Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Konkaboti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বুদ্ধদেব বসু
কঙ্কাবতী
কবিতা-ভবন
১৯৩৭
বু দ্ধ দে ব ব সু প্রণীত
উ প ন্যাস
সাড়া, অকর্মণ্য, মন-দেয়া-নেয়া, যবনিকা-পতন, অনেক রকম,
সানন্দা, রডােডেনড্রন-গুচ্ছ, যেদিন ফুটলে কমল, আমার বন্ধু,
ধূসর গােধূলি, হে বিজয়ী বীর, একদা তুমি প্রিয়ে,
সূৰ্য্যমুখী, অসূৰ্য্যম্পশ্যা, লাল মেঘ,
পরস্পর, রূপালি পাখি,
বাড়ি-বদল, বাসর ঘর,
পারিবারিক
প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সঙ্গে
বিসর্পিল, বনশ্রী
ছাে টো গ ল্প
রেখাচিত্র, অভিনয় অভিনয় নয়, অদৃশ্য শত্ৰু, মিসেস গুপ্ত,
প্রেমের বিচিত্র গতি, শ্বেত পত্র
ঘরেতে ভ্রমর এলাে,
অসামান্য মেয়ে
প্রবন্ধ ও প্র ম ণ
হঠাৎ-আলাের ঝলকানি, আমি চঞ্চল হে, সমুদ্রতীর
.
ক বি তা
বন্দীর বন্দনা, পৃথিবীর পথে, কঙ্কাবতী
ছােটো দের
রঙিন কাচ, ঘুম-পাড়ানি, এলােমেলাে, জলতরঙ্গ,
সাগর-রহস্য (প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে) কান্তিকুমারের পঞ্চকাণ্ড,
শনিবারের বিকেল, অপরূপ রূপকথা (হান্স
আণ্ডারসেনের তর্জমা, ৩ খণ্ডে)
কঙ্কাবতী : কাল ও কখনাে
অন্যান্য কবিতা : বুদ্ধদেব বসু প্রণীত
কবিতা ভবন
২০২ রাসবিহারী এভিনিউ
কলিকাতা
প্রকাশক : বুদ্ধদেব বসু
২০২ রাসবিহারী এভিনিউ, কলিকাতা
প্র থ ম সং স্ক র ণ
আ যা ঢ, ১ ৩ ৪ ৪
জু লা ই, ১ ৯ ৩৭
দুই টা কা
প্রিন্টার-শ্ৰপ্ৰভাতচন্দ্র রায়
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস,
৫ ও ৬ চিন্তামণি দাশ লেন, কলিকাতা
কঙ্কাবতী : কাল ও কখনাে : ও অন্যান্য কাবতা কাল ••• ১ কখনাে ::: ••• বেহায়া সুত্থান্বেষী মধ্যবর্তী কোনাে মেয়ের প্রতি অন্য-কোনাে মেয়ের প্রতি ১১ ১৩ ••• ২২ চুল অন্ধকার সিড়ি একখানা হাত কবি ২৮ চুম্বন এই সব ••• ৩২ আমার কবিতা ( রমাকে) আরশি সেরিনাড় কঙ্কাবতী কবিতা ১৩ ১ গান ৫৬ ৫৮ আমন্ত্রণ-মাকে প্রেমিকের প্রার্থনা মধ্যরাতে ::: ••• ৬৭ রূপকথা ही शंख्या শেষের রাত্রি। ••• ৭০ ৭১
No text on this page.
এই বইয়ের কবিতাগুলি প্রায় সবই ১৯২৯ ও ৩০ এই দুই বছরের মধ্যে লেখা, ও মূলত একই ঝোঁকের সৃষ্টি। সেই সময়কার সমস্ত কবিতার মধ্যে যেগুলাের কোনাে-না-কোন কারণে কিছু-না-কিছু মূল্য আছে বলে এখন আমার মনে হয়, শুধু সেইগুলােই একত্রিত হ’লােক স্কা ব তীতে। রূ প ক থা কবিতাটি ১৯৩২-এর ; একটা ঝোঁক কেটে যেতে-যেতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে দিয়ে গেলাে। শে যে র রা ত্রির প্রথম দুই শ্লোক লিখেছিলাম ১৯৩১-এ, তারপর সেদিন এই বইয়ের জন্য কোনােরকমে টানা-হেঁচড়া করে শেষ করে দিলাম। ওর ধুয়ােটা ভালাে লাগলে বলে কবিতাটা হারাতে ইচ্ছা করলাে না। তা ছাড়া হঠাৎ হা ও য়া ১৯৩৪-এ লেখা। আমি আমার কবিতার মাজাঘষা অদল-বদল বড় একটা কবিনে ; একবারে যেমন লেখা হয়ে যায় সেটাই সব চেয়ে ভাললা—আমার নিজের পক্ষে অন্তত একথা সত্য। তা ছাড়া, যে-কোনাে কবির পক্ষেই পরবর্তী পরিণতির শাসনে নিজের পুরাকালের রচনা কাটছেড়া করা আমি অন্যায় মনে করি। এখন যতই কঁাচা মনে হােক, তখন যে-সুর বেজেছিলাে তা আর ফিরে আসবে না কিছুতেই। নিজের পুরােনাে লেখাগুলাে নিয়ে বসলে উপরের পালিসটা হয়তাে ভালাে করতে পারি, কিন্তু কবিতার যেটা আসল জিনিস সেই সুরটাই নষ্ট হয়ে যাবার ভয় থাকে। নিজের পুরােনাে লেখা বর্তমান রীতিতে ঢালাই করতে না-গিয়ে নতুন কবিতা লেখা ঢের ভালাে এবং ঢের সােজা। এ-বইয়ের প্রথম দিককার কয়েকটি কবিতার বিশৃঙ্খলতা এখন আমার পছন্দ না-হলেও ওদের রূপটাকে সম্পূর্ণই বজায় রেখেছি। তবু অতি অল্প একটু অদল-বদল না-করেও পারিনি; কোনাে-কোনাে কথা কি বাক্যরচনার ভঙ্গি এখন কিছুতেই সহ্য হয় না। কলকাতা ১৯৩৭ বুদ্ধদেব বসু
No text on this page.
কাল সে আসিবে হেথা-এই কথা লিখে পাঠায়েছে।
নিজ হাতে লেখা চিঠি সেই চিঠি রয়েছে ড্রয়ারে,-
( যে-কোনাে মুহূর্তে খুলে আবার পড়িতে পারি তাহা।)
নাচের গতির মতাে টানা-টানা হাতের আখর,
বড়াে-বড়ো রেখাগুলি এ উহার শরীরে টলি
বড়াে-বড়াে লেখাগুলি, কিন্তু চিঠিখানি ভারি ছােটো।
‘ইতি’তে করেনি শেষ, লিখিয়াছে শুধু তার নাম
তা-ও দু’ অক্ষর।
রাস্তায় গাড়ির শব্দ, তার পরে চাবুকের শিষ,
মুহূর্তের নীরবতা—আবার সে চাকার ঘর্ঘর,
ঘােড়ার খুরের খটখট।
তার চেয়ে স্পষ্ট তার পদধ্বনি কাঠের সিড়িতে,
আরাে স্পষ্ট—আরাে স্পষ্ট—দ্রুত শব্দ, দ্রুত পদক্ষেপ ;
উৎসুক হাতের ঠেলা—খুলে গেছে ভেজানাে দুয়ার।
প্রথমে ফুলের গন্ধ-বায়ু তারে করিছে লেহন,
আবার চুলের গন্ধ-বাতাস কি এখনাে বহিছে ?
ক ক্কা ব তী
একটি সােনালি সুতা এলায়ে পড়েছে মাের কঁাধে,
ছড়ায়ে গিয়েছে মুখে—চোখে—ঠোটে রাশীকৃত সােনা;
তারপর কণ্ঠ ঘিরি’ কুন্দ দুইটি হাতের
কোমল উত্তাপ,
দশটি পরির মত দশটি আঙল মাের বুকে।
‘কাল সে না আসে যদি ! যদি আসে, ভালাে নাহি বাসে।
‘তেমন না হয় যদি তার প্রেম, তােমার যেমন !
‘যদি সে বাসেও ভালাে, যত ভালােবাসিতে সে পারে,
তবু তব ভালাে নাহি লাগে।
P
কাল-সে তাে আজ নয় ; কাল—সে তাে দেখা দেবে কাল,
আজ তার সেই চিঠি রহিয়াছে—দেখিবে ?-ড্রয়ারে,
নিজ হাতে লেখা চিঠিটানা-টানা হাতের আখর,
বড়াে-বড়ো লেখাগুলি, কিন্তু চিঠিখানি ভারি ছােটো
বড়াে-বড়াে রেখাগুলি এ উহার কানে-কানে কয়--
কাল সে আসিবে!
এখন তাে সবে সন্ধ্যা সারা রাত্রি—তবে তাে প্রভাত।
কাল সে আসিবে।
আমি তাে দেখেছি তারে (কত তারা, যারা দেখে নাই )
সােনার ঢেউয়ের মত কেশরাশি উঠিছে উচ্ছসি,
ঠোঁটের আরক্ত রেখানদীতে দীপের ছায়-সম
ভাঙিয়া ছড়ায়ে যায় সারামুখে, যখন সে হাসে।
বাদামি সে চোখ দুটি নদীতে দীপের ছায়া-সম
ভাসিয়া বেড়ায় ঘুরে-স্থির হ’তে কভু নাহি জানে।
জানে না কি ?
কপাল ঈষৎ নত, দৃষ্টি তবু ছুটিছে সুমুখে,
( অথচ কঁপেনি ভুরু, কোনাে রেখা পড়েনি ললাটে)
চঞ্চল দীপের ছায়া সহসা ফুটেছে তারা হয়ে,
পর-পর ছুটে আসে আলােকের সুচীতীশ্ন শর
রয়েছে সুমুখে কভু ?
আমি তাে দেখেছি তারে—সেই চোখ, চুল আর ঠোঁট,
সােনার ঢেউয়ের মত, ঢেউয়েতে দীপের ছায়া-সম :
স্বর্গে মাের কিবা কাজ, পৃথিবীরে কেন বা চাহিবাে ?
সারা রাত্রি কেটে গেলাে, ভাের হ’লাে কাল।
দুপুরে বাড়িলাে নােদ বিকাল সে এসেছে ঝিমায়ে ;
গােধূলি রয়েছে শুয়ে পশ্চিমের গােলাপি বালিসে ;
গােধূলির অন্ধকারে মরে গেলে আজিকার দিন।
ক ক্কা ব তী
কই, সে ত আসিলাে না! কত স্বপ্ন দেখেছিলে তুমি !
‘তােমারে বাসে না ভালাে! জানে না বাসিতে ভালাে সে যে।
যদি সে আসিতাে, তবে তােমার তা ভালাে লাগতাে না,
ভালােই হয়েছে।
কখনাে সে আসিবে না;-আমরণ অপেক্ষা তােমার?
হায় রে দুর্ভাগা !
আমার সৌভাগ্য এই, ভবিষ্যৎ দেখিতে পারি না ;
( তােমরা পারাে কি ? )
কে জানে কাল কী হবে? হয়-তাে বা আসিবে সে কাল।
কাল—তার শেষ নাই, মাের। শুধু আজ নিয়ে বাঁচি;
মা কখনাে হয় নাই—হতে পারে, তার নাম কাল,
নিয়ত হতেছে যাহাহ’য়ে গেছে, আজ তার নাম।
ব্যস্ত এ-পৃথিবী আছে মাের তরে আজিকার মততা ;
পৃথিবী-মানুষে ভরা, মাের 'পরে সকলের দাবি
পৃথিবী কাজের কল, মাের 'পরে সবগুলি চাকা-
এই নিয়ে কাটে মাের আজ।
কিন্তু কাল ! কে জানে কাল কী হবে, বুঝি সে আসিবে !
