Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kushadhaj
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
জি
(শিশু নাটক)
শ্ৰীযােগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীতু,
আষাঢ়-১৩৩৮
( গানগুলি সুকবি শ্রীযুক্ত সুনিৰ্ম্মল বসুর রচিত )
দাম ছ' আনা
প্রকাশক-শ্ৰীসুবােধচন্দ্র মজুমদার
প্রবােধচন্দ্র মজুমদার এণ্ড ব্রাদাস
২২৫ বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকা
প্রিন্টার—শ্রীশশধর ভট্টচার্য্য
মাসপন্নলা প্রেস
১৯৭১ ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
চ্ছি
রাজা যযাতি
মন্ত্রী
কুলগুরু
রাজ পুরােহিত
সিদ্ধান্ত
শ্রীনাথ
অযযাধ্যার রাজা
ঐ মন্ত্রী
রাজা যযাতির শুরু
রাজা যযাতির পুরােহিত
অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ
ঐ জ্যেষ্ঠপুত্র
ঐ দ্বিতীয়পুত্র
ঐ সর্বকনিষ্ঠ পুত্র
সুদখাের ধনী মহাজন
বল্লভ
কুশধ্বজ
শেঠজী
সুমন্ত্র সারথি, ভিক্ষুক নারায়ণ, দেহরক্ষক সৈন্যগণ, প্রতিহারী,
অমাত্যবর্গ, রাজভৃত্যগণ।
উজ্জ্বল দৃশ্য
(কুশধ্বজ ও কয়েকটি ঋষিবালকের গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।
ঘট ভরে চল্ জল আনি ভাই,
চট করে আজ চল,
রঙীন-উষায় লাল হােল আজ
নীল দরিয়ার জল।
আলাে ছায়ার পথটি দিয়ে
ঘাটু পানে চল্ ঘটুটি নিয়ে,
কাটব সাতার এপার ওপার
প্রাণ হবে শীতল ।
মাখব মােরা ফুলের রেণু,
পরব ফুলের মালা,
সােহাগ-মদে ভরব মেরি
কৃষ্ণচূড়ার ডাল।
পদ্ম-মধু পান করে’ ভাই
বাড়ীর পানে ফিরব সবাই,
‘প্রণব’ নাদে ভরব দিশি,
করব কোলাহল।
কুশলজ
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
স্থান-ক্ষুদ্র পল্লী ; সিদ্ধান্তের পর্ণ কুটীর।
সময়-অপরাহু। সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রী উপবিষ্ট।
মন্ত্রী।—ব্রাহ্মণ ! এখনাে সময় আছে, এখনাে ভেবে
দেখ যে, কি কঠিন কাজে তুমি উদ্যত হয়েছ।
সিদ্ধান্ত।-মন্ত্রিবর ! মহারাজ যযাতির বেতনভােগী
কর্মচারী আপনি। রাজার কাজে বেরিয়েছেন, তাঁর মন
রক্ষা কৰ্তে হবে। পিতৃভক্ত রাজা তাঁর পিতার স্বর্গকামনায়
যজ্ঞ কচ্ছেন—আট বছরের ব্রাহ্মণ বালককে সেই যজ্ঞের
আগুনে আহুতি দিয়ে হােম নির্বাণ করতে হবে, এই হচ্ছে
তার বিধান। তাই আজ আপনার কর্তব্য, সমস্ত বিশ্ব-সংসার
খুঁজে দেখতে হবে কোথায় কোন্ ব্রাহ্মণ কোটি স্বর্ণ মুদ্রার
লােভে তঁার শিশু-পুত্রকে বলি দিতে প্রস্তুত। খুঁজে
এসেছেন সকল পৃথিবী। কিন্তু বলুন তাে মন্ত্রীমশাই, এক
কুশধ্বজ
দৈন্য যার
এই সিদ্ধান্ত ব্রাহ্মণকে ছাড়া অর্থ-পিশাচ পুত্র বিক্রেতা আর
একটি ব্রাহ্মণও পেয়েছেন কি ? আপনার একমাত্র আশাস্থল
আমি, মহারাজ যযাতির যজ্ঞে প্রধান আহুতি হবে আমার
দুগ্ধপোষ্য শিশু। তবে আবার আমাকেও অমন ভাবে বিগড়ে
দেবার চেষ্টা কচ্ছেন কেন ?
মন্ত্রী।কেন সেকথা জিজ্ঞেস কচ্ছ ব্রাহ্মণ ?-সিদ্ধান্ত।
আজন্ম ভিখারী তুমি, জীর্ণ কুটীরে তােমার বাস। সূর্যোদয়
হতে সূৰ্যাস্ত পর্যন্ত প্রত্যহ অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে
তােমাকে তােমার অস্তিত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে।
জগতে এত বড় সমস্যা, কোটি স্বর্ণ মুদ্রার প্রলােভন যে তার
কাছে কত উচু, কত বিশাল-সেকথা আমি বেশ বুঝতে
পারি। কিন্তু একটা কথা আমি তবু বুঝতে পারিনি’ ব্রাহ্মণ !
--সেটা হচ্ছে, টাকার লােভ কি এত বড় যে বুক থেকে
ছিনিয়ে মানুষ তার সােনার চাদ ছেলেকে ঘাতকের হাতে
তুলে দিতে পারে ? ছিঃ ! ব্রাহ্মণ ! তুমি এমন পশু !-
সিদ্ধান্ত।—মন্ত্রীমশাই! আপনি সব বুঝতে পারেন, ভান
কচ্ছেন! রাজকার্যে আপনার অসাধারণ দখল থাকতে পারে
আমি তা স্বীকার কচ্ছি। কিন্তু, দৈন্যের ব্যথা আপনি কিছুই
বুঝতে পারেন নি সেকথা আমি খুব জোর গলায় চেঁচিয়ে
কুশধ্বজ
;
বলতে পারি। জানেন মন্ত্রীমশাই, আমার আজকের ইতিহাস
কি জানেন ? চারিটি নয়, পাচটি নয়, কেবল তিনটি ছেলে
আমার। সেই কাল দুপুরে একবার তাদের মুখে একমুঠো
করে ভাত দিতে পেরেছি। তারপর হতে আজকে এই
এতটা সময় প্রায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের মুখে একটা
ক্ষুদকণাও দিতে পারি নি ; বাছারা আমার দুপুরের পর হতে
এর মাঝে তিন তিনবার এসেছে—ক্ষুধার্ত কুকুর যেমন
কাতরভাবে তার প্রভুর মুখের দিকে তাকায়, তেম্নিভাবে
আমার দিকে তাকিয়েছে—কিন্তু, মন্ত্রীমশাই! ওহহহহ !
মন্ত্রী।থাক ব্রাহ্মণ ! আমি সব বুঝতে পেরেছি।
তুমি কাতর হয়ে না আর,আর বলার দরকার নেই।
সিদ্ধান্ত।-না, তা হবে না। সব কথা আপনাকে
আজ শুনতেই হবে মন্ত্রী মশাই! কিসের কাতরতা? আজ
পাষাণে বুক বেঁধে দাঁড়িয়েছি—নিজের সন্তানকে নিজে
বলি দিতে উদ্যত হয়েছি। কাতরতা কোথায়
কাতরতা ?শুনুন্ তবে তিন তিনবার ছেলেরা আমায়
“বাবা!” বলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, পেটের ক্ষুধায় ছটফট
কচ্ছে নিজের চোখে তা দেখেছি। কিন্তু তা দেখেও
অব্রাহ্মণের ন্যায়, পিশাচের ন্যায়, মিথ্যে কথা বলে, মিথ্যে
৭
কুশধ্বজ
কেবল
আশায় মুগ্ধ করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছি। এই শুধু আমার
একদিনের ইতিহাস। কিন্তু আমার সমস্ত জীবন এমনধারা
অসংখ্য দৈন্যের ইতিহাসে ভরপূর ।
মন্ত্রী।-বুঝেছি ব্রাহ্মণ ! তুমি পিশাচ নও।
ঘটনাচক্রে তােমাকে আজ এমন কাজে উদ্যত হতে হয়েছে।
সিদ্ধান্ত।দৈন্তের জ্বালা যে কত ভীষণ, কত দুঃসহ,
তা ভুক্তভােগী ছাড়া আর কারাে বুঝবার শক্তি নেই।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ও বৎসরের পর বৎসর
সারাজীবন অনাহারে ও অর্ধাহারে আমাদের দিন কেটেছে।
নিজে কঙ্কালসার হয়েছি,ব্রাহ্মণী ব্যারামে ভুগছেন, মুমূর্ষ
—আর ছেলেগুলির খেলাধূলা, হাসি তামাসা ক্রমশঃই যেন
মলিন ও নিষ্প্রভ হয়ে নিভে আসছে। এসমস্তই আমার
দৈন্যের ফল।
মন্ত্রী।-ব্রাহ্মণ ! অতীতের চিন্তা করে আর বৃথা
কেন কষ্ট ভােগ কচ্ছ? কাল পর্যন্ত তুমি দরিদ্র ছিলে, কিন্তু
আজ এই মুহূর্ত হ’তে তুমি রাজার কৃপায় একজন বিশিষ্ট
ধনী।
সিদ্ধান্ত।-হুঁ, মন্ত্রীমশাই! সে কথা আমাকে বুঝিয়ে
দিতে হবে না। ‘রাজার কৃপায়’ ?-হ, রাজার কৃপায়
কুশধ্বজ
বটে, কারণ এই কোটি স্বর্ণমুদ্রা তাহারই রাজ
ভাণ্ডারে সঞ্চিত ছিল। কিন্তু এই কৃপা লাভ কৰ্ত্তে
মহারাজকে যে কি মহামূল্য দিতে হচ্ছে, সেটাতে আপনার
অজানা নেই মন্ত্রীমশাই।
মন্ত্রী।—না, তা আমার ভালাে রকমই জানা আছে।
নিজের হৃৎপিণ্ড ছিড়ে তুমি তাকে যজ্ঞের শিখায় আহুতি
দিতে প্রস্তুত হয়েছ !
