Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Panch-misheli
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আঁচমিশেলি
শ্রীঅবনী নাথ রায়
ভি,
এম, লাইব্রেী
৬১, কর্ণওয়ালিশ ঈীট, কলিকাতা।
প্রকাশক- শ্রীগােপাল দাস মজুমদার, ডি, এম, লাইব্রেরী ৬১, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা প্রিন্টার-আশুতােষ মজুমদার বি, পি, এমস প্রেস ২২াবি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা। মূল্য-এক টাকা মাত্র।
মুখ পত্র
এ কয়টি প্রবন্ধের লেখক,
শ্ৰীযুক্ত অবনী নাথ রায়,
একজন প্রবাসী বাঙ্গালী। কয়বৎসর পূর্বে রবীন্দ্র নাথের ফাল্গুনী
দিল্লীতে অভিনিত হয়, অবশ্য অভিনেতারা সকলেই ছিলেন,
প্রবাসী বাঙালী। সেই সূত্রে শ্রীযুক্ত অবনী নাথ রায় ফাল্গুনী
সম্বন্ধে যে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন সেটি আমি সেকালের
সবুজপত্রে উদ্ধৃত করে দিই। এই সুত্রে আমার তাঁর লেখার
সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে দিল্লী সহরে প্রবাসী সাহিত্য সম্মিলনে
তঁার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়।
তাঁর যে বলবার কথা আছে, আর তিনি যে তা বলতে
পারেন এই ধারণবশতঃই আমি তাঁর প্রবন্ধ সবুজপত্রে প্রকাশ
তার পর তিনি বাংলার সাহিত্য ও সমাজ সম্বন্ধে
পর যে সকল প্রবন্ধ লেখেন, সেইগুলি একত্র করে এই ক্ষুদ্র
গ্রন্থ প্রকাশ করছেন।
বাঙলায় প্রবন্ধ সাহিত্যের তাদৃশ্য মৰ্যাদা নেই ; বাঙলা সাহিত্য
যে-কোনও ইউরােপীয় সাহিত্যের তুলনায় এ বিষয়ে নিতান্তই
বড় কবি বড় গল্পলেখকের সংখ্যা কোন দেশেই বেশি নয়,
কারণ এ দুই ক্ষেত্রে তিনিই মাথাতুলে দাড়াতে পারেন যার
করি।
হীন।
ন অন্তরে আছে প্রতিভা। আর প্রতিভা হচ্ছে সেই সহজ শক্তি যা আমাদের পাঁচজনের নেই আর যা শিক্ষা দীক্ষার প্রসাদে অর্জন করা অসম্ভব। কিন্তু মন নামক বস্তু সকলেরই আছে। আর এই মনেরই প্রধান প্রকাশ প্রবন্ধ সাহিত্যে। এই কারণে আমি প্রবন্ধ সাহিত্যের বিশেষ পক্ষপাতী। আমার বিশ্বাস যে বাঙলীজাতির শিক্ষিত মন আছে, আর এ মনের রূপের ও শক্তির যথার্থ পরিচয় পাওয়া যাবে, যখন বাঙলাভাষায় একটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধ সাহিত্য গড়ে উঠবে, যেমন ফরাসীভাষায় গড়ে উঠেছে। আর এক কথা, কাব্য সাহিত্য, প্রবন্ধ সাহিত্যের অপেক্ষা রাখে। সংস্কৃত আলঙ্কারিকরাও বলেন যে উপযুক্ত “ভাবকের” (cretic) অভাবে কাব্যবৃক্ষ অবকেশি হয়ে পড়ে অর্থাৎ নিষ্ফল হয়। কবির আমাদের যা দান করেন, তা যে আমাদের গ্রহণ করবার শক্তি আছে তার পরিচয় আমরা দিতে পারি শুধু critical সাহিত্যে। শ্ৰীযুক্ত অবনী নাথ রায়, রবীন্দ্র-সাহিত্য ও সাহিত্যের মর্ম, তিনি কি বুঝেছেন, তার প্রবন্ধাবলীতে তাই বলতে চেষ্টা করেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের বিচারক স্বরূপে পাঠকের কাছে উপস্থিত হন নি। জজিয়তি করা যে ক্রিটিকের কাজ নয়, এ জ্ঞান তার আছে। লেখক প্রবাসী বাঙালী। অতএব এ প্রবন্ধগুলি থেকে পরিচয় পাওয়া যায় যে বাংলা সাহিত্যের প্রভাব বাঙলার বাইরেও বাঙালীর মনের উপর কতটা আছে, দ্বিতীয়তঃ তাঁর সামাজিক
বিষয়ে প্রবন্ধগুলি থেকে দেখা যায় যে প্রবাসী বাঙালীরা ;
আমাদের অনেক ঘবােয়া কুসংস্কার থেকে কতটা মুক্ত। এইসব
কারণে, আমি আশা করি যে বাঙালী পাঠক সমাজে বইখানির
আদর হবে। ইতি-
২১ শে এপ্রিল ১৯৩১।
প্রমথ চৌধুরী
No text on this page.
স্বর্গগ
নারায়ণ দাসী দেবী
মাতৃ দেবীর
শ্রীচরণােদ্দেশে
সূচীপত্র
•••
১২
২০
৪।
৪৪
১। রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন
২। কানী
৩। বিবাহ-সমস্যা ও দেবদাস
প্রতাপ ও দেবদাস
৫। বিন্দুর ছেলে
৬। বিরাজবৌ
৭।
চরিত্রহীন
৮।
মনুষ্যত্ব যাচাই
৯। চতি পথে
১০। মানুষের অধিকার
•••
•••
৫৪
•••
•••
•••
৮১
৮৬
•••
পাঁচমিশেলি
রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন
রবীন্দ্রনাথ বলেচেন যে জন্মের বা মৃত্যুর যাদের দিনক্ষণ
আছে তাদের কেউ স্মরণ করে না—সে দিনক্ষণ যাদের নেই
তারাই স্মরণীয় হয়ে থাকেন। রবীন্দ্রনাথকে তাই যদিচ আমরা
আজ তার জন্মদিনে বিশেষ করে স্মরণ করছি কিন্তু আমাদের
জাতি তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করচের গান আমাদের কঠে,
র ভাবধারা আমাদের চিন্তায়, তাঁর সৃষ্ট আদর্শ আমাদের
সম্মুখে—এক কথায় আমরা তার প্রতিভার ভিতর বাস করছি
—এ যুগে তাঁর প্রতিভাকে অতিক্রম করবার সাধ্য আমাদের
কারুর নেই।
আমার পক্ষে অবশ্য তাকে স্মরণ করবার অন্য কারণও
আছে এবং সে কারণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। আমি তাঁর নিকট
সম্পর্কে এসেছিলুম। আজকের দিনে সে প্রসঙ্গের অবতারণা
করলে হয়ত আপনাদের ধৈৰ্য্যচ্যুতি হবে না।
পাঁচমিশেলি আজকের থেকে আঠার বছর আগে যে দিন বােলপুরে কবির একপঞ্চাশত্তম জন্মােৎসব অনুষ্ঠিত হয় সেদিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলুম। আমার যতদূর জানা আছে সেই কবির প্রথম প্রকাশ্য সাধারণ জন্মােৎসবের অনুষ্ঠান। তখনাে তিনি নােবেল প্রাইজ পান নি। তাই প্রবাসী’র পৃষ্ঠায় তাঁর এই রকম পরিচয় দেওয়া হয়েছিল—“রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যসেবী; তিনি বহুবর্ষ ধরিয়া নানাভাবে বঙ্গভাষা ও বঙ্গদেশের কল্যাণ করিয়াছেন—” ইত্যাদি। সে দিনটার কথা আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে অক্ষয় হয়ে গাঁথা আছে। পূৰ্ব্ব রাত্রে ১ত্যেনবাবু (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ), চারুবাবু, প্রভৃতি এসেছিলেন। এরা আশ্রমের অধিকাংশ পৰ্ব উপলক্ষেই কলকাতা থেকে এসে যােগ দিতেন। উষার শুভ মুহূর্তে পট্টবস্ত্র পরে আম্রকাননের মধ্যে কবি এসে দাড়ালেন। চারিদিক ধূনার গন্ধে আমােদিত হয়েছিল এবং কুণ্ডলীকৃত ধোয়ার কুয়াসা দণ্ডায়মান কবির বরবপুকে আচ্ছন্ন করেছিল। সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণ-সম্পাতের বহুপূৰ্বে উন্মুক্ত আকাশতলে নিস্তব্ধ আম্রবীথিকার মধ্যে মুদিতচক্ষু দণ্ডায়মান কবি, আর তাকে বেষ্টন করে একান্ত শ্রদ্ধাবনত আশ্রমের আমচারিগণ-সমস্তটাকে রূপ দেবার ভাষা আমার নেই—কেবল এই বােধটুকু আমার চৈতন্যকে জড়িয়ে আছে যে আমি একটা খুব বড় জিনিষ সেদিন এই পােড়। চোখে ২ রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন প্রত্যক্ষ করেছিলুম এবং তারই গৌরবময় স্মৃতি আজও বহন করে বেড়াচ্চি। সেদিনের আর কোন খুঁটিনাটি ঘটনা আমার মনে পড়ে না —মনে থাবার বয়সও সেটা নয়। শুধু এইটুকু মনে আছে যে অজিতবাবু ( অজিতকুমার চক্রবর্তী) তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ সেদিন সকালে পড়েছিলেন। সেই প্রবন্ধ ১৩১৮ সালের ‘প্রবাসী’র আষাঢ় এবং শ্রাবণ সংখ্যায় ছাপা হয়। শাস্ত্রীমশায় । শ্রীযুক্ত বিধুশেখর শাস্ত্রী) সেদিন কবিকে আশীর্বাদ করেছিলেন। তারপর খাওয়া-দাওয়ার খুব ঘটা ছিল। আমার বােলপুর আশ্রমে ভর্তি হওয়ার একটু ইতিহাস আছে। সেটুকু আজ বলার কোন বাধা নেই—যার জন্যে বলতে পারতুম না তিনি স্বর্গীয় হয়েছেন। বাল্যকালে আমরা তিন বন্ধুতে মিলে ৩০শে আশ্বিন তারিখে রাখীবন্ধন করেছিলুম। তাতে হিন্দুমুসলমানের মধ্যে প্রীতির বন্ধন হয়েছিল কি না জানা নেই কিন্তু আমাদের নামে রিপাের্ট হয়েছিল। কোন রায়সাহেব খেতাব-লুব্ধ ভদ্রলােক এই সৎকৰ্ম্মটি করেছিলেন। তার ভাগ্যে জোটে নি—কিন্তু আমাদের ভাগ্যে রাষ্টিকেসন জুটেছিল। এই ঘটনায় মর্মপীড়িত হয়ে আমি স্কুল ছাড়তে বদ্ধপরিকর হই। রবীন্দ্রনাথের ষ্টেটে আমাদের গ্রামের এক ভদ্রলােক চাকরি করতেন। ৬নং দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেনে
পাঁচ-মিশেলি
তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম। তার ঘরে বসে খেয়াল
হ’ল রবিবাবুর সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়। চেষ্টা করলুম কিন্তু
দারওয়ানকে অতিক্রম করে তার কাছ পর্যন্ত পৌছুতে পারলুম
। হতাশ হয়ে যেখানটায় বসেছিলুম দোতলার থেকে সে
জায়গাটা দেখা যায়। রবিবাবু দোতলায় পায়চারি করতে
করতে হঠাৎ আমাকে দেখতে পেলেন এবং ডেকে পাঠালেন ।
তখন একসঙ্গে তিনজন দারওয়ান ছুটে এসেচে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
প্রথম কথা কওয়ার স্মৃতি এখনাে আমার মনে পড়ে। কথা শুনে
মনে হয়েছিল—কি স্বর ! এমন আওয়াজ ত কখনাে শুনিনি
কণ্ঠে বীণার ঝঙ্কার কাকে বলে তা জানা ছিল না—কিন্তু সেদিন
তার প্রমাণ পেয়েছিলুম।
রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন এসেছি। না ভেবে
চিন্তেই উত্তর দিলুম—“বােলপুর যাব বলে।” আশ্চর্যের বিষয়
রবীন্দ্রনাথ তখুনি রাজি হয়ে বল্লেন—“বেশ, পরশু দুপুরের গাড়ীতে
আমার সঙ্গে
যেয়।” একেবারে বােলপুর পোঁছে তারপর
বাড়ীতে খবর দিলুম।
বােলপুর থাকার সময়টা তার কাছে কাছেই থাকতুম।
কবিতা লিখে তাঁকে দেখাতুম—তিনি করেক্ট করে দিতেন।
দুপুরবেলা শান্তিনিকেতনের দোতলায় জাজিমের উপর বসে
শান্তিনিকেতন-সিরিজের থেকে প্রবন্ধ বুঝিয়ে নিতুম—কথননা
৪
রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন
বিরক্ত হতে দেখিনি—এক কথা পাঁচবার বুঝিয়ে বলতেন। ছুটির
সময়ও বাড়ী না গিয়ে তাঁর সঙ্গে যেতুম। একবারকার ছুটির
ঘটনার সঙ্গে এই প্রবন্ধের যােগ আছে।
সেবার আমরা গরমের ছুটিতে পদ্মার ধারে শিলাইদা বেড়াতে
গিয়েছিলুম। সঙ্গে ছিলেন দিনুবাবু ( দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ),
নগেনবাবু (নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়) আর সস্ত্রীক রথীবাবু ( রথীন্দ্র
নাথ ঠাকুর)। শিলাইদার কুঠীবাড়ীতে আমাদের থাকার স্থান হ’ল।
কবির জন্য তেতলার একটি ঘর নির্দিষ্ট হয়েছিল। একতলার
একটি ঘরে আমি, আর একটি ঘরে দিনুবাবু স-এস্রাজ বিরাজ
করতেন। রবীন্দ্রনাথের “রাজা” তখন ছেপে বেরিয়ে গেছে।
এই ছুটিতে কবি “জীবনস্মৃতি” এবং “অচলায়তন” একসঙ্গে
লিখতে শুরু করেন। কবি সমস্ত দিন ধরে লিখতেন-সন্ধ্যার
সময় আমাদের পড়ে শােনাতেন। এটি কবির চিরকালের
অভ্যাস। কুঠীবাড়ীর দোতলার সেই সান্ধ্য আসরগুলির কথা
আমার খুব মনে আছে। তখন দূরের দেবালয়ের কাঁসরঘণ্টার
শব্দ থেমে যেত—কুঠীবাড়ীর একপ্রান্তের ঝাউ গাছটা সে সে
শব্দ করত—দূরের পদ্মার হাওয়া ধানের ক্ষেতের উপর দিয়ে
ভেসে আত—ঘরের মধ্যে আমরা পাঁচটি প্রাণী মুগ্ধচিত্তে কবির
লেখা গুতুম।
এই ছুটিতে একদিন হঠাৎ আমার মনে হ’ল যে কবির কাছে
পাঁচমিশেলি ৫ আমি যথেষ্ট পরিমাণে থাকতে পাচ্চি নে অর্থাৎ সন্ধ্যার সেই আসর এবং মাঝে মাঝে কবির খাবার থালা থেকে পরমান্নের বাটী পেয়েও আমার মন ভরত না। তাই কবির প্রতিদিনকার চিঠির ডাক যখন উপরে যাচ্ছিল তখন সেই সঙ্গে আমিও একখানা চিঠি লিখে উপরে পাঠিয়ে দিলুম। চিঠিখানির ভাবার্থ বােধ হয় এই ছিল যে অজিতবাবু যেমন আপনার সঙ্গে পদ্মার উপর বােটে বাস করেছেন সেই রকমই কিছু একটা আশা নিয়ে আমি এখানে এসেছিলুম কিন্তু আপাতত সেটা কোন রকমেই হতে পারছে না ইত্যাদি। বেশ মনে আছে সেদিন কবি সন্ধ্যার আগেই নীচে নেমে এলেন এবং একতলার রকে একখানি আরাম- কেদারায় আসন গ্রহণ করলেন। তারপর আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি পায়ের কাছে গিয়ে বসলুম। তিনি আমার চিঠির কোন উল্লেখ করেন নি। যতদূর মনে পড়ে কথাও আমাদের বেশি হয় নি। সেদিন কৃষ্ণপক্ষের রাত ছিল। সন্ধ্যার পরেই গাঢ় অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেল। সেই অন্ধকার ফিকে হয়ে দূরের সিমেন্টওয়ালা চত্বরে যখন চাদের আলাে পড়ল তখন অনেক রাত—কবি আসন ত্যাগ করে উঠলেন। সমস্ত অন্ধকার দিয়ে তার সান্নিধ্য সেদিন অনুভব করেছিলুম। পূর্বেই বলেচি এই ছুটিতে কবি “জীবনস্মৃতি” আর “অচলায়তন” এক সঙ্গে লিখুতে সুরু করেন। “অচলায়তনের রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন প্রথম নামকরণ হয়েছিল ‘গুরু’। রবীন্দ্রনাথের কোন একখানা বই সম্বন্ধে পৃথভাবে কিছু বলতে যাওয়ার মধ্যে একটা ব্যর্থতা আছে, কেননা কবির সমস্ত লেখার ভিতর দিয়ে তাঁর সমগ্র জীবনটাই বিকশিত হয়ে উঠেছে। এই বিকাশের ধারা অনুসরণ করতে হলে “সন্ধ্যাসঙ্গীত” থেকে সুরু করে “শেষের কবিতা” পৰ্য্যন্ত আতে হয়—তবে এর প্রত্যেকটি স্তর চোখে পড়ে, কবির কাব্যরচনা যে জীবনরচনার অন্তর্গত তার পরিপূর্ণ উপলব্ধি হয়। বিশ্বানুভূতি কবির কাব্যের এবং জীবনের মূল সুর-তারই ধারা দেশ, কাল এবং পাত্রের ভিতর দিয়ে বিচিত্র হয়ে তাঁর সমস্ত কাব্যসৃষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে আছে—কোন একটা বিশেষ কাব্যের মধ্যে তার সাময়িক চেহারাটা নজরে পড়তে পারে মাত্র–তার ধারার ক্রমভিব্যক্তির আলােচনা নিষ্ফল। শাস্ত্রানুশাসনের বন্ধনে আমাদের দেশের এবং সমাজের মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে কি রকম পঙ্গু করে দেওয়া হয়েচে ‘অচলায়তনে সেইটিই দেখানর প্রয়াস। এই অনভিপ্রেত পীড়নের কঠিন নাগপাশে জর্জরিত হয়ে আমাদের মানবাত্মা অবিরত কাঁদচে- প্রতিমুহূর্তে এরা মানুষের সনাতন নিত্যমুক্ত মনকে অপমান করচে —অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা এবিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞান। চারিদিকে প্রকাণ্ড উঁচু প্রাচীর তুলে বিশ্বের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে অচলায়তনের মধ্যে আবদ্ধ করেছিলুম—মনে হয়েছিল ৭ পাঁচ-মিশেলি এতেই বুঝি মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ। এখানে ভাবনা করবার কিছু নেই—আমাদের ভাবনা শাস্ত্র ভেবে রেখে গেছেন আমাদের মনে যে সমস্যার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক তার সমাধানও শাস্ত্ৰ পূৰ্ব্বে থেকে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সুতরাং এখানে আমরা পরম নিশ্চিন্ত এবং নিরুদ্বেগ। যা কিছু করি শাস্ত্রানুসারে করি -কি কাজ করে কি ফল পাব তাও আমাদের আগে থাকতেই জানা। এখানে আমাদের আশা করবার, আকাঙ্ক্ষা করবার কিছু নেই—এখানে পরম করণীয় হচ্চে চোখ কান মুখ বুজে সব মেনে নেওয়া এবং গতানুগতিক স্রোতে ভেসে চলা। কিন্তু এই সফরচিত ব্যবস্থাটি চিরন্তন হতে পারত যদি মানুষের মন চৈতন্যস্বরূপ না হয়ে জড় হ’ত। মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য- বিধাতাসে ভয় করবে, ভাবনা করবে, পথ খুঁজতে গিয়ে ভুল করবে এবং ভুল করতে করতে পথ খুঁজে পাবে—এই মানুষের স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম। রচিত পথে পা তুলে দিয়ে পিছন থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে দেওয়া হবে এবং সে সেই ধাক্কার চোটে দিগ্বিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চবে, না এ মানব-ধৰ্ম্ম, না এতে গৌরব করবার কিছু আছে। শুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা অচলায়তনের হাওয়াকে পরিপূরিত করেছিলুম-সেখানে অন্য হাওয়ার প্রবেশ নিষেধ ছিল। হয়েছিল এতেই বুঝি এখানকার হাওয়া বিশুদ্ধ থাকবে। এটা মনে
রবীন্দ্রনাথ ও তাচলায়তন
মনে হয় নি যে সত্যকে এ রকম করে সঙ্গোপনে বাঁচিয়ে রাখতে
হয় না-সে নিজের তেজে নিজে বাঁচে। বিশ্বের সর্বব্যাপী
হওয়ার, অবাধ সংস্পর্শেই বদ্ধ হওয়ার মুক্তি—নচেৎ কলুষিত হয়ে
সে প্রাণঘাতী হয়।
অচলায়তনের ঐ সনাতন ব্যবস্থা চিরস্থায়ী হতে পারত যদি
সেখানে পঞ্চকের মত ছাত্র নবীন প্রাণ নিয়ে উপস্থিত না হত।
পঞ্চকের প্রাণ বিশ্বের নবীনতার হিল্লোলে স্পন্দিত—শাস্ত্রাচারের
নিষ্পেষণে সে প্রাণ মরবার নয়। তাই মহাপঞ্চকের ন্যায়
মহাজ্ঞানীর ভাই হয়েও সে শাস্ত্রের প্রথম সূত্রটা মুখস্থ করতে
পারলে না—বােধস্থ করা ত দূরের কথা। অথচ তার চেয়েও
বয়সে ছােট মুভদ্রের মনে এই চিরাচরিত প্রথার সংস্কার কি
রকম দৃঢ়ভাবে কামড়ে ছিল। এই রকমই হয়। কচিৎ
দু’ একজন এমন লােক জন্মান যাদের মন দূরের সুরে বাঁধা
—ক্ষুদ্রতা এবং অসত্য কোন রকমেই তাদের মনকে বাঁধতে
পারে না।
এই মিথ্যা আচারের পুঞ্জীভূত গ্লানি যেদিন আকাশব্যাপী
হয়ে ওঠে সেদিন প্রকৃতির নিয়মানুসারে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়—
এই মিথ্যাকে পদদলিত
গুরুর আবির্ভাব হয়।
অচলায়তনের গুরুও একদিন রুদ্রবেশে এসে দেখা দিলেন।
আয়জনের উঁচু প্রাচীর চুরমার করে মাঠের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন।
পাঁচমিশেলি
নিজেকে সংক্ষিপ্ত করে চারটি দেওয়ালের ভিতর বাঁচিয়ে
রাখার মধ্যে সার্থকতা নেই-উন্মুক্ত বিশ্বের খােলা রাজপথ
দিয়েই যে বিশ্বের প্রভুর আসা-যাওয়া !
