Bally Sadharan Granthagar
Rupali Pakhi Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রূপালি পাখি
বুদ্ধদেব বসু
ডি, এম্, লাইব্রেরি
৬১, কওয়ালিস স্ট্রিট
কলিকাতা
প্রকাশক
গোপালদাস মজুমদার
ডি, এম, লাইব্রেরি
৩১, কন ওয়ালিস ষ্টিট, কলিকাতা।
প্র থ ম
সংস্ক র ৭
মে, ১ ৯ ৩ ৪
মূল্য ১
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস,
প্রিন্টার—শ্রীপ্রভাতচন্দ্র রায়
৭১১নং মির্জাপুর ড্রিট, কলিকাতা।
উৎসর্গ এ পঙ্কজকুমার দাশগুপ্ত
No text on this page.
বসন্তের সেই সকালবেলায় সে ঘুম থেকে উঠলাে : আ
উঠে দেখলাে সে একা ; নিজেকে তার একা লাগছে।
এখন, চিরকাল এই নিঃসঙ্গতাকে সে ভয় করেছে। একট,
ভীষণ আতঙ্ক : যদি কখনাে তাকে সত্যি-সত্যি একা থাকছে
হয়। আর আমাদের জীবনটা এমনি যে সব সময় হাতের কাছে
মানুষ পাওয়া যায় না ; আর মানুষ যদি বা পাওয়া যায়, ঠিক
মানুষকে পাওয়া যায় না; আর এমনও যদি হয় যে ঠিক
মানুষকেই পাওয়া গেলো, ঠিক সময় হয়তাে তখন নয় ।
তবু, মানুষ নিয়েই আমরা বাঁচি। মানুষকে আমরা খুজি :
মানুষকে ঘৃণা করি, মানুষকে ভালােবাসি। আর যদিও ঘৃণা
জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, পূর্ণতার একটা অঙ্গ,
এমন কি—তবু, ভালােবাসতে পারলেই ভালাে।
আর তাই সে তার যৌবনের প্রথম থেকে নিজের চারদিকে
টেনে এনেছিলো ছােট একটি বন্ধুর দল। তাদের সে টেনে
নিয়েছিলাে নিজের মধ্যে, সেই বন্ধুদের, এডিসনের বাতি যেমন
বিদ্যুতের স্রোতক টেনে নেয় নিজের মধ্যে, তারপর জলে
ওঠে। সে-ও জ্বলে উঠেছিলাে ; বন্ধুদের
প্রাণের শিখা
নিয়েছিলাে শােষণ করে’, বড় হয়ে উঠেছিলো নিজে। কেবল
সঙ্গ-লিপ্সা, কেবল সময় কাটানাের তাগিদ—তার চেয়ে অনেক
বেশি এই বন্ধুতা। তার চেয়ে অনেক নিগূঢ়, অনেক জটিল
সভার অন্ধকার মূলে তার সঞ্চার। সেই আগুনে, সেই উত্তাপে
তার জীবনের লালন। বন্ধুদের থেকে সে নিতে অকৃপণ,
অপরিমিত স্রোতে-প্রায় নির্লজ্জভাবে। আর অবিশ্যি
নিজেকে তার দিতেও হতাে : কিছু না-ভেবে, কিছু বাকি
-রেখে।
ঠিক বলা হলাে কী ? কিন্তু যেটকু সে বাকি রেখেছিলাে,
কোনাে মানুষ তা অন্য-একজনকে দিতে পারে না। সে ভয়
করতে—তার সত্তার সেই চেতনা-অতীত অন্ধকার, তাকেই
সে ভয় করতে। কেননা সেখানেই নির্জনতা : আমাদের চরম
নিঃসঙ্গতা সেখানেই। সে তা ভুলে থাকতে চাইতাে; এমন
ভাণ করতে যেন তা নেই। অনেক, অনেকদিন পর্যন্ত।
কিন্তু সেই অন্ধকারের দরজা কি খুলে গেলাে আজ এই
বসন্তের সকালবেলায়? কী আতঙ্ক! কী যন্ত্রণা।
মানুষ না-হলে বাঁচা যায় না, কেবল মানুষ নিয়েও বাঁচা
যায় না। কোনাে মানুষই সব সময় একরকম নয়। তা ছাড়া,
ঘটনার সুলত চিরকাল এলােমেলাে জাল বুনে যাচ্ছে,
তা থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নেই। যাকে যখন চাই, পাওয়া
যায় না হয়তাে। তার চেয়েও খারাপ, যাকে যখন
যে-রকম করে’ চাই, তা পাইনে। মনের
আছে ; তার উপর আমাদের হাত নেই। আছে ক্লান্তি।
আছে উদাসীনতা। আছে
অবসাদ,
সর্যন্ত
অনক রকম অবস্থা
সৌরজগতকে যা লুপ্ত করে দিতে পারে। সুতরাং অন্যকোনাে আশ্রয় দরকার, নিজের মধ্যে কোনাে আশ্রয় । কী তা হতে পারে? মানুষ কী করে বাঁচে? কী করে’ সময় কাটায় ? মানুষ কী করে তার জীবন নিয়ে ? যথেষ্ট পয়সা থাকলে, হঠাৎ মনে হতে পারে, এই ক্লান্তির সঙ্গে ভালাে- রকম একবার যুদ্ধ করা যায়। বেড়ানাে যায়। পড়া যায়। ডুবে থাকা যায় সামাজিকতার আমােদে। একটু-আধটু মদেও ডােবা যায়—যদি নেহাৎই দরকার হয়। অবসাদ দূর করতে একটা ক কূটেলের মত কিছু নয়। কিন্তু যখন আমরা এখান থেকে ওখানে যথেষ্ট ছুটোছুটি করলুম; বিভিন্ন চেহারার, বিভিন্ন ঢঙের, বিভিন্ন রঙের যথেষ্ট মেয়ে-পুরুষের সঙ্গে যথেষ্ট মাখামাখি করলুম; যখন আমরা অজ্ঞান হয়ে না-পড়া পর্যন্ত কক্টেল খেলুম- তারপর কী তারপর—ঠোটের উপর লেগে-থাকা ক্ষীণ বিস্বাদ, আর আবার সেই ক্লান্তি—আরাে ভয়ানক, আরাে বিশাল-কেননা এর পরে আর নতুন কিছু করবার নেই, এর পরে সেই একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি। আর-একটা উপায় আছে। কাজ। যে-কাজ আমাদের বাঁধে, যে-কাজ আমাদের কিছু ভাববার সময় দেয় না। এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে চিরকালই কম, চিরকালই কম, যারা কেবল বসে’-বসে’ পয়সা খরচ করে জীবন কাটাতে পারে। বাকি সবাইকে কোনাে-না-কোনাে রকম কাজ করতে হয়। ভাগ্যিস করতে হয়। নয় তাে মানুষ বাঁচতে কী করে? ?
কী করে সহ্য করতে এই জীবন—এই শূন্যতার অর্থহীন
প্রসার ?
কাজ আছে দু'রকমের। একটা সহজ, সরস, নিজের ইচ্ছায়
সঞ্জাত, আনন্দে উদ্দীপিত সে-কাজে কোনাে ভার নেই,
কোনাে দায় নেই। পাখি যেমন করে কাজ করে ; যে গাইতে
পারে তার গলা দিয়ে যেমন সুর ফোটে। তা ফুটে ওঠে
আমারই ভিতর থেকে, আবার নতুন করে সৃষ্টি করে আমাকে।
নিজের যতখানি তাতে দিই সেটা খােয়া যায় না; সেটা ফিরে
আসে নিজের মধ্যে, রূপান্তরিত, বিশুদ্ধ ; জমে ওঠে বিশুদ্ধ
রসের প্রেরণায়, আঙরের নিটোল হৃদয়ের মত।
আজকালকার পৃথিবীতে এ-ধরণের কাজের ক্ষেত্র ক্রমেই
সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। যন্ত্র রয়েছে। রয়েছে বিরাট, দুর্বোধ্য
অর্থনৈতিক সিসটেম। একজনের আলাদা হয়ে কিছু করাটা
লােকসান-ধনবৃদ্ধির দিক থেকে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক
লােকের একযােগে কাজ করবার যে-সামঞ্জস্য, তারই জোরে তাে
সিটেম টিকে আছে। ধনস্ফীতিও হচ্ছে, সন্দেহ নেই : কিন্তু
যদি জিজ্ঞেস করাে সেট। এমন অসমান, মাত্রাহীন, ছন্দহীন কেন,
সে আলাদা কথা।
যে-কাজ অন্যের জন্য, যে-কাজ নিছক জীবিকার জন্য, তাতে
অভ্যাসের যান্ত্রিক অসাড়তা আসতে বাধ্য। তবু সেটা ভালাে,
কেননা তাতে সময় কাটে। আর এই কাজও একটা নেশা
হয়ে উঠতে পারে : আপনি কেবলই কাজ করে যাচ্ছেন,
কেন জানেন না; কেবলই বাড়িয়ে যাচ্ছেন আপনার টাকা,
কেন জানেন না। আজকালকার দিনে এ-ধরণের লােককেও প্রতিভা বলা হয়। হ্যা, দানবীর প্রতিভা । দানবীর প্রতিভা। কারণ মনের একরকম অসুস্থতা, বিকৃতি ছাড়া এ কিছু নয়। তবু, একটা কেন্দ্র তারা পেয়েছে, একটা আশ্রয় ; ক্লান্তিকে তারা পরাস্ত করেছে। জীবনের সমস্যার সমাধান করেছে কোনাে একরকম করে। যদিও, হতে পারে, জীবনকে একেবারে অস্বীকার করেই তারা তা করতে পেরেছে । মােটের উপর, কাজকে বাদ দেয়া যায় না, সেটা প্রয়ােজন। আর তাই তাকেও তার কাজ খুঁজে নিতে হবে। আমাদের এই বিরাট সিটেম প্রায় সব মানুষকেই শােষণ করে নিয়েছে। মুক্তির রাস্তা আছে কেবল তাদের, যারা বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক, যারা কবি, যারা শিল্পী। ঈশ্বর যদি সেদিক থেকে আপনাকে কিছু দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি চেষ্টা করতে পারেন এই পৃথিবীর মধ্যে থেকেও তাকে ফাকি দেবার । আর তার ছিলাে একটু দেখার সুড়সুড়ি—একটুখানি ক্ষমতা, এমন কি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ সে-জন্য। সে-ই তাে তার জীবনের শেষ দুর্গ—অনাক্রমণীয়, আনন্দময়। সেখানে সে ভয় করে না একা হ'তে। তা-ই বা কেন—সেখানে সব চেয়ে কম সে একা : সমস্ত কথার আর সুখে-ফেটে-পড়া হাসির শব্দ সে-আনন্দ, সে-সম্পূর্ণতা তাকে দিতে পারে না, যা সে পায় একা ঘরে বসে’ এক পাতা কবিতা পড়ে কি—ঈশ্বর যদি দয়া করেন- কয়েক লাইন কবিতা লিখে। সেই নিঃসঙ্গতায় ধ্বনির আর স্বপ্নের আর ভাবনার ভিড়, সেখানকার নীরবতা বাণীময়।
কিন্তু তবু, নিজেকে মুখােমুখি সে দেখতে চাইতো না,
দেখতে পারতাে না কখনো। যেটা সত্যিকারের নিঃসঙ্গতা
তার সত্তার সেই অলক্ষ্য, অন্ধকার স্রোত, তাকে সে ভয়
করতাে। তাকে চাপা দিয়ে রাখতে চাইতো সব সময়। তার
দিনের জীবন-তার বন্ধুরা, তার হাসি আর গল্প—সব
মিলে রচনা করেছে একটা আড়াল। তার সেই নিজেকে
রেখেছে লুকিয়ে। অন্য আড়াল এই আর্ট, যা তাকে জড়িয়ে
ধরেছে, যা তাকে ঢেকে রেখেছে, যা তাকে প্রায় দেবতার মত
অনধিগম্য করে তুলেছে। সে ছিলাে সুখী,
সে ছিলাে সুখী, নিজের সেই
দূরত্বে, তপস্বীর মত নির্লিপ্ততায়। জীবনের এ-ই তাে শেষ
সীমা, সে তখন ভেবেছিলাে ।
এমনি করে সে কাটিয়ে এসেছে অনেক, অনেকদিন।
কখনাে সে নিজেকে একা হতে দেয়নি। যখন সে একা, তখন
সে লিখছে কি পড়ছে। এত ক্লান্ত হয়ে শুতে গেছে যে চোখ
বােজবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। যদি কখনাে ঘুম
আসতে দেরি হয়েছে, উঠে আলাে জ্বেলে শুয়ে-শুয়ে বই পড়েছে
যতক্ষণ ঘুমের ভারে বই খসে না-পড়েছে হাত থেকে । তার
বিভীষিকাকে সে সরিয়ে রেখেছে দু’হাতে ঠেলে ; নিজেকে
কখনাে একা থাকতে দেয়নি।
প্রথম যৌবনেই একটা জিনিস সে উপলব্ধি করেছিলো।
তা এই যে আমাদের এই মানুষের জগতেই পরিবর্তন আর
বিক্ষোভ আর অশান্তি : আর্ট চিরন্তন। মানুষের জগতেই
দূরে চলে যাওয়া আর কাছে আসা, ভালােবাসা আর ভুলে’
যাওয়া : কিন্তু আফ্রোদিতের দীর্ঘ, কালাে চুল চিরকাল সমুদ্রের
ঢেউয়ে ঢেউয়ের মত জড়িয়ে থাকবে ; চিরকাল ঝলমল করবে
হেলেনের বক্ষ গ্রীষ্ম-নিবিড় বনে পাকা আপেলের মত। আর
সে তার অন্তরের চোখ ফেরালে আর্টের দিকে : আর সেই
দীপ্তিতে পৃথিবী যেন মুছে গেলাে। আমার জীবন হােক
আর্টের মধ্যে : মনে-মনে সে বললে। এ-জীবন মায়া-এ-কথা
বলবার নতুন একটা ধরণ মাত্র।
যা-ই হােক্, সুখ সে পেয়েছিলো। বন্ধু : বই : মাঝে-মাঝে
নিজে একটু লেখা। সে একটা কাগজও বার করেছিলাে।
কাগজ বেশিদিন চলেনি, কিন্তু যে-ক’দিন ছিলাে তাকে
রেখেছিলাে ভরে।
সেই সময়ে, ঘুম-ভাঙা চোখে সকালবেলাকার আবছায়া
আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবলে, সেই সময়েই আমি
সব চেয়ে সুখী ছিলুম ; সে-সুখ আমি আর জানবাে না।
কিন্তু সুখ অনেক রকমের আছে ; সুখের অনেক স্তর
আছে। আমি কি সেই তখনকার সুখ নিয়ে এখন তৃপ্ত হতে
পারবে? সে ভেবে দেখলে, আর সে অবাক হয়ে গেলো
আবিষ্কার করে যে সেই সুখ এখন আর সে চায় না। তাকে
সে ছাড়িয়ে এসেছে, তাকে সে ফেলে এসেছে অনেক দূরে।
কী চায় সে এখন ?
আশ্চৰ্য্য, মানুষ কী-রকম বদলায়। পদে-পদে আমরা
মােহ রচনা করি, আর মনে-মনে বলি, এটাই শেষ, এটাই
চরম। কিন্তু একদিন কিছু হয়-ত ঘটে, কি ঘটেও না, আর
০
চরম নয়।
:
সে-মােহ ভেঙে যায়, জীবন খোজে নতুন দিগন্ত। তখন
দেখতে পাই, এতদিন যেটা ছিলাে সেটা কুঁড়ি মাত্র ; তাকে
ভেঙে দিয়ে, তা থেকে ফেটে বেরিয়ে আসছে এইবার
সত্যিকারের ফুল। এমনি, চিরকাল। আবার গড়ে ওঠে
নতুন মােহ ; আবার তা ভেঙে যায় ; জীবন চিরকাল নিজেকে
ছাড়িয়ে যায়। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কিছুই শেষ নয়, কিছুই
কেবল পল্লবের পর পল্লবে ফুটে ওঠা : নিজেকে
ঝরিয়ে দেয়া, আবার নতুন হয়ে ওঠা। জীবনে সুখ কি দুঃখ,
ব্যর্থতা কি সাফল্য বলে কিছু নেই : কেবল আছে এই স্রোত।
এই স্রোত, যা কোনােখানেই থামবে না, যা মিশে যাবে এক
মৃত্যুর মহাসমুদ্রে।
কিন্তু হয়-তত জীবনে সার্থকতা আছে। এই স্রোত—তা
তাে চাকার মত ঘুরে-ঘুরে মরে না; একবার যেখানে ছিলাে,
সেখানে তাে আর ফিরে আসে না। তা বয়ে চলে, তা
এগিয়ে চলে। হয়তাে তা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে-
কোনাে সার্থকতায়, পরিপূর্ণতায়। বার-বার এই ভেঙে পড়া,
আর সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে বার-বার নতুন হয়ে ওঠার ভিতর
দিয়ে হয়তাে আমরা পরিপূর্ণ হয়ে উঠছি। জীবন তাে
গ্রামােফোনের রেকর্ড নয় যে বার-বার নিজের পুনরাবৃত্তি
করবে। জীবনে দু’বার কখনাে-এক সুর বাজে না.1 যে-
অভিজ্ঞতা দু’বছর আগে আমার এসেছিলাে, তা আজ যদি
আবার আসে, তা মােটেও এক জিনিস হবে না। কেননা
আমি তাে আর সে-আমি নেই।
৮
এত শক্তি
হয়-তাে, শেষ পর্যন্ত, নিঃসঙ্গতাতেই মানুষের চরম পূর্ণতা।
হয়-তাে—কিন্তু তা এত কঠিন, তাতে এত কষ্ট ।
সেজন্য প্রয়ােজন যে মানুষের কাছ থেকে তা আশা করা
অন্যায়। কেবল ঈশ্বর একা, আর-কেউ নয়, কেবল ঈশ্বর
একা হতে পারেন। আমরা যখন বলি, একা থাকতে চাই,
তার মানে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশার যথেষ্ট হয়েছে এখন।
কেননা কোনাে মানুষই নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ নয়।
আমরা মানুষের সঙ্গ খুজি ? কেন আমরা বই পড়ি? শুধু কি
সময় কাটাবার জন্য, হালকা একটু আমােদের জন্য ? যদি তার
মূলে আমাদের অন্তরের কোনাে গভীর প্রেরণা না-থাকতাে,
তাহলে মানুষ হতে শুকনাে কতগুলাে হাড় ; আর বই
যে-কাগজে ছাপা হয় হতাে তারই মত শুকনাে। কিন্তু
মানুষ জীবন্ত ; আর বইও জীবন্ত-যেহেতু জীবন্ত মানুষের
তা সৃষ্টি। যখন একটা বই পড়ি, শুধু কি কতগুলাে কথার
কুচকাওয়াজ চোখের উপর দিয়ে ভেসে যায় ? না, তা প্রাণের
তীব্র একটা স্রোত : আমাতে যা সঞ্চারিত হচ্ছে, আমাকে যা
ভরে’
আর মানুষ তার কাছ থেকে আমরা কী চাই? সে সুন্দর
হবে, সে ভালাে হবে, সে বুদ্ধিমান হবে ; ভালাে করে সে
কথা বলবে, যেখানে হাসবার হাসতে ভুলবে না। কিন্তু শুধু
এই ? তা-ই যদি হতাে, তাহলে শেখানাে-পড়ানাে, মাজা-
ঘষা পুতুল নিয়েও তাে কাজ চলতে পারতাে। সব চেয়ে বড়
যার প্রয়ােজন, যা না-হলে অন্যকিছুরই কোনাে মানে হয় না,
তুলছে।
;
তা এই যে তার মধ্যে থাকবে প্রাণের উষ্ণতা, আগুনের শিখার
মত উষ্ণ ; আগুনের শিখার মত জলবে তার প্রাণ। সে যখন
ঘরে এসে ঢুকবে, নিয়ে আসবে একটা উষ্ণ অনুভূতি ; যদি
তার হাতের উপর হাত রাখি, চামড়ার নিচে তার রক্তের
উষ্ণ স্পন্দন যেন অনুভব করতে পারি।
এমনি করেই আমাদের পূর্ণতা আমরা খুজি। আর মানুষকে
যখন পেয়েছি, আজকের মত বই পড়া যখন শেষ হয়েছে,
তখন স্তব্ধতা, তখন শান্তি, তখন নির্জনতা। তখন তার
আগে নয়। তখনই ভালাে লাগে চুপ করে বসে থাকতে,
আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতে ; তখনই ছড়িয়ে
যাই মেঘে আর পাতায় আর তারায় ; তখনই হারিয়ে যাই
বিশ্বের নিঃসীম অন্ধকারে। বড় মধুর, সেই নিঃসঙ্গতা। মনে
হয়, এর আগে যা-কিছু হয়েছে, যা-কিছু পেয়েছি সব যেন
সার্থক হয়ে উঠলাে এর স্পর্শে ।
কিন্তু আগে কিছু পাওয়া চাই : এ যেন আসে সবার শেষে,
দিনের শেষে, আমাদের জীবনের রাত্রি-মুহূর্তে।
কেননা অনেক আমাদের প্রয়ােজন; অনেকগুলাে সুর
নিয়ে আমাদের এই জীবন। কোনাে-একটা যদি বাদ পড়ে
যায়, তাহলে নিজেকে খণ্ডিত, বিভক্ত, অঙ্গহীন মনে হয়।
কিন্তু নিঃসঙ্গতা যদি হয় অভাব--তা থেকে আমাদের রক্ষা
করাে, দেবতা। নিঃসঙ্গতা যদি হয় অসম্পূর্ণতা, আত্ম-খণ্ডন,
অঙ্গহীনতা—তার ভয়ঙ্কর নিষ্পেষণে যদি আমাদের হৃৎপিণ্ড
হাঁপাতে থাকে, যদি আমরা মরে যাই ! পৃথিবীতে তার মত
আর-কিছু নয়—এই সীমাহীন শূন্যতার চেতনা : তা আমাদের
মুচড়িয়ে ভেঙে ফেলে, ছিড়ে ফেলে টুকরাে-টুকরাে করে ;
সেই তীব্র বিষের ধারে আমাদের মাংসের দেয়াল ক্ষয়ে যায়।
তখন কোথায় আমি যেতে পারি? কী আমি করতে পারি ?
এই যাকে ‘আমি’ বলছি, তার কতটুকু আর বাকি আছে !
অভাব ! জ্বলন্ত, জীবন্ত কোনাে অভাব-এক মুহুর্ত যাকে
ভুলে থাকা যায় না। আর তাই নিয়ে বেঁচে থাকা।
সেই নিঃসঙ্গতাই কি আজ আমাকে ঘিরছে মৃত্যুর কালাে
জলের মত, আয়নার দিকে তাকিয়ে সে ভাবলে ।
আজকাল বেশির ভাগ সময় তাকে একা থাকতে হয় ।
বন্ধুরা পৃথিবীর প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা শিকার করে’
বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে মাঝে-মাঝে যখন দেখা হয়, তাদের
চোখ উজ্জ্বলতরা, তারা কথা বলে দ্রুততরাে; তাদের সমস্ত
শরীরের ভঙ্গিতে শিকারীর সতর্ক সচেতনতা। এ-খেলায়
উত্তেজনা প্রচুর, সন্দেহ নেই। আজকের দিনে জঙ্গলে বুনন
জানােয়ার শিকারের চাইতে এই সহরে টাকা শিকারে অনেক
বেশি স্নায়বিক শক্তি, অনেক বেশি ধৈৰ্য্য, আর ধূর্ততা নিশ্চয়ই
অনেক বেশি দরকার। যাদের নিয়ে সে জীবন আরম্ভ
করেছিলাে, যাদের উপর সে নির্ভর করেছিলো, যাদের মুখ
থেকে সে কখনাে তার উৎসুক চোখ ফেরায়নি, তারা আন্তে-
আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। যাবেই।
সে কী করে বাধা দেবে,
ভাগ্যকে বেঁধে রাখবে কেমন করে? জীবনই তাে এই।
যাকে ভালােবাসি সে কেন দূরে চলে যায়, চিরকাল মানুষের
এই কান্না। ঘটনা তাকে ঠেলে নিয়ে যায় দূরে, মৃত্যু তাকে
কেড়ে নিয়ে যায়। কিন্তু, অত বেশি কষ্টের যদিও নয়, তবু
এক হিসেবে সব চেয়ে ভয়াবহ, সব চেয়ে নিষ্ঠুর এই অলক্ষিত,
মন্থর বিচ্ছেদ ; যখন কাছাকাছি থেকেও দিনের পর দিন আমরা
পরস্পরের দূরে সরতে থাকি ; যে-সংজোযনা আমাদের মধ্যে
ছিলাে তা নষ্ট হয়ে যায়, যে-উদ্দীপনা আমাদের মধ্যে জ্বলেছিলাে
তা নিবে যায়।
অনেকদিন থেকেই সে তা বুঝতে পারছিলাে, যদিও নিজের
কাছে সে তা স্বীকার করবে না। একটা অভাব মাথা খুঁড়ে
মরছিলো তার মধ্যে। কিন্তু তাকে ভাষা দিতে তার ভয়।
কিন্তু আজ আর তাকে ঠেলে রাখা গেলাে না, বসন্তের এই
সকালবেলায়। তা উথলে উঠলাে উত্তপ্ত, দুঃসহ স্রোতে তার
বুকের ভিতর থেকে। একটা কষ্ট, প্রায় শারীরিক কষ্টের মত।
টষ্ট করছে তার হৃৎপিণ্ড, যেন তা এখনই ফেটে যাবে।
চায়ের সঙ্গে সে খবরের কাগজ খুললাে, কিন্তু একটা
লাইন সে পেলাে না পড়বার মত। ছবির পাতার দিকে
একটুখানি তাকিয়ে থেকে সে সেটা ফেলে দিলে ছুড়ে। চিঠি-
এলাে ;
চিঠিগুলাে একবার হাতে তুলে দেখে সে আবার রেখে
দিলে, একটাও খুললে না।
এখন এই তত সমস্ত দিন পড়ে আছে তার সামনে।
নিয়ে কী করা যায় ?
