Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sarola

Basu,ushapramodini · 2010/04/23

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

লা
(উপন্যাস)
শ্ৰীমতী ঊষাপ্রমােদিনী বসু
প্রণীত।
কলিকাতা,
সিটি বুক সােসাইট,
• আট আনা

কলিকাতা,
৭৩ নং মাণিকতলা ধ্রুট, এম্ প্রেমে
আশুতােষ চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত।

সরলা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
বিবাহে বিষাদ ।
*
হুগলির বরদাকান্ত দত্ত মহাশয়ের বাটীতে মহাধুম; আজ
একমাত্র স্নেহের পুত্রী, আঙ্করের ধন সরবালার বিবাহ।
বরদাবাবু অবস্থাপন্ন ব্যক্তি। তিনি কন্যার বিবাহে নিজ সন্ত্রম ও
অবস্থানুযায়ী আমােজনের ত্রুটি করেন নাই। বহু আত্মীয় ও নিমন্ত্রিত
ক্তির সমাগম হইয়াছে; অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সমাবেশ
হইয়াছে—তাহারা বৈঠকখানায় বসিয়া শাস্ত্রালাপ করিতেছেন এবং
* ম বরদাবাবুর প্রশংসা ও ভাবী নব দম্পতীকে আশীৰ্বাদ ও
দীর্ঘজীবন কামনা করিতেছেন। বালক বালিকা

। প্রফুল্লমনে ইতস্ততঃ ক্রীড়া করিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদের আনন্দ কোলাহলে চতুর্দিক পরিপূর্ণ হইতেছে। অন্তঃপুরে স্থানে স্থানে মহিলাগণ বিবিধকার্যে নিযুক্ত ; কার্যের সহিত গল্প ও হাস্য পরিহাস চলিতেছে। কোথাও বা দুই চারিজন নব্যা একত্রিত হইয়া কেবল হাস্য পরিহাসে সময় কাটাইতেছেন। দাস দাসীগণ নূতন রঞ্জিত বস্ত্র পরিধান করিয়া প্রফুল্লমনে কার্যে ব্যস্ত। মধ্যে মধ্যে নানাবিধ বন্ধ যন্ত্র হইতে বিবিধ প্রকারের বাদ্যধ্বনি উখিত হইতেছে । দত্ত বাটীতে আজ আনন্দের উৎস ছুটিয়াছে। বরুদবাবু প্রাচীন হিন্দু সম্প্রদায়ের মতাবলম্বী এবং বাল্য বিবাহের অতিশয় পক্ষপাতী। তিনি আপনার অষ্টম বর্ষীয়া একমাত কন্যা সরলাবালার সহিত ত্রয়ােদশ বর্ষীয় বালক সুবােধচন্দ্রে। পরিণয় ক্রিয়া সম্পাদন করিতেছেন। সুবােধচন্দ্র পিতৃ মাতৃহীন হইয়া কোনও আত্মীয়ের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হইতেছে। বরদাবাৰু এই বালককে জামাতৃপদে বরণ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলে সরলার মাতা অসম্মতি প্রকাশ করিয়া বলিলেন-“পিতৃ মাতৃহীন না বালকের সহিত আমার সরলার বিবাহ দিব না। সরলা কি এতই কুরূপা, অথবা তাহার বয়স কি এতই অধিক হইয়াছে যে, সুপাত্রের অনুসন্ধান করা চলিবে না? ঐ পাত্র ভিন্ন তাহার আর কোন সুপাত্র জুঠিবে না?” গৃহিণীর কথা শুনিয়া বরদাবাবু কহিলেন-“সুবোধ অতি সৎপাত্র নামে সুবােধ, কাজেও সুবােধ। কেমন শিষ্টশান্ত, কেমন শিষ্টশান্ত, দেখিলে চল জুড়ায়। কামাদের পুত্র সন্তান নাই, লুবােধ পুত্র স্থানীয় হইবে বলা সর্বদা তোমার নিকটে পাকিবে, চক্ষুর অন্তরাল হইবে। অন্য পাত্রের সহিত বিবাহ হইলে তার কন্যা জামাতাকে নিয়ে ৪ কাইয়া বসিলেন। সভাস্থ সুন্দররূপে সজ্জিত করা হইয়াছে ; স্থানে। বিষাহৈ বিষাদ। নিকটে রাখতে পারিবে না ! রূপে, গুণে, বংশে সুবােধ অতি ওম পাত্র ; তুমি এ বিবাহে অমত করিও না।” বরদাবাবুর কথায় গৃহিণীর আর অমত রহিল না। তিনি সানন্দে কন্যার বিবাহে সম্মতি প্রদান করিলেন এবং বিবাহের দিনও স্থির হইয়া গেল। অাজ সরলার বিবাহ। কয়েক দিন হইতে নাচ, গান, আমােদ প্রমােদ চলিতেছে। আজ সাজসজ্জার আরও ধূম পড়িয়া গিয়াছে। আজ যে যাহা চাহিতেছে কর্তা গৃহিণী তাহাকে তাহাই দিতেছেন, মার বলিতেছেন “তােমরা সকলে আশীৰ্ব্বাদ কর, যেন আমার সরলা-সুবোধ সুখী হয় ও দীর্ঘজীবী হয়ে বেঁচে থাকে। সকলেই দুষ্টচিত্তে ভাবী নবদম্পতীর মঙ্গল কামনা করিতেছে। 'সন্ধ্যার অনতিপূৰ্বেই অন্তঃপুরে নবীনদিগের মধ্যে কেহ কেহ ক’নে নাজাইতে বসিলেন, কেহ কেহ বা নিজ নিজ বেশ ভূষা করিতে লাগিলেন। প্রৌঢ়ায়া মাঙ্গলিক আচারের উদ্যোগে প্রবৃত্ত হইলেন । কহ কেহ বা এ দিক ও দিক পরিদর্শন করিয়া গৃহিণীপনা প্রকাশ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। সন্ধ্যার পর হইতেই নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ আগমন করিতে লাগিলেন এবং সকলে বহির্বাটীস্থ প্রাঙ্গন সভ দাম বেলােয়ারী ঝাড় জ্বলিতেছে ; লতা পুষ্প পত্রে সজ্জিত করিয়া স্থানটীকে কুঞ্জবনে পরিণত করা হইয়াছে। সুবােধচন্দ্র দরিত্র সন্তান; সুতরাং বরদা বাবু নিজ ব্যয়েই তাৰী. জামাতার বিহাৰ্থ আগমনােপলক্ষে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য ও , বন্দোবস্তু করিয়াছেন ? সন্ধ্যার অল্পক্ষণ পরেই বধ বাদধ্বনিতে হুগলি সহর, কাপাইয়া,আলােকমালায় চতুর্দিক ৪ সরল। । আলােকিত করিয়া, চারি ঘােড়ার গাড়ীতে চড়িয়া বালক বর সুবােধ- চন্দ্র দেখা দিলেন। মেয়ে মহলে চারিদিক হইতে উকি ঝুকি দিয়া বর দেখিবার ঘটা পড়িয়া গেল। কেহ বলিল-*বেশ বর, যেমন আমাদের সরলা, তেমনি বর হয়েছে। কেহ বলিল---দেখ, যেন সাক্ষাৎ কার্তিক ; সরলার মা, তােমার বেশ জামাই হয়েছে। আহা ! বেঁচে থাক, এই প্রার্থনা !” সরলার মাতার আনন্দের সীমা নাই। বালক সুবােধচন্দ্রের সরল, সুন্দর মুখ দেখিয়াই তাহার হৃদয়ে বাৎসল্য স্নেহের আবির্ভাব হইয়াছে। রাত্রির প্রথম প্রহরেই বিবাহের লগ্ন। বিবাহের প্রারম্ভিক ক্রিয়ার জন্য বরকে অন্তঃপুরে ছাদনাতলায় আনা হইল। রক্তবস্ত্রাবৃত সরলাও তথায় নীত হইল বালিকার ঘুম আসিয়াছিল, চতুর্দিকে লােক সমাগম দেখিয়া সে কঁদিয়া ফেলিল। সকলে সদর করিয়া তাহাকে সান্ত্বনা করিতে লাগিল। স্ত্রী-আচার আরম্ভ হইল। পশ্চাৎ হইতে কেহ বরের কান মলিয়া দিতে লাগিল, কেহ নাক ধরিয়া টানিল । সরলার মাত সরলার মাতা সকলকেই নিষেধ করিতে লাগিলেন। বহিৰ্বাট হইতে বরদাবাবু বলিয়া পাঠাইলেন বরের উপর যেন কোন অত্যাচার না হয়, ছেলে মানুষ-কাতর হইবে । রাত্রি অধিক হইতেছে, বিবাহের সময় উত্তীর্ণ হয়, শীঘ্র শীঘ্র স্ত্রী-আচার কার্য শেষ করিয়া লও।” কৃর্তার ভৎসনার ভয়ে কেহই আর বই । গায়ে হাত দিতে সাহস করিল না। স্ত্রী-আচার শেষ হইলে যক্ষ ক’নেকে বিবাহ স্থানে আনা হইল। বরদাবাবু সম্প্রদান করিতে বসিলেন-পুরােহিত মন্ত্র পাঠ করিতে লাগিলেন। পুরােহিত বৰাক সকল মন্ত্র উচ্চারণ করিতে বলিলেন, দুঃখের বিষয় বর তাহার অ উচ্চারণ করিতে পারিল না! এইরূপে বিবাহকাৰ্য্য সমাধা বিবাহে বিষাদ ৫ বর-কনেকে লইয়া নব্যার বাসরঘরে আসিলেন ; বালিকারদলও তাহাদের অনুসরণ করিল এবং দুই চারি জন প্রৌঢ়াকেও তথায় দেখা যাইতে লাগিল। বাসর ঘরের শােভা অতীব মনােহর। চারিদিকের দেওয়ালে নানা- বিধ সুন্দর সুন্দর চিত্র, তাদের চতুর্দিকে ফুলের মালা ও লতাপ সাজাইয়া দেওয়াতে চিত্রগুলিকে আরও ৯ লর দেখাইতেছে। বিবিধ আকারের দেওয়ালগিরি ও ঝড়ে বাতি জ্বলিতেছে। কক্ষতলে সতরঞ্চের উপর জরির কারুকার্য খচিত চাদর পাতা; বরকনে আসিয়া তথায় বসিয়াছে, নঝনাগণ বরকনের চারিদিকে ঘেরিয়া বসিয়াছেন। কিয়ৎ- ক্ষণ বাক্যালাপ করার পর বর বলিল-“আমার বড় অসুখ করিতেছে, আমি শুইব।” সরলার মাত তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি কহিলেন- “তা শােওন। বাবা, অনেক রাত হয়েছে, একটু ঘুমাও, সব ভাল হয়ে যাবে।” সমবেত নবীনগণকেও সরলার মাতা কহিলেন, “ছেলে মানুষ, অসুখবােধ কষ্টে, একটু ঘুমুক। তােমর আজকার মত একটু সরে যাও, গােলমান হলে খুন হবেনা। কিছু মনে করনা, বাত জেগে অসুখ হলে কর্তা শুনে রাগ করবেন।” “তা বটেইতে, ছেলেমানুষ, রাত জাগায়ে দরকার নাই” এই কথা বলিয়া সকলে কক্ষান্তরে চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে সুবোধের ভেদ হইতে লাগিল। বরদাবাৰু সংবাদ পাইয়া অন্তঃপুরে আসিলেন এবং চিকিৎসক আনিবার জন্য লােক পাঠাইলেন। অনতিবিলম্বে চিকিৎসক আসিলেন; তিনি রােগীর অবস্থা ভাল বলিলেন না, ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া চলিয়া গেলেন।

৬ বিবাহ বাড়ীতে হাহাকার পড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ পূর্বে যে স্থান আনন্দ কোলাহলে, মাঙ্গলিক ধ্বনিতে ও বাদ্যনিৰুণে পরিপূরিত ছিল, সেই স্থানে এখন বিষাদের করুণবনি শ্রুত হইতে লাগিল। এক মুহুর্তের মধ্যে আনন্দ কোলাহল কোথায় চলিয়া গেল। সুবােধচত্রের অবস্থা ক্রমশঃ মন্দ হইতে লাগিল। হায়! কোথা নব-বিবাহিত দম্পতী লইয়া সকলে আনন্দ করিবে, না বিষন্ন হৃদয়ে, শঙ্কিত মনে রোগীর শুশ্রুষা করিতেছে এবং প্রতি মুহূর্তে অমঙ্গল আশঙ্কা করিতেছে । এত চেষ্টা—এত শুশ্রুষা সমুদায়ই বৃথা হইল। ঔষধে কোনও উপকার দশাইল না—বিবাহ রাত্রি প্রভাত হইবার পূর্বেই বালক সুবােধচন্দ্র মানবলীলা সম্বরণ করিল। একটা সংসার শােক-সমুদ্রে ভাসিল। বালিকা সরলার আট বৎসর বয়সে, একই রাত্রে বিবাহ বৈধব্য দুই-ই ঘটিল। ac, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। অনাথিনী । সময় কাহারও অপেক্ষা করে না। মানুষের দিন মুখের হউক, আর দুঃখের হউক, চলিয়া যায়। বরদা বায়ুর সেই ভীষণ শােকের দিনও চলিয়া গেল, কিন্তু স্মৃতিটুকু সকলের হৃদয়কন্দরে চিরদিনের জন্য অঙ্কিত হইয়া গেল। প্রথম শােকের উচ্ছাস ক্রমে কমিয়া আসিল, কিন্তু যেটী চিরদিনের সেইটী রহিয়া গেল। এক দিন দুই দিন করিয়া মাস উত্তীর্ণ হইল। একমাস দুইমাস করিয়া ক্রমে ছয়মাস কাটিয়া গেল। বরদাবাবুর শরীর দিন দিন ভগ্ন হইতে লাগিল। বড় সুখের অশালতা ছিন্ন হওয়ায় তাহার হৃদয় এতদূর ভগ্ন হইয়াছিল যে, অবশেষে তাঁহাকে শয্যাশায়ী হইতে হইল। সরলার মাতা স্বামীর শয্যাপাশ্বে থাকিয়া অহোরাত্র তাহার শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন এবং সতত ঈশ্বরপদে স্বামীর মঙ্গল কামনা করিতে লাগি- লেন। অর্থকে অর্থজ্ঞান না করিয়া স্বামীর চিকিৎসার জন্য তিনি জস্র ব্যয় করিতে লাম্বুিলেন। স্থানীয় প্রধান প্রধান ডাক্তার- সরলা । ; ( গণ চিকিৎসায় নিযুক্ত হইলেন ; মধ্যে মধ্যে কলিকাতা হইতে ডাক্তার লইয়া যাওয়া হইতে লাগিল। কখন পীড়ার বৃদ্ধি, কখন কিঞ্চিৎ উপশম, কোনদিন ভাল, কোন দিন মন্দ, এইরূপে এক বৎসর কাটিয়া গেল। এই এক বৎসরে বরদাবাবু সম্পূর্ণরূপে শয্যাশায়ী হইয়া পড়িয়াছেন, আর উঠিবার শক্তি নাই ; এখন তাহাকে দেখিলে আর চেনা যায় না। পীড়ার ক্রমশঃ বৃদ্ধি ও মােগ অসাধ্য বুঝিয়া ডাক্তারগণ জবাব দিয়া- গেলেন; কিন্তু সরলার মাতা এখনও তাহার স্বামীর জীবন-আশা পরি, ত্যাগ করেন নাই। তিনি সারগণকে ধৈর্য সহকারে চিকিৎসা করিতে বিশেষরূপ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। ডাক্তারগণ অগত্যা যাতায়াত করিতে লাগিলেন এবং ঔষধ দিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে সরলার মাতার গহনাগুলি প্রায় সমস্তই বিক্রয় করা হইল এবং তাহার পর ঋণ করিয়া চিকিৎসা চলিতে গিল। কিন্তু যাহার পরমায়ু শেষ হইয়াছে, মানবের সাধ্য কি যে তাহার জীবন দান করিতে পারে। এত চেষ্টা সমস্তই বৃথা হইল! প্রায় দেড় বৎসরকাল রোগে ভুগিয়া বাদাবাবু ভবধাম পরিত্যাগ করিলেন। ও তাহার মাতার অবস্থা কি শোচনীয়! হায়! আজ তাহারা অনাথিনী ; রাজগৃহিণী আজ কাঙ্গালিনী ! কাহার আশ্রয় লইবেন এমন লােক নাই ; কে তাঁহাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিবে, কাহার মুখপানে চাহিবেন? জগদীশ্বর ! তৈমার এ কি লীলা ? তুমি কাহাকে ভঙ্গিতেছ, কাহাকেও গড়িতেছ। মহিমাময় ! তােমার মহিমা মানবের ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য। ভগবন্! তােমার অসীম শক্তির পরিচয় সর্বত্র প্রকাশিত। তুমিই রক্ষাকর্তা; তােমা ভিন্ন এই অনাথ পরিবার আর কাহাকে ডাকিবে, আর কাহারই বা আশ্রয় লইবে! মানব উপলক্ষ মা-তুমিই নিরাশ্রয়ের আশ্রয়। সরল।

অনাথিনী। এ ন ; করিয়া তারা বরদা বাবু একজন অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন, তাহার নাম হর- প্রসাদ মিত্র। তিনি হুগলির মধ্যে একজন সম্রান্ত ও ধনবান ব্যক্তি। বরদা বাবুর মৃত্যুর পরেই তিনি তাহার স্ত্রী ও একজন প্রাচীন পরিচারিকাকে বরদা বাবুর বাটীতে প্রেরণ করিলেন; তাহার করদা বাবুর বাটীতে সরলা ও তাহার মাতার তত্ত্বাবধান করিতে লাগিলেন। ঋণ পরিশােধের কথাপ্রসঙ্গে একদিন সরলার মাতা হয়- প্রসাদ বাবুর স্ত্রীকে বলিলেন-“বাটী বিক্রয় করা ভিন্ন ঋণ পরিশােধের অন্য উপায় নাই, সুতরাং বাটী ও সমুদায় আসবাব পত্র বিক্রয় সমস্ত ঋণ পরিশােধের পর যে টাকা, উত্ত হইবে, তাহার কিয়দংশ দিয়া সরলার নামে একটা বাটা ক্রয় করা হউক। হরপ্রসাদ বাবুর তত্ত্বাবধানে তিনি সরলার সহিত সেই বাটীতে বাস করিবেন।” হরপ্রসাদ বাবুও বুঝিলেন যে বাটী বিক্রয় করা ভিন্ন গুণ পরি- শোধের অন্য উপায় নাই; সুতরাং বাটী বিক্রয়ের পক্ষে মত দিয়া তিনি এই প্রস্তাব করিলেন যে, “অন্য কাটী ক্রয় করিবার আপাতত কোন প্রয়ােজন নাই। তাহার বাটীর অন্দর মহলের পার্শ্বে তাহার ( ক্ষুদ্র কাটা আছে, সরলার মাতা পুত্রীর সহিত সেই বাটীতে বাস করুন ; তাহা হইলে সরলার মাতার তঁাহার সহিত ঠিক এক বাটীতে বাস করাও হইবে না, অথচ একত্র বাস করার সমস্ত সুবিধা পাইবেন। আর তাহারা চিরজীবন যাহাতে সে বাটীতে বাস করিতে পারেন, তিনি ( হরপ্রসাদ বাবু। সেরূপ বন্দোবস্ত করিবেন। করিবেন। সরলার মত হরপ্রসাদ বাবুর প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। বরদা বাবুর মৃত্যুর দেড়মাস পরে সরলা ও তাহার মাতা হর প্রসাদ বাবুর বাটীতে আসিলেন। হরপ্রসাদ বাবুর বাটীর সরলা। : পশ্চাৎ ভাগস্থ সেই ক্ষুদ্র বাটী সরলা ও তাহার মাতার বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। হরপ্রসাদ বাবু সরলার মাতার পুরাতন পরি- চারিকাকেই তাহাদের সেবার জন্য নিযুক্ত করিয়া দিলেন; কিন্তু সরলার মাতা নূতন বাটীতে আগমন করিয়া পরিচারিকা দর্শনে ক্ষুব্ধ হইলেন। হরপ্রসাদ বাবু তাহাদের জন্য কত কষ্ট স্বীকার করিতেছেন, তিনি সে জন্য লজ্জিত। কাহারও দান গ্রহণ করিতে তিনি দুঃখিত ও সঙ্কুচিত হন, অধিক পীড়াপীড়ি করিলে বিরক্তও হন। কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে দান গ্রহণ না করিলে উপায় নাই। সরলাকে লইয়া কোথায় দাঁড়াইবেন, সেই জন্য এই বাটতে কাস করিতে স্বীকৃত হইলেন, কিন্তু পরিচারিকা দর্শনে সন্তুষ্ট হইলেন না। তিনি পরিচারিকাকে কহিলেন-“দেখ বাছা, আমার এখন আর এমন সঙ্গতি নাই যে, তােমাকে মাহিয়ানা দিয়া রাখিব। অতএব তােমাকে যে বাবু নিযুক্ত করিয়াছেন, তাহাকে গিয়া বল যে, আমাদের দাসীর প্রয়ােজন নাই।” পরিচারিকা মিত্র বাড়ীতে গিয়া ঐ কথা বলিলে মিত্র-গৃহিণী সরলার মাতার নিকট আসিয়া কহিলেন-“হঁ। বো, তুমি দাসীকে চলিয়া যাইতে বলিয়াছ কেন? তুমি কি কোনকালে কষ্ট করিয়াছ, যে, এত কষ্ট সই করিতে পারিবে ? সরলা ছেলেমানুষ, সে কখন দাসীর কোল হইতে নামিত না-এখন কি সে কাজ করিতে পারিবে ? ভাই, তুমি আমাদের পর ভাবিলে ! তুমি উহাকে রাখ নাই নিলে তিনি বড়ই দুঃখিত হইবেন। উহার মাহিয়ানা বা ভরণ পােষণের জন্য তােমাকে ভাবিতে হইবে না। তুমি উহাকে রাখ।” সরলার মাতা কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হৃদয়ে ও অপূর্ণ লােচনে কহিলেন- * দিদি, তােমাদের সদ্ব্যবহার এ জীবনে ভুলিব না। সাধারণ মানবের অনাথিনী । কখন এরূপ মহত্ত্ব দেখা যায় না। তাহারা কখন ব্যথীর ব্যথা বুঝে না-অনাথার প্রতি দৃকপাত করে না। তােমরা দেবতা—সেই জন্যই এই দেবত্ব তােমাদের দেহে বিদ্যমান রহিয়াছে। মানবের চিরদিন কখন সমান যায় না; ভগবান্ যখন যে অবস্থায় রাখিবেন, তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আমাদের নিজ নিজ কৰ্ম্মফলেই এ অবস্থা ঘটিয়াছে, ইহাতে আমাদের অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। নয়। কাজ করিতাম না বলিয়া কি এথন কাজ করিতে পারিব না ! সে গত সুখের আলােচনায় এখন আর ফল কি ! এখন মনে করির, ভগ রানের ইচ্ছায় এতদিন এক অবস্থায় ছিলাম, এখন আবার তাঁহারই ইচ্ছায় অবস্থান্তর ঘটিয়াছে। কিন্তু এ অবস্থাকে দুঃখজনক মনে করা কখনই উচিত নয়। ভগিনী! দুঃখ মনে করিলেই দুঃখ, সুখ মনে করিলেই সুখ। মিত্র-গৃহিণী সরলার মাতার কথা শুনিয়া মনে মনে তাহার ধৈৰ্যশীলতার প্রশংসা করিলেন এবং তাহাকে এ বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিয়া আর কিছু না বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। মিত্র পরিবার। হরপ্রসাদ বাবুর চাৰি পুত্র ও এক কন্যা। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম বিজয়কুমার,বয়স কুড়ি বৎসর, বি,এ, পড়িতেছে। মধ্যমপুত্র বসন্তকুমার, বয়স আঠার বৎসর, ডাক্তারী পড়ে। তৃতীয় পুত্র শরৎকুমার এন্ট্রান্স স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে—তাহার বয়স পঞ্চদশ বৎসর। কনিষ্ঠ পুত্র শিশিরকুমার দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়িতেছে ; শিশিরকুমার শরৎ- কুমার অপেক্ষা দুই বৎসরের ছােট। হরপ্রসাদ বাবুর প্রথম তিন পুত্রের বিবাহ হইয়াছে ; শিশিরকুমার এখনও অবিবাহিত। কন্যা প্রমীলার বয়স দশ বৎসর, সম্প্রতি কলিকাতায় বিবাহ হইয়াছে। চারিপুরে পর একমাত্র কন্যা প্রমীলা-বড় আদরে, তাহাকে সকলেই ভাল বাসে। প্রমীলা বালিকা হইলেও অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও চতুরা। সে এতদিন একাকিনী ছিল, এখন সঙ্গিনী পাইয়া অত্যন্ত সুখী হইল। তাহার মধ্যমা ও তৃতীয়া ভ্রাতৃবধূদ্বয় বালিকা বলিয়া এখনও পিজালয়ে বাস করিতেছে এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবধু তাহাপেক্ষা কয়েক মিত্র পরিবার। বৎসরের বয়ােজ্যষ্ঠ বলিয়াই হউক, বা অন্য কোনও কারণেই হউক, তাহার সহিত মন খুলিয়া মিশিতে চাহে না। বিবাহের পর প্রমীলা এ পর্যন্ত খরালয়ে পুনর্গমন করে নাই। সে অবিবাহিতার ন্যায় এখানে ওখানে বেড়াইতে যায় এবং খেলা করিয়া বেড়ায়। প্রমীলা মাষ্টারের নিকট পড়ে। হরপ্রসাদ বাবু সরলাকে ও মাষ্টারের নিকট পড়িতে বলিলেন। তাহাতে সরলার মাতা বলিয়া পাঠাইলেন-“সরলার আর পড়িবার আবশ্যক নাই, যাহা শিখিয়াছে তাহাই যথেষ্ট। হরপ্রসাদ বাবু বুঝাইয়া লিলেন-“সরলার লেখা পড়া শিখিবার ইচ্ছা আছে, তাহাতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। স্ত্রীলােক উত্তমরূপ শিক্ষিত হইলে তাহার উন্নতি ভিন্ন অবনতি হয় না। বিশেষতঃ সরলা এখন বালিকা, এখন কুইতে যদি সৎশিক্ষা পায়, তাহা হইলে পরিণামে উহার মঙ্গল হইতে পারে। আমার প্রমীলা অপেক্ষা সরলা বয়সে ছােট, প্রমীলা যখন পড়িতেছে, তখন সরলার পড়িতে দোষ কি ?* হরপ্রসাদ বাবুর আগ্রহ দেখিয়া সরলার মাতা আর কোনও আপত্তি করিলেন না। সরলা মাষ্টারের নিকট পড়িতে লাগিল। শিশির ও প্রমীলা সরলাকে নিঙ্গ সহােদরার গল্প লেহ করে ; সরলাও তাহাদের নিত্যন্ত অনুগত। প্রত্যহ প্রাতঃকালে শিশির ও প্রমীলা সরলাকে ডাকিয়া আনে, তিনজনে পড়াশুনা করে, একত্রে খেলা করে, কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া থাকে না এক জনের সুখ দুঃখ অপর দুইজনে সমভাবে ভােগ করে। বড়ই সুখে সরলার দিন কাটতে লাগিল। বালিকা পিতৃবিয়ােগজনিত শােক দুঃখ হরপ্রসাদ বাবু এবং তাহার গৃহিণীর যত্নে ও স্নেহে ক্রমে ক্রমে বিস্মৃত হইতে লাগিল। সরলার সরলতায় ও নম্রতা, ১৪ সরলা। সকলেই মুগ্ধ। সকলেই তাহাকে ভালবাসে। শিশির ও প্রমীলার সহিত তাহার অকৃত্রিম ভালবাসা দর্শনে সকলেই সুখী। দিনের পর দিন অতীত হইতে লাগিল। এক দিন সরলার মাতা একটী ক্ষুদ্র বাক্স হস্তে লইয়া মিত্র-গৃহিণীর নিকট উপস্থিত হইলেন এবং উহা তাঁহার সম্মুখে রাখিয়া কহিলেন—“দিদি, এই গহনা- গুলি বিক্রয় করিয়া দিতে হইবে। সমস্তই গিয়াছে, কেবলমাত্র আমার অবশিষ্ট দু' একখানি ও সরলার এই গহনাগুলি যত্ন করিয়া রাখিয়াছিলাম, আজ তাহা তোমার হস্তে অর্পণ করিলাক্স ; এই গুলি বিক্রয় করিয়া দিতে হইবে।” এই বলিয়া বাক্স খুলিলেন। অলঙ্কার দেখিয়া মিত্র-গৃহিণী কহিলেন-“কেন বােন, এই সকল অলঙ্কার এখন বিক্রয় করিয়া কি হইবে?” সরলার মাতা কহিলেন-“দিদি, আমার কিছু টাকার প্রয়ােজন আছে; টাকা ব্যাঙ্কে জমা থাকিবে, গহনা সইজে হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে, টাকা ব্যাঙ্কে জমা থাকাই ভাল।” এই বলিয়া সরলার মাতা গহনাগুলি রাখিয়া চলিয়া গেলেন। হরপ্রসাদ বাবু সরলার মাতাকে বিশেষরূপ জানিতেন। তিনি মনে করিলেন সরলার মাতা নিশ্চয়ই কোনও বিশেষ প্রয়ােজন বশতঃ গহনা বিক্রয় করিতেছেন, এবং তিনি যখন গহনা বিক্রয়ের অভিলাষ করিয়াছেন, তখন উহা বিক্রয় না করিয়া ক্ষান্ত হইবেন না। সুতরাং হরপ্রসাদ বাবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও গহনাগুলি বিক্রয় করিয়া ছয় হাজার টাকা সরলার মাতাকে প্রদান করিলেন। সরলার মাতা সমস্ত টাকা হরপ্রসাদ বাবুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন এবং বলিয়া দিলেন যে, তাহারা যে বাটীতে বাস করিতেছেন, সেই বাটার মূল্যস্বরূপ এই টাকা হইতে দুই হাজার টাকা হরপ্রসাদবাবু গ্রহণ করুন এবং বাকী চাকা সরলার নামে ব্যাঙ্কে জমা থাকুক। আর তাহাদের বাটী মিত্র পরিবার। ১৫ বিক্রয়ের টাকা যাহা অবশিষ্ট আছে, তাহাও এই টাকার সঙ্গে ব্যাঙ্কে জমা থাকুক।” বাটীর মূল পাইয়া হরপ্রসাদ বাবু আশ্চর্যান্বিত হইলেন এবং বলিয়া পাঠাইলেন “সে কি কপা, বাটীর মূল্য দিতে হইবে না। আমি সে বাটী সরলাকে দান করিয়াছি। সরকার মাতা তা কিছুতেই শুনিলেন না; বলিলেন,-“আমি ও বাটী তবে সইব না ; সরলাকে লইয়া গাছতলায় থাকিব সেও ভাল, তথাপি ও বাটীতে থাকিব না।” হরপ্রসাদবাবু বুঝিলেন, যে তাহার অবর্তমানে তাহার পুত্রগণ সরলা ও তাহার মাতাকে যদি ঐ বাটীতে বাস করিতে না দেয়, এই মনে করিয়াই সরলার মাতা এক্ষণে বাটী ক্রয় করিতে চাহিতেছেন। অগত্যা তিনি টাকা গ্রহণ করিলেন এবং সরলার নামে বিক্রয় কোবালা লিখিয়া দিলেন। সকলেই জানিলেন যে সরলার মাতা বাটী ক্রয় করিলেন। হরপ্রসাদ বাবু সরলার মাতার নিকট হইতে টাকা লইয়া ব্যাঙ্কে সরলার নামে জমা রাখি- লেন; এবং সরলার মাতাকে প্রবােধ দিবার জন্য বলিলেন বাটা বিক্রয় করিলাম। এই সংবাদ হরপ্রসাদ বাবু ও তাহার গৃহিণী ব্যতীত আর কেহই জানিল না। হরপ্রসাদ বাবুই বরদাকান্ত বাবুর প্রকৃত বন্ধু! এরূপ অকৃত্রিম বন্ধুত্ব সংসারে বিরল। এইরূপ মহত্ত্ব ও সহৃদয়তা যদি সকল মানৰ হৃদয়ে বিরাজ করি তাহা হইলে সংসার স্বর্গ হইত।

'। . চতুর্থ পরিচ্ছেদ . t মাতা-পুত্রী। পূর্বোক্ত ঘটনার পর ছয় বৎসর অতীত হইয়া গিয়াছে ; হয়- প্রসাদ বাবুর স্বর্গলাভ হইয়াছে ; সংসারের ভার এখন বিজয়ের প্রতি অর্পিত হইয়াছে। বিজয় বি, এ, পাস করিয়া কলেজে অধ্যয়ন পরিত্যাগ করিয়াছিল, হরপ্রসাদ বাবুর মৃত্যুর পর হইতে বিষয় সম্পক্তির তত্ত্বাবধান করিতে লাগিল এবং সংসারের ভার গ্রহণ করিল। বসন্তকুমার ডাক্তার হইয়া চিকিৎসা ব্যবসা আরম্ভ করিল। শরৎ ও শিশির কলিকাতায় পড়াশুনা করিতে লাগিল। শ্বশুরের পড়ার সময় বধুগণ আসিয়াছে, তদবধি আর, পিত্রালয়ে যায় নাই। হরপ্রসাদ বাবুর মৃত্যুর দুইমাস পরে প্রমীলা শ্বশুরালয়ে গিয়াছে। সরল। এখন সঙ্গিনী হারা, তাহার এখন আর সে প্রফুল্লতা নাই। সরলার মাতার আর্থিক অবস্থার অবনতি হইলেও তাহার দান- শিলতার হ্রাস হয় নাই। তিনি সুচিকার্যে সুনিপুণা এবং চিত্রাঙ্কণ মাতা-পুত্রী। করিতেও জানিতেন। এই উভয় বিদ্যাই এখন তাহার উপজীবিকা স্বরূপ হইয়াছে। হরপ্রসাদ বাবুর আশ্রয়ে আসার পর হইতে তিনি সূচিকাব্যের আয় হইতে নিজের এবং কন্যার ভরণ পোষণ চালাইতেন ; হরপ্রসাদ বাবু তাহাতে দুঃখিত হইতেন এবং সময়ে সময়ে কিছু অর্থ সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইলে, বিনয়পূৰ্ব্বক নিষেধ করিয়া পাঠাইতেন। তিনি সমস্ত দিন যে সকল শিল্প কাৰ্য্য করিতেন, কন্যা সরলা নিকটে থাকিয়া তাহা শিক্ষা করিত। রাত্রে সান্ধ্যকৃত্য সমাপনান্তে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতেন এবং সরলাকে তাহা বুঝাইয়া দিতেন ও নানাবিষয়ে বহুবিধ উপদেশ দিতেন। হরপ্রসাদ বাবুর মৃত্যুর এক বৎসর পূর্বে সরলার মাতা অতিথি- শালা স্থাপন করিতে মনস্থ করিয়া হরপ্রসাদ বাবুকে কহিলেন—“বহুদিন হইতে আমার অতিথিশালা স্থাপনের অভিলাষ আছে, কিন্তু এ পর্যন্ত মনের ইচ্ছা কার্যে পরিণত করতে পারি নাই। আমার বাটীর পার্শ্বে যে জায়গাটুকু আছে সেই জায়গায় একটা সামান্য রূপ অতিথিশালা নির্মাণ করাইয়া দিতে হইবে। এই কয় বৎসরে সরলার নামীয় টাকায় যে সুদ জমিয়াছে তাহা দ্বারাই যেরূপ সম্ভব সেইরূপ একটী অতিথিশালা নির্মিত হউক। এখন আমার যেমন অবস্থা সেই অবস্থানুসারে অতিথি সৎকার করিতে চেষ্টা করিব।” হরপ্রসাদ বাবু সরলার মাতার অভিপ্রায়মত অতিথিশালা নির্মাণ করাইয়া দিয়াছিলেন। সরল। ও তাহার মাতা উভয়ে পরিশ্রম করিয়া সূচিকাৰ্য্য ও অন্যান্য শিল্প কাৰ্য্য করেন এবং সেইগুলি বিক্রয় করিয়া যাহা উপার্জন হয় তাহার কিয়দংশ দ্বারা সংসার খরচ চালাইয়া অবশিষ্ট অর্থ অতিথি সৎকারে ব্যয় করেন। বাক হইতে যে সু পান তাহাও অতিথিশালার জন্য ব্যয় হয়।