সিদ্ধান্ত।-হ, প্রস্তুত হয়েছি। অম্লান বদনে আমার
দুধের ছেলে—আট বছরের সুকুমার শিশু কুশধ্বজকে
আমার সংসারের একটা উজ্জ্বল আনন্দকে—আপনার হাতে
সঁপে দিচ্ছি, যজ্ঞে আহুতি দেবার জন্য। নিয়ে যান মন্ত্রী
মশাই, তাকে নিয়ে যান। খুব সাবধানে নিয়ে যাবেন, যেন
সে পালিয়ে আসতে না পারে। যজ্ঞের আগুন দেখে ভয়
পেয়ে সে যদি চেঁচিয়ে ওঠে, মুখে কাপড় পূরে তার কথা
বার শক্তি বন্ধ করে দেবেন। যদি সে ভয়ে পিছিয়ে যায়,
তাকে জোর করে আগুনে ঠেলে দেবেন। তারপর মুহূর্তের
মধ্যেই
( সিদ্ধান্তের কণ্ঠরােধ হইয়া আসিল।
চক্ষু মুছিয়া ঢােক গিলিল। মন্ত্রীর চক্ষু অশ্রু-
সজল। তিনিও কাতরভাবে চোখ মুছিলেন।)
কুশধ্বজ
;
মন্ত্রী।—ব্রাহ্মণ ! রাজার যজ্ঞ অসম্পূর্ণ থাক, সেও
ভালো ; তবু আমি তােমার বুক থেকে ছেলে কেড়ে নিতে
চাই না।
সিদ্ধান্ত।—সে হয় না মন্ত্রীমশাই। অনেক কল্পনা
করেছি, অনেক সুখের চিন্তা করেছি, আবার পেট পুরে খাব,
সবাইকে পেট পূরে খাওয়াব’ ; দুঃখ দারিদ্রের কোন ব্যথাই
আর আমাদের বুকে বাজবে না—এমন ধারা অনেক কিছু
কল্পনা আমাকে তােলপাড় করে ফেলেছে। আপনি এক
মুহূর্তে তা ভেঙ্গে দেবেন না মন্ত্রীমশাই! আমি কুশধ্বজকে
খবর পাঠাচ্ছি। তিন তিনবার সে খেতে এসে ফিরে
গিয়েছে—নিরাশ হয়ে হয়তাে খেলার মাঠে যেয়ে ঘুমিয়ে
পড়েছে। এখনি সে এসে পড়বে মন্ত্রীমশাই! আপনি
ততক্ষণ হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম করবেন। আসুন
মন্ত্রীমশাই, আমার সঙ্গে আসুন।
(উভয়ের প্রস্থান)
১০
দ্বিতীয় দৃশ্য
স্থান-সিদ্ধান্তের বাগান, নানারকম শাকসজীতে ভরপূর ।
( সিদ্ধান্ত ও তৎপশ্চাতে মন্ত্রীর প্রবেশ। সিদ্ধান্তের
হাতে দুইখানা আসন।)
সিদ্ধান্ত।আসুন মন্ত্রীমশাই, এই নির্জন বাগান
আমাদের গুপ্ত পরামর্শের বেশ উপযুক্ত হবে। (আসন
পাতিয়া) বসুন আপনি, কুশধ্বজ এখনি এসে পড়বে।
মন্ত্রী।—কিন্তু রাজী হলে তাে হয় ? তুমি তাকে বিক্রী
কচ্ছ এবং কি জন্য বিক্রী কচ্ছ, তা যদি সে বুঝতে পারে
তবেই হয়তো একটা গােল পাকিয়ে তুলবে।
সিদ্ধান্ত।—না, মন্ত্রীমশাই! কুশধ্বজ আমার তেমন
ছেলে নয়। অতি পুণ্যের ফলে এমনধারা দু’একটি ছেলে
কদাচিৎ আমাদের মত দরিদ্রের ঘরে এসে জন্ম গ্রহণ করে।
কিন্তু কি করব মন্ত্রীমশাই ? অদৃষ্টের দোষে আজ তাকেও
বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছি।
নেপথ্যে।-ঠাকুর ! সিদ্ধান্ত ঠাকুর। বাড়ী
সিদ্ধান্ত।-( চমকিত হইয়া) ঐরে সেরেছে! সর্বনাশ
উপস্থিত ?
কুশধ্বজ
মন্ত্রী।-কেন ? কেন ব্রাহ্মণ ? ও কে ডাকছে তোমায় ?
কেন ডাকছে?
সিদ্ধান্ত!—সে কথা আর জিজ্ঞেস কচ্ছেন কেন মন্ত্রী-
মশাই ? সে একজন প্রসিদ্ধ ধনী, নাম তার শেঠজী।
কুক্ষণে তার কাছ থেকে কিছু ধার করেছিলুম, এখন তারই
ফলভােগ কচ্ছি আমি। এই ঋণ, আর এই যমের তাগিদ,
মৃত্যু পর্যন্ত আমার সঙ্গে সঙ্গেই যাবে।
নেপথ্যে।-ওগাে কৰ্ত্তা! বড় যে ফিস ফিস, আওয়াজ
হচ্ছে, অথচ সাড়া দিচ্ছ না! বলি ব্যাপারখানা কি হে।
সিদ্ধান্ত।আসুন, আসুন শেঠজী, ভিতরে আসুন।
( শেঠজীর প্রবেশ)
শেঠজী।—হাঁ, তাতে আস্বাে নিশ্চয়ই। কিন্তু কি
হচ্ছে তােমার ? চুপি চুপি এই খানটায় বসে কি কচ্ছ? বাড়ী
পেরিয়ে এসেছ তাে এই নির্জন জঙ্গলের ভিতর। কেন,
শেঠজী যাতে কোন খোঁজ না পায়, সেই তত মৎলবখানা
তোমার ?
সিদ্ধান্ত।আজ্ঞে না শেঠজী। বিশেষ
বিশেষ একটু কাজে
এই ভদ্রলােকটির সঙ্গে একটা পরামর্শের জন্যে এখানে
এসেছি। আপনাকে ফাঁকি দেবার জন্যে নয়।
১২
কুশধ্বজ
শেঠ জী।—আর নয় কি ঠাকুর? ফাঁকি তাে দিচ্ছ
আজ দু’বছর যাবৎ। তিন গণ্ডা পয়সা ধার নিয়েছ আজ
প্রায় তিন বছর হতে চল্ল। ফি মাসে তিন আনা সুদ হিসেব
করে দেখতে কত টাকায় দাড়িয়েছে ! অথচ একটা পয়সা
দেবার নাম নেই ! তুমি তােমার ভদ্দর লােকের সঙ্গে লুকিয়ে
বসে দিবিব পরামর্শ কচ্ছ। কি পরামর্শ তােমাদের ? আবার
কাউকে মােটা টাকাটা ফাকী দেবে সেই পরামর্শ হচ্ছে তাে?
সিদ্ধান্ত।-শেঠ জী, আপনি আমাকে যা ইচ্ছে তা
বলতে পারেন, কিন্তু ইনি একজন বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি।
ওকে এমন ভাবে-
শেঠজী।—আর রেখে দাও তােমার এমন ভাবে ।
শুড়ির সাক্ষী মাতাল ছাড়া আর জুটবে কোত্থেকে? তােমার
বন্ধুটির গায়ে তো দিবি সাজ পােক, তার একটা ফেলে
দিলেও তাে আমার টাকাটা মিটে যেতাে। তা’ করবার নাম
নেই, পরের টাকা কিনা, তাই আর দেবার নামটি হচ্ছে না।
আবার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে ‘বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি,
জোচ্চোরের দল কোথাকার ?
