Bally Sadharan Granthagar

Bandir Dairy

Sarkar, Hemantakumar · 2010/02/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বন্দীর ডায়েরী
- 4 + ? "
( ডিসেম্বর ১৯২১ হইতে জুন ১৯২২)
শ্ৰীহেমন্তকুমার সরকার
প্রকাশক,
শ্রীফুলেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
ইণ্ডিয়ান বুক ক্লাব,
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট,
কলিকাতা ।
মূল্য এক টাকা
( সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

০ ০ ০ আমাদের প্রকাশিত পুস্তকাবলী :- ১। বিশ্বভারত(বিশ্ব সভ্যতায় ভারতের বাণী) ঐরাধাকমল মুখােপাধ্যায় প্রণীত, ছেলেদের বিবেকানন্দ—এপ্রিয়রঞ্জন সেন, এম, এ, প্রণীত ৩। অরবিন্দ (সচিত্র ) ৪। চিত্তরঞ্জন (সচিত্র) শ্রীকুমাররঞ্জন দাশ, এম, প্রণীত, ৫। লেনিন (বলশেভিক নেতার জীবনী ও মতামত, গান্ধীর সহিত তুলনা) ৬। স্বদেশরেণু, (৫ম সংস্করণ) (স্বদেশপ্রেমােব্দীপক . . ০ ০ ০ • ও ০ ০ ০ Des ৭। পল্লীব্যথা (দুঃখময় পল্লীজীবনের করুণ কবিতা) সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় ৮। দেশের কথা ( চিত্তরঞ্জন দাশের দেশসম্বন্ধী প্রবন্ধাবলী) কাব্যের কথা (ঐচিত্তরঞ্জনের বৈষ্ণব কবিতা ও বাংলার গীতি কবিতা সম্বন্ধীয় প্রবন্ধাবলী) মহাত্মার বাণী (কারাদণ্ডের পূর্ববর্তী ছয় মাসের প্রবন্ধাবলী) ১১। মহাগ্লার বিচার ও হাকিমজীর প্রতি পত্র ও ও ও ১২। উড়িষ্যার চিত্র সচিত্র অভিনব উপন্যাস, সুন্দর বাঁধাই, ৩য় সংস্করণ বাহির হইল, ৩২৭ পৃঃ, লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঔপন্যাসিক গ্রীষতীন্দ্রমােহন সিংহ প্রণীত। হেমন্তকুমার সরকারের গ্রন্থাবলী ( সমস্ত মাসিক পত্রে উচ্চ প্রশংসিত) ১৩। ছায়াবাজি (সমাজের অন্ধকার দিকের চিত্র লইয়া নূতন ধণের গল্পের বই ০০৩ ১৪। পষ্ট কথা (বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনের কথা ) ১৫। মুগশঙ্খ (বর্তমান যুগােপযােগী কতকগুলি উদ্দীপনাময় প্রব) ১৬। উল্টোক (ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সমালােচনা ও রাজনীতি বিষয়ক মৌলিক প্রবন্ধ ) নূতন বাহির হইল :- ১৭। স্বরাজ কোন পথে? (মূল্য ॥•) কো-অপারেটিভ, ননকো-অপারেশন, সােসিয়ালিজম ও ননকো-অপারেশন, নিরুপদ্রব আইনভঙ্গ, শ্রমজীবী সমস্যা, কৃষিজীবী সমস্যা কাউন্সিলে ননকো-অপারেশন, কংগ্রেসের পুনর্গঠন প্রভৃতি প্রবন্ধ আছে। প্রবাসী বলেন বাংলাদেশের অবস্থা আজ শশাচনীয়। ‘দৈন্ত-জীর্ণ কক্ষ তার, মলিন শীর্ণ আশা, ত্রাসরুদ্ধ চিত্ত তার, নাহি নাহি ভাষা”—ছায়াবাজিতে গ্রন্থকার সেই ছবিই আকিয়াছেন। এই আখ্যায়িকাগুলির বিষাদ আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। পষ্ট কথায় ও যুগশঙ্খে কতকগুলি সাময়িক প্রচার প্রবন্ধ আছে, দেশের মঙ্গল কাজে গ্রন্থকার দেশের যুবকদের ডাক দিয়াছেন। প্রবন্ধগুলির যুক্তিমত্তা ও সহৃদয়তা প্রশংসনীয়। এই গ্রন্থ পাঠে আমাদের যুবকদের দুর্জেয় রক্ষণশীলতা একটু নাড়া পাইলে আমরা সুখী হইব। উন্টোকখা বই চারিখানির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য। প্রবন্ধগুলিতে গ্রন্থকার সাহিত্য আদি বিষয়ে সাধারণভাবে আলােচনা করিয়াছেন। তাঁহার আদর্শ অতিশয় উচ্চ, বাংলার সাহিত্য সে আদর্শের নিকটেও দাড়াইতে পারে না বলিয়া অত্যন্ত অধিক তিরস্কৃত হইয়াছে। পাঠকেরা বই খানি পড়িয়া দেখিতে পারেন। ভারতী বলেনঃ-সমাজের নানা চিন্তা, নানা সমস্যার কয়েকটা টুকরা মাত্র লেখক ছােট ছােট প্লট, চিত্র, নক্সার ভিতর দিয়া ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। অনেকগুলি চিত্রে ছােট গল্পের মসলা আছে। এইখানি ( ছায়াবাজি) পড়িয়া লেখকের ভাবুকতার পরিচয় পাই।

সূচীপএ ৫। ২৪ ০১ ০ २१ ୨୫ গ্রেপ্তারের পূর্বে গ্রেপ্তারের দিন গ্রেপ্তারের পরদিন বিচারের দিন আলিপুর জেলে দশদিনের নির্জন কারাবাস কংগ্রেসের সপ্তাহ রঙ্গরসের পর্ব নন্দলালের কাহিনী দৈনিক জীবনের কয়েকটা চিত্র হরিলাল গান্ধীর গ্রেপ্তার সাধনা কিরণবাবু ও অরবিন্দর কে বসন্তে তিন সপ্তাহ জেলে সংবাদ পত্রের আবির্ভাব “ব্রিটিশ জষ্টি” জেলের সাধারণ অবস্থা ৫৪ ৬৯ ০ ০ ০ ৮২ ৮৫ ০৮ ৮৮ ০ ০ ০ ১০৬ ফরিদপুর জেলের কাহিনী (পরিশিষ্ট)

উৎসর্গ পত্র
তমার জন্যই বন্দী-জীবনে
বন্ধনের জ্বালা অনুভূত হয় নাই,
তাই
তােমারই হাতে এই
অকিঞ্চিৎকর কাহিনী দিলাম।
-শ্রীহেমন্ত।

ভূমিকা। প্রায় ১৭১৮ বৎসর আগে একবার একজন প্রসিদ্ধ সাধুকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম—“দেশে এত ধৰ্ম্মাত্মা মহাপুরুষ থাকা সত্ত্বেও দেশের দুর্দশা ঘুচে না কেন?” মহাপুরুষ হাসিয়া বলিয়াছিলেন—“ভয় নাই। দুঃখের দিন প্রায় শেষ হইয়া আসিল। আর বিশ বৎসর পরে দেখিবে দেশের চেহারা বদলাইয়া গিয়াছে।” দেশের দিকে চাহিয়া তখন সে কথা বিশ্বাস করিতে সাহস হইত না। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক পাণ্ডারা তখন ব্যাকরণ শুদ্ধ ইংরাজীতে আবেদন লিখিয়া রাজ দরবারে পেশ করিতে ব্যস্ত; কলেজের ভাল ভাল ছেলেরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় টীকা কপালে আঁকিয়া এক একটা ডেপুটীগিরি বা মুন্সেফী পদ বাগাইয়া বাঙ্গালী জন্ম সার্থক করিবার জন্য গলদঘর্ম। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা বলিলে তখন লোকে পাগল বলিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিত। যাহারা ঘােতর স্বদেশী তঁাহারা এক সুট বন্ধে মিলের কাপড় কিনিয়া দেশকে কৃতার্থ করিতেন । আর আজ ? আজ প্রকৃতই দেশের চেহারা বদলাইয়া গিয়াছে। যাহারা ডেপুটিগিরি করে তাহার আর বুক ফুলাইয়া লােকসমাজে সে কথা প্রচার করে না, যাহারা রায় সাহেব বা রায় বাহাদুর তাহারা যেন ভদ্র সমাজে অপাংক্তেয় ; যাহারা ব্যবস্থাপক সভায় বক্তৃতা দিয়া ঔপনিবেশিক স্বায়ত্বশাসনের মহিমা কীৰ্ত্তন করে তাহারা লোকের কাছে উপহাসাপদ। দশ অজি নিজেকে চিনিয়াছে ; মেকিতে তাহার আর মন ভরে না। আজ ছেলে বুড়া, কুলি মজুর সবাই স্বরাজ চায়। বাঙ্গালীর সাত মহল ভেদ করিয়া অন্তপুরেও সেই স্বরাজের কথা গিয়া পৌঁছিয়াছে। তাই - P, lo আশা হয় যে আরও পাঁচ সাত বছর বাঁচিয়া থাকিলে হয় ত এ লীলার বাকি টুকুও দেখিয়া যাইব। ১৯০৫ সালে যখন বাংলার জীবন-নদীতে প্রথম বান ডাকিয়া দুকুল ভাসাইয়া দিয়াছিল, আজ সেইদিনের কথা মনে পড়ে। আদরের ঘরের নন্দদুলাল সেদিন সুখশয্যা ছাড়িয়া আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, ভালছেলে সেদিন পাশ দিবার মায়া কাটাইয়া টেক্সটু-বুকের নােট ফেলিয়া মায়ের দেওয়া মােটা কাপড়, মাথায় তুলিয়া লইয়াছিল, বকাটে ছেলে সেদিন সিগারেট ফেলিয়া লাঠি খেলিতে ছুটিয়াছিল। সবাই বুঝিয়াছিল বাঙ্গালীর জীবনে একটা নূতন অধ্যায় আরম্ভ হইয়া গেল। প্রথম অধ্যায় যিনি লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন সেই সুরেন্দ্রনাথের লেখনী অল্পদিনের মধ্যেই ভোঁতা হইয়া গেল ; কিন্তু বাঙ্গালীর জীবনের আখ্যায়িকা সেইখানেই থামিল না। উপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র, অরবিন্দ আসিয়া দ্বিতীয় অধ্যায় লিখিয়া দিলেন। বারীন্দ্রকুমার, পুলিনবিহারী, যতীন্দ্রনাথ, রাসবিহারী জ্বলন্ত অক্ষরে তৃতীয় অধ্যায় লিখিয়া ফেলিলেন, বাঙ্গালীর এই জীবন-নাটক লিখিবার জন্য লেখকের অভাব হইল না। আজ ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ বা পূর্ণচন্দ্রের মত রাহুগ্রস্ত, কেহ বা পরলােকগত, অপরে কৰ্ম্মান্তরে লিপ্ত, কিন্তু আপনি বিধান সেনাপতি আজ” সুতরাং যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের অভাব হইল না। ভারতের এক নিভৃত প্রান্ত হইতে বাছিয়া বাছিয়া ভগবান এক তপঃসিদ্ধ সাধুর ললাটে শ্বেতচন্দনের টীকা পরাইয়া তাহাকে এই মহাযুদ্ধের অধিনায়ক করিয়া পাঠাইলেন। দেশময় বজ্রনির্ঘোষে “গান্ধী মহারাজকী জয়” ধ্বনি ঘােষিত হইল। বাঙ্গালী সে ধ্বনি শুনিল, কিন্তু অবসাদ বশতঃই হােক, অথবা অতীতের স্মৃতির প্রভাব বশতঃই হােক একটু যেন থমকিয়া দাড়াইল। তাহার পর খাটি বাঙ্গালী চিত্তরঞ্জনের মুখে যখন তাহা প্রতিধ্বনিত হইল, চিত্তরঞ্জন যখ! রাজবেশ ছাড়িয়া ভিখারীর কন্থা কঁাধে তুলিয়া লইলেন তখন বাঙ্গালী সমস্ত বিচার বিতর্ক ভুলিয়া ঝাপাইয়া পড়িল। চরিত্রের মহত্ত্বে তাহারা অভিভূত হইয়া পড়িল। (চঞ্জ : সারা ঘর ছাড়িয়া পথে আসিয। দাড়াইয়াছিলেন, হ্যানদের শ্রদে বন্ধু হেমন্তকুমার তাঁহাদের একজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের (শ্রষ্ঠ ছাত্রের যাহা কিছু অনায়াসলভ্য সবই তাহার আয়ত্বের মধ্যে ছিল। কিন্তু অর্থ, যশ বা পদমর্যাদার মােহ তাহাকে ভুলাইতে পারে নাই। খদ্দর পর চাকরী ছাড়া হইতে আরম্ভ করিয়া জেলে যাওয়া পর্যন্ত অসহযােগীর সমস্ত কর্তব্যগুলিই তিনি পালন করিয়াছেন; সুতরাং জেল হইতে আসিয়া আমাদিগকে তাহার অভিজ্ঞতার কথা শুনাইবার অধিকার তাহার আছে।) বাংলার নবযুগের ইতিহাসে এই আড়াই বৎসর ধরিয়া চতুর্থ অধ্যায় লিখিত হইতেছে। বোধ হয় আবার একটা নূতন অধ্যায় আরম্ভ করিবার সময় আসিল। হেমন্তকুমারের এই পুস্তকখানি য় ত বা সেই নূতন অধ্যায়ের গােড়ার কথা। ; কলিকাতা উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ০ই ভাই, ১৯২২।

গৌরচন্দ্রিকা। স্বদেশের জন্য যাহারা সকল সুখ ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছায় কারাবরণ করিয়াছেন সেই পুণ্যশ্লোক লােকমান্ত ও তিলক, মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, পণ্ডিত মতিলাল, মৌলানা শৌকত আলি, মৌলানা মহহ্মদ আলি, লালা লজপৎ এবং অন্যান্য সহস্র সহস্র দেশসেবকগণের পবিত্র নাম স্মরণ করিয়া আমার এই সামান্য কাহিনী লিখিতে আরম্ভ করিলাম। শ্ৰীঅরবিন্দ ঘােষ, বারীন্দ্র কুমার ঘােষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি মহারথীগণ সরল প্রাণস্পর্শী ভাষায় নিজ নিজ কারাকাহিনী লিখিয়া গিয়াছেন। যাহারা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর বা ফাসির মুখ হইতে ফিরিয়া দশ বারাে বৎসর অসীম ক্লেশ সহ করিয়া কারাকাহিনী লিখিয়াছেন, তাহাদের পাশে আমাদের এই ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ডের কাহিনী লেখাই ধৃষ্টতা মাত্র। মন্দ কবি যশঃপ্রার্থী গমিষ্যামুপহাতাম্। প্রাংশুলভ্যে ফলে লােভা উদ্বাহুরিব বামনঃ ॥ মন্দকবি যশপ্রার্থী হইয়া উদ্বাহু বামনের ন্যায় প্রাংশুলভ্য ফল লােত বশত পাড়িতে গিয়া যেমন উপহাসম্পদ হইয়াছিল, আমিও সেইরূপ উপহাসের পাত্র হইবার জন্যই এই দুঃখের কাহিনী লিপিবদ্ধ করিতেছি। কণ্ঠে যখন দুষ্ট সরস্বতী চাপে তখন মানুষের কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান থাকে । কারাদণ্ড প্রাপ্ত হইয়া অনেকেই কাহিনী লিখিতেছেন। আমিও সঙ্গদোষে অপরাধ করিয়া ফেলিলাম। কারাকাহিনীর ভিতর আমার কথা তেমন নাই, আছে কেবল যে সকল মহাত্মাদের সংস্পর্শ জেলে আসিয়া লাভ করিয়াছি, তাহাদেরই সম্বন্ধে দুই চারি কথা। শাস্ত্রবচন মানিতে পারি নাই, অপ্রিয় সত্যও দুই এক জায়গায় বাহির হইয়া পড়িয়াছে। মিথ্যা গল্প-উপন্যাস লেখা যাহাদের ব্যবসায় সেই সাহিত্যিকদের

iloy
মুখ হইতে হঠাৎ একটা সত্য বাহির হইলে সকলের আনন্দিত হওয়ারই
কথা। সেই ভরসায় দুই একটী সত্য কথা বলিবার অভ্যাস এই সুযােগে
করিয়া লইলাম। আশাকরি এজন্য কেহ কিছু মনে করিবেন না।
(অসহযােগ আন্দোলনে লুকোচুরি কিছুই নাই। সত্যের এবং অহিংস
নীতির মর্যাদা রক্ষাই অসহযােগীর প্রধান ধৰ্ম্ম। এই ভরসায় পেটেব
কথা স্থানে স্থানে বলিয়া ফেলিয়াছি, আশা করি সত্য বলিয়া সেগুলিকে
কেহ অস্বীকার করিবেন না এবং প্রকৃত অসহযােগীর আদর্শে অনুপ্রাণিত
হইয়া আমার উপর রাগ করিবেন না এবং রাগ করিলেও অহিংসই
থাকিবেন।
কলিকাতা,
১৫ই জুলাই, ১৯২২
শ্ৰীহেমন্তকুমার সরকার)

No text on this page.

হেমন্ত কুমার সরব বন্দীর ডায়েরী sites একের পরিচ্ছেদ। গ্রেপ্তারের পূর্বে । চোখ খারাপ না হইলেও অনেকে যেমন সখ করিয়া চশমা পরে- তেমনি দরকার না থাকিলেও দেশের কাজে একবার জেল খাটিবার সখ আমার হইয়াছিল। “সুখে থাকিতে ভূতে কিলােয়,” কথায় শুনিয়াছিলাম এবার নিজের জীবনেই তাহা প্রত্যক্ষ করিলাম। যেদিন বিশ্ব- বিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও অধ্যয়ন ছাড়িয়া অসহযােগ আন্দোলনে যােগ দিলাম – সেই দিনই কারাবাস সুনিশ্চিত জানিয়াছিলাম। আসাম বেঙ্গল রেলের ধর্মঘট উপলক্ষে চাঁদপুরে ওখাপ্রহরী ধরিয়াও ছাড়িয়া দিল, গােয়ালন্দে পুলিশ সাহেব খোজ করিয়াও পাইলেন না, নারায়ণগঞ্জে টিক- টিকি লাগিয়াও ধরিতে পারিল না—তখন ভাবিলাম, এ যাত্রায় কি কপালে জেল নাই? কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানে “রাজদ্রোহসূচক বক্তৃতা করিয়া, বিখ্যাত করাচী রেজোলসনের প্রস্তাবক হইয়াও যখন ওয়ারেন্ট বাহির হইল না; শ্ৰীযুত চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত “বাঙ্গলার কথার declaration না দিয়া প্রিন্টার-পাবলিসার হইয়াও জেলে যাওয়ার সুযােগ আসিল না; তখন মনে করিলাম আমার সবই বৃথায় গেল, এত २ বন্দীর ডায়েরী , দিনেও এমন একটা কিছু করিতে পারিলাম না যাহাতে সরকার বাহাদুর আদর করিয়া তাহাদের হােটেলে স্থান দেন। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখে হঠাৎ শুনিলাম চট্টগ্রাম হইতে শ্ৰীযুত যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত প্রভৃতিকে আলিপুর জেলে আনা হইতেছে। সন্ধ্যার সময় শিয়ালদহ ষ্টেশনে ছুটিলাম। চট্টগ্রাম ডিষ্ট্ৰীক্ট কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারী পক্ককেশ শ্ৰীযুক্ত মহিমচন্দ্র দাস মহাশয়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হইল। তিনি বলিলেন “দণ্ডটা দুই মাসের হইলে কংগ্রেসে ইতে পারিতাম।” আমি বলিলাম “এবার কংগ্রেসে যাইতে হইবে , কংগ্রেসই আপনাদের কাছে আসিবে।” তারপর প্রায় দেড়মাস পরে শ্ৰীযুত জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তার সংবাদ শুনিয়া হাওড়া স্টেশনে তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিতে গেলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা হইল না। দেশের চারিদিক হইতে একে একে বয়স্ক নেতারা জেলে আসিতে লাগিলেন, অথচ আমাদের মত যুবক বাহিরে থাকিয়া কেবল তাহাদিগকে অভ্যর্থনাই করিবে—ইহা আর কতদিন ভাল দেখায়? জেলে মানুষ কেমন থাকে দেখিবার জন্য ৫ই ডিসেম্বর শ্ৰীযুত জিতেন্দ্র বাবুর সহিত দেখা করিবার জন্য প্রেসিডেন্সি জেলে গেলাম। দেখিলাম ভালই আছেন এবং মরেন নাই। শুভ মুহূর্তে সরকার বাহাদুর ভলান্টিয়ার ইস্তাহার জারি করিলেন। এই আদেশ অমান্য করিবার জন্য শ্ৰীযুত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌলবী মজিবর রহমান প্রভৃতি হিন্দু-মুসলমান নেতাগণ, পূব্বেই এক ফতােয়া ( manifesto) দিয়াছিলেন। দেশবন্ধু তখন বােম্বাইয়ে কংগ্রেসের কাজে গিয়াছেন। ২৩শে নবেম্বর মহাত্মা Mass Civil Disobedience (সমবেতভাবে নিরুপদ্রব আইন ভঙ্গ) বরদোলিতে আরম্ভ করিবেন—এই জন্যই আরও হার উপস্থিতি প্রয়ােজন হইয়াছিল একের পরিচ্ছেদ তিনি বোম্বাই হইতে আসিলে ২৭শে নবেম্বর প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির এক বৈঠকে গবর্মেন্টের আদেশ বে-আইনি বলিয়া ঘােষণা করা হইল। ভলান্টিয়ার সমিতির কাজ চালানাে সম্বন্ধে দুইটি মন্তব্যের প্রস্তাবক ও সমর্থক হইলেন ঢাকার শ্ৰীযুত শ্ৰীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘােষ, শ্ৰীযুত সুভাষচন্দ্র বসু ও বর্তমান লেখক। নেতারা সকলে গ্রেপ্তারের জন্য প্রস্তুত হইলেন। সরকারী ভাড়-করা গুণ্ডা দ্বারা মারামারি কাণ্ডের সম্ভাবনা থাকায় কলিকাতায় আপাতত সভা সমিতি বন্ধ রাখিয়া পরে সুবিধামত করা হইবে স্থির হইল। প্রাদেশিক সমিতি দেশ বন্ধুর হাতে সমস্ত ক্ষমতা দিয়া দিলেন। তাঁহার গ্রেপ্তারের পর কে কে কর্মকর্তা নিযুক্ত হইবেন তাহা ঠিক করিবার ভারও তাঁহাকে দেওয়া হইল। ৪ঠা ডিসেম্বর ৫ জন স্বেচ্ছা সেবককে খদ্দর ফেরি করিতে বাহির করা হইল। তাহাদের কেহ ধরা পড়িল না। ৫ই তারিখে কয়েকজন ধরা পড়িল। দেশবন্ধুর ভয় হইয়াছিল এক হাজারের বেশী লােক জেলে যাইবার জন্য পাওয়া যাইবে না—তাই ঠিক হইল ৫|১০|২০ জন করিয়া ক্রমশ অল্পে অল্প সংখ্যা বাড়াইতে হইবে। আর ভলান্টিয়াররা বিনা ব্যাজেই (badge) বাহির হইবে—কারণ গবর্মেন্টের লােক ব্যাজ লইয়া হরতাল বন্ধ করিবার জন্য ঘুরিতেছে এইরূপ শােনা গেল। ৩১শে ডিসেম্বরের পূর্বে হয় স্বরাজ না হয় কারাবাস-দেশনেতাগণ ইহাই ঠিক করিয়া দিলেন। সময় আর বেশী নাই, স্বাধীনতার সমর ঘােষিত হইয়াছে—কিন্তু সেনা কই ? বাঙালী যুবকেরা সুশীল ও সুবােধ বালকের মত গবর্মেন্টের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় ব্যস্ত---কে দেশের জন্য লড়িবে? অশিক্ষিত কুলি মজুর সব দলে দলে আসিতে লাগিল হিন্দুস্থানী ও মুসলমান অনেক আসিল, কিন্তু বাঙ্গালীর ছেলে কোথায় ? এই দুরবস্থায় ব্যথিত হইয়া দেশবন্ধু ঠিক করিলেন যে ৬ই ডিসেম্বর ৪ বন্দীর ডায়েরী তারিখে একজন এমন লােককে পাঠাইতে হইবে যে গ্রেপ্তার হইলে দেশের লােকের দৃষ্টি একটু পড়ে। ১১ নং ওয়েলিংটন স্কোয়ারে কংগ্রেস আপিসের নীচের তলার একটী ছােট ঘরে দেশবন্ধুর পরামর্শগৃহ ছিল। বিকালে তিনি আসিয়াছেন—আর সে ঘরে শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র,কিরণশঙ্কর রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, চিররঞ্জন দাশ ও বর্তমান লেখক ছিলেন। কে বাহির হইবে? একে একে বর্তমান লেখক, সুভাষচন্দ্র, চিররঞ্জন, কিরণ বাৰু যাইবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। “বাঙ্গালার কথা” চালানাে ও লো-পড়ার কাজের জন্য আমার আবেদন নামঞ্জুর হইল। সুভাষচন্দ্রকে ভলান্টিয়ারদিগের কাপ্তেন হইয়া বােজ বােজ তাহাদিগকে বাহির করিবার ভার লইতে হইল, তাহারও যাওয়া হইল না। শ্ৰীযুত কিরণ বাবু সব বিদ্যা- য়তন ও প্রচার সমিতি চালাইবেন বলিয়া তাহাকেও থাকিতে হইল। শ্ৰীমান চিররঞ্জন বলিলেন আমার তাে কাজ নাই, আমিই বাহির হই। দেশবন্ধু আনন্দের সহিত তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিলেন। ঠিক হইল ৬ই ডিসেম্বর ২৫ জন ভলান্টিয়ার লইয়া চিররঞ্জন বাহির হইবেন। ৬ই ডিসেম্বর সকালে দেশবন্ধুর বাড়ীতে যে দৃশ্য ঘটিয়াছিল তাহার একটু বর্ণনা আবশ্যক। পূৰ্বদিন রাত্রি ১১টার সময় দেশবন্ধু দক্ষিণ কলিকাতা কংগ্রেস কমিটির প্রধান উদ্যোগী শ্ৰীযুক্ত হেমেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত মহাশয়কে ডাকিয়া বলিয়া দিলেন যেন পরদিন সকালে ২৫জন ভলান্টিয়ার চিররঞ্জনের সঙ্গে যাইবার জন্য ঠিক থাকে। প্রাতে শয্যাত্যাগ করিয়াই তিনি খোজ করিতেছিলেন ২৫ জন ঠিক হইয়াছে কি না। কাপ্তেন সুভাষচন্দ্র তে চিররঞ্জনকে পাঠাইতে নারাজ—নিজেই আগে যাইতে চান। বর্তমান লেখকের যাইবার আবেদন অগ্রাহ হইল। অবশেষে ৬ই দ্বিপ্রহরে কংগ্রেস আপিস হইতে শ্ৰীমান চিররঞ্জন খদ্দর কাঁধে কলেজ- ঈট হ্যারিসনরােডে অন্যান্য ভলান্টিয়ারগণের সহিত বাহির হইলেন। ।

একের পরিচ্ছেদ ৫ প্রত্যেক পাঁচজন সেবকের সঙ্গে একজন চালক ও একজন চর থাকিত। কোথায় কোথায় যাইতে হইবে চালক নির্দেশ করিয়া সঙ্গে লইয়া যাইত। আর কে কোথায় যাইল, কিম্বা ধরা পড়িল, সে খবর তৎক্ষণাৎ আপিসে পৌছাইয়া দেওয়া চরের কাজ ছিল। সে তফাতে তাতেই থাকিত। বিকালবেলায় খবর পাওয়া গেল চির গ্রেপ্তার হইয়াছে, তাহার সঙ্গে আরও আঠারাে জন ধরা পড়িয়াছে। তখন কংগ্রেস আপিসের চৌতলায় আমাদের বৈঠক বসিয়াছিল। হাওড়ায় গুলি চলার পর কিরূপ অবস্থা হইয়াছিল সাহিত্যৰথী শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তাঁহার সরসভঙ্গীতে চমৎকার বর্ণনা করিতেছিলেন—এমন সময় দুঃসংবাদ উপস্থিত ! শরৎবাবু তাে প্রমাণ করিয়া দিলেন জেলটা তেমন ভাল জায়গা না এবং তাঁহার কেমন পছন্দ হয় না! শ্ৰীযুক্ত কিরণ বাবু হাসিতে হাসিতে বলিলেন “কাল সবাই যেতে চাইল দেখে আমিও ভয়ে ভয়ে যেতে চেয়েছিলাম—গেলেই তত ধরা- পড়েছিলাম আর কি।” এইরূপ মজার কথাবার্তা চলিতে লাগিল। সকলেই কিন্তু অন্তরে অন্তরে বুঝিতেছিলেন—দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে। নীচে দেশবন্ধু পুত্রের গ্রেপ্তারের সংবাদ পাইয়া অটল কর্তব্যের মূৰ্ত্তিমান বিগ্রহরূপে বসিয়া কাৰ্য্যের নির্দেশ করিতেছিলেন। শ্যামসুন্দর বাবু প্রভৃতি উদ্বেলিত অন্তকরণে তাঁহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়াছিলেন। কিন্তু অটল নিস্তব্ধতার মাঝে সান্ত্বনার কাদাকাটি বা প্রবােধদানের অবসর হয় নাই। যিনি জীবনের সর্বস্ব দান করিয়া একমাত্র পুত্রকেও দেশের জন্য সানন্দে কারাগারে প্রেরণ করিলেন—তাহার সান্ত্বনার উৎস ভগবানের কাছে, এখানে নয়। সন্ধ্যার সময় বাড়ীতে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন আসিয়া সমবেদনা প্রকাশ করিয়া গেলেন। সমস্ত বাড়ীটা যেন মুহূর্তে বদলাইয়া গেল। লাল- বন্দীর ডায়েরী বাজারের হাজতে শ্রীমানের জন্য কম্বল ও খাবার পাঠানাে হইবে কি না তাহা লইয়া আলােচনা চলিতে লাগিল। দেশবন্ধু একা চিররঞ্জনের জন্য পাঠাইয়া সকলের জন্যই খাবার ও কম্বল কিনিতে টাকা দিলেন। কিন্তু হাজতে গিযা শােনা গেল, দেরী হইয়া গিয়াছে, তখন আর খাবার দেওয়া চলিবে না এবং শ্রীমানেরা তাহার পূর্বেই গােরা সার্জনদের হাতে নিঃশব্দে অনেক চড়, লাথি ও গালাগালি খাইয়াছেন। বাড়ীতে হুকুম হইয়া গেল—মােটা চালের ভাত ও এক তরকারী দিয়া সুকলে খাইবেন। দুঃখের চিহু কোথাও নাই—একটা নিস্তব্ধ আনন্দের গভীরতা ঝড়ের সূচনা করিতেছিল। ৫ই তারিখে প্রেসিডেন্সি জেলে দেশবন্ধুর সহিত আমরা জিতেন বাবুর সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলাম। সুপারিন্টেন্টে কর্নেল হ্যামিল্টনের আদেশ অনুসারে সকলকে চেয়ার দেওয়া হইয়াছিল এবং জেলর সাহেব আমাদের কাছে অনুগত ভৃত্যের মত দাড়াইয়া ছিলেন। আমি শুধু মনে মনে ভাবিতেছিলাম—কাল বােধ হয় আমাদিগকে জেলর সাহেবের সামনে এখানে দাড়াইতে হইবে, আর তিনি চেয়ারে বসিয়া আমাদিগকে হুকুম করিবেন। আসিবার সময় জিতেন বাবুর পায়ের ধূলা লইয়া বলিলাম-“বাহিরে অনেক বাগড়া আপনার সহিত করিয়াছি, এখন বুঝিয়াছি কিছু অন্যায়ও হইয়াছে, ক্ষমা করিবেন, এবার ঝগড়া করিতে হয় তাে জেলে আসিয়া করিব।” জিতেন বাবু হাসিতে হাসিতে স্নেহ- আলিঙ্গন দিলেন। চিররঞ্জন ওরফে শ্ৰীমান ভােল পরদিন প্রেসিডেন্সি জেলে দেখা করিতে বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন। আমি একবারে ভিতরে গিয়া দেখা করিব এবং ডােম্বলের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিব বলিলাম। বিধাতা সে সুযােগ হইতে আমাকে বঞ্চিত করেন নাই।

একের পরিচ্ছেদ ৭ ঐ দিনও সন্ধ্যার সময় গবর্মেন্ট হাউস হইতে দেশবন্ধুকে আহ্বান করিয়া চিঠি আসিয়াছে। ২৪ শে যাহাতে হরতাল না হয়, তাহার জন্য গভর্ণর একবার দেশবন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা বলিবার বন্দোবস্ত করিতেছিলেন। কিন্তু ডাকিয়া পাঠাইলে যে মান যায়, তাই নানা কৌশলে চেষ্টা করা হইল যাহাতে দেশবন্ধু নিজে হইতে যান। প্রথমে মহারাজ প্রদ্যোৎকুমার দূতী হইয়া আসিয়া অনুবােধ করিলেন। প্রাইভেট সেক্রেটারী গুলে সাহেব টেলিফোনে কত হাসিখুসির সঙ্গে বলিলেন যে মিঃ, দাশ His Excellencyর ( লাটসাহেবের) সঙ্গে দেখা করিতে চান শুনিয়া তিনি বড় আনন্দিত হইয়াছেন। ঘন ঘন টেলিফোন ও. চিঠি আসিতে লাগিল। এদিকে দেশবন্ধুও লিখিত নিমন্ত্রণ না পাঠাইলে যাইবেন না। সাহেব বলিলেন যে লাটবাহাদুর কি বলিয়া ডাকিয়া পাঠাইবেন! দাশ মহাশয়ও জবাব দিলেন তাহার মত ক্ষুদ্র ব্যক্তি আহূত না হইয়া কোন সাহসে মহামান্য গভর্ণরের সঙ্গে দেখা করিতে যাইবেন। এই ভাবে কয়েক দিন কাটিয়া গেল অবশেষে সরকার পক্ষ হইতেই ডাকা হইল। গবর্ণর স্বীকার করিলেন হরতাল করিতে অনুরােধ করা বেআইনি নয়, খদ্দর বেচা বে-আইনি নয়, তবে আমাদের দেশের লােকই তাঁহার নিকট নালিশ করিয়াছে যে স্বেচ্ছাসেবকেরা তাহাদের উপর জুলুম করে তাই তিনি ইস্তাহার জারি করিয়াছেন। যাহা হউক দেখা হওয়ার ফলে কিছুই হইল না।

