Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Mouna O Mukhar Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মৌন ও মুখর
No text on this page.
মৌন ও সুখ
শ্রীমমতা মিত্র
দাম এক টাকা
বিচিত্রা নিকেতন
২৭১, ফড়িয়াপুকুর থ্রীট, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
পৌষ, ১৩৪১
শ্রীশৈলেন্দ্রচন্দ্র বসু ( ২নং গোপাল বসু লেন, কলিকাতা) কর্তৃক
টলাই প্রেম হইতে মুদ্রিত।
শান্তিনিকেতন
কল্যাণীয়া
তােমার বইখানি পড়ে দেখলুম। কবিতার ভিন্ন ভিন্ন
অবস্থা আছে। তার মধ্যে যে আলোেক জ্বলে উঠলে সে
জ্যোতিষ্কলােকে স্থান পায় সর্বদা তার সন্ধান মেলে না।
অদূরদেশ ও অচিরকালের কীর্তিতে যদি তুমি সন্তুষ্ট হতে
পারে তবে সেই সন্তোষের কারণ তােমার আছে। ভবিষ্যৎ
আছে। আশীৰ্বাদ করি তােমার সাধনা সফল হবে। ইতি
২৯ অগ্রহায়ণ ১৩৪১
শুভাকাক্ষী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
No text on this page.
নিবেদন এই পুস্তকের অধিকাংশ কবিতা বিচিত্রা, জয়শ্রী, উদয়ন, বঙ্গলক্ষ্মী, দেশ প্রভৃতি সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, কয়েকটি নতুন। পূজনীয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আশীৰ্বাদ লাভের সৌভাগ্যে আমি গৌরবান্বিত। তাঁর বাণী অন্যত্র মুদ্রিত হলাে। প্রতিভাবান চিত্র-কলা-কুশলী শ্ৰীযুক্ত ব্ৰতীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচ্ছদ-পটের সুদৃশ্য ছবিখানি এঁকে দিয়েছেন। অধিকাংশ গানে সুর সংযােগ করেছেন সুপ্রসিদ্ধ সুর- শিল্পী শ্ৰীযুক্ত হিমাংশুকুমার দত্ত। সেগুলি বিশিষ্ট গীত- শিল্পীরা গ্রামােফোনে রেকর্ড করেছেন। আমার পূজনীয় পিতা সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত কালীচরণ মিত্র ও পিতৃবন্ধু শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত শৈলেন্দ্রচন্দ্র বসু প্রফ সংশােধন ব্যাপারে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। সুবিখ্যাত ঔপন্যাসিক শ্রদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সহায়তা নানা ভাবে পেয়েছি বই প্রকাশ সম্পর্কে। এদের সকলেরই কাছে আমি ঋণী।
৬১ পৃষ্ঠায় তৃতীয় ছত্রে “সরমে আঁখি পাত” এর জায়গায়
সহৃদয় পাঠক পাঠিকাগণকে “লাজে নয়ন পাত পড়তে
অনুরােধ করি।
প্রভূত যত্ন নেওয়া সত্ত্বেও বইখানির দু’চার জায়গায়
বিরাম ও ইলেক চিহু ব্যবহৃত হয় নি, এজন্য পাঠকবৃন্দের
কাছে মার্জনা চাই। ইতি
কলিকাতা
শুক্লা-দ্বাদশী
১লা পৌষ, ১৩৪১
শ্রীমমতা মিত্র
উৎসর্গ
সরমারাধ্য
পিতা
ও মাতার
যুক্ত চরণকমলে
No text on this page.
সূচী বিষয় পৃষ্ঠাঙ্ক ১ মৌন ও মুখর শ্রেষ্ঠ উপহার আকাক্ষা ৫ অহল্যা ৮ ১১ মুখর দেহ পসারী ১২ স্বপ্ন ১৭ যাত্রাপথে ১৮ :: অন্তরতম ২০ সন্দেহ ২২ ••• ২৪ ••• গ্রীষ্মের রূপ মিলন-ক্ষণে ২৬ ২৭ ••• বর্ষা দূর সিন্ধু পার হতে বাদল প্রভাত ২৮ ৩২ ...
• বিষয় পৃষ্ঠাঙ্ক শরৎ ৩৪ ৩৫ ৩৭ শুধাতে এলে দু’আঁখি মেলে সতী দুঃখের সার্থকতা শারদ-শ্ৰী ৪ ২ ৪৪ ••• ৪৫ • • • ৪৭ ৪৯ ব্যাকুলতা দেবদাসী যেদিন তুমি রবে না আর কাছে . মালা যাচনা দু’টি কথা ৫১ ৫২ অসময় প্রলয়-লীলা ••• ৬০ ৬২ ০ ০ ০ ৬৪ বাঙলার মেয়ে মিনতি ৬৮
মৌন ও মুখর
তােমারে দেখেছি যবে পুলকে পরাণ মম
হয়েছে চঞ্চল,
শারদ নিশির শুভ্র জ্যোছনা-ধারার সম
আজি সে উছল।
তুমি ত’ জানে না আজো তােমারি আঁখির আলাে
কোন্
উষা-কালে
সহসা পরশি’ মােরে হরিয়া সকল কালাে
আমারে রাঙালে।
{
মৌন ও মুখর
২
দূর হ’তে শুনি যবে মৃদুল পায়ের ভাষা
দেখি আঁখি মেলে,
চকিতে চমকে বুকে তরুণ মধুর আশা,
বুঝি তুমি এলে।
শিহরি সারাটি দেহ অসহ হরষ ভরে
করে টলমল,
চাহে না আমার আঁখি তােমার নয়ন 'পরে
সরম-বিহ্বল।
মুখর সকল দেহ, হিয়ার মাঝারে মন
আছে মৌন হয়ে,
যে কথা বলিতে চাই তাই হয় সুগােপন,
মনে যায় র’য়ে ।
হৃদয় দেহের সাথে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ চলে,
শান্তি সে কোথায় ?
গহন তান্তরে মাের প্রেমের মাণিক জ্বলে,
চিনে নিও তায়।
শ্রেষ্ঠ উপহার
নিভৃত অন্তর মাঝে ব’হে চলে যে স্নেহের ধারা
ঠেলিয়া উজানে,
কভু সে প্রকাশ পায়, কখনাে বা আপনাতে হারা-
বাধন না জানে।
মৌন মূক সেই স্নেহ ছিল ভরি’ তব চিত্ত-তল,
অনির্বাণ আলাে তা’র, দীপ্তি তার চির-অচপল
হিয়ার অমৃত তব আজি হয়ে আশীষ- উতল
এলাে মাের প্রাণে।
মৌন ও মুখর
৩০
সে সুধা পেয়েছি আমি, অমৃতের জেনেছি আস্বাদ
আজিকার ভােরে,
উষার উদয় সাথে লভিয়াছি পরম প্রসাদ
আপনার করে।
সহস্রের মাঝ হতে কাছে মােরে নিয়েছিলে টানি,
মায়া দিয়ে, প্রাণ দিয়ে বুঝেছিলে অন্তরের বাণী।
সেই স্মৃতি মনে করে পাঠায়েছ আশীৰ্বাদখানি
প্রীতি-রসে ভরে
পুরাণে। বরষ, ওগো, ধীর পায়ে সকরুণ হেসে
যায় দূরে চলি’,
নবীন অতিথি কা'র দীপ্ত আশা বিশ্ব-দ্বার-দেশে
উঠিছে উছলি'।
যে মধু লেগেছে মনে রাত্রি-শেষ আলােক-সম্পাতে
আজি তাই আনিয়াছি বৎসরের প্রথম প্রভাতে
শ্রেষ্ঠ উপহার মম দিতে তব ওই দু’টি হাতে
ভরিয়া অঞ্জলি।
আকাঙ্ক্ষা
প্রভাত হলে রম্য পুষ্প-বনে
নানা বরণ তু আমি ফুল,
তোমার লাগি' গাথব সযতনে
এটি মালা সুগন্ধ-আকুল।
যত্নে গাঁথা আমার ফুল-হার
দেব তােমার কণ্ঠে উপহার।
আমার গলায় কত যে সুর ফোটে
তভারের বেলা করুণ ভৈরবীতে,
বেহাগ রাগ উচ্ছ্বসিয়া ওঠে
রাত্রি হলে ছন্দ-মধুর গীতে।
সেই সে আমার সুরের কল্প-লােকে
থেক তুমি স্বপন-মাখা চোখে।
২
মৌন ও মুখর
বিভল-করা ফাগুন পূর্ণিমাতে
কী আবেশে বিশ্ব হয় তাের,
তখন শুধু তুমিই থেক' সাথে,
ব’ তােমায় গােপন আশা মাের।
নয়ন মােদের রইবে নিদ্রাহারা,
তন্দ্রাহীন জাগবে শশী তারা।