মন্ত্রী।—সাবধান শেঠজী ! মুখ সামান্ করে কথা
বলে। এত বড় অভদ্র তুমি যে, একটা অপরিচিত লােক।
কুশধ্বজ
ক
দেখেও তুমি কিছুমাত্র সংযত হচ্ছ না, তুমি আমাকেও
জোচ্চোর ডাকতে সাহসী হচ্ছ ! খবর্দার উল্লুক!
শেঠ জী।-কে গাে তুমি আকাশের চাদ ? জোচ্চোরই
যদি না হও তবে ভালয় ভালয় তােমার বন্ধুর টাকা ক’টা
ফেলে দিলেই তো চুকে যায়। আবার ভয় দেখানাে হচ্ছে
আমাকে? আমি শেঠজী—কত শত লােককে আমি হাবু-
ডুবু খাওয়াই, আর ইনি কিনা সেই আমাকে
সিদ্ধান্ত।—শেঠ জী, আপনি যা তা বল্বেন না।
আপনাকে অনুনয় করে বলছি, আপনি আমার অতিথিকে
অপমান করবেন না। আপনার টাকা শােধ দেবার বন্দোবস্ত
কচ্ছি শেঠজী! আপনি বিশ্বাস করুন। আমাকে আর এক
দিনের সময় দিন। শুধু একদিন। তবু আমার অতিথিকে
তাপমান কবেন না।
শেঠজী।—আরে রেখে দাও তােমার ‘অতিথি! ওসব
ছাগল-গাধাকে যদি
মন্ত্রী-চোপ, রও উলুক ! রসাে, দেখাচ্ছি তােমাকে
হঠাৎ দুইবার হাততালি দিলেন
মন্ত্রীর দেহরক্ষক সৈনিকের প্রবেশ)
শেঠজী।—( ভীত ও কাতরভাবে ) ও বাবা! এ কেরে
১৪
কুশধ্বজ
বাবা ! দোহাই বাবা তােমার! (মন্ত্রীর নিকট হাতজোড়
করিয়া) আমার ঘাট হয়েছে, আর কোন্ আহাম্মুক তােমাকে
গাল দেয়? (সৈনিকের দিকে তাকাইয়া) ওরে বাবা ! এ
যে তকমা-আঁটা, খােলা তরােয়াল হাতে জঙ্গী সিপাই বাবা ।
আমায় ক্ষমা করে বাবা! তােমার পায়ে পড়ি; দোহাই
বাবা! আমায় ক্ষমা কর। ( শেঠজী মন্ত্রীর পায়ের উপর
ধপ করিয়া পড়িয়া গেল।)
মন্ত্রী।—( শেঠজীকে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া ফেলিয়া) যা,
তবে পালা উল্লুক, পালা হতভাগা।
শেঠজী।—এই যাচ্ছি বাবা ! আর কোন হতভাগা
তােমাদের কাছে আসে!
(উঠিয়া বেগে প্রস্থান)
মন্ত্রী।—(সৈনিকের প্রতি) যাও জয় সিং, বাইরে অপেক্ষা
সৈনিক।—যাে হুকুম।
(কুর্ণিশ করিয়া প্রস্থান)
মন্ত্রী ব্রাহ্মণ ! এই তােমার উত্তমর্ণ ? এত বড়
জংলী, এমন অসভ্য তােমার এই শেঠজী।
সিদ্ধান্ত।—আপনি বলতে পারেন মন্ত্রীমশাই! কিন্তু
কুশধ্বজ
দৈনিক দুঃখ
আমি তার সমালােচনা কৰ্ত্তে অক্ষম। ঋণের দায়ে আমি
তার কাছে কেনা হয়ে আছি, জিভ, আমার শুকিয়ে কাঠ
হয়ে গেছে, কাজেই কোনরকম মতামত প্রকাশ কৰ্তে আমি
অক্ষম।
মন্ত্রী।-বুঝেছি সিদ্ধান্ত ! তােমার
কাহিনীর মধ্যে একটা জিনিষ আজ আমি নিজের চোখে
দেখে যাচ্ছি। যাক, কুশধ্বজ যদি রাজী হয়, তাহলে
তােমার আর কোন দুঃখুই থাকবেনা। ওরকম দু’চারটে
শেঠজীকে তুমিই তখন কেনা-বেচা করতে পারবে। কিন্তু
কই? তােমার ছেলেরা তাে কেউ আছে না ব্রাহ্মণ !
সিদ্ধান্ত।-নেপথ্যে পদ শব্দ শুনিয়া) ঐ যে ছেলেদের
সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
(নেপথ্যে) বাবা ! তুমি আমায় ডেকেছ ? কি খাবার
এনেছ আজ ? দাও বাবা, শীগগীর খেতে দাও। আর যে
থাকতে পাচ্ছি না আমি।
(কুশধ্বজের প্রবেশ, তৎপশ্চাতে
তাহার বড় ভাই দুটিও প্রবেশ করিল।)
কুশধ্বজা-বাবা ! কাল রাত্তির হতে কিছুই খাই নি।
আমি যে দাড়াতে পাচ্ছি না। কৈ ? কি খাবার এনেছ ?
কুশধ্বজ
কোথায় খাবার ? খাবার কোথায় বাবা? -একি! তুমি
কথা কইছ না কেন? তােমার কি হয়েছে বাবা? ইনি কে?
ইনি কি তোমায় গালমন্দ করেছেন?
বল্লভ।-ওরে কুশে, তা নয়রে, তা নয়। দেখছি
দু’জনারই চোখে জল। বাবার চোখে জল, আর এই ভদ্দর
লােকের চোখেও জল দেখছি। বাবা! কি হয়েছে তােমাদের?
কুশধ্বজ ।তবু কথা কইছ না বাবা ? তবে ডেকেছ
কেন আমায় ? আমি তত দিবি ঘুমিয়েছিলুম, তবে ডেকে
পাঠালে কেন বাবা? একি ?-তবু তুমি চুপটি করে বসে
আছ বাবা ?
তােমার মাথা নীচু, চোখে জল ; মুখ তােমার
কালাে হয়ে গেছে ! বল, বাবা বল, কি এমন ব্যাথা তােমাকে
আজ এমন করে আকুল করে তুলেছে ? বল সব কথা খুলে
বল। তােমার পায়ে পড়ি বাবা, একটিবার সব কথা খুলে
বল। আমি এতটুকু বলে ঘৃণা কচ্ছ তুমি ? তাই কি কিছুই
আমাকে বলতে চাও না? কেন, আমি কি তােমার কোন
উপকারই করতে পারি না? আমার দ্বারা যদি সম্ভবপর
হয়, আমি আমার জীবন দিয়েও তােমার দুঃখু দূর করব
এটা তুমি বেশ ভাল করে জেনে রেখাে বাবা ।
সিদ্ধান্ত।-কুশধ্বজ !
সে কথা জানি বলেই আজ
কুশধ্বজ
তােমায় ডেকে পাঠিয়েছি। তুমি তো জান বাবা, অভাবের
তাড়নায় কতদিন তােমাদিগকে না খেয়ে থাকতে হয়েছে।
আমরাও অস্থিচর্মসার হয়ে পড়েছি। কিন্তু আজ আজ
তুমি যদি স্বীকার কর, তােমার যদি ইচ্ছা হয়, তবে এক
মুহূর্তে আমরা সমস্ত দারিদ্র হতে মুক্তি লাভ করতে পারি।
তাই তােমাকে ডেকেছি বাবা !
কুশধ্বজ ।--বাবা! সে কি কথা!-আমি ইচ্ছে করলে
তোমাদের দারিদ্র্য দূর হতে পারে! একথার অর্থ কি বাবা?
তবে কি আমায় বিক্রী করে তােমাদের অভাব দূর করতে
চাও ? বেশ, তাই যদি হয়, তবে তাতেও আমার আপত্তি
নেই। আমি হাসি মুখে তা স্বীকার কচ্ছি। কর বাবা,
আমায় বিক্রী করে সংসারের অবস্থা ভাল কর। আমি
হাসিমুখে সম্মতি দিচ্ছি।
সিদ্ধান্ত।আমি তাই করেছি কুশধ্বজ ! এই আমার
সম্মুখে
মহারাজ যযাতির প্রধান মন্ত্রী বসে আছেন। তােমায়
তার হাতে সঁপে দিলে তিনি আমাকে এক কোটি মোহর
দিবেন। এক কোটি মােহর ! একটি দু’টি নয়, এক কোটি
সে যে কত বড় সম্পত্তি, তুমি তা ভাল করে বুঝতে পারবে
। তুমি
কুশধ্বজ
!
বল্লভ।—আচ্ছা, এই মন্ত্রীমশাই আমাদের কুশেকে
নিয়ে কি করবেন ?