আমি যারে দেখিয়াছি, হয়তাে বা আসিবে সে কাল!
कहा वो
আমি তাে দেখেছি তারে—হ’লােই বা শুধু একবার !
সােনার ঢেউয়ের মতাে তার সেই কেশের উচ্ছ্বাস,
টলটলে আলাে চোখে-ঢেউয়েতে দীপের ছায়া-সম ;
আমি তাে দেখেছি তারে—আঁখি যবে তারা হয়ে ফোটে,
কত তারা—যারা দেখে নাই।
বেহায়া
দিন বুঝি নিবে আসে; বিকালের রােদ
ঢলে পড়ে সুপারির শিরে,
মেঘের মেয়েরা মিলে করিছে আমােদ
লাল আলাে-গােলাপি আবিরে।
এখনাে বাঁধিনি চুল? সময় হলাে যে,
আসিবে সাঁঝের বেলা সে আমার খোঁজে।
মুকুরে পড়েছে এসে বিকালের আলাে,
কে রয়েছে মাের মুখে চেয়ে!
তােমাকে তাহার চোখে লাগিবে কি ভালাে?
ঠোট নাড়ে অচেনা সে মেয়ে।
‘হাসাে কেন?’ হাসিটুকু মিঠে বটে ওর।
আকাশে ঘনায়ে এলাে আঁধারের ঘাের।
হলদে সাড়িটা-না, না, হলদে আলােয়
যাবে নাকো দেখা ওর রঙ,
লাল ?—তা বড় চড়া! নীল, তা-ও নয়—
খয়েরিটা মানাবে বরং !
কঙ্কা ব তী
যাকগে—সাদাই ভালাে,-কালাে-পেড়ে সাড়ি।
বাহিরে সাঁঝের ছায়া হয়ে আসে ভারি।
শিশু শেফালিকাগাছ জানালার কাছে,
কিছু দূরে সাঁঝের তারাটি,
তারি মুখখামুখি হয়ে দীপ জ্বলিয়াছে,
শিউলিতে ছেয়ে গেলাে মাটি।
বাতাসে সুরভি ভাসে, আর মাের গায়ে।
রজনীর চোখে ঘুম আসিছে জড়ায়ে।
মুকুরে পড়েছে এসে প্রদীপের আলাে,
দেখা হলাে সে-মেয়ের সনে,
‘তােমাকে তাহার চোখে লাগিলল কি ভালাে?
কী যে সে কহিলাে মনে-মনে।
আকাশ তারায় ভরা-রাতের দুপুর।
ঘুম বুঝি ভেঙে এলাে শেফালি-শিশুর।
ক ঙ্কা ব তী
কহিলাম আয়নার অচেনা মেয়েকে,
‘আসিবে না, এ তাে জানা কথা।
এইবার এই খেলা দাও তবে রেখে
সখ ছিলাে—মিটিয়াছে তাে তা ।
অবনত হয়ে আসে মেয়েটির চোখ।
মুকুরে ঠিকরি’ পড়ে তারার আশােক।
এসেছে মলিন হয়ে বিকালের আলাে,
( পরিয়া দেখিলে হয় নীল !)
রবির রঙিন চিতা পুড়ে হলাে কালাে,
(খােপাটা হলো কি খুব ঢিল ?)
মাঝরাতে আয়নায় মেয়েটার ছায়া,
‘এখনাে দেখাও মুখ ? এমন বেহায়া !
সুত্থান্বেষী
আমরা থাকিবাে সুখে—আমি আর তুমি, মা আমার,
অনেক ঘুরেছি পথে, ভালাে নাহি লাগে আর চলা;
খুঁজেছি, বুঝেছি সব ; মেয়েদের চোখের তারার
শ্যামল মেঘের বুকে দেখিয়াছি বজ্র-সম ছলা;
কোমল দেহের মাঝে কামনার অসুস্থ বিকার।
তবু মনে প্রেম ছিলল, মােহ ছিলাে, কী ছিলাে জানি না;
কী আগুনে পােড়ে প্রাণ, ক্ষণমাত্র নাই অবসর।
কারে যে বেসেছি ভালাে, জানি নাকো, তােমাকেই বিনা।
—পিছনে কে তাড়া করে ! পিপাসার্ত্ত, অশান্ত অন্তর।
হৃদয়ের ব্যবসায় আজ মাের ধরে গেছে ঘৃণা।
এইবার হ’ববা সুখী-আমি, আর তুমি, মা আমার ।
ছােটো একখানি বাসা খােলা মাঠে, ছােটো সহরেতে,
কাজ নাই বড়ো কাজে, বড়ো কথা কহিবাে না আর ;
রাত্রি আর দিন যাবে ছােটো সুখে, তবুও সুখেতে।
একটু সুখের তরে দেহ কাঁদে, মনে হাহাকার।
ক ক্লাব তী
আমাদের ঘরে, মাগাে, মেয়েদের দিবাে না আসিতে
যদি কভু আসে ওরা, আমি যবে থাকিবাে না ঘরে
লাল-পেড়ে সাড়ি পরে আসে যদি হাসিতে-হাসিতে
তুমি চুপ করে থেকো; কিম্বা বােলাে, ভুগিতেছে জ্বরে ;
ওদেরে চাহি না মােরা, বলে দিয়ে মুখে কি ইঙ্গিতে।
জীবন গানের মতাে—কোনাে ভার হবে না বহিতে ;
তুমি মাের, আমি তব, পৃথিবীর কেহ মােরা নই।
মাের কাছে থেকে যেন মৃত্যু তব হয় আচম্বিতে
আর কিছু প্রার্থনার নেই মাের এই আশা বই;
--আমি যদি আগে মরি, পারিবে না তুমি তা সহিতে।
মধ্যবর্তী
আমরা বসিয়া আছি—আমি আর নয়নকুমার :
নয়ন সে মাের বন্ধু, আমাদের সাত বছরের
জানাশােনা। আমরা যেতাম যবে পথ দিয়ে হেঁটে,
পাশ কেটে যেতে-যেতে বলাবলি করিতাে ছেলেরা
দ্যাখাে, দ্যাখাে, চলিয়াছে দুই বন্ধু।
আমরা বসিয়া আছি, মাঝখানে চায়ের টেবিলে
সাদা পেয়ালার মুখে উঠিতেছে সূক্ষ্ম, সাদা ধোঁয়া।
এক চুমুকের পরে : ‘আজকে কী ভীষণ গরম।
তারপর পনেরাে মিনিট চুপচাপ।
পেয়ালা অর্ধেক হলাে : ‘পড়েছে কি নতুন বইটা
ব্যনার্ড শ’র ? নয়ন সে শুধু মাথা নাড়ে,
নয়ন সে কথা নাহি কয়।
সিগারেট বার করে কহি আমি : ‘দেশলাই আছে ?
পেয়ালা ফুরায়ে আসে, মুহূর্তে মুহূর্ত কেটে যায় ;
প্রতিটি মুহূর্ত কাটে, তাই মােরা গুনি বসে-বসে :
পরেশ লিখেছে চিঠি। তাই নাকি? এগােয় না কথা।
১১
‘আজ সিনেমায় যাবে? নয়ন আবার মাথা নাড়ে,
নয়ন সে কথা নাহি কয়।
আর কী যে বলা যায়। খুজি আমি আকাশ-পাতাল
মাছের মতন বােবা, চাহি মােরা এ উহার পানে,
নয়ন আমার মুখে, আমি ওর মুখেতে তাকাই।
দেখিতে পাই না আমি ওর মুখ-নয়ন আমার
মুখ নাহি দেখে।
ফুটে ওঠে সেই মুখ, যেদিকেই তাকায় নয়ন,
যেই মুখ দেখি আমি, ওর পানে যখন তাকাই ।
সাত বছরের বন্ধু আমি আর নয়নকুমার।
১২
কোনাে মেয়ের প্রতি
একটু সময় হবে? পাশে গিয়ে বসিবাে তােমার ।
(মােদের বাড়িতে বড় লােজন, বিষম বিভ্রাট,
মায়ের মেজাজ চড়া, শিশুগুলি করিছে চীৎকার।
টবেতে ফুলের চারা তােমাদের বাড়ির সিড়িতে,
নতুন সবুজ পাতা নড়িতেছে ঈষৎ হাওয়ায় :
সিড়ির সুমুখে ঘর, ছােটো ঘর, ঠাণ্ডা, পরিষ্কার,
সেলাই-কলের কাছে ছছাটো টুলে রয়েছে বসিয়া।
সুতাে বুঝি ফুরায়েছে ? বই খােলা কোলের উপরে,
ভিজে কালাে চুলগুলি এলায়ে পড়েছে সারা পিঠে,
সাদা সেমিজেরে ঘিরি’ কালাে পাড় উঠেছে জড়ায়ে,
সাড়ির চওড়া পাড়, সাদা সাড়ি, মিশকালাে পাড়।
ঠিক তব পাশে নয়—তবু কাছে, বসিবাে চৌকাঠে-
একটু সময় হবে ?
মমাদের বাড়িতে বড় লােকজন—কোথায় যে যাই।
বাইরে দারুণ রােদ--বেরােতেও সরে না যে মন।
১৩
दहावी
দাড়ায়েছি জানালায়মড়িতেছে নতুন পাতারা;
রাস্তায় এসেছি নেমে—সিড়িগুলাে টবেতে সাজানাে ;
রাস্তাটা হয়েছি পার—সব চেয়ে নিচের সিড়িটি।
মােরা কাছাকাছি থাকি, রাস্তাটির এপার-ওপার
তুমি মাের নাম জানাে, আমিও জেনেছি তব নাম।
তুমি মাের নাম শােনন, শুনেছি তােমার ডাকনাম।
আমারে দেখিলে তুমি-পারিবে না?—চিনিতে পারিবে,
আমি তত তােমারে চিনি; মাঝখানে রাস্তাটুকু শুধু
তারপর সাদা সিড়ি, লাল টবে নড়িছে পাতারা।
;
একটু বসিবাে শুধু। থাক, তুমি না-ই বা উঠলে,
ছােটো টুলে বসে থাকো; বেশ আছি-এখানে-চৌকাঠে।
ভিজে চুলগুলি দেখে সারা দেহ করিবাে শীতল,
ছােটো পা দুখানি দেখে ত মন লইবাে সারায়ে।
লােকজন জড়াে হােক, প্রাণপণে চাচাক শিশুরা,
মায়ের মেজাজ হােক আকাশের রােদের মতন;-
আমার কী এসে যায় ? তুমি বসে আছে মাের কাছে ।
ভিজে তব চুলগুলি ; ঘরখানি ঠাণ্ডা, পরিষ্কার।
১৪
কঙ্কা ব তী কহিবাে হালকা কথা,বাজে কথা, তুমি যা বুঝিবে। (নেহাৎ কহিতে হবে যদি !) সেদিনের থিয়েটার—আমাদের পাড়ার খবর, সব চেয়ে রূপসী কে আধুনিক সিনেমা-জগতে, বড় চুল ভালাে কিনা। আফ্রিকার জন্তু আর ব্যাধি। মাঝে-মাঝে হাসিবে না? ছলছল-ঢেউয়ের মতন। ছলছল চলে ঢেউ—তার মতাে বাজে তব হাসি। জুড়াবে আমার দেহ ছলছল সেই হাসি শুনে, জুড়াবে আমার মন ভিজে তব এলােচুল দেখে। সিড়ির সুমুখে ঘর—ছােটো ঘর-ঠাণ্ডা—পরিষ্কার- মােদের বাড়িতে বড়াে লােকজন বিষম বিভ্রাট একটু সময় হবে ?
