Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Anjali
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
অঞ্জলী
ইন্দুভূষণ রায় প্রণীত।
শ্ৰীতারকগােপাল ঘােষ বি, এ, কর্তৃক
৬৩৪, মেছুয়াবাজার রােড হইতে
কলিকাতা
১২, মেছুয়াবাজার রােড, ঝামাপুকুর,
নবৰিভাকর যন্ত্রে,
শ্রীগােপালচন্দ্র নিয়োেগী দ্বারা মুদ্রিত।
১২৯৪।
মুল্য • আনা।
No text on this page.
উপহার।
ভৈরবী-চৌতাল ।
প্রাণেশ হে, প্রাণারাম,
প্রাণ-রমণ, চিত্ত-মােন,
সৰ্ব্বস্ব সঁপিয়ে তােমা
তৃপ্তি না মানে প্রাণ।
অতি বিচিত্র বিশ্ব-রচনা
অসীম সুন্দর, পূর্ণ মঙ্গল,
পরাস্ত চিন্তা দিব্য প্রতিভা
সীমা কে দিবে তার।
তারই মাঝে গঠিলে বিরলে
হৃদয়-কুসুম-কানন এ,
হে শিল্পী মহিমা তােমারই হে;
আহরি যতনে রুচির প্রসূনে
প্রেমা জড়িত নানা রাগ যুত
সােহাগে দি তােমারে নাথ
লহ লহ উপহার।
No text on this page.
ভূমিকা। যিনি এই অনন্ত, অসীম, অতি বিচিত্র, অসীমসুন্দর, পূর্ণমঙ্গল, দিব্যপ্রতিভা ও চিন্তাকে পরাস্তকারী বিশ্ব রচনা করিয়া তারই মাঝে বিরলে যে হৃদয়-কুসুম-কানন গড়িয়া- ছেন, আমাদের কবি সেই কুসুমােদ্যান হইতে নবরাগযুত প্রেমাজড়িত কুসুমাবলী চয়ন করিয়া প্রেমভরে সেই বিশ্বশিল্পীকেই অঞ্জলি প্রদান করিয়াছেন। কবির হৃদয় কুসুম-কাননে স্বভাবজাত কুসুম বই আর কিছুই নাই। দেশবিদেশ হইতে আনীত কলমের গাছ নাই। সে কুসুমে সুবাস এবং মধু আছে কি না তাহা কাল পরীক্ষা করিয়া বুলিবে। সকল সুদৃশ্য ফুলে মধু থাকে না, অথবা সকল মধুময় ফুলে সৌন্দৰ্য্য থাকে না। একাধারে রূপ, গুণ এবং সহজলভ্যতা প্রকৃতির কোথাও দেখা যায় না। সুতরাং অঞ্জলি প্রদাতার কুসুমগুলির মধ্যে যে সে সকল গুণই আছে, আমরা এরূপ বলিতে চাই না। শুধু তাও নয়। আজ এই উনবিংশ শতাব্দীতে নূতন সভ্যতার আলােক পাইয়া ভারত নূতন ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া উঠিয়াছে। এখন আর লােকে ধূপদীপ-গন্ধমাল্য-চুয়াচন্দন সমম্বিত দেবচরণে উৎ- সর্গীকৃত বন্য কুসুমের নির্মাল্য মস্তকে ধারণ করিয়া তৃপ্ত হয় না; বরং উহা অসভ্যতার পরিচায়ক বলিয়া গণ্য হয়। সুবাসিত অডিকলম গ্রভৃতি বিলাতী গন্ধদ্রব্য না হইলে লােকের আর ভাল লাগে না। এখন তাপসতরুমূলস্থ বেদীতে উপবিষ্ট জটাবলধারী আচার্যের উপদেশে আর মধুরতা নাই। ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দিবার জন্য এখন নাট্যশালা এবং
•
বারাঙ্গনার প্রয়ােজন-নতুবা উহা নীরস লাগে। সুতরাং
আজিকার দিনে যে এই অঞ্জলিবদ্ধ কুসুমে সকলেরই মনাে-
রঞ্জন করিবে, আমরা সে আশা করিতে পারি না।
এখন যদি কাহারও জিজ্ঞাস্ত থাকে যে, পাঠকসমাজে
আদৃত হইবার প্রত্যাশা নাই, তবুও ইহা সাধারণে প্রকাশ
করা হয় কেন ? তাহার উত্তরে আমাদের এই মাত্র বলি-
বার আছে যে, পাঠকসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করা আমাদের
উদ্দেশ্য নহে। চিন্তা, ভাব ও পরিশ্রমের বিনিময়ের উপরই
মানবসমাজ প্রতিষ্ঠিত। ইহা মানুষের প্রকৃতিসিদ্ধ- ইহার
উপর আমাদের কোন হাত নাই। সুতরাং কতক পরি-
মাণে উহার জন্য মানুষ দায়ীও বটে। যাহাদের খাটুনিতে
বাঁচিব, তাহাদের জন্যই খাটিব ;-ইহা আপনা আপনি
শিখিয়াছি। সুতরাং যে যতদূর পারে সে তাহাই করে।
ললাকের মুখাপেক্ষী হইলে চলে কই-আমি পারি কই
আমার যাহা আছে দিলাম ; ইহাতে কাহারও কোন কাজ
হয়, ভাল;-আমি সার্থক জন্মা হইলাম; না হয়, আমার দোষ
কি ? যিনি হৃদয়-কুসুম-কানন জন করিয়াছেন, তাহার
চরণেই সে কাননের কুসুমরাশি সােহগে ঢালিয়া দেওয়া
হইয়াছে ; সে নিৰ্ম্মাল্য যদি কেহ আদর করেন, তাহারই
মহিমা , না করেন, তাহারই ইচ্ছা। তাহাতে গ্রন্থকার বা
প্রকাশকের বলিবার কিছুই নাই। আমরা এই মাত্র বলিব
‘‘তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক।”
গ্রন্থে নূতন কি আছে ? নূতন কি থাকিবে ? পৃথিবীতে
নুতন কিছুই নাই। হৃদয় পুরাতন ; চিন্তাশক্তি পুরাতন ;
?
;
ভাবুকতা পুরাতন; ভাষা পুরাতন; ছন্দোবন্ধন পুরাতন; সবই পুরাতন ; নূতন কোথায় আছে? এক দিকে যেমন সবই পুরাতন, অপর দিকে তেমনি নূতনও আছে। এই চিন্তা, ভাব ও শক্তির গতি স্বতন্ত্র ;- আজকার দিনে উহা অনেক পরিমাণে স্বতন্ত্র ;-সুতরাং নূতনই বলিতে হইবে।-উষার সৌন্দর্য্যে অনেকেই মুগ্ধ হয় ; উষা যে নীরবে, গম্ভীরভাবে, ভক্তিরাগে রঞ্জিত হইয়া ভুবনেশ্বরের আরাধনা করে, তাহা কয় জনে দেখে ? বীণ, সেতার, তানপুরা, তবলা, পাখােয়াজাদি সহযােগে, বিশুদ্ধ তানলয়মিশ্রণে কলাবতের গীতধ্বনিতে অনেকেই মুগ্ধ হইয়া থাকে,—কিন্তু এই অনন্ত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড যে দিব্য নিরুণে, দিব্য বাদি সংযােগে, দিব্য মধুর তানলয়সহকারে অবি- শ্রান্ত অনন্তস্বরে ভুবনেশ্বরের বন্দনা গান করিতেছে, তাহা কয় জনে শুনিয়া থাকে? “কার বা পিতা, কার বা মাতা ; কার বা ভাই, কার বা ভগ্নী; নদীস্রোতসমাকুল কাষ্ঠখণ্ড- চয়ের ন্যায় একত্রিত হইয়া আবার সেই স্রোতাবেগেই দূর দূরান্তরে চলিয়া যায় ; কায়ে প্রাণে সম্বন্ধ নাই কাকস্য পরিবেদনা।” সকলেই এই কথা বলে ; কিন্তু ইহলােক এবং পরলােকে যে অচ্ছেদ্য যােগ রহিয়াছে, তাহা কয়জনে বুঝিতে পারে ? অপর দিকে পিতা, মা, ভাই, ভগ্নী, স্ত্রী, পুত্র, বন্ধু, বান্ধব, ইহারা সকলেই যে এক এক খণ্ড ভারী প্রস্তরের ন্যায় হইয়া মােহসূত্রে বান্ধিয়া মানুষকে অগাধ সংসারসাগরে অনুক্ষণ নিমগ্ন করিতেছে; সংসার রূপ ব্যাধ যে মােহবাগুরা পাতিয়া, সুখবংশীর মােহন ধ্বনিতে ; আনস-কুৱঙ্গকে প্রলুব্ধ করিয়া, অবশেষে বিষম নিরাশা-শরে বিদ্ধ করিতেছে ; ভবসংসার যে একটী ভীষণ মরুক্ষেত্র, সুখ যে তাহাতে মরীচিকা মাত্র ; ‘সংসার-কাননের কোন বৃক্ষেই যে প্রিয়তম সুখপক্ষী নাই ;'—‘সেই অাখির আলােক বিনা এ সকলি যে অন্ধকার’; তাহা কে চিন্তা করে ? আমাদিগের গ্রন্থকারের চিন্তা পৃথিবীর সুখ দুঃখ, প্রণয় বিচ্ছেদ, এ সকল অতিক্রম করিয়া অবিরত উর্ধদিকে ধাবমানা। প্রকৃতির মনােমােহিনী ছবি দেখিতে দেখিতে, সংসারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতে করিতে, সুখীর সুখের মধ্যে, দুঃখীর দুঃখের মধ্যে, প্রণয়ীর প্রণয়ের মধ্যে, এবং বিরহীর মর্মস্পর্শী বিরহগীতির মধ্যে আমাদের গ্রন্থ- কার প্রতিমুহূর্তে জীবন-মহাষাগের কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছেন--সুখ দুঃখ, সম্পদ বিপদ, মিলন বিচ্ছেদ, জীবন ও মরণ সমানভাবে স্বর্গের সােপান হইয়া আমাদের গ্রন্থ- কারের নিকট নূতন ভাবে প্রকাশিত। পাঠকসাধারণের ময়নসমক্ষে তাহার সমুজ্জ্বল চিত্র গ্রন্থকার দিতে পারি- য়াছেন কি না জানি না, তথাপি তাহার এই সূত্র- পাতই আমাদের নিকট প্রচুর বলিয়া বােধ হইতেছে। কবি তাহার সকলটুক সুখ, সকলটুক দুঃখ, সকলটুক ভাব, সকলটুক চিন্তা, সকলটুক প্রেম, সকলটুক ভক্তি অঞ্জলি পূরিয়া সেই ভক্তাধীন চরণে সমৰ্পণ করিয়াছেন— আমরা বলি কবির সকলই সার্থক হইয়াছে। গ্রন্থে কবিত্বের উচ্ছাস কতদূর আছে, তাহা আমাদের বিচাৰ্য্য নহে। তবে এইমাত্র বলি যে, কবি স্বীয় ভাবে অনু-
lo
প্রাণিত হইয়াই ইহার সকলগুলি কবিতা লিখিয়াছেন; ইহাতে
অন্য কাহারও ভাব বা ছায়া প্রতিফলিত করা হয় নাই।
এ সব বিষয়ে আর আমরা কিছু বলিতে চাই না।
সাধারণ্যে যাহা প্রকাশ করিতেছি, তাহার বিচার সাধা-
রণ্যেই হউক। এই উপলক্ষে আমাদের আরও কয়েকটী
কথা আছে, অতঃপর তাহাই নিবেদন করিতেছি।
১। বাঙ্গালায় কবিতা লিখিতে হইলে অক্ষর গণনা
করিয়া লিখিতে হয়। কিন্তু একটু সূক্ষ্মরূপে চিন্তা করিলেই
দেখা যায়, যে উহাও মাত্রা-বিভাগের উপর নির্ভর করে।
বাঙ্গালায় এক এক অক্ষরে এক এক মাত্রা ; এই জন্যই
অক্ষর গণনা করা হয়। মাত্রা আবার উচ্চারণের সময়-
বিভাগানুসারে নির্ধারিত। সুতরাং যেখানে স্বরান্ত বর্ণ
হলন্তের ন্যায় উচ্চারিত হয়, সেখানে গণনায় একটী অক্ষর
বেশী থাকা দোষ মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে না। তােপ,
যেখানে স্বরান্ত বর্ণ হলন্তের ন্যায় উচ্চারিত হইলেও ছন্দঃ
পতন না হয়, সেখানে মাত্রা-সংখ্যা নির্দিষ্ট রাখিবার জন্য
বিশেষ চেষ্টা না করিয়া যদি হলন্ত বর্ণই দেওয়া যায়,
তাহাও দোষ মনে করা উচিত নহে। অপর দিকে যে যে
স্থলে কেবল মাত্র অর্থসাধনের নিমিত্ত শব্দের অন্তে ‘ও’কার
বা ‘ই’কারের উচ্চারণ করিতে হয়, এবং ঐ ‘ও’কার বা
‘ই’কারের উচ্চারণ স্বতন্ত্র না হইয়া শব্দের শেষ বর্ণের
সহিত উচ্চারিত হয়, সেই সেই স্থলে ঐ ‘ও’ বা ‘ই’কে
একটী স্বতন্ত্র মাত্ৰামধ্যে গণনা করা উচিত নহে। এই গ্রন্থে
সর্বত্রই এই প্রণালী অবলম্বিত হইয়াছে।
in ২। বাঙ্গালায় চলিত ভাষায় সম্বােধন পদের ব্যবহার আদৌ নাই বলিলেই হয়। ডাকিবার সময় কেহই সরলাকে ‘সরলে, ‘সাধু’কে ‘সাধাে’ বা ‘হরি’কে ‘হরে’ বলিয়া ডাকেন না। কেবল সংস্কৃতের অনুকরণেই এই পদ্ধতি ব্যবহারানুবােধ ব্যতিরেকেও ব্যাকরণে স্থান পাইয়াছে। বাস্তবিক পক্ষে এই রীতি সম্পূর্ণ নিপ্রয়ােজন। এই কারণে, এবং এবিষয়ে একটী মীমাংসা হওয়া প্রার্থনীয় মনে করি- যাই আমরা গ্রন্থ মধ্যে এই রীতির অনুসরণ করি নাই। ৩। সংস্কৃতে যেরূপ লিঙ্গপ্রকরণের উপর ভাষা অত্য- ধিক পরিমাণে নির্ভর করে, বাঙ্গালায় তাহা করে না। এবিষয়ে বাঙ্গালা ভাষা সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃতের পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া চলিতে পারে নাই। ফলতঃ এসকলবিষয়ে সংস্কৃতের ন্যায় একটা বিশেষ বাঁধাবধির মধ্যে ফেলিয়া ভাষাকে অনর্থক দুরূহ করা আমাদের মতে যুক্তিসঙ্গত নহে। এই গ্রন্থমধ্যে আমরাও বিশেষ বিশেষ স্থল ব্যতীত যথাসাধ্য ঐ দুরূহ রীতি অতিক্রম করিয়া চলিয়াছি। কেবল মাত্র যে সকল স্থলে নিতান্ত শ্রুতিকর্কশ হইবার আশঙ্কা আছে, সেই সকল স্থলেই প্রচলিত রীত্যনুসারে লিঙ্গযােজনা করা হইয়াছে। ৪। বিশুদ্ধ উচ্চারণ অনুসারে সংস্কৃত বর্ণমালায় আট চল্লিশটী অক্ষর আছে। বাঙ্গালা ভাষায় সংস্কৃতের উচ্চারণ- পদ্ধতি পরিত্যাগ করিয়া বর্ণমালার সংখ্যা সমানই গ্রহণ করা হইয়াছে। স্বরবর্ণের হস্ব এবং দীর্ঘ উচ্চারণ এক রূপই করা হয়। হরি’ এবং ‘কালী’ বলিতে সমান সময়ই
প্রয়ােজন হয়, অথচ ‘কালী’ লিখিতে দীর্ঘ ঈকার না দিলে
একটী বিশেষ অশুদ্ধ বলিয়া গণ্য হয়। এইরূপ ব্যঞ্জন
বর্ণেও ‘জ” এবং “য’; দুটী ‘ব’; শ, ষ, স ণ, ন; বিসর্গের
পরস্থিত খ এবং ক্ষ, ইহাদের উচ্চারণগত পার্থক্য আমা-
দের দেশে আদৌ নাই ; অথচ লিখিবার বেলা সে
বিষয়ে বিশেষ সাবধান হইতে হয়। সুতরাং এই বর্ণ
গুলিকে অতিরিক্ত বলিলেও চলে। অপর দিকে, কতুক
গুলি উচ্চারণ আছে, অথচ তজ্জন্য বিশেষ বর্ণের কোন
ব্যবস্থা নাই। করে এবং ‘ক’রে’; ‘কাল’ এবং কাল,
ইত্যাদি স্থলে একই অক্ষরে ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ বিশিষ্ট
শব্দ হয়। ‘ক’রে এবং ‘কাল, বলিতে কতকটা ইকারের
উচ্চারণ হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ নহে। সুতরাং উহার মাঝে
‘ই’কার সন্নিবেশ করা যায় না; অথচ স্বতন্ত্র কোন
অক্ষরও নাই। যে (') চিটী ব্যবহৃত হয়, উহার কোন
নামও নাই, অথবা বর্ণমালার মধ্যে উহার কোন স্থানও
নাই। এটা একটা অভাবু বলিতে হইবে।
আমাদের বিবেচনায়, প্রথমােক্ত অতিরিক্ত বর্ণগুলির
হয় স্বতন্ত্র উচ্চারণ প্রচলন, না হয় একেবারে বর্ণমালা
হইতে উহাদিগকে অপসরণ করা উচিত। এবং শেষােক্ত
(') চিত্ন টীর ‘অনুক্ত’ এই নাম দিয়া অনুস্বাদির ন্যায়
বর্ণমালার মধ্যে স্থান দেওয়া উচিত।
সংস্কৃত ভাষায় অতিরিক্ত বর্ণগুলির বিশেষ বিশেষ
উচ্চারণ নির্দিষ্ট আছে। হ স্ব-দীর্ঘ-ভেদ বিশেষ রূপে
প্রচলিত। হ স্ব ও দীর্ঘ বর্ণ সকলের মাত্রার উপর নির্ভরূ
করিয়াই সংস্কৃত ভাষায় কবিতা লিখিতে হয়। হ্রস্ব, দীর্ঘ
এবং প্লত বর্ণে যথাক্রমে এক, দুই এবং তিন মাত্রা ধরা
সংস্কৃতের নিয়ম। ঐ নিয়ম লঙ্ঘন করিলে সংস্কৃতে ছন্দ
দোষে দোষী হইতে হয়। বাঙ্গালায় এ প্রথার বিন্দুমাত্রও
প্রচলন্স নাই। ফলত ঐ প্রথার অনেক উপকারিতাও
আছে। কিন্তু তাহা স্বত্বেও উহা বাঙ্গালা ভাষায় প্রচলিত
করা প্রায় অসম্ভব। তবে যদি কেহ সে চেষ্টা করিয়া
দেখেন, কি হয় বলিতে পারি না। ঐ প্রথা অবলম্বন
করাতেই জয়দেবের কবিতায় এত মধুরত্ব । এই গ্রন্থে
কতকগুলি সঙ্গীতে এই প্রণালী অবলম্বনের চেষ্টা করা
হইয়াছে। এক্ষণে সুধীজনগণসমীপে আমাদের প্রার্থনা এই
যে এ সকল বিষয়ের একটা মীমাংসার জন্য চেষ্টা হউক।
অবশেষে বক্তব্য এই যে, মুদ্রণকালে নানা প্রকার
গােযােগ বশত কোন কোন স্থলে বর্ণাশুদ্ধি ঘটিয়াছে,
অনেক স্থলে বিরাম-চিহু গুলির সুসমাবেশ হয় নাই
কোন কোন স্থলে শব্দুপরিবর্তন করিয়া দিবার কথাছিল,
তাহাও দেওয়া হয় নাই; সৰ্ব্বাপেক্ষা দুঃখের বিষয় এই
হইয়াছে যে প্রতি পৃষ্ঠার শীর্ষে গ্রন্থের নাম দেওয়া হয়
এ সকল ত্রুটীর জন্যে, ভরসা করি, পাঠকবর্গ
আমাদিগকে মার্জনা করিয়া বাধিত করিবেন। যদি
ঈশ্বরেচ্ছায় কখনও ইহার পুনঃসংস্করণ হয়, তখন সকল
ত্রুটি সংশােধিত হইবে ইতি।
শ্ৰীতারকগগাপাল ঘােষ বি, এ,
প্রকাশক।
নাই।
অঞ্জলী।
উষার দেবারাধনা।
ভৈরবী-ঝাপতাল।
নিরখি এ বিশ্বচ্ছবি জুড়াই নয়নে।
গাই আনন্দ রাগে লােকপাল ভূতভাবনে।
উষার প্রসন্ন শিরে জ্যোতীরাজ ভানুবিরাজে।
ভয় নাই তাপ নাই তমােহীন ভুবনে।
স্বর্ণরাগে সমুজ্জ্বল প্রকৃতি-সুন্দর ভুবন।
প্রকৃতি সুকণ্ঠা কোটি বিহঙ্গের কুজনে।
প্রকৃতির রাজা তুমি কেন নর নীরব ?
উঠরে জড়তা ছাড় গাও বিশ্ববন্দনে।
হরি স্মরণ করি, আনন্দ-বদনে,
খুলি দিব্য দিবদ্বার, বাহিরিল ধীরে,
ত্রিদিব-ললাম-ভূতা, পুণ্য-জ্যোতির্ময়ী
অরুণ-নন্দিনী ঊষা। ভরিল সংসার
মুগ্ধ-রূপ-মাধুরীতে, ভুবন ভরি
স্বগীয় সৌগন্ধ-ভারে। কিবা মায়া-বলে,
শান্তিরস-সিন্ধুনীরে নিমগন আহা!
