Bally Sadharan Granthagar
Rakta - Kamal
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
-কমল
(নাটক)
শ্রীশচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
মনােমােহন থিয়েটারে অভিনীত
প্রথম অভিনয়—১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৬
আৰ্য সাহিত্য ভবন
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা
১৩৩৬
শ্রীবরিদকান্তি বস্তু
আৰ্য সাহিত্য ভবন
কলেজ স্লট মার্কেট, কলিকাতা
302
আষাঢ়, ১৩৩৬
দাম এক টাকা ]
প্রিন্টার-নরেন্দ্রনাথ কোঙার
ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্ক
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ট, কলিকাতা
কবি নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু
বইখানি পড়ে খুসী হয়ে তুমি গান লিখে
দিয়েছ। শুধু তাই নয়, স্বরচিত গানে তুমি সুর দিয়েছ
এবং অক্লান্ত শ্রম করে সে গান তুমি অভিনেত্রীদের
শিখিয়েছ।
তােমার গানের দাম আমি জানি। তাই
ঋণের কথা না তুলে, বইখানির সঙ্গে তােমার নাম জড়িয়ে
দিলুম।
তােমার গুণমুগ্ধ
শচীনুদা
নিবেদন
রক্ত-কমল প্রথমে প্রকাশিত হয় নটরাজে’। উদীয়মান
অভিনেতা শ্ৰযুক্ত রবীন্দ্রমােহন রায়ের উৎসাহে নাটকখানি।
মনােমােহন থিয়েটারে অভিনীত হয়। এবং শ্রীযুক্ত নির্মলেন্দু
লাহিড়ী, শ্রীযুক্ত বিশ্বনাথ ভাদুড়ী প্রভৃতি মনােমােহনের অভিনেতৃ-
বর্গের চেষ্টায় ও যত্নে নাটকখানি অভিনয়ের দিক দিয়ে সাফল্য
লাভ করে।
আমার পরম স্নেহভাজন কবি নজরুল ইলাম ন’খানি
গান রচনা করে দিয়েছেন। আর আমার পরম স্নেহের পাত্র
শুমান্ নির্মলচন্দ্র বসু অক্লান্ত পরিশ্রম করে অভিনয়-সাফল্য
সম্ভবপর করে দিয়েছেন। নাম প্রকাশ করতে নারাজ এমন
দু-চারজন বন্ধু ও বান্ধবীর সাহায্যের কথাও ভুলতে পারছিনে।
—এদের সকলকেই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ইতি
অনু করিয়া পুৰুকে মন্তব্য লিখিবেন না,
য, ছৰি থাকিলে ছিড়িবেন না।
}B?
CUB416
'; f3a 1.
No text on this page.
{
BfAA
::::35:
-কমল
[ ছােট্ট একখানা দ্বিতল বাড়ীর পিছনের বাগান। বাগানে পাকা রেলিংএর
পিছনের গলি দিয়া মাঝে মাঝে দু’চারজন লোক যাওয়া-আসা করিতেছে। বাগানের
ফুলের গাছগুলি প্রায় সবই সাদা ফুলে ভরিয়া আছে। এক কোণে লতাকুঞ্জের মাঝে
বেতের সােফার সামনে বেতের একটা টেবিল। দাদা মহাশয় সেই সােফায় বসিয়া আছেন ।
তাঁহার চুল আর দাড়ি সব সাদা। পাইপে করিয়া চুরুট খাওয়া তার অভ্যাস।
কমল ষোল বছরের নানা-দাদা মহাশয়ের স্নেহের শেষ সম্বল। গায়ের রং বেশ
ফর্সা ; পরণে একখানি নীলরঙের শাড়ী, গায়ে সেই রঙেরই একটি ব্লাউজ।
পশ্চিম থেকে সিদুরে-আলাে আসিয়া বাগানের গাছে গাছে, দাদা মহাশয়ের
লতাকুঞ্জে আর কমলের মুখে-চোখে পড়িয়াছে।
দাদা মহাশয়ের দৃষ্টি আকাশের দিকে। কমল গাহিতেছিল |
কমল।
– ভীমপলশ্রী, দা)
আসে বসন্ত ফুলবনে
সাজে বনভূমি সুন্দরী।
চরণে পায়েলা রুমুঝুমু
মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি'।
ফুল-রেণু-মাখা দখিনা-বায়
বাতাস করিছে বন-বালায়,
দোলে বল্লরী-দো-খোঁপায়
মঞ্জরী-মালা মুঞ্জরি'।
দুলে আলাে-ছায়া বন-দুকুল,
ওড়ে প্রপতি কল্কা-ফুল,
কর্ণে অতসী স্বর্ণ-দুল
আলােকলতার সাতনরী ।
সােনার গােধুলি নামিয়া আয়
আমার রূপালী ফুল-শােভায়,
আমার সজল আঁখি-পাতায়
আয় রামধনু-রং ধরি।
কমল । ( ফুলের গাছগুলি দেখিতে দেখিতে একটু পিছাইয়া গিয়া
হাতে তালি দিয়া) বাঃ, বা, বাঃ! দাদামশাই, শীগগীর !
এই এখানে!
দাদা মহাশয়। কি দিদি ?
কমল। এইদিকে, শীগগীর !
( দাদা মহাশয়ের কাছে গিয়া হাত ধরিয়া টানিয়া আনিতে আনিতে)
ভারি মজা দাদামশাই! কখনাে শুনিনি, কখনাে দেখিনি।
—একেবারে নতুন একটা রহস্য!
দাদা মহাশয়। কি রহস্য দিদি?
কমল। চলুন, এগিয়ে চলুন—এই, আর-একটু! এইবার দেখুন ত !
(দাদা মহাশয়ের হাত ছাড়িয়া দিয়া তার মুখের দিকে চাহিল )
কেমন, একটা বিচিত্র রহস্য একেবারে রূপ নিয়ৈটে ওঠেনি ?
দাদা মহাশয় । কই দিদি, কিছুই তাে দেখতে পাচ্ছিনে
কমল। সেকি, দাদামশাই! দেখতে পাচ্ছেন না?
দাদা মহাশয়। এই ঘােলা চোখের কি আর রূপ দেখবার শক্তি আছে
দিদি !••••••কিছু নেই।
কমল। আমি যে বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি দাদামশাই।
দাদা মহাশয়। তাের ওই চোখ দুটো যে বড় নীল দিদি। বিশ্বের
সকল রূপ যে অম্নি এসে ওদের কাছেই ধরা দেয়।
কমল। খােল-চোখে সেটি ঠাহর হ’ল কি করে ?
দাদা মহাশয়। এই ষােলটা বছর রােজ-বােজ দেখছি বলেই! আর
সুধু তাে এই ঘােলা-চোখ দিয়েই দেখিনি—সারাটি মন দিয়ে
দেখেছি। সুখের সময় দেখেছি, দুঃখের দিনেও দেখেছি। এক
এক করে যােলটা বছরের প্রতি দিন, প্রতি মুহূর্তে তাের ওই
রূপের বিকাশ হতে দেখেছি।••••যােল বছরের এমন করে
দেখা, তবু ঠাহর হবে না !
।
কমল। এই যা! আবার গম্ভীর হয়ে উঠছেন! কি আপনার
হয়েছে দাদামশাই? কথা কইতে কইতে এমনি গম্ভীর হয়ে যান।
যে, আপনাকে দেখে আমার প্রাণ কেঁপে ওঠে! কি হয়েছে ?
দাদা মহাশয়। কই কিছুই তাে হয়নি দিদি! আমার চোখ হাসছে
? ঘােলা-চোখ কখনাে কি হাসে? শুকনাে ঠোট কখননা।
কি হাসির রসে ফুলে ওঠে?
কমল। না, ও-সব কথা আমি শুতে চাইনে, কিছু শুনতে
চাইনে। একটিবার দেখুন না, ওই রক্তজবা-গাছটির দিকে
একটিবার চেয়ে দেখুন।
দাদা মহাশয়। ( এগিয়ে) তাের যখন দশ বছর বয়েস, তখন ওই
গাছটি এনে লাগিয়েছিলুম। ও যখন প্রথম ফুল দিয়েছিল, তখন
তুই এসে ওর সামনে দাড়িয়ে থাকতিস্—কিছুতেই আর তােক
ঘরে নিয়ে যেতে পাতুম না। তখন তুই কাপড় পরতি লাল,
জামা পরতি লাল, সকালের আর সন্ধ্যার লাল আকাশের দিকে
চেয়ে দাড়িয়ে থাকতি আর কেন যেন তাের চোখ দুটোও লাল
হয়ে উঠত। দেখে আমার ভয় হােত ! একদিন গাছটা
কেটে ফেলে দেবার জন্যে কাটারি দিয়ে ওর গােড়ায় চোপ দিতেই
পেছন থেকে তুই চেঁচিয়ে উঠলি। ওকে আর কাটতে পারুলুম
, শুকিয়ে গেল। আজ দেখছি ওর নতুন পাতা গজিয়েছে,
ওর ডালগুলােয় সবুজ রং লেগেছে, আঘাতকে জয় করে ও আজ
বেঁচে উঠেছে।
রক্ত-কমল কমল । কি করে বেঁচে উঠল তাই-ই একবার শুনুন। ওর গােড়ায় আমি একটি মাধবীর চারা লাগিয়েছিলুম। আমার ছােট্ট সেই মাধবী বড় হােলাে, যৌবন পেল আর পরম আগ্রহে এই গাছটিকে জড়িয়ে জড়িয়ে বেড়ে উঠতে লাগল। আমি বােজ বােজ বাগানে এসে তরুণী মাধবীর সেই কীৰ্ত্তি দেখি আর হেসে হেসে মরি। ক্রমে আবাগী ওকে ঘিরে একেবারে ছেয়ে ফেল্লে। আমি ভাবলুম ও রাক্ষসী-বেচারা গাছটার হাড় থেকে মজ্জা বার করে তাই খেয়ে বড় হচ্ছে। কিন্তু আজ বুঝতে পেরেছি দাদামশাই, ও রাক্ষসী নয়। আমার মাধবী মানুষের চেয়েও বড়-মানুষ যা পারে না, মাধবী তাই-ই করেছে। নিজের স্পর্শ দিয়ে, মেহ দিয়ে, ভালােবাসা দিয়ে সে প্রাণহীন শুনাে কাঠে জীবনের স্রোত বইয়ে দিয়েছে, সৃষ্টির একটা প্রকাণ্ড রহস্য ভেদ করেছে-মানুষ যা আজও কতে পারেনি। দাদা মহাশয় । (একটু অন্য দিকে গিয়ে) ও-রহস্য মানুষ যে অনেক আগেই ভেদ করেছে দিদি ! কমল। ইস! মানুষ যদি তাই পাবে, তাহলে জীবনে একটিবার আঘাত খেয়েই সারাটা জীবন গুমরে-গুমরে ময়ূবে কেন? দাদা মহাশয় । কিন্তু তবুও মানুষ সে আঘাতের বেদনা ভুলতে পারে। ( পায়চারি করিতে করিতে) তুই যখন প্রথম আমার কোলে এসেছিলি, তখন ওই গাছটাকে আমি যেমন করে আঘাত করেছিলুম, তেমন করেই—না, না, না, তারও চেয়ে নির্মমভাবে , ৫ রক্ত-কমল •••এই হৃৎপিণ্ডটা সাড়াশী দিয়ে চেপে পিষে একখণ্ড পাথর করে রেখে দিয়ে তাের মা চলে যায়। তখন ভেবেছিলুম এই পা দিয়ে আর চলতে পায় না, এই চোখ দিয়ে আর দেখতে পাব না, এই বুকের ভেতর আর স্নেহ-মমতা-ভালােবাসার কণামাত্র কখনাে অনুভব কতে পারব না।••••••কিন্তু তুই—তাের ছােট্ট ওই মাধবীর মতােই আমায় বাঁচিয়েছিস্যােলটা বছর আমায় বাঁচিয়ে রেখেছি। অন্তরের যে উৎস একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল, তুই তাের অফুরন্ত স্নেহ, অসীম ভালােবাসা ঢেলে আবার তাতে। ভাদরের ভরা জোয়ার বইয়েছি।••••তাের স্নেহের পরশ যতদিন না পেয়েছিলুম, ততদিন••••••ততদিন কমল। দাদামশাই, দাদামশাই--সে দুর্দিন কেটে গেছে—স্মৃতি থেকে তা মুছে ফেলুন। দাদা মহাশয়। সে দুর্দিন কেটে গেছে: সত্যিই কেটে গেছে। কিন্তু •"স্মৃতি থেকে সে জ্বলন্ত-অঙ্গার-লেখা মুছে ফেলা যায় না। তুই তা জানিনে দিদি-তুই তা বুঝিসনে তাই, তাই ভুলতে বলি। তবু ভুলেছি তাের পরশে অনেক ভুলেছি ; কিন্তু সবটুকু ভুলতে পারিনি, সবটুকু ভুলিনি। (অস্থির পদবিক্ষেপে ঘুরিতে লাগিলেন) কমল । এ আমি কি করলুম! রহস্য করুতে গিয়ে সেই স্মৃতি কেন জাগিয়ে তুলুম ! কি সৰ্বনেশে স্মৃতি এই ! যােল বছর কেটে গেল, তবুও ওঁর মন থেকে তা মুছে গেল না! কিন্তু কি সে স্মৃতি,
রক্ত-কমল
এমন যার জ্বালা, এত যার দাহ! কিছুই তাে জানিনে! দাদা-
মশাই! ( হাত ধরিয়া আনিয়া) ওই গাছটার নবজীবনলাভ
দেখে আমার বড় আনন্দ হয়েছে। আমার আবার ছেলেবেলার
সেই কথা মনে পড়ছে, দাদামশাই !
দাদা মহাশয়৷ কোন্ কথা ?
কমল। সেই লাল শাড়ী পরবার কথা, সেই লাল জামা পরুবার কথা,
সেই লাল আকাশের দিকে চেয়ে থাকার কথা! সব মনে
পড়ছে দাদামশাই! কি ছেলেমানুষই তখন ছিলুম! যখন
গাছটার সানে দাড়িয়ে থাকতুম, তখন কি মনে হ’ত জানেন ?
দাদা মহাশয়। কি"কি মনে হত ?
কমল । গাছ-ভরা রক্তজবা দেখতুম, আকাশ-ভরা রক্ত-তরঙ্গ দেখতুন,
আর আমার মনে হত, আমি যেন বক্ত-কমল, রক্ত-সরােবরের
মাঝে জন্মেছি।
দাদা মহাশয়। যা! কি মনে কতিস্!
কমল। ( কাছে গিয়া) না, না, কিছু নয়, দাদানশাই !
দাদা মহাশয়। মনে করতি রক্তের মাঝে তুই জন্মেছি রক্তের মাঝে
ভেসে বেড়াচ্ছি? তাের শিরার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠত, তুই
শুধু রক্তই দেখতিস্? কালােজমাট-বাঁধা ঠাণ্ডা রক্ত।
কমল । (হাত ধরিয়া) না দাদামশাই।
দাদা মহাশয় । ( আকাশের দিকে অপলক নেত্রে চাহিয়া ) ঘরমর
রক্ত-কালাে•••জমাট-বাঁধা ঠাণ্ডা রক্ত! ঠি, ঠিক্ মিলে
৭
রক্ত-কমল
যাচ্ছে। সেই রক্তের মাঝে তুই আমার কমল রক্তকমল
রক্তকমল • অবিকল !...ঠিক যেমনটি দেখেছিলুম। কিন্তু কিন্তু
তুই কি করে জালি? চোখে সে দৃশ্য তাে দেখিনি, কানেও
সে কথা কখনাে শুনিনি! তবু জেনেছি! বাইরের সব
মানুষের কণ্ঠ চেপে রাখলুম, তবুও সেইদিনের সেই কথা গােপন
রাখতে পারলুম না! শিরার রক্ত-তরঙ্গ নেচে নেচে তাের মনকে
সে কথা জানিয়ে দিয়ে তােক ক্ষেপিয়ে রক্তপাগল করে তুল্ল !
কমল। দাদামশাই, দাদামশাই! আমি যে কিছুই বুঝতে পারছিনে
আমার বড় ভয় করছে দাদামশাই।
দাদা মহাশয় । ( প্রকৃতিস্থ হইয়া কমলকে কাছে টানিয়া লইয়া তাহার
মাথায় হাত দিয়া) ভুলে যা, ভুলে যা দিদি ! সে-সব কথা ভুলে
যা। ছেলেবেলায় অমন অনেক কথা মনে হয় সেসব কথার
কোনাে মানে থাকে না। •••••আমি যখন স্কুলে পড়তুম, তখন
ভাতুম আমি রাজা। কিন্তু দেখুঁতে পাচ্ছিস্ তাে আমি রাজা
নই, কখনাে হইনি, কখনাে হবােও না। কিন্তু ছেলেবেলার
মন•••সে ওই এক রকম! হ্যা, দেখতে দিদি আমার পাইপটা
কোথায়।
[ কমল পাইপ আনিতে গেল
রক্তের ছোঁয়া লেগেছে। এত করে চেষ্টা করুলুম ওকে
মুক্ত রাখতে কিন্তু পারলুম না। পায়ূব কি করে? সেই ঠাণ্ডা
৮
রক্তকমল
জমাট বাঁধা রক্তের মাঝ থেকে ওকে সরিয়ে এনেছি সত্যি, কিন্তু
ওর পিতার রক্ত যে ওর দেহের মাংসের, মেদের, মজ্জার প্রতি
কণায় আগুন ধরিয়ে রেখেছে। এতদিনের স্নেহ-বারি সিঞ্চন
করেও তাে সে আগুন নেভাতে পারলুম না !
( কমল আসিয়া দাদা মহাশয়কে পাইপ দিল ।
হ্যা, এই যে, দে তো দিদি ধরিয়ে দে !
( কমল পাইপ ধরাইয়া দিল।
কমল। দাদামশাই!
দাদা মহাশয় । কি দিদি !
কমল। কি সুন্দর সন্ধ্যা !
দাদা মহাশয়। লাল বলেই কি সুন্দর বছিস্?
কমল । না, না দাদামশাই! এমনি সন্ধ্যায় মানুষ তার বাইরের
সবকিছু ভুলে আত্মস্থ হয়। জগৎটাকে একান্ত করে নিজের
ভেতর অনুভব করে।
দাদা মহাশয়। কিন্তু এ জগৎটা বড় বেয়াড়া দিদি, কিছুতেই মানুষের
কাছে নিজেকে ধরা দেয় না। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা, ছলনা
চাতুরি করেই সে আবার মানুষের অন্তর থেকে বেরিয়ে যায়।
শুধু বেঘিয়েই যায় না, নির্মম আঘাত করে মানুষের স্বপ্ন মুহূর্তেই
ভেঙে দেয়।•••মানুষ জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখে তা জানিস্ দিদি ?
রক্ত-কমল
দেখে, জেগে থেকেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। আর এমনি সন্ধ্যা
সেই স্বপ্নের নেশা জমিয়ে তােলে। মানুষ যখন সুখ-স্বপ্নের নেশায়
বুদ হয়ে আপনাকে ভুলে যায়, তখনই আসে আঘাতের পর
আঘাত, কঠোর নির্মম আঘাত।
( পায়চারি করিতে লাগিলেন, কমল পাষাণ-দুর্তির মত
দাড়াইয়া রহিল। সহসা কমলের হাত ধরিয়া ।
এমন সন্ধ্যে দেখে ভুলিনি, এমন জ্যোৎস্না দেখে মজিনি! শেষে
এমন করে ভুল ভাঙিয়ে দেবে, এমন করে নেশা ছুটিয়ে দেবে যে,
সারাজীবন সুধু জলে-পুড়ে মরবি, ছাই হয়ে যাবি !••খবরদার!
কমন্স । দাদামশাই, আপনার আজ কি হয়েছে? এমন উত্তেজিত
হয়েছেন কেন ?
দাদা মহাশয়। কেন!...ঠিক জানিয়ে দিদি ! ঠিক বলতে পারছিনে!
তবে আজ আমার মনে হচ্ছে কি জানিস্ ? • আজ হয়ত একটা
ভয়ানক কিছু ঘটবে, যেন ঘটেছিল সেই বােল বছর আগে।
কমল ॥ না, দাদামশাই! ভয়ানক কিছু ঘটবে না।
ঘটবে না। ও আপনার
দাদা মহাশঃ ॥ ভুল নয় দিদি, ভুল নয় ! আমার মন তার চোেখ
দিয়ে দেখতে পাচ্ছে-অন্ধকার নেমে আসছে, নেমে এসে
জ্যোৎঙ্গাকে গ্রাস করছে আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে
কালাে, কদৰ্য্য, তীক্ষ্ণ-নখর একখানা হাত বেরিয়ে এসে তােকে
রক্ত-কমল
আকর্ষণ কছে ! ছিনিয়ে নেবে.. আমার বুক থেকে তােকে
ছিনিয়ে নেবে, যেমন করে একদিন তাের মাকে ছিনিয়ে
নিয়েছিল। পালা কমল পালা, ঘরে গিয়ে দোর দে!