সত্যের পথ চিরকালই সহজ এবং সরল--মন্ত্রের গুঞ্জনধ্বনির
মধ্যে সে পথের সন্ধান মেলে না। দর্ভকপাড়ায় সরল বিশ্বাসে
নামগানের মধ্যে সত্যের সহজ রূপ আছে—শােনপাংশুদের
প্রীতি এবং ভালবাসার মধ্যেও সত্যের সহজ রূপ বিদ্যমান।
কোন এক আদিম প্রাতে আমাদের গুরু আমাদের একটি সত্য
বস্তু দান করে অন্তর্হিত হয়েছিলেন—এতদিন ধরে কেবলি ভেবে
আচি আমরা বােধ হয় সে বস্তু হারাই নিবােধ হয় আমরা
এগিয়েই চলেছি। হঠাৎ কোন ঘটনার অপ্রত্যাশিত আঘাত
উপস্থিত হয়ে সে বস্তুর যাচাই আরম্ভ হয়। তখন বিস্মিত হয়ে
দেখি আমরা একটুকুও এই নি—কেবল এক বস্তুকেই পুনঃ পুনঃ
প্রদক্ষিণ করে ঘুরেচি। পঞ্চককে পেয়ে আচাৰ্য অদীনপুণ্যের
এইটি হয়েছিল। তিনি একমুহূর্তে বুঝতে পারুলেন—ভুল, ভুল,
এতদিন যা করেছি সব একেবারে ভুল—এতদিন যার পূজা করেছি
সে তার কঙ্কাল। তাঁর ভিতর এই সত্যানুসন্ধানের প্রবৃত্তি বরাবরই
ছিল।
কিন্তু মহাপঞ্চকের মধ্যে সত্যনিষ্ঠার চেয়ে মূঢ়তা ছিল
শতগুণ। তাই তিনি সত্যের সামনে এসেও তার প্রতি বিমুখ হয়ে
রইলেন
রবীন্দ্রনাথ ও অচলায়তন
কিন্তু আর না। ব্যাপার ক্রমশঃ ঘােরালাে করে তুলেচি।
এইবার সময় থাকতে বিদায় নেব। একটা কথা বলে রাখি—
রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আমার স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে যে সব ঘটনা উন্নত
করেচি তার একমাত্র উদ্দেশ্য তার শিশুসুলভ কবি-প্রকৃতিটিকে
চিনিয়ে দেওয়া। অবশ্য আমাকে অবলম্বন করে যে সব ঘটনা
ঘটেছিল তার জন্যে আমারও গৌরব কম নয়।
৫ শে বৈশাখ ১৩৩৬
ফাল্গুনী
ফাল্গুনের সংক্রান্তির দিন দিল্লী বেঙ্গলী ক্লাবের নাট্যকলা
বিভাগের তত্ত্বাবধানে রবীন্দ্রনাথের “ফাল্গুনী" নাট্য-কাব্য অভিনীত
হয়েছে।
বাংলার বাইরে, এমন কি বাংলাদেশেও ফাল্গুনী কোথাও
অভিনীত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এক রবীন্দ্রনাথ নিজেই
ফাল্গুনী বােলপুরে এবং কলকাতায় অভিনয় করেছিলেন। একে ত
রবীন্দ্রনাথের ইদানীন্তন লেখার যে অভিনয় হতে পারে এ কথা
সাধারণে বলে না।
তার উপর ফাল্গুনী আবার সবার সেরা -
রূপকের চরম। সুতরাং এদের এ নিৰ্বাচণে সাধারণে যে খুসী
হবেন না এবং একে সুবুদ্ধির কাজ বলে মনে করবেন না, এ কথা
বলাই বাহুল্য।
কিন্তু একটা কথা বিবেচনা করতে হবে। রুচিরও ক্রমবিকাশ
এবং ক্রমােন্নতির স্তর আছে। আমাদের দেশে এমন সময় ছিল
যখন যাত্রার দলে গোঁফ কামিয়ে স্ত্রীলােকের পার্ট অভিনয় করে
লােকে বাহবা নিত। ক্রমশঃ থিয়েটারের যুগে রুচির আর
একটু উন্নতি হ’ল। তখন লােকে চোখের ও কানের খােরাক
১২
ফাল্গুনী ছাড়া মনের খােরাকেরও খোঁজ করতে লাগল। বৰ্তমান রবীন্দ্র- সাহিত্যে আবার আত্মার খােরাকের কাজ চলছে। কিন্তু আমাদের দেশের শতকরা নিরনব্বই জন লােকের এই আত্মা প্রভৃতি বড় বড় কথা নিয়ে মাথা ঘামানাের ফুরসৎ নেই। লঘু সাহিত্য এখানে বেশী আদরণীয়। আজও আমাদের দেশ তলােয়ারের অস্ফিালন এবং বীররসের মােহ কাটাতে পারে নি। সূল্মের চেয়ে স্কুলের প্রতিই আমাদের আকর্ষণ বেশী। তাই আমার মনে হয় দিল্লীর বর্তমান নাট্য-কলাবিভাগের নেতৃবৃন্দ ফাল্গুনীর মত বই নিৰ্বাচণ করে যে সুরুচির পরিচয় দিয়েছেন, তা সর্বজনপ্রিয় না হলেও অনন্যসাধারণ। বাংলার বাইরে বাঙ্গালীরা যে প্রবাসজীবন যাপন কবেন, সেখানে তারা যে শুধু ডাক্তারি, ওকালতি, ব্যবসা ছাড়াও অন্য বিষয় চিন্তা করে থাকেন, এটা আশারই কথা বলতে হবে। কি প্রাণপাত পরিশ্রম করে যে এদের এটিকে সার্থক করে তুলতে হয়েছিল তার সামান্য ইতিহাস আমি জানি। দিল্লী থেকে মন্মথ বাবুকে পাঠান হ’ল বােলপুরে গানের সুরগুলি আদায় করে আনতে। রবীন্দ্রনাথের চরণােপান্তে উপস্থিত হলে তিনি সব শুনে বল্লেন, “তুই দু’দিনের মধ্যে ফাল্গুনীকে দিল্লীতে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাস ?” তিনি যে প্রবাসী বাঙালীদের কাছ থেকে এতদিন কোন সাড়াই পান নি এটি বােধ হয় তারই আভাস। তারপর দিনেন্দ্রনাথের কাছ থেকে সুরগুলি আয়ত্ত করে তিনি পাঁচমিশেলি t ফিরে এলেন। মাঝির কুটীরের দৃশ্যে সারদা বাবু বল্লেন, কুটীরের উপর দিয়ে একটু বাঁকা ছােট একখানি ডাল থাকবে। ইঞ্জিনীয়ার নৃত্যগােপাল বাবু তিন দিন মাঠে মাঠে ঘুরে ঠিক সেই রকম একটী ডাল আহরণ কল্লেন। আর ফুল ঝােপঝাড় গাছপালা ত সমস্ত দিল্লী সহর ঝেটিয়ে, এমন কি আম্বালা থেকেও আনা হয়েছিল। যেখানে যেটুকু হলে ideal-এর কাছাকাছি পৌঁছানাে যায় বলে এঁদের মনে হয়েছে, তার জন্যে বিন্দুমাত্র চেষ্টার ত্রুটি এরা করেন নি। বাইরে থেকে এইটুকু জেনেই এদের প্রেরণার প্রতি আমার মন কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। অভিনয় সম্বন্ধে বলার কথা এই যে অ্যামেচার অভিনয়ের যে সব সাধারণ খুঁত হয় তা এদের হয়েছিল। প্রত্যেক অঙ্কের মধ্যে প্রচ্ছদপট উঠতে বড় বিলম্ব হচ্ছিল এবং সে জন্যে দর্শকবৃন্দ অধীর হচ্ছিলেন। কিন্তু ভিতরের লোেকদের তাড়াতাড়ি করবার চেষ্টার অন্ত ছিল না। প্রত্যেক দৃশ্যে সীল আগাগােড়া বদল করতে হয়েছে। সেজন্যে কতকটা বিলম্ব অপরিহার্য। আর এগুলি details-এর খুত, principle-এর নয়। এদের সার্থকত। সেইখানে যেখানে ছােট ছােট ছেলেমেয়ে তাদের কচি কচি হাত দু'খানি নেড়ে নেড়ে গেয়েছিল, “দখিন হাওয়া, পথিক হাওয়া, দোদুল দোলায় দাও দুলিয়ে।” যদি সেদিন কারাের প্রাণ এই দোলায় দুলে থাকে, যদি তিনি অনুভব করে থাকেন যে বাংলার বাইরে ১৪ বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস” অর্থাৎ যে বয়সে মানব-মনের রসের উৎস একেবারে শুকিয়েও যায় না, আবার বিচারবুদ্ধিরও অপ্রতুলতা ঘটে না। কিন্তু আমার বন্ধুর প্রবন্ধ শুনে আমার সে ধারণা উল্টে গেছে এবং তার জায়গায় অপর একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। সেটি হচ্চে এই যে বিবাহ সম্বন্ধে আমাদের সামাজিক মনােভাব অত্যন্ত একপেশে। সংস্কারহীন এবং উদার যে মনােভাবের প্রসাদে এই সব জটিল প্রশ্নের মীমাংসা হতে পারে আমাদের সমাজে তার একান্ত অভাব। বন্ধু উপরের কয়েক ছত্রে যে প্রশ্ন তুলেছেন তার বিচার করতে গেলে আমাদের ভারতবর্ষীয় বিবাহের রীতি এবং নীতির গোড়ার কথা থেকে সুরু করতে হবে। শাস্ত্রানুসারে আমাদের দেশে পাঁচ রকম বিবাহপদ্ধতি প্রচলিত আছে—গান্ধৰ্ব্ব, রাক্ষস, আসুর, পৈশাচ এবং ব্রাহ্ম। মনু তার শাস্ত্রবিধির মধ্যে সবগুলিকেই স্থান দিতে বাধ্য হয়েচেন। কন্যাকে টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার নাম আসুর বিবাহ। তাকে বলপূর্বক হরণ করার নাম রাক্ষস বিবাহ। সুপ্তা অথবা প্রমত্তা কন্যাতে উপগত হওয়ার নাম পৈশাচ বিবাহ। বরকন্যার পরস্পর ইচ্ছাসংযােগে বিবাহ হওয়ার নাম গান্ধর্ব বিবাহ। আর ব্রাহ্ম বিবাহ মানে হচ্ছে সেই ধরণের আমরা সদাসর্বদা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, যাতে কন্যাকে বর প্রার্থনা করবে না, অযাচক বরকে কন্যাদান বিবাহ বা পাঁচমিশেলি করতে হবে। সম্প্রতি আমাদের হিন্দুসমাজে কেবলমাত্র ব্রাহ্ম বিবাহ চলিত দেখতে পাওয়া যায় তার কারণ হচ্ছে এই যে অন্যান্য বিবাহপদ্ধতিগুলির মধ্যে সামাজিক কোন নির্বিড় অভিপ্রায় নেই —যা আছে তা হচ্চে অর্থবল, বাহুবল, না হয় ত রিপুর বল। এই কারণে ধর্মশাস্ত্রে ওগুলিকে অগত্যা স্বীকার করেও নিন্দা করা হয়েছে—সুতরাং সামাজিক জীবনে ওগুলি যথাসাধ্য পরিত্যক্ত হয়েছে। মনু গান্ধর্ব বিবাহকেও কামসম্ভব বলে একটু খোঁটা দিয়েছেন। ভারতবর্ষীয় বিবাহপদ্ধতির মধ্যে দিয়ে তার সামাজিক কি অভিপ্রায় ব্যক্ত হচ্চে বুঝতে হলে আমাদের সমাজ-জীবনের তথা ভারতীয় সভ্যতার ভিতরকার তত্ত্বটি বােঝ চাই। ভারতীয় সভ্যতার ধারা হচ্চে নিবৃত্তিমূলক—এখানে প্রবৃত্তির জয় গাইবার কোন রীতি ছিল না। সুতরাং যে দেশে ত্যাগ এবং নিবৃত্তির চর্চা হয়ে থাকে, সে দেশে সমাজের মূল উপাদান ব্যক্তি নয়, গৃহ। এই গৃহকে গৃহাশ্রম নাম দিয়ে' শ্রেষ্ঠ আশ্রম বলা হয়েছে, এবং যারা দুর্বলেন্দ্রিয় মনুর মতে তারা এই আশ্রমের অযােগ্য। সুতরাং হিন্দু স্ত্রী প্রেয়সী নয়, গৃহিণী—যৌথ পরিবারের অঙ্গবিশেষ। এই পরিবারে স্ত্রীপুরুষের প্রেম বলে যে একটি স্বাভাবিক হৃদয়বৃত্তি আছে তাকে অতিক্রম করে দাম্পত্য প্রেম নামক একটি সামাজিক হৃদয়বৃত্তিকে গড়ে তােবার সাধনা ছিল । ২২
বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস”
কিন্তু এ কথা আমাদের মনে রাখা চাই যে এদেশ গৃহকেও
চরম বলে স্বীকার করেনি—এখানকার গৃহাশ্রম বাণপ্রস্থের
পূর্বাশ্রম মাত্র। মুক্তির অন্বেষণে একদিন গৃহকে ত্যাগ করতে
হবে, এই ছিল ভারতসমাজের উপদেশ। এবং উক্ত আদর্শকে
সম্ভব করে তােবার জন্যে আমাদের দেশে অল্প বয়সে মেয়েদের
বিবাহ দেওয়ার প্রথা প্রবর্তিত হয়েছিল। যে ইচ্ছা স্ত্রীপুরুষের
মিলন ঘটায়, তার একটা বিশেষ বয়স আছে। অতএব যদি
বিবাহকে সমাজের সম্পূর্ণ ইচ্ছানুমত করাই শ্রেয় হয়, তবে সেই
বয়সের পূর্বেই বিবাহ চুকিয়ে দেওয়া ভাল। বিবাহের পূর্বেও
নানা কথাকাহিনী ব্রতপূজার মধ্যে দিয়ে তাদের মনকে এই
আদর্শের উপযােগী করে
উপযােগী করে গড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা।
স্বামী তাদের পক্ষে একটা আইডিয়া—যতটা তাদের নিজের
মনের জিনিস, ততটা বাইরের জিনিস নয়। সমাজে সতী
স্ত্রীর মাহাত্ম্যকীৰ্ত্তনের যে ব্যবস্থা আছে তাতেও এই উদ্দেশ্য
পরিপুষ্টি লাভ করে।
এই রকম করে আমাদের যে সমাজ গড়ে উঠেছে সে যে
নয় এ কথা বলা বাহুল্য। এ সমাজের স্থিতির
দিকেই লক্ষ্য, গতির দিকে নয়। তাই মন্দিরের মত জরাজীর্ণ
আচারুঅনুষ্ঠান আঁকড়ে স্থাবর হয়েই সে রইল, বৃক্ষের মত
শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আলাে-বাতাস সে গ্রহণ করতে পারলে
আদৌ চলিষ্ণু
আঁচ-মিশেলি । এই রকম ক্ষয়িষ্ণু সমাজ-সৌধের একখানি হঁট নড়তে দিলেও ক্ষতি। তাই এখানে সতর্কতার অন্ত নেই—চলা-ফেরা সম্বন্ধেও তার এত সাবধানতার বাণী । বিবাহ সম্বন্ধে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সে খাতির করে না—ভয় করে, তাই প্রাণপণে দাবিয়ে রাখতে চায়। কেন না আচারই তার বাহন, বিচার নয়। সমুদ্রযাত্রা, ম্লেচ্ছদেশে বাস এককালে সমাজে নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় ছিল। এপারের যাত্রীদের না হয় কোন রকমে ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছিল, কিন্তু ওপারের যাত্রীরা যখন হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ের উপর এসে পড়ল, তখন সাগরপারের নতুন মত, নতুন শিক্ষা, নতুন অভ্যাস এপারে একটা বিপ্লবের সৃষ্টি করলে। কিন্তু তবুও প্রাচীণ বিবাহ ব্যবস্থার সনাতন পদ্ধতি থেকে সমাজ এক-চুল সরে দাঁড়াতে রাজি হ’ল না। এইখানে এখনাে সে নিৰ্ম্মম—এইখানে আঘাত পড়লে একেবারে তার ভিতে গিয়ে ঘা লাগে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বােঝা যায় যে আমাদের চিন্তার ধারায় এবং ততােধিক জীবনযাত্রার প্রণালীতে বহু পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথম কথা, আমাদের সমাজের যে নিশ্চলতার উল্লেখ পূৰ্বেই করেচি সেটি হচ্চে সমস্ত প্রাণশক্তির প্রতিকূল, মানব- ধৰ্ম্মের বিরােধী। নিবৃত্তিমার্গের কথা আগে যা বলেছি তা হচ্চে ব্রাহ্মণের ধর্ম—সমাজজীবনে সকলেই ব্রাহ্মণ নয়। যারা ক্ষত্রিয় তাঁরা নব নব ক্ষেত্রে আপন চঞ্চল শক্তির সাধনা করতে ছােটেন ২৪ বিবাহ-শমস্যা ও “দেবদাস” নয়। গার্হস্থ্যনীতির জটিল বেড়াজালে তাদের বেঁধে রাখা অসম্ভব। ক্ষত্রিয়ের চিহ ছিল রক্তবস্ত্র—সেটা বিদ্রোহের প্রতীক—তাই ক্ষত্রিয়ের দ্বারাই পুরাকালে যত কিছু বিপ্লব ঘটেছে। ভারত- ইতিহাসে এর উদাহরণ বিরল ভরতজন্মের আখ্যান- মূলক ‘অভিজ্ঞান-শকুন্তলম্ নাটকের নায়ক দুষ্যন্তই বলুন, আর বুদ্ধ, মহাবীর, শ্রীকৃষ্ণই বলুন, সবাই ছিলেন ক্ষত্রিয়। বর্তমান কালে যে ব্ৰহ্মণ্যশক্তির বিশেষ অপহূব ঘটেচে একথা জাতে আর কারাে বাকী নেই। আর ক্ষত্রিয়েরা যে নিবৃত্তিমার্গী নয় একথা সেদিন উপেনবাবু তার অভিভাবণে বলেছেন। ইউরােপীয় সমাজের মূলপ্রকৃতি যেমন রাষ্টিক, আর্থিক আমাদের সমাজের মূলপ্রকৃতি তেমনি সাম্প্রদায়িক—অর্থাৎ শ্রেণীবিশেষের আচারধারাকে রক্ষা করার দ্বারা তার ধর্মকে বিশুদ্ধ রাখার ব্যবস্থাতন্ত্র। বর্তমান জীবনে এই প্রকৃতির সম্পূর্ণ বদল হয়েছে। ব্রাহ্মণ তাঁর আচারধারাকে রক্ষা করতে পারছেন প্রতিদিন চোখের সামনে দেখা যাচ্চে—এমনি সব শ্রেণীরই দশা। আগে সমাজের যে উপাদান ছিল গৃহ, এখন সেখানে ব্যক্তি চেপে বসেছে। তার কারণ পাশ্চাত্য দেশের ভাবধারা ভারতের উপকূলে আছড়ে পড়েছে এবং পড়ছে—চোখ বন্ধ করে অথবা কানে তুলল গুজে তাকে ঠেকাবার উপায় নেই। দ্বিতীয়তঃ অর্থকৃচ্ছতার যুগে গৃহাশ্রমের সে বিশেষত্ব আর নেই। ২৫ পাঁচমিশেলি অন্ন-সচ্ছলতা না থাকলে বহুল-সম্বন্ধ-বিশিষ্ট সমাজের নিয়ম কখনন পালিত হতে পারে না। ফলে গৃহাশ্রমের পরিধি এখম সঙ্কীর্ণ হ’তে হ’তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীতে এসে দাঁড়িয়েছে। আরাে সর্বনাশের কথা হয়েছে এই যে আমরা অধিকাংশ লােকই গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে বাস করচি—এখানে সমাজের বাঁধন অত্যন্ত অগা, সমাজকে তার প্রাপ্য দিতে লােকে কড়াকড়ি করছে, উপরন্তু সবলেন্দ্রিয় দুৰ্ব্বলেন্দ্রিয় সকলেই নির্বিচারে গৃহাশ্রমের পক্ষপাতী। গৃহী আর এখন তপস্বী নেই, অপরপক্ষে কোন বড় তপস্যা জীবনে গ্রহণ করতে গেলেই গৃহত্যাগের ব্যবস্থা হয়েছে। মেয়েদের অল্প বয়সে বিবাহ দেওয়ার পথ আইন দ্বার। রুদ্ধ হয়েছে। ব্রত, পূজা প্রভৃতি অনুষ্ঠান পাড়াগাঁয়ের মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে স্বামিত্বকে আইডিয়া করে গড়ে তােলবার উপযােগী আবহাওয়ার অভাব হয়েছে। সতীত্বকে সংস্কার বলে উল্লেখ করতেও দেখা যাচ্চে। এ সমস্তই আমাদের পরিবর্তিত জীবনযাত্রার ফল,—অথচ সমাজের কাঠামাে এখন বদলে যেতে পারে নি। নি। সেইজন্যে আজকাল সমাজের সমস্ত বাধাকেই আমরা বহন করচি, অথচ তার লক্ষ্যকে স্বীকার করতে পারচি নে। যে গৃহ ছিল একদিন আশ্রম, আজ সে গর্ত হয়ে দাড়িয়েছে।
বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস” সমাজের উপাদান যখন ছিল গৃহ তখন নারীকে গৃহিণীর রূপ দিতে আমাদের বাধেনি, কিন্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের যুগে তার প্রেয়সীরূপই একান্ত হয়ে উঠল। বন্ধু যে free loveএর কথা তুলেছেন, তাকে সমাজ-জীবন থেকে নির্বাসিত করতে হলে সমাজ নিরাপদ হয় সত্য, কিন্তু নিঃসম্পদও হয়। নরনারীর মধ্যে প্রকৃতি যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে রেখেচন, সেই বিচ্ছেদের আকাশে একটি প্রবল শক্তি সর্বদা বিচিত্র আকর্ষণলীলায় প্রবৃত্ত। পুরুষের চিত্তের উপর স্ত্রীলােকের যে প্রভাব আমাদের দেশ তার নাম দিয়েচে শক্তি। এ শক্তি সংহারও করে, সৃষ্টিও করে। সমাজে এ শক্তির অভাব ঘটলে তার সৃষ্টিক্রিয়ার নির্জীবতা ঘটে, মানুষ এ অবস্থায় নিস্তেজের মৃত গতানুগতিক হয়ে চলে। আমাদের সমাজের আজ সেই অবস্থা হয়েছে। অচল স্থিতিকে সে চেয়েছিল বলে সর্বপ্রকার সক্রিয় শক্তিকে সে দূরে সরিয়ে রেখেছিল—আজ জেগে দেখচে বাইরের আঘাত থেকে আত্মরক্ষা করার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। আরাে একটা কথা। হৃদয়বৃত্তির আনুষঙ্গিক উৎপন্ন একটা জিনিষ আছে যার নাম হচ্চে মাধুৰ্য্য। এই মাধুৰ্য্য আলাের মত, এ একটি শক্তি। আমাদের সমাজে প্রেমের চাষ করবার যে ব্যবস্থা আছে তাতে এ শক্তির স্বতঃস্ফূৰ্ত্ত বিকাশ হয় না। অথচ পুরুষের চিত্তকে নারীর এই প্রাণবান মাধুৰ্য্য ভিতরে ভিতরে ২৭ পাঁচমিশেলি সক্রিয় না করলে সে আপন পূৰ্ণফল ফলাতে পারে না। বীরের বীৰ্য্য, কর্মীর কর্মোদ্যম, রূপকারের কলাকৃতিত্ব প্রভৃতি সভ্যতার সমস্ত বড় বড় চেষ্টার পিছনে নারীপ্রকৃতির গৃঢ় প্রবর্তনা আছে। আনন্দলহরী নামে একখানি কাব্য শঙ্করাচার্যের নামে প্রচলিত। বিশ্বগত আনন্দকে আনন্দলহরীর কবি নারীভাবে দেখেচেন। অর্থাৎ তার মতে মানব-সমাজে এই আনন্দশক্তির বিশেষ প্রকাশ নারীপ্রকৃতিতে। অথচ আমরা এই শক্তিকে চিরকাল বাইরে ঠেলে রাখলুম—ভিতরে আমল দিলুম না। নারীর এই মাধুৰ্য্য যে বিলাসসামগ্রী নয়, সে যে মানুষের সকল সাধনাতেই পরম সম্পদ এ কথা বােঝবার বয়স আজো আমাদের সমাজের হ’ল না —আমাদের সর্বব্যাপী শক্তিহীনতার এ-ও একটা প্রধান কারণ। শুনতে পাই বঙ্কিম বাবু লিখে গেছেন যে বাল্যপ্রেমের উপর ঈশ্বরের অভিসম্পাত আছে। অন্যদেশে আছে কিনা জানিনে কিন্তু আমাদের দেশে যে আছে তাতে আর সন্দেহ নেই। এর কারণ ঐ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে খর্ব করবার প্রবৃত্তি। আমাদের সামাজিক আইন-কানুন এমনি বিচিত্র এবং তার দংষ্ট্র। এতই দূরবিস্তৃত যে কোন হৃদয়বৃত্তিকে অভিসম্পাত করে তুলতে আমাদের বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয় না। আপাতত এই সম্পর্কে আমার “দেবদাসের কথা মনে পড়ছে। শরৎ বাবুর এ উপন্যাস আপনারা সকলেই পড়ে থাকবেন। ছােট বেলা থেকেই দেব- ২৮ বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস” দাসের একমাত্র সঙ্গী ছিল পাৰ্বতী। খেলা-ধুলা, দুষ্টমি প্রভৃতি সব কাজেই পাৰ্বতী ছিল তার সহায়, এবং এই সব চিরন্তন তুচ্ছতার ভিতর দিয়েই প্রেমের দেবতা তার আসনখানি তাদের হৃদয়পটে বিছিয়েছিলেন। অন্য কোন সমাজ এই মধুর সম্বন্ধটিকে কোনক্রমেই বাধাগ্রস্ত করতে চাইত না—বরং এর শক্তির দ্বারা সমাজ-জীবনকে লাভবান করে তুলত। কিন্তু আমাদের সমাজ তর্জনী তুলে বলে, “খবরদার, বেচাকেনা ঘরের মেয়ের সঙ্গে জমিদারের ঘরের ছেলের বিয়ে হয় না। পরস্পরের এতদিনের সম্বন্ধ এক ফুৎকারে উড়ে গেল, সমাজের বাধাই বড় হয়ে রইল। এ বাধা দেবদাসের জীবনের উপর যে কি ফল প্রসব করতে পারে তা’ সমাজ একবারও ভেবে দেখার দরকার মনে করলে না, প্রেমের নিৰ্যাতনে এমনি এর ত্রুর আনন্দ ! তারপর চলচ্চিত্ত দেবদাস যখন অধঃপতনের শেষ সীমায় নেমে গেল, তখন সমাজ আবার তর্জনী তুলে বল্লে, ‘লােকটা কি মন্দ, কি দুর্ণীতি-পরায়ণ। মানব-মনের সামনে আজ এই প্রশ্ন উদিত হয়েচে যে দেবদাসের অধঃপতনের জন্য দায়ী কে? সে যে কোন মতেই অধম হয়ে জন্মায় নি, গল্পে সে প্রমাণের অভাব নেই। পিতাকে সে ভক্তি কত-মৃত্যুর পর বাহ শােক প্রকাশ না করে তাঁর শােবার ঘরে গিয়ে পড়েছিল ; তার শ্রাদ্ধে নিজের অংশের বহু অর্থ ব্যয় করেছিল। মাতৃভক্তি যে তার কত অসীম ছিল তা’ এ আখ্যায়িক ২৯ পাঁচ-মিশেলি একটু প্রাণ দিয়ে পড়লেই ধরা যায়। পরপারের ডাক যখ এসে পৌছুল তখন মায়ের পদপ্রান্তে গিয়ে আছড়ে পড়ার জন্যে কি সে মর্মন্তুদ আকুলি-বিকুলি—অথচ নিজের মসীলিপ্ত কালিমামাখা মুখখানা কিছুতেই মায়ের সামনে দেখানর স্পর্ধা সে করতে পারলে না। সত্যি কথা বলতে কি, দেবদাস পিতৃমাতৃভক্ত না হলে এই গল্পটির এ রকম পরিণতি হতে পারত না। বড় ভাই দ্বিজদাসের মত সে না ছিল অর্থগৃধু , না ছিল কপটাচারী। অথচ এই দ্বিজদাসই তার হাজার রকমের নীচতা নিয়ে সমাজের মাথার মণি হয়ে রইল, দেবদাস তার হাজার রকমের উদারতা নিয়ে একেবারে তুচ্ছ হয়ে গেল। অত্যাচার সে করেছিল এ কথা অস্বীকার করচি নেকৰ্ম্মফলের ন্যায়বিধানে তার পুরা ফল সে পেয়েছে। বারে বারে ভুগেছে, কুৎসিত রােগাক্রান্ত হয়েছে, শেষকালে মৃত্যু হ'ল তার এমন এক সময় যখন তার কাছে না ছিল একজন বন্ধু, না ছিল একজন পরিজন। মৃত্যুর পর চঁড়ালে তাকে বেঁধে নিয়ে গেল এবং কোন্ পুষ্করিণীর কোন্ তীরে তাকে অর্ধদগ্ধ অবস্থায় ফেলে রেখে এল ইতিহাস তার খবর রাখলে না। এর চেয়ে বেশী শাস্তি আমাদের সমাজবিৰ্গণ নিশ্চয়ই তাকে দিতে চাইতেন না। কিন্তু মানব-মনের রুদ্ধ দুয়ারে একটা প্রশ্ন এই ব’লে অবিরত মাথা খুঁড়ে মরচে যে দেবদাস যেমন কর্ম করেছিল তেমনি ফল পেয়েছে, এই কি এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর ? কে তাকে এই বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস” পথের পথিক হওয়ার উপকরণ জুগিয়েছিল? কে তাকে তার সকল সার্থকতার পথ থেকে ছিনিয়ে এনে কর্ণধারবিহীন নৌকার মত গভীর তুফানে ছেড়ে দিয়েছিল ? কি সে তার অপরিসীম ব্যথা যার সর্বনেশে জ্বালা জুড়ুতে তাকে সুরার আশ্রয় নিতে হয়েছিল ? সমাজের কেবল কি বেদনা দেবারই অধিকার, ব্যথা বােঝ বার দায়িত্ব নেই ? জৈবধৰ্ম্মের সঙ্গে যেখানে মানবধৰ্ম্মের লড়াই বেধেছিল সেখানে দেবদাস জৈবধৰ্ম্মের কাছে পরাস্ত হয়েছে মানি, কিন্তু তবু ত তাকে ছােট মানুষ ভাবতে পারি নে। মদ খেয়ে নিজের মানবত্বকে বিলুপ্ত করে না দিয়ে যে ব্যক্তি বেশ্যার হাতে আত্মসমর্পণ করতে পারত না, সে কি মানুষ হিসাবে এতই ঘৃণ্য ? তাই আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আলােচনাপ্রসঙ্গে বলেছিলুম, “দেবদাসের মধ্যে সব চেয়ে বড় চরিত্রই হচ্চে দেবদাস। নীতিবিদ বন্ধু নাক সিটকে বলেছিলেন, না, “দেবদাসের মধ্যে বড় চরিত্র হচ্চে চন্দ্রমুখী—সে যে পরশমণির জোরে বেশ্যাবৃত্তি ত্যাগ করে নিবৃত্তির পথে এল সেইটি দেখানই হচ্চে “দেবদাসের বড় কথা। হতেও পারে, কিন্তু আমার কেবল এই কথাটি মনে হয় যে দেবদাসের ভিতর দিয়ে শরৎ বাবু আমাদের এক দিককার দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন। নীতিসংস্কারাচ্ছন্ন আমাদের মন এতকাল দুর্ণীতিকে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি দিয়েই বিচার করে এসেছে কিন্তু দুর্ণীতিরও যে একটা পূৰ্ব্বেতিহাস থাকতে পারে এবং সে ইতিহাস যে অত্যন্ত করুণ হতে পাঁচ-মিশেলি পারে দেবদাসকে দিয়ে সেইটিই প্রমাণ হয়ে গেল। To know all is to pardon all-ইংরাজি এ প্রবাদবাক্যও কি সত্য নয় ? পার্বতীকে নিয়ে এইবার হয় ত ঝগড়া বাধবে। তাকে সতীসাধ্বী বল্তে অনেকের আপত্তি হবে। সমাজের ব্যবস্থা মাথা পেতে নিয়ে সে শ্বশুরঘর করতে গিয়েছিল কিন্তু তার মনের অসীম রাজত্বে দেবদাসই যে চিরকাল একাধিপত্য করেচে এ কথা কারুরই অগােচর নেই। পার্বতীর জীবনে তালসােনাপুরই সত্য কি হাতীপােচই সত্য, দেবদাসই সত্য কি ভুবন চৌধুরী সত্য, মনই সত্য কি দেহ সত্য, এ প্রশ্নের মীমাংসা জগদীশ্বরের দরবারে এখননা পেশ করা আছে—আমরা কেবল এইটুকু জানি যে মানুষ এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারে নি। * Elixir of life বলে কোন বস্তু আবিষ্কার হয়েছে কি না আমার জানা নেই। মানুষ চিরকালই আনন্দের সন্ধানে ব্যস্ত, প্রকৃতির বৈচিত্র্য এবং প্রবৃত্তির তারতম্য হিসাবে এই সন্ধানের পথ প্রতি মানুষেরই বিভিন্ন। লালা বাবু একদিন এক কথায় রাজৈশ্বৰ্য্য ত্যাগ করে আনন্দের সন্ধানে যাত্রা করেছিলেন। যতীন দাস সেদিন যে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিল তার মধ্যে সে তার অমৃতরূপ দেখেচে। দেবদাসও যে সুবিপুল বেদনার অনলে খধূপের মত নিজেকে নিঃশেষে উৎসৃষ্ট করেছিল সেও এই চিরন্তন বিবাহ-সমস্যা ও “দেবদাস অর্ধজ্ঞাছ আননের অভিসারে। মানুষের এ যাত্রাপথ এখনও শেষ হয় নিলীলাময়ের এ অনন্ত লীলা চলেইচে। তাই এ পথবাহীদের কে ছােট কে বড় তার মীমাংসা আজ পর্যন্ত হতে পারল না ! কোন সমাজই এখন পর্যন্ত বিবাহ-সমস্যার নির্দোষ সমাধান করতে পারে নি। মানুষের চরিত্রে এখনাে প্রবৃত্তির এবং নিবৃত্তির দ্বন্দ্ব সমান চলেছে। অতএব প্রতীচ্যের সমাজবিধিই শ্রেষ্ঠ এবং কল্যাণকর—এ কথা বলা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। অপরপক্ষে আমাদের সমাজে পূর্বতন আদর্শের সঙ্গে পরিবর্তিত জীবনযাত্রার যে একটি স্বতঃবিরােধ জন্মেচে সেইটির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করাই এ প্রবন্ধের অভিপ্রায়। * বিবাহ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ থেকে এই প্রবন্ধের উপকরণ গৃহীত হয়েছে।
প্রতাপ ও দেবদাস “বিবাহ-সমস্যা ও দেবদাস” বলে আমি একটি প্রবন্ধ লিখে ছিলুম। সেটি যখন স্থানীয় সাহিত্যসভায় পড়া হয় তখন প্রবন্ধ শােনার পর আমার এক অধ্যাপক-বন্ধু আমাকে নিভৃতে ডেকে নিয়ে বলেন যে আমি দেবদাসের চরিত্রের মাত্র একটি দিক দেখিয়েছি অর্থাৎ দেবদাসের প্রতি সহানুভূতিই আমার প্রবল—তার ফলে তার নৈতিক অবনতির দিকটা আমার লেখায় ফুটে ওঠেনি অথবা তার নৈতিক অবনতি ব্যাপারটা আমি খুব বড় বলে মনের মধ্যে স্থান দিই নি। বন্ধুর অভিযােগ ঝেড়ে ফেলতে পারলুম না। মনের মধ্যে অবিরত জিজ্ঞাসা করতে লাগলুম, আচ্ছা, এই যে দেবদাসের এই রকম শােচনীয় অধঃপতন হ’লকিসের ফলে হ’ল ? কি সে বস্তু যার অভাবে তার সমস্ত কর্মোদ্যম একেবারে পঙ্গু হয়ে গেল,—তার কর্ণধারবিহীন নৌকা চোরাবালির কবলে পড়ে একেবারে আঘাটায় আছাড় খেলে ? একটু হদিশ পাওয়ার আশায় আমার অন্য এক অধ্যাপক- ৩৪ প্রতাপ ও দেবদাস বন্ধুর দুঙ্গে একদিন এই প্রসঙ্গে আলােচনা করলুম। আমাদের প্রশ্নোত্তরমালাটা এই রকম- ‘দেবদাসের অধঃপতনের জন্যে আপনি তাকে দোষী মনে করেন ? বন্ধু একটু সাবধান হয়ে উত্তর দিলেন ; বল্লেন, ‘দেবদাসের প্রেমের নিষ্ঠাকে প্রশংসা করি, সে খুব ঘা খেয়েছে একথাও স্বীকার করি, কিন্তু তার অধঃপথে নেমে যাওয়াটা আদৌ সমর্থন করি নে। তার জন্যে আমার মনের মধ্যে দুঃখ আছে, ব্যথা আছে, সহানুভূতি আছে কিন্তু শ্রদ্ধা নেই। এই বন্ধুটি আইডিয়ার রাজ্যে ultra-modern বলে খ্যাত। সুতরাং তাঁর উত্তর শুনে ভাবনা বেড়েই গেল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছা, দেবদাস পরবর্তী জীবনে কি করতে পারত, একটা আন্দাজ করুন ত, তার জন্যে একটা alternative জীবনযাত্রার পথ কল্পনা করুন। বন্ধু কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বল্লেন, “কেন, সে বড় অধ্যাপক হয়ে পড়াশুনার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে সব ভুলতে চেষ্টা করতে পারত; না হয় ত দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারত—কত পথ তার জন্যে খােলা ছিল। তা না করে সে আবদেরে ছেলের মত না-পাওয়ার দুঃখে কান্না ৩৫
পাঁচমিশেলি
জুড়ে দিলে, তারপর নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে। আপনি যাই
বলুন, এ কিন্তু তার নিছক দুর্বলতা—এর স্বপক্ষে বলার কিছু নেই।
স্বপক্ষে বলার ত কিছু নেই জানি, কিন্তু জগতের মতে মত
দিতেও আমার যেন কোথায় বাধতে লাগল। মনে হতে
লাগল কি যেন একটা element আমরা হিসাবের মধ্যে আচি
নে—তাই যত গােল বাচে—দেবদাসের পরিপূর্ণ বিচার হচ্চে
না। কি সে বস্তু যা আমাদের মানসিক চিন্তার হাতকে elude
করচে, সন্ধান করতে লাগলুম। সুতরাং দেবদাসের আখ্যায়িকা
আবার গােড়া থেকে বুঝে দেখার চেষ্টা করতে হ’ল।
দেবদাসের কাহিনী সংক্ষেপে এই দেবদাস বড়লােকের
দুরন্ত ছেলে—পড়াশুনার প্রতি গােড়া থেকেই তার দারুণ
বৈরাগ্য। ভাল লাগৃত মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ান, ঘুড়ি উড়ান,
পাড়াময় উপদ্রব করে বেড়ান প্রভৃতি ধরণের স্বাধীন আনন্দ।
এই আনন্দে একমাত্র সঙ্গী জুটেছিল পাশের বাড়ীর মেয়ে
পার্বতী। দেবদাস পাঠশালা ত্যাগ করলে-পাৰ্বতীও আর
পাঠশালায় পড়তে গেল না। সমস্ত দিন দুজনে দুজনের সহচর।
দেবদাসের মেজাজ-অনুসারে কখন আদর, কখন মারধাের খাওয়া
ছিল পার্বতীর নিত্য পাওনা। এই রকম করে তালসােনাপুরের ক্ষুদ্র
প্রান্তে তাদের যে সংসার, সেখানে দুজনে দুজনের কাছে একান্ত।
ভবিষ্যতের কোন ভাবনা না ভেবে
ভেবে দু’টি অসামাজিক মন