১১
সরলা।
বৈশাখ মাস, সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। খিড়কীর পুষ্করিণীতে সরল
একাকিনী গাত্র ধৌত করিতেছিল। এমন সময় পচাৎ হইতে
কে বলিল—“সরলা, এখনও মা, তাের কাপড় কাচা হয় নাই ?
সন্ধ্যা হইয়াছে, একলা ঘাটে রহিয়াছিস ?” সরলার চমক ভাঙ্গিল,
কহিল-“যাই মা, হইয়াছে।” এই বলিয়া সরলা তাড়াতাড়ি
কাপড় কাচিয়া তীরে উঠিল। সরলার মাতা অগ্রে চলিনে, সরল
তঁাহার পশ্চাতে চলিল। সরলা এখন আর বালিকা নহে, যৌবনে
পদার্পণ করিয়াছে ; তাহার স্বভাব সিদ্ধ নম্রতা ও লজ্জাশীলতা আরও
বৃদ্ধি পাইয়াছে। এখন কোন কোন সময় তাহাকে ঈষৎ বিষগ্ন দেখা
যায়, আবার অনেক সময় তাহাকে দেখিয়া মনে হয় যেন সে কোন
গভীর চিন্তায় মগ্ন।
সরলার মাতার বয়স পঞ্চত্রংশ বর্ষের অধিক হইবে না, কিন্তু
হাকে পঞ্চাশৎ বর্ষীয়া বৃদ্ধার ন্যায় দেখায়। মস্তকের অধিকাংশ
কেশ শুভ্র হইয়া গিয়াছে, বদনমণ্ডল গম্ভীর, নয়নকোণে কালিমা
পড়িয়াছে। যৌবনে তিনি যে রূপবতী রমণী ছিলেন, এখন তাহার
অল্প চিহ্নই বিদ্যমান।
পথে যাইতে যাইতে মাতা কহিলেন—“আমি যদি না আসি-
তাম তাহা হইলে বোধ হয় আরও খানিকক্ষণ জলে পড়িয়া
থাকিতে।”
সরলা কহিল--“আজ বড় গরম পড়িয়াছে, বড় গা জ্বলিতে--
ছিল, ওই জল হইতে উঠিতে ইচ্ছা হইতেছিল না।”
মাতা আর কথা কহিলেন না; উভয়ে নীরবে বাটী আসিলেন।
সর, অ৬ বস্তু ত্যাগ কতঃ শুষ্ক বস্ত্র পরিধান করিয়া কক্ষতলে
অসিল। মাতা কার কেশরাশি অচড়াইয়া দিতে বসিলেন।
।

মাতা-পুত্রী। সরলার মাথায় হাত দিয়া জননী কহিলেন--“ওমা, চুল দিয়া যে জল পাড়তেছে, এখন স্নান করিয়াছ না কি ?” সরলা নীরব রহিল। মাতা পুনরায় কহিলেন-“এমন করিয়া সন্ধ্যার সময় স্নান করিলে কয়দিন বাচিবি !” এবারেও সরলা নিরুত্তর। মাতার নয়নদ্বয় অশ্রু পরিপূর্ণ হইল, কন্যা দেখিতে পাইবে বলিয়া তাড়াতাড়ি অশ্রু মুছিয়া ফেলিলেন। তাহাকে বিষন্ন দেখিলে পরল। পাছে দুঃশিত হয় সেজন্য তিনি সরলার সম্মুখে সর্বদাই প্রফুল্প ভাব দেখাইয়া থাকেন ; যেন তঁাহার কোন চিন্তা নাই, শােক দুখ নাই, এরূপ ভাবু প্রকাশ করেন। তার একমাত্র ধ্রুবতারা, নয়নমণি সয়লা ; সেই সরলার বিগ্নতা তিনি কি করিয়া দর্শন করিবেন। ভগবান , তাহার চিরদিনের সুখশান্তি হরণ করিয়াছেন; সেই চিরদুঃখিনী সরলা যাহাতে সুখী হয় মাতা কোন্ প্রাণে তাহা না করিবেন। সরলার ভ্রমরকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশরাশি সৰ্বাঙ্গ ঢাকিয়া পড়িয়াছে সেই আলুলায়িত কুন্তলের মধ্যে অপূৰ্ব সরলতা মাখা, সৌন্দৰ্য্যপূর্ণ, শাস্ত, বিষণ্ঠ মুখখানি মাতার হৃদয়ে শেলবিদ্ধ করিতে লাগিল। মাতা ভাবিতেছেন—“হায় অভাগি, কেন 'আমার গর্ভে জন্মিয়াছিলি। আমার গর্ভ দোষে তােকে এত যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইতছে। শুনি- ছি পিতামাতার পাপে সন্তানগণ কষ্ট পায়। তিনি দেবতুল্য মানুষ ছিলেন, তাহাকে পাপ স্পর্শ করে নাই। আমি হতভাগী, আমার পাপেই সােণার সংসার ছারখার হইল। মা, তাের বিব মুখ যে আমি আর দেখিতে পারি না! হ ভগবান, তােমার মনে এই ছিল!” মাতার নয়নদ্বয় অধর্ষণ করিল, তাড়াতাড়ি তাহা মুছিয়া ফেলিলেন। আবার তিনি মনে মনে কহিলেন- হরি হে, ধৈর্য দাও; যাহা হইবার হাত হইয়াছে, আর সরলা। ফিরিবে না। হে জগদীশ, চিরদিন তােমার পদে যেন সরকার মতি থাকে ; অজ্ঞান বালিকা যদি ভ্রমে পতিত হয় রক্ষা করিও। হরিহে, তুমিই একমাত্র ভরসা। ভগবান, অসময়ে যাহাকে আমাদের একমাত্র আশ্রয়দাতা করিয়া দিয়াছিলে তাহা- কে ও হরণ করিলে ! অদৃষ্টে যাহাই থাকুক না কেন, ভগবান, ধর্মে যেন চিরদিন মতি থাকে ; সত্য পথ হইতে যেন কখন পদস্খলন না হয়। চিরদিন কাহারও সমান যায় না, সকলেই সুখ দুঃখ ভােগ করিতেছে ; সংসার অনিত্য ইহা যেন সৰ্ব্বদা মনে থাকে। মধুসূদন, সরণা যেন তোমার্চ কৃপা কণায় বঞ্চিত না হয়।” মা তার অশ্রু বাধা মানিল নানয়নপ্রান্ত হইতে দর বিগলিত ধারে প্রবাহিত হইতে লাগিল ; বস্ত্র প্রান্তে অশ্রুমুছিয়া সযত্নে কথার কেশগুলি অচড়াই মা দিতে লাগিলেন। সরলা ভাবিতেছে-“আমি কেন মার পুত্র হইলাম না। হে ভগবান, কেন আমায় পুত্র করিয়া দিলে না! আমি যদি কল্প না হইতাম তাহা হইলেত মায়ের এত কষ্ট হইত না ; আমার জন্যইত মা’র যত দুঃখ। আমি পাপীয়সী কেন জন্মিলাম। জন্মি- লামত মরিল না কেন! তখন যদি মরতাম তাহা হইলে কোন যন্ত্রণাই থাকিত না। আমার জন্য স্নেহময় পিতা অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন- রাজরাণী স্নেহময়ী জননী অনাথিনী হইলেন—পরিশেষে পরের মুখাপেক্ষী হইতে হইল! না জানি অদৃষ্টে আরও কত কি আছে! জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় প্রমীলা অপেক্ষা আমায় অধিক স্নেহ (রতেন--মাতাৰুে জননীর ন্যায় শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন, আ:দের দৃষ্টগুণে তিনিওঁ কালের কবলে কবলিত হই- নেন! মা আর নিশিদিন বিষন্ন হইয়া থাকেন, আমিই rি সেই

মাতা-পুত্রী।
২১
বিষগ্নতার কারণ নই ? মা আমার জ্ঞানবতী, তিনি দারিদ্র্যের
জন্য কাতর নন, আমারজন্যই তাহার এত মনঃকষ্ট ; মা’র এ মনঃকষ্ট
কি আমি দূর
করিতে সক্ষম হইব না ? উগবান, অামায়
সেশক্তি দাও যেন মায়ের প্রফুল্ল মুখ দেখিতে পাই। কাহারও
অবস্থা চিরদিন সমান যায় না। আমি নিজের অবস্থায় কিছুমাত্র
কাতর নই, তাহাত সৰ্বান্তর্যামী তুমি সকলই জান ; নিজের সুখ
দুঃখের জন্য ক্ষণতরেও ভাবিনা, মাতার উপদেশ যেন সৰ্বতাে-
ভাবে পালন করিতে পারি, ইহাই তােমার চরণে প্রার্থনা।
তােমার অসীম করুণা মানবের উপর অবিরত বর্ষণ করিতেছ,
যেন তোমার সেই অপরিসীম দয়া উপলব্ধি করিতে পারি। যেন
তােমার শ্রীচরণ হইতে মন কখন বিচ্যুত না হয়।”
সয়লা আরও কত কি ভাবিতে লাগিল। তাহার স্থির অচঞ্চল
দৃষ্টি সম্মুখের বাতায়নে পতিত চন্দ্ররশ্মির প্রতি নিপতিত
রহিয়াছে। কক্ষে একটী প্রদীপ জ্বলিতেছে। মাতাপুত্রী উভয়ে
নীরব-নিস্তব্ধ ; উভয়েই চিন্তামগ্ন। এমন সময় কক্ষ দ্বারে কে
ডাকির “কাকিমা। সরলার মাতার চমক ভাঙ্গিল। মাতাপুত্রী
উভয়েই দ্বারদেশে দৃষ্টিপাত করিলেন, দেখিলেন একটা যুবক
দণ্ডায়মান রহিয়াছেন সরলার মাতা কহিলেন—এস বাবা, এস ;
বাহিরে দাড়িয়ে রয়েছ কেন, ঘরে এসে বস। সরলা, শিশিরকে
একখানি আসন পেতে দাও।” সরলা আসন পাতিয়া দিল,
শিশির কুমার গৃহমধ্যে আসিয়া আসনে উপবেশন করিলেন।
সরলার মাতা কহিলেন-“বাবা, আমি ভাবিতেছিলাম যে শিশির
ৰাটী আসিয়াছে তবে আমার নিকট আসিল না কেন ?
লাকে বলিলাম যে তােমার প্রমীলা দিদি কেমন আছে জিজ্ঞাসা
•

২২ সরলা। করিম এ , ৩ এ+: iজুক মেয়ে যে কিছুতেই গেল গেল না। ছেলে বোায় এক সঙ্গে খেলা করিয়াছি, এখন তাহাকে এত লজ্জা কেন?” শিশির একটু হাসিয়া কহিলেন—“সরলার একথা আমি প্রমীলাকে বলিয়া দিব ; সরলা প্রমীলার কথা কিছুই জিজ্ঞাসা করে নাই তাহাও বলিয়া দিব।” সরলার মাতাও একটু হাসিলেন, বলিলেন—“প্রমীলা আসিলে সরলা স্বস্তি পায়, উহারা দুটা যেন এক প্রাণ ; প্রমীলাকে ছাড়িয়া উহার বড় কষ্টে দিন যাইতেছে। শিশির কহিলেন—“সে জন্যই বােধ হয় অত কাহিল হইয়া গিয়াছে। কোন অসুখ হয় নাই ত ?” সরলারমাতা। না, কোন অসুখ হয় নাই বটে, তবে দিন দিন বড় রােগা হইয়া যাইতেছে কেন, জানিনা। সরলার প্রতি নেত্ৰপাত করিয়া স্নেহ পূর্ণস্বরে শিশির কহিলেন- সরলা, তােমার কি কোন অসুখ আছে ? লুকাইও না, বল, তাহার চিকিৎসা করা যাইবে। রােগ বৃদ্ধি পাইলে পরে কাকি- মাকে কষ্ট পাইতে হইবে, জানিও। যদি কোন অসুখ হইয়া থাকে স্পষ্ট করিয়া বল। দিন দিন মলিন হইতেছ কেন, সরলা ?” সরলা অতি ধীরে ধীরে উত্তর করিল—“না,কোনও অসুখ নাই- বেশ ভাল আছি। প্রমীলা কেমন আছে? কা আসিবে? তাহাকে আনিলে না কেন ?” শিশির একটী ঘােট নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন—* প্রমীলা শীঘ্রই আসিবে। সে সেখানে গিয়া তােমার জন্য বড় কাদিয়াছে, তাহার শাশুড়ী দুইমাসের জন্য পাঠাইয়া দিবেন, সেজন্য চিন্তা নাই।” সরলার বদন প্রফুল্ল হইল। তাহার বিষন্নমুখে হাসি দেখিয়া মাতা একটু হাসিয়া কহিলেন-“পাগলী, তাের জন্য কি সে শ্বশুরঘর করিবে না।

মাতা-পুত্রী।
শিশির কহিলেন—“কাকিমা, সেও তাই চায়। সরলাকে পাইলে
সে সব ভুলিয়া যায়, সে সরলাকে বড় ভালবাসে।
সরলাকে সকলেই ভালবাসে। সরলার নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও
সরলতা প্রকৃতই সকল লােকের মন আকর্ষণ করে। এমন লােক
নাই যে সরলার প্রশংসা করে না। তবে সরলা আজ কাল একটু
দুষ্ট হইয়াছে, প্রমীলা আসিলে আমি সে দুষ্টামী দূর করিব।” এই
বলিয়া শিশির হাসিলেন।
সরলার মাতা হাসিয়া কহিলেন—“সত্য, সরলা বড় লাজুক
হইয়াছে, কাহার ও সম্মুখে যাইতে চাহেন; তুমি তাই এখনও
এখানে বসিয়া আছে, অন্য লােক হইলে ও এতক্ষণ কোথায় পলাইয়া
যাইত।
শিশির। তবে কাকিমা, আমি বিদায় হই, রাত হইয়াছে।
সরলারমাতা। এখন কিছু দিন থাকিবে, না শীঘ্রই যাইবে।
শিশির। গ্রীষ্মের ছুটী হইয়াছে, এখন একমাস বাটা
থাকিব।
সরলারমাতা। আবার কাল আসিও।
শিশির আসিব” বলিয়া প্রস্থান করিলেন।
55

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। হিংসা-একটী চিত্র। দিবা দ্বিপ্রহর। মিত্র বাটীর দ্বিতলের একটী সুসজ্জিত কক্ষে বসিয়া এই যুবতী কথপােকথন করিতেছে। হলে গালিচা পাতা : তদুপরি রমণীদ্বয় বসিয়া হাস্য পরিহাস করিতেছে। একজনের বয়স অনুমান অষ্টাদশ বর্ষ, বর্ণ উজ্জল শ্যাম, মধ্যমাকৃতি, গঠন লালিত- পূর্ণ, মুখে গৰ্ব্বচিন্ন প্রকটিত। অপর প্রথম অপেক্ষা বয়সে কিছু না হইবে; বর্ণ গৌর, স্কুলাঙ্গী, দৃষ্টি চঞ্চল ও প্রখর। প্রথমা সুন্দরী বিজয়ের সহধর্মিনী, সুরবালা; দ্বিতীয়। বসন্তের স্ত্রী, চন্দ্রকলা। চন্দ্রকলা সুরবালাকে সম্বােধন করিয়া কহিল—“দেখ দিদি, ঐ ছুড়ীটাকে ফেলে আমার গা জ্বলে যায় ! চন্দ্রকলার বাক্যে সুরবালা কপট ভীতি ভাব দেখাইয়া কহিল- “চুপ কর বােন, চুপকর; এখনি যদি কেহ একথা শুনতে পায়, তা হলে আমাদের কাধে মাথা থাকে না।” চন্দ্রকলা তাচ্ছিল্য ভাবে উত্তর করিল-ভয়ে মরে গেলাম .

হিংসা—একটী চিত্র।
২৫
আর কি! তুমি যেমন ভয়ে বাঁচ না, আমি তা পারব না, তাতে
আমি ভালই হই আর মন্দই হই।”
সুরবালা। তা ভাই, কাজে কাজেই ভয় করতে হয়। শেষে
কি অপমানিত হব। আপনার মান আপনার ঠাই। আমাদের
যেমন অদৃষ্ট ভাই, দশ জনে যদি দশ কথা বলে যায় তাহাও নীরবে
সহ করতে হবে।
চন্দ্রকলা। কি দায় পড়েছে সহ করবার জন্য ? বাপের বাড়ী
চলে যাব। আমার সঙ্গে যিনি বিবাদ করবেন তা’র ভিটামাটী উৎস
করব, ভিটায় ঘুঘু চরাব তবে আমার নাম চন্দ্রকলা!
চন্দ্রকলার বাক্যে সুরবালা সন্তুষ্ট হইয়া কহিল-ভাই,
আমি ত ঐ মিচকেমুখী ছুড়ীটাকে দেখতে পারি না, কি
কি করব ভাই, পরের ঘরে সব জ্বালাই সহ্য করূতে হয়।
মরণ আর কি! আবার মাষ্টারের কাছে লেখা পড়া শেখা
হয়েছে। গলায় দড়ি যােটেনি ? বিধবার আবার লেখা পড়া।
ছিছি! ঘেন্নায় মরি!
চন্দ্রকলা। আবার শিশির বাবু বলেন—“সরলাকে যে না ভালবাসে
তার মনুষ্যত্ব নাই, সে হৃদয়হীন”। প্রিমী বলে—“সরল সরলতার
প্রতিমূর্তি!” সরলা সরণ করেই সকলে পাগল। মরণ নেই সরল
পােড়র মুখীর! আমার ইচ্ছা কল্পে শীলের নােড়া দিয়ে ওর
মুখ রগড়ে দিই।
সুরবালা। ভাই, আজ দেখছি তুমি একটা কাপ্ত না
বাধিয়ে ছাড়বেনা। আমাদের এই সব কথা শুনে যদি কেহ
গিন্নীর কানে তােলে তা হলে লাঞ্ছনার একশেষ হবে।
চন্দ্রকলা। হলেই হােল আর কি। যেমন বাড়ীর গিন্নী,
।

সরলা।
।
তেমনি তার সন্তানগণ রত্নসদৃশ ! গুণের বালাই নিয়ে মরি! দেখ দিদি,
আমার ভাই বােধ হয় বুড়ী মাগী এদের সব গুণ করেছে, নইলে
এত হবে কেন? আপনার লােকে কেহ এত আদর, যত্ন ও
শ্রদ্ধা করেনা। ঐ মাগীটাই যত নষ্টের মূল। আবার আমাদের
সঙ্গে কথা কন না, মেয়েকে আসতে দেন না! ডাইনী-মাগ
কোথাকার!
সুরবালা। ওলাে, কবে নাকি সরলার বাপ এদের কি উপকার
করেছিল, সেই কৃতজ্ঞতা ইহারা ভুলতে পারে নাই! তাই এত
মান্য, তা জানি ?
চন্দ্রকলা। জানি, সবজানি, সরলার বিধুমুখেরগুণ! কৃতজ্ঞতা
কি আর বুঝতে বাকী নাই! আর সেজ বউ পােড়র মুখী আমাদের
নিকট একবারও আসে না; সেও সরলা বলতে অজ্ঞান, বুঝিবা
সরলাকে পেলে একেবারে গলে যা! ঢলানিরা সব!
সুরবালা। আবার এক টলানি আসছেন, জান ত?
চন্দ্রকলা। আবার কে ?
সুরবালা। প্রিমী। কাল পরশুর মধ্যে আসবে যে, ননি
নাকি ?
চন্দ্রকলা। তা শুনি নাই ; আর , শুবার তত আবশ্যক
নাই। ওদের এইবার ঘষালকলা পূর্ণ হবে।
সুরবালা। আমার ভাই ইচ্ছা যে ওদের ও বাড়ী হতে বিদায়
করে দিই, কিম্বা এবাড়ী আসা বন্ধ করে দিই।
চন্দ্রকলা। এবাড়ী আসা আমিই বন্ধ করব তবে আমার নাম
চন্দ্রকলা। আর যে বাড়ীতে উহারা আছে উহাতে আমাদের
কর্তৃত্ব করবার অধিকার নাই, কায়ণ উহায়া ওবাড়ী কিনেছে।

r
হিংসা—একটী চিত্র।
সুরবালা। যাই হক, ওদের এ বাড়ী আসা বন্ধ করার ভার
তােমার উপর রহিল, আমি এবিষয়ে নিশ্চিন্ত রহিলাম।
চন্দ্রকলা। যদি সাহায্য আবশ্যক হয় বলব, নচেৎ তােমার
কিছুই করতে হবে না। আমি ওদের পীরিত এমন চটাৰ যে ওদের
আর মুখ দেখাদেখি থাকবে না। তবে একটু বিলম্ব হবে, কারণ
গিন্নী রয়েছেন, চারিদিকে দৃষ্টি রেখে কায করতে হবে।
যাহাতে আমাদের প্রতি সন্দেহ না পড়ে তাহা করতে হবে। তুমি
চন্দ্রকলার বুদ্ধির দৌড়টা একবার দেখ।
এই বলিয়া চন্দ্রকলা একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসিল। সুরবালা
সন্তুষ্ট হইল এবং তাহার মনস্কামনা পূর্ণ হইবে ভাবিয়া মহা আনন্দিত
হইল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। প্রেম-অর একটী চিত্র। পাঠক পাঠিকাগণ, যে সময় কুটিল হৃদয়া রমণীদ্বয় নিজ নিজ হৃদয়ের ঘৃণিত ভাব প্রকাশ করিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে হরপ্রসাদ বাবুর ভবনের অন্য এক অংশের আর একটী চিত্র দর্শন করুন। শরতের শয়ন কক্ষে শৈবলিনী এবং সরলা বসিয়া আছে। সরল। নীরবে বসিয়া কি ভাবিতেছে দেখিয়া শৈবলিনী স্নেহভরে, সরলার চিবুক ধরিয়া কহিল,-“সরলা, কি ভাবছ?” সরলার চমক ভাঙ্গিল, কহিল, “কৈ কিছুই না।” এই বলিয়া আবার নীরব হইল। শৈবলিনী আবার সাদরে, দুই হস্তে সরলার মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া কহিল—“কিছুই না” বলিয়া যে নীরব হইলে ? শীলা, তােমায় পূৰ্ব্বকার মত দেখিনা কেন? সেরূপ প্রফুল্লভাব তােমার বনে দেখিতে পাই না কেন? শীলু, তােমার স্বভাবে এত অভাব ঘটিল কেন, বলিবে না? প্রমীলার বিচ্ছেদই কি ইহার কারণ? সরলার আদরের নাম শীলা।

প্রেম—আর একটী চিত্র। ২৯ সরলা মৃদু হাসিয়া অতি ধীরে ধীরে কহিল-“কৈ, আমিত কিছুই বুঝিতে পারি না, তবে তােমরা যদি কিছু অভাব দেখিতে পাও ত বলতে পারি না। তুমিও ত এতক্ষণ কোন কথা বল নাই, তুমি কি ভাবিতেছিলে ?” শৈবলিনী ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল-*আমি ভাবিতেছিলাম মানুষ কিসে সুখী হয়। তােমার মতে এ জগতে প্রকৃত সুখী কে, সরলা?” সরলা উত্তর করিল-“যিনি প্রকৃত প্রেমিক, যিনি বিশ্ব প্রেমিক, তিনিই প্রকৃত সুখী।” শৈবলিনী কহিল-“কিন্তু প্রকৃত প্রেমিক তুমি কাহাকে রল ? সংসারের চক্ষে যাহাদিগকে সুখী দেখা যায় তাহারা সকলে কি প্রকৃত সুখী নয়?” সরলা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাই। ধন, মান, ও অতুল সম্পদের অধিকারীকেও সুখী বলা যায় না। ভােগবিলাসই তাহাদের মধ্যে অনেকের মুখ ; প্রকৃত সুখ কাহাকে বলে তাহা তাঁহারা জানেন না। যিনি রিপুর অবশীভূত, ভােগ লালসা বর্জিত, স্বার্থত্যাগী, পরহিত সাধনই যাহার জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য এবং সৰ্ব্বভূতে যাহার সমান দৃষ্টি, তিনিই বিশ্ব প্রেমিক, তিনিই সুখী। আনন্দ ভিন্ন নিরানৰ কখনও তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। তিনিইত মর জগতে নর দেবতা। শৈবলিনী। কিন্তু এ সংসারে ওরূপ জিতেন্দ্রিয় মহাত্মা বিরল। হিংসা, অহঙ্কার ও স্বার্থপরতায় • এ সংসার পরিপূর্ণ। পরউপ- কার দূরের কথা, পরের সর্বনাশ করাই, পয়র শুভ দেথিয়া ঈর্ষা করাই যেন সাধারণ মানবের স্বভাব। তবে যাঁহারা সংসারা- শ্রম পরিত্যাগ করিয়া, মায়াজাল ছিন্ন করিয়া, বান প্র অবলম্বন করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে প্রকৃত সাধু থাকিতে পারেন।

সরলা। সরল! ভগবান্ যাহার প্রতি কৃপা করিয়াছেন, সংসারে থাকি- য়াও তিনি অনন্ত সুখ ভোগ করি এখন। যিনি প্রেমময় জগ- দীশ্বরের প্রেমের অধীন, সংসারের ঘাের কোলাহলের মধ্যে থাকিয়া ও যিনি দিনান্তে একবারও তঁাহাকে স্মরণ করেন, তাহাকেই ভাগ্যবান্ বলিতে হইবে। সংসারত্যাগী মহাপুরুষ যে জিতেন্দ্রিয় হইবেন তাহা আশ্চর্যের বিষয় নহে, কিন্তু সংসার ত্যাগ করিলেই যে ভগবৎ প্রেম জন্মে বা ভগবানের কৃপাপাত্র হওয়া যায় এমন কিছু নির্দিষ্ট নাই। যিনি সংসারে কিয়া ভগবৎ প্রেম লাভ করিয়াছেন, তিনি কামনা মধ্যে থাকিয়াও নিফাম—সংসারী হইয়াও সংসারের নিলিপ্ত ভাবে জীবন যাপন করেন। অার ভগবানকে ডাকিবার সময় অসময় নাই, দেশ কাল পাত্র ভেদ নাই। যিনি সেই প্রেমময় ভগবানকে নিশি দিন ডাকেন এবং তাহার চিন্তাতে যিনি সুখ বিবেচনা করেন, তিনিই ভাগ্যবান। ভগবান প্রেমম প্রেমেই ভগবান বিরাজিত। যে জন প্রেমিক, তাহার কি আর নশ্বর জগতের সুখের কামনা থাকে ? ক্ষমা, দয়া, সরলতা, পরােপকারিতা, নিরহঙ্কারিতা তাহার গৌরব বর্ধন করে। আমার দৃঢ় বিশ্বায় যিনি জিতেন্দ্রিয়, নিষ্কাম প্রেমিক, সৰ্ব্বভূতে যাহার সমান দৃষ্টি, তিনিই ভগবানের বিশেষ অনুগ্ৰহ ভাজন। আমার যাহা ধারণা তাহাই তােমায় কহিলাম । আমার এই ধারণা যদি ভ্রমপূর্ণ ৰয় তাহা হউক, আমি আমার এ ভম ভাঙ্গিতে ইচ্ছকরি না, কারণ আমার এই বিশ্বাসেই সুখ, আমি এই চিন্তাতেই সুখী এবং এই বিশ্বাসেই আমি চিরদিন থাকিতে বাসনা করি। উভয়ে কিয়ৎক্ষণ নীরব হইয়া রহিল। পরে শৈবলিনী কহিল,“ঘাটে চল, বেলা গেল।” সরলা উঠিল এবং উভয়ে কাপড় কাচিতে প্রস্থান করিল।

প্রেম—আর একটী চিত্র। ৩১ সরলার বাল্য কাল হইতে সৎ শিক্ষার অভাব হয় নাই এবং সেহ সৎশিক্ষার ফলে সরলার এই পঞ্চদশ বর্ষে হিন্দু ধৰ্ম্মে ও নীতি শাস্ত্রে কিঞ্চিৎ ব্যুৎপত্তি জন্মিয়াছে। শৈবলিনীর নিকট বলিয়াই সরলার মুখে এত গুলি কথা বাহির হইল, অন্য লােকের সম্মুখে হইলে সে একটাও বাক্য উচ্চারণ করিতে পারিত না।

সপ্তম পরিচ্ছেদ। উপদেশ। {} এক মাস দুই মাস করিয়া হরপ্রসাদ বাবুর মৃত্যুর পর এক বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। সরলার মাতার সংসার সেইরূপই চলিতেছে। আপনা- দের অবস্থায় মাতা ও কন্যা কেহই অসন্তুষ্ট নহেন। তাহারা আগ্রহ ও প্রতি সহিঙ দীন দরিদ্রকে সাধ্যমত অন্ন প্রদান, নিঃসহায় পীড়িতের শুশ্রুষা ও অতিথি সৎকার করিতেছেন। তাহাদের সৎকার্যে অনেকেই সন্তুষ্ট, কেবল নীচমনা, খল প্রকৃতির লােকেরাই বিষম হিংসানলে দগ্ধ হয়। সন্ধ্যা বহুক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়াছে। সরলার মাতা এতক্ষণে সায়ংকৃত্য সমাপ্ত করিয়া উঠিলেন। শয়ন কক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন সরল। তথা নাই। তিনি একখানি বাঙ্গালা গীতা হস্তে লইয়া পাঠ করিতে বসিলেন। কিছুক্ষণ পরে সরলা গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া মাতাকে উপদেশ। ৩৩ গীতা পাঠে নিমগ্ন দেখিয়া তাঁহার নিকটে গিয়া বসিল এবং নীরবে গীতা পাঠ শুনিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পাঠ করিয়া সরলার মাতা পুস্তক বন্ধ করিয়া যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন এবং কন্যাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন—“সরলা, তােমার জেঠাই মায়ের নিকট গিয়াছিলে ?” সরলা গীতা পাঠ শুনিতে নিতে এক মনে চিন্তা করিতেছিল, মাতার আহ্বানে চমক ভাঙ্গিল। কহিল-“কি বলিলে মা ? অন্যমনস্ক ছিলাম, শুনিতে পাই নাই।” সরলার মাতা কহিলেন-“আজ প্রমীলার মা তােমাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছিলেন, তুমি গিয়াছিলে কি না তাহাই জিজ্ঞাসা করিতেছি।” সরলা। , গিয়াছিলাম। এই মাত্র সেখান হইতে আসিতেছি। মাতা। তিনি কোনও প্রয়ােজনীয় কথা বলিলেন কি ? সরলা। হাঁ। অন্যান্য কথার পর বলিলেন, তুমি আমার জ্যেষ্ঠা ও মধ্যমা বধুয়ের সহিত যেরূপ মিলিয়া মিশিয়া থাক তাহা ভাল বটে, কিন্তু একটু সাবধান থাকিও, উহাদের সকল কথার তুমি সহসা উত্তর করিও না, উত্তর করিবার পূর্বে ভালরূপ বিবেচনা করিয়া উত্তর করিও। অবশ্য উহাদের প্রত্যেক কথার উত্তর দিতে আমি নিষেধ করিতেছি এরূপ মনে করিও না, তবে উহারা কখন্ কোন্ কথা কি উদ্দেশ্যে এলে তাহা হয়ত তুমি সকল সময় বুঝিতে পার না, এজন্য তােমায় সাবধান করিয়া দিতেছি। মাতা। ওরূপ কথা কেন বলিলেন বুঝিয়াছ কি? সরলা। বুঝিয়াছি। তঁাহারা এখন মধ্যে মধ্যে আমার কথার দােষ ধরিয়া থাকেন, কোন্ দিন কোন্ কথায় কি গােযােগ উপস্থিত হইবে এই জন্যই আমাকে সাবধান করিয়া দিলেন।