কমল। দাদামশাই, দাদামশাই।
( রেলিংয়ের ধারে একটি অস্পষ্ট মনুষ্য-মূর্তি আসিয়া দাঁড়াইল।
কমলকে তাই দেখাইয়া চাপা স্বরে)
দাদা মহাশয়। ওই !...ওই যে আছে ! কমল পালা!
কমল ॥ ও রাস্তা দিয়ে একটা মানুষ যাচ্ছে, দাদামশাই!
দাদা মহাশয় । মানুষ নয় কাল ! নর-রূপী রাক্ষস ! তােকে ছিনিয়ে
নিয়ে যাবে। আমি ও চেহারা চিনি, ও চলন-ভঙ্গি জানি!...
পালা কমল, পালা !
কমল। চলুন দাদামশাই, আমরা ঘরে যাই।
দাদা মহাশয়। না না, আমি যাব না : ও আমাদের পেছু নেবে।
তুই যা। আমি এখানে দাড়িয়ে ওকে প্রতিরােধ করব। যা
কমল নইলে তাের সানে আমি মাথা খুড়ে মরব।
কমল। যা খুসি তাই করুন, আমি চম !
দাদা মহাশয় । কই গেলিনে যা বছি, শােন্।
কমল । কি যে আপনি বলেন !
দাদা মহাশয়। যাবা কমল, আমায় একেবারে পাগল করে দিনে...
হাতজোড় কছি, ঘরে যা।
১১
[ কমল দাদা মহাশয়ের দিকে বিস্ময়পূর্ণ দৃষ্টিপাত কবিয়া
অবনত মস্তকে ঘরের দিকে চলিয়া গেল। দাদা মহাশয়
কমলের দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। কমল
ঘরে গিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। দাদা মহাশয় আরাে
কিছুক্ষণ সেই ভাবেই দাড়াইয়া রহিলেন। তারপর
ফিরিয়া দূরে দণ্ডায়মান মূর্তিটির দিকে আবার চাহিলেন।
মূর্তি সচল হইয়া কাছে আগাইয়া আসিল। বেশ
সবল চেহারা, কঁচা-পাকা চুল, মুখে উচ্ছলতার
চিহ্ন। বয়স মাঝা-মাঝি ]
দাদা মহাশয়। তুমি !••সরে যাও, সরে যাও ! যেমন আঁধার থেকে
বেরিয়ে এসেছ, তেমনি আঁধারের সঙ্গে মিলিয়ে যাও! এ বাড়ীর
কাউকে তােমার ওই কদৰ্য পৈশাচিক মূর্তি দেখতে দিয়ে
না••••••যাও!
পতিত-প্রসন্ন । আমি শেষবার আপনাকে অনুরােধ কযুতে এসেছি।
•••শেষবার !
দাদা মহাশয়। অনুবােধ ! কি অনুরােধ ?
পতিত-প্রসন্ন । আমার কন্যাকে ফিরিয়ে দি।
দাদা নহাশয় । ( আতঙ্ক-কম্পিত-কণ্ঠে) কি! কি বল্লে ?
পতিত-প্রসন্ন | আমার কন্যাকে ফিরিয়ে দি।
দাদা মহাশয় । চুপ ! চুপ! ও-কথা মুখ দিয়ে বার কোরাে না,
রক্ত-কমল বাতাসকে শুতে দিয়াে না.••আকাশকে শুতে দিয়াে না- নিজের মনের ভেতর পাথর-চাপা দিয়ে রেখে দাও! পতিত-প্রসন্ন । সে কি মশাই! • পিতা আমি কন্যাকে চাইব না ! দাদা মহাশয় । ( প্রথমে শ্লেষপূর্ণস্বরে, পরে রুক্ষ্মভাবে ) পিতা তুমি ! আমার কাছে তােমার কন্যা দাবী করছ!•••যাও, যাও পানােন্মত্ত পিশাচ, তােমার সঙ্গে কথা বলতেও আমি ঘৃণা বােধ করি। পতিত-প্রসন্ন । মাতাল হই, পিশাচ হই, তবু আমি পিতা! সে আমার কন্যা•••আমি তাকে চাই ! দাদা মহাশয় । তুমি তাকে চাও! ভালাে, পায়রা নিয়ে যাও। পতিত-প্রসন্ন । আমি বলপ্রয়ােগ করতে চাইনে। দাদা মহাশয়। পুলিশের সাহায্য নাও। পতিত-প্রসন্ন ॥ তাও আমি চাইনে। দাদা মহাশয়। কেন চাওনা সাধু? সাহস হয় না? স্মরণ আছে সেই পৈশাচিক কীৰ্ত্তি ! (পতিত-প্রসন্ন মাথা নীচু করিয়া রহিল) স্মরণ আছে সেই ঘরময় রক্ত • কালাে • জমাট-বাঁধা...ঠাণ্ডা রক্ত ? 'পতিত-প্রসন্ন । দীনের মত তােমার কাছে নতজানু হয়ে আমি প্রার্থনা করেছি,"হৃদয়ের সঞ্চিত বেদনা অশ্রুর আকারে প্রকাশ করে তােমার কাছে বারবার ক্ষমাভিক্ষা করেছি কিন্তু পাষাণ তুমি, তােমার পাথর-মন তাতে গলেনি। নিমেষের ভুল শােধরাবার এত চেষ্টা আমি করছি, আর তুমি নিৰ্মম হৃদয়ে তার জের টেনেই চছ !
রক্ত-কমল
দাদা মহাশয়। নিমেষের ভুল নয় আত্মপ্রবঞ্চক! তােমার স্বধর্মের,
তােমার স্বভাবের প্রকাশ ! সে পৈশাচিকতা তােমার অন্তরের
জিনিষ। তুমি তাই তােমার কন্যার মনেও সংক্রামিত করেছ".
নইলে ছ’মাসের সেই শিশুকে নিয়ে এসে এমন করে পালন
করে যােল বছরেরটি করে তুলেছি, তবু আজও রক্ত দেখে তার
মন আনন্দে নেচে উঠবে কেন? তােমার সমস্ত কল্মষ ছেলে
দিয়েছ সরলা ওই বালিকার শিরায় শিরায় !••••• তবু আমি
তাকে দেবা করে তুলব। তুমি যাও, চলে যাও ! তােমার কন্যা
নেইসেদিনকার সেই রক্তের মাঝে তােমার কন্যা, আমার
কন্যা এক সঙ্গে তলিয়ে ডুবে গেছে। যাও !
পতিত-প্রসন্ন। বার বার এই প্রত্যাখ্যান-জনিত অপমান, এই অভদ্র
অমানুষিক আচরণ আর আমি নীরবে সহ্য করব না।
{ দরজা ঈষৎ উন্মুক্ত করিয়া কমল মুখ বাড়াইয়া বলিল—একি!)
আজ আমি স্পষ্ট করে বলে যাচ্ছি, এই অপমানের এই লাঞ্ছনার
প্ৰতিশােধ আমি নেব: আমার অধিকার আমি প্রতিষ্ঠিত করব।
যে বলপ্রয়ােগ করতে এতদিন কুণ্ঠাবােধ কয়ছিলুম, প্রয়ােজন
হ’লে তাও করূতে আর দ্বিধাবােধ কয়ব না, এমন প্রতিশােধ
নেব, যা তুমি কল্পনায়ও
কল্পনায়ও আতে
আন্তে পার না।
স্বার্থান্ধ,
নির্মম, হৃদয়হীন বৃদ্ধ
মিল। দাদামশাই!
১৪
রক্তকমল
[ পতিত-প্রসন্ন কমলকে দেখিয়া আচ্ছন্নের মত দাড়াইয়া
রহিল। দাদা মহাশয় দ্বিধা কাটাইয়া কলের দিকে
ফিরিয়া দাড়াইলেন। কমল ছুটিয়া আসিয়া দাদা
মহাশয়কে জড়াইয়া ধরিল।
দাদা মহাশয় । চল, দিদি-ঘরে চল।
( দুজনে ঘরে গিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল )
রক্ত-কমল
পূরবী।
– পিলু, কাহার )
ফাগুন-রাতের ফুলের নেশায়
আগুন-জ্বালায় জ্বলিতে আসে।
যে দীপ-শিখায় পুড়িয়া মরে
পতঙ্গ ঘােরে তাহারি পাশে।
অথই দুখের পাথার-জলে
সুখের রাঙা কমল দোলে,-
কুলের পথিক হারায় দিশা
দিবস-নিশা তাহারি বাসে।
-
সুখের আশায়মেশায়
বুকের সুধায় চোখের সলিল,-
মণির মােহে জীবন দহে।
বিষের ফণির গরল-শ্বাসে৷
বুকের পিয়ায় পেয়ে হিয়ায়
কঁদে পথের পিয়ার লাগি,
নিতুই নূতন স্বরগ মাগি
নিতুই নয়ন-জলে ভাসে।
9Btc
৪
stbd 1855:
৫ে৪
[ ছোট একটি বসিবার ঘর। চারিদিকের দেয়ালে ছবি। একখানা বড় আয়না।
ঝখানে একটা টেবিল, খানকতক চেয়ার, পাশে একথালা সােফা। মমতা দুই
বাহু টেবিলের উপর রাখিয়া বসিয়া আছে ; তার বেশ অসংলগ্ন, চুল রুক্ষ, কবর।
শিথিল, হাতে সােনার চুড়ি, গলায় হার। চোখ দুটি লাল, টেবিলের উপর
একটা মদের গ্লাস, একটা শেলাই টুকরী, সামনে একখানা বাঙলা খবরের
কাগজ। সহচরা করুণা পিছনের দিকে দণ্ডায়মানা।]
করুণা। আর খেওনা দিদিমণি ! শেষে একটা ব্যামােস্যামসং হবে।
মমতা। চুপ কচুপ কর করুণা। বেশ আছি দিনগুলাে একটার
পর একটা কেমন করে আসছে, কেমন করে চলে যাচ্ছে,
কিছুই বুঝতে পাছিনে•••বড় আরাম করুণা, বড় আয়ান!
করুণা। গয়না দু’চারখানা যা ছিল, একে একে তাে সবই শেষ করলে,
দাদাবাবুও তাে এক মাস কোনাে খোঁজ-খবর নেয় না,
পাওনাদারদের জালায় তাে অতেষ্ট। এমন অবস্থায় একটু যদি
বুঝে চল, তাহলে চলবে কেন দিদিমণি ?
মমতা। না চলে, তুই চলে যা!কি দাড়িয়ে রইলি যে সুখের
সন্ধানে যা•••••সংসারে সুখের স্রোত বয়ে যাচ্ছে •••••গ
ভাসিয়ে দিগে যা।
করুণা। আমার নিজের জন্যেই কি বছি? আমার আবার ভানা
কিসের? গতর খাটিয়ে খাব।•••তােমার কথাই বছিলুম।
মমতা। আমার কথা তুই কি বুঝবি ? জানি, আমি কি ছিল্প,
আর কি হয়েছি ? কি হারিতার খবর রাখিস্ ? কিছু
জানিনে কিছু বুঝিনে। ( আয়নার কাছে গিয়া নিজেকে
দেখিয়া আবার পান করিবার জন্য গ্লাস তুলিল)
করুণা । ( গ্লাস ধরিয়া ফেলিয়া) দোহাই দিদিমণি, আর না।
মমতা ছেড়ে দে, ছেড়ে দে বলছি।•••দিবিনে•••দিবিনে? তবে
দেখু:-( বাঁ হাতে করুণার গলা টিপিয়া ধরিল )
করুণা । { গ্লাস ছাড়িয়া দিয়া) তবে খাও•••মর !
( মমতা গ্লাসের সবটুকু নিঃশেষ করিয়া সােকায় গিয়া বসিল)
মমতা। কেমন, দিলিনে?
করুণা ॥ তুমি না ভদ্রলােকের মেয়ে, গৈর বউ? ছিঃ ছিঃ !
মমতা। কি বল্লি ?•••ভদ্রলােকের মেয়ে•••গেরস্তর বউ? মনে
করিয়েল? সারাদিন আগুন পান করে যা ভুলেছিলুম,
তা মনে করিয়ে দিলি?মনে যখন করিয়ে দিলি, তখন
শােন্! ছিলুম ভদ্রলােকের মেয়ে, ছিলুম বনেদী গেরস্তর বউ।
এখন? কুলটা মাতাল : সমাজের কলঙ্ক !
করুণা । তা এখানে এমন ক'রে পড়ে থেকে কদিন আর চলবে?
জীবনটাকে তাে রাতে হবে ?
* *
১৮
মমুতা। তুই কি বলতে চাস্? --আরাে নেমে যেতে বলি, না ?
বতে চা, জাত যখন খুইয়েছি, তখন আর সাধু কেন ?
ধাপে ধাপে একেবারে শেষ পর্যন্ত নেমে যেতে বলি, কেমন ?
করুণা । আমি কিছুই বলিনে।
মমতা। ওই দে..পুরুষে আর মেয়েতে তফাৎটুকু দেখ। তাের
মনে যদিও তাই আছে, মুখ ফুটে বলতে পারিসনে। আর
একটা পুরুষ, মনের ওই কথা বলে ফেলতে কিন্তু দ্বিধা কত না
বেশ বিনিয়ে বিনিয়ে, কত মিষ্টি করে, ভবিষ্যতের সুখের চিত্র
একে দেখিয়ে, ভুলিয়ে তােকে পাগল করে একেবারে রসাতল
অবধি টেনে নিয়ে যেতাে। তারপর কি কত, জানি ?
তারপর তােকে সেইখানে ফেলে রেখে হাসিমুখে ঘরে ফিত।
তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব তাকে মােহ-মুক্ত বলে ঘরে তুত,
আর তাের জন্যে ব্যবস্থা। নন্ত নরক।"করুণা! বুঝি
•••এসব কথা বুঝি?
করুণা না, দিদিমণি, অত-শত ম বুঝিনে। আমি বুঝি, যখন
ভুল করেছ, আর সে ভুল জোধরান যায় না—তখন মিছে কেন
ভেবে মর। যা অদৃষ্টে আছে তাই হবেখেয়ে-পরে যাতে সুখে
খাতে পার, তাই কর !
মমতা। সুখে যাতে থাকতে পারি, তাই ক ?' সুখ •
দিন সুখের সন্ধান করেছিলুম মা-বাবা বিয়ে দিলেন ! ভালাে
ঘর দেখে, ভালাে বর দেখে বিয়ে দিলেন।••••নতুন অনেক
রক্ত-কমল
কিছু পেলুম.•••••কিন্তু সুখ পেলুম না! সুখ তাে পেলুমই
দুখ-সাগর ফুলে উঠল কি আক্রোশে জানিনে সে গর্জে গচ্ছে
ধেয়ে এসে বুকের ওপর দুঃখের তরঙ্গাঘাত করতে লাগল,
তবুও সুখের আশা ভুলতে পারলুম না। বুঝলি করুণ সুখের
আশা তবুও ভুলতে পারলুম না। তাই দেখে দুঃখ কি করলে
জানিস্ ? সুখের বেশ পরে এসে হাতছানি দিয়ে আমায়
ডাকলে:•••• তাকে তখন বড় ভালাে লাগল •••••তার দাসীত্ব
বরণ করে নিলুম•••••সে জিজ্ঞেস করূলে সুখ চাও? আমি
বলুন, একটু-আধটু নয়—একেবারে পরিপূর্ণ সুখ ! সে খি
খি ক'রে হেসে উঠল•••তারপর বল্লে, সবুর কর ! তারপর
এই তাে দেখছিস, সুখ। আরাে সুখ চাইব? না..না...
করুণা, আর সুখ চাইব না।•••••••••গেলাসটা ভরে নিয়ে
আয়-কাণায় কানায় ভূক'রে নিয়ে আয়।
করণা। আতে হয়, তুমি নিয়ে এস। ও-বিষ তােমায় আমি দিতে
পারব না।
মমতা। দিতে পারবিনি!•••••পাবিনি ?•••• বেশ, না দিলি।
আমি নিজেই যাই•••• বেশ!
[ মমতা টলিতে টলিতে উঠিয়া টেবিলের উপর হইতে গ্লাসটা
লইয়া পাশের ঘরে যাইবার জন্য অগ্রসর হইল। সহসা
থমকিয়া দাড়াইয়া ফিরিয়া আসিয়া গেলাসটা টেবিলের উপর
রাখিয়া দিল। তারপর করুণার গলা জড়াইয়া ধরিয়া
রক্ত-কমল
মমতা রাগ করেছি, করুণা?•••রাগ করিসনে! তুই তাে জানিসনে
"তুই তাে বুঝিসনে! আগুন আগুনকে খেয়ে ফেলে...
তাই ওই আগুন পান করি।
•••••
(বাইরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনিয়া)
দেখতে আবার বুঝি পাওনাদার এসেছে!...নে হারছড়া নিয়ে
বা। ওদের পাওনা চুকিয়ে দে।
[ মমতা হার খুলিয়া করুণার হাতে দিল, করুণা আবার তার
গলায় পরাইয়া দিল
করুণা ।
এখন থাক। দরকার হলে নেব !
( করুণা বাহিরে চলিয়া গেল
মমতা। সুখ-সুখ-সুখ ! কেমন আবাগি, আর সুখ চাইবি ?•••
পরিপূর্ণ সুখ !...চাইবি ? (সােফায় বসিয়া দুই হাতে মাথা
চাপিয়া ধরিল )
করুণ। ( বাহির হইতে) দাদাবাবু এসেছেন দিদিমণি !
মমতা। কে? কে এসেছে বলি?
করুণা। দাদাবাবু!
মমতা। দোর বন্ধ করে দে!
রক্তকমল
(পতিত-প্রসন্ন প্রবেশ করিয়া )
পতিত-প্রসন্ন । এ বাড়ীর মালিক কে মমতা?•••তুমি না আমি
(মমতা দাড়াইয়া পাশের ঘরে যাইতে উদ্যত হইল)
শােন মমতা, দাড়াও। তােমার সঙ্গে দুটো দরকারি
কথা আছে।
(মমতা ফিরিয়া দাড়াইয়া পতিত-প্রসন্নের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিল)
মমতা। আমার তাে কোনােই দরকার নেই !
পতিত-প্রসন্ন । আর অভিমান কেন মমতা ? সে বয়েস চলে গেছে।
( পতিত-প্রসন্ন মমতার হাত ধরিতে অগ্রসর হইলে, মমতা
সরিয়া দাড়াইয়া টলিতে লাগিল
কি মাতলামাে সুরু করেছ ?
মমতা। মাতাল অস্পৃশ্যা..ঘৃণার পাত্রী? না?
পতিত-প্রসন্ন । নয় কি?
মমতা। কিন্তু চিরদিন তাে মাতাল ছিলুম না !•••• ছিলুম্ ?
[ পতিত-প্রসন্ন সে কথার জবাব না দিয়া একখানি
চেয়ারে বসিয়া পড়িল। মমতাও টেবিলের আর-একধারে
আর-একখানি চেয়ার টানিয়া বসিয়া
२२
রক্ত-কমল
মমতা ॥ করুণা নিয়ে যায়! ••কি কথা কইছ না যে! চেয়ে চেয়ে কি
দেখছ? দেখছ সে বসে নেই! • দেখ-হৃদয় ব'লে যদি কিছু
থাকে, তবে দেখ কাকে কি করেছ। হৃদয়ই নেই তার দেখবে
কি করে! ••আচ্ছা চোখ আছে ত ? দেখ এই দাগ।
মাতাল হতে চাইনি বলে চাবুক মেরেছিলে : মনে আছে?
নেই? তা কেন থাকবে। কিন্তু এ তোমার একদিনের একটি-
বারের মাত্র কীৰ্ত্তি নয়। পিঠে, বুকের ভেতরে অবধি এমন
অনেক দাগ তুমি একে দিয়েছ, তবে আমি এই হয়েছি! কাউকে
যদি বলি বিশ্বাসও করূবে না::"বুঝবেও না। যাক্ কি বতে
এসেছ, বলে চলে যাও !
পতিত-প্রসন্ন । তােমার সঙ্গে আর আমার সম্বন্ধ রাখা সম্ভবপর
নয় !
মমতা ॥ তা তাে জানি !
পতিত-প্রসন্ন ॥ তুমি বুদ্ধিমতী, বুতে পারবে বৈকি ! আমার আর
এমন অর্থ নেই যে, এই বাড়ীর ভাড়া যােগাই।
মম। তার জন্যে ভাবছ কেন?•••আমিই চলে যাব।
পতিত-প্রসন্ন । আজই তােমায় যেতে বলছিনে•••সুবিধে মত একটা
যায়গা দেখে উঠে যেও! আর পারােত নিজেকে শােধরাবার
চেষ্টা কোরাে !
মন ॥ সে আজ্ঞে গুরুদেব !
