Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Manosi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
fos
****
মানসী।
৯.৫৯
কাব্যরঞ্জন
No text on this page.
অশেষ-গুণসম্পন্ন বদান্য জমিদার
শ্ৰীযুক্ত জিতেন্দ্রকুমার পাল চৌধুরী।
মহাশয়ের করকমলে ।
ধীমান্,
আপনার নিকট আমি নানাপ্রকার ঋণে আবৃদ্ধ।
গণের কণামাত্র পরিশােধের ক্ষমতাও আমার নাই; সে
বিষয়ের আলোচনাও আজ কৃরিব না।
আপনি একদিন এক খানি মাসিক পত্রের একটা
শুনাইয়া আমাকে বলিয়াছিলেন,—এ গল্পটীর ছাত্মাবলম্বনে
এক পানি নাটক লিখিলে বেশ হয়। আপনায় সে উক্তি
স্মরণে রাথিয়া, 'মানসী’ লিখিত হইয়াছিল। যদ্যপি আমি সে
গল্পের অত্যধিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন করিয়াছি, তথাপি
আপনি হস্তলিখিত-কাপি (manuscript) দেখিয়া, অত্যন্ত
সন্তুষ্ট হইয়া, আপনার নিজের ন্যাশন্যাল থিয়েটারে ইহার অতি-
নয়ের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
সে দিন বুঝিয়াছিলাম, আপনি মানসী’কে উপেক্ষা
চক্ষুতে দেখেন নাই। শুধু এইটুকু মাত্র ভরসায়, ইহা আপনার
করে অর্পণ করিলাম। ইতি,
চিরমঙ্গলকান্দী-
প্রকাশকের বক্তব্য। = বৰ্ত্তমানযুগে সুরমম্যাপত্যুকার কোনও লেখক নাটক প্রচনা করিছেন,-আমি জানি না। আমার বিশ্বাস, গ্রন্থ- কার এ বিষয়ের প্রথম পথি-প্রদর্শক। গােপায়া ন্যাশন্যাল থিয়েটারে যখন ইহার অভিনয় হয়, তখন অকেনেই—ইহার প্রচুর প্রশংসা করিয়াছিলেন, এবং উহা প্রকাশিত করিতে গ্রন্থকারকে অনুরােধ করিয়াছিলেন। কোনও কোনও সম্রাক্ত ভদ্রলােক অর্থ সাহায্য করিতেও প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন। কিন্তু নানা কারণে গ্রন্থখানি এতদিন মুদ্রিত হয় নাই। এ নাটক ধানি রাজভক্তি মূলক ; রণজিতের চরিত্রে রাজ- ভক্তি সুস্পষ্ট পরিস্ফুট।—এই কারণে আমি নিজ ব্যয়ে উহার মুদ্রণ-বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করিলে, গ্রন্থকার মহাশয় দয়া করিয়া আমাকে উহা মুদ্রিত করিতে অনুমতি দিয়াছেন। গ্রন্থ প্রকাশিত হইল, এক্ষণে সাধারণে ইহার প্রতি স্নেহ দৃষ্টিপাত করিলেই আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। আর এককথা,-নাটক থানি প্রথম অভিনীত হইলে, যাত্রার দলের কোনও অধিকারী, ইহাকে গীতাভিনয়ে পরিবর্তিত করিয়া দিতে গ্রন্থকারকে অনুরােধ করেন। সেজন্য গ্রন্থের পরিশিষ্টে কয়েকটী গান সংযােজিত হইল। যাত্ৰাধিকারিগণ, যথাস্থানে গান গুলি গীত হইবার ব্যবস্থা করিলে, সহজেই উহার “গীতাভিনয় চলিবে। ইতি-- বিনীত-প্রকাশক ।
মানসী।
oo
ঐবিপিনচন্দ্র দেব কর্তৃক প্রকাশিত।
১৩২৬ বাদ।
মূল্য » এক টাকা।
পাত্র-পাত্রী। স্ত্রী। শত্রুজিৎ ক্ষপ প্রভা ০ দ্বিতীয়পক্ষের রাজী। সেনাপতি-পত্নী। পদ্মাবতী ০ ০ ০ চন্দ্রচূড় রণজিৎ কাশ্মীরের সম্রাট। ঐ মন্ত্রী। ঐ সেনাপতি। নির্বাসিত প্রধান সভাসদ। মানসী সম্রাট কন্যা। পরিচারিকা। চামেলী এতদ্ব্যতীত সখিগণ, দাসী, নাগ- বিকাগণ, ফুলওয়ালী, জেলেনী, কাই রিয়া-পত্নী, নর্তকীগণ প্রভৃতি। পুরন রত্নেশ্বর-পুত্র। বিজয় পুরঞ্জন সখা। রঘুবীর ••• পার্বত্য-সর্দার। বাহারাম ••• সংসারত্যাগী যুবক । এতদ্ব্যতীত সার্বভৌম, ছদ্মবেশী অধ্যাপক, শিষ্যদ্বয়, রাজবৈদ্য, জেলে, কাঠুরিয়া, ছদ্মবেশী সন্ন্যাসী, ছদ্মবেশ ফুওয়ালা, প্রহরী, দূত, সভাসগণ, সৈগণ, বাধবালিকগণ প্রভৃতি।
মানসী।
প্রথম অঙ্ক।
১ম দৃশ্য-পৰ্বত, দুর্গাভ্যন্তর।
(আহত রত্নেশ্বর শয্যায় শায়িত, ভঁহার এক পার্শ্বে
বিষন্ন মনে বিজয় উপবিষ্ট ।)
যত্নে। বিজয়, ক্রমেই আমার সময় সংকীর্ণ হয়ে আছে। বড় খেদ রইলাে,
প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হলােনা। অকারণ অবমানিত, নিগৃহীত হয়ে যখন
কাশ্মীর ত্যাগ করি, স্পন্ধাভরে বলেছিলুম,—যদি ধৰ্ম্ম থাকে, যদি
পাপ-পুণ্যের বিচারকা কেট থাকেন, একদিন আমার নির্দোষত
সপ্রমাণ হবে। বলেছিলুম,—অনাদরে, উপেক্ষায় যে কাশীর আমাকে
ত্যাগ করূলাে, সে কাশ্মীর যাতে সাগ্রহে, সসম্মানে আমাকে পুনগ্রহণ
করে, আমি তাই করবো। তা-ই করেছিলুম। সীমান্তে যে
রণবহ্নি-জ্জ্বলিত হয়েছিল, আমার ব্রত-উদ্যাপনে সে বহ্নি নিঝাপিত
হবে, মনে বড় সাধ ছিল। কিন্তু হলো না, কঠোর নিয়তির নির্মম
বিধানে, আমার আশা, আমার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হতেই, আমাকে
ভবের হাট হতে চির-বিদায় গ্রহণ কত্তে হলাে !-বড় কষ্ট, প্রতিজ্ঞা
অপূর্ণ রইলাে !
বেগে পুরঞ্জনের প্রবেশ।
পিত্তহঠাৎ চমকিয়া) একি, পিতা আমার আহত?-শয্যাশায়ী?
পিত এ দশা কেন?
২ মানসী। র। পুরন, বিচলিত হয়ােনা। গতকল্য নৈশ-সমরে আমি গুরুতর আত হয়েছি। তার ফলে শীঘ্রই আমাকে রণক্ষেত্র, এমন কি কবরঙ্গক্ষেত্র পরিত্যাগ কত্তে হবে। কিন্তু বৎস, পিাশে,যতদিন কাশীরা স্বরাজ্যে তােমাকে সসম্মানে পিতৃপকে প্রতিষ্ঠিত না করেন, ততদিন যেন সমরের বিরাম না হয়। শৈশবে তুমি মাতৃহীন হয়ে ছিলে, আর পিতা ও ছেড়ে চললাে; এ বিরাট সংসার ক্ষেত্রে তুমি আজ একা, নিরবল। কিন্তু তথাপি বৎস, পিতৃ-প্রতিজ্ঞা পূরণের ভার তােমার উপর রইলাে,-বিস্মৃত হয়ােনা। পর। বাবা, এ সময়ে এ সর্বনাশ হলাে? আমি যে বড় যত্নে সমস্ত সেনা সজ্জিত করে, এখনই শত্রুপক্ষ আক্রমণের উদ্যোগ কচ্ছিলুম। নৈশ-সমরে জয়-পরাজয় অনিশ্চিত ছিল, আজ যে বড় আশা করেছিলুম, বিপক্ষপক্ষ দলিত করে তাদের সকল গৰ্ব্ব-ধৰ্ব্ব করবো! বে। তাই কর। আমার জন্য বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হয়োনা। এ অধাত আমার মরণঘাত। চিকিৎসা-শুশ্রুষার জ বুথ। বিব্রত হয়ো।। শোন বৎস, আমার অভাবে তিলমাত্র কাতর হয়ে, আমার দীর্ঘদিনের সাধনা নষ্ট করােনা। আর বাছা, বীরের শোক অশ্রু ত নয়, - অসির ঝঙ্কার । পুর। তবে পিতঃ, তাই মূলমন্ত্র হলো। আজ হতে অসিতই পুরঞ্জনের সাব্রত হলাে। পিতৃরক্তে যে সমরের আন্ত, শােকাশ্রুতে সে সময়ের সমাপ্তি হবে না। যে দুরন্ত শত্রুর নির্মম অসি পিতৃক্ষ বিদীর্ণ করেছে, সে শক্রর উত্তপ্ত শােণিতধারায় পুরঞ্জনের অসিত উদ্যাপিত হবে। এর ব্যর্থতা-মানবের অসাধ্য। বরে। প্রতিজ্ঞা কর,যতদিন কাশীররাজ সাগ্রহে তােমায় পিতৃপদে প্রতিষ্ঠিত না করেন, ততদিন তিনি তোমার প্রবল প্রতি । সসম্মানে কাশ্মীর-বাস—তোমার একমাত্র সাধন। পুর। এই পিতৃচরণ স্পর্শে প্রতিজ্ঞা কচ্ছি, যতদিন দেহে কণামাত্র শােণিত বিদ্যমান থাকবে, যতদিন পুরঞ্জনের শেষ নিঃশ্বাস আকাশে বিলীন না হবে, ততদিন পিতৃপ্রতিজ্ঞা পূরণে শৈথিল্য প্রকাশ কৰা না। এতিয়া করুম,-পর্বত-প্রমাণ বাধা-বিরে ও প্রতি বিন্দুমাত্র হৃক্ষেপ করে, জীবন-সঙ্কটের জন্য মুহুৰ্ত্তমাত্র চিন্তা না করে, অতিষ্ট পথে :
মানসী । দ্রুত অগ্রসর হব। প্রতিজ্ঞা কম-মন্ত্রে সাধন কিংবা শৰীৰ র। আঃ,-সকল উদ্বেগের অবসান হলাে। পুরঞ্জন, আশীৰ্ব্বাদ করি, মনােবাসনা অচিরে পূর্ণ হোক। বিজয়, আজ দশ বৎসর বনে বনে ভ্রমণ ক'রে দশ সহস্র সৈন্য সংগ্রহ করেছি। সে সমস্ত সৈন্ত, আয় আমার প্রাণাধিক পুত্র পুরঞ্জনকে এ মুহুর্ত হতে তােমার হাতে অর্পণ কম। তাকে আমার উদ্দিষ্ট পথে চালিত করে। বিপদে সম্পদে তার সঙ্গ ছাড়া হয়ােনা। রসেরের তোমার নিকট এই শেষ প্রার্থনা। বি। পূবর, মাতাপিতৃহীন অসহায় বালক যখন অকুল সংসার-সাগরে ভেসে যাচ্ছিল, যখন আপনার (সহ, আপনার যত্ন, আপনার অনুগ্রহ ব্যতীত তার একদিনও বঁাচ বার সম্ভাবনা ছিলনা,তখনকার সে চি আজ ও তার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল বর্ণে অক্ষিত আছে। যতদিন এ চার দহ পঞ্চভূতে ন', মিশায় ততদিন ই থাকবে। বিজয়ের এ দেহ এতদিন অাপনার সেবায় উৎসর্গীকৃত ছিল, আজ হতে আপনারই আদেশে সহোদর-প্রতিম পুরনের সেবায় নিয়োজিত, এলাে। দেব, রণে-বনে সম্পদে-বিপদে অঞ্জ হতে বিজয় আজীবন পুরনের চির-সহচ- ... আপন নিশ্চিন্ত হােন। ছে। আর এক কথা, (শন, তোমরা দুজনেই শোন-কাশ্মীরের সিংহাসন সাত কখনও আমার উদ্দেশ্য ছিল না। রাজার প্রতি আমার হিংসা নেই, দ্বেষ নেই,শুধু বীরত্ব প্রদর্শনে তঁার চিত্তাকর্ষণ আমার লক্ষ্য এ শক্রতা প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য। আমার উদ্দেশ্য দুজনেই জেনে রাখ,-ভুল করােনা। বিজ। রাজ্যলাভ আপনার উদ্দেশ্য নয়। শুধু তবে- যুতে। অনেক দিন অনেক বার বলেছি, তা আমার উদ্দ্যেশ্য নয়। তারা পরম ধাৰ্ম্মিক, সরল, সত্যপরায়ণ। দশ বৎসর আগে মন্ত্রী চন্দ্রচূড়ের ষড়যন্ত্রে আমি নির্বাসিত হই। নির্দোষতা প্রমাণের জল্প, সকল চেষ্টা, সকল যত্ন যখন ব্যর্থ হয়, তখনই অভিমানে আতক্রোধ হই। এটা ভিয় ধর্মের দোষ কি গুণ, জানিনা। (গণপরে আমার চিরদিনই ছিল, নিজের বাহুবলে নিজের বীজে রাজাকে মুখ করে তাৰ - t, ও মানসী। মেহ অর্জন করি। নির্দয় কাল, তাতে বাদ সাধলাে।" পূর। মন্ত্রী চচুড়- আর সেনাপতি রণজিৎ, এই দুই শর শােণিতে পিতৃঋণ পরিশোধিত হবে। জে। ভুল করোনা বৎস। সেনাপতি রণজিৎ সুচরিত্র। আমারই বন্ধু- পুত্র। সে ধর্মভীরু, তার প্রতি জাতক্রোধ হ'য়েনা। পুর। পিতঃ, তারই তীক্ষ্ণ অসি পুরঞ্জনকে পিতৃহীন কলো, এ কথা কিরূপে বিস্মৃত হব। কর্তব্য-পালন বীরধর্ম। রাজভক্ত রণজিৎ রাজাজ্ঞায় বিদ্রোহ দমন কত্তে এসেছে। সম্মুখযুদ্ধে আমি দৈবাৎ আহত হয়েছি, তার কোনই দোষ নেই। তার সঙ্গে শত্রুতা, কর্তব্যের অনুরোধ পর্যন্ত, আর বেশী নয়। দ্রত রঘুবীরের প্রবেশ । র। বিলম্বে সর্বনাশ – সৈন্য যুদ্ধাৰ্থ প্রস্তুত। এতক্ষণে আমাদেরই আক্রমণ করা উচিৎ ছিল। একি প্রভু শায়িত ! ঝত্বে। বুযু, বগন আজ অন্তিম-শয্যায় বিশ্রাম কচ্ছে। জীবনদীপ অচিরে চির-নিৰ্বাপিত হবে। ভাই, এসময় অধিক আর কি বলবে? আজ হতে পুরঞ্জনকে তোমাদের হাতে সপে দিলুম, আমার শূন্যস্থান তার দ্বারা পূর্ণ করে। রঘু একি! ইদপিণ্ড হতে রক্ত নির্গত হচ্ছে। হায় হায়, এ সর্বনাশ কে করূলে ? নে বনে, পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতুম আমরা, বড় শক্ত স্নেহুডোরে বেঁধে ছিলে প্রভাে। সেভোরের আকর্ষণে সব ছেড়ে তােমার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিলুম, তােমার তৃপ্তির জন্য প্রাণ পৰ্য্যন্ত পণ করেছিলুম,- আর আজ এভাবে তুমি আমাদের ছেড়ে যাবে ? তা হবেনা, তা হতে দেবোনা। বল, বল প্রভো, কি করূপে তোমার জীবন রক্ষা পায়-আমরা সবাই মিলে তাই করবো। বড়। কালে যাকে গ্রাস করে, তাকে কেউ ধরে রাখতে পারেনা, রঘু। আমি জানি তোমরা আমার বিশেষ অনুরক্ত। কিন্তু এ যাত্রা আমার নিষ্কৃতি নেই। এক্ষণে সবাই মিলে আমার শেষ’অনুৰােখ রক্ষা কর। আমার অভাবে হতাশ না হয়ে, আমার প্রতিরক্ষায় যত্ন-পর হও। সঞ্চলে তোমরা আমার প্রতি অবিচারের প্রকিরি ব্যবস্থা কর। পর্যবেকত তা দেখে আমি পরিতৃপ্ত হব। 1
মান ।
দুরে তোপধ্বনি।
ও দুর্গ
বি। ঐ শুক্র তােপধন :বোধহয় তারা অগ্রসর হচ্ছে।
তবে আর তিলান্ধ বিল করোনা। যুদ্ধে অগ্রসর হও।
রক্ষা কত্তে হবে। যদি অভ্যা তা অসম্ভব হয়, তােমরা বনে পাহাড়ে
আশ্রয় গ্রহণ কর। শত্রুর সংখ্যা ততধিক হলে, কৌশল অবলম্বন
ভিন্ন উপায় কি ?
পুর। ( ব্যস্তভাবে) দুর্গরক্ষার ভার আপাত: ৪৫ । গ্রহণ কর।
আমি এ মুহূর্তেই শত্রুর সম্মুখীন হচ্ছি । রঘু কাকা গুপ্ত-পথে ঘুরে
গিয়ে তাদের পশ্চাদ্দেশ আক্রমণ করূবে।—তবে পিতঃ, ক্ষণেকের
অন্ত বিদায়, অচিরে শত্রুসৈন্য বিতাড়িত করে, আবার এসেচরণ সেবায়
নিযুক্ত হন।
(বেগে প্রস্থান)
রছে। গেময় ও অবিলুপেন র্মে নিযুক্ত হও, আমার জল্প, চিন্তা
নিরর্থক।
বন্ধু। এর পরিয়ায় বিয়, রইলে। আমি পুরনের আশে পালন
.
২য় দৃশ্য—উপত্যকা পথ। (স-সৈন্য রণজিতের প্রবেশ ।) য। সৈগণ, আজ বিষম পরীক্ষার দিন। কত দিন কত পরীক্ষায়, তোমরা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছ; কতদিন কত যুদ্ধে, শত-সহস্র অয়াতির উষ্ণ শােণিতে তােমরা তােমাদের কীত্তির পথ পরিষ্কৃত করেছ, কতদিন কত আসম-বিপদে, বিন্দুমাত্র হৃক্ষেপ না করে, প্রাণ তুচ্ছ জেৰে তােময়া ক্ষত্রিয় খ্যাতি রক্ষা করেছ, আজ কি তা বিস্তৃত হবে? তােমাদের চিরশু যশঃ প্রভায় সমগ্র কাশ্মীর-রাজ্য আজ সমুদ্ভাসিত,-কাশ্মীর সম্রাট গৌরবান্বিত। সে গৌরব-প্রভা কি এ পৰ্বত গহ্বরে বিলুপ্ত হবে? সৈন্যগণ। না, না, কখনই নয়, কখনই নয়। ঋণ। হাঁ, সৈন্যগণ, প্রাণপণে আমরা আজ আমাদের পূর্বকীর্তি, পূৰ্বগোঁয়, পূর্ণভাবে রক্ষা করবো। শত্রু যতই দুর্ধর্ষ হােক, যুদ্ধক্ষেত্র যতই দুর্গম হােক-প্রাকৃতিক বাধাবিঘ্ন যতই প্রতিকূলতাচরণ করুক,-সঙ্কর- সাধনে রণজিৎ বাহিনী কথনও পশ্চাৎপদ হবে না। দেশমাতৃকা আম দের দহন্তে নিগৃহীতা, -রাশক্তি অবজ্ঞতা। প্রাণপণে আমরা আজ মায়ের সম-সম্রাটের গৌরব, অক্ষুন্ন রাখবো। বল সৈন্যগণ সমগ্র বাহিনী মধ্যে কে এমন কাপুরুষ, কে এমন কুলাঙ্গার আছে, যে এ পুণ্য কাজে জীবন দানে সঙ্কুচিত ? সৈন্যগণ। কেউ নয়, কেউ নয়। ফ। তবে সৈন্যগণ, অই দেখ, অদুরে পার্বত্য দুর্গ! নৈশসমরে শবর্গ পরিশ্রত-ক্লান্ত। এ সুযােগ পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য নয়। এস, এ সময় আমরা ভীম-বিক্রমে অতিদুর্গ আক্রমণ করি। আবার বলি, সৈন্যগণ, মাতৃভূমি,-কাশ্মীর সম্রাটের মান-সম্রম তােমাদের হাতে। আজ যদি এ আক্রমণ ব্যর্থ হয়, সকলের মুখে চির-কণৰু কালিমা লিপ্ত হবে। মগণ। কখনও নয়,প্রাণপণ, কখনও নয়। । হ, পাণ অতি তুচ্ছ,-সন্ত্রম রক্ষা কত্তে হবে। ক্ষত্রিয়ীর প্রাণের মমতা কবেনা। একলক্ষ্য হও, সম্মুখে কালক কামান গর্জন করুক, এক্ষেপও করেন। আমাদের লক্ষ্য অই সম্মুখস্থ দুর্গ-কবর্গকে দিতেই মা দুর্গ রক্ষা করে দেবেন। ?
মানসী। । সৈন্যগণ। কিছুতেই নয়, কিছুতেই নয়। ণ। তা-ই চাই। এ দুর্গ হস্তগত হলে, শবর্গ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। আয় অর্ধক্রোশ মাত্র ব্যবধান, খুব সাবধান। প্রথমেই শক্ত-কামান হস্তগত কয়। অগ্রসর হও--বল, জয় কাশ্মীর কাজের জয়। সৈন্যগণ। জয় কাশ্মীর রাজেয় জয় । ( প্রস্থান) প। সহকারী সেনাপতি কীজি দুর্গের পাদ্দিক আক্রমণ করবেন, স্থির আছে। এ-ই তার উত্তম অবসর। এইবার সংকেতদেশ প্রদান করি। (সংকেতন) বেগে পুরঞ্জনের প্রবেশ । প। এই যে রণজিৎ! আমি অনেকক্ষণ তোমার অনুসন্ধান কচ্ছি। এক্ষণে তুরীখন ক্ষ্য করে, এখানে এসে সাক্ষাৎ পেলুম। এস সোপাত, উভয়ের ব্যক্তিগত শক্তি পরীক্ষিত বেক্। । শক্তির পরীক্ষা? বালক, তুমি কতদিন এতে ব্রতী হয়েছ, তাই রণজিতের শক্তি পরীক্ষায় সাহসী হলে? পুর। সেনাপতি, অসি ধারণ কর। রণক্ষেত্র পুরন দুর্বল হন্তে অসি ধারণ করে। শীঘ্রই তার পরিচয় পবে। শুনেছিলুম, তুমি অভিজ্ঞ, কিন্তু এ দুর্গম পথে দুর্ভেদ্য দুর্গ আক্রমণ, -মার অনভিতাই সমান । বালক, দস্যু-দমন যখন সংকল্প, তখন যে কোনও উপায়ে আমাকে তা কতে হবে। দুর্গমত। সুগন্নতার চিন্তা রণজিৎ কথনও করে। দমন ফক্তে এসেছি, দমন করূদেই। প। রণজিৎ, তুমি বয়স্ক সুতরাং জ্ঞি, এ ধারণাই—আমার প্রথমে ছিল, কিন্তু ক্রমে তা দূর হচ্ছে। তুমি আমাকে বারবার দস্যু এলে অবমানিত কতে উৎকণ্ঠ, কিন্তু রণ, জং, ভারতের বিরাট ইতিহাসের আলােচনা কর, দেখতে পাবে, একটী নয়, দুটী নয়, ভারতীয় প্রত্যেক রঞ্জন বংশেরই আদি পুরুষ, এথমে দা বলে অখ্যাত ছিলেন। আরও শোন, উত্তরাধিকার-সুত্রে গৌরবের পদ অধিকার করা অপেক্ষা, তুমি কি মনে কর, আত্ম-ক্ষমতায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা কম থর কথা ?
মান। । . বণী পুঞ্জন, বৃথা আস্ফালনে রণজিং তত অভ্যস্ত নয়, যত অভ্যস্ত অলি- সঞ্চালনে। রণাঙ্গণে আমার সেনা অবতীর্ণ, আত্মরক্ষায় যত্নপুর হও। (তুরীধ্বনি) পুর। পুনঃ পুনঃ সংকেত ধ্বনির অবশ্যই গৃঢ় উদ্দেশ্য আছে। দুও সুবিধা অধিকক্ষণ দেবেনা, রণজিৎ। এস, তােমাকে আমি বৈযুক্ত আহ্বান কচ্ছি। মুণ। বারবার তোমার আহ্বান প্রত্যাখান করা সত নয়। বিয়ে প্রয়ােজন নেই। ( উভয়ের যুদ্ধ, সহসা কতিপয় পার্বত্য সৈন্যের প্রবেশ । পুর। সৈন্যগণ, যে যেখানে আছ, দাঁড়াও। পদমন্ত্র অগ্রসর হবে। রণজিৎ একক,-পুরঙ্কন অসম-যুদ্ধে খ্যাতি লাভের প্রতjী নয়। ( উভয়ের পুনঃ যুদ্ধ ও প্রস্থান) নল। এল আর হা করে পঁড়িয়ে লাভ কি? ২ সৈ। অই যেতে চেয়ে দ্যাখ-চুলোর প্রাচীরে পিপড়ে সারি বেঁধেছে ১ হৈ ৰোগ হয় বিক্ষ সৈন্যদলসৰ্ব্বনাশ (বেগেরঘুবীরের প্রবেশ } বন্ধু সৈন্যগণ, সৰ্ব্বনাশ হয়েছে। পুঞ্জন কোথায়? বিপক্ষের তুলল। আমরা, বিষম প্রতারিত হয়েছি। ভাবা অঞ্চমত্র সৈনা সম্মু ভাগে রেখে, সমস্ত সৈন্য নিয়ে দুর্গের পশ্চাদ্ভাগ অ ঐণ করেছে। ? ? ? কামান শত্রু হন্তগত। ঘাের বিপদ উপস্থিত—পুরুঞ্জ. কে ? সৈ। তিনি কাশ্মীর সেনাপতির সঙ্গে যুদ্ধ কচ্ছেন। র। তাকে পাওয়া চাই। বিষম চতুরতা, ভীষণ শুরণ!! সর্বনাশ হলো : সৈন্যগণ মুহুৰ্ত্ত মাত্র বিলম্ব না করে দুর্গাভিমুখে অগ্রসর হও। সঙ্কটের দিন আজ,আমাদের প্রভু রত্নেশ্মর আজ আহত অবস্থায় দুর্গে শায়িত। যদি তার প্রতি কিঞ্চিত্র মমতা থাকে, বিপদের দিকে হৃক্ষেপও না করে, দুর্গ রক্ষায় তৎপর হও। প্রাণের মমতা করেন। গেলে আমার পশ্চাদ্ধাবন কর। ( সকলের প্রস্থান) = ৩য় দৃশ্য --দুর্গাভ্যন্তর। (বলেশ্বর শায়িত) (ঘন ঘন তােপধ্বনি। (বিজযেব দ্রুত প্রবেশ ) সহসা *ল দুর্গের পশাঙা। আক্রমণ করেছে। দুর্গ প্রাচীষ স্থানে ম হযছ-দুর্গ বক্ষা করা অসাধ্য। ( রঘুবীরের দ্রুত প্রবেশ) অসাধসাধন কতে হবে, প্রাণ দিয়েও দুর্গ রক্ষা করা চাই। মুমু দু ধ তি— হস্ত বন্দী,-এ কল্পনা ও ভয়াবহ। শত্ব। রঘু দুর্গ প্রচীর নগ্ন হযে থাকল, অধিকক্ষণ—দুর্গরক্ষাকতে পার্ধে। * স 1্য। অত্যক বিশেষতঃ তারা সুসজ্জিত-সুশিক্ষিত, পুরন কোথায়? পুরঞ্জনের প্রবেশ । প। দু তে দুর্গ আক্রান্ত ওপে, ফুট এলুম-শত্রু বাছুরকি, বঘু কাকা, তুমি এখানে? দুর্গ রক্ষায় যা একটু ক্ষীণ-আশা ছিল, তা ও বথু। দুর্গ আক্রান্ত লক্ষ্য করে আমি ও ফিরে এসেছি। এখনষ্টপায় ? পু। ভুল, প্রথমই ভুল করেছিলুম। শত্রুর কৌশল বুঝতে পারিনি। তথাপি তুমি যদি পশ্চাৎ হতে বণজিতের বাহিনী আক্রমণ কওে, তারা একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতো। এক্ষণে সে আশাও নেই। একটা ভুলে এ সর্বনাশ হলাে। রঘু। ভুল ?—আমাদের সৈন্য সংখ্যা দশ সহস্র। এই শ সহস্রের প্রাণের বিনিয়ে ও যদি এ ভুশের সংশোধন হয়, বল। দুগাণিতির জন্য প্রাণ দিতে কেউ পরাধ হবে না। সরে। সর্দার, অকারণ প্রাণিহত্যা-আমার অভিপ্রেত নয়। বিশেষতঃ আমি মরুতে বসেছি। এ অবস্থায়—এ দুঃসাহরণনীতিবিদ।
মানসী। বধু। শুধু আপনার জন্য ও নয়। দুর্গ শত্রু হন্তে ডালি দিয়ে, কলঙ্কের চিহ্ন ললাটে অহ কওে কার সাধ যায়, এতো ? সঙ্গে। ভাই, স্থির হও--শোন। একটা দুর্গে - জুয়ে, বা একটা-দুর্গে ক্ষয়ে,-বড় বেশী শাহ ক্ষতি হয় না। (ষে অস্থা,- তাতে এ দুর্গের আশা,ত্যাগ করাই সঙ্গত। অাজ তোম'-~-এ দুর্গ ছেড়ে গেলে,--বিপক্ষ দল-- এগ রক্ষার জন্য -- অহর্নিশ-দশ সহস্র সৈ এখানে রাখতে--যাবে না। * র সখ্য-- স পাওয়া মাত্র তোমরা, যে কোন ও মূহুর্তে-- এ দুর্গ : কনিন--হস্তগত কত্তে---পর।। আমার কথা শোন-~-( দন) অগৌণে আমাদের সম ও সৈন্য-- গভীর বনে লুকারিতা। যতক্ষণ সকলে- বিপদ না হয়, যতক্ষণ এ দুর্গন্থ রসদ,গো বারুদ---স্ত্রশস্ত্র-গুপ্তা-ে-স্থানান্তরিত না হয়-ততক্ষণ অবশ্য—শর গতি রােধকতে হবে। { তোপধ্বনি। সে ভার আমার উপর রইলো। বিজয়, পিতৃদেবকে সত্বর স্থা:ন্ততি বরুবার ব্যবস্থা কর। যুদ্ধোপকরণ সরায় ভার সদর উপর। তোমাদের যতক্ষণ প্রয়োজন, আমি ততক্ষণ শত্রুর গ, যে কোনও উপায়ে প্রতিব্যে ব7ে1। সঙ্গে। তাই হোক। দুর্গে যে গুপ্তপথ—আছে- স থ ঘূ-খাতীয় দ্রব্য সম্ভার-সত্বর - শুনানিত কর। আর আমাকে-অত্র সরাতে হবে না । শত্রুর সাধ্য নেই,--নানুষের সাধ্য—নেই,আমায় বন্দী —করে। শীঘ্রই--আমার প্রাণ পাখী--দেহ পির হতে--মুক্ত হয়ে —চিরতরে—চিরমুক্তাকাশে-উড্ডীন হবে--শােন,-উঃ জল--জল দান) বিজ। * দুর্গ দেশের চেষ্টা কচ্ছে। পু। পিতাকে,বেগ,-আমি চলুন। ( প্রস্থান), ঘু। দেখি, আমি কি কত্তে পারি। বিজয়, অন্ততঃ কিছুক্ষণ এ কক্ষ রক্ষা ( বংশীধ্বনি ও দুইজন সৈন্যের প্রবেশ) দেখ, দুর্গেশ্বর এ কক্ষে আছেন। যতক্ষণ আমি এখানে ফিরে না আস, ততক্ষণ প্রাণ দিয়ে ও কক্ষ ধার রক্ষা কবে। (এস্থান।
মানসী। ( অদূরে কোলাহল) মম। কোলাহল-মেই—বর্ধিত হচ্ছে। দগ্ধ ও—তা হলে-প্রতিরো -চলবে না বিজ। (বাতায়ন দিয়া দেখিয়া ! বিপক্ষ সৈন্ত ক্রমেই বর্ধিত হলে। অসি বর্ষার যুদ্ধ। শত্রু। গত:রাপ মানুষের অসাধ্য। বলে। যাক—নিয়তি গতিরোধ-অনুক। আর—সমগ—নেই, বিজয়, মনে রেখে প্রতি-মনে রেখো। শেৰেীৰ্যে প্ৰতি রাখবে। দেয়। তা মেনে কিংবা-মাতিক্ষায় —সে পথ-পঙ্কির-করা-মার--পক্ষেও-মুকঠিন ছিল না। কিন্তু রক্কেশ - বকশনও-আত্মহমান-ক্ষু-করেনি। (তা •র' ও করান- ণ (দান) - ! । ( কতিপয় কাশ্মীর সৈন্যের প্রবেশ) পার্বত্য-সৈন্য। সাবধান-আপ অগ্রসর হলি-আ মলি। কাশ্মীর সঙ্গ। ওকে, কি রের ব্যাট। বীর ! ও দিককার খবর রাখ? বধ, শালানের। ( রণজিতের প্রবেশ) বণ। সাধ'ন সৈন্যগণ,-শেস সাবধান। কারও প্রতি-অধ্যায় পীড়ন, কিংবা বুধা রক্তপাত করােনা। বিজিত সৈন্যগণ, আত্মসমর্পণ কর, কোন ভয় নেই। বিজ। (অগ্রসর হইয়া আমাদের অভিযানে আত্নসমর্প শব্দ লেখা নেই রণজিৎ। রণ। দুর্গ অধিকৃত, আর যুদ্ধ নিরর্থক। জি। দুর্গের প্রাচীরটা—পান কতক পুরাতন ইট-জল্প কয়েছ সত্য, কিন্তু দুর্গবাসী অরে, রণজিৎ। যতক্ষণ এ দুর্গের একটা প্রাণীও জীবিত থাকবে, ততক্ষণ যুদ্ধ অনিবার্য। বণ। প্রায় সমস্ত সৈন্য ছভঙ্গ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আর প্রাণি esta? বিজ। যে কয়জন দুর্গে আছে, তারা বীয়ের মরণ মরুষেখ দেখে নাও।
মানসী । ২ উস্তন। বিজ। এ মণের নাম আত্মহত্যা—অত্মহত্যা মহাপাপ। বিজ। এত. ধৰ্ম্ম জ্ঞা। য’দ তো থ সনাপতি, তা হলে এ মু” কক্ষ অ- মণ লজ্জা হলাে? গধপতি এ ঋক্ষ মৃত্যু শয্যায় শায়িত। ৭। মৃত্যু শয্যায় ? র। মৃত্যুশয্যায়—'সেনাপতি। নৈলে,-"ধ হয়—এ-সংৰে- দুর্গ জয়-হতে-- । রুণ! দুর্গধতি কি যুদ্ধ নিছিন ? কাল নৈশসমরে তনি গুরুতঅহত হন। দুর্গা:ধস; তব: স্বণী, কিন্তু তুমি ? বিজ। আমি ?-আমার স্বাীনতা বার কবো। জ?-অম্ভব : ভাল. কি মুল্য রণজিতের নিকট তু শ স্বাধীতা জয় কত্তে অভিষী, যুবক ? এ মুমূর্ণ, মাৰীরের অন্তিম পরিচর্যায় আমি নিযুক্ত। এ কাণ্য সা• দ প্তির পর, কাশ্মীর সেনাপতির সঙ্গে দ্বৈযুদ্ধের ফলে। যুবক, তােমার সাহস প্রশংসনীয়। ভাল তাই হবে। সৈন্যগণ, এ কক্ষ আক্রমণে নিরস্ত হও। আমার পুনরাগমন পর্যন্ত তবে তুমি এখানেই আছ, যুবক। (পুরনের প্রবেশ পুর। পুনরাগমন কত্তে হবে না, রণজিৎ। গানের অবকাশ নেই। দুর্গ আক্রান্ত দেপে আমি সহসা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছিলুম। সৈন্য সংখ-বাহুল্য পুরন এ যুদ্ধে পরাঙ্কিত সত্যু, কিন্তু চৈত, যুদ্ধের ফল শীত হয়নি। ভরসা আছে, কাশ্মীর সেনাপতি পার্বত্য দশকে এ সুযােগ দানে কাতর হবেন না। পুন,.তুমি বয়সে নবীন হ'লেও, সমরে প্রবীণ, এ কথা অস্বীকার করি না। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে তােমাদের জয়ের কোনই আশা নেই- এটা নিশ্চিত। তর্কের অনুরােধে ণেকের জণ্ঠ, নয় স্বীকার কম, তুমি দ্বৈত যুদ্ধে জয়ী হবে। কিন্তু ভেবে দেখ,-কাশ্মীর রাজের কখনও সেনাপতির অভাব হবে না। এক রণজিতের স্থান শত যাথিৎ পূর্ণ করুদ্ধে সুতরাং এ যুদ্ধে তোমাদের কি লাভ হতে মানসী। । এ পারে? তোমার পিতা অন্তিম শয্যায় শায়িত, এ অবস্থায় বরং তোমরা সন্ধি প্রার্থী হলে, আমি বিবেচনা কন্তে পারি। সন্ধি? - সন্ধি কথাটা পুরনের কে চীতে লেখে না, রণজিৎ। বহ। রণজিৎ-সন্ধিতে - আম— সত। প্রার্থনা-কচ্ছি--। রণ। সন্ধি প্রার্থনা ? ( ক্ষণ চিন্তার পর) ক্ষতি নেই---কিন্তু তোমরাই কাশ্মীর সীমান্তে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে-উদ্দেশ্য কি, জানিনা। গবে। রণজিৎ, তুমি--আমার--পয়নও। আমি--ও-কাশ্মীর বাসী। জল জলদান) আমি—যা-ই,-সন্ধৱসৰ্ত্ত অণ। কি সর্ক বলুন। মজে। সকলের-ধীনতা—দুগ-তোমার। রণ। আপনি সীমান্তের যে কয় খানি গ্রাম হস্তগত করেছেন, তা ত্যাগ কর্কে সম্মত আছেন ? তে। করলুম-জল-( জলদান) অণ। (স্বগতঃ) সন্ধি না করুলে, এরা সহজে বঙ্গীত্ব স্বীকার করবে, এরূপ মনে হয় না। অকারণ প্রাণিহত্যা মহাপাপ। দুর্গ গ্রহণে সন্ধি স্থাপন নিতান্ত মন্দ বলে মনে হয় না। সঙ্গে। সম্মত? ণ। যাতে সম্রাটের অবমাননা হয়, তেমন সন্ধি আমি কত্তে পারিনা। কাপনার প্রস্তাবে উপস্থিত সকলকেই স্বাধীনতা দিতে হবে ? রে! হাতে-সম্রাটের--অমৰ্য্যাদা-হবে-না। দুর্গে-প্রবেশ কয়েছ। তামাবিনা যুদ্ধ-দুর্গ-ত্যাগ কচ্ছি। যুদ্ধে- পরাজয়-বীকা--র। সন্ধি-প্রার্থনা (স্বগত) এ অবস্থায় পীড়াপীড়ির নাম নৃশংসতা। = ( রঘুবীরের প্রবেশ যু। পুন এখানে নিশ্চিন্ত হলুম। স। আদেশ? বধু। পালিত হয়েছে। বচ্ছে। নিশ্চিত। রণজিৎ- ?
