Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prem O Pratima Ed. 1st

Sen,rameshchandra · 2009/12/11

PDF Proofread

Front matter

/ । T ।, প্রেম ও প্রতিমা’র কবিতাগুলি আমি পড়েছি ও পড়ে বিশেষ আনন্দলাভ করেছি। একঘেয়ে মামুলি ধরণের কবিতা পড়ে যারা বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়েছেন, প্রেম ও প্রতিমা তাঁদের কাছে এক বিস্ময়কর নূতন জগতের অবতারণা করবে। প্রত্যেক কবিতাটি ভাবে, ভাষায়, পদ-লালিত্যে, শব্দ-বৈচিত্র্যে, ছন্দোমাধর্য্যে ও রসগরিমায় অনবদ্য ও সুসংবদ্ধ। কবির প্রকাশভঙ্গীও বেশ হৃদয়- গ্রাহী। ফলে, রচনাগুলির রসমাধুরী ঘনীভূত হয়ে যে অনেক উচ্চগ্রামে গিয়ে ঠেকেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আগে কবিতার যে ঠাট ছিলাে, এখন তা অনেক বদলে গেছে। মহাভারতের কথা অমৃত-সমান। কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান্। এ গােছের কবিতায় এখন আর রসপিপাসা মিটে না। রসের আস্বাদন-বৈচিত্রী যেখানে প্রাণের গভীর অভূতির সঙ্গে যােগ রক্ষা করে গড়ে ওঠে, সেখানে তার প্রতি স্পন্দন মনের কোনও না কোনও স্ত্রীতে ঝঙ্কার দিয়ে বেদনা জাগিয়ে তােলে। যতক্ষণ সেই বেদনা প্রাণের নিকষে শােণালি আভায় ফুটে না ওঠে, ততক্ষণ আমরা তাকে রসস্থষ্টির প্রচেষ্টা বলে অভিনন্দন করতে পারিনে। স্নেহাস্পদ শ্রীমান্ রমেশচন্দ্রের কবিতাধারায় অনুভূতির সেই বেদনাটি বিশিষ্টরূপে জাগায় ও সেইজন্য তার কবিতা আমার ভালাে লাগে। তৃষাতুর মনের একটি নিবিড় আবেগ সমগ্র হয়ে তার কাব্যে ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। রমেশচন্দ্রের কবিতা প্রাণে সত্যিকারের রসসঞ্চার করে। -অধ্যাপক রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত খগেন্দ্রনাথ মিত্র, এম-এ

No text on this page.

No text on this page.

প্রেম ও প্রতিম
শীরমেশচন্দ্র দাস
প্রণী
What of Rafael's sonnets, Dante's picture ?
This : no artist lives and loves, that longs r
Once, and only once, and for one only......
I shall never, in the years remaining,
Paint you pictures," no, nor carve you statues,
Make you music that should all-express me ;
So it seems : I stand on my attainment -
This of verse alone, one life allows me ;
Verse and nothing else have I to give you.
Other heights in other lives, God willing :
All the gifts from all the heights, your own, Love !
R. Browning
এ, সি,সরকার এগুসস
কলিকাতা

প্রকাশক :
শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার, বি-এ
এ, সি, সরকার এণ্ড সুস লিঃ
১৫, কলেজ স্কোয়ার,
কলিকাতা
প্র থ ম স ও ক র ণ
ফাল্গুন, ১৩৪
মার্চ, ১৯৩৪
দাম
এ ক টা কা
প্রিন্টার :
শ্রীশশধর ভট্টাচার্য্য
মাসপয়লা প্রেস
৯০।৩ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট,
কলিকাতা

সুকবি শ্রীকরুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়
বন্ধুবরেষু
রমেশচন্দ্র দাস
১২, ৩, ৩৪.

এই বইয়ের কবিতাগুলি প্রবাসী, বিচিত্রা, এবং অধুনালুপ্ত ভারতী, বঙ্গবাণী প্রভৃতি মাসিক পত্রিকা হইতে সম্পাদকদের অনুমতিক্রমে পুনর্মুদ্রিত হইল সূচীপত্র ১০ ১৪ ••• ১৮ ••• ১৯ ২১ ২২ ২৪ ২৫ । २१ তৃষিত যৌবন, বিলাস-পরিচয়, বুকের রক্ত ক্ষীর হয় যবে, রাত-ভিখারী, সহসা প্রভাতে আজ, তুমি এসে জানাইলে মাের, তােমার প্রণয়, আমারে সরস করাে, বিজয়ার আশীৰ্বাদ, বিরহিণী, নিজেরে করেছি ঘৃণা, কবি-সাথী, আমার প্রিয়ার পদ্ম-পায়ের, প্রেম ও প্রতিমা, এক্টী সে নারীদেহ, তােমার ও বরত, সামান্য নারীর মতাে, সে-প্রথম রজনীতে, তােমরা দু’জনে যবে, কী দুঃখ দিলে যে তুমি, যেখানে যে-পথ দিয়ে, তুমি যবে তার সাথে, কত বড় ভাগ্য তব, এক্টী সে মেয়ে ছিলাে, রাহুর প্রেম, ৩৩ ৩৪ ৩৬ ৩৭ ৩, ৪০ ৪১ 82 ৪৪

তৃষিত যৌবন
কাল রাতে দেখিনু স্বপন,
নিখিলের ঘরে ঘরে উঠেছে ক্রন্দন ।
বিশ্ব ভরি’ যতাে প্রেম ছিল ঘরে ঘরে,
আজ তাহা নাহি কিছু প্রিয়জন তরে।
শ্যামল ক্ষেতের পারে বনান্তের তীরে,
ছিল যতাে রূপ-ক্ষুধা কুটীরে কুটীরে,
আজ যেন নাহি কিছু। উঠানের মাঝে,
যে পুষ্প উঠিত ফুটি ফুল-স্নিগ্ধ লাজে
প্রতিটি সন্ধ্যায়, নিরানন্দ মূচ্ছাহত
আজি তাহা,–আর যেন আগেকার মতাে
প্রেম-তৃষা রূপ-ক্ষুধা তুলে নাহি ধরে
কৃষকের গৃহলক্ষী বধূর অন্তরে।
বসন্তের উচ্ছলিত পবন-হিল্লোলে
মৃদুমন্দ মৰ্ম্মরিত পল্লবের কোলে,
কুহুরব বেজে ওঠে,—সেই কুহুতানে
সরম-সঙ্কোচনত কিশােরী-নয়ানে
চঞ্চলতা জাগে নাকো। ধরণীর পরে
সর্ব ক্ষুধা শ্রান্ত ক্লান্ত চিরদিন তরে

প্রেম ও প্রতিমা
আকাশে বাতাসে যেন ভরি’ চারিধার—
অতৃপ্ত প্রেমের তৃষা, শুধু হাহাকার,
হৃদয়ের কান্না শুধু। মানবের মন
সারাটি ভুবন ফিরে হেন রত্ন ধন
খুঁজে খুঁজে পায় নাকো আজ,—যাহা লয়ে
পূর্ণ-মনে যেতে পারে প্রিয়ার আলয়ে।
হেন ভাষা পায় নাকো, ল’য়ে যেই সুর
ব্যক্ত করে দিতে পারে নিজ ভারাতুর
হৃদয়ের লক্ষ কথা।
ব্যাকুল নয়নে,
বসন্তের অপরাহ্নে মুক্ত বাতায়নে
বসিয়া রয়েছে প্রিয়া; সুরভি বাতাস
নিঃশব্দে নিতেছে কাড়ি প্রতিটি নিশ্বাস
সঙ্গীতের তালে তালে। মূৰ্চ্চনার সম
নীলাম্বরী শাড়ী খানি নিরুপম
অচঞ্চল তনুখানি করিয়া বেষ্টন
একপাশে পড়েছে ঘুরিয়া। সুদর্শন
তরঙ্গিত এলােচুল পিঠে ফেলা তার
মৌন কোন্ দৈন্য-স্পর্শে স্তব্ধ চারিধার।
প্রিয়া যেন প্রাণহীন সােনার প্রতিমা,
ধূৰ্জ্জটী-ধেয়ানমগ্ন,অপূর্ব মহিমা
স্তব্ধ মুখে, স্নান চোখে। সব অঙ্গে তার
ধ্যান-ক্ষীণ কান্তি যেন তাপসী উমার।
মমতা-মাখানাে দু’টি কালো আঁখি তলে
নবীন বর্ষার যেন কালো আলাে জ্বলে ;
মুগ্ধ
૨

