Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pathan-gaurab Kabya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পাঠান-গৌৱব
শ্রীসেঞ্জীব চৌধুরী এম-এ,
ইংরেজী ভাষার অধ্যাপক নেপাল ; ভূতপূর্ব অধ্যাপক-আনন্দমােহন কলেজ,
ময়মনসিংহ ; প্রভাতকুমার কলেজ-কন্টাই ; ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সিটী লাইব্রেরী—ঢাকা
এক টাকা
অগ্রহায়ণ-১৩৪৫
প্রিন্টার--শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য্য
ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্ক
২০৩১১,কর্ণওয়ালিস টু, কলিকাতা
উৎসর্গ
আমার আদরের কন্যা নমিতা
রাণীর স্মৃতিকল্পে উৎসর্গীকৃত হইল
No text on this page.
পাঠান-গৌরব
প্রথম সর্গ
দিল্লীর প্রাসাদে আজি আনন্দ অপার,
বিজয়ের জয়ডঙ্কা বাজিছে সতত ;
দুর্জয় পাঠান সেনা সদা রণজয়ী
জিনি রাজপুতনার মহারাজগণে
করি বন্দী লক্ষ সেনা, শত সেনাপতি
ফিরিছে নগরে আজি ; মহানগরীর
প্রতি গৃহে প্রতি কক্ষে দিব্য আলােকের
মনােরম জ্যোতিচ্ছটা! বিজয়ী পাঠান
মহােম্মদে মত্ত সবে কঁপাইছে ধরা।
কোথা রাজকক্ষে নাচে দিব্য রমণীর
রমণীয় কেশরাশি, সুমধুর স্বনে
কোথা বা প্রাসাদ কক্ষ পূর্ণ মুখরিত ।
.
পাঠান-গৌরব
কোথা বা সম্রাট-সেনা ফিরিছে নগরে
আল্লাহ আর রবে, কোথা মজিদে
তুলিছে সহস্র সেনা আকাশের পানে
বিজয় গৌরবরবে উপাসনা সুর
ভক্তিভরা প্রীতিভরা মনঃপ্রাণ-হরা !
নগরীর কেন্দ্রস্থলে সুরম্য প্রাসাদ ;
শত জয়ধ্বনি, শত আনন্দকল্লোলে
উপবিষ্ট দিল্লীশ্বর নাছিরউদ্দিন
সগৌরবে সিংহাসনে সভাকক্ষে সেথা।
সম্মুখে রণবিজয়ী সেনাপতিগণ ;
আনন্দের পূর্ণ জ্যোতি খেলিছে সবার
উজল আনন’পরে। পুলকে সভায়
আলিঙ্গিছে রণজয়ী সেনাপতিগণে
সেনাপতি বলব; সদা মহারথী
অজেয় রণকৌশলে। দীর্ঘ শ্মশ্রু তার
দুলিতেছে বক্ষোপরে, পক্ককেশচয়
সুবৰ্ণ টোপরে ঢাকা, সুদৃঢ় শরীর
শাৰ্দল শরীর যথা কঁপে ঘন ঘন
শকতির মহাতেজে ; আঁখিদ্বয় হতে
অবিরত ঝরে তেজ, মধ্যাহ্ন গগনে
তপ্ত তপনের তীব্র রশ্মিজাল প্রায়।
প্রথম সর্গ
পিতৃপার্শ্বে দাড়াইয়া বঙ্গের ঈশ্বর
ধৰ্ম্মপ্রাণ মহামতি তনয় বুগরা ;
নাতিবৃদ্ধ নাতিযু, খ্যাত বীর বলি
পাঠান সেনানী মাঝে। পার্শ্বে তার পুনঃ
যুবক কায়কুবাদ বুগরা-তনয়
যৌবনের মদে মত্ত ; অদূরে তাহার
যুক্ত করে দাড়াইয়া সেনাপতিদ্বয়
বিনায়েৎ মহবৎ। পূর্ণ সমাঝে
শুভ্র চন্দ্রাতপ তলে দিল্লী প্রাসাদের
গর্জিলা অশনিনাদে মহারণজয়ী
সেনাপতি বলব। বিজয়-সন্ধ্যায়
কহিলা সুদৃঢ়
কণ্ঠে চাহি সভাপানে,
“ধন্য মুসলমান, ধন্য বিজয়ী পাঠান,
ধন্য দাসরাজ বংশ; ধন্য জাহাপনা
ভারত-বিজয়ী, ধন্য দিল্লীর ঈশ্বর।
বদ্ধ আজি জাঁহাপনা রাজ কারাগারে
রাজপুতনার যত মহারথিগণ।
মহাবীর সবে তারা, সুনিপুণ অতি
জটিল রণ কৌশলে ; শুধু নাহি মানে
একতার মহাশক্তি। বলে হিন্দু বলি
হিন্দুস্থানে আপনারে, কিন্তু ভুলে যায়
সংহতির শক্তি কথা ক্ষুদ্র স্বার্থ বশে।
পাঠান-গৌরব
৪
বিলুপ্ত ভারতে আজি শকতি হিন্দুর,
ইসলাম গৌরব রবি উদিছে আকাশে।
ছিন্ন ভিন্ন করি ক্লিষ্ট হিন্দুর সমাজে
ঐক্যহীন শক্তিহীন, বসাইব হেথা
ইসলামের মহাস্তম্ভ, হিন্দুর শােণিতে
ভাসাইয়া হিন্দুস্থান, হিন্দুর মন্দির,
দুষ্ট মূর্তি আরাধনে, প্রােথিব হেথায়
ইসলাম গৌরবস্তম্ভ ; হিন্দুর শ্মশানে
জ্বালাইব দিব্য-আলাে নব ধরমের।
দেহ অনুমতি আজি, ওহে দিল্লীশ্বর।
বিজয় গৌরবে দীপ্ত পাঠান শকতি
এ আদেশ তব কাছে মাগে শুভক্ষণে।”
থামিলেন সেনাপতি ; সৰ্ব্ব সভাজন
চমকিল শুনি হেন অসম্ভব বাণী,
চমকে পথিক যথা অকস্মাৎ শুনি
পথমাঝে বিভীষণ ধ্বনি অশনির।
কহিলা নাছিরুদ্দিন বৃদ্ধ নরপতি
ধৰ্ম্মমতি, চাহি নিজ সেনাপতি পানে,
“সত্য যা কহিলে তুমি সেনাপতির ;
ইলাম গৌরব রবি উদিছে আকাশে;
ভীষণ মরুর দীপ্ত অগ্নিজাল মাঝে
প্রথম সর্গ
প্রস্ফুটিল সগৌরবে যেই দিব্য ফুল,
আজি বিস্তারিছে তার অপূর্ব সৌরভ
সমগ্র জগতময় ; আজি ধরাতল
মুগ্ধ গন্ধে তার। কিন্তু রক্ত-সরােবরে
ফুটিবে কি ধৰ্ম্মশতদল ; পদ্মপত্রে
স্থির জলবিম্ব কভু ; কিম্বা মলময়
ঘৃণিত কর্দম জলে ফুটিবে কি কভু
প্রতিবিম্ব ? নাহি হেন বিশ্বাস আমার।
ধৰ্ম্মেতে ধার্মিক হােক মুসলমানগণ
এ বিশাল হিন্দুস্থানে, এ আকাঙ্ক্ষা মম।
দৃষ্টান্তে ধৰ্ম্মের স্রোত বহে সুবিমল ;
নহে রক্তে, নহে বলে, নহে ত কৌশলে।
বিজ্ঞ তুমি, বুঝি হলে মত্ত রণজয়ে,
তাই ধৰ্ম্মতত্ত্ব কথা মিশাইছ হেলে
ধরণীর ক্ষণস্থায়ী রাজনীতি সনে।
বহিছে হিন্দুর গঙ্গা হিন্দুস্থানময়,
পার্শ্বে তার সিন্ধু হেন চলিবে বহিয়া
ইসলামের পুণ্যস্রোত, পবিত্রিবে দোহে
এ মহাভারত ক্ষেত্র। নহে মতি মম
আরােধি সে গঙ্গাস্রোতে, বিচ্ছেদি তাহারে
বহাইতে নব নদী; মানি অসম্ভব
হেন চেষ্টা এ বিশাল হিন্দুস্থান মাঝে!”
পাঠান-গৌরব
৬
রাজবাক্যে আশ্বাসিত উল্লসিত অতি
বলব-তনয় বীর বুগরা সুমতি।
কহিলা বিনীত কণ্ঠে পিতৃপানে চাহি
“নহে পিতঃ ! এই পথ ধৰ্ম প্রতিষ্ঠার,
ধৰ্ম্মের সম্বন্ধ নাহি রাজনীতি সনে;
আছে যা সে প্রাণে প্রাণে ; শুদ্ধ ধৰ্ম্মস্রোত
ফন্তু হেন পবিত্তিয়া মনবুদ্ধি সবে
ক্রমশঃ প্রকাশে নিজে ধরাতল পরে
অপরূপ স্নিগ্ধ রূপে ; দিব্য শক্তি তার ;
রাজনীতি, জ্ঞাননীতি, নীতি সমাজের
সবারে আপন করে ; আপনার ছাঁচে
সবারে গড়িয়া করে মূর্তি মনােহর
শুভময়ী শান্তিময়ী। সে মধু মূরতি
প্ত করে ভেদজ্ঞান ; পরশণে তার
ভুলে যায় ধরাতলে মানবের মন
ক্ষুদ্র ভেদনীতি, ক্ষুদ্র স্বার্থ অন্ধকার।
তবে কেন নরহত্যা নরের সমাজে ;
কেন মিছা আকাক্ষার মরীচিকা মােহে
ভাসাব নরের রক্তে নরের মেদিনী?
কেন সৃজি ধৰ্ম্মনামে মহা হাহাকার
অত্যাচার উৎপীড়ন, কেন বা সজোরে
দহি এক ধর্মে হেথা চাহি বইতে
প্রথম সর্গ
দগ্ধ তার ভস্ম’পরে ধর্মস্রোত আর ?
এ নহে বিধাতৃ ইচ্ছা, এ নহে কখনও
স্রষ্টার সৃষ্টির নীতি।
এ শুধু মােহের
আপাতমধুর মূর্তি, অপ্রমিত বলে
আক্রমিছে রণজয়ী পাঠান সমাজে।
হব সাবধান মােরা, নহে এই মােহ
বিনাশিবে দাসবংশে, পারে বিনাশিতে
সমগ্র ইসলাম শক্তি ভারত মাঝারে।
শত্ৰু চারিদিকে আজি। দুর্জয় মােগল
গর্জিছে ভীষণ রবে পশ্চিম সীমায়।
কতবার মােগলের প্রবল পীড়নে
শূন্য হ’ল রাজকোষ ; কতবার প্রজা
করুণ ক্রন্দনাকুল, আসিয়াছে হেথা,
সম্রাটের সন্নিধানে আশ্রয় পিয়াসে।
হােথা রাজপুত-শ্রেষ্ঠ মেওয়াত মালােয়া
অতর্কিতে আহরিছে শকতি মহান্
রােধিতে পাঠান শক্তি হিন্দুস্থান মাঝে ;
এ নহে সময় কভু ইলাম স্থাপনে
অসিমুখে, আজি মম এ যুক্তি সম্রাট।”
স্নিগ্ধ বারিস্রোত যথা বসন্ত সময়ে
পূরিয়া মধুর নাদে নদীর দুকূল
পাঠান-গৌরব
মধুর নিঃস্বনে পশে কল কল রবে
শান্ত সাগরের বুকে, তথা বুগরার
কোমল মধুর বাণী পশিল হৃদয়ে
মহাপ্রাণ সম্রাটের ; সেনাপতিগণ
মুগ্ধ ক্ষণেকের তরে ; মুসলিম তিলক
হয়ে বিজয়ােন্মত্ত ধৰ্ম্মনীতি কথা
স্থির অচঞ্চল স্বরে পূর্ণ সভা মাঝে
কহিল কোমল কণ্ঠে ; দ্রবিল সবার
ক্ষণতরে প্রাণ সেথা; শুধু সিংহ হেন
গর্জিয়া উঠিল পুনঃ মুখ্য সেনাপতি
কঁপে থথরি
চাহি বুগরার পানে ; আঁখি দু’টি হতে
দ্রুত ক্রোধ-রশ্মিজাল বাহিরিল ঘন
রম্য চন্দ্রাতপ তলে পূর্ণ সমাঝে।
রণজয়ী বলবত্ ;
==
কহিলা সম্বােধি পুত্রে তেজস্বী জনক :-
“কি কহিস্ রে বুগরা! ধৰ্ম্ম তুই শুধু
জানিস্ এ ধরামাঝে! সেনাপতি হয়ে
ফকির সাজিলি বুঝি! ধিক্ রে জীবনে।
তাের শুধু বিশ্বপ্রেম, আর কেহ কোথা
নাহি ভাবে ধরণীর মঙ্গলের কথা !
ধিক্! ধিক্ ! বৃথা তুই হলি সেনাপতি।
প্রথম সর্গ
বৃথা মুসলমান জন্ম হেন শ্লাঘ্য কুলে।
ধৰ্ম্ম মাের মহারণ, গতি তার কোথা
নাহি জানি, জানিবার নাহি প্রয়ােজন ।
আর মুসলিম আমি, কোটি মুসলমান
চাহি এ ভারত ভূমে ; না জানি কখন
কোথা শুকাইবে নদী, কোথা বা পর্বত
লুটিবে মুসলিম বলে ধরণীর বুকে।
জানি বহিবে কবে শােণিতের স্রোত
ধৰ্ম্মতরে হিন্দুস্থানে। আর জাঁহাপনা!
চাহে নিবেদিতে দাস শুধু এক কথা
দিল্লীশ্বর পদযুগে ; দৃষ্টান্ত কখনাে
পশি ধরাময় সৰ্ব্ব নরের অন্তরে
এক ধর্মে দীক্ষিবারে না ধরে শকতি।
নাহি ইতিহাসে কোথা এ হেন বারতা,
নাহি ধর্ম গ্রন্থ মাঝে ; তাই এ বাসনা
মহাযুদ্ধে যত হিন্দু করি পরাজয়
ধরিব হিন্দুর চক্ষে পবিত্র কোরাণ
বরিতে ইস্লাম ধর্মে ; না বরে সে যদি
দক্ষিণ করের এই মহা অস্ত্র ল’য়ে
নিপাতিব মহাশত্রু হেথা মুসলিমের।”
কহিতে কহিতে কাপে তীব্র বীরদাপে
সেনাপতি বলব ; হয়ে আত্মহারা
;
পাঠান-গৌরব
হানে অসি তীব্র বেগে ধরণী উপরে।
দীপ্ত সেনাপতি-মুখ জ্বলন্ত অঙ্গার !
বিনায়েৎ মহবৎ সেনাপতিদ্বয়
হেরি বর্বনের মুখ সমর্থিল তায় ;
যুবক কায়কুবাদ ত্যজিয়া আসন
সমর্থিল পিতামহে সাধুবাদ দিয়া।
অকস্মাৎ হল ধ্বনি “আল্লা হাে আর” ;
অকস্মাৎ শত শব্দে উঠিল কঁপিয়া
নগরীর যত কক্ষ ; ঘন মহারবে
কঁপে পূর্ণ সভাস্থল ভূকম্পনে যথা।
চমকিল সভাজন, চমকে সম্রাট,
শুনি অকস্মাৎ সেথা হেন মহাধ্বনি।
নিমেষে কক্ষের দ্বারে প্রবেশিল সেথা
নগরীর রক্ষিগণ, সঙ্গে বদ্ধকর
দীন ফকিরের বেশে বন্দী একজন।
অচঞ্চল আঁখি তার স্নিগ্ধতায় ভরা ;
অঙ্গকান্তি মনােহর স্বর্ণকান্তি হেন ;
পাদুকা বিহীন পদ ; স্বর্ণ দেহ পরে
দুলিতেছে শুভ্রবস্ত্র, পূর্ণিমার রাতে
দুলে যথা মেঘজাল গগনের বুকে
আবরিয়া পূর্ণ চন্দ্র। হেরিল সম্রাট
মেঘাবৃত সুধাকরে; শুধাইলা তারে
১১
প্রথম সর্গ
“কে তুমি কেন বা হেথা ঘুরিছ গােপনে
পাঠানের রাজ্য-কেন্দ্রে ! জান না কি তুমি
পাঠানের রক্ষিগণে,—অব্যর্থ যাহারা
শত্রুর সন্ধানে নিত্য মম রাজ্য মাঝে ?
কেন সঙ্গীহীন হেথা ফকিরের বেশে
সঙ্গোপনে প্রবেশিলে দিল্লীর সীমায় ?
কহ সত্য ; মুক্ত তুমি, সত্য কহ যদি
এই রাজ সভামাঝে ; নহে সুনিশ্চয়
মৃত্যু তব ; জেনাে বাণী পাঠান-রাজের।”
বন্দীরে পশ্চাৎ করি এল আগুসরি
রক্ষীর নায়ক বর, কহে করযােড়ে
চাহি সম্রাটের পানে মহাসভা মাঝে-
“জাহাপনা ! এল হেথা ফকিরের বেশে
দুষ্ট এই গুপ্তচর, ফিরে দ্বারে দ্বারে
ভিক্ষা মাগি ; আর হেরে নগরীর মাঝে
সৰ্বস্থান ছদ্মবেশে। কেল্লার সমীপে
রাজরক্ষী দেখি এই ছদ্মবেশী জনে
দিল আমাদের করে ; বদ্ধ করি হেথা
তাই আনিয়াছি মােরা সম্রাট সমীপে।
অনুমতি মত কাৰ্য সাধিব সকলে।”
গরজিলা সেনাপতি বলব বলী
মত্ত করিবযথা করি-যুথ মাঝে :
পাঠান-গৌরব
১২
“লহ কারাগারে এই ছদ্মবেশী জনে ;
হবে স্থির গুপ্তচর, নহে হেন বেশে
কেন প্রবেশিবে হেথা কেল্লার সীমায়
জয় কোলাহল মাঝে, আত্মহারা যবে
বিজয় গৌরবােন্মত্ত পাঠানের সেনা।
জাহাপনা, শুনিয়াছি মােগলের সেনা
পুনঃ আসিয়াছে হােথা সীমান্তের পথে ;
হেরি ব্যস্ত হেথা রণে পাঠান সেনানী
আবার নেমেছে সেথা পাৰ্বত্য-মূষিক
ক্ষুদ্র খাইবার পথে, চাহে করিবারে
পরাভব পাঠানের গৌরব ভারতে।”
নিস্তব্ধ সে দীন বেশী ফকির প্রবর ;
হেরিলা তাহার পানে ফিরাইয়া আঁখি
দিল্লীর ঈশ্বর পুনঃ ; কহিলা সম্বােধি,
“কহ পরিচয় তব ওহে গুপ্তচর।
কহ সত্য, দিমু আমি অভয় তােমায়।”
সম্রাট, আদেশে সেথা সরি গেল দূরে
নেতাগণ, মুক্ত হল সেথা
মেঘ হ’তে সুধাকর ; রাজসভা মাঝে
কহিলা ফকিরবর রাজ-পানে চাহি,
“জন্ম মম কান্দাহারে আফগান দেশে
জাহাপনা! শুনিয়াছি জ্ঞাতিগণ মুখে,
যত রক্ষী
প্রথম সর্গ
•
প্রবল বিদ্রোহে পিতা লইলা আশ্রয়
জননীর সহ দূরে পৰ্বত গহ্বরে।
সেথা ঘাের ঝামাঝে কোন নিশাকালে
পর্বত ছায়ায় কোন বনানী মাঝারে
প্রসবে জননী মােরে ; জনক জননী
নিশীথে সন্তান বুকে ফিরে অন্ধপ্রায়
সূচী-ভেদ্য অন্ধকারে, রক্ষিতে জীবন
প্রবল বিদ্রোহী হতে-জননীর বুকে
সদ্যসুত হতভাগ্য কম্পিত তনয়।
দৈবে ব্যাঘ্র মুখে পড়ি হারায় জীবন
জনক জননী দোহে ; প্রভাতে জঙ্গলে
শুষ্ক সিক্ত বাত্যাক্লিষ্ট পত্রের শয়নে
পেল সেথা অর্ধমৃত অধম বালকে
কোন রাখালের দল ; রাখাল-রমণী
পালে মােরে কান্দাহারে এই পরিচয়।”
বসন্ত শিশির যথা অতি ধীরে ধীরে
পড়ে স্নিগ্ধ তৃণ-শিরে উষার আলােকে,
অমৃত কণায় তােযে নবীন মুকুরে
নবীন প্রান্তর বকে, তথা সমাঝে
ঝরিল
মধুর
বাণী কান্দাহার-মণি
রহিমের মুখ হতে, তুষিল সবায়।
পাঠান-গৌরব
১৪
মুগ্ধ রাজা, মুগ্ধ রক্ষী, মুগ্ধ সভাজন ;
সবে চাহে এক দৃষ্টে আগন্তুক পানে,
অমৃতের ধারা হেন বদনে যাহার
ক্ষরিল অদ্ভুত বাণী।
বাণী। শুধাল সহসা
সেনাপতি বলব, ভাঙ্গি নীরবতা
ক্ষণিকের, সভামাঝে সুগম্ভীর স্বরে !