পতিত-প্রসন্ন! পরিহাস নয় মমতা! তােমার এই অধঃপতনের জন্যে
২৩
রক্তকমল
আমিও কিছু দায়ী বটে! জীবনের এই একটি ভুলের সংশােধন
আমি কয়ুতে চাই।
মমতা। মিথ্যাবাদী, প্রবঞ্চক:: একটি ভুল?
পতিত-প্রসন্ন । নয় কি?
মমতা। আর সেই হত্যা ?
পতিত-প্রসন্ন। কী! (বেগে উঠিয়া দাড়াইয়া)
মনতা। কি বার, আমায় হত্যা করে নিমেষের আর-একটা ভুল
করতে চাও !
পতিত প্রসন্ন । ( বলিয়া পড়িয়া) তুমি কি করে জানলে? তুমি কি
করে জানলে ?
নতা। প্রকৃতি থেকে যে কাজ করে গােপন রেখেছিলে, প্রমত্ত
অবস্থায় তা যে সব স্বীকার করে ফেলেছ। তােমার তা মনে
নেই, কিন্তু আমার আছে। সেবার ‘তুমি পালাও। পালিয়ে
তুমি বাঁচ। বাঁচ্লে কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত করলেনা•••আর-একটি
নারীর সর্বনাশ করলে ! সবই যদি নষ্ট করেছ, জীবনটাই বা
রাছ কেন? দাও শেষ করে। আবার একটিবার ভুল কর,
তারপর অনুতপ্ত হও, তারপর তােমার সমাজে ফিরে গিয়ে
আবার সুখের সংসার পেতে বােস! সঙ্কোচ কিসের ? কর,
আঘাত কর!
পতিত-প্রসন্ন। (মমতার কাছে অগ্রসর হইয়া) মমতা, আমি তােমার
প্রতি অবিচার করেছি।
২৪
রক্ত-কমল
মমতা। সে কি কথা সাধু, সে তােমার নিমেযের ভুল বইত নয় !
পতিত-প্রসন্ন। মনতা, আমি তােমায় পরিত্যাগ কয়ূব না।
মমতা কিন্তু আমি করব।
পতিত-প্রসন্ন ॥ তুমি আমায় পরিত্যাগ কোরােনা, মমতা। সংসারে
আমার কেউ নেই!...একদিন তাে আমায় ভাসােবাতে ?
মম। সে ভালােবাসার কথা আর বােলােনা, তুমি গলা টিপে তাকে
মেরেছ। সে কথা বলে আর কোনাে লাভ নেই। কিন্তু
জিজ্ঞেস করি, বিদায়ের পালা শুরু করে সহসা মিলন-মঙ্গল
শোনাচ্ছ কেন? ভয় হচ্ছে ব'লে ? তােমার গুপ্ত কথা প্রকাশ
করে দেব মনে করে আমায় তুমি আবদ্ধ করে রাখতে চাও?
নীচ, আমি তা করব না। তার নিজের বাপ যা গােপন
রাখলে, তা আমি প্রকাশ করব কেন?
পতিত-প্রসন্ন। মমতা, ভুমি এত মহৎ, তা আমি জান্তুম না।
মমতা। আমি কি, তা আমিই জানি • এবার তুমি বিদায় নাও।
পতিত-প্রসন্ন। মমতা, আমি তােমায় পরিত্যাগ কতে চেয়েছিলুম
অন্য কোন কারণে নয়, অর্থের অভাবে। নইলে এত পাষণ্ড
আমি নই যে, তােমার এই অধঃপতনের সহযাত্রী হয়ে তােমায়
বিপদে ফেলে চলে যেতে চাইব।
মমতা। সহযাত্রী ! কথাটা ঠিক হল না। বল-তােনার প্রলুব্ধ
করে এনে সহযাত্রী করে নিয়ে, তারপর•••
পতিত-প্রসন্ন। আমি আমার সকল অপরাধ স্বীকার কয়ছি, মমতা।
রক্ত-কমল
(মনতার কাছে অগ্রসর হইতেই।
মমতা। ওই চেয়ারে বােসস! তারপর বলাে তােনার বক্তব্য।
পতিত-প্রসন্ন ॥ অর্থের অভাবে তােনায় আমি পরিত্যাগ করতে চে-
ছিলুম। অর্থ সংগ্রহের সকল চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হয়ে আমাকে
নিৰ্ম্মম হতে হয়েছিল। একটা উপায় ছিল.••এখনাে আছে।
কিন্তু আমাকে দিয়েই তা হবে না। আমার সাহায্যের জন্যে
একজন লােকের দরকার-পুরুষ হলেও ক্ষতি নেই, নারী হলে
তােত ভালােই হয়। সাহস করে কাউকে বলতে পারিনি। প্রচুর
অর্থ, সাহায্যকারীকে তার অংশ দিতেও প্রস্তুত কিন্তু সাহায্য
চাইতে গেলেই সাহায্যকারীকে আমার অতীত জীবনের সেই
ভুলের পরিচয় দিতে হয়। তাই সাহস পাইনি..কিন্তু তুমি
যখন তা জান, তখন তােমাকে সকল কথা খুলে বলতে আমার
আর সঙ্কোচ নেই। বল, তুমি আমায় সাহায্য করবে ?
(মমতা নীরব রহিল )
শােন। আমার কন্যা জীবিত আছে। তার মাতামহের সমস্ত
সম্পত্তির অধিকারিণী সে। আমি যদি তাকে আমার গৃহে
এনে আমার মনােনীত পাত্রের সঙ্গে তার বিবাহ দিতে পারি,
তাহলে বিপুল সম্পত্তির কর্তৃত্ব আমি পাব। জীবনের বাকী দিন
কটা তােমাতে আনাতে একসঙ্গে শান্তিতে কাটিয়ে দিতে পারব।
রক্ত-কমল
(কিছুকাল নীরব থাকিয়া)
আমি পাত্র অবধি স্থির করে রেখেছি। কন্যাকে ফিরিয়ে
আবার জন্যে অনেকবার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু আমার শ্বশুর,
দাম্ভিক, নির্মম, স্বার্থান্ধ সেই বৃদ্ধ বার বার আমায় অপমান
করে তাড়িয়ে দিয়েছে। কন্যার সঙ্গে একটিবারও আমায়
সাক্ষাৎ কতে দেয়নি। চিঠি লিখে আমার মেয়েকে সব কথা
জানাবাে ভেবেছিলুম; কিন্তু তাও সাহস হয়নি।
( আবার কিছুকাল নীরব থাকিয়া)
তুমি যদি সাহায্য কর মমতা, তাহলে আমার কন্যার উদ্ধার
সাধন হয়-তােমার জীবন, আমার জীবন সুখময় হয়। বল,
বল মমতা, তুমি আমায় সাহায্য কবে ?
তা। একবার সুখের কথায় মজিয়ে ঘরের বার করেছ আবার
সেই সুখের কথা শুনিয়ে নারীত্বের অবশিষ্ট যেটুকু আছে তাও
নষ্ট করে পুরােদস্তুর পিশাচী করে তুলতে চাও? কিন্তু সুখ
আর চাইনে! অনেকবার চেয়েছিমন-প্রাণ ঢেলে চেয়েছি ।
মান-সম্রম বিকিয়ে চেয়েছি: কুলশীল বিসর্জন দিয়ে চেয়েছি।
অমন ক'রে চাওয়ার ফলে যা পেয়েছি, তাতেই আমার সুখের
স্বপ্ন ভেঙে গেছে•••আর তা চাইনে।
[ বাহিরে একটা উচ্চ শব্দ হইল, সঙ্গে সঙ্গে একটা আর্তনাদ।
মমতা উঠিয়া দাড়াইল
২৭
রক্ত-কমল
মমতা। ওকি শব্দ! কি বুঝি একটা সৰ্ব্বনাশ হয়ে গেল। করুণা,
করুণা!
করুণা। কি দিদিমণি!
মন । দেখলে! রাস্তায় কি হল ?
[ করুণা বাহিরে চলিয়া গেল
পতিত-প্রসন্ন । এইবার আমার কথার জবাব দাও, মমতা !
মতা। চুপ !••এ সময় কথা কোয়ােনা ! কার বুঝি সৰ্ব্বনাশ হ’ল !
পতিত-প্রসন্ন। এখনাে নেশা কাটেনি।
মনতা। তােমাকে দেখেই নেশা ছুটে গেছে। বুকের আগুন দাউ
দাউ করে জ্বলে উঠেছে•••কথা কোয়ােনা।
( করুণা ঘরে ঢুকিতেই মমতা তাহার দিকে অগ্রসর হইল )
কি! কি হয়েছে করুণা ?
করুণা। কি হয়েছে তাতে বুঝতে পারলুম না, দিদিমণি ! দেথলুম
একটি বুড়াে ভদ্দর লােক রাস্তায় পড়ে ধুকছে আর দূরে একখানা
গাড়ি জোরে ছুটে যাচ্ছে, কতকগুলাে লােক তার পিছু পিছু
ছুটছে আর চেঁচাচ্ছে। আর কতকগুলাে লােক হল্লা করূছে।
মমতা। ভদ্রলােকটিকে কেউ সাহায্য করূছেনা?
করুণা। লােকগুলাে সব হল্লা কছে—কেবল রাস্তার একটা মুটে
লােকটিকে গিয়ে ধরেছে।
মমতা। তুই চলে এলি কেন?
২৮
রক্ত-কমল
করুণা । আমি একা কি কব দিদিমণি ? তাই তােমার কাছে ছুটে
এলুম।
মমুতা। যা, তাকে এই ঘরে নিয়ে আয়, মাথায় জল দে, হাওয়া কর,
ডাক্তার ডা! কি, চেয়ে রইলি যে ! যা !
করুণা। দাদাবাবু তুমি যাওনা, ভদ্রলােকটিকে নিয়ে এস, আহা
বড় চোট পেয়েছে গাে, বড় চোট পেয়েছে।
মমতা ॥ যাও। জীবনে অন্তত একটি ভালাে কাজ কর।
পতিত-প্রসন্ন । তাহলে তুমি সম্মত হবে ?
মমতা। যাও !
[ পতিত প্রসন্ন বাহির হইয়া গেল
করুণা, ও-ঘরের বিছানায় একটা চাদর পেতে দে। কুঁজো,
অডি-কলনের শিশি, পাখা ঠিক করে রাখ ! কি সর্বনাশ হতে
বসেছে!
[ করুণা পাশের ঘরে চলিয়া গেল। মনতা চঞ্চলপদবিক্ষেপে
ঘুরিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে
বুঝি একটা ভীষণ কিছু হয়ে যায়, একটা পরিবারের সকল সুখের
আলাে বুঝি নিভে যায়!
(পাশের ঘরের দুয়ারের কাছে গিয়া )
করুণা, একটু দুধ গরম করে রাখ।
(সিড়িতে পায়ের শব্দ শুনিয়া)
মনত । কি দেতে হয় ! ভগবান্ কি দেখতে হয় !
[ মমতা দুই হাতে মুখ ঢাকিল। পতিত-প্রসন্ন এবং রাস্তার
একটি মুটে আনন্দময়কে ধরিয়া ঘরে প্রবেশ করিল।
আনন্দময় বৃদ্ধ • আঘাত পাইয়া একেবারে
হারান। নাই। মমতা হাতের ইসারায় পাশের ঘর
দেখাইয়া দিল। পতিত-প্রসন্ন আর করুণা আনন্দময়কে
পাশের ঘরে লইয়া গেল। মুটে দ্বারের কাছ
হইতেই চলিয়া গেল। পতিত-প্রসন্ন আনন্দময়কে
রাখিয়া পাশের ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিতেই মমতা
সেই দিকে অগ্রসর হইল
পতিত-প্রসন্ন। কোথায় যাও? আমার কথার একটা জবাব
দিয়ে যাও।
[ মমতা ঘৃণা-ব্যঞ্জক দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল। তারপর
পাশের ঘরে চলিয়া গেল। পতিত-প্রসন্ন কিছুক্ষণ
তাহার দিকে চাহিয়া থাকিয়া একটা চেয়ারে বসিয়া
পড়িল
পতিত-প্রসন্ন। আজ একটা হেস্তনেস্ত করে যেতে হবে। একবার
এই কুলটাকে দিয়ে কার্যোদ্ধার করিয়ে নিতে পারুলে এই
দাম্ভিকতার প্রতিশােধ গ্রহণ করব। এত দম্ভ ! আমারই অস্ত্রে প্রতিপালিত, আর আমাকেই সে ঘৃণা করে, মুখের উপর সে- কথা বলতেও সঙ্কোচ বােধ করেন। কিন্তু ও-কণ্ঠ আমার রােধ করতেই হবে, সুধু ঔদ্ধত্যের জন্যে নয়, আমার সেই গােপন কথা চিরকাল গােপন রাখবার জন্যে। কণ্ঠরােধ করতেই হবে এই নারীর আর সেই বৃদ্ধের ! ( মমতা ঘরে ঢুকিয়া সােফায় উপবেশন করিল। কি ফিরে এলে যে, শুশ্রুষা করে পুণ্য সঞ্চয় ককূলে না? মমতা। তার পথও তুমি বন্ধ করেছ ! পতিত-প্রসন্ন। তার মানে ? মমতা। তার মানে এই শুদ্ধাচারী তােমার স্পর্শ দিয়ে, পাপ-প্রভাব দিয়ে আমায় এনি কলুষিত করেছ যে, আজ আমি কোন ভদ্র- লােকের সাতে গিয়ে দাড়াতেও পারিনে। পতিত-প্রসন্ন। আমি তােমায় যখন-তখন মদ খেতে বলিনি! অভ্যে তুমিই বাড়িয়েছ ! আমার দোষ কি? মমতা। না, না তােমার কি দোষ? তুমি যে পুরুষ ! তােমার তত কোনাে দোষ হতে পারে না। দোষ আমার আমি নারী, কামিনী, নরকের দ্বার। দোষ সর্বত্র নারীর, কেননা নারীই ত কুহক বিস্তার করে সরল পুরুষদের প্রলুব্ধ করে নরকে টেনে আনে সুখের সংসার পুড়িয়ে ছাই করে দেয় ! পুরুষ? সে
7
রক্ত-কমল
ততা চির-শিশু-বড় সরল, বড়ই নিৰ্ম্মল ! অতীতের পানে চেয়ে ,
দেখ, দেখবে কলঙ্কের এতটুকুও কালিমা কোথাও তােমায় স্পর্শ
করেনি। পুরুষ হচ্ছে সৃষ্টির হংসাবতার, নীরটুকু ফেলে ক্ষাটুকু
খেতে সে ওস্তাদ। আবার হাঁস যেমন পাকের ভেতর সারাদিন
ঘাের ফেরা করে অথচ পাখা দুটি তার শুভ্রই থাকে, তেমনি
পুরুষ যতই নীচুতে নেমে যা, চরিত্র নাকি তার নিষ্কলঙ্কই
পাকেমার্জনা-লাভ, ভালাে-হবার সুযােগ না চাইতেই সে পায়।
নারী বলেই সীতাকেও অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল...আর নারী
বলেই সে-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও তিনি রেহাই পেলেন না।
পতিত-প্রসন্ন। বাঃ, তুমি তাে বেশ বলতে পার, অনেক কথা
শিখেছ তাে !
মমতা। সু-শিক্ষা তুমি কখনাে পাওনি; কিন্তু আমি কিছু পেয়ে-
ছিলুম•••আজও তারই জাবর কাটছি।
পতিত-প্রসন্ন । যাক্ বিদূষী, তােমার বিদ্যের পরিচয়ে আমার প্রয়ােজন
নেই। এখন বল, আমায় সাহায্য কবে কি না?
মমতা ॥ না !
পতিত-প্রসন্ন। ভবিষ্যৎ চিন্তা করে জবাব দাও।
মমতা। ভবিষ্যতের চিন্তা আগে যখন করিনি...তখন আর তার
প্রয়ােজন?
পতিত-প্রসন্ন । আমার আশ্রয় হারালে তােমায় কোথায় গিয়ে দাড়াতে
হবে জান?
৩২
মমতা। যা ভেবেছ তা নয়, মা জাহ্নবী তার মেহ-শীতল বক্ষ পেতে
অপেক্ষা কয়ছেন তার ডাকও আমি শুনতে পেয়েছি।
পতিত-প্রসন্ন। আর একদিন তােমায় ভাবার অবকাশ দিলুম, আজ
তুমি প্রকৃতিস্থ নেই। আমি চলুম !
[ প্রস্থান
মমতা। উঃ, কি ভয়ানক লােকের কথায় ভুলেছিলুম, চেহারায়
মজেছিলুম !•••যাক্ আর ভাবতে পারিনে।
[ মমতা দুই হাতে মাথা ধরিয়া বসিল। পিছন হইতে
আনন্দময় তাহার মস্তক স্পর্শ করিলেন, করুণা পাশের
ঘরের দুয়ারের সামনে দণ্ডায়মান
আনন্দ। মা, আমি এখন আসি। তােমার কৃপায় এবারটা বেঁচে
গেলুম। আর একদিন এসে সন্তানের কৃতজ্ঞতা নিবেদন
করে যাব।
[ মমতা উঠিয়া মাথায় কাপড় টানিয়া দিয়া আনময়ের
নিকট হইতে একটু দূরে দাঁড়াইয়া মাথা নীচু করিয়া
মমতা। আর একটু বিশ্রাম করা ভালাে ছিল না?
আনন্দ । বেশ ত সুস্থ হয়েছি। একটু জরুরি কাজে বেরিয়েছিলুম,
সেটা এখনই শেষ কতে হবে। বুঝতেই তাে পার মা, জীবন-সূৰ্য্য
অস্তাচলে ঝুঁকে পড়েছে। কখন বিনা নােটিশে ডুবে যায়। আজ
৩৩
রক্ত-কমল
যেন মমতাময়ীর দ্বারে এসে পড়ে বেঁচে গেলুম•••এমন মা তাে ঘরে
ঘরে পাব না।
মমতা । ও-কথা ব'লে আমায় লজ্জা দেবেন না। একখানা গাড়ী
ডেকে দেব ?
আনন্দ। কিছু প্রয়ােজন নেই মা, এখন যাই-কাল আবার আস্ব ।
[ আনন্দময় অগ্রসর হইলেন—মমতাও তার পিছন পিছন
দুয়ার পর্যন্ত আগাইয়া গেল, আনন্দময় বাহিরে গেলে
মমতা। দেখুন, যেতে পারবেন কিনা নইলে গাড়ী ডেকে দি।
আনন্দ। না, মা, কোনাে চিন্তা নেই।
[ প্রস্থান।
মমতা ॥ এত তাড়াতাড়ি করে চলে গেলেন কেন, করুণা? তুই
কি আমার কথা কিছু বলেছিস্?
( করুণা চুপ করিয়া রহিল।
চুপ করে রইলি যে! আবাগি, কি সর্বনাশ করেছিস তুই।
পরিচয় দিয়েছিস?
করুণা। উনি যে জানতে চাইলেন ?
মমতা। উনি জানতে চাইলেন আর তুই সব বলে ফেল্লি ! দেখ,
ততা, তুই কি করেছি। ওরে, আমার লজ্জা, আমার কলঙ্ক
আমি আর গােপন রাখতে চাইনে। সে পরিচয় দিয়েছি বলে
আমার দুঃখ হচ্ছে না। কিন্তু অসুস্থ ওই বৃদ্ধকে এ সময়ে তুই
কেন আমার পরিচয় দিলি ? তা যদি না দিতি, তাহলে হয়ত
৩৪
রক্ত-কমল
আর একটু অপেক্ষা করে, ভাল করে সুস্থ হয়ে, তবে যেতেন।
আমার পরিচয় পাবার পর কোনাে ভদ্রলােক কি আর এখানে
থাকতে পারে ? হয়ত চলতে গিয়ে আবার প'ড়ে গেছে,
হয়ত রাস্তায় একটি লােকও নেই যে সাহায্য কবে। করুণা!
তুই কি করেছি-কী করেছিস্ ! যা এখুনি রাস্তাটা আর
একবার দেখে আয়।
ভয় নেই দিদিমণি, তেমন চোট কোথাও লাগেনি। একটু
জল দিতে, বাতাস করুতেই সুস্থ হলেন, উঠে বসলেন।
তারপর তােমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি প্রথমে
কিছুই বলিনি। অমি দু’চার কথা বল্লুম। শেষে ওর কেমন
যেন সন্দেই হ’লখুচিয়ে খুঁচিয়ে তােমার সব কথা জেনে
নিলেন। শুধু তােমার কথা দিদিমণি-দাদাবাবুর নামও জাতে
চাইলেন না, আমিও•বল্লুম না। আমি তাে তােমার মনের অবস্থা
জানি, দিদিমণি ! আমি তাই বন্ধুম। শুনে কিছুক্ষণ তিনি
মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন, তারপর আমায় বল্লেন, তােমায়
যেন না বলি, তিনি সব শুনেছেন। কিন্তু দিদিমণি, তােমায় না
বলে আমি কি থাকতে পারি ?
( দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল )
মমতা। কণা, তাের ভাই না কে-একজন আত্মীয় আছে বলেছিলি?
রুণা। মামাতাে ভাই, দিদিমণি!
রক্ত-কমল
মমতা। সেই না তােকে তার বাড়ী গিয়ে থাকতে বলেছিল ?
করুণা ॥ তার না নেই, ছােট্ট একটি বউ, সংসারের কাজ চলে না,
তাই বলেছিল—আমি গিয়ে যদি দেখি শুনি, তাহলে ভালাে।
হয়। আমি কি করে যাই? তােমার সব দেখা-শোেনা না
কলে তুমি হাতে টাকা থাকতেও উপােস ক'রে ময়ুবে, ছেড়া
কাপড় প'রে দিন কাটাবে! তাই তাকে বলে দিয়েছি, আমি
যেতে পারব না।
মন। তােকে সেইখানেই যেতে হবে।
করুণা ।
কেন ?
মনতা। আমি আর তােকে রাখতে পাব না।
সে কি গাে ! আমি কি তােমার কাছে নাইনে চাইছি,
কথন চেয়েছি ! দু'বেলা দু'মুঠো খাই, তাও না-হয় আমি
রোজগার করে জোটাব। তবু তোমায় আমি ছেড়ে যাব না।
আমি তোমায় ছেড়ে গেলে একটি দিনও তুমি বাঁচবে
মমতা। সংসারের সব বাধন ছিড়ে এলুম, আর এখন তুই আমাকে
বেঁধে রাখতে চাস? করুণা, মায়ায় জড়িয়ে আমায় ধরে রাবার
চেষ্টা তুই করিনে। স্নেহ, মমতা, ভালােবাসা—এ সব আমার
জন্যে নয়।
করুণা ॥ আচ্ছা তাই হবে গাে, তাই হবে। আমি তােমার সঙ্গে ঝগড়া
করে কালই তােমার বাড়ী ছেড়ে চলে যাব। এখন যাও,
৩৬
রক্ত-কমল
গােসলখানায় গিয়ে মাথায় ভালাে করে ঠাণ্ডা জল দাওগে
যাও।
মমতা। তামাসা নয়, করুণা! তােকে যেতেই হবে।
[ পাশের ঘরে চলিয়া গেল
করুণা। আমি যাব, কিন্তু একা যাব না, তােমাকেও সঙ্গে করে
নিয়ে যাবি। আনন্দবাবু বলেছেন, একটা ব্যবস্থা কিছু করে
দেবেন। দেখেই বুঝেছিলুম যে ভদ্রলােকের দয়ার শরীর।
তাইত ব’লে ফেলুম তােমাকে এ নরক থেকে উদ্ধার কতে।
কি জ্বালায় দিন-রাত তুমি পুড়ছে, তা কি আমি বুতে পারিনে!
( ঝাড়ন আনিয়া টেবিল পুছিতে পুছিতে) কিন্তু ভগবান বুঝি
মুখ তুলে চেয়েছেন।
( পাশের ঘরে মমতা গাহিতে লাগিল )
( জয়জয়ন্তী, একতালা )
দারুণ পিপাসায় মায়া-মরীচিকায়
চাহিতে এলি জল বনের হরিণী !
দগধ মরুল
কে তােরে দেবে জল,
ঝরিবে আঁখি-নীর তােরি নিশিদিনই ।
নিবায়ে গৃহ-দীপ আপন নিঃশ্বাসে
আলেয়ার পিছে এলি সুখ-আশে !
৩৭
রক্তকমল
সে সুখ অবসান
সুমুখেতে শ্মশান
পিছনে অন্ধকার চির-নিশীথিনী ।
কেন তুই বন-ফুল বিলাস-কাননে
করিয়া পথ ভুল এলি অকারণে?
ছিড়ে সাঁঝে তােরে মালা গাঁথি, ভােরে
দলিল বিলাসী পথ-ধূলি সনে!
সন্ধ্যা-গগাধূলির রাঙা রূপে ভুলে,
আসিলে এ কোথায় তমসার কূলে !
শ্রাবণ-মেঘ হায়
ভাবিয়া কুয়াশায়
হারালি পথে তাের, রে হতভাগিনী!
করুণা। না, আবার কঁদতে সুরু করূলে। আচ্ছা মেয়ে ! যখন বুক
ফেটে ওর কান্না পায়, তখনই ও গান গায়, খাওয়া-দাওয়া
আজ আর হবে না।
( মমতার প্রবেশ ]
করুণা । যাও লক্ষ্মীটি, এইবারটি নাইতে যাও।
মমতা । করুণা!
করুণা । কি দিদিমণি।.
মমতা। আমাকে হাসিমুখে বিদায় দিতে পাবি তত ?
করুণা। কোথায় যাবে দিদিমণি ?
৩৮
মুমতা। কোথায়?•••তা এখনও ঠিক করিনি...এই মাষ্টারি-টাষ্টারি
নিয়ে কোনাে দূরদেশে যদি চলে যাই।
করুণা । মাষ্টারি করূবে তুমি !
মমতা। অবাক হয়ে গেলি যে রে ! আমার যা বিদ্যে আছে তাই
নিয়েই কত মেয়ে মাস্টারি করে দিন কাটাচ্ছে।
করুণা । আমি তা বলছিনে দিদিমণি যে সর্বনেশে অভ্যেস করেছ !
মমতা। আর ছোঁব না করুণা, আর তা ছোবনা।
করুণা । সত্যি বছ দিদিমণি? পাবে ?
মমতা। একদিনে সর্বস্ব ত্যাগ করতে পাগুম, আর এইটে পাব
! করুণা, তুইতাে নারী—কিন্তু নারী কতখানি শক্তি ধরে,
তার সন্ধান রাখিনে!
[ মমতা চলিয়া গেল
করুণা । ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন!
(মমতা আবার ফিরিয়া আসিল )
ওকি! আবার এলে কেন, দিদিমণি? নাইতে যাও।
( মমতা একখানা চেয়ার টানিয়া বসিয়া পড়িল)
অমন করছ কেন? হয়েছে কি ?
মমতা। কিছু হয়নি করুণা ! করুণা, একটা কথা বলতে পারি ?
বড় শক্ত প্রশ্ন:•••• নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করেও জবাব পাচ্ছি
তুই বলতে পারি ?
করুণা । কি জানতে চাও, বল।
৩৯
রক্ত-কমল
মমতা। কিন্তু তুই তাে জবাব দিতে পাবি না।••••* তুই কি করে
জবাব দিবি?
( মমতা চুপ করিয়া রহিল )
করুণা। বলি নাইবে-খাবে না? তােমার পেটের জ্বালা নেই বলে
কি আমিও শুকিয়ে থা?
মমতা। জ্বালা নেই বল্লি ?"বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। সেই
কবে আগুন ধরেছিল ..'আজও আছে! ..রাবণের চিতার মত
দিন-রাত দাউদাউ করে জ্বলছে ?
করুণা । আমি কি তােমার সামনে মাথা খুঁড়ে ময়ূব?
মমতা। প্রশ্ন কয়ছিস্?
প্রশ্ন কয়ছিস্? •••• তাহলে তাে জবাব দিতে পারবিনি...
করুণা, পাবিনি!
করুণা। আগে কথাটা বলেই ফেল।
মমতা। তুই আগে তাের নিজের প্রশ্নের একটা মীমাংসা করে নে•••
স্থির করে নে যে মবি !
করুণা | কি বলে কিছুই তাে বুঝতে পারছিনে। মাতালের কথা তত
নয় ••এমন ক'রে কখনাে তে মাতলামি করে না ! তুমি কি
আমায় না মেরে রেহাই দেবে? স্থির করেছি ময়ূব। এখন বল
কি বলতে চাও !
মমতা মবি স্থির করেছিস?"••ঠিক তত?
করুণা। হাঁ, ঠিক••এবার বল।
৪০
রক্ত-কমল
মমতা। বল্ ছে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আতে একটিবারও দ্বিধাবােধ
কলুম না, আর দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবার সময়, এত সংশয় এসে
সঙ্কোচ এসে বাধা দেয় কেন? “তুই কি দুনিয়ার মায়া কাটাতে
পেরেছিস্?
করুণা । তুমি মনে মনে কি ঠাওরেছ বলত দিদিমণি?
মনতা। তুই পাবিনি করুণা, মরতে পাবিনি !
বুঝতে যখন
পায়ুছিসনি:তখন মরতেও পাবিনি! যা, করুণা, নাইতে
যা-খেয়ে পেটের জালা ঠাণ্ডা করগে।
করুণা। দিদিমণি, লক্ষ্মীটি আমার, চল, নাইতে চল।
[ দুজনেই চলিয়া গেল
উঃ লা পুষকে মন্তব্য লিখিবে না,
এ, বি থাকিলে হিড়িকে না।
১১
রক্তকমল
পূরবী ।
-( মাঢ়, কাহারবা
কেউ ভােলে না কেউ ভােলে অতীত দিনের স্মৃতি।
কেউ দুখ লয়ে কঁদে, কেউ ভুলিতে গায় গীতি।
কেউ শীতল জলদে হেরে অশনির জ্বালা,
কেউ মুঞ্জরিয়া তােলে তার শুদ্ধ কুঞ্জ-বীথি।
হেরে কমল-মৃণালে কেউ কঁাটা, কেহ কমল,
দলি চলে, কেউ মালা গাঁথে নিতি।
কেউ জালে না আর আলাে তার চির-দুখের রাতে,
কেউ দ্বার খুলি জাগে, চায় নব চাদের তিথি।
কেউ ফুল
৪২
PUBLIC
SH.
( Estbd 1885:
6.
LA
[ দাদা মহাশয়ের বসিবার ঘর। মাঝখানে টেবিল, চারিপাশে চেয়ার। পশ্চিম
দিকের দ্বারের সামনে কালাে পর্দা।
মালী একটা ভাসে কতকগুলি সাদা ফুল টেবিলের উপর রাখিয়া গেল। দাদা
মহাশয় ও আনন্দ ঘরে ঢুকিলেন।
আনন্দ। খাসা ছেলেটি ! দেখে আমার বুকে নিতে ইচ্ছে হল।
তাই বছিলুম একটা ভালাে দিন দেখে
দাদা মহাশয় । চুপ, চুপ, আনন্দ শুনতে পাবে !
আনন্দ। কে শুনতে পাবে?
[ দাদা মহাশয় প্রশ্নের জবাব দিলেন না। চাদরখানি আলনায় '
ঝুলাইয়া আর লাঠিগাছটা দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিয়া
চেয়ারে বসিলেন
আনন্দ।
কে শুনতে পাবে?
[ দাদা মহাশয় উত্তেজনায় কঁপিতে কাপতে উঠিয়া দোরের
দিকে গেলেন। তারপর ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন
দাদা মহাশয়। ভুলে গেছ আনন, তাকে তুমি ভুলে গেছ ?
আনন্দ। কাকে ভুব, বন্ধু!
৪৩
রক্ত-কমল
[ দাদা মহাশয় চেয়ারে বসিয়া টেবিলের উপর মাথা
রাখিলেন, তারপর বলিলেন
দাদা মহাশয় ॥ আনন্দ! ভাগ্যবান্ "তুমি ভাগ্যবান্ ! তােমার
মতাে আমারও যদি স্মৃতি লােপ পেত, তাহলে আমি বাঁচতুম
তাহলে ••তাহলে ভগবানকে সত্যই মঙ্গলময় বলে হাজারবার
প্রণাম কতুম !
আনন্দ । কে শুনে ফেলবে বলে ভয় পাচ্ছ ?
দাদা মহাশয়। বুঝতে পাছ না? আমার কন্যা! তােমার ওই
পাষাণ-মনে যার স্মৃতি-রেখাটি আজ অঙ্কিত নেই। অথচ তুমি
তাকে এত ভালােবাতে।•••••যােলটা বছর কতটুকু সময়
আনন্দ? তারি মাঝে ভুলে গেলে !
আনন্দ। না বন্ধু ভুলিনি "ভুলতে পারিনি ! হ্যা, তবে তােমার মত
আত্মহারা হইনি। বুকের ভেতর আগুন রয়েছে বলে মনকে
পুড়ে ছাই হতে দেব কেন? আমি জানি আঘাত সইতেই
হবে, আঘাতের বেদনায় ভেঙে পড়লে যে জীবন যুদ্ধে পরাজিত
হয়ে ধুলােয় মিলিয়ে যেতে হবে। তা জেনেই আঘাতকেও আঘাত
করেই আমি ফিরিয়ে দিতে চাই। তাইত বলেছিলুম, কমলের
বিয়ে দিয়ে আবার সুখী হতে চেষ্টা কর।
দাদা মহাশয়। বিরে। বিয়েতে সুখ ! আনন্দ তােমার স্মৃতি ভ্রংশ
হয়েছে, বুদ্ধি-নাশ ঘটেছে।
আনন্দ। বল, আমি ইহলােকেই নেই, পরলােকে চলে গেছি।
৪৪
রক্তকমল তুমি কথা কইছ আমার সঙ্গে নয়, আমার প্রেতাত্মার সঙ্গে। স্মৃতিভ্রংশ, বুদ্ধিনাশ কেমন করে হ’ল শুনি? দাদা মহাশয়। হয়নি ? বুকে হাত দিয়ে বলত, বিবাহ তােমায় সুখী করূতে পেরেছিল কি? আমি জানি সুখ পাওনি! বিয়ে করে আমিও সুখের সন্ধান পাইনি, আমার অভাগী কন্যা জীবনদান করেও সুখ পায়নি! বিয়ে করে সুধু সুখই যে পাইনি তা নয়, আনন্দ। অমৃত মনে করে যা এক চুমুকে পান করে ফেলুম, তা বিষ হয়ে সারাটা দেহ-মন জর্জরিত করে ফেলেছে। কমলের বিয়ে দিলে তারও জীবন তাে এম্নি ক'রেই ব্যর্থ হবে ! আনন্দ। সব ব্যাপারেই তােমার বড় বাড়াবাড়ি। বিয়ে ত সংসারের লােকই করেছে, সবাই কি আমাদের মত দুঃখই পেয়েছে। দাদা মহাশয় ॥ দুঃখ হয়ত পায়নি; কিন্তু সুখ? সুখ কি পেয়েছে ? বিবাহিতা নারীর মুখপানে আমি চেয়ে দেখি, বিবাহিত পুরুষের কথা আমি কান পেতে শুনি—দেখে শুনে আমি বুঝেছি, বিয়ে করে তারা আর যাই পাক্, সুখ পায়নি:সুখ পায়নি • আনন্দ। না, না, অমন কথা তুমি বােলােনা। তুমি সংসারকে দেখনি, বােঝেওনি। মানুষ বিয়ে করে বলেই তাে সংসারে চাঁদের হাট মেলে। বিবাহই তাে পুরুষ আর নারীর মিলন মধুময় করে তােলে, আর সেই মধু-মিলনকে সার্থক করে তাদের থােক- খুকুর দল। তাদের আধ-আধ বুলি, তাদের হাসি, তাদের ৪৫
রক্ত-কমল
তাজা তকে নরম হাতের নিবিড় আলিঙ্গনই মানুষের অনেক
আলা, অনেক দুঃখ ঘুচিয়ে দেয়।
দাদা মহাশয়। অস্বীকার করিনে আনন্দ, তােমার একটি কথাও
আমি অস্বীকার করিনে। আমিই কি বাতুম যদি না কমলকে
পেতুম...বাচ তুম না আনন্দ, কিছুতেই বাচ তুম না। পুরুষ আর
নারীর বিবাহ তাদের সুখ দিতে পারে না, পুরুষ আর নারীর
সন্তান তাদের সুখ দিতে পারে, এ কথা আমি মানি।
আনন্দ ॥ কথার মারপ্যাচ কেন বন্ধু ? বিবাহের ফলই তাে সন্তান।
দাদা মহাশয়। না•••না আনন্দ, বিবাহের ফল সন্তান নয়, হের
ফল বন্ধন•••শাস্ত্রের বন্ধন লােকাচারের বন্ধন!
আনন্দ। ধর্মের বন্ধন।
দাদা মহাশয় । হাে, তবু সে বন্ধন!
আনন্দ । কিন্তু
সাদা মহাশয়। মিছে কেন তর্ক করুছ আনন্দ..অতীতের পানে চেয়ে
দেখ না। শাস্ত্রের বন্ধনে, লােকাচারের বন্ধনে, তুমি যাকে ধর্ম
বছ তারই বন্ধনে যদি না আমার কন্যাকে সেই পাষণ্ডের
জীবনের সঙ্গে বেঁধে দিতুম, তাহলে কি সেই লম্পটের কাছ থেকে
তাকে মুক্ত করে আনতে পারতুম না ? আর তা যদি পারতুম,
তাহলে কি আমার কন্যাকে তােমার শাস্ত্রের, তােমার লােকা-
চারের, তােমার ধর্মের কাছে জীবন বলি দিতে হত ?
হত না •"আনন্দ কিছুতেই হত না। অথচ যে মুহূর্তে
৪৬
রক্ত-কমল তার বিয়ে দিলুম, সেই মুহূর্তে, আইন, আচার, সমাজ, শাস্ত্র, সবই সবার সকল অধিকার হরণ করে হৃত সেই অধিকার ন্যস্ত কল অযােগ্য..সকল রকমে অযােগ্য, সেই স্বামীর ওপর। •••••সেই অধিকারের পরােয়ানার জোরে অমানুষ সেই স্বামী যখন স্ত্রীর উপর অত্যাচার সুরু করল, তখন তুমি, আমি, সমাজ, সবাই তাই চুপ করে চেয়ে দেখলুম : চোখের সামনে অমানুষিক অত্যাচার দেলুম : চোখের সামনে দেলুম সেই অত্যাচারের ফলে সে মরে গেল!-শাস্ত্র, লােকাচার, পিতা, সুদ কেউ তাকে বাঁচাতে পারল না ! আনন্দ । আমাদের সে শশাকের ইতিহাস একটা ব্যতিক্রম:••প্রতি পরিবারেই কিছু ও-রকম ঘটনা নিত্য ঘটছে না। দাদা মহাশয়। না, না আনন্দ, ব্যতিক্রম নয়। ভেতরে ভেতরে সব পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে••আমরা বাইরে তার প্রকাশ হতে দিচ্ছিনে। সঞ্জয়ের মতাে যদি তােমার দৃষ্টিশক্তি থাক্ত আনন্দ, তাহলে এইখানে বসেই দেখতে পেতে কত সীমন্তিনী অত্যাচার- জর্জরিত হয়ে রাতের পর রাত গােপনে অশ্রু বিসর্জন করূছে, কত বিধবা ব্যর্থ জীবনের জন্য ভগবানকেও অভিসম্পাত কছে, কত পুরুষ বিবাহ করেছিল বলে দাতে ঠোট কামূড়ে মনের ক্ষোভ, দুঃখ, অনুশােচনা চেপে রাখছে। ••••"সেই দৃষ্টিশক্তি যদি থাকত, তাহলে একটির পর একটি, প্রতি পরিবারের প্রতি ঘরের এত সব অত্যাচারের অবিচারের অনিয়মের ৪৭
রক্তকমল
।
পুরুষ আর
পরিচয় পেতে, যে তর্কের আর কোনাে অবসর পাত না।
( দাদা মহাশয় উত্তেজিত হইয়া পায়চারি করিতে লাগিলেন)
আনন্দ! তুমি বুঝি সঞ্জয়ের সেই দৃষ্টি পেয়েছ?
দাদা মহাশয়। না, আনন্দতা পাইনি। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি যে মােহে
আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, সেই মােহ আমার কেটে গেছে••মানুষের
কৃত্রিম ব্যবস্থার সব গোজামিল আমার কাছে ধরা পড়েছে।••••
জীবনের আনন্দ পাবার জন্যে পুরুষ আর নারীর মিলনের
প্রয়ােজন আছে । কিন্তু বিবাহের প্রয়ােজন নেই..অন্ততঃ সেই
বিবাহের যা কেবলই বন্ধন, যা ইচ্ছামত ছিড়ে ফেলে পুরুষ বা
নারী কখনাে মুক্তিলাভ করতে পারে না।••••
নারীর মিলন হােক্, কিন্তু বিবাহের নামে তারা যেন না অচ্ছেদ্য
বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জীবন দুঃখময় করে তােলে।
আনন্দ। নব্য কালেজী ছােকরারাও তােমারই মত মানুষ সম্বন্ধে,
সমাজ সম্বন্ধে এইরকম অদ্ভুত মত পােষণ করে।
দাদা মহাশয়। একটু তফাৎ আছে আনন্দ। ছেলেরা পড়া কথা
আওড়ায়। অভিজ্ঞতা তাদের নেই। আমি জীবন-ভাের ভুগে
ভুগে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।••••••তােমার সঙ্গে আমার
পার্থক্য কোথায় জান ? তুমি মানুষের বর্তমান অবস্থা আর
ব্যবস্থাকে চরম মনে করে চোখ বুজে থাকতে পার। আমি
তা পারিনে। আমি দেখছি মানুষ ভুলের উপর ভুলই
করে যাচ্ছে, মানুষ সত্য-বিমুখ হয়ে পড়ছে, ভুলের আবর্জনা
৪৮
রও-কমল
ঠেলে ফেলে মানুষ সত্যকে প্রকাশ কতে সাহস পাচ্ছে না ;-
বংশানুক্রমে উলেরই জের টেনে চলছে।
[ অন্য ঘরে কমলের গান শােনা গেল। দাদা মহাশয়
আর আনন্দ দুজনেই চুপ করিয়া গান শুনিতে
লাগিলেন। তাহাদের কঠিন আড়ষ্টভাব অনেকটা
কাটিয়া গেল
কমল।
- ভৈরবী, দারা )
নিশীথ-স্বপন তাের ভুলে যা এ নিশি-শেষে।
বাদল-অবসানে আকাশ উঠেছে হেসে।
চখার পাশে আসে বিরহ-রাতের চী,
আঁধার লুকাল ঐ দূর বনে এলােকেশে।
সরম-রাঙা-গালে জাগিল কুমারী উষা
তরুণ অরুণ ঐ এল রাঙা বর-বেশে।
[ শেষ পদটি গাহিতে গাহিতে ঘরে ঢুকিয়া কমল থমকিয়া
দাড়াইল, গান ছাড়িয়া দিয়া কহিল
কমল । ছােট দাদামশাই আপনার সঙ্গে আড়ি।
আনন্দ। অভাগার অপরাধ?