প্রতাপ ও দেবদাস পরস্পরকে জড়িয়ে এক হয়ে বেড়ে উঠছিল—তাতে না ছিল কোন স্বার্থের গন্ধ, না ছিল কোন কামনা। কিন্তু এই অতি- স্বাভাবিক সম্বন্ধ মানুষের সমাজে টেকে না! মানুষ তাকে কোন পরিচিত গণ্ডীর মধ্যে ফেলে তার একটা ব্যবহারিক নাম দিতে চায়। কিন্তু সে কথা পরে। দেবদাস বড় হ’ল-তালসােনাপুর গ্রাম আর তাকে ধরে রাখৃতে পারলে না, তাকে পড়ার জন্যে কলকাতা যেতে হল। এইবার বৃহৎ জগতের সঙ্গে মােকাবিলা। সে জগতে কত আকর্ষণ–পােষাক, পরিচ্ছদ, সিনেমা, বায়স্কোপ, থিয়েটার, ফুটবল ম্যাচ, কলেজ, প্রফেসার ইত্যাদি। এ জগতের কিছুরই সঙ্গে পার্বতীর পরিচয় নেই—সে তার ক্ষুদ্র তালসােনাপুর গ্রামে দেব-দা’র পাঠশালা পলায়ন, বাঁধের ধারে ছােটাছুটি, কি একটা কাজে গাফিলতি হওয়ায় দেব-দা’র হাতে কঠিন শাস্তি প্রভৃতি হাজার রকমের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে রইল। ইতিমধ্যে পার্বতীও বড় হয়েছে। তার বিয়ে দেওয়া দরকার। দু’টিকে ছােটবেলা থেকে একত্র দেখে দেখে জীবনেও তারা একত্র গ্রথিত হয় এ ইচ্ছা পাৰ্বতীর বুড়াে ঠাকুর-মায়ের মনে জেগেছিল এবং তিনি কথাট। দেবদাসের জননীর কাছে একবার তুলেও, ছিলেন, কিন্তু সমাজের পাষাণ-প্রাচীরে সজোরে মাথা যুকে তার এ ইচ্ছা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল—রইল শুধু অপমানের ৩৭
পাঁচমিশেলি
জ্বালা। দেবদাসের জননী ঈষৎ হেসে বলেছিলেন, বেচাকেনা-
ঘরের মেয়ে তিনি নেবেন না। একটা অতি সহর্জ সরল
সম্বন্ধ সমাজের বিষাক্ত নিঃশ্বাসের বাষ্পে পুড়ে ধাক্ হয়ে
গেল।
পাৰ্বতী সুন্দরী ছিল—সুতরাং তার বিয়ের জন্যে তার বাপ
ভাবিত হন নি। বরঞ্চ দেবদাসের বাড়ীতে প্রত্যাখ্যাত হয়ে
তাঁর জিদ বেড়ে গেল এবং একমাসের মধ্যেই তিনি মেয়ের
বিয়ের সম্বন্ধ পাকা করে ফিরে এলেন। এইবার পার্বতীর
মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল।
স্ত্রীলােকের সাধারণত আঁকড়ে ধরবার প্রবৃত্তি। ছােটবেলা
থেকেই পার্বতীর চিত্তাকাশে এক দেবদাস ব্যতীত আর কেউ
বিরাজ করে নি। সে একেবারে সমর্পিতপ্রাণা—সুতরাং অন্যকে
ভজনা করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য। দেবদাসের উপযুক্ত সহচরী সে
-ভয় ডর লজ্জা তার ধাতে ছিল না। সে রাত্রে গােপনে
দেবদাসের সঙ্গে দেখা করে বলে, আমাকে পায়ে স্থান দাও।
পুরুষ নিজের মনের খবর নিজেই অনেক
নিজেই অনেক সময় রাখে না।
দেবদাস শুনেছিল, পার্বতীর সঙ্গে বিয়েতে তার বাপমায়ের
আপত্তি। পার্বতী যে এতটা দুঃসাহসের পরিচয় দেবে তার
জন্যেও সে প্রস্তুত ছিল না। সুতরাং পরের দিন বাপের কাছে
বিয়ের কথা তুলে বকুনি খেয়ে সে কলকাতায় চলে গেল
প্রতাপ ও দেবদাস এবং সেখান থেকে পার্বতীকে লিখে দিলে যে সে তাকে কোনদিনও খুব ভালবাসত না। ভাগ্যদেবতা অলক্ষ্যে হাসলেন। চিঠি ডাকে দেওয়ার পর থেকেই দেবদাসের মনে উল্টা স্রোত বইতে আরম্ভ হ'ল। সহসা তার নজরে পড়ল ককাতার এসে সে যা পেয়েছে তার চেয়ে 7ে হারিয়েছে অনেক বেশী। কলকাতার পাওনার তুলনায় পাৰ্বতী যে অনেক বড়। ফলে সে আবার বাড়ী ফিরে গেল এবং চেষ্টা করে পার্বতীর সঙ্গে দেখা করলে। পুকুরের পাড়ে দু’জনের এই দেখা হওয়ার দৃশ্য শুনেচি চলচ্চিত্রের জগতে অতুলনীয় হয়ে আছে। পার্বতী চিরকালই অভিমানিনী মেয়ে—স্বেচ্ছায় যে অর্ঘ্য সে দেবদাসের পায়ে নিবেদন করেছিল তাকে পদদলিত করার সিংহিনীর রুদ্ধসম্মান আলােড়িত হয়ে উঠেছিল। সে বল্লে, চলচ্চিও তােমাকে বিশ্বাস নেই। এইবার ভুল এবং অভিমানের ভিতর দিয়ে জীবনের নাট্যলীলা জমে উঠল। পাৰ্বতীর বিয়ে হয়ে গেল, দেবদাসও কল্কাতায় ফিরে এল। এখন তার জীবনের যেন আর কোন অবলম্বন রইল না। পাৰ্বতী গত এবং অনাগত জীবনের কতখানি:স্থান অধিকার করেছিল, তাকে হারানাের আলােয় সেটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। সামনের বাকী জীবন মরুভূমির মত ধূ ধূ করছে—শুষ্ক, বিস্বাদ, রিক্ততার দৈন্যে অবসন্ন। জীবনে আর কিছু করণীয় নেই—করার শক্তিটুকুও যেন পাঁচমিশেলি পাৰ্বতী নিয়ে চলে গেছে। সুতরাং কোন আশা নেই,, কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, কোন উদ্যম নেই—আছে কেবল নিরাশার তপ্ত জালা, যে নিতান্তই আপনার ছিল তাকে গ্রহণ না করার শান্তিপূর্ণ আত্মগ্লানি। ভবিষ্যতে জীবন-মরুভূর মাঝখানে কোন ওয়েশিই চোখে পড়ে না—কানে আসে দিগন্তপ্রসারী ক্লান্তিকর একটানা একটা সুর—পাৰ্বতী নেই, নেই, নেই ! মনের যখন এই রকম আলুথালু নিরাবলম্ব অবস্থা তখন দেবদাসের বন্ধু জুটুলাে চুণিলাল। দেবদাসের মনে শান্তি নেই, অথচ চুণিলাল দিব্য নিশ্চিন্ত। দেবদাস মনে করলে তবে হয় ত চুণিলালের সঙ্গে গেলে স্বস্তি পাওয়া যাবে। পাপের প্রথম দর্শনে দেবদাসের ভদ্র মন সঙ্কুচিত হয়েছিল কিন্তু ক্রমশঃ তার পিচ্ছিল পথে অবতরণ করতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হ’ল না। এ কাহিনী আর বাড়িয়ে লাভ নাই—বাকিটা সকলেরই জানা। যে বস্তুর অভাবে দেবদাস তরতর করে অধঃপথে নেমে গেল, সে বস্তু যে ইচ্ছাশক্তি এ কথা সম্ভবত বুঝিয়ে বলার প্রয়ােজন নেই। আমাদের বাঙালীর মনে আর একটি এই ধরণের প্রেমের ইতিহাস প্রভাব বিস্তার করে আছে সে হচ্চে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতাপ এবং শৈবলিনীর প্রেমকাহিনী। দেবদাসের সঙ্গে প্রতাপের প্রভেদ এই যে প্রতাপ রিপুজয় করেছিল—দেবদাস পারে নি। প্রতাপ শৈবলিনীকে কম ভালবাসত তা নয়,-শৈবলিনী বলেছিল, তুমি ৪০ প্রতাপ ও দেবদাস থাকতে আমার সুখ নেই, তাই প্রতাপ যুদ্ধে প্রাণ দিলে। গঙ্গার গভেও প্রতাপ অনেকবার ডুবে মরতে গেছে—শৈবলিনীই বরং পারে নি। প্রতাপের প্রেম মহান্ আদর্শে অনুপ্রাণিত শৈবলিনীকে পাওয়া অসম্ভব জেনে সে সংসারের মধ্যে বৃথা কোলাহলের সৃষ্টি করতে চায় নি, নিজেই আস্তে আস্তে সরে গিয়েছিল।' শৈবলিনীর পরম মঙ্গলই ছিল তার কাম্য-তার দেহ কোনদিন সে চায় নি। তাই বঙ্কিমচন্দ্র সগর্বে বলেছেন যে প্রতাপের পুণ্যকাহিনী বর্ণনা করে তাঁর লেখনী ধন্য হ’ল। এই প্রসঙ্গে একটা অবান্তর কথা বলে রাখি। আমার বিশ্বাস বঙ্কিমচন্দ্র শৈবলিনীর উপর অবিচার করেছেন। প্রতাপকে মনে মনে ভজনা করার জন্যে তিনি শৈবলিনীকে যে রকম প্রায়শ্চিত্তের তুফানে নাকানি-চুবুনি খাইয়েচেন অতটা কিন্তু না করলেও পারতেন। বাস্তবিকই বিবাহের উদ্দেশ্য এবং সার্থকতা যদি দুটি প্রাণকে একত্র করা হয়, তবে প্রতাপই ত শৈবলিনীর স্বামী—চন্দ্রশেখরের সঙ্গে যে লােকাচার তাকেও ত সে কোনদিন ক্ষুন্ন করে নি। সমাজের কাঠামােকে অবিচলিত রাখার উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্র তার এই উপন্যাসে একটি চিরবিশ্বসিত shibbolethকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং রূপ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেচেন মাত্র। কিন্তু সে কথা যাক। ইচ্ছাশক্তির অভাবে মানুষ যে কি-রকম নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার আর একটি উদাহরণ আমরা পাই টুর্গেনিভের “ডি” ৪১
পাঁচমিশেলি
নামক উপন্যাসে। এই রুটিনের চরিত্রে অনেকগুলি গুণের
সমাবেশ হয়েছিল—সে বক্তৃতা করে মানুষের মন হরণ করতে
হরণ
পারত, বুদ্ধি ছিল তার সাধারণের চেয়ে অনেক বেশী, সব কথা
চট্ করে বুঝতে এবং বুঝিয়ে বলতে তার দক্ষতা ছিল। মাথায়ও
অনেক মতলব খেত—কিন্তু বিধাতা পুরুষ তাকে মেরুদণ্ডহীন
করে গড়েছিলেন। যদি বক্তৃতা করেই জীবনকে পুষ্পিত ক'রে
তাের উপায় থাকৃত তবে রুডিনের জীবন ব্যর্থ হত না,
কিন্তু মানুষের ভাগ্যবিধাতা চান কাজ এবং কাজকে গড়ে
তোলবার অটুট, ইচ্ছাশক্তি। তাই রুডিন জীবন-ভাের ভেসে
ভেসেই বেড়াল—কোথাও স্থিতিলাভ করতে পারলে না। সংগ্রাম
ক্ষেত্ৰ হ’ল তার শেষ শয্যা—এ বিষয়েও প্রতাপের সঙ্গে কডিনের
মিল আছে।
দেবদাসও যে নিছক কামনার তাড়নায় দেহপণ্য-জীবিনীদের
দ্বারস্থ হয়েছিল এ কথা বলতে পারি নে। মনের কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ়
অবস্থায় চুণিলাল তাকে যে পথের পথিক করে দিয়েছিল সে
নির্বিচারে নেই পথ বেছে নিয়েছিল এবং তাকে কাটিয়ে ওঠবার
শক্তি তার ছিল না। প্রবৃত্তির লাগাম চড়িয়ে জীবনকে পিশাচের
লীলাভূমি করূলে যে শান্তি পাওয়া যায় না, শান্তি যে সংরুদ্ধবীৰ্য্য
নিবৃত্তিকামীদের করায়ত্ত, এ কথা কেউ কোনদিন দেবদাসকে
বুঝিয়ে বলে নি। তাই সে হতভাগ্যের হিসাবের ভুল হয়েছিল।
৪২
প্রতাপ ও দেবদাস
কিন্তু সেই কারণে দেবদাসকে পেঁচি-মাতালের কোঠায় ফেলে
তার উপর অবিচার করা হবে। তার মধ্যে প্রেমের স্পর্শমণি
ছিল—তা না হলে তাকে অবলম্বন করে চন্দ্রমুখী সােনা
হয়ে উঠতে পারত না। সে নিজে মন্দ হয়েও অন্যের
ভালকে উদ্বোধিত করে তুলেছিল। সে বিপথগামী কিন্তু দুরাচারী
নয়—নিজের শরীরের উপরই সে অযথা অত্যাচার করেছিল
কিন্তু মন ছিল তার নিষ্কলুষ। শেষ পর্যন্তও তার মনে নীচতা
প্রকাশ পায় নি। নারা বলেন মানুষের মধ্যে একরকমের
স্বভাব আছে যা ভালবাসা ব্যতীত কিছুতেই নিবৃত্ত হয় না।
এ কথা যদি সত্য হয় তবে দেবদাস যে সেই স্বভাবের মানুষ
ছিল একথা বােধ হয় হলফ করে বলা যায়।
অনেক শাস্তিই পেয়ে গেছে—মরণের পরে এ পারের দেনা
এপারেই চুকিয়ে গিয়ে সে যেন নির্দেন অবস্থায় বিধাতার সামনে
দাড়াতে পারে এই প্রার্থনাই আজ করি। যদি তাকে পুনর্জন্ম দেন
তবে যেন এই বহুসংস্কারপ্রপীড়িত ভারতবর্ষে সে আর না জন্মায়।
*
জীবনে সে
* There are certain natures-and they are frequently
the highest type of our kind-who cannot drown love by
any means except love. With them, it is a homeopathic
kind of treatment that is indicated to cure
like with
like. Work, other interests, travel-nothing on God's earth
will drive away the melancholy and fretting of the soul
with such unhappy creatures, Nothing but love...'
-Bree Narran.
৪৩
বিন্দুর ছেলে শরৎচন্দ্রের গল্প বা উপন্যাস পড়া এক, তাদের সম্বন্ধে লেখা আর। তাঁর লেখা পড়ে চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে কিন্তু নিজে কেঁদেচি বলেই অপরকে কাঁদাতে পারব এমন কোন যুক্তি নেই। কেন না, একটা নির্ভর করে নিজের উপর, আর একটা নির্ভর করে নিজের শক্তির উপর। শরৎ বাবু সত্যিই বলেছেন যে, চোখ দুটো থাকলেই পড়া যায়, কিন্তু হাত দুটো থাকলেই ত লেখা যায় না। ‘বিন্দুর ছেলে’ ‘রামের সুমতি’ এবং পথ-নির্দেশ, শরৎচন্দ্রের এই তিনটি গল্পকে triplet বলা যায়। তিনটিই ব্ৰহ্মদেশে লেখকের প্রবাসকালে লেখা হয়েছিল, প্রথমে ‘রামের সুমতি', তার পর ‘পথ-নির্দেশ’, আর তার পর ‘বিন্দুর ছেলে। সব গল্পই ‘যমুনায় ছাপা হয়। তখনাে ‘ভারতবর্ষ জন্মগ্রহণ করে যখন ‘যমুনা’য় শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ বেরুচ্ছিল, তখন “ভারতী’তে রবীন্দ্রনাথের ‘রাসমণির ছেলে’ বেরুচ্ছিল। দু’জন শক্তিশালী লেখকের লেখার মধ্যে এইটুকু সংযােগ বর্তমান আছে। নি। ৪৪ বিন্দুর ছেলে শরবাবুর নিজের মত ও-তিনটি গল্পের মধ্যে পথনির্দেশ সব চেয়ে ভাল উতরেছে, যদিচ সাধারণের রায় তা নয়। সাধারণে বলে ‘বিন্দুর ছেলে’ ও-তিনটি মণির মধ্যে কৌস্তভ এবং আমার মনে হয় তারা মিথ্যা বলে না। কোন একটি আদর্শের উপর লেখকের পক্ষপাত থাকা অসম্ভব নয়। আর ‘পথ- নির্দেশে’র আদর্শের উপর যে শরৎচন্দ্রের পক্ষপাত আছে সেটা র অন্য লেখা থেকে ধরা পড়ে। ‘বিন্দুর ছেলে’ যখন প্রথম বেরুতে সুরু হয় তখন পাঠক-মহলে একটা সাড়া পড়ে গিয়েছিল। সকলেই বলেছিলেন, কথা-সাহিত্য- ক্ষেত্রে আবার একজন প্রকৃত শক্তিশালী লেখকের আবির্ভাব হয়েছে। শরৎ বাবুর পরবর্তী কালের লেখা তাঁর সে গৌরব বাড়িয়েছে বই কমায় নি এবং তার সে গৌরব আজও তেমনি অম্লান। এ কথাও বােধ হয় নির্ভয়ে বলা যেতে পারে যে, সাহিত্যের দরবারে শরৎচন্দ্রের আসন চিরস্থায়ী হয়ে গেছে—কেননা শরৎচন্দ্র তাঁর যে অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবন-রসের পাত্র পূর্ণ করেছেন তা সত্যিই বিচিত্র এবং অভিনব। সেই অভিজ্ঞতা থেকে যে মধু গল্পাকারে নিঃসৃত হয়েছে তার জুড়ি মেলাতে বাংলাদেশকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হবে। পৃথিবীতে এক শ্রেণীর লােক দেখতে পাওয়া যায় যারা ৪৫
পাঁচমিশেলি
মনঃপ্রধান—মনের জোরেই তারা নড়ে-চড়ে বেড়ায়—শরীরটা
তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ গৌণ। বিন্দু এই শ্রেণীভুক্ত। সেবড়লােকের
মেয়ে-ছেলে পুলে হয় নি—ফিটের ব্যামাে ছিল। কোন কারণে
মন খারাপ হলেই তার মূচ্ছ হত। তার বড় জা অন্নপূর্ণা
একদিন এই ফিটের ব্যামাের এক আশ্চৰ্য্য দৈব ঔষধ আবিষ্কার
করলেন। মূচ্ছা হবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে নিজের দেড় বছরের
ছেলে অমূল্যকে বিন্দুর কোলে বসিয়ে দিলেন—ছেলে কঁচা
ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল—বিন্দু প্রাণপণ বলে ছেলেকে বুকে
চেপে ধরলেসে দিন আর মূচ্ছা যাওয়া হল না। এর পর
থেকে অন্নপূর্ণা বিন্দুকে একেবারে ছেলে দিয়ে দিলেন।
বাড়ীতে আর ছেলে পুলে ছিল না। সুতরাং অমূল্যধন
মাকে আশ্রয় করে বড় হতে লাগল। বিন্দু যখন ছেলে নিয়ে
পড়ল তখন ঐ তার ধ্যান জ্ঞান হয়ে দাড়াল। বড় হয়ে তার
ছেলে মানুষের মত মানুষ হবে, দশজনে প্রশংসা করে বলবে
ঐ অমূল্যর মা’ এই ছিল তার আদর্শ। ঐ আদর্শে এতটুকু
আঘাত লাগলেই বিন্দু ক্ষেপে উঠত। শেষে হলও তাই। ঐ
ছেলের বিষয় নিয়েই তাদের দুই জায়ের মনান্তর হয়ে গেল।
ছেলেকে মানুষ করবার সংকল্প মনে থাকলে তার বাপ
মাকে প্রত্যেক খুঁটিনাটি বিষয়েও সাবধান হতে হয়। নরেন
বিন্দুদের বাড়ী আসা পর্যন্ত বিন্দু অমূল্যকে নিয়ে বিব্রত হয়ে
৪৬
বিন্দুর ছেলে
পড়েছিল। নরেন বয়াটে ছেলে—সে যাত্রাদলের গান গায়,
অ্যাক্টো ব, আর পড়াশােনার নামে মা। নরেন আসার
পর থেকে অমূল্যর দশ আনা ছ’আনা চুল ছাঁটার সখ হ’ল,
তার পকেটের মধ্যে পােড়া সিগারেটের অংশ পাওয়া গেল,
অবশেষে সে বিন্দুকে না বলে অন্নপূর্ণার কাছ থেকে টাকা
নিয়ে হেড মাষ্টারের জরিমানার টাকা শােধ করলে।
বিন্দু অমূল্যর ধরণ দেখে ক্রমশঃই মনে মনে শঙ্কিত হচ্ছিল,
শেষের ঘটনায় সে একেবারে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উঠল।
তার যত রাগ গিয়ে পড়ল বেচারী অন্নপূর্ণার উপর।
কেন না
তিনি টাকা না দিলে ত অমূল্যর এত সাহস হত না।
রাগের মাথায় বলে ফেলে, কার পয়সা খরচ কর সেটা
দেখুঁতে পাও না ? কার রােজগার খাচ্চ পচ, সেটা জান না?