সে উঠে দাড়ালাে। তার বুকের উপর সমস্ত সময়ের যেন
ভার। সে ভাবলে একটা বই পড়ে, কি কিছু লেখে, কিন্তু
১২
দুটো কাজই অসম্ভব মনে হলাে। যদি সে একটা বই
খােলে তাহলে তার ভিতর থেকে এই যন্ত্রণাই লাফিয়ে
উঠবে সাপের মত। আর, কী সে এখন লিখতে পারে, তাকে
ঘিরে এই শূন্যতা, মৃত্যুর এই কালাে জল ?
আর সে বুঝতে পারলে যে আর্টের উপর বড় বেশি
আস্থা সে রেখেছিলাে। আর্ট থেকে অনেক শান্তি পাওয়া
যায়, অনেক শক্তি; কিন্তু জীবনের কোনাে দুঃসহ ভীষণ রূপ
যখন ভেঙে পড়ে বুকের উপর, তখন যাকে সে দুর্গ বলে
জেনেছে তা ছিড়ে উড়ে যায় প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে তাবুর মত।
আর একেই সে আশ্রয় করেছিলাে, সে বেঁচেছিলো এরই
মধ্যে। জীবনকে মুখােমুখি দেখতে সে চায়নি ; তার চোখ
ছিলাে আর্টের উপর। আজ জীবন নিচ্ছে তার প্রতিশােধ। সে
যেন উপড়ে পড়ছে, মূলসূদ্ধ। যেখানে চিরন্তনতা, যেখানে
অখণ্ড শান্তি, যেখানে অনির্বচনীয় সম্পূর্ণতা—সেই সমস্ত আজ
ছােট ছেলের হাতের এলােমেলাে আঁকিবুকির মত অর্থহীন।
বড় ভয়ঙ্কর-জীবন যখন
ভেঙে পড়ে,
উত্তপ্ত, অনবগুণ্ঠিত, স্পন্দমান জীবন। কী ব্যথা। আমাদের
সমস্ত সাহস আর সমস্ত শক্তি একত্র করেও তাকে সহ
করা যায় না। জীবন যখন বুকের উপর তার দুরন্ত,
উন্মত্ত ঝাপটা মারে, তখন রক্ত ঝরবেই, রক্ত ঝরবেই হৃৎপিণ্ড
দিয়ে—তখন আমাদের একমাত্র প্রার্থনা এই হতে পারে
একেবারে যেন মরে না যাই।
তাই, এই বাচাই বােধ হয় আমাদের সব চেয়ে বড়
০
সাধনা : জীবনকে সহ্য করা, জীবনকে পরিপূর্ণ করে তােলা।
আর তারপর আর্ট ।
এই সহজ কথাটা বুঝতে এত সময় নিলে, সে ভাবলে ।
কিন্তু যদি কোনো উপায় থাকতাে, কোনাে মুক্তি! কোনাে
নেশা, হৃদয়কে যা দিয়ে অসাড় করে ফেলা যায় ; যাতে
ঘুমিয়ে পড়া যায়—দীর্ঘ, নীরন্ধ, ঘুম। এ কী ভয়ানক যে ব্যথা
থেকে কোনাে মুক্তি নেই, জীবনে ব্যথা থেকে কোনাে মুক্তি
নেই।
বাড়ি থেকে একটু বেরােলেও হয়, সে ভাবলে। কাছেই
আছে বন্ধুর বাড়ি, হয়তো আরাে দু’একজন সেখানে আসবে।
কী উৎসুকতা, মানুষের কণ্ঠস্বর শােনবার জন্য কী উৎসুকতা।
কথা, কথা, কথা : মফিয়া। টষ্ট করে যেখানটা ছিড়ে
পড়ছে, তখনকার মত একটু অবশ করে বটে।
সমস্ত কথার আড়ালে, সমস্ত কথা ছাড়িয়ে বুকের মধ্যে যা
শিরশির, শিরশির করছে সব সময়, তাকে কী করে’ চাপা
দেবাে ?
তবু-তবু তাকে যেতেই হবে মানুষের খোঁজে ; যে-সব
কথা কোনােরকমেই তার জীবনের অংশ নয়, তা-ই শুনতে,
আর বলতে। যা-ই হােক, এই শূন্যতার চেয়ে সেটা
ভালাে । এ আর আমি সইতে পারছিনে, এই শূন্যতা।
বাক্স থেকে জামা খুলে সে পরতে গেলাে। আর
দেখলল, একটা বােম নেই জামায়। হাতের কাছে
একটা সেফটিপিন নেই। বাধা পেয়ে সে থমকে গেলাে :
আর তবু,
;
১৪
আর রাগের একটা সূক্ষ্ম স্রোতে তার শরীরের শিরা জ্বলতে
লাগলাে।
আর হঠাৎ, হঠাৎ, অত্যন্ত সহজে, অত্যন্ত নিশ্চিতভাবে
সে ঠিক করে ফেললে সে বিয়ে করবে ।
হয়তাে তাতে তার এই নিঃসঙ্গতা ভেঙে যাবে, বুকের
উপর থেকে সরে’ যাবে সময়ের ভার। আনন্দের
উন্মত্ততা তাতে থাকবে না হয়তাে ; থাকবে শান্তি ।
আর এখন তা-ই তাে সে চায় : শান্তি। এ-রকম ভেঙে-চুরে
যাওয়ার আর কত ? আর-একজনের সঙ্গে যদি মিলতে
পারি, আর-একজনের স্রোত যদি আমার স্রোতে এসে
মেশে, তাহলে কি জানবে না সেই প্রচণ্ড, অখণ্ড শান্তি ;
সেই স্তব্ধতা, বাতাসে বার
বিদ্যুৎ ?
বেশি কথা
থাকবে না --কথার কী দরকার? নীরব, উষ্ণ একটা
আশ্বাস—তা ছাড়া আর কী চাই ? একটা আশ্বাস :
ভয় নেই, ভয় নেই। জীবনকে কোরাে
।
হৃদয়ে উষ্ণতার স্পর্শ, - উষ্ণ ভূতি,
উষ্ণ ভূতি, নিবিড়, নীরব
রক্ত-সংস্পর্শ । আর কী চাইতে পারে মানুষ ? তখন আমি
আর জীবনকে ভয় করবো না, তখন আমি জীবনের
চোখের দিকে তাকাবাে, জীবনকে নেবাে দু’হাত ভরে,
নেবাে বুকের মধ্যে, 'আমার রক্তের স্রোতে। পাথব ভেঙে
ফেলল : আমার এট থরের হৃদয় সরিয়ে দাও ; মাকে
দাও জীবন্ত মনে হংপিও য! গা', উত্তপ্ত, স্পন্দমান রক্ত
সমস্ত শরীরে ছরিয়ে দেবে, সমস্ত সত্তায়
১৫
জামাটা সে ছুড়ে ফেলে দিলে হাত থেকে : তারপর
বসে-বসে ভাবতে লাগলাে কাকে বিয়ে করা যায়। অনেক
মেয়েকে সে চেনে। তারা সবাই সহরের ; তাদের মধ্যে
সহুরেপনার রক্তহীনতা কোনাে-না-কোনাে ভাবে যেন।
আছেই। তারা এত চমৎকার—এত ভালাে করে তারা
কথা বলতে পারে, হাসতে পারে এমন মানানসই করে :
তবু
ভিতরে-ভিতরে তারা যেন শুকননা, তাদের রক্ত যেন
পাৎলা ; কোথায় তাদের বিবর্ণতা, কোন্ গােপন অদৃশ্য
উৎসে তারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এক-এক করে সকলের
কথা ভাবলে। তাদের
অনেককেই তার ভালল
লাগে। কোনাে-কোনাে মেয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা আছে
মনে-মনে। দু’একজন আছে, যাদের বুদ্ধিতে, মনের দীপ্তিতে
মুগ্ধ না-হয়ে সে পারে না। কিন্তু সে কি তা-ই চায়—
মনের দীপ্তি ?
একজনের কথা তার মনে পড়লাে। ক্ষীণ তার শরীর।
বেশি কথা সে বলে না। বড় আর কালাে তার চোখ।
আর সেই চোখ তুলে কেমন করে সে তাকায় ! বার-বার তা
মনে পড়ে।
তাই সে বাক্স থেকে আর-একটা জামা বার করে’
পরলে, একবার তাকালে নিজের দিকে আয়নায়, তারপর
বেরুলাে রাস্তায়। কী বােকা
আমি, যেতে-যেতে সে
ভাবলে, এতদিন আমি জানিনি কোথায় রয়েছে আমার
পূর্ণতা।
বুদ্ধি?
১৬
••
মিনু বসে ছিলো সেলাই হাতে নিয়ে ; সে কাছে যেতে
চোখ তুলে একবার তাকালাে। কিছু বললে না।
‘তােমার পাশে একটু বসতে পারি? সে বললে।
মিনু একটু সরে জায়গা করে দিলে তার জন্য ।
‘রাখো তােমার সেলাই। কথা আছে।
সেলাইয়ের উপর আরাে একটু ঝুকে পড়ে মিনু বললে,
বলাে না।
একটু চুপ করে থেকে সে বললে, “তুমি কি আমাকে বিয়ে
করবে ?
মিনুর সক্রিয় আঙুলগুলো স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার কালাে
চোখের দৃষ্টি লুটিয়ে পড়লে তার মুখের উপর। দাত দিয়ে
সেলাইয়ের বাড়তি সুতােটা কেটে ফেলে সে বললে, “আমি
কেন তোমাকে বিয়ে করবো?
‘কেনই বা করবে না?
মিনু মাথা নিচু করলাে; তার ক্ষীণ আঙুলগুলাে আবার
চঞ্চল হয়ে উঠলাে সেলাই নিয়ে। আস্তে-আস্তে সে বললে,
এখনো—এখনাে নয়।
‘কখনন, তাহ'লে ?
কে জানে।
কিন্তু তবু সে বসে রইলাে; এই উত্তর নিয়েই সে চলে
যেতে পারে না রুমাল বার করে সে ঘাড় মুছলাে
একবার। তা' বললে, ‘আমি কি ভুল করেছি ?
মিনুর মাথানত ; আর তার কালাে চুলের মাঝখানে
১৭
দীর্ঘ ভাগ-রেখা তার চোখের সামনে আশার উজ্জ্বল রাস্তার
মত জ্বলে উঠলাে।-না, ভুল করােনি, মিনু বললে।
‘তবে ?
নরম, ক্ষীণস্বরে মিনু বললে, “ঈশ্বরের মনে যা আছে,
তা-ই হবে।
‘আর তােমার মনে কী আছে জানতে পারিনে?
মিনু রেখে দিলে সেলাই ।-কেন জানতে চাও ? তার
স্তব্ধ, কালো চোখ তুলে সে বললে, ‘তােমার ইচ্ছা দিয়ে তুমি
কী ঘটাতে পারে ?
কপিল—নাম তার কপিল—বুঝতে পারলে। উঠে দাড়িয়ে
সে বললে, একদিন হয়তাে সময় আসবে। বলে চলে
গেলাে।
'।
১৮
বাড়ি ফিরে এসে তার মনে পড়লাে আর-একজনের
কথা। যাকে, কোনাে-এক সময়ে, সে ভালােবেসেছিলাে।
একমাত্র ভালােবাসার ব্যাপার, তার জীবনে।
বয়েস তখন অল্প ছিল। জীবনে ছিলাে সুখ ; নতুন
যৌবনের উদ্দীপনা। বসন্তের গাছে যেমন নতুন, সবুজ
পাতার রাশি, তেমনি তার জীবনে তখন আশা আর স্বপ্ন
আর সঙ্কল্প আর নতুন অনুভূতির ভিড়। আর সেই উন্মীলনের
একটা মঞ্জরী, সেই মেয়ে, বাণী। একটি মেয়েকে না-হলে
সে-সময়কার ছবি অবিশ্যি সম্পূর্ণ হয় না।
গ্যয়টে ছিলেন একজন মানুষ যিনি সমস্ত জীবন ভরে’
প্রেম করে গেলেন—আত্মার সমৃদ্ধির জন্য । যেমন আমরা
ব্যাঙ্কে টাকা জমাই, আর বড়লােক হয়ে উঠি ; তেমনি
আমরা আত্মায় প্রেম জমাই, আর বড় হয়ে উঠি।
নিখুত হিসেব ! চোখ খুলে রাখাে, কোনাে সুযােগ হারিয়ে না:
কোন্ অভিজ্ঞতা তােমার আত্মায় সােনার
সােনার টুকরাে হয়ে
উঠতে পারে, কিছুই বলা যায় না।
মনের বিরাট আত্ম-প্রেম। আর তারা
একদল আছে এদের জীবনের মূল কথা হচ্ছে ‘অভিজ্ঞতা।
এনি, বির
১১
অভিজ্ঞতা : কিনা, যে-সব স্ত্রীলােকের সংস্পর্শে তুমি এসেছে তাদের সংখ্যার আধিক্য। সংখ্যাটা যত বড়, তত বেশি তারা ‘পেলাে’। বছরের পর বছর তারা খাঁজ কেটে- কেটে যায়, আর মােট অঙ্কটার স্ফীতিতে গর্বে আর সুখে বুক তাদের ভরে ওঠে। ওঃ, কখনাে কোনাে সময় নষ্ট হয়নি, এ-কথা মনে করবার তৃপ্তি । কিন্তু সে ছেলে ছিলাে লাজুকগগাছের—মেয়েদের সঙ্গে বিশেষ করে লাজুক। কখনাে সে এগিয়ে যাবে না। সব সময় সে সরে দাঁড়াবে, ছেড়ে দেবে। আর হয়তাে, শেষ পৰ্য্যন্ত, সেটাই ঠিক—কেননা জীবনেই আছে অপব্যয়, যন্ত্রে নেই । যন্ত্র মিনিট ধরে নির্দিষ্ট একটা বস্তুর পরিমাণ উৎপাদন করতে পারে : লক্ষ বীজের অপব্যয়ে একটা ফুলের সৃষ্টি। আর সে চেয়েছিলাে সৃষ্টি করতে। আর তাকে সৃষ্টি সে করেছিলাে, সেই মেয়েকে। একদিন সে তাকে দেখলে, আয়নার সামনে বসে’ খোপা বাঁধছে বিকেলের আলােয় ; অসমাপ্ত প্রসাধনের সৌরভ তার গায়ে । চমকে উঠলাে তার মন। এ কী! রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে অবাক হয়ে সে ভাবলে, এ কী! আমি কি প্রেমে পড়ছি ? মন ঠিক করতে অনেক সময় সে নিয়েছিলাে—কি নিতে, যদি না বাণী নিজেই অসতে এগিয়ে। আর তারপর, যত কবিতা সে পড়েছিলাে, যত কল্পনা তার মনকে কোনাে- না-কোনাে সময়ে হানা দিয়েছে, সে-সমস্তরঙ্গ বাণী জড়িয়ে গেলাে, মিশে গেলাে ; উঠে এলাে সেই তরুণ কবি-মনের স্বপ্ন- ! । g
সমুদ্র থেকে, একদিন আফ্রোদিতে যেমন উঠে এসেছিলাে
ঢেউয়ের সমুদ্র থেকে। কিন্তু আফ্রোদিতে সে নয়, প্রেমের
জননী সে নয় : তার মধ্যে ছিলাে না সেই অপরিসীম,
অনির্বচনীয় কোমলতা। তা তাে তারই কোমলতা, তারই
স্নেহ, যে-সমুদ্র থেকে আফ্রোদিতে উঠে এসেছিলাে : যে-
স্নেহে বুক ভরে যায়, যে-বিশাল স্নেহ সীমাহীন, সময়হীন
শূন্যতার মধ্যে একদিন প্রাণকে এনেছিলাে, তা না-হ'লে
প্রেমের দেবতার কি সৃষ্টি হতে পারে ?
, যদি কোনো দেবীর সঙ্গে তাকে তুলনা করতেই হয়
সে আর্টেমিস, বনের ছায়ায় এইমাত্র মিলিয়ে গেলাে যার
উজ্জ্বল, উন্মুক্ত চুল ; যে হানা দেয়, স্বপ্নকে যে হানা দেয়,
ঘুমের নির্জনতা যে ভরে রাখে। রাত্রি যার, আর রাত্রির অরণ্য,
আর চাদের অপরূপ কান্তি, চাদের ঐশ্বৰ্য্য।
তাকে ঘিরে
ছায়া, তাকে ঘিরে রহস্য। সে নয় নগ্ন আর নিঃসঙ্গ আর
বিশুদ্ধ আফ্রোদিতের মত।
কপিল তাকে সৃষ্টি করেছিলাে কবিতার ইন্দ্রজাল থেকে,
আর সে অবিশ্রান্ত স্ফীত করে তুলেছিলাে কপিলের অন্তরের
কবিতার স্রোত। এমন পরিপূর্ণ দেয়া-নেয়া আর হয় না।
যা থেকে তার উদ্ভব, বাণী তাকেই আবার নতুন করে
তুললো। কপিলকে সে-ই তো হাতে ধরে নিয়ে গেলাে
আর্টের রহস্য :ৰ্ম্মে। এতদিন সে যেন বাইরে অপেক্ষা
করেছিলাে, এই বিশাল প্রাসাদের বাইরের কারুকার্য শুধু
দেখছিলাে মুগ্ধ হয়ে। আজ সে খুঁজে পেলাে ভিতরে
, ,
২১
যাবার রাস্তা। সেখানে বাণী মশালের মত জ্বলছে তার সামনে। যা-কিছু সে পড়েছিলাে, সব আবার পড়তে হলাে নতুন করে। স্তব্ধ হয়ে গেলাে সে বিস্ময়ে, সম্রমে, ভয়ে। কয়েকটা কথার মধ্যে এত থাকতে পারে, কে জানতাে। আমি যদি এত বেশি কবিতা না-পড়তুম, মনে-মনে সে বললে, তাহলে হয়তাে তাকে ভালােবাসতুম না। যদি তাকে ভালাে না-বাসতুম, তাহলে হয়তাে কবিতাকে জীবনে এমন করে পেতুম না। সত্যি, কাকে আমি ভালােবেসে- ছিলুম-কবিতাকে, না সেই মেয়েকে ? যা-ই হােক, তাতে মধুরতা ছিলাে, তাদের সেই ভালােবাসায়। তাতে মধুরতা ছিলাে, আনন্দ ছিলাে, কান্না ছিলাে। ছিলাে স্নেহ, সত্যিকারের স্নেহ। বােধ হয় অল্প বয়েসে সেটা আসে না। বােধ হয় স্নেহ জীবনের দুরূহতম সিদ্ধি। অনেক বছরের অনেক দুঃখের, অনেক বিপ্লবের, অনেক মৃত্যুর ও নব- জন্মের পরে তবে তা পাওয়া যায়। কঁাচা বয়েস ভালােবাসতে পারে না, তা বড় বেশি আচ্ছন্ন থাকে নিজের মধ্যে। তখন থাকে নতুন আত্ম-সচেতনতার গর্ব। তখন থাকে স্পর্ধার অজ্ঞান নিষ্ঠুরতা। নিজের একটু লাগবে সেই ভয়ে অন্যকে দ্বিগুণ মারতে তখন আমরা কুণ্ঠা করিনে। যতদিন নিজে ব্যথা না-পেয়েছি, অন্যকে ব্যথা দিতে আমরা ভাবিনে : ততদিন স্নেহ আসে না। ভালােবাসা, কপিল ভাবতে লাগলাে, ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত। তার কাছে আমরা আনত হবে। গৰ্বহীন, ••
:
লজ্জাহীন, ভয়হীন—নিজেকে নিঃশেষে সমর্পণ করবে তার
কাছে। ফেলে আসবাে আমাদের সব পরিচয়, সব অভিজ্ঞান
-বাইরে থেকে যত জিনিসে আমর জড়ানাে—কেবল
নিজেকে নিয়ে যাবে, নিরাভরণ, তিরাবরণ নিজেকে
—তবে যদি পাই ঈশ্বরের আশীৰ্বাদ । আমাদেরও হতে হবে
আফ্রোদিতের মত নগ্ন, শুভ্র, বিশুদ্ধ : তবে যদি প্রেমের জন্ম
দিতে পারি।
কিন্তু সে-সময়ে, কপিল ভেবে দেখলে, সে-সময়ে আমি
ছিলুম আর্টে আচ্ছন্ন হয়ে, আমার মুখ ছিলাে ঢাকা। আর
তাকেও আমি দেখেছিলুম আর্টের জ্যোতিমণ্ডলের মাঝখানে:
তাকে দেখতেই পাইনি, সত্যি বলতে। সত্যি বলতে, পরস্পরকে
আমরা কখনাে দেখিনি।
আমরা শুধু একে অন্যের মধ্যে
নিজেদের পােষা স্বপ্নকে দেখেছিলুম।
আর তাই, তাদের সেই ভালােবাসা ঠিক ফুলের মত হয়ে
উঠতে পারেনি। ঠিক ফুটে উঠতে পারেনি, ফুল যেমন করে’
ফোটে। কোথায় যেন একটু জোর ছিলাে। একটু চেষ্টা।
হৃদয়াবেগ নিয়ে টানা-হেঁচড়া । কখনাে হয়-তত নিজেদের
ফেনিয়ে
তুলতে হতাে, তারা তা বুঝতে পারতাে না। আমি,
আমি! এই ‘আমি’র বেড়াজাল থেকে তারা সত্যি-সত্যি
বেরিয়ে আসতে পারতাে না কখনাে। আমি ভালােবাসছি,
আমি পাচ্ছি ভালােবাসা। তারা তা ভুলতে পারতাে না,
পরস্পরকে ভুলতে পারতাে না।
পারতাে না। ভুলতে দিতাে না, এমন কি।
বসে-বসে ভাবতে, দেখতে তাদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের প্রতি
অদ্ভুত নিষ্ঠা তাদের : তা থেকে তারা ভ্রষ্ট হতে পারে না মুহূর্তের জন্য । তার তবু, তাতে মধুরতা ছিলাে। বাণী ছিলাে তার মনের মত মেয়ে। সে হাসতে পারতাে। সে খুসি হতে পারতাে। তার ভালাে লাগতাে তার কাছে থাকতে, তাকে দেখতে, তার কণ্ঠস্বর শুনতে। আর তাদের সেই সমস্ত দীর্ঘ, দীর্ঘ আলাপ- দীর্ঘ দুপুর ভরে’, দীর্ঘ সন্ধ্যা ভরে’ অবিশ্রান্ত তাদের কথা বলা। বােধ হয় সেই কথাতেই তাদের চরম সংস্পর্শ, তাদের সব চেয়ে বড় সুখ। বােধ হয় চুপ করে থাকতে তারা একটু ভয় করতে মনে-মনে ; ভয় করতাে অন্য রকমের সংস্পর্শ। যদিও সেটাও ছিলাে। থাকতেই হবে। একটা অনিবার্য অংশ, তাকে বাদ দেয়া যায় না। কিন্তু বাদ দিতে পারলেই যেন ভালাে হতাে। অনিবাৰ্য্য : কিন্তু যতখানি প্রাধান্য তাকে দেয়া হয়েছে, ঠিক তার যােগ্য কি ? অবিশ্যি মূলে সেটা আছেই। গভীর, গভীর মূলে । ওকে যে-রকম ভালােবাসি, ও-রকম করে কোনাে পুরুষকে ভালােবাসা যায় না। ও মেয়ে বলে’ই ওকে এই বিশেষ ধরণে ভালোবাসছি। কিন্তু এই পর্যন্ত। আর তারপর ? আমাদের শরীর সম্পূর্ণরূপে আমাদের মনের দাস—সে-ই তাে সভ্যতা। আমরা বাচি তাে মন দিয়েই, শরীর তার কতগুলাে প্রতীক রচনা করে মাত্র। কে বলবে এই কথা বলার আনন্দই সব চেয়ে বড় নয়, সব চেয়ে ভালাে নয় দূরে গিয়ে মনে-মনে ভাবা ? এমনি সে ভেবেছিলাে, সেই সময়ে। তখনও সে জানেনি ২৪
কথা বলার অপরিসীম ক্লান্তি, ভাবনার অবরুদ্ধ অন্ধকার।
আমরা যা চাই, তা মুক্তি। নিজের মধ্যে বন্দী হয়ে আছি,
তা থেকে মুক্তি চাই। যেখানে আমি ছাড়া কিছু নেই,
সেই ধূসর নিঃসঙ্গতা থেকে যেতে চাই আরক্ত, উত্তপ্ত সংস্পর্শের
পূর্ণতায়।
আর বাণীকে যখন তার ছাড়তে হ’লল, বড় লেগেছিলো
তার ; কিন্তু তার চেয়েও বেশি তার রাগ হয়েছিলাে--
বাণীর উপর, তার নিজের উপর, সমস্ত পৃথিবীর উপর
তখন পর্যন্ত দুঃখে অনভ্যস্ত, তাকে যে এই কষ্ট
পেতে হবে, এটা তার কাছে প্রকৃতির একটা নির্লজ্জ
ব্যভিচারের মত লেগেছিলাে। বিদ্রোহে জলে উঠেছিলো
তার নবযৌবনের অভিমান। দুঃখকে গ্রহণ করবার নম্রতা
আর সাহস তার ছিলো না : সে তাকে লড়বেই, তাকে
মাড়িয়ে যাবেই পায়ের তলায়—যদি সেই সঙ্গে নিজের হৃৎপিণ্ডও
মাড়িয়ে যেতে হয়, তা-ই হােক ।
আর খানিকটা সময় সে ছিলাে তিক্ত আর কঠিন আর
নিষ্ঠুর ।
সে মরে’ ছিলাে।
সে মরে’ ছিলো, সে বেঁচে উঠেছিলো। বেঁচে উঠেছিলাে
নতুন হয়ে। যাতে নতুন হয়ে উঠতে পারি, সেইজন্যই
মাঝে-মাঝে মরতে হয়।
আশ্চৰ্য্য, মানুষ কী-রকম বদলায়। এ-কথা যখন বলি,
‘আমি অসুখী’, তার মানে এ নয় যে সুখী হবার কোনাে
উপকরণ আমার হাতে নেই। যদি তা-ই হতো তাহলে
কি এত লাগতত মনে? তাহলে বাইরের কোনো কারণকে
দোষ দিয়ে একটু সান্ত্বনা কি পাওয়া যেতাে না? তা তাে
নয় : অনেক উপকরণ হয়-ততা আছে কিন্তু সে-সব আমি
ছাড়িয়ে এসেছি। মন খুজছে কোনাে নতুন, কোনাে
গভীরতররা তৃপ্তি। তা পাবাে কোথায়? জীবনে দুঃখের
এ-ই তাে একটা মূল উৎস যে আমরা এক জায়গায় দাড়িয়ে
থাকিনে; পুরােনো বাঁধ ভেঙে কেবলই বেরিয়ে যাই, কেবলই
এগিয়ে যাই; কিন্তু আমাদের গায়ে লেগে থাকে পুরােনাে
অভ্যাসের আঁশ, পুরােনাে জীবনের অনুষঙ্গ একেবারে হঠাৎ
ভেঙে ফেলতে পারিনে। আর নতুন বাসনার উন্মেষ সঙ্গে-
সঙ্গেই তাে তার পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে না : অপেক্ষা করতে
হয়—আর দুঃখ পেতে হয়।
সেই চুপচাপ, অলস দুপুরবেলায়, বাণীর কথা মনে করে’
তার ভালাে লাগলাে। এতদিন পরে, কতদিন পরে ! এখনাে
মনে করতে ভালাে লাগে। সত্যি, প্রথম প্রেম ভােলা
যায় না। তবু, তাদের যে চিরকালের মত ছাড়াছাড়ি হয়েছে,
ভালােই হয়েছে সেটা। তার দিন ছিলাে : তার দিন গেছে।
এতদিন ধরে তাকে সঙ্গে-সঙ্গে টেনে আনলো কিছুতেই চলতে
। আসতেই হ’তাে কোনাে-না-কোনাে দিক থেকে ভাঙন।
বাইরে থেকে না-এলে, নিজেদেরই ভিতর থেকে। তবু
ভালাে যে বাইরে থেকেই তা এসেছিলো। তবু ভালাে যে
তাদের ছাড়াছাড়ি হয়েছিলাে অশ্রুতে আর চুম্বনে। তবু
ভালাে যে স্মৃতির চিরন্তন অরণ্য বসন্তের মত মধুর।
একটু
সে একটু চোখ বুজলে, আর সেই অন্ধকারে ফুটে
উঠলাে বাণীর মুখ। ম্লান, অত্যন্ত ম্লান—এত ম্লান তাে সে
কখনাে ছিলাে না। বালিসে মাথা রেখে সে শুয়ে আছে,
খােলা তার ঠোট। কপিল অনেকক্ষণ তাকিয়ে
রইলাে। ক্লান্তি জড়ানাে তার মুখে। সে যেন মরছে।
সে মরছে, মরে যাচ্ছে। আর এই তাে আমি তার
দিকে তাকিয়ে আছি : আমার চোখের উপর আস্তে-আস্তে
সে মরছে। আমি তাকে মরে যেতে দিচ্ছি।
আকাশের গায়ে স্বচ্ছ সাদা মেঘ জড়ানাে, যেন উর্বশীর
শরীর থেকে ওড়না খসে পড়েছে। কপিল সেদিকে তাকিয়ে
রইলাে চুপ করে। সে চাইলে স্তব্ধ হয়ে যেতে, একেবারে
স্তব্ধ : চুপচাপ, চুপচাপ শুয়ে থাকা এই দীর্ঘ উষ্ণ দুপুর
ভরে। সে কিছু করবে না, সে কিছু ভাববেও না।
শুধু চুপ করে থাকবে তার নিজের মধ্যে। বিশ্ব চঞ্চল :
তার সমস্ত গ্রহমণ্ডল আর তারার পুঞ্জ আর নীহারিকারাশি
নিয়ে চিরকাল ঘূর্ণমান,
কোটি-কোটি মৃত্যুর অন্ধকারের
ভিতর দিয়ে চিরকাল ধাবমান ; কিন্তু কোনােখানে, তার
অন্তরে কোনােখানে নিশ্চয়ই আছে শান্তি ; আছে অপরিসীম,
অনশ্বর স্তব্ধতা। আর আমাদের হৃৎপিণ্ড ঢিপঢিপ করে’
ভেঙে পড়তে চাইছে ; আর আমাদের রক্তের তীব্র স্রোত
টেনে তুলছে বাসনার আর হতাশার ফেনা; কোন্ দুৰ্বার
প্রাণ-রস বয়ে’
যাচ্ছে আমাদের দেহ-তরুর
শাখায় আর পাতায়, আমাদের প্রতি অঙ্গে, প্রতি
२१
মুহূর্তে
: তবু দাও, আমাকে দাও অন্তরের সেই স্তব্ধতা,
সেই ধ্বংসহীন শান্তি ; আমাকে শক্তি দাও চুপ করে’
থাকবার।
কিন্তু কী করে পাওয়া যাবে তাকে? আর যতক্ষণ
পাওয়া না-যায়, একে কী করে সহ্য করবে ?—এই ক্লান্তি,
এই নিঃসঙ্গতা? আমি যে মরে যাচ্ছি, কপিল মনে-মনে
বললে, আমি যে মরে যাচ্ছি।
কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তার লজ্জা হলাে, নিজেকে প্রশ্রয় দিতে
আরম্ভ করলে তার শেষ কোথায় ? যা-ই হােক না, মনের
মধ্যে মেনে নাও। কিছু বােলাে না : মনে-মনে, নিজের
কাছেও বােলাে না। তা চলুক তার নিজের স্রোতে, নিজের
ধারে নিজেকে ক্ষয় করে’ যা : বলে তাকে আরাে শক্তি দেবে
কেন?
