাতৃহীন বালক বালিকাগণের ভার গ্রহণ করিলেন। নবজাত শিশুটির জন্য ছাগ- দুগ্ধের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। সময় পাইলেই নিজে তাহার তত্ত্বাবধান মহর্ষি ভুবন মােহন করিতেন। মাতা ও ভ্রাতৃবধু বিধবা; সুতরাং, সৰ্ব্বদা শিশুর পরিচর্যা করা তাঁহাদের পক্ষে অসম্ভব ; আর স্তন্য দুগ্ধ না হইলে বালকের জীবন রক্ষা হওয়াও সম্ভবপর নহে, এজন্য তিনি একটি শিশুকন্যাবতী রাজবংশী জাতিয় স্ত্রীলােককে পরিচারিকা নিযুক্ত করিলেন। শিশু তাহার স্তন্যও খাইতে লাগিল। এই শিশুই আমাদের বর্তমান কৃতী বাবু জগদীশ চন্দ্র কর। শৈশবে মাতৃহীন হইয়াছিলেন বলিয়া পারিবারিক লােক তাহাকে প্রথমে দুখু বলিয়া ডাকিত ; পরে পণ্ডিত মহাশয় নাম রাখিলেন জগদীশ চন্দ্র। এইরূপে বাধা পাইয়া ভুবন মােহন সংসার ত্যাগ করিতে পারিলেন বটে, কিন্তু নির্লিপ্ত যােগীর ন্যায় সংসারে বিচরণ করিতে লাগিলেন। কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজে। দিনাজপুর আসিবার কয়েক বৎসর পর, ভুবন মােহন একবার, মাঘােৎসব উপলক্ষে, কলিকাতায় গেলেন। তখন ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র বৰ্তমান। ব্রহ্মানন্দের অমৃত-বষিণী বক্তৃতায়, তিনি যার পর মাই মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছেন, কেশব চন্দ্রের বক্তৃতা শুনিবার পূর্বে সুদুর্বোধ্য ব্রহ্মতত্ব যে, সরল ও সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যাত হইতে পারে, তাহা তাঁহার ধারণা ছিল না। সেই সময়েই ব্রাহ্মাচাৰ্য বিজয় কৃষ্ণের সহিত তাঁহার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মে। বিজয় কৃষ্ণ, তাহার অতুল ধর্মানু- রাগ ও অসীম ভগবদ্ভক্তি দেখিয়া তাহাকে নিজ বাড়ীতে লইয়া যান। তাঁহার সহধর্মিণী ভুবন মােহনকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতে লাগিলেন। যে কয়েক দিন ভুবন মােহন তথায় ছিলেন সে কয়েকদিন তিনি সহস্তে মহর্ষি ভুবন মােহন ; তাহাকে সযত্নে নানাবিধ নিরামিষ খাদ্য পাক করিয়া খাওয়াইয়াছিলেন। অতঃপর বিজয় কৃষ্ণ দিনাজপুর আসিয়া ভুবন মােহনের আশ্রমেই থাকিতেন ; তাঁহাকে লইয়া সর্বদা ধর্মালোচনা করিতেন এবং গভীর রাত্রিতে তাঁহাকে ধ্যান-যােগদি শিক্ষা দিতেন। ভুবন মােহন স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে যথেষ্ট ভক্তি করিতেন। একবার তিনি কলিকাতায় তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহাকে ভক্তপহার প্রদান করিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও তাহাকে প্রীতি সম্বর্ধনায় সন্তুষ্ট করিয়াছিলেন। এক্ষেত্রে। ১৯১৩ খৃঃ অঃ ডিসেম্বর মাসেভুবন মােহন কতিপয় আত্মীয় ও আত্মীয় সহ পুরী গিয়াছিলেন। জগন্নাথদেবের মন্দিরের নিকট গিয়াই তিনি প্রেম- কুলিত নেত্রে কহিলেন, “এই স্থানই চৈতন্য দেবের শেষ লীলাভূমি।” তিনি জগন্নাথ দর্শন করিয়া যার পর নাই পুলকিত হইয়াছিলেন। তিনি ভক্তি গদ গদ হৃদয়ে পুরীর সমুদায় স্থান পরিভ্রমণ করিয়া দেখিয়াছিলেন। ঐ সময়ে তাহার সঙ্গীয়া ভ্রাতুস্পুত্রী আমাশয় রােগে আক্রান্তা' হয়েন, কিন্তু তিনি তাহাতে বিচলিত না হইয়া প্রেমােঝও ভাবে ভ্রমণ করিতেন। প্রত্যাগমন কালে কলিকাতা হইয়া আসিলেন। সেই সময়ে একদিন দেখিলেন কালীঘাটে একজন গায়ক মধুর কণ্ঠে গাহিতেছে, “এ দুনিয়া গােলক ধাঁধ ভাই মায়ার বাঁধন এ সংসার- এ দেহ ভোের মাটির ছবি- মাটিতে কর বিহার। =
মহষি ভুবন মােহন
কিসের জন্য
মাটি হবে
আতর গােলাপ সাবান মাখ ভাই
এত যত্ন কর কার ?
পতন হলে
শৃগালে করবে মাংসাহার।
দিশে হারা
কিসে এত অহঙ্কার।
এদেহ তাের
চিহ্ন নাহি রবে আর।
ধন জন
পরিবার
মিছে বল আমার আমার
সকল ফাকি
ভেবে দেখ (মন) কেবা কার ?
ভাব হরির
রাঙ্গা চরণ মন আমার ।
শেষের দিনে
সেজন বিনে
অন্য গতি নাহি আর।”
এই গান শুনিয়া ভুবন মোহন ভাবে বিভাের হইলেন। দুই চক্ষে
অবিরল প্রেমের ধারা বহিতে লাগিল।
মুদলে অাখি
নীলকণ্ঠ বলে
অমানিত্ব।
আমরা পূৰ্বেই বলিয়াছি, ব্রাহ্ম ভ্রাতৃগণের ব্যাভিচারে, সর্বত্রই
ব্রাহ্মসমাজের প্রতি সাধারণের অশ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল। ব্রহ্মানন্দ, কেশব
১৮
মহষি ভুবন মােহন চন্দ্র, সাধু অঘাের নাথ, বিজয়কৃষ্ণ ও ভুবন মােহনের ন্যায় দুই চারিজন প্রকৃত মহাত্মা সমাজে থাকিলেও, হিন্দুসমাজ তাহাদিগকে গণনার মধ্যে ধরিতেন না। এতদ্ব্যতীত হিন্দুসমাজ, হিন্দুশাস্ত্রের বহিভূত কোরাণ ও বাইবেলের উপদেশ গ্রহণ করিতে সৰ্ব্বদাই অসম্মত ; সুতরাং ব্রাহ্ম- সমাজকে অস্পৃশ্যই মনে করিতেন। যে সময়ে ভুবন মােহন, দিনাজপুরে ব্রাহ্মসমাজের উন্নতিকল্পে বদ্ধপরিকর হইলেন, তখন তথায় হিন্দু- সমাজ অপেক্ষাকৃত দৃঢ়তর বন্ধনে সম্বন্ধ ছিল। অঘাের নাথ ও বিজয় কৃষ্ণ প্রভৃতি বাগ্নিগণের সুললিত বক্তৃতা শুনিবার জন্য, স্কুলের ছাত্র- গণ, নিতান্ত উৎসুক হইলেও, অভিভাবকগণের কঠোর শাসনে তাহ অনেকেই শুনিতে পারে নাই। যদি কেহ লুকাইয়া, ব্রাহ্মসভায় বক্তৃতা শুনিতে যাইত, তাহার অভিভাবক তাহা জানিতে পারিলে, তাহাকে গুরুতর দণ্ডে দণ্ডিত করিতেন, ছাত্র ব্যতীত কোন ভদ্রলােক ব্রাহ্মসভায় গেলে সমাজ তাহার উপর খঙ্গহস্ত হইত। তিনি সমাজচ্যুত হই- তেনা-ব্রাহ্ম সভার বক্তৃতা শুনিতে গেলেই যখন এই দশা, তখন যাহারা ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিতেন তাহাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। পণ্ডিত ভুবন মােহন এই ব্রাহ্মসমাজের নেতা; সুতরাং তিনি নিরামিষ- ভােজী ভগবদ্ভক্ত হইলেও, হিন্দু-সমাজের পক্ষে গুরুতর অপরাধী বলিয়া গণ্য হইলেন। তাঁহার সমাজভুক্ত ব্যাভিচারিগণের সঙ্গে তিনি জাতি- চ্যুত বলিয়া গণ্য হইলেন। হিন্দু-সমাজ তাহাদের সহিত সমুদয় সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিলেন।-ব্রাহ্ম-সমাজভুক্ত কেহ পুনরায় হিন্দু-সমাজে আসিতে চাহিলে তাহাকে যথা বিধি প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইত। এই- রূপে সহরে দলাদলি আরম্ভ হইল। ক্রমেই সে দলাদলি সুদৃঢ় হইতে ।
মহর্ষি ভুবন মােহন ; লাগিল। হিন্দুগণ, ব্রাহ্মদিগকে হুকা দেওয়া বন্ধ করিলেন,-খাওয়া দাওয়া ত দূরের কথা! কিন্তু ভুবন মােহন কথনও কাহার প্রতি বিদ্বেষ ভাব পােষণ করেন নাই। কোন স্থানে পুরাণ-পাঠ হইতেছে শুনিলে, তিনি অনিমন্ত্রিত হইলেও তথায় যাইতে অপমান বােধ করেন নাই। কিন্তু তাহাতেও হিন্দুসমাজ তাহার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশে ক্ষান্ত হয় নাই। একদিন তিনি একবাসায় পুরাণ-পাঠ শুনিতে গেলেন ; দুর হইতে উঁহাকে দেখিয়া সকলে পাঠককে ঈঙ্গিত করিলেন; তিনি সভাস্থ হইব। মাত্র সেদিনের মত পুরাণ-পাঠ বন্ধ হইয়া গেল। পুরাণ-পাঠ শুনিতে পাইয়া তিনি ক্ষুন্ন হইলেন বটে, কিন্তু তাহার অবমাননার জন্য তিনি ক্ষুব্ধ হইলেন না। ভুবন মােহনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা যাদব চন্দ্র দিনাজপুর জজ আদালতে চাকুরী করিতেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জয়চন্দ্রের সহিত মুনােমালিন্য হওয়ায় কয়েক বৎসর পূর্বে, তিনি পৃথক হইয়াছিলেন; এবং ভুবন মােহন, ব্রাহ্ম-সভার জন্য বালুবাড়ীর যে স্থানটুকু দিনাজপুরের মহারাজ বাহা- দুরের নিকট হইতে লইয়াছিলেন, ব্রাহ্মসভা গণেশ তলায় স্থানান্তরিত হইলে তিনি তথায় পৃথক বাসা করিয়া বাস করিতেছিলেন। ১৮৯৫খৃঃ অব্দের শেষ ভাগে যাদব চন্দ্রের প্রথমা কন্যার বিবাহ স্থির হইল। যাদব চন্দ্র তখন ভুবন মােহনের ব্রাহ্মসমাজ ভুক্ত, পাত্রের পিতা হিন্দু! তিনি বলিলেন, হিন্দুমতে বিবাহ না হইলে তিনি পুত্রকে বিবাহ করিতে দিবেন না । অগত্যা যাদব চন্দ্র হিন্দু- সমাজের শরণাপন্ন হইলেন। নেতৃগণ বলিয়া উঠিলেন,-যদি তিনি ভুবন মােহনের সংশ্রব পরিত্যাগ করিয়া, যথাবিধি প্রায়শ্চিত্ত ও কালী মহর্ষি ভুবন মােহন পূজা করিতে পারেন, তবেই তাহাকে তাহারা গ্রহণ করিবেন। এই শুনিয়া যাদবচন্দ্র বজ্রাহতের ন্যায় বসিয়া পড়িলেন। একদিকে দারুণ কন্যাদায়,—অপর দিকে ভ্রাতৃবর্জন! কি করিবেন কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। কাহাকেও কিছু না বলিয়া বিষন্ন বদনে বাসায় গিয়া, বসিলেন। ভুবন মােহন এই সংবাদ জানিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ যাদব চন্দ্রকে যথেষ্ট উপদেশ দিয়া কহিলেন, “তুমি দুঃখিত হইওনা। সকল ধৰ্মই এক। কালীপূজা, সেই ব্রহ্মেরই আরাধনা। তুমি নিঃসঙ্কুচিত চিত্তে হিন্দু-শাস্ত্রোচিত ব্যবস্থানুযায়ী কন্যা সম্প্রদান কর তাহাতে আমি কিছু মাত্র দুঃখিত হইব না। হিন্দু-সমাজ যখন আমার সংশ্রব ত্যাগ করার জন্য তােমাকে বলিয়াছে তাহাতে তােমার সম্মত হওয়াই কৰ্তব্য; কারণ আমি তাহাদের বিরুদ্ধ-সমাজভুক্ত। আমি তােমার সমাজিকগণের সঙ্গে না মিশিলেও আমিত স্থানান্তরে যাইতেছি না। এরূপ অবস্থায় আমার সংশ্রব ত্যাগে তােমার অসম্মত হইবার প্রয়ােজন কি ?” ভুবন মােহনের মহানুভবতায়, যথাকালে যাদবচন্দ্রেব কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হইল। হিন্দুসমাজের নেতৃগণও ভুবন মােহনের এই উদারতার কথা শুনিয়া বিস্মিত হইলেন। অপূৰ্ব্ব সত্যনিষ্ঠা। পাঠক অবগত আছেন, আনন্দ চন্দ্র কর মহাশয় তাহার পুত্রগণের শিক্ষার ভার ভুবন মােহনের হস্তে ন্যস্ত করিয়াছিলেন। ভুবন মােহন তাহাদের শিক্ষা সুবন্দোবস্ত করিলেন কিন্তু বালকগণ পড়াশুনায় তেমন মনােযােগী ছিলনা। বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহারা ক্ৰমে উচ্ছ,ঙ্খল হইয়া উঠিল। একবার ধর্মসভায় জগদ্ধাত্রী পূজোপলক্ষে যাত্রা গান ১১১ মহর্ষি ভুবন মােহন হইবে। আনন্দ চন্দ্রের কনিষ্ঠ পুত্র জগদীশ চন্দ্র তখনও শিশু সুতরাং তদ্ব্যতীত অপর তিনি পুত্র সন্ধ্যার পর তাড়াতাড়ি খাইয়া গান শুনিতে গেল। সেখানে কতিপয় দুর্বত্ত ছাত্রের সহিত দিনাজপুরের মহারাজার কয়েক জন বরকন্দাজের একটুকু কথান্তর হয়। আনন্দ চন্দ্রের পুত্রগণ ছাত্রগণের সহিত মিলিত হইয়া বরকন্দাজগণকে নিদারুণ প্রহার করিয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিল। তখন রাত্রি প্রার এগারটা, ভুবন মােহন তখন পড়িতেছিলেন। ভ্রাতুস্পুত্রগণ দৌড়িয়া ঘর্মাক্ত কলেবরে প্রত্যাগত হইল দেখিয়া, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় গিয়াছিলে? এত রাত্রে কোথা হইতে আসিলে?” “ভ্রাতুস্পুত্র অক্ষয় চন্দ্র কহিল, “ধৰ্ম্ম সভায় জগদ্ধাত্রী পূজায় গান শুনিতে গিয়াছিলাম।” তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না ; অত জিজ্ঞাসা করিবার সময়ও তাঁহার ছিল না, তিনি তখন শাস্ত্রাধ্যায়নে বিশেষ মনােনিবেশ করিয়াছিলেন। পরদিন মহারাজার বরকন্দাজগণ অক্ষয় প্রভৃতি বালকগণের বিরুদ্ধে মােকদ্দমা স্থাপন করিল। স্থানীয় কোন কোন উকিল মােক্তারের ছেলেরাও এই মােকদ্দমার আসামি হইল। এজন্য মহারাজা স্থানীয় উকিল মােক্তারের সাহায্যে বঞ্চিত হইয়া, স্বীয় সম্মান সংরক্ষণ জন্য কলি- কাতা হইতে ব্যারিষ্টার ও অন্যত্র হইতে উকিল আনাইলেন। মােকদ্দমা গুরুতর ভাবে চালিতে লাগিল। অক্ষয় চন্দ্রের পিতা আনন্দ চন্দ্র সেই সংবাদ শুনিয়া ঠাকুর গা হইতে আসিলেন। স্থানীয় উকীলগণের সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির হইল যে, ভুবন মােন যদি সাফাই দেন,তিনি যদি বলেন, অক্ষয় রাত্রি দশটা হইতে বারটা পর্যন্ত বাড়ীতেই ছিল তবেই রক্ষা নচেৎ দণ্ড অনিবাৰ্য। এইরূপ পরামর্শ করিয়া মহর্ষি ভুবন মােহন আনন্দ চন্দ্র বাসায় আসিয়া ভুবন মােহনকে বলিলেন,-“ভুবন! আজ আমার মান-সম্ভ্রম নষ্ট হইতে উদ্যত হইয়াছে। মান গেলে আর আমি লােক-সমাজে মুখ দেখাইতে পারিব না,-তাহা হইলে আমার মৃত্যুই শ্রেয়।” এই বলিয়া আনন্দ চন্দ্র অশ্রুপূর্ণ নয়নে ভুবন মােহনের হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন, “ভুবন ! বল, আমার কথা রাখিবে কি না?” ভুবন। আপনি বলুন আপনার কথা না শুনিয়া আমি কি বলিব ? আনন্দ। ঘটনার দিন রাত্রি দশটা হইতে বারটা পর্যন্ত অক্ষয় বাসায় ছিল তুমি এইরূপ সাক্ষ্য না দিলে, অক্ষয়ের ফাটক হইবে, বংশের কলঙ্ক হইবে—আমি লোক-সমাজে বাহির হইতে পারিব না। ভুবন। মেজদাদা! আপনি আমার জ্যেষ্ঠ আপনার অনুরােধ আমার সর্বথা পালনীয় ও শিবােধাৰ্য, কিন্তু দাদা! সত্যই ধৰ্ম্ম, আমি আজন্ম যে সত্যের সেবা করিয়া আসিতেছি, আমি প্রাণান্তেও সে সত্যে জলাঞ্জলি দিতে পারিব না। অক্ষয় জেলে যাউক বা ফঁসিকাষ্ঠে ঝুলুক, আমি মিথ্যা কথা কহিয়া তাহাকে বাঁচাইতে পারিব না। তজ্জন্য সমগ্র পৃথিবী আমার প্রতিকূল হইলেও আমি সত্য হইতে বিচলিত হইতে . পারিব না। আপনি আমার গুরুজন ও জ্ঞানী, আশা করি আপনি পুত্রবাৎসল্যের বশবর্তী হইয়া আমাকে অসদুপদেশ প্রদান করবেন না । ভুবন মােহনের কথায় আনন্দচন্দ্র একেবারে হতাশ হইলেন। যথা- সময়ে দারােগা গিয়া ভুবন নােহনের জবান বন্দী লইল। তিনি প্রকৃত কথা বলিলেন। অক্ষয় চন্দ্র চালান হইয়া কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইল। এই ঘটনায় ভুবন মােহনের সত্যনিষ্ঠা সমস্ত সহরে পরিব্যাপ্ত মহর্ষি ভুবন মােহন হইল। হাকিমগণও ইহা শুনিয়া বিস্মিত হইলেন। সকলেই তাহাকে অসাধারণ সত্যনিষ্ঠ জানিয় যার পর নাই ভক্তি করিতে লাগিলেন। এক ব্রাহ্মণকে তিনি এক জমিদারী সেরেস্তার কার্য্য লইয়া দিয়া ছিলেন। কিছুদিন পর ব্রাহ্মণ কিছু টাকা আত্মসাৎ করিয়াছেন এই রূপ অভিযােগে একটি মােকদ্দমায় পড়েন। তিনি স্বীয় সচ্চরিত্রতা প্রমাণের জন্য ভুবন মােহনকে সাক্ষী মানিলেন। চাকুরী হওয়ার পূর্বে তিনি তঁাহার বাসার প্রায় বৎসর কাল ছিলেন, সেই সময় তিনি তাহার চরিত্র ভালই জানিতেন। ভুবন মােহনের এইরূপ সাক্ষ্যেই বিচারক ব্রাহ্মণকে নিরপরাধ সাব্যস্ত করিয়া অব্যাহতি দিলেন। ক্ষমা। (১) পাঠক অবগত আছেন পণ্ডিত ভুবন মােহন, আনন্দ চন্দ্রের কনিষ্ঠ শিশু পুত্রের লালন পালন জন্য একজন দেশীয় কন্যাবতী চাকরাণী রাখিয়াছিলেন। ক্রমে কন্যাটী বড় হইয়া আনন্দ চন্দ্রের কন্যা সরলার সহিত লেখা পড়া শিখিতে লাগিল। কন্যাটা বেশ ফুট ফুটে সুন্দরী, এজন্য তাহার মাতা প্রভৃতি সকলে তাহাকে সাহেবাণী বলিয়া ডাকিত, পণ্ডিত মহাশয় তাহার নাম রাখিলেন সুনীতিবালা। তিনি তাহাকে বড় ভাল বাসিতেন। তিনি তাহাকে স্কুলে নিম্ন-প্রাথমিক পৰ্য্যন্ত পড়াইয়া, নিজে বাড়ীতে বাঙ্গালা ছাত্রবৃত্তি পৰ্য্যন্ত শিক্ষা দিলেন। তাহাকে অনেক সময় নিজে কত নীতি ও ধর্মোপদেশ শিক্ষা দিতেন। তাহার সুশিক্ষায় সুনীতিবালা নীতি-পরায়ণা ও সুশীল হইয়া উঠিল। 