Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Parnaput Vol. 2

Roy,kalidas · 2009/11/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পণপুট
তিীয় খণ্ড
একালিদাস রায়।
রাসপুর্ণিমা
মূল্যবাঁধাইস

P-49, Russa Road North
BHAWANIPORE.
৫ গুপ্ত এণ্ড কোম্পানী হইতে
চন্দ্রকুমার দত্ত চৌধুরী কর্তৃক
প্রকাশিত।
স্লিন্টার-শ্রীশীতলভট্টাচার্য
মানসী প্রেস।
S33,রাম
কফs

পরম ভক্তিভাজন সাহিত্যরথী
শ্ৰীযুক্ত
দীনেশচন্দ্র সেন
মহােদয়
চরণেষু
.

P-4
“কাঞ্চন থালি নাহি আমাদের
অন্ন নাহিক জুটে,
যা কিছু পেয়েছি এনেছি সাজায়ে
নবীন
পণপুটে।”
রবীন্দ্রনাথ

ভূমিকা পর্ণপুটের ১ম সংস্করণে প্রকাশিত কয়েকটি কবিতা, ২য় ও ৩য় সংস্করণে পরিবর্জিত হইয়াছিল,সেই কবিতাগুলির সহিত আরাে কতকগুলি নূতন কবিতা যােগ দিয়া একত্রে পর্ণপুট ২য় খণ্ড নামে প্রকাশিত হইল। নূতন কবিতাগুলির প্রত্যেকটিই কোন না কোন মাসিক পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। সেগুলিকে আমূল পরিমার্জিত ও পরিসংস্কৃত করিতে হইয়াছে। এই কাৰ্য্যে আমার ছাত্র সুকবি শ্রীমান্ কৃষ্ণদয়াল বসু বি, এ, আমাকে যে সাহায্য করিয়াছেন—তাহার জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। ভাবিয়াছিলাম কবিতাগুলিকে কুটীশূন্য করিয়া প্রকাশ করিব কিন্তু ক্ৰটীর আর অন্ত নাই—চিরজীবন পরিশ্রম করিলেও টীর শেষ হইবে না। অনেকস্থলে পরিমার্জনে বিপরীত হইয়া উঠিতেছে-ত্রুটী বাড়িয়া যাইতেছে। সেজন্য আয়াস স্বীকার বৃথা ভাবিয়া গ্রন্থাকারে প্রকাশ করিয়া ফেলিলাম-পাঠক ও সমালােচকগণের সাহায্যে কতকটা পরিমার্জিত হইতে পারে। কবিতাগুলিকে যে মার্জনা দিতে পারিলাম না সহৃদয় পাঠকগণের নিকট আমি সে মার্জনা ভিক্ষা করি। ইতি- . নিবেদক গ্রন্থকার।

No text on this page.

পর্ণপুট
( দ্বিতীয় খণ্ড)
বিত্ত ও চিত্ত
বিত্ত হতে চিত্ত বড় এই ভারতের মন্ত্রবাণী।
নিত্য ধ্রুব সত্য যথা, বিত্ত তথা যুক্তপাণি।
যক্ষপতি মাণিক মতি
চাল্লে পায়ে, বিমুখ সতী,
বক্ষে তুলেন নন্দী যদি যােগায় জবা মাল্য আনি।
বিত্ত হতে চিত্ত বড় এই ভারতের পুণ্যবাণী।
শ্মশানবাসী পাগলা ভােলার চরণতলে সে কোন জুমা,
যাহার লাগি তপস্বিনী রাজাধিরাজকন্যা উমা ?
অমৃত যায় হয়নাক নর
নারী হেথায় চায় না সে বর,
রাজদুলালী গতায়ু দীন যতির চাহে পা দু'খানি।
নিত্যধ্রুব সত্য যথা বিত্ত তথা যুক্তপাণি।
বক্ষে রাখি গােপ রাখালে, গােপীমাতার শুন্য পিয়া
রাজ তনয়ের, ব্ৰজের মজে তৃপ্ত হলাে তপ্ত হিয়া।

পর্ণপুট
হস্তীনাতে রাজার দলে
অর্ঘ্য মাল যাহার গলে
বিপ্রগণের চরণতলে ধন্য সে যে পাস্ত দানি।
বিত্ত হতে চিত্ত বড় এই ভারতের নিত্য বাণী ।
আচণ্ডালে হেরেছি এক যুবরাজের বক্ষ 'পরে।
কিরাতবীরের দক্ষিণাটি মহাভারত শীর্ষে বরে।
তপােবনের বহির্দেশে
রাখিয়া রথ, দীনের বেশে
মুনির ধেনুর করে সেবা মহারাজ ও মহারাণী।
নিত্য ধ্রুব সত্য যথা বিত্ত তথা যুক্তপাণি।
বামন পদে পাতালপতির ধূলিধূসর মৌলি জাগে।
বিদুর দ্বারে ক্ষুদের কণা রাজন্যেরা ভিক্ষা মাগে।
ছত্রচামর হেলায় ঠেলে
মগধ দেশের রাজার ছেলে
বেড়ায় ঘুরি শৈলবনে শাশ্বত ধন সত্য মানি।
বিত্ত হতে চিত্ত বড় এই ভারতের নিত্য বাণী।
মাণিক রতন ঢেলার মতন, চিরন্তনের চরণতলে
কপিশ জটায় তপচ্ছটায় তুষ্টিতেজের তপন জলে।
ত্যাগী যােগীর চরণ ধূলায়
সম্রাটের ললাট বুলায়,
গুরুর খড়ম পূজ্য পরম সিংহাসনের মােগ্য জানি।
নিত্য ধ্রুব সত্য যথা বিত্ত তথা যুক্তপাণি।
ভারতবর্ষ।

তীয়দেব
ভীষ্মদেব
হে রাজেন্দ্র! দাশরাজগৃহে নিজ যৌবরাজ্য পরিহারছলে
দুটি ভারতের তুমি শাসনপােষণভার নিলে করতলে।
সেই হতে রাত্রিদিন রাজধৰ্ম্ম ক্লান্তিহীন করিলে পালন,
ভ্রাতা ভ্রাতৃপুত্রপৌত্রে করি রাজছত্র ছায়ে রক্ষণলালন।
ধর নাই রাজ্যদণ্ড মাণিক্যমুকুটমাল্য বাহচিহ্নচয়,
তবু রাজচক্রবর্তী, অনপত্য পিতামহ রাজনিলয় !
তারপর হে গাঙ্গেয় বণ্টন করিলে যবে ঐশ্বৰ্য্যবৈভব
দুই পার্শ্বে দুই দলে দাড়াইল পৌত্রগণ,-পাণ্ডব কৌরব।
নেহারিয়া দুই দিকে যােগ্যাযযাগ্য গুণাগুণ করি বিচারণ
দুটী রাজ্য দুই দলে, মহাভাগ, করি ভাগ করিলে অর্পণ।
ঐহিক ভারত রাজ্য ঋদ্ধিবৃদ্ধি বাহুবল দিলে কুরুগণে,
বিসর্জি দৈহিক প্রাণ যুঝিলে যাদের লাগি রথারােহণে।
মহাভারতের রাজ্য পাণ্ডবে করিলে যান বিরাট বিশাল
রাজনীতি শান্তিপৰ্ব্বে, চিররাজ্য যুড়ি যার সৰ্ব্ব দেশ কাল।
সে রাজত্ব লুপ্ত আজি যে রাজত্ব দিয়েছিলে রথে ধনুঃশরে,
শাশ্বত রাজিছে বিশ্বে দিলে যাহা ব্রহ্মালােকে শরশয্যাপরে।
ভারতবর্ষ।
১

পট
পুরু
রাজর্ষি আদর্শবীর ওগাে ত্যাগি জানিয়াছ সার,
দেহের তারুণ্য শুধু কিঃ ধিঃ লালসার ভার,
কাম্য বস্তু উপতভাগে কামনার নহে অবসান,
ধৃতরা লভি বহ্নি বৃদ্ধি পায় লভেন সিৰ্বাণ।
যৌবনের ইন্দ্রলােক স্বপ্নরাজ্য লােভনীয়তম
নিমেষে ঠেলিলে পায়ে,উড়ে গেল ফাগমুষ্টিসম,
পলকে পড়িল ঝরি কুন্দোপম দশন সুন্দর,
শুত্র হলাে কাশসম, অলিকৃষ্ণ চিকুর চর।
উজ্জল গরুড় চক্ষুঃ হলাে ম্লান, দৃষ্টি হলাে ক্ষীণ,
নলিনললিত চৰ্ম্ম হলে লােল গতক্রী মলিন।
নমিতে পিতার পায় কুজ হলাে উন্নত কন্ধ,
সেই দৃশ্য বিশ্বমাঝে সব হতে ভাস্বর সুন্দর।
আত্মায় যৌবন বৃদ্ধ, দেহে বৃদ্ধ, হে তরুণ পুরু,
হে আৰ্যসত্তম তুমি চিরদিন প্রবীণের গুরু।
তনু যত হলে স্নান শিথিলিত পলিত গলিত,
চিত্ত তত উজলিয়া হলাে দীপ্ত মােহন ললিত।
জরাপর্ণশালাতলে আত্ম তব তরুণ তাপস,
যৌবনের রাজছত্ৰতলে নহে ব্যসনী বিবশ ।
সন্ধ্যাভবিমনিভ যৌবনের পরপরদেশে
ধ্রুবতারা জ্বলে যথা দিগন্তের কুহেলির শেষে,

ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রধনু উত্তরিয়া উজ্জ্বল উদার
আত্মার মুমেগিরি চিরদিন উজ্জ্বল তােমার।
হে বরিষ্ঠ, তপােনিষ্ঠ, হে বশিষ্ঠ আৰ্য্যের গৌরব,
তােমার ত্যাগের পুণ্যে বিশ্বজয়ী ভারতে পৌরব।
গৃহস্থ।
একলব্য
প্রণিপাত, হে কিরাত, যে অনাৰ্য্য আৰ্যের প্রধান,
হীনজন্মা বলি তুমি গুরুকুলে পাওনিক স্থান।
একলব্য, বীরখ্যাতি একা লভ্য তব বিশ্বমাঝে,
শহীন শরবর, বরণীয় বীরের সমাজে।
রাজন্যেরে ভিক্ষা দিলে, নিঃস্ব, তবু নহত ভিখারী
ত্যাগের আদর্শ তুমি, কিসের না নহ অধিকারী
?
বিশ্বব্যাপী জ্ঞানব্ৰহ্ম, অংশ তার প্রজ্ঞাবীজময়,
কানন কান্তার গিরি যথা বােক্ হবে অভুদয়
সৃষ্টির বিধানসুত্রে। কে বােধিবে তাহার উন্মেষ ?
অক্ষয়, জীবনধৰ্ম, কি করিবে অসূয়া বিদ্বেষ?
কে পারে রােধিতে বিশ্বে পঞ্চমাঝে পঙ্কজবিকাশ
খনির তিমির গর্ভে অঙ্গারকে মণির নিবাস ?
যে শক্তি ছুটিবে বিশ্বে ব্যামমার্গে পুষ্পকের রথে
কে রাখিবে তারে বাঁধি জিত্বের বাঁধা রাজপথে ?

পর্ণপুট
জাহ্নবী চলিবে ছুটি অবিচারে গিরি বনে মাঠে,
কে তারে মােধিতে পারে বারাণসী প্রয়াগের ঘাটে ?
মানব সমুদ্র মাঝে কে করিবে শাশ্বত বিভাগ
বাঁধ বাঁধি ? বিরাটের অঙ্গে অঙ্গে কে কাটিবে দাগ ?
যে শক্তি নিহিত মূলে কেমনে তা করিবে উচ্ছেদ
শাখার ছেদনে বলাে ? অখণ্ড সে মূলে নাই ভেদ।
যেখানে মানুষ বাজে সেইখানে দেবতা বিরাজে,
দেবত্ব আবদ্ধ নহে আভিজাত্য পিঞ্জরের মাঝে।
চাহনিক রাজছত্র দিগ্বিজয়, রত্নের ভাণ্ডার,
সবার উপরে ঠাই তব চিত্ত ধ্রুব দেবতার ।
দেখায়েছ কভু নহে একনিষ্ঠ সাধনা বিফল
সকলেই অধিকারী লভিবারে তপস্যার বল।
কাম্য কিছু নাহি তব যােগ্যতার করেছ প্রমাণ,
মহাভারতের পীঠে দুর্ভাসনে লভিয়াছ স্থান।
শক্তি সে যে ব্ৰহ্মময়ী ত্যাগ সে যে পরমার্থময়
আৰ্য্যের নাহিক লজ্জা তার কাছে লভি পরাজয়,
সত্য চির হােতূ প্রিয়, মিথ্যা হােক্ চির তিরস্কৃত
মহাভারতের কথা তাই গেয়ে হইল অমৃত।
দীক্ষার দক্ষিণাছলে করিয়াছ সর্বস্ব প্রদান,
এর কাছে অশ্বমেধ বিশ্বজিৎ হয়ে আসে স্নান।
লক্ষগুণ প্রতিশােধ হে বীরেন্দ্র দিয়াছ ঘৃণার,
অক্লেশে বর্জিয়া তব চিরাজ্জিত জীবনের সার।

অন্তুষ্টি
আৰ্য সে করুক গর্ব কাটি নিয়ে অলিটি তব,
অনাৰ্য্য নিষাদ তুমি, তােমারেই আৰ্য মােরা ক’বব।
এসেছিলে ভ্রান্তমুঢ়ে দিতে শুধু সত্যের সন্ধান
সত্যের প্রতিষ্ঠা কৰি কৰ্ম তব তাই অবসান।
জাগাে তুমি হে নিষাদ ভারতের গুরুগণ মাঝে
পণ্ডমাংস পুষ্ট দেহে রক্তসিক্ত কৃষ্ণাজিন সাজে।
জ্বলন্ত সত্যের মুর্তি জাগাে তুমি জাগো ত্যাগবীর,
নত হােক পদে যত রক্তগৰ্ব্বী ভ্রান্তজনশির।
প্রবাসী
অন্তর্দষ্টি
তােমারে হেরিব বলিয়া যখন প্রভাতে নয়ন মেলি
তব উজ্জ্বল চুড়ার ছটায় দৃষ্টি হারায়ে ফেলি।
রিনি ঝিনি ধ্বনি নূপুর নিকরে,
কণ্ঠের হারে আলােক ঠিকরে,
তােমারে হেরিনা হেরি শুধু তব ব্যোমে ব্যোমে চলকেলি
তােমারে হেরিব আশায় যখন উষায় নয়ন মেলি।
দ্বিপ্রহরে যবে হেরিব বলিয়া নয়ন ভরিয়া চাই
অাখি ঝলসানাে শ্ৰীমুখ ছটায় দিশেহারা হয়ে যাই।
পদনখ আভা ভাসে বোমপথে,
ছুটে হুতাশন তব আঁখি হতে

পর্ণপুট
আবেশে অলসি পড়ে বিলােচন, তােমারে কইগাে পাই ।
দিবাভাগে তােমা হেরিব বলিয়া আঁখি মেলি যবে চাই।
হেরিব বলিয়া নব ভরসায় নিশাকাশে-চাই যবে
তৰ অঞ্চলে খচিত মণিরা ঝলমল করে সবে।
নাহি শুনি ভাষা, হেরি সিতহাস,
পাই পরশ-শুনি নিঃশ্বাস,
এমনি করিয়া কাটে বারমাস কোথায় হেরিব কবে?
বিশ্বজীবনে বিশ্বাসভরা সাধ মিটিবেনা তবে ?
শারদ গগনে হেরিনি তােমায় পেয়েছি আশীষ সার,
হেরেছি বরষা ঘন গৌরবে ঘন কুন্তল ভার,
নব বসন্তে ধরার অধরে
চুম্বন সুধা ঢেলেছ সাদরে
তােমার জীলার সকলি দেখেছি বাকী নাই কিছু আর,
তােমারেই দেখা শুধু বাকী রয় সকল দেখার সার।
মহাকাল পানে চেয়ে থাকি ঠায় নাহি হেরি তব কায়া,
ব্যোমপারাবারে নাহি হেরি তােমা হেরি শুধু তব ছায়া,
জীবনে, তােমার পুলক হরষ,
মরণে অলখ শ্রীকর পরশ,
ভুবনে তােমার আভাষ শুধুই, গন্ধবরণে মায়া,
নয়ন মেলিয়া হেরি শুধুছায়া হেরিনা তােমার কায় ।
১৪

আঁখি মেলে তােমা অনেক খুজেছি আর আঁখি মেলে নয়,
বাহিরের চাওয়া শেষ, দেখি যদি ভিতরে চাহিলে হয়।
বধির করিনু অধীর শ্রবণ,
অন্তর পানে ফিরাই নয়ন,
করি মূক এবে মুখর রসনা প্রলােভন কৰি জয়,
অনেক ঢুড়েছি আঁথি মেলে মেলে, আর আঁখি খুলে নয়।
তােমার আভায় হারাই তােমায় জ্বলজ্বল তব ভাতি
ভােমার লীলায় হেরিনি তােমায়, খেলায় গিয়াছি মাতি।
আলােক শুধুই ঝলসেছে আঁখি
দেখিতে দেয়নি রাখিয়াছে ঢাকি
বিশ্বের প্রতিবিম্বে-বিম্বে শত মায়াজাল পাতি
সকলি আঁধারি করেছি আজিকে গভীর তিমিররাতি।
বিশ্ববস্তু গিয়াছে হারায়ে সংসার আজি ধূলি,
রিক্ত নিঃস্ব আত্মার সাথে হােক আজি কোলাকুলি,
কিছু নাই শুধু আছে আধিয়ার
আজিকে হবেগাে ভাল অভিসার,
কালের নিদ্রা বিভাবরী এবে, সব লাভ ক্ষতি ভুলি
করেছি রুদ্ধ সব দ্বার গুলি হৃদি দ্বার শুধু খুলি।
গহন গুহায় এসে উচ্ছল নদী হয়ে আজ ছােটো,
মােময় হৃদিকুঞ্জ উজলি কুসুম হইয়া ফোটো।
উঠ খনিমাঝে মণি হয়ে অলি,
কাল’ মেঘে তুমি হানগাে বিজলি,

পর্ণপুট
ধুমকুণ্ডলী ভেদি দপদপি শিখা হয়ে জ্বলে ওঠো,
ঢালি কৌমুদী বিধু হয়ে উদিত প্রাণ মন ললাটো।
বহিভুবন লুপ্ত, বিরাজে ধ্বংস-ধ্বান্ত শুধু
অতল অসীম প্রলয়পয়ােধি চারিদিকে করে ধূধূ
বাজাও তােমার পাঞ্চজন্য
নবীন সৃষ্টি হােক আসন্ন
হৃদয়-সগ্নে এ নাভি-পদ্মে জাগ জাগ প্রাণ বঁধু
নব রবি শশী গ্রহ তারকারা, বিশ্বে বিলাক মধু।
বেপথুবিননাদে নব ভবরথ তােনারে বহিবে বুকে,
তব পদদেব-ধারা ঝরে যাবে চোখে মুখে।
ভক্ত হৃদয় বন্ধে রন্ধে,
বাজিবে বংশী প্রণবমন্দ্রে--
অঙ্গে অঙ্গে ঝােম মঞ্জরী জাগিবে সত্বসুখে,
সহস্রমুখী অশ্রুধারায় নদী বয়ে যাবে বুকে।
এমনি করিয়া নিখিল বিশ্ব আমাতে উঠিবে জাগি,
বিশ্বম্ভর নিঃস্ব ভক্তে হবে যবে অনুরাগী।
বাহিরে মিলেনা স্বরূপ তােমার,
বুঝেছি রুধিয়া ইন্দ্রিয়-দ্বার,
তােমার লাগিয়া ফিরিব না আর দেউলে মঠ মন্দিরে মাগি
আঁধারের ধন বিশ্বের সনে আঁধারে উঠিবে জাগি।
ভারতবর্ষ।

মৃত্তিকা
মৃত্তিকা
ধূসর-বসনা বিভূতিভূষণা ওমা শঙ্কর-কিঙ্করী
অঙ্কে বহিছ বক্ষে টানিছ সস্নেহে দিবা-শর্বরী।
সন্ততি লাগি সর্বংসহা সহিতেছ শত যন্ত্রণা,
তব কৃপা ছাড়া একটী পলকে হয়না জীবন কল্পনা।
আদিকাল হতে বসে’আছ মাতঃ শিয়রে জালিয়া বর্তিকা,
তব পদ চুমি শতবার নমি জয়গাে জননী মৃত্তিকা।
অঞ্চল ঢাকা সুধা দিয়ে নিতি ক্ষুধাতৃ হরে অন্নদা,
কাঞ্চন-হীরা-হার পাইয়ে চুমা খাও হেসে রত্নধা।
শুন্য তােমার বন্যা ধারায় গিরি উরসিজে উচ্ছলে,
চিকুরের ছায়া তব শ্যামমায়া ঢুলায় শিৱস হিনলালে।
কোটিকোটি আলো যুগে যুগে জালে, অক্ষয় প্রাণবর্তিকা,
তব পদ চুমি শতবার নমি জয়গাে জননী মৃত্তিকা।
ধূলাখেলা কালে বাল্য আশীষে করমা শতায়ু প্রার্থনা,
শােকসঙ্কটে তব অঙ্কটি বিলায় শান্তি সান্ত্বনা।
অভিমান করি তব বুকে পড়ি দেই গড়াগড়ি শৈশবে,
সব দিতে পারি ছাড়িবারে নারি তব গৌরব-বৈভবে।
জ্ঞান প্রেম আলাে তুমি বুকে আলাে হে বিরাট প্রাণবর্তিকা
পদধুলি চুমি শতবার নমি হে আদিজননী মৃত্তিকা।
১৭

পর্ণপুট
হরি প্রেমে নাচি দেই গড়াগড়ি তব দেহে তরি সন্ধানে,
সবার প্রণতি বহি যথা-ঠায়ে বিতর আশীষ সন্তানে।
তিলক চুম্ব দাও মা অলকে বুলাও হস্ত কায়ি।
মূর্তিতে তুমি মৃন্ময়ী মাতা চিত্তে দেবতা চিন্ময়ী।
তােমারি অঙ্গে গড়ি দেবদেবী, মেহে তব জ্বালি বর্তিকা
তব রােমাঞ্চে পূজি তাঁহাদেরে, জীবনজননী মৃত্তিকা।
তােমারি পিশিত-পিণ্ডে জনম, অন্ধজননী গান্ধানি।
শতনাড়ী পথে জীবরসদনে রেখেছ জীবন সঞ্চারি।
পাপে তাপে শাপে চারিদিক হতে লভি যবে শত লাঞ্ছনা,
অঞ্চল তলে লুকাইয়া তুমি শক্ররে কর বঞ্চনা।
দেহের দশায় জ্বালাও নিভাও প্রাণালােক স্থির বর্তিকা
তব ধূলি গণি স্বরগের মণি হে আদি জননী মৃত্তিকা।
ভারতবর্ষ।
সুন্দর
ওগাে, সুন্দর, তব মন্দিরে মােরে কর কৃপা করে পূজারী
ঢালি পায় তব জীবনের সব অর্ঘ্যবিভব উজাড়ি।
দাও এ কণ্ঠে মন্দার মধু-
রসতরঙ্গ, সুন্দর বঁধু,
তােমারি নান্দী পরমানন্দে-নবীন ছন্দে প্রচারি
১৮

মানসী পূজা
তােমার আসন বসন ভূষণ চিন্তামণিতে খচিব,
মনােদীপ আলি সারারাতি খালি আরতি দেয়ালী রচিব।
বনদেবীদের কবরীভূষণ
কুসুমগুলিরে করিয়া চয়ন
ভৰি আনি ডালা গাঁথি দিব মালা ওগাে ফুলদোলাবিহারী।
দিবস রাত্রি জুটিবে যাত্রী আমারি শঙ্খ বাদনে
সবার অর্ঘ্য নিজ হাতে তুলি দিব অঞ্জলি চরণে
বেদমন্ত্রে দীক্ষা আমার
দাও সুন্দর, ভিক্ষা আমার
পদতলে রব আমি শুধু তব সেবাগৌরব ভিখারী।
উপাসনা।
মানসী পূজা
একবার শুধু হেরি একবার নমি প্রভু।
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবােনা কভু।
একবার দরশনে একটী শুনিয়া কথা
একবার পরশনে যাবেনা এ ব্যাকুলতা
এস ওগাে মম মনে যথা দুখমুখ ব্যথা
সেথা তােমা-হেন ধনে লুকায়ে রাখিব প্রভু
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবেনা কভু।