১৪
মান।
একটা কথা
বিপক্ষ সেনাপতি এ কক্ষে।
গছে। চুপ। -কি-কণা।
দুর্গের দ্রব্য সম্ভার কাশীর রাজের সম্পত্তি বলে গুণ্য হবে।
ছে। বা=আছে-সব। হলাে ?
শক্তি হলাে। আর তবে শােণিত প'তে প্রয়োজন নেই।
(তুরীখনি ও পটক্ষেপণ)
৪র্শ দৃশ্য--প্রাঙ্গন সম্মুখস্থ পথ । ( পদচারণা করিতে করিতে চন্দ্রচূড়ের প্রবেশ) । গন্ধমূষকের বিষ্ঠকে পতি পরিণত করা যাদের স্বাব, তাদের সঙ্গে পেরে উঠা দায়। কি ই বা যুদ্ধ,-তার জয়ের জয়, আজ ব্রাহ্মণ বিদেয়, কাল প্রকাশ্য দরবারে সায় অভ্যর্থনা । এতে রণজিতের খ্যাতি গৌরব বাক্ষ্যময়, শতগুণে ড়ে উঠবে। রাজা এ কয় বৎসর রণজিতের গুণ- মুগ্ধ ! আমা1 আশা আকাশ-কুসুমে পরিণত হতে বসেছে। এক কণ্টক ইন্ধ'র কত্ত না কত্তে আর এক কণ্টকের আবির্ভাব ! অদৃষ্ট কি এতই অপ্রস ? রাজা অপুত্রক, এ অবস্থায় চচু বংশেরই সিংহাসন লাভটা সঙ্গত নয় কি? রাজ্যটা পাছে রত্নেশ্বর-বংশগত হয়, সে আশঙ্কায় দশ বছর পূর্বে সাবধান হয়ে কৌশলে তাকে নির্বাসিত কুরি। তখন যদি কানহুম, রণজিৎ টার উপর রাঙ্গার নজ পড়বে, তাহলে একসঙ্গে দুই কটকই উদ্ধরের পথ ধম। কিন্তু তখন তা টের পাবার উপায় ছিল না। কিন্তু এখন ? এখনই কি চচুড় সহজে নিয়ন্ত হবে ? কখনই নয়। রণজিৎ, তুমি আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে উদ্যত হয়েছ, সাবধান! ' সৰ্বস্ব—চন্দ্রচূড়ের সর্বস্ব পণ, যে কোনও উপায়ে তােমার অধঃপতন সাধন করবাে। দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেও রাজার যখন সন্তান সম্ভাবনা নেই, তখন বিধাতা আমার প্রতি নিতান্ত অপ্রসন্ন, এরূপ মনে কতে পারি না। তবে কটক দূর কত্তে হবে। অই যে রণজিতের সে পাগলটা এদিকে আসছে। দেখি কোনও ছিদ্রের সন্ধান কতে পারি কিনা। বাইয়াম,-হন হন করে কোথা যাচ্ছ রে? - ( খুঁারামের প্রবেশ বা। কে মন্ত্রী মশায় ? প্রণাম গাে। আমার যাওয়া কিসের খুঁজে বুঝতেই পাচ্ছেন। পজিটা একটু হালকা হয়ে পড়েছে। চন্দ্র। কেন বাঞ্ছা? পজি হালকা হল কিসে? শুনলুম, তুমি ও যুদ্ধে গিয়েছিল । যুদ্ধ জয় হলাে,-কত ধন রত্নে, পুঁজি বেড়ে উঠবে, তা না হয়ে উল্টো হলো যে? ব্যাপার খান। কি বল তাে, বাঙ্গা।
মানী। বা। ওগাে, ধন-রত্নের ধর, বাধা বড় একটা ধারেন। যুদ্ধে গিয়েছিলুম, পাড়ে,-ভেবে ছগুম, গঙ্গা আনবে ভার ভার। কিন্তু গাঞ্জার বদলে আচ্ছা সামিষ্ট পেয়ে এসেছ, বাবা। শীতে তাজা হাড় জমাট বাধ বার যােগাড় হয়ে পড়েছিল। চত্র। শীতে হাড় জমাট:বে যু ক তেমন উৎসাহ উদ্দীপনা ছিলন'. তেমন জাকাল বুকম হয় নি, ব'সে ব'সে সময় কেটেছিল? কর। আকাল নয়?- বল, একদম নাকাল ২শার পথে পড়েছিলুম, আয় কি? উঃ কি মাগিরি কাটাকাটি-ফি গড়াগড়ি লুটোপুটি । তারপর - পাখীর ঝড় উড়লাে ! চন্দ্র। তারা পলায়ন কৰুে ? এই, চড়ই, বাবুই, টুনটুনি, বুলবুল--সব উধাও হলাে। তা বনে কি, চিল স্তেন পালায় ? চন্দ্ৰ বুবলু না, এ কি রকম যুদ্ধ ! বাল। সুহৎ যুগো, কুহৎ যুই। ব্যাটা যে বেহায়! অমিত শীতের দাপটেই দাত কপাট খেলুম। শেষ, অগত্যা গাজার ঝাল খালি করে, প্রাণে চলু। তায়পুর, কষ্টে-সৃষ্টে যদি বা দুর্গে বেশ করা গেলাে-ময় গাে, তাদের আর আচড় কামড়ের বিরাম নেই। তারপর-সন্ধি---। চন্দ্র। দুর্গ হস্তগত করার পর সন্ধি হলো? বা। হাঁ, দুর্গে ঢুকেও দুপক্ষে ধু। এক চাপট হয়ে গেল,—তারপর সন্ধি। চ। দুর্গ অধিকারের পর আবার সন্ধি হলো কেন ?-শক্তদের বন্দী করা হলো না। বা। আজ্ঞে, তারা তেমন পাই বটে। কায়ার মায়ায় ছায়া ও স্পর্শে তা। খাড়া হলে বেমালুম বরং মাথাটা পেতে নিতে রাজি। সন্ধি না করে তাদের বন্দী কতে গেলে, আরও দু'শ শতের গরম রক্ত না কোন শক্ত বরফ হয়ে যেতো! চন্দ্র। (স্বগত) লােকটা বােক, কিন্তু মিথ্যা কথা বলে না। ও যা বলে, তা যদি সত্যি হ-যাক। (প্রকাশ্যে) অচ্ছ। বাঞ্ছারাম, তুমি ঠিক জান, দুর্গের ভিতর সন্ধি লো? কি সয় কি তুমি সেখানে উপস্থিত কল মা পড়তে • ? আর হাতে বেয়ায় কাজ মশায়, (গমধ্যে) চ। দড়াব ঘুরাম, ৩নংশোন, আমাদের সব সঠিক খবর জাহের কিনা, তাই একটী # দু দুবার করে জিজ্ঞেস করি। বিরক্ত হয়ােন। । তা ড় বড় রুই কালের কাছ সেনা কেন বাবা? এ চুনােপুটা নিয়ে ঘাটাঘাটি কেন ? আর মাত্র একটা কথা বাঞ্ছাম,শােন্ বাবা, তোকে ছটাক খানেক গ। দেবাে এখন, সত্যি করে বলতো, তুই যা বল্লি, তা নিজ চোখে দেখে এসেছিস্ তাে? বল, সত্যি তােকে গাজা দেবে। এখন ? বাঞ্ছা। ও, এযে গরজ রশী—বে আসি মন্ত্রীমশায়, প্রণাম—আমি কিছুই জানিনে। (ঘস্থান চত্ব। বাল আন্ত পুগি যা বলে তা বড় মিথ্যা হয় না। তা, ও যা তে, তার উপর , একাতে পারে, বিষয়টা কাজে লাগতে পারে! দসুদের তে পেয়ে, গড়ে অ সার মূল গৃঢ় একটা রহস্য আছে,-- রাজার মনে এটুকু যন কোলে জন্ম না যায়, তবে কাজ হাসিলের পথটা খুবই সরল কয়ে যায় । আর ব্যাপারটাকে কোনও প্রকারে যদি রাজনীতির গণ্ডীর মধ্যে টেনে আন্তে পারি, তা হলে *কেল্লাই ফতে হয়। ন'—না,-কণাটা হসে ঈড়াবার নয় তো! যোগাড় যন্ত্র করে হবে। সন্তানদের চার জনকে হস্তগত করা পুণোহিত সার্বভৌমকে মুঠোর ভিতর পূত হবে। কিন্তু ব্যাটা তার অর্থ পাচ-রক্ত শসা ! হোক, রণজিতের সর্বনাশে আমার সব পণ। একটা রূপকে হাত করা কঠিন হতে পারে, অসম্ভব বে না। কা প্রকাশ্য দরবার-সময় নেই, আজই সব যােগাড় কত্তে হবে। আবার একটা ব্রাহ্মণ বিদায়ের বট আছে ! কি মুস্কিল- (এম) ৫ম দৃশ্য--রাজ থ। অধ্যাপকের প্রবেশ । অধ্যা। বাগি বাল, পঞ্চ বৎসর সিন্ধান্ত বাগীশের তল্পি ব্লা বন কয় সংস্কৃত্বের গুটা পাচ ছয় শ্লোক আবৃত্তি কণ্যা লইছি। গলায় বল দিয়া ব্ৰহ্মণ অধ্যাপক হয়া দুইটা শিষ্য অবদি জুটাইয়া ফেলছি। চেরাখানা মন্দ কি ? শুদ্ৰ বল্যা নিবে কোন হাল ? এহন মনে মানে ফিতে পাল্লে, এক দাও মারা নিমু। আরে, যানকন্তু, দু- লােচন-হালারা গেল কেম্বায় (স্থান) (শিষ্যদ্বয়ের প্রবেশ ) ১ম শি। (কণ্ঠয়ে চেষ্টা) পুণ্য-পুণ্য-পুণা-পর-পর-উপকারে-কাকে, দানে—দানে-দানে বাড়ে—বাড়ে খ্যাতি। ঘোড়া শালে—শালে -শালে বাড়ে-বাড়ে ঘোড়া,ঘােড়া-ঘোড়া—ড়া—ড়া—হাতী -হাতী শা--শ–শালে হাতী-হাতী। ২য় শি। ইহলােকে-লােকে, লােকে করে—রে-রে-- দান, কবে দান, পর- পর লোকে পায়--পায়। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণ ইতেলে তু-তু-তুষ্ট--হেঁটে--হেঁটে-ব-স—স্বর্গে—যায়--যায়। পা- তিনে? আমি কণ্ঠস্থ কৃত্বং। ( অধ্যাপকের প্রবেশ ) অধ্যা। ছাড়ান দে-সংস্কৃত্ব ছাড়া দে ব্যটা। অন্ধ্র গণ্ড। চণব শ্লাক গোটা দুই দিবস মধ্যি গলাধঃকরণ কত্তি পাল্লা না,-হেইঞ্জ বঙ্গীয় ভাষায় পাঠের ব্যবস্থা দিছি বেলা পঞ্চম ও উত্তীণ ইর চলো.-দ্বাদশ দণ্ড মধ্যি রাজ সভায় উপস্থিত হার চাই। নইলে অপ রম্বা। একই নিশ্বাসে প্লাক বলবার চাই কিন্তু আগে অইতে বল্যা রাহ ছি। ১ম শি। তা পাবে। এই দেখুন না,--পুণ্য-পুণ্য-পর-পর-য-মনে নেই, ধমকের চোটে সব ঘুলিয়ে দিলেন, পণ্ডিত জি ! অধ্যা। গণ্ডমূর্খ,-এই আশখ মুলে বইসা একাণ্ডে শ্লোক মুখস্থ করবার চাই।
মানী। নলে এই ৱেও যা গ স বুক অইবা। প, 'চ, মো : ধয় আবৃত্তি কর দেহ। ২য় শি। (খ) সেেেছরে। (ক) ইহ--ই-ইংকে পায় তৃ-- অধ্য। কুমাও, অপচেও ওভও, সকলই পণ্ড বা দেহ,ছি। এই তোমার কণ্ঠস্থ কৃত্ব? দুই দুই দিবসে অষ্টগণ্ডা তাম্রমুদ্র সলে বাস ইলম। বই, বইস অৰ্ব্ব চীন যুগল, শীঘ্র করা শ্লোক আবৃত্তি করা লও। রাকাত শিখ না, পুণ্য পর উপকা দানে বাড়ে ক্যাতি, ঘোড়ালে ঘােড়া বাড়ে, হাতীশালে ৩াতী। পলােচন কইবা,- ইহলােকে করে দান, পরলােকে পায়, ব্রাহ্মণ অইলে তুষ্ট, হেট স্বর্গে যায়। ছ? কও দেহি রামকান্ত। ১ম শি। পুণ্য -পুণ্য-পর---উপ–প ফারে, কাবে, দানে-দানে বাড়ে, দানে বাড়ে, বাড়ে খ্যাতি। ঘােড়া 'লে- শালে হাতী-হাতী বাড়ে-ঘোড়া শা-ে-ঘাড। ' —ল হক ঘোড়া- (জিম্বাদ্বা দস্তু কর্তন অধ্য। জালাইয়া খাইলা ঘােড। শালে ঘোড়া বাড়ে, হাতী শালে হাতীকও। ১৭ শি। ঘোড় শালে ঘােড়া-(ঘাড়া—ড়া—বাড়ে বাড়ে, হাতী খালে-- লে--লে হাতী। হয়েছে। কেমন হয়নি পণ্ডিত কি? অধ্যা। অইছে, অতি কষ্টে, অর্থ ব্যতীপাতে অইছে। আবৃত্তি কর, আবৃত্তি কর, বাল করা কইবার চাই কিন্তু তুমি এহন কও দেহি পদ্যলােচন, ২য় ৭ি। ইহলােকে--লােকে করে দান-দান—ন, পর-পর লোকে খা- অধ্যা। অন্তিমূখ, কেবল খাইবার চিন। পায়, পায়, পায়। ২য় শি। পায়--পায়-পায়। ১ম শি। শালী হাতে, হাতী শালে; হাতি শালে, শালী হাতে। অধ্যা। আরে রও, রামকান্ত, তারে কইবার দেও। * মান। 8 {শ। $ে করে 1 দান, পয়লাকে লোকে লোকে - অধ্য। ও পো, মশুকের মধ্যি কালি পুরীষ ঢুকাইছ, বেৰখণ্ড যোগে স না । মূ-~- (বেত্রাঘাত ও অহ) অয় নয়। (অঙ্গতে উপবীত ছিন্ন হন। এ ছা—লি কি পাজি , ও, ভূমি ও, যজ্ঞোপবীত গ পর্যন্ত 'ছন্ন করছে- নিপা দিছ ? ২য় শি। এক্ষোধে আমি পরল'কে পাবন পণ্ডিত জি, বাসায় ও যান্ডিনে। দেখুন . fঠ দিষে মার দর দর রক্ত ছুট ছ! অধ্যা। ন য ই কৰ্ম্ম কি? মামার ই অষ্ট গণ্ড। তমূদ্র ঈদরে ঢুক ছু - টেক , খাে এম*ছ, এন মােল গণ্ডা রত মুদ। আশা ছাই দিবা ?-- তােমার পিঠের হাড় গগড়া কবg ছাড়। ১ম শি। আধাপক জি, কাল গেলে হয় না? শুনছি কাল তর আমোদ- চ গনি ট ন হবে। অধ।। তোম। সতি গােষ্টির মণ্ড অইব। শেলিফ, আৰু অইছে ব্রাহ্মণ বিদায়, কাল যাইয়া অইও কি? এতিবে। চশ, বল ‘ছ । ২ শি । আমি বামুই নই, আমি আজ যাব না। আমার পৈতে ও ছিড়ে গে ই। অধ। (গ) হালার পোরা'ত নাকাল ফবা ছাড় শে দেছি। (কা ) দ্যাখ, পথিমধ্যি যদি শিষ্য করবার পারি, সেইজন্য অৰ্দ্ধগণ্ডা 'মমুদ্রার ঘুঙ্গী ক্রয় করা আছি। নে কুষ্মাণ্ড, হেই দিয়া পৈতা বানাইয়া ল। ২য় শি। ঘুন্সী দিয়ে পৈতো • অধ্যা। যেপ্লিকের জালা ত সইবার নয়। আগের পৈত। কি বস্ত্র ছিলরে ব্যাটা? নাপাতর পেয়ে গাইত্রী পা পৈতা কেডা দেয়রে যও ? ১ম শি! পণ্ডিত জি, ওকি নাপতের ছেলে ? গলায় ও পৈতে নয় ? ঘুলী ছিল ? অধ্যা। (স্বগত) হালার পো, আমার পৈতা কি যজ্ঞসূত্র ? যাউক, তা তুমি জানায় কেথায় ? কিন্তু রাগের মুহে বড় ঠেলাম দেহি ? (প্রকাশ্যে) নাপিত ওরে কয় কেডা?-নাতের বামুণ।
" মান। ১ম িনাতর আর কি পৃথক বাণ হয়। ঔষ নিখে, ঋরে ও বায়ু। নয়! আচ্ছা বল দেখি,পদ্মলােচন, “রো কোন্ গােত্রীয় ? ২শি। কেন? কচ্ছপ গােৰ। ও ধাকচ্ছপ গোত্র কি ? ২৪ শি। এই যে অধ্যাপক শশায় সেদিন বলে দিলেন । (ঘ) হালার পাে, তাের ষ্টির মুও কইছিলাম। (প্রকা) আয়ে কাপ গােত্র। রামকান্তমিত বড় অশান্ত, বকুব দেছি । পছিদ্র অন্বেষণে পমুখ !- আন পাঠে মন দেহ বল ছি । নইলে বেত্রাঘাতে তুমি ও অর্জরিত অইব। কও দেহি নিজের পাঠ, ১ খি। নাগতের ছেলের সঙ্গে পাই দিবাে আমি? কখনই না। নাপতের ছেইলা, নাপিতের ছেল'বলা রাজ পৃথিমধ্যি চেচান ছাড় বা ত, পিঠের মধ্যি তােমার রক্ত গঙ্গাস্নান অইব কিন্তু। সাবধান। ১ম শি। অধ্যাপক মশায়, আমায় রাগবেন না,-বলছি। শেষটা রা- * সতায় গিয়ে সব বলে দেবো তখন। অধ্যা। (স্বতঃ) অল জীয়ৰু বানর দেহি। ছ্যামড়া গুলি লঙ্কার গুই পিঠের। যাউক এহন ত শান্তনা দিতে অইব। (প্রকাশ্যে) বাবা রামকা, রাগ করোনা, বাবা। ক্রোধের তুল্য শক্র নাস্তি। রাগের নামণ্ডল। বাবা, শান্ত হয়। চল। লুচি, পুরি, মোহনভােগ সীতাভোগ, খাজা, গজা, পাতা, জিলিপি, রসগােল্লা, লালমােহন, মতি- চোরালড কত কইমু, কত কাই? বৃহৎ ব্যাপার আজগর আয়ে- ১ম ৭ি। ক্ষী দেবেনা? ক্ষীর, সরু, দধি, দুই না, মন, ঘৃত, ময়দা, বাসে, চিনি--কত আনব ? সঙ্গে সঙ্গে গণ্ডা গণ্ডা রজত মুদ্রা! রাজভাণ্ডায়-- অইছে। একেবারে লঙ্কাকাণ্ড! ব্রা শোকটা আবৃত্তি করা শও তো। ১ম শি। দেখুন পণ্ডিতি আমি ওসব শিখতে পারবাে না, মনেই থাকে , ছই। অ্যা। (স্বগতঃ) মাটা ফাইছি। অষ্টগও তা মুদ্রা সলিলে দিছি।
২২
মানসী ।
* '
সঙ্গে ত নিবারই অই। মূলধন তুলতে অইব ত।
২য় শি। (গ) রাম ব্যাটা ধমকে কাজ সমূলে নাকি? আমিও চেষ্টা
করে দেখি। (প্রকাশ্যে গুলি, আমায় আর ঘাটাবেন না,
বলছি। আজ আমি যাচ্ছিনে কো। -কাল নাচ গান-তামাসা,
আমি কাল যাব।
কাল যাইবা? কাল তােমার সাত শুর শ্রাদ্ধ অইব? নাচ গানে
মুদ্রা মিলেরে ব্যাটা? শ্লোক না শিই, বেশী কথা কইবা না।
কোনও মতে আমার মূলধন তুলতে অইব ত? অপৰু কথা কইবা
না, সাখাও কিন্তু ।
১ম শি। অপৰু কথা বিরূপ পণ্ডিত ফি
আরে যেমন, দুধ, কলা, চা এসকল অপৰু কথা ছড়ান দিবা।
১ম শি। তবে কি বলতে হবে ?
কুষ্মাণ্ড, অপগণ্ড, বেল্লিক, অষ্টকম ভােতা করছ? এই দুধ অইছে
দুগ্ধ, কলা অইছে যা, চাউল কইবা না, তণ্ডুল কইও। বুঝছ?
সত্বর চল, বিলম্ব করা আমার মুণ্ডটা চাবাইয়া কাইও না।
.
( সকলের প্রস্থান।
ষষ্ঠ দৃশ্য—উদ্যান।
পদ্মাবতীর গীত।
?
(ফুলে কলি ছিড়িতে ছিড়িতে)
বিষাদ-ব্যথিত কেন আজি চিত, বুঝিতে নারি ।
কি জানি কেনরে, মরম মাঝারে, কি যেন যাতনা ভারি।
আকুল হতাশ আসিবার পাশে,
ক্ষণে অভি মুদি, ক্ষণে তয়াসে,
কঁপিয়ে মরি
কি জানি কি ছিল, -কোথা লুকালাে-
সকলই আঁধার হেরি।
.
হঠাৎ মনটা আজ এমন হলাে কেন? কি জানি একটা অজানিত অমঙ্গল,
কি জানি একটা বিষাদ-বেদনা আমায় আকুল করে তুলছে! হঠাৎ
বুকের মাঝখানটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিছুতেই যেন
স্বস্তি পাইনে। নাথের যুদ্ধ গমন সময়েতো মন এত উতলা হয়নি।
তঁার অন যাতনাতে গােপনে নীরবে সহ্ করেছি। ও আজ
এমন হলো কেন? নাথ রাজসভায় গেছেন, শয্যায় পড়ে একটু তন্দ্রা
হলাে, তাতেই যেন কি একটা স্বপ্ন দেখলুম, ঠিক সামনে আসছে
-কিন্তু সে হতেই যেন চিভের এ বিকায়---
( রণজিতের প্রবেশ
রণ। বিকারটা কিসের প্রাণেশরি? বিকারের বাড়াবাড়ি হলে, এ গরীব
বেচারীর তখন উপায়? শেষটা কি হাতিয়ার ছেড়ে নেড়ানেড়ীর দলে
মিশবাে?
পদ্ম। মন্দই বা কি? তুমি তরবালের বদলে করতাল, আর আমি হীরের
চুড়ির বদলে রসমঞ্জরী হাতে নেব। দুজনেই গেয়ে গেয়ে দিনরাত
ভিক্ষা করে বেড়াব, গাছতলায় পােব, একদও ও ছাড়ি হাড়ি নেই।
না, ছাই,
৮
২৪ মানসী। রণ। ও,-হাড় ছাড়ির বিকার ? তারই জ তুমি বৈষ্ণবী সাজবে? কেন আমি তােমা ছাড়া কতক্ষণ থাকি প্রিয়ে ? গন্য। দণ্ডেই যে যুগ বয়, নাথ। যতক্ষণ তুমি কাছে থাক, অন-শয়ন মনে থাকেনা। নিমেষে দিন কেটে যায়। কিন্তু ক্ষণকাল তুমি কাছ ছাড়া হ'লে সে সময়টা যেন যেতেই চায় না। একদও যেন কত যুগ ! তুমি যে পথে চলে যাও, এক দৃষ্টিতে আমি সে পথ-পানে চেয়ে থাকি, কবে আসবে! আজ তুমি রাজসভায় গেলে, আমিও একটু ঘুমিয়ে কি একটা স্বপ্ন দেখলুম। সে হতেই প্রাণটা আই ঢাই কছে। রণ। স্বপ্ন ?— এখনও স্বপ্নে ভয় পাও ? স্বপ্ন কি কখনাে সত্য হয় প্রিয়ে ? পদ্মা। স্বপ্ন সব সময়ে সত্য:না হােক,কখনও কখনও স্বপ্নে ভবিষ্যৎ সুখ দুঃখের হ্রপাত হয়, একথা তােমাই মুখে শুনেছি। প্রিয়তম, বড় ভয় হচ্ছে। যতদূর মনে পড়ে, স্বপ্নে যেন দেখেছি, এক গুপ্ত শত্রু তােমায় আমায় বিপজ্জালে জড়িত করবার চেষ্টা কচ্ছে! রণ। অকারণ ভীতা হচ্ছ। গুপ্ত শত্রুর ভয় তােমার ? প্রিয়তমে, তুমি রণজিতের প্রাণেশ্বরী। তােমার কেশাগ্ৰ কম্পিত হবার পূর্বে, এই বিস্তীর্ণ কাশ্মীর ভূখণ্ড, একটা বিরাট, বীভৎস, মহাশ্মশানে পরিণত হবে। সাথে সাথে রণজিতের তীক্ষ্ণ অসির বিদ্যুদ্ধার পরীক্ষা কত্তে কাশ্মীর-বাসী কেউ সহজে প্রয়াসী হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। পদ্মবতি, যতক্ষণ রণজিতের হস্তু অসি ধারণে সমর্থ থাকে, ততক্ষণ পার্থিব বিপদের তিলমাত্র চিন্তা, তুমি মনেও স্থান দিও না। তবে দৈক দুর্বিপাকের ভয়। সত্য সত্যই যদি তেমন হয়, সত্য সত্যই হৃদয়েরি, বিধি বিড়ম্বনা ফলে যদি আকস্মিক বিপদের প্রবল ঝঙ্কাবাত, এ দম্পতি যুগলের মন্তকোপরি প্রচণ্ড বেগে প্রবহমান হয়, তবে, তবে প,তবে এই ভাবে তখন তােমায় বুকের মাঝখানে লুকিয়ে রেখে, আপন উন্নত ললাটে, সে ঝয়াবাতের সমস্ত বেগ,—সে যতই প্রচণ্ড হােক-অকাতরে সহ কবাে। চিন্তা কি ? পদ্ম। নাথ,'আমার গত জন্মের কত পুণ্যফলে তােমা হেন স্বামীদেরের চরণ সেবার অধিকারিণী হয়েছি। আমি সহায় সম্পল, ধন, রত্ন, জন,
গানসী।
ঐশ্বৰ্য্য, আদর যত্ন,—কিছুই চাইনে। জন্মে জন্মে যেন তােমার সই
চরণ-যুগল হৃদয়ে ধারণ কন্তে পাই, এই মাত্র কামনা।
রণ। প্রিয়তমে, তুমি রুমণী রত্ন, দেবী প্রতিমা। তােমার বিনিময়ে, আজ
যদি কেউ এই বিপুল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত বৈভব-সম্পদ, সমস্ত সুখৈ-
শৰ্য্য পুরীভূত করে আমায় বিলিয়ে দিতে উদ্যত হয়,—সসাগরা
ধরিত্রীর একচ্ছত্র সম্রাটের অপরিমেয় মান সম্রম, অতুলনীয় খ্যাতি
গৌরবের কীর্তি-কিরীট কেউ যদি আজ আমার মাথায়,—তােমার
বিনিময়ে,-স্বেচ্ছায় পরিয়ে দিতে অগ্রসর হয়, আমি হেলায় শতবার
তা প্রত্যাখ্যান করি! তুমি আমার সমগ্ৰ হৃদয় রাজ্যের একমাত্র
অধিশ্বরী! কিসের চিন্তা? এই বিরাট বিশ্ব-সংসারে এমন কেউ নেই,
তােমার আমার পবিত্র বন্ধন ছেদন করে। আর পদ্মাবতি, যদিই
অসম্ভব সম্ভবপর হয়, যদিই-অজানিত কোনও দৈব বিড়ম্বন শতবাহু-
বিস্তারে সত্য সত্যই আমাদের গ্রাস কত্তে আসে, তাতেই বা ভয় কি?
মবাে,--দুজনেই মরুবাে। দুজনেই বুকেবুকি হয়ে, একসঙ্গে ভবের
হাট হ’তে চিরবিদায় গ্রহণ কবাে।
পদ্ম। হৃদয়সৰ্বস্ব, ও কথা মুখে এনােনা। তবে বিপদে সম্পদে, বণে, বনে
অট্টালিকা শ্মশানে,—দাসীকে চরণ ছাড়া করােনা, এই বিনতি।
(গাইতে গাইতে বালিকাদলের প্রবেশ)
যন করিয়ে কত, গেঁথেছি মনের মত
কুসুমের হার, ধর উপহার।
ধর উপহার, ধর উপহার, কুসুমের হার গলে ধর উপহার।
অবলা বালিকা দল, কি আছে সব বল ?
আনিয়াছি বন ফুল, পুজিবারে উপচার,
ধর লহ উপহার,কুমুমের হার, ধর উপহার।
ভকতি-চন্দনে মাখা, হদয়ের ভাষা লেখা।
দেখ ফুলহারে সখা, কি আছে কি দেবো আর ?
ধর লই উপহার,কুসুমের হার, ধর উপহার।
(নৃত্যগীত সহকারে মালা দান ও প্রস্থান)
মানসী। *; শ। 'এ বালিকাল, আমাকে এমন সম্মানে সম্মানিত কলে? পদ্ম। এ আমাদের মানসী দিদির কাও। একদিন এ অভ্যর্থনারই মহলা চলছে। বলতে গেলে, মানসী দিদির এ ছােট ছেলে খেলাকেই আদর্শ ধরে, মহারাজ তােমার বিরাট অভ্যর্থনার আয়োেজন করেছেন। ক্ষুদ্র হতেই সে মহতের সূচনা। (মানসীর প্রবেশ) মান। পদ্মদিদি, তােমার সঙ্গে আমার আড়ি,-মিছ মিছি তুমি আমার নামে যা তা লাগিয়ােনা। রণ। সে কি দিদি, তুমি আমার অভ্যর্থনার পক্ষপাতিনী নও? মান। “না”। রণ। হেই একটী ‘না’ তে আমার সকল উৎসাহ,—সকল আনন্দ যে অনেক থানি খাট করে দিলে, দিদি। মান। তুমি যে আমার একটা কথাও রাখ না। তুমি আর আমার তেমন ভালবাস না, যেমন টুকু বিয়ের আগে বাসতে। রণ। (স্বগত) সরলতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি! সংসারের কুটিলতা—আবি- লতার ছায়াও একে স্পর্শ করেনি। মন। ঠিক কথা বলেছি। বউদিদি, রাগ করূলে ? পদ্মা। ঈ—ভারি মানুষটা কি না! রণ। মানসি, বােন, আমি তােমার কোন্ কথাটা রাখিনি, স্মরণ হয় না যে। মান। কেন? আমি তােমার সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চেয়েছিলুম, তুমি বললে বাবাও অসম্মত হতেন না। তুমি ই যে তথন বারণ কলে। বণ। এই কথা?—অসভ্য পার্বত্য জাতির সঙ্গে যুদ্ধ, হয়ত আমাদের পর্বত করে ঘুরে বেড়াতে হবে,—এই ভেবেই তােমায় সীমান্ত যুদ্ধে সঙ্গে নিয়ে যাই নি, দিদি। মান। বড় সাধ ছিল, একটা বড় যুদ্ধে গিয়ে সৈন্য-চালন নৈপুণ্যটা হাতে কলমে শিখেনি। তুমি ই সে সাধে বাদ সাধলে। রণ। যেরূপ প্রতিভা, যেরূপ একাগ্রতা তােমার, তাতে এ খাে আর বেশী সময়সাপেক্ষ হবে না, দিদি। মান। তবে,বল এর পর সুযােগ ঘটলেই, আমায় সঙ্গে নেবে?
মান। ২৭ / পদ্মা। ও গাে, একটা কথা । তুমি কি চিরদিনই এমি অসিধারিণী, রণ- রঙ্গিণী সেজে ঘুরে বেড়াবে? মান। উই, তা কেন? তােমার মত পরের মন যােগাবার মালা জপের ** ব্রত নেবাে। পদ্ম। ভারি দেমাক-দেখা যাবে না, তখন দেখা যাবে। রণ। পদ্ম, একটা কথা তােমায় বলি নি, মানসীর ঘােগ্যবর- মান। তােমরা আমায় না তাড়িয়ে ছাড়চো না ? পদ্মা। ভাল, মহারাজ মানসীর বিয়ের পক্ষে এত উদাসীন কেন? ষষ্ঠী কৃপায়, মানসী দিদি যে পনেরতে পা দিয়েছে। রণ। মানসীর যােগ্যবর যে মেলানাে ভার পদ্ম। হা বলতেছিলুম, মানসীর যােগ্যবর এতদিনের পর, একটা মাত্র আমার চোখে পড়েছিল। পদ্ম। কে সে ভাগ্যবান পুরুষ? তবে বিয়ের প্রস্তাব হােক না কেন? রণ। এ ক্ষেত্রে বিয়ের প্রস্তাব চলেনা। তবে এটা সত্য, যেমন পাত্রী মানসী -তেমন পাত্র পুঞ্জন। 'পদ্ম। পুরঞ্জন লােকটা কে গাে ?-কেন, বিয়ের প্রস্তাব চলেনা কেন? মণ। সে রাজার শত্রু মধ্যে পরিগণিত। গত সীমান্ত গত সীমান্ত যুদ্ধে সেই প্রধান সেনাপতি ছিল। পদ্মা। তবে? রণ। হাঁ, এ প্রসঙ্গের আলােচনায় লাভ নেই। চল, এক্ষণে ঘরে যাই। সন্ধ্যার পর আবার রাজবাড়ী যেতে হবে। রাণীর নিমন্ত্রণ। ( প্রস্থান) ১৯ মেধাচ্ছে, কিছুই ভাল লাগছে না, পয় দৃশ্য-কক্ষ। (রাজ্ঞী ও পরিচারিকার প্রবেশ ) রাণী। আমি এ কক্ষে রইলুম, আমার আজ মন ভাল নেই। একটুখানি নিরিবিলি থাকবে, দেখিস, কেউ যেন এখানে এসে আমায় বিরক্ত না করে। তুই যা।ই, শােন, সেনাপতি রণজিৎসিংহের আমার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কথা আছে, বিশেষ জরুরী কাজ,কত কাজ যুটে ছাই, একটু সােয়ান্তি পাবার যাে নেই,তা সে আসূলে, এখানেই নিয়ে আসি।' যা— (পরিচারিকার প্রস্থান) আর সইতে পারি না। দিন রাত তিলে তিলে জ্বলে মছি, আর সইতে পারি না। প্রাণের জ্বালা কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারি না,-লুক্কায়িত রুদ্ধ বৈগ হৃদয়ে চেপে রাখতে, হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে। আল সরম ছেড়ে মরম-ব্যথা মুখে ব্যক্ত করবাে। নইলে উপায় নেই। ইঙ্গিতে সংকেতে কত দিন বুঝতে দিয়েছি, মনপ্রাণ আমার তারই চরণে অর্পিত, কিন্তু এমনই সরল,—এমনই অনভিজ্ঞ সে আমার, সে ভাবের সন্দেহটা পর্যন্ত তার মনে জাগে মি। আজ এ নির্জন-কক্ষে, মুখ ফুটে তাকে আপন প্রাণ বিলিয়ে দেব। কিন্তু কিন্তু যদি তা অসম্ভব, পুরুষ কি এত নির্দয়, এত পাষাণ হতে পারে? সাধ করে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে গেলে, কেউ কি তা পায় ঠেলে ? তবে শুনেছি, শুনেছি কেন, জানি, পদ্মাবতীকে সে ভাল- বাসে,—তাতে ক্ষতি কি? অমর কি একটা কুসুমে পরিতৃপ্ত থাকে? - গীত দাও গাে বলে, কোথা গেলে, পাব তারে ভাবি যারে ? হৃদয় জুড়িয়ে সে যে, তবু খুঁজে পাইনে তারে। পাখীর মধুর তানে,
মানসী।
২৯
তারই স্বর বাজে কাণে,
তারই গন্ধ ভেসে আসে, মৃদু মলয় সমীরে।
ফুটিলে কুসুম রাশি,
হেরি তারই প্রীতি-হাসি,
আকাশে ভাতিলে শশী, সে মুখ শুধু মনে পড়ে।
, আর গান ভাল লাগছে না ছাই। কি করি?—ওই পদশব্দ
হচ্ছে না?