দুইয়ের পরিচ্ছেদ। -- গ্রেপ্তারের দিন । ৭ই ডিসেম্বর বাংলার জাতীয় ইতিহাসে একটা স্মরণীয় দিন। ১৪৮ নম্বর রসারােডে শ্ৰীযুত দেশবন্ধুর ভবনে সে দিন সকলেই একটু সকালে উঠিয়াছেন-রাত্রে বােধ হয় কাহারও ঘুমই হয় নাই। দেশবন্ধু চায়ের টেবিলে বসিয়া সার্ভেন্ট কাগজ খানা পড়িতেছিলেন। সম্পাদকীয় স্তম্ভে তাঁহার অতুলনীয় ত্যাগ এবং চিররঞ্জনের গ্রেপ্তারের সম্বন্ধে একটা চমৎকার প্রবন্ধ বাহির হইয়াছিল। সেইটি পড়িতে পড়িতে দেশবন্ধুর চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। অপূর্ণ নয়নে তিনি বলিলেন--“আমার ছেলের জন্য আমি দুঃখিত নই, আমার একটা ছেলে আমি দিয়াছি, কিন্তু বাংলা দেশে কি আর ছেলে নাই, বাংলার সােনার ছেলেরা কি মরে গেছে ?” বাংলার যুবকগণের চৈতন্য সম্পাদনের জন্য দেশবন্ধু ইতি পূৰ্বেই একটা আবেদন (Appeal) বাহির করিয়াছিলেন কিন্তু তাহাতে ফল কিছুই হয় নাই। তাই তিনি ঠিক করিলেন দেশে যদি পুরুষ নাই থাকে, তবে ঘরের মেয়েদেস স্বেচ্ছাসেবক হইয়া রাস্তায় বাহির হইতে হইবে। কাপ্তেন বসু ৬ আমরা তাে অনেক আপত্তি করিলাম। পুরুষ সকলে কারাগারে গেলে তারপর মেয়েরা নামা উচিত, অন্তত আমরা থাকিতে ভঁহারা বাহির হইবেন—ইহা কিছুতেই হইতে পারে না। জলদগম্ভীর স্বরে “Crying aptain” (সুভাষচন্দ্র) ও আমাদের উপর দেশবন্ধুর হুকুম হইল—তােমরা দুয়ের পরিচ্ছেদ কাজ চাও, না ভাবের আবেগের বিলাসিতা চাও ? অতঃপর স্থির হইল শ্ৰীমতী বাসন্তী দেবী ভলান্টিয়ার হইয়া বাহির হইবেন। দেশবন্ধুর ভগিনী শ্রীমতী উর্মিলা দেবী, নারী-কৰ্ম্ম-মন্দিরের শ্রীমতী উমা দেবী ও সুনীতি দেবী আসিলেন। ৩ জন মহিলা ও ২জন পুরুষ বাহির হইবেন, স্থির করা হইল। শ্ৰীমতী বাসন্তী দেবী, উর্মিলা দেবী, সুনীতি দেবী ও কংগ্রেস আপিস হইতে ২জন ভলান্টিয়ার লইয়া বাহির হওয়া স্থির হইল। চালক হইয়া কে যাইবে কথা উঠিলে আমিই অগ্রসর হইলাম। কিন্তু দেশবন্ধু অমত করিলেন। অনেক পীড়াপীড়ির পর এই শর্তে অনুমতি দিলেন যে আমি গাড়ীতে থাকিয়া উহাদের নির্দিষ্ট স্থানে লইয়া যাইব এবং ইচ্ছা করিয়া ধরা দিব না। আমি: তাহাতেই রাজি হইলাম। সুভাষচন্দ্রের বাড়ী হইতে মােটর আসিল। সেই গাড়ীতে আমরা চড়িয়া কংগ্রেস আপিস হইতে খদ্দর ও দুই জন ভলান্টিয়ার লইয়া প্রথমে কলেজ স্ট্রীট ও হ্যারিসন রােডের মােড়ে নামিলাম। এই খানেই আগের দিন চিররঞ্জন গ্রেপ্তার হন। মায়েরা চারিদিকের দোকানে হরতাল করিবার জন্য অনুরােধ করিতে লাগিলেন। সকলেই স্বীকৃত হইলেন। মায়ের হাতের খদ্দর কত লােকে কিনিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে ভিড় জমিয়া উঠিল। আজ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সহধম্মিনী ও ভগিনী দেশের জন্য রাস্তায় বাহির হইয়াছেন দেখিয়া কত লােক অশ্রুবর্ষণ করিতে লাগিল। নিকটে যে সমস্ত কনেষ্টবল দাঁড়াইয়া ছিল তাহারা কিছু বলিল না। পূৰ্ব্বদিন চিররঞ্জনকে ধরিয়া জোড়াসাঁকে থানায় লইয়া যাওয়া হয়। আমরা তারপর জোড়াসাঁকো থানার দিকে চলিলাম। সুভাষদের গাড়ী খানা খারাপ হইয়া গেল। একখানা ট্যাক্সি লইয়া রওনা হইলাম। ট্যাক্সি ওয়ালা ভুল করিয়া জোড়াবাগান আউটপােষ্টে লইয়া গেল। সেখানে ১০ বন্দীর ডায়েরী রাস্তায় দণ্ডায়মান একজন পুলিশ প্রহরীকে গ্রেপ্তারের কথা বলিতে সে বলিল—আমরা চাকরী করি বলেই কি এমন অধঃপতিত হয়েছি যে মায়েদের গ্রেপ্তার করবাে ? জোড়াবাগান থেকে একজন হিন্দুস্থানী যুবক একখানা মােটরে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আসিতে লাগিল। জোড়াসাঁকো থানার সামনে যে সমস্ত দোকান আছে তাহাদিগকে হরতাল করিতে বলা হইল এবং মায়েরা থানার ইন্সপেক্টর বাবুর কাছে খদ্দর বিক্রয়ের জন্য গেলেন। এমশ সকলে বড়বাজারের দিকে অগ্রসর হওয়া গেল। তখন হাজার হাজার লােক চারিদিকে দাড়াইয়া গিয়াছে। বড়বাজার থানার সম্মুখ দিয়া যাইয়া ফিরিবার সময় দেখিলাম একখানা মােটর-বাইকে পুলিশের এসিটাণ্ট কমিশনর ও দুই জন সার্জেন্ট আসিতেছে। মাকে এই কথা বলাতে তাহারা আবার ফিরিয়া থানার দিকে চলিলেন। দুইজন সার্জেন্ট আসিয়া মায়েদের জিজ্ঞাসা করিল Mada, what are you doing here (মহাশয়া, আপনারা এখানে কি করিতেছেন ?) মায়েরা বলিলেন—We are selling Khaddlar and (leclaring hartal ( আমরা খদ্দর বিক্রয় করিতেছি ও হরতাল করিতে সকলকে অনুরােধ করিতেছি) সার্জেন্ট-Will you kindly walk to the Thana আপনার অনুগ্রহ করিয়া থানায় যাইবেন? মায়েরা,--Oh ves, most gladly ( নিশ্চয়ই, আনন্দের সহিত যাইব।) আমি তখন গাড়ী হইতে জিজ্ঞাসা করিলাম যে, মা আপনাদের কি গ্রেপ্তার করিয়াছে ? মা বলিলেন--হ। তখন বেলা ৪৩ টা হইবে। তখনি ট্যাক্সি লইয়া কংগ্রেস আপিসে চলিলাম। আর একটা ছেলেকে দিয়া বাড়ীতেও টেলিফোন করিবার জন্য বন্দোবস্ত করিলাম। কংগ্রেস । আপিসে খবর পৌছিতেই কলিকাতা বিদ্যাপীঠ অধ্যাপকদের নিষেধ সত্ত্বেও দুইয়ের পরিচ্ছেদ ১১ ভাঙিয়া গেল এবং ছেলেরা দলে দলে গ্রেপ্তার হইবার জন্য বাহির হইল। সকলের মুখেই দৃঢ়ভাব, কথা নাই। আমি তত পাঁচজন খিলাফতী ভলান্টিয়ার লইয়া বড়বাজারের দিকে ট্যাক্সিতেই চলিলাম। থানার সম্মুখে যাইতেই রিভলভার হাতে একজন সার্জন আমাদের গ্রেপ্তার করিয়া ভিতরে লইয়া গেল। চারিদিকে লাল পাগড়ীর ভিড়-রাস্তায় কাতারে কাতারে সংক্ষুব্ধ জনসংঘ। কত লােক গ্রেপ্তার হইবার জন্য স্বেচ্ছায় ছুটিয়া আসিতে লাগিল। সে এক অপরূপ দৃশ্য। সে এক অপরূপ দৃশ্য ! পুলিশের লােকের চোখ দিয়াও জল পড়িতে লাগিল। থানার ভিতর গিয়া মায়ের কাছে আসিয়া প্রাণটা বাঁচিল। বড়বাজার থানার ইনসপেকটার মহাশয় বড় ভদ্রলােক অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি আমাদিগকে যথাসম্ভব আদর যত্ন করিলেন। হাওড়ায় যখন গুর্খা পুলিশ মােটর ভতি হইয়া রাতদুপুরে রাস্তায় রাস্তায় হুড়মুড় শব্দে ঘুরিয়া বেড়াইত তখন শ্ৰীযুত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় যেমন বলেন যে জাগিয়া উঠিয়া নিজের গা নিজে টিপিয়া দেখিতেন—আছি না ধরে নিয়ে গেছে। আমারও সেই অবস্থা হইল –“ধরেছে না নেমন্তন্ন করে এনেছে” ঠিক বুঝিলাম না। এদিকে দলে দলে লােক আসিয়া থানা ভতি করিতে লাগিল। ১০/১২ বছরের ছােট ছােট ছেলে খাদি টুপি ও জামা গায়ে দিয়া আসিয়া উপস্থিত। দারােগা বাবু, তাহাদের গ্রেপ্তার করিতেছেন না বলিয়া বেচারার কঁদিতে লাগিল। খানিক পরে দেখি ঐ সব ছেলেরা কৃত্রিম দাড়ি গোপ লাগাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে এবং বলিতেছে আমাদের বয়স ২১ বৎসর, আমাদের এইবার ধর। একজন ধনী মাড়ােয়ারী যুবককে ছাড়াইয়া লইবার জন্য তাহার পিতা কত চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সে বেচারী আসিয়া চেয়ারের পিছনে দাড়াইয়া রহিল—কিছুতেই যাইতে ১২ বন্দীর ডায়েরী চায় না। তাহার স্ত্রীর ও মায়ের অসুখ ইত্যাদি দুঃসংবাদ দিয়াও পিতা তাহাকে রাজী করিতে পারিলেন না। পরে যুবকটিকে হাজতে দেখি নাই বােধ হয় চাকৃতির জোরে পুলিস-কর্মচারিগণ তাহাকে বাড়ী ফিরাইয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিল। ডেপুটী কমিশনার পূর্ণচন্দ্র লাহিড়ি ও আর একজন এসিষ্ট্যান্ট কমিশনার মায়েদের কত অনুরােধ করিলেন একটা নাম অনুগ্ৰহ করিয়া সই করিয়া দিয়া তাহারা যেন বাড়ী যান। মায়েরা বলিলেন--আমরা কোনও অন্যায় করি নাই, পুলিশ আমাদিগকে আনিয়াছে, আমরা জামিন দিতে চাই না, তােমরা যাহা ইচ্ছা করিতে পার। লাহিড়ি মহাশয় আমার দিকে আঙ্গুল দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—who is that boy ? (ঐ বালকটি কে?) পরে আমার পরিচয় পাইয়া আমাকেও নাম-সই করিয়া চলিয়া যাইবার অনুরােধ করিলেন। বলা বাহুল্য তাঁহার অনুরােধ রাখিতে পারি নাই বলিয়া আমরা দুঃখিত ছিলাম। ইতিমধ্যে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন কয়েকজন থানায় খাবার প্রভৃতি আনিয়াছিলেন। বাহিরে নেতারা সংক্ষুব্ধ জনসাধারণকে ঠাণ্ডা করিতেছিলেন। শ্ৰীযুক্ত সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র মহাশয় কাগজে একটা কিছু message (বাণী) দেওয়ার জন্য বলিলেন—মায়েরা একটা লিখিয়া দিলেন ; আমাকেও বলিবামাত্র ভাবিলাম সুযােগ ছাড়ি কেন! সব নেতাই লম্বা লম্বা “মেসেজ” দেন—আমি না হয় ছােট্ট একটু কিছু লিখি। মাষ্টার মহাশয়ের মত ছাত্রদিগকে অহ্বান করিয়া তিন লাইন লিখিয়া দিলাম- Come out and enlist in thousands as volunteers. Swaraj is within sight. I wish your life may be hallowed by taking part in this righteous fight for your great Motherland's freedom, ; ০ দুয়ের পরিচ্ছেদ। “ছাত্রবৃন্দ, তােমরা কলেজ ছাড়িয়া এস এবং হাজারে হাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলভুক্ত হও। স্বরাজের আবির্ভাব সূচিত হইয়াছে। আমার ইচ্ছা মাতৃভূমির স্বাধীনতা আনয়নের জন্য এই ধৰ্ম্মযুদ্ধে যােগ দিয়া তােমাদের জীবন পবিত্র হয়।” মায়েদের রাত আটটার সময় ট্যাসি করিয়া লইয়া গেল। (আমরা ৬০/৭০ জন Prisoners van এ (বন্দী গাড়ীতে) লালবাজার রওনা হইলাম—খুব ঘূর্তি! রাস্তায় গাড়ী থামাইয়া দুই চাৰিজন ঢুকিয়া পড়িল। লালবাজারে পৌছিয়া উপর নীচে দুইঘরে ৭২ জনকে পূরিল। সেই শীতকালের রাত্রে ৭২জনের শােয়র জন্য খানদশেক কম্বল দিল। পর্দাহীন পাইখানার গন্ধে আমােদিত ঘরে নৃত্যগীতে রাতটা কাটিয়া গেল। ১৫ হইতে ৫০ বৎসর পর্যন্ত বয়স্ক হিন্দু মুসলমান শিখ সকলেই দলে ছিলেন। রাতে মুড়ি চিনি খাইতে দিয়াছিল। হাজতের ডাক্তার, রাইটার, জমাদার প্রভৃতি সকলেই খুব ভদ্র ব্যবহার করিয়াছিলেন এবং আমাদিগকে যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছিলেন। প্রহরীদের মধ্যে দুই একজন তােত গানের সঙ্গে তাল দিয়া নাচিতেছিল। গান শুনিয়া সার্জন সাহেবদের ঘুম ভাঙাতে মধ্যে মধ্যে আসিয়া গালাগালি দিয়া যাইতে লাগিলেন। সকলে হাসিয়াই অস্থির। পূর্বরাত্রে ভােলদের উপরে লাথি ঘুষি চলিয়াছিল—আমাদের বেলায় শুধু কথার উপর দিয়াই গেল। কপালের জোর থাকিলে এমনই হয় '- তিনের পরিচ্ছেদ। ও? গ্রেপ্তারের পরদিন । রাত্রি শেষ হইবার আগেই অন্ধকারকে আশ্রয় লইয়া সকলে পর্দাহীন পাইখানার কাজ শেষ করিয়া লইয়াছিল। মুখ ধুইবার জন্য প্রহরী ঘটি করিয়া দরজার বাহির হইতে জল ঢালিয়া দিল, আমরা হাতে আঁজলা করিয়া গ্রহণ করিলাম। তারপর ছেলেদের আর এক কাজ জুটিল। দেওয়ালের রং নূতন করা হইয়াছিল- সেই কঁচা রং আঙ্গুলে লাগাইয়া সাদা জায়গায় নানা রকম লেখা হইতে লাগিল। “স্বরাজ আশ্রম—লাল- বাজার” “২৪শে হরতাল” ইত্যাদি কত কি যে বাংলা, হিন্দী, উর্দ, গুরুমুখী ভাষায় লেখা হইল তার আর সংখ্যা নাই। পূৰ্ব্বদিন রাত্রে নামধাম লিখিবার সময় যাহার যাহা পকেটে ছিল কাড়িয়া লওয়া হইয়াছিল। সকালে একখানা পত্রিকা কি প্রকারে আসিয়া পড়িল। দেখিলাম পণ্ডিত মতিলাল ধৃত হইয়াছেন। পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে রহিয়াছে “We learn Srimati Basanti Debi ( Mrs C_R Dass ), Urmila Debi, Suniti Debi and Sj Hemantakumar Sarkar were arrested yesterday.” (শ্ৰীমতী বাসন্তী দেবী, উর্মিলা দেবী, সুনীতি দেবী ও শ্ৰীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার কাল গ্রেপ্তার হইয়া- ছেন।} সম্পাদকীয় স্তম্ভে এই কয়টা কথা দিয়াই শেষবাকি কলমটা সব ফাক, সাদা জায়গা। পত্রিকার মন্তব্য পৰ্য্যন্ত নাই। আর এক পৃষ্ঠায় তিনের পরিচ্ছেদ। ১৫ খুব বড় বড় অক্ষরে দেওয়া হইয়াছে কালকার ঘটনা এবং মেয়েদের গ্রেপ্তারের কথা। সকালবেলার খাবার গরম গরম জিলিপি দিল—মহা আনন্দে নিজেরা ভাগ করিয়া খাওয়া গেল। শােনা গেল ম্যাজিষ্ট্রেট আসিয়াছেন—শীঘ্রই আমাদিগকে যাইতে হইবে। তাড়াতাড়ি খাইয়া লইবার হুকুম হইল এবং এরূপ অসময়ে কেন আমাদিগকে খাবার দেওয়া হইয়াছে বলিয়া জমাদারকে এক সাহেব আসিয়া মধুর ভাষায় গালাগালি দিয়া গেলেন। বেলা আটটার সময় খিড়কি দরজা দিয়া আমাদিগকে ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে লইয়া যাওয়া হইল। দুধারে লগুড়ধারী সিপাই, মধ্যে মধ্যে পিস্তল হাতে সার্জন সাহেবরা দাঁড়াইয়া আছে। ঘরে ঢুকিয়াই চেয়ারে যে মূর্তি দেখিলাম তাহা প্রাতঃকালে না দেখাই শাস্ত্রের বিধান। কেহ জামিন দিতে স্বীকার হইল না। আসিবার পূর্বেই আমরা সকলে ঠিক করিয়া লইয়াছিলাম কি ভাবে চলিতে হইবে। ম্যাজিষ্ট্রেট হুকুম দিলেন পরদিন প্রাতে প্রেসিডেন্সি জেলে বিচার হইবে। ফিরাইয়া আবার ঘরে বন্ধ করা হইল। বেলা ক্রমশই বাড়িয়া চলিয়াছে—প্রেসিডেন্সি জেলে কখন যে লইয়া যাইবে স্থির নাই। সময় কাটাইবার জন্য আবার হৈ হৈ রৈ রৈ আরম্ভ হইল। লালবাজারের মেথর প্রভৃতিকে ২৪শে ডিসেম্বর হরতাল করিতে উপদেশ দেওয়া হইল। অবশেষে বেলা দুইটার সময় ‘লরি’ (Lorry) আসিল—খাঁচার মত তার দিয়ে ঘেরা। আমরা রাস্তার দুধারের লােককে “২৪শে হরতাল” বলিতে বলিতে প্রেসিডেন্সি-জেলে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। জেলের ভিতর সারি সারি দুজন দুজন করিয়া বসাইয়া দেওয়া হইল--আমিও বসিলাম। খানিক পরে জেলর আসিয়া আমায় ধরিয়া ফেলিলেন। বলিলেন—“Hallo, you are here! Do you want to stay with young Das?

বন্দীর ডায়েরী ( ওঃ আপনিও এখানে! আপনি চিররঞ্জুনের সঙ্গে থাকিতে চান?) আমি afrontal, I have no option, if you allow I will certainly prefer it, (আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা নাই, তবে আপনি যদি থাকিতে দেন আমার ভালই হইবে।) আমাকে আলাদা করিয়া শ্ৰীমান ভােম্বলের কাছে লইয়া যাওয়া হইল। অন্যান্য সকলকে আর একদিকে লইয়া গেল। বেলা তিনটার সময় স্নানাদি করিয়া আহারে বসিলাম—আমাদের সহিত দেখা করিতে বাড়ী হইতে লােক আসিয়াছে। আহার রাখিয়া দেখা করিতে চলিলাম।: মায়েদের রাত্রে প্রেসিডেন্সি জেলে আনিয়া Female Wardএ (মেয়েদের জেলে ) রাখিয়াছিল। লাটসাহেব কাউন্সিল ডাকিয়া পরামর্শ করিয়া রাত্রেই তাঁহাদের ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। শুনিলাম পরদিন আবার তাঁহারা স্বেচ্ছাসেবকরূপে বাহির হইবেন। তাহাদের গ্রেপ্তারের পর কলেজের অনেক ছেলে বাহির হইয়াছে এবং শিখ-মহিলা অনেকে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ গ্রহণ করিয়াছেন। একবস্ত্র ও একখানা গায়ের কাপড় লইয়া বন্দী হইয়াছিলামবাড়ী হইতে কিছু কাপড় চোপড় পাঠাইতে বলিয়া দিলাম। Interview (দেখা) করার সময় আমরা ভিতরে চেয়ারে বসিলাম, মাঝখানে লােহার জালের বেড়া—এইভাবে কথাবার্তা সারিয়া cell (কুটুরীতে) ফিরিলাম। আহারাদি শেষ হওয়ার পর বেলা ৩ টার সময় বন্ধ করিয়া Warder ( জেলকর্মচারী) সাহেব চলিয়া গেলেন। একহাত চওড়া একখানি লােহার খাটে বিচালির গদির উপর কম্বল বিছাইয়া মাথায় একখানা কম্বল বালিশ করিয়া আর একখানা গায়ে দিয়া মশার কামড় উপভােগ করিতে করিতে নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হইলাম। যতক্ষণ ঘুম না আসিল ততক্ষণ চীৎকার করিয়া আমি ও ভোম্বল পাশাপাশি তিনের পরিচ্ছেদ ১৭ cell ( কুটুরী) হইতে গল্প চালাইতে লাগিলাম। আমি যে কুটুলীতে ছিলাম সেটাতে নাকি কোনও কালে শ্ৰীযুত সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জেলে আসিয়া বাস করিয়া গিয়াছিলেন। আমি আসার ঠিক আগেই শ্ৰীযুত জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ঐখানে ছিলেন।

চারের পরিচ্ছেদ। বিচারের দিন। ? গর্মেন্ট হইতে আদেশ আসিয়াছিল যে আমাদের বিচার জেলের মধ্যেই হইবে—কেন-না দু-একজন “প্রভাবসম্পন্ন নেতা” (Influential leaders) নাকি আমাদের মধ্যে ছিল যাহাদের বিচার প্রকাশ্য আদালতে করিলে শান্তিভঙ্গের সম্ভাবনা হইতে পারে। আমি ও ভােম্বল এই সংবাদে খুবই flattered ( আপ্যায়িত) হইলাম, কারণ আমরাই নিরন্ত-পাদপ দেশের এরম ছিলাম। প্রবল প্রতাপান্বিত ব্রিটিশ গবর্মেন্ট আমাদের ভয় করে ভাবিয়া যে কোনও শাস্তি লইতে প্রস্তুত হইলাম। ভােলদের বিচার কোর্টে হইবার কথা ছিল। জেলের মধ্যে আমাদের একটু আগেই উহাদের দণ্ড হইয়া গেল। দুই বৎসর, এক বৎসর, ছয়মাস ও ফাইন- বিচারকের যেমন খুসী একই অপরাধে বিভিন্ন শাস্তি দিয়া চলিয়া গেলেন। ভােম্বলের ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা, না দিলে আর ছয় সপ্তাহের আদেশ হইল। আমাদের ডাক পড়িল। কোর্ট ইনপেক্টর বাবু আমাকে খাতির করিয়া চেয়ারে বসিতে দিলেন। ব্যারিষ্টার শ্ৰীযুত এস, এন, হালদার মহাশয় নােটু লইবার জন্য উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে ম্যাজিষ্ট্রেট অনুমতি দেন নাই—কিন্তু বিচার প্রকাশ্যভাবে হইতেছে কি না জিজ্ঞাসা করায় পরে অনুমতি দিয়াছিলেন। শ্ৰীযুত হেমেন্দ্রনাথ দাস গুপ্ত প্রভৃতি কংগ্রেসের দুই একজনও উপস্থিত ছিলেন। সার্জেন্টরা বাইবেল চুইয়া পরিষ্কার মিথ্যা সাক্ষী দিয়া গেল। একজন স্বেচ্ছাসেবককে দুইজন সার্জন . চারের পরিচ্ছেদ ধরিয়াছি বলিয়া সনাক্ত করিয়া গেল। আমার বােধ হয় দুই জনে দুই দিক হইতে দুই হাত চাপিয়া ধরিয়াছিল! একে একে ভলান্টিয়ারগণকে জিজ্ঞাসা করাতে নানাজনে নানা রকম উত্তর দিতে আরম্ভ করিল। একজন I don't like to be tried by a slave like you (cotata মত গােলামের কাছে আমার বিচার চাই না)। আর একজন বলিল— I refuse to answer the servant of a satanic government (তােমার মত শয়তানী গবর্মেন্টের চাকরের কথার জবাব আমি দিব না)। আর একজন বলিল---If you ask me whether I am a volunteer I will say I am what you choose to call'a Gandi goonda (যদি আমায় জিজ্ঞাসা কর আমি স্বেচ্ছাসেবক কি না তাহা হইলে বলিব তােমরা যাহাকে গান্ধীগুণ্ডা’ বল আমি তাই ) আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে আমি এই কথাগুলি বলিয়াছিলাম-I am simply gaping with wonder at the truth spoken by these Christian gentlemen after kissing the Bible......(As I consider myself a free Indian I deny the jurisdiction of this court set up by the British falsely in the name of law and Order. I hope to be released when the prison gate will be opened by the first President of the Indian Republic and that's on the 31st of December. “এই সকল খ্রীষ্টান সার্জেন্টগণ বাইবেল ছুইয়া যে সমস্ত অমূল্য সত্য বলিয়া গেল আমি অবাক হইয়া সেইগুলির কথা ভাবিতেছি.. যেহেতু আমি নিজেকে স্বাধীন ভারতীয় বলিয়া মনে করি আমি আইন ও শৃঙ্খলার মিথ্যা দোহাই দিয়া স্থাপিত এই ব্রিটীশ আদালতের অধিকার অস্বীকার করি। ৩১শে ডিসেম্বর তারিখে ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের বন্দীর ডায়েরী প্রথম সভাপতি আসিয়া কারাদ্বার উন্মােচন করিলে আমি বাহির হইব আশা করি । ধিচারে আমাদের ৭২জনের ছয়মাস সশ্রম কারাদণ্ড হইল। কেবল একটি ছেলের পিতা আসিযা ক্ষমা প্রার্থনা করাইয়া তাহাকে মুক্ত করিয়া লইয়া গেলেন। এই ছেলেটি লালবাজারে রাত্রে খুব গান ও লাফালাফি করিয়াছিল। আমার তখনই সন্দেহ হইয়াছিল, এত উৎসাহ থােপে টিকিবে কি না? শাস্তির হুকুম হইবার পরেই সকলে সমস্বরে “গান্ধী মহারাজকী জয়” ‘স্বরাজকী জয়” প্রভৃতি জয়ধ্বনি দিলেন। অমনি ‘পাগলা ঘণ্টী” (Alarm) বাজানাে হইল। ভলান্টিয়ারদিগকে থামাইবার জন্য আমাদের অনুরােধ করা হইল। কোর্টের এবং জেলের অফিসার সকলেই ভদ্র ব্যবহার করিলেন। ইন্সপেক্টর বাবু করমর্দন করিয়া ক্ষমা চাহিলেন—পােড়া চাকরীর দায়ে এই সমস্ত অন্যায় করিতে হয় বলিয়া দুঃখ জানাইলেন। আমরা পােড়া চাকরি ছাড়িয়া দিতে বলিলাম। এই জঘন্য গােলামির জন্যই তাে আজ আমাদের এমন অবস্থা। ১০ই ডিসেম্বর সন্ধ্যার সময় বন্ধ হওয়ার পর শুইয়া আছি এমন সময় দেখি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মৌলানা আবুলকালাম আজাদ, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, পদ্মরাজ জৈন, ভোলানাথ বৰ্মন প্রভৃতি গ্রেপ্তার হইয়া আসিলেন। আর এক ওয়ার্ডে মৌলানা আকরম খাঁ, শ্ৰীযুক্ত সুভাষচন্দ্র প্রভৃতি আসিয়াছেন খবর পাওয়া গেল। তাঁহাদের ওয়ার্ডে কয়েকজন চীনা ছিল। শুনিলাম আকরম খাঁ সাহেবকে তাহারা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—Opium, opium ? Cocaine,cocaine ? অর্থাৎ ‘আপিম’ কোকেন’ কোন্টা চুরি করিয়া জেলে আসিয়াছ? খাঁ সাহেব ঘাড় নাড়াতে তাহারা আবার বলিল—Gandi, Garidi ? “গান্ধী, গান্ধী” করিয়া আসিয়াছ ? তখন তিনি বলিলেন—হাঁ। আপিম কি কোকেন চারের পরিচ্ছেদ ভিন্ন আর কি কারণে জেলে আসা হইতে পারে—চীনাগণ বােধ হয় ধারণাই করিতে পারে না! প্রেসিডেন্সি জেলের ইউরােপীয়ান ওয়ার্ডটি মন্দ নয়—উপরে ৫টি cell ( কুটুরী), নীচেয় পাঁচট। বাবুচিখানা ও স্নানাদির জায়গা ওয়ার্ডের ভিতরেই। সামনে অল্প একটু জায়গা আছে—চারিদিকে পাঁচীরঘেরা --একজোড়া হরিণও ছিল। কবিবর ডােম্বলের তত হরিণযুগল দেখিয়া কবিত্ব জাগিয়া উঠিল—বলিয়া ফেলিলেন :- ছিঃ মাের৷ সুলােচনে গােদাবরী তীরে হরিণ হরিণী যথা উচ্চ বৃক্ষ চূড়ে” ইত্যাদি মাইকেল যে হরিণ হরিণীকে উচ্চ বৃক্ষচূড়ে কপােত কপােতর স্থানে চড়ান নাই, ভায়ার কবিত্বের ঝোঁকে সে খেয়ালই ছিল না ! প্রেসিডেন্সি জেলের সুপারিন্টেটে কর্ণেল হ্যামিল্টন ভদ্র ব্যবহার করিতেন। প্রাতে ডাক্তার বাবুকে সঙ্গে করিয়া আমাদিগকে দেখিতে আসিতেন। ওয়ার্ডারের আদেশ অনুসারে বিছানা গুটাইয়া দরজার কাছে দাড়াইয়া বড় সাহেবকে অভ্যর্থনা করিতে হইত। ডাক্তার বাবু আমাদিগকে আগেই প্রণাম করিতেন; ভালমানুষ বলিয়া তাহাকে বােধ হইত। ‘সুপার'কে (সুপারিন্টেন্টেকে) আমরা মুখে Good morning ( সুপ্রভাত) বলিয়া সম্ভাষণ করিতাম। তিনিও আমাদের সঙ্গে যথোচিত ভদ্রতা করিতেন। জেলর সাহেব মুখ মিষ্টি, অথচ পেটে-পেটে দুষ্ট গােচের লােক ছিলেন। তবে আমাদের সঙ্গে কিছু অভদ্র ব্যবহার করেন নাই। ওয়ার্ডার ব্রিগস্ সাহেব পূৰ্বে সেনা বিভাগে কাজ করিতেন। পেন্সন লইয়া জেলের কাজে ঢুকিয়াছেন। বন্দীদের অপেক্ষা তাহারা যে বেশী স্বাধীন এমন মনে হইত না। বেচারা গোপ জোড়াটা পাকাইয়া সকলকে ;

২২ বন্দীর ডায়েরী ভয় দেখাইতেন। একট। বানান লিখিতে কলম ভাঙ্গিয়া ফেলিতেন। অধীনস্থ সাধারণ কয়েদী বা সিপাহীদের উপর তিনি খুব প্রভুত্ব করিতেন। একদিন সুপার আসিতেছেন, এই খবর না দেওয়াতে একজন কয়েদী- অফিসরকে খুব ধমকাইয়া দিলেন। দেখিলাম হিন্দুস্থানী ভাষার সমস্ত বিশ্রী গালাগালি তাহার কণ্ঠস্থ ! ব্রিগস্ সাহেব সর্বদাই আমাদের বলিতেন—তােমরা যা-খুসী কর, দেখো যেন আমার চাকরির কোনও হানি না হয়। ব্রিগস্ চোখে কম দেখিতেন। কয়েদীরা সুবিধা পাইলেই তাঁহার পিছনে দাড়াইয়া জিব বাহির করিয়া ভ্যাংচাইত। এসিটান্ট জেলর প্রভৃতি সকলেই আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করিতে চেষ্টা করিতেন। প্রেসিডেন্সি জেলের সাধারণ কয়েদীরা আমাদের দেবতার মত ভক্তি করিত। আমাদের বাবুর্চি অথবা বেহারার কাজ যাহারা করিত তাহাদের ভক্তি দেখিলে অবাক হইতে হইত! কত প্রকারে যে আমাদের যত্ন করিবে তাহা খুজিয়া পাইত না। জেলের পাটের কলে যে সমস্ত কয়েদী কাজ করিতে আসিত তাহারা দূর হইতে ইসারা করিয়া জিজ্ঞাসা করিত আমরা সিগারেট খাই কি না! শুনিয়াছি পাটের কলে আবগারী বিভাগের গুপ্ত কারবারে হাজার হাজার টাকা খাটতেছে। গবর্মেন্ট যেমন জেলটাকে ব্যবসার জন্য রাখিয়াছে জেলের ভিতর কর্মচারী ও কয়েদীগণ সেইরূপ আরও কত ব্যবসাই না ফাদিয়াছে। শুনিলাম একটাকা দিলে সিপাহীদের নিকট নাকি আট আনার জিনিষ পাওয়া যায়। ভাল কাজ মন্দ কাজ পাওয়ার জন্য ঘুষ চলে। থাকার ভাল জায়গার জন্য ভাড়ার গুপ্ত বন্দোবস্ত আছে, খাবার ভাল পাইতে হইলেও পয়সা খরচ করিতে হয়। জেলের ভিতর মানুষকে নষ্ট করিবার কত রকম বন্দোবস্ত যে প্রহিয়াছে, তাহা পরবর্তী অধ্যায় সমূহে ক্রমশঃ জানা যাইবে।

চারের পরিচ্ছেদ এই প্রেসিডেন্সি জেলে আলিপুর বােমার মামলার আসামী শ্রীঅরবিন্দ, বারী, উল্লাসকর, উপেন্দ্র প্রভৃতি ছিলেন। উপেন্দ্র প্রভৃতি ছিলেন। এইখানে নরেন গোঁসাইকে গুলি করা হয়। এবং কানাই সত্যেনের ফাসিও এইখানেই হয়। কানাই- লালের কথা মনে করিলে গাত্র রােমাঞ্চিত হয়। ফাসির দিন সকালে গভীর নিদ্রামগ্ন কানাইকে জেলর আসিয়া তুলিলেন, হাসিমুখে নির্ভীকভাবে মঞ্চের উপর কানাই দাঁড়াইয়া কেবল বলিল, দড়িটা একটু সরাইয়া দাও আমার দাড়িতে লাগিতেছে। মৃত্যুকে এমন করিয়া বরণ করা সেই যুগের বাংলার সাধনার মূর্ত প্রতিমা কানাইয়ের পক্ষেই কেবল সম্ভবপর ছিল। আমরা সেই নরদেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম করি। তাঁহার তিরােভাবের স্থানে আসিয়া নিজেকে ধন্য মনে করি।'

পাঁচের পরিচ্ছেদ আলিপুর জেলে। ১১ই ডিসেম্বর প্রাতে একখানা ট্যাসি করিয়া ডােম্বলকে ও আমাকে প্রেসিডেন্সি জেল হইতে আলিপুর জেলে পাঠানাে হইল। সৈদিন রবিবার, জেলর সাহেব গির্জায় গিয়াছেন। আমাদিগকে অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিতে হইল। পলিটিক্যাল প্রিজনারদিগের চার্জে গ্র্যান্ট বলিয়া একজন ওয়ার্ডার ছিলেন। আমরা আসিবামাত্রই তাহাকে খবর দেওয়া হইল। মন্থরগমনে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে তিনি দেখা দিলেন। গ্র্যান্ট ভোম্বলের পুরাতন বন্ধু—দেখিয়াই তাহাকে চিনিতে পারিয়াছে; ভােম্বল কিন্তু মনে করিতে পারিল না। অবশেষে দুই বন্ধুতে পরিচয় হইয়া গেল। জেলরের আপিসে ছােট ডাক্তার বাবু বসিয়া ছিলেন। লালবাজার হইতেই তাহার সুখ্যাতি শুনিয়াছিলাম। বিড নামে আর একজন ওয়ার্ডার আসিয়া পরিচয় দিলেন যে তিনি ট্রাঙ্ক মার্ডার কেসের সেই বিখ্যাত সাক্ষী that mau without memory ( স্মৃতিশক্তিহীন ব্যক্তি ) যাহাকে শ্ৰীযুত সি, আর, দাশ জেরা করিয়াও কোন উত্তর পান নাই, কারণ সব কথারই তিনি জবাব দিয়াছিলেন I don't remember ( আমার মনে নাই)। চীফ ওয়ার্ডার আর্থার রায়ান আসিয়া জানাইলেন যে তিনি জাতিতে আইরিস সুতরাং আমাদের কোনও ভাবনা নাই। জেলর উইলিয়ম রায়ান্ আসিলে আর্থার তাঁহার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করাইয়া দিলেন। তিনি সি, আর, দাশ মহাশয়ের পাঁচের পরিচ্ছেদ গ্রেপ্তারের কথা শুনিয়া ১৫ মিনিট চুপ করিয়া ভাবিলেন এবং আমরা জেলে আসাতে দুঃখ প্রকাশ করিলেন। এইখান হইতেই রায়ান সাহেবের সহৃদয়তার পরিচয় পাই। এই সব দেখিয়া শুনিয়া মনে করিলাম জেলে আসিয়া নিতান্ত জলে পড়ি নাই। বড় ডাক্তার বাবু আসিয়া আমাদিগকে ওজন করিলেন ও দৈর্ঘ্য মাপিলেন, ওজন ১৫৮ পাউণ্ড ও দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট হইল। সংকল্প করিলাম সপ্তাহে এক পাউণ্ড করিয়া বাড়িতে হইবে। পরে আমার সে সংকল্প নিতান্ত ব্যর্থ হয় নাই। এইবার আপিসের মধ্যেই জেলের পােষাক পরিতে হইল। আমরা বলিলাম ভিতরে গিয়া কাপড় ছাড়িব, কিন্তু অনুরােধ রক্ষা হইল না। জেলে প্রবেশ করিতে করিতেই লজ্জা, ঘৃণা, ভয় ত্যাগ করিতে আমাদিগকে “ইউরােপীয়ান্ প্রিজনার” বলিয়া গণ্য করা হইল। জেল কোডে আছে, যে সকল লোেক সাধারণ কয়েদী অপেক্ষা ভাল খাওয়া পরায় অভ্যস্ত তাহাদিগকে জেলকর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করিলে “ইউরােপীয়ান” শ্রেণীভুক্ত করিতে পারেন। চীনা, নিগ্রো, ফিরিঙ্গি সকলেই জেলে “ইউরােপীয়ান” বলিয়া গণ্য হয়—কেবল হতভাগা ভারতবাসী ভদ্রলােক সাধারণতঃ এই সুবিধা পায় না। ইউরােপীয় শ্রেণীভুক্ত হইলে খাওয়া পরা এবং কাজের অনেক সুবিধা। ইউরােপীয় এই নামের কি মহিমা ! প্যান্ট, কুর্তা ও টুপি লইয়া আমরা জেলের ভিতর প্রবেশ করিলাম। সেখানে একটি ছােট ওয়ার্ডে আমাদের দুইজনকে রাখা হইল। পরে শুনিলাম ঐটির নাম Female Ward (মেয়েদের ওয়ার্ড )। বাংলায় উহার যে নাম জেলে চলিত আছে,লজ্জার খাতিরে তাহা জানাইতে পারিলাম না।

২৬
বন্দীর ডায়েরী
এই ওয়ার্ডে দুইটা সেল (কুটুরী’ ), মাঝে একটী ঘর, সবশুদ্ধ ৬ জন
লােকের থাকিবার স্থান আছে। আমরা যখন আপিসে বসিয়া ছিলাম সেই
সময়েই দেখিলাম কতগুলি মেয়ে কয়েদী স্থানান্তরিত হইতেছে।
ইহাদিগকে সরাইয়া আমাদের জন্য জায়গা করা হয়।