।
( ২ )
ভয়-মুক্ত বিশ্বধাম। সখীরে নিরখি,
স্মিতমুখী মনানন্দে বসুমতী সতী ।
চিরবাল-লীলাময়ী সৰ্বরী সুন্দরী
খেলিতে শশাঙ্কলনে আজি অভিমানে
ঢালিয়াছে অঙ্গে কালি ; কলঙ্কিত তাহে
দেব-নর-বন্দনীয় অসীম সুন্দর
ভুবনেশ্বরের দিব্য ভুবন মন্দির।
কোকনদ-করে ধরি ঊষা সুবদনা
সুবর্ণের সম্মার্জনী
মন্দির মার্জনে,
আইলা প্রফুল্লমুখী ; মন্দাকিনী-নীরে,
বরষি সহস্রধারে তিতিলা ধরণী।
দূর-গত তমােজাল-কালিমা-জঞ্জাল ।
স্নাত-কলেবরা উষা, পুণ্যময়-প্রাণ,
পুণ্যশ্বেতবসনা, শান্তি-মাহিতা
বলিলেন যােগাসনে; শােভা হেরি মরি,
ভুবন ভাসিল ভাবে ; বাজিল দুন্দুভি
লােক গােলােক ধামে ; দিগঙ্গনাগণে
ফুল্লমুখী; মেঘমালা হেলিয়া দুলিয়া
বেড়াইছে মনােরঙ্গে ; অলকা-বাসিনী,
মহাযােগ-নিমগনা, দিব্য জ্যোতির্ময়ী
মনােরমা শুকতারা ;—যােগানন্দে আহা,
ক্রমে নিমীলিত আঁখি ; যােগ-ভরে যেন,
অনন্তের অনন্তত্ব-মাঝে লুকাইতে
চাহেরে ত্বরিতে ; দেখি, বহিল সন্দেশ
সুরভি-সন্দেশবহ, অনুরাগ ভরে,
অনিল, দেবের ঘরে; ভকতি-গম্ভীর
ছুটিল অমরবৃন্দ,
সমাগত আসি
রমণীয় উপাশে। কি শােভা মরিরে ।
কুমুদিনীকুল মাঝে, প্রসন্ন সলিলে,
কমলিনী ফুলরাণী, শােভে শতদলে
যেমতি, তেমনি উষা দেবসভা মাঝে।
প্রসন্ন পবিত্র মুখ সুখ-সমীরণে
প্রস্ফুরিত; বিন্দু বিন্দু ঝরে অবিরল
মন্দাকিনী-ধৌত-আঁখি দুৰ্বাদল-শিরে।
সে অশ্রু মাখায়ে ঘন দিয়া ফুলাঞ্জলি
ভুবনেশ শ্রীচরণে, বিহগ-কূজনে-
মনােন্মাদি, সকরুণ; গদগদ স্বরে,
গাহিল শ্রীমতী ঊষা ;-
নমে হে প্রাণেশ,
মন্দির-মার্জন-দাসী তােমার চরণে।
প্রাণে গাঁথা নাথ, তুমি আপনার প্রেমে,
কি আর বলিব আমি? তােমাধনে ছাড়ি,
বঁচে কি ক্ষণেক দাসী ? থেক প্রাণমাঝে,
( ৪ )
প্রাণধন, চিরদিন ; ও মুখ নেহারি,
প্রেম-উন্মাদিনী আমি, পরাণ-বিহ্বলা ;
নিত্য যেন হেন, বঁধু, বিসরি আপনা,
গাই তব যশােগান, এই হে মিনতি।
ভুবন সঙ্গীত।
১
যােগ-নিদ্রা পরিহরি আজ বিশ্ব গুন রে
ভুবন সঙ্গীত ;
আর নিদ্রা যেয়ােনারে, অই গুন এ সংসারে,
মধুর নিকণে নিত্য গীতধ্বনি উঠিছে-
অদ্ভুত সঙ্গীত।
মেঘে বাজে জয়ভেরী ভুবনেশ্বরের রে,
গম্ভীর সঙ্গীত !
গুনরে নীরবে আর সঙ্গীত ও চমৎকার,
বিবিধ ইন্দ্রিয় পথে প্রাণে পশি ভুলালে,
মজাইল চিত।
মন দিয়া গুনরে সঙ্গীত।
সন্ধ্যারাগে আভাময়ী
তটিনী সুন্দর যে
তাওত সঙ্গীত।
( ৫ )
আর অই শৈল-পায় বন-বিবাসিনী গায়
‘বিধি বলি ক্ষীণরবা ক্ষুদ্র তরঙ্গিনী রে,
তাওত সঙ্গীত।
কমলে ভাসালে প্রাণ সৌন্দর্য্যের হিল্লোলে,
তাওত সঙ্গীত।
আর অই যেন গলে, নীল পল্লবের কোলে,
কেসরের ক্ষুদ্র মুখ দেখি দেখি মজিলে,
তাওত সঙ্গীত।
বল তবে কি নয় সঙ্গীত ?
সুবিস্তীর্ণ মাঠগুলি শস্য-শােভা-তরঙ্গে,
তাওত সঙ্গীত।
ভীম শৈলরাজ শিরে ধরি চির-হিমানীরে
স্তবধ গম্ভীর বৃদ্ধ যােগী ধ্যানে নিমগ্ন,
তাওত সঙ্গীত।
জনপদে জনমুখে হাসি দেখি হাসিলে,
তাওত সঙ্গীত।
আর চল বন মাঝে যথা তরুরাজ রাজে,
অত্যুঙ্গ তমাল শাল ডুবি ভীম গাম্ভীর্যে ;
তাওত সঙ্গীত।
বল না গাে কি নয় সঙ্গীত ?
৪
দুরন্ত তৃষ্ণার জল
ক্লান্ত-পান্থ-পাশেরে,
তাওত সঙ্গীত।
বরষে মুষলধারে,
বসি নিজ গৃহ-দ্বারে,
দেখি, দেখি, দেখি ধারা, যা ভাবিলে মনেরে,,
তাওত সংগীত।
দুরন্ত প্রান্তরে পান্থ, দূরে ক্ষীণলােক রে,
তাওত সংগীত।
প্রাতে উচ্চমঞ্চে উঠি, দেখ রক্ত ভানু ছুটি
ব্যোম, বায়ু, বৃক্ষচূড় আরক্তিম রঞ্জিয়া,
তাওত সঙ্গীত।
বল তবে কি নয় সংগীত ?
স্বচ্ছ সরণীতে
চাদ কৌমুদী নাচায় যে,
তাওত সংগীত ।
বিঘাের তামসী নিশী অনন্ত বিস্তৃতি মিশি
উপজে যুগান্ত-দৃশ্য
বিশ্বময় ব্যাপিয়া
তাওত সঙ্গীত।
পত্রের নীলিমা মাঝে ফুল দোলে বাগানে
তাওত সঙ্গীত।
সন্ধ্যার গাম্ভীৰ্য্য কাছে পশ্চিমে চপলা নাচে
ঘাের ঘন-ঘটা বিশ্ব ডুবাইয়ে তিমিরে,
তাওত সঙ্গীত।
বল তবে কি নয় সঙ্গীত ?
কামিনীর কাণে দোলে গমনে ভুষণ রে
তাওত সংগীত।
স্তবকে স্তবকে ফুল পরি অঙ্গে সমাকুল,
বায়ুভরে বনলতা মৃদু মন্দ হিল্লোলে,
তাওত সংগীত।
বাসন্ত গগন তলে, সহকার শাখাদলে,
উড়ি, বসি, ঘুরি, ফিরি পতঙ্গে কি বলে যে,
তাওত সংগীত।
বল তবে কি নয় সঙ্গীত ?
৭
লক্ষ্যে ধায় জীবশিশু, সাধে কোলে লও যে
তাওত সঙ্গীত।
সংসার-সন্তপ্ত প্রাণ, করি যে অমৃত পান,
আদরের ধনে নিয়ে বুকে রাখি জুড়ালে
তাওত সংগীত।
কুসুমের পত্রে দোলে হিমানীর বিন্দুরে
তাওত সঙ্গীত।
( ৮ )
অপাঙ্গে পাইলে ক্রটি মায়া-মাখা আঁখিদুটী
অপাঙ্গে দোলায় অশ্রু দেখায়ে আঁধার রে
তাওত সংগীত।
রমণীর কিবা না সঙ্গীত ?
পর দুঃখে অশ্রু-আঁখি করুণাসুন্দরী যে
তাওত সংগীত।
রােগশয্যাপাশ্বে আসি ঢালে যে অমৃত-রাশি
মায়ার প্রতিমাখানি সুশ্রুষা-রূপিনী রে
তাওত সংগীত।
সংসার-মরুর মাঝে মধুমতী প্রীতি রে
অপূৰ্ব সংগীত।
এক ইন্দ্রজাল-বলে সমস্ত সংসার চলে,
যে করে নীরস প্রাণে রস সঞ্চারয়ে রে
তাওত সংগীত।
মর্তমাঝে ত্রিদিব সংগীত।
নিশীথ-বসন্ত-সখা মানস-উন্মাদী রে
অতুল সঙ্গীত।
নিশীথ-স্বপন-কোলে কর্ণে কি মাধুরী দোলে,
জাগিয়ে চমকি শুন সেই বেণু গান রে,
মধুর সংগীত।
( ৯ )
নদীবক্ষে দূরবাহী নিশীথ বেণুয়া রে,
বিচিত্র সংগীত ।
স্বর্গ মর্ভ ভাসাইয়া প্রাণ মন মাতাইয়া,
উৎকণ্ঠা-কামিনী-কণ্ঠে নিশীথ বিরহ রে,
অষ্পর সংগীত ।
মর্তে নারী জীবন্ত সংগীত।
কলঙ্কে কলঙ্কী চাদ অধিক সুন্দর যে
তাওত সংগীত।
রমণী-শ্রীমুখমাঝে, কলঙ্কী জযুগ রাজে,
তলে তার কৃষ্ণ আঁখি ইন্দ্রজালময় রে,
তাওত সঙ্গীত।
পাতা গুলি নিয়ে খেলি সুখী সমীরণ যে,
তাওত সঙ্গীত।
কৌতুকী অনিল, একা শ্ৰীমতী অলকা-রেখা,
কপাল-প্রান্তরে পেয়ে যে খেলা সে খেলে রে
তাওত সঙ্গীত।
এ জগতে কি নয় সঙ্গীত ?
১১
অনন্ত আঁধারে ছিল
এ হেন ভুবন যে
তাওত সঙ্গীত।
( ১ )
সেই সে আঁধারে হয়
তরল আলােকোদয় ;
জয় ! জয় ! ভুতময় বিশ্বরূপ ভাসিল !
তাওত সঙ্গীত।
বিশ্ব যাবে রসাতল ; আবার মারুত, জল,
রুষিবে প্রলয়ানল, পরস্পরে গ্রাসিবে ;
ব্যোম চিরস্থিত ;
যােগীন্দ্র পুরুষ পাশে সকলি সঙ্গীত রে !
সকলি সঙ্গীত !!
সংসার সঙ্গীতময়,
নিত্য উঠে তান লয়,
ঋষভ পঞ্চমে সদা সুধাধার ক্ষরিছে।
বাতুল আমি রে তাই
মহেশের গুণ গাই
ক্ষীণ কণ্ঠ মিলাইয়া ভুবন সংগীতে রে,
প্রাণ মােহে মােহিছে।
তােমার দয়ায় প্রাণ,
চাহি, করি প্রতিদান ।
এত সুখে তুমি দেব মহী তুমি মেখেছ।
এ রস-রসনে শক্তি দীন জনে দিয়েছ।
জননীর সন্দেশ।
‘উঠ বৎস উঠ বলি কে ডাকিলা মােরে
দ্বিযাম যামিনী যােগে ? শুনি সেই ধ্বনি,
চমকি উঠিল প্রাণ, চাহিনু চকিতে
হেরিনু-(হায় রে ! কিবা কব তা এ মুখে ?
ভুলিতে কি পারি আমি ?)—জননী আমার ।
সেই মুখ সেই আঁখি, সকলই সে সব
পুণ্য-প্রেম-বিজড়িত। রহিল চাহিয়া,
কেমন বিভ্রান্ত মন, অনিমিষ আঁখি
মুখপানে; দুনয়নে নেহারি নেহারি
সহসা বহিল ধারা। সুধাইনু ধীরে,
মা আমার! কেম আজি এ মহীমণ্ডলে,
এলে, মা জননী? ওমা ! ওমা! হেরি তােমা
ধায় দুনয়নে অশ্রু, নারি নিবারিতে।
কেন আজি এ নিশীথে, কি মনে করিয়া,
দিলে দেখা দীন জনে? স্বর্গসুখমাঝে,
পড়ে কি, মা ! মনে তব অভাগা সন্তানে ?
ছেড়ে গেছ মাগাে তুমি সংসার-কাননে,
ভ্রমি গাে একাকী আমি ; কন্টক বিধিলে
চরণে, পড়ে গাে মনে তােমার সে মুখ
( ১২
;
সকরুণ স্নেহভরা ; অমনি গাে বেগে,
জেগে উঠে কোটি দুখ অন্তর মাঝারে,
ফাটে বুক; মা মা বলে কঁাদি গাে সঘনে।
কি তােমার নাম মাগাে! জুড়ায় পরাণ,
অমন্ত তাপের মাঝে ! কিবা মধুমাখা ।
তৃপ্ত নাহি হল প্রাণ, হৃদয়ের ক্ষোভ
মিটিল না মা বলিয়ে। নামের মাঝারে,
বিরাজ কি, জননী গাে, আত্মা স্বরূপিণী ?
শুনিয়া ভুলিলা ধীরে-ধীরে, অতি ধীরে,
প্রশান্ত গম্ভীর আঁখি, আজও মনোমাঝে
জাগে রে দুর্দমা স্মৃতি দীপ্তশিখাসমা।
কহিলেন বাণী, কিবা শুনিনু শ্রবণে
প্রাণ-সঞ্চারিণী ভাষা ; পুত্তলিকা যেন,
শুনিনু বিমূঢ়প্রায় ;
বৎস রে আমার ।
অই গুন সুরলােকে পিতৃকুল তব,
সুরগণ সঙ্গে মিলি, মনানন্দে মাতি,
করিছেন জয়ধ্বনি
; মধুর
উৎসবে,
মাতােয়ারা। তুমিধন, বিধি-বরে আজি
নবজাত, সমাগত হারাণ মাণিক
হাতে পুনঃ ;
তাই
এত, পূৰ্ণানন্দধামে
পূৰ্ণানন্দ-প্রেম-মত্ত ত্রিদিবমণ্ডলী
( ১৩ )
;
সমাকুল ; এইরূপ হয় রে নিয়ত,
পাপীর জীবন লাভে। কত যে আনন্দ
সুরলােকে, শুভক্ষণে, এলে পাপী ঘরে,
কি আর বর্ণিব তাহা ? এত দিন পরে,
অকুলে হারান ধন ! তােমারে আবার
ফিরিয়া পাইনু ঘরে। কি আর বলিব ?
ইচ্ছা হয় এক বার পূৰ্ব্বদেহ ধরি,
বসি তােমা কোলে করি ; নয়ন-আদরে
তিতি তােমা মনসুখে । হায় রে যখন
কামচারী-
মন-মাতঙ্গ-তাড়নে
ছুটিলে উন্মত্তপ্রায়, কত যে কাদি ।
ভুলিনু তা এতদিনে। আজি বিধি-বরে,
চির-অপনীত মম প্রাণের কালিমা,
হইল ‘পবিত্র কুল জননী কৃতার্থ।
বলিতে বলিতে তুলি জয় জয় ধ্বনি
কোথা লুকাইলে ওমা ? উরগাে আবার,
মধুর গম্ভীর স্বরে বল বিবরিয়া,
শুনি শিহরিয়া, পুন স্বর্গের সন্দেশ।
সংসার-মরীচিকা।
ভৈরবী—আড়া।
কেন বীণা কাঁদিস রে আর বিষাদে হতাশ হইয়ে ?
সুখী হবে যদি, চল লােকালয় তেয়াগিয়ে।
বনবিলাসী হইবে,
কোকিল সনে গাইবে,
নিশীর শিশির জলে অশ্রু-জল মিশাইয়ে
হরিণশিশু ধাইবে,
এক মনে তাই দেখিবে,
জুড়াবে প্রাণ বনফুল হৃদিমূলে রাখিয়ে।
বনদেবী-দ্বারে গিয়ে
প্রেমণ গাইয়ে
বঁধুয়ারে মাঙি লবে প্রেম-ভিখারী সাজিয়ে ।
১
প্রভাতে না শয্যা হ’তে উঠিতে উঠিতে রে
ঘেরি চারিধার,
বালকের মধুহাসে, বালিকার সুধাভাষে,
শিশুর ক্রন্দন রােলে অমৃত সঞ্চার;
অতুল আনন্দে ভাসে হৃদয় আমার ।
২
দয়াময়ী, স্নেহময়ী প্রাণের প্রতিমা রে
প্রেয়সী উচ্ছাসে ;
আনন্দ-নয়নকোলে, পড়ে আসি ঢ'লে ঢ'লে,
( ১৫ )
আনন্দ অধর-প্রান্তে, দশন-বিলাসে;
গৃহকর্মে ফিরে, আর মৃদুমধু হাসে।
স্নেহময়ী ভগিনীর স্নেহভরা মুখে রে
কত কথা ভাসে।
কখন তােদর পাশে, কভু বধূসহবাসে,
আহলাদে উৎফুল্ল মধুমাখা পরিহাসে।
টিপি টিপি চলে আর পিটি পিটি হাসে।
8
নিকটে বয়স্থা মাতা মায়া-প্রবাহিনী রে,
কর্তৃত্ব বিধানে;
আলস্য না কাছে আসে, বধূরে অনুজ্ঞা ভাষে,
কভু চাহি নাতি আর নাতিনীর পানে,
সাধের বালিকা-কাল পুন ডেকে আনে।
সন্তানের মুখ চাহি কত কাজে রত রে,
জনক আমার ;
দাস দাসী ফুল্ল মনে, আত্মীয় স্বজন গণে,
প্রতিবেশী মণ্ডলীর সাধুব্যবহার
ধ্বনিছে এ কর্ণে মম ‘সােণার সংসার।
সংসার ! এ কি রে বাজে নিরন্তর কাণে রে
মধুর নিকণে?
যেদিকে এ কর্ণ ধায়, এ কি শুনিবারে পায় ?
‘সংসার’ মধুর নাদ বাজিছে গগনে।
ধ্বনিত সে প্রতিধ্বনি বন উপবনে ।
৭
কি শুনে ভুলিলে মন কি দেখে ভুলিলে রে ?
ও যে বিষভরা !
মানবের দম্ভজয়ী, অই মূর্তি মনােময়ী,
না জানি কি মন্ত্রে মুগ্ধ করে মূঢ় ধরা।
এত যে গরল-পূর্ণ তবু মনােহরা !
ও মূরতি দেখি কিবা হইলি বিমূঢ় রে
ও রে মূঢ় মন ?
যে নয়ন ভুলাইল, হৃদয় হরিয়া নিল,
রােমাঞ্চিত বিকশিত করে মুগ্ধজন,
মুগ্ধজনে বলে তারে ভুবনমােহন।
৯
দেখনাকি চারুচন্দ্র ব্যোম-বক্ষস্থলে রে
মধ্যমণিপ্রায়।
হেরিলে নয়নভরে কার বা না মন হরে ?
( ১৭ )
দীনধনী মূখজ্ঞানী ভুলায় সবায়।
দূরবানী কিবা নাহি সুন্দর দেখায় ?
দূর হতে সংসারের কুহক-সন্ধানে রে
ভুলে
সৰ্ব্বজন,
প্রবেশিলে একবার, ফিরিতে পারে না আর
অনাথ অগতি জীব ;-যাতনা ভীষণ !
কি হবে নিস্তার নাই, না হলে মরণ।
১১
ভীমবীৰ্য করী, তােরে কি আর বলিব রে
কৌশলই সাধন;
কৌশল সুদূরে থাকি, জ্ঞানী জনে দেয় ফঁাকি ।
বীৰ্য্যবান নতশির, নমে ও চরণ ;
নয় কেন বন্দী আজ তব জেতৃগণ ?
আশ্চৰ্য্য! আবার সেই নরকের জীব রে
ঘৃণিত-জীবন,
নিৰ্যাতনে নিন্ত্রিত, মনপ্রাণ নিষ্পেষিত,
তবুরে দুর্ভাগ্য জীব করে তা স্মরণ,
‘চাহি না সংসার’ নাহি বলে কোন জন।
( ১৮ )
অতুল ভুবনজয়ী কোথা সেই বুদ্ধি রে,
কোথায় এখন ?
যে বুদ্ধি সাগরাচলে, যে বুদ্ধি নক্ষত্রদলে,
যে বুদ্ধি এ ভূতগণ করে রে শাসন,
তার গলে আজ কি না সংসারবন্ধন।
১৪
কেন বা সংসারদাস? কেন বা না রাখে রে
শাসনে সংসারে ?
আপন প্রতিভাবলে, আপন শাসনতলে,
কেন না সংসার পরে প্রভুত্ব প্রচারে ?
বিশ্বজয়ী নর নমে কেন রে তাহারে ?
আবার নির্লজ্জ লােকে কত প্রলােভনে রে
মােহে অজ্ঞ জনে।
অই ক্রীতদাস সব, করে কত কলরব ;-
‘সংসার সমান কিছু নাহি এ ভুবনে
আবার তারাই মরে সংসার তাড়নে।
অই পাখী পিঞ্জরেতে আজি ম্রিয়মাণ রে,
নিশ্চল-চরণ ;
বেড়াইত এককালে আকাশে বা বৃক্ষডালে
করিত আপন মনে আহারান্বেষণ ;
জানিত কি হবে তার এমন মরণ ?
১৭
মূঢ়তা, মূঢ়তা বই আর কিছু নয় রে,
ওরে মূঢ় মন!
স্বাধীনে ভ্রমিতেছিলে, কিবা দেখি রে নামিলে ?
এখন পড়িয়া ফাদে কঁাদ অকারণ।
কে আর শুনিবে মূঢ়, তােমার ক্রন্দন ?
১৮
যাদের অমৃতময়ী মূরতি তােমার রে
সুখপ্রস্রবণ,
দুদণ্ড না গত হতে, তােমার নয়ন-পথে
ধাইবে প্রবল অশ্রু তাদের কারণ।
কে বলে সুখের এই সংসার-কানন ?