কমল। অপরাধ নেই দাদামশাই ? কথা দিয়ে সেই কথা না রাখা
৪৯
রক্তকমল
বুঝি বুড়ােদর নীতি-শাস্ত্রে অপরাধ বলে গণ্য হয় না? এক
হপ্তার ওপর থেকে বলছি আমার সঙ্গী এনে দিন, অথচ সঙ্গীর
কোনাে সন্ধানই নেই। বল্লেই হয় যে, আমাকে দিয়ে ও-কাজ হবে
! ( ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
দাদা মহাশয় । ওর কোনাে কথারই ঠিক নেই দিদি। ও হচ্ছে আস্ত
একটা পাগল। তুই আর ওর কতটুকু পরিচয় পেয়েছি?
যখন কলেজে পড় তুম, তখন থেকে ওই ক্ষ্যাপা লােকটার সঙ্গে
পরিচয়, তুই ছাড়া ওর চেয়ে আপনার জন আজ আমার কেউ
নেই, কিন্তু ওর ক্ষ্যাপাটে ভাব আজও কাটেনি। ওর ওপর
রাগ কলে অবিচার করা হয়।
কমল । না রাগ করবে না ! আড়ি, আড়ি, আড়ি!
আনন্দ। আড়ি দিনে দিদি, শেষে পাবি বলছি।
ভাব কয়।
কমল । আমার কথা যে শশানে না, তার সঙ্গে আবার ভাব ?
আনন্দ। একটি কথা দিয়ে যদি ভাব জমিয়ে তুলতে পারি ?
কমল ৷ সুধু কথায় আর চিড়ে ভেজে না!
আনন্দ। কথায় চিড়ে ভেজে না, কিন্তু মন ভেজে। এমন অনেক
কথা আছে যা সময়মত বলতে পারুলে মুহূর্তে মনকে আনন্দে
গলিয়ে টলিয়ে দেয়।
কমল। অত ভণিতা না করে বলে ফেল্লেই হয়!
আনন্দ। তাই বতেই তাে এসেছি কিন্তু শােনে কে ?
রক্ত-কমল
কমল। বলুন না।
আনন্দ। সঙ্গীর সন্ধান পেয়েছি। কেমন, আড়ি চলবে না ভাব
হবে ?
[ কমল আনন্দের কাছে গিয়া তার পিঠের উপর ভর দিয়া
কানের কাছে মুখ লইয়া জোরে জোরে
কমল ॥ ভাব-ভাব-ভাব ।
[ দাদা মহাশয় আর আনন্দ হাে-হহ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।
কমল একটু সরিয়া দাড়াইয়া
কমল। ও! ঠাট্টা হচ্ছে বুঝি ! মিথ্যে কথা বলা হচ্ছে ? আচ্ছা।
[ কমল ফিরিয়া চলিয়া যাইতেই আনন্দ তাহাকে ধরিয়া
ফেলিলেন। দাদা মহাশয় আবার হাে হো করিয়া
হাসিয়া উঠিলেন
আনন্দ। সত্যি বছি, দিদি। আমি পরিহাসও করিনি, মিথ্যেও
বলিনি। সঙ্গীর সন্ধান আমি পেয়েছি; কিন্তু তােমার দাদা-
মশাই তাকে আনতে সম্মত নন।
কমল। দাদামশায়ের সম্মতির প্রয়ােজন ? আমি বলছি তাকে
আনুতে হবে।
[ আনন্দের কাছে আসিয়া তাহার চুলের ভিতর আঙ্গুল
চালাইতে চালাইতে
আচ্ছা, ছােটদামশাই, সঙ্গীটি দেখতে সুন্দর তত? আমারই
বয়সী তাে ?
আনন্দ । সুন্দর, সকল রকমেই তােমার যােগ্য। নইলে তাকে কেন
আন্তে চাইব? সুন্দরের পাশে কুৎসিত সুধু অশােভনই নয়,
অাহ।
কমল। সে গান গাইতে পারে তাে? সাহিত্যে তার অনুরাগ আছে
তাে? চোখে-মুখে খুৎ নেই তাে কিছু ? তার নামটি কি?
আনন্দ। গান গাইতে পারে কি না, তা তাে বলতে পারলুম না দিদি
তবে কথাগুলাে যেমন মিষ্টি, তাতে মনে হয় গানও গাইতে পারে ।
মাসিক-কাগজে মাসে মাসে যখন কবিতা লেখে, তখন ধরা যেতে
পারে, সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ আছে। চোখ দুটি তাের
চোখের মত অত নীল না হলেও চেয়ে চেয়ে দেখতেই ইচ্ছে হয় !
কমল ও ছােটদামশাই, বুড়াে বয়সে আপনার তাহলে মাথা
ঘুরে গেছে।
দাদা মহাশয় । ঠি, ঠিক দিদি। আমিও ওকে বছিলুম, ওর বুদ্ধি
লােপ পেয়েছে।
আনন্দ। আগে শুনেই নে দিদি। তার নাকটি খগ-নাসা জয় কতে
না পারুলেও একটু বাঁকা, আর সেই নাকের নীচেকার গোঁফজোড়া
যদিও আরসুলায় বা আর কিছুতে খানিকটা খেয়ে ফেলেছে,
দেখতে তবুও মন্দ হয়নি।
কমল। দাদামশাই!
.२
দাদা মহাশয় । কি দিদি।
কমল । আপনারা দুজনে যুক্তি করে এ কি নিৰ্ম্মম পরিহাস সুরু
করেছেন! হৃদয় বলে কোনাে জিনিষই কি আপনাদের নেই ?
একেবারে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এতবড় বাড়ীতে একা একা দিন
কাটাবার যে কি কষ্ট, পুরুষ আপনারা তা কি করে
বুঝবেন!
আনন্দ। ওরে পাগলি, তাই বুঝি বলেই তাে আমি তাের
একটি সঙ্গী জুটিয়ে দেবার জন্যে এত ব্যস্ত। এইবার তার নামটি
শােন-তার নাম হচ্ছে শ্রীমান্ চিরচঞ্চল চট্টোপাধ্যায় - তাের
অঞ্চল ধরে অন্দরেই সে বসে থাকবে ।
কমল । আচ্ছা, এ পরিহাসের প্রতিশােধ আমি নেব।
•
[ কমল ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল
দাদা মহাশয় । পাগুলিকে ক্ষেপিয়ে ভালো কয়লে না আনন্দ।
সমবয়সী কেউ না থাকায় সত্যিই ওর বড় কষ্ট হচ্ছে।
আনন্দ। আমি তাে সেই জন্যেই বলছি, বিয়ে দিয়ে ওর এই নিঃসঙ্গ
অবস্থা ঘুচিয়ে দাও।
দাদা মহাশয়। না, না আনন্দ, তা হয় না । যদি বুঝতুম বিয়ে দিলে
ও সুখী হবে, তাহলে আমি ওর বিয়েই দিতুম। কিন্তু সুখ পাবে
বলেই ওর বিয়ে আমি দেব না। একটি সঙ্গিনী জুটিয়ে দাও
আনন্দ। দুটিতে বেশ থাকবে।
রক্ত-কমল
আনন্দ। কিন্তু.....
দাদা মহাশয়। বিবাহের স্বপক্ষে আমি কোনাে কথা শুনতে চাইলে
আনন্দ। তুমি ওর একটি সঙ্গিনী জুটিয়ে দাও। সেই মেয়েটি,
তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, তাকে নিয়ে এস।
আনন্দ। তাকে! তার অতীত জীবন সম্বন্ধে তুমি কিছুই তাে জান না।
দাদা মহাশয় । আমার জান্বার কি প্রয়ােজন ? তােমার আশ্রয়ে
এতদিন রয়েছে, তুমি তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ •••
আনন্দ। কিন্তু•••••
দাদা মহাশয়। আনন্দ, তুমি যাকে নিঃসঙ্কোচে কন্যার স্থান দিয়েছ,
তাকে কি আমিই কন্যা মনে করে ঘরে ঠাই দিতে পারি না?
কন্যা কন্যা!•••••যা আনন্দ, তুমি তাকে নিয়ে এস। তার
জন্যে আমি পিতার স্নেহ বুকে করে রেখেছি।
আনন্দ। তােমায় আমি আজও ভালাে করে চিন্তে পারলুম না।
এক এক সময় তােমায় দেখি উদারতায় আকাশের মত অসীম,
স্নেহে সাগরের মতই অগাধ—কিন্তু আবার মাঝে মাঝে তােমার
সঙ্কীর্ণতার পরিচয় পাই, আর তাতে ক্ষোভও হয়, দুঃখও হয়।
দাদা মহাশয়। এতদিনকার এমন ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও যখন আমার বুঝতে
পারনি, তখন বােঝবার চেষ্টা আর কোরাে না আনন্দ। বাকী
দিন ক’টা না বুঝে বন্ধুত্বের জুলুম স’য়েই কাটিয়ে দাও। তাতে
বেশী কিছু ক্ষতি হবে না।
৫৪
রক্ত-কমল
পূরবী।
-( সিন্ধুভৈরবী, কাওয়ালী)
ভাঙা মন আর
জোড়া নাহি যায়।
ঝরাফুল আর
ফেরে না শাখায় ।
শীতের হাওয়ায় তুষার হ'য়ে,
গলি খরতাপে বারি যায় বয়ে
গলেনাকো আর হৃদয়-তুষার
উষ্ণ ছোঁওয়ায়।
গাঁথা ফুলমালা নাহি দিয়া গলে
শুকালে নিঠুর তব মুঠি-তলে,
হাসিবে না সে ফুল শত আঁখি-জলে
আর সে শােভায়।
স্রোতের সলিলে যে বাঁধ বাঁধিলে
ভাঙিয়া সে বাঁধ, আজ
তােমারে ভাসায়।
*.
3
't
stbd 1885:
( পতিত-প্রসন্ন তাহার বৈঠকখানায় বসিয়া আছে। তাহার হাতে একখানা খবরের
কাগজ। মাঝে মাঝে সে কাগজখানি দেখিতেছে, আর মাঝে মাঝে দ্বারের দিকে
চাহিতেছে। তাহার মুখে-চোখে অসহিষ্ণুতার ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে। করুণা ধীরে
ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। তাহাকে দেখিয়া পতিত-প্রসন্ন চাঞ্চল্য দমন করিল ! ]
পতিত-প্রসন্ন। তুই এ সময়ে কেন এলি, করুণা?
কর । ওমা! সে কি কথা দাদাবাবু! তুমি খবর পাঠালে বলেই
ত এলুম !
পতিত-প্রসন্ন | এসেছি যখন, তখন বােস! তােকে দুটো কথা
জিজ্ঞেস্ করি।•••• করুণা, মমতা কোথায় জানিস্ ?
করশা। আমিও তাে তাই জিজ্ঞেস্ করব।
পতিত-প্রসন্ন। চালাকি রাখু, করুণা ! তুই তাকে ছেড়ে থাকতে
পারিনে। বল্ সে কোথায় ?
করুণা । আমি জানিনে দাদাবাবু ! সেই যে সেদিন বডড মাতাল
হয়েছিল, তােনার সঙ্গে ঝগড়া হােলাে—তারপর আমায় একা
পৈমে , করুণা আমায় বিদায় দিতে পায়বি? আমি বল্লুম,
। সে বল্লে সংসারের সকল বাঁধন ছিড়ে এলুম; তুই আমায়
বেঁধে রাখতে চা! এই ব’লে একটুখানি হালে। আমি
ভালুম মাতালের কথা। কিন্তু সকালে উঠে পাতি পাতি ক'রে
খুজলু, কিন্তু কোথাও তাকে পেলুম না।
পতিত-প্রসন্ন। আমায় খবর দিলিনে কেন ?
করুণী। দুটো দিন এমন বিহ্বল হয়ে পড়েছিলুম যে, কিছুই ঠিক কতে
পালুম না। তারপর শুলুম তুমি সব শুনেছ আর বলেছ
আমার দেখা পেলে মাথায় একগাছা চুলও রাখবে না। তাই
আমিও পালিয়ে গেলুম।
পতিত-প্রসন্ন । তাের কথা আমার বিশ্বাস হয় না।
করুণা। তোমরা বড় লােক, আমাদের কথায় বিশ্বাস হবে কেন ?
পতিত-প্রসন্ন। হু! তুই এখন কোথায় থাকি ?
করুণা ওই হথায়
পতিত-প্রসন্ন । হােথায় কোথায় রে ? কোন রাস্তায়, কত নম্বরের
বাড়ী ?
করুণা । আমি কি লেখা-পড়া জানা মেয়েমানুষ যে, রাস্তার নাম নম্বর
সব বলে দিতে পারব ?
পতিত-প্রসন্ন । ন্যাকামাে করিনে করুণা, আমায় চিনি তাে ?
করুণা। তা আর চিনিনে! এতদিন ধরে দেখুলুন।
পতিত-প্রসন্ন। তবে এবার সত্যি কথা বল্।
করুণা। মিথ্যে কথা আমরা কইনে দাদাবাবু। গত তিয়েই যন
খেতে হবে, তখন মিথ্যে কয়ে লাভ ? মিথ্যে কথা কইতুম যদি
বুঝতুম তাহলে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে বসে খাওয়া চলবে।
রক্ত-কমল
-----
\
পতিত-প্রসন্ন। সত্যি ব, সত্যি বল্ করুণা। তাহলে আমি এমন
ব্যবস্থা করে দেব, যাতে পায়ের উপর পা রেখে তুই জীবন কাটিয়ে
দিতে পারবি।
করুণা । কথা দিয়ে করুণাকে ভােলাবার চেষ্টা কোরাে না, দাদাবু।
করুণা অনেক দেখেছে, অনেক শুনেছে! ঘর থেকে যাকে বার
করে এনেছিলে, তাকেই বড় খেতে দিতে আর আমি তাে
একটা দাসী!
পতিত-প্রসন্ন। করুণা, তুই জানিনে আমি তার জন্যে সর্বস্বান্ত
হয়েছি।
করুণা। তার জন্যে নয় দাদাবাবু, নিজের চরিত্তিরের জন্যে।
পতিত-প্রসন্ন । যাক্, তাের সঙ্গে সে তর্ক করা বৃথা।
এখন সত্যি
করে তুই বল, কোথায় থাকি।
করুণা ॥ সে এক বুডাের বাড়ীতে। আর একটি জন প্রাণীও সে
বাড়ীতে নেই। আর সে বুড়ােকে তত তুমি দেখেইছ। সেই যে,
সেদিন রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল।
পতিত প্রসন্ন । হ্যা ভালাে কথা, সেই বুড়াে কে বলতে পারি ?
আগে যেন তাকে কোথায় দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। অথচ
ঠিক ঠাহর করতে পারুছিনে।
করুণা-~~ কি তার যষ্টিপূজো করেছি না তার ঠিকুজী তৈরী
করেছি যে সাতগুষ্টির পরিচয় বলতে পায় ?
পতিত-প্রসন্ন। করুণা, তাের কথা শুনে আমার সন্দেহ হচ্ছে। তুই
'।
৫৮
রক্ত-কমল
জানিস্ মমতা কোথায়। তুই সে কথা গােপন রাখতে চেষ্টা
কয়ছি; কিন্তু আমি সে কথা তাের কাছ থেকেই বার করে
নেব। এই বাড়ীতে আমি তােক ততদিন আটক করে রাখব,
যতদিন না তুই মমতার খবর আমায় বলে দিবি। আর শুধু
খবর বলে দিলেই তাের মুক্তি হবে না, তােকে আর মমতাকে
আমার কথামত চলতে হবে। আমি বাড়ীর চাকরদের আগে
থেকেই বলে দিয়েছি যে তুই এলে যেন আর না ফিতে পারি।
( করুণা বসিয়া পড়িল) কি কথা কইছি না যে?
করুণা। কথা বল্পে যখন বিশ্বাস করে না, তখন চুপ করে থাকাই
ভালাে। বাজে ব’কে মুখ ব্যথা করে লাভ কি ?
পতিত-প্রসন্ন । তাহলে এ বাড়ী থেকে মুক্তিলাভের আগ্রহ তাের
নেই ?
করুণা ॥ থাকলেই কি পাক?
পতিত-প্রসন্ন । করুণা, তুইত আমার মুণ খেয়েছি—আর কখনাে ত
আমি তাের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি।
করুণা। খারাপ ব্যবহার তােমায় কয়ুতে দেবই বা কেন? আমরা
তত ভদ্র লােকের মেয়ে নই যে, খারাপ ব্যবহার করূলেও
নিরুপায় হয়ে পড়ে থাকব। আমাদের ছাতির জোর আছে,
প্রাণেও সখ নেই, খেটে খাই। প্রাণ দিয়ে কাজ
করি। তোমরা খেতে দাও, পয়ুতে দাও, মাইনে দাও। আমিই তো
আর দাও না যে, লাথি খেয়ে ঝাটা খেয়ে তােমাদের কাছে
৫৯
।
রক্ত-কমল
প’ড়েই থাকতে হবে।
খারাপ ব্যবহার একবার করেই দেখ
না !
পতিত-প্রসন্ন। করুণা রাগ করিসূনে। আমি তােকে চটিয়ে একটু
আমােদ করছিলুম। সেবার অসুখের সময় তুই যে রকম ক'রে
আমার সেবা করেছিলি, আমার মা-ও হয়ত তেমনটি করতে
পারত না।
করুণা । তখন যে তুমি ভালাে লােক ছিলে ! তখন যদি তােমায়
এমনটি বুঝতুম, তাহলে কি আর সেবা কতুম—যমরাজকে ডেকে
বহুম তােমার গতি কযুতে।
পতিত-প্রসন্ন । এখন তাহলে তাই করি।
করুণা। এক একবার ইচ্ছে হয়, তাই করি। কিন্তু পরের অকল্যাণ
ডেকে আন্তে মন সরে না ! ভাবি সম্বন্ধই যখন নেই, তখন
তােমাদের ভালাে-মন্দ বিচার করে আমার লাভ?
পতিত-প্রসন্ন ॥ সম্বন্ধ নেই কেন কণা !
করুণা ! কি ক'রে আর থাকবে? যার জন্যে তােমার কাছে ছিলুম,
তাকেই যখন তাড়িয়ে দিলে, তখন আমারই বা কিসের
টান থাকবে ?
পতিত-প্রসন্ন । তুই মমতার কথা বছি। কিন্তু আমি তাে তাকে
সেই তো স্বেচ্ছায় আমায় ত্যাগ করে চলে
গেছে।
করুণা। দাদাবাবু, আমি মুপ হ'লেও মেয়ে মানুষ। মেয়ে মানুষকে
রক্ত-কমল
আমি জানি, তার ব্যথা কোথায় জমে ওঠে, তা বুঝি বলেই
বলছি, তুমিই দিদিমণিকে তাড়িয়েছ।
পতিত-প্রসন্ন। হয়ত তাের কথাই সত্যি! হয়ত তাকে আমিই
তাড়িয়েছি। কিন্তু আমার ইচ্ছে সেরূপ ছিল না। আজ যদি
তাকে আবার পাই, তাহলে তার প্রতি যে অবিচার করেছি, গেহ
দিয়ে ভালবাসা দিয়ে তা ডুবিয়ে তলিয়ে দিতে পারি। তােকে
তত সেইজন্যেই ডেকে পাঠিয়েছি করুণা। তার সন্ধানটা আমায়
বলে দে। আমি নিজে গিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনি—তারপর
আগেকার মত আমাদের দিনগুলাে আনন্দে কাটিয়ে দি। বস্
করুণা কোথায় সে?