হয়ের পরিচ্ছেদ। দশদিনের নির্জন কারাবাস। আমারা চাহিয়াছিলাম শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্র মােহন সেনগুপ্ত, জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি যেখানে আছেন, সেইখানে থাকিতে। কিন্তু এত জায়গা থাকিতে Female Ward (মেয়েদের ওয়ার্ডে) কোন্ কুগ্রহে স্থান পাইলাম কিছুতেই ঠিক করিতে পারিলাম না। মহিলাদের সঙ্গে গ্রেপ্তার হইয়াছিলাম বলিয়া বােধ হয় এইরূপ করিয়াছে মনে হইল। কিন্তু তাহাদের তাে ছাড়িয়া দিল আমার ভাগ্যে কেবল মেয়েদের জেলে আটক হওয়াই পুরস্কার হইল ! তবে পরে শুনিলাম, ভােম্বলের জন্য আমার এ দুর্গতি। লালবাজারে সে খাইল গােরাদের হাতে মরিগর্মেন্ট হুকুম দিলেন তাহাকে তফাৎ করিয়া রাখিতে যেন মারের দাগ কেহ না দেখিতে পায়। আমি তাে মার খাই নাই- আমাকেও সঙ্গদোষে অস্থানে পড়িতে হইল ! চারিদিক বন্ধ জনমানবের সাক্ষাৎকার নাই। কেবল খাবার দিতে বা তালা আটকাইতে যখন দয়াময় কেহ আসে, তখন মানুষের মুখ দেখা। যায়। দরজার গায়ে একটা চাবি লাগাইবার ছিদ্র ছিল সেইটা দিয়া বাহিরের জগতের সঙ্গে পরিচয় লাভ করিতাম। দিনে পাঁচীল-ঘেরা ছােট একটু জমির মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতাম, অথবা মাটীর উপর কম্বল পাতিয়া দুজনে শুইয়া আকাশের চিল গুণিতাম। তিন খানি করিয়া কম্বল দিয়াছিল, একখানি পতিতাম দুইখানি গায়ে দিতাম। আর অতিরিক্ত জামাটীতে বালিশের কাজ করিত। আমরা নামে ২৮ বন্দীর ডায়েরী ইউরােপীয়ান, কাজেও ইউরােপ কি বুঝিতে পারিয়াছিলাম। বিলেত ফেরৎ নই বলিয়া অনেকের নিকট উপেক্ষা পাইয়াছি, এবার সরকার বাহাদুরের কৃপায় সাহেবিয়ানার চূড়ান্ত হইয়া গেল। ইউরােপীয় পােষাক, ইউরােপীয় diet (খাবার), ইউরােপীয় বাবুর্চি,এমন কি ইউরােপীয় শীত পৰ্য্যন্ত ছিল ! একে ডিসেম্বর মাস তাতে মেঘলা ছিল—আমাদের অন্ধকার কারাগৃহের শীত, ইউরােপের শীতকেও হারাইয়া দিল। সুপারিন্টেণ্ডেন্টের কাছে একখানা বেশীর ভাগ কম্বল চাইলাম, তিনি দুঃখিত হইয়া বলিলেন জেলের আইনে দিবার হুকুম নাই। সর্দি কাশীতে অস্থির হইলাম, অবশেষে গরম জামা পাইলাম। আমাদের খানার একটু নমুনা দিই। পরে শুনিয়াছিলাম ইহারই নাম ইউরােপীয়ান diet (খাদ্য)! ভােরে উঠিয়া “ছােট হাজরি”, -এক এক মগ চা, আধখানা পাঁউরুটী ও কিছু মাখন মিলিত। চায়ের চেহারা দেখিয়া মনে হইত, গােশালা হইতে বস্তুবিশেষ মগে করিয়া আনা হইয়াছে! মাখনটা কি দিয়া প্রস্তুত ছিল, তাহা অনেক ভাবিয়া স্থির করিতে পারি নাই। পেটের জ্বালায় খানিকটা খাইয়া বাকিটা মেথরকে দিতাম। বেলা ১১টার সময় “ব্রেকফাঃ”—মােটাচালের দুটী ভাত, আধ সিদ্ধ দুটী ডিম, খানিকটা ডাল ও একটা চালকুমড়াের ঘাট আসিত। কোনও দিন ইহার ব্যতিক্রম হইবার জো ছিল না। চাল- কুমড়াের তরকারির এমন একটা গন্ধ ছিল যে, অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত উঠিয়া আসে। আমার নাকে দিনরাত সেই গন্ধটা লাগিয়া থাকিত। ডালগুলি জলে সিদ্ধ করা হইত, কিন্তু দানাগুলি দেখিলে মনে হইত যেন হাসিয়া আমাদিগকে ঠাট্টা করিতেছে। আমি তাে চোখ কান বুজিযা ডিম ও ভাত খাইতাম, কিন্তু ভােল ভায়া অপরাজেয় ছিলেন । তিনি আমার পরিত্যক্ত চালকুমড়াের তরকারি পর্যন্ত লইয়া গােগ্রাসে গিলতেন। এরই নাম পেটের জ্বালা ! বিকালে পাচটার সময় “ডিনার” ছয়ের পরিচ্ছেদ ২৯ —দুইখানি হাতরুটী, কয়েক টুকরা মাংস, তাহাতে আলুর বদলে প্রায়ই কচু দেওয়া, ও পূৰ্ববর্ণিত চা আসিত। মাংস জড়িত হাড় পরিষ্কার করিতে করিতে চোয়াল ব্যথা হইয়া যাইত। এক একদিন লম্বা টুকরা লইয়া দুজনে tug of war (দড় টানাটানি) করিতাম ! একদিন তাে ওয়ার্ডার সাহেব বন্ধ করিয়া চলিয়া গেলেন ; কাহারও দেখা নাই! ক্ষুধার চোটে নাড়ী বাপান্ত করিতেছে ! আগের দিন বেলা ৪২ টায় খাইয়াছি আর আজ একটা বাজিয়া গেল ! গুর্খা প্রহরীকে বলিলাম জেলর সাহেবকে খবর দিতে ; সে দয়া করিয়া জানাইল যে আমাদের সহিত কথা বলার হুকুম নাই! অবশেষে পাহারা বদলের সময় খবর পাঠানাে গেল। জেলর আসিয়া বাগান হইতে বেগুন লইয়া ঘানি হইতে তেল আনাইয়া ভাজাইয়া দিলেন। তৎসঙ্গে বােধ হয় কাহারও পাত কুড়ানাে শুকনাে ভাত দুটী পাওয়া গেল। ঐ অল্প অনুগ্রহের জন্যই ভগবানকে ধন্যব দ দিলাম। বিকালে খাওয়ার পরেই ৫২ টার সময় ঘরে বন্ধ করিয়া যাইত। এক একটি মশা ওজনে বােধহয় এক ছটাক হইবে—আর এইরূপ মশার বাহিনী যে কতগুলি আমাদের ঘরে ছিল, তাহা বলা যায় না! নাকটুকু মাত্র বাহির করিয়া ঘুমাইতাম প্রাতে উঠিয়া দেখিতাম নাকের ডগা শরীরের সহিত অসামঞ্জস্য করিয়া অসম্ভব রকম বাড়িয়া গিয়াছে। দিনমানে ঘুম দিতামজীবন প্রণালী সমস্তই উল্টাইয়া লওয়া গিয়াছিল। সকালে শীতের উৎপাতে স্নান হইয়া উঠিত না—বিকালে স্নান করিতাম। জেলের নিয়ম অনুসারে সকাল হইতে দশ ঘণ্টার মধ্যে ৩ বার আহার- আর বিকাল হইতে সকাল পর্যন্ত উপবাস। দুইখানি রুটী ও কয়েক- টুকরা মাংস খাইয়া কোনও কোনও দিন মাঝ রাত্রে ঘুম ভাঙিয়া যাইত, চারিদিকে সজল নয়নে দৃষ্টিপাত করিয়া সেই শীতের রাত্রে জল খাইয়া বন্দীর ডায়েরী দগ্ধোদরকে প্রভাত পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে আদেশ করিতাম। ভাগ্যি দুজনের ঘুম দেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ ছিল, তাই তেমন দুঃখ পাই নাই। অনিতাম আমাদের নাকডাকার শব্দে প্রহরীদের নিদ্রার ব্যাঘাত হইত। ভােম্বলের নাক ভীষণভাবে ডাকিত আমি নিজে শুনিয়াছি, কিন্তু আমার নিজের নাক ডাকিতে তাে কোনও দিন শুনি নাই। ক্র্যাডক বলিয়া একজন ইংরেজ কয়েদী আমাদের বাবুচির কাজ করিত। সে আগে Flying corpsএ অফিসার (উড়াে জাহাজের কর্মচারী) ছিল। পরে কলিকাতায় বার্ড কোম্পানিতে কাজ করার সময় False.cheque (জাল চেক) লেখার জন্য একবৎসর শ্রীঘরবাসের আদেশ পায়। এই ক্র্যাডক এবং ছােট ডাক্তার বাবুর শ্রীমুখ দর্শন আমাদের নিত্যকাজ ছিল। আয়না ছিল না—আমার মুখ ভােম্বল দেখিত, ভােম্বলের মুখ আমি দেখিতাম। প্রথম দিন তাে অদ্ভুত খালাসীর পােষাকের মত পােষাক পরিয়া পরস্পরকে দেখিয়া হাসিতে হাসিতে কাটাইলাম। তারপরদিন এইরূপ পােষাকে জনৈক স্থূলকায় নেতাকে কিরূপ দেখাইবে ইহা ভাবিয়াই হাসিয়া কাটাইলাম। খাল পেন্সিল কাগজপত্র বই কিছুই ছিল না, যতক্ষণ জাগিয়া থাকিতাম, সময় কাটানাে তত চাই। যে সকল নকল এখা পাহারা দিত, আমাদের সঙ্গে কথা বলা তাহাদের পক্ষে নিষেধ ছিল। একদিন একজন সাহস করিয়া জিজ্ঞাসা করিল—গান্ধী মহারাজের রাজ কবে হবে। তখন বুঝিলাম ইহারা বাংলা জানে এবং সকলেই আসামের লােক, গুখা নয়। ইহারা লােক ভাল ছিল, ক্ৰমশঃ বেশ আমাদের বশ হইয়া গিয়াছিল। ভােম্বল চন্দ্রের মুখখানা ক্রমশ একঘেয়ে হইয়া উঠিল। মুখদর্শন তবুও সহ করা যায়, কিন্তু তাহার নবরামপ্রসাদী সুরের গানের জ্বালায় ঘরে ৫ ছয়ের পরিচ্ছেদ টেকা দায় হইল। এমন সময়ে একদিন বাড়ী হইতে সকলে দেখা করিতে আসিলেন। ভােলকে লইয়া গেল। আমাকে আর দেখা করিতে দিল । ঘড়ি ধরিয়া ১৫ মিনিটের পর আবার ফিরাইয়া আনিল। তখন ৩ মাসে একবার interview (দেখা) ও একখানা চিঠি লেখার নিয়ম ছিল।' পরের সপ্তাহে আমাদের দুজনের সঙ্গেই বাড়ীর সকলের দেখা হইল। আমরা আসিবার পূর্বে একটা লােহার তারের খাচা বিশেষের ভিতর সাধারণত interview হইত। আমাদের জেলরের ঘরেই বসিতে দেওয়া হইয়াছিল। ইতি মধ্যে সহরে গুজব রটিল ভােম্বলকে মারিয়া ফেলা হইয়াছে। জেলে সন্ধ্যার মধ্যে কতবার কত লােক টেলিফোন করিল, অফিসররা তাে মহাবিব্রত। স্যার হেনরী হুইলার হইতে আরম্ভ করিয়া কতজনে খবর চাহিলেন। কংগ্রেস আপিসে শুনিলাম লােকের ভিড় আর শেষ হয় । দেওয়ালে লিখিয়া দেওয়া হইল—ভােল মরে নাই। প্রাতে শ্ৰীযুত নিশীথ সেন ও সত্যেন্দ্র চন্দ্র মিত্র মহাশয় সুপারের সহিত ভিতরে আসিয়া স্বচক্ষে দেখিয়া গেলেন যে ভােল সশরীরে জীবিত আছে। এদিকে কাউন্সিলের মেম্বাররা এতদিন একটা কিছু করিতে পারিতেছিলেন না— এইবার একটা বিষয় পাইলেন। ভােম্বলের সম্বন্ধে কাউন্সিলে অনেক প্রশ্ন উঠিল। গবর্মেন্ট সাফ জবাব দিলেন যে তাহাকে মারা হয় নাই। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের সুপারিনটেণ্ডেণ্টের মেডিকাল এগজামিনেসনের রিপাের্ট পৰ্য্যন্ত উদ্ধৃত করিয়া দেওয়া হইল যে মারের কোনই চিছু নাই। এই মেডিকাল এগজামিনেসন কখন যে হইয়াছিল তাহা ভােম্বলও টের। পায় নাই, আমিও দেখি নাই। জেলের কাণ্ডই সব অদ্ভুত ! এদিকে নির্জনবাসে প্রাণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। সুপারের কাছে বই চাহিলাম। বাড়ী হইতে কিছু “নির্দোষ” বই আনিবার অনুমতি পাওয়া বন্দীর ডায়েরী গেল। আয়না, চিরুণ, সাবান, সেফটিরেজর প্রভৃতি আনার অনুমতি পাইলাম। খাল পেন্সিল পাইলাম। সাতদিন চাহিয়া একটু দাঁতমাজন ও একটা টিনের মগ পাইয়াছিলাম। এখন সময় মন্দ কাটিতে লাগিল না। এই দশদিন সত্য সত্যই জেল খাটিতে হইয়াছিল। থালা থােওয়া, বিছানা তােলা, কাপড়কাচা সমস্তই করিতে হইত। একদিন লুকাইয়া সামান্য পরিমাণ পানের মসলা পাইয়াছিলাম, কোথায় রাখিব ভাবিয়া পাই নাই। একবার জামার ভিতর, একবার ঘরের কোণে, এইরূপে কত শঙ্কিত ভাবে রাখিতে ছিলাম। তারপর ক্র্যাডক আসিয়া শিখাইয়া দিয়া গেল যে জেলের দেওয়া বেনিয়ানের বুকের নিকট যে দু’পর্দা কাপড় আছে, তাহার ভিতরকার পর্দা ছিড়িয়া পকেট করিতে। চীনা কয়েদীদের নিকট সে এই শিক্ষালাভ করিয়াছিল। চীনাদের মাথা আছে বটে! জেলের পােষাকে পকেট থাকে না, একথা বলিয়া রাখি। আর এক- জন হাসপাতালের কয়েদী ঔষধ দিতে আসিয়া বলিয়া গেল- “ডাক্তার বাবুকে বলুন যে মাজায় বেদনা, তাহা হইলেই হাসপাতালে পাঠাইবে, সেখানে সকলের সঙ্গে দেখা হইবে।” ডাক্তার বাবু আসিলে ভােম্বলের মাজায় বেদনা হইল। “সুপার বলিয়া গেলেন ঘরেই চিকিৎসা করিতে, কাজেই একবার মালিস করিয়া বেদনা সারিয়া গেল। সময় কাটিবে বলিয়া কাজের জন্য সুপারকে বলিলাম। তিনি বলিলেন Take rest, my dear boys, you have had enough work outside (এখন বিশ্রাম কর, বাইরে তােমরা অনেক কাজ করেছ)। আমরাও আর পীড়াপীড়ি করিলাম না। পরে ওয়ার্ড হইতে বাহির হইয়া দেখিয়া- ছিলাম কাগজে আটা দিয়া পাতলা কাপড় লাগানাে, খাম আঁটা প্রভৃতি কাজ অন্যান্য সকলকে দিত। ইহা হইতে তিন প্রকার শিল্পেরও উদ্ভব - ছয়ের পরিচ্ছেদ হইয়াছিল! দু’একজন গান্ধী টুপি, চটীজুতা ও একসাইজ বুক তৈয়ারি আরম্ভ করিল। ইতিমধ্যে জেলের সর্বময় কর্তা স্যর আবদুর রহিম ও ইনস্পেক্টর জেনের একদিন আমাদের দেখিতে আসিলেন। তাঁহার শুভপদার্পণের ফলে এক একটা মশারি পাইলাম। আমরা যাহার উপর শুইতাম সেই জিনিসটা ইটে গাঁথা এক হাত চওড়া একটা কবরের মত। মাথার দিকে খানিকটা উচু করিয়া গাঁথা-বালিশের কাজ করিবে বলিয়া। এই কবরটী রাত্রে এক একদিন এমন ঠাণ্ডা হইয়া যাইত যে আমরা ভাবিতাম পরদিন সকালে নিজের জীবন্ত সমাধি হয়ত স্বচক্ষেই দেখিতে হইবে! কিছুদিন পরে লােহার খাট দিয়াছিল। ক্রমশঃই সুখের মাত্রা বাড়িতে লাগিল। একটা বিচালির গদিও পাওয়া গিয়াছিল। তাহার সঙ্গে কয়েক শত ছারপােকাও মিলিয়াছিল । রাত্রে দণ্ডে দণ্ডে প্রহরীরা আসিয়া তালা টানিয়া দেখিত এবং জানালার ভিতর দিয়া আলো ফেলিয়া দেখিত আমরা আছি না পালাইয়াছি ! তাহাদের বিকট জুতার শব্দ, তালা নাড়ার আওয়াজ, মুখের উপর আলাে ফেলা এবং মশা ছারপােকার কামড় ও দারুণ শীত, তৎসঙ্গে কোনও কোনও দিন মাঝরাত্রে ক্ষুধা, রাত্রি কাটাইবার বড়ই সুবিধা করিয়া দিয়াছিল। ৩ সাতের পরিচ্ছেদ। কংগ্রেসের সপ্তাহ। কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ আইন অমান্য করিয়া সভা করা স্থির করিয়াছেন। এমতী হেমপ্রভা দেবী, চারুলতা দেবী প্রভৃতির নেতৃত্বে প্রত্যহ কলিকাতায় নানাস্থানে সভা হইতে লাগিল। পুলিশ সভা শুদ্ধ লােককে ঘেরাও করে লাঠি চালায়, মেয়েদের গায়ে পৰ্যন্ত হাত দেয়—তবুও লােকে শান্ত থাকিয়া দলে দলে ধরা দেয়। পুলিশ ‘লরি বােঝাই করিয়া বেড়াল- পার করার মত মাঠে গিয়া সকলকে ছাড়িয়া দেয়। আদালতে হাজির করিলেও কম শাস্তি দেয়। জেলে জায়গা হয় না। ছােট ঘােট ছেলেরা সভাপতি হইয়া বক্তৃতা দেয়। গভর্মেন্ট , অর্ডার দিলেন- ছাত্রদের ছাড়িয়া দাও, তাহা না হইলে “গােলামখানা” ভাঙ্গিয়া পড়ে। কত বৃদ্ধ প্রৌঢ়কে ছাত্র বলিয়া ছাড়া হইল। আগে লােকে জেলে আসিতে ভয় পাইত—এখন খালাসের দিনে কয়েদী খুঁজিয়া পাওয়া যাইত না! বৎসরের কম বয়সের ছেলেদের জেলের দরজা হইতেই ফিরাইয়া দেওয়ার হুকুম আসিল। ছেলেরা আসিয়া কম বয়স স্বীকার করে না - জেল কর্তৃপক্ষ মেডিক্যাল এগজামিনেসন করিয়া ছাড়িতে চায়, তাহারা কিন্তু যাইতে চায় না। এক একজন ২/৩ বার জেলে আসিয়াছে। সুপারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হইল ছয় মাসের কম শাস্তি যাহাদের, তাহারা একটা undertaking দিলেই ছাড়া পাইবে। অনেক ভলান্টিয়ারের দণ্ড হ্রাস হইয়া গেল—কেবল নেতৃস্থানীয় কয়েক জনের পূরাই রহিল।

সাতের পরিচ্ছেদ তখন বাংলার হিন্দু মুসলমান সকল নেতাই প্রায় জেলে আসিয়াছেন। ভলান্টিয়ারদের চীৎকার গােলমালে, এবং ন্যায়সঙ্গত অবাধ্যতায় জেল কর্তৃপক্ষ অস্থির হইয়া উঠিলেন। জায়গার অভাব, পােক দিতে পারেন , কম্বল নাই, খাবার বন্দোবস্ত হয় না, কি করেন ? একজন সাধারণ কয়েদী “বন্দেমাতরম্” ধ্বনি করাতে সুপার রুলের গুতা দেন। তাহাতে সে সাহেবকে ধরাশায়ী করে—তখনই পাগলা ঘন্টি (Alarm bell) বাজানাে হইয়াছিল—ফোর্ট হইতে মেসিনগান্ লইয়া ৯০ সংখ্যক পাঞ্জাবী এবং রয়াল ওয়েষ্টকেন্ট সেনাদল জেল ঘিরিয়া ফেলিল! ইহাকেই বলে মশা মারিতে কামান দাগা ! এদিকে আমরা স্বরাজের স্বপ্নে মসগুল! স্বরাজ হইলে কে কি পােষ্ট লইব, তাহার চিন্তাতেই সময় যায়। কাহাকে জেলে আনিতে হইবে, কাহাকে ‘অহিংস’ ফাসি দিতে হইবে—ইত্যাদি সমস্ত ঠিকঠাক ! আমেদাবাদ কংগ্রেসে যে যাইবই সে বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। লর্ড রেডিং ও পণ্ডিত মদনমােহন মালবীয় কলিকাতায় আসিয়াছেন- গােল টেবিলের বৈঠকের কথা চলিতেছে, আমরা প্রতিমুহূর্তেই খালাসের আশা করিতেছি। এক একখানা মােটরের শব্দ শােনা যায়, আর ভাবি “ঐ বুঝি আমাদের নিতে এসেছে।” ২২শে ডিসেম্বর গভর্মেন্টের সঙ্গে কথাবার্তা যেখানে আসিয়া পৌছিল—তাতে মুক্তির সম্ভাবনা সুনিশ্চিত হইয়া গেল। হরতাল বন্ধ করা হইবে, ভলান্টিয়াররা ছাড়া পাইবে— পরে গােল টেবিলের বৈঠক হইবে—দেশবন্ধু মহাত্মাকে তার করিলেন মহাত্মাজী রাজী হইলেন না। আমাদের সব আশা-ভরসা ফাসিয়া গেল। ২৪শে ডিসেম্বর পূরা দস্তুর হরতাল হইল, এবার ভলান্টিয়ার বাহির করা হয় নাই-লােকে নিজে হইতেই শান্তিপূর্ণ হরতাল করিয়াছিল। গভর্মেন্ট বন্দীর ডায়েরী violence এবং intimidationএর (জোর জবরদস্তি ও ভীতি- প্রদর্শনের দোহাই দিতে পারিলেন না। জেলে সেদিন বুদ্ধিমান গভর্মেন্ট ছুটী দিয়াছিলেন ! আমরা সকলে উপবাস করিয়া হরতাল করিয়াছিলাম। গােলমাল থামাইতে আমাদিগের সাহায্য জেলকর্তৃপক্ষ প্রার্থনা করিলেন। তখন আর কেমন করিয়া বন্ধ রাখিবেন ? আমাদের মধ্যে দশ জনকে এক ওয়ার্ড হইতে আর এক ওয়ার্ডে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হইল। প্রথমে যে সমস্ত ভলান্টিয়ার আসে, তাহাদের মধ্যে ১৮জন ভােম্বলের এবং ৭২জন আমার সঙ্গে জেলে আসিয়াছিল। তাহারা সকলেই আমাদের ভালবাসিত এবং কথা শুনিত। আমরা গোলমাল করিতে নিষেধ করিয়া দিলাম। শ্ৰীযুক্ত সেনগুপ্ত, জিতেন বাবু প্রভৃতির চেষ্টাতে অনেক কষ্টে কয়েকদিন পরে গোল থামিল। এইবার খাবার লইয়া যুদ্ধ বাধিল। “ইউরােপীয় খাদ্যের সুখভােগ হইতে নিজেদের বঞ্চিত করিতে হইল! তখন যে খাবার সকলকে দেওয়া হইত, তাহা গাের অখাদ্য। এক একটি চালের কি চেহারা-যেন কুস্তিগীর পালােয়ান—চিবাইতে হইলে আর একজন চোয়াল ধরিয়া নাড়িয়া দিলে ভাল হইত—ভাতে চেতন-অচেতন কত পদার্থ থাকিত। কঁকড়, কাঠের টুকরা, মাছি, চুল, পােকা—কত না জিনিস মিলিত! ডালে ডুবুরী নামাইয়া দানা তুলিতে পারা যাইত কিনা সন্দেহ! মূলাের পাতাটাতা সুদ্ধ জলে সিদ্ধ করিয়া এক প্রকার অদ্ভুত উপায়ে প্রস্তুত পদার্থকে তরকারী বলা হইত! একটু তেঁতুল দয়া করিয়া দেওয়া হইত—আমাদের ভরসা সেই টুকুই ছিল। বেলা বারটার সময় এই নবাবী খানা খাইয়া আর আহারে অভিরুচি থাকিত না। যাহারা খাবার লইয়া আসিত, তাহাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, অথবা পাকশালার অবস্থা যাহারা স্বচক্ষে সাতের পরিচ্ছেদ দেখিয়াছে তাহাদের পক্ষে ভাত মুখে ভােলাই একটা মস্ত বড় সাধনার বস্তু ছিল। টিনের খােলা বাক্সে ভাত, বালতিতে ডাল, টিনের ডাবুতে করিয়া মাপা ডাল ও তরকারী খাইতে খাইতে পুলকে অশ্রুপাত হইত। একখানি লােহার থালাতে ভাত আর এক খানিতে জল খাওয়া ও অন্য সমস্ত কাজ সারা রীতি ছিল। সকালে বিখ্যাত “লপসি”—আর দুপুরে বিকালে ভাত অথবা রুটি দিত। সকলে মিলিয়া “লপসি” খাওয়া বন্ধ করা গেল। সুপার দায়ে পড়িয়া রুটিগুড়ের বন্দোবস্ত করিলেন। তারপর পাকশালার ভার আমাদের হাতে আসিল। চুরি বন্ধ হওয়াতে খাবার অনেকটা ভাল হইল। ইতিমধ্যে সরকার ভদ্রলােক কয়েদীদের রাজনৈতিক অরাজনৈতিক নিৰ্বিশেষে special class prisoners (বিশিষ্ট শ্রেণীর কয়েদী) বলিয়া ভাল খাওয়া পরার বন্দোবস্ত করিবেন, শােনা গেল। আমরাও সেই আশায় আর তত কিছু গােলমাল করিলাম না। এই সময়ে শ্রীযুক্ত সাতকড়িপতি রায় আসিয়া আমাদের ওয়ার্ডে জুটিলেন। তাহার বিরুদ্ধে চার্জ ছিল—Organising au illegal assembly on the Harrison Road (হারিসন রোডে মােটর গাড়ীতে বসিয়া বে আইনি সমিতি গঠন করা ) আমি বলিতাম in a motor car on a tree “গাছের উপর মােটর গাড়ীতে বসিয়া বলিলেই চার্জটি সৰ্বাঙ্গসুন্দর হইত! প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট জে, এন, সরকার মহাশয় বিচার করিয়াছিলেন। এই ধর্মাবতারের হাতে আমাদের দণ্ড হয়। সাতকড়িবাবু পূৰ্বে ইহার সহিত একসঙ্গেই এফসিকিউটিভ সার্ভিসে ছিলেন। যাহা হউক সাতকড়ি- বাবু খালাস পাইলেন। সাতকড়িবাবুর সহৃদয়তা ও স্নেহাধিক্যে মুস্কিলে পড়িতে হয়। সকলকে in a motor car বলীর ডায়েরী । খাওয়াইয়া তিনি খাইতেন না। মাছ মাংস বাল্যকাল হইতে খান না, কিন্তু বন্ধনে বিশেষ পটু ছিলেন। আমরা খাইতাম ও সাতকড়িবাবুকে লক্ষ্য করিয়া বলিতাম—“কারাে খেয়ে সুখ, কারাে খাইয়ে সুখ।” সাতকড়িবাবু খালাস পাইলে one, two, three, এক-দুই-তিন করিয়া সকলে একযােগে মড়াকান্না কাঁদিয়াছিল।

আটের পরিচ্ছেদ। রঙ্গরসের পর্ব। • ১৯২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চলিয়া গেল। কর্মদোষে আমাদের স্বরাজ লাভ হইল না। কিন্তু জেলে আমাদের স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়া গেল। খাওয়ার ভার নিজেদের হাতে আসিল। দু'একটুকরা মাছ মাংস পৰ্যন্ত মিলিতে লাগিল-বাড়ী হইতে আনিয়া বিছানা এবং ধুতি জামা ব্যবহারে অনুমতি পাওয়া গেল—পরস্পর মেলামেশা করিবার বিশেষ কোনও বাধা রহিল নাবাহিরের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, চিঠিপত্র লেখা- গভমেন্টের আইন পরিবর্তনে কতকটা সুবিধা হইয়া গেল। সিপাহীদের মধ্যে অনেকেই ভাল ব্যবহার করিত—জেলের অফিসররাও ভদ্র ব্যবহার করিতে লাগিলেন। সাধারণ কয়েদীর মত ‘ফাইল” করিয়া সারি দিয়া দাড়ানো, কিম্বা “সরকার সেলাম” প্রভৃতি অপমানকর প্রথাকে আমরা আমলই দিই নাই। একদিন গভর্মেন্টের চীফ সেক্রেটারী ও পুলিশ কমিশনার আসিয়া জেলে discipline নাই বলিয়া সুপারিনটেন্টে ডাঃ য্যাশকে (Dr. Ashe) খুব ধমকাইয়া গেলেন। সাহেব তখনি পাগলা ঘণ্টী বাজাইয়া দিলেন! জেলে পাগলা ঘণ্টী বাজিলে সকলে নিজের নিজের ঘরে ঢুকিয়া পড়ে, সিপাহীরা বন্দুক লইয়া বাহির হইতে ছুটিয়া আসে—তিনবার বন্দুক ছােড়া হয়, প্রহরীরা whistle (বাঁশি) দিতে থাকে—সব ওয়ার্ড বন্ধ হইয়া যায়। রাত্রে হইলে মশাল জ্বলিয়া চারিদিকে সিপাহীরা ছােটে। কয়েদী পালাইলে অথবা জেলের কর্মচারী কেহ আক্রান্ত হইলে এই ঘণ্টা ঢং ঢং করিয়া বাজিতে থাকে, অনেক সময় গার্ডরা তৈরি থাকে কিনা ৪ বন্দীর ডায়েরী দেখিবার জন্যও বাজানাে হয়। পাগলা ঘণ্টী পড়িতেই ভলান্টিয়াররা ঘরে ঢুকিতেছিল, এমন সময় কয়েকজন গুখ। ধাক্কা দেওয়াতে তাহারা ঢুকিতে অস্বীকার করিল। ডেপুটী সুপারিনটেন্টে ব্যাটাসবি ( Battersby) সাহেব হঠাৎ সেদিন তাহার নিত্যকর্ম জেল প্রেসের ম্যানেজারি ছাড়িয়া ধূমকেতুর মত আসিয়া উদয় হইলেন। তিনি “সিবিল গার্ড” বলিয়া একটি ছেলে নাকি কি বলে—তাহাতে তিনি সম্মুখে এক বেচারা বালককে পাইয়া তাহার গলা টিপিয়া ধরেন—তৎক্ষণাৎ গ্রান্ট নামে একটা ফিরিঙ্গি ওয়ার্ডার তাহাকে মারিতে মারিতে লইয়া গিয়া কুটুরীতে বন্ধ করে। এই ব্যাপার লইয়া অনেক গােলমাল বাধিল। সুপার সাহেব হুকুম দিলেন সকলে ৪৮ ঘণ্টা দরজাবন্ধ থাকিবে। কিন্তু পরে এই হুকুম রদ হইল। আমাদের নেতাগণও নিজেদের অপরাধ আছে বলিয়া ৩৬ ঘন্টা উপবাসের বিধান দিলেন। যে যেমন পারিল এই প্রায়শ্চিত্ত করিল। এই ব্যাপার উপলক্ষে জেলর রায়ান সাহেবকে একজন কি একটা বলিয়া- ছিল, তিনি হাসিতে হাসিতে আমায় বলিলেন—Look at this Mr. Sarkar, he has gone mad-( মিঃ সরকার দেখুন, এ লােকটা পাগল হয়ে গেছে!) জেলরের ধৈৰ্য্য ও ক্ষমাণ দেখিয়া বাস্তবিক মুগ্ধ হইয়াছিলাম। রায়ান সাহেব লােকটা এমনই ভাল মানুষ যে জেলের চাকরি করিয়া এক পয়সা ঘুষ লন না, সিগারেট পর্যন্ত খান না—আমি বলিতাম তিনি পাদরী না হইয়া জেলর কেন হইলেন। সপ্তাহে এক পাউণ্ড হিসাবে ওজন বাড়িতে লাগিল। ওয়ার্ডার বিড়ল ( Beadle) আসিয়া পরামর্শ দিল—ঘানি ঘুরাও শরীর বাঁধিয়া যাইবে It is a lovely exercise- ইহা একটি চমৎকার ব্যায়াম।) বিড়ল একটি রত্ন বিশেষ। খাটি ইংরেজ বটে—রেজিমেন্টে ড্রামার ছিল। ষ্টেশন মাষ্টারি করিয়াছে, স্পিনিং মাষ্টারি করিয়াছে, বাইবেলের ক্লাশও করিয়াছে, 1) আটের পরিচ্ছেদ ৪১ দ্বিতীয় পক্ষে ইতালীয় রমণী বিবাহ করিবার জন্য ধৰ্ম্মপরিবর্তন করিয়া রােমান ক্যাথলিক হইয়াছে। বিড ল সাহেবের দাপটে জেলের কয়েদী অস্থির। সার্চ করা, কে করা, শাস্তি দেওয়া লইয়াই সাহেব ব্যস্ত। তিনি আবার জল্লাদের কাজটিও করিয়া থাকেন। এক একটি ফাসি দিয়া ১৬, টাকা করিয়া পান। বলিলেন, প্রথম দিন ফাসি নিতে কষ্ট হইয়াছিল, সারাদিন খাই নাই, স্ত্রী অনেক ধায়, বলে ওকাজ করিও না—কিন্তু এখন ফাঁসি দেওয়া তাহার কাছে A. B. c. র মত সহজ হইয়া পড়িয়াছে। তিনি সবসুদ্ধ ছয়টি প্রাণীকে ভবনদীর পার করিয়াছেন। একজন খুনী মােকদ্দমার আসামী আড়াই বৎসর কারাদণ্ড লইয়া জেলে আসিল। বিড়ল গালাগালি দিয়া তাহাকে বলিল—“তুই আমার ১৬, টাকা লােকসান করিয়াছি।” আমরা আসার পর বিড ভদ্রলােক হইয়া উঠিল—আর বেটন হাতে কয়েদীর পিছনে লাগিয়া বেড়াইত না। ছােট রায়ান্ খিদিরপুরে নূতন জেলর হইয়া গেল—বিড চীফ ওয়ার্ডার হইল। এই পদোন্নতিতে বিড খুব খুসী হইয়াছিল। সুপারিন্টেন্টে ডাঃ য্যাশ জাতিতে ফিরিঙ্গি, মেডিক্যাল কলেজের এম, বি, পাশ—পূৰ্বে সিবিল সার্জন ছিলেন—এখন শেষ দশায় আলিপুর জেলের বড় সাহেব হইয়াছিলেন। তাঁহার Heart Disease হৃদ্যন্ত্রের রােগ ছিল ; রেস্ (Race) খেলিতে খুব ভালবাসিতেন—তাহার সঙ্গে সঙ্গে হাঁ হু দিবার জন্য আমার মত অনভিজ্ঞ প্রাণীকেও রেস্ সম্বন্ধে দু’ চার কথা শিখিয়া লইতে হইয়াছিল। শনিবার রেসে হারিলে পর সপ্তাহে কয়েদীদের দুর্ভাগ্য—আর জিতিলে সৌভাগ্যের উদয় হইত। যাশ সাহেব ভীতু লােক ছিলেন—আর বুড়াে বয়সে পেসনের মাস খানেক থাকিতে কিছু গােলমাল হয় পছন্দ করিতেন না। আমরাও সুযােগ বুঝিয়া অনেক প্রকার সুবিধা করিয়া লইয়াছিলাম।

৪২
বন্দীর ডায়েরী
একদিন য্যাশ সাহেব ইনেসূপেসনে গিয়া দেখেন কয়েকজন ননকো-
কয়েদী তাস খেলিতেছে। তাড়াতাড়ি লুকাইতে গিয়া একজন ধরা পড়িয়া
-গেলেন।
যাশ-বােলাে, তাস কাহাসে মিলা?
(বল, তাস কোথায় পেলে ?)
কয়েদী—হাম কেয়া জান্ত, হাম তত কয়েদী হ্যায়, হাম কেয়া বাহার
যাতা হ্যায়? (আমি কি জানি? আমি তত কয়েদী—আমি কি
বাইরে যাই ?)
মা বােলাে কাহাসে মিলা, নেহি তাে সাজা দেঙ্গে-
{বল, কোথায় পেলে, নইলে সাজা দেবো)
কঃ-আসমানসে গিরা হুয়া হ্যায়
( আকাশ থেকে পড়েছে )
যা - জদি বােললা, কাহাসে মিলা?
( শীগগির বল, কোথায় পেলে?
কঃ-তুম্ দিয়া
( তুমি দিয়েছ)
TJ - Where have you got these books ? Where is the
jail-mark? (এই বই গুলি কোথায় পেলে? জেল-মার্ক কই ?)
য়্যা-I have got them from Badshah Mia. (বাদশা
মিঞার কাছে পেয়েছি।
Is Badshah Mia the Superintendent of this jail:
( বাদশা মিঞা কি এই জেলের সুপারিন্টেন্টে ?)
সুপারের হুকুম অনুসারে ভদ্রলােককে সেলে বন্ধ করা হইল। বন্দী
হইয়া তিনি শিস দিতে দিতে পায়চারি করিতে লাগিলেন। সুপারের সন্দেহ