অন্য কোনাে মেয়ের প্রতি
গাহিতে জানি না গান, কবিতা লিখিতে পারি
শুধু,
জানাে না কবিতা-লেখা, গাহিতে পারাে তত তুমি গান।
কবির ভাষায় যাকে গান বলে, আমি তাহা জানি,
লােকের ভাষায় যাকে গান বলে, তুমি জাননা তাহা।
আজ মন ভালাে নেই ; কাগজ-কলম নিয়ে বসে
লিখিতে আলস্য বড়াে ; রাশীকৃত কবিতার বই
সুমুখে হয়েছে জড়াে; কভু এটা-কখনাে বা ওটা
পাতা উলটিয়া যাই ; চোখ চলে, বসে নাকো মন।
ঝিনুকের ছােটো বুকে সমুদ্রের গানের মতন
আমারাে মনের মাঝে সুর বাজে (শুনিতে পাও না?)
তেমনি আমার মনে চলাফেরা করিছে সুরেরা
যত গান শুনেছিনু—যত সুরে, তব মুখ থেকে-
তােমার গলার স্বর, ছেড়া-ছাড়া কথার টুকরাে,
তােমার চোখের আলাে, গােল-করে-তােলা ঠোট দুটি,
একটু জিভের আভা—লাল আভা! ছােটো, সাদা দাঁত
চকিতের বিদ্যুৎ-ঝলক !
মনের অলি-গলিতে এরা সবে ঘােরাফিরি করে,
কবিতা হয় না লেখা; “পড়া—ছাই, তা-ও তাে হয় না।
তুমি যদি আসসা, বড় ভালাে হয়। আসিয়া একটু
গান করাে যদি ।
জানাে, কাল মাের মনে নেমেছিলাে ধূসর অসুখ কপালে জুরের তাপ, অসুখের অবসাদ মনে। ঘুমের আড়ালে কাল সারারাত্রি পুড়েছে চোখে, ভােরের হাওয়ায় আজ ছেড়ে গেছে হৃদয়ের জ্বর ;- শুধু আছে অবসাদ—চারিদিকে ক্লান্তির কুয়াশা। ক্লান্তির কুয়াশা ছিড়ে সূৰ্য্যেরে আনিতে পারি কেড়ে, গান আর সুর আর চোখে-ঠোটে-মেশা—তুমি মােরে একটি মুহূর্ত দাও যদি ! একটি মুহূর্ত শুধু ! তােমার কি এসে যায় কিছু ? অযথা ঘুমাও কত, অকারণে ঘুরে আসাে পাড়া। অঞ্জলি উচ্ছলি’ তব ঝরিতেছে রাত্রি আর দিন- সােনার পূর্যের দিন, অন্ধকারে উজ্জ্বল রজনী। উদার প্রাচুৰ্য্য তব—সেই থেকে একটু সময় পারিবে না মােরে দিতে? শতদল-পদ্ম তব—সেই থেকে একটি পঙ্কৰ ছিড়ে দিতে পারিবে না?
ক ঙ্কা ব তী
একটি মুহূর্ত দাও! মাের কাছে বােসসা তুমি এসে
অর্ধ-স্ফুট নিম্নস্বরে গান গাও, শুধু গান গাও,
তাকায়ে আমার মুখে—চোখে সেই আলােক জ্বালায়ে,
ঠোট দু’টি গােল করে তুলে।
আজিকে এমনি হবে, যন্ত্রগুলি রেখে দিয়ে এসাে,
বেহালা-বাজানাে তব শুনিয়া আসিবাে কাল গিয়ে।
আজ কোনাে কথা নয়—চপলতা, ঠাট্টা আর হাসি
সব কাল হবে। কাল স্তুতি করা যাবে—যত চাও,
তােমার সাড়ির রঙ। শতমুখে ভালাে বলা যাবে
আঁচল-আঁটার ঢঙ। বাগানেতে ছুটোছুটি খেলা,
চোর-হওয়া, চড়-খাওয়া, চুমাে-খাওয়া—সব কাল হবে।
আজ আমি ক্লান্ত বড়াে, আজ মাের মন ভালাে নেই,
শুধু কাছে এসে বােসাে, নিচুস্বরে গান গেয়ে যাও
আজ আর কিছু নয়, তুমি আর আমি আর গান
একটু সময়!
(‘আমায় একটু শুধু বসতে দিয়াে কাছে’!
আমার মনে এই শুধু ভয় মিথ্যে বলল পাছে।)
১t
কঙ্কা ৰ তী
?
(না-ব’লে যায় পাছে সে, আঁখি মাের ঘুম না জানে ;
জানিনে কার কথা কও, বুঝিনে কথার মানে।)
( ‘মল্লার-গানে তব মধুস্বরে দিক্ বাণী আনি’ বন-মমরে’-
সে-বাণী এনেছাে তুমি, ভরেছে সকল দিক, বনে নয় মম অন্তরে।)
(এলে সে ফুল-জাগানাের খবর নিয়ে-
কে জেগেছে ? ফুল না আমি? কী শুনি এ?)
(বর-মাল্য গলে তব হয়নি ম্লান,
স্লা হয়নি বুঝি ? তুমি ঠিক তত জানাে ?)
( ‘বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলাে আমার মনে’-
তােমার মনের আষাঢ় ঝরে আমার চোখের বরিষণে।)
(নৃত্য-রসে চিত্ত মম উচ্ছল হয়ে বাজে’-
আমার মনের কথা বলা-সে কি তােমায় সাজে ?)
4
=
তব রাত্রি-দিন হ’তে একটি মুহূর্ত দাও মােরে,
তােমাতে আমাতে গানে এই মুহূর্তটি কেটে যাক।
আজ আমি ক্লান্ত বড়, আজ মাের মন ভালাে নেই,
ক্লান্তির কুয়াশা ছিড়ে নতুন উজ্জ্বল দিন আনন।
আকাশ লুণ্ঠন করে সূৰ্য্যেরে আনিতে পারি কেড়ে
গান আর সুর আর চোখে ঠোটে মেশা, তুমি মােরে
একটি মুহূর্ত দাও যদি।
১৯
पून
খুলে দাও চুল।
এ-দিন উজ্জ্বল বড়ঢ়, এ-আলােক পারি না সহিতে,
চাহিতে চাহে না চোখ, পুড়ে যায় মুদিত পল্পব ;
এই উগ্র, তিক্ত আলাে দীর্ণ করে নয়নের পাতা।
অজ পােকার মতো আলােকের কণিকা শিহরে
চোখের পাতার পিছে ; রাত্রির এখনাে ঢের দেরি,
এখনাে সিন্ধুর বুকে ঘুম যায় সন্ধ্যার ছায়ারা,
এখনাে রয়েছে রাত্রি অরণ্যের চরণে জড়ায়ে ;
আমার চোখের 'পরে সৃষ্টি করাে রাত্রির তিমির,
আমার দৃষ্টির পরে ঢেলে দাও ঠাণ্ডা অন্ধকার ।
চুলগুলি খুলে দাও, খুলে দাও, ঢেলে দাও মাের
নয়নে আচুল।
তােমার সে-চুল
জড়ানাে সুতার মততা, নিশীথের মেঘের মতন,
তােমার সে-কালো চুল, এলােমেলাে, অগােছাল চুল,
ঘুমের মতন ঠাণ্ডা,একমুঠো জমানাে আঁধার
তােমার সে-চুলগুলি ঢেলে দাও মাের মুখে-চোখে।
২
জভানাে সুতার স্তুপ দেবাে মুখে অজস্র ছড়ায়ে,
শুকনাে চুলের স্বাদ মাের উষ্ণ, বিশুষ্ক অধরে ;
দত্যাগ্রে কেশের গুচ্ছ, কাটি তারে তৃণের মতন,
উজ পুষ্পের মত চুল ছানি দুই হাত দিয়ে;
খসখসে চুলগুলি, তার স্পর্শে নাসিকা স্ফুরিছে,
চুলগুলি পান করে মাের উষ্ণ, সতৃষ্ণ নিঃশ্বাস ;
আঁধার আমার চোখে, বিভাবরী আমার দিবসে,
দৃষ্টি-ভরা অন্ধকার, কিছু আর দেখিতে পারি না
কেমনে তােমার চুলে খেলা করে আলােকের ফিতা,
কেমনে চুলের কালাে আকাশের আলােকে শিহরে,
কালাে এলাে চুলগুলি মাের মুখে পড়েছে কেমনে
অজস্র আকুল।
অন্ধকার সিড়ি বহুক্ষণ মুখােমুখি স্তব্ধতায় আমরা দু'জন (বিমর্ষ আকাশ ভরা মেঘ। বিষন্ন বর্ষার সন্ধ্যা-অন্ধকারে আমরা দু’জন- (মেঘে-মেঘে ধূসর আকাশ !) আঁকাবাঁকা সরু গলি—আলাে নাই, কোলাহল-চলাচল নাই, এলােমেলাে ছােটো বাড়ি, দোতলায় ছােটো এক ঘর, ঘর-ভরা অন্ধকার, আকাশে বিষঃ মেঘ, গলি আলােহীন ; বহুক্ষণ স্তব্ধতায় মুখােমুখি আমরা দুজন। বিষন্ন আকাশ ভরে আরাে গাঢ় হয়ে এলাে কালাে মেঘগুলাে, আরাে কালাে হয়ে এলাে ঘর-ভরা ঠাণ্ডা অন্ধকার : জানালার সাদা কাচ আরাে সাদা হলাে অন্ধকারে (তাবরা চেয়ে কত সাদা গ্রীবার রেখাটি ।) হঠাৎ নামিলে বৃষ্টি ; চমকি উঠিলাে জেগে কনকনে হাওয়া, হাওয়া এসে থেকে-থেকে টোকা দেয়, বাড়ি দেয় জানালার কাচে, ঝোড়া হাওয়া, জোলাে হাওয়া হাততালি দেয় খালি সারা গলি ভরে, সারা বাড়ি ভরে খালি বাড়াবাড়ি অস্থির হাওয়ার ।
ক স্কা ৰ তী
মাথা খুড়ে, কথা ক’য়ে ফেরে হাওয়া দেয়ালে-দেয়ালে,
জোলাে হাওয়া, বােড়া হাওয়া ঘর ভরে ঘােরাঘুরি করে,
স্তব্ধ হয়ে মুখােমুখি বসে আছি আমরা দু’জন।
বাহিরে বৃষ্টির শব্দ ; বৃষ্টির অজস্র কথা সারা গলি ভরে।
বাঁকা গলি, ফঁাকা গলি-তার সাথে এত কথা কী আছে বৃষ্টির ?
(গ্রীবার রেখাটি দেখা যায়।)
আলাে নাই, লােক নাই, কোলাহল-চলাচল নাই,
এতটুকু ছােটো গলি-তার সাথে কী কথা যে এত?