উড়িতেছে সুখপাখী তব নেপথে রে
না পার রহিতে।
ধাইলে পশ্চাতে তার, সেও উড়ি অনিবার,
পশিল গহন বনে, দেখিতে দেখিতে;
কোথা সে প্রাণের পাখী লুকাল চকিতে?
( ২০ )
অবােধ! কি দেখ আর অই দেখ নাই রে
সুখ-বিহঙ্গম।
তবুও আশার বাণী অন্তে সুমধুর মানি,
চাহিতেছ প্রতিতরু করি পরিশ্রম।
এ সকল গাছে কোথা পাখী প্রিয়তম ?
পিতা মাতা ভাই বােন বনিতা সন্তান রে
বন্ধু প্রাণসম,
কে দিবে তােমায় সুখ? কার পানে তােল মুখ?
দারুণ নিরাশা শেষে বিধিবে মরম।
এ সকল গাছে কোথা পাখী প্রিয়তম ?
২২
দুরন্ত এ পশুভূমি, বন বিভীষণ রে
বুঝিবে অচিরে।
এ বন দুরন্ত ঘাের, ধন্য রে প্রতিজ্ঞা তাের
প্রাণ দিবি বনে তবু যাবিনা বাহিরে ;
এখনি অরাতিকুল ফেলিবে যে ঘিরে।
জীবন তব
।
নূতন
নবীন উৎসাহে রে
ফুল তব মন।
পিতা মাতা মনে গণি, করিলা ডমরু ধ্বনি,
পাতিলেন জাল, কোথা যাবে, বাছাধন ?
এত দিনে নিলে গলে সাধের বন্ধন।
২৪
বিবাহ ! বিবাহ! এ কি ভাবিলে না মনে রে--
কর মধু পান !!
গলা জ্বলে বুক জ্বলে, মস্তকে মস্তিষ্ক জ্বলে ;
মর, তবু মুখে গাও তার নাম গান,
হবে তুমি এক জন সংসারীপ্রধান।
বনিতারূপিণী অই বন্ধনী তােমার রে
যে ভুলাল মন।
আবদ্ধ বিবাহ-জালে ওরে মন এতকালে,
সাধের শিকলে বাঁধা যুগল চরণ।
ছিড়িবে কি, ছুঁতে মাত্র নাহি সরে মন।
বেড়াতে অতুল দম্ভে নাহি মাত্র ছিল রে
ভীতির সঞ্চার ;
যাই দড়ী গলে দিলে, অমনি রে হারাইলে
. উচ্চ মনােবৃত্তি যত; হইলে অসার ;
মেষের চরিতে এবে মনুষ্য আকার।
( ২২ )
২৭
রব না সংসারে বলে দুঃখে যদি কর রে
নিঃশ্বাস বর্জন ;
অমনি বলিবে লােকে কেন মর দুঃখ শােকে
যাবে যাও, কারে বল ? কে করে বারণ ?
কে না জানে বেঁধে রাখে কোন্ আকর্ষণ।
জিজ্ঞাস উড়পগণে, কেন বা ও পথ রে
করিয়ে বর্জন,
নিজ নিজ অভিমতে, নিত্য নব নব পথে,
কেন বা স্বাধীন ভাবে না করে ভ্রমণ।
কে দেখেছে বেঁধে রাখে কোন্ আকর্ষণ ?
মাঝে মাঝে হয় ধূমকেতুরও উদয় রে
সংসার গগনে ;
ক্ষণমাত্র শূন্যে থাকি, সকলেরে দিয়া ফঁাকি,
আসি পুনঃ কোথা যায়, জানিবে কেমনে ?
আপন নিয়তি-পথে ভ্রম নিজ মনে।
কেমন নিয়তি-চক্র না পার বুঝিতে রে
তুমি অভাজন,
বনিতার পড়া হলে, ভাস রে নয়নজলে ;
( ২৩ )
পিতা মাতা ভাই বােন সন্তান কারণ,
নিয়ত থাকে রে তব বিচলিত মন ।
কেন পুন তাহাদের করিয়ে দর্শন রে
প্রেমময় মুখ,
উথলিয়ে উঠে হিয়ে, বহে অশ্রু আঁখি দিয়ে,
তাহাদের সুখে সুখ অসুখে অসুখ ;
কোন্ বস্তু দিয়ে বিধি গঠিল এ বুক?
সংসার ইহার নাম খেলনা তাহার রে
তুমি অভাজন।
সংসারী তােমার নাম, এই ত সংসারে ধাম,
নরাকার মেষ মধ্যে তুমি এক জন।
পরিত্রাণ নাহি তব না হলে মরণ।
তােমার সংসারে, দেব, তােমাকে ছাড়িয়া
পথহারা হয়ে কঁদি আঁধারে পড়িয়া ।
আঁখির আলোেক ! আলাে দেখাও আমারে।
পার কর ভবপতি! ভব-পারাবারে।
জন্মভূমির প্রতি।
লগ্নী—জৎ।
অস্তমিত রবি, কি কাল রজনী
আইল মা তাের ভাগ্যে ও ধূয়া
মেঘ উঠিল, ঝটিকা বহিল,
প্রাণ করে দুরু দুরু ও।
ঘাের আঁধারে ঢাকিল মেদিনী;
আতঙ্কে কাপে বুক ঊরু ও।
২
চন্দ্রমা ডুবিল, নক্ষত্র নিবিল,
ভয়ঙ্করী একি রজনী ও!
নিশাচর-পাখী উড়ে না উড়ে না;
নিশাচর জীব ডাকে না ও।
খর্গরহস্তা শ্মশান-কালিকে
আকাশে অট্ট অউ হাসে ও ;
ঘর ঘর গর্জে গভীর হুঙ্কারে ;
আতঙ্কে পরাণী শােবে ও।
3
শয় মা জননী ।
কি কাল রজনী
তােমার ভাগ্যে অহো ও।
( ২৫ )
চাহিয়ে মুখ তাের ফাটে যে বুক
ওমা! ওমা! মাগাে! ও।
কি ছিলে তুমি, একি হয়েছ গাে?
নেহারি আঁখি না সম্বরে লাে !
প্রাণ চমকে, মুখে না রে রা
ওমা! ওমা! মাগাে! ও।
তােমার পুণ্যে পবিত্র সংসার
কেন মা মুখে আজ কালিমা ও ?
মুদিলে আঁখি মরমে মরিয়ে,
বিষাদ-বিষে জরিয়ে ও।
প্রতাপ আদিত্য আদিত্য সমান
আপন গৌরবে
ডুবেছে ও ;
কে আর উড়াবে বীর গর্বে মাতি
স্বাধীনতার পতাকা ও !
* গুহ বংশদ্ভূত যশােহরাধিপতি মহারাজ প্রতাপাদিত্য বঙ্গ জ কায়স্থ,
ফুলের শিরােভূষণ ছিলেন। ইহার অসামান্য শৌর্যবীৰ্য কাহার ও
অবিদিত নাই। বর্তমান যশােহর জেলার প্রধান নগর যশােহর ইহার
রাজধানী ছিল না। ইহার রাজধানী বর্তমান খুলনা জেলার অন্তর্গত
কালীগঞ্জ থানার অধীন। এখন ইহার নাম লুপ্ত প্রায় হইয়াছে।
* নাহি কালীনাথ হরিনারায়ণ পুণ্যকৰ্মা গুরুপ্রসাদ ও ; গৌরব-রবি, পুণ্যের ছবি হায় রে কোথায় লুকায়েছে ও। ৯ * যে দান দেখি বড় চৌধুরী বংশে হাসিল চমা মিহির ও ; শ্মশান সমান সে কুল আজি অহহ বিধাতা! ও ও ও! * মহাত্মা কালীনাথ রায় চৌধুরী গুহবংশের অন্তর্গত টাকীনিবাসী প্রসিদ্ধ মুন্সিবংশে জন্ম গ্রহণ করেন। নানা গুণে বিভূষিত হইয়া ইনি ৰঙ্গজ কায়স্থকুলের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। ইহার সৎকীর্তির কথা এখনও চারিদিকে প্রচারিত রহিয়াছে। ধর্মসংস্কারবিষয়ে ইনি মহাত্মা রাজা রামমােহন রায়ের দক্ষিণহস্তস্বরূপ ছিলেন। বারাণত হইতে টাকী পৰ্য্যন্ত যে সুপ্রশস্ত রাজবক্স এখনও বিদ্যমান আছে, তাহা ইহারই কীৰ্ত্তি। অন্য কীৰ্ত্তি লুপ্ত হইলেও একমাত্র এই রাজত্মই ইহার নাম চিরস্মরণীয় করিবে। মহাত্মা হরিনারায়ণ ঘােষ টাকীতে জন্ম গ্রহণ করেন। ইনিও বঙ্গজ কায়স্থ। ইনি সাবেক আমলের সুবর্ডিনেট জজের পদে অভিষিক্ত হইয়া বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন এবং এই প্রতিষ্ঠার পরিচায়ক রায় বাহাদুর উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইনি দরিদ্রের সহায় ছিলেন। গুরুপ্রসাদ রায় চৌধুরী টাকীর সন্নিকটস্থ সৈদপুর গ্রামে বঙ্গজ কায়স্থকুলে গুহবংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। * গুবংশােদ্ভব কৃষ্ণদাস চৌধুরীর পাঁচ পুত্র হইতে পাঁচটী ধাৱা উৎপন্ন হইয়াছে, তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠের ধারা বড় চৌধুরীর বংশ নামে খ্যাত।
( ২৭ )
১০
* কীর্তি-কুশলা সে জগত্তারা
সরসীতীরে আজ কঁদে ও;
সহ সােদরা ভার জাগে না জাগে না,
মায়ের মুখ পানে চাহে মা ও।
১১
পুরুষ সকলে হয়েছে পাষাণ
পাপ-রত মােহ-মূঢ় ও ;
এত আৰ্তনাদ তবু জাগে না জাগে না,
তাের দুখ যাবে মা কিসে ও।
১২
করুণা-রূপিণী কোমলপ্রাণা
অযুত দুহিতা তাের যে ও ;
তাের কপালে আজ না জানি কি পাপে,
পাষাণে বাঁধিল প্রাণ ও।
'১৩
পাপ-পুরুষ হাে হাে হাসিছে,
মদিরা নাচিছে বিকট ও ;
কলঙ্কিনী কুল-কামিনী সঙ্গে,
বুকের উপরে তাের বিহরে ও।
* বংশে ইহার জন্ম। ইনি টাকীর প্রসিদ্ধ রামদেব রার বংশের
কুলবধু ছিলেন। টাকীতে চৌবাড়ীর পুকুর নামে যে সুন্দর পুষ্করিণী
অদ্যাপি বিদ্যমান আছে তাহা ইহারই কীর্তি।
১৪
অনাথ হাহাকারে, বিধবার নিঃশ্বাসে,
ভরিল মা তাের বুক ও ;
দুঃখ দারিদ্র্যে পীড়িল মরম ;
কেমনে সও এত যাতনা ও।
ধৰ্ম্মশীল যারা ভয়বাসি মনে,
পলাইল তােরে ত্যজিয়ে ও।
কাদের নিয়ে আর জুড়াবে হিয়ে
অহাে ভাগ্য রে! ও! ও! ও ।
সহিষ্ণুতা তাের বলিহারি ও মা!
কাঙালিনী আমার ও!
না জানি কি পাপে এ ভােগ ভাের মা ;
তাের দুঃখে বিদরে হিয়ে ও।
আর সে বসন্ত হাসে না সুহাস,
আর সে চন্দ্রমা হাসে না ও,
সমীর বহে না কীর্তি-কাহিনী,
নির্জীব জড়তা মুধুই ও।
১৮
ও মা! ও মা ! কেঁদ না কেঁদ না !
বিধিরে ডাক মা নীরবে ও।
দয়াময় হরি কৃপা করিলে,
যাবে এ দুর্দিন তাের মা ও।
শারদীয় উচ্ছাস।
১
সাধিবারে শরতের অতুল সৌন্দৰ্য্য রে
বরষার নীর
বহিয়ে অজস্রধারে, কত কত উপচারে,
কবি জন-মনােরমা চারু প্রকৃতির রে
সুন্দর শরীর
সাজায়ে অন্তরে রয়। প্রকৃতির শােভাময়
চারু চাদে হাসাইল আনন মহীর।
সরসে শশাঙ্ক-বধূ রােমাঞ্চ-শরীর।
২
পরিষ্কার গগনের শুভোজ্জ্বল কোণে রে
ঊষা সুবদন,
তুলি আঁখি ধীরে ধীরে সানুরাগে ধরণীরে—
ধরণীর সুখ-মুগ্ধ প্রণয়-আনন রে
করে বিলােকন ।
( ৩০ )
ধরিত্রী প্রকৃতিরাণী উষা সুৰ্যসােহাগিনী
মিলিলে, কোথায় আছে এদের তুলন,
উগ্রভানু যেই যােগে প্রিয়-দরশন ?
পূৰ্ব জলনিধি জলে স্নাত-কলেবর রে
পবিত্র তপন ।
ক্ষেমঙ্কর রূপ ধরি বলি যােগাসনােপরি
স্নিগ্ধ তেজঃপুঞ্জ সুৰ্য মন প্রাণ লয় রে
করিয়ে হরণ।
পবিত্র রুচির মুখ দেখিলে উপজে সুখ
কহ রবি কেন তব লােহিত লােচন ?
নির্জনে নিশীথ-যােগ কর কি সাধন?
৪
সবে বলে বসন্তেই কুজন-জীবন রে
মােহে বনস্থল ;
কোথা অই বৃক্ষ ডালে, পল্লবের অন্তরালে
লুকায়ে বদনখানি তুলিছে সুতানে রে
সুকণ্ঠ সরল ?
নাই নাই মহী মাঝে, যে ধ্বনি ও বনে বাজে;
কোকিলেরই কণ্ঠে আছে কোকিল সম্বল।
কে বলে কুরূপ তােমা, বসন্ত-বৎসল?
( ৩১ )
সরসে প্রফুল্লমুখী রাজরাজেশ্বরী রে
সুপর্ণা সুন্দরী।
প্রকম্পিত জলদলে, মৃদুল মৃদুল চলে,
ক্ষীণতর লীলারাজী করিয়ে বিস্তার রে,
তরঙ্গ মঞ্জরী।
প্রশান্ত পদ্মিনী তাতে অনিলের অভিঘাতে
মিলাইছে আপনার সৌন্দৰ্য-লহরী।
এ যে শােভা ভাবুকের মনােমুগ্ধকরী ।
জলের উপরাকাশে ক্ষুদ্র পতঙ্গম রে
কি গান গাইয়া,
উড়িতে উড়িতে ঢ'লে বলিল কমল-দলে ;
স্বাধীনে উড়িল পুন গায়িয়া গায়িয়া রে
গেল রে উড়িয়া ।
কেমন বিধির বরে ক্ষুদ্র কীট সুখে চরে ;
দুরন্ত মনুষ্য দুঃখে রহে রে মরিয়া।
হে মানব ! সে কি তুমি প্রভুত্ব পাইয়া?
হবেইত অনিলের সুখ-দৰ্প-গতি রে
এ মুখ শরতে।
( ৩২ )
স্মিতমুখী বনফুল উজলি উদ্যানকুল,
যেন কোটি কুললক্ষ্মী বরি ঋভুনাথে রে
আনিছে জগতে।
প্রাণদ কুসুম-সার ; পাইরে কণিকা তার
প্রগল্ভ পবন ধায় মন্দ মন্দ গতে,
সুরপুর ছাড়ি কেন দুঃখের মরতে ?
৮
হরিত-রঞ্জিত ক্ষেত্র নবীন সৌন্দর্য্যে রে
কিবা শােভা পায় !
শরতের শােভা সাথে বৈদূৰ্য-দামিনী-নাথে
যেন বায়ু বিম্বিয়াছে ধান্য-রঙ্গভূমে রে
নবীন শােভায় ;
দর্পণের আন্দোলনে সদর্পণ ঘনে ঘনে
আন্দোলিত, চমকিত মরীচিমালায়।
হেরিলে এ শােভা প্রাণ 'কার না জুড়ায়?
দুকূলে হরিত মাঠ মধ্যে চারু শােভে রে
ক্ষীণা তরঙ্গিণী ।
লুটিয়ে লুটিয়ে যায়, ঝকমক করে তায়
সুবৰ্ণ ময়ূখমালে রজত সলিল রে ;-
বেণু-নিনাদিনী,
( ৩৩ )
ললিত ব্রততীখানি, শারদ তটিনী রাণী
সুঅঙ্গ পূর্ণতা ভরে মন্থরগামিনী ।
এই কি, যে রূপে তুমি কবি-উন্মাদিনী ?
নিমগ্ন পুলিন পরে, শাখীর শাখায় রে,
গম্ভীর-দর্শনে,
ক্রৌঞ্চবধূ ক্রৌঞ্চ সনে জললীলা-বিলােকনে,
ভাবুক দম্পতি যেন ভাব-মগ্ন নারে রে
ফিরাতে নয়নে।
তীরান্তরে তীরপ্ৰায় উড়ে আসে উড়ে যায়,
কেলী-প্রাণ পাখীগুলি কৰ্ণ-সুখস্বনে ।
কে না চাহে দুই দণ্ড দেখিতে নয়নে ?
আর অই সরসীর লহরী-ললিত রে
কাক-চক্ষু জলে,
বেড়িয়ে কমল দলে, বিলােল গমনে চলে
সভাব-মরাল-রাজি করি প্রদক্ষিণ রে
আরাধ্য কমলে ;
কোথা অন্ত কোথা তার, তাই যেন বারবার
অন্বেষণ-পর হংস যায় জলতলে ;
ক্লান্ত, পরাঙ্খ হয়ে ভেসে উঠে জলে।
( ৩৪ )
নিৰ্বৰ্ষ শারদ মেঘ কত ভয়ে ভীত রে
করে এ ভুবন ।
মেঘসখী-অভিমুখে মেঘসখা মনসুখে
অসার মেঘের ডাকে ভুলিয়ে দেখায় রে
প্রমােদ-নটন,
মেঘচ্ছবি নিরখিয়ে, পুচ্ছচ্ছবি বিস্তারিয়ে,
প্ৰতিনাদি জলদের গভীর গর্জন।
হা রে পাখী প্রবঞ্চিত দুই রে এমন !
নির্মেঘ শারদ মভ কৌমুদী-ভাসিত রে
বিশ্ব-বিমােদম।
কবির কল্পনা-প্রিয়, তাই দিয়ে সুধামিয়,
বাঁচান তৃষিত-প্রাণ চকোর দম্পতি রে
সুকবি সুজন
জল বিনা হা হা করে চাতক-মিথুন মরে
কহ কবি মরিবে যে জলদ-জীবন।
এত দিন কি বলে বুঝাবে তার মন ?
১৪
বিচিত্র-বঙ্কিম-গ্রীব-দর্প-বিচ্ছুরিত, রে,
ময়ুর-বরণ,
( ৩৫ )
আসিবে শরত বলে, আগে ভাগে নভস্তলে,
সাজায়েছে কত রাগে, মেঘমুক্ত রবি রে
স্বর্গের তােরণ।
শিকরে অরেণু ধরা আজ কত মনােহরা !
চপলা মেঘের বালা হেমাংগু-বদন,
ছুটে এসে দেখে যায় চমকি নয়ন।
শরতের নদী তুমি তাত আমি জানি রে,
কল-কল্লোলিনী।
কি শােভা দেখাবে বলে ভােলা মন এই স্থলে
ভুলায়ে আনিলে, সখি, কই তাহা কই রে
কাম-বিহারিণী।
এত যে সৌন্দৰ্য-ভরা, সরসীই মনােহরা,
অন্তোরুহ বিনা নদী নহে সুশােভিনী।
তরু গাে বিধির সৃষ্টি হৃদয়-হারিণী ।
উদধি-মেখলা মহী রাজরাজেশ্বরী রে
এ সব সম্পদে।
শারদ-বিটপী-গলে, সসুম প্রবাল-দলে,
কবির কল্পনাময়ী বিলােল বল্লরী রে
নব পরিচ্ছদে।
( ৩৬)
ভাবি মনে মনে তাই এ সুচারু লতা নাই,
না জানি সে দেশ ম কোন সুখমদে।
এ সম্পদ ত্যজি কেবা সুব্ধ রাজ পদে ?
---
দুষ্কণ্ঠক ভেককুল কর্ণ-বিড়ম্বন রে
কুলিষ নিঃস্বনে,
নিগ্রহী-কলিন্দভীত, দুৰ্বিবর-লুক্কায়িত,
মতঙ্গ-নির্ঘোষ সহ, গৰ্বস্ফীত-গ্রীব রে,
অমত্ত তুলনে।
অনিন্দ্য কুসুম-হের সুরক্ৰম কদম্বের
কদম্ব লুকাল দেখি লজ্জানত মনে,
শারদ নক্ষত্ৰ-দাম-মণ্ডিত গগনে।
১৮
প্রেরিত শরত যদি রােগ-শােক-দগ্ধ রে
জুড়াতে ভুবনে,
ভূত-ধাত্রী ধরিত্রীর প্রাণ না কি হয় স্থির
পূজিলে ঋতু-রাজে প্রসন্ন কুসুমে রে—
নানা উপায়নে।
মুখ-কান্তি নিরখিয়ে, কার না জুড়ায় হিয়ে ?
শান্তির চামর নিয়ে, সহাস্য বদনে,
দুঃখী জীব গৃহে গৃহে নিরত ভ্রমণে।
{ ৩৭ )
শরৎ, তােমারে দেখি কত ভাবে দোলে রে
হৃদয় আমার
হার নিয়ম মত সুখ দুঃখ ক্রমাগত ;
শ্রান্তি অন্তে বিশ্রামের বিশেষ বিধান রে
ভুবনে প্রচার;
হেমন্ত শীতের পরে সুবলন্ত ঘরে ঘরে
যাহার মঙ্গল গান গায় অনিবার ;
গ্রীষ্ম বর্ষা অন্তে তুমি বিধানে হার।
কেন বা দুর্বোধ নরে মস্তিষ্ক আলােড়ি রে
ঘাের অহঙ্কারে,
ভীম বিশ্ব অকস্মাতে, পরমাণু সুসম্রাতে,
স্বজাত, বিধাতাহীন, স্বতঃ-নিয়মিত রে
নির্ভয়ে প্রচারে ?