পর্ণপুট
আজি ইন্দ্রিয়চয় রুদ্ধ করি আমি,
সে পথ তােমার নয় বুঝিয়াছি ওগাে স্বামী,
ধরি পথ মনােময় এস দেব, দিবাস্বামী
তথা যেন তব রয় চিরজ্যোতি ওগো প্রভু।
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবনা কভূ ৷
হৃদি মন্দিরে রাখি ইন্দ্রিয় দ্বারগুলি,
দ্বিধাভয় হীন থাকি একে একে দিব খুলি,
দিতে পারিবেনা ফাকি যদিবা কখনো ভুলি
ঢলে পড়ে যদি আখি হারান তবু প্রভু।
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবােনা কভু।
দ্বার বাতায়ন যত খুলিব হেরিবে সবে,
দীপারতি অনারত নিশীথে জ্বলিতে রবে,
দ্বারে হবে অবনত ধূপধূম-সৌরভে
ভক্ত জুটিবে কত চারিপাশে মম, প্রভু।
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবেনা কভু।
তারপর যদি মরি দেহ হবে ধূলিলীন,
মনােমন্দির ভরি তুমি রবে সমাসীন,
মন আর তুমি হরি সনাতন চিরদিন
যাবে সেবাইত করি নিখিল জনেরে প্রভু,
একবার শুধু লভি তৃপ্ত হবেনা কভু
ভারতবর্য।

ভক্তের মহিমা
ভক্তের মহিমা
ভক্ত ভিন্ন দেবতারে তব রক্ষা করিবে কে ?
বিনা ভকতের বুকের অস্থি স্বরগ শ্মশান যে।
ভক্তের কাছে লভি পরাজয়
ধন্য দেবতা দেন বরাভয়।
ভক্তের বাধা মাথায় করিয়া ভগবান বয় রে।
ভক্ত নহিলে বুকে ধরি’ তা’য় মানুষ করিবে কে?
ভক্তের হৃদি-তরণী বাহিয়া দেশে দেশে প্রভু চলে,
সে তরী ডুবিলে ডুবিবে দেবতা গভীর অতলজলে,
ভক্ত নহিলে কেবা বলাে আর,
নিতি নিতি নানা স’বে আবদার?
কে হবে তাহার জনক জননী সখাসখী ধরাতলে,
মনের মতন প্রাণের যতনে কে সাজাবে ফুলদলে ?
নিতি দেবতার সিনান করায় ভক্তের অাখিধারা
ভক্ত-দেবতা প্রেমে গলাগলি উৎসবে মাতােয়ারা।
চিরদিন অই ভক্ত-হৃদয়,
দেবতার প্রিয় বসতিনিলয়,
মন্দির বিনা হবে যে দেবতা একেবারে গৃহহারা।
আগ্নেয়ী তৃষা কে মিটাবে তা’র ভক্তির সুধা ছাড়া।

পর্ণটি
ভক্ত ভিন্ন কে দেখাবে পথ দুৰ্গম কান্তারে ?
উক্ত ভিন্ন সর্বগ্রাসী সে ভিক্ষা কে দিতে পারে?
ভক্তে ছাড়িলে নাহি ভগবান,
কেবা গায় গুণ কেবা রাখে মান ?
ভক্তের পদ নিজে ভগবান থােয়াইল জলধারে,
ভক্তের রথে সারথি 'তাইতে দুয়ারী ভক্তদ্বারে।
ভক্ত দেবতা হরিহরাত্মা সন্দেহ নাহি তায়,
রুদ্রেরাে চোখে ঝরে জলধারা ভক্তের বেদনায়।
ভক্তির জয় ভক্তের জয়,
গাহে দেব নর এ নিখিলময়,
দেবতা বন্দী ভক্তের দীন কুটীরের আঙিনায়,
দেবতা কাতরে ছল ছল আঁখি ভক্তেরি কৃপা চায় ।
ভারত।
উপাসনা
সেকি কভু বাসবে ভাল তুমি ভুবনময়,
এই স্বভাবের সকল শােভা পাথর যদি হয়
সেই পাথরে দেউল গড়ি
বেদী অচি, তাহার পরি
ধাতুর পুতুল পূজি’ যদি গর্বে গাহি জয়,
সেকি তুমি বাসবে ভাল ওগাে ভুবনময়।
২২

অলকাপুরী
সমীর যদি রুদ্ধ রহে চামর কেশর ফাকে ফাকে
কলধ্বনি বদ্ধ যদি ঘন্টা কাসর সানাই শাখে ;
থাকতে বিশাল সিন্ধু নদী,
গঙুষে হয় পাছ যদি,
কোশার বুকে তােমার তৃষার সলিল যদি রয়?
সেকি তুমি বাসবে ভাল ওগাে ভুবনময়?
কুসুম কানন মলয়গিরির কতটুকু গন্ধধূপে?
বিশ্বজোড়া নিলয় তােমার, পূজব তােমায় অন্ধকূপে ?
রবি শশী তারার মালায়
যায়না আঁধার এত আলায়,
হবে কি আর ক্ষীণ প্রদীপে মােহের আঁধার ক্ষয়?
সেকি তুমি বাসবে ভাল ওগাে ভুবনময়?
উপাসনা।
অলকাপুরী
হেথায় শুভ্র প্রাসাদ নিকর অভ্র ভেদিয়া রাজে,
দামিনীর মত পুরকামিনীরা বিহরে তাহার মাঝে।
চারু চিত্রিত কাচ বাতায়নে
চীন-চেলকের কেতনেকেতনে
শােভিছে ইস্ত্র নিকেতন সম ইন্দ্রায়ুধের সাজে
মরময় হনির অভ্র ভেদিয়া রাজে।
२७

পর্ণপুট
গুরু-গুরু উঠে মুরজধ্বনি বারিদমত্রোপম
কুটে কুটে শােভে কূটজমালিক। বলাকার শ্রেণীসম
পুর অলিন্দে কুট্টিমবুকে
নীর-লবাম নিঝর মুখে,
ঝর ঝর ঝরে মৌক্তিকমণিরত্ন রম্যতম
অলকাপুরীর সৌধ শােভিছে শারদ নীরদোপম ।
তথায় ললনা সমৃণাল লীলা কমলে ব্যজন করে,
নব অবদাত কুন্দ কলিকা অলকে পুলকে ধরে।
বিলেপি লােধ পরাগ মােহন
গণ্ডেরে করে পাণ্ডুবরণ
শ্রবণে শিরীষ চুড়াপাশে চারু নবকুরবক পরে,
নবনীপ শােভে সীমন্তিনীর সীথিপথে থরে থরে।
ষড় ঋতু তথা দ্বন্দ্ব ভুলিয়া একই দেহে হলো লীন,
যড়ানন সম বনগৌরীর অঙ্কেতে সমাসীন।
সারাটি বরষ ম লতিকায়
হাসে ফুলবালা বনবীথিকায়।
মঞ্জরী পরে মধু পিয়ে অলি গুঞ্জরে নিশিদিন,
রচিছে রসনা সরসীসতীর হংস সারণী মীন।
সারাটি বরষ সরসীকাসারে সরসিজ ফুটে রয়,
ভবনে ভবনে চিরভাস্বর শিখীর কলাপচয়,

অলকাপুরী
বিতত বহে মােহন মাধুরী
কেকাকাকলীতে মুখরিত পুরী।
নিশি নিশি যথা পৌর্ণমাসীর গরিমা গগনময়,
তিমির, তমালকুঞ্জেরাে মাঝে প্রবেশিতে পায় ভয়।
পরমানন্দ ভিন্ন তথায় আঁখিনীর নাহি ঝরে,
যাহা কিছু ব্যথা প্রণয়িহৃদয়ে মন্মথফুলশরে
প্রণয়কলহ অভিমান ছাড়া
প্রিয় যেথা নাহি হয় প্রিয়াহার,
নাহি শৈশব জড়জরা যেথা রূপে না ম্লানিমা ধরে,
চির যৌবন-বৈভব যথা বিরাজিছে ঘরে ঘরে।
বিম্বিত তারা পুঞ্জের প্রায় পাটল-প্রসূনে ভরা
তােরণ বেদিকা সােপান যথায় স্ফটিক মণিতে গড়া
যক্ষের চারু করতে
পুষ্কর যথা বাজে মধুরাতে
বাজায় বধূরা অদূরে তাদের মধুরা সপ্তস্বর।
কণ্ঠ তাদের নিয়ত কল্পতৰুজাত সীধুভরা।
মন্দাকিনীর সলীলশীকর-সুন্নাত বায়ে বায়ে,
শ্রমসম্ভব রােম-জললব বিদূরিয়া গায়ে গায়ে
যক্ষবালার। হেমসিকতায়
নিহিত করিয়া মণি মুকুতায়

পর্ণপুট
লুকোচুরি খেলে বেশভূষা ফেলে মার ছায়ে ছায়ে
বাজে মঞ্জীর উড়ে হেমরেণু লােল রাঙা পায়ে পায়ে
প্রণয়িণী যথা মধু যামিনীতে কুসুমের শষ্যায়
চপলদমিতকর্ষণজাত কৃত্রিম রােষণায়,
লাজ-আবরণী একহাতে ধরে
চূর্ণমুষ্টি ছুঁড়ে আন করে
নিলাজদৃষ্টি বিলাসদী পরে অন্ধ করিতে চায়,
নিঠুর নাথের হাসিতরঙ্গে সবি নিস্ফল হায়।
অংলিহ প্রাসাদের শিরে বিভ্ৰমশালা রাজে,
তঙ্করসম বাতায়ন পথে পশে মেঘ তার মাঝে,
তিতয়ে বধুর বদন-নলিন
চিত্রাবলীরে করিয়া মলিন
শীর্ণ হইয়া পলায় তুর্ণ ভয়ে সঙ্কোচে লাজে,
ধূপধূমসম ধূসর বরণে বাতায়নপথ সাজে।
নিশীথে যখন মেঘযবনিকা গগন হইতে সরে
গোয়ােজ্জল কৌমুদীছটা সৌধ শিখরে পড়ে।
নিতম্বিনীর নগ্ন হিয়াম,
চুম্বন করি উনােজে গড়ায়,
চত্রকান্ত-মালিকায় তার শীতসুরধুনী ঝরে,
রােমে রােমে পশি স্মরপীড়িতার তনুর উন্মা হরে

যক্ষের গৃহে লক্ষ্মী অচলা ময়ুর-সিংহাসনে
দিন যাপে তারা অপ্সরা সহ মধুর সম্ভাষণে।
ধনপতিগুণ-বলনারত
মধুরকণ্ঠ কিঃর যত,
তাদের সমাজে ঘুরে নিশিদিন বৈভ্রাজ উপবনে
অচলা তথা ভবনে জীবনে মনে প্রাণে যৌবনে
এবা।
অজয়
জয় জয় জয় অজেয় অজয় গৈরিকধারী সাধক তুমি,
ভাগীরথীনীরে সিনানে নেমেছ তেয়াগি ভূধরতাপসভূমি।
তুমি রসগু, যজ্ঞকুণ্ড নিয়ে ভাসায়ে রসের স্রোতে,
বিলায়ে দুপাশে সহজ-তত্ত্ব আসিয়াছ রস-সাধন পথে।
প্রেম পৰশনে সরস করিয়া রসহীন রূঢ় রাঢ়ের মাটী,
পণ্য আননি, পুণ্য এনেছ, আননিক স্কুটা, এনেছ খাঁটী।
বজ্রকঠিন বাহাবরণে কুসুম-কোমল হৃদয় ধর’
কঠোর যােগীর হৃদিকরে ঝরাও রসের নিঝর খর।
কেন্দুবিধ তরুতে ফুটাও কান্ত কোমল পদের মালা
জয়তু অজয় জয় জয়দেব, জয়তু বৃন্দাবনের কালা।
রামী রজকীর বসন তিতায়ে বিশালাক্ষীর আরতি সারি’
নানুরের ভিটে করি চির মিঠে এলে তুমি জ্ঞানদাসের বাড়ী

পর্ণপুট
“কানুর পীরিতি মরণ অধিক” এ যে বড় অভিমানের বাণী
উজানীর ঘাটে এ ব্যথা কেমনে ভাসাইয়া দিলে হে অভিমানী ?
ঢল ঢল কাচা অঙ্গলাবনি অবনীতে যার বহিয়া যায়
তার গুণগানে লােচনের সনে কীৰ্ত্তনধূলি মাখিলে গায়।
উদ্ধারণের উদ্ধারবাণী তােমারি কণ্ঠে শুনেছি প্রিয়।
শীর্ষেতে তুমি লয়েছ বাঁধিয়া কেশব গুরুর উত্তরীয়।
অভয়া ভক্ত সাধুপুত্রেরে দিয়াছ অটল ধৰ্ম্মে মতি
ছাগল-পালিকা বণিকজায়ারে করেছ বঙ্গপূজ্যা সতী।
জাতির গণ্ডী ভেঙে চল তুমি ভক্তেরে তুমি মাথায় ধরে
ব্যাধ গােপ তাঁতি বণিক রজক ভক্তির গুণে সবাই বড়।
কতনা ভক্ত কতনা সাধক কতনা কবিরে মন্ত্র দিলে।
কতনা গৃহীরে বৈরাগী করি হে রসিক তুমি সঙ্গে নিলে।
কত কুমুদের নয়ন মেলালে গােরাদ জ্যোতিশলাকা দিয়ে,
অমৃতবাৰ্তা ঘােযিল বলে, তব ভৃঙ্গার সলিল পিয়ে।
তব মৃদঙ্গ বাজে দ্রিম দ্রিম ছুটে আসে সবে যে যথা আছে,
তাথই-তাথই হরি-কীৰ্ত্তনে দুই তীরে সারা বঙ্গ নাচে।
তব উদ্দাম রসের বন্যা দুর করে ভাঙিয়া চলে,
“ঘর করি বার বার করি ঘর” বেণুর মন্ত্র শ্রবণে বলে।
ধন্য অজয়! ধন্য এ দাস-ধন্য আমার সমুদ্ভব
সেই পূত ভূমে যথায় তােমার নিত্য প্রেমের মহােৎসব।
মানসী।
২৮

প্রিয়া
প্রিয়া
সনাতনী।
অন্নপূর্ণ তব করে ভিক্ষা লভিবারে
সাধ করে হইয়াছি শাশ্বত ভিখারী।
যাচিয়া লয়েছি আমি অনন্ত তৃষরে
লভিবারে তব করে সুশীতল বারি।
তােমার অঞ্চল-স্নেহ লভিতে, নয়ন
হয়ে আছে যুগে যুগে অশ্রুর নিলয় ।
ব্যাধিরে করেছি সাধি এ দেহে বরণ
তব কর-কিসলয়ে হতে নিরাময়।
মধুবাণী শুনিবারে করি অভিমান,
মমতা লভিতে করি বিরহ-সৃজন,
শয়নে নয়নে শুধু করি নিদ্রা-ভান
জাগিয়া উঠিতে তব লভিয়া চুম্বন।
ঝরাইতে অবারি তােমার নয়নে
জনমে জনমে আমি বরি গাে মরণে।
প্রবাসী।
প্রাক্তনী।
কতবার স্বয়ংবর-সভ তেয়াগিয়া
এ কাঙ্গাল কণ্ঠে তব দেছ বরমালা।

পর্ণপুট
ঘুরিয়াছ বনে বনে আমার লাগিয়া,
কতবার সাজায়েছ বরণের ডালা।
কতবার রাখিয়াছ সতীতেজোগুণে,
শমনের দণ্ড হতে আমার জীবন।
কতবার সাজায়েছ তরবার তূণে,
বুথ-রশ্মি শতবার করেছ ধারণ।
নতুবা সহজ সবি হইল কেমনে?
কিছুই তােমার যেন নহেক নূতন।
কোথা পেলে? কই ? কিছু শেখনি জীবনে
সবি চির পরিচিত প্রবুদ্ধ প্রাক্তন।
কোন আদিকাল হতে আছ মাের সাথে
জন্ম হতে জন্মান্তরে মানস সত্তাতে।
প্রবাসী।
রূপময়ী।
তুমি মাের আঁখিতারা, তুমি মাের আলাে,
তুমি মাের ক্লিষ্টক্লান্তদৃষ্টিসঞ্জীবন।
এই বিশ্বখানি মাের লাগে বড় ভালাে
তােমার স্বচ্ছতা ভেদি নেহারি যখন।
বিশ্বেরে দেখালে তুমি ইন্দ্রধনু সাজে
লক্ষকোটী শিখী যেন পক্ষ মেলি নাচে।

ভিন্ন
সব মায়া ভাব রস, রূপ হয়ে কাজে
সব মন্ত্রগুলি যেন ঘুরে কাছে কাছে।
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা দীপ খদ্যোতিকা
মাণিক্য ওষধি-রশ্মি গড়েছে তােমায়।
শত জনমের মাের স্বপ্ন-নীহারিকা
কেন্দ্রীভূত পুঞ্জীভূত তব প্রতিমায়।
তুমি যাতে নাহি তাহা মায়া বিম্ব ছায়া,
কিম্বা ঘন তমঃ, যার নাহি বর্ণ কায়া।
এবাস।
রসময়ী।
আনন্দ-মদিরা তুমি নিত্য রসায়ন,
তােমারে পিইয়া মােরা চিত্ত ঢুলু ঢুলু,
রসের নিঝর, লভি তােমার জীবন
আমার জীবন-নদী বহে কুলু কুলু।
তব প্রেমমধুগঙ্গা এলো কি ধরায়
রসরাজপাদপদ্মে জনম লভিয়া ?
সুধাসিন্ধুসমুখিত মন্দারের গায়
তােমার অঙ্গুলি গুলি ফুটিল কি প্রিয়া?
সম্মিলিত সপ্তবর্ণ পরিণত বসে,
জিল তােমার শুভ্র গােরস হৃদয়।

পর্ণপুট
রক্তিম আনন্দ হাস্যে অধর বরষে
চন্দ্রবিম্বে যেন স্ফুট রক্তাম্বুজ চয়।
ইহেরে করেছ প্রিয়ে স্পৃহনীয়তম
জীবনে করেছ ঘন চুম্বনের সম।
প্রবাসী।
কৃষকবালার ব্যথা
আমার এমন কি হলো বন খা খা করে প্রাণটা খালি
ঘরের কাজে মন লাগে না বাড়ীর লােকে দিচ্ছে গালি।
আমার জ্বালা সে কি জানে ?
দুপুর রাতে বাঁশীর গানে ?
ঘুম কেড়ে লয়, রাত্রি জেগে চোখের কোণে পড়ল কালি,
রাতে তারে ঘুম কিরে নাই বাঁশী কেন বাজায় খালি ?
সকালবেলা হাঁক ছেড়ে সে চলে যখন গাের পালে,
গােবরঝুড়ি ঝখে ধরি তখন আমি বুই গােহালে।
গাই ছাড়িতে বাছুর ছাড়ি
দুধ পিয়ে লয় তাড়াতাড়ি,
মার কাছে খাই ঝটার বাড়ি পিষীর কাছে ঠো গালে
দেহটা মাের রয় গােয়ালে প্রাণটা চলে গাের পালে।
আমি যখন দাদার লেগে ভাত নিয়ে যাই বিলের মাঠে
কণ্ঠরি গান গেয়ে গেয়ে ভুয়ের আলে ঘাস সে কাটে,
৩২

কৃষকুলার ব্যাখা সে যদি চায় নয়ন তুলে, তবে আমার মনের ভুলে বাবলাবেড়ায় অচলা বাধে, পিছলে পড়ি পিছল বাটে; অই আ’লে মাের মনটা ললাটে শরীর চলে বিলের মাঠে। একদিনে সে দশটি বিঘা ফেলতে পারে একাই রুয়ে, বুধীর মত দুধােল গাই-ও এক লহমায় ফেলে দুয়ে। মস্ত যাঁড়ের শিঙটি ধরে ফিরায় সে যে গায়ের জোরে। তাল-নারিকেল গাছে উঠে পায়ের জোরে লাফায় ভুয়ে। দেখি তাহার সাঁতার কাটা অবাক হয়ে কী খুয়ে। কবির দলের দোহারীতে গায় সে মেতে পরাণ খুলে। বাউল-নাচে ঘুঙুর পায়ে, নাচে সে যে হাতটি তুলে। গাজন-দিনে সন্নিসি সাজ- বাবরীচুলের ঢেউখেলা ভজ, মন্তলার মালামাে তার, কার না দেখে পরা ভুলে? আমার ত কেউ নয়কো তবু দেমাকে বুক উঠে ফুলে। কানে গোঁজা সন্ধ্যামণি, নতুন তালের ছাতি কাবে, রাঙা ডুয়ে গামছা দিয়ে, যদি আবার কোমর বাঁধে, বিন্দাবনের কালার পারা করে আমায় আপন-হারা ;

পর্ণপুট
তারি পায়ে পড়তে লুটে, শুধু আমার পরাণ কাঁদে,
বশী পচন ধরে যখন কালার মতন মােহন ছাদে।
আমার এমন কি হলাে বােন, হুহু করে মনটা খালি,
ইচ্ছে করে কাদি কেবল সবাই আমায় দিচ্ছে গালি।
কুটুনা কোটায় আঙুল কাটে
হাট যেতে হয় যাই যে মাঠে,
মনের ভুলে হাত পা পােড়াই, মুনের সরা-ই দুধেই ঢালি।
আমার যে বােন আসছে কঁাদন, হুহু করে প্রাণটা খালি।
* ৫
মানসী।
পতিতা
তােরা যা-লো সবে বাহিয়া তরণী,-গাহিয়া গান,
আমি রই এই ঘাটে,
দেখি হেথা সতী-বধূর সুখের মধুর প্রাণ
পল্লীর নদীবাটে।
এই গাঁয়ে আসি পরি’ পরিণয়-সি দূরটিপ,
শুভ সন্ধ্যায় জেলেছিনু দেবদেউলে দীপ।
আঙিনা ভরিয়া শিশু-দেবরের সে কলতান,
স্মরিতে হৃদয় কাটে
তার কালো সই বাইয়া তরণী, গাইয়া গান,
আমি রই এই ঘাটে।
৩৪

পতিতা
বারাে মাসে তেরাে ব্রত পাৰ্বণ মহােৎসবে
রচেছি পূজার থালা,
মঙ্গল-কাজে এগােদের মাঝে হুলুর রবে
ধরেছি বরণ ডালা।
ঐ পথে নিতি বহিতাম কত কলসী জল,
সিক্ত রহিত মােরি করে গৃহ-তুলসীতল।
দিবাশ্রমজল নিশার সােহগে হইত মধু
অলকে দুলাত মােতি,
লােক-মুখে-মুখে রাক্ষসী, হলো লক্ষ্মী বধু,
সাক্ষাৎ ভগবতী !
ঐ যায় যেবা, আড়াল পড়িল অড়র বনে
যার খাম তনুলতা,
নব কৈশােরে পাতান সই সে, তাহার সনে
হইত মনের কথা।
স্নান করি ফিরি সুধা দিৰে মরি সবার পাতে,
ঝম লােহ শাখা চুড়ি আহ,উহার হাতে,
তক-তক করে পতি-বৈভবে ভবনতল,
সতী-গৌরবে ফিরে,
চুমিবে থােকারে, মুছিবে লােকের চোখের জল
লভিবে আশীষ শিরে।