তৃ ষি ত যৌ ব ন
মনে হয়, তার সেই কালাে দুটি চোখে
আমার অস্তিত্বটুকু লুপ্ত যেন শােকে,
লুপ্ত যেন মাের এই জীবনের গতি।
অঞ্চলের প্রান্ত হতে স্বর্ণস্তনজ্যোতি
দেখা যায় ক্ষীণতম আভাসের মতাে,
পাতার আড়ালে দু’টি গােলাপ আনত,
দুটি যেন পূর্ণিমার সুগােল সুষমা,
জ্যোতিঃশতদল যা’র নাহিক উপমা
অমর্ত্যলােকেও।
আমি তার পার্শ্বদেশে
ধীরে ধীরে যাইনু উঠিয়া। অনিমেষে,
অনিন্দিত মুখপানে রহিলাম চাহি’
আবেগ-উচ্ছ্বাসভরে ;-যেন কিছু নাহি
হৃদয়ের কথা বলিবার ; স্তব্ধ হয়ে
বক্ষমাঝে শুধু মাের আপনারে লয়ে
রহিলাম বসি।হৃদয়ের লক্ষ কথা,
প্রণয়ের উদ্বেলিত শত মুখরতা,
আজ যেন শান্ত মৌন সবে।-সাধ মনে,
রক্তিম-প্রণয়-ভরা সহস্র চুম্বনে,

প্রতি মা
অন্তরের অন্তহীন বিশ্বাসের ভরে
আপনার সবটুকু তার দুটি করে
উজাড় করিয়া দিতে। আজ কিছু নাই
প্রকাণ্ড এ বিশ্ব-মাঝে ; খুঁজে নাহি পাই
প্রণয়ের কোনাে কথা ; বিশ্ব যেন আজ
লাবণ্যের প্রেতমূৰ্তি রিক্ত-শূন্য সাজ।
মাের চিরদিবসের ছিল যেই প্রিয়া,
আজ যেন মনে হয় গেছে সে চলিয়া।
সেই হাসি, সেই সুর, চঞ্চলতা সেই,
অঙ্গে অঙ্গে ছন্দ-নৃত্য আর যেন নেই
মাের আজিকার এই তরুণ প্রিয়ার
সব দেহ-মনে। কী গম্ভীর দেহভার
তার সেই অনিন্দিত তনুখানি আজ
রেখেছে বেষ্টন করি’। নাহি সেই সাজ
প্রতিক্ষণে নিত্য নব, পরে আর খােলে
দিনে শতবার ; নাহি কথা সন্ধ্যা হলে,
নাহি সেই পূর্বকার মান অভিমান,
নিশীথের ছল-ভরা সেই নিদ্রাভাণ,
নাহি সে চুম্বন-স্পৃহা অধরে তাহার,
৪

তৃ ষি ত যৌ ব ন
তরল তনুটি ভরা সুরভি-সম্ভার ;
নাহি আর পূর্বকার সেই ছেলেখেলা।
মনে হয় প্রিয়া মাের বড়ই একেলা
এই দীন মঘরে। অবনত মুখে
স্তব্ধ হয়ে বসে রয় আমার সম্মুখে।
নিশীথের সুপ্তিসম চোখ, মুখ, চুল
নিদ্রালস ; সর্বতনু বিষাদ ব্যাকুল ;
সর্বাঙ্গে মিনতি মাখা। দীনহীন হয়ে
কেমনে বাঁচিয়া থাকে মানব-আলয়ে
প্রিয়-হারা প্রিয়া মাের ? ধরণীর ঘরে
নাহি প্রেম ভালােবাসা মানবের তরে।
তার সে হৃদয়মাঝে নাহি হেন বাণী,
যাহা লয়ে ব্যক্ত করে নিজ প্রেমখানি
নিজ প্রিয়া পাশে ।
সমস্ত আকাশ
মানবের দুঃখে দুখী ফেলিছে নিশ্বাস ।
মর্ত্য-ঘরে অহর্নিশ করিছে ক্রন্দন
মৰ্ত্তবাসীদের যতাে তৃষিত যৌবন

বিলাস-পরিচয়
তােমার সােনার অঙ্গে এত লজ্জা সরম ভয়,
সকল অঙ্গ দেয় যে তবু বিলাস পরিচয় !
তােমার সিথির সিদূর রেখা,
নিবিড় অনুরাগের লেখা,
তােমার শাড়ীর আঁচল-দোলায় ফাগুন হাওয়া বয়,
সকল অঙ্গ দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।
তােমার তরুণ তনু-লতায় কতই বাণী জাগে,
তােমার রাঙা শাড়ী খানি লাল যে অনুরাগে ;
পান-খাওয়া-লাল পাতলা ঠোঁটে
বাসর রাতের ছন্দ ফোটে,
জোড়া-ভুরুর মাঝখানে টিপ আগুন জেলেই রয়,
সকল অঙ্গ দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।
আগা চুড়ির রিনিঝিনি দেয় কত সংবাদ,
গৃহকর্মের ফাঁকে ফাঁকে ঘটায় পরমাদ।
তােমার সলাজ ডাগর আঁখি,
হাতছানি দেয় থাকি থাকি,
আমায় দেখে যায় যে বেধে তােমার চরণদ্বয়,
সকল অঙ্গ দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।

বি লা
রি চ য়
তােমার ঘাড়ের পিছনদিকের দু’চার উভড়া চুল,
নয়তাে খোঁপা, নয়তাে বেণী, তবুও টুলটুল।
যতই টানাে বুকের আঁচল,
বুক যে তােমার ততই উচল,
ঢাতে গিয়ে জানিয়ে দিলে এই লাগে বিস্ময়,
সকল কৰ্ম্ম দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়
মাথার কাঁটা, ফুল-চিরুণী ছােটায় অনলকণা,
তােমার গলার সাত্রী-হার জৌলসে যৌবনা।
আঁচলে ঐ চাবির-গােছায়,
চরণ-তলে আল-মােছায়,
তােমার শাড়ীর ভঁজে ভাঁজে আনন্দ-দুর্জয়।
সকল অঙ্গ দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।
চুলটি বাঁধাে বৈকালে সই, আরসি খানি পাতি’,
তখন মনে জাগে না কি মধুর কতাে রাতি ?
যখন তুমি সন্ধ্যা-ক্ষণে,
বিছনা পাতত আপন মনে,
তখন তােমার হৃদয়-কোণে কিসের অভিনয় ?
সকল কৰ্ম্ম দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।

প্রেম ও প্রতি মা
যতই তুমি সাবধানেতে চলা-ফেরা কয়রা,
তােমার মনের অজানাতেই নিজেই ধরা পড়াে ;
তােমার নীরব দেহ-লতা,
জানায় তােমার মনের কথা,
চুপ করে সই, বসে থাকো, চুপ করা সে নয়,
তােমার মনের সাত-মহলের দাও যে পরিচয়।
ঘর-শত্রু তােমার ঘরে রয় যে রূপােন্মাদ,
আয়না-সমান কবির মনে পাতা তােমার ফাঁদ ;
যতই তুমি এড়িয়ে চলল,
তােমায় তুমি বাড়িয়ে ভােলাে,
আব্রু বেশী ঢাকতে গিয়ে আব্রু তােমার ক্ষয়।
সকল কৰ্ম্ম দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়
আলগা খোঁপা যখন তােমার হঠাৎ খুলে পড়ে,
দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে তা নাও তে আঁচল ধরে
সামান্য এই কাজটী নিয়ে,
মন যে আমার দাও রাঙিয়ে,
এই টুকুতেই টলিয়ে দে যাও, মন যে কেমন হয়।
সকল কৰ্ম্ম দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয় ।
Lyri
৮

বি লা প
প রি চ য়
মুখে তুমি আঁচল চেপে জানাও নিরন্তর
তােমার এমন সােনার দেহ, সােনার কলেবর ;
সােনার বুকে রাঙা কমল,
টস্টসে ঠোট, বাঁকা পিছল ;
সােনার দেহের ফুলদানিতে মাধুরী-বিস্ময়,
মুখে তুমি আঁচিল চেপে জানাও সমুদয় ।
•
জীবন তােমার স্নিগ্ধ-শুচি লজ্জাটুকু নিয়ে,
কী রহস্য জানাও তুমি তার-ই আড়াল দিয়ে ;
সর্বাঙ্গে দাও আঁচল টানি,
দেখতে যা পাই একটু খানি,
সেই টুকুতেই তােমার দেহের পাই যে পরিচয়,
তােমার দেহের সকল খবর সেইটুকুতেই কয়।
ওগাে রাণী, নিজেই তুমি জানাে নাকো হায়,
তােমার দেহের জ্বালায় তুমি কতই অসহায়।
তােমার চলন, বসা, দাড়া,
যৌবনেরি দেয় যে সাড়া,
ছলা-কলার প্যাচ শেখ’নি নিঃশঙ্ক নির্ভয়।
সকল অঙ্গ দেয় যে তােমার বিলাস পরিচয়।