4 ১১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন সে পণ্ডিত মহাশয়ের বিশেষ অনুরক্ত হইল। সৰ্ব্বদা তাঁহার সেবা শুষ। করিত। সে তাহার নিকট হােমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুত করিতে শিখিয়াছিল। কোনও রােগী আসিলে তাহার নির্দেশ মত সে ঔষধ দিত। ক্রমে সুনীতি বালা কৈশরে পদার্পণ করিল। তাহার রূপ- লাবণ্য দিন দিন প্রকটিত হইতে লাগিল। তাহা দেখিয়া কতিপয় নীচাশয়ের পাশবিক প্রবৃত্তি জাগিয়া উঠিল। তাহারা দেখিল সুনী- তিকে তাহার মাতাসহ ভুবন মােহনের বাসা হইতে বাহির করিতে পারিলে আর তাহাদের মনােভিলাষ পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা নাই। তখন তাহারা, তাহার মাতাকে বেশী বেতনের প্রলােভন দেখাইল। তাহার মাতা ভুবন মােহনের নিকট হইতে বিদায় লইয়া তাহার নৃতন মনিবের বাড়ী যাইতে প্রস্তুত হইল। সুনীতিকে তাহার সঙ্গে যাইতে বলিল, কিন্তু সে শৈশব হইতে যাহাদের সঙ্গে বাস করিয়া আসিতেছিল, পণ্ডিত মহাশয় যে তাহাকে কন্যার ন্যায় স্নেহ করিয়া আসিতেছিলেন, তাহাদের সেই স্বর্গীয় স্নেহে জলাঞ্জলি দিয়া সে মাতার অনুসরণে সম্মত হইল না। মাতা তাহাকে নিদারুণ প্রহার করিল, ভুবন মােহনও তাহাকে কত বুঝাইলেন কিন্তু কিছুতেই সে যাইতে চাহিল না। অগত্যা তিনি সুনীতির মাতাকে কহিলেন, “আচ্ছ। আজ থাক, তুমি যাও সুনীতিকে পরে আরও বুঝাইয়া তােমার নিকট রাখিয়া আসিব। মা ছেড়ে কি ও থাকতে পারে ?” অগত্যা সুনীতির মাতা সুনীতিকে ছাড়িয়া একাকীই নূতন কার্যে যােগদান করিল। পাপিষ্ঠেরা তখন ভুবন মােহনে পবিত্র আত্মায় কলঙ্ক আরােপ করিতে লাগিল। তখন তিনি সুনীতিকে মহর্ষি ভুবন মােহন নানা প্রকার বুঝাইয়া তাহার মাতার নিকট রাখিয়া আসিলেন। পাষণ্ড- গণ তখন তাহাদের পাশবিক বৃত্তি চরিতার্থের সুযােগ অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইল। প্রথমে তাহারা সুনীতির মাতাকে কহিল, “তাের মেয়ে আর বিয়ে দিয়ে কি করবি? একটা বাড়ী করে দেওয়া যাক্ তাের মেয়ে যাতে সুখে থাকে তাই করা যাবে।” সুনীতির মাতা তাহাতে সম্মতা হইল না। তখন তাহারা বাজারের একজন বেশ্যার নিকট সুনীতিকে বিক্রয় করিলে বিস্তর টাকা পাওয়া যাইবে বলিয়া তাহাকে লােভ দেখাইল। সামান্য চাকরাণী সেই বিপুল অর্থের লােভ সম্বরণ করিতে পারিল না, সুনীতিকে বেশ্যার নিকট বিক্রয় করাই অবধারিত হইল। এই কথা শুনিয়া সুনীতি বালা দশদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিল, তাহার বােধ হইল তাহার পায়ের নীচ হইতে যেন পৃথিবী সরিয়া যাইতেছে, তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল। কে তাহাকে এই নিদারুণ বিপদ হইতে রক্ষা করিবে,-কাহার শরণাপন্ন হইবে? সংসারে তাহার একমাত্র অবলম্বন জননী। আজ সেই জননীই তাহার সর্বনাশ সাধনে উদ্যতা। তাহার অবস্থা আজ যুপকাষ্ঠবদ্ধ ছাগ শিশুর ন্যায় হইয় দাড়াইয়াছে। আজ তাহাকে সহানুভুতি দেখাইবার জগতে কেহ নাই। যে মাতাকে সে এতদিন স্নেহময়ী দেবী মনে করিত, আজ তাহাকে দেখিলে সে কালনাগিনী মনে করিয়া ভয়ে শিহরিয়া উঠিতে লাগিল। সে একবার মনে করিল পাপিষ্ঠের বাড়ী হইতে পলায়ন করিতে পারিলে বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবে, কিন্তু তাহারও সুযােগ খুজিয়া পাইল না। চারিদিকে পাষণ্ডের চরগণ তাহার গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিল। কিরূপে সে পলায়ন করিবে ? আর পলাইলেই বা কে মহর্ষি ভুবন মােহন • তাহাকে আশ্রয় দিবে? এই সকল চিন্তা করিয়া সে কিছুই স্থির করিতে পারিল না। তখন সে বিপদবারণ ভগবান্কে চিন্তা করিতে লাগিল। তখন তাহার হৃদয়ে বসিয়া কে যেন তাহাকে ভুবন মােহনের শরণাপন্ন হইতে বলিয়া দিল, সে তৎক্ষণাৎ তাহাকে একখানা পত্র লিখিল :- “বাবা! আজ বড় মর্মাহত ও বিপদগ্রস্ত হইয়া আপনাকে এই পত্র লিখিতে বাধ্য হইলাম। আপনি ছােট বেলা হইতে আমাকে পালন করিয়াছেন, তাই আপনাকে এই বিপদ-সময়ে প্রাণের দুঃখ জানাই- তেছি। আমি এখানে আসিয়া অবধি আমার আহার নাই নিদ্রা নাই ;-প্রতি মুহূর্তে শশঙ্কিত প্রাণে, ব্যাভীতা হরিণীর ন্যায় অতিশয় ব্যাকুল ভাবে অবস্থান করিতেছি। বাবা! বলিব কি, সে কথা আপনার কাছে কিরূপেই বা প্রকাশ করিব ? তথাপি লজ্জা সরমের মাথা খাইয়া, শুধু এই পাপ-কারাগার হইতে পরিত্রাণের জন্য, আপনাকে সেই কথা না জানাইয়া থাকিতে পারিতেছি না। মা, দুষ্ট লােকদের কুপরামর্শে ভুলিয়া, আমাকে পাপের পথে পরিচালিত করিবার চেষ্টা করিতেছেন। শুনিতেছি এমনকি,-আমাকে বাজারে বেশ্যার কাছে বিক্রয় করিবেন। আপনি আমার পিতা ও মাতা, আপনি ছাড়া এ সংসারে আমার আর কেহ নাই। যদি ইহার কোন প্রতিবিধান বা আমার পরিত্রাণের উপায় থাকে তবে শীঘ্ৰ করুন ; নতুবা জানিবেন, আপনার স্নেহের সুনীতিকে আজই চিরদিনের জন্য এই পাপ সংসার হইতে বিদায় লইতে হইবে। আমার এই শেষ প্রণাম গ্রহণ করুন ইতি আপনার মেহের- সুনীতি বালা।”
মহর্ষি ভুবন মােহন - পখানা লিখিয়া সুনীতি গােপনে একটী বালক দ্বারা পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট পাঠাইয়া দিল। ভুবন মােহন দিনাজপুর আলিয়া অবধি সর্ব সাধারণের নিকট পণ্ডিত মহাশয় বলিয়াই সুপরিচিত হইয়া- ছিলেন। তিনি পত্র খানি পড়িলেন। সুনীতি বালার দুঃখে ভঁহার হৃদয় বিগলিত হইল, দুই চক্ষে বারিধারা বহিতে লাগিল। তিনি, তখন কিরূপে তাহাকে এই আসন্ন বিপদ হইতে উদ্ধার করিবেন, তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। অবশেষে সুনীতিকে, তঁাহার বাসায় আসিবার জন্য সংবাদ দিলেন। সে সংবাদে সুনীতি পরম আশ্বস্ত হইয়া, মায়ের নিকট হইতে পলায়ন করতঃ পণ্ডিত মহাশয়ের আশ্রয় লইল। তিনি তখন ষােড়শী সুনীতিকে বিবাহ দেওয়াই কৰ্তব্য মনে করিয়া সপ্তাহ মধ্যে জলপাইগুড়ীর একটি ভদ্র লােকের সঙ্গে ব্রাহ্ম মতে তাহার বিবাহ সম্পন্ন করিয়া দিলেন। পাষণ্ডগণের সংকল্প ব্যর্থ হওয়ায় তাহারা নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইল, এবং ভুবন মােহনকেই তাহাদের এই সর্বনাশের কারণ মনে করিয়া সুনীতির মাতাকে দিয়া তাহার বিরুদ্ধে অবৈধ বিবাহের জন্য মনুষ্যহরণের অভিযােগ উত্থাপন করিল। ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট স্বয়ং এই মােকদ্দমার স্থানীয় তদন্তে আসিলেন। ভুবন মােহন আদ্যোপান্ত সমুদয় বিবরণ তাঁহাকে জানাইলেন সুনীতিবালার জবানবন্দীতেও তাহার উক্তি প্রমাণিত হইল, দিনাজপুরের তদানীন্তন জজ মিঃ কেলি পণ্ডিত মহা- শয়ের নিকট বাঙ্গালা পড়িতেন, তিনি ও সহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ পণ্ডিত মহাশয়ের দেব-চরিত্র প্রমাণিত করিলেন। তদন্তে ষড়যন্ত্র- কারীগণের নাম বাহির হইয়া পড়িল। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব বুঝিতে ১১৮ মহর্ষি ভুবন মােহন পারিলেন, সুনীতির মাতা চক্রান্তকারীগণের ক্রীড়া-পুলি মাত্র। তিনি ভুবন মােহনকে সসম্মানে মুক্তি দিয়া কহিলেন, “আপনি ষড়যন্ত্র- কারীগণের প্রতিকূলে মান হানির মােকদ্দমা করিতে পারেন। আপনি মােকদ্দমা না করিলে আমি ইহাদের বিরুন্ধে অন্য উপায় অবলম্বন করিব।” ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের আদেশ শুনিয়া ষড়যন্ত্রকারীগণ বিষম বিপদে পড়িল। তাহারা সাহেবের নিকট কত অনুনয় বিনয় করিলেন কিন্তু কিছুতেই ফল হইল না। তখন তাহারা দয়ার সাগর ভুবন মােহনের শরণাপন্ন হইল। তাহাদের করুণ ক্রন্দনে তাহার দয়ার সঞ্চার হইল, তিনি তাহাদিগকে ক্ষমা করিলেন এবং ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট তাহাদের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাহিলেন। ম্যাজিষ্ট্রেট তাহার সম্মানের জন্য তাহাদিগকে ক্ষমা করিলেন এবং তাহার এই অপূর্ব ক্ষমার জন্য তাহাকে ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন। এই সুনীতি বালার ব্যাপারে বঙ্গের তদানীন্তন সুপ্রসিদ্ধ সমালােচক ও দিনাজপুরের ডিপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট বাবু, যােগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ বলিয়াছিলেন, “শকুন্তলার কন্ব মুনি আর সুনীতি বালার ভুবন মােহন।” (২) ‘ভুবন মােহন ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মের দীক্ষিত নহেন, তিনি ব্রাহ্ম সমাজের প্রথানুযায়ী কুকুটাদি ভক্ষণ করেন না। তিনি একাহারী নিরামিষ- ভােজী,তাও আবার বৈষ্ণব-চূড়ামণি রায় সাহেব বাহাদুরের গােবিন্দ জী বিগ্রহের প্রসাদই তাহার একমাত্র আগ্রহের খাদ্য। এরূপাবস্থায় তঁাহাকে নিরাকার-সেবী ব্রাহ্ম না বলিয়া পৌত্তলিক হিন্দু বলাই সমী- মহর্ষি ভুবন মােহন চিন। এরূপ পৌত্তলিককে ব্রাহ্মসভার আচাৰ্য পদে প্রতিষ্ঠিত রাখিলে ব্রাহ্মসমাজের তথা নিরাকার ব্রাহ্ম-বাদের অবমাননা করা হয়। এই মহাসত্য এতদিন পরে ১৯১০ খৃষ্টাব্দে কতিপয় ব্রাহ্ম ভ্রাতা চসমার সাহায্যে আবিষ্কার করিলেন। একদিন তাঁহারা ব্রাহ্মসভায় এই বিষয় আলােচনা করিয়া ভুবন মােহনকে আচাৰ্য পদের অযােগ্য বলিয়া প্রকাশ করিবামাত্র তিনি বেদি হইতে গাত্রোখান করিয়া সাগ্রহে বলিলেন, “আমি এই পদের প্রার্থী নহি, আপনারা আসুন, আমাকে অব্যাহতি দিন, আমি অনেক দিন হইতে অবসর লইবার সুযােগ অনু- সন্ধান করিতেছিলাম আজ ভগবান্ সে সুযােগ মিলাইয়াছেন, আজ আমার বড় শুভদিন, তাই এমন সুযােগ মিলিল। আপনারা আমাকে এতদিন আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন তাই আমি আপনাদের সেবা পরিত্যাগ করিতে পারি নাই। আহারাদি সম্বন্ধে আপনারা আমাকে যে দোষ দিয়াছেন, তাহা খণ্ডাইবার সাধ্য আমার নাই, ভগবান্ আমাকে যে প্রবৃত্তি দিয়াছেন তদনুযায়ী আমাকে চলিতেই হইবে। বিশেষতঃ ব্ৰহ্মচৰ্য্যই তপস্যার মূল ; আমি প্রাণান্তেও তাহা পরিত্যাগ করিতে পারিব না। রায় সাহেব বাহাদুরের গােবিন্দজীকে আমি ব্রহ্মের একটি কল্পিত রূপই মনে করি, এবং সেই ব্রহ্মের প্রসাদ গ্রহণ করিয়াই পরম তৃপ্তি লাভ করিয়া থাকি। ভগবানের নিকট আমার একান্ত প্রার্থনা যেন আমরণ আমি সে প্রসাদে বঞ্চিত না হই।” এই বলিয়া ভুবন মােহন বেদি পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইলে অপর সভ্যগণ তাহাকে বেদি হইতে নামিতে বাধা দিয়। উল্লিখিত প্রস্তাব- কারিগণকে যৎপরােনান্তি ভৎসনা করিলেন। কেহ কেহ বা উত্তেজিত মহর্ষি ভুবন মােহন হইয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইলেন। ব্রাহ্মসভায় দারুণ শান্তিভঙ্গের সম্ভাবনা হইয়া উঠিল, উভয় পক্ষের কোলাহলে সভাগৃহের চতুর্দিক মুখরিত হইয়া উঠিল। বেগতিক দেখিয়া ভুবন মােহন তাড়াতাড়ি উভয় পক্ষের মধ্যে গিয়া বিবাদ নিবারণ জন্য উভয় পক্ষকে সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। তখন গােলমাল থামিয়া গেল। গােলমাল থামিয়া গেল বটে কিন্তু ভুবন মােহন আচার্য পদ পরি- ত্যাগ করিতে প্রস্তুত হইলেন। অতঃপর বিরুদ্ধ পক্ষ তাহাদের প্রস্তাব অসঙ্গত হইয়াছে বুঝিতে পারিয়া তাহার নিকট ক্ষমা চাহিল। আত্মাভি- মানহীন ভুবন মােহন তাহাদিগকে ক্ষমা করিলেন। তিনি আর আচাৰ্য পদ পরিত্যাগ করিলেন না। ব্রাহ্ম সভা পূৰ্ব্ববৎ চলিতে লাগিল। সর্বজীবে সম দয়া। (১) একদিন ভুবন মােহন শহরের একজন জমিদারের বাটীতে চিকিৎসা করিতে যাইবেন। জমিদার মহাশয় বেলা অনুমান দুইটার সময় ঘােড়ার গাড়ী পাঠাইয়া দিয়াছেন। গ্রীষ্মকালের প্রখর রােদ্রে শকটবান ও অশ্ব দুইটি ক্লান্ত হওয়ায় তাহাদের শরীর ঘর্মাক্ত হইয়াছে দেখিয়া তিনি শকটবানকে তঁাহার বাটীর সম্মুখস্থ পাকুড় বৃক্ষের ছায়ায় গাড়ী রাখিয়া বিশ্রাম করিতে বলিলেন। শকটবান তাহাই করিল। তিনি তখন একটি ছাতা লইয়া পদব্রজে জমিদার মহাশয়ের সন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। জমিদার