Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly

Amar Americar Aviggata Part. 1

Dutta, Bhupendranath. · 2010/03/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

a
সং
নেক
hভজ্ঞতা
প্রথম ভাগ
ܪ ܢ ܀
ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, এম, এ; পি এইচ, কি।
কলিকাতা
ভাদ্র, ১৩৩৩।
মূল্য পাঁচসিকা

পবিত্রর গুহ
কর্তৃক প্রকাশিত
৫৫ নং মাণিকতলা ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
গ্রন্থকার কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
প্রিন্টার-ঐশশিভূষণ পাল,
মোফ প্রেস,
১৫নং নয়ানা দত্ত ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

একাশকের নিবেদন
ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রণীত “আমার আমেরিকার
অভিজ্ঞতা” নামক পুস্তকের প্রথম ভাগ প্রকাশিত হইল।
এই পুস্তকের সামান্য অংশ “Monthly Messenger” এবং
“ভারতী” পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ
দত্ত মহাশয় সুদীর্ঘকাল বিদেশ যাপন করিয়া স্বদেশে
ফিরিয়া তাহার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছেন। আশা
করি সহৃদয় পাঠকগণ এই পুস্তক মনােযােগ সহকারে
পাঠ করিবেন।
৮ই ভাদ্র, ১৩৩৩
ইতি:
কলিকাতা।
শ্রীপবিতকুমার গুহ।

শুদ্ধিপত্র।
পৃষ্ঠা
লাইন
অশুদ্ধ
৬
মাতৃজাতির
২৬
১৪
বিজেতৃ
Campus
পেটে
ompus
পেট

সূচীপত্র।
১। সূচনা
২। শিক্ষা
০ ০ ৫
১৬
৪১
সমাজ
৪।
ধর্ম
•••
•••
•••
১১৯
৫। স্ত্রীলােক
৬। বৰ্ণ-বিদ্বেষ
৭। নিগ্রো-সমস্যা
৮। নিগ্রোর শিক্ষা
১৪১
•••
১৮
০ ০ ০

No text on this page.

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। --- জীব..র ঘূর্ণিতে পড়িয়া কুলালের । স্যায় ঘূর্ণায়মান হইয়া পৃথিবীর অনেক দেশেই আমি ভ্রমণ করিয়াছি। নানা দেশের নানাশ্রৈণী ও নানামতাবলম্বী লােকের সহিত মিশিয়াছি, নানা ভাবতরঙ্গের প্রবাহে পড়িয়া আসিয়াছি। অনেক জিনিষই পৰ্যবেক্ষণ করিয়াছি, অনেক প্রকার শিক্ষালাভও করিয়াছি। বিদেশে আমার ঘূর্ণায়মান ভাগ্যচক্রের উত্থান ও পতন এবং নানাপ্রকার লােকের সহিত ভাবের আদানপ্রদানের ফলে যে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি তাহা দেশবাসীর সম্মুখে প্রদান করিতে চাহি। আজকাল ভারতে সর্বপ্রকারের আদর্শের ভালমন্দ লইয়া একটা বুঝাপড়া চলিতেছে। ভারত আজ পুরাতন ও নূতনের সন্ধিস্থলে দণ্ডায়মান। দেশে যে নানা প্রকারের আন্দোলন চলিতেছে, তাহার অর্থ এই যে ভারতবাসীর মনে একটা অশান্তি আসিয়াছে, ভারতবাসী আর পূর্বেকার মতন স্থাণুবং বসিয়া আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। নাই—তাহার মন একটা আৰৰ্তে ঘুরিতেছে, যদিচ এ আবৰ্ত্ত এখনও একটা বিশেষ প্রকারের প্রবাহে পরিণত হয় নাই। তরুণ ভারত পুরাতনে আর সন্তুষ্ট নহে, ইহা যিনি যতই অস্বীকার করুন তাহাতে সত্যের অপলাপ হইবে না। পুরাতনে আর চলিতেছে না, কিন্তু নূতনটি কি এই লইয়াই এক্ষণে বিচার চলি- তেছে ও দিগভ্রম হইতেছে। স্বভাবতই এ বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। আমি যখন বালক ছিলাম সেই সময়ে দেশের নেক নেতৃ- স্থানীয়ের মত ছিল যে, আমাদের পশ্চিমাভিমুখী হইতে হইবে। GATE 990? Sretan radical, reformer, patriot grafo বিশেষণে অভিহিত হইতেন। ভারতের এমন দিনও গিয়াছে যখন “কালা-ইংরেজত্ব” ভারতবাসীর আদর্শের পূর্ণত্ব বলিয়া পরিগণিত হইত, আবার এমন দিনও আসিয়াছে যখন প্রাচীন বৈদিকযুগের সভ্যতাই প্রশস্ত বলিয়া গণ্য হইয়াছে। লােকের মন এ বিষয়ে ঘড়ীর pendulumএর মতন দোদুল্যমান হই- কারণ এ ব্যাপার স্বাভাবিক, সমাজ dynamic অথাৎ পরিবর্তনশীল, কখন অগ্রসর হয়, কখন পশ্চাৎপদ হয়। কিন্তু আমাদের কর্তব্য হইতেছে সমাজের এই পরিবর্তনশীল শক্তির দ্বারা ভারতকে উন্নতির দিকে অগ্রসর করিয়া লইয়া যাওয়া। এই অগ্রসরের অর্থে আমরা কি বুঝি তাহা লইয়াই গােল- মাল। এই অর্থে “ই-বঙ্গের” এক প্রকার বুঝেন আর তেছে।

আমার-মেরিকায় অভিজ্ঞতা।
;
অন্যেরা অন্য প্রকার বুঝেন। এতদিন আমাদের সমাজে
যাহারা নেতৃত্ব করিতেছিলেন তাঁহাদের অনেকেই গুন
Bayswaterএর আবর্তে “কালা-ইংরেজ” সাজিয়া দেশে
প্রত্যাবর্তন করিয়া ইঙ্গ-বন্ধুত্বের দোহাই দিয়া প্রভু করিতে-
ছিলেন। কিন্তু সেকাল আজ চলিয়া গিয়াছে। এলে কোন
ব্যক্তি বা শ্রেণীকে শ্লেষ করিতেছি না; কিন্তু এইটুকু বলিতে
চাই যে, যাঁহারা এককালে Bayswaterএ কালা-ইংরেজ
সাজিয়াছিলেন তাঁহারা ইউরােপকে ভাল করিয়া বা একেবারে
চিনেন নাই, সেই জন্যই দেশের সম্মুখে কিম্ভুতকিমাকার আদর্শ
ধরিয়াছিলেন।
ইউরােপে, এক কথায় বলিতে গেলে সমগ্র পাশ্চাত্য
ভূখণ্ডে, আদর্শের বুঝাপড়া চলিতেছে। পশ্চিম আর পুরাতন
সন্তুষ্ট নহে; জীবনের সর্বদিক দিয়াই সে বিদ্রোহী হইয়াছে
তার ঘরে আগুন জ্বলিতেছে; পশ্চিম নিজেই আজ দিগভ্রান্ত
হইয়াছে। যে আগুণ অনেক দিন হইতে অন্তরে গুমরাইতে
ছিল তাহাই অনুকূল পবনে বােলচেভিকি বিপ্লব ও তাহার জাতি
সােসালিষ্ট বিদ্রোহ নামে সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িতেছে।
পশ্চিম নিজের ঘরই সামলাইতে পারিতেছে না, আর আমরা
সেস্থলে কোন্ মুখী হইব,ইহা ভাবিবার কথা বটে।
আমরা নূতন চাহি, কিন্তু তাই বলিয়া পাশ্চাত্যের উচ্ছিষ্ট ও
ত্যজ্যকে কুড়াইয়া ভারতে নূতনের স্থানে স্থাপন করিতে পারি
এবং তােপ স্বর্ণযুগের আকাঙক্ষায় অতীতে পশ্চাদবলোকন

আমায় আমেরিকায় অভিজ্ঞতা। সে যুগ করিতে চাই না : স্বর্ণযুগ সম্মুখে এবং ভবিষ্যতে। আমাদের নিজেদেরই আনয়ন করিতে হইবে আর cut and dry আদর্শ কুত্রাপি প্রাপ্ত হইব না। সেটা আমাদের নিজে দেরই গড়িয়া লইতে হইবে। তবে ভাল যে স্থলেই প্রাপ্ত হওয়া যাইবে তথা হইতেই তাহা সংগ্রহ করিতে হইবে । কেহ কেহ ভাবেন বিদেশই স্বর্গরাজ্য, কেহ কেহ বলেন তাহা একটা নরক। উভয় মতই ভুল। আমি সুদীর্ঘকাল বিদেশে যাপন করিয়া এই অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি যে, মানব সর্বত্রই সমান। যাহারা মানবের উৎকৃষ্টতা ও অপকৃষ্টতা, উন্নতি ও অবনতির পরিমাণ ‘race-theory”র দাড়িপাল্লায় করেম তাঁহারা সত্য ধরিতে পারেন না এবং (তৎপরিবর্তে) জগতে হলাহলেরই মন্থন করেন। আমরা স্বদেশের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী ভাঙ্গিয়া বিদেশকে দেখিতে ও বুঝিতে চাই; তাহার ফলে নিজেরাও ভালমন্দ অনুভব করিয়া একটা নূতন আদর্শ গঠন করিতে পারিব। কূপ- মধ্যে মণ্ডকের মতন বসিয়া থাকারই ফলে আমাদের জাতীয় মৃত্যু হইয়াছে। যদি আবার তাহার পুনর্জীবন প্রাপ্ত হইতে হয়, তাহা হইলে অন্যেরা যে প্রকারে নবজীবন প্রাপ্ত হইতেছে তাহা পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। এ বিষয়ে আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির যে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়াছে তাহার যৎকিঞ্চিৎ পরিচয় জ্ঞাপন করিতে চাই। অবশ্য ইহা আমার ভ্রমণবৃত্তান্তের ; ৪ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। হই। হয়। দৈনন্দিন লিপি বা খােস গল্প হইবে না, কেবল ব্যক্তিগত অভি- জুতা মাত্র। নানাকারণে যৌবনের প্রাক্কালে আমি দেশত্যাগী হইতে বাধ্য তৎকালে আমার মন কালা-ইংরেজত্বে অভিভূত ছিল। কারণ, বিজিত জাতির যে সব লােকের মনে প্রাচীনের বন্ধন শিথিল হইয়া যায় ও যাহারা জেতৃবর্গের আদর্শে অভিভূত হইয়া পড়ে, তাহাদের শূন্য মনে নূতন একটা কিছু গ্রথিত না করিলে সমাজ-তত্ত্বের নিয়মানুযায়ী অনুকরণ-প্রবৃত্তিটাই বলবতী হয়। সমাজ-বৈজ্ঞানিকেরা বলেন নূতন সভ্যতা বা চর্চা imitation, adaptation আর invention-এই তিন প্রকারে প্রচারিত আমাদের সমাজের নূতন চর্চা এখনও কোন স্থলে imitation-স্তরে আবদ্ধ রহিয়াছে, আর কোন স্থলে adaptation এর স্তরে উঠিয়াছে। কুড়ি বৎসর পূর্বে আমাদের অনুকরণ-প্রবৃত্তি বলবতী ছিল। স্বদেশী আন্দোলনের তরঙ্গ আসিয়া তাহা ভাঙ্গিয়া দেয়; কিন্তু তৎকালের তরুণ হৃদয়ে পূর্ব আদর্শের ছাপ এ তরঙ্গ সম্পূর্ণরূপে ধৌত করিতে পারে নাই। আর তাহা সম্ভব হইবে কি করিয়া ? বাল্যাবস্থা হইতে আমরা “Mary had a little lamb” পাঠ করি, বিদেশের সেই নীলচক্ষু, কটাচুল ব্যক্তিরা কি প্রকারে সুখে থাকে আর তাহা- দের সমাজ কি উন্নত, তাহাদের ইতিহাস কি গরীয়ান্ ইহাই আমাদের দেশের বালকদের পাঠ্য এবং অন্যদিকে আমাদের সমাজ কি ঘৃণিত, আমরা কি অধঃপতিত জাতি-—ইহাই নিত্য ;

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। চারিদিকে শুনি। দেশের কয়জন মহাত্মা ভারতের যথার্থ ইতিহাস পড়িয়াছেন আর কয়জন লােক ইউরােপের সংবাদ ভালরূপে রাখেন? এই সব কারণে আমাদের বাল্যকালে Social heredity বড়ই দীন ছিল। গত বিশ বৎসরের জাতীয় কৰ্ম্ম ও ব্যক্তিগত আত্মােৎসর্গের ফলে আজ বাঙ্গালায় ও নিখিলভারতে যে বংশগত সামাজিক প্রভাব অর্জিত হই- য়াছে, তাহার ফল আজকালকার তরুণ যুবকেরা ভােগ করিতেছে ও তারা তাহাদের কাৰ্য্যেরও সুবিধা হইবে। কিন্তু আমাদের জীবনের প্রাক্কালে বাঙ্গালায় সবই অন্ধকার ছিল। বাল্যকাল হইতেই “ভূতলে অধম বাঙ্গালী জাতি” গীতি শ্রবণ করিয়াছিলাম। এই সব কারণেই তখনকার তরুণ মন মাতৃ- জাতির ভূয়া আদর্শের দিকে দৌড়িয়াছিল । আর শিক্ষায় যে তাহার সংশােধন হইবে সে রাস্তা আজ পর্যন্ত ভারতে নাই ! ভারতে শিক্ষার বেশীর ভাগ স্থলে অথ—কেরাণীগিরি বা দাবােগাগিরি করিবার জন্য যতটুকু শিক্ষার প্রয়ােজন তত- টুকু। এই জন্যই আমার বােধ হয় বেশীর ভাগ বাঙ্গালীর মন কালা-ইংরেজত্বের ছাপে অঙ্কিত এবং সেই জন্যই কালা- ইংরেজ বাঙ্গালী ইউরােপে আসিয়া এত শীঘ্র adaptive হয়। যাহাই হউক, আমি যখন দেশ হইতে বাহির হই তৎকালে তরুণ মন বিদেশের সভ্যতার দিকে বিশেষ আকৃষ্ট ছিল। দেশত্যাগ করিবার সময় বােম্বাই হইতে জাহাজ গ্রহণ পা আমেরিকার অভিজ্ঞতা। করিয়া ইউরোপ হইয়া আমেরিকায় আসি। জাহাজেই অনু- সন্ধিৎসু মন অনেক বিষয় অনুকরণ করিয়া ফেলিল, সেইজন্য যখন New Yorkএ অবতরণ করিলাম তখন আর “জঙ্গলী” নহি। পূর্বেই শুনিয়াছিলাম যাহারা স্বাধীন আমেরিকার প্রধান নগর নিউইয়র্কে অবতরণ করে তাহাদের স্বাধীনতার প্রতিমূৰ্ত্তির সম্মুখ দিয়া যাইতে হয়। জাহাজ বন্দরের সম্মুখে এই প্রতিমূর্তির কাছে আসিবামাত্র আরােহীরা কোলাহল করিতে লাগিল। এই আরােহীদের মধ্যে ইউরােপের পতিত ও গরীব শ্রেণীর সভ্যের দলই বেশী। তাহাদের কাছে আমেরিকা স্বাধী নতার দেশ, তথায় যাইলে মানুষ স্বাধীনতার বাতাসে নূতন জীবন প্রাপ্ত হয়, তাহার আত্মা পূর্ণ বিকাশ প্রাপ্ত হয় এবং রাস্তায় সােণা কুড়াইয়া পাওয়া যায়। অতএব দীন দুঃখী ঔপনিবেশিক দের কাছে এই প্রতিমূর্তি স্বাধীনতার দেশে অভ্যর্থনাকারী বলিয়া পরিগণিত হওয়া আশ্চর্য্য নহে। যখন আমি এই প্রতি, মূৰ্ত্তির সম্মুখ দিয়া জাহাজে গমন করি তখন কত আশা, কত ভরসা ও উদ্যম লইয়াই নিউইয়র্কের বন্দরে নামিয়াছিলাম। কিন্তু ছয় বৎসরের পরে আবার যখন সেই প্রতিমূর্তির সম্মুখ দিয়া আমেরিকা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাই, তৎকালে মনের ভাব অন্যপ্রকার হইয়াছিল, তখন এই স্বাধীনতার প্রতিমূর্তিকে কুহ- কিনী বলিয়া মনে হইয়াছিল। আমেরিকা ত্যাগ করিবার কালে যখন দেখিলাম নিউইয়র্ক বন্দরে বৈদ্যুতিক আলােকে চারিদিক ঝলসাইতেছে আর স্বাধীনতার প্রতিমূৰ্ত্তি আলােকহস্তে স্বাধীন- আমার আমেরিকায় অভিজ্ঞতা। তার দেশের রাস্তা দেখাইতেছে, সেই সময়ে আমেরিকার ধূলি পা হইতে ঝাড়িয়া ফেলিয়া সেই মূৰ্ত্তির দিকে নিরীক্ষণ করিয়া মনে মনে বলিলাম-“হে আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতিমূৰ্ত্তি, তুমি শঠ ও প্রবঞ্চক, লােকে তােমাকে যাহা বলিয়া সম্বােধন করে, তুমি তাহা নহ।” পরে ইউরােপে কোন আমেরিকান বন্ধুর নিকট এই ঘটনার উল্লেখ করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, এই মূৰ্ত্তির অন্তর ফাঁপা আর মুখ ইউরােপের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, তুমি ইহার কাছ হইতে আর বেশ কি চাহ ?” অর্থাৎ এই মুৰ্ত্তি আমেরিকার স্বাধীনতার symbolস্বরূপ, কিন্তু তাহা অন্তঃসার- শূন্য, কারণ আসলে সে দেশে মানবের স্বাধীনতা নাই, মার ইউরােপকে আদর্শ করিয়া তাকাইয়া আছে। যে স্থানের মানব মুক্ত নয়, তাহার কাছ হইতে মুক্তির বাণী কি প্রকারে শ্রবণ করিবে ও সে দেশে তাহা কি প্রকারে অনুভব করিবে ? যাহা হউক, নিউইয়র্কে পদার্পণ করিয়া ক্রমে ভারতীয় দলে মিশিলাম। তথাকার পরলােকগত Myron H. Phelps- স্থাপিত india Houseএ তঁহাদের একটি আচ্ছা ছিল ; তথায় যাহারা অগ্রে আমেরিকায় আসিয়াছেন তাহারা আমেরিকান প্রাপ্ত হইয়াছেন এবং আমার মতন যাঁহারা নূতন আসিয়াছেন তাঁহাদিগকে “গাধা পিটিয়া ঘোড়া করা হইতেছে”। যাহারা নূতন ইউরােপ বা আমেরিকায় পদার্পণ করেন তাহারা যদি দেশ হইতে পাশ্চাত্য আদব-কায়দা না শিখিয়া আসেন, তাহা হইলে সাধারণত তদ্দেশের লােকের সহিত মেশার অসুবিধা হয়, ;

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; বিশেষতঃ ইংরেজীভাষীয় দেশে, কারণ তাহাদের দেশসমূহে আদব-কায়দার বেশী কড়াকড়ি। অবশ্য রাস্তাঘাটে, দোকানে, খাবার স্থলে “কে কার কড়ি ধারে”! কিন্তু তথাকথিত ভদ্র- সমাজে ইহার বিশেষ প্রয়ােজন। কিন্তু ইহাতে কেহ যেন মনে না করেন যে, ভারতবাসীরা পাশ্চাত্য সমাজে “দহরম মহরম” করিতে পায় ; পাশ্চাত্য সমাজে মেশা ভারতবাসীর কপালে বড়ই কম ঘটে। কিন্তু তথাপি যে দেশে থাকিতে হয় সে দেশের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি মানিয়া চলিতে হয়। ইহার ব্যতিক্রমের জন্যই বিদেশে ভারতবাসীরই অসুবিধা হয় এবং পাশ্চাত্য দেশের অনেক স্থলে যে ভারতবাসীর বিপক্ষে বিদ্বেষ ও ঘৃণা জন্মিয়াছে তাহার অনেকট। উপরােক্ত কারণে ঘটিয়াছে। ভারতবাসী স্বভাবতই রক্ষণশীল, তন্মধ্যে বাঙ্গালী কিছু কম বলিয়া বােধ হয়। রক্ষণশীলতা পােষাক-পরিচ্ছদে নিজের পরিচয় না দিতেও পারে, কিন্তু মনে মনে ভারতবাসী বিশেষ গোড়া। তবে বিদেশে বাঙ্গালী শীঘ্র আত্মহারা হয়, কারণ মনে সে কালা-ইংরেজ। মনােমােহন ঘোষ, উমেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমল হইতে বাঙ্গালীর “ইউরােপীয়ানা”র প্রবাদ হইয়াছে, এবং তাহার জের আজও চলিতেছে। ইহার জন্যই আমেরিকাস্থ বঙ্গভাষী ছাত্ৰ তথায় আসিয়া শীঘ্র আমেরিকান আদব-কায়দা দোরস্ত হইয়াছিল এবং অন্য প্রদেশের অনেকে, বিশেষতঃ মজু- রের দল, নিজেদের রক্ষণশীলতার জন্য ভারতবাসীর কাৰ্য্যের অন্তরায় হইয়াছিল।

আমেরিকার তিতা। সে সময়ে আমেরিকা-প্রবাসী ভারতবাসীদের মধ্যে দুই শ্রেণী ছিল—প্রথম ছাত্রের দল, দ্বিতীয় মজুরের দল। দলে তৎকালে বেশীর ভাগই স্বাবলম্বী ছিলেন অর্থাৎ রােজ- গার করিয়া পাঠের খরচ চালাইতেন। ঘর হইতে বিনা- সাহায্যে অথবা অল্প সাহায্যে এমেরিকায় স্বীয় উপার্জনের দ্বারা বিদ্যাশিক্ষা করা যায় এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াই অনেকে সেদেশে গমন করিয়াছিলেন এবং তাহারা তাহাদের উদ্যমে কৃতকাৰ্যও হইয়াছেন। নিজের অধ্যবসায়গুণে এবং শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের দ্বারা বিদ্যোপার্জন করিয়া দেশের নানা- বিধ কার্যে লিপ্ত হইয়াছেন। আমেরিকান শিক্ষার ফলে তাহারা উদ্যোগী ও কর্মকুশল হইয়াছেন। আজকাল কোন কোন বঙ্গভাষী লােকের নিকট হইতে শ্রবণ করা যায় যে, আমে- রিকা-প্রত্যাগত লােকেরা কাজের লােক নয়, তাহার humbug বা bluffer ইত্যাদি। আমার সম্মুখে যিনি যখন একথা বলিয়া- ছেন, তখনই আমি তাহাকে উত্তর দিয়াছি “নাম বলুন”। দুই একজন স্বদেশে সুবিধার অভাবে নিজেদের শিক্ষা বাস্তবকার্যে পরিণত করিতে অক্ষম হইয়াছেন বটে, কেহ হয় ত একটা bogus ডিপ্লোমা লইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে পারে, কিন্তু তাহা- দের সংখ্যা অতি কম ; বিশেষতঃ প্রথমােক্ত শ্রেণীর লােকদের অপরাধ যে, তাহারা দেশের লােকের সাহায্যের অভাবে নিজেদের শিক্ষাকে কার্যকরী করিতে পারেন নাই এবং অন্য পক্ষে সরকারী চাকরির প্রভাবে সমাজে “হােমরা চোমরা” র লেলিকার অভিজ্ঞতা। হইতে পারেন নাই। যাহাই হউক, আমেরিকার হাওয়া ও শিক্ষা লােককে কৰ্ম্মকুশল ও পটু করে এ সে গুণ আমে- রিকা-প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে লক্ষিত হয়। বিদেশীরা আমেরিকায় প্রথম শিক্ষালাভ করে—dignity of labor, অর্থাৎ শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা। এখানে শারীরিক শ্রমের প্রতি ঘৃণা নাই, শ্রম ও অধ্যবসায়ের দ্বারা সকলেই জীবন উন্নত করিবার চেষ্টা করেন এবং আমেরিকার অনেক ধনাট্য ও সমাজের শীর্ষস্থানীয় লােক পূর্বে মজুরের কৰ্ম্ম করিয়াছেন। ইহার জন্য তাঁহারা লজ্জিত নন, বরং সমাজ তাহাদের তজ্জন্য শ্রদ্ধা করে। আমেরিকায় সকলকারই পূর্বপুরুষেরা কুলী- মজুর ছিলেন, তাঁহারা জঙ্গল কাটিয়া বাদ করিয়াছেন, নিজ হস্তে শ্রম করিয়া ধনােপাৰ্জন করিয়া সেই জন্য প্রত্যেক আমেরিকানেরই বেপরােয়া ভাব। এই সব কারণেই তদ্দেশের সমাজ সাম্যবাদী। আমেরিকা-প্রবাসী ভারতীয়দের ভিতর তাহার প্রভাব লক্ষিত হয়। আমার সেই দেশে প্রবাসকালে যে দুই একজন ছাত্র পাঠের জন্য বাড়ী হইতে টাকা পাইতেন, অথবা কোনপ্রকার Scholarship পাইতেন, তাহারা নিজেরাই স্বাবলম্বী ছাত্রদের কাছে শ্রদ্ধায় নতশির হইতেন। এমনও জনকতক ছাত্র তৎকালে ছিলেন যাঁহারা কপর্দকশূন্য অব- স্থায় জাহাজের খালাসী হইয়া সে দেশে উপস্থিত হন, এবং শেষে নিজের শারীরিক শ্রম ও অধ্যবসায়ের দ্বারা জীবনের উদ্দেশ্যে সফলকাম হইয়াছেন এবং শিক্ষাকে কার্যকরী করিয়া আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। আজকাল বদ্ধিষ্ণু ব্যক্তি হইয়াছেন। কিন্তু স্বদেশে তাহারা এ সব সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইতেন। আমেরিকায় পৃথিবীর নানাদেশের ছাত্র বিদ্যাশিক্ষার্থ গমন করে। তদ্দেশে যত বৈদেশিক ছাত্রের আগমন হয়, জৰ্ম্মানিতে তত হয় না। ইহার প্রধান কারণ, সে দেশে নিধনও বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারে। বিদেশী ছাত্র হয়ত দিনের বেলায় কোন রেষ্টুরেন্ট বা বাের্ডিং গৃহে কৰ্ম্ম করে ও বাকি সময় কলেজে পড়ে, অথবা দিনের বেলা কোন জায়গায় চাকরি করে এবং রাত্রিতে স্কুলে বা কলেজে পাঠ করে, অথবা গ্রীষ্মবকাশে কৰ্ম্ম করে এবং শীতকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ করে। আমে- রিকায় সাধারণকে উচ্চ বিদ্যা দিবার জন্য যত চেষ্টা হয় অন্য দেশে তাহার কিছুই হয় মা। এই সব কারণে যুক্ত সাম্রাজ্যে শতকরা ৯৫ জন লিখিতে পড়িতে পারে। এই প্রকারে অধ্য- বসায় ও শিক্ষার ফলে আমেরিকান জীবনে আত্মনির্ভরতা ও কৰ্ম্মকুশলতা এই দুইটি গুণ বিশেষভাবে লক্ষিত হয়। এ বিষয়ে সে স্থলের লােকের চরিত্র পৃথিবীর অন্যান্য জাতিসমূহ হইতে উৎকৃষ্ট। এই জন্যই রুষের বেলচেভিকেরা আমে- রিকার এই সব গুণের সমাদর করে এবং নিজের দেশের লােক- দেরও সেই প্রকারে গঠন করিবার চেষ্টা করিতেছে। বােল- চেভিকিদের যে সব কর্মকুশল ও উপযুক্ত শােক নানাপ্রকার অনুষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় হইয়া কাৰ্য্য করিতেছেন তাহার পূর্বে আমেরিকার কলকারখানায় কাৰ্য্য করিতেন। লেনিন যখন আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। রুষের আদর্শের বিষয় বলিয়াছিলেন যে, “we must come out of Asiatic barbarism” অর্থাৎ এসিয়ার বর্বরতা আমাদের ত্যাগ করিতে হইবে; তখন তিনি ও তার সহযােগীরা আমেরিকার কর্মপ্রবণতাকে ও কর্মকুশলতাকে আদর্শ বলিয়া লইয়াছিলেন। পশ্চাৎপদ ও নিরক্ষর রুষজাতিকে তাহারা আমেরিকানদের মত কৰ্ম্মপটু করিতে চেষ্টা করিতেছেন। এই dignity of labor লইয়াই নুতন ভূখণ্ডের ও পুরাতন ভূখণ্ডের world-viewর বিশেষ প্রভেদ। আমেরিকা নবীন এবং সাম্যবাদী। তথাকার লােকদের সামন্ততান্ত্রিক (feudal) পুরাতন স্মৃতি নাই। সকলেরই পূর্বপুরুষ ইউরােপের পতিত- শ্রেণীসম্ভুত বা গণশ্রেণীসম্ভুত। এই সব বুভুক্ষিত ও উৎপীড়িত ব্যক্তি যখন শ্রেণী ও জাতি-বিভাগ-সমন্বিত ইউরােপের সমাজ ত্যাগ করিয়া আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে তাহা দর সাম্যবাদী নূতন দেশে সামন্ততান্ত্রিক বশস্মৃতি বা শ্রেণীবিভাগের উৎপাতের বালাই থাকে না, ততটুকু সামাজিক স্বাধীনতা তাহার প্রাপ্ত হইয়া জীবনের উন্নতির জন্য শারী- রিক শ্রমের উপর নির্ভর করে। আর সেদেশে পুরাতন ভূখণ্ডের ন্যায় জাতিভেদ নাই, যে আজ মজুর আছে, ভবিষ্যতে সে ধনী হইয়া “ভদ্রলোেক” বলিয়া গণ্য হইবে, পরে তাহার শিক্ষা ও যােগ্যতানুসারে যুক্ত গভর্ণমেন্টের (Federal Government) সভাপতি ব্যতীত সমস্ত পদই তাহার জন্য মুক্ত। বৈদেশিক ঔপনিবেশিকেরা আমেরিকার তখন

আল আলাভিজ্ঞতা।
বিভিন্ন stateএ গভর্ণরের পদে নিযুক্ত হইয়াছে। এই
জন্যই শ্রমের মর্যাদা তথায় আছে। অবশ্য New Englandএর
অতি পুরাতন ঔপনিবেশিক গােষ্ঠিতে বংশমর্যাদার গর্ব আছে
এবং New Portএর সমাজে ধনের গর্ব আছে, কিন্তু তাহারা
সংখ্যায় সমস্ত দেশে মুষ্টিমেয়। সাম্যবাদী দেশে এ অনুষ্ঠান
কি প্রকারে উদ্ভূত হইল তাহা ভবিষ্যতে বর্ণনা করিবার ইচ্ছা
পূর্বেই বলিয়াছি, ছাত্রজীবনে শারীরিক শ্রম করা লজ্জার
কথা নহে, বরং অধ্যাপকেরা সেরূপ ছাত্রের প্রশংসা করেন এবং
তাহাকে উৎসান্বিত করেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের
Chancellor বা President পৰ্যন্ত এই প্রকারে বিদ্যাশিক্ষা
লাভ করিয়াছেন। সামাজিক বিষয়ে এই সব ছাত্রের সহিত
ধনাঢ্যঘরের ছাত্রদের কোন পার্থক্য নাই। বরং যে ছাত্র
“চালবাজ” বা টাকার গর্ব করে তাহাকে অন্যান্য ছাত্রগণ
snob বলিয়া ঘৃণা করে। এই প্রকারে আমেরিকার যুক্ত
statie (United States of America ) 2093
প্রতি
একটা আবহাওয়া গঠন
করিয়া দেয়।
ইহার জাতীয় ফল অতি ভাল। ইউরোেপ এ বিষয়ে অতি
পশ্চাৎপদ আর এসিয়া তাে সস পাপিষ্ঠ স্ততােধিক।
যাহাদের জাতীয় জীবন গঠন করিতে হইবে, তাহাদের এই
শারীরিক শ্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে হইবে। যে জাতি
শ্রমের সম্মান ও মর্যাদা করিবে না, বর্তমান যুগে সে জাতির

আমার আমেরিকার মতই।।
উত্থান সুদূরপরাহত।
পৈত্রিক সঞ্চিত অর্থের আয়ে মুখে
চেয়ারে বসিয়া নেতাগিরি করিয়া নাম করা সহজ বটে, কিন্তু
পশ্চাৎপদ অধঃপতিত জাতিদের সে রাস্তায় মুক্তি নাই। এই
জন্যই কেবল নব রুষ নহে, নব চীন এবং জাপানও আমেরিকায়
নিকট হইতে আদর্শ গ্রহণ করিতেছে।
যাহারা নূতন চীন গঠন করিতেছেন তাহাদের অনেকে
আমেরিকায় শিক্ষিত। ভারতের দুর্ভাগ্য যে অর্থহীন ভারতীয়
ছাত্রদের আমেরিকায় গমন করিয়া বিদ্যাশিক্ষার পথ তদ্দেশের
গভর্ণমেন্ট কর্তৃক রুদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু অর্থশালী ছাত্রের জন্য
আমেরিকার দ্বার এখনও মুক্ত আছে।

শিক্ষা। আমেরিকায় শিক্ষার বড় আদর, সকলেই জ্ঞানার্জনের জন্য ব্যগ্র। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ (primary education ) আইনানুযায়ী প্রত্যেকের করণীয়। এইজন্য নিরক্ষর লােক সেদেশে বড়ই বিরল যদিচ কোনও শিক্ষকের মুখে শ্রবণ করি- আছি যে আইনের কড়াকড়ি সত্ত্বেও শতকরা পাঁচ জন লােক প্রাথমিক শিক্ষালাভ হইতে নিজেদের বঞ্চিত করে ! আমে- রিকায় সকলে নানাপ্রকারে বিদ্যার্জন করে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ব্যতীত রাত্রিকালীন স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রীষ্ম- বকাশে গ্রীষ্মকালীন স্কুল ( summer session ), এবং বিভিন্ন সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক ইনষ্টিটিউটসমূহ জনসাধারণের বিদ্যা পিপাসার তৃপ্তিসাধন করিতেছে আমেরিকায় নিম্নশিক্ষার জন্য primary school, high school ও তৎপরে বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এই সব public schools সরকারী ব্যয়ে পরিচালিত হয় এবং তথায় ছাত্রেরা বিনা বেতনে বিদ্যালাভ করিতে পারে। 1677 private high school 71 academy 15, সে সব স্থানে ধনাঢ্য বংশের ছেলেরা পাঠ করে। উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আছে। পূর্বদিকে কতকগুলি = তবে আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; কলেজ আছে যথাঃ Amhers ও Hamilton যাহাদের সহিত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নাই। ইহারা M. A. ডিগ্রী পর্যন্ত প্রদান করে। আমেরিকায় বহু বিশ্ববিদ্যালয় আছে তন্মধ্যে কতকগুলি সাম্প্রদায়িক, কতকগুলি ষ্টেটের, কতকগুলি private। অবশ্য সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ষ্টেট হইতে charter লইতে হয় এবং গভর্ণমেন্টের শিক্ষাবিভাগীয় কমিশনারের তত্ত্বাবধানের অধীনে আসিতে হয়। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ্ধতি ইংলণ্ড ও জার্মাণির পদ্ধতির সংমিশ্রণে উদ্ভূত হইয়াছে। ইংলণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি “কলেজ পদ্ধতির” (College system) উপর নির্মিত ; আর জার্মাণির পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ্ধতি ( University system ); যদিচ পূৰ্বে (লুথারের সময়) জার্মাণিতেও “কলেজ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু আমে- রিকায় উভয় পদ্ধতির সার গ্রহণ করা হইয়াছে। আমেরিকায় কতকগুলি কলেজের সমষ্টিতে একটি বিশ্ব- বিদ্যালয় গঠিত হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নানা- প্রকারের কলেজ আছে ; প্রথমতঃ Undergraduate School ও তৎসঙ্গে Engineering School, উভয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রস্বরূপ বিরাজ করে। অনেকস্থলে এই সঙ্গে School of Commerce, Law School, School of Dentistry, Medicine, Theology, Pharmacy, Music, Journalism, agriculture প্রভৃতি নানাপ্রকারের উচ্চ জীবিকার্জ- ; ২।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
নের উপযােগী শিক্ষার জব্দ কলেজ আছে। আবার Art and
Pure Science প্রভৃতি Undergraduate Collegeসমূহের
উপর হইতেছে,
Post-Graduate বিভাগ যাহা Graduate
School নামে অভিহিত হয়। এই স্থলে উল্লেখ্য যে, আমে-
রিকায় সর্বপ্রকারের বিদ্যাপীঠকেই চলিত ভাষায় “স্কুল” বলিয়া
কথিত হয় ; সাধারণতঃ লােকমুখে “কলেজ” শব্দটা ব্যবহৃত
হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি একজন chancellor বা স্থান
বিশেষে President দ্বারা পরিচালিত হয়। ইহাদের উপর
Board of Trustees প্রভৃতি শাসন-সম্বন্ধীয় ও কার্যনির্বাহক
বিভিন্ন কমিটী আছে। আবার গ্রাজুয়েট ও পুরাতন ছাত্রবৃন্দ
লইয়া একটি Alumni Association আছে। যদি কখন বিশ্ব
বিদ্যালয়ের অর্থের প্রয়ােজন হয়, তাহা হইলে এই সমিতির
নিকট হইতে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়।
এবম্প্রকার শিক্ষা-পদ্ধতিতে Undergraduate School
পৰ্যন্ত ইংলণ্ডের অনুকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু B. A. পাশ
করিয়া Post-Graduate বিভাগে উন্নীত হইলে অন্য প্রকারের
শিক্ষাপদ্ধতি দেখিতে পাওয়া যায় ।
এস্থলে জাৰ্ম্মাণ পদ্ধতির
প্রভাব লক্ষিত হয়। এ সময়ে আর খেলাধূলার অবসর থাকে
, নিবিষ্টমনে গভীর অধ্যয়ন করিতে হয় এবং ছাত্রেরা কোন
একটি বিষয়ে বিশিষ্টজ্ঞান (specialization) লাভ করিবার
চেষ্টা করে।
আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবস্তুর নির্বাচন

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সম্বন্ধে সকলে একমত নয়। কতকগুলি বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিধি যে, Undergraduate ছাত্রের স্বীয় ইচ্ছানুসারে যে কোন Course নির্বাচন করিবার অধিকার আছে। কিন্তু অন্যগুলি বলে যে, ইহা ছাত্রদের পক্ষে অমঙ্গলজনক। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে Undergraduate collegeএর পাঠ্য- পুস্তকসমুহকে কতকগুলি Groupএ বিভক্ত করা হইয়াছে যথাঃ নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে—“Scientific-Literary Group,” "Scientific-Historical Group" ইত্যাদি আছে। এই সব বিভাগে কতকগুলি Course অবশ্যপাঠ্য, আর কতকগুলি Course আছে optional—তাহাদের মধ্যে ইচ্ছামত Course নির্বাচন করিয়া লইতে হয়। শেষােক্ত পদ্ধতির সমর্থকেরা বলেন যে, আমেরিকায় Undergraduate ছাত্রেরা অল্প বয়সে (১৮১৯ বৎসর) কলেজে প্রবেশ করে ; তাহাদের যদি ইচ্ছা মত course পাঠ করিবার অধিকার দেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহারা এমন সব course অসংলগ্নভাবে নির্বাচন করিবে যাহা দ্বারা একটা উদার এবং গভীর শিক্ষার উপকারিতা হইতে বঞ্চিত হইবে, অথবা সব বাজে course গ্রহণ করিয়া ফাঁকি দিবার চেষ্টা করিয়া নিজেদেরই পরে ফাঁকি দিবে। অতএব একটা বাঁধাবাঁধি নিয়ম থাকুক। ইহা লইয়া দুই পদ্ধতির পরিপােষক- দের মধ্যে বিবাদ আছে। আমার এখনও স্মরণ রহিয়াছে যে, আমার Alma materএর Dean এক বক্তৃতায় উপহাস করিয়া । বলিয়াছিলেন যে, তাহাদের এই Group-পদ্ধতিকে অনেকে আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ব্যঙ্গ করিত; কিন্তু এক্ষণে Harvard, Yale, Columbia প্রভৃতি বৃহৎ বৃহৎ বিদ্যালয়সমুহ এই পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করি- বার জন্য লােলুপদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিতেছে। তাহার এই উপ- হাসের ভিত্তি এই যে, Harvardএর তদানীন্তন নূতন প্রেসি- ডেন্ট Lowell এই পদ গ্রহণ করিয়াই তথায় Group পদ্ধতি প্রচলিত করিয়াছিলেন। আমি যখন আমেরিকায় Undergraduate ছিলাম তখন এই group পদ্ধতির বিপক্ষে ছিলাম ; কিন্তু অদ্য আমেরিকা ও জাৰ্ম্মাণির শিক্ষা পদ্ধতি নিজে উপলদ্ধি করিয়া ইহা বেশ বুঝি- য়াছি যে, এই group পদ্ধতি অল্পবয়স্ক Undergraduateদের পক্ষে প্রশস্ত ব্যবস্থা। কারণ ইহাতে একটা উদার শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করিয়া দেয়; কিন্তু যথায় ( বিশেষতঃ আমেরি- কার কালিফোর্নিয়া অঞ্চলে) যাহাইচ্ছা নির্বাচনের ব্যবস্থা আছে, তথায় ছাত্রেরা যথেচ্ছা নির্বাচন করিয়া unit ভরাইয়া দিয়া Semster পূরায়। ইহাতে অনেক সময় অক্লেশে একটা Degree পাওয়া যাইতে পারে বটে, কিন্তু একটা উদার শিক্ষার উপকারিতা হইতে বঞ্চিত হইতে হয়। আমেরিকায় ছাত্র যতদিন Undergraduate থাকে ততদিন তাহাকে বিশেষ বাঁধাবাঁধির মধ্যে থাকিতে হয়। প্রথমতঃ একটা termএর পাঠ্য Courseএর উপর নির্ভর করে না, কিন্তু সপ্তাহে কতিপয় ঘণ্টার পাঠ তাহাকে রেজেষ্টারি করিতে হইবে; অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠের পরিমাণের যে ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
নির্দিষ্ট হিসাব আছে তাহার minimum ঘণ্টার পাঠ
ছাত্রকে গ্রহণ করিতে হইবে। এই নির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয়
অনুসারে সপ্তাহে ১২-১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিভিন্ন। কলেজের
termএর প্রারম্ভে প্রত্যেক ছাত্রকে তাহার উপরােক্ত ঘণ্টা
হিসাবের courseগুলি তাহার advisor রূপে নিয়ােজিত অধ্যা-
পকের কাছ হইতে সহি করিয়া লইয়া Deanএর আফিসে দিতে
হয়। প্রত্যেক Undergraduateএর একজন অধ্যাপক তাহার
schoolএর Dean দ্বারা Advisor রূপে নিয়ােজিত হয়, ইনি
ছাত্রের পাঠ্য নিরূপিত করেন। প্রত্যেক termএ সে কতটা
পাঠের ভার বহন করিতে পারিবে তাহার বিচার ও অনুমতি
দেওয়া তাহার হাতে।
ছাত্রের পড়া আরম্ভ হইলে ক্লাসে তাহাকে প্রত্যহ পড়া
দিতে হয়।
অধ্যাপক প্রত্যহ যখন ছেলেদের পড়া জিজ্ঞাসা
করেন তখন তাহার Note Bookএ তৎক্ষণাৎ ছাত্রের উত্তরের
ভালমন্দ বুঝিয়া একটা মার্ক দেন। তৎপরে অনেক সময়ে
সাপ্তাহিক পরীক্ষা, তৎপরে মাসিক পরীক্ষা,
মাসিক পরীক্ষা, Semster
( আমেরিকায় term বলে ) অন্তে শেষ পরীক্ষা হয়। এই
স্থলে অন্যান্য দেশের পরীক্ষার সহিত ইহার বিশেষ প্রভেদ যে,
term শেষ হইলে সমস্ত পরীক্ষার মার্কগুলি একত্রিত করিয়া
অধ্যাপক সেই Courseএর পাশ মার্ক নির্ধারিত করেন।
তাহাতে যে ছাত্র বরাবর নিয়মিতরূপে পাঠ করিয়া আসিয়াছে
সৈ শেষ পরীক্ষায় ফেল হইলেও অনেক সময় Courseএ ফেল