বুকের রক্ত ক্ষীর হয় যবে
বুকের রক্ত ক্ষীর হয়ে যবে ওঠেগাে নিমেষ মাঝে,
তরুণীর বুক ভরি’ ওঠে যবে মাতৃহৃদয়-লাজে,
মনের দেহের সেই বসন্ত, যৌবন-মধু-মাসে,
পূর্ণ-কাতর বুকের পাঁজর ফুল ফুটে ভরে আসে।
স্নেহ দিয়ে যবে উছলিয়া পড়ে প্রেমের পেয়ালাখানি,
স্বর্গলােকের শিশু-দূত করে তার সাথে কানাকানি,
ধরণীর বুকে ঈর্ষা জাগায় গরবীর অভিমানে,
হাজার মুকুল ঝরে’ শুধু পড়ে চাহি’ তার মুখপানে।
অজাত শিশুর আসার স্বপনে মা’র মন যবে ফোটে,
সাহারার বুক তখনি কেবল ফুলিয়া ফুলিয়া ওঠে ;
তখনি কেবল বালুকার দল ব্যর্থ-জীবন তরে,
রাগিয়া কাঁদিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া উড়িয়া উড়িয়া মরে।
ক্ষণে ক্ষণে যা’র চমকিত তনু আশা-সন্দেহ ভরে,
সাহসিকা কোন্ দয়িতের সনে মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করে ;
এখনাে-অজানা সেই হাসি ভরা স্বপনেতে দেখা মুখ,
ঘুরে ফিরে আসে—জেগে ওঠে শুধু হৃদয়ের চাপা ভুখ।

বুকের রক্ত ক্ষী র হয় যবে
যেদিন নিমেষে বুকের রুধির সুধা হয়ে স্তনে ঝরে,
বিরহ-বিধুর আকাশ সেদিন কাঁদিয়া কাটিয়া মরে ;
বিশ্বে সেদিন সে কি হাহাকার বাতাসে বাতাসে ওঠে,
অপরিচয়ের পরিচয় লাগি’ মা’র মন যবে ফোটে।
তরুণী-কিশােরী,কতাে লাজ ভয় তাহার হৃদয়-তলে,
এখনাে বােঝেনি এখনাে শেখেনি প্রণয় কাহারে বলে;
দয়িতের ঘরে সে-ই তার সব, সে-ই বধূ, সে-ই রাণী,
তবুও তাহার উথলে সরম করিবারে কানাকানি।
দয়িত যখন মিলন-আশায় মুখটি তুলিয়া ধরে,
নীরব নিশীথে এখনাে তাহার বুক দুরুদুরু করে ;
বেশী কিছু নয়, একটি মধুর চুম্বন লভি’ ঠোটে,
বাহুর পীড়নে এখনাে তাহার অঙ্গ শিহরি’ ওঠে
লজ্জায় ঢাকা খুকিটি এখনাে, ভয়-কম্পিত হিয়া,
চায় কভু হ’তে, চায় নাকো পুনঃ সে-ই বধূ, সে-ই প্রিয়া;
যৌবন তার বাঁধিয়া রেখেছে,তাহারি আড়ালে রহি
চায় যেন কারে হৃদয় ভরিয়া মরণ-বেদনা বহি'।
এত প্রেম তা'র, এত ভালােবাসা, এত যে অধর-সুধা,
উঠিতে বসিতে হয়েছে নাকাল,—মিটেছে কি তার ক্ষুধা?
এত যে নিভৃত অতুল সােহাগ, পরাণ হাঁপায়ে ওঠে,
তবুও একেলা,চায় যেন কারে, কা’র পানে মন ছােটে।

প্রেম ও প্রতি মা
চুমার ভিখারী দয়িত তাহার তা'রে শুধু একা পেয়ে,
নির্মম ভাবে দেয় শুধু লাজ, সরম ধরেনা দেহে।
চায় যেন কারে বন্ধু-দোসর, তাহারা হইবে দু'টি,
তাই এ ক’দিন তার-ই পথ চেয়ে হৃদয় উঠেছে ফুটি'।
ভালােবাসা মাঝে এতদিন সে যে ছিল যে বড়ই একা,
হঠাৎ সে-দিন স্বর্গীয় দূত তাহারে দিয়েছে দেখা ;
অতি নিৰ্ম্মল সুন্দর সে যে,—চতুর্দশীর শশী,
সাথী হয়ে তার দেছে তারে দেখা মানব-ভবনে পশি'।
সারা ভুবনের হাসি-ভরা মুখ আজি তা’র ক্রোড় পরে,
মেটে নাকো আশা যতবার দেখে অতুল সােহাগ ভরে ;
সেই লাজ ভয়, সেই আকুলতা আর নাই তার মুখে,
আজিকে তাহার সারাটি হৃদয় বিভােল স্বপন-সুখে।
ভরা-দুপুরের উগ্র বাতাস আসিতেছে থাকি থাকি,
এখনাে ঘরেতে,বাহিরের কাজ রয়েছে সকলি বাকি ;
বেলা বুঝি যায় !“আজ কিছু নয়, কেবল হৃদয় ভরি’
লইবে আজিকে তারা তিনজন সব বােঝাবুঝি করি’
বাঁধন আজিকে বাঁধে নিকো বাসা তাহার তনুটি পরে,
খোঁপা অগােছালাে, মাথার আঁচিল কেবল খসিয়া পড়ে ;
সেমিজ আজিকে ভেজে নাকো ঘামে, ব্লাউজ নাহিকো গায়ে,
উদাসী বাতাস তনুর রেখায় মরিবারে যেন চাহে।

বু কে র রক্ত ক্ষী র হ য় য বে
পাষাণ হইয়া এতদিন যাহা ছিলাে দুরন্ত প্রেমে,
দেহের তুষার গলে গিয়ে আজ জল হয়ে এলে নেমে ;
খােকারে তাহার কখনাে কোলেতে, বক্ষে কখনাে টানে,
চুমা পরে চুমা খায় চোখে মুখে, চায় দয়িতের পানে।
খােকার হাসিটি ছােপ মেরে দেয় তাহার দু'খানি ঠোঁটে,
ধার-করা সেই হাসি-মাখা-চোখ দয়িতের পানে ছােটে;
চায় যেন আজ খুলিয়া বলিতে—ভয় আজি কা’র তরে,
সেই-দিবসের খুকিটি যদিও,আর সে কাহারে উরে?
চাহি’ দোহা-পানে ভাবে শুধু আজদেবতা কাহারে করে,
দেবতার পাশে লােকে মাগে যাহা সকলি তাহার ঘরে ;
পিয়াসী বুকের যত রূপ-ক্ষুধা আজিকে তাহার দ্বারে,
ফুটিছে টুটিছে আবার ফুটিছে সঙ্গীত-ঝঙ্কারে !
এ কি প্রেম শুধু ? এ কি তপণ ?
এ কি তৃষা? এ কি ক্ষুধ?
পলকে পলকে এই যে পুলক, এই কি অমৃত-সুধা ?
দেবতা উপরে,—তাহারে টানিয়া বসানাে মানব ঘরে,
মানবের সাথে একাসন করা—এত পাপ কোথা ধরে ?
সারা শরীরের শােণিতের দল সুধার আকারে জাগি
যেদিন বক্ষে উঠিল জমিয়া আরেক জীবন লাগি’,-
জগৎ জুড়িয়া সে কী সঙ্গীত মানবের ঘরে ঘরে,
দেবতা ভাবিছে স্বর্গে বসিয়া—এত সুখ কোথা ধরে?

রাত-ভিখারী
রাত-ভিখারীর কান্না ওঠে গলির মাঝে ওই,
বিজন-পথে নাই কোন জন রাত-ভিখারী বই।
আঁধার-কুটিল রাস্তা হতে,
কান্ন ওঠে করুণ স্রোতে,
সেই সুরেতে মন যে কাঁদে, উদাস হয়ে রই।
রাত-ভিখারীর কান্না শুনি গলির মাঝে ওই।
.
রাত-ভিখারী চছে কেঁদে,-গাইছে কত গান,
কাকর-কুচি পাষাণ-আঁটা, কঁাদে পথের প্রাণ
চছে কেঁদে আপন মনে,
ব্যথা শােনায় জনে জনে ;
ঘরে ঘরে রুদ্ধ দুয়ার,নেই কিছু আজ দান
পথের উপর যায় যে বহে একলা দুখের বান!
দিনের আলােয় খঞ্জ, কালা, কুরুগী আর
অলি-গলির মােড়ে মােড়ে দেখি হাজার বার
তাদের করুণ কান্নাকাটি
শুনি, তবু কান না পাতি ;
মৰ্ম্ম বুঝি রাত-ভিখারীর গভীর বেদনার।
চোখের কোণে উপছে ওঠে অশ্রু-পারাবার !
১৪

রা ত - ভি খা রী
ওদের কি গাে নেই বেরুতে দিন-দুপুরের মাঝ ?
দি-দুনিয়ায় এ যে রে ভাই সৃষ্টিছাড়া কাজ ।
কাঁদতে ওদের এমনি ক'রে,
কে শেখালাে ? কি মন্তরে ?
আঁধার রাতি ক্ষণে ক্ষণে ককিয়ে ওঠে আজ।
কেউ দেখেছে এমন ধারা দিদুনিয়ার মাঝ ?
পর।
রাত্রি যখন নিদ্রা-মগন, রুদ্ধ সকল ঘর,
রাত-ভিখারী বাহির হ’ল তখন পথের পর!
দিনের হাটের এত শেষে,
বাহির হ’ল কি উদ্দেশে?
কান্না শুনে ভিক্ষা দিতে ভােলে যে অন্তর।
আঁধার-পথের পথিক যে-জন কোনখানে তার ভর?
দিভিখারী দিনের আলােয় ভিক্ষা হাঁকে হায়,
রাত-ভিখারী কান্না শােনায় বিজন-বেদনায়।
কণ্ঠ ঈদে ভিক্ষা-ছলে,
ভাসায় সবায় চোখের জলে ;
আদিম যুগের মনের কথা পথে-পথেই গায়।
হারিয়ে-যাওয়ার বেদন:বাণী ওই যে শােনা যায় ।