}
(রণজিৎ ও পরিচারিকার প্রবেশ)
রণ। এ যে অতীব নির্জন কক্ষ ? মহারাণী এখানে কেন ?
পরি। তার আজ মন ভাল নেই।
রণ। তাহলে আজ না হয়, দেখা না-ই হলাে
রাণী। কথা আছে, আপনার সঙ্গে বিশেষ কথা আছে। অই খানে বসুন।
(দাসীর প্রতি) তুই যা, দেখি কেউ যেন এ কক্ষের নির্জনতা ভঙ্গ না
করে।
(পরিচারিকার প্রস্থান) :
এরূপ নির্জন স্থানে, আমার একাকী অবস্থান কি সত।
রাণী। সেনাপতি, উদ্বিগ্ন হয়ােনা। আমার সব কথা আজ স্থির হয়ে তােমাকে
শুতে হবে। কাটা অতি নির্জন, আমার আদেশ ভিন্ন কারও
এখানে প্রবেশাধিকার নেই, তুমি নিশ্চিন্ত হও। (ক্ষণপরে) সেনাপতি,
-রণজিৎ, শত দাস দাসী পরিবেষ্টিত হলে, অমূল্য বসন-দুষণে দেহ
ভূষিত করে,সুরসাল আহাৰ্যে রসনা পরিতৃপ্ত করে এ অভাগিনী
বড় অশান্তিতে কাল কাটাচ্ছে। পলা বিসর্জন দিয়ে, তাই তােমার
নিকট খুলে বলতে, আজ তােমাকে এখানে ডেকেছি।
রণ। রাজি, শুনে বিশেষ সু ও বিষয় কু-প্রকৃতির রমনিকেতন এই
ভূস্বর্গ কাশ্মীরের যিনি সর্বময়ী অধিশ্বরী-যার আলী সংকেতে
সুবিশাল কাশ্মীয় রাজ্যের আবাল-বৃদ্ধ নিমেষে লক্ষ-ক্ষেত্রে ধাবিত
মানসী। h, হতে তিলমাত্র কাতরতা, প্রদর্শন করে না, যার ইঙ্গিতাভিলাষ পরি- পূরণের জন্য, অসীম ক্ষমতাশালী, প্রবল প্রতাপান্বিত রাজচক্রবর্তী শত্রুজিৎ স্বয়ং সমুৎসুক,তার এমন কি অভাব থাকতে পারে, যার জন্য মনের শান্তি নষ্ট হয়েছে? দেৰি, দাসের নিকট অকপটে সকল কথা ব্যক্ত করুন, আপনার সদিচ্ছা পূর্ণ কত্তে এ অধম বিন্দুমাত্র কুষ্টিত হবে না। রাণী। রণজিৎ; আমার ইচ্ছা পূর্ণ কত্তে একমাত্র সমর্থ তুমি ! রণ।.. অনুমতি কক্ষ, আমি:দাস মাত্র। রাণী। ৰণজিৎ, তুমিই আমার হৃদয় রাজ্যের একমাত্র অধীশ্বর,-আমি তােমার দাসু রণ। রাজ্ঞি, আপনি কাকে কি বলছেন? আমি যে আপনার আজ্ঞাবহ ভৃত্য রণজিৎ সিংহ। 'রাণী। তােমায় চিনিনা, রণজিৎ, বুক চিরে দেখাবার হলে দেখাতু, তােমার অই অনিন্দ্য সুন্দর কমনীয়া মূর্তি, আমার অন্তরের ও অন্তস্তলে উজ্জ্বল রূপে অঙ্কিত আছে। রণ। রাশি, আজ কি আপনার মনের স্থিরতা নেই ? জ্ঞান-বৈকল্য উপস্থিত ? -- রাণী। জন ধ্যান আমার সকলই যে তুমি রণজিৎ ! দয়া কর রণজিৎ, আজ নয়, কান নয়, প্রথম দর্শন হতে এই পাঁচ বছর, আমি তিলে তিলে পুড়ে মরছি । র। রাশি, একি শুছি? অগণিত শক্রর শতশত কামান গর্জনে যে রণজিতে কেশ ও কম্পিত হয়নি, সে রণজিৎ, যে আন্ধু তােমার খামে ভীত, সমােমাঞ্চিত। এসব সত্য, নাস্বপ্ন... রাণী। স্বপ্ন নয় রণজিৎ, ধ্রুব সহ্য। ত্যই ক্ষুণপ্রভা জীবন যৌবন **. তােমার চরণে মন কতো! চাইনে স্না, চাইনে ঐশ্বৰ্য্য, রণজিৎ, হেলায়লই তগ বলবাে তুমি আমার, ছিছিছিছি-রাশি, রস সংঘত কর। সীতা-সাবিত্রী, দমবার দেশে জন্ম তােল, তােমার হৃদয়ে এ পৈশাচিক, লালসায় পান কেন? প্রবৃত্তি দমন কর, কুলধৰ্ম্ম রক্ষা কর।
মানসী। ৩১ রাণী। এই সুদীর্ঘ পাঁচ বছর সে চেষ্টা করেছি। প্রাণ পণে করেছি, কিন্তু কৃতকার্য হই নি। রণজিৎ, সত্য বলছি, পথের ভিকারিণী ও বুঝি এ অভাগিনী হতে সহস্রগুণে সুখী। আর পারিনা, দয়ার প্রাণেশ্বর, রণ। কি ঘৃণা, কি ঘৃণা,-এবণে ও দেহ কলুষিত হয়। তােমার ছায়া স্পর্শেও অনন্ত নরকের পথ প্রশস্ত হয়। আমি যাই, (প্রস্থানােদ্যত) রাণী। শােন, শােন নির্দয়, রণ। (যাইতে যাইতে) রণজিৎ পিশাচ নয়। (প্রস্থান) রাণী। এ সত্য, না স্বপ্ন ? আমি জাগ্রৎ, না নিদ্রিত ? এ অভিনয়, কাল্পনিক বাস্তব ? সমগ্র কাশ্মীরের একমাত্র অধীশ্বরী আমি,-সামান্য একটা সৈনিকের নিকট উপেক্ষিত হলুম? এখানেই কি এ নাটকের যবনিকাপাত হবে? না, না, কখনই নয়, কখনই নয়। বিমর্দিত- পুচ্ছ ভুজঙ্গিনীর তীব্র-দংশন কত আলা ময়, মুখ, রণজিৎ, শীঘ্রই তা হৃদয়ের পরতে পরতে অনুভব কবে। তােমার মত তুচ্ছ একটা কীটামুকীটকে পদতলে বিমর্দিত-মথিত কত্তে ক্ষণপ্রভার কতক্ষণ ? কিন্তু বােনা, তা বােনা,-রাবণের চিরজ্বলন্ত-চিতা, তােমার বুকের ভিতর অহরহঃ জ্বলবে! অনন্ত, তােষানলের ব্যবস্থা করবাে, এই প্রতিজ্ঞা ! এত অবজ্ঞা ? এত অহঙ্কার? পদ্মাবতীর প্রেমের এত মাদকতা ? উত্তম, তবে পদ্মবতী, আগে তুমিই প্রস্তুত হও। (বেগে প্রস্থান)
৮ম দৃশ্য-রাজসভা।
(সভাসদগণ ও নর্তকীবৃন্দ ।
এম স। ওগাে, আমরা তীর্থ-কাকের মত হা করে বসে আছি, একটুকু
কৃপাদৃষ্টি পাত কর না গা?
২য় । হাগা, ভায়া আমার তৃষ্ণায় ছটফটাচ্ছেন, একটু রসবারি সেচৰ
কর। একটা আধটা প্রেমের গান গাও-বুঝলে ?
গীত।
-
নিৰ্তকীবৃন্দ।
প্রেম করা নয় মুখের কথা,
বিলিয়ে দিতে হয় পরাণ ।
প্রেমে শুধু দেওয়া চলে,
চে’তে হয় না প্রতিদান।
তুমি ভালবাস যারে, সে যদি না চায় গাে ফিরে,
সাধতে হবে চরণ ধরে,-
ভুলে গে’ মান-অপমান।
সে যদি গাে পায়ে ঠেলে, লুইতে হবে চরণ তলে,
প্রেমের পূজা, নয়ন-জলে,
সুখের তাতে নেই বিধান।
১ম স। বাহবা বাহবা, খাঁটি কথা,--‘প্রেমের পূজা নয়ন জলে’—কিন্তু
আলতা না ধুয়ে যায় ।
(মন্ত্রী ও সার্বভৌমের প্রবেশ)
চত্র। (জনান্তিকে) সভাসদের মুখ আমি বন্ধ করেছি। আর একটা বড়
শুভ লক্ষণ ! মহারাজ কি জানি পাছে স্নেহ-বশে কথাটা উড়িয়ে দেন,
সেজন্য বাণী মাকে আগে হতে যাতে বুঝিয়ে রাখা যায়, তার চেষ্টা
কত্তে গিয়েছিলুম। যতটুকু বুঝলুম, রাণীমা তার প্রতি ততটা প্রসন্ন
নন। এটা কম সুবিধার কথা নয়।
মানসী।
সৰ্ব্বে। (জনান্তিকে) তৰে তােমার একাদশ বৃহস্পতি! (প্রকাশ্যে) হরি, হরি,
কলৌ নাস্ত্যেব গতিরন্যথা। (জনান্তিকে) আমার কথা ভুলে
যেয়ােনা। কপর্দকেনাল্প—এক কড়া কমেও হবেনা। (প্রকাশ্যে)
হরি, হরি, নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।
২য় স। ও গাে, থামলে কেন? অমৃতে অরুচি কেন? কি বলেন, সৰ্বভৌম
মশায়?
সার্ক। হাঁ, রাজসিক ব্যাপারে এগুলাে অঙ্গভূষণ বটেই তে। হরি, হরি,
(জনাস্তিকে বুঝলে,—এক কড়া কমেও আমি ওতে নেই।
চন্দ্র। (জনান্তিকে) চিন্তা নেই,—ও আপনার সিন্ধুক-জাত ধরে নি।
১ম স। ওগাে, আর খালি খালি দাড়িয়ে কেন ? চলুক।‘মন গেছে যে,
অই রাঙ্গা পায়।
গীত।
কুড়ায়ে কুসুম রাশি
*
নর্তকীবৃন্দ।
দেবে বলে দিয়েছিনু মন। বেঁধু) ।
মজিয়ে অবলায়, কেন অযতন ?
কত দিন কত নিশি,
পরায়েছ হাসি হাসি ফুল আভরণ,
যদি নিমেষের তরে,
গিয়েছি কখনও দূরে,
অভিমান ভরে কত করেছ রোদন,
* যে’চে কাছে গেলে আজি ফিরাও বদন।
নীরব নিশীথে শশী, ঢালিত সুধার রাশি,
বকুলতলায় বসি সে সুখ স্বপন,
বুকে জড়াইয়ে বুক আদরে চুমিতে মুখ,
ভুলেছ সকলি সখা নাহি কি স্মরণ ?
পুরুষ কঠিন এত ? পাষাণ এমন ?
--
৩৪ মানসী। (রাজা, রাণী ও মানসীর প্রবেশ) রাজা। মন্ত্রিবর, কল্যকার ব্রাহ্মণ-ভােজন-ব্যাপার যথা-নির্দেশ সম্পন্ন হয়েছে শুনে, বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। আজ সেনাপতির অভিনন্দন উৎসব যাতে সৰ্বাঙ্গসুন্দর হয়, তাতে বােধ হয় চেষ্টার ত্রুটা হয়নি? চন্দ্র। রাজাদেশ পালন-পক্ষে ভৃত্যের সাগ্রহ দৃষ্টি আছে। তবে কালকের ব্যাপারে সম্ভাবনার অতিরিক্ত ব্যয়বাহুল্য ঘটেছে। রাজা। অ ঘটুক। আমার প্রিয়তম সুহৃদ রণজিৎসিংহের প্রতিকামনায়, তাঁর অভিনন্দন ব্যাপারে,—কিঞ্চিৎ ব্যয় বাহুল্য আমি অকাতরে অনুমােন কর্পো। সেনাপতি বােধ হয় শীঘ্রই সভায় উপস্থিত হবেন, তােমরা সকলে তাঁর প্রতি বিশিষ্ট সম্মান প্রদর্শন কর, এই আমার অনুরােধ। চন্দ্র। রাজাদেশ যথাযথ পালিত হবে। রণজিতের প্রবেশ । রাজা। এস, মেহ-ভাজন রণজিৎ, ঐ নির্দিষ্টাসনে উপবেশন কর। সভা- সগণ, গত যুদ্ধে সেনাপতি যেরূপ অসীম বীরত্ব, অসামান্য রণনৈপুণ্য প্রকাশ করেছেন, তজ্জন্য কাশ্মীরবাসী, তার নিকট চিরকৃতজ্ঞ। অস্তরনিহিত সে অপরিমেয় কৃতজ্ঞতার যৎসামান্য নিদর্শন—এই অভ্যর্থনায়ােজন। তার প্রথম নিয়ােগ হতে, এই পাঁচ বছর আমি তার বীরত্বে একান্ত মুগ্ধ! তবে এই যুদ্ধজয়ের স্মৃতিচিহূ-স্বরূপ আজ স্বহস্তে আমি তাকে এই রত্নখচিত অসি উপঢৌকন প্রদান কছি। সেনাপতি, এ সামান্য উপহার গ্রহণ করে, আমাকে সুখী ও বাধিত (অসিপ্রদান) রণ। ভক্তিভাজন কাশ্মীরাধিপতি, প্রজাসাধারণের প্রতি আপনার স্নেহ- বাৎসল্য, আপনার আদর-যত্ন, আপনার নিরপেক্ষতা, কাশ্মীর-বাসী কাউকে বলে জানাতে হয় না। আপনার অনুগ্রহে এ দাস লালিত, পালিত, কাশ্মীরে সম্মানিত। আজ এরূপ অভ্যর্থনায়সে সন্মান শতগুণে বুর্কিত হলাে। এ অভিনন্দনের উপযুক্ত কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করি, তেমন ক্ষমতা আমার নেই। তবে এই মাত্র বলতে পারি, যতদিন হস্ত মানসী। অসিধারণে সমর্থ থাকে, যতদিন ধমনীতে একবিন্দু রক্ত প্রবাহিত হয়, ততদিন এ প্রিয়তম অসি, এ অমূল্য উপহার, আমার চির সহচর হবে। ভগবানের নিকট প্রার্থনা,—আমা হতে যেন রাজদত্ত এ অসির অবমাননা না হয়। চন্দ্র। সেনাপতি, আপনার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা স্বয়ং রাজমুখে ব্যক্ত হয়েছে। আপনার কীর্তিগানে আজ কাশ্মীর গগনমণ্ডল মুখরিত। আপনার প্রতি কামনায়, রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিবর্গ বহিরঙ্গনে সমাগত। চলুন, আপনি তাদিগে দেখা দিয়ে কৃতার্থ করবেন। (ক্ষণপরে) কিন্তু একটা কথা,-গত যুদ্ধে যে সমুদয় দস্যু ধৃত বা বন্দীকৃত হয়েছে, যে ব্যসম্ভার হস্তগত হয়েছে, তার বিস্তৃত বিবরণ আজ প্রকাশিত করাআপনার অভিপ্রেত নয় কি ? আমরা সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। রণ। এ যুদ্ধ ফলে কোনও দ ধৃত বা বন্দীকৃত হয়নি,উল্লেখ মােগ্য কোনও দ্রব্য-সম্ভার ও হস্তগত হয়নি,একথা আমি পূৰ্বেই রাজ- সকাশে নিবেদন করেছি। রাজা। হাঁ, একথা রণজিৎ পূৰ্বেই বলেছেন। যাক—দস্যু বা দ্রব্য-সম্ভারের জন্য আমি লালায়িত নই, মন্ত্রি। চন্দ্র। কিন্তু কথাটা এই,—যুদ্ধে জয়লাভ হলাে, অথচ একটী দস্যও ধৃত হলােনা। শর্গ করায়ত্ত হলাে,—অথচ কোনও দ্রই রাজভাণ্ডার -জাত হলােনা, এটা নিতান্তই বিস্ময়ের বিষয়। রণ। যুদ্ধ-ফলে যে সন্ধি হয়, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বী শত্রুর স্বাধীনতা অক্ষুন্ন ছিল, আর, বিশেষ কোনও দ্রব্য দুর্গে আদৌ ছিল না। চন্দ্র। যুদ্ধ-ফলে সন্ধি ! ভাল, সন্ধির ক্ষমতা কি সেনাপতি মশায়ের ছিল ? রণ। সেনাপতির সে ক্ষমতা ছিল কিনা, মন্ত্রী মহাশয় কি তার বিচার কর্তা? চন্দ্র। বিচারের অধিকার আমার থাক বা না-ই থাক, উপস্থিত রাজসভা- সমক্ষে আপনি সে কৈফিয়ৎ প্রদানে অবশ্যই বাধ্য। রণ। সন্ধির ক্ষমতা আমার ছিল কিনা, জানিনা। তবে সরল বিশ্বাসে সন্ধি আমি করেছি। আর সে সন্ধিতে মহারাজের সম্মান সম্পূর্ণ অক্ষু .. == রয়েছে।
চন্দ্র। সে বিচারের প্রয়ােজন ? মাথাই নেই, মাথাব্যথা ? সন্ধির ক্ষমতাই যদি না থাকলে, তবে তার কল কিরূপ হয়েছে, বা হবে, সে বিচারে প্রয়ােজন? রাজা। তর্কের সীমাটা ক্রমে প্রীতির গণ্ডী অতিক্রম কচ্ছে, ন, মন্ত্রি ? চন্দ্র। মহারাজ, বিষয়টা একটু গুরুতর বলেই মনে হয়। যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ কলুম, এ অবস্থায় জয়-লব্ধ দ্রক সম্ভারের কিংবা বিজিত শত্রু দলের বিশেষ বিবরণ জানতে সাধারণের মনে একটা আগ্রহ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনা যে রূপ দাড়িয়েছে, তাতে প্রজাসাধারণের নিকট কতটুকু বিবরণ প্রকাশ করা সঙ্গত, তা অবশ্যই চিন্তনীয়। রণ। সকলের নিকট অসংকোচে সত্য বিবরণ প্রকাশ, সর্বাবস্থায়ই সঙ্গত। চন্দ্র। সেনাপতি মহাশয় যা সত্য বলে ঘােষণা কচ্ছেন, সাধারণে তা বেদ- বাক্য বলে গ্রহণ না ও কত্তে পারে । বণ। রণজিৎসিংহ মিথ্যাবাদী-কাশ্মীর বাসী কেউ এ কথা বলতে সাহসী হবে, আমার এ বিশ্বাস ছিল না। চন্দ্র ! দুর্গে গ্রহণ-যােগ্য দ্রব্য-মাত্র ছিল না,-একথা বিশ্বাস কবে, সকলেই এরূপ-সরল, সেনাপতি মশায় কি তাই বলতে চান ? আর, কোনও গুপ্ত কারণ ব্যতীত, পরাজিত শত্রুর মুক্তি বিধানেরই বা কি প্রয়ােজন : ছিল ? রণ। মন্ত্রী মহাশয়, আপনি আমাকে শুধু মিথ্যাবাদী বলেই নিরস্ত নন? রণজিৎ অর্থগৃধু নর-পিশাচ, এমন কি বিশ্বাসঘাতক, ইঙ্গিতে তাও ঘােষণা কত্তে সঙ্কুচিত নন্ ?- মহারাজ,-- মান। বাবা, এ সব কি ? সেনাপতি দাদার ধৈর্য্যের কি একটা সীমা নেই? তুমি এখানে আছ বলে, কত কষ্টে তিনি ক্রোধ সংবরণ কচ্ছেন, দেখ দেখি। রাণী। মানসী, তুই ছেলে মানুষ, ওসব কথায় তাের কাজ কি? প্রজার মনােরঞ্জনের জন্য গুণনিধি রামচন্দ্র, পতি-গত-প্রাণা প্রিয়তমা সীতাদেবীকে পর্যন্ত বর্জন কর্তে বাধ্য হন, একথা বিস্মৃত হয়েছিস্?- বিষয় যে গুরুতর তাতে সন্দেহ কি ?
মান সৰ্বে। (স্বগতঃ) সত্যি রাণীমাকে অবধি চন্দ্রচূড় হাত করেছে। যা আমার পথ সহজ হয়ে পড়েছে-মহাজন যেন গতঃ স পন্থাঃ-রাণীমার পেছৰেপেছনে চলবাে। ফল হয়, পােহাবার, না হয়, শুধু রে যাব। (প্রকাশ্যে) পৰ্ব্বততা বহ্নিমান্ ধূমাৎ-শাস্ত্রে আছে, পৰ্বতে ধূম দেখে বহ্নির অনুমান সুসঙ্গত। হরি, হরি,—তা কাৰ্য দেখে কারণ অনেকটা অনুমান করা যায় বই কি?--কলৌ নাস্ত্যেব গতিরন্যথা। হরিহরি। চন্দ্র সেনাপতি, আপনার পদের গুরুত্ব অত্যধিক,--শুভ বস্ত্রে মসীবিন্দুপাত সহজেই দৃষ্ট হয়, সুতরাং আপনারই সুবিধার জন্য, এক্ষেত্রে বিচারের সম্পূর্ণ প্রয়ােজন। রণ; কিসের বিচার ? চন্দ্র। সন্দেহ-সাপেক্ষ বিষয়ের বিচারে আপাততঃ প্রয়ােজন নেই। আপনি স্বয়ং যতটুকু স্বীকার কচ্ছেন, তাই এক্ষেত্রে আলােচ্য হােক। আপনি এক প্রকার স্বীকৃত, দস্যুদের আপনি স্বেচ্ছায় মুক্তি দিয়েছেন। রণ। মিথ্যা কথা।—কেউ বন্দীই হয়নি। কাজেই, মুক্তির কথাই উঠেনা। চন্দ্র। ভাল, দুর্গ তাে হস্তগত হয়েছিল ? ইচ্ছা মাত্রই শত্রুদল বন্দী হতে, এটা কি আপনি অস্বীকার করূবেন ? রণ। দু একজনকে হয়ত বন্দী করা যেতে পারতাে। চন্দ্র। ব-তাহলেই হলাে। রাজনীতির হিসাবে তাতে আপনার অপরাধ হয়েছে কিনা, তারই বিচার হাে। রণ। আপত্তি নেই। সম্পূর্ণ সরলতাবশে যা আমি করেছি, তাতে যদি কোনও রাজনীতিক অপরাধ হয়ে থাকে, মহারাজ তার বিচার করুন । মান। বাবা, এ সকল বিচার-বিতর্ক এর পর হলে ভাল হয় না। এ আনন্দের দিনে, এসব উৎপাত রাণী। মানসি, তুই চুপ কর। যােগ্য ব্যক্তির সম্মান-দান রাজার অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু এক্ষেত্রে সেনাপতি যথার্থই যােগ্যতা অথবা অযােগ্যতা প্রদর্শন করেছেন, তারই বিচার আগে হওয়া সঙ্গত নয় কি? সৰ্বে। হরি হরি--রাণী মা সাক্ষাৎ সরস্বতী !--কলৌ নাস্ত্যেব গতিরন্যথা। তা না হলে, এতবড় রাজ্যের সর্বময়ী কী হরেন কেন? ?
মানসী। চন্দ্র। (স্বগতঃ) রাণীমার এতটা সহানুভূতি স্বপ্নেরও অগােচর। যদিও এটুকু বুঝেছিলুম, কোনও কারণে রণজিতের প্রতি তিনি অপ্রসন্ন, কিন্তু ব্যাপার এতটা গড়াবে, ভাবতে পারিনি। দেখা যাক্, কত দূর কি হয়। (প্রকাশ্যে) রাণীমার কথা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। এক্ষণে মহারাজের আদেশে কাজ হবে। রাজা। মন্ত্রি, এক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করুবাে, এই স্থির করেছি। রণজিৎ আমার পরম স্নেহের পাত্র, সে জন্যই আমি তোমাদের বাগবিতণ্ডায় যােগদান করিনি। পাছে কেউ মনে কর, আমি মেহবশে পক্ষপাত প্রদর্শন কচ্ছি। রাজার জীবন বিড়ম্বনা- সময়-বিশেষে পুত্র-স্নেহ, পত্নী-প্রেমে পৰ্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়। আজ আমি এবিষয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকবে। তােমরা সকলে মিলে, যা ভাল বিবেচিত হয়, তাই কর। চন্দ্র। তাহলে, রাজপুরােহিত সার্বভৌম মহাশয়, কিংবা স্বয়ং রাণী মা আপনার প্রতিনিধি রূপে বিচার কার্য সম্পন্ন করুন। আশাকরি, সেনাপতি মশায়ের তাতে আপত্তি হবে না। রণ। ধৰ্ম্ম-সঙ্গত ন্যায়বিচারে কারই আপত্তি হতে পারে না। মান। বিচারটা এদণ্ডেই না হলে, নয়? (ক্ষণ পরে) কে অভিযােগ কচ্ছে? চন্দ্র। কর্তব্যের অনুরােধে, দশের প্রতিনিধিরূপে, অগত্যা আমিই এ অপ্রীতিকর অভিযােগ উপস্থিত কচ্ছি। মান। অভিযােটা কি ? চন্দ্র। অবৈধভাবে শক্রর স্বাধীনতা-বিধান। মান। প্রমাণ। রাণী। তাের এ সবে কাজ কি মানসী? এক্ষণে এ সম্পর্কে সেনাপতির কি বক্তব্য আছে, তাই উচিৎ। রণ। আমার বক্তব্য আমি পূর্বেই প্রকাশ করেছি। পুনরুক্তি বােধ হয় নিয়ােজন। রাণী। তবে শােন রণজিৎ, ইচ্ছা করে দেশের শত্রুর স্বাধীনতা-প্রদান অপরাধে তুমি অপরাধী, ন্যায় ও ধর্মের অনুরােধে এ কথা বলতে আমি বাধ্য। অবশ্য বাধ্য। শােনা মানসী। ৩৯ মান। মা, রাণী। চুপ,এখন দণ্ডের ব্যবস্থা। সাৰ্ব। শাস্ত্রে আছে, কণ্টকেনৈব কণ্টকং—কাটা দিয়ে কাঁটা উদ্ধার হরি হরি রাণী। আমার বিবেচনায়,-স্বাধীনতার মূল্য স্বাধীনতা । সেনাপতি, তুমি অন্যায়রূপে শত্রুকে স্বাধীনতা দান করেছ, সে জন্য তােমার স্বাধীনতা আজ হতে বিলুপ্ত হ’লল।—তােমার দণ্ড নির্জন-কারাবাস। রাজা। রাণি, রাণী। প্রাণেশ্বর, সেনাপতি রণজিৎ সিংহ আপনার-আমার পরম স্নেহ-পাত্র হতে পারে, তার অবমাননা, তার নিগ্রহ, অশেষ যন্ত্রণাকর হতে পারে, কিন্তু তাও বরং সহ কত্তে পারি, অকাতরে সহ্য কত্তে পারি,তথাপি আপনার চিরশুভ্র যশশ্চন্দ্রমায় রেখামাত্র কলঙ্ক- কালিমা পাত হতে দিতে পারিনা। কাশ্মীররাজ মেহবশে কৰ্তব্য- চ্যুত হয়েছেন, বিচারে শিথিলতা দেখিয়েছেন, একথা কিছুতেই কেউ যাতে বলতে না পারে, তারই জন্য আমি আজ এ ব্যাপারে স্বয়ং এতটা জড়িত হয়েছি। আমার কথা কিছুতেই ব্যর্থ হবেনা। রাজসভা তবে ভঙ্গ হলাে। চলুন নাথ, চল, মানসী। (যাইতে যাইতে স্বগতঃ) আমার অভিনব নাটকের এই মাত্র প্রথম-অঙ্ক। (প্রস্থান) (পশ্চাৎ পশ্চাৎ নীরবে মানসী ও রাজার প্রস্থান) চন্দ্র। দণ্ডাজ্ঞা শুলে, সেনাপতি ? রণ। শুনলুম। এই রাজাদেশ ? চন্দ্র। সন্দেহ কি? রাজার প্রতিনিধি স্বয়ং রাণীমার আদেশ—সুতরাং রাজাদেশ! রাজাদেশ অবশ্যপালনীয়। যে রণজিৎ আজ পঞ্চাধিক বর্ষ হতে রাজার তুষ্টি সম্পাদনকেই জীবনের সারব্রত বলে সঙ্কল্প করেছিল, যে রণজিৎ রাজার অঙ্গুলী-মাত্র হেলনে, অম্লান বদনে, এতদিন, অনল মুখে অগ্রসর হতেও তিলমাত্র সঙ্কোচ বােধ করেনি, সেই রণজিৎ - মানসী । আজ রাজাদেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য, কারাদণ্ড গ্রহণে পরাঘুখ হবে না। রণজিৎ সম্পদে বিপদে, শয়নে স্বপনে,সম্রাটের গৌরবাকাঙ্ক্ষা, দেশের হিতকামনা, নিশিদিন, প্রতিমুহূর্তে, হৃদয়ের পরতে পরতে সযত্নে পরিপোষণ করে থাকে। দেশের মঙ্গলের তুলনায়, রণজিৎ ব্যক্তিগত সুখ-স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্মান-প্রতিষ্ঠা, চিরদিনই নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান করে আসছে। সুতরাং আজ সে, এ বিচারের বিরুদ্ধে অসি উত্তোলন করে দেশের মধ্যে একটা অশান্তির কালানল সৃষ্টি কত্তে অভিলাষী নয়। এই আমি রাজত্ত অসি, রাজকীয় পরিচ্ছদ,-রাজাজ্ঞায়-এ মুহূর্তে সর্বসমক্ষে পরিত্যাগ কচ্ছি,-পরাও, আমাকে শৃঙ্খল পরা, বন্দীক,—কারাগারে নিয়ে চল। (পটক্ষেপণ)
।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
১ম দৃশ্য—সীমান্ত পাহাড়।
(ঝরণার পার্শ্বে মুরল।)
১.
গীত।
।
মুরলা।
ভুলিৰ বাসনা অন্তরে, ভুলিতে কই পারি ?
নিরাশা সাগরে ভাসি, তবু, আশা, কই ছাড়ি?
কেনগাে হায়, দেখা হলাে ?
-না দেখা যে ছিল ভালাে,-
করেছি পান হলাহল, বল, কেমনে উগারি ?
(পুরঞ্জনের প্রবেশ)
৪। (জনান্তিকে) সরলা বালিকে, সত্যই তুমি হলাহল পান করেছ। এ
অসম্ভব প্রণয়াকাঙ্ক্ষা তােমার মনে কিসে উদিত হলাে, ভগবান্
জানেন। বিজয় দাদা কি এত মূখ, তােমার আশা-লতায় জল সেচন
কবে ? তবে এ ভাবের মােশ্নতি কিসে হচ্ছে ? যাক, অঙ্কুরেই
একে নষ্ট না কলে, পরিণামে তােমাকে বিষম কষ্ট পেতে হবে। এ
দুরাকাঙ্কা দূর করা আমারই কর্তব্য। (প্রকাশ্যে )মুরলে, নিরিবিলি
বসে, কি গান গাইছ ?
মুর। তুমি শুনেছ গানটা ? সেদিন এটা একটা বৈষ্ণবী গেয়েছিল। শুনে
ছিলুম, তাই গাইলুম, দোষ আছে ?
পুর। দোষ নেই তত! তবে এটা কোনও নিরাশ প্রেমিকার খেদ-গান ।
তােমার মুখে শােভা পায় কি ?
মুর। গান গাইতে অত বিচার কত্তে হবে ?
৪২ মানসী। পুর। যার যেমন-মন, তার কাছে তেমন গানের আদর হয়। তুমি কি নিরাশ-প্রেমিকা, মুরলে? মুর। নিরাশ-প্রেমিকা কাকে বলে, তা আমি জানিনা। পুর। (স্বগতঃ) স্ফুটনােম্মুখ কুসুম-কলিকা মাত্র ! তথাপি অজ্ঞাতে প্রকৃতির অত্যাচার আরব্ধ হয়েছে। মুর। তুমি:ভাবছ কি ? পুর। ভাবছি তােমারই কথা। আচ্ছা, তুমি কাউকে ভালবাস? মুর। বাবাকে ভালবাসি,-মা নেই, তাকে ভালবাম, তােমাকে ভালবাসি, বিজয় দাদাকে ভালবাসি। পুর। তােমার বাবাকেই এখন শুধু ভালবাসা উচিৎ মুর। আর কাকেও ভালবাসায় দোষ আছে ? পুর। দোষ নেই, তবে বিজয়কে বা আমাকে ভালবাসলে, শেষে হয়ত কষ্ট পাবে। মুর। কেন? কষ্ট পাব কেন ? ভালবাসায় কি কষ্ট পেতে হয় ? (ক্ষণপরে) হাঁ, তা হয় বটে। মা যখন মরে যায়, তখন মনটা বড় কাদছিল, বড় কষ্ট হয়েছিল। পুর। তবেই দেখ, আমি বা বিজয়, কবে কোথায় চলে যাব, তখন তােমায় কাদতে হতে পারে। মুর। তােমরা আমায় ছেড়ে চলে যাবে ? আমি যে তােমাদের অনেক খানি ভালবাসি। তােমার বা বিজয় দাদার সঙ্গে বেড়াতে, খেলাতে, কথা কইতে, আমার বেশ লাগে। তােমাদের লাগে না? পুর। মুরলে, তুমি সরলা বালিকা। বলতে গেলে সব হয়ত বুঝতে পাবেনা। তােমার এখন যার-তার সঙ্গে মেশামেশি ভাল দেখায় না। যার সঙ্গে তােমার বে’ হবে, তাকেই তােমার ভালবাসতে হবে। মুর। বে’ কি ? বর-কনে হওয়া ? বেশ তাে, যার সঙ্গে আমার বে’ হবে, তাকেও ভালবাবােতােমাদের ও ভালবাসবো । বিজয় দাদার সঙ্গে আমার বে’ হয় না ? পুর। বিজয় দাদা তােমায় কিছু বলেছে ? -- মানী। মুর। কই ? কিছুই না। তবে তােমার মত সে তাে আমায় ভালবাসতে বারণ করেনি। পুর। (স্বগতঃ । বিজয় দাদা কি তবে এ পাৰ্ব্বত্য ব্যালিকাকে যথার্থই ভালবাসে ? মুর। আবার কি ভাবছাে ? পুর। বিজয়ের সঙ্গে যদি তােমার বে’ না হয় ? মুর। বেশতো, না হয়, বে’ না-ই হলাে। কিন্তু তা বলে তােমরা চলে যাবে কেন ? তােমরা চলে গেলে আমি কার সঙ্গে অমন করে হাবাে, গাইব, অই ঝরণার জলে ফুল ছুড়ে খেলা করূবাে ? পুর। মুরলে. চিরদিন এ ভাবে কাটবেনা ত ! বড়টী হলে তােমায় ঘর- সংসার নূতন করে পাততে হবে, তত ? বরের সঙ্গে হয়ত বা কোনও নূতন দেশে চলে যেতে হবে। মুর। আমি আমার বাবাকে ছেড়ে চলে যাব ? তুমি বল কি পুরঞ্জন দাদা? এই ক’দিন বাবাকে না দেখতে পেয়ে মনটা কেমন হয়ে গেছে। তবু তােমরা আছ, তাই তত উতলা হইনি। অই-অই যে বিজয় দাদা আসছেন। ( বিজয়ের প্রবেশ) বিজ। পুরঞ্জন এখানে ? তােমাকে যে খুজে মছি। পুর। পুরঞ্জন এখানে তােমার গুপ্ত রহস্য ভেদ কচ্ছেন। বিজ। আমার গুপ্ত রহস্য ? পুর। হাঁ, এই যে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমের মহলা দেওয়া হচ্ছে। আমায় তা জানিয়েছ কখন। বিজ। মহলায় এখন ও জমাট বাঁধেনি। নইলে কি তুমি ফাঁকে পড়তে ? পুর। অনেক টা তবু নিশ্চিন্ত হলুম। মুরলে, শুনলে-- বিজ। বাজে কথার এ সময় নয়, পুরঞ্জন। সর্দার ফিরে এসেছেন। মুর। বাবা ঘরে ফিরে এসেছেন ? আমি দেখি গে তবে ( প্রস্থান) পুর। সর্দার ফিরে এসেছেন ? কাশ্মীরের সংবাদ কি ? বিজ। সংবাদ আমাদের খুবই অনুকূল। প্রধান সেনাপতি রণজিৎ সিংহ কারারুদ্ধ। রাজ্যময় একটা অসন্তোষের ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। বােধ হয়, কাশ্মীয়-রাজ একটা ভীষণ যন্ত্র-জালে জড়িত হচ্ছেন। সর্দারের মুখে সব শুনতে পাবে এখন, ঘরে চল । ( প্রস্থান) ২য় দৃশ্য—কাশ্মীর রাজ প্রাসাদের কক্ষ। == । . (রাণী ও চামেলীর প্রবেশ রাণী। এটা খুব নিরিবিলি জায়গা। সব বল, শুনি। চামে। বড় ভয় হয়। রাণী। তাের কিছুমাত্র সাহস নেই, কাজেও ততটা মনােযােগ নেই। পূরাে- পূর পনেরটা দিনের ভিতর, তুই কিছুই কত্তে পাল্লিনে। চামে। দিন রাত ত আমি সুযােগ খুজছি, কিন্তু বাঞ্ছা পাগলেটা যে ভারি সেয়ানা। এক মুহূর্ত কাছ ছাড়া হতে চায় না। যেন যখের ধন, আগলে বসে থাকে। তারপর ওদিকে ওষুদে মাগীর ঘাের বিতৃষ্ণা । মুখেই তুলতে চায় না। পনের দিন আমি সেখানে আছি, তার ভিতর কুল্লে দুদিন গুড়াটা মিশা’তে পেরেছিলুম। রাণী। তাের দ্বারা কাজ হবে না। পনের দিনের ভিতর, অন্ততঃ পাঁচটা দিন তাের কাজ করা উচিৎ ছিল। চামে। ওমা, কি করে করি গাে? প্রথম সপ্তা খানেক তাে পাগলেটা মাগীর কাছেই ঘেসতে দেয়নি। এখন অনেকটা আস্থা জন্মিয়েছি বটে, তবু তার কেমন সন্দেহ-সন্দেহ-ভাব। আর মা, আমার ও ভয়- আছে তাে, তাড়াতাড়ি কত্তে যেয়ে, শেষটা লােক জানাজানি হয়ে যায় যদি, তবে বাছা তােমারও ঘাের অপযশঃ, আর আমার ত খাড়ার তলে মাথা। রাণ। হাঁ, খুব সাবধানে কাজ কত্তে হবে বটে, কিন্তু অত ‘ডিমে তেতালা’ রকমে চলবে কেন? খুব হাত চালাকির সঙ্গে কাজ কল্লে, কারও সন্দেহের কোনই কারণ থাকবে না। ওষুদে জিনিষটা মিশালে স্বাদের তারতম্য হয় না। আচ্ছা, এ দুদিনের ফলে কোনও কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি? চামে। রাৰ্ণিমা, এ সব ফন্দি-ফিকির না কলৈও এ যাত্ৰা মাগীর রক্ষে নেই। মিন্সের কারাবাসের দিন হ’তে মাগী নাকি জল ভিন্ন কিছুই মুখে তুলে নি। তবে ঐ পাগলেটা জোর করে যা কিছু খাইয়েছে। এখন ত দিন রাত মাগীর ছটফট, মাত্র সার।
২. সানী ।
**,
*
রাণী। তবে ওষুদে কিছুটা কাজ হয়েছে। খুব সাবধান—কিন্তু মাত্রাটা
একটু বাড়াতে হচ্ছে। একটু দাঁড়া তুই
(প্রস্থান)
চামে। বােন্পাের সঙ্গে দেখা করবাে,এই বাহানা ধরে বেরিয়ে এসেছি।
সন্ধ্যায় বাড়ী ফিতে হবে। নৈলে সন্দেহ কত্তে পারে, বাঙ্গটা
যেন সত্যি চারচোখে পঞ্চানন—
(রাণীর পুনঃপ্রবেশ)
রাণী। এই নে’ দেখি। এ গুড়াে-টুকু সমান ভাগে পাঁচ দিন ওষুদে মিশিয়ে
দিবি। একদিন অন্তর হলেই বেশ হবে। খুব সাবধানে কাজ
করবি। আর দ্যাখ, তুই এখানে এসেছিলি, এটী যেন কেউ না
জাতে পায়। সন্ধ্যার অন্ধকারে গােপনে তােকে পুরী হতে বের
করে দেবার ব্যবস্থা কচ্ছি। চামেলী, শশা,-কাজটাতে হাত-সাফাই
দেখাতে পারি যদি, এই গলার মুক্তাহার তাের পুরস্কার !