“নাহি মাগে তব কাছে জন্ম-কথা আজি
পাঠানের অধীশ্বর। জিজ্ঞাসে সম্রাট
বিজয় মদিরামত্ত রাজ-সৈন্য মাঝে,
কে তুমি পশ্চিলে আসি ? কেন অতর্কিতে
রাজ্য বার্তা তরে ফির নগর ভিতরে ?
কহ সত্য, নহে মৃত্যু জেনাে সুনিশ্চয় ;
মায়াবী রাজার চর কত আসি ঘুরে
পাঠানের এ নগরে; কিন্তু নাহি হেরি
তােমা হেন ছদ্মবেশী কভু এ জীবনে।”
নিস্তব্ধ ফকির-বর ; বলব বাণী
পশেও পশেনা তার শ্রবণ বিবরে।
বাত্যা হেন বৈশাখের বহি গেল বেগে
মন্ত্রীর কঠোর বাণী ; কুটীর আশ্রয়ী
পান্থ হেন সয়ে নিল সে বাত্যার বেগ
কান্দাহার-মণি-বর। শুধু আঁখি দুটি
স্থির দৃষ্টে নিরখিল দিল্লীশ্বর পানে,
;
;
প্রথম সর্গ
৩
তৃষ্ণায় চাতক যথা কাতর নয়নে
নিরখে আকাশ’পরে সলিল-প্রবাহী
শান্ত জলদের মালা শান্তির পিয়াসে।
পুনশ্চ শুধিলা তারে দিল্লীর ঈশ্বর
সম্রাট নাছিরুদ্দিন দাস-কুলমণি।
“দেহ পরিচয় তব ওহে পরদেশী ।
কে তুমি, কেন বা হেথা দুর্গের সীমায়
পশিলে ফকির বেশে; কিবা আকাঙক্ষায়
চাহ মম রাজ্য বার্তা ; দুর্দম মােগল
জানে কি খবর মম সন্ধানে তােমার ?
কিম্বা তুমি মহাশ মালােয়ার চর
কিম্বা চর মেওয়াতের! মুসলমান বেশে
ঘুরিছ জানিতে বার্তা দুয়ারে দুয়ারে
মাগি ভিক্ষা যথা তথা পুরবাসী কাছে।
কহ সত্য, নাহি ভয়, দাস রাজগণ
অন্যায়ে করে না কারো জীবন হরণ।
সে নহে মুসলিম ধৰ্ম্ম, দুর্বলের বল
সতত পাঠানগণ।
আরব মরুতে
মানব-হৃদয়-মরু ঘাের পিপাসায়
করে যবে আর্তনাদ, ঘন হাহাকার,
তখন স্রষ্টার দূত স্বরগ হইতে
এল নামি, দিতে সুধা পিপাসিত নরে।
১৬
পাঠান-গৌরব
আমি মুসলমান দূত! সে শান্তি পিয়াসী,
নাহি অন্যায়ের ভয় মাের কাছে তব।”
কহিলা ফকির-বর দিল্লীর সম্রাটে
উজল আননে ধীরে,
বাণী
সুমধুরে,
কহে যথা শীত-শেষে নূতন কোকিল
বসন্তের আগমনী, কিম্বা নিশাশেষে
মধুর উযার বাৰ্তা কনক শিশির।
শুভ্র দেহ-কান্তি তার, জীর্ণ বস্ত্র ভেদি
ঝলকে ঝলকে ঝরে দিব্য তেজমালা :
“রহিম আমার নাম, জাতি মুসলমান,
ছিনু রাখালের দলে বিংশতি বৎসর
পৰ্বতে পৰ্বতে দূরে আফগান দেশে
চরাইয়া মেষপাল ; একদা বিজনে
সান্ধ্য অন্ধকারে হরে মেষশিশু মাের
দুরন্ত শাৰ্দল এক ; ধাইনু ছুটিয়া
ব্যাঘ্র প্রতি দিশাহারা, ধরিতে আপন
নিঃসহায় মেষশিশু ; হারাইনু পথ
বিজন কান্তারে সেথা সন্ধ্যার আঁধারে।
ক্লান্ত ক্ষুধাক্লিষ্ট দেহে লই আশ্রয়
কোথা তরুতলে ; সেথা নিশা আগমনে
গরজে ভীষণরবে বন্য পশুদল ;
ক্লান্তদেহে না ভাবি বিপদ আপন।
১৭
প্রথম সর্গ
হেলায় আইল নিদ্রা, হেরিনু স্বপনে
সিংহ ব্যাঘ্র বরাহের মহাচক্র মাঝে
রয়েছি শুইয়া আমি, শুধু শিরে মম
রাখিছে আপন হস্ত স্বর্গ-জ্যোৎস্না মাখা
কোন স্বরগের দূত ;
কম্পিত হৃদয়ে
শঙ্কিত হইয়া চাহি কাতর নয়নে
সেই স্বর্গ দূত পানে। কহে দূত সেথা
সে গহন বনে, সেই মহাচক্র মাঝে
অমৃত-মধুর সুরে আশ্বাসিয়া মােরে ।
“নাহি ভয়, নাহি ভয়, ওহে মুসলমান্।
যাও পাঠানের দেশে ; কহ দিল্লীশ্বরে
জলদগম্ভীর স্বরে সম্ভাষিয়া ধীরে,
“হও মুসলমান, রাজা! হও মুসলমান্!”
প্রভাতে স্বপ্নের শেষে হেরিনু নয়নে
ভীষণ সে পশুগণে ; একে একে তারা
সম্ভমে ফিরিয়া গেল, স্পর্শিল না মােরে।
শুনি সেই স্বপ্নবাণী স্বরগ দূতের
দিশাহারা, পথহারা, ক্ষুধাতৃষ্ণাহারা
ছুটি হিন্দুস্থান পানে। কত কাল গেল
নাহি জানি, কিম্বা কোথা চলি কোন পথে।
নাহি জানি রাজদুর্গ, না জানি প্রাসাদ,
জানি কে রাজরক্ষী, কেবা সেনাপতি,
২
পাঠান-গৌরব
কোথা পুরবাসী আর, কোথা পুর-দ্বার।
চাহি আমি দিল্লীশ্বর নাছির-উদ্দিনে,
চাহি শুনাইতে তারে স্বপন-বারতা
“হও মুসলমান রাজা! হও মুসলমান।”
তীব্ৰস্বরে বাহিরিল কণ্ঠে রহিমের
স্বরগের পুণ্যাদেশ; স্তব্ধ সভাস্থল,
স্তব্ধ চন্দ্রাতপতলে সৰ্ব্ব সভাজন
দীপ্ত সেই গরজনে। মুগ্ধ ক্ষণতরে
রক্ষী সেনাপতি সহ দিল্লীর ঈশ্বর।
কি যেন আহ্বান আসি দূর স্বরগের
পশিল সবার হৃদে, কি যেন আলােক
আবরিল সবাকার হৃদয় আকাশে।
গর্জে সবে সমকণ্ঠে কক্ষে প্রাসাদের
“হও মুসলমান সবে, হও মুসলমান”।
মিশাইল সেই সুরে আপনার সুর
বুগরা কায়কুবাদ ; মিশাইল সুর
মহবৎ বিনায়েৎ রক্ষিগণ বে;
মিশিল সম্রাট কণ্ঠ সে মহা গর্জনে।
হল প্রতিধ্বনি কক্ষে, কপিল প্রাসাদ,
ফিরাইয়া সেই সুর সেই শুভক্ষণে।
স্থির শুধু বলব; রক্তবর্ণ আঁখি
ঘুরিছে কোটরে দ্রুত, মহাচক্র যথা
১১
প্রথম সর্গ
যন্ত্রের তীব্র চালনে ; কিম্বা পত্ৰচয়
ঘুরে যথা ঘূর্ণীবেগে আকাশের পথে।
স্থিরকণ্ঠে কহে বীর সম্রাটের প্রতি ;
“অবাক্ হইনু আজি, দিল্লীর ঈশ্বর ।
গুপ্তচর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া যবে
গরজে রাজার সুর, বুঝিব নিশ্চয়
ঘাের অমঙ্গল হবে সৰ্ব্ব রাজ্যময়।
ঘৃণ্য অতি গুপ্তচর, গােপন আঁধারে
পাতে অভিসন্ধিজাল স্বার্থসিদ্ধি আশে।”
কহিতে কহিতে কথা কঁপে থরূথরি
সেনাপতি বঙ্গবন্ ;
নমি রাজপানে
বাহিরিল ত্যজি সভা, মৃগরাজ যথা
ছাড়িয়া দুর্বল মৃগে অরণ্য মাঝারে
ঘৃণায় ফিরিয়া চলে আপন গহবরে
বিজন মরুর বুকে, দীপ্ত অভিমানে।
বীরদর্পে গেল চলি ত্যজি সভাস্থল
সেনাপতি
বলবন্ ;
কহিলা সম্রাট
চাহিয়া রহিম পানে, “ধন্য আজি মাের
রাজসভা, ধন্য আমি, ধন্য এ নগরী ;
পবিত্র সকল আজি তব পদরজে ;
নহ তুমি গুপ্তচর ; কোন দেবদূত
পবিত্র ইসলাম-পথে চালাতে আমায়
পাঠান-গৌরব
২০
;
আসিয়াছ হেথা নামি ; রুম দোষ মম,
গুপ্তচর বলি তােমা সম্বােধিনু আমি।
ক্ষম বৃদ্ধ বলবনে, দন্তী সেনাপতি
নিন্দিল সন্দেহে তােমা গুপ্তচর বলি।”
কহিতে কহিতে হ’ল সেথা নতজানু
সম্রাট নাছিরুদ্দিন ; ত্যজি সিংহাসন,
মাগে ক্ষমা রহিমের পদে করযােড়ে।
“থাম’! থাম’! থাম’! বলি উঠিল ডাকিয়া
নব আগন্তুক সেথা সম্বােধি রাজায়।
“নাহি দোষ কিছু তব পাঠান ঈশ্বর ;
বৃথা কেন মাগ ক্ষমা আগন্তুক হতে ?
পবিত্র উৎসের প্রায় হৃদয়ে তােমার
রাজে সদা ধৰ্ম্ম-উৎস, কিন্তু স্রোত তার
বইতে হইবে ধীরে ভারত মাঝারে।
বহিছে হিন্দুর গঙ্গা, অদূরে তাহার
শান্তবেগে বহে যাবে সিন্ধু ইসলামের
তুষিয়া মানব হৃদি, দানি শান্তি নরে।
যে যাহার পথে চলি বহে যাবে ধীরে
শান্তির সিন্ধুর পানে সদা অবিরােধে।
গঙ্গার পবিত্র বায়ু চলিবে বহিয়া
ধীরে সিন্ধু-বক্ষ’পরে, সিন্ধু-বায়ু পুনঃ
কভু প্রবাহিয়া যাবে গঙ্গাহৃদি 'পরে।
প্রথম সর্গ
খননে কি প্রয়ােজন ? কেন বা স্বলে
খনিবে সিন্ধুরে তুমি বহাইতে সেথা
খরতর বারিস্রোত? কেন হিন্দুগণ
খনিবে স্বাধীন গঙ্গা টানিতে তথায়
অধিক সলিল রাশি? আপনি বাড়িবে
স্বগুণে সিন্ধুর স্রোত নব ইস্লামের।
আপনি গম্ভীর হবে খরতরা নদী
বিস্তারি আপন ক্ষেত্র গতি আপনার।”
দিব্যালােকে উদ্ভাসিত হইল আনন
কান্দাহার সুত-শ্রেষ্ঠ দূত রহিমের।
একদৃষ্টে হেরে পুনঃ সৰ্ব্ব সভাজন
নব আগন্তক আঁখি, প্রভাতে যেমতি
অন্ধকার ক্লিষ্ট জীব একদৃ, চাহে
নব দিবাকর পানে, দিব্য জ্যোতিঃ যার
পূরি নভঃ, পূরি ধরা, পূরিয়া সাগর
পূরি নদনদী আর স্থাবর জঙ্গম
ছুটে শেষে আলােকিতে পর্বতের বুকে
অাঁধার পর্বত গুহা আপন গৌরবে।
কহিলা বুগরা চাহি সম্রাটের পানে
শান্ত, শুদ্ধমতি, বীর বলব তনয় :
“জাহাপনা ! পাঠানের বিজয় দিবসে
স্বর্গ হতে এল নামি স্বরগের দূত
২২
;
পাঠান-গৌরব
শিখাইতে নীতি ধর্ম ; বিজয়ের মােহ
মধ্যাহ্ তপন যথা ঝলসে নয়ন।
দৃষ্টি কভু নহে স্থির সে তীব্র আলােকে।
জিনিয়া হিন্দুর রাজ্য বসায়েছি মাের
জয়দর্পে সিংহাসন ; করেছি আপন
বহুদেশ হিন্দুস্থানে স্বর্ণশস্যভরা ;
অনৈক্যে হেরেছে রণে হিন্দুরাজগণ।
পুনঃ বিজয়ের মােহে ইচ্ছি স্থাপিবারে
হেথায় মুসলিম ধৰ্ম্ম রণশক্তি বলে।
এ নহে সত্যের পথ, এ শুধু স্বপনে
মরুমরীচিকা ছবি ; বুঝি তাই খােদা
প্রেরিলা স্বরগ দূতে রক্ষিতে পাঠানে
অপার করুণাবশে, হিন্দুস্থান মাঝে।
শত ধন্যবাদ আজি খােদার চরণে।
সযত্নে দিল্লীতে মােরা পূজিব সকলে
স্বর্গদূতে সসম্মানে, পরামর্শ মাের।”
রক্তিম গগনকোলে গােধূলির বুকে
ডুবিল সন্ধ্যার রবি সুদূর সাগরে ;
উদিল গােধূলি তারা ; নগরে নগরে
থামিল বিজয় বাদ্য ; শুধু মসজিদে
আবার উঠিল ধ্বনি সান্ধ্য নমাজের।
আবার গাহিল কণ্ঠ ভেদিয়া গগন
;
প্রথম সর্গ
ধাতার মঙ্গল ইচ্ছা, মঙ্গল বিধান,
প্রার্থনার পুণ্যগীতি পবিত্র করুণ।
দানি অনুমতি সেথা রহিম রক্ষণে
সেনাপতি বুগরারে, সমাপিলা সভা
ধর্মপ্রাণ দিল্লীশ্বর নাছিউদ্দিন।
“ধন্য” “ধন্য বলি উঠে যত সভাজন
মহাপ্রাণ সম্রাটের মহান্ চরিতে;
“ধন্য” “ধন্য” প্রতিধ্বনি হইল চৌদিকে
শুভ্র চন্দ্রাতপ তলে পূর্ণ সভাস্থলে।
দ্বিতীয় সর্গ
;
চুম্বনে
;
মালােয়ার রাজপথে নিশা অবসানে
মন্দগতি চলে ক্লান্ত মেওয়াতের সেনা
মালােয়ার পুরীপানে; তরুণ তপন
তখনাে উষার বুকে
ঊষার
নীরব নিস্তব্ধ সুপ্ত পূরব সাগরে ।
আকাশে নক্ষত্ৰচয় মিটি মিটি হাসি
ঘােষিছে নিশার শ্রান্তি
বসন্ত কোকিল
ক্ষণে ক্ষণে কুঞ্জমাঝে ডাকি কুহুরবে
পূরিতেছে দিগন্তর ; শিশির কণিকা
কোমল পল্লব বুকে হাসিতেছে মৃদু
জলন্ত হীরক প্রায়। পুষ্প-তরুগণ
বিতরি মধুর গন্ধ পূরিছে পুলকে
ঊষায় পবন-প্রাণ ; শ্রান্ত নিশীথের
ক্ষীণ অন্ধকাররাশি সরিছে ক্রমশঃ
উদ্যান প্রান্তর হতে ; ক্রমশঃ আকাশ
নবীন আলােক জালে হতেছে পূরিত ।
হেনকালে মালােয়ার রাজধানী পানে
চলিছে সেনানী সহ সুরসিংহ বলী
দ্বিতীয় সর্গ
;
যুবরাজ মেওয়াতের ; মেওয়াতের সেনা
মিলি মালােয়ার সনে আক্রমিবে বলে
প্রবল পাঠান শক্তি দূর ফতেপুরে ;
সঙ্গে ভীমসিংহ বীর
মুখ্য
সেনাপতি।
মেওয়াত মালােয়া দোহে মৈত্রীসূত্রে বাঁধা ;
দোহে দোহাকার বন্ধু স্থির অচঞ্চল।
বিবাদের দাবানল দহিতেছে যবে
বিশাল শৌর্যের ক্ষেত্র, যবে রাজপুত
ভুলিয়া ক্ষাত্র-গৌরব ক্ষাত্র রাজনীতি,
ভুলি একতার শক্তি এক গৌরব,
খণ্ডযুদ্ধে বিসর্জিল শকতি আপন
পাঠানের শক্তি-স্রোতে, মালােয়া তখন
দৃঢ়
মৈত্রীডডারে বাঁধা মেওয়াতের সনে।
মালােয়ার যুবরাজ মেওয়াত জামাতা ;
মালােয়া সেনানী সবে মেওয়াতের তরে
সমর্পিতে পারে প্রাণ ; মালােয়া গৌরবে
গৌরবিত মেওয়াতের নৃপতি আনন।
বিশাল ভারতবর্ষে বিষাদ-গরুতে
তপ্ত মরু-ভূমি বুকে সরােবর প্রায়
দুর্জয় প্রতাপে শােভে মেওয়াত মালােয়
সংহতির শক্তি বলে ; পাঠান্ শকতি
পারে নি নাশিতে সেই দৃঢ় মৈত্রী বাঁধে।
;
পাঠান-গৌরব
••
মেওয়াত মালােয়া দেহে বাঞ্জে নাহি
সমর পাঠান সনে; কিন্তু আজি আর
নাহি ধৈৰ্য মালােয়ার কিম্বা মেওয়াতের।
নিঠুর যবন-শক্তি দলিয়াছে হেলে
বন্দী রাজপুতগণে ; দীপ্ত রােষানলে
বধিয়াছে বলবন্ বন্দী রাজগণে।
তাই হিন্দুস্থানময় আবেগ ক্রোধের ;
তাই সাজিতেছে আজি মেওয়াত মালােয়া
আক্ৰমিতে মহাশত্রু ; তাই শক্তিদ্বয়
মিশি চাহে বিনাশিতে শত্ৰু উভয়ের।
ধীরে উষালােকে পশে মালােয়ানগরী
দুর্জয় মেওয়াত সেনা ; কপিল সে রবে
বিশাল পুরীর কক্ষ; পুরিল গৌরবে
সেথা সবাকার প্রাণ, সে শুভ প্রভাতে।
আইলা মালােয়া-রাজ পূরীর দুয়ারে
আহ্বানিতে মেওয়াতের যুবরাজ বরে।
মিলিল নগরবাসী; জয় জয় নাদে
ভরিল মালােয়াপুরী, হৃদি মালােয়ার।
উদিল আকাশে রবি; পূরব গগন
ছাইল আলােক জালে, পূরিল নগরী
তপনের দীপ্ত নব কর বক্ষে ধরি।
গগনে জলদ জাল শােভি নব রঙে
দ্বিতীয় সর্গ
ছড়াল গগনময় ; মন্দ সমীরণে
বিশাল প্রাসাদশিরে উড়িল গৌরবে
বিচিত্র রাজপতাকা, অজেয় নিশান।
আহ্বানিলা সুসিংহে মন্ত্রণা সভায়
মালােয়ার নরপতি ; আহ্বানিলা যত
মন্ত্রী সেনাপতি সবে ; বসি সিংহাসনে
সভামাঝে বৃদ্ধ নৃপ শূরভদ্র বলী
মালােয়ার অধীশ্বর, মালােয়া গৌরব,
কহিলা গম্ভীর কণ্ঠে, সম্বােধিয়া সবে।
“স্বাগত মালােয়া দেশে মেওয়াতের সেনা,
স্বাগত মালােয়া বীর মুরসিংহ বলী।
স্বাগত মেওয়াত মৈত্রী ; ধন্য রাজনীতি
প্রবীণ মেওয়াতপতি বলভদ্র বীরে!