প্রেম ও প্রতি মা
হারিয়ে-যাওয়ার নীরব বাণী শুনে যে চমকাই,
দো-তলার এই ঘরে শুয়ে উদাস হয়ে যাই।
ধরণী কা’র প্রতীক্ষাতে
ঠায় দাড়িয়ে নিঝুম রাতে,
হাত বাড়িয়ে নেবে তুলে—প্রহর গণি তাই।
আপন ব’লে আঁকরে ধরিনাই কিছু আজ নাই!
বেদন-বুকের গুমােৰ্ট ভাষায় ওই ডাকে ফের শােন,
কান্না অত শােনায় কারে ? পথ আজি নির্জন।
আমার ঘরের জা-তলায়
কান্না ওঠে,মন যে গলায় ;
ব্যথার চেয়ে ভয় যে কেমন ভরিয়ে তােলে মন।
শূন্য-পথের একলা পথিক ওই কাঁদে ফের শােন্।
ভাছি শুয়ে,–এই সড়কে চলি তত দিনরাত,
কতই চেনা—শতেক কাজে কতই যাতায়াত।
তবু ভাবি আজকে রাতে,
রাত-ভিখারীর কান্না সাথে
পথের উপর কী ভয়ানক মরণ-ছায়াপাত ।
দু পাশের দুই বাড়ীর মাঝে শশ্মশান অকস্মাৎ!
১৬

রাত • ভি খা ।
গৃহবাসীর গােপন সুখে সাধলাে কে রে বাদ ?
মুখর বধূর মুখ থেমে যায়—মরণ-অবসাদ !
কাহার করুণ আর্তনাদে
ঘরের পাষাণ দেওয়াল কঁদে ?
জমাট-বাঁধন্ পাথর নড়ে!—এ কী আর্তনাদ।
ভাঙলো আজি মুখর বধূর রাত্রি-জাগার সাধ।
পূর্ণিমা-রাত, একাদশী,—আজকে তিথি কোন্ ?
এই তিথিতেই বাহির হবে, এ যে ভীষণ পণ !
ভাবি,—যেন, ওর ঐ সুরে
চলে গেছি অনেক দূরে,
অনেক-দেখা পথের শেষে কোন্ সে অদর্শন ?
সকল গানের শেষের কলি-বুকভাঙা বেদন!
রাত-ভিখারীর রাত-পানাে ঐ যে করুণ ভাষ,-
অনন্তেরি গােপন দুখের বেদন-পরকাশ।
জাগিয়ে তােলে এই পৃথিবীর
চির-যুগের কান্না গভীর !
জাগিয়ে তােলে ব্যথিত, বুকের মৌন ইতিহাস,
রাত-ভিখারীর রাত-কাঁপানাে ঐ যে করুণ ভাষ!
৩
১৭

সহসা প্রভাতে আজ
সহসা প্রভাতে আজ হেরিনু প্রিয়ারে,
মনে হ’ল কতদিন দেখি নাই তারে
আপন হৃদয়-মাঝে। খেয়ালের ভরে
দেখিলাম চাহি’ আজ সমস্ত অন্তরে
প্রেয়সীর মুখপানে; নির্বাক নীরবে
রহিনু বসিয়া ;—মনে হ’ল—যেন কবে
যুগান্তের সেই পূর্ব প্রথম প্রভাতে
পেয়েছিনু তারে। সেই হ’তে তারি সাথে
সুখে-দুঃখে করিয়াছি ঘর ;-প্রতিদিন
কতত কাছে পেয়েছি তাহারে ; নিদ্রাহীন
কত রাত্রি কাটায়েছি এই প্রিয়া সনে
কতাে সমারােহে। তবু আজ ভাবি মনে
কোন্ সে রহস্যময়ী চির-সঙ্গোপনে
রেখেছে প্রিয়ারে ঢাকি’ রহস্য-বেষ্টনে।
১৮

তুমি এসে জানাইলে মােরে
আজ শুধু এই কথা মাের মনে জাগে,
আমাদের সেই শুভ মিলনের আগে,
কোথা ছিলে তুমি আর কোথা ছিনু আমি ?
কোন্ কাজে মগ্ন হয়ে ছিনু দিবা-যামি ?
—কিছু না ভাবিয়া পাই! অন্তরের পানে
একটী দিনের তরে সে-অর্থ সন্ধানে
চেয়ে কভু দেখি নাই। আজি বারবার
আমাদের মিলনের সেই পূৰ্ব্বকার
ভাবিয়া দেখিতে চাই সেই দিনগুলি,-
বৃথা চেষ্টা,—সব যেন গেছি আজ ভুলি’!
মিলনের আগে যেন ছিল নাকে ‘আমি’,
মাের এ অস্তিত্বটুকু খায় সেথা থামি।
তুমি এলে, তুমি এসে জানাইলে মােরে
আমার দিবসগুলি সচেতন করে।
•hriss

তােমার প্রণয়
.
আমারে বেসেছ ভালল জানি আমি জানি,
আমার লাগিয়া শুধু তব প্রেমখানি।
আমারে চিনেছ শুধু, জেনেছ আমারে ;
অন্তরের দিক হতে আমার মাঝারে
পেয়েছ যে একমাত্র সত্যের সন্ধান,
এ-ও জানি আমি। আমারে করেছ দান
ইহকাল পরকাল তব,—মনে মনে
এ-ও জানি।তবু আজ ভাবি ক্ষণে ক্ষণে
আমি নহি একমাত্র রাজ-অধিরাজ
তব হৃদয়ের। শুধু মনে হয় আজ,
সারা বিশ্ব তােমা লাগি ফিরিছে কাদিয়া,
যুগ যুগ ধরি তব প্রণয় যাচিয়া ;
বিশ্ব যেন ক্ষণে ক্ষণে উঠিছে নিঃশ্বসি’
তােমা লাগি দিগন্তের অন্তরালে বসি'।
২৪

আমারে সরস করে
আমারে সরস করাে তব গন্ধ-রসে।
তােমার সৌরভটুকু মদির পরশে
মাের এই চিত্তখানি রাঙাইয়া তলে।
ঐ যে গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রথিত বসন্ত মােনলা
বিরাজিছে তব তনু-পরে,চিরকাল
আমার পরাণ-মাঝে সায়াহ্ন-সকাল
চির-নব বসন্তের আনুক সংবাদ।
মিটাও এ পরাণের যতাে ক্ষুধা-স্বাদ
ভরিয়া এ প্রাণ-পাত্র তব সুধাদানে,
ফাঁকটুকু যেন নাহি থাকে কোনােখানে
আমার নয়নপাতে দাও সে অঞ্জন,
আচম্বিতে নিখিলের যতাে লক্ষ জন
অপরূপ হয়ে ওঠে। বীভৎস কুৎসিত
বিলীন হউক তব সৌন্দৰ্য্য সহিত।

বিজয়ার আশীর্বাদ
কি বলে’ করিবাে আশীর্বাদ ? আজ তুমি
লুটায়ে পড়েছ মাের পদপ্রান্ত চুমি,
কহিতেছ মৌনমুখে—“করাে আশীর্বাদ।
শূন্য নিঃস্বতায় তাহে করে আর্তনাদ
চিত্ত মাের। ভালােবেসে সযতন করে
রাখিয়াছি গৃহে মম কত যত্ন ভরে
গৃহের সৌন্দৰ্য সম।
কত পুণ্য মম—
সবা হতে তােমা' পেয়েছি নিকটতম !
যে স্নেহ-আনন্দ ভরে, যে প্রণয় ল’য়ে
অহর্নিশ আছ তুমি এ দীন-আলয়ে,
যে বক্ষে লয়েছ তুমি মাের সুখ দুখ,
শত দৈন্যরাশি, কোথা মাের সেই বুক ?
আমারে দেবতা ভাবি, এত গর্ব কোথা,
আশীর্বাদ করে’ আজ শােনাই বারতা ?
१२

বিরহিণী
কাল রাতে ঘুম হতে উঠিলাম জাগি,
সহসা অন্তর মাের কার কথা লাগি
উঠিলাে কাঁদিয়া। চাহিলাম শূন্য পানে,
ক-যেন চাহিয়া আছে করুণ নয়ানে
মাের আঁখি-পানে। মনে হ’ল বিশ্বে এই
যত ব্যথা উঠিয়াছে প্রতি মুহূর্তেই
যতাে বক্ষ হতে,—আজ তারা সারি সারি
কোন্ এক প্রান্তরে দেবে বুঝি পাড়ি।
নীলাম্বরী পরি’ যেন কোন্ উদাসিনী
চলিয়াছে, যেন এক করুণ কাহিনী।
মনে হ’ল ওর লাগি’ বাহিরিবে কবে
মাের ব্যথা ?—একে একে চলে যায় সবে,
আমি শুধু পড়ে বই লয়ে আকুলতা,
বাড়ে শুধু রজনীর তীক্ষ্ণ নীরবতা।