পপুট
বান্দীর মেয়ে ডাক দিয়ে ফিরে ছাগল হাঁসে
জালি কঁাধে হাসি মুখে,
মণি বাঁধে ওষে কাদামাখা ছেড়া শাড়ীর ফাসে,
ও ও আছে কত সুখে।
শিশু কলরােলে গৃহভরা পশুপক্ষীদলে
লক্ষ্মী-জননী ঘুরিতেছে যেন করুণ ছলে,
পতি পায়ে শেষে মাথা রেখে আহা মুদেগো চোখ
যদি এ সধবা সতী-
ওর পদধুলি শিরে নিবে তুলি দেশের লােক ;
মরি রে ভাগ্যবতী।
বালিকার ব্রতে রচি দেবতার অধ্য-ডালি
ঢালিনু পিশাচ পায়।
লভিলাম প্রেমজীবনের হেমপ্রদীপ জ্বালি
ধোঁয়া আর কালিমায় ।
নিঝর তেয়াগি পিইনু মাঠের পঞ্চবারি,
উল্কার পিছে ধাইলাম ধ্রুবতারকা ছাড়ি।
গেল শুভব এক পলকের মােহন ভুলে,
ইহকাল-পরকাল ।
পিশাচ-শানে নিয়ে এল বৈতরণী কুলে
মারীচের মায়াজাল।

পতিতা
মুক্তা ফলিতে পারিত এ তনু-ক্তি ভরি
স্বাতীর পুণ্য জলে,
হইতে পারিত মম লাবণ্য-শ্ৰীমঞ্জরী
পরিণত মধু-ফলে।
মহারাণী হয়ে মম সংসার-সিংহাসনে
শাসিতে তুষিতে পারিতাম নিতি আপনজনে।
উঠিতে পারিত মম যৌবন-সিন্ধুনীরে
বৎসলতার সুধা,
হরিতে পারিত মাতৃজীবন, স্তন্য-ক্ষীরে
পিতৃলোকের ক্ষুধা ।
শত্রুরও যেন হয়নাক হেন অশুভ ক্ষণ,
কর এ বিধান দান,
হেয়জন-পেয় সুরার ঝে, গােরসধন
বেচেনাক, ভগবান ।
দাও শ্বাশুড়ীর লাঞ্ছনা শত, মলিন বেশ,
ননদীর গালি, আধপেটা ভাত, রুক্ষ কে,
উদয়-অস্ত দাও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম,
ক্ষতি নাই, ক্ষোভ নাই।
ফিরে নিতে রাজী সংসারপথ সুগম
ফিরে যদি আজি পাই।

পর্ণপুট
সবি শেষ হােথা ঐ জলে চিত। নীর তীরে
শেষ সব আয়ােজন।
হেথা প্রিয়জনে দহিয়া ভাসায়ে নয়ন-নীরে
ফিরিতেছে কত জন।
এ মুখে আগুননা দিবেনা, হায় কি পাপের ফল
অশৌচ পালিয়া সপিবে না কেহ পিণ্ডজল,
নুতন করিয়া এই পোড়া মুখে আগুনই কেন?
চির চিতা জ্বলে বুকে।
পড়িবে ললিত লালসা, লালিত তনুটি হেন
কুকুর শৃগাল মুখে।
তাের। যা-লাে ফিরে বাইয়া তরণী, গাইয়া গান
নগরের রূপহাটে।
দিনে দশবার বেয়ে মর দেহতরণীখান
নরকের পার ঘাটে।
হারাতে আমায় কেন এলি হায় সােনার গায়,
মধুযৌবন যাপিনু যেথায় সােহাগছায় ?
জীবনের জ্বালা আজিকে জুড়াতে মরিতে চাই
ডুবে এই নদী-নীরে।
রসাতলে আছি নদীতল দিয়ে নরকে যাই
তােরা ষালাে সখী ফিরে।
৩৮

গৃহলক্ষ্মী
গৃহলক্ষ্মী।
ভূষণহীন মলিনদীনা এস আমার প্রিয়া,
সজ্জা নাহি, লজ্জা কিসের? কাতর কেন হিয়া ?
গন্ধতেলে চুলের বাহার,
টোখোপা চাইনা আমার,
অনি বেশে সানে এসে দাড়াও রমণীয়া,
আন্তা আঁকা, সাবান মাখা নেইবা হলো প্রিয়া
গয়না পরা সয়না আমার আসতে হবে খুলি।
চাইনা আমি তৈরিকরা ময়নাপড়া বুলি,
সত্যকথা সরল কথা
শুনতে প্রাণের ব্যাকুলতা।
মুছতে তােমার হবেনাক হাতের পায়ের ধূলি,
গয়না যদি থাকেই গায়ে আসতে হবে খুলি।
সাজ করা আজ সইবন সই শােভন দেহময়,
বেগমসজ্জা দেবহুতির সহ নাহি হয়।
রঙ মাখলে কনকচাপার
ঐগরিমা বাড়বে কি আর ?
শ্যামের ভােগে আমিষ হেরে অঙ্গ শিহরয়।
কোন দুখে বা গােপন কর আপন পরিচয় ?

পট
রান্না ঘরের হলুদ মাখা ময়লা তেলে জলে
আটপহুরে কাপড় পরে অনি এসাে চলে।
নখ গেছে ক্ষয় বাটনা বেঁটে,
কুটনা কুটে আঙুল কেটে,
চুন খয়েরে দাগ পড়েছে তােমার করতলে,
শুভ্রতা ত হবেই ধুসর সেবাব্রতের ফলে।
তুলসী তলার মণ্ডলীতে দেব মণ্ডপ মাঝে,
হাত দুখানি কঠিন হলাে মার্জনারই কাজে।
প্রিয়ে তােমার বদননলিন
বহ্নিপে স্বিন্ন মলিন,
যজ্ঞ হতে উঠলে যেন যাজ্ঞসেনীর সাজে।
গৌরবে সই এস, কেন সঙ্কুচিত লাজে ?
সতীর’ অলক লৌহ হয়ে বেড়িল ঐ হাতে,
চঞ্চলা মা ত্রিলােকরমা পড়লাে বাঁধা যাতে।
আধার চিরে অরুণলেখা
তােমার শিরে সীথির রেখা,
অরুন্ধতীর রাঙা পায়ের অরুণ দ্যুতি তাতে,
জালায় নিতি সন্ধ্যারতি কুটীর আঙিনাতে।
ছদ্মবেশে ঘুরছে বলে চিনবনাক আমি?
পরশ দিয়ে করলে সােণা আমার নায়ে নামি।
৪০

চন্দন-ঘর গান
ভাগ্যবতীর পরম রতন
আয়ুষ্মতীর প্রাণের যতন,
শুভ্র শাখার স্বচ্ছতাতে চিনছি দিবাস্বামী,
জানিনা কোন্ পুণ্যফলে তােমার আমি স্বামী।
ধূপত আছে নাইবা হলে রূপার ধূপধার ?
হবিহীন বারাণসী পুণ্য বেশী তার।
পল্লীবনের মল্লীবধূ
রূপ না থাকুক আছে মধু
হেমকমলে কি হবে, নাই গন্ধমধু যার?
কুণ্ঠা কিসের কণ্ঠে যদি নাইবা থাকে হার?
মানসী।
চন্দন-ঘষার গান
দুয়ার খােলগাে
দুয়ার খােলগাে
চন্দন-বন-সুন্দরী।
এনেছি পুষ্প
শ্রীফলপত্র
সন্ধান করি বন ভরি।
ওন ঘন ঘন ঐ শখ বাজে
এখনো যে সতি, রত গৃহকাজে।
পরিতেছ বুঝি
কোষেয় শাটা
গঙ্গার জলে স্নান করি?
১

পর্ণপুট
গন্ধ-স্নেহের দীপখানি আলি
ধূপদানে ধূপগুগগুলু চালি,
আনাে মৃগমদ
পুষ্পের ডালি
দূর্বা তুলসী-মঞ্জরী।
তােমার কঠিন কাঠের দুয়ারে
করি করাঘাত—শুন, বারে বারে,
পূজার বেলা যে বহে যায়-যায়
কষ্ট যে হবে শঙ্করী।
পরিচারিকা।
ভারত-রমণী
দিত্মণ্ডলে শশিলেখাসমা অজ্ঞান-তম খণ্ডনী-
সূক্তজননী ব্ৰহ্মবাদিনী ঋষ্মওল-মণ্ডনী।
ইন্দ্রে তুষিয়া ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে বাঁধিয়াছ তুমি পুরে,
জ্ঞানলােচনের উন্মােচনের লাগি সাধিয়াছ দুশ্চরে।
অমৃত ভূমারে যাচিয়া নিয়াছ পদে ঠেলি ইহ-ক্ষুদ্রেরে
মরণে ডরনি বরণ করেছ নির্ভীক তেজে রুদ্রেরে।
যােগিবরে শুধু জঠরে ধরনি ভূষিয়াছ জ্ঞানসম্পদে,
ব্ৰহ্ম-বিচারে দিগ্বিজয়ীরে জিনেছ রাজার সংসদে।
ভারতরমণী জয় মা মূৰ্তা সামসঙ্গীত মূচ্ছন
তিমির-মগ্ন ভগ্ন দেউলে আজো করি তব অর্চনা।
৪২

ভারত-রমণী
ভৃঙ্গার-চীর-দণ্ড ধরালে স্নেহের পুতলি সন্তানে,
শতেক যােজন করেছ ভ্রমণ ব্ৰহ্মজ্ঞানের সন্ধানে।
পরম তত্ত্ব-তর্ক বিচারে বিচারিকা হলে গৌরবে,
নাস্তিকমতি-চরণে জুটিল মনীষা-সরােজ-সৌরভে।
তব পদতট চুম্বন করি মহাকাব্যের অম্ভোধি
শুনায় কীৰ্ত্তি-কীৰ্ত্তন তব নিখিল বিশ্বে সম্বােধি’,
বনকান্তারে প্রাণকান্তের আধ বসনের অংশিনী,
সুপথ নেত্রী হিতবিধাত্রী ঋতবতী শুভশংসিনী।
ভারত-রমণী সতী শিরােমণি লােকমাতা, শােকে সান্ত্বনা
দিশি দিশি তব ঘােষিত কীর্তি দেশে দেশে যােবনা।
রূপ রাজপদ, মান-সম্পদ তেয়াগিয়া, রাজনন্দিনী,
শম সংযম শৌৰ্য তপের অনুরাগে হলে বন্দিনী।
শীর্ষে ধরেছ কুটীরাঙ্গণে ধূলিমাখা দীনমঙ্গলে।
অন্ধ হৃদয়-বন্ধুর লাগি বেঁধেছ নয়ন অঞ্চলে।
একাধারে সখী, গৃহিণী, সচিব, শিষ্যা ও দেবী বন্দিতা
পতিরে বন্দ্যা, তােমার পূজায় সৰ্ব্বদেবতা নন্দিতা।
গৃহে গৃহে অপবর্গফলদা তুমি শরীরিণী জাহ্নবী
সতী-ধম্মের অরাতি মৰ্ম্মে হান’ ভীমশূল, ভৈরবী।
ব্ৰহ্মচারিণী ভারতরমণী মুক্তলালসা-বন্ধন
গহনমগ্ন মন্দিরে তব আজো গাহি গুণ বন্দনা।
পতিসহ তােমা চিতায় বহিয়া ধন্য দেবতা বহ্নি যে
তােমার শুদ্ধি পরখ করিতে আরো বিশুদ্ধ হন নিজে।
৪৩

পর্ণপুট
নিখিলজগৎ শীর্ষে ধরেছে তােমার গণিত-জল্পনা।
কালতিকা, সাধনা-নায়িকা, জাগাও কবির কল্পনা।
জিনেছ শমনে মরকেতনে অয়ি জয়ত্রী মণ্ডিত
প্রকৃতি-পালনে, শাসনে, ব্যসনে, রণে রাজনীতি-পণ্ডিত।
ভবন-কমলা, নবনী-কোমলা, পুণ্যবিমলা অন্নদা,
শৌৰ্যপালিনী ধৈৰ্যশালিনী বসুধার মত রত্নধা।
ভারতরমণী জয়ম। মুর্তা হৰিকীৰ্ত্তন-মুচ্ছ না।
তােমার কীৰ্ত্তি সূক্ত গাহিয়া ভক্তিতে কৰি অৰ্চনা।
পরিচায়িকা।
বসন্তসেনা
কুলটা ভবনে লভেছ জনম সাধকরে’ ত্যাগ করনি কুল,
সমাজধৰ্ম্ম পদে দলে’ তুমি দয়িতে তেয়াগি করনি ভুল।
সতীর স্বর্গ ত্যজি কলঙ্ক-পঙ্কে নামনি হে স্বৈরিণি ।
পঙ্কেরি মাঝে জন্ম তােমার, পুণ্যসুরভি পজিনী।
কামকলাকোলকুতূহলমাঝে জনমি কাননা-অন্ধ নও,
তুমিত কামের কিঙ্করী নহ, তুমি বুঝি তার ভগিনী হও?
অন্নের লাগি ওগো কিন্নরি। অবরেণ্যেরে বর’নি গেহে
সম্পদ তব নহেত কাম্য, স্বর্ণের খনি তােমার দেহে।
যক্ষের ধন লুন্তি এনেছে তােমার কণ্ঠ, তােমার বীণা,
রাজরাজন্যে ভৃত্যেরাে মত গণ্য করিতে করযে ঘৃণা।
৪৪

কসেনা
সুপুরুষ বিট, শ্রেষ্ঠী, নটো বৃথা লুটে পড়ে তোমার পদে,
মণিউষ্ণীষ পাদপীঠ তব, স্তব নাহি শুন’ গর্ব মদে।
গজবাজি বাধা মৰ্ম্মর দ্বারে কুজে পারাবত রজতথামে।
হ তােমার চিত্রসেনের প্রাসাদ যেনগাে মর্ত্য ধামে।
কিসের অভাবে, বিষের বেদনা? এলােকেশে কেন গৌরবিনি
শিলাকুট্টিমে লুটে লুটে চোখে ঝরাইছ শােক-মন্দাকিনী ?
কনক হয়েছে পাবকের সম, রজত, হয়েছে ফণীর লালা,
বৃশ্চিকসম দংশিছে হৃদি হীরাগজনিধি মণির মালা।
রত্নের ধূলি চোখে দিয়ে তব করিল বিধাতা প্রবঞ্চনা,
নারী-জীবনের পরম কাম-পাওনি প্রিয়ের প্রেমের কণা।
সেবকশীষ নত হয় যত তােমার অরুণ চরণ তলে,
প্রিয়তম পদ সেবিতে ততই প্রাণ গলে তব নয়ন জলে।
কল্পলতিকা ছড়ায়ে মুকুতা সারারাতি লুটো ধরণীতলে,
নির্বাক নবযৌবন তব তনু-মণিদীপে বৃথাই জলে।
বহনের দুখ সহন কঠিন ত্যাগের সুখ যে মুখের সার,
কতদিন ব’বে ওগাে পূজারিণী দাসী-জীবনের অর্ঘ্য ভার?
দানে-দীন হয়ে দুলালে বেজন মাটির খেলনা দিয়াছে তুলি
শেষসম্বল উত্তরীয়টা সপেছে তােমায় আপনা ভুলি’,
সুমেরুসমান বিত্ত তােমার দুহাতে বিলাতে পারিবে যে,
জানি, চাহ দেবী, সেই দেবতার চরণযুগল করিতে সেবা।
সঙ্গীত তব বেদনাকরুণ রচেছে উদাস মােহন মায়া,
বসতৃষার মরীচিকা মাঝে বয়ে তুলেছে গহন ছায়া।
৪

পর্ণপুট
বিদায়
বিগত যামিনীর
হষমার
মিলন-মেলা অই মলিন ম্লান,
নিদয় হয়ে তােরে হৃদয় হতে তুলি
বিদায় দিতে তার বিদরে প্রাণ।
সানাই বিনাইয়া করুণ তান তুলে,
দারুণ নিপীড়নে অরুণ আঁখি ফুলে,
এমনি একদিন
মালিনী-আশ্রমে
ঋষিরও চোখে এলে অবান,
আমরা গৃহী হায়
তনয়াবা,
মায়ায় দুর্বল মুহমান।
বংসে প্রাণােপমা
ভবন-রােশম
কেমনে বু’বগে মা তােমারে ছাড়ি?
হােলীর পরদিনে
শূন্য দোলতলা
আবিররাঙা যেন, এঘর বাড়ী।
এ গৃহে প্রতি রেণুকণিকা তুমি-মাখা
চরণরেখা তব আঙিনাভরা আকা,
রােপিত লতিকার। লুটাৰে স্নেহহারা
ফুকারি হবে সারা সাধের সারী।
তােমারি করে সাজে বাতিটি জ্বলিবে না,
প্রভাতে ঝরিবেনা ঝানির বারি।

বিহার
বিদায় দিতে হবে, এখানে কেন হবে?
দেউলে বরণীয় সেখানে তুমি,
হেথাত নাই সাথী এ তব খেলাপাতী,
এ তব নহে ব্ৰতসাধনা-ভূমি।
মােদের গৃহ হেথা আঁধার হবে, হােক,
তােমার প্রেমে সেথা জলুক হেমালােক,
হৃদয় টুটে তবু
বিদায় দিতে হবে
নয়নজলে চাদ-ললাট চুমি।
এখানে নন্দিনী
আদর-নন্দিতা,
বন্দ্যা মন্দিরে সেখানে তুমি।
যাহার চরণে
অর্ঘ দিনু তােমা
পরাণ হতে সেষে পরমপ্রিয়,
এ ভব-অর্ণব
উত্তরিতে সদা
ধরিয়া থেক তার উত্তরীয়।
তুক শুভ, তব সেবায় জীবলােক,
সতীর যশে শাখা শুভ্রতি হােক।
দুঃস্থ দীন হীনে
শান্তি-সান্ত্বনা সতত দিও,
পরম দুল
জীবনবল্পত
চরণপাবে শরণ নিও।
দুঃখে দুর্দিনে
৪৯

পর্ণপুট
প্রাণের সাধ যাহা তােমার হােক তাই,
ইহার বেশী কি মা আশিস-বাণী ?
যশের জ্যোছনায়
রসের ঝরণায়
ভর’মা সংসার, চাদের রাণী ।
হ্রী তব হােক ভূষা, হােক অবিচল।
হােক ধী-মণ্ডিত তােমার চারুকলা।
সতত আশ্রিত
দুখীর অশ্রুতে
আর্জ বহে যেন আঁচল খানি,
তােমারি শির’পরে যেন মা চিরতরে
বিরাজে বিধাতার অভয়পাণি।
উপাসনা
বহুরূপী
বিশ্বপতি,—বিশ্ব ভরি তােমায় ঢুড়ে মরি
ডাকি সদাই কোথায় তুমি দাওহে দেখা মােরে,
হঠাৎ যদি এস কোনাে মূর্তিখানি ধরি
ভাবতে মনে শঙ্কা লাগে, বরবাে কেমন করে।
কোন্ রূপে যে আসবে তাহার কিছুই নাহি জানা,
বহুরূপী,-তােমার রূপের ঠিকঠিকানা নাই ;
হারাবােকি ক্ষেপা যেমন পরশ পাথর থানা
হারিয়ে ফেলে বাকী জীবন খুঁজলে ফিরে তাই ?
=

মঙ্গল-চী
কাঙাল হয়ে এসে—যদি ছেড়া কঁাথার ঝুলি
কাজের সময় দুপুর বেলায় পাত’ আমার দ্বারে,
কেমন হবে—যদিই আমি নিঠুর বাহু তুলি
চোখ রাঙিয়ে দিই তাড়িয়ে পথের পর পারে ?
কুষ্ঠী হয়ে এসে যদি আলিঙ্গিতে চাও
শুয়ে পড় আমার খাটের নরম গদিটিতে
কেমন হবে যদিই বলি আরে রে দূর যাও,
ভৃত্যে কহি হাসপাতালের পথটি দেখাইতে ?
ভৃত্য হয়ে এসে-যদি নিত্য করে ক্ষতি,
করি পীড়ন তাড়ন তােমায় কুটীর অজুহাতে ;
শত্রু হয়ে করলে পরখ আমার মতি গতি-
একটী খাতের শােধ-যদি দেই শতেক প্রতিঘাতে ।
তাই বলি নাথ দেখতে তােমা চাইব না আর আমি
যদি কভু তােমার দেখা যােগ্য নাহি হই।
ধরতে যেদিন পাবনা বুকে সর্বভুতে, আমি
ডাব সেদিন জোরগলাতে “কোথায় তুমি, কই ?
गान
মঙ্গল-চণ্ডী
ওগাে গৃহস্থ,-মাতা মঙ্গলচণ্ডী এসেছে বারে,
পূজা দাও ওগাে—চির শুভ হবে তােমাদের সংসারে।
সিন্দুর-মাখা-পুত্তলিকায় ঝুলাইয়া ঐ বাঁকে
কসী বাজাইয়া, দেখ দেখ, আহা দ্বারে-ঘরে কেবা হাঁকে।

পপুট
দুই মুঠা চাল দুইটী-সুপারি দাও দাও ডেকে ওরে
ওর ডাকে প্রাণ চমকিয়া উঠে থমকি কেমন করে?
কাশীর আওয়াজে কার গলা যেন সকরুণমুরে বাজে,
বুঝি—সিন্দুর-ছন্নে দোলায় ছলনাময়ী মা রাজে।
বঞ্চক বলি দূর করি ওরে-করিওনা বঞ্চিত,
হীন যাঙ্কারে ধর্মের নামে করেছে সে উন্নীত।
দেবতারে তুমি কর যে ভক্তি, কৃপা কর’ অভাগায়,
এ খ্যাতি তােমার অক্ষয় হােক ক্ষুন্ন করােনা তায়।
কর’না বিচার দেবতার নামে দুই মুঠা তুলে দিতে
ঠিকঠিকানায় পৌঁছিবে, যাবে জননীর বেদীটিতে।
একলা আসিলে পাছে তুমি তারে পথে দাও দূর করি’
আসিয়াছে তাই ভিক্ষা মাগিতে মায়ের আঁচল ধরি।
দীন দুলালের কর ধরি দেবী অতিথি তােমার দ্বারে,
কাঙালে তাড়ায়ে ভ্ৰম ক্ৰমে তুমি তাড়ায়ে দিওনা তারে।
ওগাে চণ্ডীর সুখীসন্তান!-তব ভাণ্ডার ঘরে
অনেক ছেলের গ্রাসাচ্ছাদন গচ্ছিত থরেথরে।
ধত কর ব্যয় তার মাঝে জেন’, সব হতে খাটী তাই
যে দুটী মুঠায় প্রাণে বেঁচে যায় ফকির ভিখারী-ভাই।
ৰারি ধন তুমি তারে কর দান,-তবু হয় লাভ ধ্রুব,
-তনয়-কাঠ মায়ের আশিস বণ্টন করে শুভ।
উপাসনা।

অন্তর্ধান
“নের মাঝে লুকিয়ে গেল আমার মানস উৰ্ব্বসী,
“অভাগা এ পুরুরবার আশার-সুমধুর
আশার-সুমধুর শশী।
অধর পাকা বিফলে,
চরণ দুটী থলকমলে,
চুলগুলি তার মিলিয়ে গেল তলাল ঝাউয়ের কুঞ্জবনে।
তাহার ভূষার শিঞ্জ-রণন-ভৃঙ্গকুলের গুঞ্জরণে।
অঙ্গ তাহার লতিয়ে গিয়ে জড়ালাে কোন বৃক্ষ’পরি,
মুখের বাণী, পাখীর গানে মুখর, বন-বক্ষ ভরি।
কিসলয়ের তাম্র-রাগে
আঙুলগুলি রম্য জাগে।
তারুণ্য তার উঠলাে ফুটে নিখিল তরু-বল্লী-প্রাণে,
• লতায় পাতায় দুকুল দুলে, নুপুর বাজে ঝিল্লীতানে।
মনের মাঝে লুকিয়ে গেল আমার মায়ার অপসরী।
- নয়ন ভরে পাইনা তারে, ফিরে না সে রূপ ধরি।
চুলগুলি তার গভীর কালো
নিরাশাতে তাই মিলা’লাে,
রক্তচরণ,—উঠলাে ফুটে শশাণিতঝরা যন্ত্রণাতে,
ষ তাহার পরশ তাহার জাগছে বৃথা-
সানাতে।