চামে। ঐ হার ছড়া আমায় দেবে ?
রাণী। হা হার ছড়া—এখন আয়, সঙ্গে আয়।
( উভয়ের প্রস্থান)
।
৩য় দৃশ্য --পাৰ্বত্য দুর্গ । সর্দার? { পুরঞ্জন, বিজয় ও রঘুবীর। পুষ। এই একমাত্র কাবণে রণজিৎসিংহ কারারুদ্ধ ? রঘু। সেজন্যই মনে হয়, ভিতরে ভিতরে কি একটা ষড়যন্ত্র চলছে। পুর। তুমি এ সংবাদ নিশ্চিত জান, রঘু। ছদ্মবেশে আমি স্বয়ং দরবারে উপস্থিত ছিলুম। যে দিন উৎসব, সে দিনই আমি প্রাতে কাশ্মীরে উপস্থিত হই। কয়দিন সেখানে থেকে কাশ্মীরের পথ ঘাট, দুর্গ, সৈন্য-সংখ্যা প্রভৃতির সঠিক সংবাদ সংগ্রহ করেছি। পুর। ভাল করনি সর্দার, দেরী করে ভাল করনি। রণজিৎ সিংহের কারাবাস সংবাদ আরও পূৰ্বেই আমাদের জানানাে উচিৎ ছিল। রঘু। এটা আমি তত প্রয়ােজনীয় মনে করিনি। পুর। প্রয়ােজনীয় নয় ? আশ্চৰ্য্য! যে মহাত্মা আমাদের প্রতি উদারতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন শত্রু হয়ে ও যিনি, আমাদের প্রতি অসামান্য সৌজন্য প্রদর্শনে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য প্রকাশ করেন নি, শত্রুতা ভুলে গিয়ে যিনি পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অযাচিত ভাবে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন,—এক কথায় আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে যিনি আপন স্বাধীনতা হারা হয়েছেন, কারাকষ্ট ভােগ কচ্ছেন,-তার বিপদে, তার লাঞ্ছনা-পীড়নে, এ দীর্ঘ দিন উপেক্ষা প্রদর্শন অপেক্ষা নীচতা, হীনতা ও কাপুরুষতা আর কি হতে পারে ? যতই দুঃসাহসিকতা সপ্রমাণ হােক, যতই বিপদ পাতের সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকুক , ইচ্ছা হয় বিজয় দাদা,-এই দণ্ডে, এই মুহূর্তে, সেনাপতির দুর্গতি মােচনে তৎপর হই। কাশ্মীর সেনাপতি রণজিৎ সিংহের নিকট, বর্তমানে পুরঞ্জন অপটি-শােধ্য ঋণে আবদ্ধ। এ ঋণের শােধ চেষ্টা অবশ্যই কবাের বিজ। বর্তমানে কিসে তা সম্ভব বল ? শত্রুভাবে, বল-প্রকাশে কাশ্মীরে প্রবেশ করি, তেমন সেনাবল আপাততঃ আমাদের নেই। একাকী তােমার কাশ্মীর গমনে কি লাভ হতে পারে? একটা নিবিড় ষড়যন্ত্র মানসী । ৪৭ মেঘ নিশ্চিতই কাশ্মীরাকাশে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, নতুবা এই সামান্য কারণে সেনাপতির এত নিগ্রহ সম্ভবপর হতাে না। সকল দিক দেখে মনে হয়, বিধি আমাদের প্রতি অনুকূল। এ অবস্থায় তােমার একাকী কাশ্মীয়-প্রবেশে অঙ্কুরেই সব বিনষ্ট হতে পারে। তুমি বিপন্ন হতেই বা কতক্ষণ? পুর। এ সময়ে বিপদ-ভয়ে কাতর হব? আমিই যার সর্বনাশের একমাত্র হেতু, তাকে অকুল পাথারে ফেলে রেখে, নিজে নিশ্চিন্ত থাকবো,- এত নীহাশয় পুরঞ্জন নয়। বিজ। এতটুকু আত্ম-মৰ্যদা জ্ঞান, এতটুকু মহত্ব তােমার আছে, তা সকলেই জানি। কিন্তু ভেবে দেখ, তুমি বিপজ্জালে জড়িত হলেই যে রণজিৎ সিংহ নিপৎ হবেন, তার নিশ্চয়তা আছে কি? মধ্য হতে, এ চেষ্টায় তােমার পিতৃ-প্রতিজ্ঞা-পূরণের পথ চিররুদ্ধ হতে পারে। পুর। তবে উপায় বিজয় দাদা?-এ অবস্থায় নিশ্চষ্ট বসে থাকা যে, পুরঞ্জনের প্রকৃত বিরুদ্ধ। বিজ। নিশ্চষ্ট থাকতে কে বলছে ? পুর। ভাল, আমাদের সৈন্য সংখ্যা ঠিক কত? বিজ। এই কিয়দিন মধ্যে পঞ্চ-সহস্র সৈন্য আমাদের বলবৃদ্ধি কৰেছে। পুর। তবে আমাদের সৈন্য সংখ্যা সর্ব সমেত পনের হাজার ? বিজ। কিছু কম। গত যুদ্ধে কিছু সৈন্য নষ্ট হয়েছিল। পুর। সর্দার, কাশ্মীর-রাজ কত সেনা পােষণ করেন ? রঘু। ষাট হাজারের কম নয়। বিজ। আমাদের চতুগুণ হ’তে ও বেশী । পুর। হােক চতুগুণ–শােন সর্দার, বর্তমান সৈন্য-বল নিয়েই কাশ্মীর- রাজের বিরুদ্ধে অচিরে যুদ্ধ ঘোষিত হবে। রাজধানী আক্রান্ত না হােক, সীমান্ত প্রদেশের স্থানে স্থানে অগৌণে আমি এমন রণবহ্নি প্রজ্জ্বলিত কবাে, যাতে সমগ্র কাশ্মীর-রাজ্য ভীত, সন্ত্র, স্তম্ভিত হয়ে যাবে। আমাদের ইচ্ছানুরূপ সন্ধি ব্যতীত এ কাল-সমরের নিবৃত্তি হবে না। এ সমরে হয় প্রতিজ্ঞা পূর্ণ, নয় ধরা পুরন শূন্য হবে।
৪৮
মানসী!
রিজ। সর্দার, দেশের অবস্থা দেখে এসেছ, কোন্ দি আক্রান্ত হলে সহজেই
স্থানীয় অধিবাসী ভীত হয়ে পড়বে, মনে কর?
ব্লঘু। এ হিসাবে পশ্চিম দিক আক্রমণই সঙ্গত।
পুর। তবে তাই হােক। বিজয় দাদা, আজ হতে একপক্ষ মধ্যে কাশ্মীরাক্রমণ
আমার সংকল্প। অচিরাৎ তুমি সেনামণ্ডলী মধ্যে এ আদেশ ঘােষণা
কর। ইতােমধ্যে আমি স্বয়ং ছদ্মবেশে একবার কাশ্মীর ভ্রমণ করে
আসবাে।
বিজ। তােমার গমনে প্রয়ােজন ? বরং এ অবসরে আরও কিঞ্চিৎ নুতন
সৈন্য সংগ্রহ কল্পে কাজ হবে। উপস্থিত সৈন্যদের শিক্ষার বিধান ও
সঙ্গত নয় কি? তুমি গেলে আমাকে ও কাজেই যেতে হবে।
পুর। তুমি এখানকার সমস্ত বন্দোবস্তের ভার স্বয়ং গ্রহণ কর। আমার
জন্য চিন্তিত হ’য়ােনা। ছদ্মবেশধারণে পুঞ্জনের নৈপুন্য তােমাৰ
অজ্ঞাত নয়। আমি একাই কাশ্মীরে যাচ্ছি।
{মুরলার প্রবেশ
মুর। তােমাদের পরামর্শ সব শুনেছি, আমি। বাবা, এবার কিন্তু আমায়
| ফেলে যেতে পাবেনা—সঙ্গে নিতে হবে।
রঘু। আমরা যাব, যুদ্ধ কওে, তুই গিয়ে কি কবি মা?
মুর। কেন, যুদ্ধ কবাে।
রঘু। পাগল মেয়ে। মেয়েতে যুদ্ধ করে কখনও ?
সুর। শিখে নিলে পাবােনা? বিজয় দাদা এই যে নূতন করে রান্না
শিখিয়েছেন, তা কত্তে পারিনা, বাবা?
বুঘু। রান্না আর যুদ্ধ সমান? ক্ষেপা মেয়ে !
মুর। তা হবেনা বাবা, সেটা হবেনা। আমি যাব। বিজয় দাদা এ কয় দিন
আমায় শিখিয়ে নিন, দেখবে তখন, আমি তীর ছােড়া, বর্শামারা,
ঘােড়ায়চড়া, অসিধরা,সব শিখে নেবাে।
পুর। আজ হতেই তবে মহলা আরম্ভ হােক না মুরলে ?
মুর। তাই বেশ।
(সকলের প্রস্থান)
৪র্থ দৃশ্য কক্ষ-বারান্দা। রাজা। (পাদ চারণ করিতে করিতে) কে বলে রাজা স্বাধীন ? কে বলে রাজা রাজ্যের সর্বময় কর্তা? প্রভু-ভৃত্য, স্বাধীনতা-অধীনতা,-এর কোনই অর্থ নেই। আমি দেশের প্রভু, আমার ইচ্ছায় দেশ পরি- চালিত,-এ এম ঘুচেছে আমার। লােকমতের দাস আমি,-সে দাসত্বের ভীষণ-খঙ্গে বন্ধুত্ব, এমন কি মনুষ্যত্ব পৰ্য্যন্ত ছেদন কত্তে বাধ্য হয়েছি, আমি! যে রণজিৎকে আমি আমার চির-হিতাকাক্ষী বন্ধু বলে মনে মনে সহস্রবার স্বীকার করি, অন্ধ-বিচারে সে রণজিৎ আমার, কারাগারে লৌহ শৃঙ্খলাবদ্ধ ! প্ৰতীকারের কোন্ উপায় অবলম্বন করেছি ? মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারি না আমি, আপন বিবেক-সম্মত কাৰ্য্য কত্তে ক্ষমতা নেই আমার, আমি আবার প্রভু,—আমি একচ্ছত্র সম্রাট! আমি স্বাধীনতার সর্বোচ্চ-শিখরে সমাসীন! ধিক্। ইচ্ছা হয় এ দণ্ডে এ পুতুল-খেলা পরিত্যাগ করি (পরে) পারি, সব পারি, কিন্তু হয়ত শান্তুি ভঙ্গ হবে,—দেশের মধ্যে একটা ঘাের অশান্তির অনল জ্বলে উঠবে। ( চিন্তা ) মানসীর প্রকেশ। মানসী। (স্বগতঃ) আহা, সেনাপতি দাদার কারাবাসের দিন হতে, বাবার মুখে একটা দিন হাসি দেখতে পাইনি। বাবা যেন কি ভেবে ভেবে আকুল! দাদার নিগ্রহে বাবার বুকে শেল বিদ্ধ হয়েছে। ভাল, তিনি কেন প্রর্তীকার চেষ্টা করেন না ? আর তিনি না করেন, আমিই কেন সে চেষ্টা দেখি না? এতে বাবা ত রুষ্ট হবেন না। আশ্চৰ্য্য, এতদিন এ সহজ কথাটা মনে আসেনি ! দেখবাে, আমিই সে চেষ্টা দেখবো। কিন্তু তাও তাে সহজ নয়। দাদার ক্ষে নির্জন কারাবাস। মা আমায় অবধি তাঁর কাছে যেতে বারণ করেছেন। যা, এ চিন্তা পরে হবে, এখন বাবার সঙ্গে খানিকটা আলাপ করে তাকে অন্যমনস্ক কত্তে হবে। (প্রকাশ্যে ) বাবা, বাবা, তুমি এখানে? আমি যে তােমায় খুজছি বাবা,
মানসী।
রাজা। কে ? মানসী? মা, এখানটা বেশ নির্জন, তাই একটু পায়চারি
কচ্ছি। হট্টগােল যেন ভাল লাগে না, মা।
মান। কই বাবা, আগেত তুমি একটা অমনতর বেড়িয়ে বেড়াতে না।
আমি, না হয়, সেনাপতি দাদা-তােমার সঙ্গে থাকতুম। (স্বগতঃ)
ঈদ, -বাবার মুখখানি কাল হয়ে গেল,-হঠাৎ দাদার প্রসঙ্গ তুলে
ভুল করেছি। (প্রকাশ্যে) বাবা, এ কয় দিন একটীবারও তুমি ত
আমার অন্ত্রখেলা দেখনি। আজ দেখবে বাবা?
রাজা। মা, এ কয়দিন তাের অস্ত্রখেলাও দেখিনি,—গানও শুনতে পাইনি।
একটা গান গাইবি, মা ?
মান। গাইব, কিন্তু কোন্ গানটা গাই, বাবা?
রাজা। কোথা আছ দীন বন্ধো,এইটী গা, না, মা।
মান। এটী পূরবী। ভাল, এটাই গাইব।
(পূরবীর সুর-সাধন)
রাজা। (স্বগতঃ) এই সংসার-মরুভূমে মানসী মাত্র আমার ক্ষুদ্র ছায়াতরু!
আকস্মিক বজ্রতাপে এ তরুটীও আমার ম্লান হয়ে গিয়েছে। কিন্তু
তথাপি স্বভাব-বশে—আমায় স্নেহছায়া দানে কাতর নয়।
গীত।
মান।
কোথা আছ দীন বন্ধো, দীনজনে কর দয়া।
কিসে তরি ভবসিন্ধু, , ভেবে ভয়ে কঁপে কায়া।
পড়েছি হে, যুণীপাকে,
বিড়ম্বনা দেখে বা কে ?
কাতরে ডাকি তােমাকে, আর যাতনা যায়না সওয়া।
জন্ম জন্ম কৰ্ম্ম-ফেরে,
ঘুরি ফিরি বারে বারে
এবার হরি দয়া করে, ঘুচাও ভবে আসা যাওয়া।
মানী। রাণী। (অন্তরাল হইতে। মানসী, দুপুর নেই, সন্ধ্যা নেই, রাগিণী নিয়েই আছিস ! (প্রবেশ) তুই না পদ্মাবতীকে দেখতে যেতেছিলি ? গিয়েছিলি? রাজা। অকারণ মানসীকে তিরস্কার কচ্ছ কেন, রাণি? সে ভগবান্কে ডাকছে, কাজটা কি মন্দ? রাণী। তুমি এখানে আছ, আমি তা জানতুম না। রাজা। আমি এখানে আছি -এটুকু জালে না হয়, মনের ভাবটা মুখে প্রকাশ পেতাে না, এই মাত্র। রাণি, এ কয়দিন তােমার স্বভাবের গুরুতর পরিবর্তন লক্ষ্য কচ্ছি। (ক্ষণপরে) আয় মা, উদ্যানে একটু বেড়িয়ে আসি। (রাজা ও মানসীর প্রস্থান) রাণী। ঈ, আদর কত? ছুড়ীটা ভারি আদা’রে হয়ে দাড়িয়েছে। ওটা আমার দুচক্ষুর শূল! দুর ছাই,—পােড়ার মুখী পদ্মাবতীর খবর নিতে এসে, মিছামিছি রাজার দুটো কথা শুন্লুম! রাজার ভাব যেন এ কয়দিন কেমন কেমন ঠেছে! ফলে—সেদিন, হঠাৎ এতটা বাড়া- বাড়ি করে বােধ হয় ভাল করিনি। কিন্তু প্রতিহিংসার এমন সুন্দর সুযােগ, কেইবা পরিত্যাগ কত্তে পারে? (চিন্তার পর) এক পক্ষে কিন্তু কাজটা খুবই ভাল হয়েছে। আর কেহ না বুঝুক, রণজিৎ তার কারাবাসের প্রকৃত কারণ অবশ্য বুঝতে পেরেছে। আবার যদি চেষ্টা করি, তবে অতটা ফোঁস ফোঁস কত্তে সাহস পাবে না, এবার বিষদাঁত ভেঙ্গে গেছে। উঃ, কত অবমাননা, (ক্ষণ পরে) তবু মন যে বুঝে না! যাক্,-আগে হাতের কাজ নিকেশ করি, তারপর আবার চেষ্টা করূবাে-। ক্ষণপ্রভার ইচ্ছার গতি- রােধ করা কারও সাধ্য নয়। (প্রস্থান)
৫ম দৃশ্য-সরোবর-তীর।
জেলে ও জেলেনীর প্রবেশ।
জেলেনী। দ্যাখ, মিন্সে জালে মাছ পড়েছে,
গীত।
”
জেলেনী। ডুবদে’ মাছটা ধর। (মিন্সে)।
জালের ফাকে গলিয়ে গেলো,
“মাছের চড়া দরু।
জেলে। উহু, উহু, উহু, উহু, লা,
রেতে ধরে সন্নিবাতিক, শিউরে উঠে গা,
জেলেনী। যা, যা, যা,-ন্যাকামী ছাড়,
জলদি জলে পড়,
নইলে, কিলের চোটে হাড় গুড়িয়ে
ছাড়াবে তাের জ্বর।
জেলে। আমায় এত বড় কথা, মনে লেই তাের ডর ?
জেলেনী। কারে দেখা চোখ-রাঙ্গানি,
মাবে এক ঠোকর ।
চলে যাব যেথা সেথা করবােনা তাের ঘর,-
ঐ কথাটী বলিসূনেকো, দোহাই ছুড়ী তোর,
নিচ্ছি মাছের তের খপর।
(জলে ঝাঁপ ও জেলেনীর জালের দড়ি টানিয়া লইয়া প্রস্থান)
(কলসী কক্ষে-নাগরিকাদ্বয়ের প্রবেশ।)
১মা। সম্নেসী ঠাকুরকে দেখেছি, শ্যামা ?
২। ওমা, দেখিনি ? রাজ্যির যত লােক যে সেখানে তেঙ্গে পড়েছে।
এমন সােণার-কার্তিক চেহারা, যে না দেখলে, তার চোখের পাপ-পুণ্যি
রয়ে গেল গাে,চোখের পাপ-পুণ্যি রয়ে গেল।
জেলে
মানসী । ১। সত্যি ভাই, কি তার মুখের গঠন, কি তার গায়ের বরণ। চোখ দুটোত নয়, যেন চন্দ্র-সূর্য্যি ! জ্যান্ত আগুন বেরােয়। ২। এ বয়সে অনেক সন্নেসী দেখেছি লা, কিন্তু এমনটী আর হয়নি। শুনেছি, ঠাকুর নাকি, দিনরাত নির্জলা উপােস করেন,—কিছুই মুখে তােলেন না। (৩য়া নাগরিকার প্রবেশ) ৩য়া। কার কথা হচ্ছে লা? কিসের কথা ? ২য়া। সন্নেসী ঠাকুরের লা, সন্নেসী ঠাকুরের। সম্নেসী ত নয়, যেন ঠিক রাজপুত্তর। ৩া। কি জানি বােন্ শুনেছি, কত চোর-জালিয়াত, কত জেলভাঙ্গা-কয়েদী ভরং ধরে এ দিনে সম্নেসী সাজে! তাই ওসবে তেমন পেত্যয় নেই। ১মা। ওকথা মুখে আনিনে , মুখে আনিনে। জিভ, শুদ্ধ পচে ধসে খসে পড়বে। শুনেছি, এ সন্নেসীর পায়ের ধূলা মাথায় করে, কত মরা মানুষ বেঁচে গেছে। এ সহজ সন্নেসী নয়। (৪র্থা নাগরিকার প্রবেশ ) ৪র্থা। অই যে কথায় বলে,- ‘কেবা রাং কেবা সােণা, বাহির দেখে যায় না জানা,'—এ ও হয়েছে তাই। ৩য় । কথাটা কিলা বিধু? ৪র্থা। আমি কিন্তু আগ হতেই বলে আসছি,—যে, যা-ই বলুক, লােকটা এ, মন্দ নয়। তা আমার কথা কেই বা শশানে, কেই বা দেখে ? ওয়া। কি বলছিস, বুঝিয়ে বলনা ভাই। কার কথা কি শুনে এসেছি। ৪র্থ। ওলল, শােনা কথা দিয়ে ঢাকে কাঠি পেটা’—আমার অভ্যেস নয়, ওসব তােদের কাজ। চিলে কাণ নিয়েছে শুনে, ঘরে ঘরে পরের কিচ্ছে রটান,-তােরাই ভাল জানি। ওয়া। মম্ কুন্দলে মাগী,খালি খালি গালি দিচ্ছি যে ? আমরা পরের ‘কিচ্ছে’ ঘরে ঘরে রটিয়ে বেড়াই, -আর উনি হচ্ছেন সতীর মা পার্বতী,—কি ঘেন্না, কি ঘেন্না, ৪র্থা। হা লা চোখ-ধাগী, পােড়া-মুখী, তুই আমাকে কুলে বলে গালি দেবার কেলা? ডাইনি, রাক্ষুসী, আমি তাের খাই, না, তাের পরি লা? ম ম বলবার তুই কে?
মানসী। ৩। ওলাে নাকি-সুরে-পেত্নী, অল্পেয়ে, হতচ্ছাড়ী, ৪র্থা। তুই খাদা-নাকী, হ্যাদা-পেট,-ভাতার বাগী,-ধেড়ে বুড়ী, ৩। তুই কুল নাশী, ৪র্থা। তুই মাদী খাসি, ৩। দূ বিদ খুটে-কুলােমুখী, আমি ধেড়েবুড়ী, আর উনি কচি ছুড়ী ! আনাড়ী, লক্ষ্মীছাড়ী, ৪র্ষা। মাবাে মুখে মুডাের বাড়ি ! নচ্ছারি, এই-মুখে লাথি মারি, ম, ম, ম- ( অঙ্গভঙ্গী) ১মা। থামলাে থাম্ তােরা,অবাক্ কল্লি যে। ৪র্থ।, দ্যাখ তত গা,-গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধাতে এলে ? ম পােড়াকপালী, কথা বললুম আমি বুৰু লিনে তুই, গালি দিবি কেন লা ?- ৩। দু-দুবার সইলুম, শ্যামা, আবার ভূতঝাড়া আরম্ভ করূবাে, বলছি- ১মা। চুপ, চুপ, বােন্হ, বিধু, তুই কেবলই একমনে বলে যাচ্ছিলি কিনা, আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। ঝগড়ায় কাজ নেই, বল দেখি, কি বলছিলি-কাকে তুই ভাল বলতিস্? ৪র্থা। হ,—কি কথা হচ্ছিল ? দ্যাখ, দেখি বােন্, মাগী মাথাটা বিগড়িয়ে দিলে, ৩য়া। আবার ? ২। তুই থাম্ বােন্। ১মা। বলছিলি, মানুষের বাহির ভেতর চেনা দায়। ৪র্থা। হাঁ গা, হাঁ। এই দ্যাখনা, সন্নেসী ঠাকুর কারুর সঙ্গে কথা কন্ না, কিন্তু বাঞ্ছারাম, যাকে সবাই পাগল বলে,-তার সঙ্গে ঠাকুরের কত অন্তরঙ্গ । ২য়া। সে কিলা ? বা কি করেছে ? ৪র্থা। সব কি জানা যায়? তবে এই দুপুর বেলায় ঠাকুর গােপনে বাহার সঙ্গে কত নাকি আলাপ কল্লেন। হয়ত পদ্মদিদির জন্য কোনও ওযুদ-পত্তরই বা দিয়ে থাকবেন। ১মা। তা, দি লা দি। পদ্মদিদি সতী-লক্ষ্মী। পতির দুঃখে প্রাণ দিতে বসেছে। ৩। “ গা, পদ্মদিদির ব্যানাে নাকি, দিন দিন বেড়ে চলছে ? ইয়া। আজ তাকে দেখতে যেতে পারিনি লা, কাজের ঝঞ্চটে ছিলুম। কাল যাব ভাবছি। ১। ওলাে, অই সুর্য্যি-ঠাকুর ডুবু ডু, এই বেলা চল, জল নিয়ে বাড়ী যাই। পটক্ষেপণ) তৃতীয় অঙ্ক। ১ম দৃশ্য-কক্ষ। (পদ্মাবতী শায়িতা, বাঞ্ছারাম নিকটে উপবিষ্ট, ঔষধ হস্তে চামেলী) চামে। এখনই এ ওযুদ-টুকু খাওয়াতে হবে গাে। বাছা। সময় হয়েছে? দাও দেখি। (গ্রহণ) মা, এ ওযুদ-টুকু খাও দেখি, এখন। চামে। (স্বগতঃ) এ টুকু গিলে ফেল্লেই আমার কাজ শেষ হয়। বাঞ্ছা। মা, ঘুমুচ্ছ ? ওষুদটুকু খেতে হবে, মা। পদ্ম। আঁ—ওষুদ ? আর কেন? আর ওষুদ কেন,বাঞ্ছারাম? আমার গণার দিন যে,-ফুরিয়ে এসেছে। ওষুদে আরকি ফল হবে ? যাই বাঞ্ছারাম,-বড় দুঃখ রইলাে,—যাবার সময়—তার দেখা পেলুম না। বাঙ্গা। ও কথা, বলিস্ নে মা, বুক যে ফেটে যেতে চায়। বাপ, মা, ভাই- বােন্,-ছার সংসারের কোনও ধার ধাতাে না, বাঞ্ছা। তাকে তুই শক্ত মায়া-ডােরে বেঁধেছি। সে ডাের কি করে ছিড়ে যাবি মা? তা হবে না। এখন ওযুদ-টুকু মুখে নাও, চিন্তা নেই, বােগ সেরে যাবে। পদ্ম। বাঞ্ছা, একি আমার—সাবার লােগ ? ওষুদে এ রােগের উপশম হবে কেন? তাতে বরং—যাতনা বাড়ে। বাবা, তুই আমাকে, যে যত্ন—যে শুশ্রুষা-কল্পি,—ছেলে মায়ের জন্য,-বাপ মেয়ের জন্য,বুঝি তেমন করে না। তাের ঋণ—এ জন্মে—শােধ হলােনা। যদি তাের—সব কথা,-তাকে বলে যেতেও-পাতুম! বাছা, একটাবার—জন্মের শােধ,—একটাবার-শুধু চোখের দেখা, -তিলেকের তরে, চোখের দেখা হয় না? এসময়ে,তাকে দেখতে গেলে, হেসে হেসে,মত্তে পাত্তম। কোনও দুঃখ থাকতাে না। তাঁর পায়ে মাথা রেখে মরা- সে তাে-সুখের মরা। কিন্তু আমি অভাগিনী,সে সৌভাগ্য—হবে কেন?