দুর্দিন হিন্দুর আজি ; ঝা হেন হেথা
বহিছে পাঠানশক্তি হিন্দুস্থান পরে।
ভীষণ সে ঝা বেগে লুটিছে ভূতলে
সংখ্যাহীন বনস্পতি, শত শত বর্ষ
বিপুল গৌরবে যারা শােভিল ভারতে।
হেলায় দলিছে আজি ক্ষত্রবীরগণে
দুর্দম যবনগণ, হেলায় লুটিছে
খণ্ড হিন্দু শক্তি আজি যবন চরণে।
চাহি ঐক্য, চাহি শক্তি, চাহি তেজ আজি
পাঠান-গৌরব
২৮
হিন্দুস্থানে হিন্দুহৃদে ; চাহি ত্যাগবল
স্বদেশ উদ্ধার তরে স্বধৰ্ম্ম রক্ষণে।
যবন জিনিছে আজি যত হিন্দুকুলে ;
যুদ্ধে বন্দী করি যত ক্ষাত্র বীরগণে
করিতেছে অত্যাচার, দলিছে হিন্দুরে
নিত্য নব নিৰ্যাতনে; যবন কারায়
মৃত আজি দীনবেশে ক্ষত্রিয়-গৌরব
বীরচূড়ামণি সবে ; হিন্দুর শােণিতে
ভাসিতেছে হিন্দুস্থান হিন্দুর মন্দির।
দহিছে হৃদয় মম হেরি অনাচারী
দুর্দম এ শত্রুগণে পশিতে হেলায়
এ বিশাল হিন্দুস্থানে। জানিনা কি ক্ষণে
পাঠান পশিল হেথা। কোন্ বা কুক্ষণে
কুলাঙ্গার জয়চন্দ্র হিন্দুকুল-কলি
খনন করিয়া নদী আনিল ভারতে
এ হেন কুম্ভীরগণে; আপনার পায়ে
করিল কুঠার হানি হেন সৰ্ব্বনাশ
স্বর্ণময়ী স্বর্ণপ্রসূ ভারত-মাতার।
লুপ্ত
আজি হিন্দুস্থানে ;
হিন্দু ধৰ্ম্ম, হিন্দু জ্ঞান, হিন্দুর দর্শন
অকালে কালের গ্রাসে,—দিবাকর
যথা রাহুগ্রাসে সুমলিন ; দুর্দম যবন
••
হিন্দুর গৌরব
২৯
দ্বিতীয় সর্গ
;
সহজে দলিছে আজি সত্য সুধাভরা
হিন্দুর গর্বিত বক্ষ ; সহ্য নাহি হয়।
একে একে পড়িতেছে হিন্দুরাজগণ
যবনের করতলে ; অমার আকাশে
পড়ে যথা অবিরত উলকার আলো
শক্তিহীন প্রাণহীন ধরণীর 'পরে।
ঝড়ে তারকার প্রায় আছে লুকাইয়া
হিন্দুর পবিত্র জ্ঞান, পবিত্র দর্শন।
মথি নর হৃদয়ের অমৃত সাগর
আহরিলা যে অমৃত হিন্দু ঋষিগণ,
আজি বিনিন্দিত সেই অপূৰ্ব্ব অমৃত,
দলিত যবন পদে, শুষ্ক তৃণ হেন
হেলায় অবলুষ্ঠিত ধূলার উপরে।
রােধিব আমরা এই শক্তি যবনের
আপনার শৌর্যবলে ; নাশিব স্ববলে
পবিত্র এ হিন্দুস্থানে যবন শকতি।
এখনাে হিন্দুর হৃদে মহাশক্তি জাগে ;
এখনাে হিন্দুর রক্তে বহে তীব্র বেগে
গৌরবের মহাতেজ ; বেদমন্ত্র বলে
এখনাে হিন্দুর প্রাণ নিত্য জাগরিত।
চাহি শুধু আজি সেই শক্তির আহ্বান,
পূর্ণ জাগরণ তার—পূর্ণ পরকাশ
পাঠান-গৌরব
বিশাল এ কর্মক্ষেত্রে ; এই সন্ধি ক্ষণে
আনিব সেই শক্তি বাঁধিব তাহারে
দৃঢ় মৈত্রী ডােরে মােরা; আমি বেগে
দুর্দম যবন শক্তি ; উড়াইব বলে
স্বচ্ছ সরােবর হতে ধূলি আবরণ।
স্বপ্ন হেন উড়ি যাবে হিন্দু শক্তি বলে
ম্লেচ্ছ-শক্তি-মরীচিকা ; জাগিবে আবার
হিন্দুস্থান নবগৰ্ব্বে ধরণী উপরে।”
নীরবিলা নরপতি, নীরবে যেমতি
শরতের মেঘমালা বরষার শেষে।
কহে ভীমসিংহ বীর মিত্র সেনাপতি ;-
“সত্য যা কহিলা আজি মালােয়া ঈশ্বর ;
শত শত ক্ষত্র নৃপে খণ্ড যুদ্ধে
জিনি
কৈল বন্দী যবনের সেনাপতিগণ
মানিয়া ধৰ্ম্মনীতি চাহে বলবন্
দীক্ষিতে সবারে সেথা মুসলিম ধরমে।
ধর্মপ্রাণ বন্দী যত হিন্দু নৃপগণ
নিন্দিল সাহসে সেথা দিল্লী সভামাঝে
নিকৃষ্ট যবন ধৰ্ম্মে ; ধন্য বীর তারা।
যবন আসিছে আজি, প্রতিষ্ঠিতে বলে
ভারতে আপন ধৰ্ম্ম দূর আরবের।
হিন্দু মােরা, নাহি চাহি ধৰ্ম্ম যবনের
••
৩১
দ্বিতীয় সর্গ
;
===
;
হিংসে যারা দেব দ্বিজে-গােবধ যাদের
নিত্য নৈমিত্তিক কৰ্ম্ম, রাজ্য তরে যারা
প্রভুহন্তা, পিতৃহন্তা; জিনিব আমরা
স্ববলে যবন শক্তি, রক্ষিব ধরমে।”
থামিলেন ভীমসিংহ।
কহে তেজসিংহ
মালােয়ার সেনাপতি, মালােয়া গৌরব
“ধন্য এ সঙ্কল্প তব সেনাপতিবর ।
লাঞ্ছিত ক্ষত্রিয় আজি যবনের পদে ;
দুর্জয় পাঠান শক্তি কালানল প্রায়
গরজে ভারতবক্ষে, দহিতেছে হেলে
হিন্দুস্থানে হিন্দু-শৌর্য ; চাহে দহিবারে
হিন্দুধৰ্ম্ম, হিন্দুনীতি, হিন্দুর গৌরব।
কে সহে লাঞ্ছনা হেন ক্ষাত্র ধরমের?
কে সহে আপন বক্ষে পর পদাঘাত
শত শত বর্ষ ব্যাপি ? কে পারে সহিতে
এতকাল নির্যাতন অপমান ঘাের
পরদেশী পরদ্বেষী বিধৰ্ম্মীর হাতে ?
যে সহে—সে মূখ অতি, অতি কাপুরুষ!
বৃথা জন্ম হেথা তার এই হিন্দুস্থানে
হিন্দুর গৌরব ক্ষেত্রে, বৃথা হিন্দু নাম
ধরে সে ভারত বক্ষে, বৃথা শক্তি তার।
বেগে বন্যা স্রোতে হেথা আসিছে ছুটিয়া
পাঠান গৌরব
৩২
যবনের নীতি ধারা, কলুষিতে হেলে
শান্তিময় ভারতের সুধা সরােবরে ;
রােধিব সে গতি মােরা, শক্তি মহীধর
ধরিব সম্মুখে তার, করিব নির্মূল
যবনের অহঙ্কার—এ সঙ্কল্প মম।”
থামিলেন মালােয়ার সেনাপতিবর।
কহে সভাসদগণে বীরপতি বলী
মালােয়ার যুবরাজ যুবক সুধীর
“সত্য যা কহিলে আজি সেনাপতিবর ;
দলিছে ক্ষত্রিয়গণে আপনার বলে
যবনের শক্তি হেথা; হিন্দুর গৌরব
লাঞ্ছিত যবন তেজে ধরণী উপরে।
দীপ্ত জ্বালাময় তাই হিন্দুর হৃদয় ;
মত্ত প্রতিশােধ আশে, আজি সন্ধিক্ষণে
কিন্তু হেরিতেছি আমি দৃশ্য মনােহর
দূর ভবিষ্যের
বুকে মানস-নয়নে ;
আসিতেছে নবযুগ
নবীন বরণে
নবশক্তি হৃদে নিয়ে, দিব্য আলো তার
দ্রুত নামিতেছে আসি ধরণী উপরে
নিৰ্ম্মল ঊষার কোলে নব রবি প্রায় ;
পাঠান সােপান তার ; মুসলমান ধ্বজা
দ্বিতীয় সর্গ
উড়িছে গগনে আজি ; ক্রমশঃ ভারতে
বহুজাতি, বহুধৰ্ম্ম, বহুনীতি ধারা
বহিবে বাহির হতে, প্রতিঘাতে তার
জাগিবে নবীন প্রাণ ভারত সমাজে,
প্রকাশিবে সনাতন নূতন বরণে।
মরুমাঝে মনােরম সরােবর হেন
দূরে অতি দূরে হােথা শতাব্দীর বুকে
দেখিতেছি মূৰ্ত্তি তার ; দেখি স্বপ্ন হেন
বিশাল ভারতে সবে এক ধৰ্ম্ম-পথী ?
এক ঈশ্বরের লক্ষ্যে এক মহাম্বনে
গাহে সবে একতানে ধাতার গৌরব
উচ্চকণ্ঠে চাহি ঊর্ধে স্বরগের পানে।
নাহি বাদ, নাহি ভেদ, নাহি বিসম্বাদ,
নাহি ক্ষুদ্র ছায়া নিয়ে ঘাের বিতণ্ডার
জ্বালাময় মহারব ; নাহি পরস্পরে
প্রাণহীন প্রতিহিংসা ধরমের মােহে।
ভাই ভাই করি হেথা আলিঙ্গিছে স্নেহে
হিন্দু মুসলমান সবে, অতীত আঁধার
ঘােতর কলহের, গিয়াছে ডুবিয়া
প্রেমের আলােক জালে ; এক নীতি-ডােরে
বাঁধা সবে ; এক দেশে এক মাতৃবুকে
একই শাসন সূত্রে ; সে আদর্শ পুনঃ
পাঠান-গৌরব
জাগায় জগত-হৃদে মহামিলনের
পবিত্র বাসনা-বল ; জাগে সেই বলে
সৰ্ব্বদেশ ধরাতলে ; ভারত পবন
বহে দেশ দেশান্তরে বার্তা মিলনের।”
নীরবিলা বীরপতি ; ক্ষণিকের তরে
মুগ্ধ সবাকার মন, মুগ্ধ হয় যথা
প্রভাতে জলধি হেরি তরুণ-তপনে
উদিতে আকাশ-পথে নবীন গৌরবে।
কহে সুরসিংহ সেথা শুনি তার বাণী
মেওয়াতের যুবরাজ বীর চূড়ামণি--
“অপূৰ্ব আদর্শ কথা শুনাইলে আজি
মালােয়র যুবরাজ ! দূর ভবিষ্যের
মধুর মিলন-বাণী সুধাধারা হেন
ঝরিল আননে তব ; মন চিত্রপটে
অঙ্কিলে অপূর্ব ছবি দিব্য মিলনের ;
শুদ্ধ আদর্শ-ই বটে মিলন সােপান ;
যুগে যুগে নরপ্রাণ আহরে শকতি
যুগের আদর্শ হতে, বসন্তে যেমতি
হিম-ক্লান্ত তরুচয় লভে নব রস
শান্ত স্নিগ্ধ রসময়ী ধরণী হইতে।
হেরিয়াছ হেন স্বপ্ন প্রভাতে সন্ধ্যায়,
কভু সুষুপ্তির কোলে কভু জাগরণে,
দ্বিতীয় সর্গ
কভু বা চন্দ্রিমা তলে শারদ নিশায়
নিৰ্ম্মল আলােকে যবে পাপিয়ার দল
মধুকণ্ঠে গাহে নীল নবীন গগনে।
ধন্য এ হৃদয় তব ; পবিত্র সরসে
ফোটে কুমুদিনী, নহে সমল সলিলে।”
স্তব্ধ সভাজন শুনি বাণী সুমধুব ;
একে চাহে অন্য পানে; ক্ষণতরে সেথা
সমরের অভিলাষ স্বপ্ন-কথা বলি
ভাতিল সবার হৃদে ; কহে সম্বােধিয়া
সবারে, মালােয়াপতি পুনঃ সভামাঝে-
“ধন্য মিলনের আশা হৃদয়ে তােমার
মেওয়াতের যুবরাজ! কিন্তু সে মিলন
সম্ভবে কি আজি হেথা যবনের সনে ?
উদ্দীপ্ত যবন-শক্তি, মত্ত পশুবলে
চাহে নাশিবারে তােমা, ধরম তােমার।
চাহে না সে মৈত্রী হেথা, স্বপ্নেও হেরে না
মৈত্রীর
মধুর
ছবি আজি এ ভারতে।
অসমানে কোথা কবে সম্ভবে মিলন ?
সাধ স্বকৰ্তব্য সবে আজি সন্ধিক্ষণে।
যুগের কর্তব্য সাধি যুগধর্ম পথে
অগ্রসর হও সাবে, সুদূর স্বপনে
ভুলিও না কভু আজি কর্তব্য আপন।
পাঠান-গৌরব
৩৩
প্রকাশি আপন শক্তি যুগবীরগণ
বহাইবে সত্যপথে করমের স্রোত
যুগে যুগে কর্মক্ষেত্রে, হবে না ব্যথিত
বর্তমানে দুঃখময় পাপময় হেরি।
পৃথিবী কৰ্ম্মের ক্ষেত্র, কৰ্ম্মবলে সদা
খােলে মানবের অাখি সত্যের সন্ধানে ;
কর্মের আদর্শ রাখি হিন্দুরথিগণ
যুগে যুগে ধন্য কৈল এ ভারত ভূমি।
কৰ্ম্মই কৰ্ত্তব্য আজি ; ধৰ্ম্ম আপনার
আনিছে কর্মক্ষেত্রে কর্মবীরগণে।
চল রণে কর্মক্ষেত্রে, দেখাও আপন
শৌৰ্য্য, সময়ের বুকে কর্তব্য সাধিয়া।”
তৃপ্ত সভাজন শুনি বাণী তেজোময়ী
বীর সুরভদ্র মুখে, তৃপ্ত পান্থ যথা
হেরি সরােবর-বারি মরুভূমি মাঝে।
কহে নরপতি পুনঃ, “চল, চল সবে
পাঠান-বিজয়ে আজি ; সাজ রণসাজে
রক্ষিতে গৌরব হেথা দলিত হিন্দুর।”
“সাধু, সাধু” বলি সবে সমর্থিল সেথা
বীর সুরভদ্র-বাণী ; সৰ্ব্ব সভাজনে
প্রশংসিয়া মহাসভা শেষিলা নৃপতি।
দীপ্ত দিবাকর যবে মধ্যাহ্ন গগনে
৩৭
দ্বিতীয় সর্গ
উজল উঠিল জ্বলি, জয়ধ্বনি করি
মন্ত্রণার কক্ষ ত্যজি চলিলা সকলে
যে যার ভবন পানে। সুমঙ্গল ধ্বনি
ধ্বনিল প্রাসাদ শিরে ; হইল ঘােষণা-
“মেওয়াত মালােয় দোহে দূর ফতেপুরে
আক্রমিবে পাঠানেরে ; রক্ষিবে গৌরব
হিন্দুর এ হিন্দুস্থানে জিনিয়া যবনে।”
তৃতীয় সর্গ
প্রমােদ উদ্যানে বসি দিল্লী নগরীর
রম্য মন্ত্রীভবনের বিস্তীর্ণ সীমায়
যুবক কায়কুবাদ বুগরা-তনয় ;
সম্মুখে উদ্যানমাঝে সহস্র বরণে
ফুটিছে বসন্তফুল ; সহস্র পল্লবে
পল্লবিত তরুশাখা ; দীর্ঘ তরুশিরে
আনন্দে গাহিছে পাখী নূন সঙ্গীতে
বসন্তের আগমনী ; পালক মেলিয়া
নাচিয়া খেলিছে সেথা উদ্যান মাঝারে
স্বাধীন ময়ূরগণ ;
বিস্তীর্ণ পেখমে
সহস্র তারকা প্রায় জ্বলিছে উজল
কত শত নব রঙে দিব্য অাঁখিচয়
শিখীপুচ্ছে মনােরম ; উদ্যানের বুকে
অসংখ্য কুটির রাজে লতাপুঞ্জ মাঝে ;
সুন্দরী রমণীগণ সম্মুখে তাহার
(নবীন যুবতী সবে) নবীন সজ্জায়
পূরে নিত্য নব রসে যুবক হৃদয়।
আসনে কায়কুবাদ ; সবুজ লতিকা
তৃতীয় সর্গ
;
ঝুলিছে আসন পরে ; বামে বসি তার
নবীন যুবতী প্রিয়া আলেয়া রূপসী ;
নব গন্ধে নব সাজে নাচিছে সম্মুখে
যােড়শী যুবতীগণ উন্নাদি হৃদয়।
হয়ে মত্ত মদিরায় কঁপিছে যুবক
ক্ষণে ক্ষণে মােহােম্মদে, হেরিয়া নয়নে
নবীন যুবতীগণে উদ্যান মাঝারে।
বসন্ত-গগনতলে পূরিয়া উদ্যান
মধুর সঙ্গীত-সুরে মধুর সন্ধ্যায়
গাহিছে যুবতীগণ। আত্মহারা সুখে
কহিল কায়কুবাদ গদগদ স্বরে
চাহি নিজ প্রণয়িনী আলেয়ার পানে,
“হের আকাশের পানে বারেক আলেয়া !
সাজায়ে নবীন রঙে সুনীল গগন
ডুবিতেছে সান্ধ্যরবি, উঠিতেছে ধীরে
অনন্ত অমৃত-ভাণ্ড বসন্ত চন্দ্রিমা।
এমনি সুধায় পূর্ণ মানব জীবন ;
মহতী পিয়াসা আশে এমনি সুধার
ছুটে দ্রুত অবিরত মানবের মন।
মানব-সাহিত্য আর মানব-বিজ্ঞান
মানব-সঙ্গীতকলা, মানবের নীতি
মও হেন সুধা তরে ; মহানদী প্রায়
;
পাঠান-গৌরব
৪ ০
বহিয়া নিতেছে তারা মানবের মনে
আপনার মহাস্রোতে সুখ-সিন্ধুপানে
চির-স্থির অনাবিল ; হেরেছি নয়নে
আজি বসন্ত-সন্ধ্যায় নবযুগ-ছবি।
ভােগের সােপান রাজি অতি মনােহর ;
আরােহি চলিছে তায় মানব-সমাজ
নব স্বরগের পানে, কভু ছবি যার
অতীতের অন্ধকারে মানবের মনে
খেলে নাই হেন স্নিগ্ধ অপরূপ রূপে।
তৃপ্ত আজি হৃদি মাের সে দৃশ্য হেরিয়া ।
নবীন প্রবৃত্তিচয় ভােগের আশায়
জাগিয়া উঠিছে হৃদে, বসন্ত-বাতাসে
বীজ বক্ষ ভেদি যথা অঙ্কুর নিচয়
তােলে শির সুকোমল তপন আলােকে ;
কে না দানে সার বল এ হেন অঙ্কুরে ?
কে চাহে বরিতে দুঃখ, ভরিতে জীবনে
ঘন কৃষ্ণ কালিমায় ? কে চাহে বাঁধিতে
বিমুক্ত প্রবৃত্তি স্রোতে কঠোর বাঁধনে
অসার শাসন-ডােরে ? কে চাহে ফিরিয়া
ঘৃণিত কর্দম পানে, হেরিয়া সম্মুখে
পদ্মপূর্ণ সরােবরে স্ফুট কমলিনী ?
যে চাহে, সে মূখ অতি ; মানব জীবন
৪১
তৃতীয় সর্গ
শুধু ভােগ সাধনার অতুল সােপান!