মহাশয় অত রৌদ্রে তিনি পদব্রজে গিয়াছেন দেখিয়া মনে করিলেন গাড়ী যায় নাই। তিনি কহিলেন, “আমি যে আপনাকে ১২১ মহর্ষি ভুবন মােহন আনার জন্য গাড়ী পাঠাইয়াছি, গাড়ী কি যায় নাই?” তখন তিনি ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “গাড়ী গিয়াছে, কিন্তু দেখিলাম গাড়োয়ান ও ঘােড়া দুইটি রৌদ্রে ক্লান্ত হইয়াছে, তাই আমি তাহাদিগকে বিশ্রাম করিতে দিয়া নিজেই হাটিয়া আসিলাম। আমি একাকী একটুকু কষ্ট স্বীকার করিলে যদি তিনটি জীবের ক্লেশের লাঘব হয় সেই জন্যই তাহা- দিগকে ছাড়িয়া আসিয়াছি। জমিদার মহাশয় তাঁহার দয়া দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। ( ২ ) একদিন প্রাতে একজন ভক্ত পণ্ডিত মহাশয়কে একহাড়ী রসগােল্লা আনিয়া দিল। পণ্ডিত মহাশয় নিজে যত্ন করিয়া হাড়ীটি রাখিয়া দিলেন, ভক্ত, পণ্ডিত মহাশয়ের ভবনেই আহার করিতে অনুরুদ্ধ হইলেন, দুই প্রহরে পণ্ডিত মহাশয়ের সঙ্গে একত্রে খাইতে বসিলেন, মনে করিয়া- ছিলেন এইবার রসগােল্লার হাড়ী খােলা হইবে। কিন্তু খাওয়া শেষ হইল, হাড়ী আর বাহির হইল না। আহারান্তে তাহার সহিত আলাপ করিয়া পণ্ডিত মহাশয় হাড়ী লইয়া বাহির হইলেন । ভক্তও পাছে পাছে চলি- লেন। কিয়দ্র গিয়া তিনি কুলি পাড়ায় প্রবেশ করিয়া কুলি বালক-বালিকা- গণকে ডাকিয়া সেই রসগােল্লা বিতরণ করিতে লাগিলেন। ভক্ত অবাকু হইয়া চাহিয়া রহিল। যাহাকে সে দেবতার ন্যায় ভক্তি করে,-যে দেবতার সেবার জন্য সে কত যত্নে রসগােল্লাগুলি আনিয়াছিল, তাহার একটিও সে দেবতা গ্রহণ করিলেন না। তাহার সেই ভক্তপহার কুলিবালক- বালিকাগণ ভােজন করিল-যজ্ঞের ঘৃত কুকুরে খাইল দেখিয়া তিনি নিতান্ত মর্মাহত হইয়া কহিলেন, “আমি আপনার জন্য অতি যত্নে এই ১২২ মহষি ভুবন মােহন । মিঠাই আনিয়াছিলাম, আপনি তাহার একটিও খাইলেন না।” ইহা শুনিয়া ভুবন মােহন কহিলেন,—“বাবা! আপনি দুঃখিত হইবেন না। ইহারা খাইলেই আমার খাওয়া হইল। আমি এ জীবনে অনেক মিঠাই খাইয়াছি,—ইহারা কখনও খায় নাই। ইহাদের পিতা মাতা গরীব, মিঠাই কিনিয়া দিবার সাধ্য তাহাদের নাই। ইহারা মিঠাই খাইয়া যেরূপ সুখী হইল আমি সেরূপ হইতাম না। ইহারা এই উপাদেয় মিঠাই খাইয়া যে আনন্দলাভ করিল আমি তাহাতেই খাওয়া অপেক্ষা অধিকতর পরিভােষ লাভ করিলাম। বাবা! শৃগাল কুকুর প্রভৃতি পশুরাই নিজে খাইয়া সুখী হয় ;-মানুষ তাহা পারে না। মানুষের আত্মা পরকে খাওয়াইয়াই সুখী। আমি ভরসা করি আপনার ভালবাসার জিনিস, পর সেবার নিয়ােজিত হইল বলিয়া আপনি সুখী হইবেন এবং আপনার অর্থ ব্যয়ও সার্থক মনে করিবেন।” এই কথা শুনিয়া ভক্ত অবাক হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, তবে কি ইনি সত্য সত্যই দেবতা। দ্বাদশ অধ্যায়। ভুবন মােহন দিনাজপুরে আসিয়া ব্রাহ্মধৰ্ম্মের উন্নতির জন্য আত্ম- নিয়োগ করিলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান বিষয়ে বা কর্তব্য কাৰ্যে কখনও অবহেলা করেন নাই। তাঁহার অপূর্ব শিক্ষাদান-প্রণালীর জন্য তিনি অচিরকাল মধ্যেই ছাত্রগণেরও কর্তৃপক্ষের ভক্তি ও শ্রদ্ধাভাজন হইলেন। তঁাহার গুণগরিমা চারিদিকে পরিব্যাপ্ত হইল।
মহর্ষি ভুবন মােহন দিনাজপুরাধিপতি স্বর্গীয় মহারাজা গিরিজানাথ রায় বাহাদুর তাহার অগাধ সংস্কৃত জ্ঞানের কথা শুনিয়া তাহার নিকট সংস্কৃত শিখিতে অভিলাষী হইলেন। এবং তাহাকে গৃহ-শিক্ষক নিযুক্ত করিয়া প্রত্যহ সন্ধ্যার পর সংস্কৃত পড়িতে লাগিলেন। রাজপ্রাসাদ হইতে তাহার বাসা প্রায় দুই মাইল দূরবর্তী। রাস্তাও জঙ্গলাকীর্ণ ও শ্বাপদসঙ্কুল ছিল। তিনি ইচ্ছা করিলেই, মহারাজা বাহাদুর তঁাহার যাতায়াতের জন্য গাড়ীর বন্দোবস্ত করিতেন, কিন্তু তিনি সেরূপ ইচ্ছা কখনও করেন নাই। তিনি বলিতেন গাড়ীতে বেড়াইলে তাহার শরীর শিথিল হইয়া যাইবে, আর তিনি দরিদ্র সেবা করিতে পারিবেন না। রাজবাড়ী হইতে প্রায় রাত্রি দশটার সময় সেই জঙ্গলাকীর্ণ পথে বাসায় ফিরিতে কতদিন কত বাঘের সম্মুখে পড়িয়াছেন। একদিন বাঘে তাহাকে তাড়াও করিয়াছিল, কিন্তু তিনি ভবভয়হারী ভগবাকে স্মরণ করিয়া দৌড়িয়া পলায়ন করতঃ জীবন রক্ষা করিয়াছিলেন। এই রূপে প্রায় চারি বৎসর কাল তিনি মহারাজা বাহাদুরকে সংস্কৃত শিক্ষা দিয়াছিলেন। সূক্ষ্মদর্শী মহারাজা বাহাদুর হার অগাধ সংস্কৃত জ্ঞান, অতুলনীয় শিক্ষাদান-প্ৰণালী, সচ্চরিত্রতা ও সহৃদয়তার পরিচয় পাইয়া তাহাকে যথেষ্ট ভক্তি করিতেন। মহারাজা বাহাদুর পরম বৈষ্ণব ছিলেন। ভুবন মােহনের অহৈতুকী ভগবদ্ভক্তি দেখিয়া তিনি মুগ্ধ হইয়া ছিলেন। তাঁহাকে তিনি দেবতার ন্যায় ভক্তি করিতেন। মহারাজা বাহাদুর যখন শঙ্কটাপন্ন কাতর অবস্থায় জন্মের মত কলিকাতায় যাত্রা করেন, তখন জুলুম সাগর-প্রাসাদে ভুবন মােহন তাহাকে দেখিতে গেলেন। মহারাজা বাহাদুর বালকের ন্যায় 'ভু মােহনের পা দুখানি ১২৪ মহষি ভুবন মােহন জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিলেন, “পণ্ডিত মহাশয়! চলিলাম,-এই আমার শেষ যাত্রা, এ সময়ে দেবতার পদধূলি লাভে আমি চরিতার্থ হইলাম।” ভুবন মোহন তাঁহাকে নানারূপ প্রবােধ দিয়া বাসায় ফিরিলেন। রাজপ্রাসাদের অদূরে রাজারামপুর গ্রামে স্বর্গীয় সুপ্রসিদ্ধ পণ্ডিত মহেশচন্দ্র তর্কচূড়ামণি মহাশয় বাস করিতেন। তর্কচূড়ামণি মহাশয় অশেষ শাস্ত্রজ্ঞানে জ্ঞানী হইলেও মহামহােপাধ্যায় উপাধি ব্যাধিগ্রস্ত হয়েন নাই; অথবা তাহা লাভের জন্যও তিনি কোন চেষ্টা করেন নাই। তিনি চেষ্টা করিলে হয়ত অনেক “সম্রাট” ও “রাজা”র আসন কম্পিত হইত। দুর্ভাগ্য বশতঃ এহেন পণ্ডিতরত্ন দৃষ্টিশক্তি-হীন হইয়াছিলেন। ভুবন মােহন তাহার নিকট গিয়া শাস্ত্রালােচনা করিতেন । মহারাজা বাহাদুরের শিক্ষা-সমাপ্তির পর প্রায় প্রত্যহ সন্ধ্যার পরই তিনি তথায় যাইতেন। ভুবন মােহনের অসীম শাস্ত্রানুরাগ ও ভগবৎ প্রেমের পরিচয় পাইয়া তর্কচূড়ামণি মহাশয় তাহাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিতেন। অনেক সময় গাড়ী করিয়া তিনিও ভুবন মােহনের আলয়ে আসিতেন। তর্কচূড়ামণি মহাশয়ের বাড়ী, ভুবন মােহনের বাসা হইতে প্রায় রাস্তা অধিকতর জঙ্গলাকীর্ণ ও শ্বাপদসঙ্কুল। ভুবন মােহন সন্ধ্যার পর তথায় গিয়া অধিক রাত্রে বাসায় ফিরিতে কতবার বাঘের সম্মুখে পড়িয়াছেন, কিন্তু তিনি তাহাতেও তর্কচূড়ামণি মহাশয়ের নিকট যাইতে বিরত হন নাই। তিনি শাস্ত্রালােচনা ও ধর্মচর্চাপেক্ষা জীবনকে তুচ্ছ মনে করিতেন। একদিন অধিক রাত্রে বাসায় ফিরিতে- ছেন, পথিমধ্যে দেখিলেন অনতিদূরে একটি অগ্নিগােলক তাহার দিকেই আসিতেছে, পরক্ষণেই দেখিলেন, অগ্নি নিবিয়া গেল। আবার একটু তিন মাইল দূরে।
মহর্ষি ভুবন মােহন পরেই দেখিলেন পুনরায় সে গােলক রাস্তা ছাড়িয়া মাঠের দিক অগ্রসর হইল,আবার নিবিল আবার জ্বলিল। তিনি এই অভূতপূর্ব অগ্নিগােলক দেখিয়া বিস্মিত হইলেন, ভাবিলেন একি ? তবে লােকে যে ভূতের গল্প করে তাহা কি সত্য? একি সেই ভূত? ভুবন মােহনের নির্ভিক হৃদয় ক্ষণেকের জন্য দমিল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার কারণানুসন্ধানের জন্য তাহার হৃদয়ে বলঞ্চার হইল। তিনি এরূপ ক্ষেত্রে কারণানুসন্ধান করিয়া ছাড়িতেন না। ভূতভাবন ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া তিনি ইহার কারণ নির্ণয় করিতে অগ্রসর হইলেন। এবং দ্রুতপদে কিয়দ্দর অগ্রসর হইলেই দেখিলেন এক যুবতী একটি ধূপতি লইয়া মাইতেছে। সে যখন ধূপতির আগুনে ধূনা দিতেছে তখনই আগুন জ্বলিতেছে, আবার ধূনা পুড়িয়া গেলেই, অগ্নিশিখা নির্বাপিত হইতেছে। তিনি যুবতীর সম্মুখীন হইয়া কহিলেন,“মা ! আপনি কে? কেন এত রাত্রে এই নির্জন ভয়াবহ পথে এমন করিয়া বেড়াইতেছেন?” যুবতী কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিল, “আমি একজন সন্ত্রান্ত হিন্দুর ঘরের বাল বিধবা। আমার কোন আত্মীয় পীড়িত, দিনের বেলা যাইতে পারি না, তাই রাত্রে তাহাকে দেখিতে চলিয়াছি। কোন লােক আমাকে দূর হইতে দেখিলেই ভয়ে পলাইবে এবং আমিও আগুনের আলােকে নিজ পথ দেখিয়া লইতে পারিব মনে করিয়া এইরূপ ভাবে চলিয়াছি।” রমণীর কথায় ভুবন মােহন অবাক হইলেন এবং “তবে যাও মা” বলিয়া বাসায় প্রত্যাগত হইলেন। তাঁহার অসাধারণ ভাষা-জ্ঞান ও শিক্ষাদান-প্রণালীর কথা ইউরােপীয় কর্মচারিগণও জানিতে পারিয়াছিলেন। দিনাজপুরের তদানীন্তন ।
মহর্ষি ভুবন মােহন সহকারী ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ডেমন তাহার নিকট বাঙ্গালা শিক্ষা করিয়া- ছিলেন। তাহার শিক্ষাদান-প্রণালী ও সাধুতায় সাহেব তাহাকে যার পর নাই ভক্তি করিতেন। কয়েক বৎসর পর, তিনি, রাজসাহী বিভাগের কমিশনার হইয়া, যখন দিনাজপুর পরিদর্শনে আইসেন, তখন ভুবন মােহন মডেল স্কুলের শিক্ষক। সাহেব মডেল স্কুলের দ্বার দেশে গিয়া তাহার বঙ্গভাষার গুরু ভুবন মােহনকে ভক্তিভরে করযােড়ে নমস্কার করিয়া স্কুল পরিদর্শন করিলেন। সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি এখন কত পান?” ভুবন। চল্লিশ টাকা। সাহেব। তাহাতে আপনার চলে ? ভুবন মােহন বলিলেন, “ইহাতেই আমার বেশ চলিতেছে বরং আবশ্যক খরচ করিয়াও কিছু উদ্বৃত্ত হয়।” সাহেব শুনিয়া অবাক হইলেন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি অতি সামান্য ভাবে জীবিকা নির্বাহ করিতেন। সামান্য শাকশজী ডাল এবং মােটা চাউলের ভাতই তঁাহার উপাদেয় খাদ্য ছিল। সামান্য একখানা মােটা থানের কাপড় পরিতেন ও মােটা চাদর গায়ে দিতেন। পায়ে একজোড়া সাধারণ চটি ব্যবহার করিতেন শীতকাল ভিন্ন জামা ব্যবহার করিতেন না। তিনি বলিতেন, “আমি বাবাে আনার ধুতি পরিলেও যাহা থাকিব পাঁচ টাকার ধুতি পরিলেও তাহাই থাকিব। সুতরাং পােষাকের জন্য বেশী ব্যয় করিয়া ফল কি? বরং তাহাদ্বারা দরিদিগকে দরিদ্রদিগকে সাহায্য করিলে তাহাদের উপকার হয়। কেহ কোন মূল্যবান বস্ত্রাদি তাহাকে দিলে, তিনি তাহা কোন দরিদ্রকে দিতেন—নতুবা তাহা বিক্রয় করিয়া ১২৭ মহর্ষি ভুবন মােহন তন্মল্যে ঔষধ আনিয়া বিতরণ করিতেন। তিনি দেড় হাত চওড়া একখানা ঘােট চৌকিতে একখানা কাপড় পাড়িয়া শয়ন করিতেন। ভ্রাতুপুত্রগণ তাহাকে ভাল চৌকিতে ভাল বিছানায় শুইতে বলিতেন কিন্তু তিনি কিছুতেই তাহাতে সম্মত হইতেন না। একদিন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতুস্পুত্র যােগেন্দ্রনাথ মনে করিলেন তাহার সেই প্রিয় চৌকিখানির অস্তিত্ব লােপ না করিলে আর তাহাকে ভাল চৌকিতে শশায়ান যাইবেনা। তিনি ভুবন মােহনের অনুপস্থিতি কালে সেই চৌকিখানি ভাঙ্গিয়া একে- বারে পােড়াইয়া ফেলিলেন এবং একখানি বড় চৌকি আনিয়া সেস্থানে রাখিয়া দিলেন। ভুবন মােহন ঘরে গিয়া তাঁহার সেই চৌকি নাই দেখিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। ভ্রাতুস্পুত্র বলিলেন, “আপনার সেই চৌকিখানা পােড়াইয়া ফেলা হইয়াছে,-আপনি এই চৌকিতে শয়ন করুন। তখন তিনি নিতান্ত দুঃখিত হইয়া কহিলেন, “আমার দিনাজপুর আসার স্মৃতি তােমরা লােপ করিয়াছ ; এজন্য আমি বড়ই দুঃখিত হইলাম। আমি দারিদ্র্যের ক্রোড়ে লালিত পালিত হইয়াছি, দারিদ্র্যই আমার বরণীয়, বিলাসিতা আমার পরম শত্রু। আমার চৌকি গিয়াছে আমি মাটিতেই শুইব।” এই বলিয়া তিনি মাটিতেই শয়ন করিতে উদ্যত হইলেন; তখন কনিষ্ঠ ভ্রাতুস্পুত্ৰ জগদীশ চন্দ্র কহিলেন, আপনি এই বিছানায় না শুইলে বাসার সমুদায় চৌকি ও বিছানা পােড়াইয়া সকলেই মাটিতে শুইব। এই কথা শুনিয়া অগত্যা ভুবন মােহন তাহাদের নির্দিষ্ট বিছানায় শয়ন করিলেন। দিনাজপুরের তদানীন্তন জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ নােলেন তাহার নিকট বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষা করেন। তিনিও তাহাকে যারপর নাই ভক্তি করিতেন।