কী দীর্ঘ মনে হচ্ছে এই দুপুরবেলাটা। আর এমন
চুপচাপ। সময় যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে ঘড়িটার
দিকে তাকালাে ; শুনলাে তার টিকটিক—সময়ের
হৃৎস্পন্দন। ঘড়িটার কোনো ভাবনা নেই ; সে কখনাে
ভুল করে না, তাড়া করে না; তার কাটা এক জায়গা
থেকে আর-এক জায়গায় আসতে যতটা সময় নেবার তা-ই
নেয়। কিন্তু আমাদের পক্ষে কী কষ্ট—কী কষ্ট সেইটুকু
রাস্তা পার হয়ে আসতে, কী কষ্ট, যখন রুদ্ধশ্বাসে, কান
পেতে শুনতে হয় প্রতিটি মুহূর্তের পায়ের শব্দ।
ভালাে লাগে না। ঐ একটা কথা সমস্ত প্রাণ দিয়ে
ক্ষীণ
২৮
সে ঘৃণা করে : ভালাে লাগে না। সব সময় কি ভালো
লাগতেই হবে ? মাঝে-মাঝে যদি ভালো না-ই লাগে, অত
ভয় কেন তাকে ? মাঝে-মাঝে ভালাে তাে লাগবেই না।
চুপ করে সহ্য করাে সেটা,
করাে সেটা, মুখ দিয়ে তা এনে না
কখনাে। সেটা রােগ, সেটাকে লুকিয়ে রাখে।
করুণার উপর, অন্যের দয়ার উপর জুলুম কোরাে না।
কতদিন, কত লােককে সে এ-সব কথা বলেছে। আর
আজ তার নিজেকেই বলতে হলো : ভালাে লাগে না।
কী লজ্জা, কী অবমাননা। সে চোখ বুজলাে; নিশ্চল,
নিঃশব্দ। নিজের চারদিকে সে রচনা করবে শূন্যতা। নিজেকে
সে লুপ্ত করে দেবে। লুপ্ত করে দেবে তার এই তৃষ্ণার্ত,
করুণাপ্রাখ সুমকে।
তার ঘরে বই, কেবল বই। যে-সব আত্মা। তাকে
লালন করেছে । তাকে দিয়েছে শক্তি, দিয়েছে শান্তি, সেই
সমস্ত মহান, মৃত্যুহীন আত্মার উপর এক-এক করে সে
মন বুলিয়ে গেলাে।
যদি সে একটু হাত বাড়ায়,
তাহলেই তাদের পেতে পারে : ছাপার পৃষ্ঠা থেকে তার
মুখের উপর এসে লাগবে জ্বলন্ত নিঃশ্বাস, আর তবু সে
নিশ্চল হয়েই রইলাে। এখন নয়, এখন নয়। যে-বই
জীবন্ত, তার উপর জবরদস্তি চলে । সহজে তাকে
পাওয়া যায় না। ক্লান্তি থেকে, বিতৃষ্ণা থেকে, দম্ভ থেকে
যদি তাকে হাতে তুলে নাও, সে তােমার হাতে মরে’
থাকবে, প্রকাশ করবে না তার রহস্য। অনেক সময় তাকে
দিতে হয়, নিজের অনেকখানি তাকে দিতে হয়। সে সৃষ্টি
করবে তার নিজের ভাব-মণ্ডল ; আর সেই বাষ্পে জ্বলে
উঠবে তার শিখা। আর তুমিও জ্বলে উঠবে—নিবিড়
মিলনের লাবণ্যে, পারস্পরিক প্রবাহের নিস্পন্দ আনন্দে।
কিন্তু তার উপর জোর কোরাে না; জোর করলে সে ধরা
দেবে না। রাখাে নিজের মধ্যে তােমার ক্লান্তি। যে-বই দিয়ে
তুমি তাকে হত্যা করতে যাবে, হত্যা করবে সেই বইকেই :
ক্লান্তি থাকবে।
অপরূপ, অপরূপ—ভীষণ প্ৰজ্বলন্ত সেই সব আত্মা। কিন্তু
জীবন আরাে কত ভীষণ, আরাে কত অপরূপ। অনেক,
অনেকদিন পর্যন্ত, কপিল ভাবলে, আমি সেই আগুনের
দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম, সেটাই
চরম। দূর থেকে জীবনকে দেখেছিলাম—তার ভাঙাচোরা
তার বিকৃতি, তার তুচ্ছতা নিয়ে ; আর দেবতাকে আমি ধন্যবাদ
জানিয়েছিলাম যে তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমার প্রয়ােজন
নেই সেই তুচ্ছতায়, সেই ভাঙাচোরায় অবিশ্রান্ত বিক্ষুব্ধ হ'তে
—আমার জন্য আছে এই আগুনের দেয়াল, এই বিরাট অখণ্ড
জ্যোতিঃপুঞ্জ। আজ ভাঙলে ভুল । আজ জীবন আমাকে
মারছে তার অন্ধকার, অপরূপ রহস্য দিয়ে। আজ জীবন
আমাকে ছিড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে—তারই তাে এই ব্যথা।
এতদিন, এতদিন পরে আমি হয়তাে বাঁচতে শিখবাে। আমার,
এই আর্ট তত সেই বঁাচারই একটা অংশ। বাঁচতে হবে,
শিখতে হবে বাঁচতে। আমরা যেমন লিখতে শিখি, পড়তে
••
৩০
শিখি, ভালােবাসতে শিখি, তেমনি বাঁচতেও শিখতে হয়। আর
এই বাচাটাই আসল, সব চেয়ে বড়।
আর এমনি করে সমস্ত দিন সে কাটিয়ে দিলে ; আর
বাইরের রাস্তায় সন্ধ্যার ছায়া যখন দীর্ঘ হয়ে লুটিয়ে পড়ছে,
তখন সে উঠলাে, বেরুলাে বাড়ি থেকে। আবার গেলাে মিনুর
কাছে। মিনু কলের নিচে কয়েকটা চায়ের বাসন ধুচ্ছে, আর
গান করছে গুগুন্ করে। সে চুপ করে গিয়ে দাড়ালাে তার
পাশে। মিনু একবার চোখ তুলে তার দিকে তাকালাে, তার
চাপা গলার গুগুনানি থামলাে না।
কপিল বললে, ‘আবার আমি এলুম।
‘একটু দাড়াও।
কাজ শেষ করে মিনু উঠলাে। দোতলায় খােলা বারান্দা,
সেখানে পাটির
উপর বসলাে দু’জনে। হাওয়া বইছে
দক্ষিণ থেকে ; আর পশ্চিমের আকাশে অপরূপ কোনাে
মণির মত জ্বলছে পঞ্চমীর চাঁদ। খানিকক্ষণ কেউ কিছু
বললে না।
মিনু তার নখ দিয়ে পাটির উপর একটা আঁচড় কাটলে ।
বললে, কী চাও তুমি আমার কাছে ?
কপিল বললে, ‘বড় একা লাগে ।
‘ভালােই তাে।
‘না, ভালাে নয়। বড় কষ্ট।
মিনু একটু চুপ করে রইলাে।
‘না-হয় কষ্টই হলাে।
‘যদি কষ্ট হ’তেই হয় তবে আর উপায় কী। কিন্তু কষ্ট
পেতে কে চায়? মরতে চায় কে?
‘তােমার মনের কথাটা কী, বলবে বুঝিয়ে ?
‘বােঝাতে পারবো না। তুমিই বলো : যা চাই তা কি
পাবাে না কখনাে ?
‘সে-কথা আমি বলবাে কী করে? অনেক সময় তাে
আছে।
‘সময়ই যে নেই। বড় ছােট জীবন।
‘তুমি কি তাকে খুব বেশি করে’ চাও, সত্যি?
কপিল একটু চুপ করে রইলাে, তার মাথা আনত।
‘আমি তাকেই শুধু চেয়েছি। মরে গেলেও মেকিকে মেনে
নিতে পারিনি।
‘মেকিকে কেন নেবে ?
‘আর যদি তা কখনাে না-ই পাই—
তবে ?
‘কী আর করবাে, ক্ষীণ, অস্পষ্টম্বরে কপিল বললে ।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে চোখ তুলে তাকালাে :
‘কিন্তু পাই যদি, সেটাই তাে ভালো।
মিনু একটু ভাবলে ।
‘হয়তাে পাবে—কোনাে সময়ে।
‘তােমার মুখের এই আশ্বাস কি নিতে পারি ?
‘আশ্বাস যদি দিতে পারতুম, নিজেকেও তাহলে দিতে
পারতুম।
৩২
‘কোথায় তােমার কুণ্ঠা ?
মিনু চুপ করে একটু ভাবলে ।
‘তুমি বরং এখন যাও।
‘কিন্তু আবার তাে আসতে হবে ফিরে।
‘হা, ফিরে আসবে।
কপিল মিনুর একখানা হাত টেনে নিলে নিজের হাতের
মধ্যে। মিনু হাত সরিয়ে নিলে না ; নরম, উষ্ণ, ঈষৎ-আর্জ
তার হাত কপিলের মুঠোর মধ্যে এসে লুকোলাে।
‘এত ভয় কেন তােমার ?
কপিল বললে।
‘না, ভয় নয়। ভয় করিনে বলেই তাে তােমাকে চলে যেতে
বলতে পারছি।
‘কিন্তু আর কী ? আর কী হ'লে ভরে উঠবে তােমার মন ?
‘আমাকে দিয়ে তাে শুধু কথা নয়।
‘কী, তাহলে?
মিনু ক্ষীণ হাসলাে :
‘তুমি আর আমি—আমরা কী? কী আমরা করতে পারি?
সবই ঈশ্বরের হাতে। কেবল ঈশ্বর ফুল ফোটাতে পারেন।
কপিল একটু চুপ করে রইলাে।
‘আমরা নষ্ট তাে করতে পারি।
মিনু অত্যন্ত মৃদুস্বরে বললে, নষ্ট হবে না।
তারপর খানিকক্ষণ দু’জনেই চুপ। ক্ষীণ চাদ এরই মধ্যে
ঝুলে পড়েছে লাল হয়ে ; অন্ধকার হয়ে আসছে। কপিল মিনুর
হাত ছেড়ে দিয়ে বললে, যাই তাহলে।
‘একটু বােসাে।
কপিল
চুপ করে’ অপেক্ষা করতে লাগলাে।
‘আমাকে দিয়ে কি ভরবে তােমার নিঃসঙ্গতা? মিনু
আস্তে-আস্তে বললে।
‘যদি ভরে তুলতে না-পারি, সে-দোষ আমারই হবে।
তারপর অনেকক্ষণ তারা বসে রইলাে, পরস্পরের দিকে না-
তাকিয়ে, কিছু না-বলে। তারপর কপিল আস্তে-আস্তে উঠে
দাড়ালো।
মিনু তার দিকে চোখ তুললাে :
‘চললে ?”
হ্যা, যাই এবার।
মিনু তার সঙ্গে সিড়ির মাথা পর্যন্ত এলাে। একটু দাড়ালাে
দু’জনে, একবার মিললাে দু’জনের চোখ।
‘আবার কবে আসবে ?” মিনু বললে।
আবার দেখা হবে’, বলে’ কপিল সিড়ি দিয়ে নেমে
গেলাে।
৩৪
এখন অবিশ্যি বাড়ি ফেরা যায় না, রাস্তায় বেরিয়ে সে ভাবলে। কিন্তু কী করা যায় ? কোথায় যাওয়া যায়? যানের আর মানুষের, গতির আর শব্দের সেই ঘূর্ণির মধ্যে সে দাড়িয়ে রইলাে, ভাবতে লাগলাে। সমস্ত রাস্তাটা ঝকঝক করছে, বসন্তের এই সন্ধ্যায়। কোনােখানে তাকে যেতেই হবে। আর হঠাৎ তার মনে পড়লাে তার বন্ধু বাসবকে। বাসব দাস, যে গল্প লেখে। তার গল্প ভালাে : কিন্তু একজনের লেখার ভিতর দিয়ে তার কতটুকুই বা পাওয়া যায়। অন্তত, এই বাসবকে বেশি পাওয়া যায় না। সে কম লেখে। আর যেটুকু লেখে, খুব কম করে লেখে। আর তার লেখা যেন তার অন্য-কোনাে লুকোনাে সত্তা থেকে সঞ্জাত, যা সংযত, যা শীত- স্বভাব, যাতে নিখুঁত মাত্রা। সে-সত্তা নয়, কপিল যাকে চেনে ; যা দিয়ে সে হাসে, আর চলে, আর কথা বলে ; যেখানে সে জ্বলছে, যেখানে সে যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে, যেখানে তার আনন্দ ফোয়ারার মত উচ্ছলিত। যারা কেবল তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হলাে, তারা তার কী জানলে? আমার কপাল ভালাে, কপিল ভাবলে, আমি তার সঙ্গে এক সময়ে জন্মেছি। আমার কপাল ভালাে, তার সঙ্গে আমার দেখা
হয়েছে। আমি পেয়েছি তার উষ্ণতার স্পর্শ : তার যে-উষ্ণ,
উৎসুক প্রাণ জ্বলে ওঠে তার চোখে আর তার হাসিতে।
দু’জনের মধ্যে ছিলাে বন্ধুতা, যার ভিত্তি শ্রদ্ধায়, স্রষ্টার
আনন্দে, একই কোনাে সন্ধানের ব্যথায়, একই আত্মপ্রকাশের
উৎসুকতায়। আমরা সকলেই চাই অন্য কারাে কাছে নিজের
কথা বলতে। কিন্তু কথা আসে না। কথা যা আসে, তা রূপক ;
কেমন করে’ লােকে তা বুঝবে ? কিন্তু কেউ হয়তাে বুঝবে,
কোনাে-একজন হয়তাে বুঝবে। তাই আমরা আশা করি ।
একদিন তাকে হয়-ততা পাওয়াও যায়। আর তখন মন ভরে
যায় নতুন আনন্দে, নতুন ঐশ্বর্যের অনুভূতিতে।
বেশি দেখা তাদের হতাে না। বেশি দেখা হবার প্রয়ােজন
যেন তাদের নেই। বাসব ঘুরতে সমাজের অন্য-এক স্তরে। তার
অবস্থা ভালাে ; কপিলের চাইতে সে উচু ‘জাত। যে-সব
জায়গা, যে-সব বাড়ি নিয়ে বাসবের পরিধি, কপিলের সেখানে
প্রবেশ নেই। মাঝে-মাঝে তাদের দেখা হতাে—দু’জনের
কোনাে-একজনের বাড়িতে। বাসব হয়-তত তাকে নিয়ে
যেতে কোনাে হােটেলে। আর তারা কথা বলতে কি,
আরাে ভালাে, চুপ করে বসে থাকতে কোনাে ফরাসি সাদা
মদের ছােট্ট গেলাস সামনে নিয়ে।
আর তাদের মধ্যে একটা সংস্পর্শ ; একটা সংস্পর্শ যা, তারা
অনুভব করতাে, কখনাে নষ্ট হবে না।
অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা নেই, কপিল ভাবলে । এখন
কি তাকে বাড়ি পাওয়া যাবে? না-পাওয়ারই কথা : তবু-না-
হয় বসেই থাকবে গিয়ে। নির্দিষ্ট কারাে জন্য অপেক্ষা করা
;
তবু ভালাে।
কপিল একটা বাস্-এ চড়ে বসলাে—বাসবের বাড়ি সহরের
অন্য প্রান্তে। আর গিয়ে অবিশ্যি সে তাকে পেলে না ;
অপেক্ষা করতে লাগলাে তার ঘরে বসে।
ঘরের মধ্যে অবিশ্বাস্য বিশৃঙ্খলা। যেখানে-সেখানে বই
ছড়ানাে-চেয়ারের উপর, মেঝেতে, কুশানের নিচে। কোনাে
বইয়ের ফাকে রয়েছে চ্যাপ্টা-হয়ে-যাওয়া সিগ্রেট, পৃষ্ঠা-চিহ্ন।
প্রকাণ্ড টেবিল : সেখানে কাগজ-পত্রের অরণ্যের মধ্যে কপিলের
চোখে পড়লাে একতাড়া আলগা কাগজ-বাসবের অত্যন্ত যত্নহীন
দ্রুত হাতের লেখায় ভরা, তুলে নিয়ে সে পড়তে আরম্ভ করলাে।
সে যা ভেবেছিলাে তা নয় ; একটা লেখা নয়। চার-পাঁচটা
লেখার আরম্ভ : কোনােটার দু’পাতা, কোনােটার কয়েক
লাইন মাত্র।
রয়েছে একটা, রয়েছে কেঁচো আর
উইপােক নিয়ে প্রবন্ধ, আর শিশুদের
জন্য একটা
রূপকথা, তারপর আরাে একটা গল্প । সবগুলাে লেখাই টাটকা
—দেখেই বােঝা যায় । কপিল কাগজের তাড়াটা গুছিয়ে
একধারে রেখে দিলে সরিয়ে। তার সঙ্গে দেখা হতেই বাসব
এ-সম্বন্ধে যা বলবে তা মনে করে মনে-মনে সে হাসলাে।
অনেকক্ষণ কাটলাে, বাসব ফিরছে না। কপিল বসে রইলাে,
দুটো-একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করলাে। এখনাে তার মন
যাচ্ছে না পড়ায়। একদিন সে গর্ব করে বলেছিলাে, যে-কোনাে
ছাপার অক্ষরের জিনিস হলেই আমি সময় কাটাতে পারি।
আর এখন চারদিকে তার ছাপার অক্ষরের পাহাড়। কিন্তু সে
রয়েছে দুরে। অনেক লােভনীয় সব নাম তার চোখে পড়লাে :
কিন্তু সে পাতাও ওন্টালে না, কি পাতা উল্টিয়েই রেখে দিলে ।
দশটা প্রায় বাজলল। দু’ ঘণ্টার উপরে সে বসে আছে।
কিন্তু তার খুব খারাপ লাগছিলাে না। আর বাড়ি ফেরবার
কথা এখনাে সে ভাবতে পারছে না।
বাসব ফিরলাে প্রায় এগারােটায়। সুন্দর তার কাপড়-
চোপড়, সুন্দর করে আঁচড়ানাে তার চুল। কিন্তু তার মুখ একটু
ম্লান।
‘এ কী! তুমি !
‘কত দেরি করলে !
‘কতক্ষণ বসে আছাে?
‘অনেকক্ষণ।
বাসব একটা চেয়ার টেনে এনে কপিলের কাছে বসলাে।
‘ঘরটার আনাচে-কানাচে আমি ছড়ানাে রয়েছি। কিছু মনে
কোরাে না।
তােমার সব নতুন লেখা দেখছিলুম’, কপিল বললে ।
‘ওঃ! বাসব দু’আঙুলে মাথাটা টিপে ধরলল। কিচ্ছু
লিখতে পারছিনে। মাথা খারাপ হয়ে গেলাে কিনা
ভাবছি।
কপিল-এ-কথা শােনবার জন্য সে প্রস্তুত হয়েই ছিলাে-
ক্ষীণ একটু হাসলাে।
‘সত্যি কিছু লেখা হচ্ছে না। কী হ’লল আমার ?
-
‘কয়েকদিন না-ই লিখলে।
‘আমিও ভেবেছি ও-কথা। মনে-মনে বলেছি, ভিতর
থেকে একদিন ঝোঁক আসবে। কিন্তু কতদিন তাে
গেলাে। কোথায় ? কোথায় ? ভিতরটা যেন একেবারে
মরে গেছে।
কপিল তার দিকে তাকালাে, আশ্চৰ্য্য উজ্জ্বল তার চোখের
দিকে, যেখানে আগুনের মত জ্বলছে প্রাণ। কিছু বললে না।
‘তারপর কাল মনে করলুমআর নয়, এবার লিখবােই,
জোর করেই লিখবাে। কাল সমস্ত দিন ঘরের দরজা বন্ধ
করে’--ঐ তাে দেখলে। কিন্তু কী কষ্টই যে হয়েছে।
‘একসঙ্গে ক’টা লিখবে ?
‘ঐ জন্যেই তাে। একটা আরম্ভ করে’ই মনে হয়, কী
ছাই হচ্ছে। তক্ষুনি অন্য কিছু ধরি। এমনি করতে-করতে
ঐ তত দাড়িয়েছে।
পড়েছাে নাকি?
একটু থেমে,
অন্যরকম সুরে বাসব জিজ্ঞেস করলে।
‘সব পড়িনি।
‘যেটুকু পড়েছে, খুব খারাপ হয়নি তাে ?
‘না, খারাপ হয়নি।
কথাটা শুনে বাসব যেন গভীর শান্তি পেলাে মনে।
নিঃশ্বাস ছেড়ে বললে, যাক্, খারাপ না-হলেই হলাে। কিন্তু
সত্যি, আর কি কখনাে সত্যিকারে ঝোক আসবে না লেখার ?