আটের পরিচ্ছেদ ৪৩ হইল শিস দিয়া ইসারা করিতেছে, বােধহয় অন্য কয়েদী আসিয়া মারিবে। চলিয়া যাইতে যাইতে ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন- সু-শিটি দেতা হ্যায় কাহে? (শিস দিচ্ছ কেন?) কঃ—হামারা দিলমে আনন্দ হুয়া, পাগলা বি গানা করত, হাম কেঁও নেই শিটি দেঙ্গে ? (আমার মনে আনন্দ হয়েছে, পাগলে গান করে, আর আমি শিস দিতে পাবাে না?) সু-হাতকড়ি লাগায়েগা? (হাতকড়ি লাগাবাে ?) কঃ-বহুত আচ্ছা, লেকিন মুখকড়ি কাহাসে মিলে গা? (বেশ, কিন্তু মুখকড়ি কোথায় পাবে?) সুঃ—যানিমে জুতেগা ? (ঘানিতে দেবাে ?) কঃ- বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া) সিম্পল হ্যায়। ( আমার বিনাশ্রম কয়েদ, কি করে ঘানিতে দেবে?) এক বাঙালী পাদরীর বক্তৃতার ক্যারিকেচর সােমেশ্বর বাবু করিতেন। বাইবেল ক্লাসে ছাত্রেরা হাসাহাসি করাতে চটিয়া তিনি মুদ্রাদোষবশতঃ জিবুটি মাঝে মাঝে বাহির করিতে করিতে যিশুখৃষ্টের জন্মতত্ত্ব বুঝাইয়া দিতেন। Jesus Christ was born by the Holy Spirit of God. This story is either impossible or wonderful. If I can prove the story is not impossible then it must be something wonderful. How was the first tiger born? How was the first buffalo born ? How was the first. man born? Was it not by the Spirit of God and God alone 3 So was Jesus Christ born. Then it is conclusively proved that the story is not impossible but something wonderful. “যিশু খ্রীষ্ট ঈশ্বরের পবিত্ৰাত্মা হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ৪৪ বন্দীর ডায়েরী কথা হয় অসম্ভব, না হয় আশ্চর্যজনক। যদি আমি প্রমাণ করিতে পারি ইহা অসম্ভব নয়, তাহা হইলে ইহা আশ্চৰ্যজনক বলিয়া প্রমাণিত হইবে। প্রথম ব্যাঘ্র কিরূপে জন্মিয়াছিল? প্রথম মহিষ কিরূপে জন্মিয়াছিল ? প্রথম মানুষ কিরূপে জন্মিয়াছিল ? তাহাদের জন্ম কি একমাত্র ঈশ্বরের পবিত্ৰাত্মা কর্তৃক হয় নাই? সেইরূপ যীশুখৃষ্টও জন্মিয়াছিলেন। সুতরাং ইহা একবারে প্রমাণ হইয়া গেল—যে এই কথা অসম্ভব নয়, ইহা এক আশ্চৰ্যজনক ব্যাপার।” শ্রীমান্ ভূদেব ভট্টাচাৰ্য্য নকল করিতে অদ্বিতীয় ওস্তাদ ছিলেন। যাত্রা, থিয়েটার, সভাসমিতির বক্তৃতা প্রভৃতি নকল করিয়া সকলকে হাসাইয়া অস্থির করিতেন। “পাঞ্জাব ও খিলাফতের অত্যাচার” নামক তাহার একটি বক্তৃতা তুলিয়া দিলাম। মুখে না শুনিলে এগুলির রস জমে না—তবুও পড়িয়া কতকটা ধারণা করা যাইতে পারিবে। বক্তৃতাটি বড় মজার। আসল কথা না বুঝিয়া অনেক বক্তাই নিজেকে এইরূপ হাস্যাস্পদ করিয়া থাকেন। খিলাফতে দেশ ছাইয়া গিয়াছে বলিয়া বক্তার কত আপশােষ, আর পাঞ্জাবের অত্যাচার কি ভীষণ—তাই তিনি ভারত হইতে “খিলাফত ও পাঞ্জাব” এই দুটিকে দূর করিবার জন্য শ্রোতাগণকে উপদেশ দিতেছেন। সভা খুব জোর চলিয়াছে, অনেকে হিন্দীতে ও উর্দুতে বক্তৃতা করিলেন ; হিন্দী কোন রকমে কিছু বুঝিতে পারিলেও উৰ্দর বেলা অজ্ঞ বাঙ্গালী, শব্দজগতের ভাব দেখিয়া একেবারে হতভম্ব হইয়া আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিল। যাহা হউক, ইত্যাকার যখন সভা জমিয়াছে, তখন একজনের বক্তৃতায় বিশেষ অর্থ প্রকাশ পাইয়াছিল। অনেকের অনুরােধে বক্তা ত অতি আড়ম্বরের সহিত অতিকষ্টে উঠিয়া দাড়াইলেন, আসর ফঁাক গেলে যেমন হয় ;-সকলেই কথা বলিতেছিলেন, আটের পরিচ্ছেদ। ৪৫ বক্তার ক্ষীণ অথচ মর্মভেদী গলা তাহাদের সমবেত শক্তির নিকট পরাভূত হইয়া কিঞ্চিৎ আরম্ভের পূর্বেই বিশ্রাম লইতেছিল, এক্ষণে—তাহার অদ্ভুত স্বর মুদ্রিত-চক্ষু ব্যক্তির নিকট আৰ্তনাদরূপে শ্রুত হইতে লাগিল। বক্তা—“পূজনীয় সভাপতি মহাশয়া, আউর সমবেতা ভদ্র মণ্ডলী। আজ আপনােক হিয়ি পর কাহে মিলা গিয়া হয়। আপলােগোকে মিনেকো জরুর কুছ মতলব হােনা চাহিয়ে। দেখিয়ে আপনােক তাে কলকভেমে হরবখত ট্রামগাড়ী চড়তেহেঁ, থ্যাটার দেখতেহেঁ, বায়ুস্কোপ দেখতে হেঁ, সরাব পিতেহেঁ, খুব মজা লুটতেহেঁ ;-মগ-অ-অ- আপলােক আপনা দেশকা খবর কুছ নেহি জাতে হাে। ইয়ে ত বড় সরকী বাত, হায় না? বলিয়ে ত আপলােকনে বলিয়ে না! (সভার মধ্য হইতে কেহ কেহ বলিয়া উঠিলেন, “, , ইয়ে ত বড়ি সরকী বাত, হায়” )। আব, দেখিয়ে পাঞ্জাবমে কেয়া হুয়া, আপলােগোকো খবর নেহি মিলা কি হুই পর কেতনে ডায়ের লােগ, কেতনে খারাপী কিয়া থা। উনি বাতকে লিয়ে হাম্ আপকো পাস মেইনৎ করতে হু। আপনােক পাঞ্জাব—আউর খেলাফতকে। কুছ, জাতে হাে? (অনেকে বলিলেন-‘নেহি নেহি, আপ, বলিয়ে না” ) সবুর কলিজিয়ে হাম আপলােগোকে সম্ঝায় দেগা (এই শেষের বাক্যটি শুনিয়া কোন কোন ভীতু বাঙ্গালীর ভয় পাইবার কথা ছিল) মেরে ভাইয়েলােগ (করুণ স্বরে) পাঞ্জাবমে বহুত খিলাফত, হাে গিয়া,—কেতনে আদমীকে পর জুলুম হুয়া, খুন নিকালা, জাভি চলা গিয়া, এতনে বড়ী খিলাফত, আপলােক, কভি নেহি দেখা হয়। (সভা কি জানি কেন নিস্তব্ধ ; দু-একজন মৌলবী যাহারা সভায় ছিলেন, তাহারা ত অবাক ; বক্তার সে সময়ে feelings আসিয়া গিয়াছে; সুতরাং কি বিরাট স্বরভঙ্গের উচ্ছাস!) মেরে ভাই ৪৬ বন্দীর ডায়েরী ( যেন কঁদিয়া ফেলিলেন) পাঞ্জাবমে যাে খিলাফত হুয়া, উহি ত মহাত্মা গান্ধীনে বােলা না ? দেখিয়ে আভি হিন্দু মুসলমানকে এককাট্টা হােনা চাহিয়ে। আপনােক এক পয়সা, দো পয়সা, চার পয়সা, এক রূপেয়া, দো রূপেয়া, চার জপেয়া, এক শশা, দো শাে, চার শশা, যউ যেতনে শো হায়—হিয়ি পর দান করকে গঙ্গাসাগর স্নানকী পুণ্য অর্জন করলিজিয়ে (উপমা শুনিয়া সভা মধ্যে আহা, হা! ধ্বনি হইতে লাগিল )। হাম্ আউর কুছ, নেহি বলেঙ্গে কাদিতে কাদিতে) থোড়ে দু এক বাত বােলকে বইঠেঙ্গে দেখিয়ে ইয়ে খিলাফৎ হিন্দুস্থানমে ভি আ গিয়া, আভি হাম্‌কো আপকো সবকোইকো নােণেকে Time আ গিয়া—হাম্‌কো বচ নিঃসরণ নেহি হােত হায়। আপলােগোঁকো এক কাম করনে হােগা–ইয়ে পাঞ্জাবকো আউর খিলাফৎকো, ইয়ে দোনােকা দূর কনে হােগা (বক্তা, তাড়াতাড়ি বসিয়া পড়িলেন, যেন সবই বুঝান হইয়াছে, যাহাদের ঘটে একটু বুদ্ধি ছিল তাঁহারা শুধু মনে মনে বলিলেন “হায় রে।” ) কুমিল্লার শ্ৰীযুত কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচাৰ্য মহাশয় চট্টগ্রামে শিশু- শিক্ষায় স্বরাজ’ নামক বক্তৃতা করিয়া এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইয়া আলিপুর জেলে আসিয়াছেন। তিনি প্রথমভাগের কথাগুলি হইতেই দেখাইয়া দিয়াছেন আমরা কি ভাবে স্বরাজ লাভ করিতে পারি। সরকার বাহাদুর ইহাতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংস হইয়া যাইবে মনে করিয়া কালিকাবাবুকে জেলে পুরিয়াছেন। বক্তৃতাটি নিয়ে দেওয়া হইল। শিশু শিক্ষায়অরাজ- সমবেত সভ্য মহােদয়গণ ! স্বরাজ সাধনার প্রায় সকল কথাই আমাদের শিশু শিক্ষা প্রথম ভাগেই রয়েছে। মাত্র মদন মােহনের সেই আটের পরিচ্ছেদ ৪৭ প্রথম ভাগ শিশু শিক্ষা খানার আলােচনাতেই স্বরাজের সকল কথাই আমরা জানতে পারি, বুঝতে পারি, আর ইচ্ছা করলে কাজেও কতে পারি। প্রথমেই ধরুন, ইংরাজ আর ভারতবাসীতে সম্বন্ধটা, অন্ততঃ ইংরাজ মনে করে, কিরূপ—যেন কৃষাণ আর গরু। ওদের জন্য ভারতবাসী অবিরাম মৈ টানে, আর এই নরাকৃতি গরুগুলিকে ওরা খেতে দেয় রােগীর খাদ্য—শুধু খৈ। তাই প্রথম ভাগে রয়েছে—মৈ টানে -খৈ আনে। এখন আমরা অতি অসার এই খৈ খাই কি দিয়ে? কি দিয়ে খাবাে আর? শুধু-শুধু শুকনাে খৈই খেতে হয় আমাদের। তাই খৈ খাই, দৈ নাই। আজ আমাদের গােধনের অভাব, কাজেই দৈ-দুধ-ক্ষীর-ননী-মাখন সকলেরি অভাব। তাই দৈ ছাড়া শুধু খৈ খেয়েই জীবন কাটাতে হয় আমাদের। প্রভুদের ঠাই এর বেশী আর কিছুরই আশা নেই। তবে, শুধু খৈয়েতে তে পেট আর ভরে না, ক্ষুধার দারুণ জ্বালা মেটে না, তাই পেটের জ্বালা কমাতে গােরুর মত ঘাস খেতে হয়। ঋণ জালে জড়িত ভারতবাসী ভাল পুষ্টিকর খাদ্য কিনে খেতে সমর্থ নয়, এ বুঝেই শিশু শিক্ষায় কবি মদনমােহন বলে গেছেন যে ভারতবাসী—ঋণদায় তৃণখায়। কেন, কৃষিকাৰ্য্য করে এ সােণার দেশে আমরা ভাতের যােগাড় করিনে কেন ? তাই বা হবে কিরূপে? কৃষীবল হৃষ্টপুষ্ট গােধনই বা কই আমাদের অই যে খাদ্যাদি অভাবে ভারতের যত সব-কৃশকায় বৃষ ধায়। আর জমী জমাই বা কই? ভূমিরও যে সত্ত্ব লােপপ্রায়। কাজেই একটী পাখী পালন কতে চাইলেও আজ ভাবনা করতে হয় -কোখা রাখি তােতা পাখী ? তােতাটী রাখবার মতন স্বাধীন স্থানটুকুও যে আজ স্বদেশেই নেই আমাদের। তাই তাে অপর কবি দুঃখ করে গেয়ে গেছেন - ভারতবাসী ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী হলে। এই স্বদেশের ০৮ বন্দীর ডায়েরী। প্রবাসীরা আজ বাড়ী ঘর স্ত্রী পুত্রাদি পরিজন সব ছেড়ে উদাসীন ভাবে দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে! বাড়ী গিয়ে প্রিয় পরিজনদের কেউ মুখ দেখাতে ইচ্ছা করে না। দরিদ্রের বাড়ী যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। তাই বাড়ী যাও মাটী খাও, অবস্থা তাে এইরূপ। এখন কি করা কর্তব্য ? এমনি ভাবে কি দিন চির দিনই যাবে আমাদের ? না এর একটা উপায় কতে হবে ? যদি করূতে হয়,তবে আর দেরী নয়। এবার মরা গাঙ্গে বান ডেকেছে। মহাত্মাজীর বংশী- রবে যমুনা উজান বয়েছে। বন্যার জলে বড় বড় মাছ সব ভেসে এসেছে। যদি মাছ ধরূতে হয় তবে আর বিলম্ব নয়। গেল কাল ফেল জাল। মাছ ধরূতে নাকি ভূতের ভয়। ভূত নাকি বিপদে ফেলে, ধরা মাছ সব খাবার লােভে ঘাড় মটকাতে চায় ; না, সে ভয় এবার আর করাে না কেউ। কারণ, ভূতেরা যত কয় তত নয়। হলেই বা কি? এবার যে মন্ত্র পেয়েছি আমরা-বন্দে মাতরম-এ মন্ত্রে যে শমন ভয় দমন হয়। আইনের শমন—আর সেই অন্তিমের শমন—এই উভয় শমনের ভয়ই যে এ মন্ত্রে, এ মাতৃমন্ত্রে আমাদের—দমন হয়। তবে আর ভয় কিসের এবার ? কেনই বা ভয়?- অভয় হয়ে এখন কি কবো আমরা? কেন, অই শিশু শিক্ষাতেই তাে রয়েছে সে উপদেশ মরগণকর পণ। এখন আবার আমাদের নরত্ব পুরুষত্বের গৌরবে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হবে। পঁড়িয়ে হিন্দু মুসলমান সকলে মিলে ঐক্য সূত্রে সংবদ্ধ হয়ে গণ বদ্ধ হতে হবে। কারণ সৰ্ব্ব সম্প্রদায়ের ঐক্য বিনে, স্বরাজ আমাদের লাভ হবে না, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে না, তা হতেও পারে না। তাই নর সবকে ‘গণ’ বদ্ধ হতেই হবে। পরে দৃঢ়তম পণ কতে হবে। কারণ সাধনার পথ আমাদের সুগম-নিরাপদ নহে। সম্মুখেতে বিপদ অত্যাচার নির্যাতন লাঞ্ছনার অতীব ভীষণ আটের পরিচ্ছেদ ৪৯ ‘ঘনবন'। তা অতিক্রম করতে হলে, স্বরাজ স্বর্গে গিয়ে স্বাধীনতা সুধা পানের আশা কলে-নরত্বের সাহস শক্তি বলবীর্যের মতন দৃঢ়তম পণও চাই আমাদের। সাধন ব্ৰত আমাদের ভঙ্গ করবার জন্য, ঘন বন বাসী হিংস্র পশুদের মতন সরকারী ফৌজ পুলীশ অচিরেই যে ভীষণ অত্যাচার আরম্ভ কবে-বীর বিক্রমে তা অতিক্রম কতে পারলেই সম্মুখেই পাব আমরা স্বাধীন স্বরাজের ধন আর জন। তাই শিশু শিক্ষার কবি কৌশলে অতি সংক্ষেপে উপদেশ দিয়েছেন আমাদের-নগণ করপণ ঘন বন ধন জন। অনেকে বলতে পারেন-বলেনও বৰ্তমান অবস্থায় স্বরাজ লাভের চেষ্টা আমাদের ‘দুঃসাহসের কাজ। সুতরাং ফলে তার—দুঃখ হবে। কারণ ‘দুঃসাহসে দুঃখ হয়। তা হয় সত্যি। কিন্তু কার ? দুঃশীলের ইহা—নিঃসংশয় বটে। সুশীলের তাে নয়। দুঃশীল যারা -হিংসক অত্যাচারী অনাচারী যারা—তাদেরি দুঃখ হয় দুঃসাহসে-এতে অবশ্যই কোনাে সংশয় নেই। কিন্তু সুশীল আর সুবােধ যাঁরা সর্বদা মনােযােগ দিয়া নেতৃগুরুর হিতােপদেশ মেনে চলেন তাঁদের দুঃখ হবে কেন? দুঃশীল নই আমরা—হবােও না, মহাত্মাজীর উপদেশ মত সুশীল শান্ত থেকে আমরা বীরের মতন সাধন পথে অগ্রসর হয়ে চলবে, তবে 'আমাদের দুঃখ হবে কেন ? না, তা হবে না, এমন হয়না, হতে পারে না। কাজেই নির্ভয়ে আমরা স্বরাজ সাধনায় লিপ্ত হতে পারি। দেরী নয়—‘ঘরের ভিতর আলাে আসিয়াছে। ‘আর শুইয়া থাকিওনা’ ‘অলস হইও না। কাজে ততা দূরের কথা কথাতেও কারাে মনে ব্যথা বা বেদনা দিও না। কাণাকে কাণ খোড়াকে খোঁড়া বলিও না। যে জনযে কথায় মনে দুঃখপাতাকে সে কথা ৪ বন্দীর ডায়েরী বলিওনা।-ইহাই মহাত্মাজীর অহিংসা ব্রতের মূল নীতি। নিজে ভােগ বাসনায় মত্ত হয়াে না। ধনীদের সুখ দানের জন্য ব্যস্ত হয় না। দীন দেখিয়া দান করিবে। দরিদ্রের দুঃখ কষ্ট মােচন করিবে। মায়ের আমাদের বড় মলিন বেশ। তাই রায় কবি দুঃখ করিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করেছেন-“কেন গাে মা তাের ধূলায় আসন কেন গাে মা তাের মলিন বেশ? বিদেশী বস্ত্রের কলঙ্ক কালিমাতেই মায়ের বেশ অমন মলিন। তাই তত জগতে মায়ের আমার আজ আর নেই। কারণ, যাহার মলিন বেশ তাহার আদর নাই। তা—থাকেও না। মলিন বেশ এখন মায়ের দূর করতে হলে, মহাত্মাজীর উপদেশ মত, বিদেশী বস্ত্র ত্যাগ করে নিজ হাতে নিজের বাড়ীর তুলাতে চরকায় সূত৷ কেটে, তা দিয়ে ঘরের তাঁতে কাপড় বুনে, সেই শুভ্র নির্মল খদ্দরে মাকে সাজাতে হবে। মায়ের সন্তান আমাদেরও খদ্দর ভূষণে সজ্জিত হতে হবে । তবেই বেশের কলঙ্ক কালিমা মলিনত্ব সব দূরীভূত হবে, তখন জগতে আমাদের আদর সম্মান সকলি হবে। সুতরাং চাই এখন ঘরে ঘরে চরকা তাঁত, খদ্দরের শুভ্র বেশ। চরকা আমাদের না ধরূলে জগতের চড় খেতে খেতেই জঘন্য জীবনের আমাদের অবসান করতে হবে। তাই যেন জগৎ ইঙ্গিতে বলছে আমাদের-‘ধর তােরা চরকা—নতুবা আমাদের চড় খা। এখন আমরা সত্বরই চরকা ধরবাে, কি বিশ্ববাসীর চড় খাবে। তার নির্ধারণ ভার আমাদের উপর। সকলে তা নির্ধারণ করুন। তার পর আমার প্রিয় ছাত্রগণ, অই নকল নবীশের কাজ ‘লেখা পড়া ছেড়ে গও। লেখা পড়া করে যেই গাড়ী ঘােড় চড়ে সেই-এ শিক্ষা কুশিক্ষা। লেখা পড়া শিখে গাড়ী ঘােড়া শুধু চড়া নয়, মানুষ হওয়া চাই। সেই শিক্ষা শিখবার জন্য এসাে সকলে আমরা মানুষ গড়া জাতীয় বিদ্যা মন্দির সব প্রতিষ্ঠিত করি। তরুণ ভারতের স্বরাজ .

আটের পরিচ্ছেদ অই তাে ; অরুণ উদিত প্রায়। রাত নেই রাত নেই আর। —পাখী সব করে রব রাতি পােহাইল। তাই তাে দেখছি, মায়ের আমার প্রতি কাননে কুসুমকলি সকলি ফুলি’, না, এই সুখময়ী উষার সুখ সমাগমে আর শুয়ে থাকা নয়, প্রাণ কলি আজ সকলি ফুটেছে; তা দিয়ে অঞ্জলি অর্পণ করে, চারু চরণ মায়ের পূজা করুন সকলে : ফলে স্বরাজ হবে। হলে কি হবে ? কিহবে? তখন আর দৈ ছাড়া শুধু খৈ আমরা খাবাে না। কারণ - অই তত যেন দিব্য আজ আমি দেখতে পাচ্ছি স্বরাজের শুভ যুগে সবুজ তৃণময় সব গােচারণ মাঠ, মখমলের গালিচার মতন দেশময় আস্তীর্ণ হয়ে আছে। আর মুক্ত প্রাণে মায়ের মহিমা গাথা গান কতে কতোখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। গরু গাভীবৎস সব চরাতে চরাতে সেই রাখাল শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে এ সে পবিত্ৰ আৰ্যস্থানের আৰ্য মুনি ঋষিদের পুণ্য তপােবন দৃশ্য। কি মধুর এ পবিত্র দৃশ্য—গােচারণ করতে করতে শিশুদের নিজ নিজ জাতীয় পাঠের অনুশীলন। তাই হবে এবার। দুগ্ধ-দক্ষিীর মাখন নবনীতে পুষ্ট কলেবর, সুস্থ-গাঢ় মস্তিষ্ক সব ছেলেদের নিজ নিজ পাঠের ফলে হবে কি? হবে এই, যেন দেখছি আমি স্বাধীন ভারতের স্বরাজ নন্দন বনে, জ্ঞান বিজ্ঞান বিদ্যার ‘ফুটিল মালতী ফুল সৌরভ ছুটিল’। সেই মনােমদ সৌরভ যেন, ইয়ােরােপ আফ্রিকা আমেরিকা সমগ্র এসিয়াকে মধুরতায় ভর পূর করে দিলে। গন্ধে মাতােয়ারা বিশ্বের যাবতীয় মধুলােপুপ মধুপগণ আকুল হয়ে উঠলো। অই যেন আজ দেখতে পাচ্ছি ভারত স্বরাজ নন্দনে দিক দিক হতে—পরিমল লােভে :অলি আসিয়া জুটিল। তাই হবে। পরিমল লােভে বিদেশী অলিদের ভারতেই আসতে হবে। শান্তির অমৃত, তৃপ্তির বন্দীর ডায়েরী মধু, ভারত জাত মালতী ছাড়া আর কোথাও যে নেই। সুতরাং গুণ গুণ রবে ইহারি গুন গান করে পরিমল ভিক্ষায় ভারতের নিকটই অলিদের যেতে হবে। তাতে ফল কি হবে ? সে দানের ফল যেন অই অজই ভারতের ভাগ্য গগনে উঠিল রবি লােহিত বরণ। আর তার 'আলােক পাইয়া লােক পুলকিত মন। তাই হবে। সৌভাগ্যের রবিকরে ভারতের ভাগ্য গগন সমুদ্ভাসিত হবে। ঘাের তিমিরের অপসরণে নবীন আলােক পেয়ে হবে আমরা ‘পুলকিত মন’ শ্রমের ফলে আমাদের মায়ের বন্ধন মােচন হলে মলিন বেশ দূর হলে সকলের দুর্দশা ঘুচলে দেশে স্বাধীন স্বরাজের প্রতিষ্ঠা হলে মা তখন কি করূবেন ? অই এখনি মা শ্রান্ত ক্লান্ত সন্তানদের শান্ত স্নিগ্ধ শীতল করবার জন্য খদ্দরের অঞ্চল সঞ্চালনে সুমধুর বাতাসের হিল্লোল তুলেছেন তাইতাে যেন—শীতল বাতাস বয় জুড়ায় শরীর। সন্তাপ বিদগ্ধ শরীর আমাদের জুড়াবেই নিশ্চয়। সাধু সাধনায় আমাদের সাফল্য লাভ দর্শনে--অন্তর্যামী ভগবানের অন্তরও স্নেহ রসে বিগলিত হয়ে সহস্র চক্ষুতে তাঁর আবেগের অশ্রুধারা প্রবাহিত হবে। সেই পবিত্র অশ্রুই যেন নীরব নিশীথে ‘পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির। তা পড়বেই এবার। মহাত্মাজীর সাধনায় ভগবানের আসনও টলবে এবার নিশ্চিত। আশীৰ্বাদ অশ্রুতে তার অভিষিক্ত হয়ে অমৃতস্নিগ্ধ হবাে আমরা। তাই বলি ভারতবাসী প্রবীণ গুরু মহাত্মাজীর আহ্বানধ্বনি :এসেছে অই-জাগুন সকলে উঠুন সকলে। মধুর স্বরে অই যে মহাত্মা ডাক্‌ছেন আমাদের—উই শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ উঠ,-রাজনীতিতে শিশু সবে-নব মন্ত্রে দীক্ষা নেবার জন্য মুখাদি ধুয়ে শুদ্ধশুচি হও আগে, মনের মুখ ধুয়ে হিংসা মলিনত্ব দূর কর।

আটের পরিচ্ছেদ মাতৃপূজা মন্দিরে প্রবিষ্ট হয়ে মায়ের চরণ বন্দনা কতে হবে, মাতৃ-পূজায় আত্মনিয়ােগ কতে হবে, এ সময় আর অপবিত্র পরের বেশ শশাভা পায় না। ত্যাগ করে তা’, নিজ বেশ খদ্দর পর। পরে ‘আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ। মহাত্মাজী বলছেন—সাধক তােমরা অন্যের প্রতি মনকে বিক্ষিপ্ত করাে না। নিজেদের কর্মের ফলে অন্যের অনিষ্ট সাধন কতে পারূলে কি না, - যাকে বিপন্ন মনে কর, তার ধ্বংস সাধনে তােমরা সমর্থ হলে কি না, সেদিকে চেয়াে না। কারাে অনিষ্ট সাধন সংকল্পে কোনাে কাজ করে না। বিশ্বমঙ্গল মানসে-সকলেরি কল্যাণ কামনায়—শুদ্ধ শুচি মনে সাধনায় লিপ্ত হও। হয়ে অন্য সব দিক হতে মনকে নিবত্তিত করে, স্থির চিত্তে আপন পাঠেতে স্বীয় কর্তব্য ব্রতে স্বরাজের সংগঠন কার্যে মননানিবেশ কর। বিক্ষিপ্ত চিত্তকে স্থির কর, চঞ্চলতা পরিহার কর, সাধনা সিদ্ধ হবে, স্বরাজ লাভ হবে, সকল দুঃখের অবসান হবে। খেলাফতের প্রতীকার হবে, জালিয়ানওয়ালাবাগের বেদনার উপশম হবে। সত্য ধর্মের পথে থেকে স্থির মনে সাধনা কর। ইহাই মহাত্মাজীর দেওয়া পাঠ। আসুন সকলে আমরা এই নবযুগের আপন পাঠেতে মন করি গাে নিবেশ। বন্দেমাতরম।

নয়ের পরিচ্ছেদ। নন্দলালের কাহিনী। দ্বিজেন্দ্রলাল যাহার কথা গাহিয়া ধন্য হইয়াছেন সেই স্বদেশপ্রেমিক মহাপুরুষ শ্রীনন্দলাল অভাগা দেশের কি হইবে ভাবিয়া প্রাণরক্ষার্থে জেলে আসিয়াছিলেন। তাঁহার সম্বন্ধে কবি বলিয়াছেন :- “নন্দলাল তাে একদা একটা করিল ভীষণ পণ স্বদেশের তরে যা ক'রেই হােক রাখিবে সে জীবন।” গর্মেন্ট ভলান্টিয়ার ইস্তাহার জারি করার পর নন্দলাল দেখিলেন এসময় বাহির হইলে ছয় মাসের উপর দিয়া যাইবে—পরে হইলে হয় তােত স্বদেশের জন্য গুলি খাইয়া মরিতে হইবে। তাই তিনি ভয়ে ভয়ে মেয়েদের সঙ্গে ভলান্টিয়ার হইয়া বাহির হইয়াছিলেন—একটু আশাও ছিল, হয় তােত ধরিবে না, কিম্বা ধরিলেও ছাড়িয়া দিবে। কপাল দোষে মেয়েদের ধরিয়াও ছাড়িয়া দিল—কিন্তু নন্দলালকে জেলে আসিতে হইল। ১৭ (১) ধারায় নন্দলালের সাধারণ ভলান্টিয়ার রূপে শাস্তি হইল। নন্দলাল একজন ‘লীডার’ হইয়াও এ অপমান সহ করিলেন—কেবল শাস্তিটা কম হওয়ার খাতিরে। ফরিদপুরে অনেক লীডার বাহির হওয়ায় নন্দলালের আর লীডার’ হইবার তেমন ইচ্ছা ছিল না। তা ছাড়া জেলে আসিয়া “লীডারসিপ” একজামিনে পাঁচ সাতবার ফেল হইয়াছিলেন। ফরিদ- পুরের ১২ বৎসর হইতে ৮০ বৎসর বয়স্ক অসংখ্য লীডার ১৭ (২) ধারায় শান্তি পাইয়া আসিয়া জেল জুড়িয়া বসিল। নন্দলাল সকলের

নয়ের পরিচ্ছাে
আজ্ঞাবহ ভৃত্যের ন্যায় থাকিতেন, কারণ লীডার হইয়া আড়াই বৎসর
জেলখাটা নন্দলাল পছন্দ করিতেন না। মহাত্মার কথায় বিশ্বাস করিয়া
জেলমুখাে হইয়াছিলেন, ভাবিয়াছিলেন যে ডিসেম্বর মাসটা কাটাইয়া
দিলেই তাে স্বরাজ, তারপর গবর্মেন্ট হাউসের দক্ষিণদিকের কামরায়
বাস ! কিন্তু হায়, সব আশা বিধি চূর্ণ করিয়া দিলেন ! তাই কাজের
অভাবে হতাশ হইয়া নন্দলাল পরচর্চা লইয়া জেলে ঘুরিতেন
ফিরিতেন। একটা Company জেলে খােলা হইয়াছিল—
Leaders & Leaders
!
Detractors & Back-biters
Managing Directors-Mr. Unmotived Malignity
& Mr. Infernal Busy Body.
নন্দলাল এই কোম্পানির canvasser হইলেন এবং সেয়ার বিক্রী
করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে সকল সেয়ার বিক্রী হইয়া গেল।
জনৈক উদীয়মান নে বন্দী-নেতাদের জীবনী ও ছবি সংগ্রহ
করিতেছিলেন। লেখক কতকগুলি প্রশ্ন নেতাগণকে জিজ্ঞাসা করিয়া-
ছিলেন। নন্দলাল নিজে হইতেই তাহার উত্তর লিখিয়া পাঠাইতেছিলেন।
আমি দেখিলাম তাহাতে নন্দলালের অপমান-যাচিয়া জীবনী ও ফটো
বাহির করা নিতান্ত লজ্জাকর। তাই প্রশ্নের উত্তরগুলি কাড়িয়া রাখিলাম।
নীচে সেগুলি দিলাম—আশা করি পাঠকবর্গ অন্য কাহাকেও এগুলি
বলিবেন না বা দেখাইবেন না :--
প্রঃ—আপনি কি রকমের স্বরাজ চান ?
আপনার স্বরাজের আদর্শ কি
(১) যে স্বরাজে খেটে খেতে হবে না—আমি সেই রকমের
স্বরাজ চাই।
?

বন্দীর ডায়েরী আমার স্বরাজের আদর্শ টেনিসনের Land of the Lotos- Eatersএর মত, কি কিছু না হলে বিলেতের মত হলেও হবে। প্রঃ—আপনার আদর্শ স্বরাজ আপনি মহাত্মাজির প্রবর্তিত Nonviolent N. c. 0. দ্বারা লাভ করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন কি? • (২) মহাত্মাপ্রবর্তিত অহিংস অসহযােগের দ্বারাই আমার আদর্শ বরাজ লাভ হবে বলে বিশ্বাস করি। এখন থেকে ঐ গুণের অনুশীলন করলে ভবিষ্যতে নির্বিবাদে সুখভােগ সম্ভবপর হবে না। প্রঃ—এই আন্দোলনের Non-violence নীতি সম্বন্ধে আপনার কি মৃত? (৩) অহিংস নীতি বড়ই উপাদেয়। বর্তমানে অহিংস না হয়ে উপায় কি? অস্ত্র শস্ত্র নাই—প্রাণটাও ইচ্ছে করলে বাঁচানাে যায়—এমন স্থলে অহিংস নীতিই বেশ। প্রঃ-আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন আমরা non-violent থাকা সত্ত্বেও গবর্মেন্টের পক্ষ থেকে কোন violence হবে না? আর যদি গবর্মেন্টের পক্ষ থেকে বেশী রকম অন্যায় অত্যাচার অনর্থক হতে থাকে তা হলে দেশের লােকের পক্ষে Non-violence নীতি মেনেচলা কি সম্ভবপর হবে বলে মনে করেন ? (৪) গবর্মেন্টের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই মা’র ধ’র হবে - পয়সা দিয়ে গুণ্ডা ভাড়া করেও মারামারি করাবে--কারণ তাতে Mass Civil Disobedienceএ (সমবেতভাবে নিরুপদ্রব আইনভঙ্গে) বাধা হবে- ভারতও ইংরেজের হাত ফসকে কখনও যাবে না। গবর্মেন্টের পক্ষ থেকে অত্যাচার হলে পূর্ববঙ্গের লােকে না সহ্য করতে পারে কিন্তু কলিকাতার চারি পাশের জেলার সকলে এ রকম অত্যাচার চিরকাল স’য়ে আসছে, এখনও সইছে এবং ভবিষ্যতে সইতে প্রস্তুত আছে।

নয়ের পরিচ্ছেদ প্রঃ—হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মিলন স্থায়ী হবে বলে বিশ্বাস করেন কি ? (৫) হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মিলন কেন স্থায়ী হবে না, তার কোনও কারণ দেখা যায় না। হিন্দুর মন্দিরে মুসলমানের প্রবেশ, আবার মুসলমানের মসজিদে হিন্দুর উপাসনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতায় মাড়ােয়ারী মুসলমানের জল পৰ্য্যন্ত খেয়েছে—ছাত্রদের মধ্যে তাে হিন্দু মুসলমান বিচার উঠে গেছে বলেই হয়। আর একটা কথা, হিন্দুর সংখ্যা দিন দিন যেমন কমে আসছে আর মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছে তাতে কিছুকাল পরে হিন্দু বলে পরিচয় দিতে বেশী লােক থাকবে না। তখন হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথাই ভাবতে হবে না। ইতিমধ্যে যত দিন সে শুভ মুহূর্ত না আসে, ততদিন হিন্দুরা গােবরগণেশের পরামর্শমত নামাবলীর লুঙি পলেই সব গােল চুকে যাবে। প্রঃ—দেশ স্বাধীন না হ’তে জাতীয় শিক্ষার প্রচলন সম্ভব নয় বলে অনেকে বলেন। এ বিষয় আপনার কি মত? জাতীয় শিক্ষার ব্যবস্থা কি ধরণে হওয়া আবশ্যক? (৬) বিনা পয়সায় ইস্কুল কলেজ চালাতে পালে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই জাতীয় শিক্ষার প্রচলন সম্ভবপর হতে পারে। যদি কেজি, অক্সফোর্ডের গ্রাজুয়েট বিনা বেতনে জাতীয় শিক্ষার ভার গ্রহণ করেন তবে কেন হইবে না? অধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যক্ষ, সেক্রেটারী সমস্ত বিলাতের পাশ হওয়া দরকার। চেয়ার, বেঞ্চি, ইলেক্টিক ফ্যান প্রভৃতি পাশ্চাত্য বিলাসিতার চিহু যেন বিদ্যালয়ে না থাকে। কেবল অধ্যাপকদের জন্য চায়ের সরঞ্জাম প্রভৃতি রাখলেই চলবে। ছাত্রগণ জাতীয় ভাণ্ডারে পাঁচ টাকা বন্দীর ডায়েরী করে চাঁদা দিলেই পাশ করিয়ে দেওয়া উচিত। ছাত্রদের শারীরিক ব্যায়ামের জন্য মাষ্টার মশায়দের পা টেপার বন্দোবস্ত করা কর্তব্য। প্রঃ-ভারতবর্ষে নানা জাতির বাস আর নানা রকমের ধর্মসম্প্রদায় আছে ; এ অবস্থায় Indian Nationalisno গড়ে ওঠা সম্ভবপর মনে করেন কি ? তা যদি হয়, তবে এই Indian Nationalism কি রকমের হবে ? (৭) নানা জাতি ও নানা ধর্মসম্প্রদায় থাকা সত্ত্বেও যদি ইংরেজের মত একটা বাইরের শক্তি চিরকাল ভারতবর্ষের ঘাড়ে চেপে থাকে- তাহলে Indian Nationalism (ভারতীয় জাতীয়তা) বরাবর বাড়তে থাকবে ও সুন্দর গড়ে উঠবে। বিলাতে প্রস্তুত চীনেমাটির মহাদেবের মূর্তির মত এই Nationalismএর (জাতীয়তার) মূর্ত হবে। প্রঃ মহাত্মা গান্ধীর Contributionএর স্থায়ী প্রভাব ভারতীয় জাতীয় গঠনে কতটা? (৮) এ বিষয়ের বিচার ১০০ বছর পরে হবে। এক বছর আগে এ প্রভাব সম্বন্ধে লােকের ধারণা খুব উচ্চই ছিল—এখন কমেছে - এর পর বাড়বে কি কবে ভবিষ্যৎ জানে। প্রঃ-চরকা সম্বন্ধে আপনার মত কি ? (৯) চরকা ভালই জিনিস। যারা সূতাে কাটবেন তঁাদের আলস্য দুর হবে, সস্তায় মােটা কাপড় হবে, কুপােষ চরকার জ্বালায় বাড়ী ছাড়বে, ছেলে বুড়াে সকলকে দিয়ে ঘরে পয়সা আসবে, বিলেতের শ্রমজীবীরা না খেতে পেয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করবে। মধ্যে একদিন বাহিরের এক ভদ্রলােক একটি পকেট ক্যামেরা লইয়া আসিয়া নন্দলালকে ফটো দিবার জন্য অনুরােধ করিয়াছিলেন।

নয়ের পরিচ্ছেদ ইতিপূর্বে নন্দলাল একলা বসিয়া কখনও ফটো তুলেন নাই। সেদিনও ক্যালেণ্ডারে ও কাগজে ফটো উঠিবে শুনিয়া নন্দলাল ভীত হইলেন। বাংলাখবরের কাগজে চিররঞ্জন দাশ, সুভাষ চন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায় প্রভৃতি নেতাগণের যেরূপ চিত্র বাহির হইয়াছিল, তাহাতে নন্দলাল ভাবিলেন কষ্ট করিয়া ফটো তুলিয়া লাভ কি ? খানিকটা কালি ধ্যাবড়াইয়া নীচে যার-তার নাম লিখিয়া দিলেই তােল চলিবে। নন্দলাল অনুতাপ করিয়া বলিতেন, এবার হইতে ১৭ (২) ধারায় লীডার হইয়া জেলে আসিব, ৬ মাস জেল হইলে যে ছবি ও জীবনী বাহির হয় তাহা জানিলে আগেই একটা ফটো তুলিয়া ও জীবনী লিখিয়া রাখিয়া জেলে আসিতাম। মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন বাহির হইয়া কাগজের কলমকে-কলম বিজ্ঞাপনের দরে contract (চুক্তি) লইয়া সাত দিন উপরি-উপরি ছবি ও জীবনী ছাপাইয়া দিবেন। মন্দিরের চূড়াই সকলে দেখে—কিন্তু মাটির নীচে অন্ধকারে পড়িয়া বাহারা ভিতের হঁট হইয়াছে, তাহাদের কথা কেহ ভাবে না। সমস্ত ভলান্টিয়ার সর্বপ্রথম স্বাধীনতাসমরে জেলে আসিল, তাহাদের জীবনী কেহ লিখিল না দেখিয়া নন্দলাল নিজেই সে কাজের ভার লইলেন এবং পূৰ্বোল্লিখিত জীবনীসংগ্রাহক নেতার পন্থা অনুসরণ করিয়া কতকগুলি প্রশ্ন করিয়া পাঠাইলেন। দু’জন তাহার উত্তর দিয়াছিল- বাকি সকলে সাত্ত্বিকতাপ্রণােদিত হইয়া জীবনকাহিনী প্রচার করিতে চাহে নাই। একদিন মহাতর্ক উঠিল যে মহাত্মা গান্ধীর নন-কো-অপারেশন তত্ত্ব ধার করা কিনা। কেহ বলিলেন তিনি টলষ্টয়ের নিকট এ তত্ত্ব পাইয়াছেন—কেহ বলিলেন গুজরাতী বৈষ্ণব বলিয়া তাহার জীবনের সহিত এই সকল তত্ত্ব মিশিয়া রহিয়াছে। নন্দলাল প্রমাণ করিয়া দিলেন ৫ বন্দীর ডায়েরী নন-কো-অপারেশন বাংলার সম্পূর্ণ নিজস্ব জিনিস। দেড় শতবৎসর আগে যখন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এ দেশের বস্ত্রশিল্প নষ্ট করিবার চেষ্টা করিতে- ছিল, তখন তাহাদের অত্যাচার সহিতে না পারিয়া তিরা বুড়ো আঙ্গুল কাটিয়া ফেলিয়াছিল যেন অন্যায় সহ করিতে না হয়। তারপর দীনবন্ধু মিত্রের “নীল দর্পণে পাওয়া যায় নদীয়া, যশােহর প্রভৃতি জেলার চাষীরা নীলের আবাদ একযােগে বন্ধ করিয়া নীলকরদিগের অত্যাচার হইতে কিরূপে মুক্তি পাইয়াছিল। আমাদের কবিবর রবীন্দ্রনাথের লেখার ভিতর নন-কো-তত্ত্ব সমস্তই রহিয়াছে। নন-কোবাদের প্রধান কথা দুঃখের ভিতর দিয়া আত্মশুদ্ধি দ্বারা স্বাধীনতা লাভ। স্বামী বিবেকানন্দও বলিয়াছেন- “সুখ তরে সবাই কাতর কেবা সে পামর দুঃখে যার ভালবাসা” রবীন্দ্রনাথ ১৩২১ সালের ভাদ্র মাসেই লিখিয়াছেন- “ধনী যে তুই দুঃখ ধনে সেই কথাটি রাখিস মনে ধূলার পরে স্বর্গ তােমায় গড়তে হবে। বিনা অস্ত্র বিনা সহায় লড়তে হবে।” এখানে non-violenceএর (অহিংস ভাবের) কথাও পষ্ট পাইলাম। বিনা অস্ত্রে আমাদিগকে যুদ্ধ চালাইতে হইবে। রবীন্দ্রনাথ “গােরা”র ভিতর non-defenceএর (পক্ষ সমর্থন না করার) idea দিয়া গিয়াছেন। পুলিসের অত্যাচার নিবারণ করিতে গিয়া গােরা মােকদ্দমায় পড়িল- কিন্তু গবর্মেন্টের উপর বিশ্বাস না থাকায় সে নিজেকে defend ( পক্ষ সমর্থন করিল না। গােরার যুক্তি ও অসহযােগীর যুক্তি একই রূপ। “চোখের বালি”র একস্থলে মহেন্দ্র কি একটা পড়িয়া নাইবে -পুত্র- বৎসলা মাতা রাজলক্ষ্মী বুঝিতে না পারিলেও শুধু পুত্রের মন-রক্ষার্থে সেটা নয়ের পরিচ্ছেদ তুর্কী ভাষার একটা কিছু হইলেও শুনিবেন—রবীন্দ্রনাথ এ কথা বলিতেছেন। এত ভাষা থাকিতে তুর্কী ভাষার উল্লেখ করা কেন হইল ? এস্থলেই খিলাফতের পূর্বাভাস রহিয়াছে। আর পাঞ্জাবের অত্যাচার সম্বন্ধে কবি তাে কত কথাই লিখিয়াছেন একতকাল আগে শিখদের উপর কি অত্যাচার হইয়াছিল তাহা পৰ্যন্ত লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন— নিম্নের কবিতা কয় লাইনে জালিয়ানওয়ালাবাগের চিত্র পাওয়া যায়- “পঞ্চ নদীর তীরে ভক্তদেহের রক্তলহরী মুক্ত হইল কিরে ?” সরকারী উপাধি পরিত্যাগ সে তত রবীন্দ্রনাথ নিজেই সর্বপ্রথমে ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করিয়া পথ দেখাইয়াছেন! Non-payment of * tax (খাজনা বন্ধ) তােল তাহার নিজের প্রজারাই করিয়াছে। অনেকের ধারণা মহাত্মা চরকার কথা প্রথম হলেন। খ্রষ্টাব্দের বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মিলনের অধিবেশনে সভাপতি শ্ৰীযুত চিত্তরঞ্জন দাশ চরকার কথা স্পষ্ট বলিয়া গিয়াছেন—চরকা না হইলে যে আমাদের মুক্তি নাই তাহাও বলিয়াছেন। অমৃতসর কংগ্রেসে মহাত্মা গান্ধী রিফর্মসের পক্ষে ছিলেন। শ্ৰীযুত চিত্তরঞ্জনই non-cooperation ( অসহযােগ) সাব্যস্ত করেন, এবং ভােটে মহাত্মার মত গ্রাহ্য না হইয়া চিত্তরঞ্জনের মতই গ্রাহ্য হয় ! জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, তত-চরকা প্রচার, বিলাতী বর্জন, হরতাল, এবং উপবাস সবই তত বাঙ্গালী ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দেই করিয়াছে। ইহা হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণ হইতেছে যে অসহযােগ আন্দোলনের ভিতর এমন কিছু নাই যাহা বাঙ্গালী দেয় নাই বা জানিত না। এই বক্তৃতা শুনিয়া সকলের চোখ ফুটিল। এতদিন যে-বাংলা সকল ১৯১৭ বন্দীর ডায়েরী বিষয়ে ভারতকে পথ দেখাইয়াছে—যে বাংলা সম্বন্ধে গােখলে বলিয়া- faccia What Bengal thinks today India will think tomorrow-“যাহা বাংলা আজ ভাবিবে, কাল সমগ্র ভারত তাহা ভাবিবে”—সেই বাংলা যে অসহযােগ আন্দোলনের জন্য গুজরাতের কাছে ঋণী নয় ইহার প্রমাণ পাইয়া উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলী বিশেষ আশ্বস্ত হইলেন। সকলে নন্দলালের যুক্তিমত্তায় বিস্মিত হইয়া গেলেন ।

দশের পরিচ্ছেদ। দৈনিক জীবনের কয়েকটি চিত্র। আলিপুর জেল স্বরাজ-আশ্রম হইয়া উঠিয়াছে। কোনও সাধক বই লিখিতেছেন, কেহ ধ্যান করিতেছেন, কেহ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতেছেন, কেহ টিকির মহিমা প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন,“কেহ হাত দেখিয়া ভবিষ্যৎ বলিয়া বেড়াইতেছেন, আবার কেহ বা খেলা ধূলা লইয়াই ব্যস্ত আছেন। মূক বাচাল হইয়াছে, পঙ্গু গিরি লঙ্ঘনের উদ্যোগ করিতেছে, শুষ্ক তরু মুঞ্জরিত হইয়াছে, মরা গাঙে বান ডাকিয়াছে—জেলের ভিতর সাধনার এমনই প্রভাব ! যিনি কোনও দিন মা সরস্বতীর ধার ধারেন নাই- তিনি ও সাহিত্য চর্চায় মনােনিবেশ করিয়াছেন। ব্যারিষ্টার প্রবর বীরেন্দ্রনাথ শাসমল মহাশয় আইন ছাড়িয়া আমার অধিকার ভাষাতত্ত্বের চর্চায় মনোেযােগ দিয়াছেন। Apologv•তে তুষ্ট হইয়া তিনি ‘নাকোলজি’র সৃষ্টি করিলেন—অর্থাৎ নাকে খত দিতে দিতে apology ( ক্ষমা প্রার্থনা করার নাম হইল নাকোলজি। একজন গৌরবর্ণ বন্ধুর শরীর দিন দিন বেশ পুষ্টিলাভ করিতেছিল, আমরা তাহার জামার ভিতর হইতে রক্তের আভা ফুটিয়া বাহির হইতেছে বলিলাম। বীরেন বাবু বলিলেন—তাহারও ‘কক্তের কাভা বাহির হইতেছে। রাঙা মানুষের যদি রক্তের আভা হয়, তবে কাল মানুষের কেন ‘কক্তের কাভা’ হইবে না? শুধু ভাষাতত্ত্বের শ্রাদ্ধ নয়, অনর্গল কবিতার সৃষ্টিতেও বীরেন বাবু, সিদ্ধহস্ত ছিলেন। হালুয়া, টোষ্ট ফুটিয়া *৬৪ বন্দীর ডায়েরী প্রভৃতির উপর কত কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। কবি সত্যই বলিয়াছেন --“ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কালিদাস ডােবে কত পাথারে!” ফরিদপুরের একজন নেতা কাহার ত্যাগ কত বড় তাহা লইয়া তর্ক তুলিলেন। তিনি অপমাকে সেকেন্ ক্লাসে ফেলিয়াছিলেন। সুভাষ, কিরণবাবু প্রভৃতি বিলেত-ফেরত বলিয়া তাহাদের ত্যাগ ফাষ্ট ক্লাস। তাহাকে অনেক খােমােদ করিলাম আমায় ফাষ্ট ক্লাসে প্রােমােশন দিতে। তিনি বলিলেন বিলাত না গেলে হইবে না। আমি জবাব দিলাম এ-কথা দুবছর আগে বলেন নাই কেন তাহা হইলে বিলাত ঘুরিয়া আসিয়া নন্-কো-অপারেশন করিতাম ! তিনি বলিলেন ভাগ্য চাই- ভাগ্যে না থাকিলে বিলেত-ফেরত নন্-কো-অপারেটর হওয়া যায় কি ? বিলাতের উপর এই ভক্তি দেখিয়া একটি ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। পূৰ্ব্ব- বঙ্গের একজন অবসর প্রাপ্ত গবর্মেন্ট সার্ভেন্ট একজন অসহযােগী কর্মীকে বলিয়াছিলেন—“ইহার পূর্বে তত একবার বােমার দলে মিশিয়া দুইটা পিস্তল ও একটা বােমা দিয়া এমন সুপ্রতিষ্ঠিত যে ইংরাজরাজ্য তাহা ধ্বংস করিবার চেষ্টা করিয়াছিলে ! ইংরাজের তত কিছুই হইল না-মাঝখান থেকে তােমাদের ভবিষ্যৎটা মাটি হইল। ইংরাজ চলিয়া যাইলে তােমাদের কি অবস্থা হইবে একবার ভাব না--তাই নন্ কো অপারেশন করিয়া ইংরাজ তাড়াইতে চাও! এমন রেল, টেলিগ্রাফ জাহাজ কোথায় পাইবা। বাঙ্গালীর মাথায় কি এ সমস্ত আসিবে ? আর ইংরাজ কি দয়ার সাগর ! আমার একবার অসুখ—কমিশনার সাহেব সস্ত্রীক আমার ভাঙ্গা বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত, বলিলেন-Old chap, I am sorry you are ill। নিজে তাে “ছরি” (দুঃখিত) হইলেন—মেম সাহেব হাতে করিয়া আমার কপালে জলপটি দিয়া দিলেন। এমন দয়ার সাগর ইংরাজকে তােমরা তাড়াইতে চাও?”