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। হইবার সম্ভাবনা কম থাকে। একটা courseএ ফেল হইলে সেই বিষয়ে পুনঃ পরীক্ষা দিবার তাহার অধিকার আছে। ফলে এই দাড়ায় যে, আমেরিকায় এবং সে হিসাবে বােধ হয় সমস্ত ইউরােপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিদ্যাশিক্ষা দিবার অনুষ্ঠানের স্থানরূপে কাৰ্য্য করে, তাহা ছাত্রের স্মৃতিশক্তির পরীক্ষার মাপ- কাঠির স্থলরূপে পরিণত হয় না এবং অধ্যাপক ছাত্রকে ফেল করিয়া আপনাকে গৌরবান্বিত মনে করে না, বরং তাহার তাহাতে অপমানই হয় এবং নেহাৎ গর্দভ না হইলে ও পাঠে ফাঁকি না দিলে কেহ পরীক্ষায় ফেল হয় না। আবার অন্য পক্ষে যে ভাল পড়া করে না এবং বৎসর শেষে সমস্ত পাঠের উপর যাহার মার্ক শতকরা ৭০ নং না থাকে তাহাদের মধ্যে প্রথম প্রকারের ছাত্রকে কলেজ হইতে বহিস্কৃত করিয়া দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় প্রকারের ছাত্রের ক্লাসে পদোন্নতি হয় না। আমেরিকায় বি-এ ডিগ্রি লইতে হইলে ৪ বৎসর পড়িতে হয়। কিন্তু ইংলণ্ডে তিন বৎসর। আমেরিকায় এই চারি বৎসর Freshman, Sophomore, Junior, Senior নামে চারি ক্লাসে বিভক্ত। একজন নিম্ন ক্লাস হইতে উচ্চ ক্লাসে উঠিতে পারে না; ইহার মানে ইহা নয় যে সে এক ক্লাশে দুই বৎসর থাকিবে ও পুরাতন পড়া পড়িবে। ছাত্র যদি কতকগুলি Courseএ ফেল হয় তাহা হইলে যতদিন সে সেই সব কোর্সে পুনঃ পরীক্ষায় (একটি ফেল কোর্সে দুইবার পুনঃ পরীক্ষা দিবার অনুমতি আছে) উত্তীর্ণ না হয় ততদিন Faculty তাহার ৪ - ૨૨ আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। নাম উপরের ক্লাসের ছাত্র-তালিকায় লিখিবে না। কিন্তু ছাত্র- মহলে ও Students' Unionএ তাহার পদের অবনতি ঘটিবে । এই Students Union কলেজের সমস্ত Undergaduate ছাত্রবৃন্দ লইয়া গঠিত হয়। হাই স্কুলের Matriculation পাশ করিয়া ছাত্রকে কলেজে প্রবেশ করিতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন হাই স্কুলের বিভিন্ন প্রকা- রের Standard থাকাতে ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষার ( Entrance requirement ) বিভিন্ন Standard হওয়ায় অনেক ছাত্রকে সৰ্ত্ত (condition ) লইয়া ভৰ্ত্তি হইতে হয় অর্থাৎ যদি কোন ছাত্র তাহার হাই স্কুলে elementary chemistry at physics 21 biology al 53754 71 97 105149 ভাষা না শিক্ষা করিয়া কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে আসে, তাহা হইলে শেষােক্ত স্কুলের কর্তৃপক্ষ তাহাদের entrance requirementএর সহিত ছাত্র তাহার Matric পরীক্ষার সময় কি কি বিষয় পাশ করিয়াছে তাহা মিলাইয়া দেখেন এবং যদি দেখেন যে ছাত্র কোন কোন বিষয়ে কলেজের requirement পরিপূরণ করিতে পারে না, তাহা হইলে তাহাকে সেই সব বিষয়ে সৰ্ত লইয়া ভর্তি হইতে হইবে অর্থাৎ তাহাকে Undergraduate পঠশায় সেই সব বিষয় পাঠ করিয়া পরিপূরণ করিতে হইবে। আর যে ছাত্র অনেক বিষয়ে entrance requirements পরি- পূরণ করিতে পারে না তাহাকে special ছাত্ররূপে ভর্তি হইতে হয়। সে যতদিন না এই সব সৰ্ত্ত পূর্ণ করিয়া দিতে আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পারে ততদিন তাহার নাম উপরােক্ত কোন ক্লাসের ছাত্র তালিকায় থাকে না। আমেরিকার পূর্বভাগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অতি রক্ষণশীল লক্ষণাক্রান্ত। তথায় entrance requirement পরিপূরণ করি- বার জন্য লাটিন বা গ্রীক ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়। এইজন্য হাই স্কুলে classical লাটিন ভাষা অবশ্যপাঠ্য। বিএ ডিগ্রি লইতে হইলে হয় দুই বৎসর ফ্রেঞ্চ ও এক বৎসর জাৰ্ম্মাণ, বা এক বৎসর ফ্রেঞ্চ ও দুই বৎসর জাৰ্ম্মাণ অবশ্যপাঠ্য। এই জন্য প্রত্যেক ছাত্রকে এই দুই ভাষার অন্ততঃ একটীতেও হাই স্কুলে অধ্যয়ন করিয়া আসিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়া চারি বৎসর পড়িয়া ছাত্রকে বি, এ ডিগ্রি গ্রহণ করিবার সময় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়- মানুযায়ী একটা Thesis লিখিতে হয়। এই Thesis একটি courseএর অনুরূপ বলিয়া গণ্য করা হয় এবং ইহা না লিখিলে ডিগ্রি মিলে না। ইহা ব্যতীত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক ব্যায়াম অবশ্যকরণীয়। ছাত্রকে routine অনুযায়ী সপ্তাহে এক ঘণ্টা করিয়া দুইবার বা ততােধিক বার ব্যায়ামাগারে ( Gymnasium) যাইয়া ব্যায়াম চর্চা করিতে হয়। ইহাও একটী অবশ্য গ্রহণীয় Courseএর তুল্য গণিত হয় প্রত্যেক বারেই ব্যায়াম-শিক্ষকের কাছে হাজরি দিতে হয় । যিনি এই ব্যায়াম Courseএ ফাকি দেন বা ফেল হন (অনুপ- স্থিতির জন্য কোস পূর্ণ না করায়) তাহার ডিগ্রি পাইবার এবং ২৪ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সময় আটক বাধে। Undergraduate জীবনের আর একটি অবশ্যকরণীয় বস্তু—বিশ্ববিদ্যালয়ের Chapelএ প্রত্যেক দিন ধৰ্ম্মোপাসনার সময় উপস্থিতি। যে সব বিশ্ববিদ্যালয় খৃষ্টীয় ধৰ্ম্মের ভিত্তির উপর স্থাপিত অথবা সাম্প্রদায়িক মতবাদের উপর স্থাপিত সে সব স্থানে উপাসনায় উপস্থিতি অবশ্যকর্তব্য। তবে বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু সহস্র ছাত্রের ক্ষুদ্র উপাসনালয়ে একসঙ্গে উপস্থিতি সম্ভব নহে, তথায় routine অনুযায়ী ছাত্রকে হাজিরি দিতে হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসঙ্ঘকে প্রত্যেক দিন উপস্থিতি দিতে হয়। পূর্বাঞ্চলে হার্ডভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় Unitarian নামক উদার সাম্প্রদায়িক মতবাদের উপর স্থাপিত বলিয়া তথায় ধৰ্ম্মাগারে উপস্থিতি অবশ্যকরণীয় নহে; কিন্তু বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ভজনাস্থলের সহিত বন্দোবস্ত করা আছে যাহাতে তৎসম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্র তথায় রবিবারে গিয়া ভজনা করিতে পারে। গ্রীষ্মকালের প্রারম্ভে আকাডেমিক বৎসর শেষ হইলে, undergraduate s post-graduate স্কুল-সমূহের পরীক্ষা শেষ হইলে পরীক্ষোত্তীর্ণ ছাত্রদের ডিগ্রি দেওয়া হয়। ডিগ্রি গ্রহণ করিবার সময় ধুমধামে একটা Commencement Dayর ক্রিয়া নির্বাহিত হয়। ইংলণ্ডে ও ভারতে ইহাকে Convocation Day বলে। এই চরম দিনের এক সপ্তাহ অগ্র হইতেই ডিগ্রিপ্রার্থী ছাত্রদের মধ্যে নানাপ্রকারের ধুমধাম একটি অনুষ্ঠান হইতেছে যে, উত্তীর্ণ ক্লাস আগত চলে।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। Senior FtACP Students' Unionএর মান ও খাতির রক্ষা করিবার জন্য দায়ীত্ব বুঝাইয়া দেওয়া। আর একটি পার্বণ হইতেছে—এই সময়ে একদিন সন্ধ্যাকালে অগ্নি জ্বালা- ইয়া (bonfire) তাহাতে বহি পােড়ান হয় অর্থাৎ যাহার যে কোসে’ বেশী জ্বালা পাইতে হইয়াছে তাহাকে সেই কোসের text book পােড়াইতে হয়। অবশ্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমণ্ডলীর মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি আছে। ছাত্র- মণ্ডলের মধ্যে এই সব সামাজিক ক্রীড়া ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের ফল ভােগ করিতে হইলে আমেরিকায় ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস ( Residence ) প্রয়ােজন। অবশ্য যাহাদের সহরেই বাস তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে (dormitory) থাকে না, কিন্তু বেশীর ভাগ ছাত্ৰই সহরতলি ও গ্রাম হইতে আসে, তাহাদের ছাত্রাবাসেই থাকিতে হয়। এই একত্র বাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ompus এ একটা সামাজিক জীবন গঠিত হয়। কিন্তু এই জীবন ইউরােপের মহাদেশখণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে নাই । আমেরিকার ছাত্রজীবন তদ্দেশের যুবকদের জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় ; কারণ ছাত্রাবস্থায় বিদ্যাশিক্ষা ব্যতীত নানা প্রকারের সামাজিক ব্যাপার, ক্রীড়া, ক্লাব, সাহিত্যিক সমিতি, কলেজের মাসিক পত্রিকা পরিচালনা, রাজনীতির চচ্চা প্রভৃতি নানাবিধ অনুষ্ঠানের ভিতর জীবন অতিবাহিত হয় বলিয়া এই সময়কার মধুময় স্মৃতি জীবনে চিরকাল জাগ্রত থাকে। অনেকে ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। এই সময়ে নানা সামাজিক ব্যাপারে যােগদান করিয়া নিজেদের ভাবী স্ত্রীর সন্ধান করিয়া লন। অনেকেই যাঁহারা পঠদ্দশায় কোন মহিলার সহিত বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হইবার জন্য প্রতিজ্ঞ। বদ্ধ থাকেন, তাহারা বি-এ ডিগ্রি পাইয়া বিবাহ করিয়া অর্থোপার্জনে মনােযােগ করেন। আর যাহারা বেশী পাঠ করিয়া উচ্চ ডিপ্লোমার প্রার্থী হন তাহারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন, বাকী সকলেই সংসারে মন সন্নিবেশিত করেন। আমেরিকার ছাত্রজীবন জগতে অতুলনীয়। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজেও এ ছাত্রজীবন পাওয়া যায় না। অবশ্য আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন ইংরেজী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনেরই ক্রমবিকাশ। ই লণের জীবনই আমেরিকায় স্থানান্তরিত হইয়াছে। তথাপি প্রভেদও উৎপন্ন হইয়াছে—আমেরিকার বিশেষত্ব অন্যত্র পাওয়া যায় না। যাহারা বি-এ বা বি-এসসি পাশ করিয়া উচ্চ ডিগ্রীর প্রার্থী হন তাহারা আর এক বৎসর বা ততােধিক সময় পাঠ করিলে এম-এ বা এমএসসি ডিগ্রি পাইবার অধিকারী হন। অবশ্য এ পাশেও কড়া পরীক্ষা আছে। কিন্তু Graduate Schoolএ পাঠ করিবার সময় আর undergraduate collegeএর মতন বাঁধাধিতে থাকিতে হয় না । Postgraduate ডিপ্লোমা-প্রার্থীরা যাহা ইচ্ছা পড়িতে পারেন, তবে একটি বিষয়কে প্রধান (major) study করিয়া লইতে হয় এবং বাকী একটি বা দুইটি বিষয়কে minor study করিয়া

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
সইতে পারা যায়। ছাত্রকে প্রধান বিষয়েই বিশেষ জ্ঞান
(specialization) লাভ করিতে হইবে এবং ইহারই উপর সে
ডিপ্লোমা পাইবে।
পােষ্ট গ্রাজুয়েট
ছাত্রদের ক্লাসে রীতিমত হাজিরে দিবার
বাঁধাবাঁধি নিয়ম নাই ; কামাই করিলে ভয়ের কারণও নাই; তবে
মাসিক ও term:শেষে প্রত্যেক কোর্সের পরীক্ষা আছে এবং
তাহাতে অতি উচ্চ মার্ক রাখিতে হয়। এ বিষয়ে সমগ্র
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক রীতি প্রায়ই নাই অর্থাৎ যদিচ সর্বত্রই
পােষ্ট গ্রাজুয়েট ছাত্রকে তাহার পােষ্ট গ্রাজুয়েট কোর্সে
শতকরা ৮-৯ নং পাশ মার্ক রাখিতে হয়, তথাচ কোন
কোন স্থানে সেই ছাত্র যদি কোন undergraduate কোস
লয় তাহা হইলে তাহাকে শতকরা ৭০ নং পাশ মাক’ রাখিতে
হইবে যদিচ সেই কোসে undergraduate ছাত্রের পক্ষে
শতকরা ৬০ নং হইতেছে পাশ মাক।
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কোসে’ পাশ করিবার জন্য
নিম্নলিখিত বিধান আছে। কোসে'র পরীক্ষাপত্রের পূর্ণ মাক
হইতেছে ১০০ ; তাহা পঞ্চম ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে; যথা-
৫০-৫৯ (E), ৬০-৬৯ (D), ৭০-৭৯ (G), ৮০-৯০ (B),
৯০-১০০ (A)। ইহার মধ্যে E হইতেছে ফেল মার্ক
আর D সর্বনিম্ন পাশ মার্ক। আবার এই মার্কের মধ্যে যােগ
ও বিয়ােগের চিহ্ন ( plus and minus signs) দ্বারা
মার্কের তারতম্য করা হয় । যথা—কেহ যদি D—(ডি মাইনাস)
==
২৫

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। মাক প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে তিনি সে কোসে ফেল হইলেন আবার যদি কেহ D+(ডি প্লাশ) মাক প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে তিনি সে কোর্সে পাশ মা প্রাপ্ত হইলেন ত বটেই, তবে তাহার মার্ক ৬০-৬৯ মধ্যে পড়িল ইত্যাদি। পূর্বেই বলিয়াছি যে, পােষ্ট গ্রাজুয়েট বিভাগে পাঠকালে পরীক্ষায় বেশী পাশমার্ক রাখিতে হয়; কারণ undergraduate বিভাগে অনেকে বিশেষ ঃ ধনীর সন্তানেরা, সামাজিক ও ক্রীড়া কৰ্ম্মে বিশেষ অনুরাগী হয় বলিয়া তৎকালে পরীক্ষায় বেশী কড়াকড়ি নাই ; কিন্তু post-graduate বিভাগে পাঠের সময় বেশী সময় পড়াইয়া ও পরীক্ষা শক্ত করিয়া Faculty তাহা পূর্ণ করিয়া লয়। আর যাহারা post-graduate study করেন, তাহারা নিজেদের জীবন শিক্ষক বা অধ্যাপকের কর্মে নিয়ােজিত করিবেন বলিয়াই উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। তাঁহাদের সেই জন্য ফাঁকি দেওয়া চলে না এবং উচিতও নহে। তাহাদের বুদ্ধি ও মৌলিকত্ব প্রদর্শন করিতে হয়। তৎপরে এম-এ ডিপ্লোমা গ্রহণ করিয়া ডাক্তারের ডিপ্লোমার প্রার্থী হওয়া যায়। অথবা তিন বৎসর post-graduate study করিয়া “ডাক্তারের ডিপ্লোমার প্রার্থী হওয়া যায় কিন্তু তাহা হইলে এম-এ ডিপ্লোমা মিলে না। আমেরিকায় ডাক্তারের ডিপ্লোমার মধ্যে কেবল Ph.D ডিপ্লোমা দেওয়া হয়। অবশ্য fof Sai 79 M.D. Pedagogyou Dr. of Pedagogy, কোন কোন স্থানে Dr.of commerce ডিপ্লোমাও প্রদান করা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। হয়। 17 L. L. D fucatat "Honoris causa" i প্রদান করা হয়। Post-graduate studyর সময় আমেরিকা জাৰ্ম্মণির অনুকরণ করে। আমেরিকার এই “ডাক্তার” ডিপ্লোমা জার্মাণির অনুকরণেই প্রদান করা হয়। বি.এ পাশ করিয়া তিন বৎসর পড়িয়া একটা মৌলিক গবেষণাপূর্ণ Dissertation লিখিয়া মৌখিক পরীক্ষায় পাশ হইলে Ph. D ডিপ্লোমা পাওয়া যায়। অতএব আমেরিকায় High School হইতে উত্তীর্ণ হইয়া ৭ বৎসর পড়িলে “ডাক্তার” ডিপ্লোমা পাওয়া যায় আর জার্মানির Hochschuleএর পরীক্ষা পাশ করিয়া তিন বৎসর পড়িলে “ডাক্তার” ডিপ্লোমা পাওয়া যায়। এই জন্য আমেরি- 717 B. A fu att stort for High School certificate (avetorium ) সহিত সমান গণ্য হয়, যদি আমেরিকা বা ইংলণ্ডে বি.এ ডিগ্রী-প্রাপ্ত ছাত্র জার্মাণির Hochschule- উত্তীর্ণ ছাত্রাপেক্ষা বেশী বিষয় পড়ে। জাৰ্ম্মাণির Standard of Education নিম্ন স্কুল হইতেই অন্যান্য দেশ হইতে অতি উচ্চ ; সেইজন্য দেশের শিক্ষা-বিভাগের দাবীও বেশী । যাহাই হউক, উভয় দেশের Ph. D. শ্রেণীতে পড়িয়া আমি ইহা উপ- লব্ধি করিয়াছি যে, আমেরিকার Ph. D ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি জাৰ্মাণ হইতে বেশী কোস পড়ে সেই জন্য তাহার খবরও বেশী জানা থাকে। কিন্তু শিক্ষা সম্বন্ধে দুই দেশে প্রভেদও আছে। আমেরিকায় Undergraduate বিভাগের বিদ্যা গভীর হয় না। ' আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। একজন B. A. “তিগ্ৰী”-প্রাপ্ত যুবক অনেক বিষয়ে কিছু কিছু জানে বটে, কিন্তু তাহার জ্ঞানের গভীরত্ব-প্রাপ্তি হয় postgraduate পাঠের সময়। অবশ্য আমেরিকান পণ্ডিতেরা বলেন যে Undergraduate কলেজ গভীর জ্ঞানলাভের স্থান নহে। একজন তরুণ যুবক যে চিকিৎসা-বিদ্যা বা আইন অধ্যয়ন করিবে অথবা ব্যবসায়ে লিপ্ত হইবে অথবা নিম্নশ্রেণীর স্কুলের শিক্ষক হইবে তাহার পক্ষে জগতের জ্ঞান সাধারণভাবে জানা থাকিলেই যথেষ্ট। Specialist হইতে হইলে আরও বেশী পাঠের প্রয়ােজন এবং জ্ঞানের গভীরতা অনেক সময় অধ্যাপকের বিদ্যার উপর নির্ভর করে । অধ্যাপকের যদি গভীর জ্ঞান ও মৌলিকত্ব থাকে, তাহা হইলে ছাত্রদেরও বিশেষ জ্ঞান- লাভ হয়। আমেরিকায় Ph. D ডিপ্লোমাপ্রার্থীকে যে সব নিয়মাধীন হইতে হয় তাহা এই ডিপ্লোমার জন্য পৃথিবীর সর্বত্রই সাধারণতঃ সমানভাবে বিদ্যমান। কিন্তু নিম্নলিখিতভাবে বিশেষত্ব আছে যথা—কতকগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের “ডাক্তার”-ডিপ্লোমার প্রার্থী হইবার এক বৎসর অগ্রে তাহাকে তাহার উপযুক্ততা প্রমাণ করিবার জন্য একটা preliminary পরীক্ষা দিতে হয় ; পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলে তাহাকে “ডাক্তার”-ডিপ্লোমার প্রার্থী বলিয়া গণ্য করা হয় এবং তাহাকে তাহার অধ্যাপকের অনু- মত্যনুসারে Facultyর কাছে Dissertationএর subjectmatterএর নামটী পেশ করিতে হয়। ইহা পরীক্ষার এক আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। বৎসর পূর্বে করিতে হয়। যদি Faculty তাহার “topic গ্রাহ্য করিয়া লয়, তাহা হইলে তাহাকে মৌলিক গবেষণায় নিযুক্ত হইতে হয়। এই শেষ বৎসরে ছাত্রকে তাহার major course, (যে কোসে সে ডিপ্লোমা গ্রহণ করিবে) একটা Seminar গ্রহণ করিতে বাধ্য। এই Seminarএ ছাত্রকে মৌলিকত্ব দেখাইতে হয়, কোন বিষয় মৌলিক অনুসন্ধান করিয়া গবেষণা- পূর্ণ প্রবন্ধ পাঠ করিতে হয়, তকবিতক করিতে হয় ইত্যাদি। ছাত্রের Dissertation লেখা সমাপ্ত হইলে Facultyতে তাহা দাখিল করিতে হয়, এবং তাহা গৃহিত হইলে মৌখিক পরীক্ষার সময় নির্ধারিত হয়। এই সময় সে যে সব বিষয় sitt pfauts ( Major and Minor studies ) otto মৌখিক পরীক্ষা সেই সব বিষয়ের অধ্যাপকদের সম্মুখে দিতে হয়। সমবেত পরীক্ষকেরা যদি তাহাকে “পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে বলিয়া রায় দেয়, তাহা হইলে সে Faculty কর্তৃক “ডাক্তার” ডিপ্লোমা প্ৰদানিত হইয়া সম্মানিত হইবে। পূর্বে বলিয়াছি যে, আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতি elective-পদ্ধতির উপর স্থাপিত ; তথাকার বিদ্যাও তৎপ্রকারে elective। বহু পূর্বে আমেরিকান ছাত্রেরা দলে দলে ইউ- রােপে আসিত; বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিশেষতঃ তাহারা ণিতে আসিত। আমেরিকার বিজ্ঞান জাৰ্ম্মাণি হইতে, সাহিত্য-চৰ্চ্চ ইংলণ্ড হইতে সংগৃহীত। তবে আজকাল আমে- রিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিদেশীয়ের প্রভাব হইতে মুক্ত হইয়াছে। *

আমার আমেরিকার অভিতা।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক অধ্যাপকের অভ্যুদয়
হইয়াছে, এইজন্য অল্প ছাত্ৰই বিদেশে বিদ্যাশিক্ষার জন্য যায়।
তবে একথা স্বীকার করিতে হইবে যে, আমেরিকার অনেক
প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক জাৰ্মাণজাতীয় ও বাকীরা বেশীর ভাগই
জাৰ্মাণীতে শিক্ষিত।
জগতে উচ্চ শিক্ষা লাভ করিতে হইলে অথবা বিজ্ঞান
উত্তমরূপে শিক্ষা করিতে হইলে, জাৰ্মাণ ও ফরাশি ভাষা
শিক্ষার বিশেষ প্রয়ােজন ; কারণ বিজ্ঞানের বিশেষ চর্চা
ঐ দুই দেশে হইতেছে। এইজন্য যিনি বৈজ্ঞানিক জগতে
নূতন আবিষ্কার ও মতামতের সংবাদ রাখিতে চাহেন তাহাকে
উপরােক্ত দুই ভাষা শিক্ষা করিতেই হইবে। এইজন্য
আমেরিকার High School-এতে জাৰ্মাণ ও ফরাশী ভাষা
অবশ্য পঠনীয় বলিয়া গণ্য হয় এবং Undergraduate
Collegeএ এই দুই ভাষা পড়িতে হয়। শেষে Ph. D.
পরীক্ষা দিবার সময় পরীক্ষার্থী ছাত্রের এই দুই ভাষার সহিত
পরিচয় আছে তজ্ঞাপক Certificate প্রদান করিতে হয় ;
কিন্তু অনেকস্থলে মধ্যপ্রদেশে ইহার ব্যতিক্রমও হয়,
যথা :—lowa Universityতে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা এই যে, যিনি উচ্চ শিক্ষা
লাভ করিতে চাহেন তাহাকে জগতের গুটীকতক ভাষা শিক্ষা
করিতেই হইবে। Goethe-এর সেই পুরাতন উপহাস,
“যিনি একটি ভাষা জানেন তিনি কোন ভাষাই জানেন

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
না” কথাটীর অর্থ আছে। আমরা দেশে কেবল ইংরেজী
পড়ি বলিয়াই আমাদের জ্ঞান সংকীর্ণ ও একদেশদর্শী ; আমরা
একটা দ্রব্যকে বিভিন্ন দিক্ দিয়া নিরীক্ষণ করিতে পাই না।
এইজন্যই আমাদের শিক্ষিতমণ্ডলীর বিদ্যা কূপের গণ্ডীর
মধ্যে আবদ্ধ থাকে বলিয়া আমাদের মন ‘কালা ইংরেজত্বে”
পরিণত হইয়াছে। আমাদের বিদ্যার অর্থ ভারত সম্বন্ধে
কতকগুলি অস্পষ্ট ও ভ্রান্ত ধারণা শিক্ষা করা ও ইংলণ্ডের
পুরাতন বিদ্যার চর্বিত চর্বণ করা। তৎপরে ইংলণ্ড বিজ্ঞান
সম্বন্ধে পশ্চাৎপদ রহিয়াছে। জাৰ্মাণীর পণ্ডিতেরা তাহাদের
ঘাের শত্রু ফ্রান্সের সম্বন্ধে বলেন যে, বিজ্ঞান সম্বন্ধে ফ্রান্স ও
জাৰ্মাণী উভয় দেশ সমানভাবে চলিতেছে, কিন্তু ইংলণ্ড
৩০ বৎসর পশ্চাতে রহিয়াছে। কিন্তু বিগত যুদ্ধের প্রয়ােজনের
প্রেরণায় Physics ও Chemistryতে নাকি ইংলণ্ড অগ্রসর
হইয়াছে। এই সব কারণে আমরা কেবলমাত্র ইংরেজী
ভাষার ছাত্র বলিয়া নিজেরাও অগ্রসর হইতে পারিতেছি না।
মহিলাদের শিক্ষার জন্যও আমেরিকায় বিশিষ্ট ব্যবস্থা
আছে। পূর্বদিকে Co-education System ( যুবক
যুবতীদের এক সঙ্গে শিক্ষা পদ্ধতি ) প্রচলিত নাই বলিয়া,
তথায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রীলোেকদের জন্য পৃথক কলেজ
আছে, যথাঃ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Berhard College,
Brown ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে স্ত্রীলােকদের জন্য
পৃথক কলেজ আছে ; তদ্ভিন্ন, নিউইয়র্ক ষ্টেটে Vassar
5.
৩৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। College, নব-ইংলণ্ডে Bryn Mawr College প্রভৃতি। এই সব কলেজে “M. A” পর্যন্ত ডিগ্রি দান করা হয়, আর বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কলেজগুলিতে Doctor ডিগ্রি পর্যন্ত প্রদান করা হয়। ইহা ব্যতীত, জীবিকানির্বাহের জন্য যে সব বিদ্যালাভ প্রয়ােজন, যথা :--শিক্ষয়ীত্রির কৰ্ম্ম, ব্যানিজ্যাদি, ডাক্তারি, আইন প্রভৃতি জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সব Teachers School, School of Commerce, Medical School, Law School প্রভৃতি আছে, সেই সব প্রতিষ্ঠানগুলিতে মহিলাছাত্রীরা অবাধে প্রবেশাধিকার লাভ করেন, অর্থাৎ তথায় Co-education পদ্ধতি প্রচলিত আছে। কিন্তু মধ্য- পশ্চিম ও পশ্চিমে সর্ববিষয়েই Co-education পদ্ধতি প্রচলিত আছে বলিয়া তৎস্থান সমূহে স্ত্রীলােকদের জন্য পৃথক কলেজের বন্দোবস্ত নাই। এবম্প্রকারের উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত মহিলারা জীবনের সর্বৰ- কৰ্ম্মেই নিযুক্ত হন। তাঁহারা স্বীয় জীবিকার্জনের জন্য কোন একটী পেষাবলম্বন করিয়াছেন বলিয়াই যে তাহারা সকলে অবিবাহিতা থাকেন তাহা নহে; অনেকে বিবাহিত জীবন ; যাপন করেন। জগতের সর্বত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্কীর্ণতা আছে। প্রথমতঃ অনেকের মতে বিদ্যালয়ে যে শিক্ষা লব্ধ হয় তাহাতে বিদ্যা পূর্ণতা লাভ করে না, ছাত্রকে নিরূপিত পাঠ্য পাঠ ও অধ্যাপকের মতগুলিকে আবৃত্তি করিতে আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। শিখিতে হয়—ইহাতে তাহার নিজের চিন্তাশক্তি বিকাশ প্রাপ্ত হয় না। এই দলের ব্যক্তিরা বলেন যে, যাহারা জগতে গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তি বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যা শিক্ষা করেন নাই—যথা :--“জষ্টুয়ার্ট মিল, হাবট স্পেস” ইত্যাদি। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষায় এবারের দোষ থাকিলেও একটি বিশেষ সুবিধা আছে ; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় চিন্তাবৃত্তিকে একটা Training দিয়া দেয় যাহা দ্বারা লােক জীবনের সর্বকর্মে যুক্তি ও পদ্ধতি অনুসারে কাৰ্য্য করিতে পারে। দ্বিতীয় দোষটী অতি মারাত্মক এবং এ দোষ সংশােধনের পথ এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। এই দোষটীর মূল কারণ এই যে, সর্বত্রই বিদ্যালয়গুলি হয় গভর্ণমেন্টের অথবা কোন সম্প্রদায়ের, এবং সর্ব বিদ্যাপীঠই ধনীশ্রেণীর অর্থে কোন বিদ্যালয়েই একটা স্বাধীনমতের উদ্ভব হইতে পারে না। Upton Sinclairএর “Goose step in Education” নামক পুস্তক পাঠ করিলে এই দোষটী কি তাহা ভালরূপে বােধগম্য হইবে। যে সব বিদ্যালয় গভর্ণমেন্ট পােষিত, তথায় তাহার স্বার্থবিরুদ্ধ কোন প্রকার শিক্ষার বা মতের চর্চা হইতে পারে না; যে সব বিদ্যালয় সাম্প্র- দায়িক, তথায় তৎ সম্প্রদায়ের গোড়ামীই কেবল শিক্ষা দেওয়া হয়। তৎপরে যে সব বিশ্ববিদ্যালয় এ সব বিষয়ে স্বাধীন অথচ ধনীশ্রেণীর দ্বারা পােষিত, তথায় সেই শ্রেণীর চালিত। ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
ফলে
স্বার্থবিরুদ্ধ কোন প্রকার শিক্ষার চর্চা হইতে পারে না।
আজকালকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি “গােলামখানায়”
পর্যবসিত হইয়াছে। বােধ হয় এ বিষয়ে প্রাচীনকালের বিদ্যা-
পীঠ হইতে বর্তমানের বিদ্যালয়গুলির শিক্ষাপদ্ধতি নিকৃষ্ট।
ইহাতে মানুষ গঠিত না হইয়া গােলামেরই সৃষ্টি হইতেছে।
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি দোষ-তথায়
Capitalist-শ্রেণী-পরিপুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রের চিন্তার
স্বাধীনতার উদ্বোধন না করিয়া তাহাকে গােলামে পরিণত
করা হয়। এইজন্য অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধৰ্ম্ম, সামাজিক,
আর্থনীতিক, রাজনীতক, radical মতাবলম্বী অধ্যাপকের
স্থান নাই। সাম্প্রদায়িক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গোড়ামীর
শ্রাদ্ধ করা হয়, আর Capitalist পােষিত বিদ্যালয়ে শিক্ষা
দেওয়া হয় যে ধনীশ্রেণীর অর্থনীতি-বিজ্ঞানই যথার্থ তথ্য,
তাহাদের স্থাপিত সমাজই মানুষের চরমােন্নতি। এই স
কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন প্রকার radical মতের চর্চা
হইতে পারে না বলিয়া কতকগুলি একদেশদর্শী Fanatic
বাহির হয়। এই জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সর্বত্রই সঙ্কীর্ণতার
দুর্গস্বরূপ হইয়াছে। ইহার ফলে স্বাধীনদেশসমূহের বেশীর
ভাগ ছাত্রবৃন্দ Chauvinism রােগাক্রান্ত। ইহাকে তাহারা
স্বদেশপ্রেম নামে অভিহিত করে।
আমেরিকার বিদ্যালয়ে ছাত্ৰমণ্ডলীর মধ্যে রাজনীতির
আলােচনা হয়। জাতীয় পর্ব উপলক্ষে অথবা Semster
৩৭

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
;
‘শেষ হইলে বা কলেজ বন্ধ হইলে Chapelএ সমবেত ছাত্রবৃন্দ
জলদগম্ভীরস্বরে জাতীয় সঙ্গীত গান করে। কলেজে জাতীয়
ভাবের বিশেষ আধিক্য ; কিন্তু তাহা শাসকশ্রেণীর জাতীয়
ভাব ও রাজনীতিক মতবাদ ; বিরুদ্ধ মতবাদ প্রচার প্রস্ফুরিত
হইতে পারে না, যথা সােসালিজমের চর্চা করিতে আপত্তি
নাই কিন্তু তাহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিলেই Dean-এর কাছ
হইতে ধমকানি খাইতে হয়।
আজকাল পৃথিবীর সর্বত্র নব্য শিক্ষার ফলে মানুষের
মন এক ছাঁচে ঢালা হইতেছে। আধুনিক বিদ্যা আন্তর্জাতিক,
তজ্জন্য শিক্ষিত ব্যক্তির মন এবং চিন্তাও তদ্রুপ স্বদেশের গণ্ডীর
বাহিরে যাইতেছে। সেইজন্য একজন জাপানী, একজন
আমেরিকান ও একজন ইউরােপীয়, এই নব শিক্ষার ভিত্তির
উপর দণ্ডায়মান হইয়া নিজেদের বােধগম্য করিতে পারে এবং
নিজেদের মধ্যে বিশেষ প্রভেদ আছে বলিয়া মনে করে না।
তথাপি প্রত্যেক দেশের শিক্ষায় একটা বিশেষত্ব আছে।
আমেরিকার বিদ্যার মধ্যে দিয়া যে world-view শিক্ষা
দেওয়া হয় তাহা ইংলণ্ড, জাৰ্মাণী, বা ফ্রান্স হইতে পৃথক।
ইহা বিভিন্ন দেশে বিদ্যালাভ ও সেইসব দেশের সাহিত্যের
সহিত পরিচয় না থাকিলে বােধগম্য হওয়া দুরূহ। পৃথিবীর
সর্বত্র এক বিজ্ঞানই ( Concrete Science ) পড়ান হয়,
তথায় কোন গােল নাই; কিন্তু Abstract science যথা
সামাজিক বা অন্য প্রকারের দর্শন শাস্ত্রে ভিন্ন মুনির ভিন্ন মত

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
আছেই, তদ্ব্যতীত বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, সামাজিক
ও আর্থনীতিক সমস্যার আবর্তে পড়িয়া ঐ সব দর্শন
তদনুযায়ী বিশেধ প্রকারের world-view সৃষ্ট হইয়াছে।
ইহা প্রাচ্যভূখণ্ডের সভ্যতা ও জাতিসমূহের উপর আমেরিকান
জনমতেই দ্রষ্টব্য।
আমেরিকায় জা ওসমস্যা ( Race-problem ) আছে,
তাহার বিষয় ফলও তদ্দেশের সভ্যতার সর্ব অঙ্গেই প্রবেশ
করিয়াছে। আমেরিকানের মনে ও চিন্তায় তাহা প্রতিনিয়তই
প্রতিফলিত হইতেছে। কিন্তু জাৰ্মাণীতে ও ইউরােপীয় মহাদেশে
সে সমস্যা নাই বলিয়া সে স্থানে প্রাচ্য সভ্যতা ও জাতিসমূহের
সম্বন্ধে অন্য ধারণা। আমেরিকায় Colour Problem
আছে বলিয়া তাহার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তথাকার সমাজ রং
বিভাগের উপর প্রতিষ্ঠিত ও সমাজতত্ত্বের World-viewও
তদনুরূপ। কিন্তু ফ্রান্স ও জাৰ্মাণীতে ঐ সমস্যা নাই বলিয়া
জাতিতত্ত্ববিষয়ে অন্যপ্রকারের ধারণা। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে,
আমেরিকার যুক্তসাম্রাজ্যের রং-সমস্যা আছে বলিয়া তথাকার
জাতীয় জীবনে রং বিভীষিকা এত প্রবল যে আমেরিকান জাতি
পৃথিবীর মধ্যে একটা সৃষ্টিছাড়া জাতি হইয়াছে। এ বিষয়ে
আমেরিকানেরা নিজেরাই বিশেষ দুঃখিত! কিন্তু অন্যদিকে এই
বৈষম্যের জন্যই আমেরিকায় radicalism-এর প্রাবল্য।
ফ্রান্স ও বলশেভিক রুষ ছাড়া আমেরিকা বােধ হয় জগতের
তৃতীয় দেশ যথায় radical চিন্তা জনসমাজে বর্তমান আছে।
৩৯

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
আমেরিকার শিক্ষা অন্যান্য দেশ হইতে স্বভাবতঃই নূতন
ভাবপ্রসূত। তথাকার পাঠ্যপুস্তক, পাঠ্যবস্তু ও চিন্তাতে আধুনিক
ভাব বর্তমান। তথাকার অধ্যাপকেরা এই সব বিষয়ে ইংলণ্ডকে
ঠাট্টা করেন, কারণ ইংলণ্ডে পুথিপাতি সবই মান্ধাতার
আমলের। আমেরিকা নূতন দেশ বলিয়া প্রাচীন সংস্কারবদ্ধ নয়,
এবং আধুনিক জ্ঞান ও ভাবকে সহজেই জীর্ণ করিতে পারে।
কিন্তু আমেরিকা যতই অগ্রগামী হউক না কেন এক জায়গায়
তাহার একটা গণ্ডি আছে, radicalism তাহার বাহিরে
যাইতে পারে না; অর্থাৎ শাসক শ্রেণীর (আমেরিকায় ধনী
শ্রেণী, তথায় Plutocracy বর্তমান) স্বার্থ ও সংস্কার বিরুদ্ধ
মতবাদ আলােচিত হইতে পারে না। বর্তমান সমাজ ও ষ্টেট
যে প্রকারে অবস্থিত তাহাকে radical অবস্থায় রূপান্তরিত
করা অথবা radical মতবাদ প্রচার করা আইন বিগহিত
কৰ্ম্ম। এইজন্যই স্বাধীন চিন্তা বা মানবের স্বাধীনতার পূর্ণ
ভাব তথায় স্ফুর্তি পাইতে পারিতেছে না। অবশ্য অন্যান্য
দেশেরও এই অবস্থা।
৪০

সমাজ
আমেরিকান সমাজ সাম্যবাদী অর্থাৎ সমাজ পদমর্যাদার
তারতম্যতা হেতু বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত নহে। এই পদমর্যাদার
বিভিন্নতার পরিচায়ক নানা প্রকারের পদবী (titles ) লােক
মধ্যে প্রচলিত নাই। এক কথায় আমেরিকান লোক-সমাজে
সকলেই “বরাবর’ অর্থাৎ সমান। আর্থিক অবস্থার তারতম্যতা-
জনিত কোন বৈষম্য সমাজে উপস্থিত হয় না। সামাজিক
বিষয়ে সকলেই এক সঙ্গে আহার বিহার ও বিবাহাদি করে ;
সকলেরই সমান অধিকার ও দাবী, সকলেই Mr
Gentleman.
আমেরিকান ষ্টেট জন-তন্ত্রের উপর সংস্থাপিত এবং
ঔপনিবেশিক সময় হইতেই তৎকালিন সমাজ সাম্যবাদী।
ষ্টেটের Constitution সকলকেই সমান অধিকার দিয়াছে ;
এইজন্যই আজ পর্যন্ত সাম্যবাদের হাওয়া তৎদেশে বিশেষ
ভাবে প্রবল। যে ব্যক্তি অতি গরীব সেও নিজ অধ্যবসায়-
গুণে অতি উচ্চাবস্থায় আরােহণ করিতে পারে এবং প্রেসিডেন্ট
পৰ্যন্ত হইতে পারে। তাহার হীনবংশ, সাংসারিক দুরবস্থা
এবং শিক্ষার সংকীর্ণতা প্রভৃতি জীবনের উৎকর্ষ ও সফলতা-
লাভের অন্তরায় হয় না। তৎদেশে মানবের মনুষ্যতাকে খর্ব
করিবার কোন ব্যবস্থা নাই; এইজন্য সকলেই জগৎকে
৪১