(মুখােমুখি বসে আছি মােরা।
বাহিরে বৃষ্টির শব্দ ; ঘর ভরে পায়চারি অস্থির হাওয়ার,
আকাশে মেঘের কালাে ; ঘর ভরে অন্ধকার ফেলিছে নিঃশ্বাস :
ওর মুখে কথা নাই, মাের মুখে কথা নাই কোনাে ।
••
চুপ করে গেলাে হাওয়া, আকাশ হালকা হ’লল; বৃষ্টি গেলাে থেমে।
ঘর ভরা তবু অন্ধকার।
বড়াে অন্ধকার সিড়ি, খাড়া-খাড়া সিড়িগুলি চোখেই পড়ে না।
বেরােবার পথ বড়াে এলােমেলাে—ভারি অন্ধকার।
২৩
कका वो
কোথা হতে তাই এক আলাে নিয়ে এসে
মাের পিছে নেমে এলাে—তবু কোনাে কথা কহিলাে না।
থেমে-থেমে নেমে এলােমাের মুখে তবু কথা নাই।
খাড়া-খাড়া সিড়িগুলাে বড়াে অন্ধকার
এক-দুই-তিন-চার-ও যদি কহিতে কোনাে কথা )
•••দশবারাে—(আমি যদি কথা কহিতাম।)
বড়াে অন্ধকার সিড়ি—আলাে নিয়ে এলাে মাের পিছে,
বড়াে এলােমেলাে পথ-বেরােবার ঐ ভাে দরজা।
বাঁকা গলি, ফাঁকা গুলি চুপচাপ শুয়ে আছে মনমরা হয়ে
এ কী! এর মাঝে দেখি আকাশে তারাও উঠিয়াছে,
ঝাঁকে-ঝাঁকে ঝকঝকে উঠেছে অনেক তারা এখন আকাশে।
ফাকা গলি, বাঁকা গলি—এই শেষ মােড়।
আলাে ভরা, লােক ভরা, কোলাহল-চলাচল ভরা
বড় রাস্তা এই।
(বড়াে অন্ধকার সিড়ি-পাড়াও, আলােটা নিয়ে আসি।
“তুমি যদি সঙ্গে যাও, অন্ধকারে ঠিক যাবাে নেমে।)
२8
কর্কশ শব্দের স্রোত চাকায়-চাকায় উচ্ছসিছে
(বড়াে অন্ধকার সিড়ি, আলাে নিয়ে দিয়ে আসি চলল।
‘তুমি যদি আগে যাও, পথ দেখে ঠিক যাবাে নেমে।)
প্রবল, ধবল আলাে চারিদিকে অজস্ব ঝরিছে-
(ও কী? এসাে ! দাড়ায়ে রয়েছে কেন ওখানে? যাবে না?
‘আলােটা সিড়িতে রেখে ফিরে এসাে , শােনন, কথা আছে।)
আলাে ভরা বড় রাস্তা, লােক ভরা, কোলাহল-চলাচল-ভরা-
(দু’জনায় গল্প জমিয়াছে।)
অনেক স্রোতের মত দিকে-দিকে গজিছে ট্র্যাফিক,
ঝরিছে অজস্র আলােমােটারের, দোকানের, ইলেকট্রিকের
(বােবা ওরা, বােকা ওরা, স্তব্ধতায় মুখােমুখি বসে ছিলাে ওরা
আমরা অনেক কথা বলি,
আমরা অনেক কথা শুনি,
আলােটা সিড়িতে রেখে গল্প করি—গল্প করি আমরা দুজন।)
একখানা হাত
আকাশে জমেছে মেঘ ; পথ নিরিবিলি ;
সব চুপ; রাত দু’পহর।
বাড়িগুলি অন্ধকার পথের দুধারে ;
ঘুমায় সহর।
শরীরে জমেছে ক্লান্তি, দুই চোখে ঘুম,
হেঁটে-হেঁটে একা ফিরি বাড়ি।
এখনি আসিবে বৃষ্টি ; তাই জোর করে
চলি তাড়াতাড়ি।
হঠাৎ পথের মােড়ে একটি বাড়ির
নিচের ঘরের জানালায়
দেখিলাম, মান-নীল ইলেকট্রিকের
আলাে দেখা যায়।
শুধু এই জানালায় আলাে জলিতেছে,
অন্ধকার সহর নিরালা ;
কাছে এসে চোখ তুলে যেই তাকালাম,
বুজিলাে জানালা।
ক ক্কা ব
নিলাম তাহারি ফাকে পলকের তরে
একখানা সাদা হাত দেখে
দুইটি কবাট এসে বুজিলাে তখনি
দুই দিক থেকে।
একখানা সাদা হাত, কয়টি আঙুল,
আংটির হীরার ঝলক,
মণিবন্ধে সরু রুলি, ম্লান-নীল আলাে,
চোখের পলক।
আবার দুচোখ ভরে ঘুম জমে এলাে,
সকল পৃথিবী অন্ধকার :
-এই কথা না-জেনেই মৃত্যু হবে মাের
হাতখানা কার।
এসেছি নিজের ঘরে, বৃষ্টিও এসেছে,
হাওয়ার চীৎকার যায় শােনা ;
যার হাত, কাল তার মুখ দেখি যদি,
আমি চিনিবাে না।
বিছানায় শুয়ে আছি, ঘুম হারায়েছে ।
না জানি এখন কত রাত ;
—কখনাে সে-হাত যদি ছুই, জানিবাে না,
এ-ই সেই হাত।
কবি
একা-একা কথা কই;-তােমরা সে-কথা
নিতে পাও কি ?
তােমরা নিতে পাও—একা-একা কত
বকি আর ঝকি ?
হৃদয়ে ফুলের মতাে ফুটিছে কবিতা
সুৰ্য্যের উদয় হতে সন্ধ্যার সময় ;
হয়ে ফুলের মতাে কবিতা ঘুমায়
সন্ধ্যা হতে সূর্যের উদয়।
আকাশে তারার মতাে তাহারা অনেক,
সমুদ্রে ঢেউয়ের মতাে ঢের ;
তাদের দু’একটি কি রােদের মতন
পড়িয়াছে চোখে তােমাদের ?
তােমরা দেখিতে পাও সেই ফুলগুলি-
কেমনে যে হয় ?
যে-আকাশে তারা তারা-যে-সমুদ্রে ঢেউ,
সে-আকাশ আমার হৃদয়,
সে-সমুদ্র আমার হৃদয়।
মনে-মনে কথা কই বিবাহের রাতে
বাসর-ঘরেতে,
তােমরা সে-কথা শােনাে দুয়ারের কাছে
বুঝি আড়ি পেতে ?
যার কাছে কথা কই, সে কি শুয়ে আছে
মাথা রেখে নরম বালিসে ?
অথবা ঘুমায় সে কি আকাশের বুকে,
সমুদ্রের সাদা মুখে মিশে ?
তােমরা দেখেছে তারে কখনাে কি ? তারে
তােমরা কি চেনাে ?
তার সাথে তােমাদের হয়েছে আলাপ
মনে হয় যেন !
তােমরা তাহার ঘুম ভেঙে দিয়েছে কি ?
কেমনে তা হয় ?
যে-আকাশে, যে-সমুদ্রে আছে সে ঘুমায়ে-
সে-আকাশ আমার হৃদয়,
সে-সমুদ্র আমার হৃদয় ।
২১
চুন
জানাে ভাে, কী হয়েছিলাে কাল রাতে—আমি
চেয়ারে ছিলাম যবে বসে?
হাসছ? শুনেই নাও সব কথা; পরে
তােমরাই বােলােকর দোষ এ।
নভেল পড়ছিলাম ; দমকা হাওয়ায়
নিবে গেলাে হঠাৎ আলােটা,
ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাত মুছে নিলাে এসে
কপালের ঘাম ফোঁটা-ফোটা।
ভারি ভালাে মনে হলাে কালাে অন্ধকার,
রাস্তার আলাে জানালায়,
তারপর•••তারপর যা হলাে সে-কথা
ভাবিয়া এখনাে হাসি পায়।
এখনাে সে-কথা ভাবি; চোখ বুজে থেকে
গড়ি সেই কালাে অন্ধকার,
বই নিয়ে আজ রাতে বসিবাে যখন
আলােটা কি নিবিবে আবার ?
এই সব
একবার চোখােচাখি খােলা জানালায়
অনেক আনন্দ আর খানিক বিস্ময়,
একটু দুরাশা :
তারপর রােদে পুড়ে দিন ক্ষয়ে যায়,
মনের আকাশ ভরে স্বপ্নের কুয়াশা।
-আর-কিছু নয়।
অনেক তারার মুখ, খানিকটা উঁদ,
সকল কাজের শেষে ঘুমের সময়
শান্তির শিশির :
সুখ, দুঃখ, কিছু কথা, বাসনা, বিষাদ,
তারপর অন্ধকার মৃত্যুর রাত্রির।
-আর-কিছু নয়।
আমার কবিতা (রমাকে )
কবিতা পড়তে চাও? আমার কবিতা ?
ললাকে যাকে ভালাে বলে, যার জোরে—আশা করা যায়-
সাহিত্যের ইতিহাসে মাের নাম র'বে এক কোণে
সে-সব পােড় না তুমি ; সেগুলাে তােমার তরে নয়।
ললাকে যাকে ভালাে বলে, তােমার তা ভালাে লাগিবে না।
তােমার লাগিবে ভালাে, এমন কবিতা
হয়-ততা লিখতে পারি কোনােদিন-আশা করা যায় ।
নিতান্ত মনের কথা, ছােটো কথা;-খুসি হবে পড়ে।
তারপর—যে-যুবকে তখন বাসিবে তুমি ভালাে,
অন্ধকারে তার কানে গুঞ্জরিবে সে-কবিতা মাের।
৩৫
আরশি
কঙ্কাবতীর জানালার পরে রজনী বাড়ে,
একাদশী-শশী একা সে ঘুমায় আকাশ-পারে,
আর শিশু-তারা উকি মেরে যায় আরশি-আড়ে।
কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে,
আহা-লাল চুল, রেশমি-নরম, লাল সে-চুল!)
একাদশী-শশী-সে-ও তাে ঘুমায়, কেউ জাগে না,
হানে না নয়নতারার নয়নে চাহে না হেনা।
আরশির আড়ে তারার নয়শয় অচেনা।
(কঙ্কাবতী।স চুল এলাে করে দিয়েছে-
আহালাল চুল, হালকা, হলুদ-লালচে চুল !)
ঘুমােনাে মায়েরে চুমমা খাবে না সে ওষ্ঠাধরে,
ঘুমােনাে ভায়েরে চুমাে খাবে না সে চোখের 'পরে।
ঘুমােনাে চাদের চুমােগুলাে সব শিশিরে ঝরে।
(কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে-
আহা—লাল চুল, শুকননা, সােনালি-লাল সেচুল !)
कहावी
আরশির আড়ে—ফুল নয় ! ও যে নয়ন ফোটে,
চোখের তারায় ঘুম নেই—ঘুম নেইকো মােটে,
চুমাে নেই চোখে, চুমাে নেই তার দুইটি ঠোটে।
(কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে—
আহা, লাল চুল, পালা, আলতা-লালচে চুল!)
ঠোটের রেখাটি রেখে যায়,-রেখা বুকের বাঁকা,
আরশির বুক কঠিন—সেথায় যায় না আঁকা,
আরশির মুখ কঠিন, ঠাণ্ডা, নিরেট ফাকা ।
(কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে
আহা, লাল চুল! ঝিকিমিকি-সােনা! লাল সে-চুল !)