মানসী। বাল। এত নিরাশ হচ্ছিস কেন মা? এখন ওষুদটুকু খা দেখৰি অনেকটা সােয়াস্তি পাবি। পদ্মা। তাের এত ইচ্ছা—যদি,-মুখে ঢেলে দে,—কিন্তু, দেখবি,—ওষুদ পেটে গেলেই,—জ্বালা বেড়ে উঠবে। পিপাসা বাড়বে। বাঞ্ছা। ও তাের মনের ভুল। খা, মা,-(ওষুদ প্রদান ) মা, শ্মশানে এক সম্নেসী এসেছেন, তাঁকে পায়ে ধরে স্বীকার করিয়েছি, আজ এখানে পদধূলি দেবেন। তিনি দেখে গেলে, আপনি তখন রােগ সেরে যাবে। পদ্মা। বাপ, সন্নেসীর ধুলাে,তার সঙ্গে, আমার প্রাণের দেবতার- পায়ের ধূলাের যােগাড় কর । সে পা যে,—আমার গয়া-গঙ্গা বারাণসী। আর যেরে—সে পাম্নের ধূলাে,-এ জন্মে—মাথায় কত্তে -পাবােন৷। উঃ বড় জ্বালা—পিপাসা-বাড়লো । প্রাণ যেন বেরিয়ে—যেতে চাচ্ছে। ( ছটফট করা ) চামে। (স্বগতঃ) কাজ নিকেশের দেরী নেই। এই বেলা সরে পড়ি। সবটুকু শেষ করেছি। পাগলটা এ দুদিন, দুপুরে বাড়ী থাক্তাে না, তাতেই অনেকটা সুবিধে হয়েছিল। যাক, এই বেলা হার-ছড়া বুকে নি’গে। আর পরের মজুরি কত্তে হবে না। ( প্রস্থান) বাঞ্ছা। সত্যি যে মার অস্থিরতা বাড়লো ! হায় সাধ্বী-সতি, তােমার এ বিড়ম্বনা কেন?—যে অবস্থা, তাতে ক’দিন এ ভাবে কাটবে ? একি, মা যে এলিয়ে পড়ছেন! ( মানসীর প্রবেশ ) মান। দিদির অবস্থা আজ কেমন, বাহারাম ? দিদি, দিদি- পদ্ম। অ্যাকে ?—কে--মানসী - আয় বােন্, কাছে আয়। যে—সইতে পারিনা। বড়-আলা— বােন্, শেষ দেখা—আর —হলােনা। মানসী, চল্লম,-তুই দেখি, আমার--অভাবে, যেন, তার কষ্ট না হয়। আর যখন--এসে, অভাগিনীর-কথা, জিজ্ঞেস করেন, বলি--তাঁর চরণ-দাসী,—তারই চরণ—ভাবতে ভাবতে, --কোন্ অজানা দেশেরওনা হলাে। বড় কষ্ট-শেষ দেখা হলােনা। উঃ, তৃষ্ণা--জল- ( বাঞ্ছারামের জল দান) মানসী। : ৫৭ মান। দিদি অমন করােনা। আমি যে কোনও উপায়ে, শীঘ্রই তার সঙ্গে দেখা করূবাে। তঁাকে সব বলবাে। ত্বরায় একটা সুব্যবস্থা পদ্মা। ত্বরায়? -বােন্,--আমার নৌকা-যে, ঘাটে বাঁধা, দেরী সয়না। উঃ, পিপাসা, জল - (জল-দান) মানসী,-বড় সাধে, বড় আশায় বুক বেঁধে আমি—পূজার নৈবেদ্য সাজাতেছিলুম-আশা না পুরুতে চলে যেতে হলাে। ( যন্ত্রণা-প্রকাশ) মান। বাঞ্ছারাম, দিদির অবস্থা আজ একটু খারাপ, সাবধানে থেকো। আমি রেতে না আসতে পারি, কাল প্রাতে আবার আবাে। (স্বগতঃ) যে কোনও উপাঙ্গে দাদাকে এনে দেখাতে হবে, অবস্থা সঙ্কটজনক। হয় বিধাতঃ, সতীর অদৃষ্টে এতকষ্ট । { প্রস্থান) (পদ্মাবতীর অস্থিরতার অত্যন্ত বৃদ্ধি) বাঞ্ছা! মা, একি কচ্ছি, মা, একটু ঘুমুতে পালে বেশ হতাে ! তুই ঘুমাে, আমি বাতাস করি। পদ্ম। বাপ, এই—ঘুমুচ্ছি—এ ঘুমই—আমার—বুঝি-কাল-ঘুম। স্বামি ( মূচ্ছ। বাঞ্ছা'। হা ভগব, পাগলের শেষ-বন্ধন সত্যি কি হে ছিন্ন কবে? হায় হায়—ঘন ঘন শ্বাস বইছে! ওগাে-কি হবে, মুখ দিয়ে যে ফেন উঠছে! উপায় ?-এনে কে আছে ? (সন্ন্যাসীর প্রবেশ ) সন্ন্যা। হর হর বহর হর বম্। স্থা। বাবা, এসেছেন? আসুন, আসুন,দেখুন স্বর্ণলতা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। বাঞ্ছারামের সকল আশার শেষ হতে চল্লো। ঠাকুর, যদি দয়া করে এসেছেন,—নিকটে আসুন। দেখুন, মা আমার বুঝি সকল মায়া কাটাতে বসেছে। (সন্ন্যাসীর দেহ পৰ্যবেক্ষণ) সন্ন্যা! (স্বগতঃ) আশ্চৰ্য্য! সম্পূর্ণ বিষ-লক্ষণ ! সেঁকো বিষের ধীর-ক্রিয়া। কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। (নাড়ীধারণ) —। = মানসী || বাবা, কি দেখছেন? এ অসময়ে আপনার আগমন,--বিধাতার অপার করুণার নিদর্শন। ঠাকুর পায়ে পড়ি, মাকে আমার রক্ষা করুন। (পদধারণ) সন্ন্যা। (বাঞ্ছাকে উঠাইয়া) বাঞ্ছারাম, শুনেছি, তুমি মায়াবন্ধন চ্ছেদন করে সংসার ত্যাগ করেছিলে,-তবু তােমার এত অধীরতা ? বাঙ্গা। ঠাকুর, মায়ামমতার ধার বাঞ্ছা একবার কাটিয়ে ফেলেছিল। যেখানে সেখানে দু’মুষ্টি ভােজন,-গাছ তলায় শয়ন, বাঞ্ছা পাগল অনেক দিন অভ্যেস করেছিল? কিন্তু এখানে এসে পাগল বাঁধা পড়েছিল। কি যে আকর্ষণ, বুঝে উঠতে পারে নি। ঠাকুর, এ স্বর্গীয়-সেহ হ'তে বাঙ্গা কি চির বঞ্চিত হবে ? সন্ন্যা। অদৃষ্ট! ভাল, আমি তােমাকে যা জিজ্ঞেস কবে, তার সরল উত্তর দেবে কি ? কোনও কথা গোপনে না রেখে, সব বলতে সম্মত আছ ? বাহু। জিজ্ঞেস্ করুন, যা জানি, সব অপকটে বলবাে। সন্ন্যা। উত্তম। তুমি পূৰ্ব্বে বলেছিলে, রণজিতের কারাবাসের পর হতে এর ব্যারামের উৎপত্তি। কি রােগ হয়েছিল, বলতে পার? বা। রােগ প্রথমে তেমন বিশেষ একটা ছিল না। দুর্বলতা ছিল, অনাহার-হেতু দুর্বলতা। সন্ন্যা। ঔষধ ব্যবস্থা কে করে ? বাঞ্ছা। পারিবারিক বিশ্বস্ত-বৈস্ত মুরারী গুপ্ত। সন্ন্যা। ঔষধ সেবন করতি কে? তুমি স্বয়ং। বাঞ্ছা। আমি--কোনও সময়ে বা চামেলী । সন্ন্যা। চামেলী কে? এ পরিবারের পুরাতন পরিচারিকা? বান্ধা। পুরাতন নয়,নূতন। পুরাতন পরিচারিকা স্থানান্তরে যেতে বাধ্য হয়, তারই বদলে চামেলী আসে। স্যা। চামেলীকে দেখতে পাই ?--সে এখানে কতদিন কাজ কচ্ছে ? বা। প্রায় এক মাস। সন্ন্যা। রােগের বৃদ্ধি, কতদিন লক্ষ্য কচ্ছ ? বাঞ্ছা। এই-সপ্তাহ দুই হতেই বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে। আপনি চামেলীকে মানসী। দেখতে চান্ ? সে যে এখানেই ছিল,-- একটু খানি আসে, এই যে সে ওষুদ দিয়েছে। - সন্ন্যা। বােধ হয়, আর তাকে খুঁজে পাবে না। যাক,--তুমি আমার উপর সম্পূর্ণ আস্থা-স্থাপন কত্তে পার ? আমার যে কোনও ব্যবস্থা, যতই অদ্ভুত হাে--তুমি নিঃসন্দেহে গ্রহণ করতে সম্মত--কি ? বা। মায়ের মঙ্গলের জন্য, আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই কত্তে সম্মত। আপনার ব্যবস্থা অসংকোচে গ্রহণ কল্বাে। সন্ন্যা। উত্তম। একে এখনই গােপনে স্থানান্তরিত কত্তে হবে।- কেউ জানবে না। আজ রাত্রি-বােগে আমি এ রাজ্য ত্যাগ কচ্ছি। ইনি আমার মা.তুমি একে আমার সঙ্গে প্রেরণের বন্দোবস্ত, এখনি কর। কাল তুমিও আমাদের সঙ্গে মিলিত হবে। বাঞ্ছা। এখনই—এমুহূর্তে আমি এ স্থান ত্যাগ কত্তে পারি। আমার এখানে থাকার কোনই প্রয়ােজন নেই। সন্ন্যা। প্রয়ােজন আছে। রাজ্যবাসী আপাততঃ জানুক, পদ্মবতী প্রাণ ত্যাগ করেছেন। নইলে একে নিরাপদ স্থানান্তরিত করাও, সহজ হতে পারে। শুধু সেনাপতিকে যে কোনও উপায়ে গােপনে কাল জানিয়ে যাবে,--স্বাধীনতা প্রাপ্তি মাত্র, তিনি যেন, কাশ্মীরের উত্তর সীমাস্থিত ভৈরব দুর্গে গমন করেন। সেখানে তার অভীষ্ট সিদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সাবধান, এ কথা যেন দ্বিতীয় ব্যক্তির কর্ণগােচর না হয়। সবই অতি গােপনে করা চাই। বাঞ্ছা। ঠাকুর, সহজে সেনাপতির দর্শন-লাভ, আমার পক্ষে অসম্ভব। সন্ন্যা। দর্শন না পাও,-অগত্যা প্রথম আদেশ পালন করে আমাদের সঙ্গে কাল তুমি মিলিত হবে। পরের ব্যবস্থা পরে হবে। পদ্মাবতীর প্রাণবিয়ােগ হয়েছে, এ সংবাদ এখনি রাষ্ট্র করে, তাকে শ্মশানে নেবার ব্যবস্থা কর। সঙ্গে খুব বিশ্বাসী অতি অল্প লােক থাকবে। সেখানে গােপনে তুমি একে আমার হস্তে অর্পণ করূবে। কৌশলে সব কাজ কত্তে হবে। বুঝলে ? বা। কাল কোথায় ঠাকুরের চরণ-দর্শন হবে ? সন্ন্যা। পরে জাবে, তখন। রাত্রি তৃতীয়-প্রহরে শ্মশান-ক্ষেত্র, আমাদের মিলন-স্থান। এক্ষণে চল্পম,-দেখ সাবধান, তােমার কৌশল- চতুরতার উপর এর জীবন নির্ভর করছে। আরও শােন, এ ঔষধ কখনও আর প্রয়ােগ করােনা। এটা বিষবৎ পরিত্যাজ্য। ( প্রস্থান) 4 ২য দৃশ্য - কক্ষ (রাণ ও চামেলীর প্রবেশ ) রাণী। কি বললি? দফা শেষ? সত্যি বলছি ? চামে। চামেলীর কথনও কাজে ভুল হয়? যেমনটী বলেছিলেন, ঠিক তেমনটী করেছিলুম। কাজ নিকেশ। রাণী। দাড়া,-তুই আপন চোখে দেখেছি,-শেষ নিঃশ্বেস বন্ধ হয়েছে ? চামে। মাগী ছটফট, কত্তে লাগলাে, চোখ দুটো কপালে উঠলাে,-মুখ দিয়ে ‘গেজেল ছাড়তে লাগলাে, তার পর ঠাণ্ডা ! আমি নিজে দেখে এলুম রাণী। চুপ চুপ- এই নে, তাের পুরস্কার। (হরিদান)। কিন্তু খুব সাব- ধান, দেখিস্ যেন এ সব কথা মশা-মাছিতেও জানতে না পায়। যা এদিক দিয়ে বেরাে’য়ে যা,—আর কখনও এ মুখখা হনে। চামে। তবে প্রণাম হই গো । (প্রণাম ও স্বগতঃ) আর দেখা কত্তে বারণ কচ্ছৈ। তবে কি এ নকল-হার দিয়ে ঠকিয়ে দিচ্ছে? সেড়া দেখাব, -হকের ধন-উপরি দেওয়া নয় তো! যাই দেখিগে। ( প্রস্থান) রাণী। রূণজিৎ, আমার অভিনব-নাটকের এক অঙ্কের অভিনয় শেষ হলাে। এখন নুতন দৃশ্য অভিনীত হবে। অই কার পদশব্দ হচ্ছে না? ( রাজার প্রবেশ ) রাজা। রাণি, তোমাকে খুঁজছি। রাণী। কেন নাথ ? রাজা। বিশেষ কথা আছে। রাণী। কি সে কথা, নাথ ? এ কয় দিন তুমি নিশিদিন কি ভাবছাে ? এত চিন্তা কিসের তােমার ? রাজা। চিন্তা ? চিন্তা রাণি ? যে দিন আপন বিবেক-বুদ্ধি পায়ে দলে নীরবে, অবিচারের প্রশ্রয়-দান করেছি, সে দিন হতেই পাপকীট চিন্তামূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করে হৃদয়-কেন্দ্রে প্রবিষ্ট হয়েছে। সেদিন হতেই পাপের জ্বালায় দিনরাত জ্বলে মরছি।
মানী। রাণী । কিসের অবিচার, কিসের পাগ, প্রিয়তম ? তুমি পরম পুণ্যশীল,-- দেব-চরিত্র। তােমাকে পাপগ্রস্ত হতে হবে কেন ? রাজা। পুণ্যশীল,--দেব-চরিত্র ? ছি-ছি রাণি, যে কাপুরুষ বৃথা লােকাপ- বাদ ভয়ে ভীত হয়ে হৃদয়-জাত স্নেহ-দয়া-বাৎসল্য, এমন কি আপন বিবেক-বুদ্ধি, অম্লানবদনে, অতলজলে বিসর্জন দিতে পারে ;-- যে লঘু-চেতা,--নরাধম,--অকৃত্রিম সৌহার্দ্য, অনন্য-সুলভ-প্রভুভক্তি, দীর্ঘকালের হিতাকাঙ্ক্ষা,-- এ সমস্তের পরিবর্তে, বিশ্বস্ত-বন্ধুর কারাবাসের ব্যবস্থা, অসংকোচে অনুমােদন কত্তে পারে, সে পুণ্যশীল,- ঘাের নারকী? সে দেব-চরিত্র, না পিশাচ-প্রকৃতি? রাজ্ঞি, আমি সেনাপতির ব্যাপারে সে দিন যে চিত্ত-দৌৰ্ব্বল্যের পরিচয় দিয়েছি, নিতান্ত অল্পমতি-বালকে ও বুঝি তেমন করেনা। আমি আজ সে মহাপাপের গুরুদণ্ড ভোেগ কচ্ছি। রাণী । প্রাণবল্লভ, এ সম্বন্ধে তর্ক করা বৃথা। কাজটা ন্যায়সঙ্গত না হলে, সকলে নীরবে এ ব্যবস্থা গ্রহণ কত্তো না। বিজ্ঞ মন্ত্রী, বহুদর্শী রাভ-পুরােহিতের ব্যবস্থা, অসমীচীন, এ কথা তােমার মুখে সাজেনা। রাজা। রাণি, আমি বুঝি বুদ্ধি-ভ্রষ্ট হব। একটু নির্জনতা আকাঙ্ক্ষা করি। রাণী (স্বগতঃ) ঘাের চিত্ত-দুৰ্বলতা (প্রস্থান) রাজা। উঃ, আজ কত দিন গত হতে চললাে,- (চিন্তা) (মানসীর প্রবেশ) মান। বাবা, তুমি এখানে? একটা কথা আছে, বাবা। রাজা। মানসী ? আয় মা । মান। বাবা, তােমার এ ভাবনার শেষ কর। তােমার মুখ দেখে যে আমার কষ্ট হয়, বাবা ? রাজা। হাঁ, মা, ভাবনার শেষ কত্তে হবে। শক্ত করে একদিক ধতে হবে। নইলে আর উপায় নেই। তুই কি কথা বলছিলি, মা- মান। আমার একটা কথা আছে। রাজা। কি তাের কথা মা? কি সে কথা ? মান। আমি একবার কারাগারে সেনাপতি দাদার সঙ্গে দেখা কবাে। শীঘ্রই দেখা করূবাে। তােমাকে তার অনুমতি দিতে হবে।
মানী।
রাজা। অনুমতির প্রয়ােজন ? তুই কি মধ্যে মধ্যে তার কাছে যানে ?
মান। কি করে যাব, বাবা ? উপায় নেই যে !
রাজা। উপায় নেই, সে কি কথা মা ?
মান। তার য়ে নির্জন কারাবাস। কারও দেখা কবার হুকুম নেই।
রাজা। নির্জন কারাবাস ?--আমি ত ততটা ভাবি নি। লজ্জা, ক্ষোভ,
ঘৃণায়, এ সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত কারও সঙ্গে আলাপ পর্যন্ত করিনি! ভয়,
সংকোচে, নিজে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ পৰ্য্যন্ত কত্তে সাহসী হই নি।
সে এ দীর্ঘকাল তবে তাের মুখ অবধি দেখতে পায়নি ?-- কি
নিৰ্যাতন, কি নৃশংসতা !
মান। হাঁ বাবা, ভয়ঙ্কর নির্যাতন--তার কত যন্ত্রণা হচ্ছে, ভেবে দেখ তাে,
বাবা।
এ কয়দিন ভেবে ভেবেই সারা হচ্ছি। আর পারিনে, মা। এ
সকলেরই জন্য, আমিই সম্পূর্ণ অপরাধী।
মান। তােমার দোষ কি বাবা? যাক্, আমি তবে দেখা করব,--আজই,
এখনই দেখা কবাে।
রাজা। এখনই ?—এই রেতের বেলায় ?
মান। পদ্মদিদির অবস্থা বড়ই সঙ্কট জনক বাবা, আজই দেখা করা চাই।
কিন্তু তােমার মােহরাঙ্কিত আদেশ-পত্র সঙ্গে নিতে হবে। নৈলে,
গােল হতে পারে।
রাজা। সেজন্য চিন্তা নেই। আয় মা, সব বন্দেবস্ত আমি নিজেই করে
রাজা।
( প্রস্থান)
৩য় দৃশ্য—কারাগার।
(শৃঙ্খলাবদ্ধ রণজিৎ)
( দ্বারে প্রহরীদ্বয় পাহারায় নিযুক্ত) (একজনের তন্দ্রাবস্থা )
১ম প্র। ওরে মাধ,-তুই একটা গাধা! ঘুমুচ্ছি যে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
ঘুমানাে, গাধা-ঘােড়র কাজ।
২য় প্র। ওরে রামা, তুই একটা পেচক। রাত জেগে শীকারের সন্ধানে
আছি। রেতে জাগা, পেচক-বাদুড়ের কাজ।
১ম প্ৰ। মাধা-গাধা;—বেশ খাপ খায়। রামা পেচক--এটা কেমন ঠেকে।
হয় । যেমনই ঠেকুক, আঁতে ঘা লেগেছে তাে? পেচক রেতের বেলায়
শীকার খুঁজে, তুই ও তাই।
১ম প্ৰ। দূর অহম্মুখ! এখানে এ দুপুর রেতে শীকার মেলে? সত্যি ভাই,
এ কয়দিন পাহারায় পড়ে, নাড়ীশুদ্ধ শুকিয়ে উঠবার যােগাড় হলাে।
অই দ্যাখ, কে আছে
( মানসীর প্রবেশ)
মান। প্রহরি, সেনাপতি-দাদার সঙ্গে সাক্ষাৎ কবে।
১ম প্ৰ। কে গা, মানসী ঠাকরুণ? , তেমন হুকুম নেই যে।
মান। এই দেখ হুকুম,-বাবার হুকুম ।
১ম প্র। সই-মােহর করা?
২য় প্র। আরে তা নইলে, উনি কি ফটক পার হয়ে আসতে পাত্তেন ? তাের
সকল কাজেই বাড়াবাড়ি-
১ম প্র। কি জানিস্ মাধ, সাবধানের বিনেশ নেই। তা হলে কাজেই
দোর খুলে দিতে হয়।
(জার উন্মােচন)
(মানসীর কারাগৃহে প্রবেশ),
আঁন। সেনাপতি-দাদা, জেগে আছ?—দাদা-
রণ। কে-কে তুমি ?
মান। আমি—মানসী।
৬০ মানসী। রণ। মানসী! বােন্, তুই? তুই এখানে কেন ?-নন্দনের পবিত্র পারি- জাত, নরকের এ পূতিগন্ধ-কলুষিত বাতাসে কেন ? মা বােন্, হুরায় ফিরে যা। মান। আমি যে তােমায় নিতে এসেছি। কোথায় ? মাম। তােমারই ঘরে। ঘরের প্রবর অনেক দিন পাই নি। সে যেন এক যুগ ! আমার পরী কুশলে আছে, মানসী ? হা-অদৃষ্ট! মান। ধরে চল, দাদা। রণ। কই, আমি ত এ পর্যন্ত সেরূপ আদেশ পাই নি। মান। তা, নয়, আমি তােমায় মুক্ত করে নে’ যার। পুর। তা ও কি হয়, দিদি ? স্বেচ্ছায় রণজিৎ গৌরব-অসি পরিত্যাগ করে কঠোর লৌহ-শৃঙ্খল হাতে পরেছে,-স্বেচ্ছায় সুখের স্বর্ণ পরিত্যাগ করে এ জঘন্য নরকবাসে স্বীকৃত হয়েছে, কেবল রাজার মর্যাদা রক্ষার জন্য। আর আজ সে পলায়ন কবে ? ছি, দিদি, ও কথা মুখে আনি নে। মান। দাদা, বাবা তােমার জন্য ভেবে ভেবে কি হয়ে গেছেন, তা যদি একবার দেখতে, চোখের জল আপনি ঝরে পড়তে! বাবা এ কাৰ্যে কষ্ট হবেন না, এটা নিশ্চয়। রণ। প্রকাশ্যভাবে রণজিৎ রাজাজ্ঞায় কারারুদ্ধ, গােপনে সে কারাগার ত্যাগ কৰ্ব্বে, মানসি ? মান। দাদা, পদ্মদিদির শরীর ভাল নেই। তিনি তােমায় দেখতে ব্যাকুল হয়েছেন। পদ্মাবতী-মানসি, ধৰ্ম্ম-রা কত্তে বন্দিত্ব স্বীকার করেছি। শেষ অবধি ধৰ্ম্ম রক্ষা করূবাে। মান। অন্তত দুদণ্ডের জন্য , চল, দাদা। প্রহরীদের জন্য চিন্তা নেই। এ লক্ষ মুদ্রার হার তাদের ডায়াসে নীরব কবে। সে জন্যই এটা আজ গলায় করে এসেছি। তুমি আজ না গেলে, পদ্মদিদি অধীরা হয়ে পড়বেন।
মানদী'। ৬৫ যেতে পারি না, দেখব ধর্মের বিচারই দেখব, মানসী রাজাদেশ ভিন্ন রণজিতের কারাগৃহ ত্যাগ অসম্ভব। এতে অদৃষ্টে যা আছে, তাই ঘটবে। মান। তবে যাবেনা ? ভাল, অচিরে প্রকাশ্য রাজাজ্ঞা যে কোনও রূপে সংগ্রহ করেই, তবে তােমায় নিতে আবাে। এখন তবে যাই, দাদা। ( যাইতে যাইতে স্বগতঃ ) কৰ্তব্যতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি। ( প্রস্থান ) : ২য় প্ৰ। দরজায় কুলুপ বন কর, রামা। একটু তুই-জেগে থাক্, ভাই, আমি একটু দাড়িয়ে ঘুমুই । ১ম প্ৰ। সাধে বলি, মাধা-গাধা। দাড়িয়ে ঘুম ! কারাধ্যক্ষ ও রাণীর প্রবেশ । করা। প্রহরীদ্বয়, কিছু সময়ের জন্য তােমরা ফটকে গিয়ে অপেক্ষা কর। রাজকীয় বিশেষ প্রয়ােজনে, স্বয়ং রাণী-মা বন্দীর সঙ্গে দেখা কবেন। ততক্ষণ আমি নিজেই এখানে উপস্থিত থাকবে। ১ম প্র'। যে আজ্ঞে হুজুর । ( উভয়ের প্রস্থান ) রাণী। কারাধ্যক্ষ, তােমার ব্যবস্থায় বড় সন্তুষ্ট হর্মেছি। প্রতিশ্রুত পুরস্কার দ্বিগুণিত হলাে। তবে আমার ইচ্ছা,--বীর সঙ্গে আমার কথােপকথন দ্বিতীয় ব্যক্তির কর্ণ-গােচর মা হয়। তুমি একটু অন্তরালে অপেক্ষা কর,আমি রুদ্ধ-কক্ষে কর্তব্য সম্পন্ন করবে। কারা। রাণীজির আদেশ শিরােধার্য। রাণী। চাবি দাও—( গ্রহণ) যেতে পার— ( কারাধ্যক্ষের প্রস্থান) পদ্মাবতী বেঁচে নেই, এটুকু আগে জান্ত দিতে হবে। অভাব পূরণ, -মনের স্বভাব। কিন্তু রণজিৎ, এবার সাবধান, আবারও যদি অবমাননা কর,তা হলে, তা হলে রণজিৎ, তােমার শিরায় শিরায় এমন বিষের আগুন জ্বলবে, যা পিশাচেরও কল্পনাতীত। ( দ্বার উন্মােচন ও প্রবেশ ) রণ। আবার, কে তুমি ? রাণী। আমি ক্ষণপ্রভা, রণজিৎ। ক্ষণ প্রভা,-রাণী ! আপনি এখানে? পুর্ণ।
মানসী। রাণী। বিস্মিত হ'য়ােনা রণজিৎ, তােমার বিপদে আমি স্থির থাকতে পারি নি, তাই এ অসময়ে এসেছি। রণ। বিপদ ? আমার আর বেশী বিপদ কি হতে পারে, রাজ্ঞি ? বিপদ- সাগরে আমি যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। রাণী। পদ্মবতী বেঁচে নেই, সেনাপতি। রণ। অসম্ভধ-মিথ্যা কথা। রাণী। কাশ্মীরের রাণী মিথ্যা কথা জানে না। রণ। ধরা ধৰ্ম্ম-শূন্যা হয়েছে, এ বিশ্বাস করি না। পাপ-পুণ্য,--এ কি তবে কবির কল্পনা ? রাণী। ধরা ধৰ্ম্ম-শূন্যা কৈম হবে, রণজিৎ ? পদ্মাবতী গিয়েছে, কিন্তু ক্ষণপ্রভা তােমার চরণ সেবার জন্য এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ছি-ছি, রাণি, আবার ? আবার সেই উৎকট গরললাগার ? দূর হও, তােমার মুখ দর্শনেও পাপ আছে। রাণী। রণজিৎ, এত নিদয় হ’য়ােনা। অপবাদ, গঞ্জমা, তুচ্ছ করে, হেলায় রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য পায়ে ঠেলে, আজ আমি তােমার প্রেম-ভিখারিণী । একদিন উপেক্ষা করেছিলে, তা ও ভুলে গিয়ে,লজ্জা, সরম, মান, অপমাম—সব বিসর্জন দিয়ে, উপেক্ষিতা রমণী আবার তােমারই চরণ-তলে উপস্থিত! এবার তারে বিমুখ করােনা, নিরাশার তীক্ষ্ণ শেল বুকে বিঁধিয়ােনা। তােমার চরণ-ধরে বিনয় করে, বলছি, আমাকে দয়া কর, প্রাণে বাঁচাও ( চরণধারণে উদ্যত ) ছি-ছি-ছি—কি ঘৃণা, কি ঘৃণা,--কর্ণ বধির হও। পাপিয়সি, মধ্যাহ্ন মাৰ্ত্তণ্ড-প্রভা-সমন্বিত, উত্তঙ্গ-গিরিশৃঙ্গের শীর্ষ-ভাগে সমাসীনা হয়ে তুমি,ভীষণ-তমসাচ্ছন্ন, অতল-পাতাল-প্রদেশের নিম্নতম- গরে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিতে উদ্যতা? তুমি মানবী, না পিশাচী ? ছি---ছি-ছি---ছি—দুলােকের দেবী-প্রতিমা-জ্ঞানে কাশ্মীরবাসী কি এতদিন প্রেতপুরীর প্রেতিনী-পূজায় নিযুক্ত ছিল? দ্যুতিময় মধ্যমণি-পরিশােভিত হেম-হার জ্ঞানে কাশ্মীররাজ কি এতদিন প্রাণঘাতিনী কাল-ভুজঙ্গিনীকে আদরে গলা ধরেছিলেন? কি ? ২ মামী । ভ্রম—কি ভ্রম! সৰ্ব্বনাশি ~~-রাক্ষসি, তাের ত কিছুরই অভাব ছিল । দেবীর অধিক আদর-যত্ন, পূর্ত-চরিত্র স্বামীর পবিত্র-প্রেম, ইন্দ্রানীর তুল্য সুখৈশ্বৰ্য্য-বৈভব—সব পায়ে ঠেললি? সব তাের উৎকট লালসার উদ্দান-স্রোতে তৃণবৎ ভেসে গেল ? ধিক্ পাপিষ্ঠে, ধিক্। বাণী। সত্যই রণজিৎ, সত্যই তবে, এবারও উপেক্ষা কচ্ছ ? রণ। নিশ্চিত-শতবার। ( রাণীর উত্থান ) রাণী। উত্তম। তবে শােন, শােন রণজিৎ, যার রূপের মােহৈ মুগ্ধ হয়ে তুমি ধরাকে সরা জ্ঞান কচ্ছ, যার প্রেমে অন্ধ হয়ে, রাজরাণী ক্ষণ- প্রভার হৃদয়ে বার বার অপমানের তীব্র-শেল বিদ্ধ কত্তে তিলমাত্র সংকোচ বােধ কচ্ছ না, সেই অতি আদরের পদ্মবতী তােমার, এই ক্ষণ প্ৰভারই ক্রোধ-বহ্নিতে এতক্ষণ শ্মশান চিতায় ভস্মীভূত হয়ে গেছে। তুমি, তুমি রণজিৎ, ক্ষণপ্রভার কোমল হৃদয়ে যে আগুন জ্বালিয়েছ,—তা ইতে সহস্রগুণ তীব্ৰানলে নিশিদিন, প্রতি মুহূর্তে তােমাকে হাড়ে হাড়ে পুড়িয়ে জ্বালাবার জন্য, আমি স্বয়ং তাকে বিষ-প্রয়ােগে হত্যা করেছি,আজ হত্যা করেছি। ধণ। হত্যা-হত্যা ? পদ্মাবতীর্কে হত্যা করেছি ? রাসি, আমি তােকে হত্যা কবাে। (শৃঙ্খল ভগ্ন হওন ) পাপিয়সি,-মা, না, প্রেতিনীর পাপ-রক্তে এ হাত কলঙ্কিত কবে মা। দূর হ, দূর হ, পিশাচী,-ততার জন্য নৃতন মরক প্রস্তুত হবে। { ( দৃশ্য পরিবর্তন ) ৪র্থ দৃশ্য—পাৰ্ব্বত্য দুর্গের সম্মুখ ভা। বিজ। ( বিজয়ের প্রবেশ) ( স্বগতঃ) আশ্চর্য! এখনও পুরঞ্জন ফিরে আসছে না। আজ যুদ্ধ-যাত্রার দিন নির্দিষ্ট ছিল, কিন্তু সে অনুপস্থিত ! মনে নানা আশঙ্কার উদয় হচ্ছে--তাকে একক যেতে দিয়ে ভাল করিনি। কি ককে, কিছুই যেন স্থির কত্তে পাচ্ছিনে। ( মুরলার প্রবেশ } মুর। দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে কি ভাবছো, বিজয় দাদা?- বেলা যে বেড়ে উঠলো। বাবা সৈন্যদের তাগিদ দিতে বেরাে’য়ে পড়েছেন। আর, এই দ্যাখ, আমি কেমন ‘সেজে গুজে’ ঠিক হয়ে আছি। তুনি কচ্ছ কি ? বিজ। বাঃ, চমৎকার বেশ! পুরুষ কি নারী, চেনবার যাে নেই । এ বেশে ঘােড়ায় চড়ে লড়াই কত্তে পারা যাবেনা ? আমি ত মােড়ায় চড়া শিখে ফেলেছি ; নয়, বিজয় দাদা? বিজ। হাঁ, শিখেছ, বই কি? মুর। তবে চল, দেরী কেন ? বিজ। পুরঞ্জমের যে এখনও দেখা নেই, তাই ভাবছি। মুর। সত্যি। পুরঞ্জন দাদা আমাদের ছেড়ে এতদিন কোথায় আছেন, বল দেখি ? তার মনটা বড় কঠিন। (পুরঞ্জুনের প্রবেশ ) পুর। কি মুরলা দিদি, দুজনে নিরিবিলি আমার খুব নিন্দা কচ্ছ ? বাঃ, একেবারে রণরঙ্গিনী । বিজ । আমাদের সঙ্গিনী হকে। পুর। আমাদের নয়, শুধু তােমার, বল। ভাব-ভঙ্গী দেখে মনে হয়, মুরলা শুধু দুদিনের জন্য নয়, তােমার চির জীবনসঙ্গিনী হবে। যাক, এখন কাশ্মীরের কথা। বিজ। ই, তােমার বিলম্ব দেখে, বড় চিন্তিত হচ্ছিলুম। এক্ষণে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল !
মানা। । বিলম্বের কারণ, পরে শুতে পাৰে । এক্ষণ পূর্ধ্ব-অবস্থার সমূহ পরিবর্তন কত্তে হবে। তারই উদ্যোগ কর । পশ্চিম দিক দিয়ে আক্রমণের সংকল্প ত্যাগ করেছি। বিজ। কেন ? পুর। উত্তাল-তরঙ্গ-সঙ্কুল রিশাল-জলধি-মধ্যে কর্ণধার-বিহীন ভগ্নতরীর যে অবস্থা, এ যুদ্ধে কাশ্মীর-বাহিনী সে অবস্থা প্রাপ্ত হবে। কাশ্মী- রের ভিতরকার অবস্থা শােচনীয়। আজ যদি আমরা এ সীমান্তে সমরানল প্রজ্জ্বলিত করি, কাশ্মীরে রণকুশল সেনাপতি একটিও নেই যে, যথারীতি সৈন্য চালনা করে। কাজেই এবারকার যুদ্ধে স্বয়ং সম্রাটকে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে হবে। যদি আমার অনুমান সত্য হয়, তবে খুশু-যুদ্ধে পদে পদে আমরা তাদের পর্যদস্ত কবাে। অতর্কিত ভাবে কোনও যুদ্ধে, কোনও কৌশলে যদি, রাজাকে আমরা অবরুদ্ধ কত্তে পারি, সহজেই অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। তাই স্থির করেছি, মূল-দুগ্ম হতে অধিক দূর অগ্রসর না হয়ে, কাশ্মীর-সেনাকে সীমান্তের অরণ্য মধ্যে টেনে আনাই সঙ্গত। সংকর মন্দ নয়। তবে এতে সব উলটে গেল। সর্দারের সঙ্গে না হয়, আমি স্বয়ং সে সব ঠিক কচ্ছি! আপাততঃ তােমরা দুজনে বরং একটী পীড়িতারমণীর শুশ্রুষা-ভার গ্রহণ কর। কাশ্মীর-সেনাপতি রণজিৎ সিংহের পত্নী এ দুর্গে সমাগতা। সকল কথা পরে জাবে। এক্ষণে বিশেষ যত্ন ও সন্ত্ৰমের সঙ্গে তার সংবর্ধনা কবে। মুরলে, তােমার উপর এ মুমূর্ণ, রমণীর সকল ভার অর্পণ করে, আমি নিশ্চিন্ত হলুম। বিজয় দাদা, একটা সুপ্রশস্ত কক্ষ পদ্মাবতীর জন্য নির্দিষ্ট কর। উনি আমার মাতৃকা অতিথি। আমি এখনই সর্দারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। সময় সংকীর্ণ, অগৌণে যুদ্ধ ঘােষণা কতে হবে। ( প্রস্থান) মুর। এ পদ্মাবতী কে, বিজয় দাদা ? ইমি পুরঞ্জন দাদাৰ কে হন্ ? বিজ। কেউ নন, অথচ সকলই। পুরঞ্জন চিরদিনই অসহায়, বিপন্ন, বা রুগ্নজনের পরম বন্ধু। চল, তাকে দেখিগে, চল। (উভয়ের প্রস্থান) বিজ ।
৫ম দৃশ্য –কাশ্মীর-রাজসভা।
( সভাসদৃগণ ও নৰ্তকীবৃন্দ ।
১ম স। ভাই, রেতের বেলা দরবার ! কারণটা কিছু জানতে পেরেছ ?
২য় স। রাজ-রাজোড়ার কাণ্ড, ভাই, বুঝবার যাে-টী নেই। বাতিক ঘাড়ে
চাপলাে,-বস্, সঙ্গে সঙ্গে হুকুম জারি !
১ম স। শীতে যে কেপে মরি গাে ! প্রাণটা যে জমাট বাঁধবার যােগাড় হলাে ।
৩য় স। ওগাে, শুনেছ ? দাদার রক্তটা একটু তাজা কর গা, তাজা কর ।
রাগিণী-ভাজার সঙ্গে সঙ্গে দু একটা বিদ্যদ্বাণ-বর্ষণ, চলুক, দেখবে;
অমি দাদা চেগে উঠবে।
১নন। এই ফাল্গুনের ফুর ফুরে হাওয়া, আর আপনারা শীতে জড় সড় ?
২য় স। আসল কথা জান ? দুটো গান, একটু নৰ্ত্তন, আর ঐ ভায়া যা
রলেছে,--মধ্যে মধ্যে এক আধটা কটাক্ষ-হনন! বুঝলে ? চলুক,
গুভস্য শীঘ্রং।
৪
গীত।
নর্তকী। মধুর মৃদুল মলয় রায়, ধীরে বয়ে যায় ।
আবেশ-মদিরা-মাখা, পরশনে শিহরে কায় ।
কোকিল ডাকে বকুল ডালে,
ভ্রমর চুমে ফুল,
নীলাকাশে চাঁদের হাসি,
প্রাণ করে আকুল!
এমন ঝেতে, মনের মানুষ বিনে একা থাকা দায়।
১ম স। বাহবা, কেয়া ফুর্তি, চলুক, চলুক।
৩য় স। ছুড়ীগুলিত নয়, যেন ফুলের কলি, ফুটো ফুটো কচ্ছে।
গীত।
ফুটে কলি চুমে অলিকুল।
মুখে মুখে বুকে বুকে উভয়ে সুখে আকুল।
মানসী ৭১ মৃদু-মলয়-তালে, খেলে ফুল দুলে দুলে- প্রেমাবেশে হাসে গরবিনী, নীল-গগন-তলে, শশধর সুধা ঢালে, আমােদে ঢলি কুমুদে নাচে মরি কি অতুল। গুণ, গুণ, গুণ, স্বরে, মধুপ আদর-ভরে, প্রেম-কথা কয় নিরিবিলি, কাটিলে রজনী, ফুরালে মধুখানি, উড়ে যায় অলি, অমনি সরমেতে ঝরে ফুল ! (মন্ত্রী ও সার্বভৌমের প্রবেশ) চন্দ্র। ছেলেটার অসুখ, মন ভাল নেই। তিন সপ্তাহ জ্বর ছাড় চেনা। সান্নিপাতিক লক্ষণ। রেতের বেলা প্রলাপ বাড়ে। শীঘ্র বাড়ী ফিরে যেতে পাল্লে বাঁচি। সাৰ্ব। আর ভাই পিত্ত-শূলে প্রাণে মলুম। হরি হরি—কলৌ নাস্ত্যেব গতিরন্যথা। (জনান্তিকে) সেই—সেই—দুর্দিন হতে যােগের সঞ্চার। ক্রমেই বাড়ছে। (প্রকাশ্যে) হরি হরি,“উহুহু—ঐ যে গাে, চিন্ চিন্ কচ্ছে। চন্দ্র। আজ এ দরবারের উদ্দেশ্য কিছু জানেন ? সাৰ্ব। কিঞ্চিপি নাস্তি। হরি হরি—ই হি হি-হি-বড় ব্যথা। ( রাজার প্রবেশ) রাজা। রাজ-পুরােহিত মহাশয়, উপস্থিত সভাসদ, বর্গ, আজ বিশেষ প্রয়াে- জনে এ নৈশ-সভার আহ্বান করেছি। আমার বক্তব্য এই- সেনাপতি রণজিৎসিংহের কারাবাস, আমার বিবেচনায়, বিচার- বিভ্রাটের চুড়ান্ত নিদর্শন! সমগ্র কাশ্মীরবাসী যার বাহুবলের নিকট বহুবার ঋণগ্রস্ত, যার মণ-চাতুৰ্যে, যার সাহস বীর্য্যে, কাশ্মীর- রাজ্য বহুবার আততায়ীর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষায় সমর্থ হয়েছে, সেই কর্তব্যপরায়ণ, অকৃত্রিম ভিক্ত রণজিৎ গত যুদ্ধে যদিই ৭২ মামী । -P#স' » ', । । । । সরল-বিশ্বাসে, এমন কোন কাজই করে থাকে, মাতে রাজনীতির হিসাবে, তা অপরাধ মধ্যেই পরিগণিত হতে পারে, তথাপি আমার বিবেচনায়, রণজিতের সে দোষ দেশবাসীর নিকট সহস্রবার ক্ষমার ঘােগ্য। এ সামান্য কল্পিত অপরাধে তার কারাদণ্ড-বিধান, বর্ব- রতার নামান্তর মাত্র। সভাসদগণ। সাধু সাধু, অতীব সূত্য কথা । রাজা। এ দীর্ঘ সময়, এ বিষয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি, তারই ফলে আজ এ সভার আহবান। আমার মত আমি মুক্ত কণ্ঠে ব্যক্ত কল্পম, এক্ষণে উপস্থিত সকলে এ বিষয়ে বিবেচনা করুন, এই আমার অভিপ্রেত। রাজপু। রাজা দেবতা বিশেষ। রাজ-ধারণার উপর কার ধারণা সুসঙ্গত হবে? চন্দ্র। (জনান্তিকে) অর্থ হজম হয়ে গিয়েছে, পুরােহিত মশায় ? সব শেয়ালের এক ডাক’ হলাে ? রাজা। আরও কথা আছে। পূর্বেই বলেছি, রণজিতের অপরাধ সম্বন্ধে আমার গুরুতর সন্দেহ আছে। তর্কের অনুরােধে, ক্ষণেকের জন্য, স্বীকারও করা যায় যদি, রণজিৎ এ ক্ষেত্রে অপরাধী, তথাপি যে দণ্ড ভােগ করেছে, তাই কি তার পক্ষে অত্যধিক বলে মনে হয় না? এ অবস্থায় অগৌণে তার মুক্তি বিধান, আমার একান্ত অভিপ্রেত। সভাসদগণ। সাধু, সাধু, উত্তম। ( মানসীর প্রবেশ মান। বাবা, বাবা, মা বড় কেমন কচ্ছেন। তাকে শ্যাম রাখা দায় হয়েছে। তিনি প্রলাপ বকছেন। দেখ’ সে শীগগির। রাজা। যে পাপানল এ রাজ্যে এলেছে, তাতে সব বিধ্বস্ত হবে। বিধির সূক্ষ্ম বিধান। ( প্রহরীর প্রবেশ) প্রহ। হুজুর, উত্তর প্রান্তীয় কেল্লা হতে জনৈক দূত অচিরে রাজসাক্ষাৎকার প্রার্থনাকচ্ছেন। জরুরি |ংবাদ, কি অনুমতি হয় ? ব্রজা। তাকে এখানে নিয়ে এস। (প্রহরীর প্রস্থান) । ** মানসী। রাজ। আবার উত্তর প্রান্তে কি কোনও গােলযােগের সূত্রপাত হলাে ? বিচিত্র কি? ছিদ্রেনাঃ বহুলী ভবন্তি। চন্দ্র। (স্বগতঃ ) সব যে ফাঁসিয়ে যাবাব যােগাড় হচ্ছে ! মধ্য হতে প্রচুর অর্থহানি,মনস্তাপ—সার হলাে। ( দূতের প্রবেশ) রাজা। কল দূত, কি সংবাদ নিয়ে এসেছ। কোনও গুরুতর বিভ্রাটের সংবাদ নয় তাে ? দূত। মহারাজ, সংবাদ গুরুতরই বটে! উত্তর সীমান্তে আবার ভীষণ বিদ্রোহ উপস্থিত । পুরঞ্জন নামক দুর্দান্ত-দমু এবার প্রায় বিশ হাজার সৈন্যসহ যুদ্ধে অগ্রসর। দিন দিন গ্রামের পর গ্রাম তাব হস্তগত হচ্ছে। রাজা। অনুমান বাস্তবে পরিণত হলাে! মহারাজ, সেনাপতির কাৰ্য্য-ফলেই এ উৎপাত আবার উপস্থিত। সুতরাং তার আচরণ ভ্রম-সংকুল বা সরলতা-মূলক, যাই হােক, বাজনীতির হিসাবে তা গুরুতর বটে। বাজা। সে আলোচনা বর্তমানে নিষ্প্রয়ােজন। এক্ষণে বাজেব মঙ্গল- প্রয়ােজনেই তাব আশু মুক্তি-বিধান একান্ত আবশ্যক। শুনেছি, সেনাপতি নাকি প্রকৃতিস্থ নেই। তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, মান। কৈ বললে এ কথা ? আজ এইমাত্র দরবারে আসার পূর্বক্ষণে কারাধ্যক্ষ স্বয়ং এ কথা জানিয়েছেন। সুতরাং তার নিকট হতে সাহায্যর আশা বিন্দুমাত্র নেই। রাজা। রণজিৎ বিকৃত-মস্তিষ্ক ? মন্ত্রি, এ কথা তুমি এতক্ষণ বলনি কেন ? রণজিৎ আমার বিগতবুদ্ধি ? কাশ্মীর রাজ্য-তরণীর একমাত্র কর্ণধাব, আমার প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর রণজিৎ, আমারই নিৰ্যাতনে এত প্রপীড়িত? ধিক, ধিক্ আমাকে? উঃ, এ বিপদ হতে পরিত্রাণের পথ আমি স্বহস্তে রুদ্ধ করেছি? উত্তম! পাপের ভয় যতশীঘ্র ডুবে , মানসী। • ??" r"'। *, ** যায়, ততই মঙ্গল। বা, সহাকার বাৰু। যাও সূত, কেদারকে বলগে, কাশ্মীর-রাজ শক্ত-মনে অসমর্থ। মান। বাবা, ক্রোধ সংবরণ কর। কার উপর বিরক্তি-শ্রদর্শন কচ্ছ? আমাদের নিজেদের মধ্যে যতই ভুল-ভ্রান্তি, যতই দোষ-ত্রুটী ঘটে থাকুক, সে জন্য দেশ-মাতৃকার অপরাধ কি? জন্মভূমির আসন্ন বিপদে কোন সুসন্তান উপেক্ষা প্রদর্শন করে থাকে। দেশের শত্রু অবশ্যই বিতাড়িত—বিদলিত হবে; পরে অন্য কথা। রাজা। মা, কে আছে তাের জন্মভূমির ? কে আছে তাের দেশের সুসন্তান, যার দ্বারা মায়ের বিপদ দূর হবে? এ রাজ্যের রাজা পাগল, রাণী পাগল, সেনাপতি পাগল,-পাগলের রাজ্য উৎস যাবে না, মা ? মান। বাবা, রাণী মা উদ্ভান্ত সত্য, কিন্তু এখনও তত ধীর, স্থির, গম্ভীর, চির-প্রশান্ত-হৃদয় রাজা শজিৎ সিংহাসনে উপবিষ্ট। সেনাপতি- শ্রেষ্ঠ রণজিৎসিংহ না হয়, বিকৃত-বুদ্ধি, কিন্তু এখনও ত, তারই প্রিয়-শিষ্যা মানসী অসি-ধারণে সমৰ্থা। আমার অস্ত্রশিক্ষা কি বাবা, শুধু ছেলে খেলার জন্য? এ বিপদের বেলা, তুমি স্বয়ং যুদ্ধ- ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হও, মানসী তােমার সহায়তা করূবে। যার যতটুকু শক্তি, দশের জন্য, দেশের কাজে ব্যয়িত হবে, এঅপেক্ষা গৌরবের বিষয় আর কি আছে? জয়-পরাজয় ? সেজন্য চিন্তা কেন? কাজ করে যাব, ফলাফলের কর্তা বিশ্বেশ্বর। আর বাবা, নিরাশারই বা এমন কারণ কি আছে? এখনও তাে কাশ্মীরের ষষ্ঠি সহস্র সৈন্য দিষষ্ঠি-সহ-হস্তে অবিশ ধারণে সমর্থ । বিংশতি সহস্র শত্রুর ভয়ে আজ যদি কাশ্মীর রণ-বিমুখ , এ কলঙ্ক বে রাখবার স্থান হবে না। না, বাবা, তা হবে না, তা হতে দেবােনা। প্রাণ থাকতে, তােমার চির শুল্লোল যশশ্চমা বিন্দুমাত্র কলঙ্ক-কালিমা লিপ্ত হতে দেবােনা। আজই ৰাৰা, আজই—এ দঙেই অনুমতি কর, কাশীরে রণ-ডঙ্কা বেলে উঠ, আকাশ-পথে দুন্দুভিধ্বনি উখিত হােক—শক্তগণ সে গগন-ভেদী ৰূবে কম্পিত, কৃতিসন্ত্রস্ত হয়ে সীমান্ত প্রদেশ পরিত্যাগ করুক।.
