Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sir Chandramadhab Ghosh

Kumar, Ganendranath Ed · 2010/01/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্যর চন্দ্রমাধব ঘোষ
L
জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমার-সম্পাদিত
ফাগুন-১৩৩৯
মূল্য ১১

প্রজাপতি-সম্পাদক অজ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমার
২০৯ কর্ণওয়ালিশ ফ্লীট, কলিকাতা
প্রিন্টার-শ্রীঅহিভূষণ ঘােষ
ভিক্টোরিয়া প্রেস
১এ, মহেন্দ্র গােস্বামী লেন, কলিকতা।

মান্যবর রাজা স্যর মন্মথনাথ রায় চৌধুরী, কে, টি, এম,এল, সি, এম,আর, এ,এস, এফ,আর, এস,এ, এফ,আর, সি,আই।

No text on this page.

বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সুণোগ্য
সভাপতি
প্রসিদ্ধ কর্মী, সকল সকাৰ্য্যে
উৎসাহী নেতা
আদর্শ স্বামী
মান্যবর রাজা স্যর মন্মথনাথ রায় চৌধুরী
মহােদয়কে বাঙ্গালীর গৌরব
স্যর চন্দ্রমাণব ঘোষ মহাশশ্নের
পুণ্যজীবনকথা শ্রদ্ধাসহকারে
উৎসর্গ করিলাম
জানেনাথ কুমার

No text on this page.

Chunkelh Ghore ruly 1906

No text on this page.

স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ জন্ম ও বংশ-বিবরণ স্যর চন্দ্ৰমাধব ঘােষ ঢাকা জেলার অন্তর্গত বিক্রমপুর পরগণার যােলঘর গ্রামে ১২৪৫ সালের ১৫ই ফান (ইং ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দের ২৬শে ফেব্রুয়ারী) জন্মগ্রহণ করেন। তাহার পিতৃদেবের নাম রায় গুগীয় দুর্গাপ্রসাদ ঘােষ বাহাদুর এবং মাতৃদেবীর নাম স্বর্গীয়া চনমালা। রাজা আদিশূর বিরাট যজ্ঞ সমাধা করিবার জন্য যে পঞ্চজন ব্রাহ্মণকে কান্যকুঞ্জ হইতে আনয়ন করিয়াছিলেন তাহাদের সঙ্গে পঞ্চজন কায়স্থও বঙ্গদেশে আসিয়াছিলেন। সেই পঞ্চজন কায়স্থের মধ্যে মকরন্দ ঘােষ অন্যতম। স্যয় চন্দ্ৰমাধব এই মকরন্দ ঘােষেরই বংশধর। বঙ্গদেশের ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের কায়স্থগণ আপনাদিগকে চিত্র গুপ্তের বংশধর বলিয়া দাবী করেন। তাঁহারা আরও বলেন যে, তাহারা ক্ষত্রিয় বা অন্তত পক্ষে ক্ষত্রিয়ের সমতুল্য এবং সম্মানে ব্রাহ্মণেরই অব্যবহিত পরবর্তী। নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র যে ইতিবাদ-বিশ্রুত যজ্ঞ করিয়াছিলেন সেই যজ্ঞ-সভায় কায়স্থগণকে, ক্ষত্রিয়ের আসনে উপবেশন করিবার অধিকার দিয়াছিলেন। বখতিয়ার খিলিজি পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গ অধিকার করিলে পর লক্ষ্মণ সেন পূর্ববঙ্গের রাজধানী বিক্রমপুরে গমন করেন এবং প্রায় একশত বৎসর কাল তিনি ও তাঁহার বংশধরগণ হিন্দুরাজ্যের এই অবশিষ্ট অংশের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন। পরে ইহাও মুসলমানগণের অধিকার- ২ শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ করেন। ভুক্ত হয়। মুসলমানেরা বিক্রমপুর ধ্বংশ করেন এবং সুবর্ণগ্রাম বা সােনারগাঁওয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। যখন লক্ষ্মণ সেন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী নবদ্বীপ হইতে বিক্রমপুরে পলায়ন করেন সেই সময়ে তাঁহার সহিত বহু সদ্ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারও বিক্রমপুরে আশ্রয় গ্রহণ যে সকল উচ্চশ্রেণী ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাহারাও রাজার সহিত বিক্রমপুরে আগমন করিয়াছিলেন। লক্ষ্মণ সেন ইহাদিগকে বিক্রমপুরের চতুষ্পৰ্থে ভূমি দান করিয়াছিলেন। বিক্রমপুরের সন্নিহিত অঞ্চলের উচ্চশ্রেণী কায়স্থগণকে আজও তথাকার সাধারণ লোকেরা ভুইয়া বলিয়া থাকে। বিক্রমপুরে হিন্দুরাজ্যের স্বাধীনতা লুপ্ত হইবার সময়ে কায়স্থগণের কিয়দংশ চন্দ্রদ্বীপে পলায়ন করেন এবং ক্রমশঃ প্রবল পরক্রান্ত হইয়া উঠেন। উহারা বঙ্গীয় কায়স্থ সমাজ গঠন করেন। কিন্তু ভাল ভাল কুলীন ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবার বিক্রমপুরের উপকণ্ঠ বা সান্নিধ্য ত্যাগ করেন নাই। অবশ্য দারিদ্র্যে ও অভাবে ইহাদের অবস্থা ক্রমশঃ অত্যন্ত শশাচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। বিক্রমপুরের নিকটবর্তী জলাভূমির মধ্যস্থিত গ্রামগুলিতে কয়েক ঘর ঘােষ, বসু, গুহ, মিত্র ও দত্ত বসবাস স্থাপন করিয়াছিলেন। ঘটকেরা বলেন, স্যর চন্দ্রমাধব ঘেসেপূৰ্বপুরুষগণও তাহাদের অন্তর্ভুক্ত; তাহারা চন্দ্রদ্বীপ হইতে এই অঞ্চলে আগমন করিয়াছিলেন। চন্দ্রদ্বীপ ও বরিশালে ভাল কুলীন ব্রাহ্মণের বাস ছিল না। যেখানে ভাল কুলীন ব্রাহ্মণের বাস, তথায় ভাল ভাল কুলীন কায়স্থগণ ও থাকিতেন এবং ইহাই সম্ভব বলিয়া মনে হয় । উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যাহাই ঘটুক না কেন, স্যর চমাধব ঘােষের পূর্বপুরুষগণ ষোলঘরে আসিয়া বসবাস স্থাপন করিয়াছিলেন। এই যােলঘর গ্রাম প্রাচীন দয়ালভােগ গ্রামের পার্শ্বেই অবস্থিত ছিল। বৌদ্ধ দয়াল বা বিহারের নামে উৎসর্গীকৃত বলিয়াই এই গ্রামের নাম দয়ালভােগ হইয়াছিল। স্যর চন্দ্ৰমাধবের স্যর চমাধব ঘােৰ পূৰ্বপুরুষগণের অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না; তথাপি সাধারণ লােকে তঁাহাদিগকে ভুইয়া নামে অভিহিত করিত। পিতামহ ও পিতা চমাধবের পিতামহের নাম গােবিন্দপ্রসাদ ঘােয। তাহার ভাই ছিল না। তাহার অকালে মৃত্যু হইয়াছিল। তিনি বিধবা পত্নী ও দুই পুত্র রাখিয়া গিয়াছিলেন। পুত্রদ্বয়ের নাম—হরপ্রসাদ ঘোেষ ও দুর্গাপ্রসাদ ঘােষ। কনিষ্ঠ দুর্গাপ্রসাদ অত্যন্ত বুদ্ধিমান বালক ছিলেন। তিনি তঁাহার মাতার নয়ন-মণি ছিলেন। তিনি চরকায় সূতা কাটিয়া তব্ধ অর্থে দুর্গাপ্রসাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন । দুর্গাপ্রসাদ অল্প সময়ের মধ্যেই ফারসী ও বাঙ্গালা ভাষায় অভিজ্ঞ হইয়া উঠেন এবং বরিশালের কালেক্টরীতে কৰ্ম্ম পান। তাঁহার কর্মে যােগ্যতা, সাধুতা এবং অধ্যবসায় দেখিয়া কর্তৃপক্ষ তাহাকে চট্টগ্রামের সেরেস্তাদার-পদে নিযুক্ত করেন। ইতিমধ্যে দুর্গাপ্রসাদের সহিত বজ্রযােগিনীর প্রসিদ্ধ গুহ জমিদার-বংশীয় কমলাকান্ত গুহ মহাশয়ের কন্যার বিবাহ হয়। বজ্রযােগিনী গ্রাম অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৌদ্ধ সাহিত্যে ইহা অতীশের জন্মভূমি বলিয়া কথিত আছে । কমলাকান্ত একটী মাত্র পুত্র রাখিয়া পরলােক গমন করেন। তঁাহার নাম গুরুপ্রসাদ গুহ। গুরু প্রসাদ নিঃসন্তান ছিলেন। ইহার পিতৃব্য ও খুল্লতাত-পুগণের বংশধরবৃন্দ ক্রমে প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হইয়া উঠেন। ইহাদের মধ্যে কালীকিশাের গুহ মহাশয়ের নাম বিখ্যাত। কমলাকান্তের এক খুড়তুতা ভাইয়ের কন্যার সহিত প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার ও বাগ্মী মনােমােহন ঘােষ ও লালমােহন ঘােষের পিতা রামগােপাল ঘােষের বিবাহ হইয়াছিল। ইহাদের উভয়ের সহিত স্যর ' চমাধবের প্রভূত সদ্ভাব ছিল ।

স্তর চমাধব ঘােষ দুর্গাপ্রসাদের এক কন্যা ও এক পুত্র। কন্যাটাই জ্যেষ্ঠা- তঁাহার নাম সত্যভামা ; কনিষ্ঠটা পুনাম চন্দ্রমাধব ঘােষ। ইহারই জীবন-চরিত বৰ্ত্তমান প্রবন্ধে বণিত হইতে ছ । ষােলঘর গ্রামে দুইটী সন্তানই ভূমিষ্ঠ হয়েন। চন্দ্র মাধবের অন্নপ্রাশন হইয়া যাইবার পর তাঁহার পিতা দুর্গাপ্রসাদ স্ত্রীপুত্রকন্যাদিকে কর্মস্থল চট্টগ্রামে লইয়া যান। কর্মসূত্রে এখানে তিনি কয়েক বৎসর অবস্থান করেন। আজও তাহার নাম তথাকার লােকে সসম্রমে স্মরণ করে। দুর্গাপ্রসাদ তেজস্বী ও অত্যন্ত সৎ ব্য িছিলেন। সাধুতার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। একবার চট্টগ্রামের কালেক্টর সাহেব দুর্গাপ্রসাদকে বলেন- তুমি ট্রেজারীর চাবি অপর একজন কর্মচারীকে প্রদান কর। কি কারণে এরূপ আদেশ তাহাকে দেওয়া হয় তাহা কালেক্টরসাহেবই জানিতেন। কিন্তু কাছারীর নিয়ম-অনুসারে এরূপভাবে ট্রেজারীর চাবি দেওয়া অসঙ্গত ও অন্যায়। কাজেই তিনি তাহার উপরিওয়ালা কালেক্টর সাহেবের আদেশ রক্ষা করিতে অসম্মত হইলেন। এজন্য কালেক্টরসাহেব তাঁহার উপর অত্যন্ত চটিয়া গেলেন এবং সরকারে লিখিলেন - এরূপ অবাধ্য কর্মচারীকে কৰ্ম্মচ্যুত করা উচিত। কিন্তু বিভাগীয় কমিশনার মিষ্টার হার্ভে যখন এই ব্যাপারের আমূল তদন্ত করিলেন, তখন তিনি প্রীত হইয়া দুর্গাপ্রসাদকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং উহাকে ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট করিয়া দিয়া চব্বিশ পরগণার সদরে তথাকার বিভাগীয় কমিশনের পার্শনাল এসিষ্ট্যান্ট নিযুক্ত করিলেন। ফলে দুর্গাপ্রসাদ চট্টগ্রাম হইতে চব্বিশ পরগণার সদর আলিপুরে বদলী হইলেন। স্যর চন্দ্রমাধব যখন চট্ট গ্রামে যান, তখন তঁাহার বয়স পাচ বৎসর। এখানে তিনি ১৮৪২ খৃষ্টাব্দ হইতে ৮৪৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিলেন। অতঃপর তাঁহার পিতা চব্বিশ পরণার সদর আলিপুরে বদলী কুয়েন। .

র চমাধব ঘােষ শৈশব চট্টগ্রামে থাকিবার সময়ে চন্দ্ৰমাধব একটি ছােট টাট্ট, ঘােড়ায় চড়িয়া বেড়াইতেন এবং মধ্যে মধ্যে জিলা স্কুলটী দেখিয়া আসিতেন। তখন মিষ্টার ভৌহান চট্টগ্রাম জিলা স্কুলের হেডমাষ্টার ছিলেন। তিনি চন্দ্রমাধবকে স্নেহের চক্ষে দেখিতেন। মিষ্টার ভৌহান কলিকাতার হিন্দু স্কুলে বদলী হয়েন এবং পরে চন্দ্রমাধব ভবানীপুরে আসিলে তিনি তাহার প্রিয় ছাত্র হইয়াছিলেন। দুর্গাপ্রসাদ আলিপুরে বদলী হইয়া আসিয়া ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ায় বাস করেন। তাহার বাসা তখনকার সদর দেওয়ানী আদালতের সেরেস্তাদার বাবু রামচন্দ্র মিত্রের বাটীর অতি নিকটে অবস্থিত ছিল। ইনিই হাইকোর্টের বিচারপতি স্বর্গীয় স্যর রমেশচন্দ্র মিত্রের পিতা। শীঘ্রই উভয় পরিবারে সদ্ভাব জন্মিল ; সেই সম্ভাব অদ্যাপি বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রায় তিন পুরুষ ধরিয়া উভয় পরিবারে এই সদ্ভাব চলিয়া আসিতেছে। শিক্ষার চক্রবেড়িয়ার রামানন্দ মিত্রের বাড়ীতে একটী পাঠশালা ছিল ; সেই পাঠশালায় প্রথমে চন্দ্রমাধবকে ভর্তি করিয়া দেওয়া হয়। চাউল- পটীতে কেশব মাষ্টার ও গৌরনারায়ণ বসু উভয়ে মিলিয়া একটা স্কুল খুলিয়াছিলেন, সেখানে ইংরেজী শিখানাে হইত। অতঃপর চন্দ্রমাধবকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হয়। এই গৌরনারায়ণ বসু মহাশয় অত্যন্ত বৃদ্ধবয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং চন্দ্ৰমাধব তঁাহার বাল্যের এই শিক্ষাগুরুকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন।

শ্যর চন্দ্ৰমাধব ঘােষ দুর্গাপ্রসাদ প্রায় সমস্ত পশ্চিমবঙ্গের জমি জরিপ করিয়াছিলেন এবং ব্রহ্মোত্তর ও লাখেরাজ জমির স্বত্ব-স্বামি নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার নির্ধারণে সকল পক্ষই সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। সেটলমেন্ট বা জরিপের কাৰ্যভার গ্রহণ করিয়া তাহাকে বহু স্থানে ভ্রমণ করিতে হইয়াছিল। অধিকাংশ সময়ে তাহাকে মাসের পর মাস তাবুতেই কাটাইতে হইত। বারুইপুরে থাকিবার সময়ে তাঁহার সহিত তথাকার প্রসিদ্ধ চৌধুরী-পরিবারে কর্তাদেব অত্যন্ত পরিচয় হইয়াছিল। একজন কর্তার নাম ছিল-নন্দবাবু। এখন চৌধুরী পরিবারের পুরাতন কৰ্ত্তার। সকলেই বোধ হয় পরলােকগত হইয়াছেন; এক্ষণে দুই পরিবারের বন্ধুতার কথা সম্ভবতঃ বিশ্বতির গহবরে বিলুপ্ত হইয়াছে। ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে দুর্গাপ্রসাদ যশােহরে বদলী হয়েন। ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দের ৮ই মার্চ তারিখে চন্দ্ৰমাধবকে হিন্দু কলেজে ভর্তি করিয়া দেওয়া হয়। দুর্গাপ্রসাদ চন্দ্ৰমাধবকে তাহার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় ও স্বগ্রামবাসী বাবু রামকানাই ঘােষের বাটতে তাহারই তত্ত্বাবধানে রাখিয়া যান। রামকানাইবাবু প্রেসিডেন্সি বিভাগের কমিশনারের সেরেস্তাদার ছিলেন। রামকানাইবাবুর পুত্র কালীপ্রসন্ন ঘােষও চন্দ্ৰমাধবের সহিত একত্র হিন্দু কলেজে ভর্তি হইয়াছিলেন। কালীপ্রসন্নবাবু পরে ঢাকার সরকারী উকীল হইয়াছিলেন। ইহার অল্পদিন পরে রামকানাই বাবুর মৃত্যু হয়। দুর্গাপ্রসাদ তখন যশােহরে। রামকানাইবাবুর মৃত্যু হইলে দুর্গাপ্রসাদ ভবানীপুরে একটা বাটা লয়েন। তথায় কেবল চমাধব নহেন, কালীপ্রসন্ন ঘােষ ও তঁাহার খুল্লতাত-পুত্র পূর্ণচন্দ্র ঘােষও কয়েক বৎসর অবস্থান করিয়াছিলেন। অবস্থান করিয়াছিলেন। অবশ্য দুর্গাপ্রসাদই তাঁহাদের সকলের অভিভাবক ছিলেন। পূর্ণচন্দ্র ঘােষ পরে ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট হইয়াছিলেন।

স্বর চন্দ্ৰমাধব ঘােষ বিবাহ ১৮৪৯ খৃষ্টাব্দে চন্দ্রমাধব ও ভঁহার জ্যেষ্ঠতাতপুত্র নীলমাধবের সহিত যথাক্রমে শ্ৰীমতী হেমন্তকুমারী এবং শ্ৰীমতী সৌদামিনীর বিবাহ হয়। ইহারা উভয়েই প্রসিদ্ধ টাকির রায়চৌধুরী-বংশীয় কালীশঙ্কর রায়চৌধুরীর কন্যা। হেমন্তকুমারীর বয়স যখন ছয় এবং চন্দ্ৰমাধবের বয়স তখন এগার বৎসর মাত্র। একই বাড়ীতে একই সময়ে মহাসমারােহে দুইজনেরই বিবাহ হইয়াছিল ; তবে বিবাহের স্থান অবশ্য স্বতন্ত্র ও পৃথক রাখিতে হইয়াছিল। কন্যাপক্ষ এই উপলক্ষে টাকি হইতে ভবানীপুরে আসিয়াছিলেন। পূর্ণচন্দ্র ঘােষ মহাশয় বিবাহ-ব্যাপারের তত্ত্বাবধান করিয়াছিলেন। ছাত্রজীবন এই বিবাহের অল্পদিন পরেই চমাধবের ভগিনীপতি নগরের বিখ্যাত কুলীন মুস্তফী পরিবারের রামকুমার গুহ মুস্তফীর মৃত্যু হয়। ইহাতে ঘােষ-পরিবারে শােকের গভীর ছায়া নিপতিত হয়। এইজন্য এই বিবাহকে অনেকে অমঙ্গলজনকও বলিয়াছিলেন। রামকুমার বাবুর যখন মৃত্যু হয় তখন চন্দ্ৰমাধবের একমাত্র ভগিনী সত্যভামার বয়স মাত্র ১৪ বৎসর। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন এবং পরিবারের কীরূপে দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন। হিন্দু কলেজে চন্দ্ৰমাধবের দুইজন সহপাঠীর সহিত বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল ; ইহাদের নাম- শ্ৰীশচন্দ্র ঘােষ ও কেশবচন্দ্র সেন। খিদিরপুরের বাবু মহিমচন্দ্র ঘােষ শ্রীশচন্দ্রের পিতা, এবং কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজের বিখ্যাত নেতা ছিলেন। এই দুই সহপাঠীর সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হওয়ায় চন্দ্ৰমাধবের চরিত্র সুগঠিত হইয়াছিল। চন্দ্রমাধবের অন্যান্য সহপাঠিগণের নাম উল্লেখযােগ্য বলিয়া এখানে উল্লিখিত হইল,- চণ্ডীচরণ বিশ্বাস, ইনি শ্যর চমাধব ঘােষ ; কুক কোম্পানীর কেসিয়ার ছিলেন ; কলিকাতার বাবু সাতকড়ি মিত্র ; বলাইচাদ দত্ত ; কালীকৃষ্ণ সেন, হাইকোর্টের উকীল ; ইটিলীর দেবেন্দ্র চন্দ্র বােস ও অানন্দগােপাল পালিত, ইহারাও হাইকোর্টের উকীল ছিলেন। হাটখোলা দত্ত-বংশের বাবু নবীনচঁদি দত্ত দেবেন্দ্র চন্দ্র দত্ত; ভবানীপুরের রামচ মিত্রের পুত্র কাশীচন্দ্র মিত্র প্রেসিডেন্সী কলেজের বাঙ্গলার অধ্যাপক রামন্দ্র মিত্রের পুত্র গিরিশচন্দ্র মিত্র ও উমেশচন্দ্র মিত্র ; খিদিরপুরের বাবু আশুতােষ মুখখাপাধ্যায়। ইহারা সকলেই চন্দ্ৰমাধবের বন্ধু ছিলেন। বিশেষতঃ আশুতােষ মুখােপাধ্যায়, কালীকৃষ্ণ সেন, কাশীচন্দ্র মিত্র ও গিরিশচন্দ্র মিত্রের সহিত তাহার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। হিন্দু কলেজে অধ্যয়ন করিবার সময়ে যখন তঁাহার বিবাহ হয় সেই সময়ে তিনি কতকগুলি দুষ্ট ছেলের প্রভাবে পড়েন এবং মধ্যে মধ্যে কলেজ হইতে পলাইতে আরম্ভ করেন; কলেজে না আসিয়া ইনি মনুমেন্ট, শিবপুরের বােটানিক্যাল গার্ডেন প্রভৃতি দেখিয়া বেড়াইতেন। অবশ্য ইহাতে তাহার নৈতিক চরিত্র ক্ষুন্ন হয় নাই বটে কিন্তু পড়াশুনায় তিনি অবহেলা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই সময়ে বাবু রামচন্দ্র মিত্রের পুত্র বাবু উমেশচন্দ্র মিত্র সহপাঠী চন্দ্ৰমাধবকে সাবধান করিয়া দেন এবং চ মাধবের পিতাকে বলেন, চন্দ্র মাধবকে আমাদের সহিত সৰ্ব্বদা থাকিতে বলুন; সে যাহাতে আমার ছােট ভাই কাশীচন্দ্র প্রবােধচন্দ্র ও রমেশচন্দ্র মিত্রের সহিত থাকে এমন আদেশ তাঁহার উপর করুন। চমাধব ইহাদের বাড়ীতে কয়েকমাস ছিলেন এবং ইহাদেরই ঘরের গাড়ী করিয়া ইহাদেরই সহিত কলেজে যাওয়া: আসা করিতেন। তাঁহাদের সাহচর্যে চন্দ্রমাধব দুষ্ট সঙ্গীদের প্রভাব হইতে মুক্ত হয়েন। এইজন্য তিনি মিত্রবংশীয়দের নিকট কৃতজ্ঞ আছেন বলিয়া মনে করিতেন এবং তর মাধব ঘােষ কালে যখনই সুবিধা হইত তখনই এই কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশােধ করিতে চেষ্টা করিতেন। কয়েকটী মামলায় চন্দ্ৰমাধব বিনা পারিশ্রমিকে তাঁহাদের পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন এবং মামলায় জয়লাভ করাইয়া দিয়াছিলেন। রমেশচন্দ্র মিত্র যখন প্রথম উকীল হইয়া হাইকোর্টে বাহির হন, সেই সময়ে চমাধব তাহাকে অল্পবিস্তর সাহায্য করিয়াছিলেন। মােট কথা, মিত্র-বংশীয়দিগের বাড়ীতে থাকিবার সময় হইতেই চন্দ্ৰমাধবের জীবনের গতি নূতন পথে ধাবিত হইয়াছিল এবং তিনি শীঘ্রই কলেজের স্বশ্রেণীস্থ উৎকৃষ্ট ছাত্রগণের মধ্যে অন্যতম বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিলেন। চন্দ্ৰমাধব যখন হিন্দুকলেজের উচ্চতর শ্রেণীতে অধ্যয়ন করিতেন, সেই সময়ে চট্টগ্রাম স্কুলের ভূতপূৰ্ব্ব হেডমাষ্টার মিষ্টার জােহান মিষ্টার ভাইনিং এবং বাবু ঈশানচনু সাহা তাহার শিক্ষক ছিলেন। ইহার সকলেই উৎকৃষ্ট শিক্ষক এবং ছাত্রদিগের পড়াশুনার দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন। বিশেষতঃ ঈশানবাবু ছাত্রদের উন্নতির জন্য অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করিতো এবং ছাত্রেরা যাহাতে নিয়মিতভাবে পড়াশুনা করে এবংনিয়মের অনুবৰ্ত্তী হইয়া চলে তাহাদিগকে সেইভাবে তৈয়ারী করিতেন। পড়াশুনায় ফঁাকি দিয়া তাহার নিকট হইতে অব্যাহতি পাইবার উপায় কোন ছাত্রেরই ছিল না। ঈশানবাবুর নিকট নিয়মিত ভাবে অধ্যয়নের যে অভ্যাস চন্দ্রমাধব আয়ত্ত করিয়াছিলেন সেই অভ্যাস তাহার পরবর্তী জীবনে অত্যন্ত সুফলদায়ক হইয়াছিল। হিন্দু কলেজের নিম্নতর শ্রেণীতে জয়গােপাল শেঠ নামক একজন শিক্ষক ছিলেন, ইনিও ছাত্রদিগকে নিয়মিতভাবে পাঠ মুনীলনে রত করিবার জন্য অত্যন্ত শ্রম স্বীকার করিতেন। তখন শনাথ দাস মহাশয় হিন্দু কলেজের সিনিয়র বৃত্তিভােগী ছাত্র ছিলেন,কোন শিক্ষক অনুপস্থিত হইলেহার হইয়া শ্ৰীৰাথবাবু মধ্যে মধ্যে শ্যর চমাধব ঘােষ ক্লাসে পড়াইতে আসিতেন। ইনি অতঃপর সদর দেওয়ানী আদালত ও পরে হাইকোর্টের একজন প্রসিদ্ধ উকীল হইয়াছিলেন। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে চন্দ্ৰমাধব জুনিয়র স্কলারসিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া বৃত্তি লাভ করেন। এই পরীক্ষা দিয়াই তিন বাকু জেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে গমন করেন। সেখানে তাঁহার পিতা জমি-জরিপ- কাৰ্য পরিদর্শন করিতেছিলেন। তখন রেল হয় নাই, চলমাধবকে পাক্কীতে চডিয়া বিষ্ণুপুর গমন করিতে হইয়াছিল। তিনি পিতার নিকট দুইমাস ছিলেন। এই দুই মাসে তাহার স্বাস্থ্যের প্রভূত উন্নতি হইয়াছিল। তখন বিষ্ণুপুর অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর স্থান ছিল। কলিকাতায় ফিরিবার পথে চন্দ্ৰমাধব বর্ধমান পরিদর্শন করেন এবং তথাকার দেলপােস প্রাসাদের সৌন্দর্য দেখিয়া অভ্যন্তু মােহিত হন। জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষা দেওয়ার পর চন্দ্রমাধব সদা-প্রতিষ্ঠিত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েন, কিন্তু গণিত-শাস্ত্রে তিনি কি কাচা থাকায় ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে বার্ষিক পরীক্ষায় তাহার বৃত্তি কাটা যায়। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে চমাধবের পিতা চন্দ্রমাধবকে বর্ধমানের তদানীন্তন মহারাজাধিরাজ বাহাদুর মহাতপাদের সহিত পরিচিত করিয়া দেন। তদবধি মহারাজাধিরাজ বাহাদুর চন্দ্রমাধবকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। যথাসময়ে তিনি সিনিয়র স্কলারশিপ, পরীক্ষা দেন কিন্তু বৃত্তিলাভ করিতে পারেন নাই। ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে আইনের শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন মিষ্টার মন্টি য়াে ও মিষ্টার বুলনােইস আইনের অধ্যাপক ছিলেন। এখানে আইন অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্র মাধব ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক মিষ্টার গ্ৰেফেলের শ্রেণীতেও স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ অধ্যয়ন করিতেন। এইজন্য ইংরাজী ভাষায় তাহার যথেষ্ট অধিকার জন্মিয়াছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন অধ্যয়নর সময়ে তাহার সহিত ভুবন- চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও কুঞ্জলাল মুখােপাধ্যায়ের পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ভুবনচন্দ্র হুগলী কলেজ হইতে এবং কুঞ্জলাল কৃষ্ণনগর কলেজ হইতে আসিয়াছিলেন। কুঞ্জলাল নদীয়া মুড়াগাছা প্রসিদ্ধ জমীদার দেবীদাস মুখােপাধ্যায়ের পুত্র ছিলেন। ইহারা উভয়ে এক্ষণে পরলােকগত । ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। চন্দ্ৰমাধব এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এন্টন্সি বা প্রবেশিকা পরীক্ষা প্রদান করেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েন। এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইবার সময়ে তাহাকে গুরু পরিশ্রমের সহিত পাঠাভ্যাস করিতে হইত। ইহার উপর তাহাকে আইনও পড়িতে হইত । এত পরিশ্রম তাহার সহ হইল না ; স্বাস্থ্যভঙ্গ হইল ; মুখ দিয়া রক্ত উঠিল। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে জুন মাসে বি-এ পরীক্ষা দিবার জন্য তাহার যে সঙ্কল্প ছিল তাহা ত্যাগ করিতে হইল। কিছুদিনের জন্য পড়াশুনা ছাড়িয়া সম্পূর্ণ বিশ্রামলাভের প্রয়ােজন হইয়াছিল। সেইজন্য তিনি ভবানীপুর ত্যাগ করিয়া বর্ধমানে তাঁহার পিতামাতার নিকট গমন করেন। এখানে তঁাহার স্ত্রীও ছিলেন। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে সিপাহী-বিদ্রোহ ঘটিয়াছিল তবে সুখের বিষয়, বেশীদিন স্থায়ী হয় নাই এবং বঙ্গদেশে ইহা ঘটে নাই। কিন্তু সমগ্র ভারতে-বিশেষতঃ উত্তর-পশ্চিম ভারতে এই বিদ্রোহের জন্য জনসাধারণ বিচলিত হইয়া উঠিয়াছিল । বিহার প্রদেশে এই বিদ্রোহ কিছুদিনের জন্য ভীষণ আকার ধারণ করিয়াছিল এবং লােকে ভবিষ্যৎ ভাবিয়া অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছিল। বাঙ্গলাদেশে হিন্দু মুসলমান উভয়েরই এই বিদ্রোহের প্রতি একটুও সহানুভূতি ছিল না। তাই বি:দ্রাহের ১২ স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ অবসান হইলে বাঙ্গালা দেশের লােক স্বস্তির নিঃশাস ফেলিয়া বাঁচিয়াছিল। ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে মহারাণী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন। ইহাতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ভারত-শাসনের যে অধিক'র ইংলণ্ডের রাজশক্তির নিকট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা শেষ হয়। এই সময়ে মহারাণী ভিক্টোরিয়া যে ঘােষণাপত্রের প্রচার করেন তাহ। ভারতবাসী অদ্যাবধি তাহাদের বিশিষ্ট অধিকার বলিয়া দাবী করিয়া থাকে। চন্দ্ৰমাধবের প্রথম পুত্র বাঙ্গলা ১২৬৫ সালের ১৩ই আষাঢ় ( ইংরেজী ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দের ২৬শে জুন) বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেন ; উহার নাম ছিল জ্ঞানেন্দ্র। ছয় বৎসর বয়সে আমাশয়-রোগে ভবানীপুরে উহার মৃত্যু হয়। বর্ধমানে চন্দ্ৰমাধবের শরীর বেশ ভালই হইয়া উঠিয়াছিল। তথা হইতে তিন কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া পুনরায় আইন-অ্যয়নে ব্রতী হন, এই সময়ে তিনি বহুবাজারের নিকটবর্তী মলঙ্গা লেনে তাহার জ্যেষ্ঠতাতপুত্র নীলমাধবের বাসায় অবস্থান করিতে থাকেন। এই বাসায় নীলমাধবের শ্যালক অম্বিকা বসু ও কালীপ্রসন্ন ছিলেন। এই বাসায় থাকিবার সময়ে চন্দ্ৰমাধবের প্রথম শিক্ষাগুরু গৌরীসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারী তারিখে ওলাউঠা য়ােগে প্রাণত্যাগ করেন। চমাধবের বন্ধু মেডিকেল কলেদের তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র কালীকুমার মিত্র তঁাহার চিকিৎসা করিয়াছিলেন। আইন-শ্রেণীতে চঃদ্রমা। বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিতে থাকেন। দ্বিতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় যে অল্প কয়েক জন ছাত্রের কৃতিত্বের বিষয় আইনের প্রধান অধ্যাপক মণ্টিয়াে সাহেব বিশেষভাবে উঁহার রিপাের্টে স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ উল্লেখ করিয়াছেন, চমাধব তাহাদের মধ্যে অন্যতম। মস্টিয়াে সাহেব চন্দ্ৰমাধবের শুভানুধ্যায়ী ছিলেন এবং তাঁহাকে অত্যন্ত ভাল- বাসিতেন। ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে চন্দ্ৰমাধব আইনের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কশ্মক্ষেত্রে সেই সময়ে সদর আদালতের নিয়ম ছিল এই যে, কোনও ছাত্র উক্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলে মফস্বলের আদালত-সমুহে ওকালতী করিতে, মুন্সেফ-পদে নিযুক্ত হইতে এবং উ দূর একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী করিতে অধিকারী হইতেন। চমাধব যখন আইনের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েন সেই সময় তাঁহার পিতা বর্ধমানে ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। চমাধব ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দের ১৯শে নভেম্বর বর্ধমানের উকীল-শ্রেণীভুক্ক হন। মিষ্টার এইচ-এম রীড বর্ধমানের জেল-জজ ছিলেন। তিনি চমাধবের পিতার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন বলিয়া চমাধবের সহিত সৰ্ব্বদা ভদ্র ব্যবহার করিতেন ও তাহার প্রতি প্রভূত অনুগ্রহ প্রদর্শন করিতেন। মিষ্টার এইচ-এস টমসন ছিলেন তথাকার সবজজ এবং মিষ্টার চালস হবহাউস (পরে মিষ্টার জাষ্টিস ও স্যর চালস হবহাউস) বর্ধমানের কালেক্টর ছিলেন। দুর্গাপ্রসাদ ইহারই অধীনে ডেপুট কালেক্টর ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কার্য করিতেন। রীড সাহেবের সহানুভূতি লাভ করিয়া চন্দ্ৰমাধবের কিছু কিছু মামলা জুটিত। রীড সাহেব দায়রার মামলায় মধ্যে মধ্যে তাহাকে এসেসর হইতে বলিতেন। চমাধব দুইবার দায়রা আদালতে রীড সাহেবের এজলাসে পারিশ্রমিক না লইয়া আসামীদের পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন। এই দুইটা মামলার একটীতে একজন আসামী খুনের দায়ে অভিযুক্ত ১৪ স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ হইয়াছিল, চন্দ্রমাধব কর্তৃক পক্ষ-সমর্থনের ফলে এই আসামী মুক্তি লাভ প্রকাশ্য আদালতে রীড সাহেব এইজন্য চমাধবের প্রশংসা করেন সুতরাং ওকালতী প্রথমটা তঁাহার পক্ষে বিশেষ সুখেরই হইয়াছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, ইহা বেশীদিন স্থায়ী হয় নাই। কারণ রীড সাহেব শীঘ্রই বদলী হইয়া যান এবং তাঁহার স্থলে মিষ্টার সি টি বাকল্যাণ্ড বর্ধমানের জেলা-জজ হইয়া আসেন। এই ভদ্রলােকের তঁাহার উপর মােটেই সহানুভূতি ছিল না, মাত্র তখনকার প্রসিদ্ধ উকীল মৌলবী দোহাদ রহিমের উপর তিনি কিছু সন্তুষ্ট ছিলেন। চমাধব ইহার এজলাসে কচিৎ কোন মামলা পাইতেন। এদিকে মণ্টিয়াে সাহেব স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া যে সুপারিশ করেন তদনুসারে বাঙ্গালার লিগ্যাল রিমেমব্রালার চন্দ্রমাধবকে বর্ধমানের সরকারী উকীলের পদে নিযুক্ত করেন। বাবু বংশীধর মল্লিক বর্ধমানের সরকারীর উকীল ছিলেন ; তিনি পদত্যাগ করিয়াছিলেন বলিয়া এই পদ খালি হয়। মন্টিয়াে সাহেব লিগ্যাল রিমেমব্রান্সর বোফোর্ট সাহেবের নিকট চন্দ্রমাণবের নাম মাত্র করিয়াছিলেন। বােফোর্ট সাহেব মন্টিয়াে সাহেবকে বলেন, আপনি চমাধবকে আমার সহিত দেখা করিতে বলিবেন। তদনুসারে চমাধব বােফোর্ট সাহেবের সহিত দেখা করেন এবং বােফোর্ট সাহেব কথাপ্রসঙ্গে তাঁহাকে বলেন যে, সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল- সরকার বাবু রমাপ্রসাদ রায় উক্ত আদালতের উকিল বাবু তারকনাথ সেনকে বর্ধমানের উকীল-সরকারের পদের জন্য সুপারিশ করিয়াছেন। ওকালীতে আপনার অভিজ্ঞতা কিরূপ তাহা আমাকে বলুন। ইহার উত্তরে চন্দ্রমাধব বলেন,-আমি মাত্র পাঁচ ছয়টী মামলা করিয়াছি, তন্মধ্যে তিনটী মামলা জিতিয়াছি, তিনটা মামলা হারিয়াছি ; ইহাই অমার অভিজ্ঞতা। তিনি আরও বলেন-তারকনাথ আমা অপেক্ষা স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ ১৫ প্রবীণ, তিনি সদর আদালতের উকীল এবং তাহার উপর বাবু রমাপ্রসাদ রায় তঁহাকে সুপারিশ করিয়াছেন, সুতরাং আমার ভাগ্যে এই পলাত ঘটিবে না। বােফোর্ট সাহেব চন্দ্ৰমাধবের এই সত্য ও সরল উক্তিতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া বলেন-আমি আপনার ও তারকনাথের নাম গভর্ণমেন্টের নিকট পাঠাইব কিন্তু আমার বিশ্বাস, আপনি এই পরে নিযুক্ত হইবেন। সত্য সত্যই ঘটিয়াছিলও ইহাই। এই সময়ে চমাধবের দ্বিতীয় পুত্ৰ যোগেন্দ্রচন্দ্র (নেপ) ১২৬৭ সালের ১৪ই জ্যৈষ্ঠ (ইংরাজী :৮৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে মে) তারিখে বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেন। যে বাড়ীতে তঁাহার জন্ম হয় তাহা বর্ধমানের মহারাজার সম্পত্তিভুক্ত নটুগঞ্জে অবস্থিত এবং গােয়ালবাড়ী নামে বিখ্যাত। এই বাড়ীটী চলমাধবের পিতা দুর্গাপ্রসাদ ভাড়া লইয়াছিলেন। বর্ধমানের উকীল-সরকারের পদে নিযুক্ত হইবার পর চন্দ্রমাধব ১৮৬০ খৃষ্টাব্দের ২৮শে জুন সদর আদালতের উকীল-শ্রেণীভুক্ত হয়েন। সে সময় উর্দ র পরীক্ষা উঠিয়া গিয়াছিল বলিয়া তাহাকে উহা দিতে হয় নাই। বর্ধমানের সরকারী উকীল নিযুক্ত হইবার অব্যবহিত পরেই মিষ্টার বাকল্যাণ্ডের সহিত চন্দ্ৰমাধবকে সাক্ষাৎ করিতে হইয়াছিল। কারণ বাঙ্গলা সরকার যে নিয়োগপত্র দিয়াছিলেন তাহা জেলা-জজ মিষ্টার বাকল্যাণ্ডের নিকটেই আছিয়াছিল। এই নিয়ােগপত্র বাকল্যাণ্ড সাহেবের হস্তগত হইলে তিনি চমাধবকে ডাকিয়া পাঠান এবং প্রকাশ্য আদালতে জিজ্ঞাসা করেন যে, কেমন করিয়া তিনি এই পদ লাভ করিয়াছেন। চমাধব উত্তরে বলেন, আমি এই পদের জন্য দরখাস্ত করি নাই, তবে বােফোর্ট সাহেব আমাকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছিলেন এবং এই পদের জন্য আমাকে সুপারিশ করিয়াছিলেন। বাকল্যাণ্ড সংহেবের কিন্তু সন্দেহ হয় যে, দুর্গাপ্রসাদবাবু তাহার পুত্রের জন্য চেষ্টা করিয়া এই গর চন্দ্রমাধব ঘােষ কর্মটি জোগাড় করিয়া দিয়াছেন। বাকল্যাণ্ড সাহেবের মনে এইরূপ সন্দেহ হওয়াতেই তিনি চন্দ্রমাবকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। ল্যাণ্ড সাহেবের সম্ভবতঃ এইরূপ ইচ্ছা ছিল যে, এই পদে মৌলবী জোহাদ রহিমকে নিযুক্ত করলেই ভাল হইত। তাহা না হইয়া যখন তিনি দেখিলেন যে, এই পদে একটা ছােকরাকে নিযুক্ত করা হইয়াছে, তখন তিনি ধৈৰ্য্যচ্যুত হইয়া পড়েন এবং প্রকাশ্য আদালতে চীৎকার করিয়া বলেন, “সরকার বাহাদুর ইয়ে ছােকরাকো উকিল সরকার মােকরার কিয়া হৈ;সরকারকে কাম জাহান্নামমে যাওয়ে, ইয়ে সন উসকো দে দেওঁ” ইহার অর্থ সরকার বাহাদুর একজন ছােকরাকে উকীল-সরকার করিয়াছেন, সরকারের কাজ জাহন্নমে যাউক। এই নিয়ােগপত্র উহাকে দিয়া দাও। এই বলয়। তিনি নিয়ােগ পত্রখানি সেরেস্তাদারের টেবিলে ছুড়িয়া ফেলিয়া দেন। চমাধব বাকল্যাণ্ড সাহেবের এই ব্যবহারে বিস্ময়ে অবাক হইয়া যান এবং নিয়ােগপত্ৰখা ন সেরেস্তাদারের নিকট হইতে লইয়া এজলাস-গৃহ হইতে বা হর হইয়া আসেন। ৩ কলিকাতায় গিয়া! বোফোর্ট সাহেবের সহিত দেখা করিয়া আসা হইতে পর পর যাহা ঘটিয়াছিল তিনি সে সমস্ত তাহার পিতার নিকট বলেন। তাঁহার পিতা সমস্ত শুনিয়া বলেন, “এই পদ গ্রহণ করা ভাল হয় নাই। কারণ এই পদের কার্যভার অত্যন্ত গুরু ও কঠোর দায়িত্বপূর্ণ। তুমি এই পদে কাৰ্য্য করিতে পারিবে না। তুমি এই কাজ ছাড়িয়া দাও ।” কিন্তু বর্ধমানের অন্যান্য বন্ধুগণ, বিশেষত সবজজ মিষ্টার টমসন বলেন,-না, এ পদ তুমি তাগ ক রও না। কারণ তােমার মত যুবকের পক্ষে ইহাকে ঈশ্বর-প্রেরিত বলিতে হইবে এবং তোমার কাজে আমি সাহায্য করিব। মিষ্টার টমসন চন্দ্ৰমাধবের পিতাকে বলেন যে, তিনি যেন এ বিষয়ে আর আপত্তি না করেন।

স্যর চমব ঘােষ ১৭ অতঃপর দুর্গাপ্রসাদবাবু ও তঁাহার পুত্র চন্দ্রমাধব বর্ধমানের কলেক্টর মিষ্টার বার্ডের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করেন। বাচঁ সাহেব বর্ধমানে নূতন আসিয়াছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত ভাল লােক ছিলেন। চমাধব বার্জ সাহেবকে সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বিক বলিলেন এবং তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করেন—“এ অবস্থায় কাৰ্যে ইস্তফা দেওয়া উচিত কি না।” বাচঁ সাহেব কয়েক মিনিট চুপ করিয়া থাকিয়া বলেন-“কাজে ইস্তফা দেওয়া উচিত নহে; আমি মিষ্টার বাকল্যাণ্ডকে এই বিষয় বলিব।” বলা বাহুল্য, বা সাহেবই চন্দ্ৰমাধবের সরাসরি উপরি- ওয়ালা। সুতরাং তিনি উকীল-সরকারের কার্যভার গ্রহণ করিলেন। ভার লইয়া তিনি দেখিলেন যে, অন্যূন ১২০ • মামল। বর্ধমানে বিচারাধীন রহিয়াছে এবং এই সব মামলায় গবর্ণমেণ্ট একটীপক্ষভুক্ত আছেন। ইহাতে তিনি ভীত হইয়া উঠেন বটে, কিন্তু ধীরে ধীরে কার্যে হস্তক্ষেপ করেন। প্রায়ই তিনি ও তাঁহার পিতা রাত্রি ১টা পর্যন্ত জাগিয়া মুসাবিদা তৈয়ারী, দরখাস্ত লেখা, লিখিত জবানবন্দী লেখা প্রভৃতি কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন। কাৰ্য অবাধে চলিতে লাগিল। এই কাৰ্য্য করিতে করিতে চন্দ্ৰমাধব ওকালতিতে প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কিন্তু আদালতের কার্য্য তাঁহার পক্ষে সহজসাধ্য ছিল না। সেই সময়ে সরকারী উকীলের কর্তব্য ছিল—জেলাজজের এজলাসে দায়রায় মামলা পরিচালনা করা। প্রথম দায়রা-মামলায় চন্দ্ৰমাধব সরকারীউকীল-রূপে মিষ্টার বাকল্যাণ্ডের এজলাসে হাজির হয়েন। তাঁহাকে দেখিবামাত্র বাকল্যাণ্ড সাহেব বাচ্চ সাহেবের নিকটে একখানি পত্র লিখেন। তিনি কি লিখিয়াছিলেন তাহা তিনিই জানিতেন। একটু পরেই দেখা গেল—জোহাদ রহিম একটি পরওয়ানা লইয়া সরকার-পক্ষে উক্ত মামলা চালাইবার জন্য এজলাসে উপস্থিত হইলেন এবং চন্দ্রমাধব একরূপ অপমানিত হইয়াই এজলাস-গৃহ ত্যাগ করিলেন। তখন হইতে জোহাদ রহিম সকল ১৮ স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ দায়রা-মামলায় সরকার-পক্ষে দাঁড়াইতে লাগিলেন। ইহার ফলে চমাধব আর বাকল্যাণ্ড সাহেবের এজলাসে দাড়াইতেন না। এই সময়ে সদর আদালতের উকীলদিগের সম্বন্ধে পূর্বনিয়ম পরিবর্তিত হয়। পূর্বে উর্দতে পরীক্ষা না দিলে সদর আদালতে উকীল হওয়া যাইত না, এক্ষণে সেই নিয়ম উঠিয়া গেল। ইহার পর যাহা ঘটিল তা উল্লেখযােগ্য। চন্দ্রমাধব মনে করিলেন, বর্ধমান জেলা-আদালতে ওকালতী করিবার সনদ তাহাকে দেওয়া হইয়া- ছিল ; তাহা ফিরাইয়া দিয়া বাকল্যাণ্ড সাহেবের এলাকা হইতে সরি যাওয়াই ভাল। কারণ, ইহাতে তঁাহার ক্ষতির কারণ নাই, যেহেতু তিনি সদর আদালতে ওকালতী করিবার সনদ পাইয়াছেন। তদনুসারে তিনি বাঙ্গালায় একটা দরখাস্ত লিখিয়া উক্ত সনদ বাকল্যাণ্ড সাহেবের নিকট ফেরত দিলেন। সেরেস্তাদার এই দরখাস্ত তাহার নিকট পাঠ করিলে তিনি ভুল বুঝিয়া মনে করিলেন যে, চন্দ্রমাধব উকীল-সরকারের পদে ইস্তফা দিতেছেন। এই ভ্রান্ত ধারণা হওয়ায় তিনি কতকটা বিচলিত হইয়া তাঁহার পিতাকে লিখিয়া পাঠাইলেন যে, তিনি তাঁহার পুকে লইয়া যেন তঁাহার (বাকল্যাণ্ড সাহেবের ) সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাহারা উভমেই বাকল্যাণ্ড সাহেবের নিকট উপস্থিত হইলেন। তাহারা উপবেশন না করিতেই বাকল্যাণ্ড সাহেব চমাধবকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ আপনি কেন উকীল-সরকারের পদে ইস্তফা দিতেছেন এবং আমার এজলাসে হাজির হইতেছেন না ?” চমাধব নিরুত্তর রহিলেন। তখন বাকল্যান্ড সাহেব গরম হইয়া বলিতে লাগিলেন, -“হাম কুত্তা হৈ ? হাম কৈকো কাটা হৈ?” তােম হামারা পাশ কাছে হাজির হােত নহি হৈ ?” ইহার অর্থ—-“আমি কি কুকুর ? আমি কি কামড়াই? তাই তুমি আমার এজলাসে হাজির হও না?”