আরশির মুখে ছছাটো দু’টি ঠোট—আপেল পাকা,
আরশির বুকে বাঁকা-রেখা বুকবকের পাখা,
বুক কঠিন, ঠাণ্ডা, জমাট, ফঁাকা।
(কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে,
আহা, লাল চুল! শুকননা, নরম লাল সে-চুল !)
আরশির বুক
৩৪
বাইরে কে আসে? কেউ নয়, ভাসে বাতাস খালি,
দুয়ার খােলে কে? কিছু না, হাওয়ার হাতের তালি।
জানালায় টোকা ? ভয় নেই, ঝরে ফোটা শেফালি।
(কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে
আহা, লাল চুল! মুঠি-মুঠি আলাে ! লাল সে-চুল!)
কঙ্কাবতীর রজনী সে বাড়ে-রজনী বাড়ে,
একাদশী-শশী একা জেগে রয় আকাশ-পারে,
আর শিশু-উষা উকি মারে এসে আরশি-আড়ে।
( কঙ্কাবতী সে চুল এলাে করে দিয়েছে
আহা, লাল উষা! আলতায়-সােনা, লাল সে-চুল !)
গেরিলা
মাঝরাতে আজ বাতাস জেগেছে, শুনতে পাও?
কঙ্কাবতী
এলাে এলােমেলাে ব্যাকুল বাউল উতল বাও,
কঙ্কাবতী।
আঁধার ধরণী, যামিনী নিঝুম, আকাশ কালাে,
তিমির ভেঙেছে রাঙা-ভাঙা চাঁদ—তামার আলাে।
কঙ্কা, শােনাে !
মেঘের কালােয় রঙিন সঙিন ঝলমলালে,
জানালার কাচ জলিলাে তােমার—দ্যাখাে না তা-ও ?
কঙ্কা গাে ! ·
শরীর শুয়েছে ? মাতাল বাতাসে মন উধাও!
কঙ্কা, শােননা,
কঙ্কা গো!
আকাশ ঘুমায় মাথা রেখে কালাে মেঘের কোলে,
কঙ্কাবতী।
মেঘের মুখেতে মুখ রেখে চাঁদ পড়েছে ঢলে
কঙ্কাবতী।
कहा दी
রজনীর নীড়ে ঘুমের পাখিরা উঠেছে জেগে,
আঁখি দুলে আসে তাদের পাখার বাতাস লেগে ;
কঙ্কা, জাগাে !
ঘুম নেমে এলাে মেদুর আকাশে, মধুর মেঘে,
কেন তবু তব জানালার কাচ উঠিলাে জ্বলে ?
কা গাে!
কেন তবু তব ঘর ভরে গেলাে হাওয়ার রােলে ?
কা, জাগাে,
কঙ্কা গাে !
ঘুমাও, ঘুমাও; আঁখি দু’টি তব এসেছে চুলে,
কঙ্কাবতী।
ঘুমাও, ঘুমাও! রেখাে না জানালা, রেখাে না খুলে,
কঙ্কাবতী
প্রদীপ নেবাও, নেবাও নয়ন-তন্দ্রা নামে,
তার ঢেউ সুমুখে-পিছনে, ডাহিনে-বামে,
কঙ্কা, শােনন।
ক া ব তী
হাওয়ার আওয়াজ গান গেয়ে যায় তােমার নামে,
হাওয়ার আঙুল চুলবুল করে তােমার চুলে,
কঙ্কা গাে !
মাতাল বাতাস কত কী যে কয় মনের ভুলে
কা, শােনাে,
কঙ্কা গাে!
জানালার কাচ জ্বলেছে তােমার--জ্যোছনা-কণা,
কঙ্কাবতী।
রাঙা-ভাঙা উঁদ—খানিকটা তামা, খানিক সােনা,
কঙ্কাবতী।
জানালার নিচে ধূ-ধূ সাদা পথ, আধাে-আঁধার,
ধবধবে পথ—শুধু ধূ-ধূ বালি, সাদা ধূলার ;
কঙ্কা, শােননা।
ধূলাে আর আলাে, সাদা আর লাল আবছায়ার ।
ঝাপসা ছায়ায় ঝিকিমিকির আলােক বােনা-
কঙ্কা গাে।
क का वो
ছায়া আর হাওয়া বেহালা বাজায় যায় কি শােনা!
কা, শােনাে,
কঙ্কা গাে!
বেহালার সুর কোন কথা কয় ব্যাকুল রে ?
কঙ্কাবতী।
গুমরি-মূরছি’ মরিছে তােমার ঘুমের 'পরে-
কঙ্কাবতী !
ঘুম কি ভাঙিলাে? শুনবে কি গান ? শুনবে কথা ?
জ্যোছনা-জড়ানাে ঝাপসা ছায়ার চঞ্চলতা ?
কঙ্কা, জাগাে !
চাঁদে ও আঁধারে অথই কথার অজস্রতা ;
জানালার কাচে, বালিসের কাছে বেহালা ঝরে
কঙ্কা গাে !
তুমি তাে ঘুমাও! ঘুমের শিয়রে গুমরি’ মরে
‘কঙ্কা, জাগাে,
কা গাে।
ক স্কা ব
হাহাকার করে বেহায়া হাওয়ার বেহালাখানি,
কঙ্কাবতী।
জানালার কাচে হানা দেয় তার অঝাের বাণী,
কঙ্কাবতী।
কোন কথা কয় ? তুমি কি শুনবে ? শুনবে না কি ?
আধাে-বিস্ময় আধাে-সংশয়ে মেলিবে আঁখি ?
কঙ্কা, জাগাে!
ঘর ভরে কেন পাখা ঝাপটায় সুরের পাখি ?
তােমারি তরে কি ? রাতের চাঁদের গানের রানি ?
কঙ্কা গাে!
তােমারি তরে কি ছুটো বাতাসের ছটফটানি—
‘কা, জাগাে,
কঙ্কা গাে’
বেহায়া বেহালা কী কথা যে বলে, শুনতে পাও?
কঙ্কাবতী।
ধূ-ধূ সাদা পথ তােমার আশায় হ’লাে উধাও,
কঙ্কাবতী।
৪০
কা ব জী
ধূ-ধূ সাদা পথ
সুদূর বিদেশ শেষের মােড়ে,
সেখানে তােমাকে কেউ চেনে নাকো-চেনে না মােরে,
কা, চলাে;
সেখানে তারারা সারারাত ভরে-আকাশ ভরে ।
সারারাত ভ'রে হাহাকার করে বাউল বাও,
কা গাে।
কা, শয়ন ছাড়াে গাে, নয়ন মেলিয়া চাও
কা, জাগাে,
ককা গাে !
কঙ্কা, জেগেছে? কঙ্কা, জেগেছে? কঙ্কাবতী।
কঙ্কাবতী।
বেহালার বুকে তব নাম ফোটে-কঙ্কাবতী,
কঙ্কাবতী।
বেহালা বলিছে : ‘আজিকার রাত প্ৰভাত হবে,
রাত ভাের হবে -তােমার আমার জীবন রবে,
কা, শােননা!
প্রেম জেগে রবে-মমাদের জীবন নিবিবে যবে,
আছে চিরদিন সীমাহীন প্রেম, আছে নিয়তি
কঙ্কা গাে !
কঙ্কা ব তী
সব থেমে যায়—চিরকাল চলে প্রেমের গতি,
কঙ্কা, শােননা,
কঙ্কা গাে।
আমার মুখের
তিমির মুছেছে তামার আলাে,
রাঙা-ভাঙা চাঁদ এক কোনে—বাকি আকাশ কালাে,
কঙ্কাবতী
রাতের বাতাস কী কথা যে কয় পাতার কানে,
রাতের তারারা সেই কথা জানে, সে-কথা জানে,
কঙ্কা, জাগাে!
হাওয়ার বেহালা কী কথা বলেছে অঝাের গানে,
সে-কথা কে জানে? কে জানে সে-কথা? বুঝেছে ভাললা?
কঙ্কা গােয়
চাঁদ মরে আসে; তােমার আঁখিতে জ্যোছনা আলাে !
কঙ্কা, জাগাে,
কঙ্কা গাে !
১২
কঙ্কাবতী
তােমার নামের শব্দ আমার কানে আর প্রাণে গানের মতাে-
মর্মের মাঝে মমরি’ বাজে, কঙ্কা! কঙ্কা! কঙ্কাবতী।
(কঙ্কাবতী গাে !)
দূর সিন্ধুর তরঙ্গ-রােল অমাবস্যায় অনবরত
( অন্ধকারের অন্তর-ভরা ছন্দ-শিহর স্পন্দমান )
অপ্তির 'পরে, স্বপ্নের ঘােরে ফেটে বেজে ওঠে গানের মতাে,
অন্ধকারের অন্তর থেকে তরঙ্গ-রােল ইতস্তত
কেঁপে ফুটে ওঠে, ফেটে বেজে যায়; ঢেউয়ের মুখের ফেনার মতো
( কঙ্কাবতী গাে )
গড়ায়, ছড়ায় সুপ্তির পরে স্বপ্নের ঘােরে সমস্ত রাত :
তেমনি ভােমার নামের শব্দ, নামের শব্দ আমার কানে
বাজে দিন-রাত, বাজে সারা-রাত, বাজে সারাদিন আমার প্রাণে
ঢেউয়ের মতন ইতস্তত ;
ঢেউয়ের মতন গান গেয়ে যায় : কঙ্কা, কঙ্কা, কঙ্কাবতী।
কঙ্কাবতী গাে।
দিনের স্বপ্নে, রাতের স্বপ্নে তােমার নামের শব্দ শুনি,
(কঙ্কাবতী !)
ão
ক ক্কা ব তী
লােকের চোখের অতীত স্বপ্নে তােমার নামের স্বপ্ন বুনি।
(কঙ্কাবতী!)
গুঢ় গভীর মন্দির-মাঝে ঘন্টার মত সুগ
পলকে-পলকে ধ্বনি বেজে ওঠে কঙ্কা! কঙ্কা! কঙ্কাবতী।
আমার মনের গুহার বুকে :
আমার মনের অনেক গুহার চুড়ায়-চুড়ায় শব্দ বাজে,
চুড়ায়-চুড়ায় ঠেকে ভেঙে যায়, ছড়ায় হাওয়ায় ইতস্তত
দশদিক থেকে কথা ক’য়ে ওঠে প্রতিধ্বনি :
গভীর গুহার গহ্বর থেকে গাঢ়ক প্রতিধ্বনি :
আমার মনের অপার আকাশে হাজার-হাজার প্রতিধ্বনি :
ডাহিনে ও বামে, উপরে ও নিচে, এখানে-ওখানে প্রতিধ্বনি :
প্রতিধ্বনি।
কঙ্কা-কা কঙ্কাবতী গােকা, কঙ্কা, কঙ্কাবতী
এখানে-ওখানে প্রতিধ্বনি।
••
দিনের কাজের হাজার আওয়াজ হাজার হাওয়ার জোয়ারে বহে,
হাওয়ার রথের চাকায়-চাকায় ভেঙে গুড়াে হয়ে আকাশে রটে
কত কলরােল!