মানী *** রাজা। মা, মূর্তিমতী রাজলকি, তুই এ ব্যথিত, মথিত, জড়হৃদয়ে আজ বিদ্যুদগ্নি জেলে দিলি মা। তাই হবে। কাশ্মীর রাজ্যের পঞ্চাশ সহস্র দুর্ধর্ষ সেনা শত্রুপীড়নে অগ্রসর হবে। অবশিষ্ট দশ সহস্র, সহকারী সেনাপতি কীৰ্ত্তিজের অধীনতাঙ্গ রাজধানী রক্ষা করুক। আমি স্বয়ং এ রণে অবতীর্ণ হব, আর তুই মা, রণ-কুঙ্গিনী-বেশে আমার সঙ্গিনী হবি। হয় রণে জয়, নয় কাশ্মীর রাজবংশের মূল ক্ষয় হবে। মন্ত্রি, আমার এ আদেশ এ দণ্ডেই রাজ্যময় ঘােষিত হােক। বিলম্ব না হয়। যাও দূত, তুমি ত্বয়ায় কেল্লাদারকে গিয়ে আশ্বস্ত কর। মন্ত্রি, রণজিৎ আমার কোথায় আছে, সে কি এখনও কারাগারে অবস্থান কচ্ছে? অন্য আদেশ পাইনি। কাজেই--- রাজা। এ দতে, এ মুহূর্তে, আমি স্বহস্তে তাকে মুক্ত করে দিচ্ছি। রাণী আর সেনাপতির চিকিৎসা-শুশ্রুষার ভার তােমাদের সকলের উপর বুইলাে । কালই আমরা সীমান্ত-প্রদেশে যাত্রা করবাে। আয় মা। সভা ভঙ্গ হলাে। (পট-ক্ষেপণ ) চতুর্থ অঙ্ক। ১ম দৃশ্য-শ্মশান ( দ্রুত চামেলীর প্রবেশ ) চানে। চীৎকার পূর্বক উদ্ভান্ত ভাবে আমার হার ?-জোব কবে ছিনে নিয়ে দ্য আঁধারে মিশিয়ে গেছে গাে !--আমাব মুক্তা হাব ? (দ্রুত প্রস্থান) ( বাঞ্ছারামের প্রবেশ ) বাঙ্গা। এই ত শ্মশান। আঁধার, ঘাের আঁধার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কি করে তার সন্ধান করি ? শুনলুম, তিনি কামুক্ত, কিন্তু বিকারগ্রস্ত হয়েছেন। ঘরে গিয়ে দেখলুম, যেখানে যে জিনিষটী রেখেছিলুম, ঠিক সেখানে সেটা তেমি ভাবে আছে, কেউ স্পর্শও করেনি। জালুম,-শ্মশানই তার আরাম স্থান। কিন্তু কই? এখানে ত কারও সাড়াশব্দ নেই, উপায় ? (চামেলীর পুনঃ প্রবেশ ) চামে। পেয়েছি, পেয়েছি,-চোর-দ, আমার হার? হকের ধন ছিনে নিবি? প্রাণ থাকতে নয়।—রাণীর দেওয়া হার গাে,—তা ও কি সাধে সাধে দিয়েছিল ? উঃ মানুষ খুন! দে, দে, আমার হার দে, বলছি। বাঞ্ছা। ম, এ আবার কোথাকার পেত্নী ? চামে। হু, আমায় চিবি কেন? শীগগির হার দে, বলছি। রাণীর দেওয়া — হকের ধন আমার! দিবিনে, দিবিনে? খুন কবাে। এই হাতে একটা খুন করেছি, আর একটা কববাে, বলছি। হকের ধন, সহজে ছাড়বাে ? বাঞ্ছা। কে এ মাগীরে ? চামেলী নয় ? চামে। চিনে ফেলেছে গাে,-চিনে ফেলেছে। খুলে দেবে। মানুষ খুন- খুলে দেবে। ( দ্রুত প্রস্থান) । - মনী । লাল। আশ্চর্য! 'পুঞ্জনের অনুমান তবে যথার্থ !-- পিশাচ কি স্বতন্ত্র জীব? মানুষই পিশাচ! দূর ছাই, মনটা দমিয়ে দিলে ! যাই দেখি, —অই নদী তীরে সেনাপতিব সাক্ষাৎ পাই কিনা। কয়দিনে, পাঁজার পূজি ও খালি হতে বসেছে। ( প্রান ) ( উচ্ছ্বান্ত শজিতের প্রবেশ ) হা-হা-হা, মিছে কথা। কে বলে শ্মশান শান্তির আবাস, আবাম নিকেতন ?-মিছে কথা! আগুন, আ গুন, শ্মশানের বিকট আগুনের লক্ লক্ শিখা যে গাে, আমার সকল সুখ, সকল শান্তি, সকল বল, সকল বুদ্ধি, চিব দিনের মত ভস্ম-রাশিতে পরিণত করেছে ! ওগাে, আমার সৌভাগ্যাকাশেব জ্যোৎস্নামণ্ডিত পূর্ণচন্দ্র যে এ বীভৎস শ্মশানের উৎকট অন্ধকারে চির অস্তমিত!---সত্যি কি তাই ? সত্যি পদ্মা আমার নেই। আমার নয়নের মণি, তৃষ্ণার জল,—আমার চিত্তে শুদ্ধি,—অভাবের সম্বল, আমার পদ্মা আমায় ছেড়ে গেছে ? পদ্ম, পদ্ম, যে রণজিতের ক্ষণকালের অর্শনে, ব্যাকুল হয়ে তুমি, কাতর-নয়নে তার আশা-পথ পানে চেয়ে রইতে,—যে রণজিতের একটা মাত্র সােহাগ আহ্বান তােমার কর্ণে প্রবেশ মা, তুমি এসে আদরে তার গলা জড়িয়ে ধরূতে,—সে রণজিতের শত চীৎকারেও আজ তােমার প্রাণে কি এতটুকু দয়ার সঞ্চার হয় না? এস, এস প্রাণেশ্বরি, তােমার তুষ্টির জন্য, তােমার পরিতৃপ্তির জন্য, রণজিৎ আজ অম্লানবদনে আপন হৃৎপিণ্ড উৎপাটিত করে দিতেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অই অই, কে ওদিকে খিল খিল করে হাসছে ? কি পৈশাচিক অট্টহাসি ! কে, কে তুমি? ওহহাে, কি লােমহর্ষণ দৃশ্য ! ভীষণ-বদনা, বিকট দশনা অন্ধ-বিবসনা উন্মাদিনী,-মানব-কঙ্কালে গড়া পান-পাত্র করে! অই, অই কে আবার তারই পার্শ্বে পতিত হয়ে, কাতর-নয়নে, অই পাত্র পানে চেয়ে আছে? আঁা, চিনেছি, চিনেছি, এ যে আমার পদ্মা ! আমার হৃদয়-সৰ্ব্বং পদ্ম যে গাে, তৃষ্ণায় ছট ফট কচ্ছে! একি, একি, হলাহল,-তীব্র হলাহল-ধারা তার মুখে ঢাললি? কে তুই প্রেতিনী? কে তুই রাক্ষসী ? নারী হত্যা-নারী হত্যা, ক্ষান্ত হ, ক্ষান্ত হ। হলিনে ? হলিনে? আবার 3 এসেছ?-জান? এ পরিহাসের প্রায়শ্চিত্ত,--তপ্ত বক্ষৰক্ত দান! মানসী। আবার?--তুবে পাপিয়সি, এই খৱধার অসি, সবলৈ তাের পাপ বক্ষো-মধ্যে আমূল বিদ্ধ করে,তােরই হৃদয়-নিৰ্গত উত্তপ্ত শশাণিত- ধারে এ প্রেতযজ্ঞ সমাপ্ত কবুবাে? পিশাচি, পদ্মাবতী মলে, সংসারে নারী বলতে, কেউ থাকবেনা।—নেই, পদ্মবতী নেই আমার ? : তবে চলুম- বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আজ নারী শুন্য হবে। ( দ্রুত প্রস্থান) ( নেপথ্যে আছে, আছে, আছে। ( রণজিতের পুনঃ প্রবেশ বুথ আছে--আছে--আছে? পদ্মাবতী বেঁচে আছে ? কে বল্লে এ কথা ? --একি দৈববাণী ? (বাঞ্ছারামের প্রবেশ) বাঙ্গা। দৈববাণী নয়, তবু সত্য কথা। কে তুমি উন্মাদ ? রণজিতের প্রচণ্ড ক্রোধ-বহ্নির আহুতি সেজে বা। পরিহাস নয়, সেনাপতি, সত্য কথা। আমি বাঞ্ছারাম। রণ। বাংরাম, বাহারাম, সত্যি বললি, পদ্ম আমার বেঁচে আছে ? আমি যে রে সমগ্র কাশ্মীরের ঘরে ঘরে অনুসন্ধান করেও তার তত্ত্ব পেতে পারিনি। বা। তিনি আপাততঃ কাশ্মীরের উত্তর প্রান্তস্থ ভৈরব দুর্গে আছেন। ভৈরব দুর্গে ? পদ্মাবতী আমার তৈরব দুর্গে কেন, বাছা ? বা। সে অনেক কথা, পরে শুনতে পাবেন। চলুন, তিনি আপনার জন্য বড় ব্যাকুল হয়েছেন। ব্রণ। প্রহেলিকা, বিষম প্রহেলিকা-ইন্দ্রজাল! পদ্মাবতী ভৈরব দুর্গে- পরাশ্রিতা ? পবতী কি এখনও আমারই আছে? য। সতীর চরিত্রে ঘুণাক্ষরে ও সন্দেহ করােনা, সেনাপতি, মায়ের অপমানকারী, বাহরামের বন্ধ-শত্রু। রণ , না, বাঞ্ছা, ভ্রম, বিষম ভ্রম আমার! সতীলক্ষ্মী পদ্মা আমার দেবী প্রতিমা। আমি পিশাচ, তাই নিমেষের জন্যও বিচলিত হয়েছিলুম। চল, ঘা, এখৰই ভৈরব দুর্গে চল। ( দ্রুত প্রস্থান) বা। এখাঝে বার কোথায় ধা করে মিশিয়ে গেলেন। কি মুস্কিল। (প্রস্থান) ২য়-দৃশ্য শিবির সম্মুখ পথ । (পুরঞ্জনের প্রবেশ) পুর। আশ্চৰ্য্য রমণী, কাশ্মীর-রাজ-দুহিতা সেই মানসী! গত যুদ্ধে সম্রাট পক্ষের পরাজয়ের যখন বিলম্ব ছিলনা, তখন সহসা রমণী যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে, কি অপূৰ্ব্ব কৌশলে যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ ফিরিয়ে দিলে? রমণী এমন রণকুশলা হতে পারে, আমার ধারণা ছিলনা। কি অনন্ত-সুলভ দক্ষতা, কেমন প্রশংসনীয় ক্ষিপ্ৰ-কারিতা ! কি দুদ্দম- নীয় তেজ, আবার কেমন মনােমােহিনী কমনীয়া মুর্তি! নারী একদিকে কুসুম-কোমলা, অন্যদিকে বাদপি কঠিন! কমনীয় এবং শক্তিমত্তার এরূপ অপূৰ্ব সমাবেশ, কচিৎ দৃষ্ট হয়। কিন্তু উপায়? যতদিন এ রণলক্ষ্মী, আমাদের করায়ত্ত না হন, ততদিন জয়ের আশা বােধ হয় বিড়ম্বনা । (রঘুবীরের প্রবেশ রঘু। পুরঞ্জন, তােমার উদ্দেশ্য অনেকটা সিদ্ধ হয়েছে। রাজ-সৈন্য পৰ্বত। প্রান্তে উপস্থিত। পুর। সত্য, কিন্তু আমাদের বিজয়-লাভ পক্ষে এক অভাবনীয় অন্তরায় বর্তমান। রাজকন্যা মামসী সৈন্য-চালনায় এমন পরিপক্ক, তা জান্তুম না। গত দুই দিবসের যুদ্ধে, তার বীরত্বে আমি বিস্মিত হয়েছি। এ অবস্থায়, আপাততঃ, সম্মুখসময়ে আমরা কতদুর কৃত- কাৰ্য হব, বলতে পারি না। শত্রুর অসতর্কতা,-ত্রুটী-বিচ্যুতি ই এখন আমাদের প্রধান ভরসা। ভাল, সর্দার, আমাদের গুপ্তচর, , ছদ্মবেশে কাশ্মীর-শিবিরে প্রবেশ লাভ করেছিল ? তার সংবাদ কি ? রঘু। ফুল-ওয়ালা, ফুলওয়ালী-সেজে দুটী গুপ্তচর, নিত্যই প্রায় রাজ- শিবিরে যাতায়াত কচ্ছে। ফুলওয়ালী একটা পাহাড়ী মেয়ে। সে স্বয়ং রাজকন্যা মানসীর সঙ্গে অবধি আলাপ করেছে। পুর। উত্তম। তাকে বলবে, কাশ্মীর-রাজ কিংবা তাঁর দুহিতার গতি বিধির উপর যেন তীক্ষ দৃষ্টি রাখে। আকস্মিক আক্রমণে ফল
মানসী
হবে, এটুকু বুঝতে পাল্লেই, অগৌণে সে সংবাদ যেন আমাদের
গােচর করে। উপযুক্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রচুর পুরস্কার প্রদত্ত
ঘু। আমি তাদের বিশেষ করে বলে দিয়েছি। তাদের চেষ্টার ত্রুটী
নেই। তবে শত্রু পক্ষকে বিশেষ সাবধান বলেই মনে হয় ।
পুর। তাদের অসতর্ক কত্তে হবে। এক্ষণে কিছুদিন আমরা সম্পূর্ণ
নিশ্চেষ্টর ভাণ করূবাে।
শদলকে বুঝতে দেবব, আমরা
ভয়ে বুদ্ধাভিলাষ—পরিত্যাগ করেছি । সেনাদল মধ্যে আজই
ঘােষণা কর সর্দার, অতঃপর একটী পাৰ্বত্য-সেনাও, ভ্রমেও, যেন শত্রু-
পক্ষের দৃষ্টি গােচর না হয় ।
রঘু। অবিলম্বে এ আদেশ পালিত হবে।
পুর ও ভাল, রণজিৎসিংহের তত্ত্ব কিছু পাওয়া গেছে ?
রঘু । না। বাঞ্ছারাম, সেই যে গিয়েছিল, আর ফিরে আসে নি। এ
দিকে বােধ হয়, রণজিতের চিন্তাই পদ্মাবতীর পূর্ণ স্বাস্থ্য-লাভের
এক মাত্র অন্তরায়।
পুর। পতির জন্য সতীর চিন্তা স্বাভাবিক। তাহলে একজন গুপ্ত-দূত
রণজিতের উদ্দেশে কাশ্মীরে গেলে ভাল হয় না?
রঘু। দেখা যাক,—কিছু সময় অপেক্ষা করে।
পুর। আমি একবার পদ্মাবতীকে দেখে আসি। তুমি এখনি সেনানিবাসে
গমন করে, আমার আদেশ ঘােষণা কর। বিজয় কোথায়?
রঘু । তিনি ভৈরব দুর্গেই গিয়েছেন।
পুর। উত্তম।
(উভয়ের প্রস্থান).
৩য়--দৃশ্য কক্ষ-বারান্দা। আবার, । ( রাণীর প্রকেশ ) #ণী । (উদ্ভান্ত ভাবে আগুন; আগুন, নরকের আগুন চারদিকে জ্বলে উঠেছে। জ’লে মলুম, জ’লে মলুম,—রক্ষাকর! ঐ ঐ ওদিকে শত শত কালান্তক-বিষধর বিকট-ফণা-বিস্তার করে আমাকে গ্রাস কত্তে আছে, কোন্ দিকে যাই? ঐ ঐ ওদিকে আবার —ওহহ কি ভীষণ দৃশ্য ! কাল-বদন; বিকট-দশ, বিভীষণ কৃতান্ত- কিঙ্কর সকল, জ্বলন্ত লৌহদণ্ড-করে উদ্দাম কুর্দনে আমায়ইদিকে অগ্রসর হচ্ছে! রক্ষা কর, রক্ষা কর,-একি, একি, ডুবে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি, কোটি-কোটি কৃমিকীট-পূর্ণ উৎকট দুর্গন্ধময় পূরীয়কুণ্ডের অতল গহ্বরে আকণ্ঠ ডুবে যাচ্ছি ! যাই-যাই--কে আছ কোথায়, রক্ষাকর (পতন) ( দাসীর প্রবেশ) দাসী। রাণি মা, তুমি এখানে ভূমে শুয়ে? আমি যে তােমাকে খুঁজে মরলুম! এস মা, শয্যায় এস। মন্ত্রী-মশায় এসে তােমাকে এ অবস্থায় দেখতে পেলে, আমাদের কত মন্দ বলবেন,-কত ববেন। রাণী। আঁকে, কে তুমি ? আঁ? দাসী। একি মা, তুমি অমন কচ্ছ যে ? রাণী । উঃ কি ভীষণ স্বপ্ন! জাগ্ৰৎ স্বপ্ন। দাসী। (স্বগতঃ) একি ভাব। (প্রকাশ্যে) মা, শয্যায় এস মা। রাণী । বিরক্ত করি নে, তুই। এই-ই আমার বেশ শয্যা! সতীর দেহ শ্মশানের চিত-শয্যায় তুলে দিয়েছি আমি,-সে তুলনায়, এই আমার বেশ শয্যা ! বুঝবিনে, তুই বুঝবিনে,সতী-সাধ্বীর মরণাভিশাপ সহস্র বৃশ্চিকরূপে এ হৃদয়ের পরতে পরতে কেমন অহরহঃ দংশন কচ্ছে ! সহ হয় না, মৃত্যুর শীতল-কোলে আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন, অভা- গিনীর আর নিষ্কৃতি নেই। কে বলে পাপের ভােগ, ইহকালে হয় না ? কি ছার নরকের আগুন? আমার হৃদয়ের তীব্র-হলাহল, মাখা জ্বলন্ত আগুন যে, তার অপেক্ষা সহস্রগুণ জ্বালাময়।
২ মানসী। * (মন্ত্রীর প্রবেশ ) পুরাসি, রাজমহিষী এ ভাবে ভূমে পড়ে কেন ? রাণী। আপন ইচ্ছায় মন্ত্রিবর, বিষের জ্বালায় সর্বাঙ্গ জরজর, কোথাও স্বস্তি পাইনে। তাই একটু বাইরে এসেছি। (নেপথ্যে চাহিয়া) আসুন, কবিরাজ মশায়, এ দিকে আসুন, আপনার আজ আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে, নয় ? (রাজ বৈদ্যের প্রবেশ) রাজ বৈ। আরে মশাই, তিলা অবসর নাই। এই, শষ্যা পরিত্যাগ কইর্যা গাড়টা হস্তে লইবা মাত্র সাৰ্ব্ববৌম গাে বাড়ী হৈতি ডাক পড়লাে। গিয়া না দেহি, বেটা প্রচণ্ড যণ্ডের মত কেবলই চীকাই পারছে। দুরন্ত পিত্তিশূল, চীকাই পাবারই কথা। চন্দ্র। সেখানে প্রাপ্তিটা কেমন হচ্ছে, কবিরাজ মশায় ? শুনেছি, হাত চিৎ ছাড়া, উপুড় কথাটা তার কোষ্টীতে লেখা নেই। রাজবৈ। হেই কথা কইবেন না। বেটা আসল অর্থ পিশাচ! বােজ সাদ্দ দুইসের দুদের ব্যবস্থা দিছি। বেটা পােয়াটেক দুগের সহিত সের- দুই বাসি জল মিশ্ৰিৎ কইর্যা পথ্য চালায়। তার অনে অর্থ বাইর করা আমাগাে কৰ্ম্ম নয়। সময় যায়, আহেন দেহি, রাণীমার নাড়ী পৰ্যবেক্ষণ করি। চন্দ্র। এই যে রাণী মা এখানে। রাজবৈ। এ, হা-হা-হা, বড়ই ব্যাকুবি ত! এই শীতল ভূমি শষ্যায়, দারুণ অনিষ্ট অইবারই সম্ভাবনা ! সাবধানে রাখবেন, সাবধানে রাখবেন। দেহি এহন নাড়ীড়া—নাড়ী পরীক্ষা) বড়ই চঞ্চল, চিত্ত চাঞ্চল্যটা বৃদ্ধি অইছে । যাউক, এই বটিকা দুইটা রাহেন দেহি। নিশিন্দার পাতা খলে পিষ্ট কইরা, এহনহি অর্ধেকখানা বটিকার সঙ্গে, উহার রস মিশ্রিত কইর্যা খাওয়াইবার চাই। (বটিকা প্রদান) চন্দ্র। পুরাসি, তুমি সত্বর অনুপান সংগ্রহ কর। (দাসীর প্রস্থান) রাজবৈ। গায়ে অল্প অল্প ক্ষত দৃষ্ট অইছে,-হেইত আশঙ্কার কথা ! উষ্ণজলে শরীর ধৌত ( দ্রুত চামেলীর প্রবেশ ) চামে। আমার হার?-হার ছিনে নিছে গাে ! হকের ধন, রাণীর দেওয়া মুক্তা হার! মানুষ খুন করে তবে হার পেলেছি! খুন কবাে,-- হার দে বলছি, নইলে খুন করূবাে।
মামদী । -- চন্দ্র। চন্দ্র। এ আবার কোথাকার আপদ ? বদ্ধ-পাগল ! রাজবৈ। কামড়াইব না হি ? চামে। রাণী মা, বিচার কত্তে হবে, সহজে ছাড়বাে না। আমার হার ? এই দ্যাখ, গলা শূন্য করে আমার হার ছিনে নিছে! দ্যাখ না গা, (রাণীর দিকে অগ্রসর হওন) চন্দ্র। দুর হ, পাগলী, সরে দাড়া, সরে দাড়,-কে আছিস্ এখানে ? চামে। কে রে মিন্সে, কটমটে চাউনি। মাবি নাকি ? খুন কবাে। হার ছিনে নিছে-আবার চোখ, রাঙ্গায় ! দে হার—দে হার, বলছি- নৈলে এই দ্যাখ, মজা (সহসা মন্ত্রীর বক্ষে ছুরিকাঘাত) উঃ-উঃ-মেরে ফেলেছে, -ডাইনী, রাক্ষুসী-খুন করেছে - ( পতন ) চামে। হা,হা,হা,–খুন, খুন, একটা-দুটা-- ( পলায়ন ) ( ছুরি উন্মােচন করিয়া দূরে নিক্ষেপ ) উঃ,-পাপের --ফল--ভীষণ —প্রায়শ্চি-ও-যাই--জ——— (মৃত্যু। রাজ-বৈ। রাম রাম, শিব--শিব-সাক্ষাৎ ডাইনি। কেদার যাই, শিব, শিবরাম, রাম। ( প্রস্থান) রাণী। ক্ষণেকে কি হতে কি হয়ে গেল। পাপের কি ভীষণ পরিণাম, ধৰ্ম্মের কি সূক্ষ্ম বিচার ! চামেলী পাগল হয়ে কিন্তু সকল আলার হাত এড়িয়েছে !-আমার যন্ত্রণার শেষ নেই! শেষ করূবাে,এ দারুণ জ্বালা আর সহ্য হয় না,-জীবন্ত নরক-ভােগ, আর সহ্য হয় না। জগদীশ্বর, তােমার নাম গ্রহণে ও পাপিনীর অধিকার নেই। তথাপি তােমারই নাম স্মরণ করে, এ তাপ-দগ্ধ পাপ-জীবনের অবসান কবাে। (ভূমি হইতে ছুরিকা গ্রহণ ) আত্মহত্যা মহাপাপ—জানি। কিন্তু সাগরে আমার শষ্যা, শিশির- কণায় ভয় কি ? --না, আর পারিনে, অহর্নি। এ বিষ-জ্বালার বিদ্যুহন সহ কত্তে পারিনে। (বক্ষে আঘাত। চলুম,--উঃ-রক্ষা কর (গাে-গগা শব্দ) (মৃত্যু) . ( দাসীর প্রবেশ) দাসী। এ-কি ।-একি-সৰ্ব্বনাশ! মূহূর্কে একি সর্বনাশের কাণ্ড! কে কে কলে ? কে কোথায় আছ গাে, দৌড়ে এস–দৌড়ে এস। সর্বনাশখুন-খুন- (জত প্রস্থান) ৪র্থ -- দৃশ্য পথ । ( ফুলওয়ালা ও ফুলওয়ালীর প্রবেশ ) ཨང། ফুলওয়ালা। চাইবেল ফুল ? ফুলওয়ালাঁ। মালতী মল্লিক। যুধী, শেফালী বকুল ? ফুলওয়ালা। ভরে এনেছি ডাল- পরুবি কে চিকণ মালা ? ফুলওয়ালী । বিনা সূতে সঁাথা এযে— প্রাণ করে আকুল ! -ফুলের মালা, ফুলের বালা, ফুলের কানের দুল ? উভয়ে। চাই-বেল ফুল ? (প্রস্থান উদ্যোগ ? (জনৈক পরিচারিকার প্রবেশ ) পরি। ওগাে, ফুল ওয়ালী, যাচ্ছ যে? এদিকে এস, দিদি ঠাকরুণ, তােমায় ডাকছেন, ফুল দেবে। ফুল-লা। তুই তবে ভেতরে যা,--আমি ঐ গাছ তলায় তাের অপেক্ষা কচ্ছি ॥ দেখি বেশীক্ষণ ভুলে থাকিসনে। ফুল-লী। ঈস্। ( কটাক্ষ ) ( বিভিন্ন দিকে সকলের প্রস্থান) ৫ম-দৃশ্য শিবির-কক্ষ। " ( রাজা শায়িত ও মাননীয় প্রবেশ) মান। বাবা এখনও নিদ্রিত। কাল ফুলওয়ালীর কাছে শুনেছি, নিকটেই মহাকাল-মন্দির। আজ সে মহাকাল দর্শনে যাব, বাবার কাছে অনুমতি নিতে হবে। বেলা হয়েছে, বাবা এখনও জাগেননি কেন? --বাবা,-বাবা- রাজা। (নিদ্রাভঙ্গে) আঁা--কে,--কে ? মানসী ? মা, বড় একটা সুখের স্বপ্ন দেখতে ছিলুম মা, তুই অসময়ে ঘুম ভাঙ্গালি- মান। বেলা যে অনেক পানি হলাে বাবা। তােমার ইষ্টদেব বিশ্বেশ্বর পূজার সময় যে ব’য়ে যায়। পূজায় বিলম্ব হলে, তিনি যে রাগ কৰ্ব্বেন। রাজা। একান্ত রাগ করেন, তােক তারই পায়ে বিকিয়ে দেবাে। এমন রণরঙ্গিণী দাসী পেয়ে, আশুতােষ তুষ্ট হবেন না ? মান। কি স্বপ্ন দেখেছ, বাবা, শুতে রাজা। সে চমৎকার, মা। তাের বিয়ের যেন বর এসেছে! সে আবার যে সে বর নয়, সাক্ষাৎ আশুতােষ-তুল্য নধর-কলেবর ! মান। ও কথা, থাক্ বাবা। আমার একটা কথা শুনবে, এখন ? রাজা। কি কথা, মা ? মান। শুলুম, নিকটেই মহাকাল নামক এক বিগ্রহের এক মনােহর মন্দির আছে। মনে করেছি দেব-দর্শন, সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের কারুকার্য দর্শন করুবাে। গভীর অরণ্যে মনােহর মন্দির, দর্শন যােগ্য নয়, বাবা? রাজা! দেব-দর্শনে কি আপত্তি হতে পারে মা? তবে স্থান শত্ৰু-সমাকুল, সঙ্গে উপযুক্ত শরীর-রক্ষক থাকা চাই। মান। স্থান শত্ৰু-সমাকুল সত্য, কিন্তু অস্ত্র পরীক্ষায় মানসী এখনও কি উত্তীর্ণ হয় নি, বাবা ? মানসীর শক্তি কি এখনও আত্মরক্ষার পক্ষে প্রচুর বিবেচিত হলাে না? দেব-পীঠে সৈন্য সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কি পাই ? উচিৎ? রাজা। তােমার যা ভাল মনে হয়, তাই কবে। তবে নিতান্ত একেলা যেমােনা।
মানী
মান। অমলাকে সঙ্গে নেবে। আর না হয়, দুজন অনুচর ও সঙ্গে যাবে।
রাজা। এক কথা,-সন্ধ্যার আগেই যেন শিবিরে ফিরে এস। রাত্রি
যেন না হয়।
মান। রাত্রি হবেনা। আচ্ছা বাবা, এ কয়দিন যেন শত্রুদের সাড়াশব্দ
পাওয়া যাচ্ছে না। তারা পালিয়েছে ?
রাজা। পালিয়েছে বলেইত আপাততঃ মনে হয়। কিন্তু তথাপি কিছুদিন
আমাদের এখানে থাকতে হবে, কি জানি বলবৃদ্ধি করে আবার
যদি তারা উৎপাত আরম্ভ করে ।
মান। শক্রদলের মূলােচ্ছেদ কত্তে পাল্লেই ভাল হতাে। সেদিন তারা বড়
বেঁচে গেল। আর একটু হলেই, পালাবার পথ বন্ধ করেছিলুম।
রাজা। হাঁ মা, তাের সৈন্য-চালনার প্রশংসা, শত্রুরা ও কতে বাধ্য হবে।
এখন উঠতে হয় ।
মান। হাঁ ওঠ বাবা,-বেলা বেড়ে উঠেছে।
রাজা। এই উঠছি।
( উত্থান)
৬ষ্ঠ দৃশ্য—বন-পথ ।
(কাঠুরিয়া ও তৎপত্নী।
(কাঠুরিয়ার হস্তে দুই খানি কুড়ল, তাহার স্ত্রী
মাথায় কাঠের বােঝা )
গীত।
কাঠু। চল, ঘর-মুখাে হই রওয়ানা।
কাপ। (কাঠের বোঝা ভূমে নিক্ষেপ করিয়া)
কাঠের বােঝ পিঠে নেচল--
আমি নিতে পাবােনা
মিলে, আমার ঘাড়ে চাপিয়ে বােঝা
ইন ইনিয়ে যাস্ ?
কাঠু। চল, খানিক খানি, লক্ষ্মী-মণি,
আবার মাথা খাম্।
কাপ। ঈ—আমার কিনা লোহার শরীর,
তোর গতর মাখন-ছানা !