সিদ্ধান্ত।—ওরে, সেটা আমি ভাল করে বলতে পারব
। আমার মুখ থেকে সেটা বেরুতে চায়নারে বল্লভ।
সেটা আমি বলতে পারব না।
বল্লভ।তবে মন্ত্রী মশাই! আপনিই একটু দয়া করে
সে কথাটা খুলে বলুন না কেন ? আমাদের কুশেকে দিয়ে
আপনার কোন্ কাজটা হবে মন্ত্রী মশাই
মন্ত্রী।—ব্রাহ্মণ! সিদ্ধান্ত! কিছুই গােপন করবার
আবশ্যকতা দেখছি না। সব কথা খুলে বলাই ভাল।
ওহে বালক! আমাদের মহারাজ যযাতি খুব বড় একটা
যজ্ঞ কচ্ছেন। যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে তাঁর পিতার স্বর্গলাভ
হবে। কিন্তু আট বছরের একটি ব্রাহ্মণ-বালককে যজ্ঞের
আগুণে আহুতি দিয়ে তারপর যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে। তাই
মহারাজ ঘােষণা করেছেন, যে ব্রাহ্মণ তার আট বছরের
পুত্রকে যজ্ঞে অাহুতি দেবার জন্য আমাদের হাতে সপে
দিবেন, তাঁকে তাঁর পুত্রের মূল্য বাবদ এক কোটি স্বর্ণমুদ্রা
দেওয়া হবে।
বল্লভ।—কি ? আহুতি! আহুতি কি মশাই ? আগুণে
১৯
কুশধ্বজ
ফেলে দেওয়া ? বটে! কুশেকে যজ্ঞে অহুতি!--বাবা ! তবে
কি তুমি টাকার লােভে কুশেকে পুড়িয়ে মারতে রাজী
হয়েছ ? ছিঃ ছিঃ ! তুমিতাে কখনাে এমন ছিলে না বাবা !
এত বড় তােমার টাকার লােভ ! বল, বাবা বল, কি করবে
তুমি অমন টাকা নিয়ে ?
সিদ্ধান্ত।কি করব ? বল্লভ ! তােরা যখন ক্ষিদের
জ্বালায় ছটফট্ করে আমার কাছে এসে দাঁড়াস, তখন কেন
তােদের মিছে কথা বলে তাড়িয়ে দিতে হয় তা জানিস্ ?
বল্লভ।খুৰ জানি বাবা, খুব জানি। তার কারণ হচ্ছে
তুমি দরিদ্র। এই ত?—কিন্তু তা হলেও তুমি কত উন্নত,
কত মহান্ ! এক মুঠো ভাতের জোগাড় হলেই তুমি নিজে
না খেয়ে আমাদের খাইয়েছ ; জোগাড় না হলেও কত আশ্বাস
দিয়ে, কত আশার বাণী শুনিয়ে আমাদের সবাইকে সজীব
করে রেখেছ। সেই তুমি—অমন স্নেহময় তুমি আজ
কুশেকে পুড়িয়ে মারতে রাজী হয়েছ ? এ কি সম্ভব
বাবা ?
মন্ত্রী। নিতান্ত অসম্ভব হলেও তােমার পিতা তাতেই
সম্মতি দিয়েছেন। বালক! এর পরে কি তােমার সম্মতির
জন্যও আমাদের অপেক্ষা কৰ্তে হবে ?
২২
কুশধ্বজ কুশধ্বজ।—কিছুমাত্র প্রয়ােজন নেই মন্ত্রীমশাই! পিতা আমার যত কঠিন আদেশই করুন না কেন, তাই আমার শিরােধার্য। আমার দাদারা চিরদিনই আমাকে খুব ভাল- বাসেন। আমি চলে গেলে তাদের প্রাণে বিষম আঘাত লাগবে। কাজেই তারা যদি দু’একটি কড়া কথা বলেই ফেলেন, তবে তাদের ক্ষমা করবেন মন্ত্রী মশাই। মন্ত্রী।-সিদ্ধান্ত! সােণার চাদ ছেলে তােমার। এমন ছেলের তুমি পিতা, তুমি যথার্থই ধন্য। সিদ্ধান্ত।-মন্ত্রীবর! আমায় উপহাস করবেন না। স্বর্গের দেবতা শাপভ্রষ্ট হয়ে আমার কুটীরে এসে জন্মগ্রহণ করেছিল। কিন্তু এমন হতভাগা আমি যে, তাকে আগুনে বিসর্জন দিতে উদ্যত হয়েছি। কুশধ্বজ।--তুমি কাতর ইচ্ছ কেন বাবা ? তুমিই তাে শিখিয়েছ যে, মাঝে মাঝে নারায়ণ আমাদিগকে বিপদে ফেলে আমাদের ধৈৰ্য্য ও ভক্তির পরীক্ষা করে থাকেন। আমার তত মনে হচ্ছে বাবা, এও একটা বিষম পরীক্ষা মাত্র। তাই যদি না হয়, তবে আজ আমরা এমন অবস্থায় আসব কেন ? মন্ত্রী।-কুশধ্বজ ! জীবনে অনেক লোক দেখেছি, ২১
কুশধ্বজ
এমন একটি
অনেক রকম কথা শুনেছি। কিন্তু তােমার কথাগুলি এমন
মধুমাখা, যে তা যেন প্রাণে কেমন একটা আনন্দ ঢেলে
দেয়। তোমার মত ছেলে স্বর্গের পারিজাত।
রত্নকে, এমন সােনার চাদ দেবশিশুকে, আমি আজ আমার
এই বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর মুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছি,-এযে আমার
জীবনে কত বড় একটা অভিশাপ, তা তােমায় কেমন করে
বুঝিয়ে বব বাবা ?
(মন্ত্রী দুই হাতে তাহার চক্ষু মুছিলেন।
যাক, তাহলে এ বিষয়ে তােমার সম্মতি আছে বলে
আমি মেনে নিতে পারি, কুশধ্বজ ?
কুশধ্বজ। মন্ত্রীমশাই, আমি আহলাদের সহিত
আমার সম্মতি দিচ্ছি। কেবল তাই নয়, আমার বড় দু’
ভাই কাছে থাকতে, ক্ষুদ্র আমি, আমার দ্বারা যে সংসারের
এত বড় একটা উপকার হতে পারে, আপনি যে আমায় এমন
একটা মােগ্যতা দিয়েছেন—আপনার অনুগ্রহে আমি যে
এতটা উপযুক্ত বলে নিজকে প্রমাণ করুবার সুযােগ পেয়েছি,
সেজন্য আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনি আমার
প্রণাম গ্রহণ করুন মন্ত্রীবর !
বল্লভ।-ওরে সর্বনেশে কুশে ! তবে কি তােরও
কুশধ্বজ
মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? আগুনে পুড়ে মরবার জন্য এত
আগ্রহ তাের ! বেশ, তবে তাই হােক। মন্ত্রীমশাই!
শুধু কুশে নয়, কুশের
দয়া করে আমাকেও
নিয়ে চলুন। আমিও আপনাদের যজ্ঞে আহুতি হ’ব
মন্ত্রীমশাই !
মন্ত্রী।তা' কি হতে পারে বল্লভ ? রাজার আদেশ,
শুধু—অষ্টমবর্ষীয় ব্রাহ্মণ বালক যজ্ঞে আহুতি হবে। তার
চেয়ে কম বা বেশী বয়সের কোন বালককে আহুতি দেওয়া
হতে পারে না। বিশেষতঃ একটিমাত্র বালক আমাদের
প্রয়ােজন। তােমাকে নিয়ে কি করব বল্লভ ?
বল্লভ।--আপনার পায়ে পড়ি মন্ত্রীমশাই, হয় আমার
প্রাণের ভাই কুশেকে ছেড়ে দিয়ে যান, নয় আমাকে শুদ্ধ
ওর সঙ্গে যেতে অনুমতি দিন। কুশেকে ছেড়ে আমি যে
কোনরকমেই বেঁচে থাকতে পারব না।
কুশধ্বজ।কেন দাদা, অত কাতর হচ্ছ ? ঈশ্বরের
বিধান, পিতার ইচ্ছা ও তােমাদের সকলের আশীর্বাদ ও
ভালােবাসা মাথায় নিয়ে আমি আজ আত্মবলি দিতে যাচ্ছি।
একটা আজন্ম দরিদ্রের সংসারে লক্ষনীর উজ্জ্বল শ্ৰী ফুটে
উঠবে, ধন ধান্য ঐশ্বৰ্য্য সম্পদে তাতে সােনার আলাে হেসে
কুশধ্বজ
উঠবে—কিন্তু তা সবই কেবল আমার আত্মবলির উপর
নির্ভর কচ্ছে! এমন যে সুখের বলি, এমন যে গৌরবের
মৃত্যু, আমাকে তাতে বাধা দিওনা দাদা! তুমি ভালবেসে
আমায় আশীর্বাদ কর দাদা, আমায় বিদায় দাও।
(গান)
এবার আমি যাই—
পায়ের ধূলাে দাও গাে দাদা সময় বেশী নাই।
মরণ সেতাে সবার আছে
দু’দিন আগে দু’দিন পাছে
যে মরণে গৰ্ব আছে,—সেটাই আমি চাই ।
পরের হিতে আত্মবলি-সহজ সে তাে নয়—
মরণ হবে মনােহরণ,—কিসের মরণ ভয় ?