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। মায়াময় বলিয়া দেখেন না; সকলেই Optimist, জগৎকে বিষবৎ বলিয়া কেহ ত্যাগ করিতে চায় না বরং প্রকৃতিকে তাহার অধীনে আনিয়৷ জগৎকে ভোগ করিতে চায়। প্রকৃতির শক্তিসমূহকে স্বীয় বশে লইয়া আসিয়া জগৎকে ভােগ কর, মানবের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশের প্রতিরােধ বা খর্ব করা বিধেয় নয়, যত নিস্পীড়িত ও নির্যাতিত লােক- সমূহ তথায় অ৷৷সয়া নিজেদের মনুষ্যশক্তির প্রস্ফুটন ও উৎকর্ষতার জন্য সাধনা করুক; ইহাই হইতেছে আমেরিকান সাম্যবাদের মূলমন্ত্র। ইহাকেই নবাগত ঔপনিবেশিকদল বলে “Americanism”। কিন্তু ইহা হইল আমেরিকান সাম্যবাদের একটি বঁধা গৎ (established dogma) ; কাজের বেলায় ইহা কতটা সাফল্য লাভ করে তাহই এই স্থলে আলােচ্য। উত্তর-আমেরিকার উপনিবেশসমূহ ধৰ্ম্মবিশ্বাসের জন্য নির্যাতিত, রাজনৈতিক অত্যাচারে প্রপীড়িত, ধনী-শ্রেণী দ্বারা নিষ্পেষিত, অর্থ-কষ্টে ক্লিষ্ট ইউরােপীয়ান লােকসমূহের দ্বারা সংস্থাপিত। অবশ্য দক্ষিণে (ভার্জিনিয়া প্রভৃতি স্থলে) জনকতক ইংরেজ ধনীবংশের বংশধরেরা তথায় Cotton plantation স্থাপন করিয়া বসবাস করিয়াছিল। দক্ষিণের জমি অতি উর্বরা, তথায় তুলার চাষে প্রচুর লাভ হয় এবং এই চাষ করিবার জন্য ইংরেজ ঔপনিবেশিক গভর্ণমেন্ট আফ্রিকা হইতে নিগ্রো কৃতদাস আমদানী করিতে আরম্ভ করে। এই- রূপে অল্পখরচায় তুলার আবাদ করিবার জন্য যে জনকতক 82 আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; ধনাঢ্যবংশীয় ইংরেজ দক্ষিণে বসবাস করিয়াছিল তাহারাই তথাকার Aristocracyরূপে গণ্য হইত। ইহারাই আমেরি- কান সমাজের গৌরবস্থল; কারণ, ইহাদের দ্বারা ইউরােপীয়ান “আভিজাত্য বংশের রক্ত” তাহাদের ভিতরে আসিয়াছে। এই কতিপয় বংশের দ্বারা নাকি Anglo-norman আভিজাত্য বংশের রক্ত আমেরিকান সমাজে বহমান হইতেছে এবং ইহারাই আভিজাত্য-গ-আকাক্ষী লােকদিগের মুখ বাঁচান ! আবার অন্যদিকে উত্তরের নব-ইংলণ্ডের ( New England ) ঔপনিবেশিকেরা May Flower Immigrantsদের বংশধর, তজ্জন্য তাহাদের বংশধরেরা তৎস্থানের আভিজাত্যশ্রেণী! ইহারা “May Flower Society," "Sons and Daughters of May Flower” ইত্যাদি নাম দিয়া বিভিন্ন সমিতি করিয়া নিজেদের বংশগৌবব অক্ষুন্ন রাখেন। তাহাদের বংশ- তালিকাদি পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। এক হিসাবে তঁাহারা তথাকার “কুলীন” হইবার চেষ্টা করেন, কিন্তু কাৰ্যতঃ অন্য লােক হইতে তাহাদের কোন বিশেষত্ব বা পার্থক্য নাই। আবার বর্তমানের ঔপনিবেশিকেরা উপবােক্তদের পরিহাস করিয়া বলেন যে, May Flowerএর ঔপনিবেশিকেরা শ্রমজীবি ছিল, তাহারা সংখ্যায় ছিল মুষ্টিমেয় ; কিন্তু আজ যুক্ত-সাম্রাজ্যের দশকোটি লােকই তাহাদের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিতেছে। যাহারা ইংলণ্ডের ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন তাঁহারা জানেন যে, তৎদেশের রাজা প্রথম জেমস তথাকার

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
Presbyterianদের উপর নারাজ ছিলেন। ইহাদের
গোঁড়ামীর নাম দেওয়া হইয়াছিল puritanism। এই দলভুক্ত
কতিপয়শত লােক যাহারা বেশীর ভাগ কায়িক শ্রমের দ্বারা
জীবিকা নির্বাহ করিতেন, তাহারা রাজ-রােষ হইতে নিজেদের
বাঁচাইয়া অবাধে স্বীয় বিশ্বাস ও বিবেকানুযায়ী ধর্মচর্চা
করিবার জন্য May Flower নামক একটি জাহাজে আরােহণ
করিয়া উত্তর-আমেরিকায় পলাইয়া যান। তাহারা আবার
উত্তর-পশ্চিমদিকে উপনিবেশ স্থাপন করেন। পরে ক্রমশঃ
অনেক ইংরেজ তথায় আসিয়া বাসস্থান করে ও সময়ে
চারিদিকে বিস্তৃত হয়। এই সব ইংরেজ ঔপনিবেশিকেরা
স্বীয় নব-বাসভূমিকে জন্মভূমির নাম অনুসারে নব-ইংলণ্ড
বলেন। এইজন্যই আজ পৰ্যন্ত, Rhode Island,
Vermont, Connecticut, Massachusetts gero
Statesকে New England বলে। এই স্থানের অধিবাসীরা
এককালে বিশুদ্ধ ইংরেজ বংশীয় ছিল, কিন্তু বর্তমান যুগে
আইরিশ ও অন্যান্য জাতিসমূহ তথায় বাস করিয়াছে ;
পুরাতন অধিবাসীরা অনেকে অর্থান্বেষণে অন্যত্র
বাহির হইয়া গিয়াছে। এই স্থান ইংরেজ-প্রধান উপনিবেশ।
ছিল বলিয়া এইখানকার সব বিষয়ে ইংরেজী আচার বর্তমান।
অনেকের উচ্চারণ (accent) ইংরেজের ন্যায় ; অনেক সময়ে
বাহিক আকারে ইংলণ্ড ও নব-ইংলণ্ডের লােকদের পৃথকভাবে
চেনা যায় না। নৃতত্ত্ববিৎ অধ্যাপক Starr বলেন, জলবায়ুর
৪৪

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পৃথকতার জন্য উভয় দেশের লােকদের মধ্যে বর্তমানে বাহ্যিক পার্থক্য উপস্থিত হইয়াছে। কিন্তু এই মত সৰ্ববাদিসম্মত বৈজ্ঞানিক মত নহে। যাহাহউক বহু প্রকারের নিষ্পীড়িত ও নিধন লােক আমেরিকায় আসিয়া বন কাটিয়া আদিম অধিবাসীদের প্রবঞ্চনা করিয়া, তাড়াইয়া বা মারিয়া জমি দখল করিয়া বসবাস করিয়াছে। স্বভাবতঃই ইহাদের ভিতর আভিজাত্য বা শ্রেণীগৰ্ব থাকিতে পারে না। কিন্তু যখনই গরীব ব্যক্তি ধনী বা নামজাদা হয় তখন সে “হঠাৎ বাবু” (nouveau riche) হওয়া জনিত petty-bourgeois psychology দ্বারা প্রণােদিত হইয়া উচ্চের দিকে তাকায়। সে তখন উচ্চবংশ- মৰ্যাদার জন্য ও সামাজিক সম্মানের জন্য লালায়িত, নিজেকে সাধারণ শ্রেণী হইতে পৃথক করিবার জন্য “চন্দ্র, সূৰ্য” হইতে বংশােব বলিয়া নিজের বংশতালিকা সৃষ্টি করে এবং নানা- প্রকারে নিজেকে উপরিস্তন শ্রেণীতে উত্তোলন করিবার জন্য চেষ্টা করে। এই মনস্তত্ত্ব প্রণােদিত হইয়াই গরীব আদিম ঔপনিবেশিকদের বর্তমান বংশধরগণ পরবর্তী উপনিবেশিক- দের উত্তরাধিকারীগণ হইতে সমাজে বেশী সম্মানলাভ করিবার জন্য নানা প্রকারের সমিতি স্থাপন করিয়া নিজেদের বিশিষ্ট স্থাপন করিবার চেষ্টা করে। এবম্প্রকারে যাহাদের উত্তরপুরুষেরা জাতীয় স্বাধীনতা-সমরে ও পরবর্তী অন্তযুদ্ধে (civilwar) যােগদান করিয়াছিল তাহারা “sons ৪৫ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। and daughters of the Revolution" ejero faro করিয়া নিজেদের বংশের বিশিষ্টতা জ্ঞাপন করেন ; কিন্তু প্রাচীন ঔপনিবেশিক সময়ে ও তৎপরবর্তীকালে বংশ বা ধনের তারতম্যতার জন্য সমাজে বাঁধাবাঁধি বিভিন্ন স্তর যথা : শ্রেণী ( class ) বা জাতি (caste ), গঠিতে পারে নাই। ঔপনিবেশিকেরা ইউরােপের আভিজাত্য-তন্ত্র (Aristocracy) বা সামন্ততন্ত্র (Feudalism) নবজগতে প্রতিষ্ঠিত করে নাই, কারণ বেশীর ভাগ লােকই নিম্নশ্রেণী সস্তৃত। আর দুই চার জন যে দক্ষিণে “বড়বংশের ছেলে ছিল তাহারাও নবদেশে নিজেদের পার্থক্য রাখিতে পারে নাই। তৎপরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর “মুড়ি মিছরির” একদর হইয়াছিল। “Declaration of rights of man” সকলকেই সমান করিয়াছিল। ইহার পর বাকী থাকে, মুষ্টিমেয় সুইডিস, জাৰ্মাণ ঔপনিবে- শিকের দল ; তাহাদের উপনিবেশসমূহ ইংলণ্ড কর্তৃক বিজিত হইলে তাহারা কালে ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের সহিত মিশিয়া যায়, যদিচ আজ পর্যন্ত Pennsylvaniaতে জাৰ্মাণ ঔপনিবেশিকদের বংশধরেরা জাৰ্মাণ ভাষায় কথা কহে। ইহাদের জাৰ্ম্মাণকে plattdeutsch (Low-German) বলে ; ইহা জাৰ্মাণীর গ্রাম্য ভাষা। ইহাদের গ্রামে গিয়া কেছ ইংরেজীতে কথা কহিলে তাহারা অবাক হইয়া বলিবে যে “সে বিদেশী” ! এই ঔপনিবেশিকদের মধ্যে আর একটি দল সৃষ্টি হইয়াছিল যাহারা প্রথমে সমাজের বাহিরে থাকে ; ৪৬ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ইহারা শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের দল। পূর্বেই বলিয়াছি যে ক্রীতদাস প্রথা ইংরেজ গভর্ণমেন্টই তথায় প্রচলিত করে, সেইজন্য অনেক আমেরিকান উক্ত গভর্ণমেন্টের উপর অনুযােগ করে। শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাসেরা ইংলণ্ড, স্কটলণ্ড, আয়লণ্ডের বিদ্রোহী কয়েদীদ্বারা গঠিত হইত। এই বিদ্রোহীদের ইংরেজ গভর্ণমেণ্ট দক্ষিণের তুলার আবাদিদের কাছে বিক্রয় করিত। তৎপরে অনেক গরীব শ্বেতাঙ্গ ঐসব দেশ হইতে ক্রীতদাসরূপে বা indentured labourer-রূপে দক্ষিণে আনীত হইত। শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাসেরা কিন্তু জীবনের শেষ দশায় মুক্তি লাভ করিয়া শ্বেতাঙ্গ সমাজে মিশ্রিত হইয়া যাইত, আর কৃষ্ণকায় নিগ্ৰোক্রীতদাসেরা মুক্তি পাইত না এবং রং ব্যবধানের জন্য চিরকাল পৃথক থাকিতে বাধ্য হইয়া বর্ণ সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছে। এবম্প্রকারে আমেরিকার যুক্ত সম্রাজ্যের ভিত্তি পত্তন হইয়াছে। এই প্রকারের সমাজের প্রথমাবস্থায় বেশীর ভাগ লােকই কৃষিজীবি ছিল। যত দিন দেশ কৃষি-প্রধান ছিল ততদিন সমাজে বৈষম্যের উৎপাদন হয় নাই। তৎপরে ঔপনিবে- শিকদের বংশবৃদ্ধি হওয়ায় নূতন জমির অন্বেষণে Alleghany পর্বতমালা উল্লম্বন করিয়া দলে দলে অসমসাহসিকের দল পশ্চিমে মিসিসিপি উপত্যকার দিকে ধাবিত হইতে লাগিল। ইহাদের pioneers বলিত; ইহারা নবস্থানে গিয়া আদিম অধিবাসীদের মারিয়া বা তাড়াইয়া জঙ্গল কাটিয়া বসবাস ; ৪।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
করিতে লাগিল। ইহাদের সঙ্গে এবার চরিত্রের নবাগত
ইউরােপীয়ান pioneer-রাও জুটিতে লাগিল। যাহারা ফরাশী
De Tocqeuevill-এর “আমেরিকায় ভ্রমণ বৃত্তান্ত” নামক
পুস্তকে বিবৃত এই pioneerদের জীবন-সংগ্রামের কাৰ্য পাঠ
করিয়াছেন, তাহারাই বােধগম্য করিবেন যে এবম্প্রকারের
সমাজে সাম্যবাদই প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে; কিন্তু যতই দেশ
সমৃদ্ধিশালী হইতে লাগিল, ব্যক্তি বিশেষের ধন সম্পদ বৃদ্ধি
হইতে লাগিল ততই সমাজে অল্পে অল্পে বৈষম্যের রেখা প্রকাশ
প্রাপ্ত হইতে লাগিল। শ্বেতজাতি সর্বপ্রথমে পূর্বাঞ্চলে বসবাস
করে। আমেরিকান চর্চা এই পূৰ্ব্বদিকেই প্রথমে বিশেষভাবে
প্রস্ফুটিত হয়, এই চর্চ৷ ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের বংশধরদের
দ্বারাই উৎকর্ষ সাধনলাভ করে। তথায় যখন জনকতক
বংশের মধ্যে অপরিমিত ধনের সঞ্চার হইল, তখন তাহারা
নিজেদের নিধন উত্তর পুরুষদের বিবরণ বিস্মৃত হইয়া গিয়া
ইংরেজী সামাজিক চাল গ্রহণ করিতে আরম্ভ করে।
ইহারা ইংলণ্ডে আসিয়া তথাকার রাজদরবারে প্রবেশলাভ
করিতে চেষ্টা করে। অর্থের সাহায্যে ইহারা ইংলণ্ডের
আভিজাত্যবর্গ মধ্যে মিশিতে আরম্ভ করে ; আর অনেক
দেউলিয়া ইংরেজ ও ইউরােপীয় আভিজাত্যশ্রেণীর লােক
এই আমেরিকান “নূতনধনীর” কন্যা বিবাহ করে। এই
প্রকারে ইউরােপের শ্রেণী ও জাতি বৈষম্য প্রধান সমাজের
ছায়ায় আসিয়া আমেরিকান ধনীরা স্বদেশে শ্রেণীবিভাগ
৪৮

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
স্থাপন করে। ইহার ফলেই পূর্বদিকে Newport সমাজের
সৃষ্টি। এস্থলে কোটিপতিরা নিজেদের বাসস্থান করিয়াছেন,
নিজেদের সংকীর্ণ সমাজের মধ্যে সামাজিক আদান প্রদান
করেন এবং সুবিধা পাইলে ইংলণ্ডের আভিজাত্য বংশের
সহিত বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ হন।
মানবসমাজে আর্থিক বৈষম্যতার জন্যই শ্রেণীর উদ্ভব
হয়, এবং এই শ্রেণী-বিভেদ পুরুষপরম্পরায় দৃঢ় ও বংশগত
হইলে জাতি (caste) বিভেদে পরিণত হয়। তদ্রুপ
আমেরিকায় ধনের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ায় পুরাতন সাম্যবাদ
বিনষ্টপ্ৰায় ও অনেকস্থলে বিনষ্ট হইয়াছে। যেখানে ব্যক্তি-
বিশেষ নিজের সৎ বা অসৎ উপায়ে অবাধে ধনােপাৰ্জন
করিয়া তাহা “স্বীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে ও তাহার
তেজে নিজেকে মূলধনী (Capitalist) রূপে রূপান্তরিত করিয়া
অন্যকে শােষণ (exploit) করে সেই capitalist লক্ষণাক্রান্ত
সমাজে আর্থনীতিক তারতম্যের জন্য সামাজিক বৈষম্যের
উদয় হয়। তথায় ধনীরা উচ্চশ্রেণীর লােক আর নিধনেরা
তদধীন শ্রেণীর লােক বলিয়া গণ্য হয়। এই আর্থনীতিক
কারণেই আমেরিকার সমাজে বিভিন্নস্তরের আবির্ভাব
হইয়াছে যথা—ধনকুবের-শ্রেণী, • মধ্যবিত্ত-শ্রেণী ও নিধন
কায়িকশ্রমজীবি-শ্রেণী।
সাধারণতঃ এই বলা যাইতে পারে যে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ
সমাজে caste-এর আবির্ভাব এখনও হয় নাই, যদিচ শ্বেতকায়
৪১

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
এবং
ও কৃষ্ণকায় আমেরিকানদের মধ্যে বর্ণ বৈষম্যজনিত caste
সৃষ্ট হইয়াছে। এই উভয় দলের মধ্যে কোন প্রকারের
সামাজিক ও আহারাদির আদান প্রদান নাই। এস্থলে এই
বিভেদ দৃঢ় ও বংশগত হইয়াছে ; অতএব এস্থলে জাতি বিভাগ
বর্তমান আছে। কিন্তু শ্বেতাঙ্গসমাজে এবম্প্রকারের জাতি
বিভাগ কিরূপে উৎপন্ন হইয়াছে তাহা এইস্থলে বিবেচ্য। যখন
Newport-47 তাহার বাহিরের ধনকুবেরের
সর্বপ্রকারের সামাজিক সম্বন্ধ নিজেদের শ্রেণীর মধ্যে সংকীর্ণ
করিয়া গণ্ডীবদ্ধ করেন, যখন এই সমাজের কোনও ব্যক্তির
কন্যা গরীবের ছেলের সহিত স্বেচ্ছায় বিবাহ করিলে সেই
কন্যাকে আত্মীয়গণ কর্তৃক ত্যজ্য হইতে হয় তখন এই বংশগত
শ্রেণী বিভাগকে caste বলা ব্যতীত অন্য নামে অভিহিত
করা যায় না। অবশ্য আমেরিকার নবপ্রতিষ্ঠিত সমাজে
ইউরােপের সামন্ততন্ত্রিক সমাজের ( feudal society) ন্যায়
বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে connubium (পরস্পরের বিবাহের )
অধিকার আইন দ্বারা নিষিদ্ধ নহে। আমেরিকান সমাজ
Bourgeois-প্রধান সমাজ অর্থাৎ ফরাশী-বিপ্লব যে সাম্যের
আদর্শ দেখাইয়াছিল তাহাতে feudalism ভাঙ্গিয়া
bourgeois ( মধ্যবিত্ত ) শ্রেণীর আধিপত্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত
হয়, আমেরিকান সমাজ সেই আদর্শে পরিচালিত।
আমেরিকান বিপ্লবের সময় এই আদর্শকেই সাম্যবাদীর
আদর্শ বুলিয়া ধরা হইয়াছিল, আর ফরাশী বৈপ্লবিকদের মধ্যে

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
তাহার ঢেউ আসিয়া পড়ে। এই মধ্যবিত্তশ্রেণী-প্রধান
আমেরিকান সমাজে প্রথম হইতেই feudalism-এর বীজ
ছিলনা; সকলেই খাটিয়া খাইত, সকলেই Gentleman
বলিয়া গণ্য হইত। কিন্তু কালে আর্থনীতিক প্রভেদবশতঃ
সমাজশরীরে ধনী ও নিধনীর আবির্ভাব হইল। সে অবস্থায়
ধনপ্রধানমূলক সমাজে ( capitalistic society) শ্রেণী-
বিভাগ অপরিহার্য। তৎপরে আধুনিককালে ধনের গরমে
ধনকুবেররা snobs হইয়াছেন,
তাহাদের উত্তরপুরুষদের
ইতিহাস ভুলিয়া গিয়াছেন;
চন্দ্র সূৰ্য্য হইতে
বংশােৎপত্তির তালিকা সৃজন বা আবিষ্কার করিতেছেন, আর
গরীবদের সঙ্গে connubium স্থাপনে অনিচ্ছুক ! অবশ্য
অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত বংশ যথাঃ, উকিল বা ডাক্তারের সঙ্গে,
ধনকুবেররা বিবাহাদি করিতে পারেন কিন্তু তাহা প্রেমেরই
ফলস্বরূপে দৈবাৎ ঘটে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এস্থলে একটী ঘটনা
উল্লিখিত হইতে পারে। ১৯১২ খৃষ্টাব্দে পরলােকগত কোন
কোটিপতিএকজন ডাক্তারের কন্যাকে মনােনীত করিয়া তাহাকে
দ্বিতীয় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করিবার জন্য বাগদত্তা হয়েন।
বিবাহটা একটু অসাধারণ ভাবে হইয়াছিল এবং তজ্জন্য ইহা
সংবাদপত্রে অধিকভাবে আলােচিত হয়। প্রথমে কোটিপতি
তাহার প্রথম স্ত্রী হইতে বিবাহবন্ধনে ( ডির্ভোস ) বিচ্ছিন্ন
হইয়াছেন; কিন্তু নিউইয়র্কের আইন অনুসারে ফারখত দিয়া
দ্বিতীয়বার দার গ্রহণের জন্য যে ব্যবধান সময় উত্তীর্ণ হইবার
এ
;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। প্রয়ােজন তাহা এস্থলে হয় নাই ; দ্বিতীয়তঃ, পাত্রী ১৮ বৎসরের কন্যা ও পাত্র ৪০ বৎসরের উর্ধে—৫০এর কাছা- কাছি এবং পাত্রী এক সামান্য ডাক্তারের কন্যা। এমন অবস্থায় এ বিবাহে “প্রেম” কতটা লীলা করিয়াছিল তাহা সন্দেহের স্থল। সংবাদপত্রের লােকেরা যখন এই পাত্রীকে এবিষয়ে প্রশ্ন করিয়াছিল, তিনি উত্তরদান করেন যে, তিনি ধনের লােভে নহে প্রেমের জন্যই বিবাহ করিতেছেন। আবার অন্যদিকে Newportএর একজন প্রধান সামাজিক নেত্রী মিসেস্ম ( যিনি আর একজন কোটিপতির স্ত্রী। তিনি সংবাদ পত্রের রিপাের্টারকে বলিয়াছিলেন, “আমি জানিনা মিঃ এ কি দেখিয়া ইহাকে বিবাহ করিতে ইচ্ছুক (What did Mr. A saw in her!); তবে জানিনা সমাজ এই পাত্রীকে কি ভাবে গ্রহণ করে। মিঃ এর টাকা আছে, বজরা (yacht ) ইত্যাদি আছে, জানিনা সমাজ ইহাকে কিভাবে গ্রহণ করিবে!” এইপ্রকারের অনুলােম বিবাহ জাতি- বৈষম্যের ততটা পরিচায়ক নহে, কারণ এই দৃষ্টান্তের পাত্র ও পাত্রী উভয়েই বুরজোয়া সমাজভুক্ত। ঐ আমেরিকান পাত্রটী ইউরােপীয় ফিউডেল বংশােদ্ভব নহে। সেইজন্য বৈষম্য বিশেষ ভাবে প্রকাশ হইতে পারে না। যে শ্রেণী-বৈষম্য এই স্থলে দৃষ্ট হয় তাহা পাত্রের অর্থদ্বারা দূরীভূত হইতে পারে, কিন্তু একটি প্রতিলােম বিবাহের দৃষ্টান্ত দিতেছি যাহাদ্বারা জাতি- বৈষম্যের প্রকটতা স্পষ্টই প্রতীত হয়। ১৯১৩ খৃঃ সংবাদ- • ৫২ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পত্রে প্রকাশ পায় যে উক্ত Newport সমাজের এক অনূঢ়া- কন্যা তাহার পিতার chaffeui -এর সঙ্গে পলাইয়া (elope) গগাপনে তাহাকে বিবাহ করিয়াছে। সংবাদপত্রে আরও প্রকাশ যে কন্যার পিতা ও মামা এ সংবাদ পাইবামাত্র দুইদিকে মােটর গাড়ি করিয়া বাড়ীর মেয়েকে ধরিবার জন্য দৌড়িয়াছিল, কিন্তু পলাতকেরা অন্য রাস্তা দিয়া এক গ্রামে গিয়া সেই রাত্রেই তথাকার ধর্মযাজককে নিদ্রা হইতে উত্তোলন করিয়া বিবাহ সম্পন্ন করিয়াছে। যখন উভয়ে ধর্মমতে গির্জায় গিয়া স্বামী ও স্ত্রী সম্বন্ধে আবদ্ধ হইল তখন গুরুজনের আপত্তি আর চলিতে পারেনা। এই ঘটনায় আমেরিকান সমাজে বড়ই হুলস্থুল পড়ে! কন্যার গুরুজনের মুখ হেঁট হয় যেহেতু তাহাদের বাড়ীর চাকরের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ হইল । এক বৎসর বাদে সংবাদপত্রে প্রকাশ পায় যে উক্ত কন্যা পুত্রবতী হইয়াছে ও পিতামাতার সহিত পুনর্মিলন হইয়াছে, কিন্তু কন্যার স্বামীকে তাহার শ্বশুরবাড়ীতে কখনও গ্রহণ করিবেনা, অর্থাৎ সে স্ত্রীর পৈতৃক সমাজে কখন গৃহিত হইবে ! এই প্রতিলােম বিবাহের দৃষ্টান্ত কি আমেরিকায় বীজ রূপে Caste-system-এর পরিচায়ক নহে? তৎপর আর একটী দৃষ্টান্ত দিই যাহা আমি ব্যক্তিগত ভাবে জানি। আমি বষ্টনে একটি শিক্ষিত মহিলার সহিত পরিচিত হইয়াছিলাম, যিনি প্রতিলােম বিবাহ করিয়া পিতৃভবন হইতে বহিষ্কৃত হইয়াছেন। ইনি একজন ধর্মযাজকের কন্যা, কিন্তু একজন

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
অজ্ঞ আইরিশ চাকর-শ্রেণীর লােককে বিবাহ করিয়াছেন
বলিয়া পিতার গৃহ হইতে পরিত্যক্তা হইয়াছেন। অবশ্য
আমেরিকায় প্রাচীন রােম, মধ্যযুগের
ইউরােপ বা ভারতের
ন্যায় বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে Connubium (বিবাহের অধিকার)
অপ্রচলিত নহে বলিয়া এই Caste-system হিন্দুদের মতন
দৃঢ় হইতে পারে নাই ও প্রতিলােম-বিবাহ-প্রসূত সন্তান
মাতার আত্মীয়দের দ্বারা ত্যজ্য হয় না। আমেরিকায় বয়ঃ-
প্রাপ্ত যুবক যুবতীদের মধ্যে স্বেচ্ছায় পাত্র বা পাত্রী মনােনীত
করিয়া বিবাহ করিবার নিয়ম আছে। আর আইন কোন কোন
স্থানের নিগ্রো, ভারতবাসী, আদিম-অধিবাসী, চীনা ও
জাপানী ব্যতীত সকলকার মধ্যে অবাধে বিবাহের ব্যবস্থা
করিয়া দিয়াছে। সেইজন্য Caste-system শ্বেতাঙ্গ জাতির
মধ্যে অতটা দৃঢ়ীভূত হইতে পারিতেছে না, যদিচ উপরােক্ত
দৃষ্টান্তগুলিতে দেখা যায় যে উহার বীজ সমাজে নিহিত
হইয়াছে। একবার কোনও আমেরিকান শিক্ষিত মহিলার
সহিত ভারতের জাতি-বিরােধের আলােচনা-কালে আমি
Newport সমাজের রীতির উল্লেখ করিয়াছিলাম। তিনি
প্রথমে আমেরিকায় যে “জাতিভেদ আছে তাহা স্বীকার
করিতে প্রস্তুত হয়েন নাই, কিন্তু Newport-এর দৃষ্টান্ত দেখা-
ইলে অগত্যা স্বীকার করিলেন, “হ্যা, আমেরিকার
সমাজে কতিপয় ব্যক্তিরা ভূস্বামী হইয়া নিজেদের মধ্যে
একটি Caste সৃষ্টি করিতেছে।” অবশ্য সকলেই বলেন
৫৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। যে ইহারা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়, এবং বিশাল আমেরিকান সমাজ সাম্যবাদী। আর আমেরিকান সাম্যবাদ বুঝিতে হইলে পশ্চিমে যাইতে হইবে যেখানকার লােকেরা ঘাের সাম্যবাদী। পশ্চিম অপেক্ষাকৃত সাম্যবাদী, কারণ উপনিবেশ তথায় নূতন হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে। তাহারা pioneer- দের বংশধর। সকলেই কুলীমজুরের সন্তান সন্ততি, কৃষিজীবিকা সম্বল, কাযেই তাহারা সাম্যবাদী। তথাকার সমাজ প্রাচীন হইলে কি আকারে পরিণত হয় তাহা এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত। আমেরিকান সমাজ সাম্যবাদী বলিলে কেহ না যেন বুঝেন যে সকলেই সমাজের এক মঞ্চে অধিষ্ঠিত আছেন। কোনও মানব সমাজ homogeneous নহে; তাহা নানা শ্রেণী, নানা স্তরে ও গণ্ডীতে বিভক্ত। আমেরিকা সাম্যবাদী অর্থে তথায় সকলকার সমান রাজনীতিক অধিকার আছে, ‘one man one vote” প্রথা তথায় প্রচলিত। ইহার জোরে একজন কুলীর-সন্তান নিজের অধ্যবসায়গুণে দেশের প্রেসিডেন্ট পৰ্য্যন্ত হইতে পারে। তাহার হীনবংশে জন্ম, তাহার রাজনীতিক ও আর্থনীতিক জীবনের উন্নতির অন্তরায় হয় না—দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রেসিডেন্ট Andrew lackson নিরক্ষর ও Garfield গরীবের পুত্র ছিলেন। কিন্তু যথার্থ সাম্যতা থাকিলে পরস্পরের মধ্যে যে প্রকার সমবেদনা, সহানুভূতি, সমবায় ও আর্থিক সামঞ্জস্য থাকে যাহার দ্বারা

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
সকলেই স্বীয় গুণানুসারে যথাসম্ভব উচ্চে উঠিতে পারে, আর
কেহ কাহাকেও ধ্বংশ করিবার চেষ্টা করে না, আমেরিকান
সমাজে তাহার অত্যন্ত অভাব। এই সমাজে ধনীরা কোটিপতি
হইয়া বিলাসে গড়াগড়ি দিতেছেন আর অন্যদিকে নিধনেরা
দারিদ্রে নিষ্পেষিত হইতেছেন। আর্থিক অবস্থা ভেদে
সমাজে উভয় প্রকার লােকের স্থানেরও তারতম্য হইতেছে।
অতএব কি প্রকারে বলিতে পারা যায় যে সমাজে যথার্থ
সাম্য আছে ? আমেরিকান সমাজে আজকাল ধনীর জয়-
জয়কার, তাহার ক্ষমতা অসীম, সে গভর্ণমেন্টকে গড়িতেছে,
ভাঙ্গিতেছে, যুদ্ধ বিগ্রহাদি তাহার স্বার্থানুমােদিত হইয়া
ঘটিতেছে। সে বিদ্যাপীঠ স্থাপন করিয়া নিজের স্বার্থানুযায়ী
দর্শনের প্রচার করিতেছে, তাহার ভয়ে কেহ মুখ খুলিয়া
স্বীয় মত ব্যক্ত করিতে পারে না। তাই বলি, এ হেন
capitalist-প্রধান সমাজে সাম্য কোথায়?
আমেরিকান জাতীয় শরীর উপরােক্ত প্রকারে ধনী ও
নিধনে বিভক্ত। তৎপরে গণ্ডীর ভিতর আবার নানাপ্রকারের
গণ্ডী আছে যথা—অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের এক সমাজ,
অবস্থাহীন অথবা কারীকর (mechanics) প্রভৃতি—যাহাদের
গরীব মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত বলা যায় তাহাদের এক সমাজ ;
তৎপরে গরীব ও মজুরদের পৃথক সমাজ। এই সমাজের
অর্থ এই যে, লােকেরা নিজেদের সমযােগ্য ব্যক্তিদের সহিত
সামাজিকভাবে মেশামেশি করে। ধনীর গণ্ডীর ভিতর কুলীর

