Bally Sadharan Granthagar
Meera Bai Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মীরাবাঈ
গ্রীনাথনাথ বসু
ইণ্ডিয়ান নাসিয়েটেড পাবলিশিং কোং লিঃ
১৩, গনি রােড, কলিকাতা ৭
প্রকাশকঃ জিতেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, বি. এ
৮-সি, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা ।
ই টাকা
প্রচ্ছদ :
অজিত গুপ্ত
মুদ্রাকর: ত্রিদিবেশ বসু, বি. এ.
কে. পি. বস্তু প্রিন্টিং ওয়ার্কস
১১, মহেন্দ্র গােস্বামী লেন, কলিকাতা ৬
সূচী
পা
क
গ
চ
ভূমিকা
প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
জীবনকথা
পদাবলী
পরিশিষ্ট
পদচী
১
•••
১০৩
০ ০ ০
No text on this page.
দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা
“মীরাবাঈ-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইল।
প্রথম সংস্করণ ছাপা হয় ১৩৩০ সনে; অল্পদিনের মধ্যেই
সে সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া যায়। যখন এই গ্রন্থ প্রথম
প্রকাশিত হয় তখন আশা ছিল মীরাবাঈ-এর
পদাবলী হইতে সংকলন করিয়া বিভিন্ন খণ্ডে গ্রন্থটি সম্পূর্ণ
করিব। নানা কারণে সে ইচ্ছা অসম্পূর্ণই থাকিয়া গিয়াছে।
সম্প্রতি মীরাবাঈ সম্বন্ধে ঔৎসুক্য দেখিতে পাইতেছি
এবং অনেকে আমার গ্রন্থের সন্ধানও করিয়াছেন।
হয়তাে এই অসম্পূর্ণ সংকলন তাঁহাদের এই ঔৎসুক্য
কিছু পরিমাণে নিবৃত্ত করিবে এবং কেহ কেহ
হয়তাে ইহার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া মীরাবাঈ-এর সমগ্র
রচনাবলী পাঠ ও প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হইবেন, এই
আশাতেই এই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করিতেছি। আশা
করি ইহা অধিগণের নিকট আর লাভ করিবে।
এই সংস্করণে পূর্ববর্তী সংস্করণের সংক্ষিপ্ত জীবনীর
পরিবর্তে অধুনালুপ্ত মাসিকপত্র ‘নব্যভারতে প্রকাশিত
আমার লেখা “মীরাবাঈ” শীর্ষক প্রবন্ধটি সন্নিবিষ্ট হইল।
তাহা ছাড়া প্রথম সংস্করণে ৪৬টি পদ ছিল, বর্তমান
সংস্করণে ৫টি পদ দেওয়া হইল। বর্তমান সংস্করণে
অনুবাদের স্থানে স্থানেও কিছু পরিবর্তন করিয়া দিয়াছি
যাহারা একদা মীরাবাঈ এর রচনাবলীর সহিত পরিচয়
লাভের সুযােগ দিয়াছিলেন ও নানাভাবে আমাকে
উৎসাহিত করিয়া অনুগৃহীত করিয়াছিলেন আজ কৃতজ্ঞচিত্তে
হাষে সফলকে স্বরণ করিতেছি। উহাদের মধ্যে জয়পুরনিবাসী অধুনা স্বৰ্গগত পুরােহিত হরিনারায়ণজীয় নিকট আমি বিশেষভাবে ঋণী ; তিনি তাঁহার অমূল্য গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুথি হইতে পদ সংগ্রহ করিয়া দিয়া ও অন্যান্য নানাভাবে সাহায্য করিয়া আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। রাজপুতনা ভ্রমণকালে যােধপুর- নিবাসী জগদীশ সিংহ গেলােট ও কয়েকজন বিশ্বনামা সাধুসন্ত আমাকে পুথি সংগ্রহ করিয়া দিয়াছিলেন; মীরাবাঈ মেড়তার যে রাঠোর-কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া সে কুল উজ্জল করিয়াছিলেন সেই কুলে জাত রূপাহেলীর ঠাকুর সাহেব চতুসিংহজীও তাঁহার গৃহে অতিথিরূপে অবস্থান-কালে নানারূপ সংবাদ ও মীরার পদাবলী সংগ্রহ করিয়া দিয়া উপকৃত করিয়াছিলেন। তাঁহাদের সকলকেই আমি আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। তাহাদের হস্তে আমার এই গ্রন্থ গিয়া পৌছাইবে কি না জানি না; যদি কোনদিন পৌছায় তাহা হইলে ইহাকেই তাহারা আমার ঋণশােধের সামান্য চেষ্টারূপে গ্রহণ করিলে আমি কৃতার্থবােধ করিব। শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম শ্ৰীযুক্ত প্রিয়রঞ্জন সেন মহাশয়ের চেষ্টায় ও উৎসাহে প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভবপর হইয়াছিল; এই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রণয়নেও আমি তাহার নিকট নানাভাবে ঋণী। আমার বন্ধু পণ্ডিত উমাপতি ত্রিবেদীজী আমাকে নানাভাবে সাহায্য করিয়াছেন; এই সুযােগে তাঁহার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। কলিকাতা ওই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৫ অনাথনাথ বসু
;
প্রথম সংরণের ভূমিকা
মীরাবাঈ-এর রচনাবলীর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হইল।
ভক্তিমতী মীরার নাম ভারতের সর্বত্রই বিদিত, কিন্তু তাহার
মধুর রচনাবলীর সহিত পরিচয় আমাদের মধ্যে অতি অল্প
লােকেরই আছে। তাঁহার কয়েকটি গানের সহিত আমার
প্রথম পরিচয় পাঁচ বৎসর পূর্বে; পরে ধীরে ধীরে সে
পরিচয় বিস্তৃত করিবার চেষ্টা করিয়াছি ও করিতেছি।
মধ্যযুগের যে পবিত্র ভক্তিধারা ভারতভূমিকে সিঞ্চিত
করিয়াছিল, বাঙালী পাঠকগণের সহিত তাহারই একটির অল্প
পরিচয় করিয়া দিবার জন্য মীরার কয়েকটি পদ সংকলিত
করিয়া তাহাদের সম্মুখে নিবেদন করিতেছি। ধীরে ধীরে
অন্যান্য খণ্ডে তাহার রচনাবলী হইতে সংকলন প্রকাশ করিবার
ইচ্ছা আছে। শেষখণ্ডে মীরাবাঈ-এর বিস্তৃত জীবনী,
রচনাপ্রবেশিকা ও কাব্যসমালােচনা প্রদত্ত হইবে।' এখানে
শুধু একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রদত্ত হইল। তাহার জীবনের
ঘটনাবলী সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ আছে।
তাহার মধ্যে যেটি সর্বাপেক্ষা যুক্তিপূর্ণ বােধ হইয়াছে তাহাই
এখানে দিয়াছি।
প্রাচীনকালের বিখ্যাত রচনাবলীর যে দুর্দশা পরবর্তী
সাধকগণের মধ্যে হইয়াছে, মীরার রচনাও সে
দুর্দশার হাত হইতে অব্যাহতি লাভ করে নাই। তাহার
রচনায় প্রক্ষিপ্তাংশ অনেকই আছে; তাহার মধ্যে কোন্গুলি
সত্যই মীরার রচনা তাহা নির্ণয় করা কঠিন। তাহা ছাড়া
পরবর্তী ভক্ত ও গায়কগণের মুখে মুখে অনেক স্থলে পুরাতন
পদের পরিবর্তে কোথাও নুন পদ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে, কোথাও
( ঘ ) বা নূতন শব্দ যােজনা হইয়াছে। মহৎকে নিজের গণ্ডীর মধ্যে আনিয়া ফেলিবার সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কীর্ণ চেষ্টার লায়নাও অনেক বিখ্যাত প্রাচীন ভক্তগণের বাণীকে সহিতে হইয়াছে। এই কারণে মীরার পদের অনেকগুলি সাম্প্রদায়িকতার পরিপােষক বলিয়া মনে হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে এক-একটি অবিকৃত এমন পদ পাওয়া যায় যাহার মধ্যে মীরার হৃদয়ের বিরাট সার্বজনীন প্রেমের পরিচয় পাই। আমি পদগুলি যে ভাবে পাইয়াছি সেই ভাবেই রাখিয়াছি; বিভিন্ন পাঠের মধ্যে যেটা সঙ্গত মনে হইয়াছে সেইটাই গ্রহণ করিয়াছি। সাম্প্রদায়িকতার ক্ষুদ্ৰত্বের বন্ধনে যাহারা বাঁধা পড়েন নাই, তাহাদের আপাতপ্রতীয়মান সাম্প্রদায়িকতার মধ্যেও বিশ্বের হৃদয়ের সুর ধ্বনিত হয় মনে করিয়াই সে রকম পদগুলিকেও এখানে স্থান দিয়াছি। মীরাবাঈ-এর পদগুলির ভাষা মূলতঃ রাজস্থানী হিন্দী ; তাহাতে ব্রজভাষা, মাড়বাড়ী ও গুজরাতী শব্দও অনেক পাওয়া যায়। মীরার নামে প্রচলিত কতকগুলি প্রাচীন গুজরাতী পদও আছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর হিন্দী বর্তমান হিন্দী হইতে কিছু বিভিন্ন, সুতরাং কষ্টবােধ্য ; প্রাচীন ও বর্তমান ভাষার উচ্চারণ, পদযােজনা এবং শব্দার্থের অনেক পার্থক্য ঘটিয়াছে; কিন্তু তাহার লালিত্য বর্তমান হিন্দী অপেক্ষা অনেক বেশি। অনুবাদটি যথাসম্ভব শব্দগত করিতে চেষ্টা করিয়াছি; কিন্তু যেখানে যথাযথ অনুবাদে অর্থ দুর্বোধ্য ও ভাষা কঠোর হইয়া পড়ে সেখানে ভাবানুবাদ করিয়াছি। মীরাবাঈ-এর পদগুলির বিশেষ সংগ্রহ কোথাও হয় নাই। এখনও গুজরাতে নারীগণের, রাজপুতনার চারণ- গরে ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধক ভক্ত গণের মুখে মুখে অনেক পদ রহিয়াছে। সেগুলি সংগ্রহ ;
( ৬ )
করা সহজ নহে। পশ্চিম-ভারতের নানা স্থানে, বিশেষতঃ
রাজপুতনায় ও গুজরাতে, নানা স্থানের পুথির মধ্যেও
তঁাহার গানের সংগ্রহ আছে।
বর্তমান পদাবলী সংকলনে যে সকল গ্রন্থ হইতে সাহায্য
পাইয়াছি পরিশিষ্টে তাহার একটি তালিকা দিলাম।
ভূমিকা শেষ করিবার পূর্বে যে সকল গ্রন্থকর্তার
গ্রন্থ হইতে সাহায্য পাইয়াছি তাহাদের সকলেরই নিকট
কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি।
যােধপুরবাসী অধুনা
স্বৰ্গগত মুন্সী দেবীপ্রসাদ ও শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতীর
অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ক্ষিতিমােহন সেন মহাশয় আমাকে নানা-
ভাবে সাহায্য করিয়া ও উৎসাহ দিয়া বাধিত করিয়াছেন।
শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম শ্ৰীযুক্ত প্রিয়রঞ্জন সেন, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত
প্রমথনাথ সরকার, শ্রীযুক্ত নীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী, শ্রীযুক্ত
জ্যোতিষচন্দ্র রায়, শ্ৰীযুক্ত দীননাথ সান্যাল প্রভৃতির
নিকটেও আমি নানাভাবে ঋণী। তাঁহাদের আমার
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি।
অনাথনাথ বসু
বিদ্যামন্দির, হুগলী
মাঘ ১৩৩০
জীবকথা ভারতবর্ষে ধর্ম ও ভাষা-সাহিত্যের মধ্যে একটা গভীর যােগ আছে। জগতের এই দেশেই বােধ করি খুব বেশি ধর্মকে ঘিরিয়া তাহারই ধারায়, তাহারই সুরে সুর মিলাইয়া সাহিত্য রচিত হইয়াছে। ভারতের প্রাচীন সাহিত্য ‘art for art's sake' নীতি অবলম্বন করে নাই, চিরদিন একটি বিরাট আদর্শ ভারতের এই কাব্য-সাহিত্যকে গড়িয়া আসিয়াছে। কালিদাসের শকুন্তলা বা কুমারসম্ভব যদিও রস ও সৌন্দর্যের সৃষ্টি করিয়াছে কিন্তু তাহার অন্তরের প্রচ্ছন্ন আদর্শটির প্রতিষ্ঠা মুখ্যতঃ ধর্মেরই উপর এবং তাহা আমাদের চক্ষে সহজেই ধরা পড়ে ; তাহা ধর্ম হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। ভাষা-সাহিত্যের দিক দিয়া দেখিতে গেলে মধ্যযুগের সৃষ্টিতেও ধর্ম এবং সাহিত্যের এই যােগটি আমরা দেখিতে পাই। বাঙলাদেশের শূন্যপুরাণ, মনসামঙ্গল, চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির কবিতা হইতে আরম্ভ করিয়া পশ্চিম-ভারতে কবীরের দোহা, সুরদাস ও তুলসীদাসের কবিতা—সকল- গুলির প্রাণই ধর্ম। শুধু ছন্দ বা সুর লইয়া আমাদের দেশে সাধারণতঃ কবিতার সৃষ্টি হয় নাই। ভারতবর্ষ ধর্মের একটি বিরাট ও ব্যাপক অর্থ করিয়া তাহাতে সাহিত্যকেও স্থান দিয়াছে। মধ্যযুগেই প্রাদেশিক ভাষা ও সাহিত্যের বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠা আরম্ভ হয়; তাহার পূর্বে ভারতে তালােচনা সংস্কৃতের সাহায্যেই হইত। কিন্তু খ্ৰীষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীর পর হইতে এ ধারার ব্যক্রিম ঘটে। তাহার পর হইতেই মাঝে মাঝে এমন অনেক সাধক ও ভক্তের আবির্ভাব
(ছ)
হয় যাহারা দেশে প্রচলিত ভাষাতেই তত্ত্বালােচনা আরম্ভ
করেন। বস্তুতঃ এই সকল সাধকভক্তের বাণী আশ্রয়