৩৪ সরলা। মাতা। তুমি তাহার আজ্ঞা পালনে সম্মত আছ ? সরলা। জেঠাইমা এবং তুমি যাহা আদেশ করিবে তাহাতে আমার অসম্মতির কি কারণ আছে, মা ? সে আদেশ ভাল কি না। তাহাও আমার বিবেচনা করিবার আবশ্যক নাই। তােমরা যখন যে আদেশ করিবে তাহা পালন করাই আমার কর্তব্য কৰ্ম্ম, ইহাতে আর আমার সম্মতি অসম্মতি কি, মা ? কন্যার বচনে মাতা সন্তুষ্ট হইলেন, এবং কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিলেন—“মা, ইহা জানিও যে স্থানবিশেষে অসৎ সংসর্গে সৎও অসৎ হয়, আবার অসৎ প্রকৃতির লােক অনেক সময় বিনা কারণে সরল প্রকৃতির লােকের কথায়, কাৰ্য্যে বা ব্যবহারে অন্যায়রূপে দোষারােপ করিয়া থাকে। তােমার জেঠাইমার জ্যেষ্ঠা ও মধ্যমা বধুদ্বয় যে কুর- প্রকৃতির লােক তাহা তাহার অবিদিত নাই, তজ্জন্যই তােমাকে সাবধান হইতে বলিয়াছেন। সরলা। জেঠাইমার কথায় এখন আমার মনে হইতেছে যে তাহার জেষ্ঠা ও মধ্যম বধূদ্বয় আমার প্রতি সন্তুষ্ট নহেন, কিন্তু এ কথা আমি পূৰ্ব্বে ভালরূপ বুঝিতে পারি নাই। তাহারা কেন যে আমার প্রতি অপ্রসূন্ন তাহা ত আমি জানি না, জানিতে পারিলে আমার পক্ষে ভাল হইত। মা। উহাদের অসন্তুষ্টির কারণ উহাদের প্রতি তােমার ব্যবহার, কিম্বা উহাদের প্রকৃতি, তাহা বুঝিতে চেষ্টা করিলে অল্প দিনেই বুঝিতে পারিবে। সরলা। আমি যদি উহাদের নিকট কখনও কোনও অপরাধ না করি, আমি যদি সর্বদা তাহাদিগকে মান্য ও ভক্তি করি, তাহা হইলে তাহারা কখনই অধিকদিন আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিতে পারিবেন উপদেশ। । আমি যদি ন্যায় ও ধৰ্ম্ম পথ পরিত্যাগ না করি, তাহা হইলে কেহ কখনও আমার কোনরূপ অনিষ্ট করিতে পারিবে না, ইহাই আমার বিশ্বাস। মাতা। ভগবানের নিকট নিশি দিন এই প্রার্থনা করি যেন চির দিন তােমার ধর্মপথে মতি থাকে এবং এইরূপ সরল প্রকৃতি ও উন্নতমন থাকে। মা সরলা, এ জগৎ ভীষণ পরীক্ষার স্থল। মানবগণ পূৰ্ব্বজন্মকৃত কর্মের ফল এই স্থানে ভােগ করিতে আইসে। আনন্দ- ময় পিতা তাহাদের যে উপদেশ প্রদান করিয়া এই স্থানে প্রেরণ করেন, তাহারা এই মায়াময় সংসারে আসিয়া সমস্তই • বিস্মৃত হয় এবং আপনাপন স্বার্থের জন্য অনিত্য সুখের আশায় বহুবিধ পাপানুষ্ঠান করে এবং বারবার জন্ম গ্রহণ করিয়া সেই কর্মের ফল ভােগ করে। মা, এ সংসারে কেহ কাহারও নয়, সকলি অনিত্য ও নশ্বর জানিও। মা, সুখ দুঃখ চক্রের ন্যায় অবিরত ঘুরিতেছে এবং মােহান্ধ মানবগণকে লইয়া ক্ষুদ্র বৰ্ত্তলের মত খেলা করিতেছে। ভ্ৰমান্ধ মানব পার্থিব সুখের সময় হাসে; তখন অহঙ্কার তাহাদের ভূষণ, তাহারা সে সময়ে অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করিতে যায়, নিজের শ্রেষ্ঠতা প্রদর্শন করিয়া গর্বে অন্ধ হয়; তখন তাহারা মনে করে চিরদিন বুঝি এইরূপে যাইবে; কিন্তু পরিবর্তনশীল জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আবার তাহারা যখন দুঃখে পতিত হয় তখন কাদে, নিজের অবস্থায় অসন্তুষ্ট হয়: -অদৃষ্টের প্রতি দোষারােপ করে। মা এইরূপ দুর্বলচিত্ত লােকই এ সংসারে অধিক। জ্ঞানী লােকেরা সাধারণ মানবের ন্যায় কখনও দুঃখে কাতর বা সুখে হৃষ্ট হন না; তাহারা সুখ দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন। “ভগবান যখন যে অবস্থায় রাখেন, তাহারা তাহাতেই ; } ৩৬ . সন্তুষ্ট থাকেন; অনিত্য বস্তুতে সঁহাদের মন আকৃষ্ট হয় না-তাহারা নিত্য বস্তুর অন্বেষণ করেন। মা সরলা, কখনও মনে করিও না যে এ সংসার দুঃখের। মনেই সুখ, মনেই দুঃখ ; তুমি যদি আপনাকে অসুখী মনে কর, তবেই অসুখী হইবে, সুখী মনে করিলেই সুখী হইবে। সুখ দুঃখ মানবের মনে, তাহারা ইচ্ছা পূৰ্ব্বক দুঃখ ভােগ করে। নাম গ্রহণ করিলে শােক দুঃখ থাকে না, জরা, মৃত্যুভয় থাকে না যে নাম গ্রহণ করিলে হৃদয়ে আনন্দ উছলিয়া উঠে, মনের মলিনতা দূর হয়, অশান্তিময় হৃদয় শান্তিপূর্ণ হয়, সেই মধুমাখা নাম না লইয়া লােকে কেবল ষড়রিপুর অসহ তাড়না সহ করে। যদি শান্তি চাও, তবে শান্তিময়ের চরণে আত্ম সমর্পণ করিবে। ন্যায় পথ কদাপি পরিত্যাগ করিবে না, প্রমেও কখনও সত্যের অপলাপ করিও না। মাতা নীরব হইলেন। সরলা অতি ধীরে ধীরে কহিতে লাগিল- “মা, এ জগৎ যে অনিত্য তাহা স্পষ্ট প্রতীতি হইতেছে, কিন্তু এ সংসার যে কেবল দুঃখের আকর, সুখের স্থান নহে, তাহা মনে করি না। মুখ দুঃখ যে মানবের মনে তাহাও স্বীকার করি ; কিন্তু মা, তুমি যে বলিলে অসতের সংসর্গে সৎও অসৎ হয়, তবে সতের কি এমন ক্ষমতা নাই যে অসৎকে সৎপথে আনয়ন করে।” মাতা উত্তর করিলেন-“আছে, বিলক্ষণ আছে। কিন্তু অসতেজ সংখ্যা যদি অধিক হয় তাহা হইলে একটি মাত্র সৎ সহজে তাহাদের প্রকৃতি পরিবর্তন করিতে পারে না'; উপরন্তু অসতের সহিত একত্র অবস্থান হেতু তাহার প্রকৃতিতেও অসতের প্রভাব বিস্তারিত হওয়া অসম্ভব নহে। সে কথা এখন থাক্। দেখিও, তােমার জেঠাইমার উপদেশ যৈন বিস্মৃত হইও না।” সরল। বড় বধু দিদিদিগকে কেহ বুঝাইতে চেষ্টা করেন নাই ০ উপদেশ। ৩৭ বলিয়াই আঁহারা গর্বের অন্তরালস্থ হিংসা বহিতে দিবানিশি দগ্ধ হইতেছেন। না, এমন সময় কি আসিবে না, যে সময় বউদিদিরা শান্তি পাইবেন, তাঁহাদের হৃদয়ের কলুষভাব দূর হইবে ? মাতা। সরলা, তােমার বাক্যে যারপর নাই আনন্দিত হইলাম। মা, তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হউক। ভগবান অবশ্যই সেদিন দিবেন। উপদেশ প্রদান করিয়া মন্দকে যিনি ভাল করেন তিনিই মহৎ। মা, সাবধান, আত্মরক্ষা সৰ্ব্বকাৰ্য্যে করিও। তুমি এখন বালিকা, ভাল মন্দ বিবেচনা শক্তি এখন তােমার ভালরূপ হয় নাই ; দেখিও যেন আত্ম- প্রতারিত হইও না। কখনও নিজের অবস্থায় অসন্তুষ্ট হইও না ; পূর্বে কি ছিলাম, এখন কি হইয়াছি, এ চিন্তা যেন কদাচ তােমার মনে স্থান না পায়। আমরা যেরূপ ছিলাম সেইরূপই আছি, কেবল মানবের চক্ষে ধনহীন হইয়াছি, তাহাতে আমাদের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। গত বিষয়ের জন্ঠ অনুশােচনা করিয়া মনকে কষ্ট দিও না। ভগবান্ যাহা করেন তাহা মঙ্গলের জন্য, ইহাই ভাবিবে ; কায়মনােবাক্যে তাহার প্রতি নির্ভর করিবে। জগদীশ্বরের চরণে কামনা করি দিন দিন তােমার ধৰ্ম্মলিপ বৃদ্ধি হউক। দূরে গির্জার বড়িতে টং টং করিয়া দুইটা বাজিল। মাতা একহিলেন—“সরলা, রাত্রি অধিক হইয়াছে, শয়ন কর ; অধিক রাত্রি আগিলে অসুখ হইবে।”

অষ্টম পরিচ্ছেদ।
সঙ্গিনীদ্বয়।
“বলি সরলা, তুই নাকি বড় দুষ্ট হয়েছি? এই এক বৎসর নিকটে
ছিলাম না বলিয়া এর মধ্যে আমার শিক্ষা ভুলিয়াছিস্? আচ্ছা, আমি
এসেছি, এইবার তােমায় ঠিক করিব।”
কয়েক দিবস হইল প্রমীলা শ্বশুরালয় হইতে পিতৃগৃহে আসিয়াছে।
হাসিতে হাসিতে প্রমীলা সুন্দরী উপরি উক্ত কথাগুলি সরলাকে বলিল।
সরলা হাসিয়া কহিল-“হাঁ ভাই, আমি বড় বেয়াদব হইয়াছি। তুমি
কিছুদিন থাকিয়া আমাকে আবার ঠিক করিয়া লও।”
শৈবলিনী। আমি বাঁচিলাম। দে ভাই ঠাকুরঝি, সরলা আর
আগেকার মত নাই। সর্বদাই কি ভাবে ; সেরূপ হাসেনা, খেলেনা,
আনন্দ করিয়া বেড়ায় না, যেন কত গিন্নি ।
প্রমীলা। আমি আসিয়া চার জশের নালিস নিলাম।
সরলা। কার কার ?
প্রমীলা। প্রথম বড় বউদিদির, দ্বিতীয় মেজ বউদিভিয়, তৃতীয়

সঙ্গিনীদ্বয়। সেজ বউদিদির, আর চতুর্থ ছােট দাদার। সেজ বউদিদির আর ছােট দাদার নালিস একরূপ ; আর বড় বউদিদির ও মেজ বউদিদির নালিস অন্যরূপ। শৈবলিনী। তাহাদের নালিস কিরূপ? প্রমীলা। তঁাহারা প্রথমে কিছুই বলেন নাই, সরলার নাম পর্যন্ত করেন নাই। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “সরলা কোথায়, তখন তাহারা বলিলেন সরলার বিষয় আমরা কি জানি ভাই ? সে আমাদের সহিত মেশে না, ভাল করিয়া কথা কহে না। আমি তাহাদের কথা শুনিয়া হাসিলাম। শৈবলিনী। তুমি বিশ্বাস করিয়াছ? প্রমীলা। অন্য কাহারও নাম করিলে বিশ্বাস করিতাম, কিন্তু সরলার নাম যখন করিলেন তখন কিরূপে বিশ্বাস করি ? উপরন্তু এ বিষয়ে আমি সরলার উপর সন্তুষ্ট হইয়াছি। শৈবলিনী। প্রমীলা। মা বলিলেন-“আমি সরলাকে বড় ও মেজ বউমাদের সহিত মিশিতে নিষেধ করিয়াছি।” তাহা শুনিয়া আমি অসন্তুষ্ট হইয়া কহিলাম—মা, বড় অন্যায় কাজ করিয়াছ, ইহাতে সরলার শক্ত বৃদ্ধি হইবে; তুমি ভাল কাজ কর নাই।” তাহা শুনিয়া মা কহিলেন—“সরল। কি সেরূপ নির্বোধ মেয়ে। সে আমার আদেশ শুনিয়া দুঃখিত হইয়া ছিল, শেষে আমরা সরলার মন বুঝিলাম এবং তাহার সবুদ্ধি অনুযায়ী কাৰ্য করিতে অনুমতি দিলাম।” শৈবলিনী। আমরা উভয়ে তাঁদের খরে যাইলে তাহারা নানারূপ বিজপ করেন। আমি তাহার উত্তর প্রদান করিতে উদ্যত হইলে সরল নিষেধ করে। আমরা একদিন যদি না যাই তাহা হইলে নানাপ্রকার কেন ?

৪
সরলা।
কথা তােলেন ; আবার যাইলেও তাচ্ছিল্য ও বিদ্রুপ করেন ; আমাদের
কথা লইয়া আমাদের সম্মুখে হাস্য পরিহাস করেন। আমরা তাহাদের
চরণে কি অপরাধে অপরাধিনী তাহা বলিতে পারি না।
প্রমীলা। আমি সরলাকে বিশেষরূপ চিনি, উহার মন কত দূর
উন্নত তাহা সকলের বুঝিবার শক্তি নাই।
প্রমীলার কথায় বাধা দিয়া সরলা একটু বিরক্তভাবে, অথচ ধীরে ধীরে
কহিল-“ছি। ভাই প্রমীলা, ও সব কি কথা? ও সব কথা ছাড়িয়া দাও,
কি কথায় কি কথা আসিয়া পড়িল ?”
প্রমীলা হাসিয়া বলিল—“আচ্ছা ছাড়িয়া দিলাম। এখন আমায়
কয়েকটী কথার উত্তর দাও দেখি।”
সরলা। কি, বল, উত্তর দিতেছি।
প্রমীলা। তােমার এভাব কতদিন হইয়াছে ?
সরলা। চিরকাল কি একভাব থাকিবে, ভাই ?
প্রমীলা। অপরের নিকট না থাকুক, আমাদের নিকট অবশ্যই
থাকিবে। বল্ আমার কথা শুনবি, সৰ্ব্বদা বিষয় হয়ে থাকৃবিনা—আমি
যা ব’লব শুনবি।
সরলা। তােমার কোন্ কথাটা না শুনি? ন্যায় সঙ্গত কথা কেন
শুনিব ?
প্রমীলা। মরণ আর কি। আমি ওকে ন্যায় বলিব না তাে
অন্যায় বলিব! মরূবে কবে ?
সরলা। টান পড়লেই।
প্রমীলা উভয় বাহুদ্বারা সরলার গলদেশ বেষ্টন করিয়া সাদরে তাহার
পণ্ডে একটা চুম্বন করিয়া কহিল-“বালাই ! শত্রুর টান পড়ুক। ভাই,
আমি এক বৎসর যে কিরূপে কাটিয়েছি তাহা আর কি বলব।”

সঙ্গিনীদ্বয়। সরলা। আর বেশী করিয়া বলিতে হইবে না। তােমার মনে আমার মনে যদি প্রভেদ থাকিত তাহা হইলে বুঝাইবার চেষ্টা করিতে হইত বটে। শৈবলিনী। কেন ভাই, তুমি ত আর একটী পাইয়াছিলে। প্রমীলা। তাহা হইলে কি হয় ? সরলা নইলে কি প্রমীলার হৃদয় শান্ত হয়। তিনি বলেন-“তুমি আমা অপেক্ষা সরলাকে অধিক ভালবাস, সে জন্য আমার ঈর্ষা হয়, আমার মনে হয় সরলা আমার সতীন।” প্রমীলার বাক্যে শৈবলিনী ও সরলা উভয়ে হাসিয়া উঠিল। তাহাদের হাস্য বেগ প্রশমিত হইবার পূর্বেই শিশিরকুমার সেইস্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং তাহাদিগকে হাস্যপরায়ণা দেখিয়া কহিলেন -“বেশ হাসির ঘটা পড়িয়াছে দেখিতেছি।” প্রমীলা কহিল-“ছােটদাদা, আমি মােটে দুইদিন আসিয়াছি ইহার মধ্যে সরলাকে কেমন হাস্যময়ী করিয়া তুলিয়াছি। ও বলিয়াছে আর দুষ্টামি করিবেনা, যদি করে তবে আমি শান্তি দিব।” শিশিরকুমার হাসিয়া কহিলেন—“তুই যাওয়ার পর সরলার এমন প্রফুল্লতা দেখি নাই ; আর আমিত দেখিতে পাইব না, কারণ সরলা আমার সহিত আড়ি করিয়াছে। কেমন সরলা, কর নাই?” সরলা বড় বিপদে পড়িল, কি উত্তর প্রদান করিবে ভাবিয়া পাইল না। কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ করিয়া পরে লজ্জা বিকম্পিতস্বরে ধীরে ধীরে কহিল- “কই, না।” প্রমীলা হাসিয়া সরলার পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র মুষ্টাঘাত করিয়া কহিল-“না, তবে কথা কচ্ছিস না কেন? সরলা মৃদুস্বরে কহিল-“এই যে কইছি ?” শিশির কুমার দেখিলেন সরলা এখন সঁহাকে দেখিলে বড় লজ্জা পায়, ;

৪২ সরলা। সুতরাং তাহাকে আর কষ্ট দেওয়া উচিৎ নয় মনে করিয়া তথা হইতে, প্রস্থান করিলেন। প্রমীলা কহিল-“ছােট দাদার সহিত আমরা একত্রে কত খেলা করিয়াছি, এখন তাহার সহিত কথা কহিতে লজ্জায় মরিয়া যাস।” সরলা। দিন দিন ছােট হইতেছি না বড় হইতেছি ? বাল্যকালের স্বভাব কি চিরদিন থাকে ? তখনকার খেলা কি আর এখন ভাল দেখায় ? সহসা পশ্চাৎ দিকে উচ্চ হাস্যধ্বনি শ্রবণ করিয়া সকলে পশ্চাতে চাহিয়া দেখিল শরকুমার দাড়াইয়া হাসিতেছেন। তাহা দেখিয়া শৈবলিনী আকণ্ঠ ঘােমটা টানিয়া পলাইয়া গেল। সরলা ও প্রমীলা হাসিতে হাসিতে তৎপশ্চাৎ গমন করিল। ৫ নবম পরিচ্ছেদ। পুষ্করিণীর ঘাটে। জ্যৈষ্ঠ মাস। দারুণ গ্ৰীষ্ম? দিবা অবসান হইয়া আসিয়াছে, তথাপি এখনও রবির প্রবল উত্তাপ হ্রাস হয় নাই। মানবগণ গ্রীষ্মতিশয্যে আই ঢাই করিতেছে—পাখা টানিয়া টানিয়া হাত ব্যথা হইতেছে—পিপাসায় কণ্ঠ তালু গুফ হইতেছে, আর ক্ষণে ক্ষণে শীতল জল পান করিয়া দারুণ পিপাসা নিবৃত্তি করিতেছে। জীব জন্তু যে যথায় ছায়া পাইয়াছে তথায় আশ্রয় লইয়াছে। আকাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া চাতক ডাকিতেছে—“ফটিক জ্বল, ফটিক জল। অদ্য একাদশী। সরলার মাতা ও সরলা সমস্ত দিন নিরন্তু উপবাস করিয়া রহিয়াছেন। সমস্তদিন মাতাপুত্রী-বাের্চনা করিয়া, অতিথি ডােজন করাইয়া সময় অতিবাহিত করিলেন। এই দারুণ প্রশ্ন ও প্রাণনাশক পিপাসা তাহাদের কাতর করিতে পারে নাই। সরলা ও তাহার মাতা দিবসের কর্ম সমাধান করিয়া সার কিমি পূর্বে পুষ্করিণীর ঘাটে গাত্র ধৌত করিতে আসিলেন। সরকার পাতা ৫ ৪৪ সয়লা। ; শীঘ্রই চলিয়া গেলেন; যাইবার সময় বলিয়া গেলেন-“সরলা, অধিকক্ষণ জলে পড়িয়া থাকিও না, শীঘ্রই কাপড় কাচিয়া বাড়ী আইস। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে, একাকী থাকিও না। আমি গিয়া প্রমীলাকে হউক কি অপর কাহাকেও হউক পাঠাইয়া দিতেছি। সন্ধ্যা আহ্রিকের সময় হইয়াছে, আমি চলিলাম।” মাতা প্রস্থান করিলেন, সয়লা জলে অবগাহন করিয়া রহিল। ক্রমশঃ সন্ধ্যা হইল। চন্দ্র গগণ হৃদয়ে শশাভিত হইলেন; তাহার কিরণ পুষ্করিণীর স্বচ্ছ সলিলে পতিত হইয়া চিকমিক করিতে লাগিল। অন্যমনস্কতা বশতঃ সরলার মাতার আজ্ঞা মনে নাই। সে তখন জলে গা ডুবাইয়া একমনে পুষ্করিণীর স্বচ্ছ সলিলে প্রতিফলিত চলমার প্রতিবিম্ব নিরীক্ষণ করিতে লাগিল এবং মধ্যে মধ্যে জল মধ্যে মুখ পর্যন্ত ডুবাইতে লাগিল । দেখিতে দেখিতে মাথাটি পর্যন্ত ডুবিল, তৎক্ষণাৎ আবার মস্তক উত্তােলন করিয়া সভয়ে পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিল, পাছে কেহ দেখিতে পায়। এমন সময় পশ্চাতে কে ডাকিল—সরলা”। সরলা কণ্ঠ স্বরে চমকিত হইয়া একবার পশ্চাতে দৃষ্টিপাত করিল, পরক্ষণেই মুখ ফিরাইয়া লইয়া লজ্জাভরে তাড়াতাড়ি আবস্ত্রে গাত্র আবৃত করিল। এ আবার কি জ্বালা ! বস্ত্র গাত্রে জড়াইয়া গেল। আগন্তুক কহিল—“তুমি বহুক্ষণ ঘাটে আসিয়াছ, এখনও বাড়ী যাও নাই, সেজ কাকিম আমায় বলিলেন “সরলা একাকী ঘাটে আছে, প্রমীলাকে একবার পাঠাইয়া দাও।” আমি নিজে আসিয়া ধৃষ্টতা করিয়াছি, সেজন্য ক্ষমা করিও। শিশির কুমার দেখিলেন তাহার আগমনে সরলা লজ্জা পাইতেছে, জল মুইতে উঠিতেছেন। তখন তিনি ধীরে ধীরে প্রস্থান করিলেন,এবং আইবাৰ সময় বলিয়া গেলেন-“আমি চলিলাম, তুমি শীঘ্র বাড়ী যাও, বিল, পুষ্করিণীর ঘাটে। ৪৫ • করিনা।” শিশিরকুমার প্রস্থান করিলে পর সরলা জল হইতে তীরে, উঠিয়া বাটী গমন করিল। শিশিরকুমার নিজ শয়ন কক্ষে গমন করিয়া একখানি চেয়ারে উপবেশন করিলেন। তাহার বদনমণ্ডল চিন্তাক্লিষ্ট, তিনি একমনে চিন্তা করিতে লাগিলেন এবং মধ্যে মধ্যে কপালের স্বেদবিন্দু মুছিতে লাগিলেন। শিশির কুমার ভাবিতেছেন—“সরলা আমার সহিত পূর্বের ন্যায় আলাপ করে না কেন? আমি কি কোন অপরাধ করিয়াছি ? কৈ, মনে তু পড়ে না। আর যদি করিয়াই থাকি তাহা হইলে সরলা কখন দোষ গ্রহণ করিবে না। সরলার পূর্বের ন্যায় বাল্যস্বভাবসুলভ চাঞ্চল্য আর দেখিতে পাই না। ইহার কি কোন কারণ নাই? অবশ্য আছে। সম্ভবতঃ লজ্জাই এখন তাহার পূর্ব ভাবের প্রতিবন্ধক হইয়াছে। সত্যইত, সরলা এখন বড় হইয়াছে, আমিও বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছি, এখন কি আর বাল্যকালের ব্যবহার ভাল দেখায় ? সরলা বুদ্ধিমতী, আমি এতদিন এ বিষয় বুঝিতে পারি নাই। সে যাহা হউক এখন একটা মুখের কথা কহিতেও কি বাধা আছে ? ভাল, সরলা কথা কহিলে আমি কেন নীরবে শ্রবণ করি? সরলার কথা গুলি বড় মিষ্ট ; যখনই তাহার কথা শুনি তখনই মনে হয় যেন তাহার মুখের প্রতিশব্দ আমার হৃদয় করে অমৃত বর্ষণ করিতেছে। সরলার প্রকৃতি একেমন নিখুকরী-তাহার মন কি উন্নত ! আমি এত অল্প বয়সে এত জ্ঞান কাহারও দেখি নাই। আহা! সরল জন্ম দুখিনী। সরলা ! তুমি কাননে নির্জনে ফুটিয়া নির্জনেই শুকাইয়া যাইৰে! আজ সমস্ত দিন এক বিন্দু অল পৰ্য্য উদরে প্রবেশ করে নাই। কি কঠিন মানব হৃদয়! কি ভয়ানক সামাজিক শাসন! উঃ প্রাণ ফেটে যায়। জগদীশ ! সরলার অদূরে !

৪৬ সরলা। কেন এত কষ্ট লিখিয়াছিলে? এই বালিকা তােমার নিকট কি অপরাধে অপরাধিনী, প্রভু! তাহা তুমিই জান।” শিশিরকুমার উঠিয়া বাতায়নে দাঁড়াইলেন এবং আবার ভাবিতে লাগিলেন—“সরলার এই দারুণ যন্ত্রণা কি আমি দূর করিতে পারি না। ভগবান্ আমায় সে শক্তি দাও, যেন সমাজের কুসংস্কার দূর করিতে সক্ষম হই। দয়াময় । এই ভীষণ নারী-মেধ হইতে অবলা নারী কুলকে রক্ষা কর। প্রভু, দুঃখের সময় সকলেই তােমার দোষ দেয়। দয়াময়, তােমার অপার করুণা, তুমি মানবগণকে দুঃখ প্রদান করনা—তাহারা ইচ্ছা পূৰ্ব্বক দুঃখ ভােগ কার। জন্মদুঃখিনী সরলা চিরজীবন মৰ্ম্ম যাতনা ভােগ করিবে। বালিকার বৈধব্য কি শশাচনীয় দুর্ঘটনা। সরলার বৈধব্য যন্ত্রণা দূর করা যদি আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করিত-কিন্তু লে. কলে ২ান দেওয়াও বুঝি পাপ ? সরলার মনের ভাব আমি কিছুই জানিনা ; সরলা হিন্দু বিধবা, আমার মন দিয়া তাহার মন বুঝিতে চেষ্টা করা নিশ্চয়ই ধৃষ্ঠতা।” শিশিরকুমার চেয়ারে উপবেশন করিয়া দুই হস্তদ্বারা বদন আবৃত করিয়া রহিলেন। তিনি কি রােদন করিতেছেন ? কিয়ৎক্ষণ পরে একজন পরিচারক দ্বার দেশে আসিয়া কহিল- “ছােট দাদাবাবু, আপনাকে একটী ভদ্রলােক ডাকিতেছেন।” ভৃত্য চলিয়া গেল। শিশির কুমার চক্ষু মুছিতে মুহিতে তাহার অনুসরণ করিলেন। • দশম পরিচ্ছেদ। সুহৃদ সম্ভাষে। শিশিরকুমার বহির্বাটীতে আসিয়া দেখিলেন তাহার বাল্য বন্ধু মন্মথনাথ তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। শিশিরকুমারকে দেখিয়া মন্মথনাথ সহাস্যে কহিলেন—“ভাল আছ ত, হে ? এতদিন বাটা আসিয়াছ একদিনও কি সাক্ষাৎ করিতে নাই ?” শিশিরকুমার হাসিয়া উত্তর করিলেন—“তুমি বাটী ছিলে না, কাহার সহিত সাক্ষাৎ করিব? কাল তুমি আসিয়াছ, আজ দেখা করিতে যাই- তাম, একটু কাজ ছিল বলিয়া যাইতে পারি নাই, সেজন্য ক্ষমা করিও।” মন্মথ। আচ্ছা, এবার ক্ষমা করিলাম, কিন্তু এরূপ পুনঃরায় হইলে আর ক্ষমা করিবনা। এখন চল—একটু বেড়াইয়া আসা যাউক। শিশিরকুমার বন্ধুর হাত ধরিয়া বাটীর বাহির হইলেন এবং কিয়ৎদূর গমন করিয়া কহিলেন—“আমি বাটী আসিয়া তােমাদের বাটী দুই দিন গিয়াছিলাম। প্রথম দিন শুনিলাম যে তুমি কোন কাৰ্যোপলক্ষে শ্রীরামপুর গিয়াছ, দ্বিতীয় দিন শুনিলাম তুমি ফিরিয়া আস নাই; তাহার পর আর যাই নাই। কাল শুনিলাম তুমি আসিয়াছ, আজ যাইয়া দেখা করিয়া আসিব মনে করিয়া ছিলাম, তা ভাই আজ একটা কাজ ছিল তাই যাইতে পারি নাই, আর না যাইবার একটা উদ্দেশ্যও ছিল।”

৪৮ সরলা। মন্মথ। কি উদ্দেশ্য, শুনি। শিশির কুমার হাসিয়া বলিলেন-“ভাবিলাম, দেখি তুমি আইস কি না। আমার প্রতি তােমার কিরূপ মমতা একবার পরীক্ষা করিয়া দেখি।” মন্মথ সহাস্যে শিশিরকুমারের পৃষ্ঠে চপেটাঘাত করিয়া কহিলেন- “এখন দেখিলে ত শিশিরের প্রতি মন্মথর কিরূপ মমতা ? আর আমিও বুঝিলাম মন্মথর প্রতি শিশিরের কি রকম টান!” শিশিরকুমার হাসিয়া বলিলেন-“রাত অধিক হইতেছে, তুমি বাটীর নিকট আসিয়াছ বাটী যাও, আমিও বাটী যাই ; কাল আবার দেখা হইবে।” মন্মথ। রাত হ’লইবা তাহাতে ক্ষতি কি? আমাদের রাড়ীর নিকট আসিয়াছ, একবার বাটীর ভিতর চলনা ; বাটীর নিকট আসিয়া ফিরিয়া গিয়াছ জানিতে পারিলে মা রাগ করিবেন; চল, তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবে।” শিশিরকুমার অগত্যা সম্মত হইলেন। উভয়ে সম্মুখস্থ একখানি দ্বিতল ভবনে প্রবেশ করিলেন। মন্মথকে অন্দরমহলের পথে যাইতে দেখি শিশিরকুমার কহিলেন—“মনা, আমি বাহিরে বসি, তুই শীঘ্র আয়।” মম্মথ শিশিরকুমারের হস্ত ধারণ করিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিয়া লইয়া যাইতে যাইতে বলিলেন “আর অত লজ্জা করে কাজ নাই, চল ; উনি বাটীর ভিতর যাবেন তা আবার একজন আবদালি অগ্রে সংবাদ দিবে।” শিশিরকুমার আর কোন কথা কহিলেন না, নীরবে মন্মথর অনুগমন করিলেন। মন্মথর স্ত্রী চেয়ারে বসিয়া একখানি পুস্তক পাঠ করিতেছিল, হঠাৎ স্বামীর সহিত শিশিরকুমারকে গৃহে প্রবেশ করিতে দেখিয়া অতিশয় লজ্জা পাইল এবং আকণ্ঠ ঘােমটা দিয়া পালঙ্কের অন্তরালে লুকাইল। তাহা দেখিয়া শিশিরকুমার বড়ই অপ্রতিভ হইয়া কহিলেন-“দেখ দেখি, সুহৃদ সম্ভাষে। ৪৯ । তুই বড় বেয়াদব! এমন করে লােককে লজ্জা দেয়? চল বাহিরে যাই, নচেৎ মাসীমাকে সংবাদ দে, দেখা করে যাই। মন্মথ হাসিয়া কহিলেন-“তা, আর এত লজ্জা কেন? লীলা ঘরে আছে, তাতে আর কি হয়েছে? আমি তােকে সঙ্গে করে এনেছি, তাতে তাের এত লজ্জা কেন? তাের বিবাহ হলে আমি জোর করে তাের বউ দেখে অসিব, জানিস ত আমি তাের মত লাজুক নই।” শিশিরকুমার গৃহের বাহিরে আসিয়া দাড়াইলেন। তখন অন্য দ্বার দিয়া লীলা গৃহ হইতে বহির্গত হইল। মন্মথ হাসিতে হাসিতে মাতাকে ডাকিতে গেলন। মন্মথর মাতা আসিয়া কহিলেন—“শিশির; বাহিরে দাঁড়ায়ে কেন, বাবা, ঘরে এস। বাবা, তুমি আমাদের নিতান্ত পর ভাব!” শিশির। সেকি মাসীমা ! আপনাদের পর ভাবিব কেন ? মন বড় দুষ্ট, আমার নামে আপনার নিকট নানা কথা বলে, তাই আপনি ওরূপ বলিতেছেন। তা মাসীমা, আপনি ওর কথা কখনও শুনিবেন না। মন্মথর মাতা হাসিয়া কহিলেন—“মন্মথ বলে তুমি নাকি এখানে আসিতে চাও না, তুমি বড় লাজুক ছেলে ! বাবা, আমাদের বাটী আসিবে তাহাতে লজ্জা কি? বস বাবা, আমি আসছি।” এই বলিয়া মন্মথর মাতা বাহিরে গেলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে এক থালা খাবার লইয়া আসিয়া শিশিরকুমারের সম্মুখে রাখিয়া কহিলেন- খাও বাবা।” শিশির। এই ত মাসীমা, আপনি লৌকিক আরম্ভ করিলেন। এত খাবার কে খাইবে ? তবে মন যদি খায় ত আনি খাইতে পারি। “কুচ পরােয়া নেই-এস দুজনেই আরম্ভ করিয়া দিই।” এই বলিয়া মন্মথ শিশিরকুমারকে একটী সন্দেশ দিয়া কহিলেন- “ভাই, খাও দেখি।” । ৪ সরলা। শিশির। গালে দাও। মন্মথ। তাত বটেই! তুমি অমনি আঙ্গুলে কামড়াইয়া দাও আর কি ? উভয়ে আহার করিতে লাগিলেন। মন্মথর মাতা অপেক্ষাকৃত উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন—“ওমা নলিনী, এক ডিবা পান নিয়া আয়ত? একটী দ্বাদশ বা এয়ােদশ বর্ষীয়া সুন্দরী বালিকা এক ডিবা পান লইয়া আসিল এবং শিশিরকুমারের সম্মুখে রাখিয়া মন্মথর মাতার পার্শ্বে দাড়াইয়া রহিল। মন্মথর মাতা কহিলেন -“বাবা শিশির, একবার এদিকে চেয়ে দেখ, এই মেয়েটাকে কি পছন্দ হয় ?” শিশিরকুমার কিছু বিস্মিত হইয়া সেই দিকে চাহিয়া দেখিলেন একটী বালিকা, লজ্জাবনত মুখে দাঁড়াইয়া আছে। মন্মথর মাতাকে লক্ষ্য করিয়া তিনি কহিলেন, “মাসীমা, এ মেয়েটা কে ?” মন্মথর মাতা। আমার সম্পর্কীয় দেবরের মেয়ে, মেয়েটী অবি- বাহিতা। উপযুক্ত সৎপাত্র পাওয়া যাইতেছে না বলিয়া এখনও আইবুড়া রহিয়াছে। বয়স্থা হইয়াছে কিন্তু তেমন সঙ্গতি নাই যে খরচ করিয়া ভাল পাত্রে সম্প্রদান করে, কাজে কাজেই এটা ওটা পাঁচটা দেথিতেছে। মেয়েটাও দেখিতে ভাল, তাই দেখে যদি কেহ . বিনা খরচায় গ্রহণ করে। শিশির। সৎপাত্রের অভাবে বিবাহ হইতেছে না? ভাল, আমি বিশেষ চেষ্টায় রহিলাম। আমি নিজেই পাত্রানুসন্ধান করিব। তেমন ভাল পাত্রের সন্ধান পাইলে আপনার সংবাদ দিব। বালিকা নতমুখে ধীরে ধীরে কক্ষ হইতে ক্ৰিান্ত হইল। মন্মথর মাতা কহিলেন—“বাবা, আমরা তােমাকেই পাত্র স্থির করিয়াছি। তােমার মাও এই মেয়েটিকে দেখিয়াছন, তাহার পছন্দ হইয়াছে। তিনি অর্থ চাহেন না; বলেন আমার ছেলের যদি মত হয় তাহা হইলে সুহৃদ সম্ভাষে। আমার কোনও আপত্তি নাই। এখন তােমার যদি মত হয় তাহা হইলে সকল দিকেই মঙ্গল হয়। কি বাবা, চুপ করিয়া রহিলে যে?” মন্মথ। ও কি বলবে যে ওর পছন্দ হয়েছে, ও সে ছেলেই নয়। আমি ব’ছি ওর পছন্দ হয়েছে। দেখছ না, ‘মৌন সম্মতি লক্ষণ। ও কথা কচ্ছে না, চুপ করে রয়েছে। শিশিরকুমার মন্মথর প্রতি কুটী করিয়া মখমাতাকে কহিলেন— “মাসীমা, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। যদি নিতান্তই আমার মত জানিতে চান তবে শুনুন, আমি এখন বিবাহ করিব না! কিন্তু আমি যথার্থই নলিনীর জন্য একটী সৎপাত্রের অনুসন্ধান করিব স্বীকার করিতেছি।” মন্মথর মাতা একটু দুঃখিত হইলেন। তিনি কি বলিতে যাইতে ছিলেন, মন্মথ ইঙ্গিত করিয়া নিষেধ করিলেন। শিশিরকুমার কহিলেন- মাসীমা, আজ চলিলাম, রাত্রি অধিক হইয়াছে, আবার একদিন আসিব। মনা চল।” মন্মথ অগ্রগামী হইলেন, পশ্চাৎ পশ্চাৎ শিশিরকুমার বহিৰ্বাটী আসিলেন। “আজ তবে চলিলাম, কাল আমাদের বাটীতে তুমি একবার যাইও।” এই বলিয়া শিশিরকুমার নিজ গৃহাভিমুখে গমন করিলেন।