মহ, ভুবন মােহন ; কয়েক বৎসর পর তিনি রাজশাহী বিভাগের কমিশনার হইয়া দিনাজপুর পরিদর্শনে আইসেন ; তখন ভুবন মােহন মডেল স্কুলের শিক্ষক। সাহেব স্কুল পরিদর্শন করিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি তাহার বাঙ্গালা-ভাষার শিক্ষকের উন্নতির জন্য তাঁহাকে বলিলেন, “আপনি, স্কুল-সব-ইনস্পেক্টার-পদ আপাততঃ গ্রহণ করুন, পরে আপনাকে ডিপুট ইনস্পেক্টর পদে উন্নীত করা যাইবে।” ভুবন মােহন দেখি- লেন পদোন্নতি লাভ করিলে তিনি হয়ত অর্থের মােহে মুগ্ধ হইয়া পরমার্থ ভুলিয়া যাইবেন, তাই তিনি সাহেবকে বলিলেন, “আমি যাহা পাইতেছি তাহাতেই আমার বেশ চলিতেছে, আমি আর পদোন্নতি প্রার্থনা করি না।” সাহেব ভুবন মােহনের স্বার্থত্যাগে বিস্মিত হইলেন। ভুবন মােহন জেলা স্কুলে মাসিক পঁচিশ টাকা বেতন পাইতেন। ১৮৭১ খ্রীষ্টাব্দে জেলা স্কুল হইতে সংস্কৃত শিক্ষা উঠিয়া যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাহাকে মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনে দিনাজপুর মডেল মধ্য-বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তিনি গৃহ-শিক্ষকের কাৰ্য্য করিয়াও, মাসে চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা উপার্জন করিতেন। বেতনের টাকা হইতে মাসিক পাঁচ টাকা মাতাকে, পাঁচ টাকা বিধবা ভাতৃবধূকে, পাঁচ টাকা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জয়চন্দ্রকে ও পাঁচ টাকা বিধবা ভগিনীকে দিতেন। বক্রী কুড়ি টাকা দ্বারা নিজের ভরণ পােষণ ও দরিদ্রদিগকে দান করিতেন। গৃহ-শিক্ষকতার টাকা দ্বারা পুস্তকাদি ক্রয় করিতেন ও হােমিওপ্যাথিক ঔষধ আনাইয়া বিতরণ করিতেন। তাঁহার অধ্যাপনা-নৈপুণ্য, কাৰ্যকুশলতা ও পাণ্ডিত্যে কর্তৃপক্ষ ১২১ ৫ মহর্ষি ভুবন মােন তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া, ১৮৭৪ এবং ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে তাহাকে রাজশাহী বিভাগের মধ্য-বাঙ্গালা পরীক্ষায় সাহিত্য ও অঙ্কের পরীক্ষক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর স্বর্গীয় ভূদেব বাবু তাহার স্কুল পরিদর্শন করিয়া অত্যন্ত প্রীত হইয়াছিলেন। দিনাজপুরের ভূতপূৰ্ব জজ মহাত্মা মিঃ কেলী ভুবন মােহনের নিকট বাঙ্গালা-ভাষা পড়িতে আরম্ভ করেন। তিনি পরম পুণ্যাত্মা ও দয়াবান্ ছিলেন, প্রাণান্ত ও কাহাকে প্রাণদণ্ডের আদেশ দিতে চাইতেন না। একবার একজন নরহন্তা, ভঁহার নিকট মুক্ত কণ্ঠে হত্যা করা স্বীকার করিল, তিনি তাহাকে তাহার নিকট স্বীকারােক্তির বিষময় ফল বিশদ রূপে বুঝাইলেন, উকিলগণও বুঝাইলেন,—কিন্তু সে কিছুতেই স্বীয় অপরাধ অস্বীকার করিল না, অগত্যা আইনের অনুরােধে তিনি তাহাকে প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়াই মূর্হিত হইয়া পড়িলেন। তিনি অনেক দরিদ্র বালকের পড়ার সাহায্য করিতেন। এহেন মহাত্মার সহিত মহাপ্রাণ ভুবন মােহনের বিশেষ সদ্ভাব জন্মিল। উভয়ে নির্জনে বসিয়া কত ধৰ্ম্মালােচনা করিতেন। জজ সাহেবের নিকট বাইবেলের উপদেশ শুনিয়া তাহার বাইবেল পড়িতে আগ্রহ জন্মিল। জজ সাহেব তাহাকে ইংরাজী শিক্ষা দিতে লাগিলেন। অতি অল্প দিনেই তিনি ইংরাজী শিখিয়া তাহার নিকট বাইবেল পড়িতে আরম্ভ করেন। সেই হইতে তাহার ইংরাজী শিক্ষার আগ্রহ বর্ধিত হয়। অতঃপর ১৮৯৮ খ্ৰীষ্টাব্দে ই মার্চ তারিখে, সপ্তাহে সােম, বুধ ও শুক্রবার স্বর্গীয় সাধু অঘাের নাথের জামাতা, দিনাজপুর ডিষ্ট্রিক্ট বােডের তদানীন্তন একাউন্টান্ট, বাবু নিমাই চরণ ঘােষের নিকট লেনি মহর্ষি ভুবন মােহন গ্রামারের syntax পড়িতেন এবং তাহার পরিবর্তে তাহাকে সংস্কৃত শিক্ষা দিতেন। ১৮৮১ খ্ৰীষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর জননী রাসমণি দেবী পরলােক গমন করিলে, তিনি বালকের ন্যায় রােদন করিতে লাগিলেন। তিনি জীবনে আর কাহারও মৃত্যুতে তেমন অধীর হন নাই। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি ছুটি লইয়া কলিকাতা গেলেন, তথায় পুণ্যতােয়া জাহ্নবীর তটে বিস্তর দরিদ্রকে ভােজন করাইয়া মাতার স্বার্থে যথেষ্ট দান করিলেন। দিনাজপুর আসিয়াও সেইরূপ দরিদ্র ভােজন করাইয়া দান করিলেন। তাঁহার ভ্রাতা আনন্দচন্দ্র তাহাকে এই কাৰ্যে বিশেষ অর্থ সাহায্য করিয়াছিলেন। অতঃপর তিনি জননীর স্বর্গার্থে প্রত্যহ উপাসনা করিতেন। তিনি অতঃপর রায় সাহেব বাহাদুরের কুমারদ্বয়ের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হইয়াছিলেন। পরম বৈষ্ণব রায় সাহেব বাহাদুর তঁাহার অসীম ভগবদ্ভক্তি দেখিয়া তাহাকে পূর্ব হইতেই যার পর নাই শ্রদ্ধা করিতেন এক্ষণে তাহার অধ্যাপনা নৈপুণ্য দর্শনে তাহার শ্রদ্ধা আরও বৰ্ধিত হইল। তাহারই প্রস্তাব অনুসারে তিনি দিনাজপুর-কায়স্থ- সভায় কিছুদিন সভাপতির আসন অলঙ্কত করিয়াছিলেন। দিনাজপুরের অন্যতম ভূম্যধিকারিণী হরিপুরের শরৎসুন্দরী চৌধুরাণীও তাহার নিকট কিছুদিন পড়িয়াছিলেন। ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে আনন্দচন্দ্র পরলােক গমন করেন। তিনি হরিপুরের জমীদার গণের উকিল ছিলেন। জমিদারগণ তাঁহার নিকট অনেক টাকা পাইবেন বলিয়া দাবী করিলেন। তখন তাহার অন্য ভগিনীপতি বাবু ঈশান মহর্ষি ভুবন মােহন চন্দ্র ঘােষ, ঠাকুরগাঁয় মােক্তারী করিতেন। ঈশান বাবু বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি জমিদার মহাশয়গণের সহিত আনন্দ চন্দ্রের হিসাব মীমাংসা করিতে গেলেন, কিন্তু হিসাবে নানারূপ গােলযােগ ৰাধিল। তখন ভুবন মােহন নিজেই হরিপুর গেলেন। জমিদারগণ এক সভা আহ্বান করিয়া তাহাকে ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা করিতে অনুরােধ করেন। হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ সেবক হরিপুরের জমিদারবৃন্দ ব্রাহ্ম- চার্যের হিন্দু ধৰ্ম্মানুমােদিত বক্তৃতায় বিমােহিত হইয়া গেলেন। হিসাবের সমুদয় গােলমাল মিটিয়া গেল, তাহাদের আর এক কপর্দকও পাওনা হইল না ; অধিকন্তু তাহারা তাঁহার পাথেয় পৰ্য্যন্ত বহন করিলেন। ভুবন' মােহন সংসারে থাকিয়াও, কখনও মেহ মমতার বশবর্তী হইয়া আত্মীয় স্বজনের স্বার্থের জন্য ন্যায় পথ পরিত্যাগ করেন নাই। কনিষ্ঠ ভ্রাতা যাদবচন্দ্রকে তিনি বড় স্নেহ করিতেন। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জয়চন্দ্রের সহিত যাদবচন্দ্রের মনােমালিন্য হইলে তিনি ভ্রাতৃগণের সহিত পৃথক হইয়া বালুবাড়ীতে পৃথক্ বাসা করেন। যে স্থানে তিনি বাসা করিলেন ঐ স্থানে পূর্বে ব্রাহ্মসভা ছিল। তাহার বাড়ী করার অনেক পূর্বেই ব্ৰাহ্মসভা গণেশ তলায় স্থানান্তরিত হওয়ায় স্থানটি শূন্য পড়িয়াছিল। যাদবচন্দ্র মনে করিয়াছিলেন ঐ স্থান যখন মহারাজা বাহাদুর, ভুবন মােহনকে দান করিয়াছেন তখন তাহাতে আর তাহার কোন স্বত্ত্ব নাই। ভুবন মােহনই তাহার মালিক, যাদব চন্দ্র এই স্থানে বাসা প্রস্তুত করার জন্য ভুবন মােহনের অনুমতি চাহি- লেন। ভুবন মােহন কহিলেন, “মহারাজা বাহাদুর ব্রাহ্মসভার জন্য ১২ মহর্ষি ভুবন মােহন ঐ স্থান আমাকে দিয়াছিলেন। ব্রাহ্মসভা ঐ স্থান পরিত্যাগ করিয়াছে, সুতরাং ঐ স্থান এক্ষণে আর ব্রাহ্মসভা বা তাঁহার নাই, মহারাজা বাহাদুরই উহার এক্ষণে প্রকৃত মালিক। অতএব তুমি তাহার নিকট হইতে বন্দোবস্ত করিয়া লও।” তখন দিনাজপুর সহরে জমি এখনার মত মহার্ঘ ছিল না। দিনাজপুরাধিপতির উদারতাও যথেষ্ট ছিল, বাড়ী ঘর প্রস্তুত করিয়া, পরে গিয়া বন্দোবস্ত করিলেও কোন ক্ষতি হইত না। যাদব চন্দ্র তাহাই করিলেন এবং মহারাজা বাহাদুরের নিকট হইতে স্থানটুকু পত্তন হইলেন। মহারাজা বাহাদুর এই ব্যাপারে ভুবন মােহনের কর্তব্য-নিষ্ঠায় যার পর নাই সন্তুষ্ট হইলেন। এই সময় তিনি ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে কয়েকটি উপদেশ লিপিবদ্ধ করিয়া ছিলেন। তাহার সেই “উদ্বোধন” শীর্ষক উপদেশ গুলি আমরা নিয়ে পাঠকগণকে উপহার দিলাম। “উদ্বোধন।” ১। ঈশ্বর লাভই মানব জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ২। তাঁহার সহিত নিত্য সহবাস, উপভােগ, মানব জীবনের চরম ফল। ৩। উৎসব হৃদয়ের সঞ্জীবন মহৌষধ। ৪। মােহ-নিদ্রায় নিদ্রিত হৃদয়কে প্রেমালিঙ্গনে উদ্বুদ্ধ বা জাগরিত করিতে উৎসবের ন্যায় আর দ্বিতীয় নাই। ৫। অসুরেরা সময়েই বল পায়। যতই লােক আসুরিক প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিবে, ততই সে তাহাকে পরাভব করিবার শক্তি পাইবে।
মহর্ষি ভুবন মােহন ৬। চির জীবন সুহৃদ, চির জীবন সহচর তুমি। যে মানব মর্ত্য- জগতে থাকিয়া তােমার সহিত সখ্য-সৌহৃদ্যভাব সংস্থাপন করিতে পারেন তিনিই ধন্য,তিনি সার্থক-জন্ম, তাহারই মানব-জনম ধারণ, সার্থক হইয়াছে। ৭। তুমি পুরাতন, অথচ তােমার ন্যায় নূতন আর কেহ নাই। যদিও তুমি পুরাতন, তথাপি যখনই তােমার দিকে তাকাই, তখনই নূতন ভাবে দেখিতে পাই। ৮। ব্রাহ্মধৰ্ম্ম কিজন্য উদার বা বিশ্বজনীন ধৰ্ম্ম বলিয়া খ্যাত? (ক) ব্রাহ্মধর্মে পরিমিততা ও সঙ্কীর্ণতাহীনতা। (খ) যে ধর্মে যেখানে যে কোন সত্য পাইবেন তাহাই আদরে গ্রহণ করিবেন। (গ) ব্রাহ্মধৰ্ম্মে জাতি বিশেষকে আদর করে না। (ঘ) ব্রাহ্মধর্মের গুরু সেই জগদগুরু-পরম গুরু-কেন না তিনি জানেন যে মানব সহস্র জ্ঞানে জ্ঞানী হইলেও, তাহার জ্ঞানের সীমা আছে। কিন্তু ব্ৰহ্ম অনন্ত জ্ঞানের বারিধি, তাহাতে জ্ঞানের উৎপত্তি ও বিলয়। ৯। আগমােথং বিবেকোখং দ্বিধা জ্ঞানং তমােচ্যতে। শব্দ ব্ৰহ্মাগমময়ং পরং ব্রহ্ম বিবেকজম্ ॥ যে জ্ঞান ঈশ্বরের পথ প্রদর্শক, সেই জ্ঞানকেই ঈশ্বর বিষয়ক জ্ঞান বলে। এই ঈশ্বর বিষয়ক জ্ঞান দ্বিবিধ, আগমনীখ ও বিবেকোখ। ‘সত্যং জ্ঞানমনস্তং ব্রহ্ম। ইত্যাদি শাস্ত্রীয় উপদেশ-বিশেষ দ্বারা যে জ্ঞানের উদয় হয়, তাহার ১৩৪
মহর্ষি ভুবন মােহন
নাম আগম-জনিত জ্ঞান। আর ধ্যান-ধারণা-সমাধি দ্বারা যে জ্ঞানের
উদয় হয় তাহার নাম বিবেক-জনিত জ্ঞান। আত্মা প্রবুদ্ধ হইলেই
বিবেকের উদয় হয়, এবং বিবেক দ্বারাই পরব্রহ্মকে অবগত হওয়া
যায়। আত্মার উদ্বোধনের জন্যই কীৰ্ত্তন ধ্যানাদির প্রয়ােজন।
নারদ পুরাণে প্রহ্লাদ বাক্যং-
জপতো হরি নামানি তং শত গুণাধিক।
আত্মনাঞ্চ পুনাত্যুচ্চৈজন্ শ্রোতণ পুনাতিচ।
শ্রবণং কীৰ্ত্তনং বিষ্ণো শরণং পাদ সেবনং।
অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদন।
ক্ষান্তব্যের্থ কালত্বং বিরক্তি মনি শূন্যতা।
আশাবন্ধ সমুৎকণ্ঠা নাম গানে সদারুচিঃ ॥
আসক্তি গুস্তুনাখ্যানে প্রতি স্তদ্বসতি স্থলে।
ইত্যাদয়ােহনু ভাবাঃ সুজাত ভাবান্ধুরে জনে।
ন বিদ্যা সঙ্গীতাৎ পরা।
শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রকিশাের রায় গুণসাগর বলিয়াছেন, “সঙ্গীতের অপরা-
জিতা শক্তি, যাবতীয় প্রধান শক্তিকে পরাজিত করিয়াছে। বক্তার
বক্তৃতা-শক্তি, কবির কবিত্ব-শক্তি, তার্কিকের তর্ক-শক্তি প্রভৃতি সমস্ত
শক্তিকেই সঙ্গীতের অলৌকিক শক্তি পরাভব করিয়াছে। সঙ্গীতের
মনােমােহিনী শক্তিতে ভূধর হইতে ভূগর্ভ পৰ্যন্ত সমস্ত প্রাণীজগৎ মােহিত।
যিনি জগতের শ্রেষ্ঠ কবি বলিয়া বিখ্যাত সেই মহাকবি সেকসপিয়রও
সাতিশয় সঙ্গীত-প্রিয় ছিলেন। মহাকবি মিণ্টন ও সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন।
কবিগুরু বাল্মীকি লৰ কুশকে রামগন শিক্ষা দিয়া রামচন্দ্রকে মােহিত
১৩৫
মহর্ষি ভুবন মােহন
করিয়াছিলেন। মহাকবি হােমার গান গাহিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা
করিতেন। রামপ্রসাদ, জয়দেব, চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি সঙ্গীতে দেশ
মােহিত করিয়াছিলেন।
নাম চিন্তামণিঃ কৃষ্ণশ্চৈতন্যরস বিগ্রহ
পূর্ণ: শুদ্ধো নিত্যমুক্তোহভিন্নাত্মা নাম নামিনাের।
তৃণাদপি সুনীচেন তৰােরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদাহরিঃ।
অহঙ্কার বিমুক্তানাং কেশবাে নহি দূরগঃ ।
অহঙ্কার যুতানাঞ্চ মধ্যে পৰ্বত কোটয়ঃ ।
নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যা,
নমেধয়া, ন বহুনা শুতেন,
যমেবৈধ বৃণুতে তেন লভ্য
যস্য নাস্তি নিজা প্রজ্ঞা কেবলং তু বহুতঃ,
ন স জানাতি শাস্ত্রার্থং দৰ্বীপ রসানিব ।
যস্য নাস্তি স্বয়ং প্রজ্ঞা শাস্ত্র তস্য করােতি কিম্।
লােচনভ্যাং বিহীনস্থ দর্পণঃ কিং করিষ্যতি ।
ক্ষণং ব্রহ্মাহমশ্মীতি যঃ কুৰ্যাদাত্ম বিগুণ।
তৎসৰ্ব্ব পাতকং হন্তি তমঃ সূর্যোদয়ে যথা ।
কুলং পবিত্ৰং জননী কৃতার্থা বসুন্ধরা পুণ্যবতীচ তেন।
অপার সম্বিৎ সুখ সাগরেহস্মিলীনং পরে ব্রহ্মনি যস্য চেতঃ।
এক এব সুহৃদ্ধৰ্ম্মো নিধনে হপাণুযাতি যঃ।
শরীরেণ সমং নাশং সমদ্ধি গচ্ছতি ॥
মহর্ষি ভুবন মােহন
ধর্মেনৈব জগৎ সুরক্ষিতমিদং ধৰ্ম্মো ধরাধরে।
ধৰ্ম্মা বস্তু ন কিঞ্চিদস্তি ভুবনে ধৰ্মায় তস্মৈনমঃ।
ধর্মে বিশ্বস্য জগত: প্রতিষ্ঠা।
ধৰ্ম্মে সৰ্ব্বং প্রতিষ্ঠিত।
ধন্যা মাতা পিতা তস্য পবিত্রং তৎকুলং শিৰে
পিতরস্য সন্তুষ্টাঃ মােদন্তে ত্ৰিদশৈঃ সহ।
গায়স্তো গায়সীং গাথাং পুলকাঙ্কিত-বিগ্রহাঃ।
অম্মৎ কুলে কুল শ্রেষ্ঠে জাতত ব্রহ্মোপদেশিকঃ।
কিমপ্যাকং গয়া পিণ্ডৈ কিং তীর্থ শ্রাদ্ধ তর্পণে
উত্তমাে ব্ৰহ্ম সদ্ভাববা ধ্যান ভাববাস্তু মধ্যমঃ।
জপস্তুত্যধমাে ভাবাে বাহ পূজা ধমাধমা ।”
এইরূপে বৎসরের পর বৎসর গত হইল। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দ আসিয়া
উপস্থিত হইল। ভুবন মােহন, তাহার ধর্ম-সাধনের সময় বৃদ্ধির মানসে,
ইতঃপূৰ্বেই গৃহশিক্ষকতা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, এক্ষণে জীবিকা
নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন স্কুলের চাকুরীটিও পরিত্যাগ করিতে কৃত
সঙ্কল্প হইয়া, অবসর লাভের জন্য আবেদন করিলেন। অবসর গ্রহণ
করিলে তাহার কিরূপে চলিবে তাহা একবারও চিন্তা করিলেন না।
তাহা তিনি করিতেন না। তিনি বলিতেন,
ধংহি চিন্তয়েৎ প্রাজ্ঞ আহারং নৈব চিন্তময়ৎ।
আহারােহি মনুষ্যানাং জন্মনা সহ জায়তে।”
“নিশ্চিন্ত বৈরাগী ঈশা, সকল বিষয়ের জন্যই, ঈশ্বরের প্রতি নির্ভর
করিতেন। এইজন্য তিনি বলিতেন, “আমি বলিতেছি, কি আহার
১১
