Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Raghubir

Bidyabinod,khirod Prosad · 2009/10/7

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রঘুবীর। [ মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত । ] ( অভিনয়ের প্রথম রজনী-২১শে কার্তিক, শনিবার, ৩১০ সাল।) শ্ৰক্ষীরােদপ্রসাদ- ৰিবিনােদ. এম, এ-প্রণীত। কলিকাতা। ২০১নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী” হইতে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত। ২নং গােয়াবাগান ষ্ট্রীট, ভক্টোরিয়া-প্রেসে শ্রীকুঞ্জবিহারী দাস দ্বারা মদ্রিত। সন ১৩১০ সাল। মূল্য ৬০ আনা মাত্র।

No text on this page.

অভিন্নহৃদয় সােদরপ্রতিম
শ্ৰীযুক্ত মন্মথমােহন বসু
মহাশয়ের করকমলে
গ্রন্থকারের
স্নেহ ও প্রীতির
উপহার ?

No text on this page.

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ। ০ ০ ০ ৫০ জাফর গুজরাটের নবাব মামুদসার মােল্লা, পরে নবাব। অনন্তরাও মামুদসার দেওয়ান। সাহাজান ঐ বিশ্বাসী ভৃত্য। বলদেব অনন্তরাওয়ের পুত্র। রঘুবীর অনন্তরাওয়ের পালিত পুত্র (ভীল )। দুলিঘু রঘুবীরের শিষ্য ও ভগ্নীপতি। দেবল মামুদসার নিম্নকর্মচারী, পরে জাফরের দেওয়ান। বিষণ দেবলের পুত্র। সখারাম সখার মার পুত্র। কেরামৎ জাফরের অনুচর। মন্ন, রঘুবীরের শিষ্য। ভীলগণ, দূতগণ, ঘাতকগণ, লাঠিয়ালগণ, প্রহরীগণ ইত্যাদি। ৮০ স্ত্রীগণ। পরীবাণু সামলী সথার মা মনিয়া মামুদসার কন্যা। রঘুবীরের ভগ্নী। জাফরের অনুগত স্ত্রীলােক। দুলিয়ার ভগ্নী।

No text on this page.

রঘুবীর।
প্রথম অক।
প্রথম দৃশ্য।
পীরের আস্তানা।
চক্রান্তকারী ওমরাওগণ,
কৃষ্ণপরিচ্ছদ জাফর, দেবল ও ঘাতকগণ।
জাফর। এই উপযুক্ত অবসর, নিশ্চিন্ত অন্তরে নবাব এই
বাগানের ঘরে অঘাের নিদ্রায়। মদ্যপানে সকলকেই অজ্ঞান
করেছি। প্রহরীগণ অস্ত্রশূন্য—ঘুমে অঘাের অচেতন। শীঘ্র
যাও--বিলম্ব করােনা। সময় অতিবাহিত হলে সব পণ্ড হবে। এ
সুযােগ আর আসবে না। এই পীরের সম্মুখে প্রতিজ্ঞা ক’ছি,

২
রঘুবীর।
আমি তােমাদের। এ রাজ্যের সমস্ত ভার তােমাদের উপর
থাকবে। আমার কোন স্বদেশীকে, রাজ্যের মধ্যে পরমা-
ত্মীয়কেও, তােমাদের স্থান অধিকার করতে দেব না।
দেবল। আমরা প্রস্তুত হয়েই ত এসেছি।
জাফর। দেখ আমি মােল্লা-অর্থে ঐশ্বর্যে আমার লােভ
নেই । এ শুধু প্রতিহিংসা! দারুণ অপমান, বিষম অত্যাচার।
কসের জন্য ? কি অপরাধ ? শুধু নবাবনন্দিনীর সৌন্দর্য্যের খ্যাতি
শুনে, তারে দেখতে চেয়েছিলুম—একবার শুধু সেই চাদমুখের
শােভর স্বাদ অনুভব করতে, কেশনে 'কে দেখতে
চেয়েছিলুম। শুধু দেখা-দোহাই আলা, দুরভিসন্ধিা ছিল না। শুধু
সেই জন্য দারুণ অত্যাচার-প্রপীড়িত হয়েছি। সকলেই তা
জান। তিন দিন প্রাচীরে আবদ্ধ ছিলুম—কলেই দেখেছে।
পিপাসায় চোখের তারা ঠিকরে গেছে—তবু এক ফেঁটা জল পাইনি।
সকলেই দেখেছে। প্রতিশােধ—তার প্রতিশােধ-মৰ্ম্মদ
যাতনার প্রতীকার নবাবনন্দিনী পরীবাণুকে বাদী ক’ববাে।
আর কিছু চাই না। রাজ্য চাই না, গান চাই না—পরী চাই।
--জাহান্ননে যাই, সেওবি আচ্ছা। তবু, পরী চাই।-এসে।
বিলম্ব করেন। প্রতিহিংসা, প্রতিহিংসাপরীবাণু, পরীবাণু
[ সকলের প্রস্থান।
( সাহাজানের প্রবেশ )
সাহা। কি হল—একি হল! গুপ্তহত্যার মন্ত্রণা! ভীষণ
স্থান-ভীষণ আয়োজন—ণ মূৰ্ত্তি। জফর --ভীষণ জাফর। কি
করি, কি করি! আমি একা। বুঝতে পেরেছি, পাষণ্ড উৎকোচ

গেল !
রঘুবীর।
সবাইকে
বশে এনেছে--সেপাই
-সেপাই হাতে এনেছে।
সর্বনাশ হ’ল ! কি করি, কোথায় যাই! বৃদ্ধ আমি, শক্তিহীন।
দুরাত্মারা সশস্ত্র, সতর্ক—সংখ্যায় অনেক। টের পেলে এখনি
হত্যা করবে-প্রাণ যাবে ! গেল—নবাব গেল, আর রক্ষা হল
(নেপথ্যে 'চীৎকার) ওই চীৎকার, ওই আর্তনাদ। বস্
সব চুপ—সব শেষ ! কোথা যাই—কি করি—পরীকে রক্ষা করি।
পিরবাে~-তাকে রক্ষা করতে পারবাে ! এই অবকাশ—নিশ্চয়
পাবাে। দোহাই আল্লা রক্ষা কর,রক্ষণ কুর.
প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
শয়নকক্ষ ।
পরীবাণু, সাহাজান।
সাহাজান কর্তৃক নিদ্রিত পরীবাণুর পাদস্পর্শ।
পরী।
( উঠিয়া) কি সংবাদ সাহাজান? গভীর রজনী
পুরবাসী আছে সবে নিদ্রার আশ্রয়ে,
নবাবনন্দিনী শুয়ে লভিছে বিশ্রাম,
এমন সময়ে কেন উন্মাদের মত,
হে, বৃদ্ধ, পশিলে মাের ঘরে ?

৪
রঘুবীর।
সাহ।
ক্ষমা কর
নবাবনন্দিনী! ভৃত্য আমি—বাল্য হতে
নিজ হস্তে করেছি পালন। সে সাহস
লইয়া অনুমতি পশিয়াছি ঘরে।
শুধু তাই নয়, নিঃশব্দে পশেছি আমি।
দাস দাসী কোলাহলে পাছে মাের কাৰ্য্য
পণ্ড করে—রাখিতে তােমারে মাতঃ! পাছে
আমি না হই সক্ষম, তাই গুপ্ত ভাবে
চৌর মত পশেছি প্রাসাদে।
মাের সনে। দারুণ বিপন্না তুমি আজি।
এ হেন বিপদ নিদারুণ আর কভু
পশে নাই নবাব-সংসারে !
শীঘ্র এস
পরী
কিসের বিপদ ?
সাহা।
বলিবার
শক্তি নাই, বলিবার নাই মা সময়।
মুহূর্তে এ গৃহ তব হবে কারাগার।
বন্দিনী হইতে যদি সাধ নাহি থাকে,
শীঘ্র এসাে। কেন যাব করােনা জিজ্ঞাসা।
মান রাখ-করি মা মিনতি।
পরী।
নবাবের
অনুমতি বিনা, এ ঘাের রজনী যােগে
তব সঙ্গে পলায়নে মান কি বাড়িকে
তাঁর। আগে আন নবাবের অনুমতি।

রঘুবীর।
সাহা। অনুমতি আর কি আসিবে। এই চারু
অট্টালিকা আর কি মা নবাব দেখিবে !
তাই বলি শীঘ্র এস। মান রাখিবারে
যদি থাকে আকিঞ্চন, বিলম্ব করােনা।
এ সুন্দর সুবর্ণ পিঞ্জর মাঝে, আছে
নিহিত যে ধৰ্ম্ম রমণীর, ভুজঙ্গের
ফণার প্রহার হতে, যদ্যপি রাখিতে
তারে চাও, শীঘ্র তবে সঙ্গ মাের লও।
বিশ্বাসের শীতল কোমল উপাধানে
শির রাথি, ঘুমাইতে নিশ্চিন্ত অন্তরে,
পিতা তব চিরনিদ্রা করেছে আশ্রয়।
পরী।
যা, যা—পিতা
মাের নাই।
সাহা। নাই-আর নবাব নাই ।
অবস্থা যা দেখিয়া এসেছি তঁার, তাতে
বিশ্বাস আমার, আর নাই তব পিতা।
নবাবের অন্নে পুষ্ট, নবাব-কৃপায়
রাজ্য মধ্যে সর্ব উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত,
সয়তান-প্রতিমূর্তি দুরাত্মা জাফর
নিদ্রিত নবাব বক্ষে বিধিয়াছে ছুরি।
বিশ্বাসঘাতক অন্য যত অনুচর
সেই বেইমানি কাৰ্যে হয়েছে সহায়।
কি শুনালে সাহাজান! এই কি পিতার
পরিণাম! হে ঈশ্বর কি করিলে মােরে।
পরী।

r
!
রঘুবীর।
নিদ্রা গেনু রাজার নন্দিনী; জেগে দেখি-
নিদ্রার অপর পারে সমস্ত জীবন
স্বপ্নময় রাজত্বের শুধু স্মৃতি-ছায়া।
পিতৃহীনা স্থানহীনা ভিখারিণী নাম।
কি শুনালে সাহাজান।
সাহা।
নবাবনন্দিনী
লােদনের আছে অবসর। উপযুক্ত
নয় এ সময়। নিস্তব্ধ রয়েছে পুরী।
অবাধে এখনাে চলে নিদ্রার শাসন।
চীৎকারে ভেঙ্গনা রাজ্য তার। সর্বনাশ
হবে! আত্মরক্ষা হবে অসম্ভব। চলে
এস।
পরী। কোথা যাব ?
সাহা।
ঈশ্বরের পদপ্রান্তে
স্থান। চল তােমা সেথা লয়ে যাই। ওই
পুন উঠে কোলাহল ! দুরাত্মা পশিল
বুঝি পুরে। ত্বর এসসা পরী ! এলাে~এলো,
হ’ল সৰ্ব্বনাশ ! নিশ্চিন্ত হইয়া চিন্তা
করিবার তরে, সমস্ত জীবন আছে।
পিতার উদ্দেশ্যে দিতে শােকা-অঞ্জলি
আছে চক্ষে সাগরের জল। চলে এসো।
[ পরীবাণু ও সাহাজানের প্রস্থান!
(জাফর ও অনুচরগণের প্রবেশ)
জাফর। এইত নবাবনন্দিনীর ঘর ! কিন্তু পরীবাণু কই ! কি

রঘুবীর। হ’ল-কোথা গেল।—পরীবাণু কোথায় গেল !-কে নিয়ে গেল । কে সরালে! তল্লাস করাে-তল্লাস করাে। যে নিয়ে গেছে, তাকে শূলে দাও। যে আশ্রয় দিয়েছে, তাকে সপুরী একগাড় কর। জদি যাও-জলদি চলো। তৃতীয় দৃশ্য। নাচঘর। দেবল ও জাফর। জাফর। কি করলে দেওয়ান ? দেবল। আর করা-করি কি জনাব ! যাওয়া আর হওয়া। উদ্যোগ আয়ােজন সব ঠিক। জাফর। সবাই এসেছে ? দেবল। সবাই এসেছে,—শুদ্ধ বৃদ্ধ অনন্তরাও আসেনি। জাফর। কেন ? দেবল। দেওয়ান বলেন-আমি গােলামের কাছে মাথা হেঁট করতে পাৰ্ব না। জাফর। বটে (ভুমিতে পদাঘাত করিয়া) কোই হায় ? প্রহরী। হুজুর। জাফর। জদি যাও,-একশ সিপাই সঙ্গে করে অনন্ত- রাওকে হাতে পায়ে বেঁধে গ্রেপ্তার করে আন।

রঘুবীর।
দেবল। আর আমার বিশ্বাস, পরীবাণুকে লুকিয়ে রাখার
যদি কেউ সহায়তা করে থাকে তাে, সে অনন্তরাও।
জাফর । যাও--আর বিলম্ব করােনা।
প্রহরী। যাে হুকুম জনাব !
[ প্রহরীর প্রস্থান।
জাফর। দেওয়ান্! আপাততঃ এ কাৰ্য্য শেষ কর। এই
রাজবংশীয় ওমরাও ওগুলাের যা হােক একটা হেস্তনেস্ত কর---
তারপর তােমার ল শত্রু নিপাত ক’চ্ছি। শীঘ্ৰ কাৰ্য শেষ
কর, আমি একটু বিশ্রাম নিই।
[ প্রস্থান।
দেবল। বাটা পাতি নেড়ে, গুজরাটের রাজদণ্ড হাতে
এসেছে মনে করে নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমুগে। যে
রাজ্য মামুদ-স। দুদিন রাখতে পারলে না, সে রাজ্য তাের
হাতে থাকবে কতক্ষণ! এ রাজ্য ভবিষ্যতে আমার। আমারি
কুটনীতি-অস্ত্রে হবিনে এ রাজ্যের সিংহাসনের পথ নিষ্কণ্টক
( বিষণের প্রবেশ)
বিষণ। কি করলে বাবা ?
দেবল। জাযঃ এখন নবাব।
সাধিত হল, আমার কি !
নবাবের হুকুমে এ কাৰ্য্য
( ঘাতকের প্রবেশ)
ধাতক। হুজুর! আর কি ক’ত্তে হবে আদেশ করুন।

রঘুবীর।
নবাবের জোর হুকুম,
দেবল। অনন্তরাওকে ধরে আন।
যা বিষণ, সঙ্গে যা।
[ ঘাতকের প্রস্থান।
-
?
বিষণ। এই মহাপাপ, এতেও নিবৃত্তি নাই। আবার সে
দুৰ্বল নিরপরাধ নিরীহ ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার ! আর সেই
কাজে আমি যাব ? নিরীহ নবাবের এই ভীষণ হত্যা দেখে, আমাতে
পাপ স্পর্শ করেছে। বাবা! আমি প্রায়শ্চিত্ত ক’ড়ে চ’লুম।
দেবল। আরে মূখ, অনন্তরাওকে রাখতে আছে ! সে বেঁচে
থাকলে দুদিনে নবাবকে আয়ত্ত কৰ্ব্বে,অমনি রাজ্যের সর্বে
সৰ্বা হবে—অমনি দেবলের টুটি ফাঁসির দড়ির সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।
উপযুক্ত সন্তান! তখন কি তুমি পিতার কষ্টোপার্জিত অর্থে,
গুজিয়া বরফির বংশলােপ ক’ত্তে নিযুক্ত থাকবে। নে—চলে
আয়।
বিষণ। অনন্তরাওয়ের দয়াতেই আজ তুমি এই গৌরবান্বিত
পদে অধিষ্ঠিত,নইলে তুমি কে? থাকতে কোথায় ? চিনতে
কে? বাবা! উপকারীর সৰ্ব্বনাশ করােনা। যা করেছে। তা
করেছো।-অনন্তরাওয়ের অনিষ্ট করােনা। ফেরফের।
দেবল। এখন যাস তত আয়।
দেখ বাবা ।
দেবল। বলি যাতে আয়।
বিষণ। আচ্ছা বাবা ।
দেবল। আবার বাবা !
বিষণ। শোন বাবা!
বিষণ।

রঘুবীর।
,এ ব্যাটা কচলে কচলে, বাবা শব্দটাকে কলুঙ্কে
ফৈললে দেছি। বলি আমার সঙ্গে যাবি কি না ?
বিষণ। না।
দেবল। এই “না” কইতে অত বাবার অবতারণা ক’চ্ছিলি
কেন ?
বিষণ। বােকা বয়েস আত্মহত্যা করে ; মূখ বদমায়ে
মানুষ মারে ;-আর সেয়ানা বদমায়েস দেশ নষ্ট করে। তুমি
দেশটাকে খেলে দেখছি।
দেবল। যাস্ততা আমার সঙ্গে আয় ।
( দূতের প্রবেশ)
দেবল। খবর কি?
দূত। অনন্তরাও ধরা পড়ল না।
দেবল। সে কি ?
সকলের চক্ষে ধূলো দিয়ে, অন্ধকারের আশ্রয় করে
-কোথায় সরে পড়েছে। গৃহ শূন্য-জনপ্রাণী ও তার ভেতর
নেই।
দেবল। সৰ্ব্বনাশ করলে, সব পণ্ড হ’ল-এস সঙ্গে এস।
ভাল করে সন্ধান কর, আট ঘাট আলাও—শীঘ্র এস।
[ প্রস্থান।

রঘুবীর।
১১
চতুর্থ দৃশ্য।
কুটীর-প্রাঙ্গণ।
শ্যামলী।
গীত।
চোখের দেখা পাব বলে, আশায় ভুলে থাকি চেয়ে।
সেধে কেঁদে মনটী বেঁধে তবু ছুটী দাগা খেয়ে।
চাঁদের আলো ফুলের হাসি,
এক নিমিষে করে বাসি,
উদয় হ'য়ে হৃদয়শশী বুকে নিতে এলো ধেয়ে।
অাখি ধারার ভরা নদী,
শুকিয়ে বিধি দিলে যদি,
প্রাণের নিধি নিরবধি থাকে যেন প্রাণটী ছেয়ে।
( দুলিয়ার প্রবেশ )
দুলিয়া। বলি ও রাঙ্গাবউ !
শ্যামলী। কিরে মিসে!
দুলিয়া। বলি ক’ছি কি ?
শ্যামলী। বসে বসে ভাবছি।
দুলিয়া। ভাবছি!
শ্যামলী। শুধু ভাবছিভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে গেছি।
দুলিয়া। বুলিস কি রাঙ্গাবউ, অবাক ক’বুলি যে! তাের
ভাবনা আছে!
শ্যামলী। এইবারে এসেছে।
দুলিয়া। বেশ-ভাবনাটা কি শুনতে পাই না ?

রঘুবীর।
শ্যামলী। ভাবছি, আমার অদৃষ্টে হ’ল কি! যাকে একদিন
একদণ্ডের জন্য স্থির দেখতে পাইনি, সে আজ একটি মাস ভাল
মানুষটীর মত আমার কাছটিতে বসে আছে। দিবারাত্র বিরহ স’য়ে
স’য়েই জন্ম গেল, আজ কাল কিনা বিধাতার এত অনুগ্রহ! তাই
ভাবছি, আমার হ’ল কি খাওয়াতে বসেছি ; মুখের গ্রাস ফেলে
উঠে গেছি--সেই আজও যাওয়া, কালও যাওয়া । আসি বলে
বাড়ী থেকে বেরিয়েছিস-রেধে বেড়ে প্রতীক্ষায় বসে আছি,সেই
আজও আসা, কালও আসা। উপবাসে এই রকম আমার কত
দিন কেটে গেছে। সেই তােকে দিবারাত্রি কাছটীতে দেখছি।
চক্ষের নিধি একদণ্ডের জন্য চক্ষের অন্তরালে নেই--ছায়ার ন্যায়
আমি তাের কায়ার সহচরী -এ কি বিধাতার অনুগ্রহ দুলিয়া!
ভাবছি, ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছি না। মনটা তাই কেমন কেমন
করছে। সত্যি বল দেখি দুলিয়া, এ আমার হ’ল কি !
দুলিয়া। এখন থেকে এই রকমই হতে চ’ল্ল রাঙ্গা বউ
শ্যামলীর কাছ থেকে আর বড় আমায় অন্যত্র যেতে হবে না।
রঘুয়া মহারাজ বলেছে, “এইবার থেকে তােমার খােলসা।”
দরকার হয়, মাঝে মাঝে দেখা করে আসবাে। সেখানে আর
বারাে মাস পাকবার দরকার নেই। রঘুয়া মহারাজের কৃপায়
দেশের সমস্ত ডাকাত সংসারী হয়েছে, চাষ বাস করে সংসার
প্রতিপালন কচ্চে। কাজেই তারও কোন কাজ নেই--আমারও
নেই।
শ্যামলী। ভাল দেখা যাক।
নেপথ্যে। দুলিয়া ঘরে আছিস ?
দুলিয়া। কেরে ?

রঘুবীর।
নেপথ্যে। আমি মনু। দোর খােল।
শ্যামলী। ওই হ’ল দুলিয়া! আমার চন্দ্রের দশা প্রতিপদেই বুঝি
অস্ত যায়! শুক্লপক্ষ আর বুঝতে দিলে না।
দুলিয়া। আরে না, না । ও বুঝি আমার মতন পেয়ে দেশে
এসেছে।
। ভাল এখন ত দোর খুলে দে।
(মনুর প্রবেশ)
দুলিয়া। কি খবর মন্ন?
মন্ন,। খবর আর অন্য কিছু নয়-এখনি তােমায় যেতে হবে।
শ্যামলী। আর মুখ চাইলে কি হবে, যেতে হবে সে
অনেক ক্ষণই বুঝতে পেরেছি।
দুলিয়া। বড় বিশেষ দরকার কি মন্ন, ? আজ থেকে গেলে
হয় না ?
শ্যামলী। একি মিসে! আজ নতুন কথা শােনাস কেন ?
এখনি দুর্গা ব’লে রওনা হ’। বােধ হচ্ছে যেন সমস্ত পথটা ছুটে
আসছি—ব্যাপার কি মনু,? বাবার সংবাদ ভাল ত! বলদেব ভাই
ভাল আছে ত ?
মন্ন। মনিবের বড় বিপদ !
শ্যামলী। বিপদ!-সে কি!
দুলিয়া। রঘুয়া মহারাজ থাকতে মনিবের বিপদ! সেকি
মন্ন!
মন্ন। আমাদের নবাব সুরাট বন্দরে তাপ্তীনদীর ধারে এক
বাগান তইরি ক’ছিল শুনেছিলি ।
দুলিয়া । শােনানি কি, আমি চক্ষে দেখে এসেছি। আধা
d,
२

১৪ রঘুবীর। তইরি অবস্থায় যা দেখে এসেছি, তাতেই বুঝেছিলুম, তইরি হলে দুনিয়ার এক নতুন সামগ্রী হবে। কিন্তু তার সঙ্গে মনিবের সম্পর্ক কি? মনু। সেই বাগান, অল্পদিন হ’ল তইরি হয়েছে। নবাব দিন তিনেক হ’ল আমীর ওমরাও সঙ্গে করে সেই বাগানে বাস করতে গিছলেন। দুলিয়া। তার পর ? মন্ন। নবাব রাত্রিতে বাগানবাড়ীতে শুয়েছিলেন, এমন সময় নবাবের মােল্লা—সেই যে জাফর খসেই যে বেদানা বেচতে গুজরাটে এসেছিল! রঘুয়া মহারাজ যাকে নর্মদার জল থেকে বাঁচিয়ে এনেছিল- দুলিয়া। বুঝতে পেরেছি, তার পর কি বলে যা। মনু। সেই জাফর খাঁ নবাবকে খুন করেছে। শ্যামলী। সৰ্ব্বনাশ ! তার পর ? মন, । তার পর সে সয়তান সহরে এসেই কেল্লা দখল করে নিজে নবাব হয়েছে। যত বড় বড় নবাব-বংশের ওমরাও ছিল, তাদের নেমন্ত্রণ করে বাড়ীতে এনে মেরে ফেলেছে। শ্যামলী। আমাদের মনিব ? মন্ন। ভগবান তাকে রক্ষা করেছেন, রঘুয়া মহারাজ পাষণ্ড- দের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে, মওড়া আগলে মনিব ও বলদেব ভাইকে সরিয়ে দিয়েছে। মনিবের মনিবের বাড়ীর একটি প্রাণীকেও দুরাত্মারা হত্যা ক’রুতে পারেনি। শ্যামলী। যাক্‌-বাবা ও বলদেব ভাই বেঁচে আছে ? মনু,। প্রাণে বেঁচে আছে, কিন্তু কোথায় গিয়ে যে আশ্রয়

রঘুবীর।
নিয়েছে, রঘুয়া মহারাজ খুঁজে পাচ্ছে না। আজ দুদিন ধরে খুঁজচে,
তবু তাদের দেখা নেই।
দুলিয়া। তাহলে ত বড় বিপদ মনু !
মন্ন, বড় বিপদ!
দুলিয়া। তাহলে চলুম শ্যামলী !
শ্যামলী। কাপড় চোপড় এনে দিই?
দুলিয়া। এখনি--আর দাড়াতে পারি না।
মনু। দাড়ালে বিশেষ ক্ষেতি। রঘুয়া মহারাজ একা সকল
দিক দেখতে পাচ্ছে না।
[ শ্যামলীর প্রস্থান।
দুলিয়া। তাহলে একা একা গেলে ত চ’বেনা মনু। আরও
দু পাঁচ জন লােক চাই ।
মন্ন,। হলে ভাল হয়।
(শ্যামলীর প্রবেশ)
দুলিয়া। ওকি রাঙ্গা বউ! অত বড় পুটলি কেন?
শ্যামলী। আমিও যাব।
দুলিয়া। সেকি ।
শ্যামলী। মন বলছে না গেলে মনিবকে আর দেখতে পাব না।
দুলিয়া। তা হয় না।
শ্যামলী। কেন হবে না।
দুলিয়া। তুই পাগল হয়েছিল।
শ্যামলী। তােরা বিপদ মাথায় করে চলে যাবি, আর আমি
আকাশ পাতা ভাববার জন্য এ অন্ধকূপে পড়ে থাকব।

রঘুবীর।
দুলিয়া। শুনচিস ভয়ানক বিপদ, তুই সঙ্গে গিয়ে কি বিপদের
উপর বিপদ ঘটাবি।
শ্যামলী। আমাকে নিয়ে তােদর বিপদ কি?
দুলিয়া। তাের একদম মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
শ্যামলী। আমার না তাের ?
দুলিয়া। অনেক দিন বােধ হয় আয়নাতে মুখ দেখিসনি।
যাবার আগে একবার দেখে আয়। বুঝতে পারবি, ও সামগ্রী
অরাজক রাজ্যে যাবার নয়।
শ্যামলী। বলিস কি। সিংহিনী আমি-আমি কি তোদের
মুখ চেয়ে পথ চলি।
দুলিয়া। না শ্যামলী ! হয় না।
মন্ন। ঝগড়া করিস কেন শ্যামলী ? তােরে সঙ্গে নিয়ে গেলে
রঘুয়া মহারাজ বলবে কি!
শ্যামলী। বেশ— বস্ত্র প্রদান ) এই নে।
দুলিয়া। তাহলে চললুম।
[ প্রস্থান।
শ্যামলী। দুর্গা দুর্গা !আর যদি মনিবকে না দেখতে পাই।
মন বড় কু গাইছে, আর যদি বলদেব ভাইকে না দেখতে পাই
যদি কাউকেও না দেখতে পাই। চোক আছে দেখব না? আমি কি
কিছু ক’তে পারব না? রঘুবীরের ভগ্নী-কিছু করতে পারব না।
কলঙ্ক-রঘুবীরের কলঙ্ক। সােয়মীর কি ! সে স্বার্থপর নিজের
সুখটী বেশ বুঝলে-কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিলে। আমাকে ঘরে
বেখে, নিরাপদ বুঝে ভরা বুকে চলে গেল। আমাকে সুখী দেখাই
তার সুখ। সেজন্য সে আমার ভাইয়ের কষ্ট বুঝলে না, নিজের কষ্ট

রঘুবীর।
১৭
বুঝলে না।
এত বড় স্বার্থপরকে আমি অমনি ছেড়ে দেবাে।
সঙ্গে যাব, জালাতন করব। আমায় একা ফেলে যাবার প্রতিশােধ
নেবাে।-মনিয়া, মনিয়া !–ও মনিয়া ঠাকুরব্বী !
(মনিয়ার প্রবেশ )
মনিয়া। কি বউ ?
শ্যামলী। আমার ঘরের চাবি নে। ধূনাে দি, সন্ধ্যে দি।
মনিয়া। একি কথা! দাদা কোথা গেল ?
শ্যামলী। চলে গেছে।
মনিয়া। ঝগড়া করেছিস নাকি? রাগ করে গেল নাকি ?
শ্যামলী। না, বিশেষ দরকারে গেছে।
মনিয়া। বেশ, ত, তা ত দাদা বরাবরই যায়। তুই যাবি
কোথায় ?
শ্যামলী। তাের দাদা যেখানে গেছে।
মনিয়া।
তবে দাদার সঙ্গে গেলিনে কেন ?
শ্যামলী। সঙ্গে নিলেন।
মনিয়া। তবে যাবি কেমন করে ?
শ্যামলী। একা।
মনিয়া। সেকি ! তুই যে কুলের বউ
শ্যামলী। তাের ভাইয়ের বউ-নদীর বেগ নিয়ে সাগর
দর্শনে যাব, আমার গতি রােধে কে ?
মনিয়া। ওমা, একি কথা!
শ্যামলী। ঠাকুরঝি ! হাতে ধরি, বাধা দিসনি। প্রাণ স্বামীর
সঙ্গে ছুটে গেছে, এ দেহকে আবদ্ধ করে প্রাণ-ছাড়া করিসনি।

রঘুবীর। একটা তুচ্ছ নারী আমি, আমার মনস্তুষ্টির জন্য আমার দেবতা স্বামী পরােপকারকার্য ত্যাগ করে, আমার কাছটিতে এসে বসে থাকবে । এ আমি কেমন করে সইব। সেইজন্য আমি এতকাল বিরহকে বিরহ জ্ঞান না করে আনন্দে বন-হরিণীর ন্যায় ইতস্ততঃ বিচরণ করেছি। কিন্তু আর করব কেন? ইচ্ছা করলে একমুহূর্তে যে বিরহকে দেশত্যাগী করে দিতে পারে, সেই আমি হব বিরহের দাসী! সময় নেই, অসময় নেই, সে কিনা আমাকে এসে উৎ- পীড়ন করবে ! না মনিয়া ! রাগে আমার অঙ্গ কঁপছে, আমি চ’লম। এই নে সিন্দুকের চাবি। মনিব আমার বিবাহের সময় আমাকে যে মণি যৌতুক দিয়েছে, সেইটে আমায় এনেদে। সেটা নিয়ে গেলে বাবা আমার বড় দুঃখ করে। আর এইনে ঘরের চাবি, ঝাঁট দিস, সন্ধ্যে দিস। মনিয়া। আবি কবে ? শ্যামলী। (মুখচুম্বন করিয়া ) মা কালীকে জিজ্ঞাসা করিস। তোকে ফেলে যাচ্চি, আসবার কথা জিজ্ঞাসা করছিস কেন মনিয়া। পঞ্চম দৃশ্য। নম্মদাতীর। নাবিক। নাবিক। আমিও ফকীর হ’লুম, দেশেও আকাল হ’লঘটা বাটী গহনা পত্র বেচে লা তইরি করলুম। কোথায় লােকজন পার করে দিন গুজরান করব, না কোথা থেকে নতুন নবাবের

রঘুবীর।
১৯
হুকুম বেরুলো যে, যে কেউ লােকজনকে নদী পার করবে, অমনি
তার গর্দান যাবে। হা আল্লা ! তােমার মনে এই ছিল। কি করে
খাই, কি করে জরু ছাওয়ালকে খাওয়াই ।
( অনন্তরাও ও বলদেবের প্রবেশ।)
অনন্ত। আমরা এলুম, কিন্তু রঘুবীরকে পেলুম না। সে না
এলে আমার আসা যে বৃথা হ’ল! প্রাণ আসছে না, পা চলছে না,
রঘুবীরকে ফেলে এসেছি। আমি যে তাকে বড় যত্নে পালন করেছি।
সে যে আমার জ্যেষ্ঠ সন্তান—আমার সব ! কি হবে বলদেব ?
আমাদের জীবন রক্ষা করে শেষে রঘুবীরকে প্রাণ দিতে
বল। ভয় কি বাবা! ধার্মিকের দেবতা সহায়।
অনন্ত। হাঁ বাপু মাজী!
নাবিক। কি হুজুর !
অনন্ত। আমাদের এই দুজনকে পার করে দিতে পার ?
নাবিক। হুজুর আমি পারব না।
অনন্ত। কেন বাপু মাজী ? ভাল রকম বকসিস্ করব।
নাবিক। সামান্য বসিসের জন্য গর্দান দেবে কে হুজুর !
অনন্ত। গর্দান যাবে—গর্দান যাবে। তাহলে কাজ নেই বাপু
মাজী !
নাবিক। নতুন নবাবের হুকুম, তাকে না জানিয়ে যদি
কাউকে পার করি, তাহলে আমার জৰু ছাওয়াল—যে যেখানে
কেউ আছে—সবাইকে এক গাড়ে যেতে হবে।
অনন্ত। তাহলে কাজ নেই বাপু মাজী!—আমরা অন্যত্র

২০ রঘুবীর। যাই। আয় বলদেব বনে ঢুকি। দেখ বাপু মাজী! পার করতে পার আর না পার, আমরা যে এখানে এসেছি, কাউকে ব’লােনা। নাবিক। তা বলতে যাব কেন হুজুর! উপকার করতে পার- সুম না বলে কি ক্ষতি করব ! কি করব হুজুর! গরীব-ছেলে পুলে আছে—উপার্জন করতে একা আমি-জানের ভয় করি। অনন্ত। তুমি বড় ভাল লােক বাপু মাজী! পার করলে কিছু পেতে—প্রাণের ভয়ে পারলে না। পরের অপরাধে তােমার ক্ষতি হয় কেন।—এই নাও বাপু কিছু বকসিস্। (স্বর্ণমুদ্রা প্রদান ) নাবিক। সেকি হুজুর—কিছু করলুম না—সেকি হুজুর ! অনন্ত। তা হােক-তুমি বড় ভাল লােক--আমি দেলথােস হয়ে দিচ্ছি না বলােনা। নাবিক। যা থাকে বরাতে-হুজুর তােমাকে আমি পার করব । অনন্ত। না বাপু! আর আমি পার হব না। আমার জন্যে তােমার সর্বনাশ হবে কেন ?—চল, বলদেব ! কি করে তােরে বাচাই বলদেব !-আমার অন্ধের লড়ী—আমার আশার শেষ ! বল। সেকি বাবা! আমার জন্য ভাবচ কি !– সম্মুখে স্থির। নম্মদা—বিরামদায়িনী নর্মদা—যাই ত ওর কোলে যাব। তা বলে পাতি নেড়েকে ধর দেব ? অনন্ত। তাই বুঝি যেতে হয়--আমার সব যেখানে গেছে -- অবশিষ্ট তুই-তুই বা সেখানে না যাবি কেন ? বল। সব গেছে কি পিতা ? অনন্ত। এখানে নয়-বনে চল্। কিছু ক্ষণের জন্য আত্ম- রক্ষা করু—সব শুনতে পাবি। আসি বাপু মাজী ?--সেলাম।

রঘুবীর। ২১ নাবিক। হুজুর ! অনন্ত। দুঃখ করােনা বাপু মাজী! নসীবনসীব ! [ প্রস্থান। । যা থাকে অদৃষ্টে পার করি—সঙ্গী ডাকি। মরণ ! সেত একদিন আছেই। এমন ভাল লােকের কিছু করতে পারলুম না। অমনি অমনি দুঃখ রেখে যাব ! যা থাকে অদৃষ্টে পার করি, সঙ্গী ডাকি, যেতে না চায়-হাতে পায়ে ধরেও পার করি। [ প্রস্থানােত। (রঘুবীরের প্রবেশ) রঘু। বাপু! এ দিকে একটি বৃদ্ধ ও সেই সঙ্গে একটি যুবক দেখেছ ? নাবিক। সর্বনাশ! এই বুঝি ধরতে এসেছে? কিছুতেই বলব না ? রঘু। বলনা বাপু, চুপ করে রইলে যে? নাবিক। বােকা মাঝী --কথা কইলেই ধরা পড়ব-দাতে জিব কামড়ে থাকি। কোন মতেই কথা কইব না। রঘু। কিহে বাপু! হাঁ কি না যাহ’ক একটা বল–চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে যে! বুঝতে পেরেছি-তাদের দেখেছে; কিন্তু বলতে সাহস করছনা। নাবিক। হা হুজুর ! রঘু। ভয় নেই—আমি তার আত্মীয়। তুমি নিঃসঙ্কোচে বল- কছু ভয় নেই। নাবিক। না হুজুর !