স্যর চমাধব ঘােষ চমাধব নবীন বয়সে বড়ই স্পষ্টবাদী ছিলেন এবং সে সময়ে তাহাকে কেহ কোন কথা বলিলে তিনি তাহার উচিতমত জবাব দিতে সঙ্কোচ বােধ করিতেন না। তিনি বাকল্যাণ্ড সাহেবের ঐ কথার উত্তরে বলিলেন,-অগর হুজুর কুত্তা হােত হৈ উসূকে। ইলাজ রয়তা, মগর আব যে কাটে হৈ উসকো ইলাজ নহি হৈ।” ইহার অর্থ-আপনি যদি কুকুর হইতেন তাহা হইলে তাহার কামড়ের ঔষধ থাকিত ; কিন্তু আপনার কামড়ের ঔষধ নাই । চন্দ্ৰমাধবের পিতা পুত্রের এই কথায় অত্যন্ত বিস্মিত ও শক্তি হইয়া পড়েন; কিন্তু মিষ্টার বাকল্যাণ্ড এই উত্তরে অসন্তুষ্ট হইলেন । তিনি ইংরাজীতে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমি কিরূপে তােমার ক্ষতি করিয়াছি ? চন্দ্ৰমাধব বলিলেন,-পূর্বে আমি দুই একটি মামলা পাইতাম, কিন্তু আপনি আমার সহিত উক্ত প্রকার ব্যবহার করাতে কেহ আমাকে মামলা দেয় না।” ইহাতে বাকল্যাণ্ড সাহেব চন্দ্ৰমাধবের পিতাকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন,-“আপনার পুত্র বলিতেছে আমি উহার ক্ষতি করিয়াছি ; বেশ আমি তাহা পূরণ করিয়া দিব।” অতঃপর পিতা-পুত্রে বাকল্যাণ্ড সাহেবের নিকট হইতে চলিয়া আসেন। চমাধব বাকল্যান্ড সাহেবের সহিত অত্যন্ত রূঢ়ভাবে কথা কহিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার পিতা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েন এবং বলেন, “উচ্চপদস্থ ইউরােপীয় রাজকর্মচারীদের সহিত এভাবে কথা- বাৰ্তা কহা উচিত নয়।” চন্দ্ৰধব ইহার উত্তরে বলেন,-“আমি এরূপ রূঢ়ভাবে উত্তর না দিয়া থাকিতে পারি নাই; কারণ, বাকল্যাণ্ড সাহেব নিজের ব্যবহার দ্বারাই এরূপ উত্তর দিতে আমাকে প্ররাে- চিত করিয়াছেন।” প্রাতঃকালে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাঁহার পিতা এই বলিয়া তাহাকে সতর্ক করিয়া দেন, “যদি তুমি এরূপ আচরণ

শম চমাধব ঘােষ
কর, তাহা হইলে ভবিষ্যতে তােমার ভাল হইবে না এবং একদিন
একদিন ইহার কুফল ভােগ করিতে হইবে। ইহাতে চন্দ্ৰমাধব
করেন,-“আপনার আশীর্বাদে আমার কোনও অমঙ্গল
হইবে না।”
ঐ দিনই বেলা ১টার সময় বাকল্যাণ্ড সাহেব চমাধবকে
উহার এজলাসে ডাকিয়া পাঠান এবং তিনি উপস্থিত হইবামাত্র
তাহাকে সম্বােধন করিয়া বলেন—“কাল আপনার শরীর ভাল ছিল
না; সেইজন্য তাড়াতাড়ি আদালত হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন, আজ
আপনি কেমন আছেন ?* বাকল্যাণ্ড সাহেবের এই কথায় মাধব
যেন আকাশ হইতে পড়িলেন ; কারণ তাহার শরীর অসুস্থও হয়
নাই এবং বাকল্যাণ্ড সাহেবও এ বিষয়ে কিছুই শুনেন নাই। সুতরাং
বাকল্যাণ্ড সাহেবের এ কথায় তিনি কি বলিবেন তাহা * জিয়।
না পাইয়া বলিলেন, “হুজুরের কৃপায় ভালই আছি। যাহা হউক এই
উত্তরে সকল
সকল দিকই রক্ষা পাইল । বাকল্যাণ্ড সাহেব তাহার
কথার উত্তরে বলিলেন “অচ্ছি।
(বশ; আজ আমার এজলাসে
আপনার কোন কাজ আছে ?” চমাধব উত্তর করিলেন,- “না'।
ইহাতে বাকল্যাণ্ড সাহেব বলিলেন,-“আচ্ছা তবে আপনি যাইতে
পারেন । আপনার অন্য যে কাজ আছে তাহা করুন।”
অত:পর চন্দ্রমাধব এজলাস হইতে চলিয়া আসিলেন। তখন
বহুলােক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল -- “ব্যাপার কি? বাকল্যাণ্ড সাহেব
এরূপ বদলাইয়া গেলেন কেন ?” চন্দ্ৰমাধব বিস্তৃতভাবে কোন কথা
না বলিয়া মাত্র বলিলেন-“বাকল্যাণ্ড সাহেবকে আমি কিছু ঔষধ
দিয়াছি।”
বাকল্যাণ্ড সাহেবের বাড়ীতে যখন চন্দ্ৰমাধৰ তঁাহার সহিত
সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলেন তখন বাকল্যাণ্ড সাহেব তাহাকে

শ্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ ; বলিয়াছিলেন-“তুমি এখনও অভিজ্ঞতা লাভ কর নাই, এ অবস্থায় জোহাদ রহিমই দায়রার মামলাগুলি চালাইবেন, তুমি তাহার সহিত দাভাইও এবং কাজকর্ম শিখিও।” বলা বাহুল্য, চন্দ্রমাধব তাঁহার এই আদেশ পালন করেন এবং জোহাদ রহিমের সহিত দায়রার মামলায় দাড়াইতে থাকেন। একবার এইরূপ একটা ঘটনা ঘটে দায়রার একটী মামলায় আসামীর পক্ষ সমর্থনের জন্য ব্যারিষ্টার রীড়, সাহেব আসেন ; জোহাদ রহিম সরকার-পক্ষ সমর্থন করেন। বিচারে আসামীর দণ্ড হয়। বাকল্যাণ্ড সাহেব কলেক্টরের নিকট এই মর্মে এক চিঠি লিখেন যে, এই মামলার জন্য জোহাদ রহিমকে দুইশত টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া তদনুসারে কলেক্টর সাহেব লিগ্যাল রিমেমব্রালার বােফোর্ট সাহেবের নিকট উক্ত বিল মঞ্জুরীর জন্য পাঠাইয়া দেন। বলা বাহুল্য, চন্দ্রমাধব ইতিপূৰ্ব্বে কলিকাতায় গিয়া মন্ট্রিয়য়া সাহেব ও বােফোর্ট সাহেবের সহিত দেখা করিয়াছিলেন এবং উকীল- সরকারের নিয়ােগপত্র তঁাহার হস্তে দিবার সময় বাকল্যাণ্ড সাহেব তঁাহার সহিত যেরূপ ব্যবহার করিয়াছিলেন তাহা ও দায়রার মামলাগুলির পরিচালন-সম্বন্ধীয় বিষয় তাহাদিগকে জানাইয়াছিলেন। চন্দ্ৰমাধব এই বিষয় চট্টগ্রামের ভূতপূৰ্ব কলেক্টর স্কন্স সাহেবকেও বলেন। তিনি তখন বড়লাটের ব্যবস্থাপক সভার জনৈক সদস্য। ইহারই অধীনে চন্দ্ৰমাধবের পিতা কিছুদিন ডেপুটী কলেক্টরের কর্ম করিয়াছিলেন। ইহারা সকলেই চমাধবের মুখে উক্ত ব্যাপার শুনিয়া বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তাহাকে বলেন যে, তিনি সহিষ্ণুতার সহিত কাজ করিয়া যান, শেষে সমস্ত বিভ্রাট ঘুচিয়া যাইবে। যখন জোহাদ রহিম-সম্পর্কিত উক্ত বিলখানি বােফোর্ট সাহেবের নিকট পেীছে তখন তিনি এইরূপ মন্তব্য লিখিয়া তাহা কলেক্টরের ২২ শ্যর চন্দ্রমাধব মােয ; নিকট ফেরত পাঠান যে, এই মামলায় উকীল-সরকারকে দাড়াইতে বলিলেই হইত ; আর একজন উকীলকে নিযুক্ত করিবার কোনও কারণ দেখি না; পা রশ্রমিক উকীল-সরকার অর্থাৎ চন্দ্ৰমাধবকেই দেওয়া উচিত। কলেক্টর বাচঁ সাহেব বােফোর্ট সাহেবের এই মন্তব্য গোপনে বাকল্যাণ্ড সাহেবকে জানাইলেন ; ব্যাপার বুঝিয়া বাকল্যাণ্ড সাহেবের চক্ষু স্থির হইয়া গেল। যাহা হউক, এই ব্যাপারের মীমাংসা এইভাবে হইল—উকীল-সরকার চন্দ্ৰমাধববাবু এই দুইশত টাকা, পারিশ্রমিকের দাবী ছাড়িয়া দিলেন এবং ভবিষ্যতে সকল দায়রা- মামলায় সরকার পক্ষে তিনি নিযুক্ত হইলেন। কলেক্টর বার্চ সাহেব এই মীমাংসার বিষয় চন্দ্ৰমাধবকে লিখিয়া জানাইলেন। উত্তরে চন্দ্রমাধব লিখিলেন যে, জিনি বােদো সাহেবকে উক্ত পারিশ্রমিক সম্বন্ধে কোন ক ২া জানান নাই, সুতরাং উক্ত পারিশ্রমিকের উপর তঁাহার কোনও দাবী নাই। এই প্রসঙ্গে তিনি বফোর্ট সাহেবকেও এই মর্মে পত্র লিখেন যে, দায়রা-মামলায় সরকার-পক্ষ সংর্থনের জন্য এখন হইতে তিনিই দাড়াইবেন এবং ঐ দুই শত টাকা পারিশ্রমিকের উপর তঁাহার কোন দাবী নাই। ইহার অব্যবহিত পরেই বাকল্যাণ্ড সাহেবের এজলাসে তিনটা দেওয়ানী মামলা রুজু হয়। তিনটা মামলাতেই গভর্ণমেণ্ট একটা পক্ষভুক্ত ছিলেন। মামলা তিনটীতে সরকার-পক্ষে চন্দ্ৰমাধব এবং অপর পক্ষে জোহাদ রহিম দণ্ডায়মান হন। তিনটি মামলাই খুব জোর চলিয়াছিল এবং চন্দ্ৰমাধব সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণ ও সওয়াল জবাব হিন্দুস্থানী ভাষায় করিয়াছিলেন। এই তিনটী মামলার মধ্যে একটা মামলায় গভর্ণমেন্ট হারিয়াছিলেন এবং দুইটী মামলায় জয়লাভ করিয়াছিলেন। মকদ্দমা তিনী শেষ হইলে জজ বাকল্যাণ্ড সাহেব প্রকাশ্য আদালতে চন্দ্ৰমাধবকে সঙ্গোধন করিয়া বলেন—“আপনি এই শ্যর চন্দ্রমাধব ঘোষ তিনটা মামলায় চমৎকার সওয়াল জবাব করিয়াছেন, আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। আপনি যে একটা মামলায় হারিয়াছেন সেজন্য আপনার কোন দোষ নাই। ইহার ফল এই হইল যে, মামলাকারীগণ বাকল্যাণ্ড সাহেবের এজলাসে চন্দ্ৰমাধবকে নিযুক্ত করিবার জন্য আগ্রহ দেখাইতে লাগিলেন। কিন্তু শীঘ্রই বাকল্যাণ্ড সাহেব চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার নিযুক্ত হইয়া বদলী হইলেন, বদলী হইবার পূর্বে তিনি সরকারী খাতায় মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিয়া যায়েন যে, উকীল সরকার বাবু সি-এম ঘােষ অত্যন্ত যােগ যুবক, কেবল ইহার অভিজ্ঞতার 07 ( Babu C. M. Ghosc, Government Pleader, is a very able youngman, only wanting in experience.) 1 সবজজ টমসন সাহেবের সহিত কথাপ্রসঙ্গে তিনি চন্দ্ৰমাধব সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছিলেন তাহার মৰ্ম্ম এই, “আ িইহার উপর অবিচার করিতেছিলাম , আমার ধারণা ছিল ইনি ইয়ং বেঙ্গল” (Young Bengal) দলভুক্ত সুতরাং প্রকৃত যোগ্যতা কিছু নাই। এখন দেখিতেছি ইনি উহার বিপর্ধীত। যাহা হইয়া গিয়াছে সে জন্য আমি দুঃখিত। যদি ভগবান ইহাকে বঁচাইয়া রাখেন, তাহা হইলে ইনি পরে বঙ্গদেশের একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হইবেন।” বাকল্যাণ্ড সাহেবের পদে যিনি অ'সেন তঁাহার নাম ছিল - মিষ্টার পিয়াস টেলর। ইনি বয়সে প্রবীণ ছিলেন বটে, তবে যােগ্যতা তেমন ছিল না; কিন্তু ইনি সরল, সহদ্দেশ্যসম্পন্ন, অকপ, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন ; তবে মধ্যে মধ্যে উগ্ৰমুৰ্ত্তি ধরিতেন। চন্দ্ৰমাধব ইহার সহিত একরূপ ভালই কাটাইয়াছিলেন । এই সময়ে চন্দ্ৰমাধবের পিতা নদীয়া জেলায় বদলী হয়েন। নীলকর- বিভ্রাট-সম্পর্কে বহু বাকী খাজনার মামলা রুজু হইয়াছিল ; এইগুলির বিচারের জন্য তাঁহাকে নদীয়া জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরিতে হইয়াছিল। ;

२३ শ্যর চন্দ্ৰমাধব যােব চমাধব যখন বর্ধমানে ওকালতী করিতেছিলেন সেই সময়ে ভবানীপুরের রাখালদাস মুখােপাধ্যায় বর্ধমানের ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট নিযুক্ত হন। শীঘ্রই ইহাদের দুইজনের অত্যন্ত বন্ধুত্ব জন্মে এবং সেই বন্ধুত্ব আজীবন বর্তমান ছিল। রাখালবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র আশুতােষ মুখোপাধ্যায় এক্ষণে বাঙ্গালা গভর্ণমেন্টের অধীনে একজন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। ৮৬০ খৃষ্টাব্দের ১০ই আগষ্ট চন্দ্ৰমাধবের বন্ধু খিদিরপুর-নিবাসী আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহাশয় তঁাহাকে সংবাদ দেন যে, তাঁহাদের প্রিয় বন্ধু ঐশচন্দ্র ঘােয আত্মহত্যা করিয়াছেন। এই ঘটনায় তাঁহার অন্তরে অত্যন্ত আঘাত লাগিয়াছিল ; সর্বাপেক্ষা প্রিয়জন-বিয়ােগে যেরূপ ব্যথা লাগে সেইরূপ ব্যথ। তিনি অনুভব করিয়াছিলেন। অতঃপর তাঁহার পিতাকে নদীয়া হইতে খুলনা জেলায় বদলী করা এখানে জমি-জরীপ-কার্যের তত্ত্বাবধানের ভার তাহার উপর ন্যস্ত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তখন খুলনার মহকুমা হাকিম ছিলেন। যে বঙ্কিমবাবু বঙ্গসাহিত্যক্ষেত্রে দিকপাল ছিলেন, ইনি তিনিই। প্রেসিডেন্সি কলেজের আইনের ক্লাসে তিনি চন্দ্ৰমাধবের সহাধ্যায়ী ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ও যদুনাথ বস্তু উভয়েই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বি-এ উপাধিধারী। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইবার পরে বি-এ পরীক্ষা প্রবর্তিত হইলে ইহারা দুইজনেই বি-এ পরীক্ষা দেন ও তাহাতে উত্তীর্ণ হয়েন। ইহারা দুইজনেই মাধবের সহপাঠী ছিলেন। চন্দ্রমাধব যে বৎসর এন্টাল পরীক্ষা দিয়াছিলেন ইহারা দুইজনও সেই বৎসর এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন । তবে সৌভাগ্যবশতঃ ইহারা বি-এ পরীক্ষা দিতে পারিয়াছিলেন, কিন্তু চন্দ্ৰমাধবের স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ায় তাহার আর বি-এ পরীক্ষা দেওয়া * হয় নাই; তিনি কেবল আইনের পরীক্ষাই দিয়াছিলেন। বি-এ পরীক্ষায় স্যর চন্দ্রমাধব যােব ২৫ উত্তীর্ণ হওয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র ও যদুনাথ উভয়েই ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট হইয়াছিলেন। প্রায় এই সময় কলেক্টর বার্চ সাহেব বর্ধমান হইতে হুগলীতে বদলি হইলেন। হুগলীতে তাঁহাকে অতিরিক্ত দায়রা-কাজের পদে বহাল করা হইল। বর্ধমানে তাহার স্থলে মিষ্টার স্টুয়ার্ট হগ (পরে স্যর টুয়ার্ট হগ) কলেক্টর হইয়া আসিলেন। ইনি পূর্বে পশ্চিম অঞ্চলের কোথাও ছিলেন। তিনি যখন সেখানে ছিলেন তখন সিপাহী বিদ্রোহের সময়। এইজন্য তিনি জবরদস্তিতে অনেকটা অভ্যস্ত হইয়াই বর্ধমানে আসিয়াছিলেন। তিনি কলেক্টরের কার্যভার গ্রহণ করিয়া কাছারীতে বসিবার কয়েকদিন পরেই চন্দ্ৰমাধব তাহার নিকট সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করিলেন; বলা বাহুল্য, তাহাকে সাক্ষাৎ করিবার অনুমতি তিনি দিলেন। কিন্তু এই সাক্ষাৎকারে যে ব্যাপার ঘটিয়াছিল তাহা উল্লেখ যোগ্য। যখন চন্দ্ৰমাধব হগ সাহেবের গৃহে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখিলেন যে, হগ সাহেব একটি উচ্চ টেবিলের পার্শ্বে আঁড়াইয়া রহিয়াছেন। তিনি চন্দ্ৰমাধৰ বাবুকে বসিতে বলিলেন , বরং ২ বার তঁাহার আপাদ-মস্তক লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। তার পর তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—উকীল-সরকার হ্যায়?” চন্দ্ৰমাধব উত্তর করিলেন—“খােদাবন”। তার পর আবার প্রশ্ন হইল-“উকাল সর কার হ্যায়; কুচ আর্জি হ্যায়?” অর্থাৎ তুমি সরকারী উকীল, আমার নিকট তােমার কিছু প্রার্থনা আছে? চন্দ্রমাধব ইহার উত্তরে হিন্দীতে বলিলেন,-“আমার কোনও প্রার্থনা নাই ; যেহেতু আপনি নুতন কলেক্টর হইয়া আসিয়াছেন সেই হেতু আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আপনাকে সম্মান প্রদর্শন করিতে আসিয়াছি। এই কথা শুনিয়াই হগ সাহেব গরম হইয়া বলিলেন- “তুমি আমার ২৬ শ্বর চন্দ্রমাংব ঘােষ সম্মুখ হইতে চলিয়া যাও।" চন্দ্ৰমাধৰ ভঁহাকে অভিবাদন করিয়া কতকট। হতভম্ব হইয়াই চলিয়া আসিলেন। তখনই তাঁহার ধারণা হইল,-যে উপরিওয়ালার গােড়াতেই এইরূপ ব্যবহার তাহার সহিত কাজ করা সুবিধাজনক হইবে না। কিছুদিন পরে একটা সুযোগও উপস্থিত হইল ; তাহাতে তিনি হঙ্গ সাহেবের সহত সকল সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হইলেন। সেই সময়ে বর্ধমানে বিস্তর মামলা ( Resumption Suits ) বিচারাধীন ছিল ; বহুদিন ধরিয়া মামলাগুলির ‘বচার হইতে ছিল । । এইসকল মামলার বিচার শীঘ্র শীঘ্র শেষ করিবার জন্য গবমেন্ট বর্ধমানে ৪ জন ডেপুটী-কলেক্টর নয়োগ করিবার বিষয় প্রচার ক রয়াছিলেন। চমাধব ইহা জানতে পারিয়া বাচ্চ সাহেবকে হুগলীতে লিখিলেন--“আমি ডেপুটী-কলেক্টরীর জন্য দরখাস্ত করিতে চাই ; অাপনি বর্ধমান বিভাগের কমিশনার মিষ্টার জর্জ প্লাউডেনের নিকট আমাকে সুপারিশ করুন।” বাচঁ সাহেব অবশ্য চন্দ্ৰমাধবের অনুরাে রক্ষা করিয়া ছলেন। কিন্তু কোনও কারণবশতঃ গবমেন্ট বর্ধমানে ডেপু-কলেক্টর নিযুক্ত করেন নাই ; তবে তঁাহারা চনমাধবকে বাখরগঞ্জে অস্থায়ী ডেপুটি ম্যাজি- ষ্টেট নিযুক্ত করিলেন। খৃষ্টাব্দের ৬ই সেপ্টেম্বর এই নিয়ােগ হইল । চমাধব এই নিয়োগপত্র পাইবামাত্র হগ সাহেবকে লিখিয়া জানাইলেন যে, তাঁহাকে উকীল-সরকারের পদ হইতে নিষ্কৃতি দেওয়া হউক। হগ সাহেব তঁাহাকে লিখিলেন-“আপনি বর্ধমানের উকীল মতিলাল চৌধুরীকে আপনার কার্যভার বুঝাইয়া দিন।” এই মতিবাবু চন্দ্ৰমাধবের সহপাঠী ছিলেন। তদনুসারে চন্দ্ৰমাধব মতিবাবুকে কাজকর্ম সমস্তই বুঝাইয়া দিয়া নৃতন কৰ্মস্থল বাখরগঞ্জে ১৮৬১ স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ যাইবার উদ্যোগ-আয়ােজন করিবার জন্য কলিকাতায় গমন করিলেন । এদিকে পর পর তিনট মামলা বিচারাধীন ছিল-সেগুলিতে গবমেন্ট প্রতিবাদী ছিলেন। দুইটা মামলা নূতন সবজজ রাইট সাহেবের এলাসে ছিল ( টমসন সাহেব তখন বদলি হইয়া অন্যত্র গিয়াছিলেন); অপরটী বীরভূমের আদালতে। শেষোক্ত মামলাটীর কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ সমস্ত বর্ধমানে ছিল। চন্দ্ৰমাধবকে এই তিনটী মামলার লিখিত জবানবন্দী তৈয়ারী করতে বলা হয় । তিনটী মামলাই লিখিত জবানবন্দীর মুসাবিদা করিতে এবং ঐগুলি কলেক্টর ও অন্যান্য উৰ্দ্ধতন কৰ্মচারীদিগকে দেখাইয়া লইতে তাহার বিলম্ব ঘটিয়াছিল। ইহার ফলে এই অবস্থা ঘটল যে, চন্দ্রমাধবকে বাধ্য হইয়া কলেক্টর সাহেবের নিকট অনুরােধ ক তে হইল যে, যেহেতু মামলার অব সময় নাই, সেই হেতু তিনিই আমার এই লিখিত জবানবন্দীর মুসাবিদা গুলি মঞ্জুর করু; ঐগুলি ক মশনার ও লিগ্যাল রিমমব্রাদারের নিকট চরম অনুমোদনের পাঠাইয়া এইগুলি আদালতে পেশ করিকার বিশেষ অনুমতি তিনি প্রদান করুন। নহিলে মামলার তারিখে ঐগুলি পেশ করা হইবে । তিনটী মামলার জবানবন্দীর মুসাবিদাই হগ সাহেবের হস্তে বীরভূম আদালতে বিচারাধীন মামলাটা অত্যন্ত জটিল ছিল। যখন মামলার লিখিত জবানবন্দীর মুসবিদ ও অন্যান্য কাগজপত্র তাহার সম্মুখে উপস্থাপিত করা হইল, তখন তিনি সেগুলি বুঝিতে পারিলেন না। কতক গুলি কাগজপত্র আবার কালেক্টরী অফিসের জনৈক (করণিী ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়াছিলেন। এই কারণে চমাধব বাবুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। কিন্তু তিনি তখন কলিকাতায় গিয়াছিলেন। যাহা হউক, কলিকাতা হইতে ফিরিয়াই তিনি হগ সাহেবের সহিত ২ শুর চমাধব যােব সাক্ষাৎ করিলেন। বর্ধমানে তাঁহার অনুপস্থিতি সম্পর্কে তাঁহার সহিত হগ সাহেবের বিস্তর কথা-কাটাকাটি হইল। অতঃপর হগ সাহেব বলিলেন –“আপনি যে লিখিত জবানবন্দী তৈরী করিয়াছেন তাহার বিন্দুবিসর্গও আমি বুঝিতে পারিতেছি না। ইহার উত্তরে চমাধব বাবু বলিলেন, “মামলাটী বই জটিল এবং আপনার অফিস হইতে যে অনুবাদ হইয়াছে উহাও ভাল নহে। যাদ আপনাকে আমি মামলাটা আগাগোড়া বুঝাইয়া না দিই, তাহা হইলে আপনি ইহা বুঝিতে পারিবেন না। তার পর চন্দ্ৰমাধব বাবু বলিলেন,-“আমি অনুবাদের দোষ সংশোধন করিয়া আপনার নিকট পাঠাইয়া দিব।” তৎপরদিনই তিনি হগ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সমস্ত মামলাটি বুঝাইয়া দেন। তখন তি ন লিখিত জবানবন্দী বুঝিতে পারেন এবং উহা সরাসরি পেশ করিবার অনুমতি দেন। অতঃপর চন্দ্ৰমাধব বাৰু হগ সাহেবের নিকট বিদায় গ্রহণ করেন। বিদায়গ্রহণকালে তিনি বলেন, “আমি আগামী কল্যই বর্ধমান হইতে চলিয়া যাইতেছি। আপনার সহিত আমার বনিবনাও হয় নাই, এজন্য আমি দুঃখিত। পরে চন্দ্রমাধব বাবু জানিতে পারিয়াছিলেন যে, হগ সাহেব তাহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন যে, তিনি বদমাস' অর্থাৎ দুষ্ট লােক। বদ্ধ মান-ত্যাগ ও নূতন কর্মে যোগদান তিনি মাতা, স্ত্রী, শ্যালিকা ও দুই পুসহ বর্ধমান পৱিত্যাগ করিয়া কলিকাতায় উপস্থিত হইলেন এবং তথা হইতে নৌকা-যােগে নূতন কৰ্ম্মল বরিশাল যাত্রা করিলেন। খুলনার উপর দিয়া বরিশালের পথ। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তখন খুলনার মহকুমা-হাকিম এবং তিনি চলমাধবের সহধ্যায়ী।

সর চমাধব ঘােষ যেদিন অপরাহ্নে চন্দ্ৰমাধব খুলনায় পৌছেন সেই দন অপরাহ্নেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত দেখা করতে যান। তাঁহার ইহা জান। ছিল না যে, মহকুমা-হাকিমের বাসা বন্দুকধারী সিপাহীরা পাহারা দেয়। সুতরাং তিনি বঙ্কিমবাবুর বাসার নিকটবর্তী হইতেই সিপাহীরা তঁাহার পথ রােধ করে ও সাঙ্কেতিক বাক্যে তিন শত্ৰু কি মিত্র জিজ্ঞাসা করে। চন্দ্ৰমাধবের এ অভিজ্ঞতা পূর্বে ছিল না। তিনি সিপাহীদের প্রশ্নের কোনও উত্তর দেন নাই। কাজেই সিপাহীরা কোনও অনর্থ ঘটাইতে উদ্যত হইয়াছিল। সুখের বিষয়, সেই সময় বঙ্কিমবাবুর একটী ভৃত্য তথায় উপস্থিত হয় এবং তাহাতে বিভ্রাটের অবসান হয়। পরে তিনি সিপাহীদের নিয়ম জানিতে পারিয়াছিলেন যে, উহারা আগন্তুককে তিনবার প্রশ্ন করে ; কিন্তু তিনবারই যদি কোনও উত্তর না পায়, তখন উহাকে গুলি করে। ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের ১৮ই সেপ্টেম্বর অপরাহ্নে তিনি বরিশালে উপস্থিত হইয়া নূন পদে যোগদান করেন। তখন হার্ভে সাহেব বাখরগঞ্জের কলেক্টর এবং বাবু অভয়চরণ বসু প্রধান ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন। অভয়বাবুকে চন্দ্রমধিব বাবু পূৰ্ব্ব হইতেই জানিতেন। তঁাহারা উভয়েই চমাধব বাবুকে সাদরে গ্রহণ করেন। যাহা হউক, তিনি বরিশালে আসিয়া তাহার নৃতন কর্মে ব্ৰতী হইলেন। তঁাহার উপর কয়েকটা জটিল খাজনা-সংক্রান্ত মামলার মামলার বিচার-ভার পড়িল। চমাধব বর্ধমানে উকীল-সরকারের কাৰ্য্যে মাসে প্রায় ২০০ টাকা উপার্জন করিতেন। তখন বর্ধমানের বড় বড় উকীলের পারিশ্রমিকও অত্যন্ত কম ছিল। সেইজন্য তিনি বর্ধমানে সাধারণের দেওয়ানী মামল। লইতেন না; কেবল সরকারী মামলাই তিনি করিতেন। তিনি কিছুদিন ধরিয়া ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটী কলেক্টর হইবার আকাঙ্ক্ষা করিতেছিলেন, কারণ তখনকারকালে ইহা অপেক্ষা উচ্চপদ ভারতবাসীর স্যর মাধব ঘােষ আকাক্ষা করিতে পারত না। তিনি মনে করিয়াছিলেন, ডেপুটা কলেক্টর হইলে পরে হার অবস্থার উন্নতি হইবে। কয়েকটী জেলায় কিছুদিন ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটী, ডেপুটী কলেক্টরী করিলে মামলা সম্বন্ধে তাহার অভিজ্ঞতা জন্মিবে এবং ঐ সকল জেলায় তিনি প্রসিদ্ধিলাভও করিবেন। তার পর যদি ডেপুটী কলেক্টরী শাহার না পােষায়, তাহা হইলে উহা ত্যাগ করিয়া হাইকোর্টে ওকালতি আরম্ভ করিবেন। এইরূপ বিচার- বিবেচনা এবং হগ সাহেবের হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভই তঁাহার বাখরগঞ্জে অস্থায়ী ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদ গ্রহণের কারণ। বাখরগঞ্জে অবস্থান করবার সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবুর সহিত কালী- প্রসন্ন ঘােষ মহাশয়ের পরিচয় হয় ; ইনি ভাওয়াল-রাজের ম্যানেজার ছিলেন এবং পরে রায় বাহাদুর ও সি-আই-ই উপাধি প্রাপ্ত হয়েন। ইনি সুপ্রসিদ্ধ লেখক ও বঙ্গসাহিত্যসেবী ছিলেন, অল্পদিনের মধ্যেই তাহা- দের এই পরিচয় প্রগাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হয়। বাখরগঞ্জের সদর বরিশালে থাকিবার সময়ে কালীমোহন দাস মহাশয়ের সহিত তাহার পরিচয় হয় ; তিনি তখন বরিশালের উকীল-সরকার ছিলেন। কালীমােহন বাবু কলেজে চমাধৰ যাবু অপেক্ষা এক ক্লাস নীচে পড়িতেন। বাখরগঞ্জে কায্যে যােগদান করিবার। কয়েকদিন পরেই দুর্গাপূজার ছুটী হইল। সেই সময় তথায় চমাধব বাবুর যে কয়েকজন স্বগ্রামবাসী ছিলেন তঁাহারা তাঁহাকে বলিলেন-পূজার • ছুট পাইয়াছেন যােলহঁরে গিয়া বিশ্রাম করিয়া আসুন ; চমাধব বাবু তাহাদের কথামত হরকুমার মুস্তফীর সহিত যােলঘরে গমন করেন । পথে নৌকা-ভ্ৰমণ অত্যন্ত উপভােগ্য হইয়াছিল। চন্দ্ৰমাধব বাবু যােলঘরে উপস্থিত হইলে তথাকার সম্ভান্ত ব্যঞিগণ তাঁহাকে ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করেন। কারণ তখনকার দিনে এই পদই ভারতবাসীর পক্ষে উচ্চতম পদ ছিল।

স্যর চমাধব মােয় কয়েকদিন ষোলঘরে থাকিয়া তিনি হরকুমারের সহিত পুনরায় বরিশাল যাত্রা করেন। যােলঘর যাতায়াতের পথে দুই বা তিনটী ঘটনা ঘটিয়াছিল, সেগুলি উল্লেখযোগ্য। প্রথম ঘটনাটি এই-যােলঘর যাইবার পথে যখন তাহাদের নৌকা পদ্মার কুলে উপস্থিত হইল তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে; তথা হইতে পদ্মা পার হইলে তবে বিক্রমপুরে পৌছিতে পারা যাইবে, সন্ধ্যা আসন্নপ্রায় দেখিয়া মাঝিরা নজর ফেলিবার উদ্যোগ করিতে লাগিল, কারণ রাত্রিতে প্রায়ই কেহ পদ্মা পার হইতে সাহস করে । বিশেষতঃ সেদিন রাত্রি অত্যন্ত অন্ধকারময়ী ছিল। চন্দ্রমাধৰ ষোলঘরে যাইবার জন্য এতই উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিয়াছিলেন যে, তিনি মাঝিদের বলিলেন,—“তােমরা নঙ্গর ফেলিও না, নৌকা ওপারে লইয়া চল।” যে মাঝি নৌকার হাল ধরিয়াছিল তাহাকে দাড় ধরিতে বলিলেন। নৌকায় দুইজন দাড়ি ছিল ইহাকে লইয়া তিনজন। চন্দ্ৰমাধৰ স্বয়ং হাল ধরিলেন এবং হাল যাহাতে দৃঢ়ভাবে ধরিতে পারা যায় সে জন্য তাঁহার ভৃত্যকেও তাহার সঙ্গে লইলেন। তঁাহার এই ভৃত্যটী অত্যন্ত বলশালী ছিল, যাহা হউক নৌকা বড় বড় ঢেউ কাটিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল এবং পাঁচ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রমের পর নৌকা পরপারে উপনীত হইল। জীবনের এই সময়ে চন্দ্ৰমাধব অত্যন্ত দুঃসাহসী ছিলেন এবং বিপদকে গ্রাহই করতেন না। এই ঘটনার কথা যখন চন্দ্ৰমাধবের জ্যেষ্ঠতাত হরকৃষ্ণ ঘােয মহাশয় শুনিলেন তখন তিনি আতঙ্কে শিহরিয়া উঠেন এবং চন্দ্ৰমাধবের এইরূপ দুঃসাহসিক কার্যের নিন্দা করেন। আর একটা ঘটনা যােঘর হইতে বরিশাল ফিরিবার পথে ঘটিয়া- ছিল ; সে ঘটনাটী এই-বেলা প্রায় বারটার সময় তিনি তঁাহার বন্দুকে কিছু বারুদ ও গুলি পূরিয়া পদ্মার বক্ষে ভাসমান কতক- গুলি জলচর পক্ষার দিকে বন্দুক চালনা করেন, কিন্তু গুলি ছুটিল । আবার তিনি চেষ্টা করিলেন তখনও গুলি চলিল না, ইহাতে র চমাধব মােয তিনি বিস্মিত হইয়া বন্দুকটা পরীক্ষা করিলেন। পরীক্ষা কালে দেখিলেন যে, বন্দুকটি আগাগােড়া ঠাসা রহিয়াছে। তখন তিনি এই ভাবিয়া শঙ্কিত হইলেন যে, যদি এত অধিক পরিমাণ বারুদ জ্বলিয়া উঠিত, তাহা হইলে বন্দুকটা ত ফাটিয়া যাইতই, সঙ্গে সঙ্গে তাহারও প্রাণ যাইত। যােলঘরে থাকিবার সময়ে কে এভাবে বন্দুকটি ঠাসিয়া রাখিয়াছিল তাহা তিনি জানিতেন না। তৃতীয় ঘটনাটি ঐ দিন অপরাহ্নে—বেলা প্রায় পাঁচটার সময়ে ঘটিয়াছিল। তাহার নৌকা বাখরগঞ্জ জেলার লক্ষ্মীরচরের সম্মুখে নঙ্গর করিয়া রাখা হইয়াছিল, সেখানে একটা বড় নদী ছিল উহা তাঁহাদিগকে পার হইতে হইবে। চন্দ্ৰমাধব মনে করিলেন, তিনি যখন ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট তখন এই গ্রামটা পরিদর্শন করা তঁাহার কর্তব্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি তাহার হিন্দুস্থানী চাপরাশী গুরুদয়াল, একটী ভৃত্য ও অবতীর্ণ হইলেন এবং তথাকার অধিবাসীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এখানকার জমিদার কে ? তিনি প্রজাদের সহিত কেমন ব্যবহার করেন, এবং ধান-চাউলের অবস্থা কেমন ইত্যাদি। তঁাহার এই সকল প্রশ্নের উত্তর যে গ্রামবাসীরা কিছু কিছু দিয়াছিল তাহা নহে, কিন্তু তাহাদের সন্দেহ হইয়াছিল যে, চন্দ্রমাধব প্রকৃত হাকিম নহেন, জাল হাকিম এবং তাকাত। গ্রামবাসীরা তাহাকে বলে যে, আপনি এই গ্রামে দাড়াইবেন না, এখনি আপনার নৌকা করিয়া এই গ্রাম হইতে চলিয়া যান। চমাধব বাবু তাহার প্রকৃত পরিচয় দিবার জন্য অর্থাৎ তিনি যে কে তাহা বুঝাইবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু কোন ফল হয় নাই; কাজেই তিনি তাড়াতাড়ি নৌকায় ফিরিয়া আসতে বাধ্য হন। কিন্তু নৌকায় পৌছবার পূর্বেই বহুসংখ্যক মুসলমান লাঠি হাতে করিয়া মার মার শব্দে তাঁহাকে তাড়া করিল। চন্দ্ৰমাধব বাবু সত্বর নৌকার ভিতর প্রবেশ করেন এবং বন্দুকটি বন্দুক লইয়া সর চমাধব ঘােষ ঠাসিয়া রাখেন। উদ্দেশ্য যদি লোকগুলা সত্য সত্যই নৌকার উপর চড়াও হয় তাহা হইলে তিন গুলি চালাইবেন ; অধিকাংশ লােককে নৌকার নিকটে আসিতে দেখিয়া ইনি গুলি চালাইতে উদ্যত হইয়াছিলেন । কিন্তু চাপরাশী গুরুদয়াল তঁাহার বন্দুকটি ধরিয়া ফেলে এবং তাহাকে মিনতি করিয়া বলে, “আপনি গুলি চালাইবেন না।” ইহাতে চন্দ্ৰমাধব বা অত্যন্ত বিরক্ত হন বটে, কিন্তু অবশেষে গুরুদয়ালের অনুরােধ রক্ষা করেন। অতঃপর তিনি মাঝিদিগকে নৌকা খুলিয়া দিতে ও নদী পার হইতে আদেশ করেন। মাঝিরা নৌকা খুলিয়া দেয়। তখনও গ্রামবাসীরা তাহাকে শাসাইতেছিল। নৌকাখানি নদীর উপর আরও কিছুদুর অগ্রসর হইলে চাপরাশী কেন বন্দুক চালাইতে বাধা দিয়াছিল তাহা বুঝাইয়া বলে। সে বলল, “এখানকার অধিবাসীদের অধিকাংশই মুসলমান এবং ভীষণ প্রকৃতির গুলি চালাইলে কি রক্ষা থাকিত। তাহারা আপনাকে খুন করিত এবং নৌকায় কাহাকেও খুন-জখম করিতে বাকী রাখত না। আমরা লক্ষ্মীচরের কিনারা হইতে চলিয়া আসিয়া ভালই করিয়াছি এবং ইহাতে আমাদের জীবন-রক্ষা হইয়াছে।” চন্দ্ৰমাধব বাৰু এই কথা শুনিয়া নিরুত্তর রইলেন। খৃষ্টাব্দের ২০শে অক্টোবর প্রাতঃকালে তিনি বরিশালে উপস্থিত হয়েন। ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদ যাইল তিনি বাসায় পৌছিতেই ডাক-হরকরা একখানি সরকারী চিঠি তাঁহার হস্তে প্রদান করিল। চিঠিখা নব মৰ্ম্ম এই--বাখরগঞ্জে আপনাকে যে অস্থায়ী ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের পদে নিযুক্ত করা হইয়াছে সেই নিয়োেগ নাকচ করা হইল। চন্দ্ৰমাধবের জ্যেঠতুত ভাই নীলমাধব বসু তাঁহাকে পূর্বেই জানাইয়াছিলেন যে, তিনি উকীল- ১৮৬১ স্যর মাধৰ ঘােম সরকারের কর্তব্য-পালনে ঔদাসীন্য দেখাইয়াছেন—এই অপরাধে তাঁহাকে জব্দ করিবার চেষ্টা চলিতেছে। বর্ধমানের কলেক্ট হগ সাহেবের আদেশে এবং কমিশনার প্লাউডেন সাহেবের সুপারিশে এইরূপ কাৰ্য্য করা হইতেছে। এই সম্পর্কে হগ সাহেব কমিশনার গাউডেন সাহেবের নিকট যে রিপাের্ট দাখিল করিয়াছিলেন তাহার নকল প্লাউডেন সাহেব বরিশালে চন্দ্ৰমাধব বাবুর নিকট পাঠাইয়াছিলেন। উক্ত সরকারী চিঠি পাইয়া তিনি অবিলম্বে কলিকাতা যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন, তৎক্ষণাৎ তিনি কলেক্টরকে কাজ-কর্ম বুঝাইয়া দিলেন এবং অতি দুঃখে চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে বরিশাল ত্যাগ করিলেন। এই চাকুরিটী তাহার অত্যন্ত পছন্দসই হইয়াছিল ; কাজেই ইহা যাওয়াতে তাহার ক্লেশের সীমা ক্লেশের সীমা ছিল না। সে সময়ে তিনি জানিতেই পারেন নাই যে, তঁাহার ভবিষ্যৎ আরও কত উন্নত। বলিতে গেলে বলিতে হয় যে, একরূপ বিধাতার বিধানেই তাহার এই চাকুরী গিয়াছিল এবং তাহাকে বাধ্য হইয়া আইনের ব্যবসায় অবলম্বন করিতে বাধ্য হইতে হইয়াছিল। বরিশাল হইতে কলিকাতায় ফিরিবার পথে একটী উল্লেখযােগ্য ঘটনা ঘটিয়াছিল। সন্ধ্যার একটু পরেই চন্দ্ৰমাধবের নৌকা পিরােজপুরে পৌছে এবং সেই রাত্রির জন্য উহা খালে নঙ্গর করিয়া থাকে। সেখানে আরও অনেক নৌকা নঙ্গর ফেলিয়া অবস্থান করিতেছিল। শেষ রাত্তিতে চন্দ্ৰমাধবের বিহারী ভৃত্য সুধীলাল তাহাকে ধীরে ধীরে এই বলিয়া জাগায়, “চোর আয়া যায়, পাকড়ে গা ?” চমাধব বাবু নৌকার পিছন দিকে শয়ন করিয়াছিলেন, তাহার এক পার্শ্বে ছিলেন হরকুমার এবং অপর পার্শ্বে ছিল তঁাহার বন্দুক। বন্দুকে বাদ ঠাসা ছিল বটে, কিন্তু গুলি ছিল না। তিনি তাড়াতাড়ি বন্দুকে গুলি ভরিয়া হরকুমারকে জাগাইয়া তুলিলেন, হরকুমার চোরের নাম শুনিয়া ভয়ে কঁপিতে .

শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ লাগিলেন। চন্দ্ৰমাধববাবু নির্ভীক ছিলেন। তিনি বন্দুকটি ধরিয়া প্রস্তুত হইয়া রহিলেন, সুধীলালও একটী বড় দাও লইয়া তাহার নিকট বসিয়া রহিল। এমন সময়ে চুপি চুপি কথাবার্তার শব্দ শুনা গেল এবং একটা ছােট ডিঙ্গী নৌকা একরূপ নিঃশৰে চমাধব বাবুর নৌকার গায়ে লাগিল। নৌকার চারিধারে যে মাদুরের বেড়া ছিল, তাহার ফাক দিয়া দেখা গেল যে, ঐ ডিঙ্গীটাতে চারিজন জোয়ান লােক দাড় ধরিয়া বসিয়া আছে। নিশ্চয় তাহাদের নিকট দাও ছিল ; কারণ উহাদের মধ্যে একজন নৌকার ঝাপ তাড়াতাড়ি কাটিয়া ফেলিল এবং যাহা কিছু পায় তাহা লইবার জন্য নৌকার ভিতর হাত ঢুকাইয়া দিল। সে হাত ঢুকাইবামাত্র সুধীলাল তাহার হাত লক্ষ্য করিয়া দাও চালাইল কিন্তু সেই সঙ্গে বিহারী ভৃত্যদের প্রকৃতিসুলভ গালি সে উচ্চৈঃস্বরে দিতে ভুলে নাই। ইহার ফলে এই হইল যে, চোরটা গােপনে তাহার হাত সরাইয়া লইল এবং সুধীলালের দায়ের আঘাত নৌকার কাঠের উপর পড়িল। চন্দ্রমাধব বাবু তখনই নৌকার ভিতর হইতে বাহিরে আসিলেন এবং এদিক ওদিক লক্ষ্য করিয়া বন্দুকের আওয়াজ করিলেন, কিন্তু তিনি নৌকার ভিতর হইতে বাহির হইবার পূর্বেই চোরেদের ডিঙ্গীখানা কতকটা দূরে চলিয়া গিয়াছিল এবং ২/৩ মিনিটের মধ্যেই ফুলেশ্বর নদীর মাঝামাঝি অগ্রসর হইয়া ছল। বন্দুকের আওয়াজ শুনিয়া অনেকগুলি নৌকার লােক জাগিয়া উঠিয়া চীৎকার আরম্ভ করিল বটে কিন্তু চোরেরা পলাইয়া গেল এবং তাহাদিগকে ধরিবারও কোন উপায় হইল না। কলিকাতা যাইবার পথে তিনি তাঁহার পিতার কর্মস্থল খুলনায় অবতরণ করলেন। এইখানে তাঁহার পিতা, মাতা ও স্ত্রী ছিলেন, তাহারা চমাধবের এত বড় চাকুরী নষ্ট হইল শুনিয়া অত্যন্ত দুঃখ . প্রকাশ করিলেন। দুঃখপ্রকাশ ভিন্ন তাহাদের পক্ষে অন্য উপায় র চমৰ মােৰ ছিল না। খুলনায় একদিন থাকিয়া তিনি কলিকাতা যাত্রা করেন এবং ১১ খৃষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর কলিকাতায় পৌছেন। কলিকাতায় উপস্থিত হইয়া তিনি অবিলম্বে তাঁহার পুরাতন অধ্যাপক মণ্টিয়াে সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন এবং যাহা যাহা ঘটিয়াছে তাহা বলিলেন। মণ্টিয়াে সাহেৰ গভর্ণমেন্টের নিকট পাঠাইবার জন্য একটা কড়া চিঠির মুসাবিদা করিয়া দিলেন ; চিঠিখানিতে তঁাহার বিরুদ্ধে যাহা করা হইয়াছে তাহার তীব্র প্র তবাদ করা হইল। চিঠিখানিতে আরও বলা হইল যে, তাহার নিকট কৈফিয়ৎ তলব করা হয় নাই বলিয়া অত্যন্তু অবিচার হইয়াছে এবং সে জন্য তাহার যে আর্থিক ক্ষতি হইয়াছে তাহা সরকার বাহাদুরকে পূরণ করিয়া দিতে হইবে। এই চিঠির ফলে বাঙ্গালা সরকার বর্ধমানের প্লাউডেন সাহেবের নিকট কৈফিয়ৎ তলব করেন। চমাধব বাবু এই সম্পর্কে বাঙ্গালা সরকারের চীফ সেক্রেটারীর সহিতও দেখা করেন। তিনি চন্দ্রমবি বাবুকে হগ সাহেবের সহিত দেখা কষিয়া এ ব্যাপার মিটাইয়া ফেলিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু চন্দ্ৰমাধব ব'বু তাহাকে বলেন, “গ সাহেবের নিকট যাইতে আমার মন সরিতেছে না; কারণ আমার আশঙ্কা হয় ইহার সহিত দেখা করিতে গেলে আমি অপমানিত হইব।” অতঃপর চন্দ্রনাথ বাবু বর্ধমানে গিয়া প্লাউডেন সাহেবের সহিত দেখা করিলেন। তাহার সহিত কথাবার্তা কহিয়া চন্দ্রমাধব বাবু বুঝিতে পারিলেন যে তিনি তাহার উপর বিরক্ত হইয়াই আছেন সুতরাং তাহার নিকট চ::মাধব বাবু আশ্বাসবাণী পাইলেন না। ইহার পর চমাধব বাবুর সহিত প্লাউডেন সাহেব ও হাসাহেবের অনেক চিঠি লেখালেখি হয়। পরিশেৰে গভর্ণমেন্টের বিচারে ইহাই স্থির হয় যে, চন্দ্ৰমাধব বাবু উকীল-সরকারের কর্তব্যে বরাবর অবহেলা করিয়া আসিয়া- স্তর চমাধব ঘােষ ছেন বলিয়া হগ সাহেব কমিশনারের নিকট যে মন্তব্য প্রকাশ করেন তাহা অন্যায় হয় নাই এবং চন্দ্রমাধব বাবু ইচ্ছা করিলে উকীল- সরকাররূপে বর্জনে ফিরিয়া যাইতে পারেন। বলা বাহুল্য যে, হগ সাহেব বা কমিশনার প্লাউডেন সাহেব—ইহাদের দুইজনের কেহই চন্দ্রমাধব বাবু কোন মামলায় লিখিত জবানবন্দী তৈয়ারী করিতে দেরী করিয়াছেন- এই কথা ব্যতীত তাহার উপর এমন দোষারােপ করিতে পারেন নাই যে, উহার এই কার্যের কার্য্যের দ্বারা গভর্ণমেন্টের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হইয়াছে অথবা এই বিলম্বে গভর্ণমেন্টের মামলা নষ্ট হইবার সম্ভানা হইয়াছে বস্তুতঃ চন্দ্রমাধব বাবুর রচত মামলার জবানবন্দী রাজ- বিভাগের কর্তৃপক্ষ অথবা লিগ্যাল রিমেমব্রানসার কর্তৃক আংশিক রূপেও রদবদল করা হয় নাই এবং এই জবানবন্দী যথাসময়ে পেশ করা হইয়াছিল অথচ ইহা সত্ত্বেও গভর্ণমেন্টের পূর্ব আদেশের নড়চড় হইল না এবং চন্দ্রমাধব বাবুকেও তাহারা ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেটের পদে পুনরায় বাহাল করিলেন না। বৰ্ধনানে আবার উকীল-সরকার হইয়া যাইতে চঃ মাধব বাবুর মন সরিল না , সুতরাং তিনি হগ সাহেবকে একটা কড়া চিঠি লিখয়া উকীল- সরকারের পদে ইস্তফা দিলেন। এই চিঠিখানি মণ্টিয়াে সাহেব মুসা- বিদা করিয়া দিয়াছিলো। পূৰ্ব্ব হইতে তিন ভাবিয়া রাখিয়াছিলেন যে, সদর দেওয়ানী আদালতে তিনি ওকালতী করিবেন। খৃষ্টারে ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হন। তঁাহার আশঙ্কা ছিল যে, হগ সাহেব ও প্লাউডেন সাহেব তাঁহার সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী করিবার পথে বাধা দিতে পারেন কিন্তু তঁাহারা সে সম্বন্ধে কোনও কিছু করেন নাই। তথাপি চন্দ্ৰমাধব বাবু পূৰ্ব্ব-সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছিলেন এবং সদর দেওয়ানী আদালতের তদানীন্তন প্রধান জজ রাইকেস সাহেবের সহিত দেখা করিয়াছিলেন। ১৮৬২ ৮ স্তর চমাধব ঘােষ এই রাইকেস সাহেব যখন চট্টগ্রামের কলেক্টর ছিলেন তখন চন্দু- মাধব বাবুর পিতা তাহার অধীনে ডেপুটী কলেক্টরের কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন । সুতরাং তিনি চন্দ্ৰমাধববাবুর প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করেন। সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হইয়া চমাধব বাবু ভবানীপুর কাসারিপাড়ায় দীনবন্ধু মুখার্জীর বহির্পাটী মাসিক আট টাকায় ভাড়া লয়েন। সেই সময়ে বাবু কালীপ্রসন্ন ঘােষ আ’লপুরের ট্রেজারীতে জন ইংলিস হাব্বে সাহেবের অধীনে কৰ্ম্ম করিতেন । চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জীর স্ত্রীটে কালীপ্রসন্ন বাবুর একখানি বাড়ী ছিল। তখন চন্দ্রনাথ চাটার্জীর দ্বীট নরিপাড়া নামে অভিহিত হইত। চন্দ্রমাধব বাবু যখন সদর দেওয়ানী আদালতে প্রবেশ করেন তখন রমাপ্রসাদ রায় মহাশয় ঐ আদালতের বড় উকীল-সরকার এবং শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয় ছােট উকীল-সরকার ছিলেন। উকীলগণের মধ্যে রমাপ্রসাদ যায় ছিলেন অগ্রণী ; কেবা জজেদের উপরই যে হার প্রভূত প্রভাব ছিল তাহা নয়, সমস্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর উপর তঁাহার বিপুল প্রভাব ছিল। তঁাহার পাণ্ডিত্য যে অধিক ছিল তাহা নহে কিন্তু অত্যন্ত দক্ষতা ও কূটবুদ্ধির সহিত তিনি কর্তব্য সম্পাদন করিতেন। অতি স্পষ্টভাষায় তিনি সওয়াল-জবাব করিতেন। তিনি অনর্গল বলিয়া যাইতে পারিতেন বলিয়া একটা কথা কখনও আটকাইত না ইনি বিখ্যাত হিন্দু-সমাজ-সংস্কারক রাজ। রামমোহন রায়ের পুত্র ছিলেন। রমাপ্রসাদ রায় সম্পূর্ণ বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। পূর্বে তিন আলিপুরের ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতা যখন চট্টগ্রাম হইতে আলিপুরে বদলী হয়েন তখন তিনি এই রমাপ্রসাদ বাবুর হস্ত হইতেই কাৰ্যভার বুঝিয়া লইয়াছিলেন। রমাপ্রসাদ বাবু রাজার মত বাস করিতেন এবং প্রত্যহ প্রাতঃকালে তাহার বাড়ীতে যেন রবার সিত। বাদলাদেশে তখন আর একজনও ব্যক্তি ছিলেন না স্তর চমাধব ঘােষ যিনি প্রভাবে-প্রতিপত্তিতে রমাপ্রসাদ বাবুর সমতুল্য। তাঁহার মত প্রভাবশালী অপর একজন ভারতবাসী এ পর্যন্ত কচিৎ দেখা গিয়াছে। সকল শ্রেণীর লােকই তঁাহার সহিত দেখা করিত। ওকালতীতে এবং পদমৰ্যাদায় ঠিক তঁাহার এক ধাপ নীচের লােক ছিলেন-বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত, মুন্সী আমীর আমীর আলী, বাবু কৃষ্ণকিশাের ঘােষ, মিষ্টার আর-টি এলেন ; ইহাদের পরের ধাপেই ছিলেন --বাবু দ্বারকানাথ মিত্র, অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুকুল- চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্রীনাথ দাস এবং কৃষ্ণসখা মুখব্যাপাধ্যায়। চন্দ্রমাধব বাবুর সহিত রমাপ্রসাদ বাবু ও শম্ভুনাথ বাবুর অতি সামান্য পরিচয় ছিল ; কিন্তু বাবু দ্বারিকানাথ মিত্র ও প্রনাথ দাসকে তিনি বিশেষরূপ জানিতেন। সেই সময়ে সদর দেওয়ানী আদালতে আরও কয়েকজন ওকালতী করিতেন। তাঁহাদের নামও উল্লেখযােগ্য ; একজনের নাম ছিল বাবু মহেন্দ্রলাল সােম, ইনি হিন্দু কলেজের একজন প্রসিদ্ধ ছাত্র ছিলেন এবং বাবু শ্ৰনাথ দাসের সতীর্থ ছিলেন ; কিন্তু সুপণ্ডিত হইলেও ওকালতীতে তাহার ভাল পশার ‘ছল না। আর একজন ছিলেন বাবু কালীপ্রসন্ন দত্ত ; ইনিও হিন্দু কলেজের কৃতী ছাত্র, কিন্তু ওকালতীতে ইহার ভাল পশার ছিল না। তবে হিন্দু আইনে প্রভূত অধিকার ছিল বলিয়া হিন্দু আইন-সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলায় তিনি নিযুক্ত হইতেন। টাকীর ভুবনমােহন চৌধুরী ও মুন্সী আব্বাস আলী এবং পাওয়াবাসী একজন মুসলমান উকৗলের বেশ পশার ছিল। মুন্সী আব্বাস আলী অতি শিষ্টাচারসম্পন্ন ভদ্রলােক ছিলেন। আর একজন উকীল ছিলেন তাহার নাম গােপাললাল মিত্র ; ইনি চমৎকার বলিতে কহিতে পারতেন কিন্তু তিনি কতকটা অলস এবং আত্মােন্নতির প্রতি উদাসীন ছিলেন। তবে তাঁহার হৃদয় ছিল অত্যন্ত উদার, ৫০ র চন্দ্রমাধব ঘােষ স্বভাব ছিল অত্যন্ত মধুর এবং তাহার বিবেকবুদ্ধি ছিল অত্যন্ত প্রবল। তিনি যদি ওকালতীর দিকে মন দিতেন, তাহা হইলে খুব বড় পশারওয়ালা উকীল হইতে পারিতেন। চমাধব বাবুর সহিত শীঘ্রই ইহার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হইয়াছিল। গােপাল বাবুর মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাহা অক্ষুন্ন ছিল। মৃত্যুর কয়েক বৎসর পূর্বে গােপাল বাবু ওকালতী ছাড়িয়া কলিকাতা মিউনিসিপ্যালিটীর ভাইস-চেয়ারম্যান হয়েন এবং পরে পেন্সন লইয়া উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র রাথিয়া যান। আর একদল যুবক সেই সময়ে সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে চলমাধবের কলেজের সহপাঠী আনন্দগোপাল পালিত ও কালীকৃষ্ণ সেন কিছু কিছু কাজ-কৰ্ম্ম করিতেছিলেন। ইহারা দুইজনেই চমা,ব বার বন্ধু ছিলেন। আর একজন ছিলেন রমেশচন্দ্র মিত্র (পরে স্তর রমেশচন্দ্র মিত্র)। রমেশচন্দ্র কলেজে চােব অপেক্ষা দুই ক্লাস নীচে পড়িতেন। ইনি ভবানীপুরের রামচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের পুত্র, তাহার সম্বন্ধে পরিচয় ইতি- পূর্বেই দেওয়া হইয়াছে। রমেশচন্দ্র বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী যুবক ছিলেন, তবে সেই সময়ে ওকালতীতে তাহার কিছু হইত না নিলেই হয়। আর একজন উকীল ছিলেন তাহার নাম বাবু দুর্গামােহন দাস; তিনি পূর্ব- বঙ্গের প্রসিদ্ধ মোক্তার বীরেশ্বর দাসের ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন সুতরাং হার পিতৃব্যের দ্বারা কিছু কিছু মামলা পইিতেন। তঁাহার ভ্রাতা কালীমােহন দাস বরিশালের উকা-রকার ছিলেন। কালীমোহন বা1 কলিকাতা হাইকোর্টে ওকালতা করিতে আসিতেছেন বলিয়া দুর্গামোহন বাবু, বরিশালের উকীল-সরকার হইবার জন্য বরিশালে গমন করেন। আর একজনের নাম বাবু রাধানাথ বসু, ইনি মজিলপুরের দত্তদিগের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন; ইনি যখন হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন সেই সময় চন্দ্র- মাধৰ বাৰ মধ্যে মধ্যে তঁাহার সহিত দেখা করিতেন এবং পড়াশুনায় শ্যর চমাধব ঘোষ ৪১ ; তাঁহার নিকট হইতে কিছু কিছু সাহায্য লইতেন। চন্দ্রমাধব বাবু যখন সদর দেওয়ানী আদালতে প্রবেশ করেন তখন রাধানাথ বাৰু তথাকার এন্টনী ছিলেন এবং উকীল-হিসাবে কিছু কিছু মামলা-জোগাড়ের নিস্ফল চেষ্টা করিতেছিলেন। সদর স্ত্রীটের একটী বাড়ীতে তিনি একটা ঘর ভাড়া লইয়া অফিস করিয়াছিলেন। তিন এত ভাল লােক ছিলেন যে, ঐ ঘরের একাংশ চঞ্চমাধব বাবুকে সিকি 'ভাড়ায় ভাড়া দিয়াছিলেন। সেই সময়ে কয়েকজন জজের নাম এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। বড় ছিলেন রাইকেস সাহেব ; তাহার পরবর্তী জজের নাম মিষ্টার বিণী ট্রেভর ; হার পরবর্ত্তী জজের নাম মিষ্টার রেলি। আর একজন জজের নাম ছিল মিষ্টার ষ্টীয়ার। আণ্ডার কোর্টে সৰ্বশুদ্ধ পাঁচজন জজ ছিলেন। এই সময়কার আর একজন জজের নাম ছিল মিষ্টার লচ; ইনি চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রবেশের পূর্ব হইতে ছিলেন কি পরে অসিয়াছিলেন 'তাহ। বলিতে পারা যায় না। রাইকস সাহেব সেকালের সিবিলিয়ান ছিলেন, তিনি জবরদস্ত হাকিম ও সুচতুর ব্যক্তি ছিলেন বটে কিন্তু আইনে তঁাহার বেশী অধি- শার ছি না । ট্রেভর সাহেব উৎকৃষ্ট আইনজ্ঞ ছিলেন। রেলি সাহেব শিষ্টাচারসম্পন্ন, সহৃদয় এবং বুদ্ধিমান ব9ি ছিলেন। স্ত্রীয়ার সাহেবের সম্বন্ধে অধিক ব’লবার কিছু নাই। চমাধব বাবু যখন সদর দেওয়ানী আদালতে যােগদান করেন এখন তাহার সহিত প্রায় কোনও মােক্তারের পরিচয় ছিল না অখিলচঁাদ সেন :মক একজন মাের ছিলেন তিনি চন্দ্রমাধব বাবুর গ্রামবাসী ; ইনি গোলােকটাদ সেনের ভ্রাতা ছিলেন। গােলােক বাবু চন্দ্র মাধব বাবুকে বাল্যকালে দেখিয়াছিলেন। রামলাল গোঁসাই নামক আর একজন মােক্তার ছিলেন, তাহার সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর যৎসামান্য পরিচয় ছিল, কিন্তু চন্দ্র মাধব বাবুর পিতার নিকট তিনি স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ সুপরিচিত ছিলেন ; আর একজন মােক্তার ছিলেন তঁাহার নাম গুরুপ্রসাদ দাস, ইহার সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর পরিচয় না থাকিলেও ইহার পিতার সহিত তাহার পরিচয় ছিল ; গুরুপ্রসাদ বাবু বেশ ভাল লােক ছিলেন। আর একজন মোক্তারের নাম বৈকুণ্ঠ চক্রবর্তী, ইনি চন্দ্রমাধব বাবুর পিতার সহিত পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তিনি চন্দ্ৰমাধববাবুকে কোনও প্রকার সাহায্য করিতেন না। সেই সময়ে পূর্ববঙ্গের বড় মােজার বীরেশ্বর দাস সদর দেওয়ানী আদালতে মােজারী করিতেন। সকল ঘারেরই জন্মস্থান ছিল হয় বিক্রমপুর, নয় ঢাকা জেলার বিভিন্ন স্থান। ফকিরচাদ সেন, আনন্দনাথ চৌধুরী নামক জনৈক বৃদ্ধ মুহুরীকে চমাধব বাবুর সহিত পরিচিত করাইয়া দেন; ইনি পূর্বে মুনসেফ, আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। সুতরাং চ মাধব বাবুকে খুব বেশী রােজগার করিবার আশা একপ্রকার ত্যাগ করিয়াই ওকালতী আরম্ভ করিতে হইয়াছিল। তবে তঁাহার ইচ্ছা ছিল পিতার নিকট হইতে কোনও প্রকার সাহায্য গ্রহণ না করা—কোনও রূপে নিজের উপায়ে নিজেকে চালাইয়া লওয়া। ও কালতী আরম্ভ করিবার সময়ে তাহা । হাতে পুজি ছিল মাত্র ১৫ টাকা। ইহা তিনি গভর্ণমেন্টের নিকট হইতে তাঁহার বেতন এবং বরিশালে যাইবার পাথেয়-হিসাবে পাইয়াছিলেন। মধ্যে মধ্যে তিনি ২১টী ছােট খাটো মামলা পাইতেন, তাহাতেই তাহার কোনও রূপে চলিয়া যাইত। ইতিপূর্বে উল্লিখিত উকীলদিগের কেহই তাহাকে কোনও প্রকার সাহায্য করেন নাই। তবে প্রসিদ্ধ উকীল বাবু নাথ দাস মধ্যে মধ্যে দুই একটা মামলায় তঁহাকে জুনিয়র বা সহকারী লইতেন! ২৩ মাস এইভাবেই চলিয়া আসিতেছিল। এমন সময়ে হঠাৎ অবস্থার গতি প রবর্তিত হইয়া তাহার অনুকূল স্তর চন্দ্রমাধব ঘােষ হইয়া উঠিল। মােতার গুরুপ্রসাদ বাবু একটী “রিভিউ” মামলায় তাহাকে শ্রীনাথ দাস মহাশয়ের সহকারী নিযুক্ত করেন। ফী নির্ধারিত হইয়াছিল ১২ টাকা। তখনকার দিনে রিভিউ”মামলায় প্রায়ই এড়ভােকেট জেনারেল মিষ্টার রীচি, মিষ্টার ডয়েন প্রভৃতির ন্যায় বড় বড় ব্যারিষ্টার সদর দেওয়ানী আদালতের দরখাস্তকারীদের তরফে দাড়াইতেন। কখনও কোনও জুনিয়র বা নূতন উকীল এই মামলায় দাড়াইবার জন্য নিযুক্ত হইতেন না। চমাধব বাবু শ্ৰীনাথ দাস মহাশয়ের জুনিয়র হিসাবে এই মামলা গ্রহণ করিতে সঙ্কোচ বোধ করেন নাই। মামলাটীর বিচার হইয়াছিল মিষ্টার রাইকেস ও মিষ্টার ষ্টীয়ারের এজলাসে। যখন মামলটীর শুনানী উঠিল, সেই সময়ে আদালতে উকীল, মােক্তার, মামলাকারী প্রভৃতির অত্যন্ত ভিড় হইয়াছিল। অপর পক্ষে উকীল ছিলেন বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত, বাবু কৃষ্ণকিশোর ঘােষ, মিষ্টার আর টি এলেন এবং সম্ভবতঃ রেভিনিউ বাের্ডের অবসর প্রাপ্ত সদস্য মিষ্টার এইচ ষ্টেমফোর্ড । শ্রীনাথবাবু মামলা চালাইবার জন্য প্রস্তুত হইতে পারেন নাই ; সেইজন্য তিনি চন্দ্ৰমাধব বাবুকে সওয়াল জবাব করিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। আদালতে অনেকগুনি মােক্তার উপস্থিত ছিলেন ; তাহারা বলিলেন, “রাইকেস সাহেব বড় কড়া লোক ; আপনি নূতন উকীল, এত বড় মামলায় সওয়াল জবাব করিবেন না ; আপনাকে এমন ধমক দিবেন যাহাতে আপনার ভবিষ্যৎ নষ্ট হইয়া যাইবে। ইহা শুনিয়া চন্দ্রমাধব বাবুর ভয় হইল কিন্তু শ্রীনাথ,দাস মহাশয় তাঁহাকে ছাড়িলেন না,কাজেইসওয়াল জবাব করিবার জন্য চন্দ্ৰমাধব বা বুকে, দাড়াইতে হইল। একজন নূতন উকীলকে দাড়াইতে দেখিয়া জজের কতকটা বিস্মিত হইলেন, কিন্তু তাহার। কিছু বলিলেন না—আইনতঃ বলিতেও পারেন না। জজেরা তঁাহার বক্তৃতা ধীরভাবে শুনিতে হয় ত ৪০ স্যর চমাধব ঘােষ লাগিলেন এবং প্রয়ােজনীয় বিষয় লিখিয়া রাখিতে লাগিলেন। জজ রাইকেস সাহেব যখন মামলার বিবরণ অবগত হইলেন তখনই তিনি মামলাটার খুঁটিনাটা লইয়া চমাধব বাবুর সহিত আলােচনা আরম্ভ করিলেন অনেকক্ষণ ধরিয়া আলােচনা ও বিচার-বিতর্ক হইতে লাগিল। অতঃপর রাইকেস সাহেব চন্দ্ৰবাধব বাবুর একটা যুক্তি সম্বন্ধে বলেন যে, ইহা বালকোচিত। ইহাতে চন্দ্ৰমাধব বাবু আর অধিক আলােচনা করা সঙ্গত মনে করেন নাই এবং বসিয়া পড়েন। “রিভিউ” বা পুনর্বিচারের প্রার্থনা না-মঞ্জুর হইয়া গেল বটে কিন্তু যখন এজলাসে সমবেত উকীল-মােক্তারের। এজলাস হইতে বাহির হইয়া আসিলেন, তখন অপর পক্ষের প্রধান উকীল শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয় অগ্রসর হইয়া আসিয়া চন্দ্ৰমাধবের করমর্দন কনে এব বলেন, “এই আদালতে আপনার প্রথম সওয়াল জবাব শুনিয়া আপনাকে অভিনন্দিত করিতেছি আপনি যেভাবে মামলাটী চালাইয়াছেন তাহাও প্রশংসনীয়।” বহুলােকের সম্মুখে শম্ভুনাথ ব'র এইরূপ মন্তব্য প্রকাশ ক রয়াছিলে ? চন্দ্রনাথ আৰু অবগত হন যে, ঐদিনই শম্ভুনাথ বাবু তঁাহার যােগ্যতার কথা কয়েক জন মোক্তার:কও বংশষ করিয়া বলে। ইহার ফল এই হুইল যে, কয়েক জন মাে'ারের নিকট হইতে তিনি ৫ ৬টী মামলা পাইলেন। এই ঘটনাই চন্দ্র মাধব বাবুর জীবনের গতি ফিরাইয়া দিল এবং এই ঘটনার দিন হইতেই তাহার ওকালতীর পশর ক্রমেই বাড়িতে লাগিল। আইনের অধ্যাপনা প্রায় এই সময়ে সন্ততিঃ উক্ত ঘটনার পরে তাঁহার পুরাতন অধ্যাপক মন্টি ময়া সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুকে অনুরােধ করেন যে,প্রেসিডেন্সী কলেজের অাইন বিভাগের তৃতীয় বা যিক শ্রেণীর ছাত্রগণকে মফস্বলের স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ ৫ রাজ-সংক্রান্ত আইন-বিষয়ে তাহাকে উপদেশ দিতে হইবে। মস্টিয়াে সাহেব তখনও প্রেসিডেন্সী কলেজের আইনের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু জানতেন ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন বি-এ এবং সম্ভবত এম-এ উপাধিধারী আছেন এবং উহারা বয়সেও প্রায় তঁাহার সমান ; কাজেই এই কৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে তিনি সঙ্কোচ বােধ করিলেন এবং মন্টিয়াে সাহেবকে বলিলেন, এরূপ কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজ করতে আমি ইচ্ছুক নহি; কিন্তু মন্টিয়াে সাহেব তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না, কারণ তিনি জানিতেন চন্দ্ৰমাধবের এ কাৰ্য্য করিবার যথেষ্ট যােগ্যতা আছে। অগত্যা চন্দ্ৰমাধব বাবু বাধ্য হইয়া এই কৰ্ম্ম গ্রহণ করিলেন এবং সপ্তাহে দুই দিন করিয়া রাজস্ব-সংক্রান্ত আইন ছাত্রগণকে বুঝাইয়া দিতে লাগিলেন। সে সময়ে তঁাহার ছাত্রগণের মধ্যে রাসবিহারী ঘােষ, গুরুদাস বন্দ্যোপ ধ্যায়, অতুলচন্দ্র মল্লিক (ইনি পরে ব্যারিষ্টার হইয়া ছিলেন ও ডাক্তার শরৎকুমার মাকের পিতা) এবং বি-কে মল্লিক (ইনি পরে হাইকোর্টের জজ হইয়াছিলেন) প্রভৃতির নাম উল্লেখযােগ্য। ইহারা গভীর মনােযােগের সহিত চন্দ্রমবি বাবুর বক্তৃতা শুনিতেন। চ- মাধব বাবু পরে জানিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহার সম্বন্ধে ইহাদের খুব উচ্চ ধারণা ছিল। তিনি যে কয়মাস মন্টিয়ে। সাহেবের হইয়া এই কাৰ্য্য করিয়াছিলেন সেই কয়মাস মাসিক ৩০০ টাকা হিসাবে বেতন তিন পাইতেন। প্রথমে চমাধব বাবু বেতনের টাকা লইতে চান নাই কিন্তু পরে মন্টিয়ে। সাহেবের নির্ধ্বতশয্যে তাহাকে উহা গ্রহণ করিতে হয়। এখানে ইহা বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, পর পর দুই বৎসর প্রতি বৎসরে পাঁচমাস করিয়া তাঁহাকে মন্টিয়াে সাহেবের হইয়া এই অধ্যাপনার কার্য করিতে হইত। ক্রমে ইহাও বহুলােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল।

০৬ স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ সরকার-পক্ষে ডাকাতি মামলায় নিযুক্ত । এই সময়ে হুগলীর ডাকাতি-কমিশনার রেলী সাহেব একটা বড় ডাকাতি-মামলা পরিচালনের জন্য চন্দ্রমাধব বাবুকে সরকার-তরফে নিযুক্ত করেন। মামলাটী হুগলীর তদানীন্তন অতিরিক্ত দায়রা-জজ বার্ড সাহেবের এজলাসে বিচারাধীন ছিল। এই বাচঁ সাহেব পূর্বে বর্ধমানের কলেক্টর ছিলেন। জুরীর সাহায্যে মামলাটীর বিচার হইবে—এইরূপ ব্যবস্থা হইয়াছিল। রেলী সাহেবের অধীনস্থ ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট বাবু রাখালদাস মুখােপাধ্যায় চন্দ্ৰমাধব বাবুর পুরাতন বন্ধু, তঁাহারই চেষ্টায় চন্দ্রমাধব বাবু এই মামলাটী পাইয়াছিলেন। হুগলীর উকীল-সরকার ঈশানচন্দ্র মিত্র মহাশয়কে এই মামলায় গভর্ণমেন্ট নিযুক্ত করেন নাই বলিয়া তিনি আসামীদের তরফে দাড়াইয়াছিলেন। মামলাটী তিনদিন ধরিয়া চলিয়াছিল এবং চন্দ্রমাধব বাবুকে মামলাটীর জন্য কঠোর পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল। উভয় পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণাদি শেষ হইবার পর এবং আসামী- দের তরফের সওয়াল জবাব শেষ হইবার পর দায়রা-জজ বাচঁ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুকে বলেন, “আপনার আর সওয়াল জবাব করিবার প্রয়ােজন নাই, আমি মামলাটী জুরিদিগকে বুঝাইয়া দিতেছি।” চন্দ্ৰমাধব বাবু ইহা একবারেই পছন্দ করেন নাই কিন্তু জজ যাহা করিতে যাইতেছিলেন তাহাতেও বাধা দেওয়া সঙ্গত মনে করেন নাই। অধিকাংশ জুরী ইংরেজীতে অনভজ্ঞ ছিলেন বলিয়া জজ তাহাদিগকে বাঙ্গালা ভাষায় চার্জ বুঝাইয়া দেন। জজ ভাল বাঙ্গালা বলিতে না পারায় জুরীরা তঁাহার কথা বুঝিতে পারেন নাই। এদিকে জজ সাহেব জুরীদিগকে চার্জ বুঝাইয়া দিয়াই ভঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনাদের অভিমত কি? কিয়ৎক্ষণ আলােচনার পর জুরীদের নায়ক কতকটা থতমত খাইয়া এলােমেলােভাবে এমন কয়েকটী কথা স্যর চমাধব ঘােষ ৪৭ ছিল না। বলিলেন,-যাহার অর্থ হয় মামলাটা প্রমাণ হয় নাই। চন্দ্রমাধব বাবু তখনই প্রকৃত ব্যাপার বুঝিতে পারিলেন এবং তিনি কি করিতে যাইতেছেন তাহার ঔচিত্য-অনৌচত্য সম্বন্ধে কাহাকেও প্রশ্ন করিবার অবসর না দিয়াই তিনি জুরীদিগকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, “থামুন, থামুন। তার পর তিনি জজকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, জুরীদিগকে কি করিতে হইবে তাহা তাঁহারা বুঝিতে পারেন নাই, যদি আপনি অনুমতি করেন, তাহা হইলে আমি সংক্ষেপে মূল সমস্যাগুলি তঁহাদিগের সম্মুখে উপস্থাপিত করি।' জজ বার্ড সাহেবও জুরীদের ভাব-ভঙ্গীতে ও কথায় এরূপ বিস্মিত হইয়াছিলেন যে, তাহার পক্ষে চন্দ্ৰমাধব বাবুর কথায় সম্মত হওয়া ব্যতীত অন্য উপায় যাহা হউক, চন্দ্রমাধব বাবু তখনই সংক্ষেপে জুরীদিগকে সমস্ত ব্যাপার বুঝাইয়া দিলেন। জুরীরা তখন আসামীদিগকে সকল অপরাধে অপরাধী বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। জজ বাচঁ সাহেব জুরীদের এই অভিমত শুনিয়া মৃদু হাস্য করিলেন এবং আসামীদিগের প্রতি চৌদ্দ বৎসর, দশ বৎসর—এইরূপ দীর্ঘকালের জন্য কঠোর কারাদণ্ডভােগের আদেশ দিলেন। বলা বাহুল্য, ভুল করিয়াই হউক বা না করিয়াই হউক, জুরীদের অভিমত প্রকাশিত হইবার পর কোন উকীল আর কিছু বলিতে পারেন না, বলিলে উহা বে-আইনি হয় কিন্তু জুরীরা মামলাটা না বুঝিয়া দায়িত্বহীনভাবে মতপ্রকাশ করিবেন এবং তাহার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা নিষ্কৃতি পাইবে-ইহা চমাধব বাবুর নিকট বিসদৃশ বােধ হইয়াছিল ; কারণ এই মামলায় যাহারা আসামী হইয়াছিল তাহারা সত্যসত্যই ডাকাত ছিল। তখনকার কালে সিবিলিয়ানগণ বাঙ্গালা ভাষা ভালরূপ জানিতেন না এবং এখনকার কালেও অনেক সিবিলিয়ান জানেন ན་ , তখনকার কালের সিবিলিয়ানরা তাই জুরীদিগকে বাঙ্গালা ভাষায় চার্জ বুঝাইয়া দিতে ঠিকমত পারিতেন ৮ স্যর চমাধব ঘােষ । এক্ষণে সে অসুবিধা দূর হইয়াছে। 'এক্ষণে জুরীরা ইংত্রা ) বুঝিতে পারেন বসিয়া জজেরা ইংরাজীতেই জুৱীদিগকে চায় বুঝাইয়া দেন। হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠা ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে ১লা জুলাই হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরাতন সুপ্রীম কোর্ট ও সদর দেওয়ানী আদালত এই দুইটীর সম্মিলনে হাইকোর্ট স্থাপিত হয়। তখন এই দুইটী আদালতে যে সকল জজ ছিলেন তাঁহারাই নব-প্রতিষ্ঠিত হাইকোর্টের জজ হন। হাইকোর্টের আপীল বিভাগ তখন ভবানীপুরের যে বৃহৎ বাটীতে সদর দেওয়ানী আদালত বসিত সেই বাড়ীতে বসিতে থাকে এবং হাইকোর্টের আদিম বিভাগের কাৰ্য্য সুপ্রীম কোর্টের পুরাতন বাড়ীতেই চলিতে থাকে। আইন অনুসারে স্থির হয় যে, হাইকোর্টের জজের সংখ্যা পনের জনের অধিক হইবে না; তিন ভাগের এক ভাগ বিচারপতি সিবিলিয়ান ও বাকী ব্যারিষ্টার হইবেন। দেশীয় জ কত জন বসিবেন তাহার বিষয়ে কোন কিছু বলা হয় নাই। রমাপ্রসাদ রায় কলিকাতা হাইকোর্টের প্রথম দেশীয় জজ নিযুক্ত হয়েন। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে যে, ইনি সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল-সরকার এবং বাঙ্গালা দেশের একজন প্রভূত প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। দুঃখের বিষয়, নিয়ােগ- পত্র আসিবার পূর্বেই রমাপ্রসাদ রায় মহাশয়ের মৃত্যু হয়। তঁাহার স্থলে কাহাকে হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত করা হইবে ইহা লইয়া জল্পনা-কল্পনা চলিতে থাকে। রমাপ্রসাদ বার মৃত্যুর পর বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাই টের উকীল-সরকার নিযুক্ত হন। তখন ওকালতীতে ৬াহার মাসিক আয় প্রায় পনের হাজার টাকা হইত। পর বৎসর অর্থাৎ ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয় হাইকোটের র যাৰ বােব এ নিযুত হন। সুতরাং শবাবুকে হাইকোর্টের প্রথম দেশীয় বিচারপতি বলা যাইতে পারে। একবার কথা উঠে যে, যে সকল উকীল সদর দেওয়ানী আদালতে ওফালতী করিতেন অর্থাৎ তথাকার উকীলশ্রেণীভুক্ত ছিলেন তাঁহাদিগকে নব-প্রতিষ্ঠিত হাইকোর্টের উকীল(vakil)করা যাইতে পাৰে কি না। ইহাতে উকীলদিগের মধ্যে অত্যন্ত চাঞ্চল্য উপনিত হয়। অবশেষে নিম্নরূপ ব্যবস্থায় এই চাঞ্চল্য দূরীভূত হইল :- যে সকল ব্যারিষ্টার সুগ্রীম কোর্টে ব্যারিষ্টারী করিতেছিলেন, তাহাদিগকে হাইকোর্টের এডভােকেট এবং সদর দেওয়ানী আদালতে যে সকল উকীল ওকালতী করিতেছিলেন তাঁহাদিগকে হাইকোরে উকীল ও এনী করা হইয়াছিল। নিম্নলিখিত বিচারপতিগণকে লইয়া হাইকোর্ট কাৰ্যারত করেন আর বার্ণেস পিকক (প্রধান বিচারপতি), স্যার চালস জ্যাকসন, স্যার মাডুম্যান্ট ওয়েলস (ইহারা তিনজনে সুপ্রীম কোর্টের এক ছিলেন); মিষ্টার এইচ-টি রাইকেস, জি লীচ, সি-বি ট্রেভর, এইচ-ভি বেলী, সি-ষ্টয়ার এবং এফ-বি-কেম্প, ( হারা সকলেই সিভিলিয়ান ও সদর দেওয়ানী আদালতের জজ ছিলেন) হাইকোর্ট স্থাপিত হইলে পর সুর বাসে পিক আপীল বিভাগের বিচারাসনে বসিতে আরম্ভ করেন এবং কিছুকাল তথায় বসিয়াছিলেন, এই সময়ে তাহার সহযােগী ছিলেন বিচারপতি মিষ্টার বেলী এবং বিচারপতি মিষ্টার কেম্প। স্যর বার্নেস পিককের আইনে প্রভূত জ্ঞান ছিল এবং কর্মশক্তি, অধ্যবসায় ও দক্ষতা ছিল অসাধারণ ; ঘােট বড় সকল মামলাই তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করিয়া বিচার করতেন । তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন ; উকীল ও ব্যারিষ্টারে তিনি কোনও ভেদ • | মাধব ঘােষ রাখিতেন না। ইনি সকলের সহিত সমান ব্যবহার করিতেন এবং সে ব্যবহারও ছিল অত্যন্ত ভদ্র ও শিষ্টাচারপূর্ণ। এইজন্য তিনি হাইকোর্টে এমন আবহাওয়ার সৃষ্টি করিয়াছিলেন এবং জনসাধারণের মনেও, এমন ধারণার সঞ্চার করিয়াছিলেন—যাহার সমান আবহাওয়া ও ধারণা এ পর্যন্ত দেখা যায় নাই, অতিক্রম করা ত দূরের কথা। সুর বার্ণেল পিক যখন এজলাসে বসিতেন তখন এজলাস যেন গম গম্ করিত, এজলাসে সর্বত্র একটা গাম্ভীৰ্য্য বিরাজ করিত, একটা ভয়ের ভাব সকলের মনেই থাকিত। কোন উকীল বা ব্যারিষ্টার তাহার এজলাসে ফাকা কথা বলিতে বা ধাপ্পা দিতে পারিতেন না। প্রত্যেক উকীল বা ব্যারিষ্টারকেই তঁাহার মামলা ভাল করিয়া বুঝিয়া এবং তৎসম্পর্কিত আইন উত্তমরূপে অধ্যয়ন করিয়া তাহার এজলাসে হাজির হইতে হইত। তিনি খর্বাকৃতি ছিলেন কিন্তু তাহার চক্ষু দুইটা ছিল বৃহৎ ও উজ্জ্বল। যদি সওয়াল জবাবকারী কোন উকীল বা ব্যারিষ্টারের প্রতি তিনি তাকাইতেন, তাহা হইলে মনে হইত, তিনি সেই উকীল বা ব্যারিষ্টারের মনের ভিতরে গিয়া প্রবেশ করিয়াছেন, ইহার ফল ইহাই হইত যে, উক্ত উকীল বা ব্যারিষ্টার অত্যন্ত সতর্কতার সহিত তাহার যুক্তি- তর্ক ও নজীর প্রয়ােগ করিতেন। স্যর বার্নেস পিকক অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী ছিলেন। প্রত্যহ ঠিক বেলা ১১টার সময় তিনি বিচারাসনে উপবেশন করিতেন। তার পর জলযােগের সময়ে আধঘণ্টা বিশ্রাম করিতেন এবং অপরাহ্ন সাড়ে চারিটা পর্যন্ত বিচারকার্য করিতেন। অতঃপর তালিকাভুক্ত পরবর্তী মামলার বিচার আরম্ভ করিতেন এবং যতক্ষণ উহা শেষ হইড-এমন কি বিচার শেষ করিতে যদি রাত্রি টাও ৰাজিত ততক্ষণ তিনি এজলাস হইতে উঠিতেন না। তাহার খাটির শক্তি এতই বিপুল ছিল। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, বিচারপতি মিষ্টার ৰেলী ও বিচারপতি স্তর চক্ৰমাধব ঘােষ ; মিষ্টার কেম্প তাহার সহিত একত্র বসিয়া বিচার করিতেন। বাহুল্য যে, তাহাদিগকে সর্বদা সতর্ক হইয়া থাকিতে হইত। একবার একটী ঘটনা ঘটিয়াছিল যাহা এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে। বিচারপতি মিষ্টার কেম্প, যখন বাখরগঞ্জের জেলা-জজ ছিলেন সেই সময়ে তিনি একটী মামলার বিচার করিয়াছিলেন ; সেই মামলায় তিনি যে রায় দিয়াছিলেন তাহার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল রুজু হইয়াছিল। ঘটনাচক্রে স্যর বার্নেস পিকক, বিচারপতি মিষ্টার বেলী ও বিচারপতি মিষ্টার কেম্পের এজলাসেই এই আপীল-মামলার বিচার-ভার পড়ে। মামলাটীর শুনানী আরম্ভ হইবামাত্র বিচারপতি মিষ্টার কেম্প স্তর বার্নেস পিকককে বলেন, নিম্ন আদালতে এই মামলার বিচার আমিই করিয়াছি সুতরাং এই মামলার আপীল শুনা আমার কর্তব্য কি? শুর বার্নেস পিকক বলিলেন, “আপনি থাকুন এবং আমার সহিত এই মামলার বিচার করুন।” ইহা আইনসঙ্গত কি না তাহা স্বতন্ত্র কথা। যাহা হউক, এই আপৗল মামলার বিচার শেষ হইল। বিচারে কেম্প, সাহেবের নিম্ন আদালতের রায় উল্টাইয়া গেল এবং আশ্চর্যের বিষয়, বিচারপতি মিষ্টার কেম্প, স্যর বার্পেস পিককের রায়ের সহিত একমত হইলেন। এইপ্রকার অদ্ভুতভাবে স্যর বার্নেস পিকক হাইকোর্টের বিচারকার্য পরি- চালনা করিতেন এবং তাহার নিম্নতম বিচারপতিরা তাহাকে এমন ভয় করিতেন যে, তিনি যতক্ষণ এজলাস হইতে না উঠিতেন ততক্ষণ তাহার। কেহ আদালত হইতে বাড়ী যাইতেন না। একদিন অপরাহ্নে জনৈক বিচারপতির স্যর বার্নেস পিকক এজলাস হইতে উঠিবার পূর্বে বাড়ী যাইবার প্রয়ােজন হইয়াছিল ; তিনি তাহার গাড়ী জজেরা যে দরজা দিয়া বাহির হইয়া গাড়ীতে চড়েন সেই দরজায় না আনাইয়া অন্ত দরলয় আনাইয়া রাখেন এবং কোনও রূপে সরিষা পড়েন।

। ৰ চমাধব ঘােম সুর বার্ণেল পিক অপেক্ষা কড়া জল আর একজনও হাইকোটের বিচারপতির আসনে উপবেশন করেন নাই। কিন্তু তাহার একমাত্র দুর্বলতা ছিল-তাহার পুত্র ইংলও হইতে এদেশে ব্যারিষ্টারী করিতে আসিয়াছিলেন সুর বাসে তাহাৰ পুত্ৰকে তাহারই এজলাসে ব্যারিষ্টারী করিতে দিতেন। তাঁহার পিতার এজলাসে কয়েকটা মামলা পরিচালনের = ভঁহাকে নিযুক্ত করা হয় । অৰ এরূপ কথা বলিতে পারা যায় না যে, তর বার্নেস কোন মামলায় তাহার পুত্রের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করিয়াছিলেন; তবে এরুপ দেখা যাইত যে, তাহার পুত্র যখন সওয়াল নবাব করিতেন তখন প্রায়ই তার বার্ণে তাহাকে যুক্তি-তর্ক দ্বারা সাহায্য করিতেন, এমন কি তঁাহার যুক্তির স্বপক্ষে নজীরের পুস্তকও মধ্যে মধ্যে তাঁহার হাতে দিতেন। উকীল-ব্যারিষ্টার-মহলে এই লইয়া অনেক কথা উঠিয়াছিল এবং অনেকে এইজন্য স্যর বার্লেস পিককের দোষ দিতেন। স্যর বার্নেস পিককের এই পুত্ৰটী অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং সকল বিভ্রাটের অবসান ঘটে। স্যর বার্নেস পিকক প্রধান বিচারপতির আসনে উপস্থিত থাকিবার কালে এই একটা মাত্র দোষের কাৰ্য করিয়াছিলেন। আর একজন বিচারপতি কিছু কাল পরে তাঁহার ব্যারিষ্টার-পুত্রের প্রতি ইহা অপেক্ষাও অধিকতর পক্ষপাত প্রদর্শন করিয়াছিলেন-সেই জজের নাম ছিল মিষ্টার লুই জ্যাকজন। এই দুইটা ব্যাপার চন্দ্রমাধব বাবুর মনে বরাবরই জাগরূক ছিল ; ১৮৮৫ সালে যখন তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইয়াছিলেন তখন সর্বপ্রথমেই তিনি তাহার পুত্র যােগেন্দ্রচন্দ্র ঘােষকে বলিলেন—তুমি আমার এজলাসে কোন মামলা লইয়া দাড়াইও না ; অবশ্য সিনিয়র উকীলের সহকারীরূপে দাড়াইতে পারিবে। চন্দ্রমাধব বাবুর এই দৃষ্টান্তের অনুসরণে ভূতপূর্ব প্রধান বিচারপতি স্যার রিচার্ড গাথ তাঁহার পুত্র কলিকাতা হাইকোর্টে ব্যারিষ্টারী করিতে আসিলে তাঁহাকে নিজের স্যর চমাধব ঘােম এজলাসে দাড়াইতে নিষেধ করিয়াছিলেন। তবে ভঁহার পুত্র মিষ্টার ভরিউ গাৰ্থ আদিম বিভাগ হইতে প্রেরিত এমন আপীল মামলায় তাঁহার পিতার এজলাসে দাড়াইতে অনুমতি পাইয়াছিলেন যে মামলায় আদিম বিভাগে তিনি নিযুক্ত ছিলেন। বিচারপতি স্বর চালস জ্যাকসন অত্যন্ত প্রশংসনীয় ব্যক্তি ছিলেন; তিনি মধ্যে মধ্যে আপীল-বিভাগের বিচারাসনে বসিতেন। ইনি ভদ্র, শিষ্টাচারসম্পন্ন ও যােগ্য বিচারক ছিলেন এবং উকীল ব্যারিষ্টারের যােগ্যতাও বুঝিতে পারিতেন কিন্তু তিনি দণ্ড দিবার পক্ষপাতী ছিলেন। একবার চন্দ্রমাধব বাৰু ইহার এজলাসে একটা মামলায় উকীল নিযুক্ত হইয়াছিলেন। আপীলকারীর পক্ষে উকীলের বক্তব্য শুনিয়া বিচারপতি স্থার চালস জ্যাকসন হারই দিকে ঢলিয়া পড়েন এবং চন্দ্রমাধব বাবুকে প্রতিবাদীর পক্ষে কি বলিবার আছে তাহা বলিতে বলেন; চলমাধব বাবু পুংপুরূপে তাহার মামলার সওয়াল জবাব করেন। স্থর চাল জ্যাকসন চন্দ্ৰমাধব বাবুর মক্কেলের অনুকূলেই রায় দিয়াছিলেন। রায় দিবার সময় তিনি বলেন, প্রথমে আমি চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রতিকূলেই রায় দিব মনে করিয়া- ছিলাম কিন্তু চমাধব বাবুর অটুট যুক্তিপূর্ণ সওয়াল জবাব না নিলে আমি তদ্রুপ রায়ই দিতাম। বিচারপতি স্যর মরুভুয়্যাণ্ট ওয়েলস কখনও আপীল বিভাগে বসেন নাই। শক্তিশালী বিচারক বলিয়া তিনি পরিচিত ছিলেন তৰে মধ্যে মধ্যে তিনি বিচারকোচিত গণ্ডী অতিক্রম করিতেন। বিচারপতি মিষ্টার রাইকেস অত্যন্ত দক্ষ এবং দ্রুতবিচারকম ছিলেন তবে তিনি জুনিয়র উকীল-ব্যারিষ্টারদিগের প্রতি বড় শিট ব্যবহার করিতেন না। চমাধব বাবুর প্রতি তিনি বরাবরই সময় ছিলেন।