ভােগ লক্ষ্য মানবের, মানব-বিজ্ঞান
বাড়াইছে কায়া তার, মানবের নীতি
চাহে সংযমিতে তারে বিকাশের তরে।
মানব-সাহিত্য আর মানব-সঙ্গীত
স্তরে স্তরে উততালিছে সুখস্বর্গ পানে
মানবের বৃত্তিচয়ে। হেন স্বর্গ বটে
নরের চরম আশা। আজি এ সন্ধ্যায়
পূর্ণ চন্দ্রিমার তলে মহাসুখ মাঝে
হেরি প্রতিমূর্তি তার ভবিষ্য-হৃদয়ে
পুলকি উঠিছে তনু,সুন্দরি আলেয়া।”
কহিতে কহিতে হল মহাপুলকের
বিপুল স্পন্দন তার উজল আননে।
সুরাপাত্র নিয়ে হাতে পিয়িল হেলায়
মধু সুরা মন্ত্রীপৌত্র ; চুম্বিল সােহগে
সুন্দরী আলেয়া-গণ্ডে। মত্ত সুখােম্মদে
কহিলা আলেয়া চাহি যুবকের পানে
মৃদু কণ্ঠে সে সন্ধ্যায় :-
“নাহি জানি মােরা
দর্শন সাহিত্য তত্ত্ব ; না জানি বিজ্ঞান
কোথা কিবা করিতেছে মানব সমাজে।
জানি শুধু সুখমধু,জানি চম্পকের
পাঠান-গৌরব
৪২
আছে গন্ধ, আছে সুর বসন্ত কোকিলে ;
আছে ক্ষুদ্র তারকার দিব্য প্রতিকৃতি
মনােরম শিখিপুচ্ছে, আছে আজি নভে
প্রাণােন্মাদী সুকোমল মধু সুধারাশি।
আর আছে মনােরম মন্ত্রীর উদ্যানে
হেন চন্দ্রিমার তলে লতাপুঞ্জ বুকে
যুবক কায়কুবাদ মত্ত সুখভরে।
চাহি জানিতে কিছু অধিক ইহার।”
নিঃসরিল মধুসুর শত যুবতীর
সুকোমল কণ্ঠ হ'তে। বসন্ত সন্ধ্যায়
উঠিল আনন্দ গীতি ভেদিয়া গগন
পূরিয়া উদ্যান সেথা। গাহিল সন্ধ্যায়
শুনি সে মধুর তান বসন্ত-কোকিল
কুলায় বিটপীশিরে ; নড়ে পত্ৰচয়
মর্মরিয়া রাখি তান সে সঙ্গীত সুরে।
উদ্যানে কুসুমচয় দুলিল সােহগে
রাখি তান সেই সুরে, সন্ধ্যার শিশির
নাচিল পল্লব শিরে মধুর নৰ্ত্তনে।
দূরে প্রাসাদ সােপানে কে আসিছে হােথা ?
কার ছবি উজলিছে সন্ধ্যার আলােকে
প্রাসাদ সােপান-রাজি, কে বা সে মূরতি
উজল আসিছে হেথা উদ্যানের পানে
৪৩
তৃতীয় সর্গ
চঁাদতলে জিনি স্নিগ্ধ চঁাদ-গরিমায় ?
হেরিলা কায়কুবাদ দূরে ছায়া তার ;
গেরিল
যুবতীগণ
আসিতেছে হেথা
দ্রুত নামি উদ্যানের পথে সে মূরতি।
নিস্তব্ধ সে সুখদৃশ্য নিস্পন্দ নীরব।
থামে নৃত্যগীত, থামে অকস্মাৎ সেথা
যুবতী কণ্ঠের মধু অপূৰ্ব নিঃস্বন,
থামে যথা বর্জনাদে গভীর নিশীথে
মেঘহীন নীলাকাশে শারদ অম্বরে
সহস্র পাপিয়া কণ্ঠ পূর্ণ মধুতানে।
পলাইল চারিদিকে যুবতীর দল ;
পলায় আসন ছাড়ি সুন্দরী আলেয়া
প্রিয়তমা যুবকের ; সুরাপাত্র দূরে
ছুড়িল কায়কুবাদ, স্তব্ধ-নেত্রে হেরি
দিল্লীর সাম্রাজ্ঞী দেবী ফতেমা রূপসী,
পিতৃম্বস আপনার, প্রশংসা বাহার
পূরিত সহস্র কণ্ঠ রাজো পাঠানের ।
মুহূর্তে উদ্যানমাঝে আসিলা ফতেমা ;
কহিলা কঠোর কণ্ঠে ভ্রাতুষ্পত্রে চাহি :-
“যাহ বৎস, যাহ আজি ফতেপুর রণে
জিনিতে হিন্দুর সেনা ; পাঠান-গৌরব
আক্ৰমিতে আসে হিন্দু; সেনাপতি হয়ে
;
পাঠান-গৌরব
৪৪
যাহ রণে ; নহে এই বিলাস সময়।
অনিচ্ছুক যুঝিবারে হিন্দুসেনা সনে
বুগরা সে মহারণে, যেথা মালােয়ার
সৈন্য সেনাপতি গর্জে মত্ত করী হেন
আক্ৰমিতে পাঠানের গৌরব ভারতে।
তর্কে আচ্ছাদিল নীতি, ঔদ্ধত্যের বশে
তুচ্ছিল সে বৃদ্ধ পিতা মন্ত্রীর আদেশ।
তাই পদাঘাতে তারে তাড়িলা জনক
মন্ত্রীশ্রেষ্ঠ বলব। যাই রণে তুমি
বরিবে তােমায় পিতা সেনাপতি পদে।”
স্তম্ভিল কায়কুবাদ, স্তম্ভিল উদ্যান
গম্ভীর সে করবে রাণী ফতেমার।
স্তম্ভে শাখে শাখিগণ, স্তম্ভে তরুশিরে
কোমল পল্লবরাজি কুঞ্জলতা বুকে।
ঘন বিদ্যুতের ডাকে কঁপে যথা প্রাণ
পথক্লান্ত পথিকের, কপিল তেমতি
যুবক কায়কুবাদ। ক্ষণকাল তরে
মােহের মদিরা গেল উড়িয়া হেলায়
কোথা কোন দূরদেশে ; উড়ে যথা হেলে
বৈশাখের শুষ্কপত্র পবনের বেগে
দ্রুত আকাশের পানে। কহিলা চাহিয়া
যুবক কায়কুবাদ পিতৃসা পানে—
===
তৃতীয় সর্গ
“স্বৰ্গজ্যোতিঃ হেন তােমা হেরিয়া হেথায়
কঁপিছে হৃদয় মম; কি যেন আঁধার
গিয়াছে হৃদয় ছাড়ি ক্ষণকাল তরে।
ধন্য পিতৃম্বস তুমি, দিল্লী-অধীশ্বরী,
ধন্য এই মন্ত্রীপুরী জনমে তােমার।
কিন্তু কহ তুমি আজি, কহ মাতঃ মােরে
হয়ে রাজ্য অধীশ্বরী, রহি নিত্য ডুবি
ঐশ্বৰ্য্য আলােক মাঝে উজল অসীম,
কেন নিত্য রাঁধি তুমি অন্ন আপনার
যত্নে আপনার শ্রমে ; আপন বসন
কেন বা আপন হস্তে বুন গাে জননি!
কার তরে এত অর্থ এ রাজ্য বিশাল ?
কার তরে মণিমুক্তা প্রবাল পাথর ?
কেন ঐশ্বর্যের রাণী নিয়াছ বরিয়া
দারুণ দারিদ্র্য দুঃখ ; কেন দিল্লীশ্বর
তােমার আদর্শ হেরি দরিদ্রের বেশে
বসে রাজ-সিংহাসনে ফকিরের প্রায় ?
কহ মােরে আজি মাতঃ কি তথ্য ইহার !
যাব আমি ফতেপুর সেনাপতি হয়ে,
জানি জয়ে আছে সুখ, গৌরব অসীম”।
শুনি
ভ্রাতুপুত্র
বাণী কহিলা ফতেমা
পাঠানের মহ;রাণী দাসকুলবধূ
পাঠান-গৌরব
৪৬
“কি কহিস রে বালক! ভােগ তরে শুধু
মানবের এ জীবন ? ঐশ্বৰ্য অতুল
রাজ্যভরা শুধু রহে রাজসুখ তরে ?
আশ্চৰ্য্য হইনু আজি শুনি কথা তাের !
রাজৈশ্বৰ্য্য প্রজাধন, সম্পত্তি প্রজার ;
মানিয়া সুখ দুঃখ শীত গ্রীষ্ম ঘাের
করিয়া অসীম শ্রম মধ্যাহ্ন তপনে,
করি ঘৰ্ম্মপাত ক্ষেত্রে বারিপাত হেন
শ্রাবণের, অর্জে যাহা দরিদ্র কৃষক
সে কি শুধু রাজতরে রাজসুখ তরে?
রাজভােগ অনলের যােগাতে ইন্ধন
মরে কি দরিদ্র প্রজা অন্নবস্ত্রহীন
জরাক্লিষ্ট রােগগ্রস্ত রাজপথ পরে ;
পুষিতে সন্তানগণে রাজপুরুষের
রাজভােগে রাজসুখে, মরে কি কৃষক ?
আশ্চৰ্য্য শুনিনু হেন বাণী মুখে তাের ;
নাহি শাস্ত্রে হেন কথা, না হেরি কোরাণে।
দরিদ্র কৃষক হেন আপনার ভােগ
আপনি অর্জিবে রাজা, আপন বসন
আপনি বুনিবে নিত্য আপনার শ্রমে।
কিন্তু সে কথায় আজি নাহি প্রয়ােজন ;
রণতরে যাও তুমি ফতেপুর পানে;
A
৪৭
তৃতীয় সর্গ
দুয়ারে হিন্দুর সৈন্য গর্জিছে ভীষণ
মদোন্মত্ত কী যথা; যাও সিংহভুত
খণ্ড খণ্ড করি তারে রাজার দুয়ারে
আন তুমি, রক্ষ পাঠানের কুলমান ;
রাখ মুসলমান ধৰ্ম্ম, উৎপাটিতে যারে
এ ভারতক্ষেত্র হতে চাহে অবহেলে
হিন্দুর বিশাল শক্তি আপনার বলে।
রাখ রাজ্য, রাখ ধৰ্ম্ম এ ঘাের বিপদে,
যাহ বীর-পুত্র রণে, হও রণজয়ী ;
দুৰ্বল জনক তব নাহি বুঝে নীতি,
বুঝে বীরের ধর্ম ; তাই সে বিমুখ
আজি এই মহারণে ; বক্ষ তুমি মান।”
কহিতে কহিতে সেথা ত্যজিলা উদ্যান
দিল্লীশ্বরী মহারাণী বলব তনয়া।
নিশীথের অন্ধকারে উলকার প্রায়
হেরিল তাহারে সবে—কিম্বা মরীচিকা
যথা মরুভূমি পরে নিদাঘ সন্ধ্যায়।
ধীরে লতাকুঞ্জ হতে বাহিরিল পুনঃ
নিম্মুক্ত গগন তলে সুন্দর উদ্যানে
যতেক যুবতীগণ। আসিল আলেয়া
পরম প্রেয়সী নারী, রাবেয়া, আয়েবা,
৪৮
পাঠান-গৌরব
হেলিমা প্রভৃতি যত যােড়শী যুবতী।
স্বর্ণমূৰ্ত্তি হেন সবে, তপ্ত কাঞ্চনের
উজল নবীন রঙে শােভিল নিশীথে
চঁাদতলে তারা হেন। সােণার অঞ্চল
সেথায় চুমিল ধীরে সান্ধ্য শিশিরের
কোমল মধুর বিন্দু কোমল পরশে।
কহিলা আয়েষা চাহি যুবরাজ পানে
“আশ্চৰ্য্য শুনি যে কথা আজি যুবরাজ ;
যেতে হবে মহারণে কাফেরের সনে।
কিবা ভয়ঙ্কর রণ! শুনি রণ-কথা
কঁপে হৃদি থথরি, নরমুণ্ড রণে
যায় গড়াগড়ি হেলে লােষ্ট্র পিণ্ড প্রায়।
ঝরে তীব্র বেগে সেথা নরের রুধির
বরষার বারি হেন, তীব্র আর্তনাদে
বিলাপে সহস্র সেনা হস্তপদহীন।
কে হারে কে জিনে তার নাহিক ঠিকানা।
অনিশ্চিত রণফল, অনিশ্চিত যথা
গগনে শারদমেঘ, নিত্য সচঞ্চল ;
নাহি দিব যেতে মােরা রণে যুবরাজে।”
“দিব না যাইতে রণে” কহিলা হেলিমা ;
“কুঞ্জমাঝে কুঞ্জনাথে রাখিব বাঁধিয়া
দিব্য প্রণয়ের ডােরে; ফুটিবে চম্পক
•
তৃতীয় সর্গ
বসন্তের আগমনে, গাহিবে বিহগ
করুণ মধুর কণ্ঠে, নাচিবে ময়ুর
মােদের এ কুঞ্জমাঝে ; নাহি দিব যেতে
এ হেন মধুর মাসে মধুর সঙ্গীরে
দূরে কাফেরের রণে, এ সত্য আমার।”
মৃণাল-কোমল দুটি বাহু প্রসারিয়া
যুবকের গলদেশে, কহিল আলেয়া।
ঝরে অশ্রু অবিরত আঁখিদ্বয় হতে
নিৰ্ম্মল উজল বিন্দু, তৃণশির পরে
ঊষার শিশির যথা।
কহে সকরুণ
পিক-বিনিন্দিত কণ্ঠে আলেয়া রূপসী।
“মােরাও যাইব রণে শাহজাদা সনে।
সাজি রণ-সাজে সেথা রহিব দুর্গের
সুরক্ষিত কোন কক্ষে ; হেরিব নয়নে
বাতায়ন পথে তব মূৰ্ত্তি মনােহর ;
হেরিব তােমায় মােরা, ওহে প্রিয়তম
যুঝিতে হিন্দুর সনে, রণস্থলী মাঝে।”
বিহ্বল বিহঙ্গ যথা পল্লব শয়নে
সুখময় বসন্তের-বিহ্বল তেমতি
যুবক কায়কুবাদ ; বিস্মরিল হেলে
রাণীর আদেশবাণী
বুগরা-তনয়।
গাহিল সুকণ্ঠে পুনঃ শতেক রমণী
পাঠান-গৌরব
ভরিয়া উদ্যান বক্ষ, পিয়িল সে সুধা
চম্পক, গােলাপ, যুথী, মালতী, পারুল !
পিয়িল আকাশে সুধা পাপিয়ার দল
সে মধুর ধ্বনি হতে, স্তম্ভিল গগনে
চমকি তারকায় মিদনুধা-পায়ী।
কহিলা কায়কুবাদ যুবতী সকলে—
“শুনিয়াছি রণবার্তা, জানি রণজয়ে
আছে সুখ, আছে আশা পূর্ণ গৌরবের।
কিন্তু সুখশয্যা ছাড়ি কে কোথা বরে
মহারণে মৃত্যুশয্যা, কে চাহে গরল,
নিত্য অধিবাস যদি অমৃত-সাগরে।
ভীষণ হিন্দুর সেনা আসিছে ছুটিয়া
দীপ্ত প্রতিহিংসা বশে ; আমি কেন মরি
মক্ষি হেন দাবানলে, কেন সুখ ছাড়ি
জ্বলন্ত অনল মাঝে সপিব জীবন
হেথা মহাসুখে মম মধু-কুঞ্জ বনে
ভুঞ্জিব পিরীতিসুধা, স্নিগ্ধ মদিরার
মধুস্বাদে রব মত্ত আপন প্রাসাদে।”
নিরবিল মন্ত্রীপৌত্র ; হ’ল আত্মহারা
সুখমােহে পুনর্বার কুঞ্জবনমাঝে
নিৰ্ম্মল গগন তলে মন্ত্রীর উদ্যানে।
ডুবিল হেলায় পুনঃ বিলাস-সাগরে
তৃতীয় সর্গ
যুবক কায়কুবাদ, মত্ত করী যথা
নিদাঘে ডুবায় দেহ শীতল সলিলে।
সহসা উঠিল ধ্বনি
দূরে প্রাসাদের
বিস্তীর্ণ সােপানপথে, শত সেনা যেন
রণমত্ত ধায় বেগে শত্রুসৈন্য পানে।
সহস্র চরণ ধ্বনি কঁপাইল বেগে
বিশাল প্রাসাদ কক্ষ, উদ্যান বিশাল।
হেরে প্রাসাদের পানে বুগরা তনয়,
হেরে নারীগণ সেথা; আইল সম্মুখে
অকস্মাৎ বেগে এক মন্ত্রীর দুয়ারী।
নিবেদিল রক্ষীবর যুবরাজ পদে।
“দ্রুত আসিতেছে, প্রভু, মন্ত্রী বলব
হেথা এ উদ্যান পানে রক্ষিগণ সনে ;
অনুমতি যুবরাজে
দিতে এ বারতা।”
পুনঃ লুকাইল দ্রুত নারীগণ সবে
লুকায় শ্মশান হ’তে প্রেতগণ যথা
হেরি দীপ্ত দিবাকর উদিত গগনে।
নিমেষে পশিল সেথ সেনাপতির
মন্ত্রীশ্রেষ্ঠ
বলব;
গর্জিল সরােষে
নিশীথে উদ্যান বুকে, গর্জে যথ! বেগে
দাবানল, হেরি তরু বনানী মাঝারে।
কহে বৃদ্ধ বীর চাহি পৌত্রে আপনার
পাঠান-গৌরব
;
“কি কর কায়কুবাদ ! দুর্জয় শমন
দণ্ড নিয়ে দ্বারে আজি ; এই কি রে তাের
বিলাস বাসনা কাল ? এ কি রে সময়
কুঞ্জবনে মােহােম্মদে মত্ত হতে তব।
দেখ, দেখ, মহাবেগে আসে স্রোত হেন
কাফেরের সেনাগণ, আসিতেছে তারা
চৌদিকে ঘিরিয়া আজি শক্তি পাঠানের।
পশ্চিমে গর্জে মােগল, পূৰ্ব্বে ও দক্ষিণে
মালােয়ার মেওয়াতের সেনাপতিগণ
পাতিয়াছে সৈন্যজাল, আসিছে সরােষে
বীরশ্রেষ্ঠ যুবরাজ বীরপতি রণে।
ছিন্ন ভিন্ন পাঠানের রক্ষীসেনাচয়
সুদূর নগর দুর্গে। রাজপুত নদী
হেলায় ভাসায়ে দিল তৃণগুচ্ছ হেন
দুর্দান্ত পাঠানগণে আপনার স্রোতে।
এবে ফতেপুরে তারা, করি জয়নাদ
আসিছে দিল্লীর পথে দ্রুততর বেগে।
মত্ত তুমি হেনকালে মােহােত্মাদে হেথা
মত্ত পিতা যথা তাের আদর্শের মােহে ।
নির্বোধ জনক তাের, চাহে হিন্দুস্থানে
হিন্দুসনে বাড়াইতে মৈত্রীর শকতি।
কে চাহে রে মৈত্রী তার ? হিন্দু মহাস্রোত
তৃতীয় সর্গ
গরজে ভীষণ রবে হিন্দুস্থানময়
ডুবাইতে মুসলিমের ক্ষুদ্র তরী খানা
দুর্ধর্ষ প্রতাপে নিজ ; হিন্দু রােষ শিখা
দহিছে মুসলিম তরু, গৰ্ব মুসলিমের।
কে না সাজে হেন রণে? যে না সাজে আজি
সে যে অতি কাপুরুষ ; ভাবিছ কি মনে
সুন্দর এ কুঞ্জবনে বিলাসের মােহে
কাটাইবে চিরকাল ? অসম্ভব আশা !