স্মরণ করেন রাজা আমার ভাগ্য ভালাে তাই
এবার আমি যাই।
(কুশধ্বজ হাঁটু গাড়িয়া দাদার সম্মুখে ভূপতিত হইল)
বল্লভ।—আয় কুশে, আয় ভাই !-(কুশধ্বজকে বক্ষে
জড়াইয়া) বিদায় ?তাের দাদার কাছে আজ তুই বিদায়
চাইতে এসেছি ভাই ? কেমন করে তােক বিদায়
দিবরে কুশে?
২৪
কুশধ্বজ
কুশধ্বজ।দাদা! তুমি যদি অমন ভাবে চোখের জল
ফেলতে থাক, তবে যে আমারও বুকটা দমে যাবে দাদা!
আমার যে বুকটা তা হলে নরম হয়ে যাবে। দাদা! ঐ
দেখ, বাবার দিকে চেয়ে দেখ। তুমি কি মনে কর যে,
বাবার কোন দুঃখু হচ্ছে না? তা হলে সেটা তােমার একটা
বিষম ভুল। বাবাকে সান্ত্বনা দাও, আর মাকেও সান্ত্বনা
দিও দাদা! আমি যাচ্ছি, তােমরা রইলে। মার কাছে
বিদায় চাওয়া হ’লনা। তার সঙ্গে দেখা কন্ট্রে গেলেই
গােলমাল বেধে যাবে। মা ও বাবার সেবার ভার এখন
হতে তােমাদের উপর রইল। বড়দা ! তুমি যে কিছুই
বলছ না ?
শ্ৰীনাথ-কুশে! আমি অবাক হয়ে গেছি তােদের
ব্যাপারখানা দেখে। আগুনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে
তাের এত আগ্রহ! আশ্চৰ্য্য বটে বয়সে তাের চেয়ে
অনেক বড় ; কিন্তু আজ তাের সাহস দেখে তােকে ‘দাদা
বলে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। কুশে ! একটা প্রশ্ন শুধু
আমার বুকের দোরে বার বার এসে আঘাত কচ্ছে।
প্রশ্নটা হচ্ছে এই যে, বাবা কার ক্ষিদে মেটাবার জন্য
এমন কাজে সম্মতি দিয়েছেন ?—তিনি কি আমাদের
২৫
কুশধ্বজ
;
অনেক
ক্ষিদেটা এত বেশী দেখেছিলেন যে, তার জন্য আজ তােকে
আগুনে পুড়িয়ে মারতে তিনি রাজী হয়েছেন? তিনি
কুশধ্বজ—দাদা! তােমার
শ্রীনাথ।-চুপ কর কুশে ! কোন দিন কথার অবাধ্য
ইনি। চলে যাচ্ছি আজ, জন্মের মত চলে যাচ্ছি
আজও আমার কথায় বাধা দিনে ভাই ! তাের সমুখে
আজ বুক খুলে আমার শেষ কথাটা বলে নি।
কথা কইব জীবনে, কিন্তু তুই তো আর শুতে আসৃবিনে।
বাবা! কুশের সামনে তােমাকে আজ দু একটি কথা
বলব, অপরাধ হলে আমার দোষ ক্ষমা করাে বাবা!
ক্ষিদের জ্বালা সইতে না পেরে জীবনে অনেক দিন
তোমাকে বিরক্ত করেছি, সে কথা সত্যি বটে। কিন্তু
তুমি একদিনও কেন বল্লেনা যে, ‘ওরে হতভাগা, যদি পেট
পূরে খেতে চাস, তবে কুশের মায়া ছেড়ে দে। পেটপূরে
খেতে হলে ওকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে হবে। তা
হলে-
কুশধ্বজ ।বড় দা !
শ্ৰীনাথ।—চুপ কর কুশে ! গলদটা কোথায়, তা বুঝিয়ে
দিচ্ছি। বাবা! তুমি যদি একবারও সে রকম আভাস দিতে,
২৬
কুশধ্বজ
==
তা হলে দেখতে তােমার শ্রীনাথ আর বল্লভ মাটি কামড়ে
পড়ে থাকত, তবু একটা কাতর যন্ত্রণাও তাদের মুখ থেকে
ফুটে বেরুত না, এক মুঠো ভাতের জন্যও তারা তােমাকে
আর কিছুমাত্র বিরক্ত করত না। কিন্তু সে কথা সােজাসুজি
বলে এ তুমি কেমন ব্যবস্থা কল্লে বাবা ? কাকে তুমি
যখন কোটি স্বর্ণমুদ্রার অধীশ্বর হয়ে শান্তিলাভের চেষ্টা
করবে,তােমার কুশে যে তখন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে
যাবে বাবা !
(শ্রীনাথের পতন ও মূচ্ছা)
সিদ্ধান্ত।-ওরে শ্রীনাথ, শ্রীনাথ ! কুশেরে আমার !
( সিদ্ধান্তের মূচ্ছা)
কুশধ্বজ-দাদা! দেখ, দেখ, বড়দা ও বাবা বুঝি
অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন। মার কাছে আর যাওয়া
হ’ল না দাদা! তিনি তা হলে কিছুতেই আমায় যেতে
দিবেন না, আমার অভাবে তােমরা তাকে সান্ত্বনা দিও
দাদা! মন্ত্রীমশাই ! আর দেরী করবেন না। চলুন, এই
অবসরে আমাদের সরে পড়া ভাল।
মন্ত্রী।—চল তবে, চল বাপ!—গােলাম আমি, হুকুমের
চাকর। তাই আজ অমন ধারা কাজ কত্তেও আমি বাধ্য।
কিন্তু আমার কৰ্ম্মফল যাবে কোথা? নরক—শত সহস্র
২৭
কুশধ্বজ
নরক-লক্ষ নরক আমার জন্য পরকালে অপেক্ষা কচ্ছে
তা আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি। চল, চল কুশধ্বজ, ঘাতকের
সঙ্গে চল। সারথি ! রগ সাজাও, এই মুহূর্তে।
( নেপথ্যে )-যে আজ্ঞা।
( কুশধ্বজকে টানিয়া লইয়া মন্ত্রীর প্রস্থান)
বল্লভ।—কোথা যাস, ওরে কুশে! সত্যি করেই চলে
গেলি ভাই ? কুশে !কুশেরে আমার!
( কুশধ্বজ ও মন্ত্রীর পশ্চাতে পাগলের মত বল্লভ
বেগে বাহির হইয়া গেল ! )
২৮.
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
স্থান-অযােধ্যার রাজসভা। সময়--সন্ধ্যা। মহারাজ
যযাতি, রাজ পুরােহিত, কুলগুরু ও অমাত্যবর্গ
আসনে উপবিষ্ট। সিংহাসনের উভয় পার্শ্বে
দেহরক্ষকগণ, ও দ্বারদেশে
প্রতিহারী দণ্ডায়মান।
যযাতি।~~গুরুদেব! মন্ত্রী যে এখনও ফিরে এলেন না।
আজ বহুদিন যাবৎ এই পুণ্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা হয়েছে ;
পিতার আদেশ—অষ্টমবর্ষীয় ব্রাহ্মণ-শিশুকে আহুতি দিয়ে
যজ্ঞ পরিপূর্ণ কৰ্ত্তে হবে, নৈলে তার স্বর্গলাভ অসম্ভব।
তাই একটি ব্রাহ্মণ-কুমারকে কিনে আার জন্য আমার
বহুদর্শী সুচতুর মন্ত্রীকে কোটি স্বর্ণমুদ্রা সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়েছি।
কিন্তু সেও যে আজ অনেক দিন ! তবু কৈ ? মন্ত্রী যে
এখনাে ফিরে এলেন না। গুরুদেব !
কুলগুরু।-মহারাজ ব্রাহ্মণবংশে কে এমন চণ্ডাল আছে
যে, অর্থলােভে তার অষ্টমবর্ষীয় বালককে অগ্নিতে আহুতি দিতে সম্মত হবে ? ১ম অমাত্য।—এ যে সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে মহারাজ! যযাতি।তবে উপায় ? আমার পিতার স্বর্গ কামনায় যে যজ্ঞের উদ্্যাপন করেছি, তার কি সম্পূরণ করতে পারব না? যাও, প্রতিহারী! জেনে এসাে, মন্ত্রী এখনও ফিরে এসেছেন কি? প্রতিহারী।-যে আজ্ঞে মহারাজ! (অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিল।) রাজ পুরােহিত।মহারাজ ! বুঝতে পারি না যজ্ঞ- ধিপতি বিষ্ণুদেবের এ আবার কোন অপরূপ লীলা! যা’ তা’ জিনিষ দিয়ে নয়, একটি অষ্টমবর্ষীয় ব্রাহ্মণ-শিশুকে যজ্ঞে আহুতি দিতে হবে । তা’ নৈলে তার যজ্ঞের পরিসমাপ্তি হবে না ! ওকি। ও কিসের শব্দ!-রথের শব্দ নয় ! ২য় অমাত্য।-হ মহারাজ! রথের ঘর্ঘর শব্দই বটে। নিশ্চয়ই যাতি।—প্রতিহারী।
কুশধ্বজ
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী।—মহারাজ !বায়ুবেগে রথ ছুটে আছে।
মন্ত্রিবর ও তার কোলে একটি বালককে দেখা যাচ্ছে।
যযাতি।-(ব্যাকুলভাবে অতি আহলাদের সহিত) যাও,
যাও প্রতিহারী, তাদের এখনই নিয়ে এসো।
প্রতিহারী ।যাে হুকুম।
(অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিল)
যযাতি।—(শান্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া) দেখি এইবার
পূর্ণ মনস্কাম ! (করযােড়ে ঊদ্ধ দৃষ্টিতে) পিতা! কতদিন ?