নিজেরে করেছি ঘৃণা
হে ধরিত্রি! সঞ্জীবনী তব সুধা-দানে
নব শক্তি দাও পুনঃ মম মন-প্রাণে।
তােমারে বেসেছি ভালো সব প্রাণ দিয়া
মাের সুখে দুঃখে ;-তাই আজ মাের হিয়া
ভিক্ষা এক মাগে শুধু—দিয়ে তব সুধা
আবার বাঁচায়ে ভােললা মাের রূপ-ক্ষুধা।
তােমারে বাসিয়া ভালাে সারা জন্ম ধরে’
জীবনের প্রতি পলে বাসি যেন মােরে।
আজ শুধু অহর্নিশ ভয় হয় মনে
নিজেরে করেছি ঘৃণা নিজের নয়নে।
বসুন্ধরে, দূর করে দাও এই ত্রাস,
জীবনের মৃত্যুহীন এই মৃত্যু-গ্রাস।
এই ভিক্ষা তব পাশে, হে মাের মৃগয়ি,
নিজেরে করিয়া ঘৃণা ছােট নাহি হই।
*; • ৯-১- ১
२९

কবি-সাথী
বৈশাখ রাত,বসে আছি বাতায়নে,
আমরা দু’জন, কতাে কথা মনে মনে।
দখিনা মলয় বহিছে ছাদের পরে,
প্রিয়া মাের কহে বাহুটি আমার ধ'রে,
হে মাের পরাণ-প্রিয়,
ঘুমায়ে পড়িলে আমারে জাগায়ে দিও।
ঘন-ঘাের-ভরা সেদিন বাদল-সাঁঝে,
ঝমঝমাঝম্ বাহিরে মাদল বাজে ;
বড় মিঠা শীত লাগিছে দোহার গায়ে,
কাছটি ঘেসিয়া প্রিয়া মাের বসে তাহে;
-হে মাের পরাণ-প্রিয়,
ঘুমায়ে পড়িলে আমারে জাগায়ে দিও।
শরতের রাত, জ্যোৎস্না উঠেছে ফুটি,
দোর-জানালায় চাদ সে পড়েছে লুটি',
ঘরের মেঝেতে ছড়ানো রজত-ধূলি
প্রিয়া মাের কহে আঁখি দু’টি তার তুলি,
-হে মাের পা-প্রিয়
দুপুর নিশীথে আমারে জাগায়ে দিও।
৪

প্রেম ও
প্রতি মা
হিমের খবর এসেছে ধরার কোলে,
দেখিতে দেখিতে বেলা যেন যায় চলে;
জ্যোছনা মলিন নীহারিকা জলসাতে,
প্রিয়া মাের কহে ঘুম-মাখা আঁখি-পাতে,
-হে মাের পরাণ-প্রিয়,
গভীর নিশীথে আমারে জাগায়ে দিও।
ককন শীত, শব্দ নাহিকো তিল,
থথম রাত, দুয়ারে লাগানাে খিল ;
লেপের ভিতরে আমরা দু’জনে শুয়ে,
প্রিয়া মাের কহে বুক পরে বুক থুয়ে,
-হে মাের পরাণ প্রিয়,
ঘুমায়ে পড়িলে আমারে জাগায়ে দিও।
চৈতালি রাত,-মল্লিকা, যূথী, যাথী,
সুরভি-মাতাল,করে তারা মাতামাতি ;
পিক্‌ মুহুর্মুহু কুহু কুহু ওঠে ডাকি,
প্রিয়া মাের কহে বক্ষে কপােল রাখি,
-হে মাের পরাণ-প্রিয়,
ঘুমায়ে পড়িলে আমারে জাগায়ে দিও।

আমার প্রিয়ার পদ্ম-পায়ের
আমার প্রিয়ার পদ্ম-পায়ের মলের রুনিঝুনি,
কতই ভাবে বাজে তাহা—অবাক হয়ে শুনি।
প্রিয়ার পায়ের মল দু’ গাছি
থেকে থেকে ওঠে নাচি',-
আমার বুকে দেয় যে দেখা ফুলেরি ফাল্গুনী,
কতই মধুর প্রিয়ার পায়ের মলের রুনিনি!
পল্লীগ্রামের প্রিয়া আমার, নয় কো সহরবাসী,
নুপুর, মল ও পাঁয়জোরে তার মন ওঠে উল্লাসি'।
পল্লীগ্রামের প্রিয়া আমার,
বয়স হ’লল,“তবু তাহার ।
কিশাের তরুণ প্রাণটী যে আজ সুরের অভিলাষী।
আমার প্রিয়ার কাণ্ড দেখে মনে-মনেই হাসি।
কততই ক’বাে প্রিয়ার পায়ের মলের চতুরালি,
শ্যামের বাঁশীর বােল্বােলা-বােল দেয় যে কাণে ঢালি’!
নুপুর কহেন্দুশােন্ ওরে শােন্,
বুঝতে পারি বাজনা এ কোন্ ?
নয় কো কেবল রুনিঝুনি,বাজনা নয় এ খালি,
তরুণ প্রাণের অঞ্জলি অর দেয় গােপনে ঢালি।
२१

প্রেম ও প্রতি মা
।
নুপুর কহে,—ওগাে কবি, শােনাে আমার বাণী,
বুঝতে যদি পারাে বােবঝা কইছি কানাকানি ;
তােমার বধূ, পরাণ-প্রিয়া,
যৌবনে আজ কাতর-হিয়া,
সরম লাগে আজকে তাহার কইতে সকল বাণী,
নুপুর হয়ে তাই তাে গাহি তাহার ব্যথাখানি।
প্রাণখানি তার ভরপূর আজ তােমার আরাধনে,
তাহার হয়ে তাই তাে আজি কাঁদি নিরজনে।
সুখের বেলায় হেসে ছুটি,
দুখের বেলায় কেঁদে উঠি,
কান্না আমার, হাসি আমার, বােঝে গাে কয় জনে
রাত্রি-দিবস গুমরে মরি আমার আপন মনে।
নাক সিটকে থেকো নাকো, ওগাে সহরবাসী,
সভ্যতার-ই বা এসে সব দিলাে গাে নাশি।
আমি জানি কতই মধুর
আমার প্রিয়ার পায়ের নুপুর !
কাজের ফাঁকে নুপুর কহে বচন রাশি রাশি,
দুই-চারিটি কথা তাহার কহিতে আজ আসি।
२

আ মা র প্রি য়া র প দু-পা য়ে র
রাত-বাৰােটা, আহার শেষে শুয়ে আছি ঘরে,
তন্দ্রা-বশে শুনি আমি-
নুপুর কেঁদে মরে।
নুপুর কহে,—ঘুমিও নাকো,
একটু ওগাে জেগে থাকো,
জেগে থাকো লক্ষী আমার,ঘুমােও কেমন করে?
খাওয়া সবার চুকে গেলেই যা’বােতােমার ঘরে!
কানের পাশেই নুপুর তােলে করুণ সুরের হাওয়া,
ঘন-ঘন দোরের পাশে করে আসা-যাওয়া !
দোরের পাশে কোন্ নিরালায়,
নুপুর বাজে কিসের খেলায় ?
চমকে দিয়ে থমকে দাঁড়ায় !—এমনি গােপন গাওয়া ।
নুপুর বলে—আর দেরী নেই, স্বর্গ যাবে পাওয়া।
হয় তাে নিঝুম দুপুর বেলায় বাইরে’ ঘরে আছি,
হঠাৎ শুনি নুপুর বাজে কোথায় কাছাকাছি।
বড়ই মধুর তাহার ভাষা,
দেয় যেন গাে কিসের আশা?
স্বপন আমার নয় দুরাশা !—কয় যে সােজাসুজি।
নুপুর কহে গােপন কথা—সব কথা তার বুঝি।
৯

প্রেম ও প্রতি মা ৮ সকাল বেলায় রান্নাঘরে সবাই আপন-হারা, মা-পিসী-বােন্ ব্যস্ত সবাই স্কুলের ভাতের তাড়া। হয় তাে সেথায় দাড়াই গিয়ে, নুপুর বলে ঝুনঝুনিয়ে, ওগাে এখন সরাে তুমি, দাও গো এখন ছাড়া, কেমন ভাবে কাজ করি গাে, ঠায় যদি রও খাড়া ? আমার প্রিয়ার নুপুর দুটির এমনি গােপন বাণী, কেও বােঝে না, বুঝি আমি, বােঝে আমার রাণী। যখন যেমন সময় মতাে, নুপুর কহে বাণী কতত! নুপুর মােদের মিলন-দূতী,—সব কথা দেয় আনি’, গুরুজনের মাঝখানেতেই গােপন কানাকানি। আমার প্রিয়ার পদ্ম-পায়ের মললরি ঝঙ্কার ঘােচায় আমার পুরুষ মনের সকল অহঙ্কার ! নুপুর কহে—তােমার বধূর পা দু’টি এই বড়ই মধুর। যেনি নিটোল তেমনি কোমল, কি ক’বাে গাে আর- নুপুর কহে কতই কথা—শুছি পরিষ্কার !