করিয়াই প্রাদেশিক ভাষাগুলি অনেকস্থলেই প্রথম প্রসার
লাভ করে।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই যুগটি সকল দিক দিয়া
দেখিতে গেলে একটি অপূর্ব যুগ। ইউরােপে যখন
অন্ধকারের যুগ চলিতেছিল, উত্তর-ভারতবর্ষে ধর্ম, সমাজ
ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তখন নূতন নূতন সৃষ্টির চেষ্টা হইতেছিল।
উত্তর-ভারতের ভাষাগুলির তখন কৈশাের কাল। নব নব
প্রেরণায় এই ভাষাগুলি সেই সময়ে নিত্য নূতন সম্পদ
লাভ করিতেছিল।
ধর্মের ব্যাপারেও তখন এক বিপ্লব চলিতেছিল। শুষ্ক
কর্ম ও জ্ঞানবাদ তখন লােকের মনের উপর প্রভাব
হারাইয়াছিল। মানুষের ক্ষুধিত মন তখন কোন নূতন
সত্যের স্পর্শে সরস হইয়া, সার্থক হইবার জন্য আকুল হইয়া
উঠিয়াছিল। ধর্ম যখন প্রাণহীন হইয়া আসে তখন তাহাতে
নানা ব্যভিচার ঘটে। যে যুগের কথা বলিতেছি তাহার ঠিক
অব্যবহিত পূর্বে ধর্ম বলিতে কতকগুলি আচার ছাড়া আর
বিশেষ কিছু ছিল না; নানা ক্ষুদ্রতা, সঙ্কীর্ণতা তখন সমাজ
ও ধর্মজীবনকে দিনের পর দিন ক্ষুন্ন করিতেছিল। রাষ্ট্রীয়
জীবনেও তখন একটি বিবােধ চলিতেছিল। হিন্দু ও
মুসলমানের সংঘর্ষ দিনের পর দিন কঠোর হইয়া আসিতে-
ছিল। রাষ্ট্রব্যাপারের এই বিবােধ ধর্মজগতেও সংক্রামিত
হইয়াছিল। তাহা ছাড়া জাতিভেদ দিন দিন সমাজদেহে
উৎকট ব্যাধিরূপে প্রকাশিত হইয়া উঠিতেছিল।
এই সময়ে দুই পথে জাতীয় জীবনের এই বিভিন্ন
সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা সে যুগে হইয়াছিল। এক পথ
( ২ ) বিশুদ্ধ পরব্রহ্মবাদ—যাহাতে জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সঙ্কীর্ণতা নাই, যাহা মানুষের মনকে জ্ঞানের উন্নত স্তরে লইয়া যাইতে পারে। আর এক পথ ছিল—মানবের যে বৃত্তিগুলি নিমগামী হইয়া এই সঙ্কীর্ণত, এই বিরােধের সৃষ্টি করিয়াছিল সেগুলিকে রূপান্তরিত করিয়া এক বিরাট বিশ্বেশ্বরের প্রেমের লীলানন্দে ডুবাইয়া দেওয়া। প্রথমটির ফল হইয়াছিল বিশুদ্ধ জ্ঞানভক্তিবাদ ; তাহারও বিভিন্ন প্রকার হইয়াছিল। কবীর, নানক প্রভৃতি ধর্মগুরুগণ বিশেষ করিয়া প্রথম পথটি আশ্রয় করিয়াছিলেন বলা যায়; দ্বিতীয়টির ফল হইয়াছিল ভক্তিবাদ, লীলাবাদ ; তাহার পরিণতি হইয়াছিল বৈষ্ণব ধর্মের সৃষ্টিতে। •• নানক, শ্রীচৈতন্য, রামানুজ, কবীর, তুলসীদাস, মীরাবাঈ প্রভৃতি সেই যুগের সৃষ্টি। জ্ঞানবাদী নানক পঞ্জাবে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ প্রচার করিয়া হিন্দুমুসলমান সমস্যার সমাধান- চেষ্টা করিয়া শিখধর্মের ও শিখজাতির সৃষ্টি করিতেছিলেন ; নিরক্ষর জোলা কবীর সৃষ্টির বিচিত্র প্রকাশের মধ্যে এক অরূপের লীলার সন্ধান লইতেছিলেন; রামানুজ জ্ঞান ও ভক্তির এক অপূর্ব সমন্বয় সৃষ্টি করিতেছিলেন ; তুলসীদাস রামায়ণ লিখিতেছিলেন। মুসলমান ধর্মেও তখন সুফিবাদের প্রাধান্যের যুগ চলিতেছিল। চিন্তী সম্প্রদায় প্রেমিক বিশ্বপতির রূপ কল্পনা করিতেছিল। শ্রীচৈতন্য বাঙলাকে ভক্তির মন্দাকিনী-ধারায় সিক্ত করিতেছিলেন, তাহার স্রোত পশ্চিম ভারত পর্যন্ত গিয়া পড়িয়াছিল। মীরাবাঈ এমনই এক যুগে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতবর্ষ কোনদিনই তাহার সাধক ভক্তদের জীবন- কথাকে সন-তারিখের পর্যায়ে ভাগ করিয়া দেখে নাই, সে ভাবের ইতিহাস রচনা করিতেও চেষ্টা করে নাই। সাধকের (ঝ) । বাণীই তাঁহার সাধনার ইতিহাস, সুতরাং তাহার জীবনের সমগ্র ইতিহাস—ইহাই ছিল এ দেশের প্রাচীনকালের ধারণা। যে দেশ যে জাতি সমস্ত জীবনটাকেই একটি সাধনা বলিয়া মনে করে তাহার পক্ষে এটা কিছু আশ্চর্য নয়। নানা রূপকের কাহিনীর ভিতর দিয়া ভারতবর্ষের সে যুগের সাধকদের সাধনার ইতিহাস কীর্তিত হইয়াছে। কিন্তু এই ভাবের ইতিহাসকে অনেক দুর্ভাগ্য বহিতে হয়, সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কীর্ণতার মধ্যে সাধনার ও সাধকের বিশেষত্বটি অনেক সময়েই হারাইয়া যায়। জনকথা অনেক সময়ে প্রচ্ছন্ন রূপকটির অর্থ বিকৃত করিয়া ফেলে; তখন সত্য- মিথ্যা নির্ণয় করা দুরূহ হইয়া পড়ে। তাহার উপর আবার যে সাধনার ইতিহাস শুধু গানের সুর আশ্রয় করিয়া চলে তাহার লাঞ্ছনা অনেক ; কোথাও হয়তাে নূতন পদ রচিত হইয়াছে, কোথাও বা নূতন শব্দ যােজনা হইয়াছে। নিজের নামটি প্রচ্ছন্ন রাখিবার বিনয়ও এ দেশে দুর্লভ নহে। অনেক সময়ে ভক্তবৃন্দ সাধকের মাহাত্ম্য বাড়াইবার জন্য স্বরচিত বহু পদ তাহার নামে চালাইয়া দিয়াছেন; এই সকল কারণেই কোন-এক সাধকের নামে যে সকল পদাবলী প্রচলিত আছে তাহার বেশির ভাগই হয়তাে তাহার রচনা নহে। সুতরাং তাহার ভিতর তাহার জীবন বা সাধনার কাহিনী খুজিয়া পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু তবুও জনপ্রবাদকে অস্বীকার করা চলে না। কারণ তাহার অন্তরের সত্য রূপকটি ধরিতে পারিলে অনেক কথাই সহজ হইয়া পড়ে। এখানে এই ভাবে, মীরার সাধনার ইতিহাসের ভিতর দিয়া, যতটুকু পারা যায় জন- প্রবাদের রূপকটি ধরিয়া এই ভক্তিমতী রাজপুতানীর জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে চেষ্টা করিব।
(ঞ)
মীয়াবাই যাজপুর পরম বৈষ্ণব এক রাঠোর কুলে
জন্মগ্রহণ করেন; ইতিহাসের হিসাবে তাহার জন্ম অনুমান
১৫০৪ ঐ: অৰে হয়। (এইখানেই বলিয়া রাখা ভাল যে
মীরার অসত্যুর তারিখ লইয়া নানারূপ মতভেদ আছে।)
তাঁহার পিতা বলসিংহ মাড়বাড়ণা রাও যুধাজীর পৌত্র
ছিলেন ; উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি মেড়তার ভূস্বামী হন।
এই মেড়তা তালুকের অন্তর্গত কুড়কী গ্রামেই মীরার জন্ম
মীরার খুল্লতাতপুত্র রায়মল্ল তাহার বাল্যস ছিলেন
পরম বৈষ্ণবের গৃহে লালিত পালিত হইয়া এই দুইটি শিশুর
অন্তঃকরণে বাল্যকাল হইতে ভক্তির বীজ অঙ্কুরিত হয়;
রায়মল্ল রাজস্থানের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ; চিতাের অবরােধের
সময় তিনি দুর্গপ্রাকারে আকবরের গুলিতে নিহত হন ।
তিনিও ভক্ত বৈষ্ণব এবং সুকবি ছিলেন।
লােকপ্রবাদ যে বাল্যকালে প্রতিবেশিনী কোন বালিকার
বিবাহের উৎসব দেখিয়া উৎসুকা মীরা তাহার মাতাকে
জিজ্ঞাসা করেন-“আমার স্বামী কে?’ ক্রীড়াচ্ছলে মাতা
গৃহদেবতাকে দেখাইয়া উত্তর দেন—এই গিরিধারীলাল
তােমার স্বামী। বালিকা মীরা সেই দিন হইতে গিরিধারী-
লালকে আপনার স্বামিজ্ঞানে পূজা করিতেন। বিশ্বের
দেবতা, প্রেমের দেবতা, মীরার প্রভু, এই গিরিধারীর
মুর্তিতেই ভঁহার নিকট প্রকাশিত হইলেন। তিনি প্রভু, তিনি
স্বামী, তিনি বিশ্বের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করিয়াছেন।
মীরার উপাস্য গিরিধারীমূর্তি সম্বন্ধে আর একটি কাহিনী
প্রচলিত আছে। একদিন তাহাদের গৃহে এক সন্ন্যাসী
আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাঁহার সহিত নারায়ণের শিলামূর্তি
-গিরিধারীলালের মূর্তিছিল। মীরার বয়স তখন চার
( ) বৎসর মাত্র। মীরা সেই মূর্তিটি সইবার জন্য বায়না ধরেন। সন্ন্যাসী মূর্তি দিতে অস্বীকার করেন এবং মেড়তা ছাড়িয়া চলিয়া যান। তাহার পর মীরা প্রায়ােপৰেশন-ব্রত গ্রহণ করেন। তখন সন্ন্যাসী স্বপ্নে আদিষ্ট হইয়া মীরাকে মূর্তিটি দান করেন। মীরা আজীবন সেই মূর্তি উপাসনা করিয়াছিলেন। রাজপুতদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রচলন নাই। কিশােরী মীরার বিবাহের ব্যবস্থা হইল; মীরার রূপলাবণ্যের খ্যাতি তখন বহুদূর বিস্তৃত হইয়াছিল। তাঁহার অন্তরের সৌন্দর্য দেখিয়াই শুধু তাঁহার বাহিরের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হইয়া মেবারের রাণা তাহাকে পুত্রবধু করিয়া লইয়া গেলেন ; ইতিহাসবিদিত রাণা সংগ্ৰামসিংহের কনিষ্ঠ পুত্ৰ কুমার ভােজের সহিত তাহার পরিণয় সম্পন্ন হইল। মীরা শশুরের গৃহে আসিলেন। বহুস্থলে মীরাকে কুম্ভ রাণার মহিষী বলা হইয়াছে। কর্ণেল টড রাজস্থানে প্রথম সেই ভুলটি করেন ; তাহার পর বহু ঐতিহাসিক, অনৈতিহাসিক গ্রন্থে তাহা স্থান পাইয়াছে; কিন্তু এই মতবাদ যে সম্পূর্ণ ভুল তাহা মুন্সী দেবীপ্রসাদ ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণের গবেষণার দ্বারা নিঃসন্দেহরূপে প্রমাণিত হইয়াছে। তাহারা মেবারের রাজদপ্তরে অনুসন্ধান করিয়া প্রমাণ পাইয়াছেন যে মীরা ও কুম্ভ কোনমতেই সমসাময়িক হইতে পারেন না। বস্তুতঃ কুম্ভ মীরার বহুপূর্বে প্রায় দেড়শত বৎসর আগে—জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং তাহাদের বিবাহ অসম্ভব। চিতােরগড়ে কুম্ভের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের পার্শ্বে মীরাকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বলিয়া খ্যাত একটি মন্দির আজও দেখা যায় ; টড বােধ করি সেই দেখিয়া প্রথম •০ ভুল করেন।
( )
মীরা খরের গৃহে আসিলেন। তাঁহার শ্বশুরকুল ছিলেন
পরম শৈৰ। এইখানে তাহাকে যে প্রথম হইতেই কঠোর
পরীক্ষার আগুনের সহ সহিতে হইয়াছিল তাহা একটি
জনকশার ভিতর দিয়া আমরা জানিতে পারি।
জনকথাটি অবিশ্বাস্য ; তাহাতে আছে শশুরগৃহে প্রথম
পদার্পণকালে চিরাচরিত প্রথামত মীরাকে যখন গৃহদেবতা
শিবকে প্রণাম করিতে বলা হয় তিনি না কি অস্বীকার করিয়া
বলেন, আমি এক গিরিধারী ছাড়া আর কাহাকেও প্রণাম
করিব না। পরবর্তী কোন ভক্ত কর্তৃক রচিত এই
কাহিনীটির মধ্যে হয়তাে সম্প্রদায় হিসাবে মীরার ঐকান্তিক
ভক্তির নিদর্শন রহিয়াছে, কিন্তু যিনি
তেরে ভুবনবৃন্দাবনমে সাৱলিয়াকে সুর বাজৈ *
গাহিতে পারেন তাহার পক্ষে এ ক্ষুদ্রতা অসম্ভব। যাহাই
হউক, এই কাহিনীর মধ্যে, কবীর যে বলিয়া গিয়াছিলেন
সাধকের সাধনা সতীর সাধনা হইতে ভীষণ, সেই কথাটিরই
সুচনা পাই। কিন্তু এখনও তাহার জীবনের বহু পরীক্ষাই
বাকি।
মীরার দাম্পত্য জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই আমরা
জানিতে পারি না। তিনি যে অসুখী হন নাই তাহাই মনে
হয়। হয়তাে তিনি বিলাসিতার পঙ্কে ডুবিয়া বিশ্বেশ্বরকে
কিছুদিনের জন্য তুলিয়া ছিলেন; কিন্তু সে ভােলা কিছুদিনেরই
জন্য। তাহার পরেই আবার ডাক আসিল-কঠোর ডাক।
বিবাহের দশ বৎসরের মধ্যে কুমার ভােজেরই মৃত্যু হইল।
তরুণী মীরা বৈধব্যের কঠোর স্পর্শ অনুভব করিলেন।
এতদিন যে দেবতাকে ভুলিয়া ছিলেন তিনি আজ কঠোরভাবে
তাহাকে মনে করাইয়া দিলেন। তখন বিধবা মীরা তাঁহার
* এর-উচ্চারণ কতকটা ইংরেজী ‘w” বা “ওয়র মত।
চরণে নিজেকে সমর্পণ করিলেন। পার্থিব স্বামীকে হারাইয়া
তিনি বিশ্বের স্বামীর সমানে চলিলেন।
দেবর বিক্রমদেব তখন মেবারের রাণা। তিনি নূতন
নূতন পরীক্ষার নিমিত্ত হইয়া মীরার সাধনার একাগ্রতা পরীক্ষা
করিলেন। শশুরকুলে বহু নির্যাতনই তাঁহাকে সহিতে হইল।
কিন্তু তিনি ডাক শুনিয়াছেন, কেহ কি আর তাহাকে বন্ধনে
বাঁধিয়া রাখিতে পারে ?