রঘুবীর।
রঘু। না হুজুর কি !
নাবিক। হা হুজুর !
রঘু। না হুজুর, হাঁ হুজুর করছ কেন?
নাবিক। কি আর করি হুজুর ! না করে যে আর উপায়
নেই।
রঘু। তােমায় বলতে কি বারণ করে গেছে ?
নাবিক। না হুজুর !
রঘু। আ মূখ! প্রকাশ করতে বাকি রাখলি কি ?
নাবিক। আজ্ঞে না হুজুর! আমি কখন কারও কিছু বাকী
রাখিনি, সবই নগদা নদী।
রঘু। কাউকে কি নদী পার হতে দেখেছিস্?
নাবিক। আমি দেখতে জানিনা হুজুর !
রঘু। তুই ঠিক দেখেছি—তারা নিশ্চয় এসেছে-তুই দেখে
বলছিস নি।
নাবিক। দোহাই হুজুর! আমি দেখতেও জানিনি, বলতেও
জানিনি।
রঘু। বেশ, আমাকে নর্মদা পার করে দিতে পারি?
নাবিক। আর সব পারি, কেবল ওইটেই পারিনি।
রঘু। তবে দূর হ।
নাবিক। আজ্ঞে হাঁ হুজুর! সেই ভাল। তাহলে হুজুর সেলাম
করি।
রঘু। তােকে পুরস্কার দিতুম,বলতে পারলিনি! দেখে
থাকিস্ ত বল্-আমি সেই বৃদ্ধের পরমাত্মীয়। বিষম দুর্যোগের
সূত্রপাত ঝড় উঠলাে নর্মদা এখনই সংহারিণী মূর্তি ধরবে।

রঘুবীর।
সম্মুখে গভীর বন—নিকটে আশ্রয় নেই—জীবনের আশঙ্কা পদে
পদে। তিনি আমার প্রভু-পিতা। দেখে থাকিস্ ত ব ভাই।
চিরকালের মত তাের কেনা থাকবে।
নাবিক। খােদার কসম—মিথ্যে ক’য়ােনা। সত্য করে বল
তুমি কে ?
রঘু। রঘুবীরের নাম শুনেছিস্?
নাবিক। তুমিই সেই ?
রঘু।
আমিই সেই।
নাবিক। তুমিই এক চড়ে একটা বাঘ মেরেছে ?
রঘু। আমিই ।
নাবিক। তুমিই শুড়:ধ’রে একটা বুনাে হাতীকে বন থেকে
টেনে এনেছো?
রঘু। আমিই।
নাবিক। একটা জ্যান্তো তালগাছ মাঝামাঝি ভেঙ্গে তন
করেছিলে তুমি ?
রঘু। (সস্মিতে) হ ! আমি।
নাবিক। এই নর্মদায় টপ করে ডুব দিয়ে, একটা ন্যাজা-
মুড়ে শুদ্ধ আস্ত কুমীর ড্যাঙ্গায় টেনে তুলেছিলে তুমি ?
রঘু। আমি ।
নাবিক। তুমিই বেদানাওলাকে নর্মদা থেকে উদ্ধার করেছে ?
রঘু। এতক্ষণ হাসিমুখে তােমার কথার উত্তর দিচ্ছিলেম
মিয়া ! আর থাকতে পারলেম না। সেই নরাধমকে রক্ষা করে
আমি দেশের সর্বনাশ করেছি।-এখনও অবিশ্বাস করছ-গা
টিপে দেখছ-বড় নরম, না?

।
.
২৪
রঘুবীর।
নাবিক। বাবা বিশ বছর দাড় টেনে, হাল ধরে, বেটে ঠেলে
হাত দোরস্ত করেছি-পীরের কাছে মামদো বাজী! তুমি রঘুবীর ।
যাও-এখানে কেউ আসেনি। উহুহুঃ ( চীৎকার)
রঘু। কি হ’ল-কি হ’ল মিঞা।
নাবিক। ওরে বাবা ! আঙুলে এত জোর ! এক্ষণি হাতের
হাড় ভেঙে ছাতু হয়ে গিয়েছিল আর কি! এখন বুঝেছি-
ওরে বাবা !
রঘু। বুঝেছো ?
নাবিক। বিলক্ষণ বুঝেছি !–ছেলেপুলে কাছে থাকলে এই
এক টিপনীতেই বংশলােপ হয়ে যেত। তা বাবা রঘুবীর !
তােমায় ত আমি লায়ে তুলতে পারব না। তুমি যে লায়ে উঠে,
আদর ক'রে, আমাকে এমনি একটী টিপনী দেবে, আর আমার
লা খানা শুদ্ধ দেখতে দেখতে বানচাল হয়ে যাবে, সেটী
হচ্ছেনা। ওরে বাবা,-এক টিপনী সাতবার চিড়িক মারে
যেরে।
রঘু। তবে কি আমার মনিব ওপারে ?
নাবিক। রক্ষা কর বাবা। তােমার মনিব ত মনিব-তােমার
গন্ধও আর ওপারে নয়। কে বাবা লা খনি খুইয়ে, ছেলে ,
পুলেকে না খাইয়ে মারবে! ছেড়ে দাও বাবা মিঞা সাহেব
থুড়ি, হুজুর রঘুবীর ! ঝড় উঠলাে আমি ঘর সামলাইগে।
রঘু। তাহলে আমার মনিব কোথা ?
নাবিক। এই বনের ভেতর বাবা !- উঃ কটকট, ঝন্‌ঝন্‌,
চিড়িক, চিড়ি, কটাস্ কটা, ধড়াস্ ধড়াস, নানা জাতের
আওয়াজ প্রাণের ভেতর যেরে, ওরে বাবা !

রঘু। রঘুবীর। উত্তাল তরঙ্গময়ী ভীষণ নর্মদা ! ফেনিল রাক্ষসী মুখে তুলিয়া হুঙ্কার, দশদিকে উন্মত্ততা করিয়া প্রসার, কার লােভে ছুটিয়াছ পুনঃ উন্মাদিনী ? জানিনা কি স্বর্গচ্যুত কৌমুদী পুতুলী কি অপূৰ্ব পারিজাত ললাভে, প্রভঞ্জনে ধরেছ সহায়, সে আনিয়া দিবে ততরে পূরিয়া অঞ্জলি। শােণিত নিষিক্ত ধরা আগে হ’তে দুরাত্মার নির্মম চরণ- ভরে, থর থর কঁপেকঁপে প্রাণ, তার যাতনায়, তবে কেন নর্মদা সুন্দরী। আবার ভীষণ মূৰ্ত্তি ধরি, অবিরাম সহস্র কর্কশ হস্তে ব্যথিত শরীরে তার, করিস প্রহার ? ক্ষমা দে নর্মদা ! অতীত বরষ পঞ্চ, এমনি ভীষণ নিশা-এমনিই ঘন অন্ধকারে, তব সঙ্গে করি ভীম রণ, এক নরাধমে কাড়িয়া লইয়াছিনু তব গ্রাস হতে। প্রতিহিংসা ল’তে তাই এলে কি নর্মদা ? নিয়তির কাৰ্যে বাধা দানে, করিয়াছি যেই মহাপাপ, উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত করিব তাহার ! ভীষণ মৃত্যুর ভয়ে জ্ঞানশূন্য প্রভু মাের, আসিয়াছে তব জলে প্রাণ বিসর্জিতে। প্রিয় পুত্র সঙ্গে

রঘুবীর।
আছে তার---আর আছে পুত্র সম এই
নরাধম—একের জীবন বিনিময়ে
এত প্রাণে হবে না কি সন্তোষ ভােমার ?
তবে শােন উন্মাদিনী কল্লোলিনী! দেখা
যদি নাহি পাই গর, তােমারে করিব
আত্মদান, ক্লান্ত আমি সংসারে ঘুরিয়া ।
[ সকলের প্রস্থান।
।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
ধন।
সাহাজান, পরীবাণু।
সাহা। পরী! কিছুক্ষণের জন্য এই শিলাতলে আশ্রয় গ্রহণ
কর। আমি স্থান অন্বেষণ করি। ভয়ানক ঝড়-মহাপ্রলয়-
পরী ! তােকে পাবার জন্য চারিদিক থেকে যেন সয়তানের
অনুচরেরা হাত বাড়াচ্ছে। দানা তাণ্ডব নৃত্য করছে—ডাকিনী
খলখল হাসছে।
পরী! এই শিলার আশ্রয়ে অবস্থান কর।
খােদা পরীকে রক্ষা করা-নবাব মামুদসার স্মৃতিচিহ্ন পুছে ফেলে।
।
এ কোহিনুর প্রলয়-আঁধারে ডুবিয়ে মেরে না। বােস
পরী আমি স্থান দেখি।-কোথাও যানি।-এ শিলাতল পরি-

রঘুবীর।
২৭
ত্যাগ করে এক পদও অগ্রসর হ’সনি। যদি স্বয়ং পীর এসে
স্থান ত্যাগ করতে বলে, তবু উঠিসনি। আমি খুঁজে দে
অঙ্কুকারে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে দেখি—এ নির্মম কঠোর অরণ্যের
বুকে এক বিন্দুও দয়ার অস্তিত্ব আছে কি না।
পরী। আমি এইখানে চুপ করে বসে থাকবো।
সাহা। চুপ করে থাকবি-একপদও স্থানান্তরে যাসনি।
পরী। ফিরতে কতক্ষণ হবে ?
সাহা। যতক্ষণ না আশ্রয় পাই। মস্তকে বৃক্ষপতন )
পরী—পরী! সব শেষ—আমি গেছি। আমার জীবন শেষ-প্রকাণ্ড
গাছ আমার ঘাড়ে পড়েছে।—আমি মলুম !
পরী। হা আল্লা ! আমার সব গেল!—কই, কোথা তুমি-
কতদূরে তুমি ?
সাহা। উঠোনা—এসোনা।
পরী। তুমি গেলে, আমার কি হবে?
সাহা। জানিনা-উঠোনা।-কোথাও যেওনা। ঈশ্বরের
পদপ্রান্তে বসিয়ে রেখেছি, বসে থাক। যদি অনুম্ভরাওয়ের
গৃহে আশ্রয় পাও—তাহলে লােকালয়ে ফিরাে। নচেৎ নয়-
শিলাতল—ওইখানে-উঠোনা। সব পিশাচ—সয়তান-উঠোন,
এসােনা-নড়ােনা প্রকাণ্ড গাছ-মানুষের ক্ষমতা হবেনা--
হ'ল—যাই—আল্লা!
পরী। সাহাজান-সাহাজান! কোথা তুমি? অন্ধকার-পথ
দেখতে পাচ্ছিনা। খােদা! রক্ষে কর-সাহাজানকে রক্ষে কর।
সাহাজান ! সাহাজান!-এই বনের ভিতর কে কোথায় দয়ালু
শক্তিমান আছ, এসবক্ষে কর, রক্ষে কর।

২৮ রঘুবীর। ( রঘুবীবের প্রবেশ ) রঘু। এই ভীষণ অরণ্যে, এই নিবিড় অন্ধকারে খুঁজি কোথায় ? বিষম চীৎকারও বৃক্ষের শাখাভঙ্গ-শব্দে ডুবে যাচ্ছে। একটা মাত্ৰ আৰ্তনাদ-কোন হতভাগ্য বিপন্নের এক করুণ কঠোর স্বর ---একবার মাত্র আমার শ্রুতিস্পর্শ করেছিল,একপদ অগ্রসর হতে না হতেই, আবার প্রভঞ্জনের ভীম চীৎকারে মিলিয়ে গেছে। আর শুনতে পেলেম না। বড় অন্তর্যাতনার চীৎকার —কিন্তু কার ? নর্মদা কি হতভাগ্যকে গ্রাস করলে ? পরী। কেগা তুমি ?—কে কথা কইলে গা তুমি ? রঘু। একি রমণীকণ্ঠ ! • এই বিষম এই বিষম দুর্যোগে- দুর্যোগে-প্রকৃতির বিভীষিকাময়ী লীলার মধ্যে কোমলপ্রাণ রমণী ! কে মা তুমি ? একি—চুপ করলে কেন ? কেমা তুমি ? সন্তান নিকটে আছে, নির্ভয়ে কথা কও। কই মা! কোথা মা তুমি ? বড়ই ভীষণ স্থান-মৃত্যুর আশঙ্কা পদে পদে। কথা কও। শপথ করছি -সন্তানের কাছে বিন্দুমাত্রও ভয়ের কারণ নেই। ভৃত্য আমি, দাস আমি, পুত্র আমি, সহােদর আমি, কথা কও। রক্ষা করতে এসেছি, রক্ষা করব। আত্মীয়-হারা যদি হও, সেই আত্মীয়ের সন্ধান করে দেব। উত্তর দাও-এখনও দিচ্ছ না—তবে বল- প্রয়ােগে ধরে নিয়ে যাব--কাউকে বিপন্ন দেখে ফেলা যাওয়া আমার রীতি নয়। বিপন্ন সৰ্পকে রক্ষা করে, মাথায় দংশন নিয়েছি—তবু তাকে ফেলে আসিনি। উত্তর দাও। পরী। একটী বৃদ্ধ বিপন্ন—গাছ চাপা পড়েছে। রঘু। কোথায় কোথায় ? পরী। দুচার পদ এই দিকে যান। ।

রঘুবীর। ২৯ রঘু। বেঁচে আছেন ? তা জানিনা। । পরী। পরীক্ষা ) (রঘুবীর কর্তৃক বৃক্ষ অপসারণ ও রঘু। মা ! সব পরিশ্রম যে বৃথা হ’ল। বৃদ্ধ যে প্রাণে নাই। পরী। সাহাজান! তােমার অদৃষ্টে এই ছিল রঘু। কেঁদোনা মা ! এখন আত্মরক্ষার সময়। ७ वृक তােমার কে ? পরী। পরমাত্মীয়। রঘু। কে ইনি? পরী। তা বলব না। রঘু। বেশ তােমাদের ঘর কোথায় ? পরী। তাও বলব না। রঘু। বেশ-কোথায় রেখে আতে হবে বল ? পরী। কোথাও নয়। রঘু। তাও কি কখন হয় ! পরী। আত্মীয় অামাকে এ স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। রঘু। সে অবস্থা ত আর নেই। আত্মীয় ত আর ফিরছেন না। পরী। আমিও এখানে থাকবো—আর ফিরবাে না। রঘু। এ অন্যায় পণ। পরী। তিনি বলেছেন--এখান থেকে উঠলেই বিপদে প’ডুবি। চারিদিকে হিংস্র জন্তু, প্রতিমুহূর্তে মস্তকে বৃক্ষপতনের আশঙ্কা, এস্থান হতে অধিক বিপদ আর কোথায় জননী। রঘু।

-
রঘুবীর।
পরী। সর্বত্র তিনি বলেছেন সর্বত্র।
রঘু। তা ঠিক—বিপদ যে সৰ্ব্বস্থানেই আছে, তাতে আর
সন্দেহ কি ! মায়ের কোলে--মাতৃস্তন্যেও বিপদের বীজ নিহিত
আছে। কিন্তু মা! এখানে যত, এত আর ত কোথাও নেই।
পরী। এখানে বিপদ শুধু প্রাণের-বাহিরে ধৰ্ম্মের। সয়তান
এখন গুজরাটের সিংহাসনে। তুমি যেই হও—তার অত্যাচারের
হাত থেকে রক্ষা করা তােমার সাধ্য নয়।
রঘু। তুমি হিন্দু না মুসলমানী ?
পরী। তা বলব না।
রঘু। হিন্দু ভাই ভগ্নীর সংসারে যেয়ে বাস করতে পারবে ?
পরী। তাহলে আমি মুসলমানী।
রঘু।
তা হােক--বিপন্না তুমি-হিন্দুর চক্ষে দেবী-তােমায়
আশ্রয় দিলে হিন্দুর গৃহ অপবিত্র হয় না।
পরী। আমাকে নিয়ে কেন বিপদে পড়বে ?
রঘু। তােমায় দিবানিশি মৃত্যুর আবরণে ঘিরে রাখবে।
তুমি যদি প্রস্তুত থাকতে পার, তাহলে কার সাধ্য তােমার
অঙ্গ স্পর্শ করে।
পরী। নিরাপদ রাখা তােমার সাধ্য কি!
রঘু। অবিশ্বাস করছ কেন মা?
• পরী। তাই যদি থাকতাে, তাহলে এমন শক্তিমান প্রজা
থাকতে নবাব মামুদসার কি একটা তুচ্ছ গােলামের হস্তে ভীষণ
রঘু। আপনি কি নবাবনন্দিনী ?
পরী। আর পূৰ্ব্বস্মৃতি কেন !আমি ভিখারিণী।

রঘুবীর। ? রঘু। নবাবনন্দিনী। অনন্তরাওয়ের আশ্রয়ে যেতে কি আপ- নার কোন আপত্তি আছে ? পরী। আপনিই কি অনন্তরাও রঘু। তারই ভৃত্যরঘুবীর।—পালিত সন্তান। পরী। ভাই। আমার হাত ধর—অভাগিনী নবাবনন্দিনীকে তােমাদের ঘরে আশ্রয় দাও। এই পরমাত্মীয়ের আদেশ—যদি দেওয়ানজীর ঘরে আশ্রয় পাই, তবেই আমি লােকালয়ে ফিরবাে, নচেৎ স্বয়ং ঈশ্বর এসে আশ্রয় দিতে এলেও তার কাছে যেতে পারব না। ভাই! ভগ্নীকে সঙ্গে নাও। রঘু। এস ভগ্নী—হিন্দুর গৃহ-শােভাকরী কমলা ! এই দারুণ অন্ধকার ভেদ করে-অনন্তরাওয়ের অন্ধকার ঘর আলো করবে এস। [ প্রস্থান। সপ্তম দৃশ্য। অরণ্যের অপরপার্শ্ব। ( অনন্তরাওয়ের প্রবেশ ) অনন্ত। হা নরাধম পাষণ্ড জাফর! কি করলি? নবাবকে হত্যা করেও কি তাের জিঘাংসা-প্রবৃত্তি চরিতার্থ হ’লনা ? তার আদরের ধন-একমাত্র কন্যা-সােণার কুসুম অকালে বৃন্তচ্যুত

রঘুবীর।
করে উত্তপ্ত তরঙ্গে ভাসিয়ে দিলি! নিষ্ঠুর নর্মদা !
আনন্দ-প্রতিমাকে তুই কোন্ প্রাণে গ্রাস করলি?
এমন
( বলদেবের প্রবেশ )
বল। একি পিতা! উন্মত্তের মত আত্মনাশ করতে এদিকে
ছুটে এসেছো? এ যে নর্মদাতীর। শেষ কালে কি জলমগ্ন হয়ে
অপঘাতে প্রাণ হারাবাে ?
অনন্ত। কিসের শব্দ হ’ল বুঝতে পারলি কি ?
বল। ও কোন হতভাগ্য গাছ চাপা পড়ে, বুঝি প্রাণ
খােয়ালে।
অনন্ত। গাছ চাপা পড়ে নয়-নম্মদায়-
বুল। তার আর আশ্চর্য কি! নিরাশ্রয়ের আশ্রয় -তুমিই
যখন আজ আশ্রয়হীন, তখন কত হতভাগ্য যে নর্মদায় পড়বে,
কার সংখ্যা কি ?
অনন্ত। হতভাগ্য নয়-হতভাগিনী।
দেবল। সে কি।
অনন্ত। নবাবের কন্যা পরীবাণু।
দেবল। সেকি ! কে বলে ?
অনন্ত। কেউ বলেনি-মায়ের করুণস্বর শুনে বুঝেছি।
সে মধুর স্বর সপ্তাহ পরে আবার শুনলেম ! কিন্তু হা ঈশ্বর ! আর
বুঝি শুনতে পাবনা।
বল। পিতা! এ শােকের সময় নয়-আত্মরক্ষার সময়।
অনন্ত। আয় মা ফিরে আয়। হায় রঘু ! বিপন্নাকে রক্ষা
করতে এসে কি তাের এই পরিণাম।

? রঘুবীর। বল। হা ভগবান! ক’রলে কি? এমন মহাজ্ঞানী ব্রাহ্মণকেও উন্মাদ করলে!—পিতা! ফিরে এসাে। অনন্ত। রাে-ওদের ধরে আনি। বল। কাকে আনবে? কে আসবে?—পিত ! চলে এসাে, যে গেছে, সে গেছে—আর আসবে না। - ( পরীবাণুকে লইয়া রঘুবীরের প্রবেশ ) রঘু। কেন আসবেন বলদেব! প্রাণের টানে ব্রহ্মাণ্ড ছিড়ে আসে-ভগবান করতলগত হয় ; আর একটা তুচ্ছ জীবন ফিরে আসেনা? এই নাও পিতা! তোমার নন্দিনী, নিয়তির আবরণ ভেদ করে, নর্মদার সহস্র উন্মত্ত তরঙ্গের শিরােভূষণসহস্রদল স্বর্ণ- কমল-জল ছেড়ে স্থলে এসেছে। পিতা ! চরণে আশ্রয় দাও। বল। সেকি!—সেকি! ভাই তুমি ?—যথার্থই তুমি ? অনন্ত। রঘু ! নিয়তি-প্রেরিত ভার। তুমি ভিন্ন এ ভার ধারণ করে সাধ্য কার! এই নে, আমার কন্যা পরীবাণুকে শ্যামলীর পাশে স্থান দে। রঘু। বলদেব! বড় অন্ধকার, পথ পিচ্ছিল-বন্ধুর। পরী- বাণুকে হাত ধরে নিয়ে চল। পরী। ভগবান!—ভগবান! [ সকলের প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
নদীতীরস্থ কানন।
রঘুবীর ও বলদেব।
রঘু। ভাই বলদেব! সমস্ত রাত্রি লােকের দ্বারে দ্বারে গিয়ে
আশ্রয় ভিক্ষা করলুম, কেউ আশ্রয় দিলে না—দিতে সাহস
করলে না। এরূপ অবস্থায় সামান্য পর্ণকুটীরের আশ্রয়ে পরীকে ত
আর রাখতে পারি না। রাত্রিও শেষ হতে চল, দিবালােকে ত
পরীকে স্থানান্তরিত করতে পারব না। পরীবাণুর সন্ধানে নিশ্চয়ই
চারিদিকে চর প্রেরিত হয়েছে। দুরাত্মা জাফর নিশ্চয়ই নিশ্চিন্ত
নাই।
বল। তাহলে করবে কি?
রঘু। এই অন্ধকার থাকতে থাকতে, এই দুর্যোগের সহায়তায়,
এস আমরা অরণ্যে প্রবেশ করি। বনের পাতা লতায় গভীর
অরণ্যের ভিতরে কুটীর নির্মাণ করে, আপাততঃ দিন কয়েকের
জন্য সেখানে বাস করি। তারপর সুবিধা দেথে আমরা সবাই

রঘুবীর।
রামগড়ের রাজার রাজ্যে চলে যাব। আপাততঃ লােকের
সমক্ষে অবস্থান যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিনা।
বল। রাজ্য-ঐশ্বর্যের মধ্যে প্রতিপালিত-দুঃখ কাকে বলে
জানেনা,-বনের ভিতর বাস করলে পরী বাচবে কেন?
রঘু। সময় সমস্তই সইয়ে দেবে ভাই! তার’লে নগরের
মধ্যে আজ কাল ত তাকে কোন মতেই নিয়ে যেতে পারি না।
যমের মুখ থেকে রক্ষা করে কি তাকে জাফরের মুখে দেবো !
বল। তাহলে এক কাজ করনা কেন দাদা !~~যে উপায়ে
দুরাত্মা জাফর গুজরাটের সিংহাসন প্রাপ্ত হয়েছে, সেই উপায়েই
তার রাজত্বের পিপাসা মিটিয়ে দাওনা কেন। রাজ্যেরও মঙ্গল
হয়-পরীও রক্ষা পায়। ভীলাক্ত এখনও ত তােমার দেহে
প্ৰধাবিত।
রঘু। ছি বলদেব ! ওকথা মুখেও এনােনা। তুমি দেবতা
পিতার সন্তান।
বল। বৃদ্ধ পিতা আজ কি অপরাধে বনবাসী দাদা?
রঘু। অপরাধ অবশ্যই আছে, নইলে শাস্তি কেন ?
বল। পিতা অপরাধী
রঘু। নিশ্চয়—পিতাকে জিজ্ঞাসা করাে, জানতে পারবে।
?
(অনন্তরাওয়ের প্রবেশ)
অনন্ত। কতদূর কি করে উঠলে রঘু ?
রঘু। কিছুই করে উঠতে পারিনি।
অনন্ত। তাহলে উপায় ?
রঘু। বনে ঢুকবো।

।
রঘুবীর।
অনন্ত। তারপর ?
• রঘু। আপাততঃ কুটীর নির্মাণ করে তার ভেতরে বাস
অনন্ত। বেশ-তাহলে, বিলম্ব করছাে কেন? অন্ধকার
থাকতে থাকতে নিয়ে চল। এখানে ত আর থাকতে সাহস
ক’রছিনা।
[ রঘুবীরের প্রস্থান।
বল। তুমিও দাদার মতে মত দিলে—অম্লান বদনে বিতর্কে
দাদার কথায় বনে ঢুকবে !
অনন্ত। মূখ বালক! কবে তাের ভাইয়ের কথার প্রতিবাদ
করেছি। একবার তার অমতে কাজ করেছি, তার ফলে আজ
বনবাসী হয়েছি। সাগর-পরিমাণ কামনা নিয়ে ব্রাহ্মণ-গৃহে
প্রবেশ করেছিলুম, তার ফল পেয়েছি। তবে আর কেন বলদেব ।
বনে প্রবেশ কর -রঘুবীরের কথার প্রতিবাদ করিনি।
(পরীবাণু ও রঘুবীরের প্রবেশ )
পরী। হাঁ ভাই, তুমি নাকি বনে ঢুকতে কুণ্ঠিত হ’চ্ছ ?
বল। শুধু তােমার জন্য পরী।
পরী। ছিলুম নবাবনন্দিনী-শস্ত্র শিখিনি—জ্ঞানদৃষ্টিহীনা
নবাবী ঐশ্বৰ্য্যকেই ঐশ্বৰ্য্য জ্ঞান করেছিলুম ; দারিদ্রে যে ঐশ্বৰ্য্য
থাকে, তা ত জানতুম না। সে ঐশ্বর্যের স্বাদ পেয়েছি। কি
জানি কি পূণ্যফলে তােমাদের সঙ্গ লাভ করে, তার মধুরতা
অনুভব করেছি। ব্রাহ্মণকুমারী আমি--যমবর-মৃত্যুর নামে
উৎসর্গীকৃত, আমাকে বনে ঢুকতে ভয় দেখাও কেন ভাই ।

রঘুবীর।
বল। তােমার যদি এমন হৃদয়বল পরী! তাহলে আর
আমি বনে ঢুকতে কুণ্ঠিত হব কেন।
পরী। হয়ােনা। দাদা বললে, দারিদ্র্যের ভিত্তিতে যে
ঈশ্বর্যের প্রতিষ্ঠা, তা অটল অব্যয়—ভুবনব্যাপী সৌরভময়—
ভগবানের প্রিয় সামগ্রী। দাদা আরও বললে, শুধু দুটী ক্ষুদের
লােভে ভগবান হস্তিনায় এসে ভিখারী বিদুরের ঘরে উপযাচক
হয়ে অতিথি হতেন ; আর হস্তিনার রাজা কত নিমন্ত্রণে--কত
সাধ্য সাধনায়ও তঁাকে ঘরে আনতে পারতেন না। ভিক্ষানেই
যদি তার এত লােভ, তাহলে তুচ্ছ নবাবীর জন্য তেমন
অতিথিটীকে ছেড়ে দেব কেন?
কে বলেছে দুই নবাবনন্দিনী ? আজ থেকে তুই
আমার কন্যা-আমার বৃদ্ধ বয়সের শান্তিদায়িনী। আয় মা ! তাের
হাত ধরে বনে যাই।
অনন্ত।
=
দ্বিতীয় দৃশ্য।
প্রাসাদকক্ষ।
জাফর ও সখার মা।
জাফর। হাঁ বিবি! তুমি পরীবাণুকে কি রকম দেখলে বলদেখি ?
স, মা। জনাব! সে আর আপনাকে কি বলব। বড় ফন্দি
করে তাদের সন্ধান নিয়ে এসেছি। আপনাকে কি বলব—সেকি
৪

রঘুবীর। সুন্দরী ! কিন্তু যা দেখলুম তার তুলনা কই? ঘুটঘুটে আঁধার-কোলের মানুষটি পর্যন্ত দেখা যায় না- সেই আঁধার ভেদ করে, সেই অগম বিজন বনের ভেতরে, চারিদিক আলাে করে, বাতাসে রূপ ছড়িয়ে—সে আপনাকে আর বেশী কি বলব জনাব যেন যমুনার কাল জলে সােণার কলসী ভেসে উঠলো। জাফর। বিবি! সে রত্নী যে আমায় এনে দিতে হচ্ছে । স, মা। তাইত জনাব—তাইত জনাব ! আমি হাবলা গােবলা মানুষ। সাত চড়ে আমার রা বেরােয় না। কি বলতে কি বলি, কি করতে কি করি। অবলা বিধবা—আমি কি পারব ? জাফর। তুমি নিশ্চয় পাবে। তােমার গুণের কথা শুনেই তােমায় আনিয়েছি। আর এই মুহূর্তেই তােমার গুণের পরিচয় পেয়েছি। যাকে পাবার জন্য আমি গুজরাটের পথ নরশােণিতে প্লাবিত করেছি, গুজরাটের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অট্টালিকা প্রাণীশূন্য করেছি। সেই অতুলনা সুন্দরী পরীবাণু চক্ষের পলকে অদৃশ্য হয়েছে। চারিদিকে চর পাঠিয়েছিলেম, কেউ সন্ধান করতে পারেনি। তুমি করেছ। তুমিই আমার সহায়তার যােগ্যপাত্রী। পুরুষ হ'লে তােমাকে উজীর করতুম। তুমি স্ত্রীলােক, আর কি করব—তােমায় যথেষ্ট পুরস্কৃত করব—পরীবাণুকে ধরে দিতে পারলে জায়গীর দেব। স, মা। তাইত জনাব,-তাইত জনাব! কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পড়ব! শেষ কালে কি ঠ্যাঙ্গানি খেয়ে মরব । ম'লে, আমার জায়গীর ভােগ করবে কে? জাফর। কে মারবে ? বলকি বিবি! নবাব জাফর স্বার লােক তুমি, চলেছ জাফর খাঁর কাজে, তােমার গায়ে হাত তুলবে। তােমার দিকে যে তীব্র দৃষ্টিতে চাইবে, সে কমবখ্যাত, গিয়ে রয়েছে রঘুবীর। জেনে রাখ। কোই হায় ? (নেপথ্যে—হুজুর !) জলদি কেরাম খকো বােলাও, (নেপথ্যে বহুত আচ্ছা) জবর লােককে তােমার সঙ্গে দিচ্ছি, সেপাই দিচ্ছি ; যা হুকুম করবে, তাই তারা এনবে। এদের সঙ্গে করে নিয়ে লােকের ঘর ঘর সন্ধান কর- পরীবাণুকে এনে দাও। (কেরামৎ খার প্রবেশ) দেখ কেরাম—এই বিবির কাৰ্য্যে তােমায় নিযুক্ত কম। বিবির হুকুম-সে আমার হুকুম মনে করবে। যেখানে যেতে বলে যাবে, যা করতে বলে করবে। কেরা। যে হকুম জনাব । জাফর। আর বিবির যখন যে কজন সেপাইয়ের দরকার হবে, সে কজন তুমি তৎক্ষণাৎ মােতায়েন রাখবে। কেরা। যযা হুকুম। স, মা। আচ্ছা জনাব। সে মেয়েটী যদি আর কেউ হয় ? আফর। যেই হােকনা কেন, তাকেই আমার জন্য নিয়ে আসবে। আমি এদেশের রাজা- এদেশের যত কিছু উৎকৃষ্ট সামগ্রী, সমস্ততেই আমার অধিকার। স, মা। তাত বটেই। নইলে আবার রাজা কি! রাজা সন্দেশের খােসা ছাড়িয়ে শাঁস খাবে, ক্ষীরসাগরের নীর গাবিয়ে তােলপাড় করে শুধু ঢেউগুলি জিবের আগায় চাকবে, গােলাপী বাতাস নিজড়ে শুধু আপিটুকুতে পিত্তি রক্ষা করবে। ফুল- বাগান থেকে আরম্ভ করে গােভাগাড় পর্যন্ত যেখানে যা কিছু সেরা আছে, সব তার। নইলে আবার রাজা কি ?