ঊষা যখন আবে মৃদু পায়ে
পূব-মহলে দুয়ারখানি ঠেলে,
ঘুম ভাঙাবে পরশ করে গায়ে,
দেখো আমায় প্রথম আঁখি মেলে।
ভােরের পাওয়া সেই চাহনিটিরে
মনের মাঝে রাখব মায়ায় ঘিরে।
প্রিয়ার কানে প্রেম জানাবার ছলে
পঞ্চমেতে কুহরি’ গায় পিক,
চঞ্চলতা জাগায় চিত্ত-তলে,
মৌন ভাঙি মুখর দশ-দিক
কুহু-ধ্বনি তােমার হৃদয়খানি
দেয় যেন মাের হিয়ার কাছে আনি'।
৭
আকাক্ষা
আকাশ যখন কাজল-কালাে মেঘে
লুকিয়ে মুখ কঁাদে অঝোর ধারে,
আদ্র বাতাস ধায় সে প্রবল বেগে,
চমক হানে চিকুর বারে বারে।
ভীষণ রবে রজ যবে হাসে
তখন ওগো থেক আমার পাশে।
ফুলের সুবাস, চঁাদের মধু আলাে,
ভােরের হাওয়া, পাখীর কল-গীতি
সবই যে গো লাগে আমার ভালাে,
সুধায় ভরে চিত্ত আমার নিতি
এদের সাথে মুগ্ধ আমার মন
তােমার পায়ে করব নিবেদন।
আমার এই প্রাণের পদ্মফুলে
ঘুমিয়ে আছে পেলব ভালবাসা,
দিলেম সপি’ তােমার চরণ-মূলে
গন্ধ-গানে আকুল যত আশা।
স্পর্শে তােমার হৃদয় আমার প্রিয়,
বিথারি’ দল ফুটবে রমণীয়।
অহল্যা
যুগ যুগ ধরে ধরণীর 'পরে
ঘুমায়ে রয়েছ তুমি,
উপরে তােমার আকাশ উদার,
পাশে জাগে বনভূমি
কত দিন এসে ধীরে চলে যায়,
তুমি অচেতন সুখ-তন্দ্রায়,
বাতাস তােমার পাষাণ ও-গায়
পরশ করে গো চুমি।
শান্ত হিয়ায় চিরনিদ্রায়
মগ্ন রয়েছ তুমি।
ছয় ঋতু তার দেয় উপহার
তােমার সমুখে আনি’,
পাথরের বুকে কোনাে দুখে-সুখে
ফোটে না, ফোটে না বাণী
শ্যামল স্নিগ্ধ বরষার ধারা
ঝরে অবিরল তব দেহে সারা,
হে পাষাণ, তুমি তনু-মন-হারা,
সাড়া নাহি দাও, জানি।
ঝর ঝর জলে নিবিড় বাদলে
নিশ্চল শিলাখনি।
অন্য-মনায় তাের দলি’ পায়
যায় কত পথচারী,
নাহি জানে তারা শিল প্রাণহারা
এক দিন ছিল নারী
তাদেরি মতন কত সাধ আশা
একদা এ-বুকে বেঁধেছিল বাসা ;
দিয়েছে পেয়েছে স্নেহ ভালবাসা,
ফেলেছে অশ্রুবারি।
দেহে মনে তার রাগিণী বীণার
উঠেছিল ঝঙ্কারি।
প্রাণের কমল কা’র শাপে বল
মুদিল রে দলগুলি,
কে ছিড়িল ফুল গন্ধ-আকুল
বৃন্ত হইতে তুলি’ ?
অন্তর-বীণা আর নাহি বাজে
সুমধুর সুরে প্রভাতে ও সাঁঝে,
হয়েছ পাষাণ নিমেষের মাঝে
চুমিয়া ধরার ধূলি,
বক্ষে তোমার আর বারবার
পরাণ ওঠে না দুলি’ ।
কা’র পদ-রেখা হলে বুকে লেখা
হবে শাপ অবসান ?
অচল পাথরে দেবতার বরে
কে করিবে প্রাণ দান ?
নিষ্ঠুর শাপ হবে বিমােচন,
ঝলিয়া উঠিবে নবীন জীবন,
কল্যাণময়ী নারী অতুলন
আর বার পাবে প্রাণ
কত যুগ ধরে মৃত্যু-সায়রে
অহরহ করে স্নান ?
.
মুখর দেহ
মনের কথা বেঁধেছে নীড় তােমার নয়ন-কোণে
পাতার আড়ে লুকিয়ে সঙ্গোপনে।
নিভৃতে আজ আমার কাছে পড়ল সে যে ধরা,
দেখেছি সেই মধুর বাণী অমৃত-রস ভরা।
চোখের সাথে প্রাণের কথার চ’ছে বিনিময়,
নীরব মুখ, চোখ শুধু বাঙময়।
চিত্তে আমার বাজায় বীণা তােমার পরশখানি,
ঝঙ্কারিয়া ওঠে প্রাণের বাণী।
গভীর যে প্রেম মনের মাঝে উঠছে গ'ড়ে ধীরে
আঙুল তব জানায় তাহা আমার আঙুল ঘিরে।
মুখের কথার নাই প্রয়ােজন, মৌন সে আজ রয়,
তনু তোমার সকল কথা কয়।
পসারী
সব বেচা-কেনা শেষ করে দিয়ে
এখন চলেছি ঘরে,
হেন কালে মােরে কে তুমি, জননি,
ডাকিলে
মধুর স্বরে ?
হাতে যা রয়েছে মিঠাই এ-গুলি
সামান্য গুটি-কয়,
তাের ঘরে, মাগাে, দিয়ে যেতে পারি
এমন কিছুই নয়।
দূর গাঁয়ে মাের ঘরেতে রয়েছে
পাঁচটি নাতিনী নাতি,
আমি গেলে সবে “কি এনেছ” বলি’
ছুটে আসে হাত পাতি।
তাহাদের লাগি' যাহা হাে কিছু
হাটবারে হয় নিতে,
চাহে নাক’ মন হাসি-মুখগুলি
মলিন করিয়া দিতে।
১৩
পসারী
জাগি আমি যবে আকাশেতে, মাগাে,
পড়ে না আলাের রেখা,
সুপ্ত জগৎ, গগনের কোলে
শশী তারা যায় দেখা।
বনের বুকের আঁচলখানিতে
তখনাে আঁধার ছায়া,
আম-কাঁঠালের গাছের নয়নে
জড়ানাে ঘুমের মায়া।
গরীব আমি যে, নিদ্রার ঘাের
নাহি ঘেরে মাের আঁখি, .
প্রভাতে আমারে জাগাবার তরে
গাহে নাক’ গান পাখী।
চেয়ে একবার পরাণ সমান
স্বপন-মাখানাে গায়ে
বােঝাটি মাথায় হাট-পথ-পানে
চলে আসি পায়ে পায়ে।
আঁকা-বাঁকা পথ জঙ্গল কত
পার হয়ে যবে আসি
ধরণী তখন উজ্জ্বল হয়
লভিয়া রবির হাসি
মৌন ও মুখর
১৪
দশ বারাে কোশ পথ বাহি’ তবে
পহু ছাই এসে হাটে,
সেখানে আমার বেচা-কেনা করে
সারাটি দিবস কাটে।
কপাল মন্দ থাকে গাে যেদিন
হয়ে যায় লােকসান,
দেবতা যখন হন প্রসন্ন
ফিরি ঘরে লাভবান।
খর রােদ সহি, সহি জলধারা
বরষায় মাঠে বাটে,
দুখ ক্লেশ নাহি, এমনি করিয়া
সহজে দিবস কাটে।
ক্ষেতে কাজ করি বাকি দিনগুলি,
হাটবারে হাটে আসি,
এই ভাবে মাের কেটে যায় দিন,
এই আমি ভালবাসি।
কাহারাে দয়ার নহি প্রত্যাশী,
তােষামােদ নাহি করি,
সহজ সরল পথ বেয়ে মাের
চলেছে জীবন-তরী।
১৫
পসারী
ক্ষেতের কাজেতে সহায় আমার
রূপসী প্রেয়সী মম,
সকল কর্মে রহে সে পার্শ্বে
পরম বন্ধু সম।
হাড়-ভাঙ্গা শ্রম করিয়া গােঙানু
দীর্ঘ জীবন আমি,
শেষ হয়ে এল এ-পারের পালা,
সন্ধ্যা এসেছে নামি'।
শীতে, বরষায়, রৌদ্রের দিনে
কাজ ল’য়ে আমি থাকি,
তাহারি মাঝেতে মাের কুটীরের
সােনার ছবিটি আঁকি।
এই যে এখন চলিয়াছি পথে,
কল্পনা চলে সাথে,
নাতিদের তরে গৃহিনী হয় ত’
কঁাথার শয্যা পাতে।
আঁধার গাঁয়েতে কুটীরে আমার
এক কোণে দীপ জ্বলে,
বধূ গান গায় ছােট ছেলেটিরে
ঘুম পাড়াবার ছলে।
মৌন ও মুখর
বড় বড় তরু দুধারে সঁাড়ায়ে
রয়েছে তুলিয়া মাথা,
আমি গেলে তারা চিনিয়া আমারে
সাদরে নাড়িবে পাতা।
অনেক কথাই হয়ে গেল বলা,
জননি, বিদায় তবে,
আঁধার এখন ছেয়েছে অবনী,
বহু পথ যেতে হবে।
আগের মতন নাহি বল দেহে,
যৌবন গেছে চলে,
অতি দ্রুত আর পারি না চলিতে
বেশী পথ যেতে হলে।
চির-পরিচিত চির-আদরের
গাছে-ঘেরা গ্রামখানি
চোখে পড়িলেই কী সে মন্তরে
পরাণ লয় যে টানি’!