একাদশ পরিচ্ছেদ সন্দেহে সতর্কতা। ছুটীর পর শিশিরকুমার ও শরৎকুমার কলিকাতায় গমন করিয়াছেন। শিশিরকুমারের নানা স্থান হইতে বিবাহের সম্বন্ধ আসিতেছে। মন্মথরমাতা শিশিরকুমারের সহিত নলিনীর বিবাহ দিবার জন্য অনুরােধ করিয়াছিলেন, কিন্তু মিত্ৰগৃহিণী বলিয়াছেন—“পুত্রের অসম্মতিতে আমি কোথাও তাহার বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিব না। তাহার বিবাহের বয়স যায় নাই; এখন অমত আছে, পরে মত হইতে পারে, তখন বিবাহ দিব। এখন অমত করি- তেছে, কিরূপে তাহার বিবাহ সম্বন্ধ স্থির করিব? কাজে কাজেই তাহারা অন্যত্র নলিনীর বিবাহের চেষ্টা দেখিতে আরম্ভ করিলেন। ঘটকদিগকেও শিশিরকুমারের মাতা ঐরূপ কথা বলিলেন; তাহারাও বেগতিক বুঝিয়া ক্ষান্ত হইল। সরলার মাত শিশিরকুমারের বিবাহে অসম্মতির কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। মিত্ৰগৃহিণীকে সে সম্বন্ধে কোন কথা জিজ্ঞাসাও করি- লেন না। তাঁহার মনে ঈষৎ সন্দেহের উদয়-হইল। তিনি ভাবিলেন- • ন সন্দেহে সতর্কতা। “শিশিরের বিবাহে অমতের কারণ কি ? তাহার অপর ভ্রাতৃত্রয়ের অল্প বয়সে বিবাহ হইয়াছে, সে কেন এখনও বিবাহে অমত করিতেছে? কি জানি, আমার মধ্যে মধ্যে কেমন মনে হয় সে যেন সরলার প্রতি বিশেষ অনুরক্তনা, না, আমার ভ্রম। সরলাকে কে না ভালবাসে? হয় ত তাহার ইচ্ছা যে আরও দুইটা পাশ দিয়া বিবাহ করিবে। শিশির বাল্যবিবাহ ভালবাসে না, সেইজন্য বােধ হয় অমত করিতেছে, আমারই বুঝিবার ভুল হইয়াছে।” আবার ভাবিলেন-“ভুলই বা কি করিয়া বলি, কখনও ভুল নয়। সরলার প্রতি তাহার আধুনিক ব্যবহার দেখিয়া আমার মনে হয় যে সে সরলাকে পূর্বের ন্যায় ভগিনী ভাবে ভাল- বাসিতে পারিতেছে না। বিধবা বিবাহ সমাজে চলিত নয় বলিয়া বােধ হয় একথা প্রকাশ করিতেছে না। শিশির কি সেই জন্য সর্বদা বিষগ্ন থাকে? শিশির সুবােধ, বিদ্বান্, সচ্চরিত্র, কিন্তু তবুও আমার সাবধান হওয়া উচিত। সরলার মন যে পথে আছে সেই পথই হিন্দু বিধবার অব- লম্বনীয়, সরলা যাহাতে পথ ভ্রষ্ট না হয় সে দিকে আমার আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। সরলার মনে যে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর উপস্থিত হইয়াছে তাহা ত মনে হয় না। তাহার হৃদয়ে যে প্রেমের অঙ্কুর বিকাশ হইয়াছে তাহা তাহার মুখ দেখিলে কিছু মাত্র বােধ হয় না। যাহা হউক এখন হইতেই সতর্ক হওয়া প্রয়ােজন। এত দিন এ সকল চিন্তা আমার মনে উদয় হয় নাই। সরলার ভবিষ্যৎ জীবন যাহাতে সুখময় এবং মঙ্গলময় হয় আমাকে তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। মাতার যাহা কৰ্তব্য তাহা আমি করিব, তাহার পর জগদীশ্বরের মনে যাহা আছে তাহাই হইবে।” সরলার মাতা এই প্রকার কত কথাই ভাবিলেন ; আবার ভাবিলেন- “সরলার মনে যদি কোন প্রকার ভাবান্তর উপস্থিত না হইয়া থাকে, তাহা হইলে আপাতত চিন্তার কারণ নাই। কিন্তু এরূপ স্থলে প্রেম জন্মানও ৫৪ সরলা। অসম্ভব নহে। সরলার দুঃখে শিশির প্রকৃতই দুঃখিত। সরলার দুঃখ বিমাে- চনের জন্য সে প্রাণ দান করিতেও প্রস্তুত। শিশির সরলাকে প্রাণের সহিত ভালবাসে। কিন্তু হায়! এ ভালবাসার ফল হয় ত বিষময় হইবে। শিশির একদিন কথাচ্ছলে বলিয়া ফেলিয়াছিল, ‘সরলাকে বিধবা বলা যায় না; সরলার ন্যায় বিধবাদিগের বিবাহ শাস্ত্রে নিষিদ্ধ নহে। আমি সেই দিন হইতে ঈষৎ সন্দেহ করিয়া আসিতেছি।” সরলার মা মধ্যে মধ্যে এইরূপ কত কি ভাবিতেন, আর সরলার ভবিষ্যৎ চিন্তা করিয়া বিষন্ন হইতেন। প্রখরা বুদ্ধি সরলার পক্ষে তাহার মাতার মনােগত ভাব বুঝিতে অধিক বিলম্ব হইল না। সে মাতার চিন্তার কারণ বুঝিতে পারিয়া সেই সময় হইতে মাতার ইঙ্গিত মত সতর্কতা অবলম্বন করিতে লাগিল, কিন্তু তাহার বাহিক ব্যবহারের কিছুমাত্রও পরিবর্তন হইল না। মাতা কন্যার মনের ভাব বুঝিতে চেষ্টা করিতেন, কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেন না। সরলা যে সরলা সেই সরলাই আছে; হাসিয়া খেলিয়া বেড়ায়, অতিথি সেবা করে, দেবপূজা করে, মাতার নিকট ধৰ্ম্ম উপদেশ শ্রবণ করে। সরলার মাতা বুঝিলেন যে সরলা শিশিরকে পূৰ্ব্ববৎ ভ্রাতৃস্নেহ করিয়া থাকে, কিন্তু এখন বয়ােধিক্য বশতঃ স্বভাবসিদ্ধ লজ্জা শিশিরের সম্মুখে নিঃসঙ্কোচ ব্যবহারে প্রতিবন্ধক হয়।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। প্রেমিকে চতুরে। কলিকাতার পটলডাঙ্গায় একটী ছাত্রনিবাসে শিশিরকুমার ও শরৎ- কুমার বাস করেন। উভয়ের স্বতন্ত্র কক্ষ। ছাত্র নিবাসে প্রায় কুড়ি পচিশ জন কলেজের ছাত্র আছে। মন্মথও কয়েক মাস হইতে সেই নিবাসে আশ্রয় লইয়াছেন। শিশিরকুমার ও মন্মথ দুই বন্ধুতে বিশেষ আনন্দের সহিত কাল কাটাইতেছেন। এক দিন গ্ৰীষ্মধিক্য বশতঃ”শিশিরকুমার অধিক রাত্রি পর্যন্ত ছাদে শয়ন করিয়া আছেন এবং মনে মনে কত কি চিন্তা করিতেছেন। রজনী জ্যোৎস্নাময়ী; তাহার দৃষ্টি চন্দ্রের প্রতি নিরিষ্ট। এক এক খণ্ড মেঘ আসিয়া চন্দ্রকে ঢাকিয়া ফেলিতেছে, আবার সরিয়া যাইতেছে। শিশিরকুমার চিন্তিতমনে তাহাই দেখিতেছেন। এমন সময় কে ডাকিল “শিশির। শিশিরকুমার ফিরিয়া দেখিলেন-মন্মথ। মন্মথ কহিলেন—“তুমি এখনও ঘরে যাও নাই—এত রাত্রি পর্যন্ত ছাদে রহিয়াছ? এ সময়কার ঠাণ্ডা হাওয়া ভাল নয়, ঠাণ্ডা লাগাইলে অসুখ হইতে পারে।”

সরলা। । শিশির। অতিশয় গরম বােধ হওয়াতে ঘরে শুইতে পারিলাম না। এখানে বেশ ঠাণ্ডা বােধ হইতেছে তাই উঠি উঠি করিয়াও উঠিয়া ঘরে যাইতে পারিতেছি না। মন্মথ। আজ শরৎ দাদা বাড়ী গিয়াছেন বলিয়া তুমি বড়ই বাড়া- বাড়ি আরম্ভ করিয়াছ। গরম ত আর কাহারও বােধ হইতেছেনা, কেবল তোমারই হইতেছে। শিশিরকুমার হাসিয়া বলিলেন-“তুমি কেমন করিয়া জানিলে যে আমি ছাদে আছি ?” মন্মথ। আমি বাহিরে আসিয়া দেখিলাম তােমার ঘরের দরজা খােলা ঘরে কেহ নাই; মনে করিলাম তবে হয়ত ছাদে ওইয়া আছ, তাই এখানে আসিলাম, দেখিলাম সত্য সত্যই তাই । শিশির। আসিলে ভালই হইল। একাকী ছিলাম, সঙ্গী পাই- লাম। এসেছ যখন বস, একটু গল্প করিয়া বাঁচি, রূপর দুই জুনেই ঘরে যাইব। উভয়ে কিয়ৎক্ষণ নীরব রহিলেন। পরে শিশিরকুমার উৰ্দ্ধদেশে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিলেন—“দেখ মন্মথ, ঐ যে একখণ্ড কৃষ্ণবর্ণ মেঘ আসিয়া চন্দ্রকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল, জানিও আমার অদৃষ্টাকাশ ঠিক ঐরূপ মেঘাচ্ছন্ন। মন্মথ। তুমি ইচ্ছা করিয়া নিজের অদৃষ্টকে মেঘাচ্ছন্ন করিতেছ। তুমি ত কাহারও কথা শুনিবে না—বড় একগুঁয়ে হইয়াছ। তুমি যে এমন বেয়াদব হইবেস্তাহ পূর্বে জানিতাম না। শিশিরকুমার হাসিয়া কহিলেন-“কেন ভাই, আমি একগুয়ের কাজ কি করিলাম.আর কিরূপেই বা বেয়াদব হইয়াছি, বল। ভাই, ইচ্ছা করিয়া কে দুঃখ ভােগ করে ?”

প্রেমিকে চতুরে। মন্মথ। তুমি ত ইচ্ছা করিয়াই নিজের জীবনকে অবনতির পথে লইয়া যাইতেছ। তােমাকে বিবাহ করিবার জন্য এত অনুরােধ করা হইতেছে, বিবাহ করিতেছ না কেন? শিশির। তােমরা কি মনে কর আমি বিবাহ করিলেই সুখী হইব? চতুর মন্মথ কহিলেন—“কেন সুখী হইবেনা ? অসুখের কারণই বা কি? শিশির। বিবাহ করিয়া সুখী হওয়ার পরিবর্তে বরং অসুখীই হইব, কারণ যাহাকে বিবাহ করিব তাহাকে সুখী করিতে পারিব না। একটা বালিকার অনাবিল জীবন দুঃখ পূর্ণ করিতেছি ভাবিয়া আরও অসুখী হইব। মন্মথ। এখন ঐরূপ বলিতেছ, ব্রিাহ হইলে আর ওরূপ কথা বলি- বেনা। আমি অমন তােমার মত বিবাহের নামে বিরক্ত বহু লােককে দেখিয়াছি, পরে তাহাদের বিবাহ হইলে নব বধূর পদ লেহনে সন্তু হয় নাই। প্রথমে অনেকে বিবাহের নামে খঙ্গহস্ত হইয়া থাকে, কিন্তু বিবাহের পর বধূদিগের অনুগ্রহাকাঙ্ক্ষী ভৃত্যের ন্যায় হইয়া পড়ে। এই বলিয়া মন্মথ হাস্য করিতে লাগিলেন। শিশিরকুমারও হাসিয়া কহিলেন—“তােমার মত গর্দভই স্ত্রীর পদাবনত হইয়া পড়ে। কামিনীর বঙ্কিম কটাক্ষ শিশিরকুমারকে বিদ্ধ করিতে পারে না। মন্মথ। তুমি শিশির, ভাের বেলা গাছের পাতায়, দুর্বাঘাসে পড়িয়া থাক, একটু বাতাস গায়ে লাগিতে না লাগিতে ঝরিয়া পড়, সূৰ্য্যতাপে শুকাইয়া যাও, তােমার আবার শক্তি আছে? আমি মন্মথ, নামেই ভুবন বিজয়ী, আমার অব্যর্থ সন্ধানে সকলেই পরাজিত, তা জান ? শিশিরকুমার হাসিয়া বলিলেন-“দোহাই তােমার, আমার প্রতি সঙ্কুচিত ৫৮ সরলা। কৃপা দৃষ্টি ক’রনা! আমি গরীব বেচারা, আমার শক্তি নাই, জানত তােমার প্রতাপ সহ্য করিতে পারিব না।” মন্মথ শিশিরকুমারের মনােভাব বুঝিয়াছিলেন, কিন্তু কে তাহার প্রণয়- পাত্রী তাহা বুঝিতে পারেন নাই। শিশিরকুমারের ব্যবহারে মন্মথ দুঃখিত হইলেন, ভাবিলেন ‘এই কি শিশিরের বন্ধুত্ব! আমাকে সমস্ত গােপন করে? কিন্তু আমার নিকট কখনই গােপন রাখিতে পারিবে না। প্রকাশ্যে কহিলেন--“শিশির, পাগলামী ছাড়িয়া দাও, বিবাহ কর, আর অমত করিও না। বিবাহে কেন অমত কর, আমি তাহা আজ না শুনিয়া ছাড়িব না।” শিশিরকুমার নীরব রহিলেন—কোনও উত্তর করিলেন না। তাহাকে নীরব দেখিয়া মন্মথ কহিলেন-“রুঝিয়াছি, তুমি কাহারও প্রণয়ে পতিত হইয়াছ। কিন্তু শিশির, তুমি নিতান্ত বালক নও, ভাল মন্দ বিচার করিবার শক্তি জন্মিয়াছে, লেখা পড়া শিখিয়াছ, তােমার এরূপ বিকল চিত্ত হওয়া উচিত নয়। ভ্ৰমান্ধতা বশতঃ এখন যাহা সুখময় মনে করিতেছ, ভবিষ্যতে তাহা কালকূটপূর্ণ বােধ হইতে পারে, তাই বলি- তেছি, বুঝিয়া কাৰ্য কর।” শিশিরকুমার এইবার উত্তর করিলেন—“ভাই মন্মথ, সত্যই আমি এক- জনকে প্রাণের সহিত ভাল বাসিয়াছি ; সে ভালবাসা তােমাদের চক্ষে নিষ্কলঙ্ক না হইতে পারে, কিন্তু আমার চক্ষে তাহা নিৰ্ম্মল।” শিশিরকুমারের কথায় বাধা দিয়া মন্মথ কহিলেন—“শিশির, সত্যই যদি তুমি তাহাকে পাইলে সুখী হও, তবে তাহাকেই বিবাহ করুন কেন? এরূপ মনাগুণে পুড়িতেছ কেন?” শিশির। আমি মানব হইয়া দেবীর আশা করিয়াছি, সে মানবের দুপ্রাপ্য। ।

প্রেমিকে চতুরে। মন্মথ। যদি দুষ্প্রাপ্য হয় তবে তাহার জন্য এত আগ্রহ কেন ? তাহার আশা ত্যাগ কর। শিশির। তাহার আশা বহুদিন ত্যাগ করিয়াছি। মন্মথ। তবে বিবাহ করিবেনা কেন? শিশির। তাহাকে বিবাহ করিবার আশা ত্যাগ করিয়াছি বলিয়া কি তাহার ভালবাস ত্যাগ করিব ? আত্মসুখের জন্যই কি প্রেম ? মন্মথ হাসিয়া কহিলেন-“ওঃ ! তােমার এতদূর গড়াইয়াছে! কিন্তু আমার বিশ্বাস হইতেছেনা। তােমার ভালবাসা রূপজ মােহ হইতে পারে। আকাঙ্ক্ষা মিটে নাই বলিয়া এখন ওরূপ মনে হইতেছে, রূপতৃষ্ণা মিটিলে আর এভাব থাকিবেনা। “ছি!*-ঘৃণায় মুখ ফিরাইয়া শিশিরকুমার বলিলেন-“ছি! তুমি আমায় এতদুর নরপিশাচ মনে কর? রূপ-তৃষ্ণা যে ব্যক্তির হৃদয়ে বলবতী হয়, তাহাকে রূপ-তৃষ্ণা উন্মত্ত করে, প্রেমে তাহা করে না।” মন্মথ। তুমি যাহাকে ভাল বাসিয়াছ তাহার নিকট ভালবাসার প্রতিদান পাইয়াছ কি ? শিশির। আমি প্রতিদান চাহি না। মন্মথ মনে মনে কহিলেন ইহাকেই প্রেম বলে। প্রকাশ্যে কহিলেন- এটা নুতন বটে, কারণ ভালবাসার প্রতিদান পাও নাই, আবার যাহাকে ভালবাস, সেও দুষ্প্রাপ্য—এটা নূতন বটে !” শিশির। তােমাদের নিকট নূতন হইতে পারে, কিন্তু আমার নিকট নূতন নয়। মন্মথ। সে কথা যাউক। এখন বল দেখি, সে অসাধারণ ব্যক্তিটী কে? শিশির তােমার শুনিয়া কোনও ফল নাই। মন্মথ। কেন? আমি তােমার বন্ধু, তােমার দুঃখে আমি দুঃখ সরলা। বােধ করি, সুখে সুখ প্রাপ্ত হই। তােমার মনের জ্বালা আমার নিকট গােপন রাখিবে ? শিশির। তুমি আমায় প্রাণের সহিত ভালবাস তাহা আমি জানি, কিন্তু ভাই, এ হতভাগ্য তােমার অসীম ভাতৃস্নেহের উপযুক্ত নয়। মন্মথ। ও সব বাজে কথা ছাডিয়া দাও। শিশিরকুমার কোনও উত্তর না করিয়া নীরবে চিন্তা করিতে লাগি- লেন, কিয়ৎক্ষণ পরে আত্মবিহ্বলের ন্যায় বলিতে লাগিলেন- “ভাই, সমাজ মনে করে আপনার মর্যাদা রক্ষা করিয়া চলিতেছে, ন্যায়, পথে চলিয়া ধর্ম পালন করিতেছে, কিন্তু সমাজ বুঝিতে চাহে যে দিন দিন তাহার কি অধধাগতি হইতেছে! ভাই, যাহারা নিজে নিত্য অসংখ্য দুষ্কৰ্ম্ম করিতেছে তাহারা আবার অপরের প্রতি অন্যায় শাসন করিতে চায় কেন ? কথায় বলিতেছি, তুমি পর স্ত্রী হরণ কর, তাহাতে তুমি জাতিচ্যুত হইবেনা, আর যদি তুমি বিধবা বিবাহ কর তাহা হইলেই জাতিচ্যুত হইবে। তুমি ইংরেজের হােটেলে অখাদ্য ভােজন করিয়া আইস তাহাতে জাতিচ্যুত হইবেনা, আর বিলাত গমন করিলেই জাতি যাইবে। ভাই, আমাদের এই কুনিয়ম কি দুর হইবেনা ? ইহাতে যে কত লােকের সর্বনাশ হইতেছে, কত ভণ্ড তপস্বীর বৃদ্ধি পাইতেছে তাহা বর্ণনাতীত। মন্মথ শিশিরকুমারের কথার মর্ম গ্রহণ করিতে না পারিয়া বিস্মিত হইয়া তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। শিশিরকুমার প্রকৃতিস্থ হইয়া পুনরায় বলিতে লাগিলেন—“ভাই, দুৰ্বল হৃদয়ের আবেগ ভরে পাগলের ন্যায় কি বলিতেছি কিছু মনে করিও না।” মন্মথ গম্ভীর ভাবে বলিতে লাগিলেন—“ভাই শিশির! তােমার মনের কথা আমি স্পষ্ট কিছুই বুঝিতে পারি নাই বটে, কিন্তু এইটুকু বুঝিয়াছি প্রেমিকে চতুরে। যে সমাজ তােমার বাসনার প্রতিকুল,—অর্থাৎ তুমি এমন কাৰ্য্য করিতে অভিলাষ করিতেছ যাহা সমাজের প্রচলিত রীতি বিরুদ্ধ। ভাই, সমাজের বিরূদ্ধে কোন কথা বলিবার পূর্বে তুমি কি উত্তমরূপ চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ যে সমাজের নিয়ম ভাল কি মন্দ? সমাজের বন্ধন এখন অনেক শিথিল হইয়া পড়িয়াছে সন্দেহ নাই এবং সেই শিথিল- তার সুযােগে অনেকে দুষ্কৰ্ম্ম করিয়াও সমাজ কর্তৃক শাস্তি হয় না। কোন কোন বিষয়ে সমাজের বন্ধন শিথিল হইয়াছে বলিয়া সকল বিষয়ে যে সমাজের বন্ধুন শিথিল করিতে হইবে এ কিরূপ,যুক্তি ? তােমার ঈঙ্গিত কাৰ্য্য সমাজের প্রতিকূল বলিয়া হয়ত তুমিসমাজের প্রতি বিরক্ত হইছে। ভাল করিয়া বুঝিয়া দেখ, তােমার কাৰ্যে বাধা দেওয়া সমাজের পক্ষে ন্যায়- সঙ্গত কি অন্যায়। সমাজ বা ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে কথা কহিতে হইলে অনেক বিবেচনা শক্তি, অনেক জ্ঞানের প্রয়ােজন।” শিশিরকুমার ধীরে ধীরে কহিতে লাগিলেন—“না ভাই! আমার মতই যে অভ্রান্ত এমন কথা আমি বলিতেছিনা; কিন্তু আমার বর্তমান ধারণাও এই যে, যে বিষয়ে আমি সমাজকে দোষী ও পীড়ক বলিতেছি, সে বিষয়ে সমাজ নিশ্চয়ই দারুণ অত্যাচারী। মন্মথ। হইতে পারে। তােমার মনের অভিলাষ আমার নিকট ব্যক্ত করিতে তােমার আপত্তি আছে বুঝতেছি সুতরাং আমি তাহা শুনিতে চাহি না। কিন্তু তােমাকে বন্ধুভাবে একটা কথা বলিয়া রাখি; তােমার মনের যে অভিলাষ আমার নিকটও ব্যক্ত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছ, সমাজ তােমার যে অভিলাষ চরিতার্থের অন্তরায়, তোমার সে অভিলাষ পূর্ণ হওয়া সহজ সাধ্য নহে, হয়ত সম্পূর্ণ অসম্ভব। সুতরাং তােমার পক্ষে সে দুরাশা পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। অনর্থক কেন ইচ্ছা পূৰ্ব্বক মৰ্ম্মপীড়া ভােগ কর ?

৬২
সরলা।
শিশিরকুমার নীরব রহিলেন, কোন কথা কহিলেন না।
মন্মথ কহিলেন-“রাত্রি প্রায় তিনটা বাজিয়াছে, এখন যাইয়া শয়ন
কর; সমস্ত রাত্রি অনিদ্রায় কাটাইলে অসুখ হইবে।”
শিশিরকুমার ও মন্মথ উভয়ে উঠিয়া স্বস্ব কক্ষে গমন করিলেন।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
মাথাধরা।
একদিন বৈকালে প্রমীলা, সরল ও শৈবলিনীকে সমভিব্যবহারে
লইয়া তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবধুর কক্ষে গমন করিল। চন্দ্রকলা ও সুরবালা
উভয়ে তথায় বসিয়াছিল। তাহাদের আসিতে দেখিয়া উভয়েই
বিরক্ত হইল। সুরবালা প্রকাশ্যে কহিল-“কি ভাগ্যি যে এদিকে
তােমাদের পদার্পণ হ’ল ! তবু ভাল, আজ সকালে কার মুখ দেখে উঠেছি
বলিতে পারি না।”
প্রমীলা। বােধ হয় নিজের মুখ নিজেই দেখে উঠেছ।
চন্দ্রকলা। নিজের মুখ নিজে কিরূপে দেখিবে ?
প্রমীলা হাসিয়া কহিল-“দেখিতেছন। বিছানার সম্মুখেই বৃহৎ আরসী;
বিছানা হইতে মুখ দেখা যায়। বড় বউদিদি সেই জন্যই আরসী খানি
ওরূপ কায়দা করিয়া রাখিয়াছেন, প্রত্যহই নিজের মুখ নিজে দেখিয়া
উঠেন।”
প্রমীলার বাক্যে সুরবালা ও চন্দ্রকলা উভয়েই বিশেষরূপ বিরক্ত
হইল, কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছুই বলিতে পারিল না।
০

৬৪
সরলা।
চন্দ্রকলা। সে যাক। বলি, তবু ভাল যে এ ঘরে সেজ বউএর
দর্শন পেলেম, উনি ত আমাদের ছায়া মাড়ান না !
শৈবলিনী নিরুত্তর রহিল। প্রমীলা কহিল—“তােমর ত ভাই,
বড় যা, ঘােট যাকে কোন্ আসিতে বল ? তােমরাও ভাই খোজ লওনা,
সেজবউদিদির ঘরে কখনও যাওনা, শুধু কি ওরই দোষ ?”
সুরবালা। ভাই, দোষ আমাদেরই। আমরা মন্দ বলেইত কেহ আমাদের
গ্রাহ্য করেনা, কাজেই কাহাকেও ডাকিনা। কাজ কি ভাই, যদি মন্দ
করিয়া দিই।
এই বলিয়া সুরবালা সরলার প্রতি ভ্রুকুটি কটাক্ষপাত করিল। সরলা
তাহা দেখিয়াও দেখিলনা।
চন্দ্রকলা। সরলাকে আমরা ডাকিলেও আসে না, কি ভাগ্যি আজ
এসেছে।
প্রমীলা। আমি দুমাস এখানে আসিয়াছি, কৈ এক দিনও ত ডাকিতে
শুনি নাই। সরলা ত আপনা হইতেই আসে।
সরলা ব্যস্ততা সহকারে বলিল—“ডাকেন বৈকি,আমিও ত আসি, তবে
সকলদিন আসিতে পারি না।”
সরলার কথার ভাবার্থ প্রমীলা ও শৈবলিনী উভয়েই বুঝিল, প্রমীলা
আর কিছু বলল না।
সুরবালা এক জন ঝিকে ডাকিয়া কহিল—“ও রে ঝি! অডিকলমের
শিশিটা দিয়ে যাত, বড় মাথা ধরেছে
সুরবালার মাথাধরা যে কৃত্রিম তাহা প্রমীলা বুঝিল এবং অতি কষ্টে
হাস্য সম্বরণ করিল।
শৈবলিনী। বড়দিদির কি তবে অসুখ করিতেছে ?
সুরবালা। হাঁ, বড় মাথা ধরিয়াছে!
প্রমীলা। তবে আমরা আর বিরক্ত করিবনা, চল যাই।

মাথাধরা। সুরবালা। না, বস, বস, বিরক্ত আর কি, বিরক্ত আর কি। শৈবলিনী। মেজদিদি ঘাটে যাইবেন না ? চন্দ্রকলা। না, আমি আজ ঘাটে যাইব না। প্রমীলা। বেলা গিয়াছে, আমাদের ঘাটে যাইতে হইবে, চল যাই। প্রমীলা, সরলা ও শৈবলিনী প্রস্থান করিল। চন্দ্রকলা কহিল—“দেখলি দিদি, আস্পর্ধা! আমাদের সব দোষ দিল।” সুরবালা। আমাদের দেখতে পারে না ; দেখলি না ঠেস দিয়ে আমায় কত কথা বলিল। চন্দ্রকলা। আ মরণ! ছুড়ী এবার এসে যদি ওরকম করে ধলে তবে আমি মুখের মত জবাব দিব। কিয়দ্দর বাইয়া সরলা প্রমীলাকে কহিল—“ভাই প্রমীলা, তুমি বড় দুষ্ট হইয়াছ ; হাজার হউক তােমার গুরুজন ত বটে। আর গুরুজন নাই বা হইল, মন ত সকলকারই সমান। আমাকে কেহ যদি কটু কথা বলে, সে সকল কথা আমার কেমন লাগে, উহাদের ত সেইরূপ লাগিয়াছে। ছিঃ! ভাই, আমি তােমার উপর বড় বিরক্ত হইয়াছি। প্রমীলা উভয় বাহু দ্বারা সরলার গলদেশ বেষ্টন করিয়া বলিল- সরলা, তাের মত কি ক্ষলেই সরলা ? তাের মত কি সকলকারই মন? তা নয়—সরলা, তা নয়। আমার কথায় ওদের দুঃখ হয় নাই, ক্রোধের উদয় হইয়াছে। সকলেই যদি উহাদের খােমােদ করিয়া চলিবে, দোষ ধরাইয়া না দিবে, শাসন না করিবে, তাহা হইলে উহাদের ক্রুরতা আরও বৃদ্ধি পাইবে যে!” সরলা হাসিয়া বলিল—“তুমি শাসন করিবার উপযুক্ত পাত্রীই বটে। তুমি শাসন করিবার কে ?

সরলা
শৈবলিনী তুমি উহাদের শাসন করিবে ? যাহাদের শাসন করিবার
কথা হারাই যখন প্রশ্রয় নেন তখন তুমি কি শায়ম করিবে ?
এলা। সে কথা আমি বিলক্ষণ ও নি। যদি আমি উহাদের মতে
মত প্রদান করি, বাক্যের এতিবাদ করতে সাহস না করি, তাহা হইলে
উহারা আরও “ধিনি” হইয়া উঠিবে। প্রতি কথায় যােব দেখাইলে, পদে
পদে শ্ৰম বুঝাইয়া দিলে এবং দৃষ্টান্ত দেই। কথায় কথায় সৎ উপদেশ
প্রদান বমিলে উহাদের ত্রুর চরিত্রের শোষন হইতে পারে।
শৈবলিন।। যদি তাই হয় ত অতীব উত্তম। ভগবান্ করুন,
দিদিদিগের মন ভাল হউক।
আর কেহ কি বলি না, ভিলভনে ঘাটে গমন করিল।
সুরবালা প্রাতঃকালে কাহারও মুখ দেখিতে ভালবাসিত না, সেই
জন্য বিছানার নিকট দণি এরূপভাবে রাধিনাছিল যে নিদ্রাভঙ্গ হইব।
মাত্ৰ নিজমুখ ফর্পণে দেখা যাইবে। স্কুল বাল: এই দর্পণ রাখিবার কারণ
গ্রীনা জানিভ। সেই জন্যই তাবাসস্থলে ঐ কথা বলিয়াছিল এবং
সুরবালা নিজের মনের ভাব প্রকাশ হইল ভাবিয়া মনে মনে অত্যন্ত
রোবাবিষ্ট হইয়াছিল।
نن و
.
-----

চতুর্দশ পরিচ্ছে। বিজয়া দশমী। দুই মাস হইল প্রমীলা শ্বশুর বাটী গিয়াছে। আশ্বিন মাস, পূজার ছুটীতে শরৎকুমার ও শিশিরকুনার বাটী আসিয়াছেন। মিত্র বাটীতে এবৎসর পূজায় বিশেষ সমারােহ হয় নাই। পূজা শেষ হইয়াছে, অদ্য বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমী বাঙ্গালী হিন্দুর পরম আনন্দের দিন। এই দিন তাহাদের নিকট শত্রু মিত্র সব একাকার ; সকলে শত্রুতা ভুণিয়া শত্রুকে মিত্র ভাবে আলিঙ্গন করে। কুত্রাপি হিংসা দ্বেষ স্থান পায় না। দীন দরিদ্রের অবধি আনন্দের সীমা থাকে না—জগৎ আনন্দ ভরা বলিয়া প্রতীয়মান হয়, প্রতি মানবের হৃদয়ে পবিত্রতা বিরাজ করে। এই দিন পরস্পরের সম্মিলন দৃশ্য কি মনােমুগ্ধকর ! সয়লা একাকিনী খিড়কীর পুষ্করিণীর সােপানে বসিয়া আছে। শহরের কোলাহল তাহার কর্ণে প্রবেশ করিতেছে না। সন্ধ্যার পর যথাযােগ্য পুরজনদিগকে প্রণাম ও আশীৰ্বাদ করিয়া আসিয়া সরলা নির্জনে বসি- আছে। তাহার হৃদয়ে পূৰ্ব্বস্মৃতি জাগিয়া উঠিতেছে। সে ভাবিতেছে, ৬ সরলা। “সেই একদিন আর এই এক দিন। বাল্যকালে ঝিয়ের সঙ্গে পূজা দেখিতাম, আনন্দ করিয়া বেড়াইতাম, বিজয়ার দিন বাটী বাটী প্রণাম করিয়া আসিতাম, তখন সকলই আনন্দপূর্ণ ছিল। এখন সমস্তই এত বিষাদ মাখা বােধ হয় কেন? বৎসরের তিন দিন কেবল আনন্দের। যে তিন দিন আনন্দময়ী মা ভক্তের ঘরে বিরাজ করেন, সেই তিন দিন তিনি সকলের হৃদয়ে আনন্দ ঢালিয়া দেন। আজ কে যেন সমস্ত আনন্দ হরিয়া লইয়া গিয়াছে, মায়ের সঙ্গে সমস্ত আনন্দ চলিয়া গিয়াছে। কে বলে আজ আনন্দের দিন? আজ ঘাের বিষাদের দিন। আজ মা শ্বশুর বাটী গেলেন! মা গাে! যে তিন দিন তুমি এখানে ছিলে, সেই তিন দিন এই হতভাগিনীর হৃদয় শীতল ছিল, প্রাণে কতই আনন্দ ছিল। আজ সে আনন্দ কোথায় চলিয়া গিয়াছে, তৎপরিবর্তে বিষাদ সমস্ত হৃদয় আচ্ছন্ন করিয়াছে। জ্যোৎস্যায় যেন আজ কে মসী" ঢালিয়া দিয়াছে। আজ ত চন্দ্রের সে কিরণ নাই ; ফুল ফুটিয়াছে, কিন্তু সেরূপ সৌন্দৰ্য্য দেখিতেছি না। লােকে বলে আজ প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের বৃদ্ধি হয়, তবে আমি আজ সৌন্দর্য্যের হ্রাস দেখিতেছি কেন ? আজ মা বঙ্গবাসীগণকে কঁদাইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। জননী। আবার এক বৎসর পরে আসিবে, এতদিন সন্তানদিগকে ছাড়িয়া থাকিবে কি, মা ? না না, মা কি কখন সন্তানকে ছাড়িয়া থাকিতে পারেন ? আমরা পাপী সে জন্য মাকে দেখিতে পাই না ? মা সৰ্ব্বদাই আমাদের নিকটে আছেন, দিবা রাত্রি আমাদিগকে রক্ষা করিতেছেন। আমরা অজ্ঞান, মােহাচ্ছন্ন, তাহার করুণা উপলব্ধি করিতে পারি না।” সরলার অশ্রুতে বক্ষ ভাসিতে লাগিল। সে বাহজ্ঞান শূন্য হইয়া এক দৃষ্টিতে আকাশ পানে চাহিয়া আছে এবং মধ্যে মধ্যে ডাকিতেছেমা, মা!”