অন্নপূর্ণা নিঃস্ব ঘরের মেয়ে ছিলেন—তিনি এই শ্লেষবাক্য
সহ্য করতে পারলেন না। বিশেষ করে তিনি অনুমান করে
নিলেন যে, এই শ্লেষের মধ্যে ভাসুরের উপার্জনহীনতার প্রতিও
ইঙ্গিত আছে। তার স্বামীগর্বে আঘাত লাগল। তিনি তৎক্ষণাৎ
দিব্যি করে ফেললেন যে, বিন্দুদের দেওয়া ভাত আর খাবেন
—যদি খান ত যেন ছেলের মাথা খান। এই দিব্যি শুনে
কানে আঙ্গুল দিয়ে দীর্ঘ বার বচ্ছর পরে বিন্দু ফের মূচ্ছিত
হয়ে পড়ল।
৪৭
পাঁচমিশেলি
বিন্দু অন্নপূর্ণাকে দেবীর মত ভক্তি করত—অন্নপূর্ণা বিন্দুকে
সন্তানের চেয়েও ভালবাসতেন। বিন্দু বলত যে অন্নপূর্ণাই আদর
দিয়ে তার মাথা খেয়েছেন। সময়ে অসময়ে সে গল্প বলার জন্যে
দিদির গলা জড়িয়ে আব্দার করত। বিন্দু যখন এই ঝগড়ার
পর নতুন বাড়ীতে ছিল তখন তার মা তাকে বাপের বাড়ী
নিয়ে যাওয়ার কথা তুললেন। বিন্দু রাজি হল না—বলে,
‘না, মা, তা হয় না। যতক্ষণ বেঁচে আছে, ততক্ষণ যেখানেই
থাক, সেই সব। এখানে অন্নপূর্ণা বিন্দুর কাছে তার মায়ের
চেয়েও উঁচুতে স্থান পেয়েচেন।
বিন্দু যে শুধু অন্নপূর্ণার কাছেই আদর পেত তা নয়—
ভাসুর যাদবেরও সে অশেষ স্নেহের পাত্রী ছিল। তিনি কোন
দিন বিন্দুকে ‘বৌমা বলে ডাকেন নি, ‘মা’ বলতেন। বিন্দুর
কোন কথাই তাঁর কাছে কোন দিন উপেক্ষিত হয় নি। তারই
কথামত তিনি পাঠশালা উঠিয়ে এনে বাড়ীতে বসিয়েছিলেন। যখন
দুই জায়ে ঝগড়া হ’ল—পৃথগন্ন হলেন—তখন পর্যন্ত যাদব বিন্দুর
একরত্তি দোষ দেন নি। বলেছিলেন, আগাগােড়াই কাজটা
ভাল করনি, বড়বৌ। আমার মাকে তােমরা কেউ চিলে না।
আমার মায়ের কথা শুধু আমি বুঝি। কিন্তু বড়বৌ, এই যদি
মাপ করতে পারবে তবে বড় হয়েছিলে কেন ? সন্ধ্যার পর
যখন বাড়ী এসে শুলেন বিন্দুর ভয়ানক অসুখ, বললেন, ‘কত
৪৮
বিন্দুর ছেলে
সাধ করে সােনার প্রতিমা ঘরে আলুম বড়বৌ, জলে ভাসিয়ে
দিলে ? আন্দি এখন যাব। এর চেয়ে সহজ এবং সরলভাবে
মেহের আন্তরিকতা প্রকাশ করার উদাহরণ আমার আর জানা
নেই।
বিন্দুও এই ভাসুরকে দেবতার মত ভক্তি করত। বলেছিল,
‘এমন দেবতার মত ভানুর পেতে অনেক জন্ম জন্মান্তরের
তপস্যার ফল থাকা চাই। তাই বাপের বাড়ী গিয়ে যখন সে
মরণাপন্ন তখন বাপ মায়ের কথায় ঔষধ পথ্য খেলে না,
স্বামীর কথায় কোন ফল হ’ল না, এমন কি অন্নপূর্ণার কথাও
সে দিন কোন কাজে এল না। একমাত্র যাদবের কথাই সে দিন
সে রেখেছিল। এইখানে শরৎচন্দ্রের মৌলিকতা একটি লক্ষ্য
করবার বিষয়।
যাদব বলেন, 'বাড়ী চল মা, আমি নিতে এসেছি।
একদিন যখন এতটুকুটি ছিলে মা, তখন আমিই এসে আমার
সংসারের মা-লক্ষ্মীকে নিয়ে গিয়েছিলাম, আবার আসতে হবে
ভাবি নি। তা মা শােনন, যখন এসেচি তখন হয় সঙ্গে করে
নিয়ে যাব, না হয় ও-মুখখা আর হব না। জান ত মা, আমি
মিথ্যে কথা বলি নে। সত্যভাষণপুঞ্জিত আত্মবিশ্বাসের এর চেয়ে
শক্তিময় প্রকাশ কোন জাতির সাহিত্যে আছে কি না আমি
জানি নে।
৪
৪৯
পাঁচমিশেলি
বিন্দুর আদর্শবাদের কথা আগেই বলেছি—তার মন ভালে
শরীর আর টেকে না। যে অমূল্য তাকে ছেড়ে একটা রাত
ঘুমুতে পারত না, তাকে যখন সে এক মাসের উপর চোখে দেখতে
পেলে না, যখন সে বুঝলে দিদি তাকে ত্যাগ করেছেন, বঠঠাকুরকে
সে অপমান করেছে, তখন জগতে বেঁচে থাকার সব অবলম্বনই
যেন তার হঠাৎ ফুরিয়ে গেল। বাপের বাড়ী এসে তার জ্বর
হ’ল—দিনে দু’বার তিনবার মূচ্ছা হতে লাগল—অবশেষে শেষ
মূৰ্ছা আর ভাঙতে চায় না। যদি বা কোন গতিকে ভাঙল, নাড়ি
তখন একেবারে বসে গেছে। তারপর যখন সে ফের অমূল্যকে
দেখলে, দিদিকে দেখলে, ভাসুর ঠাকুরের কথা শুনলে, তখন তার
মন স্বপ্রতিষ্ঠ হ’লশরীরও সারল। অমূল্য, দিদি, ভাসুর
ঠাকুরকে নিয়েই তার সংসার—মাধব যেন সেখানে গৌণ—বিন্দু-
চরিত্রের এইটুকুই বিশেষত্ব।
মাধব যাদবের বৈমাত্রেয় ভাই কিন্তু দাদার উপর এই ছোট
ভাইটির শ্রদ্ধার : অন্ত ছিল না। লেখক সেটা অনেক কথার
ভিতর দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। মাধব বল্চেন, আর গােলমাল
করাে না, যাও। বােঠান যে রকম করে পা ফেলে বেড়াচ্চেন, দাদা
এখনি উঠে পড়বেন। পাগল তুমি! দাদা শুনেছেন, আর
গােলমাল করাে না!' বিন্দু যখন চুপ করে থাকার জন্যে অনুযােগ
করেছিল তখন মাধব বললেন, ‘ও-বিদ্যে আমার দাদার কাছে
বিন্দুর ছেলে
শেখা। ঈশ্বর করুন, যেন অমনি চুপ করে থেকেই এক দিন
যেতে পারি।
অন্নপূর্ণার সঙ্গে বিন্দুর কলহের কথা মাধব শুনেছিলেন।
বিন্দু রাগের মাথায় যা বলেছে সেটা যে তার মনের কথা নয় তা
মাধব বিলক্ষণ জাতেন। কিন্তু তবু ভাই-এর অপমান তার মৰ্ম্মে
গিয়ে বিধেছিল। বিন্দু যখন দুঃখে অনুশােচনায় কেঁদে কেঁদে
সারা হচ্ছিল তখন তার কষ্ট মাধব বােঝেন নি তা নয়, তবু
দাদাকে বিন্দুর হয়ে কিছু বল্তে রাজি হলেন না। বলেন,
‘হাজার দিব্যি করলেও আমি দাদাকে বলতে পারব না। তিনি
নিজে জিজ্ঞাসা না কবুলে গিয়ে বলব, এত সাহস আমার গলা
কেটে ফেলেও হবে না।
কিন্তু এর চেয়েও মাধবের আরাে বড় পরিচয় পরে আছে।
বিন্দুকে বলেছিলেন, সংসারে যে যেমন অদৃষ্ট নিয়ে আসে, তেমনি
ভােগ করে, তার জীবন্ত সাক্ষী আমি নিজে । কবে বাপ মা
মরেচেন জানি নে ; বড়-বৌঠানের মুখে শুনি আমরা বড় গরীব
কিন্তু কোন দিন দুঃখ কষ্টের বাষ্পও টের পেলাম না। কোথা
থেকে চিরকাল পরিষ্কার ধপধপে কাপড় জামা এসেছে তা আজও
বলতে পারি নে। তারপর উকীল হয়ে মন্দ টাকা পাইনে। ইতিমধ্যে
কোথা থেকে কেমন করে তুমি একরাশ টাকা নিয়ে ঘরে
এলে ; এমন অট্টালিকাও তৈরি হ’ল—অথচ দাদাকে দেখ,
;
পাঁচমিশেলি
চিরকালটা নিঃশব্দে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেছেন, ছেড় সেলাই করা
কাপড় পরেচেন—শীতের দিনেও তার গায়ে কখন জানা দেখি নি
-একবেলা এক মুঠো খেয়ে কেবল আমাদের জন্যে—সব কথা
আমার মনেও পড়ে না, পড়ার দরকারও দেখিনে—শুধু দিনকতক
আরাম করছিলেন—তা ভগবান সুদ শুদ্ধ আদায় করে নিচ্ছেন।
এই উক্তির মধ্যে যাদবের নিঃশব্দ আত্মদানের যে কাহিনী নিহিত
আছে এবং মাধবের যে ঐকান্তিক ভ্ৰাতৃভক্তি এবং tenderness
প্রকাশ পেয়েছে অন্য দেশের সাহিত্যে তার জুড়ি আছে কিনা
সন্দেহ।
আমার মনে হয় misunderstanding সকল সংসারেই হয়,
যেমন বিন্দুদের সংসারে হয়েছিল কিন্তু অমন অন্নপূর্ণা আমাদের
সংসারে নেই বলে, আর যাদবের মত আমরা নিজেরা কেউ নই
বলে আমাদের misunderstanding এর গ্রন্থি আর কিছুতেই
খােল না।
বাংলা দেশের পারিবারিক জীবনের রসস্রষ্টা শরৎচন্দ্রের
ত্রিপঞ্চাশৎ জন্মদিনে আজ তার উদ্দেশ্যে সসম্রমে নমস্কার করি।
তিনি আমাদের পরিশ্রম-খিন্ন অভাব-অনটন-পরিম্নান নীরস জীবনের
দ্বারে মাধুর্যের যে আস্বাদ বয়ে নিয়ে এসেছেন তার জন্য তাঁকে
নমস্কার করি। তিনি আমাদের ভাই-বোেনর সম্বন্ধকে মধুর
h
বিন্দুর ছেলে
করেছেন, দেবর-বৌদিদির সম্বন্ধকে অকৃত্রিমতার গৌরবে পূত
করেছেন। তাকে না পেলে আমাদের জীবন-পুস্তকের একটি
অধ্যায়ই অনুস্মাক্ত থেকে যেত—জীবনকে গ্রহণ করবার একটা পরি-
প্রেক্ষিতাই (perspective) আমাদের চোখে পড়ত না। তাঁকে
পেলে আমরা রমেশকে পেতুম না—উপীনকে পেতুম না
মহিমকে পেতুম না। নারায়ণীকে পেতুম না-সাবিত্রীকে পেতুম
নামাকে পেতুম না-
‘তােমাকে ঘেরিয়া আজি নাচে মত্ত বিজয়িনী দল,
গ্রহে গ্রহে প্রণব-ওঙ্কার ;
হে নারীত্রাণের মূসা, হে গঙ্গার নব-ভাগীরথ
সেবকের লহ নমস্কার।
বিরাজ বে শরৎচন্দ্রের যে সমস্ত রচনা পাঠ করিয়া পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছিল ‘বিরাজবৌ' তাহাদের অন্যতম নহে। অপরপক্ষে কাহারাে কাহারাে মুখে শুনিতে পাইয়াছি বইখানির একঘেয়েমী দোষ আছে। যাহারা এ মতের পােষকতা করেন তাহাদের নেহাত দোষ দেওয়া যায় না, কারণ বইখানি আগা- গােড়া একটানা দুঃখের মর্মন্তুদ কাহিনী—ইহার মধ্যে সুখদুঃখের ওঠাপড়ার ইতিহাস নাই—আর কোন ঘটনাবৈচিত্র্যের সমাবেশ নাই—যাহা আছে তাহা ঐ দুঃখ-বৈচিত্র্যেরই এপিঠ ওপিঠ। সমস্ত বইখানির মধ্য দিয়া নীলাম্বর এবং বিরাজবৌ-এর অপরিসীম দুঃখের করুণ কাহিনী স্বচ্ছ বৰ্ত্তিকার মত দপ দপ করিয়া জ্বলিতেছে। এই একটানা দুঃখের বেদন-ইতিহাস পড়িতে পড়িতে মন হাঁপাইয়া ওঠে, কিন্তু সেজন্য গ্রন্থকারের কোন অপরাধ নাই। যদি অপরাধ কাহারও থাকে তবে সে বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের ভাগ্য-বিধাতার যিনি এর ঘরে ঘরে এমন অকাতরে দুঃখের স্রোত বহাইয়া দিয়াছেন। তাই আমার মনে হয় এই বইখানি একেবারে খাঁটি প্রাচ্যদেশীয় (eastern)-ইহার মধ্যে পাশ্চাত্য দেশের আদর্শবাদের অথবা ঘটনা ৫৪ বিরাজ বৌ সি দূর বিন্যাসের কোনরূপ ছায়াপাত নাই। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই আমার কথা পরিস্ফুট হইবে –‘গাঁয়ে বসন্তের প্রাদুর্ভাব হইলে নীলাম্বরের যখন জ্বর হইল বিরাজবৌ সন্ধ্যাবেলায় এক মুঠা কঁচা চাল আর এক ঘটি জল খাইয়া দিন কাটাইতে লাগিল—পাঁচদিন পরে নীলাম্বরের জ্বর ছাড়িলে মা শীতলার পূজা পাঠাইয়া দিয়া তবে জলগ্ৰহণ করিল। মা শীতলার নিকট মানস করিয়াছিল, ‘ভাল যদি কর মা তবেই আবার খাব দাব, না হলে অনাহারে প্রাণত্যাগ করবে। মনে ভাবিয়াছিল, “সি”থের এ তােলবার আগে এ সিথে পাথর দিয়ে হেঁচে ফেলবাে। অবস্থাবৈগুণ্যে নীলাম্বরের যখন আর দিন চলাচলের উপায় রহিল না তখন সে কিছুদিনের জন্য বিরাজকে তাহার মামার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়া ভাগ্যপরীক্ষার নিমিত্ত কলিকাতায় যাইতে চাহিয়াছিল—বিরাজ ন্যায়সঙ্গত কোন কারণ দেখাইয়া প্রতিবাদ করিতে পারিল না কিন্তু স্বামীকে ছাড়িয়া যাওয়ার বিরুদ্ধেও তাহার মন বাঁকিয়া দাড়াইল—অবশেষে “অসুখ কচ্চে” “বড় অসুখ কচ্চে” বলিয়া দুয়ারের গাড়ী ফিরাইয়া দিল। তাহার মনের ভাব গ্রন্থকার নিজেই বলিয়া দিয়াছেন, ‘ঘুম ভেঙে উঠে ওঁর মুখ না দেখে আমি একটা দিনও কাটাতে পারব না। উপরে যে দুইটি ঘটনার উল্লেখ করিলাম তাহা পাশ্চাত্য- দেশীয়দের চক্ষে হাস্যকর—তাহারা ইহার যুক্তিযুক্ত হৃদয়ঙ্গম পাঁচ-মিশেলি করিতে পারিবে না—ইহাকে নারীত্বের যুক্তিহীন লাঞ্ছনা কল্পনা করিয়া এতদেশীয় নারীজাতির প্রতি তাহারা কৃপাকটাক্ষ করিবে। বস্তুতঃ তাহাদেরও দোষ নাই। সতীত্বের এ আদর্শ ' ভারতবর্ষের জলহাওয়া ব্যতীত অন্যত্র বাঁচিয়া থাকিতে পারে না। ইহা ভারতবর্ষের নিজস্ব—যুগযুগান্তের ঐতিহ্য এই আদর্শকে পরিপুষ্ট করিয়াছে—তবে নারী স্বামীত্বের আইডিয়ার মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ- রূপে বিলুপ্ত করিয়া দিতে পারিয়াছে। আরও একটি কারণে এই বইখানিকে আমি খাটি প্রাচ্যদেশীয় বলিতে চাই—ইহার আখ্যানবস্তুর ভিতর দিয়া ভারতবর্ষীয় ভাগ্যবাদ (Fatalism) স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। বিরাজ স্বামীকে একদিন জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, আজ হাত ধরে বার করে দিলে কাল কোথায় দাঁড়াবে, সে কথা একবার ভাব কি ? নীলাম্বর উত্তর দিয়াছিল, ‘যিনি ভাববার তিনি ভাববেন, আমি ভেবে মিথ্যে দুঃখ পাইনে। থামিয়া বলিয়াছিল, তা ছাড়া ভাবতে থাকলেই কি কপালের লেখা মুছে যাবে ? কপালে হাত দিয়া দেখাইয়া বলিয়া- ছিল, চেয়ে দেখ, বিরাজ, এইখানে লেখা ছিল বলে অনেক রাজাকে মহারাজাকে গাছতলায় বাস করতে হয়েছে—আমি ত অতি তুচ্ছ। ইহাই ভারতবাসীর চরম ভাগ্যবাদীত্ব—তাহার সকল দুঃখের মুল, তাহার সকল দুঃখের কারণ। বুদ্ধিবৃত্তির দোহাই দিয়া মানুষ বিরাজ বৌ আবহমান কাল সুখদুঃখের কারণ খুঁজিতে চেষ্টা করিয়া আসিতেছে —কত দার্শনিক মতবাদ গডিয়া তুলিয়াছে, কত বিচার করিয়াছে —কত বিশ্লেষণ করিয়াছে কিন্তু সেই উত্তমং রহস্যং সেদিনও যেমন সুদূরে ছিল, আজও তেমনি সুদূরে আছে। মাত্র তিন চারিটি চরিত্র এই আখ্যায়িকার সম্পদ—কিন্তু ইহারাই তাহাদের জীবনের ধারা দিয়া বইখানিকে প্রােজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছে। নীলাম্বর আর বিরাজবৌ-এর চরিত্রের চারিপাশে ঘটনাপরম্পরা পাক খাইয়া ফিরিয়াছে—এই দুইটি চরিত্রের অন্ত- র্নিহিত সত্য বুঝিতে পারিলে বাকি অংশটা স্বচ্ছ হইয়া যায়। নীলাম্বর মড়া পােড়াইতে, কীর্তন গাহিতে, খােল বাজাইতে এবং গাঁজা খাইতে পারিত। তাহার উন্নত গৌরবর্ণ দেহে অসাধারণ শক্তি ছিল। সে যেমন গ্রামের মধ্যে পরােপকারী বলিয়া খ্যাতি পাইয়াছিল, গোঁয়ার বলিয়া তেমনি অখ্যাতিও লাভ করিয়াছিল। ইহা বােধ হয় অতিরিক্ত শক্তিরই অপরাধ—শক্তির আতিশষ্যকে সকলে সহ্য করিতে পারে না, গোঁয়ার্তুমির নাম দিয়া নিজেদের অক্ষমতাটুকু ঢাকিয়া লয়। এই বিংশ শতাব্দীতে নীলাম্বরের মত লােক আর জন্মগ্রহণ করিতেছে না—এ যুগে সকলেই কাজের লােক-নীলাম্বরের মত do-nothingsদের এ যুগে স্থান নাই। গ্রন্থকার বলিতেছেন, ‘নীলাম্বরের মা সাত বৎসর পূর্বে তিন বৎসরের শিশুকে বউ ব্যাটার হস্তে সমর্পণ করিয়া পাঁচমিশেলি স্বর্গারােহণ করেন। সেই দিন হইতে নীলাম্বর সমস্ত গ্রামের রােগীর সেবা করিয়াছে, মড়া পােড়ইয়াছে, কীৰ্ত্তন করিয়াছে, গাঁজা খাইয়াছে কিন্তু জননীর শেষ আদেশটুকু এক মুহূর্তের জন্যও অবহেলা করে নাই। নীলাম্বর যদি বিংশ শতাব্দীর আদর্শ কাজের লোেক হইত তবে ঠিক ইহার উল্টাটাই করিত অর্থাৎ রােগীর সেবা করিত , মড়া পােড়াইত না, কীৰ্ত্তন গাহিত না, গাঁজা খাইত না কিন্তু জননীর শেষ আদেশটুকু অবহেলা করিত। এই নীলাম্বর অতিরিক্ত সােজা ধরণের লােক ছিল। নিজের স্বভাবসিদ্ধ সরল বুদ্ধি দিয়াই জগৎটাকে বুঝিতে চাহিত। মা ছােট বােনটীর ভার তাহার মাথায় দিয়া গিয়াছিলেন—নগদ যাহা কিছু ছিল, বিরাজের গায়ের অলঙ্কার, দুইখানি বাগান বিক্রয় করিয়া এবং যদু মােড়লের দরুণ ডাঙ্গা বাঁধা দিয়া, এক কথায় অবস্থার অতিরিক্ত করিয়া ভাল ঘরে বােনটির বিবাহ দিল। নিজের কি করিয়া চলিবে এ কথাও যেমন একবার ভাবিল না, হরিমতি পীতাম্বরেরও বােন, তাহারও এ বিবাহে অর্থসাহায্য করা উচিত, একথাও তেমনি একবার মনে পড়িল না। অধিকন্তু জামাইএর মাসে মাসে পড়ার খরচ জোগাইবার প্রতিশ্রুতি দিয়া আসিল তাহার পর উপযুপরি দুই বৎসর অজন্ম হইল—ভদ্রাসন বাধা পড়িল—হালের গরু মরিল-পুকুর শুকাইয়া রৌদ্রে ফাটিতে লাগিল, তথাপি নীলাম্বর ধার করিয়া যতীনের পড়ার খরচ
বিরাজ বৌ
জোগাইতে লাগিল। বিরাজ বলিল, ‘পুটির শ্বশুর বড়লােক,
সে যদি নিজের ছেলেকে না পড়তে পারে আমরা পড়াব কেন?
যা’ হয়েছে তা হয়েছে, তুমি আর ধার করতে পারবে না।
নীলাম্বর শুষ্ক হাসি হাসিয়া বলিয়াছিল, সব বুঝি বিরাজ, কিন্তু
শালগ্রাম সুমুখে রেখে শপথ করেছি যে। তার কি হবে ?