করুণা। কিন্তু সেখানে তাে তুমি যেতে পারবে না, দাদাবাবু!
পতিত-প্রসন্ন। তার জন্যে নরকেও নেমেছি, তা তাে জানি।
করুণা । তবুও পাবে না।
পতিত-প্রসন্ন। আত্মহত্যা করেছে, গঙ্গার জলে ডুবে মরেছে ?
করুণা । সে কথা বচ কেন ?
পতিত-প্রসন্ন। সেদিন সেই কথাই সে আমায় বলেছিল, বলেছিল মা
জাহ্নবীর শীতল বুকে সে আশ্রয় নেবে!
করুণা। হয়ত তাই করত, কিন্তু করতে পারেনি। তােমারি জন্যে
পারেনি!
পতিত-প্রসন্ন। তোর কথা তাে বুঝতে পাছিনে করুণা !
করশা। বুঝবে কি! বাের মত প্রাণ তােমার নেই।
রক্ত-কমল
পতিত-প্রসন্ন । করুণা, তাের কোনাে মতলব আছে?
করুণা । মানুষকে এত অবিশ্বাস কর কেন? কোনাে মতলব নিয়ে
যে আসিনি, তা তাে জান! তুমি ডেকেছ বলেই এসেছি।
ইচ্ছে করে আসিনি তাে?
[ পতিত-প্রসন্ন অস্থিরভাবে ঘরময় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল,
তারপর সহসা করুণার কাছে দাড়াইয়া
পতিত-প্রসন্ন ॥ করুণ, চ, আমায় মমতার কাছে নিয়ে চল্ !
করুণা। তুমিত সেখানে যেতে পাবে না, দাদাবাবু !
পতিত-প্রসন্ন । হেঁয়ালি রাখ করুণা। বল্ সে কোথায় ?
করুণা। তােমার শ্বশুরবাড়ী।
পতিত-প্রসন্ন । ( উত্তেজিত হইয়া আৰ্তম্বরে) করুণা ! করুণা !
(পতিত-প্রসন্ন দুই হাতে মাথা চাপিয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িল।
PUBLIC
As
2; stbd 1885:
LIBRAR
রক্ত-কমল
পূরবী ।
- বাগেশ্রী, কাওয়ালী)
ঘাের তিমির ছাইল
রবি-শশী-গ্রহ-তারা।
কঁপে তরাসে ভীত ধরণী
অসীম আঁধারে হারা ।
প্রলয়ের মহাকাল,
এলায়েছে জটাজাল,
নাচিছে ঝড়ের সাথে
সুরধুনী-জলধারা।
চমকি চমকি উঠে
চপলা চপল ফণা
লুকাইল শিশু শশী,
মূরছি দিগঙ্গনা।
চাতকী চাতক-বুকে
বিভল কঁদিয়া সারা।
[ দাদা মহাশয়ের বার্সার হলঘর। ঘরের মাঝখানে বড় একটা টেবিল, তার
চারিপাশে চেয়ার। পূবের দিকে দাদা মহাশয়ের থাকিবার ঘর। পশ্চিম দিকের দেয়ালের
গায়ে একখানি সােফা। হলঘরের খােলা দরজা দিয়া কমলের ঘরখানি দেখা যায়। সেই
ঘরের জানালার কাছেই একটা অর্গানে বসিয়া মমতা গান গাহিতেছে, কমল চিত্রার্পিতার
মত জানালায় ভর দিয়া দাঁড়াইয়া তাহাই শুনিতেছে।
মমতা ॥
— রাতের দুর্গা, কাওয়ালী)
কেমনে রাখি আঁখি-বারি চাপিয়া ?
প্রাতে কোকিল কঁদে নিশীথে পাপিয়া !
এ ভরা-ভাদরে আমার মরা-নদী।
উথলি উথলি উঠিছে নিরবধি,
আমার এ চাঙা ঘটে,
আমার এ হৃদি-তটে,
চাপিতে গেলে ওঠে।
দুকূল
ছাপিয়া !
৬৪
রক্ত-কমল
নিষেধ নাহি মানে আমার এ পােড়া আঁখি,
জল লুকাব কত কাজল মাখি মাখি!
ছলনা করে হাসি
অমনি জলে ভাসি,
ছলিতে গিয়া আসি ভয়েতে কাপিয়া !
[ কিছুক্ষণ গান শুনিবার পর দাদা মহাশয় পাইপ মুখে তাহার
ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া হলঘরের মাঝখানে
দাড়াইলেন
দাদা মহাশয় । কি জমাটবাধা ব্যথা বুকে নিয়ে অভাগী দিনের পর
দিন জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ! যখনই ও গান গায়, তখনই
মনে হয় ওর প্রাণ এই অবিচার আর এই অত্যাচারের সংসার
থেকে ছুটি নিয়ে যাবার জন্যে ডুকরে ডুকরে কঁদছে!•••এতদিন
কাছে রইল তবুও কিছু জিজ্ঞেস করূতে পালুম না! প্রশ্ন
করুতে সাহস হ’লনা, এই অল্প বয়সে কার অভিশাপে জীবনের
সব আনন্দ হারিয়ে ফেলেছে ! আনন্দ বলতে চেয়েছিল.....
কিন্তু আমি তা শুনিনি••••••আর-একটা ব্যর্থ জীবনের করুণ
কাহিনী শােনার মত শক্তি অর্জন করতে পারিীম-ধলেই তা
শুনিনি।
কমল (মমতাকে। আপনার কাছে আমার গান শেখা হবে না।
৫
রক্তকমল
আপনি গান সুরু করুলেই আমি নিজেকে ভুলে যাই, দুনিয়া
ভুলে যাই। কানে যেন শুনতে পাই পরপার হ’তে আমার
অভাগী মা আমারই জন্যে ডুকরে কাঁদছে।
মমতা। (চোখের জল মুছিয়া ঠোটে মন হাসি ফুটাইয়া) তাহলে
আমাকে বিদায় দাও, কমল! আমাকে দিয়ে তাে তােমাদের
কোনাে কাজই হবে না।
কমল। বিদায় দেব আপনাকে। এ জীবনে নয়। আপনার কাছে।
আমি কি পেয়েছি জানেন? জ্ঞান হবার পর থেকে যা না পেয়ে
কখনাে শান্তি বােধ করিনি, সেই মাতৃস্নেহ আমি পেয়েছি
আপনারই কাছে। দাদামশাই তাঁর স্নেহের ভাড় খালি করে
দিয়েছেন, নিজের সৰ্ব্বস্ব দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে তুলে এত বড়টি
করেছেন, কিন্তু তবু যেন কি-এক অভাবের বেদনা থেকে থেকে
আমায় কেবল পীড়নই করুত। আপনি এসে আমার সেই
গােপন ব্যথা ঘুচিয়ে দিয়েছেন, অন্তরের এক কোণে যে গভীর
ক্ষতটা ক্রমেই বেড়ে উঠছিল, আপনার স্নেহের প্রলেপে তা ধীরে
ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে !
দাদা মহাশয়। (উঠিয়া দাড়াইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে )
যা একবার শুতে চাইনি, তা শােম্বার আগ্রহ মন থেকে
দূর হােক্! শাের আর প্রয়ােজনই বা কি ? শাস্ত্রের,
সমাজের অত্যাচারের আর-একটি দৃষ্টান্ত বইত নয়! মমতা
নিশ্চিতই বিবাহিতা—আর বিবাহের এই ত পরিণাম।
রক্ত-কমল
(মমতাকে) আপনাকে যখন প্রথম দেখেছিলুম, তখন আমার
ভয় হয়েছিল। ভয় হয়েছিল যে, বয়সের পার্থক্য আমাদের মিলনের
মাঝে একটা পাচীল তুলে দেবে। তথন চেয়েছিলুম একজন
খেলার সাথী- তখন তাে ভাবতেও পারিনি পর এমন করে
আপন হতে পারে, অপরিচিত কেউ এসে গেহের এমন নিবিড়
বাঁধনে বাঁধতে পারে। তখন তাে এ সব কিছুই বুঝতুম না,
জাতুম না।
মমতা । কিন্তু কমল, আমি তােমার শ্রদ্ধা পাবার যােগ্য তাে নয়ই,
হয়তাে তােমার ভালােবাসা পাবারও অযােগ্য!
কমল। সে কথা মানি কি করে বলুন ত! কোথায় ছিলেন আপনি
আর কোথায় ছিলুম আমি! দুজনার কেউ ত জান্তুম না যে,
একদিন আমাদের উভয়ের মাঝে এমনি পরিচয় হবে। আপনি
এলেন চাকরী করূতে; আর আমি বেতন-ভােগী শিক্ষয়িত্ৰী রূপে
আপনাকে আপনার প্রাপ্য স্থান দিলুম। বড় জোর চারটে দিন
আপনাতে আমাতে শিক্ষয়িত্রী-ছাত্রীর সম্বন্ধ ছিল। তারপর
কি করে যে শিক্ষয়িত্রী মায়ের স্থান অধিকার করে বল, আর
ছাত্রী মেয়ে হয়ে অগাধ স্নেহ লাভে নিজেকে ধন্য বােধ করুতে
লাগল—তা আপনিও জানেন না, আমিও জানি না।••••••
আপনার আর আমার এ সম্বন্ধ তো কেউ জোর করে পাঠিয়ে
দেয়নি। তবু কি করে আপনি বলতে পারেন আপনি
এতটুকুও অযােগ্য।
রক্ত-কমল
কাদা মহাশয় আনন্দ ঠিকই করেছে। ভাগ্যহীনের বাড়ীতে
ভাগ্যহীনায় আশ্রয় দিয়ে সে বুদ্ধিমানেরই কাজ করেছে। নইলে
আর কে ওর মর্যাদা রাখতে পাত? কেইবা বুঝত ওই
অভাগীর হৃদয়ের বেদনা!
কমল। আমি বুঝি—আপনার মনের কোথাও মস্ত বড় একটা খোঁচা
রয়েছে। কিন্তু তার জ্বালা ত ভুলতে হবে। আপনি ভাগ্যহীনা
সন্দেহ নেই-কিন্তু আমিও কি তাই নই ? মাকে কখনাে
দেখুলুম না, পিতা আছেন কি নেই তার খোঁজও পেলুম না !
আচ্ছা, আপনি আপনার মাকে দেখেছেন, পিতার গেহ-স্পর্শ
কখনাে পেয়েছেন ?
মমতা। সব পেয়েছিলুম। সংসারে সুখের হাট জমিয়ে তােলবার
কোনাে কিছুরই অভাব ছিল না। কিন্তু ভগবান্ (ললাট
দেখাইয়া) এইখানে কি একটা দাগ একে দিয়েছিলেন যার
ফলে কপালে কিছুই সইল না—সব পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে
এসেছি কমল! আজ আর পেছনের দিকে চাইতে পারিনে।
কমল। আসুন অতীতকে আমরা ভুলে যাই। অতীতের কথা
ভালেই, পিছন ফিরে চাইলেই, যখন আপনার আমার
দুজনারই মন কাণায় কাণায় বেদনায় ভরে ওঠে, তখন অতীতকে
দিয়ে আমাদের কোনাে প্রয়ােজনই নেই। আসুন বর্তমানের
ওপরই আমরা আমাদের জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলি। যা
ঘটে গেছে, তা স্মৃতি থেকে মুছে যাক। আজ থেকে আমরা
৬৮
রক্ত-কমল
এমন কিছু করবনা, এমন কিছু হতে দেবনা,যাতে করে আমাদের
প্রাণে নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
মমতা। ( অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া) হায়রে সরলা বালা !
কমল । কি সুন্দর হবে আমাদের এই জীবন ! ব্যথা নেই, শঙ্কা
নেই, অতীতের দাগা নেই।
মমতা। তাহলে তাে বেঁচে যাই কমল ; কিন্তু তা যে হয় না।
কমল। হয় না? হয় ! নিত্যি হচ্ছে !
মমতা। নিত্যি হচ্ছে !
কমল ॥ হা নিত্যি হচ্ছে ! আপনি ত সূর্যোদয় দেখেছেন! আমি
চেয়ে চেয়ে কতদিন ত দেখেছি। দেখে দেখে বুঝেছি যে জীবনের
এক একটি দিনকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। সূৰ্য্য
সারাদিন ধরে নিজের আগুনে নিজেই পােড়ে, তার সকালের
সেই সিদুর গােলা রং পুড়ে পুড়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, কিন্তু
দিবাবসানে দিনের দাহ তার অঙ্গে তাে কোনাে দাগ রাখতে
পারে না। সকালে যখন তাকে দেখি, তখন আবার সেই
সিদুর গােলা রঙ, সেই হাসি, আর সেই উষ্ণ পরশ!••••••
আমাদের জীবনকেও ওই রকম কতে হবে। অতীতের জের টেনে
চল্লেই, জীবনের আনন্দ একেবারে মাটি হয় না। আর একখানি
গান গান—আমি সুরটা ঠিক করেনি। কিন্তু আস্তে আস্তে
গাইবেন, সুর যেন না প্রাণকে বাইরে নিয়ে আসে। তাহলে
কিন্তু আমার শেখা হবে না।
রও-কমল
[ কমল জানালার কাছে একটা চেয়ার টানিয়া আনিয়া
বসিয়া পড়িল, মমতা গান শুরু করিল
মমতা।
-ভৈরবী গজল, দাদরা )
মাের ঘুম-ঘােরে এলে মনােহর,
নমােনম,
নমােনম,
নমােনম।
শ্রাবণ-মেঘে নাচে নটবর
ঝম ঝম,
রমঝম,
ঝমঝম ॥
শিয়রে বসি চুপি চুপি চুমিলে নয়ন,
মাের বিকশিল আবেশে তনু
নীপসম,
নিরুপম,
মনােরম।
মাের ফুল-বনে ছিল যত ফুল,
ভরি ডালি,
৭০
রক্ত-কমল
দি ঢালি,
দেবতা মাের !
হায়, নিলে না সে ফুল, ছিছি বেভুল,
নিলে তুলি।
খেপা খুলি
কুসুম-ডাের।
স্বপনে কি যে কয়েছি তাই গিয়াছ চলি,
জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতায়
প্রিয়তম,
প্রিয়তম,
প্রিয়তম !
দাদা মহাশয় । কমল গান শিখছে। ওই কয়সে আর একজনও ওই
ঘরে বসেই এমনি করে গান শিখত তারও কণ্ঠ এমনি করে
সুধা বর্ষণ কত ! যে সুরে সে গান গাইত, সে সুর আজও
আছে, কণ্ঠে কণ্ঠে আজও তা ধ্বনিত হচ্ছে কেবল সে-ই নেই।
[ দাদা মহাশয় উঠিয়া পায়চারি করিতে করিতে সহসা থামিয়া
দাড়াইয়া দেয়াল-পঞ্জীর কাছে দৌড়াইয়া গিয়া তারিখ
দেখিয়া
৭১
রক্ত-কমল
!
সেই দিন! ভগবান্ সেই দিন যোল বছর আগেকার সেই
দিন আজ আবার ঘুরে এসেছে।
সারাটা দিনের মাঝে
একটিবারও সে কথা মনে হ’ল না ! এই স্নেহ, এই মমতা !
(দুই হাতে মাথা চাপিয়া বসিয়া পড়িলেন।
গান নয়, গান নয়:::আজকার দিনে এ বাড়ীতে গান নয়, হাসি
নয়, উৎসব নয় ! সব আলাে নিবিয়ে দিতে হবে, সব কণ্ঠ চেণে
ধতে হবে, সব ভুলে গিয়ে যােব বছর আগেকার সেই ভীষণ
রাতের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে হবে।
(কমলের ঘরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হইয়া সহসা থামিয়া)
মনে আলাে জ্বেলেছে। কমল আমার এতদিনে মনে আলাে
জ্বেলেছে। সে আলাে নিভিয়ে দেব কেন? জগতের সব
অন্ধকার, সব বেদনা, সব নিরাশা আমারই বুকের ভেতর
জমা হয়ে থাক্, কমল তার মন-প্রাণ আলােয় আনন্দে ভরপুর
করে রাখুক। সে স্মৃতি আর কারু মনে রাখার প্রয়ােজন
নেই, আমার বুকের ভেতরই তা জ্বলুক, রাবণের চিতার মত
দিনের পর রাত রাতের পর দিন সমানভাবেই তা জ্বলুক।
( আনন; ঘরে প্রবেশ করিয়া দাদা মহাশয়কে
দেখিয়া স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া)
আনন্দ। এ কি বন্ধু!
এ কি বন্ধু ! তােমার এ কি মূৰ্ত্তি !
দাদা মহাশয়। আনন্দ, এসেছ! সত্যিকার বন্ধু তুমি ! উৎসবে
৭২
রক্তকমল
ব্যসনে সব সময়েই তুমি আমার কাছে এসে দাঁড়াও। এস বন্ধু!
( আনন্দের হাত ধরিয়া টানিয়া দেয়াল-পঙ্গীর কাছে গিয়া তারিখ
দেখাইয়া) মােল বছর আগে ঠিক এই দিনে আমার মা তার
প্রাণ দিয়ে বিবাহের প্রায়শ্চিত্ত করেছিল।•••আনন্দ! ঠিক এই
দিনে ! কেউ জানে না আনন্দ! তুমি আর আমি ছাড়া কেউ
জানে না। আর যে জানে, তার চোখ দিয়ে হয়ত এক ফোটা
জলও আজ বেরুবে না। • পিতা আমি.. আমারই মনে ছিল
! মনে যখন হ’ল, তখন ভাবলুম আনন্দ সব আলাে নিভিয়ে
দি, সবার কণ্ঠ চেপে ধরি, কিন্তু আলাে যখন জ্বলেছে কমলের
মনে আলাে যখন জ্বলেছে তখন তা নিভিয়ে দিয়ে কি লাভ?•••
চল আনন্দ, তুমি আর আমি, সংসারে স্বতি ছাড়া আর
কিছু সম্বল যাদের নেই, চল সেই আমরা গিয়ে আজ তার তর্পণ
করি! জল দিয়ে নয়, তিল দিয়ে নয়, অশ্রু দিয়ে—যে অশ্রু
বুকের ভেতর ষােলটা বছর জমে রয়েছে তাই গলিয়ে ঢেলে দিয়ে।
আনন। চল, দুই বুড়ো ছেলে মিলে মায়ের তৰ্পণ করি। চল!
[ দুই জনে দাদা মহাশয়ের ঘরে গিয়া জানালার কাছে
মুখখামুখি হইয়া বসিলেন। সঙ্গীতের শব্দ শেষ হইয়া
গেল। করুণা হলঘরে ঢুকিয়া চেয়ার টেবিলগুলি
গুছাইয়া রাখিতে লাগিল
কমল। কি স্তব্ধ সন্ধ্যা !
মমতা। বাইরে কি অন্ধকার।
রক্তকমল
এত ও কেন ?
মমতা। আকাশে মেঘ জমেছে!
কমল। বাড়ীতে কি আর-কেউ নেই! এরা সব কোথা গেল!
দাদামশাই এখনও বাড়ী ফেরেননি, যদি জল হয়।
মমতা ॥ ঝড়ও হবে !
কমল। আমি দাদামশায়ের খোঁজে লােক পাঠাই।
[ কমল উঠিয়া হলঘরে গেল। মমতা উঠিয়া জানালায়
ভর দিয়া দাড়াইল
মমতা। মনটা সহসা কেঁপে উঠল কেন? আবার কি বিপৰ্য্যর
ঘটবে? ( ঘরময় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
কমল। ( হলঘরে) তুই এখানে কাজ করছিস্ করুণা, তবু কথা
কইছি না যে !
করুণা । আমি তাে পাগল নই যে একা একা কথা কইব।
কমলা। শব্দও তাে কযুতে পারি।
করুণা। নিঃশব্দে কাজ কবার শিক্ষাই তাে এতদিন পেয়ে এসেছি।
কমল। না, আজ একটু শব্দ ক। দাদামশাই যে এখনাে এলেন
করুণা?
করুণা। তিনি তাে আজ বেলােননি।
কমল। কোথায় তিনি ?
করুণা। ওই ঘরে দুটিতে বসে রয়েছেন।
কমলা। ছােটা’মশাইও এসেছেন বুঝি!
৭৪
রক্ত-কমল
করুণা ॥ একজনকে না দেখে আর-একজন যে একটি দিনও থাকতে
পারে না !
কমল ॥ ওরা কেন চুপ করে রয়েছেন?
করুণা কেন, তা ওঁরাই জানেন?
কমল। তুই কি সারা সন্ধ্যে টেবিলই ঝাড় বি ?
করুণা। চায়ের জল চড়িয়ে এসেছি !
কাল। শীগগীর ক'রে চা তৈরি ক'রে আন, বুড়ােদের মৌতাতের
সময় হয়েছে, তাই ব'সে ব'সে হয়ত ঝিমুচ্ছে।
করুণা দিদিমণিও তো চুপ করে রয়েছে !