পট লাবণ্য তার,-মােহ হয়ে ফেলে মােরে অন্ধ করি, তাহার হাসির ফেনায় ফেনায় উঠলাে হিয়ার বন্ধুভৰি। স্বপন হয়ে—নীলাম্বরী আছে আমার জীবন ভরি’ অঙ্গ তাহার ভঙ্গী তাহার সঙ্গ তাহার লক্ষপাকে হয়ে স্মৃতির নিবিড় লতা জডলাে এই বক্ষটাকে। প্রবাসী। সঙ্গীতসুন্দরী কণ্ঠের অচ্ছােদহ্রদে সােপানে সােপানে, কনক-কঙ্কণ কনি’ কে অই কিন্নরী, উঠে তীরে ঢালি জল কল কল তানে নামে ফিরে ভরিবারে সােণার গাগরী। একি খেলা সারাবেলা মিছে উঠা নাম, বুদ্ধিজীবী দেখে বলে ‘এ নারী পাগল। বিষয়ী, ভৃত্যেরে কহে ‘থামা ওরে থামা’ ভাবেন সমাজপতি,--‘কুলটার ছল। ভেকেরে জড়ায়ে ফণী-ফণা তুলে চায়, তার শিরে ছায়া রচি নাচিছে ময়ূর- মরাল,-মৃণাল ত্যজি দিগ্বিদিকে ধায়, তটে তটে বাজে জলতরঙ্গ মধুর। লাক্ষারাগে ফুটে লক্ষ প্রেমের নলিন, আনন্দ মূচ্ছনে লুটে কবি-মনােমীন। ৫৪

বৌ-কথা-কও
বৌ-কথা-কও
রে নিয়ে, রে পাণি, আজো তাের গলিলনা হিয়া,
কহিলি না কথা হয় চাহিলি না আজিও ফিরিয়া ?
কতযুগ কল্প গেল কি দুর্জয় অভিমান তাের,
কত রবি এল গেল কতনিশি হয়ে গেল তাের,
দয়িত যাচিল দয়া পদ্ তলে,-হয়ে কৃতাঞ্জলি
‘অনিদান অভিমান মঞ্চ প্রিয়ে মুঞ্চ প্রিয়ে’ বলি,
কাতর কাকুতি করি নিরাশায় ত্যজিয়া পরাণ,
পক্ষিজন্ম লভি আজো ভাঙাতেছে তব অভিমান।
ওগাে বধূ কথা কও ক্ষুদ্রকণ্ঠ গেল যে বিদরি—
যাহা খুশী দণ্ড দাও, অয়ি চণ্ডি পাষাণী সুন্দরী।
কথা কও কথা কও সৃষ্টি যেগাে যাবে রসাতলে,
দেখাদেখি গৃহে গৃহে যদি হেন অভিমান জলে।
মানসী।
জলরাণী
মকরপতির ককুদে বসিয়া দুলে
সলিলের মহারাণী।
হ্রদনদনদী-গদগদ নাদে তার
মুখরিত রাজধানী।

পণপুট
দশন হইতে হাসিলে মুকুতা ঝরে,
অধরের রাগে–বিক্রম-দ্বীপে ভরে,
কথাটী কহিলে চলে সন্ত্ৰমে ডরে
স্রোতে পােতে কানাকানি।
তারার দীপালী নাচায়ে আরতি করে
দিগন্তে-ইত্ৰাণী।
নক্র করিছে বজ্র করিয়া গ্রীব।
আদেশের অবধান।
দিক্করিকরে রচিত তােরণে কিবা
বৃংহন-জয়-গান।
শিরে তরীর বিতান প্রতান ওড়ে ;
শীকর-নিক-জনিত জড়িমা ঘােরে,
চঞ্চলানিল,-অঞ্চল তার ভরে
কল কল তুলে তান।
মৃণালতন্তু দুকুলের নাই তার
কূলে কূলে অবসান।
শফী-নয়নে কাজল এঁকেছে দীঘি
পরাণের কালিমায় ।
বরুণছত্র বারুণী ধরিয়া রয়
সঘন গগন গায়।

জলৱণী
সারসবৃন্দ ব্যজন করিতে ছুটে,
ইন্দীবরের চামর,চঞ্চুপুটে।
চরণসকাশে মরাল-দুতেরা জুটে,
বার্তা বহিয়া খায় ;
মীনগুলি রচে বেড়িয়া বেড়িয়া কটি
মঙুল মেখলায়।
ৰারিকুঞ্জর কুম্ভ ভরিয়া আনে
তীর্থের জলে নিতি,
তিমিরাজ করে সলিলােচ্ছ,সদানে
অভিযেক যথারীতি।
তপনবি-ললাটিকা শােভে ভালে,
অঙ্গরাগের সুষমা ইন্দু ঢালে
বলাকামালিক গলে দুলে, শৈবালে
কল্পিত তার সীথি,
সিন্ধু-তুরগ-গণ
গাহে বন্দনা গীতি।
ট
অর্পে সাদরে ভূধর-লক্ষ্মী তার
গৈরিক উপায়ন।
ক্ষেত্ৰকানন **ত্ৰপুষ্প-ভার
করে পায় নিবেদন।
জননীর চুমা, ব্যজনীর বায়ু, ছায়া,
লভেছে দিঠিতে সরল তরল কায়া,

পর্ণপুট
বুলায়ে তপ্ত অাখে অঞ্জন মায়া
ঘুমে করে নিমগন।
স্নিগ্ধ চরণ-অরুণ-বরণে ফুটে
মুগ্ম সরােজগণ।
গম্ভীরধম কস্তু একটি করে
ঘােষিছে বিজয়বাণী ;
বরাটকময় মঞ্জুষ মণিভরা--
ধরেছে অন্য পাণি।
ক্লিষ্ট লাট তাপজালা রাখে পায়
তরুছায়াময় মরু, তার করুণাম,
ত্যজি বিদ্রোহ হুতাশন ক্ষমা চায়
চির পয়জয় মানি।
বরাভয় লয়ে,-রাজে মঙ্গলময়ী
গৌরবে বরুণানী।
প্রবাসী।
মণিকারের প্রতি
ক্ষুদ্র হাতুরিটি হাতে শুধু রাত্রিদিন
দীপ জালি’ অন্ধকোণে ওগো মণিকার।
অক্লান্ত, একান্তচিত্ত, মুগ্ধ, শ্রান্তিহীন
সন্তর্পণে গড়িতেছ হেমচন্দ্রহার।

পাঁচ মিনিটের কর্তা
ওগাে শিল্পি! কল্পনার প্রতি অনুরাগ,
আকুতি, মাধুরী সুধা বিন্দু বিন্দু করি
চালিতেছ। ক্ষুদে ক্ষুদে, প্রতি ক্ষুদ্রভাগ,
আজন্মসঞ্চিত অর্ঘ্যে দিছ ভরি ভরি।
একি শুধু তুচ্ছ তব দগ্ধোর লাগি ?
একি শুধু শুষ্ক শীর্ণ মুদ্ৰামুষ্টিতরে?
লভনি কি তৃপ্তি-সুখ ওগাে অনুরাগি,
রসের নিঝরে--মৰ্ম্মকুহরে কুহরে ?
প্রেমিকের অকৃত্রিম আনন্দের ধারা,
সাধনায় করেনি কি তােমা আহার?
ভারত
পাঁচ মিনিটের কর্তা
আজকে বসি’ ঠাকুরদাদার কেদারায়,
থােক। আমি গিয়াছি তা ভুলিয়া,
ছোঁয় না মাটী, দুলাচ্ছি তাই দু’টি পায়
খবরের এই কাগজ খানা খুলিয়া।
চশমাটা তঁার, কাণে দিছি লাগিয়ে
চোখ ছাড়িয়ে নাকের’পরে ঝােলে যে।
গুড়গুড়িটার নলটা নিছি বাগিয়ে,
লাগছে নাকি ঠাকুরদাদা বলে হে ?
কে আছ হে, এস দেখি এ দিকে,
তামাক দিতে বলনা রামনিধিকে।

পর্ণপুট
সাদা কাগজ সামনে এত, কি লিখি ?
পটলা কেন জটলা করিস ওখানে?
রােকা নে, যা,—পান্তোয়া আর জিলিপি
গাল ভরে আত গিয়ে দোকানে।
হাসছ মাখন ? মেজাজ আমার জান না
এক্ষণি যে পারি তােমায় তাড়াতে।
শাল জোড়া আর লাঠিটা ছাই আন না?
যাব একবার বেড়াতে পূর্ব পাড়াতে।
চালাও আজি ঢালাও পােলাও খিচুরী
হবে নাক অভাব কোনো কিছুরি।
ডাকের চিঠি রাখবে আমার দেয়াজে,
জবাব টব লিখব আমি দুপরে।
{ গ্রাহ মােটেই কচ্ছেনাক এরা যে
কড়া শাসন চাই ইহাদের উপরে।
পাওনাদারে বলবে কিছু পাবে না,
দেখলে গাড়ী বলবে দোরে থামাতে,
নাপিত এলে আজকে ফিরে যাবে না
গোপদাড়িটা হবেই আমায় কামাতে।
যাচ্ছ কোথা? হয় না বুঝি কেয়ার, এ?
দেখছে না-যে বাবু তােমার চেয়ারে ?

পাঁচ মিনিটের কর্তা
ঠাকুর দাদা যদিই পড়ে আসিয়া
ভাবছো বুঝি, হব বেকুব বােকাটি ?
হাত বুলিয়ে বলবে আমি হাসিয়া
‘এ-ঘরেতে গােল করাে না থােকাটি।
একশতবার মক্সাে কর লেখাটা
মাধব খুড়ো আসবে তোমা পড়তে
আজকে যে চাই নামতাঘােষাশেখাটা
নইলে প্রহার আছে তােমার বরাতে।
পাকা চুল মাের তুলতে বাবার মামাকে
ভাতে না হয় পাঠিয়ে দিও রামাকে।
রােদে রােদে আজ হবে না বেড়ানাে,
ঘরে বসে’ ছবিই আঁকো শেলেটে।
হবে না আম কুড়ানাে, নাই এড়ানাে
দুধ খাৰে আজ চেলে চায়ের পেলেটে ?
পাড়ার যত দুষ্ট ছেলে বকাটে
সঙ্গে মিশে বদমায়েশী শিখালে।
দুপুর বেলা বদ্ধ রবে কপাটে।
ছুটি পেলে পড়লে বেলা বিকালে,
ছাদের পরে উড়িয়ে দিবে বুড়িটি
সঙ্গে শুধু থাকবে দিদি-বুড়িটি।

পর্ণপুট
মনােবিজ্ঞানের ধারা
ছাত্রাবাস-কক্ষে বসি রাত্রি হলে তাের
মনােবিজ্ঞানের রুক্ষ নীরস কঠোর
অংশগুলি পড়িতেছি। ধরি ক্ষীণ আলো
করােটি-গুহার মাঝে অন্ধকার কালো
গুহবন্ধু-কূপে কূপে বেড়াতেছি ঘুরি’
স্নায়ুমণ্ডলের ক্ষেত্রে খনি খাত খুড়ি
ঢাড়িতেছি তত্ত্বরত্ন-সত্য মহামণি,
পেশীপুঞ্জে আকুঞ্চন প্রসারণ গণি।
হেন কালে প্রজাপতি বাতায়ন দিয়া
পুঁথির চিত্রাঙ্ক পরে বসিল উড়িয়া,
বিশ্লিষ্ট বিন্যস্ত চিন্তা একটি নিঃশ্বাসে
উড়ে গেল পতঙ্গের পরে বাতাসে।
সানা’য়ে উঠিল বাজি সাহানা রাগিণী
বনায়ে জাগিল নেত্রে বাসন্তী যামিনী
কূজন গুনময়ী।-লাজ বরষণে
বাজিল মঙ্গল-শঙ্খ-কল-হরষণে,
চন্দন-কন্তুরী—ধূপ-লুগন্ধ-বিস্তারে-
পূর্ণকুম্ভে, পুণ্য বৃক্ষে, মঙ্গল আচারে
হুলু হলু কোলাহলে কঙ্কণ নিনে,
ভরিল কল্পনাকু হারিদবরণে।

মনােবিজ্ঞানের ধারা
তারপর ধীরে ধীরে
সন্নত নয়নে
কে আসে ও আলিম্পনামণ্ডিত প্রাঙ্গণে ?
পল্লবিনী সঞ্চারিণী লাবণ্য-লতিকা
সালঙ্কার, হস্তে লয়ে মল্লিক-মালিক।
অশােক পাটল পুঞ্জ ফুটাইয়া পায়
কে বালিকা নিশান্তের দীপসম চায় ?
তারপর শুভদৃষ্টি–প্রাণ-বিনিময়
সাতপাকে শতপাকে জড়িত হৃদয়।
তারপর সে পরশ মনােরসায়ন,
শ্রীখণ্ড বিলেপস স্নিগ্ধ বিনােদন।
পুলক-প্ররােহময় হলো অঙ্গ তরু
শ্যাম স্বপ্নে ভরে গেল জীবনের মরু।
সমগ্ৰ নিখিল হলাে প্রফুল্ল পেলব
আবেশে নমিয় আসে নয়ন-পল্লব।
কিন্তু একি! কোথা গেল পরীক্ষার পাঠ?
কারাগৃহে বসে গেল সৌন্দর্য্যের হাট।
অধ্যাপক। ক্ষমা কর, কেন কক্ষ আখি ?
নিদেশ পালিতে তব রেখেছি কি বাকী ?
এ জল্পনা, এ কল্পনা—একি মনছাড়া?
ছাড়িয়া গেছে কি মনােবিজ্ঞানের ধারা ?
অর্চনা।

পর্ণপুট
কালরূপ
ভােমরা তােরে কুরূপ বলে? হলেই বা তুই কালাে,
তাের রূপে যে সুন্দরেরই শ্রীমন্দির ঐ আলাে।
সুন্দরের বন্দনার লাগি
কুঞ্জ বনে আছিস জাগি ;
অঙ্গটি তাের কু বটে,-সুক্ষ্ম যে তুই প্রাণে।
রূপের ভেজে মধুর যাহা
সেবন করিস, মধুপ, তাহ,
ঢালিস্ পুনঃ মঞ্জুকল গুঞ্জনে—আর গানে।
হলিই বা তুই কালো
অনিন্দ্য তুই, সুন্দরে তুই বাসি যে রে ভালাে ।
ও কালাে মেঘ, লােচন-রুচির, যদিও তুই কালো।
বুক চিরে—তুই ফুটাস চির সুন্দরেরই আলাে।
ইন্দ্রধনুর স্বপন দেখিস,
চন্দ্ররেণু গায়ে মাখিস,
অধীর শিখী নাচে-রে তাের মেদুর পরশনে।
সুন্দরেরই বার্তা কহিল,
যক্ষপুরে পশরা বহিস,
ধরে তাের সুধার ধারা বর্ষণে-আর পনে।
কে বলে তাে কালো ?
সুন্দরের স্পন্দনে তােৰ-পতাকা উড়ালো।
৩৪

ওরে গভীর দীঘল দীঘি, হলিই বা তুই কালাে,
তাের কুপে যে উঠল ব্যেপে সবার রূপের আলাে।
রূপের মােহে মরাল ছুটে,
রূপ ছড়ায়ে কমল ফুটে,
সােম তপনের প্রেম স্বপনে উজল তনুখানি।
রূপসীরা গানের ছলে
নােয়ায় মাথা চরণ তলে,
তাের মুকুরে মুখ দেখেরে রূপনগরের রাণী।
কে বলে তােয় কালে?
ৰন তাের আলিঙ্গনে বরাজ জুড়ালাে।
ওরে আঁখি কাজল বরণ, যদিও তুই কালাে,
তাের বিহনে গভীর আঁধার, বহি রবির আলাে।
সুন্দরের এ টি শােভন
তুই করেছিস দৃষ্টিলােভন,
চাঁদ তারকা মাগে জীবন তো তারকার দোরে।
তুই অনিমিখ, রূপের পানে,
মুদে থাকি রূপ ধেয়ানে।
দেবতা বসানের অর্থ দিল তােরে।
কে বলে তােয় কালাে ?
শিল্পীরা সব কটাক্ষে তাের কল্পনা ছুটালাে।
ভারতী।

পর্ণপুট মরণ মঙ্গল (ম্যাথু আৰ্ণন্ড) ঢাল’ ফুল কুঙ্কুম চন্দন,—আর যাহা মধুমঙ্গল- শান্তিশেষে শান্তি লভি সেষে সুখী, তার সাধনা সফল। বিশ্ব তার হাস্ত চেয়েছিল হাশ্যে সেত ভরে দেছে তায় হভরে হৃদি ক্লান্ত আজি দিনান্তের শান্তিটুকু চায় শােক-তাপ-ঝড়-ঝ মাঝে উড়ে ঘুরে অবসন্নতায়, পাখাটি হইল অবশ,-লভিয়াছে শান্তির কুলায়। সঙ্কীর্ণ দেহের কক্ষে রবে রুদ্ধশ্বাস তার আত্মা কেন ? মৃত্যুর বিরাট পরিষদে নিঃশ্বসি’ জুড়াল আজ যেন। এতিভা। শেষের দিন (আলালুদ্দিন রুমী) অন্তিমশয়নে হেরি, করােনা হাহাকার প্রিয় বন্ধুগণ! সমাধি খনিতে দেখি মায়ামু, ভ্রমভরে করােনা লােদন। যেদিন সকলে মিলি উল্লাসে করিতেহবে মহামহােৎসব সেদিন ললাট-বুকে করহানি হাহুতাশ করে কি বান্ধব ? আমার প্রিয়ের সহ স্বগীয় মিলনের হবে নাট্যলীলা,- অনধিকারীর লাগি বিচিবে যবনিকা সমাধির শিলা। যখন প্রিয়ের গৃহে,—বিজয়মঙ্গলগান হইবে আমার, সে কেমন হবে বন্ধু, তখন তােমরা যদি কর হাহাকার? ভারতী। r

সন্ধ্যাকালী
আত্মদান
(জালালুদ্দিন রুমী)
ওগাে সুন্দর বথিবর,—ওগাে সুন্দর শিকারী,
আঁখি-বাণে বিধ হৃদয়-হরিণ মানস-কাননবিহারী।
বঁধু,—নিশিনিশি তােমা লাগিয়া
শুধু-তারকার মত জাগিয়া,
তনু মন ক্ষীণ, হয় দিন দিন তব পথ পানে নেহারি,
মগন কর হে তােমার কিরণে হে রবি গগন-বিহারী।
প্রভু,তব উদ্দেশে ছুটিয়া
কভু,-বনপ্রান্তরে লুটিয়া,
এ নদী, কান্ত, হয়েছে শ্রান্ত, চরণ-প্রা-ভিখারী,
উদেল চল কল্লোলে টান’-উল্লোললীলা-বিহারী।
ওগাে সুন্দর রথী,ওগাে সুন্দর শিকারী
তৰ প্ৰেমজালে বন্ধন কর চঞ্চল চিত আমারি
ভারতী।
সন্ধ্যাকালী
আজ বরষা দিবসশেষে তােমার পূজা সন্ধ্যাকালী,
শশান রচে অৰ্য তােমার উস্কামুখীর দেউটি জালি,
ধূপ জালে ঐ আলেয়াতে,
কঙ্কালে,-মাল্য গাঁথে,
চিতায় চিতায় হােম করে সে মজবসার অজ্য গলি।

পর্ণগট
বিদ্যুতের খঙ্গাঘাতে পশ্চিমাকাশ-যুপাঙ্গনে।
কালাে মেঘের মে মহিষের রক্ত ছুটে প্রস্রবণে।
দুলছে তমালঝাউয়ের চামর,
তুলছে সমীর তুমুল উমর,
কল্পিত অই নীপ, যুথীতে শ্বেতাজে নৈবেদ্য-থালি।
খদ্যোতের ভােগ আরতি জালে জবার রক্ত শাখে,
দাদুরী দেয় হুলুধ্বনি ঢাক বাজে ঐ মেঘের ডাকে।
বিবনে,-ঝিল্লী নিকর,
বাজায় পূজা কাসর ঝাঝর,
অট্টহাসে,-পবাসে,-নদনদী দেয় করতালি।
ভারতী।
পল্লীলক্ষ্মী
এস-বঙ্গের উটজানে ফিরে পল্লীশ্রী জননী।
কল্যাণি, অয়ি মঙ্গলমষি, উল্লাসে ভরি অবনী।
আন’ পুষ্টিসৌষ্ঠব পুন,আনমা তুষ্টি, তৃপ্তি,
আন’মা স্বাস্থ্য, শক্তি, স্বস্তি,-গতে অরুণ দীপ্তি।
গেহময় আন’ হাসিলতান, দেহময় তােল’ রূপের তুফান,
আন’ মেহময়ী যশােদার মত দক্ষিীরসরনবনী।

भनौमी হংস-কপােত-কূজনমুখর কর প্রাঙ্গণ-অঙ্ক- ধূপসৌরভে, দীপগৌরবে দেউলে বাজাও শব্দ। শােভাও মঞ্চ ফলসম্ভারে, ফুলমালঞ্চ-অলিঝারে, এস আলিপনা-চাকচিত্ৰণে বিথারি চরণলানি। সতীসীমন্তে অক্ষয় কর শুভ সিন্দুর বিন্দু। মেহসিন্ধুর অঙ্কে দোলাও শিশু-নন্দন ইন্দু। পার্বণৰত পৰ্বপূজার আন’মা দূর্বা দুর্ভোপচার, গন্ধের ডালা, কুন্দের মালা, আরতির থালা, ব্যজনী। কুশেকাশেশরে নীবারে পুষ্পে উশীরে শম্পে ধান্যে, শােভাও ক্ষেত্র,-ভরাও পাত্র পিষ্টক-পরমান্নে। ফিরুক সরসী স্বচ্ছশীতল। মীনময়ী মীননয়নােলা, এস সুপুষ্ট ধেনুগগাষ্ঠীতে ভরি গােষ্ঠের সরণী। প্রসূনপ্রসবে ঋদ্ধা হউক ভবনব্রততী বন্ধ্যা, পুন মৃদঙ্গ মন্দিরা রােলে নন্দিত হােক সন্ধ্যা। ব্যায়ামে ব্রহ্মচর্যের বলে অশথনি সর্জের তলে রচি তপােবন আন’ সে পাবন শৌর্যযাগের অরণি। পুষ্করে ব্যাধি ক্ষেত্ৰসীমায়, এস’ দূরে রাখি বন্যা, বিক্রম-মণিমঞ্জুষা করে,-শ্যামসমুদ্র-কন্যা! কুম্ভে বাজায়ে কাকণ, বরিবে সুজ দিগ্‌ধুগণ, ফিরে এস বাহি স্বর্ণশিল্প-পরিকল্পিত তরণী। উপাসনা।

হাফেজের নৈরাশ্য
কি হবে স্মরিয়া চেগিলের সেই গােলাপকলির দিন?
হৃদয়ের মধু উন্মাদনা যে হয়ে আসে ক্রমে ক্ষীণ।
কে শুনিবে ম্লান হতাশের গান চারিপাশে শুধু চাই,
নিভে আসে দীপ, নুয়ে পড়ে দেহ, কোথাও দরদী নাই।
প্রেয়সীর চোখে নাহি উষালােক, গােধুলিধুসর আজি,
উপলের মত ব্যথিছে কলিজা অশ্রুগুটিকারাজি।
শত্রুর দেশে যাত্রী হয়েছে, মিত্ৰ আছিল যারা,
নবযৌবন-প্রমােদসৌধ—হয়েছে লৌহ কারা।
যে দীপালী শুধু বিলা’ত রশনি এবে তা’ ঢালিছে কালি,
সখার শপথ বিপথে গিয়াছে বিথারিয়া চতুরালী।
ভন ভন করে শুধু মাছিগুলো মধু নাই মৌচাকে,
একটি কণাও খােশবু নাই এ আতরদানের ফাঁকে।
লক্ষ্যবিহীন দিনগুলি গেছে ব্যর্থ কাজের ঘােরে
জানিনা চামেলিবন্যা আসিয়া কখন গিয়াছে সরে।
ক্লিষ্ট জীবন চাপাল পৃষ্ঠে,-জঞ্জাল যত তার,
উষ্ট্রের সম করেছে কুজ—ভারের উপর ভার।
কি লাভ করিনু এত বসন্তে নাহি পাই কিছু খুঁজি,
কোরকের শুধু শুকান ওর কঁাটা যে করেছি পুঁজি।
ঘােড়ার লাগাম খসে পড়ে যায়,-যৌবন এবে ক্ষীণ,
রেকাবের পরে টলিয়া কাটিবে শেষের কয়টা দিন।
পরিচারিকা।