রঘুবীর। জাফর। বল ত বিবি। স, মা। সে আমার আগে থাকতেই বলা আছে জনাব। তাহলে এস মিয়া ! দেখা যাক কতদুর কি করে উঠি। সেলাম জনাব ! [ কেরামৎ ও সখার মার প্রস্থান। (দেবলের প্রবেশ) - দেবল। সেলাম জনাব! সন্ধান পেলেন কি ? জাফর। (স্বগত) পরীবাণুকে লুকিয়ে রাখার মূল অনন্তরাও- বে-অকুফ-বদমাস! দেবল। (ভীতিপ্রকাশ ও স্বগত) আরে মল-এ আবার কি মূর্তি! শেষ কালে চোটটা আমার ঘাড়ে এসেই পড়ে নাকি! জাফর। শুধু মেহেরবাণী ক'রে বাঁচিয়ে রেখেছি। বেতমিজ বেইমান্। দেবল। আজ্ঞে হ ! হুজুর মেহেরবাণী করে যে রেখেছেন সেটা ঠিক। আর সেইজন্য বেতমিজ ব’ললেও বলা যায়। আর বেইমানের ত কথাই নেই। জাফর। বেল-লিক- দেবল। (স্বগত) খেলে—এইবার দেবলের দফা সারলে। ( প্রকাশ্যে ) সন্ধান কি পাওয়া গেলনা জনাব! সখার মা কি কিছু খবর দিতে পারলেনা ? জাফর। কেও দাওয়ান ? সন্ধান পেয়েও পাওয়া গেলনা। তাই ত ব’লছি—ঘদমাস, বে-তুমিজ, বে-ইমা, বে-ল্লিক। কোতল রঘুবীর। ৪১ ক’রবাে-শূলে দেব-জ্যান্ত চামড়া তুলে নেব (দেবলের ভীতি- প্রকাশ) কি বল দেওয়ান। বলতে পারি কি না ? দৈবল। খুব বলতে পারেন-বরাবরই বলতে পারেন। বাপ, বাঁচলেম, আমাকে নয়। শালা চাষাব’লছে তাকে, আর খিচুচ্ছে আমাকে। জাফর। বুড়াে ব’লে দয়া করে ছেড়ে দিয়েছি। এত বড় বেয়াদব!—এত বড় আস্পর্ধা!—আমাদের আদেশ অমান্য করে পরীবাণুকে আশ্রয় দান!-দেওয়ান! যেমন করে পার, অনন্ত- রাওকে গ্রেপ্তার কর। সব ওমরাও যখন গেছে, তখন অনন্তরাও থাকে কেন? আর দয়া নয়—অনন্তরাওকে বেঁধে আনন। দেব। যাে হুকুম জনাব ! তৃতীয় দৃশ্য রাজপথ । ( সখার মার প্রবেশ) স, মা। ওমা আসছেই তাে গাে ! বনের ভেতর টাকা লুকিয়ে রেখেছি, জানতে পারলে নাকি ! লােকের ঘরে ঘরে ঢুকে এ টাকা করেছি—জাতে পারুলে না কি! তাহলে ত গেলুম দেখছি—আর ত সখার মার প্রাণ রক্ষে হ’লনা-ভবলীলা ত সাঙ্গ হ’ল !-দোহাই বাবা ! আমি গরীব-অনাথা—আমার কাছে কিছু নেই বাবা ।

৪২
রঘুবীর।
( বালক বেশে শ্যামলীর প্রকেশ )
শ্যামলী।
শ্যামলী। তুই ? এখানে কতক্ষণ আছিস?
স, মা। আমি নেই বাবা ।
শ্যামলী। রয়েছিস আবার নেই কি !
স, মা। তা তুমি যা বল বাবা, আমি কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিনি।
শ্যামলী। ভয় নেই, আমি একটা খবর জানতে চাই।
স, মা। অত কাছে এসােনা বাবা!
ভয় নেই—আমি দস্যু নই।
স, মা। তা হােক, একটু দূরে থেকে কথা কও।
শ্যামলী। বেশ—দূরে থেকেই জিজ্ঞাসা করছি-বল, এখানে
কত ক্ষণ আছিস ?
স, মা। একদণ্ডও নেই বাবা !
শ্যামলী। সেকি!
স, মা। এক দম নেই।
শ্যামলী। এ কি রকম কথা ?
স, মা। আজকাল কথা এই রকমই হয়ে গেছে বাবা।
শ্যামলী। সেকি বেটী! তামাসা করছি ?
স, মা। দোহাই বাবা ! তামাসা আমাদের করতে নেই।
শ্যামলী। বেশ—ব দেখি, এপথ দিয়ে কোনও হিন্দু ওমরা-
ওকে যেতে দেখেছি কিনা ?
স, মা। আমি চোকে কিছুই দেখতে পাইনা বাবা! আমি
ছেলে হারিয়ে অন্ধ হয়ে পথে পথে বেড়াচ্ছি।
শ্যামলী। বলতে পারলে, মহামুল্য পুরস্কার দেবে।

রঘুবীর।
স, মা। কি বললে—হিন্দু ওমরাও ?
শ্যামলী। হা।
স, মা। কি মহামূল্য পুরস্কার দেবে দেখি।
শ্যামলী। নিশ্চয় দেবাে ! এখনি দেখাবাে-আগে কল্।
স, মা। দেখেছি।
শ্যামলী। সত্যি ?-প্রতারণা নয় ?
স, মা। কই—কি পুরস্কার দেবে দাও।
শ্যামলী। তারে দেখতে কেমন ব দেখি ?
স, মা। তবে আর বকসিস নেওয়া হয়েছে।
শ্যামলী। ঠিক বলেছি—দিব্যি করছি—নিশ্চয় দেবাে।
স, মা। আর কখন দেবে বাবা.! দেবার সময় যে উতরে
গেল।
শ্যামলী। দেখতে কেমন-না বলতে পারলে বিশ্বাস করি
কেমন করে ?
স, মা। বিশ্বাস হবেনা-সে ত জানা কথা বাবা! যাও বাছা
তুমি নিজে খুঁজে দেখ, আমি নিজের ছেলেকে খুঁজে দেখি।
শ্যামলী। কাজেই—মাফ কর বাছা—বিশ্বাস হ’লনা।
( প্রস্থানােত)
স, মা। লাগে তাক লাগে তুক, দেখি একবার আঁধারে
ঢিল মেরে। হাঁগগা বাছা ! দেওয়ানজীকে খুঁজছ ত?
শ্যামলী। (ফিরিয়া) এই নে পুরস্কার-মহামূল্য
শীগগির বল্ কোন্ পথে গেছে। শীগগির ব–দেরি সয়না,
শীগগির বস্।
স, মা। এটা কি বললে বাছা!-মাণিক ?
মণি।

শ্যামলী। তাের সাত পুরুষকে আর খেটে খেতে হবেনা শীগগির বা বেটী ? স, মা। শীগগির যাও—এই পথে যাও—ছুটে যাও—গেলেই ধরতে পারবে। শ্যামলী। মা কালী! মুখ রেখে মা ! যা বাছা, এখন অন্যত্র যা--এখানে আর তাের থাকবার দরকার নেই। স, মা। (স্বগত) মা কালী কি আর ও মুখ রাখবেন। খানিকটে এই পথে গেলেই একটী হালুম্ব, তার পর ওই চাঁদ মুখ কালাে হয়ে যাবে। কি ক’বুব, মাণিক হাতে পেয়েছি আর ছাড়তে পারছিনা। আহা বেশ মুখখানি! (প্রকাশ্যে) তােমায় বেশ দেতে বাছা! তুমি বড় সুন্দর শ্যামলী। কি ক’ব বাছা, হয়ে পড়েছি। স, মা। হাঁ বাছা ! তুমি বুঝি কোন রাজার ছেলে ? শ্যামলী। হবে । হবে। এখন যা-বসি পেলি চলে যা। স, মা। হরি হে-দীনবন্ধু । [ প্রস্থান। শ্যামলী। এবেশে পিতার সম্মুখে কেমন ক'রে উপস্থিত হই। লজ্জা করছে। উই—পারবােনা—বেশ পরিবর্তন করি [ প্রস্থান। স, মা। (নেপথ্যে দেখিয়া স্বগত) কেমন কেমন ঠেকছে। যে ! পুরুষ মানুষ তাে নয় ! চলন কেমন-বলন কেমন। না হ’লনা! পেছু নিতে হচ্ছে। ও মা ! ও কি! চোখের পলক ফেলতে না ফেতে রাঙ্গা ছুরিটা হয়ে গেল যে যাই-যাই-

৫
ঘুবীর।
পাছু পছু যাই। কেরামৎ এ সময় কোথায় গেল? যাই—সে
বেটাকেও সঙ্গে নিতে হবে। নইলে একা পেরে উঠবাে না।'
re
চতুর্থ দৃশ্য।
কক্ষ।
দেবল ও বিষণ।
বিষণ। এমন সােণার রাজ্যটা ছারেখারে দিলে ।
দেবল। কি ক’ব, জমীকে উৰ্ব্বরা করতে হলে, দিন কতক
ভাগাড় করে রাখতে হয়।
বিষণ। বটে! তাহলে এমন রাজ্যটার ধ্বংসের পথেই অগ্রসর
হলে!
দেবল। এখন ইচ্ছে করলেও ফেরা যায় না।
বিষণ। বেশ, তবে সৰ্ব্বনাশই কর। ভাল, আর একটা কথা
জিজ্ঞসা করি।
দেবল। আর জিজ্ঞাসা ক’তে হবে না। জিজ্ঞাসা আবার
ক’রুবি কি ? জিজ্ঞাসা করবার আছে কি? কাজ করতে চাস্ত
সঙ্গে আয়। মঙ্গল চাস ত এখনও সময় আছে, সঙ্গে আয়।
নইলে নবাব যদি ঘুণাক্ষরে জানতে পারে যে, আমার ঘরে ধর্মপুত্তর
শাপভ্রষ্ট হয়ে অবস্থান করছেন, তাহলে একটী চপেটাঘাতে

রঘুবীর।
তােমায় সেই ধৰ্ম্মরাজের চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেবে। আমার
বাবাও তখন ঠেকিয়ে রাখতে পাবে না।
বিষণ। তােমায় ঠেকাতে হবেনা। আমাদের যে যেতে হবে,
অনেক কাল বুঝেছি।
দেবল। বুঝেছিস্ ত এগিয়ে যান।
বিষণ। ভাল, আমীর ওমরাওদের যে হত্যা করলে, তাতে
হয় তােমাদের স্বার্থ আছে। কিন্তু রাণীপুরের নিরীহ প্রজা
তাদের মেরে, তােমাদের কি স্বার্থ হল।-গ্রামকে গ্রাম একেবারে
উৎসন্ন দিলে !
দেবল। তারা অনন্তরাওকে স্থান দিয়েছিল কেন ?
বিষণ। সবাই কি দিয়েছিল ?
দেবল। সে কৈফিয়ত ত তােয় দিতে আসিনি। কৈফিয়ত
নেবার অন্য লোক আছে।
বিষণ। কই-এখানে যে সে লোেক দেখতে পাচ্ছিনা, তাইতেই
ত দুঃখ! (স্বর্গের দিকে হস্ত প্রসারণ) ওখানকার কৈফিয়ত যে
শুনতে পাইনা-কেউ যে কখন শুনতে পেলে না—তাইতেই ত
নিরপরাধের উপর এই উৎপীড়ন ?
( দুলিয়ার প্রবেশ)
দেবল। একি! কে তুই?
বিষণ। তাইত, কে তুই?
দেবল, কোথা থেকে এলি?--কেমন ক'রে এলি?-কথা
কচ্ছিা যে?—আরে মরু, কে তুই ?
বিষণ। কি আপদ ! কে তুই ?
দেবল। এগুনি—ওইখান থেকে দাড়িয়ে বল।
*,
"

রঘুবীর।
৪৭
বিষণ। তবু এগােয়—পেছিয়ে যা—এখনও বলছি পেছিয়ে যা।
নইলে মলি। (দেবলের পশ্চাতে গমন)।
দেবল। বিষণ! অস্ত্র নিয়ে আয় তবেটার মুণ্ডচ্ছেদ করি।
( বিষণের পশ্চাদ্গমনের চেষ্টা )
বিষণ। (দেবলের পশ্চাৎ গমন) কে আছিস্ রে ! আয় ত।
দেবল। কি চাও—ওইখান থেকে বলতে পারনা ?
দুলিয়া। কিছু চাইনা হুজুর !
তবে কি করতে এসেছে?
দুলিয়া। হুজুরের নামে একখানা চিঠি আছে, দিতে এসেছি।
বিষণ। আগে বলতে হয় বেটা! নইলে এখনি যে কেটে
ফেলেছিলুম !
দেবল। থামাে বীরবর! আর বিদ্যে ফলাতে হবেনা। কার
কাছ থেকে এসেছিস?
দুলিয়া। হুজুর চিঠি পড়লেই জানতে পাবেন। (চিঠি
খুলিতে খুলিতে)
দেবল। তা বাইরে দরওয়ান রয়েছে, তার হাতে দিনি
কেন ? তােকে আসতে দিলে কে ?
বিষণ। দেখ বাবা! চিঠিখানা পড়েই দরওয়ান বেটাদের মেরে
দেশ ছাড়া করে দাও। এত বড় আস্পর্ধা! বিনা হুকুমে বাড়ীর
ভেতরে লােক প্রবেশ করূতে দেওয়া ! কে তােকে ঢুকতে
দিয়েছে বস্ত?
দুলিয়া। আমায় কেউ ঢুকতে দেয়নি হুজুর !
বিষণ। সে কি! তবে কেমন করে এলি ?
তুলিয়া। ঐ বাগানের ভেতর দিয়ে এসে, ওই পাঁচিল টপকে,

রঘুবীর।
খড়া বেয়ে ওই তেতালার ওপরে উঠে, ছাদ দে-ছাদ দে এদিকে
এসে, আবার দেয়াল বেয়ে নেমে, এই ঘরের ছাদের ওপরে না
পড়ে, ছাদ না খুড়ে, ওই ওপর থেকে নেমে এসেছি।
বিষণ। ও বাবা, এ বলে কি! (দেবলের অন্তরালে গমন।
এ ডাকাত যে !
দেবল। সঙ্গে লােক আছে, না একা ?
দুলিয়া। এখন একা—তবে দরকার হলে সঙ্গী জুটতে পারে।
বিষণ। ও বাবা ! একটু মােটা হওনা। তােমার পাপে
দেখছি সব গেল।
দেবল। রঘুবীরের নাম দেখছি। কিন্তু রঘুবীর কে ?
দুলিয়া। দেওয়ান অনন্তরাওয়ের পুত্র।
দেবল। তার নাম ত বলদেব। আবার অনন্তরাওয়ের ছেলে
কোথায় ?
দুলিয়া। ইনি তার পালিত পুত্র।
দেবল। পালিত পুত্র!-হা হা হা ! বুঝতে পেরেছি--সেই
রােঘাে।
দুলিয়া। তাঁর নাম রঘুবীর-রঘঘ নয় ।
দেবল। আচ্ছা তাই তাই। সেই ভীল ছোড়া ত ?
দুলিয়া। ভীল ছোড়া নয়-ভীলরাজ।
দেবল। ভাল, তা ভীলরাজ চান কি?
দুলিয়া। ওই চিঠিতেই লেখা আছে।
দেবল। ও বিষণ! ভীলরাজ আমাকে লিখেছেন কি শুনবি?
বিষণ। ভীলরাজের আস্পর্ধাও ত কম নয়। তােমাকে চিঠি
লেখে!

রঘুবীর। ৪৯ দেবল। তাইত দেখছি। দুটো চারটে শাস্ত্রের উপদেশ দিয়ে, ভীলরাজ শেষকালে কাকুতি মিনতি করে এই ভিক্ষা ক’রছেন, যেন তার মনিবের প্রতি ' আর কোন অত্যাচার না হয়। বেশ, ভলরাজকে বলি যে, এ শ্রাদ্ধবাড়ী নয়,-এ রাজ্য। এখানে কাজ আছে—ভিক্ষে নেই। অনন্তরাও রাজদ্রোহী। তার শাস্তি দেওয়া না দেওয়া সম্বন্ধে রাজার বিবেচনা।—ভিক্ষ শিক্ষে এখানে মিলছে না। দুলিয়া। যা বলবার থাকে লিখে দাও হুজুর ! দেবল। সে একটা অতি তুচ্ছ ভীল চাকর, তাকে আমি লিখে দেবাে কি তাকে বলিস, আমার বাড়ীতে যদি দরওয়ানী করতে চায় ত, দিতে পারি । দুলিয়া। ও কথা আমি শুনবােনা হুজুর! যা বলতে চাও লিখে দাও । দেবল। আরে মরূ-এ বেটার আস্পর্ধাও ত কম নয়! যা ত বিষণ, ভীমসিং বেটাকে ডাক্ত। কাণ ধরে এ বেটাকে বাইরে নিয়ে যায়। বিষণ। আর পটাপট জুতাে করে দেয়। দেখ, বেটা। এখনও বলছি—রাগাসনি, মারা যাবি । দুলিয়া। জৰাব না নিয়ে যাবার হুকুম যে আমার ওপর নেই হুজুর । দেবল। চোপরাও, বেয়াদৰ-গাধা গিপ্পোড় ! আবি শির জুদা হাে যাগা । বিষণ। চোপরাও- দুলিয়া। বেশি দেরি করােনা হুজুর ! আমার আবার অন্য

রঘুবীর।
কাজ আছে। মুখ চেয়ে দেখছো কি হুজুর? জবাব না নিয়ে ত
যাবনা।
দেবল। যা ত বিষণ, ভীমসিংকি যে কেউ থাকে-ডেকে
আন্ত। বেটাকে একটা পাকাপােক্ত জবাব দিয়ে দি।
দুলিয়া। (পথরােধ করিয়া জবাব দিয়ে যাও।
দেবল। ভীমসিং-ভাটারাম—গাঁট্টা তেওয়ারি-জবরদস্ত খা।
( নেপথ্যে হুজুর !)
জলদি ইধার আও—সব আদমি আও।
( প্রহরিগণের প্রবেশ)
এই শালা লােগকো বাধকে থােড়কুচি করূকে কাকে দরিয়ামে
কেঁ দেও।
বিষণ। ফেক দেও—জলদি কাট ডালে। শালা বেয়াদবকে।
আবি শিখলায়কে দেও।
সকলে। আও শালা কম্বত!
১ম, প্ৰ। ( অগ্রসর হইয়া) আরে কোন্ হায় ! ---তুলিয়া
মহারাজ!
সকলে। (বন্দিগি—সেলাম ইত্যাদি অভিবাদন )
১ম, প্ৰ। হিয়া ক্যা করূনে আয় ওস্তাদজী ।
২য়, প্র। কিধার দেকে আয়া ওস্তাদজী !
৩য়, প্র। রঘুরা মহারাজকো তবিয়ত আচ্ছি ওস্তাদজী ।
৪র্থ, প্র! আইয়ে - আইয়ে, খােড়া ভাঙ, স্নায়, পিজিয়ে
ওস্তাদজী।
১ম, প্র। মাফ, কিজিয়ে হুজুর ! দুলিয়া মহারাজ এ চারে

রঘুবীর।
আদমিকোই ওস্তাদ হায়। উনকো পাকাড় লেনেকেত হাম
লােগ নেহি সেকেগা।
বিষণ। উব, নকুরিমে বরখাস্ত হােগা।
সকলে। ক্যা করেগা হুজুর! নকুরি যাগা ত ক্যা করে।
১ম, প্ৰ। নকুরি যাগা ত মকুরি মিলেগালেকেন ওস্তাদজী
যানেসে ওস্তাদজী নেহি মিলেগা ।
দেবল। বহুত আচ্ছা, চলা যাও।
[ প্রহরিগণের প্রস্থান।
কি বলিস বিষণ!
বিষণ। আর বলাবলি কি, লিখে দাওনা।
দৈবল। তবে দোয়াত কলম কাগজ নিয়ে আয়।
দুলিয়া। এই যে আমারি কাছে আছে হুজুর !
দেবল। দেখ, তােমরা যে মনে করেছ, অনন্তরাওয়ের ওপর
দুলিয়া। দেওয়ানজী বল।
দেবল। বেশ, দেওয়ানজীর ওপর এই যে অত্যাচায়-তােমরা
হয়ত মনে করেছ, আমি করেছি। কিন্তু দোহাই ধর্ম, আমি
এর কোনও খোঁজ খবর রাখিনা। কি করব, প্রাণের দায়ে চাকরি
করছি। দেওয়ানজীর তবু অরণ্যেও স্থান আছে । কিন্তু আমার
ওপর যদি জাফর কষ্ট হয়, তাহলে ত্রিজগতে আমার স্থান নেই।
(পত্র লিখিয়া দুলিয়ার হস্তে প্রদান )—ভাল, রঘুবীর কি করে ?
দুলিয়া। এই ফুল বিপিত্তর—এই রকম কত কি নিয়ে, কেবল
পূজা আচ্ছাই করে।
বিষণ। আচ্ছা, বাবা যদি আমার পত্রের জবাব না দিত,
তাহলে কি হত ?

রঘুবীর। দুলিয়া। সে কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করছ হুজুর! কাজ যখন মিটে গেল, তখন আর ওকথা তুলতে নেই। দেবল। বেশ, আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, সরল ভাবে তার উত্তর দেবে কি ? দুলিয়া। অনুমতি কর হুজুর ! দেবল। তুমি রঘুবীরের কে ? দুলিয়া। সাকরেত। দৈবল। তুমি যার সাকরেত, তার নাজানি কত শক্তি! আমি তার শক্তির একটু পরিচয় জানতে চাই। দুলিয়া। কি করে জানাবাে ? দেবল। দেখছি, তুমি ত একা। আর আমার বাড়ী প্রহরী বিেষ্টত। এরা যেন তােমার সাকরেত। কিন্তু তা যদি না হত, যদি তােমাকে দশজনে মেরে ফেলতে ? দুলিয়া। রঘুয়া মহারাজের আশীর্বাদে হুজুর ! ও রকম পঞ্চাশ- জনকে আমি একা ঠেকিয়ে রাখতে পারি। দেবল। যদি একশাে লােকে ঘেরে ধরতাে ? দুলিয়া। তাহলে ?—দেখতে চাও হুজুর ! বিষণ। দেখাওনা ভাই সরদার। দুলিয়া। (বংশীধ্বনি) ( চারিদিক হইতে ভীলগণের প্রবেশ) (দেবল ও বিষণের ভীতির অভিনয় ) সকলে। ক্যা হুকুম মহারাজ।

রঘুবীর।
দুলিয়া। হুজুরকে সেলাম কর। ( ভীলগণের দেবলকে
অভিবাদন) নাও-চল, আসি হুজুর !
দেবল। কিন্তু নবাব যদি নিজে অত্যাচার করে,-আমার
কথা না শুনেও অত্যাচার করে।
দুলিয়া। সে' আমরা বুঝতে পারবাে। আসি হুজুর—অনুমতি
সেলাম।
দেবল। সেলাম।
দুলিয়া। (বিষণের প্রতি) সেলাম হুজুর !
বিষণ। সেলাম-সেলাম।
[ দুলিয়া ও ভীলগণের প্রস্থান
দেবল। এ আবার কি আপদূরে বিষণ
বিষণ। বাবা, কৈফিয়ত নেবার লােক এসেছে। এখনও
যদি মঙ্গল চাও, ত দেওয়ানীতে লাথী মেরে বনবাসী হইগে চ
তাতে দুদিন বাঁচবে।
দেবল। তাইত—তাইত, চল—চল-পালাই চল্।
,
[ প্রস্থান

পঞ্চম দৃশ্য।
ময়দান ।
(কৃষকের প্রবেশ )
গত।
বৃন্দে দূতি গাে! তােদের কালায় নাকি পেঁচায় পেয়েছে।
ঢুকেছিল গােপীর গোয়ালে,
সেথায় নাকি বেসেছিল পেচো চোয়ালে, *৮৬১
যেমনি করবে ননী চুরি অনি ঘাড়ে পড়েছে।
ডুকরে কেঁদে ব’তেছে বাশী,
ওগো বৃন্দে প্রাণ-গোবিন্দে দেখ গাে আসি,
কোথায় রাধা রূপসী, কালার এবার বেজায় কাশি, বুঝি না বাচে।
( সখার মার প্রবেশ )
কৃষক। আপনি কোথায় যাচ্ছ বিবি ?
স, মা। হরে! এপথে তুই কিছু দেখেছিস ?--কেউ গেছে ?
কৃষক। আজ্ঞে আমি একটা রাঙ্গা বকনা ছুটে যেতে দেখেছি।
স, মা। আর কিছু ?
কৃষক। আর দেখেছি একটা গন্ধগােকলাে।
স, মা। আর তাের বাবার মাথা ?
কৃষক। না বিবি। সেটা দেখিনি। আমার বাবা, আমার হবার
আগেই মারা পড়েছে। আর পাড়ার লােকের মুখে শুনেছি, বাবার
আমার খুব ক্ষেমতা ছেল, কিন্তু মাথা ছেল না।

ক
রঘুবীর।
স, মা। দূর বেটা চাষা? কোন মেয়েকে এপথ দে যেতে
দেখেছিস কি ?
কৃষক। আমার বেই হয়নি বিবিঠাকরুণ! তা মেয়ে দেখবো।
স, মা। মেয়ে মানুষ ?
কৃষক। তা দেখেছি বিবিঠাকরুণ ।
স, মা। কি রকম দেখেছি বল্ ত ?
কৃষক। বিবিঠাকরুণ,! আমাকে নজ্জা দিচ্ছে তা আমি
বলতে পারবনি।
স, মা। কেরে বেটা ! বলনা-বসিস্ পাবি।
কৃষক। না বিবি ! আমি গরীব-তুমি লবাবের বিবি---
বলতে ভয় খাচ্ছি।
স, মা। কোন ভয় নেই ব–আমি নবাবের লােক—আমি
অভয় দিচ্ছি। কেউ তােকে কিছু বলতে পারবে না।
কৃষক। এই তােমাকেই দেখেছি বিবি।
স, মা। দূর বেটা চাষা !
কৃষক। হাগা বিবি,! চাষাতে কি দেখতে জানেনা।
স, মা। আ আমার পােড়া কপাল! দুনিয়াতে এত নবাব
বাদসা-আমীর ওমরাও থাকতে শেষকালে কিনা চাষার নজরে
,
ঠেকে গেলুম !
কৃষক। কেমন—ঠিক দেখেছি ত বিবিঠাকরুণ ।
স; মা। দেখেছি-দেখেছি, তাের চোখ আছে—চোখ আছে।
কৃষক। তাহলে আমার বকসিস?
স, মা। একটী অল্পবয়সী সুন্দরী স্ত্রীলােক—এ পথ দে যেতে
দেখেছিস্?

৫৬
রঘুবীর।
কৃষক। ও হরি ! তাতে দেখেছি।--তা আগে বলনি কেন?
স্ত্রীলােক ?—তাতে দেখেছি। তবে মেয়ে মেয়ে করছিলে কেন?
স, মা। কোথায় দেখেছিস বাছা!
কৃষক। স্ত্রীলােক-গেরস্তর বউ-আহা যেন মা লক্ষ্মী।
বিবিঠাকরুণ, সে মা লক্ষ্মীর যে কি রূপ-- আর তোমায়
কি বলব।
স, মা। কতক্ষণ দেখেছি বাছা !
কৃষক। কতক্ষণ কি!এখনও হয়ত আছেন-গাছের
তলায় বসে আছেন। অনেক দুর থেকে বােধ হয় আসছেন।
স, মা। কোন্ গাছের তলায় ?
কৃষক। এই পথে একটুখানি গেলেই বঁদিকে একটা বড়
গাছ-গেলেই দেখতে পাবে। তাহলে আমায় কি দেবে, দাও।
স, মা। ঠিক দেখেছিস্ত ?
ধ্রুক। আচ্ছা, তুমি আগে দেখে এসাে, তার পর দাও।
( কেরামতের প্রবেশ )
স, মা। কি খবর কেরামত, !
কৃষক। কেরামতের কেরামতি!--যাবে কোথায়
স, মা। এই নে বকসিস্!
কৃষক। আধ পয়সা।
স, মা। যানা বেটা ! যে বকানটা বকিয়েছিল, পর্দান
নিইনি, এই ভাগ্যি।
[ কৃষকের প্রস্থান।
তারপর ? ফেলে যে চলে এলি ?

ঘুবীর।
কেরা। মােড়া আগলেছি, আর যাবে কোথায়! ওই আসছে
-দেখ দেখি তােমার সেই কিনা ?
স, মা। কেরামৎ ! দেখ, দেখ--কি রূপ দেখ!
কেরা। ইস! কেয়া তােফারে ।
স, মা। বাদসার মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেবাে। একবার নিয়ে গিয়ে
ফেলতে পারলে হয়। (কেরামকে) তুই একটু আড়ালে যা,
আমি দুটো একটা কথা কয়ে ভাবগতিকটে বুঝে নিই। ডাকলে
আসি। নবাব পরী পরী করে মরছে কেন ? একে যদি পায়,
তাহলেও তার জন্ম সার্থক হয়। স’রে পড়। স’রে পড়।
[ কেরামতের প্রস্থান।
( শ্যামলীর প্রকেশ )
শ্যামলী। হাঁ বাছ! বৃদ্ধ দেওয়ান অনন্তরাও এখানে কোথায়
থাকে বলতে পার?
স, মা। আর বাছা! অনন্তরাও কি আর আছে।
শ্যামলী। নেই!-না না কে তুই ?—তুই এখানে! কেমন
করে এলি !—আবার কোথা থেকে জুটলি !
স, মা। আর বাছা! বুড়াে মানুষ পেয়ে ঠকিয়ে এলে
কাজেই নিরুপায়ে এখানে সেখানে ছুটোছুটি করতে হয়। তা বাছা,
এমন নিষ্ঠুর তুই ! সারা রাতটা আমাকে ঘুরিয়ে মারলি !
শ্যামলী। অবিশ্বাস করছি কেন বাছা! সে খুব ভাল
মাণিক। অমনি অমনি পেয়ে গেছি, তাতে আবার দুঃখু কি !
তােহ’তে ত কোন কাজ হ’ল না। এই দেখ, এখনও ঘুরে সুরে
বেড়াচ্ছি।

রঘুবীর।
বহুমূল্য মণি-
স, মা। এ রূপ নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, তাতে কার অপরাধ
বাছা!
শ্যামলী। অবিশ্বাস করিনি-ঘরে যা।
রাজার ঘরের ধন।
স, মা। আর বাছা, ডাহা ফাকিটে দিলে, অবিশ্বাস না
করে কি করি। একটা মাটির মাণিক দিয়ে, চোখে যেন ধূলো
দিয়ে, সাত রাজার ধন মাণিক চলে এলে --অবিশ্বাস না করে কি
করি ।
শ্যামলী।
তুই বলছিস্ কি ?
স, মা। আর বলাবলি কি?-মাটির মাণিকে আর ঠছিনা
শ্যামলী। বেশ, ঠকা বােধ করিস-ফিরিয়ে দে।
স, মা। এই নে বাছা, আঁচলেই বাধা আছে।
(মণি
প্রদান )
শ্যামলী। বেশ, আর কেন তবে পঁড়িয়ে রইলি ? চলে যা।
স, মা। দূর-ন্যাকা ছুড়ী!-চ'লে যাব বলেই কি, এই
পাঁচ ছ কোশ রাস্তা হেঁটে, তােকে মাণিক ফিরিয়ে দিতে এলুম?
তুই কোথাকার বােকা মেয়ে ! নে--সঙ্গে চ'।
শ্যামলী। কোথায় যাব ?
স, মা। যেখানে হীরের ছায়ে দাত ঘবি, মুক্তোর চূণে।
পাণ খাবি, সােণর দোলায় দুলবি, গােলাপের পাপড়ীর তাকিয়ায়
হেলান দিবি।
শ্যামলী। সে কোথায় ?
স, মা। এই আমাদের নবাবের রঙমহল।
শ্যামলী। দুর্গা, দুর্গা ! নেপথ ছাড়।

রঘুবীর।
স, মা । চটি কেন চুড়ী! শােনা। এই সাতটা মুলুকের
আসল মালিক হবি তুই। নবাব হবে তাের গােলাম। নবাব
তোর জন্যে একেবারে পাগল হয়েছে।
শ্যামলী। বলি কি!--আমাকে না দেখেই।
স, মা। কি জানি, স্বপ্নে কেমন করে তােকে দেখে ফেলেছে।
দেখেই পাগল,বলে এনে দাও।
(কেরামতের প্রবেশ।)
ওরে কেরামত! শুধু রূপে নয় রে ! এযে কোহিনুর ! কথায়
রসিকতায়—টুকটুকে ঠোট ঢাকা মুখখানি থেকে মুক্তো ঝ’ছে !
কেরা। বল কি বিবি !-কিগাে বিবি ! নবাবের ওপর রাগ
করে যাচ্ছ কোথায় ?
শ্যামলী। মা, সতীকুলরাণী !—অবলা বিপন্না।-এ মহাবিপদে
মান রেখাে মা। স্বামীর অবাধ্য হয়ে এসেছি, দেখো মা ! তারে
যেন লজ্জায় মুখ না হেঁট করতে হয় ।
স, মা। চুপ করে রইলি কেন—চল। রােদ্র উঠে পড়ে
সারা রাত ঘুরিয়ে মেরেছি-কোমর খ'সে যাচ্ছে। (আড়মােড়া
ভাঙ্গিতে ভাঙ্গিতে) নে— আয় ।
শ্যামলী। নিয়ে যাবে কে ?
কেরা। এই যে গােলাম হাজির বিবি।
শ্যামলী। তবে তঞ্জা আহেঁটে যাব ?
কেরা। এই কঁাধে করে নিয়ে যাব বিবি ।
স, মা। গাঁয়ের ভেতরটুকু পর্যন্ত হেঁটে চল--- সেখানে পার্ক।
ডেকে, নিয়ে যাব।
= =

রঘুবীর।
শ্যামলী। কিন্তু আমার একটা পণ আছে—আমাকে নিয়ে
যেতে হলে আমার হাতটা ধরে নিয়ে যেতে হবে।
স, মা। এও আবার একটা কথা কি! নে—আমার হাত
হস্তধারণের উদ্যোগ )
শ্যামলী। আর না যদি পারি, তাহলে নাকটা আমাকে
বাসস্ দিয়ে যেতে হবে ।
স, মা। (পিছাইয়া) সেকি কথা!—আরে ম’ল, সেকি কথা?
শ্যামলী। কি করব বাছ! এ আমার পণ। যেতে প্রস্তুত
তােরা নিয়ে যেতে পারলেই হয়।
স, মা। ওরে কেমরাত! ছুড়ীটে কি বলে শােন্ না ।
কেরা। হাঁ হাঁ – ওতে আমি খুব রাজি। ( তাল ঠুকিয়া)
হাম্ লে যায়েঙ্গে। বল কোন হাতটা ধরতে হবে ?
শ্যামলী। না থাক্‌, গরীব-পয়সার জন্য এসেছিস্ গােলামী
করতে। না থাক, পথ ছাড়—আমি চলে যাই।
কেরা। সেকি বিবি -- ছাড়বাে কি ?
শ্যামলী। তবে ধরুকিন্তু বুঝে দেখ,-- তামাসা করছিনা
নাকটী দিতে হবে।
কেরা। নাক কেন বিবি ! তােমাকে জান পর্যন্ত দিতে
প্রস্তুত। তুমি মেহেরবাণী করে নিলেই হয়।
স, মা। হায় হায় !—চুড়ীটের দেখছি মাথাটা খারাপ হয়ে
গেছে। নে---আয় ভাই, আর পাগলামি করিনি—চল।
( শ্যামলীর হস্তধারণের চেষ্টা )
শ্যামলী। তবেরে বেটী কবি । গায়ে হাত দিবি কিছু কি
কি!-( সখার মার কেশ ধারণ )

রঘুবীর।
৬১
স, মা। হাঁ হাঁ হাঁ ছাড়ছাড়-উঃ-ছাড়—আরে মূল
ছাড়গেছি গেছি—ছাড়-ওরে বাবারে, ছাড়—ওরে কেরামতে
দেখছিস্ কিঃ-উঃ!-ছাড়।
কেরা। আরে বেটী করি কি! হাঁ হাঁ করিস কি
করি কি!
স, মা। ওগাে ধনাগাে-মেরে ফেলে যে গো !
কেরা। তবেরে বেটী ।
শ্যামলী। তবেরে বেটা ! (সবার মাকে ছাড়িয়া কেরামতকে
ধারণ)
কেরা। আঃ-উঃ-গেছি গেছি—আর না!—মেহেরবাণী
বিবি----ছাড় ছাড়।
শ্যামলী। গেরস্তর মেয়েকে পথে বেরুতে দেখলে আর কখন
তামাসা করবি ?
কেরা। দোহাই বিবি !-মেহেরবাণী !-আরে বাপ!
স, মা। ওগাে কে কোথায় আছ-বাচাওনা গো !
শ্যামলী। এখনও বল।
কেরা। উঃ-উঃ-আরে বাপ!
স, মা। ওগাে, ভালমাষের ছেলেকে মেরে ফেলে যে গো !
-ওগাে কে কোথায় আছ-বাঁচাও নাগাে।
নেপথ্যে। ভয় নেই—ভয় নেই।
এখনও বল
নইলে
খুন করব।
কেরা। আর করব না।- দোহাই দানা বিবি ! আর করব
না।-দোহাই জিনি বিবি !—আল্লার কিরে, আর করব না।
ওরে বাবারে!
শ্যামলী। বল,

জঘুবীর।
(দুলিয়ার প্রবেশ)
দুলিয়া। ভয় নেইচয় নেই।
স, মা। ও বাবা–বাঁচাও বাবা!-কি ডাকাতে চুড়ী বাবা?
সুলিয়া। কি বিপদ-স্ত্রীলােক!
স, মা। হাঁ বাবা, সৰ্বনেশে স্ত্রীলােক বাবা-খুনে মেয়ে।
আগে হাতটা ওর চুল থেকে ছাড়িয়ে দাও ত বাবা! তারপর
হাত পা বেঁধে দিয়ে দাও। বেটীকে চ্যাংদোন্না করে দেশে
নিয়ে যাই।
শ্যামলী। যা, তােকে ক্ষমা করলুম্-তাের পাপের উপযুক্ত
দণ্ড দিলুম না-কিন্তু সাবধান ! যেন মনে থাকে।
দুলিয়া। দু দুটো লােক চীৎকার করছে একটা মেয়ের মারে।
আরে কেও—তুই?--কি সর্বনাশ ।--তুই।
স, মা। ও আটকুড়ীর বেটা!—আর দেখছি কি! বুঝতে
পারছি না !
কেরামত, সখার মার পলায়ন।
দুলিয়া।
নে, আর এখানে থাকে না - চলে আয়।
শ্যামলী। যা-আমি তাের সঙ্গে যাব না।
দুলি। মাফ করূ শ্যামলী ! হাত জোড় করছি।-এসেছিস
ভালই হয়েছে -নইলে তােকে আন্‌তে আমায় আবার ফিরে
দেশে যেতে হত।-চলে আয়-- কি অপূৰ্ব্ব সামগ্রী আমরা
পেয়েছি—দেখবি আয়।কঁদিনি ভাই ! যথার্থই তােকে সঙ্গে
না এনে আমি অপরাধ করেছি।—মার্জনা ক। শক্তি-স্বরূপিণী
বুঝতে পারিনি। প্রাণে তরঙ্গ উঠেছিল—সে তরঙ্গ আমি রােধ
চলতে গিছলুম। শ্যামলী:! আমায় মার্জনা কর।

সাধs
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বনমধ্যস্থ পর্ণকুটীর।
পরীবাণু।
গীত।
সে যে অতীতের স্মৃতি সুমধুর।
মরম বীণার সকরুণ সুর।
বড় প্রিয় ছবি, প্রভাতের রবি,
ধীরে ধীরে যেন উদিল।
সে যে মরুভূমি মন্দাকিনী-ধারা,
অাঁধার সাগরে শুভ ধ্রুব তারা,
মনে করি ভুলি, বিধাতার তুলি,
ফিরে ফিরে তাই অকিল।
ছার সিংহাসন, ছার রাজ্যধন,
মণি-মুক্তাহার অনল ভীষণ,
আমি প্ৰেমৰাণী, চির অভিমানী,
সকলি রহিল সকলি ডুবিল ।
যা হবার হবে, কিছু ত না রবে,
ছাই মিশে যাবে অতুল বৈভবে,
য় প্রেমময়, করুণা-শাল
রাঙ্গা পায় কলি ফুটিল।
খলিল কি কলি রহিল !)