নিষ্ঠুর কাফের সেনা পূরিবে কারায়
যদি নাহি যাহ রণে, কিম্বা হার যদি
রাখিবে শৃঙ্খলে বান্ধি নির্জন কারায়
অন্নহীন বস্ত্রহীন ; কুকুরের প্রায়
প্রহারিবে পদাঘাতে জেনাে সুনিশ্চয়।
কিম্বা বধিবে রে সবে ক্রোধে অস্ত্রানলে।
উড়িবে স্বপন সম সুখের বাসনা
তখন হৃদয় হতে। চাহ যদি সুখ
হয়ে এস রণজয়ী, জয় সুখমূল।
জয় বৃক্ষ, জেনাে মুখ ফলমাত্র তার।
চল, চল, রণে কালি, কর জয় সেথা
শত্রুসেনাপতিগণে, রাখহ গৌরব
রণক্ষেত্রে মসলিমের ; আমি যাব হােথা
পশ্চিমে মােগল জয়ে দুর্জয় সংগ্রামে।
পাঠান-গৌরব
৫৪
বৃদ্ধ আমি, পক কেশ, পক জ্বযুগল
দুলিছে নয়ন পরে, তবু নাহি ডরি
সমরে শত্রুর সনে ; সাজ রণসাজে
সঙ্গে নিয়ে মহবৎ বিনায়েৎ আদি
মুখ্য সেনাপতিগণ, যাব আমি একা
দুর্জয় মােগল জয়ে পঞ্জাব সীমায়।”
শিহরে কায়কুবাদ বুগরা-তনয়
শুনি পিতামহ বাণী, শিহরে যেমতি
বনভূমি মাঝে পান্থ অকস্মাৎ হেরি
দুর্দম শার্দলরাজে আগুলিতে পথ
বিকট বদন খুলি ; করিল স্বীকার
আক্ৰমিতে ফতেপুরে হিন্দুসেনাগণে।
চলিল। প্রাসাদে সবে ; আনন্দের ধ্বনি
ভরিল প্রাসাদ কক্ষ, বাজিল বাজনা
ঘােষি রণযাত্রা ; হােথা আপন প্রাসাদে
শুনিলা ফতেমা রাণী রণভেরী ধ্বনি,
গৌরবে ভরিল বক্ষ দিল্লী-প্রতিমার ।
••
চতুর্থ সর্গ
কোথা গাে তুমি মানব সাধনা
অতল হৃদয়সিন্ধু করিয়া মন্থন
আহরিল তব সুধা ; দেহ আজি মােরে
বিন্দু তার, কর কৃপা অধম এ দাসে।
পবিত্র অমৃত কণা লভিয়া তােমার
যুগে যুগে কত নর গিয়াছে চলিয়া
ধরায় দেবত্ব রাখি, দিব্য জ্যোতিঃ রাখি
অজ্ঞানের অন্ধকারে, কীৰ্ত্তিস্তম্ভ পুতি’
অনন্ত সময় বুকে অব্যয় অক্ষয়।
মহান্ পবিত্র বুদ্ধ তব কৃপা বলে
দানিল নীতি মানবে ; অন্ধ ঊরুপার
চিরবদ্ধ অাঁখি দুটি খুলিলে গাে তুমি
অবতরি খৃষ্টরূপে; আরবের মরু
শীতল করিলে পুনঃ দানি মহম্মদে
স্বর্গীয় সত্যের সুধা মানবের তরে।
জন্মিলে গাে গৌররূপে পুনঃ বঙ্গভূমে
চিরশস্যশ্যামলিত, সিঞ্চিলে ভারতে
কুহক দর্শন-দগ্ধ নরহৃদিমাবে
পাঠান-গৌরব
ভক্তির অমৃত বারি। কে বলে গাে তুমি
শুধু ক্ষণিকের আলাে, ক্ষণিকের তরে
উজলি হৃদয় ক্ষণে যাও গাে উড়িয়া ?
সত্যের জননী তুমি শক্তি সঞ্চারিণী,
জন্মদাত্রী আদর্শের মানব সমাজে
যুগে যুগে কে দেখাল অজ্ঞান মানবে
পবিত্র সত্যের পথ ? কে রাখিল নীতি
কিম্বা আদর্শ-গৌরব ? কে বহাল স্রোত
বিজ্ঞান-শক্তি সুধার ? কে তুলিল নরে
দ্রুত দিব্য স্বর্গপানে চির আলােকের ?
সে যে তুমি মহাশক্তি দিব্য শান্তিময়ী।
এস গাে, এস গাে, আজি হৃদয়ে আমার
উজল আলােকে নব, পাত গাে আসন
দিব্য তেজে আঁধার সে গহন মাঝারে।
জ্বলিল সন্ধ্যার আলাে ; শত মজিদে
গাহিল সহস্র কণ্ঠ আকাশের পানে
দিল্লী নগরীর শত প্রাঙ্গণ মাঝারে।
কুটিরে নীরবে শ্বেত আসন উপরে
বসিয়া রহিমখান, পাতি জানুদ্বয়
করযােড়ে উৰ্দ্ধ আঁখি ; আঁখিদ্বয় হতে
ঝরিছে আলােক রাজি, গগনে যেমতি
ঝরে তারকার আলাে গভীর নিশীথে।
•
চতুর্থ সর্গ
তুলিয়া মধুর ধ্বনি একদৃষ্টে চাহি
ক্ষুদ্র বাতায়ন পথে আকাশের পানে,
গাহিলা রহিমখান্ স্বরগের দূত
চাহি স্বর্গরাজপানে সুদূর স্বরগে ।
“খােল আঁখি, খােল আঁখি ওগাে দয়াময়!
ওগাে বিশ্বরাজ, ওগাে বিশ্বের পালক!
চাহ গাে ভারত পানে; হের ভস্মময়
সত্যের পবিত্র কায়া ; গভীর আঁধারে
দেহ সত্য আলাে পুনঃ দূর অতীতের।
যুগ যুগ ধরি তুমি এ ভারতভূমে
হ'লে অবতীর্ণ পিতঃ! কৃপায় তােমার
হইল গৌরবান্বিত এই পুণ্যভূমি ;
উদি জ্ঞানসূৰ্য্যরূপে ভারত গগনে
উজলিলে ধরাতল ; চীন ব্ৰহ্মদেশ
সুদূর আরব আর সুদূর উরূপা
উজলিল সে আলােকে ; কোথ। আজি তুমি
জ্ঞানময় দয়াময় প্রেমময় নাথ ?
খােল গাে, খােল গাে অাঁখি ওগো দয়াময়!
হের গাে ভারত পানে, পুনঃ আল হেথা
সত্যের স্বরগ আলাে ; যা পুনঃ ডুবে
অবিশ্বাস অন্ধকার, নাশুক আলােক
সন্দেহ-কালিমা রাশি—দগ্ধ হােক তায়
পাঠান-গৌরব
৫৮
জ্ঞানহীন প্রাণহীন বিশ্বাস কঠোর
যুগে যুগে ধরাতলে বহাইল যারা
গভীর শশাণিত স্রোত, কান্দাইল কত
মানবে, নাশিল কত স্মৃতি অতীতের।
সঞ্চারুক নবশক্তি ভারত হৃদয়ে,
জ্বলুক নবীন জ্যোতিঃ; আলােকে তাহার
উড়ে যা ভস্ম হেন ক্ষুদ্র স্বার্থলীলা
এই পুণ্যভূমি হতে ; হােক্ প্রতিষ্ঠিত
বিশ্বধর্ম বীজ হেথা ; ভুলে যাক্ নর
ভেদ বার্তা চিরতরে ধরণী উপরে।
এক ধৰ্ম্মস্রোত এক মানব সমাজে
প্রকাশুক ধরাময় ;
বিভিন্ন শাখায়
ছুটুক সে মহানদী শান্ত স্নিগ্ধ বেগে
অনন্ত শান্তির হ্রদে, ডুবে যাক হেলে
কুটিল কলহ-পঙ্ক, ক্ষুদ্র স্বার্থ নেশা;
দূরে যাক ক্ষুদ্রতার মােহ অগণন,
দূরে যাক সমরের ঝাট ভীষণ।
খােল গাে, খােল গাে আঁখি ওগাে দয়াময় ।
হের গাে ভারত পানে, ভারত জীবন
দীপ্ত হােক নব তেজে, নবামৃত আজি
বিনাশুক নব বলে বিষকণাচয়ে।
ভারত অন্তর মাঝে আসুক আবার
চতুর্থ সর্গ
পবিত্র সত্যের আলাে, জড় অন্ধকার
সে আলােকে অবহেলে যাক্ রে উড়িয়া।
আবার খুলুক পথ ভারত দর্শন
ধরার মানবতরে, সাহিত্য মধুর
ছিড়ি মােহময় জাল ইন্দ্রিয় লীলার
উঠুক গর্জিয়া পুনঃ সঞ্চারিতে সুধা
ক্লিষ্ট ভারতের হৃদে ; নবীন গৌরবে
ফুটুক সত্যের ফুল ভারত উদ্যানে।
আরবের সত্য স্রোত মিশি সেই স্রোতে
সনাতন শান্তিময়, বহুক উজলি
ক্লিষ্ট এ ভারত বুকে, জড়শক্তি বলে
জীর্ণ দীনহীন আজি ; উঠুক ভাতিয়া
ঘন অন্ধকার মাঝে আলাে অতীতের।
হিন্দু মুসলমান হেরি সে দিব্য আলােক
ভুলে যাক্ স্বতন্ত্রতা, ভুলে যাক ছায়া
অনাবিল ধরমের ; কায়াপূজা শুধু
হােক প্রতিষ্ঠিত হেথা; আসুক নামিয়া
ভারতে পবিত্র শান্তি জগতের তরে।”
গাহিতে গাহিতে অাখি খুলিল রহিম,
ক্ষুদ্র সে কুটীর মাঝে ; কার পদধ্বনি
নম্র সুকোমল আসি পশিল শ্রবণে ।
ফিরাইয়া আঁখিদ্বয় হেরিলা রহিম
৬০
পাঠান-গৌরব
মুসলিম কুলতিলক দিল্লীর সম্রাটে
সাম্রাজ্ঞী ফতেমা সহ প্রবেশিতে সেথা
আপনার ক্ষুদ্র গৃহে;
দিল্লীর ঈশ্বর
দীন ফকিরের বেশে ধবল বসনে ;
শােভিছে ধবল দেহ আপন আলােকে
পূর্ণিমার চন্দ্র যথা। সে স্নিগ্ধ আলােকে
আলােকিত রহিমের কক্ষ সুবিমল
সন্ধ্যার সে অন্ধকারে! কহিলা সম্রাট
চাহি রহিমের পানে গদগদ স্বরে
“ধন্য হে ফকিরবর! ধন্য জন্ম তব
ধরাতলে ; ধন্য তব হেথা আগমন।
পবিত্র ভারত আজি পদরজে তব ;
প্রচারিতে ধরাতলে আদর্শ মহান
অনাবিল
ধরমের,
আসিলে হেথায়
দিল্লীব এ রাজপুরে নগরে আমার।
প্রতিহিংসা অন্ধকার আবরিছে আজি
হিন্দু মুসলমান আঁখি, আবরে যেমতি
কুজঝটিকা রবিকর; প্রতিহিংসানল
স্বতেজে করিছে ভস্ম ধরম অঙ্কুর
হিন্দু মুসলমান হৃদে ; ক্ষুদ্র ছায়া তরে
উন্মাদ মুসলিমগণ মদোন্মত্ত প্রায়
ছুটিছে যুঝিতে রণে; ক্ষুদ্র ছায়া তরে
;
চতুর্থ সর্গ
সহস্র সহস্র হিন্দু আহ্বানে সমরে
দন্তী মুসলমানগণে; শক্তি উভয়ের
আক্ৰমিতে আসে বেগে মােগলের সেনা
পশি খাইবার পথে ; জলবিম্ব প্রায়
ডুবিছে মৃত্যুসাগরে হিন্দু মুসলমান।
হেন অন্ধকারে, হেন সমর অনলে
এসেছ স্বরগ দূত! স্বরগ আলােক
বিতরিতে ধরা’পরে, এসেছ নামিয়া
পরম করুণাবশে ভারতের বুকে।
কিন্তু কোথা আশা দেব, সেই মিলনের ?
কোথা সে বিশ্ব
ধরম, দিবাকর হেন
দানিতে সকল নরে এই ধরা পরে
দিব্য আলাে, দিব্য শান্তি ? কোথা নরপ্রাণে
পবিত্র সত্যের ধারা, কোথা ধরাতলে
ভ্ৰাতৃভাব সৰ্ব্ব নরে? নাহি চিহ্ন তার ;
এখন সকল জাতি সকল ধরম
ক্ষুদ্র স্বার্থমদে মত্ত ; এখনাে সমর
নরক হইতে আসি মত্ত করী হেন
দলিছে নর-সমাজ ; এখনাে বিজ্ঞান
ধরিয়া বিকট রূপ চাহিছে নাশিতে
ধরাতলে নগণে আপনার বলে ;
দাম্ভিক মানব-সৃষ্টি চাহে দহিবারে
পাঠান-গৌরব
মানুষে অবনীপরে, দাবানল যথা
জনমি গহন মাঝে দহে তরুগণে
স্বর্ণ-লতিকায় ঢাকা ; এখনাে মানব
জাতিভেদ দেশভেদ শৃঙ্খল বন্ধনে
চাহে নাশিবারে হেথা নিজ ভ্রাতৃগণে।
এখনাে অসত্য ছবি সত্য রূপ পরি
মরীচিকা হেন লােভে নয়ন সবার ;
ছুটে নর তারি পানে হ’তে দগ্ধতায়
ক্ষুদ্র পিপীলিকা যথা দগ্ধ হয় হেলে
দীপ্ত দাবানল তেজে বনভূমি মাঝে।
কোথা আজি সত্য ছবি ফকির প্রবর ?
কোথা বারিরাশি হেন দীপ্ত মরুভূমে ?
কোথা তপনের আলাে এ হেন নিশীথে
হেন অন্ধকার মাঝে ঘন গহনের ?
কহ আজি কহ মােরে মুসলিম প্রবর,
দেহ শান্তি ক্লিষ্ট হৃদে, এ তপ্ত পরাণে।
সহস্র মুসলিম সেনা গিয়াছে ছুটিয়া
যুঝিবারে মহারণে মােগলের সনে ;
সহস্র গিয়াছে পুনঃ হিন্দু-রাজ-রণে।
পশ্চিমে বলব বলী মত্ত জয়ােন্মাদে
যুঝিছে মােগলসনে, দক্ষিণ সীমায়
যুঝিছে কায়কুবাদ যুবক দুর্বল
চতুর্থ সর্গ
মালােয়ার বীরমণি বীরপতি সনে।
কোথা একতার আশা এ হেন বায়
বিশাল ভারত’পরে, কোথা শান্তি আশা ?
কহ হে ফকিবর, কহ আজি মােরে।”
কহিলা ফকিরবর কক্ষে আপনার
চাহি ধীরে পাঠানের অধীশ্বর পানে
“সত্য যা কহিলে তুমি ওহে দিল্লীশ্বর।
সত্য সেই ছবি তুমি অাকিলে যা’ আজি
নিজ চিন্তা-ভূলিকায় ; হেরিতেছি আমি
ভীষণ হতাশা ঘাের মানব সমাজে।
আলেয়ার আলাে তরে ধরার মানব
ছুটিছে ঘন আঁধারে, কায়া ভ্রমে তারা
করিছে ছায়ার পূজা, ভুলি একেশ্বরে
সহস্র ঈশ্বর পূজা করিছে সতত
অজ্ঞানের মােহ বশে, ক্ষুদ্র দেব পদে
দানিছে বৃহৎ পূজা সে মহা আঁধারে।
কিন্তু বর্তমানে হেরি ভবিষ্যৎ আশা
নাহি ত্যজে জ্ঞানী নর, বর্তমান সদা,
ভবিষ্য-পৰ্বত-শিরে উত্থান সােপান।
মহা-তুফানের শেষে সুশান্ত জলধি ;
;
পাঠান-গৌরব
;
মহা-শীত শেষে আসে বসন্ত মাধুরী ;
জ্বলন্ত রবির আলাে ডুবে যায় হেলে
স্নিগ্ধ শান্ত সুধাকরে। ক্রুদ্ধ দাবানল
নিৰ্বাপি রাখিয়া যায় বনানী মৃত্তিকা
সারপূর্ণ শক্তিপূর্ণ ; ভীষণ প্লাবন
সর্বগ্রাসী সর্বনাশী, ভরায় পলিতে
ধরাতল, নবশক্তি নবকান্তি দিয়া।
মহা অন্ধকার, মহা অজ্ঞানের শেষে
আলােক আসিবে নামি, মহা সমরের
সর্বগ্রাসী অগ্নিশেষে আসিবে ধরায়
স্নিগ্ধ শান্তি-সুধা আলাে; হয়াে না নিরাশ।
সহস্র কায়কুবাদ যাইবে পুড়িয়া
সেই মহাশান্তিপথে, সহস্র বলব
তুলিয়া আপন শির মহাশৈল প্রায়
হেলায় ডুবিবে সেথা, সহস্র নাছির
যুগে যুগে আলিঙ্গবে দূর-শান্তি রেখা
জিনিয়া প্রতিবন্ধকে। আসিবে তখন
সত্য এ ভারতভূমে, মহাস্রোত যার
আবরিবে মহাসিন্ধু হেন ধরণীরে
পবিত্র শান্তির নীরে ; মানব সমাজে
নাহি রবে অজ্ঞানের ঘন অন্ধকার,
নাহি রবে সমরের অনল ভীষণ
চতুর্থ সর্গ
দহিতে মানবে হেথা ; অসত্য আঁধার
পারিবে আবরিতে সত্যের গরিম।।
আছে হেন আশা মম; আছে অন্ধকারে
সুস্থির আলােক রেখা অচল অটল।
তাই স্থির আজি আমি এ মহাপ্রলয়ে ;
তাই মহাসমরের ঘাের বিভীষিকা
বিচলিতে নারে মােরে ; তাই হেরি চোখে
সহস্র মুসলিম হত মােগলের করে,
সহস্র সেনানী মৃত বীরপতি-রণে
টলে হৃদয় মম ; আছি দাড়াইয়া
অসীম সময় বুকে স্থির অচঞ্চল।
দেখি যদি অন্ধকার আসিছে ঘনায়ে
অসীম অপরাজেয়, মহাকাল হেন
ডুবাইতে নরক্তে নরের মেদিনী,
আমিও ফিরিয়া যাব কুটিরে আপন
“খাইবার” পথে ; পর্বত গুহায়
পুনঃ চরাইব সেথা শ্বেত মেষদল
সৰ্ব্ব মেষপাল সনে ; গাহিব পৰ্বতে,
শান্তির আহ্বান গান, আনন্দে নাচিবে
শুনি পাখী সে সঙ্গীত, নবীন পল্লব
মর্মরিয়া মিশাইবে তান আপনার
সে দিব্য সঙ্গীত সনে, তরঙ্গিনিগণ
পাঠান-গৌরব
নিবে সেই সুর বহি অনন্ত সাগরে।
রহিমের গুপ্ত আশা রহিবে লুকায়ে
দূরে পর্বতের বুকে, ফিরিবে সে শুধু
হেরি স্নিগ্ধ মনােহর ইঙ্গিত ধাতার
পুনঃ এই হিন্দুস্থানে, এ দগ্ধ ভারতে।”
নিস্তব্ধ নাছিরুদ্দিন, শুনি হেন বাণী
সন্ধ্যায় রহিম মুখে ; কহিলা ফতেমা
চাহি ফকিরের পানে ধীরে মৃদুস্বরে
কণ্ঠে যেন কোকিলের বাহিরিল ধ্বনি
মধুর বসন্ত-রাতে, কিম্বা বােধনের
দেবী যেন কহে কথা অমৃত বর্ষণে
“কহিলে যা স্বর্গদূত, সত্য মানি তাহা ;
বিশেষ—বাণী তােমার বর্ষিল শ্রবণে
সুধাধারা, শ্রাবণের বারিধারা হেন।
কিন্তু সে যে গুপ্ত কথা দূর ভবিষ্যের।
কঁদিছে পরাণ মম আজি অবিরত
নিঠুর যুদ্ধ-চিন্তায়, কঁদে যথা তরু
নিঠুর হিম-বর্ষণে ; দুর্দান্ত মােগলে
আক্ৰমিতে গেছে পিতা; ভ্রাতুপুত্রবর
নির্বোধ কায়কুবাদ গিয়াছে দক্ষিণে
যুঝিতে মালােয়াসুত বীরপতি সনে।
কি জানি কি হ’ল কোথা মহারণ মাঝে ?
;
৬৭
চতুর্থ সর্গ
জানি না সৈনিকগণ জিনিছে কি রণে
দুর্দম শত্রুর সেনা দক্ষিণ সীমায় ;
জানি পিতা হবে জয়ী, কে কবে কোথায়
পরাজিয়া গেছে সিংহে বনানী মাঝারে ?
কিন্তু ভ্রাতুস্পুত্র নহে রণে সুকৌশলী ;
প্রমােদ উদ্যান হতে আহ্বানি বালকে
পাঠাই মহারণে, কোমল পল্লব
নিদাঘে মরুমাঝারে দিয়াছি ফেলিয়া।
তাই কঁাদে প্রাণ মম ; কহ, কহ দেব,
ফিরিবে কি রণজয়ী ভ্রাতুস্পুত্র মম ?
জিনিবে কি সমরে সে বীরপতি বীরে ?
হবে কি সমরে জয়ী মুসলিম সন্তান?