সুশৃঙ্খল-নিয়মিত, পৰ্য্যায়তঃ সঞ্চালিত,
প্রতিপদে মহাজ্ঞান ঘেরিয়াছে যারে,
সে বিশ্ব বিধাতাহীন কেমনে প্রচারে ?
৪
সাগরকূলে সন্ধ্যা।
গৌরী-ঝাপতাল।
সন্ধ্যারাগে দীপ্যমান ভীম গাম্ভীৰ্যব্যঞ্জনে,
অধিষ্ঠিত মহারাজ দেবরাজ বীরাসনে।
নরনারী গাও সবে,
থেক না নীরবে,
‘জয়দেব জয়দেব’ ষড়জ-ঋষভ-নে।
প্রকৃতি ভক্তিমুখরা
অপূৰ্ব্ব যােগিনী ধরা
ধ্যায় পরম দেব যােগেশে
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ-প্রতিমা।
ত্যজ না নিজ গরিমা,
গাও অনুরাগে ভারে—ভবেশ নিরঞ্জনে।
-৬
এখনও নিবৃত্ত নহে মাৰ্ভণ্ড কিরণ,
সুবর্ণ সরল রেখা করে প্রকটন।
উজলিয়ে গগনের গুড় বক্ষস্থল,
শ্রান্ত রবি অন্বেষণ করে অস্তাচল।
২
ঘুরিয়া নগরময় ক্লান্ত কলেবর
চিন্তা আর রবিকরে জীবন কাতর
পদ নাহি চলে আর অবসন্ন প্রাণ
ইচ্ছা মনে জুড়াইতে, দেখি সুখস্থান।
( ৩৯ )
মনােরম সিন্ধুকূলে মনােরম ঠাই ;
দূরগত সিন্ধুবাতে ভাবনা বালাই।
অবসাদে সিন্ধুকুলে পড়িনু বসিয়া।
স্বভাবের ভাব দেখি উথলিল হিয়া।
৪
অবিস্পষ্ট শশিলেখা শােভে শিবােপরে
সন্ধ্যার সুবাস বহি আসে বায়ুভরে।
সুরঞ্জিত কত রাগে গগন-মণ্ডল।
প্রতিবিম্ব নিয়ে খেলে সাগরের জল।
৫
প্রসারি প্রবলবক্ষ সিন্ধু সুবিশাল ।
অই দূরে সিন্ধু-যাম উড়াইয়ে পাল।
এ ভীম সমুদ্রমূৰ্ত্তি তুচ্ছজ্ঞান করি,
অই ছুটে বায়ু জিনি ধীবরের তরী।
পরসীর প্রিয়পঁথি জেন্দাবেস্তা করে,
আগত পারমীপুঞ্জ প্রান্তর উপরে।
স্থানে স্থানে বসি সবে মূৰ্যগুণ গায় ।
সানন্দ পারসী-শিশু নাচিয়া বেড়ায়।
( ৪০ )
৭
বিরাজে জলধিকুলে সুচারুহাসিনী
পুত্রকন্যা সহিতে পারসী সীমন্তিনী।
কামিনী-কোমলকণ্ঠে, কোকিল-কূজনে,
করে সূৰ্য-গুণগান একতান মনে।
অই রে লােহিত বর্ণ অরুণ-আনন
লােহিত বরণে রঞ্জে পশ্চিম গগন।
পশ্চিম সাগর-জল আরক্ত উজ্জ্বল।
বিহরে সাগর বক্ষে শােভা নিরমল।
উৎকলিকাতুল আঁখি চাহে ভানুপানে,
রােধে প্রতিরােধী রশ্মি চড়িয়ে বিমানে
কেমন চক্ষুর গুণ বুঝিতে না পারি,
কাঁপিতেছে যেন ভানু গগন-বিহারী।
লুক্কায়িত বারিনিধিগর্ভে স্পর্শমণি,
ভীমবলে টানে যথা লৌহের তরণী ;
জানি না কি মহামন্ত্রে সিন্ধু সরিৎপতি
টানিতে লাগিলা বেগে ভানু অধােগতি
( ৪১ )
কে বলে একাই দোষী রাহু মহাকায়,
দেখ না কি খেলা আজ জলধি দেখায়
প্রসারিল ভীমমুখ বিষম সাগর,
দেখিতে দেখিতে অই ডুবিল ভাস্কর।
১২
এই ছিল গগনের উচ্চ সিংহাসনে,
চকিতে লুকাল কোথা আঁধারি গগনে।
একবার আঁখি তুলি দেখিল অম্বর,
এই ছিল কোথা গেল মহান ভাস্কর।
কাঁদিয়া উঠিল কাক শােকে বায়ু-কোলে।
বাজিল বিজয়নাদ জলধি-কল্লোলে ।
প্রকৃতি-পুলকে হাসে আকাশের চাদ।
কতই মধুর ক্ষুদ্র পতঙ্গনিনাদ।
১৪
নামিল সুন্দরী শান্তি স্নিগ্ধ মহীপানে।
অপূৰ্ব্ব মাধুৰ্য্য হাসে চড়িয়ে বিমানে।
প্রফুল্ল গগন-শােভা আনন্দ উৎসবে।
এমন সৌন্দর্য্য কেবা দেখিয়াছে কবে ?
( ৪২ )
এমন সুন্দর শােভা দেখে নাই কেউ।
অই রে আনন্দে নাচে সাগরের ঢেউ।
নাচে রে তরণীমালা কণ্ঠের উপরে।
কিশােভা! কিশােভা! আহা মন প্রাণ হরে
এ আর নূতন কান্তি জোয়ারের জলে ।
কি শােভা বিহরে মরি শুভ্র ফেনদলে !
কি শােভা বিহরে অই তরঙ্গের স্তরে !
যে দেখিল সে রহিল বিমুগ্ধ অন্তরে।
১৭
আর তায় ফেনরাশি আদরিণী প্রায়,
গড়িল প্রেমের মল তরণীর পায় ;
দুলিল সাধের মালা সিন্ধু-উপকুলে ;
নাচে চারু ধুকধুকী সিন্ধুহৃদিমূলে ।
১৮
বলিল সুন্দরী শান্তি স্বর্ণসিংহাসনে।
প্রকটে মাধুরী কত কাদম্বিনীগণে!
এ শােভা না হেরি গেহে রহে কোনজন?
এ হেন প্রান্তরভূমি জনতা-সদন।
( ৪৩ )
অই দূরে দাড়াইয়ে মহারাষ্ট্র ধীর।
পরিষ্কত সুবসনে মণ্ডিত শরীর,
প্রশস্ত ললাট খানি, শিরসে উষ্ণীষ,
সুচারু আনন, চক্ষে চঞ্চল নিমিষ।
মন্দগামী সদাগর টাটু আরােহণে,
করিছে বিতণ্ডা কত দালালের সনে ;
এক হাতে কড়িয়ালি শাসে অশ্বর,
আর হাতে পূর্ণ জমা-খরচের ঘর।
২১
আর কারা ?পটুগিজ কামিনী মণ্ডলী।
কৃষ্ণঅঙ্গে চমকিছে কণক বিজলী ।
দোলাইয়ে পীন কণ্ঠে স্বর্ণকণ্ঠহার,
কার সাজে, কিবা বেশে এতই ঠ্যাকার ?
২২
আর তুমি কে সুন্দরী অশ্ব আরােহণে,
হাসিতেছ পতি সনে আনন্দ-বদনে ?
আদরের আদরিণী স্বামী কণ্ঠমালা,
সে তুমি না বীরনারী ব্রিটানিয়া বালা?
( ৪৪ )
তুলনা তুলনা আর ওরূপ তুলনা ;
শশাঙ্কলাঞ্ছিনী অই ভারত ললনা ।
বিনা আৰ্য রমণীর মুখ মণ্ডল,
আর কিবা পবিত্রতা-উপমার স্থল ?
২৪
দলে দলে তর্করত্নে অনঙ্গা-প্রসঙ্গে,
পড়ুয়ার গণ ভাসে কৌতুক তরঙ্গে।
নবীন প্রমত্ত মন, নবীন উৎসাহে,
সহজে ভাসিয়ে যায় ভাবের প্রবাহে।
অই দূরে বাজে বাঁশী বাষ্পীয় শকটে
দেখিতে দেখিতে অই আসিল নিকটে।
এ বায়ু-সমুদ্র মন্থি কঁপায়ে গগন
বরদার ক্ষুদ্র রেল দিল দরশন।
ঘােটকের ক্ষুরনাদ, শকটের বােল,
উঠিল গগনপথে মহা গগুগােল।
অসংখ্য আরােহীগণ ষ্টেশনে নামিয়া,
যায় পদে অশ্বে আর শকটে চাপিয়া ।
( ৪৫ )
২৭
সিন্ধুকুলে মাঠ এই, সমীর-সেবনে,
দলে দলে আসিতেছে কত শত জনে।
গৌরাঙ্গ পুরুষ যায় অশ্ব আরােহিয়া
দুর্ভাগ্য দেশীয় যায় চরণে চাপিয়া।
২৮
মহাতীর্থ সাগরের ক্ষার-পুত জলে,
নামিয়া সন্ন্যাসী অই বীজ মন্ত্র বলে ।
কূলে সহচরগণ করে আয়ােজন,
দিবেন ঠাকুর উঠি বদনে ওদন।
২৯
আবার নিক্ষেপি আঁখি দেখিনু চাহিয়া,
অনন্ত মহান সিন্ধু বক্ষ বিস্তারিয়া।
অনন্ত-অপার—দৃষ্টি নাহি পায় কূল ;
কি আশ্চর্য্য জলনিধি সাগর অভুল!
সম্মুখে বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র শুভ্র সুবসনে
বিতরে কতই শােভা ভাবুক নয়নে ;
বালুকার ক্ষুদ্র মূর্তি পবিত্রতাময়ী;
কি জানি, কেমনে হয় ভুবন-বিজয়ী।
( ৪৬ )
অই জ্বলে রডুমালা শৈল-কণ্ঠহারে,
দূর হ’তে কি সুন্দর দেখায় তাহারে।
হাসিতেছে রাজপথ বাষ্পীয় আলােকে,
ভুলিতে কি পারে সেই যে দেখেছে চ’খে ?
১২
বালকিশােরের * অই ইন্দ্রপুরীমাঝে,
ইন্দ্ৰম শ্বেতকায় আনন্দে বিরাজে।
সুখমুগ্ধ ভবনের বাসগৃহ হতে,
কি সুন্দর জ্যোতি চমকিছে দৃষ্টিপথে।
অদূরে নগর-প্রান্তে দ্বীপ কোলবায়,
আশ্চর্য্য আলােক স্তম্ভ অই দেখা যায়।
অবিশ্রান্ত ঘুরিতেছে ক্ষমা নাহি তায় ;
ক্ষণেক জ্বলিয়া উঠে পুনঃ নিবে যায়।
২
ক্ষণে হয় ক্ষীণকায় ক্ষণে হয় স্থল ;
দেখি অন্ধকারে পথভ্রান্ত তরীকুল
সহজে চিনিয়া লয় পথ আপনার,
নহিলে কে তরীকুল করিত নিস্তার ?
বােম্বাই নগর ইংরাজদিগের পল্লী।
( ৪৭ )
কেতুমি ও গগনের কোণে লুকাইয়া
কি দেখ ও ক্ষুদ্র মুখখানি প্রকাশিয়ার
তুমি রে মঙ্গল তারা নিশাতী সই,
আয় তাের কাছে দুট মন কথা কই।
আর তুমি কে সুন্দরী সে ছবি লইয়া
সমীরণ সনে নাচ, বুকে লুকাইয়া ?
অপসরী-লহরী:লীলা জলধি-হৃদয়ে,
কে দেখিবি আয় তােরা ত্বরান্বিত হয়ে
উড়ায়ে অঞ্চল, দশ দিক মুগ্ধ করি,
যেয়ােনা যেয়ােনা, ওগগা উলুকাসুন্দরী।
দাড়াও এ প্রাণ ভরে দেখি একবার
অই তব মধুময় মাধুরী-ভাণ্ডার।
৩৮
তুমি না জোছনা, দেব-দিবাকর-বালা?
জনমিলে বাড়াইতে কুমুদের জ্বালা।
বল কেবা আছে হেন ভুবন ভিতরে,
মুগ্ধ হয় রূপবতী সপত্নীর স্বরে ?
( ৪৮ )
তুমি রে আনন্দময়ী অরুণ-নন্দিনী।
ভুবন ভুলাও রূপে ভুবনমােহিনী।
বিচিত্র এ নারীজাতি বিধাতার মায়া,
নয় কেন সুধাময়ী তপনতনয়া ?
কমনীয় মুখ তব কোমল প্রকৃতি।
জুড়া’তে তাপিত প্রাণ কে শিখাল নীতি ?
সুশীলা সন্তাপহরা, প্রেম-সুবন্ধনে
কে দিল গাঁথিয়া তােমা শশাঙ্কের সনে ?
৪১
আর তুমি মানময়ী বিরহিণী প্রায়,
সিংহাসন ছাড়ি কেন গাছের তলায় ?
কই রে কি দুঃখে, ছায়া,'মুদিয়ে নয়ন,
ধূলায় লুটাও ঝাপি বিষন্ন বদন ?
৪২
কাল চাদ বুকে নিয়ে কাল সরমারে,
কাল ব’লে ঘুণা বুঝি করেছে তােমারে ?
রুদ্রমুখে না ডরান নাহিক কোথাও ;
শান্তিময়ী ছায়া ! তাই ধূলায় লুটাও।
( ৪৯ )
39
অই রে অর্ণবপােতে মৃত্তিকার তেলে,
কে দিয়েছে স্ফটিকের চারুদীপ জ্বেলে
জানালার পথে শিখা সতেজে ছুটিয়া,
কি সুন্দর চলে যায় আঁখি চমকিয়া।
৪৪
রাধে রে পথিক অই মাঠ মধ্য খানে,
তিন খানি ইউকের উনুন বিধানে।
ক্ষুধায় আকুল প্রাণ, পিয়াসে আতুর,
স্বহস্ত-প্রস্তুত অন্ন কতই মধুর।
৪৫
অই রে উঠিল কেঁদে নীড়ে বিহগিনী
তাড়না করিছে বুঝি দারুণ যামিনী।
দিবা নাই আর কেবা তরাইবে ভয়ে,
কঁদে রে বিহঙ্গ-বধূ নিরুপায় হয়ে।
৪৬
আর তুমি সুধা-আশী চকোর-বণিতা।
হইয়াছ চাদ পেয়ে কতই মুদিত।
মনসাধে চা নিয়ে করিছ বিহার ;
অদূরে ভগিনী তর করে হাহাকার।
( ৫ )
৪৭
সুখ-স্নিগ্ধ গগনের বক্ষস্থল দিয়া
দুই একখানি মেঘ উড়িয়া উড়িয়া
চন্দ্রমার মুখ ঢাকি আশা বিনাশিয়া,
কতই তামাসা করে চকোরিণী নিয়া।
৪৮
লুকায়ে মেঘের আড়ে সুচারু আনন,
চকোরিণী-ভাব চঁাদ করে পরীক্ষণ।
পাগলিনী দেখি মেঘ গেল গাে সরিয়া ;
তা দেখি অই রে চাদ উঠিল হানিয়া।
৪১
মরি মরি কি সুন্দর চিক্কণ কিরণে,
চমকিছে মেঘমালা বিবিধ বরণে।
সােহগে সুনমি শ্যাম সুন্দর আনন,
সুন্দরী লহরী মুখ করে রে চুম্বন ।
এ হেন সুন্দর ভূমি হইল আঁধার ;
অই দূরে ধূধূ করে অকুল পাথার ;
নিজ নিজ বাসে গেল জীবজন্তুগণ ;
এ হেন, কৌমুদী-নিশা আঁধার-ভবন।
( ৫১ )
দেখিতে দেখিতে নিশা হইল গভীর।
অই অই নিশা-পাখী উল্লংঘিল শির।
কে সুর-সুন্দরী তুমি জুড়াও শরীর?
শীতলতে! তাপিতের প্রাণ যে অস্থির !!
৫২
আবার কঁাদে রে প্রাণ নিজ ভাগ্য স্মরিয়া।
হায় রে জুড়াব আমি আর কোথা যাইয়া ?
এ হেন সুন্দর স্থান কতই অমৃত পান
করিল এ জগতের জীবগণ আসিয়া ;
অভাগার প্রাণ সুধু রহে রে চমকিয়া।
দয়াময়। দাও স্থান চরণে আমায় ।
পাপীর জ্বলন্ত প্রাণ আর কে জুড়ায় ?
প্রীতি।
সময়েতে ফুটেছিল ফুল অপরূপ রে
প্রীতি নাম তার ;
স্বর্গীয় মাধুৰ্য মাখা, স্বর্গীয় বরণে ঢাকা,
স্বর্গীয় সুগন্ধে করে পাগল সংসার,
হৃদয় কাননে ছিল ফুল-কুল-সার।
২
ভাতিলে গগন-ভালে রক্ত-রাগ রবি রে
সােণার বরণ,
ফুটে শতদল জলে, সূৰ্য্যমুখী মহীতলে,
সােনার কুসুমগুলি উজলি কানন ;
ফুটেছিল প্রতি হেরি প্রণয়ের ধন।
;
ভাবের হিল্লোলে দোলে চারু প্রীতি ফুল রে-
মারুত প্রবাহে
অকলঙ্ক লজ্জা ভরে, অপূৰ্ব্ব মাধুরী ক্ষরে
চকিত হিমানীবিন্দু-মুক্তাফল তাহে ;
ধীরে অঙ্গ দোলাইয়া ধীরে চক্ষু চাহে।
-
;
৪
বক্ষ তার মধু ভরা মিগ্ধ তার গন্ধ রে
নহে দূর-ব্যাপী।
বিনীত সৌন্দৰ্য-ভার, বিনীত সম্পদ তার,
হেরিলে হিংসায় মরে কে হেন সন্তাপী ?
তার প্রেম বিলপিবে কেবা সে প্রলাপী ?
অই অর্ধবিভাসিত, পত্রদল মাঝে রে
শােভে অনুপম
গােলাপ সৌন্দৰ্য্য মাখা, অন্তরে সুরভি রাখা,
সােহাগে বলিবে বল ফুল প্রিয়তম ;
কিন্তু কভু নয় নয় প্রীতি ফুল সম।
কেমনে ? ছিল যে তার অকণ্টক দেহ রে
চারু প্রীতি ফুল ।
গােলাপের কোমলতা, গােলাপের মধুরতা,
নিৰ্ম্মধু গােলাপ গন্ধ নহে তার তুল।
কমলে কন্টক বিধি বিঁধিল আমূল।
কি জানি কেমনে তায় প্রীতি সঞ্চারিলে রে
হৃদয়-উদ্যান,
স্বগীয় উদ্যান সম
ধরে শােভা নিরুপম ;
অনিন্দ্য সুষমা চারু কাড়ি নিল প্রাণ ।
ছিল না-এ ভূমণ্ডলে হৃদয় সমান।
জনমিবে প্রীতি ব’লে আকাশের নীর রে
বর্ষে নাই নীর ;
অবােধ, বুঝিতে নারি কেমনে সঞ্চারি বারি
কোমল হৃদয়-ভূমি প্রসূতী প্রীতির
উৎপাদিল প্রীতিধন গৌরব মহীর।
ঘৃণা রাগ দ্বেষ হিংসা কন্টকীর কুল রে
লুকাইল সব ;
প্রসন্ন গগনতলে প্রসন্ন মারুত-বলে
অঙ্কুরিল হৃদয়ের অতুল বিভব।
অমর ভুবনে উঠে জয় জয় রব ।
দেখিতে উন্নতমুখী পদ্ম সূর্যমুখী রে
প্রিয় স্বামী ধন ;
দেখি প্রিয় পতি মুখ, অন্তরে অনন্ত সুখ,
খ্রীড়া-সঙ্কুচিত বালা; নত সু-আনন।
ভুলে নাই আর প্রীতি লাঙ্গে সে নয়ন।
দেখি নাই রূপ, তবু চায় প্রাণ, বলি রে
সােনার বরণ;
কে জানে কি রূপ তার
তবু সে সৌন্দৰ্য্যভার
প্রাণ মন আঁখি নিল করিয়ে হরণ।
নিরাকার রূপ বুঝি ভুবনমােহন।
১১
শুনেছ কি ফুলকুল-নদী-গিরি-বন রে
কত কথা কয় ?
শুনেছ কি, প্রীতি ফুল প্রাণ করি সমাকুল,
মধুর নিনাদে মধু ঢালে প্রাণময় ?
কে বলে সুতন্ত্রী নাদে সুখ অতিশয় ?
১২
দেখি সে অরূপ রূপ ভয়ঙ্কুচিত রে,
লুব্ধক ভ্রমর ;
সু অঙ্গে বসিতে যায়, পাছে সে কোমল কায়,
হেলায় ব্যথিত হয় অমনি অন্তর।
এ সুঅঙ্গে ব্যথা দিতে কে নহে কাতর ?
কি সুধা এ প্রীতি-ফুলে সঞ্চিলেন বিধি রে
পারি বুঝিতে
( ৫৬ ) রসনা-অস্পৃশ্য-ধন দূর হতে আস্বাদন- পার ত অতুল সুখ পারিবে লভিতে। অক্ষয় ভাণ্ডার হেন কি আছে মহীতে ? ১৪ ধরে কি মােহিনী শক্তি প্রতি অবতীর্ণ রে, কাড়ে প্রাণ মন। ন আত্মীয় ন আপন দেখি নাই সে কেমন ; (প্রীতি ফুল রসে দৃষ্টি কিবা সুচিকণ !!) বর মালা দিয়ে গলে সঁপিনু জীবন। কে তুমি পরের প্রাণ? কেন তব তরে গাে আকুল এ প্রাণ? চাই সদা কাছে থাকি, চাই রে নয়নে রাখি, বিরহের পরে প্রাণে কর শান্তিদান। পেলে তােমা তুচ্ছ কেনশােণিতের টান ? কে না জানে কি দারুণ জঠর-যন্ত্রণা রে কে না তায় জানে ? যাই সুতে কোলে পাই সকলই ভুলিয়ে যাই ; দে দেয় যাতনা তারে গেঁথে রাখি প্রাণে। কেন রে অতুল সুখ চাহি তার পানে ?