দশের পরিচ্ছেদ ইংরেজ এবং ইংরেজের বিলাতের উপর আমাদের সকলেরই এইরূপ একটা ভাব লুকাইয়া-চুরাইয়া মনের ভিতরে আছেই—ইংরাজ রাজত্বের ভিত্তি আমাদের অন্তরের এই গােপন অন্ধকারে। হঠাৎ জেলের মধ্যে একদিন সাড়া পড়িয়া গেল—ভারত মাতার স্ব-নিযুক্ত গার্জেনদের সভা হইবে। জানা গেল ভারত-মাতার উইল আবিষ্কৃত হইয়াছে—তাহার ভিতর অসহায় ভারতমাতার যে সমস্ত গার্জেনের নাম আছে—তাহার মধ্যে জেলের দু একজনও আছেন। তাহাদের উপর ভারতমাতার উদ্ধারের ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার ;-খাইবার নাইবার সময় নাই—কোথায় কে কি খাইতেছে, কি পরিতেছে, শাস্ত্র অনুসারে চলিতেছে কিনা, নৈতিক চরিত্র ঠিক আছে কিনা, দেশ উদ্ধারের কথা ভাবিতেছে কিনা—এই সমস্ত তদারক করাই ইহাদের কাজ হইল। আপনারা সকলেই ভারতমাতার জয় বলেন, কিন্তু ভারতবাবার কথা কেহই মনে করেন না। ভারতবাবা প্রায় সহস্র বৎসর হইল মারা গিয়াছেন-আমাদের পিতৃভাষায় তিনি যে সমস্ত উপদেশ দিয়া গিয়াছেন, স্ব-নিযুক্ত গার্জেনরা সেইগুলি দেশের লােককে মানাইতে পারিলে, ভারতমাতা যে অচিরে উদ্ধার হইবেন তাহাতে সন্দেহ নাই। এই গার্জেনের তালিকায় নন্দলালের নামও ছিল। নন্দলাল সকলকে বলিয়া বেড়াইত~~~ “আমি না করিলে, কে করিবে আর উদ্ধার এই দেশ ? তখন সকলে বলিল-বাহবা বাহবা বাহবা বেশ! তাই শুয়ে শুয়ে, কষ্টে বাঁচিয়ে রহিল নন্দলাল। সকলে বলিল -ভ্যালারে নন্দ, বেঁচে থাক্ চিরকাল। চট্টগ্রাম কনফারেন্সের পর আবার এক গণ্ডগোল বাধিল। যখন সার্ভেন্ট কাগজের সংবাদদাতা তার করিয়া জানাইলেন যে স্যর আশুতোষ বন্দীর ডায়েরী চৌধুরী এবং মিঃ ব্যোমকেশ চক্রবর্তী মাটিতে বসিয়া সকলের সঙ্গে প্রার্থনায় যােগ দিয়াছিলেন—তখন স্বরাজ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হইয়াছিলাম। জাহাজ হইতে নামিয়া বেণী:দারােগার আদেশ অনুসারে চট্টগ্রামে যখন কেহ বন্দেমাতরম্ ধ্বনি দিল না এবং প্রােসেশন করিয়া সভানেত্রীকে লইয়া গেল না, তখন বুঝিলাম দেশের লােকের নিয়মানুবর্তিতা (discipline) কত বাড়িয়াছে। ১৯০৬ সালে বরিশাল-কনফারেন্সে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, বিপিনচন্দ্র পাল, কৃষ্ণকুমার মিত্র প্রভৃতি লাঠির আঘাতের মুখে মাতৃমন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে শশাভাযাত্রা করিয়া প্যাণ্ডালে উপস্থিত হইয়াছিলেন। এই ১৬ বৎসরে দেশ কতট অগ্রসর হইয়াছে—বরিশাল ও চট্টগ্রামের অধিবেশনদ্বয়ের তুলনা করিলেই বােঝা যায় ! বরদোলি রেজোসন অনুসারে দেশের লােক এমন ভাবে চলিতে পারিবে, এতটা সফলতার কথা বােধ হয় ঐ মন্তব্যের সৃষ্টিকর্তাও ভাবিতে পারেন নাই ! শ্ৰীযুক্তা হেমপ্রভা দেবীর ভলান্টিয়ার ইস্তাহারের বিরুদ্ধে লড়াই করার রেজোলসন ধামা চাপা দেওয়া হইল - কারণ পাশ হইলে অনেক নীরব কর্মীর বিপদ। জেলে আসার উত্তেজনায় কাজ নষ্ট হইবে এবং বরদোলি মন্তব্য অমান্য করা হইবে ভাবিয়া ও-কথায় বড় একটা কাণ দেওয়া হইল না। চট্টগ্রাম প্রাদেশিক সম্মিলনীর সভানেত্রীর অভিভাষণ পড়িয়া নন্দলাল তাে চটিয়াই অস্থির! অভিভাষণের এক তীব্র সমালােচনা লিখিয়া সে সকলকে পড়িয়া শুনাইতে লাগিল। নন্দলালের সমালােচনাটী নীচে দিলাম- বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মিলনের চট্টগ্রাম অধিবেশনের সভানেত্রীর অভিভাষণের সমালােচনা। রবীন্দ্রনাথ, আখতােষ, অখিলচন্দ্র, ফজলুল হক, বিপিনচন্দ্র প্রভৃতি দশের পরিচ্ছেদ মনীষীবৃন্দ যে আসন অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন বর্তমান অভিভাষণ সেই আসনেরই উপযুক্ত হইয়াছে। আমাদের একজন শ্রদ্ধাস্পদ নেতার কথায় বলিতে গেলে—এই অভিভাষণ অসহযােগ আন্দোলনকে মৃত্যুজনক শেষ ifa ettimantes (has dealt final death blow), aterapi বরদোলি মন্তব্যের পর অসহযােগ আন্দোলনের জীবন ধারণের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল চট্টগ্রাম অধিবেশনে তাহাও গেল। স্পষ্ট করিয়া কাউন্সিলে প্রবেশ করার কথা বলা হইয়াছে। কাউন্সিলে প্রবেশ করিতে হইলে দেশের লােক অসহযােগ আন্দোলনের নেতাগণকে পাঠাইবেন কি ? তাঁহারাই তাে ইতিপূর্বে লােককে বলিয়াছিলেন কাউন্সিল ছাড়। কাউন্সিলে প্রবেশ করিয়া অনেকে মন্ত্রীত্ব প্রভৃতি পাইবেন—কিন্তু যাহারা চিরদিনের জন্য ত্যাগব্রত গ্রহণ করিয়াছেন তাহারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকিবেন। কারণ তাঁহাদের কাউন্সিলে ঢোকাই অসম্ভব। তারপর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে ভলান্টিয়ার ইস্তাহারের জন্য আবার লড়াই করিতে। উত্তেজনা দ্বারা জাতি বড় হয় না ; উত্তেজনার মুখে যে সমস্ত লােক জেলে গিয়াছে, তাহাদের জেলে থাকিয়া প্রায়শ্চিত্ত করাই উচিত। এখন আমাদের কাজ বাহিরে। দেশের লােকের ভুলিয়া যাওয়া উচিত যে দেশবন্ধু প্রভৃতি নেতা কারাগারে বােগশয্যায় রহিয়াছেন-কারণ এসব কথা মনে করিলে অশিক্ষিত জনসাধারণ উত্তেজিত হইতে পারে, তাহাতে নীরবে গঠন কৰ্ম্মের বাধা আসিবে। সুতরাং ভলান্টিয়ার ইস্তাহারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানাে ঠিক নয়। সভানেত্রী বলিয়াছেন বাংলার আত্মসম্মানের কথা-সমগ্র ভারতের সামনে বাংলার আত্মসম্মান বলি দিবার ক্ষমতা কি বাঙালী রাখে না ? শেষ কবিতাটীতে মহাত্মা গান্ধীকে অপমান করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে

৬
বন্দীর ডায়েরী
“বল হউক গান্ধী বন্দী’ -কবি এমনই কবি যে মহাত্মা শব্দটী যােগ
করিয়া দিয়া ছন্দ মিলাইতে পারেন নাই। তাছাড়া আরও একটী
অন্তনিহিত ভাব রহিয়াছে যেন মহাত্মা বন্দী হােন তাহাতে আমাদের
কি যায় আসে ? দু এক লাইন পরে বলা হইয়াছে—
“ওরে যে যায় যা সে, তুই শুধু বল
আমার হয় নি লয়
বল আমি আছি, আমি পুরুষােত্তম
আমি চির দুর্জয়
ইত্যাদি
এরূপ আত্মরক্ষায় সচেষ্ট এবং আত্মপ্রশংসাপরায়ণ নেতাদিগের দ্বারা
কিছু হইবে না। তাই বলিতেছিলাম এই অভিভাষণ যেন দেশের লোক
গ্রাহ্য না করেন, এই আমার বিনীত অনুবােধ।

এগারাের পরিচ্ছেদ। হরিলাল গান্ধীর গ্রেপ্তার-সাধনা। ; মহাত্মা গান্ধীর জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীহরিলাল গান্ধীর বন্দী হওয়ার ইতিহাস বড় চমৎকার। ইনি এখন ব্যবসা-সম্পর্কে কলিকাতা নিবাসী হইয়াছেন। ইহার দোকান বড় বাজারে। যে দিন মেয়েদের সহিত আমরা গ্রেপ্তার হইয়া বড় বাজার থানায় নীত হই-হরিলাল আসিয়া সকলের সহিত দেখা করিয়াছিলেন এবং মহাত্মার কাছে একটা খবর দেওয়ার জন্য অনুরুদ্ধ হইয়া বলেন-“I need not send it to Mahatma ; my father is present here in the person of Mr. C. R. Dass. Whatever he says we will do.” (মহাত্মার নিকট পাঠাইবার দরকার নাই, এখানেই মিঃ দাশের মধ্যে আমার পিতা উপস্থিত রহিয়া- ছেন)। এ গেল ৭ই ডিসেম্বরের কথা। ১০ই ডিসেম্বর শনিবার ষ্টার থিয়েটারে কি একটা নূতন ‘প্লে’ হইবার কথা ছিল। হরিলাল তাঁহার অংশীদারের অনুরােধে ঐ ‘প্লে’ দেখিতে যাইবেন বলিয়া টাকা লইয়া বাহির হইলেন। থিয়েটারে যাওয়ার আগে মৌলানা আজাদের সঙ্গে দেখা করিয়া যাইবার কথা ছিল। মৌলানা সাহেবের বাড়ী গিয়া দেখিলেন যেন একটা নিস্তব্ধতার বিষাদময় আঁধারে বাড়ীটি আচ্ছন্ন হইয়া আছে। শুনিলেন মৌলানাকে, এখনই গ্রেপ্তার করিয়া লালবাজারে লইয়া গিয়াছে। লালবাজারের পথে মৌলানার সেক্রেটারীর নিকট শুনিলেন দেশবন্ধু দাশ প্রভৃতিও গ্রেপ্তার বন্দীর ডায়েরী থিয়েটার দেখা আর হইল না—বাসায় ফিরিয়া হরিলাল মহাত্মা এবং অন্যান্য সকলের নিকট পত্র লিখিলেন যে তিনিই কালই গ্রেপ্তার হইবেন। বন্ধুবান্ধবদের নিকট পরদিন বিদায় নিলেন। অনেকে বলিলেন বােম্বাই যাইয়া গ্রেপ্তার হইতে-হরিলাল কিন্তু কলিকাতাতেই ধরা দেওয়া সাব্যস্ত করিলেন। ১১ই ডিসেম্বর রবিবার পা হইতে মাথা পর্যন্ত খদ্দরে সজ্জিত হইয়া হরিলাল একটা ট্যাসি লইয়া চলিলেন লালবাজারে। কয়েকদিন পূর্বেই লালবাজারে সার্জনদের হাতে ভােম্বলের মার খাওয়ার কথা শুনিয়া হরিলাল ভয়ে ভয়ে একখানি ভাল কক্কাদার কাশ্মীরী শাল দিয়া গা ঢাকিয়া গিয়াছিলেন। লালবাজার যাইয়া একজন সার্জেনকে বলিলেন-I am a Congress volunteer, I offer myself for arrest ( আমি একজন স্বেচ্ছাসেবক, আমায় গ্রেপ্তার কর)। সার্জন নাম জিজ্ঞাসা করাতে হরিলাল তাহার কার্ডখানি সার্জনের হাতে দিলেন। সার্জন-Are you anyway related to that Gandi ? (তুমি কি সেই গান্ধীর কেউ হও?) হরিলাল-Somewhat. (কতকটা হই। সার্জন –In what way? (কি রকম?) হরিলাল—He is my father. (তিনি আমার পিতা) সার্জন-Are you quite sure or you are bluffing ? ( তুমি ঠিক বলছ, না চালাকি করছ ?) হরিলাল-Oh, no, ( না, মােটেই না ) Go-Go away, you are a young man, you should not go to prison. (যাও চলে যাও, তুমি যুবক, তােমার জেলে যাওয়া উচিত নয়)। :

এগায়াের পরিচ্ছেদ ৭১ ইতিমধ্যে সার্জনদের ভিড় লাগিয়া গেল। গান্ধীর ছেলে নিজে ধরা দিতে আসিয়াছে, চারিদিকে অন্যান্য লােক দলে দলে জমিতে লাগিল। পুলিশের একজন বড়কর্তা আসিলেন। তিনি বলিলেন—why have you come here ? Go to your own Thana. There is the main gate, you please walk out (এখানে এসেছ কেন? তােমার নিজের থানায় যাও, ঐ সদর দরজা রহিয়াছে, বাহির হইয়া যাও)। হরিলাল বলিলেন I came here to offer myself quietly for arrest, otherwise a big demonstration may get up { আমি এখানে এসেছিলাম যে কোনও রকম লােকের ভিড় না হয় এই জন্য )। কিন্তু কোতােয়াল শুনিলেন না। এদিকে বড়বাজারের থানায় ফোন করিয়া খবর দিলেন—গান্ধীর ছেলে যাইতেছে গ্রেপ্তার করিবে। লালবাজার হইতে হরিলাল বড়বাজার চলিলেন। সেখানকার ইন পেক্টার ফিরাইয়া দিলেন, বলিলেন ৫জন না হইলে তিনি গ্রেপ্তার করিবেন । যদি ওজন ভলান্টিয়ার লইয়া তিনি চিৎপুর হইতে বড়বাজারের দিকে হরতালের কথা বলিতে বলিতে আসেন, তাহা হইলে তাহাকে গ্রেপ্তার করা হইবে ঠিক হইল। হরিলাল ছুটিলেন খিলাফত আপিসে, তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। খিলাফত আপিসে কেহ নাই, কয়েকদিন পূৰ্ব্বে পুলিশ ইহাকে খানাতল্লাসী করিয়া বন্ধ করিয়া গিয়াছে। একজন দোকানদার বলিয়া দিল খিলাফত আপিস ক্যানিং স্ট্রীটে উঠিয়া গিয়াছে। হরিলাল ক্যানিং স্ট্রীটে চলিলেন। সেখানে কাহারও সন্ধান না পাইয়া কংগ্রেস আপিসে চলিলেন। হরিলাল ইতিপূর্বে কখনও কংগ্রেস আপিসে পদার্পণ করেন নাই, ঠিকানাটা মনে ছিল। এই দুঃসময়ে কাজে লাগিয়া গেল। আপিস তখন বন্ধ হইয়া १२ বন্দীর ডায়েরী গিয়াছে। কয়েকজন ভলান্টিয়ার সামনে জটলা করিতেছিল। হরিলাল তাহাদের জিজ্ঞাসা কলিলেন আপিসের কর্তারা কেহ আছেন কিনা, তিনি দেখা করিতে চান। হরিলালের শালের বহর দেখিয়া ছেলেদের সন্দেহ হইয়াছিল, এ একটা সি, আই, ডি। তাহারা কত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিল, না পর্যন্ত যখন হরিলাল বলিলেন না, অথচ বলেন আমার সঙ্গে তােমরা গ্রেপ্তার হইতে রাজি আছ কি না, তখন সকলে নিঃসন্দেহ হইয়া গেল, এ লােকটা নিশ্চয়ই সি, আই, ডি! তাহারা বলিয়া দিল, আজ গ্রেপ্তার হইবার সময় চলিয়া গিয়াছে, আমরা পাঁচটার পর গ্রেপ্তার হইতে বাহির হই না, আপনি কাল আসিবেন। হরিলাল ট্যাসি লইয়া সার্ভেন্ট আপিসে চলিলেন। ছেলেরাও তাড়াতাড়ি এক ট্যাসি ধরিয়া হরিলালের পিছন ধরিল। সার্ভেন্ট আপিসে পৌছিয়া হরিলাল বসিয়াছেন, এমন সময় ঐ ছেলেদের দুএকজন শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী মহাশয়ের কাণে কাণে গিয়া বলিল—ঐ লােকটা সি, আই, ডি! এই কথা শুনিয়া সকলে হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। শ্যামবাবু বলিলেন-সি, আই, ডি নয়, ইনি মহাত্মার বড় ছেলে। তখন ভলান্টিয়ার দের মুখের চেহারা যে কি প্রকার হইয়া গেল সকলেই অনুমান করিতে পারেন। অবশেষে বেচারারা হরিলালের সহিত যাইয়া গ্রেপ্তার হইতে স্বীকার হইল। আধঘণ্টা ছুটি লইয়া বাসা হইতে দেখা করিয়া ফিরিবে বলিল। সার্ভেন্ট আপিসে পুলিশকোর্টের উকিল শীকেদারেশ্বর গাঙ্গুলি মহাশয় বসিয়া পরামর্শ করিতেছিলেন যে প্রাকটি ছাড়িবেন কি না। আর পরামর্শের সময় রহিল না, তিনিও হরিলালের সহিত যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। শ্যামবাবু হরিলালকে উপদেশ দিলেন “অনর্থক গ্রেপ্তার হইয়া কি করিবে। কাজের লােকের অভাব, একটা কাজ লইয়া বসাে। যদি রাজি থাকোতাে আমি তােমায় বড়বাজার কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারী এগারাের পরিচ্ছেদ এমন কি ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট পৰ্য্যন্ত করিয়া দিতে পারি।” তখন শ্যামবাবু বাংলার অবিসংবাদী একচ্ছত্র কর্তা (Dictator)। হাজার হােক মহাত্মার ছেলে হরিলাল দেবতার ছলনায় ভুলিলেন না। এদিকে ছেলেরা ফিরে না, হরিলাল অস্থির হইয়া উঠিলেন, আজ যে সকলের কাছে বিদায় লইয়া আসিয়াও তাঁহার গ্রেপ্তার হওয়া হইল না। অবশেষে রাত প্রায় আটটার সময় ছেলেরা তিনজন আসিল। একটা ট্যাকসিতে হরিলাল সকলকে লইয়া চলিলেন। চিৎপুরের মােড়ে গাড়ী থামাইয়া সারি বাঁধিয়া বড়বাজারের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। এমন সময় দেখিলেন ৫৬ জন সার্জন থানার দিক হইতে আসিতেছে। তাহাদের দেখিয়া হরিলাল কেদারবাবুকে বলিলেন ‘২৪ তারিখ হরতাল’ বলা সকলে বলিবামাত্রই ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের মত চারিদিক হইতে সার্জনরা ছুটিয়া আসিয়া ধরিল, হরিলাল স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন। বড়বাজারে কোনও পুলিশ কর্মচারী মহাত্মার ছেলের নামে মিথ্যা চার্জ লিখিতে চায় না। অবশেষে ইন্সপেক্টর বাবু বাধ্য হইয়া চাকরীর খাতিরে লিখিলেন। যথােচিত যত্ন করিয়া হরিলালকে লালবাজারে পাঠাইলেন। সেখান হইতে প্রেসিডেসি জেলে আসিয়া বিচারে ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড হইল। তিনমাস প্রেসিডেন্সি জেলে থাকার পর হরিলাল ও কেদারবাবুকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হইয়াছিল। হরিলালের অসুখে অসুখে শরীর অত্যন্ত খারাপ হইয়া গিয়াছিল—৫ মাসে ২৫ পাউণ্ড ওজন কমিয়া গেল। কিন্তু এত সাধের সশ্রম কারাদণ্ড বৃথায় গিয়াছিল। জনৈক হিতৈষী নে জেলে হরিলালের উপর চটিয়া বলিয়াছিলেন He has defiled a great name! (তিনি একটী মহৎ নাম অপবিত্র করিয়াছেন।) কি করিবে বেচারা তােত “ত্যজ্য-পিতা” করিতে পারে না।

৭৪
বন্দীর ডায়েরী
অথচ মহাত্মার ছেলে বলিয়া সকলেই তাহাকে এই বয়সেই মহাত্মা
বানাইতে চায় ! কপালের ভােগ ! রবিবার নিষ্ফলা বার, সেইদিন গ্রেপ্তার
হইতে বাহির হওয়াতেই হরিলালের কপাল এমন চটিয়াছিল । এই বয়সে
ছয়বার জেল খাটিয়াও হরিশালের চৈতন্য হইল না।

বারোর পরিচ্ছেদ। কিরণবাবু ও অরবিন্দরকে। বিলাতে থাকিতে কিরণশঙ্কর বাবু অসহযােগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে খুব তর্ক করিতেন। ব্যারিষ্টারি পাশ করিয়া কলিকাতায় আসিয়া অসহযােগী নেতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। তখন দেশবন্ধু মফঃস্বলে। একজন ভক্ত ও ভাবুক নেতা বলিলেন—জামদগ্ন্য মন্ত্রবলে এক লাখ সৈন্য তৈরি করেছিলেন, এ কথায় যদি বিশ্বাস না কর, তবে এ আন্দোলনে যােগ দিও না। আর একজন আইনব্যবসায়ী নেতার বাড়ীতে গেলে তাহাকে কেহ বসিতে বলিল না—উপরন্তু নেতা মহাশয় মুখের কাছে টেবিলের উপর পা নাচাইতে লাগিলেন। কিরণবাবু সংকল্প করিলেন -“না, ইহার ভিতর অমি নই।” কিন্তু কপালের লেখা কে খণ্ডাইতে পারে ? দেশবন্ধু ফিরিলে শ্ৰীমনি সুভাষচন্দ্রের সহিত কিরণবাবু জুটিলেন। তাঁহাকে একবারে কংগ্রেসের শিক্ষা-বিভাগের ভার দেওয়া হইল। এই কাৰ্য্য তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সহিত চালাইতেছিলেন—এমন সময় “বাঙ্গলার কথায় রাজ- দ্রোহসূচক প্রবন্ধ লিখিবার অভিযােগে তিনি গ্রেপ্তার হন। উক্ত প্রবন্ধ যে দিন বাহির হয়, সেই দিন আমি গ্রেপ্তার হই। প্রিন্টার ও পাবলিশার আমার নামই ছিল। কিন্তু দয়াময় ব্রিটিশ গবমেন্ট আমাকে একবার ছয়মাস দিয়াছেন বলিয়া শ্ৰীযুত অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়কে প্রিন্টার বলিয়া গ্রেপ্তার করিলেন। কিরণবাবুও গ্রেপ্তার হইয়া আমাদের গৃহে আশ্রয় লইলেন।

৭৬ বন্দীর ডায়েরী ! কিরণবাবু under-trial হইয়া হাজত অবস্থায় প্রায় তিনমাস আমাদের সহিত ছিলেন। তাহার রঙ্গরস ও প্রসাদ না হইলে আমাদের জেলের জীবন বােধ হয় অসহ্য হইয়া উঠিত। জেলে প্রবেশ করিয়াইগেটে আমাদের সঙ্গে দেখা হইল। প্রথম কথা কিরণবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন এখানে দাড়ি কামাইতে পাওয়া যায় কি না। যেন দাড়ি কামাইতে না দেওয়া হইলে, তিনি রাগ করিয়া এখনই ফিরিয়া যাইবেন! কিরণবাবু গম্ভীরভাবে আমাদের অভিভাবক হইয়া বসিলেন। তাহার কারণও আছে। তিনি যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রােফেসর ছিলেন—সে সময় আমার দাদা ওখানে পড়িতেন। সুভাষচন্দ্রও তাঁহার আসিবার কিছুদিন আগেই প্রেসিডেন্‌সি হইতে বিতাড়িত হইয়াছিলেন। বড়লােকের সঙ্গে যেমন আত্মীয়তা না থাকিলেও সকলে আত্মীয়তা আবিষ্কারের চেষ্টা করেন, সুভাষকে মানুষ করা লইয়াও সেইরূপ অনেকে অধিকারের দাবী করিতেন। সুভাষ আই, সি, এস ছাড়িয়া অসহযােগ আন্দোলনে যােগ দিয়াছে, তাহাকে মানুষ করার গর্ব অনেকে ন্যায় অন্যায় ভাবে করিতেন। গরীব আত্মীয় হইলেও যেমন কেহ স্বীকার করে না আমাদের বেলায় সেইরূপ হইত, যাহারা মানুষ করিয়াছে তাহারা কোনাে কথাই বলে না। কিরণবাবু কিন্তু সমভাবেই আমাদের সহিত সম্বন্ধটা স্বীকার করিতেন। তা ছাড়া দেশবন্ধুর সহিত কিরণবাবুর সত্য সত্যই একটা সম্বন্ধ ছিল-সম্পর্কে ভাই হইতেন। সুতরাং বয়সে ৪৫ বৎসর বড় হইলেও তিনি আমাদের “বাবাজী” বলিয়া ডাকিলে আমরা কোনও আপত্তি করিতাম না। আরও একটা মস্ত কারণ ছিল। কিরণবাবু পূৰ্বে আর একবার যখন বিলাতে ছিলেন—তখন মহাত্মা গান্ধী তাঁহাদের বাসারই এক অংশে থাকিতেন। সেই সময়ে তিনি একমাস কিরণবাবুর নিকট বাংলা বায়াের পরিচ্ছেদ ৭৭ পড়েন এবং একসঙ্গে জাহাজে দেশে ফেরেন। কিরণবাবু তাঁহার ছাত্রটির নামে গর্বিত হইতেন এবং সকলকেই কৃপার চক্ষে দেখিতেন ও বলিতেন বাংলা তেমন শিখাইতে পারি নাই বটে কিন্তু চরিত্রটা গঠন করিয়া দিয়াছি। তাহার সহিত ছাত্রের মতের একটু পার্থক্য ছিল—কিরণবাবু অহিংসনীতি সব জায়গায় মানিতেন না—তিনি বলিতেন I believe in violence provided other people do it ( sa parehontest বিশ্বাস করি যদি অন্যলােকে করে)। শ্ৰীযুত দাশ মহাশয় সেন্ট্রাল জেলে আসিবার পর হইতে কামানাে বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন এবং অসুখের জন্য অমাবস্যা, পূর্ণিমা ও একাদশীর দিন উপবাস করিতেন, আর ছাগলের দুধের ছানার জল খাইতেন। কিরণবাবু, চুপি চুপি আমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেন—“দাশ মশায়ের লীডার হওয়ার সখ হয়েছে নাকি ? তিনি যে মহাত্মাকেও হারাইলেন।” কিরণবাবু হাসিতে হাসিতে বলিতেন-দাশ মহাশয় প্র্যাকটিস্ ছাড়ার পর তাহার স্থান অধিকার করিয়া কংগ্রেসকে অর্থসাহায্য করিবেন- এই ভাবিয়া ব্যারিষ্টার হইয়া আসিয়াছিলেন। কিন্তু গবর্মেন্ট ধরিয়া আনিয়া তাহার সকল উদ্দেশ্য বিফল করিয়া দিল! তিনি মনকে সান্ত্বনা দিলেন—জেলে আসিয়া সকল জেলার নেতাদের সঙ্গে আলাপ হইল, বাহিরে গিয়া তাহারা নিজের নিজের জেলার মােকদ্দমাগুলি কিরণবাবুকে পাঠাইবেন! ইহার পরিবর্তে আগামীবার তাহারা যখন জেলে আসিবেন কিরণবাবু তাহাদিগকে বিনা পয়সায় defend (পক্ষ সমর্থন করিবে। সকলে এই কথাতে বিশেষ আশ্বস্ত হইলেন। তবে যদি স্বরাজ হয় তােত তিনি প্র্যাকটিস করিবেন না বলিয়াছিলেন! তাঁহার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাই—স্বরাজ গবর্মেন্টের অধীনে তিনি একটা ছােট ৭৮ বন্দীর ডায়েরী চাকরী পাইলেই তুষ্ট হইবেন। বাছিয়া বাছিয়া তাহার ইচ্ছা Land Assessmentএর কলেক্টর হইবেন। মাহিনা দুই শত টাকা হইলেই হইবে—কারণ তিনি জমিদারের গােমস্তার মত মাহিনা অপেক্ষা উপরির উপরেই বেশী ভরসা রাখেন। আমরা আমাদের স্বরাজ গবর্মেন্টের মিমিষ্টরি লাভের ক্ষেত্র হইতে একজন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী সরিয়া গেল মনে করিয়া সানন্দে রাজি হইলাম। শোনা গেল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা জেল হইতে বাহির হইয়া আর রাজনীতি চর্চা করিবেন না। তাহারা ইতিমধ্যেই কংগ্রেস আপিসে লিডারশিপ, রিজাই দিয়া চিঠি পাঠাইয়াছেন। দেশ অনেক আঘাত সহিয়াছে—এই আঘাতটা সহিতে পারিবে কিনা ভাবিয়া কিরণবাবু চিন্তিত হইলেন এবং লিডারসিপের vacancy তে (খালি পদে) দরখাস্ত করিয়া দিলেন। আমি দরখাস্ত করিতে চাহিলে তিনি বাধা দিলেন। আমাকে বলিলেন—“যদি জেলের ভিতর তােমার ৩ জন admirer ( প্রশংসাকারী) ও আমার তিনজন নিন্দুক বাহির করিতে পারাে তাহা হইলে আমি তােমাকে পথ ছাড়িয়া দিব।” কয়েকদিন জেলের সর্বত্র ঘুরিলাম—অত্যন্ত বিনীত ভাবে যার-তার প্রশংসা ও সেবা করিতে লাগিলাম—মিথ্যা সাক্ষীর মত সাজাইয়া দু-একজন admirer ( ভক্ত। যােগাড় করিলাম কিন্তু কিরণবাবুর সামনে জেরায় টিকিল না! এদিকে তাঁহার নিন্দুকও মেলে না ! হতাশ হইয়া নেতা হওয়ার সাধ এই অল্পবয়লেই বিসর্জন দিতে হইল! ভয় হইল বেশী কিছু চেষ্টা করিলে সকলে বল হইতে একবারে নাম কাটাইয়া হয়ত জেল হইতে বাহির করিয়া দিবে ! তাই প্রকৃত অসহযােগীর মত নীরবে এ অত্যাচার ভগবানের মুখ চাহিয়া সহিয়া গেলাম। কাহার শাপে জানিনা কিরণবাবু, জলবসন্তে শয্যাশায়ী হইলেন।

বায়াের পরিচ্ছেদ ৭৯ তাহাকে অন্য ওয়ার্ডে একটা কুটুরীতে আলাদা করিয়া রাখা হইল। অসুখ হইলে জেলে কেমন মজা তাহা প্রতিপদে বুঝিতে পারিলেন। কিন্তু অসহযােগীর belief in suffering ( কষ্টসহিষ্ণুতায় বিশ্বাস) চাই, তাই মুখ বুজিয়া থাকিলেন। আমরা চুরি করিয়া কিরণবাবুকে দেখিতে যাইতাম। ধরা পড়িলাম আমি-আমার উপরও মা শীতলার কৃপা হইল। ইহার বৃত্তান্ত পরবর্তী অধ্যায়ে দিব। এ দিকে কিরণবাবুর কে সপ্তাহের পর সপ্তাহ মুলতুবী হইতে লাগিল ! কিরণবাবু গম্ভীরভাবে প্রচার করিলেন যে তাঁহাকে শাস্তি দেওয়া সম্বন্ধে ভারত গবর্মেন্ট বিলাতে তার করিয়াছেন। মহাত্মার সঙ্গে তাহাকে deport ( চালান) করা হইবে কি না তাহাও গবর্মেন্ট ভাবিতেছেন। তবে সৈন্য ও পুলিশবিভাগে গােলমাল উপস্থিত হইতে পারে বলিয়া সাহস পাইতেছেন না। দেশের লােক কেহই কিরণবাবুর মত দেশভক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে চাহিল না—যাহারা দিল তাহাদের কথা ম্যাজিষ্ট্রেট বােধ হয় ভয়ে বিশ্বাস করিলেন না—অবশেষে একদিন কোর্টে গিয়া কিরণবাবু আর ফিরিলেন না। বেচারা অরবিন্দ পাবলিশার বলিয়া ছয় মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইল। ব্রিটিশ বিচারতত্ত্ব কি সূক্ষ্ম । কিরণবাবু চলিয়া গেলে পেনাল কোডের ৮৫ধারা অনুসারে absconder ( ফেরার) বলিয়া তাহার সমস্ত জিনিস আমরা বাজেয়াপ্ত করিলাম। জেলে থাকিতে কিরণবাবু বলিয়াছিলেন বাহিরে গিয়া এইরূপ একটা manifesto ( নিবেদন পত্র) বাহির করিলে কেমন হয়—“ভারতের ৩৩ কোটী নরনারী যে পরাধীনতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া সহিয়াছে, আমরা এমন কি মহাপুরুষ হইলাম যে সে পরাধীনতা সহ করিয়া থাকিতে পারিব না? ভগবান জেলে আনিয়া আমাদের অহঙ্কার চূর্ণ করিয়াছেন। আমরা মনে করিয়াছিলাম দেশবাসী হইতে আমরা স্বতন্ত্র ও উৎকৃষ্ট বন্দীর ডায়েরী শ্রেণীর জীব—তাই স্বাধীনতাকামী হইয়া লাফাইতে লাফাইতে জেলে আসিয়াছিলাম—আমাদের সে গৰ্ব্ব ধূলিসাৎ হইয়াছে। জেলের ভিতর মহাপুরুষের মত মহৎ বস্তু কিছু দর্শন হইল না—তবে ছােট মানুষের উপযুক্ত ছােট জিনিস সরিষার ফুল দেখিয়াই যাইতে হইল—তাই প্রতিজ্ঞা কম্নিতেছি, দেশের সমস্ত নরনারীর ভাগ্যের সহিত ভাগ্য মিশাইয়া আমরা সকল অত্যাচার সহিয়া জীবন কাটাইব এবং আর অহঙ্কার করিব না। আশা করি সকলে আমাদিগের পূর্ব অপরাধ ক্ষমা করিবেন।” এই প্রতিজ্ঞাপত্রে অনেকেই গুপ্তভাবে সহি করিতে রাজি ছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কেহই সম্মত হইলেন না। কিরণবাবুকে একটি statement ( বর্ণনাপত্র) দেওয়ার জন্য আমরা অনুরােধ করিয়াছিলাম—দুষ্ট লােকে বলে তিনি নিম্নলিখিত statementটি করিবেন স্থির করিয়াছিলেন—আমরা কিন্তু বিশ্বস্তসূত্রে জানি এরূপ কোনও statement করা হয় নাই। Mr. Magistrale, I want to make an epoch-making statement. I have the honour of being prosecuted under that prince of sections of the Indian Penal Code, --Section 124 A. (Sedition)-along with some of the noblest sons of India, including Mahatma Gandhi, Maulana Mahomed Ali, and others. I do not care whatever punishment you may inflict on my revered leader Arabinda Mukherji. A great leader as he is, he can cook his own food and not only that he actually 'cooks for five others. Ile will easily bear the strain of your punishment. My conviction may result in disaffection in the army and police, and as my creed of non-violence will be ia danger so I humbly request you to let me off and sentence বাবাের পরিচ্ছেদ bris him to any term of imprisonment, As a protest against any punishment likely to be inflicted on me, the great Public Prosecutor, the Rai Bahadur, has already threatened to take leave for 3 months. So I beseech you, Mr. Magistrate, to consider the grave consequences of punishing me and I wain you timely not to do anything without consulting the Cabinet.