দিনের ক্লান্তি ঘুচিবে সকলি
যাইলে আপন ঘরে,
জুড়াইবে তনু স্নিগ্ধ নিদ্রা
নামিয়া নয়ন পরে।
স্বপ্ন
গান
ঘুমের মাঝে পরশ পাই
হৃদয়-পাতে,
স্বপন হয়ে দেয় সে দেখা
নীরব রাতে।
দিনের বেলা আমার মনে
ঘুমিয়ে থাকে গােপন কোণে,
আড়াল হ’তে মিলন-মাল।
লুকিয়ে গাঁথে।
স্বপনে আসে আমার কাছে
আঁধার হলে,
নিদ-মহলে অলখ হাতে
আগল খােলে।
বুঝি নে তার কেমন মায়া,
নিশায় ফেলে আপন ছায়া,
মিলিয়ে যায় মােহন ছবি
আলাের সাথে।
যাত্রাপথে
তােমার হাতের দেওয়া, ওগো, দুঃখ-ভার গুরু
সমাদরে মাথায় তুলে ল’ব,
আজ হ’তে মাের নূতন যে গো যাত্রা হলো সুরু
সাথে লয়ে চরম দান তব।
বন-পথে চ’তে আমি করব নাক’ ভয়,
জ’বে প্রাণে দীপ্ত প্রেমের শিখা;
সেই আলােতে পথটি আমার হয়ে আলােকময়
ললাটে মাের আঁকবে জয়ের টীকা।
১৯
বিত্ত যে গাে আমার, প্রিয়, তােমার মধুর স্মৃতি,
সেই শুধু মাের পরম সম্বল ;
তােমার হাসি, তােমার কথা জাগায় মনে প্রীতি,
আবার যে, হায়, চক্ষে আনে জল।
খুজব আমি সারা জীবন তব চরণ-রেখা
পথে, মাঠে, সাগর-নদী-তীরে,
হঠাৎ যদি কোথাও, ওগো, মেলে তােমার দেখা
সেই আশাতে চাইব ফিরে ফিরে
কঠিন পথ যেদিন আমার অাবে শেষ হয়ে,
মৃত্যু-ছায়া ঘনাবে সম্মুখে,
ওগাে নিঠুর দেবতা মাের, তােমার স্মৃতি লয়ে
সেদিন আমি
মুব
আঁখি
সুখে।
অন্তরতম
যা’র তরে মন কাদে অনুখণ
সেই যে গাে নাই পাশে,
স্মৃতির মাঝারে রয়েছে সে বেঁচে,
নিশীথ-স্বপনে আসে।
এমনি করিয়া কাটে দিন দুখে,
বুকের মাণিক নাহি পাই বুকে,
ব্যাকুলতা যে গাে বেড়ে ওঠে মাের
তাহারে পাবার আশে ।
২১
অন্তরতম
চোখের আড়াল হয়ে গেছে সে যে,
পাই নাক’ খুঁজে আর,
তীব্র বেদনা বক্ষ-বীণায়
তােলে শুধু ঝঙ্কার।
বাহিরে কেবলি খুজিয়া বেড়াই,
যত চাই তারে তত’ই হারাই,
ব্যর্থতা যে গাে নিবিড় করিয়া
বাজে বুকে বার বার।
বাহিরে সে আজ দূরে গেছে চলে,
হয়ে গেছে পর সম,
আঁখি আর তারে না পায় দেখিতে,
মনে সে এসেছে মম।
অজানিত রসে সুগভীর করে
হৃদয় আমার দিয়েছে সে ভরে,
অন্তর আজ পরশ করেছে।
মাের অন্তরতম।
৪
সন্দেহ
গভীর রাতে শুছি জেগে নিবিড় অন্ধকারে
বাজছে গান বীণার তারে তারে ।
দূরে ফেলে এলেম যারে, ভুলেছি যা’র স্মৃতি,
সে কি আমায় শােনায় এমন গীতি ?
সবাই যখন ঘুমায় সুখে সুষুপ্তির কোলে
বেদন আমার বক্ষ ভরি’ তােলে।
বাতাস বেয়ে আছে ঘরে চেনা নিশাসখানি,
শােনায় কানে ভালবাসার বাণী।
সুরঙ্গমা, দেখত’ চেয়ে, বাতায়নের তলে
কাহার সুর আকুল অশ্রুজলে।
এই রাগিণী জাগায় মনে মিলন-রাতিগুলি
বিস্মরণের সাগর হতে তুলি।
তুচ্ছ রূপ প্রধান হয়ে ভ’রুল আমার মন,
হারিয়ে গেল তাইত’ পরম ধন ।
২৩
সন্দেহ
বাহির মােরে কল পাগল, চাইনি ভিতর পানে,
ঘুরেছি, হায়, রূপের প্রবল টানে।
চোখের ক্ষুধা মিটল আজি, হৃদয় ক্ষুধাতুর,
পাইনা সুধা, রিক্ত চিত্তপুর।
নিশীথে বােজ শুনছি আমি যেন বীণার ধ্বনি,
ঘুমের ঘােরে স্বপন মনে গণি।
আজকে কেন উতল হলো আমার সারা প্রাণ
বীণার এই শুনে করুণ তান?
আমার রাজা প্রাসাদ ত্যজি’ এলাে কি মাের আশে
খােলা আমার বাতায়নের পাশে ?
গভীর সেই অসীম প্রেম বীণার তারে তারে
সজল সুরে ফুটছে বারে বারে।
জাগাে, জাগো, সুরঙ্গমা, দেখ বারেক তরে
কে জাগে ঐ একলা পথ 'পরে ।
গ্রীষ্মের রূপ
দিন ভর দর দর,
ঘাম দ্যায় গাত্রে,
তৃষ্ণায় প্রাণ যায়,
জল নেই পাত্রে।
কষ্টের একশেষ
হয় সব দগ্ধ,
তাপ-ময় মাঝ-দিন
নিঃসাড়, স্তব্ধ।
আই ঢাই প্রাণ মন
ভরপুর
ক্লান্তি,
চায় কায় চায় মাের
বিলকুল শান্তি
২৫
গ্রীষ্মের রূপ
ঝিঝির ঝিঝির
বয় সুখ-দাত্রী,
সার্থক হয় মাের
গ্রীষ্মের রাত্রি
বন-ময় ওই দ্যাখ,
বেল জুই ফুটুল,
চাধা সব খা
বাস তা’র ছুটুল।
গাছ 'পর গায় পিক
গায় গান হর্ষে,
সুর তার মঞ্জুল
ঝঙ্কার বর্ষে।
ঘুম-ঘাের ছায় চোখ
বিশ্রাম মাগছে,
নিৰ্ম্মল চাদ আজ
দূর দূর জাগছে
মিলন-ক্ষণে
গান
তুমিত’ মগন ছিলে
অাপন ধ্যানের মাঝে,
কা’র আগমনী আজ
সহসা হৃদয়ে বাজে ?
একে একে মেলে দল
তব প্রাণ-শতদল,
কারে স্মরি’ মুখ তব
রাঙা হলাে মধু লাজে ?