কমল। এই এতক্ষণ ধরে গান শেখালেন, একটু বিশ্রাম করবেন না !
[ করুণা কোন জবাব দিল না। মালী ফুলের তােড়া নিয়ে ঘরে
প্রবেশ করিল। তাহার পায়ের শব্দে চমকিয়া উঠিয়া
কমল। ও কে! মালী ! কথা না বলে ঘরে ঢুকৃছ কেন ?
[ নালী কোন কথা না কহিয়া ইঙ্গিতে সম্মান জানাইয়া
টেবিলের উপর ভাসটি রাখিয়া চলিয়া গেল। কমল
তাহার দিকে চাহিয়া থাকিয়া
কমল। সবাই যেন নবাব হয়েছে ! কথাটি বলতেও কষ্ট হয়।
করুণা ! কথা কইছি না যে! দাদামশাই।
রক্ত-কমল
[ দাদা মহাশয়ের ঘরের পর্দার কাছে দাড়াইয়া পর্দা ফাক
করিয়া একটু দেখিয়াই সে সরিয়া আসিল। তাঁহার
মুখ বিবর্ণ। মাথা নীচু করিয়া সে তাহার ঘরে ঢুকিল।
করুণা ভিন্ন দরজা দিয়া ভিতরে চলিয়া গেল
কমল । কি হয়েছে বলুন তাে! সারা বাড়ীটা স্তব্ধ, কাৰু মুখে কথা
নেই, আলােগুলাে অবধি আঁধারের সঙ্গে লড়ে লড়ে যেন ম্লান হয়ে
পড়েছে। পর্দার আড়াল থেকে দাদামশায়ের ঘরে উকি মেরে
দেখলুম, দুই বন্ধুতে মুখখামুখি বসে আছেন—কেউ কথা কইছেন
না, অথচ দুজনের চোখ দিয়েই জল গড়িয়ে পড়ছে। কি হয়েছে!
মমতা । ও কিছু নয় কমল। মানুষের মন মাঝে মাঝে অজানা কারণে
অমূনি ভারি হয়ে ওঠে।
কমল। কিন্তু সবারই মন আজ এক সঙ্গেই ভারি হয়ে উঠল কেন?
আর সুধু মানুষের মন তাে নয়, আকাশ মেঘে ভারি হয়ে সুয়ে
পড়েছে, আঁধার গাঢ় হ'য়ে চারিদিক থেকে চাপ দিচ্ছে,
বাতাসও এমনি ভারি হয়ে উঠেছে যে, টেনে শ্বাস নিতে কষ্ট
হচ্ছে !
[ মমতা কমলের হাত দু’খানি মুঠোর ভিতর লইয়া চুপ
করিয়া রহিল
কমল । আপনি চুপ করে রইলেন! কথা বলুন, কথা বলুন।
রক্তকমল
[ কমল মমতাকে জড়াইয়া ধরিল। মমতা তাহাকে কোলে
টানিয়া লইয়া তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে
লাগিল। হলঘরের টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম সাজাইয়া
রাখিয়া করুণা একটি একটি করিয়া চায়ের পেয়ালা
পরিষ্কার করিতে লাগিল
জাদা মহাশয়। ( উঠিয়া জানালার কাছে দাড়াইয়া) সুধু আমরাই
মায়ের তর্পণ করলুম না আনন্দ, চেয়ে দেখ, প্রকৃতি দেবীও
মানুষের অস্বাভাবিক বলির জন্যে তর্পণের আয়ােজন করেছে।
প্রকৃতি কৃত্রিম সইতে পারে না। তাই মানুষের কৃত্রিম ব্যবহার
বলি আমার কন্যার ব্যর্থ জীবনের কথা স্মরণ করে বিশ্বপ্রকৃতিও
বেদনায় নুয়ে পড়েছে।
কমল। আকাশ, বাতাস, মানুষ, সবাই মিলে যেন কি-এক ভীষণ
ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
গোপনে গোপনে ধ্বংসের কি এক বিরাট
আয়ােজন যেন চলছে! আমারও যে আর কথা কইতে সাহস
হচ্ছে না। কথা বলুন! আপনিও চুপ কবেন না, কথা বলুন!
মমতা। ভয় কি কমল ! বিপদ যদি সত্যিই কিছু আসে, আমরা
বাড়াসুদ্ধ লােক মিলে কি সে বিপদকে হটিয়ে দিতে পারব না?
{ পতিত-প্রসন্ন হলঘরে ঢুকিয়া ঘোরবন্ধ করিয়া দিল।
করুণা তাহাকে দেখিয়া আচ্ছন্নের মত দাড়াইয়া
রহিল। তাহার হাত হইতে একটা চায়ের পেয়ালা
মেঝেয় পড়িয়া ভাঙ্গিয়া গেল
রক্তকমল
কমল। ও কি শব্দ?
মমতা। 'ভগবান্ !
[ চায়ের পেয়ালা পড়িয়া যাইবার সঙ্গে সঙ্গেই হলঘরের
আলাে নিভিয়া গেল
করুণা। আলাে ! আলাে !!
কমল । করুণা অমন ক'রে চেঁচিয়ে উঠল কেন?
দাদা মহাশয় | আনন্দ, শুনেছ আর্তনাদ! ধরণীর বুক ফেটে বেরিয়ে
এসে সারা বিশ্ব কাঁপিয়ে তুল!
আনন্দ। কিছু নয়, বন্ধু কিছু নয়—করুণা আলাে চাইছে।
দাদা মহাশয়। করুণা আলাে চাইছে ! ঠিক কথা। আলাে চাই,
আলাে ! অন্ধকার বড় গাঢ় হয়ে উঠছে, আলল, আলাে
করুণা ॥ আগাে! আলাে !!
[ কমলের ঘরে চলিয়া গেল
কমল। (উত্তেজিত ভাবে উঠিয়া দাড়াইয়া) আলাে ! আলাে !!
দাদা মহাশয় । একি আনন্দ, সারা বিশ্ব আলাে আলাে করে আর্তনাদ
করে উঠল কেন? তবে কি সত্যি,সত্যিই কি মৃত্যু এসে
বিশ্ব গ্রাস করছে! সত্যিই মৃত্যু এসে আমার কমলকেও আজ
ছিনিয়ে নিয়ে যাবে-যােল বছর আগে ঠিক এমনি রাতে যেমন
করে তার মাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আনন্দ ! প্রস্তুত
হও! মৃত্যুর সঙ্গে সংগ্রাম করতে হবে !
৭৮
রক্ত-কমল
[ দাদা মহাশয় কম্পিত হন্তে আলাে লইয়া পর্দা সরাইয়া
হলঘরে আসিয়া দাড়াইলেন। তাঁর পিছনে আনন্দ।
ঠিক সেই সময় করুণাও কমলের ঘর হইতে আলাে
হাতে হলঘরে উপস্থিত হইল। সেই আলােতে দেখা
গেল পতিত-প্রসন্ন চেয়ারে বসিয়া আছে। কাহারাে
দিকে না চাহিয়া সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
কমল তার ঘরের পর্দার আড়ালে আসিয়া দাঁড়াইল
দাদা মহাশয় । ( পতিত-প্রসন্নকে দেখিয়া ) এসেছে, আনন্দ ! মৃত্যু
সেদিনকার সেই পিশাচের মুক্তি ধরে সত্যিই আবার
এসেছে! দেখ !
[ আনন্দ দাদা মহাশয়ের কম্পিত হস্ত হইতে, আলােটা লইয়া
টেবিলের উপর রাখিল। কমল পর্দার আড়াল হইতে
সরিয়া গিয়া মমতার গলা জড়াইয়া ধরিল
কমল। সেই কুৎসিৎ লােকটা এসেছে, দাদামশাই যাকে দেখলেই
উত্তেজিত হয়ে ওঠেন! বেয়ারা চাকরগুলাে সব নবাব হয়েছে।
কেন ওকে আসতে দিলে?
পতিত-প্রস। আমি আমার কন্যাকে নিতে এসেছি।
( দাদা মহাশয় আর মমতা দুজনেই চমকিয়া উঠিলেন।
রক্তকমল
কমল। ওকি! আপনি চম্কে উঠলেন কেন, আপনার মুখ অম
সাদা হয়ে গেল কেন ?
মমতা ? ( নিজেকে সামলাইয়া লইয়া) কিছু নয় কমল, কিছু নয়।
লােকটার কণ্ঠস্বর শুনে প্রাণটা কেন যেন কেঁপে উঠল ।
কমল । সত্যি কি কর্কশ কণ্ঠ ! কি বল্লে ? দাদামশাই চুপ করে
রইলেন কেন ? শুনি, লােকটা কি বলে!
মমতা। (কমলকে জড়াইয়া ধরিয়া) না, না, কমল তুমি যেওনা !
কমল। আমি না গেলে দাদামশাই স্থির থাকতে পারবেন না।
এখুনি গিয়ে ওই অভদ্র লােকটাকে আমি তাড়িয়ে দিচ্ছি।
দাদামশাই আমার বুড়াে, কিন্তু একেবারেই কি অসহায় ?
দাদা মহাশয়। তােমায় আমি বারবার নিষেধ করেছি এ বাড়ীর কাছে
আসতে !
পতিত-প্রসন্ন। সে আজ্ঞা পালন করা-না-করা নির্ভর করে আমারই
ওপর।
দাদা মহাশয় তা জানি। কিন্তু আমার অনুমতি না নিয়ে আমার গৃহে
আসা যে অনধিকার প্রবেশ তা তুমি জান ?
পতিত-প্রসন্ন ॥ জানি ! জেনেও তা করেছি আমার নিজের অধিকার
প্রতিষ্ঠা করূতে!
আনন্দ। তােমার যদি কিছু বক্তব্য থাকে তােত ওই ঘরে চল। করুণা
আলােটা ওই ঘরে দিয়ে এস।
( করুণা আলাে লইয়া দাদা মহাশয়ের ঘরে গেল )
৮০
রকম পতিত-প্রসন্ন। আমার বক্তব্য যা, তা আমি অনেক আগেই বলে শেষ করেছি, বেশী কিছু আর বার নেই। কমল। লােকটা অত চেঁচিয়ে কথা কইছে কেন? বাইরে কি সঙ্গীর রয়েছে। তাদের বুঝি শােনাতে চায়? দাদা মহাশয় ৷ বােসস বেয়াদব তােমার শাস্তির ব্যবস্থা আমি কছি। [ দাদা মহাশয় দোরের দিকে অগ্রসর হইলেন। পতিত-প্রসন্ন একটু হাসিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন পতিত-প্রসন্ন । আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন, অত কষ্ট আপনাকে কয়তে হবে । আপনি ওই চেয়ারে বসুন। চোখে যদি কম না দেখতেন, তাহলে এখান থেকেই দেখতে পেতেন দোর তালা দিয়ে আমি বন্ধ করে রেখেচি। চীৎকার করেও কোনাে লাভ নেই। বেয়ারা চাকরদের বখশিস দিয়ে আমি বশ করেছি। যে উদ্দেশ্যে আমি এসেছি, তা সিদ্ধ না করে আমি এ গৃহ পরিত্যাগ- করছি না। দাদা মহাশয়। (দুয়ার ঠেলাঠেলি করিয়া হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিয়া) আনন্দ, তুমি এর প্রতিবিধান কর। আমার মাথা ঘুরছে। ( আনন্দ দাদা মহাশয়কে ধরিয়া চেয়ারে বসাইয়া দিল। কমল । ছেড়ে দিন, আমায় ছেড়ে দিন। মমতা ॥ না, না কমল, তুমি ওখানে যেতে পারবে না। ৮১
কমল। আমি যাব, আমায় ছেড়ে দিন। দাদামশাই আমার বৃদ্ধ,
অসহায় •••• তাঁকে সাহায্য কয়বার কেউ নেই.•••••আমিই তাকে
অপমানের হাত থেকে বাঁচাব । ছেড়ে দিন.••••(কমল
মমতার হাত ছাড়াইয়া উঠিয়া দাড়াইল)
কমল যেয়ােনা, যেয়ােনা•••••দাদামশায়ের জীবনব্যাপী চেষ্টা
ব্যর্থ করে দিও না।
{ কমল সেকথা না শুনিয়া ছুটিয়া হলঘরে চলিয়া গেল। মমতা
প্রসারিত হাত বাড়াইয়া দাড়াইল, তারপর কিরিয়া দুই
হাতে মুখ ঢাকিয়া
মমতা। ভগবান্, রক্ষা কর, রক্ষা কর।
[ কমল হলঘরে প্রবেশ করিয়া একেবারে দাদা মহাশয়ের
পিছনে গিয়া দাড়াইয়া, মাথায় হাত দিয়া
কমল। দাদামশাই!
দাদা মহাশয় । { চমকিয়া উঠিয়া) কমল! তুই এখানে কেন ? ঘরে
যা, ঘরে যা ! . দিদি।
আনন্দ। তুমি ঘরে যাও দিদি।
কমল। ঘরে যাব! কেন ? অভদ্র একটা লােক এসে আমার
দাদামশাইকে বৃদ্ধ আর স্থবির দেখে অপমান করূবে, আর আমি
৮২
রক্ত-কমল
• •
পর্দার আড়ালে বসে তাই শুনে আমার শীলতা রক্ষা কব ?
( পতিত-প্রসন্নকে) আপনি কে তা জানিনে। যেই হােন্••
• দাদা মহাশয় । কমল, চুপ কয়, কথা ক’নে !
কমল। (দাদা মহাশয়ের দিকে ফিরিয়া) একটু থামুন দাদামশাই।
আপনি যেই হােন্, অতি অভদ্র লােক আপনি। কিসের
জন্যে যখন-তখন আপনি
আপনি এসে
এই বৃদ্ধকে অপমান
করেন ?
পতিত-প্রসন্ন । কিসের জন্যে, শুনবে? বিশ্বাস কবে তােত!
তােমারই জন্যে।
কমল। ( কিছুদূর পিছাইয়া গিয়া সবিস্ময়ে) আমারই জন্যে।
দাদা মহাশয় । ( উঠিয়া দাড়াইয়া) কমল, দিদি, তুইও আমার কথা
শুলিনি! আনন্দ, আর পালুম না, রাখতে পালুম না !
পতিত-প্রসন্ন । হ্যা, তােমারই জন্যে। তােমাকে যা আমার বদ্বার
আছে, স্বার্থান্ধ এই বৃদ্ধ -
কমল । ভদ্রভাবে কথা কইবেন। আমার দাদামশাই সম্বন্ধে কোননা
অসম্মানজনক কথা আমি কারাে কাছে শুনতে প্রস্তুত নই।
দাদা মহাশয় । আনন্দ, আনন্দ! ( আনন্দের হাত দুখানি জড়াইয়া
ধরিলেন)
আনন্দ। কমল, আমি বছি ঘরে যাও!
কমল। আপনি বলছেন! আপনি তত বেশ কথা কইতে পায়ছেন।
তবে এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন কেন? আপনার সামনে
সকল
দাদামশায়ের অপমান করূছে, আর বন্ধু হয়েও এতক্ষণ দুটো
কথা বলা তাে উচিত মনে করেননি।
(দাদা মহাশয় ও আনন্দ পরস্পর পরস্পরের হাত জড়াইয়া ধরিলেন।
পতিত-প্রসন্ন । তােমার স্পষ্ট কথা শুনে আমি প্রীত হয়েছি।
কমল। এখুনি আবার ঘােরর অপ্রীত হবেন, বলুন কি আপনার
বক্তব্য।
দাদা মহাশয় ॥ কমল!
কমল। একি দাদামশাই, আপনি এমন করূছেন কেন?
পতিত-প্রসন্ন । শােনাে কমল, তুমি আমার কন্যা ! ( উঠিয়া দাড়াইয়া
পায়চারি করিতে লাগিল )
দাদা মহাশয়। ওঃ! (চেয়ারে বসিয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিলেন)
মমতা। ভগবান্ ! ( আবার জানালায় মাথা রাখিল )
[ কমল বিস্ময়ে কিছু পিছাইয়া গিয়া সকলের মুখের উপর
দৃষ্টি বুলাইয়া লইয়া
কমল ॥ কন্যা !•••••তৃণপনার কন্যা! • আমি !••••••দাদামশাই !
ছােটদামশাই ! একি! কেউ কথা কইছেন না, প্রতিবাদ
করূছেন না। তবে সত্যি! সত্যি!
৮৪
রক্তকমল
(দৌড়াইয়া ঘরে গিয়া মমতার পিঠের উপর ৰুকিয়া পড়িয়া)
কমল। শুনেছেন.!
কেউ প্রতিবাদ করুলেন না!
আপনিও মুখ তুলছেন না যে !
( উঠিয়া সরিয়া দাড়াইয়া )
আমি তাে কিছুই বুঝতে পায়ছিনে। যদি সত্যিই হয়,
তাহলেই বা আপনারা সবাই এমন কয়ছেন কেন? মৃত্যুকে
শিয়রে দেখে লােকে যেমন মুড়ে যায়, তেমনি করে সবাই আড়ষ্ট
হয়ে পড়েছেন কেন? দুঃসংবাদ, না সুসংবাদ ! মাতৃহারা।
কন্যা ষােল বছর পরে তার পিতার সন্ধান পেয়েছে, এ তার
দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য!
( আরো সরিয়া দাড়াইয়া )
কে বুঝিয়ে দেবে ! পিতার পরিচয় এত চেষ্টা করে গােপন
রাখবার মাঝে যে রহস্য রয়েছে, তা কে উদঘাটন করে
সত্যকে আমার কাছে প্রকাশ করে দেবে। কেউ নেই....
সংসারে আপন জন আমার কেউ নেই! একা! একেবারেই
একা আমি।
• • • • • এ
[ কমল ধীরে ধীরে সরিয়া আসিয়া হলঘরের দরজার
কাছে দাড়াইল
৮৫
রক্ত-কমল
পতিত-প্রসন্ন। কন্যা !
কমল। পিতা।
[ কমল দৌড়াইয়া তাহার কাছে গিয়া উপস্থিত হইল।
পতিত-প্রসন্ন তাহাকে বুকে টানিয়া লইলেন
দাদা মহাশয়। আনন্দ! সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হও। ওই জীবন্ত
মৃত্যুর হাত থেকে আমাদের কমলকে আজ ছিনিয়ে রাখতে হবে।
কমল ॥ (পতিত-প্রসন্নের বন্ধন হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া)
দাদামশাই।
দাদা মহাশয় । কি দিদি !
কমল। এর অর্থ কি ?
দাদা মহাশয় । কিসের অর্থ দিদি ?
কমল । আপনাদের এত দিনের ব্যবহার?
দাদা মহাশয়। রক্তের সম্বন্ধ, আনন্দ, রক্তের সম্বন্ধই আজ প্রবল হ’ল!
কমল, পিতাকে দেখেই বুঝি আজ মনে হচ্ছে এই যােলটা বছর
আমরা তাের সঙ্গে অসদ্ব্যবহারই করে এসেছি
কমল। অসদ্ব্যবহার করেননি, কিন্তু অমানুষিক ব্যবহার করেছেন।
দাদা মহাশয় ॥ শােনা মানন্দ, কমলের কথাগুলাে কান পেতে শােনাে
•••তাতে কেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে !
কমল। দাদামশাই আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি অকৃতজ্ঞ নই।
কিন্তু একথা কি জাবার আমার অধিকার নেই যে কি কারণে
৮৬
রক্ত-কমল
আপনি আমার পিতার পরিচয় গােপন রেখেছিলেন, আর কি
কারণেই বা আমার পিতাকে বার বার আপনি অপমানিত করে
ফিরিয়ে দিয়েছেন?
পতিত-প্রসন্ন । অতীতের কথায় আর কাজ কি মা ! তােমার স্নেহান্ধ
দাদামশাই, তােমার সঙ্গ-ছাড়া হবার ভয়েই আমার পরিচয়
গােপন রেখেছিলেন।
কমল। আমার সঙ্গ-ছাড়াই বা হবেন কেন? দাদামশায়ের কি বােঝ
শক্ত যে পিতাকে পেয়েও আমি তাকে ছেড়ে থাকতে পারিনে।
জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে তিনি আমাকে বাঁচিয়ে বড় করে
তুলেছেন, আর আমি তার সেই মেহের প্রতিদান দেব তার
বুকে আঘাত করে ?•••দাদানশাই কি সত্যিই তাঁর কমলকে
চেনেন না ?