৬৪ রঘুবীর। (রঘুবীরের প্রবেশ . রঘু। পরী—বােন! তােমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করবে। পরী। বল। রঘু। বেশ বুঝে জবাব দাও। পরী। কি, বল। রঘু। এমনি করে অনিশ্চিত জীবন নিয়ে ঘােরার চেয়ে, একটা স্থিতির উপায় দেখলে হয় না? পরী। কেন, বেশ ত আছি ভাই। রঘু। এই কি থাকা!—এই কি নবাবনন্দিনীর যােগ্য স্থান! -এই কি নবাবনন্দিনীর যােগ্য অবস্থা! অতি বড় দীন যে, সেও এ অবস্থার কামনা করে না। এই কি নবাবনন্দিনীর যােগ্য আহার! কারাগারের বন্দীও বুঝি এর চেয়ে সুখাদ্যে আপনার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে অবসর পায়। পরী। কথায় কথায় ভুলে যাও—আমি যে এখন আকাশ- ভলাশ্রয়ী ঋষির নন্দিনী ভাই! আনন্দ যে আমার দাসত্ব করে! রঘু। বটে, কিন্তু আমরা তােমার এ অবস্থা দেখতে পাচ্ছিনা। বােন। পিতা মর্মপীড়িত, বলদেব মৃতপ্রায়। পরী। ভাল, কি রকম করে স্থিতি হবে ? রঘু। লুকিয়ে আছি-বেরুবার পথ পাচ্ছিনা। যদি পাষণ্ড কোনও রকমে টের পায়, তাহলেই সর্বনাশ। তখন তােমায় রক্ষা করা বড়ই কঠিন কাৰ্য্য হয়ে পড়বে। বেশ বুঝে দেখ। পরী। নাই বা রক্ষা হ’ল ! যদি একান্তই অশক্ত হও, তাহলে তােমার ভগ্নীর দেহ জাফরের কাছে যেতে পারে, প্রাণ যাবে না।

ষুিবীর।
রঘু। কিন্তু আমরা যে যােন, তােমার মঙ্গলেভ ত্যাগ করতে
পাছি না !
পরী। বেশ, আমায় কি করতে বল ?
রঘু। তােমায় কিছু করতে বলিনা।প্রভু যদি আমার
একটু নিশ্চিন্ত হতে পারেন,দারিদ্র্যের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে,
কোন রকমে যদি একটু সচ্ছল হতে পারেন,-কুটীর ছেড়ে
আবার যদি নিজের অট্টালিকায় গিয়ে বসতে পারেন, তাহলে
ভগ্নী, এ জীবনে সূৰ্য্যকে পর্যন্ত তােমার মুখ দেখতে দিইনা।
পরী। আমি বুঝতে পারছিনা করতে চাও কি ?
রঘু। নরাধম জাফরের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করি। তাহলে
পিতা আবার স্বপদে প্রতিষ্ঠিত হন।
পরী। সে সন্ধি করবে কেন?
রঘু। সে ভরসা আমার আছে। অনন্তরাওকে যদি সে
বন্ধু পায়, তাহলে জাফর আপনাকে কৃতকৃতার্থ জ্ঞান করে ।
বন্ধুরূপে পাবার প্রত্যাশা নেই বলেই, তার এত অত্যাচার।
পরী। তাহলেই যে আমাকে রক্ষা করতে পারবে, তার
বিশ্বাস কি ?
রঘু। তােমার অস্তিত্ব জানবে কে! অনন্তরাওয়ের অন্তঃ-
পুরে প্রবেশ করবে —সাহস কার ? (পূরীর চ’ক্ষে অঞ্চল দান )
কেঁদোনা ভগ্নি ! শুদ্ধমাত্র তােমার মত জানবার জন্য জিজ্ঞাসা
করেছি--তােমার মনে আঘাত দেবার জন্য নয়। তােমার তৃপ্তির
জন্য রাজ-ঐশ্বর্যের মস্তকে পদাঘাত করে দরিদ্রতাকে চিরদিনের
জন্য আত্মীয় করতে পারি। পথে পথে, তরুতলে, বিজন অরণ্যে,
মরু প্রান্তরে বাস ক’তে পারি, মৃত্যুকে সহাস্য বন্ধনে আলিঙ্গন দিতে

রঘুবীর।
পারি। তােমার যদি ইচ্ছা না হয়, তাহলে আমরা যা আছি, তাই
রইলুম।
পরী। অনন্তরাওকে পিতা বলেছি, তােমাদের ভগ্নীয় স্থান
গ্রহণ করেছি। আমার পিতা, আমার ভাই—একটা গােলামের
কাছে মাথা হেঁট করবে ?
(শ্যামলীর প্রবেশ
!
শ্যামলী। কখন না কখন না।
কখন না -কখন না। পা রাখবার স্থানে মাথা
ছোয়াবে!-কখন না।—ওরা না রাখতে পারে, আয় পরী, আমার
কাছে আয়। ওরা অট্টালিকার মানুষ, অট্টালিকায় যাক্। আমরা
ভিখারিণী,-আয় পরী,-- আমরা আকাশতলে আশ্রয় গ্রহণ করি।
রণু। একি, কে তুই!—এখানে কেমন করে এলি ছায়া-
মূৰ্ত্তি--না সত্য সত্যই শ্যামলী
শ্যামলী। না, দাদা। ছায়া নই-কায়া—সত্য সত্যই তােমার
পোড়ামুখী শ্যামলী।
রঘু। শ্যামলী ।
-এযে অসম্ভব শ্যামলী
শ্যামলী। নারীর অসম্ভব কি!
রঘু। দেবতার অগোচর স্থান—কে তােকে সংবাদ দিলে ।
শ্যামলী। কার নাম ক’ব ?-যিনি দেবতার দেবতা—ঘিনি
অঘটনঘটনপটীয়সী—সেই ভবানী।
(দুলিয়ার প্রবেশ )
দুলিয়া। দোহাই ধর্মাবতার ! আমি নই।
রঘু। বেশ করেছি—তাতে লজ্জা কি ভাই।

রঘুবীর।
দুলিয়া। না মহারাজ! আমি এর কিছুই জানি না। রাস্তার
মাঝে একটা লােক ত্রাহি ত্রাহি চীৎকার করছিল। মনে ক’লুম,
হয় ত কাউকে বাঘে ধরেছে,না হয় ডাকাতে ঠেঙাচ্ছে। গিয়ে দেখি—
দোহাই মহারাজ, গিয়ে দেখি—বাঘ নয়-ডাকাতও নয়-তমারই
[ দুলিয়ার প্রস্থান।
রঘু। এসেছিস, কিন্তু আমার অবস্থা বুঝতে পারছি কি
শ্যামলী ?
শ্যামলী। কতক কতক।
রঘু। কিছুই বুঝতে পারিনি শ্যামলী! যে আমার সম্মুখে
দাড়িয়ে—জানিস্ এটী কে ?
শ্যামলী। ভাইকে দর্শন করতে এলে যে দৈবজ্ঞি হয়ে আসতে
হয়, তা কেমন করে জাবাে? তবে পথে আসতে আসতে দুলিয়ার
কাছে শুনেছি যে, নর্মদা আমাদিগে একটী বােন উপহার দিয়েছে।
তার নাম পরীবাণু।
পরী। আমি এক পিতৃমাতৃহীনা অভাগিনী। এরা দয়া করে
আমার পিতৃত্বের ও ভ্রাতৃত্বের ভার নিয়েছেন।
রঘু। না শ্যামলী ! পরীর ভ্রাতৃত্বের ভার গ্রহণ করে, আজ
আমি গৌরবান্বিত—আমার জীবন সার্থক। একদিন যার নাম
শুনে, গুজরাটের আবাল বৃদ্ধ বনিতা সসম্রমে মন্তক অবনত করত,
ইনি সেই মহাত্মা নবাব মামুদসার একমাত্র নন্দিনী পরীবাণু। কিন্তু
ভগবান অযােগ্য পাত্রে ভার দিয়েছেন। ভগ্নীর মর্যাদা রাখতে
পারব কি ?

রঘুবীর। শ্যামলী। যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ ত রাখবার চেষ্টা ক’তে হবে। প্রাণ যায়,—নিরুপায়। তখন ত আর তুমি আমি দেখতে আছি না। কি বলিস পরী! পলকমাত্র সময়ের জঙ্গও যার দর্শন-লাভ বহুভাগ্যের কথা, সেই প্রতাপশালী নবাবের কন্যা আজ দরিদ্রের আশ্রয়ে ! কে পাঠালে দাদা ? নবাব যখন জীবিত ছিল,তখন এই বালিকার ঘরে সূর্যকিরণও যদি প্রবেশ করতে চাইত, তাহলে বােধ হয়, তাকেও লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে যেতে হত। কিন্তু আজ নিদাঘ-তপনের প্রখর দৃষ্টি, হিংস্রক জীবের বিলােল রসনা, পিশাচের লােভ, দস্যুর অত্যাচার, সকলে চারিদিক হ’তে তােমার প্রতীক্ষায়। কিন্তু সে মহিমান্বিত নবাব কোথায় ! আদরের কন্যার অবস্থা —শত আবেদনেও আর নবাব দেখতে আসছে না। স্বয়ং রাজ্যেশ্বর যার মর্যাদা রাখতে পারুলে না, তখন আমরা তার কি ক’তে পারি ! তবে ভাই, এ ক্ষণভঙ্গুর জীবন নিয়ে আবার অযােগ্য তার আক্ষেপ কেন ?-তাহলে আয় পরী কাছে আয়। বন্ত রমণী—ভিখারিণী -এ অপূর্ব সঙ্গলােভে জ্ঞানশূন্যা—আয় ভাই, কাছে আয় আমাকে তাের ভগ্নীর স্থানটা ভিক্ষা দে। আমি মহানন্দের অধিকারিণী হয়ে, একদব্যাপী জীবনের ভিতরে শত বৎসরের পরমায়ু আবদ্ধ করে রাখি । পরী। এসস ভগ্নী, হৃদয়ের এক প্রান্তে স্থান দিতে, আমার এই তুচ্ছ- --অতি তুচ্ছ হৃদয় গ্রহণ কর। অরণ্যে এসে এখন আমি শত সম্রাট-নন্দিনীর ভাগ্য পেয়েছি। পূৰ্ব্ব জীবন সাধ করে ভুলে গিয়েছি। ক্ষমা কর বােন্—নিজেকে অভাগিনী বলে আমি নারী জীবনের অমৰ্যাদা করেছি। শ্যামলী। পিতা কোথায়! বলদেব ভাই কই ?

রঘু। রঘুবীর। এই কুটীরেরই সন্নিকটে, এক গাছের তলায় তাদের ব’বার স্থান করে দিয়েছি। শ্যামলী। আয় বােন, পিতৃদর্শন করে আসি। ( সকলের প্রস্থান। - দ্বিতীয় দৃশ্য। তরুতল। অনন্ত ও বলদেব। অনন্ত। রঘুবীর সন্তান আমার। পুত্ৰজ্ঞানে পুষেহে জননী তােমার, কত যত্নে শৈশব হইতে তারে করেছে পালন। কোন্ জাতি, কি কাৰ্য্য পিতার, কোন্ দূর দেশ হতে আগমন তার, আজীবন করেছি গোপন। ব্যবসায়ী পিতা- দাক্ষিণাত্যে রাজেশ্বর বীর বিশ্বনাথ, দকাৰ্য ছেড়ে, প্রভুভক্ত ভৃত্য মত- ছায়া যথা, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছে আমার। সহ বিপদ হতে করেছে উদ্ধার। এক দণ্ডে ছেড়েছে কামনা। এক দণ্ডে পাশরিয়া অস্তিত্ব আপন, রাশি রাশি ক

রঘুবীর।
অমূল্য রতন,আজীবন দস্যুতার
যত উপার্জন – সমস্ত দরিদ্রে করে
দান, আমার আদেশে দারিদ্র্য করেছে
সার।
মৃত্যুকালে দুটি শিশু সন্তানের
তার মােরে করে গেছে সমর্পণ। পুত্র,
এমন অজ্ঞান আমি রেখেছিনু তারে,
বাল্যে রঘু ভৃত্যজ্ঞানে দেখেছে পিতারে।
ছিনু পুত্রহীন,--ব্রাহ্মণ-দম্পতী মাের।
পুত্র পেয়ে সুলক্ষণ-আত্মহারা
বালকে পুত্ৰত্বে দিছি স্থান,রঘুবীর
জ্যেষ্ঠ সহােদর, হারানিধি, সুলক্ষণা
শ্যামলী ভগিনী তাের। ঝঘুবীর-মুখে
আপন বংশের মুখ করি নিরীক্ষণ।
ভাই বােনে কাছে বসাইয়া, শুনাইয়া
শিখাইয়া, আমি ঋষিতুল্য গঠিয়াছি
ভীলের কুমারে ;
ঋষিকন্যা রচিয়াছি
ভীলের কুমারী । স্বামীত্বে কুমার দিছি
সৰ্বসুলক্ষণ। কামনার অপূরণ
বিন্দুমাত্র রাখিনি তাহার।
বাপ, আজি জীবনের সীমান্তে আসিয়া,
কিবা লােভে, কোন্ প্রাণে রঘুরে করিব
মাের ভীষণ তঙ্কর।-স্মরণে অন্তর
কাপে থর থর।—আমার আদেশে
পুণ্যময় জ্যোতির্ময় ব্রাহ্মণ-জীবন,
বল দেখি

৭১
রঘুবীর।
সুঘুবীর যঙ্গি পুনঃ পশে অন্ধকারে,
আমার কথায়, এত উচ্চ স্থান হতে
যদ্যপি পতন হয় তার, বলদেব
বা, হবে ব্ৰহ্মহত্যা-পাতক আমার।
বলদেব। তবে পিতা, অপঘাতে দিবে কি জীবন?
অহােরাত্র জীবনের আশঙ্কা বহিয়া,
অহােরাত্ৰ দারিদ্রের যাতনা সহিয়া,
শিলা জলে, প্রবল বাত্যায়, অশনির
তলে তলে মস্তক রাখিয়া, ভারাক্রান্ত
হৃদয়েয় সনে, বনে বনে সাধ করে
করিবে ভ্রমণ ? যেথা যাবে, সঙ্গে যাবে
সেখানে তাড়না-তুলিতে ক্ষুধার গ্রাস
মুখে উঠিবে না—এভাবে চলিবে কত
ক্ষণ ? পিতা, ভগ্নদেহে কতক্ষণ
রহিবে জীবন? শক্তিমান ভাই মাের
ইচ্ছা যদি করে, শমনের মুখ হতে
আনিতে যে পারে ছিনাইয়া! তবে কেন
দুরাত্মা জাফর, যমের কিঙ্কর সম
অসঙ্কোচে ঘুরিবে পশ্চাতে? বল পিতা
সহি তা কেমনে ?
পিতা, একবার বল-পায়ে ধরি বল
একবার,-“রঘুবীর, অপঘাত মৃত্যু
হ’তে, রক্ষা কর মােরে!”
অনন্তু। একি, একি! কারে দেখি রঘুবীর সনে।

২ রঘুবীর। (রঘুবীর ও শ্যামলীর প্রবেশ) এস মাগাে! বিপদের দারুণ পীড়নে নিপীড়িত ভ্রাতা পিতা এ হেন দারুণ দুঃসময়ে, কোথা হ’তে বিধাতা আপনি, সঁপেছে পিতার করে বিপন্না-রমণী। বড়ই কাতর- কণ্ঠে আজ, উর্দ্ধে চেয়ে ডেকেছি সহায়। মা শঙ্করী দাসী তার করেছে প্রেরণ। জননী! বুঝিয়া লও ভার।কিন্তু মাগাে! এখানে:কেমনে এলি ? কে দিলে সংবাদ ? এ হেন ভীষণ স্থান, কি করে শ্যামলী রাণী! পাইলি সন্ধান ? শ্যামলী। কি জানি কেমনে, সহসা হইল পিতা মন উচাটন। বসে আছি ঘরে, কে যেন কঠিন করে আকর্ষিয়া কেশে, আনি এই বনদেশে পিতৃ-পাদপদ্মমূলে দিয়েছে ফেলিয়া। অনন্ত। ক্লান্তিভরা মায়ের বদন। বলদেব, যাও মাকে ল’য়ে-বিশ্রাম করহ দান। শ্যামলী। এস ভাই। বহুদিন পরে, ভাই বোনে পুনরায় মিলেছি যখন,- চল সাথে- বসিয়া নির্জনে, সংসার-বিস্মৃতিভরা বন্যবধূ উপকথা কবি শ্রবণ। [ শ্যামলী ও বলদেবের প্রস্থান

৭৩
রঘুবীর।
অনও। ভাল কথা, কি করিলে স্থির রঘুবীর ?
রঘু। দুর্জন যেখানে থাকে, কৰ্তব্য সে স্থান
পরিহার। দেশ ছাড়ি, অন্যত্র গমন
আমি করিয়াছি স্থির।
অনন্ত।
আমি।
রঘু।
কিন্তু রঘুবীর,
জন্মভূমি স্বর্গের ঈশ্বরী!—জ্যেষ্ঠ পুত্র
তুমি বুদ্ধিমান। মত্ত মাতঙ্গের বল
বিধাতা করেছে দান। এমন সহায়
মাের, বার্ধক্যে যুবার বলে বলীয়ান
এ বৃদ্ধ বয়সে বাপ, তস্করের
ভয়ে, চৌরভাবে মাতৃপরিত্যাগ ভাগ্যে
ছিল কি আমার ?
প্রভুমুখে শুনিয়াছি –
জননী-জঠর হ’তে বিচ্যুত যে শিশু,
তার জন্মভূমি-সূতিকাগৃহের কোণে
বিঘত প্রমাণ স্থান। যেমন বিকাশ
পায় প্রাণ, সেই সঙ্গে জন্মভূমি বাড়ে
দিনে দিনে। ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধ কলেবরে,
ছােটে ভূমি ধরণী-সীমায়। শিখায়েছো
নিষ্কাম কামনা ; তবে, আজ কেন দাসে
এ ছলনা! ভিক্ষা মাগি পায়, ত্যাগ শিক্ষা
দিয়াছ আমায়। নীচ আমি, ভিত্তি ভাল
নয়, আদেশ করনা দাসে। আসিয়াছ
৭

৭ঃ
রঘুবীর।
লয়ে মহাপ্রাণ। ভীলদ আত্মহারা,
উন্মত্ত ছুটিয়াছিল মরণের পথে,
করুণাম ধরে তারে হে করুণাময়,
অঞ্জলি পূরিয়া দ্বিজত্ব করিয়া দান,
মিটায়ে দিয়াছ তার আকাঙ্ক্ষার ক্ষুধা ।
পুত্রে তার আত্মজ-আদর ঢেলে, কোলে
নেছ তুলে।
কর্তব্য সাধনে, দলিয়াছ
অম্লান বদনে, ঐশ্বর্যের জ্বালাময়ী
অন্তরের রেখা। পায়ে ধরি পিতা, দেখ
চেয়ে, কোথায় তােমার স্থান। পদরেণু
পড়ে আছে ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া-ভিক্ষা আশে
গ্রহশশী নীরবে চাহিয়া-মিলিল না
শ্রীচরণ সীমার সন্ধান। কোথায় আমি !
অতি তুচ্ছ কোথায় জাফর।
কোথা ক্ষুদ্র
সে গুর্জর—সেকি তােমারে ঘেরিতে পারে ?
প্রকাণ্ড প্রান্তর লয়ে, লয়ে বন, লয়ে
উপবন, সুনীল গগনস্পর্শী লয়ে
শৈলমালা, বিধাতার সৃষ্টিকাল হতে
আছে ধাঁধা-ব্রাহ্মণের ঘর। এস পিতা,
পুত্র কন্যা লয়ে, সে গৃহের এক পাশে
লইয়া আশ্রয়, সংসার-যাতনা যাই
যেবা মহাপ্রাণ, সাগর-মেখলা
ধরা জন্মভূমি তার ।
ভুলে।

রঘুবীর।
আয়ােজন। ততক্ষণ নর্মদা-সলিলে
সমাপিয়া সন্ধ্যা কাৰ্য আসি রঘুবীর !
[ উভয়ের প্রস্থান ।
চতুর্থ দৃশ্য।
নদীতীরস্থ পথ।
সখার মা।
স, মা। এ পথে গেছে ?-না ! নদীর দিকে গেছে? না!
তবে গেল কোথা?—উপে?না। সন্ধান ক’লুম, হাতে ধ’লুম
-স’রে গেল!-অমনি অমনি নয়-ঠেঙিয়ে গেল !-শুধুই মার
খেয়ে ম’লুম--কাজ হ’ল না! আমায় মার!-আমি নবাবুনী-
আমায় একটা উচা মেয়ে এসে ঠেঙিয়ে গেল !শােধ নিতে
পারব না! সখার মাকে মারু—জবাব দিতে পারব না!—কোথায়
গেল—এদিকে? না!—ওদিকে—না! বনে ? হু! বন ছুঁড়বাে
মাটী খুঁড়বে—আকাশে উড়বাে—যেখান থেকে পাব, সেখান
থেকে ধরে আবাে।-একি! বনের ভেতর থেকে বেরােয় কে?
-একি দাওয়ান মশাই!-ঠিক হয়েছে, মা কালী মুখ চেয়েছে!
ঠিক জবাব-অপমানের ঠিক জবাব দেবব-কথন ছাড়বাে না!
দোহাই মা, মুখ রেখে মা-জোড়া মােষ মা !
[ অন্তরালে গমন।

5.
৭৬
রঘুবীর।
অনন্ত।
( অনন্তরাওয়ের প্রবেশ)
অনন্ত। এ আমি কি কলুম!-নদার তীরে আসতে, পথ
ভ্রমে, এ আমি কোথায় এসে পড়লুম! ধীরে ধীরে অন্ধকার চারিদিক
থেকে ঝ'রে ঝ'রে সমস্ত স্থানটা গ্রাস করে ফেললে! কি করে
আবার গভীর বনে প্রবেশ করি! কেমন করে পথ পাই। সে
যে বড় দুর্গম স্থান! কেমন করে ফিরে যাই।—যা যা—কে
তুমি? প্রেতিনীর মত অন্ধকার আশ্রয় করে, ওখানে দাড়িয়ে
অছি-কে তুমি ?
স, মা। এই আমি বাবা ।
অমন ভীষণ স্থানে কেন ?—এদিকে এগিয়ে এসো।
স, মা। কেমন বাধবাধ ঠেছে বাবা।
অনন্ত। কোন ভয় নেই। নিঃসঙ্কোচে এগিয়ে এসাে।
ফেও, সখার মা।
স, মা। আহ্নিক করবার জল ছিল না, তাই নর্মদা থেকে
একটু জল নিতে এসেছিলুম।
অনন্ত। তা এত দূরে কেন সখার মা !
স, মা। এই ভিমরতি হয়ে গেছি বাবা! কাছ আর দূর, বড়
ঠাওর করতে পারি না।
অনন্ত। মিছে নয়, পাষণ্ডের অত্যাচারে সমস্ত দেশবাসীকে
জ্ঞানশূন্য করেছে, তা তুমি ত অধলা স্ত্রীলােক। ভাল, জল নিতে
এসেছিলে, কলসী কই ?
স, মা। আঁনতে অনিতে পোড়া জল চ’কে গেল বলে,
মনের দুঃখে কলসী কোমর থেকে সরে পড়েছে বাবা।
অনন্ত। তাহলে এখন একলা যাবে কেমন করে ?

ঘুবীর ।
স, মা। সেইটেই এই পথের ধারে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছি,
আর কলসীটা খুঁজছি। বােধ হয় ঘাটে ফেলে এসেছি।
অনন্ত। বেশ-খুঁজে দেখ।
স, মা। গা যে ছমছম করছে।
অনন্ত। আমি সঁড়িয়ে রইলুম।
[ প্রস্থান।
২ারামের প্রবেশ )
সঁখা। হা কী? এদিশে সখার মাকে দেখেছাে ?
অনন্ত। নর্মদা না কলসী ফেলে এসেছে-আনতে গেছে।
সখা। কেও দা ওসান মশায় ?
অনন্ত। হাঁ, কি সংবাদ সখারাম ?
সখা । পালাও - পালাও-দাওয়ান মশায় ?-বেটী খসাহে-
বের চর। বেটী তোমায় ধরিয়ে দেবে—দিলে বসি পাবে।
অনন্ত। বলিস্ কি ! তাের মার এমন আঁধঃপতন হয়েছে ।
সখা। আর বাবা! মাথার খামিজ না থাকলে মেয়ে মানুষের
যা হয়, তাই হয়েছে। পালাও- বাবা, পালাও।
অনন্ত। কোথা যাই সখারাম ! ঘাের অন্ধকার—আমি পথ
হারিয়েছি।
স। এস, আমার হাত ধর।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
( সখার মা ও লাঠীয়ালগণের প্রবেশ)
স, মা নির্ভয়ে আয়। বামুন এক সময়ও যদি কিছু
মা করতে পারবি, ত ক’বি কবে?
( সকলের প্রস্থান ও নেপথে কোলাহল।

৭
রঘুবীর।
( রক্তাক্ত কলেবরে সখারামের প্রবেশ )
সখা। কি--ক’রব!হ’লনা!-দাওয়ান মশায়কে ছিনিয়ে
নিয়ে গেল !—রাখতে পারলুম না।-মার খেলুম, মারতে পারলুম
। কেন পারলুম না!—সঙ্গে সখার মা !—সবার মার হুকুমে
ডাকাত বেটার দাওয়ান মশায়কে বাঁধলে! মুখে কাপড় দিয়ে
কথা বন্ধ করে দিলে! আমি মার খেলুম দেখলুম, কিছু বলতে
পারলুম না। কেন পারলুম না ?—মারতে গেলে আগে সখার
মাকে মারতে হয়। ডাকাত বেটার কে ? সখার মার চাকর
বইত নয়!—যদি যুদ্ধ হত—হওয়া উচিত ছিল সে বেটীর সঙ্গে।
কিন্তু সখার মাসে বেটী সখারামকে গর্ভে ধরেছে—স্বর্গের
চেয়ে উচু পায় নিয়েছে। সেই খানেই হ’ল গােল ! লড়াই
করতে মন এলাে—কিন্তু হাত এলােনা।
চতুর্থ দৃশ্য।
বনমধ্যস্থ কুটীর-প্রাঙ্গণ।
রঘুবীর ও বলদেব।
দেখ বলদেব, হিংসা, কথা ছেড়ে দাও।
তুলােনাকো জাফরের নাম। রাজ্যভােগ
অদৃষ্টে যদ্যপি তার থাকে, তুমি আমি
বাধা দিলে, হইবে কি সে ভােগের শেষ ?

" রঘুবীর। ধৰ্ম্মে হক, লােভে হােক, অথবা ঈর্ষায় কৌশলে কুচক্রে হােক, বিনা রক্তপাতে কি হােক নরক্তে ধরণী প্লাবিয়া হইবে কামনা পূর্ণ যখন যাহার, বাধা দিতে তার, নর-শক্তি অতি হীন- সম্পূর্ণ অক্ষম। পবিত্র গুর্জর রাজ্য, আৰ্য ঋষি-রাজ ছিল অধীশ্বর যার, সে রাজ্য যবন কোথা পেলে ? মরুভূমে সূৰ্য্যোত্তাপে নিত্য-দগ্ধ বালুময় স্থান, আর তার মূল্যবান্ খর্জুর পাদপ একমাত্র সম্পত্তি যাহার, সে যবন স্বর্ণপ্রসূ ভারতের সহস্র বীরের শিরে কি করিয়া পাতিল আসন ? তবে কার রাজ্য কে ল’য়েছে, আমি কেন মিছে কার ধন কারে দিতে রাজদ্রোহী হব ? ভাল, রক্ষা কর পিতারে তােমার। যদি পিতৃরক্ষা ধৰ্ম্ম তব হয় ; অপঘাত হ’তে যদি রক্ষা তার কর্তব্য তােমার, জাফরের প্রাণ লও। নহে পিতা মাের বাঁচিবে না। বাচিবার হয় যদি, পিতা" জাফরের সহস্রপীড়নে, বেঁচে রবে। অপঘাত মৃত্যু যদি নিয়তি তাহার; জাফরের রক্তে তাহা ধৌত নাহি হবে। বল!

বল।
রঘু।
বঁধুবীর।
অপঘাত মৃত্যু যদি নিয়তি তাহার,
তােমা আমা হতে তার প্রাণ যেতে পারে।
অসমর্থ কার্যের বিচার করে, মূর্থে দেখে
পাণ্ডিত্যে কালিমা। প্রাণ যার ধন, সেই
দেখে শৌর্যে বীর্যে পিশাচের লীলা।
ক্রুদ্ধ হইওনা ভাই! কুদ্ধ যেই, শুধু
আত্মনাশ কাৰ্য্য তার। পিতারে রাখিতে
যদি মানস তােমার, শান্ত হও, দেখ
চারিধার। ধীরভাবে প্রতিকাৰ্য কর
আলােচনা। সুমিষ্ট ঔষধে যদি হয়
রােগনাশ, বিষ পানে কিবা প্রয়ােজন।
পুণ্যবলে দ্বিজগৃহে লভেছছা জনম,
বর্ণের মর্যাদা তুমি রাখহ ব্রাহ্মণ !
হাতে পেয়ে কাল ভুজঙ্গমে, না ভাঙ্গিয়া
তুণ্ড মুণ্ড, ক্ষীরসরে করেছে তর্পণ।
এবে আদর করিয়া তারে, বান্ধি নিজ
বৃদ্ধ প্রভু-গলে, দেখাও সংসারে ভাই
অপূৰ্ব্ব মাহাত্ম-পরিচয়।
দেখে যা
সমগ্ৰ সংসার, দেখে বাক স্বর্গ হতে
দেবতা আসিয়া, দেখে যা শাস্ত্রকর্তা,
দেখে যা এক এক ধৰ্ম্ম-অবতার
আজন্ম তপস্যারত মহর্ষিমণ্ডল,
ধরাতলে মহাধৰ্ম্ম-প্রতিষ্টা কেমন ?
আছে পিত নীরবে তোমার মুখ চেয়ে।
ল।

রঘুবীর।
৮১
তােমার শক্তির পরে করিয়া নির্ভর,
নিশ্চিন্ত অন্তর, তব দত্ত উপহার
ননীর পুতলী হস্তে করেছে গ্রহণ।
অচলের অন্তরালে চিরছায়া মধ্যে
নিবসিয়া, জানে সে কোমলা বালা রবি-
কর কভু আর পারিবেনা পরশিতে
তারে। সে ত নাহি জানে কি ধৰ্ম্ম তােমার ?
ভাই, তারে কেন এ ছলনা! বৃদ্ধ পিতা
হয় লজ্জার বশে, মহত্ত্বে মায়ায়
আত্মবলি দিল তব ধৰ্ম্মের মন্দিরে।
বালিকার কি অপরাধ ? জান যদি
মনে জ্ঞানে—প্রতিশােধ লইবে না যদি
সব যায়, বলদেব অনন্ত পরীরে
একে একে যেতে দেখ রাক্ষস-উদরে,
কেন তবে বৃদ্ধ দ্বিজে সন্তান-মায়ায়
সুবৰ্ণ-কুসুম-লতা দিলে জড়াইয়া ?
কিবা তব অভিপ্রায় ?
অভিপ্রায় কিবা ?
অভিপ্রায় ? বলি কারে ? জলে অবিরাম
প্রতিহিংসা অন্তরে অন্তরে। চিরসুখী
স্থবির ব্রাহ্মণ, জীর্ণ শীর্ণ লােকে তাপে,
প্রাণ লয়ে বনে বনে করিছে ভ্রমণ,
সংজ্ঞা শূন্য,যেন এ সংসারে কেহ নাই
তার। কার কুটিলতা-বিষে জর্জরিত
রঘু।
বল।

রঘুবীর।
প্রভু তব, প্রভুভক্ত বীর? কেন এত
স্থির? সদা স্থিরতায় পুণ্য নাই। ভাই ।
সদা ক্ষমা কাপুৰুষে করে। তাই বলি
পুত্ৰত্বের প্রতিষ্ঠা লভিয়া, যার গৃহে
গৃহবাসী তুমি রঘুবীর, রক্ষা কর তারে।
ভাল ভেবে দেখি।
ফের ভেবে দেখি ।
রঘুবীর, প্রতিকার্যে চিন্তায় যে জন
শক্তির নির্ভর করে, আত্মহত্যা তার
বল।
পরিণাম।
( সখারামের প্রবেশ )
রঘু। একি!—কে তুমি ?—ক্ষতবিক্ষত কলেবর, সর্বাঙ্গে
রুধিরধারা -কে তুমি?
সখ। র’স বাবা! আমার এখন পরিচয় দেবারও সময় নেই,
আর দেখবারও সময় নেই। এখন তুমি
এখন তুমি কে বল দেখি বাপধন
যম ?
রঘু। আমি রঘুবীর।
খা। তাহলেই ঠিক হয়েছে। তাহলে বাপধন যম! তােমার
যমদণ্ডটা এই গরীব অনাথের কোমল স্কন্ধে একবার ঠেকিয়ে
দাও ।
রঘু। কেও সখারাম ?
সখা । এই যে বাপধনের মুন্সী চিত্রগুপ্তের খাতায় আমার নাম
উঠেছে।

রঘুবীর। রঘু। একি সখারাম! এ প্রকার অবস্থা কেন ?—এখানে কোথা থেকে এলে ? বল। কে তােকে সংবাদ দিলে ? সখা। যমের বাড়ীর সংবাদ আবার কে দেয় বাবা! নেয়ােত নেয়ােত। তাহলে প্রভু আচমন করে, এই গরীবের মাথাটার উপর একটু লােভ করুন। রঘু। তােমার এরূপ অবস্থা কেন?—কোন বিপদের সংবাদ এনেছো কি ?—এই বনের ভিতর কেহ কি তােমার প্রতি অত্যাচার করেছে ? সখা। অধম দাসকে আবার ছলনা কেন প্রভু! প্রভু মনিব- ভক্ষণ কাৰ্যেই নিযুক্ত আছেন, একদিনের জন্য একটা দাস ভক্ষণ করে দেখলে ক্ষতি কি? দাস বলে ভয় করবেন না। শাকান্ন ভক্ষণ কাৰ্যে এ অঙ্গে যে অস্থি সঞ্চয় করেছিলেম, দু চার বেটা লেঠেলের মনুগ্রহে সেগুলাে আজ ছাতু হয়ে গেছে! সুতরাং একবার যদি আপনি গালে তােলেন, তাহলে কলাই-ডাল মাখা অন্নগ্রাসের মত, • দাস অমনি চেনা রাস্তায় চলে যাবে, আপনাকে ডােকটী পর্যন্ত লতে হবে না। রঘু। লেঠেল কি ? সখ। আপনার দূত। রঘু। বল, তাের এরূপ অবস্থা কেন ? বিশেষ যদি আহম্ভ 'য়ে থাকি, তাহলে এই স্থানে দুদিন অপেক্ষা কর। সখা। সেকি বাবা! আমাকে কি কই মাছ পেলে যে, ন্যাজার দকটে ঝােলে দিয়ে, মুডাের দিক্‌টে জিইয়ে রাখবে ? রঘু। চ'লে যা পাগলা ! এ রহস্তের সময় নয়।

৮৪ রঘুবীর। সুখা। আর বাবা! তােমার অত্যাচারেই পাগল হতে হয়েছে। তিলােত্তমা মূর্তি ধ’রে সুন্দ উপসুন্দ দুটো ভাইকে খেলে। মা ভবানী সেজে শুম্ভ নিশুন্তের স্ত্রী দুটোর সিথের সিদূর মুছে নিলে। সীতা মূর্তিতে রাবণটাকে সবংশে ধ্বংস ক’রুলে। পঞ্চস্বামীর আদ- রিণী–অভিমানে এলান বেণী—আঠার অক্ষৌহিণীর দেহরক্তে জবজবে করে ভিজিয়ে, তবে সে বেণী বন্ধন করলে। আর কত ব’লব বাবা ধৰ্ম্মরাজ ! ছেলের কাটা মুণ্ড সেজে সিন্ধুরাজের মাথাটা উড়িয়ে দিলে। মুষল সেজে যদুবংশটাকে নস্তি করে ফেললে। আর এই প্রভুভক্ত ভৃত্যের মূৰ্ত্তি ধরে অনন্তরাওকে মুখশুদ্ধি করবার ব্যবস্থা করছ। রঘু। সে কি রকম? সখা। আর রকম কি ? এই যে স্বচক্ষে দেখে এলুম বাপধন যম ! রঘু। সে কি! সখা। এই যে বেদানাওয়ালার অনুচর—মামদো বেটার। দেওয়ানজীকে ধরে নিয়ে গেল ! রঘু। সেকি !—কোথায় ? কোন্ দিকে ? এতক্ষণ চাই মামদোর খপ্পরে। বলা। এতক্ষণে যােগ্যস্থানে দুর্বল ব্রাহ্মণ। রঘু। শ্যামলী !-শ্যামলী !--[ শ্যামলীর প্রবেশ )—এই একে নিয়ে গিয়ে—এখনি এর ক্ষতের শুশ্রুষা করে পাঠিয়ে দাও। বিলম্ব করােনা। [ সখা ও শ্যামলীর প্রস্থান। বল। আর কেন ভাই! পিতা গেছে যবনের কারাগারে

রঘুবীর।
দেবতা অনন্তরাও অবরুদ্ধ আর ফিরবে না।-উদ্ধার করতে
হলে রক্তস্রোতে গুজরাট ভাসাতে হয়! অযােগ্য সন্তান আমি
পিতৃরক্ষায় অসমর্থ। তাই তােমার সহায়তা ভিক্ষা করেছিলুম।
এখন কাৰ্য্যশেষ।-ভাই পিতার প্রতিনিধিত্ব নিজে গ্রহণ করে,
আমি তােমাকে আমাদের রক্ষার সকল দায় হ’তে নিষ্কৃতি দিলুম।
( প্রস্থানােত।
রঘু। যাও কোথায় ?
বল। আর তােমার গলগ্রহ হয়ে থাকবে কেন?
রঘু। হায় উন্মাদ বালক! মৃত্যুমুখে ছােট কেন?
বল। বিজ্ঞতা-আবর্তে পড়ে যদি কৃতজ্ঞতা ডুবে যায়, তাহলে
উন্মত্ততার অপরাধ কি ?
রঘু। তােমার দিকে দৃষ্টি রাখি—সে সময় আমার নেই।
ফের-আত্মহত্যা করােনা।
বল। আত্মহত্যার আর বাকী কি?—আমার বৃদ্ধ, সন্তান,
বৎসল পিতা-তিনিই যখন গেলেন, তখন আমি কই ?
রঘু। পিতা তােমার গেল—এ কথা বললে কে ?
বল। (অবজ্ঞার হাস্থ ) বেশ, না যান--যদি ফেরেন, তখন
আবার আবাে।
অজ্ঞান বৰ্বর ভীল পুরুষত্বহীন!
আর কেন, ছেড়ে দাও পিতারে আমার।
[ প্রস্থান।
রঘু। সত্য কথা ! তিরস্কার করিতে আমারে
যা বলিলে ব্রাহ্মণকুমার! প্রতিবর্ণ
সত্য তার। ডুবে বুঝি গেল কৃতজ্ঞতা।

রঘুবীর।
আজীবন বালকত্ব লয়ে, যদি আমি
থাকিতাম চিরমুখ বর্বর সন্তান।
উদরপূরণ সার ভেবে, যদি আমি
শুদ্ধমা আহার খুঁজিয়া-কভু চৌর্য্যে
কভু প্রাণীবধে, কভু দাসত্বে ভিক্ষায়
যাপিতাম মাের চিরদিন
; নগ্নদেহে
উন্মুক্ত হৃদয়ে প্রাণ ভরা আলিঙ্গনে
কিম্বা যদি করিতাম পশুরে আপন ;
সুখ বুঝি থাকিত আমার । কেন আমি
ব্রাহ্মণে ভজিনু ? কেন আমি তার কথা
শুনে আত্ম প্রশ্ন করিতে শিখিনু ? বাধা-
শুধু বাধা-বাধা যেন জীবনে করেছে
ক্রীতদাস। সময়ে কি অসময়ে, ভ্রমে কিম্বা
জ্ঞানে, কার্য্যে কি অকার্য্যে, প্রতিপদে বাধা
বঁধে দুৰ্বল চরণ। হে বিধি! সুমতি
দাও মোরে, অহঙ্কার বিচূর্ণ আমার ।
বিপন্ন ব্রাহ্মণ-আমি ভৃত্য। বিধিদত্ত
যে শক্তি আমার, হয় ত কণ্টক তার
মূলসহ উৎপটিতে পারি। নীচগৃহে
জন্ম মাের-আমার কি কাজ জনার্দন ?