১৭
স্পর্শমণি-গুণ প্রতি পেলে কার ঠাই রে
ভাবি তাই মনে ;
দূরে থাকে প্রিয় জন প্রীতি করে আকর্ষণ
লুকালে তপন, পদ্ম হারায় জীবনে,
প্রতি সম কোথায় সে বাঁচে আকর্ষণে ?
১৮
পতি শশাকে পদ্মিনীর মত প্রীতি কভু রে
ত্যজে না জীবন।
শ্রীচরণ ধ্যান করি কাটে দিবা-বিভাবরী
অনাথিনী উন্মাদিনী ; বিরস বদন।
কেন পতি পেলে তবে নমে রে নয়ন ?
প্রিয়জন-অদর্শনে প্রীতি পাগলিনী রে
তাতেও সুন্দর।
কভু তার শূন্য আঁখি ;
; কভু রে নীরব থাকি,
কভু বা প্রলাপ প্রীতি গায় নিরন্তর।
এলোকেশী নাচে কভু করি বায়ু ভর।
কভু প্রীতি উদাসিনী তাতেও সুন্দর রে
অতি মনােরম।
কেবা বন্ধু প্রিয়জন? কার তরে আকিঞ্চন ?
তবু প্রীতি পর লাগি ভাবে রে বিষম।
ইচ্ছা করি নাহি করে হৃদয়-সংযম।
উদারতাময়ী প্রীতি বিশ্বময় তার রে
প্রণয়-বিস্তার।
নাহি মান অভিমান সমান কি অসমান,
সবারই প্রণয়ে প্রীতি দেয় রে মাতার!
কি দিয়ে গঠিল বিধি তনু খানি তার !
২২
কত যে মধুর ভাবে সতত নেহারি রে
ভাসে গুণময়ী।
এ ধন লইলে বুকে,
কেবা সে বঞ্চিত সুখে ?
প্রীতির পবিত্র নাম ভুবন-বিজয়ী।
বুকে রেখে নাহি হয় কে তার প্রণয়ী ?
এত গুণময়ী প্রীতি এত যে সুন্দর রে,
প্রীতি নাহি জানে।
রূপ-গুণ-ফল তার, পরে দিয়ে উপহার,
সুখী করে পরপ্রাণ শৈশব অজ্ঞানে।
এমন সরলা বালা আছে কোন খানে ?
( ৫৯ )
২৪
কেমন বিধির ইচ্ছা নতুবা বিজনে রে
কেন হেন ফুল?
নরচক্ষু নাহি যায়, আলাে না প্রবেশে তায়,
সামান্য এ গন্ধবহ না করে আকুল ;
তবু প্রীতি স্বপ্রকাশ মহিমা অতুল !
কে আছে এ ভূমণ্ডলে প্রীতি সহ প্রেম রে
না করে স্থাপন ?
যােগীর হৃদয় ধন, সংসারীর প্রিয়ধন,
অবনীর ইন্দ্রজালময় আকর্ষণ !
প্রীতি বিনা সিদ্ধ হয়, কিবা সে সাধন ?
না বুঝি অবােধ নরে বাহিরের ফুলে রে
করে কি সাধন ?
প্রীতি হীন যােগধ্যান প্রীতি বিনা গুণ-গান
প্রীতিহীন দেবার্চনা নিশার স্বপন।
থাকে প্রতি, আর ফুলে কোন প্রয়ােজন?
২৭
পাপীর সৌভাগ্যে প্রতি বসুধা-বাসিনী রে
করিতে নিস্তার ;
নর নারী অভাজন পাপমগ্ন অনুক্ষণ
প্রতি পদে পাপী, তাই প্রীতির সঞ্চার।
নর প্রতি প্রেম কত প্রীতি-বিধাতার!
২৮
সৃষ্টির বিধাতা বদ্ধ আপন ইচ্ছায় রে
যার প্রেম-ভােরে ;
সে কি রে সামান্য ধন ? তারে করি অযতন,
অভাগা এখন আমি কাদি দোরে দোর ;
কে আর করিবে দয়া দোষদুষ্ট মােরে ?
হায় রে অকালে মাের কোথা গেল প্রীতি রে ?
আমি ধূর্ত খল ।
হৃদয় যে শুকাইল, তাই প্রীতি লুকাইল ।
এবে হাহাকার কিন্তু চক্ষে নাই জল ।
দূর হ, নারকী, চাও স্বর্গের সম্বল ?
সরােজের প্রতি ইন্দু।
বিভাষ-ঠুংরি ।
হরি, শ্রীচরণে দাও হে স্থান অধম আমায়
ভােমা ছেড়ে প্রাণসখা যাব হে কোথায় ?
ওহে সংসার মরুমাঝে
কত ব্যথা বুকে বাজে
কি আর জানাব তােমায় হে;
প্রাণ-জ্বালায় জ্বলি,
লাজ ভয়ে জলাঞ্জলি
দিয়ে ফিরি পাগলের প্রায় হে।
ওহে আত্মীয় স্বজন গণে,
দেখি সবে প্রাণপণে,
ডুবাইতে চায় হে আমায় হে,
মােহের জাল পাতি
বসে আছে দিবারাতি
ভুলাইছে কত ছলনায় হে।
ওহে শান্তিনিকেতন,
জুড়াও হে জীবন,
বাঁচি না বাঁচি না এ আলায় হে ;
জুড়াও তাপিত হিয়ে,
প্রাণ মন সাঁপিয়ে
থাকি বাধা অভয় পায় হে। প্রােণের দায়)
১
কে বলে রে সরােজিনী সরসেই হাসে রে
বিকসি আনন ?
তবে কেন শতদল ত্যজিয়ে অমল জল
মৃণালবাসিনী করে স্থলে বিচরণ ?
কেন রে ত্যজিল বালা মৃণাল আসন ?
কেন রে উন্নতমুখী সূৰ্য-ভিখারিণী রে
আজি এ ভূতলে ?
বিনােদ-গম্ভীর হাসি শত শশী সুপ্রকাশি
সৌন্দৰ্য-মাধুর্যে গঞ্জি রতন উজ্জ্বলে,
বিন্যাসি চরণ চাৰু ধীরে ধীরে চলে।
সরােজ ! কি দুঃখে বল ত্যজিয়ে সরসী রে
এসেছ এখানে?
নবনী ভােমার কায়
বারিও নবনী প্রায়,
তা ছাড়ি এখানে আসিয়াছ কোন্ টানে ?
কি দোষ দেখিলে তুমি বিধির বিধানে ?
৪
কি বলে দাড়াব কাছে ; কাপালে হৃদয় রে
v
দপ করি চুর।
ইচ্ছা হয় কথা কই, আবার সাহসী নই,
আবার সাহসে বুক করে দুর দুর।
কেন এ সামান্য ভাব এতই মধুর !
৫
হৃদয়ের দুর্বলতা দেখে আপনার রে
লাজে মরে রই।
বিদ্যার পরীক্ষা ল’য়ে ইচ্ছা, বুঝি এ হৃদয়ে,
চরণের যােগ্য তব হই কি না হই;
মনের সে সাধ মম পূর্ণ হল কই ?
বড়ই অবােধ লােক; কত কথা কয় রে
দেখিয়ে তােমায় ।
বিনিয়ে মধুর স্বরে কত যে তামাসা করে
কত যে মনের ভাব বিদ্রুপে জানায়।
বিষম হইল দেখি বিবাহের দায় ।
বুঝে না কেমনে হবে, অঘটন ঘটা রে
হয় কি কখন ?
ভানু-ভিখারিণী তুমি, ভানুই শােহাগ-ভূমি
একমাত্র ভানু তব বাসনার ধন ;
ইন্দু কোথা পাবে তােমা করিলে যতন ?
৮
অসাধ্য সাধন এ যে, অসাধ্য সাধন রে,
অসাধ্য সাধন।
হইবার নয় যাহা, কেমনে সাধিব তাহা ?
অক্ষম পুরুষ আমি অতি অভাজন,
ক্ষীণাললাকে ফুটে কোথা সরােজিনী ধন?
মিছে আশা দেয় লােক, মিছে কথা কয় রে
মিছে কাজে মরে।
সাধনে হয় না যাহা, সহজে কে পায় তাহা ?
বুঝেও না বুঝে লােক তবু ছল ধরে ;
পড়িলাম দেখি এ যে বিষম সমরে
, না, আর ভাবিব না এ সব ভাবনা গো
অসার ভাবনা ।
পরিতাপ পাই পাছে, যার ধন তার কাছে,
যাও গাে অমৃতময়ী সরসীশােভনা ।
বাড়ায়ােনা অভাগার আর এ যাতনা।
যাও যাও ফুল্লমুখী যেখানে হইবে সুখী
পুণ্য গুণে অলঙ্কত কর এ সংসার।
করুন শ্রীভগবান কল্যাণ তােমার ।
কম্পনা।
১
;
অপরূপ সরােবর স্নিগ্ধ সুশীতল ;
তায় বিকসিত চারু হৃদয়কমল ;
অযযানি-সম্ভবা সমাসীনা তদুপরি
বিধাতৃ-মানসী-কন্যা কল্পনাসুন্দরী।
২
রূপ নাই, রূপে তবু করে ঢল ঢল ;
স্বর্গের সৌরভে পূর্ণ অবনীমণ্ডল।
উজ্জ্বল কোমল কান্তি স্নিগ্ধ চিরদিন ।
আপনা আপনি পূর্ণ কলঙ্ক-বিহীন।
শিশুমুখে হাসি নয় কামিনীর স্বর ;
বিদ্যুতের কান্তি নয় নীল জলধর ;
পদ্মের গরিমা নয় কুসুমের বাস;
এ আর কি গুণে করে মানস-বিকাল ।
৪
কেবা বুঝে বিধাতার সৃজন-কৌশল ?
নয় ত পঙ্কজ কেন সােনার কমল ?
মলিন দুর্গন্ধময় মানব-অন্তরে,
ত্রিদিববাসিনী বল কি সুখে বিহরে ?
মানবের গৃহে বাস, অমানুষী তার
রীতি নীতি ব্যবহার আচার বিচার।
অদ্ভুত দেখিয়ে তারে নিরবাক হই ;
পাগলিনী বলি তারে তাই আমি কই।
অলােক-গম্ভীর তার গম্ভীর মূরতি ।
অলােক-সামান্য কাজে ঘাের তার রতি
আপনার প্রকৃতির চির অনুগত।
আপনার ভাবে মুগ্ধ আপনি নিয়ত।
৭
আজনম স্বাধীনতা একমাত্র সই।
আজনম নাহি জানে স্বাধীনতা বই।
তাই নাহি বিকাইল পরিণয়-পদে ;
অনূঢ়া রহিবে পণ সম্পদে বিপদে।
৮
ܪ
বালিকার সরলতা অপাঙ্গ-বিলাসে ;
চাদের মাধুৰ্য তার সুধাময় হাসে
দেবতার পবিত্রতা লােকে চমৎকার।
কল্পনা-চরিত্র চারু রহস্যভাণ্ডার।
( ৬৭ )
বাল্যলীলা বালিকার বয়সে কি যায় ?
কল্পনা নিমগ্না আরও বালিকা লীলায় ।
ভাঙ্গিতেছে গড়িতেছে মনের মতন।
পুলকিত যত পায় নূতন নূতন।
সংসারের সব কাজে সৰ্ব্বদা শিথিল ;
শরীরের প্রতি নাই যত্ন এক তিল ।
দিবানিশী এক মনে জিলে গায় গান।
কি জানি কি রসে দেয় ভাসাইয়া প্রাণ।
১১
সংসারের সঙ্গে নাই গতি ব্যবহার।
ইচ্ছাময়ী ইচ্ছারঙ্গে করয়ে বিহার ।
অহহ! কিবা অলৌকিক শক্তিযােগে যােগী ।
ব্যোম-বিহারিণী অই কল্পনা বিহগী ।
হৃদাসনে বিরাজিত এই, আর নাই।
কল্পনা, কল্পনা বলি খুঁজিয়া বেড়াই ।
দেখি বনে দাড়াইয়ে ফুল লয়ে করে,
কি দেখিছে সেই জানে তাহার ভিতরে।
( ৬৮ )
অই চাৰু হিমাদ্রির উচ্চতম শিরে,
উন্মুখী জোছনা যথা আসি ধীরে ধীরে,
কৌতুকে আদর্শ-বিম্বে দেখে নিজমুখ ;
দেখিতে কল্পনা তায় কতই উৎসুক।
১৪
দৃষ্টির অসহ্য যথা মরু ভয়ঙ্কর,
কুটিলাবালুকারাশি সতত প্রখর,
তথা গিয়ে করে খেলা কল্পনা বাভুল ;
মরীচিকা-রঙ্গ দেখি হাসিয়া আকুল।
অথবা দেখিয়ে প্রতিযােগী দিবাকর,
পাতিয়ে বিচিত্র ধনু হয় অগ্রসর ।
আবার সে ধনু রাখি গরজে গভীর,
দিক চাপি ধায় যথা মেঘ মহাবীর ;
তা দেখি কুটিল হাসি হাসি সৌদামিনী,
হেথা সেথা ঘুরে ফিরে বিচিত্রগামিনী ;
যথা এই সকলের বিষম সংবাদ,
তার মাকে কল্পনার কতই আলাদ।
১৭
।
কিবা প্রীতি মাঠে তার, কানন ভ্রমণে
কিবা প্রীতি তটিনীর নীয় নিরীক্ষণে
কিবা প্রীতি অন্তরীক্ষে নক্ষত্র গণিয়া,
কিবা প্রতি চাদ পানে চাহিয়া হাসিয়া ।
১৮
দিকব্যাপী জলদে কি দেখে নাক কেউ ?
ইচ্ছা সুখে খেলে নে কে জলধির ঢেউ ?
ঝঞ্চাবাতে কে উল্লালে নাচিয়া বেড়ায় ?
আমােদে কে ক্ষণপ্রভা ধরিবারে ধায় ?
বিহগীর কুল নাকি পুতুল তাহার !
মাঠের গােবৎস নাকি সঙ্গী খেলিবার।
কমলে ভ্রমর গায়, চাহে এক জানে ।
বল্লরী-বিহারী তরু দেখে এক প্রাণে।
০
কোকিলের কণ্ঠে বাজে কিবা সে বাদন,
হইয়ে উৎকর্ণ তাই শুনে একমন।
জলের কল্লোলে ভাসে আনন্দপাথারে ।
ভাবি তাই কি দিয়ে গঠেছে বিধি তারে
( ৭ )
কাকের কর্কশ গানে কর্ণে বাজে কাঠ,
অবাক দেখিয়ে হই কল্পনার ঠাট;
যেন কি অপূৰ্ব্ব রসে ডুয়েছে মন,
যেন কি অদ্ভুত লােকে করেছে গমন ।
সংসার-বনের চারু বিহঙ্গিনীচয়
যথা ব’সে পরস্পয়ে মন-কথা কয় ;
দেখিনা ত তাকে কভু তাহাদের সনে,
একাকিমী কল্পনার বসতি বিজনে।
যােগিনী ত নয়---কই যােগে তার মন ?
আপনার প্রীতি-রসে আপনি মগন ।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড তার চিন্তার বিষয়,
লীলাময়ী কল্পনার সব লীলাময় ।
২৪
বিদ্যা বা ধনের কাছে নূ্যনতা স্বীকার
কল্পনার উচ্চমনে স্থান নাহি তার ।
ধন-মান-জ্ঞান-বিদ্যা কল্পনার পাশে,
সদা লালায়িত তার সুখসহবাসে।
{ ৭১)
২৫
কল্পনার সঙ্গী যেই সুখী সেই জন।
কল্পনার ব্যবহার অমৃতবর্ষণ।
কল্পনা-হৃদয়-নিধি সুধার আধার ।
হেন সহবাসে সুখ নাহি হয় কার ?
মিষ্ট কথা কল্পনার মত কারু নাই।
কল্পনা-রসনে বর্ষে অমিয় সদাই।
মধু মাখা মুখ যার, সুধা মাখা বুক,
এ ধনে রাখিতে হৃদে কাহার অসুখ?
२१
উৎসবে আনন্দ সতী বিষাদে সান্ত্বনা ।
রণে বনে চিরদিন সঙ্গিনী কল্পনা।
সম্পদে বিকার নাই দারিদ্র্যে বিষাদ
এ হেন কল্পনা-লাভে কাহার অসাধ ?
•
২৮
এত গুণ না থাকিলে, অয়ি রে কল্পনে ।
পর দুঃখে অশ্রুজল কেন ও নয়নে ?
দীনদরিদ্রের গৃহে কেন তর বাস?
সুখাৰ্ত্ত শােকার্ডে কেন প্রণয়-প্রকাশ ?
( ৭২ )
মঞ্জুভাষী কল্পনার বিরহীর কানে
কোন্ কথা? মন্ত্রমুগ্ধ কর কোন্ গানে ?
উচ্ছ সে “উদ্ভান্তপ্রেম’ বল কার গুণে ?
মগ্না মমােময়ী কীৰ্ত্তি কার কথা শুনে ?
পাঠাইয়ে দূরে নাথে দিন গ’ণে, গণে,
বিরহ-বিধূরা বাঁচে কাহার সানে ?
আত্মীয় স্বজন ত্যজি কেন গাে বলনা,
কল্পনার সনে এত নিৰ্জন-জল্পনা ?
জননীর কানে তুমি কত খানা গাও।
আশার জননী হয়ে জনকে জুড়াও।
শিশু মনে কত রঙ্গে কর রে বিহার।
একি রে কল্পনা তব লীলা চমৎকার !
৩২
শিশু তুমি চির দিন, শিশু তুমি নও;
যৌবনে যুবতী নও। সার কথা কও,
কে তুমি? •একিরে! তব তুলনাই নাই ?
কি শিশু, কি যুবা বৃদ্ধ, প্রণয়ী সবাই ?
( ৭৩ ) কি স্বপ্ন রে সর্বনাশী; দিবানিশি নাই, উদ্ভ্রান্ত হৃদয়ে মম দেখাও সদাই ? একবার পাই যদি ছায়া তুমি স্বার- থারে মনের কথা থাকরে আমার সতত চকিত প্রাণ, দুঃখে সদা ম্রিয়মাণ, কি কাজ ও উচ্চ আশে ? থাকরে আমার ; এ মনের দ্বার আমি খুলিব না আর। কোকিল। এ ঘাের নিশীথে কেন কঁদিয়ে উঠিলি রে উহু উহু বলি ? পাখী রে কি দুখে, বল, কাদাইয়ে বনস্থল, কাদি এমন করে ? কি জ্বালায় জ্বলি, কঁদিয়ে, ডাকিয়ে পাগরে পারা হলি ? তুই কি আমার মত এর জ্বালায় রে জ্বলিস সদাই ? তাের ও করুণ সুরে, • যে কেমন করে, উথলে লুকান পােক, বল কোথা যাই ? চুপ কর, ওরে পাখী, ৭-র কাজ নাই। ৭
চুপ কর, চুপ কর, কাদিয়ে তাকিয়ে রে
কাদালি আমায়।
আয় মাের কাছে আয়, বল পখী কি জ্বালায়,
এ রেতে এমন করে, কঁাদ উভরায়
কি তাের প্রাণের স্বালা বল রে আমায়।
;
৫
সরল সংসার, আহা, নিশীথের জ্বালা ও
কিছুই না জানে ;
সমস্ত দিবস পরে, শ্রান্ত-ক্লান্ত কলেবরে
ঘুমায়; কি জানে জ্বালা দুধে ধােয়া প্রাণে ?
কেঁদ না, জাগিবে তাের শােক-গাঁথা-গানে।
আহা মরি । অই চাদ অই তারা গুলি রে
আজ কত হাসে !!
তাের ও শশাকের গানে, যে বিষাদ ঢালে প্রাণে ;
লুকাবে ও হাসিমুখ শশাকের উচ্ছাসে ।
বিষাদ আনিস, না রে সুখের আবাসে ।
আহা, অমরাত্মিগুলি এহেন সময় রে,
আছে বুঝি ধ্যানে।
( ৭৫ )
যে করে কঁদিস তুই, আকাশের পথ ঘঁই,
ও তাের করুণ স্বর পশিবে পরাণে ;
ভাঙ্গিবে সমাধি তাের বিষাদের গানে।
৭
অই দেখ কোথায় নিভৃত স্থল পেয়ে রে,
প্রাণের জ্বালায়,
অনিল ঘুমায়ে ছিল; তাের ডাকে সে জাগিল ।
সখা সখা বলি দেখ, ছুটে গাে কোথায়,
ঘুম-চখে চুলে চুলে পাগলের প্রায় ।
৮
'কাদম্বিনী জাগি অই এলােথেলো প্রায় রে,
পিছে পিছে ধাই,
ঘুমাইয়ে ছিল কোথা, মনে কি পড়িল কথা,
অমনি ছুটিল আর দেখা শুনা নাই।
কার তরে হল এরা পাগল সবাই ?
কুলবধূ শুক তারা সুবেশ বিন্যালি রে
উকি দিয়ে চায়!
বাহিরিল ধীরে ধীরে, বারেক না চায় ফিরে;
কার তরে এত রেতে কোথাকারে যায় ?
আহা ! মুখ ম্লান হবে নাহি পেলে তায়।
কি ডাক ডাকিস তুই, জাগিল সবাই যে
একে, একে, একে ।
ঢেলে দিয়াছি যেন পরাণ, ডাকিস হেন
বিষাদ ঢালিস্ প্রাণে কেন ডেকে ডেকে ?
হু হু কি করে রে প্রাণ তের থেকে থেকে?
কি ডাক ডাকি তুই ডাকিয়ে তাকিয়ে রে
হইলি পাগল
পাখী রে পাগল বিনে, কে বল পাগল চিনে ?
তাই রে কবির প্রাণ শুনেই বিকল।
আপনি পাগল তুই করিলি পাগল।
১২
প্রাণস্পর্শী স্বর তাের অতি প্রাণম্পশী রে,
পরশ-পাথর।
তাের ডাক শুনি শুনি, মনে মনে কত গণি,
কি তরঙ্গ তুলে দিস্ প্রাণের ভিতর
চমকে হৃদয়, অঙ্গ কাপে থর থর।
রূপ খানি কাল তাের প্রাণ ভরা আলো রে
তাই এত গাও!