তেরাের পরিচ্ছেদ বসন্তে তিন সপ্তাহ। জেলে আসিবার পূৰ্ব্বে বসন্তকাল তাহার হরিৎ অঞ্চল, মলয় বাতাস, পাখীর ডাক লইয়া কখন যে যাইত আসিত তাহা খোঁজ রাখিবার সময় পাই নাই। এইবার টের পাইলাম বসন্ত কাহাকে বলে। কিরণবাবুর স্থান আমি দখল করিলাম। পােলিটিক্যাল প্রিজনার বলিয়া আমাদিগকে জেলের বড় হাসপাতালে লওয়া হইত না। তাহাতে শাপে বর হইয়াছিল। বড় হাসপাতালটির চেহারা অতি সুন্দর—দেখিলে থাকিতে ইচ্ছা করে-- কিন্তু ভিতরের বন্দোবস্তের একবার পরিচয় পাইলে আর ও-মুখে। হইতে কাহারও বাসনা থাকে না। এখানে একপ্রকার Hydropathic treatment হয়—ঔষধের বালাই বেশী নাই—ভগবানের সৃষ্ট পবিত্র বারি সকল রােগ আরাম করিয়া দেয়। হাজার ডাইলিউসনের হােমিওপ্যাথিক ঔষধের মত ঘােল এবং দুধমিশ্রিত জল খাইয়া রােগী দুদিনেই সতেজ হইয়া উঠে। ইহার উপর ডাক্তারবাবু প্রভৃতি জেল কর্মচারীর গালাগালিও পথ্যের কাজ করিয়া থাকে। একটি থার্মোমিটার ছিল, দশ মিনিট রাখিলে হয়তাে নরম্যাল পর্যন্ত ওঠে! কাজেই কাহারও বেশী জ্বর হইবার উপায় ছিল না। আমাকে ছােট্ট একটি কুটুরীতে তফাৎ করিয়া রাখা হইল। পাশে কিরণবাবু থাকিতেন। রাত্রে কাছে থাকার জন্য লােক দরকার হইল—কিন্তু দুজনেরই দরজা তালাবন্ধ-খুলিবার নিয়ম নাই। যখন জ্বর ১০৪ ডিগ্রি তখনও রাত্রে নিজের কাজ সমস্তই নিজেকে করিয়া লইতে তেয়াের পরিচ্ছেদ হইবে। পায়খানা প্রভৃতির বন্দোবস্ত ঘরের ভিতরেই। পরদিন কিরণবাবু আমার কুটুরীতে থাকিবার অনুমতি পাইলেন। কিন্তু সেখানে এমন জায়গা নাই যে দুজনের বিছানা হইতে পারে। ভদ্রলােকের শরীর তখনও ভাল করিয়া সারিয়া উঠে নাই—সারারাত পাখ-হাতে বসিয়া আমার শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। ভােরে দরজা খােলার দরকার হইল—রাত ৪টার সময় খবর পাঠানাে হইল—প্রহরী জমাদারকে ডাকিতে ডাক্তারকে গিয়া খবর দিল-বেলা প্রায় ৬টার সময় দরজা খােলা হইল। রােগীর চরম অবস্থায় খবর দিলে ডাক্তারবাবু আসবার পূর্বেই বােধহয় সে অনায়াসে এই সময়ের মধ্যে পরলােকে প্রস্থান করিতে পারিত। এই ঘটনার পরদিন নিকটের দোতলায় একটি বড় ঘরে Invalid hair এ করিয়া আমাকে স্থানান্তরিত করা হইল এবং শুশ্রুষার জন্য শ্রীমান সুভাষচন্দ্রকে ও হাসপাতালের দুইজন কয়েদীকে আমার ঘরে থাকিতে অনুমতি দেওয়া হইল। নৃতন সুপারিনটেন্টে মেজর সলবেরি { Major Salisbury) আমাকে অনেক পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন- যেরূপ ভীষণভাবে বড় বড় গুটি বাহির হইয়াছিল তাহাতে তিনি Small pox বলিয়া সন্দেহ করিয়াছিলেন। মেজর সাহেব খুব যত্ন করিয়া প্রত্যহ দেখিতেন। পথ্যের জন্য ডাব, কমলা ও ডালিম পৰ্য্যন্ত দিয়াছিলেন- জেলের ইতিহাসে বােধহয় আমিই প্রথম এই সুরসাল ফলগুলি জেলের পয়সায় পাইয়াছিলাম। মেজর সাহেব ১৬০০ টাকা মাহিনার আই, এম, এস,জল-বসন্তে আমায় কুইনিন্ মিকশ্চারের ব্যবস্থা দিলেন। ডাক্তারবাবু চাকরীর খাতিরে রােজ ঔষধ দিয়া বলিয়া দিতেন যে, না খাইয়া যেন ফেলিয়া দিই। বড় সাহেব জিজ্ঞাসা করিলে কয় দাগ খাইয়াছি তাহা প্রত্যহ হিসাব দিতেন! সুপার আসিয়া ডাবগুলি টিপিয়া দেখিতেন বােধহয় পাকিয়াছে কিনা দেখা তঁহার উদ্দেশ্য ছিল—হয় তােত মনে ৪ বন্দীর ডায়েরী { করিতেন এত বড় ফল কাঁচা খাইলে পেটের অসুখ করিতে পারে : একদিন ডাবের উপরটা টিপিতে টিপিতে মুখ ফুটিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিলেন-You don't eat this? Do you? (তােমরা এইট! খাও:নাকি?) আমরা হাসিয়া বলিলাম, No-না। মেজর সাহেব লােকটি মােটের উপর মন্দ ছিলেন না। ভয়ে ভয়ে তিনিও আমাদের কিছু কিছু সুবিধা দিয়াছিলেন। তবে চিকিৎসাবিদ্যা এখনও তাহার কতটা মনে আছে বলা শক্ত। জেলের ডাক্তারবাবুর। ততা ও-বিষয়ে বড় একটা মাথা ঘামান্ না—ঘামাইবার প্রয়ােজনও নাই। এমনটি না হইলে কয়েদীর ভব-যন্ত্রণা শীঘ্র শীঘ্র লাঘব হইবে কি করিয়া এইখানেই ব্রিটিশ গবর্মেন্টের সহৃদয়তার পরিচয় পাওয়া যায় ! বসন্তের দাগ মুখময় রহিয়া গেল—জেল হইতে আমার মত দাগী হইয়া আর কেহ বাহির হইতে পারিবেন না ভাবিয়া মনকে প্রবােধ দিলাম।

চোদ্দর পরিচ্ছেদ। জেলে “সংবাদপত্রের আবির্ভাব। মে মাসে হঠাৎ খবরের কাগজ বাহির করার Epidemic (সংক্রামক ব্যাধি) উপস্থিত হইল। শ্ৰীযুত যােশী হিন্দীতে “হিতবার্তা” প্রকাশ করিলেন। এক ওয়ার্ডের নীচে হইতে “বিশ্বনিন্দুক”, উপর হইতে “বিশ্বপ্রেম” বাহির হইল। পােলিটিক্যাল হাসপাতাল হইতে “উড খবর প্রকাশিত হইল। লিখনভঙ্গীর সরসতায় “হিতবার্তা” অদ্বিতীয় ছিল। ‘হিতবার্তা’র জ্বালায় সকলে অস্থির হইয়া উঠিলেন। সকলের সকল গােপন খবরটি ঠিক ‘ হিতবার্তা'য় বাহির হইবে। শ্ৰীযুত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী মহাশয় অবশেষে যােশীজীর কাছে হাতজোড় করিয়া বলিলেন “তােমার পায়ে পড়ি, তুমি এ সব লিখাে না, তােমার কাগজ যদি বেরােয় তােত আমি অন্নত্যাগ করবাে।” এমন কি বাহিরে যাইয়া যােশীজীকে মস্ত বড় এক সম্পাদক করিয়া দিবেন এবং “সার্ভেন্টে” যােশীজীর ছবি বাহির করিবেন, এ পর্যন্ত বলিলেন। ব্রহ্মহত্যার ভয়ে অগত্যা আমাদের আমােদ করিবার একটি উৎস বন্ধ হইল। “বিশ্বনিন্দুক” দুই তিন দিন বাহির হইয়া শ্যামবাবুর অনুরােধে বন্ধ হইল। “বিশ্বপ্রেম”ও ঐকারণে সূতিকাগৃহেই মারা গেল। “উড়াে খবর” সাপ্তাহিক হইয়া গেল। স্বরাজ হইলে শ্যামবাবুকে Press Censor করিয়া দিলে মন্দ হইবে না! “উড়ােখবরে” কিরূপ লেখা বাহির হইত তাহার কিছু নমুনা দিলাম। (১) জেলে “বিশ্বনিন্দুক” দেখা দিয়াছেন। সাধু সাবধান!

বন্দীর ডায়েরী (২) হঠাৎ আজ “হিতবার্তা” আপিসে খানাতল্লাসী হইয়াছে। সুপার দলবলসহ উপস্থিত ছিলেন। ১২৪ ধারাও নাকি জারি হইবে। (৩) সকলের জানিয়া রাখা ভাল যে সুপার আদেশ করিয়াছেন কোনও নন-কো-অপারেটর সার্কুলার রােডে (জেলের প্রাচীরের ধারের রাস্তায় । যাইতে পারিবেন না। (৪) জেলর রায়ান সাহেবের গলা ভাঙিয়াছে। যাহারা কাণে কম শােনেন জানিয়া রাখুন। (৫) দেশবন্ধুর বােজ জ্বর হইতেছে-তাপ ৯৯ ডিগ্রী। শ্ৰীযুত শাসমলের ওজন ১৪ পাউণ্ড কমিয়া গিয়াছে—শ্ৰীযুত হরিলাল গান্ধী ২৫ পাউণ্ড কমিয়াছেন। (৬) জুন পঞ্চাশ সমর্থ ব্যক্তি নাকি খদ্দর পরিয়া ট্রাম গাড়ী রিজার্ভ করিয়া কালীঘাট হইতে শ্যামবাজার গিয়াছিল। গাড়ীর গায়ে লেখা ছিল- Campaign in favour of Kaddar। এখন আর illegal assembly বা obstruction এর চার্জে ভলান্টিয়ারদের ধরিবার জে নাই। গবর্মেন্টকে কেমন ফাকি দেওয়া হইয়াছে। (৭) কংগ্রেস কমিটি হইতে একখানি ষ্টিমার রিজার্ভ করিয়া পদ্মাবক্ষে ঘুরিয়া খদ্দর প্রচলনের চেষ্টা করিলে মন্দ হয় না। দুই পাশে “wear Khaddar” বড় বড় অক্ষরে লিখিলেই চলিবে। শুনিলাম শ্রীনন্দলাল এই ঝড়-বাতাসের দিনে নিজের প্রাণ বিপন্ন করিয়া সপরিবারে এই ষ্টিমারের চাজ লইতে রাজি আছেন। 16) Ty Gants Field Marshal Nowka Pande atf পেন্সন নিতেছেন। এই সৌভাগ্য কি আমাদের হইবে ? খবরটি এত ভাল যে বিশ্বাস হয় না!' (৯) জমাদার ভুলটুন মিশরকে বদলি করা হইয়াছে। সে ঘুষ খাইত ৮৭ চোদ্দর পরিচ্ছেদ —কয়েদীগণের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করিত এবং অসহযােগী বন্দীদিগকে ভক্তি করিত। এরূপ লােককে জেল সার্ভিস হইতেই তাড়াইয়া দেওয়া উচিত। (১০) গােরা ডিগ্রিতে ( European Ward ) Ex-Sergeant Parrot খুনী মােকদ্দমার আসামী হইয়া আসিয়াছেন। ইনিই শীত- হরিলাল গান্ধীকে গ্রেপ্তার করিয়াছিলেন এবং শ্ৰীযুত হেমন্তকুমার সরকারের বিরুদ্ধে বাইবেল ছুইয়া Parrot-এর মত মিথ্যা সাক্ষী দিয়াছিলেন। ভগবান এখনাে মাথার উপরে আছেন বলিয়া বােধ হইতেছে! (১১) সম্প্রতি জনৈক ভলান্টিয়ারের টিকি একজন বিলাত ফো লীডার কাটিয়া দিয়াছেন। বাইরে পকেট-কাটার দৌরাত্ম্য আর জেলের ভিতর টিকিকাটার আবির্ভাব হইল—টিকিধারীগণ সাবধান! (১২) কয়েকজন নেতা বাঙালী খাবার ছাড়িয়া মাড়ােয়ারী চৌকা হইতে খাইতেছেন। “সাধে কি বাঙালী মােরা চির-পরাধীন। এইরূপ কত খবর বাহির হইত। উড়ো-খবরের সম্পাদক ছিলেন - সবজান্তা উপাধ্যায়। ইহা “হস্ত করুন” যন্ত্রে শ্রীনিফর্ম। ব্রহ্মচারী কর্তৃক মুদ্রিত হইত।

পনেরে পরিচ্ছেদ। -~০০০ “ব্রিটিশ জষ্টিস”। ব্রিটিশ জাতির ন্যায়পরতার কথা বলিতে অনেকের কৃতজ্ঞতায় চক্ষু ছল ছল করিয়া আসে। কিন্তু আজ Law and order এর নামে আমলা- তন্ত্র কি করিতেছে নিম্নবর্ণিত ‘কেস’ কয়টি হইতেই বুঝা যাইবে। মাত্র কয়েকটি উদাহরণ স্বরূপ দিলাম-এরূপ ঘটনা গত কয়েক মাসের মধ্যে হাজার হাজার ঘটিয়াছে। সংবাদ পত্রের পাঠকমাত্রেই সেগুলি অবগত আছেন। চোর মাতালদের বিনা ওয়ারেন্টে রাস্তায় যে ধারা অনুসারে গ্রেপ্তার করা হয় সেই ধারায় বাড়ী হইতে বে-আইনিভাবে গ্রেপ্তার করিয়া দেশবন্ধু দাশকে প্রায় আড়াই মাস কাল হাজতে রাখা হইল। দিনের পর দিন মােকদ্দমা মুলতুবী হইতে লাগিল—ভাল রকম সাক্ষ্য সাবুদ মেলে না। অবশেষে অন্য লােকের স্বাক্ষর দেশবন্ধুর স্বাক্ষর বলিয়া চালাইয়া দেওয়া হইল এবং তাহার ছয় মাস কারাদণ্ড হইল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির ২৭ শে নবেম্বর (১৯২১) তারিখের চারিটি মন্তব্য খবরের কাগজে পাঠানাের জন্য শ্ৰীযুত বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের ছয় মাস কারাদণ্ড হইল। ভলান্টিয়ার আন্দোলন সম্বন্ধে দেশবন্ধুর একটা নােটশ শ্ৰীযুত সুভাষ চন্দ্র বসু covering letter দিয়া কাগজে পাঠাইয়াছিলেন বলিয়া তাহারও ছয় মাস হইল। দেশবন্ধুর নামের ঐ নােটিশে সহি অন্য লােকের হাতের লেখা।

পনেরাের পরিচ্ছেদ এই ‘কে’ তিনটি সম্বন্ধে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যারিষ্টারের মত নিয়ে উদ্ধৃত করিলাম। (1) There is no evidence in the cases of Mr. Das, Mr. Sasmal and Mr. Bose that there was ever an anlawful association. (2) There is no evidence either in those cases of any management or promotion of an unlawful association. (3) In the case of Mr. Sasmal, the only allegation of fact against him is that he sent four resolutions of the Bengal Provincial Congress Committee to the Press, Unless the resolutions offend against the law, he has committed no offence of any kind. But the resolutions do not offend against the Criminal Law Amendment Act, 1908. Resolutions. Bengal Congress Committee. At a general meeting of the Bengal Provincial Congress Committee held last Sunday, the 271b November at II, Wellington Square the following four resolutions were adopted, the first two with only one dissentient voice and the last two unanimously.

বন্দীর ডায়েরী Resolution. No. 1 This committee is of opinion that there is no truth in the various statements made in the Government communique, viz-that the volunteers under the Congress organisation in Bengal interfered with the administratior. of Law and the maintenance of Law and order by practising intimidation, molestation public at large and certain sections of Goverament servants, This committee states that these volunteers have be-n consistently peaceful and on-violent and therefore resolves that the work of the Congress be etc. on the carried on as before. Resolution. No. 2 Whereas in the opinion of this committee the recent orders of the Governor-in-Council and the Commissioner of Police, Calcutta, are unjust, arbitrary and intended to paralyse the activities of the Benga Provincial Congress Committee and thus the movement • of Non-violent Non-co-operation, this committee appealsto the public to enrol themselves as Congress volunteers in order to carry on the work of the Congress in a peaceful and non-violent manner, পনেরাের পরিচ্ছেদ Resolution, No. 3 That this committee is of opinion that the orders prohibiting public assemblies and processions in Calcutta and moffussil which have hitherto been carried on peacefully are unjustified and unwarranted but in view of the probability of provocation by agencies unfriendly to the Congress and in as much as no such meeting should be held till all sections of the public are trained to withstand guch provocation and incitements, this committee decides that the holding of public assemblies and processions in areas affected by such orders be kept in abeyance till a perfectly calm and non-violent atmosphere is ensured in the opinion of this committee or of any body appointed by it. Resolution No. 4 Resolved that in view of the present extremely grave political situation in this province Sj. C. R. Das, President of this committee, be invested with full: powers to carry on the work of the Congress or behalf of the committee in consultation with the Bengal Provincial Khilafat Committee. বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটী। বিগত ২৭শে নভেম্বর তারিখে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটীর ক ৯২ বন্দীর ডায়েরী এক সাধারণ অধিবেশনে নিম্নলিখিত চারিটি প্রস্তাব ( প্রথম দুইটি একজন ব্যতীত অন্য সকলের সম্মতিক্রমে ) গৃহীত হইয়াছে। কংগ্রেস ভলান্টিয়ারগণ কর্তৃক শাসন এবং শান্তি রক্ষায় বিঘ্ন উৎপাদিত হইয়াছে বলিয়া সরকারী ইস্তাহারে যে সকল মন্তব্য প্রচারিত হইয়াছে, এই কমিটীর মতে তাহা সত্য নহে। কমিটীর মতে এই সকল ভলান্টিয়ারেরা সকল ব্যাপারে শান্ত এবং নিরুপদ্রবভাবে আচরণ করিয়াছে। সুতরাং কমিটির সংকল্প এই যে কংগ্রেসের কাজ পূৰ্ব্ববৎ চালানাে হউক। ২। যেহেতু এই কমিটীর মতে সপরিষদ গবর্নর ও কলিকাতার পুলিশ কমিশনারের আদেশ অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারমূলক এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটীর কাৰ্যে বাধা উপস্থিত করার জন্য উদ্দিষ্ট, অতএব এই কমিটী জনসাধারণকে ভলান্টিয়ার হইয়া কংগ্রেসের কাৰ্য্য শান্ত এবং নিরুপদ্রব ভাবে চালাইবার জন্য অনুরােধ করিতেছে। ৩। কলিকাতা এবং মফঃস্বলে সভা ও শােভাযাত্রা বন্ধ করিবার জন্য যে সরকারী আদেশ প্রচারিত হইয়াছে এই কমিটীর মতে তাহা অন্যায় এবং অসমর্থনীয়। কিন্তু যেহেতু কংগ্রেসের শত্রুপক্ষ লােকের ক্রোধ উদ্দীপ্ত করিবার জন্য যে সকল কাৰ্য্য করিতে পারে তাহা নীরবে সহিয়া থাকার মত ধৈৰ্য্য জনসাধারণের হয় নাই সুতরাং এই কমিটীর মীমাংসা এই যে, এই কমিটী কিংবা ইহা দ্বারা নিযুক্ত কোন লােকের মতে যতদিন কোন বিশেষ স্থানে পূর্ণ শান্তি ও নিরুপদ্রব ভাব বিরাজ না করে ততদিন সেই স্থানে সভা ও শােভাযাত্রা করা স্থগিত থাকুক। ৪। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক হওয়ায় প্রস্তাব করা যাইতেছে যে এই কমিটীর সভাপতি শ্ৰীযুক্ত চিত্তরঞ্জন দাশকে বঙ্গীয় খেলাফৎ কমিটীর সহিত পরামর্শ করিয়া কংগ্রেসের কাজ চালাইবার পূর্ণ ক্ষমতা দান করা হউক।

পনেরাের পরিচ্ছেদ শ্রীহট্টের এক মৌলবী আসিয়া কলিকাতায় বক্তৃতা দিল-সেখ তাহেরের ঘাড়ে সেই বক্তৃতার রাজদ্রোহ আসিয়া পড়িল। অথচ তিনি বলেন সে সভায় উপস্থিত পর্যন্ত ছিলেন না। এই অপরাধেই ছয় মাস কারাদণ্ড লাভ হইল। শ্রীমান অমূল্যভূষণ বসু কলেজ স্ট্রীটে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা করিয়া ভলান্টিয়ার দল গঠন করিতেছিলেন বলিয়া একবৎসর কারাদণ্ড প্রাপ্ত হইলেন। একই অপরাধে কাহারও দু’বৎসর, কাহারও ৭ দিন পর্যন্ত সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড হইতে লাগিল। শ্ৰীযুক্ত চিররঞ্জন দাশ ও আমাদের কেসে মিথ্যা সাক্ষীর বহর দেখিয়া তাজ্জব লাগিয়া গেল। এক একজন সাক্ষী যেন ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির ! এইরূপ গলদ প্রত্যেকের কেসেই কিছু না কিছু আছে। ভাগ্যি অসহযােগীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করেন নাই—না হইলে কয়টি কেস ইংরেজের আদালতেই টিকিত সে সম্বন্ধে সন্দেহ আছে। যাহা হউক, অসহযােগীদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। তাহারা এই কলুষিত বিচার- পদ্ধতিকে মানেন নাই এবং এই পদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত আমলাতন্ত্রকে লােকচক্ষে অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করিতে পারিয়াছেন।

যােলাের পরিচ্ছেদ
eo -
জেলের সাধারণ অবস্থা।
(ন-কো-অপারেটারগণ জেলে আসাতে জেলের চেহারা পরিবর্তন
হইয়া গিয়াছে। ইংরেজের এই জেলগুলি মানুষকে সংশােধন করিবার
জন্য নয়--এখানে আসিলে লােকে আরও খারাপ হইয়া যায়।
নিয়মের অধীনে কয়েদীদিগকে থাকিতে হয় তাহার দুই একটি
উদ্ধৃত করিব :-
যে সমস্ত
OFFENCES
(1) Talking during working hours, or talking
loudly, laughing or singing at any time after having been
ordered by an officer of the prison to desist [ Rule 604,
(1) B. J. Code ]
(2) Visiting the latrines or bathing platforms
except at stated hours, or without permission of an
officer of the prison, or resorting unnecessarily to the
night latrine, or omitting or refusing to employ dry
earth in the manner directed by the prison regulations.
[ Rule 6o4 (16)}
(3) Refusing to eat the food prescribed by the
prison diet scale [ 604 ( 17 ) ]
(4) Omitting or refusing to keep the person cltan

ষােলাের পরিচ্ছেদ or disobeying any order regulating the cutting of hair or nails, (5) After an interview every prisoner shall be carefully searched before he is removed from the place where the interview has been held, [678) Punishments :- :- { 1) Hard labour in case of simple imprisonment. (2) Forfeiture of remission, privileges etc, (3) Solitary confinement. (4) Link fetters, 15) Bar fetters, (6) Cross-bar fetters, (7) Hand-cuffing behind or to a staple (8) Penal diet. (9) Whipping. (10) Substitution of gunny clothing for ordinary dress, গান তত দূরে থাক্‌, হাসা, জোরে কথা বলা পর্যন্ত নিষেধ। পায়খানার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া আছে—তাহার মধ্যেই সব সারিতে হইবে। পাইখানার কোনাে আবরু পর্যন্ত নাই। রাত্রে পাইখানায় যাওয়া অপরাধ। যে অখাদ্যই দেওয়া হউক না কেন, না খাইলে শাস্তি। চুল ও দাড়ি রাখিবার নিয়ম নাই—ঘােড়ার ললাম-কাটা কঁচি দিয়া সকলের মাথা মুড়াইয়া দেওয়া হয়। দেখা-সাক্ষাতের পর সার্চ করা নিয়ম—যদিও ১৬ বন্দীর ডায়েরী সি, আই, ডি, এবং জেলের কর্তারা সে সময়ে বসিয়া থাকেন এবং মাঝখানে লােহার জালের বেড়া থাকে। এইরূপ কত না নিয়ম আছে ! এই সকল সুন্দর নিয়ম পালন না করিলে কতপ্রকারের শাস্তি রহিয়াছে। নির্জন কারাবাস, হাতকড়ি লাগানাে, পায়ে বিকট বেড়ি দেওয়া, উপর দিকে হাত তুলিয়া দেওয়ালের গায়ে হাতকড়ি লাগানাে, ফেন খাওয়ানাে, চট পরানাে এবং হাতপা বাঁধিয়া বেত লাগাননা প্রভৃতি কতপ্রকার সভ্যতা- সম্মত শাস্তির বিধান রহিয়াছে। এই সকল শাস্তি দেওয়ার ভার যাহাদের হাতে তাহারা যে কি শ্রেণীর জীব—সেই পরিচয় একটু দিব। সুপারিনটেন্টে সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া কয়েদীদের পরিদর্শন করেন। সঙ্গে একজন কয়েদী রাজছত্রের মত প্রকাণ্ড একটা ছাতা মাথার উপর ধরিয়া ছুটিতে থাকে—কয়েদীরা সারি দিয়া দাঁড়াইয়া “সরকার সেলাম” করে, দুইহাত খুলিয়া দেখায়, ঠোট টানিয়া ধরে, মুখের ভিতর কিছু আছে কি না-এইরূপ কত কায়দা ! Latriue parade. bathing parade, স্নান, আহার, ওঠা-বসা সমস্ত আদেশ অনুযায়ী করিতে হইবে। কোনও কোনও জেলে কয় বাটি জলে স্নান করিতে হইবে, তাহাও ঠিক করা আছে। সিপাহী জমাদার সকলে যেন এক একটি ক্ষুদ্র লাটসাহেব ! কেহ কয়েদীকে দিয়া জুতার ফিতা বাঁধায়, কেহ পা টিপাইয়া লয়, আর মুখে চব্বিশ ঘণ্টা কয়েদীর মা-বােনের শ্রাদ্ধ তত লাগিয়াই আছে-কথায় কথায় মারা এবং কে করাও অছে। ঘুষ খাইতে এমন ওস্তাদ জীব আর 'নাই। Convict warder, convict mate প্রভৃতি নিজের কয়েদী হইয়াও এইরূপে অন্য কয়েদীর প্রতি অত্যাচার করে। কাটা দিয়া কাটা তুলিয়াই ইংরেজের জেল চলে। সাহেব অসির ৪৫ জন মাত্র—তাহাদের দাপট, সহ করা যায়- ১৭ যােলাের পরিচ্ছেদ কিন্তু তপ্ত-বালি আমাদের দেশী সিপাইদের তাপ একবারে অসহ! বড় জমাদার জেলর আসিবার পূর্বে তাঁহার চেয়ারে বসিয়া নাকে চশমা অটিয়া জেলের মধ্যে কয়েদীদের দেখাইয়া রিপাের্ট লিখিতেন—এমন কি দেশবন্ধুর মত ব্যক্তি সামনে দিয়া যাইলেও তিনি ক্ৰক্ষেপ করিতেন না। অবশ্য সুপারিনটেন্টে দাশ মহাশয় গেলে নিজহাতে চেয়ার আগাইয়া দিতেন! বড় সাহেবের চেয়ে জমাদারের এমনই দোদণ্ড প্রতাপ। তাহাকে দেখিলেও কয়েদীকে খাড়া হইয়া “সরকার সেলাম” দিতে হইত!) অবশ্য সকলেই এরূপ ছিল না। ভুলুটুন মিশির নামে এক জমাদার ছিল। তাহার মত ধার্মিক ও সৎলােক খুব কম দেখা যায়। নিজের কর্তব্য করিয়া যাইত—কয়েদীর পিছনে লাগা তাহার স্বভাব ছিল না। প্রেসিডেন্‌সি জেলের গােলমালের সময় শত্রুরা মিথ্যা রিপাের্ট করিয়া তাহরা নাম জড়াইয়া তাহাকে বদলি করায়। ভুলুটুন বড় ভাল লােক ছিল— তাই তাহার এ শাস্তি। সিপাহীরা সাধারণ কয়েদীদের কতবার গুণতি করিত তার ঠিক নই। জেলের সবই জোড়ায় জোড়ায় চলে। ঘণ্টা বাজানাে পর্যন্ত জোড়ায় জোড়ায় ! দুই দুই করিয়া গােণার হিসাব-বে-জোড়া হইলেই মুস্কিল ! জমাদার ফালতুদের (prisoner-servant ) ডাক দিলেই তাহারা বর হইতে বাহির হইয়া গুণতি দিত। যেই ডাকিত—“এ ফালতু”, তাহারা উত্তর করিত—“যাগ হ্যায়, হুজুর” এবং বাহির হইয়াই বলিত “সেলাম হুজুর।” ভােরে ঘুম-ভাঙানােতে চটিয়া ঘরে ফিরিয়াই বলিত “শালা, ছাতু।” আমরা বলিতাম—“এই হ’ল হুজুর, বাবা—আর এখনই শালা!” তাহারা বলিত “বাবু, জেলে সব শালাই বাবা ; সাধে কি বাবা বলি, তাের চোটে বলায় বাবা। বাইরে এইসব লােককে আমরা চাকর রাখি না।” বাস্তবিকই তাই। একদিন একজন “ফালতু” বাড়ীতে চিঠি পাঠাইবার ১৮ বন্দীর ডায়েরী জন্য এক নূতন সিপাহীকে পাইয়া সাপের মন্ত্র শিখাইয়া দিল এবং চুরি করিয়া তাহাকে দিয়ে চিঠি পাঠাইল। দায়ে পড়িয়া মানুষ কি না করে, ভদ্রলােকের ছেলেকেও সাপুড়ে হইতে হয় ! আলিপুর জেল কুলীন কয়েদীদের জায়গা। দেশের বাছাই কর। ১৫০০ সেরা কয়েদী এখানে থাকে। তাহাদের অধিকাংশই লেখাপড় জানে এবং প্রেসের কাজ করে। তাহাদের সঙ্গে থাকিয়া মনে হয় না যে এই সমস্ত মানুষই খুন, জখম, জাল, জুয়াচুরি এত করিয়াছে। এক একজনের দণ্ড কি ভীষণ—একটি কয়েদীর ৪২ বৎসর কারাদণ্ড হইয়াছে। আমার ধারণা এই সকল কয়েদীর শতকরা ৫০ জন নিরপরাধী এবং বাকী সকলে হয়তাে হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় অন্যায় করিয়া ফেলিয়াছে। অবশ্য কতক আছে যাহারা ১০/১৫/২০ বার জেলে আসিয়াছে-কিন্তু পুলিশের উৎপাতে তাহারা বাহিরে টিকিতে পায় না। আমাদের “ফালতু” (prisoner-servant) মথুরানাথ দাস ইহার একটি দৃষ্টান্ত ছিল। মথুরার জীবন কথা অতি আশ্চর্য রকমের। এমন সদানন্দ, পরােপকারী, শ্রমশীল, বুদ্ধিমান, সেবাপরায়ণ মানুষ কমই দেখা যায়। কিন্তু সে ছেলেবেলা হইতে জেল খাটিতেছে এবং এখন দশবারের বার আসিয়াছে। ৩১ বৎসর বয়সের মধ্যে ২৪ বৎসর জেলে কাটাইয়াছে। ৭ বৎসর বয়স হইতেই মথুরের প্রতিভা বিকশিত হইতে থাকে। নিজেদের দোকানে বসিয়া পয়সা চুরি করিতে আরম্ভ করে। বাপম Reformatory ইস্কুলে দেন। সেখান হইতে মথুর হাত-পাক করিয়া ফিরিয়া আসে। মপুরের বিবাহ ঠিক হইয়াছিল। কিন্তু ভগ্নিপতির মা’র ষড়যন্ত্রে সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যায়। হতাশ হইয়া মথুর বিপথ অবলম্বন করে। এক দুশ্চরিত্র নারীর প্রেমে পড়িয়া চুরি ভাল করিয়া আরম্ভ করে। শেষে ঐ নারীই ! D যােলাের পরিচ্ছেদ তাহাকে পুলিশে ধরাইয়া দেয়। সে-ও প্রতিহিংসা বশত স্ত্রীলােকটিকে চোরাই মাল রাখার অপরাধে জড়াইয়া দেয়। সারে এইরূপ ব্যবহার পাইয়া মথুর পাষাণ হইয়া উঠিল! একদিন চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িবার ভয়ে একটি যুবতীর জিহবা কাটিয়া দেয়। বিচালির গুদামে আগুন লাগাইয়া দিয়া নিকটস্থ লােকের বাড়ী চুরি করে। নবাবের ছেলে সাজিয়া শূন্য নবাববাড়ী হইতে গাড়ী গাড়ী জিনিস লইয়া যায়। অবশেষে অন্নাভাবে কালিঘাটের মন্দিরের শ্যামরায়ের গহনা লইয়া পালায় ; তাড়া খাইয়া পায়খানায় ঢুকে—সেখানে সাপের মুখে পড়ে। অতিকষ্টে পালাইয়া সেবার প্রাণ বাঁচায় কিন্তু মথুর বলে—সেই রাত্রেই তাহার মা মারা যায়। চুরির পয়সা বাড়ীতে মেয়েরা লইত না-মথুর বন্ধুবান্ধব- গণের সহিত খরচ করিয়া বেড়াইত। চোরের উপর মথুরের ভয়ানক রাগ! সে বলে জেলে আসিলে কোনাে বেটা খোজ করে না, কিন্তু বাহিরে গেলেই সকলে ভালবাসা দেখাইয়া তাহাকে চুরি করায় ও সেই টাকায় ক্ষুর্তি করে। দয়া মায়া মথুরের ছিল না, এমন নয়। অগ্নিকাণ্ড, জলে-ডােবা এ সমস্ত বিপদে প্রাণ বিপন্ন করিয়া সে লোককে সাহায্য করিয়াছে। লােকের কষ্টে তাহার চোখদিয়া জল পড়িত। যখন কাহারও আশ্রয়ে থাকিত—একটি পয়সা লােকলান করিত না। কিন্তু পুলিশের লােক গিয়া বলিয়া তাহার কাজ ছুটাইয়া দিত—দাগী বলিয়া কেহ তাহাকে রাখিতে সাহস পাইত না। সে বলিত জেলে আসিলে খরচ চলিবে কেমন করিয়া? আর যদি জেলেই যাইতে হয়, তবে চুরি করিয়াই যাওয়া ভাল। মথুরের এ যুক্তি একবারে অখণ্ডনীয় থানার লােকে খাবার এবং মদ প্রভৃতি খাওয়াইয়া মথুরের নিকট হইতে অন্যান্য চুরির সন্ধান লইতে চেষ্টা করিত। সময় সময় মা’র-ধ’রও করিত—কিন্তু মথুর নাম বলিবার পাত্র ছিল না।

বন্দীর ডায়েরী মপুর জানে না এমন কাজ নাই। ময়রার কাজ, ছুতারের কাজ, ধােপর কাজ-গাড়ী কানাে, দরােয়ানী করা, রান্না করা-সকল কাজে মথুর ওস্তাদ ছিল! সে পেশােয়ারে Labour Corpsএ নায়েক হইয়া গিয়াছিল। বােগদাদে যাইবে ঠিক করিয়াছিল, এমন সময় outfit expenses বাঁচাইতে গিয়া চুরি করিয়া জেলে আসে। মথুর একবার নিজের ক্ষমতা দেখাইবার জন্য জেলখানা হইতে পালাইয়াছিল। আবার নিজেই আসিয়া ধরা দিয়াছিল ! মথুর বলিত “কয়েদী পালালে বাঘ, মরলে কাক।” কথাটি বড় সত্য। কয়েদী পালাইলেই পাগলাঘণ্টী বাজে, কত সিপাহী ছুটাছুটি করে, বন্দুক আওয়াজ হয়—কিন্তু যখন মরে তিনদিন ধরিয়া পচিলেও ফেলিবার বন্দোবস্ত আমরা যখন জেলে আসিয়া খাওয়ার ভার হাতে লইয়া উন্নতি করি মথুর খুব খুসি। বলিল আমাদের ৮নম্বর ওয়ার্ডে যত “ভাল ভাল নামী নামী কয়েদী” সকলেই বলিতেছে -“ছেলেবেলা হইতে জেল খাটিতেছি এমন তরকারী খাই নাই।” মথুর দুঃখ করিয়া বলিত--জেলের সে সুখ গিয়াছে, প্রথমে যখন জেলে আসিতাম কয়েদীরা চুরি করিয়া পয়সায় তিন সের দুধ বেতি, এক পয়সায় আধসের কইমাছ ভাজা হাসপাতালে পাওয়া যাইত জেলে এই সুবিধা হওয়ায় চোরের দল বাড়িয়া যাওয়াতে এখন জেলের ভিতর চোরাই-জিনিস খাবার-দাবার দুর্মূল্য হইয়াছে। আগে জেলের ভিতর চুরি করিয়া দৈনিক ৫০/৬০ টাকার আফিম, মদ, গাঁজা, কোকেন প্রভৃতি বিক্রয় হইত—আর আজকাল সব বন্ধ ! সিপাহীরা টাকায় আট আনা কাটিয়া নেয়। তাই মথুর সংকল্প করিয়াছে এবার বাহিরে গিয়া আমাদের কাছে থাকিবে—আর চুরি করিবে না। তাই যখন কোনাে অসহযােগী খালাস হইয়া যায় মথুর অনুরােধ করে—“বাবা বাইরে গিয়ে যােলাের পরিচ্ছেদ ১০১ স্বরাজ করুনগে, তাহলে আর চুরি করে আসতে হবে না।” মথুরের ইচ্ছা কবে পূর্ণ হবে—জানি না। জেলের Convict হেড-রাইটার শ্ৰী-মিত্র মহাশয় আমাদিগকে যথেষ্ট সাহায্য করিতেন। তিনি জেলরের • Personal Assistant গগাছের ছিলেন-খাতাপত্র রিপাের্ট প্রভৃতি তিনিই ঠিক করিয়া দিতেন, জেলর সাহেব চোখ বুজিয়া সই করিয়া যাইতেন। আমাদের অভাব অভিযােগ কিছু থাকিলেই মিত্র মহাশয়কে খবর দিলেই তিনি তৎক্ষণাৎ জেলকর্তৃপক্ষের কর্ণগােচর করিয়া তাহার প্রতিবিধানে মনােযােগ দিতেন। জেলে আসিয়া আরও ছােটবড় কতজনের সহিত আলাপ হইয়াছিল। সকলেই আমাদিগকে ভালবাসিতেন এবং যথাসাধ্য সাহায্য করিতে চেষ্টা করিতেন। কত বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শেই না আসিয়াছিলাম । খ—মাইতি নামে এক ভদ্রলােক জাল চিঠির জোরে ডেপুটিম্যাজিষ্ট্রেট হ'ন এবং দুই বৎসর কাজ করার পর টে জারি হইতে টাকা সরাইতে গিয়া ধরা পড়েন। এই দুষ্কৰ্ম্ম না করিলে তিনি ইংরেজের রাম-রাজত্বে পেন্স লইয়া বাহির হইয়া যাইতে পারিতেন। এখন এই ভুতপূৰ্ব্ব ডেপুটি আলিপুর জেলে চাল ঝাড়ায় নিযুক্ত আছেন। ইহার ১৫ বৎসর কারাদণ্ড হইয়াছিল--প্রায় কাটাইয়া তুলিয়াছেন। আর একজন কয়দী শ্রী চৌধুরী --৯ বার জেল ভাঙিয়া পালাইয়া- ছেন এবং ১৯ বৎসরের মেয়াদ প্রায় কাটাইয়া এখন খালাস হইবার মুখে আসিয়াছেন। তিনি বলেন স্বরাজ হইলে আর ডাকাতি করিবেন না। প্রায়ই জিজ্ঞাসা করেন—“বাবু স্বরাজ কবে হবে? আমার যে রাত্রে ঘুম হয় না!” এখানকার হাসপাতালে পাগলদের জন্য একটা ওয়ার্ড আছে। শ্রীহরিচরণ বোস অত্যন্ত মাতাল ছিলেন বলিয়া তাহার আত্মীয়েরা পাগল ১০২ বন্দীর ডায়েরী বলিয়া তাহাকে এখানে পাঠান। এক বৎসরে তিনি ৬৬ পাউণ্ড ওজনে বাড়িয়াছেন। এখন হরিচরণকে নিতে কেহই আসেন না—অনেক চিঠি লেখা হইয়াছে - কাহারও খোঁজ নাই। হরি বাবু বলেন ‘নিরুপায় হইয়া জেলের কর্মচারী কাহাকেও না মারিলে আমার মুক্তি নাই, তখন যেকয়মাস জেল হইবে, খাটিয়া দিয়া বাহিরে যাইতে পরিব, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বাহির হইবার সম্ভাবনাই নাই।” বি, এল, মিত্তির নামে একজন দেশী খ্ৰীষ্টান ভদ্রলােক এইখানে ছিলেন। তিনি সারাদিন ঘুমাইয়া সন্ধ্যা হইতে গান ধরিতেন “আমি সারাটি রজনী রহিব জাগিয়ে” এবং সকলকে সারাটি রজনী জাগাইয়া রাখিতেন। তাঁহাকে বহরমপুরে পাঠান হইয়াছে। সৈয়দ আলি নামে এক পাগল সকালে “লসি” খাইতেছে, এমন সময় আমরা উপস্থিত হইলাম। একজন কয়েদী বলিল—কাজ করিলে তাহাকে ভাল খাবার দেওয়া হইবে। জিজ্ঞাসা করিল, “ঘানি ঘুরাইতে পারিবে ?” সৈয়দ আলি বলিল -“বাবা, জগতে গােৰু কি ফুরাইয়া গিয়াছে ? বেটারা আমাদের ঘানিতে দিতে চায়, তাই বুঝি এই বলদের খাবার খাওয়ায় ?” এরূপ বুদ্ধিমান পাগলকে ছাড়িয়া দেওয়াই উচিত নয় কি ? জেলের ভিতর দুইটি ওয়ার্ডে আন্দামান-ফেরৎ স্বদেশী ডাকাতি ও ষড়যন্ত্রের আসামীরা থাকিতেন। তাঁহাদের সহিত আমাদের মেলামেশা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ক্রমশ কড়াকড়ি কমিয়া গেল এবং নেপথ্যে আসা- শ্যাওয়া চলিত। ইহাদের মধ্যে রাজা বাজার বােকে, ঢাকা ও বরিশাল কন্সপিরেসি কে, শিবপুর প্রাগপুর প্রভৃতি পােলিটিক্যাল ডাকাতি কেসের ২২ জুন ছিলেন। কাহারও ৭৮১০/১৫ বৎসর মেয়াদ অনেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তাঁহাদের সহিত মিশিতে আমাদের যােলাের পরিচ্ছেদ ১০৩ লজ্জা করিত! ছয়মাসের জেল লইয়া তাহাদের পাশে দাড়ানা ধৃষ্টতা- মাত্র! যেন মুরগীর ঠ্যাং ভাঙিয়া জেলে আসিয়াছি ! ইহাদের অনেক গুণ ছিল--কেহ ছবি আঁকিতেন, কেহ নারিকেলের ছােবড়া হইতে সুন্দর চেন তৈরি করিতেন, কেহ বা বই, বাঁধাইতেন, গান-বাজনা অনেকেরই জানা ছিল। ইহাদের সশ্রদ্ধ ভালবাসার কথা আমরা কোনও দিনই ভুলিতে পারিব না। জেলে আমরা আসার পর অনেক সুবিধা হইয়াছে। কিন্তু আগে যে সমস্ত অমানুষিক অত্যাচার হইত তাহা ইহারা সমস্তই ভােগ করিয়াছেন। ইহাদের ত্যাগ ও সহিষ্ণুতায় আমাদের পথ অনেকটা সুগম হইয়াছে। এখন রাজনৈতিক বন্দীদিগের তেমন ভয়ঙ্কর কষ্ট নাই। বাইরের জগতের খবর ‘ইংলিশম্যান’ ‘ষ্টেটসম্যান’ কাগজের মধ্যদিয়া কিছু পাওয়া যায়। কাজের মধ্যে আপাতত খাম আঁটাই প্রধান ছিল। অনেকে বাগান-করা, রান্নার তদারক ও পরিবেশনও করিতেন। খাঁচার ভিতর দেখা সাক্ষাৎ করার নিয়ম হওয়ায় আত্মসম্মানের হানি করিয়া কেহ আর আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবগণের সঙ্গে দেখা করিতেন না। তাহা না হইলে মাসে দুইবার দেখা করা এবং দুইখানি চিঠি লেখার হুকুম আছে। জেলের অনেক ব্যাপার হইতে বুঝিলাম গবর্মেন্টের রসবােধ যথেষ্ট আছে। আলিপুর চিড়িয়াখানার কাছে বলিয়া বােধ হয় আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ খাঁচার ভিতর হওয়ার বন্দোবস্ত হইয়াছিল। আরও non-violent non-co-operationes cota Female Warda রাখা হইল! মেয়েদের জেল বহরমপুরের পাগলা গারদের এক অংশে, সৃষ্ট হইল! রসিকতার চূড়ান্ত। জেলের ভিতরকার অসহায় অবস্থাটাই মানুষকে কষ্ট দেয়। অসুখ- বিসুখ হইলে তাে বিপদ। চিঠিপত্র দেখাশুনা খাওয়া দাওয়ার ১০৪ বন্দীর ডায়েরী জন্য জল কর্তৃপক্ষের দয়ার উপর নির্ভর। যেখানে রাখিবে বা বদলি করিবে সেখানেই থাকিতে হইবে। নিজের স্বাধীন ইচ্ছা বিন্দুমাত নাই। সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া দেওয়াল-ঘেরা একটা জায়গায় পচিতে হয়। দেওয়ালের ওপারেই স্বাধীনভাবে মানুষ চলে—আর ভিতরের লােকের কি অবস্থা । রাত্রে আলাে নিবাইতে হইলে সিপাহীর খােসামােদ করিতে হয় । যে সমস্ত লােক বাহিরে থাকার অবস্থায় কথা কহিতেও সাহস পায় না—তাহাদেরই অধীনে জীবনযাপন করিতে হয়। বৃষ্টির দিনে ঘরে চাবিবন্ধ হইয়া ভিজিতে ভিজিতে বা অসুখের দিনে একা জেলে বন্ধ হইয়া কষ্ট পাইতে পাইতে নিজের অসহায় অবস্থার কথা উপলব্ধি করা যায়। একদিন সিপাহীকে ডাকিয়া পাওয়া গেল না—ঘরে সারারাত্রি আলাে জ্বলিল, ঘুম হইল না। কলের জল জেল কর্তৃপক্ষের খেয়াল বশে একদিন বেশী আসিল না—কাহারও স্নান হইল না। রােগে পথ্য পাওয়া যায় না। বাহিরের ডাক্তারী সাহায্য বা শুশ্রুষা পাওয়ার উপায় নাই—এই স্থলেই বন্দী বলিয়া নিজেকে মনে হয়। শ্ৰীযুত চাদমিঞার টাইফয়েড, হইল- অসুখটা কি বুঝিতেই সুপারের যে কয়দিন গেল তাহার মধ্যে চাদমিঞা সাহেবের অবস্থা সাংঘাতিক হইয়া উঠিল। সেবা শুশ্রুষার লােকের অভাপথ্যাদি পাওয়া যায় না। অবশেষে অনুমতি লইয়া জনকয়েক অসহযােগী শুশ্রুষার অধিকার পাইলেন। মিঞাসাহেব বেদানা চাহিলেন, সুপার জেলের কন্ট্রাকটরের হাত দিয়া আনাইবার হুকুম দিলেন --তিনি পরদিন বাজার হইতে সব চেয়ে সস্তা দুটি শুনাে ডালিম আনিয়া দিলেন! যেদিন ১০৪ ডিগ্রি জ্বর সেদিনেও সুপার বুঝিতে পারেন নাই, কি হইয়াছে! মিঞা সাহেব দুর্বলতার কথা বলিলে—সুপার ডিম ও ভাত খাইতে পরামর্শ দিয়াছিলেন। তাহার কথা শুনিলে পরদিনই ।