পুণ্য তিথি যে আজ
মিলনের কথা আনন,
স্বপন জড়ানাে আঁখি
তােলাে ধীরে ওর পানে।
কত যুগ যুগ ধরে
কামনা করেছ ওরে,
সেই এলাে দ্বারে তব
অতুল মোহন সাজে।
বর্ষা
কাজল-বাসি আকাশ-গায় দুলছে,
বৃষ্টি ওই মেঘ-ঝালর খুলছে।
আদ্রকায় বাতাস বয় হর্ষে,
সবুজ ঘাস আষাঢ়-জল স্পর্শে।
বজ দ্যাখ, ক’রছে মেঘ দীর্ণ,
মাঠের পর ভাঙল গাছ জীর্ণ।
আঁধার ঘাের ছাইল সব বিশ্ব,
নয়ন চায় অতুল এই দৃশ্য।
অনুক্ষণ ঝরছে জল ঝরছে,
মনের কা’র বেদন-ভার বলছে,
নূপুর পায় বাজিয়ে যায় বৃষ্টি,
ঢাল মুখ সকল আজ সৃষ্টি।
চাষার মন ভ’রল
বল
ভরসা,
ভুবন-ময় নামল শােন্ বরষা।
দূর সিন্ধু পার হ'তে--
(জাৰ্ম্মাণ লেখক হারমান সুডারম্যানের “রেজিনা” উপন্যাসের
নায়িকার কাহিনী অবলম্বনে)
দূর সিন্ধু পার হ'তে ভেসে এসে সকরুণ সুর
করে মােরে বেদনা-বিধুর।
হে শােভনে, বলল সেথা ছিল তব কী সে ইতিহাস ?
আজো বুঝি সমীরণ ব’হে আনে কত দীর্ঘশ্বাস।
নিৰ্যাতন অপমান সাথে তব শােণিতের রেখা
কুটীরের মাঝে, নারী, আছে যেন চিরতরে লেখা,
আজো যায় দেখা।
জাগায়েছ সাড়া মনে তাই তােরে চিনি
অয়ি বিদেশিনি ?
২৯
দূর সিন্ধু পার হতে
গভীর নিশীথে যাও মুগ্ধ প্রাণে কোথা একাকিনী
ভয়হীনা হে অভিসারিণি ?
সুপ্ত প্রিয়-শয্যা পাশে আসসা হেরি নিঃশব্দ চরণে,
থমকি’ চমকি’ ওঠো আপনার বক্ষের স্পন্দনে।
সিক্ত করাে প্রিয়-তনু ঢালি’ উষ্ণ অঞ অবিরল,
নিৰ্ম্মম আঘাত তব বিনিময়ে হলাে যে সম্বল
স্থির অচঞ্চল।
শিহরি’ লুটায়ে পড়াে ধরণীর তলে,
বেদনা-বিহ্বলে !
প্রতীক্ষা করিছ হেরি নিৰ্ণিমেষে বসি' সেতু পরে
দীর্ঘ কত রাত্রি দিন ধরে ।
বিশুষ্ক মলিন মুখ, আঁখি দু'টি ম্লান ছলছল
কী ধন খুজিয়া, হায়, সর্বহারা, বিবশ, বিভল ?
রুক্ষ কেশ ঘিরে আছে, হে তাপসি, ব্যথিত আনন,
উপবাস-শীর্ণ দেহে একি তব কঠিন সাধন,
রাত্রি জাগরণ ?
কা’র লাগি কাটাইছ বিনিদ্র যামিনী
অয়ি বিরহিণি ?
৫
মৌন ও মুখর
৩০
তপস্বিনী অপর্ণার তপে তুষ্ট হলাে বুঝি হর,
পেলে শেষে মনােমত বর।
কথা-হারা মুখ তব, চোখে তব ঘনাল বিস্ময়,
আধ’ লাজে আধ’ ভয়ে দুরু দুরু কাপিল হৃদয় ।
বাঞ্ছিতের স্নেহ-স্পর্শে অভিমান হলাে যে তরল,
সােহাগ আদর লভি’ মন তব অশান্ত চঞ্চল
হ’লল সুশীতল।
সুমধুর হাসি তব ফুল্ল ওষ্ঠ-পুটে
উঠিল যে ফুটে।
প্রখর প্রদীপ্ত রবি ক্লান্ত হেসে দিগন্তের কোলে
ধীরে ধীরে পড়ে এলে ঢ’লে।
দেখিল না অশ্রু তব, শুনিল না ব্যাকুল মিনতি,
ছাড়াইয়া বাহু-পাশ গেল সে যে দ্রুত পদে অতি
যৌবনের প্রিয়া সাথে দূর কুঞ্জে মিলনের আশে,
জানিল না নিভৃত কুটীরে কেহ ধূলুষ্ঠিত বাসে
আঁখি-জলে ভাসে।
অশ্রু রূপে ফুটে উঠে মৰ্ম্ম-ব্যথা তার
ঝরে অনিবার।
৩১
দূর সিন্ধু পার হতে
ফিরে এসে প্রিয় তব কী দেখিল অপরূপ ছবি,
কোলে তােরে ল’য়েছে জাহ্নবী।
উদ্বেগ-কাতর তব সারা মন আশঙ্কা-চঞ্চল
লভিল কি উপেক্ষিতা, আকাঙ্ক্ষিত শান্তি অবিচল ?
যে স্নেহ চাহিয়াছিলে, পাও নাই একদিন তরে,
সেই স্নেহ, সেই প্রেম আকুল আবেগে পড়ে ঝরে
তব তনু 'পরে।
অতৃপ্ত প্রাণের তব অপূর্ণ সে ক্ষুধা
শেষে পেলো সুধা।
জীবনের খেলা তব চিরতরে হয়ে গেছে শেষ,
আজ শুধু ভাসে তার রেশ।
অরণ্য এখনাে তব পদ-চিহ্ন আছে বক্ষে ধরি,
সুনীল জলধি আজো থেকে থেকে উঠিছে শিহরি’;
তােমার অন্তর-ব্যথা আছে মিশে স্তব্ধ নীলাকাশে,
মৌন
মূক মৃদু
বাণী বসন্তের উতলা বাতাসে
যেন ভেসে আসে।
জগতের কাছে আজো আছে মহীয়ান
তব আত্মদান।
বাদল প্রভাত
রজনী ধরে পড়ছে ঝ'রে বিরামহীন ধারা
উতল নিজ গানে;
মেঘের বুকে লুকায়ে সুখে প্রভাত আলো-হার।
আঁধার শুধু হানে।
যামিনী শেষে জাগিয়া দেখি
চোখ জুড়ানাে দৃশ্য একি,
ক্ষেতে যে ভরা জল ।
কচি সবুজ ধানের তৃণ করছে টলমল।
কর্মহীন এমন দিন জাগায় সুখ মনে
অলসতায় ভরা,
সার। সকাল স্বপন-জাল গাঁথি গৃহের কোণে,
কাজেতে নাই ত্বরা।
আমের গাছে তাচেনা পাখী
কি কথা কয় আড়ালে থাকি,
তবুও প্রাণ ভরে,
পুলক লাগে শুধু কেবল খুসী হ’বার তরে
বাদল প্রভাত
শ্যামল বন অনুক্ষণ ডাকে আমায় কাছে,
দেয় সে হাতছানি,
তাহার মনে গােপন কোণে লুকায়ে কি যে আছে ।
বুঝিনে তার বাণী।
সবুজ রূপে উঠল ভরে
কখন সে যে নবীন করে—
দেখি নি চোখ মেলে,
শ্যামল বাসে অঙ্গ ঢেকে প্রকৃতি আজ এলে।
তাজ যে হেরি গগন ঘেরি’ কাজল-কালােকা’র
আঁচলখানি লােটে,
নূপুর বাজে ভুবন মাঝে শুনছি অনিবার,
পরাণ মেতে ওঠে।
বাদল প্রাতে সজল ছায়া
চিত্তে আনে নিবিড় মায়া,
মুগ্ধ চেয়ে থাকি
বাহির পানে মেলিয়ে দিয়ে আবেশ-মাখা আঁখি
শরৎ
গান
বাদল শেষে শরত বুঝি
এসেছে আজ প্রাতে,
পূরব-লােকে দুয়ার খােলে
রবি আপন হাতে।
রাতের ঘন আঁধার টুটি
সােনার আলাে উঠছে ফুটি,
নবীন বেশে নিখিল ধরা
বিপুল সুখে মাতে।
শয়ন পাতে শিউলি গুলি
সবুজ তৃণ কোলে,
বনের ওই আঁচলখানি
শিশির ভরে দোলে।
যে জন আছে সুদূর পুরে
তাহার লাগি পরাণ ঝুরে,
উদাস মম নয়ন দুটি
মগন বেদনাতে।
শুধাতে এলে দু'আঁখি মেলে
শুধাতে এলে দু’আঁখি মেলে
আমার দু’টি নয়ন 'পরে
মধুর সেই বাণী,
যে-কথা বাজে হিয়ার মাঝে
বাইরে তারে কেমন করে
আলাের কাছে আনি ?