( ৭৭ )
এক কথা তােরে বলি, ডাকিস যদি রে জ্বলি,
জ্বালাতেও মুখ এত নাহিক কোথাও ;
কঁদিয়ে এ সুখ পাখী কেন রে খােয়াও ?
বিরহের সুখ যাহা বিরহী না হলে রে
জানে কোন্ জন ?
প্রাণের নিভৃত স্তরে, বিরহ যতন করে,
স্থাপে যে মূরতি, আর কোথায় তেমন ?
জমাট রূপের রাশি কেবলই তখন।
।
লােকালয়ে মুখ আর বুঝি দেখাইতে রে
নাহি চাহে প্রাণ
তাই রে লুকায়ে থাক, আড়ালে লুকায়ে ডাক,
লুকায়ে লুকায়ে গাও; তাই তাের গান
উদাস করে রে আরও উদাসীর প্রাণ।
ছিলি ত লুকায়ে, পুনঃ এলি, কেন এলি রে
এত দিন পরে ?
কি আশা পেলি রে বল ; ভাসাইলি বনস্থল
কাদিয়ে কেন রে তবে? কোন্ লাজভরে,
চাহিলে, চকিত আঁখি ছল ছল করে ?
( ৭৮ ).
যে তাের প্রাণের জ্বালা জানি তাত জানি রে,
অই দুখে জ্বলি ;
পুড়ে সদা অন্তস্তল, কি করি আমায় বল,
গুমরে গুমুরে ফেটে যায় বক্ষ স্থলি
দুহাতে দুপাশ ধরি সহি তা সকলি ।
৩
১৮
পাখী রে, লইয়ে তােরে, হেন ইচ্ছা হয় রে,
চলে যাই বনে।
শৈলরাজ-পাদমূলে,
পুণ্য শৈলনদীকুলে,
পাষাণ শয়নে গুনি, মুদিয়া নয়নে,
অন্তিমে সখার নাম তােমার বদনে।
হায় মাের প্রাণসখা এমন করিয়ে গো
‘গেলে কোথাকারে
চাহি সখা সখা বলি অন্তরীক্ষ বনস্থলী
কোথায় লুকালে ফেলি আমায় আঁধারে ?
কেমনে বাঁচি গাে সখা ছাড়িয়ে তােমারে ?
-প্রেম-বৈরাগী।
মরণ-সঙ্গীত।
লক্ষ্মী -যৎ।
শােক-দহনে দহিছে হৃদয়,
আয় মা, আয় মা, মা গাে ও!
কাল-সাগরে তুলিছ নিয়ত,
লীলাময়ী চারু লহরী ও ;
একটি তরঙ্গ আশার হিল্লোলে
উঠিল, ভাসিল, ডুবিল ও।
२
ক্ষুদ্র মূরতিখানি লভিয়ে জনম,
নবীন উদ্যমে ছুটিল ও।
দূর দূর দেশে বাড়িতে বাড়িতে,
একেবারে আজ বিলীন ও।
কোথা সেই আশা যাহার উচ্ছ্বাসে
ঘাের সমাকুল হৃদয় ও ?
দিবার উদ্যমে নিশা জাগরণে
নিবৃত্তি নহিল যাহার ও।
( ৮০ )
৪
কোথা সেই দম্ভ, ব্যোমস্পশী শির,
কারও কাছে নমিল না ঘৃণায় ও ?
বিশাল সংসার নয়নের কোণে
ধূলির সমান হেরিল ও।
কোথা সে প্রভুত্ব, যার লাভ তরে
বিপর্যস্ত ব্যোম মেদিনী ও?
দুর্লভ জীবন হেলায় সঁপিল
জীবন-মহাযাগ ভুলিলা ও।
কোথা সে ভবন, প্রিয় পরিজন,
সম্পদ, সে মান-সম্ভ্রম ও ?
একটি ভূণতরে সঁপিতেম প্রাণ,
আজি কেন বিরাগ সকলে ও ?
সুগুণ-গরিমা প্রকাশ তরে,
প্রাণের কালিমা ঢাকিতে ও,
নাহি সে প্রবৃত্তি বিশ্বজয়ােম্মুখী ;
অহাে ! এ কি পরিবর্তন ও ?
( ৮০ )
সুযশ-কাহিনী কুযশ-ঘােষণা
কাৰ্য-নিয়ন্ত্ৰী আর নহে ও।
জীবন-সংগ্রামে জয়লাভ তরে,
মাহি সে উৎকট আয়াস ও ।
অশু সুখে মজি, লােক-ভয়ে ডরি
প্রেমের ভয় তাের ভুলিলা ও।
মৃত্যুর কথা, ভবিষ্য বারতা,
দূরে দূরে সব রাখিলা ও ।
জ্ঞান-গরিমা, অপার বাসনা,
অহহ! এ লােক তরে নিবিল ও
কি কাজ সুখে, কি ভয় দুঃখে,
বিচল নহে প্রাণ কিছুতে ও।
১১
থাকিল সংসার, থাকিল বাসনা,
শেষে কায়া শ্মশানে থাকিল ও।
সব ফুরাইল ; রহিল যাহার
বিচ্ছেদে হা হা করে ও।
( ৮২ )
১২
বিরস বদন যাদের, হেরিলে
দেখিত নয়নে আধার ও ;
এত আৰ্তনাদে এখন সে হিয়ে
ভিজে না, গলে না, এ কি ও!
জীবন-স্বপন কেমনে ভাঙিলে গাে ?
পাষাণে জল-রেখা শুকালে ও।
ঘাের এ নিয়তি মৃত্যুর বিধান
জীবের ভাগ্যে! ও ! ও! ও!
১৪
এক মুহূর্তে একি বৈরাগ্য
শিখাইলে ওমা, তারে ও!
বাম হইল যাই ফিরিল না আর
মােদের রােদন সার ও।
যার যতনে তাপ না জানি
শান্তি লভিনু যে বুকে ও ;
ভাবনা না জানি ভয় পাশরিনু,
আজ কোথা সে বুক, ও মা, ও ?
( ৮০ )
রবি শশী নিরখি উথলে সাগর,
পরশ ছুটে দেখি ধ্রুবে ও ;
যার মুখ দেখি উথলিত হিয়ে
কই, মা, সে মুখ এখন ও ?
স্নেহের ত্রুটি দেখিলে যার
ফাটিত নয়ন মানে ও ;
আজি তার স্থানে এক-বিষাদে
অন্তর বাহির পূরিত ও !
১৮
ভবের বন্ধন সব ত কাটিল সে
প্রেম-বন্ধন কৈ কাটিল ও।
আজি তার তরে গমন-পারে,
ছুটিছে পরাণ কেন ও?
এ কি সম্বন্ধ স্থাপিলে, জননী,
ইহলােকে পরলােকে ও?
তার চরণ চিন্ ধরিয়ে ধরিয়ে
পরপারে যাব খুঁজিয়ে ও।
( ৮৪ )
অনন্ত লােকে শান্তির সুখে
কেমনে বিহরে দেখিব ও।
হৃদয় ভরিব আঁখি জুড়াইব
পুণ্যের সুষমা নিরখি ও।
বিগত ভাবিয়ে জ্বলি তাপানল,
আশু তাের নিদেশ শিরে ও,
ভাবীভাবনা কবে জুড়াব
মা তাের মধুমাখা কোলে ও।
যাও তবে শােক, স্বার্থপরতা,
জ্ঞানগৰ্ব্ব, সুখ-পিয়াস ও ;
পৃথিবীর যশ চাহি না চাহি না
তার পাশে নিও, মা, কোলে ও
সরােজের দেহ-ত্যাগ।
খাম্বাজ-কাওয়ালি ।
দিবানিশী দেখি তােমায় বড় সাধ মনে।
তােমারে দেখিবার তরে
প্রাণ যে কেমন করে
দেখিলে অাখি ঝরে, (ও) তা সহ কেমনে ?
কুসুমে কি ভালবাস?
চাদে বুঝি ভালবাস ;
(আর) আমার মুখ বিরস, (ও) তা দেখ কেমনে ?
লুকাবে, লুকাও তুমি ;
কঁদিয়ে কঁদিয়ে আমি
মরিব, দেখিব তুমি তা দেখ কেমনে ?
১
;
যেয়াে না যেয়াে না বঁধু কাদায়ে এরূপে গগ
ভাসায়ে আমারে
জান তােমা না দেখিলে, আঁধার দেখি গাে তিলে,
কেমনে নিদয় হয়ে ফেলি এ আঁধারে
পলা’লে, মরি যে এবে বিরহ f::..'।
( ৮৬ )
২
এমন করিবে যদি বল তবে কেন গো
ভাের নাহি হ'তে,
বাড়ায়ে সােনার করে, দাসীর চিবুক ধরে,
হানালে ; ফুটালে মােরে মজাতে এমতে ?
এসেছিলে এ লীলা দেখাতে এ জগতে?
কিবা আছে এ সংসারে ? কার তরে ধরি গাে
এ পাপ জীবন ?
নয়নের মণি তুমি, আমার সর্বস্ব তুমি,
তুমি মম সুখ দুঃখ, জীবন মরণ ।
তােমার বিহনে দাসী বাঁচে কতক্ষণ?
৪
ঘােমটা তুলিয়া দেখিলাম একবার গাে
যাই তব মুখ,
একবার, একবার না ফিরিল আখি আর
এ প্রাণ বিকায়ে পায়ে লভিলাম সুখ।
কেন পরিণামে, সখা, দিলে প্রাণে দুখ ?
৫
দেখেই ও মুখ তব সুখের সাগরে গাে
দিলাম তার ।
( ৮৭)
ভাঙ্গিল স্বপন-সুখ কি বলে দেখাব মুখ ?
রবিহীন প্রাণ আমি রাখিব না আর।
দাড়ায়ে দেখ গাে মরে সয়ােজ তােমার।
৬
ধন্য তুমি দেববালা, ধন্য তব প্রেম গে।
মােহিলে পরাণ।
সম প্ৰেম-মরকত সখি রে, তােমার মত,
গেল যে কোথায় ছাড়ি না পাই সন্ধান
তবু ত গেল না সই এ পাপ পরাণ ।
•
৭
বুঝিনু তােমার মত এ দগ্ধ হৃদয়ে গাে
নাহি প্রেমধন ;
আশার ছলনে সই দিবানিশী মরে রই
হা ধিক! হা ধিক মােরে! কোন্ প্রয়ােজন
এ বাঁচনে ?-হয় প্রেম, নয়ত মরণ !!
৮
কোথা র’লে এ কণ্ঠের শতেশ্বরী হার।
দেখা দিয়ে, হরি,প্রাণ রাখ গো আমার ।
প্রেমবৈরাগী।
প্রতিপদের চন্দ্র
আলেয়া—আড়া।
কি দেখি তাের মুখে রে চঁাদ, প্রাণ ভরা প্রিয়চ্ছবি,
তাই তােরে ডাকি আয় না, হৃদয়-রাজ্যের রাজা হবি
যত দেখি তত চাই,
পিয়াসার শান্তি নাই,
কি সুধা মাখায়ে বিধি তােরে গঠেছিল রে ;
অন্তরে অন্তরে থেকে,
আশা নাহি মিটে দেখে,
প্রাণে পূরে রেখে দিব আর কোথা পলাইবি ?
ঢাকিয়ে রূপের ডালি,
চোর-বেশে কেন এলি,
ইন্দু রে আমার ?
গগনের কোণে থাকি,
ইন্দ্রজাল-সুধা মাখি,
চাকিয়ে অসিত বাসে মুখ সুধাধার,
কি বলে হাসিস তুই, হাঁ ইন্দু আবার ?
( ৮৯ )
২
বড়ই নিষ্ঠুর তুই ;
সারা নিশা নাহি শুই
আমি তাের তরে।
বল কাল কোথা ছিলে ?
আমারে কি পাশরিলে
কেমনে পাশরি ছিলে ? দোর দিয়ে ঘরে,
পাষাণ! একাকী আমি কাঁদি তাের তরে।
তাের মুখ না দেখিলে,
আঁধার দেখি যে তিলে,
বুঝনা ত তাহা।
সুধুই কি আমি অতি ?
দিদি বসুমতী সতী
সারারাত কেঁদে বুক ভাসাইল আহা!
কুসুম আঁধারে ফুটে করে আহা! আহা!
৪
সিন্ধুরও শােকের সিন্ধু
উথলিয়ে উঠি, ইন্দু,
ভাসালে ধরায়।
( ৯০ )
ধরা নিজ জ্বালা ভুলে,
সিন্ধুরে করিয়ে কোলে,
গলা ধরে ভাই-বােনে করে হায়! হায় ।
দোহে বায়ু, আঁখি মুছি, চামর চুলায় ।
আর
বনস্থলী ?-অভিমানে
আধারে ঢাকি বয়ানে
কাঁদিল কতই ;
গুমুরে’ গুমুরে মরে,
ফুল-ভূষা করে ধরে,
দারুণ মানিনী, ছুড়ে ফেলে দিল অই ।
তাের তরে সারা সব, সুধু আমি নই।
দেখ ইন্দু তাের তরে
সবাই এমনি করে
কেন বল তাই ।
দয়া কি হয় না তাের ?
দয়া কোথা জানে চোর ?
রে পাষাণ! বল কাল কার লাগি পাই,
ভুলে ছিলি, একেবারে মনে পড়ে নাই ?
( ৯১ )
৭
তাের মুখ না দেখিলে
মােরা যে দেখি রে তিলে
ভুবন আঁধার
অতুল সৌন্দৰ্য-ভরা,
অই ঢল ঢল করা
মুখ খানি কিসে বল্ হই রে বিসার?
ও যে প্রাণ-ভরাচ্ছবি সুধার আধার।
কিবা তাের মধু হাসি
পরাণে পশিয়ে আসি
দুরে দুঃখ-ভার
ভুলি তা কেমনে বল ?
মনে হলে, ছল ছল
অাখি যে মানে না মাের, ইন্দু রে আমার
কিছুতেই ঘুচে না যে আঁখির আঁধার ।
কি মন্ত্র পড়িয়ে তুই
অলক্ষ্যে ঢালি তুই
মধু কর-ধারা।
( ১২ )
তাের ও কিরণ মাখি
কেন রে বনের পাখী
সারারাত উহু উহু করে হয় সারা।
সাধে কিরে হই আমি পাগলের পারা।
যেখানে বিরাজ তুমি,
হয় সে উৎসব-ভূমি
মধুরিমাময়।
জোছনা বিলা’ রঙ্গে;
জোছনা মাখিয়ে অঙ্গে
যে ভাব-লহরী ছুটে মম প্রাণ ময়
কেমনে ভুলিব তাহা বল রে নিদয় ?
;
১১
কাল ছিলি না রে বলে,
তারা কুল দলে দলে
এসে নভস্তল।
ডুবে তাের সুপ্রকাশে
যে সুখে তাহারা ভাসে
সে সুখ তাে ছেড়ে আর কোথা পাবে বল ?
বিধবার কুল যেন করে জ্বল জ্বল।
শুভক্ষণে দিলি দীক্ষা
সয় খুব, করি শিক্ষা,
সহিষ্ণুতা, ধরা!
প্রতি দিন উকি দিয়ে
যা’স তুই পলাইয়ে
তৃষা না মিটিতে জুর করি যে ত্বরা,
ধৈৰ্য্য নাই, অদর্শনে জেন্তে হই মরা ।
কি হবে সে কথা তুলি
প্রকৃতির দ্বার খুলি
বসিস যখন,
শুনে তাের উপাসনা
বল বল কোন্ জনা
না পেয়ে প্রাণেশে নাহি করে রে ক্রন্দন ?
পেলেও আনন্দে নাহি কাঁদে কোন্ জন ?
১৪
বুঝিলি ত না কিছুই
বড়ই নির্মম তুই
তাহাতে মায়াবী ;
( ৯৪ )
দেখি তাের মুখ-রাগ
মনে নাহি থাকে রাগ,
তাই বুঝি ভেবেছি নিয়ত জ্বালাবি?
প্রাণে পূরে রেখে দিব, প্রতিফল পাবি।
যেমন মনিব শঠ তুইও তেমন।
সে মাের কোথায় গেল করি জ্বালাতন ?
মন মাের চুরি করে
পলাল এমন করে
কোথা সে প্রাণের সখা পেলে দরশন
প্রেমের নিগড়ে তারে করিব বন্ধন।
-প্রেম-বৈরাগী ।
।
ভুবনেশ্বরের দরবার ।
বেহাগ-একতালা।
সকলই তোমার চমৎকার !
তারা চন্দ্রমা জ্যোৎস্না প্রকাশিবে কিবা মহিমা
কি দিবে সীমা ?
এক তােমার ভানুর কিরণ
উজলে অযুত অযুত ভুবন
দেয় প্রাণ প্রতিভা সম্পদ জীব তরু লতিকায়।
( ৯৫ )
এক তােমার ভাষার বীজ নিহিত মানব-হৃদয়ে,
অনন্ত কণ্ঠে অনন্ত বিকাশ দেখিতে দেখিতে অবাক।
এক গগন-গরভ-ধাবিত
অযুত অযুত লােক ;
এক লােক কোটি কোটি জীব-তরু-লতা-নিবাস ;
কটস্থ এক তুমি অণু-অণু সব ভেদিয়া
যােগাইছ যার প্রয়ােজন যত ভাবিতে ভাবিতে অবাক।
শুভক্ষণে মনসুখে একাদশী দিনে,
পদ্মাসনে সমাসীন শৈলেন্দ্রশেখরে,
গভীর সমাধি-মগ্ন বিভাবনা-বলে
একান্ত হৃদয় মম। চারি দিক যেন,
মৃত্যুপতি-পদাঙ্কিত, ঘাের নিশা-শেষে,
রােগীর প্রকোষ্ঠ যথা, স্তিমিত গম্ভীর।
শশান-বৈরাগ্য-ধৃত, বিশাল-বিস্তৃত,
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড-ধাম। ধ্যান-মাত্ৰ-প্রাণা,
স্বভাব-যােগিনী জাগে প্রকৃতি সুন্দরী
পরমেশ-প্রাণময়ী। শােভা নিরখিয়া
দূরবনে শােকে বন-কপােতী কঁদিয়া
করে রে আকুল প্রাণ, অবিরত ধারে,
টালে রে বিষাদ প্রাণে। ঘাের সন্তাড়নে,
অত্যুগ্র ইন্দ্রিয়বৃত্তি দৃঢ়-নিপীড়িত,
( ৯৬
a
প্রগ্রহ-তাড়িত প্রায় ; উদ্যম-বিজিতা
প্রবৃত্তি আনত-মুখী, মন্ত্রমুগ্ধ যেন,
লােল-জিহ্বা ভুজঙ্গিনী শীর্ণ-তেজোময়ী ;
জাগ্রত বাসনাগুলি সুনিদ্রিত আজি
সমাধির শান্তি-কোলে ; মায়া তিরােহিত ;
কিবা কুহেলিকা-জিত চকিত সংসার
দূরগত, তমাে যথা অরুণ-উদয়ে।
ঘাের ঘন-ঘটা-বিদ্ধ অমানিশা মাকে
দীপিলে অটল যথা জ্বালাময়ী রূপে
নিশ্চলন্তী সৌদামিনী সাজে অপরূপ,
তেমতি ক্ষুরিল জ্যোতি, উদ্দাম ঝলসে,
সহসা অন্তরাকাশে। নেহারি সে শােভা
ভাবাবেশে মুগ্ধ-মতি রহিনু চমকি
বিচেতন জড় প্রায়।
হায় রে চকিতে,
ইন্দ্রজাল-মুগ্ধ-প্রাণে অজস্র বহিল,
গিরি-তরঙ্গিণী-বেগে প্রবল উচ্ছ্বাসে
অযুত অমৃত নদী; মােহিল পরাণ!
নব সাজে নব বেশে, নেত্ৰ-পথে আজি
নবীন-মূরতি ধর ব্ৰহ্মাণ্ড-মণ্ডলী।
ত্রিদিব-সুন্দরী সন্ধ্যা বিমানবাহিনী,
স্বগণ-সঙ্গিনী, রঙ্গে, সুহেন সাজে
মধুরতা সখী,
উরিলা ধরণী-ধামে। এ শুভ সময়ে,
যােগ-নিমীলিত-নেত্র, মহাযােগে মাতি
মগ্ন ভানু মহেশের মহিমা-সাগরে ।
প্রাণাবেশে মহাপ্রাণ প্রকৃতি সুন্দরী,
প্রেম-উন্মাদিনী সতী, গাহিলা মধুর,
যােগেশের যশােগান।
শান্তির সােহাগসুখে পূর্ণ-প্রাণা আজি
নামিলা ধরায় ধীরে ; ধীরে--অতি ধীরে-
মধুর মধুরতর, নিঃশব্দ-সঞ্চারে
পিযুষ ঢালিলা প্রাণে ; হায় রে আবেশে
অবশ, বিবশ অঙ্গ, বিমােহিত প্রাণ।
অই মণি-কাঞ্চনাভা শােভাগরবিণী
সুরূপা সন্ধ্যার তারা ! দেবদূতী তুমি,
কি সংবাদ, অয়ি শুভে! .শিরােধার্য্য করি
সমুদিতা ব্যোমপথে ? আসিছে রজনী।
ভুবনের সিংহাসনে ভুবনের পতি
সমাসীন ; তাই কি রে বহ সুসন্দেশ
দেবতার ঘরে ঘরে ? দেখিতে দেখিতে,
আইল ছুটিয়া লঘু, সম্বৰ্ধন
তরে,
শ্রান্তিহরা শশিপ্রিয়া সৰ্ব্বরী সুন্দরী
সুরবধ। সখীগণ পারে কি থাকিতে ?