তিনি আসিয়া দাঁড়াইলেন ভক্তির উদার রাজপথে।
বৈষ্ণবের সেবা এবং গিরিধারীর ভজন ও আরাধনায় তাঁহার
দিন কাটিতে লাগিল। তাহার কণ্ঠস্বরে অপূর্ব মােহিনীশক্তি
ছিল; সেই কণ্ঠে যে একবার তাহার ভজন শুনিয়াছে সেই
মুগ্ধ হইয়াছে; দিনে দিনে তাহার সাধনার খ্যাতি ছড়াইয়া
পড়িল; বহু সাধুসন্ন্যাসীর সমাগমে তাঁহার পুরী মুখরিত
হইতে লাগিল।
রাজকুলবধূর, তরুণী বিধবার এই কার্যকলাপ অন্য
অন্তঃপুরচারিণীদের চক্ষে কটু বােধ হইল; বিক্রমজিৎও
কুলবধুর এই লােকলজ্জাত্যাগ, সাধুসঙ্গ সহ করিতে পারিলেন
; প্রথমে তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা করা হইল; ননন্দা
উদাবাঈ ছিলেন বিক্রমদেবের প্রধান সহায়, তিনি বন্ধুকে বহু
উপায়ে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ‘মীর-মন হরি
ভায়াে রে'—সে মন আর ফিরিল না।
উদা বলিলেন—ওগাে ভাতী (বধূ), কুলে যে কলঙ্ক
লাগিতেছে, সাধুসঙ্গ ত্যাগ কর, নগর যে তােমার নিন্দাবাদে,
মুখর হইয়া উঠিল।
মীরা বলিলেন-আমার মন যে ডুবিয়াছে, সে রসে
আমি মুগ্ধ।
A
( ট )
উ লােত দেখাইলেন—মুক্তার হার পর, আতরণ জলে
তুলিয়া লও। সাধুর জীবনে কত দুঃখ, কেন তুমি তাহা
সহিবে ?
;
মীরা আনমনে উত্তর দিলেন—আমি তাে রত্নভূষণ ত্যাগ
করিয়াছি, শীলসন্তোষই এখন আমার ভূষণ হইয়াছে।
উদা ভয় দেখাইলেন; কিন্তু মীরার মন বিমুখ হইল না।
তাহার পর, শােনা যায় না কি রাণা তাহাকে বধ করিবার
জন্য বিষের পাত্র হরিচরণামৃত বলিয়া পাঠাইলেন; সেই বিষ
কি মীরার হাতে অমৃত হইল; তিনি তাহা পান করিয়া
অমর হইলেন। অত্যাচার অপমানের গরল নীলকণ্ঠের ন্যায়
কণ্ঠে ধারণ করিয়া তিনি সত্যই অমর হইলেন।
•
তাহার অলৌকিক ভক্তির মহিমা প্রকাশ করিবার জন্য
আরও অনেক কাহিনীর সৃষ্টি হইয়াছে। তাহাদের ভিতরে
এই কথাটিই আমরা পাই যে তিনি বহু লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহিয়াই
সাধনার পথে চলিতেছিলেন।
এই দুঃখ-বিপদের মধ্যে মীরা প্রথমে কি করিবেন স্থির
করিতে পারেন নাই; কথিত আছে তিনি তখন তুলসীদাসকে
উপদেশ প্রার্থনা করিয়া পত্র লেখেন। আমি তােমার কন্যা,
এই বিপদে পড়িয়াছি, এখন কি করা উচিত আমাকে বল।”
তুলসীদাস তখন উত্তর দেন যে গৃহ ত্যাগ করিতে হইবে;
যে গৃহে হরির অপমান হয় সে গৃহ পরম প্রিয় হইলেও
তাহাকে ছাড়িতে হইবে। প্রহলাদ পিতাকে ছাড়িয়াছিলেন,
বিভীষণ ভ্রাতাকে ত্যাগ করিয়াছিলেন, ভরত মাতাকে ছাড়িয়া-
ছিলেন। তুমিও গৃহ ছাড়।
কিন্তু তুলসীদাসের যে পত্ৰ মীরার উদ্দেশে লিখিত
হইয়াছিল বলা হয় তাহা তকৃত বিনয়পত্রিকার একটি পদ,
() পত্র নহে। এটি যে বিশেষ করিয়া মীরার উদ্দেশ্যেই লিখিত তাহা মনে করিবার কোন কারণ বা প্রমাণ নাই। তাহা ছাড়া ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে তুলসীদাস মীরার পরবর্তী কালের। সুতরাং এটিকেও জনপ্রবাদ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। মনে হয় তুলসীদাসের কোন ভক্ত এই কাহিনীটি রচনা করিয়া মীরা ও তুলসীর মধ্যে একটি সম্বন্ধ সৃষ্টি করিয়া স্বীয় গুরুর মহিমা বিস্তার করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু মীরা মেবারে আর থাকিলেন না। মীরা তো মেবার ত্যাগ করিলেন; তাঁহার আর স্থান কোথায় ? ভাবিলেন বুঝি বাল্যসখা রায়মল্পের আশ্রয়ে মমড়তাতে তিনি থাকিতে পারিবেন; রতনসিংহ তখন স্বর্গে। কিন্তু মেড়তাতেও তাহার স্থান হইল না ; তাহাকে আবার পথে আসিয়া দাঁড়াইতে হইল। একে একে সকল বন্ধন তঁহার ছিন্ন হইল—আত্মীয়- স্বজনের বন্ধন, লােকলজ্জার বন্ধন। এ জগতে তাহার আয়, তাঁহাকে বাঁধিবার, আর কেহই রহিল না। তিনি গাহিলেন- মেরে তাে গিরিধর গােপাল দুসরা ন কোর্স। তাত মাত ভ্রাত বন্ধু অপনা নহি কোর্স। গৃহত্যাগের পর মীরার সাধনা প্রকৃতভাবে আরম্ভ হইল। তখনও তিনি তাহার আরাধ্য দেবতাকে স্বামিরূপে বরণ করিয়া ভক্তির উচ্চতম স্তরে উপস্থিত হইতে পারেন নাই; ত্যাগই সাধনা নহে। মীরা গৃহ ছাড়িয়াছেন বটে কিন্তু যাহার জন্য ছাড়িয়াছেন তাহাকে তাে পান নাই। প্রেমের নিকমণি দুঃখ; সে নিকযমণিতে ভঁহার প্রেম সত্য সােনার রেখা আঁকিয়া দিয়াছে। আগুন তাহাকে বহন ( ৩ ) করিয়াছে। কিন্তু যে দেবতার জন্য এত দুঃখ সহন, তিনি ততা এখনও দাসীকে দেখা দেন নাই, মিথ্যা হইতে মুক্তি তাে মিলে নাই। তিনি গাহিলেন- মীরাকে প্রভু সঁচী দাসী বনাও। ঝুঠে ধংধােসে মেরা ফন্দা ছুড়াও। মুক্তি মার্গ দাসীকে দিখাও। তিনি বলিলেন,-আমি বহু চেষ্টা করিতেছি, ধর্মোপদেশ গ্রহণ করিতেছি, সাধুসেবা করিতেছি, কিন্তু তবুও যে তােমাকে পাইতেছি না; তুমি এস, হে প্রভু, তুমি এস, আমাকে মুক্তির পথ দেখাও, আমাকে তােমার সত্য দাসী করিয়া লও। তিনি গাহিলেন- তুমহারে কারণ সব সুখ ছােড়া। অব কুঁ মুঝে তরসাৱ। তােমার জন্য, হে প্রভু, সকল সুখই তাে ছাড়িয়াছি, আর কেন দুঃখ দাও? তুমি এস, তােমার আগমনে আমি ধন্য হই, এ দেহমন্দিরের অন্ধকার দূর হয়। তাহা তাে হয় নাই; এখনও যে- মন্দিরিয়াম। দিৱড় বিনা আঁধিয়া। দীপ বিনা এই মন্দির এখনও যে অন্ধকার। গৃহ ছাড়িয়া মীর বৃন্দাবনের পথে চলিলেন। পথে রাজপুতনার বাস নদীর তীরে তিনি কিছুদিন বাস করেন। সেইখানে তাহার সাধনা সফল হইল; মন্দিরে দীপ জলিল, শুভ্র চিত্তদল যে অমরের আগমন প্রতীক্ষা করিয়া এতদিন ফুটিয়া ছিল, তাহার স্পর্শ এইবার তিনি পাইলেন। ইহারই (৫) জ তাঁহাকে বহুদিন বিরহ ও প্রতীক্ষায় কাটাইতে হইয়াছিল। এই বিরহ ও প্রতীক্ষার ভিতর দিয়াই তিনি জীবনে পরম সার্থকতা লাভ করিয়াছিলেন। মীরার বিরহ ও প্রতীক্ষার পদগুলিই সুন্দর। তাহাদের ভিতরে মানবের চিরন্তন বিরহের সুর ধ্বনিত হইতেছে। তাই তারা আমাদের হৃদয়কে এরূপ করুণভাবে স্পর্শ করে। তিনি বিরহে আকুল হইয়া পড়িতেছেন, তখনও প্রিয়তমের দর্শন লাভ করেন নাই। তিনি সখীকে বলিলেন- হেরী মৈ' তাে প্রেমদিনী। মেরা দরদ না জানে কোই। সখী, আমি যে প্রেমে পাগল হইয়াছি। আমার দুঃখ কেহ বুঝিতেছে না। তিনি প্রার্থনা করিলেন—আমি রাজ্য, সম্পত্তি, পতি, পার্থিব প্রেম, সকলুই বিসর্জন দিয়া আসিয়াছি; তােমার দাসী মীবা তােমার শরণার্থিনী হইয়া আসিয়াছে, তুমি তাহাকে সকল রকমে গ্রহণ কর। তুমি বিনা আমাকে দয়া করে এমন যে আর কেহ নাই। তিনি গাহিলেন— প্যারে দরসন দীজ্যো আয়, তুম বিন রহাে ন জায়। জল বিন কঁবল, চংদ বিন রজনী, ঐসে তুম দেখা বিন সজনী। হে প্রিয়তম, দর্শন দাও, তুমি বিনা যে আর থাকিতে পারি না। জল বিনা যেমন কমল, চন্দ্রহীন যেমন রজনী, হেপ্রিয়, তুমি বিনা যে আমি তেমনি। ২
তিনি বােনায় আকুল হইয়াছেন, বিৱহে তাহার ব
অলিয়া যাইতেছে।
আকুল ব্যাকুল ফিক্স রৈণদিন, বিরহ কলেজে খায়।
এদিকে বাদল নামিয়াছে, চারিদিকে মেধ করিয়া
আসিয়াছে, কিন্তু এ গৃহ শূন্য।
চিতনন্দন বিলমাঈ, বদরা নে ঘেরী মাঈ।
চিতনন্দন যে বড় বিলম্ব করিতেছেন। মেঘ ডাকিতেছে,
ব চমকিতেছে, এখনও তিনি আসিলেন না! কোথায়
তিনি ?
কিন্তু এতদিন পরে বুঝি তাহার সাধনা সফল হইল।
তিনি অন্তরে তাঁহার দেবতার পদধ্বনি শুনিতে পাইলেন।
সুনী মৈ হরিআন কি আৱাজ।
এইবার তিনি আসিলেন। তাই তাঁহার পাওয়ার
আনন্দ।
মেহা বসবাে করেরে, আজতাে রমিয়াে মেরে ঘরেরে।
বাদল নামিয়াছে, নামুক ; প্রিয়তম আজ আমার গৃহে।
জীবনদেবতা এতদিন পরে তাহার গৃহে অতিথি; তিনি
নিঃশেষে আপনাকে বিলাইয়া দিয়া আজ তাহাকে পাইয়া-
ছেন। কিন্তু তখনও হারাইবার ভয়
বহুত দিনপৈ প্রীতম পায়
বিছুড়নকো মােহি ডরেরে।
তাই তখন প্রার্থনা—তুমি আমাকে তােমার চাকর
করিয়াও রাখ; আমি বৃন্দাবনের কুগলিতে তােমার
লীলাগান করিয়া বেড়াইব; তােমাকে স্মরণ করিব, নিত্য
প্রভাতে তােমার দর্শন লাভ কৰিব, তাহাই হইবে আমার
বেতন। আমি আর কিছু চাহি না।
(২)
মীরা এখন গম দেশের যাত্রী।
চলে আগা লে কাল দেখ ভরে।
বহ ভন্ন প্রেমকা হৌজ হল কেনা করে।
হে আমার মন, সেই অগম দেশে চল, কাল যেখানে
যাইতে ভয় পায়; সেখানে প্রেমের পূর্ণ সমােবরে হংস
খেলা করিতেছে। এইবার লজ্জাকে তােমার ওড়না করিয়া
লও, ধৈর্ষকে কর বসন। সেইখানেই হইবে তােমার পূর্ণ
তৃপ্তি, পরম মুক্তি।
এইবার আনলীলা আরম্ভ হইল; তিনি ঝুমুট’
খেলায় চলিলেন—
সখী রী মৈ তাে গিরধরকে রগ রাতী।
পচরগ মেরা চোলা র গা দে, মৈ ঝুরমুট
খেলন জাতী।
সখী, আমি গিরিধরের রঙে রঙিয়া আছি। আমার সাড়া
পাঁচ রঙে রঙাইয়া দাও, আমি ঝুমুট খেলিতে যাই।
এই ঝুরমুট’ বিশ্বদেবতার সহিত রাসলীলা। সে খেলার
আনন্দে সকলই ডুবিয়া যায়; চত্ৰ যায়, সুষ যায়, ধরণী
আকাশ সকলই চলিয়া যায়, থাকে শুধু সেই এক অবিনাশী-
সেই বিশ্বের দেবতা স্বামী।
মীরা আজ জীবনের চরম সার্থকতা লাভ করিয়াছেন,
জন্মজন্মের ‘পুজী পাইয়াছেন; আর তঁাহার ভাবনা কি?