এখন হেথা উজল মেলা,
দীপ্ত রবি করছে খেলা,
সরম লাগে দিনের বেলা
খুলতে হিয়াখানি,
ঘুমিয়ে আছে বুকের কাছে
প্রাণের যত বাণী।
জাগিয়াে নাক’ ভিতরে রাখাে
হৃদয়-পুরে যে-কথা মম
আছে এখন সুপ্ত,
চিত্ত-তলে যে-মণি জ্বলে
আঁধার ঘরে আলোক সম
রাখো গাে তা’য় গুপ্ত।
মৌন ও মুখর
তপস্বিনী অপর্ণার তপে তুষ্ট হ’লাে বুঝি হর,
পেলে শেষে মনােমত বর।
কথা-হারা মুখ তব, চোখে তব ঘনাল বিস্ময়,
আধ’ লাজে আধ’ ভয়ে দুরু দুরু কাপিল হৃদয় ।
বাঞ্ছিতের স্নেহ-স্পর্শে অভিমান হলাে যে তরল,
সােহাগ আদর লভি’ মন তব অশান্ত চঞ্চল
হলাে সুশীতল ।
সুমধুর হাসি তব ফুল্ল ওষ্ঠ-পুটে
উঠিল যে ফুটে।
প্রখর প্রদীপ্ত রবি ক্লান্ত হেসে দিগন্তের কোলে
ধীরে ধীরে পড়ে এলে ঢ’লে।
দেখিল না অশ্রু তব, শুনিল না ব্যাকুল মিনতি,
ছাড়াইয়া বাহু-পাশ গেল সে যে দ্রুত পদে অতি
যৌবনের প্রিয়া সাথে
দুর কুঞ্জে
মিলনের আশে,
জানিল না নিভৃত কুটীরে কেহ ধূলুণ্ঠিত বাসে
আঁখি-জলে ভাসে।
অশ্রু রূপে ফুটে উঠে মৰ্ম্ম-ব্যথা তার
ঝরে অনিবার।
দূর সিন্ধু পার হতে,
ফিরে এসে প্রিয় তব কী দেখিল অপরূপ ছবি,
কোলে তােরে ল’য়েছে জাহ্নবী।
উদ্বেগ-কাতর তব সারা মন আশঙ্কা-চঞ্চল
লভিল কি উপেক্ষিতা, আকাঙ্ক্ষিত শান্তি অবিচল ?
যে স্নেহ চাহিয়াছিলে, পাও নাই একদিন তরে,
সেই স্নেহ, সেই প্রেম আকুল আবেগে পড়ে ঝরে
তব তনু 'পরে।
অতৃপ্ত প্রাণের তব অপূর্ণ সে ক্ষুধা
শেষে পেলো সুধা।
জীবনের খেলা তব চিরতরে হয়ে গেছে শেষ,
আজ শুধু ভাসে তার রেশ।
অরণ্য এখনাে তব পদ-চিহ্ন আছে বক্ষে ধরি,
সুনীল জলধি আজো থেকে থেকে উঠিছে শিহরি’;
তােমার অন্তর-ব্যথা আছে মিশে স্তব্ধ নীলাকাশে,
মৌন মূক মৃদু বাণী বসন্তের উতলা বাতাসে
যেন ভেসে আসে।
জগতের কাছে আজো আছে মহীয়ান
তব আত্মদান।
মৌন ও মুখর
৩৮
দিন কত শত হয়ে গেল গত
কালের স্রোতের মাঝে,
ছিল না যে কেহ সেই দিল স্নেহ
সাথী হ’লাে সব কাজে।
কত বেশ আর কত আভরণে
নিতি নব রূপে সাজালে যতনে,
দেখেছ কভু বা মিলন-লগনে
কখনাে গৃহের কাজে।
ফুলের মতন করেছি বয়ন
দিনগুলি সুখে লাজে।
অনল সমুখে তব সুখে দুখে
সঙ্গিনী করেছিলে,
সেই দিন হতে সংসার-পথে
চলেছি দুজনে মিলে।
আজি কি তােমার চলা হলো শেষ,
সুদূরের পানে চাও অনিমেষ,
কোন্ অজানার পেলে উদ্দেশ,
কারে তুমি পরশিলে ?
ভাঙা-বুকে আমি সারা দিন-যামী
মরি যে গাে তিলে তিলে ।
৩৯
সতী
ফলে ফুলে ভরা শােভাময়ী ধরা
নয়ন সমুখে জাগে,
মঞ্জুল বেশে উষা ভােরে এসে
রবির প্রসাদ মাগে।
শ্রাবণ-আকাশ মেঘে ছলছল,
চৈতালি রাতে বাতাস বিভল,
শারদ-শশীর হাসি নিরমল
অনুপম চোখে লাগে,
মিথ্যা এ সব করি অনুভব,
তুমি যে সবার আগে।
ব্যাধির পরশে ধীরে আসে খসে
জীবন-মৃণাল ওর,
জড়াব কেমনে প্রাণ-বীণা সনে
ছিড়ে আসা দেহ-ডাের ?
দিনে দিনে প্রিয়-তনু হয় ক্ষীণ,
সােনার বরণ হেরি প্রভা-হীন,
নয়নের জ্যোতি পাংশু, মলিন,
ছায়াময়, ঘাের ঘাের।
চলে যাবে, হায়, ত্যজিয়া আমায়
নিঠর দেবতা মাের।
1
মৌন ও মুখর
৪ ০
বীণার আমার ছেড়ে বুঝি তার
ঝঙ্কার আসে থামি’,
আকুল বরষা এসেছে সহসা
নয়নে আমার নামি।
আঁখির আলাে নিভে নিভে আসে,
ম্লান ছায়া শুধু হেরি চারি পাশে,
পরাণে বিপুল অবসাদ ভাসে,
নিরাশ হয়েছি আমি।
তবুও তাহারে নারি বাঁচাবারে
পূজি’ যা'রে দিন-যামী।
চরণ শ্রান্ত, দেহ যে ক্লান্ত,
চিত্ত সকল ভােলে,
বুকের মাঝারে কেন বারে বারে
হিয়ার পুতলি দোলে !
ঘুম ওই নামে নয়নে আমার,
দূর হতে কে যে ডাকে অনিবার,
যাই, যাই, দেরী হবে নাক’ আর,
এখনি যাব গো চলে,
শুধু আগে তার প্রিয়রে আমার
শেষ কথা যাই বলে।
৪১
সতী
ত্যজিয়া তােমায় ধরা-অমরায়
কোথাও নাহি যে সুখ,
যেখানেই থাকি রবে মাের আঁখি
আগ্রহে উৎসুক।
ধরণীর খেলা সারা হলাে তব,
সুরু হবে তাই অভিযান নব,
চির-সঙ্গিনী সাথী আমি হ’ব,
আর নাহি কোন দুখ,
অচেনা আবাসে রব তব পাশে
চেয়ে সদা উন্মুখ।
দুঃখের সার্থকতা
অসীম দুঃখে দিনে দিনে মাের উঠিয়াছে বুক ভ'রে,
আঁখি-জলে রাতে ভিজেছে শিথান সকলের অগােচরে।
কাজল মেঘের খেলা দেখিয়াছি শ্রাবণ-আকাশ ঘিরে,
দেখি নাই শুধু কেমনে প্রকৃতি ফানে হাসে ফিরে।
নিবিড় বাদল জমেছে বক্ষে, জমেছে নয়ন-কোণে,
পুলকের হাসি হেসেছি যে কবে এখন পড়ে না মনে।
সুখের স্মৃতির মাঝে করি বাস রঙিন অতীত দিনে,
স্মরণের পটে তুলিকা বুলায়ে লই সব ছবি চিনে।
কত স্মৃতি সাথে বিদায়ের ক্ষণ হৃদয়ে রয়েছে মিশি’,
ঘন কালো কেশ এলায়ে গগনে কঁদিছে শ্রাবণ নিশি ।
তামসী আঁধারে ঢাকা চারিদিক, ঝরঝর বারি ঝরে,
সেই রাতে আমি বিদায় লইয়া বাহিরিনু পথ 'পরে।
পিছনে ফেলিয়া উজল অতীত সম্মুখে এনু চলে,
জানি নি তখন আমার লাগিয়া কি ছিল কালের কোলে।
নিকষ কৃষ্ণ মেঘ ভেদ করি বিজলী উঠেছে জ্বলে,
ভজিয়াছে দেহ, ভিজেছে বসন রাতের অশ্রু জলে।
।
৪৩.