স্তর চত্রমাধব ঘােষ বিচারপতি মিষ্টার ট্রেভরের আইনে অত্যন্ত অধিকার ছিল এবং তাঁহার প্রভূত বিচারবুদ্ধিও ছিল। সিবিলিয়ন জজদিগের মধ্যে তিনিই যােগ্যতম বলিয়া পরিগণিত হইতেন। বিচারপতি মিষ্টার লীচ, অত্যন্ত ভদ্র ও শিষ্টাচারসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। সকলের সহিতই তিনি সদয় ব্যবহার করিতেন, তবে তিনি দক্ষ ছিলেন না এবং বিচারকার্যে অনুচিত বিলম্ব করিতেন। বিচারপতি মিষ্টার বেলীও অত্যন্ত ভদ্র ও সদয়হৃদয় ছিলেন। যােগ্য বিচারপতি না হইলেও ইনি নিরপেক্ষ বিচার করিতে এবং বিচারাসনে বসিয়া স্বাধীনচিত্ততার পরিচয় দিতে সর্বদা ইচ্ছুক ছিলেন। তাঁহার এজলাসে একটা ঘটনা ঘটিয়াছিল যাহাতে তাহার তেজস্বিতা ও স্বাধীনচিত্ততার পরিচয় পাওয়া গিয়াছিল। ঘটনাটা এই:-- বিচারপতি মিষ্টার বেলী ও বিচারপতি মিষ্টার ফিয়ারের এজলাসে একবার সমস্যা উঠে যে, এডভোেকট ও উকীল এই দুইজনের মধ্যে কে অগ্রে আদালতকে সম্বােধন করিবার অধিকারী হইবে? এডভোেকট মনােমােহন ঘােষ ও উকীল বাবু অনুকূলচন্দ্র মুখােপাধ্যায় তাহাদের এজলাসে একই মামলায় নিযুক্ত হইয়াছিলেন। সমস্যা হইল, এডভােকেট মনােমােহন ঘােষ অথবা উকীল অনুকূলচন্দ্র মুখােপাধ্যায় মহাশয়-এই দুই জনের মধ্যে কোন ব্যক্তি অর্থে আদালতকে মামলা-সম্পর্কে সম্বােধন করিবেন ? কাহার এরূপ সম্বােধনের প্রথম অধিকার ? সমস্যা উঠিতেই বিচারপতি মিষ্টার বেলী ও বিচারপতি মিষ্টার ফিয়ার দুইজনে মতবিরােধ উপস্থিত হইল। বিচারপতি মিষ্টার বেলী বলিলেন, যিনি বেশীদিন আইন- ব্যবসায় করিতেছেন তিনি উকীলই হউন অথবা এডভােকেটই হউন, তিনিই অগ্রে আদালতকে সম্বােধন করিবার অধিকার পাইবেন। বিচারপতি মিটার ফিয়ার বলিলেন,—এডভােকেটই আদালতকে র চমাধব যােব সম্বােধন করিবার প্রথম অধিকরি পাইবেন। উভয় বিচারপতির মধ্যে এইরূপ মতবিরােধ ঘটিল বলিয়া বিচারপতি মিষ্টার ফিয়ার তৎক্ষণাৎ প্রধান বিচারপতি সুর বাসে পিকের নিকট বাইলেন এবং তাঁহাকে সমস্ত কথা বলিলেন। সুর বার্নেস অবিলম্বে বিচারপতি মিষ্টার বেলী ও বিচারপতি মিষ্টায় ফিয়ারের এজলাসে এই সমস্যা-নিবারণের জন্য উপস্থিত হইলেন। স্যর বার্ণেস পিকক বিচারপতি মিষ্টার ফিয়ারের অভিমতেরই সমর্থন করিলেন। তিনিও বলিলেন-এডভােকেটগণেরই অগ্রে আদালতকে সম্বােধন করিবার অধিকার আছে। কেন না, হাইকোর্টের লেটারস পেটেন্টে ব্যবহারাজীবগণের শ্রেণী সম্বন্ধে এইরূপ উল্লেখ আছে—এভভভাকেট, উকীল ও এনী, বিশেষত এডভােকেট ৰা ব্যারিষ্টারগণ ইংলণ্ডে উৎকৃষ্টতর শিক্ষালাভ করিয়াছেন। কিন্তু বিচারপতি মিষ্টার বেলী তাঁর বার্ণেসের এই অভিমত গ্রহণ করিলেন না। তিনি এই মত দিলেন যে, সদর দেওয়ানী আদালতেই হউক বা সুপ্রীম কোর্টেই হউক, যিনি এই দুইটা আদালতের একটীতে অপরের অপেক্ষা অগ্রে ভর্তি হইয়াছেন, তিনিই আদালতকে প্রথম সম্বােধন করিবার অধিকারপ্রাপ্ত। উকীলদিগকে আমি অধিকতর অধিকার-বিশিষ্ট এডভােকেট বলিয়াই মনে করি। প্রধান বিচারপতি সুর বার্ণেসের মতের সমর্থন না করিয়া তাহার সম্মুখেই স্বাধীনভাবে আত্মমত প্রকাশ করিয়া বিচারপতি মিষ্টার বেলী স্বাধীনচিত্ততা ও তেজস্বিতার পরিচয় দিয়াছিলেন। বিচারপতি মিষ্টার ৰেণীর সহৃদয়তা ও শিষ্টতা সর্বজনপ্রসি ছিল। একবার শিয়ালদহ ষ্টেশনে একটা ঘটনা ঘটিয়াছিল, ঘটনাটা এইচমাধুৰবাৰু , ট্রেণের একটি প্রথম শ্রেণীর কামরায় উঠিতে গিয়া দেখিলেন—উহাতে কয়েক জন ইউরােপীয় মহিলা ও উলােক বলিয়া আছেন। ট্রেনের অপর কোনও কামরায়ও গান শর মাধব ঘােম * ছিল না। কিন্তু এই কামরাটীতে দুই এক জনের স্থান তখনও ছিল। সেইজন্য তিনি এই কামরাটীতে উঠিতে যাইতেছিলেন। তিনি যখন কামরার ভিতরে প্রবেশ করিতে উদ্যত হয়েন সেই সময়ে উহার মধ্যস্থ আরােহীদের মধ্যে কেহ কেহ বলেন, এখানে আর জায়গা নাই। তখন তিনি নিরুপায় হইয়া এই কামরায় স্থান পাইবার আশা পরিত্যাগ করিয়া স্থান ত্যাগ করিতে উদ্যত হয়েন। এমন সময়ে চমাধব বাবুকে পরিচিত-স্বরে এক ভদ্রলােক আহ্বান করিলেন। মুখ ফিরাইতেই তিনি দেখিতে পাইলেন, বিচারপতি মিষ্টার বেলি তাহাকে আহ্বান করিতে- ছেন এবং বলিতেছেন—আপনি কামরার ভিতরে প্রবেশ করুন। মাধব বা ট্রেণের মধ্যে প্রবেশ করিবামাত্র বিচারপতি মিষ্টার বেলি দাড়াইয়া উঠিলেন এবং তাঁহাকে জনৈকা ইউরােপীয় মহিলার পার্শ্বে উপবেশন করিতে বলিলেন। তার পর তিনি সেই মহিলার সহিত চমাধববাবুর পরিচয় করিয়া দেন। মিষ্টার ব্রাউটন নামক অপর একজন বিচারপতি ট্রেণের উক্ত কামরায় ছিলেন ; কিন্তু তিনি চন্দ্ৰমাধব বাবুকে স্থান দিবার জন্য কোন প্রকার সাহায্য করেন নাই। সে যাহা হউক, বিচারপতি মিষ্টার বেলির অনুগ্রহে ও ভদ্রতায় চমাধববাবু অত্যন্ত আরামে গন্তব্য স্থানে যাইতে পারিয়াছিলেন। তিনি চন্দ্ৰমাধব বাবুকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কোথায় যাইতেছেন? চমাধববাবু অল্পক্ষণই ট্রেণে ছিলেন। সেই সময়টুকু বেলি সাহেব নানারূপ কথাবার্তায় তাঁহাকে প্রীত করিতে চেষ্টিত হইয়াছিলেন। বিচারপতি মিষ্টাৰ ষ্টীয়ার বেশ ভাল লােক ছিলেন; কিন্তু বিচারক- হিসাবে তাহার খ্যাতি ছিল না। তিনি ছিপে করিয়া মাছ ধরিতে ভালবাসিতেন এবং দু পাইলেই বড় বড় পুকুর বা দীঘিতে মাছ রিনে।

সুর চুমাধব ঘােষ বিচারপতি মিষ্টার কেম্পের বিচারকার্যে অভিজ্ঞতা ছিল ; তিনি সহৃদয়, শিষ্টাচারসম্পন্ন ভদ্রলােক ছিলেন এবং তাঁহার প্রকৃতি নম্র ছিল। দৃঢ়চেতা বিচারক বলিয়া তাহার খ্যাতি ছিল না। তিনি দুর্বলচিত্ত বিচারক ছিলেন। হাইকোর্ট যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময়ে সদর দেওয়ানী আদালতে বিস্তর মামলা বিচারাধীন ছিল। এই সকল মামলার বিচার শীঘ্র শী শেষ করাই হাইকোর্টের বিচারপতিরা তাহাদের প্রথম কর্তব্য বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। তখনকার প্রথানুসারে আপীল বিভাগে আপীল পেশ করিবার সময়ে আপীলের কারণগুলি ইংরেজী, অথবা বাঙ্গালা অথবা উর্দু ভাষায় লিখিয়া দেওয়া হইত। বিচারপতি ও উভয়পক্ষীয় উকীলগণের জন্য যথারীতি পেপার বুক (Paper-book ) তখন দাখিল করা হইত না। আপীল পেশ করিবার সময়ে বিচারপতি ও উকীল- গণের হাতে নিম্ন আদালতের রায় ও আপীলের দরখাস্তের ইংরেজী অনুবাদ একত্র গাঁথিয়া দেওয়া হইত। হাইকোর্টের কয়েকটা এজলাসে আরও অল্প কিছু দিন ধরিয়া ইংরেজী বা উর্দতে সওয়াল জবাব করা হইত বটে, কিন্তু স্যর বার্নেস পিককের এজলাসে অথবা আপীল বিভাগের কোনও ব্যারিষ্টার এজলাসে ইংরেজীতেই সওয়াল জবাব করিতে হইত, হইত, উর্দ তে সওয়াল জবাব করা চলিত না। মুন্সী আমীর আলি তখনকার অন্যতম প্রসিদ্ধ উকীল ছিলেন, তিনি স্তর বার্নেস পিকককে বলিয়া কহিয়া তাহার সম্বন্ধে এইরূপ ব্যবস্থা করিয়াছিলেন যে, তিনি শুর বার্ণেসের এজলাসে উর্দুতে সওয়াল জবাব করিতে পারিবেন এবং তাহার উৰ্দ, সওয়াল- জবাব দোভাষী ইংরেজীতে তর্জমা করিয়া বিচারপতিগণকে শুনাইতেন। কি এইরূপ ব্যবস্থা অধিক দিন চলে নাই। অল্প দিনের মধ্যেই ইকোর্টের বিচারপতিরা এই প্রথা উঠাইয়া দিলেন। ব্যারিষ্টার- স্যর মাধব যােব ; জজদিগের এজলাসে উকীলগণকে কেবল ইংরেজীতেই সওয়াল- জবাব করিতে হইত। তবে অন্যান্য জজদিগের অর্থাৎ সিভিলিয়ান- জজদিগের এজলাসে আরও কিছুদিন উর্দতে সওয়াল জবাব চলিয়াছিল ; কেবল যে সকল উকিল ইংরেজী ভাষায় তেমন অভিজ্ঞ ছিলেন না, সেই সকল উকীলকেই উর্দতে সওয়াল জবাব করিতে দেওয়া হইত। কিন্তু এই প্রথাও শীঘ্ৰ উঠাইয়া দেওয়া হয়। ইহার ফলে এই হইল যে, মুন্সী আমির আলি, বাবু কৃষ্ণকিশোের ঘােষ এবং অন্যান্য উর্দু ভাষায় অভিজ্ঞ উকীলগণের পশার খুবই কমিয়া গেল এবং বাবু জারিকানাথ মিত্র, বাবু অনুকূলচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, বাবু অন্নদা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবু শ্ৰনাথ দাস প্রভৃতি ইংরেজীতে অভিজ্ঞ উকীলগণের অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হইল অর্থাৎ তাহাদিগের পশার-প্রতিপত্তি ক্রমেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতে লাগিল। শম্ভুনাথ পণ্ডিত বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত কাশ্মীরদেশীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। লক্ষে নগরীতে ইনি জন্মগ্রহণ করেন এবং সেইখানেই তাঁহার শিক্ষালাভ হয়। প্রথমে সদর দেওয়ানী আদালতের ইনি কেরাণী ছিলেন। সিনিয়র উকীল-সরকার বাবু রমাপ্রসাদ রায়ের মৃত্যুকালে তিনি জুনিয়র সরকারী-উকীল ছিলেন ; ফৌজদারী আপীল-মামলায় তাহাকে সরকার- পক্ষে দাঁড়াইয়া মামলা চালাইতে হইত। বাবু রমাপ্রসাদ রায়ের মৃত্যু হইলে তিনি সরকারী-উকীল নিযুক্ত হয়েন। বাৰু জগদানন্দ মুখােপাধ্যায় জুনিয়র সরকারী-উকিলের পদ পান। বাবু রমাপ্রসার রায়ের মৃত্যু-সময় হইতে বিচারপতি-পদে অধিষ্ঠিত হইবার অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিতের ওকালতীর আয় মাসিক প্রায় ১৫ হাজার টাকা ছিল। কতকগুলি বড় বড় উকীল ইংরেজী ভাষায় স্তর চমাধব ঘােষ স্তর বার্ণেস অনভিজ্ঞ ছিলেন বলিয়া তাঁহাদের পশার কমিয়া গিয়াছিল বলিয়াই শম্ভুনাথ বাবুর পশার এরূপ বাড়িয়া উঠিয়াছিল। শম্ভুনাথ বাবু যােগ্য, অভিজ্ঞ, পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার যেমন তীক্ষ্ণ ধীশক্তি ছিল, সেইরূপ সহানুভূতি-প্রবণ উদার হৃদয়ও ছিল । উচ্চনীচ সকলের প্রতিই তিনি ভদ্র ব্যবহার করিতেন। পিককের সুপারিশে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তর বাসে শম্ভুনাথ বাবুর যােগ্যতা এবং ঔচিত্যপূর্ণ যুক্তির সহিত আত্মপক্ষ-সমর্থন-প্রয়াস দেখিয়া তাহার অনুরাগী হইয়াছিলেন। শম্ভুনাথ বাবু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইলে সকল শ্রেণীর লােকই সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন এবং সকলেই বলিয়াছিলেন,-ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নির্বাচন আর হইতে পারিত না। শম্ভুনাথ বাবুর বিপুল পশার হইয়াছিল এবং হাইকোর্টের জজ হইয়া তাহার পদ বৃদ্ধি পাইয়াছিল.তথাপি তিনি বাবু রমাপ্রসাদ রায় মহাশয়ের মত প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করিতে পারেন নাই। ইহার কারণ, তিনি কাহারও সহিত মিশিতেন না। নিতান্ত বাধ্য না হইলে তিনি কোনও ইউরােপীয় রাজপুরুষ বা জজদিগের সহিত দেখা করিতেন না। বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিতের পরই মিষ্টার আর-টি এলেনের পশার- প্রতিপত্তি ছিল। তিনি প্রথমে সুপ্রীম কোর্টের এটর্নী ছিলেন। পরে তিনি সদর দেওয়ানী আদালতে ও হাইকোর্টে ওকালতি করিবার অধিকার পাইয়াছিলেন। উকীল-হিসাবে তাহার অসাধারণ যােগ্যতা ও নৈপুণ্য ছিল এবং সকলের প্রতিই তিনি শিষ্ট ও ভদ্র করিতেন। তাহার অধিকাংশ মক্কেলই ইউরােপীয় নীলকর ও জমিদার ছিলেন । বাঙ্গালা ও বিহার প্রদেশে তাঁহাদের জমিদারী ও নীলের সাবাদ ছিল। , ইউরােপীয়গণের মামলা, তাহার একচেটিয়া ছিল।

স্যর চমাধব যােব কৃষ্ণকিশাের ঘােষ অতপর উকীলবাবু কৃষ্ণকিশাের ঘােষের নাম উল্লেখযােগ্য। প্রথমে ইহার পশাব-প্রতিপত্তি প্রায় বাৰু শম্ভুনাথ পণ্ডিতের মতই ছিল ; সদর দেওয়ানী আদালতে বরং ইহার পশার শম্ভুনাথ বাবুর অপেক্ষাও অধিক ছিল। কিন্তু ইংরেজী ভাষায় তাহার ভাল অধিকার না থাকায় সওয়াল জবাব প্রভৃতি ইংরেজীতে করিতে পারিতেন না বলিয়া হাইকোর্টের প্রতিষ্ঠার পর তাহার পশার অত্যন্ত কমিয়া যায়। শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয় হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইলে তিনি তাহার স্থলে সিনিয়র উকীল-সরকার নিযুক্ত হন। সদর দেওয়ানী আদালতে সিভিলিয়ান জজেরা-বিশেষতঃ বিচারপতি মিষ্টার ট্রেভর তাঁহার সম্বন্ধে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পােষণ করিতেন বলিয়াই ইংরেজী ভাষা উত্তমরূপ না জানিয়াও তিনি সিনিয়র উকীল-সরকারের পাদ লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার পক্ষে অত্যন্ত প্রশংসার কথা এই যে, সেই পরিণত বয়সে তিনি বাড়ীতে কঠিন পরিশ্রম করিয়া ইংরাজী ভাষা কিছু কিছু আয়ত্ত করিয়াছিলেন এবং কোনও প্রকারে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে তাহার বক্তব্য তিনি জজদিগকে বুঝাইতেন-মধ্যে মধ্যে উহাতে বাঙ্গালা বুনিও থাকিত। শেষে গবর্নমেন্টের মামলাই তিনি করিতেন। তিনি অত্যন্ত যােগ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁহার ভদ্রতা সহৃদয়তাও যথেষ্ট ছিল। চন্দ্রমাধব বাবুকে তিনি ভালবাসিতেন এবং তাঁহার সম্বন্ধে কৃষ্ণকিশাের বাবুর উচ্চ ধারণাই ছিল। যখনই তাঁহার হাতে কোনও মামলা পড়িত—সে মামলা হাইকোর্টেই হউক বা মফঃস্বল আদালতেই হউক, তিনি সেই মামলায় চন্দ্ৰমাধব বাবুকে নিযুক্ত করিতেন এবং বলিতেন—এই মামলা চক্ৰমাধববাবু তাঁহার হইয়া চালাইবেন। কিশোের বাবুর নিকট হইতে এইরূপ দুই স্তর চমাধব খােব মামলা চন্দ্ৰমাধব বাবু পাইয়াছিলেন এবং দুইটা মামলাই তিনি তাঁহার হইয়া জিতিয়া দিয়াছিলেন । মুন্সী আমীর আলি উকীল মুন্সী আমির আলি ছিলেন বিহারী মুসলমান ভদ্রলােক। তিনি অনর্গল চমৎকার উর্দ বলিতে পারিতেন। সত্যই সে সময়ে তাঁহার তুল্য উৎকৃষ্ট উর্দ-ভাষী উকীল আর কেহ ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও দক্ষ ব্যক্তিও ছিলেন। বিহার হইতেই তাহার অধিকাংশ মামলা আসিত। কিন্তু হাইকোর্ট স্থাপিত হইবার পরে যখন উর্দ তে সওয়াল-জবাব উঠিয়া গেল, তখন তাহার পশার একেবারে কমিয়া আসিল। এমন কি, শেষে তাহাকে ওকালতীতে ইস্তফা দিয়া মেটিয়াবুরুজে অযযাধ্যার ভূতপূর্ব নবাবের মর-উ মােহমন বা প্রধানতম কর্মচারীর পদ গ্রহণ করিতে বাধ্য হইতে হইয়াছিল। দ্বারিকানাথ মিত্র ইহার পর উকীল-হিসাবে বাবু দ্বারিকানাথ মিত্রের নাম উল্লেখ যােগ্য। ইনি অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। লােকে তাহাকে প্রতিভাসম্পন্ন পুরুষ বলিয়াই মনে করিত। ইংরেজী ভাষায় ইহার প্রভূত অধিকার ছিল এবং উৎকৃষ্ট ইংরাজীতে অনর্গল কথা বলিতে পারিতেন। এক কথায় বলিতে হইলে বলিতে হয়, ইনি ইংরাজীতে বাগ্মী ছিলেন। এইজন্য আদালতে ইনি প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। চমাধব বাবু যখন বহুবাজারে থাকিয়া প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন অধ্যয়ন করিতেন, সেই সময়ে দ্বারিকানাথ বাবুর সহিত তাহার পরিচয় হইয়াছিল। দ্বারিকা বাবু সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী আরম্ভ করিয়াছিলেন। প্রথম প্রথম কিছুদিন তাহার ওকালর্তীতে বিশেষ শুর চন্দ্রমাধব ঘােষ সুবিধা হয় নাই। তিনি মধ্যে মধ্যে মামলার বাঙ্গালা নথিপত্র ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়া দিতেন। তিনি দুই একবার চন্দ্রমাধব বাবুর নিকট নৈরাশ্যপ্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন যে, ওকালতীতে তিনি উন্নতির বিশেষ আশা দেখিতে পাইতেছেন না। কিন্তু তাঁহার মত যােগ্য ব্যক্তির উন্নতি অবশ্যম্ভাবী। দ্বারিকানাথ উদারচেতা, করুণহৃদয় ভদ্রলােক ছিলেন , বিপন্ন ব্যক্তিকে বিশেষতঃ পীড়িত ও নিরাশ্রয় ব্যক্তিকে সাহায্য তিনি সততই করিতেন। একবার চন্দ্ৰমাধব বাবু ও দ্বারিকাবাবু পূজার ছুটীতে মুঙ্গেরে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। সেখানে অবস্থান করিবার সময়ে একজন দুঃস্থ বাঙ্গালী ভদ্রলােক ওলাউঠায় আক্রান্ত হয়েন। ইনি দ্বারিকাবাবুর আত্মীয় কুটুম্ব নহেন, সম্পূর্ণ অপরিচিত। কিন্তু দ্বারিকাবাবুর যখনই শুনিলেন যে, এক ব্যক্তি ওলাউঠা-রােগে আক্রান্ত হইয়াছেন, তখনই তিনি ঔষধাদি লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হয়েন এবং রাত্রি দ্বিপ্রহর পৰ্য্যন্ত তঁাহার সেবা-শুশ্রুষা করেন। ইহাতে নােকটী বাচিয়া যান। আর একবার জামালপুর রেলওয়ে অফিসের একজন বাঙ্গালী কেরাণীকে একজন ইউরােপীয় প্রহার করিয়াছিল। কয়েকজন বাঙ্গালী ভদ্রলােকের অনুরােধে দ্বারিক। বাবু পারিশ্রমিক না লইয়া এই কেরাণীর পক্ষাবলম্বন করিতে প্রবৃত্ত হয়েন। ফলে ইউরােপীয় আসামীকে বাঙ্গালী কেরাণীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হয়। শম্ভুনাথবাবু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইবার পর হইতেই দ্বারিকানাথ মিত্র মহাশয়ের পশার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাইতে থাকে এবং তাহার ওকালতীর আয় শম্ভুনাথ বাবুর মত হইলেও উহার কাছাকাছি হইয়া উঠে। অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ইহার পরবর্তী উকীলের নাম বাৰু অনুকুলচন্দ্র মুখােপাধ্যায়। যখন স্যর চমাধৰ ঘােষ চলমাধব বাবু সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী আরম্ভ করেন সেই সময়ে তাহার সহিত অনুকুলবাবুর পরিচয় ছিল না। কিন্তু ক্ৰমে উভয়ের মধ্যে সব.হয়। তখন চন্দ্ৰমাধব বাবু বুঝিতে পারেন যে, অনুকূলবাবু প্রকৃতই সজ্জন ব্যক্তি। উকীল-হিসাবে তাহার যােগ্যতা উচ্চাঙ্গেরই ছিল এবং তিনি অত্যন্ত যােগ্যতা ও দক্ষতার সহিত মামলা পরিচালন করিতেন। হাইকোর্ট স্থাপিত হইবার পর তাহার পশার-প্রতিপত্তি অত্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং তৎপরে তিনি সিনিয়র উকীল-সরকার নিযুক্ত হয়েন। পরিশেষে তিনি হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতিও নিযুক্ত ইয়েন। কিন্তু একবৎসর পরেই তাঁহার মৃত্যু হয়। তাহার মৃত্যুতে চমাধব বাবুর অত্যন্ত ক্ষতি হয় ; কারণ তিনি চন্দ্রমাধব বাবুর প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহ প্রকাশ করিতেন। অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় অতঃপর উকীল বাবু অন্নদাপ্রসাদের নাম উল্লেখ করিতে হয়। যখন চন্দ্ৰমাধব বাবু সদর দেওয়ানী আদালতে উকীল হয়েন সে সময়ে অন্নদাপ্রসাদবাবুর সহিত তাহার জানাশুনা ছিল না। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহাদের উভয়ে পরিচয় হয় । অন্নদাবাবু উন্নতচরিত্র ও উদারহৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ভদ্রতার আদর্শ ছিলেন। প্রথমে তিনি কোনও সরকারী আফিসে কৰ্ম্ম করিতেন; পরে শম্ভুনাথ বাবুর পরামর্শে তিনি সেই কর্মে ইস্তকা দিয়া সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হয়েন। প্রথম প্রথম শম্ভুনাথ বাবু তাঁহাকে খুবই সাহায্য করিতেন; কারণ তিনি অন্নদাবাবুর বিশেষ বন্ধু ছিলেন। হাইকোর্ট স্থাপিত হইবার পর অন্নদা বাবুর পশার খুবই বৃদ্ধি পায় এবং যখন সিনিয়র উকীল-সরকার অনুকুলচন্দ্র মুখােপাধ্যায় মহাশয় হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েন, সেই সময়ে অন্নদাবাবু হাইকোর্টের সিনিয়র উকীল-সরকার নিযুক্ত হয়েন।

এর মাধব ঘােম চমাধৰ বাৰু ইহাকে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা করিতেন। অন্নদাবাবু চলমাধব বাবুকে বিশেষ স্নেহ করিতেন। অন্নদাবাবুব পুত্র বাবু অবিনাশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধায় হাইকোর্টের উকীল হইয়াছিলেন। তাহার সহিত চমাধব বাবুর সহিত অত্যন্ত সৌহার্দ্য জন্মিয়াছিল। শ্রীনাথ দাস অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের পরেই উকীল শ্ৰনাথ দাস মহাশয়ের নাম উল্লেখ করা উচিত। ইনি যখন হিন্দু কলেজে পড়িতেন তখন গণিতশাস্ত্রে প্রভূত পারদশী বলিয়া ইনি খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন । কমিটি পরীক্ষা (Committee Examination) দিয়া এনাথ বাবু ও বাৰু শম্ভুনাথ পণ্ডিত সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হয়েন। ইহাদের যখন সদর দেওয়ানী আদালতে কয়েক বৎসর ওকালতী করা হইয়াছে সেই সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাৰুতথাকার উকীল হইয়াছিলেন। নাথ দাস মহাশয় প্রভূত ধীশক্তিসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন এবং হাইকোর্ট স্থাপনের অল্পদিন পরেই ইহার খুবই পশার হয়। ইহার যােগ্যতা সমধিক থাকিলেও ইনি শ্রমকাতর ছিলেন। উকীল বাবু দ্বারিকানাথ মিত্র ও ইহার অন্যান্য সতীর্থ উকীল যেরূপ পরিশ্রমী ছিলেন, ইনি সেরূপ ছিলেন না। ইহার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল এবং তাহারই উপর নির্ভর করিয়া আদালতে মামলা পরিচালন করিতেন। সেই জন্য মধ্যে মধ্যে ইহার ভুল হইত; জজেরা মনে করিতেন—ইনি ইচ্ছা করিয়া তাহাদিগকে ভুল বুঝাইবার জন্য ভুল করিতেছেন। ইনি বড় মধুরপ্রকৃতি ও সদয়-হৃদয় ব্যক্তি ছিলেন এবং কোনও কারণেই শিষ্টাচার বর্জন করিতেন না। কখনও কোনও জজ যদি ইহার উপর কঠোর মন্তব্য প্রকাশ করিতেন, তাহা হইলে তিনি তাহা অসাধারণ ধৈর্য, সহকারে সহ করিয়া যাইতেন। মকদ্দমা বুঝাইবার সময়ে ভুল কথা।

গুর চােধ ঘােষ বলিবার জন্য সময়ে সময়ে জজদিগের নিকট হইতে তাঁহাকে কঠোর মন্তব্য শুনিতে হইত। জজেরা বাবু দ্বারিকানাথ মিত্র ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ উকীলগণের সম্বন্ধে যেরূপ উচ্চ ধারণা পােষণ করিতেন, শ্ৰনাথ বাবুর সম্বন্ধে তাহারা সেরূপ উচ্চ ধারণা পােষণ করিতেন না। কিন্তু শ্রীনাথ বাবুর যােগ্যতা ও ধীশক্তি যে যথেষ্ট ছিল ইহা জজেরা জানিতেন। স্যর বার্নেস পিকক শ্ৰনাথ বাবুর মেধা ও মনীষার প্রশংসা করিতেন এবং শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয়ের মৃত্যুর পর দ্বারিকানাথ মিত্র মহাশয়ের পরিবর্তে হাইকোর্টের বিচারপতি-পদ নাথ বাবুকে দিবার জন্য সুপারিশ করিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাহার উপরে কোনও কোনও বিষয়ে নির্ভর করিতে না পারায় তাঁহাকে তিনি উক্ত পদের জন্য সুপারিশ করিতে পারেন নাই। শ্ৰনাথ বাবুর সম্বন্ধে চন্দ্ৰমাধব বাবুর ধারণা কিন্তু অন্যপ্রকার ছিল। শ্রীনাথ বাবু যে ইচ্ছা করিয়া মামলার বিবৃতিতে দুল করিতেন; ইহা তিনি মনে করিতেন না। নাখ বাৰু মামলার নথিপত্র একবার মাত্র পড়িতেন ; তাহার বিশ্বাস ছিল যে, মামলার শুনানীর সময়ে তিনি মামলার সম্পূর্ণ বিবরণ আদালতে বিবৃত করিতে পারিবেন। কিন্তু তাহার এই বিশ্বাস সকল সময়ে সত্য হইত না; মামলার বিবৃতিতে কখনও কখনও তিনি ভুলও করিয়া ফেলিতেন। তিনি বড় আমােদপ্রিয় লােক ছিলেন। তাহার বাড়ীতে বার মাসে তের পার্বণ ও সেই সকল উপলক্ষে আমােদ-আহ্লাদ, গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়ান হইত। তখনকার কালে উকীলদের মধ্যে একমাত্র নাথ বাবুই বাটীতে সকলের অপেক্ষা পূজা ও উৎসব বেশী করিতেন ও তঁাহার বন্ধু-বান্ধবগণকে ভােজ দিতেন। তাঁহার বাড়ীতে পূজা-পার্বণ ও অন্যান্য ক্রিয়া উপলক্ষে যাত্রা, কবি, বাইনাচ ইত্যাদি খুবই হইত। জগদানন্দ মুখােপাধ্যায় যখন হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময়ে বাবু জগদানন্দ ;

স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ মুখখাপাধ্যায় সিনিয়র উকীলদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাইকোর্টের জজ হইলে পর তিনি জুনিয়র উকীল-সরকারের পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। উপরে উল্লিখিত উকীলগণের মত অত অধিক পশার হার ছিল না; কিন্তু হার কতকগুলি বড় বড় রাজা ও জমিদার মক্কেল ছিলেন; তাহাদের নিকট হইতে তিনি মােটা মােটা ফি পাইতেন। বাবু রমাপ্রসাদ রায়ের মৃত্যুর পর তাহার উপর উচ্চ- পদস্থ রাজপুরুষগণের কৃপাদৃষ্টি পতিত হয় এবং তিনিও তাহাদিগকে তাঁহার ভবানীপুর-বকুলবাগান-স্থিত প্রাসাদতুল্য বাটীতে নিমন্ত্রণ করিতেন ভােজ দিয়া তঁাহাদিগকে পরিতৃপ্ত করিতেন। সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড যখন যুবরাজরূপে কলিকাতায় আগমন করিয়াছিলেন, সেই সময়ে জগদানন্দ বাবু তাঁহাকে ও ভদয় মহিষীকে তঁাহার বাটীতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। একমাত্র জগদানন্দ বাবুর বাটী ব্যতীত গরতে অবস্থান-কালে যুবরাজ আর কোনও সাধারণ ভদ্রলােকের বাটীতে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া পদার্পণ করেন নাই। অতঃপর মিষ্টার আর-ই টুইডেল নামক উকীলের নাম উল্লেখ যােগ্য। ইনি ইউরেশিয়ান ছিলেন। ইহার শরীরের বাঁধন বেশ ছিল। ইনি বেশ ভাল লােক ছিলেন এবং ভদ্রতায় কাহারও চেয়ে কম ছিলেন না। ইহার হৃদয়টাও ছিল হৃদয়টাও ছিল করুণ। ইনি বুদ্ধিমান ছিলেন এবং মামলার নথিপত্র খুব তাড়াতাড়ি পড়িয়া লইয়া মামলা বুঝিয়া লইতেন ও উহার মধ্যে কি কি তথ্য আছে সে সবও বুঝিয়া লইতে তাহার বিলম্ব হইত না। চন্দ্রমাধব বাবু যখন সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হয়েন, সেই সময়ে টুইডেল সাহেবের বেশী পশার ছিল না। ক্রমে তাঁহার পশার বাড়িয়া উঠে এবং কিছুদিন তাঁহার অত্যন্ত পশার ছিল। তিনি যে খুব যােগ্য লােক ছিলেন তাহা নহে, তিনি কাজ যাহা করিতেন ভালই করিতেন। চন্দ্রমাধৰ বাবুর স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ সহিত টুইডেল সাহেবের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হইয়াছিল এবং উভয়ে উভয়কে শ্রদ্ধা করিতেন। টুইডেল সাহেব ইংলণ্ডে গিয়া বিবাহ করেন এবং তথা হইতে তাহার পত্নীকে এখানে লইয়া আসেন। ইহারা স্বামী স্ত্রীতে বহুকাল সুখে বাস সুখে বাস করিয়াছিলেন ; তার পর টুইডেল সাহেবের মৃত্যু হয়। তাহার মৃত্যুতে তাহার বন্ধুবান্ধবগণ বন্ধুবান্ধবগণ অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। রমেশচন্দ্র মিত্র রমেশচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা আবশ্যক। চমাধব বাবুর সহিত ইহার পূর্ণ পরিচয় ছিল। রমেশচন্দ্র হাইকোর্টের উকীল ছিলেন। আদালতে এবং আদালতের বাহিরে চন্দ্রমাধব বাবুর সহিত ইহার নিত্য দেখা-শুনা হইত। রমেশবাবু নানা গুণে বিভূষিত ছিলেন। প্রথম প্রথম ওকালতিতে তাহার পশার হয় নাই। কয়েকটা মামলায় চন্দ্ৰমাধব বা রমেশবাবুকে জুনিয়র বা সহকারী নিযুক্ত করিয়া ছিলেন এবং তাহাতে রমেশবাবু তাহাকে যে সাহায্য করিয়াছিলেন তাহা অতি মূল্যবান। ইহার অল্পদিন পরে তাঁহার যােগ্যতার বিষয় প্রকাশিত হইয়া পড়ে এবং পূর্ববঙ্গের কয়েকজন মােক্তারের দৃষ্টি তাঁহার উপর পতিত হয়। তাঁহারা বিশেষতঃ মােক্তার বাবু বীরেশ্বর দাস তাহাকে প্রায়ই মামলা দিতে থাকেন। এইরূপে রমেশ বাবুর পশার বৃদ্ধি পাইতে থাকে ও ক্রমে তাহার পশার খুব বেশী হয়। কালীমােহন দাস হাইকোট স্থাপিত হইবার অল্পদিন পরেই বাবু কালীমােহন দাস র চমাধব ঘােষ বরিশাল হইতে আসিয়া হাইকোর্টে ওকালতী আরম্ভ করেন। কয় বৎসর ধরিয়া কালীমােহন বাবুর সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর এই লইয়া অত্যন্ত এতিযােগিতা চলিতে থাকে যে, পূর্ববঙ্গের মামলা কাহার হাতে কত অধিক আসে। চন্দ্রমাধব বাৰু এবং কালীমােহনবাবু উভয়েই ঢাকা জেলার লােক, বিশেষতঃ কালীমােহনবাবু ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ মােক্তার বাবু বীরেশ্বর দাসের ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন। কালীমােহন বাৰু সুবক্তা এবং তেজস্বী ছিলেন ; যথেষ্ট স্বাধীনচিত্ততার পরিচয় দিতেন। মক্কেলের পক্ষ-সমর্থনে নির্ভীকতার পরিচয় দিবার প্রয়ােজন হইলে সে পরিচয়ও দিতেন, অনেক সময়ে উত্তেজনার বশে তিনি বিবেচনা-শূন্য হইয়া কাৰ্য্য করিতেন। ; হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হাইকোর্ট স্থাপিত হইবার এক বৎসর পরে বাবু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হাইকোর্টের উকীল হয়েন। তিনি প্রথমে মুন্সেফ ছিলেন, পরে মুন্সেফী ছাড়িয়া ওকালতী আরম্ভ করেন। ওকালতীতে তঁাহারও বেশ পশার হইয়াছিল। ওকালতী আরম্ভ করিবার সময়ে হেমবাবুকে চলমাধব বাৰু কিছু কিছু সাহায্য করিয়াছিলেন। বাবু দেবেন্দ্রচন্দ্র বসু, বাবু কালীকৃষ্ণ সেন এবং চন্দ্রমাধব বাবুর কলেজের অন্যান্য সহপাঠিগণ হাইকোটে ওকালতী করিতেন বটে, কিন্তু খ্যাতি লাভ করিতে পারেন নাই; তবে তাহাদের মন্দ পশার ছিল না। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে চন্দ্রমাধব বাবুর পিতা আমাশয় যােগে সঙ্কটাপন্নরূপে আক্রান্ত হইয়া কৰ্মস্থল খুলনা হইতে ভবানীপুরে আগমন করেন। সেই সময়ে বিক্রমপুরের প্রসিদ্ধ কবিরাজ পীতাম্বর সেন কলিকাতায় কবিরাজি করিতেছিলেন , তাঁহারই হাতে চন্দ্ৰমাধব হর চমাধব যােব বাবুর পিতার চিকিৎসার ভার ন্যস্ত করা হয়। চন্দ্ৰমাধব বাবু প্রাণপণে পিতার সেবা-শুশ্রুষা করিতে থাকেন। পরে তাঁহার পিতা বায়ুপরিবর্তনের জন্য হয় মুঙ্গের না হয় রামপুরে গমন করেন। ঠিক কোন্ জায়গায় বায়ুপরিবর্তনের জন্য গিয়াছিলেন তাহা জানা যায় নাই। নভেম্বর মাসে চলমাধব বাবুর পরিবারবর্গ বিক্রমপুর হইতে ভবানী- পুরে আইসেন। চন্দ্ৰমাধৰ বাবু তখন ভবানীপুর কসারীপাড়ায় বাৰু কৈলাসচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাটী ভাঙ্গা লয়েন। চমাধব বাবু সদর দেওয়ানী আদালতের উকীল হইবার দশ মাসের মধ্যে তাহার উন্নতির সূত্রপাত হয়। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি সদর দেওয়ানী আদালতে ওকালতী করতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। হাইকোর্ট স্থাপিত হইলে পর ছয় মাসের মধ্যে চন্দ্রমাধব বাবুর ওকালতীর আয় মাসিক পাঁচশত টাকা হইয়াছিল। অতঃপর ক্রমেই তাঁহার পশার বাড়িতে থাকে। কেবল পূর্ববঙ্গ হইতেই যে তিনি বিস্তর মামলা পাইতেন তাহা নহে, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার হইতেও তিনি বহু মামলা পাইতেন। যতই দিন যাইতে লাগিল ততই তাহার পশার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তিনটী কারণে তাঁহার এরূপ দ্রুত সাফল্যলাভ হইয়াছিল । প্রথম কারণ তিনি কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন, প্রায় প্রত্যহ রাত্রি একটা পৰ্য্যন্ত তিনি মামলার নথী ও তৎসংক্রান্ত আইন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পাঠ করিতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না মামলাটী ভাল করিয়া বুঝিতে পারিতেন ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই ছাড়িতেন না; দ্বিতীয় কারণ-ইংরেজী ভাষায় তাহার প্রভূত অধিকার ছিল বলিয়া তিনি উৎকৃষ্ট ইংরেজী অনর্গল বলিতে পারিতেন এবং সেইজন্য মামলার বিষয় জজদিগকে ভাল করিয়া বুঝাইতে সমর্থ হইতেন; তৃতীয় কারণ আদালতে যখন তিনি মামলার বিবৃতি করিতেন তখন সেই বিবৃতি যাহাতে স্পষ্ট এবং সত্য হয় সেদিকে পূর্ণ দৃষ্টি রাখিতেন; তাহার সওয়াল জবাবেও তিনি কাপট্য পরিহার • স্যর চন্দ্ৰমাধব ঘােষ করিতেন। শুনা যায়, হাইকোটে তিনি যেরূপ দ্রুত সাফল্যলাভ করিয়াছিলেন তাহা সাধারণতঃ দৃষ্ট হয় না। কোনও উকীলই তাহার মত এত শীঘ্র উন্নতির শিখরে আরােহণ করিতে পারেন নাই। উদীন্তন ব্যারিষ্টারগণ সদর দেওয়ানী আদালতে এবং হাইকোট স্থাপিত হইবার পর হাইকোর্যে যে সকল ব্যারিষ্টার বারিষ্টারী করিতেন তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করিলে অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। সদর দেওয়ানী আদালত যে বাড়ীতে বসিত সেখানে ব্যারিষ্টারদের জন্য বসিবার ঘর ছিল না; সেইজন্য উকীলদের কাইব্রেরী ঘরের অতি নিকটেই ব্যারিষ্টারদের জন্য একটা ঘর দেওয়া হইয়াছিল। এই ঘরে যে সকল ব্যারিষ্টার অপীল বিভাগে মামলা করিতে আসিতেন -- তাহারাই বসিতেন। এভােকেট-জেনারেল মিষ্টার রিচি, মিষ্টার লংভিল ক্লার্ক, মিষ্টার পিটারসন, মিষ্টার মণ্টীয়াে এবং আর ও ২৩ জন ব্যারিষ্টার ঐ ঘরে বসিতেন। তাহারা প্রায়ই “রিভিউ” মামলায় নিযুক্ত হইতেন। হাইকোট স্থাপিত হইবার পর নিম্নলিখিত ব্যারিষ্টারগণ যােগদান করেন -মিষ্টার কাউই, মিষ্টার ডয়েন, মিষ্টার পল (পরে স্যার চলসি পল), মিষ্টার উডরফ, মিষ্টার পিট-কেনেডি, মিষ্টার ইভান্স, মিষ্টার পিউ, মিষ্টার ফিলিপস, মিষ্টার ককরেন এবং আরও কয়েকজন। ইহারা সকলেই আপীল-বিভাগে দাড়াইতেন; চন্দ্ৰমাধব বাবুও আপীল বিভাগে মামলা লইয়া দাড়াইতেন। আপীল-বিভাগ হাইকোর্টের জন্য প্রস্তুত নুতন বাড়ীতে উঠিযা না আসা পর্যন্ত ইহাদের পশার বৃদ্ধি পায় নাই। মিষ্টার রিচি ব্যবহারশাস্ত্রে প্রগাঢ় জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন। তাহাকে পরে বড়লাটের ব্যবস্থা-সচিব নিযুক্ত করা হইয়াছিল। •• স্তর মাধব ঘােষ ৭১ মিষ্টায় লংভিল ক্লার্কও অাইনে পারদশী বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন, তিনি সুবক্তা ছিলেন। পিটারসন সাহেব ফৌজদারীতে খুব ভাল ব্যারিষ্টার ছিলেন। সময়ে সময়ে ইনি দেওয়ানী মামলাও সইতেন। এই ভদ্রলােকের হৃদয় অত্যন্ত উচ্চ ছিল। চন্দ্রমাধব বাবু যখন জুনিয়র ছিলেন তখনও উঁহার সম্বন্ধে পিটারসন সাহেবের উচ্চ ধারণা ছিল। একবার চব্বিশ পরগণার তদানীন্তন জেলা-জজ বােফোর্ট সাহেবেৰ এজলাসে চন্দ্ৰমাধব বাবু মণ্টিয়ে। সাহেবের সহিত একটী মামলায় দাড়াইযাছিলেন। মন্টিয়াে সাহেবের সওয়াল জবাবের পর চন্দ্রমাধব বাবুও সওয়াল জবাব করেন। পিটারসন সাহেব তাহাদের সওয়াল জবাবের উত্তর দিবার সময়ে প্রকাশ্য আদালতে চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রশংসা করেন। পিটারসন সাহেব ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে হাইকোর্টের অস্থায়। বিচারপতি পদে নিযুক্ত হয়েন; কিন্তু বেশী দিন তিনি এই পদে কাৰ্য করেন নাই; ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দের শেষেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ব্যারিষ্টার মস্টুিয়ো সাহেব ব্যবহারশাস্ত্রে প্রগাঢ় পণ্ডিত ছিলেন তিনি উচ্চদরের বা এবং অত্যন্ত তেজস্বী ও স্বাধীনচিত ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন অধ্যয়ন করিতেন সেই সময়ে মন্টিয়ো সাহেব সুপ্রীম কোর্টের অস্থায়ী ষ্ট্যাণ্ডিং কৌন্সিলর ছিলেন। কিন্তু জদিগের সহিত তাহার বনিবনাও হইত না বলিয়া যখন দ্বিতীয় বার ষ্ট্যাণ্ডিং কৌন্সিলের পদ খালি হয়, সেই সময়ে তাঁহাকে উক্ত পদে পুনরায় নিযুক্ত করা হয় নাই। সদর দেওয়ানী আদালতের ও হাইকোর্টের জজেরা তাহাকে দেখিতে পারিতেন না; কিন্তু তাহা হইলেও তঁাহারা তাঁহার প্রগাঢ়-আইনজ্ঞান ও উদার-চিত্ততার জন্য তঁহাকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন। জজ এবং উকীলেরা মন্টিয়াে সাহেবের অনুরাগী ছিলেন না, তাহার কারণ আর কিছুই নহে • ৭২ র মাধব ঘােষ তিনি সামান্য কারণেই রাগিয়া উঠিতেন এবং খামখেয়ালী ছিলেন। সেইজন্য পশারও তিনি জমাইতে পারেন নাই। সদর দেওয়ানী আদালতের উকীলেরা সাদা মসলিনের চাপকান পরিতেন বলিয়া মন্টিয়াে সাহেব তাহাদিগকে বলিতেন-Babies in linen' বা পােষাকপরা শিশুর দল। চন্দ্ৰমাধৰ বাবুকে কিন্তু তিনি অত্যন্ত ভালবাসিতেন এবং সাধ্যমত তাহাকে সাহায্য করিতেন। পক্ষে মন্টিয়াে সাহেব তাহার সদ্বন্ধু ছিলেন। মন্টিয়াে সাহেব শেষ বয়সে দুরবস্থায় পতিত হয়েন , এমন কি মৃত্যুকালে তাহার এক কপর্দকও ছিল না। তাহার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমস্ত খরচ চন্দ্ৰমাধব বাবু প্রদান করিয়াছিলেন। ব্যারিষ্টার কাউই সাহেবের প্রগাঢ় আইন-জ্ঞান ছিল। কয়েক বৎসর তিনি এডভােকেট-জেনারেলের পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিচারপতি এবং উকীল-ব্যারিষ্টারগণ তাহাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। ব্যারিষ্টার মিষ্টার জন করেণ বড় শিষ্টাচারপরায়ণ এবং রসভাষী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি চমৎকার বলিতে ক হতে পারতেন। কিন্তু ব্যারিষ্টারীতে তিনি সাফল্যলাভ করিতে পারেন নাই । একবার তিনি কোনও একজন জজ সম্বন্ধে বিদ্ধপ করিয়া বলিয়াছিলেন-“he has neither brain nor balls, and is like a cow which does not give milk but only kicks.” অর্থাৎ তাহার না আছে মাথা, না আছে চোক; যে গরু দুধ দেয় না কেবল চা মারে তিনি উহারই মত। মিষ্টার আর-ভি ডয়েন শক্তিশালী ও শ্রমশীল ব্যারিষ্টার ছিলেন। যে সকল মামলায় আইনের সূক্ষ্ম তর্ক না উঠিত, কেবল ঘটনার জটিলতা তর্কের বিষয়ীভূত হইত সেই সকল মামলায় তিনি অপরের অপেক্ষা পারদর্শিতা প্রদর্শন করিতেন । ব্যারিষ্টারদের মধ্যে তাহার পশার সকলের চেয়ে বেশী ছিল। তিনি অবসর গ্রহণ করিলে ব্যারিষ্টার মিষ্টার আর চলমাধব ঘােষ পল ও ব্যারিষ্টার মিষ্টার উডরফ ভঁহার মত পশারােলা হইয়া উঠেন। মিষ্টার চালস পল প্রতিভাশালী ব্যারিষ্টার ছিলেন, কিন্তু ডয়েন সাহেবের মত যােগ্যতা তাহার ছিল না। তিনি প্রথমে হাইকোর্টের ষ্ট্যাণ্ডিং কৌন্সিলর নিযুক্ত হয়েন ; তৎপরে হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতির পদে তাঁহাকে নিযুক্ত করা হয়। অবশেষে তিনি এডভােকেট-জেনারেলও হয়েন। এডভােকেট-জেনারেলের পদে কর্ম করিবার সময়ে তিনি স্যর’ উপাধি লাভ করেন। আপীল-বিভাগে মিষ্টার ডয়েনের পরেই স্যর চাল পলের পশার ছিল। তখনকার কালে মিষ্টার জেটি উডরফের মত পরিশ্রমী ব্যারিষ্টার অ র কেহ ছিলেন না। মামলার নথি তিনি এমন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়িতেন যে, সমস্ত ঘটনাই তার নখদর্পণে থাকিত। এইজন্য তাহার প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে যে কোনও উকীল বা ব্যারিষ্টার দা ড়াইতেন, তঁহাকেও পূর্ণভাবে প্রস্তুত হইয়া দাড়াইতে হইত। কারণ, পূর্ণ রূপে প্রস্তুত হইয়া না দাড়াইলে তাহার হাতে রক্ষা ছিল না, প্রতিপক্ষ উকীল বা ব্যারিষ্টারকে হারিতে বা অপ্রস্তুত হইতে হইত। ব্যারিষ্টার উডরফ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবু সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পােষণ করিতেন। একবার বিচারপতি মিষ্টার লুইস জ্যাকসনের এজলাসে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত একটি জটিল মামলা বিচারাধীন ছিল। ভাগলপুরের বাৰু সূৰ্য্যনারায়ণ সিংহ এই মামলাটীর তরিকাযে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ব্যারিষ্টার উডরফ তখন ইংলণ্ডে। সূৰ্য্যনারায়ণ বাবু তাঁহাকে ইংলণ্ডে পত্র লিখিয়া জানিতে চাহেন যে, যে ব্যারিষ্টার এই মামলায় নিযুক্ত আছেন তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য কোন্ উকীলকে নিযুক্ত করা উচিত? ইহার উত্তরে উডরফ সাহেব লিখেন যে, চন্দ্রমাধব বাবুকেই নিযুক্ত করা উকীল বাবু মােহিনীমােহন বায় উক্ত জজের প্রিয়পাত্র বলিয়া উচিত।