সত্যভারতী
কমলার কৃপা
'।
রাজেরাে দুন্দুভিনিনাদে সম্বােধন করে দম্ভভরে,
তাই শুনে চঞ্চল। দেবতা এস তার রত্নাসন পরে।
বণিকেরা করে তুৰ্য্যনাদ, চাটুস্তুতি-প্রশস্তি গাহিয়া,
গঞ্জে তার এস ব্যস্ত হয়ে,-পণ্যভরা তরণী বাহিয়া।
রক্তস্নাত অসি আন্দোলিয়া দ্য, ডাকে ভেরীর গর্জনে
ইন্দিরা বন্দিনী হয়ে রও আনন্দেই তাহার ভবনে।
কৃষকের নাই আড়ম্বর শীর্ণশঙ্খে দীন আবাহন
পশেনাক তােমার শ্রবণে তার ক্ষীণ করুণ বােধন।
ছিলে যবে ক্ষুদ্র বালিকাটি ছিলে যবে সমুদ্রের গেহে,
খেলেছিলে শঙ্খগুলি নিয়ে অঙ্কে চুমি সন্তানের মেহে,
আজি বুঝি হয়েছ তরুণী,-তূরী ভেরী হরিয়াছে মন
কতিপুটে পশেনা তাই সে শখের দীন আবেদন।
উপাসনা।
সত্যভারতী
মাগােতােমার চরণ-জ্যোতি শলাকায় ফুটাও তাদের আখি,
যার—শুধু ভান করে, চিনেনা তােমারে স্বার্থ তিমিরে থাকি।
ভূমারে তাহার হেলায় ঠেলিয়া
বিরাট-মহা-রুদ্রে ফেলিয়া
তুচ্ছ ক্ষুদ্রে উচ্চ গণিয়া,-নাচিছে মাথায় রাখি।

পট
পূর্ণেরে তারা জানিতে চাহেনা,-খণ্ডেরে ভাবে পূর্ণ।
বক্ষে ধরিতে না পারি সমূহে কৰািরে চায় চূর্ণ।
শাশ্বত বে-দূরে পরিহরি
অনৃত অসারে রয়েছে আঁকড়ি,
তেয়াগি সত্যে-ভূষণ করেছে, ভূয়ো ভণ্ডামি ফাকি।
বিধাতার হতে পরম বিধাতা নিজেদের করে গণ্য
ঋকিবন্ধে—ছাগের তুঙে,-অচিয়া হয় ধন্য।
তুমিষে জননী নিখিল জননী
নহে নিজ গৃহ অখিল অবনী
মহামানবের অরাতিগণেরে একথা বল’মা ডাকি।
পরিচালি।
রুদ্রবরণ
ক্ষুদ্র মােরা তবুও তার রুদ্ররূপে কভুনা ভরি,
শিখা বক্ষে ধরে’ হাসিয়া গৃহ কক্ষে বরি।
মুণ্ডমালা কণ্ঠে যার তুণ্ডে জ্বালা, খঙ্গ হাতে,
মণ্ডপে সে চণ্ডিকারে অর্জি অমাবস্যরাতে।
পিশাচ প্রেত নৃত্য সাথে প্রমথ যথা অট্ট হাসে
শবের হৃদি-আসনে তথা ডাকিতে পারি সর্বনাশে।
ক্রীড়ার তরে অধিকারি সিংহটারে টানিয়া নেই,
মকমুখে গও রাখি’ণাপদে অর্ঘ্য দেই।
१२

পিনাকে জ্যা-আরােপ করি ত্রিশূলে দেই সিদূর একি
নিদ্রা লভি অনন্তের হাজার কলা-ছায়ায় থাকি।
সহিতে পারি গহন-দাহ যজ্ঞ ভূমে উগ্রতপে,
তীব্র শুচি-তপন তলে বসিতে পারি লক্ষপে।
ক্ষুদ্র মােরা তবুও তার রুদ্র তেজে কভুনা ভরি,
বজশিখা বক্ষে সহি আপন গৃহককে বরি।
ডরিব কেন শমনে যদি দমিতে পারি জীবনপণে
1?
ক্ষতির ভীতি না থাকে যদি, রিক্ত যদি মরণে রণে।
কাড়িতে পারি তারা ককলিত বর আশিস্ ৰদি
পড়িতে পারি ঋপায়ে যদি হেরিয়া রণ-রুধির-নদী,
নাচিতে পারি ঈশান সাথে পিছল পথে বিষাণ নিয়ে,
পরিয়া মহাশঙ্খমালা করােটি ভরে গরল পিয়ে,
যুঝিয়া যদি জিনিতে পারি অভয় পাশুপতটি তার,
খুঁজিয়া যদি আনিতে পারি পাতাল হতে মণির হার,
শায়কে অাখি বিলেখি, তারে সপিতে পারি অর্ঘ্যরূপে,
পশিতে পারি কুণ্ডমাঝে, রেপিতে পারি মুণ্ড যুপে।
ভরিব কেন সকলি ডারি নিজের কিছু না যদি গণি,
পড়িতে পারি চক্রতলে,-ধরিতে পারি নক্ৰ ফণী।
ক্ষুদ্র মােরা তবুও তারি ক্ষুদ্রতারে কভু না ভরি
শিখা বক্ষে ধরে’-হাসিয়া গৃহ-কক্ষে বরি।
ভাৰতৰ

পটি
হরির দয়া
জানিগাে প্রভু তােমার প্রথা ব্যথায় তাই ডরি না,
রমার দয়া-তােমার হেলা, তাহারে যেন বরিনা।
দলিয়ে তুমি পালন কর, জ্বালায়ে তবে কলুষ হর,
ঠেলিয়া দুরে সরায়ে দিয়ে বিপদে রাখ সদা হে।
পীড়িয়া তুমি পাড়াও ঘুম, দংশি ঠোটে খাওযে চুম,
বক্ষে চাপি দোলন দাও, আদরে তােল কাদায়ে।
বিধিয়া তায় করুণা ঢালো ঘরষি চিত আলােক জালে
বিদারি, বুকে বিতর জ্ঞান এ ভবপাশ মােচনে।
আঘাতে তুমি জাগাও প্রভু, চোখের পাতা টানিয়া কভু,
মারিয়া তুমি বাঁচাও,-হরি-মরণহীন জীবনে।
জানিগাে প্রভু তােমার প্রথা ব্যথায় তাই ডরিনা,
রমার দয়া;-তােমার হেলা, তাহারে যেন বরি না।
নামায়।
প্রবঞ্চিত
প্রেমিকপ্রাণের অর্ঘ্যে সেজে হলে ধনীর নন্দিনী
রূপলালসায় কপটকথায় অপ্রেমিকের বন্দিনী।
কার ধনে তার মন ভুলালে ? জান কি কোন্ বীরদুলালে
পাঠাল স্বরুধির ধারা তােমার চরণ রঞ্জনে?
৭৪

প্রিয়ার চিঠি
কোন মণিকার অনুরাগী
গড়লে নুপুর রাত্রি জাগি?
ঐ শােন তার নামটি বাজে মঙুমধুর শিঞ্জনে।
বুকের স্নায়ুতন্তু জালে
কোন্ যুবরাজ অন্তরালে
বসন তােমার বিরচিল? নাম লেখা কার অঞ্চলে?
মালাকরের ছদ্ম লভি
তােমার বাগে তরুণ কৰি
মালা গেঁথে কষ্টে তােমার দুলাইল কৌশলে।
সে সব তুমি খোজ নিলে না, ওগাে ধনীর নন্দিনী,
রসিক সুজন ফেলে,-হলে অবসিকের বন্দিনী।
ভারতী।
প্রিয়ার চিঠি
হাতের লেখা নেহাৎ কঁাচা লাইন হরফ নয়ক সােজা,
কতক কতক যাচ্ছে পড়া কতকগুলো যায়না বােঝ।
বানান-ভুলে,নানান ভুলে-ব্যাকরণের-শ্রাদ্ধ করা,
এলােমেলাে আবলতাবল অনেক বাজে কথায় ভরা।
কোন্ খানে বা লিখতে গিয়ে লেখেনিক লজ্জাভরে,
লিখে আবার কেটে দেছে,—সেটাই বেশী চক্ষে পড়ে।
তবু এ মাের মনের মতন, হিয়ার রতন, প্রিয়ার চিঠি,
তাহার কালাে তরুণ আঁখির এ যে হাজার করুণ দিঠি।
চতুরতার আমিষ নাহি প্রিয়ার আতপ অন্নকূটে
মােমের কুসুম নয়ত, এ যে বনের কুসুম পত্রপুটে।
৭৫

পণপুট
ভাষার ক্ষতিপূরণ এতে ভালবাসার গভীরতায়
প্রতি অখর মুখর হয়ে বলছে মােরে কত কথাই।
এ শুধু তার নয়ক চিঠি—আমিত তার হৃদয় জানি,
আলােছায়ায় কালো সাদায় এ তার হিয়ার ছবিখানি।
সেই আঙুলের পরশ লভি সেই অলকের গন্ধবায়ে
প্রিয়া আমার অনেকখানি জড়িয়ে আছে চিঠির গায়ে।
কোথায় পাব সাজান ফুল! এ যে আমার শিউলিতলা।
এলাে মেলো আপনা এ-নাইক এতে শিল্পকলা।
হার ছিড়ে এ মুক্তাগুলাে ছড়ান যে পথের পরে,
হারাবেনা একটিও এর পথিক-প্রাণনাথের করে।
ছিন্নমমঘের ভানুর কিরণ,ইন্দ্রধনু বক্ষে আঁকে,
হিয়ার অমল নীলিমা তার দেখছি রেখার ফাঁকে ফাঁকে।
এ যে আমার প্রিয়ার লিপি তাহার হিয়ার রক্তে লেখা,
মীর নিকষ-উপল পরে প্রেমের উজল কনকরেথা।
সংকর।
চারি
অপরাধ
তব মন্দিরে অযুত ভক্ত বন্দিছে নিশি দিন,
আমি তার মাঝে অবােধ অধম অক্ষম দীনহীন,
তব পুরােহিত বলি পরিচয় দিয়া দেবি আপনায়,
বঞ্চনা করি কত জনে আমি অপরাধী, হায় হায়।
৭৬

প্রদীপের পুনর্জন্ম
কৃপা করি দেছ কমলকাননে পশিবার অধিকার,
সাজী ভরি আমি তুলেছি তােমার শতদল কতবার,
বিভ্রমভ্রমে বিলাস লীলায় করিয়াছি বিনিয়ােগ,
কমলমধুরী তােমায় না দিয়া আপনি করেছি ভােগ।
অমৃতকল্প তব প্রসাদের বণ্টনভার পেয়ে
গর্বে মত পাত্রপাত্র দেখিনিক হায় চেয়ে।
তােমার মহিমা বুঝে কিনা বুঝে করিনিক বিচারণ,
শৃগাল কুকুরে তােমার প্রসাদ করিয়াছি বিতরণ।
বিত্তবানের দুয়ারে কতই বহেছি অর্ঘ্য ভেট,
বন্দনা কত করেছি ছন্দে করি মাের মাথা হেঁট,
তােমার পদারবিন্দ-মাধুরী—সিক্তকণ্ঠে মম।
দেবি ভগবতি ভারতি, আমার চারি অপরাধ ক্ষম।
প্রদীপের পুনর্জন্ম
আবার মােদের আধার আগারে প্রদীপ জ্বলেছে আজ,
আজিকে প্রেয়সি, ঘুচেছে কুণ্ঠা প্রণয়লীলার লাজ।
ঘরের প্রদীপ নয়ন মেলিলে মুদিয়া রহিতে আঁখি,
সঙ্কোচে,-মুখ-পঙ্কজ তব অঞ্চল দিয়ে ঢাকি।
পরিহাস-পটু চটুল নিজে নিভালাম মুখবায়
কুসুম-শয়ন-রজনী হইতে নিভিয়া রহিল হায়।

পর্ণপুট
নির্বাণ পেলে জন্ম হয়না, এ-কথা কে-আর শোেনন ?
আবার বৰ্ত্তী ভেছে জনম জ্বলিছে এ গৃহকোণে।
মােদের দোহার হৃদয় পাবকে কনক প্রদীপ জলে,
তােমার অঙ্কবেদিকায় তব হৃদি-মেহ তায় গলে।
সােনার প্রদীপ জ্বলেছে বলিয়া মাটীর প্রদীপপ তাই
সারারাতি জ্বলে, দহে পলে-পলে, আজি বিশ্রাম নাই।
বাছনির লাগি আজিকে তাহার বাড়িয়াছে সমাদর,
কখন জাগিবে উঠিবে সে কেঁদে কখন পাইবে ডর।
সচেতন ঘুম, জাগ’ দশবার, রাতে বাড়িয়াছে কাজ,
বহুদিন পরে আবার এ ঘরে প্রদীপ জ্বলেছে আজ।
মানী
শিশুর প্রতি
সারাটি দিন কি যে কথা বলিস অনর্গল
হেথায় ও-সব শুনবে কেবা বল?
যে দেশ হতে এলি’ রে তুই সেই মুলুকের ভাষা
হেথায় কেহ বুঝবে কভু,-মিছে সে তার আশা,
ও মা পারিজাতের বনের কলকুজন ভুলি
শিখতে-হেথায় হবে তােমায় মত্তভূমের বুলি।
মকুজন চলবেনাক বাছা-
এ নয় তােমার কুকানন—এ যে তােমার খাঁচা।
৭৮

হাসি
সারাটি দিন কিযে করিস খেলনাগুলি নিয়ে
কি হবে হায় বনা ও সব দিয়ে?
যে দেশ হতে এলিরে তুই সেই মুলুকের খেলা
সইবেনা কেউ, চলবেনা ওই হেথায় সারাবেলা।
খেয়ালখেলায় যােগ দেবেকে ? ওযে নেহাৎ-বাজে।
কারাগারের মতন হেথায় কাজের শাসন রাজে।
হেথায় লীলা নেইক ধারা
এৰে তােমার ত্রিদিব নহে, এষে তােমার ধরা।
পরিচারিকা।
হাসি
( পারভকবির ভাবাবলম্বনে)
যাতনা বেদনা আসুক যতনা কেন,
নির্ভয় চিতে ভুলােনা হাসিতে যেন।
বস্বজন-কৃপায় কৃপণ হয়ে,
দূরে দূরে সরে যায় যাবে যাক চলি,
যবে চারিধার ভরিয়া আঁধার আসে,
বিধু-তারাগণ তখনাে যেমন হাসে,
হাসিতে ভাসায়ে সকল তমসা রাশি
অস্ত সাগরে হেসে হেসে পড়ে ঢলি।

পট
সব কার অবরুদ্ধ রইবে, নােক
হাসির ফোয়ারা শুধু শতধারা হােক,
যাব প্রাণ দিতে দিতে কাদিতে কেন?
হাসিতে হাসিতে নাড়ী ছিড়ে যেন মনি,
গােলাপ যেমন আঁধারে আলােকে হাসে,
শিশিরে বালা বাতাসে পুলকে হাসে,
হেসে হেসে শেষে বাটা হতে খসে পড়ে
লুটোপুটি হেসে ভুয়ে যায় গড়াগড়ি।
মােসলেম ভার।
শান্তিমঠ
আমার কুটীরে এনেছ লক্ষ্মী তােমার দ্যুলােক অলকাভূমি,
দুরিত দৈন্ত দুঃখ,-পুণ্য যবনিকা দিয়ে ঢেকেছ তুমি।
হাবিহাৰে-সিনানপিধানে বুঝিতে পারিনা আমি বেদীন,
মুছি মালিন্য ক্লিন্নতা, গৃহে করিয়াছ শুচি কলুষহীন।
ধপ ধপ করে বসন ভূষণ তক তক্ করে শয়ন খানি
বাসনকোসনে ঝঝ শােভা দিয়াছে তােমার পাবনপাণি।
উঠানে সিদুর বিন্দু পড়িলে প্রতিকণা তার যায় যে তুলা,
তুলসীতলাটি গােময় লিপ্ত লুপ্ত তথায় বালুকাধুলা
উট প্রাচীরে জীর্ণতাগুলি ঢাকিয়াছ পট চিত্র দিয়া,
খচ্ছ উজল কাচ সজ্জায় জলে আলাে গৃহ উজলিয়া।

পুত্রহারা
জীর্ণ বসনে সূচিকাভরণে নবীন জীবন দিয়েছ প্রিয়ে।
যত দারিদ্র্য-ছিদ্র-বিবর ভরেছ, ভদ্রে,-ঋদ্ধি দিয়ে।
কেমনে শােভাও বহুব্যঞ্জনে কুশুভ্র অন্ন থালা?
সুধাতুলিকা কি অঙ্গুলিগুলি, কোথা হতে সবি মাধুরীচালা?
রাজমায়ােজনো চেনা আমার তব শাকান্ন যেমন রুচে,
এনে দেবতার ভােগের মতন, চিররােগীদেরে অরুচি ঘুচে।
যখন যা চাই হাতে হাতে পাই, ওগাে জঙ্গমা কল্পলতা,
অমৃতলােকের ছায়া সুশীতল মারুতে জুড়াল সকল ব্যথা।
এ ভবনে জড় লভেছে জীবন, ধরিয়াছে জরা তরুণ শােভা,
তুচ্ছ লভেছে উচ্চ আসন,-কুৎসিত, হলে নয়নলােভা,
তােমার যত্নে ধেনু ঘটোপ্পী, তৰু ফলঢ্য, মধুপ-ধূত,
শিশুরা হৃষ্ট, পশুরা পুষ্ট, অতিথি তুষ্ট সাদরাহত।
মুখ কমলের কলগুঞ্জনে তুষিছ শ্রবণ পদ্মননা,
চরণ নখরে বুঝিবা ঠিকরে পরশমণির দ্যুতির কথা।
দেশের গর্বী ধনীর দুলাল ভ্রমণের ছলে সেদিন এলো
আমার কুটীরে শান্তিদেবীর মঠ-অভিধানে ভূষিয়া গেল।
পুত্রহারা
আবার আমায় এই বয়সে ধরতে হলে হাল,
আবার আমায় আপন হাতে ছাইতে হলে চাল,
আবার দুনী সেচতে হলো মাখতে হলে পাঁক,
আবার ছানী কাটতে,হলাে বইতে হলাে বাঁক।
চ

পর্ণপুট
লাঙলজোয়াল চেলিয়ে আমি ধরিয়েছিলাম চুলে
বিক্রী করে ফেলেছিলাম কাস্তেকোদাল গুলাে
নূতন করে সে সব যখন গড়িয়ে নিয়ে আসি
আপন দশা ভেবে, এত দুখেও পেল হাসি।
বিক্রী করে ফেলেছিলাম ভাল বলদ জোড়া
তার ঠায়েতে নিয়ে এলাম দুটো বুড়ো খোড়া।
লােহার দুনী বিক্রী করে বাঁধিয়েছিলাম পীড়ে
আজকে ফুটো কাঠের দুনী যােগাড় করি ফিরে।
আঁকা পুতে মই দিয়ে ঐ বানিয়েছিলাম তাক,
সারকুড়টা বুজিয়ে ফেলে লাগিয়েছিলাম শাক,
ভেবেছিলাম সুখ আয়েসে কাটবে বুড়ােকাল ;
আবার আমার এই বয়সে ধরতে হলো হাল।
পাঁচকড়িকে ঠকর মকর শিখিয়েছিলাম বলে
কয়লাখাদে কাজকর্ম করত আসানসােলে।
বল্পে পাঁচু,-“কিছু কিছু পাচ্ছি এখন, বাবা,
নিজের হাতে চাষ করে আর কষ্ট কেন পাবা?
তা ছাড়া চাষ করলে, গ্রামে খাতির থাকে কই ?*
প্রথম প্রথম সে সব কথায় আদৌ রাজী নই,
শেষে অনেক ধরায় আমি দিলাম জমি ভাগে।
আবার লাঙল ঠেলতে হবে ভাবিইনিক আগে।
পায়ের উপর পা চাপিয়ে তামাক খেতাম বসে
বসে বসে ধরল শেষে নানান রকম দোষে।
আজ
৮

সকাল’ খাই সকাল’ না’ই দিনে ঘুমুই পড়ি
একটুখানি বাদল-ওষে কেসে কেসে মরি।
সয়নাক রােদ সয়নাক জাড় সয়না মেহৎ,
বসে থেকে ধরল বাতে চলতে নারি পথ।
মাটী হলাে এই খাটুনীর কাঠামােটা ক্রমে
আবার কোদাল পাড়তে হবে ভাবিইনিক ভ্রমে।
অনেক আগে পালিয়ে গেছে পুণ্যবতী সে ত,
এ অভাগাও আজকে ওদের কাছেই চলে যেত।
পাঁচুর দুটো কচিকাচা বাছার পানে চেয়ে
আবার সিনী সেচতে হলে চোখের জলে নেয়ে।
আজ গতরে নেই তাগােদ ঠেলতে নারি হাল,
মাটী যেন পাথর কঁড়ি বসতে না চায় ফাল।
হাঁফিয়ে পড়ি একটুখানি টানতে গিয়ে দুনী
ধানের সাথে আজকে চোখের জলের বীচন বুনি।
নজর ঘােলা, পাঁজর ভাঙা, মাজাতে জোর নাই,
কেমন করে বেঁচে আছি ভাবি কেবল তাই।
বৌমা বলেন “চালিয়ে নেৰ কোনাে রকম করে
ধান ভেনে কি দাসীপনা নিয়ে পরের দোরে,
তুমি বাবা,—এই বয়সে মাঠ যেওনা আর।
তাই কি তারে করতে দেব থাকতে কখন হাড়।
উঠি পড়ি কেঁদে কেঁদে কাদায় জমি কই
আর গুছি পুততে হলাে চষতে হলে ভুই।
।

পর্ণপুট
সূৰ্য্যমণি
হিন্দুর গৃহ প্রাঙ্গণতলে আমি এ শবরীবালা
এক কোণে রহি দীনাকুন্ঠিতা সহি ঘৃণা, বহি জাল।
ওগাে—সবাই যখন ফুটে
মাের-তখন ফুটিতে নাই।
আমি-সাঁজে ভােরে নাহি ফুটি
দিন-দুপুরে ফুটিগাে তাই।
হায়-আমি যে শবরী বালা
আমাতে হয়না দেবতার পূজা, হয়না কবরীমালা।
আমি দিন যাপি পত্রলেখার নীরব বেদনা নিয়া।
জীবনের এই খেয়া নায়ে লুটে মীনগন্ধার হিয়া।
ওগাে-ভাব কি, হৃদয় প্রাণ
একা—তােমাদেরি শুধু আছে ?
আর,হৃদিহীন করি বিধি
এই-শরীকে গড়িয়াছে ?
বাক্‌-সে কথা বলে কি ফল?
তাই বলে কেহ মুছিবেনা দীন অশুচির আঁখি জল।
বৈকাল হতে সন্ধ্যামণিরা করে বারনারী সাজ,
কতই আদর লভিছে তারাও, হেরি আর পাই লাজ।
এক প্রকার বর্ণ ফুল-দুপুর বেলায় ফুটে বলিয়া আমাদের দেশে
ইহাকে পরমণিও বলে।
৮৪

সূৰ্য্যমনি
ঐ-চামেলি, ইরাণীগুল
শুনি—তাহাদের জয়জয়।
প্রিয়,-বিদেশী হা হানা,
কই ?—সেওত হিন্দু নয়।
যা-সে কথা বলে কি কয়?
পাতাবাহারের গরবিনী মেয়ে ‘মা-গোঁসাই তারা নয়।
আছে যাহাদের মাধুরী শােভা শােভন গন্ধমােদ।
তাহাদের সনে তুলনা চলে না, আছে এতটুকু বােধ।
তবে--আমিত ঘৃণিতা, তবু
আছে-মােয়রা সাধ ক্ষুধাতৃষা,
নারী-জীবন ধৰ্ম্ম সবি,
মােয়র-আসে বাসন্তী নিশা,
হায়-হৃদয় ফেহনা খুজে
কুরূপার হৃদি নহে প্রেমহীন, বুঝেও কেহনা বুঝে।
মানি, অধিকার নাহিক আমার, জানি, আমি হেয় হীনা,
চাহিনা করুণা, বুঝিনা বলিয়া করােনা অমন ঘৃণা।
প্রেম--আলপন তােমাদের
বুঝি,—যদিও শ্রবণ রুধি।
মধু- চুম্বন-বিনিময়
বুঝি,যদিও নয়ন মুদি।
মাের-বলিবার কিছু নাই,
বলিতেছিলাম এ নহে আমার ফুটিবার ঠিক ঠাই।
.