দুঃখের সার্থকতা
দুখের রজনী পােহায়েছে বুঝি, অরুণ রশ্মি-রেখা
উদয়-অচল রাঙা করে দিয়ে ওই যে গাে দিল দেখা।
আবার তােমারে পেলেম ফিরিয়া নিভৃত হৃদয় মাঝে,
উল্লাসে মাের বুকের বীণায় কত না রাগিণী বাজে।
কল্পনা শুধু করেছি তােমারে, দেখেছি কেবল রাতে,
স্বপনেতে মাের এসেছ, বন্ধু, অলখ চরণ-পাতে।
যে তােমারে পেয়ে হারায়ে ছিলেম বাদল অন্ধকারে
সেই তুমি ফিরে আঘাত করেছ পুরাণে জীবন-তারে।
অনেক দুঃখ দিয়েছ, দিয়েছি, শূন্য হয়েছে বুক,
সুখের আশায় ঘুরেছি অনেক, তিলেক পাই নি সুখ।
তাতে ভেজা নিদ-হারা রাত সাক্ষী রয়েছে মম,
বিষাদ-সলিলে স্নান করে আজি পাইলাম নিরুপম।
কাছে থেকে প্রেম নাহি যায় বােঝা, বুঝেছি আসিয়া দূরে,
বিরহ-বেদনা সহিয়া এবার চিনিলাম বন্ধুরে ।
দুঃখ আমার সার্থক হ’লল, বিচ্ছেদ মধুময়,
শুষ্ক পরাণে আজিকে আবার দখিনা বাতাস বয়।
শারদ শ্রী
গান
শিশির-ভেজা চরণ ফেলে
কনক-রঙা আঁচলখানি
লুটিয়ে ভূয়ে কে আজ এলে ?
অরুণ-আলাে সােহাগ ভরে
তরুণ তৃণ পরশ করে,
সলিল ভারে অলস নদী
বইছে ধীরে উজান ঠেলে
বিদায় নিল বাদল আজি,
ধরার দ্বারে শরৎ এলাে
ভরিয়া তা’র ঋতুর সাজি।
শেফালি আর কাশের রাশে
অমল মিঠা সমীর ভাসে,
সুনীল বেশে গগন চাহে
বৃষ্টি ধােয়া নয়ন মেলে।
ব্যাকুলতা
আর যে তুমি চপল-পায়ে
আসো না মাের ঘরে,
আমার
প্রাণ যে কেমন করে।
সকাল কাটে, সন্ধ্যা আসে,
তােমায় ত’ মা পাই না পাশে,
বক্ষে তােমায় ফিরে পেলে
বক্ষ আমার ভরে;
আমার
প্রাণ যে কেমন করে।
স্তব্ধ রে আজ আমার কাছে
মিঠে মুখের বােল,
ওরে শূন্য আমার কোল।
চমকে দিয়ে হঠাৎ এসে
জড়ায় না আর ভালবেসে,
নীরব হয়ে গিয়েছে, হায়,
হাসির কলরােল,
ওরে
শূন্য আমার কোল।
মৌন ও মুখর
৪৬।
জড়িয়ে ছিলি আমায় যে রে
ভালবাসার ডােরে,
আমি ছাড়াই কেমন করে ?
ছিলি রে মােকদিনে রাতে
আমার দুঃখ সুখের সাথে,
শূন্য আমার হৃদয়খানি
ছিলি রে তুই ভ’রে,
আমি ছাড়াই কেমন করে ?
কোন্ সুদূরে রইলি, মাগো,
আয় রে কাছে আয়,
আমার পরাণ কঁাদে, হায় ।
আজকে এই পাটল সাঁঝে
আয় রে আমার বুকের মাঝে,
ব্যগ্র ব্যাকুল চিত্ত আমার
তােরেই শুধু চায়,
আমার পরাণ কঁাদে হায়।
দেবদাসী
পুষ্প-ভূষণে সাজায়ে অঙ্গ আছ তুমি একা জাগি’
এ ঘাের নিশীথে কাহার আঁখির করুণা-প্রসাদ মাগি’?
পাষাণ দেবতা কোনাে দিন কি গো চাহিবে নয়ন তুলে
চৈত্র রাতের উতলা বাতাসে ক্ষণিক আবেশে ভুলে ?
যৌবন তব হইবে সফল যাহার সােহাগ পেয়ে
তারি তরে বুঝি অনিমেষ চোখে সারা রাত আছ চেয়ে ?
সকলি মনের ভুল,
পাথরের বুকে কোনাে কালে, হায়, ফোটে না প্রেমের ফুল।
অতীতের কোন্ উজল প্রভাতে নবীন ফাগুন তােরে
পরশ করিয়া রূপে রসে তব দিয়েছিল তনু ভ’রে।
জাগিয়া প্রথম অবাক নয়নে চেয়েছিলে ধরা পানে,
রঙিন কত না আশা অভিলাষ উঠেছিল ফুটে প্রাণে
দেবতার সাথে মিলনের কথা দিবা রাতি অনুখন
তব বর-দেহে বাজায়ে তুলিল পুলকের শিহরণ ।
কোন্ সে অতীত সাঁঝে
মায়াময় তব আঁখিতারা দু টি মুদেছিল সুখ-লাজে।
মৌন ও মুখর
৪৮
প্রতি রাত তব বৃথাই কাটিছে ল'য়ে পূজা-সম্ভার,
ধীরে নিশি আসে সুগভীর হয়ে, নাই দেখা দেবতার
কত না যামিনী কাটাও জাগিয়া দেউলের দ্বারে বসে,
ফুল-সাজ তব রজনীর শেষে শুকায়ে পড়ে যে খ’সে।
আঁখির কাজল হয় গাে মলিন, শীর্ণ মুখের হাসি,
ফুটিবার আগে কমল-কলিকা ঝরিয়া হও যে বাসি।
ব্যর্থ অশ্রুজল
বাঁধনহারায়ে সিক্ত করে গাে পাষাণ সােপান-তল।
ও যে প্রাণ হারা, ও যে গাে পাষাণ কামনা-বাসনা হীন,
অধীর আবেগে তাের পানে, হায়, চাহিবে না কোনাে দিন
কা’র পায়ে তুমি সঁপিয়াছ, নারি, যৌবন ভরা দেহ ?
ওর মনে নাই কামনার লেশ, ওর বুকে নাই স্নেহ।
ভালবাসা তব পারে না সপিতে কঠিন পাথরে প্রাণ,
যা কিছু তােমার দিয়েছ, দিতেছ, নাহি পাও প্রতিদান।
তবুও কিসের আশে
দিবা রাতি কেন রহিয়াছ জাগি’ নিঠুর প্রিয়ের পাশে ?
যেদিন তুমি রবে না আর কাছে
যেদিন তুমি রবে না আর কাছে,
পরের ঘরে হবে পরের সম,
• চোখের আড়াল হলেও জেনে মনে
জীবনে মাের তুমিই প্রিয়তম।
তােমার কথা নিত্য স্মরণ করি’
কাটবে দিবস, কাটবে বিভাবরী,
আমার মনের মণিকোঠার, মাঝে
র’বে তােমার মূর্তি অনুপম।
আজকে, সখি, এলেম তব কাছে,
এটি কথা শুধাই শুধু তােরে ;
শপথ আমার, মিথ্যা বলিস নে,
সত্যি করে বল গাে, রাণি, মােরে,-
পরের ঘরে ব্যস্ত নানা কাজে
আমায় কি তাের পড়বে মনােমাঝে ?
স্মরণ করে আমায় ক্ষণে ক্ষণে
অশ্রু কি তাের আস্বে আঁখি ভরে ?