তিনি বৃন্দাবনে আসিলেন পূর্ণ জ্ঞান লইয়া, প্রেমের
সাগরে স্নান করিয়া। সেখানে তাহার দেবতার সহিত
নিত্যলীলা চলিল।
জীবনের শেষদিকে মীরা দ্বারকায় আসেন। সেইখানেই
অনুমান ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার দেহান্ত ঘটে। মীরা মেবার
( ) ত্যাগ করিবার পর মেবারের অবস্থা দিন দিন মন্দ হইয়া আসিতেছিল। এতদিন পরে মেবারের নােক বুঝিল মীরার সঙ্গেই চিতােয়-রাজলক্ষ্মী মেবার ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন। তখন তাঁহার সন্ধান হইল। মেবার হইতে দ্বারকায় ব্রাহ্মণ গেল তাহাকে ফিরাইয়া আনিতে। কথিত আছে তিনি ব্রাহ্মণের অনুরােধে কি করিবেন স্থির করিতে না পারিয়া রণছােড়জীর মন্দিরে গাহিতে লাগিলেন- সাজন সুধ জো জানাে তেঁা লীজো হে। মীরাকে প্রভু গিরিধর নাগর মিলি বিছুড়ন নহি কীজো হয়। হে প্রিয়তম, তুমি যদি আমাকে শুদ্ধ মনে কর তবে তােমার কোলে আমায় স্থান দাও, আমাকে তােমার বক্ষে তুলিয়া লও। হে মীরার প্রভু একবার মিলিয়া আবার আমাকে ছাড়িও না। মীরা তখন না কি রণছােড়জীর মূর্তিতে মিলাইয়া যান। জীবনদেবতা এতদিনে তাহাকে সত্যই বঙ্গে টানিয়া লইলেন ; অসীম প্রেমের মধ্যে অনন্তকালের জন্য তিনি ডুবিয়া গেলেন। অনাথনাথ বসু পদাবলী
মীরাবাঈ
১
১
মীরাকে প্রভু সঁচী দাসী বনাও।
বুঠে ধংধ মেরা ফদা ছুড়াও।
লুটে হী লেত বিবেককা ডেরা।
বুধি বল যদপি কর বহুতেরা।
হায় রাম নহি কছু বস মেরা।
মরত হু বিৱস প্রভু ধাও সবের।
ধরম উপদেশ নিত প্রতি সুনতী হু।
মন কুচালসে ভী ডরতী হু।
সদা সাধু সেবা করতী হু।
সুমিরণ ধ্যানমে চিত ধরতী হু।
ভক্তি মার্গ দাসীকে দিখাও।
মীরাকে প্রভু সঁচী দাসী বনাও।
২
১
হে প্রভু, মীরাকে (তােমার) সত্য দাসী করিয়া লও।
মিথ্যা কাজের বাঁধন আমার খুলিয়া দাও। (তাহারা)
আমার বিবেকের ঘর লুটিয়া লইতেছে, বহু বুদ্ধি প্রয়ােগেও
যে আমি কিছু করিতে পারিতেছি না। হায় রাম, কিছুই
যে আমার বশে নাই; আমি মরিতেছি, আমি বিবশ হইয়া
পড়িয়াছি; প্রভু তুমি শীঘ্র এস, শীঘ্র এস। ধর্মের উপদেশ
নিত্য নিত্য শুনিতেছি; পাপকে ভয় করিয়া মনকে পাপ
হইতে রক্ষা করিতেছি। সদা সাধু সেবা করিতেছি; স্মরণ
ধ্যানে চিত্ত আমার নিযুক্ত করিয়াছি। এইবার তােমার
দাসীকে মুক্তির পথ দেখাও। হে মীরার প্রভু মীরাকে
তােমার সত্য দাসী করিয়া লও।
মীরাবাঈ
হে য়ী মূহ হরি বিন মহাে ন জায়।
সাস্য লড়ে মেরী ননদ খিজাৱে, রাণা রহাে রিসায়।
পহররা ভী রাখখ্যা চৌকী বিঠায়াে তালা দিয়ে জড়ায়।
পূর্ব জন্মকী প্রীত পুরাণী, সাে কু ছহাড়ী জায়।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর আওর ন আৱে
হারী দায়।
:
২
হে সখী, আমি যে হরি বিনা থাকিতে পারি না।
শাশুড়ী কোন্দল করেন, ননদ আমায় গঞ্জনা দেন; রাণা তত
আমার প্রতি বিরক্তই হইয়া আছেন, তিনি প্রহরী
বসাইয়াছেন, ঘরে তালা দিয়াছেন। কিন্তু আমার এই
পূর্বজন্মের পুরাতন প্রেম, ইহাকে আমি ভুলি কি করিয়া ?
হে মীরার প্রভু গিরিধর নাগ, অন্যকে যে আমার ভাল
লাগে না।
৫
মারাত
প্যারে দরসণ দীজ্যো আয়,
তুম বিন হাে ন জায়।
জল বিন কবল, চংদ বিন রজনী,
ঐসে তুম দেখা বিন সজনী।
আকুল ব্যাকুল ফি রৈণ দিন,
বিরহ কলেজে খায়।
দিবস ন ভুখ নীদ নহি রৈণা,
মুখ কথণ ন আৱৈ বৈণা।
কহাঁ কই, কুছ কহত ন আৱৈ
মিলকর তপত বুঝায়।
কু রসাবে অংতরজামী,
আয় মিলল কিরপা কর স্বামী।
মীরা দাসী জনম জনমকী,
পরী তুমহারে পায়।
হে প্রিয়তম, আসিয়া দেখা দাও; তুমি বিনা যে আর
থাকিতে পারি না। জল বিনা কমল যেমন, চন্দ্র বিনা
রজনী যেমন, তেমনি হে স্বজনী, তুমি বিনা আমি।
আকুল হইয়া রাত্রি দিন ফিরি, বিরহে আমার বক্ষ
অলিতেছে। দিনে ক্ষুধা নাই, রাত্রে নয়নে নিদ্রা
নাই, মুখে আমার কথা সরে না। কাহাকে বলি, কিছুই যে
বলিতে পারি না; কেবল তুমি মিলিলেই এ আগুন
নিভিবে।
হে অন্তর্যামী, আর কেন ব্যথা দাও, এস; হে স্বামী,
কৃপা কর। হে প্রিয়তম, তােমার জন্মজন্মের দাসী মীরা
তােমার চরণে পড়িয়া আছে।
৭
মীরাবাঈ
৪
পিয়া বিন রহাে ন জায়।
তন মন মেরে পিয়া পর বার,
বারবার বলি জায়।
নিসদিন জোউ বাট পিয়াকী,
কবরে মিলােগাে আয়।
মীরাকে প্রভু আস তুমারী,
লীজো কংঠ লগায়।
৪
প্রিয়তম বিনা যে থাকা যায় না। আমার এ তনু মন
প্রিয়তমের কাছেই সমৰ্পণ করিয়াছি। নিশিদিন চাহিয়া
আছি তাহার পথের দিকে, কবে আসিয়া মিলিবেন। হে
মীরার প্রভু, তােমারই আশায় আছি। তুমি এস, তােমার
কঠে আমায় গ্রহণ কর।
মীরাবাঈ
৫
তুমহারে কারণ সব সুখ ছােড়,
অব মেহি কু তরসাকাে।
বিরহ বিথা লাগী উর অন্দর,
সাে তুম আয় বুঝাৱাে।
অব ছােড়া নহি বনে প্রভুজী,
হঁস কর তুরংত বুলাকাে।
মীরা দাসী জনম জনমকী,
অংগ আঁগ লগাৰৱা।
৫
(প্রভু) তােমার জন্য সব সুখ ত্যাগ করিলাম, আর
কেন আমাকে দুঃখ দাও ? বিরহের ব্যথায় হৃদয়
অলিতেছে, তুমি আসিয়া (সে আগুন নিভাও।
প্রভু, এখন আমাকে ত্যাগ করা যে (তােমার) সাজে না।
এবার হাসিয়া আমাকে পাশে ডাকিয়া লও। তােমার
জন্মজন্মের দাসী মীরার অঙ্গে তােমার অঙ্গের স্পর্শ বুলাইয়া
দাও।
মীরাবাঈ
৬
নীদলড়ী নহি আৱে সারী রাত।
কিসৱিধ হােয়ী পরভাত।
চমক উঠী সুপনে সুধ ভুলী।
সংত্রকলা ন শােহাত।
তড়ফ তফ জীৱ জায় হমাররা।
কব রে মিলে দীননাথ।
ভয়ী রে দিৱানী তন সুধ ভূলী।
কোঈ ন জানী মহারী বাত।
মীরা কহৈ বাত সােই জানে।
মরণ জীবন জিন হাথ।
১২
সারারাত্রি নিদ্রা আর নয়নে আসে না। কে জানে
প্রভাত কেমন হইবে? স্বপ্নে বুদ্ধিহারা হইয়া চমকিয়া
উঠিয়া ভাবি চত্ৰকলা কোথায় মিলাইয়া গেল ; ব্যাকুল
হইয়া প্রাণ আমার যায়; হে দীননাথ, কখন আসিবে ?
বুদ্ধিহারা হইয়া পাগল হইয়াছি। আমার কথা কেহই
জানিল না; মীরা কহে, জানেন শুধু তিনি যাহার হাতে
আমার জীবন মরণ।
১৩
মীরাবাঈ
৭
সাজন ঘর আৱাে মীঠাবােলা ।
কবকী খড়ী পথ নিহার।
বাঁহী আয়া হােসী ভলা।
আৰৱ নিসংক সংক মত মাননা।
আয়াহী সুখ বহেলা।
তন মন বার কর গোছাৱর।
দীজা স্যাম মােহেলা।
আতুর বহুত বিলব নহি করণা।
আয়াহী রংগ রহেলা।
তেরে কারণ সব রংগ ত্যাগ।
কাজল তিলক তমােলা।
তুম দেখা বিন কল ন পরত হৈ।
কর ধর রহী কপােলা ।
মীরা দাসী জনম জনমকী,
দিলকী ঘুংড়ী খােলা।
১৪
৭
হে মধুরভাষী, তােমার প্রিয়ের এ গৃহে এস। কতদিন
আর দাড়াইয়া দাড়াইয়া পথ চাহিয়া থাকিব? তুমি আসিলে
যে ভাল হইবে। তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে এসাে, শঙ্কা মানিও
না। তুমি আসিলেই সুখ হইবে। এ দেহ মন (তােমার
চরণে ) উৎসর্গ করিব, মােহন শ্যামকে দিব। আমি আতুর,
বিলম্ব করিও না; তুমি আসিলে রঈ পূর্ণ হইবে। তােমার
জন্যই যে সব রঙ ত্যাগ করিয়াছি, কাজল তিলক তাম্বুল।
তােমাকে না দেখিলে যে সময় কাটে না। আমি মাথায়
হাত দিয়া বসিয়া আছি। তােমার জন্মজমের দাসী মীরা
আজ বক্ষাবরণ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছে।
মীরাবাঈ
পিয়া মােহি আরত তেরী হে।
আরত তেরে নামকী, মােহি সঁঝ সবেরী হে।
স্নাতন কে দিৱল কর, মনসা কর বাতী হাে।
তেল জলাউ প্রেমকো, বালু দিন রাতী হাে৷
পটিয়া পাড় জ্ঞানকী, মতি মগ সবার হােত।
পিয়া তেরে কারণ ধন জোবন বা হে।
সেজড়িয়া বহু রংগিয়া, বহু ফুল বিছায়া হে।
রৈণ গঈ তারা গিণত, প্রভু অজই ন আয়া হাে৷
আয়া সাবণ ভাদব, বরসা রিতু আঈ হােত।
মেহা ঘটা ঘন ঘেরি নৈনন ঝরি লাঙ্গ হে।
মাত পিতা তুমকো দিয়ে তুমহী ভুল গয়াে হাে।
তুম তজি অওর ভরকো মনমে নহি আনে হাে৷
তুম হাে পূরে সাইয়া, পূরা সুখ দীজো হাে।
মীরা ব্যাকুল বিরহনী, অপণী কর লীজে হাে৷
১৬
হে প্রিয়, (আমার জীবনে) তােমার আরতি হউক।
তােমার নামের আরতি সকাল-সন্ধ্যা আমার অন্তরে
হউক। এ তনুকে দীপ করিব, মনকে করিব বাতি, প্রেমের
তৈল আলাইব; সে দীপ দিনরাত্রি অলিবে। জ্ঞানের
পাটা (মাদুর) বিছাইয়া বসিব, হরিতে রতি ভিক্ষা
করিয়া সাজাইয়া লইব। তােমার জন্য, হে প্রিয়, ধন যৌবন
উৎসর্গ করিব। এ শয্যা বহু রঙ্গের, বহু ফুল পাতিয়াছি।
তারা গণিতে রাত্রি প্রভাত হইল; আজও প্রভু আসিলেন
। আবণ গেল, ভাত্র আসিয়াছে, বর্ষা নামিয়াছে;
মেঘ ঘনঘটা করিয়া ঘিরিয়া আসিতেছে, নয়নে জল
নামিয়াছে। মাতা পিতা তােমাকেই আমাকে দিয়াছিলেন,
আর তুমিই আমাকে ভুলিয়া গেলে ? তুমিই তাে জান,
তােমাকে ছাড়িয়া অন্য কোন স্বামীকে স্মরণ করি না।
তুমি, হে প্রভু, পূর্ণ স্বামী, পূর্ণ সুখ তুমিই দিতে পার।
ব্যাকুল বিরহিণী মীরাকে এইবার তােমার আপন
করিয়া লও।
১৭ ।
মীরাবাঈ
১
রমময়া বিন নীদ ন আৱে।
নীদ ন আৱে বিরহ সতাৱে
প্রেমকী আঁচ চুলাৱে ।
বিন পিয়া জোত মদির আঁধিয়ানরা,
দীপক দায় ন আৱে।
পিয়া বিনা মেরী সেজ অলুনী
জাগত রৈণ বিহারে।
পিয়া কব রে ঘর আৱে।
দাদুর মাের পপিহিয়া বােলৈ,
কোয়ল সবদ সুণাৱে।
ঘুমট ঘটা উলর হােই আই,
দামিন দমক ডরাৱে।
নৈন ঝর লাবে।
ক্যা করু কিত জাউ মােরী সজনি,
বেদন কূণ বুতাৱে।
বিরহ নাগণ মােৰী কায়া ভসী হৈ,
লহর লহর জিৱ জাৱে।
জড়ী ঘস লাৱে।
কো হৈ সখী সহেলী সজনী,
পিয়ান্টু আন মিলাৱে।
মীরাকে প্রভু কব রে মিললাগে,
মনমােহন মােহি ভাৱে।
কৰৈ হঁস কর বতলাৱে।
১৮
১ প্রিয়তম বিনা যে নয়নে নিদ্রা আসে না। নয়নে নিদ্রা নাই, বিরহ ব্যথা দিতেছ, প্রেমের আগুন জ্বালা দিতেছে। প্রিয় বিনা এ উজ্জল মন্দির অন্ধকার; অন্য দীপ এখানে সাজে না। প্রিয়তম বিনা আমার এ শ্যা বৃথাই লাগিতেছে। জাগিয়াই রাত্রি কাটাইতেছি। প্রিয়তম কবে গৃহে আসিবেন? দাদুর ডাকিতেছে, ময়ুর পাপিয়া গান করিতেছে, কোকিল ধ্বনি শুনাইতেছে। চারিদিকে ঘন- ঘটা উন্মুখ হইয়া আসিতেছে। দামিনী চমকিয়া ভয় দেখাইতেছে। নয়নে বাদল নামিয়াছে। হে স্বজনি, কি করি, কোথায় যাই। আমার এ বেদনার আগুন নিভাইবে কে? বিরহ নাগিনী আমার দেহ দংশন করিয়াছে, বিষে যে জীবন যায়। কে ঔষধ দিবে? হে স্বজনি, কে আমার আপন জন আছে যে প্রিয়তমকে আনিয়া আমার সহিত মিলন করিয়া দিবে ? ওগাে মীরার প্রভু, কবে আসিয়া মিলিত হইবে ? আমার মন তুমিই হরণ করিয়াছ। কখন আসিয়া তুমি হাসিয়া কথা বলিবে ? ১৯
মীরাবাঈ
মৈ জাণো নহী প্রভুকে মিলন কৈসে হােঙ্গ রী।
আয়ে মেরে সজনা ফিরি গয়ে অগনা,
মৈ অভাগণ রহী সােঙ্গ রী।
নিল বাসর মােহি বিরহ সতারে,
কল ন পরত পল মােঙ্গ রী।
মীরাকে প্রভু হরি অবিনাসী,
মিলি বিছনাে মতি কোই রী।
২০
১০
জানি না প্রভুর সহিত মিলন কেমন করিয়া হইবে।
আমি অভাগিনী শুইয়া ছিলাম, আর প্রিয়তম আসিয়া অঙ্গন
হইতে ফিরিয়া গেলেন। নিশিদিন আমাকে বিরহ জালা
দিতেছে, সময় যে আর কাটে না; হে মীরার প্রভু হরি
অবিনাশী, একবার মিলিয়া আবার ছাড়িয়া গেলে কেন?