পঞ্চম দৃশ্য।
জাফরের কক্ষ।
জাফর, শৃঙ্খলাবদ্ধ অনন্তরাও ও প্রহরীগণ।
জাফর। পারুবে না ?
অনন্ত। পারব না।
জাফর। পারুবে না ?
অনন্ত। কিছুতেই না।
জাফর। তুমি বন্দী, তােমার জীবন মরণ এখন আমার
হাতে। বৃদ্ধ বয়সে অপঘাত মরণই বুঝি শ্রেয় বিবেচনা করলে ?
অনন্ত। অপঘাত মরণ আর কামনা করে কে? তবে বৃদ্ধ বয়সে
পিশাচের হাতে ম’তে হ’ল বটে।
জাফর। তুমি উন্মাদ। এখনও বলছি, তুমি যদি আমার কথা
শোন, তাহলে অাবার স্বপদে প্রতিষ্ঠিত হতে পার।
অনন্ত। তুমি যেখানে নবাব, সেখানে দেবলই উপযুক্ত সচিব।
অযােগ্যকে আর সে পদ দেবার প্রয়ােজন নাই।
জাফর। তুমি হিন্দু হয়ে মুসলমান-কন্যাকে গৃহে স্থান দাও,
এ তােমার কত বড় বেয়াদবী।
অনন্ত। কি ক’ব, অদৃষ্ট। রেখে ফেলেছি, এখন আর তাকে
ত ত্যাগ করতে পারিনি।
জাফর। তুমি তাকে জোর করে ধরে রেখেছে। তার
অনিচ্ছায়, বন্দিনীর ন্যায় তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। যদি

.
রঘুবীর।
মঙ্গল চাও, যদি ভীষণ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে
পরীবাণুকে আবার মুসলমানের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দাও।
অনন্ত। মুসলমান হলে তােমার কাছে পাঠাবার কোনও
আপত্তি থাকত না। কিন্তু যে নরপিশাচ নিশ্চিন্ত নিদ্রিত প্রভুর
বক্ষে অস্ত্র মারতে পারে, সে কি মুসলমান ?
জাফর। জান বৃদ্ধ! কার সম্মুখে কথা কচ্ছ?
অনন্ত। একটা চোরের সম্মুখে। একজন শক্তিমান্ রাজা,
শত্রুদের বিধ্বস্ত করে, রাজ্যে শাস্তিস্থাপন করে, আপনার গৃহে
নিদ্রা যাচ্ছিল, ঘৃণিত তঙ্কর! সেই অবকাশে তার সােণর রাজ্যটা
অপহরণ করেছে। ঘূণিত প্রভুঘাতক! তােমায় আর ধিক কি
ব’লব, এদেশে মানুষ থাকলে, চোরের যথােপযুক্তই শান্তি হত।
সৌভাগ্য তােমার রাজ্যে লােক নাই। আমি বৃদ্ধ, চর-সঞ্চালনেও
অপারক, নহিলে এই মুহূর্তেই পদাঘাতে ওই অঘােগ্য মস্তক থেকে
রাজ্যের ভার অপসারিত করে দিতেম ।
জাফর। বদমাস কাফের !- বিনাশার্থে অস্ত্র উলেন)
—এ তাের উপযুক্ত শান্তি নয়।কৈ হয় ?
{ প্রহরীর প্রবেশ)
এই বুড়ো বদমা ডাকুকো ঠাণ্ড গারােদে নিয়ে যাও। কাল
ফজরে, বাজারের মাঝখানে-সকল লােকের সানে, দেয়ালের সঙ্গে
গেঁথে মেরে ফেল। এক কোপে কাটলে মরণের মজা টের পাবে
। যাওজদি সানেদে লেযাও। কি ব’, তাের নিজের
স্ত্রী নাই; থাকলে, এই এমনি করে (পদাঘাত ) কে পদ
জলিত করে, বান্দার বঁাদী সাজিয়ে এ অপমানের প্রতিশােধ নিতু।
যাও - লেখাও।
[ প্রহরী ও অনন্তয়ের প্রস্থান।

বঁধুবীর ।
(অদিক দিয়া দেবলের প্রবেশ )
দেবল। কি ক’লেন জনাব!
জাফর। কিসের কি কলু?
দেবল। অনন্তরাওয়ের কি ক’বুলেন ?
জাফর। দেয়ালে গেঁথে মারতে হুকুম দিলুম্।
দেবল। সর্বনাশ! কলেন কি! ফিরিয়ে আনুন—জনাব ।
ফিরিয়ে আনুন।
জাফর। কেন দেবল! ভয় পেয়েছে না কি?
দেবল। ফিরিয়ে আনুন জনাব–ফিরিয়ে আনুন। যতদিন
মা রঘুবীরকে ধরতে পারছেন, ততদিন কারাগারে নিক্ষেপ করুন,
প্রাণে মারবেন না।
জাফর। ও—সেই রঘুবীর! সেই গোলামের ভয়ে অস্থির
হয়ে তুমি আমাকে নিষেধ করতে ছুটে এসেছে !
দেবল। জনাব! যদি মঙ্গল চান, তা হলে হুকুম র
করুন—-বৃদ্ধকে প্রাণে মা’রূবেন না।
জাফর। এই রকম প্রাণ নিয়ে তুমি রাজ্যশাসন করবে?
দেবল। প্রাণ থাকলে ত শাসন! সে রঘুবীর থাকতে
কিছু হবে না।
জাফর। হবে না ?
দেবল। কিছুতেই নয়।
জাফর। হবে না ?
দেবল। কিছুতেই নয়।
জাফর। কৈ হয় তা হলে আর একদণ্ডও বিলম্ব ক’রুহি
ল। এখনই তাকে ফিরিয়ে তােমারই সম্মুখে তার জীবলীলার

রঘুবীর।
অবসান করে দিচ্ছি। কৈ হ্যায়।-নেপথ্যে হুজুর !) কয়েদীকে
ফিন্ লে আও।
দেবল। দোহাই জনাব, উন্মাদ হবেন না। রঘুবীর!-সে
ভীষণ রঘুবীর!-ইচ্ছে করলে, এখনি ছাত থেকে ঝরে পড়তে
পারে, দেয়াল ফুড়ে গজিয়ে উঠতে পারে। ফিরিয়ে আনুন—কারা-
গারে নিক্ষেপ করুন, দেয়ালে আঁথবেন না, মারবেন না ।-
জনাব !-জনাব !
জাফর। কি হ’লকি হ'ল !
দেবল। আমি নই—দোহাই আমি নই।
জাফর। কে তুই ?—কে তুই ?
রঘু।
(রঘুবীরের প্রবেশ ও দ্বারাবরােধ)
চিনিতে কি পার জাহাপনা ? আরে আরে !
তুমি যাও কোথা? (দেবল ও জাফরকে ধারণ)
একি, একি! পাপম্পর্শে
পূদেহ এত কল্পবান্! নাও ব’স।
ভয় কেন ? সুবিজ্ঞ দেওয়ান, এ রাজ্যের
ভার তব শিরে। কোমল রমণী-প্রাণে-
পরশিয়া পুরুষের অঙ্গ সমীরণ,
হৃদে যার তরঙ্গ তাড়ন, হেন নারী
বক্ষ বুকে ধরে, কভু রাজ্য কি শাসিত
হয় বীর ! মৃত্যু দেছে সহস্র-সংসারে।
শােকাত্তের করুণ চীৎকারে, ভরায়েছে।
গুঞ্জরের নিস্তব্ধ-গগন। জান ত হে-

রঘুবীর।
সে রােদনে আছে প্রতিধ্বনি ! মহাকার্যে
পুরস্কার আছে মহাফল ! ফল ল’তে -
কম্পিত অন্তর । ছি ছি বীরবর! দেখ
চারিধারে, কারা ছুটে কাতারে কাতারে
আমারে করিতে আবেদন! জ্ঞানচক্ষু
করি উন্মীলন, চেয়ে দেখ নরাধম !
তীব্র-স্মৃতি ভীম আকর্ষণে, ওই দেখ
শত শত বিগত জীবনে উঠেছে কি
তীব্র কোলাহল ! প্রতিহিংসা-প্রতিহিংসা-
প্রতিহিংসা গায়। বিষাদ-প্তরঙ্গভরা
শােকাশ্রু অঞ্জলি, একবাক্যে ভিক্ষা চায়
প্রতিহিংসা-হত্যা কর জাফর দেবলে।
দেয়ালে দেয়ালে ফোঁটা, হের করে ঢল
ঢল যুগল নয়ন, সুধাধারে করে
আবেদন –পিতৃহীনা-রক্ষা কর মােরে।
ওই দেখ নবাবের বিমল বদন,
পার্শ্বে তার অমনি ফুটিয়া, আঁখি ঠারে
আমারে দেখায় শত আদেশের বল
ইঙ্গিতে বাঁধিয়া শুধু বলে হত্যা কর
জাফর দেবলে! কি করা কর্তব্য মাের
অনুমতি কর জাহাপনা!
জাফর। তুমি !—তুমি রঘুবীর ?
ভুলে গেছ! আমি রঘুবীর।
জাফর। হত্যা আশে যদি আসা গভীর নিশায়,
রঘু।

৯ ২ ঘু। ঘুবীর। এখনিই প্রাণ লহ মাের, অন্য কথা নাহি প্রয়ােজন। কোন্ প্রাণে, কি সাহসে বলিলে যবন ! ভােগতৃষ্ণা মিটিল না ; নবাবে মারিয়া ধনে প্রাণে, তবু তব তৃপ্তি আসিল না ;-স্থবির ব্রাহ্মণ, প্রতি পদে কম্পিত চরণ, নিজের শরীর- ভারে সর্বদা কাতর, যষ্টিতে করেছে ভর,—প্রতিক্ষণে বসিয়া রয়েছে বৃদ্ধ মৃত্যু প্রতীক্ষায়, তবু তারে ঘরে রেখে মন বুঝিল না।—এমন প্রাণের মায়া। বুঝিয়া সে বৃদ্ধে অসহায়, স্থির জেনে বচন মরণ তার তােমার কৃপায়, তবু, চুরি করে এনেছে তাহারে। • এত ভীত! এমন জীবনে মায়া!—প্রাণ নিতে কোন্ প্রাণে বলিলে জাকর? একদিন যে সাগরে ছিলে ভাসমান, সে সিন্ধুর নাহি ছিল সীমা। নর্মদার আবর্তের পাকে পাকে ঘুরে, কথায় কথায় যবে পশেছিল জল; সে সময় মৃত্যু যদি করিতে কামনা, সাজিত তখন। শেষে হতভাগ্য নবাবের বিশ্বস্ত নিদ্রায় এ হেন গভীর নিশা করিয়া আশ্রয় আশাতরু করেছে রােপণ। কল তার রঘুবীর। করিছ ভক্ষণ। এ সময় জাহাপনা, মরণ কামনা ! ভীরু মেযেঙ্গ সংহারে উদ্যোগে হয় না প্রয়ােজন। তাই যদি, হবে কেন চৌভাবে পশিলে আমার জাফর। রঘু। পুরস্কার দিবে বলেছিলে, তাই আসিয়াছি—আসিয়াছি ল’তে পুরস্কার। এ কণ্টক বাঁচিলে পরাণে, নিরাপদে রাজ্যভােগ হবেনা তােমার। রাজ্যভােগ যদি চাও, আগে নিষ্কন্টক হও। লও- এই লও ছুরিকা ভীষণ। যে কণ্টকে হিন্দুস্থানে কত দ্য বিদ্ধ হয়ে ছেড়ে দেছে সু-ব্যবসায়, আগে তারে ফেল উপাড়িয়া। ধর ধর্ম-অবতার । ধয় ধর, কঁপে কেন কর ? ত্বরা মােরে দাও পুরস্কার। তােমার জীবন রেখে প্রভুদ্ৰোহী আমি। আমার উচিত শাস্তি ভব করে প্রাণ বিসর্জন। রঘুবীর ! ক্ষম্ম কর মােরে। বল তবে কোথা প্রভু মম ? সে যেহে সৰ্ব্বত্যাগী-তারে কেন ধরিয়া আনিলে ? জাফর। কযু।

রঘুবীর। জাফর। কই হয়?-নেপথ্যে হুজুর!)—ব্রাহ্মণকে জলদি খােলস দেকে হিঁয়া লে আও। ( প্রহরীগণ কর্তৃক অনন্তরাও ওঁ বলদেবকে আনন) জাফর। দেবল! বন্দী শৃঙ্খলমুক্ত হাে’। ( প্রহরীগণ কর্তৃক শৃঙ্খল মােচন) বল। দাদা! দাদা! আজ বড় আনন্দের দিন। প্রতিশােধের এই সময়। দুরাত্মা যবন ! ( পদাঘাত) রঘু। কি কর—কি কর, আত্মহারা - উন্মত্ত যুবক! বালক—বুঝতে পারেনি—অপমানে পারেনি—অপমানে জ্ঞানশূন্য। নবাব ! ক্ষমা কর। রঘু চলে এস ; নরাধম পুত্র এমন উদ্ধত ! [ রঘুবীর, অনন্ত ও বলদেবের প্রস্থান। দেবল। জনাব ! বড় লেগেছে কি ? জনাব! জনাব ! জাফর। দূর হ কাপুরুষ ! আমার সামনে থেকে এখনি ( পদাঘাত)। [ গড়াইতে গড়াইতে দেবলের প্রস্থান। ও-এত অপমান! কি করি ; কি করি? ওই কীটামুর্কীটের অপমান উদরস্থ করে, আমাকে রাজ্য করতে হবে। তার চেয়ে মৃত্যু ভাল। এই পশ্চিমে চেয়ে প্রতিজ্ঞা ক’ছি, যদি এই কীটদংশন হতে অব্যাহতি পাই, তবেই এ রাজত্ব করবো, নইলে যে ফকীর ছিলুম,সেই ফকীর হব। প্রতিজ্ঞা করলুম-অনন্ত- রাওয়ের সম্পর্কে যে কেউ থাকবে, তারেই মেরে ফেবাে-রঘুবীয় -কে রঘুবীর কিসের জীবনরক্ষা! তার জন্য এত অপমান এত লাঞ্ছনা! কিছু রাখবে না—অনন্তরাওয়ের সম্পর্কে কিছু

রঘুবীর ।
রাখবাে না। কিছু নয়—উপকার কিছু নয়। দুরভিসন্ধি-সয়তানী
-মারোমারাে-কাফের মারাে।
उपब्छे ।
প্রথম দৃশ্য।
কুটীর প্রাঙ্গণ।
রঘুবীর ও শ্যামলী।
সদা ভয়—কখন কি করি। দস্তগৃহে
জন্ম মাের,-কঠোরতা—জীবনের বীজ
উপাদান। সদা ভয়-আপনা হারায়ে
কবে কার সর্বনাশ করি। জন্ম সঙ্গে
জন্মেছে যে নীচ নিষ্ঠুরতা—জন্ম সঙ্গে
পেয়েছি যে শােণিতের তৃ-দ্বিজ-দত্ত
জ্ঞান-আবরণে, অনাদরে এতকাল
অর্ধমৃত প'ড়েছিল হৃদয়ের মাঝে ।
কিন্তু হায়! মরণ ত হলনা তাহার ।
গগনের সীমান্তে বিষম বাত্যায়
উত্ত্যক্ত সিন্ধুর কোলে, উন্মত্ত তরঙ্গে

== রঘুবীর। ব্যবচ্ছিন্ন ফেনিল নর্তন, যেই মত মাঝে মাঝে, দূরে—অতিদূরে, শ্যামছায়া বিলাসিনী বেলাভূমি দেয় ঝাপাইয়া, পিশাচের আচরণ ঘায়, হৃদয়ের নিভৃত গুহায়নিদ্রালসা প্রতিহিংসা- প্রবৃত্তি আমার, সেই মত তুলি বুঝি বিষম ঝঙ্কার,-এইবার শােন্ বােন! বলদৰ্পে সে চাহিবে চারিধার,সেকি প্রবােধ মানিবে আর ? ক্ষুধিত শাৰ্দল, সে কি হরিণীর আকৰ্ণ-বিশ্রান্ত চোখে নিরথিতে বিধাতার তুলির কৌশল নিশ্চল বসিয়া রবে ?—কি করি শ্যামলী ? শ্যামলী। চিত্তের প্রশান্তি লাভ সে ত বিধাতার করুণায়। কর্মক্ষেত্রে করি অবস্থান, আজন্ম তুষার ভরা স্থির হিমাচল হৃদয়ের পঞ্জরে পঞ্জরে জ্বালামুখী বায়ুকণা আজীবন রয়েছে মাখিয়া। উষ্ণ নয়নের জলে তার, জন্মিয়াছে কত শত উষ্ণ প্রস্রবণ। শান্তি চাও, কর ভগবানে আত্মসমর্পণ। তারে স্মরি, পথ চলে যাও। পথের কণ্টক- শিরীষ কুসুমরাশি সম-সন্তর্পণে, নিষেবিবে ব্যথিত চরণ। আগে হ'তে তবে কেন চিন্তান্বিত ধীর রঘুবীর। ৯৭। ঘু। আগমনে যদি প্রাণে করে দিই অনল সংযােগ বারুদের কণামত, বিষম প্রচণ্ড বিস্ফারণে, ব্রাহ্মণ-নির্মিত এই হৈম (হৃদয়ে হস্ত দিয়া) অট্টালিকা মুহূর্তে কি চূর্ণ হয়ে যাবে ? একদণ্ডে হব কি দানব ? একদণ্ডে জীবনের এত মধুরতা, নিমজ্জিয়া দিব কিহে অনল সাগরে। তমােরাশি সম্মুখে আমার,-যেন যাই-কোথা যাই। স্বপ্নের নিবৃত্তিশূন্য অদম্য গমন যেন ফিরিতে ভুলিয়া গেছে। যেন বাধা দিতে, তটিনী হয়েছে পথরেখা। মরুভূমি কোমল শ্যামল তৃণ ভরা- দৃষ্টি আকর্ষী সম নন্দন কানন । কঠোর নির্মম শিলা চরণ পরশে গ’লে যেন শিশিরে হয়েছে পরিণত। বল দেখি প্রাণময়ী! এমন যতনে জীবনের খাদ্য আহরিয়া, অবশেষে মরে যাব ক্ষুধায় তৃষ্ণায় ? শ্যামলী। ভীলনারী- শাস্ত্রজ্ঞানহীনা। তবে, তােমার চরণ- প্রান্তে বসে, যা কিছু শিখেছি এতদিন, তাতে মাের এই মাত্র জ্ঞান-এ সংসারে | . কেহ কারে করেন সংহার। প্রাণ বধে । খুবীর। নিজ হস্তে প্রাণ-অধিকারী। প্রাণ রাখে, যে ধীর বুঝেছে ভাল প্রাণের মমতা। অতৃপ্ত হইতে প্রাণ এসেছে ধরায়, অতৃপ্তিই সাধ তার। মায়ের আদরে পুষ্ট, দুষ্ট শিশু যথা, নিত্য নব তুলে আবদার, মায়ের প্রহার লােভে, নিত্য নব নব আকিঞ্চনে জননীরে করে জ্বালাতন,—প্রাণও তেমন, ক্ষীর মুখে দিলে চায় নিষের আস্বাদ। নিষ দাও। তৃপ্তি দেখাইবে তার মুখের বিকারে। ফল কথা, আত্মতৃপ্তি ছায়া মরীচিকা। তৃপ্তি যেথা, গতির নিবৃত্তি সেথা। তাই দেখি, তৃপ্তি তৃপ্তি করে উন্মত্ত জীবন- স্রোতে নিত্য অভিনব উঠিছে তরঙ্গ। তাই দেখি তৃপ্তিলােভে সৰ্বস্ব করিয়া দান, কেহ আরো দানে করে আকিঞ্চন। অদমর্থ সৰ্ব্বত্যাগী চারু করতলে অবশেষে ভােগ করে বিক্ষোট যাতনা । তৃপ্তি লােভে কেহ কুরে জীবন সংহার, কেহ রাজ্য দেয় ছারখার। পিতৃহীন বালকের সর্বস্ব কাড়িয়া, দেয় তারে শ্যামতৃণে সুন্দর আসন শিরপরে নীলাকাশ চারু আচ্ছাদন। তৃপ্তি লােক্তে কেহবা রাজত্ব করে, কেইবা দাসত্ব রঘুবীর। করে জীবন কাটায়। যা তোমার লাগে ভাল, তাই কর ভাই! আমি শুধু এই চাহি অনুমতি, আমার যা ভাল লাগে, আমারে করিতে যেন ক’বােনা নিষেধ। এই মাত্র আমি বুঝি। শাস্ত্রমতে প্রভু যদি পরম দেবতা, প্রভুরক্ষা যদি ধর্ম হয়, তবে অন্নদাতা জ্ঞানদাতা পবিত্র ব্রাহ্মণ-অঙ্গে বেষ্টনী হইয়া স্থিতি কাৰ্য্যই তােমার। তাই বটে বােন্। কিন্তু ধৰ্ম্ম করেনা ত অন্ত্রের প্রহার ! নীরবে প্রভুর গায় সংলগ্ন হইয়া শুধু সে প্রহার সহ করে। শ্যামলী। শুনিয়াছি ধর্মের রক্ষণে, অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী প্রাণী, মুহূর্তে মিশায়ে গেছে কুরুক্ষেত্র- সমর-সাগরে। নিজে তগবান কৰ্মী- সারথির রূপে ধৰ্ম্মরথে আবােহিয়া, আপনি দেখিলা প্রভু সহাস্য বদনে বট্‌ত্রিংশ অক্ষৌহিণী-আঁখি-নিমীলন। তবে তুমি কেন পারিবে না ? ব্রাহ্মণের জীবন রাখিতে, ধৰ্ম্মপ্রতিষ্ঠার তরে, যবন-যবনাধম জাফর দেবলে যদি ধরা হতে দাও পাঠাইয়া, সতে S কিবা ?

রঘুবীর।
তবে বােন! শােন অবধানে।
একদিন নর্মদার ভীম গ্রাস হতে
রেখেছিনু দুরাত্মা সে জাফরের প্রাণ।
একদিন নিদাঘ সন্ধ্যায়, ক্ষুদ্র এক
তরণী সদর, দেখিলাম আসিতেছে
তটিনীর পারে। সহসা উঠল ঝড়
প্রবল বাত্যায়, নিমেষে ডুবিয়া গেল
তরী। দৈববশে ছিঃ তার তীরে। চেয়ে
দেখি, নদীর জলে, তরঙ্গের ভীম
কোলাহলে, জীবনে মরণে টানাটানি
মায়া আর নিয়তির ভীষণ সংগ্রাম।
রণরঙ্গে আহ্বানে স্ফালনে, ঘাের রবে
ফেনিল-বদনা ভীমা নর্মদা প্রকৃতি
আর্তনাদে করিছে মজ্জন। হেরি আমি
সে দৃশ্য ভীষণ, রহিতে নারিনু স্থির
তীরে। ভবানী স্মরণ করি পড়িলাম
উন্মত্ত সলিলে, কিন্তু হায়! সে তরঙ্গ
বাধা ঠেলে উপনীত হইতে হইতে,
তরঙ্গিণী গ্রাসিল সবারে, বহু কষ্টে
শুধু মাত্র একেরে বাঁচা। সে তােমার
দুরাত্মা জাফর। ফল-ব্যবসায়ী বেশে
সবে মাত্র এ অভাগ্য দেশে তার সেই
পদার্পণ। বল ত খামলী প্রাণময়ী
মন্ত্রী-স্বরূপিণী তুমি, প্রত্যেক কার্যে

রঘুবীর। মাের অর্ধ ফলে তব অধিকার ভেবে, বল ত শ্যামলী। প্রকৃতি আপনা হতে যে কাৰ্য্য সাধিতে গেল, আমি কেন বাধা দি তারে ? নর্মদার উন্মত্ত সলিল যে সময় নরাধমে গ্রাসিতে ছুটিল, পাষণ্ডের প্রাণ নিরখিয়া, গুৰ্জ্জুরের রক্ষাকাৰ্যে প্রহরিণী—সতর্ক তটিনী যে সময় শত্রু আক্রমণ তরে অগ্রে ধরেছিল, আমি কেন করিনু উদ্ধার ? আমারে দেখিতে পেয়ে, লজ্জিতা প্রকৃতি আমারে কি দিয়ে গেল বিনাশের ভার । প্রাণ রেখে, প্রাণ হত্যা করিব কেমনে । শ্যামলী। তবে চল, রাজ্য ছেড়ে এত দূরদেশে চলে যাই, যেথা পঁহুছিতে না পারিবে দুরাত্মার করের প্রসার। বঘু। হৃদয়স্থ হৃষীকেশ ! ধর্মাধর্ম তুমি জান প্রভু!—শুধুমাত্র সাহস ভিক্ষায় পদ পানে আছি তাকাইয়া। কিন্তু কই দেখা ত দিলে না প্রভু!—বােঝ ত হল না ! সাহস ত এলােনা আমার নহে এই দণ্ডে মুণ্ড ছিড়ে দুই দুরাত্মার, রক্ত- রাগে জবাপুষ্প সম, তব পাদপদ্মে প্রভু দিতাম অঞ্জলি !—তখন শ্যামলী তাই চল । {

রঘুবীর।
মহাপুণ্য অর্জন বিশ্বাসে, স্ফীত বক্ষে
দম্ভভরে চলিতাম ধরণীর বুকে।
কিন্তু হৃষীকেশ,-কোথা বােন হৃষীকেশ ?
বৰ্ব্বর-হৃদয় মধ্যে যদি স্থান তার,
তবে কেন এ সংসারে জাতির প্রভেদ
এত ? কেন—শুধুমাত্র ঘৃণার অর্জনে
কেন আমি ভীলনারী-জঠরে পশিমু ?
এক কাৰ্য-এক রক্তপাত, তবে আমি
কেন দস্যু হই, আর ধরণী-ঈশ্বর
কেন পায় পুষ্পমালা প্রতিমূর্তি গলে ?
হ’লন শ্যামলী, চলে চল। নারী তুমি-
মানবের দেহ সঙ্গে বাঁধিতে জীবন
সূত্র দিয়ে পাঠায়েছে বিধাতা তােমায় -
বিধাতার চরম কল্পনা, তুমি যদি
না আসিতে, জনমের সঙ্গে সঙ্গে, ধর।
যেতে রসাতলে।-নারীমুখে জিঘাংসার
কথা ! -না শ্যামলী, চল যাই অন্য পথে।
[ উভয়ের প্রস্থান ।

দ্বিতীয় দৃশ্য ।
বন।
শ্যামলী ও দুলিয়া।
শ্যামলী। ওরে মিসে! ঠাওরাচ্ছিস্ কি বল্ দেখি ?
দুলিয়া। দুই ঠাওরালি কি বল্ দেখি ?
শ্যামলী। ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্ম করে ত ভাই আমার উন্মাদ-ও হতে ত
কিছু হয় না। ওর ওপর নির্ভর করলে ত বামুনের সর্বনাশ হয়।
দুলিয়া। রঘু মহারাজ যদি কিছু না করে, তাহলে আমরা
কি কব ?
৭১
শ্যামলী। তবে কি ক্ষমতা থাকতে—প্রতিকারের শক্তি থাকতে
ব্রহ্মহত্যার পাপভাগী হবি ?
দুলিয়া। কি ক’ব বল!
শ্যামলী। আমি বলি—দেশ থেকে আমাদের ভীল ভাইদের
নিয়ে আয়। নইলে এ অত্যাচারের দমন হবে না।
দুলিয়া। আলেই কি প্রতিকার হবে ?
শ্যামলী। এই ত আমার বিশ্বাস ।
দুলিয়া। তবে এনিছি।
মিলী। সেকি ।
দুলিয়া। তবে ঠাওরাচ্ছি কি!-আমি কি রঘুয়া মহারাজের
মতন পাগল নাকি। রঘুয়া মহারাজ বামুন হয়ে গেছে, আমরা ত
আর হইনি। আমাদের দেহের ভীল-রক্ত অত্যাচার সইতে জানে

৬৪
বঁধুবীর।
না। , অত্যাচারের নাম শুনলে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছুটোছুট
করে বেড়ায়।-আমি কি চুপ করে আছি।
শ্যামলী। সত্যি!
দুলিয়া। জাত ভাইদের দিয়ে বন ভরিয়ে রেখেছি।এখন
সব লুকিয়ে আছে, কিন্তু দরকার হলে, পিলপিল করে বেরিয়ে
দেশ নাস্তা নাবুদ করে ফেলবে।
শ্যামলী। দুলিয়া! সামান্য রমণী আমি, কিন্তু মনে মনে আমার
বড় অহঙ্কার—ভাই আমার রঘুবীর স্বামী আমার দুলিয়া। দুলিয়া !
বৰ্প ক'রে এক অবলা আর এক অবলার ভার নিয়েছে। আমি
দর্প করেই নিশ্চিন্ত, কিন্তু দর্প রক্ষার ভার যার, সে আমার
সম্মুখে।
দুলিয়া। আমি আগে একটা কথাও কইছি না,-দেখিনা
রঘুয়া মহারাজের ধর্ম কি করে ! যেই দেখবাে গতিক খারাপ, অমনি
টপ, ক'রে দিল খুলে দেব।-দেখবো কোন্ বেটা শয়তান কেমন
করে মনিবের কাছে আসে। কিন্তু আগে কিছু ক’রূতে পারূবােন।
শ্যামলী । ভয় করে—পাছে গুরু রাগ করে। গুরুর ক্রোধ-শ্যামলী।
মনে হলে গা সিউরে ওঠে। গুরুবাক্য অবহেলার ভয় যদি না
থাকতাে, তাহলে কি বেটা নেড়ে মনে মনেও পরীকে পাবার
কামনা করতে পারে। মনের ভেতর পরীর কথা না উঠতে উঠতে,
বেটার মনে ভােজালি পূরে দিতুম না! বেটা লােহার সিন্ধুকে
থাকলে, তার ভেতরে সিধ লাগাতুম। কি ব’ রাঙা বউ !--হাত
পা বাধা-ম’রে আছি।
শ্যামলী। চুপ করু—দাদা আছ।
দুলিয়া। তাহলে আমি পালালুম। আমার ওপর দুখানা

রঘুবীর।
ডুলি আবার হুকুম হয়েছে।—দেখি-আমি ফ ব’লুম, যেন
তাের দাদাকে বলিসনি।
শ্যামলী। তুই কি পাগল!
[ দুলিয়ার প্রস্থান।
(রঘুবীরের প্রবেশ)
রঘু। দুলিয়া ছেল না?
শ্যামলী। ছেল—এখন ভুলির চেষ্টায় গেল।
রঘু। সে ত অনেকক্ষণ বলেছি,এতক্ষণতাহ'লে ক’ছিল কি ?
শ্যামলী। হাঁ দাদা! দুখানা ভুলি আনতে ব’ললি যে?
রঘু। একখানা বাবার জন্য, একখানা পরীর জন্য। বলদেব
হেঁটে যাবে—অশক্ত দেখলে কাঁধে নেবাে।
পরীর প্রবেশ)
পরী। পরী তােমার ডুলিতে চড়ছে না।
রঘু। নাহ'লে যেতে পারবি কেন ?
পরী। পরী তােমার-ওই উচু পাহাড়ের ওপর তিনবার খড়া
বেয়ে উঠেছে, ওখান থেকে তিনবার ঝাপ খেয়েছে। তােমার পরী
আর সে পরী নেই।
রঘু। বলি কি?-পরীকে এ সকল বুদ্ধি দিলে কে? তুই
বুঝি!
শ্যামলী। আর কি করি। তােমরা হচ্ছ বামুন মানুষ-সাধু
লােক। আমরা হচ্ছি ভীল। অত সাধুগিরি আমাদের ধাতে সয়
। কি বলিস বােন্! কাজেই একটু লাফালাফি দুপােদুপি, হ’ল
বা লাঠীটে, হ’ল বা সড়কীটে চালাচালি শিখতে হয়। হ’ল বা

রঘুবীর। খানিকটে মল্লযুদ্ধই করলুম।—তােমরা এখানে নেই, এমন সময় হঠাৎ অবল মনে করে যদি নেড়ে বেটার কোন সেপাই শাস্ত্রীই ধ’তে আসে, তাহলে তার চুলের মুটীটে ধরে, বার কতক হয়ত ঘােরপাকই খাইয়ে দিলুম। বধু। ব’লিস্ কি, অবাক করলি যে ! পরী। বােন্ যতটা ব’লছে, তত নয়—তবে কিছু কিছু দৌড় ঝাপটা শিখেছি বটে।আর শিখেছি আত্মরক্ষা। দাদা! প্রাণের যাতনায়, নারীর মর্যাদা রক্ষা করবার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলুম। দীননাথ কৃপা করেছেন -অামার মনের কথা ভগ্নীকে বলে দিয়েছেন। শ্যামলী আমাকে আত্মরক্ষা শিখিয়েছে। সম্মুখে আমার গুরু। গুরু কৃপায় পিশাচের আক্রমণকে তুচ্ছ কবার হৃদয়বল সংগ্রহ করেছি। আমার পাগলিনী ভগ্নী এমন অসমসাহসিনী-লজ্জায় ভাই তােমায় ব’তে পারিনি। শ্যামলী। পরীক্ষা চাও-দিতে প্রস্তুত আছি। বধু। আর পরীক্ষায় কাজ নেই, বুঝতে পেরিছি। লজ্জা কেন পরী! ভবানীর শ্ৰীচরণ প্রান্তে তােদের ফেলে রেখেছি। মা নিজে প্রতিকারের ব্যবস্থা করেছেন। শুনে, আমি এক মুহূর্তে সহস্র মাতঙ্গ- বলে বলীয়ান—আমি নিশ্চিন্ত।—তবু সাবধান! আমরা যখন না থাকবো, তখন এস্থান কোন মতেই ত্যাগ করাে না।

তৃতীয় দৃশ্য।
অরণ্যপথ।
মঃ, ও দুলিয়া।
অনু। কোথায় দুলিয়া ?
জুলিয়া। ডুলির চেষ্টায় গায়ে যাব।
মন্ন, । আর যেতে হবে না-ফের।
দুলিয়া।
কেন বল দেখি ।
মনু। এবারে ব্যাপার কিছু কঠিন।-কাতারে কাতারে সৈন্য
নিয়ে নিজে জাফর এসে বন দখল করতে আসছে ।
দুলিয়া। দেখেছিস ?
মনু। প্রথমে লােকমুখে শুলুম যে, ডাকাত ধবার জন্য
নবাব সৈন্য সামন্ত নিয়ে আছে।-কোযা ডাকাত ? এই বনে ।
কে ডাকাত ? তা বলতে পারূলে না।—সন্দেহ হ’ল বনে ঢুকে
এক প্রকাণ্ড শালগাছের ডগায় উঠলুম। উঠে দেখি, কাতারে
কাতারে সেপাই। পেছনে জাফর,-এক হাতীর ওপর। সঙ্গে
তামসুন্দর করে সাজান ।
দুলিয়া। কত লােক বােধ হ’ল ?
মম.। সে অসংখ্য ! দেখে মাথা ঠিক রইল না—নেমে পড়লুম।
দুলিয়া। তবু আন্দাজ ?
মনু।
। হাজারের তু কম নয়।-এই এত বড় বনটা ঘেরাও
করতে হবে–তুই বুঝে দেখ না।
দুলিয়া। আমরা ত সবে দুশাে জন—তাহলে উপায় !
,

রঘুবীর। মনু। ধর্মযুদ্ধ যদি ক’তে চাওরে ভাই, তাহলে দুনিয়াকে জন্মের শােধ সেলাম কর। আর অধৰ্ম্মযুদ্ধ যদি ক’রূতে বল, তাহলে ও দু হাজার কেন, অমন দশ হাজারকে দেশত্যাগী করিয়ে দিতে পারি। দুলিয়া। তাইত, পিশাচের সঙ্গে পিশাচের আচরণ—খুনে- খুনীতে আবার ধর্মাধর্ম কেন! নিরপরাধ ব্রাহ্মণের সুখের পথে কণ্টক। যেমন করে পারি খুন কর, হয় অধৰ্ম্ম—হােক। আমরা ধৰ্ম্ম চাই না—প্রাণ চাই। (শ্যামলীর প্রবেশ } শ্যামলী। ছিঃ! ও কথা কি কইতে আছে!—ধর্ম চা’ না ! ধর্মহীন প্রাণ—সে প্রাণের অস্তিত্ব কই ?-অধৰ্ম্মে পিশাচ নাশ- সেকি আমার ভাই জানে না! অধর্মে কাৰ্য্য সাধন-সেত কোন্ কালে হত! তাহলে তােদর প্রয়োজন কেন? ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য না, ভাই আমার, তােদের মুখ চেয়ে আছে ! ধৰ্ম্ম রক্ষা কর—দুলিয়া! আমার গর্বের ঘরের দীপ নিৰ্বাণ করি নি। দুলিয়া। বেশ—মনু, ! সবাইকে তূণ বাণ নিয়ে সুবিধা মত এক একটা গাছে উঠে থাকতে বল্। আমি রঘু মহারাজের অনুমতি নিয়ে আসি। মনু। বেশ-বিলম্ব করি নি। দুলিয়া। তাই হােক—তাের ইচ্ছাই পূর্ণ হােক, তাহলে হাসি- মুখে বিদায় দে। একদিকে দু হাজার, অন্যদিকে কেবলমাত্র কুড়ি। মা ফেরাই ধরে রাখ শ্যামলী শ্যামলী। যিনি ধৰ্ম্মরক্ষাকর্তা, তার ইচ্ছা। প্রাণ ত যাব বলে পা বাড়িয়ে আছে। তাই বিচ্ছেদের ভয়ে আমার দেবতাকে প্রাণের