মৌন ও মুখর
আমায় যদি ভাব গাে, সই, কভু,
ঠি তা আমি জাব ব’সে দূরে,
সান্ত্বনার স্নিগ্ধ রস-ধারে
হৃদয়খানি উঠবে মম পূরে।
চিত্তে মাের সেই স্মৃতি র’য়ে র’য়ে
উজান ঠেলে চ’বে ব’য়ে বয়ে,
লক্ষ্যহারার সন্ধ্যা সকাল বেলা
উঠবে ভরে স্মৃতি-মধুর সুরে।
মালা
শিয়রে তব এলেম রেখে গন্ধ-মধু ঢালা
এটি যূথী-মালা।
মদির সেই মাল্যখানি নিয়ে হে তুলে নিয়ে,
সুবাস টুকু হৃদয় ভরে পান করিয়ে প্রিয়।
একটু শুধু সােহাগ-সুধা আমায় মনে করে
রেখো তাহার 'পরে ।
সারা দিনের যত্নে গাঁথা আমার মালাখানি ।
দিনু তােমায় আনি'।
পত্র দলে রয়েছে মাের আকুল ভালবাসা,
জড়িয়ে আছে ঘিরিয়া এরে কত মুকুল আশা
আবেগ ভরা মনটি নম গাঁথিয়া এর সাথে
দিলেম এনে রাতে।
একলা ঘরে নিশীথ কালে বুঝি কিসের টানে
চাইবে মালা পানে।
হয়ত মনে জাগবে তব কাহার হাতে গাথা,
পড়বে খুলে প্রাণের কা’র সরম- ভীরু পাতা
গভীর সুখ আবে মােহ নীরব সেই ক্ষণে
তোমার সারা মনে।
যাচনা
গান
নয়ন-আড়ালে
যে বারি লুকানাে আছে,
তারি দু’টি ফোটা
চাহি আমি তব কাছে।
ভরি সারা মন
রবে অনুখণ
এমন কিছু গাে
আজি মাের হিয়া যাচে।
তব পাশে থাকা
ফুরাবে আমার যবে
বেদনার দান
সম্বল হয়ে রবে।
ধন নিরুপম
সেই হবে মম
দু’টি ফোটা জল
ফেলে যদি যাও পাছে।
দু’টি কথা
দু’টি কথা সে যে বলি’ বলি’ করে,
আজিও হয় নি শােনা,
সে কথা তাহার অন্তর মাঝে
করে সদা আনাগােনা
সেই কথা ল’য়ে নাড়াচাড়া চলে,
চোখে মুখে তার কী সুধা উছলে,
জানিনে বুঝিনে হ’তেছে সে মনে
কী মায়ার জাল বােনা
মৌন ও মুখর
৫৪
উতলা উদাস দখিন বাতাস
ভেসে ফিরে চারি ধারে,
পশিয়া ঘরেতে গােধূলি বেলায়
হাসিয়শুধানু তারে,
“বাহিরের কাজে পড়িয়াছে ছুটি,
বলল শুনি আজ তব কথা দুটি,
যে বাণী সদাই ধ্বনিছে তােমার
হৃদয়-বীণার তারে।”
দেখিতে দেখিতে সারাটি আননে
লালিমা উঠিল ভাসি,
সরম গভীর তনুখানি তার
ঘিরিল সহসা আসি'।
মাথাটি রাখিয়া আমারি এ-বুকে
কহিল সে ধীরে লাজারুণ মুখে
চির-জীবনের দু’টি কথা সেই
“তােমারেই ভালবাসি।”
অসময়
কুসুম-বন-পানে
চেয়ে তুমি হঠাৎ কেন
দাড়ালে এই খানে ?
বল গাে মনে কি বা আছে,
চাও কি কিছু আমার কাছে ?
নইলে কেন থামলে হেথা
কিসের মৃদু টানে।
কুসুম-বনে চেয়ে তুমি
দাড়ালে এই খানে ।
চেয়ে মুখের 'পরে
বললে তুমি এলে হেথায়
এটি তােড়ার তরে।
গােলাপ-বন শুষ্ক আজি,
ফোটে না আর পুস্প রাজি ;
রুদ্র রবির পরশে সব
জীর্ণ পাতা ঝরে,
বৃথাই তুমি এসেছ আজ
এটি তোড়ার তরে ।
মৌন ও মুখর
পউষে শীত কালে
রক্ত-গােলাপ ফুটেছিল
গাছের ডালে ডালে।
ভ’রেছিল সকল বন
গন্ধে তা'র অনুক্ষণ,
কানন ছিল আলো করে
শাদায় পীতে লালে ।
রক্ত-গােলাপ ফুটেছিল
পউষে শীত কালে ।
করুণ নয়ন মেলে
সময় সব ফুরিয়ে দিয়ে
এখন তুমি এলে।
রৌদ্র-উজল শীতের প্রাতে
তােড়া বেঁধে দিতেম হাতে
আতে যদি দু’দিন আগে
সকল কাজ ফেলে,
সময় সব ফুরিয়ে দিয়ে
এখন তুমি এলে।
প্রলয়-লীলা
( বিহার ভূমিকম্প উপলক্ষ্যে )
প্রকৃতির একি তাণ্ডব লীলা হেরি চারিধারে আজি,
মরণের হাতে প্রলয়-বিষাণ মহা তেজে ওঠে বাজি’ ।
রাজার প্রাসাদ ভেঙে পড়ে, ভাঙে গরীবের কুঁড়ে ঘর,
সংহার এল পৃথিবীর বুকে, টলমল চরাচর।
ছুটাছুটি করে বাঁচিবার তরে শত শত নর নারী,
কত শব, হায়, রাজপথ ’পরে পড়ে আছে সারি সারি ।
কোলের ছেলেরে বাঁচাইতে গিয়ে জননী দিয়েছে প্রাণ,
স্বামীরে খুঁজিতে পেল কোন সতী শুধু শব দেহখান।
সোনার সহর শ্মশান হয়েছে, কোলাহল গেছে থেমে,
মহা নিদ্রার আবেশ সহসা ভুবনে এসেছে নেমে ।
মৌন ও মুখর
৫৮
হাজার হাজার গৃহ গেছে প'ড়ে, হয়ে গেছে ভূমিসাৎ,
তাহারি তলায় কত না মানুষ মুদেছে নয়ন-পাত।
মরিয়াছে পতি,
ম’রেছে পুত্র,
স্বামী-সন্তান-হারা
স্পন্দবিহীন, অবিরল শুধু ঝরিছে আঁখির ধারা।
নিদারুণ ছবি চোখে আনে জল, হৃদয় ব্যথায় ভরে,
ভৈরব এ কে করাল রূপেতে নিষ্ঠুর খেলা করে ?
মরণ-যজ্ঞে জীবন আহুতি দেয় সবে দলে দলে,
বিভীষিকাময় একি এ দৃশ্য হেরি আজ ধরাতলে !
ধরণী হয়েছে ক্ষুধায় কাতর, মহা বলি লয় তাই,
মানুষের সে যে জননী সে কথা আজি আর মনে নাই।
মৃত্তিকা ফুড়ে উঠিছে উপরে কর্দমময় জল,
গন্ধক ধাতু বিকট গন্ধে করে সবে বিল।
নিমেষের মাঝে প্রলয়ঙ্কর ভাগ্য-বিপৰ্যয়,
বিপন্ন গণে কে করিবে ত্রাণ, কেবা দিবে বরাভয় ?
লেলিহান জিভ মেলিয়া অনল দূর হ'তে কাছে আসে,
সঙ্কটকালে অভাগা সকলে কোথা যাবে কা’র পাশে ?
কল কারখানা চূর্ণ হয়েছে শত শত লােক ল'য়ে,
বাঁচিয়াছে যারা রয়েছে তাহারা ভয়ে দিশাহারা হয়ে।
প্রচণ্ড কাল ধরেছে আজিকে মূর্তি ভয়ঙ্কর,
সমগ্র দেশ বিনাশ করিছে মেলি’ মুখ-গহ্বর।
==
৫৯
প্রলয়-লীলা
।
বেঁচে আছে যারা দেখিলে তাদের চোখে জল রাখা দায়,
আকাশের তলে খােল মাঠ 'পরে তাহাদের দিন যায়।
সব বাড়ী ঘর হয়েছে ধ্বংস, চিহ্ন নাহিক’ আর,
সান্তনা বাণী শােনায় এমন লােক মেলা অতি ভার।
আশ্রয়-হারা, অন্ন-বিহীন, অন্তর জ্বলে শশাকে,
দুরন্ত শীত দুঃখ বাড়ায়, ভয়ে ঘুম নাই চোখে।
থেকো না ঘুমায়ে এ সময় কেহ, জাগো, জাগাে দেশবাসী,
দুর্গত জনে করো সহায়তা, দাড়াও পার্শ্বে অসি'।
ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে যারা দুঃখে হ’তেছে সারা,
সমবেদনায় তাহাদের, ওগো, মুছাও অশ্রুধারা।
কম্পনা
মন্দ ভাল নানা লােকের সাথে
নানা কাজে কাটে আমার দিন,
চিত্ত যখন মগ্ন বেদনাতে
ওষ্ঠে ফোটাই হাস্য-রেখা ক্ষীণ।
গভীর রাতে এল আঁধার ঘরে
ভাবনা তােমার হৃদয় আমার ভরে।
নিবিড় কালো নয়ন-তারা দু’টি
রয় গাে চেয়ে যেন আমার পানে,
মনের ভাব ভাষায় উঠে ফুটি
অঝাের ধারে ঝরে যুগল কানে।
তখন আমার শান্ত নীরব হিয়া
আবেগ ভরে ওঠে উচ্ছ্বসিয়া।
৬১
কল্পনা
আঁধার মাঝে তােমর দুটি হাত
জড়ায় ধীরে আমার তনুখানি,
মুদিয়া যায় সরমে আঁখি-পাত,
কইতে গিয়ে পাই নে খুঁজে বাণী ।
অতল গভীর এটি নীরবতা
ডুবিয়ে দেয় সকল প্রাণের কথা।
স্বচ্ছ শরত জ্যোৎস্নাময়ী নিশি
ভুবনময় দেয় যে জ্বেলে আলাে,
ভরে আমার প্রাণের দশদিশি
তােমার চোখের কিরণখানি ঢালল।
চাদের আলােয় নাইক' আমার কাজ,
তােমার আলো পড়ুক্ চিত্ত-মাঝ ।
স্বপ্ন ভরা মধুর রাতি মাের,
দূরের মানুষ কাছে আমার আসে,
চোখে তখন লাগে নেশার ঘোের,-
বুকের
মাণিক আমায় ভালবাসে।
এম্নি করে রাতের পর রাতে
মন যে মম স্বপন-জাল গাঁথে ।
পলাতক
তােমার
নিবিড় ঘন বাদল দিনে
কোথায় তুমি গেলে
মায়ের কোল ফেলে ?