পর্ণপুট
পুরুৎ ঠাকুর
শুনে শখের সাড়া, দলে দলে
পাড়ার ছেলে জুটুল কোলাহলে,
দুহাত পেতে, ফেল্লে সবাই ঘিরে
মােদের সৱল পুরুৎ ঠাকুরটিরে।
গুড় পাটালী যা ছিল তার সাথে
বিলিয়ে সবি দিলেন হাতে হাতে।
বা’র দরজায় জুটল কতকগুলা,
দিলেন তাদের কঁাকুড় কলামূলা
পথে যেতে জুটল আরাে ছেলে
হাতে তাদের আতপ দিলেন ঢেলে।
শেষে খালি ন্যাকড়া খানি ঝাড়ি
পুরুৎ ঠাকুর ফিরে গেলেন বাড়ী।
শুধু হাতে ফিরতে তারে দেথে
গৃহিণী তাঁর এলেন রেগে ঝেকে,
রাঙা শাখায় উজল বাহুখানি
তুলে তিনি গর্জে ক’লেন “জানি
ভ্যাকরা বামুন বুদ্ধি তােমার ভোতা
ন্যাকড়া খালি, চাল কলা সব কোথা?
দেখি যদি কালকে খালি হাত
এ বাড়ীতে বন্ধু তােমার ভাত।
৮৬

পুরুৎ ঠাকুর
পুরুৎ ঠাকুর মুখটি করি নীচু
দাড়িয়ে রলেন রান্নাঘরের পিছু।
পরের দিনে গানটি সারি যবে
ঠাকুরসেবা করতে যেতে হবে
পুরুত ভাবেন “কালকে কতক ছেলে
গুড় পাটালী একবারে না পেলে।
ভাইত মিঠাই আলে হাড়ী ভরে
কিছু তাহার আছেই ভাঁড়ার ঘরে।”
গিন্নী যখন রান্নাঘরে,—চুলাে
ধরাচ্ছিলেন নেড়ে নেড়ে কুলাে,
ভাড়ার ঘরে হাতড়িয়ে সব হাঁড়ি
মণ্ডা মিঠাই নিলেন তাড়াতাড়ি।
সকল ছেলেই আতপ চালের সাথে
মও সেদিন পেল হাতে হাতে।
গিন্নী যখন আসনখানি পেতে
দিতে গেলেন দেওরকে জল খেতে,
পেলেননাক কিছুই হড়ী খুজে
ব্যাপারটা কি নিলেন সবি বুঝে,
বল্লেন রেগে সামূনে পেয়ে চোরে
এত মিঠাই ফুরালো কি করে?”
চুলকে মাথা পুরুৎ কহেন—এ-এ
আমি-আমি, ফেলেছি সব খেয়ে।”

পর্ণপুট
লালপেড়ে তার অচল রাখি গলে
স্বামীর পায়ে গিন্নী আঁখি জলে
বল্লেন “ঠাকুর আর কিছু না চাই
জন্ম জন্ম যেন তােমায় পাই।”
উপাসনা।
মঙ্গললক্ষ্মী
( সঙ্গীত-মালিনীছলে )
জয় জয় অয়ি মাতঃ ভারতক্ষেলক্ষ্মী ।
নমি সুরনবন্দ্যা, নন্দিতা কাব্যকুঞ্জে,
নব নব মধুছলে, মতি। অর্ঘপুঞ্জে,
শুভ বর তব হস্তে, দৃষ্টিতে দুগ্ধকুল্যা,
চরণ-নলিন-গন্ধে মুগ্ধ এ মৰ্ম্ম-মক্ষী।
সুতগণ তব অঙ্কে তুষ্ট মা শুন্য অন্নে,
পুজনপদ রঙ্গে পুষ্ট মা স্বর্ণপণ্যে।
রহ তবু অতি খিন্না দুঃখিনী দৈপিষ্টা,
নহ তুমি সতি ঘৃণ্যা চৌদিকে দৈবরক্ষী
শতশত মঠ-চৈত্যে মন্দিরে শঙ্ঘণ্টা,
বিগলিত মধুচিত্তে ভারতী মুক্তকণ্ঠা,
কমল-কুমুদ-মল্লী-মালিক। দিব্যবক্ষে,
মুখরিত রসবল্পী, কৌতুকী লক্ষ পক্ষী।
জয় জয় নমি মাতঃ ভারতী সৌখ্যলক্ষ্মী।
৮৮

চীন-পরিব্রাজকের প্রতি
চীন-পরিব্রাজকের প্রতি
কহ কহ ওগাে পৰ্যটক,
ভারত গৌরব গাথা গাহ তুমি প্রাচীন কথক।
পূৰ্ব্ব সিন্ধু কূলে রহি কহ তুমি অশনি নির্ঘোষে
উৎকর্ণ শুনিব মােরা অর্ণবের অন্য তীরে বসে।
তােমার প্রত্যক্ষ লব্ধ, নহে শাব্দ, অনুমানগত ;
কহিতে অতীত কথা অধিকারী কে তােমার মত?
কহ,-মােরা নহি হেয় আফ্রিকার কাফ্রীর মতন
মােদের অতীত নহে অরণ্যের জঘন্য জীবন।
সমগ্ৰ নিখিল যবে ঘনবনে,—গিরির গুহায়
দুঃস্বপ্ন দেখিতেছিল অজ্ঞতার ঘাের তমিস্রায়,
ভারত তখনি ছিল বিশ্বব্যা আলােকের রাণী,
জ্ঞানের সুমেরু শৃঙ্গে ছিল তার তুঙ্গরাজধানী।
নালন্দা বৈশালী কাঞ্চী তক্ষশিলা উজ্জয়িনী কাশী,
ধ্রুবমন্ত্রে সত্যমার্গে জ্ঞানস্বর্গে উঠিল উদ্ভাসি,
জ্যোতিষ্কমণ্ডল যেন সৌরলােকে সমুজ্জলতম
বিরিঞ্চির চতুমুখে মূর্তিমান বেদগান সম।
কহ কহ তাম্রলিপ্তি সৌরাষ্ট্রের ঐশ্বর্যের কথা
বসুধা ইন্দিরারূপে খুলেছিল রত্নসত্ৰ যথা।
কেমনে সে চারুকলাশিল্পরাজলক্ষ্মী আসিয়ার
হিমাদ্রির শুভ্রশৃঙ্গে রচেছিল সিংহাসন তার।

পূর্ণপুট
অঙ্গবঙ্গ কলিঙ্গের স্বর্ণকুক্ষি কান্তারে প্রান্তরে
অন্নপূর্ণা,--অন্নকূট খুলেছিল জীবজন্তু তরে।
অহিংসামন্ত্রের ধ্বজা, মৈত্রীছ, তুলিয়া আকাশে
মগধের রাজশক্তি আৰ্যাবর্তে বাঁধে বাহুপাশে।
সর্বস্ব বিলায়ে নিঃষে বক্তৃপট পরিত সম্রাট
জ্ঞানিগুণিপদপ্রান্তে ক্ষাত্রশক্তি লুটাত ললাট।
সিদ্ধার্থের ধ্রুববার্তা প্রবর্তিতে শুধু সিংহাসন,
বুদ্ধের সেবার লাগি রাজর্ষির শাসন পালন।
তেয়াগিয়া ভােগস্পৃহা অৰ্দ্ধদেশ জুটে সংঘারামে
অর্ধেক জীবন যাপে গৃহিসংঘ তীর্থ ধামে ধামে।
ভােগের বিহার হতে শ্রেষ্ঠ গণে যােগের ‘বিহার
পারের কড়ির শুল্কে বেচিতেছে সমগ্র সংসার,
সকলে বর্জিতে চাহে অর্জনের প্রার্থী নাহি দেশে
নিরাশ্রয় ভােগ সুখ ত্যজে অশ্রু অনাথের বেশে।
শাঠ্যদ্বেষহীন পৌর জানপদ, নাহি চৌরভয়
ভবরােগ ভিন্ন অন্য রােগশঙ্কা নাহি দেশময়।
অস্ত্রাগারে ঊর্ণনাভ করে তা তন্তুর বিস্তার,
রাজদণ্ড রহে তােল বহি রাজচিহ্নের সম্ভার,
আপনি আপন দণ্ড দেয় পাপী হইয়া নিষ্ঠুর,
গুহপাপ অশ্রুজলে নিবেদিয়া চরণে গুরুর।
ছায়াশূন্য নাহি বক্স, চৈত্যশূন্য নাহি পুরগ্রাম,
পথে পথে’গীত হয় তথাগততথ্য অবিশ্রাম।
।

চীন-পরিব্রাজকের প্রতি
ভূপে ভূপে তীর্থযাত্রী, মহােৎসব বিহারে বিহারে,
যেধিমত্র উদীরিত নিষাদেরো আগারে আগারে।
অহৎ শ্ৰমণ ভিক্ষু বর্ণাশ্রমী সাগ্নিক ব্রাহ্মণ,
ভ্ৰাতৃভাবে প্রেমানলে পরস্পরে করে আলিঙ্গন।
নাহি দ্বন্দ ধর্মে ধর্মে একই লক্ষ্য সবারি জীবনে
অহিংসা পরমধর্ম’ এই মন্ত্রে দ্বিধা নাহি মনে।
স্বার্থ হতে সত্য বড়, বিত্ত হতে চরিত্র মহৎ,
দগু হতে ক্ষমা বড়,-শমদম পরম সম্প।
নৃপতির পরিষদে ভিক্ষু বিপ্র নিগ্রস্থ, শ্রমণ,
সমান মর্যাদা যদে লভে শ্রদ্ধাদত্ত রত্নাসন।
ইহলােকে পিতৃকল্প, পরত্রের গুরুর মতন
নৃপ, করে আপনার বক্ষেরক্তে প্রকৃতিরঞ্জন।
তাপিত ক্ষুধিত আর্ত তৃষাতুর ব্যাধিত কাতর,
লভিত গৃহীর গৃহে অহরহ সেবাসমাদর।
পথে পথে পান্থশালা, শান্তিসত্ৰ আতুর নিবাস,
মাঠে মাঠে প্রতিবর্ষ, মেহস্পৰ্শ সান্ত্বনা-আশ্বাস,
পালিত সন্তানস্নেহে জীবজন্তু আগারে প্রান্তরে
অভ্যাগত গুরুসম দিব্য অর্ঘ্যে বন্দ্য ঘরে ঘরে
অনুশাসনের লিপি সমুৎকীর্ণ পৰ্বতে পাহাড়ে,
সদ্ধর্ম বিজয়ী হলো চীন ব্ৰহ্ম তিব্বতে তাতারে।
পিটকের বাণী বক্ষে বহি ধন্য শতস্তম্ভ সুপ
স্থাপত্য ভাস্কৰ্য্য চিত্র কারুশিল্প ধরে চারুরূপ।

পণপুট
বিশ্বপ্রেম সোমরস নিঃস্যন্দিত বােধিমতলে,
প্রভুর বদনচন্দ্রে, মত্ত তাই পিয়ে কুতূহলে,
নিমগ্ন সমগ্র দেশ নির্বাণের একাগ্র চিন্তায়,
কাদম্বরী নির্বাসিত বর্ষাশেষে কাদম্বিনী প্রায়।
কহ কহ পৰ্যটক ভারতের সে পুণ্য বারতা
ভারত তােমার তীর্থ, ধর্মক্ষেত্র, পার্থিব দেবতা।
হইনি শুধু আমি এ দেশের প্রাচীনের পায়,
পক্ষপাত গর্বে পাছে স্বদেশের সুখ্যাতি বাড়ায়।
অমর হয়েছ তুমি পুণ্যতীর্থরেণু পরশনে,
কহ কহ হে বিদেশী, সত্য বেশী তােমার বচনে।
পরিচারিকা
মুখরা
কেন কোন কথা শুনিব কাহারাে ? কেন কোন অপরাধে?
মুখরা মুখরা’ বলছ ত সবে,-মুখর হয়েছি সাধে ?
সাধে কি লােকের কথা শুনে মাের সারা দেহ যায় জ্বলে
সবাই তােমরা মুখরাই হতে,-মাের মত দশা হলে।
মা-হারা হ’লাম বয়স যখন,-মাত্র বছর দেড়,-
যেতে ছ'মাস গেল বাপ মরে’ এম্‌নি গ্রহের ফের।
কোলহারা হয়ে, রােগে ভুগে ভুগে, রােদে পুড়ে, শীতে জমে,
গড়ায়ে গড়ায়ে কেঁদে কেঁদে শেষে ডাগর হলাম ক্রমে।

বড় ত হলাম। বড় হয়ে ওঠা লাগিলনা কারাে ভালাে,
বেয়ারামে-ভােগা দেহখানা রােগা তায় রং ছিল কাল।
যত বড় হই,দাদারাে ততই মুখখানা হয় ভার
দূরে যাক্ কোনাে যত্ন দেখানাে কথাও কন না আর।
বউদি আমার উঠতে বসতে কেবল পাড়ত গালি,
ছিলনাক খাওয়া,—ছিল দুই বেলা পিণ্ডি গেলাই খালি।
রুখু কটা চুলে,-ময়লা টেনায় হয়ে উঠলাম ধাড়ী,
দাদার গলায় আটকে গেলাম আমি এ লক্ষীছাড়ী।
অল্প টাকায় তেজবরে এক বুড়ো বর খোঁজ করে
একদিন দাদা বিদেয় দিলেন,—ঠিক যেন ঘাড়ে ধরে।
বিধবা ননদী ছিল একজন, শ্বাশুড়ী ছিল না মাের,
উগ্রচণ্ডা মূৰ্ত্তি,-বাপরে,তার কি মুখের তােড়।
তােমরা আমারে মুখরা বলিছ—তারে দেখনিক বলে।
পান হতে চুণ খসে পড়লেই উঠত সে রাগে জ্বলে।
স্বামী থাকতেন বিদেশে কাজেই কেউ মােরে পুছিত না,
ময়লা ফেরাণী, রুখু চুল-তাই সেখানেও ঘুচিল না।
বুড়াে ছিল বটে, লােক ছিল ভাল, ক’দিনে যা পরিচয়,
মনে হতাে যেন অভাগীরে ভালবাসত সে অতিশয় ।
তা হলে কি হয় ? কপাল কেমন? রােগ নিয়ে বাড়ী এল,
যেতে বছর ছাড়কপালীর সীথির সিঁদুর গেল।

পর্ণপুট
সকলি সইয়া দেওরের ঘরে ছিনু মাস নয় দশ,
সেথা হাড়ভাঙা খাটুনী খেটেও হলােনা একটু যশ,
ননদী জায়েরা একদিন-ও মােরে কথা কহিল না হেসে,
কাঁদিতে কাঁদিতে দাদারি বাড়ীতে ফিরিয়া এলাম শেষে।
এক বেলা দুটো খাই হেথা, তাই বসে বসে খাই কি?
আমি এলে পরে বৌঠাকরুণ ছাড়িয়ে দেছেন বি।
গম যব পিশি, টেকী পাড় দিই সারাদিন ধরে রাখি,
দিনে অবসর পাইনাক বলে’ রাতে বসে বসে কাদি।
তবু বৌদির টিস টিস করা ক্রমেই বাড়িতে রয়,
পেরি বাড়ীতে খেটেখুটে খাই বেশীকথা কিছু নয়,
এত খাটি তবু শুধু হতাদর—এই বড় মাের দুখ,
সইতে না পেরে ক্রমে ক্রমে বেড়ে তাই ছুটে গেল মুখ।
মাথা গুজে গুজে মুখ বুজে বুজে বল আর কত সই ?
বরাবর আমি—তােমরাও জান—এমন মুখরা নই।
বাপ ভাই বােন মায়ের আদর সােয়ামীর ভালবাসা,
মা-বলিয়া-ভাক জুটিল না হায়-এ জীবনে নেই আশা।
ভুলেও মিষ্টি কথাটি যাহারে কেউ কয় নাই ডাকি,
সে পােড়ামুখীর পােড়ামুখে শুধু অমৃত ঝরিবে না কি?
তােমরা কি বলল এততেও আমি সুধামুখী হয়ে রবাে ?
মড়ার বাড়া আর গাল নাই, কেন কার কথা স’ববা?
১৪

মান ও এ
মান ও প্রাণ
গাঁয়ের মাঝে ম তলায় আজ
লােকের ভিড়ে বসেছে ঐ মেলা,
পাল্লা দিয়ে কুস্তি মালামােয়
মল্লগণের তথায় আজি খেলা।
পূর্বপাড় আর উতরপাড়ার দল
আস্ফালনে করছে কোলাহল,
আপাশে পাঁচ সাতটা গাঁয়ের যত
ভদ্র ইতর জুটল বিকেল বেলা,
গাঁয়ের ভিতর ম তলায় আজ
কাতার দিয়ে বেতর লােকের মেলা।
তাল ঠুকে সব দাড়ায় পালােয়ান
কাপড় তাদের মালকোচ্চামারা,
চাপড় মারে হাতের পেশীর 'পরে
হাঁফর সমান হফায় বেদম তারা।
হারছে যে সে মলিনকাতরমুখে
কাহাসি কষ্টে হেসে দুখে,
আস্তে আস্তে মিশছে তাদের ভিড়ে
নিকলতায় আস্ফালিছে যারা,
কাতার দিয়ে গাঁয়ের যত লােকে
বাড়ায় সবে কাঠের পুতুলপারা।
।

পর্ণপুট
হল্লা করে লােক জমেছে যত
মল্লেরা সব পড়ে তাদের গায়,
কেউবা হাঁকে “বাবা, বলি হারি”
কেউবা বলে “আহারে হায় হায়।”
পূর্বপাড়ার নেইক আশা কোনন,
লড়তে ভাল পারলেনা একজননা,
উতুরপাড়া বুক ফুলিয়ে ডাকে
‘জোয়ান মরদ কে-আর আছিস, আয় ।
জয়ীপাড়া,-গৰ্ব্বভরে ঘুরে
পূর্বপাড়া কাঙাল চোকে চায়।
একটা ভাঙা পাঁচীর পরে বসে,
ছিল নিতাই পূর্বপাড়ার লােক,
করছিল তার বুকটা দুরু দুরু
ভঙ্গি নানান ধরছিল তার চোখ।
পূর্বপাড়ার প্রত্যেকেরি সনে,
প্রাণটা তাহার যুঝতেছিল রণে,
বলছিল আর থেকে থেকে ডেকে
“বেশ চলেছে, ছেড়না ভাই নােক
আহা, আহা, বাগিয়ে ধরে দাদা
থামলে কেন? সালে লও এ বোক।

बानबाग
তিনটি বছর এমনি দিনে ঠিক
একা নিতাই সবার সনে যুকে,
হারিয়ে দিল উতুর পাড়ার দলে ;
সকল মন্দ কেদানী তার বুঝে।
ফিরুল, তারা মুখটি করে চূণ,
মনে মনে গেয়ে তাহার গুণ,
মুষড়ে গিয়ে সইল অপমান
রইল কোণে লুকায়ে মুখ গুজে।
নিতাই চাদের খুঁটের পালােয়ান,
মিনাক গ্রামটী গােটা খুঁজে।
আজকে রােগে বড়ই কাহীল কাবু
টেললে পড়ে নিতাই পালােয়ান।
মাদুর ছেড়ে এর এলাে তবু
নেহাৎ যে তার বড় প্রাণের টান।
চোকে তাহার নাল শােকের ধারা
সামনে তাহার জিতল উতুরপাড়া।
থাকতে বেঁচে, মসা তলায় আজ
পূর্বপাড়ার খর্ব হলাে মান।
ঝাঝরা তাহার পাঁজরাতে হাত চেপে
বল্লে আজ কি করলে ভগবান।

পণপুট
লাফ দিয়ে সে সবার মাঝে কয়
“ভাবছ কি তাই, নিতাই বেঁচে নাই ?
মহাতী শ’লাখ টাকা দাম
আসবি কেরে? লড়তে আমি চাই।”
বিজয়ী সব মল্লেরা কয়, “দাদা,
তােমাকে যে চেনেনা সে গাধা।
মােড়ল তুমি পাগল হলে নাকি ?
পায়ের ধূলাে তােমার যেন পাই,
মা মনসা রক্ষাকালী তােমা
সকাল সকাল ভালো করুন, ভাই।
দু’তিন জনে আলে তারে টেনে
দেহ তাহার করছে টলমল ।
ভাইরা তারে ধরে নে’ যায় বাড়ী
দুঃখে ক্ষোভে চক্ষে তাহার জল।
থেকে থেকে হাত ছাড়িয়ে কয়
‘মান হতে আর প্রাণটা বড় নয়,
প্রাণ নিয়ে কি ধুয়ে ধুয়ে খাবাে ?
করলি কি হায় ধরলি কেন বল?
এমনেই কি রইব বেঁচে আমি ?
হারল যেরে পূর্ব পাড়ার দল।
মানসী।

বঙ্কিমরণে
.
বঙ্কিমস্মরণে
আজিকে তােমার জনমবাসরে, প্রণমি তােমারে, হে দেশাচাৰ্য,
নবীনবঙ্গ-জীবনযজ্ঞে তােমার অর্ঘ্য অগ্ৰধাৰ্য্য।
মন্ত্রদ্রষ্টা হে নবস্রষ্টা, জাতীয় জীবন তােমার সৃষ্টি,
দেশকাল-সীমা উত্তরি’ ধায় ত্রিলােকোত্তর তােমার দৃষ্টি।
বঙ্গহৃদয়-পঙ্কজরবি, অই বাজে তব বিজয়ডঙ্কা,
বঙ্কিম, তব অমৃত-আলােকে ঘুচেছে অমৃততিমির শঙ্কা।
শ্যামলা মায়েরে তর্পিলে তুমি অপিয়া জবা অশােক রক্ত।
চণ্ডিকা বাণী ইন্দিরারূপে মঠমন্দিরে হেরেছ, ভক্ত।
জীবন-উষার ঋছন্দোগ, দেছ,-ঋষি, দেশমাতৃমন্ত্র,
নবীন বঙ্গে দিলে অগিরা,-নব ষড়ঙ্গ পুরাণ তন্ত্র।
বঙ্গহৃদয়-পঙ্কজরবি,ঐ বাজে তব বিজয় ডঙ্কা।
বঙ্কিম, তব অমিত প্ৰভায় ঘুচেছে দেশের অনৃতশঙ্কা।
গতানুগতিক জনপ্রবাহে তুলি বিদ্রোহ বৈজয়ন্তী,
আত্মাগুহার আহিত পুরুষে জাগায়ে তুলেছ, স্বকৃতপন্থী।
দ্বন্দ্ৰবিবাদ অন্ধপ্রমাদ খণ্ডিত তব পণ্ডা যত্নে,
খনিখাত খুঁড়ি গিরিদরী ঢাড়ি এনেছ আহরি সতরঙ্গে।
বঙ্গহৃদয়-সরােজ-সূৰ্য্য, ঐ বাজে তব তুৰ্য-ডঙ্কা,
বঙ্কিম, তব অমৃতশঙ্খে ঘুচেছে দেশের অন্বতশঙ্কা।

পর্ণপুট
শিল্পজগতে তুমি প্রজাপতি, কল্পনা তব সেবিকা ধন্য,
প্রতাপ কুন্দ রমা মহেন্দ্র মৃন্ময়ী তব পুত্র কন্যা।
সত্য হইতে পরম সত্য তােমার সৃষ্টি এ মায়া বিশ্বে
নিত্য হইতে চরম নিত্য দিয়াছ দীক্ষা শতেক শিষে।
বঙ্গহৃদয়-রাজীবসূৰ্য্য,ঐ বাজে তব তূর্য ডঙ্কা।
বঙ্কিম, তব অভয়শঙ্খে ঘুচেছে দেশের অবােধ শঙ্কা।
মােদের সদ্মে ছলনাছদ্মে সেজেছ পাগল কমলাকান্ত।
বনমঠে তব, হে ভীমকান্ত, হেরেছি স্বরূপ ৰুদ্ৰশান্ত।
মসংসারে রেখে গেছ তব যতেক অমর মানসপুত্র,
ত্যজেছ মৰ্ত্ত, বুকে বাঁধা তবু তব পদাজ-মৃণালসূত্র।
মানসসরসী-সয়ােজসূৰ্য,ঐ বাজে তব শৌৰ্য্য ডঙ্কা।
আৰ্য্য, তােমার গুরুগর্জনে ঘুচেছে দেশের লজ্জাশঙ্কা।
বহুদির দারুণ বেদনা পীড়িল তােমার করুণ বক্ষ,
শত বাণীতে করে ছলছল তিতাল যা তব নয়ন-পশ্ন ।
বাণীর মরালী করে তায় কেলি তীরে তীরে নীতিবেতসীকু,
গীতামন্ত্রের সান্ত্বনা তাহে ফুটে আছে হয়ে সরােজ পুঞ্জ।
বঙ্গহৃদয়-পঙ্কজ-ভানু,-ঐ বাজে তব বিজয় ডঙ্কা।
বঙ্কিম,-তব আশার শঙ্খে ঘুচেছে দেশের অসার শঙ্কা।
পরিচারিকা।
১০০

গােবিন্দদাস
গােবিন্দদাস
বাঙাল দেশের কাঙাল কবি, যাচ্ছ চলে অমর ধামে,
গােলােক হতে এলে কনক রথ,
আজকে তােমার শুভক্ষণে চোখের জলে শােকের নামে
করবনাক পিছল তােমার পথ।
অন্নদা মা’র অনুকুটে কাদলে পােড়। পেটের তরে
আজকে তােমার জুড়াক জঠরজ্বালা।
বিদায় নিলে হৃদয়হীন এ নিদয় দেশের মাথার 'পরে
সপে দিয়ে কলঙ্কেরি ডালা।
}
দেশে সােণার মিনার উঠে, বাগদেবতার বালাখানা
তােষাখানার বিশাল আয়ােজন,
জ্ঞান প্রচারের নামে দেশে জুটে দামী বিলাস নানা
সােণার অজিন, সােণার কুশাসন।
পরিষদের সভায় রাজা মহারাজের তাজের ছটা
গ্রন্থশালায় রাজে হাজার ছবি
সম্মিলনে—সম্মেলনে মহােৎসবের প্রমােদ ঘটা
পায়না খেতে হায়রে কাঙাল কবি।
৩০
;
এইকি তােমার সমুন্নতি? লােকে বলে উঠছ ক্রমে,
হায়রে নিঠুর কবির জনমভূমি !