৪৪
কঙ্কাবতী
আমি সেদিনের শব্দের নিচে, আমি সে-কাজের শব্দের পিছে শুনি
আমার বুকের হৃদয়ের রােলে, রক্তের তােড়ে, কানে আর প্রাণে শুনি
(কঙ্কাবতী )
হৃৎ-শব্দের সাথে তাল রেখে টিপ টিপ টিপ গান গেয়ে যায়
কঙ্কা-কঙ্কা—কঙ্কাবতী-
কঙ্কাবতী গাে।
রাতের ঘুমের নীরব সময় মুখর তােমার নামের গানে,
প্রতি মুহূৰ্ত্ত ফুটে ঝরে যায়, ফেটে মরে যায় ফুলের মতাে,
ফুটে ঝরে যায় তােমার নামে ;
রাতের ঘুমের প্রতি মুহূর্ত সুখে ফুটে ওঠে তােমার নামে,
প্রতি মুহূর্ত তােমার নামের শব্দে ফোটে ।
কাজের জোয়ারে, ঘুমের সময়ে তােমার নামের শব্দ রটে—
কাকা-কঙ্কাবতী!
কঙ্কাবতী গাে।
মাঝরাতে দেখি আকাশের বুকে ঝকঝকে তারা-আলাের পােকা,
আকাশ কোমল।
৪৫
ক স্কা ৰ তী
আকাশ কোমল, আকাশ কালাে।
কোমল-কালাে সে আকাশের বুকে ঝকঝকে তারা একশাে কোটি
আলাের পাখার আড়ালে তাকায়, আবার সুকায়, তাকায় হঠাৎ,
চোখের পাতার খুব কাছে এসে মিটমিট করে তাকায় হঠাৎ
আবার লুকায় আলাের পাখার আড়াল টেনে।
আমি মনে ভাবি : তােমার নামের শব্দের সুর ওরাও জানে,
সেই সুরে ওরা ঘুরে-ঘুরে নাচে, দূরে আর কাছে বেড়ায় উড়ে
ঝিকমিক।
সেই সুরে ওরা কখনাে তাকায়, কখনাে লুকায়, তাকায় আবার
মিটমিট ।
আকাশের বুকে ফুটেছে তােমার নামের শব্দ একশাে কোটি,
তােমার নামের শব্দ আমার মনের আকাশে তারার মতাে,
ফুটেছে তােমার নামের শব্দ তারার মতন একশাে কোটি
কঙ্কাবতী গাে! কঙ্কাবতী গাে! কঙ্কাবতী।
তারার মতন একশাে কোটি।
আবার কখনাে জেগে রয় রাতে একা বাঁকা চঁাদ পশ্চিমেতে,
রাতের নদীতে আরাে জেগে রয় আঁকাবাঁকা চাদ জলের নিচে।
পশ্চিম-ভরা আকাশ ফাকা !
৪৬
কঙ্কা ব তী
ও
তারাদের কেউ দেয় নাই দেখা, আকাশ ফাকা।
একা জাগে চাঁদ-তা ছাড়া সকল আকাশ ফাকা।
শুধু ঐ দূরে দিগন্তরেখা যেখানে ঢলেছে গাছের নিচে,
একসার মেঘ, সরু, এলােমেলাে, আঁকাবাঁকা কালাে সাপের মত
গাছের সবুজে জড়ায়ে শরীর রয়েছে পড়ে।
আঁকাবাকা মেঘ, একা বাঁকা চাঁদ, বাঁকারেখা চাঁদ জলের নিচে,
আঁকাবাঁকা জল, একা বাঁকা চাঁদ, আকাশ ফাকা।
আমি চেয়ে থাকি, দেখি চোখ ভ'রে; মনে হয় মাের, আঁকাবাঁকা জলে,
মেঘের রেখায়
একা বাঁকা চাদ চুপ-চুপ করে কথা ক’য়ে যায় :
ফাঁকা আকাশের রন্ধ্রে রন্ধে, ঝরে পড়ে সুর-কঙ্কা! কঙ্কা!
কঙ্কাবতী।
সাপের মতন জড়ানাে মেঘের বুকে জেগে ওঠে সাপের মতন দ্রুত বিদ্যুৎ,
লাল বিদ্যুৎ, দ্রুত বিদ্যুৎ তােমার নামের শব্দে জাগে;
আকাশ ফাটায়ে লাল বিদ্যুৎ বজ্ৰ বাজায়—“কঙ্কা! কঙ্কা!
কঙ্কাবতী।
আকাশের কোনু ফাঁকা কোন থেকে দেখা দেয় এক তাড়ানাে তারা
হঠাৎ ! হঠাৎ !
৪৭
খসা তারা এক, মরা তারা এক আগুনের মুখ নিয়ে ছুটে যায়,
অবাক! অবাক।
চোখের পলকে ছুটে চলে যায়, ফুলকি ছড়ায়ে জ্বলে পুড়ে যায়,
মুখ থুবড়িয়ে উলটিয়ে পড়ে মাটির 'পরে,
উবু হয়ে পড়ে ঠাণ্ডা, শক্ত মাটির 'পরে।
তবু তার পিছে জ’লে চলে আসে লাল আলােকের দীর্ঘ রেখা,
সাপের মতন আঁকাবাঁকা রেখা, দীর্ঘ রেখা ?
জ্বলে চলে আসে, কেঁপে কেঁপে জ্বলে, জলে আর বলে—“কঙ্কা! কঙ্কা!
কঙ্কাবতী।
এলােমেলাে জলে আলাে ওঠে জলে, ছলছল-ঢেউ তােমার নামে
তীরে চুমাে খায়, দূরে নিয়ে যায় ঢেউয়ের জলের স্রোতের টানে
তােমার নামের শব্দ, কঙ্কা! কঙ্কা! কঙ্কা! কঙ্কাবতী।
আকাশে ও চাদে, জলে আর মেঘে, দিগন্ত-পারে গাছের ছায়ায়,
ফাঁকা আকাশের রন্ধে-রন্ধে, মেঘের শরীরে, জলের স্রোতে
চুপেচুপে বলা চাদের মুখের কথা
চাদের মুখের কথা জেগে ওঠে : কঙ্কাবতী।
আমার মনের কথা বেজে ওঠে : কঙ্কাবতী।
তােমার নামের শব্দ ঘনিছে, কঙ্কাবতী।
কঙ্কাবতী গাে!
৪
কবিতা
(রসেটির “Troy Town পঠিতব্য)
আজ মাঝরাতে ঠাণ্ডা বাতাস ছুটবে যখন,
ঘুম ফেলে দিয়ে তুমি চলে এসাে এখানে কেমন ?
মুখােমুখি বসে কবিতা পড়বাে আমরা দু’জন।
(হেলেনের বুকে মনের বাসনা বেঁধেছে বাসা,
মনের বাসনা সকল কালের সব পুরুষের
ভেঙে গুড়াে হ’লাে ট্রয় !)
ছুটবে বাতাস, শুকনাে বাতাস, কঁপবে আকাশ ;
পূবের সবুজে দেখা যাবে লাল চাঁদের আভাস।
চুল খুলে দিয়ে তুমি চলে এসাে এখানে কেমন?
(হেলেনের বুক নিখুত, নিটোল, নরম, সাদা,
ফলেছে সেখানে মনের বাসনা সব পুরুষের
পুড়ে ছাই হ’লাে ট্রয় !)
৪১
o
কঙ্কা ব তী পূবের রেখায় গাছের সবুজ হয়েছে গভীর, সেখানে ফুটবে ছােটো, একমুঠো চাঁদের আবির। মুখােমুখি বসে কবিতা পড়বাে আমরা দু’জন। ( হেলেনের বুকে দু’টি পাকা ফল ভরেছে বসে, বাসনার রসে সকল কালের সব পুরুষের পুড়ে খাক হ’লাে ট্রয় !) আকাশের মাঠে ফুটে রবে তারা ফুলের মতন, উদার আকাশে হাজার তারার হাজার নয়ন- মুখখামুখি বসে কবিতা আমরা পড়বাে যখন। ( আফ্রোদিতের মন্দিরে গেলাে অর্ঘ্য দিতে স্পার্টার রানি হেলেন-বাসনা সব পুরুষের। ভেঙে গুড়াে হ’লাে ট্রয় !) ঘুম ফেলে দিয়ে তুমি চলে এসাে, খুলে ফেলে চুল, এলােচুল তব হালকা হাওয়ায় উড়বে আকুল শুকনাে বাতাস, ঠাণ্ডা বাতাস ছুটবে যখন। ( হেলেন রচেছে অর্ঘ্য নিজের বুকের ছাঁচে সােনার বাটি সে-মনের বাসনা সব পুরুষের। চুরমার হ’লাে ট্রয় !)
ক ঙ্কা ব তী
নড়বে হাওয়ায় ঢিলে রাউজের চওড়া কিনার,
চুলগুলি সব চোখে আর বুকে, চিবুকে তােমার
ঝরবে হাওয়ায় কবিতা আমরা পড়বাে যখন।
(স্পার্টার রানি ভিনাসের পায়ে আনতজানু
সােনার সেবাটি মধুর দুরাশা সব পুরুষের।
গুড়াে-গুড়াে হ’লাে ট্রয় !)
মেঝের উপর মেঘের মতন সাড়ির আঁচল
লােটাবে তােমার ;-আঁচল, ঘুমের মতন শীতল,
পুরােনাে কবির পুরােনাে কবিতা পড়বাে যখন।
( আফ্রোদিতেকে অর্ঘ্য দিয়েছে সােনার বাটি
স্বর্গ-দুহিতা হেলেন—দুরাশা সব পুরুষের।
পুড়ে খাক হলাে ট্রয় !)
টেবিলের আলাে হাতের বইতে, হাতে আমাদের ।
চুলে আর চোখে ঘুম-ভাঙা রাঙা আধেক চাদের
মলিন জোছনা-কবিতা আমরা পড়বাে যখন।
(সােনার সেবাটি গড়া হেলেনের বুকের ছাঁচে
স্বাদে আর সাধে, বিষাদে ভরেছে সব পুরুষের
ছারখার হ’লাে ট্রয় !)
পৃথিবী নীরব, আকাশ নীরব, সব চুপচাপ,
কেবল বাতাস পাতায়-পাতায় বকবে বিলাপ,
কেবল আমরা কবিতা পড়বাে—আমরা দু’জন।
( ভিনাসের পায়ে নতজানু হয়ে কহিছে কথা
দেবতা-দুহিতা হেলেন—কবিতা সব পুরুষের।
মার হলো ট্রয় !)
উতল বাতাস, মাতাল বাতাস, রাতের বাতাস,
বাতাসের ভাষা শুনবে পাতারা, শুনবে আকাশ ;
পুরােনাে প্রেমের কবিতা পড়বাে আমরা দুজন।
( ‘আমার বুকের ছাঁচে গড়া এই সােনার বাটি
বাসনার রসে আনিয়াছি ভ'রে সব পুরুষের।
—গুড়াে-গুড়াে হ’লাে ট্রয় !)
বিশাল সাগর পার হয়ে এসে বাতাস পাগল
জানালার কাছে চীৎকার করে আবােল-তাবােল
বকতে থাকবে—আমরা কবিতা পড়বাে যখন।
( ‘চেয়ে দ্যাখাে, দেবী, মাের দুই স্তন উঠেছে ফুলে,
স্বপ্ন-স্বর্গ-মৃত্যু-মহিমা সব পুরুষের।
-পুড়ে ঝুরি হ’লাে ট্রয় !)
ক কা ব তী
সারা পৃথিবীরে ঘুরে-ঘুরে যাবে বাতাস পাগল,
সারা রাত ভরে সকল পৃথিবী দেবে সে টহল
আমরা দু’জন প্রেমের কবিতা পড়বাে যখন।
(এই নাও, দেবী, মাের উপহার—বুকের বাটি,
দাও তার মনে মনের বাসনা সব পুরুষের।
-ঝুরি-ঝুরি হ’লাে ট্রয় !)