নাহি জানি অন্য ধর্ম, জানি শুধু, দেব,
আমি মুসলমান-সুতা, মুসলিম-তনয়া।
চাহি জয় মুসলিমের, চাহি মুসলিমের
সিংহাসন এ ভারতে, চাহি কীৰ্ত্তি তার
সকল ভারতময় ; জানি
ধরায় ধরমশ্রেষ্ট ধর্ম মুসলিমের ।
জিনিবে কি মুসলমান শত্রুর সমরে,
কুশলে আসিবে ফিরি জনক আমার,
ফিরিবে কায়কুবাদ বিজয়ী সমরে ?
ভাসিবে মহা আনন্দে এ দিল্লী নগরী
শুধু সদা
পাঠান-গৌরব
৬৮
পুনঃ মহা কোলাহলে মুসলিমের জয়ে ?
কহ, কহ, দেব মােরে, স্বর্গদূত তুমি
কত ভবিষ্যৎ কথা কহিলে হে আজি
সন্ধ্যায় সম্রাট সনে; কহ শুধু মােরে
ভীষণ সমর বার্তা উভয় সীমায়।
চাহে ফতেমা তত্ত্ব দূর
ভবিষ্যের,
চাহে সে বিশ্ববার্তা, না চাহে সে আজি
কবে কোথা সৰ্ব্ব জাতি একতা বন্ধনে
চলিবে ধরম-পথে ধরাতল 'পরে !
চাহি শুধু জয়বাৰ্তা, চাহি রণজয়
মুসলিমের ধরাতলে, চাহি এ ভারতে
শুধু মুসলিমের জয় সর্বদা সমরে।
চাহি পিতার ন্যায় বিস্তারিতে হেথা
অসি হস্তে মুসলিমের ধৰ্ম্ম শান্তিময়
এ বিশাল হিন্দুস্থানে, নাহি হেরে মন
হেথায় হেন স্বপন ; চাহি শুধু জয়
রণে, যবে আসে রণ ; পাঠান-গৌরব
চাহি সদা এ বিশাল হিন্দুস্থান পরে।
কহ দেব! কহ মােরে জিনিবে কি রণে
বালক কায়কুবাদ, হবে রণজয়ী ?”
অধীর দিল্লীর রাণী বলিতে বলিতে
ঝরিল নয়নে অশ্রু, তৃণ-শির 'পরে
;
••
৬৯
চতুর্থ সর্গ
কনক শিশির যথা। কঁদিলা ফতেমা
অন্তরে ভাবিয়া শত অমঙ্গল কথা।
কহিলা রহিম চাহি ফতেমার পানে
“না জানি ভবিষ্য-কথা, দিল্লী অধীশ্বরি ।
নাহি মােরা বেশধারী ফকির পথের
নিত্য নব মায়াছলে ভুলায় যাহারা
দুর্বল মানব-মন ; শত মিথ্যা কহি
অর্জে অর্থ রাজপথে কিম্বা পল্লী মাঝে।
ধিক্ সে জঘন্য নেশা। ধর্মের নামেতে
বিস্তারিছে মহাপাপ মানব-সমাজে।
জানি শুধু শক্তি-কথা, জানি মুসলমান
ভারতে বিজয়ী হবে খােদার কৃপায়।
দুর্জয় মুসলিম-নদ জনমি আরবে
বহিছে ভারত পানে; ক্রমে ভারতের
প্রতি দেশ, প্রতি গ্রাম, প্রত্যেক কান্তার
হবে মুসলমানময়, সন্ধ নাহি তায়।
মুসলিম শকতি ক্রমে জিনিবে ভারতে
দুর্জয় হিন্দু-শকতি, দিল্লীর ঈশ্বর
অচিরে ভারতেশ্বর হইবে ভারতে।
আর জানি পিতা তব দুর্জয় প্রতাপে
শক্তিবলে পরাজিবে মােগল সেনায়
পশ্চিমের মহারণে ; কিন্তু দক্ষিণের
পাঠান-গৌরব
সেনাদল জিনিবে কি, সন্ধ হয় মনে।
বালক কায়কুবাদ অকুশলী রণে ;
বিনায়েৎ মহবৎ নামে সেনাপতি।
বীর সেথা বীরপতি মালােয়া তনয়,
উদ্দীপিত রণদৰ্পে, উচ্চ আদর্শের
মহাবলে বলীয়ান, সুকৌশলী রণে।
সেই হবে রণজয়ী বিশ্বাস আমার ;
আসিবে হিন্দুর সেনা অগ্রসরি হেথা
এই রাজধানী পানে; যদি পিতা তব
আসে হেথা হয়ে জয়ী রক্ষিতে নগরী,
পুনঃ পরাজিত হবে হিন্দুর শকতি।
কিম্বা যদি আসে হেথা বুগরা সুমতি
রক্ষিতে পাঠান দেশ, হবে রক্ষা তার।
এই শুধু জানি দেবি! না জানি অধিক।”
শুনি পিতৃজয়-কথা হল হরষিত
ফতেমা পিতৃবৎসলা; কিন্তু শেষবাণী
শেল হেন বিদ্ধ হল সম্রাজ্ঞীর প্রাণে।
কঁদিল কোমল প্রাণ, কহিলা চাহিয়া
বলব-তনয়া সেথা দিল্লীশ্বর পানে
“কেন দিল্লীশ্বর এবে অলস হেথায় ?
রাজ্যের বিপদ জানি কোন্ রাজা কোথা
নিশ্চল সন্ন্যাসী প্রায় বসে গাে কুটিরে ?
৭১
চতুর্থ সর্গ
কভু মিথ্যা নাহি হবে রহিমের বাণী,
কভু তপ্ত নাহি হবে ঊষার শিশির ;
অমৃত তরঙ্গ হেন সত্য ভবিয়ের
বিহরে রহিম হৃদে, প্রতি কণা তার
অমৃতের কণা হেন সঞ্চরে হৃদয়ে।
দ্রুত যাক দূত সেথা দূর বঙ্গদেশে
আনিবারে বুগরারে, সাজুক সকলে
দিল্লীবাসী রােধিবারে হিন্দু-আক্রমণ।”
নীরবিলা দিল্লীশ্বরী ; ত্যজিলা আসন
অধীর চঞ্চল মনে ফিরিতে প্রাসাদে,
ফিরে যথা বনমাঝে শঙ্কিত হরিণী
গুহায় আশ্রয় আশে ; কহে দিল্লীশ্বর
চাহি দিল্লীশ্বরী পানে কোমল বচনে
“তিষ্ঠ ক্ষণকাল রাণি ! কাহার আদেশে
আসিবে যুঝিতে হেথা সােদর তােমার ?
পিতৃ-অপমান-দগ্ধ সুমতি বুগরা
গেছে বঙ্গদেশে নিয়ে অনুমতি মম।
বিনা রহিমের বাণী ফিরিবে না হেথা ;
বৃথা অধীরতা তব এ মহাশঙ্কটে ;
এস, সঙ্গে যাব দোহে আপন প্রাসাদে।”
শুনি সম্রাটের বাণী নিবত্তিলা ধীরে
৭২
পাঠান-গৌরব
ফতেমা পাঠানবধু বলব-তনয়া ;
আনন বিষাদভরা, পূর্ণচন্দ্র যথা
শ্রাবণে জলদে ঢাকা ; কহে সুকরুণ
চাহি রহিমের পানে, চাতক যেমতি
চাহে নীলাকাশ পানে নিদাঘ সন্ধ্যায়
মধু বরষণ আশে, কিম্বা গােধূলির
ক্লান্ত তারা চাহে যথা সুধাকর পানে।
;
“দেহ অনুমতি দেব। পাঠাইতে দূত
বঙ্গে বুগরা-সমীপে ; কঁপিছে হৃদয়
থরথরি আজি মম অকুশল ভয়ে।
রক্ষ পাঠান-গৌরব,
ওহে
স্বর্গ
দূত,
পুণ্যময় স্বরগের ; জানিনা কখন
হিন্দু সেনা আক্রমিবে পুরী পাঠানের।
আসুক বুগরা হেথা সৈন্যগণ সহ
রক্ষিতে পাঠান পুরী, রক্ষিতে সবারে
এ ভীষণ দুরদিনে; জানি বীর ভ্রাতা
হবে কাতর কভু সমরের ভয়ে।”
নীরবিল মহারাণী, হেরিলা রহিম
দূরে বাতায়ন পথে, রাজদূতদ্বয়
দ্রুত আসিতেছে হেথা কুটিরের পানে।
মুহূর্তে পশিল আসি কুটির দুয়ারে
••
চতুর্থ সর্গ
সমরের দূতদ্বয়, কঁপিতে কঁপিতে
কহে কথা যুক্তকরে, কাপয়ে যেমতি
কদলী প্রবল বায়ে বৈশাখ-সন্ধ্যায়—
“জাঁহাপনা ! পলাইছে দক্ষিণের রণে
পাঠানের সেনাগণ ; আসিছে ছুটিয়া
সবে দিল্লীপানে আজি, অজাগণ যথা
সিংহমুখে ছত্রভঙ্গ ফিরে গৃহপানে।
বন্দী বিনায়েৎ খান্ সৈন্যগণ সহ ;
জানি কোথায় আজি সেনার নায়ক
যুবক কায়কুবাদ; শুনি রণ ত্যজি
অশ্বপৃষ্টে ছুটিয়াছে রাজধানী পানে
মন্ত্রী-পৌত্র, হেরি রণে ছত্রভঙ্গ সেনা
অনুমতি হাে দাসে, আসিয়াছে দাস
অন্য সেনাপতি হ’তে অনুজ্ঞা লইয়া।”
কম্পিল সম্রাট হৃদি, কম্পিল সেথায়
হৃদি রাণী ফতেমার, নাহি আসে আর
নম্র মধুমাখা বাণী সে নম্র অধরে।
আননে কালিমারেখা হইল অঙ্কিত
স্বর্গদূত রহিমের, কহিলা রহিম
চাহিয়া সম্রাট পানে সে কাল সন্ধ্যায়-
“যা দূত বঙ্গদেশে, আসুক বুগরা ;
পাঠান-গৌরব
৭}
মম আজ্ঞা আসিবারে রক্ষিতে নগরী।
বিষম বিপদে দেশ, বুঝি কিছুকাল
বিলুপ্ত-গৌরব হবে ভারতে পাঠান
মত্ত বলব তরে! কি জানি কি হয় ?
দুর্দম প্লাবনস্রোতে আসিছে হেথায়
জয়ী রাজপুতসেনা; যাহ, দাসরাজ !
আপনি সমরে সাজি, কহ দূতগণে
সেনাপতি হয়ে তুমি যুঝিবে সমরে!
সাহসে পূরিবে হৃদি শুনি এ বারতা
সৈন্য সেনানায়কের, যুঝিবে সকলে
পুনঃ রণে বীরতেজে ; যাহ তুমি রণে,
যাবৎ বুগরা হেথা না আসে ফিরিয়া।”
শুনি রহিমের বাণী দাসকুলমণি
উঠিলা ফতেমা সহ ; সন্ধ্যার নমাজ
তখনি হইল শেষ, সৰ্ব্ব মজিদে
দিল্লীর পাঠানগণ আতঙ্কে শুনিল
পাঠানের পরাজয় ফতেপুর রণে।
চলিল সকল প্রজা প্রাসাদের পানে
জানিতে রাজ-ঘােষণা, অবিলম্বে চর
ঘােষিল নগরময় ঢঙ্কার নির্ঘোষে--
‘সংগ্রামে যুঝিবে নিজে দিল্লীর ঈশ্বর
দাসরাজ-কুলমণি নাছির উদ্দিন
চতুর্থ সর্গ
শ্রেষ্ঠ সেনাপতি-পদে। শুনি সে ঘােষণা
সাজিল পাঠান সবে। বাজিল দুন্দুভি
নিশীথে নগরময় সৰ্ব্ব রাজপথে।
হােথা ক্ষুদ্র কুটিরের কক্ষ অভ্যন্তরে
হেরি আকাশের পানে, হয়ে নতজানু
কহিলা রহিম খান্ সুকরুণ স্বরে ;
“রক্ষ, রক্ষ খােদা! আজি মুসলিম ধরম
এ দিব্য ভারতভূমে এ মহা বিপদে।
আসিছে বিকট ধ্বনি মহাপ্রলয়ের,
দুৰ্বল মুসলিম-তরু রাখ হিন্দুস্থানে।”
মন্দ সমীরণ বহি সে কণ্ঠ করুণ
দূরে বাতায়ন পথে নিশার আলােকে
উড়াইল স্বর্গপানে ; গাহে প্রতিধ্বনি
মিশায়ে রহিম কণ্ঠে কণ্ঠ আপনার
পূরি সে করুণ সুরে দিগদিগন্তর—
“রক্ষ বক্ষ খােদা, আজি মুসলিম ধরম
এ দিব্য ভারত ভূমে এ মহাবিপদে।”
;
পঞ্চম সর্গ
মালােয়ার রাজপুরে রাজ-অন্তঃপুরে
সন্ধ্যার অাধারে বসি একা বাতায়নে
চাহি আকাশের পানে, কে গাে এ মূরতি
দিব্য স্বরগের শােভা, নবীনা যােড়শী
তপ্তকাঞ্চনবরণা হয়ে আত্মহারা
কি হেরিছে মনােমাঝে! কার প্রতিকৃতি
ভাসিয়া সুন্দর হৃদে ডুবি পুনঃ তায়
আলােড়িছে বক্ষ তার ? কেন স্বর্ণময়ী
মালােয়ার কুলবধূ অপূর্ব রূপসী
একেলা চাদের শোভা শরতের রাতে
বিষাদে হেরিছে আজি মেলিয়া নয়ন ?
চল গাে কল্পনে। আজি সেই বাতায়নে
সে নব নয়ন পথে, হের কিবা প্রেম
উথলি উথলি হৃদে খেলিছে সেথায়।
কোন তীব্র উচ্ছ্বাসের আবেগ মধুর
আলােড়িছে হৃদি তার ? কেন বা একাকী
শূন্য আকাশের পানে, শূন্য হৃদি নিয়ে
অনিমেষ দৃষ্টে হেরে মালােয়ার বধূ
বীর বীরপতি-বাঞ্ছা বরাঙ্গী করুণা।
পঞ্চম সর্গ
জ্বলিল সন্ধ্যার আলাে, প্রাসাদ অন্দর
উজলিল সে আলােকে ; উদ্যানে প্রাঙ্গণে
নীরব প্রহরীগণ সবে অস্ত্রকরে
স্থির দাঁড়াইয়া সেথা প্রাসাদ রক্ষণে।
সন্ধ্যা সমাগমে এবে নাহি কোথা আর
দিবসের মহারব, নাহি শব্দ ঘাের
নগরের শতপথে সহস্র শকটে।
শুধু দূরে মন্দিরের ঘণ্টা সুমধুর
সঘনে উঠিছে বাজি, শুধু আরতির
পূত সুমধুর ধ্বনি উঠিছে আকাশে
মধু ধূপ গন্ধ সহ মধুর স্পন্দনে।
কোথা বা ব্যাকুল পাখী সঙ্গিগণহারা
ডাকিছে কাতর রবে, কোথা পেচকের
কুটিল কর্কশ স্বর কঁপিছে সঘনে
রাজ অন্তঃপুরমাঝে প্রাসাদের কোণে।
মালােয়র অধিপতি শূরভদ্র বলী
সমাপিয়া রাজসভা ফিরিলা প্রাসাদে
পুত্র
বীরপতি তরে।
অধিরাণী ক্ষুব্ধচিত্তে চিন্তে অবিরত
রতন পালস্কোপরে পুত্রের মঙ্গল।
ছয় মাস ত্যজি দেশ গিয়াছে সমরে
রাজ্যের গৌরবমণি; অন্ধকার সদা
ব্যাকুল চিন্তায়
৭৮
পাঠান-গৌরব
রাজপুরী যুবরাজ বীরপতি বিনা-
অন্ধকারময় যথা গ্রহণের দিনে
সুনীলিম গগনের মাধুরী সুন্দর।
সন্ধ্যার আকাশে শােভে নিৰ্ম্মল জ্যোছনা ;
বাতায়নপথে দূরে হেরিছে করুণা
নিৰ্ম্মল চঁাদের পানে, স্নিগ্ধ সুধা যার
হৃদয়ে আনিল মুখ মধুপরশের
নিজ প্রিয়তমবুকে দূর অতীতের।
মধুর চন্দ্রিমা আলল, চন্দ্রিমা কিরণ
ঢালে সুধাধারা সদা ধরণী উপরে
তুষি সর্বজীবহৃদি ; মধুর তেমতি
বীর বীরপতি বুকে প্রেম আলিঙ্গন
প্রণয়িণী করুণার ; তাই চঁাদ সুধা
অহরহঃ জাগাইছে প্রিয়তমা-হৃদে
প্রেমময় প্রিয়তমে, তাই হৃদি তার
স্নিগ্ধ শান্ত করে পূরিছে আবার
স্মৃতির মধুরিমায়, তাই প্রাণ তার
ক্ষণে ক্ষণে উঠে কপি, চম্পক যেমতি
বসন্তের মধুবায়ে পল্লবের বুকে।
নিস্তব্ধ রাজ-নন্দিনী, রাজকুলবধূ
স্মৃতি-সুখে আত্মহারা। তৃষিত পাপিয়া
শারদ পূর্ণিমা কোলে শারদ গগনে
৭৯
পঞ্চম সর্গ
পিয়ে অবিরত মধু যথা চঁাদ হতে,
পিয়িছে নীরবে তথা স্মৃতিসুধাধারা
অচকিতা অচঞ্চলা করুণা রূপসী
মধুর শরত রাতে মধুর স্বপনে।
অকস্মাৎ প্রিয়সখী প্রমীলা রূপসী
ডাকিল পশ্চাৎ হ’তে ; উঠিল কাপিয়া
বাস্তবের পরশনে স্বপনের মােহ
রাজবধূ করুণার, কঁপে যথা হেলে
কুলায় পাখীর হৃদি, অকস্মাৎ হেরি
কম্পিত বিটপীবরে মধুর সন্ধ্যায়
দ্রুত ভূকম্পন বেগে ; কহিলা প্রমীলা
চাহি প্রিয় সখী পানে
“কি করলাে হেথা ?
হেরি নিশানাথে হােথা ভাবিছ কি বালা
নিজ প্রাণনাথ কথা ? কিম্বা প্রকৃতির
মধুর সৌন্দর্য্যে বুঝি হলে আত্মহারা
আজি শরতের রাতে ? কেন হেরি আজি
মুগ্ধ তােমা বাতায়নে শারদ সন্ধ্যায় ?
বিরহিণ। কহ মােরে মরমের কথা
পিক-কণ্ঠে, কহ সখি! প্রেম-মদিরার
আকুল কম্পিতকণ্ঠে স্বপন-বারতা
সন্ধ্যার, সন্ধ্যায় আজি ; কিবা তন্দ্রা ঘাের
পাঠান-গৌরব • মােহিল হেলায় তােরে ওলাে সুনয়নি। কঁপিলে হঠাৎ কেন হেরিয়া আমায়। ভাবিছ কি পত্র-কথা গত দিবসের ? নাহি আজি চিহ্ন তার, অশ্রুবিন্দু তাের সিক্ত করিয়াছে তায়, নাহি লিপি 'পরে মসীর মধুর রেখা, প্রেমময় লিপি হল আত্মহারা পিয়ি অশ্রু আঁখি হতে প্রেমিকার, স্বরগের প্রেম সুধামাখা। কহ দিদি ! কহ তাের স্বপন বারতা।” মধুর নিঝর জিনি বাণী সুকোমল ঝরিল প্রমীলা-কণ্ঠে ; কহিলা করুণা মেওয়াত-রাজ-তনয়া বন্ধু মালােয়ার- “নাহি ভাবি পত্র কথা, হে সখি প্রমীলে । কি কাজ সে ভাবনায় ? অশ্রুসিক্ত তার অমিয়-কোমল দেহ গিয়াছে মিলায়ে হেলায়, পরাগ যথা স্ফুট চম্পকের মিলায় শিশির-নীরে ; ভাবি স্মৃতিকথা। কি মধুর স্মৃতি, সখি । কিবা সুকোমল মনােময় ছবি তার। কিবা সুধাময় দিব্য রামধনু-রঙে সৃজিল বিধাতা সুকোমল তনু তার! বুঝি পদ্মরাগে স্বর্গের সুষমা ঢালি নিৰ্মাইল ভায়
•৮১
পঞ্চম সর্গ
স্মৃতির মধুর কান্তি স্বরগ-সুন্দর।
নিশ্বাসে কস্তুরী-গন্ধ স্মৃতি-প্রতিমার,
কমলিনী হেন স্পর্শে, শিষ্ট সুকোমল।
চঞ্চল নয়নদ্বয় দিব্য
জযুগলে
জ্বলে তারকার প্রায় ; নীল কেশরাজি
জিনি গগনের নীল, গগন-গরিমা
দুলে দু-কুন্তল ঢাকি আবেশ-পবনে।
হ’ মুগ্ধ হেরি তায় মৃদুতা-বশে;
তাই কঁপিল এ হিয়া পদশব্দে তব
কোমল গালিচা পরে, সত্য কহি সখি।”
নীরবিলা রাজবধু, নীরবে যেমতি
গােলাপের বুকে
স্নিগ্ধ কণা শিশিরের
গাহি চঁাদ-সুধা-গীতি স্নিগ্ধ শরতের।
কহিলা প্রমীলা চাহি করুণার পানে
হেরিয়াছ প্রেমছবি, মেওয়াত তনয়া !