র চন্দ্রমাধব ঘােষ এব তাহার উপর মােহিনী বাবুর প্রভূত প্রভাবও ছিল বলিয়া লােকে বলিত; কিন্তু ইহা সত্ত্বেও চন্দ্ৰমাধৰ বাবুকে উডরফ সাহেব মনোনীত করিয়াছিলেন। ব্যারিষ্টার কেনেডি সাহেবের আইনে প্রভূত অধিকার ছিল এবং লােকও ছিলেন খুব ভাল। তবে তঁাহার বক্তৃতার বা বলিবার ধারা ভাল ছিল না। তিনি কিছুদিন অস্থায়ীভাবে হাইকোটে জজীয়তী করিয়াছিলেন। মিষ্টার গ্রিফিথ সুগভীর আইন-জ্ঞানসম্পন্ন ব্যারিষ্টার ছিলেন। তাহার হাতে যে মামলা পড়িত সেই মামলার নথিপত্র তিনি আগাগােড়া ভাল করিয়া পড়িতেন—খুটিনা কিছুই বাদ দিতেন । তখনকার কালে তাহার পশার কোনও ব্যারিষ্টার অপেক্ষা কম ছিল না। জজেরা তাহাকে যেমন বিশ্বাস, তেমনি খাতিরও করিতেন। এমন কি, গবমেন্টও ভঁহাকে অত্যন্ত খাতির করিতেন। ভারতবাসীদের প্রতি তাঁহার সহানুভূতি ছিল না সেইজন্য ভারতীয়গণ তাহাকে খাটি এংলো-ইণ্ডিয়ান বলিতেন। প্রায় ২০ বৎসর কাল তিনি বড়লাটের ব্যবস্থাপক সভার অতিরিক্ত সদস্য ছিলেন এবং সদস্য থাকিবার সময়েই তিনি কে-সি-আই-ই উপাধি লাভ করেন। ব্যারিষ্টার মিষ্টার এল-পি পিউ স্যর গ্রিফিথ ইভান্সের ভ্রাতা ছিলেন। তিনি যেমন সদাশয় ছিলেন তেমনই তঁাহার হৃদয়ও ছিল উচ্চ। তিনি ইভান্স সাহেবের মত কৃতী ও পণ্ডিত ছিলেন না বলিয়া ব্যারিষ্টারীতে সেরূপ সাফল্য লাভ করিতে পারেন নাই। পিউ সাহেব ভারতবাসীদের প্রতি সহানুভূতি-সম্পন্ন ছিলেন এবং তাঁহার ভ্রাতার মত গবর্ণমেন্টের নিকট তাহার খাতির ছিল না। পিউ সাহেবের পত্নীও সদাশয়া ও দয়াক্ৰহৃদয়া ছিলেন এবং চন্দ্ৰমাধৰ বাবুর পরিবারস্থ মহিলাগণের সহিত তাহার আলাপ-পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।

স্যর চমাধব ঘােষ পিউ সাহেব বৃদ্ধ বয়সে কলিকাতায় পরলােক গমন করেন। তাঁহার মৃত্যুতে সকল শ্রেণীর লোকই দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিলেন। ব্যারিষ্টার মিষ্টার ফিলিপসের নাম আরও পূৰ্বেই করা উচিত ছিল। তিনি যেমন ভাল লােক ছিলেন, তেমনই আইনও তিনি উত্তমরূপ জানিতেন। ব্যবহারশাস্ত্রে তাহার প্রভূত অধিকারের জন্য তিনি সতীর্থগণের সম্মানাই ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাৰু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইবার অল্প দিন পরেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন এবং দেশে চলিয়া যান। ইহার বহু বৎসর পরে--১৯০৬ খৃষ্টাব্দে চন্দ্রমাধব ঘােষ মহাশয় ‘স্যর’ উপাধি লাভ করিলে তিনি ইংলণ্ড হইতে তাহাকে অভিনন্দিত করিয়া পত্র লিখেন এবং সেই পত্রে তাহার প্রভূত প্রশংসাবাদ করেন। বলা বাহুল্য, তঁাহার এই পত্ৰ চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রীতির কারণ হইয়াছিল । হাইকোটে বিস্তর মামলা জমিছিল এবং বিচারপতিগণের সংখ্যায় অল্পতার জন্য সেগুলির বিচার যথাসময়ে করিয়া উঠা যাইতেছিল না বলিয়া ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে কয়েকজন নূতন বিচারপতির নিয়োগ হয়। তাঁহাদিগের নাম-(১) মিষ্টার ই-পি লেভিঞ্জ ; (২) মিষ্টার এ-এ রবাটস ; (৩) মিষ্টার ই জ্যাকসন ;(৪) মিষ্টার ডব্লিউ-এস সেটন-কার ; (৫) মিষ্টার জেপি নরম্যান ; (৬) মিষ্টার ডব্লিউ মরগ্যান , (৭) বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত; (৮) মিষ্টার লুইস জ্যাকসন এবং (৯) মিষ্টার জর্জ ক্যাম্বেল। বিচারপতি লেভিঞ্জ সাহেব ভাল আইনজ্ঞ ছিলেন বলিয়াই সকলে মনে করিত; কিন্তু বিচারকার্য্যে, তাঁহার সম্বন্ধে এইরূপ ধারণা প্রকট হয় নাই। ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বিচারপতি মিষ্টার রবাটস বেশীদিন কাজ করেন নাই; তিনি ১৮৬৫ খৃষ্টাৰেই কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করেন। বিচারপতি মিষ্টার আসন অত্যন্ত সদাশয়, ভদ্র ও বিবেকবুদ্ধি- এর সমাধব ঘােষ সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু বিচারকার্যে দক্ষতার পরিচয় দিয়া নাম করিতে পারেন নাই। বিচারপতি মিষ্টার সেটন-কার পূর্বে বাঙ্গালা সরকারে ছিলেন। তিনি বাঙ্গালা ভাষায় কথা কহিতে পারতেন মন্দ নহে; কোনও বাঙ্গালী তাহার সহিত দেখা করতে যাইলে তিনি বাঙ্গালায় তঁাহার সহিত কথা কহিতেন। বাঙ্গালীর সহিত বাঙ্গালায় কথা কহার দিকে তাহার ঝোঁক ছিল। জজ হিসাবেই বলুন বা মানুষ হিসাবেই বলুন, কেহ তাহাকে পছন্দ করিতেন না। ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দে তিনি জজীয়তীতে অবসর গ্রহণ করিয়া স্বদেশে গমন করেন। কিন্তু পরে ভারত গবমেন্টের পররাষ্ট্র-বিভাগের সেক্রেটারী হইয়া পুনরায় ভারতে আগমন করিয়াছিলেন। বিচারপতি মিষ্টার জে-পি রমানি প্রকৃতপক্ষে অতীব সদাশয় ও করুণহৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি স্বীয় বিবেক বুৰি-চালিত হইয়া কাৰ্য্য করিতেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন এবং সকলের প্রতিই শিষ্ট ব্যবহার করিতেন। চমাধব বাবুব উপর তিনি বড় সদয় ছিলেন এবং তাঁহার প্রশংসা করিতেন। স্যর বার্ণেল পিকক ছুটা লইলে তিনি কিছুদিন তাহার স্থানে প্রধান বিচারপতির কাৰ্য্য করিয়াছিলেন । টাউন-হলের সিড়িতে (টাউন-হলে তখন হাইকোর্টের আদিম বিভাগ অবস্থিত ছিল) এক ধর্মান্ধ ওহাবী মুসলমান তাহাকে অতি নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। জজ মিষ্টার মরগ্যান (পরে র ওয়াল্টার মরগ্যান) পূৰ্বে সুপ্রীম কোটের ইকুইটী বিভাগের মাষ্টার ( Master of the Equity Side) ছিলেন। হাইকোর্ট স্থাপিত হইলে ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে তিনি হাইকোটের বিচারপতি-পদে নিযুক্ত হয়েন। তিনি ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত হাইকোর্টে জজীয়তী করিয়াছিলেন। পরে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের হাইকোটের তর মাধৰ ঘোষ । বিচারপতি (Court Justice) নিযুক্ত হইয়া কহিকাতা হাইকোট হইতে চলিয়া যান। কলিকাতা হাইকোটে জজ-হিসাবে তিনি নাম করিতে পারেন নাই। তাহার একটা দোষ ছিল --অল্পেই রাগিয়া উঠিতেন। কিন্তু তাহার রায়ে এরূপ দোযের পরিচয় পাওয়া যাইত না। বিচারপতি শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয় সম্বন্ধে ইতিপূর্বে বিস্তারিত ভাবেই বলা হইয়াছে। তিনি হাইকোর্টের জজ হইলে সকল লােকেই সন্তোষ প্রকাশ করিয়াছিল। বিচারপতি মিষ্টার জ্যাকসন পূর্বে রাজশাহীর জেলা-জঙ্গ ছিলেন। উকীল বাবু মােহিনীমোহন সায় রাজশাহী জেলা-আদালতে ওকালতী করিতেন। তঁাহার সময়ে তিনি হাইকোটের সিবিলিয়ান জজদিগের মধ্যে সকলের অপেক্ষা যােগ্য ছিলেন। মামলা বুঝিতে তঁাহার একটুও বিলম্ব হইত না। তিনি সামান্য কারণেই রাগিয়া উঠিতেন এবং জুনিয়র বা নূতন উকীলদের উপর হার অনুৰাগ ছিল না। তাহাদের উপর বড় কড়া ব্যবহার করিতেন। তাহার নিজেরও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তিনি খুব তাড়াতাড়ি মামলা বুঝিতে পারেন। এই বিশ্বাসের বশবত্তী হইয়। অনেক সময়ে উকীলকে মামলা বুঝাইবার অবসর না দিয়া নিজেই মামলার বিষয় শেষ করিয়া ফেলিতেন। এইজন্য তিনি প্রত্যহ বৈকাল হইতে না হইতে তাহার কৰ্ত্তব্য সমাধা করিয়া ফেলিতেন। ইনি হাইকোটে আসিব অল্পদিন পরেই চন্দ্ৰমাধব বাবু ইহার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একবার একটা বড় রকমের ফৌজদারী আপীল-মামলা চন্দ্ৰমাধব বাবু র্তাহার এজলাসে চালাইয়াছিলেন। তবধি তঁাহার উপর জ্যাকসন সােেহবর ভাল ধারণা হইয়াছিল। জজ জ্যাকসন সাহেবের এজলাসে উকীল বাবু মোহনীমােহন রায় চমাধব বাবুর বিপক্ষে দাড়াইলে অনেক সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবুকে জজের সহিত ঝগড়া করিতে হইত। জ্যাকসন সাহেবের পুত্র স্যর চমাধব ঘোষ কেহ বা কলিকাতা হাইকোর্টে ব্যারিষ্টারী করিতে আসিয়াছিলেন। তিনি জজ জ্যাকসন সাহেবের এজলাসে চন্দ্রমাধব বাবুর বিপক্ষে দাড়াইলেও চমাধব বাবুকে জ্যাকসন সাহেবের সহিত ঝগড়া করিতে হইত। কিছুদিন ধরিয়া এমন ব্যাপার হইয়া উঠিয়াছিল যে, জজ জ্যাকসন সাহেবের এজলাসে মামলাকারীগণ বা তাহাদের মােক্তারগণ উকীল বাবু মােহনীমােহন রায়কে বা ব্যারিষ্টার জ্যাকসন সাহেবকে নিযুক্ত করিবে এই লইয়া ভীষণ তর্ক-বিতর্ক করিত; কেহ মােহিনীবাণু ও ব্যারিষ্টার জ্যাকসন সাহেব-দুইজনকেই নিযুক্ত করা সমীচীন মনে করিতেন। হাইকোর্টে এই ব্যাপার লইয়া খুবই জল্পনা- কল্পনা ও গাল-গল্প চলিত। দুঃখের বিষয় ব্যারিষ্টার জ্যাকসন সাহেব অল্পদিন মধ্যেই পরলােক গমন করেন। বিচারপতি মিষ্টার ক্যাম্বেলের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার নিকটে মামলার সওয়াল-জবাবের সময়ে তিনি প্রয়ােজনীয় বিষয়গুলি প্রায়ই লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতেন । 'আশ্চর্যের বিষয় এই যে, লিপিবদ্ধ করিয়া না রাখিয়াও তিনি মামলার সমস্ত তথ্য অধিগত করিয়া লইতেন। তিনি চতুর ছিলেন এবং মামলা শীঘ্র বুঝিতে পারিতেন। কিন্তু মােগ্য ও অভিজ্ঞ বিচারপতি বলিয়া হাইকোটে তিনি খ্যাতিলাভ করিতে পারেন নাই। ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের বিচারপতিপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ; পরে তিনি বাঙ্গালা দেশের ছােটলাট নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে চন্দ্রমাধব বাবুর তৃতীয় পুত্র সতীশ চন্দ্র ঘােষ জন্ম গ্রহণ করেন। এই সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবু ভবানীপুর কঁসারিপাড়ার বাৰু অম্বিকাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (আলা-নিবাসী) বাড়ী ভাড়া লইয়া বয়বাস করিতেছিলেন। এই বাড়ীতেই সতীশচন্দ্রের জন্ম হয়। ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে আরও কয়েকজন নূতন জজ হাইকোর্টে নিযুক্ত স্যর চন্দ্রমাধব গো ৭৯ হয়েন। তাঁহাদের নাম - মিষ্টার মিল, মিষ্টার স্কট, মিষ্টার পিটারসন, মিষ্টার এ-জি ম্যাকফারসন, মিষ্টার এফ-এ গ্লোভার এবং মিষ্টার জে-বি ফিয়ার। বিচারপতি মিল সাহেব ও স্কট সাহেব হাইকোর্টের আপীল-বিভাগে বসতেন না; সেইজন্য তাঁহাদের বিষয়ে বিশেষ কিছু বলা সম্ভব নহে। 1. বিচারপতি নিষ্টার পিটারসন অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত হইয়াছিলেন । তিনি অভিজ্ঞ জজ বলিয়া হাইকোর্টে খ্যাতি লাভ করিতে পারেন নাই। এক বৎসরের মধ্যেই তিনি জজীয়তী হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া চলিয়া যান। বিচারপতি মিষ্টার এ-জি ম্যাকফারসন (পরে স্যর আর্থার ম্যাকফারসন। যােগ্য অভিজ্ঞ বিচারক বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। অবসরগ্রহণের পূর্বে তিনি হাইকোটের সর্বোত্তম বিচারপতি বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তিনি ভদ্র ও সদাশয় ব্যক্তি ছিলেন। বিচারপতি মিষ্টার গ্লোভার বিচারকায্যে যােগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন নাই; তবে তিনি সদয়হৃদয় ও ভদ্র ছিলেন। বিচারপতি মিষ্টার জে-বি ফিয়ার সুযােগ্য এবং তেজস্বী বিচারক ছিলেন। কিন্তু তিনি খুটিনাটীর দিকে অত্যন্ত অধিক নজর দিতেন বলিয়া অনেক সময়ে তাঁহার রায়ে খুত থাকিয়া যাইত। তিনি ভদ্র ও দয়ালু ছিলেন; কিন্তু নাম ও খ্যাতির প্রার্থী ছিলেন। প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার মিষ্টার মনােমমাহন ঘােষের সহিত তাহার অত্যন্ত বন্ধুত্ব ছিল এবং অনেকে মনে করি যে, তাহার উপর মনোমােহন ঘােষের সমধিক প্রভাব ছিল এবং তাহার যুক্তির দিকে তিনি অযথা ঢলিয়া পড়িতেন। এইরূপ ধারণার ফলে বিচারপতি জ্যাকসন সাহেবের এজলাসে মামা পড়িলে মামলাকারীরা যেমন মােহিনীবাবুকে উকীল নিযু করিতে ক তর চমাধব ঘােষ ছুটিত, ফিয়ার সাহেবের এজলাসে মামলা পড়িলে তেমনই ব্যারিষ্টার মনোমােহন ঘােষকে মামলাকারীরা নিযু ক করিত। বাবু প্রতাপচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হুগলী জেলার আসা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন, ইনি চন্দ্রমাধব বাবুর জনৈক পুরাতন বন্ধু । ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে এই প্রতাপ বাবু চন্দ্ৰমাধব বাবুর সহিত বহু বাজারের বাবু নবীনচন্দ্র বসুর পরিচয় করাইয়া দেন। নবীনবাবু কলিকাতার কোমও একটী অফিসের বেনিয়ান ছিলেন। প্রতাপবাবু আৰ্ম্মি এণ্ড নেভী ক্লোদিং বাের্ডে কৰ্ম্ম করিতেন। শীঘ্রই নবীনবাবুর সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব জন্মে। সেই বন্ধুত্ব বহুকাল-নবীনবাবুর মৃত্যুকাল পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল। নবীনবাবু উচ্চমনঃ ও পরােপকারী ব্যক্তি ছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে যে অফিসে তিনি বেনিয়ন ছিলেন সেই অফিস ফেল হইয়া যাওয়ায় নবীনবাবু অত্যন্ত ঋণগ্রস্ত হয়েন এবং তাহার অবস্থা নিঃস্ব হইয়া পড়ে ; দরিদ্র অবস্থাতেই তাহার মৃত্যু হয়। এই নবীনবাবুর দ্বারা এলাহাবাদের বাবু নীলকমল মিত্রের সহিত চন্দ্রমাধব ক্রমে নীলকমলবাবুর সহিতও তাঁহার বিশেষ বন্ধুত্ব জন্মে। নীলকমলবাবু খুব ভাল লোক ছিলেন। বাঙ্গালী- মাত্রই এলাহাবাদে যাইলে তাহার আতিথ্য গ্রহণ করিতেন--স্বজাতির অতিথি-সংকারে ইনি মুক্তহস্ত ছিলেন। কিন্তু নবীনবাবুর মত তঁাহার হৃদয় উচ্চ ছিল না। নীলকমলবাবু দেখিতে সুপুরুষ ছিলেন এবং তাঁহার চক্ষু দুইটাও ছিল উজ্জ্বল। তিনি যেমন বুদ্ধিমান তেমনি চতুর ছিলেন। চন্দ্রমাধববাবু বলিতেন, নীলকমলবাবুর মত পরিশ্রমী লােক আর কখনও আমি দেখি নাই। এলাহাবাদ এবং কানপুর জেলায় তাহার মদের ভাটী ছিল এবং কয়েক বৎসর ধরিয়া তিনি মদ চোলাই করিবার একচেটিয়া অধিকার ভােগ করিয়াছিলেন। তৈয়ারী ব্যতীত তাহার অন্যান্য ব্যবসায়ও ছিল। বাবুর পরিচয় মদ ।

শ্যর চাবি ঘোষ ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে-হাইকোর্টে পূজার ছুটতে চন্দ্ৰমাধব বাৰু বায়ুপরিবর্তনের জন্য এলাহাবাদে গমন করেন। যমুনার তীবে একটী ঘােট দোতালা বাড়ী তিনি থাকিবার জন্য লইয়াছিলেন। এই বাড়ীটির মালিক ছিলেন বাৰু নীলকমল মিত্র। এখানে থাকিবার সময়ে তিনি তাঁহার নিকট-আত্মীয় ফরিদগুরের জনৈক পুলিশ সাব-ইনস্পেক্টরের নিকট হইতে এই মর্মে এক টেলিগ্রাম পান যে, জনৈক চুরির আসামীর নিকট হইতে জোর করিয়া একরার করাইয়া লইবার অপরাধে তিনি দায়রা সােপর হইয়াছেন; তিনি অত্যন্ত বিপন্ন। এই কারণে উক্ত সাব-ইনস্পেক্টর তাহার পক্ষ-সমর্থনের জন্য চন্দ্ৰমাধব বাবুকে ফরিদপুরে আসিবার জন্য তার-যােগে অনুরোধ করিয়াছেন। চন্দ্রমাধব বাবু স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য এলাহাবাদে গিয়াছিলেন ; কিন্তু ইহা সত্ত্বেও তাহার নিকট-আত্মীয়কে বিপন্ন দেখিয়া অবিলম্বে ফরিদপুর যাত্রা করিতে প্রস্তুত হইলেন। তিনি প্রথমে কলিকাতায় আসিলেন। তার পর কলিকাতা হইতে কুষ্টিয়া হইয়া ফরিদপুরে পৌছিলেন; তিনি ফরিদপুরে পৌছিলে উক্ত সাব-ইনস্পেক্টর তাঁহার অগ্রজ এবং বাবু, ভগবান চন্দ্র বসু-( ইনি স্যর জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা এবং ফরিদপুরের তদানীন্তন প্রধান ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট) প্রমুখ কতিপয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তাঁহাকে অভ্যর্থনা করেন। ভগবান বাবু ও আরও কয়েকজন ভদ্রলোক চন্দ্ৰমাধববাবুকে বলেন, আপনি এই মামলায় জড়াইবেন না । কারণ ঢাকা হইতে আগত দায়রা-জজ মিষ্টার এবারবি–“যিনি দায়রা আদালতে এই মামলার বিচার করিবেন তাহার ধারণা এই যে, কলিকাতা হইতে আগত কোন উকীল বা ব্যারিষ্টার তাহার এজলাসে আসামীর পক্ষ-সমর্থনার্থ উপস্থিত হইলে তিনি সেই উকীল বা ব্যারিষ্টারের প্রতিকূলতা করিতেন এবং মক্কেলের বিরুদ্ধে রায় দিতেন। এবারক্রমবি সাহেবের ধারণা ছিল যে, স্যর চমাধব ঘােষ আসামী যখন কলিকাতা হইতে উকীল বা ব্যারিষ্টার আনাইয়াছে তখন তাহার মামলায় গলদ আছে এবং সে তাহার চক্ষে ধুলি দিবার চেষ্টা করিতেছে। এই কথা শুনিয়া চমাধব বাৰু অত্যন্ত নিরুৎসাহ হইয়া পড়িলেন। তিনি বিস্তর কষ্ট করিয়া তাহার আত্মীয়ের উপকার করিতে আসিয়াছেন, তাঁহার উপস্থিতিতে আত্মীয়ের ক্ষতি হয়, ইহা ত হইতে পারে না। এই জন্য তিনি তাঁহার আত্মীয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন- “এ অবস্থায় কি করা যায় ? আগামী কল্য মামলার দিন স্থির হইয়াছে-ভাবিবার সময় নাই।” চন্দ্রমাধব বাবুর আত্মীয় বলিলেন- “আমি কাল প্রাতে আপনার কথার উত্তর দিব। কিন্তু আপনি নথিপত্র পড়িয়া মামলা চালাইবার জন্য প্রস্তুত হইতে থাকুন। চমাধব বাবু সমস্ত রাত্রি জাগিয়া মামলাটী ভাল করিয়া পড়িয়া রাখিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে তঁাহার আত্মীয়টী আসিয়া বলিলেন- “আমি বেশ করিয়া ভাবিয়া চিন্তিয়া স্থির করিয়াছি যে, আপনিই আমার পক্ষ সমর্থন করিবেন, ইহাতে ফল যাহাই হউক না কেন? ২ হাজার টাকার কমে আপনার মত একজন উকীল আনিতে পারা যাইত না। তার পর আপনি যখন কষ্ট স্বীকার করিয়া আমার পক্ষ সমর্থনের জন্য এলাহাবাদ হইতে আসিয়াছেন তখন এমন সুযােগ আমি ত্যাগ করিব না। আমার ভাগ্যে যাহা হয় হউক-আপনিই আমার পক্ষ সমর্থন করুন। কাজেই মাধব বাৰুও তাহার পক্ষ সমর্থনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। এই সময়ে ক্লা জজ-আদালতের প্রসিদ্ধ উকীল মৌলবী গােলাম মুস্তাফা ফরিদপুরে চন্দ্রমাধব বাবুর সহিত দেখা করিতে আসিলেন। তিনি চন্দ্ৰমাধৰ বাৰকে মামলা দিয়েন। কোনও একটা মামলা তঁহাকে বুঝাইয়া দিবার জন্য মৌলরী সাহেব ফরিদপুরে আসিয়াছিলেন। চন্দ্ৰমাৰ বাৰ মৌলবী সাহেবকে দেখিয়া স্যর চলমাধব ঘােষ ৮ বলিলেন,-“আপনি আসিয়াছেন ভালই হইয়াছে ; আমি এখানে আমার এক আত্মীয়ের পক্ষ-সমর্থনের জন্য আসিয়াছি ; দায়রা-আদালতে এবারবি সাহেবের নিকট মামলার বিচার হইবে। আপনাকে এই মামলায় আমার সহিত দাড়াইতে হইবে।” মৌলবী সাহেব আনন্দের সহিত তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। অতঃপর উভয়েই দায়রা- আদালতে চলিলেন। সেখানে গিয়া দেখিলেন,—“সার্কিট হাউসের একটি ঘােট ঘরে এজলাস বসিয়াছে। জজের বসিবার জন্য যে উচ্চ বেদী ( Platform ) থাকে, তাহা ছিল না। দায়রা-জজ এবারক্রবি সাহেব মেঝেতেই একটা চেয়ার-টেবিল লইয়া বসিয়াছিলেন। 'দুইটী নীচু রকমের বেতের মোড়া ছিল, উহাদের একটীতে পেস্কার ও অপরটীতে উকীল-সরকার বসিয়াছিলেন। উকীল বা অপর কাহারও বসিবার জন্য কোনও রূপ আসন ছিল না। এইরূপ অবস্থা ও ব্যবস্থা দেখিয়া এবং জজের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত বলিয়া তিনি তাহার বন্ধু মৌলবী গোলাম মুস্তাফাকে বলিলেন,-আপনি আমার উপস্থিতির কথা জজকে বলুন।” মৌলবী সাহেব জজকে হাইকো হইতে উকীল ' চমাধব বাবুর উপস্থিতির কথা জানাইলেন। জজ এবারক্রমবি সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুর আগমনের কথা পূৰ্বেই শুনিয়াছিলেন। চমাধব বাবু তাঁহার টেবিলের নিকট আসিলে তিনি তাহার দিকে চাহিয়াই দেখিলেন না। কাজেই চন্দ্ৰমাধব বাবু তাঁহার বন্ধু মৌলবী সাহেবকে দিয়া তাঁহার আগমনের কথা জজকে জানাইতে বাধা হইয়াছিলেন। জজের নিকট চন্দ্ৰমাধব বাবুর আগমনের কথা বলিলে জজ তাহার দিকে চাহিয়া দেখিলেন এবং চাপরাশীকে মােড়া নিয়া দিতে বলিলেন। কিন্তু মােড়া পাওয়া যাইল না; কাজেই তাঁহাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাহার নিজের খাস কামরা হইতে দুইখানি চেয়ার আনাইতে হইল। একটী আসিল চন্দ্ৰমাধৰ বারুর জন্য, অপ ৪ স্যর চমাধব ঘােষ মৌলবী সাহেবের জন্য । চেয়ার দুইটীতে চন্দ্ৰমাধব বাবু ও মৌলবী সাহেব উপবেশন করিলেন। জজ সাহেব মধ্যে মধ্যে চন্দ্রমাধব বাবুর দিকে বক্রদৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন । অত:পর মামলার বিচার আরম্ভ হইল। বিচারকার্যে সাহায্যের জন্য তিন জন এসেসরও নিযুক্ত হইয়াছিলেন। গােড়াতেই প্রথম সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে উঠিল যখন সাক্ষীর সাক্ষ্য লিখিয়া লওয়া হইতেছিল, তথন চন্দ্ৰমাধব বাবু দেখিলেন যে, এক অদ্ভুত পদ্ধতি অবলম্বন করা হইতেছে। সাক্ষী বাঙ্গালায় দুই এক কথা বলিবামাত্র পেস্কার উহা বাঙ্গালাতেই লিখিয়া লইতেছিলেন, তাহার পর সেই কথাগুলি হিন্দুস্থানীতে ভাষান্তরিত করিয়া জজকে বলিতেছিলেন ; জজ ঐগুলি ইংরাজীতে লিখিয়া রাখিতেছিনে। জুজ বাঙ্গালা জানিতেন না বলিয়া এইরূপ ব্যবস্থা করিতে হইয়াছিল। গােড়াতেই চন্দ্ৰমাধব বাবু দেখিলেন যে, পেস্কার সাক্ষীর জবানবন্দী লিখিয়া লইতে ভুল করিতেছেন। চমাধব বাবু এজন্য আপত্তি উত্থাপন করিলেন। জজ তাহাকে হিন্দুস্থানীতে জিজ্ঞাসা করিলেন,-“কি ইয়াছে ? চমাধব বাবু ইংরাজীতে উত্তর করিলেন,--“পেস্কার ক্ষীর জবানবন্দী লিখিয়া সইতে ভুল করিতেছেন।” ইহাতে জজ অত্যন্ত বির-ির সহিত বলিলেন, “আপনি যদি আর একটা কথাও ইংরেজীতে বলেন, তাহা হইলে আমি আপনায় জরিমানা করিব।” চন্দ্রমাণব বাবু তখন প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারিলেন এবং মনে মনে ভাবিলেন-তার স্কেলের অদৃষ্ট মন্দ। কিন্তু তিনি সঙ্কল্প করিলেন- সাহেবের সহিত ল ই করিতে হইবে, তাহাতে তাহার মক্কেলের যাহা হয় হউক। তিন দিন ধরিয়া বিচার চলিয়াছিল। এই তিনদিনই চন্দ্রমাণব বাবুর পক্ষে বিষম কষ্টকর হইন্নাছিল। সরকার পক্ষে প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হইতে জজ চচুমপব বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, স্যর চন্দ্রমধিব ঘােষ “আপনি কি ইহাকে জেরা করিতে চান ?” চন্দ্রমাধব বাবু প্রথম সাক্ষীকে জেরা করিতে আরম্ভ করিলেন। সাক্ষীকে দুই তিনটী প্রশ্ন করিবার পরই জজ পরবর্তী প্রশ্নে আপত্তি করিয়া বলিলেন,-“এ প্রশ্ন অনাবশ্যক; আপনি সাক্ষীকে ঘাবড়াইয়া দিবার জন্য এইরূপ প্রশ্ন করিতেছেন।” চন্দ্রমাধব বলিলেন,-“ এ প্রশ্ন অত্যন্ত দরকারী এবং ইহা সত্য; তাহা সত্ত্বেও আপনি আপত্তি করিতেছেন কেন, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না।” ইহাতে জজ বিরক্ত হইয়া বলিলেন,- “আচ্ছা বেশ প্রশ্ন করুন।” অতঃপর চন্দ্রমাধব বাবু সাক্ষীকে বিশেষভাবে জেরা করিতে আরম্ভ করিলেন। জজও পূর্বের মত আপত্তি করিতে লাগিলেন। তখন চন্দ্রমাধব বাবু বলিলেন,-“আমি প্রশ্ন করিতেছি, আপনি ইহা লিখিয়া লউন ; যদি না করিতে দেন, তাহা হইলে লিখিয়া লউন যে, প্রশ্ন করিতে দিলাম না। ইহাতে জজ তাহাকে জেরা করিবার অনুমতি দিলেন। সরকার-পক্ষের প্রত্যেক সাক্ষীরই জেরার সময়ে জজের সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর এইরূপ লড়াই হইয়াছিল। প্রত্যেক সাক্ষীকে জেরা করিবার পর চন্দ্রমাধব বাবু আসন গ্রহণ করিতেছিলেন, সেই সময়ে জজ সাহেব তাহার দিকে অপরের অলক্ষ্যে আড়চোখে চাহিয়া দেখিতেছিলেন। সম্ভবতঃ চন্দ্ৰমাধব বাবু আদালতের অপমাননাকর কোনও কিছু আকার-ইঙ্গিতেও করেন কি না তাহা তিনি লক্ষ্য করিতেছিলেন। কোনও প্রকার বেচাল দেখিলে তাহাকে শাস্তি দিবেন, ইহাই হয় ত তাহার অভিসন্ধি ছিল। কিন্তু চমাধব বাবুও প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, তিনি এমন ব্যবহার করিবেন না যাহতে জজ সাহেব তাহাকে দোষী করিতে পারেন। তিনদিন তাহাকে অত্যন্ত সতর্ক হইয়া চলিতে হইয়াছিল। দ্বিতীয় দিনের শেষে সরকার-তরফের সাক্ষীদের সাক্ষাদান শেষ হইয়া গেল। পরদিন চন্দ্রমাধব বাবু সওয়াল জবাব করিবেন; সেজন্য ;

স্যর চমাধব ঘােষ তিনি প্রস্তুত হইলেন। জজ সাহেব বাঙ্গালা বুঝিতেন না এবং তিনি চন্দ্ৰমাধব বাবুকে ইংরেজীতে সওয়াল জবাব করিতে দিতেও অসম্মত। সেইজন্য চমাধব বাবু জজ সাহেব ও এসেসরগণকে তঁাহার বক্তব্য বুঝাইবেন কেমন করিয়া তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। যাহা হউক, অবশেষে তিনি হিন্দুস্থানীতেই সওয়াল জবাব করিবেন বলিয়া স্থির করিলেন। রাত্রি প্রায় তিনটা পর্যন্ত তিনি জাগিয়া বিশেষ পরিশ্রম- সহকারে প্রয়ােজনীয় বক্তব্যগুলি লিখিয়া রাখিলেন এবং সওয়াল জবাবে যে সকল হিন্দুস্থানী শব্দ প্রয়ােগ করিতে হইবে তাহা মনের ভিতরে জোগাইয়া রাখিতে লাগিলেন। পরদিন আসামীদের তরফের সাক্ষীদিগের সাক্ষ্য লওয়া হইল। জজ তখন উকীল-সরকারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার কি বলিবার আছে ?* উকীল সরকার বৃদ্ধ, নিতান্ত সেকেলে এবং ইংরেজী ভাষায় অজ্ঞ। তিনি উঠিয়া কেবল এই কয়টী কথা বলিলেন,-- সব ইনস্পেক্টর ও কনষ্টেবলদের অপরাধ সপ্রমাণ হইয়াছে ; উহাদিগকে কঠোর দণ্ড দেওয়া উচিত। অতঃপর জজ এবারবি সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আপনার কি বলিবার আছে বলুন। তিনি তখন দাড়াইয়া উঠিয়া হিন্দুস্থানী ভাষায় জজকে বলিলেন,--আমি যদি ইংরেজীতে সওয়াল করি তাহা হইলে আদালতের সুবিধা হয় ও সময় বাঁচে কি না। তাহার পর আমি উহার মর্ম এসেসরগণকে বাঙ্গালায় বুঝাইয়া দিব।” জজ কিন্তু তাহার এই প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন' না'। তিনি বলিলেন-“এখানে আপনি ও আমি ছাড়া আর কেহ ইংরাজী জানে না; তবে তবে ইচ্ছা করিলে আপনি বাঙ্গালাতে সওয়াল করিতে পারেন। চমাধব বুঝিলেন,-বাঙ্গালায় সওয়াল করা পশুশ্রম মাত্র। কারণ তাহার এক বিন্দুবিসর্গও বুঝিতে পারিবেন না। কাজেই তিনি জজ সাহেবকে বলিলেন,-“আমি হিন্দুস্থানীতেই সওয়াল করিব। অতঃপর স্তর চমাধব ঘােষ চমাধব বাবু সওয়াল আরম্ভ করিলেন। ১•১২ মিনিট অন্তর একটি করিয়া যুক্তি শেষ করিবামাত্র জজ সাহেব তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে থাকেন,—“সওয়াল শেষ হইল কি?” চমাধব বাবু মৃদু হাসিয়া উত্তর করেন,-“আমার আরও অনেক বলিবার আছে। আশ্চর্যের বিষয়, চন্দ্ৰমাধব বাবু পৌনে এক ঘন্টা সওয়াল করিবার ভিতরে জজ সাহেব একবারও তাহার সওয়াল হইতে কোনও বিষয় লিখিয়া রাখেন নাই। জজ সাহেব যখন দেখিলেন,-পৌনে এক ঘণ্টাতেও চমাধব বাবুর সওয়াল শেষ হইল না তখন তিনি বুক পকেট হইতে কতকগুলি কাগজ বাহির করিয়া পড়িতে লাগিলেন। এই সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবু মনে করিলেন,-জজ সাহেবকে এইবার কায়দায় পাওয়া গিয়াছে, তিনি যত অসদ্ব্যবহার করিয়াছেন এইবার সুদসমেত তাহা ফেরত দেওয়া যাইবে। এই মনে করিয়া তিনি চুপ করিলেন। জজ তাহার দিকে চাহিয়া বলিলেন -“আপনি সওয়াল করিয়া যান। তখন চন্দ্ৰমাধব বাবু জজকে সম্বােধন করিয়া হিন্দুস্থানীতে বলিলেন-“হুজুর যদি অন্য কাজ করেন, তাহা হইলে আমার সওয়াল জবাব করিবার কোনও প্রয়ােজন নাই। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত এবং কতকটা উচ্চস্বরে এই কথা কয়টি বলেন। কিন্তু ইহার ফল অদ্ভুত হইল ; জজ তখনই তাঁহার হাতের কাগজ গুলি রাখিয়া দিলেন এবং দুই মিনিট কাল জড়পদার্থের মত অসাড় ও নীরব হইয়া রহিলেন। অতঃপর চন্দ্ৰমাধব বাবু সওয়াল জবাব আরম্ভ করিলেন এবং আশ্চয্যের বিষয় এই যে, তিনি তখন সওয়ালের প্রয়ােজনীয় অংশগুলি টুকিয়া রখিতে লাগিলেন। জজ সাহেব ইহার পর আর চমাধব বাবুকে থামাইবার চেষ্টা করেন নাই। চন্দ্রমাধব বাবুও এই সুযােগে জজ সাহেবকে ও এসেসরগণকে মামলাটা যতদুর সাধ্য বুঝাইয়া দিতে লাগিলেন। তিনি এসেসরদিগের দিকে চাহিয়া তাহাদের ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, তাঁহারা তাহার সওয়াল জবাব ;

৮৮ স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ শুনিয়া তাহারই পক্ষপাতী হইয়াছেন। এমন কি, এসেসরগণ পরস্পরের মধ্যে যে সকল কথাবার্তা কহিতেছিলেন সে সকলও শুনিতে পাওয়া যাইতেছিল। তাহাতেও বুঝা যাইতেছিল যে, তাহারা আসামীকে নিরপরাধই বলিবেন। অতঃপর চন্দ্রমাধব বাৰু তঁাহার সওয়াল শেষ করিলেন এবং উপসংহারে জজসাহেব ও এসেসরগণকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন,-“আমি আর হুজুরকে ও আপনাদিগকে কষ্ট দিব না; আমার সওয়াল শেষ হইল। আশা করি, আমার সওয়াল জবাব হইতে আমার মক্কেলের নির্দোষিতা সম্বন্ধে আপনাদের মনে কোনও সন্দেহ থাকিবে না।” চমাধব বাবুর সওয়াল জবাব শেষ হইবার পর জজসাহেব মৌলবী গগালাম মুস্তাফা সাহেবকে সিজ্ঞাসা করিলেন,—“আপনার কিছু বক্তব্য আছে কি? মৌলবী সাহেব তখন দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন- “হুজুর ! চন্দ্রমাধববাবু হাইকোর্টের একজন বড় উকীল। কাজেই হাইকোর্টে যেরূপ সওয়াল হয়। তিনি সেইরূপ সওয়াল করিয়াছেন। আমি হুজুরের আদালতের উকীল-হুজুরের আদালতে যেরূপ সওয়াল হয়, ঐরূপ সওয়াল জবাবই করিতে চাই।” জজ এবারক্রমবি সাহেব এই কথায় খুবই প্রীত হইয়া বলিলেন-“আপনি সওয়াল করুন।” মৌলবী সাহেব তদনুসারে দুইগরিটী কথা বলিয়াই বসিয়া পড়িলেন। জজ সাহেব এসেসরগণকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—আসামীদের সম্বন্ধে আপনাদের মত কি?” এসেসরগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর কলিলেন-“আসামীর। নিরপরাধ ; সুতরাং মুক্তি পাইবার অধিকারী।” জজ সাহেব তাহাদের এই মন্তব্যে বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-“বেকসুর খালাস ?” এসেসরগণ উত্তর করিলেন-“হ। খােদাব।” জজ সাহেব অতঃপর দুই এক মিনিট চুপ করিয়া রহিলেন, তার পর মামলা সম্বন্ধে যে সকল বিষয় টুকিয়া রাখিয়াছিলেন সেই গুলি দেখিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া মনে হইতেছিল-আসামীদিগকে শাস্তি স্যর চন্দ্রমাধব ঘোষ ৮১ • দিতে পারিলেই যেন তিনি খুসী হয়েন। যাহা হউক, জজ সাহেব বলিলেন,-রায় পরে দেওয়া হইবে; আসামীরা যেমন জামিনে খালাস আছে সেইরূপই থাকিবে। এই বলিয়া তিনি এজলাস ত্যাগ করিলেন। আদালত হইতে বাহিরে আসিবার সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাৰু দেখিলেন,- বহুলোক মামলাটা দেখিবার, তাহার সওয়াল জবাব শুনিবার ও মামলার ফল কি হয় তাহা জানিবার জন্য সমবেত হইয়াছে। বাসায় আসিবার সময়ে বহুলােক হাব অনুসরণ করিল ; কারণ, তাহাদের ধারণা হইয়াছিল যে, ইনি অসম্ভব কার্য করিয়াছেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু কিন্তু তাহার আত্মীয়কে বলিলেন,-“আপনি জেলে যাইবার জন্য প্রস্তুত হউন, তবে একরূপ নিশ্চিত জানিবেন যে, হাইকোটে আপীল করিয়া আমি আপনাকে খালাস করিয়া আনিব।” এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা উচিত। যে কয়দিন চন্দ্রমাংব বাবু ফরিদপুরে ছিলেন এবং যে কয়দিন মামলাটী চলিয়াছিল সে কয়দিনই রাত্রিতে কয়েকজন পুলিস কনেষ্টেবল তফাৎ হইতে তাহার বাসার দিকে লক্ষ্য রাখিয়াছিল। যে মামলাটীতে আসামী পক্ষ- সমর্থনের জন্য তিনি ফরিদপুরে আসিয়াছিলেন, উহা পুলিশ কর্তৃক রুজু করা মামলা। ইহা ম্যাজিষ্ট্রেট ও পুলিস সাহেবের আদেশে রুজু-করা হইয়াছিল। তাহারা সব-ইনস্পেক্টর ও কনষ্টেবলদিগকে দণ্ড দেওয়াইবার জন্য অত্যন্ত উৎসুক হইয়াছিলেন। সম্ভবতঃ এইজন্যই তঁাহারা কনষ্টেবলদিগকে লক্ষ্য রাখিতে বলিয়াছিলেন, চন্দ্রমাধব বাবুর বাসায় আসামীদের তরফে কোনও সাক্ষী যাইতেছে কি না, এবং তাহাকে শিখাইয়া-পড়াইয়া লওয়া হইতেছে কি না। যাহা হউক, চন্দ্রমাধব বাবু বাসায় পৌছিয়া ভাবিলেন-তঁাহার পক্ষে আর এক মুহূর্তও ফরিদপুরে থাকা উচিত নহে। কারণ, থাকিলেই ভঁহাকে তাঁহার আত্মীয়ের প্রতি যে দণ্ডের আদেশ হইবে তাহা শুনিতে স্যর চমাধব ঘােষ হইবে। দণ্ড যে তঁাহার হইবে, এ ধারণা মাধব বাবুর মনে বদ্ধমূলই হইয়াছিল। সেই দিন রাত্রিতেই চন্দ্ৰমাধব বাবু ও তাঁহার বন্ধু মৌলবী সাহেব ঢাকায় রওনা হইলেন। তখন চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতা ঢাকার জরিপ বিভাগের ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন। চন্দ্রমাধব বাবু ঢাকায় পৌছিয়াই টেলিগ্রাম পাইলেন, উহাতে তাঁহার আত্মীয় লিখিয়াছেন,-“আমি ও অন্যান্য আসামী বেকসুর খালাস পাইয়াছি। আপনি ফরিদপুর হইতে চলিয়া যাইবার পরদিনই জজ সাহেব এই রায় দিয়াছেন।” এই সংবাদে চন্দ্র মাধব বাবু অত্যন্ত আনন্দিত হয়েন। মৌলবী সাহেব ফরিদপুর হইতে ঢাকায় ফিরিয়া আসিয়া ঢাকার জজ-আদালতের উকীলদিগের নিকট চন্দ্ৰমাধব বাবুর যােগ্যতার কথা উল্লেখ করিয়া তাঁহাকে একেবারে স্বর্গে তুলিয়া দিলেন এবং বলিলেন,—“তিনি সওয়াল করিবার সময়ে যে উর্দু বলিয়াছেন, তাহা এই আদালতের মধ্যে যে উকীল খুব ভাল উর্দু বলিতে পারেন তাঁহারই মত তিনি অনর্গল ভাল উদ্ বলিয়াছিলেন।” অতঃপর চন্দ্ৰমাধব বাবু ঢাকা হইতে তাঁহার জন্মভূমি যােলঘড় গ্রামে সেখানে তাঁহার পিতার নিকট হইতে তিনি জানিতে পারেন যে, এবারবি সাহেব ফরিদপুর হইতে ঢাকায় ফিরিলে তিনি তাহার সহিত দেখা করিয়াছিলেন। সেই সময়ে এবারবি সাহেব কথাপ্রসঙ্গে এই মামলার কথা চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতার নিকট উত্থাপন করিয়া বলেন-“হাইকোটের এক ছােকরা উকীল আমার এজলাসে অাসামীর তরফে নিযুক্ত হইয়া আসিয়াছিল, সে আমাকে খুবই ভুগাইয়া গিয়াছে। কিন্তু ছােকরা উকীল খুব ঘােগ্য এবং বড় চালাক।' এবারবি সাহেব অবশ্য জানিতেন না যে, যাহার নিকট তিনি উক্ত উকীলের কথা বলিতেছেন তিনি উক্ত উকীলের পিতা। চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতাও ইহা উক্ত জজ সাহেবের নিকট ভাজেন নাই। গমন করেন।