মহর্ষি ভুবন মােহন করিব, অথবা কি পরিধান করিব বলিয়া ভাবিও না, কেন না তােমা- দের যে সকল অভাব আছে, তাহা তােমাদের স্বর্গীয় পিতা জানেন। ঈশ্বরের রাজ্য ও তাহার ধর্ম সর্বাগ্রে অন্বেষণ কর, তাহা হইলে এই সকল দ্রব্যও তোমাদিগকে প্রদত্ত হইবে। কল্যকার নিমিত্ত ভাবিও না। তিনি অবসর প্রাপ্তির আবেদন করিলেন, তদানীন্তন বিভাগীয় ইনস্পেক্টার, তাহার ন্যায় একজন প্রবীন শিক্ষককে সহসা পরিত্যাগ করিতে কুষ্ঠিত হইলেন। তিনি ভুবন মােহনকে আরও কিছুদিন, অপেক্ষা করিতে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু ভুবন মােহন যে ধর্মের ডাকে ছুটিয়াছেন, তিনি ইনস্পেক্টার সাহেবের নিষেধ শুনিবেন কেন ? যাহার ডাকে রূপ-সনাতন একদিন বঙ্গেশ্বর সায়েস্তা খাঁর কঠোর আদেশ লঙ্ঘন করিয়াছিলেন, ভুবন মােহন আজ তাহারই ডাক শুনিয়াছেন, সুতরাং তিনি সাহেবের অনুরােধ শুনিলেন না। তিনি কহিলেন “আমি এতদিন আপনাদের সেবা করিলাম, এক্ষণে দয়া করিয়া আমাকে অবসর দিন, আমি একবার ভগবানের সেবায় আত্মনিয়ােগ করি।” ইনস্পেক্টার মহােদয় আর কথা কহিলেন না, তিনি তাঁহার আবেদন মঞ্জুর করিয়া মাসিক কুড়ি টাকা তাহার অবসর বৃত্তি নির্ধারণ করিলেন। ত্রয়ােদশ অধ্যায়। সেবা ব্রত। ভুবন মােহন বলিতেন, “জগতের নর-নারীগণ ব্ৰহ্ম হইতে বিভিন্ন নহে, তাহারাও পরব্রহ্মেরই অংশ। যেমন হস্ত পদাদি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমষ্টিই শরীর, সেইরূপ সমস্ত আত্মার সমষ্টিই ব্ৰহ্ম। ইহার একটি বাদ ১৮ মহর্ষি ভুবন মােহন দিলে, অপরটি অঙ্গহীন হইয়া পড়ে। অঙ্গহীন উপাসনায় তাহার প্রীতি হইতে পারেন না। সেই ব্ৰহ্মকে যেমন সত্য স্বরূপ জানিয়া,—তাহাতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখিয়া,--আপনার আত্মাতে প্রতিষ্ঠিত করিয়া, সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম সুহৃদ মনে করিয়া, তাঁহাকে প্রাণের প্রতি দিয়া পূজা করিতে হইবে, সেইরূপ তাহারা প্রিয় সন্তান নর-নারীগণকে, ভ্রাতা-ভগিনীর ন্যায় প্রাণ দিয়া ভাল বাসিতে হইবে, সর্বপ্রকারে তাহাদের কল্যাণসাধনে তৎপর থাকিতে হইবে। আপনার মধ্যে আত্মা দ্বারা আত্মাকে জানিয়া বিশ্বাত্মা রূপে আরাধনা, এবং কল্যাণকর কাৰ্য্য দ্বারা জগতের নরনারীগণের প্রীতি ও পরিতােষ সম্পাদন করা উভয়ই সাধনার অঙ্গ। ইহার একটি বাদ দিলে উপাসনা পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্ত হয় না। সর্বদাই পরমাত্মা জীবাত্মাকে উপদেশ দিতেছেন। জীবাত্মার প্রতি পরমাত্মার উক্তি লইয়াই বেদ-উপ- নিষদ। আত্মাই অনন্ত বেদময়,-তাহার বাণী বেদ-স্বরূপ। মন বাহ্ন বিষয়ে বিক্ষিপ্ত থাকিলে, আত্মা চঞ্চল ও অধীর হইয়া উঠে। অস্থির আত্মার সেই বাণী উপলব্ধি করা যায় না। বিক্ষিপ্ত মনকে বাহবিষয় হইতে সংহৃত করিয়া, আত্মাতে প্রতিষ্ঠিত করিতে হয় এবং ঐকান্তিক চিত্তে আত্মার ধ্যান করিতে করিতে সেই বাণী শ্রুত হওয়া যায়। তখন আত্মাও ব্ৰহ্ম- ভাবাপন্ন হইয়া পড়ে। দেবহুতি-তনয় মহর্ষি কপিল একজন সিদ্ধ ব্ৰহ্ম- জ্ঞানী ছিলেন। তিনি ব্রহ্মভাবস্থ হইয়া মাতাকে উপদেশ দিতেছেন, আমি একমাত্র পরমব্রহ্ম পরমাত্মা হইয়াও সর্বদা সকল ভূতে জীবাত্মা রূপে অবস্থান করিতেছি। সেই জীবকে অবজ্ঞা করিয়া যে পরব্রহ্মের অর্চনা করে, তাহার সে অর্চনা বিড়ম্বনা মাত্র। অতএব সৰ্ব্বভূতে অধিষ্ঠিত জীবাত্মারূপে আমাকে দান, যান, মিত্রতা ও সর্বত্র স মহর্ষি ভুবন মােহন দ্বারা আপ্যায়ন করিবে। সুতরাং ব্রহ্ম-উপাসনার দুইটি অঙ্গ-জীব ও ব্ৰহ্ম। এক ব্ৰহ্মই ব্যষ্টি ভাবে জীব, এবং সমষ্টি ভাবে ব্ৰহ্ম। “সতং জ্ঞানমনন্ত মেকমেবা দ্বিতীয়। সত্য ও জ্ঞানস্বরূপ পরব্রহ্ম এক অদ্বিতীয় হইয়াও অনন্তরূপে বিরাজ করিতেছেন। সকল আত্মার আত্মা পরমাত্মাকে যেমন আপনার আত্মাতে প্রতিষ্ঠিত করিয়া তাহাকে জানিবার চেষ্টা করিবে,স্তুতি, কীৰ্ত্তন প্রার্থনাদি দ্বারা সৰ্বোতভাবে তাহার পূজা করিবে, সেইরূপ ভিন্ন ভিন্ন দেহীদিগের মধ্যে অবস্থিত জীব-নিকরকেও দয়া মৈত্রী, সেবা ও কল্যাণকর কাৰ্য্য দ্বারা তাহাদের প্রীতি সাধন করিবে। আত্মার তুষ্টিতেই ভগবানের তুষ্টি। দয়া পরােপকারাদি জীবহিতকর কাৰ্য্য দ্বারা আত্মার যেমন তুষ্টি হয় তেমন আর কিছুতে হয় না। যিনি এক দিনও স্বীয় শক্তি দ্বারা ক্ষুধিতের ক্ষুধা, তৃষিতের তৃষ্ণা ও দুঃখীর দুঃখ মােচন করিয়াছেন, তিনি ইহা স্পষ্ট উপলব্ধি করিয়াছেন। সংসারে আত্মার তৃপ্তি-কর যদি আর কিছু থাকে তবে পরসেবা বা পরহিত- সাধনকেই নির্দেশ করিতে হয়। যাহা জগতের কল্যাণকর, আত্ম- তৃপ্তি ও ভগবৎপ্রীতির সাধক তাহাই ধর্ম। দয়া দ্বারা সেই জগতের কল্যাণ, আত্মপ্রীতি ও ভগবৎপ্রীতি সম্পাদিত হয়। এইজন্য মহাযােগী মহাদেব উপদেশ দিয়াছেন,—“দয়াই সকল ধর্মের মূল, সর্ব প্রযত্নে সেই দয়া-ধৰ্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করিবে।” তাই ভুবন মােহন পরসেবাও ব্ৰহ্মোপাসনা বলিয়া মনে করিতেন, এবং সেই পরসেবার জন্য পাের্জনা থাকা কালে হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আরম্ভ করিয়াছিলেন। পাের্জ- নার সঙ্গে তাঁহার সেবাব্রতের উপকরণ হােমিওপ্যাথিকের বাক্সটি ১৪০ মহর্ষি ভুবন মােহন পরিত্যাগ করিয়া আইসেন নাই। তিনি দিনাজপুর আসিয়া দেখিলেন এখানে কোন হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসক নাই। এলােপ্যাথিক ও কবিরাজী চিকিৎসাই এখানে প্রচলিত। হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতি তাহার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। বর্তমান যুগে একমাত্র হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসাই মানবের একমাত্র উপযােগী বলিয়া তাহার বিশ্বাস ছিল । তিনি জগতের হিতের জন্য তাহা প্রচার করাও ধৰ্ম্ম বলিয়া মনে করিতেন। তিনি বলিতেন, “ব্রাহ্মধৰ্ম্মও রাম মােহনের ধর্ম নহে, হােমিওপ্যাথিকও হানিমানের চিকিৎসা নহে। ব্রাহ্ম-ধর্মের মূলতত্ব ও “সদৃশ-বিধান-তত্ত্ব” দুইটিই ভগবানের মহাসত্য। শতসহস্র শতাব্দী পূৰ্ব্বে, গিরিগুহাবাসী পর্ণফলমূলাশী আৰ্য ঋষিগণের জীবন-ব্যাপিনী সাধনার ফলে এই মহাসত্য প্রকাশিত হইয়াছিল। “এক মেবাদ্বিতীয় * উপলব্ধি করিয়া তাহারাই সচ্চিদানন্দ পরমাত্মা-পরম ব্রহ্মের আরাধনা বা উপাসনা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন এবং “বিষস্য বিষমৌষধং হােমিওপ্যাথির মূলতত্ত্ব, সদৃশ-বিধান-তত্ত্ব এককালে তাহাদিগ- দ্বারাই উদ্ভাবিত হইয়াছিল। কালক্রমে আৰ্যগণের তপােবল বা সাধনার গতি যতই মন্দীভূত হইতে লাগিল, এই দুইটি মহাসত্যও ততই বিলুপ্ত হইতে লাগিল। সেই লুপ্তপ্রায় মহাসত্যই সত্যস্বরূপ ভগবানের ইচ্ছায় জগতের কল্যাণের জন্য মহাত্মা রাম মােহন রায় ও মহাত্মা হানিমান দ্বারা পুনরায় জগতে প্রকাশিত হইয়াছে।” তিনি আরও বলিয়াছেন, যেমন মাতাপিতা সন্তানের কল্যাণের জন্য সময় সময় আদেশ মূলতত্ত্ব,এই মহর্ষি ভুবন মােহন উপদেশ প্রদান করেন। বিশ্বপিতাও সেইরূপ তাহার জগৎ সন্তানের কল্যাণের জন্য মহাপুরুষগণের মধ্য দিয়া তাহার মঙ্গলাদেশ প্রচার করেন। মানব মাত্রেরই তাহা পালন করা অবশ্য কর্তব্য। ‘তস্মিন প্রীতিস্তৎ প্রিয়কাৰ্য্য সাধনঞ্চ তদুপাসনমেব’ এই নব বিজ্ঞা- নের যুগে, বিজ্ঞানের মহাসত্যে প্রতিষ্ঠিত এই নব বিধানের গ্রহণ ও প্রচার করাই আমার উদ্দেশ্য। সত্য প্রকাশ, তাহা কেহ প্রতিরোেধ করিতে পারিবে না। তথাপি আমার এই ক্ষুদ্রশক্তিদ্বারা, তাঁহার সেই মঙ্গলাদেশ যতটুকু পালন করিতে পারি তাহাতে ত্রুটি করিব না, কারণ জগতের মঙ্গলের জন্য ইহা মঙ্গলময় বিধাতার মহাদান। তাহার প্রদত্ত ধন, তাহার সন্তানগণকে বিলাইব ইহাতে আমার গৌরবের লাঘব কি? এই মঙ্গল বিধানের যতই প্রচার হইবে ততই জগতের মঙ্গল। পাপ- তাপ-ক্লিষ্ট, সদাচার-ভ্রষ্ট, সংসার-নিষ্পেষিত, ও সমাজ-তাড়িত দুঃস্থ নর- নারীগণের মানসিক ব্যাধি নিরাকরণের একমাত্র সহজ সুগম পন্থা যেমন ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্ম, সেইরূপ দুঃখ-দারিদ্র-নিপীড়িত ও অশেষ ব্যাধি জর্জরিত নর- নারীগণের দৈহিক ব্যাধি হইতে নিষ্কৃতি লাভের সহজ অথচ অল্প ব্যয়- সাধ্য হােমিওপ্যাথি একমাত্র মহৌষধ। রাশি রাশি শাস্ত্র আলােড়ন ও অধ্যয়ন করিয়া এবং যাগ যজ্ঞ তপশ্চৰ্যাদির অনুষ্ঠান করিয়াও যে ভব- ব্যাধির উন্মলন করা যায় না, তাহা যেমন এক হরি নামে সাধিত হইতে পারে সেই প্রকার গণ্ডায় গণ্ডায় গুলি ও বােতলে বােতলে রাশি রাশি ঔষধ সেবন করিয়া যে ফল পাওয়া যায় না তাহা সুনির্বাচিত হােমিওপ্যাথির একটা মাত্র অনুবটিকাতেই পাওয়া যাইতে পারে। ১৪২ মহর্ষি ভুবন মােহন ভক্তাবতার দেবর্ষি নারদ যেরূপ ভৈরব হুঙ্কারে ঘােষণা করিয়া জগতকে জানাইয়াছেন, “হরের্ণাম হরের্ণাম হরের্ণামৈব কেবলম্।” “কলৌনাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেবগতিরন্যথা।” সেইরূপ বৈজ্ঞানিক মহাসত্যের উপর দণ্ডায়মান হইয়া হানিমানও হােমিওপ্যাথিক প্রচার করিয়া বলিয়াছেন,-“রাশি রাশি ঔষধ সেবন করিয়া নাড়ী বিদাহিত করিবার প্রয়ােজন নাই,হােমিওপ্যাথিক একটি ফেঁাটা বা একটি বটিকাই অশেষ রােগ নির্মূল কারক।” “সত্যমেব জয়তে” সত্যেরই জয় হইবে। অল্পদিনের মধ্যেই ব্রাহ্মধৰ্ম্ম সকল ধর্মের সার এবং হােমিওপ্যাথি সকল চিকিৎসার সার-বিধান বলিয়া সৰ্বদিসম্মতি ক্রমে জগতের সর্বত্র সত্যরূপে গৃহীত হইয়াছে। অল্পায়াস ও অল্পব্যয় সাধ্য দুইটী বিধানই এই যুগের সম্পূর্ণোপযােগী। পাপাণু নাশ করিতে হরি নামের মত যেমন মহাশক্তি সম্পন্ন মহাস্ত্র আর নাই,বােগাণুর বিনাশেও হােমিওপ্যাথির মত অপূৰ্ব বিধান আর নাই। এই উভয়ের মূলে বিধাতার যে অপূৰ্ব্ব মহীয়সী শক্তি প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত আছে তাহা ক্ষুদ্র মানববুদ্ধির অগম্য। হমিওপ্যাথি বা সদৃশ-বিধান-তত্ব যখন সাতসমুদ্র তের নদীপার হইয়া ভারতে আসিয়া এই অল্প দিনের মধ্যে এই ঘাের পরিপন্থী এলােপ্যাথি ও কবিরাজী প্রভৃতি প্রাচীন বিধানরাজির সমক্ষেও জয়ী হইয়া সৰ্ব্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে,তখন ইহা যে এক কালে জগতের প্রধানতম চিকিৎসা-বিধানরূপে পরিগণিত হইবে না,তাহা কে বলিতে পারে?সতত্যয় জয় হউকইহাই আমার প্রাণগত ভিক্ষা ও প্রার্থনা। ১৪৩ মহর্ষি ভুবন মােহন আমি আমার ক্ষুদ্র শক্তি দ্বারা যতটুকু সম্ভব ততটুকু ইহার প্রচার করিতে চেষ্টার ত্রুটি করিব না। ভগবানের রােগগ্রস্ত দুঃস্থ সন্তানগণের সেবার জন্য দাস রূপে আমার প্রাণ ও মন সমস্তই নিয়ােজিত করিলাম। ফলাফল একমাত্র ফলদাতা বিধাতাই জানেন। প্রভু যেমন ভৃত্যদ্বারা কাৰ্য্য সম্পাদিত করিয়া লন, বিধাতাও তাহার কাৰ্য্য এই নগণ্য দাসের দ্বারা নির্বাহিত করিবেন। তাহার কাৰ্য্য তিনিই চালাইবেন আমি ইহার জন্য কাহারও নিকট প্রার্থী হইব না। যাহারা আমার নিকট চিকিৎসিত হইবার আশায় আসিবেন আমি কখনই তাহাদিগকে বিমুখ করিয়া ফিরাইয়া দিব না। পীড়া বা কোন আকস্মিক অনিবার্য কাৰ্য্য বশতঃ নিতান্ত অসমর্থ বা উত্থানশক্তি রহিত না হইলে এই সেবা ব্রতের বাধা করিব না।” তিনি দিনাজপুর আসিয়া প্রথমতঃ তাহার দুই একটি দরিদ্র ছাত্রকে চিকিৎসা করিলেন তাহাতে বেশ ফল হইল দেখিয়া ক্রমে লােকে তাহার চিকিৎসার অনুরাগী হইল। না হইবে কেন? বিনা ব্যয়ে সুচিকিৎসা পাইলে, লােকে অর্থব্যয় করিবে কেন? তারপর হােমিওপ্যাথি ঔষধ খাইতে কোন কষ্ট নাই, উহা বিস্বাদ নহে, সুতরাং মােগিগণ পণ্ডিত মহাশয়ের ঔষধের পক্ষপাতী হইয়া উঠিল। জিলাস্কুলে থাকা কালে তাঁহার রােগী সংখ্যা খুব কমই ছিল। অধিকাংশ ছাত্রের অবস্থাই মধ্যম। তারপর তিনি নূতন, এবং হােমিও- প্যাথি চিকিৎসাও তখন সাধারণের অপরিজ্ঞাত ছিল। অভিভাবক গণের অনেকেরই হােমিওপ্যাথির উপর তেমন আস্থা ছিল না। দৈনিক দুই চারিটি মাত্র রােগী তাহার নিকট আসিত, তিনি তাহাদিগকে ঔষধ দিতেন,তখন তাহার চিকিৎসালয় বা কম্পাউণ্ডার কেহ ছিল না। ১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন লাগিল। ঔষধ বাক্সে থাকিত, তিনি নিজেই ব্যবস্থা করিতেন এবং নিজ হস্তেই ঔষধ দিতেন। মডেল স্কুলে যাওয়ার পর তাহার রােগীর সংখ্যা বাড়িতে লাগিল। ইহার মধ্যে তাঁহার ছাত্ৰই অধিক ছিল। এই সব ছাত্র দরিদ্র,-ডাক্তারের দর্শনী ও ঔষধের মূল্য দেওয়া তাহাদের পিতা মাতার পক্ষে অসাধ্য ছিল। পাঁচ বৎসরের মধ্যে রােগীর সংখ্যা বাড়িয়া গড়ে দৈনিক প্রায় ১৫ জন দাড়াইল। ক্রমে রােগীর সংখ্যা উত্তরােত্তর বাড়িতে দশবৎসরের মধ্যে রােগীর সংখ্যা গড়ে দৈনিক প্রায় পঁচিশ জন হইয়া উঠিল। তখন বাসায় সুনীতিবালা পণ্ডিত মহাশয়ের অনেকটা সাহায্য করিত। তিনি তখন প্রায়ই ঔষধের বাক্স লইয়া রােগীর বাটীতে যাইতেন,-রােগী দেখিয়া ঔষধ দিয়া আসিতেন। অতি অল্পসংখ্যক রােগীই বাসায় ঔষধ নিতে আসিত। এই সময়েই দিনাজপুরের জেলা জজ মিঃ কেলী তাহার নিকট বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষা করিতেন। তিনি পণ্ডিত মহাশয়ের দাতব্য ও সুচিকিৎসার কথা শুনিয়া তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন। পণ্ডিত মহাশয়ের চিকিৎসায় তাহার এরূপ বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে তিনি যতদিন দিনাজপুরে ছিলেন, অসুস্থ হইলে সিবিল সার্জনের চিকিৎসাধীনে না থাকিয়া পণ্ডিত মহা- শয়ের দ্বারা চিকিৎসিত হইতেন। একদিন রাত্রে তাহার শরীর অসুস্থ হওয়ায়, প্রাতে পণ্ডিত মহাশয়কে ডাকিয়া পাঠাইলেন। পণ্ডিত মহাশয় গিয়া তাহার ঔষধাদির ব্যবস্থা করিলেন। সাহেব পণ্ডিত মহাশয়কে প্রাতরাশের জন্য চা, রুটি ও ডিম আনাইয়া দিলেন। পণ্ডিত মহাশয় তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান পূর্বক বলিলেন,-“আমাকে ক্ষমা করিবেন আমি নিরামিষভােজী, এই আমিষাত্মক খাদ্য আমার প্রবৃত্তির ১০৫ মহর্ষি ভুবন মােহন বিরােধী।” এই কথা শুনিয়া সাহেব ঐ সকল খাদ্য তাহার সম্মুখ হইতে বাবুচিকে লইয়া যাইতে বলিলেন; এবং তাহার বাগান হইতে ফল- মূল-শাক-সজী তাহার বাসায় পাঠাইয়া দিলেন। তিনি যতদিন দিনাজ- পুরে ছিলেন মাঝে মাঝে ভুবন মােহনকে এইরূপ প্রীতির উপহার প্রদান করিতেন। রােগীর সংখ্যা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায়, তিনি তাহার পাঠাগারে একটি আলমারীতে বেশী পরিমাণ ঔষধ আনিয়া রাখিতে লাগিলেন। তখন বালুবাড়ীর ছাত্রগণ মধ্যে কেহ কেহ তাহার ঔষধ বিতরণের সাহায্য করিতে লাগিল। তখনও তিনি রােগীর রেজেষ্টারী খুলেন নাই, কেবল কাগজে নাম ধাম টুকিয়া রাখিতেন। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে রােগীর সংখ্যা আরাে বাড়িয়া উঠিল, তাই তিনি সেবাব্রত পালনের জন্য চাকুরী পরিত্যাগ করিলেন। ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে একজন বেতন-ভােগী কম্পাউণ্ডার নিযুক্ত করিলেন এবং ১৯০০ সালে রােগীর সংখ্যা আরও বর্ধিত হওয়ায় আর একজন কম্পাউণ্ডার নিযুক্ত করিলেন । তখন অনেক মাদার টিঞ্চার শুনাইয়া ঔষধ প্রস্তুত করিয়া লইতেন। প্রথমে ম্যাঙ্গালাের হইতে ঔষধ আনাইতেন। সেখানে মূল্য সুলভ ছিল, কিন্তু তাহার ধারে ঔষধ দিত না। কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ হােমিওপ্যাথিক ঔষধ-বিক্রেতা শযুক্ত মহেশচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের সহিত পণ্ডিত মহাশয়ের পরিচয়, ছিল। তিনি তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন এবং অনেক সময় ধরে ঔষধ দিতেন। এনিমিত্ত অতঃপর তিনি তাঁহার দোকান হইতেই ঔষধ আনাইতে আরম্ভ করিলেন। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ব্যবসায়ী হইলেও সদাশয় ও দানশীল। তিনি পণ্ডিত মহাশয়ের এই মহৎ কার্যের সাহায্যে ১৪৬ মহর্ষি ভুবন মােহন ; বার্ষিক একশত টাকার ঔষধ দান করিতেন। এস্থলে আমরা আর একজন সদাশয় ব্যক্তির কথা উল্লেখ না করিয়া থাকিতে পারিলাম না। ইনি বরিশালের সেই স্বনামধন্য যাত্রা-দলপতি মহাপুরুষ মুকুন্দদাস। গত ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে তিনি দিনাজপুরে গান করিতে আসিয়া পণ্ডিত মহাশয়ের সেবাব্রতের সাহায্যার্থে পচিশ টাকা দান করেন। চাকুরী পরিত্যাগের পর পেনের কুড়ি টাকাই তাহার একমাত্র সম্বল ছিল। তাহা দ্বারা নিজের খােরাকী, দরিদ্রকে দান ও ঔষধ বিতরণ এবং ঔষধালয়ের ব্যায় নিৰ্বাহ একরূপ অসম্ভব হইয়া উঠিল। বদান্য-বর ধর্মপ্রাণ জমিদার শ্ৰীযুক্ত রায়সাহেব বাহাদুর তাহার আহারের জন্য রাধাগােবিন্দ জীর ভােগের ব্যবস্থা করিলেও অর্থকৃচ্ছতা দূরীভূত হইল না। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে দিনাজপুর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য হইল; তিনি তাহার প্রার্থী হইলেন। তিনি মাসিক কুড়ি টাকা বেতনে বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিযুক্ত হইয়া বালিকাগণকে নীতি শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করিলেন। কিন্তু ইতঃপূর্বে তিনি সুনীতি বালা প্রভৃতির ব্রাহ্ম- বিবাহ ও কতিপয় বিধবার বিবাহ দেওয়ায় হিন্দু-সমাজ মনে করিল, তিনি বালিকাগণকে হিন্দুধৰ্ম্ম-বিগহিত শিক্ষা দিতেছেন। এজন্য স্কুলের হিন্দু সভ্যগণ তাহার বিরােধী হইয়া উঠিল ; অগত্যা তিনি সে পদ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। ভুবন মােহন ভগবানে আত্মসমর্পণ করিয়া, নিষ্কাম ভাবে পরসেবায় নিযুক্ত হইয়াছেন, তাহার কাৰ্য্য বন্ধ থাকিতে পারে না। যাঁহার কাৰ্য্য, তিনিই চালাইতে লাগিলেন। ভুবন মােহন কাহারও নিকট সাহায্য প্রার্থী না হইলেও, অনেকে স্বতঃপ্রণােদিত হইয়া, তাহার এই মহাৰতের ১৪৭ মহর্ষি ভুবন মােহন সাহায্য করিতেন। তিনি প্রত্যহ প্রাতে দশটা পর্যন্ত সমাগত রােগী দিগকে ঔষধ বিতরণ করিয়া, যে সকল রােগী তাহার চিকিৎসালয়ে আসিতে অসমর্থ, তাহাদিগকে দেখিতে বাহির হইতেন। বেলা দুইটা পর্যন্ত রোগীর বাড়ী ঘুরিয়া বাসায় ফিরিতেন এবং 'নাহান্তে আবার বেলা চারটার সময় বাহির হইয়া অনেক রাত্রে বাসায় ফিরিতেন। তিনি কেবল ঔষধ বিতরণই একমাত্ৰ কৰ্ত্তব্য মনে করিতেন না, অবস্থা গতিকে অনেক মগার শুশ্রুষার ভারও গ্রহণ করিতেন। ক্রমে সুদূর মফঃস্বলেও তাহার গুণ-গরিমা প্রচারিত হইল। মফস্বলের অনেক দরিদ্র কৃষক আসিয়া তাহাকে অনেক সময় লইয়া যাইত। তাহারা পথ্যাদি পাক করিতে না জানিলে তিনি নিজে পথ্য পাক করিয়া, তাহাদিগকে শিক্ষা দিতেন ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে একদিন বর্ষাকালে সন্ধ্যার একটুকু পূর্বে আমরা তাহাকে সহরের বাহির, করিমুল্লাপুরের রাস্তায় যাইতে দেখিয়া কোথায় যাইতে- ছেন জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি কহিলেন, “করিমুল্লাপুরের একজন রােগীর ঔষধ আনিতে একজন লােক গিয়াছিল, আমি রােগীকে মাগুর মাছের যুষ খাওয়ার ব্যবস্থা দেওয়ায়, সে বলিয়াছে যুষ পাক করিতে তাহারা জানে না, তাই আমি তাহাকে যুষ পাক শিখাইতে যাইতেছি।” করিমুল্লাপুর, তাহার বাসা হইতে ৪ মাইল দূরবর্তী বর্ষার সময় রাস্তাও কর্দমাকীর্ণ। সেই দুর্গম পথে বর্ষার প্রদোষে পরহিতার্থে তাঁহাকে পদব্রজে এতদূর পথ যাইতে দেখিয়া, পাষাণহৃদয় ও ক্ষণেকের জন্য ভক্তিবসে দ্রবীভূত হইল। তাহার রােগী সংখ্যা ক্রমশঃ আরও বর্ধিত হওয়ায় ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রােগিগণের রীতিমত বেজেক্টরী খুলিলেন। এ বৎসর রােগীর সংখা প্রায় ৬০•• হইল। ক্রমেই রােগীর সংখ্যা T ১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন যতই বাড়িতে লাগিল ঔষধ ও আলমারীর সংখ্যাও তাহাকে ততই বাড়াইতে হইল। ১৯০৬ খ্ৰীষ্টাব্দে তিনি দেখিলেন, তাহার চিকিৎসালয়ের আয়তন বৃদ্ধি না করিলে রােগিগণকে ঔষধ বিতরণ ও তাহাদের অবস্থানের স্থান সংকুলন হইতেছে না। এই কাৰ্যে প্রায় দুই হাজার টাকার প্রয়ােজন, এই টাকা তিনি কোথায় পাইবেন? তাহার হাতে টাকা নাই। লােকের নিকট ও তিনি চাহিতে যাইবেন না, তবে এ টাকা সংগ্রহের উপায় কি ? তিনি এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে স্থির করিলেন, যিনি তাহাকে এ কাৰ্য্যে নিয়ােজিত করিয়াছেন তিনিই এ টাকা দিবেন। তখন তিনি সেই ভগবানের পাদপদ্মে নির্ভর করিয়্য কার্যে অগ্রসর হইলেন। এই সংবাদ জানিতে পারিয়া বদান্যবর রায় সাহেব বাহাদুরের সুযােগ্য কনিষ্ট কুমার শ্রীযুক্ত পূর্ণেন্দু নারায়ণ রায় ও মাজদিহার জমিদার রাধা গােবিন্দ চৌধুরী মহােদয় দ্বয় যথেষ্ট সাহায্য করিলেন। ইটের দেওয়ালের উপর টীনের ছাদ দিয়া, চিকিৎসালয়ের আয়তন বর্ধিত হইল। এই ঘরের কাৰ্য শেষ হইতে প্রায় ৮০০, তাহার ঋণ হইল। এই সংবাদ জানিতে পারিয়া দিনাজপুরের জনসাধারণ চান্দা তুলিয়া তাহাকে ঋণ মুক্ত করিলেন। ইহাই বর্তমান ভুবন মােহন-দরিদ্র-দাতব্য-হােমিওপ্যাথিক-চিকিৎসালয়। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে এই চিকিৎসালয়ে প্রায় ২০০০ রােগী হইয়াছিল। তিনি শিক্ষায় যেমন ব্যুৎপন্ন হইয়াছিলেন, শিক্ষা-দানে যেমন অভি- জ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন, আবার হােমিওপ্যাথিক চিকিৎসায়ও সেই- রূপ পারদর্শিতা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তাহার রােগ ও ঔষধ নির্বাচন করিবার ক্ষমতা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হইত। ব্ৰহ্ম- যুদ্ধের পর তিনি বৌদ্ধধৰ্ম্মতত্ব অবগত হইবার জন্য ব্রহ্মদেশে গিয়া- ১৪৯ মহর্ষি ভুবন মােহন ছিলেন। প্রথমে রেঙ্গুনে অবতরণ করেন, পরে ইরাবতী নদী দিয়া পেণ্ড, আভা ও অমরাবতী প্রভৃতি স্থান পরিভ্রমণ করেন। রেঙ্গুনে ফিরিয়া আসিবার কালে পথিমধ্যে একজন ইউরােপীয় উচ্চ রাজপুরুষের সহ- ধর্মিণীকে সর্দি-গৰ্ম্মি রােগাক্রান্ত দেখিতে পান। সাহেব, পত্নীর চিকিৎসার জন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থা করিয়া ফল পাইতে ছিলেন না। পণ্ডিত মহাশয় তাহার হােমিওপ্যাথিক ঔষধের বাক্সটি সঙ্গেই রাখিতেন। তখনও তাহা তাঁহার সঙ্গেই ছিল। সাহেব তাহাকে চিকিৎসক জানিয়া তাহার শরণাপন্ন হইলেন। তখন তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই দুই এক ফোটা ঔষধ দিয়া রােগিণীকে সুস্থ করিলেন। তদ্দর্শনে সাহেব যার পর নাই সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে বিস্তর টাকা পারিতােষিক দিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু তিনি তাহা গ্রহণ করিলেন না। অতঃপর সাহেব তাহাকে ইউ- রােপীয়গণের উপাদেয় নানারূপ খাদ্য আনিয়া দিয়া খাইতে অনুরােধ করিলেন। তাহা দেখিয়া তিনি কহিলেন, “মহাশয় ! অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে ক্ষমা করিবেন, আমি নিরামিষ ভােজী,-এই আমিষাত্মক খাদ্য আমার রুচির বিরােধী, এজন্য গ্রহণ করিতে পারিলাম না।” এই কথা শুনিয়া অগত্যা সাহেব কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ কিছু ফল-মূল তাহার বাসায় পাঠাইয়া দিলেন। ইহার কয়েক বৎসর পর তিনি একজন ব্রাহ্ম মহিলাকে আনিবার জন্য রেঙ্গুন যাইতেছিলেন। তাঁহাদের জাহাজখানি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করিলে একজন আরােহিনী ইংরেজ মহিলা সমুদ্র-মন রােগে আক্রান্ত হইলেন। সেই জাহাজে তাঁহার স্বামীও স্বামীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি জাহাজের ডাক্তারকে তাঁহার চিকিৎসায় নিযুক্ত মহষি ভুবন মােহন করিলেন, কিন্তু ডাক্তারের চিকিৎসায় কোন ফল দর্শিল না,ইংরেজ মহিলা ক্রমেই অধিকতর কাতরা হইতে লাগিলেন। তাহা দেখিয়া তঁাহার স্বামী বড় চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। অকূল অর্ণববক্ষে সুচিকিৎ- সার আর কোন সুবন্দোবস্ত করিবার উপায় নাই দেখিয়া তিনি একেবারে হতাশ হইলেন। সাহেবের এই বিপদের কথা শুনিয়া দয়ার সাগর ভুবন মােহন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি সাহেবের নিকট গিয়া কহিলেন, “আপনার পত্নী নাকি ‘সমুদ্র-মনে অত্যন্ত কাতর হইয়াছেন, আমার নিকট উহার বেশ ভাল ঔষধ আছে,যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে তবে আমি দেখিতে পারি।” অমানিশার গাঢ় অন্ধ- কারে পথভ্রষ্ট পথিকের সাহায্যে সহসা কেহ আলাে আনিলে যেরূপ তাহার হৃদয় আশ্বস্ত হয়, সাহেবও তদ্রুপ আশ্বস্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে অতীব আগ্রহ সহকারে নিজ কক্ষে লইয়া গেলেন। ভুবন মােহনের সুনির্বাচিত দুই এক দাগ ঔষধেই ইংরেজ মহিলা সুস্থ হইলেন। তখন সাহেব তাহার জন্য ইউরােপীয় উপাদেয় নানাবিধ খাদ্য আনাইয়া তাঁহাকে খাইতে দিলেন, কিন্তু ভুবন মােহন তাহা খাইলেন না, কহিলেন, “আমি নিরামিষভােজী, আপনার এই শ্রদ্ধার জিনিষ আমি গ্রহণ করিতে না পারিয়া লজ্জিত ও দুঃখিত হইলাম, আশাকরি অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক ক্ষমা করিবেন। সাহেব “আচ্ছা বেশ” বলিয়া তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্য উপায় অবলম্বন করিলেন। ভুবন মােহন তৃতীয় শ্রেণীতে ছিলেন, সাহেব কাপ্তেনের সহিত বন্দোবস্ত করিয়া তাহার জন্য একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্যাবিন লইলেন এবং তাহার জিনিষ পত্র লােক দ্বারা তৎক্ষণাৎ তথায় আনাইয়া তাহাকে তথায় থাকিবার যথা মহর্ষি ভুবন মােহন মােগ্য সুব্যবস্থা করিলেন। যথাকালে জাহাজ রেঙ্গুন পৌছিলে, সাহেব কুলি দ্বারা তাহার জিনিস পত্র তাহার গন্তব্য স্থলে পৌছাইয়া দিলেন। তিনি ১৯১১ খ্ৰীষ্টাব্দে শ্ৰীশ্ৰীমন্ ভারতেশরের রাজ্যাভিষেকোপলক্ষে অনর-সার্টিফিকেট পাইয়াছিলেন। তাঁহার নিকট অনেকে হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিখিতে আসিত। তিনি তাহাদিগকে যথাবিধ শিক্ষা দিয়া তিন বৎসরান্তে পরীক্ষা লইতেন, এবং উপযুক্ত ছাত্রকে ডিপ্লোমা দিতেন। তাহার এই চিকিৎসালয় সংসৃষ্ট শিক্ষা-সমিতির নাম "Dinajpur Homeopathic Poor Charitable Dispensary and Hannimana club" আমরা গভর্ণমেন্ট প্রদত্ত তাহার অনর-সাটিফিকেটের নকল পাঠক গণের কৌতূহল নিবারণা নিম্নে প্রকাশ করিলাম, "By Command of His Excellency the Viceroy and Governor General of India in council this cirtificate is presented in the name of His Most Gracious Majesty King George v Emperor of India on the occasion of His Imperial Majesty's Coronation Durbar at Delhi to Babu Bhuban Mahan Kar, late Pandit of the Middle English school, Dinajpur in recognition of services in the gratuitous treatment of the sick people as a Homeopathic Doctor." 