পট
রঙীন চুড়া উঠছে বটে ; পড়ছি না তায় রঙীন ভ্রমে,
অধঃপাতের সীমায় গেছ তুমি।
যে যা বলুক,-মগের মুলুক’ আখ্যা তােমার যােগ্য বটে,
পাথর ডলাে আতুরজনের বুকে।
মােক্ষদা মায় ঠেলে,—আজো যক্ষরাজে বসাও মঠে,
লােকসমক্ষে দাঁড়াবে কোমুখে?
ভাটের বৃত্তি ছাড়বে যেদিন, গুণের যেদিন কীর্তি গাবে,
ধনের চেয়ে গণবে জ্ঞানে বড়,
রিক্ত কাঙাল ভক্ত গুণী যেদিন তােমার ভক্তি পাবে,
বলব সেদিন “পূজাঞ্জলি ধরো।”
মানগরবী গরীব কবি! পারে কি কেউ এমন কথা
কইতে, তুমি চিত্তে ছিলে দীন?
সহিয়াছ তেজের আল পাঁজরভাঙ্গা হাজার ব্যথা,
তবুত বীর হওনি কভু হীন।
গাইতে তুমি পারনিক বিত্তবানের বৈতালিকী-
স্তুতি গতি নিত্য সাজে প্রাতে,
করতে জাহির বাক্যখ্যাতি মাসিকী বা সাপ্তাহিকী
বাজাওনিক চক্কা নিজের হাতে।
মাগনিক ভিখ, দেউলপথে ঝুলি কঁাধে বাউল সাজে
লেখনি নাম চিরদাসের খতে,
বাণীরে বানরী করি-নাচাওনিক সভার মাঝে,
নাট্যশালার নেপথ্যের পথে।
---

গােবিন্দ
চেষ্টা করে হওনি কবি, কবি হয়েই জন্ম নিলে
প্রাচীনশ্যামল বাংলামাটী চিরে।
তােমার কবি-প্রতিভাটির প্রতিমাটি তিলে তিলে
তৈরী নহে শিল্পশালার ভিড়ে।
দেশের কলাসাহিত্যে আজ কৃত্রিমতা অনুষ্যত,
নাইক তাহে নিজস্বতার লেশ,
এ-মাটীতে খাটি কবি হবেনা আর সমুদ্ভূত।
তুমিই তাহার শেষগাে তুমি শেষ।
চির তরুণ চারণকবি, দারুণ ব্যথায় সর্বহারা,
মরণপথে গাইলে করুণ গান,
শুনলনাক গৌড়বাসী-বধির অভিশপ্ত তারা,
ব্যর্থ হলাে তীক্ষ্ণ সুরের বাণ।
ফেলবে তােমার বজ্রবাণী বিশ্ব বুঝি ভস্ম করে ;
শৃঙ্গী ঋষির শাপের মত গতি।
কাব্য তােমার উচ্ছসিত গলা ফেটে প্রাণের জোরে ;
ছিন্নমস্তা,—তােমার সরস্বতী।
দৈন্যজ্বালায় দর্পফণা তুলেছিলে,-সর্প-কবি,
কাব্যগীতির মলয়গিরি-ভূমে,
কাঠুরিয়ার নিঠুরকঠোর কুঠারখানার পরশ লভি’
ছড়ালে বিষ চন্দনেরি ক্রুমে।
সাধে কি আর শাপপাদকে হস্তে নিলে জটাধারী ?
জালে বাড়ব অশ্রু বারিধির ?

পট
সাধে কি আর লেখনীরে করলে তীখ তরবারি।
বীণ-কাঠেরে মুগুর, কবিবীর?
নিগ্রহে হন আশুতোেষও জলজ্জট উগ্ৰয়ােষে,
কুসুমমৃহ-বজ্রসম জলে।
মণের আদর্শ যে, সে তরুও দাৰবহি পােৰে
ঘষণে সেও পােড়ায় বনস্থলে।
তােমার প্রতি অত্যাচারের চিত্র যখন নেত্রে ভাসে
করালীরূপ ধরে আমার বাণী,
রুদ্ররূঢ় অমার্জিত তােমার ভাষণ কঠে আসে
ভদ্রকালীর শাসন নাহি মানি।
শরাহত মরাল সম মরলে আলায় ছটফটিয়ে,
গাইতে তুমি পেলে তেমন কৈ ?
রাখলেনাক বঙ্গবাসী তােমায় দুটো অন্ন দিয়ে ;
চাওনি কিছু-অন্নদুটি বই।
তিন রূপ
অশ্রু-হারা সালঙ্কারা বালা, এলে যবে প্রথম এ গেছে-
কুণ্ঠিত গুণ্ঠিত মুখখানি হরিদ্রার অঙ্গরাগ দেহে।
ক্ষেত্র যেন শিশিৱসুন্নাত স্বর্ণশস্যে পীতপুষ্পে ভরা
মৌন মঞ্জ, মূর্তি মরি তব মনে পড়ে মম মনােহনা।
১০৪

তন রূপ
তারপর দেখিতে দেখিতে বসন্তের বনভূমি সম
কুমিত পল্লবিত হয়ে উল্লসিলে এ যৌবন মম।
দাড়িস্থ বিম্বের রস পিয়ে শুকক গাহিল সুস্বনে,
তব কেশগন্ধে অন্ধ হয়ে মনােভৃঙ্গ মূৰ্ছিল চরণে।
নিদাদের উত্থানের মত ঋদ্ধ শান্ত স্নিগ্ধ চপল,
ফলভারে নম্র আজি তুমি, আজি তব নারীত্ব সফল।
সুশীতল তব প্রেমছায়ে ঝিরি ঝিরি অঞ্চল পবনে
লভিতেছি নেত্র দুটী মুদি পূর্ণতৃপ্তি সংসার-জীবনে
পরিচারিকা
অযােগ্য
আমারে তােমার যােগ্য করিতে অশেষ আয়াস লভি,
মানুষের হাতে যাহা কিছু আছে চেষ্টা করেছি সবি।
জনমের আগে যে বিধান হলাে জীবনের সহচর
নখরে ক্ষুদিয়া লিথিল যা বিধি ললাট ফলক’ পর,
অঙ্গের সনে অঙ্গীভূত যা অটল নিদেশ যত
তাহাত বিতথ করিতে পারেনা যত্ন সাধনা শত।
অপরাধী আমি, ভাবিয়া দেখিনি, করিয়াছি অবিচার
একটী জীবনে অাঁধার করিতে ছিলনাক অধিকার।
ষত তুমি মাের নিকটে এসেছ হৃদয় সপেছ, বালা
চিনেছি জেনেছি তত তােমা তাই জলে অনুতাপ জাল।

পর্ণাট
কৃপা করে মাের কুটীরে এসেছ যত আছ হাসিমুখে
তত সখি হায় মরি লজ্জায় ব্যথা বাজে তত বুকে।
তোমার সকলি সপিয়া প্রেয়সি বড় লাজ দিলে মােরে
সকল শরীর ঝিমঝিম করে বাঁধ যদি বাহু ডােরে।
আপন হীনতা স্মরি সঙ্কোচে কুণ্ঠায় সারা হই,
তাই বলে আমি সরে সরে যাই, অবহেলা নয় সই।
অবলা সরলা জাননাক ছলা বাড়ায়ে দিয়াছ পাণি,
তুমি সখি তার কিছুই জাননা নিজে তুমি কত খানি।
অতিকৰুণায় দিওনাক লাজ কুটী নয়নে চাও
নিষ্ঠুর হও নির্দয় হও সান্ত্বনা পেতে দাও।
বাহু উপাধানে নিশীথ-শয়নে ঘুমে পড়’ যবে লুটে
জানিনা কোন সুখের স্বপনে মুখে তব হাসি ফুটে।
জাগিয়া শিয়রে, তব কেশে শিরে যখন বুলাই কর,
তপ্ত শ্বাসের গুপ্ত শাসনে কেঁপে উঠে অন্তর।
আঁখি ছলছল হৃদি টলমল তােমাপানে যত চাই
আহা তব প্রেমঅচ্ছােদনীরে কোন বিপ্লব নাই।
মৃগশাবকের শিরে যেন এগো-কিরাতের আঁখিজল,
কালাে ভ্রমরের তপ্ত নিশাসে শুকাবে কি ফুলদল ?
তুলসী বলিয়া কার তলে দেবি, সেবাদীপ নিতি ভালাে
হে মাের সেবিকা, চন্দনমে বিষমে জল ঢালো।
আধার কুটীরে লুকাই মাণিক, দপ দপ তারা জ্বলে
দৈবের দান তবু ভয় প্রাণে তস্কর কেহ বলে।

সঙ্গীত
মাের গুণ গানে মধুর বচনে ভুলাবে কেমনে হাসি।
যাহা মাের নাই কেমনে ভাবিব আছে তাও রাশি রাশি ?
ভুলাইবে জ্বালা কেমনে আদরে বুলাইয়া দেহে পাণি ?
অনুলেপনের শকতি কি সতি ঘুচাবে মর্মগ্লানি ?
এত ভাল বাস’—এত ভাল তুমি, তাই ভাবি অবিচার
হলেনা কেন, হে মাের কান্তা দেবের কণ্ঠহার ?
হে মাের গৌরি, শাক ভাতে যদি সুধা বলি লও হাসি,
লজ্জায় তবে ভিখারী দয়িত হইবে শ্মশানবাসী।
উপাসনা।
সঙ্গীত
নিবেদন
( ইমন কল্যাণ)
জননি, তােমার চরণ সরােজে মজে যেন মম মানস অলি,
গীত কবিতার মধুপানে যেন রহে কলাকেলীকৌতূহলী।
মানি দেভয় ভঙ্গি, সেবি যেন, সবি বি লজ্যি,
স্বেচ্ছায় দুখে করিয়া সঙ্গী,-পিচ্ছিল পথে নাচিয়া চলি ।
সুলভ সুখের শত প্রলােভন, খেয়ালের যত দেওয়ালী শােভন,
চিত্তে জাগাবে শলভম্বপন,-মােহমূঢ় হয়ে না যেন টলি।
লভিব বিশ্বে কত লাঞ্ছনা, নিঃস্বজীবনে কত বঞ্চনা-
তােমার সেবায় জীবন যাপনা করি কেন, সবি চরণে দলি।

পর্ণপুট অপূৰ্ব আগমনী ( বিফিট- খাজ) দোলায় চড়ে আয় জননি রােদনে তাের বােধন বাজে, অট্টহাসির কোলাহলে আয় এ ভীষণ শ্মশানমাকে । শ্মশান ভাল বাসি বলি করলি এ দেশ শ্মশানস্থলী কুকুর শৃগাল ভুতপ্রেতপাল পিশাচ বেতাল হেথায় রাজে। তাের--মড়ার কথায় আসন রচি, ভাঙ্গা কলস নেচে বাজাই গাঁথি মহাশঙ্খমালা করােটিতে অর্ঘ্য সাজাই। শ্মশানভর শবের পরি রুদ্রাণী তােয় বরণ করি, আয় মা এবার মহাকালী ছিন্নমস্তা তারার সাজে। অসময়ে (বিভাস ) আজি—শারদ প্রভাতে কোকসভাতে করুণ পূরবী ধরিলে কে ? কিশাের আশার কল-উল্লাস একটি নিমিষে হরিলে কে? ভরিতে শুভবােধনগাগরী কে বাজালে আহা বিজয়াবাশরী? ঝলসি লুলিত নবপত্রিকা, হেন অঘটন কৰিলে কে ? তরুণ প্রেমের বাসর সভায় গীতগােবিন্দ থামাইয়া হায় বজ্রকণ্ঠে পস্ফটিকায় মােহমুদগর পড়িলে কে ? ভাসায়ে গােকুল অকূলসাগরে কেবা দিলে ডাক মথুরানগরে ? প্রমােদকুঞ্জ প্রতিবিলাপের শােকসঙ্গীতে ভরিলে কে? ১০৮

সঙ্গীত
দুর্দিনে
(পূরবী)
কণ্ঠের কল উল্লাস আসে গ গদ নাদে ভরি
কেলিকালিন্দীকল্লোলধারা হয়ে আসে গােদাবরী।
ভারি হয়ে আসে আঁখি পল্লব থেমে আসে চল হাসিকলরব
নেমে এলাে বুকে অকালবরষা ঘনঘাের ঘটা করি।
গুনগভীর অম্বরতলে বনায় সজল মায়া
ঘনায় জীবন
ভুবন
ভরিয়া তমালগহন ছায়া।
গুরুগুরু করে হিয়ার স্পন্দ, দুরু দুরু বাজে ব্যথিত ছন্দ,
মেঘমল্লার মুচ্ছিয় উঠে সাহানার সুর হরি।
নৈরাশ্যে
(বেহাগ)
আমার হৃদয়বনবাগানে কুসুমকলি আর ফুটেনা।
গুঞ্জরিয়া পুঞ্জে পুঞ্জে মক্ষী অলি আর জুটেনা।
মুষড়ে পড়ে তরুলতা
মর্মরিয়া উঠে ব্যথা
মঞ্জরিয়া রােমাঞ্চিয় মলয় সুবাস আর লুটেনা।
আঁধার আজি কুঞ্জভবন
কাদার সময় এলাে এখন
সকল কণ্ঠ কুণ্ঠিত আজ হাসির ধারা আর ছুটেনা।
শুকাল সব রসের ধারা
কল্পতরু লক্ষীছাড়া
কুজনকলরবােৎসবে ভাবের উৎস আর উঠেন।

পর্ণগুট
দেহ ও আত্মা
( সিন্ধুভৈরবী)
দেহটারে ভালবাসিতে না পারে, নাহিক ক্ষতি।
দেহাহিতে ভালবাসিতেই হবে ওগাে ও সতি।
পুরাজনমের পাপ-অর্জিত
এই দেহখানা রূপবর্জিত
মৃণালের মত তাই হলো তার পকে গতি।
আত্ম আমার রাঙা ঢল ঢল সরেজসম
মধু সৌরভে গৌরবে
চরম
শত দলে সেষে রহিবে আকড়ি
কেমনে তাহায় যাবে পরিহরি
অনাদরে তারে কেমনে ঠেলিবে, সরস্বতি ?
( ইমন ভূপালী)
জ্ঞানেধ্যানে তপে ফুলচন্দনে অনেক হয়েছ বদিত,
শুধু নামজপে মম মনে মনে হওহে বন্ধু নন্দিত।
ঋতুনেমি রাশিচক্র অয়নে
ব্যোমে ব্যোমে সােমে তারকা তপনে,
তব জপমালা ক্ৰমাবর্তনে নিখিল বিশ্বে ছন্দিত।

সঙ্গীত
থেমে যাক যত শঙ্খ ঘণ্টা ঢক্কা ডঙ্কা ঝনা,
থেমে যাক যত তর্কদ্বন্দ্ব তত্ত্ববিচার জল্পনা,
গন্ধ পরশে রসে রূপে রূপে
তব নাম জপি শুধু চুপে চুপে,
উশীর কুসুম ধূপে ধূপে ধূপে হােক জপমালা গন্ধিত।
মম কণ্ঠের বাণী লুণ্ঠন কর, সঙ্গীত লহ সংহরি’
গুধু তব নাম জপি অবিরাম নিশিদিন প্রাণমন ভরি।
করুক শুষ্ক বীজের আঘাত
গীতিমন্ত্রিত সন্ধ্যা প্রভাত,
অমৃত ভূমায় ডুবাক আমায় প্রেমরস নিঃসন্দিত।
প্রিয়ার লিপি
(কানাডা)
আজি বসন্ত প্রাতে এ অভাগা প্রিয়ার লিপিটি পাইল না,
শ্ৰীকরকমলমধুর আশায় এ মনােঙ্গ ধাইল না।
আসিল রসিদ চাদার পত্র, দেনার তাগিদ দুতিন ছত্র,
উৰ্দ্ধতনের আকুটি আইল প্রিয়ার হাসিটি আইল না।
চেঁচাইল চিল হাকিল পেচক ডাকিল বায়স কঁদিল চাতক
আজি বসন্তে গৃহহাপকণ্ঠে কোকিল কণ্ঠ গাইল না।
ফুটিল পলাশ ফুটিল সিমুল, ফুটিল ধুতুরা রাঙা জবাফুল,
মাধবী উষয় পত্রের ফাঁকে কনক চাপাটি চাইল না।
১১১

সিন্ধুকূলে
হে বিরাট, হে অজর, হে অক্ষর, ব্ৰহ্মানন্দরূপ,
আজি আমি তব পাদমূলে,
কাঁপে অঙ্গ থরথর প্রভঞ্জনে বেণুকুঞ্জসম
দাড়াইয়া অনন্তের কূলে।
বিশ্বম্ভর, একি রুদ্র অভিব্যক্তি, সর’ সম্বর
একি তব বিশ্বরূপ নব?
অব্যক্ত ভৈরব রঙ্গে একি হেরি তাণ্ডব চণ্ডিমা
নীলক, হে নটে, তব।
-না একি মহামায়া,-অঘটনঘটননিপুণা ?
একি ইন্দ্রজাল সম্মােহন ?
সুপ্ত কি প্রবুদ্ধ আমি? স্থূল-দেহ তেয়াগি অথবা
সূক্ষ্মদেহে করিছি ভ্রমণ ?
সম্বিৎ স্তম্ভিত মম হে অম্বুধি, দাও দিব্য দৃষ্ণ,
ধুয়ে দাও আঁখির অঞ্জন,
এস শান্ত সান্তরূপে, পরিগ্রহ করিয়া বিগ্রহ
অর্ধাঞ্জলি করহ গ্রহণ।
হে অব্যক্ত তুমি বুঝি মৌনী হয়ে, দিগন্তের পারে
তপস্যায় ছিলে সমাহিত।
জ্ঞানাঙ্কুশ হানি’ মৰ্ম্মে ইন্দ্রিয়ের, নির্মম নিগ্রহে
যােগে চিত্ত করিয়া নিভৃত।
১১২

সিন্ধুকূলে
কবে কোন পূর্ণিমায় পােভ অকস্মাৎ তৰ
গ্রহকুঞ্জে মৃদঙ্গ নিনাদে,
দিগন্তের গণ্ডী ভাঙি এলে দণ্ডী উদ্দও উল্লাসে
তপঃ ত্যজি প্রেমের উন্মাদে।
‘প্রকাশাননের’ মত জ্ঞানদন্ত করি পরিহার
আরম্ভিলে এ মহাকীৰ্ত্তন,
বেদান্তের ঘটপট ভেঙেচুরে উদ্ভান্ত আবেগে
উত্তরঙ্গ তোমার নৰ্ত্তন।
মহাব্যোম পড়ে নমি এ তাণ্ডবে মার্তাণ্ডের সহ
রসােল্লাসে আনন্দ হিল্লোলে,
সৌরচন্দ্র, গৌরচন্দ্র -প্রেমানন্দে উৎসবের লাগি
পড়ে গলে উল্লোল কল্লোলে।
তুমি বুঝি নহ শুধু প্রেমমত্ত ক্ষিপ্ত আত্মহারা,
তুমি পরজ্ঞানের পাথার,
চতুর্থ-কমণ্ডলু উদ্বেলিয়া তােমাতে ওঙ্কারে
চতুর্বেদ দিতেছে সাতার ;
সৃষ্টির কধুর নাদে জেগেছিল তব অধু ভেদি’
বিরাটের রজোরাগ সহ
প্রলয়বিষণারাবে গরজিবে পুন গর্ত ভয়ি
ঔর্ব-বহি আলি ভয়াবহ।
স্তরে স্তরে তরঙ্গিয়া ব্ৰহ্মজ্ঞান বহি চিরদিন
আঘাতিছ ঋষি-চিত্ত-কূলে

পর্ণপট
পাশরিয়া ভেদ-বুদ্ধি লভে নর ভুমার আস্বাদ
জীবন্মুক্ত হয় পাদমূলে।
ধাঁধা-ধন্দ দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বাধাবন্ধ, সব যায় দূরে
সৰ্ববিধ সঙ্কোচ ক্ষুদ্রতা,
ছিড়িয়া হৃদয়গ্রন্থি ঝম্প দিতে চাহে আত্মা, শুনি
সৎ-চৎ-আনন্দ বারতা।
কৰ্ম্মের দুন্দুভিধ্বনি হুঙ্কারিয়া উঠে তব প্রাণে
দীক্ষা মন্ত্র দেয় সাধনায় ।
কোটি ভক্ত মুক্তাত্মার কৰ্ম্মপুঞ্জ ব্রহ্মে সমর্পিত
রাশীভূত একত্র তােমায়।
কোন কল্পরাত্রিশেষে ব্রহ্মাণ্ডের সিংহদ্বার পরে
বাল-সূৰ্যতেজস্কৰ্য্য নাদে
দিগ, দিগন্তে বিস্তারিলে হে স্রষ্টার বরিষ্ট সন্তান
ভরি বিশ্ব সৃষ্টির সংবাদে।
সেই হতে অনারত অতি শান্তিক্লান্তিহীন
রুদ্রদত্ত মহাতেজোবলে,
চাঞ্চল্যে তাড়িতে তাপে ভুযন্ত্রেরে রেখেছ বাঁচায়ে
অনন্তের কর্মক্ষেত্র তলে।
অৰ্ব্বদ তুঙ্গ রথ মেরুক্রান্তিবিশ্রান্ত প্রাঙ্গণে
অবিশ্রান্ত ছুটিতেছি হেরি,
আন্দোলিয়া তারাস্তোম, আলােড়িয়া বিশ্বকোলাহল
বাজে ব্যোমে তব রণভেরী ।
১১৪

সিকুলে
কত যুগযুগান্তর মন্বন্তর উদিল মিশিল
তুমি কিন্তু জন্মান্তরহীন,
কত বিশ্বগ্রহতারা কত সৃষ্টি তােমাতে ডুবিল
তুমি আছ শাশ্বত নবীন।
এ পৃথী বুদুসম হৃত্তরঙ্গে হয়েছে কল্পিত
কল্পশেষে হবে মজ্জমান,
যুগান্তের যােগনিদ্রা ভঙ্গ হলে মৃৎ-পঞ্জরে পুন
নব বিশ্ব করিবে নির্মাণ।
ফেনধ্বজ মহারথ, মহাকাল সারথি তােমার,
রুদ্র তব অয়শ্চক্রবাল,
চরাচর পঙ্কসম কেন্দ্রাতিগ কেন্দ্রানুগ বেগে
আকৃষ্ট বিকৃষ্ট চিরকাল!
তরঙ্গতুরঙ্গযুথ ফেনবিহু উৎসারিয়া ছুটে
উদঞ্চিত কেশর-প্রকর,
যুগে যুগে জয়ধ্বনি পাঞ্চজন্যে রাত উদীরিত
ভেদি তব নেমির ঘর্ঘর।
আজি আমি নহি তুচ্ছ হে অখণ্ড তব সন্নিধানে
বিমণ্ডিত তব গরিমায় ।
বাসনার অরুণিমা হৃদয়ের সকল কালিমা
মগ্ন আজি তব নীলিমায়।
অগাধ অব্যয় ধূ-ধূসীমাহীন অমেয় অনাদি
নাহি কুল নাহিক কিনারা,

পর্ণপুট
কুণ্ঠা দ্বিধা সংকীর্ণতা সৰ্ববিধ নীচতা তুচ্ছতা
এ বিরাটে হয়ে গেছে হারা ।
শত শত কল্লোলিনী বহি আনি অর্ঘ্য বসুধায়
করিতেছে আত্ম সমর্পণ,
তােমার বিদ্রুমবনে ইন্দিরার জন্মক্ষেত্র তলে
তীর্থযাত্রী চন্দ্রমা তপন।
হেথা কন দণ্ড পল নন্দিব মাস ষড়ঋতু
সবি তব মহিমায় মাখা।
রজোমুক্ত অাত্মা মাের পঞ্জ-পিঞ্জর তেয়াগিয়া
অনন্তে ছুটিতে মেলে পাখা।
আজি এ প্রশান্ত আত্মা অনন্তের শ্যামগােষ্ঠ হতে
কেমনে ফিরিবে ধরাধামে ?
নৃশংস হিংসায় ভরা সংসারের কংসাগরে পুন
ফিরে যেতে চোখে বর্ষা নামে।
পরম আগ্রহে ব্যগ্র, সিন্ধু তব দরশন তরে
আসিয়াছি আজন্ম পিয়াসী
অনন্ত-তৃষায় নেত্র চাহে আজি পিয়ে নিতে তব
ইন্দ্রনীলনিভ অম্বুরাশি।
কত নিশি তােমা সিন্ধু কল্পনায় ভেঙেছি গড়েছি
আজি তব প্রত্যক্ষ প্রকাশ,
কেমনে ফিরিব বন্ধু দুই বিন্দু অশ্রু-অর্ঘ্য ঢালি
ত্যজি শুধু দুটী দীর্ঘশ্বাস ?