কপিল চুপ করে রইলাে।
‘তারপর দ্যাখাে-আজকে আবার মনটা এবােরে বেঁকে
বসেছে। কালকের লেখবার ঠেলায় আজ সমস্তটা দিন নষ্ট
করতে হলাে। এই ভাে, দ্যাখাে, বাড়ি ফিরছি।
‘নষ্ট কেন বলছাে?
বাসব মুহূর্তের জন্য চোখ বুজলাে :
‘শুধু দিন নষ্ট হলে ভাবনা ছিলাে না। এখন ভয় হচ্ছে
আমি নিজেই হয়-ততা নষ্ট হয়ে হাচ্ছি।
‘তােমার মন আজ ভালাে নেই।
‘অবিশ্যি ও-কথার কোনাে অর্থ হয় না, তা ঠিক। কিন্তু
আমার আর ভালাে লাগছে না এ-সব। বড় বেশি লােক,
বড় বেশি কথা—সবই বড় বেশি। আজ এক বাড়িতে
গিয়েছিলুম, সেখানে মেয়ে-পুরুষে মিলিয়ে প্রায় তিরিশ জন
উপস্থিত ছিলে। আর-বিশ্বাস করবে ?আমি তাদের
প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে আলাপ করেছি।
‘এতে আশ্চর্য কী। তােমার তাে এই করেই অভ্যেস।
‘কিন্তু এ-অভ্যেস আমায় ছাড়তেই হবে। এই অভ্যেসই
"আমাকে মেরে ফেলছে। এমন কেন হ’লাে যে আগেকার
মও আমার আর লেখা আসছে না? এই ধরণের অকারণ,
অর্থহীন, নিষ্ফল মেলামেশা—তা আমার জীবনীশক্তি শুষে
নিচ্ছে।
‘কিন্তু এরই মধ্যে তুমি জন্মেছে। এরই মধ্যে তুমি
বড় হয়েছে। এ থেকে তুমি পালাবে কী করে?
‘ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে-বসে’ কেবল পড়বাে আর
লিখবাে।
৪০
উঠলাে।
কপিল মুচকি হাসলাে।
‘পারবাে না ভাবছাে?” বাসব সে-হাসি লক্ষ্য করে বলে
‘ইচ্ছে করলে কী না পারি।
‘হ্যা’, কপিল বললে। যা ইচ্ছে করে, তা-ই আমরা
করতে পারি। যা ইচ্ছে করে, তা-ই শুধু করতে পারি।
কিন্তু আমাদের ইচ্ছেটাই যে বার-বার বদলায়।
‘সে-কথা ঠিক।' বাসব একটু চুপ করে রইলাে, তারপর
আবার বললে, কিন্তু জীবনের একটা কেন্দ্র দরকার ?
‘তুমি কি এখনাে তা খুঁজে পাওনি?
খুঁজে কি তা পাওয়া যায় ? নিজে থেকেই তােত
গড়ে ওঠে, আমরা টেরও পাইনে।
দু’জনে পরস্পরের চোখের দিকে একবার তাকালাে, তারপর
খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাে।
‘তােমার মধ্যে আজ একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করছি’, কপিল
বললে।
নিজের এই নিষ্ফলতা আমি আর সইতে পারছিনে।
‘লিখতে না-পারার নিষ্ফলতা ? কপিল হাসলো।
‘শুধু তা-ই নয়। যদিও সেটাও আছে। একটা প্রকাণ্ড,
সমগ্র নিষ্ফলতার সেটা একটা অংশ। বাসব তার চেয়ারে
নড়ে-চড়ে একটু ভালাে হয়ে বসলাে। একটু পরে বললে,
‘এক-এক সময় আমার মনে হয় যে আমি হয়তাে সত্যিকারের
আর্টিসটই নই। তা যদি হতাম, তাহলে আমার জীবন
আর্টের মধ্যেই পেতে তার কেন্দ্র।
৪১
‘ও-কথা বােলাে না’, প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে কপিল বলে উঠলাে।
কী ছিলাে তার কথার সুরে, বাসব একটু অবাক হয়ে
তার মুখের দিকে তাকালাে। কপিল আবার বললে, ‘না-
ওখানে নয়, ওখানে নয়, তুমি যা চাও।
তােমার আর্ট
তােমার ভিতর থেকে উঠে আসবে, তােমাকে লুকিয়ে রাখবে
। তােমার আর্ট তােমার ফুটে-ওঠা, গাছের যেমন ফুল ।
কিন্তু আসল জীবনটা গাছের, আসল জীবনটা তােমার।
‘কিন্তু জীবনে যদি কিছু না-থাকে—
‘জীবনে কিছু থাকবে না কেন? এতদিনে তুমি কি এই
বুঝলে ?
একটু সময়, বাসব সােজা তার সামনে তাকিয়ে রইলাে।
‘এটা বুঝেছি যে জীবনে ক্লান্তি আছে। আর কোনােখানে
আছে কোনাে বিকৃত ভাগ্য। আমরা যা করতে চাইনে,
আমাদের দিয়ে তা-ই করায়। আমাদের মনকে তৈরি
করে একরকম করে’, আর জীবনের ঘটনাকে তার বিপরীত।
আর এই অবিশ্রান্ত আত্ম-বিরােধে আমরা ক্ষয়ে যেতে
থাকি, শুকিয়ে যেতে থাকি।
‘তুমি তােমার নিজের কথা বলছে।
‘হঁ্যা, নিজের কথাই তাে বলছি। একটু আগে বাড়ি
ফিরতে-ফিরতে ঠিক এ-সব কথা ভাবছিলুম। যে-সব জায়গায়
যেতে আমি চাইনে, ঠিক সে-সব জায়গাতেই যাই; যাদের সঙ্গে
মিশলে আমাকে কেবল ক্লান্ত হতে হয়, তাদের সঙ্গেই রােজ
মিশি।
•
৪২
‘কেন করাে ও-রকম ? ‘না-করে’ পারিনে। কপিল একটু থেমে রইলাে। ‘বুঝতে পারি’, মৃদুস্বরে সে বললে। ‘বড় ভয়ানক নিঃসঙ্গতা এই জীবনে। বাসবের উজ্জ্বল চোখ মুহূর্তের জন্য যেন কোমল, অস্পষ্ট হয়ে এলাে। সেইজন্যেই তাে’, আস্তে-আস্তে সে বললে । ‘যদি সেই নিঃসঙ্গতা ভরে তুলতে না-ই পারাে, তাকে মারবার ব্যবস্থা অন্তত করতেই হবে। কপিল অপেক্ষা করতে লাগলাে, ভিতরে-ভিতরে তার নিঃশ্বাস রুদ্ধ। এ-ই তাে সে ভেবেছে আজ সমস্ত দিন ভরে’ —সে, ধৈর্য্যে স্তব্ধ, প্রার্থনায় আনত। আর এর কী বলবার আছে এ নিয়ে—এই চঞ্চল, অশান্ত মানুষ, নিজের মধ্যে যে ছিড়ে যাচ্ছে ? ‘হ্যা, তাকে মারতেই হবে’, বাসব আবার বললে, ‘মারতে হবেই। যেমন করে পারাে। আর-কোনাে উপায় নেই তােমার। আর আর কেমন করে তা হবে ? কোনাে নেশা-যে-কোনাে নেশা। আর এ-রকম নেশা আর কী আছে—মানুষের মুখের, মানুষের কণ্ঠস্বরের, মানুষের গায়ের গন্ধের ? এত বৈচিত্র্য কি তুমি পাবে মদে? এমন অফুরন্ত বৈচিত্র্য? আর এমন নির্মম, এমন ভয়ঙ্করও আর- কোনাে নেশা নয়। আর-কোনাে নেশা কি আছে যা তােমার আত্মাকে পচায় ? ৩
বাসব অল্প একটু হেসে উঠলাে।—‘আমরাই হচ্ছি বর্তমান
যুগের সন্ন্যাসী, আমরা যারা শিল্পী। আমরাই চাই পৃথিবী
থেকে দূরে সরে যেতে, নিজের জীবনকে সৃষ্টি করতে।
কোনাে শঙ্করাচার্যের, কোনাে সেইন্ট ফ্রান্সিসের পৃথিবীর
উপর এমন বিতৃষ্ণা ছিলাে না—যা আছে আমার—আর
তােমার।
‘পৃথিবীর উপর বিতৃষ্ণা আছে নাকি আমাদের ?
‘যখন পৃথিবী মানে এক সন্ধ্যায় তিরিশজন মেয়ে-পুরুষের
সঙ্গে আলাদাভাবে আলাপ করা, একটু হেসে বাসব বললে ।
‘যখন পৃথিবী মানে টাকা পাওয়া আর টাকা খরচ করা।
যখন পৃথিবী মানে তােমার চারদিকে সব পচে’-যাওয়া
আত্মার দুর্গন্ধ।
‘সে-পৃথিবীকে তােমার যেটুকু না-দিলেই নয়, তা-ই দেবে ।
তার বেশি দেবে না। বাকিটা তােমার ; বাকি সময় তােমার।
তা কি যথেষ্ট নয়? অন্তত তা-ই নিয়ে কি তুমি তােমার
জীবনকে সৃষ্টি করতে পারাে না ?
‘আমিও ও-কথা ভেবেছি, একটু চুপ করে থেকে বাসব
বললে। মনে-মনে বলেছি কতবার ; এই আমি দরজা বন্ধ
করলুম পৃথিবীর মুখের উপর । এর পর থেকে আমার নিজের
জগত যেখানে আমি রাজা, যেখানে আমি ঈশ্বর। বর্তমান
সময়ের এমনি ব্যবস্থা যে একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকবার উপায়
নেই ; পৃথিবীর মােটা-মােটা সঁাৎসেঁতে আঙুল মাঝে-মাঝে
গায়ে এসে লাগবেই। সেটা সইবাে মুখ বুজে। আর তা ছাড়া,
৪৪
সেটা শুধু আমার চামড়াতেই লাগবে—ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।
আমার খোলসে, আমার বাইরের-আমিতে। কিন্তু তা ছাড়া
আরো কিছু আছে। তা ছাড়া যেটা আছে সেটাই তাে
আসল। যেখানে আমি রাজা হবে, সেখানে আমি হবো
কপিল মাথা নিচু করে চুপ করে রইলাে, আর বাসব বলতে
লাগলো :
‘কিন্তু নেশার হাত থেকে মুক্তি নেই। মানুষের মুখ
আমাকে দেখতেই হবে, আমাকে শুনতেই হবে মানুষের কথা।
আমাকে পেতেই হবে অনেক মিলিত নিঃশ্বাসের সেই ভারি
উত্তাপ। রােজ যখন সন্ধ্যা হয়, আমার মধ্যে একটা প্রবল
শারীরিক তৃষ্ণার মত জ্বলে ওঠে সেই কামনা। আর আমাকে
বেরিয়ে পড়তে হয়—এখানে, ওখানে, গৃহহীন প্রেতের মত
লম্পট যেমন গণিকার দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়ায় ।
আমাকে যেতেই হবে—এ-কথার ভয়াবহতা তুমি বুঝতে
পারছাে ?—যেতেই হবে, না-গিয়ে আমার উপায় নেই। আর
ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি কাটিয়ে দিই—আমার কাছে যাদের
কোনাে অস্তিত্বই নেই, সেই সব লােকের সঙ্গে, আমার কাছে
কোনােরকম অর্থ হয় না এমন সব আলাপে। ভালাে লাগে
, তবু যেতে হয় : নিজের উপর রাগ হয়, নিজেকে ঘৃণা
করতে আরম্ভ করি—তবু যেতে হয়। কেন ? কেন এটা?
এমন একটা নিঃসঙ্গতা আছে যাকে চাপা দিতেই হবে, যাকে
ভুলতেই হবে। নয় তাে তুমি বাঁচতে পারবে না।
৪৫
কপিল চোখ তুলে তার বন্ধুর দিকে তাকালাে। তার
চোখ ঝলসাচ্ছে ; জ্বলজ্বল করছে তার সমস্ত মুখ। সুপুরুষ
তাকে বলা যায় না; কিন্তু এই উত্তেজনা, আত্ম-প্রকাশের এই
রােমাঞ্চ তার মুখে এনে দিয়েছে এক অদ্ভুত আভা যাতে
সে প্রায় সুন্দর হয়ে উঠেছে।
আর, একটু পরে কপিল আস্তে জিজ্ঞেস করলে, তােমার
স্ত্রী কেমন আছে ?
সঙ্গে-সঙ্গে বাসবের মুখের চেহারা বদলে গেলাে। তার
চোখ আত্ম-সচেতন হয়ে উঠলাে; ঠোটে ফুটে উঠলে মার্জিত,
সূক্ষ্ম, একটু হাসি।
‘ও, মৈত্রেয়ী! ভালাে আছে, বেশ ভালােই আছে সে।
বাসবের বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর। তারই সমাজের
মেয়ে ; দু’পরিবারে অনেকদিনের জানালােনা। যখন তারা
নেহাৎ ছেলেমানুষ তখন থেকেই তাদের বিয়ে একরকম ঠিক
হয়ে আছে। আর তাদের বিয়ে অল্প বয়েসেই হয়।
মৈত্রেয়ীর সঙ্গে কপিলের দু’একবার দেখা হয়েছে। অপূৰ্ব্ব
দেখতে। প্রথম বছরটা বাসবকে খুবই সুখী মনে হয়েছিলাে
তাকে পেয়ে। লােকে তা-ই বলে।
কিন্তু তাদের এই বিয়েটা সম্পূর্ণ ' সামাজিক : তাদের
সমাজের, তাদের দলের মধ্যে একটা ঘটনা ; তাদের সমাজের
একটা শােভা যেন। সবাই খুসি হয়েছিলাে; সবাই মুগ্ধ
হয়েছিলাে তাদের দেখে। বাঃ, চমৎকার মানিয়েছে। এবং
অন্যের চোখে এই ভালাে-লাগাটাই যেন তাদের বিয়ের
৪৬
•• উচ্চতম সফলতা। তা যেন তাদের জীবনের নয় : তা বেড়ে উঠতে পারেনি তাদের সত্তার অন্ধকারে। কিন্তু বিয়ে নেপথ্যের, বিয়ে অন্ধকারের ; বিয়ে কেবল দু’জনের পরস্পর-উৎসুক, পরস্পর-সংবেদিত জীবনের। কেবল মিলন নয়, সংবেদন। পূজার প্রদীপের শিখা যেমন দেবতার অন্ধকার মুখের দিকে উৎসুক। যেমন দেবতার অন্ধকার, ভয়ঙ্কর দৃষ্টি শিখার আরক্ত অভীপ্সার উপর আনত। আত্ম- অঞ্জলিতে আর আত্মসমর্পণে, প্রার্থনায় আর করুণায় অনির্বচনীয় সেই সংবেদন। সে-বিয়ে যখন হয়, তখন আর ভয় থাকে না। সেটা সমস্ত জীবনের : সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে তা আনে গভীরতরাে, নতুনতরাে সংস্পর্শ; বয়েস যত বাড়ে, তা শান্তিতে সােনালি হয়ে উঠতে থাকে, সােনালি হেমন্তের মত। কিন্তু এই বিয়ে, যেটা কেবল সামাজিক, প্রধানত অন্যের খুসির জন্য, যেটা একটা শােভা, গােষ্ঠাগত জীবনের একটা অলঙ্কার—এ-বিয়ে কৃত্রিম, এ-বিয়ে মিথ্যা। যে-জিনিস সম্পূর্ণ বাইরে থেকে চাপাননা তার ভার বেশিদিন সয় না। যে- জিনিস নিজের ভিতর থেকে গড়ে ওঠেনি, দু’দিনেই তার রস শুকিয়ে যায়। তারই আছে ক্ষয় ; তা-ই যায় পুরােনাে হয়ে ; তাকেই ছিড়ে ফেলে সময়ের আঙুল। আর আমরা আমাদের মূঢ়তা থেকে চমৎকার ছােট-ছােট থিওরি তৈরি করি : বলি, ভালােবাসাই এমনি, জীবনই এমনি : বলি, যতদিন তাকে কাছে না পাও, ততদিনই প্রেমের মহিমা। ৪৭
তখনই আমাদের মধ্যে আসে পবিত্রতার বিকৃতি, কামুকতার
বিকৃতি, ছােট্ট-ফুটফুটে-ফুলের-মত মেয়েকে উপাসনার বিকৃতি।
অবিশ্যি এমন নয় যে বাসব সত্যি-সত্যি অসুখী ছিলাে।
জীবন চলতাে মসৃণগতিতে ; কোনােখানে একটা চিড় নেই,
একটু খুঁত নেই । কোনাে অভাব নেই, কোনাে বিরােধ
নেই, কোনাে সংঘাত নেই। স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই একসঙ্গে
বেরুতে। একই সব লোেককে তারা চেনে; একই সব জায়গায়
তাদের যাতায়াত। অনেক তাদের রুচির ও আসক্তির মিল ।
মৈত্রেয়ীর সঙ্গে কথা বলতে বাসবের ভালাে লাগতাে। আর
অনেক কিছু নিয়েই সে কথা বলতে—শুধু তার লেখার কথা
কখনাে নয়। আর মৈত্রেয়ী যদি কখনাে ভুল করে’ কিছু
বলে ফেলতে, সে থাকতাে চুপ করে। সে যে লেখে সেটা
যেন ঈষৎ একটু লজ্জার ব্যাপার, স্ত্রীর কাছে তার এই
মনােভাব। সেটা লুকোতে হবে : স্ত্রীর কাছ থেকে সেটা
লুকোতে হবে।
এমনি কাটছিলাে। তারা সুন্দর একটি ছবি তৈরি
করেছিলাে—এই পর্যন্ত। তারা মানিয়েছিলাে—যাতে অন্যেরা
দেখতে পারে এবং দেখে খুসি হতে পারে। এই পর্যন্ত ।
ভিতরে সব ফাকা। মৈত্রেয়ী কখনাে আগুনের অঞ্জলির মত
জ্বলে ওঠেনি, লুটিয়ে পড়েনি; আর বাসব কখনাে তার ভয়ঙ্কর
দেবতার-মুখের করুণ, অপরূপ দৃষ্টি আনত করেনি তার উপর।
মৈত্রেয়ীর মনে অবিশ্যি কোনাে ক্ষোভ ছিলাে না। থাকবার
কথাও নয়। যা আমরা কখনাে আকাঙ্ক্ষাই করিনি, যা আছে
৪
বলেই আমরা জানিনে, তার অভাব আমরা বুঝব কী করে?
মৈত্রেয়ী যা চেয়েছিলাে, তা-ই সে পেয়েছিলো।
মনে ছিলাে
ছিলাে সুখ :
চিরপরিচিত পারিপার্শ্বিকে
শৈশব থেকে
অভ্যস্ত তার জীবন পেয়েছে বলে। তার
বিয়েটা যেন খেলা। মেয়েদের বিয়েতে যে-বিচ্ছেদের, দ্বিধা হয়ে
যাবার, ছিড়ে পড়বার যে-ব্যথা, তা তাকে পেতে হয়নি।
যেখানে সে ছিলাে, সেখানেই সে রয়ে গিয়েছিলাে। যে-
বাড়িতে তার জীবন কাটবে তার সঙ্গে অনেক আগে থেকেই সে
পরিচিত। যে-মানুষকে নিয়ে তার জীবন কাটবে তাকে সে
অনেক আগে থেকেই মনে-মনে মেনে নিয়েছে স্বামী বলে।
তাকে পেতে হয়নি কোনাে আকস্মিকতার, কোনাে বিচ্ছেদের,
কোনাে নিৰ্মম রহস্যের ব্যথা। আর সেখানেই সে সুখী।
বাসবের কথা অবিশ্যি আলাদা। তার মধ্যে ছিলাে এক
অপরিসীম অভাবের চেতনা ; কোন্ সূক্ষ্ম, তিক্ত কষ্টে তার
বুকের ভিতরটা যেন টন করছে সব সময়। কিন্তু তার
কাছে সে হার মানবে না, মরে গেলেও। এ নিয়ে যদি বিলাপ
করতে হয়, লজ্জায় সে মরে যাবে। আর, কেউ-যত
লােকের সঙ্গে সে মিশতাে, যত লােকের
পর ঘণ্টা সে আলাপ করতে—কেউ সন্দেহ করতাে না তার
অন্তরের শূন্যতা। শুধু কপিল জানতো। শুধু কপিল বুঝতে ।
এ নিয়ে কখনাে তাদের মধ্যে স্পষ্ট কোনাে কথা হয়নি
অবিশ্যি। তবু, কপিলের পক্ষে বােঝা খুবই সহজ ছিলাে
কোনােরকমে স্ত্রীর কথা উঠলেই বাসবের মুখের চেহারা
সঙ্গে ঘণ্টার
৪১
বদলে যেতে। নেমে আসতে তার চোখের পাতা,
ঠোটে ফুটে উঠতাে সূক্ষ্ম হাসি।
আর তবু, স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে তার মনে কোথায় যেন একটা
অনাসক্তি ছিলাে। সাধারণ অর্থে প্রেম যদি সে চাইতাে,
সে তা পেতে পারতে ইচ্ছে করলেই। ছােটখাটো একটা
প্রেমের ব্যাপার, একটা ছুটির দিন, আত্মার শনিবারের রাত্রি।
চাইলেই সে পেতে পারতাে। কিন্তু কোন মেয়ের সঙ্গেই
তার সম্পর্ক ভদ্র নাগরিকতার বাইরে যেতে পারতাে না।
তারপর কোথায় যেন একটা বাধা, তার নিজেরই ভিতরে একটা
পাথরের দেয়াল। এটা লােকে লক্ষ্য করতাে, আর পুরুষরা
বলাবলি করতেও রকম স্ত্রী যার, ইত্যাদি। এমনি আমরা
মানুষকে বিচার করি, বাইরে থেকে দেখে।
দীর্ঘ নীরবতা। তারপর হঠাৎ কপিল বললে :
‘আমি ভাবছি বিয়ে করবাে।”
বাসবের উজ্জ্বল চোখের পরিপূর্ণ দৃষ্টি তার মুখের উপর
এসে পড়লাে :
‘হঁ্যা, করাে। আমার অবাক লেগেছে এতদিন তুমি বিয়ে
করােনি।
‘অবাক লেগেছে ? কেন ?
‘যখন থেকে তােমাকে চিনি আমার মনে হয়েছে তােমার
মধ্যে কোথায় একটা অসম্পূর্ণতা আছে।
‘কপিলের ভগ্নাংশ! কপিল হেসে উঠলাে, নিজেকে
ঠাট্টা করে।
কিন্তু বাসব সে-হাসিতে যােগ দিলে না :
‘তােমার মধ্যে ভালােবাসার অভাব ছিলাে।
‘ভালােবাসার? খুব নিচু গলায় কপিল পুনরাবৃত্তি করলে।
‘তােমার জীবন ছিলাে একটা সুরে বাঁধা, একটু চুপ করে’
থেকে বাসব বললে।
‘কী সে-সুর ?”
‘তা তুমিই ভালাে জানাে । কিন্তু একটা সুর। অনেকদিন
চলেছে সেটাতে। সেটারও প্রয়ােজন ছিলাে সেটা না-হলেও
তােমার চলতাে না।
বাসব হঠাৎ থেমে গেলাে। কপিল বললে :
‘কিন্তু এখন আর সেটাতে চলছে না—এ-ই তাে বলতে
চাও তুমি ?
‘না, আর চলছে না। সেটা ফুরিয়ে গেছে—অন্তত, যাওয়া
এখন নতুন সুর আসা দরকার তােমার জীবনে।
আর তা তুমি কোথায় পাবে—তা তুমি কোথায় পাবে, যদি না
কোনাে মেয়ের মধ্যে পাও, কোনাে মেয়ের সঙ্গে সংস্পর্শে ?
কপিল চুপ করে রইলাে। আর বাসব বলতে লাগলাে :
‘তােমার মধ্যে বাইরের একটা প্রশান্তি ছিলাে। আর
আমি, অস্থিরতা যার জন্ম-গত, আমি প্রথমটায় ঈর্ষা করেছিলুম
তােমার সেই প্রশান্তিকে। জীবনকে তুমি একদিক থেকে
মেনে নিয়েছিলে ; কোনাে দিক থেকে, কোনােখানে, একটা
মিল খুঁজে পেয়েছিলে নিজের মধ্যে। সেটা ভালাে , নিজেকে
অকার অবিশ্রান্ত ছড়িয়ে-ছড়িয়ে দেয়ার চাইতে সেটা ভালাে।
উচিত।
নিজের অনেকটা বাঁচে তাতে, জমে ওঠে। কিন্তু জীবনের
সবটা তুমি নাওনি—নিতে চাওনি। তােমার সেই আত্মস্থতার
খুটি ছিলো তােমার গৰ্ব আর নিজের উপরে তােমার অভিমান।
অভিমানে তুমি মুখ ফিরিয়ে ছিলে। গর্বে তুমি চোখ তুলে
তাকাবে না। নিজেকে তুমি সম্মােহিত করে রেখেছিলে
বিশেষ একটা আদর্শে। খানিকটা জোর-খাটিয়েছিলে নিজের
উপর। তােমার মধ্যে যে-প্রশান্তিটা দেখা যেতাে, সেটা
সত্যিকারের প্রশান্তি নয় : সেটা তোমার গর্বের আর
অভিমানের শক্ত-হয়ে-থাকা। তােমার মধ্যে কোথায় একটা
কঠিনতা কি ছিলাে না ? সেটা আসে ভালােবাসার অভাব
থেকে। আমি অনেকদিন থেকে আশা করে’ ছিলুম যে সেটা
তােমার ভাঙবে, তােমার এই অভিমানের বিমুখতা। অন্যকে
তুমি মারতে চেয়েছিলে তা দিয়ে, মেরেছিলে কেবল নিজেকেই
এ চলতে পারে না, আমি বুঝেছিলুম। নতুন কোনাে সুর
আসতেই হবে তােমার জীবনে। তােমাকে সহজ হতেই
হবে, সত্যিকারের নম্রতায় আর বিনয়ে সহজ।
আর তা শুধু
তখনই হবে যখন তুমি ভালােবাসার স্পর্শ পেয়েছে। একবার
যদি ভালােবাসার হাত তােমাকে স্পর্শ করে, তুমি আর কঠিন
হয়ে থাকতে পারাে না। তুমি তখন মাথা নিচু করবে, তুমি
তখন চুপ করে থাকবে ; জীবনের গভীর রহস্যের সামনে
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়াবে। একটা সময় আছে, যখন আমরা
নিজের ব্যক্তিত্বের মােহে অন্ধ হয়ে থাকি ; তার বাইরে কিছু
দেখতে পাইনে ; তার বাইরে যা-কিছু, তাকেই ঘা দিতে
।
৫২
চাই। কিন্তু তখন তােমার হবে সেই ব্যক্তিত্ব থেকে মুক্তি।
তখন তুমি আর ঘা দিতে চাইবে না; তখন তােমার মধ্যে
আসবে ভালােবাসা ; তখন তুমি বুঝবে।
‘আর এটা কী, এই ভালােবাসা, তুমি যার কথা বলছাে?