স্যর চমাধৰ ঘােষ এই মামলায় জয়লাভের ফলে ঢাকা জেলা হইতে চন্দ্ৰমাধব বাবু বিস্তর মামলা পাইতে থাকেন। তিনি কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া ফরিদপুরের ব্যাপার কয়েকজন উকীলকে এবং বিচারপতি বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিতকে বলেন । ইহা শুনিয়া তাহারা খুব হাসির রােল তুলিয়াছিলেন। শম্ভুনাথ বাবু ও দুই একজন উকীল বলেন,- “চন্দ্রমাধব বাবু আপনি অত্যন্ত দুঃসাহস দেখাইয়াছিলেন, যদি দায়রা-জজ আদালত-অবমাননার অপরাধে আপনাকে শাস্তি দিতেন, তবে আপনি কি করিতে পারিতেন?” চমাধব বাবু তৎক্ষণাৎ উত্তর করিলেন-“হাইকোটে আপনাদের মত আমার যে সব বন্ধু রহিয়াছেন তাহার হাইকোর্টে আপীল করিয়া উক্ত জজের অন্যায় আদেশ নাকচ করাইতেন।" হাইকোটে চন্দ্রমাধব বাবু নির্ভীক, তেজস্বী, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা ও অকপট উকীল ছিলেন, তাহার সাধুতার বিষয় উকীল ও জঙ্গদের নিকট অবিদিত ছিল না। তাই যদি কখনও তিনি অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করিতেন, জজেরা তাহাতে আপত্তি করিতেন না, কারণ তাঁহার জানিতেন, তিনি ইচ্ছা করিয়া এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করেন নাই মামলায় এরূপ মন্তব্য-প্রকাশের ভিত্তি পাইয়াই তিনি এক্সপ তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন। এই সময়ে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত পুরাতন সিবিলিয়ান হাইকোর্টের উকীল-শ্রেণীভুক্ত (Vakil) হইবার জন্য আবেদন করেন এবং তাঁহাদের আবেদন গ্রাহ হয় ও তঁাহারা উকীলশ্রেণীভুক্ত হয়েন। তাঁহাদিগের নাম-মিষ্টার জর্জ প্লাউভেন, মিষ্টার গােল্ডবেরী এবং মিষ্টার ষ্টেনফোর্থ। প্লাউডেন সাহেব বর্ধমান বিভাগের কমিশনার ছিলেন। ইহারই ধারা চমাধব বাবুর ডেপুটি কলেক্টরী চাকরী নষ্ট হইয়া হইয়াছিল, তাহা পূর্বে বলা হইয়াছে। গােল্ডবেরী সাহেব পর্বে রাজসাহী বিভাগের কমিশনার ছিলেন। প্লাউডেন সাহেব ও স্যর চমাধব ঘােষ গােল্ডবেরী সাহেব প্রথম প্রথম বড় বড় জমিদারের নিকট হইতে কয়েকটা মামলা পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু ওকালতীতে সাফল্যলাভ করিতে পারেন নাই। সেইজন্য তঁাহারা প্রথমেই সরিয়া পড়েন। ষ্টেনফোর্থ সাহেব ইহাদের পর আরও কিছুদিন হাইকোর্টের উকীল ছিলেন, তার পর তিনিও চলিয়া যান। প্লাউডেন সাহেব ও চন্দ্রমাধব বাবু একই আদালতের উকীলও হইলেও উভয়ের মধ্যে কথাবার্তা ছিল না। তবে ঢাকার ওয়াইজ সাহেবের মামলায় প্লাউডেন সাহেব ও চন্দ্ৰমাধব বাবু উভয়েই নিযুক্ত হইয়াছিলেন ; সেই সময়ে দুইজনকে বাধ্য হইয়া কথা কহিতে হইয়াছিল। ষ্টেনফোর্থ সাহেব রেভেনিউ বাের্ডের সদস্য ছিলেন। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে ‘রিভিউ’ মামলায় বিচারপতি রাইকেস ও ষ্টীয়ার সাহেবের এজলাসে ষ্টেনফোর্থ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রতিপক্ষ হইয়া দাড়াইয়াছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই ষ্টেনফোর্থ সাহেবের সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর ঘনষ্ঠ পরিচয় হয়। তাহার যােগ্যতা সম্বন্ধে ষ্টেন সাহেবের উচ্চ ধারণা ছিল । রাসবিহারী ঘােষ ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যায় সম্ভবতঃ ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে বাবু রাসবিহারী ঘােষ, বাৰু গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মৌলবী মহম্মদ ইউসুফ হাইকোর্টের উকীলশ্রেণীভুক্ত হয়েন। গুরুদাস বাবু কিছুদিন মুর্শিদাবাদের উকীল ছিলেন, সেই জন্য রাসবিহারী বাবুর কিছু পরে তিনি হাইকোর্টে আসেন। বাবু ত্রৈলােক্য নাথ মিত্র (পরে ডক্টর) পূৰ্বে হুগলীতে ওকালতী করিতেন, ইনিও রাসবিহারী বাবুর পরে হাইকোর্টে ভর্তি হয়েন। ইহারা সকলেই যােগা ব্যক্তি, এবং অল্পদিনের মধ্যেই হাইকোটে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মৌলবী মহম্মদ ইউসুফ (হিন্দু হইতে মুসলমান ধর্মে শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ দীক্ষিত) মুন্সী আমীর আলীর অনুগ্রহে গয়া হইতে আসিয়াছিলেন। ইউসুফ সাহেব দক্ষ, চতুর ও পরিশ্রমী ছিলেন। হাইকোটে শীঘ্রই তাহার পশার জমিয়া উঠে। বিচারপতি দ্বারিকানাথ মিত্রের মৃত্যু হইলে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত কাহাকে করা হইবে—ইহা নির্ধারণ করিবার জন্য কোন্ উকীল কত মামলা পান তাহার একটী তালিক। তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি স্যর রিচার্ড কাউচের আদেশে প্রস্তুত হইয়াছিল। এই তালিকায় ইউসুফ সাহেবের নাম প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছিল। বাবু রাসবিহারী ঘােষ উকীল হইবার অল্পদিন পরেই ডক্টর (Doctor) উপাধি লাভ করেন। কিন্তু তাঁহার স্বভাব অত্যন্ত উদ্ধত ছিল এবং অল্পেই রাগিয়া উঠিতেন বলিয়া অধিকাংশ উকীল ও জজ তাহাকে পছন্দ করিতেন না। তবে আইনে প্রগাঢ় অধিকার ছিল বলিয়া তাঁহার সম্মান অত্যন্ত অধিক ছিল। গুরুদাস বন্দ্যেপাধ্যায় রাসবিহারী বাবুর তুল্য প্রতিভাসম্পন্ন না হইলেও তিনি আইনে সুপণ্ডিত ছিলেন এবং তাহার স্বভাব ছিল নম্র, ব্যবহারও ছিল শিষ্ট-শান্ত ; বিশেষতঃ যে কেহ তাহার নিকটে আসিতেন, তঁাহারই সহিত তিনি সদ্ব্যবহার করিতেন বলিয়া তিনি শীঘ্রই লােকের প্রতিশ্রদ্ধার পাত্র হইয়া উঠেন। চন্দ্ৰমাধব বাবুর সংহত গুরুদাস বাবুর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় এবং ক্রমে উভয়ে উভয়ের অনুরাগী হইয়া উঠেন। ত্রৈলােক্যনাথ মিত্র রাসবিহারী বাবু ও গুরুদাস বাবুর সমতুল্য ছিলেন না, তাহার স্থান উহাদের অপেক্ষা নিম্নে ছিল । এই সময়ে আরও কয়েকজন ভদ্রলােক হাইকোটের উকীলশ্রেণী- ভুক্ত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের নান - মিষ্টার রেঞ্চফোট; ইনি পূর্বে খুলনার লবণ বিভাগের অধ্যক্ষ । Salt-Superintende) ছিলেন ; বাবু, রাজেন্দ্র মিত্র এবং বাবু শনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্ৰনাথ বাবু ৯৪ সুর চন্দ্র মাধব ঘােষ বিক্রমপুরের অধিবাসী। ইহাদের সকলেরই সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর বন্ধুত্ব হইয়াছিল। প্রথম সন্তানের মৃত্যু ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দের ১৪ই জানুয়ারী তারিখে চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রথম পুত্রের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাহার বয়স হইয়াছিল মাত্র ৬ বৎসর। জ্ঞানেন্দ্র সারীপাড়ার বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছিল এবং প্রথম হইতেই বিদ্যালয়ে প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিল। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অনেক গুলি বাঙ্গালা বই সে পড়িয়াছিল ; এমন কি, সে বাঙ্গালাতে জ্যামিতিও অধ্যয়ন করিতেছিল। একবার একজন প্রসিদ্ধ সিভিল সার্জন চমাধব বাবুর বাড়ীতে একটা রােগী দেখিতে আসিয়াছিলেন। সেই সময়ে তিনি জ্ঞানেন্দ্রকে পাঠে নিযুক্ত দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞসা করেন বালকটী কি পড়িতেছে। এই প্রশ্নের উত্তরে তাহাকে বলা হয় যে বালকটি জ্যামিতি (Geometry) পড়িতেছে। তখন সিভিল সার্জন বলেন, আপনারা ছেলেটাকে বধ করিতেছেন। শেষে তাহার কথাই ফলিল ; জ্ঞানেন্দ্র আমাশয় রােগে আক্রান্ত হইয়া মারা পড়িল। ছেলেটা দেখিতে অতি সুশ্রী ছিল। অতি অল্প বয়সে তাহার গুণপণা দেখিয়া লােকে বলিত-এ ছেলে আঁচিলে হয়! জানেরে মৃত্যুতে চমাধব বাবুর পরিবারে শােকের যে আঘাত লাগিয়াছিল তাহা বর্ণনা করা যায় না। পরিবারের প্রত্যেকেই জ্ঞানেন্দ্রকে ভালবাসিতেন। বিশেষতঃ চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতার সে অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিল। জ্ঞানেন্দ্র পিতামহের কোলে বসিয়া আছে—এরূপ অবস্থার একখানি ফটোগ্রাফ আছে। জ্ঞানেরে মৃত্যুর পর চন্দ্রমাধব বাবুদের পরিবারে আরও তিনজনের মৃত্যু ঘটে। (১) চন্দ্ৰমাধব বাবুর জ্যেষ্ঠ তাত হর প্রসাদ, ঘােষ; (২) চন্দ্ৰমাধববাবুর জ্যেষ্ঠতাত-পুত্র বাবু নীলমাধব ঘোষের একমাত্র পুত্র এবং স্যর চমাধব ঘােষ (৩) নীলমাধবের মাস। পর পর এই চারি জনের মৃত্যুতে চমাধব বাবুর মন এরূপ ভাঙ্গিয়া যায় যে, তিনি ওকালতীতে মন দিতে অসমর্থ হয়েন। এমন কি, সন্ধ্যার সময়ে তিনি আফিস-ঘরে পর্যন্ত বসিতেন না। এইজন্য তঁাহার ওকালতীতে অত্যন্ত ক্ষতি হয় ; বাবসা মন্দা পড়িয়া যায়। তাঁহার পশার মন্দ হইবার আর একটা কারণ—তাহার দুইজন মুহুরী আনন্দনাথ চৌধুরী ও অম্বিকাচরণ বসু তাহার পূর্ববস্থিত কতিপয় মক্কেলের সহিত ষড়যন্ত্র করে ; ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য--যাহাতে তাহারা তাঁহাদের পুরাতন মােক্তার ছাড়িয়া দিয়া উহাদিগকেই তাহাদের মােতার করেন। দুই একটা স্থলে উহাদের এই উদ্দেশ্য সফলও হইয়াছিল। পূর্ববঙ্গের কয়েকজন মােক্তার এই ষড়যন্ত্রের বিষয় জানিতে পারেন এবং চমাধব বাবুর হাতে মামলা দিতে ভীত হয়েন। ইহাতে চন্দ্ৰমাধব বাবুর পূর্ববঙ্গের মামলা খুব কমিয়া যায় । এক সময়ে তাহার হাতে পূর্ববঙ্গের মামলা একেবারেই কমিয়া গিয়াছিল ; এমন কি, দুই চারিটাও আসিত কি না সন্দেহ। অতঃপর তঁাহার চক্ষু খুলে। তখন তিনি বুঝিতে পারেন যে, তাহার ঔদাসীন্যে ও তাঁহার মুহুরীদের আচরণে তাঁহার কি বিপুল ক্ষতি হইয়াছে। এই সময়ে উকীল বাবু রমেশচন্দ্র মিত্র পূর্ববঙ্গের মোরদিগের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। হারা চন্দ্ৰমাধব বাবুর মূহুরীদের আচরণে শঙ্কিত হইয়া রমেশচন্দ্রকে মামলা দিতে লাগিলেন। ইহাতে পূর্ববঙ্গ ও প্রেসিডেন্সী বিভাগের বিস্তর মামলা তঁাহার হস্তচ্যুত হইয়া পড়ে। অনেক চেষ্টা করিয়াও তিমি পরে তাহার এই দুই অঞ্চলের বিপুল পশার ফিরিয়া পান নাই। অবশ্য, অনেকটা পাের আবার ফিরিয়াছিল বটে, কিন্তু সমস্ত পশার আর ফিরিয়া আসে নাই। বিহার অঞ্চলের পশারও তাহার কতকটা নষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু তিনি আবার ;

স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ তাহা ফিরিয়া পাইয়াছিলেন। বাবু অনুকুলচন্দ্র মুখােপাধ্যায় বিহারের মামলাই খুব বেশী করিতেন। ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন ; তাহার পর হইতে চন্দ্ৰমাধব বাবুর হাতেই বিহারের মামলা খুব বেশী আসিতে থাকে। ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে বাবু রমেশ- চন্দ্র মিত্র হাইকোটের জজ হয়েন। সেই সময়ে চন্দ্র মাধব বাবু বিহারের মামল। যত পাইতেন এত আর কোনও উকীল পাইতেন না। বিহারের যত ভাল ভাল মামলা সে সমস্তই চ5 মাধব বাবু ও বাবু মহেশচন্দ্র চৌধুরী ভাগাভাগি করিয়া পাইতেন। তবে চন্দ্ৰমাধব বাবুর সকল অঞ্চলের মামলা ধরিলে তাহাদের সংখ্যা মহেশ বাবুর অপেক্ষা অনেক বেশী হইত। মহেশবাবুর পশার বেশীর ভাগ বিহারেই আবদ্ধ ছিল । জামাতার মৃত্যু এবং যে বৎসর চন্দ্রমাধব বাবুর পরিবারে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে যাহার ফলে তাহার পশার কমিয়া যায়, সেই বৎসর হার প্রথম কন্যা মােড়শীবালা জন্ম গ্রহণ করে। চন্দ্রমাধব বাবু তখন কাসারিপাড়ায় রামকুমার যাত্ৰাওয়ালার বাড়ীতে থাকিতেন। ইহার পরে তাহার আরও দুইটী সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় কনিষ্ঠ পুত্র সুরেন্দ্র চন্দ্র এবং দ্বিতীয় কন্যা নলিনীবালা। সুরেন্দ্রচন্দ্রের জন্ম হয় ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে এবং নলিনীবালা জন্ম গ্রহণ করে—১৮৬৯ খৃষ্টাব্দে। ইহারা যে বাড়ীতে ভূমিষ্ট হয় সেই বাড়ী ভবানীপুর ৮নং চন্দ্রনাথ চাটার্জীর স্ত্রীটে অবস্থিত। এই বাঙী চমাধব বাৰু ক্রয় করিয়াছিলেন ও উহার সংস্কার-সাধনও করিয়াছিলেন। ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে তাহার প্রথম কন্যার সহিত টাকার জমিদার স্বর্গীয় তারাশঙ্কর রায়চৌধুরীর পুত্র বাবু, অক্ষয়চন্দ্র রায়চৌধুরীর বিবাহ মহাসমারােহে সম্পন্ন হইয়াছিল। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে অক্ষয়চন্দ্র ওলাউঠা- রােগে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েন। তিনি ভবানীপুরে থাকিয়া লেখাপড়া স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ শিখিতেছিলেন। এই ঘটনায় চক্ৰমাধব বাবুর পরিবারে আবার শােকের ঝ উঠে। অক্ষয়রে আকৃতি ছিল যেমন সুন্দর প্রকৃতিও ছিল তেমনই সং। স্বভাব মধুর ছিল বলিয়া তিনি সকলেরই প্রীতি-ভাজন ছিলেন। অক্ষয়চন্দ্রের মৃত্যুকালে তাহার কন্যা যােড়শীবালার বয়স হইয়াছিল মাত্র ১৩ বৎসর। অক্ষয়চন্দ্রের মৃত্যুকালে ষড়শীবালা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং পরে তাহার এক কন্যা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিন বৎসরের কন্যাটা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। পশার হাস হওয়ায় চন্দ্ৰমাধব বাবু উত্তমরূপে উপলব্ধি করিতে পারেন যে, ওকালতী কঠোর শ্রমসাধ্য কাৰ্য। ওকালতীতে সাফল্য লাভ করিতে হইলে এবং সেই সাফল্য অক্ষুন্ন রাখিতে হইলে কেবল পাণ্ডিত্য ও কৌশল থাকিলেই চলিবে না, একটানা কঠোর পরিশ্রম করিতে হইবে। পশার হইয়াছে আর ভয় কি—এই মনে করিয়া একটু শৈথিল্য দেখাইলেই তাহার পতন হইবে। কারণ, যাহারা মামলা জোগাইয়া থাকে তাহারা সর্বদাই উকীলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিয়া থাকে। তাহারা কেবল দেখেউকীল তাহাদের মামলার জন্য ভাল করিয়া প্রস্তুত হইতেছে কি না। উকীলকে কেবল যে আদালতেই ভাল কাজ করিতে হইবে তাহা নহে, বাড়ীতেও মামলার জন্য খাটিয়া-খুটিয়া উকীলকে প্রস্তুত হইতে দেখিলে মক্কেলের বিশ্বাস জন্মে যে, তাহার উকীল তাহার জন্য বিশেষ শ্রম স্বীকার করিতেছেন। মক্কেলের এই বিশ্বাসই উকীলের সাফল্যের মুল। একবার এই বিশ্বাস নষ্ট হইলে উকীলের পশারও নষ্ট হইয়া থাকে। চন্দ্ৰমাধব বাবু এমন সকল মামলায় বেশীর ভাগ নিযুক্ত হইতেন, যে সকল মামলার বিচার্য বিষয় হইত ম্যাপ অর্থাৎ যাহাদের বিচারের সময়ে ম্যাপ-সংক্রান্ত আলােচনা উত্থাপিত হইত। এই শ্রেণীর মামলায় বাবু শ্ৰনাথ দাসের কৃতিত্ব ও পারদর্শিতা সমধিক ছিল। লােকে শৰ চমাধব ঘােম হাকে এই শ্রেণীর মামলা পরিচালনার পক্ষে ভাল উকীল মনে করিতেন। চন্দ্রমাধব বাবুকে লােকে এই বিষয়ে শ্রীনাথ বাবুর ঠিক পরবর্তীই মনে করিতেন। এই শ্রেণীর অনেক মামলায় লােকে চমাধব বাবুকে শ্রীনাথ বাবুর বিরুদ্ধে নিযুক্ত করিত। চমাধব বাবু এইসকল মামলায় শ্ৰনাথ বাবুর যােগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এবং অনেক মামলায় তাহাকে চমাধব বাৰু হারাইয়াও দিতেন—বিশেষতঃ বিহার অঞ্চল হইতে আগত এই শ্রেণীর মামলায়। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে শুর বার্ণেস পিকক ছুট লয়েন ; তাঁহার স্থলে বিচারপতি মিষ্টার নরমান অস্থায়ীভাবে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। মিষ্টার নরম্যান কিন্তু সিনিয়র পিউনি জজ (Senior Puisne Judge) ছিলেন না, তথাপি তাহাকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করা হইয়াছিল। ইহার কারণ সম্ভবতঃ ইহাই ছিল যে, আইন- অনুসারে ব্যারিষ্টার জজ ভিন্ন আর কাহাকেও অন্ততঃ কিছুদিনের জন্যও প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করা যাইত না। পর বৎসর অর্থাৎ ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার মার্কবি (পরে স্যর উইলিয়ম মার্কবি ) হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। তিনি অত্যন্ত ভদ্র, শিষ্টাচারসম্পন্ন, সদয়হৃদয় ব্যক্তি ছিলেন ; আইনেও তাহার প্রভূত জ্ঞান ছিল এবং তিনি বিবেক-বুদ্ধি-অনুসারে বিচারকার্য নিষ্পম করিতেন। অন্যান্য বিচারপতি অপেক্ষা মামলা বুঝিয়া লইতে তাঁহার দেরী হইত এবং উহার রায় দিতেও তিনি অধিক বিলম্ব করিতেন। বিচারপতি জ্যাকসন সাহেবের সহযােগী হইয়া তিনি বিচারাসনে বসিলে জ্যাকসন সাহেবকে বিব্রত হইতে হইত। তিনি তাড়াতাড়ি বিচারকার্যে অগ্রসর হইতে পারিতেন না। মার্কবি সাহেব বালক অপরাধীদিগের চরিত্র-সংশােধনের জন্য অত্যন্ত চেষ্টা করিতেন। এক সময়ে চমাধব বাধু তাহার সহিত এই কার্যে ব্ৰতী হইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার কোনও শ্যর চােধর ঘোষ ফল হয় নাই। মিষ্টার মার্কবি চন্দ্ৰমাধব বাবুর গুণের পক্ষপাতী ছিলেন এবং তাহার সম্বন্ধে উহার উচ্চধারণা ছিল। ১৮৬৬ অথবা ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে চন্দ্রমাধব বাবুর পিতৃদেব ঢাকার জ রপ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন। এই সময়ে তাঁহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হইয়াছিল; তিনি প্রায়ই রােগে ভুগিতেন। এইজন্য চন্দ্রমাধব বাবু তাঁহার পিতাকে জোর করিয়া বলেন-“আপনি পেন্সন লউন আর চাকরী করিবার প্রয়ােজন নাই। আমি আপনার একমাত্র পুত্র, আমি যথেষ্ট উপার্জন করিতেছি ; আমার উপার্জনে আমাদের পরিবার প্রতিপালন স্বচ্ছলে হইতেছে। এমন অবস্থায় আর আপনার চাকুরী করিবার প্রয়ােজন নাই। এখন পেন্সন লইলে আপনি তিনশত টাকা পেন্সন পাইবেন ইহা ত কম নহে সুতরাং আপনি অবসর গ্রহণ করুন।” পুত্রের কথায় পিতা পেন্সনের দরখাস্ত করিলেন কিন্তু রেভেনিউ সার্ভে বিভাগের অধ্যক্ষ চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতাকে অবসর দিতে অসম্মত ছিলেন, ইহার কারণ আর কিছুই নহে-দুর্গাপ্রসাদ বাবু সুযােগ্য কর্মচারী ছিলেন এবং জরীপের ব্যাপারে তাহার প্রভূত অভিজ্ঞতা ছিল। সেইজন্য উক্ত অধ্যক্ষ দুর্গাপ্রসাদ বাবুকে বলিলেন, “আমি রেভেনিউ বাের্ডকে দিয়া সুপারিশ করিয়া প্ৰম শ্রেণীর ডেপুটী কলেক্টর করিয়া দিব আপনি, এখন পেন্সনের দরখাস্ত করিবেন, না।” দুর্গাপ্রসাদ বাবু এই বিষয় তাহার পুত্রকে লিখিয়া জানাইলেন। চন্দ্র মাধব বাবু তখন ঢাকায় গিয়া তাহার পিতার উপরিওয়ালা জরীপ বিভাগের অধ্যক্ষের সহিত দেখা করাই যুক্তিযুক্ত মনে করিলে। পূজার ছু তে তিনি ঢাকায় যাইলেন এবং তঁাহর পিতাকে সঙ্গে লইয়া ৩ধ্যক্ষ মহাশয়ের নিকট তাহার বক্তব্য নিবেদন করিলেন। তাহার কথার সারবত্তা উপলব্ধি করিয়া অধ্যক্ষ মহাশয় ( Superintendent of Surveys) চুপ করিয়া রহিলেন। তিনি পরে দুর্গাপ্রসাদ বাবুর স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ পেন্সনের দরখাস্ত রেভেনিউ বাের্ডের নিকট পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। ঢাকার সমস্ত উচ্চপদস্থ দেশীয় সরকারী কর্মচারী চন্দ্র মাধব বাবুর পিতাকে সম্মান করিতেন এবং সকলেই তঁাহার অনুরাগী ছিলেন । তাঁহারা প্রায় সকলেই চন্দ্ৰমাধব বাবুকে সনির্বন্ধ অনুরােধ করিলেন যে, তিনি যেন তাঁহার পিতাকে পেন্সন লইতে জিদ না করেন। চন্দ্র মাধব বাবু কিন্তু তাঁহাদের এ অনুরােধ রক্ষা করতে অসম্মত হইলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতারও এত শীঘ্র চাকুরী হইতে অবসর লইবার ইচ্ছা ছিল না। এদিকে রেভেনিউ বােডে তাঁহার পিতার পেন্সনের দরখাস্ত পাইয়া লিখিয়া জানাইলেন যে, দুর্গাপ্রসাদ বাবু যদি আরও কিছুদিন চাকুরী করেন তাহা হইলে বোর্ড খুব খুসী হইবেন। দুর্গাপ্রসাদ বাবু বোর্ডের এই অনুরােধ রক্ষা করিতে অসম্মত ছিলেন না, কিন্তু চন্দ্ৰমাধব বাৰু সঙ্কল্প করিয়া বসিলেন, কিছুতেই আর হার পিতার চাকুরী করা হইবে না। তিনি স্পষ্টই তাঁহার পিতাকে বলিলেন- “এত অধিক বয়সে ক্ষুন্ন স্বাস্থ্য হইয়া কঠিন পরিশ্রম করিলে আত্মঘাতী হইতে হইবে। পেন্সন আপনাকে লইতেই হইবে।” পরিশেষে পুত্রের অনুরােধই প্রবল হইল ; দুর্গাপ্রসাদ বাবু বাের্ডকে জানাইলেন যে, তিনি পেন্সন লইবেন। অতঃপর গভর্ণমেন্ট তাহার পেন্সনের দরখাস্ত মঞ্জুর করলেন এবং তৎসহ তাঁহাকে রায় বাহাদুর উপাধিও দিলেন। পেন্সন লইয়া চমাধব বাবুর পিতা ঢাকা হইতে মাধব বাবুর মাতা ও ভগিনীকে সঙ্গে লইয়া কলিকাতায় আগমন করিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু কিছুদিন পূর্বে চন্দ্রনাথ চাটার্জীর স্ট্রীটে যে বাট ক্রয় করিয়াছিলেন এবং যাহা মেরামত করিয়া একেবারে নৃতন করিয়া লইয়াছিলেন মাধব বাবুর পিতা পরিজনবর্গের সহিত সেই বাড়ীতেই বাস করিতে লাগিলেন। তখনকার কালে রায় বাহাদুর উপাধি এখনকার মত সুলভ হয় না। ;

শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ তখনকার কালে কেবল ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট ও সবজদিগকেই এই উপাধি দেওয়া হইত এব তাহারা সরকারী কর্মে নিযুক্ত থাকিবার কালেই অথাৎ পেন্সন লইবার পূর্বেই এই উপাধি পাইতেন। আমাদের বিশ্বাস চন্দ্র মাধব বাবুর পিতাকেই অবসর গ্রহণের পর গভর্ণমেন্ট সর্বপ্রথম রায় বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার সি-পি হবহাউস (পরে স্যর চালস হবহাউস বাট) হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। ইনি পূৰ্ব্বে বর্ধমানের কলেক্টর ছিলেন ও পরে জেল-জজ হইয়াছিলেন। চন্দ্রমাধব বাবুর পিতা যখন বর্ধমানে ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন তখন এই হবহাউস সাহেব তাহার উপরওয়ালা ছিলেন। হাইকোটে কিন্তু ইনি জজ-হিসাবে সাফল্য অর্জন করিতে পারেন নাই। তিনি যত দিন হাইকোর্টের জজ ছিলেন ততদিন চন্দ্র মাধব বাবুর সহিত তিনি ভাল ব্যবহারই করিয়া- ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে তিনি হাইকোর্ট হইতে অবসর গ্রহণ করেন ; সেই সময়ে তাঁহার পিতৃব্যের মৃত্যু হইলে তিনি ব্যারণ (Baron) হয়েন। ১৮৬৬ বা :৮৬৭ খৃষ্টাব্দে বিচারপতি শম্ভুনাথ পণ্ডিত মহাশয়ের মৃত্যু হয়। তঁাহার মৃত্যুতে সকল সম্প্রদায়ের লােকই শােকপ্রকাশ করিয়াছিলেন, কারণ বিচারক-হিসাবে তিনি প্রভূত প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়া ছিলেন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় হইয়াছিলেন। উকীল বাবু দ্বারিকানাথ মিত্র তাহার স্থলে বিচারক নিযুক্ত হয়েন। তাহার যােগ্যর বিষয় সকলের বিদিত ছিল বলিয়া তাহার নিয়ােগে সকল শ্রেণীর লােকই আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিল। চন্দ্ৰমাধব বাবুব পীড়া সম্ভবত ১৮৭০ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে চন্দ্ৰমাধব বাবুর পৃষ্ঠব্রণ হয় ছিলেন ।

স্যর চলমাধব ঘােষ ক্রমেই উহা বৃদ্ধি পাইতে থাকে এবং যাতনাদায়ক হইয়া উঠে। ডার সূৰ্যকুমার সৰ্বাধিকারী তখন চমাধববাবুর পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ও ডাকার কাশীচন্দ্র দত্ত পৃষ্ঠৰণী পরীক্ষা কবিয়া দেখিলেন, কিন্তু অস্ত্রোপচার করা উচিত কি না সে বিষয়ে তঁাহারা একমত হইতে পারিলেন না; কাজেই কলিকাতার তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ শল্য-চিকিৎসক ফেরার সাহেবকে আনা হইল। ফেরার সাহেব ব্রণটা দেখিয়া বলিলেন -“অস্ত্র করা ছাড়া আর অন্য উপায় নাই; তবে হাইকোর্ট পূজার ছুটীতে বন্ধ হইলে পরও অস্ত্রোপচার করা যাইতে পারে।” ফেরার সাহেব চলিয়া যাইবার পর তিনি ডাক্তার সূৰ্যকুমার ও ভাজার কাশীচন্দ্রকে বলিলেন--“অস্ত্রই যদি করিতে হয় তাহা হইলে আর বিলম্ব করিবেন না, অবিলম্বে অস্ত্র করুন। সূর্যবাবু আপনি শীব্র অস্ত্র করিবার জন্য ব্যবস্থা করুন। ইহাতে সূর্যবাবু বলেন-- আমি যখন আপনাদের পারিবারিক চিকিৎসক এবং অস্ত্র করিতে সমর্থ তখন আমি অস্ত্রোপচার করিব। তবে আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহা হইলে ফেরার সাহেবকে উপস্থিত থাকিতে বলিতে পারেন। ইহাতে চন্দ্ৰমাধব বাবু উত্তর করেন—“ফেরার সাহেবকে যদি ছুরি ধরিতে না হয় তাহা হইলে তাহাকে আনিবার দরকার নাই। আপনি আজই অস্ত্রোপচার করিবার ব্যবস্থা করুন।” তৎক্ষণাৎ চন্দ্ৰমাধব বাবুর পৃষ্ঠব্ৰণে অস্ত্রোপচার করিবার ব্যবস্থা করা হইল। তিনজন ডাক্তার এই কাৰ্যে ব্রতী হইলেন; স্থির হইল, সূৰ্য্যকুমার বাবু অস্ত্র করিবেন, কাশীচন্দ্ৰ বাৰু তাহার সহযােগিতা করিবেন এবং ডাক্তার বিহারীলাল ঘােষ রােগীকে ক্লোরােফরম (Chloroform ) করিবেন। চন্দ্রমাধব বাবুর পূর্ব হইতে ধারণা ছিল যে, ক্লোরােফরম করিলে রােগী আর বাঁচে না-অজ্ঞান অবস্থাতেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সেইজন্য ক্লোরাে- ফরম দ্বারা অজ্ঞান হইতে চমাধব বাবু অনিচ্ছুক ছিলেন, তাই যখন র চমাধব ঘোষ ; ২০ মিনিট ধরিয়া ক্লোরােফরম প্রয়ােগ করা হয় এবং যখন তিনি বুঝিতে পারেন যে, তাহার সংজ্ঞা প্রায় লুপ্ত হইয়া আসিতেছে, তখন তিনি সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িয়াছেন এইরূপ ভাণ করেন ; প্রকৃতপক্ষে তিনি সংজ্ঞা হারান নাই। ডাক্তার মনে করেন ক্লোরােফরম-প্ৰয়ােগ সফল হইয়াছে, চন্দ্রমাধব বাবু অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছেন আর ক্লোরােফরম দিবার প্রয়োজন নাই। চমাধব বাবুকে অজ্ঞান মনে করিয়া সূৰ্য্যকুমার বাবু অস্ত্রোপচার আরম্ভ করিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু সম্পূর্ণ সজ্ঞান অবস্থায় অস্ত্র-প্ৰয়ােগের তীব্র যন্ত্রণা দন্তে দন্ত দিয়া অসামান্য সহিষ্ণুতার সহিত সহ করিতে লাগিলেন। অস্ত্র- প্রয়ােগ ঠিকমত হয় নাই। প্রথমতঃ সূর্য কুমার বাবু উৎকৃষ্ট অস্ত্রো- পচারবিৎ ছিলেন না; দ্বিতীয়তঃ তাহার ছুরি ভাল ছিল না • অস্ত্র করিতে করিতে তঁাহাকে ছুরি বদল করতে হইয়াছিল, কারণ তাঁহার নিজের ছুরিতে একবার কি দুইবার ব্রণ কাটে নাই। একবার কাটা এত খারাপ হইয়াছিল যে, চন্দ্রমাধব বংকে গােঙাইতে হইয়াছিল। ডাক্তার বিহারী বাবু তৎক্ষণাৎ তাহার নাসিকায় ক্লোরােফরম প্রয়ােগ করেন কিন্তু ১মাধব বাবু পুনরায় সংজ্ঞাশূন্য হইয়াছেন এইরূপ ভাণ করেন। যাহা হউক অস্ত্রোপচার শেষ হইয়া যাইল ; কত্তিত স্থান সেলাই করিয়া দেওয়া হইল ; ডাক্তারের সূর্যকুমার বাবুকে অস্বােপারে সাফল্যের জন্য প্রশংসা করিলেন। অন্য দুইজন ডাক্তার জ্ঞান আনিবার জন্য তাহার মুখে জল ছিটাইতে লাগিলেন। তখন মাধব বলিলেন, ''আর মুখে জল দিবার দরকার নাই, যাহা হইয়াছে সবই আমি জানি, কারণ আমি জ্ঞান হারাই নাই।” ডাক্তারেরা ইহাতে বিস্মিত হয়েন এবং মনে করেন, মাধব বাবু ক্লোরােফরমের ঘােরে এইরূপ কথা বলিতেছেন। সেইজন্য তাহারা তাহার ঘাের কাটাইবার নিমিত্ত আবার তাহার মুখে জল ছিটাইতে আরম্ভ করিলেন। তখন মাধব ১০৪ স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ বাবু চক্ষু মেলিয়া বলিলেন-“আমার সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল , সজ্ঞানে আমি অস্ত্রোপচার করাইয়াছি।" এই বলিয়া একে একে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল তিনি সকলই বর্ণনা করিলেন। তখন ডাক্তারেরা তাহার অসাধারণ ধৈৰ্য্য, সহিষ্ণুতা ও সাহসের পরিচয় পাইয়া স্তম্ভিত হইয়া যাইলেন এবং সেজন্য তাহার প্রভূত সাধুবাদ করিতে লাগিলেন। যৌবনে চন্দ্রমাধব বাবু সত্যই অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি ছিলেন এবং কোন প্রকার শারীরিক কষ্ট বা দুঃখকে গ্রাহ্য করিতেন না, শারীরিক যন্ত্রণ। তিনি সহ্য করিতে পারিতেন। কিন্তু পরিণত বয়সে তাহার সেরূপ সাহস ও সহিষ্ণুতা ছিল না। পরিণত বয়সে সজ্ঞানে অস্ত্রোপচার করিতে তাহার ভয় হইত। যাহা হউক, পৃষ্ঠব্রণে অস্ত্রোপচারের ফলে তাহাকে দুই মাস শয্যাগত থাকিতে হইয়াছিল। দুইমাসের পর ক্ষতস্থান শুষ্ক হইলে তিনি তাহার জ্যেষ্ঠতাত-পুত্র বাবু নীলকমল ঘােষের সহিত বায়ু-পরিবর্তনার্থ এলাহাবাদ গমন করেন। সেই সময় তাহার পুত্র যােগেন্দ্র চন্দ্র ঘােষ তঁাহার সহিত গিয়াছিলেন তিনি তখন অত্যন্ত বালক। পূজার দীর্ঘ অবকাশের পর তিনি এলাহাবাদ হইতে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। খৃষ্টাব্দে মিষ্টার ডব্লিউ এঙ্গি হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। তিনি সিবিলিয়ান। পূর্বে তিন জেল-জজ ছিলেন। তিনি পরিশ্রমী, অভিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ও বিবেকবুকিসম্পন্ন বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন বিচারক ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবুর সম্বন্ধে তিনি উচ্চধারণা পোষণ করিতেন। ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে প্রধান বিচারপতি স্যর বর্ণেস পিকক পুনরায় ছুটা লইয়া বিলাত যাত্রা করেন। সেবারও বিচারপতি নরম্যান সাহেব সিনিয়র পিউনি জজ না হইয়াও তঁাহার স্থলাভিষিক্ত হইয়া অস্থায়ীভাবে কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন। প্রধান বিচারপতির পদে অস্থায়ীভাবে কাৰ্য করিবার সময়ে ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে তিনি আততায়ীর হস্তে নিহত হইয়াছিলেন। ১৮৭০ স্যর চমাধব ঘােষ স্যর বার্নেস পিকক ছুটীতে বিলাতে থাকিবার সময়েই—তথ। হইতেই অবসর গ্রহণ করেন। স্থর রিচার্ড কাউচ তাহার স্থলে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হইয়া আসেন । স্যর বার্ণেসের অবসর গ্রহণের পরে হাইকোটের উকীলগণ সমবেত হইয়া স্থির কবেন যে, তাহারা এই প্রসিদ্ধ বিচারপতির একটা তৈলচিত্র প্রস্তুত করাইয়া উহা হাইকোটে রাখিবেন। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জার বিষয়, তাহারা তাহাদের সে সঙ্কল্প কায্যে পরিণত করিতে পারেন নাই। তবে তঁাহারা তাহাকে যে বিদায়-অভিনন্দন প্রদান করিয়াছিলেন তাহা তাহারা ইংলণ্ডে স্যর বার্গেসের নিকট পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তৈলচিত্র প্রস্তুত হয় নাই, ইহার কারণ অকিাংশ উকীল চাদা দিতে চাহেন নাই। ইহা প্রস্তুত করিতে খরচাও অনেক পড়িত। অথচ স্যর বার্ণেসকে সকলেই একজন বড়দরের জজ বলিয়া মনে করিতেন। সঁহার সম্বন্ধে চন্দ্ৰমাধব বাবুর অভিমত ইহাই ছিল যে, তাহার সম-সময়ে তঁাহার তুল্য যােগ্য, ধর্মভীরু, স্থির-ধীর, অভিজ্ঞ, পরিশ্রমী, ব্যবহারশাস্ত্রবিং বিচারক দ্বিতীয় আর কেহ হাইকোর্টে ছিলেন না। স্যর রিচার্ড কাউচ কলিকাতায় আসিয়া কার্যভার গ্রহণ করিবার পূৰ্বে তদানীন্তন সিনিয়র পিউনি জজ মিষ্টার কেম্প অস্থায়ীভাবে প্রধান বিচারপ তর পদে কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন। বিচারপতি নরন্যান সাহেবের হত্যার পরই কেম্প সাহেবকে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা হইয়াছিল । স্যর রিচার্ড কাউচ প্রধান বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত হইয়া অল্পদিনের মধ্যেই তাহার যােগ্যতার ও বিবেকবুদ্ধির পরিচয় দিয়াছিলেন। কিন্তু স্যর বার্ণেসের সহিত তাহার তুলনা করা যাইতে পারিত না। শ্যর রিচার্ড মােটেই শিষ্টাচারপরায়ণ ছিলেন না , উকীল ব্যারিষ্টারদিগের সুর চন্দ্রমাধব ঘােষ প্রতি তিনি বড় কর্কশ ব্যবহার করতেন। মাঝে মাঝে তিনি অধৈৰ্য্য হইয়া উঠিতেন। সেজন্য তিনি লােকের অনুরাগ আকর্ষণ করিতে পারেন নাই। তাই ১৮৭৫ খষ্টাব্দে যখন তিনি অবসর গ্রহণ করিয়া স্বদেশ যাত্রা করেন, সেই সময়ে উকীলেরা তাহাকে বিদায়- অভিনন্দন প্রদান করেন নাই ; সম্ভবতঃ ব্যারিষ্টাররাও তাহার সম্মানার্থ ভঁহাকে ভােজ দেন নাই। একটা অত্যন্ত জটিল আপীল-মামলা অনেক দিন ধরিয়া স্যর রিচার্ড কাউচের এজলাসে হইয়াছিল। এই মামলায় আপীল- কারীদের তরফে চন্দ্ৰমাধব বাবু নিযুক্ত হইয়াছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবুর যুক্তিতর্কপূর্ণ সওয়াল শুনিয়া স্যর রিচার্ডের মনে তাহার সম্বন্ধে উচ্চধারণা জন্মিয়াছিল এবং বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্রের নিকট তিন চন্দ্রমাধব বাবুর অত্যন্ত প্রশংসা করিয়াছিলেন। বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্রের মৃত্যু হইলে তাহার স্থানে কাহাকে নিযুক্ত করা হইবে—ইহা লইয়া আলােচনা হইলে প্রধান বিচারপতি স্যর রিচার্ড কাউচের নিকট যাহাদের নাম প্রস্তাবিত হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে চন্দ্রমাধব বাবুর নামও ছিল। স্যর রিচার্ড কাহার নাম সুপারিশ করিবেন--ইহা লইয়া কিছুদিন ভাবিয়াও ছিলেন। পরিশেষে তিনি আদেশ করেন যে, গত ৪৫ বৎসর কোন্ কোন্ বড় উকীল কত মামলা করিয়াছেন তাহার একটি তালিকা প্রস্তুত করা হউক। এই তালিকা প্রস্তুত হইলে দেখা যায়,-উকীল মহম্মদ ইউসুফ সর্বাপেক্ষা বেশী মামলায় নিযুক্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু তখনও তিনি জুনিয়র। তাহার পরবর্তী উকীলের নাম বাবু রমেশচন্দ্র মিত্র ; রমেশ বাবুর পরেই চন্দ্রমাধব বাবু। সুতরাং রমেশবাবুর নামই প্রধান বিচারপতি মহােদয় সুপারিশ করিলেন এবং বিচারপতি দ্বারকানাথের আসনে তিনিই উপবিষ্ট হইলেন।

তাঁর চমাধব ঘােষ ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে উকীল বাবু রমেশচন্দ্র মিত্র হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। ঐ বৎসরই ব্যারিষ্টার মিষ্টার চালস পলকেও অস্থায়ী- ভাবে বিচারপতি-পদে নিযুক্ত করা হয়। তিনি সুনিপুণ ও যােগ্য ব্যক্তি ছিলেন বটে, কিন্তু বিচারক-হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন নাই। তিনি সময়ে সময়ে অধীরতা ও চাঞ্চল্য প্রকাশ করিতেন এবং স্বতাভিমানী ছিলেন। তঁহার কায্যকাল ঐ বৎসরেই শেষ হইয়া যায়। ঐ বৎসরেই অর্থাৎ ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে উকীল বাবু অনুকূলচন্দ্র মুখাে- পাধ্যায়কে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি-পদে নিযুক্ত করা হয় । অনুকূল বাবুর নিয়ােগে হাইকোটের উকীলদিগের হাইকোর্টের জজ হইবার যােগ্যতা প্রমাণিত হয়। এতদিন মাত্র একজন দেশীয় ব্যক্তিকে হাইকোর্টের জজ করা হইত। অনুকূল বাবুর নিয়োগে সে সংখ্যা বৃদ্ধি পাইল। অনুকূল বাবু বিদ্যাবা, যােগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শিষ্টাচার প্রভৃতি দ্বারা দেখাইয়া দিয়াছিলেন যে, তাহাকে বিচারপতি-পদে নিয়ােজিত করিয়া গবর্ণমেন্ট ঠিক কাজই করিয়াছিলেন। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, বিচারপতি অনুকূলচন্দ্র এক বৎসর গত হইতে না হইতেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েন। তিনি চন্দ্রমাধব বাবুর শুভানুধ্যায়ী বন্ধু ছিলেন। ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার চালস পন্টিফিক্স হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত হইয়া আসেন। তিনি ব্যারিষ্টার ছিলেন। হাইকোকে সমদশী বিচারক হিসাবে তিনি বিচারকার্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন। তিনি যে কেবল বিবেকবুধিসম্পন্ন ছিলেন তাহা নহে, তিনি কর্মতৎপর বুদ্ধিমান এবং স্বাধীনচেতা ছিলেন। কোনও বিশেষ উকীল বা ব্যারিষ্টারের প্রতি তাঁহার পক্ষপা'ততা ছিল না। চন্দ্রমাধব বাবুর যোগ্যতা সম্বন্ধে তাহার উচ্চধারণা ছিল এবং তিনি তাহার গুণের প্রশংসা করতেন।