স্তব্ধ এই নীরব ঘরে
নাল ঘুম নয়ন 'পরে,
আকাশ হ’তে কাহার তুমি
ডাক শুনতে পেলে ?
মায়ের কোল ফেলে।
গেলে
তুমি
সার্থী কেহ নাইক' তােমার
একূল পথ পরে,
যাবে কেমন করে ?
মেঘে ঢাকা বাদল দিনে
কেমনে পথ যাবে চিনে ?
একটু আলো কোথাও আজ
নাই তােমার তরে,
যাবে কেমন করে ?
।
তুমি
পলাতক
তােমার
জীবন শুরু হয় নি আজো,
এখনি সব সারা,
এ কি খেলার ধারা ?
সবার প্রাণ সুধায় ভরে
মুকুলেতে পড়লে ঝরে,
মায়ের কোলে শুয়ে তুমি
মুদলে আঁখি-তারা,
তােমার
এ কি খেলার ধারা ?
মায়ের
দেখছ না কি সুদূর থেকে
আজি তােমার তরে
নয়ন দু’টি ঝরে ।
আঁখির আলো হারিয়ে শােকে
অশ্রু ফোটে শুষ্ক চোখে,
অতীত দিনের মধুর স্মৃতি
হৃদয় তার ভরে,
মায়ের
নয়ন দু’টি
ঝরে।
বাঙলার মেয়ে
বাঙালীর মেয়ে জন্মেছি এই বাঙলা মায়ের কোলে
শ্যামা জননীর শ্যামল আঁচল নিয়ত যেথায় দোলে।
ললাট-লিখন ভাগ্য-দেবতা লেখে নি যতন করে,
শিশুকাল হতে তাইত আজিও দুঃখ ছাড়ে না মােরে ।
শৈশবে আমি হারায়েছি বাপে, বঞ্চিত তার স্নেহে,
মা’র অযতনে কেটেছে দিবস কোলাহল ভরা গেহে।
পড়সৗর। সবে বলেছে “অপয়া”, সে ব্যথা গিয়েছি স’য়ে,
আজ দেখি চেয়ে তাদের কথাই ফ’লেছে সত্য হয়ে।
বাঙলার মেয়ে
নব বিবাহের রঙিন নেশার কাটে নি মধুর ঘাের,
দু’জনার মাঝে শিথিল তখনো হয় নি প্রেমের ডাের।
নয়ন-সমুখে স্বপন সতত করিত গো ঝলমল,
অসহ পুলকে দেহ মন মাের হয়েছিল বিহ্বল।
কোথা দিয়ে যেত দিবস কাটিয়া, কখন আসিত রাতি
কিছুরি খেয়াল ছিল না আমার পাইয়া তরুণ সাথী।
জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ সময় তাইত যাই নি ভুলি’, ,
বিষন্ন মনে অমৃত যোগায় স্মরিলে সে দিনগুলি।
ভাগ্য-লিপির সব লেখা মাের ক্রমে হয়ে এল বাঁকা,
নিঠুর সত্য পাইল প্রকাশ, রহিল না আর ঢাকা।
ভেবেছিনু প্রেম অক্ষয় হয়ে থাকে বুঝি বুকে লীন
আকাশ যেমন ধরণীর পানে চেয়ে রয় চিরদিন।
মধুর স্বপন ভেঙে গেল মাের কঠিন আঘাত পেয়ে,
ফিরায়েছে মুখ তরুণের প্রেম সহসা দেখিনু চেয়ে।
উপাধান মাের ভিজায়েছি রাতে আকুল অশ্রুজলে,
“পুরুষ পাষাণ” এই কথা শুধু জেগেছে চিত্ততলে।
মৌন ও মুখর
৬৬
যা’র বাড়া নাই রমণীর দুখ সে ব্যথা সয়েছি আমি,
আমার তবুও বলিতে যে বাধে তাহারে “আমার স্বামী”।
ধাপে ধাপে তা'র পতন হইতে দেখেছি এ-দু’টি চোখে,
শিহরি’ উঠেছি নিন্দা যখন ক'রেছে সকল লােকে।
কাছে ছিল তবু পাই নাই পাশে, এ-ব্যথা বলিব কা’য় ?
অনাদর দেখে দিন গেছে মোর অভিমানে যাতনায়।
তবুও তখন পারি নি বুঝিতে এ-দুখ কিছুই নয়,
ভাবী কাল-বুকে অসীম বেদনা রহিয়াছে সঞ্চয়।
চমকি উঠি শুনিনু যেদিন হয়েছে শয্যাগত,
যক্ষ্মা নাকি গাে বক্ষের মাঝে করেছে গভীর ক্ষত।
যক্ষ্মা ! যাহার শুনিলেই নাম শিহর লাগে গে। দেহে,
সেই রােগ মাের এল এত কাছে আমারি আপন গেহে।
যে-স্বামী আমারে ছিল গো ভুলিয়া, দুঃখ দিয়েছে মােরে,
তাহারি লাগিয়া করুণায় স্নেহে হৃদয় উঠিল ভরে।
সব অভিমান দূরেতে সরায়ে বসিনু তাহার পাশে,
সেবায় তাহার জীবন-প্রদীপ যদি গো আবার হাসে।
৬৭
বাঙলার মেয়ে
মৃত্যুর ছায়া হেরি চারিদিকে, কেঁপে কেঁপে ওঠে প্রাণ,
দু’টি হাত দিয়ে জড়াইয়া থাকি ক্ষীণ এই দেহখান।
জানি আমি তবু একদিন, হায়, ছাড়াইয়া বাহু ডাের
অজানা লােকের সন্ধানে যাবে মুক্ত পরাণ ওর।
কাতর মিনতি ফোটে দুই চোখে কভু বা দেখিতে পাই,
বুঝি মনে মনে নীরব ভাষায় ক্ষমা চায় মোর ঠাই।
বক্ষ আমার ফেটে যেতে চায়, অশ্রু বাধা না মানে,
কেমনে বােঝাই সে ছাড়া আমার হৃদয় কিছু না জানে।
যৌবনে কত জেগেছিল সাধ, কত না মােহন আশা,
সে সকল কবে গিয়েছে মিলায়ে, পায় নি তাহারা ভাষা
ফলে ফুলে ভরা উজল ধরায় ছিল যা’র হাসি মুখ
চিরকাল তরে বিদায় লইতে আজিকে সে উৎসুক।
নিদহারা রাতে ভেবেছি কত যে ভাসিয়া আঁখির নীরে,
হয়ত কখনাে হারাণে মাণিক পাইব বক্ষে ফিরে ।
পেয়েছি ফিরিয়া, তবুও হৃদয়ে হরষ কিছু না জাগে,
করুণ নয়নে চাহিয়া ও যে গো এখনি বিদায় মাগে ।
মিনতি
গান
আজি সব ভােলাে, ভালাে,
নিমীল নয়ন-পাতা
ক্ষণেকের তরে খােলো।
অবগুণ্ঠনখানি
মন হ'তে ফেলে। টানি',
মরমের কথা তব
কানে কানে আজি বলে।
যত কথা অাছে মনে
আভাস ফুটুক্ তার
ওই দু’টি আঁখি কোণে
নয়নের জলে মিশি’
গেছে কেটে কত নিশি,
আঁধার জীবন মম
আলাে দিয়ে ভরে তােলে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.