আ মা র প্রি য়া র প দু-পা য়ে র
পায়জোরে জোর বাজনা বাজে, বাজনা কানে আসে,
তাই তাে প্রিয়ার পা দু'খানি পরাণ ভালােবাসে;
কোথায় শােভে নিটোল পাহাড়,
সুধার সায়র কোলে যাহার ?
কোথায় সুগােল রূপ-শতদল লুকিয়ে কেবল হাসে,
সন্ধানী ওই নুপুর তাহা কহে আমার পাশে!
একটু খানি গােড়ালি তার দেখিয়ে নুপুর কহে
তােমার চোখের অন্তরালে কী রূপ হেথায় রহে।
হাতীর দাঁতের মতন নিটোল
হাতীর দাতের মতন সুগােল,
কমল-কোমল উরুর নিচোল যৌবনে আজ দহে।
আনন্দে আজ বেহুস হয়ে মদালসে রহে !
প্রেম-আরতির ভজন ওঠে ও চরণ-মঞ্জীরে,
শুনছি আমি আম্মনা হায়, প্রেমানত শিরে ?
প্রিয়ার কমল পা দু'খানি,
আমার কাছে স্বর্গ জানি;
আমার মনের সব কামনা কেবল ঘুরে ফিরে,
জাগে ওগাে, জাগে ওর ঐ পা দু'খানি ঘিরে।
৩১

প্রেম ও প্রতি মা
বিছা আমার, ধৰ্ম্ম আমার, বিকিয়েছি সব হায়,
জ্ঞান-গরিমা সব ঢেলেছি ওই দুটি ওর পায় !
এই এ সুঠাম পায়ের কাছে,
এমন মধুর আর কি আছে ?
দুধে-আক্তার রং খেলে যায় কুঙ্কুমেরি হায় !
হৃদয়-জয়ী পা দু’টি তার রূপের গরিমায় ।
আমার প্রিয়ার সােনার দেহে কতই অলঙ্কার,
কোথায় কাহার আস্তানা হায়, খোঁজ রাখি না তার।
আমি গাে আজ জানি কেবল,
প্রিয়ার পায়ের দু’ গাছি মল ;
বড়ই মিঠে খামখেয়ালি আচমকা ঝঙ্কার !
দিন্দুপুরের মাঝখানেতেই ঘটায় অভিসার!
আমার প্রিয়ার পদ্মপায়ের মলের রুনিনি,
কতই ভাবে বাজে তাহা—অবাক হয়ে শুনি।
প্রিয়ার পায়ে কী মধু রয়,
মল দু’টি তা’ সঙ্কেতে কয় !
বক্ষে আমার ব’য় যে গাে হায়, সুরের সুরধুনী!
বড়ই মধুর প্রিয়ার পায়ের মলের রুনিঝুনি !

প্রেম ও প্রতিমা বাহুতে হবে না বন্দী গােধুলির লগ্নশেষে ধরিত্রীর বক্ষে যথা তিমিরের নিঃশব্দ সঞ্চার, রজনীর শেষ অঙ্কে অনুচ্চার সমারােহে পূর্বাচলে জাগে যথা রবি, কিশােরীর বক্ষমাঝে ইঙ্গিতের ভরে যথা জেগে ওঠে কাম ক্ষুরধার, তেমনি আমার মনে আপনি ভাসিয়া ওঠে ওই তব কমনীয় ছবি। ভুলে যাবাে ভুলে যাব, যত ভাবি ভুলে যাবে, ভুলে যাবাে ও মুত্তি তােমার, ভুলিতে পারি না আমি! ভােলা কি সহজ কথা ও অপূর্ব সৌন্দৰ্য-করবী ? আমার এ রূপ-ক্ষুধা প্রচণ্ড পিপাসা এ যে মায়ামরু মৃগ তৃষ্ণিকার,- তোমার সৌন্দর্য্যে আমি অন্ধ-আঁখি,—তাই আমি নব নব সৃষ্টির গরবী । v তুমি তাে জানাে না, হায়, নিজেরে হারায়ে আমি হয়ে আছি শুধু তােমায়, আমার মুহূর্তগুলি তােমার মধুর নামে বিরহ-বিধুর, কুরমান , দিন-তাের শান্তি নেই, রাত্রি-ভাের নিদ্রা নেই, আনন্দের নেই যে সময়, তােমার ধ্যানের ছন্দে স্পন্দিত হইয়া নিত্য আজ আমি রচি তব গান। ধ্যান-কৃশ তনু মাের তােমার রূপের স্বপ্নে প্রেমানন্দে হয়েছে চিন্ময়, বাহুতে হবে না বন্দী, ছন্দে আমি আঁকি তাই রূপ তব অক্ষয় অম্লান। ৫ ৩৩ এটী সে নারীদেহ তােমারে বেসেছি ভালাে একান্ত আপন মনে হৃদয়ের অনন্ত গহনে, তােমার ও মুর্তি, সখি, বারেবারে ভুলিবারে চেষ্টা আমি নিত্য করি বৃথা, প্রতি দণ্ড প্রতি পল তব স্মৃতি অবিচল জাগিয়া রহে যে দেহ-মনে, গােপন অন্তরে মাের ধ্বনিত হও যে নিত্য, সুবিচিত্রা প্রজ্ঞাপারমিতা। তােমারে বেসেছি ভালাে, এ-কথা জানে না কেহ, জানে নাকে বিশ্ববাসীজনে, তুমিও জানােনা হয়, কেঁদে কেঁদে কে কোথায় রচিতেছে মরণের চিতা, অন্তরে লুকায়ে রেখে উত্তপ্ত আশ্লেষ ভরে ভাবে নিত্য স্তব্ধ ধ্যানাসনে তােমার কুমারী মুর্তি,-কি দারুণ শাস্তি সে যে ! হে মাের দীপ্তা অপরিচিত। তােমারে বেসেছি ভালাে, এ-কথা তুমিও সখি, স্বপনেও জানিবে না কভু, তবুও গােপনে হায়, বাঁচায়ে রাখিতে হবে সবার মনের অন্তরালে ; এমনি নিঃসঙ্গ হয়ে মনেরে বঞ্চনা করি’ স্পর্শসুখ পেতে হবে তবু, এটা সে নারীদেহ,-তিল তিল রেখা তার বিচ্ছুরিত দ্বিচক্রবালে। কল্পনা-রােমাঞ্চ-সুখে মনের মুকুরে মাের অপরূপ অপূর্ব সে নিধি সন্ধ্যার আমেজ সম অলক্ষিতে ঘিরে রবে র হীন আকাশ পরিধি। ৩৪ তােমার ও বরতনু । তােমার ও বরতনু প্রস্ফুটিত পদ্ম যেন, রূপে আমি মুগ্ধ হয়ে রই, দূর হ’তে ঘ্রাণ ল’য়ে ফিরাইয়া লই মুখ, আঁখি মুদি অলস আচুল ; তােমার ও দেহ-পদ্ম দেখি আর শ্বাস রুধি কামনাকাতর যততা হই, নিমেষের তরে শুধু সসঙ্কোচে দেখে লই রাঙা গাল, ঠোঁট আর চুল। তােমার ও রূপ হেরি মনােমাঝে কেঁদে ওঠে সজ্জিত প্রথম প্রণয়ী, কুণ্ঠিত ও তনু ঘেরি’ অমেয় রহস্য কতত ভেবে মন বেদনা-আকুল ; তােমার তনুর ছলে আমার বেসুরা প্রাণে দু-চারিটি সুর গেঁথে লই, তুমি যবে অমনা একান্ত নিকটে এসে ছুঁয়ে যাও আলতাে আঙল। হয়ত কখনাে তুমি শুধু মুহূর্তের তরে মাের পানে হাসিমুখে চাও, অঙ্গের সুবাস ঢালি’ দু-চারিটি কথা ক’য়ে সহজে যাও গাে কভু চলি, তুমি তাে জানাে না সখি, তােমার দেহের স্বাদ পিছনে রাখিয়া তুমি যাও, আমি তাহা বহুক্ষণ সুখে করি আস্বাদন, শিহরণে পড়ি আমি ঢলি। স্পর্শের তরঙ্গগুলি পিছে যাহা ফেলে যায় সুন্দর সুডৌল তনুখানি, অগাধ রােমাঞ্চসুখে আমি তাহে করি স্নান, স্পর্শ-মিগ্ধ অবশ পানি। -- সামান্য নারীর মতো সামান্য নারীর মত তুমিও পাতিবে ঘর, হবে জায়া, ললিতা প্রেয়সী, তােমার ও স্বর্ণত স্বর্ণমুল্যে বিকাইবে পুরুষের পরশপীড়নে, সৃজন-আনন্দ-রসে কুমারীর মণিবন্ধ খসিবে সলজ্জ শিহরণে, তবুও ভাবি যে আমি,তুমি দেবী, কাব্যলক্ষ্মী, অসামান্যা, মহামহীয়সী। তােমারে পাব না কভু, দুঃখ তাহে নাহি কিছু, হে অস্পৃশ্যা সুন্দরী শ্রেয়সী, এই যে গােপন আলা সহিতেছি তনু-মনে, প্রতি পলে, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে, তাতেও নাহিকো দুঃখ, ম্লানমুখে স’য়ে র’বাে অভ্রভেদী আত্মবিসর্জনে, তােমার ও নাম-মন্ত্রে সৃজি’ ল’ব মহাতীর্থ—মহাকাল অনন্তবয়সী। • : *** ' . * * * * * *** *** *** *** * * * * * *** *** *** ** ' :. . . w. $ 10. এই দুঃখ শুধু মনে,—তব দেহ-পদ্ম-মধু অপরে করিবে আস্বাদন, সামান্য নারীর মতাে তুমিও পাইবে সুখ আপনারে করি’ অর্ঘ্যদান আমার অদেখা তনু অপরে দেখিবে খুঁটি’ প্রতি অনু করি’ উদঘাটন, আমার সে মহাতীর্থ আমি যা’ পুজিবাে নিত্য কামনার কেলি পুষ্পোদ্যান। এ দুঃখ কাহারে ক’বা, আমার নীরব স্তব একান্ত অক্ষম অসহায়, কোথাও কাহারাে মন বিপুল বিরহ সহে রবে না সজাগ প্রতীক্ষায় । ৩৬ সে প্রথম রজনীতে আমার এ ভীরু আঁখি, এ ভীরু চাহনি না কি তােমারে করায় রাঙামুখ, এ দৃষ্টি অসহ লাগে—তাই তব গাল দু’টি হয়ে যায় সুচির ডালিম, সে-প্রথম রজনীতে রুদ্ধশ্বাস আলিঙ্গনে হবে নাকো লজ্জায় লালিম, পলকে পলকে যবে চুম্বনে ভরিয়া যাবে ঠোট, গাল, চোখ, গলা, বুক? আমারে দেখিয়া তুমি অঞ্চল টানিয়া দাও, দেখে মাের লাগে যে কৌতুক, এ-হাত যদিও কভু ভুলেও করে নি স্পর্শ শাড়ী তব মেঘলা-গ্লানিম, সে-প্রথম রজনীতে লজ্জায় যাবে না মরে’-লজ্জা তব আতীব্র আদিম, তােমার ও দেহ হ’তে শ্লথ হয়ে যাবে যবে অবশিষ্ট শেষ শাড়ীটুকু? সেদিন সন্ধ্যায় যবে এসেছিলে একা তুমি নগ্নপায়ে ভবনে আমার, সেই পদ্ম-কলি সম শুভ্র পা দুখানি হেরি’ আঁখি হ’লাে তৃষার্ত চাতক, মাের অন্ধ দৃষ্টিতলে তুমি রাঙা হয়েছিলে,-আমি ভাবি এ লজ্জা তােমার কেমনে রাখিবে বেঁধে দুই দেহ-তটে যবে উথলিবে যৌবন-উদক? পেলব পুলকে সখি, উত্তীর্ণ হইবে যদি কামনার উজান সাগর, আমার নিশ্বাস লেগে কাটা হয়ে ওঠে কেন ঘাড়ে তব সূক্ষ্ম ললাম-থর ? ৮.pdated.*** • ৭৭ *** ::::" শpter-1 ৩ « তােমরা দু’জনে যবে আজ আমি ভাবি মনে, ভাবি শুধু অহরহ সেই তমাে রজনীর কথা, ভাবিতেও ভয় লাগে, বুকেতে আষাঢ় জাগে, জলে কঁপে দু’টি ভীরু আঁখি ; সেদিন আসিবে সত্যি ? সত্যই দেখিতে পাব জীবনের এত বড় ফাঁকি ? চুপ করে দেখে যাব, দেখিয়াও বেঁচে র’বব, স’য়ে যাবে এত বড় ব্যথা? তােমরা দু’জনে যবে ভুঞ্জিতে উৎসুক র’বে অঙ্গে অঙ্গে মিলন-গাঢ়তা, দু’টি দেহ-পাত্র ভরি’ মদিরা করিবে পান বুকে বুক ঠোটে ঠোট রাখি’, নিবিড় মিলন সেই, সে মিলন-আবেশেই দু’জনে কঁপিবে থাকি থাকি, তখন অভাগা আমি সারা রাত কেঁদে কেঁদে দেখিবাে চাদের উলঙ্গ। তােমরা দু’জনে যবে নিবিড় সান্নিধ্য-সুখে নিদ্রাহীন সারাটি রজনী, অধরে লােলুপ ক্ষুধা, বুকেতে আনন্দ-বহি, কামনা-কাজল আঁখি-পাতে, হায় সে মিলন-যামী,তখন কোথায় আমি ? মাঠে বসে তারাগুলি গণি, তব দেহ-গন্ধ স্মরি জব মধু নাম করি’ মন্ত্ৰসম জপিৰৰ সে-রাতে। সে-রাত আসিবে যবে, এ-প্রাণ বাঁচিয়া র’বে? মৃত্যু কি হবে না তার আগে ? আমার সে চাদমুখ উচ্ছিষ্ট হইয়া যাবে-ভাবিতেও মনে জ্বালা লাগে। *৭***•. । । ।। Yor if, ।