স্বর্ণ-তুলি দিয়ে আঁকা; শুনিয়াছি কত
অপূর্ব প্রেম বারতা কাব্য ও পুরাণে
অপরূপ পুণ্যময়; কিন্তু নাহি হেরি
হেন মূর্তিময়ী ছবি অপূর্ব প্রেমের
কভু কোথা ধরাতলে ; নাহি শুনি
কভু
হেন মধুমাখা বাণী প্রেম-স্মিরিতির
কোন প্রণয়িনী-মুখে, হেন স্বপ্ন কথা।
;
পাঠান-গৌরব
৮২
ধন্য মালােয়ার পুরী পরশে তােমার ;
পবিত্র এ দেশ সখি। ধরি নিজ বুকে
এ হেন প্রেমের আলাে ; নাহি সন্ধ মাের,
মহারণে রণজয়ী হবে বীরপতি
প্রিয় প্রাণনাথ তব, ফিরিবে গৌরবে।
ফিরে পাবে তুমি, সতি! নাথে আপনার
আপন কোমল বুকে; স্মৃতিমূৰ্ত্তি তব
ধরি দিব্যমূৰ্ত্তি পুনঃ নয়ন-রঞ্জন
আসিবে নিকটে তব বাস্তবের রূপে
উজলিতে হৃদি তাের নবীন গৌরবে।
তবু ইচ্ছা হয় মনে জিজ্ঞাসি বারেক
সমর-কুশল বার্তা, জান কি গাে, সখি
বীরের বারতা কিছু পেয়েছ সংবাদ
আজি কোথা ? কহ দেবি! কহ প্রিয় সুরে
সখি প্রমীলারে তব প্রিয়তম কথা।”
কহিলা করুণা চাহি প্রমীলার পানে
আবেশে আদর ভরে ; উজল আনন
সহসা শারদ-মেঘে চন্দ্রিমার প্রায়
হইল মলিন বর্ণ ; বিষাদের ছায়া
ভাতিল আনন 'পরে, জ্যোতিঃ নয়নের
নিমেষে আবৃত হ’ল অশরুকণার
অপরূপ আবরণে ;
পঞ্চম সর্গ
“কেন সখি, আজি
বিস্মৃতি সাগরে লুপ্ত বিষাদের ছবি
পুনঃ আনিছ হেথা, কেন অন্ধকারে
পূরিবি হৃদয় পুনঃ সান্ধ্য-চঁাদতলে ?
নাহি জানি কি সংবাদ সে মহারণের।
জানি কোথায় নাথ, কোন সে সুদূরে !
খুঁজিয়া দেখিনু লিপি, নাহি সেথা কিছু
সমর কুশল-বার্তা; আছে শুধু তায়
প্রেম-বিজড়িত রূপে অপূৰ্ব্ব অঙ্কনে
কোমল হৃদয় তার, নাহি রণ-কথা;
জানি শুধু এ সংবাদ রাজদূত মুখে
দক্ষিণে আসেনি রণে বলব বলী ;
অগ্রসরি গেছে নাথ দিল্লী নগরীর
পূরবের সীমানায় সৈন্যগণ সহ।
সৈন্য সনে আছে বন্দী সে দূর দুরগে
সেনাপতি বিনায়েৎ, আসিয়াছে রণে
সেনাপতি হয়ে সেথা নাছির উদ্দিন
সসৈন্যে ; কাঁপিছে তাই হৃদয় আমার।
পক্ষাধিক আসিয়াছে এ সংবাদ, সখি !
নাহি জানি অন্য কোন বারতা রণের।
ধর্মপ্রাণ দিল্লীশ্বর, শুনি নিজ শ্রমে
অর্জে আপনার অন্ন, আপন বসন।
;
পাঠান-গৌরব
শুনি সতীশ্রেষ্ঠ রাণী ফতেমা রূপসী
সদা স্বামী-অনুগামী; আপনার অন্ন
আপনি করে রন্ধন ; সম্রাটের সনে
নিত্য বুনে নিজবস্ত্র, নিজ পরিধান ;
ইচ্ছা হয় হেরি হেন আদর্শ মহান
নরললাকে ; ইচ্ছা হয় হেরি সে যবনে
বিপুল কীরিতি যার চন্দ্রিমার প্রায়
উজলে ভারতভূমি; ইচ্ছা হয় হেরি
দিল্লীর সম্রাজ্ঞী দেবী সতী ফতেমারে
ঋষির আদর্শ যারা রাখিছে ভারতে।”
চমকে প্রমীলা শুনি অসম্ভব কথা
রমণী করুণামুখে, চমকে যেমতি
তৃণদলে হেরি সর্প প্রভাতে পথিক।
কহিলা প্রমীলা চাহি করুণার পানে
দৃঢ়কণ্ঠে সেথা সেই বাতায়ন পথে,
সে রম্য প্রাসাদ-কোণে শারদ-সন্ধ্যায়-
“কি কথা কহিছ বালা? চাহ হেরিবারে
যবন-নগরীমাঝে যবনের রাজে
যবনের রাণীসহ, চাহ পূজিবারে
যবনে আদর্শরূপে হিন্দুস্থান পরে ?
মহাশত্ৰু সে যবন, পাপশিখা তার
জ্বলে হুতাশন হেন ভারতের বুকে,
পঞ্চম সর্গ
করি ভস্মময় আজি ভারত-গৌরব
ভারতের দিব্য-নীতি ভারত-সমাজ ;
জান না যবনগণ দুষ্ট দুরাচারী ?
জান না যবন তরে নিত্য কত শত
গােমাতা হারায় প্রাণ ! জান না কি তুমি
অনাচারী যবনের পাপ পিয়াসায়
নিত্য হারাইছে কত হিন্দুর রমণী
আপন হৃদয় ধন, সতীত্ব সম্পদ ?
জান না যবন চাহে প্রতিষ্ঠিতে হেথা
বলে ধৰ্ম আপনার, আরব মরুর
বিদগ্ধ বালুকা দিয়া চাহে আবরিতে
সুফলা ভারতভূমি স্নিগ্ধ শান্তিময়ী ?
চাহ তুমি হেরিবারে যবন-নৃপতি
যবনের অধীশ্বরী, আশ্চর্য একথা !
যবনে পবিত্র ভাব সম্ভবে না কভু।
সম্ভব ফুটিবে পদ্ম দুর্গন্ধ গােময়ে,
সম্ভব গাহিবে পাখী দগ্ধমরুভূমে,
সম্ভব তুষার রাতে ফুটিবে চম্পক
নবরাগে বিটপীর বিশুষ্ক শাখায়,
তবু না সম্ভবে কভু
পবিত্র ধরম
অনাচারী যবনের পাপিষ্ঠ হৃদয়ে।
জানি কি হবে যদি শুনে এই কথা
পাঠান-গৌরব
মালােয়ার মহারাজ, বীর বীরপতি
কি ক্ষুব্ধ হইবে শুনি এ হেন বাসনা
নিরমল হৃদে তব, হেরি দুগ্ধমাঝে
হেন গােমূত্রের কণা, অতি সর্বনাশী।”
নীরবিলা প্রিয় সখী, নীরবে যেমতি
বিপুল পবন-ধ্বনি প্রলয়ের শেষে ;
কহিলা করুণা চাহি প্রমীলার পানে
“একি কথা তাের মুখে শুনি রে প্রমীলে!
যবন ঘৃণিত এত মানব সমাজে ?
হয় বিশ্বাস মম; মানুষ সর্বদা
মানুষ এ ধরতলে, দোষ গুণ রহে
সকল সমাজে সদা অবনীর 'পরে।
এক রক্ত, এক মাংস সকল মানুষে,
এক হৃদি বক্ষে তার, এক সুখ দুঃখে
সদা অভিভূত সৰ্ব্ব মানবের মন ;
একই ঔষধি, এক মহাশক্তি বলে
রক্ষে তারে ব্যাধি হ’তে, এক মাতৃ-স্নেহ
সৰ্ব্ব-জাতি-মাতৃ প্রাণে, এক ভয়ে সদা
কঁপে প্রাণ সবাকার, একই পুলকে
পুলকিত হয় হেথা মন মানবের।
এক হাসি সৰ্ব্ব নরে, এক উৎস হতে
সকল বাসনা স্রোত বহে অবিরত।
৮৭
পঞ্চম সর্গ
যবন যবন বলি নাহি তার প্রাণ
নাহি অনুভবশক্তি, নাহি শােক তার
স্বামী-পুত্র বিরহের, নাহি দুঃখ সুখ ?
নাহি চক্ষু, নাহি কর্ণ, নাহি ভাবস্রোত
যবন হৃদয় মাঝে, নাহি নীতি-জ্ঞান
কিম্বা স্নেহসূত্রে বাঁধা সমাজ-বন্ধন
বিধৰ্ম্মী যবন প্রাণে এই ধরাতলে ?
অপূৰ্ব কিরণ-ছটা এ হেন নিশীথে
হেরি মত্ত নাহি হয় যবন-হৃদয় ?
না হয় বিশ্বাস মম; মানুষ আমরা,
মানুষ যবন সবে, ভেদজ্ঞান মােহে
অন্ধ মােরা, নাহি হেরি অন্তর প্রান্তরে
নিত্য প্রবাহিতা এক ফজ-স্রোত খেলা
চিরন্তন সনাতন ; তাই এত জ্বালা,
তাই দুঃখ ভূমণ্ডলে, তাই কান্না শােক
যত তাপ, যত পাপ অশান্তি ধরায়।
নহে হেন মােহে মুগ্ধ বীর বীরপতি ;
উদ্দীপিত চিত্ত তার আদর্শ গৌরবে ;
নিত্য সত্যোৎসাহী বীর, সত্য পথে খোঁজে
অপূৰ্ব আদর্শ-নীতি মানবের হিতে।
মানুষ-মানুষ কেন এই ধরাতলে ?
কে রাখে সমাজে তার ? কোন্ সুশাসনে
পাঠান-গৌরব
বহে শক্তি ধরমের, কোন্ শক্তি বলে
নীতির লহরী খেলে হৃদয়-সাগরে ?
আদর্শ, সে শক্তি সখি। লক্ষ্যে আদর্শের
ছুটে নর যুগে যুগে ; মহান্ আদর্শে
উদ্দীপিত বীরপতি প্রিয়তম মম
মালােয়া গৌরব-মণি। জানি আমি কেন
সমরে যুঝিছে নাথ যবনের সনে।
নহে রণ পিপাসার প্রবল তাড়নে
তাড়িত মালােয়া-বীর, নহে বীরগণে
জিনিয়া অতুল কীৰ্ত্তি লভিবার আশে
গেল নাথ দুরজয় পাঠান-দলনে।
রক্ষিতে যুগের ধর্ম গেছে প্রিয়তম
উদ্দীপিত মহাদর্শে, চাহে আলিঙ্গিতে
পাঠানে মৈত্রী বন্ধনে, ইচ্ছে যদি তারা
হেন মৈত্রী, হেরি রণে সদা অমঙ্গল।
জানি তার মর্মকথা, নহি নামে শুধু
মরম-ঈশ্বরী তার, হে প্রিয় প্রমীলে।”
“অদ্ভুত শুনি আজি আননে তােমার
মধু বিশ্ব-প্রেম কথা মেওয়াত-তনয়া।”
কহিলা প্রমীলা চাহি করুণার পানে
স্নিগ্ধ চঁাদকরে দিব্য বাতায়ন পাশে
৮৯
পঞ্চম সর্গ
শরত-সন্ধ্যার কোলে ; “অদ্ভুত শুনি
মানব আদর্শ কথা; সত্য বটে, দেবি।
মানুষ—মানুষ সদা এই ভূমণ্ডলে।
এক রক্তে, এক মাংসে গঠিত সবার
শরীর এ ধরাতলে, এক বৃত্তি স্রোত
বহিছে সকল প্রাণে, ভূধর হইতে
বহে যথা অবিরত শত তরঙ্গিণী
এক স্নিগ্ধ সলিলের গৌরবে মাতিয়া
অনন্ত তরঙ্গ-রঙ্গে ; কিন্তু কহ, দেবি।
নহে কি শৃঙ্খলে বাঁধা নিয়ম বিশ্বের ?
পৃথক নিয়মে বাঁধা অনন্ত-বন্ধনে
নহে কি এ সৃষ্টি-জাল ? এক প্রাণ সদা
খেলে বটে বিশ্বময়, সমীরণ যথা
অবাধে বহিয়া চলে ধরাতল পরে ;
তবু আছে বিভিন্নতা সৃষ্টির সমাজে ;
যে নিয়মে তরুরাজি বসন্ত পল্লবে
নব প্রাণে হয় তৃপ্ত, সে নিয়মে কভু
পায় ফিরিয়া প্রাণ মৃত পাখিগণ
বনানীর নিরজনে ; যে নিয়মে
ঘুরে
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড সবে এক কেন্দ্র টানে
অনন্ত শূন্যের বুকে অনন্ত সময়
দ্রুত বিদ্যুতের বেগে, জীবনের গতি
৯
পাঠান-গৌরব
নহে সে নিয়মে বাঁধা ; কিম্বা যে নিয়মে
পূর্ণিমায় ছুটে বেগে সাগরের বারি
সুদূর আকাশ পথে, কভু সে নিয়মে
উচ্চতম শৃঙ্গমালা হিমাচল শিরে
না চলে চুম্বিতে বেগে সুনীল-গগনে।
পৃথক নিয়মে বাঁধা শক্তি-শ্রোত-চয়
অনন্ত সৃষ্টির মাঝে ; মানব সমাজে
দেশ-কাল-ভেদে বহে নীতিতরঙ্গিণী
তেমনি অসীম স্রোতে ; কে পারে রােধিতে
গতি তার খরতরা ? কে চাহে হাতে
এত শত স্রোতস্বতী সৰ্ব্ব ধরাময়
এক মহাস্রোত পথে সাগরের পানে ?
যে চাহে সে মূখ অতি, না জানে সে জন
গূঢ় তথ্য জীবনের ; হিন্দু মুসলমান
এ দুটি পৃথক জাতি, শকতি দোহার
বহিছে পৃথক স্রোতে, পৃথক সমাজে,
পৃথক নিয়মে বাঁধা অবনীর 'পরে।
কার শক্তি মিশাইবে আদর্শের বলে
এই দুটি মহাস্রোতে? কে পারে খনিতে
হিমাচল, কহ সখি ! কেন অসম্ভবে
সম্ভব ভাবিয়া নর হইবে আকুল ?
আপন আপন ধৰ্ম্ম-গৌরব রাখিয়া
;
৯১
পঞ্চম সর্গ
•
;
চলিব জীবনে মােরা, যবন-সন্তান
চলিবে আপন পথে আপন নিয়মে।
সংঘর্ষণ হয় যদি, প্রাণ বিনিময়ে
রাখিবে গৌরব নিজ হিন্দু এ’ভারতে।
তাই ক্ষত্রিয়ের রণে মৃত্যু ও কুশল,
মৃত্যুও স্বরগ বলি কীৰ্ত্তিত পুরাণে।
তাই যুগে যুগে হেথা কত অবতারে
অবতীর্ণ হ’ল বিভু ; রামরূপ ধরি
বিনাশিলা পূৰ্ব্বে যত রাক্ষসের কুল
দেবদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী
তাই নারায়ণ
দ্বাপরে কৃষ্ণের রূপে নিপাতিলা হেথা
কুটিল কৌরবকুলে কুরুক্ষেত্র রণে।
জানি এই ধৰ্ম্ম শুধু বেদ-পুরাণের,
এই সনাতন নীতি ; নাহি জানি কোথা
কি আদর্শ কোন্ পথে লইবে মানবে
এ জড়-শকতি-ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন মরতে।
কিবা মূল্য তার হেথা, সময় সাগরে
কি পথে বহিবে তার স্রোত নবীন !
হিন্দু, হিন্দু সদা, ধৰ্ম্ম রক্ষিবার তরে
অকাতরে দিবে প্রাণ সমর অনলে।
কি মৈত্রী বাঁধিবে তারে যবনেব সনে ?
কোথা কবে মৈত্রী হয় তৈলে ও সলিলে ?
পাঠান-গৌরব
১২
কোথা কবে মৈত্রী হয় আকাশে ভূধরে ?
নাহি চাহি হেন মৈত্রী মেওয়াত তনয়া,
বুঝি তােমার দীপ্ত আদর্শের কথা।”
কহিলা করুণা, চাহি প্রিয় সখী পানে—
“কহিছ কি নীতি-কথা, সখি, এ সন্ধ্যায়
হেন শুদ্ধ, হেন শুভ্র চন্দ্রিমার তলে ?
কেন তর্কে আচ্ছাদিছ গৌরব সত্যের ?
সত্য বটে—এক স্রষ্টা পৃথক শাসনে
পৃথক বাঁধন ডােরে রাখেন বাঁধিয়া
বিভিন্ন সৃজন-নীতি সৃজন মাঝারে।
মানুষ নহে গাে কভু সে নিয়ম হ'তে
ভিন্ন হেথা ; তবু নর নরের নিয়মে
নিয়ত রয়েছে বাঁধা ; সে রম্য নিয়মে
প্রীতি-ভালবাসা ধারা মধুর খেলায়
খেলে মানবের প্রাণে, অগ্ৰসরি তারে
নিত্য পূত প্রণয়ের মহাসিন্ধু পানে।
অগণিত সীমাহীন অনন্ত লহরে
ছুটে প্রকৃতির বুকে প্রকৃতি-শকতি
স্রষ্টার আদেশ বহি; মানবের নীতি
আদর্শের বেগে চলি আপনার পথে
সূজে অগণিত মৈত্রী, ভাঙ্গে বহু বাঁধে
পঞ্চম সর্গ
অনন্ত সময়-বুকে মিশে শেষ দিনে
এক স্থির সিন্ধু-নীরে মহামিলনের।
এই নীতি মানবের, এ আদর্শ তার
উদ্দীপিত সে আদর্শে হবে সদা নর।
সেই তার ধ্রুবতারা, সেই তার আলো
আঁধার বনানীমাঝে, সে পবিত্র আলো
যুগে যুগে ধরাতলে ভুলায় তাহারে
ক্ষুদ্র স্বার্থ-কথা সদা, সেই কেন্দ্র তারে
রাখে স্থির অনাবিল নীতির গগনে।
জাগে এ বিশ্বাস সদা, হৃদয়ে আমার।
আর জাগে এ বিশ্বাস বিপুল গৌরবে
মম প্রিয়তম-হৃদে, তাই সদা সখি ।
দোহে একাসনে বসি মাগি সদা বর
বিশ্ববিধাতার কাছে মহামৈত্রী তরে।
নাহি ভাবি কেবা হিন্দু, কেবা মুসলমান,
মাগি নর তরে বর নরের জগতে।
কিন্তু নহে প্রাণ আজি তৃপ্ত ভাবনায়
সুদূর আদর্শ হেরি, কঁদি অবিরত
রণে অকুশল ভাবি দিবস রজনী।
পূজি স্মৃতিমূৰ্ত্তি সখি ! সুদূর সুখের
নিত্য হৃদয় মাঝারে ; সেই ছবি মম
অভিনব প্রণয়ের ভাতিবে কি চোখে
পাঠান-গৌরব
১৪
পুনঃ দিব্য সত্য রূপে? হেরিব কি নাথে
আপনার পুরে পুনঃ? কহ সখি মােরে
ফিরিবে কি প্রিয়তম রণজয়ী হেথা ?”