দাদা মহাশয়। যদি বুঝি দিদি, তাহলে কৈফিয়ৎ চানে। কৈফিয়ৎ
দেবার ক্ষমতা আমার নেই। শুধু এইটুকু জেনে রাখ যে
প্রয়ােজন হয়েছিল,—তােকে তাের পিতার আয়ত্তের বাইরে
রাখা প্রয়ােজন হয়েছিল, তাই এতদিন এমন করে তােকে
আগলে রেখেছিলুম ! তাতে আমার নিজের কোনাে স্বার্থ ছিলনা।
কমল, ঈশ্বরের কাছে শপথ করে বলতে পারি, আমার নিজের
কোনােই স্বার্থ ছিল না।
পতিত-প্রসন্ন। কমল, মা আমার, বৃথা তর্কে কোনাে লাভ নেই। চল
আজই আমার ঘরে চল। তােমার দাদামশাই যদি আমার সঙ্গে
৮৭
রক্ত-কমল
* * *
থাকতে সম্মত হন, তাহলে সাধ্যমত আমি তার যত্ন করে জীবনের
বাকী কটা দিন যাতে তিনি সুখে শান্তিতে থাকতে পারেন, তার
ব্যবস্থা করব।
দাদা মহাশয়। আনন্দ! কাছে এসে দাড়াও আরাে কাছে এসে
কমল কৈফিয়ৎ চেয়েছে••••••সে কৈফিয়ৎ আমি
দেব, নইলে চলে যাবে... আমায় ছেড়ে সে তার পিশাচ
পিতার কাছে চলে যাবে !
পতিত-প্রসন্ন। আমি বলি নাই কন্যা, তােমার মেহান্ধ দাদামশাই
তােমার সঙ্গ-ছাড়া হবার ভয়ে আমার পরিচয় গােপন
রেখেছেন?
দাদা মহাশয়। কমল, পিতার গৃহে যেতে চাও, কিন্তু জান তােমার
পিতা নররূপী পিশাচ।
কমল ৷ দাদামশাই! আপনি যে দৃষ্টি দিয়ে আমার পিতাকে
দেখছেন, সন্তান হয়ে আমি তাে সে দৃষ্টি দিয়ে তাকে দেখতে
পারি না।
দাদা মহাশয়। জান, তােমার পিতা দারুণ ব্যভিচারী, উচ্ছঙ্খল,
মাতাল।
কমল। কিন্তু তিমি মার পিতা !
দাদা মহাশয়। জান, কমল, মাতৃহারা শিশু তুমি যখন শূন্য ঘরে পড়ে
কঁদছিলে, তখন তােমার ওই পিতার পাষাণ বুকে তােমার
জন্যে এক ফোটাও মেহ ছিল না।
৮৮
রক্ত-কমল
D
খতিত-প্রসন্ন । বিশ্বাস কোরােনা
কোরােনা কন্যা • •••এসব কথা বিশ্বাস
কোরােনা !
'কমল ॥ স্নেহহীন হলেও তিনি আমার পিতা !
দাদা মহাশয়। উচ্চ জ্বল, মাতাল, স্বার্থপর এই পিতার টানই কি
সব টানের চেয়ে প্রবল হ’লকমল?
কমল। মাতৃহারা সন্তানের কাছে, পিতার চেয়ে আপনার আর কে
হতে পারে দাদামশাই?
দাদা মহাশয়। 'আর পায়ুছিনে, আনন্দ, কমল তার পিতার
কাছেই চলে যা! তবুও.. তবুও সে কথা শুনিয়ে আমি তার
সারাটা জীবন দুৰ্ব্বহ করে দিতে পাব না। যদি শশানে পাগল
হয়ে যাবে! সে আমি দেখতে পাব না ! আনন্দ! তার চেয়ে
কমল চলে যাক্, নিভে যা সব আলল,-স্নেহ, মমতা, কর্তব্য
সব ফুরিয়ে যাক! শ্রান্ত, সৰ্বস্বান্ত এই বৃদ্ধ দীর্ঘ জীবনের গুরু
বােক ফেলে দিয়ে এইখানকার মাটিতেই মিলিয়ে যা
[ কমল দাদা মহাশয়ের কাছে আসিয়া তাহার মাথায় হাত
বুলাইয়া দিতে দিতে
কমল । • দাদামশাই!
দাদা মহাশয়। যাও দিদি, পিতৃগৃহে যাও!, সেখানে গিয়ে সুখে
থাক!
পতিত-প্রসন্ন। কমল, বাইরে তােমার জন্যে গাড়ী রেখে এসেছি ।
চল আজই আমরা দুজনে পশ্চিমে চলে যাই।
কমল। দাদামশাই, সত্যিই কি আমায় বিদায় দেবেন?
দাদা মহাশয়। বিদায় দেব! কমল, যােল বছর তােকে আগলে
রেখেছি..আজ আর পায়ুছিনে, কিছুতেই পাছিনে! ক্ষমা
কর, তাের এই বৃদ্ধ দাদামশায়ের দুর্বলতা ক্ষমা কর, কমল।
( আনন্দ চোখ মুছিল)
কমল। বিদায় দিতে হবে কেন দাদামশাই? আপনার, আমার
আর পিতার এই তিনটি মাত্র প্রাণীর ঠাই কি এক যায়গায় হতে
পারেনা? পিতা আপনার কাছে কি এমন অপরাধ করেছেন
যার আর মার্জনা নেই ?
দাদা মহাশয় । সে অপরাধের পৈশাচিকতা আমি তাের কাছে প্রকাশ
করতে পারবনা কমল ! সে প্রশ্ন তুই তুলিলনে দিদি !
কমল। তাহলে কি আমায় বুঝতে হবে দাদামশাই যে, ববার মত
নয় এমন কোনাে সামান্য কারণেই আমার পিতার প্রতি আপনি
বিমুখ হয়েছেন আর সেই কারণেই আজ আমাকে হয় পিতৃস্নেহ
নয় আপনার মহাথেকে বঞ্চিত হতে হবে ?
দাদা মহাশয় । তাের যা খুসি তাই বােঝ, কমল আমায় আর প্রশ্ন
করিসনে! সকল প্রশ্ন, সকল দাবী-দাওয়া আজ শেষ করে
দিতে চাই আনন্দ।
রক্ত-কমল
.
আনন্দ। এত কঠোর কেন বন্ধু, এমন নির্মম হৃদয়ে অতীতের জের
টেনে কেন চলছ ! মার্জনা কর, জামাতাকে মার্জনা করে
কমলের দুঃখ দূর কর।
দাদা মহাশয়। আনন্দ, তুমি ও-কথা বােলােনা। তুমি ত জান কি
গুরুতর অপরাধ সে করেছে ! তুমি ত জান আমার কি সর্বনাশ
সে করেছে!
পতিত-প্রসন্ন । নিমেষের সেই একটি দিনের ভুলের জন্যে কি বার বার
আমি মার্জনা ভিক্ষা করিনি।
দাদা মহাশয়। কন্যাকে নিতে এসেছ নিয়ে যাও, আর আমি বাধা
দেবনা! কিন্তু ভুল বলে, নিমেষের ভুল বলে তােমার সেই
পৈশাচিকতা চাপা দিতে চেওনা !
কমল। কিছুই তাে বুঝতে পাছিনে! এ রহস্য কে ভেদ করে
দেবে, কে সত্য প্রকাশ করে আমায় আজ কৰ্তব্য বুঝিয়ে দেবে ?
( মমতা ঘর হইতে বাহির হইয়া )
মমুতা। আমি দেব কমল।
কমল । (দৌড়াইয়া গিয়া মমতাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিনি আপনি
আমার মায়ের স্থান অধিকার করেছেন। মা যদি থাকতেন,
তিনিও এ সময় চুপ করে থাকতে পাতেন না! এরা সব
পুরুষ, খুব স্নেহশীল হ'লেও নারীর কর্তব্য এরা কি করে
বুঝবেন !
রক্তকমল
পতিত-প্রসন্ন । কমল ওই নারীর দেহ স্পর্শ কোরােনা। ও-হে
স্পর্শ করে পবিত্র মাতৃনাম উচ্চারণ কোরােনা। ও সমাজে
কলঙ্ক, ও সমগ্র নারীর লজ্জা!
মমতা। আমার সে লজ্জার কথা, সে কলঙ্কের কথা আমি নিজেই
আজ এদের কাছে প্রকাশ করে দিয়ে চিরবিদায় গ্রহণ করব।
কিন্তু তার আগে তােমার প্রকৃত পরিচয় তােমার মেয়েকে শুনিয়ে
যাব।
পতিত-প্রসন্ন। কিন্তু আমি তােমার টুটি চেপে ধব।
করুণা কজনার মুখ বন্ধ কবে ?
পতিত-প্ৰসন্ন। করুণা তুই চুপ কহ্ !
দাদা মহাশয় । একি! সবাই এর পরিচিত ! আনন্দ ?
আনন্দ। আমি তা জান্তুম না !
মমতা। (কমলের কাছে গিয়া তাহার একখানি হাত হাতে লইয়া )
কমল, তােমার ওই পিতা মানুষ নয়, পিশাচ। তােমার
মাতৃহন্তা! ঘরময় রক্ত আর তারই মাঝে তােমার মাতার
মৃতদেহ, পাশে তুমি। তােমাদের সেই অবস্থায় ফেলে রেখে
তােমার এই পিতা পলায়ন করে। তােমার দাদামশাই তার
মৃতা কন্যার জাত্মার শান্তি কামনায়, জীবিত তােমার ভবিষ্যৎ
চিন্তায়, তোমার পিতার সেই পৈশাচিক কীর্তির সবখানি আগুন
বুকে করে রেখে দেন!
৯২
[ কমল সােকায় পড়িয়া গেল। পতিত-প্রসন্ন মমতার গলা
টিপিয়া ধরিল, করুণা চীৎকার করিয়া উঠিল, কমল
ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতে লাগিল ; আনন্দময় আর করুণা
পতিত-প্রসন্নের কবল হইতে মমতাকে মুক্ত করিবার
চেষ্টা করিতে লাগিল, দাদা মহাশয় কমলকে জড়াইয়া
ধরিলেন। মমতা পড়িয়া গেল
আনন্দময় ॥ জুল আনাে, জল আনন।
[ আনন্দময় মমতার মাথা কোলে করিয়া বসিলেন। করুণা
জল আনিয়া মমতার মুখে-চোখে দিতেই মমতা অনেকটা
সুস্থ হইয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল। পতিত-প্রসন্ন ঘুরিয়া
বেড়াইতে লাগিল
দাদা মহাশয়। আমার কোনাে অপরাধ নেই দিদি। আমি এই
আঘাত থেকে বাঁচাবার জন্যেই......
কমল। (দাদা মহাশয়ের বুকে মুখ লুকাইয়া) আমি বুঝেছি, সব
বুঝেছি দাদামশাই ! আমায় ক্ষমা করুন !
( দাদা মহাশয় কমলের পিঠে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন)
.
মমতা ॥ কমল, এ আঘাত আমায় বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। শুধু
অতীতের কথা স্মরণ করেই নয়, ভবিষ্যতের কথা ভেবেও তােমার
রক্ত-কমল
পিতার পরিচয় দেওয়া প্রয়ােজন হয়েছে। তােমার
প্রয়ােজন হয়েছে। তােমার প্রতি
স্নেহবশত যে তােমার পিতা তােমায় নিয়ে যেতে চাইছেন, তা নূর
কমল। তা যদি হ'ত, তাহলে আমি সে মেহ থেকে তােমায়
বঞ্চিত কতুম না। তােমাকে নিতে চাইবার পিছনে যে
কুমতলব তার রয়েছে, তা আমি জানি...
পতিত-প্রসন্ন ॥ নারি?
মমতা। শােনাে কমল, তােমার দাদা মহাশয়ের সম্পত্তির লােভে
তােমার পিতা তােমায় নিতে চাইছেন। গােপনে তােমার
বিবাহ দেবার ব্যবস্থাও করে রেখেছেন।
পতিত-প্রসন্ন। উঃ! দুধ দিয়ে কালসাপ পুষেছিলুম !
দাদা মহাশয় । সে কি!
কমল। পিতা।
পতিত-প্রসন্ন । কন্যা, তুমি আমায় মার্জনা করেছ?
কমল । আপনার আর আমার মাঝে আমার মায়ের রক্ত ব’য়ে যাচ্ছে !
সে রক্ত-সাগর সাঁতরে আমি আপনার কাছে যেতে পাব না ।
আপনি যান, আর কখনাে আমায় নিতে চাইবেন না। দাদা-
মশাই, আমার জন্যে আপনি কত সয়েছেন! সারাটা জীবন
তুষের আগুন বুকে চেপে রেখেছেন।
পতিত-প্ৰান্ন । কমল! আমায় যদি না ক্ষমা কতে পার, আমার
সঙ্গে যেয়ােনা। কিন্তু তােমার প্রতি আমার কণ্ঠ্য তাে তাতে
শেষ হবেনা। তােমার দাদা মহাশয় বৃদ্ধ, মৃত্যু এসে কখন তাকে
রক্ত-কমল
টেনে নেয় তার ঠিক নেই! তােমার দাদামশায়ের মৃত্যুর পর
তােমাকে আমারই আশ্রয় গ্রহণ কতে হবে। আমি ধৈর্য্য ধরে
ততদিন অপেক্ষা করব। কিন্তু এই নারীকে তােমরা জাননা।
ও ভদ্রলােকের গৃহে স্থান পাবার আযােগ্য, ভ্রষ্টা, আমার
পাপ-পথের সঙ্গিনী !
পতিত-প্রসন্ন তালা
[ মমতা মাথা নীচু করিয়া রহিল।
খুলিয়া চলিয়া গেল
দাদা মহাশয় । মমতা একথা সত্যি?
মমতা। সত্যি!
দাদা মহাশয়। আনন্দ, তুমি সব জেনে-শুনেও একে আমার বাড়ীতে
ঠাই দিয়েছ ?
আনন্দ। আমি তাে তােমায় সবই বলতে চেয়েছিলুম।
দাদা মহাশয়। আমি তখন ভাবতেও পারিনি যে তুমি জেনে-শুনে
একটা কুলটাকে কমলের সঙ্গী করে দেবে?
কমল। দাদামশাই।
দাদা মহাশয় । চুপ কর কমল !
আনন্দ। আমি জান্তুম না যে, তােমার জামাতার সঙ্গে এর কোনাে
সম্বন্ধ ছিল।
দাদা মহাশয় ॥ মমতা, আমার গৃহে তােমার ঠাই হতে পারেনা।
রক্ত-কমল
মমতা। তা আমি বুঝি.••আপনি রাতে চাইলেও আমি থাম না ।
আমি এসেছিলুম কমলকে তার পিশাচ পিতার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা
করতে। আমার সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে, এখন আমি নিজেই
চ'লে যাব।
[ মমতা কমলের ঘরে প্রবেশ করিল
আনন্দ। নিমেষের একটি ভুল কি এতই বড়, বন্ধু, যে কপনাে তা
মার্জনা করা যায় না?
দাদা নহাশয়। নিমেষের ভুল নয় আনন্দ, মমতার ব্যভিচার নিমেষের
ভুল নয় ! ওই দুষ্পবৃত্তিই তার সত্যিকার জিনিষ ।
আনন্দ। কিন্তু তারপর, সেই একবারের ভুলের পর সে তার চিত্ত
কেমন করে শুদ্ধ করেছে, কত বড় উদারতা, কতখানি মহত্ব সে
অর্জন করেছে, তার পরিচয় তাে তুমি পেয়েছ বন্ধু!
দাদা মহাশয় । ও-চিত্তশুদ্ধির ও-উদারতার মহত্বের কোনাে মূল্য নেই
আনন্দ! ও-সব ওর মনের খেয়াল। কোথায় একটা আঘাত
পেয়েছে আর সেই আঘাতের বেদনা ভুলে থাবার জন্যে
মানুষের উচ্চ প্রবৃত্তিগুলাের নকল করে যাচ্ছে।
আনন্দ । একবার যে ভুল কবে, সারাটা জীবন কি তার জন্যে তাকে
দগ্ধে দগ্ধে ময়ূতে হবে !
দাদা মহাশয়। তাইত হয় আনন্দ ! আগুনে হাত দিলে হাত
T=f.
পােড়ে, সাপকে বুকে নিলে সে দংশন করে। বুদ্ধিমান মানুষ
তাইত আগুনে হাত দেয় না, সাপকে বুকে নেয় না।••••••মমতা
তার স্বামীর • কাছে বিশ্বাসহন্ত্রী হয়েছে তাকে কে বিশ্বাস
করতে পারে ?
আনন্দ। তুমিই না একদিন বলেছিলে যে পুরুষ নারীর মিলন তুমি
চাও, কিন্তু বিবাহ চাও না। অথচ বিবাহ-বন্ধন ছিন্ন করেছে
বলেই মমতাকে তুমি মার্জনা কতে পাছ না।
দাদা মহাশয় । আজও আমি সেই কথাই বলি। বিবাহবন্ধন ছিন্ন
করেছে বলেই মমতার প্রতি আমি বিরূপ নই। মমতা বিশ্বাস
ভঙ্গ করেছে, সেই-ই তার অপরাধ।
{ মমতা আর করুণা আবার হলঘরে প্রবেশ করিল। সকলে
চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল
মমতা। কমল, বিদায় দাও :
( কমল তাহার কণ্ঠ জড়াইয়া ধরিল।
আমায় কোনাে অনুবােধ কোরােনা কম, পতিতার যদি
আশীৰ্বাদ কয়বার অধিকার থাকে তাহলে আশীর্বাদ করছি সুখী
হও।
১৭
মল
[ দাদা মহাশয় আসিয়া কমলকে সরাইয়া লইলেন।
দাদা মহাশয়কে প্রণাম করিয়া
মমতা। কমলকে কলুষিত করূতে আসিনি, এসেছিলুম তাকে রক্ষা
কতে। এই কথাটাই সুধু আপনি বিশ্বাস কবেন।
দাদা মহাশয়। আশীৰ্বাদ করি শান্তি লাভ কর।
( আনন্দময়কে প্রণাম করিয়া) আপনি আমায় পাক থেকে
টেনে তুলেছিলেন। আপনার দয়া আমি ভুলতে পায়না।
বিদায় দিন।
আনন্দময় । আমার কাছে কেন বিদায় চাইছ ? এই বুড়াে বয়সে
মা ছেড়ে তত আমি থাকতে পাব না। সংসার তােমাকে
অপ্রয়ােজনীয় মনে করে; কিন্তু সন্তানের কাছে মা তাে
অপ্রয়ােজনীয় নয় !
দাদা মহাশয়। আনন্দ !
আনন্দ ॥ জানি বন্ধু, তুমি কি বলতে চাও ! তােমার বন্ধুত্বের প্রতি
আমার শ্রদ্ধা আছে; কিন্তু আমার এই মায়ের প্রতি আমার
কৰ্তব্যও রয়েছে। আর সেই কর্তব্য পালন করতে যদি তােমার
বন্ধুত্ব আমায়,-হারাতে হয়, সে আঘাতও যদি সইতে হয়, আমি
তা সইব, হাসিমুখেই সইব! সংসারে তােমার কমল আছে ;
কিন্তু এই মা ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই ! এস মা।
[ আনন্দময় মমতার হাত ধরিয়া বাহির হইয়া গেল, করুণাও
সঙ্গে সঙ্গে চলিল। তাহারা ঘরের বাহিরে গেলে কমল
ছুটিয়া দরজার কাছে গিয়া দাড়াইল। দাদা মহাশয়
উত্তেজিত হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কমল
আসিয়া সােফায় বসিল। দাদা মহাশয় চেয়ারে
বসিলেন। দুজনে দুজনার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন
দাদা মহাশয়। কমল, তাের পিতাকে মার্জনা কতে পারি ?
কমল। সে কি দাদামশাই।
দাদা মহাশয়। চেষ্টা কর, চেষ্টা ক। তাকে মার্জনা ক'রে তুই তার
কাছে চলে যা!•••আমি তাের পিতার হাতেই তাের সম্পত্তির
ভার দেব !••••••আনন্দ চলে গেল, এবার তুইও যা! একা
আমি চির-বিস্মৃতির মাঝে ডুবে যাই।
[ কমল উঠিয়া দাদা মহাশয়ের কাছে গিয়া তাহার পিঠের
উপর ভর দিয়া কাধে মাথা রাখিল
কমল। দাদা মহাশয়, আপনার পাইপটা এনে দেব?
(দাদা মহাশয় কমলকে কাছে টানিয়া, মস্তক চুম্বন করিয়া)
দাদা মহাশয় । কমল, দিদি, সৰ্ব্ব আমার !
যবনিকা
মনােমােহন থিয়েটার
উদ্বােধন রজনীর অভিনেতৃবর্গ
অধ্যক্ষ
•••
•••
* * *
দাদা মহাশয়
পতিত-প্রসন্ন
আনন্দ
পূরবী
কমল
নাট্টাচাৰ্য্য শ্রীসুরেন্দ্রনাথ ঘােষ
(দানীবাবু)
শ্ৰীনির্মলেন্দু লাহিড়ী
বিশ্বনাথ ভাদুড়ী
গণেশচন্দ্র গােস্বামী
শ্ৰীমতী ইন্দুবালা
শ্ৰীমতী শেফালিকা (পুতুল)
শ্ৰীমতী সরযুবালা
শ্ৰীমতী আশালতা
।
মমতা
করুণ।
•••
রঙ্গভূমি সজ্জাকর
রবীন্দ্রনাথ সরকার
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.