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। বাড়ীর লােক আসিয়া সামাজিকতা ও আহারবিহারাদি করিতে পায় না ; আবার প্রথমােক্ত সমাজে গরীব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লােকের সহবাস পােষায় না। সে সেস্থলে fish out of water ( খাপছাড়া) রূপে প্রতীত হয়। আবার অঙ্গ- দিকে বুরজোয়ার সমাজে কুলীর বাড়ীর লােকের স্থান নেই। কিন্তু আমেরিকান সমাজে ইউরােপীয় “Feudalism” বা হিন্দুর “Caste”এর গন্ধ নাই বলিয়া গরীবের ছেলে যখন ক্রোড়পতি হয় তখন সে তাহার পূৰ্বশ্রেণী হইতে বহির্গত হইয়া ধনকুবেরের শ্রেণীভুক্ত হয় ও ধনীদের সহিতই তাহার দহরম্ মহরম্ চলে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ধনকুবের হারিম্যান ও এ কারনেগী প্রভৃতিকে উল্লেখ করা যায়। অর্থের মাহাত্ম্যে ইহাদের পূর্বস্মৃতি, বংশগৌরবের অভাব ও দারিদ্রের “কালীমা” সবই চাপা পড়িয়া যায়। অবশ্য ইহারা বহু ক্রোড়পতি বলিয়া জগতের সর্বত্রই সম্মানিত হইয়াছেন। কিন্তু আর যে সব nouveau riche ২৪ মিলিয়নপতি তাহাদের অবস্থা কিরূপ? এই বিষয়েই একবার আমি কোন আমেরিকান বন্ধুর বাড়ীতে আলােচনা করিতেছিলাম ; ইহারা অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী- ভুক্ত, পেশায় উকিল ও সামাজিক ব্যক্তি। আলােচনা কালে আমি বলিয়াছিলাম যে nouveau richeএরা (স্বকীয় উপ- র্জনে একপুরুষে ধনী) কি সমাজ পায় না? দৃষ্টান্তস্বরূপ বলিয়াছিলাম যে অমুকের wholesale grocery store আছে, সে দুই মিলিয়নপতি, তাহার স্ত্রী ইংলণ্ডের উচ্চ সমাজে প্রবেশ অামার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। লাভ করিয়াছে এবং রাজদরবারেও গমন করে ; আর অমুকের Beer factory আছে, সে জাৰ্মাণী হইতে কপর্দকশূন্য ঔপ- নিবেশিকভাবে আমেরিকায় আসিয়াছিল। এক্ষণে সে চারি মিলিয়নপতি ; ইহাদের কি সমাজের উচ্চস্তরে গ্রহণ করা হয় নাই ? ইহার উত্তরে গৃহস্বামী আমায় বলিয়াছিলেন, “হাঁ, ইহাদের সমাজ আছে; কিন্তু কি প্রকারের সমাজের সহিত ইহারা আদান প্রদান করে ?” আমার বন্ধু-বংশ নব-ইংলণ্ডের একটী প্রাচীন ঔপনিবেশিক বংশ এবং ইংলণ্ডবিজেতা নৰ্মান William the conqueror-এর ধ্বজবাহকের বংশধর বলিয়া গরিমা করে। অর্থ হিসাবে এই বংশের কর্তা উপরােক্ত দুই- জন ধনী অপেক্ষা নিকৃষ্ট কিন্তু বংশ গরিমার মাহাত্মে নিজেকে সমাজের কুলীন বলিয়া গণ্য করেন; কারণ নব-ইংলণ্ডে (বষ্টন প্রভৃতি স্থানে) আভিজাত্য গৌরব বংশতালিকা ও বিদ্যাগর্বের উপর নির্ভর করে। ইহাতে প্রতীত হয় যে পূর্বাঞ্চলে বংশগৌরব কেবল ধনের উপর নির্ভর করে না, যে সব প্রাচীনবংশসমূহ আর্থনীতিক অথবা অন্যান্য কারণ বশতঃ বহুকাল হইতে সম্মানিত হইয়াছে, তাহারা সমাজে “কুলীনত্ব প্রাপ্ত হইয়া তজ্জনিত বিশেষত্বের দ্বারা লােকমধ্যে নিজেদের গৌরবান্বিত করিবার জন্য চেষ্টা করে। এখানে এক গণ্ডীর মধ্যে আর এক গণ্ডী অঙ্কিত হইয়াছে, এক সমাজ চক্রের ভিতর আবার বিভিন্ন ক্ষুদ্র চক্র গঠিত হইয়াছে। ৮ ; ৩. আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। এইরূপে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ সমাজে প্রথমে অর্থনীতিক তারতম্য অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণীর (Class) উদয় হইয়াছে। আবার এই বৃহত্তর শ্রেণীর মধ্যে বংশমর্যাদা, বিদ্যাগরিমা, পেশা ইত্যাদি লইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমাজচক্রের উদ্ভব হইয়াছে। বাহির হইতে লােকে বলিবে আমেরিকায় জঘন্য পদমর্যাদা- সূচক খেতাব সমূহ ( Titles ) নাই; সকলেই “মিষ্টার” সকলেরই সমপ্রকারের অধিকার ও দাবী; স্বীয় ক্ষমতা ও বুদ্ধি অনুসারে স্বীয় জীবনকে সফল করিতে পারে, এবং জাতীয় জীবনের উচ্চ শিখরে আরােহন করিতে পারে। তৎপরে। শ্বেতাঙ্গ জাতির মধ্যে অবাধে পরস্পরের সহিত বিবাহের আদান প্রদান ও একত্র ভােজন ( Connubiun and Commensality ) প্রচলন আছে। অতএব “সাম্যবাদ” তথায় বর্তমান ! একজন ইউরােপীয় বা এসিয়াবাসীর নিকট এই সব অনুষ্ঠানগুলি সাম্যবাদের পরিচায়ক হইতে পারে, কারণ তাহার দেশে ইহার অত্যন্ত অভাব ; কিন্তু আমেরিকার সমাজ শরীরে প্রবেশলাভ করিয়া তাহার প্রত্যেক অঙ্গকে তন্ন তন্ন করিয়া নিরীক্ষণ করিলে পৰ্যবেক্ষণকারীর অন্য ধারণা হইবে । আমেরিকার তথাকথিত সাম্যবাদ অষ্টবিংশ শতাব্দীর চিন্তাপ্রসূত। “ফরাশী বিপ্লবে” তাহার উৎকর্ষতা লাভ করে। এ যুগের সাম্যবাদের মূলমন্ত্র ছিল যে, প্রাচীন বংশানুক্রমিক আভিজাত্যবর্গকে ( Feudal Aristocracy) বিনষ্ট করিয়া আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সমাজের হর্তাকর্তারূপে উত্থান করান। উপরেরস্তরের ব্যক্তিদের সহিত সাম্য করিতে হইবে অর্থাৎ রাজা, খেতাবওয়ালা আভিজাত্যের দল স্বীয় উচ্চাসন হইতে অবতরণ করিয়া উকিল, ডাক্তার ও ব্যবসায়ীদলের সহিত একমঞ্চে বিরাজ করিবে। তৎকালীন সাম্যবাদ অর্থে ইহাই ছিল; কিন্তু এ সাম্যবাদ নিম্নস্তন কৃষিজীবি ও শ্রমজীবিদের উপর ব্যবহৃত হইবে না। তাহাদের সহিত সাম্যতা সম্ভব নহে, কারণ তাহারা, “ছােটলােক”! ফরাশী বিপ্লবের প্রাগকালে Abbe Sieyes “What is Third Estate” (তৃতীয় শ্রেণী কি ? নামক একখানি পুস্তিকা প্রকাশিত করিয়াছিলেন। তাহাতে ফরাশী বিপ্লবের দর্শনশাস্ত্র ও উদ্দেশ্য এক কথায় বিবৃত করা হইয়াছে। তিনি ইহাতে বলিয়াছিলেন যে, যদি ফ্রান্সের আভিজাত্যবর্গ (Feudal Aristocracy) পঞ্চাশ হাজার পালক বিলম্বিত শিরস্ত্রাণ পরিহিত, অশ্বারােহি ফ্রাঙ্ক (Frank) বিজেতৃবর্গের বংশধর বলিয়া জগতের সমস্ত সুখ সম্ভোগের অধিকারী বলিয়া দাবী করে, তাহা হইলে তাহারা জাৰ্মাণীতে ফিরিয়া যাউক (বিজেতৃ ফ্রাঙ্কেরা জাৰ্মাণজাতীয় ছিল ), আমরা তাহাদের চাহি না; তৃতীয় শ্রেণীই (মধ্যবিত্তশ্রেণী যাহা তৎকালে ফ্রান্সে উদ্ভব হইয়াছিল ) সব ( Third Estate is everything ), অথাৎ “দেশ” অথে ইহাদেরই জ্ঞাপন করে, ইহারাই ফ্রান্সের সমাজ ও সমস্ত সম্পদের অধিকারী। আর পদদলিত চতুর্থশ্রেণী (Proletariat ) যাহার দ্বারা মধ্য- ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। বিত্তশ্রেণী স্বীয় কাৰ্য উদ্ধার করিয়া লইল তাহাদের দাবী দাওয়া Directory গবর্ণমেন্ট নেপােলিয়ন দ্বারা grape shot গুলি দাগিয়া ভাসাইয়া দিল ! যাহাই হউক এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাম্যবাদ (bourgeois-democracy) উনবিংশ-শতাব্দীর অর্ধ সময় পর্যন্ত ইউরােপের এবং সমগ্র পাশ্চাত্য ভূখণ্ডের আদর্শ ছিল। ইহারই ফলে ইউরােপে Feudalism ক্রমশঃ ভাঙ্গিয়া যায় ও প্রত্যেকেরই সমান অধিকার, প্রত্যেকেই স্বীয় শক্তি অনুসারে জীবনকে উন্নীত করিতে পারে, পরস্পরের সহিত অবাধে বিবাহ চলিতে পারে Quta (One man one vote, career is open to all ) নবভাব আনয়ন করে। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাম্যবাদ ফ্রান্স, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিলেও ধনের আধিপত্য সমাজ হইতে নিরাকরণ করিতে পারে নাই, বরং প্রাচীন বংশগত আভিজাত্যশ্রেণীর প্রাধান্য নষ্ট করিয়া ধনী শ্রেণীর আধিপত্য স্থাপন করিয়াছে। এই জন্যই জনতন্ত্রের নামে আমেরিকায় ধনতন্ত্র (Plutocracy) বিরাজ করিতেছে! এই মধ্যবিৎশ্রেণীতন্ত্র বর্তমান পাশ্চাত্য জগতে Capitalism আনয়ন করিয়াছে, সাম্যের নামে নিধনদের নিষ্পীড়ন ও লুণ্ঠন করিতেছে ; সাধারণের 56** xfatface praat Gy one man, one vote atare সমােহনের সৃজন করা হইয়াছে। জনসংঘকে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা ও “আমার দেশ” (My country right or আমেরিআমারকার অভিজ্ঞতা। wrong) প্রভৃতি জাতীয়তার বাঁধা বুলি, ধা ধা জন্মাইবার জন্য শেখান হইতেছে—আর যাহারা কায়িক শ্রমদ্বারা ধন উৎপাদন করিতেছে তাহারা পরিশ্রমানুযায়ী পারিশ্রমিক চাহিলে তাহাদের ভাগ্যে lock-out, আর প্রয়ােজন হইলে পুলিশ ও সিপাহি ডাকিয়া গােলাবর্ষণ করিয়া আথনীতিক ন্যায় বিচারের ( economic justice) প্রার্থনার প্রত্যুত্তর দেওয়া হইতেছে। ইহারই ফলে, আমেরিকায় একদিকে ধনীরা ভােগবিলাসে নিমজ্জিত আছে, আর অন্যদিকে গরীব ধনবিহীনেরা কষ্টে দিনযাপন করিতেছে। ইহারই ফলে—অনেক অর্থনীতিবিদের মতে আমেরিকার জাতীয়-ধন ( National wealth) যাহা একশত বিলিয়ন বলিয়া নির্ধারিত হয় তাহা দুইশত বংশেতে বিভক্ত করিয়া লইয়াছে। ইহারই ফলে আমেরিকান সমাজ- তত্ত্ববিদের মতে সমাজে একদিকে upper four hundreds (উপরের স্তরের কেবলমাত্র চারিশত লােক ভােগবিলাস করিতেছে) আর সর্বনিম্নে submerged tenth ( দশমাংশ একেবারে নিমজ্জিত অর্থাৎ জগতের দুঃখ হইতে তাহাদের উদ্ধারের কোন উপায় নাই) বিরাজ করিতেছে। আর এই ঘাের বৈষম্যের ফলে সমাজে সােসালিষ্ট, কমুনিষ্ট, আনার্কিষ্ট, Industrial worke's of the world, শ্রমজীবিসংঘ প্রভৃতি গরীব পতিতদের উদ্ধার ও আর্থনীতিক ন্যায্যতার ও বিচারের জন্য নানাপ্রকারের আন্দোলন হইতেছে; এই সঙ্গে সমাজশরীরে শ্ৰেণী-সংগ্রাম (Class struggle) ঘােরতর বেগে চলিতেছে।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। গরীবের সাম্যবাদকে যথার্থরূপে মূর্তিমান করিবার জন্য সামাজিক সাম্যবাদের ( Social democracy) আদর্শ গণ- সংঘের সম্মুখে ধরিতেছে আর বলিতেছে—আমরা সাম্যবাদ এ জগতে আনয়ন করিতে চাই, সমাজে তাহার প্রয়ােজন। তাই বলি, আমেরিকায় সাম্যবাদ কোথায় ? লােকে যেস্থানে সাম্যবাদের অনুসন্ধান করে, তথায় ধনের থলিয়ার প্রাধান্য দেখিয়া পৰ্যবেক্ষণকরী বলে সাম্যবাদ কোথায় ? আমেরিকা অষ্টবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত সাম্যবাদ মূর্তিমান করিয়াছে, কিন্তু সেই সাম্যবাদ রাজনীতিক সাম্যেই পর্যবসিত হইয়াছে। তথাকার নব প্রতিষ্ঠিত সমাজের ক্রম- বিকাশের ফলে ও ধনবৃদ্ধির সঙ্গে সমাজশরীরে বৈষম্যের উদয় হইয়াছে। আজ ধনতন্ত্র সে দেশ শাসন করিতেছে। ধনীরই জয় ও প্রাধান্য ; সমাজ ও শাসনযন্ত্র তাহাদ্বারা পরিচালিত হইয়া তাহারই বনিয়াদি শ্রেণীস্বাথ (Vested class interest ) সাধিত করিবার জন্য নিয়ােজিত হইয়াছে। এক্ষণে যে কোন ব্যক্তির ক্রোড়পতি হইবার সুবিধা আর নাই ; ধনের উৎপত্তিস্থল সমূহ ধনী লােকের কর-কবলিত হইয়াছে তাহার ফলে ধনীই ধনশালী হইতেছে, গরীব জীবনধারণের ক্রমশ বর্ধমান ব্যয়ভারে ভারাক্রান্ত হইয়া অধােগতি প্রাপ্ত হইতেছে, আর মধ্যবিত্তশ্রেণী চাকরী বা পেশাগতপ্রাণা হইয়া ত্রিশঙ্কু রাজার ন্যায় মধ্যভাগে অবস্থিতি করিতেছে। ইহাই সাধারণ অবস্থা।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
সমাজ-শরীরে-চক্রের মধ্যে আবার চক্র আছে অর্থাৎ
একটি সাধারণ অর্থনীতিক শ্রেণীর মধ্যে আবার বিভিন্ন ক্ষু
সমাজ আছে। তাহার মানে, যে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমাজ
যাহা উকিল, ডাক্তার, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী ও বড় চাকুরিজীবির
দ্বারা সংগঠিত তাহার ভিতর নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লােকেদের
1 forest ( mechanic ), pastato foreman,
technical mal, সামান্য দোকানদার ও ক্ষুদ্র চাকুরিজীবির
স্থান নাই। তবে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর কোন লােক যদি
ধনাঢ্য হয় তাহা হইলে তাহার সামাজিক পদোন্নতি হয়।
তৎপরে থিয়েটারের লােকসমূহের ভদ্রসমাজে স্থান নাই।
এ দলের লোেক বেশীর ভাগ বােধ হয় গরীব ও ক্ষুদ্র মধ্যবিত্ত
শ্রেণীর মধ্য হইতে উদ্ভূত হয়, আর থিয়েটারের অভিনেতা ও
অভিনেতৃদের ভদ্রসমাজে সাধারণতঃ সন্মান নাই; কিন্তু
কেহ যদি আন্তর্জাতিক বা স্বদেশের লােকমধ্যে যশোেপাৰ্জ্জুন
করিতে পারেন তাহা হইলে তাহার প্রতি সমাজ সম্মান দেখায়
কিন্তু এ প্রকার সৌভাগ্য থিয়েটারের কম লােকেরই কপালে
ঘটে ! আবার সঙ্গীতবিদ-মহিলা
পুরুষ গুণানু-
সারে সমাজে আদৃত হন; কারণ এ শ্রেণীর লােকেরা বেশীর
ভাগ ভদ্রবংশ-সস্তুত ও ভদ্র আচার সম্বলিত। তাহারা
থিয়েটারে কাজ করে না, Concert Hall বা Opera house/
সঙ্গীত করে এবং ইহাদের মধ্যে বিশেষ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি
আন্তজাতিক যশঃলাভ করিলে সমাজের দ্বার সম্মানের সহিত
বা
৬৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। তাহার জন্য উন্মুক্ত হয়। এইসব থিয়েটারের সােকেরা, নাটক লেখকেরা নিজেদের এক সমাজ সৃষ্টি করে। তাহারা নিজেদের এক Bohernian দল গঠন করিয়া চলাফেরা করে। এইরূপ পেশা, গুণ ও বৃত্তি অনুসারে বিভিন্ন সামাজিক মণ্ডলী গঠিত হইয়াছে। তৎপর আমেরিকা জাতি ( race) হিসাবে এখনও একত্ব (homogeneity) প্রাপ্ত হয় নাই। পূর্বাঞ্চলে যে সব ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকদের বংশধরেরা নিজেদের পিতৃপুরুষের মাতৃভাষা ও আচার ব্যবহারাদি বিস্মৃত হইয়া গিয়াছে ও ইংরেজী আচরণ ( 1 adition ) গ্রহণ করিয়াছে তাহারা নিজেদের “aglo-saxon” বলিয়া পরিচয় দেয় এবং ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের বংশধরদের সহিত মিশিয়া গিয়াছে। কিন্তু মধ্যপশ্চিমে যথায় বেশীরভাগ ঔপনি- বেশিকেরা ইউরােপের অন্যান্য দেশ হইতে আসিয়াছে তাহাদের বংশধরেরা অনেক স্থলে নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া আছে এবং নিজেদের জাতীয় আচার ও ভাষা যথাসম্ভব বাঁচাইয়া রাখিবার চেষ্টা করে ; যথা মধ্য-পশ্চিমের জাৰ্মাণ ঔপনিবেশিকেরা নিজেদের জাৰ্মাণ-আমেরিকান (German- American )e pour fa75677 ( Swedish-American) ইত্যাদি বলিয়া অভিহিত করে। ইহারা ইংরেজী ও পৈতৃক ভাষা উভয়ই শিক্ষা করে এবং বিবাহাদি অনেক স্থলে নিজেদের মধ্যে করে। এই বিশেষত্ব ধর্মসম্বন্ধেও লক্ষিত হয়। ঔপনিবেশিকেরা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পুরাতন দেশের প্রথানুযায়ী ধৰ্ম্মমণ্ডলী (church) নূতন দেশে স্থাপন করে ; এইপ্রকারে সুইডরা, জার্মাণেরা বা অন্যান্য জাতীয়েরা নিজেদের গির্জার সভ্য হইয়া তথায় মাতৃভাষায় উপাসনা করে। অবশ্য যাহারা ইংরেজী জানে না তাহাদের জন্য ইহা প্রয়ােজনীয়। কিন্তু যাহারা নিজেদের “এঙ্গলাে সাক্সন” রূপে রূপান্তরিত করিয়াছে তাহারা “আমেরিকান গির্জায়” উপাসনা করে। এই বিষয় উপলক্ষ করিয়া নিউ- ইয়র্ক ষ্টেটের একজন জাৰ্মাণ ধর্মযাজক আমার সম্মুখে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, “আমাদের জাৰ্ম্মাণ ধৰ্ম্মমণ্ডলীসমূহ প্রধানতঃ গরীব, তারপর নবাগত জাৰ্মাণেরা ইংরেজী শিক্ষা করিয়া আমেরিকান সাজেন, তাহারা পূর্বের ধৰ্ম্মমণ্ডলীর সভ্য থাকিতে লজ্জা বােধ করেন, বলেন, আমি এখন আমেরিকান গির্জার সভ্য’ কাজেই গরীব “জাৰ্মাণ গির্জার” কি প্রকারে শ্রীবৃদ্ধি হইবে ?” এতক্ষণ যাহাদের বিষয় বর্ণনা করিয়াছি তাহারা সাধারণতঃ ইউরােপের টিউটনভাষী। কিন্তু যাহারা ইউ- রােপের দক্ষিণ ও পূর্ব হইতে আসিয়াছে তাহারা হঠাৎ আমেরিকান একজাতীয়ত্বের ভিতর মিশ্রিত (american melting pot) হইতে পারে না। তাহাদের বংশধরেরা “আমেরিকান” বটে এবং রাজনীতিক সমস্ত অধিকারের অধিকারী। কিন্তু আমেরিকান সমাজে তাহারা এখনও মিশ্রিত হয় নাই। আমেরিকানেরা ইহাদের স্বভাবতঃ ঘৃণা

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
করে, বলে ইহারা তেমন প্রকারে সভ্য নয় এবং ইহাদের
আচারাদি বিশ্রী ! ইহারাও নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ থাকে।
তবে যাহারা উচ্চশিক্ষিত হইয়। আমেরিকান হইয়াছে
তাহাদের কথা স্বতন্ত্র। ইহাদের মধ্যে ধনাঢ্য ললাকেরা
আমেরিকান সমাজে আদরে গৃহীত হয়। এই সব জাতির
বিপক্ষে বর্ণবিদ্বেষ নাই, ইহাদের সহিত বিবাহ ও আহারাদি
প্রভৃতি সামাজিক সম্বন্ধ স্থাপন করিতে কোন বাধা নাই কিন্তু
একটা সামাজিক ঘৃণা অন্তর্নিহিত রহিয়াছে এবং ইহার
পশ্চাতে একটা অতি প্রাচীন জাতিবিদ্বেষ ( racial dislike)
লুকাইত আছে। ইউরােপে প্রাচীনকাল হইতে টিউটন ও
ল্যাটিন, টিউটন ও শ্লাভ জাতিদের মধ্যে রেষারেষি চলিতেছে।
ইহাদের প্রত্যেক জাতিই নিজেকে উচ্চজাতি ও অপরকে হীন
জাতি বলিয়া ধারণা করে। তাহার পর আমেরিকানদের বিশ্বাস
তাহাদের “এ্যাঙ্গলাে-সাক্সন”-সভ্যতা বর্তমানে জগতের শ্রেষ্ঠ,
তজ্জন্য তাহারা অন্যদের নীচ চক্ষে নিরীক্ষণ করে। ইহার পর
টিউটন বংশীয় আমেরিকানদের চালচলনের সহিত শ্লাভ ও
ল্যাটিনদের মিল নাই এবং দক্ষিণ ইউরােপীয়রা মলিন বর্ণের
লােক। আর দক্ষিণ ইতালীয়দের (সিসিলি ও কালাব্রিয়ার
লােকদের) বদনাম আছে যে তাহারা বড় ঠগ, গাঁটকাটা ও
খুনে।
আমেরিকার বেশীর ভাগ খুন ডাকাতি ইহাদের
Mafia, Camoerra, Blackhands প্রভৃতি গুপ্ত বদমাইসের
দলের দ্বারা সংঘটিত হয় । ইহাদের “Digo ও Guinea”

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। বলিয়া অভিহিত করা হয়। লােকে বলে যে একজন ডেগাে দশ সেন্টের (প্রায় ১৯ পয়সা) জন্য একজন লােকের গলায় অবাধে ছুরিকা প্রদান করিতে পারে। এই গিনির দল সাধারণতঃ মাটি-কাটার কৰ্ম্ম করে এবং কেহ কেহ দোকানপাট ও দরজির কাৰ্য্য করে। আর গ্রীকেরা জুতাবুরুশের কৰ্ম্ম করে ও যাহারা অবস্থাপন্ন তাহারা ফল বিক্রয় করে ; এবং শ্লাভের (পােল, বুলগার, সার্ডিয়ান প্রভৃতি) কুলির কৰ্ম্ম ও অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন লােকেরা কৃষিকৰ্ম্ম করে। এই সব জাতি আমেরিকায় এখনও নিজেদের প্রতিপত্তিশালী ও সর্বব- জনসম্মানিত করিতে পারে নাই। এই সব কারণে তাহাদের প্রতি একটা পার্থক্যের উদ্ভব হইয়াছে। তবে এই সব জাতির উচ্চবংশের একজন ইউরােপ হইতে আমেরিকায় আসিলে তদ্দেশের সমাজে সাদরে গৃহীত হইবে ! একজন “গিনি” কুলী বা দোকানদারের তৎসমাজে স্থান নাই, কিন্তু সেই জাতির একজন কাউন্ট বা ডিউক আসিলে তাহার প্রতি অন্য ব্যবস্থা হইবে। তাহার মলিনবর্ণ ( Brunette ) সমাজে গ্রহণের অন্তরায় হয় না বরং এই জাতীয় একজন দেউলিয়া খেতাবওয়ালা ব্যক্তি অক্লেশে এক ধনাঢ্য আমেরিকান মেয়ে বিবাহ করিতে পারে! আমেরিকান সমাজ প্রথমে ইহাদের গ্রহণ করে নাই, তবে আজকাল ধনাঢ্য দক্ষিণ ইউরােপীয়ানের আমেরিকান “কুলীন” ঘরে বিবাহ সম্ভব হয় যদি সেপ্রকারের যোগাযােগ উপস্থিত হয়। কিন্তু তাহা পাত্রীর স্বাধীনতা ও আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। স্বেচ্ছায় পছন্দের ( Free choice) মাহাত্মের উপর নির্ভর করে। একবার আমার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সমাজ- তত্ত্বীক ক্লাশে এই বিষয়ের আলোচনাকালে প্রশ্ন উঠে যে ইতালীয়দের সমাজে গ্রহণ করা হয় কিনা? তাহার প্রত্যুত্তরে অধ্যাপক বলিয়াছিলেন, “হালে আমরা ইতালীয়দের সহিত বিবাহ করিতেছি।” কিন্তু আমি আমেরিকায় তাহা দেখি নাই বা শ্রবণ করি নাই, যদিও অনেক ইতালীয় bankrupt Baronদের আমেরিকান ধনীদের কন্যা বিবাহ করিতে শুনিয়াছি। নিউইয়র্কে আমি এবম্প্রকারের এক দেউলিয়া ব্যারণকে জানিতাম, যাহার স্ত্রী আমেরিকান মহিলা ছিলেন। তাহারা উভয়েই সঙ্গীতবিদ্যা শিক্ষা দিয়া জীবিকানির্বাহ করিতেন। কিন্তু এ বিবাহ ইউরােপেই সংঘটিত হয় এবং তাহাও স্বাধীন ইচ্ছার মাহাত্ম্য। কিন্তু এই ভদ্রলােক নিজেকে রােমান বলিয়া পরিচয় দিতেন অথচ তিনি বংশে দক্ষিণ ইতালীয় বলিয়া প্রতীত হইতেন, যদিচ গাত্রের বর্ণে তিনি মধ্য ইউরােপের লােকের ন্যায়। আমি যাহার গৃহে ইহার সহিত পরিচিত হই তাহার সঙ্গে এই কুহেলিকাপূর্ণ ভদ্রলােকের জাতির বিষয় আলোচনা কালে বলিয়াছিলাম যে, কথাবার্তায় আমি ধরিয়াছি ইনি দক্ষিণ ইতালীয় বংশীয়। ইহা শ্রবণ করিয়া গৃহস্বামিনী আমায় বলেন, “তবে তুমি কি মনে কর যে ক্যাউন্ট একখানা ছুরি টেকে খুঁজে বেড়ায়? আমি ঐ জাতিকে বড়ই ভয় করি।”

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ইহার নাম হইতেছে “জাতিবিদ্বেষ,” একজনের দোষে সমস্ত জাতিকে অভিশপ্ত করা হয়। আর একটি গ্রীক কারবারী যুবককে চিকাগােতে আমেরিকান কন্যা বিবাহ করিতে শুনিয়াছি কিন্তু এবারের বিবাহ সমাজের আশে পাশে হয় তাহাতে সমাজে কোন ফল ফলে না বা কোন প্রকারের প্রতিক্রিয়ার উদয় হয় না। এবম্প্রকারের বিবাহ এসিয়াবাসীও তথায় করিতেছে এবং কেহ কেহ উত্তম ঘরেই বিবাহ করিয়াছেন। কিন্তু এই সব বিবাহের দ্বারা আমেরিকান সমাজের সংকীর্ণতাও ভগ্ন হয় না এবং উদারতাও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় না। অন্যদিকে আমেরিকায় বিবাহ সম্বন্ধে একটা অনুষ্ঠান ঘটিতেছে যাহা পৃথিবীর অন্য কোন স্থানে এবম্প্রকার বিশদভাবে ঘটিতেছে না—তাহা sexual selection; জীবতত্ত্বীয় মতানুসারে নৃতত্ত্ব হিসাবে তাহা অতি সুফলপ্রদ। আমেরিকায় বিবাহের বেলায় পাত্র ও পাত্রীর পছন্দ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে এবং তথায় নানা- জাতীর সম্মিলন হয় বলিয়া বিবাহ অনুষ্ঠানটি sexual selection ( উপযুক্ত পাত্রের নিজের উপযুক্ত পছন্দমত পাত্রীর অনুসন্ধান) দ্বারা সংঘটিত হয়। তথায় যুবক ও যুবতীদের পছন্দ করিয়া জীবনের সহযাত্রী অন্বেষণ করার সুযােগ অতি প্রশস্ত। সেইজন্য পরস্পরকে মনােনীত করিয়া বিবাহ করিবার ফলে একটি সুন্দরাকৃতি শ্বেতাঙ্গ জাতির উদ্ভব তথায় হইতেছে। এবম্প্রকারে নানাজাতির সুন্দরাকৃতি নরনারীর ৭০ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সম্মিলনের ফলে ইউরােপীয় হইতে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গজাতি সুন্দরতর ও স্বাস্থ্যবান হইতেছে। কিন্তু এই sexual selectionটার সঙ্গে বােধ হয় অজ্ঞাতসারে colour selection ( রং পছন্দ ) চলিতেছে। একজন উত্তর-ইউরােপীয় জাতি- প্রসূত ( blond) নর বা নারী সচরাচর মলিন বর্ণের ( brunette বা brown) দক্ষিণ ইউরােপীয় নর বা নারীর সহিত বিবাহ করে না। যদি এবম্প্রকার হয় তাহা হইলে তাহার অজ্ঞাতসারে রং পছন্দ করিয়া তাহা করা হয় অর্থাৎ সেই দক্ষিণ ইউরােপীয় উত্তর-ইউরােপীয়ের সহিত মিলিতে পারে এবম্প্রকারের অপেক্ষাকৃত ফরসা রং হওয়া চাই। তবে মলিন বর্ণের এসিয়াবাসীর সহিত দুই একটি যে বিবাহ হয় তাহা অসাধারণ ও অস্বাভাবিক। সমাজের বাহিরে তাহা হয়। সেজন্য তাহা ধৰ্ত্তব্যের মধ্যে নহে। ইহাই হইল আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ সমাজ অঙ্গের বিশ্লেষণ। এক্ষণে প্রশ্ন উঠিতেছে, তথাকার আচার ব্যবহার কি প্রকার ? পূর্বেই বলিয়াছি আমেরিকায় ইংরেজী চর্চা ও সভ্যতার প্রাধান্য বিরাজমান। আমেরিকান সভ্যতা ইংরেজী সভ্য- তার ছাপে অঙ্কিত। ইংরেজী প্রথা ও tradition আমে- রিকান রীতি ও স্মৃতি। আমেরিকায় সর্বপ্রকারের ঔপনিবেশিকেরা গিয়া ইংরেজী পড়িয়া “এ্যাঙ্গলাে-স্যাক্সন” হয়, কাজেই তাহারা নিজেদের নিজস্ব হারাইয়া ফেলে এবং গভর্ণমেন্ট সকলকে খাটি আমেরিকানে পরিণত ৭১ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পুরাতন ইংরেজ করিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করে। ইহাকে বলে “একশত- ভাগ আমেরিকানত্ব (ico p. c. Americanism)। ইহার কম যিনি তিনি বিগত যুদ্ধের সময় হইতে স্বদেশদ্রোহী বলিয়া গণ্য হন! এই আমেরিকানত্ব যতই নিজের বিশেষত্বে বিমণ্ডিত বলিয়া গর্ব করুক, চর্চা ও রীতি-নীতিতে সম্পূর্ণ ইংরেজীবের ছায়ায় দণ্ডায়মান আছে। ঔপনিবেশিকদের বংশধরগণ এই “এ্যাঙ্গলাে-সাক্সনত্ব” সর্বত্র প্রচার করিয়াছে। তৎপরে আমেরিকান ধনকুবেরদের ইংলণ্ডের সমাজে দহরম্ মহরম্ হওয়ায় ইংলণ্ডের চাল ও ক্যাসান আমেরিকার উচ্চশ্রেণী তাহা অনুকরণ করে। আহার বিহারাদিতে, চালচলনে উচ্চশ্রেণীর মধ্যে খাঁটি ইংরেজী চাল কিন্তু সাধারণের মধ্যে উভয়ের কিছু পার্থক্য আছে তত্ৰাচ ইহাই আদর্শ বলিয়া সর্বত্র লােকে অনুকরণ করে ! পুরাতন আমেরিকানেরা বড় রূঢ় ও অচশ্চিত (rude and rough) ছিল এবং এখনও গ্রাম্য লােকেরাও তপ। তাহারা প্রাচীন সাদাসিধা ধরণের লােক, etiquetteএর ধার ধারে , মােলায়েম কথা বলিতে জানে না, তাহারা “hallo friend well met” ধরণের লােক অর্থাৎ উচ্চচর্চাজনিত polite manner-রূপ ভণ্ডামী (hypocrisy) জানে না। এইজন্য ইউরােপে বলে আমেরিকানের বড় rude প্রকৃতির লােক। অর্থাৎ সাধারণতঃ আমেরিকানেরা স্বাধীন প্রকৃতির লােক বলিয়া “মুখে মিঠে কথার বুলি আর অন্তরে ছুরি” এ প্রকৃতির বর্তমান ; ૧૨

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
লােক নয় অর্থাৎ slave mentality (দাস বুদ্ধি ) হইলে
যে প্রকারের চরিত্রের অবনতি হয় তাহা তাহাদের মধ্যে
অভাব। চাটুকারিতা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞ্চনা, মিথ্যাকথা
ইত্যাদির দ্বারা স্বীয় কাৰ্যোদ্ধার করা, “মুখে এক পেট
আর”, ক্ষমতাশালী লোকের খােসামােদ করা, ক্ষমতাহীন
লােকের প্রতি অত্যাচার করা প্রভৃতি দোষ প্রাচীন
আমেরিকান বংশীয়দের মধ্যে সাধারণতঃ লক্ষিত হয় না ।
তবে বিদেশীয়েরা বলে যে আমেরিকানেরা স্বভাবতঃ
bluffe?" অর্থাৎ বড় লম্বা চওড়া কথা কহে ! ধাপ্পা দিয়া
ফেনাইয়া কঁপাইয়া আসল বস্তুকে অতি বৃহদাকারে লোকের
সম্মুখে উপস্থিত করা কোন কোন ব্যবসায়ীর প্রকৃতি হইতে
পারে বটে, কিন্তু শিক্ষিত সমাজে তাহা আমার নিকট
লক্ষিত হয় নাই। আর রূঢ়তা দোষ চচ্চিত-ভদ্রবংশে
লক্ষিত হয় না।
আসল কথা এই যে “আমেরিকান” ও “আমেরিকান
জাতি” বলিলে সমাজ-তত্বীক কোন অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যায়
একদল আমেরিকান আছে যাহারা পুরাতন বনিয়াদী
বংশীয় লােক, ইহাদের চালচলন অতি দোস্ত, আর একদল
আছে যাহারা ইউরােপের সম্মার্জনী ঝাড়া (riffraffs )
ঔপনিবেশিকের দল ও তাহাদের তদনুরূপ সন্ততিগণ। এই
দ্বিতীয় দলের লােকেদের স্বদেশে কোন চর্চা ও সভ্যতা ছিল
, সমাজে স্থান ছিল না; তাহারা আমেরিকায় আসিয়া
।

অ মার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। মুক্ত বাতাসে স্বাধীনতার নামে যথেচ্ছাচার করে। ইহাদের চালচলন দুষ্য ; বিদেশী পর্যটকেরা ইহাদেরই রাস্তাঘাটে, ট্রামে, রাস্তায়, আমােদস্থলে যথেচ্ছাচার করিতে দেখিয়া তাহা আমেরিকানদের জাতীয় প্রকৃতি বলিয়া অনুযােগ করে ? আর ইহারাই ইউরােপে আসিয়া নিজেদের “আমেরিকান বলিয়া পরিচয় প্রদান করে ও নিজেদের দুর্নীতিকে “আমে- রিকার লােকে এই প্রকার করে” বলিয়া সমর্থন করিবার চেষ্টা করে। আমেরিকার বদনাম বেশীর ভাগ ইহাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়। কোন নূতন দেশে আসিলে বিদেশী তথাকার ভালটি সহজে দেখিতে পায় না, সেদেশে কিছুদিন বসবাস করিয়া যদি তাহার ঐ ভাল চক্রের ভিতর প্রবেশ করিবার সৌভাগ্য হয় তাহা হইলে স্বভাবতঃই গণ্ডীর বাহিরে থাকিয়া মেকিকে আসল বলিয়া গ্রহণ করেন। ঔপনিবেশিকের দল বাহিরে থাকিয়া মন্দটাই আসল বলিয়া অনুকরণ করিয়া নিজেদের “আমেরিকান হইয়াছি” বলিয়া বড়াই করে । তবে তাহাদের সন্তানসন্ততিগণ যদি অবস্থাপন্ন ও উচ্চশিক্ষিত হয় তাহারা নিজেদের প্রকৃতির উন্নতি করিবার চেষ্টা করে। কিন্তু এই উন্নতি স্বভাব ও বাহাবস্থার (character and surrounding) উপর নির্ভর করে। কেহ স্বভাব ও সুবিধার গুণে এক পুরুষে ভদ্রলােক হয়, অনেকেই তাহা হইতে পারিয়া “অভদ্র” ভদ্রলােক সাজিয়া বিভ্রাট আনয়ন করে। তদ্রুপ এই ৭৪ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। আবার অন্যদিকে একদলের লােক আছে পূর্বাঞ্চলে যাহাদের সমাজে বিশেষ সম্মান, তাহারা অতি বাছাবাছা লােকের সহিত মেশামেশি করে। ইহারা আমেরিকান ধনাঢ্য দল হইতে সংগঠিত। ইহাদের অহংকার যে ইহারা “move in very exclusive circle” (অতিবাছা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে মেশামেশি করেন )! আমাদের দেশে যাহারা নৈষ্ঠিকতার দোহাই দিয়া “ছুৎমাতের” নামে “নেতিনেতি” করিয়া সকল হইতে পার্থক্য স্থাপনে প্রয়াসী হন তাহাদেরও যে উদ্দেশ্য ( যদিচ ভারতে ইহা ধর্মের নামে করা হয় ), আর এই সামাজিক ছুৎছাত ভীতিগ্রস্থ “exclusive circle”এ মেশার দলের ও সেই উদ্দেশ্য ! উভয়েই নিজেকে বাহ হইতে অপসারিত করিয়া নিজের কুলীনত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করিবার প্রয়াস করে ; উদ্দেশ্য নিজের দর বাড়ান, তাই “নেতিনেতি” করে। তবে ভারতে এই স্বার্থ-সাধনটি ধৰ্ম্মের ভণ্ডামী করিয়া সমর্থন করা হয়, আর আমেরিকান সমাজে অর্থের গরমে তাহা করা হয়, যদিচ, সাম্যবাদীর দেশে তাহার কোন পরি- পােষকতা ( justification) নাই। লােকে জানে শ্রেণীস্তরে বিভক্ত বুরজোয়া সমাজের ইহাই রীতি, ইহাই চরমাদর্শ ! আর শেষ কথা এই, শ্বেতাঙ্গ সমাজ যত প্রকার স্তরে ও গণ্ডীতে বিভক্ত হউক না হউক না কেন তাহার সহিত অ- শ্বেতাঙ্গ লােকের সংস্পর্শে আসিবার কোন সুবিধা আছে কি না? পূর্বেই বলিয়াছি যে, আমেরিককার শ্বেতাঙ্গ- আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সমাজে তথাকথিত রঙীন লোকের স্থান নাই তাহা তিনি এসিয়ান জাতীয় হউন বা আফ্রিকান জাতীয় হউন। তবে অনেক society lauyদের ক্লাব আছে যথায় রঙীন লােকদের নিমন্ত্রণ করিয়া বক্তৃতা করান হয়। কোন নিগ্রো-নেতাকে এবম্প্রকার ক্লাবে আনয়ন করা হয়, শ্বেতাঙ্গ সমাজের সহিত তাহার সংস্পর্শ এই পর্যন্ত। সমাজ তাঁহার মুখের সম্মুখে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দেয়। কিন্তু তথা- কথিত রঙীন বর্ণের এসিয়াবাসীর সৌভাগ্য আরও বেশী দূর পৰ্যন্ত যায় অর্থাৎ তাহার বিশেষ আলাপি পরিচিতের শ্বেতাঙ্গের বাড়ী কালেভদ্রে কালেভদ্রে আহারের নিমন্ত্রণ ঘটে। অবশ্য এ বিষয়ে কোন বাঁধাবাধি আইন নাই, একজন এসিয়াবাসীর ব্যক্তিগত পুরুষকার ও সৌভাগ্যের উপর নির্ভর করে। একদিকে একজন এসিয়াবাসী যথায় বরাবরই অপমানিত হইয়াছে তৎস্থানে আবার তাহার স্বদেশবাসী অতি সমাদরে গৃহীত হইতেছে! যে আমেরিকায় এসিয়াবাসীর দুর্দশার সীমা নাই তথায় আবার ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আমেরিকান সমাজের সম্মানপ্রদর্শনেরও সীমা নাই! দৃষ্টান্ত- স্বরূপ বলা যায়, যখন পূর্বাঞ্চলের সমাজ চীন রাজপ্রতিনীধি Dr Wu. Ting Fangকে সাদর অভ্যর্থনা ( lionise) করিতেছিল তখন কালিফোর্নিয়ারদিকে লােকে তাহারই চীনাস্বদেশবাসীদের প্রতি নির্যাতন করিতেছিল এবং তথাকার সমাজ এই বিসদৃশ্য ব্যাপার দেখিয়া বিরক্ত হইয়া বলে, “একি, আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। একটা কুলীর জাতির লােককে লইয়া আবার এত বাড়াবাড়ি কেন ?” সেইপ্রকার যে ভারতবাসী-শিখদের প্রতি পশ্চিমে নির্যাতন হইয়াছিল সেই দেশেরই একজন শিখ, কপূরতলার মহারাজাকে আমেরিকান গভর্নমেন্ট Guest of Nation (দেশের অতিথি ) বলিয়া সন্মানিত করে। আমেরিকার যুক্তসাম্রাজ্য স্বাধীন হওয়ার সময় হইতে আজ পর্যন্ত সাতজন বিদেশী Guest of Natio বলিয়া সন্মানিত হইয়াছেন তন্মধ্যে চারিজন “রঙ্গীণ এসিয়াবাসী।” (১) চীনের প্রধান রাজমন্ত্রী পরলােকগত Li Hang Chung, (২) শ্যামদেশের মৃতরাজা যিনি যুবরাজ অবস্থায় তথায় ভ্রমণে গিয়াছিলেন, (৩) কপূর- তলার মহারাজা (৪) জাপানের Admiral Tcgo।

ধৰ্ম্ম পূৰ্বে আমেরিকার বর্ণ-সমস্যার উল্লেখ করিয়াছি। ইহা শ্রবণ করিয়া এ দেশের কেহ কেহ – কুঞ্চণ করিয়া প্রশ্ন করিতে পারেন যে, আমেরিকা খৃষ্টীয় ধর্মের দেশ, তথায় মানবের মধ্যে এবম্প্রকারের পার্থক্য কেন করা হয়? ইহা সত্য কথা যে, আমেরিকা প্রবল খৃষ্টীয় দেশ এবং তথায় ধর্মের হুজুগ অতি বেশী। আমেরিকান খৃষ্টীয় মিশনারীরা পৃথিবীর সর্বত্র খৃষ্টের পতাকা উড্ডীন করিয়া বেড়াইতেছে এবং খৃষ্টের নামে মানবের ভ্রাতৃভাব প্রচার করিতেছে ; তথাপি সেই দেশেই মানবের প্রতি এত অত্যাচার হয় ! ইহা আশ্চর্যের কথা নহে, কারণ, খৃষ্টীয় চার্চ বরাবরই গােলমীত্বে ( slavery বিশ্বাস করিয়াছে ও তাহা সমর্থন করিয়াছে ; St. Augustine বলিতেন, দাসত্ব মানবের পাপের ফল ভােগ করা মাত্র। আমেরিকা খৃষ্টীয় প্রধান কিন্তু তথাকার অধিবাসীরা নানাপ্রকারের সম্প্রদায়ে বিভক্ত বলিয়া coustitution অনুসারে তথায় কোন সরকারী ধৰ্ম্ম নাই অর্থাৎ রাজশক্তি কোন ধৰ্ম্মকেই পােষণ বা পৃষ্ঠ-পােযকতা করে না। সর্বপ্রকারের ধৰ্ম্ম-সম্প্রদায় constitutionএর সৰ্ত্ত মানিয়া দেশ। ৭৮ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। অবাধে নিজের বিশ্বাসানুযায়ী জীবনযাপন ও আন্দোলন করিতে পারে। এই সৰ্ত্ত মানে হইতেছে যে, সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠান constitutionএ মানা করা আছে, যথা- পুরুষ ও স্ত্রীর বহু বিবাহ ( polygamy and polyandry), ধৰ্ম্মের আবরণে আদিরসাশ্রিত বীভৎস ব্যাপার ইত্যাদি সেই ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস সামাজিক জীবনে অনুভূত করা হইতে পারিবে না। এই বহুবিবাহ প্রচলিত করার জন্য মৰ্ম্মণ ( Mormon) নামক একটি নবখৃষ্টীয় সম্প্রদায় জনপদ হইতে তাড়িত হইয়া উটার ( Utah) মরুভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়, এবং অবশেষে রাজশক্তির তাড়নায় “ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ” পাইয়া সে অনুষ্ঠান রদ করিয়া দেয়। এইজন্যই প্রত্যেককেই তথায় রেজেষ্টারী করিয়া বিবাহ করিতে হয় ; এবং বহুবিবাহ প্রথা সমর্থনকারী ধৰ্ম্ম- সম্প্রদায়ভুক্ত প্রাচ্যদেশীয় লােকদের আমেরিকায় প্রবেশ কালে স্বীকার করিতে হইবে যে, তাহারা বহুবিবাহকারী নন। আমেরিকায় খৃষ্টান ব্যতীত ইহুদি ধর্ম প্রচলিত আছে। তৎব্যতীত আজকাল নবভাবের নানাপ্রকারের সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হইতেছে। অবশ্য সংখ্যায় খৃষ্টীয়েরাই সর্ব প্রধান কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যদিচ একশত মিলিয়ন (দেড় কোটি) বাসিন্দার মধ্যে মুষ্টিমেয় ব্যক্তিই অখৃষ্টান, এবং যাহারা আজকালের নানাপ্রকারের নবভাবের আন্দোলন- আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। • গুলির মধ্যে বর্ধিত হইতেছেন তাহারাও সামাজিক বিষয়ে খৃষ্টীয় সমাজের অঙ্গীভূত থাকিলেও, এই বিপুল জনসংঘের মধ্যে কেবলমাত্র পঁচিশ মিলিয়ন খৃষ্টীয় চার্চের তালিকাভুক্ত সভ্য! অর্থাৎ বেশীর ভাগ লোেক খৃষ্টীয় ধর্মসমাজে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া খৃষ্টান বলিয়া পরিগণিত হন কিন্তু সেই ধৰ্ম্মের সঙ্গে তাহাদের আর কোন বিশেষ সম্পর্ক নাই ; কেবল জন্ম, অনেক সময়ে বিবাহের বেলায়, ও মৃত্যুর সময়ে ধৰ্ম্মযাজকের শরণাগত হন! ইহার মানে, সমগ্র সুসভ্যদেশে যে প্রকারের মানসিক অভিব্যক্তি হইতেছে যে, মানব তাহার ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসকে ব্যক্তিগত ব্যাপার করিয়া লইতেছে ও ধর্মের আচারগুলিকে অবশ্যকৰ্ত্তব্য সামাজিক কম্মের বেলায়ই স্মরণ করে, আমেরিকায়ও সেই অভিব্যক্তির স্ফুরণ হইতেছে। ইহার ফলে সাম্প্রদায়িক ঈর্ষা, ধৰ্ম্মের গোঁড়ামি ও অনুদারতা প্রত্যহ জীবনের কৰ্ম্ম হইতে নির্বাসিত করা হইতেছে ও একজাতীয়ত্বের শক্তির পরিস্ফুরণ হইতেছে। কিন্তু এই পঁচিশ মিলিয়নই ধর্মের নামে দেশে বিষ উদ্গার করিতেছেন ও বহির্দেশেও তাহা ছড়াইতেছেন! আমেরিকার আধুনিক আদমশুমারিতে দৃষ্ট হয় যে, লােক-সংখ্যার অনুপাতে খৃষ্টানদের মধ্যে রােমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেশী ; কিন্তু এই ঘটনা প্রটেষ্টান্ট, সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি-সঞ্চার করিয়াছে! শেযােক্তেরা বলেন যে, যুক্তসাম্রাজ্যের constitution প্রটেষ্টান্ট ভিত্তিতে সংস্থাপিত হয়। কিন্তু আজকাল ৮০

আমার আমেরিকার অতিত।
রােমান ক্যাথলিকেরা সংখ্যাধিক্য জঙ্ক শাসনবিভাগের
সর্বত্রই প্রবেশ করিতেছে ও ক্রমশঃ রাজশক্তিকে করায়ও
করিয়া তৎদেশকে ক্যাথলিক ষ্টেটে ( state) পরিণত করিতে
চায়। অবশ্য এই ভীতির কতকটা অসত্য ও কতকটা অমূলক
ভিত্তির উপর স্থাপিত ! কারণ constitution কোন বিশেষ
প্রকারের ধর্মের উপরে ভিত্তস্থাপিত নহে; যাহারা ইহা
রচিত করিয়াছিলেন তাহারা অতি উদার প্রকৃতির ব্যক্তি
ছিলেন। তাহারা “মানবের স্বাধীনতার কথাই বলিয়াছেন।
তবে কথা এই যে, “আমেরিকার জাতীয় স্বাধীনতার জন্য
যে ইংরেজ উপনিবেশিকেরা উত্থান করিয়াছিলেন, তাহাদের
মধ্যে প্রটেষ্টান্ট সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরাই সংখ্যায় বেশী ছিলেন
এবং তাহাদের সঙ্গে যে সব ডাচ, সুইড, জাৰ্মাণ ঔপনি-
বেশিকেরা যােগদান করিয়াছিলেন তাঁহারাও তদ্রুপ। তৎপরে
আমেরিকার “চর্চা” প্রটেষ্টান্ট সম্প্রদায়ভুক্ত লােকের দ্বারাই
বৰ্ধিত হইয়াছে, এই সব কারণে দেশে এতদিন এই সম্প্রদায়েরই
আধিপত্য ছিল। কিন্তু বিগত পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া
নির্যাতিত আইরিশ, দরিদ্র ইটালিয়ান, অষ্ট্ৰীয়ান, পােল
প্রভৃতি রােমান ক্যাথলিক দেশসমূহ হইতে ঔপনিবেশিকের
প্রবল বন্যা আমেরিকায় প্রবেশ করিতেছে। বিগত পঁয়ত্রিশ
বৎসরের ঔপনিবেশিক সম্পর্কীয় রাজকীয় বিভাগের
Immigration Department রিপাের্ট দেখা যায় যে,
ইউরােপের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ হইতেই বেশীরভাগ ঔপনি-
৮১