যােলাের পরিচ্ছেদ মিঞাসাহেবকে পরলােকে প্রস্থান করিতে হইত। তবে একথা বলা আবশ্যক সুপার খুব যত্ন লইয়া চাঁদ মিঞাকে দেখিতেন এবং তাহাকে ছাড়িয়া দিবার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা করিয়াছিলেন। এজন্য আমরা সকলেই তাঁহার নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ।

সতেরাের পরিচ্ছেদ। দেশবন্ধুর কথা । । একজন লেখক বলিয়াছিলেন—if Gandhi is the brain of the Non-co-operation movement then Chittaranjan is its heart—“গান্ধীকে যদি অসহযােগ আন্দোলনের মস্তিষ্কস্থানীয় বলা হয়, তাহা হইলে চিত্তরঞ্জনকে ইহার হৃদয় বলা যাইতে পারে। অনেকের ভুল ধারণা আছে চিত্তরঞ্জন কংগ্রেসের কলিকাতার বিশিষ্ট অধিবেশনে অসহযােগ গ্রহণে বিরােধী হইয়াছিলেন। বস্তুত তিনি অমৃতসর কংগ্রেস হইতেই—অসহযােগের পক্ষে ছিলেন এবং কলিকাতা অধিবেশনেও অসহযােগ একমাত্র উপায় বলিয়াছিলেন—তবে পন্থা সম্বন্ধে তাঁহার বিভিন্ন মত ছিল। কাউন্সিলে অসহযোগ করা যায় কি না, এবং জাতীয় বিদ্যালয় প্রভৃতি গঠনের উদ্যোগ না করিয়া ইস্কুল-কলেজগুলি ভাঙা উচিত কি না এবং একবৎসর সময়ে স্বরাজলাভ করিতে হইবে, না বলিয়া পাঁচ বৎসর সময় দেওয়া এইগুলিই তাহার প্রস্তাবের বিশেষত্ব ছিল। এই সকল প্রস্তাবের দূরদর্শিতা সম্বন্ধে এখন বােধ হয় দেশবাসী বিলক্ষণ বুঝিতেছেন। যাহা হউক নাগপুর কংগ্রেসে মহাত্মার সহিত আপােষে একটা মিটমাট হইলে চিত্তরঞ্জন কংগ্রেস নির্দিষ্ট অসহযােগ ব্রত উদ্যাপনে সমস্ত উৎসর্গ করেন। তাঁহার উপরই বাংলায় সর্বপ্রথম মৈমনসিংহে ১৪৪ ধারা জারি হয়। এই কাৰ্যে নামিয়াই দেশবন্ধু কারাবরণ করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন। তিনি বলিতেন জুন মাসের মধ্যে বেজওয়াদা প্রোগ্রাম কার্যে পরিণত সতেরাের পরিচ্ছেদ ১০৭ হইলেই সরকার ভীষণ অত্যাচার আরম্ভ করিবেন। প্রথম সকলেই ভাবিয়াছিলেন স্বপ্ন বিলাসী অসহযােগীদের আন্দোলন সফল হইবে না। যখন জুন মাসে এক কোটি সভ্য এক কোটি টাকা এবং বিশ লক্ষ চরকা হইল—তখন আলাতন্ত্রের মাথা ঘুরিয়া গেল। • অত্যাচারের চক্র চলিতে আরম্ভ হইল। একে একে কংগ্রেস কর্মীগণ ধৃত হইতে লাগিলে। দেশবন্ধুও প্রস্তুত হইলেন। কতবার তাঁহার গ্রেপ্তারের কথা শােনা গেল। নভেম্বর মাসে একদিন রাত্রে কে টেলিফোন করিল তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে আসিতেছে। দেশবন্ধু বিছানার কাছে একটা গরম জামা রাখিতে আদেশ দিয়া নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইতে লাগিলেন! সেদিন কিন্তু পুলিশ আসিল না। অবশেষে ১০ই ডিসেম্বর তারিখে তাঁহাকে গ্রেপ্তার করা হইল। সে দিন চিররঞ্জন ও আমি প্রেসিডেন্সি জেলে। সন্ধ্যার সময় দেশবন্ধু প্রভৃতিকে দেখিয়া আমরা হর্ষে-বিষাদে অভিভূত হইলাম। পর দিন সকালে আমাদের দু’জনকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে লইয়া গেল। ১০ই ডিসেম্বর হইতে ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসের অধিক কাল হাজত অবস্থায় দেশবন্ধু প্রেসিডেন্সি জেলে ছিলেন। জেলে আসার কিছুদিন পরেই তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা রােগে আক্রান্ত হন। সারিয়া উঠিয়াই আবার কয়েক দিন পরে জ্বরে পড়েন। এই জ্বর ৩৪ মাস ধরিয়া প্রায় প্রত্যহই হইত। ইহাতেই তাহার স্বাস্থ্য একবারে ভাঙিয়া দিয়াছিল। রাত্রে সুনিদ্রা হইত না। শরীরের ওজন দিন দিন কমিয়া গেল ! তাহার ওয়ার্ডে প্রেসিডেন্সি জেলে মৌলানা আজাদ, শ্ৰীযুত শাসমল ও সুভাষচন্দ্র বসু - থাকিতেন। সুভাষচন্দ্রই বিশেষ ভাবে দেশবন্ধুর সেবা শুশ্রুষা লইয়া থাকিতেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি শ্ৰীযুত দাশ ও শাসমল মহাশয় সেন্ট্রাল জেলে আসিয়া Sob বন্দীর ডায়েরী আমাদের ওয়ার্ডে উঠিলেন। সুভাষচন্দ্র এক সপ্তাহে পূর্বেই আসিয়া ছিলেন। শ্ৰীযুত কিরণ শঙ্কর রায়, অরবিন্দ মুখােপাধ্যায়—ইহারাও ঐখানে ছিলেন। আমরা সাত জন Female 'Ward এ রহিলাম। শ্ৰীযুত সুভাষচন্দ্র ও অরবিন্দ দেশবন্ধুর সেবাশুশ্রুষা লইয়াই দিন রাত ব্যস্ত থাকিতেন। তখনও দেশবন্ধুর প্রত্যহ জ্বর হয়। ভীষণ গরমে ছােট্ট একটি সেলে ( বােধ হয় ৪ হাত চওড়া ও ৬ হাত লম্বা) চারিদিকে বন্ধ হইয়া তাহার শরীর দিন দিন খারাপ হইতে লাগিল। এদিকে জেলের আহার তাঁহাকে আরও দুৰ্বল করিয়া ফেলিল। ক্রমে বহু মূত্র (Diabetes) রােগের লক্ষণ দেখা দিল। যন্ত্রণার জন্য পাঁচটি দাঁত ও তুলিয়া ফেলিতে হইল। গবর্মেন্ট উপযুক্ত পথ্য দানে খরচ বেশী হইবে বলিয়া তাহাকে বাড়ী হইতে খাবার আনাইতে বলিলেন। তিনি অসম্মত হইলেন। অবশেনে বন্ধু-বান্ধব ও আমাদের অনুরােধে অনেকদিন পরে রাজি হইয়াছিলেন। জেলে থাকিতে শ্ৰীযুত দাশ মহাশয়ের সহিত অনেকে দেখা করিতে আসিয়াছিলেন—পণ্ডিত মদনমােহন মালবীয়, স্যর কে, জি, গুপ্ত, মিঃ এস, আর, দাশ, লেডী বােস ও স্যর জে, সি, বােস, শ্ৰীযুত ভূপেন্দ্রনাথ বসু, আমেরিকার প্রােফেসর ভ্যান্ টাইন, রেভারেণ্ড হেণ্ডারসন, রেভা: গ্রাইস, রেভাঃ বি, এ, নাগ, শ্ৰীযুত সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক, মিঃ এন, সি, সেন, ডাঃ কুমুদশঙ্কর রায়, শ্ৰীযুত শরৎচন্দ্র বসু, কুমার কৃষ্ণ দত্ত, স্যর আবুদ রহিম, ডাঃ আবদুল্লা সরওয়াদি, ঔপন্যাসিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং । অন্যান্য অনেকে আসিয়াছিলেন। দেশবন্ধুকে জেল-কর্মচারীরা বেশ খাতির করিতেন। বন্দীরা সকলেই তাহাকে দেবতার মত ভক্তি-শ্রদ্ধা করিত। কিন্তু সময়ে সময়ে তাঁহাকেও কিরূপ লাঞ্ছনা ভােগ করিতে হইত তাহার দুই একটি উদাহরণ দিব।

সতেয়াের পরিচ্ছেদ এক দিন প্রেসিডেন্সি জেলে শ্ৰীমতী -বাসন্তী দেবী দেখা করিতে আসিয়াছেন—কথাবার্তার মধ্যে জেলর সাহেব বলিলেন Please speak aloud. I can't hear-“জোরে কথা বলুন, আমি শুনিতে পাইতেছি ।” তিনি উত্তর দিয়াছিলেন—I refuse to obey you (আমি তােমার আদেশ মানিব না।” এই ঘটনার পর তিনি দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধু বন্ধ করিতে যান—অবশেষে গবর্মেন্টের আদেশে জেলর আর ও-রকম অসভ্যতা করেন নাই। আর এক দিন সেন্ট্রাল জেলের সুপারিনটেনডেন্ট ডাঃ য়্যাশ তাহাকে গেটে নিজের আপিসে ডাকাইয়া লইয়া যান। তখন দুপুর বেলা ভীষণ রৌদ্র, জ্বর-গায়ে দেশবন্ধু আপিসে উপস্থিত হইলে ফ্ল্যাশ সাহেব নিজে চেয়ারে বসিয়া তাহাকে দাড় করাইয়া রাখেন। বাড়ীর ডাক্তার আসিয়াছিলেন—তাহার কথাবার্তার জন্যই ডাকা হইয়াছিল। দেশবন্ধু একটু খানি দাড়াইয়াই ফিরিয়া আসেন। এর পর একদিন দেশবন্ধু স্নান করিতে গিয়া মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া যান, তাহাতে পায়ে দারুণ আঘাত লাগে—এই অবস্থায় শ্রীমহী বাসন্তী দেবী অসুস্থ স্বামীর সহিত দেখা করিবার জন্য ভিতরে আসিতে চাহিলে ‘বড় সাহেব’ তাহাকে গেটে বসাইয়া রাখেন এবং বলেন শ্ৰীযুত দাশকে তিনি চেয়ারে বসাইয়া ভিতর হইতে আনাইতেছেন। শ্ৰীমতী বাসন্তী দেবী তাহাতে আপত্তি করিয়া ধন্যবাদ দিয়া চলি যাইতেছিলেন—এমন সময় সুপার ভিতরে যাইবার অনুমতি দেন। কিন্তু দেখাশুনার নির্দিষ্ট সময় অতীত হইলেই জেলরকে পাঠাইয়া শ্ৰীমতী বাসন্তী দেবীকে চলিয়া সইতে অনুরােধ করেন। আর একদিন একজন ইউরােপীয়ান, ওয়ার্ডার-( ইনি পূর্বে নাপিতের কাজ করিতেন) দরজা বন্ধ করিতে আসিয়া দাশ মহাশয়কে অপমান করে। অবশেষে জেলর অসিয়া এজন্য দুঃখ প্রকাশ করিয়া গোলমাল ১১ বন্দীর ডায়েরী মিটাইয়া দেন। এইরূপ কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনায় লাঞ্ছিত হইতে হইত। - এপ্রিল মাসে এমন গরম পড়িল যে আমাদের ওয়ার্ডে বাস করা কঠিন হইল। গরমের দিনে সন্ধ্যার সময় যেই একটু হাওয়া উঠিত, অমনি প্রহরী আলিয়া আমাদিগকে ঘরে বন্ধ করিয়া যাইত। এমন রাত্রি গিয়াছে যে গরমে সারারাত বসিয়া কাটাইতে হইয়াছে। অসুস্থ শরীরেও দেশবন্ধু এই ক্লেশ আনন্দের সহিত সহ করিতেন। যখন বাহিরে হাওয়ার শব্দ পাওয়া যাইত তিনি হাসিয়া আমাদিগকে বলিতেন—ঐ শােনাে হাওয়ার শব্দ, এইবার ঘুমিয়ে পড়াে ! একদিন রাতে অসুখের জন্য সুপার তাহাকে দেখিতে আসিয়া ঘরে কয়েক মিনিট থাকিতেই গলঘৰ্ম্ম হইয়া উঠিলেন পরে আমাদের অনুরােধে সুপার হাজত ওয়ার্ডের দোতলায় একটি বড় ঘরে সকলকে বদলি করেন। এইখানে পাঁচ মাস জেল ভােগ করিবার পর ডাক্তারের পরামর্শ মত দেশবন্ধুকে একটি টেবিল-ফ্যান দেওয়া হয়। সেটির দাম শ্ৰীযুত দাশ মহাশয়কেই দিতে হইয়াছিল—কিন্তু দুদিন না চলিতেই কল বিগড়াইয়া যাইত। দেশবন্ধু নিজের ঘর হইতে বড় একটা বাহির হইতেন না। বিকালে ঘরের বারান্দায় বসিয়া সমবেত দর্শকগণের সঙ্গে কথা বলিতেন। সারা দিন লেখাপড়া ও চিন্তা লইয়াই ব্যস্ত থাকিতেন। ভালমন্দ অনেক বাংলা নবেল তিনি অবসর সময়ে ইচ্ছা করিয়া পড়িতেন ও বাংলা সাহিত্যের দুর্দশার কথা বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতেন। অন্য সময়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বাজনৈতিক, সামাজিক, দর্শন বিষয়ক পুস্তকাদি পাঠ করিতেন ও Philosophy of Indian Nationalism ( ভারতীয় জাতীয়তার তত্ত্ব) নামক পুস্তক লিখিবেন বলিয়া নােটস্ লিপিবদ্ধ করিতেন। এই পুস্তকের প্রারম্ভ :যেরূপ হইয়াছে, তাহাতে সম্পূর্ণ হইতে দুই বৎসর সতেরাের পরিচ্ছেদ ১১: লাগিবে বলিয়া মনে হয়। এই পুস্তক লেখা হইলে একখানি অপূৰ্ব গ্রন্থ হইবে। বন্দীজীবনের নানা অভাব ও অসুবিধা সত্বেও, শারীরিক কুশলতা হারাইয়াও দেশবন্ধুর আনন্দ-উজ্জ্বল মুখের তেজ যেন ফুটিয়া উঠিতেছে। রাজার ঐশ্বৰ্য্য ত্যাগ করিয়া যিনি দেশের হিতার্থে কঠোর কারাক্লেশ বরণ করিয়াছেন, তাঁহার শক্তি কে নিরােধ করিবে ? তাহার এবং তাঁহার সহকৰ্মীগণের এই ত্যাগ কখনও বিফলে যাইবে না। কংসের কারাগারে শ্রীভগবানের জন্ম হইয়াছিল—আমাদেরও মুক্তির জন্ম এই কারাগৃহেই হইবে। সকলের সকল দুঃখ সকল ত্যাগ সার্থক করিয়া মায়ের শৃঙ্খল খুলিয়া পড়িবে—আবার আমরা স্বাধীন ভারতে মানুষের মৃত বিচরণ করিয়া জীবন ধন্য করিতে পারিব।

পরিশিষ্ট। ফরিদপুর জেলের কাহিনী। (জনৈক ভুক্তভােগী বর্ণিত) মাত্র পনর মিনিটের মধ্যে আমাদের বার জনের বিচার-কাৰ্য, আবু আলী সাহেব, সবডিভিসনা অফিসার, কর্তৃক শেষ হয়। থানার ভার- প্রাপ্ত প্রধান কর্মচারীর সাক্ষ্যতে আমাদের অপরাধ প্রমাণিত হয়। দাবােগাবাবুর মতে আমি একজন বিশিষ্ট আন্দোলনকারী। এইটুকুমাত্র অভিযােগের উপর নির্ভর করিয়া সুযােগ্য বিচারকর্তা যে দণ্ডাজ্ঞা জ্ঞাপন করিলেন, তাহার ফলে আমাকে সম্পূর্ণ দুইটি বৎসর কারাগারে অবস্থানের বন্দোবস্ত হইল। বিচায়ের ধারা,-Criminal Law Amendment Act, 17:2. এত অল্প সময়ের মধ্যে এত লােকের বিচার মাদারীপুর ধর্মাধিকরণের জীবনে সবে নূতন আরম্ভ হইয়াছিল। বিচারান্তে ফরিদপুর জেলে প্রেরিত হইয়া বহুজনাকীর্ণ গৃহে, মনুষ্যের অনুপযুক্ত আহাৰ্যে ক্ষুন্নিবৃত্তি করিয়া এবং সম্পূর্ণ অনভ্যস্তভাবে বিম্মুত্র পরিত্যাগ করিয়া কোন প্রকারে জীবনধারণ করিতে লাগিলাম। কম্বলের অভাব নিবন্ধন ডিসেম্বরের নিদারুণ শীতে অতি কষ্টে রজনী এবং অনশনে অৰ্দ্ধাশনে দিন যাপন করিতে করিতে ডিসেম্বর মাসের ২২শে তারিখ পর্যন্ত পেছিলাম। ২৩শে তারিখ এই প্রকার স্থানাভাব এবং শীতবস্ত্রের অভাবে স্বাস্থ্যনাশের আশঙ্কা জেল-কর্তৃপক্ষকে জানান হইল। সঙ্গে সঙ্গে আরও বলা হইল যে, ইহার কোন প্রতিকার অথবা তৎপ্রতিশ্রুতি তৎক্ষণাৎ না পরিশিষ্ট ১১৩ পাইলে আমরা কেহই ওয়ার্ডে প্রবেশ করিব না। সুচতুর সহকারী জেলার আমাদিগের সহিত স্বল্প কথােপকথনের পরই প্রতিশ্রুতি দিয়া এবং আমাদিগকে ওয়ার্ডে প্রবেশ করাইয়া সন্ধ্যার অন্ধকারে অদৃশ্য হইল। পরদিন প্রত্যুষে “সুপ্রভাত” “সুপ্রভাত” মুখে উচ্চারণ করিতে করিতে জেলা-ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ হগ, ডেপুটী যামিনী রায়, জেলার, সহকারী জেলার এবং মুন্সী (clerk) কয়েকজন জেল-পুলিশ সমভিব্যাহারে দর্শন দিলেন। হগ সাহেব ইতিপূৰ্বে আর একবার জেলে আসিয়া আমাদিগের সঙ্গে বহুরকম আলাপ করিয়া গিয়াছিলেন। তখন মৃদুমধুর হাসি বিজড়িত সম্ভাষণে আমাদিগকে আপ্যায়িত করিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন, পরে বুঝিয়াছিলাম তাহার এই আগমনের উদ্দেশ্য কুরুরাজ দুর্যোধনের ঘােষ যাত্রার উদ্দেশ্যেরই অনুরূপ। সে যাহা হউক ২৪শে তারিখ হগ আসিয়াই আমাদিগকে বাহিরে ‘ফাইল’ করিয়া দাঁড়াইতে হুকুম করিলেন। বলা বাহুল্য যে ইতিপূর্বে ‘ফাইল’ করাইবার কোন কথাই উঠে নাই। হগের অপূৰ্ব উগ্রমূৰ্ত্তি দেখিয়া বুঝিলাম, সবই সুচতুর সহকারী জেলারের কারচুপী। বাহির হইতে কাহারও আপত্তি ছিল না; কিন্তু এত লােকের মধ্যে হুকুমটা প্রচারিত হইতে কিছু বিলম্ব ঘটিল, সুতরাং বাহিরে আসিতেও কিঞ্চিৎ বিলম্ব অপরিহার্য হইয়া পড়িল। হগ এত বিবেচনা করার প্রয়ােজন বােধ করিলেন না; সুতরাং হুকুমটার কঠোর পুনরুক্তি হইল। যেমনি বলা আর তেমনি যে, যেভাবে পারিল • দুষমন কয়েদীগুলিকে ঘাড়ধাক্কা দিয়া, কাণে ধরিয়া, এবং কেহ কেহ বা মুখের নানারূপ ভঙ্গী করিয়া, সত্বর ঠেলিয়া বাহির করিল। ঠেলিয়া ঠেলিয়া রাস্তার উপর সকলকে দাড় করাইয়া পরে বিবিধ হুকুম প্রচার করা হইল। ইংরাজী বাঙ্গলা এবং হিন্দী ভাষায় উহা জারী করা হইয়াছিল। মােটের ১৪ বন্দীর ডায়েরী উপর উহার সারমর্ম এই যে, কেহ বন্দেমাতরম্ ইত্যাদি ধ্বনি করিতে পারিবে না। ফাইল’করিয়া ঘরে ঢুকিতে হইবে, ‘ফাইল’ করিয়া বাহিরে আসিতে হইবে। ফাইল’ করিয়া আহার করিতে হইবে। জেল সুপারি টেণ্ডেন্ট কিম্বা অন্য কোন রাজ-প্রতিনিধি (বােধহয় ম্যাজিষ্ট্রেট) জেলে শুভাগমন করিলে প্রহরীগণের মধ্যে কেহ যখন “সরকার” এই দুর্বোধ্য বিচিত্র-অর্থপূর্ণ শব্দটী তারস্বরে উচ্চারণ করিবে তখন সসম্রমে উঠিয়া দাড়াইবে এবং “সেলাম” শব্দটী বলিলে উভয় হস্তোত্তোলন করিয়া সেলাম করিবে। আরও মাথামুণ্ড কত কি হুকুম এবং অবশ্যপালনীয় নিয়ম- জানাইয়া পরে পূর্কের ন্যায় তিনটী ভাষার অঙ্গহানি ঘটাইয়া বুঝাইয়া দেওয়া হইল যে, ইহার একটী আজ্ঞা লঙ্ঘন করিলেই গুরুতর “সাজা ভােগ করিতে হইবে। তদনন্তর ২৪ জনকে নেতা সাব্যস্ত করিয়া ডিগ্রীর (cell) সন্নিহিত ক্ষুদ্র ময়দানটীতে প্রেরণ করা হইল। ১•১১ জনকে অসুস্থতা প্রযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হইল, বাকী দুষমনগুলিকে কয়েকটা ওয়ার্ডে আবদ্ধ করিয়া রাখা হইল। হুকুম তত জারী হইল, এক্ষণে উহা সকলে মান্য করিবে কি না তাহার একটা পরীক্ষা তৎক্ষণাৎ না লইয়া, হগ কেমন করিয়া ফিরিয়া যাইবেন । সুতরাং-একটী একটী করিয়া ওয়ার্ডে ঢুকিয়া হগ পরীক্ষা আরম্ভ করিলেন। জমাদার গলা ঝাড়িয়া যথাসাধ্য সুর সপ্তমে চড়াইয়া হাঁকিল,-“সরকার কিন্তু সকলে যেহেতু দণ্ডায়মান অবস্থায়ই ছিলেন এই জন্য উহা মান্য করিলেন কি অমান্য করিলেন কিছুই বুঝা গেল না। পরে জমাদার আবার গলা ফাটাইয়া গগনভেদী স্বরে বলিল ‘সেলাম। কিন্তু কই- সেলাম করা ত দূরের কথা, কেই ক্ষেপও করিল না! একবার, দুইবার, তিনবার শব্দ হইল। তথাপি সকলেই পূৰ্ব্ববৎ এলােমেলাে ভাবে • পরিশিষ্ট দাড়াইয়া রহিল! কোথায় গেল ফাইল, আর কোথায় বা রহিল সেলাম । এতক্ষণ চীৎকার করা বিফল হইল দেখিয়া হগ ভয়ানক চটিয়া মূহুর্মুহু গর্জন করিতে লাগিলেন। অবশেষে নিরাশ হইয়া অনেকের হাত ধরিয়া টানিয়া ললাটে ছোয়াইবার চেষ্টা করিলেন; তাহাও বৃথা হইল। “যাঃ, গেল জাতি গেল মান। ইহাতেও কেহ হস্তোতােলন করিল না ! সর্বনাশ ! এত অপমানও কি সহ্য হয় ! সুতরাং ঘাড়ধাক্কা ও টানাটানির ধূম পড়িয়া গেল। কেহ কেহ হগের বক্র যষ্ঠির কঠোর স্পর্শও অনুভব করিলেন। প্রতি ওয়ার্ডেই এইরূপ একটা অভিনয় হইয়া গেল। বাদ গেল হাসপাতাল এবং ময়দান। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল আমরা কিছু কম- বেশী ৩০ জন বহিষ্কৃত হইয়াছি। হগের হুকুমে আমাদিগকে ময়দানটীর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটী স্থানে দুই দুই জন করিয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ উপবেশন করান হইল। সম্মুখে চাহিয়া দেখি,-ত্রিকোণাকৃতি একটী যন্ত্র খাড়া রহিয়াছে। পাঞ্জাবের দৃশ্য মনে পড়িল,-সকলই বুঝিলাম। যাহা হউক যূপকাষ্ঠ সন্নিহিত পশুর ন্যায় প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। হগ, ডেপুটী যামিনী রায়, জেলার এবং সহকারী জেলার উক্ত, ক্ষুদ্র স্থানটীর এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া কাণাকাণি করিতে লাগিলেন। একটু পরে সহকারী জেলার ক্ষিপ্র গতিতে জেলকোড লইয়া আসিল। এখানে বলা প্রয়ােজন যে, তদানীন্তন সুপারিনটেন্টে নৃপেন বাবু তখন স্থানান্তরে ছিলেন। যামিনী রায় তাহারই স্থানে অস্থায়ী ভাবে কাৰ্য করিতেছিলেন। চারটী বীরপুঙ্গব অদূরে দাঁড়াইয়া মন্ত্রণা করিতেছিলেন। তাহাদের কাণাকাণির মাত্র “not less than fifteen” (পােনেবাের কম নয় ) এইটুকু আমার কর্ণে প্রবেশ করিল। আগে-পাছের কিছুই শুনা গেল না। কিন্তু অর্থ বুঝিলাম। ডাক্তারবাবু আসিয়া সত্বর উপস্থিত হইলেন। সঙ্গে একটি বুক-পরীক্ষা-যন্ত্র। বুকপরীক্ষা করিয়া একজনকে ফেল বন্দীর ডায়েরী করিলেন; বলিলেন—“unfit” (অনুপযুক্ত)। তাহার পরই আর একজনকে দেখিয়া হগ • বলিলেন,-“He looks quite healthy” (ইহাকে দেখিয়া বােধ হয় বেশ স্বাস্থ্যবান)। ডাক্তারবাবু, তাহার বুকে যন্ত্রটী স্থাপন করিতে না করিতেই স্বীয় পারদর্শিতার পরিচয় দিবার অভিপ্রায়েই বােধহয়, বলিলেন,-fit (উপযুক্ত)। অথবা ম্যাজিষ্ট্রেট হগ, “quite healthy” (বেশ স্বাস্থ্যবান্ ) বলিয়াছেন বলিয়াই অনন্যোপায় হইয়া ঐরূপ বলিতে বাধ্য হইয়াছিলেন! পরীক্ষান্তে হগ, আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি এখন জিজ্ঞাসা করি, তােমরা আমায় সেলাম faca fal? 'Now, I ask you again will you salute me? একজন যুক্তি দিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু যুক্তি হগের অযৌক্তিক বুদ্ধির নিকট হার মানিল। তিনি দৃঢ়স্বরে বলিলেন-Simply tell me, , will you salute? (কেবল বল, আমায় সেলাম দিবে কি না?) দৃঢ়তর স্বরে উত্তর হইল—I won't (দিব না)। ইনিই দত্ত কেন্দুয়া জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ সিংহ। হগ, রাগিয়া বলিলেন- ‘লে আও'। আর—অমনি যমকিঙ্কর সদৃশ দুইটী জেল-সিপাহী ক্ষুদ্র দেহখানা ধরিয়া, ত্রিকোণাকৃতি কাঠামে হস্তদ্বয় ঊদ্ধ করিয়া আঁটিয়া বাঁধিয়া দিল। চরণযুগলেরও তদ্রুপ দশা হইল এবং কটিদেশও কাঠামটীর সহিত দৃঢ়- ভাবে বদ্ধ হইল। নড়িবার জোটী রহিল না। পরিধানের প্যান্টটী খুলিয়া—এক হাট লােকের মধ্যে সম্পূর্ণ দিগম্বর সাজাইল, পরে পশ্চাদ্দেশে “এক খণ্ড ক্ষুদ্র সলিলসিক্ত ন্যাকড়া সন্নিবেশিত হইল। এবার গণনা আরম্ভ হইল,-“এক” অমনি সপ, সপ, শব্দ ছাড়িয়া নানাভাবে ঘূর্ণিত হইয়া বেত্ৰযষ্ঠি ভেড়ার ঘাড়ে খড়ের ন্যায়, ভীষণ বেগে পশ্চাদ্দেশে পতিত হইয়া তাহাকে ক্ষতবিক্ষত করিল। আবার শব্দ হইল “দো”—বেষ্টি- পূৰ্বানুবৃত্তি করিল। গণনা চলিল, বেও চলিল ; বেত খাইতে খাইতে পরিশিষ্ট ১৭ উচ্চৈঃস্বরে সকলকে সম্বােধন করিয়া তিনি বলিলেন-“আপনারা দেখুন মাতৃভক্ত সন্তানকে এই প্রকার কঠোয় অগ্নিপরীক্ষায় পড়িতে হয়। ইহাতে উত্তীর্ণ হইতে না পারিলে মায়ের প্রিয় পুত্র হওয়া যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি।” ক্রমশঃ শােনা গেল ‘পন্দর’ অমনি সপাং করিয়া আর এক ঘা পড়িল। একজনের পালা শেষ হইল। পশ্চাদ্দেশের ন্যাকড়া খণ্ড খুলিয়া লইয়া প্যান্টটী পরাইয়া দিল। তারপর ধরিয়া লইয়া গিয়া, সিপাহীদ্বয় দূর্বার উপর উপবেশন করাইতে চাহিল ; ক্ষতের বেদনার জন্য বসানাে সম্ভবপর হইল না। দক্ষিণ করতলে শির রক্ষা করিয়া ঈষৎ শয়ান অবস্থায় সুরেন বাবু পড়িয়া রহিলেন। এবার শ্ৰীযুত পঞ্চানন চক্রবর্তীর পালা। পঞ্চভায়া ডাক্তারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া সত্বরই কাঠামে আবদ্ধ হইলেন। তাঁহার বহুদিনের হৃৎপিণ্ডের ব্যারাম ডাক্তারবাবুর যন্ত্রে ধরা পড়িল না বা ভয়ে উড়িয়া গিয়াছিল। পূৰ্ব্ববৎ গণনা ও বেত্র চলিল! কিন্তু এবার ভ্রমবশতঃই হউক বা ইচ্ছা ক্রমেই হউক ‘পন্দর’ গণনা হইল কিন্তু আঘাত করিল চৌদ্দ। সুরেন বাবুকে ও পঞ্চভায়াকে স্বতন্ত্র ডিগ্রীতে (cell) পূরিল। অবশিষ্ট অপরাধীবর্গ বেত্র খাইল না বটে, কিন্তু হাত কড়ি, পা বেড়ির (Bar fetters and cross bar fetters) হাত হইতে কেহই নিষ্কৃতি পাইল না। হগ ‘সাজা দিয়া জব্দ করিতে আসিয়াছিলেন, সেলামটা ত হাতের পাঁচ! কিন্তু উদ্দেশ্য নষ্ট হইতে দেখিয়া, ক্ষুন্নমনে অপমানের বােঝা ঘাড়ে লইয়া মন্থর গতিতে কারা তােরণ পার হইয়া অন্তর্হিত হইলেন। অবশিষ্ট বীরগণ স্ফীত বক্ষে চলিয়া গেলেন । সেদিনকার অভিনয় শেষ হইল। এই চব্বিশে ডিসেম্বর তারিখ আমাদের অনশনব্রত পালন করিবার কথা ছিল ; সুতরাং সন্ধ্যার সময় আমরা অনুগ্রহণ করিলাম। এক একটা v ১১৪ বন্দীর ডায়েরী অল্প পরিসর ডিগ্রীতে ৩৪ জন করিয়া সমস্ত রাত্রি আটকাইয়া রাখিত। দিনের বেলা সম্মুখস্থ ক্ষুদ্র ময়দানটীতে বেড়াইতে দিত। এই ভাবে কদন্ন ভােজন করিয়া এবং শীতে কষ্ট পাইয়া দিন কাটাইতে লাগিলাম। কিয়দ্দিবস পরে নৃপেনবাবু আসিয়া সপ্তাহে এক বেলা মৎস্যের ব্যবস্থা করিলেন। আর কিছুদিন পরে সপ্তাহে দুই বেলা মৎস্যের ব্যবস্থা হইল। সর্বপ্রকার গুরুতর পরিশ্রমের কৰ্ম্ম-ঢেকিতে ধান ভানা, পাম্পে জল তােলা, যাঁতায় ডাইল গম প্রভৃতি ভাঙ্গা, নৃপেনবাবুর সময়ের বিশেষ উল্লেখযােগ্য ঘটনা। এই সকল কৰ্ম্ম নিয়মিতরূপ সম্পন্ন হয় কিনা তাহার পৰ্যবেক্ষণের ভারও আমাদের উপর ন্যস্ত ছিল। শুনিলে আশ্চর্যান্বিত হইবেন, যে নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম, যথা সময়ের পূর্বে শেষ হইতে থাকিলে, কার্যের কলেবরও দিন দিন, শুক্লপক্ষের শশাঙ্কের ন্যায়, বর্ধিত হইতে লাগিল। বলিসুলভ চাপল্যে ধৈৰ্য্যধারণ করিতে অসমর্থ হইয়া বহু অল্পবয়স্ক বালকই ঐ প্রকার নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে কর্তব্য সম্পন্ন করিয়া চলিয়া যাইত। অবসর মত একটু খেলাধূলা করিলে জেলারের একেবারে অসহ হইয়া উঠিত। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া চোক্‌ ঘুরাইয়া শাসনের সুরে বারণ করিত। আহাৰ্য্য এবং শীত বস্ত্রের বিষয় নৃপেনবাবুর নিকট অনেকবার নালিশ করা হইল; কিন্তু, কোন সুফল ফলিল না দেখিয়া পুনরায় ভ্রাতৃবৃদ চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। কিন্তু সকলে মিলিয়া একদিন পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, যে,-যতদূর পারিবেন কষ্ট সহ্য করিবেন; আর আবেদন নিবেদনে কাজ নাই। অতএব প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মাজীর নাম কারণ করিয়া সকলেই নীরব সহিষ্ণুতা অবলম্বন করিলেন। জেলে আসিয়াও আমরা এতদূর সুশৃঙ্খলতার সহিত, জেলের কোন কর্মচারীর বাক্যে কর্ণপাত না করিয়াও, সকল কার্য নির্বাহ করিতেছি জানিয়া জেল-কর্তৃপক্ষের গাত্রদাহ উপস্থিত হইল। কোন বন্ধ না পাইয়া পরিশিষ্ট জেল-কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত, শনিদেবের ন্যায় কোপপূর্ণ মনে অপেক্ষা করিতেছিল। হঠাৎ ২৩শে তারিখ সুযােগ পাইয়া শনিঠাকুর—তাহার দুর্ভোগের থলিয়াটী একেবারে ঝাড়িয়া প্রয়ােগ করিলেন। ২৪শে তারিখ ক্রিয়া আরম্ভ হইল। ইহার আরও একটা উত্তেজক কারণ ছিল। যুবরাজ, ভারতবাসী প্রজাবৃন্দের কষ্টার্জিত অর্থের সদ্ব্যবহার করিবার জন্য উক্ত ২৪ শে তারিখ কলিকাতাপদাৰ্পণ করিবেন বলিয়া আমরা সেদিন অনশনব্রত পালন করিয়া ছিলাম। ইহাতে বারুদে অগ্নিসংযোেগের ভীষণ ফল ফলিল। আমাদের এই ঘােরর অন্যায় কাৰ্য্যই, বােধহয়, ঐ উত্তেজক কারণ। নৃপেনবাবুর অধীনে আমাদের কারা-জীবন একটুও সুখকর হইল না, কেবল অশান্তি ! জেল-কর্তৃপক্ষ বুঝিলেন উল্টা। তঁাহারা দেখিলেন বালক বৃদ্ধ সকলেই এবম্বিধ উৎপীড়ন সত্ত্বেও পূৰ্ব্ববৎ অবিচলিত। কিন্তু কি আর করেন! আর নূতন “সাজার ব্যবস্থা করিতে না পারিয়া অগত্যা “মরমের ব্যথা মরমে” লুকাইলেন। তৎপরবর্তী সুপারিন্টেন্টে রাজেনবাবু, তদীয় প্রস্থানের পর অস্থায়ীভাবে জেল-মনদে জেল-মনদে অভিষিক্ত হইলেন। ভাবিলাম কিছু পরিবর্তন হইবে। কিন্তু অবিচার অত্যাচারের কোনও বৈলক্ষণ্য ঘটিল । কেনই বা হইবে ! কয়েদীর আবার দুঃখ কষ্ট কি ? •এই কথায় অনেকেই হয়তো মনে করিবেন ইহার মধ্যে অবশ্য কিছু না কিছু অতিরঞ্জন আছে। কিন্তু আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি যে, জেলের অত্যাচার অবিচারের অতিশয়ােক্তি করাতত দূরে থাকুক। স্থানাভাব প্রযুক্ত উহার কঠোরতার বর্ণনা সম্বন্ধে যথেষ্ট লাঘব করিয়াছি। এই স্থানে নৃশংসতার দুইটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। উহা হইতেই আমার কথার সত্যতা উপলব্ধি করিতে পারিবেন।