বিজয়া দশমী। ; অনেকক্ষণ পরে সরলার চৈতন্যোদয় হইল ; সে অশ্রু মুছিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিল। পুষ্করিণীর স্বচ্ছ সলিলে চন্দ্রের প্রতিবি পতিত হইয়াছে—মৃদুমন্দপবনে সলিলােপরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ উঠিতেছে, আর চন্দ্ৰ কঁপিতেছে, তবুও চন্দ্র হাসিতেছে। সরলা পাদুখানি জলে ডুবাইয়া অনন্য মনে তরঙ্গ ক্রীড়া দেখিতে লাগিল। এক একটী ক্ষুদ্র তরঙ্গ আসিয়া তাহার চরণে ধীরে ধীরে আঘাত করিতে লাগিল। দুষ্ট সমীরণ অবসর বুঝিয়া তাহার কৃষ্ণ অলকারাশি লইয়া ক্রীড়া করিতে লাগিল। সরলার পশ্চাতে, পুষ্করিণীর তীরে এক যুবক এক বৃক্ষ শাখায় ভর দিয়া দাড়াইয়া আছে। সরলা তাহাকে দেখিতে পায় নাই। যুবক অনিমিষ লােচনে সরলার প্রতি চাহিয়া আছে। কিয়ৎক্ষণ পরে যুবক ডাকিল “সরলা ! সরলার চমক ভাঙ্গিল, পশ্চাতে চাহিয়া দেখিল-শিশিরকুমার। শিশিরকুমারকে তথায় দেখিয়া লজ্জিত হইল, তাহার সম্বােধনে কোন উত্তর প্রদান করিল না। শিশিরকুমার সরলার নিকটে আগমন করিয়া সহাস্যে তাহাকে, কহিলেন-“সরল, আজ বিজয়া দশমী, তুমি আমায় প্রণাম করিলে না?” সরলা আরও লজ্জিত হইল এবং ধীরে ধীরে উঠিয়া শিশিরকুমারকে প্রণাম করিল। শিশিরকুমার হাসিয়া কহিলেন-“আমিতােমার ও চাওয়া প্রণাম লইব । তুমি ত অগ্রে আমায় প্রণাম কর নাই।” সরলা কোমল মৃদুকণ্ঠে কহিল—“আপনাকে এতক্ষণ দেখিতে পাই নাই। যাহা হউক দোষ হইয়াছে ক্ষমা করিবেন।” শিশির। আমি কখনই তােমার এ অপরাধ ক্ষমা করিব না। তবে যদি ৭০ সরলা। তুমি “আপনি” “আজ্ঞা” প্রভৃতি সম্ভাষণ ছাড়িয়া পূর্বের ন্যায় আমার সহিত কথা কও তবে তােমায় ক্ষমা করিব। বাল্যকালে প্রমীলার ন্যায় সরলাও শিশরকুমারকে “তুমি” বলিয়া সম্বােধন করিত ও তাঁহার সহিত ক্রীড়া করিতে কিছুমাত্র সঙ্কোচ বােধ করিত না। যতদিন পর্যন্ত শিশিরকুমার হুগলিতে পাঠাভ্যাস করিতেন ততদিন সরলার সহিত প্রত্যহই সাক্ষাৎ হইত, সুতরাং সে সময়ে সম্বােধনের পরিবর্তনের কোনও কারণ উপস্থিত হয় নাই। কিন্তু শিশিরকুমারের পাঠাৰ্থ কলিকাতায় অবস্থান হেতু সরলার সহিত তাহার সর্বদা সাক্ষাৎ হইত না এবং সেই সময় হইতেই তাহার সহিত সরলার ব্যবহারের ক্রমশঃ পরিবর্তন হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। সরলা বড় বিপদে পড়িল। শিশিরকুমারের এটা বড় দুষ্টামি! তিনি মধ্যে মধ্যে এই প্রকার দুষ্টামি করিতেন। সরলা কোন উত্তর না করিয়া নীরব রহিল। শিশিরকুমার সরলাকে নিরুত্তর দেখিয়া বলিলেন- “নীরব রহিলে যে ?” সরলা ধীরে ধীরে কহিল—কি-বলুন।” শিশির। আমার কথার উত্তর দাও। সরলা কি কথা? শিশির। তােমায় কতদিন বলিয়াছি যে আমাকে অত সম্মান দেখানর প্রয়ােজন নাই। তুমি আমাকে “আপনি” সম্বােধন পরিত্যাগ করিয়া কথা কও, নচেৎ আমি রাগ করিব। সরলা ধীরে ধীরে উত্তর করিল—“আচ্ছা, সেইরূপই সম্বোধন করিব।” শিশির। সরলা, আজ তােমায় কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করিব, তাহার যথার্থ উত্তর দিবে ? সরলা মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইল। শিশিরকুমার কিয়ৎক্ষণ বিজয়া দশমী। ৭১ নীরব রহিলেন, ধীরে ধীরে তাহার কয়েকটা দীর্ঘনিশ্বাস পতিত হইল। পরে কহিলেন—“সরল, আমি এতদিন যাহা তােমায় বলিব মনে করিয়া আসিতেছি আজ তাহা সমস্তই বলিব, মন দিয়া শুন।” শিশিরকুমার আবার নীরব হইলেন। সরলা একটু কৌতুহলাক্রান্ত হইল। শিশিরকুমারের কথার ভঙ্গিতে সে যে একটু ভীত না হইল এমন নহে। শিশিরকুমার বলিতে লাগিলেন—“সরল, আমি তােমার এই বৈধব্য দশা দেখিতে পারি না। তােমার কঠিন ব্রহ্মচর্য পালন আমার অসহ বােব হয় ; তােমাকে আমি সুখী দেখিতে চাই। তুমি ধরাতলে জন্মিয় অবধি জগতের নিকট অপরাধিনী! সরলা, বল তুমি কিসে সুখী হও, আমি প্রাণপণে তাহা সম্পাদন করি। তােনাকে বাল্যকালে যেমন প্রফুল্ল দেখিতাম এখন তেমন দেখিনা; তোমার বিষন্ন মুখ দেখিলে আমার হৃদয় শতধা বিদীর্ণ হয়। সরলা, বল কি করিলে তােমার বিষগ্ন- মুখ প্রফুল্ল হয়। যদি আমায় সুখী করিতে চাও তবে বল তুমি কিসে সুখী হও। তােনাকে সুখী না দেখিলে আমি এজীবনে সুখী হইবনা * শিশিরকুমারের প্রত্যেক কথার সরলার হৃদয় কাঁপিতে লাগিল। সে কি উত্তর দিবে উত্তর দিবে ভাবিয়া পাইল না, অধােমুখে বসিয়া রহিল। শিশিরকুমার আবার কহিলেন—সরলা কথাকও, আমার কথার উত্তর দাও; বল কি করিলে তুমি সুখী হইবে।” কয়েক মুহূর্ত শিশিরকুমারের মুখের প্রতি স্থির ভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া সরলা পুনরায় মুখ নত করিয়া বলিতে লাগিল—“আপনি-না- তুমি এক জন সামান্য রমণীর অষ্ঠ কেন এত ভাব ? আমি নিজের অবস্থায় কিছুমাত্র দুঃখিত নহি। তুমি যদি ভাবিয়া থাক যে আমি নিজের সরলা। অবস্থায় অসন্তুষ্ট, তাহা হইলে মহামে পতিত হইয়াছ ; আমি নিজের অবস্থায় কিছুমাত্র দুঃখিত নহি। হিন্দু বিধবার যাহাতে সুখ, হিন্দু বিধবার যে পথ অবলম্বনীয়, আমি সেই পথেই অগ্রসর হইতে চেষ্টা করিয়া থাকি, তাহাতে আমার কণামাত্রও দুঃখ বা ক্লেশ নাই। “আমার জন্য ভাবিয়া যে সময় নষ্ট করিবে, সেই সময় দেশের জন্য কোন বিষয়ে চিন্তা করিলে ভাল হয় ; আমি তাহা দেখিয়া সুখী হইব। আমাকে সুখী করা যদি তােনার অভিপ্রেত হয় তবে নিজের জীবনকে সুখী করিতে চেষ্টা কর, আমার নিকট ইহা অপেক্ষা আর কিছুই সুখকর হইবেনা।” শিশির। সরলা, বিধবাবিবাহত আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে নিষিদ্ধ নহে, তবে তুমি বর্তমান অবস্থা হইতে অধিকতর সুখী হইতে পারিবেনা বলি- তেছ কেন? সরলা, কি বলিব হৃদয় দেখাইবার নয়, নচেৎ দেখাইতাম, এ হৃদয়ে কত বেদনা! সে বেদনা তুমি ভিন্ন আর কেহ দূর করিতে পারিবেনা। আমার হৃদয় সরলাময় হইয়াছে। আমি অনেক বার তােমায় ভুলিতে চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারি নাই, সেজন্য তােমায় অন্য জানাইলাম। এজগতে শিশিরের সুখকর বস্তু যদি কিছু থাকে তবে তাহা তুমি। আমি জানি আমার ন্যায় সামান্য মানবের তােমায় লাভ করিবার আশা করা বৃথ। আমি বামন হইয়া চঁাদ ধরিবার সাধ করিয়াছি, পঙ্গু হইয়া পৰ্বত লম্বন করিতে উদ্যত হইয়াছি; যতদূর অগ্রসর হইয়াছি তাহাতে আর ফিরিবার উপায় নাই—ফিরিবার বহু চেষ্টা করিয়াছি কিন্তু ফিরিতে পারি নাই। সরলা এতক্ষণ নীরবে শিশিরকুমারের কথা শুনিতেছিল, এইবার কঁদিয়া ফেলিল। সরলা কঁদিতেছে দেখিয়া শিশিরকুমার কহিলেন,-“সরলা, মনের আবেগে কত কথাই বলিয়াছি, যদি কোন রূঢ় কথা বলিয়া থাকি তবে মার্জনা কর।”

বিজয়া দশমী। সরলা অশ্রু মুছিয়া কহিল-“রূঢ়বাক্য তােমার মুখ হইতে বাহির হওয়া অসম্ভব। কিন্তু ভাই! তুমি কি উন্মত্ত হইয়াছ? তুমি বিদ্বান্, বুদ্ধিমান ; তুমি কি জাননা যে তােমার ঐরূপ প্রলাপ বাক্য শ্রবণ করাও আমার পক্ষে দুষনীয়। পাগলামী পরিত্যাগ কর, আমার কথা শুন—তুমি বিবাহ কর, সংসারী হও, সৎকাৰ্য কর, দেশের উপকার কর, দশ জনের একজন হও, আমি তাহা দেখিয়া অতুল আনন্দ উপভােগ করিব।” সরলা পূর্বে যাহার সহিত একী কথা কহিতে লজ্জাবােধ করিত এখন তাহার সহিত প্রগলভার ন্যায় কথা কহিতেছে। সরলা ভাবিল-*এরূপ অবস্থায় যদি অমি নীরব থাকি বা দুই একটা কথা কহিয়া নিরস্ত হই তাহ হইলে বিপরীত ফল ফলিতে পারে ; শিশিরকে ভাল করিয়া বুঝাইয়া নিবৃত্ত করিতে হইবে।” সেই জন্যই সরলা লজ্জা ত্যাগ করিয়া শিশিরকুমারের সহিত এত কথা কহিতে বাধ্য হইল। সরলা নীরব হইলে শিশিরকুমার কহিলেন—“অসম্ভব, সরলা, অসম্ভব! আমার ঘাের কুহেলিকা-আচ্ছন্ন অদৃষ্টাকাশে মুখসূর্যোদয় আর কখনও হইবেনা। মৃত্যু কাহারও বশীভূত নয়, আমি ইচ্ছা করিলেই মৃত্যু হইবে , তথাপি আমি জীবতই থাকিব। সরলা, আগে বুঝি নাই কেন তােমায় এত ভালবাসি। এখন বুঝিয়াছি আমি নিজের সুখের জন্য ব্যাকুল নই, তুমি যাহাতে সুখী হইবে আমি তাহাতেমুখী হইব। তােমার এই অবস্থার পরিবর্তনই আমার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যদি তাহা না করিতে পারিলাম তবে সুখ কোথায় ? সয়লা, তােমার জীবন যেরূপে কাটিতেছে, আমার জীবনও সেইরূপে কাটিবে, ইহা স্থির জানিও। তুমি যাহাতে সুখী হও, আমি প্রাণপণে তাহা করিব। তুমি বিবাহে যদি অসন্তুষ্ট হও তবে কখনই বিবাহ করিতে বলি না। সরলা, বাল্যকাল হইতে তােমার অপূৰ্ব পবিত্র জ্যোতিঃপূর্ণ সৌন্দর্য দেখিয়া আসিতেছি, ০ ৭৪ সরলা। সে পবিত্র সৌন্দর্য্যের এখন দিন দিন বৃদ্ধি হইতেছে,-সে অপূৰ্ব দিব্য জ্যোতিঃ অধিকতর প্রস্ফুটিত হইতেছে। তােমার সরলতায় জগৎ মুগ্ধ । সেই সমস্তই দেখিতেছি তবে তােমার বদনে সে মধুর হাসি দেখিতেছিনা কেন ? পূর্বে যে প্রফুল্ল মূর্তি দেখিয়া আনন্দ লাভ করিতাম, এখন সে মূর্তি দেখিবার জন্য পাগল হইয়াছি, সে মূর্তি ভােমার কৈ? তােমার সেই প্রীতিপূর্ণ মধুর হাসি কোথায়? সরলা, যে হাসির কাছে জগৎ তুচ্ছ, আমি ভােমার সেই হাসি দেখিতে চাহি, আমি আর কিছুই চাহিনা।” সরলা নিরুত্তর, নিস্পন্দ। তাহার নয়নদ্বয় আকাশ প্রতিনিবদ্ধ। সরলা কোনও উত্তর করিল না-একটুও নড়িল না-তহার একটী ও নিশ্বাস পড়িল না। অচল পাষাণ প্রতিমার ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল । শিশিরকুমার বহুক্ষণ উত্তরের অপেক্ষা করিলেন, কিন্তু কোনও উত্তর পাইলেন না। তিনি ডাকিলেন—“সরলা, সরলা, তথাপি উত্তর পাইলেন না; একটু ভীত হইয়া সরলার নিকটে সরিয়া যাইলেন এবং তাহার হস্ত ধরিয়া দেখিলেন তাহার দেহ অসাড়, সে সংজ্ঞাহীন। শিশিরকুমার সরলার হস্ত ছাড়িয়া দিবা মাত্র সে ঢলিয়া পড়িল, আর একটু হইলেই সোপানে মস্তক লাগিয়া ফাটিয়া যাইত। শিশিরকুমার তাড়াতাড়ি তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন এবং আপনার জানুর উপর রক্ষা করতঃ অঞ্জলিপূর্ণ জল লইয়া তাহার মস্তকে দিতে লাগিলেন ও স্বীয় বস্ত্রাল দ্বারা ব্যজন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সরলার : চৈতন্য হইল। শিশিরকুমারের ক্রোড়ে মস্তক রহিয়াছে দেখিয়া সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল। শিশিরকুমার কহিলেন –“সরলা, একটু সুস্থ হইয়াছ কি ?* সরলা ধীরে ধীরে, ক্ষীণ স্বরে উত্তর করিল---“হাহইয়াছি।” শিশির। তবে বাটী যাও, এখানে আর অধিকক্ষণ থাকিওনা।

বিজয়া দশমী। ৭৫ যদি অধিক অসুখ হয়, তবে আমাকে সংবাদ দিও।' তােমার কোমল হৃদয়ে ব্যথা লাগিয়াছে সে জন্য আমায় ক্ষমা কর, আর কখনও এরূপ কথা বলিবনা। তুমি এখানে আছ তাহা জানিতাম না। আমি মনে করিয়াছিলাম এখানে এখন কেহ নাই, কিছুক্ষণ নির্জনে কাটাই মনে করিয়া এদিকে আসিয়াছিলাম। আমার মনের বেদনা কখনও কাহারও নিকট প্রকাশ করিবন স্থির করিয়া ছিলাম, আমার এ দুরাকাঙ্ক্ষা দমন করিতে অনেক দিন হইতে চেষ্টা করিতেছিলাম। আজ হঠাৎ আমার কেমন চিত্ত বিভ্রম উপস্থিত হইল হৃদয়ের বেগ কিছুতেই রুদ্ধ করিতে পারিলাম না। আমার চিত্তের এ দুর্বলতা অমার্জনীয়। যাও সরলা, বাটী যাও, আর এখানে থাকিও না। সরলা উঠিয়া দাড়াইয়া শিশিরকুমারকে বলিল—“মনকে প্রবােধ দাও, হৃদয়কে দৃঢ় কর, প্রবৃত্তিকে দমন কর ; যাহা কখনও হইবার নয়, তাহার আকাঙ্ক্ষা করি না। আমার জন্য বৃথা ভাবিওনা। আমি নিজের অবস্থায় কিছুমাত্র দুঃখিত নহি, তথাপিও যদি আমি কিসে সুখী হই তাহা জানিতে চাও, তবে বলি, তুমি নিজে সুখী হইতে চেষ্টা কর, আমি তাহাতে অশেষ সুখী হইব তােমার অমূল্য জীবন ইচ্ছায় নষ্ট করিও না; দেখিবে তুমি সুখী হইলে আমি কত সুখী হইব। আমি তােমার এসকলকথা পাগলের প্রলাপ বলিয়া মনে করি। কিন্তু মনে রাখিও, পুনৰ্ব্বার যদি আমার সম্মুখে এই ভাবের কথা কহিতে সাহস কর তাহা হইলে তখন হইতে তােমার ছায়া দর্শন করাও আমি পাপজনক বলিয়া মনে করিব।” সরলা ক্ষিপ্রপাদবিক্ষেপে প্রস্থান করিল। শিশিরকুমার সেই স্থানে বসিয়া রহিলেন। ;

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। চিন্তা। - শিশিরকুমার খিড়কীর পুষ্করিণীর সােপানে বসিয়া কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিলেন, অবশেষে তথা হইতে উঠিয়া স্বীয় শয়ন গৃহাভিমুখে গমন করিলেন। গৃহে পৌছিয়া দেখিলেন ভঁহার বালক ভৃত্য তখনও প্রভুর জন্য জাগিয়া অপেক্ষা করিতেছে। শিশিরকুমার তাহাকে কহিলেন,-“তুই, এখনও জাগিয়া বসিয়া আছি-শয়ন করিস নাই? রাত্রি অনেক হইয়াছে, শয়ন করিতে যা ; ছেলে মানুষ, অধিক রাত্রি জাগিলে অসুখ হইবে, যা ঘুমুগে !” ভৃত্য বিনীতভাবে কহিল—“আপনি আমাকে আপনার শয়ন করিবার সময় একবার আসিতে বলিয়াছিলেন, আমি আহারাদির পর হইতেই এইখানে বসিয়া আছি। আপনার আসিতে বিলম্ব হইতেছিল দেখিয়া আমি বড়ই ভাবিত হইয়াছিলাম।” শিশিরকুমার সস্নেহে ভৃত্যের পৃষ্ঠে হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিলেন- “তােকে কি জন্য আসিতে বলিয়াছিলাম মনে নাই। তুই ইতে যা।” । ক এখন চিন্তা। ৭৭ ভৃত্য চলিয়া গেল। শিশিরকুমার পুনৰ্ব্বার চিন্তাসাগরে ডুবিললেন। সরলা গৃহে গমন করিয়া দেখিল তাহার মাতা দেবালয় হইতে তখনও প্রত্যাবর্তন করেন নাই। সরলা পৰ্য্যাঙ্কে শয়ন করিল, তখন চিন্তা আসিয়া তাহার হৃদয়কে অধিকার করিল। সে ভাবিতে লাগিল-- “হায়! কি কুক্ষণেই আমার জন্ম! আমি যাহার আশ্রয়ে থাকি তাহারই সর্বনাশ করি! আমার পূর্বজন্মের পাপের ইয়া নাই! জগদীশ্বর, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিসে হয় ? জেঠাইমা আমাকে কন্যা অপেক্ষা মেহ করেন, আমি তাহারই মনােবেদনার কারণ হইব। ভগবান, আমার অদৃষ্টে আরও না জানি কত বিড়ম্বনা লিথিয়াছেন। আমার জন্যই জেঠাই- মার মেহের শিশির চিরজীবন দুঃখভােগ করিবে ? সন্তানের মনস্তাপে কোন্ জননী না কাতর হন? আর শিশির! তােমায় অদৃষ্টে ভগবান কি এত দুঃখ লিখিয়াছেন! তুমি তােমার অমূল্য জীবন একজন সামান্য, ক্ষুদ্ৰাদপিক্ষুদ্র, তুচ্ছ রমণীর জন্য দুঃখে নিমগ্ন করিবে। ছিঃ ! না, না, তাহা কখনই হইতে দিব না। যাহাতে শিশির সত্বর বিবাহ করে আমাকে তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। কিন্তু আমার চেষ্টায় কি কোন ফলােদয় হইবে? শিশিরকে আমি নিজ সহােদরের ন্যায় ভালবাসি, সেও আমাকে যথেষ্ট ভালবাসে তাহাও জানিতাম, কিন্তু তাহার ভালবাসা কোন্‌পথে যাইছে তাহা আমি এতদিন বুঝি নাই। আমার প্রতি তাহার ইদানীন্তন অতিরিক্ত স্নেহ প্রকাশ কেমন লজ্জাজনক বলিয়া মনে হইত, সেই জন্য তাহার নিকট হইতে দূরে থাকিতে চেষ্টা করিতাম । সে জন্য শিশির কতই ভৎসনা করিয়াছে, মাতার নিকট কতই অনুযােগ করিয়াছে। কিন্তু এখন দেখিতেছি আমি, নিজের অজ্ঞাতভাবে আমার একমাত্র অবলম্বনীয় পথেই চলিয়াছিলাম।” সরলার নয়নজুলে উপাধান সিক্ত হইল। সে ভাবিতে লাগিল- “আজ আমার মন এত ব্যাকুল হইঙেছে কে তাহা বুঝিতে পারিতেছি । এত দিন ত কঁদি নাই, আজ একি হইল? আজ শিশিরের কথায় প্রাণ কঁদিয়া উঠিল কেন? আমার হৃদয় অতি দুর্বল ভাই আমি জানি, ঐ দারুণ ঘাত প্রতিঘাতে হৃদয় অবিচলিভ রাখিতে পারিব না কি ভগবান! করুণানিদান দয়াময়! যেন ধৈর্যহারা না হই। প্রভু! হৃদয়ে শান্তি প্রদান কর।” 'সরলা আবার ভাবিতে লাগিল—“আমার এখান হইতে স্থানান্তরে যাওয়াই কর্তব্য, নচেৎ শিশিরকুমারের মঙ্গল নাই। তীর্থদর্শন উপলক্ষে কিছুদিন স্থানান্তরে থাকাই বিধেয়। এ বিষয়ে মাতাকে বিশেষ করিয়া বলিতে হইবে, অরই বলিব, যত শীঘ্র পারি এখান হইতে চলিয়া যাইব।” সরলার মনে এইপ্রকার কত চিন্তা উদয় হইতে লাগিল। সে ভবিষ্যতের নানাবিধ চিত্র মনােমধ্যে অভি করিতে লাগিল। মনকে চিন্তা- মুক্ত করিবার অন্য উপায় না দেখিয়া নিদ্রা যাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু নিদ্রা আসিল না। তখন সে উঠিয়া বাতায়নে যাইয়া বসিল, তথা হইতে শিশির- কুমার যথায় পুষ্করিণীর সোপানের উপর বসিয়াছিলেন সে স্থান দেখা যায়। সরলা সেই দিকে চাহিয়া দেখিল তথায় কেহ নাই, কেবল্ল তরুরাজি বাতাসে ঈষৎ হেলিতেছে, দুলিতেছে ; ফুলদল হাসিয়া এ উহার গায়ে ঢলিয়া পড়িতেছে। পুষ্করিণীর জলরাশি সেইরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গমালায় শােভিত হইয়া নাচিতেছে। চন্দ্র কিরণ সলিলােপরি নিপতিত হইয়া ঝিক্ মিক্ করিতেছে। সরলা আকাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেথিল আকাশ নিৰ্ম্মল। বিমান হৃদয়ে শুধাংশু হাসিতেছে এবং ধরণীর বক্ষে, রজত্ কিরণধারা অবিরত বর্ষণ করিতেছে। সরলা এক দৃষ্টিতে তাহাই দেখিতে লাগিল। পরে সে করজোড়ে, অপূর্ণ নয়নে উর্দ্ধে দৃষ্টিপাত করতঃ ভগবানের উদ্দেশে বলিতে লাগিল—“প্রভাে! এ বিশাল বিশ্ব চিন্তা। তােনার অপার মহিমার পরিচয় দিতেছে, তােমার অপরিমেয় করুণা মােহাক মানবগণর প্রতি সতত বর্ষিত হইতেছে, কিন্তু তাহারা তাহা বুঝিতে পারে না! আহা! কি সুন্দর, কি মনােমুগ্ধকর দৃশ্য ! অশান্তিময় হৃদয়ে যেন শান্তি সুধা ঢালিয়া দিতেছে! কে আছ, এস পাপী-তাপী জুন, একবার প্রাণ ভরিয়া প্রকৃতির “পবিত্র মূর্তি দর্শন কর। মন প্রাণ খুলিয়া, হৃদয় ভরিয়া সকলে প্রেমময়কে একবার ডাক। হৃদয়ে শান্তি পাইবে, দারুণ অশান্তি দূর হইবে। প্রেমময় জগদীশ ! নয়াকে চরণে স্থান দিও।” সরলা ভক্তিভরে প্রণাম করিল। এমন সময়ে ঘরদেশে শব্দ হইল, সরলা চাহিয়া দেখিল-তাহার মাতা । সরলার মাতা গৃহে প্রবেশ করিয়া দ্বার রুদ্ধ করিলেন এবং কহিলেন- “সরলা, তুমি এখনও জাগিয়া আছ ? অনেক রাত্রি হইয়াছে এখনও শশাও নাই কেন?” সরলা। 'একাকী ছিলাম, ঘুম আসে নাই। ঘুমাইবার চেষ্টা করিলাম, ঘুম হইল না তাই বসিয়া আছি। তােমার আজ এত বিলম্ব হইল কেন, মা ? মাতা। দেবালয়ে একজন সাধু আসিয়াছিলেন, অনেক লোক অমিয়াছিল। তিনি কত ধৰ্ম্মোপদেশ দিলেন, কত তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিলেন, আমি সেই সব শুনিতেছিলাম। তাহার পর তিনি ও অন্যান্য সকল লােক চলিয়া গেলে নির্জনে পূজা সমাধান করিয়া এখন আসিলাম। সরলা সুযােগ, পাইয়া কহিল—“মা, তুমি যে একদিন বলিয়াছিলে শীঘ্র তীর্থ স্বর্শনে যাইবে, ছয় মাস অতীত হইয়া গেল কবে যাইবে, মা ?” মাতা হাসিয়া বলিলেন—“কেন মা, তােমার তীর্থ দর্শনে যাইবার ইচ্ছা হইয়াছে ?

সরলা।
সবলা। হ, মা, অমাব তীর্থে যাইবাব অত্যন্ত ইচ্ছা হইয়াছে।
তুমি কবে যাইবে বল না, মা !
মাতা। আমব নিতাও ইচ্ছ। একবাব তীর্থ ভ্রমণ কবিয়া আসি।
তা, মা, মানুৰে ইচ্ছায় ত কিছু হয় না, তাহাব যখন ইচ্ছা হইবে লইয়া
যাইবেন।
সবল। কেন, তোমার সাইবার বাবা কি ?
মাতা। একটা প্রধান বাধা আছে ; অতিথিশালাব ভাব কাহার
উপর দিব , সেই যে বিম ভাবনা।
সরলা একটু চি। কবিয়া •--“কেন ছােট নদীর উপর ভার
দিয়া যাও না।”
মাত। আনব ত তাহাই ইচ্ছা, কিন্তু সে ইচ্ছা পূর্ণ হয় কৈ? শিশিব
দিন কতক পবে কলিকাতা যাইবে, তাহাৰ দুটা শেষ হইয়া আসিল।
তবে আব কাহাব হস্তে ভার দিয়া যাইব?
সবল। তবে পুববাহিত ঠাকুবেধ হস্তে সমদায় ভার দিয়া যাও।
পুবােহিত ঠাকুব প্রাচীন ও ধর্ম ভীক লােক, এ সমস্ত কৰ্ম্ম তিনি যপূৰ্ব্বক
করিবেন। তিনি কত যত্ন ও ভক্তিব সহিত এত কাল দেবার্চনা কবিতে-
ছেন। মা, তুমি আর অমত কবিও না, জেঠাইমা ও ত যাইবেন, তঁাহাব
সহিত পৰাম করিয়া যাহা হয় একটা ব্যবৃস্থা কবিয়া শীত্র চল। তীর্থ
ভ্রমণে যাইবার জন্য আমার মন বড় ব্যাকুল হইয়াছে।
মা। আচ্ছা, কন্য আমি প্রমীলার মাতাকে একথা বলিব।
তােমার যখন যাইবাব ইচ্ছা হইয়াছে, তখন তােমায় নিশ্চয় লইয়া যাই।
মাতার বাক্যে কন্যা অনিন্দিত হইল। কথা বার্তা শেষ হইলে মাতা-
পুত্রী শয়ন করিলেন।

।।
155
ন
যােড়শ পরিচ্ছেদ।
তথযাত্রা।
তথ্যাত্রা।
পর দিবস সরলাব মাতা ও সরল প্রমীলাব মাতাব নিকট যাইয়া
তীর্থযাত্রা সম্বন্ধে সমুদায় কথা বলিলেন। তাহা শুনিয়া মিত্র-গৃহিণী
সানন্দে কহিলেন—“বেশ ত, চলনা যাই; আমার ত যাওয়ার নিতান্তই
ইচ্ছা আছে। এ বাটীতে আর থাকিতে ইচ্ছা হয় না ; দুদিন দেবদেবী
দর্শন করিয়া নয়ন মন পবিত্র করি।”
সরলার মা। আমার অতিথিশালার ভার কাহার উপর দিয়া
যাইব সেই ভাবনাই প্রবল হইয়াছে। সরলা পুরােহিত ঠাকুরের হস্তে
ভার দিয়া যাইতে, বলিতেছে ; তুমি কি বল ?
মিত্র-গৃহিণী। সে ত বেশ কথা। তাঁহার হন্তে অতিথিশালার
ভারাৰ্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, এবং তিনিও যে যত্নপূর্বক অতিথি-
সৎকার কবিবেন তাহা নিশ্চয়।• এই ব্যবস্থায় আমার সম্পূর্ণ মত আছে।
সরলা বেশ বলিয়াছে, পুরােহিত ঠাকুরের হন্তে ভার প্রদান করিয়া চল।
সরলার মাতা। তবে তাহাই করিব।
মিত্র-গৃহিণী। তাহা হইলে কবে যাওয়া স্থির হইবে?
সরলার মা। আর বেশী দিন বিলম্ব করিবার আবশ্যক কি? যত

৮২ সরলা। শীঘ্র যাওয়া হয় ততই ভাল। ছেলেদের ত পূর্ব হইতেই মত আছে, শীঘ্রই যাওয়া হইৰে এই কথা আজই কলিকাতায় শরৎ ও শিশিরকে লেখা হউক। বিজয় ও বসন্তকেও একথা জানাও। আর আমাদের সঙ্গে ত সরকার মহাশয় যাইবেন ? মিত্র-গৃহিণী। হা, সরকার মহাশয় যাইবেন। তদ্ভিন্ন আর বিশ্বাসী লােক কৈ? আহা! সরকার বুড়াের বিশ্বনাথ দর্শনের বড় সাধ। বেণী চাকরও বাইবে। সে কালও বলিতে ছিল—‘মা ঠাকরুণের বুঝি আর তীর্থ দর্শন ঘটলাে না।” মিত্র-গৃহিণী বাটার সরকাকে ডাকাইয়া তাঁহাদের তীর্থগমনের আয়ােজন করিতে, এবং কলিকাতায় শরৎ;মার ও শিশিরকুমারকে পত্র লিখিতে বলিয়া দিলেন। "বশ্বনাথ এত দিনে তবে দয়া করেছেন ” সহাস্য বদনে এই কথা বলিয়া বৃদ্ধ প্রস্থান করিলেন। বহুদিন হইতে বৃদ্ধ সরকার কাশীতে “বিশ্বনাথ দর্শন করিবার অভিলাষ করিয়া আছেন। সরলা হষ্টচিত্তে শৈবলিনীকে সংবাদ প্রদান করতে গেল। শৈবলিনী সকল কথা শুনিয়া কহিল -“কি আনন্দের সংবাদই দিতে এসেছ ! মরে যাই আব কি?” সরলা হাসিয়া কহিল—“কেল ভাই, ইহা কি আনন্দের সংবাদ নয় ?” শৈবলিনী। তোমার পক্ষে আনন্দের সংবাদ হইতে পারে, আমার পক্ষে নয়। সত্য সত্যই যাইবে নাকি? তােমার কথায় বিশ্বাস হইতেছে , চল, মায়ের নিকট যাই। সরলা হাসিয়া কহিল-“চল”। এই বলয়। যে স্থানে সরলার মা ও মিত্র-গৃহিণী বসিয়াছিলেন উভয়ে সেই স্থানে উপস্থিত হইল। শৈবলিনী কহিল—“ মা, আপনারা নাকি তীর্থদর্শনে যাইবেন? মা, আমাকেও লইয়া চলুন।”

তীর্থযাত্রা। মিত্র-গৃহিণী বধূকে নিকটে বসাইয়া সস্নেহে কহিলেন—“মা, তােমার তীর্থদর্শনের জন্য চিন্তা কি ? তীর্থে যাইবার তােমার যথেষ্ট সময় আছে, এখন তােমাকে লইয়া যাওয়া অনেক অসুবিধা। তুমি এ বাটীতে কখনও আমাকে ছাড়িয়া থাক নাই, প্রথমে কষ্ট হইবে, পরে সে কষ্ট সহিয়া যাইবে। তােমার শাশুড়ী ত চিরদিন বাঁচিয়া থাকিবে না, ইহার পর ত একাকিনী থাকিতে হইবে, তবে মা, এখন হইতে সহাইয়া লও।” মিত্র-গৃহিণীর বাক্যে শৈবলিনী নােদন করিতে লাগিল। সরলার মাতা, মিত্র-গৃহিণী ও সরলা তাহাকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন। মিত্র- গৃহিণী কহিলেন-“ছি! মা, অবােধের মত কঁদিও না। আমি শরৎকে পত্র দিয়া যাইব—সে মধ্যে মধ্যে আসিবে। তুমি বুদ্ধিমতী, তােমার অধৈৰ্য্য হওয়া ভাল দেখায় না—স্থির হও”। এইরূপে নানা প্রকার বুঝাইয়া মিত্র- গৃহিণী শৈবলিনীকে সান্ত্বনা করিলেন। ইতিমধ্যে সরলার মাতা প্রভৃতির তীর্থযাত্রীর সংবাদ মিত্রবাটীতে রাষ্ট্র হইল। সুরবালার দাসী চাপা হাসিতে হাসিতে তাহার নিকট যাইয়া বলিল—“বউ দিদি, একটা নুতন খবর শুনেছেন?” সুরবালা। কি খবর? চাপ।। ওগাে ! তা জানেন না বুঝি? বাড়ীর গিন্নি যে চল্লেন। চন্দ্রকলা। কোথায় লাে চাপা ? গিন্নি কোথায় যাবেন ? চাপা। তীর্থে গাে, তীর্থে। গিন্নি যাবেন, সরলার মা যাবে, আর সরলা যাবে। সুরবালা। তুই এত খবর কোথায় পেনি? তােক কে বল্লে ? *পা। চাপা কি না জানে, পাকে আবার বলবে কে? চাপাই সকলকে সংবাদ দেয়। এতক্ষণ কত মজা দেখ ছিলাম। সেজবউ

৮৪
সরলা।
ঠাকরুণ ত “আমি যাব” বলে কেঁদে রসাতুল! গিন্নি কত বােঝালেন,
তবে কান্না থামে; আমি তা দেখে হেসে বাঁচি না।
সুরবালা ও চন্দ্রকলা চাপার প্রমুখাৎ তীর্থভ্রমণ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া
যারপর নাই সন্তুষ্ট হইল এবং চাপাকে প্রসন্ন মনে বিদায় দিয়া দুইজনে
রহস্যালাপে মগ্ন হইল।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। নানা কথা। মিত্র-গৃহিণীর পুত্রগণ সানন্দে র্তাহার 'তীর্থগমন প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিয়াছেন। তিনি ও সয়লার মাতা প্রভৃতি তীর্থগমনে বহির্গত হইয়াছেন। মিত্ৰগৃহিণীর তীর্থভ্রমণে গমনের পর শৈবলিনীর উপর নানাপ্রকার অত্যা- চায় আরম্ভ হইল। চন্দ্রকলা ও সুরবালা এই সময় তাহার প্রতি শত্রু সাধনের মহাসুযােগ দেখিল। শৈবলিনী এখন নিঃসহায়, তাহার পক্ষাবলম্বন করে এমন কেহই না ক্রমে ক্রমে সংসারের দুইচারটী কার্যের ভার তাহার উপর পড়িল। শ্লেষ, রঙ্গ শৈবলিনীর অঙ্গের ভূষণ হইল। “যাহাদের এত ভালবাসা, কৈ তাহাদের সহিত যাইতে পারিল না! কৈ তাহারা সঙ্গে লইয়া গেল না। আমরা মন্দ, আমাদের নিকট রাখিয়া গেল কেন? আর এখন রাত্রি দিন বসিয়া থাকিলে চলিবে না, সংসারের দুই একটা কাজ করিতে হইবে” ইত্যাদি নানারূপ বাক্যবাণ শিবলিনীর উপর বর্ষিত হইতে লাগিল। শৈবলিনী কোন কথার উত্তর না দিয়া নীরবে সমুদয় সহ করিতে লাগিল। যখন নিতান্ত অসহ বােধ হইত তখন অন্তরালে যাইয়া নীরবে ৬ সরলা। রােদন করিত। সে সন্তুষ্ট চিত্তে সংসারের অনেক কার্যের ভার গ্রহণ করিল এবং যত্নের সহিত সেই কাৰ্যগুলি সম্পন্ন করিতে লাগিল, তথাপি সুরবালা ও চন্দ্রকলার মন পাইল না। প্রতি কাৰ্যে তাহাদের নিকট লাঞ্ছনা ভােগ করিতে লাগিল। মিত্র-গৃহিণী শরৎকুমারকে মধ্যে মধ্যে বাটী আসিবার জন্য পত্র লিখিয়া গিয়াছিলেন। শরৎকুমার একদিন শিশিরকুমারকে কহিলেন- “আমি মনে করিতেছি আগামী শনিবারে বাটী যাইব, রবিবারে ফিরিয়া আসিব, তাহা হইলে পড়াশুনার বিশেষ ক্ষতি হইবে না। মা যাইতে লিথিয়া গিয়াছেন, এবং না যাইলেও নয়, একবার দেখিয়া শুনিয়া আসি, তুমি কি বল ?” শিশির। বেশ ত, শনিবারে বাটী যাও না, আমার ত তাহাই ইচ্ছা। আর মা হঠাৎ তীর্থভ্রমণে গমন করিলেন কেন, তাহার কারণ কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। তীর্থ-গমন সম্বন্ধে মাতার পত্র পাইয়াই শিশিরকুমারের মনে সন্দেহ হইয়াছিল যে হয়ত এই তীর্থভ্রমণের সহিত বিজয়া দশমীর রাত্রিতে সরলার নিকট তাহার মনােভাব ব্যক্ত করার কোন সম্বন্ধ আছে ; হয়ত সরলার মাতা ও তাঁহার (শিশিরকুমারের) মাতা উভয়েই সে ঘটনার বিষয় শুনিয়াছেন এবং সেইজন্যই তাঁহারা পরামর্শ করিয়া সরলাকে লইয়া স্থানান্তরে যাইতে ছেন। সেই সময় হইতেই শিশিরকুমার এই সকল চিন্তা মনােমধ্যে পােষণ করিয়া আসিতেছেন। মাতা প্রভৃতির ‘ীর্থ গমনের প্রস্তাব শুনিয়াই তিনি বাটী যাইতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, কিন্তু ভয় ও লজ্জা বশতঃ যাইতে পারেন নাই। শিশিরকুমার প্রকাশ্যে বললেন—“মা অনেক দিন হইতে তীর্থভ্রমণে যাইতে ইচ্ছা করিতেছিলেন বটে এবং আমরাও সকলে পূর্বে সম্মতি প্রদান করিয়াছিলাম কিন্তু সম্প্রতি যাওয়া সম্বন্ধেত, কোন কথা বলেন নাই।”