দুলিয়া।
রঘুবীর।
সমস্ত কামনার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছি। এ ক্ষণভঙ্গুর দেহ-ব’লতে
প্রাণ সঁপে দুলিয়া!এই সােণার দেহ ভগবানের আশ্রয়যােগ্য
স্থান-বলতে পারছিনা—ভগবান বল দাও-যদিই ভাঙ্গে প্রাণে-
শর!—আমার এই মাটীর বলয় যেন বর্জতুল্য কঠিন হয়, আমার
এই সিথের সিঁদুর যেন বরুণের ভাণ্ডার রঞ্জিত করে ।
[ প্রণাম ও প্রস্থান।
এত করিল যে তার, এত উপকার,
এত মহাধর্ম শিক্ষাদানে, তবু যদি
মহাপাপ পাপ নাহি ছাড়ে, ডুবে যারে
মানব জীবন! ধৰ্ম্মবলে নাই যদি
বল, হতবিধে। ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে বিষ যদি
ফল, কেন সৃষ্টি করেছিলে মহেশ্বর ।
ধৰ্ম্ম যদি শাস্ত্রের সম্বল, কেন তবে
মহাকাৰ্য্য-অবতার মানব-রচনা ?
{ প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
কাননমধ্য।
রঘু।
রঘুবীর।
নিস্তব্ধ সকল স্থান-স্তব্ধ অত্যাচার।
একি! প্রলয়ের পূর্বক্ষণে প্রকৃতির
স্তব্ধতা ভীষণ ক্ষীণ মৃদু সুগন্ধে

রঘুবীর।
বহিছে মলয়-ক্ষীণ হাসি মাখিয়াছে
এ অরণ্য অন্ধকার মুখে। আকাশের
আলােক নিঝরে, তরু-অঙ্গ সােহাগিনী
অতুল আনন্দময়ী লতা। হে শঙ্কর !
দৃষ্টি দাও —দৃষ্টিহীন ঘুরিতে সংসারে,
তােমার মঙ্গল মূৰ্ত্তি নিমেষের তরে
দেখিতে পাইনি অবসর।--দৃষ্টি দাও
হে প্রভু, অশুভ ভরা মরীচিকা শিরে
একবার করুণার ফুলটী ভাসাও।
দূর থেকে দেখে যাই চলে, দূর থেকে
হাসিতে হাসিতে ডুবি অতলের তলে।
( দুলিয়ার প্রবেশ )
কোথা হতে ? কি সংবাদ ? ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে
কেন আসিলি দুলিয়া ?
মহারাজ! মুখে
নাহি সরে বাণী। কৃপাণ বন্দুক করে
কাতারে কাতারে, ছুটে সৈন্য চারিধারে
ঘেরেছে সমস্ত বন। জাফর করেছে
পণ—একসঙ্গে সবারে ধরিয়া দিবে
ভীষণ মৃত্যুর মুখে।
খণ্ড খণ্ড করি
অস্ত্রে, অঙ্গে অঙ্গে দেখিয়া কম্পন, তবে
সে নিবৃত্ত হবে দুরাত্মা যবন।
প্রাণী রাখিবেনা প্রাণে।
সমস্ত গুরে
লয়।।

রঘু ।
রঘুবীর।
ইস্তাহারে করেছে ঘােষণা -রঘুবীর
দস্য দলপতি। তাই আজ দসুদলে
করিতে সংহার, অগণ্য বাহিনী সঙ্গে
আপনি জাফর এসে ঘেরিয়াছে বন।
অপূর্ব সুন্দর ফুল ফোটালে শঙ্কর।
তীব্র কি মধুর গন্ধ বুঝিতে আম্রাণে,
সমস্ত নিশ্বাস বুঝি যায় ফুরাইয়া।
কি উপায় ! কোথা যাই দুলিয়া এখন ?
আমি একা, অগণন শত্রুসৈন্ত মাঝে, শক্তি
হীনা—গতিহীন অবল রক্ষায়, শুধু
নামের অস্তিত্বে আছি, শৃঙ্খলে আবদ্ধ
হস্ত পদ—বন্দী মত লৌহ কারাগারে।
বরে কেমনে রক্ষা করি।
দুলিয়া।
চিন্তান্বিত
কেন গুরু! আছে শিষ্য সম্মুখে তােমার ।
শিখিয়াছি রণ-বিদ্যা তােমার কৃপায়,
শিখিয়াছি বীর ব্যবহার। নাহি ভরি
যদি আসে আপনি শমন। অনুমতি
কর একবার-ছিন্ন ভিন্ন করে দিই
যবনের সেনা।
রঘু।
এষে অসম্ভব ভাই।
দুলিয়া। বুঝিনা সম্ভব অসম্ভব। শীঘ্র দাও
অনুমতি। গুরুকৃপা করিয়া সম্বল
উন্মত্ত সাগর-জলে পড়ি ঝাঁপ দিয়া।

রঘুবীর। তরঙ্গের মস্তক কাটিয়া এক দওে করে দিই সিন্ধুনীর স্থির। যুদ্ধ যদি দুলিয়া। দিতে পার, হও অগ্রসর। কিন্তু হায় নাহি জানি, কি হৃদয়-বলে, কোন্ দৈব- শক্তি’পরে করিয়া নির্ভর, প্রজ্বলিত অনল-শিখায়, পতঙ্গ সমান একা ছুটেছে দুলিয়া ! গুরুকপা মহাশক্তি। উন্মাদ ভেবাে না মােরে হে ধীমান্! দিব বাধা সম্মুখ সমরে। পশু মত জীব হত্যা তরে, পশু মত গুপ্তভাবে গৃহে প্রবেশিয়া, নিশ্চিন্ত নিদ্রিত শত্ৰু-বুকে খরশান কৃপাণ বিধিতে, আসি নাই ল’তে অনুমতি। রণে যাব মহারাজ। আশীষ করহ মােরে দান। নিরুপায় তাই আজ্ঞা দিলাম তােমারে। কিন্তু ভাই সাবধান!-স্নেহ মায়া মম আদরে তােমরা সবাই মিলে, আমার প্রাণের চারিধারে রয়েছ যে নন্দন কানন, ফুল্ল ফুল মধু গন্ধে ছাইয়া গগন করিয়াছ মােরে ভাই বিশ্ব-অধিকারী। সাবধান ! সে ঐশ্বৰ্য্য কেড়ােনা আমার। মধু।

১১৩
বঘুবীর।
একটা কলঙ্ক খােকর্ষের অন্তি
ক্ষুদ্র কণা, তড়িত লতিকা সম, ক্ষণ
পরশনে, সোণীর আবাস মাের, কয়ে
দিবে ক্ষার।সাবধান
দুলিয়া।
যথা আজ্ঞ।
[ প্রস্থান।
শ্যামলীর প্রবেশ )
শ্যামলী। কি হ’ল কি হ’ল ভাই।
বধু।
আমলী শ্যামলী!
এ প্রচণ্ড অনল সাগর-খন ভীম
প্রভঞ্জনে মুহুর্মুহু জলন্ত স্ফুলিঙ্গ
আলােড়ন, অতি ক্ষুদ্র পতঙ্গের মত
সর্বনাশী তুই কেন মরিতে আসিলি ?
শ্যামলী শ্যামলী ! আর নয়, অসম্ভব
জীবন সাধন-অকারণ প্রাণনাশ
দেখিতে না পারি-মায়া দিয়ে বিসর্জন,
চল বােন্চল তােরে দেশে রেখে আসি।
শ্যামলী। একা যাব ? একা নাহি যাব। স্থান ত্যাগ
যদি ভাই সঙ্কল্প তােমার, চল সবে
দেশে যাই। বিরাম লভিতে যদি
থাকে আকিঞ্চন-মুহূর্ত বিলম্ব নয়।
আছে সাজান বাগান, বিশ্রামের বিধি-
দত্ত স্থান-বিধিদও আবরণে ঘেরা।

১১৪ রঘুবীর। হেথা বন মানুষের বন, সেথা গাছ, গুল্মলতা। হেথা, গাছে গাছে জড়াইয়া ভীম অজগর কুটিলতা, হৃদয়ের সার শুদ্ধ করিতে ভক্ষণ, প্রতিক্ষণ ললালুপ দৃষ্টিতে আছে চেয়ে। সেথা, কয় গাছে ? আর কি তাদের শক্তি আছে, যােঝে ধনুর্ধরা ভীল নারী সনে ? হেথা, প্রতি হৃদি কোটরে কোটরে হিংসা দ্বেষ ঘৃণা ফণাধর, মানুষের প্রতি পদক্ষেপে উঠিছে গর্জিয়া। সেথা আছে কিন্তু তার মন্ত্রৌষধি মানে। হেথা চির প্রজ্বলিত দাবানল, ধু ধু ধু ধু অনল-শিখায় শুধু কি শরীর করে ক্ষার। সংক্রামক শক্তি তার, হৃদয়, জীবন অভিলাষ, অস্তিত্বের প্রয়ােজন, সমস্তই দেয় আলাইয়া। সেথা মাঝে মাঝে ভুলে বন- হৃদয়ের আবর্জনা, অনলে বিধৌত আর যদ্যপি সংহার মূৰ্ত্তি ধরে, বরষার জলে, কিম্বা আপন অস্তিত্বে তার আছেরে নির্বাণ। তাই বলি ছাড়ি অভিমান, সঙ্গে চল—চল, ভাই চল, আমরা আপন হতে ব্রাহ্মণে করিগে বনবাসী। পিতা হবে ভীলরাজ, ভাই হবে ভীলের নায়ক-পরীবাণ হবে

রঘু।
রঘুবীর।
ভীলরাণী—তুই আর দুলিয়া শ্যামলী
তিন পারিষদ হবে সে রাজসভার।
তাই ভাল-তাই যাব ভগিনী অামার।
জ্ঞানশূন্য ভাই তাের-উন্মত্ত অস্থির,
দুরাত্মার আচরণ, আগ্নেয় অচল
বহ্নি ঘেরেছে আমায়, ভাঙ্গে যদি শিরে
হিমালয়, সুমেরু পবন বহে যদি
প্রতিক্ষণ, পশে যদি প্রতি লােমকূপে
অলিয়া হইবে বহি হিয়ার উত্তাপে।
তুমি থাক সাবধানে, ছেড়না গোপন
স্থান, বিশ্বাসঘাতক দেশে, তরুপত্র
চর। গুপ্ত অন্তরের কথা, শ্বাস মূৰ্ত্তে
হৃদয়ে পশিয়া, দূরদেশে বহি লয়ে
যায় সমীরণ-থাক অতি সাবধানে,
বৰ্ম্ম হয়ে বসে থাক পরীরে ঘেরিয়া।
সাবধান, সাবধান—অতি সংগােপনে,
যেন দেবতা না জানে। প্রভুরে করিতে
রক্ষা চলিনু শ্যামলী।
[ প্রস্থান।
শ্যামলী।
যাও-সাবধান।
।

পঞ্চম দৃশ্য।
বনপ্রান্ত পথ।
সথার মা।
স, মা। ওরে বাবা কি যুদ্ধ-কি ভয়ানক যুদ্ধ !! কিন্তু কিসের
যুদ্ধ-ক’রূলে কে! নবাবের এত সেপাই, এত শান্ত্রী--এত হােমরাও
চোমরাও ফৌজদার—সব হেরে গেল! বনের ধারে কেউ এগুতে
পালে না! ওরে বাবা, গাছ পালায় যুদ্ধ করে ! আর যাব না,
আর বনের ধার মাড়াব না—এই নাকে কাণে খৎ। মরেই
যদি যাব, ত টাকা ভােগ করে কে! ওরে বাবা কি যুদ্ধ!
আশে পাশে নবাবের সেপাই ধুপ, ধাপ, ক’রে পড়ল আর ম’ল।
(দেবলের প্রবেশ)
কেও দাওয়ান মশাই!-ও দাওয়ান মশাই! এদিকে এসােনা
পালাও পালাও।
দেবল। সেকি! আমি পালাব কি সখার মা ! আমাদের সৈন্য
আজ ডাকাতের দল ধরতে ছুটোছুটি করছে -এখন আমায় দেখে
কত বেটা পালাবে—আমি পালাব কি।
স, মা। ওই ছুটোছুটিই করছে, কিন্তু ডাকাতের দল যেমন
তেমনিই রয়েছে-ধরা পড়ছে না।
দেবল। সেকি! ধরা পড়ল না!
স, মা। যে খড় খেকো সেপাই সঙ্গে এনেছো দাওয়ান মশাই।
ওদের দিয়ে শুধু মাটী চষা হয়, লড়াই চলে না। ওদিকে যেওনা

রঘুবীর।
১১৭
—ফিরে যাও—কি পার ত এক চোচা দৌড়ে একবারে ডেরায়
গিয়ে আশ্রয় নাও। গতিক বড় ভাল নয়।
দেবল। বলিস্ কি সখার মা! তুই হয় ত লড়াই দেখে ভয়ে
ভেরে গেছি—কি দেখতে কি দেখেছি, কি বলতে কি
ব’লছি।
স, মা। আমি ভেরেছি। কিন্তু আমার সঙ্গে যে পালওয়ান
দিয়েছিলে, তারা তােমার সেপাইদের লড়াই না দেখে বেঁউরে
উঠে, আর এমন করে টাউরি খেতে খেতে, কোথায় মুখ থুবড়ে
প'ড়ল যে, আর দেখতে পেলুম না। এখন ভাবছি, লড়াইয়ের হুঙ্কার
হজমিগুলির কাজ করলে নাকি-বেটারা সব হজম হয়ে গেল
নাকি দাওয়ান মশাই! না, না—ওই যে আমার পলটনের ফৌজদার
আছে। ওকে জিজ্ঞাসা কর-ও সব খবর বলবে।
(কেরামতের প্রবেশ )
৮
দেবল। নবাব কোথায় ?
স, মা। পালিয়েছে।
দেবল। কি খবর কেরামত ?
কেরা। খবর ?—যা খবর ?
স, মা। হাঁ খবর।
কেরা। যা খবর—যা খবর ?—আমি কই ? কোথায়?
স, মা। (কেরামতের নাড়ী ধরিয়া) না দাওয়ান মশাই!
খবর ভাল নয় --কবিরাজ ডাকাও--না হয় হাকিমের সন্ধান কর।
তেজ নাড়ী ধপাস্ ধপাস্ করছে—দেখতে দেখতে তেউড়ে
যাবে।

১১
রঘুবীর।
দেবল। তুমি অমন করছ কেন কেরামত ?-খবর কি?
কেরা। খবর-লড়াই।
দেবল। লড়াই।
কেরা। ভয়ানক।
দেবল। লড়াই ।
কেরা। তুমুল।
দেবল। তুমুল কি! ভাল করে বুঝিয়ে বল—এস্থানে তুমি
নিরাপদ-ভয় নেই—ভাল করে বুঝিয়ে বল, ব্যাপারটা কি?-
রঘুবীর একা—বড় জোর দুই চার জন অনুচর—তাও তারা বৃদ্ধ
অনন্তরাও ও নবাবনন্দিনীকে নিয়েই বিব্রত। আমাদের বহু সৈন্ত
যাবে আর সে কটা লােককে ধরে আবে—তখন আবার
যুদ্ধ কি ?
কেরা। যুদ্ধ-ভয়ানক যুদ্ধ-তুমুল যুদ্ধ।-এদিকে চেয়ে দেখি
তুমুল যুদ্ধ-ওদিকে দেখি তুমুল যুদ্ধ-সেদিকে তুমুল যুদ্ধ-গাছের
ওপর—সেখানেও তুমুল যুদ্ধ !
ওরে বাবা !–চারিদিকেই তুমুল যুদ্ধ-আবার গাছের
ওপরেও তুমুল !-ওরে বাবা তুমুল বেটা কি যােদ্ধা !s:
দেবল। যুদ্ধ কার সঙ্গে ?
কেরা। কার সঙ্গে—এখনও ঠিক হয়নি।
স, মা। এইত ঠিক হয়ে গেল, আবার ঠিক হবেনা কেন!
তাইত বলি কোথায় কিছুই নেই -সেপাই ছুটোছুটি করে কেন!
বনের দিকে একবার করে ছােটে, আর দুড়দুড় করে পালিয়ে
আসে। বনের ভেতর বসে বসে তুমুল বেটা যে যুদ্ধ করছে,
কেমন করে জানব !

রঘুবীর।
দেবল। সেকি ?
কেরা। কি যে-কেই ঠাওর ক’তে পারলে না।
দেবল। বনের ভেতর ভীমরুলের চাক ছিল নাকি।
( সখারামের প্রবেশ)
সথা। ছিল বইকি,তবে তাদের হলগুলাে কিছু বড় বড়।
একটার নমুনা দেখবে?
দেবল। কই দেখি ?–ওরে বাবা, এ কিরে! এযে বিষমুখে
তীর !–ওরে সখারাম-এ রঘুবীরের তীর নাকি ?
সখা। সেইটেই বড় ভীমরুল—তবে তােমাদের বরাতে সেটার
হুল নেই। তা যদি থাকতাে, তােমাদের একটাকেও ফিরতে হত
না।- দেবলের উষ্ণীষে তীর পতন।)
দেবল। ওরে, এখানেও যেরে !(গােলমাল করিতে করিতে
সখারাম ব্যতীত সকলের প্রস্থান )
( বলদেবের প্রবেশ)
বল। সখারাম !
সথা।
কেও ঠাকুর।—যমের মুখে ছুটে এসেছো কেন ?
বল। পাষণ্ড দেবল এইখানে ছিল, গেল কোথা ?
সখ। প্রাণভয়ে যে পালিয়ে যায়, তাকে মারতে নেই।
বল। শীঘ্র বল, সে পাষণ্ড কোন্‌দিকে গেল?
সথা। তার সঙ্গে সখার মা আছে।
বস। তারে শুদ্ধ হত্যা করবাে।
সখা। সেকি-নারীহত্যা!
বল। সে নারী নয় সখারাম !—পিশাচী। যে আমার পিতার

১২০ রঘুবীর। কাছে উপকার পেয়েও অম্লানবদনে তারে শত্রুর হাতে ধরিয়ে দিতে পারে, তার অসাধ্য কাৰ্য্য নাই। সন্তান-হত্যায়ও সে কুণ্ঠিত নয়। তার জীবনের কোনও প্রয়ােজন নাই—কেবল অনিষ্ট, কেবল সৰ্ব্বনাশ ! সখা। তাহ’ক, সে সখারামের গর্ভধারিণী। বল। শীঘ্র বল্ সখারাম, নইলে তােকেও হত্যা করব। সখা । ক’রবে তা কর—কিন্তু ঠাকুর, গরীব ভীল গুলাের মহা- মূল্য অস্ত্রগুলাের এমনি করে অপচয় করােনা। বাণ ছুড়তে জান -ধনুক হাতে করেছে। কেন? দেবলা বুড়াের মাথায় লেগে বাণ প'ড়ে গেল। আমাকে মারবে, অস্ত্র প্রয়ােগের প্রয়ােজন নেই- বল কি করে মলে তােমার তােমার তৃপ্তি হয়, আমি তেমনি করে মরি—আমারও আত্মহত্যা হবেনা, তােমারও নরহত্যার পাপ হবেনা। মারো-হত্যা কর—বিলম্ব করছ কেন ? ছি ঠাকুর। কথা রাখতে জাননা, বীরত্বের আস্ফালন করতে ধনুক হাতে করেছে। আরে ছি ! [ প্রস্থান। (রঘুবীরের প্রবেশ) রঘু। ক'লে কি ভাই, সর্বনাশ করলে !—দুলিয়ার এমন অমানুষী চেষ্টার সমস্ত ফলটাকে জলাঞ্জলি দিলে ! ক্ষুদ্র বালক শত্রু মায়ূতে আশ্রয় ত্যাগ করে এতদূর এলে, এখন যে শত্রু-বেষ্টিত তােমাকে রক্ষা করতে সব যায়। বল। ভাই! প্রাণের জন্য নয়, ঈর্ষায় নয়—শুধু দুলিয়ার জীবন রক্ষার জন্য এই কাৰ্য্য করেছি।-বাইরে বেরিয়ে শত্রুর গতি

রঘুবীর।
ফিরিয়েছি। বাঁচত না-কিছুতেই বাঁচত না।ক্ষতবিক্ষত দেহ,
তাই এসেছি—অসহ-অস্ত্রশূন্য—শত্রু বহুদুর অগ্রসর হয়েছিল।
ফিরিয়েছি দাদা-ফিরিয়েছি।
( মনু, ও ভীলগণের প্রবেশ )
মনু,। মহারাজ দারুণ বিপদ!
রঘু। সে বুঝতে পেরেছি।
মনু,। আমাদের বল বুঝতে পেরে যবন সেনা আবার ফিরেছে।
আমাদের পথরােধ করেছে।
রঘু। তােমাদের আছে ক’জন ?
মন্ন। বাকী আছি আট জন। দুলিয়া আধমরা-তাকে
শ্যামলীর আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।
রঘু। মনু!
মনু ! বিলম্ব করােনা, বলদেবকে নিয়ে এই পথে যাও।
মনু। তােমাকে ছেড়ে যাব ?
রঘু।
যদি বাঁচতে চাও—এই ব্রাহ্মণকে বাঁচাতে চাও-আর
ব্রাহ্মণ-নন্দিনীর ধৰ্ম্ম রক্ষা ক’তে চাও, তাহলে আমার কথার
প্রতিবাদ করােনা।
সকলে। তােমায় ছেড়ে যাব ?
রঘু।
আমার আদেশ অমান্য করােনা।
মনু। আমরা কি মরব না ?-তাই আমাদের বেঁচে থাকতে
পরামর্শ দিচ্ছ !
গুরুর আদেশ পালনই শিষ্যের কাৰ্য। সকল সময়
প্রাণরক্ষা কাৰ্য্য নয়।—কি বলিস্ মনু !--চুপ করে আছিস
কেন? কি ক’ববি বল্।

১২২ রঘুবীর। মন্ন। আমরা শাস্ত্র জানিনা মহারাজ! আমরা তােমাকে ফেলে এক পাও নড়ব না। (নেপথ্যে কোলাহল) বল। আমিও না। রঘু। এখনও আমার কথা রাখ, বিশ্বাস—এখনও তােমাদের রক্ষা ক’তে পারি। পালাও, পালাও--এলো, এলো। হয়ত তােমাদের রক্ষা করে, আমি আত্মরক্ষায় পর্যন্ত সক্ষম হব। মন্ন। তা হতেই পারে না। তাই সব ব’সে পড়। বল- দেব, পেছনে এসো। চালাও-চালাও। উদ্ধার পাই একসঙ্গে পাব, মরি একসঙ্গে ম’রুব, চালাও। (ভীলগণ কর্তৃক বাণবর্ষণ) ( নেপথ্যে—আল্লাল্লাহাে ) ভীলগণ। হর হর হর হর--জয় রঘুয়া মহারাজের জয়। রঘু। তবে এক কাজ কর, নিষ্ফল প্রাণনাশ আমি দেখতে পারব না—কিছুতেই পারব না, এস সকলে আত্মসমর্পণ করি। ( বাণবর্ষণ ) মনু। যাে হুকুম। আর যা বলবেন সব ক’বাে-ফেলে যাব না। রঘু। দেখ, আমরা হলে কোন কথা থাকত না। নিরাশয় এক বৃদ্ধব্রাহ্মণ আর নিরাশ্রয় দুটী অবলা। মলে প্রতিকার হবে না -ধরা দিলে হতে পারে। এস সকলে আত্মসমর্পণ করি। [ প্রস্থান। মন্ন। যাে হুকুম A যষ্ঠ দৃশ্য। কাননমধ্যস্থ গুহা সম্মুখ। শ্যামলী। মলী। বাক্য মুখে আসেনাকো আর, দগ্ধবুকে নিশ্বাসে যন্ত্রণা। এই যদি সাধুতার পরিণাম, তব পদে আত্মসমর্পণে- তােমার আদিষ্ট কাৰ্যে-তাের আদিষ্ট প্রাণে—প্রতিপলে সাধুশ্রমে, এই যদি শশাণিত-নিষিক্ত পুরস্কার, মহানিদ্রা কোলে চিরনি যাও-জেগোনা জােগােনা বিশ্বপতি! ভাঙ্গ দণ্ড সৃষ্টির আধার। দাও তুলে বিশ্বব্যাপী মহাসিন্ধুজলে পীড়িতের নিশ্বাসের সমষ্টি লইয়া রচি এক মহা প্রভঞ্জনাও তুলে বিশ্বনাশী প্রলয়-তুফান। ধরা যাক গুড়াইয়া। শুধু পীড়িতের আর্তনাদ, পীড়কের হাসি খল খল—দগ্ধধর্ম পূতিগন্ধ সারে—হে নাথ, যদ্যপি এই ধরার গঠন, ভেঙ্গে দাও, ভেঙ্গে দাও- এ সৃষ্টির কিছুই না দেখি প্রয়ােজন। প্রভু, স্বামী, দেবতা—কঁতে আদেশ দাওনি, কাৰ্য করতে আদেশ দিয়েছে। কিন্তু আমি অযােগ্য-তােমার সহধর্শিণ ১২৪ রঘুবীর। হবার অযােগ্য। চক্ষে শােণিতের ধারা ছুটছে, তােমার পাদপদ্ম দেখতে পাচ্ছিনা। এ কেন প্রভু!-হৃদয়েশ্বর! তােমার আদেশের সঙ্গে এ দুর্বল হৃদয়ে তােমার প্রাণ দাও । মান রক্ষা কর—তােমার চরণাশ্রিতা শিষ্যা দাসীর মান রক্ষা কর, হৃদয়ে বল দাও, আঁখি নীরস কর। ( পরীবাণুর প্রবেশ ) পরী। দিদি-দিদি। আমাদের না কি সর্বনাশ হয়েছে- সব ধরা পড়েছে। শ্যামলী। সবাই বলদেব ভাইকে রক্ষা করতে ধরা দিয়েছে। পরী। তার পর? বেঁচে আছে কি ? শ্যামলী। তাও কি সম্ভব! পরী। যথেষ্ট শিক্ষা অনুতাপ শিরায় শিরায় অনল-স্রোত । কেন সেই বৃদ্ধ পরমাত্মীয়ের কথা শুলেম না! কেন শিলাতল পরিত্যাগ ক’লুম, কেন এলুম!—দুলি', দুলিয়া!—পরার্থে সৰ্বস্ব- ত্যাগী মহাপ্রাণ ভাই । নরদেহে দেবতার ঐশ্বৰ্য্য বহন করে কি ক্লান্ত হয়ে পড়লে ? শ্যামলী! আর কেন—ছেড়ে দে। শ্যামলী। ছি বােন! রণক্লান্ত—সুষুপ্ত মহাযােগীদের যােগভঙ্গ করাে না। মায়াময়—তাের কথা শুনে স্থির থাকতে পারবে না, এখনি তারা ফিরে আসবে। আর এখানে ফিরিয়ে আনা কেন? আর কেন, এস নিজের ব্যবস্থা করি। নারীধৰ্ম্ম বড় ভঙ্গুর । পাপিষ্ঠের কটাক্ষে বিকৃত হয়। আর নয় চলে আয়। আর নয় চলে আয়। তুই যে বড় সুন্দর-বড় মিষ্ট-বড় আদরের—বড় পিয়ারের দেবতার পুষ্প- গুলি—কিন্তু কি করব।-ভগ্নী প্রস্তুত হও আর নয়। পরী। সকল সময়েই ত প্রস্তুত রয়েছি দিদি।

ঘুবীর।
স, মা।
( সখার মার প্রবেশ)
সঁ, মা। ও বাবা, কোথায় এসে পড়লুম! আর যে বাঁচি
, কোথায় যাই--কি ক'রে উদ্ধার পাই ! হে হরি রক্ষে কর,
আর ক’বাে না—পরের মন্দ আর ক’বাে না। দোহাই হরি
প্রক্ষে কর-বাঘের মুখে দিয়ােনা—পথ দেখিয়ে দাও।
শ্যামলী। কে তুই ?
কে বাবা, কোথা বাবা।
শ্যামলী। এগিয়ে আয়।
স, মা। যা তুমি !-( উপবেশন) যা তুমি!--মা, আমায়
মেরে ফেল, কিন্তু মা আগে আমায় একটু জল দাও-বড়
পিপাসা—ল, জল।
শ্যামলী। ভয় নেই, বােস, জল আনি। ভগ্নী ! অতিথি
পরম শত্রু হলেও দেবতা। বহু ভীল ভাই প্রাণ দিয়েছে, তাদের
মৃতদেহ স্পর্শে আমি অপবিত্র, আমি স্নান করে কিছু সংগ্রহ করে
আনি। তুমি আপাততঃ ঘরে যাও, কিছু ফল থাকেত এনে ওকে
একটু জল দাও -জীবন রক্ষা কর।
[ উভয়ের প্রস্থান।
স, মা। যা--মাৰ্বলে না! জল আতে গেল, ফল আতে
গেল! আমায় খাওয়াবে বাঁচাবে ! আর আমি এদেরই সর্বনাশ
করেছি!--বর্জ। আর কেন? মাথায় পড়-এ পাপিষ্ঠা পিশাচী
শয়তানীকে চূর্ণ কর। ভগবান্ ! দেবতা সন্তানকে গর্ভে দিয়েছিলে,
কিন্তু মাকে রাক্ষসী করেছিলে কেন দয়াময়! মেরে ফেল-নরকে
গাও-আর নয়---বড় জালা। আলায় আলা নিবােও -নরকে
দাও-নরকে দাও।

রঘুবীর ।
(কেরামতের প্রবেশ)
কেরা। এই যে, এই যে বিবি এখানে নেমাজ পড়ছে। তাই
বলি, মতলব না থাকলে কি বিবিজ্ঞান বনে ঢোকে।
স, মা। সর্বনাশ হ’ল গেল ! এখনি জল আবে—সর্বনাশ
হ’ল !-দূর হ, দূর হ, চলে যা, এখানে কিছু নেই, চলে যা।
কেরা। কেন, তুমি ত আছ বিবি! তুমি থাকলেই সৰ
রইল ।
স, মা। চ'লে ঘা-এখনও বলছি চলে যা। নইলে মরবি।
কেরা। আর মরাবে কে বিবি !-রঘুবীর ধরা পড়েছে, ওই
একটা ঘাল হয়ে পড়ে আছে। মায়ূতে এখন তুমি। তা বিবি,
আমি তােমার আসাসোঁটা, আমাকে কাঁধে নিয়ে তুমি আঁদরেলনির
মতন দুপােছপি লাফালাফি ক’রুবে, এখন এ বৃদ্ধবয়সে আমাকে
মেরে আর কি কবে বিবি !
তবেরে সয়তান!-আমিই তােকে হত্যা ক’বা ।
কেরা। না বাবা! তা হলে স’রতে হ’ল। একটু আড়ালে
থাকি, বেটীর মতলবটা কি বুঝে নি।
( প্রস্থান।
( পরীবাণুর প্রবেশ )
স, মা। এসাে না—এসস না, পালাও-পালাও। শয়তান
পালাও।
স, মা।
••
(কেরামতের পুনঃ প্রবেশ)
কেরা। না, আর পালাতে হবে কেন? এই যে আমি
ঠিক আছি। সাজাদী! গােলামের ওপর হকুম, মাফ কর।

ঘুবীর।
১২৭
পরী। গাত্র স্পর্শ করে না--আমি আপনিই যাচ্ছি।
কেরা। (নেপথ্যাভিমুখে ) ওরে জ’দি-জলদি, তঞ্জাম
তঞ্জাম।
পরী। ক্ষণেক অপেক্ষা কর-আগে পিপাসার্তকে জল দিই।
কেরা। সে আমি দিচ্ছি।
পরী। এইও সয়তান!-ছুঁসনি। এই নাও বাছা ফল।
ফলে পিপাসাও যাবে, ক্ষুন্নিবৃত্তিও হবে। বসে থাক—সংবাদ দিয়ে।
(স্বগত) আমি যাই, তা হলে ভগ্নী আমার রক্ষা পাবে ; নইলে
দুঙ্গনেই যাব।
কি করি—যাই—ঈশ্বর নিয়ে যাচ্ছেন--উপায়
নেই। নে—চল।
[ পরীবাণু ও কেরামতের প্রস্থান।
স, মা। হা ভগবান্ !
হ ভগবান্ ! কি ক’রূলুম'রেও মারলু-কি
ক’রূলুম ! ওগাে কে আছ, রক্ষে কর- রক্ষে কর ।
( শালপত্র হস্তে শ্যামলীর প্রবেশ )
শ্যামলী। কি হ’ল !-কি হল ।
স, মা। ওমা সর্বনাশ করেছি-মা অতিথি হয়ে তােদের
সর্বনাশ করেছি। সঙ্গে সঙ্গে নবাবের লােক ছিল—তা জাতুন
মা! তারা এসে পরীবাণুকে ধরে নিয়ে গেছে।
শ্যামলী। সে কি!-কখন্ ?-কোন্ পথে ?
স, মা। এই পথে ; এখনি গেছে, কিন্তু মা! তুমি যে মেয়ে-
তারা যে অনেক! কি করে রক্ষা হবে না।
শ্যামলী। ( দুলিয়ার অঙ্গ হইতে অস্ত্রাদি গ্রহণ) দেহ্ সখা'র
মা! আমি চ’ল্লু। স্বামী যদি আমার বেঁচে থাকে, তা হলে

রঘুবীর।
রক্ষা করি-আর যদি না থাকে, তা হলে সৎকার করি।
ওই ফল জল রাখলুম, আগে আত্মরক্ষা কর। আর আমি দাড়াতে
পারি না—চ’লু। (দুলিয়াকে প্রণাম ও পদধূলি গ্রহণ)।
স, মা। কি করে কি হবে মা?
শ্যামলী। ভয় কি ?-আমি ওই মহাপুরুষের স্ত্রী। দেখিস্ মা,
ওই সােণার দেহ যেন শৃগালের ভক্ষ্য না হয় ।
[ প্রস্থান।
স, মা। (দুলিয়ায় মুখে জল সেচন) ও বাবা! ঘুমিয়ে থাক
ঘদি-জাগো, বেঁচে থাক --ওঠ। এ যে ম’রবার সময় নয়
বাবা !
দুলিয়া। আমি কোথায় ?
স, মা । ও বাবা ! জেগেছে। বাবা! তা হলে ওঠচেয়ে
দেখতােমার সব গেছে ।
দুলিয়া। সেকি ! রঘুমহারাজ ?
স, মা। ধরা পড়েছে।
দুলিয়া। শ্যামলী ?-~-পরীবাণু ?
স, মা। পরীবাণুকে ধরে নিয়ে গেছে। শ্যামলী পাগলিনীর
মত ছুটেছে; তাই বলছি-ওঠ ।
দুলিয়া। আমায় ধর।
[ সথার মার সাহায্যে উথান ও প্রস্থান ।

সপ্তম দৃশ্য।
জাফর ও পরীবাণু।
জাফর। তােমার জন্যই আমার এত অকিঞ্চন। তুমি
রাজ্যেশ্বরী--আমি গােলাম। এই তােমার
গােলাম। এই তােমার জন্য সমৃদু-রক্ষিত
সিংহাসন। করুণা করে, এই সিংহাসনে আরোহণ করে তার
শশাভা বর্ধন কর—আর গােলামকে দয়া করে সিংহাসনের তলে,
তােমার চরণপ্রান্তে একটু স্থান দাও। আমি এ মুখের শােস্ত
দেখে জীবন সার্থক করি।
পরী। যদি নিজের মঙ্গল চাও জাফর! তাহলে তােমার প্রভু
কন্যার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করােনা।
জাফর। সেকি সুন্দরী ! তােমার ওই চাদমুখ খানি প্রাণভরে
দেখবাে বলেই না আমি এই অমানুষিক চেষ্টায় গুজরাটকে
হস্তগত করেছি। এরূপ নিষ্ঠ র আদেশ কেন প্রাণেশ্বরী
পরী। এখনও বলছি জাফর! নিবৃত্ত হও। আমার দেবতা
সহায়। যদি অঙ্গ স্পর্শ কর, এখনি সেই হস্ত শতধা বিচ্ছিন্ন
হবে--মস্তক চূর্ণ হবে-নিবৃত্ত হও।
জাফর। ও! তােমার দেবতা সহায়!—ভাল, তােমার সেই
দেবতার সম্মুখে--তাকে সাক্ষী রেখে যদি তােমাকে আপনার
করে নিই, তাহলে ত তােমার কোন আপত্তি থাকবে না ?
কৈ হায় ?