স্থর চন্দ্রমাধব ঘােষ ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে যখন চন্দ্ৰমাধব বাবু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইয়াছিলেন, সেই সময়ে সেই সংবাদ শুনিয়া তিনি আনন্দ প্রকাশ করিয়া তাহাকে পত্র লিখিয়াছিলেন। পত্রে তিনি আরও লিখিয়াছিলেন যে, বড় দুঃখের বিষয়, এত দন চন্দ্রমাধব বাবুকে জজ করা হয় নাই তিনি (পন্টিফিক্স সাহেব ) যখন হাইকোটের জজ ছিলেন সে সময়ে চমাধব বাবুকে জজ করিলে তাহার সহিত একত্র বসিবার সৌভাগ্য তঁাহার ( পন্টিফিক্স ) হইত। চন্দ্রমাধব বাবুর পিতার মৃত্যু ১৮৭২ বা ১৮৭৩ খৃষ্টাধে চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতা পবলােক গমন করেন। তাহার মৃত্যু আকস্মিকভাবেই হইয়াছিল। দিবা দ্বিপ্রহরের সময়ে তঁাহার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বদিন রাত্রিতে তাহার বুকে বেদনা হইয়াছিল। তিনি ইহা তৎপরদিন প্রাতে তাহার পুত্র চন্দ্রমাধব বাবুকে জানাইয়া ছিলেন। কিন্তু সেইদিন সমস্ত সকাল বেলাটা তিনি বসিয়া বসিয়া চিঠি লিখিয়াছিলেন। যাহা হউক, তখনই ডাক্তার আনাইয়া দেখানো হয়। ডাক্তার বলেন,-“কঠিন অসুখের কোনও লক্ষণ ত দেখতে ছু না; তবে তিনি যেন সকাল সকাল স্নানাহার করিয়া বিশ্রাম করেন।” তদনুসারে তিনি দৈনিক পূজা আহ্নিক ইত্যাদি সত্বর সারিয়া লয়েন এবং আহারাদি করিয়া বাড়ীর অন্দর মহলে দ্বিতলে তাহার ঘরে খাটের উপর বসিয়া তামাক খাইতে থাকেন। সেই সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবু ডেঙ্গুজর ভােগ করিয়া সবে মাত্র সারিয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি তখন নীচের তলায় আহার করিতেছিলেন। সেই সময়ে চমাধব বাবুর পুত্র যােগে উপরতলা হইতে দৌড়িতে দৌড়িতে নামিয়া আসিয়া তাহার পিতাকে বলে-“বাবা ঠাকুরদাদা কেমন করিতেছেন, শীঘ্র উপরে আসুন।” চন্দ্ৰমাধব বাবু তখনই খাবার ফেলিয়া উপরে ছুটিয়া যাইলেন স্যর চমাধব ঘোষ •০ এবং দেখিলেন, তাঁহার পিতা বুকে বালিশ দিয়া চক্ষু মুদিয়া বসিয়া অাছেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু তাহার গায়ে হাত দিয়া ‘বাবা’ বলিয়া ডাক দিতেই তিনি ক্ষীণ স্বরে মাত্র “ও” বলিয়া উঠেন এবং পরক্ষণেই তাহার প্রাণবায়ু বহির্গত হইয়া যায়। তিনি যেন হার একমাত্র পুত্রের নিকট হইতে বিদায় লইবার জন্যই তদবস্থায় বসিয়াছিলেন । চন্দ্ৰমাধব বাবু তখনও বুঝিতে পারেন নাই যে, তাঁহার পিতৃদেবের মৃত্যু হইয়াছে। তাই তাহাকে বিছানায় শােয়াইয়া দিয়া চীৎকার করিয়া সকলকে ডাকিলেন। তাহার ডাক শুনিয়া চমাধব বাবুর মাতা এবং পরিবারের অন্যান্য লােক ছুটিয়া তাহার নিকটে উপস্থিত হয়েন। তখনই ডাক্তার ডাকা হয়। ডাক্তার আসিয়া বলেন-“ইতিপূর্বে ইহার মৃত্যু হইয়াছে ; হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াই মৃত্যুর কারণ” এমন মৃত্যু দুঃখের মৃত্যু নহে-সুখের মৃতু । কারণ, তিনি নিজেও ভুগেন নাই, অপরকেও ভােগান নাই। চন্দ্রমাধব বাবুর পিতা আহার করিবার সময় পুত্রকে বলিয়াছিলেন—“কল্য রাত্রিতে আমার বুকে যেরূপ বেদনা হইয়াছিল, এখন আবার সেইরূপ তীব্র বেদনা হইতেছে। তুমি আমাকে আজই কাশীতে লইয়া চল।” কিন্তু চন্দ্র মাধব বাবু মনে করিলেন এ বেদনা ফি বেদনা—শীঘ্রই আরাম হইবে। তার পর যখন দেখলেন যে, তাঁহার পিতা খাটের উপর বসিলেন তখন তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া খাইবার জন্য নীচে নামিয়া আসেন। নামিয়া আসিবার সময়ে তিনি তাঁহার পিতাকে বলয়। আসেন—“আ ম আজ রাত্রিতেই আপনাকে কাশীধামে লইয়া যাইব।” কিন্তু চলমাধব বাবুর পিতার এই শেষ বাসনা পূর্ণ হয় নাই। কারণ তাহার পূর্বেই তাহার মৃত্যু ঘটে। চ- মাধব বাবুর পিতা সর্বজনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। যে সকল জেলায় তিনি সরকারী কাৰ্য্য উপলক্ষে অবস্থিতি করিতেন, সেখানকার সর্বশ্রেণীর লােকেই তাহাকে ভালবাসিত ও শ্রদ্ধা করত। উচ্চপদস্থ রাজপুরুষগণ স্যর চমাধব ঘােষ তাহাকে সম্মান করিতেন; সকলেই জানিতেন-দুর্গাপ্রসাদ বাবু সদাশ উচ্চহৃদয় ব্যক্তি। তাই তাঁহার মৃত্যু-সংবাদ-প্রবণে সকলেই দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিলেন। ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দে হাইকোর্টে দুইজন সিভিলিয়ান জজ নিযুক্ত হয়েন , তাহাদের নাম মিষ্টার ইজি বার্ড ও মিষ্টার জি-জি মরিস। মাধব বাবু যখন বর্ধমানের উকীল-সরকার ছিলেন, সেই সময়ে বাচঁ সাহেব তথাকার কলেক্টর ছিলেন। তিনি শিষ্টাচার ও সদুদ্দেশ্য-পরায়ণ, করুণহৃদয়, ধর্মভীরু এবং সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু জজ-হিসাবে তিনি প্রতিষ্ঠা অর্জন করিতে পারেন নাই। তাই তিনি যখন অবসর গ্রহণ করেন তখন উকীলেরা তাহাকে বিদায়-অভিনন্দন প্রদান করেন নাই। চমাধব বাবুর অনুরােধে কয়েকজন প্রসিদ্ধ উকীল তঁাহার বাটীতে উপস্থিত হইয়া তাহার অবসরগ্রহণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিলেন। মরিস সাহেব বিচারকার্ষে সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। প্রথম প্রথম তাহার নাম হয় নাই, কয়েক বৎসর পরে বিচারক-হিসাবে তাঁহার বেশ নাম হইয়াছিল। তিনি অভিজ্ঞ বিচারক ছিলেন। তবে তিনি উকীদের সহিত বিশেষ ভাল ব্যবহার করিতেন না। তাহার অবসর-গ্রহণের সময়ে উকীলেরা তাহাকে বিদায়-অভিনন্দন দিয়াছিলেন কি না তাহা ঠিক করিয়া বলা যায় না। বিচারপতি বাবু দ্বারিকানাথ মিত্র ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দে পরলােক গমন করেন। ইনি যে প্রতিভাশালী ব্যক্তি ছিলেন তাহার বিষয় পূর্বেই বলা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, ইনি অতীব যােগ্য ও স্বাধীনচেতা বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি মিষ্টার জ্যাকসন (পরে স্যর লুইস জ্যাকসন) বুদ্ধিমান ও দক্ষ বিচারক ছিলেন। কোনও জজ তাহার সহিত বিচার করিতে বসিলে জ্যাকসন সাহেবের রায়েই তাহাকে রায় দিতে হইত। বিচারপতি দ্বারিকানাথকে এই জ্যাকসন সাহেব স্যর চন্দ্রমাধব ঘোষ ১১১ বড় ভাল চক্ষে দেখিতেন না। দ্বারিকানাথও তঁাহার সহিত একত্র বিচার করিতে বসিতে চাহিতেন না। কারণ জ্যাকসন সাহেব তাঁহার অপেক্ষা সিনিয়র ছিলেন। একবার কয়েকমাসের জন্য দ্বারিকানাথ বাবু জ্যাকসন সাহেবের সহিত বিচারাসনে বসিয়াছিলেন। যাহারা এজলাসে ইহাদের দুইজনের বিচারকাব্য বিশেষ করিয়া লক্ষ্য করিয়াছেন তাহারা প্রায়ই দেখিয়াছেন যে, দ্বারিকা বাবু ও জ্যাকসন সাহেবের মধ্যে কথা-কাটাকাটি চলিতেছে। একবার একটী আপীল-মামলার সওয়াল শেষ হইবার পর জ্যাকসন সাহেব বলেন—এই আপীল খারিজ করা উচিত; কিন্তু দ্বারিকা বাবু বলেন-আপীলে যাহা প্রার্থনা করা হইয়াছে তাহা পূর্ণ করা উচিত। ইহার ফলে মামলাটীর পুনরায় সওয়াল হইল এবং শেষে দ্বারিকা বাবুর মীমাংসাই বজায় রহিল। জজ দ্বারিকানাথ মিত্রের পর ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে বাবু রমেশচন্দ্র মিত্র তাঁহার স্থলে হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। রমেশচন্দ্র জজ হইলে উকীলেরা সন্তোষ প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি জজ-হিসাবে প্রভূত প্রতিষ্ঠা অন ক রয়াছিলেন। তিনি কেবল যে সুদক্ষ ও পরিশ্রমী বিচারক ছিলেন তাহা নহে, তিনি অত্যন্ত তেজী, স্বাধীনচেতা ও বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। যে কোনও কারণেই হউক, অন্যান্য জজেরা জজের তাহার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন না। সম্ভবতঃ রমেশচন্দ্র তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব করিতে চাহিতেন না বা তাহাদের সহিত বনাইয়া চলিবার কৌশল তিনি জানিতেন না। স্যর রিচার্ড গাৰ্থ অথবা স্যর কোমার পেথারাম কেহই তাহাকে অনুকূল দৃষ্টিতে দেখিতেন না। রমেশ বাবু ভদ্র ও সজ্জন ছিলেন, কিন্তু দ্বারিকানাথের মত উচ্চান্তঃকরণ তিনি ছিলেন না। কেহ তাহার সহিত মন্দ ব্যবহার করিলে তিনি তাহা প্রায়ই ভুলিতে পারিতেন না। রমেশ বাবু দুইবার অস্থায়ীভাবে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হইয়াছিলেন।

স্যর চমাধব ঘােষ তিনি বহুদিন জজীয়তী করিয়া হাইকোর্ট হইতে অবসর গ্রহণ করেন। সরকার তাহাকে স্যর উপাধিতে ভূষিত করিয়াছিলেন। এই বংসরই অর্থাৎ ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার ডব্লিউ এফ ম্যাকডােন্যাল্ড ভি-সি হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত হয়েন। ইনি সিপাহী-বিদ্রোহের সময়ে আরার কলেক্টর ছিলেন। তিনি বড় নিরীহ ও ভাল লােক ছিলেন এবং সকলেরই সহিত শিষ্ট ও সদয় ব্যবহার করিতেন। দুঃখের বিষয়, তিনি বিচারশক্তির তাদৃশ পরিচয় দিতে পারেন নাই। চন্দ্রমাধব বাবু যখন উকীল ছিলেন তখন তিনি তাঁহার সহিত বন্ধুবৎ ব্যবহার করিতেন ; তার পর চন্দ্রমাধব বাবু হাইকোর্টের জজ হইলেও ম্যাকডােনাল্ড সাহেবের নিকট হইতে তিনি সেইরূপ ব্যবহার পাইয়াছিলেন। অনেক দিন ধরিয়া চন্দ্ৰমাধব বাবু ও ম্যাকডােনাল্ড সাহেব দুইজনে একত্র বিচার করিতে বসিতেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু তাহার জুনিয়র হইলেও তিনি প্রায়ই তাঁহাকে রায় দিতে বলিতেন। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুকে স্পষ্টই বলিয়াছিলেন যে, অনেক দিন ধরিয়া বিারপতি জ্যাকসনের সহিত একত্র বসিয়া বিচার করিতে হইয়াছিল বলিয়া রায় দিবার সুযোেগ আমার হয় নাই ; কারণ জ্যাকসন সাহেব সে সুযােগ আমাকে দেন নাই। কাজেই এজলাসে বসিয়া রায় দিবার অভ্যাস আমার হয় নাই। ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে প্রধান বিচারপতি স্যর রিচার্ড কাউচ অবসর গ্রহণ করেন এবং স্যর রিচার্ড গার্থ তাহার স্থলে প্রধান বিচারপতি-পদে নিয়ােজিত হয়েন। কিন্তু তিনি ইংলণ্ড হইতে এখানে আসিয়া কার্যভার গ্রহণ করিবার পূর্বে বিচারপতি মিষ্টার এ-জি ম্যাকফারসন । পরে স্যর ) সামান্য কিছুদিন অস্থায়ীভাবে প্রধান বিচারপতির কাৰ্ষ্য করিয়াছিলেন। ম্যাকফারসন সাহেব কিন্তু সিনিয়র পিউনী কাজ ছিলেন না। সূর রিচার্ড গার্থ শ্রমশীল, স্বাধীনচেতা, বিবেকবুদি শ্যর চন্দ্রমাধব ঘোষ পরায়ণ, নিরপেক্ষ বিচারক ছিলেন। বিচারকার্যে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। তিনি নিক্তির তোলে ন্যায়বিচার করিতেন। তিনি সমদর্শী ছিলেন। সিনিয়র জুনিয়র ব্যারিষ্টারে এবং ব্যারিষ্টারে ও উকীলে কোনও ভেদ তিনি করিতেন না। তিনি সকলের কথাই মনোেযােগ দিয়া শুনিতেন এবং সকলের সহিত ভদ্র ও সদয় ব্যবহার করিতেন। তাহার এজলাসে একবার এডভােকেট-জেনারল স্তর চালস পল একটি বিষয়ে নানাপ্রকার বাক্যবিন্যাস করিয়া বক্তৃতা করিতেছিলেন ; কিন্তু তাঁহার সেই বক্তৃতায় যুক্তি-তর্ক কিছুই ছিল না। স্যর রিচার্ড গার্থ কিছুক্ষণ তাহার এই ফঁাকা বক্তৃতা শুনেন; তার পর তাহাকে উদ্দেশ করিয়া বলেন--আপনার সওয়াল জবাবে সার কথা কিছুই নাই—যাহা বলিতেছেন তাহা সমস্তই যুক্তিহীন। এই কথা শুনিয়া স্যর চালস পল বসিয়া পড়েন। অনেক দিন ধরিয়া সরকার ও সিভিলিয়ানী প্রভাব তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। কিন্তু পরে কি কারণে জানি না, এইরূপ প্রভাবের সংস্পর্শে পড়িবার লক্ষণ প্রকাশ পায় । তবে আদালতে বিচার-সম্পৰ্কীয় ব্যাপারে তিনি সকল প্রভাবেরই অতীত ছিলেন ; শাসন-সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁহাকে সরকারী প্রভাবের সংস্পষ্ট মনে হইত। আর এক কথা, পূর্বে ভারতীয়গণের প্রতি তাহার সহানুভূতি অধিক ছিল, পরে ক্রমে ক্রমে উহার হ্রাস পাইতে থাকে। এ সম্বন্ধে দুই একটী ঘটনার উল্লেখ করা যাইতে পারে। ১৮৮০ খৃষ্টাব্দে বিচারপতি মিষ্টার লুইস জ্যাকসন পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। তদানীন্তন বড়লাট লর্ড লিটন প্রধান বিচারপতি স্যর রিচার্ড গাংকে হার পদের জন্য একজন বিচারপতিকে মনােনীত করিতে বলেন। তদনুসারে স্যর রিচার্ড কয়েকজন সিনিয়র জজের সহিত পরামর্শ করিয়া মিষ্টার ফিল্ড নামক জনৈক জেলাজজকে সুপারিশ করেন এবং তাহার নাম বড়লাটের ;

স্যর চমাধব ঘােষ নিকট পাঠাইয়া দেন। কিন্তু পরামর্শ করিবার সময়ে বিচারপতি রমেশ চন্দ্র মিত্র মহাশয়কে বাদ দেওয়া হইয়াছিল। যাহা হউক, বড়লাট পরে তাঁহাকে একজন ভারতীয় ভদ্রলােক—যাহাকে উক্ত পদের জন্য নিযুক্ত করা যাইতে পারে-তাহার নাম পাঠাইয়া দিতে তারযােগে অনুরােধ করেন। তখন প্রধান বিচারপতি মহাশয় সমস্যায় পড়েন এবং ইতিপূর্বে যে সকল বিচারপতির সহিত এই বিষয়ে পরামর্শ করিয়াছিলেন তাঁহাদিগের সহিত পুনরায় পরামর্শ করেন। তঁাহারা এবার চন্দ্রমাধব বাবুর নাম পাঠাইয়া দিতে বলেন। কাজেই স্যর রিচাঙচমাধব বাবুর নাম তারযােগে বড়লাটের নিকট পাঠাইয়া দেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি ডাকযােগে বড়লাট বাহাদুরকে এই মর্শে এক চিঠি পাঠাইয়া দেন যে, যদিও তাহার অনুরােধে চন্দ্ৰমাধব বাবুর নাম পাঠাইয়া দেওয়া হইল, কিন্তু ইহা জানিবেন যে, ফিল্ড সাহেব নিযুক্ত হইলে হাইকোর্টের লাভ হইবে ; তাহাকে এই পদ না দিলে তাহার প্রতি অবিচার করা হইবে। ইহার ফলে ফিল্ড সাহেবই হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। প্রধান বিচারপতি সার রিচাড় গার্গ সাদাসিদা লােক ছিলেন। তিনি ফিল্ড সাহেবের নিয়ােগ সম্বন্ধে বিচারপতি রমেশচন্দ্রকে যে যে ঘটনা ঘটিয়াছিল সমস্তই খুলিয়া বলেন। রমেশচন্দ্র চন্দ্রমাধব বাবুকে এই সকল কথা বলিয়া দেন এবং আরও বলেন,-“চন্দ্রমাধব বাবু! আপনি গাৰ্থ সাহেবকে আপনার বন্ধু মনে করেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি তাহা নহেন।” চমাধব বাবু ইহার উত্তরে বলেন-“জজীয়তী আমি পাইলাম না বটে, কিন্তু তাই বলিয়া গৰ্থ সাহেবের সারল্য ও বিবেকপ্রবণতা সম্বন্ধে আমার বিশ্বাস ইহাতে একটুও কমে নাই। আমার ধারণা, গাওঁ সাহেবের অকপট বিশ্বাস যে, ফিল্ড সাহেব যােগ্যতর ব্যক্তি সুতরাং তাহাকেই জজীয়তী দেওয়া উচিত।

স্যর মাধব যােব . রমেশচন্দ্র অবশ্য চন্দ্রমাধব বাবুর এই মন্তব্য সঙ্গত মনে করেন নাই। আর একটা ঘটনার কথাও এইখানে উল্লেখ করিলে অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। ঘটনাটা এই -১৮৮২ খৃষ্টাব্দে স্তর রিচার্ড গার্থ বিলাতে যাইবার জন্য ছুটী লয়েন। সেই সময়ে রমেশচন্দ্র ছিলেন সিনিয়র পিউনি জজ। গাৰ্থ সাহেব ছুটী লইলে তাহার স্থলে প্রধান বিচারপতির কাৰ্য কোন্ জজ করিবেন তাহা লইয়া প্রশ্ন উঠে। ভারত গৰৰ্ণমেন্ট এ বিষয়ে পার্থ সাহেবের অভিমত চাহিয়া পাঠান। তিনি বলেন, রমেশচন্দ্রকে প্রধান বিচারপতির কাৰ্য্য করতে দিতে পারা যায় না। কারণ, প্রধান বিচারপতিকে অন্যান্য কর্তব্যের সহিত কতকগুলি সামাজিক ব্যাপারেও যােগ দিতে হয়। ভারতীয় বিচারপতির পক্ষে তাহা করা সম্ভবপর হইবে না। ভারত গবর্ণমেণ্ট কি তাহার এই আপত্তি গ্রহণ করেন নাই; তাহার। রমেশচন্দ্রকেই অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে যে, প্রধান বিচারপতি গার্থের ভারতীয়দের প্রতি পূর্ব সহানুভূতি হ্রাস পাইতেছিল। কিন্তু অবসর গ্রহণের পূর্বে তাহার সহানুভূতি আবার বৃদ্ধি পাইতে আরম্ভ হয়। চন্দ্ৰমাধব বাবুর যোগ্যতা সম্বন্ধে তাহার খুবই উচ্চধারণা ছিল । এক ভােজসভায় জনৈক ইংরেজ ব্যারিষ্টারের নিকট তিনি চমাধব বাবুর গুণকীর্তন করিয়াছিলেন। এই ব্যারিষ্টার মহাশয় পরে গাৰ্থ সাহেবের কথা তাহাকে জানাইয়াছিলেন। গাৰ্থ সাহেব বলিয়া ছিলেন—চন্দ্রমাধব বাবুর ইংরেজের to 6370 11965 (l'le has the back-bone of an Englishman) i গার্থ সাহেব ও চন্দ্রমাধব বাবু একত্র কোন প্রকাশ্য সভায় নিমন্ত্রিত হইলে তিনি চমাধব বাবুর উপর অত্যন্ত অধিক মনােযােগ দিতেন। একবার উকীল শ্ৰনাথ দাস মহাশয় হাইকোর্টের আদিম বিভাগে একটি স্যর মাধব গো গুনােটের মামলা আনেন। এক ব্যক্তি দাস মহাশয়ের নিকট হইতে টাকা কক্ষ করিয়াছিল ; টাকা দাস মহাশয়ই দিয়াছিলেন। কিন্তু হ্যাণ্ডনােটখানায় তাহার একজন আত্মীয়ের নিকট হইতে টাকা লওয়া হইল বলিয়া লেখা ছিল। মামলার শুনানি হইবার সময়ে প্রধান বিচারপতি মহাশয়ের এজলাসে এই বেনামী ব্যাপার প্রকাশ হইয়া পড়ে। ইহাতে গাৰ্থ সাহেব খুবই চটিয়া যান এবং দাস মহাশয়কে বলেন, আপনি উকীল হইয়া এরূপ বেনামী কাৰ্য কেন করিলেন তাহার কৈফিয়ৎ দিতে হইবে । ইহাতে শ্ৰীনাথ বাবু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়েন। এইদিন অপরাহ্নে বা তৎপরদিন অপরাহ্নে লড় বিশপের বাটীতে একটি বড়গােছের সান্ধ্য-সম্মিলনে প্রধান বিচারপতি গাৰ্থ সাহেব ও চমাধব বাৰু উভয়েই নিমন্ত্রিত হইয়া উপস্থিত ছিলেন। তথায় দুইজনে সাক্ষাৎ হওয়ায় কথাপ্রসঙ্গে চন্দ্ৰমাধব বাবু গাৰ্থ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন, “শ্রীনাথ বাবুর মামলার সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন কি? ব্যাপারটা কি ঘটিয়াছে ?” গার্য সাহেব তাহাকে আদালতে যাহা ঘটিয়াছিল সমস্তই বলেন । তখন চন্দ্ৰমাধব বাবু তঁাহাকে ব্যাপারটা বুঝাইয়া দিবার চেষ্টা করেন। ইহাতে গাৰ্থ সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া তাহাকে বলেন, আমি এখানে কিছু শুনিতে চাহি না ; যদি কিছু আপনার বলিবার থাকে তবে প্রকাশ্য আদালতে বেিবন।” চন্দ্রমাধব বাবু গাৰ্থ সাহেবের নিকট এরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করেন নাই। তাই তিনি তখনই এই বলিয়া তাহার নিকট হইতে উঠিয়া যাছেন যে, শ্রীনাথ বাবু এই ব্যাপারে আমাকে মধ্যস্থতা করিতেও বলেন নাই, অথবা এই মামলা সম্বন্ধে তাহার সহিত শ্ৰনাথ বাবুর কোনও কথাও গাৰ্থ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুর এই কথায় তঁাহার অন্যায় বুঝিতে পারেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তিনি শ্ৰনাথ বাবুর পক্ষ সমর্থন করিতেও আসেন নাই। তাই তখনই তিনি চন্দ্ৰমাধব বাবুকে স্যর চমাধব ঘােষ ঢাকাইয়া আনিয়া ঐ ব্যাপার সম্বন্ধেই তাহার সহিত আলােচনা আরম্ভ করেন। চন্দ্ৰমাধৰ বাবু বলেন, “শ্রীনাথ বাবু এরূপ অন্যায় কাজ করিতে পারেন না এবং করেন নাই।' গাৰ্থ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুর নিকট সকল কথা শুনিয়া শ্ৰীনাথ বাবুকে যে কৈফিয়ৎ দিবার আদেশ কবিয়াছিলেন তাহা প্রত্যাহার করেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু পরে এই ঘটনা শ্রীনাথ বাবুর নিকট উল্লেখ করিয়াছিলেন। যাহা হউক, গার্থ সাহেবের সহিত চন্দ্ৰমাধব বাবুর বন্ধুত্ব বহুকাল অটুট ছিল। এমন কি, অবসর- গ্রহণের পর ইংলণ্ডে অবস্থান করিবার সময়েও তিনি চন্দ্রমাধব বাবুর সহিত সৌহৃর্দ্যপূর্ণ পত্র ব্যবহার করিতেন । ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার এইচ-বি লফোর্ড হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। ইনি পূর্বে বর্ধমানের কলেক্টর ছিলেন এবং পরে হাইকোর্টের রেজিষ্ট্রার হয়েন। তাহার পর জেলা-জজ হইয়াছিলেন। তিনি হাইকোর্টে বেশীদিন জজীয়তী করেন নাই। জজ-হিসাবে তাহার প্রতিষ্ঠা হয় নাই। মিষ্টার জে-এস হােয়াইট ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েন। তিনি ব্যারিষ্টার ছিলেন। তিনি নিরপেক্ষ, স্বাধীনচেতা, স্যায়নিষ্ঠ, ধর্মভীরু, ব্যবহার-শাস্ত্রে প্রভূত অধিকারশালী, ভদ্র ও সদয়হৃদয় বিচারক ছিলেন। মামলা বুঝিতে তাহার বিলম্ব হইত ; বিচারপতি মিষ্টার ফিয়াসের বা মিষ্টার ফন্টির(Mr Phonti) ন্যায় মামলা তিনি চটপট বুঝিতে পারিতেন না বটে,কিন্তু তাহার বিচার-ফল সকলের সন্তোষজনক হইত এবং রায়ের উপর সকলেরই শ্রদ্ধা ছিল। চন্দ্ৰমাধব বাবুর উচ্চগুণ গ্রামের তিনি খুব প্রশংসা করিতেন। চন্দ্রমাধব বাবু কখনও তাঁহার সহিত এজলাসের বাহিরে দেখা-সাক্ষাৎ করেন নাই বটে, তথাপি তিনি অন্যান্য উকীল-ব্যারিষ্টারের নিকট তাঁহার গুণকীর্তন করিতেন।

স্যর মাধব ঘােষ ; নাই। ছিল। ১৮৬৪ ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার জে পিট কেনেডি হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি-পদে নিযুক্ত হয়েন। তিনি হাইকোটের অন্যতম সিনিয়র ব্যারিষ্টার ছিলেন। তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন ; আইনেও তাহার প্রভূত জ্ঞান ছিল। কিন্তু তাহা হইলেও জজ-হিসাবে তিনি নাম কিনিতে পারেন তিনি অতি অল্পনিই জজীয়তী করিয়াছিলেন। এই ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে হুগলীর জেলা-জজ মিষ্টার এইচ-টি প্রিন্সেপ (পরে স্যর হেনরী প্রিন্সেপ ) হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। যখন চন্দ্ৰমাধব বাবুর পিতা চট্টগ্রামের ডেপুটী কলেক্টর ছিলেন, সেই সময়ে প্রিন্সেপ সাহেব তথাকার এসিষ্ট্যান্ট ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। সেইজন্য চন্দ্রমার বাবুর পিতার সহিত প্রিন্সেপ সাহেবের পরিচয় অথবা ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে প্রিন্সেপ সাহেব হাইকোর্টের রেজিষ্টার ছিলেন। সেই সময়ে চমাধব বাবুর সহিত তাহার পরিচয় হয়। প্রিন্সেপ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুর প্রতি সর্বদা সদয় ব্যবহার করিতেন। অভিজ্ঞ ফৌজদারী বিচারক বলিয়া তাহার খ্যাতি ছিল। "Princep's Criminal Procedure Code” নামক বিখ্যাত ফৌজদারী আইনের ন্থ তৎকর্তৃক সম্পাদিত হইয়াছিল। প্রিন্সেপ-পরিবার বঙ্গদেশে সুপরিচিত। কারণ তাঁহার পূর্বপুরুষগণের কেহ কেহ সিবিলিয়ান ছিলেন এবং তঁহাদেরই মধ্যে একজনের নামে গঙ্গার একটী ঘাট আছে প্রিন্সেপ ঘা। ফৌজদারী জজ-হিসাবে প্রিন্সেপ সাহেবের যত নাম ছিল দেওয়ানী জজ বলিয়া তাহার তত নাম ছিল না। বহুকাল হাইকোটে জজীয়তী করিবার পরও তিনি দেওয়ানী মামলার বিচারকার্যে তাদৃশ প্রতিষ্ঠা অর্জন করিতে পারেন নাই। কিন্তু ফৌজদারী মামলার বিচারক হিসাবে তাহার প্রভূত সুনাম হইয়াছিল। নিম্ন আদালতের হাকিমের রায় দায়রা জজ বা জেলা-জজ কর্তৃক স্যর চমাধব ঘােয সমর্থিত হইলে তিনি সাধারণতঃ উহাতে হস্তক্ষেপ করিতে চাহিতেন না। তঁাহার ধারণা ছিল তিনি ফৌজদারী আইনে বিশেষজ্ঞ। ধারণার বশে সময়ে সময়ে তিনি মামলা সম্বন্ধে নিজের অভিমতের উপরই বেশী নির্ভর করতেন ; সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারা ধরিয়া বিচার করিতে ভালবাসিতেন না। চন্দ্ৰমাধব বাৰু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইবার পর বহুকাল তি ন ও মিষ্টার প্রিন্সেপ একত্র বসিয়া দেওয়ানী ও ফৌজদারী দুইরকম মামলারই বিচার করিয়াছিলেন। দেওয়ানী মামলার বিচারে ইহাদের দুইজনের মতবিরােধ ঘটিত না, ঘটিলেও তাহ। কদাচিৎ। কিন্তু ফৌজদারী মামলার বিচারে তাহাদের প্রায়ই মতবিরােধ উপস্থিত হইত। অথচ উভয়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাবের অভাব হইত না; তথাপি যে মতবিরােধ হইত, তাহার কারণ- ফৌজদারী আইনে তিনি অদ্বিতীয় এই আত্মাভিমান। এইরূপ মত- বিরােধ ঘটিলে চন্দ্ৰমাধব বাৰু তাহা প্রধান বিচারপতির গােচর করিতে বাধ্য হইতেন। হাইকোর্টের বিচারপতি-পদে অধিষ্ঠিত থাকিবার সময়ে প্রিন্সেপ সাহেব জুরী কমিশনের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েন এবং কিছুদিন তিনি হাইকোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতিও হইয়াছিলেন। বহুকাল হাইকোর্টে বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত থাকিয়া তিনি অবসর গ্রহণ সরকার তাহাকে স্যর ও কে-সি-আই-ই উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার এইচ-এস কানিংহ্যাম ( পরে শ্যর হেনরী কানিংহ্যাম) হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইয়া আসেন। তিনি ভারতের ভূতপূর্ব বড়লাট স্যর হেনরী লরেন্সের জামাতা ছিলেন। সম্ভবতঃ কানিংহ্যাম সাহেব পঞ্জাব চীফ কোর্টের এডভােকেট অথবা পিউনি জন ছিলেন। তাহার নিয়ােগে হাইকোর্টে সন্তোষের সঞ্চার হয় নাই। তিনিও বিচারক-হিসাবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করিতে পারেন ১২ স্যর চমাধব ঘােষ নাই। তবে তিনি সজ্জন ও সদিচ্ছাপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। চন্দ্রমাধব বাবু তাহার অনুকূল দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তারপর চমাধব বাবু হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হইলে তাহাদের উভয়ের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্ব জন্মিয়াছিল। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে আর একজন হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন ; তাহার নাম মিষ্টার আর-এল টটেনহ্যাম। ইনি পূৰ্ব্বে মেদিনীপুরের জেলা-জজ ছিলেন। তিনি অতি নিরীহ, ভদ্র ও সদয়হৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। জজ-হিসাবে তিনি পণ্ডিত বা তেজস্বিতার পরিচয় দিতে পারেন নাই। বরং তিনি কিছু দুর্বলচিত্তই ছিলেন। তবে তঁাহার জজীয়তীর শেষাশেষি তিনি মামলার শুনানীর পরই তৎক্ষণাৎ রায় দিতে এরূপ নিপুণতা লাভ করিয়াছিলেন যে, তাহা দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইত এবং তাহার সেই রায়ে একটীও ভুল থাকিত না। তাহার শিষ্টাচারের জন্য উকীল-ব্যারিষ্টার সকলেরই তিনি প্রিয় ছিলেন। চন্দ্ৰমাধব বাবু জজ হইয়া অনেককাল তঁাহার সহিত একত্র বসিয়া বিচার করিয়াছেন এবং উভয়ে সদ্ভাবে সৌহার্দ্যেই কাটাইয়াছেন। তিনি অবসর গ্রহণ করিলে চ মাধব বাবু অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করিয়া- ছিলেন। কারণ টটেনহ্যাম সাহেব কেবল যে তাহার সহযােগী ছিলেন তাহা নহে, একজন বন্ধুও ছিলেন। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে বঙ্গদেশের এডমিনিস্ট্রেটর-জেনারেল মিষ্টার ব্রাউন কিছুদিনের জন্য অস্থায়ী ভাবে হাইকোটের জজ হইয়াছিলেন। জজ: হিসাবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করিতে পারেন নাই; সামান্য কিছুদিন জজীয়তী করিয়া তিনি পুনরায় তাহার পূর্ব কৰ্ম্মে ফিরিয়া যায়েন। এই ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার এ-জে ম্যাকলিন হাইকোর্টের বিচারপতি পদে নিযুক্ত হয়েন। ইনি ২৪ পরগণার জেলা-জজ ছিলেন। এই সময়ে গবর্ণমেণ্ট বিবেচনা করিতে থাকেন-হাইকোটে আর একজন স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ ১২১ দেশীয় জজ নিযুক্ত করা হইবে কি না। আর একজন দেশীয় জজ নিযুক্ত করার প্রয়ােজনীয়তা কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করিয়াছিলেন। সেই সময়ে হাইকোর্টে খুবই জনবর বটিয়াছিল যে, মাধব বাবুকে এইবার হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত করা হইবে। কয়েকজন বিচারপতির সন্দেহও হইয়াছিল যে চন্দ্ৰমাধব বাবু ওকালতীর বিপুল আয় ত্যাগ করিয়া হাইকোর্টের জজীয়তী লইবেন কি না। এই গুজবের ভিত্তি নিতান্ত অমূলক ছিল না। কারণ, ম্যাকলিন সাহেব স্বয়ং উকীল বাবু দুর্গামােহন দাশকে বলিয়াছিলেন, “হাইকোটে যে স্থায়ী জজের পদ খালি হইয়াছে উহাতে একজন ভারতীয়কে নিযুক্ত করিবার কথা উঠিয়াছে। যদি ঐ পদে ভারতবাসী নিযুক্ত হয়, তাহা হইলে আমি অবসর গ্রহণ করিব। কারণ, ঐ স্থায়ী পদে নিযুক্ত হইবার আমারই অধিকার।” সম্ভবত আর একজন ভারতীয় জজ নিয়ােগের বিরুদ্ধে ঘাের আপত্তি উঠিয়াছিল বলিয়া হাইকোর্টে তখন ভারতীয় জজ নিযুক্ত হইবার কল্পনা কার্যে পরিণত হয় নাই। ফলে ম্যাকলিন সাহেবের নিয়ােগ কায়েমী হইয়া যায়। ম্যাকলিন সাহেব জজ-হিসাবে তাদৃশ প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন নাই। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে বিলাত হইতে একজন জজ হাইকোর্টে নিযুক্ত হইয়া আসেন। তঁাহার নাম মিষ্টার এ উইলসন (পরে স্যর আর্থার উইলসন )। তিনি মােগ্য, আইন, শ্রমশীল, স্থিরধীর ও ধর্মভীরু বিচারক ছিলেন। সকলের প্রতি তিনি শিষ্ট ব্যবহার করিতেন এবং বিচারক-হিসাবে তিনি সকলের প্রশংসা লাভ করিয়াছিলেন । তঁাহার কাৰ্যকালের শেষাশেষি তিনি ভারতবাসীর প্রতি সহানুভূতির অভাবের পরিচয় দিয়াছিলেন। বহুকাল চমাধব বাবু ও উইলসন সাহেবের বন্ধুত্ব ছিল কিন্তু পরে তাঁহাদের উভয়ে বনিবনাও হইত না। সম্ভবতঃ ইহার হেতু চন্দ্ৰমাধব বাবুর সহিত ১২২ স্যর চমাধব ঘােষ বিচারপতি মিষ্টার পিগটের মতবিরােধ ছিল এবং পিগট সাহেব উইলসন সাহেবের বন্ধু ছিলেন। পিগট সাহেব উকীলদিগের সহিত ভাল ব্যবহার করিতেন না। সেইজন্য তিনি অবসর গ্রহণ করিলে উকীলেরা তাঁহার সম্বর্ধনা করেন নাই। শে যাহা হউক, উইলসন সাহেব হাইকোর্টে তঁাহার যোগ্যতা ও সূক্ষ্মবিচাৰ- শক্তির নিদর্শন রাখিয়া গিয়াছেন। ১৮৮০ খৃষ্টাব্দে প্রধান বিচারপতি স্যর রিচার্ড গার্য কিছুদিনের ছুটী লইয়া স্বদেশ যাত্রা করেন। সেই সময়ে তদানীন্তন সিনিয়র পিউনি জজ মিষ্টার এল-এস জ্যাকসন তাহার স্থলে অস্থায়ীভাবে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েন। কিন্তু এই বংরেই জ্যাকসন সাহেব 'অবসর গ্রহণ করেন। তিনি অবসর লইতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু সকল শ্রেণীর লোকে তিনি দীর্ঘকাল হাইকোটে জজীয়তী করিতেছেন বলিয়া এত বেশী আলােচনা আরম্ভ করেন যে, তিনি আর অবসর গ্রহণ অনুচিত মনে করেন। এই জ্যাকসন সাহেব অবসর গ্রহণ করিলে জেল-জজ মিষ্টার ফিল্ড তাহার স্থলে নিযুক্ত হয়েন। এই সময়ে একজন ভারতীয়কে জ্যাকসন সাহেবের পদে নিযুক্ত করিবার চেষ্টা বড়লা করিয়াছিলেন, কিন্তু প্রধান বিচারপতির অনুরােধে সে চেষ্টা ফলবী হয় নাই। ফিল্ড সাহেব খুব পরিশ্রমী ও আইনজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাহার সম্পাদিত “Law of Evidence” এবং “Field's Regulations” নামক দুই খানি আইনের কেতাব সুপ্রসিদ্ধ। ইনি উকীলদের সহিত বড় কর্কশ ব্যবহার করিতেন বলিয়া উকীলেরাও তাহাকে প্রীতির চক্ষে দেখিতেন না। জজ-হিসাবে তিনিও তেমন সুখ্যাতি অর্জন করিতে পারেন নাই। ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে চন্দ্ৰমাধব বাবুর দ্বিতীয়া কন্যা শ্ৰীমতী নলিনীর সহিত বাবু জগদীশচন্দ্র রায়ের বিবাহ হয়। তিনি এক্ষণে পরােলােকগত।

স্যর চমাধব ঘোষ ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে প্রধান বিচারপতি গা সাহেব তিন মাসের ছুটা লইয়া বিলাতে গমন করেন। সেই সময়ে বিচারপতি শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র মিত্র সিনিয়র পিউনি জজ ছিলেন বলিয়া তদানীন্তন বড়লাট লড রিপণ তাহাকেই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত করেন। ইহার নিয়ােগের বিরুদ্ধে গার্ল সাহেব যে মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহ। ইতিপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে। লর্ড রিপণ সে আপত্তিতে কর্ণপাত করেন নাই। প্রধান বিচারপতি গাৰ্থ সাহেব ছুটী লইয়। স্বদেশে গমন করিবার পূর্বেই গবর্ণমেন্ট সঙ্কল্প করেন যে, হাইকোর্টে বিস্তর মামলা জমিয়া গিয়াছে সেইগুলির বিচারকার্য সত্বর সম্পন্ন করিবার জন্য ছয় মাসের জন্য একজন অতিরিক্ত জজ নিযুক্ত করা হইবে এবং সেই অতিরিক্ত জজ ভারতবাসী হইবেন। কারণ মামলা আদিম বিভাগ অপেক্ষা আপীলবিভাগেই বেশী জমিয়াছে। এই সম্পর্কে ইহা উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, কিছুদিন হইল ভারত-সচিব এইরূপ একটি নিয়ম করেন যে, হাইকোর্টের দেশীয় জজের। ইউরােপীয় জজদের বেতনের অপেক্ষা তিন ভাগের এক ভাগ বেতন কম পাইবেন। ষ্ট্যাটুটরী সিবলিয়ানগণের বেতন সম্বন্ধে বিলাতের গবর্ণমেন্ট এইরূপ একটা নিয়ম করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু হাইকোর্টে এরূপ নিয়ম প্রচলিত হওয়ায় জজেরা সকলেই বুঝিলেন যে, বেতনের এই অল্পতার জন্য ভাল পশারওয়ালা উকীলের আর জজ হইতে চাহিবেন না। সেইজন্য অতিরিক্ত জজের পদে কোন্ উকীল নিযুক্ত হইতে চাহিবেন তাহা তঁাহারা স্থির করিয়া উঠিতে পারেন নাই। হাইকোর্টের একজন প্রসিদ্ধ বিচারপতি একদিন কথা-প্রসঙ্গে চন্দ্ৰমাধব বাবুকে জিজ্ঞাসা করেন “আপনাকে যদি এই অতিরিক্ত জজের পদ দেওয়া হয়, আপনি উহা লহেন কি?” ইহাতে চমাধব বাবু উত্তর ১২৪ স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ দেন,-“না, লই না।” বিচারপতি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন—“বেতনের অল্পই কি ইহার কারণ ?” চন্দ্ৰমাধব বলেন,-“না, বেতনের অল্পতাই একমাত্র কারণ নহে। ইউরােপীয় ও দেশীয় জজের বেতনে তারতম্য করিয়া যে বৈষম্যের রেখা টানিয়া দেওয়া হইয়াছে ইহ। অন্যায়। ইহার ফলে কোনও দেশীয় জজ তঁাহার সহযােগী ইউরােপীয় জজের সহিত একত্র বিচার করিতে বসিলে কেবলই নেই দেশীয় জজের মন হইবে - আমি ইউরােপীয় জজের তুল্য নহি এবং এই ভাব মনে হইলে তিনি স্বাধীনভাবে বিচার করিতে পারিবেন না। যদি দেশীয় জজের বেতনের সমান বেতন ইউরোপীয় জজদেরও করিয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে আমি জজ হইতে সম্মত আছি।" সম্ভবতঃ এই মন্তব্য উক্ত জজসাহেবের প্রীতিকর হয় নাই। তিনি চমাধব বাবুর অভিমতের কোনও উত্তর দেন নাই। তৎপরে পূজার ছুটীর সময়ে চন্দ্ৰমাধব বাবু ও বিচারপতি স্যর রমেশচন্দ্র মিত্র দার্জিলিঙ্গে অবস্থান করিবার সময়ে রমেশচন্দ্রের অনুরােধে চন্দ্ৰমাধব বাবু উক্ত জজের সহিত দেখা করিতে গমন করেন। উদ্দেশ্য— তাহাকে এবং অন্যান্য জজদিগকে বলিয়া কহিয়া উকীল বাবু মােহিনী মােহন রায়কে উক্ত অতিরিক্ত জজের পদের জন্থ সুপারিশ করা। রমেশচন্দ্র ও চন্দ্রমাধব বাবু উভয়েই মনে করিয়াছিলেন,পদের মর্যাদার জষ্ঠ মােহিনীবাবু বেতনের অল্পতার দিকে যাহাতে লক্ষ্য না করেন, তেমন ব্যবস্থা করা যাইতে পারিবে। কিন্তু উক্ত জজ সাহেব চন্দ্ৰমাধব বাবুকে বলেন যে, সৰ্বপ্ৰধান উকীলেরই এই পদ লাভের সম্ভাবনা আছে। মােহিনীবাণু বা অপর কাহারও ইহা প্রাপ্তির আশা নাই। অতঃপর বাবু মহেন্দ্রনাথ বসুকে এই পদে নিযুক্ত করা হয়। ই ন প্রথম শ্রেণীর সবজজ ছিলেন এবং ইহার বেতন মাসিক ১০০০ একহাজার টাকা ছিল। কিন্তু মহেন্দ্রনাথের নিয়ােগে লােকে সন্তোষ লাভ করিতে পারে নাই।