বাতাসের মুখে নৌকোর মত আধখানা চাদ
আকাশের বুকে ছুটতে থাকবে—চঁদ উন্মাদ ।
উন্মাদ উঁদ—উন্মনমন আমরা দুজন।
( ‘দাও তার মুখে স্বাদ আর সাধ আর বিষাদ
আমার মুখের ;-সুদূর দুরাশা সব পুরুষের।
ছারখার হ’লাে ট্রয় !)
এলাে তব চুলে ঝিকিমিকি-আলাে নাচবে চাদের,
মােরা মুখখামুখি, মাের হাতে বই, মাঝে আমাদের
টেবিলের পরে ঘন-নীল আলাে জ্বলবে ;-কেমন ?
(‘আমার বুকের দিকে চেয়ে দ্যাখাে, আফ্রোদিতে,
তাহার স্বপ্নে দাও এ-স্বপ্ন সব পুরুষের।
—চুরমার হ’লাে ট্রয় !)
৫৩
ক কা ব
বই থেকে চোখ তুলে মাঝে-মাঝে তাকাবাে তােমার
আলাে-ছায়া ভরা চুলে আর চোখে-চোখের তারার
গভীর কালােয় ; তুমি মুখ তুলে হাসবে—কেমন ?
( ‘দ্যাখাে, মাের বুকে দু’টি পাকা ফল ভরেছে রসে
বাসনার রসে সকল কালের সব পুরুষের।
-পুড়ে খাক হ’লল ট্রয় !)
পুরােনাে প্রেমের পুরােনাে কবিতা পুরােনাে কবির
গভীর প্রহরে মােদের হৃদয়ে বাজবে গভীর,
ঘুমের সময়ে প্রেমের লেখন পড়বাে যখন।
('আলাে তার মনে বিশাল বাসনা, দুরাশা আলাে-
আমার চুলের স্বাদে ঘুম ভেঙে দাও প্যারিসের।
-দাউদাউ জ্বলে ট্রয় !)
জানালার কাছে চীৎকার করে মরবে বাতাস,
জানালার কাছে মুরছি’ পড়িবে ভােরের আকাশ।
মলিন আলােয় কবিতা পড়বাে আমরা দু’জন।
( স্পার্টার রানি ভিনাসের পায়ে আনতজানু
নরম চুলের স্বাদে ভেঙে গেলাে ঘুম প্যারিসের।
ছারখার হলাে ট্রয়।)
৫৫
ক ক্কা ৰ তী
পূবের সবুজে সাদা হয়ে ফোটে ভােরের আকাশ,
রাতের, দিনের মাঝখানে এসে ঝিমায় বাতাস।
বই শেষ করে চুপচাপ বসে আমরা দু’জন।
( কোথায় ভিনাস! কোথায় বা সেই বুকের বাটি।
বিশাল বাসনা বুকে জ্বলে তবু সব পুরুষের
পােড়ে লাখাে-লাখাে ট্রয় !)
গান
চোখে চোখ পড়েই যদি, নিয়াে না চোখ ফিরিয়ে,
নিয়ােনা চোখ নামিয়ে রাখাে এই—একটুখানি।
সীমাহীন এক নিমেষে—খােলা ঐ জানলা দিয়ে
কী আছে তােমার মনে—যা আছে, সব দেখে নি।
বােলাে না, একটু সময়—দু’টি চোখ—এমন কী আর!
গালে লাল রঙ এনাে না, তােমাকে মানায় না তা,
ও দেখুক ভােরের আকাশ, এ দেখুক রাতের আঁধার
আমার এ একটু সময় কালাে চোখ, কোমল পাতা।
কালাে চোখ আলােক-ভরা, ছায়াময় কোমল পাতা,
আলাে আর ছায়ার ছবি—ঝিকিমিক আমার চোখে,
নিয়াে না চোখ ফিরিয়ে—যা বলে বলুক লােকে
চোখে চোখ পড়বে যখন।
মুখে মুখ রাখিই যদি, এমন আর দোষ কী, বলল ?
মনেরে যায় না ছোঁয়া, কেমনে চাখবাে তারে
দু’টি ঠোট—ফুরফুরে ঠোট, টুকটুক-রঙিন হ’লল,
ঠোকরাই পাখির মত খুটখুট চার কিনারে।
ক কা ব তী
চারদিক ঠুকরিয়ে খাই, দুটি ঠোট ফলের মতাে,
ঐ মুখ ফুলের মতাে ফুটেছে আমার পানে ;
খুলে দাও চুলের বােঝা ঝপাঝপ ইতস্তত,
ফুটফুট নরম বুকে টেনে নাও বাহুর টানে।
টেনে নাও আমায় তুমি ফুটফুট নরম বুকে,
হৃদয়ের গােপন কথা ঢিপঢিপ নরম বুকে,
শােননা ঐ কইছে কথা হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়।
গড়িয়ে পায়ের নিচে বয়ে যায় অসীম সময়
মুখে মুখ রাখলে পরে।
আমরমাকে তুমি এখানে কখনাে যদি আসবে মেয়ে, শােনাে, আসবে কখন। আঁধার নামবে সাদা আকাশ ছেয়ে, আঁধার নামবে লাল আকাশ ছেয়ে, যবে কালাে যবে সন্ধ্যাতারার মুখ থাকবে চেয়ে মাের মুখের পানে নির- নিমেষ নয়ন- জাগবে রাতের হাওয়া উতল গানে- তুমি আসবে তখন। লক্ষ্মী মেয়ে ! মানে আসবে এখানে তুমি সন্ধ্যা হলে তুমি মেশা উষ্ণ তুষার তব লাল কপােল, মাখা সুম। তােমার কালাে চোখের কোলে, সাদা গলায় তােমার সাদা মুক্তা দোলে ; चन নীলাম্বরী সাদা শরীর ছেয়ে। এনাে স্বপ্ন তােমার কালাে নয়ন ভরি’, এসাে, লক্ষ্মী মেয়ে। . । ৫
ক স্কা ৰ তী
আমি
তব
যাবে
সাদা
ধরবাে দু হাত তব নিমেষ-তরে
তুমি আসবে যখন ;
নাম ধরে ডেকে তােমা আনবাে ঘরে,
চুলের সুবাসে তব বাতাস মরে ;
আলােক পড়ে নীল সাড়ির পরে
কেঁপে উঠবে সুখে-
তুমি আসবে যখন।
তাকাবদা গােলাপ-ফোটা তােমার মুখে
সাদা তুষার-বরণ।
আমি
ঘরে
আর
বসাবাে তােমাকে মাের ইজি-চেয়ারে,
আমি বসবাে পাশে।
জলবে মােমের আলাে এক কিনারে,
জলবে সন্ধ্যাতারা আকাশ-পারে,
জলবে স্বপ্ন তব আঁখির ঠারে ;-
কালাে আঁখির কোলে
मीणा আলােক ভাসে;
হৃদয়ের তােলপাড় শান্ত হলে
আমি বসবাে পাশে।
মাের
ক স্কা ব তী
নয়া
হাসি
হাসি
গল্প-গুজব হবে তােমায়-আমায়
उ
আমরা দু জন ;
চুলের ফ্যাশান থেকে সাহিত্য মায়;
ফুটবে ফুলের মতাে চোখের কোনায়,
কঁপবে আলাের মতাে অধর-সীমায়
লাল ঠোঁটের 'পরে-
কালাে নয়ন-মগন।
গহন স্বপনে ঘন নয়ন ভরে
হাসি
ফুলের মতন।
আমি
বলবাে তােমাকে ঢের মিথ্যে কথা
তুমি নবে, মেয়ে ;
শরীর-অন্ধকারে বিজলী-লতা,
সাড়িতে মেঘের ঘন তমিস্রতা ;
বাহুতে জলের মতাে উচ্ছলতা,
শত
কবির স্বপন
नौन
দুই
তব
নয়ন ছেয়ে।
নয়নে মরণ, তব চরণে মরণ!
তুমি শুনবে মেয়ে।
ক ক্কা ব তী
তুমি
তব
তব
বলবে আমাকে ঢের মিথ্যে কথা,
আমি শুনবব, মেয়ে।
স্বর্গের অর্ঘ্যের আমি দেবতা,
হৃদয়-গগনে আমি তপন-যথা,
হৃদয়-সাগরে চির-চঞ্চলতা-
চোখে ফুটলাে আলাে
মাের নয়নে চেয়ে ;
মােমের আলােয় মােরে বাসবে ভালাে
তুমি
লক্ষ্মী মেয়ে।
ম্লান
তুমি
মােমের আলােয় ভালােবাসবে মােরে
ভালাে-
এক
মোরা
মাের পড়বাে প্রেমে,
বাসবাে তােমায় আমি হৃদয় ভরে ;
তারকা-ফোটা ঘন সন্ধ্যা ধরে
বাসবাে, বাসবাে ভালাে পরস্পরে ;
দুর
আকাশ থেকে
প্রেম আসবে নেমে ।
নাম ধরে-ঘরে মােরা আনবাে ডেকে
প্রেমে
মােরা পড়বাে প্রেমে।
প্রেমিকের প্রার্থনা
চুলে তার খেলা করে হেমন্তের বিকালের সােনালি আলােক,
তরল নয়নে তার আলােভরা অন্ধকার করে টলমল
শিশিরের মতাে মেয়ে, শিশিরের মতাে তার শরীর শীতল,
তুষারের মতাে সাদা দেহ তার—প্রদীপের মতাে তার চোখ।
-ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
কবিতার মতাে মেয়ে, সোনালি
চুলের
রাশি রহস্যে ঘোেরালাে,
গানের মতন মেয়ে, হাসি-ভরা দুই চোখ ইঙ্গিতে গভীর,
হাসি-ভরা সারা মুখ, আনন্দ-সৌরভে তার নিঃশ্বাস মদির
চুলে তার, চোখে তার মুখে তার উৎসবের আনন্দের আলাে।
ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
পরশে চাহনি তার, দৃষ্টিতে চুম্বন, আর চুম্বনে মরণ ;
বাহুতে আনন্দ তার—অধর, হৃদয় ভরা প্রেমের সুষমা,
সকল মেয়ের প্রেমে এই মেয়ে অপরূপ, রূপে নিরুপমা।
এই মেয়ে আর কেউ জানে না বাসিতে ভাললা তাহার মতন।
—ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
৬
ক স্কা ব তী
নয়নে কামনা তার, অধরে অমৃত, আর পরশে মিনতি
নখ-কোনে, আঁখি-কোনে বাসনার গুঞ্জরণ, দৃষ্টিতে দুরাশা,
কর-তলে, পদ-তলে, বাহুতে, আঙুলে তার বহে ভালােবাসা ;
এত রূপ এ-মেয়ের এই মেয়ে সকলের চেয়ে রূপবতী।
-ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
সকল মেয়ের প্রেম যার মাঝে সেই মােরে ভালােবাসিয়াছে,
কয়েছে মধুর কথা, মনের গােপন কথা হাত রেখে হাতে;
আমারে নিয়েছে ডেকে তারা-ভরা অন্ধকারে, সুরভিত রাতে
রেখেছে আমার মুখ তার মুখে-হৃদয়ের, অধরের কাছে।
-ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
আমারে বেসেছে ভালাে শিশিরের, তুষারের মতাে এই মেয়ে,
প্রবল চুম্বনে তার, কোমল গুঞ্জনে, আর হৃদয়স্পন্দনে ;
দেহের রূপের মােহে, প্রাণের গভীর স্নেহে, প্রচুর যৌবনে
যে-মেয়ে বেসেছে ভালাে, যে জানে বাসিতে ভালাে সকলের চেয়ে
—ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোনাে আশীর্বাদ।
ক া ব তী
আর আমি-হায়, আমি ভালােবাসিয়াছি তার প্রতি দেহ-কণা,
এত ভালােবাসিয়াছিসব তারে বলা যায়, কোথায় সে-ভাষা?