একথারও উত্তর বুদ্ধিজীবিনী বিরাজ দিয়াছিল, ‘শালগ্রাম যদি
সত্যিকারের দেবতা হন তিনি আমার কষ্ট বুঝবেন, কিন্তু অদৃষ্টবাদী
সত্যনিষ্ঠ নীলাম্বরের তাহা কোন কাজেই লাগিল না। সে নিজেকে
ধ্বংস করিয়াই শপথের মর্যাদা রক্ষা করিতে লাগিল।
ক্রমশঃ হতভাগ্য নীলাম্বর জড়াইয়া বড় বিপন্ন হইয়া পড়িল।
অদৃষ্টের লেখায় তাহার অসীম বিশ্বাস ছিল—তাই মনে মনে
কাহাকেও দোষ দিল না—কাহারও নিন্দা করিল না। সে লেখাপড়া
শিখে নাই, কোন রকমের কাজকর্ম জানিত না—জানিত
শুধু
দুঃখীর সেবা করিতে, শিখিয়াছিল শুধু ভগবানের নাম করিতে।
তাহাতে পরের দুঃখ ঘুচিত বটে কিন্তু অসময়ে আজ নিজের
দুঃখ ঘুচিল না। এই বুদ্ধিভ্রংশের অবস্থায় সে নেশার ঝোঁকে
এক মারাত্মক ভুল করিয়া বসিল।
মা বাঁচিয়া থাকিতে একদিন তিনি শপথ দিয়াছিলেন বিরাজের
গায়ে কখন যেন সে হাত না তােলে। মাত্র একদিন এই শপথ
সে ভুলিয়াছিল—অমনি কোথা হইতে কি হইয়া গেল ! তিনদিন
পাচমিশেলি এক গঙ্গাযাত্রীর নাড়ি ধরিয়া সে ত্রিবেণীতে বসিয়াছিল—বিরাজ তখন ঘরে একাকী জ্বরে ভুগিতেছে—তবুও নীলাম্বর নিরুপায়ের অনুরােধ এড়াইয়া চলিয়া আসিতে পারে নাই। কিন্তু এই তিন দিন অবিরত গাঁজা খাওয়ার ফলে সে আর প্রকৃতিস্থ ছিল । বাড়ী ফিরিয়া অন্ধকার রাত্রে স্ত্রীকে ঘরে না পাইয়া বহুদিন-বিস্মৃত এক সন্দেহ অকস্মাৎ তাহার বুকের ভিতর মাথা নাড়া দিয়া উঠিল। বিরাজও চিরকাল অতিরিক্ত অভিমানিনী—সে তাহার অনুপস্থিতির কোন সদুত্তর দিতে চাহিল না। নীলাম্বর ডিবা ঘুড়িয়া মারিল—দেখিতে দেখিতে রক্তে মুখ ভাসিয়া গেল। বিরাজের আত্মসম্মানবােধ অত্যন্ত তীব্র ছিল। এই আঘাত last straw on the camel's back হইয়া দাড়াইল সে বলিল, “এই এক বছর যাই যাই কছি, কিন্তু তােমাকে ছেড়ে যেতে পারি নি। চেয়ে দেখ দেহে আমার কিছু নেই, চোখে ভাল দেখতে পাইনে, এক পা চলতে পারিনে—আমি যেতুম না; কিন্তু স্বামী হয়ে যে অপবাদ আমাকে দিলে, আর আমি তােমায় মুখ দেখাব না। তােমার পায়ের নীচে মরবার লােভ আমার সব চেয়ে বড় লােভ, সেই লােভটাই আমি কোনমতে ছাড়তে পারছিলুম না—আজ ছাড়লুম।” ইহা অপেক্ষা আর কোন করুণকাহিনীর করুণতর বর্ণনা পড়িয়াছি বলিয়া স্মরণ করিতে পারি না।
বিরাজ বৌ বিরাজ ত চলিয়া গেল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, নিরক্ষর মূর্খ গোঁয়ার নীলাম্বর তাহা লইয়া হৈ চৈ বাধাইয়া কুরুক্ষেত্র করিল । ইহার জন্য বিরাজকে মনে মনে এক বিন্দু দোষ দিল না। অত্যন্ত ব্যথার সহিত অন্তর্যামী ঠাকুরের পায়ে নিরন্তর প্রার্থনা জানাইতে লাগিল, সে যখন এতটুকু অপরাধ করে নি, তখন তার সমস্ত পাপ আমার মাথায় দিয়ে তাকে স্বর্গে যেতে দাও। এখানে সে অনেক দুঃখ পেয়ে গেছে, আর তাকে দুঃখ দিও না। যখন জানিতে পারিল বিরাজ মরে নাই, কুলত্যাগ করিয়াছে, তখনাে তাহাকে অপরাধী করিতে পারিল না। মনে মনে এই কথাই বলিতে লাগিল, সে যাহা করিয়াছে ক্রোধের বশে জ্ঞান হারাইয়াই করিয়াছে। ‘দেহে তখন তার প্রাণ ছিল না, ভাল করে জ্ঞান বুদ্ধি হবার পূর্বেই সেটা সে আমাকে দিয়ে দিয়েছিল। আর তাহার উপর আমি যে অত্যাচার, যে অপমান করিয়াছিলাম তাহা সহ্য করিতে বােধ হয় স্বয়ং নারায়ণও পারিতেন না—সে ত মানুষ। ইহাই আকাঙ্ক্ষাহীন ক্ষমার অপ্রমেয় মহিমা, ইহাই গভীরতম প্রেমের অনির্বচনীয় হীরক- দ্যুতি। কিন্তু পাশ্চাত্যদেশীয়েরা ইহাকে হয়ত নিস্পৌরুষ আখ্যায় অভিহিত করিবেন। তাই তারকেশ্বরের পথে যক্ষ্মারােগাক্রান্ত পরপারের যাত্রী মুমুর্ষ বিরাজের ভঙ্গুর দেহখানি যখন দৃষ্টিগােচর হইল তখন নীলাম্বর একবার দ্বিধা করিল না, ইতস্ততঃ করিল না, স্ত্রীর শীর্ণ দেহ ক্ষুদ্র ৬১ পাঁচমিশেলি শিশুটির মত বুকে তুলিয়া লইয়া বাসার দিকে চলিয়া গেল। মনে মনে এই কামনাই করিতে করিতে গেল যে, নিজের দোষে এ জন্মে তাকে পেয়েও হারালুম-ভগবান করুন যেন পরজন্মেও তাকে পাই। রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন যে যাহারা সাদা করিয়া বুঝিতে পারে তাহারাই মােটের উপর ঠিক বােঝে। নীলাম্বর এই রকম করিয়া বুঝিয়া ঠকিয়াছিল কিনা একমাত্র ভগবানই বলিতে পারেন কিন্তু দেশের আপামর সাধারণ যে মনে মনে তাহাকে ভালবাসিত, ভক্তি করিত, এ কথা নিঃসন্দেহ। তাই দাসী সুন্দরী পৰ্যন্ত তাহার নামে অপবাদের ইঙ্গিতটুকু সহ করিতে পারিল না। তাহার ভালবাসার লােককে বলিয়া বসিল, বরং তােমার মুখই মলে পুড়বে না, আমার দুঃখী মনিবকে দেখে ঐ মুখে হেসেছ। ঐ নীলাম্বরের মধ্যে প্রকৃত ব্রাহ্মণত্বের তেজ বিদ্যমান ছিল, তাই সুন্দরী বলিয়াছিল, বামুন বলি ওঁকে। এত দুঃখেও মুখে হাসিটি যেন লেগে রয়েছে, তবু চোখ তুলে চাইতে ভরসা হয় না, যেন আগুন জ্বলচে। শিল্পীর কথার এক একটী আঁচড়ে নীলাম্বরের চরিত্র যেন পদ্মের পাপড়ির ন্যায় দল খুলিয়া খুলিয়া বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে। তাহার পর বিরাজবৌ। কীৰ্ত্তন গানে একটা পদ শুনিয়াছিলাম, ‘প্রতি অঙ্গ মাের কানুক্ষুধাতুর’-বিরাজের স্বামীপ্রেম ঐ ধরণের। ইহার উদাহরণ পূর্বেই উদ্ধত করিয়াছি—পুনরুল্লেখ নিস্প্রয়ােজন।
বিরাজ বৌ বিরাজের প্রেমের সব চেয়ে বড় কথা, তােমাকে পেয়ে তবে তােমাকে পেয়েছি। নিজের গায়ে হাত দিয়েও কি টের পাও না যে আমিও ঐ সঙ্গে মিশে আছি ? এই বিরাজের সতীত্বের বড় অহঙ্কার ছিল। একদিন লীলাচ্ছলে বলিয়াছিল, ‘অসতী মেয়েমানুষ কখন চোখে দেখিনি—আমার বড় দেখতে সাধ হয় তারা কি রকম। আরও বলিয়াছিল যে সতীত্বে সাবিত্রীই হউন বা আর যেই হউন, কাহারও চেয়ে সে এক তিল কম নয়। বিধাতা তাহার এ দর্প সহ্য করেন নাই। তাই তাহাকে অসতীর কলঙ্ককালিমায় লাঞ্ছিত হইতে হইল। কিন্তু এত বড় দর্পিত সতীকেও কি কারণে বিভ্রান্ত হইয়া বিপথে পা বাড়াইতে হইল তাহা বুঝিতে হইলে বিরাজের সেই সময়কার মনস্তত্ব অনুধাবন করা 'আবশ্যক। তিন দিন জ্বরভােগের পর বিরাজ তখন ক্ষুধায় আকুল। জন- প্রাণীশূন্য অন্ধকার ঘরের মধ্যে জ্বরে দুশ্চিন্তায় অনাহারে মৃতকল্লা স্ত্রীকে একলা ফেলিয়া রাখিয়া নীলাম্বর পবােপকারে নিযুক্ত ছিল, কিন্তু ঘরে আসিয়া অভুক্ত থাকিবে স্মরণ করিরা বিরাজ জ্বরে কঁপিতে কপিতে চড়ালের বাড়ী চাল ভিক্ষা করিতে গিয়াছিল। ফিরিয়া আসিলে সদ্যগৃহপ্রত্যাগত গঞ্জিকা-রক্তচক্ষু স্বামী অনুপস্থিতির কৈফিয়ৎ তলব করিলেন। তর্ক বিতর্কের ফলে স্বামী তাহাকে মারিয়া বসিলেন—তখন তাহার জ্বর বিকারে দাঁড়াইয়াছে। সেই
পাঁচমিশেলি
বিকারের ঝোঁকে কেবল মনে হইতে লাগিল, স্বামী বলিয়াছেন--
তাহার হাতের ছোঁয়া জল খাইবেন না। এই চিন্তার পাশাপাশি কে
তাহার ছোঁয়া জল খাইলে ধন্য হইয়া যাইবে তাহার কথাও
মনে পড়িল। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ। তাহার পরের সমস্ত
ঘটনা ছায়াচিত্রের মত তাহার Subconscious mindএর সামনে
অভিনীত হইয়া গেল—তাহাতে সে যেন কোন Party নয়। যে
মুহূর্তে এই বিকারের ঝোক কাটিল সেই মুহূর্তেই অতল জলে ঝাঁপ
দিল। কোথায় ঝাঁপ দিতেছি, এখানে কত জল, মরিব কি বাঁচিব
এ চিন্তা একবারও মনের মধ্যে উদয় হইল না।
এই বিরাজ অসামান্য সুন্দরী ছিল, কিন্তু তবু সে তাহার রূপকে
কোনদিন বড় করিয়া দেখে নাই। বলিয়াছিল, “রূপ রূপ, রূপ।
শুনে শুনে আমার কান ভোঁতা হয়ে গেল। ** এইটেই কি আমার
সব চেয়ে বড় বস্তু ?” রূপটাই যে বিরাজের বড় বস্তু নয় গ্রন্থকার
তাহা প্রমাণ করিয়াছেন।
তাহার পর ছােট বৌ এর কথা।
মধুর
চরিত্র
কদাচিৎ চোখে পড়ে। একদিনের যে মার বিরাজ সহ করিতে
পারিল না সেই মার প্রত্যহ তাহার ভাগ্যে জুটিত। কোনদিন
তজ্জন্ত সে তাহার স্বামীকে দোষ দেয় নাই। বরঞ্চ যেদিন বিরাজ
এই মারের কথা জানিতে পারিয়াছিল সেদিন পাছে সে কোনরূপ
শাপিসম্পাত করে এই ভয়ে স্বামীর হইয়া সে ক্ষমা চাহিতে
৯-
এমন একটি
৬৪
বিরাজ বৌ আসিয়াছিল। বলিয়াছিল, যে দেবতা ওঁর দেহে অমন রাগ দিয়েছেন তিনিই মাপ করবেন। এই স্বল্পভাষিণী ক্ষুদ্রকায় ছােটজা বিরাজকে প্রাণতুল্য ভাল- বাসিত এবং ভক্তি করিত। গ্রন্থকার একটী একটি লাইনে তাহার চরিত্রের চাবি উদঘাটিত করিয়া ধরিয়াছেন, চোখ রাঙাইলে সে গলা জড়াইয়া ধরে, শক্ত কথা বলিলে পা জড়াইয়া ধরে। ছােট বৌ এর স্বভাবে বিনয় বস্তুটি আশ্চর্য রকমের পরিণতি লাভ করিয়াছিল। বিরাজের সঙ্গে সে নিজেকে কোন দিন তুলনা পর্যন্ত করিতে পারিত না। বলিয়াছিল, কোনদিন তােমার সঙ্গে আমি বেশী কথা কই নি–কথা কইবার যোগ্য ও আমি নই। কিন্তু প্রত্যেকটা বিপদের পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে তাহার সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়াছে এবং সে তাহার যথাসাধ্য করিয়াছে—ফল হয়ত সব ক্ষেত্রে হয় নাই। কিন্তু এই যে কোমল প্রকৃতির মাটীর মানুষ, কৰ্তব্যক্ষেত্রে এও ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হইয়া উঠিয়াছে। বিরাজকে একদিন কথা দিয়াছিল, দুই ভাইয়ে মিল করিয়া দিবে। বাপের বাড়ী হইতে ফিরিয়া যেই শুনিল, দিদি নাই অমনি নিজের কর্তব্য স্থির করিয়া লইল। ভাসুরের ভার সে নিজের স্কন্ধে গ্রহণ করিল। পীতাম্বর কহিয়াছিল, ‘দাদার সঙ্গে কথা কও শুলে লােকে নিলে করবে যে। উত্তরে স্বল্পভাষিণী বলিয়াছিল, লােকে আর কি পারে যে করবে ? তাদের কাজ তারা করুক, আমার কাজ আমি করি। ৫ পাঁচমিশেলি এ যাত্রা ওঁকে যদি বাঁচিয়ে তুলতে পারি লােকের নিন্দা আমি মাথায় পেতে নেব।” বিরাজের উপর তাহার বিশ্বাস ছিল অচলা—এই বিশ্বাস তাহার নারায়ণ। ইহারই জোরে বিরাজ সম্বন্ধে তাহার মনে কোনরূপ ধাঁধার জড়িমা ছিল না। তাই যখন সকলেই বাড়ী ছাড়িয়া যাইতে প্রস্তুত হইল ছােট বৌ যাইতে চাহিল না। মৃদুকণ্ঠে বলিল, ‘কখনও দিদি যদি আসেন—তাই আমি কোথাও যেতে পারবাে , বাবা। *** স্বামীর পায়ে মাথা রেখে মরার বর দিদি আপনার কাছে চেয়ে নিয়েছিলেন, সে বর কোন মতেই নিস্ফল হতে পারে না। সতী লক্ষ্মী দিদি আমার নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন যতদিন বাঁচব, এই আশায় পথ চেয়ে থাক্বআমাকে কোথাও যেতে বলবেন না, বাবা। এইখানে ছােট বৌ ভালবাসায় নীলাম্বরকেও অতিক্রম করিয়া গেল। আজকাল আমরা সকল সৃষ্টির মধ্যেই moral খুঁজিয়া বেড়াই। শরৎচন্দ্রের অবদান এদিক দিয়াও সামান্য নহে। মাতৃপিতৃহীনা ছােট বােন পুঁটির উপর নীলাম্বরের যে স্নেহ বর্ষার অফুরন্ত ধারার ন্যায় বর্ষিত হইয়াছে, নিঃসন্তান বিরাজবৌ নিজের বুকের সমস্ত মাতৃস্নেহ দিয়া যেরূপ সন্তর্পণে তাহাকে মানুষ করিয়াছিল, এই সমস্ত উপাখ্যান যদি আমাদের দুঃখ-দৈন্ত-পীড়িত পারিবারিক জীবনকে মধুর করিয়া তুলিতে না পারে তবে যে আর কিসে বিরাজ বৌ - পারিবে তাহা আমার জানা নাই। পরিশেষে ছােট ভাই পীতাম্বর যখন সর্পদষ্ট হইয়া নীলাম্বরের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়াছিল, আমার কোন ঔষধপত্র চাই না, দাদা, শুধু তােমার পায়ের ধুলাে আমার মাথায় মুখে দাও, এতে যদি না বাঁচি ত আর বাঁচতেও চাইনে, সেইদিন নীলাম্বর তাহার শেষ কান্না কাঁদিয়া চুপ করিয়াছিল। এই ভ্রাতৃস্নেহ-পূত অশ্রু যদি আমাদেরও চক্ষু হইতে অশ্রু ঝরাইতে সমর্থ না হয় তবে আর কিসে পারিবে ? শরৎচন্দ্রের গল্প বা উপন্যাস যে সকলকে মুগ্ধ করে না তাহার কারণ আমার মনে হয় এই যে তাঁহার লেখার আবেদন পাঠকের বুদ্ধি- বৃত্তির (intellect) কাছে নয়, তাহার রসবােধের কাছে। যাহারা অতিমাত্রায় intellectual, তাঁহাদের খােরকি হয়ত যথেষ্ট পরিমাণে শরৎ-সাহিত্যে মিলে না, কিন্তু যাহারা জীবনে দুঃখের এবং নিরাশার অগ্নিশিখায় জ্বলিয়া পুড়িয়া সােনা হইয়াছেন তাহার। এই সাহিত্যে এমন এক রসস্রোতের সন্ধান পাইবেন যাহা সত্য সত্যই অভিনব এবং অমূল্য। শরৎচন্দ্রের ভাষার এবং ভাবের সংযম অসামান্য একথা সকলেই জানেন। এখানে তঁাহার একটা লাইন উদ্ধত করিতেছি –সুতীক্ষ্ণ বাজের আলাে এক মুহূর্তে যেমন করিয়া অন্ধকার চিরিয়া ফেলে, আজ ছোট বৌ তেমনি করিয়া তাহার বুকের অন্তস্তল পৰ্য্যন্ত যেন চিরিয়া দিয়া গেল। সহজ, সরল, 'অনাড়ম্বর এই অভিব্যক্তি,
পাঁচমিশেলি
এতটুকু আতিশয্য ইহাতে নাই। এই সংযম বা সংহত শক্তি
ব্যতীত সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি অসম্ভব। ইহাকেই ম্যাথু আর্নল্ড austerity
বলিয়াছেন।
শরৎচন্দ্রকে যদি কেহ দুষ্কৃতি-প্রচারক বলিয়া মনে করেন তবে
তিনি ভুল করিবেন। অপর পক্ষে আমার মনে হয়, শরৎচন্দ্র
খুব বড় taskmaster. বিরাজ বৌ-এর ঐ পদঙ্খলনের জন্য তিনি
তাহাকে বড় কম সাজা দেন নাই। তাহার বা চোখ অন্ধ এবং
বা হাত পড়িয়া গিয়াছিল—সুন্দর মুখ ক্ষত বিক্ষত হইয়া গিয়াছিল।
দীর্ঘকাল দুরারােগ্য ব্যাধিতে কষ্ট পাইয়া যদি বা নীলাম্বরের সাক্ষাৎ
মিলিল ত সে কেবল তাহার পায়ের তলায় মরিবার জন্যই—তখন
আর বড় বাকি নাই। এই রকম করিয়া হতভাগীর এ জন্মের
সব সাধ ফুরাইল—দাবী রহিল কেবল জীবনের পরপারে সঁড়াইয়া
স্বামীর জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিবার। এই বিষয়ে শরৎচন্দ্র
Victor Hugoর সহিত তুলনীয়। তিনিও Jean Valjeanএর
এক টুকরা রুটি-চুরি ক্ষমা করিতে পারেন নাই—Esmeralda-র
মায়ের পতিত জীবন ক্ষমা করিতে পারেন নাই, যদিও সে
বেচারী দীর্ঘ পঞ্চদশ বৎসর অনুতাপ করিয়া কাটাইয়াছিল।
শরৎচন্দ্রের ‘বিরাজবৌ গল্পেপন্যাস পাঠ করিবার পর এবং
আমার এত কথা বলিবার পরও যদি কাহারাে মনে সন্দেহ
বিদ্যমান থাকে যে বিরাজবৌ সতী কিনা, তবে তাহাকে একটা
বিরাজ বৌ
কথা মনে রাখিতে অনুরােধ করি। হিন্দু বিবাহ এক জন্মের
নহে—তাহা যুগ-যুগান্তরের, জন্ম-জন্মান্তরের। বিরাজ বৌএর বিচার
দুটো দিনের ব্যবহারের উপর করা চলে না। তাহার বিচার
কল্পান্তের কালমেখলার তরফ হইতে, ভগবানের বুকের নিকষমণির
তরফ হইতে।
৬৯