বন্দীর ডায়েরী ১ম। জেলার বাবুর একটী দ্বাদশবর্ষবয়স্ক পুত্র একদিন একটা কয়েদীকে জামরুল খাইতে দেখিয়া সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিয়াছিল,—“বাবা, কয়েদীগুলি মানুষের মত জামরুল খায় !” কয়েদীগুলির বিষয়ে ইহার কিরূপ ধারণা জন্মিয়াছে বুঝিয়া লউন। ২। ল—নামক ওখানে একটা সাধারণ কয়েদী ছিল। ল—ভদ্র- সন্তান। তাহার অবস্থাও মন্দ নহে। গুরুতর পরিশ্রমে অনভ্যস্ত। কিন্তু তাহাতে কি হইবে ! জেলে খাটিতে একটু ত্রুটী হইলে আর হাড় মাংস একত্র থাকিবে না। রােজ যায় আসে ; কিন্তু অকস্মাৎ একদিন দেখিলাম ল—কে ধরাধরি করিয়া হাঁপাতালে লইয়া যাওয়া হইল। তাহার নিকট আমি স্বয়ং জিজ্ঞাসা করিয়া যাহা শুনিলাম, তাহাতে ক্ষোভে বিস্ময়ে আপনাকে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। জেলের একজন কৰ্ত্তার গৃহিণী হঠাৎ একদিন উত্তেজিত-স্বরে ঘােষণ। করিলেন তাহার দুইখানা এক টাকার নােট খােয়া গিয়াছে। ভৃত্য কয়েদীগণ প্রমাদ গণিল। ল—চোর সাব্যস্ত হইল। ক্রোধে অগ্নিমূৰ্ত্তি হইয়া গৃহিণী উহাদের মেট্রকে হুকুম করিলেন,—“মেরে হাড় ভেঙ্গে দে।” হতভাগ্য মার খাইয়া ধরা পৃষ্ঠে পড়িয়া আপন অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতেছিল ; এমন সময় তিনি আবার দর্শন দিয়া বাঘিণীর ন্যায় ক্রোধে আরক্তলােচন হইয়া মেন্টুকে তাড়া করিলেন। বলিতে লাগিলেন,-“শালা, কি মেরেছি! এখনও যদি কথা কইল তবে আর আমার হুকুম তামিল করলি কই?” মে বেচারি প্রাণভয়ে হৃদয় হারাইল। চৰ্ম্মের পেটা খুলিয়া চটপি আঘাত করিতে লাগিল। ল—ভূমিতে পড়িয়া ছটফট করিতে লাগিল। গৃহিণীর ক্রোধ এতদূর বাড়িল যে, তিনি নাকে কাদিয়া স্বামীর নিকট ছুটিয়া গিয়া নালিশ করিলেন। বলিলেন,-“কয়েদী শালাদের কীর্তিটা দেখলে ? আমার কথায় আদৌ কর্ণপাত করল না। তিনি পরিশিষ্ট এই রণচণ্ডী মূর্তি দেখিয়া সভয়ে বৃহৎ বপুখানা অতিকষ্টে উঠাইয়া অক্ষমতা সত্বেও ছুটিয়া গেলেন। হুকুম করিলেন,-ব্যাটার শালাকে খুব আচ্ছ। করে মার! রাজেন বাবুও অনেক দিন যাবৎ জেলে চাকী গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু তিনি বাস্তবিক একটু দয়াবান। ছােট ঘােট বালকগণ, যখন ঘর্মাক্তকলেবরে ঢেকিতে যায় এবং পাম্পে কাজ করিত এবং হাঁপাইত, তখন তিনি দয়ার্ল চিত্তে তাহাদের সঙ্গে সময় সময় আলাপ করিতেন। কিন্তু সাহস কোথায়? শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস এবং মৌলবি তমিজুদ্দিন সাহেবকে যেদিন ফরিদপুর জেল হইতে ঢাকা জেলে প্রেরণ করিলেন, তাহার পরদিন অকস্মাৎ তিনি সমুদায় কাজ কৰ্ম্ম বন্ধ করিয়া দিলেন। এই আকস্মিক ভাবান্তরের কারণ—তাঁহার দয়া না গভর্ণমেণ্ট, কিছু বুঝিতে পারিলাম না। ফরিদপুর জেলার সুপ্রসিদ্ধ চক্ষু চিকিৎসক, এম্, 'এ, সি, শ্ৰীযুক্ত মৈত্ৰমহাশয়ের পরিদর্শনের সময় আমাদের স্বাস্থ্যহানিকর অতিরিক্ত পরিশ্রমের বিষয় বলায় কোনও প্রতিকার হয় নাই; এখন হঠাৎ কেন যে সমস্ত পরিশ্রম হইতে অব্যাহতি পাইলাম, জানিনা। আবার কিছুদিন পরে সামান্য ( অবশ্য পূর্বের তুলনায় কম ) কাজ আসিল। কিন্তু স্বল্পকালের মধ্যেই একেবারে খালাস ! কিন্তু খাদ্যাদির তখন পৰ্য্যন্তও কোন বিশেষ পরিবর্তন হইল না। রাজেন বাবু আমাদের মধ্য হইতে বাছা বাছা কয়েক জনকে টিকিটে লিখিয়া Special class (বিশিষ্ট শ্রেণী) করিয়া দিলেন। টিকিটে Special class পাইয়া আমরাও বহুপরে উহার সুবিধা আদায় করিয়া লইয়াছিলাম। বাকী যাহারা রহিলেন তাহাদের মধ্যে এমন অনেকে ছিলেন যাঁহারা জেন বাবুর বিচারমত Special class পাইতে পারিতেন। কিন্তু সে সব বিচার না করিয়া একদিন তাহাদিগকে সাধারণ বন্দীর ডায়েরী কয়েদীদের মধ্যে লইয়া যাইবার জন্য পৃথক করিলেন। এই অন্যায় কৰ্ম্মের প্রতিবাদ কল্পে আমরা সমবেত কণ্ঠে প্রায়ােপবেশন ঘােষণা করিলাম। ছােট বড় সকলেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলাম। ইতি পূৰ্বে মানুষের অনুপযুক্ত আহার্যের দূরীকরণার্থ আমাদের মধ্যে অনেকে প্রায়ােপবেশন অবলম্বন করিতে ইচ্ছুক ছিলেন। এক্ষণে এই অভিনব আঘাতে দারুণ বেদনা অনুভব করিয়া আর অপেক্ষা করিতে পারিলাম না। যে বহ্নি অন্তরে অন্তরে প্রধূমিত হইতেছিল রাজেন বাবুর অন্যায় ব্যবহারে তাহা দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। রাজেন বাবুর নিকট প্রতিনিধি পাঠাইয়া আমাদের সঙ্কল্প জানান হইল। তিনি ভীত হইয়া এই আদেশ প্রত্যাহৃত করিলেন। সুতরাং আমরাও আমাদের সঙ্কল্প ছাড়িলাম। সকলেই তদবধি Special classএর নির্দিষ্ট খাদ্য পাইতে লাগিলাম। কিন্তু শেবেক্তি দল আর টিকিটে Special classএর নিদর্শন কিছুই পাইলেন না। এই ভাবে ভালমন্দের মিশ্রণের মধ্যে কয়েকটা দিন কাটিলে পর রাজেন বাবুর রাজত্ব অবসান হইল ; এবং তাহার পদে মিঃ ডাক্ওয়ার্থ নিযুক্ত হইয়া স্থায়ী ভাবে আসিলেন। ইনি আসিয়া প্রথম প্রথম কোন ব্যাপারে হাত দিলেন না। প্রত্যহ পূর্বাহ্নে আমাদিগকে দর্শন দিতে লাগিলেন। আমরা সাধারণতঃ সুপারি- স্টেণ্ডেন্ট আসিলে উপবিষ্ট থাকিলে গাত্রোখান করতঃ সম্মান প্রদর্শন করিতাম, ইনিও নীরবে চলিয়া যাইতেন। জেল কর্তৃপক্ষের পাষাণ হৃদয়ের পরিচয় দিতে গিয়া উপাখ্যানে যাহা বিবৃত করিয়াছি, সেটা ডাক্ওয়ার্থের আগমনের কিছুদিন পরে সঘটিত হইয়াছিল। আমরা জানিতে পারিয়াছি বলিয়া জেল কর্তৃপক্ষের অতিশয় ভয় হইল। পাছে কোন প্রকার একটা গোলমাল সৃষ্টি করি এই আশঙ্কায় ল—এর শাস্তির আরও কঠোর বিধান হইল, যেন কেহ পরিশিষ্ট আর আমাদের নিকট কিছু বলিতে সাহস ল করে। পরের দিন তাহাকে ঘানি:ত দিল, এই ব্যাপারে জমাদার সিপাহীটী পৰ্যন্ত অশ্রু বিসৰ্জন করিল। অন্যান্য কয়েদীগণ দুঃখে কাদিল। ঘানি ঠেলিতে হইল না, উহাদের কৃপাই ইহার কারণ। কেহই কোন প্রতিকার করিতে পারিল না। হতভাগ্য বােধ হয়-দেড়মাস পরেও সম্পূর্ণ সুস্থ হইতে পারে নাই। যাহা হৌক, যাহাতে সাধারণ কয়েদীগণের মধ্যে এই প্রকার প্রতি বাদের ইচ্ছা প্রচার না হয়, তজ্জন্য জেলার আমাদের মধ্য হইতে বাছিয়া বাছিয়া চুয়াল্লিশজনকে স্বতন্ত্র একটী ওয়ার্ডে পৃথক করিয়া রাখিয়া কড়া পাহারার বন্দোবস্ত করিল। আমরা আমাদের অন্যান্য সকলের সঙ্গে মিশিতে পারিতাম না। আর যাহারা বাকী রহিলেন তাহাদিগকেও সাধারণ কয়েদীগণের সঙ্গে মিশিতে দিত না। তবে তাহারা পরস্পরের মধ্যে এক ওয়ার্ড হইতে অন্য ওয়ার্ডে যাইয়া মিশিতে পারিতেন। এইরূপ ব্যবহারের জন্য সকলেই বিরক্ত হইলাম। কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম, কিন্তু সুপারিনন্টেণ্ডেট কারণ বলিতে স্বীকৃত হইলেন না। আবার অসন্তোষের সৃষ্টি হইল। পৃথক করণের সময় হইতেই জেলার এবং তদীয় সহকারী, ল-এর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনরূপ গুরুতর অপরাধের প্রতিশোধ লইবার জন্য সচেষ্ট ছিল। ডাক্ওয়ার্থের নিকট আমাদের ঔদ্ধত্য, দুঃসাহস এবং দুষ্টামির সম্বন্ধে অনেক কথাই নিবেদন করিয়াছিল। বস্তুত আমাদের দারুণ দুঃখকষ্ট না দেখিলে বিধাতার সৃষ্ট এই অদ্ভুত জীব দুইটী বড়ই অশান্তিতে পড়িত। কতরকম ভয়প্রদর্শন করিল। • কতরকম গুরুতর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করাইয়া হাসিমুখে আমাদের নিকট উপস্থিত হইয়া সমবেদনার সুরে কত কথাই না বলিল! কিন্তু তাহাদের সহানুভূতি ১২৪ বন্দীর ডায়েরী এতটুকু ৱালকটী পৰ্য্যন্ত চাহেনা বলিয়া এবং ভয়দর্শনে তিলমাত্র বিচলিত হয় না দেখিয়া তাহাদের ঘাের অশান্তি হইত। আমাদের মুখে হাসি দেখিলে তাহাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইত, রহস্যটী বুঝিয়া, আমরা, কঠিন কঠিন শাস্তি পাইয়াও উহাদের সম্মুখে খুবই হাসিতাম। খুবই আমােদ করিতাম । দুষ্টেরা সাহেবকে নূতন পাইয়া, আমাদের বিরুদ্ধে খুব লাগাইল। তাহাদের নীচ উদ্দেশ্য কতকটা সিদ্ধ হইল; কারণ তিনি চটিলেন। বন্ধুগণের মধ্য হইতে আমাদিগকে অন্যত্র অপসারিত করাতেই সকলে অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। তাহার উপর, আবার উহার তিন চারদিন পরে ‘দুবৃত্তদিগের শাসনাকাঙ্ক্ষী মিঃ ডাক্ওয়ার্থ আমাদেব পাকশালায় গমন করিলেন। যাহারা তরকারী কুটিতে ব্যস্ত ছিলেন তাহাদিগকে ফাইল করিয়া দাড়াইবার জন্য আদেশ করিলেন। তাহারা দাড়াইলেন, কিন্তু ফাইল করিলেন না। এই অনাহূত হুকুমে সকলেই বিষম বিরক্ত হইলেন। তদনন্তর প্রতি ঘরে ঢুকিয়া দ্বারদেশ হইতেই ‘stand up stand up “দাড়াও” “দাড়াও’বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন। এইরূপ বিরক্তিকর অনাবশ্যক শৃঙ্খলা (discipline) বিস্তারের প্রচেষ্টায় অসন্তুষ্ট হইলেও সকলে তিনি নিকটবর্তী হইলে উঠিয়া দাড়াইলাম। মাত্র একজন দাড়াইলেন না। ইনি এইরূপ বলপূৰ্ব্বক ভদ্রতা আদায়ের প্রতিবাদ করিবার জন্য বসিয়াই রহিলেন। ডাক্ওয়ার্থ ক্ষেপিয়া গিয়া তাহার জন্য font fa pofys ( Three day's night-handcuff ) TTTE করিলেন। এই ব্যবস্থায় অসন্তোষের মাত্রা এতদুর চড়িয়া গেল যে, আর সমবেত প্রতিবাদ না করিয়া থাকা যুক্তিসঙ্গত নহে বলিয়াই স্থিরীকৃত সুতরাং পরদিন সুপারিনটেন্টে আসিলে আমার কেহই দাড়াইলাম না। তিনিও নিরতিশয় ক্রুদ্ধ ও অপমানিত হইয়া সােজ। বাঙ্গালায় প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানকালে এই বলিয়া ধমকাইয়া গেলেন, হইল।

পরিশিষ্ট All right I shall bring over the Magistrate here। এই ধমকে ক্ষুদ্র বালকটীর পর্যন্ত হাসিয়া শ্বাসরােধ হইবার উপক্রম হইয়াছিল। পরদিন যথা সময়ে হগ, সমভিব্যাহারে, ডাকওয়ার্থ প্রতিশােধ লইতে আসিলেন। পূর্বের ন্যায় না চটিয়া, হগ, মৃদু ভাষায় সকলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, যে, দাড়াইবে কিনা? কিন্তু এবার আর এবার আর সেলামের কথা উল্লেখ করিলেন না। সকলেই বসিয়া বসিয়া দৃঢ়স্বরে অস্বীকার করিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হগ এই উত্তরেও ক্ষেপিলেন না। সমস্ত ওয়ার্ড হইতে বাছিয়া বাছিয়া যােল জনকে লইয়া গেলেন। আমি এবারও বাছায় ধরা পড়িলাম। আফিসের নিকট আমাদিগকে দাঁড় করাইয়া রাখিয়া হগের সম্মুখেই ডাক্ওয়ার্থ বিচার করিলেন। বিচারের ফলে একটী দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের তিন দিন নির্জন ডিগ্রীবাস (solitary cell ), পাঁচ জনের প্রত্যহ আট ঘণ্টাকালব্যাপী দণ্ডায়মান অবস্থায় হাত কড়ি (standing hand-cuff , দুই জনের পেছন হাত কড়ি (Back hand cuff ), আর বাকী আট জনের ডাণ্ডাবেড়ি (Barfetters) ব্যবস্থা হইল। পরে শুনিয়াছিলাম যে standing hand cuff চার দিনের জন্য Back hand cuff এবং Barfetters সাত দিনের জন্য। হগের সঙ্গে শ্রীসুরেন্দ্রনাথ সিংহ বাদ প্রতিবাদও করিলেন। কোন কথা কহিবার পূর্বেই হগ, তাঁহার পানে তাকাইয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন-“Were you not punished on the last occasion ?” (গেলবার তোমার শাস্তি হয়েছিল না ?) তিনি তাহার দুরভিসন্ধি বুঝিয়া সগর্বে উত্তর করিয়াছিলেন,-“yes” (হ), তাহাকে একটুও দুঃখিত বা অনুতপ্ত না দেখিয়া বােধ হয় হগ, অন্য কথার অবতারণা করিলেন! তাঁহার সেদিনকার কথার সারমর্ম এই যে,আমরা সব সময়ই অন্যায় করিতেছি আর তঁাহারা আসিয়া উপস্থিত হইলেই আমাদের বন্দীর ডায়েরী পক্ষে দাঁড়ানটা নিয়ম। আমরা ডাক্ওয়ার্থের অবিচারের কথা পড়িলে নিরুত্তর রহিলেন। “বিচার কাৰ্য” শেষ করিয়া তাঁহারা প্রস্থান করিলেন। পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি এক সপ্তাহের জন্য পরিয়া সকলের সঙ্গে মহানন্দে লৌহ নিগড়ের সুললিত রুণুঝুনু রবে সমস্ত জেলটী মুখরিত করিয়া ওয়ার্ডে চলিয়া গেলাম। যাহারা এই নব বিধানের শাস্তিলাভে একেবারে বঞ্চিত হইলেন, তাহারা আমাদিগকে আমাদের অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের জন্য হিংসা করিতে লাগিলেন। সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক হিংসার পাত্র হইলেন পর্দুভায়া এবং শ্ৰীযুত সুরেন্দ্রনাথ সিংহ। বলা বাহুল্য পঙ্কুভীয়া-এবারও দণ্ড পাইলেন, তবে এবার সুরেনবাবুর ডাণ্ডাবেড়ি এবং তাহার দণ্ডায়মান হাতকড়ি। এই সময় সকলের মানসিক অবস্থা এতদূর বিকৃত হইয়া পড়িয়াছিল যে শাস্তি না পাইলে আর কেহই শান্তি পাইতেন না। আগেকার দিনের অবমাননার শাস্তি স্বরূপ আমরা সকলেই একমাসের জন্য পত্র লিখিতে ও পাইতে, এবং বাহিরের বন্ধুবান্ধবগণের সহিত সাক্ষাৎ (interview) করিতে বঞ্চিত হইলাম। এবং দিবসদ্বয়ের জন্য শাস্তির খাদ্য (Penal diet ) প্রদত্ত হইলাম। এই খাদ্যটী অত্যদ্ভুত রকমের একপ্রকার মাড়ােত (gruel) আস্ত চাউল গুড়া করিয়া এই অপূর্ব বস্তুটী আমাদের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল। কেহই এই মহাবস্তুর মূল্য বুঝিলাম না, সুতরাং দুই দিনের মধ্যে কেহ জল ব্যতীত কিছুই গলাধঃকরণ করিলাম না। কিন্তু কি আশ্চর্য্য। দ্বিতীয় দিবস আমাদের মধ্যে কেহ কেহ নাকি এই মহাবস্তুটীর স্বরূপ বুঝিবার মানসে একটু আস্বাদন করিয়াছিল এ কথাটী জেল কর্তৃপক্ষের প্রতিগাের্চর হওয়ায় বাবুচ্চিদিগের প্রমাদ উপস্থিত হইল। নিষ্ঠুর সহকারী জেলার রক্তজবার ন্যায় চক্ষুদ্বয় ঘূর্ণিত করিয়া বেচারীদের বহুতর শাসাইল “বলিল তােরা অবশ্যই লুকাইয়া স্বদেশী বাবুদিগকে মাড় ।

পরিশিষ্ট ১২৭ ভাতের পরিবর্তে আস্ত চাউলের ভাত দিয়াছি। তাহা না হইলে তাহারা খাইল কেন? তারা ত মাড়ভাত খায় না।” বাস্তবিক সাধারণ কয়েদী গুলির ব্যবহার অতিশয় সহানুভূতিপূর্ণ ছিল। তাহার হাতে পায়ে ধরিয়া কোন প্রকারে অব্যাহতি পাইল। এখানে একটা কথা নিতান্ত আবশ্যকবােধে লিখিতেছি। কয়েদীগণের অপূৰ্ব্ব সদ্ব্যবহার এবং অপ্রত্যাশিত সহানুভূতি পাইয়া আমরা বিস্ময় মানিয়া ছিলাম। তাহাদের সরল এবং সুমধুর ব্যবহার দেখিলে তাহারা যে চুরি জুয়াচুরি করিতে পারে এমনটী মনে হয় না। তবে অভাবের তাড়নায় মানুষ সব করিতে পারে। ইহারাও অভাবে পড়িয়া বাধ্য হইয়া চুরি করে। যাহারা শান্তি পাইয়াছিল, ডাক্ওয়ার্থ, তাহাদের জন্য Sp. Class dietই ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা মাড়ােত ব্যতীত আর কিছু পাইলাম না। এটা জেলারের কিরূপ ন্যায়পরতার পরিচয় বুঝিতে পারিলাম না। এইভাবে অনশনে আছি কিন্তু না সুপারিটেণ্ডেন্ট, না অন্য কেহ, আমাদিগকে একটু ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল। মাত্র জমাদার সিপাহী এবং সাধারণ কয়েদীগণ সময় সময় দুঃখ প্রকাশ করিয়া যাইত। আরও ২৩ দিন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে শাস্তি চলিতে লাগিল। হাতকড়ি এবং পা বেড়ীর অভাব হও শেষে যাহাদের শাস্তি হইল তাহাদের মধ্যে কাহাকেও বা তিন দিনের, আর কাহাকেও বা চার দিনের জন্য ডিগ্রী বাসের ব্যবস্থা করিল। কিন্তু চারিটী বালকের বােধ হয়, না দাড়াইফর জন্য, সর্বাপেক্ষা অধিক অপরাধ হইয়াছিল ; কারণ এই চারিটী বালককে এতটী স্বতন্ত্র ঘরে আবদ্ধ করিয়া রজনীতে হাতকড়ি দিয়া রাখিত। এই চারিজনের মধ্যে একটীকে, অন্য সময় মাত্র একখণ্ড পেন্সিলের জন্য এক সপ্তাহকাল চটের পােষাক পরাইয়া রাখিয়াছিল। চটের পােষাক পরিল, ;

১২৮ বন্দীর ডায়েরী -ঠিন। অনাহারে দীর্ঘ আটচল্লিশ ঘণ্টা কাটাইল আবার ঢেকি যত পাম্পেও কাজ করিল ! এ সকল শাস্তি কি বণ্ড দেয় নাই বলিয়া নাকি ? তখন পর্যন্তও কেহ উঠিয়া দাড়াই না বা কোন রকমে সম্মান প্রদর্শন করি না। ডাক্ওয়ার্থ বুঝিলেন শাস্তিতে আমাদের জব্দ করা সুতরাং তিনি শান্তি প্রদান বন্ধ করিয়া দিলেন, প্রতিদিন আসিয়া মাত্র ঘুরিয়া যাইতে লাগিলেন, আর আমরা? আমরা কখনও বা বসিয়া থাকিয়া কখনও বা শুইয়া থাকিয়া, আবার কখন কখনও বা মুখ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া তাহার নৈরাশ্যপূর্ণ মুখখানা দেখিতে লাগিলাম। এই ভাবে কয়েক দিন কাটিবার পর (অনুমান ৫৬ দিন পর আমাদের মধ্যে প্রায় সকলেরই ক্রোধের উপশম হইল। শুইয়া বা বসিয়া থাকিয়া একটী ভদ্রলােককে পুনঃ পুনঃ অবমাননা করিতে প্রাণে বড়ই বাজিতেছিল। কি উপায় বিধান করা যায় সকলেই চিন্তা করিতে লাগিলাম। জেলার এই সময় মধ্যে মধ্যে আমাদের ওয়ার্ডে আসিয়া আমাদিগকে, একটা নিষ্পত্তি করার জন্য, পরামর্শ দিতে লাগিল। অবশেষে একদিন স্থির করিলাম যে, আমাদের মধ্য হইতে প্রতিনিধি পাঠাইয়া ডাক্ওয়ার্থকে আমাদের বক্তব্য শুনাইব। শুনাইব যে, তিনি দুষ্টের কথায় অন্যায় পথে চলিতেছেন। চারি জন প্রতিনিধি প্রেরণ করা হইল। ইত্যবসরে আর একটী ঘটনা সংঘটিত হইল। যাহারা Special Class পনে নাই তাহাদিগকে সাধারণ কয়েদীগণের মধ্যে লইয়া যাইবার জন্য পৃথক করিয়া আবার কি ভাবিয়া স্ব স্ব ওয়ার্ডে রাখিয়া গেলেন। যেদিন ডাক্ওয়ার্থের সঙ্গে আমাদের দেখা হইবার কথা সে দিন আবার তাহা দিগকে পৃথক করিয়া লইল। পুনঃ পুনঃ এইরূপ অন্যায় ব্যবহারে উহারা চটিয়া গেলেন।

পরিশিষ্ট ১২৯ যাহা হউক আমরা নির্দিষ্ট দিবস ডাকওয়ার্থের সহিত সাগৎ. করিয়া সমস্ত বলিলাম। গর্বিত ইংরেজজাত সহসা কয়েদীগুলির নিকট কিরূপে অন্যায় স্বীকার করিবে? সুতরাং কিছুতেই তিনি অন্যায় স্বীকার করিলেন না। তবে মনে মনে যে, স্বীয় অন্যায়ের উপলব্ধি করিয়াছিলেন তাহাতে আর সন্দেহ নাই; কারণ পৃথক কারণের বাতিকটা তাহাতে আর দেখি নাই। কিন্তু কিছুদিন পরে, তিনি যে আর পৃথক করার ইচ্ছা রাখেন না এ কথাও কথা-প্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন। সেদিন উহাদিগকে ফিরিয়া ওয়ার্ডে যাইতে বলিলেন। আর সরকার’ ‘সেলাম’ বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তথাপি পূৰ্বাভ্যাসবশতঃ অনুগামী জমাদার মধ্যে মধ্যে সরকার’ শব্দটী উচ্চারণ করিত ; ‘সেলাম’ শব্দটী কখনও আমাদের ওয়ার্ড গুলিতে উচ্চারণ করে নাই, সাক্ষাৎ সময় ডাক্ওয়ার্থ এই সরকার’ শব্দটীর অর্থ করিলেন গভমেন্টের প্রতিনিধি। সুতরাং তাঁহার মতে এ শব্দটী তাঁহার আগমনজ্ঞাপক মাত্র; অতএব নির্দোষ, আমরাও আর ওদিকে ক্ৰক্ষেপ করিলাম না। ডাক্ওয়ার্থ শান্তির নিশ্বাস ছাড়িয়া বাঁচিলেন, আমরাও গােল নিষ্পত্তির পর নিরুদ্বেগ হইলাম। ডাকওয়ার্থ হিংসা এবং জব্দকরার প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করিয়া একেবারে রাতারাতি ভালমানুষটী হইয়া পড়িলেন—“Reformation like an angel came”—আমরা তাে দেখিয়াই অবাক। বােধ হয় উপর হইতে চাপ আসিয়াছিল । আমাদের খাওয়া-দাওয়ার কোন প্রকার অসুবিধা না জ্বর, এই, নিমিত্ত মাঝে মাঝে, তিনি স্বয়ং আহাৰ্য্য দ্রব্যাদি পরীক্ষা করিতেন। সাক্ষাতের পর হইতে, ফরিদপুর জেলে যতদিন ছিলাম, ততদিন, আমরা তাহার আর কোন প্রকার অন্যায় দেখি নাই। বরং ভদ্রতা এবং সদ্ব্যবহারেরই ছড়াছড়ি দেখিতে পাইতাম।

১০০ বন্দীর ডায়েরী মধ্যে মধ্যে জেলার এবং তাহার সহকারীর বর্বরতায় কিছু কিছু গােল বাঁধিবার উপক্রম হইত। কিন্তু সাহেবের সহানুভূতিপূর্ণ হস্তক্ষেপে সে সকল অন্তর্হিত হইত। শুধু তাহাই নহে, তিনি সময় সময় উহাদিগকে ধমকাইয়াও দিতেন। দীর্ঘকাল, প্রায় মাসাধিক, বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকায় সকলেরই বাহির হইয়া একটু মিশামিশির বাসনাটা প্রবল হইয়াছিল। কিন্তু কেহই বাহির হইতেন না। পঞ্চুভায়া একদা যেমন মুক্ত দরজার বাহিরে পা ফেলিয়াছেন, অমনি একটী রুদ্রমূৰ্ত্তি সিপাহী ( Arm police) কর্কশ ভাষায় তীব্র প্রতিবাদ করিল। পঞ্চভায়া বলিলেন যে সে জেলারের নিকট নালিশ করিতে পারে, তাহাকে কিছু বলিবার অধিকার সিপাহীর নাই। ভিতর হইতে মুন্সি (clerk) সিপাহীকে ডাকিয়া বলিল,-“কাণ ধরিয়া ফিরাইয়া আন। পঞ্চভায়া: মনে মনে খুব চটিয়াও non-violent থাকিলেন। সিপাহীর কথায় তিনি ফিরিয়া আসিলেন। পরদিন “তিলকে তাল করিয়া এই ব্যাপারটা সাহেবের নিকট উপস্থিত করিল। সাহেব সিপাহীকে মন্দ বলিয়া মুন্সিকেও ধমকাইয়া দিলেন। সিপাহীকে আমাদের ওখানে ভবিষ্যতে পাহারা দিতে বারণ করিয়া দিলেন। মুসলমান ভাইগণ রােজা উপলক্ষে রাত্রের আহারের সুব্যবস্থার জন্য (জেলার এবং সহকারীকে বলিতেন; কিন্তু তাহার সুব্যবস্থা করা দূরে থাকুক যাহাতে রােজা পালন না হয় তজ্জন্য চেষ্টা করিতেও টী করিত না। এখানে প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে, জেলার হিন্দু এবং তাহার সহকারী ও মুন্সি মুসলমান ধর্মাবলম্বী। জেলার হিন্দুগণের একাদশীর এবং অন্যান্য অবশ্য পালনীয় উপবাসের নিমিত্ত কোন প্রকার বন্দোবস্ত, নেহাৎ দায়ে না ঠেকিলে, করিতে রাজি হইত না, আর সহকারীও দায়ে পড়িলে রােজায় সম্মতি দিত না। যাহা হউক এই সম্পর্কীয় .

পরিশিষ্ট ঘটনা, একদা সাহেবের নিকট উপস্থিত করা হইলে, সাহেব খৃষ্টান হইয়াও হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিলেন। রোজা এবং একাদশীর শক্তদ্বয় মাথা নত করিল। যখন সুপারিনন্টেন্টে ডাক্ওয়ার্থের এবং আমাদের মধ্যে দাড়াইবার প্রশ্ন লইয়া একটা ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলিতেছিল, তখন একটা অদ্ভুত ঘটা ঘটিয়াছিল। একটী অষ্টাদশবর্ষীয় বালক, তদীয় জননীর স্বর্গারােহণ হবিষ্য করিয়া দিন কাটাইতেছিল। ঐ সময় শাস্তিস্বরূপ সকলের মাড় ভাতের ব্যবস্থা হইয়াছিল, সুতরাং মৃতমাতৃক বালককেও উহাই দেওয়া হইয়াছিল—খা বা না খা। এই সংবাদ শুনিয়া সকলেই অতিরিক্ত মাত্রায় উত্তেজিত হইয়া পড়িলাম। কিন্তু ডাক্তারবাবু তাহার জন্য দুধ পাঠাইয়া দেওয়ায় উত্তেজনা দূর হইয়াছিল। ফরিদপুর জেলে কয়েকটী হাস্যোদ্দীপক ঘটনা ঘটিয়াছিল। দুইটী নিয়ে বর্ননা করিব। একটী নৃপেন বাবুর এবং অন্তটী রাজেন বাবুর আমলের শেষ ভাগে ঘটিয়াছিল। ডেপুটী যামিনী রায় নৃপেন বাবুর স্থানে তাহার অবর্তমানে কাজ করিতেছিল। এই সময় যেদিন এম, এ, সি, শ্ৰীযুক্ত মৈত্র মহাশয় জেল পরিদর্শনে গিয়াছিলেন তাহার পূর্বে একটী বালককে ডাণ্ডাবেড়ী পরান হইয়াছিল, উক্ত দিবস ঐ বেড়ী মােচন করিবার তারিখ হইলেও মােচন করা হইয়াছিল না; কিন্তু এগার ঘটিকায় সময় যখন মৈত্র মহাশয় জেলে প্রবেশ করিলেন তৎক্ষণাৎ জেলার লােক পাঠাইয়া উহা খুলিয়া লইয়াছিল। অন্যটী রাজেন বাবুর সময় হইয়াছিল।, একদিন সন্ধ্যাকালীন আহারের পর, যখন দুইটী বন্ধু রাত্রের আবশ্যক জলের জন্য পুষ্করিণীতে গিয়াছিলেন, তখন হঠাৎ হাবিলদার আসিয়া তাহাদের ওয়ার্ড বন্ধ করিতে চাহে। যাহারা সেখানে ছিলেন তাঁহাদের আপত্তি সত্বেও ওয়ার্ড বন্ধ করিল, জল লইয়া প্রত্যাবর্তন করিলে হাবিলদার তাহাদিগকে ;

বন্দীর ডায়েরী ভিন্ন ওয়ার্ডে বন্ধ করিতে চাহে এবং বল প্রয়ােগ করিতেও টী করিবে না বলিয়া প্রকাশ করে। কিন্তু উহারা কিছুতেই যখন ভঙ্গীতে টলিলেন অগত্যা হাবিলদারজী, বলপ্রয়ােগের মানসে, বংশীধ্বনি করিতে লাগিল। আমরা তখনও আহার • সমাপ্ত করি নাই। কেহ বৃক্ষ শাখা, কেহ ফেইবার ছড়ি, কেহ হকি খেলিবার লাঠি এবং কেহবা রিক্ত হস্তে শ্লথ কটিবসন টানিতে টানিতে সিপাহীগণ দৌড়িয়া তাহাদের সেই “পাগলা ঘণ্টার” পাগলের নিকট গিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু পাগলের কথায় সিপাহীগণ কর্ণপাত না করিয়া জমাদারের আদেশে অকুস্থলের অদূরে দাড়াইয়া হাসিতে লাগিল। কেহ কেহ অনুচ্চ ভাষায় পাগলা হাবিলদারকে অভিধান বহিভূত শব্দে সম্বোধন করিল ! জমাদার উক্ত বন্ধুদ্বয়কে অনেক বিনয়ের পর মিষ্ট ভাষায় ঘরে প্রবেশ করাইতে চাহিল। তাঁহাদের ঘরে তাহারা প্রবেশ করিলেন, হাবিলদার বােকা সাজিয়া অন্যত্র চলিয়া গেল। তদবধি সকলেই তাহাকে “পাগলা ঘণ্টি” বলিয়া সম্বোধন করিতেন। এইরূপ আরও বহু মুদ্র বৃহৎ ঘটনা ঘটিয়াছিল, বাহুল্যভয়ে, সে সকল খিতে বিরত রহিলাম। ১৭ই এপ্রিল ভারিখ কলিকাতা যাত্রা করি। সেই দিন ডাক ওয়ার্থের ব্যবহারটা এতই মধুর এবং প্রাণ-স্পর্শী হইয়াছিল যে, তাহা প্রকাশ কার লােভ সামলাতে না পারিয়া লিখিলাম। আমার পূর্বাপর ধারণা ছিল, ইনি রাজ-কর্মচারী হইলেও লােকটা অতি সদাশয় এবং ন্যায়বান। বন্ধুগণের মধ্যে সকলে এই ধারণা সত্য বলিয়া তাহার কাৰ্যকলাপ লক্ষ্য করিয়া, বিশ্বাস করিতেন না। কিন্তু পরে ফরিদপুর জেল হইতে বিদায় গ্রহণ করিবার কিছু পূৰ্বেই এই বিশ্বাস ঘনাইয়া আসিতে ছিল। গতবারের তথাকথিত বিপ্লবের সময় রাজদ্রোহ অপরাধে কারাবাসকালে ইহাকে কিছু কিছু জানিতাম, তাই

পরিশিষ্ট
১৩
আমার ঐ প্রকার ধারণা জন্মিয়াছিল। কিন্তু এখন দেখিতাম সম্পূর্ণ
বিপরীত। যাহা হউক উক্ত দিবস পূর্বাহ্নে তিনি পরীক্ষা করিয়া
আমাদিগের টিকিটে, পথ চলায় সক্ষম (Fit to travel) লিখিয়া-
ছিলেন। পরে বুঝিলাম নিশ্চিতই অন্যত্র যাইতেছি। পরক্ষণে ওয়ার্ড
পরিদর্শনে আসিলে তাঁহার ও আমাদের মধ্যে এইরূপ কথােপকনি
হইয়াছিল :-
আমি—Most probably, we are going to part with
you. Shall we ?
তিনি-Yes.
yfa-But we are very sorry to leave you,
foa-Is it really so ? Are you really sorry at heart?
আমি—es.
তিনি—Then I am very glad. তারপর অনেক কথা হইল ;
প্রায় সকলেরই সঙ্গে করমর্দন করিলেন, উপদেশ বাক্যও অনেক
বলিলেন। গৃহান্তরে যাইবার সময়, প্রায় তিন পাে ঘণ্ট। আলাপের পর
19677,--Forgive and forget! Oh! I punished you so
much.
ytfay -- Yes; I also request you to forgive and
forget. Good-bye. Good bless you.
তিনি-(করমর্দনান্তর) Goodbye, God grant you long.life.
সিড়িতে এক পা ফেলিয়া একটু ফিরিয়া আবার আমার করনিপীড়ন
করিয়া সহাস্যে বলিলেন,—l again bid you goodbye. Be good
and do good. That's all.
STIFT -Goodbye.

১৩৪
বন্দীর ডায়েরী
রাত প্রায় নয় ঘটিকার সময় গাড়ীর মধ্যে বসিয়া হাতকড়ীর অসুবিধা
অনুভব করিতে করিতে সকলে নানাবিষয় আলােচনা করিতেছি, এমন
সময়, গাড়ীর জানালায়
অকস্মাৎ
ডাক্ওয়ার্থের হাস্যোৎফুল্ল
সুন্দর মুখখানি দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইলাম। যেন কত কৃতজ্ঞতা
পাশে তাহার নিকট আবদ্ধ হইয়া পড়িলাম। আমাদের সঙ্গে শেষ দেখা
করিতে, তিনি দ্বিচক্রযানে নৈশ অন্ধকারের প্রতি দৃকপাত না করিয়া,
ষ্টেশনে আসিয়াছিলেন। পূৰ্ব্ববৎ অনেক কথাবার্তার পর তিনি আনন্দ
প্রকাশ করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন। গাড়ী ছাড়িয়া দিল ; সকলেই
বহুক্ষণ ধরিয়া এই সদাশয় বিদেশীটীর কথা আলােচনা করিতে লাগিলাম ;
তিনি আনন্দিত, কারণ, তাঁহাকে ছাড়িয়া যাইতে, আমরা “really
sorry!"
প্রিন্টার-শ্ৰীশশিভূষণ পা গ
মেকা প্রেস।
৭৯নং বলরাম দে স্ট্রীট, কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bandir Dairy

Author
Sarkar, Hemantakumar
Title
Bandir Dairy
File name
Bandir Dairy
Text
OCR done
Citation
1922
Published
2010/02/20
Publisher
Sri Fulendranath Chacraborty , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
156
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Biography
Keywords
Sarkar, Hemantakumar
DLI number
510875
Barcode
4990010018075.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
1iLy7jSY8DO
Download PDF

Bandir Dairy