তাই ভালােবেসে যাই, ভালােবেসে যাই তারে, তার ভালােবাসা ;
তাই তার তরে শুধু অধরের, হৃদয়ের একটি প্রার্থনা
—ঈশ্বর, তাহারে তুমি কোরাে আশীর্বাদ।
মধ্যরাত্রে
'Pray but one prayer for me 'twixt thy closed lips,
Think but one thought of me up in the stars.'
William Morris.
ভাবিয়াে আমার কথা একবার তারাভরা আকাশের তলে,
কহিয়াে আমার নাম একবার নিশীথের বাতাসের কানে;
নয়ন তুলিয়া তব চাহিয়াে একটিবার আকাশের পানে,
একবার মুখ তুলে ডাকিয়াে আমার নাম বাতাসের কানে।
আকাশে তারার ভিড়, আকাশে রূপার রেখা বাঁকা চাঁদ জ্বলে ;
রজনী গভীর হয় ; বাতাসে মদির গন্ধ ; চাদ পড়ে ঢলে—
চাদের রূপালি রেখা লাল হয়ে ঢলে পড়ে পশ্চিমের কোলে।
রজনী গভীর হয় ; আকাশ আঁধার হয়ে আসে পলে পলে-
ক্লান্ত চাদ ঢলে পড়ে, ক্লান্ত আঁখি ঢুলে আসে আকাশের তলে।
ভাবিয়াে আমার কথা একবার তারাভরা আকাশের তলে,
কহিয়াে আমার নাম একবার নিশীথের বাতাসের কানে।
বাতায়নে তারা জাগে, চঁাদের রূপালি আলাে শয়ন-শিথানে,
শিশিরের মত ঘুম ঝরে পড়ে নিশীথের আকাশের তলে,
নয়ন জড়ায়ে আসে, নয়ন ভরিয়া যায় স্বপ্নের ফসলে ;
৫
ক স্কা ব তী
রাতের ঘুমের আগে কহিয়াে আমার নাম বাতাসের কানে,
কহিয়াে আমার নাম ভালােবেসে একবার বালিসের কানে,
রাতের ঘুমের আগে ভাবিয়াে আমার কথা আকাশের তলে,
ভাবিয়াে আমার কথা ভালােবেসে একবার জানালার তলে ;
নয়ন মেলিয়া তব চাহিয়াে একটিবার জানালার পানে,
একবার মুখ খুলে ডাকিয়াে আমার নাম বালিসের কানে ;
তারপর চোখ বুজে দেখিয়াে আমার মুখ আঁধারের তলে,
দেখিয়াে আমার মুখ একবার ঘুমে-ভরা আঁধারের তলে
রাতের ঘুমের আগে দেখিয়াে আমার মুখ নয়নের তলে,
দেখিয়াে আমার মুখ একবার নয়নের পল্লবের তলে।
কহিয়াে আমার নাম একবার নিশীথের বাতাসের কানে,
ভাবিয়াে আমার কথা একবার তারাভরা আকাশের তলে,
-তারা-ভরা আকাশের, তারা-কারা জানালার তলে
নিশীথের বাতাসের, ঘুমে ভরা বালিসের কানে।
রূপকথা I see thee always in my dreams- James Clarence Mangan, নিয়ত তােমার স্বপ্ন দেখি, কঙ্কাবতী। নিয়ত তােমার স্বপ্ন দেখি । আকাশে-আকাশে লক্ষ তারা যে-কথা রটায় শুন্য ভরে, পল্লবদলে মর্মরিয়া নিশীথ-বাতাস দীর্ঘশ্বাসে ৮ - যে-কথা কহে; স্রোতের জলের কলস্বরে ছড়ায় যে-কথা ফেনার মতো, যে-কথা সকল কথার পরে ফোটে তারাময় একটি কথা সে যদি না হতাে তােমার নাম, সে যদি না হ’তত তােমার কথা, তবে আকাশের লক্ষ তারা কবে নিবে যেভাে অন্ধকারে,
ক কা ব
তবে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস
তরঙ্গায়িত স্রোতের জল
বিশাল শূন্যে নীরব হতাে-
কথা হতাে তবে কেবলি কথা
কোনাে কথা আর হতাে না গান,
সে যদি না হতে তােমার নাম
সে যদি না হ’তে তােমার কথা।
কঙ্কা, তােমার স্বপ্ন দেখি,
কঙ্কা, তােমার স্বপ্ন দেখি ;
রাত্রির মতাে তােমার চুল,
হৃদয়ে তাহার স্বপ্ন দেখি।
মৃত্যুর মতাে তােমার চুল
আমার হৃদয়ে জড়ায়ে গেছে ।
বিদ্যুৎ-ভরা চোখের আভা
আমার দৃষ্টি রেখেছে ছেয়ে।
এলােমেলাে কালাে তােমার চুল
দুঃখের মতাে বুকের 'পরে,
আমার বুকের, মুখের 'পরে
তরঙ্গ-সম তােমার চুল।
কঙ্কা ব তী
তরঙ্গ-সম তােমার চুল,
সঙ্গীত-সম শরীর তব,
বুকের রেখায় চাঁদের কণা ;
পূর্ণিমা-চাদ বুকের 'পরে।
তিমিরের তলে লুকানাে সে-চাঁদ
আমি জানি,
আমার রক্তে উষ্ণ ছন্দে
তারি বাণী।
কঙ্কা, আমার স্বপ্নের পরে বন্যার মতাে তােমার চুল,
অধরে তােমার চাদে ও আঁধারে কাড়াকাড়ি,
বুকের রেখায় নতুন চাঁদের কণা।
কঙ্কা, তােমার স্বপ্ন দেখি :
আমার মনের গহন আঁধারে, আঁধার আকাশে, আকাশের দূর তারায়-তারায়
নিয়ত তােমার স্বপ্ন দেখি,
স্বপ্ন দেখি।
হঠাৎ হাওয়া
শীতের মাঝে হঠাৎ এলাে দক্ষিণের হাওয়া,
সকালবেলায় ঘুম ভেঙে যায় কিসের স্বপ্ন দেখে
সমস্ত রাত ঘুমের মধ্যে উন্মনের হাওয়া।
ঘুমের রাজপ্রাসাদ ভরে মর্মরের সিড়ি
সেথায় শত শ্বেতচরণ করছে আনাগােনা,
শ্বেতমণির দ্যুতি বিলায় ক্ষণপ্রকাশ উৰু,
বুকের মধ্যে লাগে এসে কঙ্কণের কোনা।
সকালবেলায় ঘুম ভেঙে যায় ব্যথার কলরােলে।
সমস্ত রাত ঘুমের মধ্যে অলস ভাবনাগুলি
ঘূর্নি হাওয়ায় এলােমেলাে শুকননা পাতার মতাে-
ঘুমের রাজপথের পরে বসন্তের শ্রোত।
ঘূর্নি হাওয়ায় এলােমেলাে কল্পনার কণা
সমস্ত রাত পাতার মতাে বুকের 'পরে ঝরে,
সমস্ত রাত ঘুমের মধ্যে চুম্বনের হাওয়া,
সকালবেলায় ঘুম ভেঙে যায় ব্যথার আলােড়নে।
.
৭
শেষের রাত্রি পৃথিবীর শেষ সীমা যেইখানে, চারিদিকে খালি আকাশ ফাকা, আকাশের মুখে ঘুরে-ঘুরে যায় হাজার-হাজার তারার চাকা, যােজনের পরে হাজার যােজন বিশাল আঁধারে পৃথিবী ঢাকা। (তােমারি চুলের মতাে ঘন কালাে অন্ধকার, তােমারি আঁখির তারকার মতাে অন্ধকার ; তবু চলে এসাে; মাের হাতে হাত দাও তােমার কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।) বিশাল আকাশ বাসনার মতাে পৃথিবীর মুখে এসেছে নেমে, ক্লান্ত শিশুর মতন ঘুমায় ক্লান্ত সময় সহসা থেমে ; দিগন্ত থেকে দূর দিগন্তে ধূসর পৃথিবী করিছে খা-খা। (আমারি প্রেমের মতন গহন অন্ধকার, প্রেমের অসীম বাসনার মতাে অন্ধকার ; তবু চলে এসাে ; মাের হাতে হাত দাও তােমার- কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।) ৭১
ক া ব তী
নেমেছে হাজার আঁধার রজনী, তিমির-তােরণে চাদের চূড়া,
হাজার দের চূড়া ভেঙে-ভেঙে হয়েছে ধূসর স্মৃতির গুড়া।
চলাে চিরকাল জ্বলে যেথা উঁদ, চির-আঁধারের আড়ালে বাঁকা।
(তােমারি চুলের বন্যার মতাে অন্ধকার,
তােমারি চোখের বাসনার মতাে অন্ধকার।
তবু চলে এসাে, মাের হাতে হাত দাও তােমার,
কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।)
এসেছিলাে যত রূপকথা-রাত ঝরেছে হলদে পাতার মতে,
পাতার মতন পীত স্মৃতিগুলি যেন এলােমেলাে প্রেতের মতাে।
-রাতের আঁধারে সাপের মতন আঁকাবাঁকা কত কুটিল শাখা।
(এসাে চলে এসো : সেখানে সময় সীমানাহীন,
হঠাৎ-ব্যথায় নয় দ্বিখণ্ড রাত্রিদিন;
সেখানে মােদের প্রেমের সময় সময়হীন
কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।)
৭২
ক ক্কা ব তী অনেক ধূসর স্মরণের ভারে এখানে জীবন ধূসরতম, ঢালাে উজ্জ্বল বিশাল বন্যা তীব্ৰ তােমার কেশের তমাে, আদিম রাতের বেণীতে জড়ানাে মরণের মতাে এ-আঁকাবাঁকা। (ঝড় তুলে দাও, জাগাও হাওয়ার ভরা জোয়ার, পৃথিবী ছাড়ায়ে, সময় মাড়ায়ে যাবে এবার, তােমার চুলের ঝড়ের আমরা ঘােড়সওয়ার কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না। যেখানে জ্বলিছে আঁধার-জোয়ারে জোনাকির মতাে তারকা-কণা, হাজার চঁাদের পরিক্রমণে দিগন্ত ভরে উন্মাদনা। কোটি সুর্যের জ্যোতির নৃত্যে আহত সময় ঝাপটে পাখা। (কোটি-কোটি মৃত সূর্যের মতাে অন্ধকার তােমার আমার সময়-ছিন্ন বিরহ-ভার ; এসো চলে এসাে; মাের হাতে হাত দাও তােমার- কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।) ৭৩
কঙ্কা ৰ
তােমার চুলের মনােহীন তমম আকাশে-আকাশে চলেছে উড়ে
আদিম রাতের আঁধার-বেণীতে জড়ানাে মরণ-পুঞ্জে ফুড়ে,
সময় ছাড়ায়ে, মরণ মাড়ায়ে বিদ্যুৎময় দীপ্ত ফাকা।
(এসাে চলে এসাে, যেখানে সময় সীমানাহীন,
সময়-ছিন্ন বিরহে কাপে না রাত্রিদিন।
সেখানে মােদের প্রেমের সময় সময়হীন
কঙ্কা, শঙ্কা কোরাে না।)
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.