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
বেশিকের বন্যা আসিতেছে, এবং ইহা ক্যাথলিক প্রধান
বন্যা। এই প্রকারে আজ যুক্তসাম্রাজ্যে প্রটেষ্টান্ট হইতে
রােমান ক্যাথলিকের সংখ্যা বেশী হইতেছে ও এই সম্প্রদায়
তাহার ধর্মযাজকদের বিশেষ অনুগত।
তৎপর এই
ধর্মযাজকেরা বর্তমানের বিজ্ঞানের বিপক্ষবাদী কারণ
তাহারা নাকি বাইবেলের বিরুদ্ধবাদ প্রচার করে। এই
জন্য নাকি ক্যাথলিক ধর্মযাজকেরা বর্তমানের যুক্তিবাদপূর্ণ
চর্চা ও বিজ্ঞানের ঘাের শক্র ও তাহারা আমেরিকায় এই
চর্চার মূলচ্ছেদ করিতে চাহেন। অন্ততঃ অনেক প্রটেষ্টান্টের
মনে এই ভীতিই জাগরিত অাছে ও তাহা লােকসমাজে
সঞ্চারিত করেন। যুক্তসাম্রাজ্যের Wiscons in ষ্টেটের
কোন গ্রামে আমায় একজন চিকিৎসা ব্যবসায়ী ভদ্রলােক
এই ভীতির কথা উল্লেখ করিয়া দৃষ্টান্তস্বরূপ বলিয়াছিলেন
যে, তৎনিকটবর্তী কোন স্থানের হাইস্কুলে Biology পড়া হইত
বলিয়া তথাকার রােমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক তাহা বন্ধ
করিবার জন্য আদালত দিয়া নােটিশ জারি করিয়া তাহা
রদ করিয়া দেন! অবশ্য ইহার মূলে যে আসল ব্যাপারটি
কি তাহা উক্ত ভদ্রলােকের কাছ হইতে জানিতে পারি নাই।
এই ক্যাথলিক-ভীতির দৃষ্টান্ত যিনি আমায় দিলেন, তিনি নিজে
ব্যক্তিগতভাবে খৃষ্টান নন বরং কতকটা বােধহয় থিওসফিক
মতাক্রান্ত। প্রটেষ্টান্ট সম্প্রদায় উপস্থিত যুগে যুক্তিপূর্ণ
বৈজ্ঞানিক চর্চাকে স্বীয় সমাজের অঙ্গীভূত করিয়া লইয়াছে।
৮২

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
এবং যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের প্রতিপক্ষকে লােক-কল্যাণ ও
সভ্যতার অন্তরায় বলিয়া গণ্য করেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে
প্রটেষ্টান্ট সমাজ হইতে ডারউইনের জীবের অভিব্যক্তিবাদের
শিক্ষাকে (Principle of Evolution ) শিক্ষাগার হইতে
নির্বাসিত করিবার জন্য যে বিপক্ষতাচরণ হইতেছে তাহাতে
বেশ বােঝা যায় যে, ধর্মের সংকীর্ণতা ক্যাথলিকদের
একচেটীয়৷ নয় এবং প্রটেষ্টান্টেরাও এ বিষয়ে বাদ পড়েন না।
এই ক্যাথলিক ভীতি ইউরােপের “ইহুদি-ভীতির ন্যায়।
ইহার কতটা বাস্তব তাহার সত্যতার নির্ধারণ করা যায়
, এবং ইহা যে কতকটা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ-বিজড়িত
তাহাও একেবারে অস্বীকার করা যায় না। যদি অতীত
যুগে ক্যাথলিকেরা অগ্রগমনশীল সভ্যতার বিপক্ষতাচরণ করিয়া
থাকে, প্রটেষ্টান্টেরাও তাহা করিতে বাদ যান নাই, তৎপরে
উভয় সম্প্রদায় উভয়কে নির্যাতন করিয়াছে ও পুড়াইয়া
মারিয়াছে। যদি রােমান ক্যাথলিক ও গ্রীকচার্জ (Greek
orthodox church) বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিরুদ্ধে এবং
তাহাদের সম্প্রদায়ের সভ্যদের অজ্ঞানতার তিমিরে আবরিত
করিয়া রাখিয়াছে, প্রটেষ্টান্ট চার্চও অতীতে এ বিষয়ে কম
বিপক্ষতাচরণ করে নাই, কিন্তু যুগধর্মের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান
হইতে পারে নাই বলিয়াই এক্ষণে নতশির হইয়াছে ; তথাপি
আজও এই সম্প্রদায়ের গোড়ামি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে
উন্নতির জন্য নিয়ােজিত করিতে প্রতিপদে বাধা দিতেছে
৮৩

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
এবং সমাজকে প্রতিমুহূর্তেই বলিতেছে—এই পর্যন্ত আর
বেশী অগ্রসর হইতে পারিবে না; এই জন্যই সমাজসংস্কারক
ও সমাজবৈপ্লবিক দলসমূহের সহিত প্রতিনিয়ত বিরােধ
ঘটিতেছে।
বিগত পঞ্চাশ বৎসরব্যাপী সময় খৃষ্টিয় চার্চ প্রতিপদে
বিজ্ঞানের বিপক্ষতাচরণ করিয়া আসিয়াছে এবং অবশেষে
একটা রফা করিয়াছে, অর্থাৎ বিজ্ঞান ধর্মের প্রতিকুল
সমালােচনা করিবে না, বৈজ্ঞানিক নিজের ধর্মবিশ্বাস স্বীয়
হৃদয়কন্দরে নিভৃতভাবে রাখিবেন আর বাহিরে ল্যাবরে-
টারিতে বিজ্ঞানচর্চা করিবেন, তথায় ধর্মের সমালােচনা
করিবেন না। ইহার ফলে এই বিষয়ে অনেক বৈজ্ঞানিকের
মনের ভাব Faradayর ন্যায় হইয়াছে যিনি বলিয়াছিলেন,
“আমি আমার ধর্মবিশ্বাস জামার এক পকেটে, আর বিজ্ঞান
চর্চা অন্য পকেটে রাখি। অবশ্য কোন বৈজ্ঞানিক যদি
ছাত্র মহলে প্রকাশ্যভাবে নাস্তিকতা বা প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের
বিরুদ্ধে কিছু বলেন তাহা হইলে তাহার তথায় স্থান নাই।
আমেরিকা খৃষ্টধৰ্ম্ম-প্রধান দেশ অর্থাৎ তথায় সর্বলােকে
চার্চের সভ্য না হইলেও তৎধৰ্ম্মের হুজুগ তথায় বিশেষ প্রবল।
নাস্তিককে লােকে শ্রদ্ধা করে না। “Age of Reason”এর
প্রণেতা বিখ্যাত Thomas Paine ইংরেজ হইয়াও
আমেরিকার জাতীয় স্বাধীনতাসমরে সহায়তা করিলেও তিনি
স্বাধীন চিন্তাৰাদী বলিয়া তাহার নাম সেদেশে বিশেষ আদৃত
৮৪

আমার আমেরিকায় অভিজ্ঞতা। } হয় না। Ingersollএর দশাও তদ্রুপ। যাহারা খ্ৰীষ্টান নন তাহারা অন্য একটা কিছু বিশ্বাস করেন। সমাজে চিন্তা ও ধর্মবিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতার উপর লােকের শ্রদ্ধা নাই ; কিন্তু ইহাতে কেহ মনে যেন না করেন যে, আমেরিকায় নাস্তিক বা স্বাধীন ধর্মমতাবলম্বী লােক বর্তমান নাই। এ প্রকারের অনেক লােকই আছেন কিন্তু সে মত সমাজের উপর বিশেষ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে না বরং নূতন যে সব ধর্ম- পন্থার উদ্ভব হইতেছে, তাহাদের প্রভাব সমাজে অনুভূত হয়। আমেরিকার খ্ৰীষ্টীয় চার্চ অতি আক্রমণশীল (aggressive)। গির্জায় দেশ ছাইয়া পড়িয়াছে, তৎপরে বিদেশে সর্বত্র মিশনারী পাঠাইতেছে। বিদেশে মিশনারী পাঠান বিষয়ে আমেরিকায় যত উদ্যোগ ও উৎসাহ দৃষ্ট হয় ও যত টাকা চঁাদা উঠে অন্য কোন খৃষ্টান দেশে এ প্রকার নাই। আমেরিকান চার্চের বিশ্বাস যে, অন্য দেশ বিশেষতঃ অখৃষ্টান দেশ, তাহার ধর্মমত ও তৎসঙ্গে আমেরিকান সভ্যতা না গ্রহণ করিলে সে দেশের মঙ্গল নাই। অবশ্য চার্চের ভিতরও দলাদলি আছে, প্রত্যেক সম্প্রদায় বলে তাহার মণ্ডলী-পদ্ধতি উৎকৃষ্ট এবং বহির্জগতে তাহার অনুকরণ বাঞ্ছনীয়। আমেরিকান খৃষ্টান, বেশীর ভাগ লােকই Athanasian creed বিশ্বাস করে অর্থাৎ যীশুর ঈশ্বরত্ব, অলৌকিক জন্ম ও মৃত্যুর পর কবর হইতে সশরীরে পুনরুত্থান ও স্বর্গে গমন বিশ্বাস করে। অবশ্য ইহাদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও চিন্তা- আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। শীল ব্যক্তি আছেন যাঁহারা ধর্মের উদার ব্যাখ্যা দেন ও বাইবেলের অলৌকিক গল্পগুলির উপর নিজেদের ধর্মবিশ্বাস স্থাপন করেন না। আজকালকার শিক্ষিত খৃষ্টানেরা বাই- বেলের সৃষ্টি, অনেক প্রকার অলৌকিক ও অনৈসর্গিক গল্প- গুলির সত্যতার ও যুক্তিযুক্ততার বিষয় তর্ক না করিয়া নীরব থাকেন এবং খৃষ্টের জীবনীকে আদর্শ বলিয়া গ্রহণ করেন। ইহারা খৃষ্টান ধৰ্ম্মকে social serviceএ পরিণত করিতে চাহেন এবং করিতেছেন। ইহারা বলেন যে খৃষ্টান ধর্মের কর্তব্য হইতেছে, লােকশিক্ষার বন্দোবস্ত করা, পীড়িতদের সেবা করা, অস্বাস্থ্যকর স্থানকে স্বাস্থ্যকর করা, জনহিতকর কর্ম করা এবং নৈতিক-জীবনে খৃষ্টের উপদেশ মান্য করিয়া চলা। অবশ্য ইহারা সাম্প্রদায়িক হিসাবে Athanasian creedএ বিশ্বাসী। হয়ত কেহ কেহ সে বিষয়কে পুরুষানুক্রমিক সামাজিক প্রথা বলিয়া গ্রহণ করেন, কেহ হয়ত তাহার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেন আর কেহ অন্তরে তাহা মানেন না, কিন্তু তাহা তাহার বংশগত সাম্প্রদায়িক মত বলিয়া তাহার বিপক্ষতাচরণ করেন না। আবার এমন প্রকারের লোেকও আছেন যাঁহারা ব্যক্তিগতভাবে খৃষ্টান ধর্মে বিশ্বাস করেন না কিন্তু সামাজিকতার জন্য স্বীয় বংশগত সম্প্রদায়ের গির্জায় স্থান (pew) ভাড়া (reserve) রাখেন, তথায় পৰ্বদিনে বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেন কারণ পর্ব দিবসে গির্জার ধর্ম- উপাসনাও একটি সামাজিক ব্যাপার ; সেদিন হয়ত অমুক ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
স্ত্রীলােক গাহিবেন যিনি একজন বিখ্যাত Soprano অথবা
একজন Tenor গায়ক গাহিবেন। অবশ্য এই ভাড়াটিয়া
গায়কেরা ওই দিনের জন্য নিয়ােজিত হয়।
আমেরিকার খৃষ্টীয় সমাজকে চারি ভাগে বিভক্ত করা
যাইতে পারে, প্রথমতঃ একদল অসভ্য এবং বর্বর প্রকৃতির
লােক-সমষ্টি যাহারা বেশীর ভাগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের
মরুভুমির দিকে বাস করে। ইহারা নামে খৃষ্টান কিন্তু প্রাত্যহিক
জীবনে ধৰ্ম্ম ও নীতিশূন্য এবং অতি হিংস্র প্রকৃতি বিশিষ্ট।
Tennesse, Kentucky ষ্টেটদ্বয়ের পর্বতের লােকেরা অতি
বর্বর ও নিষ্ঠুর। তাহারা বর্তমান আমেরিকান সভ্যতার বড়
ধার ধারে না, যে ইংরেজী ভাষা কহে তাহাতে অনেক
পুরাতন ও বর্তমানে অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহৃত হয়। ইহারা
আমাদের আফগান সীমান্তের পাঠানদের ন্যায় মারকাট ও
রক্তারক্তিতে সময় অতিবাহিত করে, ইহাদের অনেকে নাকি
দ্বীপান্তরিত Scottish Highlanderদের বংশসস্তৃত। কোন
কোন ভদ্রলােকের মুখ হইতে এমনও শ্রবণ করিয়াছি যে,
খৃষ্টীয় মিশনারীদের প্রাচ্যদেশসমূহে প্রেরণ না করিয়া ইহাদের
সভ্য ও খৃষ্টান করিবার জন্য নিযুক্ত করা বিধেয়।
মরুভূমির কাছে যে সব লােক থাকে, তাহারা কেহ বা পণ্ড
উৎপাদন ক্ষেত্রে (Ranch) আর কেহ মরুভূমির canyon
বা অন্যস্থানে থাকে তাহাদের জীবনও অতি ভীষণ। সভ্যতা
ও সামাজিক জীবনের কোমলতার ফল লাভে তাহারা বঞ্চিত,
তৎপরে

আর আমেরিকার অভিজ্ঞতা। প্রয়ােজন হইলে কোন প্রকার নিষ্ঠুর কন্মে তাহারা কুষ্ঠিত মং। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোেক যাহারা সংখ্যায় সর্বোপরি, তাহারা খৃষ্টান, ধর্ম ও সামাজিক জীবনে খৃষ্টীয় প্রথার সমস্ত খুটিনাটি মানিয়৷ চলেন। অবশ্য ইহঁদের মধ্যে New Englandএর গোঁড়া puritan এবং presbyterian লােক হইতে উদার- হৃদয়ের লােক পর্যন্ত আছেন। এই গোঁড়ার দল ধর্মসম্বন্ধে অনুদার হইলেও নৈতিক জীবনের উচ্চ আদর্শের পতাকা ধরিয়াছেন এবং এই দলই প্রথমে আমেরিকার সভ্যতার মেরুদণ্ডস্বরূপ ছিল। আমেরিকান সভ্যতায় যে আজ ইংরেজী সভ্যতার স্পষ্ট ছাপ পড়িয়াছে যাহা দ্বারা আমেরিকান সভ্যতাকে ইংরেজী সভ্যতার একটি অঙ্গ বলিয়া পরিগণিত হয় এবং তজ্জন্য উভয় দেশের সভ্যতা ও চর্চা একটি সাধারণ Anglo-saxon civilization বলিয়া উল্লিখিত হয়,তাহা wat diretorit te SCTE Puritan, Presbyterian, Episcopalian প্রভৃতি সম্প্রদায়ের দ্বারাই সংঘটিত হইয়া- ছিল। New Englandএর অনুদার ও গোঁড়া খৃষ্টানের দল সঁহারা অন্য সম্প্রদায়ের নাম শ্রবণ করিতে পারে না এবং অষ্টানদের নরক বাসের ব্যবস্থা করে তাহারা সেই ইংলণ্ডের fanatic (অনুদার ) puritan ঔপনিবেশিকদেরই বংশধর। এই গোড়ার দলই অখৃষ্টানদের “সভ্য করিবার জন্য মিশনারী পাঠাইবার জন্য বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করে।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। তৃতীয় শ্রেণী উদারমতাবলম্বী খৃষ্টানের দল। ইহারা দ্বিতীয় শ্রেণী হইতে উদ্ভূত এবং খৃষ্টানধর্মে বিশ্বাসকারী। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত বলিয়া বাইবেলের উদার ব্যাখ্যা দেন। ইহাদের মধ্যে নানান্তরের উদারমত বিরাজ করে। সকলেই Athanasian creedএ বিশ্বাস করেন, অন্ততঃ সেই মন্ত্র প্রার্থনার সময় আবৃত্তি করেন, কিন্তু তাহারও উদার ব্যাখ্যা করেন। অখষ্টান দেশের মিশনারী প্রেরণের আন্দোলনটা অনেকটা ইহাদের হস্তে। ইহারা বলেন যে, খৃষ্টান ধর্ম জগতের সভ্যতার অগ্রভাবে গমন করিতেছে, তজ্জন্য খৃষ্টান social-polity । সমাজ-নীতি ) মানব জাতির কল্যাণকর ও তৎধৰ্ম্ম মুক্তিপ্রদ। অবশ্য খৃষ্টানধৰ্ম্ম অর্থে ইহারা প্রটেষ্টান্ট ধৰ্ম্মকে বুঝেন, রােমান ক্যাথলিক ও গ্রীক চার্চকে কুসংস্কার- পন্ন ও বিশুদ্ধ নহে বলিয়া প্রতিপন্ন করেন। কিন্তু ইহারা মূলেই ভুল করেন যে, ইউরােপের কতিপয় দেশ ও আমেরিকার যে অংশ সভ্য ও উন্নত তথায় যুক্তিপন্থাবলম্বী বর্তমান সভ্যতা ( rationalistic modern civilization ) বিরাজ করিতেছে, ইহার স্ফুরণের ও প্রসারের বিপক্ষে প্রটেষ্টান্ট সম্প্রদায় কম লড়েন নাই । চাচ্চ প্রতিপদে যুক্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক নবভাবকে বাধা দিয়াছে কেবল উচ্চ শিক্ষিত লােকদের কর্ম ও নির্যাতনের ফলে যে বর্তমান যুগধর্মের প্রভাব সঞ্চারিত হইয়াছে তাহারাই তেজে বর্তমান সভ্যতা উপরােক্ত দেশসমূহে বিরাজ করিতেছে। বর্তমান যুগের আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা সভ্যতা খৃষ্টীয় সভ্যতা নহে, ইহা আন্তর্জাতিক ও অসাম্প্রদায়িক, এই সত্যটী এই দল গোঁড়ামির জন্য দেখিতে চান না। এইদল মিশনারীদের শিক্ষা দিবার জন্য নানাস্থানে Theological Seminary স্থাপন করিয়াছেন। তথা হইতে ছাত্রদের শিক্ষিত করিয়া বিদেশে প্রেরণ করা হয়। পুর্বেই বলিয়াছি যে, জনসেবাকে ইহরা খৃষ্টানধৰ্ম্মের প্রধান কর্ম বলিয়া গ্রহণ করিতেছেন, তজ্জন্য Philanthropy, Social Service কর্মের উপর ইহারা বিশেষ নজর রাখেন। নিউ- ইয়র্কের Union Theological Seminary মিশনারীদের একটী বড় কেন্দ্রস্থল। ইহাতে রােমান ও গ্রীক চাচ্চ ব্যতীত সর্বপ্রকারের প্রটেষ্টান্ট সম্প্রদায় সম্মিলিত হইয়াছে। এইসব Seminaryর দলই Y.M.C.A ও মিশনারী movement চালাইতেছে। উপরােক্ত Seminaryর সভাপতি পরলােকগত Dr, Cuthbert Hall ভারতে খৃষ্টীয়নীতি ও ধর্ম প্রচারের জন্য Haskel lecturerরূপে আসিয়াছিলেন, কিন্তু এদেশে আসিয়া ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের ভাবে এত ভাবে এত অভিভূত হইয়াছিলেন যে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে তাহার উপরােক্ত খৃষ্টান সেমিনারীতে স্বীয় পদ রাখা মুস্কিল হইয়াছিল এবং ১৯১৩ খৃঃ দক্ষিণের কোন মিশনারী কনফারেন্সে ঐ সেমি- নারীর বর্তমান সভাপতি Dr. Brownকে “heathen” বলিয়া অভিশপ্ত করা হয় এবং এই সেমিনারী “Pantheism, Hinduism, vedantism” প্রচার করিতেছে বলিয়া অভিযুক্ত

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
হয়। এই সেমিনারীর অনেক ছাত্রের সহিত আমার আলাপ
ছিল, তাহারা প্রাচ্য ভূখণ্ডে মিশনারী হইয়া আসিবার জন্য
প্রস্তুত হইতেছিলেন। তাহাদের মত উদার, অন্য ধর্মের বিষয়
সংবাদও রাখেন, এবং আদৌ fanatic নহেন। ইহাদের মধ্যে
একজনকে ইহাও বলিতে শ্রবণ করিয়াছি যে, আমি অন্যধর্ম
ও তাহার নেতাদের নিন্দা করিতে শিক্ষা করি নাই, সত্য
সর্বধৰ্ম্মেই আছে। ইহাদের মধ্যে অনেককে খৃষ্টকে
ঈশ্বরের অবতার বলিয়া অস্বীকার করিতে শুনিয়াছি, অর্থাৎ
তাহারা Athanasian creed যাহা খৃষ্টান ধর্মের বীজমন্ত্র,
তাহাতে অবিশ্বাস করিতে শুনিয়াছি। এবারের একজন
ভদ্রলােক Chicago বিশ্ববিদ্যালয়ের Theological বিভাগে
Christian Theology অধ্যাপক ছিলেন। তিনি
জাপানে মিশনারী ছিলেন। তাঁহাকে আমি
প্রায়ই ঠাট্টা করিতাম, “প্রতীচ্য ভূখণ্ডের পৰ্যটকেরা
প্রাচ্যে ২৪ দিনের ভ্রমণান্তর দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া
প্রকাণ্ড পুস্তক লেখেন এবং তৎদেশসমূহ সংস্কারের
ব্যবস্থা করেন, তিনি তােপ কিছু লিখিয়াছেন কি না?
উত্তরে তিনি লজ্জায় বলতেন, “আমি বৎসর কতিপয়
জাপানে ছিলাম বটে কিন্তু তৎদেশ জানিনা এবং কোন
পুস্তকও লিখি নাই
লিখি নাই ?” ধর্ম বিষয়ে ইতি প্ৰচালত খৃষ্টান ধর্ম
আদৌ বিশ্বাস করেন না,যীশুকে কেবল একটি আদর্শ চরিত্রের
পুরুষ বলিয়া মানেন। এ বিষয়ে তাহাকে একজন Unitarian
পূর্বে

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। মতাবলম্বী বলা যাইতে পারে। কিন্তু ইহারা সকলেই Evangelical Churchএর সভ্য অর্থাৎ তথাকথিত নৈষ্ঠিক খৃষ্টান সমাজের সভ্য। ইহারাই খৃষ্টান সমাজের অভ্যন্তরে থাকিয়া তাহাকে উদার করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছেন; কিন্তু এবম্প্রকারের লােক অতি কম সংখ্যক। আবার এই শ্রেণীর মধ্যে আর এক ছাঁচের লােক আছেন যাহা দৃষ্টান্তস্বরূপ বুঝাইবার চেষ্টা করিব। এই দৃষ্টান্ত উল্লেখ করিবার কালে আমার Alma Materএর দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক Charles Grey Shawকে গ্রহণ করিতেছি। ইনি ইহার “Precints of Religion” নামক পুস্তকে লিখিয়াছেন, যপ পুরাকালে সেমিটিক ধর্ম (হিব্ধধর্ম) ও আৰ্য্যচর্চার (গ্রীক) সন্মিশ্রণে খৃষ্টীয় ধর্মের উদ্ভব হইয়াছে, তদ্রুপ বর্তমানেও শেষােক্ত ধৰ্ম আৰ্যচিন্তার ( হিন্দুধর্ম) প্রভাবের সন্নিধানে আসিতেছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, প্রতীচ্যেরা আৰ্যভাব গ্রহণ করিতে সমর্থ হয়, আর সর্ব ধর্মের নীতিতে এক কথাই ব্যক্ত হইয়াছে। আর খৃষ্টান ধৰ্ম্ম, যেহেতু সেমিটিক ধর্ম ও আৰ্যচিন্তার সমবায়ে সংসৃষ্ট অতএব বর্তমানেও ইহা আৰ্যভাব গ্রহণ করিতে পারে, কিন্তু এই সমবায়ের ফলে খৃষ্টীয় নীতিতেই ধৰ্ম্মনীতির উৎকর্ষতা লাভ করিয়াছে। ইনি নিজে একজন Theologician, কিন্তু থষ্টনীতির ব্যাখ্যাকালে বাইবেলের গল্পগুলি ভুলিয়া যান, কেবল মানবজীবনের নীতির কথারই চর্চা করেন। এই সব প্রকারের লােকই খৃষ্টীয় Evangelical আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। Churchএর মস্তক স্বরূপ বিরাজ করিতেছেন ও missionary movement চালাইতেছেন; কিন্তু এবারের লােক বােধ হয় এদেশে আসেন না। বেশীর ভাগ মিশনারী যাহারা anthos Stata otstay Chauvinist i Frati movement কিরূপে chauvinismএর ছায়ায় রহিয়াছে এবং উপরােক্ত উদারনৈতিক লােকেরাও কেন মিশনারী হন তাহা ভবিষ্যতে আলােচনা করিব। তৎপরে আসে তৃতীয় প্রকারের দল। ইহারা খৃষ্টীয় চার্চ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছেন, এবং নিজেদের ধর্মমণ্ডলী; গঠিত করিয়াছেন। এই দল নানাপ্রকারের পন্থায় বিভক্ত 7914--Christian Science Church, Theosophists, Spiritualists, Vedantists, New Thought Movement, Mental Healers ও Bahaists প্রভৃতি। বেহাই দল ব্যতীত অন্যগুলি “সুত্রে মণি গণাইব” ন্যায় সকলেই হিন্দুদর্শনশাস্ত্রের ছায়ায় দণ্ডায়মান, যদিচ বৈদান্তিকদল ছাড়া আর কেহই ইহা স্বীকার করিবেন না। আর বেহাইষ্টরা পারস্যের বেহাউল্লা প্রতিষ্ঠিত নবধর্মাবলম্বী। ইহাদের মুসলমান বলা যায় না; ইহারা বেহাউল্লাকে ঈশ্বরের অবতার বলেন, এবং তিনি যে খােদার কাছ হইতে একটি নূতন পয়গম ( আদেশ-revelation) পাইয়াছেন তাহাই বিশ্বাস করেন। এই বেহাই সম্প্রদায় ব্যতীত উপরােক্ত সকলেই অদ্বৈতবাদী ( Monist), যদিচ হিন্দুদর্শনশাস্ত্র হইতে এই ঋণের কথা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। Christian Scientists, Mental Healers, New Thought প্রভৃতি দলেরা স্বীকার করেন না। কেহ কেহ বলেন যে, Christian Science Church স্থাপয়িত্রী Mrs. Mary Baker Eddyর বিখ্যাত পুস্তক “Science and Health তাহার গুরু Mr. Quimbyর লিখিত (শেষােক্তের মৃত্যুর পর Mrs. Eddy নিজের নামে মুদ্রিত করেন)। এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে না কি লিখিত ছিল যে, এই অদ্বৈত মতবাদ গীতা হইতে গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু এই পন্থা ও মিসেস্ এডির ধৰ্ম্মের মূলােৎপত্তি বিষয়ে নানা মত আছে, আর মিসেস্ এডি তাহার ধর্মপন্থাকে খৃষ্টীয় নামে অভিষিক্ত করিয়াছেন। এইদল ডাক্তারি চিকিৎসাতে বিশ্বাস করেন না, তাহারা মানসিক শক্তিদ্বারা ব্যায়রাম আরােগ্য করেন। ইহাদের ভজনাস্থলে প্রত্যেক বুধবারে এক মিটিং হয়। সে সময় সকলকার ব্যামােহ হইতে আরােগ্য বিষয়ে confession দিতে হয়। আমি এই প্রকার confessional meetingএ উপস্থিত হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহাদের আরোেগ্য-বিষয়ক-স্বীকারােক্তি শ্রবণ করিয়া এই চিকিৎসাতে আমার বিশ্বাস উৎপাদন হয় নাই। ইহারা বিশ্বপ্রেমিক ও মানবের ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাস করেন, তথাচ নিউইয়র্কের এই পন্থার প্রধান ভজনাগারে আমি স্বচক্ষে রংএর গণ্ডী টানিতে দেখিয়াছি। আর New Thought প্রভৃতি যে সব নূতন ধরণের freelance পন্থার উদ্ভব হইতেছে তাহার অনেক নে স্বামী আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। বিবেকানন্দের ছাত্র ছিলেন, এবং তাহার নিকট শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে একজন অগ্রণী ব্যক্তি পূর্বে খৃষ্টীয় ধর্মযাজক ছিলেন, পরে স্বামী বিবেকানন্দের সংস্পর্শে আসিয়া ধৰ্মমত পরিবর্তন করেন। ইহার ধর্মযাজকত্ব অবস্থায় Chicagoতে ১৮৯৩খৃঃ Parliament of Religionsএর অধিবেশন হয়। তৎকালে ইনি স্থির করিয়াছিলেন যে, উক্ত সভায় এমন প্রকারের এক প্রচণ্ড বক্তৃতা করিবেন, যাহাতে বিধর্মীর দল বিমূঢ় হইয়া যাইবে ( would confound the heathens )। কিন্তু কপালের ফেরে উল্টা সমঝলি রাম। ইনি উক্তস্থলে স্বামী বিবেকা- নন্দের বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া নিজেই বিমূঢ় হন ও পরে খৃষ্টীয় ধর্মযাজক ত্যাগ করেন। এক্ষণে ইনি উপরােক্ত পন্থার একটি বড় পাণ্ডা। এই দলও মানসিক শক্তির দ্বারা ব্যায়রাম চিকিৎসা করেন। ইহারা এখনও একটা church গঠন করিতে পারেন নাই। এই সব ব্যতীত, New England Unitarian Church বর্তমান আছে যদিচ ইহা সংখ্যায় মুষ্টিমেয় মাত্র। এই মণ্ডলী খৃষ্টের অবতারত্বে ও ভগবানের ত্রিত্বে (Trinitarianism) বিশ্বাস করে না এইজন্য ইহারা এককালে নির্যাতিত হইতেন, এবং এক্ষণেও খৃষ্টানেরা ইহাদের খৃষ্টান বলিয়া গণ্য করে না। কিন্তু এককালে আমেরিকান রাজনীতিক, সংস্কারক ও সাহিত্যিক জীবনে ইহাদের প্রভাব অতি বেশী

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
ছিল। ইহারাই বষ্টনের Harvard University পরিচালনা
করিতেছেন।
ইহার বাহিরে থাকেন নাস্তিক ও স্বাধীন চিন্তাবাদীর দল।
কিন্তু তাহাদের কোন মণ্ডলী বা আন্দোলন আমার চক্ষে পতিত
হয় নাই। ব্যক্তিগতভাবে অনেক স্বাধীন চিন্তাবাদী আছেন
এবং সােসালিষ্ট প্রভৃতির দলে এই পন্থার লােক মিলে; কিন্তু
সমাজের উপর তাহাদের প্রভাব লক্ষিত হয় না।
আমেরিকা ধৰ্ম্ম হুজুগের দেশ তজ্জন্য তথায় ধর্মের নামে
নানাপ্রকারের প্রতারণাও হয়। এই জন্য ভারতের ন্যায়
আমেরিকাকেও great faking country বলা যাইতে পারে।
তৎদেশে পুরুষদের almighty dollar হইতেছে একমাত্র
উপাস্য, তাহারা অর্থচিন্তায় দিবারাত্র ঘুরিতেছে আর স্ত্রী-
লােকেরা হুজুগ করিয়া বেড়ায়। যাহারা গোড়া খৃষ্টান
তাহারা চার্চের হুজুগ লইয়া ব্যস্ত, আর যাহারা freelance
হইয়াছে তাহাদের নিত্য নূতন হুজুগের পশ্চাৎ অনুধাবন
করিতে হয়। প্রাচ্য হইতে কেহ একটা নূতন হুজুগ আমদানি
করিলে অমনি একদল স্ত্রীলোেক কিছুদিন তাহার পশ্চাতে উন্মত্ত
হয়। আবার কিছুদিন বাদে সেই স্ত্রীলােকেরা অন্য একটা
নূতন হুজুগে যােগদান করে। একটা season বেদান্ত
সােসাইটি, অন্য বৎসর Christian Science Church,
5896 Bahaism | New Thought Movementua
মােগদান করা হইতেছে ইহাদের রীতি। ইহারা ধৰ্ম্ম সঙ্কন্ধে

আশার আমেরিকার ভিতা। ; বিশেষ কিছু ৰুৰেন কলিয়া বােধ হয় না, তবে তাঁহারা হজুগে মাতিয়া নিজেদের social campaign ( সামাজিক আলাপ পরিচয়াদি) কৰ্ম্ম সমাধা করিয়া লয়েন। বিভিন্ন দলে মিশিয়া সামাজিক উন্নতি লাভ করিবার চেষ্টা করেন। আবার ধনী স্ত্রীলােকেরা এই হুজুগে মাতিয়া বিশেষ অর্থ ব্যয় করেন। অবশ্য ইহারা যে হুজুগেই যােগদান করুন না কেন, সমাজের অভ্যন্তরেই থাকেন ; ধর্মমতের বিভিন্নতার জন্য পৃথক সমাজ ইহারা গঠিত করেন না। সেই জন্যই এই সব হুজুগের স্থায়ীত্ব বেশী দিন হয় না। এই হুজুগের দ্বারা খৃষ্টীয় চার্চের Heathen Mission Fundএর আয়ের কথকাংশে ক্ষতি হইলেও সকলেই খৃষ্টীয়ান-আমেরিকানই থাকেন ; ধর্মের বিভিন্নতা দ্বারা বিভিন্ন আচার-ব্যবহার-সম্বলিত পৃথক পৃথক community ( মণ্ডলী) স্থাপিত হয় না। সকলেই জাতীয়ত্বে আমেরিকান, আচার-ব্যবহারে আমেরিকান ও বংশপরম্পরায় খৃষ্টীয়ান। হুজুগ কেবল কতকদিনের তরে তাঁহাদের ভাসাইয়া লইয়া যায়। তৎপরে খৃষ্টানদের ভিতর যাহারা উদারনৈতিক অর্থাৎ যাহারা যীশুখৃষ্টের ঈশ্বরত্বে ও তদনুগত অন্যান্য মতগুলিতে ( dogmas) বিশ্বাস করেন না, তাঁহাদের অনেকেও বংশ- পরম্পরায় স্বীয় বংশগত চার্চের সভ্য থাকেন। সামাজিক ব্যাপারে তাহারা বংশগত চার্চের মত ও সামাজিক অনুষ্ঠান- গুলি প্রতিপালন করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলি—আমার আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। চিকাগাে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনকালে তথাকার Post Graduate College-এর Deanকে ক্লাসে বলিতে শুনিয়াছিলাম যে, “আমি Baptist Church-এর সভ্য, কেন আমি এই মণ্ডলীর সভ্য হইলাম ও সেই চার্জের ধর্মমত কি তাহা আমি কখনও অনুসন্ধান করি নাই, আমি সেই চার্চের সভ্য কারণ আমার পিতা সেই মণ্ডলীর সভ্য ছিলেন। ইনি উপরােক্ত প্রকারের উদারনৈতিক লােক, এবং নিজে একটি বড় সমাজ- তাত্ত্বিক ; তাহাকে ঐ চার্চে যাইয়া উপাসনায় যােগদান করিতে দেখিয়াছি কারণ সামাজিক ব্যাপারে তিনি উক্ত মণ্ডলীর একজন সভ্য। আবার আমেরিকায় ধর্ম ও মানবের ভ্রাতৃত্ববন্ধনের এত হুজুগ থাকা সত্বেও তথাকার রংবিদ্বেষ , সর্বত্র কলুষিত করিয়াছে। শ্বেতচর্মী আমেরিকান সে যাহাই করুক, তাহার এই রং-আতঙ্ক দূর হয় না; সাধারণ খৃষ্টানেরা মনে করে যে, যীশুখৃষ্ট ও তঁাহার শিষ্যেরা শ্বেতচর্মী পুরুষ ছিলেন। যীশু যে ঢিলা পায়জামা পরা মস্তকে পাগড়ী শশাভিত, মলিন বর্ণের “Oriental” (প্রাচ্য দেশীয়) ছিলেন ইহা সাধারণে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে না। একবার একটি সুইডিস আমেরিকান পাদরিকে কথােপকথনচ্ছলে জিজ্ঞাসা করিয়া- ছিলাম, “আপনি সত্য করিয়া বলুন, আপনার মণ্ডলীর সভ্যগণ কি মনে করেন না খৃষ্ট তাহাদেরই মতন একজন নীলচক্ষু, কাচুল বিশিষ্ট (blond) ব্যক্তি ?” তিনি লজ্জায় অপাে- ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
সত্য,
বদন হইয়া মৃদু হাস্যে আমার কথায় সায় দিয়াছিলেন।
তৎপর যীশু যে “ইহুদী” জাতীয় ছিলেন, ইহাও অনেকে
ধারণা করিতে পারে না। এই বিষয় একজন আমেরিকান
ভদ্রলােককে বলাতে তিনি আমায় বলিয়াছিলেন যে, “ইহা
আমায় একবার একটী মহিলা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন
যে, মিষ্টার অমুক ইহা কি সত্য যে, যীশু একজন ইহুদী
ছিলেন?” অবশ্য যাহারা সঠিক সংবাদ রাখেন তাহারা
উপরােক্ত সত্য জানেন কিন্তু তাহা একটা abstract ধারণা
মাত্র। এই ইহুদি-বিদ্বেষ এবং রং ও প্রাচ্য-বিদ্বেষ-সম্বলিত
জনসমষ্টির অনেকেই ধারণা করিতে পারেন না যে, যীশুখৃষ্ট
ঐ ঘৃণ্য জাতি ও উক্ত মহাদেশের লােক ছিলেন। ১৯১২ খ
বেহাই ধৰ্ম সংস্থাপনকৰ্ত্তা বেহাউল্লার পুত্র আবদুল বেহা
এফেন্দী আমেরিকায় আগমন করেন। প্রথমে তাহাকে
ঈশ্বরের অবতারের পুত্র বলিয়া আমেরিকান বেহাইএর দল
অতি সম্মানের সহিত সমাজে গ্রহণ করিয়াছিল ; কিন্তু জনরব
শুনিয়াছি যে পরে তাহার প্রতিক্রিয়া উপস্থিত হইয়াছিল।
তাহার মলিন বর্ণ, লম্বা দাড়ী, মাথায় পাগড়ী ও ঢিলে
পায়জামা ও চোগা পরা, ও তৎপর দুর্বোধ্য ফারসীতে কথা
ও “সেলাম আলেকাম” বলিয়া অভিবাদন করিতে দেখিয়া
শ্বেতাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গিনীদের নাকি শ্রদ্ধা ও ভক্তি অনেকটা
অন্তহিত হইয়া গিয়াছিল। ঈশ্বর ও তাহার পুত্র দূর হইতে
নমস্য ও শ্রদ্ধার ভাজন, কিন্তু যদি তিনি উপরােক্ত লক্ষণাক্রান্ত

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ঘৃণ্য প্রাচ্যদেশীয় হন তবে আমেরিকান হৃদয়ে তাহার স্থান নাই। এই বিষয়ে পরে কোন হিন্দু-বন্ধু আমেরিকান অধ্যাপকের নিকট উল্লেখ করিয়া আমার উপরােক্ত সমাজ- তাত্ত্বিক মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলাম। তিনি লজ্জায় অপােবদন হইয়া মৃদুভাষে উত্তর দিয়াছিলেন, “মিষ্টার দত্ত, তুমি আমেরিকানদের যথার্থ ই চিনিয়াছ!” কালিফোর্নিয়ার অন্তর্গত Pasadena নামক স্থানে একটি বড় Presbyterian Churchএর প্রবেশদ্বারের সম্মুখে (vestibule) নাকি একটি কাচের বৃহৎ নীলচক্ষু মাটিতে ( foor) স্থাপিত করা আছে। ইহা ঈশ্বর-চক্ষুর প্রতীকরূপে তথায় স্থাপিত করা হইয়াছে ; উদ্দেশ্য যে, প্রত্যেককে ঈশ্বরাধনার পূর্বে ভগবৎ-চক্ষুর দষ্টির পরীক্ষা গ্রহণ করিতে হয়। কিন্তু এই ভগবৎ-চক্ষুর প্রতীকের রং নীল। উত্তর ইউরােপীয়দের আমেরিকান বংশধরগণের চক্ষু নীল, সেইজন্য ভগবানের চক্ষুও নীল বর্ণের ! এই ঘটনা এই সত্যের পােষকতা করে যে, মানুষ নিজের মূৰ্ত্তিতেই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করে, ঈশ্বর মানুষকে নহে। উপরােক্ত অবস্থাতে বােধগম্য হয় যে, ধৰ্ম্ম বেশীর ভাগ স্থলেই social functicn ( সামাজিক অনুষ্ঠান) রূপে কাৰ্য- কলাপে পরিণত হইয়াছে। ধৰ্ম্ম তাহার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ও কর্মগুলি হারাইয়া এক্ষণে অন্তঃসারশূন্য অস্থিতে পরিণত হইয়াছে। ধর্মের functionটা চলিয়া গিয়াছে আছে কেবল structure। যাহা পূর্বে কাৰ্যের সহায় ও আধার ছিল কারণ,

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
তাহা এক্ষণে অন্তরায় হইয়া দাড়াইয়াছে। এই জন্যই
আর উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারিতেছে না, আর
অন্ধমানব অজ্ঞতা বশতঃ নিজের মধ্যে কাটাকাটি করিতেছে।
ধৰ্ম্ম তাহার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হারাইয়া আজ পেশায় পরিণত
হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলিতে পারি আমার দুইজন আমে-
রিকান সমাধ্যায়ীদের জানিতাম, যাহারা মহানাস্তিক হইয়াও
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা লইয়া খৃষ্টীয় ধর্মযাজক পদের
জন্য শিক্ষানবীশ হইয়াছিলেন। আমি তাঁহাদের প্রশ্ন
করিয়াছিলাম যে, তাহারা খৃষ্টীয়-ধর্মে বিশ্বাসী নহেন
এবং ঈশ্বরেও বিশ্বাস নাই, তত্ৰাচ কিরূপে তাহারা এই
পেশা অবলম্বন করিলেন ? একজন ইহার উত্তরদান করেন
নাই, এবং অন্যজন বলিলেন যে চার্চের কর্মে organizing
capacity develop করা যায়, সেই জন্যই এই পেশা তিনি
অবলম্বন করিতেছেন।” পুনরায় যখন আমি বলিলাম, “এই
পেশায় তাহাকে প্রতিপদে ভণ্ড হইতে হইবে, কারণ তিনি নিজে
নিরীশ্বরবাদী, তাহার কাছে স্বর্গ নরক কিছুই নাই কিন্তু
আমি heathen, আর তাঁহাকে প্রতিনিয়তই ধর্মের বেদী
হইতে প্রচার করিতে হইবে যে, heathenরা খৃষ্টধর্মে
অবিশ্বাসী বলিয়া নরকে যাইবে ; তিনি কি আমার জীবনান্তে
নরক গমনে বিশ্বাস করেন ?” ইহার প্রত্যুত্তর তিনি দেন
নাই, কেবল অপােবদন হইয়াছিলেন। আর একটি দৃষ্টান্ত
দিব ; নব-ইংলণ্ডে ইংরেজবংশীয় আমার কোন Baptist