কাঠু। আমার হাতে কুড়ল দুখানা,
কাপ। কুড়ল বােঝা-দুই-ই-নিবি,
(আমি) কিছুই ছেবনা।
এই যাচ্ছি ঘরে,
থাক্ না পড়ে
( প্রস্থান)
কাই
ছুড়ী ভারি সেয়ানা।
(কুড়ল ও বােঝ সহ হুনি)
৭ম দৃশ্য—মহাকাল মন্দির । ( অঙ্গনে জনৈক সন্ন্যাসী উপবিষ্ট ) ( মনিশী ও অমলার প্রবেশ ) মান। সখি, দেখ দেখ, মন্দির-প্রাঙ্গণে কেমন অপূর্ব জ্যোতির্ময় এক সন্ন্যাসী উপবিষ্ট! চল, ওঁর পদ-প্রান্তে প্রণাম করে, মন্দিরে প্রবেশ করি । অম। রাজকুমারি, দেখছাে র চাউমী -আমার ত কেমন কেমন ঠেছে। মান। চুপ,তাের কেবলই সন্দেহ! দেখছিস নে, কি কমল-নিন্দিত নয়ন-যুগল, কেমন আজানুলম্বিত সুগঠিত বাছ! সন্ন্যাসীর গঠন, বর্ণ, সকলই অনিন্দ্য, সকলই চমৎকার ! একে দেখে, স্বতই আমার ভক্তি কত্তে ইচ্ছে হচ্ছে ! গম। যে ভাব দেখছি, তাতে ইনি সন্নেসী না হয়ে, রাজপুত্র হলে, হয়ত বা রাজকুমারী এখনি মালা-বদল’ করে বসতেন! মান। পরিহাসের আর সময় নেই, অমলে? চল, ওঁকে দণ্ডবৎ প্রণাম করে, মন্দিরে প্রবেশ করি। (উভয়ের প্রণাম ও মন্দিরে প্রবেশ) সন্ন্যা। (স্বগতঃ) অনিন্দ্য রূপ, অপূৰ্ব্ব চলন-ভঙ্গী! কোন্ অঙ্গ রেখে, এর কোন্ অঙ্গের প্রশংসা করুবাে? মানবদেহে এত রূপের সমাবেশ হতে পারে, আমার তা ধারণা ছিল না। বিধাতা যেন অতি সন্ত- পণে তুলি দিয়ে এক খানি অলৌকিক চিত্র অঙ্কিত করেছেন। অতি ভাগ্যবান্ পুরুষ—তিনি, এ রমণী যার অঙ্ক-শায়িনী হবেন। পুরঞ্জন, তুমি অতি দুর্ভাগ্য, প্রথম-সম্ভাষণেই এর বিরক্তি-ভাজন হবে! যাক্, এক্ষণে দ্বার রােধ করি। (মন্দির-দ্বারে দণ্ডায়মান হওন) সম। কে, এতে? দ্বার পরিত্যাগ করুন, রাজকুমারী বাইরে যাবেন। সন্ন্যা। রাজকুমারী এ মন্দিরে বন্দিনী, বহিরাগমনের আশা অল্প। মান। কি বলছেন আপনি? আপন কর্ণকে যে বিশ্বাস কত্তে প্রবৃত্তি . - ন্যা। সত্য বলছি। এ মন্দির ভােমাদের শত্রুপক্ষীয় পুরনের অধিকার ভুক্ত! তােমরা স্বেচ্ছায় মন্দিরে প্রবেশ করেছ, কিন্তু স্বেচ্ছায় তা হতে বহিত হতে পাবে না।
মানসী। মান। আপনি সন্ন্যাসী, পরম ভক্তিভাজন। আপনার মুখে এ কথা শােভা পায় না। কাশ্মীর-রাজ-দুহিতা রাজ্যের সর্বত্র স্বাধীন। পুরঞ্জন নামক দস্যু দমনের জন্যই আমরা এ অঞ্চলে এসেছি। কাশ্মীরের সূচ্যগ্র-ভূমিও পরহন্ত গত, এ কথা আমরা স্বীকার করিনা। সন্ন্যা: 'তা করবা না কর, তুমি এখন পুরঞ্জনের বন্দিনী, এটা নিশ্চিত। মান। আপনি কি ছলনা কচ্ছেন ? প্রবল প্রতাপান্বিত কাশ্মীরাধিপতির কন্যা, নগণ্য, হেয়, দেশ-বৈরী দস্য-সর্দারের বন্দিত্ব স্বীকার কবে, এও কি কখনও সম্ভক? আপনি কে? সন্ন্যা। আমি যে-ই হই, এক্ষণে অস্ত্র পরিত্যাগ কর, রাজকুমারি। মান। অস্ত্র পরিত্যাগ করূবাে, কি অস্ত্রের সদ্ব্যবহার করবাে;-তাই ভাবছি। তবে আপনি গৈরিক বসন-শােভিত,-সেজন্যই অপেক্ষা! অবিলম্বে দ্বার পরিত্যাগ করুন: সন্ন্যা। পরিত্যাগ ত দূরের কথা,—এই দ্বাঙ্গ বােধ কচ্ছি। গৈরিক-বসনের অপ-ব্যবহার করবাে না। এই দেখ, সুন্দরি, তুমি এতক্ষণ যার । নিন্দায় পঞ্চমুখ হয়েছিলে, আমিই সেই দস্যু-সর্দার পুরঞ্জন সিংহ। এক্ষণে বােধ হয় আপন অবস্থা হৃদয়ঙ্গ হলাে! আর বিলম্ব করােন্ত আত্ম সমর্পণ কর। মান। আশ্চর্য! হেয় শৃগাল,সিংহ-পরিচ্ছদ ধারণে তিলমাত্র সঙ্কুচিত হয় নি। প্রগলভতার পরাকাষ্ঠা ! উত্তম, মানসীর আত্মসমর্পণ নয় দ্য, তােমার প্রায়শ্চিত্তের সময় উপস্থিত। সন্ন্যা। রাজকুমারীর সাহস প্রশংসনীয়। তবে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণে অসম্মত হচ্ছ ?.. মান। নিশ্চিত-শতবার। সন্ন্যা। নিতান্তই- বাতুলতা। মান। কপটাধমের আত্মশ্লাঘা নিতান্তই বিরক্তিকর। সন্ন্যা। তবে প্রস্তুত হও, মানসী। কিন্তু জেনে রেখ,—পুরঞ্জনের অসি অতি খৰধার,—তােমার কোমল অঙ্গে যদি মান। সিংহ-শিশু শৃগালের নখাঘাতে ক্ৰক্ষেপ ও করেনা।
মানসী । স্যা। এক কথা শােন মানসী, তােমার আমার এ দ্বৈত যুদ্ধে যদি অবৈধ- ভাবে কেউ বাধা প্রদান করে,-যুদ্ধধৰ্ম্ম ভঙ্গ হলাে জাবে। আমার পঞ্চাশৎ সৈন্য অদূরে লুকাস্মিত। একটা মাত্র সংঙ্কেতে তারা এখানে উপস্থিত হতে পারে। তােমার রক্ষী বা অনুচরবর্গ-কেউ যদি আমাকে অতর্কিত আক্রমণ করে,উপস্থিত একটা প্রাণীও জীবিত রাখবােনা। মাম। এত ভয় মনে তোমার ? সন্ন্যা। এক্ষেত্রে সাবধানতার বিশেষ কারণ আছে। যদি তোমার মত কোমলঙ্গীয়—যদি তােমার দু' একটা মূখ অনুচরের—শুধু পরাজয় সাধনই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হততা,আমি ক্ষেপও কন্তুম না। কিন্তু জীবিত, অক্ষত কুঙ্গিনীকে পিঞ্জরাবদ্ধ কত্তে চাই, কাজেই একটু সতর্কতার প্রয়ােজন। মান। কে, কাকে পিঞ্জরাবদ্ধ কত্তে পারে, দেখা যাক্। প্রতিজ্ঞা কর পুরঞ্জন, যদি আজ এ দৈতযুদ্ধে পরাজিত হও, জীবনে আর কাশ্মীরের বিরুদ্ধে অসি উদ্যোলন করূবেনা,-কাশ্মীর-রাজের অধীনতা স্বীকার , কৰ্বে। সঁন্না। অসংকোচে কচ্ছি। তুমিও তবে প্রতিশ্রুত হও, রাজকুমারি, আজ যদি এ যুদ্ধে পরাভূতা হও, তুমি স্বেচ্ছায় আমার বন্দিত্ব স্বীকার করূবে। যতদিন না কাশ্মীর-রাজ তােমার উদ্ধার সাধনে সমর্থ হন, ততদিন এ দস্ত-ভবনে অবস্থিতি কৰে। মান। আপত্তি নেই। তােমার প্রস্তাবে আমি সম্মত হলুম। শােন রক্ষিদ্বয়, শােন বাহকগণ, শােন অমলে—এ যুদ্ধ আমাদের দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে মানসীর শক্তি পরীক্ষিত হবে। যদি পরাজিত। হই, আমি পুরঞ্জন- দয় বন্দিনী !—এস তবে পুরঞ্জন । পুর। আমি প্রস্তুত ( উভয়ের ভীষণ যুদ্ধ ও মানসীর অসি ভগ্ন হওন ) পুর। কুমারি, অসি ভয় হলাে ' মান। হাঁ দৈব বিড়ম্বনায় আমি অস্ত্রহীনা,-কাজেই পরাজিতা। পুর। তবে আত্ম-প্রতিশ্রুতি পালন কর। অঙ্গস্পর্শ করে তােমার অবমাননা কত্তে পুরঞ্জন সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক।
মানসী।
মান। তোমায় ধন্যবাদ। কিন্তু মনে রেখে পুরঞ্জন,-দুর্বিপাকে আজ
সিংহ-শিশু আমায় বন্ধ হলাে ! অমলে, তোমরা সকলে তবে শিঘিরে
ফিরে যাও। পিতাকে বলল, যতদিন তিনি উদ্ধায় সাধন না করেন,
ততদিন্স মানণী শক্ত করতল-গতা ।
অম। { ক্রন্দনে রাজকুমারি, কোন মুখে আমরা শিবিরে
মান। চুপ,-মানসীর সহচরী এত দুৰ্বল-চেতা ! শত্রু দেখে হাবে যে ?
যাও আমার আদেশ পালন্দ কর, সকলে শিবিরে ফিরে যাও। বিলম্ব
করাে না। চল তবে ধীরবর, এখন হতে কাশ্মীর-রাজ-দুহিতার
মাম-সম্রম যক্ষার ভার তােমার উপর
স্যা। রাজকুমারি, পুরঞ্জন ক্ষত্রিয় ।
( সকলের প্রস্থান ।
... ৮ম দৃশ্য-শিবিং-কক্ষ। ( রজার প্রবেশ } রাঙ্গা ও লােক-সমাজে আর মুখ দেখতে ইচ্ছা করে না। মহাপাপের ভীষণ প্রায়শ্চিত্ত আরব্ধ হয়েছে। স্বকীয় হৃদ-দৌৰ্ব্বলে নিতান্ত অনুগত সুহৃদকে যে পাষণ্ড, অকাতরে কারারুদ্ধ করে, তার বুকে শােক-শেল বিদ্ধ কত্তে পারে,-বিধাতা সে পাপিষ্ঠের সার-সৰ্ব্ব পরস্তগত করে দিয়ে তার অনন্ত তােষানলের ব্যবস্থা করূবেন, বিচিত্র কি ? কিন্তু সহ্য হয় না,-এ তীব্র যাতনা সহ্য হয় না। শােক-দুঃখের প্রবল তরঙ্গ-পূৰ্ণ-বিস্তীর্ণ—সংসার—সমুদ্রে, মানসীই আমার একমাত্র ধ্রুব নক্ষত্র ছিল, সে বিহনে আজ আমি লক্ষ্যভ্রষ্ট-দিশেহারা ! ভগ, আমার জ্ঞান-হরণের পূর্বে মান রক্ষার ব্যবস্থা কর। সম্ভ্রান্ত কাশ্মীর ভূপতি আমি, আমার দুহিতা দস্তকবলে নিপাতিত,তার উদ্ধারের উপায় করে দাও। আমার বিপুল সাম্রাজ্য, অতুল ঐশ্বৰ্য,—এ সমস্তের ও বিনিময়ে কি দস্যু আমার কন্যার ফিরিয়ে দেবেনা? ওহহ কি বিড়ম্বনা! (চিন্তা ) ( প্রহরীর প্রবেশ ) প্রহ। মহারাজ, রাজধানী হতে দূত এসেছে,-কি অনুমতি হয় ? রাজা | রাজধানীর দূত ?—ত্বরায় নিয়ে এস তাকে। —ত্বরায় নিয়ে এস তাকে। (প্রহরীর প্রস্থান) আবার সেখানে ও কি কোনও বিভ্রান্ট উপস্থিত?—যাক্। (ক্ষণপরে) গভীর অরণ্যের কোন্ স্থানে দস্যু অবস্থান করে, কোথায় মানসীকে রেখেছে, কে জানে ? আবাস স্থান নির্ণীত না হলে তার উদ্ধারের আশা কোথায় ? ( দূতের প্রবেশ ) কি সংবাদ, দূত ? দূত। বড় ভয়াবহ, মহারাজ! বলতে রসনা কম্পিত হয় { নতমুখ ) রাজা। বল, অসংকোচে বল। বজ্রাহত বৃক্ষে শিলাঘাত অনুভূত হয় না। মহাসমুদ্রে পতিত আমি, শিশির বিন্দুতে ভীত হব ? দূত। সম্রাট, রাজমহিষী বিকারের প্রাবল্যে আত্মহত্যা করেছেন। মন্ত্রী আততায়ী হস্তে নিহত। কাশ্মীর-রাজ্য মহাশ্মশানে পরিণত হয়েছে।
মানসী । ৯ রাঙ্গা । বেশ হস্লেছে। বিধাতার তুলাদণ্ডের বিচার ! রাজা-ভিখারীতে প্রভেদ নেই, পণ্ডিত-মুখে তারতম্য নেই—বেশ হয়েছে। এ পাপাত্মা যখন অকৃত্রিম বন্ধুর সুখের ভবন শ্মশানে পণিত করেছে, তখন তার রাজ্য মহাশ্মশানে পরিণত না হলে, ধর্মের মর্যাদা রক্ষা হবে। কেন? আমারই নির্মম পীড়নে আমার প্রিয়তম সুহৃদ রণজিৎ, পত্নী-শােকে উন্মত্ত, আর আমি পত্নী-কন্যাসহ সুখৈশ্বৰ্য্য ভােগ করবাে ? তা হলে যে পাপ-পুণ্য সব মিথ্যা হয়। , না, তা হবে না, তা হতে পারেনা। সূক্ষ-বিচার !–পত্নী-শােক, কন্যা-বিরহ, আমার শিরায় শিরায় বিদ্যুদগ্নি, জ্বেলে দেবে,-পাগল হয়ে আমি পথে পথে বেড়াব, এই আমার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত ! বেশ হয়েছে । (ক্ষণপরে) যাও দূত, তুমি কাশ্মীরে প্রতি গমন কর! কীর্ভিধ্বজকে বলবে, সেই-ই আপাততঃ একটা বিধি-ব্যবস্থা করুক! আমি আর ভাবতে পারিনা। দূতের প্রস্থান) রাজা। কিন্তু মানসী ?-- চিন্তা ) প্রহরি, ( ( প্রহরীর প্রবেশ প্রহ। হুজুর। রাজা। শিবিরময় ঘােষণা কর, কাল অতিপ্রত্যুষে পচিশ হাজার কাশ্মীর- সৈন্য বামদিকে এবং অবশিষ্ট সমস্ত-সৈন্য দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে, সমস্ত অরণ্য প্রদেশটা ঘিরে ফেলবার জন্য প্রস্তুত হােক। আরও শােন, যে কোনও প্রকারে, 'যে কেহ-মানসীর বর্তমান আবাস- স্থানের সন্ধান আমাকে বলে দিতে পাবে, তার পুরস্কার-কোটী মুদ্রা। একথাও এখনি প্রচার করে দাও। যাও, বিলম্ব না হয়। ( উভয়ের প্রস্থান) ৯ম দৃশ-পৰ্বত-প্রান্ত । পুরঞ্জন, বিজয় ও রঘুবীরের প্রবেশ ) পুর। বিজয় দাদা, শত্রু আমাদের কৌশলে প্ররিত হয়েছে, তারা দলে বিভক্ত হয়েছে। এক্ষণে যুদ্ধে জয় লাভ, আমাদের সাহস ও ক্ষিপ্ৰকারিতার উপর নির্ভর করে। আমি দ্বাদশ সহস্র সৈন্যসহ শত্রুর পশ্চিম বাহিনী আক্রমণ কবাে। তুমি সর্দারের সহায়তায়, অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে তাদের পূর্ব বাহিনীর গতিরােধ কর। পশ্চিম ৰাহিনী স্বয়ং রাজা শত্রুজিৎ কর্তৃক পরিচালিত। তােমরা যদি চম্পাতীরে শক্রদলকে অন্ততঃ দ্বিপ্রহর-কাল যুদ্ধে ব্যাপৃক্ত রাখতে পার, আমি বার হাজার সেনা নিয়ে শত্রু-পক্ষীয় পচিশ হাজার সেনা পরীভূত করে শত্রুজিৎকে বন্দী কবাে, নিশ্চিত বলছি। বিজ। পুরঞ্জন, এ অতি অসম সাহসিকতা!—তিন হাজার সেনা, চম্পাতীরে কতক্ষণ পচিশ হাজার শত্রুসেনার গতিরােধ কৰে? যদি আমরা পরাজিত হই, তাহলে শক্রদলের উভয় বাহিনীর মধ্যে পড়ে তুমি, সমস্ত সৈন্যসহ দলিত,—পিষ্ট হবে। প্রতিপক্ষ দুই দলে বিভক্ত সত্য, কিন্তু তাদের দূরত্ব বড় বেশী নয়। এ অবস্থায় তােমার প্রস্তাব কতদূর যুক্তিযুক্ত, বলতে পারি না। পঞ্চাশ হাজার সেনাকে সম্মুখযুদ্ধে বিপন্ন কৰাৰ চেষ্টা অপেক্ষা, পচিশ হাজার শত্রুর সহিত বলপরীক্ষায় নিযুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয় কি? চম্পাতীরে আমাদের সেনা পরাভূত হলেও, তিন্তিড়ী গিরি- সঙ্কট অাছে। এ দুই স্থানে দ্বিপ্রহর কাল, শত্রু বাহিনীর প্রতিরােধ করা তু আমার নিকট অসম্ভব বলে মনে হস্তু না। তবে এ কাজে অবশ্য বিপদ-ভয় যথেষ্ট আছে। বিজ। বিপদ-ভয়, পুরঞ্জন ? বিপদের ভয়ে,প্রাণের মমতায়, বিজয় তােমার এ প্রস্তাবে প্রতিবাদ কচ্ছে, এটী তুমি মনের গুপ্ত, কোণেও স্থান দিওনা। তুচ্ছ প্রাণের মমতা, বিজয় কখনও করেনা। তােমারই পিতার প্রসাদে বিজয়ের অস্থি-মজ্জা পরিপুষ্ট । তার প্রতি শশাণিত- কণা, তােমারই পিতার প্রসাদে পরিবর্ধিত,-এ কথা নিশিদিন প্রতি মুহূর্তে, বিজয়ের মনে জাগরুক আছে। তােমার কাজে জীবন পাত- বিজয়ের পক্ষে এ ত আনন্দের কথা, শ্লাঘার বিষয়। তবে চিন্তা এই, -জি তিন্তিড়ী-গিরি সঙ্কটে, প্রাণ দিয়ে ও, উপযুক্ত সময় পর্যন্ত শঙ্কর গতিরােধ কত্তে না পারি, তখন তােমার বিপদের অবধি থাকবেনা। সুই সম্মিলিত বাহিনীর পীড়নে তুমি পিপীলিকাবৎ পিষ্ট মানসী। পুর। বিজয় দাদা, সাহসের সঙ্গে, সুষােগের আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন, বর্তমান যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করূবাে,সে আশা নানা কারণে অল্প। এরূপ সুযােগ সৰ্ব্বদা ঘটবে, এ বিশ্বাস ও আমার নেই। এ অবস্থায়, এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবিত পন্থা অবলম্বন ব্যতীত গত্যন্তর কি? ভাল সর্দার, এ বিষয়ে ভােমার অভিমত কি ? রঘু। যুদ্ধ-কৌশলে আমি পরিপক্ক নই। আদেশ দাও, প্রাণপণে প্রতিপালন । কবাে। তবে ভাববার কথা –তিন হাজার সেনা, পচিশ হাজার সেনার সম্মুখে কতক্ষণ দাড়াতে পাবে। পুর। যুদ্ধে তােমরা জয়লাভ কবে, তেমন আশা, পাগলেও কত্তে পারে না। আমার উদ্দেশ্য পূৰ্ব্ব-বাহিনীকে পশ্চিম-বাহিনীর সঙ্গে মিলন-পথে বাধা দেওয়া। উভয় বাহিনীর মিলনে বিলম্ব-সাধন কত্তে পাল্লেই তােমাদের কাজ হলাে । সে জন্যই দুই স্থানে শত্রুর গতিরােধের ব্যবস্থা কচ্ছি। শত্রুজিতের ধৃতীকরণে তিন হাজার সেনা-ক্ষয়, আমি গুরুতর ব'লে মনে করিনা। রঘু। পুরঞ্জন, ভাল মন্দ বুঝি না। তােমরা দুজনে যা ভাল বুঝ কর। আমি প্রতিজ্ঞা বদ্ধ, আজীবন তােমার আদেশ পালন করূবাে--তা কত্তে ও আমি প্রস্তুত। পুর। তবে বিজয় দাদা, আর বিলম্ব নিষ্প্রয়ােজন। একটী মুহূর্তের শিথিলতা, একটা মুহূর্তের অপব্যয়, আমাদের সর্বনাশ কত্তে পারে! প্রয়ােজন বােধ কর, তুমি বরং পাঁচ সহস্র সৈন্য নিয়ে চম্পাতীরাভিমুখে অগ্রসর হও, দশ সহস্র সেনা-সাহায্যে পুরঞ্জন শত্রুজিৎকে বন্দী কবে। বিজ। পুরঞ্জন, দুই হাজার মাত্র সেনা আমার সহগামী হােক,—অবশিষ্ট তের হাজার সেনা নিয়ে তুমি শত্ৰু-বাহিনী আক্রমণ কর। এ যুদ্ধে বিজয়ের পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু মানুষের যা সাধ্য,বিজয় তা কবে। প্রতিজ্ঞা কচ্ছি, যতক্ষণ দেহে একবিন্দু শােণিত বিদ্যমান থাকবে, যতক্ষণ হস্ত অসি-বর্শা ধারণে সমর্থ থাকবে, ততক্ষণ শত্রুর গতিরােধ করূবাে। কিন্তু এক কথা,-তুমিও প্রতিজ্ঞা কর ভাই, যদি জাতে পাও, শত্রুর পথ উন্মুক্ত হয়েছে, তাহলে অবিলম্বে সৈন্য- সহ যুদ্ধ ক্ষেত্র পরিত্যাগ করবে। দম্ভভরে নিজে বিপন্ন হবে না । পুর। তােমার প্রস্তাবে সম্মত হলুম। কিন্তু বিজয় দাদা, সন্দেহ-বশে নিজ শক্তির হীনতা কল্পনা করােনা। বিজ। দেখতে পাবে। তবে ভাই, বিদায়।—এস, সর্দার। ( সকলের প্রস্থান) (পটক্ষেপণ)
পঞ্চম অঙ্ক।
১ম দৃশ্য—গিরি সঙ্কট।
( রক্তাক্ত কলেবর, বারুদ-বিকৃত বিজয়, পার্শ্বে বারুদ-বিকৃত।
মুরলা। সম্মুখে কামান, ঘন ঘন তােপধ্বনি।)
মুর। বারুদ সব ফুরিয়ে গেল।
বিজ। আঁ-বারুদ নেই ?
মুর। আর দু একবার মাত্র তােপ, দাগতে পাবে।
বিজ। হায়, হায়,—আরও কিছু বারুদ ও যদি থাকতত! ভাল মুরলে,
সৈন্যদের পলায়ন বার্তা নিয়ে, সর্দার কতক্ষণ পুরঞ্জনের নিকট রওনা
হয়েছেন?
শত্রুর সেনা চম্পা পার হলেই আমাদের সমস্ত সেনা যখন ছত্রভঙ্গ
হয়ে পড়ে, তখনই তােমার আদেশে বাবা সেনাপতির নিকট রওনা
হন।
বিজ। ততটুকু আমার ও মনে পড়ে। কিন্তু তারপর কতক্ষণ আমরা
এখানে আছি, ধারণা কত্তে পাচ্ছিনে।
বাবার গমনের কিছু পর, তুমি একলাটা এখানে দাঁড়িয়ে পচিশ
হাজার সেনার গতিরােধ কচ্ছ। সে প্রায় চারূদণ্ড!
বিজ। চার দণ্ড? কম নয় তাে, মুরলে ? তাহলে কতকটা নিশ্চিন্ত হলুম।
এতক্ষণে তবে পুরঞ্জন রণক্ষেত্র ত্যাগ করেছে।
মূব। ঐ আবার একদল শত্রু দেখা দিয়েছে—
বিজ। দাও, বাদ দাও-(তােপধ্বনি) এক কথা মুরলে, আমি আরও
অর্ক দণ্ড কাল, একাকী অসিবর্শা হস্তে শত্রুর আক্রমণ ব্যর্থ করবাে।
এ অবসরে তুমি আত্মরক্ষার উপায় দেখ।
মুর। তুমি ত অনুমান কচ্ছ, সেনাপতি নিরাপদ হয়েছেন? তবে চল না,
প্রিয়তম, এ বেলা দুজনেই বনের ভিতর প্রবেশ করি। শ ত আর
আমাদের খুঁজতে যাবে না!~-গেলেও আমাদের পাওয়া সহজ হবে
না। সন্ধ্যা হয়ে এল, আমরা আঁধারে মিশে যাব।
মানসী । ৯৭ বিজ। জীবিতাবস্থায় বিজয়ের পক্ষে গিরি-সঙ্কট ত্যাগ অসম্ভব, মুরলে। বিজয় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যতক্ষণ হস্ত অসিবর্শা ধারণে সমর্থ থাকে, শক্তগতিরােধে সে পরায়ুখ হবে না। বিজয় ক্ষত্রিয়, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ সে কত্তে পারেনা। মুর। ঐ আবার আর একদল শত্রু দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বিজ। বারুদ নেই ? মুর। আছে,- এই শেষ। বিজ। যা আছে, দাও। (তােপধ্বনি। প্রিয়তম, একলাটা পাঁচিশ হাজার শত্রুর বিপক্ষে দাঁড়ানাে,কেউ কল্পনাও কত্তে পারে না। তুমি আজ অসাধ্য সাধন ককূলে। বীরত্বের তুলনা নেই। তা, পুরঞ্জন যখন এখন নিরাপদ, তথন মিছামিছি, অমুল্য জীবন নষ্ট করে ফল কি ? বিজ। মুরলে, শােন।-জীবন পণ করেই, বিজয় এ পথে পা দিয়েছিল। সম্ভব অসম্ভবের চিন্তা মনে জাগে নি, বীরত্ব-শূরত্বের যশােভিলাষ বিজয়ের মনের গুপ্ত-কোণেও লুকায়িত ছিল না। পুরঞ্জনের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন কবে,--শুধু-~-এ ভাবেই বিজয় উন্মত্ত হয়েছিল, তারই ফলে কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিজয়, রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়। আনন্দের কথা, ভগবান্ তার মান রক্ষা করেছেন। প্রাণের জন্য সে তিল মাত্র চিন্তা করেনা। কিন্তু তুমি? তুমি মরলে, বৃথা আত্ম-বিসর্জন কেন কবে ? যাও মুরলে, এখনও সময় আছে, প্রাণ বাঁচাও। আর এক কথা,-তুমি আজ বিজয়ের যে সহায়তা কল্লে, পুরঞ্জনের যে উপকার কল্লে, অতিবড় সাহসী যােদ্ধা ও বুঝি তেমন পারেনা। এজীবন অগৌণে অনন্তে বিলীন হবে, জগতে তােমার বীরত্বের, তােমার মহত্ত্বের প্রমাণ থাকলাে না,তবে তােমার কীর্তি- কলাপের সাক্ষী স্বয়ং বিশ্বেশ্বর। যাও তবে মুরলে, আর বিলম্বে বিপদের সম্ভাবনা। প্রিয়তম, বার বার তুমি ও কথা বলােনা;-ক্ষুদ্র লতাচী যে গাছ জড়িয়ে থাকে, সে গাছ হতে বিচ্ছিন্ন হলে, আর কি সে প্রাণে বাঁচে? যে জগৎ বিজয় ত্যাগ কচ্ছেন, স্বর্গ হলেও সে জগতে মুলা সইতে চায়না। আমি তােমায় ছেড়ে কোথাও যাব না।
৯০, মানসী। বিজ। মুরলে, এ জগতে তােমার স্নেহময় পিতা আছেন, ভেবে দেখ, তােমার অভাবের হৃদয় শতধাবিদীর্ণ হবে। (শত্রুর কোলাহল) অই শত্রুদল অগ্রসর হচ্ছে। আর বিলম্ব করােনা। শােন তবে, প্রিয়তম, না আর সংকোচ, কেন ? মরণের পথে পা দিয়ে আছে মুরলা—আর তার কিসের লজ্জা, কিসের সংকোচ ? শােন প্রাণেশ্বর, মুরলার মনঃপ্রাণ তােমার চরণে অর্পিত। জীবনে মরণে মুরলা অই চরণ ছাড়া হবে না। মুরলা তােমার দাসী, প্রভুর সঙ্গে দাসী যেখানেই যাক্, পিতা তাতে রুষ্ট হবেন কি? ( শক্রর কোলাহল। বিজ। মুরলে, অই অই, শত্রুর কোলাহল শ্রুত হচ্ছে। আর বারুদ নেই, তাদের গতিবােধ অসম্ভব। আয়, আয় তবে মুরলে, আর সময় নেই, মাথার উপর মরণ অসি উদ্যত রেখে, বিজয় একবার প্রাণ ভরে জন্মের মত তােকে আলিঙ্গন কবে। আয় মুরলে, এই প্রথম,—এই ( উভয়ের আলিঙ্গন) মুর। জন্ম সার্থক হলাে এ জগতে মুরলার সকল সাধ পূর্ণ হলাে। জগৎ- । পিতার পায় তার অন্তিম প্রার্থনা, মুরলা যেন জন্মে জন্মে অই চরণে স্থান পায়। ( বিজয়ের পদধূলি গ্ৰহণ ) [ নেপথ্যে “জয় কাশ্মীরের জয়”-রবে কোলাহল। ] বিজ। শত্রু এসে পড়েছে। তবে মুরলে, দাঁড়িয়ে একটু তামাসা দেখ। ক্ষত্রিয়ের মরণ-খেলা দেখে নে। (অসিবর্শা ধারণ) (কতিপয় কাশ্মীর সৈন্যের প্রবেশ) ১ম। কই, এখানে ত কেউ নেই। ২। অই যেরে একটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ৩। একটা—একাকী ? ও বিজ। বিজয় একাই এক সহস্র, আয় মেষ দল। ৪র্থ । অই আর একটা, দুটো কেই ধ—মা- ১ম ধর, মারু-কার্ট। (আরও কতিপয় সৈন্যের প্রবেশ ও যুদ্ধ ) (বর্শা নিক্ষেপে ) এই দফা শেষ মানসী। মুর। (চকিতে অগ্রসর হইয়া নিক্ষিপ্ত বর্শা বুকে গ্রহণ করিয়া) আন্ধা মুরলা খা। (পতন) তবে প্রাণেশ্বর, দাসী-বিদায়--হল,-দাও~~চরণ —ধূলি— কোনও --দুঃখ নেই -হাসি-মুখে—যা-ই- বি-দ। (মৃত্যু) বিজ। একি মুরলে, গেলি, আমার আগেই চলে গেলি? আমার মরণাঘাত বুক পেতে.গ্ৰহণ কল্লি ? তবে দাঁড়া–একটু দাঁড়া, একা যানে, আমি আসছি, তবে যাবার আগে, যে কটা পারি, শত্রু নিপাত করি। (যুদ্ধ ও পতন ) [ নেপথ্যে কাশ্মীর সেনাদল অস্ত্র সংরণ কর, যে যেখানে আছ দাঁড়াও, আজকের জন্য যুদ্ধ ক্ষান্ত হলাে”। ১ম। যুদ্ধ ক্ষান্ত হলাে ? ২য়। বাঁচা গেল-বাপ,। ৩য়। ব্যাটা বলেছিল, এক এক সহস্র। এ যে তা নয়, ব্যাটা যে একাই পচিশ হাজার। [ নেপথ্যে—“দ্রুত চম্পাতীরবর্তী সমতল ক্ষেত্রে ফিরে চল। রাত্রি হলাে, বিলম্ব করােনা” । ] ৪র্থ। চল তবে, সকলে ফিরে যাই। ১ম। বাপ, এমন বুদ্ধ আর দেখিনি, গেলেই বাঁচি। (সৈন্যগণের প্রস্থান ) বিজ। মুরলে,আর অপেক্ষা—নেই, এই-যে.আ—-ছি- ( দ্রুতবেগে পুরঞ্জন ও রঘুবীরের প্রবেশ) পুর। কই, কই সর্দার, বিজয় দাদা কই আমার ? এই তগিরি-সঙ্কট-মুখ । অই যে আশে পাশে মৃতদেহ পড়ে আছে, আমার বিজয় দাদা কই সর্দার ? বিজ। কে—ভাই, পুরঞ্জন পুর। এই যে, এই যে বিজয় দাদা । দাদা, তুমি কি আহত,একি বর্শা যে তােমার হৃদয় ভেদ করেছে- কোলে লইয়া উপবেশন), দাদা ! বিজ। ভাই- পুর। তােমার এ দশা, দাদা ? বিজ। দুঃখ করােনা। -কল—সাধ-পূ-তুমি—নি- রা—প—-। -ডু-মুয়— (মৃত্যু) মানসী পুর। দাদা, দাদা, চলে গেলে? এ অভাগাকে ছেড়ে জন্মের মত চলে গেলে ? আমি তােমার কথা না শুনে, দুঃসাহস প্রকাশ করেছিলুম, এ অভিমানেই কি দাদা, আমায় ত্যাগ কল্পে ? হায় হায়, আপন দক্ষিণ হস্ত আমি আপনি চ্ছেদন কল্পম ? রঘু। এ কে ? মুরলা?—মা বিজয়ের সহগামিনী হয়েছি ? হৃদয়ের সমস্ত খানি স্নেহ দিয়ে যে তােকে এতদিন পালন করেছিলুম, মা ! সে মায়া কেটে গেলি?- পুর। মুরলা ও গেছে ? অদৃষ্ট! সর্দার বুক ফেটে যেতে চায়,--যখন ভাবি, আমার জীবন রাখতে গিয়ে বিজয় দাদা প্রাণ দিলে । রঘু। বিজয়ের তুলনা, একমাত্র বিজয়। পুর। সর্দার, যখন শুনলুম, চম্পাতীরে পরাভূত হয়ে আমাদের সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ হয়েছে, আর একাকী একটা মাত্র কামান নিয়ে, মুরল মাত্র সঙ্গিনী করে, বিজয়দাদা গিরিসঙ্কট মুখে দণ্ডায়মান, তখনই বুঝেছিলুম, এ অভাগার জীবনরক্ষাৰ্থ বিজয় দাদা আপন প্রাণ বিসর্জনে দৃঢ়- সংকল্প ! সংবাদ শুষ্কা মাত্র, তাই ছুটে এসেছি। কিন্তু পালুম না। হতভাগ্য আমি, এই স্বার্থময় জগতে নিঃস্বার্থতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি, আমার সহােদরাধিক, অকৃত্রিম বন্ধু,--মেহে পিতা, সেবায় পুত্র, ত্যাগে দধীচি, প্রতিজ্ঞায় ভীষ্ম, আমার বিজয় দাদাকে রক্ষা কত্তে পান্নুম না। মুহূর্তের বিলম্বে এ সৰ্ব্বনাশ হলাে। তবে যাও বিজয়, বীরলােকে তােমার জন্য রত্নসিংহাসন সজ্জিত রয়েছে। তােমার বন্ধুবৎসলতা, তােমার কর্তব্য-পরতা, তােমার আত্মত্যাগের তুলনা, এ জগতে মিলেনা। আর মুরলে, তুমি রমণী কুল-ললাম-ভূতা! কি ববব আর? যাও তুমি, কিন্তু তােমার নিঃস্বার্থ, তােমার কীর্তি- কলাপ ভারত ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। বুঘু। শােক-প্রকাশ বৃথা। ধষ্ঠ বিজয়, ধন্য মুরলা আমার, আপন জীবন দানে প্রভুর জীবন নিরাপদ করেছে। এ সুযােগ সকলের ভাগ্যে ঘটে না। তাদের জন্য শােক প্রকাশ অনুচিত। পুর। হ, সর্দার, যথার্থ ই বলেছ,—শােক-প্রকাশ মূঢ়তা! শােক কবে । বিজয়-মুরলার অভাবানল শােকাতে নির্বাপিত হবে না। .এ অনল হৃদয় মধ্যে নিরুদ্ধ থেকে, অচিয়ে দ্বিগুণ তেজে প্রজ্জ্বলিত হােক,—সমস্ত কাশ্মীর-বাহিনী তাতে ভস্মীভূত হবে। (পটক্ষেপণ)
২য় দৃশ্য-ব-পথ ।
.
১ম বা।
( কতিপয় ব্যাধ-বালকের প্রবেশ )
সকলে। চল, চল, জঙ্গল ঘুরি ফিরি, চুরি,
শিকার করি,যত পাই বনচর ।
অই দ্যাখ, গাছের ডালে
২য় বা { পাখী একট! আছে ঝুলে,--
৩য় বা। মারি বর্শা তুলে,-
৪র্থ বা। এই মুড়ি ধনু শর।
১ম বা। দ্যাখ, না এদিক চেয়ে,
গীধায় একটা অই শুয়ে,-
৩য় বা। মারছি দ্যাখ খুঁচিয়ে,-- (আক্রমণ )
৪র্থ বা। —ঐ পালাচ্ছে, ধ ধ ধর
সকলে। ঐ পালাচ্ছে, ধ ধ ধরু
( সকলের দ্রুত প্রস্থান)
–
৩য় দৃশ্য কক্ষ। ( মংনী উপবিষ্টা) মান। আজ সপ্তাহ-কাল আমি. পরাশ্রিতা। এ কয়দিন, কি যেন এক অভিনব যাতনা আমায় দগ্ধ কচ্ছে! পিতা কি আমার উদ্ধার সাধনে, সমর্থ হবেন? এ দুর্গের অবস্থিতি অবগত হওয়া, তার পক্ষে কি সম্ভবপর? জীবন কি তবে এ ভাবেই কাটবে? জীবনভরা মানসী পরাধীনতার লৌহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে? পরাধীনতা। পরাধীনতা ই কি আমার মনােবেদনার কারণ ? রমণী কবেই বা চির-স্বাধীন একি তবে পিতার অদর্শন-যাতনা ? সে যে এ হতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন । এ যে কিসের বেদনা,আমি আপনি যে তা ধারণা কত্তে পাচ্ছিনে। যে দিন হতে এখানে এসেছি, সেদিন হতেই যেন মনের ভিতর কি এক অজানিত বেদনার সৃষ্টি হয়েছে। (ক্ষণপরে) পুরঞ্জন কি সত্যই দ? তার যত্ন, তার আদর, তার ব্যবহার,-সকলই যে অসাধারণ । দর হৃদয় এত সরল, আচার এমন চমৎকার,-চরিত্র এমন মহৎ, এ কখনই হতে পারে না। ? } ( পুরঞ্জনের প্রবেশ } পুর। রাজকুমারি, গত দুই দিন অবিরত যুদ্ধকার্যে বিব্রত থাকায়, বিশেষতঃ আমার সােদর-কল্প, সুহৃ বিজয় সিংহের শশাকে কাতর হওয়ায়, স্বয়ং তােমাকে দেখতে আসি নি। পরিচর্যার কোনও ক্ৰটী হয়নি ত ? মান। দুর্গ-স্বামি, এ কয়দিন, আমি দুর্গে রাজরাণীর আদরে কাল কাটাচ্ছি। কিন্তু বন-বিহাঙ্গিনী, সােগার পিঞ্জরেও কারায়ন্ত্রণ ভােগ করে থাকে, তাে ? পুর। তা থাকে, কেননা, মুক্ত আকাশে সে চিরদিন ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ভদ্রে, রাজকুমারীদের ও একদিন না একদিন তাে শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হয় ! (ক্ষণপরে) সম্রাটু-নন্দিনী, এ কয়দিন একটা কথা বলতে এসে বলতে পারিনি। ভয় হয়, সংকোচ হয়,যদি অভয় দাও, কথাটা খুলে বলি। মান। আশ্চর্য! আমাকে ভয় কি, দুর্গপতি ? আমি বন্দিনী,তুমি বিজে। আমার নিকট তােমার ভয়ের কারণ কি থাকতে পারে?