‘কী আবার।
ভালােবাসা : সহজ, সজীব মানুষের
ভালােবাসা। জানাে না, কী ? তারপর হঠাৎ বাসব জিজ্ঞেস
করলে :
‘কাকে তুমি বিয়ে করছাে?
তুমি চিনবে না তাকে।
‘ঠিক করে ফেলেছাে ?
‘আমার মন আছে ঠিক। তার কথা এখনাে পাইনি।
বাসব মুহূর্তকাল কপিলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে :
‘তােমার মুখে নতুন একটা আভা।
‘তুমি তা-ই কল্পনা করছে।
‘না, সত্যি, সত্যি।
‘কিন্তু তােমাকে বলতে পারি এটা ভালােবাসার ব্যাপার
নয়।
‘কী করে জানাে ?
‘তার সঙ্গে আমার আলাপ—খুব বেশি নয়।
‘আলাপ দিয়ে কি ভালােবাসা হয় ?
কপিল চুপ করে রইলাে।
‘তুমি কি তাকে চাও?' বাসব হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে।
‘চাই?’ কপিল প্রথমটায় ঠিক বুঝতে পারলে না।
‘তুমি কি তাকে চাও?’ বাসব আবার বললে।
এইবার, তার গলার সুরে, অর্থটা বােঝা গেলাে।
‘হা, তাকে আমি চাই, অত্যন্ত সহজভাবে কপিল বললে ।
এ নিয়ে তুমি খুব বেশি ভাবছে না তাে?
‘না, ভাববার এতে কী আছে ?
‘লােকে অদ্ভুত সব কথা বলবে। বলবে, বিয়ে করা মস্ত
দায়িত্ব। আমরা যে বাঁচি সেটা কি একটা দায়িত্ব ? বলল,
সেটা কি একটা দায়িত্ব?
কপিল নীরবে তার বন্ধুর দিকে তাকালাে। বাসবের মুখে
কয়েকটা রেখা, যেন এ-সব বলতে তার কষ্ট হচ্ছে। তবু,
তাকে বলতেই হবে। কী যেন ঠেলে উঠছে তার ভিতর
থেকে।
‘বলল, এই যে তুমি আর আমি এখানে বসে কথা বলছি,
এটা কি দায়িত্ব ? পরস্পরে আমাদের যে-প্রয়ােজন, তা কি
দায়িত্ব ? ভালােবাসা কি জড়াে করে’ রাখবার, জমিয়ে
তােলবার, ভারের মত সঙ্গে-সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাবার ? লােকে
বলবে, বিয়ে তাে শুধু ভালােবাসা নয়। বিয়ে তবে কী ?
মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শ তা ছাড়া আর কী ? লােকে
বলবে, ভালােবাসা থাকে না। কিন্তু ভালােবাসা কি নষ্ট হতে
পারে? তুমিই বলল, ভালােবাসা কি কখনাে নষ্ট হতে পারে?
বাসব আস্তে-আস্তে কথা বলছে, নরম সুরে, নিজের
মনে-মনে যেন। হঠাৎ ফুটে উঠেছে তার মুখে সমস্ত দীর্ঘ
দিনের ক্লান্তি। তার মাথার এক পাশ থেকে শিথিল চুলের
৫৪
গুচ্ছ নেমে এসেছে কপালের উপর। সাধারণত উজ্জ্বল, রক্তাভ
তার মুখে যেন বেরিয়ে এসেছে অত্যন্ত সঙ্গোপন, অত্যন্ত
সযত্নে লুকোনাে একটা ম্লান।
‘লােকে তােমাকে ভালােবাসা সম্বন্ধে সাবধান করে দিতে
আসবে। বলবে, হৃদয়কে বিশ্বাস কোরাে না। হৃদয়কে বিশ্বাস
করবাে না, আমার রক্তের স্পন্দনকে বিশ্বাস করবে না, আর
বিশ্বাস করবে তােমাদের কথা ! তাদের মনে কেবল ভয়,
বুঝি ভুল করলুম, বুঝি এ থাকবে না। তারা সব কটা আঙুল
দিয়ে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় ; আর তবু যখন
আঙুলের ফাক দিয়ে খসে পড়ে, দোষ দেয় ভালােবাসার।
বলে, ভালােবাসা একটা বিলাসিতা ; অনেক আড়ালে, অনে"
যত্নে রাখতে পারলে তবে তা বাঁচে, অত সময় আমাদের কই ?
কিন্তু ভালােবাসা কি হীরের একটা টুকরাে যে তাকে অনেক
যত্নে আড়াল করে রাখবে ? তা একটা স্রোত, জীবনের সঙ্গে
তা মিশে যায়। আদরে আর বিরােধে, তিক্ততায় আর
আনন্দে তা বয়ে চলে, তা বয়ে চলে ; জীবনের ঢেউ তাকে
ঠেলে নিয়ে যায় ; সংঘর্ষে তা নতুন হয়ে ওঠে ; বছরের পর
বছরের বাঁচার ভিতর দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ করে তােলে ।
তা আলাদা করে রাখবার, আড়ালে লুকিয়ে রাখবার জিনিস
নয় : তাকে অর্জন করতে হবে এই জীবনে, যেখানে ক্লান্তি,
যেখানে গ্লানি, যেখানে উৎসবের মধুরতা। সেখানেই মিথ্যা,
যেখানে আমরা তাকে ‘পবিত্র’ বলে জানি; কেবল উৎসবের,
কেবল সৌগন্ধ্যের। সব সময় মনে থাকে ভয়, বুঝি একটু
মলিনতা লাগলাে তার গায়ে। দারিদ্র্যের সঙ্গে, কোনােরকম
কুশ্রীতার সঙ্গে, কোনাে বেসুরের সঙ্গে তাকে দেখতে পারিনে।
এই বুঝি
গেলাে ! এই বুঝি গেলাে ! একে আমরা বলি
ভালােবাসার দায়িত্ব—আমরা যারা উন্নত, যারা মার্জিত,
সূক্ষ্ম হৃদয়বৃত্তিসম্পন্ন। আর সঙ্গে-সঙ্গে অবিশ্যি ভালােবাসা
মরে যায়। কী করে তা বাঁচতে পারে যদি তা না হয়
স্রোত : যদি জীবনের ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে তা বয়ে’ না চলে ?
জীবনের মূল উৎসে যদি তা সঞ্চারিত না-হ’লল, তাহলে
তা বার-বার নতুন করে নিজেকে সৃষ্টি করবে কোন্ শক্তিতে?
যারা বলে ভালােবাসা থাকে না, তারা জানে না এই রহস্য।
ভালােবাসা থাকে, হয়-তােত তার বাইরের রূপ বল্লায়। আর
বয়েস যত বাড়তে থাকে, আমরা পরস্পরের মধ্যে পাই উষ্ণতা,
পাই স্নেহ, পাই শান্তি। অনেক বিক্ষোভ, অনেক সংগ্রামের
পরই তা আসে,
শান্তি। সেটা প্রয়ােজন ।
আর সেইজন্য সেই বিক্ষোভ আর সংগ্রামও প্রয়ােজন।
ভালােবাসা বিলাসিতা নয়, সেটা প্রয়ােজন, জীবনের প্রয়ােজন।
যত দিন যাচ্ছে, ততই আমি সেটা উপলব্ধি করছি। এমন
ভয়ঙ্কর এই প্রয়ােজন কে জানতাে!
বাসব এক হাত দিয়ে ঢাকলে তার মুখ । কয়েক মুহূর্ত
নিঃস্পন্দ স্তব্ধতা। তারপর সে সরিয়ে নিলে হাত, উঠে দাড়ালাে
চেয়ার ছেড়ে।
‘রাত বাড়ছে, বাসব বললে ।
স্নেহের সেই
৪
কী ভয়ানক, রাস্তায় বেরিয়ে কপিল বললে ।
বাইরে, রাত্রির রঙিন ভিড়। নগর কথা বলছে, প্রলাপ
বকছে। আগাছার মত, ভেসে-চলা সমুদ্রের-লতার মত
পুরুষ আর মেয়ে-দাড়িয়ে আছে, হেঁটে যাচ্ছে, চীৎকার
করছে, হাত-পা নাড়ছে। সমস্ত দিন ওরা কোথায় থাকে
-আর রাত বাড়বার সঙ্গে-সঙ্গে কোথা থেকে উঠে আসে,
মাটির তলা থেকে যেন। দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্নের অবাস্তবতা
এদের মুখে। এরা রাত্রির জীব, নগরের রঙিন রাত্রির ;
নগরের অবাস্তব, উন্মত্ত নিশীথের এরা।
ভােরের আলাের
সঙ্গে-সঙ্গে এরা মিলিয়ে যায়; আর তবু—শূন্য রাস্তাও যেন
এদের আতঙ্ক ভুলতে পারে না।
কী ভয়ানক, কপিল আবার বললে ।
তাদের দিকে সে তাকিয়ে রইলো। অন্ধকারের ভিতর
দিয়ে অনেক মশাল নিয়ে মিছিল চলে গেলাে, দেয়ালে দীর্ঘ,
কালো ছায়া ফেলে’–এরা সেইরকম। সেই অস্পষ্ট, অদ্ভুত
ছায়ার মত। দ্রুত এদের গতি, দেয়ালের গায়ে দ্রুত-বিসর্পিত
ছায়া। আর যে-আলাে এদের মুখে পড়েছে তা ধোয়ায়
ভরা ; থেকে-থেকে অস্থির, পাটল নৃত্যে তা লাফিয়ে উঠছে।
আর তারই ভিতর দিয়ে কপিলের বাস চলেছে।
কোণে বসে’ সে চোখ বুজলাে। একটা বাড়ির ভিতর
থেকে স্ত্রীকণ্ঠের বিহ্বল, বিলােল হাসির শব্দ তার কানে
এসে লাগলাে। কিন্তু এ-ই তাে জীবন। একেবারে কঁচা,
খােসা-ছাড়ানাে জীবন। এই বিস্ত, বিশৃঙ্খল মেয়ে আর
পুরুষের মিছিল। এই উন্মত্ততা। এই শূন্যতা।
জীবনকে জানতে হয়, লােকে বলে। সমস্ত দিক থেকে
জীবনকে জানতে হয়। কিন্তু তা আরম্ভ করবাে কোন্খান
থেকে ? নগরের এই রঙিন রাত্রি থেকে কি ? আমাকেও
কি হতে হবে দেয়ালের উপর একটা অস্থির, অদ্ভুত
ছায়া? তাহলে, আর-কিছু না
হােক্, জানবার তৃপ্তি
তাে পাবাে।
কিন্তু সব কি আমরা জানতে পারি? যতটুকু আমরা
জানতে পারবাে, আমাদের জন্ম-গত স্বভাব কি তার সীমা
টেনে দেয় না ? তার উপর কোনাে হাত নেই আমাদের।
আমার মধ্যে যা নেই, আমার বিশ্বে তা নেই।
শুধু
সেটুকু আমি জানতে পারি, আমার নিজের মধ্যে যা
আছে। বাইরে থেকে, জোর করে যে-জানা, সেটা ভুল,
সেটা মিথ্যা। তাতে কেবল নিজের ক্ষয়।
এই রাত্রি আমার নয়, কপিল মনে-মনে বললে, ছায়ায়
আর পাটল আলােয় জালি-কাটা এই নগর-রাত্রি।
আমি কেবল দূর থেকে দেখতে পারি, দেখে সরে যেতে
পারি। এ যদি জীবন হয়, আমার জীবন তা নয়। তার
একে
৫৮
ভালাে লাগলাে যে বাস এরই মধ্যে রাত্রির কেন্দ্র পার
হয়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত রাস্তায় এসে পড়েছে।
আর তবু-আমরা কী ? আমরাও তাে দেয়ালের গায়ে
অদ্ভুত কালাে ছায়া, মশালের আলােয় নাচছি ? বাসব
সে কী ? শুধু
তার পটভূমিকা
পটভূমিকা আলাদা।
সেখানকার রঙের বিন্যাস একটু অন্যরকম। কিন্তু একই তাে।
সেখানেও তো এই অবাস্তবতা, এই উন্মত্ততা, এই
শূন্যতা।
কিন্তু এরা কাদে না, এই রাত্রির যারা জীব, এরা
বলে না। এরই মধ্যে এরা জন্মেছে, এর বাইরে
কিছু এরা জানে না। এরা কঁদে না, এরা ভাবে না।
এরা কেবল দেয়ালের উপর মুহূর্তের ছায়া-চিহ্ন, প্রতি রাত্রে
ফুটে ওঠে, প্রতি প্রভাতে মুছে যায়।
তা নয় বাসব। যদি সে হয় দেয়ালের উপর ছায়া,
তাহলে যে-আলাে সেই ছায়া ফেলেছে সেই আলােও সে ।
এ তাে তারই আত্ম-প্রসারণ—তার সেই ছায়ামূর্তি। নিজের
কাছ থেকে সে
পালাতে চায়, নিজের আলাে থেকে।
তার আলাের আড়াল থেকে সে দেখছে, তাকে দেখতে
হচ্ছে, দেয়ালের উপর তার ছায়া-নাচ। আর কী যন্ত্রণা,
নিজের ভিতরে এই দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবার কী যন্ত্রণা ।
ভালােবাসবার প্রয়ােজন। ভালােবাসা পাবার প্রয়ােজন।
কী অদ্ভুত এই প্রয়ােজন, কী নিষ্ঠুর। তা মেটাতেই হবে।
অথচ কী করে তাকে পাওয়া যাবে কেউ জানে না।
-যায় ?
কেবল ঈশ্বর পারেন ফুল ফোটাতে। আমরা শুধু চুপ করে’
বসে থাকতে পারি।
আর যদি তা কখনাে না-আসে? যদি তাকে পাওয়া
তাহলে সেই অপরিসীম অভাব নিয়েই বাঁচতে
হবে, তবু বাঁচতে হবে । কোনাে উপায় নেই, কিছু
করবার নেই। সমস্ত বাসনা, সমস্ত উত্তপ্ত উৎসুকতা শূন্যতায়
ঝরে পড়বে, মিলিয়ে যাবে। কী অপচয়, কী ভয়াবহ
নিষ্ফলতা।
মিনুর ছােট, উষ্ণ হাতের স্পর্শ তার মনে ফিরে এলাে,
সেই স্পর্শ যেন এখনো রয়েছে তার হাতে। সেখানে যেন
জ্বলছে সদ্যোজাত, স্বাধীন কোনাে প্রাণ, যেখানে সে তাকে
স্পর্শ করেছিলাে। এ-ই কি ভালােবাসা?
কিন্তু এটা ঠিক যে কপিলের জীবনে নতুন সুর এসেছে।
সে জেগে উঠেছে নতুন একটা অনুভূতিতে। এ আমি
কখনাে জানিনি, মনে-মনে সে বললে। এই অদ্ভুত প্রয়ােজন,
আর এই ব্যথা ! কে জানতত ভালােবাসার এমন অসীম
ক্ষমতা আমার মধ্যে রয়েছে। আমি যে এত ভালােবাসতে
পারি তা কি আমিই জানতুম !
আর এর পর-ভাগ্য এ নিয়ে কী করবে? সেই
সার্থকতা কি আসবে? না কি, আস্তে-আস্তে, অলক্ষিতে,
সময়ের সঙ্কীর্ণ আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এ ঝরে’ পড়বে
শূন্যতায়, নিঃশেষ হয়ে যাবে নিষ্ফলতায়?
যদি তা-ই হয় ? ওকে যদি হারিয়ে ফেলতে হয়
সময়ের অন্ধকার গলিতে? আর কপিলের হৃৎপিণ্ড হঠাৎ
যন্ত্রণায় মুচড়িয়ে উঠলাে, সেই কথা ভেবে।
আর মুহূর্তে সে উপলব্ধি করলে বাসবের মনের ভীষণ,
বিশাল হতাশা। তার মত এমনি প্রশ্ন সে অনেক হয়তাে
করেছে মনে-মনে। আজকাল আর করে না। তবু—এমনি
করে’ তারও হৃৎপিণ্ড হাঁপায়, ভেঙে পড়তে চায়। কী করে’
সইছে সে? কিন্তু সইতেই হবে, সইতেই হবে। আর বাসবের
ভিতর থেকে তা ঠেলে ওঠে, মাথা খুড়ে মরে—আর ঐ তাে সে,
অনেক লোকের, অনেক কথার নিঃসাড়তার মধ্যে। সে পেয়েছে
তার নেশা, যাতে সে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পারে তখনকার
মত। তার এই বাইরের জীবন—তাকে নিজের চারিদিকে
বুনে নিয়েছে বৰ্ম্মের মত। বাঁচতে হবে তাে।
কিন্তু সে, কপিল—বাইরের জীবনের এই নেশাও তার
নেই। কী আছে তার? তার কি আর্ট ? তার কি ঈশ্বর ?
বজ্রের মত ভয়ঙ্কর বাণী কি তার? সে ভেবে দেখলে। সে
ভেবেছিলাে তপস্বীর মত কাটবে তার জীবন, নিজের মধ্যে
আবদ্ধ। কী মূঢ়তা, কী অন্ধ মূঢ়তা। নিজেকে কেবলই
ফেনিয়ে-ফেনিয়ে পৃথিবীকে ভরে’ তােলা। বইয়ের মধ্যে নিজেকে
পড়া, আকাশের তারায় নিজেকে দেখা, কোনাে মেয়ের উৎসুক,
সানন্দ স্বরে নিজেকে শােনা। এই তত তােমার তপস্বীর
জীবন! সে আরাে ভেবে দেখলে। আর তার মনে হলাে
তার জন্য আর-কিছু নেই, আর-কিছু নেই ; শুধু আছে মিনুর
নরম উষ্ণ হাত।
;
৬১
সেই রাত্রে বাড়ি ফিরে সে কোনাে কাজ নিয়ে বসলাে না।
বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে রইলাে
অন্ধকারে। ঘুম তার
একেবারেই পাচ্ছিলাে না; তবু যেন তার ভালােই লাগছিলো
স্তব্ধ হয়ে শুয়ে থাকতে, অন্ধকারের মধ্যে তাকিয়ে। আর চিরকাল
এটা ছিলাে তার জীবনের একটা আতঙ্ক—যদি বিছানায় শুয়ে
ঘুম না আসে। কিন্তু আজ যেন
কিন্তু আজ যেন আর এই অন্ধকারকে
তার ভয় নেই, এই নিঃসঙ্গতাকে। কী যেন, এটা ভালাে
লাগছে। কী ব্যথা, মিনুকে ছেড়ে এই চলে আসা। তখন
সে কিছু টের পায়নি; কিন্তু এখন তার হৃৎপিণ্ড টন্ করছে
টন্টন্ করছে। আর তবু কেমন যেন তার ভালােও লাগছে
ভালাে লাগছে এই রাত্রি, রাত্রিতে মিশে গিয়ে তার এই
চুপ
করে শুয়ে থাকা।
পরের দিন তার কাজ ছিলাে সহরে। সমস্তটা দুপুর তাকে
কাটাতে হ’লাে পয়সা করবে বলে পণ করেছে এমন সব লােকের
সঙ্গে পয়সার আলাপে। এ-রকম তাকে করতে হয় মাঝে-
মাঝে। তখন সংসারের মােটা মােটা, স্যাঁৎসেঁতে আঙুলগুলাে
বেশ ভালাে করেই লাগে তার গায়ে।
কিন্তু গায়ে সে
মাখে না। সেটা নেহাৎই তার বাইরের খােলস, যেখানে লাগে
সংসারের চড়-চাপড়। তার ভিতরটা সব সময় অনুপস্থিত।
আর ফেরবার সময়, সে-সমস্ত সে বাইরে রেখে আসে, বাড়ি
পর্যন্ত বয়ে নিয়ে আসে না—যদিও তখনকার মত মন হয়তাে
খারাপ লেগেছিলাে, হয়েছিলাে রাগ।
একদিক থেকে, সে বুঝেছিলাে, এটাই বাঁচবার উপায় ।
৬২
এই ভােলবার ক্ষমতা, মনে না-করবার, মনে না-রাখবার ক্ষমতা। পৃথিবীর সমস্ত ছােটখাট আঁচড় আমাদের যেটুকু নেবার তা তো নিচ্ছেই; তার উপরেও যদি তা নিয়ে আমরা ভাবতে যাই, তাহলে বাচবাে কখন ? কিন্তু সেদিন সহরটাকে তার মনে হলাে যেন অতিকায় কুৎসিত একটা জন্তু ; তারে-তারে, চাকায়-চাকায় সে ডাক ছাড়ছে, কাকে তেড়ে মারতে আসছে তৃপ্তিহীন, হিংস্র আক্রোশে, দাঁত দিয়ে তার গড়াচ্ছে ব্যস্ততার ফেনা। মানুষের নিজের হাতের সৃষ্টি, এই বীভৎস জন্তু। মানুষ তাকে দিয়েছে তার নিজের প্রাণের অংশ। মানুষের হাত তৈরি করেছিলাে বাগান, তুলেছিলাে মন্দির , তার আনন্দ ফুটেছিলাে ফুলে, আকাশের দিকে উঠেছিল তার পাথরের স্তব। কিন্তু তার শেষ কীৰ্ত্তি তখনাে বাকি ছিলল: আধুনিক কালের এই সহর, বাতাস যেখানে ভরে গেছে যন্ত্রের চীৎকারে, আর ব্যবসার ঘূর্ণিস্রোতে মানুষ কুটোর মত ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষ একে তৈরি করলে নিজের হাতে, তারপর স্তম্ভিত হয়ে গেলে নিজেই। ব্যবসার এই বিশাল, জটিল, সৰ্বব্যাপী চাকা, দারুণ বেগে তা ঘুরছে, অবিশ্রান্ত প্রদক্ষিণ করছে নিজেকে, কী করে তা চলছে কেউ জানে না, কারাে ক্ষমতা নেই তাকে থামাতে পারে। আর আমরা সবাই আটকা পড়েছি তার মধ্যে, সবাই, কেউ বাদ নেই; তারই ঠেলায় তাে আমরা ছিটকে পড়ছি এখান থেকে ওখানে ; ছটফট করছি, কাৎরাচ্ছি, গােঙাচ্ছি, তার চাপে রক্ত আমাদের শুকিয়ে গেলাে। তারই ঠেলায়, কপিল ভাবলে, আমাকে আসতে হয়েছে
এদের কাছে, এই সব লােক, মাকড়শার মত মানুষ, ব্যবসার
সেই পরম চাকার মধ্যে ছােট-ছােট এক-একটি চাকা; সেই
বিরাট ঘূর্ণনের অংশ, কিন্তু এরাও ঘুরছে নিজেদের চারদিকে,
অবিশ্রান্ত। ধূসর মানুষ, কেশহীন, রক্তহীন, তাদের কোনাে
বয়েস নেই, তাদের সুখ নেই কি দুঃখ ; তাদের হলদে চোখে
শুধু লােভের ভীষণ একাগ্রতা। যীশুকে দোষ দিয়ে বলেছিলেন
কবি : তােমার নিঃশ্বাসে পৃথিবী ধূসর হয়ে গেলাে কিন্তু সেই
কবি যদি দেখতেন আজকের এই ব্যবসা-ধূসর পৃথিবী, যীশুকে
ক্ষমা করতে পারতেন তিনি। এদের প্রত্যেক নিঃশ্বাসের সঙ্গে
আকাশের রঙ একটু করে মুছে যাচ্ছে। উচিত নয় এদেরকে
নিঃশ্বাস ফেলতে দেয়া। আর তবু, কপিল ভাবলে, এরাই
খুব সহজে, নিশ্চিন্ত আরামে নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে ; আর
আমাকেই এসে বসে থাকতে হচ্ছে এদের কাছে, যাতে নিঃশ্বাস
ফেলবার পবিত্র অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। লােভ,
লােভ ; সেই বিরাট, নিদারুণ চাকাকে যা ঘােরাচ্ছে তা লােভ ;
এই মানুষদের হলদে, শক্ত দৃষ্টিতে লােভ, লােভ ; আর এদের
শক্ত একটানা কণ্ঠস্বরে লােভ, লােভ। কপিল তা বরাবর
জেনে এসেছে, তবু আজ যেন সে তা নতুন করে উপলব্ধি
করলে। আর তার সমস্ত জঠর যেন নিজেকে উগরে ফেলতে
চাইলাে, বিতৃষ্ণায়। কেমন করে’, যেন তার নাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে
গেছে ব্যবসার এই জটিল জালের একটা বিষাক্ত সুতাে, তাকে
উগরে ফেলতে হবে।
আর যখন সব কাজ তার শেষ হলাে, তার মনে হলাে
;
৬৪
সমস্ত শরীরে আর মনে এমন ক্লান্ত জীবকে কখনাে তার
লাগেনি। পরিষ্কার দিনের আলােয় এই সহরের দিকে সে
যেন তাকাতে পারছে না। সূৰ্য্য আর তত উজ্জ্বল নয়, মানুষের
লােভ তার মুখ ঢেকেছে।
আমাকে যেতেই হবে, সে ভাবলে,
এখান থেকে আমাকে চলে যেতেই হবে। আমাকে যেতে
হবে সূর্যের আরাে কাছে।
সে ব্যবস্থা করে ফেললাে দু একদিনের মধ্যেই। তারপর
কলকাতা ছেড়ে চলে এলাে সাঁওতাল পরগনার এক ছােট্ট
সহরে, যেখানকার মানুষের সব চেয়ে বড় উত্তেজনা এই যে
রাত্তিরে রেলের লাইন দিয়ে নীল-আলো-জ্বালা মস্ত ডাকগাড়ি