আমার আমেরিকায় অভিজ্ঞতা। Church-এর ধর্মযাজক বন্ধু ছিলেন। ইনি আমায় বলেন যে, তিনি Trinitarian Christianityতে আদৌ আর বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারেন না; এইজন্য ভণ্ড না সাজিয়া তাহাকে উক্ত চার্চের সহিত সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে; আর্থনীতিক কারণ বশতঃ ইহা একেবারে অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে, তাহাকে অনেকের গ্রাসাচ্ছাদন জোগাইতে হয়। আমি তাহাকে বলিয়াছিলাম, যে যখন তাঁহার মত Unitarianদের মতন তখন কেন তিনি উক্ত সম্প্রদায়ে যােগদান করেন না, তাহা হইলে তাহার বিবেকের বিরুদ্ধে কৰ্ম্ম করিতে হইবে না। এ বিষয়ে কিন্তু তাহার ইংরেজ-জাতি সুলভ সামাজিক গোঁড়ামি ছিল, তিনি ইংরেজ Episcopal church ত্যাগ করিবেন না ইত্যাদি। কিন্তু পরে তাহার মণ্ডলীর সহিত বচসা হয়, মণ্ডলীর অনেক সভ্য চার্চ ছাড়িয়া চলিয়া যান—বলেন যে pa: torএর faith ( বিশ্বাস) নাই। তাহার বিবেক ও অর্থনীতিক সমস্যার মধ্যে ঘােরর সংগ্রাম হয়, চাকরিও পাওয়া মুস্কিল, উপবাসও করিতে পারেন না। বাধ্য হইয়া তিনি তাহার উপরস্থ কর্মচারী যে বিশপ, তাহাকে সব অবগত করাইলেন। এই বিশপকেও আমি জানিতাম। ইনি আমায় বালিয়াছিলেন যে, তাহার মণ্ডলীর মধ্যে কোন মতানৈক্য হইতে দেন না। বিশপ, আমার বন্ধুকে বিশ্বাসে আস্থা স্থাপন করিতে বলেন। পরে আমার বন্ধু আমায় লিখেন যে শেষে বিশ্বাসের দ্বারাই তাঁহাকে এ সমস্যার আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা। মীমাংসা করিতে হইবে, সেইজন্য তিনি ভগবানের কাছে তাঁহাকে “বিশ্বাস” দিবার জন্য প্রার্থনা করিতেছেন! হায়রে ধৰ্ম্ম !-পেট ও বিবেকের কলহ ভঞ্জনে অসমর্থ হইয়া তিনি “বিশ্বাস” দ্বারা বিবেককে মারিয়া তদ্বারা পেট ভরাইবার উপায় উদ্ভাবন করিলেন। এইস্থলে ধৰ্ম্মের যে function মানবকে নীতি ও ধর্মধারণার উচ্চস্তরে লইয়া যাওয়া, চার্চ তাহা হারাইয়াছে ; কেবল বাহিরের খােসাগুলিকে (dogmas and conventions ) structure ( কাঠাম ) বানাইয়া মানবকে অগ্রসর হইতে দিতেছে না। আর বেশীর ভাগ মানব এই পুরাতন কাঠামকে আসল দ্রব্য বুঝিয়া তাহাকে ধৰ্ম্মের স্থলে বসাইয়াছে। এ বিষয়ে সব ধর্মেই এক দোষ। আমেরিকান ধৰ্ম্মজীবনের যৎকিঞ্চিৎ বর্ণনার উদ্যাপন করিবার কালে একটি বিষয়ের পুনরােক্তি করিতেছি যে, তথায় ধর্মের নামে অনেক প্রকারের জুয়াচুরি চলিতেছে। তথাকার লােকেরা হুজুগে বলিয়া অনেক প্রকারের প্রতারণার আবির্ভাব হইয়াছে। অবশ্য এই সব প্রতারণা প্রাচ্যদেশীয় ধর্মসমূহের নামে হয়। তথায় নানা প্রকারের ভূত, প্রেত বিশ্বাসকারীদের ( Spiritists and occultists ) প্রচারের ফলে সাধারণে হিন্দু ধর্মকে ভূত নামান, ইন্দ্রজাল প্রভৃতির সহিত সনাক্ত করে। তাঁহারা ভাবেন হিন্দুধর্ম এক প্রকারের Black Magic মাত্র। ইহা ব্যতীত অনেক আমেরিকান আছেন যাঁহারা কেহ কেহ পারস্যদেশীয় বলিয়া পরিচয় দিয়া

আমার আমেরিকার অভিতা।
আদিয়স-মিশ্রিত এক কিম্ভুত প্রকারের ধর্ম প্রচার করেন।
পুলিশে ইহাদের তাড়া দিলে, এক জায়গা হইতে অন্য
জায়গায় পলায়ন করিয়া ব্যবসায় খুলে। হিন্দুর নাম ধারণ
করিয়া অনেক আমেরিকানও এবম্প্রকার ব্যবসায় করে।
তৎপর হিন্দুর নাম দিয়া অনেক প্রকারের তথাকথিত “যােগ
ধর্মের” পুস্তক বাহির হইতেছে। ফলতঃ অনেক প্রকারের
বীভৎস ব্যাপার ও আজগুবি “হিন্দুর” নামে চলিতেছে।
এক নিগ্রোকে হিন্দুবংশীয় বলিয়া পরিচয় দিয়া শ্বেতাঙ্গিণী
মহলে “mind read” করিতে দেখিয়াছি। আর এক নিগ্রো
“স্বামী কু” (Swami ku) নাম ধারণ করিয়া শ্বেতাঙ্গ ও
শেতাঙ্গিনীদের জন্য গুপ্তভাবে আফিঙ্গের আজ্ঞা করিয়াছিল,
শেষে পুলিশ তাহাকে ধরিয়া ফেলে।

স্ত্রীলােক
•
আমেরিকায় স্ত্রীলােকের আসন অন্যান্য দেশ হইতে
বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট হইয়াছে। তথায় নারী পুরাতন
জগতের ন্যায় তৈজসপত্রাদি বা ক্রয়বিক্রয়ের দ্রব্যের মতন
গণ্য হয় না। তথাকার স্ত্রীলােকের “আত্মা” (soul)
আছে অর্থাৎ সে কেবল একটি সচেতন জীব নহে তাহার
স্বাধীকার ও স্বকীয় মত” আছে, সে সর্ববিষয়েই জাগ্রত
পুরুষের সহিত জগতের সমস্ত দ্রব্য ভােগেই তাহার সমানা-
ধিকার আছে।
তৎদেশের সমাজ পরিচালনার জন্য পুরুষের
ন্যায় নারী ও তুল্যভাবে দায়ী।
কোন কোন প্রাচীন ধর্মে স্ত্রীলােকের আত্মার অস্তিত্বের
অস্বীকার করিয়াছে, অনেক ধর্মে আবার নারীকে নিকৃষ্টভাবে
বন্ধন করিয়া রাখিয়াছে। কোনও প্রাচীনদেশে হয় ত
পুরাকালে নারীকে সমানাধিকার দিয়াছিল, কিন্তু পুরুষ
প্রতিদ্বন্দ্বীতা করিয়া পরে তাহা অপহরণ করিয়াছে। আজ
স্ত্রীলােক সর্বত্রই পুরুষের অধীনশৃঙ্খলে আবদ্ধ ! পুরাতন
জগতের একটি অতি সুসভ্য দেশেরই এক কবি Rudyard
kipling raputa, “woman is the female of the
species” অর্থাৎ স্ত্রীলােকের কেবল কাজ হইতেছে যে

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। নারী ও পুরুষ মানবরূপী জীবের জন্ম প্রদান করা।” ইহাই হইল প্রাচীন জগতের মত। কিন্তু আমেরিকায় তাহার প্রত্যুত্তরে অধ্যাপক Lester F. Ward, "gynaecocentric theory" 0577 করিয়াছেন। তিনি জীব-তত্ত্ব হইতে দেখাইয়াছেন যে জীব- জগত সৃষ্টির জন্য নারী হইতেছে বিশেষ উপাদান, সেইজন্য সৃষ্টিতে নারীর স্থান পুরুষের ন্যায় তুল্য ; তৎপরে পুরাকালে সমাজে নারীর প্রাধান্য ছিল কিন্তু পুরুষ সংগ্রাম করিয়া নারীকে শৃঙ্খলিত করিয়াছে। উভয়েরই মনােবৃত্তি এবং কার্যকারিতা তুল্যভাবে বর্তমান রহিয়াছে, উভয়েই তাহা সমানভাবে বিকশিত করিতে পারে। ইহাই হইল আমেরিকায় নারী বিষয়ে মূলমন্ত্র। স্ত্রীলােক কেবল পুরুষের ভােগের দ্ৰব্য নহে, তাহার প্রাপ্য অধিকার দিয়া তাহাকে পুরুষের ন্যায় তুল্যভাবে অভিব্যক্ত হইতে দাও, তাহার আত্মাকে সজাগ হইতে দাও, ইহাই হইতেছে স্ত্রীলোেক বিষয়ে বর্তমান আমেরিকার অভিমত। যখন নূতন জগতের এবম্প্রকার ধারণা, তখন পুরাতন জগত নিশ্চয়ই গালে হাত দিয়া বলিবে, “এ কি হইল?” ইউরােপের (সােভিয়েট রুষ ব্যতীত) ও আমেরিকার Divorce সম্বন্ধে আইন তুলনা করিলেই উভয় স্থানের নারীর বিষয়ে ধারণার পার্থক্য দৃষ্ট হইবে। এইজন্যই ইউরােপের নারীরা আমেরিকা পছন্দ করেন, কারণ তাঁহারা বলেন যে স্বদেশে

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
তাঁহারা নিকৃষ্ট জীবরূপে গণ্য ও উৎপীড়িত হন কিন্তু নূতন
জগতে তাহাদের স্বাধীকার দেওয়া হয়।
আমেরিকায় স্ত্রীলােকপ্রতি এরূপ সম্মানের
অনেক
ইতিহাস আছে। তথায় নারী রাজনীতিক অধিকার প্রথম
হইতেই প্রাপ্ত হয় নাই, তাহারও ক্রমবিকাশ হইয়াছে।
কিন্তু সামাজিক বিষয়ে প্রথম হইতেই তাহার তুল্য অধিকার
হইয়াছিল।
যখন ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকেরা প্রকৃতির
সমস্ত বিঘ্ন উপেক্ষা করিয়া ভীষণ অজ্ঞাত অরণ্যানীর মধ্যে
প্রবেশ করিয়া জঙ্গল পরিষ্কার করিতে আরম্ভ করে, তখন
স্ত্রীরা তাহাদের স্বামীর কার্যের সহায়তা করিতেন, তঁাহারা
স্বামীর সঙ্গে প্রকৃতির সহিত তুল্যভাবে সংগ্রাম করিতেন,
তৎপর আদিম অধিবাসীদের সহিত স্বহস্তে অস্ত্র ধারণ করিয়া
নিজের মান ও গৃহস্থালী রক্ষা করিতেন। তৎকালে স্ত্রী কেবল
“sale of the species” না হইয়া পুরুষের জীবনের
যথার্থ সহধর্মিনী হইয়াছিল, গৃহে এবং তজ্জন্য সমাজে
স্বভাবতই তাহার উচ্চস্থান নির্দিষ্ট হইয়াছিল।
ঔপনিবেশিক সময়ে অনেক স্বামীহীনা স্ত্রীলােক এবং অনেক
নারী ঔপনিবেশিক যাহারা নিজেদের পুরুষ আত্মীয়দের
পশ্চাতে পুরাতন জগতে ফেলিয়া আসিয়াছেন, এই সব
স্ত্রীলােকেরা স্বীয় জীবিকা নির্বাহের জন্য স্বহস্তে নানা-
প্রকারের কাৰ্য্য করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহারা পুরুষের
কাৰ্য্য করিতেও পশ্চাৎপদ হয় না।
তৎপরে

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
তৎপরের
ইহা ব্যতীত, স্বাধীনতা সমরের সময়ে নারীরা পুরুষদের
বিশেষভাবে সাহায্য করিয়াছিলেন। তাহারা নিজেদের
স্বামী ও পুত্রদের স্বাধীকার ও জাতীয় দাবী বজায় রাখিবার
জস্য উৎসাহিত করিতেন
; যুদ্ধের সময় বিদেশ হইতে
গাত্ৰাচ্ছাদনের দ্রব্যাদির আমদানী বন্ধ হইলে তাহারা স্বহস্তে
বস্ত্রাদি বয়ন করিয়াছিলেন ; নিজেদের ভােগ, বিলাসিতা
স্বদেশ প্রেমের বেদীর সম্মুখে বলি দিয়াছিলেন।
যুগে, কৃষ্ণকায় নিগ্রো-গােলামদের মুক্ত করিবার জন্য অনেক
মহিলা উৎসাহের সহিত লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন ও
বক্তৃতার দ্বারা জনমত মুক্তির পক্ষে আনয়নের চেষ্টা করিতেন,
এবং গােলামীর বিপক্ষে যুদ্ধকে বিশেষভাবে সাহায্য করিয়া-
ছিলেন। ইহাদের মধ্যে একজনের নাম জগত প্রসিদ্ধ, তিনি
হইতেছেন “Uncle Tom’s Cabin” প্রণেতা শ্ৰীমতী
হারিয়েট বিচার ষ্টো (Itarriet Beecher Stowe)!
এই প্রকারে আর্থনীতিক ক্ষেত্রে ও জনসাধারণের মধ্যে
পুরুষের সহিত পাশাপাশি কর্ম করিয়া অবশেষে রাজনীতিক
ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে যখন তাহাদের তুল্যাধিকার ও ক্ষমতা
দিবার বিপক্ষে পুরুষ দণ্ডায়মান হইল, তখন তাহারাও তাহার
বিপক্ষে আন্দোলন করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। ইহার
69 antolatu “women's suffrage movement"
প্রবল। আজ পশ্চিমের ষ্টেট সমূহ নারীকে সর্ববিষয়ে
সমানাধিকার প্রদান করিয়াছে, কিন্তু পূর্বে এখনও তাহা

আমার আমেরিকার তিতা। প্রদত হয় নাই বলিয়া তথাকার স্ত্রীলােকেরা আন্দোলন সতেজে চালাইতেছেন। আজ আমেরিকান স্ত্রীলােক সর্বত্র রাজনীতিক তুল্যা- ধিকার প্রাপ্ত হয় নাই বটে, কিন্তু সে কখনও পুরুষের দাস নহে। স্ত্রী গৃহের কর্তৃ, সংসার স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের পরামর্শানু- যায়ী চালিত হয়, সমাজে নারীর সম্মান বেশী অর্থাৎ স্ত্রীলােককে কোন ভাবে অসম্মান করা বা তাহার আসন পুরুষের নিম্নে দেওয়াকে অভদ্রতা বলিয়া গণ্য হয়। রাস্তা ঘাটে, গাড়িতে, রেলেতে প্রভৃতি সাধারণ স্থানে স্ত্রীলােকের স্থান অগ্রে প্রদান করা হয়, “ladies first” মহিলারা সব প্রথমে ইহাই আমেরিকায় স্ত্রীলােক প্রতি পুরুষের ব্যবহারের মূলমন্ত্র ; এই আচরণ chivalry প্রসূত বটে, কিন্তু ইহাতে নারীর কর্মে অপটুতা উৎপাদন করে না। নারী তথায় পুরুষের সহিত বুদ্ধিজীবি সর্বকর্মেই প্রতিযােগীতা করে কিন্তু তাহা বলিয়া কদাপি পুরুষের কাছ হইতে অসম্মান প্রাপ্ত হয় না। ধনাঢ্যবংশ ব্যতীত অন্যসব শ্রেণীর স্ত্রীলােকেরা আর্থনীতিক বিষয়ে পরমুখাপেক্ষী না হইয়া স্বাধীন হইবার চেষ্টা করেন। এইজন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্ত্রীলোকেরা কোন প্রকারের পেশার কৰ্ম্ম শিক্ষা করেন! ইহার মধ্যে Typewriting and stenography কৰ্ম্ম তঁাহাদের একচেটিয়া ; শিশুদের জন্য, নিম্নশ্রেণীর স্কুল সমূহে (primary schools ) শিক্ষায় এরূপে ;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা ।
;
তাহাদের আধিক্য বেশী, সাধারণ পাঠাগার সমূহেও কর্মচারিণী-
রূপে তপ, তদুপরি স্কুলেও তঁাহারা বর্তমান এবং পশ্চিমের
অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে তাহারা অধ্যাপকরূপে বর্তমান এবং
কেহ কেহ ব্যবহারাজীব ও ডাক্তার হইতেছেন ; তৎব্যতীত
অন্যান্য কর্মেও তাহারা বিরাজ করিতেছেন। ইহা ব্যতীত
শ্রমজীবিক কর্মেও তাহারা বিদ্যমান যথা:-রেষ্টুরান্ট,
কলকারখানা, অনেকস্থলে কৃষি কৰ্ম্ম ইত্যাদি। এবম্প্রকারে
কায়িক শ্রমের কৰ্ম্ম হইতে অতি উচ্চাঙ্গের বৈজ্ঞানিক চর্চার
কৰ্ম্ম পর্যন্ত জীবনের সর্বক্ষেত্রেই স্ত্রীলােক বিরাজ করিতেছেন।
আমেরিকান সমাজে স্ত্রীলােকের আধিপত্য বেশী, কারণ
তথাকার সমাজ স্ত্রীলােকেই পরিচালিত করেন। মহিলাদের
নানাপ্রকারের ক্লাব আছে, তথায় তঁাহারা ধৰ্ম্ম, সাহিত্য,
সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি, জনহিতকর কর্মসমূহ বিষয়ে আলােচনা
করেন ও নানাবিধ অনুষ্ঠানাদির উদ্যোগ করেন।
তথায় স্ত্রীলােকে নানাবিধ জনহিতকর কর্মে ব্যাপৃত
বলিয়াই আমেরিকার সভ্যতার শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে। নেপাে-
লিয়ানকে একজন ফরাশী শিক্ষয়িত্ৰী বলিয়াছিলেন যে
mother is the maker of the nation ( মাতা দ্বারাই
একটি জাতি গঠিত হয়। এই সত্য আমেরিকায় বিশেষভাবে
প্রযুষ্য হয়। আমেরিকান জাতিকে মহৎ করিবার জন্য,
আমেরিকাকে সভ্যতার উচ্চশিখরে আনয়ন করিবার জন্য
তৎদেশের মহিলারা যেসব অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের অবতারণা

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। করিয়াছেন তাহা জগতে অতুলনীয়। খৃষ্টীয় মিশনারী আন্দোলন হইতে Miss Jane Adams প্রতিষ্ঠিত গরীব শ্রমজীবিদের থাকিবার জন্য Chicagoর Hall House নামক আদর্শ স্থল, ও “Industrial workers of the world” নামক শ্রমজীবি- সংঘের বিখ্যাত কৰ্ম্মী Mother Jones পৰ্য্যন্ত জাতীয় জীবনের সর্বপ্রকার কর্মে মহিলারা অগ্রণী হইয়া রহিয়াছেন। আমেরিকার সর্ব স্ত্রীলােকই লিখিতে পড়িতে পারেন। গরীব শ্রেণীর বালিকারা প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত পড়িতে বাধ্য, তৎপরে জীবিকানির্বাহের জন্য কোনও পেশাবলম্বন করেন। গরীব মধ্যবিত্ত শ্রেণীসম্ভুত বালিকার সাধারণতঃ matriculation পরীক্ষা পর্যন্ত পড়ে আর সুবিধা হইলে অনেকে কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে। অনেক স্থলে অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়েরাও উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বেশীর ভাগ স্ত্রীলােকই বিবাহ করেন এবং বেশীর ভাগই বিবাহের পর আর অর্থ রােজগারে সময়ক্ষেপ করেন না, নিজের গৃহস্থালীর কর্মে মনােনিবেশ করেন। কিন্তু এমন অনেক ঘটনা জানি যথায় স্ত্রী স্বামীকে অর্থদ্বারা সাহায্য করিবার জন্য বিবাহের পরও অর্থোপার্জন করিয়াছেন। শিক্ষিতা-স্ত্রী সংসার ধর্মের উপযুক্ত কিনা ইহা লইয়া আমেরিকায় অনেক বাদানুবাদ হইয়াছে এবং ইহা স্থির হইয়াছে যে শিক্ষিত নারী স্বামীর কর্মের সহায়স্বরূপহন ও ভাল ভাবে লালনপালন করেন। যে গােষ্ঠীর পিতামাতা ১১১ আমার আমেরিকার অভিমত, উচ্চশিক্ষিত সেই বংশের সন্তানদেরও বৃদ্ধি বৃত্তির অধিকতর বিকাশ প্রাপ্ত হয়। উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হইলেই যে স্ত্রীলােক গৃহস্থালীর কর্মে অমনােযােগী হইবে ইহা সত্য নহে; বরং অনেকে বলেন যে উচ্চ শিক্ষিত। মাতাই আদর্শ মাতা। আমেরিকায় বিবাহের বয়স সাধারণতঃ ইউরােপ অপেক্ষা বেশী। শেষােক্ত মহাদেশে যখন ১৮১৯ বৎসর বয়সের কুমারী বিবাহের উপযুক্তা বলিয়া গণ্য হন আমেরিকায় সেই বয়সে সাধারণতঃ কেহই বিবাহের উপযুক্তা বলিয়া কল্পনা করিতে পারেন না। আর পুরুষের পক্ষে বিদ্যাশিক্ষা সমাপন করিয়া অর্থোপার্জন না করিলে কেহই বিবাহের চেষ্টা করেন না। আমেরিকায় বিবাহ স্বাধীনইচ্ছাপ্রসূত, এই ব্যাপার কেনা- বেচার মধ্যে আসে না এবং যৌতুকদানরূপ উৎপাত নেই ; অর্থাৎ বিবাহটি দুইটি যুবক যুবতীর প্রেমের ফলে সংঘটিত হয়, তাহাতে পিতামাতার আপত্তি বা দেনা পাওনার কথা আসে না। অবশ্য ধনকুবেররা স্বীয় কন্যাদের যৌতুক দান করেন কিন্তু বিবাহটি পাত্র বা পাত্রীর স্বাধীন মননানয়নের উপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে যে প্রকার বিবাহাৰ্থ পাত্র বা পাত্রী মনােনয়নের জন্য ঘটক নিয়ােজিত হয় আমেরিকায় তাহা হয় না, বিবাহেচ্ছুক ব্যক্তি নিজেই স্বীয় জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী অনুসন্ধানে নির্গত হন। ইহা courtship পদ্ধতি অনুসারে হয়। আমাদের দেশে courtship সম্বন্ধে কুধারণা আছে, ইহা জাতীয় স্মৃণার (race prejudice) আমার আমেরিকার অতিতা। ফলপ্রসূত। প্রত্যেকজাতি মনে করেন যে তাঁহাদের (mores) ( রীতিনীতি আচার ব্যবহার ) অন্য জাতি অপেক্ষা উত্তম। প্রত্যেক জাতিরই রুচি ও আদর্শ স্বতন্ত্র, সেইজন্য একজাতির অন্যজাতির আচরণ, নীতি ও রুচিকে ঘৃণ্য করিবার অধিকার নাই। Courtship ব্যাপারটি আর কিছুই নয় কেবল একটি যুবক যিনি ভাবী-স্ত্রীর অনুসন্ধানে বাহির হইয়াছেন তিনি তাঁহার পরিচিত সমাজমণ্ডলীর মধ্যে কোন পছন্দসই কুমারীর সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে আলাপ করিবার চেষ্টা করেন। তিনি উক্ত কুমারীর বাড়ীতে যাতায়াত করেন এবং যদি কুমারীর পিতা- মাতা তঁাহার আচার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হন তাহা হইলে তিনি আহারাদিতে নিমন্ত্রিত হন এবং তিনিও থিয়েটার অপেরাতে কুমারীকে নিমন্ত্রণ করেন। এই প্রকারে উভয়ে পরস্পরকে বিশেষভাবে জানিতে পারেন। পরে প্রেমসঞ্চার হইলে যুবকটি বিবাহের কথা উত্থাপন করেন। ইহাতে কুমারীটির অভিমত থাকিলে উভয়ে বাদত্তা হন ও পরে একদিন বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হয়। এই ব্যাপার সংঘটন হইতে অনেক সময় লাগে, অনেকে প্রায় দুই বৎসর পর্যন্ত পরম্পরকে জানিবার চেষ্টা করেন। সেই সময়টীকে বলে she is keeping company sheray she is going out with him I FAT1675 অগ্রে পর্যন্ত এই সময়ে যদি উভয়ের কেহ আর একজনকে অপছন্দ করেন বা দোষ দেখেন, তখন তিনি তাঁহার সঙ্গ পরিত্যাগ করেন এবং যদি বাদত্ত হইয়া থাকেন তাহা

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
হইলে তাহাও ভগ্ন করেন। পাত্রপাত্রী বাত্তা হইলে
তাহা সংবাদ পত্রে অথবা বন্ধুবান্ধবদের পত্ৰদ্বারা অবগত
করান হয়, শেষে বিবাহটি প্রথমে পুলিশের বিবাহের
রেজেষ্টারি অফিসে রেজেষ্টারি করিয়া তাহার পর যাহারা
গির্জায় গিয়া ধর্মমতে বিবাহ করিতে চাহেন হারা তথায়
শেষ কৰ্ম্ম সম্পাদন করেন। বিবাহের সময় এবং পরে যখন
বর-বধু বন্ধু-বান্ধবসহ জলযােগে প্রবৃত্ত হয় ( ইহাকে wedding
breakfast বলে) তখন বন্ধুরা তাহাদের গাত্রে মুড়ি
ছড়াইয়া দেন। এ রীতি আমাদের দেশের ন্যায়। ইহার
তথ্য উদঘাটন করিবার জন্য আমি একবার চিকাগাে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব সমাজতত্বের অধ্যাপক Thomasকে
জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম,
“খৃষ্টান
আমেরিকায় কি প্রকারে
আমাদের দেশের ন্যায় বিবাহের সময় চাউলের প্রস্তুত পদার্থ
বরকন্যার গাত্রে নিক্ষেপ করার রীতি আসিল ?” উত্তরে তিনি
বলেন, “এ প্রথা ভারতবর্ষ হইতে আসিয়াছে।” চাউল বা
মুড়ি নব বিবাহিত ব্যক্তিদের গাত্রে নিক্ষেপ করার অর্থ যে,
তাহাদের বিবাহ ফলবতী ও শ্রীবৃদ্ধি সম্পন্ন হউক।
আমেরিকায় আমাদের সমাজের ন্যায় একান্নভুক্ত পরিবার
প্রথা নাই, বিবাহের পর বরকন্যা পৃথকভাবে গৃহস্থালী স্থাপন
করে। তৎপরে সমাজের দশজনের সঙ্গে পরিচিত হইতে
চেষ্টা করে তাহার অর্থ, দশজনকে স্বীয়গৃহে সামাজিক ক্রিয়া-
কর্মে নিমন্ত্রণ করিয়া সমাজের মধ্যে নিজের একটি স্থান নির্দিষ্ট
১১৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
করিয়া লইবার চেষ্টা করে। কিন্তু এই স্থানটি ঐ ব্যক্তির ধন,
গুণ ও পুরুষকারের উপর নির্ভর করে। পূর্বেই বলিয়াছি
যে, আমেরিকায় শ্রেণীবিভাগ আছে, আবার তাহার মধ্যে
বিভিন্ন গণ্ডী আছে, কাযেই উপরােক্ত ব্যক্তির আসন তাহার
কৃতিত্বানুসারে ঐ একটি গণ্ডর মধ্যে নির্দিষ্ট হয়। তবে ব্যক্তি
বিশেষে ইহার ব্যতিক্রমও হয় কিন্তু তাহা কদাচ ঘটে।
উদ্বাহরূপ জীবনের কর্মটি আমেরিকার সব নারীর
ভাগ্যে ঘটে না। অনেকেই আজীবন কুমারী থাকেন।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশ হইতে আমেরিকায় কুমারীর সংখ্যা
বেশী, ইহার মধ্যে নব-ইংলণ্ডের মাস্যাচুসেটস্ ষ্টেটে সর্বাপেক্ষ।
বেশী। ইহার নানাবিধ কারণ লক্ষিত হয়। অনেক কুমারী
মনােনীত বর প্রাপ্ত হন না বলিয়া আজীবন ব্রহ্মচর্য্যাবলম্বন
করেন ; তাহারা বলেন তাহাদের Spiritual affinity খুজিয়া
পান না; তৎপরে অনেকে অর্থনীতিক বিষয়ে স্বাধীন
থাকিবার ইচ্ছায় অবিবাহিতা থাকেন। আবার প্রৌঢ় বয়সে
কেহ কেহ “Platonic marriage” করিয়াছেন বলিয়া শ্রুত
হওয়া যায়।
আমেরিকায় বিবাহের শেষ কৰ্ম্ম ধর্মানুসারে সম্পাদিত
হইলেও প্রথমে তাহা বিবাহ-রেজেষ্টারী অফিস হইতে
রেজেষ্ট্রারী করিয়া লইতে হইবে।
Civil marriage
সর্বাপেক্ষা প্রয়ােজনীয়। আবার কে কাহার সঙ্গে বিবাহ
করিতে পারে সে বিষয়ে বিভিন্ন ষ্টেটে বিভিন্ন আইন।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। পশ্চিমের কোন ষ্টেটে আদিম অধিবাসী, প্রাচ্যদেশীয় ও নিগ্রোর সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ বা শ্বেতাঙ্গিণীর বিবাহ হইতে পারে না, আবার কোন কোন ষ্টেটে পিতৃব্য সন্তানদের মধ্যে ( first cousin ) বিবাহ নিধিদ্ধ। আবার কোন কোন ষ্টেটে Common lav marriage প্রচলিত আছে, অর্থাৎ দি কোন পুরুষ ও নারী আইনানুযায়ী বিবাহ না করিয়া আজীবন স্বামী স্ত্রীরূপে থাকে তাহা হইলে এই তাহা হইলে এই পুরুষের পরলােকান্তর উক্ত প্রকার স্ত্রী তাহার সম্পত্তির নাকি অধিকারিণী হন। অবশ্য এবপ্রকারের স্ত্রী পুরুষ সমাজের বাহিরে জীবন যাপন করেন, সমাজ এবম্প্রকারের সম্পর্ক গ্রাহ্য করিয়া লয় না । অন্যদিকে, Divorce সম্বন্ধে বিভিন্ন ষ্টেটে বিভিন্ন আইন। ইহার মধ্যে পশ্চিমের নেভাডা ষ্টেটে রেনো ( Reno) নামক স্থানে divorce অতি সহজে সম্পাদিত হয়। আমেরিকায় বিবাহরূপ অনুষ্ঠানটি যে প্রকার নানাবিধ কুলাচার ও সামাজিক রীতির বন্ধন হইতে মুক্ত, ফারখৎ ( divoice) অনুষ্ঠানটিও সে দেশে ইউরােপাপেক্ষা অনেক সহজ। লােকে বলে আমেরিকায় ফারখৎ বিবাহের শতকরা হিসাবে ইউ- রােপাপেক্ষা বেশী! কিন্তু পূর্বোক্ত দেশের মহিলারা শিক্ষায় বেশী অগ্রগামী ও আর্থনীতিক ক্ষেত্রে পরােক্ত দেশ হইতে বেশী স্বাধীন বলিয়া, এবং ফারখৎ সম্বন্ধে প্রাচীন আইনের নানাবিধ বেড়াজালের অভাব বলিয়া, আর স্ত্রীলােক সম্বন্ধে ১১৬

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
আমেরিকায় অন্য প্রকারের ধারণা থাকায়, তথায় Divorce
গ্রহণ করা অনেক সহজ।
আমেরিকার সমাজ নারী দ্বারা পরিচালিত হয়, সমাজে
নারীর প্রাধান্য বেশী। যত সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড স্ত্রীলােকের
দ্বারা চালিত ও নিম্পাদিত হয় । সমাজে একটা জনমত
নারীর দ্বারাই সৃষ্ট হয় ; কাহাকে “জাতে ঠেলিতে হইবে,
কাহাকে জাতে লইতে হইবে”; কি নূতন সামাজিক কম্মের
অনুষ্ঠান বা উদ্ভব করিতে হইবে, কি প্রকারের সামাজিক
রীতি-নীতি অবধারণ করিতে হইবে; কি প্রকারের ফ্যাসান
সমাজে চালাইতে হইবে ইত্যাদি মহিলাদের দ্বারাই অনুষ্ঠিত
হয়। আমেরিকান সমাজে কি প্রকারের etiquette মানিয়া
চলিতে হইবে তাহার standard পুস্তকসমূহ নামজাদা ধনাঢ্য
বংশীয় মহিলা সমাজনেতৃদের (society ladies) দ্বারাই
লিখিত হয়। তাহারা social etiquette সম্বন্ধে যে প্রথ
অবলম্বন করিতে হইবে বলিয়া বর্ণনা করেন সমাজ তাহাই
শিরােধার্য্য করিয়া লয়।
তৎপরে যত প্রকার club, philanthrophe ও social:
service, Eugenics, Hygiene aerop grosta ofa
আছে তাহা সবই বেশীর ভাগ স্ত্রীলােক দ্বারা পরিচালিত
হইতেছে। জাতির উন্নতিকল্পে মদ্য ও ধূমপান নিবারিনী
আন্দোলন, শিশুদের (Kindergarten ৪ •Froebe,
Montessorieর পদ্ধতি প্রচলিত হইতেছে) শিক্ষার
১১৭

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
আন্দোলন এবং নানাপ্রকার জনহিতকর আন্দোলন ও
প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি আমেরিকার নারীর দ্বারাই পরিচালিত
হইতেছে। আর স্বজাতির সর্বপ্রকার উন্নতির সােপানের
সহায় হইবার জন্যই এই অভিব্যক্তির ধারা ধরিয়া নারী
আমেরিকায় পুরুষের ন্যায় সমান রাজনীতিক অধিকারের
দাবী করিতেছে।
১১৮

বর্ণ-বিদ্বেষ
আমেরিকায় বর্ণ-বিদ্বেষ আছে অর্থাৎ ইউরােপীয় বংশজাত
শ্বেতচর্মী ঔপনিবেশিকেরা অন্য রংএর জাতিসমূহের বিপক্ষে
বিদ্বেষ পােষণ করে। এবার বিদ্বেষ কোনস্থানে জাতি
বিদ্বেষরূপে প্রকাশিত হয়, এবং কোনস্থলে রং-বিদ্বেষরূপে
বিরাজ করে। রং-বিদ্বেষের নাকাপ্রকারের ব্যাখ্যা দেওয়া
হইয়াছে যথাঃ—আধ্যাত্মিক, জীব-তত্ত্বিক, মনস্তত্বিক, দার্শনিক,
সমাজ-তাত্ত্বিক, নৃতত্ত্বিক, রাজনীতিক, সভ্যতা সম্বন্ধীয় এবং
সৰ্বশেষে আজকাল কেহ কেহ আর্থনীতিক ব্যাখ্যাও দিতেছেন
যাহা সর্বপেক্ষা যুক্তিপূর্ণ বলিয়া অনুমিত হয়। এবিষয়ে পরে
অােলাচনা করিব।
একজন অ-শ্বেতচর্মী এসিয়াবাসী বা আফ্রিকাবাসী আমে-
রিকার যুক্ত-সাম্রাজ্যে পদার্পণ করিলে তাহার প্রথম অভিজ্ঞতা
লাভ হয় যে তাহার পক্ষে প্রায়ই হােটেলে অথবা গৃহস্থের
বাড়ীতে বাস করিবার জন্য ঘর ভাড়া করা মুস্কিল হয়।
রেষ্টন্টে আহার করিতে যাইলে ফিরাইয়া দেয়, নাপিতেরা
দোকানে তাহার হাজামতি করিতে অস্বীকার করে, থিয়েটারে
অতি উচ্চদরের স্থানের জন্য টিকিট ক্রয় করিতে পাওয়া যায়

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
, অনেক বায়ােস্কাপে ঢুকিতে পায় না ইত্যাদি। অবশ্য
এসকলের ব্যতিক্রম আছে, তবে তাহা ব্যক্তি বিশেষের
কপালের উপর নির্ভর করে। যদি এই প্রাচ্য দেশীয় ব্যক্তিটি
গৌরবর্ণের হন, তাহা হইলে তিনি দক্ষিণ ইউরােপীয় কোন
জাতি সস্তৃত এই ভ্রান্ত ধারণার সুযােগে গােলেমালে রংএর
গণ্ডি অতিক্রম করিতে পারেন। কিন্তু শ্যামবর্ণ দক্ষিণ এসিয়া-
বাসীর কপালে গলাধাক্কা খাওয়াই সচরাচর ঘটে। কিন্তু
যথায় বাড়ীওয়ালী বরাবরিই এবারের লােক বাড়ীতে
ভাড়াটিয়া রাখিয়াছে, অথবা নাপিত বা রেষ্ট রান্ট-স্বামী এই
প্রকারের লােকদের সহিত পরিচিত আছে সেস্থলে আগন্তুকের
আর গােল হয় না। কিন্তু অজ্ঞাত স্থলে প্রাচ্যীয় আগন্তুকের
মুস্কিল হয়। এবিষয়ে দুঃখের কথা এই যে এবম্প্রকার
অবমাননার জন্য আইন আদালত নাই। কেবল বষ্টন ও
চিকাগােতে রং লইয়া বিদ্বেষ বা বিভিন্ন ব্যবহার দেখাইলে
আইনের আশ্রয় গ্রহণ করা যাইতে পারে। এইজন্য সচরাচর
ওখানে খুটিনাটি লইয়া প্রাচ্যীয় বিদেশীকে অবমানিত হইতে
হয় না। কিন্তু অবমাননাকারীর পক্ষে এ আইন হইতে
বাঁচিবার জন্য অনেক কৌশলও আছে, আর এই প্রকারের
অপমানিত হইয়া কেইবা আদালতে মকদ্দমা করিতে যাইবে,
কারণ ও প্রকার ঘটনা তাহার জীবনে আমেরিকায় অজস্রই
ঘটিবে, সেইজন্য কিল খাইয়া কিলচুরি করিতে হয়।
রং-বিদ্বেষ নানা প্রকারের আছে একজন শ্যামবর্ণীয়

আমায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা । । ; এসিয়াবাসীর পক্ষে যাহা অসাধারণ ঘটনা আফ্রিকার নিগ্রো জাতি সস্তৃত কৃষ্ণকায় আমেরিকানদের পক্ষে তাহা নিত্ত- নৈমিত্তিক ব্যাপার। একজন প্রাচ্যদেশীয় ব্যক্তিকে যখন লােকে জানিবে যে সে বিদেশীয় তখন কোনস্থলে আদর পাইবে এবং সর্বস্থলেই tolerated হইবে; কিন্তু নিগ্রোবংশােদ্ভব ব্যক্তি কখনও রংএর গণ্ডির বাহিরে আসিতে পারিবে না। আমার বােধহয় নিগ্রোর পক্ষে সমগ্র আমেরিকা (উত্তর মেরু হইতে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত) একটি নরক বিশেষ। তবে শুনিয়াছি যে ব্রেজিলে তাহার ব্যতিক্রম হয় কারণ তৎদেশের অধিবাসীরা মিশ্রিত জাতি, সেজন্য রং বিদ্বেষ প্রকট হইতে পারে না, নিগ্রোর বিপক্ষে তথায় সামাজিক ও আইনেরতাড়না বা ভেদ ভাব নাই। কিন্তু জানি না তথায় খাঁটি শ্বেতাঙ্গ বংশীয়দের সমাজে নিগ্রো বংশীয় লােক কি ভাবে গৃহিত হয়। তৎপরে দক্ষিণ এসিয়াবাসীর বিপক্ষে যে প্রকারের-রং-বিদ্বেষ পূর্ব এসিয়াবাসীর বিপক্ষে অন্য প্রকার। দক্ষিণ এসিয়াবাসী বিশেষতঃ ভারতবাসীকে সাধারণতঃ অজ্ঞলােকে নিগ্রো- বংশােদ্ভব বলিয়া ভ্ৰম ক্রমে অবমাননা করে, কিন্তু পূর্ব এসিয়া- বাসীকে লইয়া সে ভ্রম হয় না সেস্থলে বিদ্বেষ জাতি বিদ্বেষে পরিণত হয়; আবার পশ্চিম এসিয়ার শ্বেতচশ্মীর অধিবাসীদের বিপক্ষে রং-বিদ্বেষ নাই এবং যদি তাহারা খৃষ্টান হয় তাহা হইলে সাধারণতঃ কোন বিদ্বেষই লক্ষিত হয় না সামাজিকভাবে inferior race বলিয়া ঘৃণ্য হয়।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
শ্বেতচর্মী তুর্ক বা ইরাণীর বিপক্ষে রং-বিদ্বেষ পরিচালিত হইবে
। কিন্তু সে বিধর্মী, নিম্নজাতি, অর্ধসভ্য ইত্যাদি সামাজিক
তাচ্ছিল্য বা ঘৃণা ভােগ করিবে। অবশ্য এস্থলে সাধারণতঃ
যাহা লােকের মনের ভাব তাহাই বলিতেছি, ইহার ব্যতি-
ক্রমতাও আছে এবং অনেক প্রাচ্যদেশীয় লােক আমেরিকার
সমাজে সমাদৃত হইয়াছেন ও হইতেছেন।
এসব বিষয় ব্যক্তি-
গত ব্যাপার এবং বিদেশীর ব্যক্তিত্বের উপর সমস্ত নির্ভর
করে।
আমেরিকার নিগ্রোজাতির একজন প্রসিদ্ধনেতা Dr E.
Dubois বলিয়াছেন, বর্ণ সমস্যাই হইতেছে বিংশ শতাব্দীর
সমস্যা; আমেরিকার নিগ্রোজাতি তাহাদের সমস্যাকে এই
ভাবেই রাখিতেছেন। এই বিষয়ে আমি বার্লিন বিশ্ববিদ্যা-
লয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক Prof Edward Meyer এর সঙ্গে
তর্ক করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, “ইহা বিংশ শতাব্দীর সমস্যা
নহে, তবে আমেরিকায় থাকিলে এই ভাবেই প্রতীয়মান
হইবে বটে কিন্তু ইউরােপে এ সমস্যা নাই।” কথাটা এই যে
এই সমস্যাটিই পৃথিবীর নানাস্থানে নানারূপে বিরাজ করিতেছে
ইহা হইতেছে মুষ্টিমেয় সম্পত্তিশালী লােক দ্বারা অগণিত
সম্পত্তিহীন গরীবদের শােষণ নীতি। আমেরিকায় কৃষ্ণকায়-
জাতি ক্রীতদাসরূপে ধনীদের plantationএর কাৰ্য করিবার
জন্য আফ্রিকা হইতে আনিত হইয়াছিল ; তাহারা ভারবাহী
জন্তুরূপে ব্যবহৃত হইত। এক্ষণে যদিও তাহাদের মুক্তিদান
১২২