নানা কথা। ৮৭ শরৎ। প্রথমে আমার মনে কোনও সন্দেহ উপস্থিত হয় নাই সুতরাং তাঁহার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিয়াছিলাম, কিন্তু এখন সন্দেহ হইতেছে যে হয়ত তিনি সাংসারিক গােলযােগে বিরক্ত হইয়া চলিয়া গিয়াছেন। শিশির। তীর্থ ভ্রমণে যাইবেন সেত ভালই, কিন্তু যদি তােমার অনুমান সত্য হয় তাহা হইলে আমরা বড়ই অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছি। সেই সময় আমাদের বাটী গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করা উচিত ছিল। শরৎ। যাহা হউক বাটী গিয়া বােধ হয় সমস্ত বৃত্তান্ত জানিতে পারিব। শনিবার অপরাহে শরৎকুমার হুগলি গমন করিলেন এবং বাটী গিয়া জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। বিজয়কুমার কহিলেন-“হাঁ, বাটীর সমস্ত কুশল, আর মা এখানে মাই তাহা বােধ হয় শুনিয়াছ।” শরৎ। শুনিয়াছি। তিনি এ সময়ে তীর্থ ভ্রমণে যাইবেন তাহাত পূৰ্বে শুনি নাই, হঠাৎ পত্র পাইলাম যে তাহার তীর্থযাত্রার দিনস্থির হইয়াছে। মা কতদিন পরে আসিবেন বলিয়া গিয়াছেন? • বিজয়। মা অনেক দিন হইতে তীর্থদর্শনে ফাইবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, আমরা সকলেই ত তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছিলাম, এত দিন যাওয়া ঘটিয় উঠে নাই, সম্ভবতঃ কাকিমার এতদিন যাইবার বিশেষ আগ্রহ ছিল না, এখন উভয়েরই ইচ্ছা হইয়াছে সেই জন্যই গিয়াছেন। তাহারা কবে ফিরিয়া আসিবেন তাহাও কিছু বলিয়া যা নাই। শীঘ্র ফিরিয়া আসিতে পারিবেন বলিয়া মনে হয় না, কারণ অনেক তীর্থ ভ্রমণ করিবেন বলিয়া গিয়াছেন; ছয় সাত মাল ত হইবেই।

সরলা।
.
এই কথার পর তিন ভাতায় সংসারের অন্যান্য বিষয়ে অনেক কথা
হইল। আহারাদির পর শরৎকুমার শয়ন করিতে নিজ কক্ষে গমন
করিলেন। কক্ষে কেহ নাই দেখিয়া তিনি চেয়ারে বসিয়া এক
খানি পুস্তকের পাতা উলটাইতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে সেই
শৈবলিনী প্রবেশ করিল এবং স্বামীর নিকট গিয়া বসিল।
শরৎকুমার শৈবলিনীর দেহের অনেক পরিবর্তন দেখিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন—“শৈবলিনী, তুমি এমন হইয়াছ কেন?”
শৈবলিনী। কেন, কি হইয়াছি ?
শরৎ। এই কয় দিনের মধ্যে অতিশয় কাহিল হইয়াছ দেখিতেছি।
কোনও অসুখ হইয়াছে কি ?
শৈবলিনী। না, কোনও অসুখ হয় নাই। তােমার কতদিনের ছুটী ?
শরৎ। চুটী নাই, আমি কল্যই যাইব।
শৈবলিনী। কল্যই কেন?
শরৎকুমার হাসিয়া বলিলেন-“না গেলে পড়ার ক্ষতি। কল্য রবিবার,
কলেজ বন্ধ আছে, সেই জন্য তােমাদিগকে একবার দেখিতে আসিয়াছি।
শৈবলিনী। লেখা পড়ার ক্ষতি করিয়া থাকিবার প্রয়ােজন নাই।
তুমি দিদিদের সহিত দেখা করিয়াছিলে?
শরৎ। না।
শৈবলিনী। ভাল কর নাই। কল্য প্রাতেই তাহাদের সহিত দেখা
করিও।
শরৎ। কেন? পূর্বে ত সকল সময় বাটী আসিয়া তাহাদের সহিত
সাক্ষাৎ করিতাম না। এখনকাটীর নিয়ম বদলাইয়া গিয়াছে না কি?
শৈবলিনী। নিয়ম আর কি বদলাইবে, আমার নিজের মনের কথা
বলিতেছি। তাহাদের সহিত দেখা করা বৈধ হয় ভাল।

নানা কথা। ৮৯ শরৎকুমার মনে মনে হাসিলেন, প্রকাশ্যে বলিলেন- “আচ্ছ, দেখা করিব।” শৈবলিনী। হাঁ, ভুলিয়া গিয়াছিলাম, ঠাকুরপাে, ঠাকুরঝি ও ঠাকুর জামাই ভাল আছেন ত ? শরৎ। সকলেই ভাল আছেন। শরৎকুমার শৈবলিনীকে জ্যেষ্ঠভ্রাতৃবধূদ্বয় সন্ধে দুই এক কথা জিজ্ঞাসা করিবেন মনে করিয়াছিলেন, কিন্তু আর জিজ্ঞাসা করিলেন মনে করিলেন জিজ্ঞাসার প্রয়ােজন নাই, শৈবলিনী তাহার কথায় প্রকৃত উত্তর দিবে , কাৰ্য্যক্ষেত্রে সমুদায় • জানিতে পারিবেন। কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিলেন-“শৈবলিনী, আমি সমস্ত বুঝিয়াছি, তুমি সমস্ত সহ করিয়া যাইও। দুঃখের সময় ভগবানকে স্মরণ করিও। তিনি দুঃখহারী, বিপদে সকলেরই বন্ধু, তিনি আমাদের সহায়। তাহার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া থাকিও, তাহা হইলে তোমার কোন কষ্ট থাকিবে না। সত্যিই রমণীর গুণ, সে সহিষ্ণুতা ত্যাগ করিও না।” শরৎকুমার নীরব হইলেন। সে রাত্রিতে সংসার সম্বন্ধে তাঁহাদের আর কোনও আলোচনা হইল না।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ। । মন্ত্রপ্রদান। সেই দিন রাত্রিতে মিত্রবাটীর অন্যতম কক্ষে বিজয়কুমার ও সুরবালার এইরূপ কথােপকথন হইতেছিল। সুরবালা। তাহা কখনই হইবে না, এবার তােমাকে বলিতেই হইবে। আমি যখনই তােমায় ঐ কথা বলি তখনই তুমি বল আরও কিছু দিন যাক। এবার তাহা শুনিতেছি না; কাল তােমায় এই কথা বলিতেই হইবে। বিজয়কুমার হাসিয়া বলিলেন-“আজও বলিতেছি আরও কিছু দিন যাউক, ওরা একটু মানুষ হউক, তাহার পর যাহা হয় করা যাইবে। উহারা এখনও একরূপ নাবালক, আমরাই উহাদের অভিভাবক, এখন যদি আমরা উহাদের পৃথক করিয়া দিই তাহা হইলে লােকে কি বলিবে? উহাদের সহস্র অপরাধ মার্জনীয়।” বিজয়কুমারের কথায় সুরবালার ক্রোধবহ্নি জ্বলিয়া উঠিল। সে বলিল—“তবে তােমার ভাইদের লইয়া থাক, আমরা দুই জায়ে বাপের আটী চলিয়া যাইব, এ বাটীতে কখনই থাকিব না। কেন, আমরা কি যার মায়ের মেয়ে নই ? তাহারা কি আমাদের একেবারে বিক্রয় করিয়াছেন মন্ত্রপ্রদান। যে তােমাদের বাটীর সকলের লাথি ঝাটা খাইয়া এখানে থাকিব? সেজ বউ শাশুড়ীর সুয়াে বউ, আর আমরা তার দুয়াে বউ ! কেন, আমরা তাঁর কি বেটার বউ নই যে তাই আমাদের প্রতি এত তাচ্ছিল্য ! এই সব দেখিয়া শুনিয়া সেজ বউও শিখিয়াছে, আমাদের মােটেই মানে না, কোন কথা বলিলে গ্রাহ্য করে না, যেন আমরা ভার দাসী! আমি কখনই এ অপমান সহ্য করিতে পারি না, কাল যেখানে দুই চক্ষু যাইবে সেখানে চলিয়া যাইব। দুইটা কচি ছেলে বৈত নয়, তাদের আমার মা বাপ দুমুটো খাইতে দিতে পারিবেন।” সুরবালার পদ্মপলাশ লােচন দিয় টপ টপ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। সে অঞ্চলে মুখ ঢাকিয়া ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কঁদিতে লাগিল। এইবার বিজয়কুমার অন্ধকার দেখিলেন। তিনি ব্যস্ত ভাবে সুরবালার ময়ন মুছাইয়া দিয়া কহিলেন—“সুরবালা, কেঁদনা, তােমার অপমান করে কাহার সাধ্য! তুমি মিত্র পরিবারের কত্রী-সৰ্বেসৰ্বা, তােমার অপমান করে কাহার এত স্পর্ধা!” সুরবালা অশ্রু মুছিয়া অভিমান ভরে বলিল-“যাও, তােমার ভাল- বাসা জানাইয়া আর কাজ নাই; তােমার যত ভালবাসা জানা গিয়াছে। আমার মত হতভাগিনী এ জগতে আর কে আছে ! সকলে অগ্রাহ্ন করিবে, স্বামীর নিকট দুঃখ জানাইব, তিনিও অগ্রাহ করিবেন। আমার বাঁচিয়া থাকা বিড়ম্বনা মাত্র। আমার মত হতভাগিনী রমণীর মরণই মঙ্গল। তাহার নয়ন যুগলে পুনরায় অশ্রু দেখা-দিল। বিজয়কুমার প্রমাদ গণিলেন এবং বলিলেন –“সুরবালা, বল আমাকে কি করিতে হইবে। আমি প্রাণ দিয়া ঢামার সন্তোষ সাধন করিব। তােমার নয়নে জল দেখিয়া আমার হৃদয়ে এককালে শত শেল বিদ্ধ হইতেছে।”

সরলা। পারিব না ! সুরবালা দেখিল এইবার তাতার ঔষধ ধরিয়াছে, সে, স্বামীর নিকটে সরিয়া বসিল এবং তাহার মুখপানে চাহিয়া অভিমান ভরে কহিল-“তুমি কাল শরৎকে পৃথক হইবার জন্য বলিও। বােধ হয় সে শীঘ্র চলিয়া যাইবে, কাল নইলে আর বলিবার তেমন সুবিধা পাইবে না। দেখ, সাধ করিয়া কি পৃথক হইবার কথা বলি, অনেক জালায় বলি ; সেজ বউএর এত বড় বুকের পাটা যে আমায় বলে কি না তুমি কে যে তােমার কথা শনিব? আমি বড় জা, আমায় মান্য করিবে, আমি যাহা বলিব তাহা শুনিবে, তবে ত তাহার প্রতি স্নেহ জন্মিবে। সে ছোট হইয়া আমার এই সকল কথা বলিবে, আমি বড় হইয়া কখনই তাহা সহ্য করিতে আবার লােকের নিকট আমাদের নিন্দা করিবে। সে সব কথা তােমার নিকট বলিলে তােমার মনে কষ্ট হইবে, সে সব কথায় আর প্রয়ােজন নাই। তুমি কল্যই শরৎকে পৃথক হইতে বল। তাহার স্ত্রীর কত তেজ তাহা একবার দেখিব। তুমি নিজে সংসার চালাইতেছ, উহাদের লেখা পড়া শিখাইতেছ, তবুও তােমার নাম নাই। লােকের নিকট উহারা ভাল, আর আমরা মন্দ। আমরা মন, মনই থাকিব, ভালদের লইয়া ভাল হইতে চাহি না! সেজ বউএর দর্প আর কত সহ্য করিব? দেখুক না কত ধানে কত চাল। বিজয়। বটে! সেজ বউএর এমন স্বভাব তা ত আমি জানিতাম না। সেজ বউকে আমার ভাল বলিয়াই ধারণা ছিল। আচ্ছা, কাল শরৎকে সমস্ত বলিব এবং সেজ বউকে শাসন করিতেও বলিব। সুরবালা। শাসন করিবে ত ছাই, তাহাকে আরও মাথায় তুলিবে! সেজ বউএর নাম করিতে তাের ভাই অজ্ঞান, তােমার কথা কি সে বিশ্বাস করিবে ? লাভের মধ্যে দুইটা অপমানের কথা বলিবে। আপনার মান আপনার কাছে, তাই ভালয় ভালয় সরিয়া পড়িতে মন্ত্রপ্রদান। বলিতেছি। আমাদের কত মান্য করে তাহাও দেখিতেই পাইতেছি। আজ বাটী আসিয়া একবার আমার সহিত দেখাও করিলনা । বিজয়কুমার আর কিছু বলিলেন না। তাহার মনটা কিছু উগ্র হইয়া উঠিয়াছিল, শরৎকুমারকে পৃথক হইবার কথা বলিবেন স্থির করিলেন। রাত্রি প্রভাত হইলে বিজয়কুমার বহিৰ্বাটীতে আসিয়া শরৎ- কুমারকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন। শরৎকুমার আসিয়া ভ্রাতার নিকট বসিলেন এবং প্রফুল্লভাবে ভ্রাতার সহিত কথােপকথন করিতে লাগিলেন। বিজয়কুমারের মন কিছু ভার ভার, শরৎকুমার তাহার কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। ভ্রাতার নম্র কথায় ওতাহার সরল ব্যবহারে বিজয়কুমারের মনের উগ্রতা ক্রমশঃ মন্দীভূত হইতে লাগিল। তিনি ভাবিতে লাগিলেন—“ইহাদের মনের ভিতর কি এত খলতা ও কপটতা আছে ? না, না, তাহা হইতে পারে না। এত নম্রতা, এত সরল ব্যবহার, এত সম্মানপ্রদর্শন সমস্তই কি কপটতাপূর্ণ ?” বিজয়কুমার শরৎকুমারকে যে কথা বলিবেন মনে করিয়াছিলেন তাহা মুখে আছিল না। শরৎকুমার জিজ্ঞাসা করিলেন-“দাদা, আপনি বিশেষ প্রয়ােজন বলিয়া ডাকিয়া পাঠাইয়া ছিলেন, বিশেষ কথাত কিছুই বলিলেন না ? বিজয়। বিশেষ কথা এমন কিছুই নয়। দেখা করিবার জন্য ডাকিয়াছিলাম। তুমি কি আজই কলিকাতায় যাইবে ? শরৎ। আজই যাইব, নতুবা পড়া শুনার ক্ষতি হইবে। বিজয়। না, না, পড়ার ক্ষতি করিও না, দুই জনে মন দিয়া পড়া শুনা করি। যাহাতে শীঘ্র নিজেদের উন্নতি কৰিতে পার তাহার চেষ্টা করিবে।

সরলা
এইরূপ কথাবার্তায় কিয়ৎক্ষণ অতীত হইল। পরে শরৎকুমার বিজয়-
কুমারের নিকট বিদায় লইয়া কলিকাতায় রওনা হইলেন।
সেই দিন বিজয়কুমারকে নাকি সুরবালার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা
চাহিতে হইয়াছিল।

ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
নূতন সংবাদ।
*প্রেমের, প্রেমের, শীঘ্র ওঠ”!
পালঞ্চে প্রমীলা শয়ন করিয়াছিল। তাহার স্বামী সতীশচন্দ্র গৃক
মধ্যে প্রবেশ করিয়া কহিলেন—“প্ৰেমেরা, প্রেমেরা, শীঘ্র ওঠ।”
প্রমীলা উঠিলনা, কহিল—“কি-বলনা!”
সতীশ ! একটা নূতন সংবাদ এনেছি।
প্রমীলা। কি নূতন সংবাদ ?
সতীশ। সরলার তীর্থ যাত্রা।
প্রমীলা। ও সংবাদে নূতনত্ব কিছুই নাই।
সতীশ। কেন, অগ্রে শুনিয়াছ না কি?
প্রমীলা। সেজ দাদা আসিয়াছিলেন, তাহার মুখে শুনিয়াছি।
সংবাদ ? না—আর কিছু আছে ?
সতীশ। আছে বৈকি, বসে শুননা ?
প্রমীলা। বলশুনছি। এমন কথা যে না বসে শুনা যায় না?

সরলা।
সতীশচন্দ্র একটী হারমােনিয়ম লইয়া বাজাইতে আরম্ভ করিলেন।
সুর পঞ্চম হইতে যষ্ঠে, ষষ্ঠ হইতে সপ্তমে চড়িয়া উঠিল। হারমােনিয়মের
সুর প্রমীলার ভাল লাগিতেছিলনা-সে বিরক্ত হইয়া কহিল—“রক্ষা কর,
আর বাজাইতে হইবেনা। মাথা ধরিয়া গেল।”
সতীশচন্দ্র কোনও উত্তর করিলেন না, আপন মনে বাজাইতে
লাগিলেন। প্রমীলাউঠিয়া হারমােনিয়ম সরাইয়া রাখল।
সতীশচন্দ্র হাসিয়া কহিলেন—“তুমি বেশ লােক ত দেখছি,
বাজাইতে দাও না কেন ?”
প্রমীলা। সাধ করে বাজুইতে দিই না? পাঙ্কে তােমার বাদ্য
শ্রবণে কেহ পাগল হইয়া যায়, সেই ভরে দিই না! হারমােনিয়মের
শব্দে কানে তালা লেগে গেছে!
সতীশ। আচ্ছা, ভাল করিয়া বাজাইতেছি, হারমােনিয়ম দাও। তুমি
একটি গান কর ।
প্রমীলা। তা হলেই বেশ হয়! তা তুমি বাজাও, তােমার দুই বােন
এখানে আছে, আমি তাহাদের ডাকিয়া দিই। তুমি বাজাও, তাহারা
আসিয়া একজন নাচুক, আর একজন গান করুক।
প্রমীলাপ্রস্থানােদ্যতা হইল দেখিয়া সতীশচন্দ্র কহিলেন—“চলিলে
যে? ব’সনা, দু'টা গল্প করা যাক। আর হারমােনিয়ম বাজাইব না,
তুমি বস।”
প্রমীলা বসিল এবং একটু পরে হাসিয়া কহিল-“তুমি হাসিতেছ যে?”
সতীশ। তুমি হাসিতেছ যে?
প্রমীলা। আমি হাসিতেছি তােমার রুম দেখো তুমি হাসিতেছ কেন?
সতীশ। আমি হাসিতেছি তােমার হাসি দেখে। আমার কি রকম
দেখে তােমার হাসি এল ?
{

নূতন সংবাদ। ৯৭ } প্রমীলা। তুমি বলি বলি করিতেছ অথচ বলিতেছ না, তাই আমার হাসি পাইতেছে। ও কি! মুখের দিকে এক দৃষ্টে পাগলের মত চাহিয়া রহিয়াছ কেন? বােধ হইতেছে যেন আমায় কখন দেখ নাই সতীশচন্দ্র প্রমীলাকে হৃদয়ে টানিয়া লইয়া কহিলেন-“পাগল যে তুমি করিয়াছ, প্রেমের !” এই বলিয়া প্রমীলার আরক্তিম গণ্ডস্থলে চুম্বন করিলেন। প্রমীলা লজ্জায় বদন অবনত করিল। সতীশচন্দ্র দক্ষিণ হস্তে প্রমীলার নত মুখ খানি তুলিয়া ধরিয়া কহিলেন-“প্রমীলা, তােমার ছেলে বেলার সেই লজ্জা টুকু এখনও গেল না? শিশির বাবু বলেন যে সরলা অতিশয় লজ্জাশীলা। আচ্ছা, প্রমীলা, সে কি তােমার অপেক্ষাও লাজুক। তাহাত আমি অনুমান করিতে পারি না। তােমার মত আর কেহ স্বামীর নিকট এত লজ্জা করে না।” প্রমীলা । তুমি সরলাকে কখনও দেখ নাই সেইজন্য ওরূপ বলিতেছ, দেখিলে বলিতে পারিতে না। তাহার ন্যায় সংস্বভাবসম্পন্না, শান্ত, নম্র প্রকৃতির স্ত্রীলােক আজ কাল দেখিতে পাওয়া যায় না। সতীশ। সেই জন্যই তােমার ছােট দাদা অত মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন। সরলাকে লাভ করতে তাঁহার প্রবল বাসনা। প্রমীলা কোন উত্তর না করিয়া গম্ভীর ভাবেলতীশচন্দ্রের প্রতি চাহিয়া রহিল। সতীশচন্দ্র হাসিয়া বলিলেন,তােমার বুঝি আমার কথা বিশ্বাস হইতেছে না, কেমন ?” প্রনীল। ধীরে ধীরে উত্তর করিল,-“তুমি কেন ওরূপ কথা বলি- তেছ ? তুমি তামাসা করিয়া বলিতেছ বলিয়া মনে হয় না। তুমি কি এ সন্ধুদ্ধে কিছু শুনিয়াছ?” সতীশ। তামাসা করিয়া বলিতেছি কিনা তুমি কিরূপে বুঝিলে?

১ সরলা। বােধ হয় তুমি এ সম্বন্ধে কিছু জান, সেইজন্য আমার কথা তামাসা বলিয়া মনে হইতেছে না। প্রমীলা। তা হউক, তুমি সত্য সত্যই কি কিছু শুনিয়াছ ? সতীশ। বিশেষ কিছুই নয়। আজ বিকালে শিশিরের বাসায় গিয়াছি- লাম ; দেখিলাম, শিশির নিদ্রিত। আমি নিদ্রাভঙ্গের অপেক্ষায় তাহার পাশে বসিয়াছিলাম,সেই সময় শিশির ঘুরে ঘােরে কয়েকটা কথা বলিয়াছে, সেই কথা শুনিয়াই আমি এইরূপ অয়ন করিয়াছি। কিন্তু সে সকল কথা হইতে স্পষ্ট কিছু বুঝা যায় না। সে সফল কথা যে সরলাকে লক্ষ্য রিয়া লিয়াছে তাহা আমি নিজেই বলিতেছি, তাহার কথা হইতে কিছুই বুঝিতে পারি নাই। তার কথায় বিরক্ত হয় কেহ কোথাও চলিয়া গিয়াছে এইরূপ ভাবের কথা সে ঘুমের ঘোরে নিয়াছিল। প্রমীলা। ছােট দাদা সরলাকে প্রাণ অপেক্ষাও ভালবা পন, তাহা আমি বিলক্ষণ জানি, এবং সেজন্য যে ছোট দাদাকে কষ্ট পাইতে হইবে তাহও জানি। সতীশ। কষ্ট পাইতে হইবে কেন ? প্রমীলা। তুমি আজ যে কথা লিলে, আমি এযাব হুগলি যাইয়া ঠিক ঐ রূপই বুঝিয়া আসিয়াছি। ছোট দার ব্যবহার দেব্দি তিনি যে ক্রমশ সরলাব অনুরক্ত হইষ্মা পড়িতেছেন আমার এইরূপ মনে হইত। ছােটদাদা খুব বুদ্ধিমান ও চাপা লোক এজ বিশেষ কিছু জানা যায় না। সতীশ! তােমরা কেন যাতে তাঁহার বুষ্ট না হয় তাহা কর না ? প্রমীলা। কি, সরকার সহিত ছোটদি বিবাহ দিরার কথা বলিছে ? সতীশ। প্রমীলা কুদ্ধ হইয়া কহিল-“যাও ! ও কি কথা ! সরলার কথায় তােমার মালা।”

নূতন সংবাদ। ৯৯ ' সতীশচন্দ্র অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন-“তা--তাতে দোষ কি? যদি উহাদের দুজনেই পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত কুয়; তাহা হইলে তাহার পরিণাম ফল কিরূপ দাড়াইবে কে জানে ?” প্রমীলা গম্ভীরভাবে উত্তর করিল—“আমি কোনও কুফলের আশঙ্কা করিনা।” সতীশ। আচ্ছা, সরলার মনের ভাব কি? তুমি ত বল সেও শিশিরকে খুব ভালবাসে। প্রমীলা। হাঁ, ছােটদাদাকে খুব ভালবাসে, কিন্তু অন্য ভাবে নয় ; আমি যেমন তাকে ভাল-খাসি, সেও তেমনি ভালবাসে। আমরা তিন জনে ছেলে লােয় সর্বদাই একত্র থাকিতাম, একত্র খেলা করিতাম, ভ্ৰাতৃভাব ভিন্ন তাহার মনে ছােদদার প্রতি অন্য ভাব নাই, ইহা আমি বিশেষরূপে বুঝিয়াছি। সরলা তাহার মাতার নিকট প্রথম হইতেই অতি উচ্চ ভাবের শিক্ষা পাইয়া আসিয়াছে। সরলা সাংসারিক সুখের প্রত্যাশিনী নহে। সে সারবস্তু চিনিয়াছে, নিজের আত্মা পরমাত্মার চিন্তায় লিপ্ত করিয়াছে। সৎ শিক্ষায় সে মহৎ জীবন প্রাপ্ত হইয়াছে। তাহার মহৎ অন্তঃকরণে এ সকল ক্ষুদ্র চিন্তা স্থান পায় না। সতীশ। শিশিরও ত নির্বোধ নয়-- বাধা দিয়া প্রমীলা কহিল-“না, না, ছােটদাদার চরিত্র অতি মহৎ। তিনি নিজের মনের কথা কখনই বাহিরে প্রকাশ করিবেন না। ভালবাসা ইচ্ছাধীন বিষয় নহে, সুতরাং সরলাকে ভালবাসার জন্য কেহ তাহাকে দোষ দিতে পারে না। ব্যহারে কেহ কখনই তার দোষ দেখিতে পাইবে না ইহা আমি বেশ জানি। কিন্তু আমার ভয় হয় তিনি আর বিবাহ করিবেন না। তিনি বিবাহে অনেক দিন হইতে অসম্মতি প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন, কিন্তু তাহার মনের ভাব আমরা কেহই কিছু জানিতাম না।” - সরলা। সতীশ। সেই জন্যই শিশিরকে প্রায়ই চিন্তিত দেখিতে পাই। আমরা মনে করিতাম সে পারিবারিক গােযােগর জন্যই ঐরূপ চিন্তিত থাকে। ভাল, শিশিরের মনােভাব আর কেহই কি বুঝিতে পারেন নাই ? প্রমীলা। না, আমার ত সেইরূপ বিশ্বাস। সতীশ। সরলাও জানে না ? প্রমীলা। কিছুমাত্রও না। আমি এখানে আসার পর যুদি কোনও মূতন ঘটনা ঘটিয়া থাকে তাহা বলিতে পারি না। আমার বিশ্বাস ছােটদাদা নিজের অনােভাৰ সরলার নিকট গোপন রাখতেই চেষ্টা করিয়া থাকেন। সতীশ। তাহা হইলে এ সময়ে সরলার তীর্থ ভ্রমণে যাওয়া শিশিরের পক্ষে মঙ্গলের বিষয় হইয়াছে। সরলার অনুপস্থিতি শিশিরের মতি পরিবর্তিত হইতে পারে। প্রমীলা দীর্ঘনিশ্বাসত্যাগ করিয়া কহিল-জগদীশ্বরের মনে যাহা আছে তাহাই হইবে, আমরা কে কি করিতে পারি।” প্রমীলা নীরব হইল। এমন সময়ে ঘড়িতে টং, টং করিয়া দুইটা বাজিল। সতীশচন্দ্র কহিলেন-“প্রেমেরা, রাত্রি অনেক হইয়াছে, শয়ন করা যাউক বিংশ পরিচ্ছেদ। কাশীধাম। সরলা মাত্মার সহিত অন্যান্য তীর্থ দর্শন করিয়া এখন কাশীধামে বাস করিতেছে। মণিকর্ণিকাঘাটের অতি নিকটেই তাহাদের বাসা। তাহা- দের বাসাবাটীর নিম্নদেশে স্রোতস্বিনী ভাগিরথী কল কল রবে প্রবাহিতা, স্থানটী অতি মনােরম। সরলার মাতা, সরলা ও মিত্র-গৃহিণী বড়ই আনন্দের সহিত তথায় বাস করিতেছেন। তঁাহারা প্রত্যহ প্রাতে মনিকর্ণিকার ঘাটে স্নান করিয়া তথায় পূজা আহ্নিক সমাপন করেন, পরে বিশ্বেশ্বরও অন্যান্য দেবদেবী দর্শন করিয়া অন্নপূর্ণার মন্দিরে গমন করেন, তথায় কিছুক্ষণ অবস্থান করতঃ পূজা দর্শন করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। পথে ভিখারীগণকে যথাসাধ্য কিছু কিছু দান করেন। তাঁরা পুণ্যস্থানে শান্তিপূর্ণহৃদয়ে বাস করিতেছেন। কাহারও মনে কোনও শােক দুঃখ নাই, হিংসা-দ্বেষ-কুটিলতা নাই, সংসারের জ্বালা যন্ত্রণা নাই। তাহাদের হৃদয় আনন্দ ও শান্তিপূর্ণ। মিত্র-গৃহিণী বহুদিন পূৰ্বে দীক্ষিত হইয়াছিলেন ; কাশীতে একজন মহাত্মা সরলা ও তাহার মাতাকে দীক্ষিত করিয়াছেন। সেই মহাপুরুষকে গুরুরূপে প্রাপ্ত হওয়ায় সরলার ও তাহার মাতার আনন্দের সীমা নাই। তঁাহার শিষ্যত্ব সকলের ভাগ্যে ঘটে না। তিনি সরলা ও তাহার মাতাকে অতিশয় যত্ন করেন। তাঁহাদের দেখিয়া স ১০২ সরলা। অবধি তাহার মনে কেমন অপূর্ব বাৎসল্য স্নেহের আবির্ভাব হইয়াছে। সরলার ধর্মশীলতা, ন্যায়পরতা ও জ্ঞানলি দর্শনে তিনি অতিশয় প্রীত হইয়াছেন। সরলা তাহার মাতাকে মধ্যে মধ্যে বলে—“মা ! আর দেশে যাইও না, এমন পুণ্যস্থান পরিত্যাগ করিয়া কোথাও পাইতে ইচ্ছা করে না। যে স্থানে প্রত্যহ গুরুদেবের দর্শন পাওয়া যায়, এমন অতুল আনন্দভােগ করা যায়, প্রত্যহ বাবা বিশ্বনাথ ও অন্নপূi মায়ের দর্শন লাভ হয়, এমন সুখময় স্থান—মর্ত্যের স্বর্গরাজ্য-ত্যাগ করয়া সংসারের কোলাহলে আর প্রবেশ করিও না।” সরলার মাতা একদিন সরলার পূর্ব প্রস্তাবে উত্তর করিলেন,-মা ! নিয়তির চক্ৰ কখন কিভাবে পরিবর্তিত হয় তাহা কেহ বলিতে পারে না। তােমার আমার মনে যাহা আছে তাহা যদি ঈশ্বরের অভিপ্রেত না হয় তবে তাহা পূর্ণ হইবে না। মানবের ইচ্ছাধীন কিছুই নহে। যে কয়দিন তিনি এই পবিত্র স্থানে আমাদের রাখিনে সেই কয়দিন আমরা এখানে থাকিব, তৎপরে তাহার ইচ্ছায় আবার যেখানে লইয়া যাইবেন সেই স্থানেই যাইব। তিনি যাহা করেন সকলই মাদের মঙ্গলের জন্য, ইহা নিশ্চয় জানিও, মা। আমাদের অদৃষ্টে যে এমন সদ্গুৰু লাভ হইবে তাহ কখনও মনে ভাবি নাই—ইহা স্বপ্নাতীত। এমন মহাত্মাকে গুরুরূপে পাইয়াছি, ইহা ভগবানের কৃপা ভিন্ন আর কিছুই নয়, মা।” সরলা মাতার কথা শুনিয়া কোনও উত্তর করিল না। মনে মনে বলিল- “প্রভু! তােমার মনে যাহা আছে তাহাই হইবে; সকলই তােমার ইচ্ছা ইচ্ছাময়।” গুরুদেব মধ্যে মধ্যে আসিয়া তাঁহাদিগকে উপদেশ প্রদান করেন, তাঁহারাও একাগ্রচিত্তে উপদেশবাক্য সমুদয় শ্রবণ করেন। গুরুদেবের ৪ কাশীধাম। উপদেশ বাক্য শুনিতে শুনিতে তাহাদের বাহ্যজ্ঞান লােপ পায়, তাহারা তন্ময় হইয়া যান ও ভক্তি অশ্রুতে তাহাদের চক্ষুদ্বয় প্লত হয়। তাহাদের মনে হয় এমন মধুর স্বর, এত স্নেহ, এত পবিত্রতা, এত পরদুঃখকাতরতা, এমন সুন্দর দেবমূর্তি বুঝি মর্ত্যে নয়। সরলা ও তাহার মাতা সদগুরু প্রাপ্ত হইয়া অাপনাদিগকে পরম সৌভাগ্যশালিনী মনে করেন। তাঁহাদের গুরুদেব শ্রীমৎ বিমলানন্দ স্বামীও তাঁহাদের ন্যায় ভক্তিমতী, ধর্মশীলা শিষ্যা পাইয়া যৎপরােনাস্তি প্রতি হইয়াছেন। এইরূপে সরলার মাতা প্রভৃতি কাশতে সুখে দিন কাটাইতে লাগি- লেন। কে বলে এ জগতে সুখ নাই ? যেখানে ধর্ম সেই স্থানে শান্তি, যেখানে শান্তি সেইখানে সুখ। সরলা ও তাহার মাতা গৃহী হইয়াও তপ- স্বিনী, কামনার মধ্যে থাকিয়াও নিষ্কাম। দয়া, ধৰ্ম্ম, পবিত্রতাই তাহাদের একমাত্র অবলম্বন। .