ছুটে যায়। সেখানে সে নিলে ছােট একটা বাড়ি, কিছুদিন
থাকবে বলে। একেবারে একা ; একটা লােক শুধু আছে,
সে রেধে দেয়। বড় ভালাে লাগলাে তার যে এখানে
সকালবেলা উঠেই খবরের কাগজের মুখ দেখতে হয় না।
আর তার
মনে নামলে শান্তি। এখানে আকাশ
আছে। এখানে আকাশ সমস্ত পৃথিবী ভরে’ ছড়িয়ে আছে।
এক পা চললেই যেন আকাশের উপর হোঁচট খেয়ে পড়তে
হয়। যে-কোনাে দিকে তাকালেই আকাশের উপর চোখ
গিয়ে পড়ে। আর এত ভালাে লাগে, আকাশের দিকে
চুপ করে তাকিয়ে থাকতে
থাকতে এত ভালাে লাগে। প্রথম
কয়েকদিন, কপিল তা ছাড়া আর কিছুই প্রায় করলে না।
আর আকাশে তার আত্মা ভরে উঠলাে—কোনাে দুর্লভ,
স্বচ্ছ "সুরায় স্ফটিকপাত্র যেমন ভরে উঠতে পারে।
এমন নীল
কতদিন সে দেখেনি। সকালবেলায় স্নান, নতুন সূর্যের
জ্যোতিতে অস্পষ্ট। আর দুপুরবেলায়, সূর্যের আলো যখন
সব দিকে সমান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, সমস্ত আকাশ একটা
বিশাল, অখণ্ড নীলার মত জ্বলে ওঠে। বিশ্বাস হয় না, এত
নীল। সূৰ্য নামে পশ্চিমে, বিকেলের আকাশ নরম, সমস্ত
দিনের পর অলস-হয়ে-আসা যেন। লাল সূৰ্য্য আগুনের একটা
নীড় হয়ে ওঠে, দিগন্তে ডুবে যায় ; আকাশের চোখে যেন ঘাের
লাগে। কোথায় একটু লালচে আভা ; ক্লান্ত, আহত দিনের
রক্তস্রোত অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। তারপর অন্ধকার।
বিস্ময়ে কপিলের নিঃশ্বাস আটকে যায় ; কৗ সত্যিকারের
এই অন্ধকার। যেন হঠাৎ কালাে একটা সমুদ্র উথলে উঠলাে-
দিগন্তকে নিয়ে গেলে ভাসিয়ে। আর সেই অন্ধকার ভরে’
সমস্ত আকাশ যেন তারায়-তারায় গান করে ওঠে।
প্রথম গ্রীষ্ম—দুপুরবেলায় হাওয়া তেতে ওঠে। গাছগুলাে
তাদের সমস্ত পাতা ঝরিয়ে দিয়েছিলাে, এইবার নতুন করে
ভরে উঠছে। কোনাে-কোনাে গাছ এখনাে নগ্ন, প্রতীক্ষায়
স্তব্ধ। হাওয়ায় ওঠে শুকননা, হলদে পাতার ঘূর্ণি ; কাঠবিড়ালি
খামকা চমকে উঠে ছুটে যায়। লাল রাস্তা দিয়ে যায় গােরুর
গাড়ি, নেংটি-পরা ছােট ছেলে চুপ করে দাড়িয়ে তা-ই দেখে ।
শুধু এ-ই। এ-ই নিয়ে সমস্ত দিন, সেই আকাশের মাঝখানে।
দিগন্তে ঘন-নীল রেখা, সকালবেলায় কান্নার চোখের মত
ছলােছলে। পাখিরা চাচামেচি করে নতুন আলােয় ; আর
বিকেলের ছায়া যখন দীর্ঘ হয়ে আসে, তাদের ডানা-ঝাপটানির
••
শব্দে আকাশ ভরে যায়। গােরা তাকিয়ে থাকে ঘুমে-ভরা
চোখে। হাওয়ায় শিরশির করে ওঠে গাছগুলাে।
শুধু
এ-ই। এ-ই নিয়ে সমস্ত দিন। আর রাত্রি ভরে’
অন্ধকার, আর তারা। আর আছে সেই-সব চাদের রাত্রি,
চাদ যখন বুকের উপর এসে লুটিয়ে পড়ে। কখনাে সে ক্ষীণ
আর বাঁকা, কোনােরকম করে’ আকাশকে আঁকড়ে রয়েছে যেন,
তবু সে আমাদের রক্তকে টেনে তুলতে চায়। আর আছে
জ্যোছনার বন্যার রাত্রি ; এত জ্যোছনা, চাদ নিজেই হারিয়ে
যায় তার মধ্যে। তারপর কৃষ্ণপক্ষ : হঠাৎ মাঝরাতে লাল
হ’য়ে ভাঙা চাঁদ উঠলাে, মাঠের বুকে অদ্ভুত সব ছায়া উঠলাে
লাফিয়ে। কিন্তু সব সময়, যে-কোনাে অবস্থায়, বুকের উপর
এসে সে ধাক্কা মারে, রক্তকে টেনে তােলে তার দিকে, যেন
জোয়ারের উচ্ছাসে ।
এখানে তারা অনেক কাছে-আকাশ, আর আকাশের
চাদ আর তারা—এখানে তারা জীবন্ত। এখানে তারা দরজায়
এসে ভিড় করে। ঘা দেয় বুকে। এখানে তারা সমস্ত
জীবনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ; মিশে যায় রক্তে। এখানে
তারা বলে।
কী বলে? কপিল তা বােঝে না, বুঝতে চায় না। শুধু
তার মনে হয়, কী যেন সে পেয়েছে, এতদিন পরে কী যেন
সে ফিরে পেয়েছে। আর এক-এক রাত্রে, যখন তার সাদা
বিছানায় জ্যোছনা লুটিয়ে পড়ে, তার চোখ জলে ভরে ওঠে,
সেইদিকে তাকিয়ে।
৬৭
আর এখানে পৃথিবীতে যে-স্তব্ধতা, তা এলে তার মনেও।
সে স্বচ্ছ, স্তব্ধ একটা দিঘির মত হয়ে উঠলাে, যেখানে আকাশ
প্রতিফলিত। এখন পড়বার সময় ; কাব্যের রহস্যের আর
রােমাঞ্চের। কলকাতা থেকে সে আনালে বই। কখনাে সে
পড়ে, কখনাে সে চুপ করে বসে থাকে : কখনাে নিজে একটু
লেখে ; কখনাে কলম রেখে দিয়ে বসে-বসে ভাবে।
এক সাঁওতাল মেয়ে ইদারা থেকে তার স্নানের জল তােলে, বাসন মাজে ; তার দীর্ঘ, সবল বাহুর কালাে রঙ, রােদে চিকচিক করে। একদিন সে কপিলের চোখে পড়লাে। বাড়ির সামনে অনেকখানি ফাকা জমি ; সেখানে বিকেল- বেলায় সে শুকনাে পাতা আর কাঠের কুচি কুড়ােচ্ছে, বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। তার পরনের কাপড় কুসুম ফুল দিয়ে হলদে রঙ করা। আঁচল কোমরে জড়ানাে। সবগুলাে এক জায়গায় সে জড়াে করলে, তারপর আঁচলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাে। কপিল ছিলাে দাড়িয়ে ; তাকে দেখেই মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলে। , তারপর তার ফুলে’-ওঠা আঁচলটা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে বিকেলের আলাের ভিতর দিয়ে মাঠ পার হয়ে চলে গেলাে। পরের দিনও সে অমনি যখন পাতা কুড়ােচ্ছ, কপিল এগিয়ে এলাে তার কাছে। মেয়েটা চোখের কোণ থেকে তাকে দেখলে ; তারপর কোমর থেকে আনত তার শরীর সােজা করে’ তুলে দাড়ালাে। কপিল জিজ্ঞেস করলে, রােজ-রােজ পাতা নাও কেন? একটু দূরে
মেয়েটা ভুরু বাঁকিয়ে তার সাঁওতালি বাঙলায় বললে,
‘এ-সব পাতা দিয়ে আর কী হবে? তবে তুমি যদি রাগ করে
আর নেবাে না।
কপিল মনে-মনে হাসলাে। এই সমস্ত পাতা, ঝরে-পড়া
ডালের ছােট্ট কুচিটুকু পর্যন্ত তার। সে ভাড়া দেয়। তার
অধিকারের মধ্যে সমস্ত ।
সমস্ত। আর এই সাঁওতাল মেয়েও
তা জানে।
‘এ-সব দিয়ে কী করে? সে আবার জিজ্ঞেস করলে, তার
কণ্ঠস্বরে সাঁওতালি সুর আনবার চেষ্টা করে।
‘আগুন জ্বলে। রান্না হয়।
মেয়েটা নির্ভীক চোখে কপিলের দিকে তাকালাে। তার
জট-বাধা চুল তেলের অভাবে লালচে। তার মুখের ছাদ সুশ্রী
নয়; কিন্তু তার দীর্ঘ, দৃঢ় শরীর নিখুত আয়নার মত নিটোল।
কপিল জিজ্ঞেস করলে, তােমার নাম কী ?
একটু চুপ করে থেকে মেয়েটা বললে, ‘ঝমর।
‘ঝমর ? কপিল ঠিক ধরতে পারলে না প্রথমটায়।
‘ঝমর।—পাতা নেবে? একটু পরে, একটু উদ্বিগ্নস্বরে
মেয়েটা জিজ্ঞেস করলে।
‘নাও না।
ঝমর আবার নিচু হয়ে কুড়ােতে আরম্ভ করলাে।
তার পিঠের বাঁকা রেখা বিকেলের আকাশের নিচে স্পষ্ট আর
তীক্ষ। কপিল একটু তাকিয়ে রইলো, তারপর আস্তে-আস্তে
ঘরে গিয়ে ঢুকলাে।
१०
;
আর-একদিন সকালে সে তাকে দেখলে, মস্ত ধামা মাথায়
চাপিয়ে তার স্নানের জল এনে রাখছে। তার দুই দীর্ঘ,
কালাে হাত উপরের দিকে তােলা, শক্ত আঙুলগুলাে ধামার
ধার আঁকড়ে রয়েছে। শ্রমের চাপে চোখের দৃষ্টি তার স্থির।
কপিল বারান্দায় বসে ছিলাে; সে তার পাশ দিয়ে, তাকে
পার হয়ে গেলাে স্নানের ঘরে, তাকে দেখলেই না যেন।
কোমর বঁকিয়ে সে ধামা নামালে, তারপর স্নানের টবে
ছলছলিয়ে ঢাললে জল। দূর থেকে কপিল অস্পষ্ট দেখলে।
সে ফিরে এলো, হাতে তার শূন্য ধামাটা ঝােলানাে ;
গেলাে বাইরে ইদারার ধারে ; দড়ি-বাঁধা বালতিতে করে’
জল টেনে-টেনে ধামা ভরলাে ; একটু থমকে দম বন্ধ করে’
সেটা তুলে নিলে মাথায় ; তারপর আবার গেলে কপিলকে
পার হয়ে স্নানের ঘরে।
কপিল চুপ করে তাকিয়ে দেখলে। এই শান্ত, উজ্জল
সকালবেলার সঙ্গে এই কালাে মেয়ের অঙ্গ-চালনার ভঙ্গির
কোথায় একটা মিল ছিলো যেন।
বিধাতা এর শরীরে সুষমা দেননি। যে-সুষমা প্রতি
অঙ্গের পারস্পরিক ছন্দে, যে-লাবণ্য মুখের লক্ষ সূক্ষ্ম ভাবনার
ঢেউ-খেলানােয়, তা থেকে এ বঞ্চিত। কেননা সেটা মানুষের
সৃষ্টি। সেটা মানুষের নিভৃত অবসরের রচনা। একদিন
কোনাে মেয়ে আয়নায় তার মুখ দেখেছে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ;
একটি অলক খসে পড়েছে কপালের উপর—তা সরাতে
গিয়ে বাহুর এক অপরূপ ভঙ্গি সে আবিষ্কার করেছে।
৭১
আর-একদিন কোনাে পুরুষ তা দেখে মুগ্ধ হয়েছে : সে-কথা
বলেছে তার কানে-কানে। এমনি করে শরীরের সুষমা
আমরা তৈরি করেছি—হাজার দিনের ভিতর দিয়ে, হাজার
ভাঙা মুহূর্তে, হাজার আলস্যের স্বপ্নে। সে-সুষমা আছে
বন্য পশুতে, কিন্তু যে-মানুষ সভ্যতার দৌড়ে একেবারেই
পেছিয়ে আছে তার মধ্যে নেই। অন্তত আমাদের চোখে
তা লাগে না।
কিন্তু এই মেয়ের শরীরের সবল, নির্ভীক গতির রেখা
তাতে কী আছে, যা প্রায় সৌন্দর্যের মত। যখন সে স্থির হয়ে
থাকে, তাকে মনে হয় একতাল কাদা, এখনাে ঈশ্বরের আঙুল
তাকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু যখন সে চলে, যখন সে কাজ করে,
যখন সে দড়ি টেনে-টেনে ইদারা থেকে জল তােলে—তখন তার
দেহ-রচনার কুশ্রীতাকে ছাড়িয়ে অন্য কিছু বেরিয়ে আসে
কাজের মধ্যে সে এমন আত্ম-অচেতন ; তার বাহুর, তার
আঙুলের, তার সমস্ত অঙ্গের নিঃশব্দ গতি-রেখা এমন স্বতঃস্ফূর্ত
স্রোতে ঝরে পড়ে তার চারদিকে। এ তত প্রায় সৌন্দৰ্য্য,
এই স্তব্ধ সূর্যালােকে তার কাজের নিঃশব্দ গতি-রেখা।
কোনাে অভিযােগ এর নেই। সহজে এ কাজ করে, সব
সময় এ কাজ করে, নদী যেমন তার নিজের জল বয়ে নিয়ে-নিয়ে
যায়। কখনাে বলে না, ‘উঃ, মরে গেলুম।' কখনাে মনে আনে না,
‘আর পারিনে, আর পারিনে।' এ তার রক্তের মধ্যে মিশে
গেছে—এই কাজ। যখন অন্যের কাজ শেষ হয়, তখন সে তার
নিজের কাজ নিজে তৈরি করে নেয়। শালের পাতা দিয়ে ঠোঙা
তৈরি করে। আর পুরােনাে কাপড়ের পাড় ছিড়ে-ছিড়ে চুল
বাঁধবার দড়ি। কোথা থেকে খুঁজে-খুজে কী সব ফুল আর লতা
জোগাড় করে আনে কাপড়ে রঙ করবে বলে। সব সময় সে
কাজ করছে—যদিও সে তা জানে না।
কাজ তাে এমনি হওয়া উচিত। কাজকে যখন ভার হয়ে
উঠতে দিই, তখনই তাে আমরা, মরি। আর তাই, আমাদের
সভ্য জীবন দীর্ঘ একটা চীৎকার হয়ে উঠছে : আর পারিনে।
আর পারিনে ! এতটুকু কাজ আমরা করবাে না, একবার
প্রতিবাদ না-করে। আমাদের মেয়েরা সংসারের সব কাজই
হয়-ততা করে, কিন্তু তাদের মুখ থেকে এ-কথা কখনাে মিলােয়
: মরে গেলুম, আর পারিনে। আর তাই, ও-সব কাজ
তাদের অবিশ্যি করা উচিত নয়, কখনাে করা উচিত নয়।
শূন্যতায়, শূন্যতায় তারা পচে থাকু, তবু যেন তারা কাজ না করে।
আর আমরা পুরুষরা সমস্ত দিন ভরে’ ছুটোছুটি করি, ছটফট
করি, প্রতি মুহূর্তে ভাগ্যকে আমরা শাপ দিই, নিজের জীবনকে
ছিড়ে ফেলতে চাই কুচিকুচি করে’—আর এমন ক্লান্তি, এমন
বিতৃষ্ণা নিয়ে বাড়ি ফিরি যে আর-কিছু তখন আমাদের করবার
থাকে না। বাকি সময়টুকু আমরা মৃত। তাই যদি হয় তবে
ফেলে দাও কাজ, দু’হাতে তুলে নিয়ে আছড়ে ভেঙে ফেলল।
আর তাতে যদি সভ্যতা থেমে যেতে হয়, মানুষকে লুপ্ত হতে হয়
পৃথিবী থেকে, তা-ই হাে : তাতে কিছু এসে যায় না।
কেননা এটা সত্যি যে প্রত্যেক মানুষেরই কাজ করা
উচিত। তা ছাড়া কী আমরা করতে পারি? কিন্তু সে-কাজ
१७
যেন মিশে যায় আমাদের রক্তের মধ্যে ; কাজ যখন করছি তখনও যেন তাকে ভুলে থাকতে পারি। তা যেন আমাদের নিজেদের বাইরের কিছু না হয়, বাইরে থেকে চাপাননা ; তা যেন আমাদের পেয়ে না বসে দানাের মত, বসে দানাের মত, চুলে ধরে আমাদের টেনে নিয়ে না যায় কাজের কুৎসিত উন্মত্ততায়। সত্যিকারের যেটা কাজ, তার মূল আমাদেরই সত্তায় ; আমাদেরই মধ্যে তা বেড়ে ওঠে গাছের মত, ছড়িয়ে পড়ে উৎসুখ শাখায় আর অজস্র নতুন পাতায় : আর সেই গাছ থেকে বেরিয়ে আসে ফুল, আর ফল, আনন্দে রক্তিম- প্রাণে গুঞ্জিত এই গাছ, আনন্দে আর উৎসাহে মর্মরিত। মানুষ সৃষ্টি করে এই কাজ, এই কাজে সে নতুন হয়ে ওঠে। কাজ যদি তা না হয় ; কাজে যদি কেবল টাকাই বাড়ে, ফুল না ফোটে ; যদি তার একমাত্র ফল হয় মােটরগাড়ির সংখ্যাবৃদ্ধি—তাহলে পৃথিবীর সমস্ত টাকা আর সমস্ত মােটর গাড়ি মিলেও আমাদের বাঁচাতে পারবে না। আর কপিলের ভালাে লাগলাে এই সাঁওতাল মেয়ের তন্ময় আত্ম-অচেতন কাজসে, মানুষে ক্লান্ত, কথায় ক্লান্ত, সহরে এখানেও তাে জীবন, সে ভাবলে। চিৎপুরের রাত্রি জীবনের একমাত্র রূপ নয়। বাসবের ভয়ঙ্কর হতাশা জীবনের একমাত্র জিনিস নয়। আরাে আছে। অন্যকিছু আছে। কিন্তু তা আমাদের চোখেই পড়ে না ; আর চোখে যে পড়ে না, তাও কেউ লক্ষ্য করিনে। সহরের রাত্রির মাঝ- ৭৪
খানে দাড়িয়ে আতঙ্কে যখন চোখ বুজি, তখন আমার কানের
কাছে এ-কথা বলবার লােক আছে : কী করছে? চেয়ে
দ্যাখাে, এ-ই তাে জীবন। কিন্তু যখন আকাশের দিকে
একবার চোখ তুলে তাকাইনে; লক্ষ্য করিনে ঘাসের উপর
দিয়ে তীরের মত ছুটে-যাওয়া কাঠবিড়ালিকে, আর এই
কাজে-নিঃশব্দ সাঁওতাল মেয়েকে, তখন কেউ আমাকে একবার
বলবে না : ‘দ্যাখাে, চেয়ে দ্যাখাে।
আমার ভদ্রলােকের প্রবৃত্তি বলে, কপিল ভাবলে, “মুখ
ফেরাও, এই সাঁওতালনির দিক থেকে মুখ ফেরাও।
সমস্ত শিক্ষা, শৈশব থেকে অর্জিত যত সংস্কার, সব আমাকে
অন্ধ করে রাখবে, নিঃসাড় করে রাখবে। আমি যদি
এখনাে আমার নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে
থাকতুম, তাহলে কি একে কখনাে চোখে পড়তে?
বাড়ির সামনে যে-ফঁাকা জমি, তারই এক কোণে কী
করে একটা বেলফুলের চারা লুকিয়ে ছিলাে আগাছার
জঙ্গলের মধ্যে : এক বিকেলে ঝমরকে দেখা গেলাে,
আগাছাগুলাে হাত দিয়ে উপড়ে ফেলছে, তারপর সেই
চারায় চলছে জল।
কপিল তার সামনে গিয়ে বললে, “কী করছাে?
ঝমর চমকে ফিরে তাকালাে। কাজের মধ্যে
মধ্যে একটু
থেমে বললে, ‘ফুলের গাছ। বেলফুল।
গাছ কবে বড় হবে ? কবে ফুটবে ফুল ?
‘ফুটবে শিগগিরই। জল না-পেলে তাে মরেই যাবে।
বলে’ সে হাতের জলের ঝারিটা গাছের গােড়ার উপড়ােনে
মাটির উপর খালি করে দিলে। আবার বললে, “আরাে
কয়েকটা চারা নিয়ে আসবাে, বাবু?
‘এননা, যদি তােমার খুসি হয়।
ঝমর একটু চুপ করে রইলাে। তারপর বললে : ‘এত
জায়গা রয়েছে পড়ে—একটা বাগান করাে না।
‘ফুলের ?
‘একধারে ফুলের মিঠে গন্ধ ছাড়বে রাতে। আর
অন্যদিকে তরকারি, আর শাক নানারকমের-সকালবেলায়
আমি
তুলবাে, তােমার চাকর রেধে দেবে।
‘তরকারির একটা ভাগ তুমি নেবে না?
‘তুমি যদি দাও।
‘তােমার বাড়ির সামনে ক্ষেত আছে বুঝি ?
‘সে আর কতটুকু ! তােমার জায়গা—ফেলে
রেখেছাে কেন?
কেন? তুমি যদি বলল, আমি সব
দিই।
‘কী হবে করে ? যদ্দিনে তােমার ফুল আর তরকারি
দেখা দেবে, ততদিন কি আমি থাকবাে ?
‘বাবু, তুমি চলে যাবে ?
‘যাবাে না ?
ঝমর একটু চুপ করে রইলাে৷-“কবে যাবে ?
‘দেরি আছে এখনাে।
ঝমর একটু হাসলাে; তার কালাে রঙ চিরে ঝলসে
উঠলাে তার সাদা দাত।‘তাহলে ফুলের চারা লাগানাে
যায়, বেশি দেরি তাে ওতে হবে না।
কপিল তার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বললে :
‘বেশ তাে, করাে না।
আর ঝমর কোথা থেকে সব ফুলের চারা নিয়ে এলাে
জুটিয়ে। সেই বেলের চারার কাছাকাছি সবটা জমি পরিষ্কার
করে সেগুলাে সে দিলে পুতে। দু'বেলা সে জল দেয় ;
জল দিয়ে তাকিয়ে থাকে। অন্য কাজের মধ্যে একটু ফাক
পেলেই ছুটে এসে একবার দেখে যায়।
চারাগুলাে চমৎকার বাড়তে লাগলাে। আর কপিলও
রােজ আসে, এসে দাঁড়ায় সেখানে ; দেখে, কতটুকু বাড়লাে
আর। আশ্চৰ্য্য, এই ছােট সব টুকরাে—এরই মধ্যে নিবিড়
শিকড়ে এরা দাড়িয়ে উঠেছে, এরই মধ্যে এদের গায়ে
এসেছে প্রাণের সুবুজ;
প্রাণের সুরুজ নিগ্ধ আভা। এরা বাঁচতে চায়,
এদের প্রাণের উৎসাহ ফোটাতে চায় ফুলে-ফুলে। কী সহজে
এরা বাঁচে-কী সহজে এরা মরে।
কপিল বলে :
‘সবগুলােতে কি একই সম ফুল
ধরবে ?
‘একই সময়ে।
“কী হবে এত ফুল দিয়ে ?
‘ফুল তােমার ভাল লাগে না ? ঝমর চোখ তুলে
তাকালাে।
‘কিন্তু এত ফুল!
কপিলের এ-কথাটা ঝমর ঠিক বুঝতে পারলে না।
বললে, ‘ফুল বড় ভালাে।
রােজ তাদের দেখা হয় একটু-আধটু। গােড়ার মাটি
একটু খুড়ে ঝমর জল ঢালে। আর কপিলের এত ভালাে
লাগে মাটির সেই ভিজে গন্ধ, আর গাছের পাতার ফাঁক
দিয়ে ঝরে-পড়া বিকেলের আলাের গােল-গােল সােনালি
চাকুতি, আর চারা গুলোর গায়ে প্রাণের সবুজ আভা।
এই সমস্তর সঙ্গে মিশিয়ে ঝমরকে সে দেখলে। ছােট-ঘােট
কথা হয়। বেশি কথা ঝমর বলে না ; আর কপিলের
মনে যা আসে তা বলতে গেলে সে বুঝবে না। বেশির
ভাগ সময়, ঝমর কাজ করে যায়, আর কপিল চুপ করে’
দেখে দাড়িয়ে-দাড়িয়ে। আর সত্যি, কথা বলবার কোনাে
দরকার নেই।
আর তাদের মধ্যে যেন একটা চারাগাছ বেড়ে উঠছে
অদৃশ্য, অন্ধকার একটা গাছ, তার অন্ধকার শিকড়
সত্তার
গােপনতম তন্তুতে জড়ানাে—তেমনি উৎসুক, প্রাণের উৎসুকতায়
তেমনি কাপছে।
তারপর একদিন কপিল তাকে নিলে। নিলে অত্যন্ত সহজে।
বিনা দ্বিধায়, বিনা লজ্জায়, বিনা অহঙ্কারে। কিছু বলা
হ’লাে না-বলবার কিছু ছিলাে না। সেটা ঘটলাে, কেউ
বুঝতে পারলে না।
আর তার পর থেকে-সে যেন সব সময় রয়েছে।
কপিলের পিছনে, নিঃশব্দ, নিশ্চিত ; সব সময় যেন তার
৭৮
দিকে তাকিয়ে আছে নিঃস্পন্দ চোখে। সে যেন জলের
একটা স্রোত হয়ে তার ভিতর দিয়ে বয়ে গেলাে, তার
মধ্যে মিশে গেলাে। কপিল চেয়ে দেখলে অবাক হয়ে।
‘আমাকে তােমার সঙ্গে কলকাতায় নিয়ে যাবে?
“কী করবে তুমি সেখানে গিয়ে ?