রঘুবীর। (প্রহরীর প্রবেশ) রঘুবীরকে নিয়ে এসাে। [ প্রহরীর প্রস্থান। পরী। রঘুবীর বেঁচে আছে ? জাফর। আছে বইকি—তােমার গােলামের সঙ্গে সুখ- সম্মিলন দেখবার আশায় বেঁচে আছে (হাস্য)। নবাবনন্দিনী। তােমার দেবতা এখন আমার কাছে জীবন ভিখারী। যে তােমার শক্তিমান্ পিতার হস্ত থেকে গুজরাট ছিনিয়ে নিয়েছে, তার কাছে রঘুবীর ?-তাই কিনা তুমি মুসলমানী হ'য়ে একটা নগণ্য ব্যবসায়ী কাফেরের শরণাপন্ন হয়েছিলে! আমি শই হই—তােমার চক্ষুশূলই হই, তবু মুসলমান। আমার আশ্রয়ে আসাই তােমার কর্তব্য ছিল। একটা অতি তুচ্ছ কাফেরের কৃপা ভিখারিণী হওয়া-নবাবনন্দিনীর যােগ্য হয় নাই। তার চেয়ে আমার অঙ্কশায়িনী হওয়াই সহস্রগুপে তােমার শ্রেয়স্কর ছিল। এখনও বলছি-কৃপাভিক্ষাদানে গােলামকে চরিতার্থ কর। পরী। ভগবান্ ! আর যে আমি চ'খে কাণে কিছু দেখতে শুনতে পাচ্ছিনা। ক্রমে যে আমার জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে আসছে। মান রাখ দয়াময় । অভাগিনী প্রাণের যাতনায় তােমার চরণে আশ্রয় নিয়েছে—পায়ে ঠেলনা-দোহাই দীনবন্ধু !-নারীর ধর্ম রক্ষা কর। (শৃঙ্খলাবদ্ধ রঘুবীরের প্রবেশ) রঘু। একি । পরী। দাদা! দুরাত্মারা ছল করে অতিথি সেজে ভগ্নীর চ’ক্ষে ধুলি দিয়ে আমায় ধরে এনেছে। বধু। কি করূলে জাফর! লােকের আতিথ্য ধর্মে ব্যাঘাত দিলে! তােমার পৈশাচিক আচরণে দুনিয়ায় আর যে কেউ অতিথি-

রঘুবীর।
সৎকার করতে সাহস করবে না ! মুসলমান পুত্ৰহন্তাকেও অতিথি
প্রাপ্ত হলে দেবজ্ঞানে তার অর্চনা করে। তুমি সেই মহাধৰ্ম্মে
আঘাত করে কাফেরের কাৰ্য্য করলে।
জাফর। যাক্তার উত্তর পরে দেবে। এখন তােমায় আনি-
য়েছি কেন শােন। নবাবনন্দিনী তােমাকে সাক্ষী রেখে আমায়
আত্মদান ক’তে চান। বিষম আবদার—কি করি,—এই আবদার
তােমার সম্মুখেই রাখা কর্তব্য
কৰ্ত্তব্য বােধে, তােমাকে এখানে
আনিয়েছি।
রঘু। হস্তপদ বদ্ধ দেখে, আমার উপর এই অত্যাচার ক’তে
চাও? তবে শুন জাফর! আমার শক্তির পরিচয় তুমি কিছুই
জাননা, তােমার কাপুরুষ সৈন্য আমাকে এখানে এ অবস্থায় ধরে
আনেনি। কতকগুলি সহচরের মহামূল্য, জীবন রক্ষার জন্য আমি
বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করেছি। আমার সম্মুখে তােমার প্রভু
কন্যার উপর অত্যাচার করে না--মহানৰ্থ হবে। উপরে দেবতা
আছে-ধৰ্ম্ম আছে।
জাফর। দেখা যাক কতটা কি হয়
রঘু। জাফর! নিবৃত্ত হও।
জাফর। আর কেন প্রাণেশ্বরী। মুখ তুলে চাও, তােমার আশা
ভরসা এইত এক রঘুবীর, তখন আর অবাধ্যতায় ফল কি?
নাও--এসএগিয়ে এস, হৃদয়-সিংহাসন উন্মুক্ত শুন্য-বসে স্থান
পূর্ণ কর।
রঘু। নিবৃত্ত হ, পিশাচ নিবৃত্ত হ।
পরী। রক্ষা কর মঙ্গলনিদান! রক্ষা কর দুর্বলসহায়! সতীর
সতীত্ন যায়ক্ষা কর কে আছ কোথায়।

। রঘুবীর। রঘু। আর নয়! কত সয়,-কত সয় প্রাণে ! আজীবন সত্য পথ করিয়া আশ্রয়, দেখিতে কি হ’ল এই দৃশ্য ভয়ঙ্কর ? শক্তি দাও দেব মহেশ্বর ! মহাবঞ্জ বিঘূর্ণিয়া, তীব্র স্রোতে জল ঢালিয়া—শক্তি দাও শরীরে আমার। রমণীর সরবস ধন-সতীধৰ্ম সংরক্ষণ—শক্তি দাও বিশ্বনাশী দেব প্রভঞ্জন। শক্তি দাও- শক্তি দাও—শক্তি-স্বরূপিণী । (শৃঙ্খল ভঙ্গ) (শ্যামলীর প্রবেশ) আমলী। কেবা যাচে শক্তির আশ্রয়-নাহি ভয়- শক্তির সেবিকা আমি—সতীকুলরাণী অক্ষয় ভাণ্ডার মােরে করেছে অর্পণ। ত্রিভুবন কেঁপে যাবে, পৰ্বত ভাঙ্গিবে, খণ্ড খণ্ড হবে বজ্র, পালাবে শমন। কই কোথা—কোথা সে পিশাচ! (জাফরের প্রতি ধাবমান) রঘু। আর নয় বােন্-কার্যোদ্ধার-বিলম্বে বিফল হবে। গর্বের আধার-মহাশক্তির—তুমি নারী ধরিত্রীরূপিণী-চণ্ড মুণ্ড বিঘাতিনী নৃমুণ্ডমালিনী! রক্তস্রোতে নাহি প্রয়ােজন, আয়ােজন সুসম্পন্ন এবে, চলে আয়। এস পরীবাণু। ( দুইহস্তে দুইজনকে লইয়া প্রস্থান।

পঞ্চম অক।
প্রথম দৃশ্য।
তরুতল।
শ্যামলী, রঘুবীর ও পরীবাণু।
রঘু। (উভয়ের হস্ত ধরিয়া )
আজীবন সার দিনু জীবন প্রান্তরে,
প্রখর অন্তর দিয়ে করিনু কর্ষণ,
ফল লাভ কি হলাে আমার ?
অদৃষ্টের আবরণে,
কোন স্থানে লুকায়িত ছিল বিষবীজ,
সহসা ফুটিয়া গেল !
যেই ধরিয়া অঙ্কুরে—তারে গেনু বিনাশিতে,
দেখিতে দেখিতে বৃক্ষ অভ্রভেদী হ’ল।
দিগন্তে করিল বৃক্ষ বাহুর প্রসার।
আমার আশার ছবি--আমার সুখের রবি

১৩৪
রঘুবীর।
আমার অস্তিত্ব ভবিষ্যৎ,
ঘন পত্র সন্নিবেশে
জনমের মত বুঝি করিলরে আচ্ছাদন।
শাখে শাখে, গুচ্ছে গুচ্ছে, ফলেছে যাতনা ।
স্কন্ধে স্কন্ধে মাটী আঁকাড়িয়া,
শতমুখে বিদীর্ণ হইয়া,-
সহস্র সহস্র মুখে ছুটায়েছে আলা প্রস্রবণ ।
বড়ই ক্ষুধিত আমি,
প্রতি লােমকুপে জ্বলে মরি পিপাসায় !
ক
হায় !
দৃষ্টি বদ্ধ, গতি রুদ্ধ, তথাপি অস্থির
এখনােত মিটিল না কামনা আমার ?
কোথা প্রভু! কোথা তব সােণার সংসার।
কোথা তুই দুলিয়া আমার !
প্রভুভক্তি জীবন্ত জলন্ত-কোথা মনু।
কোথা ভীল ভাই।
কোথা বােন্ করুণার হিরন্ময়ী ধারা।
কোথা তুই পরীবাণু কুহকিনী-
ভীষণ রাক্ষসী মায়া।
কোন্ অন্ধকারে উল্কামত ফুটিয়া উঠিয়া
কোন্ দূর অন্ধকারে মিলাতে ছুটিলি ?
শ্যামলী। কি বিপদ ! সারা পথ এমন করে হাত বাঁধা—পথ
চলি কি করে ? দাদা, বহুদুর এসেছি,- অরণ্যের মুখে প্রবেশ
করেছি। আর কেন-ছেড়ে দে।

রঘুবীর।
ঘু। ছাড়বাে ?
শ্যামলী। ছাড়বি নাতাে কি চোরের মতন হাতকড়ি দিয়ে
শাস্তি দিতে দিতে সারা পথটা. আবি ?
রঘু। ছাড়বাে ? কোথায় ছাড়বাে ? স্থান কই? আছে
কে ? না—আর সাহস হয় না। ব্রাহ্মণের ন্যস্ততার বুঝতে না
পেরে হাত পেতে নিয়েছিলুম, বুঝতে না পেরে হাত ছাড়া
করেছিলুম, হারিয়েছিলুম ! ছাড়বোনা শ্যামলী-আমার আর
কেউ নেই।
শ্যামলী। না থাকে -নেই নেই। তুইতাে আছিস্? তাহলে
তুই বা আমাদের জড়িয়ে, হাতে পায়ে শৃঙ্খল জড়াবি কেন ?
আমাদের ছেড়ে দে। আমরা নিজে আত্মরক্ষা করি।
আবার সে আত্মরক্ষা কথা !
বন হ’তে মৃত্যুমুখী সে কাল নাগিনী,
ধরে এনে ঘরে দিয়ে স্থান,
সাধ করে—ভ্রাতৃশিরে লইলি দংশন।
আত্মরক্ষা কথা আর কিছু ভগিনী
জীবনের সঙ্গী মাের
সবাই রহিল কারাগারে
কিন্তু বােন্ আমি কোথা?
তারা সবে মৃত্যু প্রতীক্ষায়
বসে আছে বদ্ধ পদ করে
আমি কেন এ মুক্ত প্রান্তরে ?
লােহার ভবন আমি স্বহস্তে রচি,
আশে পাশে বস্ত্র দিয়ে স্বহস্তে ঘেরি-
?
*

।
রঘুবীর।
।
রবিরশ্মি এলাে গেল ফিরে।
এমন কঠিন ঘর,
কে ভাঙ্গিল দানবী শ্যামলী।
শ্যামলী। কে ভাঙ্গিল? তুই নিজে। আমি কি ভেঙ্গেছি ?
নীচ ঘরে জনমিয়া,
দুই দিন দ্বিজ-সহবাসে,
দুই দিন দুটো শাস্ত্র-বচন শুনিয়া
একেবারে অহঙ্কারে,
ধরাখানা শরা দেখেছিলি।
আপনারে বিশ্বকর্মা মনে করে স্থির,
নদীর তরঙ্গ ভরা বালির বাঁধের পরে,
সাধ করে অভ্রভেদী অট্টালিকা করিলি রচন।
তার যাহা পরিণাম, তাই ঘটিয়াছে
একটী বন্যায় তার,
ইট কাঠ ভিত্তি স্থান চিহ্ন সমুদায়
একেবারে আঁধারে ডুবেছে।
ধর দেখি অস্ত্র করে,
হ’ দেখি ভীলের সন্তান।
প্রকাণ্ড সাগর সেঁচি প্রতিজ্ঞা লইয়া,
নরকের তমােভেদী দর দর্শনে,
খোজ, দেখি কে আছে কোথায়।
ধরণীর মেরুচ্ছেদী তীক্ষ ছুরিকায়,
খোঁজ, দেখি জাফরের দেবলের উদর-গহ্বর।
এখনি আবার সব আসিবে ফিরিয়া।

পরী। রঘুবীর। শাস্ত্রবাক্যে শুধু হয় দেবত-তর্পণ, মানুষের কাৰ্য কিন্তু দূরে দূরে সরে। আমি কি ভেঙ্গেছি। কে ভেঙ্গেছে ভীলরাজ ? (স্বগত) ঈশ্বর! মরণ দাও, দাও প্রভু—আর কেন ? যন্ত্রণা বিষম। বল কত সহে আর ? শ্যামলী। বিপন্ন, সবার গুরু—দিয়াছিলি মােরে নিত্য শিক্ষা, তাই আমি পিশাচীরে ঘরে এনেছি। দেখি লােল জিহবা, মৃত্যু তার পাছু ঘুরিতেছে, তাই আমি গুরু জ্ঞানে, তাহারে দিয়েছি স্থান। এতে যদি সব যায় তাের—যাক- উপায় নাহিক রঘুবীর! এতে যদি ভ্রাতৃত্ব-কুসুম যায়রে ছিড়িয়া যাক—সম্পর্ক চাই না ধরাতলে। কেন ভাই আমারে রাখিলে ? কেন ভাই শেফালিকা বাঁধিতে অঞ্চলে, সােণার সহস্রদল, তরঙ্গিত সিন্ধুজলে দিলে বিসর্জন ? ভাই! মােরে ছেড়ে দাও, এখনাে সময় আছে, রক্ষা কর আত্মীয় তােমার। আমি ফিরে যাই। পরী।

১৩ রঘুবীর। শান্তিময় যে শিলার তলে, মৃত্যু মােরে সাদরে তুলিতেছিল কোলে, আবার সেখানে ফিরে যাই, দাও ভাই অনুমতি। সেকি! আমি তােমারে ছাড়িব ? তুমি ধৰ্ম্ম, তুমি কৰ্ম্ম, তুমি আত্মসার- তােমারে ছাড়িব ? সহস্র আত্মীয় প্রাণে তুলাদণ্ডে তােমার তুলনা । ভীলধৰ্ম্ম জাননা-জাননা বালা। উপরে বৈকুণ্ঠ প্রলােভন, নিয়ে ক্ষুদ্র নগণ্য জীবন, সে যদি আশ্রয় চায়, আপনি শ্রীহরি বাদী তারে ত্যজি অম্লান বদনে। ধরফের ধর, শ্যামলী আমার । এ অমূল্য রত্নভর আবার দিলাম তাের করে। শেষ চেষ্টা—শেষ চেষ্টা এবার আমার । শ্যামলী। সেই সঙ্গে দাও অনুমতি - যদি হয় প্রয়ােজন, যদি দেখি অক্ষম রক্ষায়, মৃত্যুমুখে দিব আমি প্রাণের পরীরে। নহে তব করে ন্ত ধন, তুমি ল’য়ে যাও রঘুবীর ! হিতাহিত জ্ঞান ধৰ্ম্ম মৰ্ম্মস্থানে যার, আমি আর কি বলিব তারে ? ধু।

রঘুবীর।
কার্যক্ষেত্রে কর্মের সাধনে,
ভাল নিজে যা বুঝিৰে বােন
সতীত্ব অমুল্য নিধি করিতে রক্ষণ,
যে কাৰ্য্য করিতে চায় প্রাণ,
তাই কর,-সে কাৰ্য্য আমার।
( সখারামের প্রবেশ)
সখারাম, ভাই। আমার সর্বস্ব গেছে।
সখা। সেকি, মিছে কথা কও কেন বাপধন যম! এই যে
এই যে দুটী হজমীগুলি এখনও বর্তমান। ও দুটীকে গালে দাও,
গােটা দুই ভেঁকুর উঠে, একেবারে সব হজম হয়ে যাবে এখন।
রঘু। না সখারাম, আর নয়। আমার সােণার স্বপ্ন ভেঙ্গে
গেছে, কি এক ছায়ার স্পর্শ লােভে, মরীচিকার মৃদু হিল্লোল-কম্পিত
সােণার কমলের আঘ্রাণ আকাঙ্ক্ষায় কেবল আমি ঘুরে মরেছি,
আর ঘুরূবােনা সখায়াম।
সখ। সত্যি।
রঘু। এই শেষ বার, তার পর যা গতি আমার। যদি নরত্বে
জীবনের ঔষধ না পাই, নরত্বে দেবরে বিসর্জন। এই শেষ—এই
শেষ চেষ্টা। যাও ভাই সখারাম, নিঃস্বার্থ পরােপকারী যােগ—
মত্ততার আবরণে পূর্ণ জ্ঞান—তুমিই এই দৌত্যের যােগ্য পাত্র। দয়া
ক'রে ভাই আমায় রক্ষা কর। একবার জাফরের কাছে যাও।
সখা । অত ভণিতা কেন বাপধন যম? আমাকে ভক্ষণের
পূর্বে কি একটু লবণাক্ত করে নিচ্ছ ?
রঘু। তােমায় ভক্ষণ !-শ্যামলী ! একটা পাতা কুড়িয়ে আন্

১৪০
রঘুবীর।
তো। (শ্যামলীর তথাকরণ)(দন্তে রঘুবীরের স্বীয় অঙ্গুলীচ্ছেদ ও
পত্রে লিখন) এই নাও লিখে দিলুম। এই নিয়ে জাফরের কাছে
যাও—আগে দেখিয়ে তবে কথা কও।
সখা। (পাঠ করিয়া) আমার মৃত্যুতে জাফরের মৃত্যু! তুমি
কি পাগল হলে নাকি ? এ কি লিখেছ ?
রঘু। শুধু জাফরের মৃত্যু! তােমার জীবন নাশে যে নরাধম
সহায়তা করবে, তারও পর্যন্ত মৃত্যু জেনে রেখাে সখরাম! তাই
কেন, হত্যার ইচ্ছায় তােমার অঙ্গ স্পর্শ করে যদি কেহ হত্যায়
অকৃতকার্য হয়, তারও রঘুবীরের হাতে নিপীড়ন-বিষম
লাঞ্ছনা।
সথা। তাহলে বাপ ধৰ্ম্মরাজ! আমাকেই কি বেছে বেছে
লােকের নিয়ত করে তুললে ! বেশ, এখন কি করতে হবে ?
মামদো মিঞাকে কি বলতে হবে ?
রঘু। তুমি জাফরের কাছে গিয়ে, বলদেব, দুলিয়া ও আর আর
ভীল ভাইদের প্রাণ ভিক্ষা কর।
সখা। ভিক্ষা! দোহাই ধর্মরাজ! ওইটী পারুবােনা। ও
ভিক্ষে আমার কুষ্ঠীতে লেখেনি।
রঘু। বেশ আদেশ,নরাধমকে আদেশ করে।
স। যদি না শশানে ?
রঘু। না শশানে, ভীল-হস্তে আছে তার প্রাণ।
শ্যামলী। যাও সখারাম !
নির্ভয়ে চলিয়া যাও।
শত্রুর বুকের পরে,
আলােকে, আঁধারে, নিরস্ত্র উলঙ্গ বক্ষে,

রঘুবীর।
১৪১
নির্ভয়ে চলিয়া যাও।
* বিধি যদি পথরোধ করে,
দিও তারে শুনাইয়া ভীলের কঠিন পণ
অঙ্গে তব আছে আবরণ।
হিমাচল টলে,
তবু ভীল নাহি টলে প্রতিজ্ঞায়।
জয় জয় তমােময়-
সৃষ্টির সংহাররূপী দেব মহেশ্বর।
এতদিন পরে ভীল ফিরে এসেছে স্বস্থানে
থাকুক সে সভ্যতার সনে,
হােক জ্ঞানী শত শত জ্ঞানে,
হেন সভ্যতার সম্পূর্ণ বিকাশে
আছেরে জাগ্রত ভীলপ্রাণ।
হিমালয় টলে, তবু ভীল নাহি টলে প্রতিজ্ঞায় ।
(নতজানু) ভাই-ভাই, দারুণ যাতনা।
শূন্য চক্ষে চাহি চারিধার
ভাইরে, আলােক ভিক্ষা করি।
ভাল যাও, বনপ্রান্তে আছে লােকালয়।
আছে সাধু গৃহস্থ তথায়।
আতিথ্য গ্রহণে, তার ঘরে করাে অবস্থান।
বিলম্ব করােনা, এখনি ফুটিবে রবি।
তােদের লইয়ে, আর না আবদ্ধ আমি হইব শ্যামলী ।
যাব আমি পিতার সন্ধানে।
চিরসুখী দ্বিজ সদাশয়,
রঘু।

। ১৪২ রঘুবীর। রঘু। শােকে তাপে শূন্য জ্ঞান, গৃহশূন্য পথের পথিক। তারে আগে আনিব ধরিয়া। শ্যামলী। কতদিন অপেক্ষায় রব ? সাত দিন ; এই সাতদিন রহ সঙ্গোপনে। তার পর এসে সব তার। যদ্যপি সপ্তাহমধ্যে না দেখ ফিরিতে মােরে,- তুমি আছ, আর আছে এ তােমার ভার (পরীবাণুকে শ্যামলীর হস্তে দেওন) উর্ধে আছে অনন্ত নীলিমাকাশ, পদতলে অনন্ত ধরণী ; যেও বােন্, সে সুন্দর গৃহমাঝে। গৃহস্বামী সেথা ভগবান, অবলার মহাবল দাগ। এস এস ভাই সখারাম। নারায়ণ! হীন আমি পদ্মপত্রে ভাসে মাের জ্ঞান। সহে সমীর-ভর— কোমল পরশ ত্রাসে কঁপে থরথর। বিষম পরীক্ষা কেন প্রভু! একি ঘাের সমস্যা বিষম ! অন্ধকার অন্ধকার চারিধার- আর তাে মঙ্গল আমি দেখিতে না পাই। কোন্ পথে যাই ? ছিল যারা জীবনের আলো,

একমাত্র আশাডাের, একটী নির্ভর মােররে
রঘুবীর।
১৪৩
তারাই নিয়ে দেছে বাতী। আশাদীপ নিৰ্বাপিত,
অন্ধকার-কবলিত জীবনের অতি দীর্ঘ পথ—
কণ্টকিত, জটিল, বন্ধুর।
এহেন আঁধারে ২২৪}-;
আরে করিতে-আকর্ষণ,
বিজলীর মহা প্রলােভন ! (ছুরিকা বান্ধিয়
এই ডোর ধৰি যাঁক খ্রীহরি!
এ পথে কি হারানিধি করিব সন্ধান ?
( রঘুবীর ও সখারামের প্রস্থান ।
শ্যামলী। কি বলিস্ বােন্? আর কেন পরের অনুগ্রহ ভিখা-
রিণী হয়ে থাকবো ?
পরী:। তাইত, স্বাধীনতা পেলুম, আবার এর দোর, ওর
দোর কেন ?
শ্যামলী। এই ঘর—যে ঘর ভাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে,
আজ হতে এই আমাদের আবাসস্থান।
পরী। আর ওই আমাদের গৃহস্বামী। এসো ভাই, ওই
গৃহস্বামীকে রেখে দিন কতক মনের সুখে বেড়িয়ে বেড়াই। অমন
রক্ষক থাকতে, আর কারও গলগ্রহ হবােনা।
শ্যামলী। তাহ'লে আয় বােন! হাত ধরাধরি করে ভ্রাতৃদত্ত
নূতন গৃহে মহানন্দে দুজনে প্রবেশ করি।

১৪।
রঘুৰীৰ।
পরীবাণু ও শ্যামলীর গীত।
যাই চলে যাই,
বুঝেছি এখানে বিরাম নাই।
তুঙ্গ জলদ মন্দিরে
আকুলি বিজলী সঞ্চয়ে,
ডাকে আয় চলে আয় ভাই
ধরে করে করে,
আয় করা ক'রে,
বিরাম লতিতে চলিয়া যাই।
ঢেলে দেবে তারা,
সােহাগের ধারা,
মরুতে মরিতে নাহিক চাই।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কক্ষ।
জাফর ও দেবল।
জাফর। এখন কর্তব্য কি ?
দেবল। যতক্ষণ না রঘুবীর ধরা পড়ে
জাফর। চুপরাও কাপুরুষ ! তুমিই আমার অগ্রগমনের বাধা।
আবার ধরা পড়ে কি! ধরা ত পড়লাে। শুনলে না—সেনাপতি
কি করে এলাে? রাজ্য নিষ্কণ্টক।
দেবল। সে সম্মুখ সংগ্রাম, এ গুপ্ত হত্যা ।
জাফর। দ্বারে দ্বারে ভীষণ অস্ত্রধারী প্রহরী দুর্ভেদ্য দুর্গ,
উপরে, নীচে, দেয়ালে, ঘরে,সর্বত্রই তারা দিন রাত পাহারা
দিচ্ছে, এখনও হত্যার ভয় ! এখনও বল–কি করি ! সঙ্গী ছিল,

রঘুবীর।
১৪৫
তাই তার সাহস ছিল, বল ছিল; এখন সে একা। আমার শক্তির
তুলনায় কীটামুকীট, তখন আবার ভয়।
দেবল। জনাবের অভিপ্রায় কি
জাফর। তার সঙ্গীগুলােকে হত্যা করে আগে নিশ্চিন্ত হই।
দেবল। কিন্তু আগে নিশ্চিন্ত না হয়ে সখারামকে মারবেন
?
না।
জাফর। (স্বগত) তাহলে এক কাজ করি। সখার মাকে
দিয়েই তার হত্যাকাৰ্য্য সাধন করি। (প্রকাশ্যে) দেখ দেবল, প্রতি-
নিবৃত্ত হওয়া এখন অসম্ভব। স্বকাৰ্য্য সাধন করেই যে ভীল আমাদের
হত্যার চেষ্টা ক’রুবে না, তাই বা কে বলে ?
( কেরামৎ ও সখার মার প্রবেশ)
কেরা। জঁহাপনা।
বিবি এসেছে।
[ প্রস্থান।
জাফর। সখার মা! আজ আমার একটী মহা শত্রুকে তােমায়
নিপাত ক’রুতে হচ্ছে।
স, মা। আমি বুঝেছি-সে শত্রু কে! আমি অবলা—আমি
কেমন করে পারূবব জাহাপনা ? সে রঘুবীর !
জাফর। রঘুবীর নয় বিবি! সে আমার বন্ধু, সে আমাকে
জল থেকে তুলে বাঁচিয়েছে।
স, মা। তাহলে সেই ব্রাহ্মণ, হিঁদুর মেয়ে-ব্ৰহ্মহত্যা করবাে।
জাফর। ব্রাহ্মণ নয় বিবি, সে বৃদ্ধ অশক্ত—সে আমার কি
ক’রূবে?
স, মা। তবে কে ?
জাফর। তাের ছেলে।
স, মা। ! (কপিতে ঝাপিতে ভূতলে পতন )।

১৪৬
রঘুবীর।
জাফর। পড়লে চলছে না, উঠতে হবে, এ কাজ তােমাকেই
ক’ৰ্ত্তে হবে। মহা পুরস্কার, অবাধ্য সন্তান—তাকে রেখে ফল কি ?
নাও ওঠ। -মহা পুরস্কার।
স, মা। আমি যে মা ! জাহাপনা।
জাফর। সেত সুখেরই কথা! মায়ের হাতের বিষ, সন্তান
সুখে মরূবে, মরণের জ্বালা টের পাবে না।
স, মা।
বেশ - দাও।
[ সখার মার প্রস্থান।
( সখারামের প্রবেশ)
স। আর দেরী করছ কেন মিয়া ! সময় যে উত্তীর্ণ হয়।
শেষে ছেড়েও দেবে, অথচ প্রাণেও যাবে। সে বেটা ভীলছােট
লােককথার খেলাপ হলে একেবারে অগ্নিশর্মা। কিছু শুবে
না, কোন কথা বুঝবে না। দেরী করো না—যাহ’ক একটা কর।
জাফর। হাঁ সখারাম ! রঘুবীর কেমন করে আমার ঘরে
ঢুকেছিল বলতে পারিস ?
সখা । আমাকে কি এমনিই বােকা পেলে মামদো মিয়া ?
রঘুবীর একা, আর তােমার হাজার হাজার সৈন্য, অস্ত্র ধরে সঙ্গেই
রয়েছে পাঁচ সাত বেটা। তােমাকে রঘুবীরের আসবার কৌশলটা
বলে দিয়ে, তাকে কাহিল করে দিই—কেমন ? তা হচ্ছে না
মাম্‌লো মিয়া ! আমি তোমাকে সুখে রাজত্ব ক’রূতে দিচ্ছি না।
বেটা ভীলে মনে মনে সঙ্কল্প যে, নরহত্যা করবে না। তাতেই
তােমরা আজও বেঁচে আছ। কিন্তু বেটা ভগবানের পাকে চক্রে
আমার কাছে ধরা পড়ে গেছে, হঠাৎ প্রতিজ্ঞা করে বসেছে-ৰে

রঘুবীর।
১৪৭
সখান্নামকে হত্যা কবে, যেমন করে পারে সে হত্যার প্রতিশােধ
নেবে। তীলের প্রতিজ্ঞা অটল। বেটাতে একটু দেবতার অশ
আছে কিনা! কিন্তু হলে কি হবে ; ও বেটা কাতুর, আমি মাছ।
ও বেটা গাড্ডিল, আমি মাত ; ও বেটা অংশ, আর আমি পূর্ণ।
দশ অবতারের বুদ্ধি, এই সখার মার নন্দনের মস্তিষ্কে বিরাজমান।
আমিও প্রতিজ্ঞা করছি-রঘুবীরকে দিয়ে, তােমাদের দফা রফা
করাব। শুতে, বসতে, দাড়াতে তােমাদের নাস্তা নাবুদ ক’ব।
এক দণ্ডের জন্য বিশ্রাম দেব না। যে হাত বেটা মানুষের ওপর
তুল না বলে সংকল্প করেছে, সেই হাত আমি তােমাদের রক্তে
রঞ্জিত করবে।
জাফর। তুই কি ঠাওরেছিস্? যে ব্যক্তি গভীর রজনীর
সহায়তায় চোরের মতন একজনের গৃহে প্রবেশ করে তাকে নিরস্ত্র
দেখে, বীরত্ব প্রকাশ করে—তার ভয়ে আমি নীরবে তাের মতন
বাদীর বাচ্ছার অত্যাচার সয়ে থাকবে ?
সখা। কেন সইবে ? একি মানুষে সয় ? তুমি নবাব !
আর আমি কে-কত তুচ্ছ কীটানুকীট -আমি অত্যাচারের নাম
শুলে রেগে কঁই হয়ে উঠি ; তুমি সইবে কেন ? আর যদি সও,
তাহলে বুঝবো—তুমি বাদীর বাচ্ছারও অধম।
জাফর। এইও উল্ল ! মু সামালকে বাত কহো।
সখা। তাহলে বুঝবােতােমাকে উত্তেজিত ক'ৰ্ত্তে হলে,
একটু বিশেষ রকমের উদ্যােগ আয়ােজন চাই। কেন না, আমি
চাই তােমার মৃত্যু। কিন্তু সে মৃত্যু আমার মৃত্যু দিয়ে কিনতে
হবে। সেই জন্যই মাদো মিয়া!-তােমার দরবারে এসে উপস্থিত
হয়েছি।
y

১১৮ রঘুবীর । জাফর। তুই তুচ্ছ পদার্থ, তােক মেরে হস্ত কলুষিত করবে কেন ? সখা । করতেই হবে, নইলে আমিই বা তােমাকে ছাড়বে কেন? যদি না হত্যা কর, তাহলে তােমাকে বড়ই লাঞ্ছিত হতে হবে। নরহত্যা ক’রুতেই জন্মগ্রহণ করেছ, এ অধম বাদীর বাচ্ছাকে মেহেরবাণী করতে দোষ কি? নবাব! গুজরাটের ভাগ্য বিধাতা! আমায় মৃত্যু দাও। নইলে এই দাড়ী না ধ'রে জাফর। এই- এই-- ( প্রহরীর প্রবেশ) প্রহরী। এইও-এইও- সখা। এই পয়জার না খুলে প্রহরী। হ-হ-( সখারামকে ধারণ) জনাব ! হুকুম। জাফর। যাও, এই কম্বক্তকে নিয়ে গিয়ে, বামুনের ছেলে যে ঘরে আছে, সেইখানে আবদ্ধ রাখ। যা বেইমান! সঙ্গে যা। আমি তাের মৃত্যুর বেশ সুন্দর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সখা। আঃ—তাহলে বাচাও মিয়া। জাফর। ব্যস্ত কেন? এই যে হচ্ছে। ( দূতের প্রবেশ ) দূত। জাহাপনা ! সৰ্ব্বনাশ—সব ভীল পলাতক। জাফর। সেকি! কি করে হ'ল—কি করে পালাল ? সখা। হাঁ ——তাহলে পয়জার! একটু ঘন ঘন সঞ্চালিত জাফর। সব গেছে ?

রঘুবীর। ১৪৯ দূত। হাজত ঘর খুলে দেখা গেল—কেউ নেই। ছাত ফুড়ে সেইখান দিয়ে সবাই পালিয়েছে। জাফর। কেউ নেই ? দূত। সুধু বামুনের ছেলে আছে। তাকে অন্য স্থানে রেখে ছিলুম। জাফর। গেছি না যেতে আছি--তাহলে মা-বামুনের ছেলেকে মারু—এটাকে মার—যাকে পাবি তাকে মার- সখা। তাহলে মাকেবল মা—হাত ঘন ঘন চল-- পয়জার পট পট খেল। ( বিষপাত্র হস্তে সখার মার প্রবেশ) দেবল। হা-হ!ওর মা এসেছে। জাফর। বেশ, এই নে তাের ছেলে-দেরি করলে মেরে ফেলবাে। এস দেবল,—তােম্ চলা আও। [ দেবল, জাফর ও দূতের প্রস্থান। স, মা। বাপ সখারাম ! সখা । কেও-মা ? কখন এলি মা? একি! তাের এ বেশ ..কেন ? মুখে কালিমা কেন ? চক্ষু রক্তবর্ণ কেন মা ! স, মা। বাবা, বিষের জ্বালা ধরেছে। এতকাল যে মহাপাপ করেছি, এতদিনে তার ফল ফলেছে। বাপ! মাকে ক্ষমা ক। সখা। একি মা-হাতে তাের কি ? স, মা। বিষের বাটী। সখ। সেকি!—আত্মহত্যা! স, মা। আত্মহত্যার জন্য এ বিষ নয়-পুত্রহত্যার জন্য ।

রঘুবীর।
সয়তানের কাজ করেছি-সয়তান পুত্রহত্যা আমাকে পুরস্কার
দিয়েছে—স্বহস্তে এই বিষ তাের মুখে দিতে বলেছে।
সখা। বেশ, দে! এ সংসারে কে কার? নরাধম নিজে
আমাকে হত্যা ক’তে সাহস না করে, মায়ের ওপর ভর দিয়েছে।
মৃত্যু-মৃত্যু-মা মৃত্যু দে! পুত্রহত্যা হবেনা-দেশ রক্ষা হবে।
জাফর যাবে—দেবল যাবে ; গুজরাট থেকে পাপ পালাবে-
পুণ্য হবে। প্রায়শ্চিত্ত-দে মা-সন্তানকে বিষ দে। নামে
হলাহল, কাজে সুধা। দেশীঘ্র দে।
স, মা। তােকে দেব ? পিশাচী বলে কি আমাতে পুত্রস্নেহ
নেই। তুই আদরের নিধি, তােকে বিষ দেব? আমি নিজে
খাবা! বড় পিপাসা --বড় “পিপাসা !! জলের পিপাসা নয়—
বিষের পিপাসা। (বিষপান) (2)
সখা । নারায়ণ! মধুসূদন ! করুণাময়! নারী জ্ঞানহীনা,
দয়া করাে-মাকে আমার, চরণে অশ্রয় দাও। যা মা চলে
মা-এখানে মরিনি—তাের দেহ স্পর্শ করে এস্থান পবিত্র
হবে—জাফর রক্ষা পাবে। চলে যা।
( ঘাতকগণের প্রবেশ )
১ম, ঘা। যেতে দেবে কে? চলে আয় কক্ত! দে বেটী—
বিষ দে।
সখা। তবেরে বেটা! ( চপেটাঘাত) আমার সমস্ত ক্রোধ
তােদের ওপরই খরচ কলম। (মল্লযুদ্ধ )
স, মা। ছেড়ে দে আমার ছেলেকে ছেড়ে দে পিশাচ!
(পতনােম্মুখী)

রঘুবীর।
( বলদেবের প্রবেশ )
বল। ছেড়ে দে নরাধম-ওদের ছেড়ে দে-আমাকে হত্যা
কর।
সখা। পড়িনি মা,এখানে পড়িনি। ধ'রে থাক্‌-আর
একটু প্রাণ ধরে থাক্। পালা-পালা-
১ম, ঘ। নেরে ভাই-ওটাকেও টেনে নিয়ে আয়।
বল। রঘুবীর—ভাই রঘুবীর! সহস্র অত্যাচারীর দমন
করেছে, কিন্তু তােমার কাৰ্য ক’রূতে এসে আজ একজন নিরীহ
কিরূপ অত্যাচারিত হচ্ছে দেখবে এসস, আজ শেষ দিন। বলদেব
ঘাতকের হাতে আজ প্রাণ দিলে ।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
প্রান্তর।
অনন্তরাও।
অনন্ত।
কেবা স্থির, কে গম্ভীর, এত যাতনায়
কার মুখে না পড়েরে যাতনার লেখা ?
কার বুক আঘাতে না ভাঙ্গে নারায়ণ ?
সব গেল। আমার বলিতে এ সংসারে
এক প্রাণী প্রাণে না রহিল,

রঘুবীর।
,
ভেঙ্গে গেল সােণার সংসার।
দূর হরে চিন্তা পাপীয়সি ।
বিপর্যস্ত পাষাণ অন্তর !
আর কেন ?
( রঘুবীর প্রবেশ)
রঘু। কোথা যাও উন্মাদ পথিক ? হ’ল দিবা
অবসান। কোন্ বুকে ঢুকেছ প্রান্তরে ?
কাল মেঘে আচ্ছন্ন গগন। ফিরে যাও,
ফিরে যাও। এখনি ভাসিয়া যাবে ধরা।
স্থান হেথা পাবেনা প্রবীণ, ফিরে যাও—
ফিরে যাও। অট্টহাসে হাসে কাদম্বিনী।
ভীষণ মেদিনী মূৰ্ত্তি আঁধার আলােকে
মেঘনাদে কঁপে বসুন্ধরা।
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে এখনি মাথায়
ভূমিসাৎ করিবে তােমায়। ফেরে, ফেরো !!
অনন্ত। কেও-রঘুবীর ?
রঘু। পিতা-পিতা! তুমি ?
এই কি তােমার বেশ ।
এই কি তােমার স্থান!
অনন্ত । দেখ রঘুবীর ।
কেমন সুন্দর অন্ধকার।
দেখ, রঘু, স্মৃতি যদি চাস লুকাইতে,
ডুব দেরে এ ঘাের আঁধারে !