মীরাবাঈ
১১
তুম সুগাে দয়াল মহারী অরজী।
ভৌসাগরমে বহি জাত হু,
কাঢ়ো তাে থারী মরজী।
মাে সংসার সগাে নহি কোই,
সাঁচা লগা রঘুৱরজী।
মাত পিতা অন্ধ কুটুম্ব কবীলে,
সব মতলববকো গরজী।
মীরকী প্রভু অরজী সুন লাে,
চরণ লগাও থারী মরজী।
১১
হে দয়াল, আমার মিনতি শােন। ভবসাগরে ভাসিয়া
চলিতেছি, যদি বাঁচাও, সে তত তােমারই কৃপা। এই
বিপুল জগতে তত আপনার কেহই নাই, সত্য আপনার
ধু রঘুবরজী। মাতা পিতা কুটুথ স্বজন সকলেই নিজের
গরজ লইয়া আছে।
হে মীরার প্রভু, আমার নিবেদন শােন; দয়া করিয়া
তােমার পায়ে স্থান দাও।
২৩
মীরাবাঈ
মাই মহারী হরী ন বুঝী বাত।
পিংডম প্রাণ পাপী নিকসি কঁ নহী জাত।
রৈণ আঁখেরী বিরহ ঘেরী তারা গিণত নিস জাত।
পাট ন খােলা মুখা ন বােল্যা সাঁঝ ভঈ পরভাত।
অবােলণা জুগ বীতন লাগাে তাে কাহে কী কুসলাত।
লে কটায়ী কংঠ সার কংগী অপঘাত
আৱণ আৱণ কহি গয়ােহরী আৱণহী কী বাত।
মীরা ব্যাকুল বিরহনী রে লাল রহী লালচাত।
28
১২
মাগাে, হরি আমার কথা বুঝিলেন না; এ দেহ হইতে
পাপী প্রাণ কেন বাহির হইয়া যায় না? রাত্রি অন্ধকার,
বিরহ ঘিরিয়া আসিতেছে, তারা গণিয়াই রাত্রি কাটিতেছে ;
তবুও দ্বার খুলিল না, প্রিয়তম কথা বলিলেন না; এ দিকে
রজনী প্রভাত হইয়া গেল। তাঁহার বাণী না শুনিয়া যুগ
কাটিল, কুশল কথা আর কেন ? এইবার কষ্ঠ ছিড়িয়া
অপঘাত মৃত্যুকেই বরণ করি।
হরি তত বার বার আসিবার কথাই বলিয়া গিয়াছেন।
ব্যাকুল বিরহিণী মীরা তাঁহার জন্য আকুল উন্মুখ হইয়া
রহিয়াছে।
মীরাবাঈ
দরস বিহু দুখন লাগে নৈন।
বসে তুম বিছরে মেরে প্রভুজী,
কবহু ন পায়ে। চৈন।
সবদ মুনত মােরী ছতিয়া কাংপৈ
মীঠে লাগে তুম বৈন।
এক টকটকী পংথ নিহার
ভই ছমাসী রৈন।
বিরহ বিথা কা কহু সজনী,
বহ গঈ করৱত ঐন।
মীরাকে প্রভু ক রে মিললাগে,
দুখ মেটন সুখ দেন।
২৬
.
দর্শন বিনা যে নয়ন ব্যথিত হইয়া উঠিয়াছে। হে প্রভু,
যে দিন হইতে তুমি আমাকে ত্যাগ করিয়াছ, সেই দিন
হইতে আর শাস্তি পাই নাই। শব্দ শুনিয়া আমার বুক
কাপিয়া ওঠে ( ভাবি বুঝি তুমি আসিলে); তােমার বাণী
যে আমার মিষ্ট লাগে। এক দৃষ্টে পথের দিকে চাহিয়া
আছি; এক রাত্রি যেন (তােমার বিরহে) ছয় মাসের
মত দীর্ঘ বােধ হইতেছে।
হে প্রিয়তম, আমার এ বিরহ-ব্যথা কাহার কাছে
বলিব ? সে ব্যথা আমার বুকে কাতের ধারের মত
আঘাত দিতেছে।
হে মীরার প্রভু আমার দুঃখ দুর করিতে, আমাকে
সুখ দিতে কখন আসিয়া মিলিবে ?
২৭
বলি
১৪
কৈসে জিউ রী মাঈ
হরি বিন কৈসে জিউ রী।
উদক দাদুর পীনৱত হৈ
জলসে হী উপজাঈ।
জল এক কুঁ মীন বিসরৈ
তলফন মর জাঈ।
পিয়া বিনা পীলী ভঈ রে
জো কাঠ ঘুণ খাঈ।
ঔষধ মূল ন সংচরৈ রে
বৈদ ফির জাঈ।
উদাসী হােয় বন বন ফির রে
বিথা তন ছাঈ।
দাস মীরা লাল গিরধর
মিল্যা হৈ সুখদাঙ্গ।
১৪
মা গাে, আমি কেমন করিয়া বাঁচিব, হরি বিনা আমি
কেমন করিয়া বাঁচিব? জলেই জন্ম, তাই জলেই দাদুরের
ঘূর্তি; জল ছাড়িলে মীন যে মুহূর্তও বাঁচে না। প্রিয়তম
বিনা এ দেহ ক্ষীণ হইয়াছে, কাঠে যেন ঘুণ ধরিয়াছে
ঔষধ ব্যর্থ হইতেছে, বৈদ্য নােগ দূর করিতে না পারিয়া
ফিরিয়া যাইতেছে ; উদাসী হইয়া বনে বনে ঘুরিতেছি,
ব্যথা সর্বদেহে ছাইয়াছে; হে প্রিয়তম গিরিধর, মীরা
তােমারই দাসী, তােমাকে পাইলেই তার ব্যথা যাইবে।
২৯
मीनावाने
হে রী মৈ তাে প্রেম দিৱানী,
মেরা দরদ ন জাণে কোয়।
সূলী উপর সেজ হমারী,
কিস বিধ সােণা হােয়।
গগন মন্ডল পৈ সেজ পিয়াকী,
কিস বিধ মিলণা হােয়।
ঘায়লকী গত ঘায় জানে,
কী জিন লাঙ্গ হােয়।
জৌহরকী গত জৌহরী জানে,
কী জিন জোহর হােয়।
দরদকী মারী বন বন ডােল,
বৈদ মিল্যা নহি কোয়।
মীরাকী প্রভু পীর মিটেগী,
জৰ বৈ সাৱলিয়া হােয়।
বলি সাধারণ গান।
ওগাে সখী, আমি যে প্রেমে পাগল হইয়াছি; আমার
বেদনা তাে কেহই জানে না। শয্যা আমার (বিরহে)
শূলের মত হইয়াছে, নিদ্রা যাই কি করিয়া? প্রিয়তমের
শয্যা গগনমণ্ডলে, মিলন তবে কেমন করিয়া হইবে ?
ব্যথিত যে সেই ব্যথা বােকে, আর বােঝে সে যাহার জন্য
ব্যথা। রঙ্গের মূল্য বােঝে জহুরী, আর যে সে রত্ন কেনে।
ব্যথায় পাগল হইয়া বনে বনে ঘুরিয়া বৈদ্যকে পাই না;
প্রভু যখন বৈদ্য হইবেন শুধু তখনই যে মীরার দুঃখ
মিটিবে।
মহারে ঘর আজ্যো প্রীতম প্যারা।
তুম বিন সব জগ খারা।
তন মন ধন সব ভেট করু
অওর ভজন কৰু, মৈ' থার।।
তুম গুণবংত বড়ে গুণ সাগর,
মৈ ইজী অগণহারা।
মৈ নিগুণী গুণ একো নাহী,
তুঝমে জী গুণ সারা।
মীরা কহে প্রভু কবহি মিলোগে,
বিন দরসন দুখিয়ারা।
৩২
হে প্রিয়তম, আমার গৃহে এস ; তুমি ছাড়া এ জগৎ
যে বিস্বাদ লাগে। আমি তনু মন ধন সকলই (তােমার
চরণে) নিবেদন করিব, আর তােমার ভজন করিব।
তুমি গুণের সাগর, গুণবা, আমি অপগুণ লইয়া আছি।
আমি গুণহীন, একটি গুণও আমার নাই; সকল গুণই
তােমার।
হে মীরার প্রভু, কবে আসিয়া আমার সঙ্গে মিলিত
হইবে? তােমার দর্শন বিনা আমার চিত্ত যে ব্যথিত হইয়া
উঠিতেছে।
৩৩
মীলাৰা
১৭
পিয়া ইতনী বিনতী লুণ মােরী
কোঈ কহিয়াে রে জায়।
অওরণ রসবতিয় করত হে,
হম সে রহে চিত চোরী।
তুম বিন মেরে অওর ন কোই,
মৈ সরণাগত তাের।
আৱণ কহ গয়ে অজহু ন আয়ে,
দিবস রহে অব ধাের।
মীরাকে প্রভু কবরে মিললাগে,
অরজ কর কর জোরী।
৩৪
১৭
(হে সখি,) তােমরা কেহ গিয়া (প্রিয়তমকে) বলিয়া
এস; হে প্রিয়, এই মিনতিটুকু আমার শােন; অন্যের
সহিত রসালাপে মাতিয়া আছ, আমার শুধু চিত্ত হরণ
করিয়া চলিয়া গিয়াছ। তুমি বিনা, হে প্রভু, আমার যে
আর কেহ নাই; আমি তােমারই শরণাগত।
আসিবে বলিয়া চলিয়া গিয়াছ, এখন আসিলে না ;
(জীবনের) দিন যে শেষ হইয়া আসিতেছে।
হে মীরার প্রভু, কর জুড়িয়া মিনতি জানাইতেছি;
কখন আসিয়া মিলিবে বল।
चौबाबा
১৮
দেখাে সখিয়া হরি মন কাঠো কিয়াে ।
আৱন কহি গয়াে অজহু ন আয়াে,
করি করি বচন গয়াে৷
খান পান সুধ বুখ সব বিসরি
কৈসে কী মৈ জিয়াে
বচন তুম্হারে তুমহি বিসারে,
মন মেরাে হর লিয়াে॥
মীরা কহে প্রভু গিরধর নাগর,
তুম বিন ফটত হিয়াে৷
৩)
১৮
দেখ সখি, হরি (আমার) মন কিরূপে ছিড়িয়া
গিয়াছেন। আসিব বলিয়া কথা দিয়া (তিনি) গিয়াছেন,
আজও আসিলেন না। অশন পান বিচার বুদ্ধি সকলই
যে আমি হারাইয়াছি; বাঁচি কি করিয়া ? তােমার কথা
তুমিই ভুলিলে ? (শুধু) আমার মন হরণ করিয়া চলিয়া
গেলে!
হে প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর, তােমা বিনা বুক যে ফাটিয়া
যায়।
৩৭
শীরাজ
১৯
পিয়া অব ঘর আলো মেনে,
তুম মােন তু তােরে।
মৈ জন তেরা পংথ নিহার
মারগ চিতৱত তােরে।
অৱখ বদীতা অজই ন আয়ে,
দুতিয়ন নেহ জোরে।
মীরা কহে প্রভু কবরে মিলােগ,
দরশন বিন দিন দোরে।
,
৯
হে প্রিয়, আমার গৃহে এস। আমি যে তােমারই,
তুমি যে আমার। আমি যে তােমার পথ চাহিয়া আছি,
তােমার পথ দেখিতেছি।
যে সময় ঠিক করিয়া গিয়াছিল সে সময় চলিয়া গেল,
তুমি আজিও আসিলে না; (কোথায় বুঝি) অন্যের প্রেমে
বদ্ধ হইয়া আছ ?
মীরা কহে, প্রভু কখন আসিয়া মিলিবে ? তােমার
দর্শন বিনা যে দিন কষ্টে কাটে।
••
৩১
মীলাবাল
মৈ বিরহিন বৈঠি জাগু,
জগত সব সােৱৈ রী আলী।
বিরহিন বৈঠি রগমহলমে,
মােতিয়নকী লড় পােৱৈ।
ইক বিরহিন হম ঐসী দেখী,
অংসূৱনকী মালা পাের।
তারা গিণ গিণ রৈণ বিহানী,
সুখকী ঘড়ী কৰ আৱৈ।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর,
মিলতে বিছুড়ন জাবৈ।
২০
হে সখি, আমি বিরহিণী বসিয়া রাত্রি কাটাইতেছি,
আর সকলেই সুপ্ত। রঙ্গমহলে বিরহিণী জাগিয়া বসিয়া
মতির মালা গাঁথিতেছে; আর আমি বিরহিণী অশ্রুর হার
গাঁথিতেছি। তারকা গণিয়া গণিয়া রাত্রি, প্রভাত হইয়া
যাইতেছে; আননক্ষণ কখন আসিবে? হে মীরার প্রভু,
প্রিয়তম গিরধর, তুমি মিলিলে যে আমার (সকল) বিরহ
দূর হইবে।
৪১
মীরাবাস
২১
প্রভুজী যে কহা গয়াে নেহড়ী লগায়।
হােড় গয়াে ৱিস্বাস সগাতী,
প্রেমকী বাতী বরায়।
বিরহসমন্দমে ছােড় গয়াে হে,
নেহকী না চলায়।
মীরাকে প্রভু ক রে মিলােগে,
তুম বিন মহাে ন জায়।
০২
হে প্রভু, স্নেহের বাঁধন বাঁধিয়া তুমি কোথায় চলিয়া গিয়াছ? তােমাতেই একান্ত নির্ভর স্বজনকে ত্যাগ করিয়া, প্রেমের বাতি জ্বালিয়া তুমি কোথায় গেলে? বিরহ-সাগরে আমায় ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছ, মেহের তরী ভাসাইয়া দিয়া হে মীরার প্রভু, কবে আসিয়া মিলিবে? তােমাকে ছাড়িয়া যে আর থাকা যায় না। ৪৩
শীবাজ
২২
মেরে প্রীতম প্যারে রামনে,
লিখ ভেজ, রী পাতী।
স্যাম সনেসােকবহু ন দীনহে,
জান বুঝ গুঝ বাতী।
উচী চঢ় চঢ় পংথ নিহার
নােয় রােয় আঁখিয়া রাতী।
তুম দেখ্যা বিন কল ন পরত হৈ,
হিয়াে ফটত মােরী ছাতী।
মীরাকে প্রভু কব রে মিললাগে
পূরব জনমকে সাথী।
৪৪
২২
সখি, আমি আমার প্রিয়তমকে পত্র লিখিব। আমার
সকল গােপন কথা জানিয়া শুনিয়াও তাে তিনি আমাকে
কখনই সংবাদ দিবেন না। উচ্চে (মহলের উপরে) চড়িয়া
পথ দেখিতেছি, কাঁদিয়া কাঁদিয়া আমার আঁখি লাল হইয়া
গিয়াছে।
(হে প্রিয়,) তােমাকে না দেখিলে যে শান্তি মেলে না ;
আমার বক্ষ যে বিদীর্ণ হইতেছে।
হে পূর্বজন্মের সাথী, মীরার প্রভু, (আর কেন
বিলম্ব কর?) কবে আসিয়া আমার সঙ্গে মিলিবে ?