আর কতদিন তুমি এমন নরকযন্ত্রণা ভােগ করবে ? আশীর্বাদ
কর পিতা, তােমারই আদেশে যে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা
হয়েছে, আজ তার পরিসমাপ্তি হােক, তােমারও অক্ষয়
স্বর্গলাভ হােক।
(প্রতিহারীর সহিত মন্ত্রী, তৎপশ্চাতে
ম্লানমুখে কুশধ্বজের প্রবেশ।)
মন্ত্রী।—আর, এই রাজভৃত্য মন্ত্রীর অনন্ত নরক বাসের
ব্যবস্থা হয়ে যাক।
যযাতি।-সে কি কথা মন্ত্রিবর! আমার এই পুণ্যযজ্ঞে
আপনি আমার প্রধান সহায়। আপনার মুখে এমন কথা কেন ?
কুশধ্বজ
মন্ত্রী।-কেন ? তা একবার এই বালকের চাদপান।
মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তারপর বলুন মহারাজ!
এমন দুগ্ধপােষ্য সুকুমার ব্রাহ্মণ বালককে যে মৃত্যুর মুখে
টেনে নিয়ে আসে, তার বিধান কি স্বর্গ ? না নরক?
কুলগুরু।—বুঝেছি মন্ত্রী, কোথায় তােমার আঘাত।
যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছেন রাজা, তার পিতার আদেশে।
আর তুমি তার সাহায্য কচ্ছ কর্তব্যের অনুরােধে। সুতরাং
মুক্ত তুমি, পাপপুণ্যের বিচার হ’তে তুমি সম্পূর্ণ মুক্ত।
যাক, এখন সে চিন্তার সময় নয়। (কুশধ্বজের প্রতি)
এসে বালক। তুমি একবার এইখানে এসে বস
দেখি।
(কুশধ্বজ কুলগুরুর পার্শ্বে যাইয়া বসিল)
( চিবুকে হাত দিয়া) আ মরি ! মরি! স্বর্গ হতে একটা
চাদের কণা যেন আজ এই রাজসভাতে খসে পড়েছে।
বালক ! তােমার নাম ?
কুশধ্বজ ।শ্ৰীকুশধ্বজ দেবশর্মা।
কুলগুরু।—তােমার পিতার নাম কি বালক ?
কুশধ্বজ ।-আমার পিতার নাম শ্ৰীসিদ্ধান্ত দেবশৰ্ম্মা।
যযাতি।—পিতার নামের পূর্বে ‘শ্রী বলছ বালক !
৩২
কুশধ্বজ
তবে তিনি বেঁচে আছেন ? পিতা বেঁচে আছেন, কোন্
প্রাণে তিনি সামান্য অর্থলােভে
কুলগুরু।—মহারাজ ! একি দুর্বলতা !আপনার
পক্ষে-এমন দুর্ববলতা আজ শােভা পায়না মহারাজ!
কর্তব্য।
শুধু কঠোর কর্তব্যের কথা চিন্তা করুন
রাজন!
মন্ত্রী।—হাঁ, ঠিক বলেছেন গুরুদেব। যে কৰ্ত্তব্যের
অনুরােধে-বৃদ্ধ আমি-পুত্রের পিতা হয়ে, আর এক হত
ভাগ্য পিতার বুক থেকে এমন একটা আনন্দের খনি কেড়ে
নিয়ে এসেছি ; যে কৰ্ত্তব্যের অনুরােধে এর পীড়িত
মতাকে না জানিয়ে চিরদিনের মত তার অন্ধের নড়িকে চুরি
করে নিয়ে এসেছি ; যে কর্তব্যের অনুরােধে এর অচৈতন্য
পিতা ও এক ভ্রাতাকে অসহায় অবস্থায় রেখে, ও পর
ভ্রাতাকে কোনরূপে রথের চাকা হতে মুক্ত করে পালিয়ে
এসেছি,সেই কৰ্তব্য, সেই বজের মত কঠোর কর্তব্য আজ
আপনাকেও দানব করে তুলুক মহারাজ!
রাজপুরােহিত।মহারাজ! বৃথা সময় নষ্ট করে কোন
লাভ নেই। অনুমতি হয় তাে শুভকার্য্যের আয়ােজন করা
যেতে পারে।
. কুশধ্বজ যযাতি । গুরুদেব! তা হলে আদেশ করুন- যজ্ঞসমাপ্তির উদ্যোগ করা যাক। কুলগুরু।—হ মহারাজ ! শুভমুহূর্তে যজ্ঞ পরিপূর্ণ হােক। আমি স্বচ্ছন্দে তাতে অনুমতি দিচ্ছি। ( কুশধ্বজের প্রতি) ওহে বালক, কুশধ্বজ ! তােমাকে যে কিজন্য এখানে আনা হয়েছে, তা তােমার নিশ্চয়ই জানা আছে ? কুশধ্বজ। ঠাকুর ! আমি তা বেশ ভালরূপেই জানি এবং আমি সেজন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছি। কুলগুরু।—উত্তম! তবে শাস্ত্রীয় বিধান মতে তােমাকে এখন স্নান করে মালাচন্দন ও পবিত্র বস্ত্রে সুশােভিত হতে হবে। তােমাকে তাহলে এখন স্নান কৰ্তে যেতে হয় বালক। কুশধ্বজ ।আপনারা যা আদেশ করবেন তাই হবে গুরুদেব ! শুধু একটা প্রার্থনা আছে। যজ্ঞকুণ্ডে লাফিয়ে পড় বার আগে আমি একবার আমার মাকে জন্মের মত ডেকে নেব। কুলগুরু।—আচ্ছা, তা নিও। কিন্তু তার চেয়ে তােমার উচিত হবে যজ্ঞের অধীশ্বর ভগবান্ বিষ্ণুর চরণে আত্মসমর্পণ করা। ৩৪
কুশধ্বজ
কুশধ্বজ ।--সে কিরকম করে করব গুরুদেব ? আমি
যে মন্ত্র তন্ত্র, পূজাবিধি কিছুই জানিনা।
কুলগুরু।—কিছু দরকার নেই বালক! শুধু মুখের
কথায়—একমনে তাকে ডেকে বলবে যে “হে নারায়ণ।
তুমি আমাকে গ্রহণ কর,-সব দুঃখ, ফলাফল সমস্তই আজ
তােমার পায়ে ঢেলে দিচ্ছি, আমার নিজকে তােমারই
চরণে বিলীন করে দিচ্ছি ভগবন্!”
কুশধ্বজ ।—গুরুদেব ! কি সুন্দর আপনার উপদেশ ।-
প্রাণে আমার নূতন ঢেউ খেলে যাচ্ছে !—জয় গুরুদেব ?
জয় ভগবন! জয় নারায়ণ ! জয় লক্ষীনারায়ণ ।
( কুশধ্বজ চক্ষু মুদিয়া ভক্তিভরে কপালে
মাথা ঠেকাইয়া উদ্দেশ্যে প্রণাম করিল।
তৎপর চক্ষু খুলিয়া কহিল।)
প্রস্তুত ! প্রস্তুত আমি গুরুদেব ।
কুলগুরু।—উত্তম! প্রতিহারী । যাও বালককে নিয়ে
যাও। স্নান ইত্যাদি মাঙ্গলিক কাৰ্য শেষ করে একে যজ্ঞ
কুণ্ডের কাছে নিয়ে এসাে।
প্রতিহারী।-যাে হুকুম!
(কুশধ্বজকে লইয়া প্রস্থান। সভার সকলেই চক্ষু মুছিল।)
কুশধ্বজ
যযাতি।-—চলে গেল। একটা বিদ্যুতের ছটা, করুণার
প্রতিমূর্তি, ভক্তির উৎস, প্রেমের দেবতা—বিশ্বের অপরূপ
একটা সৌন্দৰ্য্য, আনন্দের জলধি এই বালক কুশধ্বজ !
মুহূর্তের মাঝে বুকের পাতে একটা অক্ষয় দাগ কেটে চলে
গেল!