রঘুবীর। রঘু। ছেড়ে চল এ ভীষণ স্থান । অনন্ত। এ ভীষণ স্থান ? কে বলেছে ? মিথ্যাবাণী। ধূ ধূ করে ধরা, জন-প্রাণী নাই-- মানুষে আসেনা হেন কালে, নরে যেথা রয় বাপ- সে হ'তে কি এস্থান ভীষণ ? রঘু। চল ফিরে, পায়ে ধরি, চল পিতা ফিরে। অনন্ত। কোথা যাব ? সে ঘাের জঙ্গলে ? নর-ব্যাঘ্র যথা করে বাস ? রঘুবীর, অপঘাতে মরি, হেরি করিবি কি ব্রত উদ্যাপন? পুত্র-কথা চিরকাল রেখেছে। ধীমান্। শেষ কথা রাখ, মাের আকিঞ্চন। অনন্ত। ফিরে যেতে সেখােন সেখােন আর । সে পাপ সংসার- ফিরে যেতে বলােনা-বলােনা। - রঘু। ফিরে চল--শেষ ভিক্ষা । • অনন্ত। গেছে যারা, যা চলে তারা। ধৰ্ম্মপথ রয়েছে প্রসার। পুত্র কন্যা কার ? ছাড়-- চলে যাই জীবনের পথে । রঘু। বড়ই ভীষণ পরিণাম। কোন প্রাণে এ বিপদে ছাড়িয়ে তােমায়। অনন্ত। চিরদুঃখী দুঃখেই সুখের স্বাদ পায়, রঘু।

১৫ { = রঘু। রঘুবীর। তাই আমি পেয়েছি সন্তান। আশার রাজত্বে আর যাবনাকো ফিরে। শোন্ রঘু, ফিরে যেতে নাহি চাই। যদি মরি এ আঁধার রাতে - যদি মরি নির্জন প্রান্তরে। যদি শিরে হয় বাপ অশনি সম্পাত বড় সুখে ছাড়ির পরাণ । ছাড় পদ রঘুবীর- প্রভু তব শেষ ভিক্ষা চায়। রঘুবীর মরিবে যখন, যেথা ইচ্ছা যেও সেথা --কেহ এসে করিবে না মানা। বলদেবে করিয়া উদ্ধার—প্রাণসমা ভগিনীর ধর্মপ্রাণ রেখে মানে মানে সমপিয়া তােমার শ্ৰীকরে, যদ্যপি নিশ্চিন্ত পারি বসাতে তােমায়, তবেই ছাড়িবে দাস। ক্ষুদ্র নর, ক্ষুদ্র কীট। এখনও এত আছে আশা। (সহসা উঠিয়া) উর্দ্ধে নারায়ণ, তুমি জনক আমার, ছুয়ে শ্রীপদ তােমার, রঘুবীর করে অঙ্গীকার শােন পিতা, শােন শােন-- বলদেবে করিব উদ্ধার, আশ্রিত নবাব-কন্যা অনন্ত। রঘু। -

রঘুবীর ।
গদ্যই সঁপিব তব করে।
পাছে শত্রু ফের পাছে ফিরে,
পুত্র কন্যা লয়ে প্রাণ ভয়ে
পাছে ভ্রম দেশদেশান্তরে,
দুরাত্মা জাফর শূন্য করিব সংসার।
লৌহস্তম্ভ চারিধারে,--বজ্র সৌধ শিরে
লক্ষ লক্ষ প্রহরীর মাঝে যদি রয় সে পামর,
সেথা হতে আনিব টানিয়া।
বুক তার খণ্ডে খণ্ডে করি বিদারণ,
মুও ছিড়ে দিব পূজা কালীপদতলে।
অনন্ত। স্থির হও – স্থির হও।
রঘু।
ভীল নহে মায়ের সন্তান।
শিশু ভীল সিংহ মেরে খায়-
জন পিতা ! ভীল শিশু সিংহ মেরে খায় ।
মত্ত মাতঙ্গের সনে করি ভীম রণ,
দন্ত তার করি উৎপাটন
আনন্দে মাতঙ্গ-শিরে নৃত্য করে সাধে।
করী-গ্রাসী ভীম অজগর
ভরে যার বনচর কাপে থর থর,
হেলায় দলিয়ে তারে
ভীল শিশু করে শিশু-খেলা।
অনন্ত। চল্ চল্‌-যেথা যাবি যাব তাের সনে।
রঘু।
কর তবে অঙ্গীকার
আর যেন খুঁজিতে না হয়।

রঘুবীর। অনও। তোরে ফেলে যাব নাকো আর। করিয়াছি পরীর উদ্ধার। অবশিষ্ট-বলদেব। তাহারে ফিরাতে—দূতরূপে সখারামে করেছি প্রেরণ। দুৰ্বল বুঝিয়া মােরে দুরাত্মা যবন- বুঝি, দূতের ক'রেছে অপমান। অতিক্রান্ত অষ্টম প্রহর, ফিরিল না সরাম। বিলম্বে ঘটিবে সর্বনাশ আর না থাকিতে পারি প্রভু! আনহু। সহস্র প্রহরী তার, দুর্দান্ত দুর্জয় নিরস্ত্র বান্ধবহীন তুমি, রঘুবীর ! কাজ নাই পুত্রের উদ্ধারে—তুই মাের জীবন সাধন, তুই মাের প্রাণ-পাের ধন, তােমার অস্তিত্বে মাের অস্তিত্ব নির্ভর। রক্ষা করু রঘুবীর ! ফিরে আয়, কাজ নাই পুত্রের উদ্ধারে । আশীৰ্ব্বাদ কর মহামতি। আর আমি নই প্রভু, ব্রাহ্মণের নিরীহ সন্তান। বিশ্বনাথ জনক আমার। আমি পুত্র তার। শুধু মাত্র অভ্যস্ত সংহারে। দেখ প্রভু, শমন মুরতি, ফিরাতে পাপের গতি, করিতে ধরার ধ্বংস, ক রঘুবীর। শূলী শম্ভু শিয়রে আমার। সংহার-সংহার! হের বক্ষে মুক্তকেশী- অট্টহাসী অসিতবরণা ভীমা- ধ্বংসরূপা দানব-দলনী। দেখ দেখি (বস্ত্র উমােচন ও সশস্ত্র ভীলবেশ প্রদর্শন) চিনিতে কি পারহে ব্রাহ্মণ? অনন্ত। একি মূৰ্ত্তি ? রঘুবীর!-রঘুবীর! রঘু। রঘুয়! রঘুয়া! রঘুবীর নহি আর। পিতা ! মরে গেছে রঘুবীর। মৃত প্রাণ তার, মল ভরা পূতিগন্ধ মৃত্তিকার রাশি। রঘুয়া কণ্টক তরু উঠেছে সেথায়। তীব্ৰফুল গন্ধে তার ভরিবে মেদিনী। এস দ্বিজ লইতে আঘ্রাণ। [ বেগে প্রস্থান। ফের-রঘুবীর -ফে-পুত্ৰ চাই না—কিছু ফেবু। ( দুলিয়া, মনু, ও ভীলগণের প্রবেশ) দুলিয়া। প্রভু-প্রভু!—মহারাজ কই? অনন্ত। , ফেরা দুলিয়া, ফেরা মনু-ওরে ফিরিয়ে আন্- রঘুবীর উন্মাদ দস্যু হয়েছে-একা ছুটেছে। [ অনন্তরাওয়ের বেগে প্রস্থান। মনু। জয় কালী! জয়কালী । জীলগণ। জয়কালী- ( সকলের প্রস্থান। সকলের অনন্ত। চাই না। - ১৪ চতুর্থ দৃশ্য। কারাগারের সম্মুখ। দুলিয়া ও রঘুবীর। দুলিয়া। মহারাজ! এই সেই কারাগার। এই কারাগার ?—শরীর কঁপিছে ঘন ঘন। এক পদ আগুসরি যাই, আর মাের সাধ্য নাই- যারে—যারে—দুলিয়া আমার। দেথ চেয়ে কারাগার পানে, দেখ বেঁচে আছে কি সে জীবনের ভাই, দেখ দেখ কোথা আছে সখারাম- মহাপ্রাণ-পরের কারণে স্বাধীনতা দেছে বিসৰ্জ্জুন। [ দুলিয়ার অন্তরালে গমন। কালী—কালী! কুল দে মা, কুল দে শঙ্করী! প্রাণ দুটী ফিরে যেন পাই, জবাপুষ্প ৰাগ রঙ্গে রঞ্জিত এ কর এখনো মা ভিজে নাই মানব-শােণিতে। রক্ষা কর দয়াময়ী! এখনাে মা ফিরে দে সন্তানে। পরীর উদ্ধারে যদি করিয়াছ দয়া, তবে কেন বল মহামায়া-অসম্পূর্ণ রাখিবি আশায়। তাই! পেলে কি সন্ধান ?

রঘুবীর। (দুলিয়ার প্রবেশ) জুলিয়া। একি হেরি মহারাজ! বাক্শক্তি মম | কল্পনার অতীত সে দৃশ্য ভয়ঙ্কর !! রঘু। কি কহ দুলিয়া ? দুলিয়া। শােণিত সাগরে ভাসে অঙ্গ কার ? হের সরাম অনন্ত শয়নে। বুধু। (দৃশ্য পরিবর্তন, কারাগারের অভ্যন্তরে মৃত সখাৱাম।) স্বর্গধামে যােগ্য স্থানে যাও মহাত্মন্ । নমস্কার তােমার আত্মায়। কোন্ ভূলে দিয়াছিলে এ পাপ সংসারে শ্রীচরণ ? আসা মাত্র বুঝেছিলে উত্তাপের জালা । আর কেন বিলম্ব দুলিয়া, খুঁজে দেখ কোথা আছে হতভাগ্য ব্রাহ্মণ-কুমার। { দুলিয়ার প্রস্থান। বুঝিয়াছি পরিণাম এইরূপ তার। মহানল জলিল চৌদিকে- কেহ গেছে কেই যাবে সে ঘাের অনলে। মধুবীর সে অংশের অনন্ত আহুতি। অপরাংশে কে পুড়িবে নিয়তি রাক্ষসী ? ব'সে সর্ববংস করিবি শব্দ- এইকি লাে সাধ তাের মনে?

রঘুবীর ।
( দুলিয়ার প্রবেশ
দুলিয়া।
মহারাজ।
নিৰ্ম্মল সকল আশা—ভাই নাই—হের,
সুকুমার দেহ তার গত প্রাণ পড়ে ধরাহুল।
(পটপরিবর্তন, কারাগারের অভ্যন্তরে মৃত বলদেব)
রঘু।
মৃত্যুর নিথর কোলে লইতে বিশ্রাম
ছুটিয়াছে বলদেব।
মরণের তীব্র সুধা আকষ্ট করিয়া পান,
সঙ্গে সখারাম।—শুধু তাই নয় ।
দুলিয়া, সকলি গেল। সপ্তাহ সময় মাত্র
দিয়াছিনু তারে।
সপ্তাহ সময় মাত্র নিয়েছে শ্যামলী
সেকি আর আছে ?--কই, কোথা আছে ?
কোথা মাের প্রাণের ভগিনী ? না না-
দেখ দেখ, দেরে দুলিয়া! ওই দেখ,
সুমহান্ কাল সিন্ধু উত্তাল তরঙ্গে
অগণ্য সপ্তাহ-বিশ্ব মিলাতে ছুটেছে অবিশ্রাম।
দেখ ভাই ।
তরঙ্গের শিরে প্রতিবিম্বে ফুটিয়া ফুটিয়া
ঢেলে দেছে সমস্ত সংসারে স্নিগ্ধ চন্দ্রিকার আলাে।
দেখ দেখি কি শােভা দুলিয়া ! ওই হেথা
সহস্ৰ সৌন্দৰ্যমী অপরার রায়,
পরীবাণু, শ্যামলীরে রয়েছে বেরিয়া।

রবীর।
দুলিয়া। মহারাজ! শত্ৰুপুরী।
এখনও জীবিত আছে নবাব-নন্দিনী,
সে প্রাণের তুমি আবরণ।
ধরি হে চরণ-ভিক্ষা দাও,
এ অভেদ্য বজ্ৰবৰ্ম্ম কিঙ্করে তােমার ।
প্রতিজ্ঞা করিয়া আজি এসেছি হেথায়,
অদ্য রাত্রে শিক্ষা দেবাে দুরাত্মা জাফরে।
যদি নাহি পারি, যদি আজ পাপ কণ্ঠ
মিথ্যাবাক্য করে উচ্চারণ,
হস্ত পদ পােড়াব অনলে।
দিব ঢেলে হলাহল গলে।
গুরুর নিষেধ বাক্য তুলিব না কাণে।
রঘু। বেশ, ভাঙ্গি আমি কারাগার দ্বার,
দুইজনে ল ও উঠাইয়া।
[ উভয়ের প্রস্থান।
=
পঞ্চম দৃশ্য।
-
কারাগারের প্রান্তভাগ।
( মন্ন, ও ফাস হস্তে ভীলগণের প্রবেশ )
মঃ। হুসিয়ার,-খবরদার! রঘুয়া মহরাজ, গারদ ভেঙ্গে
বলদেব ও সখারামকে উদ্ধার ক’তে গেছে । আমাদের কাজ
আমরা করি আয় ! শব্দ শুনে দলে দলে সেপাই আছে। সাবধান!

রঘুবীর।
ওর এক শালাও যেন না ফেরে ! চুপে চুপে নিঃসাড়ে গলায় ফাঁস
লাগাবি আর টান্ দিবি। দেখি যেন চেঁ শব্দটী মা করতে
পারে। পাশের লােক যেন জানতে না পারে। ফাঁস লাগাটা
মার-আর গাদা কর।
( সকলের প্রস্থান।
(সশস্ত্রে প্রহরীগণ ও কেরামতের প্রবেশ
কেরা। কই, কিসের শব্দ! মিছে কথা! যেখানে কেরামত,
সেখানে শব্দ ! মিছে কথা ডাকাতকোথা ডাকাত ? আমার ওপর
কি হুকুম হয়েছে জানিস্ ?
১ম, ৩। না হুজুর !
কেরা। ডাকাতের দলকে জবাই করা। যেমন বেটাদের হতে
পাব, অমনি এক একটা করে না ধরে, টুটীটী টিপে, ছুরী খানা না
জুত সই করে গলায় বসিয়ে, এই এমনি করে আড়াই পোঁচ ; বস্
কাম ফতে।
১ম, ৩। হুজুর! কে হাজখানার দোর ভাঙছে !
কেরা। য়া, সেকি! এর ভেতর, এত কড়া পাহারা
তার ভেতরে-বড় বড় পাচিল—তাই ট’পকে! ঝুট বাৎ।
[ নেপথ্যে পুনঃ শব্দ ও প্রহরীগণের পলায়ন।
( ভীলগণ ও মনুর প্রবেশ )
মর। এই যে !
কেরা। যা !
যা! তুমি কে?
মনু। একজন ডাকু। নরাধম ! অবলা পেয়ে বল প্রয়ােগ
ক’ত্তে যাও ? নিঃসহায় কুলকামিনীকে ধরে আতে পার,-তােমার
বীরত্ব ওরা কি বুঝবে? নাও এসাে, কাটা হাত পা ছট ফট করতে
করতে তােমর কেরামতীটা একবার বােঝাবে, এস।

রঘুবীর।
কেরা। হা আল্লা! দোহাই—দোহাই।
মন্ন,। যারা তােমার কেরামতী বুঝবে, তারা কোথায় একবার
দেখবে? ঐ দেখ, ওইখানে গাদা প্রমাণ হয়ে জমে আছে।
কেরা। যা! তাইতাে—তাইতো ! দোহাই বাবা ! মেহের
বাণী-মেয়ো না- মেরাে না।
মনু। তােমার অদৃষ্টে আর অমন সুখের মরণটা হ’ল না।
তুমি ভীলরাণীর অঙ্গে হাত তুলতে গিছলে, অকথ্য কথা বলে
ছিলে ;তােমার হাত, তােমার জিবকে, আগে জবাব দিহি
ক’তে হবে, তারপর তােমার জা! যাও—লে যাও !
কেরা। হা আল্লা ! দোহাই—দোহাই।
[ কেরামকে লইয়া ভীলগণের প্রস্থান।
( রঘুবীরের প্রবেশ )
মন্ন। মহারাজ ! খবর? বলদেব ভাই আর সখারামের কি
উদ্ধার হয়েছে ?
রঘু। উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু শুধু তাদের দেহ পেয়েছি। প্রাণ
।
পাইনি।
মন্ন। হা ভগবান।
রঘু। শােন! এ শশাকের সময় নয়, কার্যের সময়।
পিশাচকে দুনিয়া থেকে যেমন করে থােক সরাতে হবে। আগে
কাৰ্য শেষ, তারপর শােক। কি করবে—আমার অদৃষ্ট, পারুম
না—সময়ে উপস্থিত হতে পাল্লেম না। তাই গেল,—সব গেল,
প্রতিহিংসা প্রতিহিংসা।
মনু। জয় ভবানী! জয় বানী।

ষষ্ঠ দৃশ্য
জাফর ও দেবল।
জাফর। ভয় কি! কাপুরুষের মত বিপদে আত্মহারা হও
কেন? স্থির হয়ে বল। বাড়িতে কি ডাকাত পড়েছে ?
দেবল। পড়েছে! পড়েছে কই, পিল পিল করে দেয়ালের
ফাটল থেকে গজিয়ে উঠেছে। সব গেল! এতক্ষণ বুঝি সব
গেল! হা ভগবান! সব গেল !
জাফর। আমার কাছে যখন এসেছ, তখন ভয় কি দাওয়ান।
স্থির হও—আমায় বুঝতে দাও!
দেবল। ভয় তাে নেই-ভরসাই বা কই! চোরকুটুরীতে শুই,
সেখানেও যখন ডাকাত ঢুকেছে, তখন আর ভরসার আছে
কি জাহাপনা ! ভাগ্যি সেখানে ছিলুম না ! নইলে তাে
গিয়েছিলুম !
(নেপথ্যে—আল্লা আল্লা হাে ! )
জাফর। বস্—আর ভয় কি! ওই আমার সৈন্য সকল জাগরিত,
এখনি ভীলকুলের উচ্ছেদ হবে। ক্ষণেক অপেক্ষা কর, এখনি
দেখবে-ডাকাতের দল ধৃত হয়ে আমার নিকট আনীত হয়েছে।
( বিষণের প্রবেশ)
দেবল। এই যে-এই যে ; কি খবর বিষণ ? ভীল গুলোর
সংবাদ কি ?
বিষণ। সংবাদ আর কি! নির্ভয়ে এখানে সেখানে রাজপথে
অলিতে গলিতে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মতন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
জাফর আর আমার অস্ত্রধারী দিগ্বিজয়ী সৈন্য সব দাড়িয়ে
দাড়িয়ে দেখছে ?
!
'

রঘুবীর।
বিষণ। দেখবার আর বড় অবকাশ দিচ্ছেনা।
জাফর। দূর হও সম্মুখ থেকে কাপুরুষ ! নইলে এখনি শির
জুদা হবে।
বিষণ। শিরের ভয় আর রাখিনা জাহাপনা! শির খাবার
হলে এতক্ষণ যেত, তােমার পুরুষত্বের অপেক্ষা ক’ত না।
জাহাপনা! পারত নিজের মাথা বাঁচাবার চেষ্টা কর ; পরের মাথার
দিকে লক্ষ্য করােনা। নইলে আজকের প্রভাতসূৰ্য্য আর
জাফরের মাথায় কিরণ বর্ষণ করবেনা।
নেপথ্যে। ভয় নেই- ভয় নেই।
দেবল। যা-ভয় নেই।
( ছদ্মবেশে মন্ন, ও কতিপয় ভীলের প্রবেশ ।
মনু। কই আঁহাপনা ? ভয় নেই--রঘুবীর ধরা পড়েছে।
জাফর। যা-রঘুবীর ধরা পড়েছে ?
মনু। একেবারে গ্রেপ্তার!
জাফর। বস্-আর কি, আমি নির্ভয়। তাহলে (বিষণকে
দেখাইয়া) এই কাফেরকে আগে কোতল কর।
মঃ। যাে হুকুম ! এই ভাই—এসকো লে যাও (জনাস্তিকে)
• একে কোতল করােনা --মহারাজের হুকুম।
বিষণ। পিতা! ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি—আমার
শান্তিতে তােমার যেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়।
( জনৈক ভীলের বিষণকে লইয়া প্রস্থান।
জাফর। আচ্ছা—একেও নিয়ে যাও।
মন্নু। ওকে আর আলাদা নয় জাহাপনা—ওকে তােমার

মরু'
রঘুবীর।
জাফর। বা—সেকি! তার মানে কি ?
মনু। তার মানে বুঝতে পারুলেনা জাহাপনা? আমরা যে
তােমার বাবাকেলে নকর।
জাফর। কে তােরা ?
। এই যে বুঝিয়ে দিচ্ছি। (ছদ্মবেশ পরিত্যাগ ) পাছে
পালিয়ে যাও কিম্বা আত্মহত্যা করে আমাদের হাতের সুখ নষ্ট কর,
তাই এ কাজ করেছি।
জাফর। যা, যা।
মন্ন,। যাও-সয়তানকে লে যাও!
দেবল। হ্যা বাবা, নে যাও। দেখ বাবা, বিনাদোষে সয়তান
আমার ছেলেকে মেরে ফেল্পে।
তুমিও চল। সতানীতে তুমিও কম নয়।
দেবল। এই যে পা বাড়িয়ে রয়েছি, চলনা বাবা! বাবা,
এক মূহুর্তে প্রস্তুত হয়েছি। মরুতে আর ভয় নেই। চল—যেথায়
নিয়ে যাবে না চল।
[ সকলের প্রস্থান।
( রঘুবীরের প্রবেশ)
আঁধারে ঢেকেছে অন্ধকার। অন্ধকারে
আঁধারে আঁধারে কোলাকুলি। অমানিশা
ভুলেছে অাপন। অস্তিত্ব ডুবিয়া যারে-
মানবত্ব মিশে যা আঁধারে। সাধ করে
বিধাতা আপনি, চেছে অতিল
শ্রী। আত্মরক্ষা ধরম সৰাৰ। পাপ
পুণ্য সেখানে কোথায়? পাপ পুণ্য নাহি
মন্ন।
বধু।

রঘুবীর। দেবতায়। শুধু কি মানুষ অপরাধী ? ছলনায় স্বরগের ভিত্তির স্থাপন। চুলনায় দানব নিধন। বৃত্তাসুর রাবণ ত্ৰিপুর সুন্দ উপসুল ভাই সমস্ত মরেছে ছলনায়। মহাবল বলি মহামতি-- ধার্মিকের শিরােমণি দাতার অগ্রণী, পশিয়াছে রসাতলে বিধির ছলনে। তবে হায়। উচ্চ আশা কি হেতু আমার। মার রঘু—শক্র মা। সংহার বিধির লীলা। লীলাময়ী চির- সংহারিণী। কুটিল সুনীলকেশী কাল- রূপা কালী শবাসন নৃমুণ্ড-মালিনী সংহারে আনন্দময়ী। বিলােল রসনা আছে ব্যগ্র ভক্ষিতে সংসার। মা রঘু- শক্র মা। শাস্ত্রকথা চিন্তার সময়। কাৰ্যে কোন্ মূখ শাস্ত্র মানে ? ভােগসুখ কেনা করে অন্বেষণ ? ভােগ-ইচ্ছা কভু ক্ষুদ্র, কভু মহা ধৰ্ম্মের পতন। মার যে যেখানে আছে, তুলে দেরে ভােজালির মুখে। বীজকণা রাখিবনা। বিষণা তুলিতে দিবনা। বুঝিয়াছি প্রাণে রাখা অধৰ্ম্ম আমার। ( জাফরের কেশ ধরিয়া দুলিয়ার প্রকেশ ) দুলিয়া। মহারাজ! অধিকৃত গুর্জর-আসন। ৬ রঘুবীর। আর এই সেই শয়তান—গুজরাটের সে মহাত্মা নবাবের আসন-তঙ্কর। রঘু। ধরে থাক দুরাত্মারে সম্মুখে আমার। শােন্ নরাধম ! এ জীবনে দেবতার করিতে তর্পণ; মনিবের ভৃত্যকাৰ্য্য করিতে সাধন, উপাদান ফুল ফল লয়ে, এতদিন যে বাহু রাখিয়াছিনু তুলে, ব্ৰতভঙ্গে প্রথম জীবনে ব্ৰতভঙ্গে, প্রাণের যাতনে, একমাত্র দেখি প্রতিকার, একমাত্র শান্তি যাতনার- এ বাহু পিশাচ-রক্তে করিব রঞ্জিত। জাফর। দোহাই! দোহাই ! ক্ষমা কর রঘুবীর! একদিন তুমি মাের রেখেছিলে প্রাণ, পায়ে ধরি, দাও প্রাণ, করােনা হরণ। রঘু। ক্ষমা (হাস্য ) ক্ষমা কি জাফর। নর্মদার কাৰ্য্যে বাধা দিয়ে, এতদিন ধৰ্ম্ম সঙ্গে সেধেছি শত্রতা ; গুরের অধিবাসী দিবানিশি উৎপীড়িত তাের অত্যাচারে, উৰ্ধ কৃতাঞ্জলি পুটে বিধির নিকটে নিত্য তাের মৃত্যু ভিক্ষা করে। তাই অঁরি দিবস শর্বরী জ্বলে যায় প্রাণ মাের অনুতাপানলে। নর্মদার আবেদনে বিধাতা যথেষ্ট শাস্তি দিয়েছে আমায়। মর্ম ছিড়ে, বলদেব সখারাম সনে

রঘুবীর।
রঘু।
আমার সকল আশা গিয়েছে অকালে।
আজি প্রায়শ্চিত্ত তার জীবন তােমার
আমার এ ধৃষ্টতার যােগ্য বিনিময়।
সময় উত্তীর্ণ হয়। জাফর প্রস্তুত হও,
অর ইষ্টদেবে ।
জাফর। দোহাই! দোহাই।
(রঘুবীর কর্তৃক হত্যা
দুলিয়া। মহারাজ! কাৰ্য শেষ ! মরেছে পিশাচ।
তারপর ?
তারপর। তারপর কি বলি দুলিয়া ।
বলিতে হৃদয় কাঁপে, জড়তায় বাক্যশূন্য
রসনা আমার। তােদের সন্ধানে যেতে
সঙ্গী শূন্য নিরাশ্রয় পরীবাণু ভার
সপেছিনু ভগিনীর করে। দিয়াছিনু সপ্তাহ সময় ।
যদ্যপি সপ্তাহ মধ্যে না দেখে
ফিরিতে মােরে, আশ্রয় লইতে
ওই উদ্ধে মহাপথ দিছি দেখাইয়ে।
সপ্তাহ চলিয়া গেছে। ঢালিয়া আঁধার
সান্ধ্য সূৰ্য্য চলে গেছে ধরণীর পারে ।
শক্তি যদি থাকে ভাই,
ধরণী ভেদিয়া যাও পরপারে ;
ভাস্করে শুধাও ভাই, সে বলিয়া দেবে
কোথায় শ্যামলী।
তার কাছে আছে ন্যস্ত গুর্জর-কুসুম।
আর প্রশ্ন করােনা আমায়, পার যদি

১৭৩
।
রঘুবীর।
ধরে আন, সিংহাসনে করহ স্থাপন।
শ্যামলী-শ্যামলী ! ভিক্ষা দাও জনার্দন!
ভিক্ষা দাও মা শঙ্করী, দাসীরে তােমার।
| প্রস্থান
দুলিয়া। ভগবান্ ! গুরুপদ করিয়া স্মরণ
আজ্ঞা-মন্ত্রে করিয়াছি তব উপাসনা।
ভিক্ষা ঘৃণা পদতলে দলিছে কামনা।
দয়াময়! এ মাের প্রথম ভিক্ষা, এই
ভিক্ষা শেষ । কৰ্ম্ম
কৰ্ম্ম যুদ্ধে জীবন সঙ্গিনী,
ক্লান্ত দেহে আরাম দায়িনী,
সর্বনাশী—সৰ্ব্বস্ব আমার
অসাক্ষাতে মিলাইয়া যদি বায় প্রভু।
ধরে রাখ–ধরে রাখ,
প্রকৃতির নিয়ম লঘিয়া
ক্ষণ তরে বেঁধে রাখ মিনতি আমার ।
(দেবলকে লইয়া মনুর প্রবেশ)
ভাই মনু ! ছিড়ে লও মুণ্ড দুরাত্মার,
শীঘ্ন কর মুণ্ডশূন্য দুরাত্মা দেবলে,
জ্ঞান-লয়ে কালীপদে দেবাে উপহার।

সপ্তম দৃশ্য। পার্বত্য বনপ্রান্ত। অনন্তরাওয়ের চিতা প্রজ্বলিত। ( ভগ্নকাষ্ঠ স্কন্ধে শ্যামলীর প্রবেশ) শ্যামলী। যাও পিতা শান্তির ক্রোড়ে সুখে নিদ্রা যাও! সংসারের সমস্ত জ্বালা তােমার আদরের কন্যার স্বহস্ত, প্রম্বলিত চিতানলে নিৰ্বাপিত হয়েছে—নিশ্চিন্ত হয়ে নিদ্রা যাও ! সহস্র জাফরেও তােমার বিশ্রামের আর ব্যাঘাত করতে পারবে না। ব্রাহ্মণ ! আজীবন জ্ঞানের সেবা করে শেষে উন্মত্ততার আশ্রয় গ্রহণ করেছ-উন্মত্ততা বড় আদরে তােমার বিশ্রামের অতি সুন্দর—অতি মধুর-ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সে অপূৰ্ব্ব মাধুর্য্যে আকৃষ্ট হয়ে তােমার পরী আর শ্যামলী প্রসাদ পাবার লােভে ছুটেছে—নাও পিতা, তাদের কোলে তুলে নাও-তােমার ঐ শান্তিময় বিশ্রামাগারের এক কোণে তাদের একটুকু স্থান দাও- তারা বড় শ্রান্ত। কিন্তু মা শঙ্করী! একবার কি তাকে শেষ দেখা দেখতে দিবিনি ? দোহাই মা-একবার দেখা! দুলিয়া! দুলিয়া! এ সময় কোথা তুই ? ( দুলিয়ার প্রবেশ) দুলিয়া। এই যে—এই যে! জয় কালী! জয় শঙ্করী! মহারাজ! রঘুমহারাজ ! শ্যামলী। কেও দুলিয়া ? দুলিয়া। একি শ্যামলী ! চক্ষু রক্তবর্ণ কেন? একি রাঙ্গাবউ! কঁাধে কাঠ কেন?

১৭২
রঘুবীর।
শ্যামলী। কাঠখানা আগে ধরুভাইকে ডাকিস্ নি।
( দুলিয়া কর্তৃক কাষ্ঠ গ্রহণ ও শ্যামলীর দুলিয়াকে প্রণাম )
মা সতীকুলরাণী ! তনয়ার কাতরকণ্ঠ তবে কি সত্য সত্য কাণে
তুলেছিস্ মা ! স্বামি! বহু অপরাধ করেছি, দাসীকে ক্ষমা কর ।
দুলিয়া। এ সব কি রাঙ্গাবউ ?
শ্যামলী। আমি চ’লুম্ ।
দুলিয়া। একান্তই ?
শ্যামলী। বিধান থাকতে দিলে না। দুলিয়া! পরীবাণু ও
আমি একত্রে বিষপান করেছি। আর পিতা ঐ জ্বলন্ত চিতায়..
দুলিয়া। মহারাজ! রঘুমহারাজ !
শ্যামলী। ভাইকে ডাকিস্ নি।
দুলিয়া। আর ত সব ফুরিয়ে গেল। গুরু আমার উন্মাদের
মত চলে গেছে। সেও জন্মের মতন দুটো কথা কয়ে নি।
মহারাজ! মহারাজ!
(শ্যামলীর কাষ্ঠ পুনঃ গ্ৰহণ ও রঘুবীরকে লইয়া
দুলিয়ার পুনঃ প্রবেশ)
শ্যামলী! শ্যামলী !
শ্যামলী। এই যে ভাই!
রঘু। তবে সৰ্ব্বনাশী ! ভাইয়ের প্রতি করুণা দেখাতে
এখন বেঁচে আছি?
শ্যামলী। আছি। (প্রণাম করণ)
রঘু। পরীবাণু কই ?
শ্যামলী। আর দেখে কাজ নাই।
দুলি। আর তাকে দেখে কাজ নাই ?
রঘু। শ্যামলী
!
!

১৭৩ রঘুবীর। রঘু। সেকি! তাকে দেখবে না!—শীঘ দেখা। সিংহাসন তার অভাবে শূন্য! পরী কই ?—গুজরাটের রাণী কই ? ( পটপরিবর্তন।) (ফুলবেষ্টিত প্রস্তরাসনে অর্ধশয়নাবস্থায় নিমীলিত নেত্রে পরীবাণু) রঘু। ওকি! ওকি ? শ্যামলী। ওই দেখ,-গুর্জরের রাণী ফুল-রেণুর আবরণে প্রকৃতিদত্ত সােণার সিংহাসনে, অনন্ত সুখের আবেশে, অর্ধ- নিমীলিত নয়নে কেমম বসে আছে। দেখ ভাই। শিলাতলে কি অপূৰ্ব্ব শােভা! ভাই, পরীকে বিষ খাইয়েছি, স্বর্ণকমলকে মন্দাকিনীর সুধার হিল্লোলে ঢেলে দিয়েছি। দুরাত্মা জাফরের কর, আর ওখানে পৌঁছিতে পারবেনা। রঘু। ঢেলে দে রে কর্ণদ্বারে গলিত পাষাণ, বেঁধে চক্ষু কালফণী-দাতে, বিদরিয়া হৃদয় আমার সহস্র ধারায় ছুটে আয়, সহস্র খাণ্ডবনাশী দাবানল। চূর্ণ কর বজ্রধর,- প্রাণ পুড়ে হােক ভস্মরাশি। শ্যামলী। তােমায় এ না সাজে রঘুবীর ! দেখ চক্ষু মরুভূমি প্রায়,-জলবিন্দু নাই। দেখ তরুস্কন্ধ কাটি বাহুবলে সাপটিয়া করেছি ধারণ, চিন্তা কিছু নাই—ফিরে নাহি চাই কোথা রয় মৃত্যুমুখী বালা- দেখরে পাষাণ-বক্ষ পাষাণ-শী তল। তুগিয়া সংসার-জ্বর-কাতর অন্তর-

১৪
•! ::
রঘুবীর।
পরী মাের ঘুমাইতে চলে।
অভিঘাত প্রচণ্ড তুফান যেই সহিতে নারি,
ক্ষুদ্রতরী তলভেদী দিছি ডুবাইয়া।
যা চলে, যা চলে অনন্ত আঁধারে,
জলকম্প সেথা নাই আর।
পিতা মাের মুখে নিদ্রা যায়,
কার সাধ্য তুলে তায়,
কে তারে তুলিয়া আনে জাগ্রত শ্মশানে
দেখাবারে চিত্তের দহন !
তবে কেন ধীর রঘুবীর
এমন অস্থির! কেন আত্মায় পীড়িত কর দারুণ বাতনে ?
বিচ্ছেদেই ধরণীর সীমার বিস্তায়,
মিলনে ধরণী কত দিন?
রেখে দিনু পদপ্রান্তে দুলিয়া আমার
তব দত্ত উপহার কাছে রেখাে -
সুখে দুঃখে রেখাে সান্ত্বনায়।
আমি চলি,-দাও পদধূলি। ( শয়ন ও মৃত্যু।)
যারে ধর প্রলয় কম্পনে।
আয়-ভাঙ্গিয়া ব্ৰহ্মাণ্ডদ্বার প্রচণ্ড আঁধার
ত্বরা দেরে ভগ্নস্তুপ ডুবাইয়া,
মুচি ন রয় ধরার
abামলীচৈতায় নিক্ষেপের উদ্যোগ )
---
যবনিকা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Raghubir

Author
Bidyabinod,khirod Prosad
Title
Raghubir
File name
Raghubir
Text
OCR done
Citation
1903
Published
2009/10/7
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
186
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Paribanu
DLI number
513132
Barcode
4990010020139.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
2qdz5YckXsN
Download PDF

Raghubir