কাঞ্চন-জড়িত-কম-কৌষেয়-বনা,
লােচনানদায়িনী, দিব্য শােভাময়ী,
তারাকুল, সভাসনে, ভুবনালাে করি
রঙ্গে রাজে একে একে —
আইল অশ্বিনী
ভরণী ভগিনী সঙ্গে, বৈদ্যকুল-মণি
পুত্রগণে সাথে করি ; কৃত্তিকা সুন্দরী
গরবিণী পুত্রধনে ; বলাই-জননী
রােহিণী ; শীতের মাঝে পুষ্যা প্রিয়তরা ;
মৃত্যু সহােদরা মঘা ; ফুল-বাস-রমা,
ফুল-মালা-বিভূষণা, সুরভি-বিহ্বল।
মজা ফল্গুনী সখী ; সুবেশধারিণী
পিকগীতি-পাগলিনী, মদোন্মত্ত-প্রাণা
সুমনােহারিণী চিত্রা ; উগ্ররূপা, ভীমা,
বিলাল-গৰ্বিণী, তীব্র-কূটি-ভীষণা
কোপন কঠোর জ্যেষ্ঠা; জীবের জননী
আষাঢ়া করুণাময়ী রােগ-শােক-শীর্ণ।
তভাগী শ্রবণ সখী নেত্রালার-সারা,
জীবদুঃখে ; ভাদ্রপদ ভাসাইয়া নীরে
গগনমেদিনী ! আরও,
কত যে আইল
কে করিবে সংখ্যা তার ?
;
;
•
ছুটে রাশি চক্রে
নিতান্ত নিরীহ মেষ ; ধাইল পশ্চাতে
বৃষভ সারিয়ে শৃঙ্গ ; মিথুন-দম্পতি
অভিরাম ; বজ্রদংষ্ট্র কর্কট ; মৃগেন্দ্র
বিভাের আপন তেজে ;
কন্যা মনােরমা ;
বণিক-তনয় ভুল; কুটীল বৃশ্চিক
সুতেজস্বী মহেশ্বাস ; প্রখর মকর ;
কুম্ভবহ মনােহর
মীন মৃদু চারু ।
কর পদ প্রসারিয়া তীক্ষ দ্যুতিমান
সে কাল পুরুষ ছুটে; ছুটিল মঙ্গল
দিব্য রক্তাম্বরধর ; বুধ শশিসুত
ইলার প্রণয়-ধন বিরহ-বিধুর ;
বৃহস্পতি মতিমান ; শুক্রাচার্য্য ধীর ;
মহারুদ্র সৈংহিকেয় মুণ্ডমালা গলে
ভয়ঙ্কর শনৈশ্চর ; নয়নাভিরাম
পুচ্ছধর ধূমকেতু ;
খর ঋক্ষযুগ ;
হরি-গত-প্রাণ ধ্রুব, অটল অচল
স্থির-মতি ; দীন-বেশ সপ্তর্ষিমণ্ডল
চাহে যেন লুকাইতে, অতুল বিনয়ে
ভস্মাবৃত বহিপ্রায় ; মনােরম সাজে
মনােরম ছায়া-পথে কত যে দেখিনু,
নাহি নাহি সংখ্যা তার। দেব-আত্মা সবে
মুনিজন-মনােহর অরূপ-সৌন্দর্য্যে
আলােকিলা সভাতল ; অনন্ত-প্রসবা
বিষণ্ণা বসুধারাণী আবরি আঁধারে
শ্ৰীমুখ ; ননদী-সখী, উত্তাপ-ভগিনী
জ্যোৎস্না বুঝায় কত, গাঢ় আলিঙ্গনে,
সুধা-নিঃস্যন্দিনী বাণী বরষি সতত।
পরম ভিখারী তুমি, সুধাংশু, আপনি,
কি সুখ, যাচিয়া, দানে ? বিচিত্র চরিত্র,
বিচিত্র বিলাস তব ! বিশ্বপতি-বরে,
চির-উদারতাময় মহাপ্রাণ তব
অক্ষয় অমৃত-খনি; তাই ও পরশে
অনলও অম্বত হয়, তাই ও পরশে
জুড়ায় তাপিত প্রাণ। বহে রাজাদেশ
করঙ্ক-বাহিনী বালা উলুকা সুন্দরী ;
উড়ায়ে অঞ্চল, রূপে
ভুবন ভায়ে,
ছুটে লযু দিশি দিশি। সেবে অবিরত
জীবের জীবন বায়ু সভাসদগণে।
সবারে আপনি প্রভা মনােহর সাজে
লাজাইছে নিজ হাতে; রূপের ছটায়
ঝলসিয়ে যায় আঁখি, জুড়ায় পরাণ ।
( ১০১ )
যা দেখিনু আর কিরে এ পাপ-নয়নে
আবার দেখিব তাহা ? যা দেখিনু চ'খে
আজিও স্মরিলে প্রাণ মােহে ভাবাবেশে।
রঙ্গে যথা দূরবনে গভীর নিশীথে
সুর-সখীগণে মিলি সুতান তুলিয়া
ঢালে গাে অমিয়ধার সুষুপ্তির কাণে,
সেইরূপ সমস্বরে মধুর নিনাদে
গম্ভীরা, চিন্ময়ী গীতি
অলৌকিক তানে
উঠিলা ভুবনব্যাপি । মনানন্দে সবে
ব্ৰহ্মাণ্ডের ছােট বড় মিলিয়া গাইল,
যােগেশের যশােগান মনানন্দে মাতি
শুনিনু তা ; মনােমদে গাঢ় মাতােয়ারা।
বিস্ময়ে ফিরায়ে আঁখি নেহারিনু যথা,
সেই এক মধুরিমা; ফিরাইনু কাণে,
সেই এক মধু-গীতি : সুসংহতে মিশি।
গানের মাধুর্যে যেন ভুবনের রাজে
চাহে গাে বাঁধিতে সবে! ভুবন-ভুলান,
পরাণ-মাতান হেন
আর ত শুনিনি কভু !! লহরে লহরে
গানের মাধুরী যেন
পরাণে পশিয়ে
সংঘাত বাঁধিল ঘন! হায় রে পরাণ
;
e
সুস্বর-লহরী
( ১৫২ )
.
নিম্পন্দ-চৈতন্যশূন্য, কি যেন হইল।
এই কি সভার কাৰ্য। এই রসে মাতি,
বিমােহিত বিশ্বজন ! একি দরবার ।
এ যে পুর্ণ মহােৎসব; সভাসদগনে
প্রাণ-যােগে বাধা যথা, পুঙ, স্ত্রী সকলে
হাতে হাতে ধরি সবে গাঢ় প্রেম-যােগে
সবে বাঁধা চলিয়াছে, বন্দনা গাইয়ে,
বিলাইয়া বিশ্বময় • পুণ্য-প্রেম-প্রাণে।
হায় রে এ সভা হেরি আর কি বাঁচিতে
চাহে রে এ পাপ প্রাণি ? সত্যই জগতে
অপূৰ্ব্ব এ দরবার। কোথায় মন্ত্রণা।
কোথায় বা অভিযােগ ? কিসের বিচার ?
নাহি যথা ব্যভিচায়, কেন অভিযােগ
কলঙ্কিবে পুণ্য সভা? কিসের বিচার ?
পূর্ণজ্ঞান বিশ্বনাথ শাসেন আপনি
ভুবন, পুণ্যের তেজে, পবিত্র সংসার।
সে বিশ্বে কলঙ্ক স্পর্শ! অনন্ত-বিধৃত,
ব্ৰহ্মাণ্ড বিয়াজমান ললিত সুঠামে
নিয়ম মঙ্গল-বাহী; অমৃতনিঃস্যন্দী,
ভ্রমাতীত কাৰ্য যার ; উহার বন্ধানে
দোষম্পৰ্শ !! দেখি শুনি ডুবিনু বিস্ময়ে।
।
( ১০৩ ) প্রকটি বিদ্যুত হাসি মঞ্জু মেঘমালা অন্তরীক্ষ-নিবাসিনী, কাম-বিহারিণী, সমাগতা মন্দগতি। ভুলাইল আশু নীলিম রূপের ছটা। কহিনু করুণ- “কাদম্বিনী! আসিলে কি কুহক বিস্তারি, ছলিতে এ পাপ প্রাণ ? নেহারি তােমায় মরি রে দারুণ লাজে। বুঝি বৃথাই অচেতন বলে তােমা জ্ঞানহীন জনে। মুখে হরি মহাম, হরিনামাঙ্কিত সুপবিত্র অঙ্গ তব ; ঘন প্রেমােচ্ছাসে হরিপুণ্য জ্যোতি ভেদি ফাটিয়া পড়িছে পরমাণু-পরমাণু; ঝলসিছে আঁখি চাহিতে তােমার পানে; কঁপিছে পরাণ কি আবেশে। কহ শুনি সুসংবাদ তব। ভাবানুরঞ্জিত স্বচ্ছ মধুর কোমল নীল অনিমেষ আঁখি তুলি ধীরে ধীরে চাহিলা পাপীর পানে। হায়রে কেমনে বর্ণিব সে স্থির-দৃষ্টি কটাক্ষ গভীর ? প্রগাঢ় উচ্ছ্বাসময়ী হৃদয়-স্পর্শিনী পরমা চিন্ময়ী বাণী সেই যে শুনি,
( ১০৪ )
বাজিছে আজিও প্রাণে ; তত্ব সুমধুর,
রেখেছে মাতায়ে প্রাণ আজও সুখমদে।
কহিলেন কাদম্বিনী সুমধুর স্বরে
কি আর কহিব আমি ? জ্ঞানহীন জনে
কিবা জানে, কি সন্দেশ দিবে গাে তােমারে?
শক্তিমতী মহাচিন্তা অক্ষমা ধারণে
যে মহাভাবের স্রোত, পারে কি করিতে
ক্ষুদ্র-প্রাণা বাণী তাহে সঙ্কীর্ণ পরাণে?
জনমি জননী বই কিছু না জানিনু ;
জননীই প্রাণ মম । জননী-আদেশে
শান্তিহীন মরুভূমে, শান্তি বিতরিয়া
ধাই দেশে দেশে মােরা । সে আদেশে ধরি
কঠোর বজ্রাগ্নিজ্বালা ভীম সংপ্রহারে
বিচুরিতে উচ্চশির, প্রয়ােজন যবে ।
মায়ের সন্তান মােরা, মায়ের সমান
ব্যবহার মােসবার। জননী-জীবিতা;
চিরদিন এ সংসারে; জননী বিহনে,
বাচিনা ক্ষণেক মােরা। জননীর কাজে
ধরি প্রাণ এ সংসারে সে কাজ সাধনে .
কত যে লভি গাে সুখ বলিব কেমনে ?
সাধি জননীর কাজ জননী-ইঙ্গিতে
*
( ১০৫ )
মরণেও সুখী মােরা। কি কাজ মােদের
মাতৃগুণ-গান বিনা ? কি কাজ জীবনে
সে কাজধন বই ? সফল জীবন,
মরণও সফল মানি; সুপ্রসন্ন মুখে,
বলেন ‘হয়েছে বেশ বিশ্বমাতা যদি ।
বলিতে সহস্রধারে কঁাদিয়া ফেলিলা
মাতৃগুণানুরাগিণী ; দেখিয়া শুনিয়া
স্পন্দহীন প্রাণ মম, মােহিত হৃদয়।
সহ অদূরে দেখি, যােগ-যুত-প্রাণা
জননী আমার ধ্যানে দেবতা-রূপিণী
পরম পুণ্যের বলে, দেবতা সমান
মােহন পুণ্যের জ্যোতি। নিরখি নিরখি
অনিমেষ আঁখি মম তৃপ্তি না মানিল
হেরি সে অমৃতচ্ছবি। আনন্দ-বিপাের,
সুধাইনু ধীরে ধীরে “জননী আমার! •
হেরিনু কি পুনঃ তােমা চিরদিন পরে ?”
হায় রে কি শুনিলাম। নিনাদিল যেন,
শতধা পীযুষ-পায়ী কল-কণ্ঠ-ধ্বনি
• এ পাপ শ্রবণে মম। কল্মষ-জড়িত
জুড়াল এ পাপ দেহ, আচ্ছন্ন এ প্রাণ
ভাসিল পুণ্যের নীরে ! অই শুন অই
( ১০৬ )
।
এখনও বাজিছে কর্ণে অমৃতসঞ্চারী
সে মােহন প্রতিধ্বনি জীবিত-সমান ;
বাছা রে ! এসেছ কি রে পুণ্যময়ভূমে,
পাপ পুরী পরিহরি ? অভাগী জননী
তােমার আমি রে সেই। জ্ঞানধৰ্ম্মন,
দুঃখ-দাবানল মাঝে ত্যজিলাম দেই
দুঃখময় ধরাতলে । মরণ-যাতনা
জাগেরে আজিও মনে । হারানু জনম
বৃথাই কাৰ্য্যের পাকে। অকূল ভাবিয়ে,
মােহান্ধ-জড়িত নেত্রে নিয়ত দেখিনু
নিরন্তর অন্ধকার এ ভব-মণ্ডলে।
জগত-জননী-পাশে কি বলে পঁাড়াব,
ভাবিয়া আকুল প্রাণ। কিন্তু কে জানিত
এত স্নেহ ভালবাসা, এতই করুণ
জননীর নিধি-ভরা ! আসিতে আসিতে
লইয়ে অমৃত ক্রোড়ে
জুড়ালেন মম
সে পাপ দেহের জ্বালা-ভুলিনু সকল ।
কিবা সে পরশ ! কিবা আশাময়ী বাণী ।
দূরে গেল দুঃখ ক্লেশ ; শান্তি-সমাবেশে,
নবীনতা-গত প্রাণ মুগ্ধ নব ভাবে।
সে হইতে কামচারী বিহঙ্গম-সম
বিহরি, বাসনা যথা। কত যে দেখিনু
অসীম অদ্ভুত দৃশ্য ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডলে
নাহি নাহি অন্ত তার। লােক পর লােকে
আনন্দে বিচরি সুখে নেহারি নেহারি
“কোথা অন্ত কোথা” বলি। পাইনু কি তবু
সীমা তার ? ক্ষুদ্র প্রাণ, ক্ষুদ্র শক্তি মম,
সাধ্য কি যে লভি তত্ত্ব ? ভীমসৃষ্টিকাণ্ড,
অগিতৌজা মহাবলাবিলােলবিধৃত,
চিত্ত-চমৎকারকারী, অগম্য অপার,
কে করিবে সীমা তার? অনন্ত-জীবনে
চিরালভ্য অনুমানি। কোথায়, কেমন
বিরাট ব্রহ্মাণ্ড-শেষ, বারম্বার মনে
আলােড়িনু ; তবু তৃপ্তি নহিল আমার ।
এ হেন অনন্ত বিশ্ব-গরভ ধাবিত,
অরূপ ভীষণ সূত্রে নিয়ন্ত্রিত ঘূঢ়,
অগণন সৌরলােক, চিরভ্রাম্যমান,
নাহি তবু ব্যভিচার, কি কালে কি স্থানে।
কে কবে দেখেছে এই ভুবন ভিতরে
চলিতে নিজ্জীব জড়ে? ভাবিলে অবাক!
কে চালিল, কে চালায়, জ্ঞান-অগােচর
চলিতেছে চিরদিন। ঘাের বিঘূর্ণিত
( ১০৮ )
চন্দ্র সূৰ্য্য গ্রহ তারা স্বগণ সমেত,
জানে বিশ্রাম কভু। এ দেবসভায়,
সেবক সরাই, হেথা আদেশ পালনে
ব্যস্ত দিবানিশী সবে। আলস্য, বিশ্রাম,
মনােভ্রান্তি, পক্ষপাত, বিঘ্ন অমঙ্গল,
দূরপরাহত সবে নিগুণ-শাসনে।
কেবলই আদেশ বাছা, কেবলই আদেশ
রাজাধিরাজের রাজ্যে। কৰ্মশীল সবে,
চেতনাভিমানী এক আমরা কেবল,
গর্ধিত অসার গর্বে, আত্মহারা হয়ে
অসাড় নিষ্কর্মা সবে। পুণ্যের সংসারে
বিধাতার, অপরাধী, অমঙ্গল আনি
কেন আজি সবে মােরা? হলে ইহা মনে,
রহি লাজে, ভয়ে, দুঃখে মরমে মরিয়া ।
টারবিলা দেব-আত্মা। সে কান্তি নেহারি
পড়িল মরম মম ক্ষোভে অভিমানে।
হায় রে ইহারিতরে লভিনু কি সবে
জ্ঞান-বুদ্ধি-পুণ্য-পুত দুর্লভ জনম
মর্তভুমে ? নিজদোষে
নিমিত্তের ভাগী।
কাদিয়া ফেলিনু দুঃখে । গাঢ় মনস্তাপে,
কহিসু করুণ স্বরে “সৰ্বসাক্ষী দেব ।
{ ১০৯ :)
কি কাজ এ প্রাণে মম, তােমার সংসারে
রােপিল যা বিষতরু, ' অশান্তির বিষে
দহিল এিপ তাপে পুণ্যময় ভব ?
কি হইবে গতি মম?”
সন্তাপিত দেখি,
আশ্বাসিলা স্নেহময়ী মধুমাখা স্বরে
বৎসরে, করুণাময়ী জগতজননী,
ভয় কি রে ? রােগে দুঃখে, ঔষধ বিধান
অপার দয়ায় স্বার, অনুতাপী দেখি
কোলে না নিয়ে কি তিনি পারেন থাকিতে ?
কত যে অগণ্য পাপী জুড়াইল প্রাণ
তাঁহার পুণ্যের স্পর্শে ! অই দেখ সবে
নিত্য মহােৎসবে মাতি, সঘনে গাইছে
জননীর পুণ্য নাম। আনন্দলহরী
উচ্ছসিত অবিরাম। এ দৃশ্য নেহারি
কার না জুড়ায় প্রাণ ? এ আনন্দস্রোতে
কে না চাহে ভাসিবারে অনুরাগে মাতি ?
-চিত্তোম্মাদী মহােৎসব ! কেহ মগ্ন ধ্যানে ;
আপনা বিসারি কেহ মনানন্দে মাতি
গাহিছে মঙ্গল-গান ; প্রেমের পাগল,
ছুটে যায় অই কেহ নক্ষএে নক্ষত্রে
( ১১০
পাগল প্রেমিক সঙ্গে ; বিরহ-বিধুর
অই কেহ খুঁজে মায়ে পরমাণু মাঝে ;
কেহ কহে তত্ব-কথা আর কতগুলি :
একান্তে শুনিছে তাহা ; কেহ সুধাপানে
আপনি বিভাের হয়ে ডাকিছে আদরে
বাটিয়া নিবার তরে ; শুনি কত গুলি
ছুটিছে অমৃতপানে। এ শােভা নিরখি
কে চায় ফিরিতে, পুন পাপের সংসারে ?
সন্তানবৎসলা তাই বলেছেন সবে
যাইতে হবে না কারও ফিরিয়া সংসারে।
চেতনাচেতন-মিশ্র অদ্ভুতগঠিত
বিশ্বদরবার এই। দেখরে চাহিয়া,
কূটস্থ পরম দেব বিরাজেন তাহে
আদ্যাশক্তি যোগমায়া রাজরাণী রূপে।
একাকী শাসেন বিশ্ব অখণ্ড প্রতাপে,
পালেন যতনে পুন;
করুণা বিধানে
রক্ষেন, নাশেন তারে।
কি বর্ণিব আমি?
বাও বাছা, দেখ নিজে হৃদয় ভরিয়ে
রাজসভা, রাজরাণী অনন্ত রূপিণী ।
বিস্ময়ে দেখিনু চাহি, বলিতে বলিতে,
কোথায় গেলেন মিশি। আবেগ-বিহ্বল,
( ১১১ )
চাহিমু চৌদিকে ঘন ; বিশাল বিত
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড-ব্যাপী দেব দরবার
ঝলসিল জ্ঞান-আঁখি। অপরূপ সাজে,
বীরাসনে বিরাজিত মহারাণী রূপে
মহাশক্তি মহামায়া।
অরূপ সৌন্দর্য্যে
ভাসিল ভুবন-রাজ্য ; অরূপ সৌন্দর্য্যে
মােহিল বােগীর প্রাণ। পিয়ে মনােমদে,
মােহ গেল বিশ্বজন চেতনাচেতন
অনন্তের রূপ-গ্রসে। হায় রে কেমনে
বর্ণি সে অতুল শােভা ?
দেখিনি সে মুখে,
শ্রীমুখ-কমল-বাসে তবু গাে এখনও
মাতােয়ারা মন মম। দেখিনি সে আঁখি,
তবু সে দৃষ্টির বাণ ভেদিয়াছে ঘন
এ পাপ হৃদয় মম নাহি পৰশিনু,
তবু গাে পরশ-সুখে বিবশ এ প্রাণ।
অশরীরী শির ভেদি অনন্ত আকাশে
জ্বলন্ত অশনিসম, শােভে তাহে চারু
দূর দূর গগনের দূরতম দেশে
মুকুটের দীপ্তচ্ছটা। কে পারে বর্ণিতে
সে মহতী রাজ-শক্তি, যে প্রচণ্ড তেজে
নিক্ষিপ্ত অসীমাকাশে ব্ৰহ্মাণ্ডমণ্ডলী
( ১১২ )
অনন্ত হর্ণায়মান। কে পারে চাহিতে
সে জ্ঞান-জ্যোতির পানে ? বিস্ময়ে দেখি
কত কত সৌর লােক প্রতিলােমকূপে,
রুদ্র তেজে প্রধাবিত, বহিয়া নীরবে
বিশ্বেশীর ভীমাদেশ! সূৰ্য্য কোটি কোটি
স্বগণ সহিত এ নিদেশ পালনে
কেবা জানে দিবারাতি। ভীমা মহেশ্বরী
মহারুদ্ররূপিনী প্রকাণ্ড জ্ঞানময়ী;
অসম্ভবা, অমৃতা, অক্ষর-কীর্তিমতী,
স্বভাব-নিবাসিনী। অনন্ত বিগ্রহে,
বিপুল ব্ৰহ্মাণ্ডরাজী, গ্রহ, চন্দ্র, তারা,
মহাসিন্ধু, মহীধর, দেশ, মহাদেশ,
স্রোতস্বিনী, অরণ্যানী, জীব জন্তু আদি,
সাধে কাৰ্য্য নিজ নিজ। মহাচক্রে ফিরি
কি কীট কীটাণু সবে ঘুরে ঘাের পাকে
যন্ত্রস্থিত রেণু প্রায় ! জ্ঞানী মহাজন
তটস্থ বিবর্তমান মহাজ্ঞানভারে।
বিস্ময়-সন্ত্রাস-ত্রস্ত অদ্ভুত নিরখি
মুদিনু এ পাপ আঁখি ; ঘূর্ণিত মস্তক,
বিক্ষুব্ধ স্তম্ভিত প্রাণ। বিভ্ৰম-দর্শনে
চাহিমু অন্তরাকাশে ; একি! ইন্দ্রজাল।
;
( ১১৩ )
চমকি চাহিনু পুন; চকিতে দেখিনু,
নাহি সেই ব্ৰহ্মমূৰ্ত্তি মহারৌদ্রময়ী,
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ডব্যাপী ভাস্বর বিভূতি,
বিপুল বিরাট দেহ। যেন মায়াবলে,
বিভাবসু, নিশানাথ, নক্ষত্রমণ্ডলে
শৈলেশ্বরে, সিন্ধুহৃদে, শৈলজিনী-নীরে,
ভূচর খেচর জীবে, কীটাণুর প্রাণে
পূর্ণ মনােরঙ্গে রাজে মনােময়ীরূপে,
মনােময়ী মনােরমা ; বিস্ময়ে চাহিনু
আপন হৃদয় মাঝে; দেখিনু বিরাজে
প্রাণভরা ছবিখানি সুহাসে প্রকটি
অরূপ রূপের ছটা। চলিয়া পড়িল
গর্ঘক্ষীত গ্রীবা মম উচ্চশির সহ ;
হইল অবশ অঙ্গ। চিত্তবিনােদন ।
প্রাণ ধন! প্রিয়ধন! বলিতে বলিতে
বিভ্ৰম-জড়িত-স্বরে, মােহ গেল প্রাণ।
সে মুখ ভুলিবার নয়।
ভৈরবী--মধ্যমান।
সে মুখ দেখিলে আর ভােলা নাকি যায়।
সে যে অতুলন রূপরাশি ভুবন ভুলায়।
পৰ্বতে কাননে ছুটি,
তরঙ্গ-বেলায় লুটি,
নাথ ! নাথ। বলে ফিরি পাগলের প্রায়।
স্বপনে দেখিয়ে উঠি,
জোছনায় পড়ে লুটি,
(বলি) প্রাণের জোছনা আমার নুকালে কোথায় ?