চরিত্রহীন 1 ‘লে মিজাৱাবল’ ইংরাজিতে তর্জমা করলে যেমন হয় ‘The Miserables' অর্থাৎ কিনা ‘হতভাগ্যেরা, শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন মানেও তেমনি ‘চরিত্রহীনেরা। বিড়ম্বিত এই দুই দলের ভাগ্যের মধ্যে যেন একটা সূক্ষ্ম মিল আছে বলে মনে হয়। শরৎবাবুর উপন্যাসখানির নাম যদিচ চরিত্রহীন, কিন্তু তাদের আসলে কেউ চরিত্রহীন নয়, বইখানির এইটুকুই হচ্ছে মজা। সতীশ আর সাবিত্রী, দিবাকর আর কিরণময়ী, কেউই চরিত্রহীন নয়। সতীশ সাবিত্রীকে নষ্ট করতে পারে নি, দিবাকরও কিরণময়ীকে নষ্ট করতে পারে নি। অথচ সমাজের বিচারে তারা ত চরিত্রহীন বটেই, হয়ত আরাে কিছু বেশী। কেননা সতীশ লুকিয়ে মদ খেত, আর বাসার একটা ঝিকে ভালবেসেছিল। কিরণময়ী তার পাতান দেওরকে ভুলিয়ে নিয়ে আরাকানে পালিয়েছিল। সমাজ এইটুকু শুনেই কানে আঙ্গুল দেবেন কিন্তু যারা উপন্যাসখানি শেষ পর্যন্ত পড়েছেন তাঁরা জানেন যে প্রকৃত অপরাধ বলতে যা বােঝায় তা এদের কেউই করেন নি। উপন্যাসখানিতে দুটি ভালবাসার প্রসঙ্গ দেখান হয়েছে আমাদের ৭০ চরিত্রহীন সামাজিক বুদ্ধিতে যা নিন্দনীয়—এক সতীশের সাবিত্রীকে ভালবাসা, আর কিরণময়ীর উপেন্দ্রকে ভালবাসা। (অথচ সকলের উপরের কথা হচ্ছে এই যে কোন ভালবাসাই গর্হিত নয়, যেহেতু ভালবাসা একটা কাজ নয় ; ও হচ্চে মনের একটা বিশেষ শক্তি। কোন্ ক্ষেত্রে কাকে অবলম্বন করে এই শক্তি বিকাশ লাভ করবে তা বলবার যাে নেই। কোন ভালবাসাই যে কারুর সমর্থনের অপেক্ষায় বসে থাকে না একথাও সহজে বােধগম্য। ও পাওনা কখন যে শুরু হয় যে পায় সেও জাতে পারে না। তারপর যখন একদিন জাতে পারে তখন তার হৃদয়ের দুকূল বয়ে প্লাবন সুরু হয়, আর সমস্ত জীবন ভরে তারই সুখ এবং দুঃখের লীলা চলে। সুরবালা একদিন বিয়ে সম্বন্ধে উপেন্দ্রকে একটা কথা বলেছিল—বলেছিল, আমি যে-ঘরেই জন্মাই না কেন আমাকে নিতে তােমাকে আসতেই হত অর্থাৎ যে যার পত্নী হবে, সে আগে থাকতেই ঠিক হয়ে আছে। সামাজিকের কানে এর চেয়ে শ্রুতিমধুর কথা বােধ হয় আর কিছু নেই। কিন্তু ভালবাসা সম্বন্ধেও কি একথা সত্য নয় ? সতীশ যে সাবিত্রীকে ভালবাসবে, এও আগে থাকৃতে ঠিক হয়ে আছে—কেউ কি ইচ্ছা করলেই কাউকে ভালবাসতে পারে? বিয়ে আর ভালবাসা এ দুয়ের মধ্যে তফাৎ ত কেবল সামাজিক স্বীকৃতির (Sanction-এর নয়ত দুই-এর মধ্যে বস্তু একেবারেই এক। ৭১ পাঁচমিশেলি এই দুই ভালবাসার পাশাপাশি আমাদের সমাজে স্বীকৃত এক ভালবাসার চরম রূপ দেখান হয়েছে--সে হচ্চে উপেন্দ্র আর সুরবালার ভালবাসা। এ ভালবাসার মােহনরূপ অস্বীকার করবার যাে নেই কিন্তু এই সম্পর্কে সমাজকে আরাে একটা কথা মনে রাখতে অনুবােধ করি। মানুষ যে স্ত্রী পুরুষ অভেদে অবস্থার দাস একথা বােধ হয় অস্বীকার করা চলে না। ভাগ্যিস্ উপেন্দ্রের সঙ্গে সুরবালার বিয়ে হয়েছিল তাই তাদের প্রেম এমন মাধুর্যে মণ্ডিত হবার সুযােগ পেয়েছিল। উপেন্দ্রের সঙ্গে সুরবালার বিয়ে না হয়ে যদি কিরণময়ীর বিয়ে হত তাহলেও যে সে-প্রেম এই রকম সার্থক হয়ে উঠত, একথা হলফ করে বলা যায়। অপর পক্ষে সুরবালার সঙ্গে যদি হারাণের পরিণয় ঘটত, তবে তাদের সে-সম্বন্ধ যে গুরুশিষ্যার সম্বন্ধকে অতিক্রম করে যেতে পারত একথা জোর করে বলা শক্ত। কেননা সব প্রেমেরই সার্থকতা পরস্পরের understanding এর উপর নির্ভর করে কোন পক্ষে থেকে তার অভাব হলেই আর পূর্ণ পরিণতি ঘটে না। এই কারণেই এ-বস্তু এত দুর্লভ—আর এই কারণেই এর অমৰ্য্যাদা করতে নেই। উপীন-সুরবালার প্রেমকে আদৌ ছােট করে দেখচি নে—কেবলমাত্র এই কথা বলতে চাইচি, যে এ একটি বিশেষ ঘটনার সমাবেশের ফল অর্থাৎ এই প্রেম নিয়ে যেমন উল্লাসে লম্ফ দেওয়ারও প্রয়ােজন নেই, কিরণময়ী-উপীনের প্রেম নিয়ে তেমনি বিষাদে আত্মহত্যা করবারও আবশ্যকতা নেই। r ৭২ চরিত্রহীন উপীন আর সতীশের চরিত্র একটু অলােচনা করে দেখা যাক। উপীনের ছিল বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্য, আর অকলঙ্ক চরিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলি পরীক্ষা তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছিলেন। আর চরিত্রে তার কেউ কোন দিন নিন্দার বাষ্পটুকুও আরােপ করতে পারে নি। ইনি হচ্ছেন আমাদের সামাজিক আদর্শের চূড়ান্ত—যদি এখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধির উপর সুধীজন বিরূপ হয়েছেন। এই উপীনের চারিত্রিক শুভ্রতা এত সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে হত যে কালিমার ঘেসটুকুও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। প্রমাণ যেদিন তিনি সস্ত্রীক সতীশের বাসার দরজায় এসে দাড়ালেন, পলকমাত্র সাবিত্রীকে দেখেই তিনি ফিরে চল্লেন-এ কে, কেন এখানে এসেছে, এখানেই থাকে কিনা প্রভৃতি প্রশ্ন একবারও সতীশকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়ােজন বােধ করলেন না। অথচ সতীশকে তিনি হাতে গড়ে মানুষ করেছেন, তাকে তিনি ভাল করেই চেনেন বলে তার গর্বের অন্ত ছিল না। এ ভুলের জন্য তিনি পরে সতীশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সাবিত্রীকে নিজের বােন বলে প্রচার করে ক্ষতিপূরণও করেছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর অত্যুচ্চ চরিত্র-গৌরব বাধাস্বরূপই হয়েছিল। দ্বিতীয় প্রমাণ, দিবাকর কলেজ খােলা সত্ত্বেও কলেজে ভৰ্ত্তি হয় নি, কিরণময়ীও তাকে সজাগ করে দেয় নি, শ্বাশুড়ী অঘােরময়ী উভয়ের সম্বন্ধকে ভাল চোখে দেখেন না, এই সব থেকে তিনি ধরে নিলেন যে কিরণময়ী-দিবাকরের সম্বন্ধটা অত্যন্ত মন্দ ৭৩ পাঁচমিশেলি দাড়িয়েছে। কিরণময়ীর দেওয়া খাবার খেলেন না, সে যখন পা জড়িয়ে ধরলে তখন গালিগালাজ করে তাকে পা দিয়ে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবােধ করলেন না—এ সব কি ঐ অভ্রভেদী চরিত্ৰগৌরবেরই দম্ভ নয়? এত অসহিষ্ণুতা কেন ? অথচ আমাদের সমাজের যত যশঃ সবই এই উপীনের প্রাপ্য। কিন্তু আমার মনে হয় উপীনের এত ভালত্ব নিয়ে সংসার চলে না। তাই যখন সুরবালা চলে গেল, দিবাকর-কিরণময়ী কঠিন আঘাত করে অজ্ঞাতবাস করলে, এক কুৎসিৎ সন্দেহের ফলে সতীশকে ত্যাগ করতে হ’ল, তখনই আমরা প্রকৃত বড় উপীনকে পেলুম। এ আর সে দাম্ভিক অসহিষ্ণু উপীন নয়—এ উপীন হচ্চে ক্ষমাশীল করুণাদ্রব-হৃদয়। উপীনের অতি- ভালত্বের সঙ্গে সংসার খানিকটা খাদ মিশিয়ে তাকে ব্যবহারিক জগতের উপযােগী করে নিলে। সতীশ অনেক কষ্টেও একটা পাশ করতে পারেনি ডাক্তারী পরীক্ষাটাও শেষ করতে পারলে না। লুকিয়ে মদও খেয়েচে, গানের আসরও তাদের অস্থানে হয়েছে। কিন্তু এর গায়ে শক্তি ছিল অসাধারণ, গান গাইতে, বাঁশী বাজাতে এর জুড়ি ছিল না, যাত্রার ষ্টেজ বাঁধতে, মড়া পােড়াতে সে ছিল অগ্রণী। পরের দুঃখে তার হৃদয় যে কত কত তার আর লেখাজোখা ছিল না-বেহারীর কথায় তার বহু প্রমাণ আছে। টাকাকে টাকা বলে কোন দিন সে গ্রাহ্য করে নি—অমন উদার ভাবে ব্যয় করতে ক’টা লােককে দেখা ৭৪ চরিত্রহীন যায় ? সাবিত্রীকে সে ভালবেসেছিল কিন্তু কোন দিন কোন ছলে, কোন সুবিধার পরিবর্তেই তাকে অস্বীকার করে নি—এমন কি সরােজিনী-জ্যোতিষের সামনে কৈফিয়ৎ দেবার দিনও নয়। তার মনের কথা আর মুখের কথা কোন দিন আলাদা হয় নি। উপীন যে কালিমার ছোঁয়াচটুকু পর্যন্ত সহ্য করতে পারেন নি, সতীশ তারই মধ্যে ডুবে রত্ন আহরণ করেছিল। সাবিত্রী যে গৃহস্থের কুলবধু নয়, সে যে সামান্য দাসী মাত্র, একথা সতীশ বুঝত না তা নয়, কিন্তু তার প্রেমে সে তাকে মহীয়সী করে দেখেছিল। তাই সরােজিনীকে লাভ করার বদলেও সে সাবিত্রীকে ত্যাগ করতে চায় নি। আরাকানে যেদিন সে মুচ্ছিতা কিরণময়ীর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হল, সে দিন সে ঘরের কুশ্রীতা, অন্ত্যজ বাড়ীউলী, চারিদিকের বিভীষিকাময় দারিদ্র—কিছুই তার মনের প্রসন্নতাকে খর্ব করতে পারে নি, চিরদিনের মত সহজ কণ্ঠে ‘বৌঠান’ বলে ডেকে দাড়িয়েছিল। দিবাকরকে তিরস্কার করার কথাও তার মনে হয় নি, বরং দিবাকর ফিরে আসূতে চায় না শুনে নিজে তার চেয়েও বেশী অত্যাচার করেছে, এই কথা বলে দিবাকরের অপরাধকে তুচ্ছ করে দিয়েছিল। মনের এই আশ্চৰ্য্য উদারতা, এই পরম পবিত্র প্রসন্নতা কম শক্তির পরিচায়ক নয়! এত শক্তি ছিল বলেই সে কুলভ্রষ্টা সাবিত্রীকে ভালবাতে পেরেছিল—কম শক্তিমান হলে পারত না। কিরণময়ীর দেওয়া উদাহরণ এইখানে মনে পড়ে। কৃষ্ণকান্তের ৭৫ পাঁচমিশেলি উইলের প্রসঙ্গে কিরণময়ী বলেছিল যে, গােবিন্দলাল মানুষ হিসাবে হরলালের চেয়ে কোন অংশেই ঘােট ছিল না কিন্তু সাংসারিক ভাল মল, নিন্দা প্রশংসার কথা খতিয়ে হরলাল রােহিণীকে নিতে চায় নি, গােবিন্দলাল তাকে মাথায় করে নিয়েছিল। এত কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে অপাত্রে ভালবাসা ন্যস্ত হয়েচে শুনলেই আমাদের সামাজিকেরা যেমন চমকে উঠেন, বাস্তবিকই ব্যাপারটা তত সােজা নয়। বহুদর্শিতার ফলে দেখা গেছে যে এ সব বিষয়ে অনেক কথা ভেবে দেখবার আছে। প্রশ্ন উঠবে, যে প্রত্যেকে এ বিষয়ে মত চালাতে গেলে সমাজ টেকে না। এর উত্তরে কিরণময়ী বলেছিল, এ-রকম প্রত্যেক বিষয়ে সমাজ যদি তার মত চালাতে চায় তাহলেও মানুষ টেকে না। কথাটা খুব সত্যি। বুঝি আমাদের সমাজ ভেঙ্গে গেল, এই ভয়ে আমরা সর্বদা আড়ষ্ট হয়ে আছি। মানুষ টেকে কি না, এ-কথাটা কোন দিনও ভেবে দেখলুম না। কিন্তু আজ সে কথা ভেবে দেখবার দিন এসেছে। আজ মানব-মনের সামনে এই প্রশ্ন জেগেচে যে সতীশ বড় কি উপীন বড়, ভালবাসতে পারার ক্ষমতা বড়, কি ভালবাসার উপর পদাঘাত করার ক্ষমতা বড় ? কিরণময়ীর চরিত্র এক পরমাশ্চর্য সৃষ্টি—এরকম স্ত্রীলােকের সাক্ষাৎ না পেলে, কিম্বা নিজের মধ্যে কিরণময়ীত্বের অনুভূতি না জাগলে ও-চরিত্র বােঝাই যায় না, বিচার করা ত দূরের কথা। ৭৬ চরিত্রহীন খুব ঝোকের ওপর কাজ করা যে তার অভ্যাস ছিল এটা বােঝ শক্ত নয়। প্রথম রাত্রে বাড়ী-ঘর-দোর উপীন সব লিখে নেবেন কল্পনা করে সে কি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল, শিষ্টাচার না মেনে কি রকম কলহে প্রবৃত্ত হয়েছিল, সকলেরই মনে পড়বে। রূপ এবং বুদ্ধি বিধাতা তাকে পুরােপুরিই দিয়েছিলেন, আর সেই সঙ্গে দিয়েছিলেন অদম্য জিগীষা । পূৰ্বেই বলেছি মানুষ অবস্থার দাস। এ হেন রূপগুণসম্পন্ন নারীর বিয়ে হ’ল যার সঙ্গে তিনি ভালবাসার কোন ধার ধারতেন না। তিনি নিজে ছিলেন নাস্তিক, স্ত্রীকেও নিরীশ্বরবাদিনী করে তুললেন। কিরণময়ী মামার বাড়ীতে মানুষ, সেখানে স্নেহের মুখ দেখেনি। শ্বশুর বাড়ীতে স্বামী পড়িয়ে খুসী হতেন, শ্বাশুড়ী নির্যাতন করে খুসী হতেন। ফলে তার প্রকৃতিতে নারীর কোমল বৃত্তিগুলি কোন দিনই বিকশিত হয়ে ওঠবার অবকাশ পেলে না, অপর পক্ষে বুদ্ধির প্রাখৰ্য বেড়ে উঠল। সুরবালার এবং উপীনের দাম্পত্য-প্রেমের কাহিনী শুনে সে স্বামীকে ভালবাসতে চেয়েছিল কিন্তু তখন too late তার স্বামী-সেবাও ছলনা নয়, আবার উপীনকে ভালবাসাও মিথ্যা নয়। কিন্তু সে ছিল অত্যন্ত দর্পিতা রমণী—উপেন্দ্রের নিষ্ঠুর অপমান, নিঃসঙ্কোচ পদাঘাত তাকে একেবারে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য করেছিল। সেই তীব্র অপমানে যে প্রতিহিংসাবৃত্তি জেগে উঠেছিল তার প্রভাবে নিজের কোন দুর্গতিই তখন আর তার অকরণীয় ছিল । উপেরে নিষ্কলঙ্ক শুভ্রতাকে রাহুগ্রস্ত করাই তখন ছিল ৭৭ পাঁচমিশেলি তার লক্ষ্য। উপেন্দ্র বলেছিলেন, ভালবালে কি কেউ এতটুকু ব্যথা দিতে পারে? সে হাতুড়েই বেড়িয়েছে, কোন দিনই কিছু পায় নি। এ-ও সত্য। এইখানেই কিরণময়ীর চরিত্রের ট্রাজিডি। সে বারে বারে পথভ্রান্ত হয়েছে। কিন্তু ভালবাসার শক্তি তার কোন রমণীর চেয়েই কম ছিল না। জ্বলন্ত বিশ্বাসের একটি চিত্র সুরবালা। তার বিশ্বাস এবং সরলতা তাকে অজেয় করেছিল। প্রখরবুদ্ধিশালিনী কিরণময়ীও একদিন সেই বিশ্বাসের পায়ে আত্মসমর্পণ করে ধন্য হয়েছিল। কেননা বিশ্বাসের এমন একটি স্তর আছে যেখানে সে সমস্ত বুদ্ধিকে অতিক্রম করে যায়। সুরবালা কোমলতারও প্রতিমূর্তি। সাবিত্রীর নাম তার পক্ষে অত্যুক্তি নয়। ভালবাসলে যে কি রকম অত্যাশ্চর্য স্বার্থত্যাগ করা যায় সাবিত্রীই তার প্রমাণ। সতীশের পরম হিতই সে চিরদিন আকাঙ্খ করেচে-সতীশকে রক্ষা করার জন্যে, তার ঘৃণা, উপেক্ষা লাভ করার জন্যে সে মিথ্যানিলা, অপযশ বরণ করে নিয়েছিল কিন্তু তবু সফল হয় নি। সতীশের স্নেহের আগুনে সব পুড়ে গিয়েছিল। এই রকমই হয়। তাই এদের প্রেমের কাহিনী মনকে এত স্নিগ্ধ করে। সাবিত্রীর ত্যাগ এবং ধৈৰ্য্য অতি বড় শিক্ষিতাভিমানী রমণীকেও লজ্জা দিয়েছে। সুতরাং তার প্রেমকে আর ছােট করে দেখার উপায় নেই। উপেন্দ্র তাকে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন তিনি আর তার বােন সাবিত্রী ৭৮ চরিত্রহীন কোন দিন জগতে ছােট কাজ করেন নি—সে একেবারেই অতিরঞ্জন 'আমার মনে হয় শরৎবাবুর চরিত্রহীন বােঝবার মত মনের অবস্থা এখনাে আমাদের অনেকেরই হয় নি। সর্ববিধ সংস্কার থেকে মনকে মুক্ত করতে না পারলে এ উপন্যাসের রসােপলব্ধি হয় না। শরৎবাবু বলেছেন যে, মানুষের ত্রুটি, বিচ্যুতিই তার একমাত্র নয়—তার মানবতা এ সকলের চেয়ে বড়। তিনি আরাে বলেছেন যে কোন স্ত্রীলােককেই তিনি অসতী বলে মনে করতে পারেন না—তারা যেন একটা মুখােস পরে আছে মাত্র—ইচ্ছা করলে যে কোন মুহূর্তে এই মুখখাস খুলে ফেলতে পারে। এই সব কথাগুলি মাঝে মাঝে অনেক প্রবন্ধে উদ্ধৃত করা হয় দেখতে পাই কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবনের উপর এদের কোন effect নেই তার প্রমাণ পেয়েছি। এর কারণ theoretically ভাল লাগা এক, আর এই sentimentকে উপাদান করে জীবন গঠিত করে ভােলা আর। তাই অতি সহজে এ সব কথাগুলি মুখস্থ হলেও ধাতস্থ হয় না। এখনাে আমাদের সমাজে কেবলমাত্র বিবাহেরই ধ্বজা সু-উচ্চে উচ্ছিত বিবাহের পবিত্রতার সংস্কার আমাদের মনকে আঁকড়ে বসে আছে। প্রতি বিবাহেই প্রেমের আদান-প্রদান হয় এটা মেনে নেওয়া হচ্চে। অপর পক্ষে বিবাহের দ্বারা সুপবিত্র নয়, এমন সব ভালবাসাই দণ্ডনীয়—এটাও স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৭৯ পাঁচমিশেলি খুজে দেখতে গেলে হয়ত শতকরা নিরনব্বইটি ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যাবে যে, বিবাহিত জীবনে মমতাকে ভালবাসা বলে ভুল করা হচ্ছে। এই সব ছােট এবং বড় সংস্কার মন থেকে অন্তর্হিত হলে ‘চরিত্রহীনের বিচার সম্ভব নয়। সাবিত্রী সতীশের মত ভালবাসা এতকাল আমাদের সমাজে ঘটে থাকলেও তাই নিয়ে উপন্যাস রচিত হয়নি—কেননা এমন অপাংক্তেয় বস্তু যে উপন্যাসের উপকরণ যােগাতে পারে, একথা কারুর মনে হয় নি। আর তার একমাত্র কারণ, (শরৎবাবুর কথায় ) ভালবাসার নিগূঢ় রহস্যের পরিচয় দেবার সত্যিকার অধিকার সেই রকম দু’চারজন হতভাগ্যেরই জন্মায়, দুঃখের কারবারে যাদের ভরাডুবি হয়ে গেছে। ৮০ মনুষ্যত্ব যাচাই অতি প্রাচীন কাল থেকে আমাদের দেশে মনুষ্যত্ব বিচার করবার একটা সনাতন মাপকাঠি চলে আসছে। এই মাপকাঠি আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। কি কি গুণ থাকলে তাকে ভাল ছেলে বলা যায়, আর কি কি দোষ থাকলে তাকে মন্দ মানুষ বলা যায়, সে সব আমাদের কণ্ঠস্থ। যেমন, ভাল ছেলে যে হবে সে বরাবর পাশ করে ক্লাশে উঠবে, ক্লাশে কারাের সঙ্গে খুনসুড়ি করবে না, কোন কারণেই অতিরিক্ত হবে না, অতিরিক্ত কঁদবে না, বাড়ীতে ভাই বােনের সঙ্গে মারামারি করবে না, খাওয়া-দাওয়া পােক পরিচ্ছদের বৈচিত্রের জন্য বিন্দুমাত্র আবদার করবে না, মােট কথা সে সকল রকমে সুবােধ আর সুশীল হবে। এই সুবােধ আর সুশীল ছেলে স্কুল ছেড়ে যখন কলেজে ঢুকবে তখন প্রতিদিন তার নিয়মিত স্থানটিতে শিষ্ট হয়ে সে বসে থাকবে, প্রফেসার অনর্গল যা’ বলে যাবেন অবিচলিত চিত্তে সে তার নােট নেবে, পরীক্ষার শেষে ভাল ফল দেখিয়ে নিজের এবং বাপ মায়ের (যদি তাঁরা বেঁচে থাকেন) মুখ উজ্জ্বল করবে। এইবার বিয়ের বাজারে তার দর geometrical progressionএ হু হু করে বেড়ে যাবে। অনেক দর-কসাকসির পর যে মেয়েটির পাণি সে পীড়ন করবে সে মেয়েটা পাঁচমিশেলি জাবে যে সেই বিবাহই হচ্ছে তার জীবনের চরম সৌভাগ্য কিন্তু ভাল ছেলেটি এই বিবাহকে চির আচরিত একটি প্রথামাত্র বলেই গণ্য করবে। তার পর সে চাকরির উমেদার হয়ে ঘুরে বেড়াবে- জুটতে দেরি হলেই তার ঝাল পড়বে স্ত্রীর অলক্ষণত্বের উপর। চাকরি পেলে অতি নিশ্চিন্ত ভাবে সে জীবনযাত্রা নির্বাহ করবে, তাস-পাশার আসর সে বাদ দেবে না, আপিসে সাহেব তার উপর অত্যন্ত খুশী থাকবেন—সমাজ বলবে, হ, এই ত মনুষ্যত্বের আদর্শ। আর সেও কেতাব থেকে বাঁধা বুলি আউড়ে morality, শিষ্টাচার, ভব্যতা প্রভৃতি সম্বন্ধে লেচার দিতে থাকবে—মােট কথা তার জীবনের সার্থকতা সম্বন্ধে কোন দিক থেকেই কারাের মনে আর সন্দেহ থাকবে না। এইবার মন্দ ছেলের বরাতটা দেখা যাক। সে কোন বার পাশ করে ক্লাশে উঠবে, কোন বার ফেল করবে। টিফিনের সময় সুধীর হয়ে বসে থাকার সুনাম কেউ তাকে দেবে না। মত নিয়ে বাগান থেকে কাঁচা আম সংগ্রহ করার অবিবেচনা তার দ্বারা ঘটবে। বাড়ীতে ভাই-বােনকে ভালও সে বাসবে, আবার মারধাের করার নালিশও তার নামে শুনতে পাওয়া যাবে। স্কুলের ছেলেদের কেউ হবে তার বন্ধু, কেউ বা স্যাঙাত, আবার কেউ বা পরােক্ষে তার অজস্র নিলে করবে। পণ্ডিত মশাই বলবেন, আমি জানি ওটার কিছু হবে না। একবারে না পারলেও দু' তিন বারে ২ মনুষ্যত্ব যাচাই পাশ করে কলেজের মুখ হয় ত সে দেখবে। কিন্তু সেখানেও সে সুনাম অর্জন করতে পারবে না। প্রফেসারের অন্যায় তিরস্কারের হয় ত সে একদিন প্রতিবাদ করবে। ফুটবল ম্যাচের গ্রাউণ্ডে তার গতি হবে অব্যাহত। থিয়েটার-সিনেমা দেখার কৌতুহল সে দমন করতে পারবে না। দেশ যখন একটা বৃহৎ ভাবাবেগে স্পন্দিত তখন সেই স্পন্দন হয় ত তার প্রাণে ঘা দেবে-হয় ত সে পড়াশােনা, ভবিষ্যতের আশাভরসা সব ছেড়ে দিয়ে একদিন সেই ভাবস্রোতে ভেসে যাবে—আবার কিছুকাল পরে হয় ত একদিন উজান বয়ে ফিরেও আসবে। তার আশা আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দেওয়ার বুদ্ধিকে লােকে সুবুদ্ধি বলবে না। কলেজের পরীক্ষা পাশ করা হয় ত তার দ্বারা ঘটে উঠবে না—বাপমায়ের মুখও উজ্জ্বল হবে না আর ঘটক-মহলে তার নাম ঘন ঘন ধ্বনিত হয়ে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার দলকে চকিত করে তুলবে না। পিতার প্রশ্নের উত্তরে হয় ত সে বলে ববে অমুককে ছাড়া আমি বিয়ে করব না। তার এই নিলজ্জতায় লােকে ছি ছি করবে। তার পর একদিন চাকরির চেষ্টায় সে বেরুবে—চাকরি মিললেও তাকে রক্ষা করা সম্বন্ধে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে না। সাহেব যে কাজে তার উপর খুসী থাকতে পারেন সেই কাজটাই হয় ত তার চোখে পড়বে না। সাহেবের উৎকট অভিমানকে সে হয় ত আমলই দেবে না এবং একদিন শ্বেতাঙ্গের আভিজাত্যটুকু ভুলে যাওয়ার ত্রুটিই হয় ত তার ৮৩