৫
মীরাবাঈ
পতিয়া মৈ কৈসে লিখু,
লিখি হী ন জায়।
কলম ধরত মেয়াে কর কংপত,
হিরদো রহহ ঘরায়।
বাত কন্তু মােহি বাত ন আৱৈ,
নৈন রহে ঝরায়।
কিস বিধ চরণকমলমে গহিহো,
সবহি অংগ ধরায়।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর,
সবহী দুখ বিসরায়।
৪৬
২৩
।
পত্র লিখি কেমন করিয়া, লেখাই যে যায় না। লেখনী
ধরিতে কর কপিয়া ওঠে, হৃদয় চঞ্চল হয়। কথা বলিতে
যাই, কথা
কথা আসে না, নয়ন যে ভরিয়া আসে।
কেমন করিয়া সে চরণ-কমলে গিয়া পড়িব ? আমার সকল
অঙ্গ যে কঁপিতেছে। হে মীরার প্রতু, গিরিধর, হে
প্রিয়তম, তুমি সকল দুঃখই দূর কর।
৪৭
মীরাবাঈ
২৪
পপইয়া প্যারে,
কব কো বৈর চিতারো।
মৈ সূতী ছী অপনে ভৱনমে,
পিয় পিয় করত পুকার্যো।
দাখ্যা উপর লুণ লগায়াে,
হিবড়ে করবত সারো।
উঠি বৈঠী বৃচ্ছকী ডালী,
বােল বােল কণ্ঠ সারো।
মীরাকে প্রভু গিরিধর নাগর,
হরি চরণ। চিত পারো।
২৪
হে প্রিয় পাপিয়া, কত দিনের শত্রুতা আজ স্মরণ করিয়া
এমন করিতেছ? আমি আপনার গৃহে শয়ন করিয়া আছি,
তুমি ‘প্রিয়’ ‘প্রিয় বলিয়া ডাকিতেছ! তােমার গান যেন
এ দগ্ধ হৃদয়ের উপর লবণ ছিটাইয়া দিতেছে, হৃদয় করাত
দিয়া কাটিতেছে; বৃক্ষের শাখায় বসিয়া কণ্ঠ ছাড়িয়া এ কি
গান তােমার! হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর,
আমি হরির চরণেই হৃদয় অৰ্পণ করিয়াছি।
৪৯
শীৱাৰা
সখী মেরী নীল ননী হে।
পিয়াকো পংথ নিহাতে,
সব রৈন ৱিহানী হে।
সখিয়ন মিলকে সিখ দই,
মন এক ন মানী হাে।
বিন দেখে কল না পরে,
জীয় ঐশী ঠানী হাে৷
অংগ অংগ ব্যাকুল ভঙ্গ,
মুখ পিয় পিয় বানী হাে।
অংতর বেদন বিরহকী,
ৱহ পিয় ন জানী হাে৷
জো চাতক ঘনকো রটে,
মছরী জিমি পানী হাে।
মীরা ব্যাকুল বিরহনী
সুখ বুখ বিসরানী হাে।
হে সখি, আমার নিদ্রা গিয়াছে। প্রিয়তমের পথ
দেখিয়া দেখিয়া রাত্ৰি প্ৰভাত হইতেছে। সখীরা মিলিয়া
বুঝাইতেছে, কিন্তু মন যে একটি কথাও মানিতেছে না।
তাহাকে না দেখিলে শান্তি মেলে না ; আমার জীবন যে
ইহাই স্থির করিয়া লইয়াছে। আমার প্রতি অঙ্গ
ব্যাকুল হইয়াছে; মুখে শুধু “প্রিয়” “প্রিয় এই বাণী ;
অন্তরে আমার বিরহের বেদনা; প্রিয়তম তাহা জানেন না।
চাতক যেমন মেঘকে চায়, মৎস্য যেমন অলকে চায়, মীরা
আজ তেমনি প্রিয়তমকে চাহিতেছে। ব্যাকুল বিরহিণী
মীরা আজ বিচারবুদ্ধি সকলই হারাইয়াছে।
শীয়াবা
হােলী পিয়া বিন মােহি ন ভাৱে,
ঘর আঁগণ ন সুহাৱে।
দীপক জোয় কহা কর হে লী,
পিয় পরদেশ রহাৱে।
সূণী সেজ জহর জ লাগে,
অসক সুসক জিয় জাৱে।
নীদ নহি নৈন আৱে।
কব কী ঠাঢ়ী মৈ মগ জোউ',
নিসদিন বিরহ সতাৱে।
কহা কহু কুছ কহত ন আৱে,
হিবড় অতি অকুলাৱে।
পিয়া কব দরস দিখাৱে।
ঐ হৈ কোই পরমসনেহী,
তুরত সদেসা লাৱে।
ৱা বিরিয়া কব হােসী মােক্,
কর নিকট বুলাৱে।
মীরা মিল হােলী গাৱে।
২৬
প্রিয় বিনা হােল আমার ভাল লাগে না; তিনি ছাড়া
এ গৃহ অঙ্গনের শােভা হয় না। হে সখি, দীপ জ্বালিয়া
কি করিব, আমার প্রিয়তম যে বিদেশে। এ শূন্য শয্যা
বিষের মত লাগে, যেন (বিষ) শুষিয়া শুষিয়া প্রাণ নাশ
করিতেছে; নয়নে যে নিদ্রা আসে না।
কতদিন আমি দাড়াইয়া পথের দিকে চাহিয়া আছি ।
নিশিদিন বিরহ ব্যথা দিতেছে। কি বলিব, কথা যে
আসে না, হৃদয় যে অতি ব্যাকুল হইয়াছে। প্রিয়তম
কবে দর্শন দিবেন? এমন কি মেহময় কেহ আছে যে
অবিলম্বে প্রিয়তমের সংবাদ আনিয়া দিবে ? সে সময় কবে
আমার হইবে, যেদিন (প্রিয়তম) হাসিয়া আমাকে কাছে
ডাকিয়া লইবেন, মীরার সহিত মিলিয়া হােলী গান
করিবেন।
২৭
ধনে কাঙ্গ কাঙ্গ কহ সমঝাউ
মহারা বালা গিরধারী।
পূরব জনমকী প্রীতি হমারী
অব নহি জাত নিৱাৰী ।
দর বদন জোৱতে সজনী
প্রীত ভইছে ভারী।
মহারে ঘের পরে গিরিধর
মংগল গাৱৈ নারী।
মােতী চৌক পূরাউ বালা
তন মন তােপর ৱারী।
মহারে সগপণ তাে সঁৱলিয়া
জুগ সনেহী বিচারী।
মীর কহে গােপিন কী বালা
হমসূ ভয়ে ব্রহ্মচারী।
চরণ সরণ হৈ দাসী তুম্হারী
পলক ন কীজে স্যারী।
৫৪
২৭ হে মাের প্রিয়, তােমাকে কি বলিয়া বুঝাই? আমার পূর্বজন্মের এ প্রীতি, ইহাকে যে নিবারণ করিতে পারি না। হে স্বজনি, সে সুন্দর অঙ্গ দেখিয়া আমার মন যে ডুবিয়াছে। হে প্রভু, এস আমার গৃহে; (তুমি আসিলে) নারীর মঙ্গলগীতে গৃহ পূর্ণ হইবে। হে প্রিয়তম, তােমার আগমনে আমি মুক্তার আলপনা দিব; এ দেহমন তােমাকেই অর্পণ করিব। তােমার প্রতি আমার এ প্রেম, এ যে যুগযুগান্তের। মীরা কহে, হে গােপী-প্রিয়, আমার বেলাতেই তুমি চির- কুমার হইলে? তােমার দাসী যে তােমার চরণই শরণ করিয়া অপেক্ষা করিতেছে, আর বিলম্ব করিও না।
মীরাবাঈ
২৮
মতবারাে বাদল আমাে রে,
হরিকো সদেসাে কুছ নহি লায়াে রে
দাদুর মাের পপিহিয়া বােলৈ,
কোয়ল সবদ সুনায়াে রে।
কারী আঁধিয়ারী বিজলী চমকে,
বিরহিন অতি ডর পায়াে রে।
গাজৈ বাজৈ পৱন মধুরিয়া,
মেহা অতি ঝড় লায়াে রে।
ফুকে কালী নাগ বিরহকী জারী,
মীর মন হরি ভায়াে রে।
২৮
মত্ত বাদল আসিয়াছে, কিন্তু হরির সংবাদ কিছুই আসিল
। দাদুর ময়ুর পাপিয়া ডাকিতেছে; কোকিল গান
করিতেছে; চারিদিক নিবিড় অন্ধকার, বিজলী চমকিতেছে।
বিরহিনী ভয়াতুরা হইয়া উঠিতেছে। শীতল পবন সশৰে
বহিতেছে, মেঘ বর্ষণ করিতেছে। কালীয় নাগ যেন বিরহের
জলা উদগার করিতেছে।
আজ মীরার মন হরি-অনুরাগিণী হইয়াছে।
মীরাবাঈ
চিতনন্দন বিলমাই,
বদরা নে ঘেরী মাঈ।
ইত ঘন গরজে উত ঘন গরজে,
চমকত বিজু সৱাঈ।
উমড় ঘুমড় চহু দিসসে আয়াে,
পৱন চলে পুরঙ্গ।
বিরহনে তেরে প্রাণ বলত হৈ
দগধ বেলী সিচাই।
প্রাণ নহত মােকে দরসন দীজে
প্রাণ রখাে চরণা।
৫৮
}
ওগাে মা, চিতনন্দন যে বড় বিলম্ব করিতেছেন। চারি
দিকে বাদল ঘিরিয়া আসিতেছে। এদিকে মেঘ গর্জন
করিতেছে, ওদিকে মেঘ গর্জন করিতেছে। বিদ্যুৎ চমকিয়া
উঠিতেছে; চারিদিকে মেঘ ভরিয়া আসিতেছে। আঞ্জ
পূর্ববায়ু বহিতেছে।
হে নাথ, তােমার বিরহে প্রাণ যে জলিয়া গেল। এ
দয় লতাকে কণাবারি সিঞ্চনে বাঁচাও; প্রাণ থাকিতে
আমাকে দর্শন দাও। (প্রভু) তােমার চরণে এ প্রাণ
রাখ।
৫৯
শীরাবাঈ
সুনী মৈ' হৰি আৱনকী আৱাজ।
মহল চঢ়ি জোউ মােরী সজনী,
কৰ আৱে মহারাজ।
দাদুর মাের পপীহা বােলৈ,
কোইল মধুর সাজ।
উমগ্যো ইন্দ্র চহু দিস বরসে,
দামিন ছােডা লাজ।
ধরতী রূপ নব নবা ধরিয়া,
ইন্দ্র মিলনকে কাজ।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর,
বেগ মিলে মহারাজ।
৬০
আমি হরির আগমন ধ্বনি শুনিতেছি। হে সজনি,
আমি প্রাসাদ-শিখরে উঠিয়া দেখিতেছি কখন মহারাজ
আসিবেন। দাদুর ময়ুর ডাকিতেছে, পাপিয়া গান
করিতেছে, কোকিল মধুর উৎসব করিতেছে। উন্মুখ মেঘ
চারিদিকে বর্ষণ করিতেছে। আজ দামিনী লজ্জা ত্যাগ
করিয়াছে (কুলবধূরা যেমন লজ্জা ত্যাগ করিয়া বাতায়ন
পথে বার বার উকি মারিয়া দেখে তেমনি)। ধরিত্রী
আজ প্রভুর মিলনের জন্য নব নব রূপ ধারণ করিয়াছে।
হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর, হে মহারাজ, শীঘ্র আসিয়া
তােমার মাসীর সহিত মিলিত হও।
৩১
বয়সে বদরিয়া সাৱনকী,
সাৱনকী মন ভাৱনকী।
সাৱনমে উমগ্যো মেরী মনৱা
ভনক সুনী হরি আৱনকী ।
উমড় ঘুমড় চহু দিসসে আয়াে,
দামিন দমকে ঝর লাৱনকী।
নহী নহী বুদন মেহা বরসে,
সীতল পৱন সােহাৱনকী।
মীরাকে প্রভু গিরখর নাগর,
আনং মংগল গাৱনকী।
৩১
শ্রাবণের বাদল বর্ষণ করিতেছে। ভাবণের এ মেঘগর্জনে
আমার মন ভরিয়া উঠিতেছে। আজ শ্রাবণে মন আমার
উন্মুখ হইয়া প্রিয়তমের আগমনের ধ্বনি শুনিতেছে। চারি-
দিকে মেঘ ভরিয়া আসিয়াছে, দামিনী চমকিতেছে, ঝড়
আসিবে। অল্প অল্প বারি বর্ষণ হইতেছে, শীতল বায়ু অলে
গেহ স্পর্শ বুলাইয়া দিতেছে। মীরার প্রভু প্রিয়তম গিরিধর,
তাই মীরা আজ আনন্দ মঙ্গল গান করিতেছে।
৬৩
মীরাবাঈ
৩২
তুম আজো জী রামা,
আৱত আসামা।
তুম মিলিয়া মৈ বহু সুখ পাউ
সরৈ মনােরথ কামা।
তুম বিচ হম বিচ অংতর নাহী,
জৈসে সুরজ ঘামা।
মীরাকে মন অওর ন মানে,
চাহে সুংদর স্যামা।
হে প্রিয়তম, তুমি এস, ভােমাকে অগ্রসর হইয়া
অভ্যর্থনা করিয়া লইব। তােমার মিলনে যে আমি পরম
আনন্দ পাই; তুমি আসিলে সকল মনােরথ আমার পূর্ণ
হইবে। তােমার আমার মধ্যে কোন অন্তর তাে মাই;
আমরা যেন সুর্য তাহার জ্যোতি। মীরার মন আর
কিছুতেই মানে না, চাহে শুধু সুন্দর প্রিয়তমকে (শ্যামকে)।
মীরাবাঈ
৩৩
মেহা বসিৱে করে রে,
আজ তাে রমিয়াে মেয়ে ঘরে রে।
নাহী নানুহ বুদ মেঘ ঘন বরলে,
মুখসরৱর ভরে রে।
বহুত দিনা পৈ পীতম পায়ে,
বিছুরণকো মােহি ডর রে।
মীরা কহে অতি নেহ জুড়ায়ে,
মৈ লিয়াে পুরবলী বর রে।
মেঘ বর্ষণ করিতেছে; আজ প্রিয়তম আমার গৃহে।
ঘন মেঘ হইতে অল্প অল্প জল পড়িতেছে, সুখসায় পূর্ণ
হইয়াছে। বহুদিন পরে আজ প্রিয়তমকে পাইয়াছি।
তাই তাহাকে হারাই হারাই ভয় হইতেছে।
মীরা কহে, প্রভু, আমার পরম প্রেমতৃষ্ণা মিটাইয়াছ।
আমার পূর্বজন্মের স্বামীকে আমি (আজ) পাইয়াছি।
৩৪
চিতনন্দন আগে মাটুংগী ।
নাচ নাচ পিয়তম হি রিঝাড়,
প্রেমী জনকো জাচুংগী ।
প্রেম প্রীতকা বাঁধ ঘুংঘর,
সুরতকী কইনী কাছুংগী।
লােক লাজ কুলকী মরজাদা,
য়া মৈ এক ন রাখুংগী ।
পিয়াকে পলংগা জা পৌঢ়গী,
মীরা হরিরংগ নাচুংগী ।
৩৪
আমি চিননের সম্মুখে নাচিব। নাদিয়া নাচিয়া
“আমি প্রিয়তমকে আনন্দ দিব, আর তাহার প্রেম ভি
করিয়া লইব। প্রেম প্রীতির নূপুর বাঁধিয়া আমি
অনুরাগের বসন পরিব।
লােকলজ, কুলের মর্যাদা, আমি আর রাখিব না;
এবার আমি প্রিয়তমের শয্যায় আশ্রয় লইব। মীরা এ
হরির রঙ্গ কী করিবে।
মীরাবার
৩৫
রাম রতন ধন পায়াে মৈয়া,
মৈ তাে রাম রতন ধন পায়াে ।
খরচে ন খুটে ৱাৰ্টু চোর ন লুটে,
দিন দিন হােত সময়।
নীর ন ডুবে ৱার্ট অগ্নি ন জালে,
ধরণী ধৰ্যো ন সমায়াে॥
নামকী নাৱ ভজনকী বতিয়া,
ভৱসাগরমে তাৰ্যো।
মীরাবাঈ প্রভু গিরধর শরণে,
চরণ কমল চিত লায়াে॥
৭.