‘আমি তােমার সব কাজ করে দেবাে।
‘সেখানে কল দিয়ে জল পড়ে, সেখানে তাে তুমি ইদারা
থেকে জল টেনে তুলতে পারবে না। আর সেখানে আমার
বাড়ির সামনে
এতটুকু জমি নেই যে তুমি বাগান করতে
পারাে।
‘আমি তােমার বাসন মাজবাে। তােমার ঘর ঝাঁট দিয়ে
দেবাে। তােমার কাপড় কেচে দেবাে।
‘না, কলকাতায় গেলে তুমি বাঁচবে না।
‘চলাে না আমাকে নিয়ে।
কপিল আবার বললে, “না, ওখানে গেলে তুমি বাঁচবে না।
আর এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন, যখন চারাগুলাে বেশ
বড় হয়েছে, অথচ ফুল ফোটবার সময় হয়নি, বিকেলবেলায়
ঝমরকে দেখা গেলাে না। অথচ সকালবেলায় ঠিক সময়ে
সে এসেছিলাে। তার চাকর কপিলকে এসে বললে যে ঝমর
রান্নাঘরের পাশের ছােট কুরিটায় মেঝের উপর পড়ে ঘুমুচ্ছে।
কপিল গিয়ে দেখলাে ঝমর পড়ে রয়েছে জ্বরের ঘােরে।
শরীর পুড়ে যাচ্ছে। কয়েকবার ডাকাডাকির পর সে একটু
চোখ খুললল, কিন্তু তার সে-চোখ থেকে দৃষ্টি মুছে গেছে।
৭৯
কপিল তাকে নিয়ে এলাে তার নিজের ঘরে। বসলাে
তার শিয়রে। মনে-মনে ভাবলে : ওর একবার চোখ খােলা
উচিত, একবার আমাকে চেনা উচিত, একবার একটা কথা
বলা উচিত। কিন্তু ঝমর পড়ে রইলাে নিশ্চল, মূচ্ছায় আচ্ছন্ন।
ডাক্তার এসে মাথা নেড়ে চলে গেলাে। এ-রকম জ্বর
এ-অঞ্চলে খুব কম হয়, কিন্তু হলে কোনাে আশা নেই।
হাতের কাছে বরফ থাকলে বরফ দেয়া যেতাে মাথায়,
কিন্তু তা যখন নেই, আপনি বরং একটু ঘুমিয়ে নিন্।
আর তাই কপিল জেগে বসে রইলাে সমস্ত রাত, আর
সমস্ত রাত ঝমর মুখের ভিতর দিয়ে ভারি, সশব্দ নিঃশ্বাস
টেনে নিলে। কখনাে কপিল একটু হাওয়া করে মাথায়,
কখনাে একটু জল দেয় মুখে ; কিন্তু মনে-মনে সে জানে যে
কিছু করবার নেই। কিছু সে করতে পারে না। ও আমার
চোখের উপর মরছে, আর এমন কিছু নেই, কিছু নেই, যা
আমি করতে পারি।
ভােরের দিকে ঝমরের গলার ভিতর আরম্ভ হ’লাে মৃত্যুর
ছার। তার সমস্ত শরীর শেষ নিশ্চেতন যন্ত্রণায় মুচড়িয়ে,
মুচড়িয়ে উঠতে লাগলাে। আর হঠাৎ তার চোখ খুলে গেলাে,
ভীষণভাবে বিস্ফারিত হয়ে গেলাে : তার কালাে মুখের
ভিতর থেকে চোখের সমস্তটা সাদ। উটিয়ে বেরিয়ে এসে
কপিলের চোখের উপর নিবদ্ধ হলো। তারপর শেষ হলাে।
আর পরের দিন, সন্ধ্যার পর, ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে
কপিল উপলব্ধি করলে ভালােবাসার সমস্ত অসহ্য ব্যথা।
৮০
জানলা দিয়ে তারায়-ভরে’-যাওয়া আকাশের দিকে সে তাকিয়ে রইলাে। আর সমস্ত আকাশ দিয়ে, সমস্ত সত্তা দিয়ে, সহস্র মৃত্যুতে মর্মরিত সমস্ত জীবন দিয়ে সে অনুভব করলে— তাকে নয়, যে এইমাত্র তাকে ছেড়ে গেলাে; কিন্তু অন্য- একজনকে, যাকে সে রেখে এসেছে ; যাকে, কোনাে-একদিন, মিলতেই হবে তার সঙ্গে। এইবার সময় হয়েছে, মনে-মনে সে বললে । ৬
কপিল ফিরে এলাে কলকাতায়—একটু শীর্ণ, অনেকখানি
কালাে; কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক বেশি সুস্থ, আর তার
মনের মধ্যে আশ্চৰ্য শান্তি।
প্রথমে সে গেলাে বাসবের কাছে। বাইরের ঘরে মৈত্রেয়ী
বসে আছে তার এক বন্ধুকে নিয়ে। দরজার কাছে কপিল
একটু ইতস্তত করলে।
মৈত্রেয়ী উঠে দাড়ালাে, তার মুখ হাসির রেখায় মধুর।
লক্ষবার এই হাসি সে হেসেছে। সে ঠিক জানে, কোন্ পেশীর
উপর কতটুকু চাপ পড়লে ঠিক ফুটবে এই আপ্যায়নের হাসি।
‘আসুন।
কপিল ঘরের ভিতর এগিয়ে আসতে-আসতে বললে :
‘বাসব কোথায়?
‘আছে। একটু বসুন। আমার এই বন্ধুর সঙ্গে আলাপ
করিয়ে দিই।
আলাপ হ’লাে। ইলা বিশ্বাসের চুল ঘন বাদামি রঙের,
ডিমের ছাঁচের মুখ। কিছু বিলিতি গােছের সৌন্দৰ্য্য।
বলবার ফাকে-ফাকে একটু অদ্ভুত চোখে কপিলকে সে দেখে
নিচ্ছিলাে। যেমন রে’ খাচার ফাক
ফাক দিয়ে আমরা
৮২
চিড়িয়াখানার জানােয়ার দেখি। কপিল বসে রইলাে একটু
আড়ষ্টভাবে।
‘একজন লেখকের সঙ্গে আলাপ হওয়া কী ভাগ্য, ইলা
বিশ্বাস বললে।
কপিল তার পাঞ্জাবির বােম নিয়ে নাড়াচাড়া করলে।
‘সােসাইটি নিয়ে আপনার গল্পগুলো ভালাে লেগেছিলাে,
সচেতনভাবে একটু হেসে ইলা বললে।
‘ভালাে লেগেছিলাে আপনার ?' এ ছাড়া কপিল কিছু
বলতে পারলে না। মনে-মনে সে অবাক হলাে। সােসাইটি
নিয়ে সে গল্প লিখলাে কবে? ইলা বিশ্বাস, তুমি কি মনে-মনে
ভাবাে তুমি আমার একজন চরিত্র?
‘আপনার সঙ্গে আলাপ করবার আমার ইচ্ছে ছিলো।
কিন্তু আপনাকে তাে কোনােখানেই দেখা যায় না।
‘ইনি কোথাও বেরােন না, মৈত্রেয়ী বললে।
‘কিন্তু সেটা কি উচিত? ইলার মুখের ভাব প্রায় উদ্বিগ্ন
হয়ে উঠলাে। যাদের নিয়ে লেখেন, তাদের সঙ্গে কি আপনার...
মেশা উচিত নয়? না-জানলে কী লিখবেন ?
‘কিন্তু জানি তাে, কপিল হঠাৎ বলে ফেললাে।
না জানি ?
ইলা মৃদুস্বরে হেসে উঠলল, ঠাট্টা ভেবে। আপনার
বেরুনাে উচিত, লােকের সঙ্গে মেশা উচিত। তা আপনার
লেখায় সাহায্য করবে।
‘লেখায় সাহায্য পাবাে বলে’ই মিশতে বলছেন ?
‘আপনার পক্ষে সেটাই তাে বড় কথা। তা ছাড়া, আমার
মনে হয়, লেখার বাইরে কোনাে জিনিসে উৎসাহ রাখা
ভালো।
কথাটা ইনি কোথায় শুনেছেন, কপিল ভাবলে । কেননা
নিশ্চয়ই এটা অন্য কোথাও শােনা, নয় তাে এমন গম্ভীরমুখে,
এমন নিশ্চিতভাবে ইনি বলতে পারতেন না। তা ছাড়া,
কথাটার অর্থ কী ? লেখার বাইরে কোনাে জিনিস? তা
কি হবে ‘সােসাইটি’, বাদামি চুলের মেয়ে, কি ক্রিকেট খেলা
না কি, জীবনের খােলসের গায়ে যতটা নােংরামি আটকে
থাকে, তা-ই নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে হবে ? তাকে কি হতেই
হবে বিজ্ঞাপনের মত স্পষ্ট, স্থল, প্রত্যক্ষ—যাতে সবাই দেখতে
পায়, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে ? কী আছে আমার
লেখার বাইরে ? লেখার বাইরে যদি কিছু থাকতো, তাহলে
লেখাটাও হ’তত আমার জীবনের বাইরে। কিন্তু তা তাে
নয়। যা আমার লেখার বাইরে, তা আমার জীবনেরও
বাইরে : তা নিয়ে আমি কী করবাে?
কেননা লেখাটা যে আমার জীবনেরই একটা অংশ।
লেখা ব্যাপারটার ভিতরকার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে খুব কম লােকেরই
ধারণা আছে। কোনো মেয়ের চোখের পুকুর থেকে বঁড়শি
ফেলে’ কবিতার লাইন তুলে আনা হয় না। চোখের সামনে
যেটা ঘটে, সেটাকে তখন-তখন মনের দেরাজে তুলে রাখিনে
গল্প লিখবাে বলে। বয়ে চলে আমাদের জীবন-আর
লেখা আসে। যেমন আমরা ভালােবাসি আর কঁাদি আর
৮৪
একা বসে’ গুগুন্ করে গান করি, তেমনি আমরা লিখি।
লেখাটাও তােমরা যাকে বলল ‘জীবন’; লেখাটাও তােমরা
যাকে বলল ‘অভিজ্ঞতা। সমস্ত জড়িয়ে এই যে
অমািদের বাঁচা, তা-ই কি যথেষ্ট নয়, তা-ই কি সব নয় ?
লেখার জন্য একটা খােপ কি থাকতেই হবে, আর লেখার
বাইরে যাতে উৎসাহ নিতে পারি, তার জন্য আলাদা
একটা খােপ ?
‘কিন্তু মেলামেশারও বাড়াবাড়ি হতে পারে’, মৈত্রেয়ী
বললে। ‘বাসব যদি এত সময় নষ্ট না-করতাে তাহলে
অনেক বড় লেখা সে দিতে পারতাে। বলে সে তার
সুন্দর লাল ঠোট গােল করে তুলে একটু হাসলাে।
যদি বাসব ইচ্ছে করতাে তাহলে সে আমাকে নতুন
একটা অলঙ্কার দিতে পারতাে, যা দেখে অবাক হয়ে
যেতে লােকে : মৈত্রেয়ীর কথাটা অনেকটা এইরকম শােনালাে।
‘বাসব আসলে ওর আর্টকে সে-রকম ভালােই বাসে না,
ইলা বলে উঠলাে চাপা পলায়, পাখির স্বরে।
‘আমারও তা-ই মনে হয়েছে’, মৈত্রেয়ী বললে। কতদিন
আমি ওকে সে-কথা বলতে গেছি।
‘ওর যদি টাকার অভাব থাকতে ভালাে হতাে। বাধ্য
হ’তে লিখতে।
‘কিন্তু টাকার জন্য লিখলে লেখা খারাপ হয়ে যায় না?
মৈত্রেয়ী জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে কপিলের দিকে তাকালাে।
“কী জানি । কপিল বললে।
৮৫
‘আপনার তাে জানা উচিত।
কপিলের মুখ একটু লাল হয়ে উঠলাে। কিছুদিন
আগে একটা সাপ্তাহিকের প্রতি সংখ্যায় একটা করে’ গল্প
সে লিখে যাচ্ছিলাে—টাকার জন্য। লােকে তা নিয়ে কথা
বলেছে। লােকে তার মধ্যে দেখতে পেয়েছে অন্যমনস্কতার
চিহ্ন। তার রচনার সে-ধার সব জায়গায় থাকছে না।
কথাগুলাে সব সময় ঠিক জায়গায় এসে পৌছতে পারছে না।
আমি যদি, কপিল ভাবলে, সবগুলো গল্প একসঙ্গে লিখে
তারপর বছরে দুটো করে বার করতুম, তাহলে ওরা কি
এ-সব কথা বলতাে?
‘নিজের কিছু টাকা থাকলেই লেখার সব চেয়ে সুবিধে
তা-ই নয় ?
‘নিশ্চয়ই, কপিল তৎক্ষণাৎ সায় দিলে ।
‘কিন্তু দুঃখ পাওয়া দরকার’, ইলা গম্ভীরমুখে বললে।
‘দুঃখ না-পেলে মানুষ বাড়ে না।
আর-একটা, কপিল মনে-মনে বললে। এটা কেন হয়
যে অন্যের কোনাে কথা বললেই এরা সেটা বুঝতে দেয় ?
সেটা লুকোবার মত বুদ্ধি অন্তত থাকা উচিত। অন্যের
কাপড় যদি পরতেই হয়, সেটা কেটে-ছেটে নিজের মাপসই
করে নেয়া যায় না? আর দুঃখ কি কেবল টাকার
অভাব? ইলা বিশ্বাস, গরিব হবার ভয় কি তােমার এতই বেশি
যে অন্য কোনােরকমের দুঃখ তুমি ভাবতে পারাে না?
‘বাসবকে দিয়ে কেউ যদি জোর করে লেখায় তাহলে
৮৬
।
দুই বন্ধু
ভালাে হয়, অন্য দু’জন কিছু বলছে না দেখে ইলাকেই
আবার বলতে হ’লল।
‘জোর করে কি লেখা হয় ?
‘না লিখতে লিখতে নষ্টও হয়ে যেতে পারে শেষ পর্যন্ত।
‘ওর নিজেরই এক-একটা ঝোঁক আসে মাঝে-মাঝে।
দরজা বন্ধ করে বসে থাকে সারাদিন। কিন্তু
করে কিছু হয় না।
এমনি
আলাপ করলে, ‘বিশ্লেষণ করলে,
নানাদিক থেকে দেখলে। আর যখন তারা মনে করলাে
যথেষ্ট খাতির করা হয়েছে, সাহিত্য নিয়ে যথেষ্ট বলা হয়েছে,
তারা চুপ করলাে। আচ্ছা, বলে’ কপিল উঠে দাড়ালাে।
‘বাসবকে কোথায় পাবাে ?
‘ওর সেই ঘরটাতেই আছে। ওর এখন লেখবার ঝোক।
‘আচ্ছা, ইলা বিশ্বাস মধুর হাসিতে তার ঝকঝকে
দাঁতের সারি দেখালাে। দু’হাত তুলে সে নমস্কার করলে।
আর যে-মুহূর্তে কপিল তাদের দিকে পিঠ ফেরালে
সে অনুভব করলে যেন তাদের মুখের ভাব বদলে গেছে :
দুই বন্ধু কাছাকাছি চেয়ার টেনে এনে যেন বলছে,
(এইবার।
বাসবের বন্ধ দরজায় কপিল টোকা দিলে, কোনাে
উত্তর এলাে না। আবার টোকা দিয়ে
আবার টোকা দিয়ে একটু অপেক্ষা
। তারপর ডাকলে, ‘বাসব।
সঙ্গে-সঙ্গে শােনা গেলাে চেয়ার ঠেলে সরাবার শব্দ।
করলে।
দীপ্তি। বাসবের এক হাতে কলম ধরাই রয়েছে, অন্য হাত দিয়ে কপিলের একটা হাত সে আঁকড়ে ধরলাে। ‘কপিল ! তার কণ্ঠস্বরে নতুন একটা সুখের সুর। আর কপিলের শরীর দিয়ে হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ স্পন্দিত হয়ে গেলাে, তার হাতের চাপে। কপিলকে সে টেনে নিয়ে এলো ঘরের মধ্যে, তারপর -যে-চেয়ারে বসে এতক্ষণ লিখছিলাে সেখানে না-বসে’ ছােট একটা চেয়ারে বসলাে, কপিলের পাশে। তার মুখে তিন দিনের দাড়ি, তার চোখের নিচে কালাে দাগ, গাল বসে গেছে। শুধু তার চোখে হিংস্র, অস্থির আর সমস্ত টেবিল ভরে’ কাগজের রাশি ছড়ানাে, চৈত্রের গাছের নিচে যেমন অজ এলােমলাে পাতা। কপিল তার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলাে। ‘লিখছিলাম,' বাসব বললে । আর তার সমস্ত মুখে হাসি অজ্ব করে উঠলাে আলাের মত। -“তা তত দেখতেই পাচ্ছি। আমি এসে বাধা দিলুম- কিন্তু না-এসেও পারলুম না। ‘ওঃ! এসে যায় না, কিছু এসে যায় না। অনেক সময় আছে। না–সময় নেই। সময়ই তাে নেই। আর সবই আছে। ‘খুব লিখছাে তত ? ‘পাগলের মত লিখছি। সমস্ত মন দাউদাউ করে’ জ্বলছে। বেশি কাছে এসাে না, পুড়ে যাবে। বলে বাসব অনিশ্চিত, কঁপা গলায় হেসে উঠলাে। তাড়াতাড়ি সে কথা বলছে, একটু উচ্চস্বরে, মাঝে-মাঝে তার অগােছাল চুলের স্তুপ নিয়ে টানা-হেড়া করছে। দু মিনিট একভাবে বসে থাকতে পারছে না। ‘ততক্ষণে তােমার কি আর কিছু বাকি থাকবে ! মনে হয় না, কপিল হেসে বললে। যা চেহারা দেখছি। ‘ওঃ, চেহারা ! স্বাস্থ্য দিয়ে কী হয়? চেহারা দেখে কী বােঝা যায় ? কী ভালল আমি আছি, কী ভালো এই ক’দিন আমার লাগছে তা আমি কী করে বােঝাববা?” ‘আমি বুঝতে পারি’, কপিল বললে। ‘এত ভালাে লাগছে যে আমি সইতে পারছিনে। অার মাঝে-মাঝে কেমন যেন ভয় করে। এ কী, আমার ভিতর থেকে যা ঠেলে উঠছে—যাকে আমি চাইনি, যাকে আমি মরে’ গেলেও থামাতে পারবাে না? এ যে আমার মধ্যে ছিলাে তা তাে আমি জানতুম না। কপিলের মনে পড়লাে মৈত্রেয়ী আর ইলার কথা-বসে-বসে’ তারা ভাবছে কী করে’ বাসবকে দিয়ে লেখানাে যায়। ‘কী অদ্ভুত যে আমাকে লিখতেই হবে, না-লিখে আমার উপায় নেই। না-লিখলে আমি যেন বাঁচবাে না। কী-যেন মাথা খুড়ে মরছে, সব সময় মাথা খুড়ে মরছে—এইখানে’, বাসব তার বুকের উপর হাত রাখলাে। ‘তার শক্তি প্রচণ্ড, আমাকে তা ছিড়ে ফেলছে। কিন্তু এমন আনন্দও আর নেই। এ- আনন্দ যে কী তা আমি কখনাে বলতে পারব না। ৮৯ বাসব উঠে গিয়ে টেবিল থেকে তার লেখার কয়েকটা কাগজ তুলে নিয়ে চোখ বুলিয়ে গেলাে। আমার এই লেখা পড়ে অবাক হয়ে যাবে। ‘ভালাে হয়েছে খুব?’ ‘আশ্চর্য! আমারই মনে হচ্ছে যেন অন্য কারাে লেখা। ‘এখন আর তাহলে তােমার ভাবনা নেই, কপিল আস্তে- আস্তে বললে। ‘কিন্তু কত লিখবাে? বাসব কপিলের কথাটা যেন শুনতেই পেলে না, ‘কত আর লিখব? মুঠো-মুঠো করে বিলিয়ে দিতে পারি, দু’হাতে জলের মত ছড়াতে পারি। হাজার কথা এক- সঙ্গে তােলপাড় করছে মনে—কিন্তু সময় নেই। এই সমস্ত লেখা এখন যদি কোনােরকমে হারিয়ে যায় তাহলেও আমার ভাবনা নেই ; আমি বসে-বসে আবার নতুন জিনিস লিখি। বাসব ফিরে এসে বসলাে। ‘তুমি কেমন আছাে? হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করলে, কপিলের চোখের দিকে তাকিয়ে। ‘বেশ ভালাে আছি। একটু সময় বাসব তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে। ‘কবে ফিরলে ? ‘কালই তাে মােটে। ‘যার জন্যে ওখানে গিয়েছিলে তা পেলে ? ‘তার বেশি পেয়েছি। বলে’ কপিল ঘােট-ঘােট কয়েকটা কথায় সাঁওতাল মেয়ের ;
কথা তাকে বললে।‘আমার চোখের উপর সে মরলল। আমি
কিছু করতে পারলুম না।
বাসবের চোখ আনত হলাে।‘খুব ভয়ানক
লেগেছিলাে ?”
না, সে-রকম কিছু নয়। কিন্তু নতুন একটা জিনিস
পেয়েছি।
‘কী সেটা?
‘বলতে পারবে না। শুধু মনে হয়, নিজেকে যেন হারিয়ে
ফেলেছিলাম, এইবার ফিরে পেয়েছি।
আর তারপর ?
‘তারপর কী তা তত জানােই।
খানিকক্ষণ দু' জনেই চুপ করে রইলো।
‘তােমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছিলাে বাইরের ঘরে, কপিল
বললে।
‘মৈত্রেয়ী ? কী করছে সে?
‘সঙ্গে তার আর-একজন ছিলাে-ইলা বিশ্বাস। আলাপ
হলাে।
‘একটুখানি “জীবন” দেখলে, তাহলে?
কপিল একটু হেসে চুপ করে রইলাে।
‘একদিন আমার কী ভালােই লাগছে যে ঐ “জীবন”
দিয়ে নিজেকে মুড়ে রাখতে হচ্ছে না।
আমি পেয়েছি আমার
নিজের জীবন।
‘কিন্তু এ কি সব সময় থাকবে?
১১
‘না-ই বা থাকলাে। যে-ক’দিন পেলাম, সুখী হয়ে নিলাম
‘সুখী হয়েছে ?
‘এত সুখী হবার ক্ষমতা যে আমার আছে তা আমি
জানতুম না।
কপিল চুপ করে রইলাে। একটু পরে বাসব আবার বলতে
লাগলাে :
‘দ্যাখাে, এই পৃথিবীতে তুমি বাঁচতে পারবে না ;
এই
পৃথিবীই তাে তােমার ভিতরটাকে খেয়ে যাবে। দু হাতে তাকে
ঠেলে রাখবে, তা থেকে পালিয়ে যাবে—যেমন করে’ পারাে।
সেটাই বাঁচবার উপায়।
‘কিন্তু তার পরেও তাে কিছু আছে : নতুন একটা পৃথিবী
তৈরি করা।
‘সেই কথাই তাে আমি বলছি। নতুন একটা পৃথিবী : কিন্তু
তাহােক তােমার নিজের, তােমার একলার। তুমি কি
অন্যদের তার ভাগ দিতে পারবে?