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
করা হইয়াছে কিন্তু এখনও তাহারা দাসরূপে সর্বত্র বিরাজ
করিতেছে। তাহারা রং-বিদ্বেষ জন্য শ্বেতকায় শ্রমজীবি ও
চাকর শ্রেণীর সহিত প্রতিযােগীতায় সমকক্ষ হইতে পারায়
সর্বত্রই সস্তায় কৰ্ম্ম করিতে বাধ্য হয়।
শ্বেতাঙ্গদের নিকট
তাহারা exploitation-এর বস্তু। তাহাদের exploit করিবার
জন্যই আনা হইয়াছিল, আজ পর্যন্ত তাহাদের সেইভাবে
ব্যবহৃত হইতেছে যদিচ অন্য আকারে।
সর্বপ্রথমে নিগ্রোর প্রতি বর্ণ-বিদ্বেষ ছিল না। কথিত
আছে যে নব-ইংলণ্ডের কোন একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি তাঁহার
নিগ্রো ক্রীতদাসকে স্বীয় গ্রামে সর্বপ্রথমে আনিবার সময়
নিজের সঙ্গে অশ্বোপরি আরােহন করাইয়া আনিয়াছিলেন।
তখন নিগ্রো দেখিবার একটি অদ্ভুত জীব ছিল। পরে
যখন নিগ্রো-গােলামের
সংখ্যা বাড়িতে
লাগিল ও
তাহাকে ভারবাহী পশুর ন্যায় ব্যবহার করা হইতে লাগিল,
তখন তাহার প্রতি ঘৃণাও বাড়িতে লাগিল। আর নিগ্রো
অশিক্ষিত ও অচতুর বলিয়া এই ঘৃণা ইন্ধন স্বরূপ কাৰ্য
করে। আবার দুর্ভাগ্যবশতঃ নিগ্রো তাহার মনিব হইতে
অন্য বর্ণের। Racc-psychology অনুসারে এক বর্ণের
জাতি বিভিন্ন বর্ণের জাতির বৈচিত্রতাকে অপছন্দ করার
মনােবৃত্তি এস্থলে কাৰ্য্যকরী হয়। মনিবের স্বীয় গােলামের
প্রতি সামাজিক ঘৃণা স্বাভাবিক, আর ঘটনাচক্রে সেই গােলাম
যদি আবার বিভিন্ন বর্ণের হয় তাহা হইলে সেই ঘৃণাটি তাহার

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
বর্ণের প্রতিও প্রযুয্য হয় এবং শেষে বর্ণ-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে।
অন্যত্র উল্লেখ করিয়াছি যে আমেরিকায় পূর্বে শ্বেতাঙ্গ
ক্রীতদাস ছিল, তাহারা কিন্তু মুক্ত হইয়া কোন সমস্যার সৃষ্টি
করে নাই। কিন্তু কৃষ্ণকায় ক্রীতদাস
মূক্ত
হইয়া এক বিষম
সমস্যার উদ্ভব করিয়াছে।
নিগ্রো যখন ক্রীতদাস ছিল তখন সে কোন সমস্যার
উদ্ভব করে নাই। সে জন্তুর মধ্যে পরিগণিত হইত! সে
plantationএ কৰ্ম্ম করিত, pork and beans পেট ভরিয়া
খাইত, tg cabinএ নিদ্রা যাইত। সে কোন সঙ্গিণী
নিগ্রো ক্রীতদাসীর সহিত মিলিত হইয়া যদি পুত্রোৎপাদন
করিত তাহা হইলে ভেড়া গরুর মত তাহার মনিবের মূলধন
বুদ্ধিই করিত, এবং জীবনান্তে তথায় তাহার কবর হইত।
এবম্প্রকার জীবন যাপনে সে একটা সমস্যার উদয় করে
কিন্তু যখন উত্তর আভ্যন্তরীণ যুদ্ধের (civilwar )
ফলে দক্ষিণের নিগ্রো গােলামদের মুক্ত করিয়া শ্বেতাঙ্গদের
সহিত সমান অধিকার দিল, তখনই একটা সমস্যার উদয়
হইল! সেই সময়ে দক্ষিণে পূর্বেকার ক্রীতদাসেরা ভােটের
জোরে senators প্রভৃতি হইতে লাগিল, রাজনীতিক সব
উচ্চপদে অধিরােহণ করিতে লাগিল, কিন্তু অজ্ঞতার জন্য
উত্তরের ধূর্ত yankee Carpet baggerদের হাতে পড়িয়া
তাহাদের দ্বারা exploited হইতে লাগিল। দক্ষিণ বিজয়ের
পর উত্তর হইতে যত ধূর্ত প্রতারকের দল আমাদের দেশের
নাই।
১২০

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। “লোেটা কম্বলওয়ালাদের ন্যায় কেবলমাত্র কার্পেট ব্যাগ হস্তে করিয়া দক্ষিণে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য দলে দলে যাইতে লাগিল। তাহারা তথায় গিয়া নিগ্রোদের বন্ধু সাজিয়া সেই অশিক্ষিতদের নানাপ্রকার প্ররােচনায় ফেলিয়া নিজেদের স্বার্থ সাধন করিতে লাগিল। ইহাতে দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ সমাজের সমূহ ক্ষতি হয়। উত্তরের লােকেরা পশ্চাতে থাকিয়া নিগ্রোদের দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গদের বিপক্ষে বিদ্বেষ বাড়াইয়া তাহাদের প্রতি নবপ্রদত্ত রাজনীতিক অধিকারের অপব্যবহার করাইয়া নিজেদের স্বার্থসাধন করিত! ইহাতে দক্ষিণের নিগ্রো বিদ্বেষ বিশেষভাবে বদ্ধিত হয়। পরে দক্ষিণ যখন আবার শ্রীবৃদ্ধি সম্পন্ন ও শক্তিশালী হইল তখন ছলে বলে কৌশলে নিগ্রোদের fri1chs৫ কাড়িয়া লয় । দক্ষিণে নিগ্রো আজ আবার “যে তিমিরে সেই তিমিরে”। এই প্রকারে কৃষ্ণকায় গােলামের প্রতি ঘৃণা হইতে নিগ্রো জাতির বিপক্ষে বিদ্বেষ হইয়াছে এবং স্বর্ণের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা উৎপন্ন হইয়াছে। তথায় শ্বেতাঙ্গ-মনিব ও কৃষ্ণকায় দাস এই সম্পর্কের জন্য একটি মনঃস্তত্ত্বের উদয় হইয়াছে যে, শ্বেতাঙ্গব্যক্তি মনুষ্য জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠজীব ও সৰ্ব্ব-মানববাচিত গুণের আকর এবং কৃষ্ণকায় অতি নীচ জীব। এমন কি এই কৃষ্ণকায় গােলামদের এক সময়ে আমেরিকানেরা মনুষ্য পদ- বাচ্য করিত না! আমেরিকায় কথিত হয় যে “আভ্যন্তরীণ যুদ্ধের অগ্রে যখন উত্তর দাস প্রথা উঠাইবার জন্য বিশেষ চেষ্টা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। করিতেছিল, সেই সময়ে দক্ষিণের প্রধান নেতা ও রাজনীতিক- কার Calhoun এই সমস্যাদ্বারা সন্তাড়িত তাহার বিবেককে আশ্বস্ত করিবার জন্য ইউরােপের বৈজ্ঞানিকদের জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠান, “নিগ্রো কি প্রকারের জীব ?” ইহার উত্তরে তৎমহাদেশের পণ্ডিতেরা বলেন যে, “নিগ্রো মানবাকৃতি বিশিষ্ট বটে কিন্তু সে মানব নহে!” ইহাতে Calhoun সান্ত্বনা পাইয়া ক্রীতদাস রাখার পদ্ধতি সমর্থন করেন। ইহার পশ্চাতে ইতিহাসের আর্থনীতিক ব্যাখ্যা ইহা ছিল যে, দক্ষিণের planterদের তুলার চাষের জন্য বিনাবেতনে মজুরের বিশেষ আবশ্যক ছিল ; নিগ্রো গােলাম প্রথা তাহা পূরণ করিত, তদ্ব্যতীত গােলামেরা আবার বংশবৃদ্ধি করিলে মূলধনীর গরু- বাছুর বৃদ্ধির ন্যায় মূলধন বৃদ্ধি হইত। একটা গােলামের মূল্য ১০০০ ডলার। সে কেবল খাইতে ও শুইতে পাইবার বিনিময়ে সমস্ত জীবন শ্রম করিয়া মনিবের চাষের আয় বাড়াইয়া দিতেছে, তৎপর সে যদি আবার দুই একটি পুত্রকে ইহজগতে আনয়ন করিতে পারে তাহা হইলে মনিবের দুই এক হাজার ডলার মূলধন আরও বর্ধিত হয়। যাহার দশটা গােলাম থাকিত তাহার দশ হাজার ডলার net capital মূলধন) আছে বলিয়া গণ্য হইত। সেইজন্য এ হেন লাভকর প্রথা উঠাইতে দক্ষিণ রাজী হয় নাই। সেই জন্যই তাহার নেতারা নিজেদের বকধাৰ্মিক বিবেককে প্রবােধ দিবার জন্য বৈজ্ঞানিকদের আশ্রয় লইত। অন্যদিকে (খাঁটি আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ধর্মযাজকগণ (Church) দাসপ্রথা সমর্থন করিত। ইতিহাসে দৃষ্ট হয় যে প্রাচীনকাল হইতে খৃষ্টীয় ধর্মযাজকগণ চিরকালই দাসপ্রথা সমর্থন করিয়া আসিয়াছে। এ হেন দাসপ্রথার উচ্ছেদ হইলে নিগ্রোবিদ্বেষ বর্ণ-বিদ্বেষে পরিণীত হয় তৎপর, আমেরিকার শ্বেতাঙ্গেরা অ-শ্বেত জাতিদের মধ্যে, তথাকার আদিম অধিবাসীদের ও নিগ্রোদের জানিত। প্রথমদের উচ্ছেদ সাধন করিয়াছিল, দ্বিতীয়দের গােলামীত্বে রাখিয়াছিল। তাহারা নিজেদের সমকক্ষ কোন অ- শ্বেতচর্মী জাতির সংস্পর্শে তখন আসে নাই কাজেই সমস্ত “রঙ্গীন” জাতি “হীন” বলিয়া পরিগণিত হইত। এবম্প্রকারে একটি বিশিষ্ট জাতির প্রতি ঘৃণা হইতে বর্ণ-বিদ্বেষের সৃষ্টি হয় এবং এক্ষণে এই বর্ণ-বিদ্বেষ সমস্ত অ-শ্বেতচর্মী জাতিদের বিপক্ষে নিয়ােজিত হইতেছে। পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে প্রাচ্যীয় মলিন বর্ণের জাতি সমূহের বিপক্ষে একটা বিদ্বেষ যে ছিল তাহার নজীর নাই। ইহা কথিত আছে যে তৎকালে আমেরিকান গভর্ণমেন্ট মিসিসিপি উপত্যকার খালি জমিতে কৃষিকাৰ্য্য করাইবার জন্য প্রাচ্য হইতে ঔপনিবেশিকদের তথায় বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল, কারণ তৎকালে ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকের বন্যা বিশেষ প্রবল ছিল না। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ কালে ইউরােপ হইতে প্রচুর শ্বেতকায় শ্রমজীবি ঔপনিবেশিক আমেরিকায় আসায় আর প্রাচ্য দেশীয় “রংঙ্গীণ” ঔপ- আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। নিবেশিকের প্রয়ােজন হয় নাই। এবং প্রাচ্যীয়দের সেদেশ আর চাহে নাই। এই শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকেরা আমেরিকায় আসিয়া যখন তথাকার অ-শ্বেতচর্মীদের সহিত কর্মক্ষেত্রে প্রতিযােগীতা করিতে লাগিল, তখন হইতে তাহারা বিশেষ ভাবে রং-বিদ্বেষ ভাবাক্রান্ত হয়। এই ঔপনিবেশিকেরাই রং-বিদ্বেষ চারিদিকে ছড়াইয়া ফেলে ও ভীষণতর করিয়া তােলে। আইরিশেরা যখন নিউইয়র্কে আসে তখনই নিগ্রোদের দেখিয়া রং-বিদ্বেষাক্রান্ত হয়, এবং এই আই- রিশেরাই কার্লিফোর্নিয়া অঞ্চলে চীনেদের ঘাের বিপক্ষে ছিল ও তাহাদের “bluddy furrint” বলিয়া ঘৃণা করিতে আরম্ভ করে। এই প্রকারে, যেসব কলকারখানাতে বুলগেরিয় জাতি সমূহ কৰ্ম্ম করে তথায় এক অ-শ্বেতচর্মীর স্থান নাই। ইউ- রােপের এই ঔপনিবেশিকের। নিপীড়িত, পদদলিত গণ শ্ৰেণী সম্ভুত, ইহারা দেশে স্বাধীনতার মুক্ত বাতাস সেবন করে নাই, ইহাদের মনস্তত্ত্ব দাসের মনস্তত্ত্ব। আমেরিকায় আসিয়া ইহারা নিজের গাত্রবর্ণের অধিকতর মূল্য আবিষ্কার করে এবং সেই সুবিধার প্রভাবে নিগ্রো প্রভৃতি অন্যান্য দাস শ্ৰেণী সম্ভুত লােকদের প্রতি ঘৃণা ও অত্যাচার করিতে আরম্ভ করে ; কারণ দাসই দাসকে উৎপীড়ন করে। এবারে মূখ বিদেশীরা তথাকথিত ‘রংঙীণ” বর্ণের লােকদের মধ্যে যে গাত্রবর্ণের ও জাতিগত পার্থক্য আছে তাহা বােধগম্য করিতে না পারিয়া একটা সার্বজনীন রং- ১২৮ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞত. বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। আমেরিকায় একেই জাতি-বিদ্বেষ ছিল, তৎপর তাহা রং-বিদ্বেষে পরিণত হয়। আর এই সব শ্বেতচর্মীদের সন্তান সন্ততিগণ এই বিষ পুরুষানুক্রমিক সূত্রে প্রাপ্ত হইয়া সমাজে তাহা ছড়াইতেছে। এইজন্যই আজ অ- শ্বেতচর্মীদের বিপক্ষে বিদ্বেষ নানাপ্রকারে ফুটিয়া উঠিতেছে । আমেরিকায় জাতি বিশেষের প্রতি ঘৃণা পরে বিদ্বেষে পরিণত হয় ও অর্থনীতিকক্ষেত্রে প্রতিযােগীতার জন্য তাহা সার্বজনীন রং-বিদ্বেষে পরিণত হয়। আজ রং-বিদ্বেষের নানাপ্রকার জীব-তত্ত্বিক, নৃ-তত্ত্বিক, সমাজ-তাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক, মনঃতত্ত্বিক, আর্থনীতিক, রাজনীতিক প্রভৃতি ব্যাখ্যা দেওয়া হইতেছে। কেহ কেহ জীব-তত্ত্বিক বিজ্ঞানের দোহাই দিয়া বলেন যে, Gernplasm হইতেছে Hire.lit\র মূল, আর বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন প্রকারের চরিত্র, অতএব আমেরিকায় শ্বেতজাতির Germplasএ অন্য চরিত্রের জাতির (Grn-yl:, মিশ্রিত হইলে বর্ণ-সাঙ্কর্যের ফলে শ্বেতজাতির অবনতি ঘটিবে। কেহ সমাজ তত্ত্বের দোহাই দিয়া উচ্চজাতি ও নিমুজাতির মিশ্রণের বিপ বলেন ; কেহ বা আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়া বলেন যে, শ্বেতজাতিই সর্বগুণের আকর ও মানব উৎকর্ষতার আদর্শ। অর্থনীতি-তত্ত্ব দিয়া কেহ কেহ বলেন, নিম্ন প্রাচ্যীয় জাতিদের সংসার নির্বাহের খরচাদির (Standard of living) মাপ কাটি বড় নিম্ন, সেইজন্য অশ্বেতচর্মী শ্রমীকেরা সস্তায় কৰ্ম্ম করিয়া শ্বেতকায় শ্রমীকদের সহিত প্রতিযােগীতা করিলে শ্বেতকায়দের আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সভ্যতার অনিষ্ট হইবে, অতএব, অ-শ্বেতকায় শ্রমীকদের আমেরিকায় ঢুকিতে দেওয়া অনুচিত। এই ব্যাখ্যাটি যথার্থই কালিফোর্নিয়ার একটী সােসালিষ্ট কনফারেন্সে গৃহিত হইয়া- ছিল। এবম্প্রকারের নানাবিধ অদ্ভুত ব্যাখ্যা ক্রমাগতই রং- বিদ্বেষের বিপক্ষে প্রদান করা হইতেছে। আমেরিকায় ইহা অভ্রান্তসত্য বলিয়া গৃহিত হইয়াছে যে, শ্বেতকায় জাতি মানবের মধ্যে দেবতা আর ইউরােপ হইতে যে আসে সতঃসিদ্ধ সে শ্বেতকায় ব্যক্তি, স্বদেশে তাহার যে আসনই থাকুক না কেন সে আমেরিকায় পদার্পণ করিলেই তাহার স্থান দেবকুলে নির্দিষ্ট হইবে। আর পশ্চিম-এসিয়া ও উত্তর-আফ্রিকার শ্বেতকায় ব্যক্তিরাও এই শ্বেতবর্ণ-দেবত্ব theoryর মাহাত্মে গােলেমালে দেবকুলে প্রবেশাধিকার লাভ করিতে পারে যদি সে খৃষ্টান হয়। অবশ্য এই দুই মহাদেশের শ্বেতচর্মীরা সাধারণে রং-বিদ্বেষ জনিত নিৰ্যাতন ভােগ করে না কিন্তু অখৃষ্টান হইলে সমাজে তাহাদের শ্বেতচর্ম ততটা আনুকূল্য করে না। এই শ্বেতচৰ্ম্ম-দেবত্ব theoryর ফলে এসিয়ার স্তাম্বুল হইতে ইরাণ পৰ্যন্ত ভূখণ্ডের লােকেরা আমেরিকায় নাগ- রিকের অধিকার প্রাপ্ত হয় কারণ তাহারা শ্বেতচর্মী অতএব শ্বেতজাতির অন্তর্গত। এই প্রকারে নানাপ্রকারের উদ্ভট মত দ্বারা যে সব জন- মত ও আইন করা হয় তাহা বিজ্ঞান ও অন্য কোন তত্বের বিচারের ভিতর আনা যায় না। যথার্থ বৈজ্ঞানিকেরা এসব আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। কথায় হাস্য করেন। তাঁহারা বলেন, এসব ব্যাপার রাজনীতির অন্তর্গত, বিজ্ঞান এই সব কথা বলে না। এইজন্যই ভারত- বাসীদের নাগরিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করিবার সময় আদালত বলিল, শ্বেতকায় মনুষ্যের (white man) অর্থ বিচারের সময় কোন লােকের মূলজীবজাতীয় ( racial) উৎপত্তির কথা বিচার করিবার প্রয়ােজন নাই, সেই লােকটীর যথার্থ গাত্রবর্ণ দেখিয়াই ( man's skin-color as it looks) তাহা সিদ্ধান্ত করিতে হইবে। কিন্তু ইহা একটি ঘাের অবৈজ্ঞানিক কথা। কারণ মধ্য ইউরােপে অনেক brown বর্ণের ও দক্ষিণ ইউরােপে অনেক darkbrown বর্ণের লোক আছেন যাহাদের ভারতীয় পোেষাকে পরিহিত করাইলে এদেশের বাস্তায় ভারতীয়দের সহিত পৃথক করা মুস্কিল, আর অনেক ভারতীয় আছেন যাহাদের ইউরােপীয় পরিচ্ছদে তৎমহা- দেশীয় বলিয়াই বােধগম্য হইবে। ফলে ইহাই হইয়াছে যে আমেরিকায় শ্বেতকায় জাতি বনাম রঙ্গীণকায় জাতি সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছে ও তাহা ব্যাঙ্কোর প্রেতাত্মার ন্যায় প্রত্যেক আমেরিকানের মস্তিস্কে বিভীষিকা উৎপাদন করিতেছে। অবশ্য রঙ্গীণজাতি অর্থে তথায় পূর্ব ও দক্ষিণ এসিয়ার অধিবাসীরা ও আফ্রিকার কৃষ্ণ ও মলিন বর্ণের লােকদের বুঝায়। আসলে এই ঝগড়াটি আর্থনীতিক কলহ। আমে- রিকানেরা বলেন যে রঙ্গীণ লােকেরা অল্প অর্থে জীবন নির্বাহ

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
করিতে পারে তজ্জন্য তাহারা অল্পাহারে কাৰ্য্য করিতে পারে
ও তদ্বারা শ্বেতকায় কর্মীদের কাৰ্য্য হইতে হটাইয়া দিতে
পারে। রঙ্গীণদের সহিত প্রতিদ্বন্দীতায় শ্বেতচর্শীরা পরাস্ত
হইবে, অতএব রঙ্গীণদের গণ্ডীর ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখ।
ইহা হইল negative দিকের কথা আর positive দিয়া
শ্বেতচর্মী পণ্ডিতেরা বলেন যে, রঙ্গীণ লােকেরা পৃথিবীর
অনেক সুন্দরাংশ বৃথায় দখল করিয়া বসিয়া আছে, শ্বেতকায়
জাতি তাহা ॥দন কাননে পরিণত করিতে পারে কারণ
বিন শেরে;ক্তদেব সহায়ক ; অতএব “controj (০;
clik rupi...", "whatenan's burden” aft 3751
সৃষ্টি করা হইয়াছিল। বিশ-ত্রিশ বৎসর পূর্বে এই
মতের বড়ই সােরগােল উঠিয়াছিল! এই সময়ের এক
সােরগােল কৰ্ত্তা বিখ্যাত ফরাসী লেখক Gustive Leb.:
বড়ই চেঁচামেচি করিয়াছিলেন যে, এসিয়ার অঙ্গীণ লােকদেব
সস্তায় কৰ্ম্মের সহিত প্রতিযােগীতায় শ্বেতকায় ব্যক্তি।
পরাজিত হইবে, তাহা হইলে সভ্যতার সর্বনাশ উপস্থিত
হইবে, অতএব সাবধান হও। অন্যদিকে, তাহারই প্রতি-
ক্রিয়া স্বরূপ ধ্বনী উঠিল যে, রঙ্গীণ লােকদের explot
{ শশাষণ ) কর, তাহারা জগতের অনুপযুক্ত জাতি। পাশ্চাত্য
পণ্ডিতেরা এই নীতিকে biological_law of survival of
t!e fittect ( জীবন সংগ্রামে উপযুক্তের আত্মস্থাপনারূপ
জীবতত্ত্বীয় আইন) বলিয়া অভিষিক্ত করিয়াছেন।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
আমেরিকার বিখ্যাত মহিলা কবি শ্ৰীমতী Ella Wheeler
Wilcox পৃথিবী পৰ্যটন করিয়া এই সংগ্রামের ফলকে
কবিতাতে নিম্নলিখিত প্রকারে ব্যক্ত করিয়াছিলেন-“যখন
শ্বেতকায় ব্যক্তি রঙ্গীণকায় ব্যক্তির দেশে যায়, তখন সে
জঙ্গলকে বাগানে পরিণত করে। তথায় শ্বেতকায়ের শ্রীবৃদ্ধি
ও রঙ্গীণকায়ের মরণ হয়। It is sad, but it is true"!
এই সব কারণেই বলিতে হয় যে, ডুবােয়া মহাশয়ের
of "the problem of the twentieth century
is the problem of color” ঠিক বলিয়া বোেধ
হয় না।
ফলে ইহা দেখা গেল যে, বর্ণ-বিদ্বেষ ও বর্ণ-সমস্যার যত
প্রকার ব্যাখ্যাই দেওয়া হউক না কেন মূলতঃ ইহা শ্বেতজাতির
রঙ্গীণ জাতির প্রতি ভয়প্রসূত। আমেরিকার অভ্যন্তরে
শ্বেতজাতি নানাপ্রকারের আইনের গণ্ডী দিয়া নিজেকে
বাচাইবার চেষ্টা করিতেছে। তথাকার দক্ষিণে নিগ্রোদের
পৰ্যটনের জন্য Jim crow carএর ব্যবস্থা আছে। হােটেল
রেষ্টুরান্ট, ক্ষৌর কর্মের স্থান, সাধারণ স্নানাগার, থিয়েটার
ও কিনােমাটোগ্রাফ, গান-বাদ্যাদির স্থান প্রভৃতিতে কৃষ্ণবর্ণের
লােক সমূহের তথায় প্রবেশ নিষেধ। রঙ্গ-বিদ্বেষ জন্য
“রঙ্গীণ” এসিয়াবাসীও সেই সব স্থানে সাধারণতঃ প্রবেশ
লাভ করিতে পায় না। তথায় কৃষ্ণকায়েরা শ্বেতাঙ্গিণীকে
বিবাহ করিতে পায় না। পশ্চিমেরও অনেক স্থানে প্রাচ্যীয়
১৩

আমার অামেরিকার অভিজ্ঞতা।
করেন।
রঙ্গীণ লােকদের সহিত শ্বেতাঙ্গিণীর বিবাহ নিষেধ হইয়াছে,
ও আমেরিকার সর্বত্রই উক্ত প্রকারের সাধারণ স্থানে
তাহাদের প্রায়ই প্রবেশাধিকার লাভ করিতে নিরস্ত হইতে
হয়। শ্বেতজাতি এবম্প্রকারে সেদেশে নিজের দুর্বল অস্তিত্ব
বজায় রাখিবার চেষ্টা করিতেছে। সাধারণে ইহাকে
তাহাদের দেবত্ব অনুযায়ী প্রভূত্ব রক্ষার চেষ্টা বলিয়া মনে
কিন্তু দুই চারিজন সমঝদারও তথায় আছেন
যাহারা ইহাকে নিজেদের দৌর্বল্যতা গুপ্ত করার চেষ্টা মাত্র
বলিয়া অভিহিত করেন। তাঁহারা বলেন, এবম্প্রকারের
প্রাচীর উত্তোলন করিয়া নিজেকে বাঁচান অর্থে ইহাই স্বীকার
করা হয় যে, প্রতিযােগীতা ক্ষেত্রে শ্বেতজাতি রঙ্গীণ
জাতিপেক্ষা দুর্বল। কথাটা অতি ধ্রুব সত্য। পৃথিবীর যথায়
শ্বেতজাতি রাজশক্তি হস্তে পাইয়া নানাপ্রকারে আইনেব
বন্ধন দিয়া রঙ্গীণ জাতি হইতে নিজেকে পৃথক রাখিবার চেষ্টা
করিতেছে, তথায় শ্বেতজাতি কেবল নিজের দৌর্বল্য
দেখাইতেছে।
আমেরিকার রঙ্গীণ-জাতির প্রতি শ্বেতজাতিক
এবম্প্রকারের রঙ্গ-বিদ্বেষ স্বতঃসিদ্ধ স্বাভাবিক বলিয়া গণিত
হয়। আমেরিকার Immigration Department কালি
ফোর্ণিয়াগত ভারতীয় ঔপনিবেশিকদের বিষয় রিপাের্ট
করিবার কালে লিখিয়াছিল যে তৎস্থানের শ্বেত অধিবাসীরা
এই ঔপনিবেশিকদের পছন্দ করিতেছে না ;
এবং শ্বেত
১৩৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। অধিবাসীদের এই দোষ হইতে ক্ষালন করিবার জন্য বলে যে কেবলমাত্র আমেরিকার যুক্ত সাম্রাজ্যে এই বর্ণ-বিভ্রাট ঘটিতেছে না, ভারতীয় ঔপনিবেশিকদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়ও শ্বেত জাতি কর্তৃক এই প্রকার অপছন্দত। দৃষ্ট হয়। শেষে রিপাের্টটি এই গভীর বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কার করে যে ইহাতে বােধগম্য হয়, শ্বেতজাতির রঙ্গীণ জাতির প্রতি অপছন্দতা স্বাভাবিক এবং তজ্জন্য প্রথমােক্ত জাতি শেষােক্ত জাতির সংস্পর্শে আসিতে নারাজ। কিন্তু এবারের গাত্রবর্ণের বিভিন্নতা জন্য অপছন্দ ও বিদ্বেষ যে সমানবের স্বাভাবিক মনােবৃত্তি তাহাতে আমার সন্দেহ আছে। আমি চিকাগাে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-তত্ত্বের অধ্যাপক DI, Thomasএর কাছ হইতে শুনিয়াছিলাম যে সেই সহরে নিগ্রোদের এক ক্লাব ছিল। এই ক্লাবের সভ্য শ্রেণীর মধ্যে প্রবেশাধিকারের একটি নিয়ম ছিল, যে, যে নিগ্রোর শ্বেতাঙ্গিণী স্ত্রী আছে সেই কেবল এই ক্লাবের সভ্য পদপ্রার্থী হইতে পারিবে। এই ক্লাবের ছয় শত সভ্য ছিল। অধ্যাপক এই ব্যাপারটিকে এই বলিয়া ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন যে, তথাকার অবস্থাপন্ন নিগ্রো ভদ্রলােকেরা ইউরােপীয় ঔপনিবেশিক মহিলাদের মধ্য হইতে স্বীয় স্ত্রী বাছিয়া লইতেন। কারণ ইউরােপীয়ানদের মধ্যে বর্ণজনিত যে inhibition থাকে তাহা ক্ষণকালের জন্য, পরে তাহা ভাঙ্গিয়া যায়; কিন্তু আমেরিকান মহিলাদের মধ্যে এই inhibitionটা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ভাঙ্গে না, কারণ সামাজিক বিধি-রীতির প্রাচীর ও বন্ধন দিয়া তাহা চিরস্থায়ী করিয়া রাখা হয়। এই ক্লাসে দুই জন আমেরিকান শ্বেতাঙ্গিণী ছাত্রী ছিলেন, তাহারা বলিলেন, “যদি ইউরােপীয় মহিলার পক্ষে এই inhib:tion ভাঙ্গা সম্ভব হয়, তাহা হইলে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গিণীর মধ্যেও তদ্রুপ হইবে না। কেন? এ বিষয়ে তঁাহারা তাহাদের সমাজকেই দোষারােপ করিলেন। শ্বেতাঙ্গ ব্যওি রা ইহা বুঝে না যে এই inhibition ব্যাপারটা ( পরস্পরের অপছন্দতা ও তজ্জন্য সংযমতা) সর্বববর্ণের জাতির মধ্যেই আছে। রঙ্গীণ জাতিরও শ্বেত জাতির প্রতি তদ্রুপ মনঃস্তত্ব। যদি এককালে নিগ্রো যুবকেরা শ্বেতাঙ্গিণী বিবাহ করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিত তাহার কারণ হইয়াছিল যে, সে শ্বেত সমাজকে নিজের আদর্শ করিয়া- ছিল ও শ্বেত জাতির দেবত্বে বিশ্বাস করিয়াছিল ; তদ্ব্যতীত একটা জাতিগত আক্রেশিও ছিল। আবার এই inhibitionএর ধ্বজাধারীদের দেশে (দক্ষিণে যেথায় বর্ণ-বিদ্বেষ পূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করিতেছে। অনেক শ্বেত পুরুষদের “রঙ্গীণ” রক্ষিতা স্ত্রীলােক আছে। উত্তরের অনেকে বলেন, দক্ষিণে বর্ণ-বিদ্বেষের বাড়াবাড়ি কিন্তু তথায় গুপ্ত ভাবে উল্টা ব্যবস্থাও আছে। আমার জার্মান অধ্যাপক লুসান বিগত যুদ্ধ- কালে নিগ্রো-সমস্যার অনুসন্ধান করিবার সময় এই ব্যবস্থার বিষয় জানিতে পারেন। তিনি আমায় বার্লিনে বলিয়া- ১৪৬

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
ছিলেন, “আমেরিকায় ইহা একটা official lie যে শ্বেত
পুরুষেরা নিগ্রো স্ত্রীলােকের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করে না।
তথাকার দক্ষিণের সহরগুলিতে শ্বেতপুরুষদের উপভােগাৰ্থ
বিশেষ ভাবে নিগ্রো-বারবণিতা রক্ষীত হইয়া থাকে।” কথা
এই যে, দুইটি জাতি পাশাপাশি বাস করিলে যৌন সম্পর্ক
সংস্থাপিত করিবে, ইহাই হইতেছে জীব-তত্ত্বিক law of
nature, আর inhibition ব্যাপারটা কৃত্রিম। প্রথম
আইনটি সত্য বলিয়াই আমেরিকায় আজ দশ মিলিয়ান
নিগ্রোর মধ্যে দুই মিলিয়ান মুলাটোর (বর্ণসঙ্কর। উদ্ভব
হইয়াছে।
আজ বর্ণবিদ্বেষের ফলে আমেরিকায় পূর্ব ও দক্ষিণ
এসিয়াবাসীদের তথায় উপনিবেশ স্থাপন নিষেধ হইয়াছে
এবং নিগ্রোদের নানাপ্রকারে উচ্ছেদ সাধন কৰিবাব চেষ্টা
হইতেছে।
এ বিষয়ে শ্বেতাঙ্গরা এত অন্ধ যে তাহারা
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়াছে। কোন এক শ্বেতাঙ্গ লেখক
নিগ্রো জাতির উচ্ছেদ কল্পে “Cana Leopard change
his spots ?” (নেকড়ে বাঘ কি তাহার গায়ের দাগ
বদলাইতে পারে) নামক এক পুস্তকেতে যত প্রকারের
জাতি বিদ্বেষ উদগীরণ করিতেছেন। একটা সভ্য সমাজে
কি প্রকারে এবারের পুস্তক লিখিত হইতে পারে ইহাই
আশ্চর্যের কথা ।
আজকাল আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে নিগ্রোসমস্যার
;

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। এই উপায় নির্ধারিত হইতেছে যে, নিগ্রো আর্থনীতিক ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গের সহিত প্রতিযােগীতায় পরাজিত হয়। নির্বাণ প্রাপ্তি হইবে, ও সেই সঙ্গে আমেরিকায় বর্ণ-সমস্যার মিমাংসা হইবে ! লুসান ইহার উত্তরে বলেন, “হ নিগ্রো মরিবে কিন্তু তাহার রক্ত শ্বেতাঙ্গদের ধমণীতে বহিত হইবে।” লুসান বলেন, “দক্ষিণে নিগ্রো ও শ্বেতজাতির রক্ত সংমিশ্রণ হুহুশব্দে বাড়িতেছে আর শেযােক্তো ইহা জানিয়াও চক্ষু বন্ধ কবিয়া আছে কারণ ইহা অবশ্যম্ভাবী।” তথায় অনেক শ্বেতাঙ্গ ও মন্তব্য প্রকাশ করিয়া বলেন, “শেষে এককোটি নিগ্রো নয়- কোটি শ্বেতাঙ্গের সহিত মিশ্রিত হইয়া যাইবে। ইহাও কেহ কেহ বলেন যে, কালে আমেরিকা Brown im's lafi হইয়া যাইবে। এই মিশ্রণ যুক্তিই সমীচীন বলিয়া বােধ হয় কারণ তৎদেশের নিগ্রোর অনুপাতে শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি বেশী হইতেছে যেহেতুক ইউরােপ হইতে ঔপনিবেশিকের বন্যা প্রবলবেগে আসিতেছে, আর নিগ্রোর ঔপনিবেশিক বন্যা ' আফ্রিকা হইতে তেমন ভাবে আসিতেছে না এবং নিগ্রোর সংখ্যাবৃদ্ধিও শ্বেতাঙ্গের অনুপাতে কম। তৎপরে, বর্ণ সঙ্করেরা রঙ্গের গণ্ডী অতিক্রম করিয়া (Spaniola) (স্পানিশবংশীয়) বলিয়া পরিচয় দিতেছে। আমেরিকায় বর্ণ-বিদ্বেষ সাধারণের নিকট এক্ষণে একটা abstraction রূপে দাড়াইয়াছে। ঐ কাল বা অ-শ্বেত রঙ্গেই বিদ্বেষ। কোন লােকের জাতি বা আকৃতি দেখিবার ১৩

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
হইবে।
প্রয়ােজন নাই, গাত্র বর্ণ দেখিয়াই তাহার দাম নিরূপিত
এবিষয়ে সংস্কৃতবিদ আচার্য্য ল্যাম্যান্ একবার
আমায় বলিয়াছিলেন, “আমাদের দেশের শােক এত অজ্ঞ
যে তাহারা মিঃ দত্তের মুখের রংই কৈবল দেখিবে কিন্তু
তাহার গঠন দেখিবে না যে তিনি আমাদেরই মতন এক
ককেসীয় জাতি সস্তুত”। আর একটা বাস্তব ঘটনার দ্বারা
ইহা বােধগম্য হইবে । অধ্যাপক লুসান বালিনের কোন এক
প্রকাশ্য স্থলে বলিয়াছিলেন যে, তাহার আমেরিকায় পর্যটন
কালে দক্ষিণের কোন স্থলের রেল গাড়ীতে আরােহন করিবার
কালে তাহার জাৰ্ম্মাণ সহযােগী অধ্যাপক অমুকের রং লইয়া
( গাল বাধিয়াছিল। রেলের কণ্ডাক্টার তাহার মলিন বর্ণ
দেখিয়া (তিনি দক্ষিণ জার্মাণির লােক, তথায় অনেক
brown বর্ণের লােক দৃষ্ট হয় ) তাঁহাকে Jim (1o calএতে
চড়াইতে উদ্যত, কারণ কণ্ডাক্টার বলে এই মলিন বর্ণের লােক
কি প্রকারে শ্বেত ব্যক্তিদের গাড়ীতে চড়িতে সাহস পায় ?
পরিশেষে কোন পরিচিত আমেরিকান ভদ্রলােক আসিয়া
বুঝাইয়া বলেন যে, “This darkman is the most
learned whiteman in America" ( 93 afaa 7617
লােকটি আমেরিকায় সর্বোচ্য শ্বেতকায় পণ্ডিত্য)। এই
প্রকারে বুঝানর পর সেই জাৰ্ম্মাণ অধ্যাপকটি রেহাই পান।
লুসান আরও বলিয়াছিলেন যে এবম্প্রকারে জাৰ্ম্মাণির বাদেন
বাদেন ( Baden-Baden) রাজত্বের অনেক লােককে রঙ্গীণ
১৩৯

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
লােক ভ্রমে তথায় গােলযােগে পতিত হইতে হইবে। সেইজন্য
বলা যায় যে, বর্ণ-বিদ্বেষ আর জাতি বিশেষের প্রতি বিদ্বেষে
আবদ্ধ নাই, ইহা একটা abstractionএ পৌছিয়াছে, ঐ
মলিন বর্ণে ই আপত্তি।

নিগ্রো-সমস্যা
পূর্বাধ্যায়ে আমেরিকান বর্ণ-বিদ্বেষ ও বর্তমান অবস্থা
উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু একথা বলিলে বােধ হয় অত্যুক্তি
হইবে না যে সমগ্র তন ভূখণ্ডে রং খিদ্বেষ আছে, শুধু
ব্রাজিলে বােধ হয় তহপ্রকট নয়। তবে যুক্ত-সাম্রাজ্যে ইহা
সহ রূপে বৰ্ত্তমান।
তথায় কৃষ্ণকায় নিয়ে ব ন একটি ;ি হইলেই
উন্মত্ত জনতা তথাকথিত দেযকে জীবন্ত দগ্ধ ক।
yitching বলে এবং এই প্রকারের শাসনকে ১n fav
বলে। তাহার অর্থ জনসাধারণ তাপৰাধীর কশ্যকে এতই
দেষের মনে করে যে তাহাকে শাদালতের শাস্তি দিবার
অপেক্ষা না করিয়া নিজ হস্তে তাহা প্ৰেদান কৰে । হারা
পুলিশের হস্ত হইতে অপৰাধীকে ছিনাইয়া লইয়, এইরূপ
কাৰ্য্য করে।
অবশ্য ইহা আইন বিগহিত কম এবং উন্মত্ত
তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর লােকদের দ্বারা সংসাধিত হয়।
বিষয়ে শিক্ষিত লােকদের সহানুভূতি নাই বলিয়া প্রকাশ করা
হয়। আঁহারা বলেন যে এ সব mobএর কাণ্ড।
১৯১৩
খৃষ্টাব্দে একবার যুক্ত-সাম্রাজ্যের কুড়িটি ষ্টেটের গভর্ণরের মিলন
হয় এবং তথায় এই lynch law বিষয় উত্থাপিত হয় যে কি
১৪১

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। প্রকারে ইহাকে দমন করা যায়। তৎসম্বন্ধে একটি দক্ষিণ ষ্টেটের গবর্নর বলেন, “আই টাই কিছু দরকার নাই, এক- বার প্রমাণটা হওয়া দরকার যে Black bruteটা শেতাঙ্গীনির উপর আক্রমণ করিয়াছে তাহাই যথেষ্ট”- -অর্থাৎ তাহার পর তাহাকে যাহা ইচ্ছা করা যায়। কিন্তু এই পাশবিক মতের বিরুদ্ধে বাকি উনিশ জন গভর্ণর তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। কিন্তু যখন কোন শ্বেতাঙ্গ-brate নিগ্রো রমণীর উপর অত্যাচার করে তখন সংবাদপত্রে তাহা লুক্কায়িত করা হয় বা অন্য প্রকারে প্রকাশিত করা হয়। যাহারা ইউরােপীয় বংশীয় নয়, কিংবা শ্বেতচর্মী নয় তাহাদের আমেরিকায় স্থান একজন মানুষের যতই সদ্‌গুণ থাকুক না কেন সে যদি গৌরবর্ণের না হয় তাহা হইলে তাহাকে আর মনুষ্যোচিত অধিকারের যােগ্য বলিয়া গণনা করা হয় না, সে সমাজের অস্পৃশ্য । সাধারণ লােকে বলে যে যুক্ত-সাম্রাজ্যের দক্ষিণ ভাগেই এই বর্ণবিদ্বেষের বিশেষ প্রাদুর্ভাব। একথা ঠিক নহে; দক্ষিণে নিগ্রোর বিপক্ষে ব্যক্তিগত ভাবে ঘৃণা নাই কিন্তু জাতিগত ভাবে আছে। আর উত্তরে জাতিগত ভাবে তাহার প্রতি ঘৃণা নাই কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আছে। উত্তরে নিগ্রোদের বিপক্ষে এরূপ কোন আইন নাই যে তাহারা শ্বেতাঙ্গদের হােটেলে, রেষ্টুরেন্ট, আমােদের স্থল ও নাই । ১৪।