৩৫
মাগাে, আমি রাম রতন ধন পাইয়াছি। আমি তো
রাম রতন ধন পাইয়াছি। এ ধন আমার খরচ হয় না,
চোরে চুরি করে না; দিন দিন ইহা বাড়িয়াই চলে।
আমার এ ধন জলে ভােবে না আগুনে পােড়ে না; ইহা
এতই বড় যে ধরণী ধরিয়াও ধরিয়া উঠিতে পারে না।
ভজনের প্রদীপ, নামের তরী আমাকে ভবসাগর পার
করিল। হে প্রভু গিরিধর, মীরা তােমার শরণ লইয়াছে;
তােমার চরণকমলে তাহার চিত্ত আনিয়াছে।
৭১
मौनाबाद
৩৬
হরিগুণ গাৱত নাচুংগী।
অপনে মংদিরমে বৈঠ বৈঠকর
গীতা ভাগবত বাচুংগী ।
গ্যান ধ্যানকী গঠরী বাঁধ কর
হরিজন বংগ মৈ লাগী ।
মীরাকে প্রভু গিরখর নাগর
সদা প্রেমরস চাখুংগী ।
৭২
৩৩
(আমি এবার) হরিগুণ গাহিয়া গাহিয়া নাচিব; আর
আমার মন্দিরে বসিয়া গীত ভাগবত পাঠ করিব। জ্ঞান
ও ধ্যান হইবে আমার সম্পদ, আর হরিজন হইবে আমার
স। হে মীরার প্রত্ন গিরিধর নাগর, আমি নিত্য তােমার
প্রেমরস আস্বাদন করিব।
৭৩
মীরাবাঈ
জু অমলীকে অমল অধারা,
য়ু মৈয়া প্রাণ হমারা।
কোঈ নিন্দৈবলৈ দুখ পাৱৈ,
মােক তাে রমৈয়া ভাবৈ ।
৭৪
৩৭
মদ্যপের কাছে মদ যেমন প্রিয়, প্রিয়তম তেমনি
আমার কাছে প্রিয়; তিনি আমার প্রাণ। কেহ নিন্দা
করে, কেহ বা বন্দনা করে, কেহ বা ( আমি তাহাকে
ভালবাসি বলিয়া) দুঃখ পায়; কিন্তু আমার প্রিয়তম
আমাকে মুগ্ধ করিয়াছেন।
৭৫
৩,
মহানাে জনম মরণকে সাথী
থানে নহি বিল দিনরাত।
তুম দেখ্যা বিন কল ন পড়ত হৈ,
জানত মেরী হাতী।
উচী চ চ পংথ নিহার,
রােয় নােয় আঁখিয়া রাত।
মাে সংসার সকল জগ বুঠো,
বুঠা কুলরা নাতী।
দোউ কর জোড়া অরজ করত
সুণ লীজ্যো মেরী বাতী।
পল পল তো রূপ নিহার
নিরখ নিরখ সুখ পাতী।
মীরাকে প্রভু গিরখর নাগর
হরিচরণচিত রাতী।
৭
,
बांग জন্ম মরণের সাথী, তােমাকে আমি দিনরাত্রি
কখনও ভুলিব না। আমার হৃদয় জানে যে তােমাকে না
দেখিলে সময় কাটে না। উচ্চে (প্রাসাদশিখরে) উঠিয়া
তােমার পথ চাহিয়া দেখি; কাঁদিয়া কাঁদিয়া আমার আঁখি
লাল হইয়া উঠিয়াছে।
এ জগৎ সংসার সকলই মিথ্যা; কুল মিথ্যা, আত্মীয়
স্বজন সকলই মিথ্যা। দুই কর জুড়িয়া মিনতি করিতেছি,
আমার কথা শােন। অনুক্ষণ তােমার রূপ দেখিয়া যে
আমি আনন্দ পাই। হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর,
তােমার চরণে আমার চিত্ত অনুরক্ত হইয়াছে।
৭৭
মীরাবাঈ
৩৯
মেরে তো গিরধর গােপাল দুসরা ন কোঈ।
জাকে শির মাের মুকুট মেরাে পতি সােঙ্গ।
তাত মাত ভ্রাত বংধু অপনাে নহি কোঈ।
ছােড় দই কুলকী কান, ক্যা করেগা কোঈ।
সংতন টিগ বৈঠি বৈঠি লােক লাজ খােঙ্গ।
আঁৱন জল সীচ সীচ প্রেম বেল বােঙ্গ।
অব তত বেল ফৈল গঈ আনং ফল হােঙ্গ।
ভগত দেখ রাজী হুই জগত দেখ নােঙ্গ।
দাসী মীরা লাল গিরধর কারাে অব মােঙ্গ।
৭
আমার তাে আছেন শুধু গিরিধারী গােপাল, আর কেহ
নাই। যাহার মাথায় ময়ূরের মুকুট তিনিই আমার পতি।
পিতা মাতা ভাই বন্ধু আমার আপনার কেহই নয়। আমি
কুল মর্যাদা ত্যাগ করিয়াছি, আর কে আমার কি করিবে ?
সাধুদের সঙ্গে থাকিয়া থাকিয়া লােক লজ্জা আমি দুর
করিয়াছি। অশ্রুজল সিঞ্চন করিয়া করিয়া প্রেমলতা নােপণ
করিয়াছি। আজ তাে লতায় ফুল ধরিয়াছে, আনন্দ ফল
হইয়াছে। আমাকে দেখিয়া ভক্ত মুগ্ধ হইয়াছে, কিন্তু জগৎ
কঁদিতেছে। হে প্রিয়তম গিরিধর, মীরা তােমার দাসী ;
এবার আমাকে এাণ কর।
৭১
মীরাবাঈ
মৈ ত মহারা রমৈয়ানে
দেখবাে কর রী।
তেরাে হী উমরণ তেয়াে হী সুমরণ
তেরাে হী ধ্যান ধর রী।
জহ জহ পাঁৱ ধরােধরণী পর,
তহা তহ নিরত কর রী।
মীরাকে প্রভু গিরর নাগর,
চরণ। লিপট পর রী।
৮
৪০
হে সখি, আমি তাে আমার প্রিয়তমকে দেখিবই। (হে
প্রিয়তম,) তােমার অরণ, তােমার ধ্যানেই আমি নিযুক্ত
থাকিব। ধরণীর উপর যেখানে তােমার পদচিহ্ন পড়িবে
সেইখানেই নিত্য তীর্থ করিব। হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম
গিরিধর, আমি তােমার চরণেই লগ্ন হইয়া থাকিব।
১
মীরাবাঈ
৪১
মহানে চাকর রাখাে জী,
বরিয়া মহানে চাকর রাখাে জী।
চাকর রহস্ বাগ লগা, নিত উঠি দরসন পা।
বৃংদাবনী কুংজ গলিনমে, তেরী লীলা গা।
চাকরীমে দরসণ পাউ, সুমিরণ পাউ খরচী।
ভাৱ ভগতি জাগীরী পাউ তিননা বার্তা সরসী।
হরে হরে সব বাগ লগাউ বিচ বিচ রাখ বারী।
সঁৱরিয়াকে দরসণ পাড় পহির কুসুম্মী সারী।
জোগী আয়া জোগ করণ কু, তপ করণে সন্ন্যাসী।
হরী ভজন কু সাধু আয়া, বৃংদাবনকে বাসী।
মীরাকে প্রভু গহির গভীরা, হৃদ বহাে জী ধীরা।
আধী রাতে প্রভু দরসণ দৈহেঁ প্রেম নদীকে তীরা।
২
০১
•
প্রভু, আমায় চাকর রাখ; হে প্রিয়তম, আমাকে
তােমার চাকর করিয়াই রাখ। চাকর হইয়া তােমার বাগান
রচনা করিব; নিত্য (প্রভাতে) উঠিয়া তােমার দর্শন লাভ
কৰিব, আর বৃন্দাবনের প্রতি কুঞ্জে পথে পথে তােমার লীলা
গান করিব। আমার এ চাকরীতে আমি তােমার দর্শন
পাইব, তােমার স্মরণ আমার বেতন হইবে, আর পাই
ভাব ভক্তি সম্পদ ; এ তিনই আমার পরম লাভ।
তােমার জন্য আমি শ্যামল বন রচনা করিব, তাহাতে
মধ্যে মধ্যে কু রাখিব; সেইখানে কুসুমিত সাড়ী পরিয়া
আমার প্রিয়তমের দর্শন লাভ করিব। তােমার বৃন্দাবনে
যােগ আসিয়াছে যােগ করিতে, সন্ন্যাসী আসিয়াছে তপস্যা
করিবার জ; আর হরি ভজন করিবার জন্য সাধু
আসিয়াছে। মীরার প্রভু যে গভীর ও গভীর, ওরে অধীর
হৃদয় ধৈর্য ধর। অর্ধ রাত্রে প্রভু তাহার প্রেমনদীর তীরে
তােমাকে দর্শন দিবেন।
৮৩
मौरावा
১২
জো তুম তােড়াে পিয়া মৈ নহি তােড়।
তােরী প্রীত তােড়ী প্রভু কিণ সংগ জোড়ু।
তুম ভয়ে তরুবর মৈ ভঙ্গ পখিয়া।
তুম ভয়ে সরবর, মৈ তেরী মডিয়া।
তুম ভয়ে গিরিব মৈ ভঙ্গ চারা।
তুম ভয়ে চংদা, হম ভয়ে চকোরা।
তুম ভয়ে মােতী প্রভু হম ভয়ে ধাগা।
তুম ভয়ে সােনা, হম ভয়ে সুহাগা।
বাঈ মীরাকে প্রভু, ব্ৰজকে বাসী।
তুম মেরে ঠাকোর, মৈ তেরী দাসী।
t
৪২
হে প্রিয়, তুমি (এ বন্ধন) ছিড়িতে পার, আমি
ছিড়িব না। তােমার প্রীতির ভাের ছিড়িয়া আর
কাহার সঙ্গে বাঁধিব ? তুমি তরুবর, আমি তাহাতে পাখী;
তুমি যে সরােবর, আমি (তাহাতে) মৎস্য ; তুমি
চাদ, আমি তােমার চকোর। তুমি, হে প্রভু, মুক্তা,
আমি দূতা। তুমি আমার সােনা, আমি তােমার
সােহাগা। হে ব্ৰজের বাসী, মীরার প্রভু, তুমি আমার
ঠাকুর, আমি তােমার দাসী।
মীনাবালী
০৩
অব তাে নিভায়। বনেগা,
বাঁহ গহেকী লাজ।
সমরথ সরণ তুম্হারী সঁইয়।
সরব ধারণ কাজ।
ভরসাগর সংসার অপরবল
জামে তুম হাে জাহাজ।
নিরধারা আধার জগতগুরু
তুম বিন হােয় অকাজ।
জুগ জুগ ভীর হরী ভক্তনকী
দীন্হী মােচ্ছ সমাজ।
মীরা সরণ গহী চরণনকী
পেজ রখাে মহারাজ।
৬
৪৩ এখন তাে তােমাকে শেষ রক্ষা করিতেই হইবে, কারণ একবার যে তুমি আমার হাত ধরিয়াছ। হে শরণ, হে শক্তিমান, সকলকে উদ্ধার করাই ভােমার কাজ। এই সংসার, এই ভবসাগর, ইহার পার নাই; তাহাতে তুমিই একমাত্র তরী। হে জগতের গুরু, আধার- হীনের তুমিই আধার। তুমি বিনা সকল কাজই অকাজ হইয়া দাঁড়ায়। যুগে যুগে তুমিই ভক্তের সহায় হইয়াছ, সমাজকে মুক্তি দিয়াছ। হে মহারাজ, মীরা তােমার শরণ লইয়াছে, তােমার চমণে তাহাকে ন দাও। ৮৭
মীরাবাঈ
৪৪
মৈ গিরধরকে ঘর জাউ।
গিরধর হারে সঁচো প্রীতম দেখত রূপ লুভাউ।
রৈণ পড়ে তব হী উঠি জাউ ভাের ভয়ে উঠি আউ।
জো পহিরাৱৈ সােঙ্গ পহির জো দে সােঙ্গ খাউ।
জহাঁ বৈঠাৱে তিতহী বৈঠ, বেচে তাে বিক জাউ।
মেরী উণকী প্রীত পুরাণী, উন বিন পল ন হাউ।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর বারবার বলি জাউ।
t
৪৪
আমি গিরিধরের ঘরে যাইব, তিনিই তাে আমার সত্য
প্রিয়তম ; তাঁহার রূপে আমার মন মুগ্ধ। সন্ধ্যা নামিবে
আর আমি তাহার ঘরে যাইব, আর ভাের হইলেই উঠিয়া
আসিব। তিনি আমায় যে বেশ পরিতে দিবেন তাহাই
পরিব, যে অল্প দিবেন তাহাই খাইব। যেখানে বসিতে
বলিবেন সেখানেই বসিব। যদি তিনি আমায় বিকাইয়া
দেন খুশী হইয়া বিকাইয়া দিব।
তাহার সহিত আমার প্রেম যে অনেক দিনের পুরাতন।
তাহাকে ছাড়িয়া মুহূর্তও থাকিতে পারি না। মীরার প্রভু,
হে গিরিধর নাগর, বার বার তােমার কাছে নিজেকে বলি
দিব।
मौवावा
পিয়া মহারে নৈণ। আগে রহজ্যো জী।
নৈর্ণ। আগে হজ্যো
মহানন ভূল মত জাজো জী।
ভৌসাগরমে বহী জাত হু
বেগ মহারী সুখ লীজ্যো জী।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর,
মিল বিছুড়ন মত কীজ্যোজী।
৪৫
হে প্রিয়তম, আমার আঁখির আগে দাড়াও। আমার
আঁখির আগে দাঁড়াও, আমাকে ভুলিয়া যাইও না। এ
ভবসাগরে বহিয়া যাইতেছি, শী আসিয়া আমার সংবাদ
লও। হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর, একবার মিলিয়া