কী দুঃখ দিলে যে তুমি কী দুঃখ দিলে যে তুমি,—ওগাে প্রিয়া, নিঠুরিয়া, ওগাে মাের শ্যামলিয়া মেয়ে, এ-জন্মের মতাে, সখি, মাের কাছে রবে তুমি একখানি দীপ্ত তরবারি, নিষ্ঠুর আঘাতে তার ছিন্ন আমি, আর তুমি মুক্তকোষ স্বচ্ছন্দবিহারী, বেদনার জ্বালা-স্পর্শে আমার এ তনু-মন অকালে জরায় দিলে ছেয়ে । অস্ পেয়েছিলাে ফিরে’ তার উরিডি প্রেমােন্মাদ গানখানি গেয়ে, কুটীল-কপােল প্লুটো পারেনি রাখিতে ধরে’ দুই চোখে উচ্ছ্বসিত বারি মৰ্ম্মর-মসৃণ মৃত গ্যালাটিয়া লভেছিলাে উষ্ণত প্রাণখানি তারি, পিগম্যালিয় সেও পেয়েছিলাে ঈপ্সিতায় অনিমেষে তার মুখে চেয়ে। রােসেটি-সিডল, আর টিসট্রা-আইসুন্ট, জুড়-সিউ, পেটরার্ক-লরা, ইন্দ্রজাল-কথা শুধু? কল্পনা-মলিন জন্ম, চারু গাথা ললিত অসতী ? মধ্যরাত্রে মন্ত্রম বৃথায় কি জপি তব মধুক্ষরা নাম একাক্ষরা, গ্যালাটিয়া সম তুমি পূর্ণ করিবে না কভু আমার এ নিঃশব্দ আরতি ? তােমারে দেখিবাে শুধু স্যার্সি সম সৰ্ব্বনাশী, নির্মম নিষ্ঠুর কুহেলিকা, লিয়েণ্ডার-তিতিক্ষায় কোনাে রাতে হিরাে সম হবে নাকো নেপথ্য-নায়িকা ? এ ১৯ যেখানে যে-পথ দিয়ে যেখানে যে-পথ দিয়ে তুমি গেছ, চলিয়াছ ফেলি’ তব পদ্ম পা দু'খানি, তােমার অবর্তমানে সেখানে দেখি যে নিত্য সু তব নতাঙ্গ সুন্দর, যেখানে দাঁড়ায়ে তুমি কয়েছে দু’ চার কথা,-কথা নয় মুক্তার নিঝরি, সেখানে দাঁড়ায়ে আমি শুনি প্রতিধ্বনি তার,-তুমি তাহা ভুলে গেছ জানি। যেখানে যে-পথ দিয়ে তুমি গেছ, দেখি সেথা সরস্বতী, সশরী বাণী, যেখানে ফেলেছ পদ—সেখানে দেখি যে শত শতদল শুভ্র থরেথর, আমিও মনের ভুলে সেই পথে চলে’ সখি, পাই তব পায়ের আদর, নিরালা সন্ধ্যায় সেথা তব নাম ডেকে ডেকে তব সাথে করি কানাকানি। কয়েছে যে-সব কথা নক্ষত্রের মতাে তাহা মাের কাছে চির জ্যোতিষ্মন, তােমার মুখের বাসে সুগন্ধ-নন্দিত তাহা অপরূপ স্নিগ্ধ গন্ধবহ, পৃথিবীর অভিধানে তেমন মধুর বাক্য খুঁজে আমি পা’বােনা সন্ধান, সে-সব কথার ধ্বনি চিরদিন করে র’বে শ্রুতিমান্ আমার বিরহ। তােমারে পাব না কভু, শুধু এই কথাগুলি জীবনের নিঃসঙ্গ সম্বল, তােমার কথার স্পর্শে তােমার মুখের মধু পান করে’ হই যে বিভল।