12th December (sd) S. Balay Lieutenant governor of Eastern Bengal and Assam 1911 মহর্ষি ভুবন মােহন সাধারণেরও তঁাহার চিকিৎসায় অটল বিশ্বাস ছিল, তাহারা কেহ তাহাকে মহর্ষি কেহ তাহাকে দেবতা বলিয়া ভক্তি করিত, এবং তাহার ঔষধ দৈব ঔষধ জ্ঞানে যারপরনাই শ্রদ্ধা করিত। একদিন একজন বৃদ্ধ মুসলমান রােগী তাহার নিকট আসিল। তিনি তাহার ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া একজন স্বেচ্ছাসেবককে ঔষধ দিতে বলিলেন, স্বেচ্ছাসেবক ঔষধ প্রস্তুত করিয়া দিলেন। বৃদ্ধের তাহাতে প্রাণের আকাঙ্ক্ষা মিটিল ,সে কহিল,“পণ্ডিত মহাশয় ! তুমি কঁাহা দাওয়া দিলেন? তুমি নিজে দাওয়া না দিলে মাের বেরাম সারিবার নহে।” ভুবন মােহন তাহার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে বিস্মিত হইলেন এবং পূর্ব প্রদত্ত ঔষধ ফেলিয়া দিয়া নিজ হাতে তাহাকে ঔষধ দিলেন। কয়েক দিন পরে সে আবার ঔষধ নিতে আসিয়া কহিল, “মাের তিন ভাগ ব্যায়াম সারি গিছে। তােমার দাওয়া হ’ল খােদর দাওয়া। আজ ঔষধ নিলেই বাকীটুকু সারি যাবে।” তিনি সেবাব্রতে যেরূপ অমানুষিক ক্লেশ সহ করিতেন তাহা বর্ণনাতীত। একদিন শ্রাবণ মাসে সন্ধ্যা হইতে অবিরাম বৃষ্টি হইতেছে। একে কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি তাহাতে আবার নিবিড় ঘনঘটায় গগন সমাচ্ছন্ন, সুতরাং গাঢ় অন্ধকার। সেই সময় একজন ভদ্রলোক সহরতলীর একটি রাস্তা ধরিয়া যাইতেছেন, হঠাৎ বিদ্যুতালােকে দেখিলেন অদূরে বৃক্ষমূলে একটি লােক ছাতা মাথায় দিয়া বসিয়া আছে। ভদ্রলােক জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে?” বৃক্ষতলাস্থ, উত্তর করিলেন, “আমি ভুবন মােহন। ভদ্রলােক বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “পণ্ডিত মহাশয় ! আপনি এসময় এমন ভাবে এখানে?” ভূবন মােহন কহিলেন, “বাবা! এখানে একটি গরীব রােগী আছে, একটিমাত্র চালির মধ্যে থাকে, ও পাক শাক মহর্ষি ভুবন মােহন করে খায়, উহাতে বসিবার স্থান নাই। রােগীটি বিকারগ্রস্ত। এই মাত্র তাহাকে ঔষধ খাওয়াইয়াছি, সে একটুকু চৈতন্য লাভ করিলেই বাসায় ফিরিয়া যাইব।” ভদ্রলােকটি ভুবন মােহনের কথা শুনিয়া আরও বিস্মিত হইলেন। অতঃপর তিনি চলিয়া গেলেন। ভুবন মােহন সেই বৃষ্টিতে ভিজিয়া রাত্রি একটা পর্যন্ত রােগীর চিকিৎসাও শুশ্রুষা করতঃ তাহাকে কিঞ্চিৎ সুস্থ করিয়া বাসায় ফিরিলেন। তিনি জাতি-ধৰ্ম্ম-নির্বিশেষে রাজা, প্রজা, ধনী, নিধন, আত্মীয় ও শত্রুতে যে একই অদ্বয় পরমাত্মা বিরাজমান বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তাহা তিনি তাঁহার সেবা-ব্ৰতে প্রমাণিত করিয়া গিয়াছেন। আমরা নিমে তাহার কয়েকটি ঘটনা পাঠকগণের নিকট উপস্থিত করিলাম। (১) মডেল স্কুলে থাকা কালে জগদ্বন্ধু পাট্টাদার নামক এক জন ছাত্র অনেক সময় তাহার সঙ্গে থাকিয়া রােগী-সেবার সাহায্য করিত। এক দিন তিনি জগদ্বন্ধুকে লইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে সন্ধ্যার প্রাক্কালে দিনাজ- পুরের পার্শ্ববর্তিনী পুনর্ভবা তটে উপস্থিত হইলেন। ইহার কিছুদিন পূৰ্বেই তাহার জননী পরলােক গমন করিয়াছিলেন। এই খানেই তাঁহার পাঞ্চ ভৌতিক দেহের অবসান হইয়াছে। মাতৃভক্ত ভুবন মােহন মাতার সেই পবিত্র শ্মশানে গিয়া বসিলেন, এমন সময় অদূরে একটি মানুষের ক্ষীণ কাতর স্বর তাহার শ্রুতি-গােচর হইল। তখন সূর্য অস্তমিত হইয়াছে, সন্ধ্যার অন্ধকার শ্মশানের নিস্তব্ধতার সহিত মিলিয়া স্থানটিকে একটুকু ভয়ানক করিয়া তুলিতেছিল। তিনি কাতরর কোথা হইতে আসিল, অনুসন্ধান করার জন্য ছাত্রটিকে মহষি ভুবন মােহন বলিলেন। সেদিন শনি' বা মঙ্গল বার ছিল কিনা তাহা জানিনা, যে বারই হউক না কেন সেই সন্ধ্যার সময় নির্জন শ্মশানে কাতর স্বর শুনিয়াইত ছাত্রের প্রাণ শুকাইয়া গিয়াছে,তখন আর সেই স্বর কোথা হইতে আসিল তাহা তাহার খুঁজিবার সাহস হইল না। অগত্যা পণ্ডিত মহাশয় নিজেই উঠিয়া, যেদিক হইতে স্বর শুনিতে পাইয়াছিলেন, সেই দিকে চলিলেন। ছাত্ৰও মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাহার পাছ পাছ চলিল। একটুকু অগ্রসর হইয়াই দেখিলেন একটি সদ্য-নিৰ্বাপিত চিতার পার্শ্বে একটি বিছানা পড়িয়া আছে সেই খান হইতেই ঐ কাতর স্বর উঠিতেছে। ভয়ে ছাত্রের বাহ্যজ্ঞান লুপ্তপ্রায় হইল, কিন্তু পণ্ডিত মহাশয়ের ভয়ে কিছু বলিতে পারিলনা। পণ্ডিত মহাশয় উহার নিকটে গিয়া দেখিলেন, ঐ বিছানার পার্শ্বে একটি মেথর মাটিতে পড়িয়া কেকাইতেছে। তাহার সর্বাঙ্গে মল লাগিয়াছে, বাহ্যজ্ঞান নাই, শরীর হিম হইয়া গিয়াছে। ভুবন মােহন ছাত্রটিকে লােকালয় লইতে কিছু খড়ি আনিতে বলিলেন। ছাত্র এবার হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে উদ্ধশ্বাসে লােকালয় পানে ছুটিল, এবং অনতি বিলম্বে কিছু খড়ি ও কয়েকজন লােক লইয়া প্রত্যাগত হইল। ভুবন মােহন সেই খড়িতে আগুন জ্বলিয়া রােগীর গায়ে তাপ দিতে লাগিলেন এবং সেই আলােকে, সঙ্গীয় বাক্স হইতে ঔষধ বাহির করিয়া তাহাকে খাওয়া- ইলেন। অতঃপর আর কয়েকটি ঔষধের জন্য ছাত্রকে বাসায় পাঠাইয়া নিজে রােগীর পরিচর্যায় নিযুক্ত রহিলেন। যথাকালে ছাত্র ঔষধ ও রােগীর কতিপয় আত্মীয়-স্বজন সহ প্রত্যাগত হইল। ভুবন মােহনের চিকিৎসা ও ওশাষায় রাত্রি বারটার সময় রােগীর চৈতন্য হইল। তিনি মহর্ষি ভুবন মােহন সারারাত্রি সেই শ্মশানে বসিয়া রােগীর চিকিৎসা ও শুশ্রষা করিলেন রােগী আরােগ্য লাভ করিল। হতভাগ্য একটি কলেরায় মৃতের বিছানা- পত্র শশান হইতে আনিতে গিয়াই নাকি কলেরা রােগে আক্রান্ত হইয়া ঐ প্রকার মরণাপন্ন হইয়াছিল। .(২) একদিন একজন মেথরাণী ঔষধ লইবার জন্য, ঔষধ-কক্ষে প্রবেশ করায় একজন স্বেচ্ছাসেবক তাহার উপর ঘৃণাত্মক কটুক্তি প্রয়ােগ করিল, তাহাতে ভুবন মােহনের দয়ার হৃদয় ব্যথিত হইল। তিনি সেবককে কহিলেন, “বাবা এটি আমার দীনের ক্ষেত্র। তোমরা কাহাকেও ঘৃণা করিলে আমার সেবা-ব্রতের অঙ্গহানি হইবে। ইহারা আমাদের মাতৃস্থানীয়া। মা কেবল শৈশবেই মল-মূত্র ফেলেন, ইহারা এক্ষণে আমাদের মায়ের ন্যায় মল-মূত্র ফেলিয়া থাকে। ইহাদিগকে ঘৃণা করিও না।” (৩) একদিন বেলা দশটার পর পণ্ডিত মহাশয় রােগী দেখিতে বাহির হইয়া গেলে একজন বারবনিতা শশব্যন্তে তাহার বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহার অনুসন্ধান করিল। হতভাগিনীর এক মাত্র পুত্র কলেরায় ঘােতর কাতর, তাই সে ব্যস্ত হইয়া আসিয়াছিল। পণ্ডিত মহাশয়কে বাহিরে না পাইয়া সে মনে করিয়াছিল হয়ত বা তিনি ভিতরে আছেন, তখন হতভাগিনীর কর্তব্যাকৰ্তব্য জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়াছিল, তাই সে বাটীর ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল। পণ্ডিত মহাশয়ের ভ্রাতুস্পুত্র-বধূ, বেশ্যাকে বাড়ীর ভিতর প্রবিষ্টা দেখিয়া ক্রোধান্ধা হইলেন, এবং তাহাকে রূঢ় মহর্ষি ভুবন মােহন বাক্যে বাহির করিয়া দিলেন। হতভাগিনী পুত্রের কাতরতা উল্লেখ করিয়া বিলাপ করিতে করিতে ভগ্নমনে বাড়ী চলিয়া গেল। অপরাহ্ে ভুবন মােন রােগী দেখিয়া বাসায় ফিরিলেন। স্নানান্তে তিনি খাইতে বসিয়াছেন, মাত্র দুই এক গ্রাস মুখে দিয়াছেন, এমন সময় সেই সংবাদ বাড়ীর বালক-বালিকাগণের নিকট জানিতে পারিয়া, তিনি একেবারে মর্মাহত হইলেন, আর খাওয়া হইল না, তৎক্ষণাৎ মুখ ধুইয়া ঔষধের বাক্স সহ বাড়ী হইতে বহির্গত হইলেন। খুঁজিয়া খুজিয়া সেই হত- ভাগিনী বারবনিতার দ্বারে গিয়া বলিলেন, “মা! আমি তোমার ছেলেটিকে দেখিতে আসিয়াছি।” বারানা হতাশ হৃদয়ে মুমুষু পুত্রের শয্যার পার্শ্বে বসিয়া তাহার শুশ্রুষা করিতেছিল, এবং পুত্রের ভবিষ্যৎ অমঙ্গলশঙ্কায় তাহার অন্তর বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছিল, এমন সময় বাহিরে ভুবন মােহনের কণ্ঠস্বর শুনিয়া তাহার মনে আশার সঞ্চার হইল। সে তাড়াতাড়ি দরজায় গিয়া পণ্ডিত মহাশয়ের পায়ে পড়িয়া কাদিয়া ফেলিল ভুবন মােহন তাহাকে আশ্বাস দিলেন এবং ঘরে প্রবেশ করিয়া তাহার পুত্রের চিকিৎসা আরম্ভ করিলেন। তাঁহার সুচিকিৎসায় বালক অনতিবিলম্বে আরােগ্য লাভ করিল। (৪) একদিন স্বর্গীয় মহারাজা সার গিরিজা নাথ রায় বাহাদুর কে, সি, আই, ই, ভুবন মােহনকে নেওয়ার জন্য প্রাতে গাড়ী ও চিঠি পাঠাইয়া- ছেন। তঁাহার একমাত্র শিশু পৌত্রটি ধনুষ্টঙ্কার পীড়ায় কাতর। প্রায় শতাধিক রােগী ভুবন মােহনের চিকিৎসালয়ে ঔষধ লইতে আসিয়াছে। পাঠক! এরূপ অবস্থায় অন্য কেহ হইলে নিশ্চয়ই রাজ- মহৰি ভুবন মােহন প্রসাদ লাভের এই সুযােগ পরিত্যাগ করিতেন না। কিন্তু সমদশী, দরিদ্ৰবৎসল ভুবন মােহন কি করিলেন? তিনি মহারাজার পত্রের উত্তরে জানাইলেন, “এখানে বহুদূর হইতে দীন, দুঃখী, অনাথ, আতুর শতাধিক রােগী আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ইহাদের ঔষধাদির ব্যবস্থা করিয়া, এবেলা আমি কিছুতেই যাইতে পারিব না। প্রয়ােজন হইলে বৈকাল বেলা অনুগ্রহ পূর্বক একটুকু সংবাদ দিলেই যাইব। ভরসা করি এই গর্হিত ক্রটি অবশ্যই ভবাদৃশ দীন-জন-পালক মহারাজা বাহাদুর- সমীপে ক্ষমা ও পরিহার যােগ্য হইবে সন্দেহ নাই।” (৫) ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে কনিষ্ট ভ্রাতুষ্পভ্র জগদীশ বাবুর পুত্র একদিন জ্বরে কাতর হইয়া পড়ে। পণ্ডিত মহাশয় তাহার চিকিৎসা করিতেছিলেন। ঐদিন রংপুর টাউনের একজন ভদ্র লোেক তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, তাহার একটি আত্মীয় বালক অনেক দিন হইতে প্রাণ-সংশয়- কাতর, এ পর্যন্ত অনেক চিকিৎসক চিকিৎসা করিয়াছেন কিন্তু কিছুতেই ফল হয় নাই, তাই তিনি তাহার নিকট আসিয়াছেন। এই কথা শুনিয়া আবন্ধু ভুবন মােহন ঐ দিন অপরাহে রংপুর যাইতে সম্মত হইলেন। অপরাহে জগদীশ বাবুর পুত্রটির জ্বর বৃদ্ধি পাইল, মাঝে মাঝে ফিট হইতে লাগিল। তখন পণ্ডিত মহাশয় ষ্টেশনে চলিয়া গিয়াছেন, জগদীশ বাবু তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়া তাহাকে রংপুর যাওয়া স্থগিত রাখিতে অনু- রােধ করিলেন। তিনি বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “তােমার পুত্রের জন্য যে ব্যবস্থা আবশ্যক তাহা করিয়াছি, শুধু তােমার পুত্র লইয়া আমি বসিয়া থাকিতে পারি না। যাহাকে দেখিতে যাইতেছি সেও একজনের পুত্র।* মহর্ষি ভুবন মােহন জগদীশ বাবু আর কথা কহিলেন না। সেখানে কয়েক জন ভদ্ৰলােক উপস্থিত ছিলেন, তঁাহার। একথা শুনিয়া অবাক হইলেন। অতঃপর ভদ্রলোকটি তঁাহার জন্য একখানি দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকেট করিলেন। কিছুক্ষণ পরে ট্রেন আসিল। ভদ্রলােকটি তাঁহাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর গাড়ীতে উঠাইতে গেলেন, তিনি তাহাতে উঠিলেন না, বলিলেন, “আমি নিজেও দরিদ্র, দরিদ্র লইয়াই আমার কাজ। আমাকে অনেক দরিদ্র রােগীর চিকিৎসার জন্য রেলে যাইতে হয়। আ জ আমি দ্বিতীয় শ্রেণীর গাড়ীতে গেলে হয়ত অনেকে মনে করিবে আমাকে রেলে নিতে হইলে তাহাদের অনেক খরচ পড়বে, এজন্য হয়ত অনেক দরিদ্র রােগী আমার নিকট আসিবে না। তাহা হইলে আমার সেবা-তে বিঘ্ন ঘটিবে।” এই কথা শুনিয়া ভদ্রলােকটি অগত্যা তাহার জন্য একখানা রিটার্ণ টিকেট করিয়া তাহাকে মধ্য শ্রেণীতে উঠাইয়া লইলেন। ভদ্রলােকটি তাহার এই কার্যকলাপ দেখিয়া তাহাকে ঋষিতুল্য মনে করিয়া ভক্তি করিতে লাগিলেন। (৬) একদিন শীত কালে তাহার জ্বর হইয়াছে। রাত্রি সাড়ে এগারটার সময় ঘাসীপাড়ার কেদার বাবু আসিয়া ব্যস্তভাবে জগদীশ বাবুকে বাহির হইতে ডাকিতে লাগিলেন। জগদীশ বাবু বাহিরে আসিলে, তিনি কহিলেন তাঁহার পিতা অত্যন্ত কাতর, তাই তিনি পণ্ডিত মহাশয়কে ডাকিতে আসিয়াছেন। জগদীশ বাবু বলিলেন, “তিনিও জ্বরে কাতর।” তাহা শুনিয়া কেদার বাবু একেবারে হতাস হইয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। ভুবন মােহন কেদার বাবুর কথা মহর্ষি ভুবন মােহম গুলি শুনিতে পাইলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ বাহির হইয়া আসিলেন এবং কেদার বাবুকে আশ্বাস দিয়া সেই রুগ্ন দেহে দিনাজপুরের দারুণ শীতের গভীর রজনীতে তাহার সঙ্গে চলিলেন। জগদীশ বাবু একটুকু আপত্তি করিলেন,—তিনি কেদার বাবুকে ডাক্তার জাকিয়া নিতে বলিলেন। ভুবন মােহন তাহার আপত্তি নিলেন না। জগদীশ বাবুর কথায় কেদার বাবু একটুকু ইতস্ততঃ করিলে, তিনি জগদীশ বাবুর প্রতি বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “যখন আমি সংবাদ পাইয়াছি তখন আমি অবশ্যই যাইব। কেদার বাবু আমাকে নিতেছেন না, আমি স্বেচ্ছা পূৰ্ব্বকই যাইতেছি।” জগদীশ বাবু আর কথা কহিলেন না। ভুবন মােহন কেদার বাবুর সঙ্গে গাড়ীতে উঠিয়া রওনা হইলেন। তাহার সেবাব্রতের এরূপ অনেক দৃষ্টান্ত অনেকে প্রত্যক্ষ করিয়া- ছেন। তিনি কঠিন পীড়ায় শয্যাশায়ী হইয়াও সেবাব্রতে বিরত হন নাই। তিনি পীড়িত হইলে জগদীশ বাবু বাহিরের দরজা বাহির হইতে তালা বন্ধ করিয়া দিয়াও তাঁহাকে নিবারণ করিতে পারেন নাই,—তিনি পিছনের দরজা দিয়া বাহির হইয়া চিকিৎসালয়ে আসিতেন। তাহাকে অসুস্থ দেহে সেবার কাৰ্য্য করিতে নিষেধ করিলে তিনি বলিতেন, “বাবা! পরের সেবাই আমার জীবনের ব্রত । যতদিন আমার দেহে একবিন্দু রক্ত থাকিবে ততদিন আমি কিছুতেই এই ব্রত ভঙ্গ করিতে পারিব না। আমি যে ব্ৰত লইয়া কর্মক্ষেত্রে নামিয়াছি, তাহা যদি করি, তাহা হইলে ভগবানের কাছে কি জবাব দিব? বাবা। এই রােগী-সেবা করিয়াই আমি আনন্দ পাই এবং ইহাতেই রােগ- যন্ত্রণার উপশম বােধ করি।”