স্বপনের কোলে ছিলাম বিবশ
চমকি উঠি জাগি।
মাথার ভিতর করে যে কেমন,
জাগিনু কিসের লাগি ?
নয়ন আমার দেখিছে আঁধার
বুক করে দুর দুর।
স্বপন-বিলাসী
কই সে আমার
অরূপ-রূপ মধুর ?
( ১১৫ )
প্রেমেতে গঠিত অতি সুললিত
ভুবন-ভুলান রূপ।
প্রেমের আননে প্রেমের সুহাস,
নাহি তার অনুরূপ।
প্রেমের নয়নে প্রেমের বিজলী
প্রেমের মাধুরী খেলে।
প্রেমেতে মাখান রুচির চাহনি
দেয়,গে অমিয় ঢেলে।
প্রেমের বদনে প্রেমের কাহিনী
মধুর মধুর বলে।
প্রেমের অধরে প্রেমের সুধারা
মধুর মধুর গলে।
প্রেম-ভরা বুকে প্রেমের লহরী
উছলি উছলি যায়।
কি দেখিনু আহা! মরি! মরি! মরি ।
আর কি দেখিব তায় ?
কেনবা জাগিনু আঁধার দেখিতে
আঁধার দেখিয়ে মরি।
ও রুপ দেখিয়ে না মরিনু কেন ?
কি সুখে বা প্রাণ ধরি ?
( ১১৬ )
২
আজ কত দিন সে মুখ দেখিনু
নিয়ত জাগে তা মনে ;
অরূপ-ফলকে কে দিল আঁকিয়ে,
জ্বলে নিদ্রাজাগরণে।
মুছিবার নয়, উঠিবার নয়,
নাহি পায় লয় ক্ষয় ;
মাজিলে ঘদিলে জ্বল জ্বল জ্বল
জ্বলে আরও প্রাণময়।
এ জনমে যদি না দেখিরে আর
তবু গাে মরিব সুখে
প্রেমের চিতায় সহজে পুড়িব
সে ছবি ধরিয়ে বুকে।
সেই যে হেরিনু আর নাহি হেরি
তবু ত ভুলিতে নারি।
পথ চলে যাই শুনি যেন পিছে
পায়ের শবদ তারি।
পৰ্ব্বতে কাননে ফিরি এক মনে
শুনি গে চকি যেন
( ১১৭ )
বিষাদ-জড়িত মধুর সুরে
ডাকিছে, বাজে গাে হেন।
প্রাণের ভিতরে স্তরে স্তরে স্তরে
পশিয়ে জমে গে স্বর ।
মাতােয়ারা যেন এমনই বিকার ;
কেমন প্রেমের জ্বর।
নদীর বেলায় প্রাণের জ্বালায়
বিষাদে শুইয়ে থাকি,
আনিয়ে গােপনে
ধরে গাে জড়িয়ে
সােনার জোছনা মাখি ।
শিহরিয়ে উঠি, নাহি পাই আর ;
অঙ্গ কাপে থর থর ।
দেখি গাে আঁধার, অকুল পাথার,
নাহি বুঝি আত্মপর।
বনে পাখী ডাকে শুনিয়ে সে স্বর
পরাণ ধরিতে ধায়,
কুসুমমঞ্জরী ধরি ধরি আনি
ছবির সনে মিলায়।
নদীর বালুকা লইয়ে যতনে
কি যেন মিলাতে চায় :
{ ১১৮ )
আপনার হৃদি চাহে একবার,
আবার নেহারে তায়।
সুন্দর দেখিলে, সুমিষ্ট শুনিলে
চমকি চমকি উঠে ;
কখন অসাড, আবার কখন
পাগলের প্রায় ছুটে ।
ওরে একবার ওমুখ দেখিলে
আর কি গো ভােলা যায় ?
জীবন মরণ কিছুই জানি না,
আর কি দেখিব তায় ?
প্রেমেতে গঠিত মূরতি সুন্দর
সেই গাে দেখেছি কবে,
সে দিন বলিয়ে । মনে মনে যেন
হইছে কেন গাে তবে ?
জমাট-প্রেমের মূরতি সুঠাম
এই যে ভালিতেছিল,
দেখিতে দেখিতে দিঠি আঁধারিয়ে
কোথায় মিশিয়ে গেল।
ঘুমাইয়ে দেখি “ জাগিলে আঁধার
এ কোন্ মায়ার লীলা ?
( ১১৯ )
R
আঁধার ঘরে কে পশিয়ে গােপনে
চুরি করি পলাইলা?
করিয়াছে চুরি, করেছে করেছে,
তাহৈ কিছু ক্ষতি নাই ।
বুক যুড়ে কেন থাকিল না ঘরে
যতনে দিতাম ঠাঁই।
চুরি করে যদি পলাইল, সুধু
মন কেন নিয়ে গেল ?
শেষ যাহা আছে কার তরে আর
ফেলে রেখে চলে গেল ?
জমাট প্রেমের
অরূপ মূরতি
হেন আর দেখি নাই।
ইচ্ছা হয় তারে বুকে করে নিয়ে
গহন বনে পলাই ।
প্রেম কি গাে ননী ? নয়ত অমন
কোমল হইল কিসে?
ননীর মতন
যেন গলে গলে
গেল সে কোথায় মিশে ।
প্রেম কি গাে জল ? জমে গো কেমনে
কখন পাষাণ হয় ;
( ১২০ )
আবার কখন উড়িয়ে উড়িয়ে
আকাশে মিশিয়ে রয়।
প্রেম কি কুহক ? এত দিন হল
চমক ভাঙ্গে না কেন ?
পরাণ আমার মােহের আবেশে
সদাই জড়িত যেন।
ঘুম ঘুম চোখ সদা ঢুলু ঢুলু
না পারি মেলিতে আঁখি,
নেশা বিনে একি দশা হ’ল মাের
আর কি আছে গাে বাকি।
স্বপনেও আসি করে গাে নাচার
কেমনে ভুলিব আর ।
স্মৃতি-সহমৃত্যু-সুখেতে মরিব,
শেষ সুখ অভাগার।
-প্রেম-বৈরাগী ।
তুমি মধু।
"তুমি মধু । তুমি মধু! তুমি মধু !
মধুর আকর ' মধুর নিঝর
তুমি হে পরাণ-বঁধু ।
( ১২১ )
মধুর মূরতি, মধুর ভারতী,
সরল মধুর হাস ।
মধুর নয়নে মধুমাখা দিঠি
মধু অঙ্গে মধু বস।
মধুর পরশে পরাণ আকুল,
এমন ত দেখি নাই ।
লাজ ভয় গেল, পাগল করল,
আপনা হারাই যাই।
তাের তরে বঁধু কি করে যে হিয়ে,
কি আর কব তা তােরে ?
বরের যে জন পর হয়ে গেল,
কি গুণ করিলি মোরে।
বঁধুহে !
একটি বাসনা হিয়ার মাঝারে
“নিয়ত জাগিছে মাের;
কব কি তা তােরে ? কি ভাবিবি মনে ?
আমি ত নেশায় ভাের ।
তাের বুকে আমি
ভাঙা তরী হয়ে ভাসি ;
তাহে প্রেম-বয় ; মধুর
হিল্লোলে
হইব সুখ-বিলাসী ।
মধুর সাগর।
{ ১২২ )
শত ছিদ্র দিয়া মধুর মধুর
চুয়া’য়ে উঠিবে মধু ;
হাড়ে হাড়ে মধু পশিয়ে পশিয়ে
বিধিবে পরাণ বঁধু।
প্রেমের বাতাসে হেলিতে দুলিতে
ডুবিতে ভাসিতে যাব,
মাঝ খানে গিয়ে ডুবু ডুবু হয়ে
জন্মের মত বিকাৰ ।
লুকাইব তাের
মধুর মধুর চাপে ;
জরিয়া গলিয়া মধুতে মিশিয়া
জুড়াব হিয়ার তাপে।
বুকের ভিতরে
মধু তুমি নাথ তােমারে ছাড়িয়ে
যাইব কোথায় আর ?
মধুহারা হলে দারুণ পিয়াস
মিটাইবে কে আমার?
প্রাণের জ্বালায় জ্বলিয়া পুড়িয়া,
যখন আসিব ধেয়ে,
নিকুঞ্জ হইয়ে বুকের ভিতরে
নিয়ে, জুড়াইও হিয়ে।
রাতির আঁধারে ভয় পেলে নাখ
হয়ােগাে চাদের আলা ;
নিদারুণ দাহে চন্দন হইয়ে
জুড়া’য়াে প্রাণের জ্বালা।
অরুণ নয়ন দেখিলে গো কারও
কাদিলে মনের তাপে,
প্রাণসখী হয়ে নিয়াে কোলে করে
জুড়া’য়াে মধুরালাপে ।
সাথে সাথে থেকো প্রাণ-যােগে গাঁথা
ছাড়িয়ে যেয়াে না আর ;
চাহিয়ে চাহিয়ে মুখ পানে তাের
ভুলে যাব এ সংসার।
৪
সখি রে !
কি তাের মধুর
রতি !
তােরে ভালবাসি বড় সুখ প্রাণে ;
সই তুই মধুমতী।
তা না হলে বল, কেন তাের তরে
সদাই আকুল প্রাণ
তিলে না দেখিলে দিশাহারা হই;
যায় মান অভিমান।
( ১২৪ )
কথায় কথায় ঘরের বাহিৰ,
লােকে দেখি কত বলে।
আপনার জনে বাঁধিয়া রাখিতে
চায় ছলে বলে কলে।
কি কব তুহারে, হাসি পায় সই
বলিতে তাদের কথা :
তােরে ভালবামি, এতেও তাদের
প্রাণে বাজে গাে ব্যথা।
চমকিয়া উঠে তাের দুট কথা
শুনিলে আমার মুখে।
পর হয়ে গেনু এই ভাবি মনে
স্বস্তি নাহি পায় বুকে।
কতই যতনে,
মাটির খেলনা
দিয়ে ভুলাইতে চায় ।
অর কি তাহাতে দিন কাটে মাের ?
বৃথাই মােরে জ্বালায়।
মধুর মধু যে তুহার পিরিতি ;
পেয়েছে যে তার স্বাদ,
আর সে কি ভুলে ? আর সে কি গলে ?
লোকে ভাবে পরমাদ ।
( ১২৪)
কেহ বলে ভণ্ড, কেহ বা পাগল,
নিবারে মনের ঝাল।
ভাল বাসে তােরে যে জন, তাহার
এই হাল চিরকাল।
হ সই!
সুধাই আরেক কথা।
ভালটি দেখিলে ভালটি শুনিলে
কেন যায় মন ব্যথা?
উষার বদন নেহারি নেহারি
নয়ন কেন গাে ঝরে ?
সন্ধ্যার নীলিমা জমিলে নয়নে
কেন মরি রাগ ভরে ?
সরিষার ফুলে গাছ আলাে করে ,
হৃদয় উথলে কেন ?
ঝাকে ঝাকে গাছে জোনাকিরা জ্বলে,
প্রাণময় আলাে যেন।
গিরি গায়ে বাজে নিঝর বাজনা,
আকুল করে গাে প্রাণ।
বিজন কাননে মাতা’য়ে তােলে গাে
বিজন পাখীর গান।
( ১২৬ )
পাইলে অনিলে, আদে লহরী
আটখানা হয়ে যায় ;
গড়ায়, গড়ায়, আবার লুকায় ;
সঙ্গে আমারে মজায়।
ফুলের সুবাস অলক্ষ্যে ছুটিয়া
পাগল করে গো প্রাণ।
মধার সঙ্গীতে সুর লহরীতে
মজিয়ে হারাই জ্ঞান।
রমণীর প্রিয় করুণ মাখান
বদন নেহারি সই
চেয়ে থাকি সুধু আপনা পাসরি
কি যেন হইয়ে রই।
বিরাজ কি সই এ সবার মাঝে
সত্য বল, দেখি মােরে ।
নয় এত মধু এদের মাঝারে
জমিল কেমন করে ?
আগে ত দেখেছি
এ সব, এখন
কেন দেখি আন আন?
এ কি হ’ল মােরে ? কে নব মাধুরী
তাদিগে করিল দান ?
( ১২৭ )
নূতন নূতন মাধুরী মাখিয়ে
উদিয়ে আমার কাছে,
একেবারে খুন করিতে আমারে
কার কাছে শিখিয়াছে ?
হাসিয়ে হাসিয়ে, বুক খানি খুলে,
যায় কি দেখায়ে মােরে,
অজ্ঞান হইয়ে, থাকি গাে পড়িয়ে,
বিঘাের নেশার ঘােরে ।
কে জানিত সই জড়ের ভিতরে
মায়াবী হৃদয় আছে ?
এ বাজী, বল, না, ভব-ভানুমতী,
কার কাছে শিখিয়াছে।
লুকাইয়ে থেকে কি রঙ্গ দেখিস,,
মামার পুতলী সই ;
তাের যা, সকলই •মাের কাছে আর
কিছু নয় মধু বই।
খাটি মধু সই, তুই রে আমার,
তুহার সকলই মধু।
জনমের তরে মােরে একেবারে
মজালি পরাণ বঁধু ।
=প্রেম-বৈরাগী ।
আমায় ছেড় না, ছেড় না।
খাম্বাজ-খেমটা।
আমায় ছেড় না ছেড় না প্রাণ-বধু হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
আমায় বেঁধে রাখ চিরপ্রেমভােরে হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
আমি তােমা ছেড়ে কোথা আর যাব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর ।
আর কে জুড়াবে এ তাপিত হিয়ে হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
আমার প্রাণজুড়ন ধন তুমি হে,
আমি বাঁচি না তােমায় ছেড়ে আর।
আমার বুকজুড়ন ধন তুমি হে,
আমি বাঁচি না তােমায় ছেড়ে আর।
আমার নয়নেয় মণি তুমি নাথ হে,
আমি বাঁচি না তােমায় ছেড়ে আর ।
আমি বিজনে তােমায় নিয়ে থাকিব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
তুমি কত কথা কবে আমি শুনিব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
আর অনিমেষে ও মুখ নেহারিব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর।
( ১২৯ }
র’ই হে,
তুমি রসসিন্ধু হও, আমি
ডুবে
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর
ভবে ভেলা হও, বুকে শুয়ে ভাসিব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আব।
তুমি ফুল-শয্যা হও, আমি জুড়াই হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর ।
তুমি চিনল হও, পুড়ে মরিব হে,
আমি যাব না তােমায় ছেড়ে আর ।
-প্রেম-বৈরাগী।
পিয়াস না মিটিল।
১
;
উষার অঞ্চল ধরি রাঙ্গা রবিচ্ছবি গাে
ৰাচিয়া হাসিয়া ;
দেখিতে দেখিতে হয়। আর দেখা নাহি যায়,
বয়ােদোষে কঠোরতা মারে পােড়াইয়া।
তৃষা না মিটিল প্রাণে সে কান্তি হেরিয়া।
২
অই সরােজিনী সই কি সুন্দর শেভে রে
সরসীর বুকে ;
আনিয়া দাও না মােরে আমিও অমনি ক'রে
( ১৩০ )
আদরে ধরিব বুকে, পরশি চিবুকে।
পিয়াস মিটিল না যে নিরখি ও মুখে।
রে চঁাদ অমন ক'রে চা’স্ নে চাস্ নে রে
অভাগার পানে ;
কি সুধা মাখায়ে বিধি তােরে রে অমিয়-নিধি
গড়িয়াছে ; ইচ্ছা হয় পূরে রাখি প্রাণে।
তৃষা না মিটিল তাের সুধারস পানে।
;
৪
শিশু রে ! হাসির খনি তাের চাদ মুখ রে
হাস,-~-আরও হাস।
কি হাসিই পেয়েছ তুমি, কি হালিই হাস তুমি
সরলতামাখা মুখে বিষাদ বিনাশ।
তৃষা মিটিল না, শিশু, হাস আরও হাম।
সংসার-সঙ্গিনী সখী তােরে নিয়ে মরি রে
কি সুখে কি দুখে ;
আর কিছু নাহি চাই, সদা হরি গুণ গাই,
সদা হরি-প্রেম পান করি তাের মুখে ;
তৃষা মিটিল না মম
রাখি তােরে বুকে।
( ১৩)
কেমন তুষার ভূমি মায়ার সংসার গো,
তৃষা বুঝি সুখ !
যতই করি না পান তৃপ্তি নাহি মানে প্রাণ
আরও করিবারে পান সদাই উন্মুখ ।
তৃষা না মিটিল মনে র’ল বড় দুখ ।
আমার প্রাণের সখা হৃদয় আঁধারি গাে
গেল কোথাকারে ;
পিয়াসা নদীর কুলে, প্রেম কদম্বের মূলে,
সেই যে দেখিনু আর না দেখিনু তারে।
তৃষা না মিটিতে ফাকি দিল সে আমারে ।
৮
আর কোথা যাব আমি, আর কোথা চাব গাে,
বঁধু বঁধু বলি ?
জিজ্ঞাসি অনন্তাকাশে, সুধাইনু উষা পাশে,
শৈবলিনী ফুলরাত্রী গিরি বনস্থলী ;
পুছি এত কেহ কিছু নাহি দেয় বলি।
প্রাণের পিয়াসা প্রাণে জাগে দিবারাত
কবে আশা মিটাইবে ভিখারীর নাথ ?
( ১৩২ }
রে মূঢ়! তৃষাই শক্তি, তৃষাই ত প্রাণ,
তৃষা-বিহীনতা আর জড়তা সমান ।
-প্রেম-বৈরাগী।
সিন্ধু-মধ্যমান।
চিরদিনের আমি গাে তার, আমার প্রাণের বঁধু আমার
(ওগো) সে মুখ দেখিলে আমি ভুলে থাকি ত্রিসংসার।
জানি, কি গুণ ক'রে
ভুলায়ে রেখেছে মােবে
এখন তারে না দেখিলে পােড়া চ’খে সুধু দেখি আঁধা।
গােপনে কি কথা বলে
ভাসালে নয়ন জলে
সে হতে প্রাণ বিকানু আমার ;
এখন ফিরাতে যে নারি আর।
(আমি ফিরাতে পারি না আর।)
কিছু সুন্দর দেখিলে
সুমিষ্ট কিছু শুনিলে
উঠে চমকি প্রাণ, বলি কি আর ।
বলি ঐ বুঝি আসিছে আমার।
(বলি ঐ বুঝি মনচোরা আমার ।)
পিলু-যৎ।
'দীন শরণ তুমি, পতিত পাবন,
প্রাণের প্রাণ তুমি, প্রাণরমণ।
নিরাশ-আঁধারে তুমি আশার জ্যোতি ;
পাপের অাধারে তুমি পুণ্যের ভাতি।
এ ভব-সমুদ্রে তুমি, এক ধ্রুব তারা;
অকূল পাথারে তুমি, কূল কিনারা।
রােগের শুশ্রুষা তুমি, শশাকের সান্ত্বনা ;
দুঃখে আশাবাণী তুমি, পাতকে প্রার্থনা।
প্রাণের পিয়াসা তুমি, ভয় দুঃখ লাজ ।
(আমার) জ্ঞান চক্ষু-যােগ মােক্ষ তুমি যােগরাজ
.ধন রত্ন মণি তুমি, তুমি প্রাণাধার ;
কি নও আমার তুমি কি নও আমার।
ভৈরবী-ফুংরী ।
ও সেই হৃদয় ধনে,
গােপনে, বাঁধিয়ে রাখি যতনে, ভাবি মনে মনে।
পলকে হারালে তারে,
মরি বিরহবিকারে,
হেরি নয়নে;
না দেখি সে প্রাণ ধনে, (আমি) বাচি কেমনে।
( ১৩৪ );
কি দিবা কিবা শর্বরী,
সে তত খেলে মুকোচুরি,
+ অামি তাে বাচিনে;
ধরিলে রাখিতে নারি সে সাধনের বনে।
মন চুরি করিয়ে মাের,
কোথা যে মুকায় চোর,
ধরিতে পারিনে;
কি জালা আবার তারি তরে এ ধারা নয়নে।
কি করে সাধিলে তারে,
পাই সদা হৃদি মাঝারে,
বল গাে আমারে ;
আমায় এমন করে পাগল করে, (আমি) আর তাে
বাচিনে।
অশুদ্ধশােধন।
পংক্তি
৬ পংক্তি
১ পৃষ্ঠা
জ্যাতীরাজ জ্যোতি-রাজ
বালি
বলি
অতুঙ্গ
অতু
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.