কপিল একটু ভাবলে ।
‘না, ভাগ দিতে যেয়াে না, অন্যদের ডেকো না সেখানে
তাহলেই তা নষ্ট হয়ে যাবে। আর যা-ই করাে, আমাদের এই
পৃথিবীকে নতুন করে তােলবার কথা ভেবাে না। পৃথিবীর যা
হবার হােক, তােমার তাতে কী? তুমি তােমার নিজের
পৃথিবী তৈরি করবে নিজের মধ্যে। সমস্ত কথা আর সমস্ত
মানুষ আর সমস্ত খবরের কাগজ একত্র হয়েও তাকে নষ্ট
করতে পারবে না। সেখানে তােমার অন্ধকার রাজত্ব। সেখানে তুমি মুক্ত, সেখানে তুমি চিরন্তন। সেখানে আর- কোনাে প্রয়ােজন তােমার নেই। কপিল চুপ করে একটু ভাবলে। তারপর বললে, ‘কিন্তু ভালােবাসার প্রয়ােজন-যে-কথা তুমি সেদিন বলছিলে ? বাসব মুহূর্তের জন্য হাতের মধ্যে মুখ ঢাকলাে। অদ্ভুত চাপ গলায় বললে, ‘যদি তা না পাও তাহলে আর কী করতে পারাে? কপিল মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলাে। আর, একটু পরে, বাসবের কণ্ঠস্বর যেন আনন্দে বেজে উঠলাে : ‘আর যদি তা পাও—যদি তা পাও, তবে তাে পেলেই। তা তত তােমার পৃথিবীকে ভেঙে দেবে না—তা তােমার মধ্যে এসে মিলবে অন্ধকার নদীর মত। কিন্তু তােমাকে সৃষ্টি করতেই হবে তােমার নিজের পৃথিবী। সবার আগে তা-ই, সবার শেষে তা-ই। তা যদি না-পারাে, পৃথিবীর সমস্ত ভালােবাসা তােমায় বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। আর যা-ই হােক্, কি না-ই হােক, একে হতেই হবে—তােমার নিজের, তােমার একলার, তােমার অন্ধকারের এই পৃথিবী। হবে তা-ই', বলে’ কপিল উঠে দাড়ালো।
৭
পরের দিন দুপুরে কপিল যখন গেলো, সমস্ত বাড়িটা
চুপচাপ। পুরুষেরা গেছে যে যার কাজে, মেয়েরা ঘুমুচ্ছে।
কপিল নিঃশব্দে মিনুর ঘরের দরজার কাছে এসে দাড়ালাে।
কিন্তু তার আগেই সে শুনতে পেলাে মিনুর কণ্ঠস্বর ।
লােহার সাদা খাটে মিনু শুয়ে, সাড়ির আঁচলটা মুখের
উপর ছড়ানাে। সে গান করছে-নরম, চাপা গলায় ; অদ্ভুত,
ভাঙা-ভাঙা গলায়। অদ্ভুত সে-গান-টেনে-টেনে যাওয়া,
বুনে-বুনে চলা ; তার কথাগুলাে বােঝা যায় না, তার সুর
জ্যোছনায় কুয়াশার মত। কোনাে দিশি সুর, সাধারণ মানুষের,
চাপা কান্নার, তাতে বিরহের আর প্রার্থনার জাদু। সেই
গান মিনু গাইছিলাে, নিজের মনে, আঁচলে মুখ ঢেকে, অদ্ভুত
ভাঙা-ভাঙা গলায়, যেন তার গলা দিয়ে স্বর ফুটছে না।
আর তবু তা উঠে আসছিলাে, ক্ষীণ স্বচ্ছ স্রোতে, বার-বার ;
সুরের অদৃশ্য জালে একই নক্সা বার-বার বােনা হচ্ছিলাে,
দুপুরবেলার সেই শান্ত হাওয়ায়। কপিল অপেক্ষা করলে,
তা থামলাে না। তা উঠে আসছে, সেই ক্ষীণ, নরম সুরের
ফোয়ারা; তা ঝরে পড়ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে, দুপুরবেলাকার শান্ত
হাওয়ায়।
;
আর কপিল স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলাে, আর শুনলে
ভাঙা-ভাঙা, চাপা গলার সেই অদ্ভুত গান। মিনুর মুখ ঢাকা,
তার শরীর একটু নড়ছে না। যেন কোনাে অদৃশ্য, গােপন
উৎস থেকে উঠে আসছে এই গান, দিনের শরীরে লুকোনাে
কোনাে অন্ধকার থেকে। একটু ছেদ নেই, ক্ষীণ হ'য়ে মিলিয়ে
যেতে-যেতে তা আবার ঠেলে উঠছে, দিনের গােপন, অন্ধকার
উৎস থেকে উৎসারিত এই গান।
আর কপিলের বুক কাপতে লাগলো, কাপতে লাগলাে,
যেন তা ভেঙে যাবে। ঘরে ঢুকতে তার সাহস হলাে না,
একটু শব্দ করতে তার সাহস হলাে না। তার সামনে এক
অন্ধকার, অনির্বচনীয় রহস্য : তার ভিতরে তাকে ঢুকতে
হবে, ঢুকতেই হবে। কিন্তু তার সাহস হয় না ; বাইরে
দাড়িয়ে সে কাপছে।
বারান্দা দিয়ে কে যেন চলে গেলাে। আর, পাছে কেউ
তার কাছে এসে পড়ে, এসে তার সঙ্গে কথা বলে, কপিল
তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লাে ঘরের মধ্যে। কিন্তু তবু থামলাে না
গান। সে আরাে একটু অপেক্ষা করলে, তারপর গিয়ে
দাড়ালাে মিনুর শিয়রে । পাশের ছােট টেবিল থেকে একটা
তুলে
নিয়ে ফেলে দিলে মেঝের উপর।
মিনু মুখ থেকে আঁচল সরিয়ে তাকালো। কিছু দেখতে
পেলে না। আর তারপর সে মুখ ফেরালাে শিয়রের দিকে।
সে উঠলাে না, কিছু বললে না ; খানিকক্ষণ শুধু চুপ করে’
তাকিয়ে রইলাে কপিলের মুখের দিকে।
তারপর বললে, এসাে’ । বলে উঠে বসলাে। কোনাে-
রকম করে জড়ানাে খোঁপা ভেঙে তার দীর্ঘ কালাে চুল নেমে
এলাে বৃষ্টির পশলার মত।
‘তােমার গান থামিয়ে দিলুম।
‘গান শুনতে চাও?
‘না, এখন আর নয়।
কপিল বসলো খাটের অন্য ধারে । মিনুর মুখ একটু
ফেরাননা, তার চোখ আনত। থেকে-থেকে তার চুলের গন্ধ
কপিলের বুকে এসে লাগছে।
খানিক পরে মিনু চোখ তুলে তাকালাে।-বাইরে গিয়ে
কেমন ছিলে ?
‘ভালাে ছিলাম বেশ।
‘এখন তােমার মন শান্ত হয়েছে ?
‘হ্যা, শান্তি আমি পেয়েছি। সে আশ্চৰ্য্য।
মিনু তার স্তব্ধ কালাে চোখ কপিলের কৃশ মুখের দিকে
তুলে চুপ করে রইলাে।
‘এখনাে কি সময় হয়নি ? একটু পরে কপিল
বললে।
‘কে জানে!
‘তুমিই তাে জানাে।
‘আর তুমি-তুমি ঠিক জাননা?
তারপর বলল।
‘ভাববার কিছু নেই।
ভালাে করে ভেবে
৯.
‘আমি অনেক ভেবেছি, মিনু আস্তে-আস্তে বললে। কিন্তু
যা আমরা ভাবি, তা-ই কি হয় ?
‘না, তা হয় না। কিন্তু যা আমরা চাই, তা-ই হয়।
‘কী নিশ্চয়তা আছে তার?
‘না, নিশ্চয়তা কিছু নেই। থাকবেই বা কেন? নিশ্চয়তা
আছে যন্ত্রে, জীবনে তা থাকে কী করে?
‘তাহলে দেখা যাক জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।
‘এখনাে কেন সংশয় তােমার মনে ?
‘যদি কোনাে সংশয় থাকে তা তােমারই জন্যে।
‘আমি জানি তােমার মনের কথা। কোনাে নিশ্চয়তা
যে নেই–বড় লাগে এ-কথা মনে করতে। যা চাই তাকে
কি পাবাে? ও-কথা জড়িয়ে কত দ্বিধা, কত যন্ত্রণা, কত কান্না।
তা তাে ছাঁচে-ঢালা, তৈরি জিনিস নয় যে হাত বাড়ালেই
পাওয়া যাবে। চাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই তাে পূর্ণতা আসে না।
আর, যা-ই বলল না, তা আসে না বলেই তাে এত মজা।
‘এ-সব কেন বলছাে?”
‘কিন্তু দুঃখও আছে বইকি, কপিল বলতে লাগলাে, যেন
নিজেরই মনে, ‘বড় ভীষণ দুঃখ সেই চাওয়ার। কান্নায়
তােমার বুক ভেঙে যাবে, হতাশায়। তবু তা সইতে হবে।
তবু যেন আমরা ভুল না করি। নিজের উপর অভিমান করে’
ভুল না করি।
‘ভুল আমি করবাে না, মিনু বললে, ‘ভুল আমি কখনাে
করি না।
১৭
৭
একটু সময় কপিল চুপ করে রইলো, চুলের মধ্যে
আঙুলগুলাে চালানাে।
‘ও-কথা তুমি বলতে পারাে?
‘না, ভুল আমি করিনে, মিনু আবার বললে ।
‘আমি ও-কথা বলতে পারিনে। আমি ভুল করেছি
অনেকবার। কিন্তু সব সময় মনে-মনে আমি জানতুম যে
ভুল করছি।”
উঠি।
‘তুমি কি এখন দুঃখিত তার জন্য?
‘এমন অপব্যয়—নিজের এমন অপব্যয়। কিন্তু ও-রকমই
হয়, ও-রকম হতেই হয়। হয়তাে তারও প্রয়ােজন আছে।
দুঃখিত কেন হ’বাে? এমনি করেই তাে আমরা পূর্ণ হয়ে
নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে, নিজেকে হারিয়ে ফেলে,
নিজেকে পায়ের নিচে মাড়িয়ে গিয়ে। সেই কষ্ট যদি না-
জানতুম তকে কি আজ এই আশ্চর্য্য শান্তি আমি পেতুম ?
মিনু কিছু বললে না। তার মুখ ফেরাননা, তার চুলের
গন্ধ কপিলের বুকে এসে লাগছে।
‘সেই সমস্ত পার হয়ে আমি আজ তােমার কাছে এসেছি,
কপিল বললে ।
তবু মিনু কিছু বললে না। কপিল তার একটু কাছে সরে’
এলাে, তারপর বলতে লাগলাে :
‘প্রথম যখন তােমার কাছে এসেছিলুম, আমাকে ফিরিয়ে
দিয়ে ভালো করেছিলে। আমি এসেছিলুম আমার হতাশা
থেকে ; তােমার কাছে চেয়েছিলুম সান্ত্বনা, চেয়েছিলুম শান্তি।
;
৯৮
কিন্তু ও-রকম করে হয় না। আমার মধ্যে ছিলাে অভাব,
ভেবেছিলাম, তােমাকে দিয়ে তা ভরে তুলবে।
‘তা কি ভরতাে?’ ক্ষীণ, ক্ষীণস্বরে মিনু বললে ।
কপিলের মুখে ছােট একটু হাসি খেলে গেলাে :
‘কিন্তু এখন আমি পেয়েছি আমার নিজের শান্তি । এখন
আমি তােমাকে ডাকছি, হতাশা থেকে নয়, নিঃসঙ্গতা থেকে
নয়—আমার আনন্দ থেকে, পূর্ণতা থেকে। সমস্ত ভাঙাচোরা,
সমস্ত ক্ষত আর লজ্জা পার হয়ে এসে—আমি, নতুন, সদ্যোজাত,
সম্পূর্ণ, আমি তােমাকে ডাকছি। এখন আর তুমি আমাকে
ফিরিয়ে দিয়াে না।
আর আস্তে, আস্তে, পাখির মত, নরম পাখির মত, মিনুর
ছােট, নরম হাত কপিলের হাতের উপর এসে পড়লো, ছােট,
ছােট আর নরম, আগুনের শিখার মত নরম, আর শিখার
মত উষ্ণ, রক্তের আগুনে উষ্ণ ; আর কপিলের হাতের ভিতর
দিয়ে যেন এক অপরূপ সুরা রক্তের মধ্যে গিয়ে মিশললা ;
আর তার সমস্ত মাংস যেন জ্বলে উঠলাে, জ্বলে উঠলাে
আননে।
আর তারপর তার মনে হলাে এ আর সে সইতে পারছে
না : মনে হ’লল, মিনুর ঘােট, নরম হাতের চাপে সে যেন
মরে যাবে—সে যেন ছিড়ে যাবে এই আনন্দে, এই ব্যথায় ।
হাত ছেড়ে দিয়ে সে উঠে দাড়ালাে।
‘আবার কবে আসবে ?” মিনু জিজ্ঞেস করলে।
‘যে-কোনােদিন।
‘কাল আসবে ?
‘আসতে পারি।
না, বলে যাও আসবে কিনা।
‘আসবাে।
আর পরের সন্ধ্যায় কপিল তাকে পেলাে ছাতে, পাটি
পেতে বসে। একটু আগে সে স্নান করেছে ।
পিঠের
উপর এলানো তার চুল এখনাে জলে চিকচিক করছে।
অনেকক্ষণ কেউ কিছু বললে না।
তারপর কপিল মিনুর আঙুলের মধ্যে নিজের আঙুল
জড়িয়ে বললে :
‘তােমার জন্য একটা আংটি আনতে ভুলে গেলুম।
‘কী হবে আংটি দিয়ে ? এ-ই তাে যথেষ্ট।
‘তবু আমরা চাই বাইরে প্রকাশ করতে। সেটা পুরুষের
দুৰ্বলতা।
‘দিয়াে আংটি এনে।
আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ।
‘সবাই এখন জানবে’, কপিল বললে ।
‘জানবেই তাে।
‘সে-কথা ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে।
‘কেন ?
‘লােকের কথাকে আমি বড় ভয় করি। তাদের ব্যাখ্যা।
তাদের বিশ্লেষণ।
‘তুমি তাে আর সে-সব কথা শুনবে না।
১০০
‘কিন্তু তবু—কেউ যদি কখনাে না জানতো! যদি এমনি
হ’তে চিরকাল ! যে-মুহূর্তে আমরা হ’বাে স্বামী আর-স্ত্রী,
তখনই আমরা এই সমাজের একটা অংশ হয়ে গেলাম,
তখনই এই পৃথিবী তার কুৎসিত, স্যাৎসেঁতে হাত বাড়াবে
আমাদের ধরতে। তাকে এড়াতে চাই, ভুলতে চাই তাকে ;
কিন্তু তাকে একেবারে বাদ দিয়ে তােমাকেও আমি নিতে
পারিনে।
‘কিন্তু তাছাড়া পায় কী?
‘না, উপায় নেই। যেমন আমাকে সইতে হয় টাকা
রােজগারের নােঙয়ামি, তেমনি এ-ও সইতে হবে।
‘কিন্তু কী এসে যায় তাতে? এ কতটুকু—তােমার
এই সমাজ আর পৃথিবী। এ তাে নেহাৎই বাইরের
জিনিস। তুমি আর আমি তাে আছি:ছিলাম, তা-ই
আছি।”
‘আর তা-ই থাকবাে’, কপিল বললে।
‘হ্যা, তা-ই থাকবাে।
একটু চুপচাপ।
‘কী শান্তি, কী আশ্চর্য শান্তি তােমার মুখে
শােনা, বলতে-বলতে কপিল মিনুর সমস্ত চুল দু হাঁটে
তুলে ধরলাে, তারপর সেই ঠাণ্ডা, নরম চুলের রাশিতে
চেপে ধরলাে তার মুখ । ঐ চুল দিয়ে নিজেকে সে যেন
জড়িয়ে রাখতে চায়, ঢেকে রাখতে চায়। লুকিয়ে থাকতে
চায় এই অন্ধকারে—মানুষের সমাজ থেকে অনেক দূরে, এই
১০১
কে সে সামলাতে চাইলাে, চাইলাে।
কুৎসিত পৃথিবী
পৃথিবী থেকে অনেক, অনেক দূরে। ঠাণ্ডা,
অন্ধকার এই ঝরনা তার মুখের উপর ঝরে পড়ছে, তার
বুকের উপর—ঝরে পড়ছে তার গভীরতম আত্মায় ।
এমনি কাটলাে খানিকক্ষণ। তারপর মিনু আস্তে-আস্তে
মুখ ফেরালাে পিছনে, যেখানে কপিলের মুখ তার চুলের
মগ্ন।
রুদ্ধস্বরে ডাকলে, এই, শােনাে।
কপিল মুখ তুলে তাকালাে, সন্ধ্যার ছাদের অস্পষ্ট
আলােয় অদ্ভুত, পাংশু তার মুখ । আর হঠাম
দুই বাহু কপিলকে ঘিরে জড়িয়ে ধরলাে, তার সমস্ত শরীর
ঢেউয়ের মত ভেঙে পড়লে তার উপর আর সেই তার
স্তব্ধ, শুভ্র মুখ হঠাৎ কপিলের চোখে গুনের একটা ঝড়
হয়ে উঠলাে, আগুনের উদ্দাম ঝড় হাজার উদ্দাম অগ্নিশিখা
অন্ধকারের ভিতর দিয়ে ফেটে
পড়ছে।
কপিল হাত
বাড়িয়ে তাকে নিতে যাচ্ছিলো, কিন্তু পরের মুহূর্তে মিনু
নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলাে, আর তার দুই চোখ ভরে
উঠলােগ
তাকাতে, কিন্তু সেই
চেষ্টায় সে আরাে
ঙে পড়লো, কান্না উথলে উঠলাে তার বুক ঠেলে। দূরে
সরে গিয়ে দু হাতের মধ্যে সে মুখ ঢাকলাে, আর কপিল
বসে রইলাে স্তব্ধ হয়ে।
.
‘তুমি চলে গেলে, রাত বাড়লাে বাড়ির সবাই একে-একে
ঘুমিয়ে পড়লাে, আমি জেগে রইলুম। সবাই ঘুমিয়ে আছে,
আমি জেগে বসে তােমায় চিঠি লিখছি।
এর আগে কখনাে তােমায় চিঠি লিখিনিভারি অদ্ভুত
লাগছে। এইমাত্র তুমি গেলে, দু’দিন পরেই আবার দেখা
হবে, তবু লিখছি। না-লিখে পারছিনে।
যখন সিড়িতে তােমার পায়ের শব্দ শুনি, যখন দেখি
তােমার মুখ, যখন শুনি তােমাকে কথা বলতে কেউ
জানে না কী কষ্ট আমি পাই, আমি যে ভেঙে লুটিয়ে
পড়তে চাই, মরে যেতে চাই। কেউ জানে না, শুধু
আমি জানি। অনেক লােকের মধ্যে তােমাকে যখন
দেখবাে, কেমন করে আমি তাকাবো তােমার দিকে ?
কথা বলবাে কেমন করে ?
এখন তুমি কাছে নেই, তবু সেই কষ্টে আমি কঁপছি।
ঢিপ ঢিপ করছে আমার বুক, আমার কেমন ভয় করছে।
তুমি কি অবাক হয়েছিলে, আমি যে কেঁদেছিলাম ?
কিন্তু আর কী উপায় ছিলল, আর কী উপায় ছিলাে
আমার ? আজ সকাল থেকে আমার চোখ থেকে-থেকে
১০৩
-
কেবলই জলে ভরে উঠছিল। কেননা আজ তুমি আমার
কাছে আসবে।
আর এখন—এখনও যদি আমি চুপ করে থাকি, কান্নায়
আমি অন্ধ হয়ে যাবাে।
কী সুন্দর তুমি—আর কী ভয়ঙ্কর। তােমার মুখের
দিকে আমি তাকাতে পারিনে। তােমাকে আমি কেমন
করে’ সইবাে?
তবু আমি জানতুম একদিন আমাকে এমনি করে’
কাদতে হবে। অনেকদিন থেকেই তা ঘনিয়ে আসছে
বুকের মধ্যে। আর এতদিন তা প্রতীক্ষা করেছে-তােমার।
একদিন তুমি আমাকে স্পর্শ করবে—আর তখন তা বুক
ঠেলে’ উঠে আসবে—কোনাে বাধা মানবে না। আমি তা
জানতুম।
তুমি কি রাগ করেছিলে, আমি যে সরে গিয়েছিলাম,
কেঁদেছিলাম ? কিন্তু এ-কান্না তাে দুঃখের নয় : এ আনন্দের,
এ সার্থকতার। যা চেয়েছিলাম—অনেক, অনেকদিন ধরে
যা চাইছি তা পেলাম, তাকে যে পাওয়া গেলাে, এই
অসহ উপলব্ধির আনন্দ। কী আনন্দ তা আশি বলতে
পারবাে না।
আমি তােমাকে চলে যেতে বলেছিলাম-ফুল’ তুমি
গিয়েছিলে। আর আমার দিন আর রাত যেন বদলে গেলাে ।
পেখম-ভােলা ময়ূরের মত দিন, প্রতির্কে রঙ বদলাচ্ছে ;
আর রাত্রির অন্ধকার যেন আমার মধ্যে কথা কয়ে’
১০৪
উঠতে চায়।
রাত বাড়ে, আমার ঘুম আসে না; হাতের উপর
মাথা রেখে শুয়ে চুপ করে ভাবি। কী ভাবি জানিনে।
এর আগে আমি কখনাে জানিনি, রাত্রির মধ্যে যে-সব
স্বর লুকিয়ে থাকে। অশরীরী ছায়া-স্বর : যে-মুহূর্তে আলাে
নিবিয়ে দিয়ে শুতে যাই, তারা যেন লাফিয়ে ওঠে, ছুটে
মারতে আসে আমাকে। আমার স্বপ্নকেও যদি তারা হানা
দেয়, সেই ভয়ে আমি চোখ বুজতে পারিনে।
আর তবু --এখন তুমি এসেছাে, এখন আমার প্রায়
বলে উঠতে ইচ্ছে করছে : আমাকে ছেড়ে দাও, মুক্তি দাও
আমাকে। যখনই তুমি আমার দিকে তাকাও, হঠাৎ একট।
আগুন লাফিয়ে ওঠে, জড়িয়ে ধরে আমাকে।
এ আমি
কেমন করে সইবো ?
মনে-মনে প্রায় বলে ফেলি তােমার সঙ্গে দেখা না-হলেই
ভালাে ছিলো। আমাকে কি চিরকাল জ্বলতে হবে, তােমার
দৃষ্টির অন্ধকারে, অন্ধকারের মধ্যে লুকোন, গােপন আগুন ?
তবু আমি জানি যে আমি আর ছাড়া পাবাে না।
তুমি এসেছাে তােমার পূর্ণতা থেকে আমার কাছে।
আমি মিলেছি আমার সার্থকতা থেকে তােমার মধ্যে।
এখন আর কিছু বলবার নেই।
কিছু আর বলবার নেই এখন। এখন আর সময় নেই
ভাবনার কি স্বপ্নের। তােমাকে বলি, তােমার স্বপ্ন দিয়ে
আমাকে জড়িয়ে রেখাে না। দেবতার মত হও তুমি, দেবতার
মত স্নেহ কোনাে আমাকে। আমার সমস্ত ত্রুটি আর
অসম্পূর্ণতার উপর পড়ুক তােমার দৃষ্টি। আমার রচনায় সেই- সব ফঁাক তুমি ভরে তুলো-স্বপ্ন দিয়ে নয়, কল্পনা দিয়ে নয়, স্নেহ দিয়ে, করুণা দিয়ে। আরাে বলি তােমাকে : তােমার অনাদর, তােমার মলিনতা, তােমার উদাসীনতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাকে লজ্জা দিয়ো না। অন্য সব জিনিস থেকে আলাদা করে রেখাে আমাকে। শুধু কি তােমার আনন্দ, তােমার সৌন্দৰ্য্য, তােমার চুম্বনই নেবো; আর যেখানে তুমি ক্লান্ত, প্রতিদিনের আঘাতে দীর্ণ, যেখানে তােমার গায়ে লেগেছে এই পৃথিবীর আঙুলের দাগ, সেখানেই থাকবে। অন্ধ হয়ে ? তোমার ভালােবাসা সইতে পারবাে, আর তােমার বিমুখতা সইতে পারবাে না ? আমি তােমার কাছে চুপ করে বসে থাকবাে; তােমার সেবা করবাে, তােমার শরীরের সেবা করবো। আমি তােমার কাছে চুপ করে বসে থাকবাে। হয়তাে এ-রকম চিরকাল থাকবে না। কেনই বা থাকবে? নতুন জিনিস আসবে : নতুন আশা, নতুন আনন্দ, নতুন দুঃখ। আর সবার শেষে থাকবে তুমি আর আমি, সবার আগে যেমন ছিলাম। এখন যেমন আছি। যেমন আছি আজকের এই রাত্রিতে। কী চুপচাপ চারদিক কলকাতা এমন চুপচাপ হতে পারে কখনো জানতুম না। কোথায় একটা কোকিল ডেকে উঠছে থেকে-থেকে, লিখতে- লিখতে আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছি। তুমি কী করছাে? ১০৬
:
আজকের সমস্ত দিনটার কথা যত ভাবছি, ততই অবাক
লাগছে। রাত্রে যখন খেতে গেলুম, আমার মুখ তুলতে সাহস
হয় না।
আর খাওয়ার পরেই পালিয়ে চলে এলুম-এখানে,
আমার এই ঘরে : সেই কখন থেকে বসে আছি জানলার ধারে।
আজ আমি আর-কিছু চাইনে, শুধু একা থাকতে চাই :
তােমার সঙ্গে থাকতে চাই, একা। কী ব্যাকুলতা, তােমার
কাছে যাবার জন্য আমার রক্তের কী ব্যাকুলতা।
মাঝখানে দু’দিন তােমাকে দেখবে না। কী তােমার
এমন কাজ একটু আসতে পারবে না ? এক সময় আমি
ভাবতুম, অনেক সময় আছে, অনেক সময় আছে এখনাে।
ভাবতুম, শান্ত হয়ে অপেক্ষা করবার শক্তি আমার আছে। কিন্তু
আজ আর একটা মুহূর্তও আমার হারাতে ইচ্ছে করছে না।
সমস্ত জীবনও যে যথেষ্ট নয় ; আমাদের জীবন আর কতটুকু?
তবু আজ মনে হচ্ছে যেন আমাদের জীবন চিরকালের ;
তােমার জীবন, আর আমার : আর এই রাত্রির ভিতর
থেকে আমার হৃদয় তােমাকে ডাকছে, তােমাকে, ডাকছে,
বাইরে যেমন থেকে-থেকে কোকিল ডেকে উঠছে।
তাহলে শেষ করি চিঠি, শুতে যাই। আমার এই
চিঠি ভরে আমার হাতের স্পর্শ তােমাকে পাঠালুম, সমস্ত
কথার চেয়ে তা বেশি। এখন শুতে যাই,
এখন শুতে যাই, যদিও জানি
শুয়ে-শুয়ে অনেকক্ষণ ঘুমােত পারবাে না।
‘আজ সারাটা দিন বাইরে-বাইরে ঘুরতে হ’লল, টাকার
১০৭
দরকার। তােমাকে যে বিয়ে করতে যাচ্ছি, তার জন্যেও টাকার
দরকার। পৃথিবীর প্রতিশােধ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিৎ আমারই। বঁচবার জন্য যেটুকু
টাকার আমার দরকার, তা কোনােরকম করে’ নিঙড়ে বার
করে’ আনবাে, তারপর দেবাে দরজা বন্ধ করে পৃথিবীর মুখের
উপর।
যেমন এখন দিয়েছি। এখন রাত্রি, আর আমি একা।
এখন আমি একা, আমি সুখী।
সমস্ত দিন কাটলাে নানা লােকের সঙ্গে নানারকমের
কথায়--সে-সব মনে করলেও এখন মরে যেতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু এমন বােকা কে যে মনে করবে ? শেষ হলাে দিন,
দিনের গ্লানিও শেষ হােক সেই সঙ্গে। এখন, এই রাত্রিতে
আর এই নীরবতায় আমি তােমার।
শােননা, কিছু টাকা পাওয়া যাবে—চলল কোথাও যাই,
সমুদ্রের ধারে কোথাও। তােমার মুখ অমন স্নান কেন—
আর এত কম তুমি হাসে ! আমার ইচ্ছে করে তােমার
হাসি শুনতে—রূপাের ঘন্টার মত আকাশে বেজে উঠছে।
সমুদ্রের ঢেউ যখন
তােমাকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে
আছড়ে ফেলবে,
তখন অমনি করে তােমাকে হাসতে হবে।
-হেসে তুমি পারবে না। চলাে যাই। সমুদ্র তােমাকে
নতুন প্রাণ দেবে, আমি তােমাকে নতুন প্রাণ দেবাে।
আর সেই যাওয়া যাতে সম্ভব হতে পারে, তার জন্য
আমাকে এখন লিখতে বসতে হবে। টাকার জন্য নাকি
১০৮
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.