মানসী । মান। পুর।. কথাটা শুনে একটু দুঃখিত হলুম। তুমি বিজি,--আমি বিজয়ী, এ দুর্গে তুমি কি তেমন ব্যবহারই পেয়ে থাক, মানসি? ক্ষমা কর, বীরবর। আমার প্রতি তােমার ব্যবহার, শতবার প্রশংসনীয়। আমি এভাবে কথাটা বলে যদি তােমার হৃদয়ে বিন্দু- মাত্র ব্যথা দিয়ে থাকি, অসঙ্কোচে সেজন্য শতবার ক্ষমা প্রার্থনা পূব । ক্ষমার কথা কিছুই নেই, রাজকুমারি! তুমি এক্ষণে আমারই সংরক্ষণে আছ। এ অবস্থায়, যদি আমার কোনও কথা বা কাৰ্য্য, কোনও প্রকারে, তােমার মন: কষ্টের কারণ হয়,-আমার ক্ষোভের অবধি থাকবেনা। সেজন্যই কথাটা প্রকাশ কত্তে, তােমার অনুমতি প্রার্থনা কচ্ছি। মান। বল, দুর্গেশ্বর, শ্রবণ-যােগ্য কথা হলে, সংকোচের কোনও কারণ নেই। পুর। উত্তম। কথাটা এই,—আমার নামমাত্র বন্দিনী হয়ে, তুমি বড়ই ক্ষুব্ধ মনে কাল কাটাচ্ছ। আমার ইচ্ছা, আমি প্রকৃতই চিরদিনের জন্য তােমার বন্দীত্ব স্বীকার করে, সপ্রমাণ করি,-আত্মসমর্পণ মাত্রই কষ্টের নিদান নয়। মান। কুমার, তুমি সরল ভাবে, যে প্রস্তাব কল্পে, আমিও তার সরল উত্তর দেবাে। আমার কাছে তােমার এ প্রসঙ্গ উত্থাপন, নিরর্থক। এ সকল আলােচনা আমার পিতার সঙ্গে করাই সঙ্গত। পুর। তুমি বুদ্ধিমতী কিশােরী, তুমি কি মনে কর,বর্তমান অবস্থায় তােমার পিতা এ প্রস্তাবে সম্মত হবেন। মান। তুমি তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি যুবক, তুমি কি মনে কর, দুর্গ স্বামি, পিতার অনভিমতে কাশ্মীর-রাজ-দুহিতা, পরের গলে বর-মাল্য দিতে স্বীকৃত হবে? আমি বন্দিনী, তােমার করায়ত্তা, এতে পিতার মান মর্যাদা অবশ্যই ক্ষুগ্ধ হয়েছে, তুমি কি মনে কর, আমি স্বেচ্ছায় তােমার অঙ্কশায়িনী হয়ে, পিতার বিষ-মুখে অধিকতর কলঙ্ক-কালিমা লেপন কবাে ? আরও শােন, তুমি অশেষ গুণ-মণ্ডিত ক্ষত্রিয়-যুবক সত্য, কিন্তু তথাপি তুমি কাশ্মীরের শত্রু তুমি দেশদ্রোহী।
১০৪ মানসী। { পুর। মানসি, আপাততঃ লােক-চকুতে আমি কাশ্মীর-রাজের শত্রু-মধ্যে পরিগণিত এ কথা স্বীকার কচ্ছি। কিন্তু পুরন দেশদ্রোহী নয়। কাশ্মীরের ধূলিকণায় তার প্রতি অস্থি গঠিত। ভাগ্য-দোষে বহুদিন সে, দেশ হতে বিতাড়িত। কিন্তু আবার যাতে দেশমাতৃকার কোমল- কোলে মাথা রাখতে পারে, আবার যাতে মায়ের আকাশ-তলে মায়ের মুক্ত বাতাস সেবনের অধিকারী হয়, সেজন্যই সে চেষ্টিত, সেজন্যই সেদস্য পদবাচ্য! এ অবস্থায়, তাকে আর যা অভিপ্রেত ইল্প বল, কিন্তু দেশদ্রোহী বলে ঘৃণা করােনা। মান। যাই হােক কুমার, মানসী পিতার অধীন। পিতার অনুমতি ব্যতীত, সে এতদিন কোনও কিছু করেনি,আজ ও কৰ্ব্বেনা । পুর। তােমার পিতার নিকট দূত-মুখে এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত ককূলে, কোনও ফল হবে বলে ত মনে হয় না । মান। তা হবে না, নিশ্চিত হবেনা। এরূপে বন্দিনী কন্যার উদ্ধার সাধন করবেন, আমার পিতা তেমন আত্ম-মৰ্য্যাদা শূন্য কাপুরুষ নন। পুর। তবে আমার আশ-লতা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে, মানসী ? মান! ক্ষমা কর, দুর্গ স্বামি,এ প্রসঙ্গের আলোচনায় বিরত হও। যতদিন এ দুর্গে বন্দিনী আছি, ততদিন দ্বিতীয় বার এ প্রসঙ্গের আলােচনা হয়,–এ আমার অভিপ্রেত নয়। পুর। (ক্ষণ চিন্তায় পর):তা-ই হবে। তােমার আদেশই প্রতিপালিত হরে। মানসি, তােমার মূর্তি কমনীয়, কিন্তু হৃদয় পাষাণ অপেক্ষাও কঠিন। ( ধীরে প্রস্থান) মান। মনের বেদনা, ক্রমেই বেড়ে উঠছে। কেন এমন হলো, কে বলবে ? গীত। আমার মন যে কেমন করে, আমার প্রাণ যে কেমন করে, কিসের বেদনা আপনি বুঝিনা, মানসী। ১৫ বুঝিবে কে মনে পরে গো, বুঝিবে কেমনে পরে ? শৈশবের স্মৃতি মাের, ওগাে মায়ের মরণ-ব্যথা, বিস্মৃতি-সলিলে গিয়েছে ডুবিয়ে, জাগেন। মনে সে কথা, কৈশােরের কত শোক, কত স্বজন-বিরহ-বেদনা, নীরবে গোপনে সহি গো, এত নয় তার তাড়না, এযে হৃদয়ের তারে মিশিয়ে তান, করুণ রোদনে কে গায় গান, সে গানের স্বরে পরাণ বিকল,- আঁখি-জল মাের ঝরে গো, আঁখি-জল মাের বারে । " - = (পদ্মাবতীর প্রবেশ }। পদ্ম। কি লা, স্বয়ংবর হবি নাকি ? মান। মৰূতে মতে বেঁচে গেছ,-তবু রসিকতা টুকুর ভুল নেই ? এ বুঝি রসিকতা ? ‘মন যে কেমন করে'—‘হৃদয়ের তারে মিশিয়ে তান, করুণ-লােদনে কে গায় গান,—তা শুনে ‘পরাণ বিকল হয় তাের, ‘আঁখি-জল ঝরে' তাের,-আর দোষ যত সব আমার?-নয় ? মান। সত্যি, পদ্মদিদি, আমার মন যে কেন এমন হলাে,—কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনে। তবু এখানে তােমার সঙ্গ পেয়ে,অনেকটা আশ্বস্ত হয়েছি। দিদি, বিশুষ্ক এ মরুভূমে তুই-ই এখন আমার একমাত্র ছায়াতরু ! পদ্ম। এটা তাের পক্ষে মরুভূমি, না, নন্দনকানন,-আমি তাের ছায়াতরু, -না, উগস্বামী পুরন কল্পতরু,—তা জানুতে আর বাকী নেই লােবাকী নেই। আমি শপথ করে বলতে পারি,তুই পুর- নেয় রূপের আগুণে পুড়ে মরেছি।
১৬ মানসী। মান। রূপের আগুন? পােড়ামুখি, রূপজ মােহে মানসী ভুলবে, এটাও তুমি বিশ্বাস কর ? পদ্ম। তবে বুঝি গুণজ প্রেম? এত শীঘ্র ‘গুণ-গ্রহণ’ টা হয়ে গেল ? মান! “ অগ্নির দহন-শক্তির অনুভব, কত সময়সাপেক্ষ, দিদি ? ভাল এত বলছি কেন ? যা অতি দয়ার একবিন্দু লাভ করে, তুমি মৃত- দেহে প্রাণ পেয়েছ; যার কৃপায় সেনাপতি দাদা এই হারানিধি কুড়িয়ে পেয়েছেন, তাঁর গুণের কথা—তােমায় বলে জানাতে হবে কেন? আর তাই বা বলছি কেন? তুমি নিজে তাঁর গুণ গেয়ে গেয়ে যে, সেদিন সারাটা দুপর কাটিয়ে দিলে । পদ্ম। ভাল, সন্ন্যাসী বেশে ছলনা, এটা তাের চোখে পড়ে না ? মান। এটা যে উভয়পক্ষে! যাক্ দিদি, এ ছদ্মবেশে ত কারও কোনও ক্ষতি হয় নি। ছদ্মবেশে না গিয়ে, দলবল নিয়েও তাে পুরন আমায় বন্দিনী কত্তে পাত্তেন। তাতে বরং বৃথা রক্তপাত হতাে। পদ্ম। আমারই হার হলাে লাে, আমারই হার হলাে। কেমন হলাে ত ? (ক্ষণপরে) না, মানসি, এখন পরিহাস থাক্, সত্যি পুরঞ্জন দেবচরিত্র, ক্ষত্রিয় যুবক। তার গুণে মুগ্ধ হবি, বিচিত্র কি ? কিন্তু কথা এই, মহারাজের কাছে সংবাদ পাঠিয়ে যুগল-মিলনের ঘটকালিটা তাে আমাকেই কত্তে হবে ? তার পুরস্কার , মান। ছি দিদি, বীরপত্নী হয়ে তুমি এমন কথা বল্লে ? এখন বিবাহ-কল্পনা, এও কি সম্ভব ? পদ্ম। মিথ্যে নয়। তবে শুধু অবলা বুদ্ধিতে কুলুচ্ছে না। তােমার দাদার পরামর্শ চাই। মান। ছি, তােমার কি লজ্জা নেই ? পদ্ম। শুনলুম, একটা বড় যুদ্ধ জয় করেছিলি,আর লজ্জাকে তাের এত ভয় ? দাদার কাছে লজ্জা ? মান। হাঁ, ভাল কথা দিদি,দাদা কি সম্পূর্ণ সেরে উঠেছেন ? পদ্মা। হাঁ, বিশ্বেশ্বরের কৃপায় তিনি এক্ষণে রােগ-মুক্ত এখন তবে যাই, -তােয়ই কাজে। ( প্রস্থান) ৪র্থ দৃশ্য-অন্তঃপুরস্থ পথ । ( একদিকে রণজিৎ, অপর দিকে দু'ব ‘ব বেশ } গুণ। তােমাকেই খুঁজছিলুম, পদ। প। এই মাত্র মানসীকে দেখে আসছি। রণ। মানসীর সম্বন্ধে আমার কর্তব্য নিয়ে, মহা সমস্যায় পড়েছি, পিরে। -- তার সমাধান কত্তে পাচ্ছিনে। প। কি এমন বিশেষ সমস্যা যার জন্য তুমি চিন্তিত হয়েছ ? রণ। সমস্যা বড় জটিল, প্রিয়ে। মানসী আমার প্রভু-কন্যা। যাব পিতা', অন্নে আবাল্য এ দেহ পুষ্ট, যার পিতার অপরিমেয় স্নেহ দয়ায় বণজিতের প্রতি অস্থি, প্রতি মজ্জাকণা, পরিবর্ধিত -যে মানসী সহােদর হতেও আমায় অধিক ভালবাসে, সেই মানসী, সেই প্রিয়তমা মানসী আমার, আজ স্বাধীনতা হারা হয়ে শত্রু দুর্গে অবরুদ্ধা। আর রণজিৎ নিশ্চিন্ত মনে, নিশ্চেষ্ট ভাবে,-সুখ-শয্যায় শায়িত থাৰে, রণজিতের প্রকৃতি সেউপাদানে গঠিত নয়। আবার, এদিকে অসামান্য কৃতজ্ঞতা ঋণ! রণজিতের তপ্ত বক্ষরক্তের বিনিময়েও সে হারাধনপ্রাপ্তির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না,—মানসী-শত্ৰু পুরঞ্জন আমায়, অযাচিত ভাবে সেধন দান করে উদারতা, মহানুভবতা ও বন্ধুতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। অধিক কি, পুবঞ্জনের ব্যবস্থা ফলেই উন্মত্ত রণজিৎ প্রকৃতিস্থ হয়ে, তারই সুসজ্জিত কক্ষে অদ্যাপি” রাজার সম্মানে বাস কচ্ছে! সেই পুরঞ্জনের বিরুদ্ধাচরণ অপেক্ষা, নীচতা, কাপুরুষতা, ও কৃতঘ্নতা, কেউ কখনও কল্পনাও কত্তে পারে কি ? বিষম সমস্যা- সমুদ্রে ভাসমান্ আমি – পৰিত্ৰাণ-লাভের উপায় দেখছিনে। পদ্ম। এই কথা ? আমি যদি এর সরল মীমাংসা করে দিতে পারি, পুরস্কার ? রণ। পুরস্কার আর কি দেবে ?- দেবার বাকী কি ? দেহ-মন সকলই যে উৎসর্গীকৃত হয়ে আছে। পদ্ম। ঈস-থাম। অত বলােনা। জামি উপায় বলে দিচ্ছি, তুমি সব কাজ গুছিয়ে নিবে।
মানী। উঠেছ। রণ। বল আমায় কি কত্তে হবে ? কি করে উভয় দিক রক্ষা করবাে, —ভেবে ঠিক কত্তে পাচ্ছিনে। পদ্মা । শােন,তবে। তােমার যে গাে গােড়ায় ভুল, তাই এত আকুল হয়ে পুরঞ্জন মানসীর শত্রু নয়, মানসীও পুরঞ্জনের শত্রু নয়, বরং উভয়ে উভয়ের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত। এক্ষণে তুমি যদি সম্রাটকে সম্মত ক'রে, সত্বর যুগল-মিলনের ব্যবস্থা কত্তে পার, সকল দিক বজায় থাকে। একদিন তুমি ত বলেছিলে, যেমন পাত্রী মানসী, তেমন পাত্র পুরঞ্জন! রণ। মানসী পুরঞ্জনের প্রতি অনুরক্তা, এটা কি সত্য? পদ্মা । এত সাহস তােমার ? আমার কথায় অবধি সন্দেহ ? এ হুজুর স্বয়ং তার প্রত্যক্ষ-প্রমাণ! এক্ষণে যা বল্লুম, তারই চেষ্টা কর। রণ। রাজার সম্মতি ? তা অতি সহজে সংগৃহীত হতে পারে, যদি পুরঞ্জন আমার প্রস্তাবে সম্মত হন। পদ্মা। কি সে প্রস্তাব, শুনি ? রণ। যদি পুরঞ্জন সসম্মানে মানসীকে সত্বর সম্রাটের নিকট প্রেরণ করেন। পদ্মা। অই যে পুরঞ্জন এ দিকেই আছেন, কথাটা উত্থাপন করে দেখ না। ( পুরঞ্জনের প্রবেশ) পুর। সেনাপতি, এখানে কোনও অসুবিধা ভােগ কচ্ছেন না তাে ? আমি নানা কারণে, সকল সময়, সকল তত্ত্ব স্বয়ং নিতে পাচ্ছিনে। অবস্থা বিবেচনায়, সে ক্ৰটী মার্জনা করবেন, ভরসা আছে। রণ। পুরঞ্জন, ভাই, তােমার বিনয়, তােমার শিষ্টাচার, তােমার অবাচিত অনুগ্রহ-রণজিৎ জীবনে যদি কখনও বিস্মৃত হয়, তা হলে তার মত নরাধম, তার মত অকৃতজ্ঞ, এ বিরাট ব্রহ্মাণ্ডে দ্বিতীয়টী আর নেই। তােমার ঋণ অপরিশােধ্য। তবে যা শুনছি, তা যদি সত্য হয়, তােমার তুষ্টি-সাধন-ব্যাপারে,-রণজিৎ কিয়ৎ পরিমাণে সহায়তা কত্তে ও সমর্থ হতে পারে। পুর। আমার সম্বন্ধে সেনাপতি কি শুনেছেন, জাতে বড় ঔৎসুক্য হয়। রণ। পুরঞ্জন, তােমাকে সহােদর-তুল্য স্নেহ করি। সরল ভাবে যা জিজ্ঞেস করুবাে, তার উত্তর সরল ভাবে দেবে, এ আশা কত্তে পারি কি ? ' মানর্সী। পুর। পুরঞ্জন বােধ হয় বন্ধুতার মর্যাদা রক্ষা কত্তে কাতর হবে না। বলুন, আপনার কি প্রশ্ন ? রণ। গুলুম, কাশ্মীর-রাজ-দুহিতার প্রতি ভৈরব দুর্গাধিপতি অনুরক্ত, এ কথা কি যথার্থ ? পুর । যথার্থ বটে। রণ। বড়ই সন্তুষ্ট হলুম। তবে ভাই, আজ আমার আর একটা অনুরােধ তােমায় রাখতে হবে। পুর। কি অনুরােধ বলুন, রাখবার হলে অবশ্যই রাখবাে । রণ। অবরুদ্ধা না রেখে, মানসীকে তুমি তার পিতৃসমীপে প্রেরণ কর, এই অনুরােধ। তুমি স্বয়ং তাকে নিয়ে সম্রাটের কাছে চল। পর। অনুরােধ লিপ্রয়ােজন। মানসীকে তাঁর পিতার নিকট প্রেরণ কবাে, এই মাত্র তা স্থির করেছি। তবে স্বয়ং সেখানে যাবার প্রয়ােজন কি, বুঝিনা। রণ। প্রয়ােজন আছে। এটা আমারই অনুরােধ জাবে। আমার ঋণের, কমাত্র পরিশােধের চেষ্টা কবাে, ভাই পুর। আপনার অনুরােধ রক্ষায়, আমার আপত্তি নেই। বর্ণ। বড় বাধিত হলুম। তা হলে বিলম্বের; প্রয়ােজন নেই। কল্য অপরাহ্নেই যাত্রা করা যাবে। রাজ-কন্যা প্রত্যর্পিতা হবেন, শুধু এটুকু সংবাদ, আজ রাজশিবিরে প্রেরণের ব্যবস্থা কর। পুর। এ দণ্ডেই তা কচ্ছি। (প্রস্থান) পদ্ম। সমস্যার সমাধান হলাে ? তােমর বুদ্ধির প্রশংসা শতবার কচ্ছি। পদ্ম। এত অনেক দিন, অনেক বার কয়েছ। এ আর নূতন কি ? রণ। কুড়ি ছাড়িয়ে বুড়ী হতে চললে, তবু নূতনত্বের সাধ মিটে নি ? চল, ৩. এক্ষপে নূতনের মায়া পরিত্যাগ করে, পুরাতন কাশ্মীরে যাবার আয়ােজন করি। (উভয়ের প্রস্থান) - ৫ম দৃশ্য-দরবার । { রাজ, রণজিৎ, অনুচরগণ । রাজা। সেনাপতি, এরূপ অসম্ভৰভাবে তােমার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করে কত আনন্দিত হয়েছি, ভাষায় তা ব্যক্ত কত্তে পাচ্ছিনে। তােমার রােগ-মুক্তির কথা, পদ্মৰতীর ঘটনা, কল্পিত উপন্যাসের ন্যায় জ্ঞান হচ্ছে। আর সুখের বিষয়, মানসী আমার, শত্রুদুর্গে তােমাদের সহবাসে কাল কাটিয়েছে। কিন্তু একটা কথা, দস্য-দলপতি সহসা মানসীকে প্রত্যর্পণ কত্তে সম্মত হলো কেন, ভেবে পাচ্ছিনে। বােধ হয়, এর মূলে তুমিই বিদ্যমান। রণ। মানসী প্রত্যর্পণ তারই অভিপ্রেত ছিল, তবে রাজ-শিবিরে তার আগমন, আমারই অনুরােধের ফল বটে। রাজা। ভালই করেছ, রণজিৎ। এক্ষণে শক্রর সদ্ব্যবহারের পুরস্কার-বিধান, নিতান্ত সঙ্গত । কত অর্থ পেলে, দস্যু-পতি তুষ্ট হবে, অনুমান কর ? রণ। অর্থে সে সন্তুষ্ট হবে কিনা, জানিনা, সম্রাটু। পার্বত্য দ্য নয়, -ক্ষত্ৰ-বংশজ বীর যুবক, সে! আপনার পরিচিত হলেও হতে পারে। রাজা। আমার পরিচিত ? বােধ হয়, অপরিচিত নয়। প্রধান সভাসদ রত্নেশ্বর সিংহকে মনে পড়ে মহারাজ ? রাজা। রত্নেশ্বর? দশ বছর পূর্বে যে কাশ্মীর হতে বিতাড়িত হয়েছিল? রণ। হাঁ, আপনার বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী পুরঞ্জন, তারই ঔরসজাত পুত্র ! রাজা। আশ্চৰ্য্য । রত্নেশ্বরের পুত্র দস্যুতা কচ্ছে? রত্নেশ্বর-পুত্র রাজদ্রোহী? রণ। তার বিশিষ্ট কারণ আছে? মন্ত্রী চন্দ্রচূড়ের ষড়যন্ত্রে, বিনাদোষে রত্নেশ্বর সিংহ নিৰ্বাসিত হন, তাঁর হৃদয়ে আমরণ, এ বিশ্বাস বলবতী ছিল। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ পৰ্যন্তু, বৃদ্ধ রাজ-স্নেহাকাজী ছিলেন, এটা আমি বিশ্বস্ত-সুত্রে জানি। আর সম্রাট, কর্তৃক সসম্মানে কাশ্মীরে আহত হবার আকাঙ্ক্ষায়, পিতার আদেশেই. পুরন যুদ্ধে রণ। ব্যাপৃত।
মানসী। পুরঞ্জন রাজা। ভাল, মানসী প্রত্যর্পণের পুরস্কার স্বরূপ, তাকে সমাদরে কাশ্মীরে আহ্বান কব-তাকে তাঁর পিতৃপদে নিযুক্ত করুবাে । রণ। এই কি প্রচুর পুরস্কার হলাে, সম্রাট। রাজা। তবে বল সেনাপতি, কি উপায়ে, কোন পুরস্কার-লাভে প প্রসন্নতা লাভ কবে? সে পুরস্কার-দানে, আমি আজ কৃপণতা প্রকাশ কবােনা। রণ। পুরঞ্জন মানসীর পাণিগ্ৰহণাভিলাষী। রাজ, বংশ মর্যাদায় সে হীন নয়। তার বীরত্বের পরীক্ষা; মহারাজ স্বয়ং গ্রহণ করেছেন। আর, তার উদারতা, মহানুভবতা, শিষ্টাচার প্রভৃতি ক্ষত্রিয়ােচিত গুণাবলীর সাক্ষী—আপনারই সেনাপতি—এই রণজিৎ সিংহ। সুতরাং এক্ষেত্রে তার আকাঙ্ক্ষা, নিতান্ত অসঙ্গত মনে হয় না। রাজা: (ক্ষণপরে) এ আকাঙ্ক্ষা-পূরণ সম্পূর্ণরূপে আমারই ইচ্ছা-সাপেক্ষ নয় ত, রণজিৎ। মানসীর মত গ্রহণ না করে রণ। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। মাসী তার গুণমুগ্ধ। আপ- নার অভিপ্রেত হলে, এতে মানসীর অসম্মতির কারণ নেই। অই যে মানসী আছে! (মানসী ও পদ্মাবতীর প্রবেশ) রাজা। আয় মা, অন্ধের নয়ন, কাঙ্গালের ধন, আমার হৃদয়-মরুভূমের একমাত্র পান্থপাদপ,-আমার বুকে আয়। মান। বাবা, বাবা,আমায় বুকে করে আমার হৃদয়ের জ্বালা দূর কর, বাবা। (রাজ-ক্রোড়ে উপবেশন) রাজা। সতী পদ্মবতি, তােমায় জীবিত দেখে, এ বৃদ্ধ কত আনন্দিত, তা আর বলে কি জানাব, মা? তুমি চির আয়ুষ্মতী হও। পদ্মা। সম্রাট, আশীৰ্বাদ করুন, পদ্মবতী যেন জন্মে জন্মে আপনার মত আশ্রয়-বৃক্ষের ছায়ায়, তার হৃদয়-দেবতার চরণ-সেবার অধিকারিণী । । (পুরঞ্জনের প্রবেশ) র। মহারাজ, বীরশ্রেষ্ঠ পুরনসিংহ রাজসভায় উপস্থিত। রাজা | এস, পুরঞ্জন, কাশ্মীরাধিপতি তােমাকে সাদরে অভ্যর্থনা কছে।
মানসী। ( পুরঞ্জনের উপবেশন ও রঘুবীরের প্রবেশ ) রাজা। ইনি কে? । কাশ্মীরের উত্তর প্রান্তবর্তী পাৰ্বত্য প্রদেশের অধিপতি। বর্তমানে আমাৰ পৰ্বম হিতাকাঙ্ক্ষী সহকারী-সেনাপতি। কাজ। বড়ই আলাদের কথা,-আজ তােমাদের সকলের দর্শন লাভ কল্পম। দৈব-বিড়ম্বনায় কাশ্মীর-রাজের হৃদয়মশি তােমার হস্তগত হয়েছিল, পুরঞ্জন। দয়া করে, স্বীয় উদারতা-গুণে তুমি আজ সে ধন আমায় প্রত্যর্পণ করেছ,এ জন্য আমি তােমার নিকট চির-কৃতজ্ঞ। আমি সেনাপতির মুখে সকলই শুনেছি, তুমি আমার নিতান্ত পর নও। তােমার ঋণ পরিশােধের জন্য, সমগ্র কাশ্মীররাজ্য তােমায় উপঢৌকন দিতেও আমি কুষ্ঠিত হব না। বল, বল, পুরঞ্জন, কিসে তােমার তৃপ্তিসাধন হবে। আমার সাধ্যের অতীত না হলে, আমি তােমার অনুরােধ অবশ্যই বা করূবাে। মহারাজের নিকট পুরস্কৃত হয়, এমন কোনও প্রশংসার কাজ, এ পৰ্যন্ত পুরঞ্জন করেনি। মহারাজ, যা বলছেন, তাতে তাঁরই উদারত সপ্রমাণ হচ্ছে। । মহারাজ, পুঞ্জলিংহের পক্ষে আমি আজ আপনার নিকট মানসী বঙ্গ ভিক্ষা-প্রার্থনা কচ্ছি। পুরঞ্জন বহু-গুণসম্পন্ন রণকুশল ক্ষত্রিয় যুবক, আমাদের মেহের মানসীর অযােগ্য পাত্র নয়। রা। মা, তাের সেনাপতি দাদার কথা গুলি ? এ সম্পর্কে তাের বক্তব্য কি মা? মান।” (সমাজে)' আমায় জিজ্ঞাসা কেন, বাবা? 'রাজা। তবে সেনাপতি, তােমার প্রার্থনা বিফল হবে না। আমি পুরঞ্জনের হন্তেই মানসী-রত্ন সম্প্রদান করবে। কলে। সাধু, সাধু, সাধু। রাজা। বৎস পুরঞ্জন, আমি আমার সর্বস্বধন মানসীকে, তােমারই করে অর্পণ করবে। কাশ্মীরের সিংহালন, এ পরিণয়ের যৌতুক স্বরূপ প্রদত্ত হকে। শান্ত ক-বংশজাত বীর যুবক তুমি,আশাকরি, পর সুদ সেনাপতি-শ্রেষ্ঠ রণজিৎ সিংহের সহায়তায় সুশৃঙ্খলা আলী। সঙ্গে রাজ্য-পালন ককে। আর মাসী? এ রত্নের অঙ্গ কোথাও হবে না, সুতরাং তার জন্য আমি চিন্তিত নই। তাহলে সেনাপতি, কালই অতি প্রত্যুষে কাশ্মীর-যাত্রার আয়ােজন কর। সর্দার রঘুবীরুও আমাদের সঙ্গী হন, আমার একান্ত অনুমােধ। এস মা পদ্মাবতি, এ সব অভ্যাগতের উপযুক্ত অভ্যর্থনার আমােজন তােমাকেই কতে হবে। রাজা ও পদ্মৰতীর প্রস্থান) রঘু। সেনাপতি, অসংখ্য পার্বত্য সেন দুর্গে উৎকণ্ঠ হয়ে আছে। তাদের সম্বন্ধে বক্তব্য কি? রুণ। হাঁ, এ শুভ সংবাদ ত্বরায় তাদের গােচর করা আবশ্যক। সর্দার, আজ হতে তােমার সমগ্র পার্বত্য-প্রদেশ কাশ্মীরের মিত্র রাজ্যরূপে পরিগণিত হলো। তুমি নিষ্কর এ প্রদেশ উপভােগ করূবে। আর আমাদের উত্তর প্রান্তস্থিত কেল্লাও তােমার শাসনাধীন থাঝে। রঘু । এ আপনাদের বিশিষ্ট দয়ার অকৃত্রিম নিদর্শন। রুণ। কিছু নয়। এ শুধু উপযুক্ততার সামান্য পুরস্কার। এক্ষণে চল সর্দার, ত্বরায় ভৈরব দুর্গে দুত প্রেরণ করি গে। (উভয়ের প্রস্থান) ( বাঞ্ছারামের প্রবেশ) কা। ওগাে, সকলেই পৃষ্ঠভঙ্গ দিচ্ছ যে? না, না, অই যে অপূৰ্ব্ব যুগল- মূৰ্ত্তি ! পাগলের আজ বড় ফুর্তি—ভাই সব। কাঁচ্চা ছটাকে আজ আর কুলুচ্ছেনা, দাদা। গাদা গাদা গাঁজার যােগাড় কত্তে হবে। আজকা-পাগল মনের সাধে বগল বাজাৰে। এরূপ একটা কিছু যে ঘটবে, তা কালই বাঞ্ছা টের পেয়েছিল। সেনাপতি-বাবার সঙ্গে মায়ের পরামর্শের খানিকটা-সে, সুযােগে হঠাৎ হজম করে ফেলে। তারই ফলে, আজ এ শুভ দিনে সভাসণের চোখ কাণের তৃপ্তি সাধনের যােগাড়, সে যে একটু না করেছে, এমন নয়। কোথায় গাে, চঞ্চল-চরণা, কটাক্ষ-ভূষণা, সা--গা-মা-পা-ধা-সাধিকা মুক্ত-শােষিকা-খুরি থুরি-রসিক-তােষিকার দল। এদিকে এস। আর দেরী কুয়ো না, মধুণে সমাপয়েৎ।
১১৪
মানসী।
( নর্তকীবৃন্দের প্রবেশ)
নৃত্য গীত।
ফুটেছে কাননে কুসুমের কলি ছুটেছে মধুর বাস।
নীলিম-গগনে, রজত-জ্যোছনা হাসিছে মধুর হাস।
গায়, পি পিউ পিউ-তানে পাপিয়া,
খায় ফুল মধু অলিকুল লুটিয়া-
মধুরা যামিনী, প্রেমিক-প্রেমিকা মিটিয়ে নে’ মনের আশ ।
[ যবনিকা-পতন )
সম্পূর্ণ ।
পরিশিষ্ট। ১৫ পৃষ্ঠা। বাঞ্ছারামের উক্তি। (২১ ছত্রে মন্ত্রীর সন্ধান কত্তে পারি কিনা। * উক্তির পর) পান। মন হলি কি দিশে হারা ? কেন মিছে হিসেব কিতেব না ? থাকলে কিছু জমার ঘরে, খরচ বাড়লে ভাবনা বাড়ে, (তের) জমার ঘর যে খালি পড়ে, খরচের নেই কুলকিনারা। শেষ দিনে নিকেশের কালে, কাজ কি মিছে গণ্ডগোলে ? ‘পাষাণী মার দেউলে ছেলে,কবুল জবাব কবি খাড়া। ২৫ পৃষ্ঠা পদ্মাবতীর উক্তি। (২য় ছত্রের পর) গান। ধম-জন-কঞ্চিরতনে নেইকো আমার প্রয়োজন। মই চরণ--জীবন-ভরা পূজিব,-এ আকিঞ্চন। ব্ৰত-ঘাগ-উপাসনা, ভজন-পূজন-সাধনা, সকলই বিফল অবলার, পতিপদ সেবা বিনা, চরণ দরশনে সফল জীবন। (নয়ন ভরে। পতিধৰ্ম্ম, পতিস্বর্গ, চতুৰ্বর্গ সতীর-পতি, পতির প্রীতিতে তুষ্ট, সৰ্ব্বদেব সতীর প্রতি, সতীর পরাগতি পতির চরণ- {
সম্পদে কিবা বিপদে, দাসীরে রেখে শ্রীপদে,-
পদ ছাড়া কভু যে না হই, (প্রভোহে )
কুটীরে কিবা ভবনে, মরুভূ-মহাশ্মশানে
চরণ তলে পড়ে যেন রই,
আমার এই কামনা, { অই চরণ বই কিছু জানিনা),
যেন যুগ-যুগান্তে সেবি চরণ। (জীবন-মরণে।)
৩০ পৃষ্ঠা। রণজিতের উক্তি।
( সর্বশেষ ছত্রে রণজিজের “কুল,ধৰ্ম্মরক্ষা কর” উক্তির পর)
গান।
হয়ে কুলবতী, একি মতি, আজ তােমার ?
এ পাপ-কথায় শিহরে কায়,-ছিছি কি ব্যভিচার ?
সীতা-সাবিত্রী, পদ্মিনী, বেহুলা,--
যে দেশ করিলা ধন্য, (তুমি) সে দেশেরই মহিলা,
তবে কেন এ দুৰ্ম্মতি, কেন এত অধােগতি,
হবে কুলে যে অখ্যাতি, ঘুচিবেনা কভু আর।
দেবীরূপে পূজিতা তুমি কাশ্মীরে,
পিশাচী গণিত হবে, অচিরে ঘরে ঘরে,
ক্ষণিক মোহের বশে, লালসার স্রোতে ভেসে
পাপ-সাগরে নিমেষে, দিওন। সাধে সাঁতার।
৪৯ পৃষ্ঠা। রাজার উক্তি। •
১৩শ ছত্রের “খেলা পরিত্যাগ করি।”—উক্তির পর)
গান
মিছে এ পুতুল খেলা হায়। (ভবে) ।
,
কে বা কার প্রজা,-কে প্রভু, কে রাজা ?
শুধুই সং সাজা,-মজিয়ে মায়ায় ।
কেহ মাতারূপে, কেউ তনয়া সেজে;
কেউ বা পুত্ররূপে, কেউ বা পিতা নিজে,-
রয়েছে কি মােহে কে যে কিসে মজে
( কেউ না ভাবে ) (কার ইঙ্গিতে নাচে ভবে, তা ।
{ দুদিনে খেলা ফুরাবে, যখন ছিড়বে মায়া-ডোর,
কাটুবে নেশার ঘোর, দেখবে সবাই সবই
ছায়া-বাজি প্রায় ।
৫৭ পৃষ্ঠা। বাঞ্ছারামের উক্তি
( ২০ ছত্রের এখানে কে আছ”-উক্তির পর)
গান।
কেন বিধি প্রতিবাণী অকালে ?
অই যে মুকুলিতা আশা লতা, শুকাইল সমূলে ।
পাষাণে বঁধিয়ে হিয়ে, কোথা আজ মা যা পালিয়ে,
ফঁকি দিয়ে--তুই পতি-প্ৰেম গেলি ভুলিয়ে
ভুলিলি পাগল ছেলে ?
ফিরে বাবা এলে ঘরে, কি বলে বুঝাব তারে,
(বলে যা, বলে যা, কোথা গেলি-কি বলিব, তুই)
নিমেষের তরে, না হেরিলে যাঁরে,
ভাসিতি নয়ন-জলে,
ঠেলে ফেলে তারে, স্নেহ-ডাের ছিড়ে
কেমনে যাইবি চলে?
তুই যে কঠোরা এত, আগে মা, তা জানিনি ত ? হ বিধাতঃ,-আজ সহসা অশনি-পাতে কি মঙ্গল ধিলে ? ৯০ পৃষ্ঠা। রাজার উক্তি। (১২শ ছত্রে “আর ভাবতে পাবি না”- উক্তির পর) গান । এতদিনে হয়, সকলই ফুরায, কুল-মান-খ্যাতি রসাতলে যায় । (আমি) অতি নিরুপায়, হায় হায় হায়, কার কাছে যাব,- কি করি উপায় ? বিপদ-পাথারে যে ছিল কাণ্ডারী, রক্ষিত দুর্দিনে প্রাণপণ করি, আপনা পশরি, তারে অকারণে, পুড়িনু যে আগুনে, তাহ’তে শতগুণে, পুড়ির জ্বালায়, তুলাদণ্ডে বিধাতার অতি সূক্ষম সুবিচার, এ দণ্ড খাবার কে হবে সহায় ? অামার কুকর্ম-ফলে, মৰ্ম্ম-দাহে সতী জ্বলে, শ্মশানের চিতানলে ত্যজিলা জীবন- করি মহাপাপ, তাতে এ মনস্তাপ, সতীয় সে অভিশাপ, ফলিল এখন। গাজি প্রাণের দুহিতা, বলে অপহৃতা-ফিরুবাে পথে পথে, পাগলের প্রায়।
No text on this page.
Printed by B. C. Deb.
at the Ramcharan Press,
HABIGAN).
অতি সুলভে গাঙ্গ, বহি ইত্যাদি জিল করা হয়,
ঐসমরেন্দ্রনাথ দেব
রায়ণ প্রে হবিগঞ্জ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.