কঁদিলা করুণা কহি বাণী সুকরুণ ;
ঝরিল নয়নে বারি, শিশিরের কণা
যথা শারদ উষায় ; হেরিলা প্রমীলা
কঁদে প্রিয়তমা সখি প্রিয়তম তরে।
;
হেনকালে রাজপথে বাজিল বাজনা,
মহাকোলাহলপূর্ণ হইল নগরী।
সহস্র বিজয় ধ্বনি উঠিল বাজিয়া
ভরি মালােয়ার পুরী; পূর্ণিমার রাতে
ছুটিল সে মহারব দিগদিগন্তরে।
প্রতিধ্বনি উত্তোলিল বাতায়ন পথে
মত্ত বিজয়ের ধ্বনি, কহিল প্রমীলা
পরাণ-প্রতিম প্রিয় সখী পানে চাহি
“ঐ শােন রব সখি ধ্রুব-বিজয়ের ।
ঐ শােন কোলাহল, বিজয়ী সেনার।
ফিরিছে বিজয়ী হয়ে প্রাণনাথ তব
হিন্দুর গৌরব রাখি ; হিন্দুস্থান মাঝে
হিন্দু বীর জয়ী আজি, তাই রাজ্যময়
আনন্দের মহারোল ; অযুত পদাতি
;
পঞ্চম সর্গ
;
পদভরে কঁপাইছে তাই এ নিশীথে
মালােয়ার রাজপুরী; চেয়ে দেখ হােথা
আনন্দে হাসিছে দিব্য হাসি সুমধুর
পূর্ণিমার পূর্ণাদ; হাসিছে গগনে
অসংখ্য তারকায় অপূৰ্ব্ব পুলকে।
ধন্য সেই মহাবীর, শক্তি যার রাখে
স্বধৰ্ম্ম-গৌরব সদা, ধন্য সেইজন
স্বজাতি-গৌরব যেবা রাখে ধরাতলে।”
বিপুল বিজয় বাদ্য পশিল প্রাসাদে,
অসংখ্য মালায়া সেনা প্রবেশিল ধীরে
বিশাল মালােয়াপুরে, দাড়াইল সেনা
তরঙ্গের প্রায় পথে পূর্ণচন্দ্র তলে
আবরি সমগ্র ভূমি; মুহু মুহুঃ পুরী
কঁপিল কামান শব্দে, গাহে সৈন্যগণ
তুলি মহারব সবে ভরিয়া নগরী—
“জয় জয় বীরপতি রাজপুত-রবি
ভারতে গৌরবময় মূরতি শৌর্যের।”
পশিল সে জয়ধ্বনি করুণার কাণে
বেগে বাতায়ন-পথে, সুখ-অশ্রুধারা
ঝরিল নয়ন হ’তে মেওয়াত-বালার।
পাঠান-গৌরব
আহত রজত-দেহ দিল্লী সম্রাটের।
ঝলকে শােণিত-ধারা বহিতেছে ঘন
দিব্য সেই কান্তি পরে ; ক্ষতময় আজি
অক্ষত অজাতশত্রু সম্রাট শরীর।
ঝরিছে নয়ন হতে অশ্রু ফতেমার
শ্রাবণের ধারা সম ; অদূরে বুগরা
ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলি বিলপিছে ধীরে ;
স্থির শুধু রহিমের গম্ভীর হৃদয় ;
স্বর্ণময়
মুখ
ঢাকি ঘন কালিমায়
গভীর বিষাদছবি উঠিছে ভাসিয়া।
তবু স্থির অচঞ্চল কান্দাহার-মণি,
গম্ভীর জলধি যথা গভীর নিশীথে।
কহিলা নাছিরুদ্দিন মুসলিম-তিলক
ধীরে মৃদুস্বরে চাহি বুগরার পানে
“যাই আমি হে বুগরা মুসলমান-মণি।
রক্ষিও এ মহাদেশ, রক্ষিও ইহারে
তীব্ৰ হিংসানল হ'তে ; হিন্দুস্থানে কভু
হিন্দু সনে বৃথা রণ শােভা নাহি পায়।
রাখি মৈত্রীভাব সদা হিন্দু-রাজ সনে
পালি ও এ মহাদেশ; হের ক্ষত হতে
ঝলকে রুধির ঝরে বারিধারা প্রায়
জরা-জীর্ণ দেহে মম; নাহি কাল আর।
ষষ্ঠ সর্গ
মুমূর্ষ নাছিরুদ্দিন দিল্লীর প্রাসাদে
দাসরাজ-কুলমণি ; শ্বেত শয্যা’পরে
শ্বেত চন্দ্রাতপতলে শ্বেত-কান্তি তার
স্বহস্ত-নির্মিত-বস্ত্রে শােভে মনােহর
উজল আলােকে আজি গভীর নিশায়।
সম্মুখে হেকিমগণ, পার্শ্বে দাসবধূ
পবিত্র ফতেমা সতী, শিরে দীর্ঘদেহ
কান্দাহার-সুত-শ্রেষ্ঠ ফকির রহিম,
তুষারধবল-কান্তি ধবল বসনে।
ঘন নৈশ-অন্ধকারে আচ্ছন্ন ধরণী
আকাশে তারকাচয় আবৃত সকলে
জলদের আবরণে, ঘন ঘন সদা
চমকে চপলা-রেখা সৃজি ঘনতর
অন্ধকার ধরাতলে ; ক্ষণে ক্ষণে দূরে
হুঙ্কারি বিটপীচয় উঠিছে কঁপিয়া
ঝঞ্চার প্রবল বেগে, কোথা তরুশিরে
ব্যাকুল ডাকিছে পাখী ঘন আশঙ্কায়।
•
পাঠান-গৌরব ৯৮ রক্ষিও ফতেমা সতী, সহােদরা তব নিত্য নিরমল-চিত্ত সরল উদার। যাই নিঃসন্তান আমি ; পাঠান-গৌরব রক্ষ তুমি এ ভারতে এই দুরদিনে। শ্রেষ্ঠ মুসলমান তুমি, হবে মহাযশা সম্রাট এ দাসকুলে, দুঃখ শুধু আজি না পারিশ্ন রক্ষিবারে মুসলিমের নীতি দীর্ঘকাল এ ভারতে; না পারি আমি পূজিতে স্বরগ-দূতে স্বরগ-সম্মানে মম রাজধানী মাঝে ; আর দুঃখ মম হেরি এ সময়ে জনকে তােমার- উদ্দীপ্ত পাঠান-কুলে প্রতিহিংসা বশে, মত্ত ধৰ্ম্মোন্মাদে, মত্ত করীবর যথা। জানি কি হ’ল সেথা রণে মােগলের। অপ্রমিত শত্রুসেনা আক্রমিছে বেগে সমরে পাঠানগণে, চাহে ধর্ষিবারে ভারতে পাঠান-শক্তি পাঠান-গৌরব। গেছে বৃদ্ধ বলবন্ যুঝিবার তরে সেই মহাশক্তি সনে; তাই ভাবি মনে হেন সন্ধিক্ষণে হেন মরণ-শয়নে কি হইবে পাঠানের ক্ষুদ্র শকতির শত শত অরি মাঝে, হেথা এ ভারতে।
ఎన్ని
যষ্ঠ সর্গ
তবু পাইতাম যদি দর্শন তাহার
জীবনের শেষক্ষণে, কহিতাম তারে
মরণ-করুণ-কণ্ঠে গুটি কত কথা।
বজ্ৰনাদে কহিয়াছি যে কথা নিয়ত
আজি কহিতাম তাহা সুকরুণ সুরে।
চাহিতাম ভেদিবারে পাষাণ-হৃদয়
মৃত্যুর কোমল সুরে ; জানি বর্জ্য যেথা
নাহি পারে প্রবেশিতে, সেথাও কখন
পশে কুসুমের গন্ধ মন্দ সমীরণে।
কিন্তু বৃথা আশা মম, বৃথা সে ভরসা ;
আহত শরীর মম মালােয়া-যুবক
বীরপতি অস্ত্রাঘাতে; শুধু কৃপা বশে
ছাড়িয়া গিয়াছে মােরে সমর-শয়নে
সসম্মানে মৈত্রী-তরে ; তৃপ্ত হৃদি মম
হেরি হিন্দু-হৃদি হেথা—হেরিয়া নয়নে
মৈত্রী ইচ্ছা হিন্দু-প্রাণে, কে করিত মােরে
রক্ষা সে সময়ে, হায় ? কে রাখিত যদি
বৃদ্ধ এ পাঠানে বান্ধি লইত মালােয়া
মালােয়ার যুবরাজ ? দিয়েছে প্রমাণ
যুদ্ধক্ষেত্রে সে যুবক মহাপ্রাণতার।
হিংসে সে মুসলমানে মুসলমান বলি—
মানে সদা ধৰ্ম্মনীতি সৰ্ব্ব ধরমের
পাঠান-গৌরব
কিন্তু মরণের নাহি বিলম্ব আমার।
ঐ শােন গরজিছে জলদের বুকে
ভীষণ বিদ্যুৎ-রেখা, নামিতেছে দ্রুত
ঘন নিশা অন্ধকারে প্রলয় আঁধার,
ঘন গরজিছে ঝঞা ভীষণ গর্জনে।
আজি শেষ-দিন মাের; পুনঃ বলি তােমা
হিন্দুস্থানে হিন্দু সনে রণের পিপাসা
যতকাল রবে হৃদে, নাহি ততকাল
শান্তি কভু মুসলিমের স্তরে স্তরে তার
হবে নিত্য অবনতি, নিয়ত পতন।
এ নহে আমার কথা—এই উপদেশ
পবিত্র রহিম-মুখে হয়েছে নিঃসৃত।”
নিরবিলা ধীরে রাজা নাছিরউদ্দিন
ক্ষত-জরাজীর্ণ দেহ ; মরণ ছায়ায়
সপিতে আপন কায়া মুদিলা নয়ন।
কহিলা বুগরা চাহি সম্রাটের পানে
“জাঁহাপনা! পাঠানের ঘাের দুরদিনে
ডুবিছে পাঠান-রবি ; নহিল, না হবে
মুসলমান কুলে হেন আদর্শ মহান
এ মহাভারত ভূমে আপনার সম।
বুঝি দাসবংশ হবে ধ্বংস নিরমূলে;
কুতবের মহাকীর্তি চিরকাল তরে
ষষ্ঠ সর্গ
ভাতিবে না কভু
হবে বুঝি লুপ্ত হেথা ! বুঝি মুসলমান
বদ্ধ রবে দিব্য এই ক্ষেত্রে ধরমের
চির অন্ধকার মাঝে মহামােহ বশে।
কে শিখাবে মহানীতি মুসলমানগণে,
কে দেখাবে হেন স্থির আদর্শ-গৌরব?
পুনঃ কোন্ শক্তিমান্ মুসলিম হৃদয়
ভুলি সৰ্ব্ব ভেদজ্ঞান, সৰ্ব্ব সঙ্কীর্ণতা
সকল স্বার্থের মােহ, সৰ্ব্ব অহঙ্কার
দানিবে মৈত্রীর শান্তি দগ্ধ এ ভারতে ?
নহিবে নহিবে কভু মুসলমান কুলে
মহান্ চরিত্র হেন ;
হেন অন্ধকার মাঝে আলােক জ্ঞানের।
তবু করিতাম আশা, যদ্যপি রহিম
দিব্য স্বরগের দূত দিব্য আলাে নিয়ে
বসিত দিল্লীর বুকে উজলি হৃদয়
মহাতেজে সবাকার ; করিতাম আশা
বৃদ্ধ ধৰ্ম্মোন্মত্ত দীপ্ত জনক আমার
হেরিত পবিত্র আলো সত্যের যদ্যপি
জীবনের সন্ধ্যাকালে। কাহার আশ্রয়ে
ডুবিছ মােদের ছাড়ি হে মুসলিম-রবি ?
কোন্ তরু-ছায়াতলে নিদাঘ তপনে
লভিব আশ্রয় মােরা? কোন্ সে বিটপী
পাঠান-গৌরব
••
মরুমাঝে দিবে শান্তি বিদগ্ধ পথিকে?
কি কুক্ষণে গেনু ছাড়ি এই রাজধানী
হয়ে অন্ধ অপমানে। কেন হায় আমি
আপনি কুঠার দিনু আপনার পায়।”
ধীরে নীরবিল সেথা সৈনিক বুগরা ;
ঝরিল অশ্রুর ধারা নয়ন হইতে
নিঝরের ধারা সম; গরজিল হােথা
মহারবে মেঘমালা ; বহে দ্রুতবেগে
গগনে পবন স্রোত, ডাকিল হুঙ্কারি
ঘন তরুগণ সবে ; গর্জে তরঙ্গিণী
হুহুঙ্কারে তরঙ্গের ; সুকরুণ রবে
শঙ্কায় ডাকিল ঘন নিশাচর সবে।
কহিলা সম্রাট চাহি বুগরার পানে
নাহি দোষ কিছু তব সৈনিক বুগরা ।
“না খণ্ডে অদৃষ্টলিপি, কেন বৃথা আর
বিফল জীবন নিয়ে কাটাইব কাল
বিশাল এ হিন্দুস্থানে; কেন রােধি আর
অদৃষ্টের তীব্র স্রোতে মিথ্যা আকাঙ্ক্ষায়।
নাহি দুঃখ কিছু আজি মরণে আমার ;
দুঃখ শুধু-হিল না আদর্শ গৌরব।
দুঃখ-নারিনু স্থাপিতে হিন্দুস্থান 'পরে
কীর্তিস্তম্ভ মিলনের, শান্ত শির যার
যষ্ঠ সর্গ
;
ভেদিয়া কালের হৃদি শশাভিত গৌরবে
কুতবের স্তম্ভ জিনি; বৃথা গেল শুধু
জীবনের দিনগুলি দিল্লী-সিংহাসনে।”
কহিলা রহিম চাহি সম্রাটের পানে
স্থির নেত্রে, স্থির চিত্তে সুগভীর স্বনে
‘বৃথা কাটে নাই তব জীবন, সম্রাট।
ধন্য মুসলমান তুমি, ধন্য জন্ম তব।
ধন্য সে বাণী রাজন্ আফগান দেশে,
স্বপনে গর্জিল যাহা কহিতে তােমায়
হ’তে দিব্য মুসলমান হিন্দুস্থান মাঝে।
মুসলমান-মণি তুমি, ওহে নরমণি ।
ধরায় আরব সত্য প্রচারিতে ক্ষম
সৰ্বরূপে; কিন্তু তার হয়নি সময় ;
ভয়ঙ্কর ঝঞ্ঝা হেন এই নিশীথের
বহু ঝা যাবে ধর্ষি অন্ধ মুসলমানে
এ পবিত্র হিন্দুস্থানে ; বহু নরপতি
হবে ধ্বংস ঝটিকায় ; বহু রাজকুল
ভস্মীভূত হবে হেথা সমর অনলে
নিদাঘের পত্র যথা দাবানল তেজে।
ভস্ম হবে সে আগুনে মকত প্রায়
বহু মুসলমান-মণি, পুড়িবে তাহাতে
সুকোমল পদ্মরাগ হেন বহু প্রাণ।
;
১০
পাঠান-গৌরব
তখন মুসলিমগণ হেরিবে ভারতে
পবিত্র সত্যের জ্যোতিঃ, সময় সাগরে
উজলি উঠিবে যবে প্রতিকৃতি তার।
তখন উঠিবে ভাতি নূতন বরণে
শত মুসলমান চোখে সত্য আরবের ;
তখন হইবে মৈত্রী হিন্দু মুসলমানে,
তখন হইবে শান্তি এ ভারত-ভূমে।
তখন দু’ সত্য স্রোত সিন্ধু গঙ্গা হেন
শান্ত সমীরণে বহি চলিবে মধুর
কলনাদে পূর্ণ শান্তি-সাগরের পানে।
নাহি রবে প্রতিহিংসা, না রবে ভারতে
অন্ধবিশ্বাসের মােহ; হবে শান্তি হেথা।
রবে প্রতিহিংসা দ্বেষ যতকাল ভবে,
রবে অন্ধ ধৰ্ম্ম-মােহ ধর্মে আবরিয়া,
নাহি শান্তি ততকাল ; হেরিতেছি আজি
দুর
ভবিষ্যের পটে সুস্পষ্ট আলােকে
মুসলমান্ ভবিতব্য এ ভারত-ভূমে।
সহস্র বলব আসি যুগ যুগান্তরে
ঘটাইবে বিসম্বাদ হিন্দু-মুসলমানে।
সহস্র নাছির আসি সে মহাপ্রলয়ে
দানিবে শান্তির সুধা আর আজি আমি
বহুকাল পরে সত্য কহিতেছি তােমা
যষ্ঠ সর্গ
;
ওহে দিল্লী-অধীশ্বর। নাহি মৃত্যু মম ;
অমর রহিম-শক্তি সৃষ্টির মাঝারে।
যুগ যুগান্তর ব্যাপি খেলে শক্তি মম
সর্বচরাচরময় ; ধরার শৃঙ্খলা
রক্ষিতে অমর আমি তার ইচ্ছায় ;
সদা শক্তিরূপে ফিরি জগত যুড়িয়া।
চলিলাম ছাড়ি আমি এ দিল্লী নগরী
এই তুফানের রাতে ; যাব ফিরি পুনঃ
দূরে “খাইবার” পথে পৰ্বত গুহায়
মেষপালকের দলে ; গাহিব সেথায়
মম মেষ-দল মাঝে অনন্ত পুলকে
ধাতার অনন্ত গুণ, নাচিবে তাহারা
মহারঙ্গে শুনি সেই পবিত্র সঙ্গীত।
পুনঃ যবে মুসলমান চাহিবে স্থাপিতে
পবিত্র কোরাণ সত্য এ ভারত’পরে
দ্বেষহীন, হিংসাহীন, স্বার্থ গন্ধহীন,
তখন পৰ্বত হতে আসিবে নামিয়া
পুনঃ এই মুসলমান পৰ্বত-সন্তান।
জেনাে সত্য এই শেষ-বাণী রহিমের।
গুপ্তচর বলি আমা কহিল বলবন ;
গুপ্তচর বটে আমি, ফিরি সঙ্গোপনে
বিশ্বময়, গুপ্তে সাধি উদ্দেশ্য ধাতার।
পাঠান-গৌরব
;
যাই রাজা! মাগে আজি বিদায় রহিম।”
ঘন গরজনে ঝা গর্জিল আবার ;
আবার আকাশ ভেদি উঠিল নিনাদ
সর্বনাশী চপলার, আবার কপিল
ভূকম্পনে ধরাতল ; চাহিদা সম্রাট
পুনরায় আঁখি মেলি ; হেরিলা শিহরি
নাহি সে পবিত্র আলাে সূর্যরশ্মি হেন
শিয়রে বিরাজমান ; হতাশে সম্রাট
ত্যজিলা পরাণ সেথা দিল্লী প্রাসাদের
বিশাল সে কমাঝে ; গর্জিল তুফান
পুনঃ ঘােরর নাদে জগত যুড়িয়া।
হাহাকার করি উঠে সম্রাট শিয়রে
ফতেমা সাম্রাজ্ঞী সতী; “হা! হা! কোথা গেলে
মম প্রিয়তম!” বলি উঠিলা ফুকারি
স্বর্ণময়ী রাজলক্ষ্মী নাছির-গৃহিণী।
হাহাকার করি উঠে
শােকভরে মহারবে কক্ষে প্রাসাদের
ঝায় নিশীথে, সেই ভীষণ আঁধারে।
হাহাকারে কঁদি উঠে চিকিৎসকগণ
আর রক্ষিগণ সবে ; হাহাকারময়
বিশাল প্রাসাদ হ’ল দিল্লী নগরীর।
ঘন উল্কাপাত হ’ল ধরণী উপরে ;
বুগরা সুমতি
যষ্ঠ সঙ্গ
কঁপে ধরা ঘন কম্পে, বিকট চীৎকারে
ছাড়ি ভূত প্রেতগণ আলয় আপন
নাচে মহারঙ্গে সেথা দিল্লী-বক্ষ 'পরে
বিশাল নগরী মাঝে ভীষণ নর্তনে।
হাহাকারে সর্বপ্রাণী পূরিল গগন
ভীষণ সে ঝঞ্চা মাঝে ; পাঠান-গৌরব
লুপ্ত হল চিরতরে ধরণী হইতে।
••
উদিল প্রভাত রবি ; জয়ধ্বনি করি
মত্ত পাঠানের সেনা মােগল-বিজয়ী
পশিল নগরী মাঝে সেনাপতি সনে।
পশি রাজগৃহে হেরে বলব বলী
মৃতদেহ সম্রাটের ; বাম পার্শ্বে তার
স্বর্ণমূৰ্ত্তি প্রায় মৃত তনয়া আপন,
দিল্লীর সাম্রাজ্ঞী সতী ফতেমা সুন্দরী।
পার্শ্বে মৃতপ্রায় হেরে তনয় বুগরা
বঙ্গের শাসক বীর সৈনিক প্রবর ;
স্তব্ধ বলব হেরি সে দৃশ্য ভীষণ।
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.