মৃত্যুর কাল
ক্ষণেকের দেখাশুনা তাহাতেই এত ভালবাসা
হলে তুমি নিতান্ত আত্মীয়,
ভূমার আভাস লভি ফিরিবার কথা নয় আর।
কেমনে ফিরিব বল প্রিয়?
মৃত্যুর কাল
( Mrs. Hemans )
শরতের শেষে পাতা পড়ে খসে রহেনাক কেউ তরুর গায়,
শুকাইয়া ঝরে ফুল ধরা পরে তুহিনশীতল মেরুর বায়।
আছে তারকার চকবালের তলে ডুবির কালের ঠিক,
হে মরণদেব তব অধিকারে সকল সময় সকল দিক।
জীবনের কাজ সাধনার লাগি আছে নিরূপিত দিনের বেলা,
নর-নিলয়ের উৎসব লাগি সন্ধ্যায় মধুমিলন মেলা।
সুপ্তি ও শ্রম উপশম লাগি মার স্নেহসম রাত্রি আসে,
হে মরণ, তব নাহি কালাকাল, সমান সকলি তােমার পাশে।
জানি কবে আসে অমার অাঁধার জানি কবে হাসে পাের্ণমাসী,
জানি নিদাঘের পাখীগুলি কবে অর্ণব পারে যাইবে ভাসি।
জানি শ্যামত কবে পীতবাস পরিয়া জাগিবে গহনে গােঠে।
কে শিখাবে মােরে হে মরণদেব কবে চুমাে দিবে আমার ঠোটে।
১১৭

পপুট
সেকি মধুমাসে, চম্পকী হাসে যবে মলয়ার কম্পু চুমে
মল্লিকা যবে আঁখি মেলে চাবে বল্লীদোলায় রবে না ঘুমে?
সেকি ধুতুরার ফুটিবার দিনে স্নান যবে লাল গুলের গাল?
কে বলিৰে তাহা? সকল কালের মালিক তুমি যে, হে মহাকাল।
সেকি গাে যথায় ফেনিল সিন্ধু উৰ্ম্মি গরজি কাঁপায় প্রাণ ।
সেকি গো যথায় মরুবিহগের। মৃগতৃষ্ণারে শুনায় গান?
সেকি গাে সােনার সংসারে যথা ফুলে ফুলে ভরা বাসক সাজ ?
কে বলিবে তাহা? দীন দুনিয়ার মালিক তুমি যে রাজাধিরাজ ।
তুমি আছ যথা সখা সখী মিলি রচে বটছায়ে মােহন মেলা,
আছ যথা পুর-সৌধ-শিখরে বরবধূ খেলে মধুর খেলা।
তুমি আছ হ্রেষা বৃংহণে যথা শাণিত আয়ুধে শােণিত ছুটে
বুথ-কেতু যথা শতধা ছিন্ন, রথীর কিরীট ধূলায় লুটে।
তরুশাখা হতে পলিত পত্র ঝরে পড়ে যায় শরৎ সাবে,
শিশির ঋতুর বিষ-নিশ্বাস কালব্যাধি আনে ফুলের মাঝে।
গ্রহ তারকারা ডুবে যায় নভে আছে নিরূপিত সময় তার
দিগ, দিগন্ত যুগ যুগান্ত তােমার শাসনে, হে সংহার।
১১

সাধ
বৈদেশিকী
শপথত
(জাপানী)
হৃদয় ভেঙ্গেছ মম তার লাগি প্রিয়তম অশ্রু নাহি ঝরে,
শপথভঙ্গের দোষে পড়িয়াছ দেবরোেষে তাই মরি ডরে।
তারি লাগি হই সারা, হইয়াছি জ্ঞান-হারা উন্মাদিনী সমা।
মাের ভাগ্যে যাই হােক, বিধাতা সদয় নােক লভ তার ক্ষমা।
প্রবাসী
প্রার্থনা
( পারসী)
তােমা হতে দূরে যেতে নাহি সাধ কোন মতে হে প্রিয় সুন্দর,
বেহেস্তে হুরীর দলে রজনীষাপনা সুখে চাহিক বর।
যথা রাখ, কৃপা করি তব চরণতলে রাখ চির দিন
বিনিময়ে চাহিনাক ধনভাগ্য কারুণে’র তব সঙ্গহীন।
সাধ
( গ্রীক)
হে কৰিদয়িত, গভীর নিশীথ ভুবন ভরিয়া ঘনায় যবে
মােরে পরিহরি চেয়ে রও তুমি তারকাখচিত সুনীল নভে।
সাধ যায় মাের ঘটাকাশ ভাঙি মহাকাশ মাঝে বিলীন হই,
ত্যজি নারীরূপ বিমান জুড়িয়া কোটি তারকায় ফুটিয়া রই।

পর্ণপুট
বসন্তে
(চীন)
নিখিল ভরিল ঋতুরাজের রূপে,
কমল কুমুদ মালা
যেন হুরী পরী বালা
ফুটিল তড়াগ দীঘি বাপী ও কূপে।
ঘনাইল পীচবন পাতার ছায়ে,
কুঞ্জ খসিয়া উঠে মলয় বায়ে,
গাহিছে অযুত পাখী
কনক বরণ মাখি
উইলাে ফুটিল নদীপুলিনে চুপে।
চির পুরাতন তবু নিতুই নব
কথার হৃদয়ে পুন সমুদ্ভব,
সুন্দর পানে হিয়া
ছুটে আজি উছসিয়া
পূজা তার দিশি দিশি কুসুমধূপে।
পরিচারিকা
কবি ও শিল্পী
( ওলন্দাজী )
রাজার বাড়ীতে দানের সত্ৰ, কেহ লয়ে যায় মণির মালা
কেহ লয় চেয়ে বসন ভুষণ কেহ বয়ে যায় মােহর থালা
কেহ লয় চেয়ে বাড়ী কি বাগান, কেহ লয় চেয়ে হাতী কি ঘােড়া,
শিল্পী লইল ফুলদানী দুটা কবি নিল শুধু ফুলের তােড়া।
র

অনধিকারী
নিভৃতের পাখী
(ইংরাজী)
লােকালয়ে এসে যেই পাখী গায়, গায় যেই পাখী লােকের তরে,
লােককীৰ্ত্তির দেউলপথে সে গলা চিরে শেষে একদা মরে।
মাংসলুব্ধ গৃধের শ্রেণী তার লাগি উড়ে বেড়ায় নভে
নগরের পথে তার দেহ লয়ে তীক্ষ্ণ নখরে ছিড়িতে রবে।
তার চেয়ে শ্ৰেয় তাহার জীবন, গায় যেবা গিরিগহনে বনে
বনফুল অলি লতা মঞ্জরী তাহার মর্ম কাহিনী শােনে।
নরসমাজের গর্বিত দয় কুষ্ঠিত যশ তারে না দহে
নীরবে নিভৃতে একদা নিশীথে কুঞ্জের কোলে মরিয়া রহে।
অনধিকারী
(ফরাসী)
মণিকার বিপণি হইতে পারাবত হরি’ মুক্তা ফল,
ভােজন করিতে গিয়ে দেখে শস্য নয়, কঠিন উপল।
নৈরাশ্যে কহিল, ফেলে দুরে নবুদ্ধি নাহি বুঝি আমি
কেন এর যত্ন ? এর চেয়ে শস্যকণা ঢের বেশী দামী।
পিতার দপ্তর খুঁজে পেতে, লয়ে জীর্ণ পাণ্ডুলিপি চয়
সাহিত্য সংসদ দ্বারে গিয়ে অরসিক সুরাপায়ী কয়,
“অকেজো এ খাতা খানা লও, এর মর্ম আমি নাহি জানি
বিনিময়ে কিছু দাও, আজ মদের দামের টানাটানি।”

बम्नौ
( জার্মান।
অস্থিচর্ম পঞ্জরের কারাগারে অবরুদ্ধ আছ নিশিদিন,
কোটি কোটি স্নায়ুজালে শতপাকে স্বাধীনতা হীন,
ধমনীপরিখ ভরি বহিতেছে রক্তনদী তার চারি ধারে
প্রপঞ্চে সংকীর্ণ তুমি গােচরের প্রহরীরা ইন্দ্রিয় দুয়ারে।
এই সৰ্ববন্ধু মাঝে বন্ধাতীত মম আত্মা বন্দী কোন পাপে ?
পীড়ন সহিছ তুমি দেবক্রোধসমুদ্ভূত কোন অভিশাপে ?
পাষাণ দুর্ভেদ্য জানি শৃঙ্খল দুচ্ছেদ্য মানি, পরিখা দুস্তর,
তুমিও দুর্জয় রুদ্র বময়, তবু কেন কারার ভিতর?
কবি
(রুশ)
সুচতুর ভাবে মিথ্যা যে কয় কারবার যার মিথ্যা নিয়ে,
মিথ্যারে যেবা করে উপাদেয় মধু ও চিনির প্রলেপ দিয়ে
আজগুবী যত অলীক সাজায়ে অকে যেই জন মােহন ছবি
সবচেয়ে সে-ই সত্য যে বলে লােকে কয় তারে অমর কৰি।
বঞ্চনা ও করুণা
(লাটিন)
ওরে ও অধীর বলো না বধির করুণাসাগর বিশ্বনাথে
বহু কামনার অপূর্ণতা বা মনােবাসনার ব্যর্থতাতে,
১২২
৫

অপাত্রে দান
বঞ্চনামাঝে কঠোর কৃপার ছল-ব্যঞ্জনা রাখেন প্রভু
দিয়ে দেন যে সব হতে বেশী বঞ্চিত করে বাঁচান কভু।
বিচার ও দুঃখ
(হিব্রু)
একদা নিশীথে দৈন্যে দুঃখে হয়ে আছি যবে মুহমান
সহসা আমার কর্ণে পশিল কাহার কঠোর কণ্ঠতান।
“দুঃখে দৈন্যে বড় বলে মেনে অবিচারী তুমি কহিছ মােরে,
সহসা আমার সংজ্ঞা জাগিল, সান্ত্বনা এলে ব্যথার ক্রোড়ে।
প্রত্যাখ্যান
(পেনিশ )
দাওনিক আলাে চেয়েছিনু যবে, তােমাতেই থাক তােমার আলো,
আঁধার আমার বেশ সয়ে গেছে আধারেই থাকি এ মাের ভালাে।
পিপাসায় যবে ফাইছিল ছাতি দাওনিক একবিন্দু বারি,
নিজের শােণিতে মিটায়েছি তৃষা, মিছে আনিয়াছ সােনার ঝারি।
বড় আশা করে চেয়েছি প্রেম, দাও নি তা ছিল অনেক দামী,
‘পুষী’ টারে কেহ ভাল বাসেনাক, দিয়ে যাও তারে, চাইনা আমি।
অপাত্রে দান
(স্কচ )
কুল দেখে কি বিত্ত দেখে বুড়ার সাথে মেয়ের বিয়া,
দেয় যাহারা তাদের মত নাইক কারাে পাষাণ হিয়া।

পর্ণপুট
গেনের মতন জামাই তাড়েন কন্যা পালায় আগে অাগে,
ভয়চকিতা পায়। যেমন, ব্যাধের পায়ে শরণ মাগে।
শেষ
দিনটী হইল শেষ।
রবি গেল পাটে
পাঠশালে পাঠ শেষ ছুটী সবাকার
মাঠে শেষ সেচা কোড়া, বেচাকেনা হাটে
তটে শেষ তটিনীর খেয়া পারাপার।
ঘাটে শেষ ঘট ভরা কঁকণের তান,
গােঠে শেষ গােধনের দিনান্ত ভােজন,
বট বিশ্বে শেষ বনবিহগের গান
বাটে শেষ হাটুরের ব্যস্ত বিচরণ।
ফোটা শেষ মালতীর বনে উপবনে
মঠে শেষ আরতির নিক্কন মধুর
ঝাটে পাটে গৃহকাজ কুটীর প্রাঙ্গণে
হাটা শেষ করি পান্থ করে ক্লান্তি দূর।
এই সর্ব শেষ মাঝে উদাস সন্ধ্যায়
জীবনের-শেষ, সে ও উকি দিয়ে যায়।
সমাপ্ত
১২৪

যুক্ত কালিদাস রায় প্রণীত গ্রন্থাবলী সম্বন্ধে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন- “তােমার কবিতা বাংলা দেশের মাটির মতই স্নিগ্ধ ও শ্যামল। বাংলা দেশের প্রতি গভীর ভালবাসায় তােমার মনটি কানায় কানায় ভরা—সেই ভালবাসার উচ্ছলিত ধারায় তোমার কাব্য-কানন সরস হইয়া কোথাও বা মেদুর কোথাও বা প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়াছে। তােমার এই কাব্যগুলি পড়িলে বাংলার ছায়াশীতল নিভৃত আঙিনার তুলসীমঞ্চ ও মাধবীকুঞ্জ মনে পড়ে। ঋতুমঙ্গল মুল্য ॥ -বাঁধা ১১ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই, এ, পরীক্ষায় মহিলাদের পাঠ্যরূপে নির্দিষ্ট প্রবাসীর মন্তব্য ষড়ঋতুর বিচিত্র বিলাসলীলা, রূপবৈচিত্র্য ও সম্পদ সম্ভারের বিশেষ অবলম্বন করিয়া বহু খণ্ড-কবিতার সমষ্টি এই ঋতুমঙ্গল। কবি বিচি ছন্দের কবিতায় প্রকৃতির ষড়ঋতুর বিশেষত্বের সহিত বঙ্গবাসীর হৃদয়ে যােগ সাধন করিয়া দিয়াছেন। যারা প্রকৃতির বিচিত্রতার মধ্যে মান মনের ভাব ঐশ্বর্যের ওতপ্রােত আদান প্রদান অনুভব করিতে চান তার ঋতুসংহার রচয়িতা মহাকবি কালিদাসের চরণানুসারী এই ক কালিদাসের ঋতুমঙ্গল পাঠ করিয়া আনন্দিত হইবেন। এবা চৈত্র ১৩২৫।

পরিচারিকা-ঋতুমঙ্গল কাব্যখানি আগাগােড়া সুমিষ্টছন্দে গ্রথিত। জয়দেবের গীতগােবিন্দের ন্যায় কোমলমধুর শব্দে ও ছন্দোবিন্যাসে ঝঙ্কত। সংস্কৃত ইন্দ্ৰবভ্রাছন্দ হইতে আরম্ভ করিয়া বাংলাভাষায় প্রবর্তিত বহুছন্দে কবি এই কাব্যখানি রচনা করিয়াছেন। এই কাব্যখানি পড়িয়া আমরা বিশেষ তৃপ্তি লাভ করিয়াছি। বল্লী মুল্য ॥ বাঁধা দ কবির ‘কুন্দ’ ও ‘কিসলয়’ একত্রে ২য় সংস্করণে বল্লরী। প্রবাসীর মন্তব্য-“খুব দক্ষ কারুকর ভিন্ন এই শ্রেণীর Epigrammatic poem সাফল্য লাভ করিতে পারে না। নবীন কবি এই কঠিন পরীক্ষায় সগৌরবে উত্তীর্ণ। অধিকাংশ কবিতাই কবিত্বসংযােগে রসমধুর।” ভারতীর মন্তব্য-কবিতাগুলির অধিকাংশই ভাবে স্নিগ্ধ, ভাষায় সুন্দর ঝঙ্কারে রমণীয়, ছন্দের অপূৰ্ব্ব লীলায় মনােহর। শব্দচয়নেও লেখকের দক্ষতা অপূৰ্ব্ব । এই তরুণ কবির কলঝঙ্কারে এমন একটা আন্তরিকতা আছে যে প্রাণের তার সে ঝঙ্কারে সঘন স্পন্দিত হইয়া উঠে। ব্ৰবেণু-মুল্য ॥ আনা, বাঁধা ১১ কবিবর যুক্ত প্রমথনাথ রায় চৌধুরী বলেন— “তোমার ব্রজবেণু মরমে পশিল গো আকুল করিল মাের প্রাণ। আধুনিক কবিকুলে তুমিই একমাত্র ব্রজ কবি, তােমার বিশেষত্ব,তুমি ব্ৰজের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড দেখিয়াছ। ধর্মকে এমন কৰ্ম্মজগতের উপযােগী, সরস সরল স্বাভাবিক করা প্রথম শ্রেণীর কবির কাজ—তুমি তাই। এতে শুধু আমাকে আকুল করে নাই—অবাক করিয়াছে।” “ভারতবর্ষ।”

অর্চনার অভিমত-(মুঙ্গের কলেজের অধ্যক্ষ কালীপদ মিত্র) “ৰজবেণু আমার ভিতরে যে সঙ্গীতের প্রতিধ্বনি জাগরিত করিয়াছে তাহাতে কোথাও কোথাও বিহল হইয়া পড়িয়াছি-পঙক্তিগুলি পড়িতে পড়িতে একটা বাষ্প জমিয়া উঠিয়াছে—গলা ভারি হইয়াছে—নেত্রপল্লব বিন্দু বিন্দু অশ্রুকণায় ভরিয়া উঠিয়াছে।” পর্ণপুট ( প্রথম খণ্ড) তৃতীয় সংস্করণ—মূল্য, উৎকৃষ্ট বাঁধাই, ১০ ভারতবষ-কবিতাগুলিতে সার আছে--সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলে সমাবেশে হৃদয়গ্রাহী। ছন্দের ঝঙ্কারও বড় মিঠে। পাঠকবর্গকে অনুরােধ তাহারা কবিতাগুলি মনে মনে না পড়িয়া যেন আবৃত্তি করেন, তাহ হইলেই ছন্দোমাধুর্যে ভাষাচাতুৰ্যে চমৎকৃত হইবেন। যাহারা তরু তাঁহারা প্রেমগীতিগুলি পড়িতে পারেন। সে গুলিতে মাধুৰ্য্য আছে কিন্তু তীব্রতা বা উদ্দামতা নাই। ম ৯ পরিশেষে বক্তব্য, পুস্তকের ছাপা কাগজ মলাট সবই পরিপাটী মুদ্রাকপ্রমাদ বড় একটা দেখিলাম না। তবে পুস্তকখানির নাম পরিচয়। যেন একটু খটকা বাধিল—পর্ণপুট-—স্বর্ণপূট ? অধ্যাপক শীললিতকুমার বিদ্যারত্ন এম, এ,। দেশমান্য শ্রীযুক্ত অশ্বিনীকুমারদ কবিতাগুলি পড়িয়া সব সত্যই মুগ্ধ হইয়াছি। একবার মনে হইয়াছিল, এমন পুস্তকের না পর্ণপুট না রাখিয়া স্বর্ণপুট রাখা হইল না কেন? আবার মনে হইল- জগতের চিত্তহারিণী মাধুরী স্বর্ণে ?-না—পর্ণে ? বিশেষ পল্লীকবিতাগুি পড়িয়া পর্ণপুট নামই যথার্থ মনে হয়, আর বলিতে ইচ্ছা হয়, ?

BAP * * * * * * * * হে সুকাব জুহল জ্বালা। বঙ্গবাসী—এরূপ স্বজাতি ধর্ম স্বদেশপ্ৰীতিৰ ভাব লইয়া আর কোন কবি মাতৃভূমির স্বরূপ-বিকাশে অবতীর্ণ হইতে পারেন নাই। ভাষায়, ভাবে, অলঙ্কার, ঝঙ্কারে, অঙ্কনে, চিত্ৰনে কবি শক্তিমান। আলােচ্য কবির নিকট অনেক আশা আছে। মানসী সম্পাদক মহারাজ জগদিন্দ্র নাথ বলেন–পর্ণপুট এক- নিসে পড়িয়া ফেলিয়াছি, উহা পাঠে যে আনন্দ পাইয়াছি, তাহা ভাষায় প্রকাশ করিবার ক্ষমতা আমার নাই। আপনার কবিতা সম্বন্ধে বলিতে গেলে এই বুলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, আপনার কবিতা ছাড়া যদি মানসী বাহির হয়, তবে মঙ্গহীন হইয়া বাহির হইবে। একথা আমার স্তুতিবাক্য নহে, সত্য কথা। দেশবন্ধু যুক্ত চিত্তরঞ্জন দাশ-পর্ণপুটের কতকগুলি কবিতা আমার খুব ভাল লেগেছে। ঢাকা সাহিত্য-পরিষদের সভাপতির অভি- ভাষণে পর্ণপুটের কথা বলিয়াছি ও, এক অংশ উঠাইয়া দিয়া'ছ। আপনি যে প্রকৃত কৰি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। প্রবাসী। কালিদাসৰু লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি, তাঁর এই কাব্যগ্রন্থও প্রথিতষশ। অনেক সুন্দর কবিতা এই পুস্তকে আছে। কাব্যামােদী যারা এখনো এই পর্ণপুটের অমৃত আস্বাদ করেন নাই; তাঁরা এইবার হা করিবেন আশা করি। ১৩২৮ ফালুন। সবিতা রায়, কড়ই পােঃ বর্ধমান। ক কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Parnaput Vol. 2

Author
Roy,kalidas
Title
Parnaput Vol. 2
File name
Parnaput Vol. 2
Text
OCR done
Citation
1921
Published
2009/11/27
Publisher
Gupta And Company,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
134
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Roy,Kalidas
DLI number
513040
Barcode
4990010020056.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
20As8Yb5Rkq
Download PDF

Parnaput Vol. 2