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। রেলগাড়ীতে প্রবেশ করিতে পারিবে না; অথচ বাস্তবপক্ষে তাহারা সর্বপ্রকারের সমান অধিকার হইতে বঞ্চিত। কিন্তু পূর্বে উক্ত হইয়াছে যে দক্ষিণে কড়া আইন আছে। আমেরিকার সর্বত্র ইহা লােকাচারের আইন যে, যে সব সাধারণ স্থলে শ্বেতাঙ্গেরা গমন করে তথায় তাহাদের গমনের অনুমতি নাই; অনেক স্থলে শ্বেতাঙ্গকে সন্ধ্যাকালে ফুটপাতে দেখিলে নিগ্রোকে টুপি খুলিয়া তাহাকে সম্মান দেখাইতে হয় এবং রাস্তা ছাড়িয়া দিতে হয়। এক কথায়, মালাবারে অন্তজ জাতিরা ব্রাহ্মণকর্তৃক যে প্রকার ব্যবহৃত হয়, নিগ্রোরাও যুক্ত-সাম্রাজ্যের দক্ষিণে তদ্রুপ ব্যবহৃত হয়। তৎদেশের civil warএর ফলে নিগ্রোকে যে সব রাজনীতিক সমান অধিকার দেওয়া হইয়াছিল তাহারা এক্ষণে নানাপ্রকারে সে সব অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়াছে। তাহারা পুনরায় রাজ- নীতিক, সামাজিক ও অর্থনীতিক দাসত্বে ( অবশ্য অন্য নামে) আবদ্ধ হইয়াছে। এক্ষণে অনেক মনিষীর মধ্যেই প্রশ্ন উঠিতেছে যে এ সমস্যার নিরাকরণের জন্য কি কৰ্তব্য? তাহার উত্তরে বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ অধ্যাপক Giddings বলেন, “দক্ষিণের নিগ্রোকে নূতন প্রকারের গােলামী হইতে খালাস করিবার জন্য উত্তর আবার যুদ্ধ করিবে না।” পূর্বাধ্যায়ে বলিয়াছি যে এক্ষণে বেশীর ভাগ আমেরিকান সমাজতত্ত্ববিদেরা এ সমস্যার সমাধানের উপায়স্বরূপ বুলি ধরিয়াছেন যে, নিগ্রোরা শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে প্রতিযােগীতায় ১৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
পারিয়া মরিয়া নির্বংশ হইবে । তঁাহারা “Struggle
for existence”এর উপর এ প্রশ্নের মীমাংসার ভার
দিয়াছেন। কিন্তু এ বিষয়ে আমার পরােলােকগত জাৰ্মান
অধ্যাপক বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ Von I.uschanএর মতামত
পূৰ্বেই উল্লেখ করিয়াছি।
কিন্তু এবম্প্রকার বিপরীত অবস্থার মধ্যে বাস করিয়াও
নিগ্রো স্বকীয় চেষ্টায় তথায় শিক্ষালাভ করিতেছে ও তাহার
ফলে আর তাহারা কুকুরের মতন ব্যবহৃত হইতে চায় না। সে
বলে তাহার দেশের Constitutio৷ তাহাকে উপযুক্ততানু-
সারে সকৰ্ম্মেই প্রবেশ করিবার অধিকার দেয় কিন্তু কাৰ্যতঃ
U151 1.6 ay; Constitution farat 97dead letter
হইয়াছে। ইহা লইয়াই সে আন্দোলন করে এবং এই জন্যই
শ্বেতচর্মীরা তাহার উপর বিরক্ত। নিগ্রো শিক্ষিত হয়।
শ্বেতের অন্নোপার্জনের উপায়ের উপর দাবী করে সেই জন্যই
ঝগড়া। নিগ্রো চাকর থাকিলে সে হয় “good nig!”
কিন্তু সমকক্ষতার দাবী করিলেই মুস্কিল। ইহা সাধারণের
মনের অভিপ্রায়। আবার একদল শ্বেতচৰ্ম্মী আছেন যাহার।
philanthropist, তাহারা নিগ্রোদের স্কুল কলেজ স্থাপন
করিবার জন্য অর্থ সাহায্য করেন। facenters Hampton
Coliege, Tuskegee Institute 5137073 SUBICZ
স্থাপিত হইয়াছে। ইহারা বলেন নিগ্রোর technical
শিক্ষায় শিক্ষিত হউক, (কৃষিকৰ্ম্ম ) নানাপ্রকার টেকনিকাল
১৪

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। কৰ্ম্ম শিক্ষা করুক আপাও নাই কিন্তু রাজনীতিক অধিকার ও সাম্যতা চাইলেই মুস্কিল। এইদল বিখ্যাত পরলােকগত Booker T. Washingtonকে সাহায্য করিতেন কারণ ওয়াশিংটন মহােদয় রাজনীতিক অধিকারের দাবী করিতেন । কিন্তু তাহার সকলেই অন্যতম নিগ্রো নেতা Dr. W. E. Dubuisqa cata f29167, Dr. Dubuisus ধমনীতে এক চতুর্থাংশ নিগ্রো শােণিত বহিতেছে ( তিনি quadroon!)। তিনি ইংরেজী ভাষায় বক্তৃতা করিতে ও লিখিতে একজন অসাধারণ পণ্ডিত ; ইউরােপের পণ্ডিত মহলে তাহার বিশেষ সম্মান। giats "Souls of the Black Folks” নামক বিখ্যাত পুস্তকে নিগ্রোজাতির হৃদয়ের বেদনা পরিস্ফুট হইয়াছে। ওয়াশিংটন মহােদয় বলিতেন যে যখন সাম্যতার অধিকার পাইব না তখন তাহার জন্য চিৎকার করিয়া লাভ কি, তাহাতে শ্বেতকায় জাতি চটে; নিগ্রোদের নানাপ্রকারের te:cin:hical ও কৃষিকৰ্ম্মাদিতে জীবিকা উপার্জ- নের চেষ্টা করিতে হইবে। তাহার মত ছিল যে নিগ্রোকে ইহুদি জাতির মতন একটি বিশেষ জাতিরূপে আমেরিকায় থাকিতে হইবে অর্থাৎ Community within a Community হইয়া থাকিতে হইবে। এ বিষয়ে তাহার বিশেষ মত ও প্ল্যান ১Ir, F. (i. Wellsএর সহিত কথােপকথনে পরিব্যক্ত হইয়াছে যাহা শেষােক্ত তাহার আমেরিকায় পরি- ভ্রমণের পুস্তকে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এবম্প্রকারের •• ১৪৫ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; রাজনীতিভীতিজনক মত থাকায় ওয়াশিংটন মহাশয় শ্বেতাঙ্গ সমাজে প্রিয় হইয়াছিলেন ও পিঠ চাপড়ানি পাইতেন; কিন্তু ডুবােয়া মহাশয়কে লােকে “১entimental aegro” বলিয়া অভিহিত করে । নিগ্রো নেতারা এই সমস্যাকে color-problen বলিয়া অভিহিত করেন। তাঁহারা রং বিদ্বেষ অন্তর্ধান করিবার উপায়ের অনুসন্ধানে ব্যস্ত। ওয়াশিংটন মহাশয় ইউরােপ হইতে শেষবারে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার তৎমহাদেশের অভিজ্ঞতার মধ্যে ইহা উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি ভারতের color-problem বিষয়ে অনেক অনুসন্ধান করিয়াও কোন সংবাদ পান নাই; কিন্তু সেইবারকার গ্রীষ্মকালে Andrew Carnegie কর্তৃক নিমন্ত্রিত হইয়া স্কটলণ্ডে গমন করেন ও কার্নেজির বাড়ীতে ভারতের সেক্রেটারি অফ ষ্টেট Lord Morleyর সহিত সাক্ষাৎ হয়। শেষােক্ত ব্যক্তি তাহাকে বলে যে ভারতেও আমেরিকার মতন সমস্যা। ডাক্তার ডুবােয়াও তাহার উপরােক্ত পুস্তকের উপক্রমণিকায় লিখিয়াছেন, “The proulem of the twentieth century is the problem of color” একজন নিগ্রো ভদ্রলােক বর্ণ-বিদ্বেষ জন্য আমেরিকায় অবমানিত হইলে তাহার মনে এই ভাবই উদয় হইবে বটে, কিন্তু বর্ণ ও জাতি-বিদ্বেষের পশ্চাতে যে আর্থ- নীতিক সমস্যা রহিয়াছে এই নেতারা তাহা দেখিতেছেন না ; গাত্রের বর্ণ একটা গৌণ কারণ, এবং সম্পূর্ণ accidental ১৪৬

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
কারণ। শুনিতেছি যে আজকাল আমেরিকায় একদল নবীন
নিগ্রো যুবক উথিত হইয়াছেন যাহারা এই সমস্যাৰ পশ্চাতে
আর্থনীতিক সমস্যার ব্যাখ্যা করিতেছেন।
১৪।

; নিগ্রোর শিক্ষা আমেরিকায় নিগ্রো সামাজিক অস্পৃশ্য। রাজনীতিক্ষেত্রে তাহার স্থান নাই, সমাজ ও তৎসংক্রান্ত সমস্ত অনুষ্ঠানাদিতে সে পারিয়া ; আর্থনীতিকক্ষেত্রে অর্থোপার্জনের বেশীর ভাগ রাস্তার দ্বার তাহার জন্য অর্গলাবদ্ধ। শিক্ষাক্ষেত্রে, দক্ষিণে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা তাহার জন্য নাই ; উত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়- সমূহে যদিচ তাহার জন্য রং-ব্যবধান নাই, তথাপি অর্থাভাবে কয়জন উচ্চশিক্ষা লাভ করিতে সমর্থ হয় ? আর উচ্চশিক্ষা লাভ করিয়াই সে কি করিবে ? তাহার দ্বারা নিজের অন্ন সমস্যা দূর করিতে সে অক্ষম। এই সব কারণে শিক্ষিত- নিগ্রোর-জীবন-সংগ্রাম-সমস্যা অতি ভয়াবহ। এইজন্যই অনেক নিগ্রো নেতা জাতীয় জীবনের ভবিষ্যৎ কুম্ফটিকাময় দেখিয়া বড়ই নিরুৎসাহ হন এবং কেহ কেহ অন্য দেশে উপনিবেশ স্থাপন করিবার পরামর্শ করেন। এ বিষয়ে দুই একবার চেষ্টাও হইয়াছিল। আমেরিকান আভ্যন্তরীণ যুদ্ধের অবসানে নিগ্রোদের আফ্রিকায় প্রত্যাবর্তন করাইবার জন্য গভর্নমেন্ট বিশেষ উদ্যোগী ছিল। সেইজন্য পশ্চিম আফ্রিকায় লাইবেরিয়া ( Liberia ) ( Liberia ) atap Safacaat স্থাপন করা হয় ; উদ্যোগীর আশা ছিল যে আমেরিকান ১৪৮ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। ; গভর্ণমেন্টের আশ্রয়ে থাকিয়া আমেরিকান ঔপনিবেশিক নিগ্রোরা তথায় নিজেদের জাতীয় উন্নতি সাধন করিবে ও ভবিষ্যতে আফ্রিকাস্থিত কৃষ্ণকায় জাতির আশাস্থল হইবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে আশায় ছাই পড়িল ; আমেরিকার ঔপনিবেশিক-নিগ্রোর দল তথায় যাইয়া তথাকার বর- নিগ্রোদের উন্নত করিবার সােপানস্বরূপ হইতে পারে নাই। প্রথমে ঔপনিবেশিকদের মধ্যে অনেকে নূতন স্থানের দেশী- নিগ্রোদের সহিত একত্ব স্থাপন করিতে পারে নাই, বর্বরদের রীতিনীতি দেখিয়া বলে, “উহারা ত bush niggers ( জঙ্গলি নিগ্রো ) আর নিগ্রো। এই প্রকারে ঔপনিবেশিকেরা দেশীয়দের বক্তসম্পর্কীয় জাতিরূপে গণ্য করিয়া তাহাদের জীবন উন্নত করিতে অস্বীকার করে। তৎপরে অতি অল্পসংখ্যক নিগ্রোই আমেরিকা হইতে আফ্রিকায় প্রত্যাবর্ত্তন করে যদিচ গভর্ণমেন্ট ও জনসাধারণ হইতে অনেকে এই উদ্দেশ্যে অনেক প্রকারের সুবিধা করিয়া দিয়া- ছিলেন। ইহার কারণ, যে একটি জনসমষ্টি যতই উৎপীড়িত হউক না কেন তাহা স্বদেশ ও স্ববাসভূমি ছাড়িয়া অজ্ঞাত ও অনুন্নত ভূমীতে গিয়া বাস স্থাপন করিতে উৎসাহ প্রকাশ করে না। আমেরিকান নিগ্রো তৎদেশে ৪ ০ ০ বৎসব ধরিয়া বসবাস করিতেছে। আমেরিকান রীতিনীতি, ভাষা, সভ্যতা, মানসিক অবস্থা ও চিন্তা দ্বারা সে অভিভূত হইয়াছে ; আমে- রিকার সভ্যতার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেও বর্ধিত হইয়াছে যদি •• ১১১ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। তাহার ফলভােগে সে বঞ্চিত। এই দেশে এই দেশে বহুপ্রকারে উৎপীড়িত হইলেও মাতৃভূমির ক্রোড় হইতে সে চলিয়া যাইয়া বিদেশের মায়া-মরীচিকার জন্য ধাবিত হয় না। এইসব কারণে আফ্রিকায় সমগ্র আমেরিকান নিগ্রোজাতির প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয় নাই। তৎপরে একদল নিগ্রো মেক্সিকোতে গিয়া উপনিবেশ-স্থাপনের প্রস্তাব করিয়াছিল, কারণ তথায় সৰ্ব্ব- প্রকারের বর্ণসঙ্করের বাস ও বেশীর ভাগ মেক্সিকানরা ( যাহারা আদিম অধিবাসীদের বংশসম্ভত ) “রঙ্গীণ লােক, সেইহেতু তথায় নিগ্রোদের রং-বিদ্বেষের লাঞ্ছনা ভােগ করিতে হইবে না। কিন্তু এই দলের মুখপাত্রেরা নাকি মেক্সিকোতে গিয়া প্রত্যক্ষ করে যে তথায় শ্বেতচর্মীদেরই (স্পেনের ঔপনিবেশিকদের বংশধরদের) প্রভাব প্রবল ; তথায় যাইয়া নিগ্রোর ভাগ্য খুলিবে না। এই কারণে এই প্রস্তাব অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়। এই প্রকার অবস্থায় ইহজগতে নিজেকে উন্নত করিবার জন্য নিগ্রো নিজের জন্য কি করিতে পারে ? উত্তরে ইহা বলা যায় যে সে যাহা করিয়াছে তাহা অতি প্রশংসনীয় এবং ভারত- বাসীর পক্ষে শিক্ষাপ্রদ। নিগ্রো অতি নির্ভরশীল হইতেছে, নিজে নানাপ্রকারের শিক্ষালাভ করিতেছে ও স্বজাতি-হিতকর নানাপ্রকারের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিতেছে। ষাট বৎসর পূর্বে গােলামীর অবস্থায় যে শ্রমের পশুর ন্যায় ব্যবহৃত হইত, সে আজ নিজের চেষ্টায় স্বীয় সমাজের শতকরা ৪৫ ভাগ নিরক্ষরতা আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। দূর করিয়াছে, কতকগুলি বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ গঠন করিয়া তুলিয়াছে, নিজের ব্যাঙ্ক স্থাপন করিয়াছে, নিজে ভূসম্পত্তি অর্জন করিয়াছে এবং আজ সর্ববিষয়ে শ্বেতচর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হইতেছে। নিগ্রো যতই শিক্ষিত ও উপযুক্ত হইতেছে, শ্বেতচর্মীদের সহিত তাহার প্রতিযােগিতা ততই বাড়িয়া উঠিতেছে এবং বিরােধও ঘনীভূত হইতেছে। আজ নিগ্রো জগতের কাৰ্য্যের সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করিতেছে, তাহাদের মধ্যেও অনেকে উচ্চশিক্ষা-প্রাপ্ত অগ্রণী লােক হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে শ্বেতচর্মীদের ঘাের আপত্তি। নিগ্রো স্বীয় গুণানুসারে সমান- ধিকার ও ন্যায্য স্থান-প্রাপ্তির দাবী করিতেছে। কিন্তু ইহাতে শ্বেতপুরুষ প্রতিবাদী ; রং-বিদ্বেষের বেড়া দিয়া নিগ্রোকে গণ্ডীর মধ্যে রাখিয়াছে। উচ্চশিক্ষাস্থল, আইন, আদালত ও অন্যান্য উচ্চ-জীবিকার কর্মস্থলে নিগ্রো উপযুক্ত হইলেও স্থান পায় না, যদিচ একবার একজন Deputy Attorney- General হইয়াছিলেন। কিন্তু ইনি প্রায় শ্বেতবর্ণের লােক (ইনি octoroon অর্থাৎ এক-অষ্টমাংশ নিগ্রো-শােণিত ইহার ধমনীতে বহমান হইতেছে ) এবং হার্ডবার্ড বিশ্ববিদ্যালয় হইতে অনেক মুরুব্বির সাহায্য-প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সমাজ ইহা চায়না যে, নিগ্রো জগতের উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হয় ও শ্বেতপুরুষের সহিত সমকক্ষতা করে। শ্বেতচর্মী-পুরুষ নিগ্রে। চাকর বাড়ীতে রাখিতে চায় কিন্তু নিগ্রো-ভদ্রলােককে নিজের বৈঠকখানায় দেখিতে চায় না। }

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
এই প্রকারে জীবনের উপজীবিকার উচ্চস্থলে উভয়
জাতিতে ঘাের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছে এবং নিঃসহায় নিগ্রো
নিজের উন্নতির কোন রাস্তা নিৰ্বিবাদে পাইতেছে না।
ফলে একদল হতাশ হইয়া হা হুতাশ করিতেছেন। কিন্তু
এ প্রকার মানসিক অবস্থায় মনস্তত্বের রীতি অনুসারে যে
পরিণাম হয় নিগ্রোদের মধ্যে তাহাই হইতেছে। নিগ্রোদের
মধ্যে ধর্মের বাতিক বড়ই বাড়িতেছে। কোন গােলামজাতির
লােকদের যখন জগতে উন্নতি করিবার সর্বপ্রকারের পথের
দ্বার বন্ধ হয়, তখন তাহার প্রতিরুদ্ধ মনের গতি বাহিরে লীলা
করিতে না পাইয়া অন্তঃসলিলারূপে বহিতে থাকে এবং তাহার
ফলে, কল্পনারাজ্যে সে নিজের মুক্তি উপলব্ধি করিতে চেষ্টা
করে। তাহার মন বহির্জগত হইতে সঙ্কুচিত বা বিতাড়িত
হইয়া “ধৰ্ম্মরাজ্যে” লীলা করিবার চেষ্টা করে এবং সেই রাজত্বে
একজন “হােমরা চোমরা” হইবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করে।
এই ধৰ্ম্মবাতিকেরই ফলে তৎসমাজের লােকেরা নানা প্রকার
hallucination প্রত্যক্ষ করে, ও নানা প্রকার iliusionএর
মধ্যে নিজেরা থাকে। আর এবম্প্রকার অবস্থায় সেই সমাজে
অবতার ও পয়গম্বরদের প্রাদুর্ভাব বড়ই বেশী হয় !
ইহা
ইতিহাসের আর্থনীতিক ব্যাখ্যানুসারেই সংঘঠিত হয়, এই লােক
গুলি সমাজে “হােমরা চোমরা” হইয়া আধিপত্য করিবার জন্য
বিশেষ চেষ্টা করে। নিগ্রোদেরও অবস্থা সেই প্রকার হইয়াছে।
অশিক্ষিত নিগ্রোরা খৃষ্টান ধর্মের বাহ্যিক খােলসটা গ্রহণ

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা অতি নিম্নস্তরে করিয়াছে আর বাইবেলের অনৈসর্গিক ও অমানুষিক গল্প- গুলিতে মজিয়া নানাপ্রকারের hallucination. দেখে! তাহাদের ধৰ্ম্মজ্ঞান খৃষ্টধর্মের অবস্থিতি করিতেছে। খৃষ্টীয় ধর্মের বাহ্যিক লইয়াই তাহারা মারামারি করে ! বাইবেল-কথিত জিহোবা কর্তৃক ছয় দিনে জগৎ সৃষ্টির গল্পে সন্ধিহান হওয়া একটা ঘাের অধর্ম ও বিভ্রাট বলিয়া পরিগণিত হয় । বাইবেল বর্ণিত পয়গম্বরদের গল্পগুলি সত্য কিনা এই সব লইয়া ধৰ্ম্মমণ্ডলী ( church) ও সমাজে তুমুল দলাদলি হয়, আর ধর্মযাজকেরা এই কলহে ইন্ধন প্রদান করিয়া নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেন। যাঁহারা উপরােক্ত গল্পসমূহে অবিশ্বাসী তাহারা Campbellite দলের পুষ্টিসাধন করেন। এই দল নবীন শিক্ষিত নিগ্রোর ধর্মসম্প্রদায়, অবশ্য ইহার নৈষ্ঠিক পাদরী ও লােকদের নিকট হেয় হন। উপস্থিত জনরব যে যুদ্ধের পর আমেরিকায় একজন “কৃষ্ণকায় পয়গম্বর আবির্ভাব করিয়াছেন। তিনি নিগ্রোদের খুব মাতাইয়া তুলিতেছেন এবং নানাপ্রকারের ভবিষ্যদ্বাণী করিতেছেন। তিনি নাকি আমেরিকার কৃষ্ণকায় ও আফ্রিকার কৃষ্ণকায়দের সহিত একতা স্থাপনে ( solidarity of the black race ) প্রয়াসী। ইহার নাম Jervis, ইনি Jamaicaতে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। যুদ্ধের পর নিগ্রোদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হইয়া ইনি এই আন্দোলন আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। সৃষ্টি করেন। আমেরিকার ধণী-শ্রেণী এক্ষণে ইহাকে প্রকারান্তরে কারাগারে প্রেরণ করিয়াছে। ডাক্তার ডুবােয়া বলেন যে আমেরিকার নিগ্রোদের মধ্যে church হইতেছে সর্বাপেক্ষা strong organization। যখন নিগ্রোর সাধারণের জন্য অন্য কোন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিবার সুবিধা নাই, তখন স্বাভাবিক যে ধৰ্ম্মক্ষেত্রেই তাহার ধর্ম- কুশলতা প্রকাশ পাইবে। কিন্তু সাধারণ নিগ্রোর মন শিক্ষার অতি নিম্নস্তরে অবস্থিতি করায় তাহার ধর্মজ্ঞান ও চর্চাও অতি নিম্নস্তরের। সাধারণ নিগ্রো অতি গোঁড়া হয়। আমি যে কতিপয় নিগ্রো নামধেয় পাদ্রীদের সহিত মিলিত হইয়াছি, তাহাদের গোঁড়ামী প্রত্যক্ষ করিয়াছি আর ইহার। স্বজাতিকে ইহা বলিয়া সান্ত্বনা দেন যে, বাবা আদম একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি ছিলেন আর যীশু খৃষ্ট যে একজন “রঙ্গীণ” ব্যক্তি ছিলেন তাহার কোন সন্দেহ নাই ! এই প্রকার অবস্থায় জগতের সবজাতির মধ্যে যে ঘটনা হয়, নিগ্রোদের মধ্যেও তাহাই হইতেছে। সাধারণতঃ অনেক শিক্ষিত নিগ্রো, ধৰ্ম্ম ও বিশ্বপ্রেমিকতার আবরণে নিজেদের জগতের সম্মুখে দাঁড় করাইবার চেষ্টা করিতেছেন। নিগ্রো গির্জার পাদরী মানবজাতির একত্ব ও তজ্জনিত বিশ্বজনীন, ভ্ৰাতৃভাব তাঁহার বেদী হইতে ক্রমাগত প্রচার করেন ; উদ্দেশ্য স্বীয় মণ্ডলীকে সান্ত্বনা দেওয়া যে কৃষ্ণকায় জাতি ও শ্বেতকায় জাতির এক উৎপত্তি এবং সেইহেতু প্রথমােক্তদের ১৫৪ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। জগতে লজ্জা করিবার কোন কারণ নাই। অনেক শিক্ষিত নিগ্রো শ্বেতচর্মীদের ধর্ম ও বিশ্বজনীন সভা ও সঙ্ঘেতে যােগদান করেন, মনস্তত্ত্বীক বিশ্লেষণের ফলে ইহার কারণ ইহাই নিরূপিত করা যাইতে পারে যে, এবম্প্রকারের সমিতির সভ্য হইতে পারিলে শ্বেত-সমাজের ছায়ায় দাঁড়ান যায়, শ্বেত- চর্মীর পার্শ্বে উপবেশন করিয়া স্বজাতির মধ্যে দরবৃদ্ধি করা যায় ও নিজের মনও আত্মপ্রসাদ লাভ করে। তৎপর এই মনস্তত্ত্বের বশীভূত হইয়া অগ্রে উত্তরের অনেক বর্ধিষ্ণু নিগ্রো ( অবশ্য বর্ণসঙ্করেরা) গরীব শ্বেতাঙ্গিনীকে বিবাহ করিতেন, কিন্তু আজকাল নিগ্রোর জাতীয় শ্লাঘা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়াতে এভাব ক্রমশ হ্রাস পাইতেছে। এই প্রকারে পূর্বে নিগ্রো শ্বেতসমাজকে আদর্শ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারিয়া অথবা সাম্য না পাইয়া নিজের নৈরাশ্য-অনলে পুড়িয়া মরিত। অগ্রে সে যে illusion- এর মধ্যে ছিল এক্ষণে তাহা হইতে বাহির হইহার চেষ্টা করিতেছে। পূর্বেই বলিয়াছি যে আজকাল তাহার একটা জাতীয় শ্লাঘা বর্ধিত হইতেছে যদিচ তাহা সার্বজনীন বলিয়া বােধ হয় না। এই নবভাবের ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে আমেরিকায় Community within a community (সমাজের মধ্যে সমাজ) গড়িতেছে । নিগ্রো নিজের জন্য বিদ্যার ও আর্থনীতিক বিবিধ প্রতিষ্ঠান সংস্থাপন ত করিতেছেই, তাহা ব্যতীত সে নিজের আমােদের স্থলও স্থাপন করিতেছে যথা ; ;

অামার অামেরিকার অভিজ্ঞতা। থিয়েটার ও অপেরা, যথায় স্বীয় রচিত নিগ্রোজাতির অবস্থা- সম্পৰ্কীয় নাটকসমূহ, গীতি ইত্যাদি নিগ্রো-অভিনেতৃবর্গ দ্বারা অভিনীত হয়। আমেরিকার সঙ্গীতবিদ্যায় যে জাতীয় বিশেষত্ব আছে তাহা নিগ্রোর দ্বারাই সৃষ্ট, ইহাকে ‘Coon Song’ বলে। অনেক স্থলে তাহারা গ্রীষ্মকাশে বিশ্রামের জন্য summer resorts স্থাপন করিতেছেন, তথায় হােটেলাদি ও সৃষ্টি হইতেছে ইত্যাদি। তৎপরে নিজেদের নানাপ্রকারের ক্লাব স্থাপিত হইতেছে। ডুবােয়া মহােদয় বলিয়াছিলেন যে, তাহারা শ্বেত-সমাজে সাম্য-প্রাপ্তির প্রয়াসী নহেন কিন্তু আমােদ ও আহারের স্থলসমূহে প্রবেশ ও সাম্যপ্রাপ্তির প্রয়াসী, কারণ এই সব অনুষ্ঠান মনুষ্যজীবনে অনিবাৰ্য আবশ্যকীয় বস্তু। কিন্তু এই সব নেতার প্রচেষ্টা ও তাহার ফলের অপেক্ষায় সমাজ বসিয়া থাকিতে পারে না, সেই জন্যই নিগ্রোসমাজ- মধ্যে উপরােক্ত প্রতিষ্ঠানাদি গড়িয়া উঠিতেছে! আর অগ্রেই বলিয়াছি যে ওয়াশিংটন মহােদয়ের এবম্প্রকারই আদর্শ ছিল। এই প্রকারে শিক্ষা ও সামাজিক বিষয়ে নিগ্রো নিজে আত্মনির্ভরশীল হইতেছে কিন্তু এক কোটি নিগ্রোর জীবন- সংগ্রাম-সমস্যা ইহাতে মিটে না। এই সমস্যাই তাহার সর্বাপেক্ষা ভীষণতর হইয়া উঠিতেছে। ৪•!৫০ বৎসর পূর্বে যখন সে গােলমী হইতে মুক্ত হইয়া ভৃত্যরূপে শ্বেতকায় ব্যক্তির বাড়ী থাকিত এবং নিজের গ্রাস ও অঙ্গাচ্ছাদনের আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। যৎকিঞ্চিৎ পাইত, তৎকালে তাহাতেই সে সন্তুষ্ট থাকিত এবং সেই সময়ে এবম্প্রকারের জীবন-সমস্যার উদয় হয় নাই। তৎকালে নিম্নশ্রেণীর ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকদের অপ্ৰাচুৰ্য- বশতঃ নিগ্রো রেষ্টুরেন্ট ও হােটেলের ভৃত্য ( water) হইতে পারিত, কোন ব্যক্তির বাড়ীতে ভৃত্যরূপে স্থান পাইত, দক্ষিণে কৃষাণ ও নানাপ্রকারের জনমজুররূপে নিজের জীবিকা অর্জন করিতে পারিত। কিন্তু বিগত ২০/৩০ বৎসর ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকদের আগমনের বেগ বিশেষরূপে বৃদ্ধি পাওয়ায় তৎদেশীয় শ্রমজীবিরা সর্বপ্রকারের শ্রমের কৰ্ম্ম একচেটিয় করিয়া লইতেছে। এক্ষণে নিগ্রোরা তাহাদের পূর্বের নানাবিধ কর্মস্থল হইতে বিতাড়িত হইয়া অন্নাভাবে হাহাকার করিতেছে। উত্তরে বেশীর ভাগ রেষ্টুরেন্ট ও হােটেল প্রভৃতি সাধারণাগারে কৰ্ম্মের জন্য তাহার স্থান নাই; কারখানা প্রভৃতিতে তাহার একেবারেই প্রবেশ নিষেধ, যদি বেলে কুলি বা ভৃত্যরূপে কতিপয় লোেক স্বীয় জীবিকা অর্জন করে। কিন্তু দক্ষিণে নিগ্রো ভৃত্যরূপে কৰ্ম্ম পায় কারণ তথায় শ্বেতকায় লােককে কেহ চাকররূপে নিযুক্ত করেনা ! অন্যপক্ষে এবপ্রকারের নিগ্রো-কুলি শ্রমজীবিসঙ্ঘ ( Trade Union) প্রবেশ করিতে পারে না, তথায়ও তাহার বিপক্ষে বর্ণের গণ্ডী টানা হয় । কিন্তু উত্তরের public s. hool সমূহের নিম্নশ্রেণীতে মধ্যে মধ্যে নিগ্রোশিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত হন। তাঁহারা শ্বেতাঙ্গ

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
ছাত্রদের পড়াইতে পারেন, কারণ উত্তরে public school
সবর্ণের ছাত্রেরা পড়িতে পারে।
আবার অন্যদিকে
উচ্চশিক্ষিত নিগ্রো ভদ্র-যুবকদের উচ্চশিক্ষাস্থলে নিযুক্ত
হইবার কোন সুবিধা নাই, তজ্জন্য উচ্চশিক্ষিত নিগ্রোদের
সমস্যা অতি জটিল। এ সব বিষয়ে তাহাদের সমস্যা ঠিক
ভারতবর্ষীয় শিক্ষিত যুবকদের ন্যায়, অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত লােক
কুলিগিরি করিতে পারে না অথচ শিক্ষানুযায়ী পেশার রাস্তার
দ্বারও মুক্ত নয়। এইজন্যই ওয়াশিংটন মহােদয় বলিতেন,
“নিগ্রোর আর উচ্চশিক্ষা লাভ করিবার প্রয়ােজন নাই, সে
Industrial education গ্রহণ করুক তাহাতে সে technical
লােকরূপে কোন রকমে গ্রাসাচ্ছাদন করিতে পারিবে।” এই
দৃষ্টান্তস্বরূপ একবার তিনি উল্লেখ করিয়াছিলেন যে, একদা
এক নিগ্রো যুবক yale বিশ্ববিদ্যালয়ে M,A পড়িতেন,
তৎকালে সেই বিদ্যাপীঠের ছাত্রদের মাসিক পত্রিকায় তিনি
"The political mistake of Mr. B T Washington”
বলিয়া এক প্রবন্ধ লিখেন, তাহাতে উপরােক্ত ব্যক্তির মত যে
“নিগ্রোর রাজনীতি-চর্চা করিবার কেন প্রয়ােজন নাই ;
সে technical শিক্ষাদ্বারা নিজের জীবিকা নির্বাহনে ব্যাপৃত
থাকুক” তাহার বিরুদ্ধে সমালােচনা করেন। কিন্তু এই
সমালােচকই পরে M, A, ডিপ্লোমা লইয়া নিজের জীবি-
কার্জনের কোন পথ না পাইয়া কোন মুরুব্বির দ্বারা
ওয়াশিংটন মহাশয়ের শরণাপন্ন হন। শেষােক্ত ব্যক্তি বলেন
১৫

আমাব আমেরিকার অভিজ্ঞতা। যে, ঐ যুবকের জন্য তৎক্ষণাৎ শিক্ষকের বা তাহার শিক্ষানু- যায়ী কোন কর্মের সন্ধান করিতে পারেন নাই। শেষে তিনি লােক মুখে শ্রবণ করেন যে, ঐ যুবক পুস্তকবিক্রেতার ( salesman) কৰ্ম্ম করিতেছে। তিনি বলেন “যে শিক্ষায় নিগ্রো তাহার গ্রাসাচ্ছাদনে অসমর্থ, বর্তমান অবস্থায় সে বিদ্যায় তাহার কি লাভ ? সে বরং technical কার্য শিক্ষা করিয়া জীবিকান্বেষণ করুক!” পূৰ্বেই উক্ত করিয়াছি যে, ইহা লইয়া দুইটা দল সৃষ্টি হইয়াছে। ওয়াশিংটনের দল সাম্যান্বেষণ না করাতে শ্বেত-সমাজের পৃষ্ঠপােষকতা পাইতে- ছেন। গভর্ণমেন্ট ও শ্বেত-জগতহিতৈষী ব্যক্তিরা নিগ্রোর “vocational” শিক্ষার জন্য সাহায্য করিতেছেন। দক্ষিণের শ্বেতসমাজ উত্তরের সমাজের উপর বিশেষভাবে বিরক্ত কারণ উত্তর নিগ্রোকে মুক্ত করিয়াছে, রাজনীতিক সাম্য দিয়াছে, উচ্চ শিক্ষার অন্তরায় নয় এবং অনেক স্থলে তাহার সুবিধা করিয়া দিয়াছে। দক্ষিণ বলে, ইহার ফলে নিগ্রোরা ‘স্ফীত- মস্তিস্তু" হইয়াছে। দক্ষিণের এই মতের সহিত সেই সব জগতহিতৈষীদের মিল আছে যাহারা উচ্চ শিক্ষার ফলে বাস্তব জগত হইতে বিচ্ছিন্ন “miere theorists”দের উপর আস্থা স্থাপন করেন না। তাহারা এপ্রকারের শিক্ষা চান যাহা দ্বারা শ্রমজীবিরা কর্মকুশল হইয়া দেশের ধন বৃদ্ধিতে সহায়তা করিতে পারে, যে বিদ্যাতে জাতির ধনবৃদ্ধির পথ প্রসারিত হয় সেই বিদ্যারই তঁাহারা পক্ষপাতী। সেই জন্যই নিগ্রোকে

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
;
‘স্ফীতমস্তিঙ্ক” না করিয়া কৰ্ম্মকুশল শ্রমজীবিরূপে বার্ধত
হইতে দেখিতে চান ; এইজন্যই নিগ্রোর এবম্প্রকার
হিতৈীরা তাহাকে “vocational training” দাও বলিয়া
রব তুলিয়াছেন। কিন্তু একজন নিগ্রোনে Dean Miller
বলেন যে, ইহাতে নিগ্রোর সভ্যতার রাস্তায় অগ্রগামী হইবার
প্রতিবন্ধকতা হইতেছে ; যে স্থলে নিগ্রোর উচ্চশিক্ষার প্রস্তাব
করা যায় তথায়ই ইহার প্রতিযােগিতারূপে vocational
trainingএর কথা উল্লেখ করা হয়। উচ্চশিক্ষার পক্ষপাতী-
দল বলেন যে, অন্য পন্থাটি নিগ্রোকে দাবিয়া রাখিবার জন্যই
প্রস্তাব করা হয়। নিগ্রোর উচ্চশিক্ষা অর্থে ইহারা বুঝেন যে
সে একজন কর্মপটু চাকর অথবা পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান
কারিকর বা সূত্রধর বা রাজমিস্ত্রি হইবে। ইহারা নিগ্রোকে
ভাবুক, লেখক বা উচ্চস্তরের পেশার স্থলে যে সব দ্বারা সে
রাজনীতিক বা নেতারূপে অভিযুক্ত হয়, সেই সব স্থানে
তাহাকে বিরাজ করিতে দেখিতে চান না। ইহারা নিগ্রোকে
ততটুকু শিক্ষা দিতে প্রস্তুত যাহা দ্বারা সে কিঞ্চিৎ জীবিক।
সংগ্রহ করিতে পারে এবং কর্মকুশলরূপে আর্থনীতিক ক্ষত্রে
অতি নিম্নস্তরে থাকিতে পারে। ইহারা নিগ্রোকে সেরূপ
প্রকারের উচ্চ শিক্ষিত হইতে দেখিতে চান না যাহা দ্বারা
সে শ্বেতকায় ব্যক্তির সহিত রাজনীতিক, ভাবরাজ্যে, ধৰ্ম্মক্ষেত্রে
নৈতিক ও অর্থনীতিক জীবনে সাম্যের দাবী করিবে।
উচ্চদরের মানসিক শিক্ষার ফলে যে সব স্পৃহার উদয়

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা। হয়, তাহা শাসকশ্রেণীর পক্ষে বড়ই অপ্রীতিকর '? সেই- জঙ্গই তাহারা সে স্পৃহার মূলই উৎপাটন করিতে চান। উপরােক্ত নিগ্রোনে মহাশয় বলেন যে, নি৪ে শিক্ষা বিষয়ে এবারের মতবাদে তাহার উচ্চশিক্ষার সুবিধার পথ সব বন্ধ হইয়া যাইতেছে, উত্তরের জগত-প্রেমিকেরা নিগ্রোর উচ্চশিক্ষার জন্য যে সব বিদ্যাপীঠ ছল তাহা হইতে নিজেদের সহানুভূতি সরাইয়া লইতেছেন ও অর্থসাহায্য বন্ধ করিয়া দিতেছেন। এই সব কারণে নিগ্রোনেতারা ভীত হইয়াছেন। মিলার, ডুবােয়া প্রভৃতি ওয়াশিংটন মহাশয় প্রবুদ্ধিত industrial trainingরূপ রবকে সুবিধাবাদীর মতবাদ বলিয়া প্রতিবাদ করিতেছেন। ইহারা বলেন, সমাজে যে রকম কারিকরও প্রয়ােজন, সেই প্রকার উচ্চ চিন্তা, নীতি ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও ভাবুকের প্রয়ােজন। বস্তুতঃ সমাজের দুই প্রকারের লােক—শ্রমীক ও ভাবুক—উভয়েরই প্রয়ােজন। কিন্তু প্রতিপক্ষ আর একটা সমস্যা তুলিতেছেন ইহারা বলেন যে, উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হইলে নিগ্রো denationalize হয় অর্থাৎ সে তাহার জাতি ছাড়িয়া চলিয়া যায়। মিলার মহাশয় বলেন যে, সহস্র সহস্র শিক্ষিত নিগ্রো স্ত্রীলােক ও পুরুষের জীবনী ও কৰ্ম্ম এই অপবাদের প্রতিবাদ করিতেছে। যদি কেহ জাতি ছাড়িয়া পলাইবার চেষ্টা করে, ভীষণ জাতি ও রং-বিদ্বেষ তাহাকে সে দুরাশার পথ হইতে প্রত্যাবৃত্ত করায়। কথাটা সত্য, অনেক শ্বেতপ্রায় নিগ্রো (quadroons,

আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা।
octor;"ns) রঙ্গের গণ্ডী ডিঙ্গাইয়া নিজেকে স্পনিস বা
ফ্রেঞ্চ-ৰংশােদ্ভৰ বলিয়া পরিচয় দিয়া শ্বেতসমাজে প্রবেশ
করিবার চেষ্টা করে। কিন্তু আমেরিকায় জাতিভেদের বন্ধন
অতি কঠোর, তাহা ছেদ করা অতি শক্ত। অনেক নিগ্রো
ধাক্কা খাইয়া স্ব-সমাজে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এক্ষণে নিগ্রোর
জাতীয় গৌরব উদ্বুদ্ধ হইয়াছে এবং নিগ্রোরূপে স্বজাতির
উদ্ধার করিবার চেষ্টা করিতেছে।
নিগ্রোর এই শিক্ষা সম্বন্ধের সমস্যার সহিত ভারতীয়
যুবকের শিক্ষা-সমস্যার অনেক সাদৃশ্য আছে। এ বিষয়ে
তারতবর্ষীয়দেরও অনেক ভাবিবার বস্তু আছে ;-বর্ণ ও
জাতিসমস্যা হইতেই এই সমস্যার উদ্ভব হইয়াছে।
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Amar Americar Aviggata Part. 1

Author
Dutta, Bhupendranath.
Title
Amar Americar Aviggata Part. 1
File name
Amar Americar Aviggata Part. 1
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2010/03/24
Publisher
Pabitra Kumar Guha, Calcutta.
Language
Sanskrit
Pages
174
Library
Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Classification
English Essay
Keywords
Nigror Shiksha
DLI number
510841
Barcode
4990010018044.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
18pQV5lufPz
Download PDF

Amar Americar Aviggata Part. 1