শ্যর চন্দ্রমধিব ঘোষ ১২৫ এদিকে হাইকোর্টের ইউরােপীয় ও দেশীয় জজদিগের বেতনের বৈষম্য দূর করিবার জন্য চন্দ্ৰমাধব বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন। তিনি কয়েকজন বড় বড় ব্যারিষ্টারকে এই বৈষম্যের কথা বলেন এবং ইহাতে যােগ্য ব্যক্তিরা হাইকোর্টের বিচারাসনে বসিতে চাহিবেন না এ কথাও তাহাদিগকে বুঝাইয়া দেন। ব্যারিষ্টার মিষ্টার হেনরী বেল এই কথার যৌক্তিকতা বিশেষভাবে উপলব্ধি করেন। ইনি অবসরপ্রাপ্ত সিবিলিয়ান ছিলেন। বড় বড় উকীল, এটনী, ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান এসােসিয়েসনের ও ইণ্ডিয়ান এসােসিয়েসনের বড় বড় সদস্য প্রভৃতিতে এই বৈষম্যের অনিষ্টকারিতা বুঝাইয়া দেন। মিষ্টার হেনরী বেল এই বৈষম্য দূর করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা আরম্ভ করেন। তিনি এরূপ চেষ্টা না করিলে এই বৈষম্য দূরীভূত হইত কি না সন্দেহ। অবশেষে স্থির হইল যে, ভারত-সচিবের নিকট সকলের সম্মিলিত আবেদনপত্র পাঠাইতে হইবে এবং তাহাতে এই বেতনগত বৈষম্য বিদুরিত করিবার জন্য অনুরােধ করা হইবে। এই আবেদনপত্রের, যৌক্তিকতা উপলব্ধি করিয়া ভারত-সচিব হাইকোর্টের জজদিগের বেতনের বৈষম্য- মূলক নিয়ম উঠাইয়া দেন। খৃষ্টাব্দের শেষ ভাগে এই ব্যাপার ঘটে। বিচারপতি মহেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় যথাসাধ্য কৰ্তব্যপালনে অবহিত হইয়াছিলেন। কিন্তু বহুকাল অধস্তন বিচার-বিভাগে কাৰ্য্য করায় তিনি পূর্ণ স্বাধীনচেতা হইবার সুযােগ লাভ করেন নাই। ইহার উপর মাত্র ছয়মাস তিনি অস্থায়ীভাবে হাইকোর্টের বিচারপতি-পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন বলিয়া হাইকোটে জজীয়তীতে কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন নাই। সম্ভবতঃ মহেন্দ্রবাবু ৮মাস কাজ করিয়াছিলেন। অবশ্য মফঃস্বল হইতে আগত জেল-জজেরা হাইকোর্টে আসিয়া যেরূপ যােগ্যতা দেখাইয়া থাকেন তদপেক্ষা কিছুমাত্র অল্প যােগ্যতা মহেন্দ্রবাবু দেখান ১৮৮৪ স্যার চমাধব ঘােষ নাই; সৰ্বাংশে তিনি তাঁহাদের সমতুল্যই ছিলেন বা তাঁহাদের অনেকের অপেক্ষা ভাল ছিলেন। কিন্তু হাইকোটে দেশীয় জজদিগের অবস্থা বড় সুবিধাজনক নহে। তাহারা যদি অন্যান্য জজদিগের অপেক্ষা অধিক যােগ্যতা প্রদর্শন করিতে না পারেন, তাহা হইলে তাহাদিগকে লােকে অনুপযুক্ত মনে করে। বাবু মহেন্দ্রনাথ বসুর সম্বন্ধেও ঠিক এইরূপ ঘটিয়াছিল। হাইকোটে র জজেরা তাহাকে অযােগ্য বলিয়াই রায় দিয়াছিলেন। সুতরাং ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে অপর একজন দেশীয় বিচারপতি মনােনয়ন করিবার জন্য বর্ণমেন্ট হাইকোটের জজদিগকে অনুরােধ করেন। ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে মিষ্টার ডব্লিউ ম্যাকফারসনকে (পরে স্যর উইলিয়াম ম্যাকফারসন) হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত করা হয়। তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, ভদ্র, শিষ্টাচারপরায়ণ, যােগ্য বিচারপতি ছিলেন। দুই একবার ফৌজদারী মামলার বিচারে পক্ষপাতিত্বের লক্ষণ দেখা গিয়াছিল। এই মামলার আসামী ছিল ইউরােপীয়। কিন্তু মােটের উপর, তাঁহার কাজ ভালই ছিল। সিবিলিয়ান জজদিগের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম হাইকোর্টের আদিম বিভাগে বিচার করিবার জন্য মনােনীত হইয়া- ছিলেন এবং সেই কাৰ্য্য তিনি প্রায় এক বৎসর কাল সুচারুভাবেই সম্পন্ন করিয়াছিলেন। চমাধব বাবু ও ম্যাকফারসন সাহেব যখন একত্র বিচারকার্য করিতেন তখন তাঁহাদের মতবিরােধ ঘটিত না ; দুইজনে প্রায় একমত হইয়া কাজ করিতেন। ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে বাবু চন্দ্ৰমাধব ঘােষ হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত ফুয়েন। যখন চন্দ্ৰমাধববাবু জর্জীয়তী গ্রহণ করেন, তখন সংবাদপত্রসমূহ তাহার বিষয়ে লেখেন যে, সেই সময়ে তিনি উকীলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। ১৮৮৫-১৯০৭ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ ২২ বৎসর কাল তিনি হাইকোর্টের জজীয়তী করিয়াছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি স্যর চন্দ্রমধিৰ ঘোষ ১২৭ একবারমাত্র অল্পকালের জন্য ছুটা লইয়াছিলেন। বিচারপতি হিসাবে তিনি বিশেষ যােগ্যতর পরিচয় দিয়াছিলেন। উকীল ও মকেল সকলেই তাহার নিরপেক্ষ সূক্ষ্মবিচারশক্তি দেখিয়া মুগ্ধ হইত। বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের রীতি-নীতি,ভূমিরাজস্ব প্রভৃতি পুঙ্খানুপুঙ্খ- রূপে তাহার জানা থাকায় তিনি অতি সুন্দর বিচারশক্তির পরিচয় দিতেন। ১৯০৬ সালের ১১ই মে হইতে ৪ঠা আগষ্ট পধ্যন্ত আড়াই মাসের জন্য তিনি কলিকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। এই নিয়ােগ-সম্বন্ধে “বেঙ্গলী লিখিয়া- f86977-"It goes without saying that the selection of Mr. Justice Ghosh to officiate as Chief Justice of the High Court during the absence of Sir Francis Maclean has given unqualified satisfaction throughout Bengal.” অর্থাৎ মিঃ ঘােষকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করায় বঙ্গবাসী- মাত্রই আনন্দিত হইয়াছে। গবর্ণমেণ্ট যােগ্য ভারতবাসীকে এইরূপ উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া ভারতবাসীর দাবী স্বীকার করিয়াছেন ; সেজন্য গভর্ণমেন্টেকেও ধন্যবাদ দেওয়া দরকার। “পাইওনীয়র পত্রও লেখেন—“মি জষ্টিস ঘােষ—যিনি হাইকোর্টের প্রধান বিচার- পতির পদে নিযুক্ত হইয়াছেন ভারতবর্ষের মধ্যে যতগুলি হাইকোর্ট আছে এবং তাহাতে যতগুলি দেশীয় বিচারপতি আছেন, তাহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। ২১ বৎসরকাল তিনি হাইকোর্টের জজীয়তী করিয়াছেন, এই একুশ বৎসরের মধ্যে তিনি বিশেষ যােগ্যতার সহিত নিজের কর্তব্য সমাধা করিয়াছেন। তিনি উকীল, ব্যারিষ্টার ও মক্কেলদের প্রতি ভদ্র ও অমায়িক ব্যবহার করেন। গত ৫০ বৎসর- কাল তিনি আইনের ক্ষেত্রে থাকায় থাকায় অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্ট হইবার পূর্ববর্তী যুগের আইন- শ্যর চমাধব ঘোষ বেত্তা; সুতরাং প্রাচীন ও নবীন আইন-পন্থীদের তিনি সংযােগস্থল। তঁাহার আদিনিবাস পূর্ববঙ্গ। তিনি আজ উচ্চ রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইলেও তাঁহার পিতৃ-পিতামহের আচার-অনুষ্ঠান বিস্মৃত হন নাই; এই কারণে তিনি ইউরােপীয় সমাজে তেমন মিশিতে পারেন না। তাহার ন্যায় প্রগাঢ় আইন-বেত্তার জীবনী প্রত্যেক যুবকের অনুকরণীয়। ১৯০৬ সালে সম্রাটের জন্মদিন-উপলক্ষে তিনি “নাইট উপাধি প্রাপ্ত হন। ১৯০৭ সালের ২রা জানুয়ারী তিনি জজীয়তী হইতে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি যেদিন অবসর গ্রহণ করেন, সেদিন হাইকোর্টের উকীল ও এটনীরা তাহাকে বিদায়-অভিনন্দন দিয়াছিলেন। তিনি সেই বিদায়-অভিনন্দনের উত্তরে অন্যান্য কথার মধ্যে বলিয়াছিলেন-“আজ আমার প্রাণে যে কি ভাবের উদয় হইতেছে, তাহা আমি ভাষায় ব্যক্ত করিতে পারিতেছি না। ২৪ বৎসর বয়সের সময় আমি হাইকোর্টে ওকালতী আরম্ভ করি, ১৮৮৫ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত আমি ওকালতী করিতে থাকি এবং ঐ সময়ে আমি হাইকোর্টের জজ হই। প্রায় ২২ বৎসর হইল, আমি হাইকোর্টের বিচারাসনে বসিয়াছি। এত দীর্ঘকাল পরে হাইকোর্টের সহিত সম্বন্ধ ছিন্ন করিতে আমার যে কষ্ট হইতেছে না, এ কথা বলিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। আমি যে এখনও শারীরিক ও মানসিক শক্তি লইয়া অবসর গ্রহণ করিতে পারিলাম, এজন্য আমি ভগবানকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। আমার অবশিষ্ট জীবন যেন জনহিতকর কাৰ্য্যে অতিবাহিত হয়, এজন্য আমি ভগবংসমীপে প্রার্থনা করিতেছি।” ১৯১১ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের উকীল-লাইব্রেরীতে স্বর চন্দ্ৰমাধবের তৈলচিত্রের আবরণ উন্মােচন-প্রসঙ্গে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি স্যর লরেন্স লরেন্স জেন্সি বলেন—“চন্দ্ৰমাধব বাবু আমার পুরাতন বন্ধু। তিনি বহুদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন এবং শর চমাধব ঘােষ ১২ বহুদিন তাহার স্মৃতি আমাদের মনে জাগরূক থাকিবে। চমাধব বহুকাল জজীয়তী করিয়া হাইকোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি হইয়াছিলেন। সম্রাট তাঁহাকে নাইট উপাধি-ভূষণে ভূষিত করেন। তিনি অতি বিচক্ষণ আইনজ্ঞ ছিলেন।” স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ বহুবর্ষ যাবৎ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিণ্ডিকেটের সদস্য ছিলেন ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-বিভাগের সভাপতি ছিলেন। তাঁহার সমসাময়িক যাবতীয় শিক্ষা-ব্যাপারে তিনি জড়িত থাকিতেন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টা তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হন; কিন্তু কয়েকমাস পরে হাইকোর্টের জজ-পদে নিযুক্ত হওয়ায় তিনি কয়েকমাস মাত্র ব্যবস্থাপক সভায় ছিলেন। হাইকোটের বিচারাসনে বসিবার পর তিনি এ সহরের যে অংশে ইউরােপীয়েরা বাস করেন সেই অংশে অর্থাৎ ভবানীপুরে যথায় তাহার পূর্ব গৃহ ছিল তথায় বাস করিতে থাকেন। এই বাটীতে ভঁহার স্বগ্রাম ও নিকটবর্তী গ্রামের বহু দরিদ্র ছাত্র থাকিয়া আহার করিত ও স্কুল- কলেজে অধ্যয়ন করিত। তিনি তাহাদের পড়িবার ব্যয় নিজে বহন করিতেন। গ্রামের সহিত তাঁহার সম্বন্ধ ছিল। স্বগ্রামে একটি স্কুল ও একটি ডিসপেন্সারী প্রতিষ্ঠাকল্পে তিনি বহু টাকা দান করিয়াছিলেন। গ্রামের লােকদিগকেও তিনি আপদে-বিপদে গােপনে অনেক দান করিতেন। সালে কলিকাতায় যে ভারতীয় সামাজিক কন্ফারেনস হয় তাহাতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ঐ বৎসর কলিকাতায় জাতীয় মহাসমিতিও হয়। কায়স্থ সমাজের উন্নতি কল্পে তিনি আজীবন চেষ্টা করিয়াছিলেন। বঙ্গদেশীয় কায়স্থ সভার তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কায়স্থজাতির মধ্যে যে বিভিন্ন শাখা আছে সেগুলির মধ্যে অর্থাৎ উত্তর রাঢ়ী, দক্ষিণ রাঢ়ী প্রভৃতিতে যাহাতে বিবাহ হয়, এজন্য তিনি চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং নিজ বংশে ও দক্ষিণরাঢ়ীয় বংশে তর মাধব ঘােষ কুটুধিতা করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন। কলিকাতায় যে বিক্রমপুর- সম্মিলনী নামক সভা আছে তিনি তাহার সভাপতি ছিলেন। কলি- কাতার ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবের উন্নতিকল্পে তিনি বিশেষ চেষ্টা করিতেন। ১৯১৭ সালে মিসেস, বেসন্তের নির্বাসনের প্রতিবাদের জন্য কলিকাতা টাউন হলে যে বিরাট সভার অধিবেশন হয় তিনি হাতে সভাপতিত্ব করেন। কংগ্রেসের দুই দলের মধ্যে যাহাতে মিলন হয় সেজন্য তিনি তাঁহার ভবানীপুরস্থ বাটীতে একটি পরামর্শ-সভার অধিবেশন করেন। ইহা ব্যতীত জীবনে তিনি রাজনীতিক আন্দোলনে যােগদান করেন নাই। বৃদ্ধ হইয়া পড়ায় তিনি বহু কাল কোন আন্দোলনে যােগদান করেন নাই। তবে ১৯১৭ সালের আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তিনি দুইটি সভার সভাপতিত্ব করেন। প্রথম সভাটি মিঃ রসুলের মৃত্যুতে শােক- প্রকাশের জন্য ইষ্ট বেঙ্গল সােসাইটীতে হয় ; দ্বিতীয় সভা মিসেস, বেসান্ত ও তাহার দুই জন সঙ্গীকে মুক্তি দেওয়ায় গবর্নমেন্টকে ধন্যবাদ দিবার জন্য টাউন হলে হয়। প্রথম সভায় তিনি বলেন যে, যদিও তিনি বৃষ্টিশক্তি না থাকায় একরূপ অন্ধের মত হইয়াছেন, তথাচ তিনি একজন বন্ধুর মত বন্ধু হারাইয়াছেন বলিয়া সভায় আসিয়াছেন। রসুলের উদার অন্তঃকরণ ও সৎসাহস ছিল। সকল জাতির প্রতি তাঁহার সহানুভূতি ছিল । ১৯০৩ সালে তিনি যখন হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি তখন তঁাহার বাটীতে একটি প্রীতি-ভভাজের আয়ােজন করেন। তিনি হিন্দু ও মুসলমানের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, কিন্তু হিন্দুরা তাহাকে এত ভালবাসিতেন যে, অনেক গোঁড়া হিন্দু তাঁহাকে আপনাদের মধ্যে বসাইয়া একত্ৰ খাইয়াছিলেন। দিতীয় সভা অর্থাৎ টাউন হলের সভায় শ্যর চলমাধব নিম্নলিখিত বক্তৃতা করেন-“সর্বাগ্রে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ প্রদান শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ করিতেছি, যেহেতু আপনারা আমাকে সভাপতিপদে বরণ করিয়াছেন। বহুদিন হইতে আমি রােগে ভুগিতেছি, কাজেই এত বড় সভায় আমি সভাপতিত্ব করিতে অপারগ। আপনারা ইহাও জানেন যে,আমি কংগ্রেস কিংবা হােমরুল লীগ ইহার কোন দলভুক্তই নহি। তথা আমি দেশবাসীর অনুরােধে -আমার এক্ষেত্রে যাহা কৰ্তব্য তাহাই পালন করিতে আসিয়াছি। হয় ত আমি মর্তী বেসান্ত ও তাহার সহকৰ্মীদের সহিত কোনও কোনও বিষয়ে একমত নহি, কিন্তু একথা সৰ্ববাদিসম্মত যে, তাহারা যাহা কিছু করিয়াছেন তৎসমস্তই সদুদ্দেশ্য- প্রণােদিত অথচ তাঁহারা মাদ্রাজ গভর্ণমেন্ট কর্তৃক অন্তরীণে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। মাদ্রাজ গভর্ণমেন্ট ইহাদিগকে অন্তরীণে আবদ্ধ করিয়া যে ভুল করিয়াছিলেন ভারত গভর্নমেন্ট তঁাহাদিগকে মুক্তি দিয়া সেই ভ্রম সংশােধন করিয়াছেন। এজন্য মাদ্রাজ গভর্ণমেন্টের একটুও দুঃখিত হওয়া উচিত নহে। আজ আমরা ইহাদিগকে আনন্দ জ্ঞাপন করিতেছি। ইহারা সত্যই বিশেষ কষ্ট ভােগ করিয়াছেন। তাহাদের অন্তরীণের সময় দেশে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছিল এখন তাহা বন্ধ হইবে বলিয়া আশা করি এবং সকল সম্প্রদায় দেখিবেন যাহাতে পরস্পরের মধ্যে কোনও রূপ মনােমালিন্য ও গােলমালের সৃষ্টি না হয়। বড়লা ইহাদিগকে মুক্তি দিয়া যে সূক্ষ্ম রাজনীতি-জ্ঞানের পরিচয় দিয়াছেন সেজন্য তঁাহাকে ও ভারত-সচিব রাইট অনারেবল মিঃ মন্টেগুকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। আমার স্বাস্থ্য এরূপ ভগ্ন যে, সার শেষ অবধি আমি এখানে থাকিতে পারিব না, আপনাদের অনুমতানুসারে আমি সভা ত্যাগ করিয়া যাইতেছি, আপনারা অন্য একজন সভাপতি নির্বাচন করুন।” মৃত্যুর পূর্বে স্যর চলমাধবের স্বাস্থ্যভঙ্গ হইয়াছিল। তিনি স্বাস্থ্য- লাভার্থ দেওঘরে যান, তথায় তিনি দেড় মাস কাল অবস্থান করিয়া- শ্যর শ্রমাধব ঘােষ ছিলেন। ১৯১৮ সালের ১৯শে জানুয়ারী তাঁহাকে কলিকাতায় আনা হাওড়া স্টেশনে উপস্থিত হইলে তাহার তন্দ্রাভাব আইসে, তখনও কেহ আশঙ্কা করে নাই যে, তাহার মৃত্যু এত শীঘ্রই ঘনাইয়া আসিতেছে। যাহা হউক, কোন গতিকে তাহাকে বাড়ীতে আনা হয়। ডাঃ ডি-এন্ রায় তাহাকে চিকিৎসা করিতে থাকেন। রাত্রি দুইটার সময় তাহার কন্যা তাহাকে পথ্য দিতে গিয়া দেখেন যে, তঁাহার নাড়ী ললাপ পাইতেছে। রাত্রি ২০টার সময় তাহার মৃত্যু হয়। তাহার অন্ত্যেষ্টি- ক্রিয়াকালে স্যর কেজি গুপ্ত, স্যর আশুতােষ মুখােপাধ্যায়, স্যর আশুতোষ চৌধুরী, স্যর বি-সি মিত্র, মাননীয় রায় দেবেন্দ্রচন্দ্র ঘােষ বাহাদুর, রায় যােগেশচন্দ্র ঘােষ বাহাদুর, রায় রাধিকামােহন লাহিড়ী বাহাদুর, মিঃ দ্বারকানাথ চক্রবত্ত, মিঃ সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক, মিঃ এএন, চৌধুতী, মিঃ সি-সি ঘােষ, ঐযুক্ত নির্মলচন্দ্র চন্দ্র প্রভৃতি বিশিষ্ট গণ্যমান্য উকীল, ব্যারিষ্টার ও স্থানীয় সম্ভ্রান্ত লােকেরা যােগদান করিয়াছিলেন। ১৯১৮ সালের ২২শে জানুয়ারী তারিখের “বেঙ্গলী” পত্র তাহার মৃত্যু সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার সার মৰ্ম্ম এই—“গত ২০শে জানুয়ারী শেষ রাত্রে স্যর চন্দ্রমাধব বােষ মহাশয়ের মৃত্যু হইয়াছে। তাহার মৃতুতে বঙ্গজননী একটি মুখোজ্জ্বলকারী সন্তান হারাইয়াছেন। তিনি বড় আইনজ্ঞ, বিচক্ষণ বিচারক ও সমাজ-সংস্কারক ছিলেন। তিনি পূর্ণ বয়সে বহু সম্মানে বিভূষিত হইয়া মারা গিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার ৮০ বৎসর বয়স হইয়াছিল। ভারতবাসীর মধ্যে তাঁহার পুর্বে মাত্র একজন বাঙ্গালার প্রধান বিচারপতির আসনে অস্থায়ীভাবে বসিয়া- ছিলেন। ২২ বৎসর কাল তিনি হাইকোর্টের জজীয়তী করিয়াছিলেন। তিনি সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিচারশক্তির প্রভাবে স্বপদের ময্যাদা রক্ষা করিয়াছিলেন। উকীল, ব্যারিষ্টার, আসামী, ফরিয়াদী সকলেই তাহাকে সমানভাবে শ্রদ্ধা-ভক্তি করিত। তাহার নিকট কোন মােকদ্দমা নথিভুক্ত স্যর চন্দ্রমাধব ঘােম ১৩ হইলে মামলাকারীমাত্রই এই ভাবিয়া সন্তুষ্ট হইত যে, তাহাদের মােকদ্দমা যােগ্য বিচারকের হাতে পড়িয়াছে। এদিকে জনসাধারণের নিকটও তিনি বিশেষ সমাদৃত ছিলেন। ১৯০৬ সালে কলিকাতায় যে নিখিল ভারতীয় সমাজ-সম্মেলন হয় তাহাতে তিনি সভাপতিত্ব করিয়াছিলেন। কায়স্থ সমাজের মধ্য হইতে ভিন্ন ভিন্ন থাক তুলিয়া দিবার জন্য এবং দক্ষিণ রাঢ়ী ও বঙ্গজ কায়স্থকে এক করিবার জন্য তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করিয়াছিলেন। দেশের রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্যও তিনি মনে প্রাণে প্রার্থনা করিতেন। বার্ধক্যে জরাজীর্ণ হইলেও তিনি শ্ৰীমতী বেসান্তের মুক্তিতে বাঙ্গালীর আনন্দ-জ্ঞাপনের জন্য টাউন হলের সভায় সভাপতিত্ব করিতে আসিয়াছিলেন। স্বগ্রাম বিক্রমপুরকে তিনি বড় ভালবাসতেন। বিক্রমপুর সম্মিলনী ও পূর্ববঙ্গ ক্লাবের প্রত্যেক অধি- বেশনে তিনি যে ভাবে হউক উপস্থিত হইতেনই। তঁাহার মৃত্যুতে যে স্থান শূন্য হইল তাহা শীঘ্র পরিপূর্ণ হইবে না। তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র রায় যােগেন্দ্রচন্দ্র ঘােষ বাহাদুর ও তঁাহার শােকার্ত পরিবারের অন্যান্য সকলের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করতেছি।” সােমবার হাইকোট বসিবার পূর্বেই উকীল, ব্যারিষ্টাব, এটর্ণী প্রভৃতি প্রধান বিচারপতির কক্ষে সমবেত হইয়া তাহার মৃত্যুতে শােক প্রকাশ করেন। হাইকোর্টের সকল জজও তথায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। প্রধান বিচারপতি স্যার ল্যান্সলট স্যাণ্ডারসন বলেন- “গত কল্য স্বর চন্দ্রমাধব ঘােষ মহাশয়ের মৃত্যু হইয়াছে। আমারা তাঁহার শােকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছি। এগার বৎসর পূর্বে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হন এবং ২২ বৎসর কাল জজীয়তী করেন। এই দীর্ঘ বাইশ বৎসরকাল তিনি হাইকোটের অনেক কাজ করিয়া- ১৪ স্যর চমাধব ঘোেষ ছিলেন। তিনি উকীল ব্যারিষ্টার আমলা -সকলের সহিত সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার করিতেন। ব্যারিষ্টারগণের পক্ষ হইতে মিঃ বি চক্রবর্তী বলেন, '১৮০৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ঢাকা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং হিন্দু কলেজে শিক্ষা লাভ করেন। ১১ বৎসর বয়সে ১৮১ খ্ৰীষ্টাব্দে তিনি গ্রাজুয়েট হন। সেই অল্প বয়সেই তিনি ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট করিয়া ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে হাইকোটে ওকালতী আরম্ভ করেন এবং ওকালতীতে বিশেষ পশার- প্রতিপত্তি লাভ করেন। আমি তাঁহার সমক্ষে বহুদিন ব্যারিষ্টারী করিয়াছি এবং তাহার বিচার-নৈপুণ্য-দর্শনে প্রীত হইয়াছি। তিনি বিশেষ পরিশ্রমসহকারে বিচারকার্য নির্বাহ করিতেন এবং সুবিচার করিবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করিতেন না। ১৯০৬ সালে তিনি কয়েক মাসের নিমিত্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির আসনে উপবেশন করেন। ৯০৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর-গ্রহণের পর হইতে তিনি স্বজাতির সামাজিক অবস্থার উন্নতিকল্পে আত্মনিয়োেগ করিয়াছিলেন। তিনি পূর্ণ বয়সেই মারা গিয়াছেন। তঁাহার মৃত্যুতে দেশে যে স্থান শূন্য হইয়াছে তাহা শীঘ্র পূর্ণ হইবে না।” ১৯১৮ সালের ২১শে জানুয়ারী তাঁহার মৃত্যুতে শােক-প্রকাশের জন্য কলিকাতা ও মফস্বলের অনেক স্কুল-কলেজের ছুটা দেওয়া হইয়া- ছিল। বাঙ্গালাদেশের যত উকীল-সমিতি আছে তাহারা সকলেই রায় যােগেন্দ্রচন্দ্র ঘােষ বাহাদুরের নিকট তদীয় পিতৃদেবের মৃত্যুতে শােকপ্রকাশক লিপি প্রেরণ করিয়াছিলেন। কলিকাতা কর্পোরেশন নিম্নলিখিত প্রস্তাবটা গ্রহণ করেন-“স্যর চমাধবের মৃত্যুতে এই কর্পোরেশন বিশেষ দুঃখ প্রকাশ করিতেছেন।” নবাব সিরাজ-উল ইসলাম প্রস্তাবটির সমর্থন করিয়া বলেন, “আমি ২০ বৎসরের অধিক কাল তাঁহার সহিত হাইকোর্টে জুনিয়র উকীলরূপে, স্যৰ চমাধব ঘােষ কাৰ্য করিয়াছি। হাইকোটে তাহার প্রভূত পশার ছিল। বিচারপতি হিসাবে তিনি ন্যায়বান্, জনপ্রিয় ও স্বাধীনচেতা ছিলেন বদেশ তাহার ন্যায় প্রতিভাবান্ লোকের জন্য গৌরবান্বিত হইয়াছে। তাঁহার মৃত্যুতে একজন উজ্জ্বলতম সন্তানের স্থান শূন্য হইয়াছে।” ১৯১৮ সালের ২৬শে জানুয়ারী কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের বাষিক অধিবেশনে ভাইস-চ্যান্সেলর স্যর দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী বলেন, “আণি অত্যন্ত দুঃখের সহিত স্যর চy মাধব ঘােষের মৃত্যু সংবাদ আপনাদিগকে জানাইতেছি। তিনি বহু বৎসর যাবৎ সিনেটের ও ‘ফ্যাকালটি অব ল'য়ের প্রধান সদস্য ছিলেন এবং ‘ফ্যাকালটি অব ল'ষের সভাপতিও ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাৰ্য্যে তিনি বিশেষ যত্ন লইতেন এবং বরেণ্য সদস্য হইলেও তাহার যত্ন ও চেষ্টা কখনই শিথিল হয় নাই। শাসনবভাগে ডেপুটী মাজিষ্ট্রেটা, আইনের অধ্যাপকতা, হা'কোর্টে ওকালতী ও জজীয়তী করিয়া তিনি যে প্রভূত অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন তাহা তাহাকে সমাজের মধ্যে বিশিষ্ট সম্মানের আসন প্রদান করিয়াছিল। সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার সংস্কারেও তিনি আত্মনিয়ােগ করিয়াছিলেন। আমরা তাঁহার শােক-সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করিতেছি।” ৯১৮ সালের ৩রা এপ্রিল বাঙ্গালার গভর্ণর লর্ড বােণন্ডসের সভাপতিত্বে ডালহৌসী ইষ্টিটিউটে কলিকাতার নাগরিকগণের একটি বিরাট শােক-সভার অধিবেশন হইয়াছিল। লর্ড রোনাল্ডসে সেই সভায় নিম্নলিখিত বক্তৃতা করেন :- “আজ আমরা স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ মহাশয়ের স্মৃতিরক্ষার উপায়- বিধানের জন্য এই সভায় সমবেত হইয়াছি। ইনি ৮ বৎসর বয়সে অনেক কাৰ্য্য করিয়া মারা গিয়াছেন। আমি বাঙ্গালায় আসিয়া গভর্ণরী গ্রহণ করিবার পর তিনি আসিয়া আমাকে অভিনন্দিত ১ শর চমাধৰ ঘােৰ করিয়াছিলেন, ইহাই তাঁহার সহিত আমার প্রথম ও শেষ দেখা। কিন্তু তাহাকে ব্যক্তিগতভাবে না জানিলেও অনেক লােকের জীবনের উপর যে তাহার প্রভাব পড়িয়াছিল তাহাতে সন্দেহ নাই। যাহার মনীষী তাঁহাদের জীবন জনসাধারণের মনের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। মাধব যে একজন আদর্শস্থানীয় পুরুষ ছিলেন, এ বিষয়ে আমাদের একটুও সন্দেহ নাই। মনীষাবলে তিনি ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। যাহারা তাহার সংস্রবে আসিয়াছেন তাহারা জানেন যে, তিনি উকীল-হিসাবে, বিচারক হিসাবেও যেমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, ভদ্রতা ও সৌজন্যেও সেইরূপ অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আজ তিনি আমাদের মধ্যে না থাকিলেও তাহার স্মৃতি রহিয়াছে।” সভায় তিনটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়। স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাননীয় বিচারপতি মিঃ গ্রীস—যথাক্রমে প্রস্তাব তিনটি উত্থাপন করেন। প্রথম প্রস্তাবের মর্ম এই যে, এই সভা স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ মহাশয়ের মৃত্যুতে গভীর শােক প্রকাশ করিতেছেন। প্রস্তাবটী উত্থাপন- প্রসঙ্গে স্যর গুরুদাস বলেন, “স্যর চন্দ্রমাধব উনবিংশ শতাব্দীতে যত মহং লােক বঙ্গে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি বহু বৎসর ধরিয়া অতি সমানজনক উচ্চপদ অধিকার করিয়া- ছিলেন। স্যর চমাধব যখন আইনের অধ্যাপক তখন আমি ছাত্র, সেই সময় চন্দ্ৰমাধবের সহিত আমার পরিচয় হয়। সে ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের কথা। শুর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় প্রস্তাবটির মর্ম এই যে, জনসাধারণের দায় স্বর চন্দ্ৰমাধবের যথাযােগ্য স্মৃতিরক্ষা করিতে হইবে। প্রস্তাবটি উত্থাপন-প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ শ্যর চমাধব ঘােম মৃতের প্রতি তাহার অসাধারণ বাগ্মিতার সহিক বলেন, “যদি আপনারা সত্য সত্যই মনে করেন যে, স্বর চন্দ্রমাধবের জীবনের অনুসরণ দেশবাসীর প্রভূত উপকার সাধিত হইবে তাহা হইলে তাঁহার যথাযােগ্য স্মৃতি রক্ষা করা প্রয়ােজন। আমি চিরকালই বীরত্বের উপাসক। যে জাতি নিজের মহৎ লােকের সমাদর করতে পারে , সে জাতির মধ্যে কখনও মহৎ লােক জন্মে না। সম্মান প্রদর্শন করিলে জীবিতেরও আবার সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া চলিতে ইচ্ছা হয়। অনেক সৈনিককে ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস দিয়া পুরস্কৃত করা হইয়াছে। ইহার কি কোন উপযােগিতা নাই ? নিশ্চয়ই আছে। ইহাতে জীবিতের প্রাণে মৃতের বীরত্বের আদর্শ অনুসরণ করিবার আগ্রহ জন্মে। প্যারিসে বীরপূজার জন্য একটি মন্দির আছে। সেই মন্দিরের নিকট দিয়া যাইবার সময়ে কোন্ ফরাসীর প্রাণে বীরত্বের ও শ্লার উদয় না হয় ? ওয়েষ্টমিনিষ্টার আবির নিকট দিয়া যাইবার সময় কোন্ ই লণ্ড বাসীর প্রাণে জাতি- গৌরব জাগিয়া না উঠে ? আমরা কি তােপ একটি গৃহ নির্মাণ করিয়া তন্মধ্যে রামমােহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামগােপাল ঘােষ, কৃষ্ণদাস পাল, আনন্দমােহন বসু রমেশচন্দ্র মিত্র ও স্যর চন্দ্ৰমাধব ঘােষ প্রভৃতি নবভারতের স্রষ্টাগণের প্রতিমূত্তি রাখিতে পারি না? এই মন্দিরকে ভবিষ্যৎ-বংশীয়গণ তীর্থস্থান বলিয়া মনে করিবে এবং এই মন্দিরের সংস্পর্শে আসিয়া সত্য স্বাধীনতা ও দেশ-প্রীতিতে তাহার উদ্বুদ্ধ হইবে। স্যর চন্দ্রমাধব ঘােষের জীবনী ও আদর্শ চিরস্থায়ী রাখার যােগ্য। বিচারক, সমাজ-সংস্কারক ও স্বদেশসেবক হিসাবে তিনি জাতির সম্মুখে একটা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছেন। তঁাহার চরিত্রে বজের ন্যায় কঠোরতা এবং নারীর ন্যায় মাধুৰ্য্য ছিল। কর্তব্যনিষ্ঠা-বলে তিনি ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট হইতে হাইকোর্টের প্রধান চার চন্দ্রমাধব খাব বিচারপতি পর্যন্ত হইয়াছিলেন। शन মাধব ঘােষ কেবল সরকারী চাকুরে ছিলেন না। তিনি স্বসমাজ ও দেশকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। তিনি সারদাচরণ মিত্রের সহিত একযােগে বিন্নি শ্রেণীর কায়স্থের মধ্যে বিবাহ চালাইয়াছিলেন। যখন বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস লিখিত হইবে তখন তন্মধ্যে স্যর চমাধব ঘােষের স্থান অতি উচ্চে বসিবে। আমাদের পিতৃ-পিতামহ হইতে আমরা যে শিক্ষা লাভ করিয়াছি তাহার ক্ষেত্র আমরা বাড়াইতে চাই। স্যর মাধব তাহার জীবনে এমন কিছু করিয়া গিয়াছেন যে জন্য আমরা তঁাহার স্মৃতিরক্ষা করিতে চাই। তাহার স্মৃতিরক্ষা করিতে গেলে টাকার দরকার। আমি জনসাধারণের নিকট টাকার জন্য চঁাদা চাহিতেছি। যদি আমরা এজন্য অর্থ না দিই এবং ব তা করিয়াই কর্তব্য সমাধা করি, তাহা হইলে সেই মৃত মহাপুরুষের স্মৃতির প্রতি অবমাননা করা হইবে। বিচারপতি মাননীয় মিষ্টার গ্রীস তৃতীয় প্রস্তাব উত্থাপন করিয়া স্যর চন্দ্ৰমাধবের গুণগান করেন। স্যর চন্দ্ৰমাধবের মত কর্তব্যনিষ্ঠ, স্বাধীনচেতা, স্বদেশের কল্যাণ- চিকীর্ষ ব্যক্তির আ বর্ভাব দেশে যত অধিক হইবে, ততই দেশের পক্ষে মঙ্গল। রায় শ যুক্ত যোগেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ বাহাদুর রায় যােগে “চন্দ্র ঘােষ বাহাদুর স্যর চন্দ্ৰমাধবের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি কলিকাতা হাইকোর্টের লব্ধ প্রতিষ্ঠ ব্যবহারাজীব, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যা- লয়ের প্রথম নির্বাচিত সদস্য ও সিণ্ডিকেটের সভ্য, কলিকাতা কর্পোরেশনের ভূতপূর্ব সদস্য, পুরাতন ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং স্তর মাধব ঘােৰ প্রথম দ্বৈতশাসনের আমলের সংস্কৃত ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। সর স্যামশুল হুদা তাঁহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন “এই দরিদ্র দেশের জন্য যােগেন্দ্রচন্দ্র যথেষ্ট কাজ করিয়াছেন।” যখন তিনি কলেজের ছাত্র মাত্র, তখন তিনি এম মীবীদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া নিজে তথায় শিক্ষা দান করিতেন । অতঃপর তিনি আসামে যাহাতে কুলী চালান দিতে না পারা যায়, তজ্জন্য প্রত্যেক বড় বড় ষ্টেশনে নিজের অর্থ দিয়া লোক নিযুক্ত করেন এবং জাতীয় মহাসমিতিতে এইপ্রকার আইনসঙ্গত ক্রীতদাস- প্রথা তুলিবার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। গভর্ণমেন্ট তদবধি কুলী- রপ্তানি আইনের ( Emigration Law) পরিবর্তন করিয়াছেন এবং ঐ নিষ্ঠুর প্রথা এখন একরূপ উঠিয়া গিয়াছে। সিনেটের সদস্যপদে থাকা- কালীন বিএসসি ডিগ্রী দিবার প্রণা প্রবর্তিত হয়। এই বিষয়ে রায় বাহাদুর যথেষ্ট চেষ্টা করিয়া ছলেন। শারীরিক ব্যায়াম-চর্চ। বিদ্যালয়ে তিনি বাধ্যতামূলক করিবার জন্য সিনেটে প্রস্তাব উত্থাপন করিলে দুর্ভাগ্যক্রমে একটি ভােটে তিনি পরাজিত হন। সহরতলীতে কলিকাতায় কয়েকটি বড় বড় রাস্তা ও ভূগর্ভস্থ পয়ঃ- প্রণালী তঁহারই চেষ্টায় খনিত হইয়াছিল । স্যর আলেকজাণ্ডার ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে ভৎসনামূলক প্রস্তাব ভৎসনামূলক প্রস্তাব সমর্থন করা সত্বেও স্যর আলেকজাণ্ডার তাহাকে একখানি সম্মানসূচক সার্টিফিকেট দিয়া- ছিলেন। স্যর আলেকজাণ্ডার অত্যাচারমূলক মিউনিসিপ্যাল আইন প্রবর্তন করিলে তিনি প্রতিবাদস্বরূপ কর্পোরেশনের সদস্যপদে ইস্তফা প্রদান করেন। সুখের বিষয়, নূতন ব্যবস্থাপক সভায় সেই মিউনিসিপ্যাল ইন রদ করা হইয়াছে।

১৪ • শ্যর চন্দ্রমাধব ঘােষ ভারতবাসীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও শিল্প-শিক্ষা-প্রবর্তনের জন্য যে সমিতি স্থাপিত হইয়াছে এবং যে সমিতি হইতে এ যাবৎ প্রায় চারিশত ছাত্রকে বিদেশে শিক্ষালাভা পাঠান হইয়াছে, সেই সমিতির তিনি স্থাপয়িতা ও সম্পাদক। তাহার ছাত্রগণ ২ টি নূতন শিল্পের কারখানা স্থাপন করিয়াছেন। তাহার ছাত্ৰমণ্ডলীর মধ্যে প্রায় ১২ জন ভি-এস সি ও পি-এইচ ডি, ৩০ জন এম-এস সি, ১০ শত জন বি-এসসি লণ্ডন, এডিনবার্গ, ম্যাঞ্চেষ্টার বার্মিংহাম, লীডস বার্লিন, প্যারিস, ব্যাসল, কর্ণেল, মিচিগান, ওহিও, কালিফোর্নিয়া, হার্ভার্ড, ইলিয়নি, টোকিও প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে শিক্ষালাভ করিয়া আসিয়া ভারতের বিভিন্ন কলেজের অধ্যাপকতা করিতেছেন। বিদেশের শিল্পবিজ্ঞান শিখাইয়। এদেশবাসীকে ও এদেশকে উন্নতির অভিমুখে লইবার জন্য তাঁহার প্রাণপণ চেষ্টা-দর্শনে ‘নব্যভারত’ পত্র তঁাহাকে বাঙ্গালার মকাডো” বলিয়া অভিহত করিয়াছিলেন । হিন্দুসমাজের তদানীন্তন নেতা স্বর্গীয় রাজা প্যারিমােহন মুখােপা- ধ্যায় ও মহারাজা স্যর মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী লিখিয়াছিলেন যে, বিজ্ঞান সমিতির পক্ষ হইতে ছাত্রগণকে বিদেশে পাঠাইয়া যােগেন্দ্রচন্দ্র সমুদ্র- যাত্রার বিরুদ্ধে যে সামাজিক আপত্তি ছিল তাহা অপসারিত করিয়াছেন। যাহা হউক, যােগেন্দ্রচন্দ্রের উপরােক্ত কার্যসমূহ তাহার বাহ্যিক কাৰ্যমাত্র। তিনি একজন মনীষাসম্পন্ন পণ্ডিত, গ্রন্থকার, দার্শনিক ও ধৰ্ম্মশিক্ষক। ভবিষ্যৎবংশীয়েরা চিরদিন তাহার নাম মনীষী-হিসাবে স্মরণ কমিবে। “হিন্দু আইন সম্বন্ধে তিনি যে তিন খণ্ড পুস্তক লিখিয়াছেন তাহাতে হিন্দু আইনের অনেক বিষয় পরিষ্কার- রূপে বুঝান হইয়াছে। প্রিভি কাউন্সিলের একজন বিচক্ষণ বিচারপতি তাহার এই হিন্দু আইনের ভূয়সী প্রশংসাবাদ করিয়াছেন। প্রাচীন সংস্কৃত গর চমাধব ঘােষ ১৪১ গ্রন্থ ও টীকা-সমূহের তিনি যে অনুবাদ করিয়াছেন তাহা তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কীর্তি। সুপ্রসিদ্ধ “বেঙ্গলী” পত্র এই গ্রন্থ সম্বন্ধে বলিয়াছেন -Will last as long as Hindu Law and the Sanskrit language will last। অবিভাজ্য সম্পত্তি ও দান সম্বন্ধে তিনি ঠাকুর অধ্যাপক-হিসাবে যে বক্তৃতা করিয়াছিলেন তাহাও তঁাহার অতুল পাণ্ডিত্য ও গবেষণাশক্তির পরিচায়ক। প্রত্যক্ষ ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তাহার গবেষণামূলক পুস্তকখানি এত সুন্দর হইয়াছে যে, জনৈক ইউরােপীয় অধ্যাপক সে সম্বন্ধে লিখিয়াছেন- “This book is the outcome of long reflection and a grand reflections.” এরূপ আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ জীবনী এ পর্যন্ত অতি অল্পই প্রকাশিত হইয়াছে। সরকারী সদস্য ও মন্ত্রীদলের বাধা সত্ত্বেও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় তাহার থানায়, ইউনিয়নে, দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ও পল্লীগ্রামে জল সরববাহের প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছিল। তাহার এই "স্তাব গৃহীত হওয়ায় কত লক্ষ দরিদ্র বঙ্গবাসীর যে উপকার হইতেছে তাহার অার সংখ্যা নাই। বাঙ্গালার শিশুরক্ষা আইন পাশ করাইয়া তিনি বহু সহস্র হতভাগিনী বালিকার জীবন রক্ষা করিয়াছেন। গভর্ণমেন্ট ও শ্বেতাঙ্গ সমাজের স্বার্থরক্ষা- কল্পে যে প্রস্তাব উপস্থাপিত হইয়াছিল তিন 'তাহার সমর্থন করিয়া ছিলেন এবং এজন্য তিনি একাধিকবার সরকারের ধন্যবাদ লাভ করিয়াছিলেন । শাসন-পরিষদের জনৈক সদস্য একবার তাহাকে বলিয়াছিলেন যে, তিনি কাউন্সিলের একজন নিঃস্বার্থ সদস্য একবার তিনি “জিদ” এই কথাটি প্রত্যাহার করিতে বারংবার অনুরুদ্ধ হইলেও তাহা প্রত্যাহার না করিয়া সভা ত্যাগ করিয়াছিলেন।

। ১২ স্যর চমাধব ঘোষ মন্ত্রীদিগের অত্যধিক বেতন, সাম্প্রদায়িক নির্বাচন, গােহত্যা- সম্বন্ধীয় আইন, কলিকাতা মিউনিসিপ্যাল আইনের পরিবর্তন * ভৃতির তীব্র প্রতিবাদ করায় তিনি সরকারী কর্মচারী ও তথাকথিত উদার, নীতিক সদস্যদের অপ্রিয় হইয়াছিলেন। চরমপন্থীদের অনেক মতের সমর্থন না করায় তিনি তাঁহাদেরও বিরাগভাজন হইয়াছিলেন। বাঙ্গালার ব্যবস্থাপক সভায় তিনি যে বিশেষ তেজস্বী ও স্পষ্টবাদী সদস্য ছিলেন ইহা বলাই বাহুল্য। ব্যবস্থাপক সভায় তাহার বক্তৃতাসমূহ বাগ্মিতার পরিচায়ক এবং রাজনীতিক তথ্যে পরিপূর্ণ। যাহারা রাজনীতি-সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান লাভ করিতে চান তাহাদেরই উহা পাঠ করা উচিত। রায় বাহাদুর যােগে চন্দ্র ঘােষের আটটা পুত্র ও তিনটি কন্যা। স্বর্গীয় সতীশচন্দ্র ঘােষ সতীশবাবু ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকালে হিন্দু স্কুলে পাঠ করিয়া তার পর প্রেসিডেন্সী কলেজে পাঠ করেন। অতঃপর বি-এল পাশ করিয়া তিনি উকীল হন। ১৯২১ ১ ৯২৪ সাল। পয্যন্ত বঙ্গীয় জমিদার-সার প্রতিনিধিস্বরূপ তিনি ব্যবস্থাপক-সভার সদস্য হন। তিনি ১৭নং ওয়ার্ড হইতে মিউনিসিপ্যাল কমিশনার হইয়া- ছিলেন। তিনি ঢাকা জেলার মালখানগরের স্বর্গীয় বামাচরণ বসুর কন্যাকে বিবাহ করেন। তাঁহার দুই পুত্র ও দুই কন্যা। জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্ৰীযুত বিমলচন্দ্র ঘােষ ও কনিষ্ঠ যুক্ত বিনয়কুমার ঘােষ। বিমল বাবু মিঃ বি-সি ঘােষ নামে পরিচিত; ইনি হাইকোর্টের সুপরিচিত ব্যারিষ্টার ।

স্যর মাধব ঘােষ তনি হুগলীর জমিদার স্বগীয় বিপিনবিহারী মিত্রের কন্যাকে বিবাহ করেন। কনিষ্ঠ পুত্র বিনয়কুমার কলিকাতা (ছােট আদালতের উকীল )। তিনি হাইকোর্টের প্রসিদ্ধ উকীল বৈদ্যনাথ দত্তের পৌত্রীকে বিবাহ করেন। শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রচন্দ্র ঘােষ ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ই সেপ্টেম্বর শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রচন্দ্র ঘােষ মহাশয় জন্ম গ্রহণ করেন। কাসারীপাড়া বঙ্গবিদ্যালয়ে প্রথমে অধ্যয়ন করিয়া তিনি হিন্দু স্কুল হইতে এণ্টন্সি ও প্রেসিডেন্সী কলেজ হইতে এফ-এ পাশ করেন। ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে তিনি বি-এ ও ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এটর্নী বি-বি রটন সাহেবের ফার্মে প্রবেশ করেন। সেখান হইতে ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে এটনীগিরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি গণিতশাস্ত্রে বিশেষ পারদশী দশ বৎসরকাল বি-বি রটনের ফার্মে কাজ করিবার পর তিনি প্রথমে ৮নং ওল্ড পােষ্ট অফিস স্ট্রীটে নিজস্ব ফার্ম খুলেন, তথা হইতে ওল্ড পােষ্ট অফিস স্ট্রীটে ফাৰ্ম্ম স্থানান্তরিত হয়। তিনি ১৭নং ওয়ার্ড হইতে দশ বৎসর কাল মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলর-পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। রায় বাহাদুর রাধাচরণ পালের মৃত্যু হইলে তিনি ই জি পি কমিটির প্রেসিডেন্ট, জেনারেল কমিটি, বিল্ডিং কমিটি, মার্কেট কমিটি ও বস্তী ইম্প্রুভমেন্ট কমিটির সদস্য হন। ১৯২৩ সালে তিনি বঙ্গীয় জমিদার-সভার প্রতিনিধিস্বরূপ ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হন এবং তিনি বৎসরকাল উক্ত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি দিল্লী ইউনিভার্সিটি কোর্টের সদস্য নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ইহা ব্যতীত তিন ষ্ট্যাণ্ডিং ফাইন্যান্স কমিটী, রেলওয়ে পরামর্শ বাের্ড, বিবাহ ১৪০ স্যর মাধব ঘােম সম্মতি কমিটি, হিন্দু দেবােত্তর কমিটি, বার কাউন্সিল, আদালত অব- মাননা কমিটি প্রভৃতির সদস্য ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় জমিদার-সভার সদস্য ছিলেন। তিনি বরিশাল জেলার কঁাচাবেলিয়া-নিবাসী স্বগীয় ভারত অহের কন্যাকে বিবাহ করেন। তাহার তিন পুত্র-জ্যেষ্ঠের নাম শ্ৰীযুক্ত অরুণকুমার ঘােষ, ইনি ব্যারিষ্টার ; মধ্যমের নাম শ্ৰীযুক্ত তরুণ কুমার ঘােষ, ইনি ইঞ্জিনিয়ার এবং কানষ্ঠের নাম অমিয়কুমার ঘােষ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sir Chandramadhab Ghosh

Author
Kumar, Ganendranath Ed
Title
Sir Chandramadhab Ghosh
File name
Sir Chandramadhab Ghosh
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2010/01/27
Publisher
Sri Ganendranath Kumar, Lokkata
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Kumar, Ganendranath
DLI number
513301
Barcode
4990010020292.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
2rijH5tfuNJ
Download PDF

Sir Chandramadhab Ghosh