একবিংশ পরিচ্ছেদ। বিবাদ। কাশীতে যে সময়ে মিত্র গৃহিণী মনের আনন্দে, শান্তিপূর্ণ হৃদয়ে কাল- যাপন করিতেছিলেন, সেই সময়ে তাহার বাটীতে ঘাের অশান্তি অনল জ্বলিয়া উঠিয়াছিল। বিজয়কুমারের দুইটা পুল, তাহাদের বয়স যথাক্রমে পাঁচ ও তিন বংসপ্ন। বসন্তকুমারের একটা মাত্র কন্যা, বয়স চারি বৎসর। শরৎ কুমারের অদ্যাপি কোন সন্তানাদি হয় নাই। বিজয় কুমারের জ্যেষ্ঠপুত্রের সহিত বসন্তকুমারের কন্যার বিবাদ উপ- লক্ষে চঞ্জ কলার সহিত সুরবালার মনান্তর ঘটে, ক্রমে তাহা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। দুই জনের অত প্রণয়, এক মন প্রাণ, কিন্তু এক্ষণে উভয়ে উভয়ের ঘোর বিদ্বেষী হইয়া উঠিল। কেহ কাহারও একটা কথা সহ করিতে পারে না, ক্রমে ক্রমে পরস্পরের মুখ দেখাদেখি পৰ্য্যন্ত বন্ধ হইয়া গেল। উভয়েই উভয়ের নামে নানা প্রকার দোষারােপ করিয়া স স্ব স্বামীর মন ভারী করিতে লাগিল। পরিশেষে ভ্রাতায় ভ্রাতায় কলহ বাধিল। বসন্তকুমার একদিন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে কহিলেন-“আমি কাহা- ও অনুপ্রার্থী নহি। আমার সম্পত্তি আমায় বুঝাইয়া দাও, নচেৎ ভাল হইবে না। যদি আপন আপন মান সকলে বজায় রাখিতে চাও, তবে পৃথক হও বিবাদ। বিজয়কুমার উত্তর করিলেন,-“বেশ কথা, সেত ভালই, আমি ও তাহাই চাই।” শরকুমার ও শিশিরকুমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয়ের ব্যবহারে মর্মান্তিক ব্যথা পাইলেন। তাহারা উভয়ে ভ্রাতৃবিরােধ মিটাইবার জন্য অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাহাদের সকল চেষ্টা বিফল হইল, কেহই তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিলেন না, বং তাহাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। বিজয়কুমার কহিলেন,-“তােমরা কি আমায় শিক্ষা দিতে আসিয়াছ? আমা অপেক্ষা তােমরা বেশী বুদ্ধিমান? আচ্ছা যাও, তােমরা নিজের বুদ্ধি লইয়া থাক, আমি কাহারও বুদ্ধি চাহি না।” বিজয়কুমাবের নিকট তিরস্কৃত হইয়া পুনরায় তাঁহারা বসন্তকুমারের নিকট গমণ করিলেন এবং বিনীতভাবে বিবাদ ভঞ্জন করিতে কহিলেন। বসন্ত কুমার উত্তর করলেন-“তোমরা বারম্বার আমাকে বিরক্ত করিও না। তােমরা যে আমার বড় হিতৈষী তাহা জানিতে বাকী নাই, আর অধিক আত্মীয়তার প্রয়োজন নাই। যাও, তােমাদের সহিত আমার আর কোনও সম্পর্ক নাই।” শরৎকুমার ও শিশিরকুমার ভ্রাতৃদ্বয়ের বাক্য শ্রবণে মর্মাহত হইয়া ফিরিয়া আসিলেন, পরে পল্লীস্থ সম্রান্ত ব্যক্তিদিগকে অনুরােধ করিতে লাগি- লেন যে-“যাহাতে আমাদের গৃহ বিবাদ মিটিয়া যায় তাহা আপনারা করুন।” তাঁহারা বলিলেন-“দেখ শরৎ, দেখ শিশির, বিজয় ও বসন্ত আমাদের কথা শুনিবে না। যেরূপ ব্যাপার দেখিতেছি তাহাতে বােধ হয় তােমাদের গৃহবিবাদ সহজে মিটিবে না। যখন আমাদের অনুরোেধ বিজয় ও বসন্তের নিকট গ্রাহ্য হবে না তখন তাহাদিগকে বৃথা বলায় ফল কি? পুণ্যাত্ম হরপ্রসাদ বাবুর সংসার যে এইরূপে “মাটি” হইবে তাহা কেহ মনে করে নাই। বড়ই দুঃখের বিষয় ! তােমাদের ভ্রাতায় ভ্রাতায় বেশ সরলা। ; মিল ছিল, হঠাৎ এতদূর হইল যে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হইল। বড়ই পরিতাপের বিষয়। শরৎকুমার ও শিশিরকুমার যাহার নিকট গমন করেন তাহারই মুখে কেবল এইরূপ নানা কথা শুনিতে পান। ভ্রাতৃকলহের পরিণাম চিন্তা করিয়া দুই ভ্ৰাতায় অবর্ষণ করিতে লাগলেন। যথাসময়ে বিষয় সম্পত্তি ও বসতবাটী বিভাগ হইয়া গেল। শরৎ- কুমার ও শিশিরকুমার এক সঙ্গে থাকিলেন ; বিজয়কুমার ও বসন্তকুমার উভয়ে স্বতন্ত্র হইয়া বাস করিতে লাগিলেন। শরৎকুমার ও শিশিকুমারের পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে, তাহারা এখন বাটীতেই আছেন। শৈবলিনী স্বামীর মনঃকষ্ট দে খিয়া নীরবে রােদন করে, আর ভাবে- “হায়! কেন এমন হইল, এমন সােণার সংসার কি পাপে ছারখার হইল। হা ভগবান্ ! কেন ইহাদের দুরদ্ধ নইলে! হরি হে! আবার সেইরূপ সুখের সংসার করিয়া দেও; ; মহাপাপী, কত পাপ করিয়াছি তাই স্বামীর মনঃকষ্ট দেখিতেছি।” পৃথক হইয়া সুরবালা এবং চকুলা আনন্দিত হইল। সুরবালা ভাবি এইবার চন্দ্রকলা ও শৈবলিনী জব্দ হইল ; চন্দ্রকলা ভাবিল এই- বার সুরবালা ও শৈবলিনী জব্দ হইল। কিন্তু শৈলিনীকে আর পূর্বে ন্যায় লাঞ্ছিত করিতে না পারায় তাহারা উভয়েই মনঃকষ্ট পাইতে লাগিল। নিরপরাধা শৈবলিনী তাহাদের চক্ষুশূল। শৈবলিনীর কেহ সুখ্যাতি করিলে তাহাদের অঙ্গে যেন বিষ ঢালিয়া দেয়।

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ। শ্মশানে। ভগবানের বুঝি ইহাও সহ হইলনা, -সরলার এসুখ তাহার বুঝি আর ভাল লাগিলনা–আবার নূতন খেলা খেলিতে ইচ্ছা হইল। তিনি সরলার জন্য নূতন দুঃখের সৃষ্টি করলেন। একদিন সন্ধ্যার পর সরলার মাতা প্রভৃতি দেবদেবী দর্শন করিয়া বাটী ফিরিয়া আসিলেন। বাটীতে আসিয়া সরণীর মাতা কহিলেন—“আজ আমার শরীর বড় অসুস্থ বােধ হইতেছে, আমি একটু শয়ন করি। মা সরলা, তুমি তােমার জেঠাই মায়ের নিকট বস।” এই বলিয়া তিনি গৃহ মধ্যে যাইয়া শয়ন করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সরলা মাতার নিকট গমন করিয়া দেখিল তাহার মা ঘরে, মেজেয় পড়িয়া ছটফট ঝরিতেছেন। সরলা মাতার তাদৃশ অৱস্থা দেখিয়া ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,-“মা, তােমার কি অসুখ হইয়াছে ? ওরূপ ছটফট করিতেই কেন? কি অসুখ করিতেছে বল, আমি জেঠাই মাকে বলি।” সরলার মাতা নয়ন মেলিয়া কন্যার পানে চাহিলেন এবং ক্ষীণস্বরে গুরুদেবকে ডাকিতে বলিলেন। • সরল তৎক্ষণাৎ একজন ভৃত্যকে গুরুদেবকে সংবাদ দিতে পাঠাইল এবং নিজে প্রমীলার মাতাকে সরে ১০৮ সরলা। লইয়া মাতার নিকটে আসিয়া বসিল ও তাহার শুশ্রষা করিতে লাগিল এবং ক্ষণে ক্ষণে মা, মা, বলিয়া ডাকিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে বিমান স্বামী সেই গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং সরলার মাতার প্রতি কিয়ৎক্ষণ স্থির দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, “মা, উঠিতে পারিবে কি ?” গুরুদেবের কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে প্রবেশ করিবা মাত্র সরলার মাতা চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন এবং উঠিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু উঠিতে পারিলেন না। তাহা দেখিয়া গুৱদেব সরণীর মাতার হস্ত ধরিয়া কহিলেন -“মা, এইবার উঠ, দেখি।” সরলার মাতা অতি কষ্টে উঠিয়া দাড়াইলেন, তাহা দেখিয়া সরলাও মিত্র-গৃহিণী অনেকটা আশ্বস্ত হলেন। সরলা ভাবিল—“আব ভয় কি ? গুরুদেবকে একবার দর্শন মাত্রেই মাতা অনেক পরিমাণে সুস্থ হইয়াছেন, তবে আর কিসের ভয়! বিমলানন্দ স্বামী কহিলেন-“আমার সহিত মণিকর্ণিকার ঘাটে আইস এবং মনে মনে ভগবানের নাম গ্রহণ কর।” গুরুদেব অগ্রে চলিলেন, পশ্চাতে সরলা ও মিত্র-গৃহিণী সরলার মাতার হাত ধরিয়া লইয়া চলিলেন, দাস দাসীগণ সকলেই তাহাদের সঙ্গে চলিল। অনতিবিলম্বে সকলে মণিকর্ণিকার ঘাটে আসিয়া উপনীত হইলেন। গুরুদেব সরলার মাতাকে একটা স্তোত্র পাঠ করাইলেন। স্তোত্র পাঠ করিতে করিতে সরলার মাতা নির্জীব প্রায় হইয়া উঠিলেন। সরল। এইবার বুঝিল যে তাহার মাতা আর বাঁচিবেন না। সে ব্যাকুল হইয়া কঁদিতে লাগিল। সয়লার মাতা সরলার হস্ত ধরিয়া গুরুদেবের চরণে রাখিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন—“প্রভাে! অনাথিনী সরলাকে আপনার চরণে সমর্পন করিয়া চলিলাম। এজগতে উহার আপ নার বলিবার কেহ নাই ; পিতঃ । উহাকে সকল সময়ে রক্ষা করি, বেন, আপনিই উহার রক্ষা কওঁ।” পরে প্রমীলার মাতার প্রতি চাহিয়া কহিলেন—ভানি। তােনার নিকট আমি অপরিশােধ্য ঋণে ঋণী। তুমি যদি আমাদের বিপদের সময় আশ্রয় না দিতে তাহা হইলে আমাদের দাড়াইবার স্থান ছিল না। সরলা তাের যত্নে ও স্নেহে পালিত। দিদি ! বেশী আর কি বলিব অভাগীকে দেখিও!” সরলার মাতা আর কথা কহিতে পারলেন না, তাঁহার চক্ষু মুদিয়া আসিল। গুৱদব সরলার মাতার মুখে গঙ্গাজল প্রদান করিলেন। সরলা উচ্চৈঃস্বরে কঁদিয়া কহিল- “মা গাে, আমি যে তােমা ভিন্ন আর কাহাকেও জানিনা, আমাকে কাহার নিকট রাখিয়া যাইতেছ ? আমি কাহার মুথ চাহিয়া থাকিব, মা? মাগাে, তােমার সরলা যে একদণ্ড তােমাকে ছাড়িয়া থাকিতে পারে না, একবার একটা কথা কও। মা এ জগতে যে আমার তুমি ভিন্ন আর কেহ নাই। এ সংসারসাগরে একাকিনী ভাসাইয়া দিয়া কোথায় চলিলে মা ! মাগো, আমার সঙ্গে লইয়া যাও।” সরলার করুণ ক্রন্দন তাহার মাতার কর্ণে পৌছিল। তিনি অতি কষ্টে নয়ন মেলিয়া ক্ষীণস্বরে কহিলেন-“সরলা, মা আমার, কেঁদনা, আমি অতি ভাগ্যবতী, আমি অতি সুখে মরিতেছি। মৃত্যুকালে স্বয়ং গুরুদেব নিকটে বসিয়া আছেন, এরূপ ভাগ্য কয় জনের ঘটে? মা ! কে কাহার ? কে কাহার পুত্র ? কে, স্বামী, কে কন্যা ? কে কাহাকে রক্ষা করে ? যিনি এত দিন, তােমায় রক্ষা করিয়াছেন; তিনিই তােমায় এখন রক্ষা করিবেন। তুমি কঁদিওনা, এ সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, তবে ক্ৰন্দন কিসের জন্য মা? আমায় আর মায়ায়বদ্ধ করিনা। সংসারের পথ বড় পিচ্ছিল, তুমি সরলা। সৎপথে থাকিয়া ধৰ্ম্ম জীবন যাপন করিও। এসময় আমায় একবার পরম ব্ৰহ্মনাম শুনাও—হরে কৃষ্ণ হরে হরে কৃষ্ণ হরি হরি।” সকলেই হরে কৃষ্ণ নাম উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। সরলার মাতার পবিত্র আত্মা নশ্বর দেহ ত্যাগ করিয়া পবিত্র ধামে প্রয়ান করিল। সরলা ধুল্যবলুষ্ঠিত হইয়া কঁদিতে লাগিল। প্রমীলার মাতা কাঁদিতে কাঁদিতে সরলাকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন। সংসারত্যাগী, জিতেন্দ্রিয়পুরুষ শ্রীমৎ বিমলানন্দ স্বামীও এদৃশ্য দেখিয়া দিলেন। পরে মনে মনে সরকার মাতার দেবত্ব কামনা করিয়া সরলাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বলিতে লাগিলেন—“সরলা, স্থির হও, কাঁদিওনা ; কাহার জন্য কাঁদিতেছ ?” সরলা গুরুদেবের আহ্বানে উঠিয়া বসিল এবং গুরুদেবের চরণদ্বয় ধারণ করিয়া কঁদিতে কাঁদিতে কহিল,-“প্রভাে! আমি মাতৃহারা । যে মা ভিন্ন আমি কিছুই জানিতাম না, আজ আমি সেই মাকে হারাইয়াছি। প্রভাে? আপনি সৰ্বান্তর্যামী, আপনি ত সকলই জানেন, তবে সরলাকে কেন আর এ সংসারে রাখিলেন। আমার সংসারের বন্ধন খুলিয়া দিন। আমি মায়ের সন্তান মায়ের নিকট যাই। আমি যে মাকে না দেখিয়া থাকিতে পারিতেছিনা। গুরুদেব ? আমাকে মায়ের নিকট যাইতে দিন। সরলার অশ্রুতে বক্ষঃ ভামিতে লাগিল।

ব্রয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ। উপদেশ। বিমলানন:স্বাণী হিরভাবে, গম্ভীরস্ব বে সরলাকে কহিলেন-“উঠ বলে, উঠ; তোমার কাতরতা শােভা পায় না। জীবন একবার যাইলে তার ফিরিয়া পাওয়া যায় না। যাহাকে ডাকলে বা যাহার জন্য কঁদিলে আর তাহাকে ফিরিয়া পাওয়া যায় না, তাহার জন্য বৃথা শােক কেন? তােমার মা শাপ স্রষ্টা দেবী রূপে ধরাতলে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, এখন শাপমুক্ত হইয়া দিব্যধামে গমন করিয়াছেন। আলাময় সংসারে অশেষ যন্ত্রণা পাইয়াছেন, এখন শান্তিলাভ করিলেন, তবে তাহার জন্য কাদিতেছ কেন? সরলা, স্থিরভাবে চিন্তা কর এবং মানস চক্ষে সংসায় ক্ষেত্র নিরীক্ষণ কর, দেখিবে ইহাই জীবন পথের শেষ সীমা। এই পথ ভিন্ন জীবনের পর পারে যাইবার অন্য পথ নাই এবং নিয়তই মানবগণ এই পথে গমন করিতেছে। সরলা, যাহা অনিত্য তাহার জন্য শােক করা বৃথা। যিনি অনিত্য বস্তুতে সুগ্ধ না হইয়া নিত্য বস্তুর কামনা করে, তিনি সেই অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন। পাপ চিন্তা বা কাৰ্যাহার হৃদয় বা হস্তকে কলুষিত করে নাই, যিনি জিতেন্দ্রিয় হই। একমাত্র ঈশ্বর আরাধনায় জীবন যাপন করেন, তিনি কাহারও জন্য শােক করেন না, এবং জীবনান্তে ঈশ্বরকে প্রাপ্ত হন। জীবন তাহারই দত্ত, তুমি সে দানের অপব্যবহার করিও না; তিনি যখন ইচ্ছা ইহা পুনঃ গ্ৰহণ করিবেন, সে জন্য ব্যাকুল হইও না। সংসারে যদি সুখ লাভ করিতে চাও তবে সেই বিশ্বচরাচরব্যাপী, সীমাহীন ১১২ সরলা। অন্তহীন নিখিল জগতের যাহা হইতে উৎপত্তি সেই পরম দয়ার সাগর, সত্য সনাতন একমাত্র পরম ব্রহ্মের আরাধনায় প্রবৃত্ত হও। যাহাকে ডাকলে শােক তাপ থাকেনা, জুরা মৃত্যু ভয় থাকেনা, অশান্ত হৃদয় শান্তিলাভ করে, নিরানন্দ দূরে যায়,সেই পবিত্র,অনিদ পূর্ণ নাম দিবানিশি স্মরণ কর, তােমার শােক দূর হইবে। যাঁহার কৃপায় মানবগণ সংসার ক্ষেত্রে বিচরণ করিতেছে, নারদাদি দেবর্ষি, জনাদি রাজর্ষি, বশিষ্ঠাদি মহর্ষি, কপি:দি সিদ্ধগণ আজী- বন ধ্যান করিয়াও যাহার আদি অন্ত খুঁজিয়া পান নাই, সেই গম ব্ৰহ্মকে নিশিদিন ধ্যান কর, তাহাকেই আপনার মনে কর। তিনি সর্বব্যাপী এবং সর্বভূতে বিরাজিত, তাহার করুণা অসীম, তিনি ন্যায় বিচারক । তিনি পাপপুণ্য অতি সূক্ষ্মভাবে বিচার করেন। তিনি সর্বাঙ্গনিদান, যাহা করেন সকলই মানবের মঙ্গলের জন্য। তিনি অনিত্যের মধ্যে নিত্য, অচৈতন্যের মধ্যে চৈতন্য স্বরূপ, তিনি একমাত্র হইয়া বহুর কামনা পূর্ণ করিতেছেন। তুমি তাহাকে কামনা কর, তোমার সকল কামনা পূর্ণ হইবে। সংসার বিদেশে আমরা সকলেই বিদেশী, আমরা সকলেই এক পিতার নিকট হইতে আসিয়াছি, এবং তাহার পরিচালনায় তাহারই কাৰ্য্য করিতে আসিয়াছি। তাহার আদেশ অবহেলা করিলেই আমাদের সেই অনুষ্ঠিত পাপের ফলভােগ করিতে হয়। ঈশ্বর কে, তিনি কি বস্তু, সংসারে আসিয়া তাহা মনে থাকে না ; আমরা কি জন্য সংসারে আসিয়াছি, তাহাও একবার ভাবি না। ভাল মন্দ, ধর্মাধর্ম বিবেচনা করিয়া অাপাত মনােহর পাপের পঙ্কিল হ্রদে প্রবেশ করি। ধৰ্ম্মপথ সরল হইলেও তখন তাহা জটিল বলিয়া বােধ হয়। এইরূপে মানবগণের ঈশ্বর জ্ঞান লুপ্ত হয়, রজঃ ও তমােগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তাহাতে তাহারা আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক তাপে তাপিত হয়। মৃত্যুর পর আত্মা উপদেশ। ১১ হে হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া এই সংসারে ভ্রমণ করে এবং পুনঃ পুনঃ জন্ম, গ্রহণ করিয়া পূর্বজন্মাৰ্জিত কৰ্ম্মফল ভােগ করে। যতকাল আত্মা ব্ৰহ্ম- জ্ঞানালোেক হইতে বঞ্চিত থাকে, ঈশ্বরজ্ঞান দ্বারা যতকাল মায়াপাশ ছিন্ন ও সংসার আসক্তি ছিন্ন না হয়, ততকাল তাহার নিষ্কৃতি হয় না। এখানে আসিয়া আমরা ঈশ্বরের আদেশ বিস্মৃত হইয়া নানাবিধ পাপানুষ্ঠান করিতেছি। আমরা যে এক পিতার সন্তান, সংসারে আসিয়া তাহা ভুলিয়া মাই, পরস্পর পরস্পরের হিংসা করি, ইহাতে আমাদের অবনতি ঘটে। “আমার মাতা, স্ত্রী বা স্বামী কিম্বা পুত্র কন্যার মৃত্যু হইয়াছে, আত্মীয় স্বজনের দুঃখ কষ্ট উপস্থিত হইয়াছে, আমার হাতে পরিতাপে সীমা নাই; কত কঁদিতেছি, শিরে করাঘাত করিতেছি, অদৃষ্টের দোষ দিতেছি, ঈশ্বরের ন্যায়বিচারে দোষারােপ করিতেছি। কিন্তু অপর কাহারও তপ অবস্থা উপস্থিত হইলে তাহার সামান্য উপকার করা, এমন কি তাহার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা দূরে থাক্ তাহার প্রতি ফিরিয়াও চাহিব না। ইহাই সাগরণতঃ সংসার প্রবাসী মানবের ধর্ম হইয়াছে। ইহাতেই মানব- গণের অধঃপতন হইতেছে এবং তাহারা অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করিতেছে।” শ্রীমৎ বিমলানন্দ স্বামী নীরব হইলেন। সরলা তাঁহার চরণ ধারণ করিয়া কাতর কণ্ঠে কহিল—“ভগবন্! আপনার পবিত্র উপদেশে আমার অন্তঃকরণ শীতল হইল। দেব! এ সংসারে আমার আর কেহ নাই, আমার বাসনা পূর্ণ করুন। পিতঃ! কৃপা করিয়া আমায় চরণে স্থান হিন; ধরাতলে যতদিন জীবন থাকিবে ততদিন আপনার দুর্লভ চরণ সেবা করিয়া দিন অতিবাহিত করিব।” গুরুদেব কহিলেন—“সরলা, তুমি সংসারে থাকিয়া যে ব্রহ্মচর্য পালন ফরিয়া আসিতেছ, তাহাতেই তােমার আত্মার উন্নতি হইয়াছে। ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, আরও উন্নতি হউক, জ্ঞান ধৰ্ম্ম বৃদ্ধি হউক। তুমি '১১৪ সরলা। সংসারাম ত্যাগ করিলেইহার অধিক ফল কিছুই পাইবে না, বরং তােমার বিপদ ঘটিতে পারে। পথে পথে নিরাশ্রয়রূপে বেড়াইতে হইবে ; তুমি বালিকা; তােমার সে পথ অবলম্বন না করাই ভাল। গৃহে থাকিলে কি ঈশ্বর জ্ঞান জন্মে না? তােমার আর সন্ন্যাস অবলম্বন করিবার আবশ্যক নাই। সংসারে থাকিঙ্কাও তুমি সন্ন্যাসিনী। সরলা ! এ বাসনা পরিত্যাগ কর। নিশা অবসান প্রায়, গৃহে গমন কর। আমি প্রত্যুষে কাশীধাম পরিত্যাগ করিব; তােমরা এখানে থাকিও না। কেহ বাটী হইতে লইতে আসিলে বাইও। ভগবান যখন যেখানে লইয়া যাইবেন সেইখানে যাইও । তিনি সন্তানের মঙ্গল ভিন্ন অমঙ্গক করিবেন না। একান্তমনে তাহার উপর নির্ভর করিও। তাঁহার চরণ ধ্যান করিয়া জীবন কাটাইবে; তিনিই তােমার রক্ষক এবং সকল সময় তিনিই রক্ষা করিবেন।” বিমলানন স্বামী প্রস্থানােদ্যত হইলেন। প্রমীলার মাতা এবং সরল তাহাকে প্রণাম করিয়া পদধূলি লইলেন, গুরুদেবও উভয়ের মস্তকে হত প্রদান করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। সরলা চাহিয়া দেখিল তাহার মাতা দেহ ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে ; সে উপদেশ শ্রবণে তন্ময় হইয়া ছিল সুতরাং সেদিকে লক্ষ্য রাখে নাই। এখন দেখিয়া ধীরে ধীরে চিতার নিকট গমন করিল এবং গললগ্নীকৃতবাসে ভূমিষ্ঠ হইয়া মাতার আত্মার উদ্দেশে প্ৰণৰ করিয়া চিতাভস্ম লইয়া সর্বাঙ্গে লেপন করিল। পরিশেষে চি স্থান দুগ্ধ ও গঙ্গাজলে ধৌত করিয়া সকলে গৃহে গমন করিল। ;

চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ। বাটী প্রত্যাগমন। যথাসময়ে সরলার মাতার মৃত্যুসংবাদ হুগলিতে শরৎকুমার ও শিশির কুমারের নিকট পৌঁছিল। তাহারা সে সংবাদে যৎপরােনান্তি দুঃখিত হইলেন। পরে দুই ভ্রাতায় পরামর্শ করিয়া তাহাদিগের মাতা ও সরলাকে বাটীতে আনিবার জন্য সেই দিনই শরৎকুমার কাশী রওনা হইলেন। শরৎকুমার কাশী পৌছিয়া মাতৃসমীপে উপস্থিত হইয়া মাতার চরণে প্রণত হইলেন। মাতা অপূর্ণনয়নে পুত্রের মস্তকে হস্তাৰ্পণ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। সরলা নতমস্তকে দাঁড়াইয়া রহিল ; তাহার চক্ষু হইতে অশ্রুধারা পতিত হইয়া ভূমিতল সিক্ত করিতে লাগিল। শরৎকুমার সস্নেহে সরলাকে কহিলেন-“সরল, আর বৃথা রোদন করিয়া ফল কি? অশ্রু সম্বরণ কর। তােমাদের বাটী লইয়া যাইতে আসিয়াছি, এখানে আর থাকিবার প্রয়ােজন নাই। তুমি আমাদের কত আদরের, কত গেহের। প্রমীলা অপেক্ষাও তুমি আমাদের মেহের পাত্রী। সরলা, বােন, কেদনা, তােমাকে কাঁদিতে দেখিলে আমরা সকলেই কষ্ট পাইব !” শরৎকুমার মাতাকে কহিলেন—মা। আর এখানে অধিক দিন থাকি ধায় প্রয়ােজন নাই, কল্যই বাটী চল। তুমি ‘মা’ বলিলে আমি শুনিব না। আমরা তােমাকে ছাড়িয়া আর থাকিতে পারিব না।”

সরলা। শরৎকুমারের মাতা হাসিয়া কহিলেন-“বাবা, আমি আর কতদিন বাঁচিব? এতদিন যদি আমার মৃত্যু হইত তাহা হইলে কিরূপে আমাকে ধরিয়া রাখিতে? সে যাহা হউক তুমি যখন লইতে আসিয়াছ তখন আমাকে ছাড়িয়া যাইবে না তাহা বুঝিয়াছি।” শরৎকুমার হাসিয়া কহিলেন-“আমরা ত তােমাকে ছাড়িতে চাহি না, তবে তুমি যখন নিজেই আমাদের ছাড়িয়া যাইবে তখন আর উপায় কি?” মিত্র-গৃহিণী একে একে পুত্র পৌত্রাদি, পুত্রবধূ ও দাসদাসীগণেয় কুশল জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। শরৎকুমার সকলেরই কুশল বার্তা জ্ঞাপন করিলেন। গৃহবিবাদের সংবা শ্রবণ করিলে মাতা গৃহে প্রত্যাগমন করিতে অস্বীকৃত হইবেন মনে করিয়া সে বিষয়ের কোনও কথা উত্থাপন করিলেন না। যথাসময়ে শরৎকুমার মাতা প্রভৃতিকে লইয়া হুগলির বাটীতে পৌছি- লেন। শৈবলিনী আসিয়া শাশুড়ীকে প্রণাম করিল, তিনিও আশীৰ্ব্বাই করিলেন। সরলা শৈবলিনীকে প্রণাম করিল, শৈবলিনীর নয়ন অপূর্ণ হইল। সে অন্য দিকে মুখ ফিরাইল। মিত্র-গৃহিণী শৈবলিনীকে কহিলেন—“মা, তােমার দিদিরা কোথায়? তাহারা ভাল আছে ত?” শৈবলিনী। হ, ভাল আছেন। মিত্র-গৃহিণী। তাহাদের দেখিতে পাইতেছি না কেন? শৈবলিনী নিরুত্তর রহিল। মিত্র-গৃহিণী শৈবলিনীকে নিরুত্তর দেখিয়া ভীত স্বরে কহিলেন- “কি হইয়াছে মা ?” শৈবলিনী ধীরে ধীরে কহিল—“আপনি কি কিছুই শুনেন নাই ? তাঁহারা আমাদিগকে স্বতন্ত্র করিয়া দিয়াছেন।” মিত্র-গৃহিণী বহুক্ষণ নির্বাক হইয়া গম্ভীর ভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন।

ৰাটী প্রত্যাগমন। ১১৭ শৈবলিনী, শাশুড়ীর ও সরলার স্নানাহারের উদ্যোগ করিয়া দিল এবং তাহাদের আহারাদি শেষ হইলে নিজে আর করিল। শৈবলিনীর আহা হইলে পর মিত্র-গৃহিণী তাহার নিকট তাহাদের তীর্থভ্রমণে গমনের পর হইতে সাংসারিক ঘটনা একে একে সকলই শুনিতে লাগিলেন। মিত্র-গৃহিণীর জ্যেষ্ঠ পুত্রদ্বয় বা পুত্রবধূদয় কেহই স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিল না। তিনি প্রথমে পুত্রদ্বয়কে, পরে বুদ্বয়কে ডাকাই আনাইয়া সাক্ষাৎ করিলেন। বিজয়কুমার ও বসন্তকুমার সংক্ষেপে দুই চারি কথা বলিয়া একে একে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। বধূধয় শাশুড়ীকে প্রণাম করিয়া নির্বাক হইয়া অবনত মস্তকে দাড়াইয়া রহিল। মিত্র-গৃহিণী কিয়ৎক্ষণ পরে পৌত্রদ্বয় ও পৌত্রীকে সমভিব্যবহারে ইয়া বাটীর মধ্যে ইতস্তত ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পুত্র ও পুত্রবধুদ্বয়ের ব্যবহারে মিত্র-গৃহিণী যৎপরােনাস্তি দুঃখিত হইলেন। তিনি বুঝিলেন যে জ্যেষ্ঠ পুত্রদ্বয় কেহই তাঁহাকে নিজ সংসারে রাখিতে ইচ্ছুক নহেন।

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ। পূৰ্ব স্মৃতি। সরলা আপনাদের বাটী গমন করিয়া দেখিল বাটীখানি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রহিয়াছে। গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া দেখিল তাহাও উত্তমরূপ পরিষ্কার। শৈবলিনী গৃহের সজ্জা ও অন্যান্য দ্রব্য পরিস্কার করিয়া যথাস্থানে রাখিয়া দিয়াছে। সরল এদিক ওদিক চাহিয়া মাতার ছুি সকল দেখিতে লাগিল। মাতার হস্তের শিল্পকাৰ্যগুলি, চিত্রপটগুলি সজ্জিত রহিয়াছে। মাতার কয়েক খানি ধর্মগ্রন্থ রহিয়াছে। মাতাকে কারণ করিয়া সরলা কঁদিতে লাগিল। কিরুক্ষণ পরে উৰ্দ্ধদেশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া কহিতে লাগিলজননী, তুমি মর্ত্যধাম ত্যাগ করিয়া দেবধামে গমন করিয়াছ; এ জীবনে তােমাকে দেখিবার উপায় নাই। কিন্তু মা, তােমার শত শত স্মৃতি চিহু জগতে বর্তমান রহিয়াছে। মা, দেবলােক হইতে তােমার তনয়ার প্রতি দৃষ্টি রাখিও—তাহাকে রক্ষা করিও; যেন মা, তোমাকে ছাড়িয়া এ ধরাধামে অধিক দিন কিতে না হয়।”

পূর্বব স্মৃতি। ১১৯ মিত্র-গৃহিণী, শরৎকুমার ও শিশরকুমারের বারম্বার অনুরােধ সত্ত্বেও সরলা তাহাদের সহিত একত্র বাস করিতে স্বীকৃত হইলনা। শিশিরকুমারের সহিত বিজয়া দশমীর রাত্রির কথােপকথনের পর হইতে তাহার বাসস্থানের নিকট থাকাও সরলার অভিপ্রেত ছিল না। কিন্তু এখন সে নিতান্তই নিঃসহায়, মিত্র-গৃহিণী ও শরৎকুমার ভিন্ন সে আর কাহার আশ্রয়ে থাকিবে সুতরাং বাধ্য হইয়া তাহাকে সেই স্থানে বাস করিতে হইল। জনৈক প্রাচীন পরিচারিকা দিবারাত্রি সরলার বাটীতে থাকিবে এইরূপ বন্দোবস্ত হইল। সরলা পূর্বের মত অতিথি সেবা, দেবপূজা এবং স্থান বিশেষে নিল প্রতিবেশী রােগীদিগের পরিচর্যায় মনােনিবেশ করিল। পূজা, আত্মিক, অতিথিসেবা ও রােগ পরিচৰ্য্যায় সমস্ত দিন কাটাইয়া অপরাহ্নে এক পাকে প্রস্তুত হবিষ্যান্ন ভােজন করে। তৎপরে দেবার্চনা উদ্দেশে অহস্ত রােপিত বিবিধ ফুলগাছ গুলিতে জল সেচন ও প্রয়ােজন মত গাছ গুলির মূল প্রদেশের মৃত্তিকা খনন, তথায় সারপ্রদান প্রভৃতি কার্য্য করিয়া সন্ধ্যার পর মন্দিরে আরতি দর্শন করিতে যায়। রাত্রিতে কোন কোন দিন বা মিত্র-গৃহিণীকে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিয়া শুনায়, কোন দিন ৰা শৈবলিনী ও মিত্র-গৃহিণীর সহিত বিবিধ বিষয়ে কথােপকথন করে। তাঁহারা নিজ নিজ গৃহে, প্রস্থান করিলে সে,আর রাত্রি দ্বিপ্রহর পর্যন্ত একমনে শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ করে প্রতিবেশীগণ সকলেই সরলার ব্যবহারে সন্তুষ্ট। সরলার কাৰ্য দেখিয়া প্রতিবেশী সকলেই তাহার খাতি করে এবং তাহাকে স্নেহ করে। ইহাতে সুরবালার ও চন্দ্রকলার হৃদয়ে যেন আশীবিষ দংশন করিতে লাগিল। কিরূপে সরলাকে লােকের নিকট অপদস্ত করিবে, কি উপায়ে তাহাকে মনঃকষ্ট প্রদান করিবে তাহাৱা সৰ্ব্বদাই সেই চিন্তায় রত।

১২০ সরলা। সরলা অলর মত সুরবালা ও চন্দ্রকলা উভয়ের বাটীতে গমন করিয়া তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করে এবং তাহাদের শ্লেষ বিদ্রুপ অঙ্গে পাতিয়া লইয়া বাটী ফিরিয়া আসে। সে তাহাদের দুর্ব্যবহারে দুঃখিত না হইয়া হাতে তাহাদের মতি পরিবর্তিত হয় তাহার চেষ্টা করে ও তাহাদের নিকট নানাবিধ হিতােপদেশ ও আদর্শ রমণীগণের কাহিনী গল্পচ্ছলে প্রকাশ করে। দেবদেবী ও তীর্থ প্রদেশের কথাও ভালরূপ বুঝাইয়া বলে। সুরবালা ও চন্দ্রকলা উভয়েই সমস্ত কথার মর্ম গ্রহণ করিতে পারে না, এবং তাহাদের সে সকল কথা। ভালও লাগে না, সুতরাং অনেক সময় তাহারা বিরক্তি প্রকাশ করে, কিন্তু সরলা তাহাতেও নিক উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করে না। একদিন সরলা কথা প্রসঙ্গে মিত্র-গৃহিণীকে কহিল-“জেঠাইমা, আপনাকে একটা কথা কয়েক দিন হইতে বলিব বলিব মনে করিতেছি কিন্তু বলিতে পারিতেছি না। মা স্বর্গে গিয়াছেন, আমি কত দিনে তাহার নিকট গমন করিব জানি না, কিন্তু যদি মা দয়া করিয়া শীঘ্রই তাহার চরণে স্থান দেন তাহা হইলে আমাদের উভয়ের মনের শেষ প্রধান বাসনা পূর্ণ হওয়া দূরে থাকুক, তাহা প্রকাশ করাও ঘটিবে না।” মিত্র-গৃহিৱী বাধা দিয়া কহিলেন—“ও সকল কি কথা সরল ? কি বলিবে বল। ও সকল অকল্যাণকর কথা কে বলিতেছ? জগদীশ অবশ্যই তােমার বাসনা পূর্ণ করিবেন।” সরলা। ঈশ্বরের নিকট আমি ত দিবারাত্রি সেই প্রার্থনা করিতেছি। দেখুন জেঠাইমা, কাশীতে বাস করিবার সময় মার ও আমার উভয়েরই মনে এই বাসনা জন্মে যে আমরা যদি দেশে ফিরিয়া আসি তাহা হইলে এখানে আর বাবা বিশ্বনাথের দর্শন পাইব না। সুতরাং অামরা যেরূপে হউক একটা শিবমন্দির প্রস্তুত করাইয়া তথায় শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করিব। মা পূর্ব স্মৃতি। ১২ মনের কথা আপনার নিকট প্রকাশ করিবার সুযোগ পাইবার পূর্বেই বিশ্বনাথের চরণে আশ্রয় পাইয়াছেন, আমি তাহার ও আমার সে বাসনা পূর্ণ করিতে পারিব কি না জানি না। জেঠাইমা, যদি আমি বাসনা পূর্ণ করিবার পূর্বেই মার নিকট গমন করি, তাহা হইলে আমায় মৃত্যুর পর যাহাতে আমাদের বাসনানুযায়ী কাৰ্য্য হয় তাহার বন্দোবস্ত করিতে হইবে। আপনি সেজ ও ছােট দাদীকে বলুন যে গুহায় এখনই এইরূপ বন্দোবস্ত করুন যে আমার মৃত্যুর পর আমার পরিত্যক্ত অর্থ ঐ কার্যে ব্যয় হইবার পক্ষে যেন কোনও গােলযােগ উপস্থিত হইতে না পারে। মিত্র-গৃহিণী কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিলেন—“ভাল,শরৎ ও শিশিরকে তােমার অভিপ্রায় জানাইব এবং তােমার সহিত পরামর্শ করিয়া যায় কর্তব্য হয় করিতে বলিব।”