মন্ত্রী-মহারাজ! দুর্বল চিন্তা এসে আপনাকে ব্যাকুল
করে ফেলেছে ? কিসের চিন্তা! আট বছরের ব্রাহ্মণ-বালক
যে দুর্বলতা স্বেচ্ছায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এসেছে সে দুর্বলতা
কি আপনার পক্ষে শােভা পায় মহারাজ।
যযাতি।-স্বেচ্ছায় কি এসেছে এই বালক ?
মন্ত্রী। মহারাজ! বালক স্বেচ্ছায় আপনার যজ্ঞে
বলি হ’বার জন্য আত্মনিবেদন
কৰ্ত্তে এসেছে।
আজন্ম
ভিখারী এই ব্রাহ্মণের সন্তান, পিতার দৈন্য দশা দূর করবার
জন্য স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে ডেকে নিয়েছে। যা আর সে কথায়
লাভ কি মহারাজ? অতীত যা তা চলে গেছে। এখন
শুধু বৰ্তমান আমাদের সমুখে পড়ে আছে। কেবল বর্তমান
চিন্তা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
রাজপুরােহিত।হ মহারাজ! “গতস্য শােচনা নাস্তি,”
তবে আর ভেবে কি ফল? এতক্ষণে বালককে বােধ হয়
কুশধ্বজ
যজ্ঞ কুণ্ডের কাছে আনা হয়েছে। আমাদেরও এখন সেখানে
যাওয়াই সঙ্গত।
যযাতি। তবে তাই হােক। চলুন তবে গুরুদেব!
চলুন মন্ত্রীমশাই, আপনারা সবাই চলুন। এখন যজ্ঞ সমাপ্তির
আয়ােজন করা যাক।
( রাজা গাত্রোখান করিলেন এবং অগ্রে
কুল গুরু, রাজ-পুরােহিত তৎপশ্চাতে রাজা,
মন্ত্রী ও অন্যান্য অমাত্যবর্গ সকলেই সভাগৃহ
পরিত্যাগ করিলেন।)
,
৩৭
দ্বিতীয় দৃশ্য
[ দৃশ্য। অযােধ্যা—প্রাসাদের সম্মুখস্ত প্রান্তর। তাহার এক
দিকে চন্দ্রাতপের নীচে রাজা, মন্ত্রী, কুলগুরু, রাজপুরােহিত
ও অমাত্যবর্গ সমাসীন। অপরদিকে দৃশ্যের বহির্ভাগে
মুক্ত আকাশের নীচে প্রকাণ্ড যজ্ঞকুণ্ড। তাহার
উজ্জ্বল আলােতে চাপের নিম্নস্থ
কিয়দংশ উদ্ভাসিত হইয়া
উঠিয়াছে।]
(নেপথ্যে গান গাহিতে গাহিতে জনৈক ভিক্ষুকের প্রবেশ)
(গান)
কিসের করিস ভয়
তােৱা কিসের করিস ভয় ?
ওই চেয়ে দ্যাখ অভয় হাসি হাসছে জ্যোতির্ময় ।
দুর্দিনে ওই চোখের জলে
কাঁদছে সবাই দলে দলে,
হাছি আমি সুখের হাসি, নাই কিছু সংশয়।
অন্ধকারে ঝা-ঝড়ে
একতারাটি বক্ষে ধরে’
কেবল, হাসি কেবল নাচি-জয় মৃত্যুঞ্জয় ।
-
কুশধ্বজ
সবাই ঘৃণা করবে যারে
পরাই আমি মালা তারে,
ওদের যত জ্বালা আমার প্রাণের মাঝে রয়।
(গানের শেষ চরণ মিলিয়া যাইবার পূর্বে গান শুনিতে শুনিতে
কুশধ্বজের প্রবেশ। সে সবে মাত্র স্নান শেষ করিয়া মালা চন্দনে
ও বহুমূল্য নূতন লাল পাট কাপড়ে সুশােভিত। বিপরীত দিক
হইতে যজ্ঞকুণ্ডের উজ্জ্বল আগুণের ছটায় তাহার সমস্ত দেহ ঝম
করিতেছে। কুশধ্বজের পশ্চাতে রাজভৃত্যগণ।)
ভিক্ষুক।-ভিক্ষা দাও বাবা আমি ভিক্ষুক।
কুশধ্বজ ।-একি ঠাট্টা কচ্ছ ভিক্ষুক! দরিদ্র ব্রাহ্মণের
ছেলে আমি। তােমায় আমি কি ভিক্ষা দিতে পারি ?
যাও, ঐ মহারাজ বসে আছেন—তার কাছে যেয়ে ভিক্ষা চাও,
খুসী হয়ে বাড়ী ফিরবে।
ভিক্ষুক।—সে হয়না বাবা! তা হলে যে তুমি ও
এতক্ষণে খুসী হয়ে বাড়ী ফিরে যেতে। কই বাবা, তুমি
তাে খুসী হতে পারনি।
কুশধ্বজ ।-কেমন করে বুঝলে আমি খুসী হতে
পারিনি।
কুশধ্বজ
অনন্ত
ভিক্ষুক।বলছে তােমার চোখ মুখ, বলছে তােমার
কথার সুর। তা যাক, তােমার কাছে কি
কিছুই নেই
বাবা?
কুশধ্বজ ।তােমাকে দেবার মত আমার কিছুই নেই।
এই পােষাক পরিচ্ছদ যা কিছু দেখছ এ সমস্তই রাজভাণ্ডারের।
আমার এতে কিছুমাত্র অধিকার নেই।
ভিক্ষুক।—আমায় মিথ্যা বলােনা বাবা! তবু তােমার
একটা অমূল্য সম্পত্তি আছে—সেটি হচ্ছে তােমার প্রাণ,
যার ভিতরে তােমার
ভালবাসা লুকানাে
আছে।
কুশধ্বজ ।—ভিক্ষুক! তােমার কথাগুলি হেঁয়ালীর
মত, আমি পরিস্কার বুঝতে পাচ্ছিনা। আমার প্রাণের কথা
বলছ তুমি ? আমার প্রাণের মালিক এখন এই যজ্ঞদেবতা
বিষ্ণু—স্বয়ং লক্ষীনারায়ণ। আমি তাকেই আমার প্রাণ
নিবেদন কর্তে যাচ্ছি।
ভিক্ষুক।তবে তাই কর বালক, তাই কর।
ভগবানের পায়ে প্রাণ ঢেলে দিতে যাচ্ছ, তবু তুমি ভিক্ষুক ।
অসম্ভব কথা বালক! তুমি এখন রাজরাজেশ্বর। বল,
বালক, বল -
কুশধ্বজ
ওঁ ধ্যায়েৎ সদা সবিতৃমণ্ডল মধ্যবর্তী নারায়ণঃ,
সরসিজাসন-সন্নিবিষ্ট কেয়ুরবান্ কনককুণ্ডলবা,
কিরীটী হারী হিরন্ময় বপুঃ ধৃতশঙ্খচক্রঃ।
( ভিক্ষুক ধীরে ধীরে বলিতে লাগিল, কুশধ্বজ সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে
তাহা আবৃত্তি করিয়া গেল )
ভিক্ষুক বল বালক, জয় নারায়ণ মধুসূদন, জয়
লক্ষীনারায়ণ হরি ! জয় গােবিন্দ মধুসূদন, জয় লক্ষীনারায়ণ
হরি।
( কুশধ্বজ মন্ত্রাবিষ্টের ন্যায় তাহা
আবৃত্তি করিয়া গেল )।
(গান)
ধ্যান ভেঙ্গে আজ শুনতে পেলাম
ও কার প্রাণের গান।
তাইতাে আমি রইতে নারি
আকুল করে প্রাণ।
ভক্ত যখন আকুল ডাকে
প্রাণের জনে ডাকতে থাকে।
গবে তখন কঠোর হৃদয়,
টবে আসনখান্।
৪১
কুশধ্বজ
খোঁজ পেয়েছি সেই জনারে
প্রাণ দিয়ে যে ডাকতে পারে,
আজকে হতে ঘুচে যাবে
সকল ব্যবধান
ধরায় নেমে আসবে এখন
প্রেমের ভগবান্।
(গাহিতে গাহিতে চকিতের মধ্যে ভিক্ষুক অদৃশ্য হইয়া গেল।)
কুশধ্বজ।একি আশ্চৰ্য্য।
কে এই ভিক্ষুক ?
কুলগুরু।-(তাহার আসন হইতে উঠিয়া অগ্রসর হইয়া)
বালক কুশধ্বজ ! তােমার মহা-সৌভাগ্য আজ। নিশ্চয়ই
কোন ভিক্ষুক-বেশী দেবতা আজ তােমাকে ধ্যানের মন্ত্র
শিখিয়ে দিয়ে গেলেন। যাক, এইবার প্রস্তুত হও বালক!