পাঁচমিশেলি
দ্বারা ঘটবে। ফলে তার চাকরি যাবে—আর এই চাকরি না
রাখতে পারার অপরাধ সমাজ চাপাবে তার নির্বোধত্বের উপর,
আর তাকে সৃষ্টিছাড়া বলে উল্লেখ করবে। এই সৃষ্টিছাড়া লোেকটি
হয় ত অপরিসীম দুঃখে এমন কাজও করবে যাকে কোনমতেই
সমর্থন করা চলে না এবং তার পর একদিন তার সমস্ত দুস্কৃতির
হিসাব বুঝিয়ে দিতে এমন এক জায়গায় যাবে যেখানে প্রশংসার
গৌরবে তার মুখ উজ্জ্বল হল কি নিন্দার কালিমায়ার,মুখ মসীলিপ্ত
হয়ে গেল তার কোন ইতিহাস আমাদের কাছে এসে পৌছবে না।
কিন্তু এই মন্দ ছেলেটির বিধাতা তঁার খাতা খুলে দেখতে
পাবেন সেখানে এমন সব কাজের উল্লেখ আছে যা ঐ ভাল
ছেলেটিরই করবার কথা। একদিন চাকরির উমেদার অবস্থায়
নিজের শেষ সম্বল চার আনা পয়সা সে একজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুককে
খাইয়ে দিয়েছিল। বন্যায় যখন দেশ ভেসে গিয়েছিল তখন সে
পরীক্ষার পড়া না পড়ে রিলিফের কাজে দিনের পর দিন কাটিয়ে
এসেচে। কলকাতায় যখন সে মেসে তখন পাশের ঘরে এক
ভদ্রলােকের মসুরিকা হয়েছিল—সবাই তাকে ছেড়ে পালিয়েছিল,
সে-ই কেবল পারে নি। তারপর অনেক দুঃখে অনেক কষ্টে সে
একা রাতের পর রাত জেগে তাঁকে নিরাময় করে তুলেছিল।
উপরের ঐ দুটি চিত্র থেকে দেখতে পাওয়া যাবে যে মানুষ
মানুষের সম্বন্ধে কত কম জানে কিন্তু তবুও তার অপরকে বিচার
৮৪
মনুষ্যত্ব যাচাই
অমুক ভাল
করবার ভার নিতে এক মুহূর্তও দেরি লাগে না।
কি মন্দ, অমুককে বর্জন করাই বিধি কি তার সঙ্গ করাই
যুক্তি—এ সব প্রশ্নের জবাব দিতে আমাদের আদৌ ভারতে
হয় না—উত্তর সব আগে থাকতেই ঠিক হয়ে আছে। কিন্তু
মনুষ্যত্বের প্রকৃত মাপকাঠিটা যে কি তাই আজো ঠিক হ’ল না।
এতদিন আমরা যাকে মাপকাঠি বলে পূজা করে এসেচি সেটা
হচ্ছে routineএর পূজা। যে যত এই routine ঘেসে চলতে
পারবে সে তত ভাল ছেলে। কিন্তু মাপকাঠিটা হবে routine
কি life তাই আজকের দিনে বিচাৰ্য্য।
শরৎচন্দ্র তার মুন্সীগঞ্জের অভিভাষণে এই কথাটা তুলেছিলেন।
স্ত্রীলােকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, “পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব
সতীত্বের চেয়ে বড় এই কথাটা একদিন আমি বলেছিলাম।
কথাটাকে যৎপরােনাস্তি নােংরা করে তুলে আমার বিরুদ্ধে
গালিগালাজের আর সীমা রইল না। মানুষ হঠাৎ যেন ক্ষেপে গেল।
অত্যন্ত সতী নারীকে আমি চুরি, জুয়াচুরি, জাল ও মিথ্যা সাক্ষ্য
দিতে দেখেছি এবং ঠিক এর উল্টোটা দেখাও আমার ভাগ্যে
ঘটেছে।” আজকের দিনে আমাদের কথাটাও তাই—পরিপূর্ণ
মনুষ্যত্ব রুটিনত্বের চেয়ে বড়—রুটিন মেনে চলে সংসারে সুখ এবং
সুবিধা অশেষ কিন্তু যে বিশেষ করে প্রাণবান তার পক্ষে এ মেনে
চলা সম্ভব হয় না। তাই তার সঙ্গে প্রচলিত পদ্ধতির, নিয়মকানুনের,
৮৫
* পাঁচমিশেলি ক আচারব্যবহারের বিরােধ ঘটে। Compromise করা তার স্বভাব নয় বলে সে তা করে উঠতে পারে না—ফলে বিরােধ বেড়ে চলে এবং সমাজ তাকে বর্জন করারই বিধি দেয়। কেন না সমাজ সাধারণ লােকের ব্যবস্থাই দিতে পারে, অ-সাধারণের জন্য কোন ব্যবস্থাই তার পুঁথিপত্রে লেখা নেই। ভগবানের সৃষ্ট এই বিশ্বসংসার অতি বিচিত্র-রূপে, রসে, গন্ধে, বর্ণে, সুষমায় পরিপূর্ণ, উন্মদ, হিল্লোলিত। সুখ এবং দুঃখ, করুণা এবং অপ্রেম, ঔদার্য্য এবং কৃচ্ছতা প্রভৃতি পরস্পর বিরােধী ভাবরাশি এখানে সহস্র ধারায় সহস্র মুখে লীলায়িত তরঙ্গায়িত হয়ে উঠছে—এই বিচিত্রতার মাঝখানে সকলের ডাক পড়ে না—কিন্তু যার পড়ে সে যে কিছুতেই ভাল ছেলে হয়ে সংসারের বাঁধা পথ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারে না এ কথা হলফ করে বলা যায়। বাঁধা পথ থেকে বিচ্যুতির জন্যে সমাজ তাকে যে লজ্জা দেয় তা হয় ত অপরিসীম কিন্তু তবু মন থেকে এ কথা কিছুতেই তাড়াতে পারা যায় না যে যিনি সব জানেন, সব দেখেন, তাঁর কষ্টিপাথরে এর মনুষ্যত্ব যাচাই করে তিনি যে দাম দিয়েছেন সমাজের দেওয়া দামের সঙ্গে তা’ কোনমতেই মেলে না। ৮৬
চলতি পথে
সেদিন ট্রেণে কলকাতা থেকে দিল্লী আছিলুম। তুফান মেল
দূর যাত্রীর ভিড়ে একেবারে বােঝাই হয়ে গিয়েছিল। ট্রেণ
ছাড়ার সামান্য একটু আগে একজন লােক তাড়াতাড়ি এসে
আমাদের কামরায় ঢুকলেন। গাড়ীর লােক ত একেবারে হাঁ হাঁ
করে উঠলাে। কোনগতিকে তাদের থামিয়ে তিনি একটু
খানি দ্বাড়াবার স্থান করে নিলেন। গাড়ী ছেড়ে দিলে।
লােকটির বেশভূষার দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হ’ল। পরণে
সাদা পায়জামা, গায়ে কালাে রঙের কোট, মাথায় কালাে রঙের
টুপি। বড় বড় দুটি চোখ, তাতে তার চেয়েও বড় বড় দুটি
চশমা, মাথায় বড় বড় চুল। চেহারায় বেশ একটু বিশেষত্ব
আছে।
গাড়ী খানিকক্ষণ চলার পর তিনি ইংরাজিতে বল্লেন, দেখুন,
রেলওয়ে কোম্পানী যে আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়, তার বদলে
তারা আমাদিগকে accomodation দিতে বাধ্য-এ দয়া নয়,
এ ব্যবসার নিয়ম। হই না কেন আমরা থার্ড ক্লাসের যাত্রী,
কিন্তু আমরা বদ্বার জায়গাটুকু পাওয়ার অধিকারী। জায়গা দিতে
৮৭
পাঁচমিশেলি পারলে টিকিট issue না করা উচিত। আমি পরের Stoppageএ গার্ডকে এ বিষয় জানাবাে। কথা বলার সুর এবং sentiment আমার কাছে নতুন লাগল। আমরা মেরুদণ্ড সােজা করে দাড়িয়ে সত্যিই ত প্রত্যেক ক্ষেত্রে এ রকম নিজেদের অধিকার যাচাই করে দেখি নে। ট্রেণ যখন চলছিল তখন অনেক সহযাত্রী উৎসাহ ভরে গার্ড সাহেবের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। ট্রেণ যখন থাম্ল তখন দেখলুম আমি ছাড়া আর বড় কেউ অবশিষ্ট নেই। যদি কোন গােলমাল হয়, আমি কেন ওর মধ্যে জড়াতে যাই এই মনােভাব। গার্ড সাহেবকে ব্যাপার জানালে তিনি আদৌ বিচলিত হলেন না। এ ত কিছু নতুন নয়, কারুর অজ্ঞাতও নয়। রেল কোম্পানী এই করে বহুকাল থার্ড ক্লাস যাত্রীদের দেহের উপর বাণিজ্য চালাচ্ছে। গার্ড সাহেব ত সেই কোম্পানীরই আজ্ঞাবহ। অবশেষে নাছােড়বান্দা লােকটিকে তিনি ষ্টেশন মাষ্টারের সঙ্গে দেখা করবার সৎপরামর্শ দিয়ে সরে পড়লেন। ষ্টেশন মাষ্টারও কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না, সুব্যবস্থাও করতে পারলেন না। লােকটি তখন বল্লেন, আমার ভাড়া ফিরিয়ে দেওয়া হােক, আমি কলকাতায় ফিরে যাব। ষ্টেশন মাষ্টার বােধহয় জীবনে এমন লােকের পাল্লায় পড়েন
চলতি পথে
নি। তিনি বিড় বিড় করে বকুতে বকুতে পালিয়ে রেহাই
পেলেন।
আমরা নিজেদের বিবরে ফিরে এলুম। লােকটি জিজ্ঞাসা
কলেন,
ওরা আমাদের নালিশে কর্ণপাত করে না
জানেন ?
আমি চুপ করে থেকে তাঁকেই কথা বলার অবকাশ দিলুম।
তিনি বল্লেন, ওরা জানে আমরা নেটিভ, আমাদের নালিশের
কোন জোর নেই। আমরা ত কিছু করতে পারব না। কিন্তু
ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে ব্যাপার আলাদা হত। আমি সে সব
দেশ বেড়িয়ে এসেছি। তারা যাত্রীদের নালিশ এ রকম অগ্রাহ্য
করে না—অগ্রাহ্য করবার শিক্ষা তাদের দেওয়া হয় না।
চিরকাল এই রকম ব্যবহারে অভ্যস্ত আমি ভাবতে লাগলুম,
সত্যিই ত। পয়সাও দেব, অথচ সেই পয়সায় পুঃ যে সব রেলের
কৰ্ম্মচারী তারা আমাদের ন্যায্য নালিশটা কান পেতে শুবে না,
এ কি বিড়ম্বনা!
ক্রমে এই লােকটির সঙ্গে আরাে ঘনিষ্ঠ আলাপ হল—দীর্ঘ
পথে ক্ষুন্নিবৃত্তি হতে পারে এমন কোন আহাৰ্য্য দ্রব্যই তার সঙ্গে
ছিল না। আমাদের এক বন্ধু ঐ ট্রেণে গয়ায় তার শ্বশুরবাড়ী
যাচ্ছিলেন, তিনি রাত এগারােটায় পৌছবেন, পূর্বাহ্রে খবরও দেওয়া
ছিল। সুতরাং তিনি তার খাবার সানন্দে সকলের সঙ্গে ভাগ
পাঁচমিশেলি
করে খেলেন। জলযােগের পর বিড়ি ধরিয়ে আবার আমাদের
আলােচনা জমে উঠল।
আমি জিজ্ঞাসা কলুম, আচ্ছা, আপনারা কি চান? কি
আপনাদের লক্ষ্য ?
‘আমরা দু’বেলা পেটপুরে খেতে চাই এবং খাওয়াতে চাই।
আমরা চাই না যে একজন বিনা পরিশ্রমে টাকার গাদার উপর শুয়ে
থাকবে এবং আর একজন সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে তার
পরিবারের পক্ষে যথেষ্ট হয় এমন উপার্জন করতে পারবে না।
We don't want to exploit others, we don't want to
be exploited.'
‘আপনারা কংগ্রেসে উপস্থিত থেকে এ মতবাদ প্রচার করেন
কেন ?
‘কতবার চেষ্টা করেছি—কেউ আমাদের কথা কানে তুলতে চায়
। সকলেই স্বরাজ পাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখছে—অথচ দেশের
লােকগুলাে যে ক্ষুধার জ্বালায় গলায় দড়ি দিচ্ছে সেদিকে কারুর লক্ষ্য
নেই। স্বরাজ দাবী করার কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে পারে এমন কণ্ঠ
যে বুজে এল।
‘আমাদের দেশের লিডারেরা ত এ বিষয় কোন উচ্চবাচ্য করেন
, এর মানে কি? তারা কি ইচ্ছা করেই এ সমস্যা এড়িয়ে
চলেন ?
চলতি পথে
হঠাৎ তার বড় বড় চোখ দুটো দীপ্ত হয়ে উঠল। একটু
উত্তেজিত স্বরে বলেন, “আমাদের দেশের লিডারদের উপর আপনার
খুব faith আছে বুঝি? আমার কিন্তু নেই। আমাদের দেশের
লিডারেরা কেমন জানেন? যেন hothouse plant-রঙ্গমঞ্চে
বক্তৃতা দেওয়ার সময় ঘড়ি ধরে তাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়-
বক্তৃতার পরই তারা মােটরে উঠে চলে যান। সাধারণ লােকের
দৈনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তাদের কোনই যােগ নেই। হাঁ, লিডার
বলি লেনিনকের জীবনী পড়বেন। চিরটা কাল কুলির সঙ্গে
কুলিগিরি পর্যন্ত করে গেলেন—বেশী বক্তৃতা দেওয়ার অবসর হয়
নি। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ লিডারেরা ত নিজেরাই
exploiters; যাঁদের বিষয় সম্পত্তি আছে, তাঁরা tenant দের
exploit কচ্ছেন, যাদের কলকারখানা আছে, তাঁরা labourerদের
exploit কচ্ছেন। এরা যখন আবার মধ্যস্থ হয়ে শ্রমিক ধৰ্ম্মঘট
মেটাতে যান তখন আমার যা হাসি পায়-এই যেমন সে দিন
গোলমুড়ী ধৰ্ম্মঘটে হয়েছিল।
তিনি চুপ করলেন—আমিও কয়েক ঘণ্টার মত চুপ করলুম।
তার চিন্তাধারার যে big dose তিনি inject করেছিলেন তা হজম
করতে আমার সময় লাগল।
পরদিন নতুন ঊষার সূর্যের পানে তাকিয়ে আমি তাকে
জিজ্ঞাসা করলুম, ‘আপনি বিশ্বাস করেন একদিন আপনাদের উদ্দেশ্য
পাঁচমিশেলি সিদ্ধ হবে ? পৃথিবীর সব মানুষ আর্থিক সাম্যাবস্থা প্রাপ্ত হবে, private property বলে কিছু থাকবে না, সকলেই দারিদ্র্যের কবল এড়িয়ে আনন্দে কালযাপন করবে ? তিনি বল্লেন, “বিশ্বাস করি বৈ কি—তাই ত এই ideal নিয়ে জীবনপাত করে খাটুচি। জানি সেদিন খুব নিকটে নয়—কিন্তু একদিন যে সেদিন আসবেই, ঐ পথেই যে মানুষের মুক্তি হবে, এ কথা নিঃসংশয়ে নিঃশ্বাস করি বলেই জীবনে ধন, জন, পুত্র, পরিবার প্রতিষ্ঠা, সম্মান কিছুই চাই নি।” আমি নবােদিত সূৰ্য্যকে যুক্তকরে প্রণাম করলুম। ৯২ মানুষের অধিকার সম্প্রতি এখানে একটি ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ থেকে এক ভদ্রলােক বেড়াতে এসে বসন্ত রােগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যার বাড়ীতে তিনি অতিথি হয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন তার যজমান। কিন্তু ছোঁয়াচে রােগাক্রান্ত গুরুর সম্মান তিনি রাখেন নি। বাড়ীর কোণে একখানি পৃথক ঘরে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। দেখা শােনা পরিচর্যা করার ভার দেওয়া হয়েছিল একটা ঠিক চাকরের উপর। তবু ভাল বলতে হয় ঐ চাকরটাকে, সে রােগী ফেলে পালায় নি। কিন্তু সে বেচারী নিরক্ষর-কি-ই বা জানে। বােগী বলেছিল তেল মাখিয়ে দাও—হয়ত জালার নিবৃত্তি হবে- সে তাই দিয়েছে। ফলে জ্বালার চোটে তিনি হাত পায়ের চামড় উপড়ে ফেলেছিলেন—মৃতদেহের সে কি করুণ বীভৎস দৃশ্য ! এই রকম করে বিদেশে একটি জীবনের পরিসমাপ্তি হয়েছে। সন্ধ্যাবেলা এই ঘটনার উল্লেখ করে বন্ধু মহলে গল্প করছিলুম উদ্দেশ্য ছিল সকলের কাছ থেকে একটু ‘আহা’, ‘উহু’ শােনা। কিন্তু দেখে আশ্চর্য হলুম বন্ধুরা এ বিষয়ে কেউ কানই দিলেন —যেন এ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা—এতে যেন কিছুই ভাববার ৯৩ পাঁচমিশেলি নেই-যেন ঐ ভদ্রলােকের এই রকম করে মরাই উচিত ছিল। বেশ বােঝা গেল আমাদের হৃদয়হীনতা কতদূর পর্যন্ত গিয়ে পোঁছেচে ! আমার স্থির বিশ্বাস মানুষ কতকগুলি অধিকার নিয়ে জন্মায়। ক্ষুধায় আহার, তৃষ্ণায় জল, শীতে গাত্রাবাসের মত রােগে ঔষধ এবং পথ্যও তার জন্মার্জিত অধিকার। এই দাবী মেটায় সমাজ —অর্থাৎ সমাজের লােকেরা। তাই ক্ষুধার্তকে আহার দান, তৃষ্ণার্তকে পানীয় দান প্রভৃতি ব্যবস্থাগুলি সামাজিক ধর্ম বলে গণ্য হয়েচে। আমাদের পােড়া দেশে অবিশ্যি সবই উল্টো। এখানে ক্ষুধায়ও আহার মেলে না, শীতেরও উপযুক্ত পরিচ্ছদ মেলে না। পেটের জ্বালায় অনেক যুবক আত্মহত্যা করচেন এ সংবাদ খবরের কাগজে পড়চি। পড়ে একটু হা হুতাশ করা ছাড়া আর কেউ কিছু করেচেন বলে শুনি নি। যদি ঐ হতভাগ্য আত্মঘাতী যুবক- বৃন্দ পুনরায় এই ভারতবর্ষেই জন্মগ্রহণ করেন, তবে আর একবারও যে তাদের আত্মহত্যা করতে হবে না তাই বা কে বল্লে ? এই ক্রমাগত আত্মহননের পুঞ্জীভূত লজ্জা এবং নিষ্পৌরুষ একদিন হয়ত জাতির অসাড়তা ভাঙ্গাবে—কিন্তু সে কবে ? কিন্তু আমি শুধু এই কথাটাই ভাবি যে ক্ষুধার্তকে আহাৰ্য্য দানের শক্তির অভাবের মত পীড়িতকে শুশ্রুষা করবার শক্তিও যদি আজ লােপ পেয়ে থাকে, তবে আমাদের এই জাতিকে ৯৪ পাঁচমিশেলি বাঁচাবে কে? জাতি অমনি মুখের লম্বা চৌড়া কথায় বড় হয় না,বেঁচে থাকে না—তাকে প্রতি ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে মানবত্বের পরীক্ষা দিতে হয়। রাষ্ট্রে, বাণিজ্যে আমরা পরাজিত লাঞ্ছিত, কিন্তু একটা বিষয়ে আমাদের গৌরব করবার আছে—সে ধৰ্ম্মে। তারই আনুষঙ্গিক হৃদয় যদি আজ শুকিয়ে গিয়ে থাকে, যদি দুঃখ দেখলেই সমবেদনায় বুক উদ্বেলিত হয়ে না উঠে, যদি তখন ফিরে তাকাই, হিসাব করি, আগু পিছু করি, তবে মিথ্যাই আমরা বৈদেশিক রাজশক্তিকে দোষ দিই। হৃদয় প্রস্রবণের মূল বৈদেশিক রাজশক্তির হাতে ধরা নেই, সে আছে আমাদের নিজেরই হাতে। এই যে একটি পীড়িত মুমুর্ষ, আত্মা বিদেশে আত্মীয়স্বজন পরিত্যক্ত হয়ে এক রকম বিনা চিকিৎসায় মারা গেল, এর জন্যে দায়ী কে ? দায়ী আমাদের এই সমাজ এবং তারই ভারবাহী আমরা। মানুষ হয়ে জন্মানর দরুণই সে বােগে সেবা পাবে, ঔষধ পাবে, পথ্য পাবে, এই অধিকার নিয়ে জন্মেছিল। আমরা তার সে অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেছি। এই বঞ্চনার ফঁাকি আজ আমরা দেখতে পাচ্চি নে বটে, কিন্তু এক দিন সে আত্মপ্রকাশ করবেই। সামাজিক মানুষকে কতকগুলি বন্ধন স্বতঃই স্বীকার করে নিতে হয়—এই বন্ধনের দায়িত্ব পুরা মাত্রায় পালন করতে পারলেই গৃহস্থাশ্রমের গৌরব। গার্হস্থ্য জীবনের আদর্শ কোন দিন এই নয় যে নিজের এবং সন্তানসন্ততিদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যটুকু মাত্রই ৯৫ মানুষের অধিকার বিধান করব—তার বাইরে আর দৃষ্টি চলবে না। ছেলে পুলে আত্মীয় স্বজন দিয়ে হৃদয়কে সরস করে তােলাই গৃহস্থ জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য। নিজের ছেলের ভিতর দিয়েই পরের ছেলেকে ভালবাসতে শিখি, নিজের বন্ধুর ভিতর দিয়েই জীবনবন্ধুর সন্ধান পাই। এই বন্ধনকে স্বীকার করে নিয়েই বন্ধনের পারে যাওয়া যায়—একে বাদ দিয়ে নয়। ছােট পাওয়ার থেকেই বড় পাওয়া, অনন্তকে পাওয়ার সূচনা হয়। “বেদপন্থী” একদিন লিখেছিলেন, মানুষকে দেখেই তার জাতিকে চেনা যায়। যে জাতির পরিচয় আমরা প্রতি মুহূর্তে এই রকম ভুল করে দিচ্চি, তারি গ্লানিকর চিত্র আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠুক, এই অপােগতি থেকে রুদ্র যেন আমাদের প্রতিনিয়ত রক্ষা করেন-“রুদ্র, ষত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যং”। সম্পূর্ণ। ৯৬
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.