আবার যেন ছাড়িয়া যাইও না।
শাবাদ
৪৬
হে জী মহারাজ ছােড় মত জ্যাজো।
মৈ অবলা বল নাহি গুসাঈ
তুমহি মেরে সিরতাজ।
মৈ গুণহীন গুণ নাহি গুলাঙ্গ
তুম সমরথ মহারাজ।
রাৱলী হােই কে কিনরে জাউ',
তুম
হে হিৱড়ানাে সাজ
মীরাকে প্রভু অওর ন কোঈ
রাখাে অব কে লাজ।
৪৬
হে মহারাজ, আমায় ছাড়িয়া যাইও না। আমি অবলা,
প্রভু (গােস্বামী, আমার কোন বল নাই; তুমিই আমার
মাথার মুকুট। আমি গুণহীন, হে প্রভু, আমার কোন
গুণ নাই, তুমি সকল গুণের আকর। আমি তােমার;
তােমার হইয়া আর কাহার কাছে যাইব? তুমিই আমার
হৃদয়ের ভূষণ। মীরার প্রভু তাে আর কেহই নয়, (তবে)
তুমিই এবার আমার লজ্জা রাখ।
১৩
মালাবাদ
3৭
রমৈয়া মৈ তাে থরে রংগ রাতী।
আওরনকে পিয়া পরলেস বসত হৈ
লিখ লিখ ভেজৈ পাতী।
মেরে পিয়া মেরে রিজে বসত হৈঁ,
গুংজ কর দিন রাতী।
চুৱা ঢোলা পহির সখী রী,
মৈ ঝুরমুট রমৱা জাতী।
কুরমুটমে মােহি মােহন মিলিয়া,
খে মিলি গল বাহী।
অওর সখী মদ পী পী মাতী,
মৈ বিন পায়। হী মাতী।
প্রেমভটীকো মৈ মদ পীয়ে
ছকী ফির দিন রাতী।
সুরত নিরতকে দিৱলা জায়গা
মনসা পূরণ বাতী।
অগমঘাণিকো তেল সিচায়গা।
বার রহী দিন রাতী।
দাসী মীরাকে প্রভু গিরধর,
হরিচরণ। চিত লাতী।
৯৪
১৭
হে প্রিয়তম, আমি তাে তােমার রক্তে রঞ্জিত হইয়াছি।
অন্যের প্রিয় বিদেশে থাকে, তাহাকে পত্র লিখিতে হয় ;
আমার প্রিয়ের আসন হৃদয়েই, দিন রাত্রি আমি তাহারই
সঙ্গে আলাপ করিতেছি। প্রেমে রাঙ্গা চেলী পরিয়া,
হে সখি, আমি ঝুরমুট খেলিতে যাই; ঝুমুটে আমি
প্রিয়তমের সাক্ষাৎকার পাই, তাহার গলায় হাত দিয়া খেলা
খেলি। সখি, অন্যে মদ খাইয়া মাতাল হয়, আমি বিনা
মদেই মাতাল। আমি প্রেমের আঁটির মদ পান করিয়া
মাতাল হইয়া দিন রাত্রি ঘুরিয়া বেড়াই। আমি যে নিত্য
অরণের দীপ আলিয়া মনকে বাতি করিয়া অগম ঘানির
(প্রেম) তৈল সিঞ্চন করিয়াছি; সে দীপ দিনরাত্রি
জলিতেছে।
দাসী মীরার প্রস্তু, হে গিরিধর, আমি হরিচরণে
চিত্ত সমৰ্পণ করিয়াছি।
শয়াল
৪৮
ফাগুণকে দিন চার রে,
হােলি খেল মনা রে।
বিন করতাল পখাৱজ বাজে,
অনহদকী ঝনকার রে।
বিন সুর রাগ ছত্তি গাৱে,
রােম রােম রংগ সার রে।
শীল সংতােষকী কেসর থােলী,
প্রেম প্রীত পিচকার রে।
উড়ত গুলাল লাল ভয়ে বাদল,
বরসত রংগ অপার রে॥
ঘটকে সব পট খােল দিয়ে হৈ
লােক লাজ সব ভার রে।
হােলী খেল প্যারী পিয়া ঘর আয়ে,
সােঙ্গ প্যারী পিয় প্যার রে।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর,
চরণকমল বলিহার রে।
১৬
০৮
ফাগুন যে শেষ হইতে চলিল, দিন চারেক আর আছে।
হে আমার মন, বসন্ত উৎসব কর। করতাল, পাখােয়াজ
নাই, তবুও অনাহতের ঝঙ্কার উঠিয়াছে, সুর নাই, তবুও
ছত্রিশ রাগের ঝঙ্কার চলিয়াছে ; আমার প্রতি নােম পুলকে
ভরিয়া উঠিতেছে।
শীল সন্তোষের কেশর গুলিয়া, প্রেমপ্রীতির পিচকারী
করিয়াছি। গুলাল (রং) উড়িতেছে যেন বাদল নামিয়াছে;
অপার আনন্দ ঝরিয়া পড়িতেছে। আজ আমি হৃদয়ের
সকল আবরণ উন্মােচন করিয়া দিয়াছি, লােক লজ্জা সকলই
ত্যাগ করিয়াছি।
হােলী খেল, প্রিয়তম গৃহে আসিয়াছেন; সেই
প্রিয়তমকে, হে প্রিয়, আদর করিয়া লও।
হে মীরার প্রভু, প্রিয়তম গিরিধর, বলিহারি তােমার
১৭
মীরাবাঈ
৪১
সখী রী মৈ তাে গিরধরকে রংগ রাতী।
“চরংগ মেরা ভােলা রংগা দে,
মৈ ঝুরমুট খেলন জাতী।
বুরমুটমে মেরা সাঈ মিলেগা,
খােল মিলি তন গাতী।
চংদা জায়গা সুরজ জায়গা,
জায়গী ধরণ অকামী।
পৱন পাণী দোনে। হী জায়গা
অটল রহে অবিনাশী।
সুরত নিরতকা দিৱলা সজোলে,
মনসাকী করলে বাতী।
প্রেম হটীকা তেল মগালে,
জলা করে দিন রাতী।
পীহর ব ন ব সাস ঘর,
সতগুরু সবদ সগাতী।
ঘর মেরা না ঘর তেরা, মীরা হরি রংগ রাতী।
১৮
৪১
হে সখি, আমি তাে প্রিয়তমের রঙে নিজেকে
বঙাইয়াছি। পাঁচ রঙে আমার চেলি রঙাইয়া দাও, এবার
আমি ঝুমুট খেলিতে যাই। ঝুরমুট খেলায় আমার
স্বামীকে পাইব, তখন এ দেহের আবরণ ছাড়িয়া আমি
তাঁহার সঙ্গে মিলিব। তখন চন্দ্র যাইবে, সুষ যাইবে,
ধরণী, আকাশ সকলই যাইবে; পবন, অল দুইই যাইবে,
থাকিবেন শুধু অবিনশ্বর স্বামী। নিত্য স্মরণকে দীপ
করিয়া লও, মন হইবে বাতি, প্রেমের হাট হইতে তেল
আনিয়া আলাও, সে প্রদীপ দিনরাত জলিবে।
আমি আমার বাপের বাড়িতেও থাকি না, শশুরের
ঘরেও থাকি না, আমার সদ্গুরুর যে উপদেশ তাহাই
আমার বন্ধু।
সখি, আমারও ঘর নাই, তােমারও ঘর নাই। মীরা
হরির রসেই রদিয়া আছে।
১৯
মীয়া
সাজন সুখ জ্যে জানে তো লীজে হে।
তুম বিন মেরে অওরন কোঈ
কৃপা রাবী কীজে হাে।
দিবস ন ভুখ রৈন নহি নিদ্রা
ঠে। তন পল পল ছিজো হাে।
মীরাকে প্রভু গিরধর নাগর
মিল বিছুড়ন নহি কীজে হাে।
১০০
হে প্রিয়, যদি আমাকে শুদ্ধ জানিয়া থাক তবে আমাকে
তুলিয়া লও। তুমি ছাড়া যে আমার আর কেহ নাই;
কৃপা করিয়া আমাকে আপনার করিয়া লও। দিবসে মুখে
অন্ন নােচ না, রাত্রে নয়নে নিদ্ৰা নাই। পলে পলে প্রাণ
যাইতেছে। হে মীরার প্রভু, গিরিধর নাগর, একবার
মিলিয়া আর আমায় ছাড়িয়া যাইও না।
১০১
No text on this page.
পরিশিষ্ট বর্তমান গ্রন্থরচনায় যে সকল গ্রন্থ হইতে সাহায্য পাওয়া গিয়াছে তাহারে তালিকা- মীরাবাঈকীশলী (হিন্দী)রেলতেভিয়র প্রেস, এলাহাবাদ। মীরাবাঈকে ভজন বৈদ্যনাথসাদ, কাশ। মীরাবাঈকে পন্য সংগ্রহ সাহিত্য ভবন, এয়াগ। মীরাবাঈকে ভজন # ভার্গব পুস্তকালয়, কাশী। শ্রমীরালীলা সরসমাধুরীশরণ, জয়পুর। মীরাবাঈকে ভজন পণ্ডিত ঈশ্বরীপ্রসাদ রামচন্দ্র, ৪) } মেরঠ। স মহিলা মৃদুবাণী মুন্সী দেবীপ্রসাদ, যােধপুর। মীরাবাঈকা জীবনচরিত্র কার্তিকপ্রসাদ খত্ৰী, কাশী। ভক্তমাল নাভাজী (প্রিয়দাসজীর টীকা সহিত) কবিতাকৌমুদী (১ম ভাগ) » রামনরেশ ত্রিপাঠী। মীর জীবন চরিত্র (গুজরাতী) কবি নর্মদাশঙ্কর। গুর্জর সাক্ষর জয়ন্তী ১৯ সস্ত সাহিত্যবর্ধক কার্যালয়, আহমেদাবাদ। বৃহৎ কাব্যদোহন ইচ্ছারাম দেশাই, বােম্বাই। মীরাবাঈ ভানুমুখরাম নিণরাম মেহতা, বয়ােস। মীরাবাঈ (বাংলা) স্বামী ভূমানন্দ, কলিকাতা। মীরাবাঈজভাণ্ডার (মারাঠী) গােবিন্দরাও মােনােবা কালেক, বােয্যই।
ক Milestonos in Gujrati Literature K. M. Jhavert. Mirabal --Law Journal Press, Allahabad. Mirabai-8. 8. Mehta, Bombay. Mirabai-A. N. Babu-Geo. Allen & Unwin, London. Mirabai-Nalini Mohan Sanyal- Ram Narayan Lal, Allahabad. কাণ নাগরীচারিণী পত্রিকা, সরস্বতী, মাধুরী, সুধা, কল্যাণ, সাহিত্য (গুজরাতা), Indian Antiguary প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত নানা প্রবন্ধ। মুদ্রিত গ্রন্থগুলি ছাড়াও লেখকের নিকট মীরাবাঈ সম্বন্ধীয় অনেকগুলি পুথি আছে; সেগুলি হইতেও যথেষ্ট সাহায্য পাওয়া গিয়াছে। ১৪ ৮৬ ০০ ৬৮ ৫৮ ৭৪ ৮৪ ৬৪ ১০ চী প্রথম পংক্তির আদ্যক্ষর অনুসারে) পদ পৃষ্ঠা সংখ্যা অব তাে নিভায়। বনে গা কৈসে জিউ রী মাঈ ২৮ চিতনন্দন আগে নাচুংগী চিতনন্দন বিলমাঈ জু অমলীকে অমল অধারা জো তুম তােড় পিয়া মৈ নহি তােণ্ডু তুম আজো জী রামা তুম সুলাে দয়াল মুহরী আরজী ২২ তুমহারে কারণ সব সুখ ছােড় থনে কাঙ্গ কাঙ্গ কহ সমঝাউ ৫৪ দরস বিনু দুখন লাগে নৈন ২৬ দেখাে সখিয়া হরি মন কাঠো কিয়ে নীদলড়ী নহি আৱে সারী রাত ১২ পতিয়া মৈ কৈসে লিখু পপইয়া প্যারে পিয়া অব ঘর আজো মেরে পিয়া ইতনী বিতনী সুণ মােরী ৩৪ পিয়া বিন রহাে ন জায় পিয়া মহারে নৈণা আগে রহজ্যো জী পিয়া মােহি আরত তেরী হ প্যারে দরসন দীজ্যো আয় প্রভুজী থে কহা গয়াে নেহড়ী লগায় ৪২ ফাগুণকে দিন চার রে ৪৬ ৪৮ ৫০০ ৩ ৫০০ . ০৫০ ৬ ১৬ পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ । ২৪ ২ ০৮০ ৭ ৪৪ - . ৪০ পদ বসে মিয়া সাৱনকী মনে বাল গায়ে রে মহানে চাকর রাখােজ মহারে ঘর আলো প্রীতম প্যারা মহারাে জনম মরণকো সাথী মাঈ মরী হরী ন বুঝী বাত মীরাকে প্রভু সঁচী দাসী বনাও মেরে তাে গিৱধর গােপাল মেরে প্রীতম প্যারে রামনে মহা বরসিৱো করে রে মৈ গিরধরকে ঘর জাউ মৈ জাণ্যো নহী মৈ বিরহিন বৈঠি জাগ মৈ তাে মহারা রমৈয়ানে বমৈয়া বিন নীদ ন আৱে রমৈয়া মৈ তাে থরে রংগ রাতী রাম রতন ধন পায়াে মৈয়া সখী মেরী নীদ নানী হাে সখী রী মৈ তাে গিরধরকে রংগ রাতী সাজন ঘর আবাে মীঠাবােলা সাজন সুধ জ্যে। জানে সনী মৈ' হৰি আৱনকী আৱাজ হবিগুণ গাৱত’ নাংচুগী হেরী মৈ তাে প্রেম দিৱানী হে রী মূহ হরি বিন মহাে ন জায় হে জী মহারাজ ছােড় মত জ্যাঙ্গো হােলী পিয়া বিন মােহি নজরে ১৮ ১৪ ১৪ ৭২ ৪
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.