কুশধ্বজ-এক মুহূৰ্ত্ত, গুরুদেব ! শুধু ক্ষণকাল
অপেক্ষা করুন-আমি জন্মের মত আমার মাতাপিতাকে
প্রণাম করে নিই।
( কুশধ্বজ মাটিতে পড়িয়া প্রণাম করিল
এবং অল্পক্ষণ পরেই করযােড়ে অগ্নি
কুণ্ডের দিকে অগ্রসর হইয়া ভীতভাবে
কহিল )
মা! মা! আমার যে ভয় কচ্ছে মা। কোথায় মা অভয়-
82
কুশধ্বজ
দায়িনি! কোথায় বিপদবারণ শ্রীমধুসূদন! আমায় নির্ভয়
কর বাবা, আমার সাহস দাও, বল দাও, শক্তি দাও।
হে নায়ায়ণ ! হে লক্ষীনারায়ণ ! আমার মাকে সান্ত্বনা দিও
প্রভাে।—মা, মা আমার ! তুমি কি এতক্ষণে জানতে পেরেছ
মা, যে তােমার কুশে, তােমার বড় আদরের কুশধ্বজ আজ
কেমনভাবে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে ? মাগাে! আমার পায়ে
কাঁটা ফুটলে যে তুমি অস্থির হয়ে যেতে মা ! কিন্তু আজ ?
আজতাে তুমি আমাকে রক্ষা কর্তে পাচ্ছ না।
রক্ষা ! কে রক্ষা কর্তে পারে ?-রাজ্যের রক্ষক রাজা
আজ আমাকে আগুনে আহুতি দিচ্ছেন ; বিশ্বের রক্ষক
স্বয়ং বিষ্ণু ও লক্ষীনারায়ণ আমাকে গ্রহণ কচ্ছেন, তবে
কে আর আমাকে রক্ষা কৰ্তে পারে ?
জয় বাবা লক্ষীনারায়ণ ! তােমারই ইচ্ছা পূর্ণ হােক।
আমায় সাহস দাও বাবা ! আমার যে বড় ভয় কচ্ছে।
লক্ষীনারায়ণ ! আমায় গ্রহণ কর তুমি ।
ওঁ ধ্যায়েৎ সদা সবিতৃমণ্ডল মধ্যবর্তী নারায়ণ !
সরসিজাসন সন্নিবিষ্ট কেয়ুরবান্ কনককুণ্ডলবান,
কিরীটী হারী হিরন্ময়বপুঃ ধৃতশঙ্খচক্রঃ।
(কুশধ্বজ চক্ষু মুদ্রিত করিয়া করযােড়ে
প্রণাম করিল এবং পশ্চাতের দিকে
তাকাইয়া কুলগুরুকে কহিল )
;
কুশধ্বজ
আমি যে নিজে পেরে উঠছি না গুরুদেব ! কাউকে
আদেশ করুন, আমাকে পেছন হতে ধাক্কা মেরে অগ্নিকুণ্ডে
ফেলে দিক। আমি ততক্ষণ আমার দেবতাকে ডাকতে
থাকি।
কোথায় ? কোথায় তুমি লক্ষীনারায়ণ ! আমায় সাহস
দাও। তােমার কোলে স্থান দাও বাবা ! আমায় গ্রহণ কর
নারায়ণ! লক্ষীনারায়ণ !—জয় লক্ষীনারায়ণ !
(কুলগুরুর ইঙ্গিতে হঠাৎ রাজভৃত্যগণ ধাক্কা
দিয়া কুশধ্বজকে দৃষ্টির বহির্ভাগে অগ্নিকুণ্ডের
মধ্যে ফেলিয়া দিল)
কুশধ্বজ।-(পড়িবার সময় ক্ষীণস্বরে) বাবা লক্ষী-
নারায়ণ!
( কুশধ্বজ অদৃশ্য হইয়া গেল।)
নারায়ণ।—(নেপথ্যে) আয়রে বাপ! বাপরে আমার !
( কুশধ্বজকে কোলে লইয়া নারায়ণের আবির্ভাব)
আমি যে সারাটি দিন শুধু তােরই জন্য এই আগুনের মাঝে
বসে আছি বাপ! ভয় কি ! ভয় কিরে তাের কুশধ্বজ !
( সভাস্থ সকলেই বিস্মিত ও নির্বাকভাবে
পরস্পরের মুখের প্রতি তাকাইতে লাগিল।)
৪৪
কুশধ্বজ
নারায়ণ !-(রাজার প্রতি) মহারাজ!
পরিপূর্ণ যজ্ঞ তব আজ
তৃপ্ত তব সর্বব পিতৃকুল। যাহ ত্বরা
নিয়ে কুশধ্বজে পুত্রহারা জননীর পাশে।
(কুশধ্বজের প্রতি)
চাদের লাবনি মাখা বাছনি আমার,
ওরে ভক্ত শিশু কুশধ্বজ ! যাহ ত্বরা
জননীর বুকে। দরিদ্র কুটীর তব
সুখ হাসি সম্পদের অতুল বিভায়
গরবে উজল হাে করি আশীর্বাদ ?
( কুশধ্বজকে রাখিয়া নারায়ণের অন্তর্ধান )
যযাতি।-(ছুটিয়া আসিয়া) কুশধ্বজ ! একি আশ্চৰ্য্য
ব্যাপার। সার্থক জনম তােমার বালক। ধন্য, ধন্য তুমি ।
ধন্য তােমার মাতা পিতা !
মন্ত্রী।-(কুশধ্বজকে কোলে লইয়া) এসে বালক।
মহারাজ! অনুমতি করুন—বাপ মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে
যাকে আমি নিয়ে এসেছিলাম, আমিই আবার তাকে সেই
বাপ মায়ের বুকে রেখে আসি।
কুলগুরুমহারাজ ! সারাজীবন যােগ তপ করেও
5
কুশধ্বজ
আমরা যার দেখা লাভ কৰ্তে পারিনি, এই বালক কুশধ্বজ
তা অনায়াসে করেছে। এমন বালকের সংস্পর্শে আজ
আমরা ধন্য আমাদের রাজসভা ধন্য এবং সমগ্র আযােধ্যাপুরী
আজ পবিত্র তীর্থে পরিণত হয়েছে।
জনৈক প্রতিহারীর প্রবেশ )
প্রতিহারী।—( অভিবাদন করিয়া) মহারাজ ! এই
বালককে অন্তঃপুরে পাঠাবার জন্য মহারাণী অনুরােধ
জানিয়েছেন।
রাজ পুরােহিত।হ মহারাজ! আজ সকলেই একে
দেখবার জন্য, এর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে
উঠেছে। আজ কারও আকাঙ্ক্ষাই অতৃপ্ত রাখা উচিত হবে না।
কুশধ্বজ। আমি মার কাছে যাব মহারাজ! মার জন্য
আমার মন বড় অস্থির হয়ে উঠেছে। দয়া করে আমাকে
মার কাছে পাঠিয়ে দিন। মা বােধ হয় এতক্ষণে কেঁদে
কেঁদে পাগল হয়ে মাথা খুঁড়ে মরছেন।
যাতি।কোন ভয় নেই বাপ! আমি এখনই তােমাকে
মন্ত্রীর সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শুধু এক মুহূর্তের জন্য
তােমাকে রাণীর কাছে যেতে হবে, তারপর তুমি তােমার
মায়ের বুকে হাসিমুখে ফিরে যাবে।
৪১
কুশধ্বজ
মন্ত্রী।—ফিরে যাবে, কিন্তু নিয়ে যাব আমি। মৃত্যুর
মুখে নিয়ে আসবার কালে এই হতভাগ্য বৃদ্ধ মন্ত্রী কাজে
লেগেছিল ; সুতরাং মায়ের ছেলে মায়ের বুকে দেবার সময়
তা কাজে লাগবে না কেন? আমিই তােমাকে নিয়ে যাব
কুশধ্বজ ! আর বলে আসব তােমার বাপ-মাকে, যে কেমন
করে স্বয়ং নারায়ণ এসে তােমাকে অগ্নিকুণ্ড হ’তে তুলে
রেখে গেছেন।—সেই ছােট্ট পাড়াটিতে আমি একটা আনন্দের
তুফান, ভক্তির বন্যা বইয়ে দিয়ে আসব কুশধ্বজ !
মহারাজ! আমাকে এ গৌরব হতে বঞ্চিত করবেন না।
এই আমার শেষ অনুরােধ।
৪৭
উজ্জ্বল দৃশ্য
( কুশধ্বজকে লইয়া ঋষিবালকগণের প্রবেশ।)
(গান)
আয়রে কুশী, বেজায় খুসী,
মনটা সবার ভাই,
তাের পরশে আজকে মােরা
ধন্য হয়ে যাই।
আয়রে সবাই দলে দলে,
ফুলের মালা পরাই গলে ;
চন্দনে আজ সাজাই ওরে--
বন্দনা ওর গাই।
বয়সে ও সবার ছােট--
আজকে সবার বড়-
সাজাও ওরে রাজার সাজে,
পায়ে প্রণাম কর ।
ওরে কুশী এদিকে আয়
তাের নামে আজ পরাণ মাতার
মরদেহে তুই অমর হলি
সন্দেহ তার নাই ।
( যবনিকা পতন)
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.