মহষি ভুবন মােহন তিনি পূর্বে রােগীর বাটীতে পদব্রজেই যাইতেন, প্রত্যহ প্রায় দশ মাইল ঘুরিয়া বেড়াইতেন। বার্ধক্যে ও রােগে ইদানীং শরীর অশক্ত হওয়ায় মালদুয়ারের স্বনামধন্য সদাশয় জমিদার শ্রীযুক্ত টঙ্ক নাথ চৌধুরী মহাশয় প্রভৃতি তাহাকে একখানি গাড়ী করিয়া দিয়াছিলেন, তাহাতেই তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতেন। তাহার এই অতুলনীয় নিষ্কাম সেবা-ব্রত, ও ধর্মপরায়ণতার জন্য দিনাজপুরবাসী রাজা জমিদার হইতে পথের ভিখারী এবং উচ্চ রাজ- পুরুষ হইতে মিউনিসিপালিটীর চাপরাশী পৰ্যন্ত তাঁহাকে মহর্ষিজ্ঞানে ভক্তি করিতেন। তাঁহার পুণ্যকীর্তির মন্দাকিনী সমগ্ৰ দিনাজপুর প্লাবিত করিয়া বঙ্গের সমস্ত জেলা এমন কি ভারতের দূরবর্তী স্থানেও প্রবাহিত হইয়া বঙ্গেশ্বরগণেরও ভক্তি আকর্ষণে সমর্থ হইয়াছিল। ১৯১৩ খ্রীষ্টাফের নবেম্বর মাসে দিনাজপুর-মহারাজা গিরিজা নাথ- নিউ হাই স্কুলের ভিত্তিস্থাপন-উপলক্ষে যে সভা হয় তাহাতে তদানীন্তন বলেশ্বর মহামান্য লর্ড কারমাইকেল বাহাদুর উপস্থিত ছিলেন। তিনিই উহার ভিত্তিস্থাপন করেন। এতে সভার অধিবেশন হইল। যখন বলেশ্বর সভায় প্রবেশ করিয়া আসন পরিগ্রহ করিলেন তখন একজন খেত-খ-শশাভিত বৃদ্ধ সভামণ্ডপে ধীর-গভীরে প্রবেশ করিলেন। বঙ্গেশ্বর দেখিলেন বদনমণ্ডলে পুণ্যপ্রতিভার অপূর্ব জ্যোতিঃ বিকাশিত হইতেছে, তাহার পরিধানে একখানা মােটা খানের ধুতি, সেই শীতের প্রাতঃকালেও গায়ে সামান্য একটি সাদা মা তদুপরি সাদা কাপড়ের দেড় পাট্টা, পায়ে সামান্য একজোড়া চটি। বৃ মণ্ডপে প্রবেশ করিবামাত্র দিনাজপুরাধিপতি সসম্ভ্রমে মহষি ভুবন মােহন গাত্রোখান করতঃ তাহাকে করষােড়ে নমস্কার করিয়া অভ্যর্থনা করিলেন। তদ্দর্শনে বঙ্গেশর জনান্তিকে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট বৃদ্ধের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবও জনান্তিকে সংক্ষেপে বৃদ্ধের পরিচয় প্রদান করিয়া তাহার পুণ্যকীৰ্ত্তি নিবেদন করিলেন। যথাসময়ে সভা ভঙ্গ হইলে মহামতি বঙ্গেশ্বর, সাগ্রহে বৃদ্ধের নিকট আসিয়া তাহার কর মর্দন করতঃ সম্বর্ধনা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার বয়স কত হইয়াছে ?” বলা বাহুল্য এই বৃদ্ধই আমাদের ভক্তিভাজন ভুবন মােহন। ভুবন। অষ্টাশি বৎসর। বঙ্গেশ্বর। আপনার জীবন আমার জীবনাপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান্। ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি আপনি আরও অষ্টাশি বৎসর জীবিত থাকিয়া, আপনার অবলম্বিত পরােপকার-ব্রত পালন করুন। ১৯১৯ খ্ৰীষ্টাব্দের ২৫ নবেম্বর ভূতপূৰ্ব্ব বঙ্গেশ্বর মহামান্য লর্ড, বােণাগুসে বাহাদুর তাহার পুণ্যময় চিকিৎসালয় পরিদর্শন করিয়া তাহার সহিত আলাপে পরম প্রীতি লাভ করতঃ তাহার মহাব্রতের সাহায্যার্থে এক শত টাকা দান করিয়াছিলেন; এবং তাহার পরলােক গমনের পর বৎ- সরও মহামান্য লাট বাহাদুর তাহার চিকিৎসালয়ের জন্য পাঁচ শত টাকা দান করিয়া চিকিৎসালয়টি তাঁহার স্মৃতিচিহ্ন-স্বরূপ থাকিবে বলিয়া আনন্দ প্রকাশ করিয়াছেন। এই সম্বন্ধে মহামান্য বঙ্গেশ্বরের শ্রদ্ধা পূরিত পত্ৰখানির নকল পাঠকগণকে উপহার প্রদান করিলাম। His Excellency Lord Ronald-shay visited the Charitable Dispensary of indigenous drugs of Pandit Bhuban Mohan ; ১২ মহর্ষি ভুবন মােহন Vidyaratna at Dinajpur on the 25th November, 1919. His Excellency was much pleased with what he saw and gave a grant of Rs 100 to the Dispensary. His Excellency was also pleased to give him a grant of Rs 500 in 1921 towards the cost of furniture for the Dispensary. . His Excellency is glad to think that this Dispensary will remain as a memorial of the Life and work of Bhuban Mohan Kar Vidyaratna, (sd). W. R. Gourlay Private Secretary to H.E. The Governor of Bengal Dated 20 -12-21, এইরূপ সম্মান ক’জনের ভাগ্যে ঘটিয়া থাকে? ভুবন মােহন এই অতুল সম্মান লাভ করিয়াও কিছুমাত্র গর্বিত হন নাই। হইবেন কেন ? তিনি যে আমাদের ন্যায় দহঙ্কার-পূর্ণ জীব নহেন, তিনি যে কামিনী- কাঞ্চন-ত্যাগী মহাপুরুষ,—বিষ্ঠা-চন্দনে, শ্মশানে-সৌধে যে তার সম- জ্ঞান, নিন্দা-স্তুতি, মান-অপমান সকলই যে তাঁহার সমান। তিনি যে আব্রহ্মস্তম্ভ পর্যন্ত সর্বত্রই ভগবানের বিভূতি দর্শন করিতেন। তিনি যে সংসারে থাকিয়াও রাজর্ষি জনকের ন্যায় নিলিপ্ত ছিলেন। তঁাহার নব্বই বৎসর বয়সের পর দিনাজপুরের জন সাধারণ তঁাহার জন্মতিথি উপলক্ষে এক উৎসব করিয়া তাহার প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করিয়া ছিলেন । ১৬৩ মহর্ষি ভুবন মােহন অক্লান্ত পরিশ্রমে সুদীর্ঘ কাল সেবা-ব্রত পালন করিয়া ১৯২০ খ্রিষ্টা- ব্দের জুন মাসে তিনি কঠিন মূত্রকৃচ্ছ, পীড়ায় আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন। অবস্থা বুঝিয়া জগদীশ বাবু তাহাকে চিকিৎসার জন্য কলিকাতা লইয়া গেলেন। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসিত হইয়া একটুকু সুস্থ হইলেই তিনি দিনাজপুরে আসিতে ব্যস্ত হইলেন। ১৮ই আগষ্ট তিনি দিনাজ- পুরে প্রত্যাগত হইলেন, তখনও তাহার শরীর নিতান্ত দুৰ্বল, চলিবার ফিরিবার সাধ্য ছিল না। সে অবস্থায়ও তিনি যথাসাধ্য রােগিগণকে ব্যবস্থা দিতেন। তাহাতে আবার তাহার পীড়া বাড়িতে লাগিল। স্থানীয় প্রবীণ চিকিৎসকগণ প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুতেই কোন ফল হইল না। ভুবন মােহন চিকিৎসকগণকে বলি- তেন, “বাবা! আর আপনারা আমার জন্য অনর্থক কষ্ট পাইতেছেন কেন? আমার সময় হইয়াছে,আমার ডাক পড়িয়াছে। চিকিৎসক গণ মুখে তাঁহাকে দুই একটা আশ্বাস-জনক বাক্য বলিয়াই অপূর্ণ নেত্রে বাহির হইয়া আসিতেন। ক্রমে তিনি একেবারে শষ্যাগত হইয়া পড়িলেন, তখনও তাঁহার সেবা-ব্রতের দিকে সম্পূর্ণ লক্ষ্য ছিল। কনিষ্ঠ ভ্রাতা যাদব চন্দ্র কর মহাশয়ের পুত্র শ্রীমান নরেশচন্দ্র কর হােমিও- প্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতি পণ্ডিত মহা- শয়ের বিশেষ আস্থা ছিল। তিনি তাঁহাকেই চিকিৎসালয়ের ভার দিলেন। ১লা সেপ্টেম্বর বাঙ্গালা ১৩২৩ সালের ১৫ই ভাদ্র হইতে তিনি সাধারণের সহিত বাক্যালাপ একরূপ বন্ধ করিলেন, না ডাকিলে আর কথা কহিতেন না, সর্বদা কেবল ধ্যান-স্তিমিত নেত্রে “ব্ৰহ্ম কৃপাহি কেব- ল” উচ্চারণ করিতেন। দলে দলে সহরবাসী নরনারী গিয়া তাহাকে ১৪ মহর্ষি ভুবন মােহন দেখিতে লাগিল,তাহারা তাহার শুশ্রুষায় আত্মনিয়ােগ করিয়া আপ- নাকে কৃতার্থ মনে করিতে লাগিল। ১৮ই ভাদ্র রাত্ৰি প্ৰভাত হইল, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, সূৰ্য্যদেব যেন বিষাদে ম্লান মুখে উদিত হইলেন। আজ ভুবন মােহনের অবস্থা আরও শােচনীয় হইয়া উঠিল। চিকিৎসকগণ একেবারে নিরাশ হইয়া পড়িলেন। সে সংবাদ মুহূর্ত মধ্যে তড়িদ্বেগে দিনাজপুরের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পৰ্য্যন্ত পরিব্যাপ্ত হইল। সমগ্র দিনাজপুর নৈরাশ্যের কালিমায় আচ্ছন্ন হইল। ধনী, নিধন, বাঙ্গালী, মারােয়ারী সকলের মুখেই সেই এক নিরাশার ছায়া, সকলের মুখেই সেই এক কথা, “হায় আর বুঝি পণ্ডিত মহাশয় ঘাঁচিলেন না, আজ বুঝি আর্ভের বন্ধু, দরিদ্রের সহায় আমাদের মায়া পরিত্যাগ করিলেন।” পথে, বাজারে ও অন্তঃপুরে সর্বত্রই সেই নিরাশবাণী প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। তাহাকে দেখিবার জন্য দূর দূরান্তর হইতে লােক আসিতে লাগিল। ভুবন মােহন সেই স্তিমিত নেত্রে ধ্যানমগ্নাবস্থায় শয়ন করিয়া অন- বরত “ব্ৰহ্ম কৃপাহি কেবল” বলিয়া ভগবাকে ডাকিতেছেন তাহার মুখে যাতনার চিহ্ন মাত্র নাই, বদন প্রসন্ন ; যেন তিনি সুখ-শয্যায় শয়ন করিয়া আছেন। ক্রমে তাহার কণ্ঠস্বর ক্ষীণতর হইতে লাগিল, বেল। দুইটা সাত মিনিটের সময় “ব্ৰহ্ম কৃপাহি” মাত্র উচ্চারিত হইল, তাহার জিহ্বা একটু নড়িল, কিন্তু “কেবল” শব্দটা আর উচ্চারিত হইতে পারিল না। জিহ্বা স্থির হইল চক্ষু নিমিলিত হইল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও দিনাজপুর বাসীকে কান্দাইয়া মহর্ষি মহাপ্রস্থান করিলেন। ক্রন্দনের রােলে বালুবাড়ী মুখরিত হইয়া উঠিল। সেই নিদারুণ মহর্ষি ভুবন মােহন শােক সংবাদ দাবাগ্নির ন্যায় মুহুর্ত মধ্যে সহরের চারিদিকে ছাইয়া পড়িল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যে যে অবস্থায় ছিল সে সেই অবস্থায়ই ছুটিয়া আসিল। আফিস-আদালত-স্কুল সমুদয় বন্ধ হইল। হাকিম, উকিল, মােক্তার, আমলা, মাষ্টার ও ছাত্রগণ শােকা হৃদয়ে উদ্ধশ্বাসে মহর্ষির পবিত্র মূৰ্ত্তি জনমের মত দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিলেন। পুলিশ ফৌজ সহ পুলিশ সাহেব আসিয়া মহর্ষির পবিত্র দেহের সম্বর্ধনা করিলেন। অতঃপর তাহার পবিত্র দেহ চন্দন, পুষ্পও পুষ্প-মালায় শােভিত করিয়া শ্মশান-যাত্রার ব্যবস্থা করা হইল। বেলা চারিটার সময় সেই সমবেত জনমণ্ডলী শব লইয়া বাহির হইল। প্রায় চারিসহ নরনা বিগলিত নেত্রে শ্মশান-যাত্রায় যােগদান করিল। হিন্দু, ব্রাহ্ম, মুসলমান, জৈন, খ্ৰীষ্টান প্রভৃতি সকল ধর্মের লােকই এই শ্মশানবন্ধুর মহাসম্মিলনে যােগ দিল। হিন্দু ও ব্রাহ্মগণ দলে দলে সংকীৰ্ত্তন করিয়া শবানুগমন করিতে লাগিলেন। শহরের সমুদয় বারাঙ্গনাগণ ও শােকাশ্রু বর্ষণ করিতে করিতে আলুলায়িত কেশে সেই শােকার্ত জন-প্রবাহে যােগদান করিল। অশীতিপর বৃদ্ধগণও বলিয়াছেন এমন শ্মশান-যাত্ৰা তাহারা আর কখনও দেখেন নাই। সহর প্রদক্ষিণ করিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে সকলে ব্রাহ্মমন্দির সমীপে উপস্থিত হইলেন। ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মের বিধানানুযায়ী উপাসনা হইলে, সকলে শ্মশানাভিমুখে চলিলেন। মহর্ষির পবিত্র দেহ বহন করার জন্য সকলেই ব্যগ্র হইয়া উঠিল। তাহাদের আগ্রহাতিশয্যে সকলকেই শৰস্পর্শে অনুমতি প্রদত্ত হইল। ব্রাহ্মণ, মেথর, খ্ৰীষ্টান, মুসলমান ও বারাঙ্গনগণ মহর্ষির পুণ্যময় দেহ বহন AY মহর্ষি ভুবন মােহন করিয়া আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে করিতে লাগিল। রাত্রি অনুমান আটটার সময় মহর্ষির পবিত্র দেহ পুনর্ভবার শ্মশান-ক্ষেত্রে গিয়া পৌছিল। বারাঙ্গণাগণ ভক্তি সহকারে তঁাহার চরণামৃত গ্রহণ করিল। পুষ্পমালা ও পুষ্পগুলি দেব-নিৰ্মাল্যের ন্যায় সকলেই আগ্রহ সহকারে ভক্তি-পূর্ণ হৃদয়ে কুড়াইয়া লইল। সহস্র কণ্ঠের কীৰ্ত্তন-ধ্বনিতে দিঙমণ্ডল মুখরিত হইল, নিদারুণ চিতা জ্বলিয়া উঠিল। দরিদ্রের বন্ধু, আর্তের সহায়, মূর্তিমান ব্ৰহ্মজ্ঞানের পবিত্র ছবি চিরদিনের জন্য অন্তর্হিত হইলেন। মহর্ষি চলিয়া গেলেন, তাহার পাঞ্চ ভৌতিক দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হইল ; রহিল তাহার অতুলনীয় বিশ্ব প্রেমের,ভগবৎ প্রেমের জ্বলন্ত দৃষ্টান্তের পুণ্যস্মৃতি! যতদিন জগতে ধর্মের সম্মান থাকিবে, ততদিন দিনাজপুরবাসীর হৃদয়ে সে স্মৃতি জাগরিত থাকিবে।
গরিশিষ্ট।
শােকোচ্ছাস,
(মহষির দেহত্যাগের পর দিনাজপুর পত্রিকায় প্রকাশিত।)
হিমাত্রির চুড়া
পড়েছে খসিয়া
নাই এ জগতে ভুবন ঋষি ;
কাল-রাহু-গ্রাসে,
হায় কবলিত
সেই অকলঙ্ক শারদ শশী।
বাল বৃদ্ধ যুবা
রাজা কি ভিখারী
শাকের সাগরে ভাসিছে সবে ;
সবাই বলিছে
করি হাহাকার
“দীনার্তের গতি কি হবে এবে ?
কে আর মুছাবে
অ সে সবার
মধুর বচনে তুষিবে হায়?”
অই দেখ অই
কত নর-নারী
আর থালু বেশ পাগল প্রায়।
অহৈতুকী ভক্তি
ছিল যার হৃদে
সেবা-ব্ৰত-ধায়ী কুমার ধীর,
হিংসা-দ্বেষ-হীন,
পন্য বর্জিত
বড়রিপু জয়ী অপূর্ব বীর।
১৮
মহর্ষি ভুবন মােহন সত্যমাচারী নির্লিপ্ত সংসারী জগৎ যাহার আপন ছিল, পঞ্চোশতেক বৎসর বয়সে হায়রে আজি সে চলিয়া গেল। প্রতিভার জ্যোতি পুণ-খা মাখা হায় না হেরিব জীবনে আর । কান্দিব, কান্দিবে এজগত বাসী স্মরণ করিয়া মুরতি তার। কান্দিলে ফিরিয়া পাব কি তাহারে আর কি মহর্ষি আসিবে ফিরে ? মৰ্তে কৰ্ম্ম শেষ হয়েছে তাহার তাই সে যাইছে অমর-পুরে। যাও তবে দেব যাও নিজ ধামে তুমি হে ত্রিদেব নগর বাসী । “মনুষত্ব কিবা শিখালে মানবে পাপ-পঙ্কর মরতে আসি। মােগ শােকে কত পেয়েছ যাতনা আজ হতে তার হইল শেষ, দেব, দেবাজনা, অভ্যর্থনা তরে তােমার ধরেছে মােহন বেশ।
মহর্ষি ভুবন মােহন
বাজিছে দুন্দুভি
নন্দন কাননে
নাচিছে অপ্সরা কিন্নরীগণ,
“জয়জয় জয়
ভুবন মােহন”
গাইছে সকলে প্রফুল্ল মন।
পারিজাত-হার
সঁথিয়া যতনে
পরাতে তােমারে আসিছে সবে,
এ-দৃশ্য অন্তরে
করিলে অঙ্কন
বুঝিবা শশাকের লাঘব হবে।
যতনে রাখিয়া
হৃদয় মন্দিরে
পবিত্র চরণ-যুগল তব,
ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি
যতদিন ভবে বঁচিয়া রব।
দিব সযতনে
সাপ্ত।
No text on this page.
-
গ্রন্থকারের শিকা
দিনাজপুর
পুস্তকালয় সমূহে ।
No text on this page.
No text on this page.