P তুমি যবে তার সাথে তুমি যবে তার সাথে সুবিস্তীর্ণ প্রেমস্বৰ্গ সঙ্গোপনে করিবে রচনা, সান্নিধ্য-রােমাঞ্চ-হর্ষে ঢালিবে শিহর-মদ্য সুখ-ঘন বুক হতে বুকে, পরিপূর্ণ অন্ধকারে রুধির-সাগর যবে ছুটিবে সঙ্গম-অভিমুখে, মৃত্যুর মমতা সম তােমারে ঘিরিয়া রবে আমার এ অনন্ত বেদনা। স্তব্ধরাতে মৃদুমুরে গুঞ্জরিবে কানে তব কামতপ্ত প্রেমের বন্দনা, বক্ষে তার মুখ গুজি’ কদম্বকেশর সম শিহরিরে তুমি যবে সুখে, প্রতিদিন ম্লানমুখে যে-ব্যথা এসেছি সহে', গােপনে লালিত যাহা দুখে, একটি নিশ্বাস হয়ে সে ব্যথা তােমারে হায় মাঝরাতে করিবে উন্মনা । হয়তাে বিকালে কভু নিবিড় কুন্তলরাশি এলাইয়া জানালার পাশে, রাত্রিগুলি মনে করি’ চিকুরে চিরুণি দিবে,ঘনচুলে অন্ধকার ঘর, বিরাট স্তব্ধতা ল’য়ে অন্ধকারে অঙ্গ ঢাকি’ দাড়াইবাে শীতল নিশ্বাসে, সীমন্তে সিন্দুর দিবে, হৃৎরক্তে আমি তাহা করে দিবে আরাে যে সুন্দর! তােমার তনুটি যবে আনন্দে কঁপিতে র’বে তাহার জানুর বেষ্টনীতে আমার ক্ষীণায়ু-দীপ নিবাইবাে নিজ হাতে—সেই সে সুন্দর রজনীতে। ৪।'w'', *; •, ২ , , , * 'এ =wf ৪১ --- কত বড় ভাগ্য তব . . কত বড় ভাগ্য তব—তুমি যাহা নহ কভু, আমি তাহা ভাবি মনে মনে, তুমি নারী লােক-চক্ষে, মাের ধ্যানে তুমি দেবী, মাের গানে তুমি লক্ষ্মী সমা, শরীরসর্বস্ব হয়ে অপরের মনােরমা,—অশরীরী তুমি মাের রমা, তােমারে পাবে না বলে তুমি মাের চিরদিন, তুমি মাের চির-সঙ্গোপনে। আতীব্র আশ্লেষ-ভরে চুম্বনে চঞ্চল হয়ে অন্ধ যবে তােমরা দু’জনে, তােমার কেশের গন্ধে বেদনার বেদী গড়ি’ পুজি আমি দেবী নিরুপমা ; মানব-আলয়ে যবে নবােঢ়া বধূটি হ’তে ক্রমে তুমি জীর্ণ প্রিয়তমা, মাের ওষ্ঠে তব নাম উচ্চারিয়া তারা হয়ে ভরে যাবে নিশীথ গগনে। . একটি ভবনে তুমি কারারুদ্ধ, মাের কাছে চির-মুক্ত উদাসী আকাশে, তােমার দেহটি দেখি নব-শ্যাম শপ পরে, আঁখি তব দীঘির অতলে, তােমার কথা যে শুনি রােমাঞ্চিত অন্ধকারে, নাম তব ভােরের নিশ্বাসে, আমার অনন্ত দুঃখ বেদনায় রাঙা হয়ে দিবসের চিতা হয়ে জলে। আমার অন্তর হায়, তােমার পায়ের কাছে অহর্নিশ মাথা কুটে মরে, তােমার বিরহ-মেঘে আমার পৃথিবী আজ অশ্রুর আষাঢ় হয়ে ঝরে । ৪২ এটা সে মেয়ে ছিলাে প্রথম সন্তান মা’য় দুই বছরের শিশু মা’র কোল গেছে সে যে ছাড়ি', বহুবর্ষ হলাে তাহা—আজ তা’র ছ'টি ছেলে প্রৌঢ়প্রায় গুম্ফশ্মশ্রুময়, প্রথম সন্তান সেই মা’র কাছে আজো যথা চিরশিশু, আর কিছু নয়, সেই দু’টি বর্ষ সেথা চির-রুদ্ধ স্তব্ধীভূত,—সেই মতাে তুমিও আমারি। জানি আমি, তনু তব আজ যাহা কৃশ শুভ্র,-কী সুন্দর কহিতে না পারি, হবে তাহা মেদ-স্ফীত, সমুদ্রের সম বক্ষ হয়ে যাবে ক্ষীণ জলাশয়, মুখের পবিত্র আলাে হবে দুর, র’বে নাকো আরক্তিম বাঁকা ওষ্ঠদ্বয়, তথাপি, আমার কাছে এই মত চিরদিন রবে তুমি অক্ষত কুমারী। NE।। ।। wil. তােনারে যেমন আজ দেখিতেছি, চিরদিন এই ছাঁচে পা’বে তুমি সীমা, মাের কেশ হবে শুভ্র, দেহ হবে লােলচৰ্ম্ম-তুমি মাের চির-উপাসনা, একটী সে মেয়ে ছিলাে, যে মােরে কাঁদয়েছিলােত যা’র চাদের গরিমা, বহু বর্ষ পরে যায় কোন্দুর তীর্থদেশে ভেবে ভেবে হইবাে উন্মনা । মন্দিরে দাঁড়ায়ে আমি ভুলিয়া পাথর-মুর্তি দেখিবাে সে মেয়ের প্রতিমা, হয়তাে তুমিও সেথা ক্ষীয়মা র'বে পাশে, তােমারে চিনিতে পারিবে না। ৪৩

রাহুর প্রেম
রাহু যেদিন পড়ল ধরা স্বর্গেতে,
অশ্রু-ফোটা কারাে চোখে পড়ল কি ?
তার লােদনের বেদন-ছায়ে ঘর পেতে
চোখের জলের আল্পনা কেও গড়ল কি?
মৃত্যু-সমান চোর-অপরাধ,—তার তলে
হৃদয়-ভরা প্রণয় কতাে জানতাে কে ?
দোষ দিয়েছে সবাই মিলে সরগােলে
বিদ্রোহী সে বিপথগামী ভ্রান্তকে।
কেউ কি সেথায় ছিল যেজন ধীর ভরে
একটু খানি ভেবেছিল তার কথা ?
কেউ বুঝেছে নয়ন-জলের নিঝরে
রাহুর প্রেমে লুকিয়ে বেড়ায় কোন ব্যথা?
রাহুর চোখে দিবস-রাতি বয় ধারা,
বাঁশীর সুরে কঁাদন তারি উঠছে গাে !
মিলন-কাতর হৃদয় কারাে দেয় সাড়া ?
তারি তরে কান্না কি কার ছুটছে গাে ?
বড়ই ভীষণ রাহুর প্রেমের টা না কি,
দোসর হৃদয় অশ্রু ঝরায় কোন্ লাজে ?
মর্ত্যবাসী! কাঁদতে পারাে কান্না কি,
রাহুর প্রণয় চিরতরেই একলা যে!
৪৪

এই লেখকের লেখা
সাগরিকা (প্রথম খণ্ড)
সাগরিকা (দ্বিতীয় খণ্ড)
সাগরিকা (তৃতীয় খণ্ড)
পরীরাণী
রতনচুর
অজ্ঞাত দেশ
কাজল-রেখা
চম্পা-দ্বীপ
যমে-মানুষে
চীতা, বা বাের্ণিওর জঙলী মেয়ে
আফ্রিকার বনে-জঙ্গলে
চোর-চূড়ামণি
ম্যাক্সিমূ-গর্কি (সমালােচনা )
মাদার ইণ্ডিয়া (ঐ)
প্রেম ও প্রতিমা (কবিতা)
দেবার মৃত্যু (কবিতা)

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mr. Das is a distinguished alumnus of our University, and sofort is a remarkable publication of his. The sheaf of luscious lyrics included in this dainty volume may be called a cycle of romance, delineating point by point the first love of a Bengali girl with all her fine fantasies, moods and attitudes. The young poet has entered with a gusto into the inner chamber of her inind and with a fine brush depicted a life-size portrait of a typical Damozel of our province. The easy rush of the lines, the various inset pictures of the cycle of romance, the heavy perfumed atmosphere of the stanzas, the lacrimae rerum in some of the touching moods, the purely physical charm of the girl, and the majestic grace of some of the fourteen-liners, --all make up an agreeable intellectual repast, at once pleasing and stimulating, The robust and rounded bcąuty of an unsophisticated village-bred girl weaves a silken spell round our mind and finds an echo in our soul. (217 safsat is undoubtedly a rich contribution to our ever-growing poetic literature. -57491977 contratatea Gentofteta, 491-4

Prem O Pratima Ed. 1st

Author
Sen,rameshchandra
Title
Prem O Pratima Ed. 1st
File name
Prem O Pratima Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2009/12/11
Publisher
M.c.sarkar And Sons,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
56
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sen,Rameshchandra
DLI number
513103
Barcode
4990010020112.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
0iavbR9g5ws
Download PDF

Prem O Pratima Ed. 1st