বড়বিংশ পরিচ্ছেদ। স্বভাবের পরিবর্তন। মিত্র-গৃহিণীর হুগলিতে প্রত্যাবর্তনের পর দুই মাস অতীত হইয়াছে। বিজয়কুমারের প্রথম পুত্র হৃদয়কুমার এক বৎসর কাল রােগে ভুগিয়া পিতামাতা, আত্মীয়স্বজনকে কাঁদাইয়া ইহলীলা সম্বরণ করিয়াছে। বিজয়কুমার ও সুরবালা পুত্রশোকে অতিশয় কাতর হইয়া পড়িয়াছেন। ইহার উপর সুরবালার ভ্রাতা রমেশ ভগীর তিনহাজার টাকা লইয়া একজন নীচ জাতীয় রমণীর সহিত পলাইয়া গিয়াছে। সেজন্য জন সমাজে বিজয়কুমারের মুখ দেখান কষ্টকর হইয়া পড়িয়াছে। তিনি পথে বাহির হইলেই লােকে বলে—“বিজয়বাবু, আপনার শ্যালক এমন ইতর, এমন বদমায়েস! ছি! ছি!” ' সুরবালাকে দেখিলেই প্রতিবেশীনীগণ বলে-“হ বড় বউ, তােমার ভাই এমন! ছি! ছি। ঘণায় মরি, অমন ভাইকে বাটীতে স্থান দেয়! বােনের এই শশাকের সময় কিনা তাহার এই কাজ।” সুরবালা ও বিজয়কুমার একে শােকে মূহমান, তাহার উপর রমেশের ব্যবহারে মরমে মরিয়া গিয়াছেন বিজয়কুমার দুঃখ, ঘণা ও লজ্জায় কাহারও সহিত সাক্ষাৎ করেন না।

স্বভাবের পরিবর্তন। এই সময় আবার হঠাৎ একদিন অপরাহু কালে বিজয়কুমারের কনিষ্ঠ পুত্র বিনয়কুমারকে বাটীতে দেখিতে পাওয়া যাইতেছেন। সুরবালা কাঁদিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় ছুটিয়া এঘর ওঘর খুঁজিতেছেন, স দাসীগণ বাটীর বাহিরে চতুর্দিকে খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। কোন কাৰ্য বশতঃ সরলা সে সময় সুরবালায় নিকট গিয়াছিল। সরল। বিল বালকেরা স্বভাবতঃই জলাশয়ে যাইতে ভালবাসে। বিনয়কুমার খিড়কীর পুষ্করিণীর দিকেও যাইতে পারে। কিন্তু সে দিকে অনুসন্ধান কেহই গেল না দেখিয়া সরলা নিজে একবার পুষ্করিণীর তীরে অনুসন্ধান করিতে গেল সেখানে উপস্থিত হইয়া পুষ্করিণীয় চতুর্পাশ্ববর্ত্তী উদ্যানের মধ্যে অনুসন্ধান করিতে করিতে বিনয়কুমারের নাম ধরিয়া বারদার ডাকিতে লাগিল, কিন্তু কোন উত্তর পাইনা। তখন পুষ্করিণীয় সােপানের উপর দাড়াইয়া জলের উপর দৃষ্টি স্থাপন করিয়া দেখিতে পাইল যে জলের উপরস্থ শেষ সােপান হইতে কিঞ্চিত দূরে জল ঈষৎ আন্দোলিত হইতেছে। ইহা দেখি মা সরলা তীরবেগে জলে অবতরণ করিয়া সেইস্থানে উপস্থিত হইল। বিনয়কুমার তথায় অমধ্যে নিম হইয়াহিল, সরলা ডুব দিয়া একটু অনুসন্ধান করিতেই তাহাকে পাইল। মৃতপ্রায় বালককে বুকে লইয়া সরলা রুদ্ধশ্বাসে বাটীর ভিতর প্রবেশ করিল। বাটীতে ছেলে পাওয়া গিয়াছে রব উখিত হইল। বিজয়কুমার ছুটিয়া লিয়া দেখিলেন বিনয়কুমার সরলার কোলে রহিয়াছে, এবং সুরবালা উন্মাদিনীর ন্যায় পুত্রের মুখ পানে চাহিয়া আছে। সরলার শ্বাস প্রশ্বাস খনও অতি দ্রুতবেগে প্রবাহিত হইতেছে, সে তখনও প্রকৃতিস্থ হইতে পারে নাই। অনতিবিলম্বে সরল অপেক্ষাকৃত সংযত চিত্ত হইয়া বিন মায়ের ৩ষায় প্রবৃত্ত হই। বহুবিধ আকস্মিক শারীরিক দুর্ঘটনার ১২৪ সরলা । । এভিষেধক ও তদবস্থায় অবলম্বনীয় শুশ্রুষা প্রণালী সরলা বহুআয়াসে শিক্ষা করিয়াছিল। তাহার চেষ্টায় অরুক্ষণ পরেই বিনয়কুমারের চৈতন্যোদয় হইল। বিজয়কুমার আনন্দাশ্রু বিসর্জন করিয়া বলিতে লাগিলেন-“সরলা, তােমার জন্য আজ আমার বিনয়কে পাইলাম। বিনয় আমাদের নয়, আজ হইতে সে তােমার, তােমার ঋণ এ জীবনে শােধ করিবার নয়।” দরবালা সরলার গলা জড়াইয়া কাঁদিতে দিতে বলিতে লাগিল- তাই সরলা, তােমার মনে কত কষ্ট দিয়াছি, তােমায় কত তাচ্ছিল্য করিয়াছি। ভাই, তখন আমরা চিনিতে পারি নাই যে তুমি কি বস্তু। কিন্তু ক্রমে ক্রমে বুঝিয়াছি তুমি মরে নও-স্বর্গের, তুমি মানবী -দেবী। কাহারও মনে কষ্ট দিলে এক দিন না একদিন তাহার ফল ভােগ করিতে হইবে। তাই, তােমার মনে কত কষ্ট দিয়াছি তাহার ফলে নিজেও যথেষ্ট মনঃকষ্ট পাইয়াছি। সরলা, বােন আমার, বল ভাই, বড় বােনকে ক্ষমা করিলে, বল, তা নইলে আমার মন স্থির হইতেছে না। ভাই সরলা, মর্ত্যে যদি শান্তি থাকে তবে সে তােমাতে, এ সংসারে যদি পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থ পরােপকারিতা থাকে তবে সে তােমাতে। ভগ্নি, তোমার ব্যবহার দর্শনে আমাদের চক্ষু ফুটিয়াছে, এখন বুঝিতেছি যে তোমার নিকট আমরা অশেষ প্রকারে অপরাধী। এগ্নি, বল ক্ষমা করিয়াছ।” সরল। বড় বউদিদি, আপনি Fাগলের মত কি বলিতেছেন! দেখুন বিনয় আপনার মুখের দিকে চাহিয়া আছে ; উহার সহিত কথা বলুন, আদর করুন। সুরবালা। ভাই, বিনয় আর আমার নয়—তােমার। বল ভাই, ক্ষমা করিয়াছ? সরলা। বউদিদি, আপনি বড় ভা, আপনি ক্ষমা চাহিতেছে।

স্বভাবের পরিবর্তন। ১২৫ কেন? আমার অপরাধ হইবে যে! অমন কথা বলিবেন না। আমি একদিনের জন্যও কিছু মনে করি নাই বা, দুঃখিত হই নাই। আপনি আমায় কি বলিয়াছেন যে আমি ক্ষমা করিব? ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি আপনাদের ধর্ম বৃদ্ধি হউক, সংসারে শান্তি আসুক। সুরবালা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল-“ভাই সয়লা, না বুঝিয়া কত কুকৰ্ম্ম করিয়াছি তাহার ইয়ত্তা নাই। এমন শান্তিময় সংসারে অশান্তির অনল আনিয়া এখন সেই আগুনে দগ্ধ হইতেছি। শান্তি কি আর আমাদের মত করে প্রকৃতি লােকেদের নিকট আসিবে।” সরলা। বউদিদি, কেন মিছামিছি আত্মগ্লানি করেন! মনে করিলেই আবার সেইরূপ সংসার হইতে পারে, আবার শান্তি হইতে পারে। আপনাদের সহিত একত্রে থাকিবার জন্য সকলেই ব্যাকুল। আপনারা তাহাদের নিকট যাইলে তঁাহার হাতে স্বর্গ পান। সুরবালা। এ কালামুখ লইয়া কিরূপে আবার তাহাদের সুখের সংসারে প্রবেশ করিব? এ মুখ আর কেমন করিয়া লােককে দেখাই ভাই ? সরলা। না বউদিদি, আপনি বড় অবুঝ হলেন! চলুন জেঠাইমার নিকটে যাই, সকলে একত্রে থাকিব, মনের কষ্ট দূর হইবে, শান্তি পাইবেন। চলুন, বউদিদি, আ মত করিবেন না। সুরবালা আর কথা কহিল না। সরলা বিজয়কুমারকে এই সংবা দিল। তিনি সুরবালাকে তৎক্ষণাৎ আঁহার মাতার নিকট যাইতে বলিলেন এবং অনতিবিলম্বে তিনিও মাতৃসমীপে উপস্থিত হইবেন এরূপ বলিলেন। মিত্র-গৃহিণী ও শৈবলিনী বিজয়কুমারের পুত্রের জলমগ্ন হওয়ার বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাই। মিত্র-গৃহিণী তাহার শয়নকক্ষে বসিয়া আছেন শৈবলিনী তাহার মাথার পাকা চুল তুলিয়া দিতেছে, এমন সময়ে সরল ।

সরলা। সুরবালার হাত ধরিয়া ও বিনয়কুমারকে কোলে লইয়া তথায় উপস্থিত হইল। হঠাৎ সুরবালাকে তথায়ু আসিতে দেখিয়া মিত্র-গৃহিণী ও শৈবলিনী উভয়েই বিস্মিত হইলেন। সুরবালা শাশুড়ীকে প্রণাম করিয়া তাহা পদতলে উপবেশন করিয়া নীরবে নােদন করিতে লাগিল। সংক্ষেপে সম্বন্ত ঘটনা বিবৃত করিল এবং বিজয়কুমারও যে অনতিবিলৰে মাতৃসমীপে উপস্থিত হইবেন মিত্র-গৃহিণীকে সে সংবাদ প্রদান করিতে বিস্মৃত হইলনা। শৈবলিনী সুরবালাকে প্রণাম করিয়া সরলার ক্রোড় হইতে বিনয়কুমারকে নিজের ক্রোড়ে লইল। মিত্র-গৃহিণীর চক্ষুদ্বয় অপূর্ণ হইল। তিনি সুরবালার হস্ত ধারণ করিয়া কেঁদনা, মা,, এই কথা বলিয়াই নীরবে অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন।

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ ক্রতার পরিণাম। কলিকাতায় শরৎকুমার ও শিশিরকুমারের নিকট সংবাদ গেল যে বিজ কুমার ও সুরবালা আবার তাদের সংসারে আসিয়া একত্রিত হইয়াছেন। শরৎকুমার ও শিশিরকুমার এই সংবাদ শ্রবণে অতিশয় পুলকিত হইলেন। ইহার পর প্রায় দুইমাস পরে শরৎকুমার ও শিশিরকুমার দুই ভ্ৰাতায় বাটা গমন করিলেন ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হস্তে সংসারের ভার অর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। মিত্র-গৃহিণীর কাশী হইতে বাটী আগমনের কিছুদিন পরেই বসন্তকুমার তন্ত্র পল্লীতে একখার্জি আটভিাড়া করিয়া তথায় বাস করিতেছিলেন। বহুদিন হইতে বসন্তকুমার অসৎসঙ্গে মিশিয়া মদ্যপানাদি কুক্ৰিয়াসক্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। নিজে চিকিৎসক হইলেও চিকিৎসা ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া অর্থোপার্জন করার প্রতি তাঁহার কিছুমাত্র মনােযােগ ছিল না। বিলাসিতা ও কুক্ৰিয়ানুষ্ঠানের ফলে তিনি ক্রমে ক্রমে অর্থ ও হীন হইয়া পড়িয়াছিলেন।

১২৮ সরলা। শিশিরকুমার একদিন প্রাতে বসন্তকুমারের বাটীর নিকট দিয়া যাইতে যাইতে দেখিলেন যে বসন্তকুমারের ষষ্ঠবর্ষীয়া কন্যা শশীকলা বাটীর দ্বীরদেশে দাড়াইয়া কঁদিতেছে। শিশিরকুমার তাহার নিকট যাইয়া কহিলেন— শশী, কাদছ কেন ? তােমার মা কি তােমায় বকেছেন ?” বালিকা কথা কহিলনা, কাঁদিতে লাগিল। শিশিরকুমার তাহাকে কোলে লইয়া মুখ চুম্বন করিয়া সস্নেহে কহিলেন- বল না মা, কে তােমায় বকেছে, লক্ষ্মী মা আমার, বলত, ঝি ফেলে কোথায় গিয়াছে ?” কাকাবাবুর আদরে বালিকা অসম্বরণ করিয়া কহিল-“মা, বকেছেন।” শিশিরকুমার জিজ্ঞাসা করিলেন-“কেন তােমার মা বকেছেন ?” শশীকলা। আমি একটা পুতুল কিনিব বলিয়া কাদিয়াছিলাম, এখন বাবার অসুখ তাই মা বকেছেন। শিশিরকুমার আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিলেন-“তােমার বাবার অসুখ তাহাত আমরা জানি না ! কি অসুখ জান? বালিকা কহিল-“তাহাত আমি জানি না, কাকাবাবু। শিশির। কবে থেকে অসুখ হয়েছে ? শশীকলা। অনেক দিন হয়েছে। শিশির। লক্ষ্মী মা, একটা কাজ করত। তােমার বাবার নিকট গিয়ে বল যে ছােটকাকাবাবু এসেছেন, আপাকে দেখিতে চাচ্ছি- তেছেন। তিনি কি বলেন শুনে এসে আমায় বলত মা; যাও, আমি তােমায় কত খেলনা, পুতুল কিনে দিব। শশীকলা ছুটিয়া পিতার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করিয়া ডাকিল-“বাবা, বাব, ও বাবা, শােন।” চন্দ্রকলা বসন্তকুমারের নিকট বসিয়াছিল সে কন্যার উচ্চৈঃস্বর শ্রবণে , ** } ক্রুরতার পরিণাম। ১২৯ ধমকাইয়া কহিল-“পাজিমেয়ে কোথাকার, বারণ করিলে শশানেনা ! এই মাত্র চেঁচাইতে ছিলি বলিয়া বকিলাম, আবার বিরক্ত করিতেছিস ? মার না খাইলে তুই সােজা হবিনা?” মায়ের কথায় বালিকার রাঙ্গা ঠোট দুখানি আবার ফুলিয়া উঠিল। বসন্তকুমার নয়ন মেলিয়া ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন—“কি হইয়াছে? উহাকে ধমকাইতেছ কেন? মা শশী, আমার কাছে আয়। শশীকলা পিতার নিকট যাইয়া কহিল-“বাবা, ছােটকাকা বাবু আপনাকে দেখিতে চাহিতেছেন, তিনি দরজায় দাঁড়াইয়া আছেন, আপনি বলিলে তবে উপরে আসিবেন।” দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বসন্তকুমার কহিলেন-“কে, শিশির এসেছে? মা শশী, তােমার ছােট কাকাকে ডাকিয়া আন।” শশীকলা অবার ছুটিয়া শিশিরকুমারকে ডাকিতে গেল এবং অনতিবিলম্বে তাঁহাকে লইয়া উপরে আসিল। শিশিরকুমার শয্যাশায়ী ভ্রাতার জীর্ণ শীর্ণ কলেবর দেখিয়া অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিলেন না। বসন্তকুমার ইঙ্গিতে শিশিরকুমারকে নিকটে আসিতে কহিলেন। শিশিরকুমারও ভ্রাতার নিকট আইয়া বসিলেন ও দুই ভ্ৰাতায় নীরবে অশ্রুবর্ষণ করিতে লাগি- লেন। চন্দ্রকলা অবগুণ্ঠন দিয়া অনতিদূরে শশীকলাকে কোলে করিয়া বসিল। কিয়ৎক্ষণ এইরূপে কাটলে পর শিশিকুমার কহিলেন—“মেজদাদা, আমরা থাকিতে আপনার এরূপ দুর্দশা হইয়াছে। আপনি নিজের অমূল্য জীন হেলায় হারাইতে বসিয়াছেন। আমরা একবার সংবাদ পাইলে কি আপনাকে এ অবস্থায় রাখিতাম ! চলুন, মেজদাদা, আপনাকে বাটীতে লইয়া যাই। আপনার চিকিৎসার ও সেবা শুশ্রুষার উত্তমরূপ বন্দোবস্ত হওয়া আবশ্যক।

সরলা। বসন্তকুমার ক্ষীণস্বরে কহিলেন—“ভাই, আর লজ্জা দিওনা, এ মুখ লইয়া আর সে বাটীতে যাইব না। ভাই শিশির, আমি তােমাদের অযােগ্য ভ্রাতা। আমায় আর ভ্রাতৃসম্বােধন করিওনা। শিশির, এখন আমি আপনার পাপের ফলভােগ করিতেছি। তােমরা দুই ভাই যখন তােমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া স্বতন্ত্র না হইবার জন্য বারবার অনুরােধ করিয়াছিলে তখন তােমাদের অনুরােধ রক্ষা করি নাই। তােমাদের সংস্রবে থাকিলে আমার বিলাস বাসনা চরিতার্থ করিবার সুবিধা হইবেনা বলিয়াই কুবুদ্ধি বশতঃ তােমাদের ন্যায় ভাইদের সংসার হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিলাম। এখন বুঝিতে পারিতেছি যে তােদের সংসবে থাকিলে আমার এরূপ শশাচনীয় দুর্দশা ঘটিত না। ভাই, দুঃখে, ঘূপায় প্রতিজ্ঞা করিয়াছি অনাহারে মরিব সেও ভাল, তথাপি এমুখ লইয়া আর তােমাদের নিকট যাইবনা। ভাই, আমার যেরূপ অবস্থা হইয়া পড়িয়াছে, দেখিতে পাইতেছ। উহার ও শশীকলার গাত্রের গহনা গুলি যতক্ষণ পর্যন্ত ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার চক্ষু ফুটে নাই। ঘটী বাটী পৰ্যন্ত যাহা কিছু ছিল প্রায় সমুদায়ই নিঃশেষ হইয়াছে, এখন সংসার অচল হইয়া পড়িয়াছে, আমিও শয্যাগত হইয়াছি, অর্থাভাবে চিকিৎসা চলিতেছেনা। আমার পাপের ফলে উহারও কষ্ট পাইতেছে। ভাই, কি বলিব, বালিকা শশীকলা যখন খুঁয়ে ব্যাকুল হইয়া করে, তখন প্রাণ ফাটিয়া যায় ! ভাই, তথাপিও ভাবিয়াছিলাম তােমাদের বলিব না; যখন শুনিবে যে 'কুলাঙ্গার আর ইহজগতে নাই তখন তােমরা অবশ্যই এই অনাথাদের লইয়া যাইবে।” বসন্তকুমার আর বলিতে পারিলেন না, তাহার কণ্ঠবােধ হইল। শিশির কুমার অশ্রু মুছিয়া কহিলেন-“মেজদাদা, ও সকল কথা ছাড়িয়া দিল। গত বিষয়ের জন্য এখন আয় অনুতাপ করিলে কি হইবে? 'ভগবান } ক্র রতার পরিণাম। নিকট প্রার্থনা করি, আপনি সুস্থ হউন ও আপনার সুমতি হউক। দাদা, আর অমত করিবেন না, চলুন বাটী লইয়া যাই।” বসন্ত। না ভাই, আমি এ অবস্থায় বাটী যাইবনা। মা আমাকে শয্যাশায়ী দেখিলে অতিশয় কাতর হইবেন, দূরে আছি বরং ভাল। তিনি কিছুই জানিতে পারিতেছেন না, নিকটে যাইলে আরও হার জ্বালবৃদ্ধি করিব বইত নয় ! কুসন্তান গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন, একদিনের জন্যও তঁাহাকে সুখী করি নাই, এখন নিজ পাপের ফলভোগ কবিতেছি। শিশিরকুমার কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন-“তাহাই হউক, শুক্রবার জন্য একজন লােক পাঠাইয়া দিব ও চিকিৎসার উত্তমরূপ বন্দোবস্ত করিয়া দিব এবং আমরাও সৰ্ব্বদা দেখিব নিব। মাকে এ সংবাদ দেওয়া হইবে না। বেলা অধিক হইয়া গেল, আমি আর বিলম্ব করিবনা, ডাক্তার আনিতে চলিলাম। এই বলিয়া শিশিরকুমার গাত্রোখান করিলেন এবং বাটীতে আসিয়া বিজয়কুমার ও শরৎকুমারের নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত বলিলেন। তৎপয়ে একজন সুদক্ষ চিকিৎসক লইয়া তিন ভাতায় বসন্ত কুমারের বাটী উপস্থিত হইলেন। চিকিৎসক রােগীকে বিশেষরূপ পরীক্ষা করিয়া কহিলেন—“পীড়া কঠিন হইয়া পড়িয়াছে, তবে ভঙ্গের কারণ নাই, উপযুক্ত চিকিৎসা ও নিয়মিত সেবা গুজৰা হইলে শীঘ্রই বােগ আরােগ্য হইবে।” ঔষধাদির ব্যবস্থা করিয়া দিয়া ডাক্তার চলিয়া গেলেন। বিজয়কুমার ও শরৎকুমার তথায় বসিয়া ছিলেন। শিশিরকুমার পুনরায় বাটীতে যাইয়া সরলাকে ডাকাইয়া সমুদায় বৃন্ত বলিলেন। সৱলা কহিল-* মেজদাদার দৈবার জন্য অন্য লােকের আবশ্যক আই, আমি নিজে তাহার সেবী করিব।”

১২ সরলা। . শিশির। তােদর অনেক কাজ। মেজদার নিকট সমতক্ষণ থাকিলে তােনার নিজের কাজ কখন করিবে? আর খাটিয়া খাটিয়া তােমার দেহ কয় দিন টিকিৰে? তুমি অস্থি চর্মসার হইয়া পড়িতেছ। সমলা। আমার জ ভাবনার কোন আবশ্যক নাই, মেজদাদার সেবার তারটা আমার উপর দাও, তাহা হইলে আমি সুখী হই। সরলা শিশিরকুমারের কোনও আপত্তি শুনিলনা। অগত্যা শিশিরকুমার সরলার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। সরলা শৈবলিনীকে সমুদায় বৃত্তান্ত জানাইল, কিন্তু মিত্র-গৃহিণীকে এই মাত্র বলিল যে—“বিশেষ প্রয়ােজন বশতঃ কয়েক দিন তাহাঁকে চন্দ্রকলার নিকট থাকিতে হইবে, দ্বিপ্রহর কালে একবার মাত্র অতিথি সেবার জন্য আসিবে।” কি জন্য বসন্তকুমারের বাটীতে থাকিবে তাহা কিছুই বলিল না। মিত্র-গৃহিণী মনে করিলেন বসন্তকুমারকে অন্য তিন সহােদরের সহিত এক সংসার ভুক্ত করিবার উদ্দেশ্যেই সরলা চন্দ্রকলার নিকট থাকিবার বন্দোবস্ত করিতেছে, সুতরাং সরলার প্রস্তাবে তিনি সানন্দে সম্মতি প্রদান করিলেন। সরলা অক্লান্তভাবে বসন্তকুমারের শুশ্রুষা করিতে লাগিল। সরলার ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া বসন্তকুমার প্রায়ই তাহার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু সরলা তাঁহাকে বাধা দিবার উদ্দেশ্যে অধিক কথা কহিতে নিষেধ করে। চন্দ্রকলা পিন অপ্ত হৃদয়ে সরলার গুপ্ত ধারণ করিয়া বলিতে লাগিল-“ভাই সরলা, তােমার ঋণ এ জীবনে শােধ হইবার নয় ; তুমি পূর্ব জন্মে, আমাদের কেহ ছিলে, নচেৎ এত মেহ, এত যত্ন অপরে করিতে পারে না। তােমার মহত্ব বর্ণণীর। হৃদয় যদি দেখাইবার হইত তাহা হইলে দেখাইতাম যে কৃতজ্ঞতা সন্ত হৃদয় পূর্ণ হইয়া গিয়াছে।” এই কথা বলিতে বলিতে চন্দ্রকলার নয়ন অশ্রু পূর্ণ হইয়া উঠিল। ।

ক্রুরতার পরিণাম। ১৩৩ সরলা বলিল-“বউ দিদি, তুমি এ সকল কথা বলিতেছ কেন ভাই? আমি শৈশবকাল হইতেই জেঠামহাশয়ের আশ্রয়ে প্রতিপালিত, এখনও জেঠাই মা আমার মাতৃস্থানীয়া, তাঁহার পুত্রগণকেও আমি চিরদিনই সহােদরের ন্যায় মনে করি, দাদার সেবা শুশ্রুষা করিব ইহা আর আশ্চর্যের বিষয় কি ভাই? পূর্বজন্মে কেন এজন্মেইত আমি তােমাদের।” সুচিকিৎসা ও শুশ্রুষাৰ গুণে বসন্তকুমার ক্রমশঃ আরােগ্য লাভ করিতে লাগিলেন। সরলার মুখে হাসি দেখা দিল, সে তাহার পরিশ্রম সফল জ্ঞান করিতে লাগিল। বসন্তকুমার অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইলে সপরিবারে তাঁহাকে মিত্র বাটীতে আনয়ন করা হইল। আবার চাৰি শ্ৰাতায় একত্রিত হইলেন। এখন চারি ভ্রাতায় একপ্রাণ, তিন বন্ধু একান হইলেন, মিত্র সংসার আবার হাসিল। এখন মিত্র-গৃহিণী মধ্যে মধ্যে বলেন—সবাই আমারে গৃহলক্ষ্মী, সরলার জন্যই আমাদের সংসারের এ ফিরিয়াছে।” তিন বৎসরের পর প্রমীলা পিত্রালয়ে আসিয়াছে। ভ্রাতৃগণে গৃহ বিচ্ছেদের পর প্রমীলা আর হুগলি আসে নাই। শরৎকুমার কতবার তাহাকে আনিতে গিয়াছেন, প্রমীলা “এখন যাইবনা,” “আর কিছুদিন পরে যাইব,” “আমায় ইহারা পাঠাইবেন না” এইরূপ নানা কথা বলিয়া তাঁহাকে নিয়ন্ত কষিত। এখন শুনিল গুহ বিবাটিক্স গিয়াছে, ভ্রাতা, ভ্রাতায় মিলন হইয়াছে, সুতরাং সে আনন্দের সহিত হগলি আসিতে ব্যস্ত হইল, পরে শিশিরকুমার তাহাকে হুগলির বাটীতে লইয়া আসিলেন। • প্রমীলা আসিয়া দেখিল, সংসারে আর পুর্বের ন্যায় হিংসা বেষ নাই পরিবর্তে শান্তি-পবিত্র আনন্দ, ক্লিাজ করিতেছে, সংসারের অবস্থা দেখিয়া সে বড় সুখী হইল। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবধুদ্বয়ের প্রকৃতির তে এরূপ পরিবর্তন হইবে তাহা সে প্লেও ভাবে নাই। এখন বড়

১৪
সরলা।
বঃ-মেজবউ শাশুড়ীর সেবা যত্ন করিতেছে-দেব, ননদ, জাকে
গেহ করিতেছে। এই সকল দেখিয়া তাহার হৃদয়ে অনির্বচনীয় আনন
জন্মিতেছে। সরলা ও ভ্রাতৃবধুদিগের সহিত একত্রে পরম মুখে তাহার
দিন কাটিতে লাগিল।

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ। প্রতিমা বিসর্জন। দিনের পর দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল, এক দিন দুই দিন ফরিয়া একমাস কাটিয়া গেল। কয়েক দিবস হইতে সরলার অল্প অল্প অল্প এইতেছে, অদ্য তাহা অতিশয় বৃদ্ধি পাইয়াছে। সরল শয্যায় ছটফট করি তেছে পাশ্বে প্রমীলা, মিত্র-গৃহিণী, বন্ধুগণ সকলেই বসিয়া আছেন; শিশির কুমার, শরৎকুমার, বিজয়কুমার ও বসন্তকুমার প্রভৃতি সকলেই মধ্যে মধ্যে * একবার আসিয়া দেখিয়া যাইতেছেন। চিকিৎসক আসিয়াছিলেন, দেখিয়া গিয়াছেন,কোন আশাপ্রদ বাক্য বলিয়া যান নাই; ঔষধ দিয়া গিয়া- ছেল, সরলা তাহা সেবন করে নাই। সকলে অনেক পীড়াপীড়ি করিয়াছে তথাপিও ঔষধ খায় নাই। সরলা যন্ত্রণায় এপাশ ওপাশ করিতেছে আর তরখরে “মাগাে যাঁই যে”, “মা তুর্দিকোথায় ইত্যাদি বাক্য বলিতেছে। প্রমীলার মাতা সরলার মস্তক ক্রোড়ের উপর লইয়া বসিয়া আছেন এবং বলিতেছেন-“মা, আমি এই যে তােমার নিকট বসিয়া আছি”। সরলা ক্রমশঃ অবসন্ন হইয়া পড়িতে লাগিল, রাত্রি বুঝি আর কাটে না! সকলে তিশয় উৎকণ্ঠিত হইলেন। পুনরায় চিকিৎসক আসিলেন, রােগীকে পরীক্ষা করতঃ জকুঞ্চিত কুরিয়া কহিলেন-“রােগীর অবস্থা ভাল সরলা। . বুঝিতেছি না, অদ্য রাত্রি কাটিবার আশা খুবই কম, বােধ হয় রাত্রি শেষে জীবন শেষ হইয়া যাইবে।। চিকিৎসকের এই বজ্রসম নিদারুণ বাক্যে সকলে হাহাকার করিতে লাগিলেন। শরৎকুমার সকলকে বুঝাইয়া সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন ও বলিলেন-“তােমরা গােযােগ করিয়া আরও উহার মৃত্যুকে ডাকিয়া আনিতেছ ; চুপ কর, গােলমাল করিও না।” শরৎকুমারের তাড়নায় সকলে চুপ করিল বটে, কিন্তু অন্তরালে কঁদিতে লাগিল। ক্রমশঃ রাত্রি গভীর হইল। সৰলা হঠাৎ চমকিতভাবে কহিতে লাগিল--“মা, মা, এই যে আমার মা—আর মা আমায় ছাড়িয়া যাইও না, আমি আর বিলম্ব করিব না।” মিত্র-গৃহিণী সরলার মস্তকে হস্তাবৰ্তন করিতে করিতে কহিলেন- “কেন মা, অমন করিতেছ?" সরলা কয়েক মুহূৰ্ত্ত মিত্র-গৃহিণীর মুখ প্রতি স্থির দৃষ্টি নন্ত' করি৷ পরে ধীরে ধীরে কহিল-“মা, এতদিন নিঃস্বার্থভাবে অপত্য- মেহে পালন করিয়াছিলেন, এখন বিদায় হই, পদধূলি দিন।” প্রমীলার মাতা কাদিতে কঁদিতে কহিলেন-“মা, আশীর্বাদ করি যেন পরজন্মে সুখী হও।” সরলা একে একে ৰধুগণের নিকট বিদায়, চাহিল ও তাহা পদধূলি লইল। প্রমীলার গলা ধরিয়া ম্লান হাসি হাসিয়া কহিল- “ভাই প্রমীলা, তবে বিদায় দাও! ভগ্নি। জন্মে জন্মে যেন তােমায়। ভগ্নীরূপে পাই।” প্রমীলা সরলার গলা জগাইয়া ধরিয়া কঁদিতে লাগিল। বিজয়কুমাৰ, বসন্তকুমার ও শরৎকুমার সকলেই অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন, সরলা চির জন্মের মতন সকলের নিকট বিদায় লইল।

প্রতিমা বিসর্জন
১৩৭
শিশিরকুমার এক দৃষ্টিতে সরলার মুখ প্রতি চাহিয়া আছেন, তাঁহার
নয়নে অশ্রু নাই, মুখে বাক্য নাই ; নীরব-নিশ্চল—পাষাণমুর্তির ন্যায়
পাড়াইয়া আছেন যাহার বুকে আগুণ জ্বলিতেছে, তাহার নয়নে জল
কোথা হইতে আসিবে?
সরলার চক্ষু ক্রমে ক্রমে মুদিয়া আসিতে লাগিল। শিশিরকুমার
হঠাৎ দৃঢ়স্বরে ডাকিলেন-“সরলা।”
সরলা উদাস ভাবে একবার শিশিরকুমারের প্রতি চাহিল, চারি
চকু সন্মিলিত হইল, সরলার নয়নদ্বয় মুদিয়া গেল।

উপসংহার সরলার দুঃখময় জীবনের অবসান হইয়াছে, তাহার পবিত্র আত্মা অমরধামে চিরশান্তি লাভ করিয়াছে। শিশিরকুমার বহু অর্থ ব্যয় করিয়া অতিথিশালার পুনঃসংস্কার ও সরলার অভিলষিত শিব মন্দির স্থাপন করিলেন এবং স্বয়ং তাহার তত্ত্বাগ্ধারণ করিতে লাগিলেন। সরলার কাৰ্য্য, কৰ্তব্য জ্ঞান, ধর্মপ্রাণতা, সহৃদয় মিত্র পরিবারে এক অপূৰ্ব্ব ভাবের সৃষ্টি করিয়াছিল। তাহার আত্মার অক্ষয় স্বর্গ সকলে অন্তরের সহিত কামনা করিত। শিশিরকুমারের বিবাহ দিবার জন্য অনেক চেষ্টা করা হইয়াছিল কিন্তু তিনি বিবাহ করিলেন না; সৎকার্যে জীবন সমর্পণ করিলেন। যাও সরলা ! পৃথিবীর কোলাহল, ঘাত প্রতিঘাতের অতীত সেই পবিত্র ধামে শান্তি লাভ কর। তােমার মত উন্নহৃদয়, পবিত্র সরল মন মানবের বাঞ্ছনীয়। তােমার ন্যায় আদর্শ কার্য যেন সকলে শিক্ষা করে। চিরদিন তােমার জন্য দুঃখীর প্রাপ্ত কঁদিবে। তুমি যে চরণ আজীবন ধ্যান করিয়া যে উচ্চ আকাঙ্ক্ষা পােষণ করিয়াছিলে, যাও, সেই অনন্ত আনময়ের পুণ্যনিকেতনে সেই, আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্তকর। দুঃখময় জীবন যে চিন্তায় সুখময় করিয়াছিলে, যাও, সেই ব্রিলােকৰাতি চরণে সকল দুঃখ অবসান কুর। সমাপ্তি

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sarola

Author
Basu,ushapramodini
Title
Uponyas
File name
Sarola
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2010/04/23
Publisher
City Book Society,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Novel
Keywords
Hingsa-Ekti Chitra
DLI number
510769
Barcode
4990010016311.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
2Eeiyv6XupS
Download PDF

Sarola