Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prabhati
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রভাতী।
দেবকুমার রায়চৌধুরী-প্রণীত
কলিকাতা,
৪১নং সুকীয়া স্ট্রীট হইতে
শ্রীরাজেন্দ্রলাল গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
চেরি প্রেস
৩নং হুমায়ুন প্লেস, চৌরঙ্গি,
কলিকাতা।
১৩০৯ ।
মূল্য, বারাে আনা
و محمد عمر مجرد ولا
উৎসর্গ।
কবিবর শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ রায়চৌধুরী
সুহৃদ্বর-করকমলেষু।
-৬৬ ১
অসংখ্য সদগুণরাশি সঞ্চিত করিয়া,
তােমারে, সৃজিল বিধি নির্জনে বসিয়া।
সারল্যের প্রতিমূৰ্ত্তি, হে বন্ধু আমার,
শুচি-স্নাত তব স্পর্শে এ জীর্ণ সংসার।
সত্যপথে, শুদ্ধচিত্তে, অকুণ্ঠিতভাবে
সদা চলিয়াছ তুমি স্বধৰ্ম্মপ্রভাবে ;-
কভু কোন প্রলােভন গ্রাসেনি’ তােমায়,
অক্ষুন্ন রয়েছ তুমি আত্মমর্যাদায় ।
ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র ভেদাভেদ নাহি তব কাছে ;
বিশ্বপ্রেমে তব প্রাণ উর্দ্ধে উঠিয়াছে ।
তােমার কবিত্ব-সুধা প্লাবি’ বঙ্গভূমি
ছুটে’ছে অনন্তধামে নীলাম্বর-চুমি'।
আপন ক্ষমতাবলে ওহে কবিবর,
ক’য়ে দেব-বরমাল্য হইও অমর।
১৬
No text on this page.
সূচী। বিষয় পৃষ্ঠা। পূজা + : আবেশ সূচনা ফুলবালা ৮ ৫ ৮ ১০ মানসী-প্রতিমা অপরিচিতা ••• ১১ ৫ । ১৩ ১৪ . . . = ৮ + ৩৫। ১৭ পূর্ণকাম নারীর প্রেম প্রণয়-মাধুরী প্রণয়ি-যুগল নিঃশেষ-দান সর্বময়ী দুর্দিন দুর্দিনের আশীর্বাদ অদৃষ্ট ০৮ ১৯ . . । २० ০ ০ ০ ••• ২২ | ০ ০ . . । ২৪ ২৫ এ ৫ ly বিষয় পৃষ্ঠা। ««««« ব্যথিতের উক্তি ৮ । ২৭ নিবেদন as a ৩২ দুর্যোগে ৩৪ অসহায় ৫ ০ ০ ০ ০ ০ . . . উদ্বোধন ••• ৩৭ ৪২ অনুতাপ ০৮ নিবারণ ০ ০ ০ ৪৩ ০ ০ ০ বর্ষ-আবাহন | ০ ০ ৫ ৪৪ টাণ্ডার জলপ্রপাত ৮ । ৪৭ হিমালয়-বক্ষে ০ ০ ০ ৮ ০৫ ৫০ জাগরণ ০৫০ ৮ ০ ০ ০ শ্ৰীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীযুক্ত অশ্বিনীকুমার দত্ত সন্ধ্যাচিত্র ৫৯ ৮ ০ ০ ৬০ আভাস ০ ০ ০ ৬১ ব্যক্ত বাসনা ৮০০ ৬২ ভিতরে-বাহিরে “যা খুসি করিও” ০ ০ ০ lo বিষয় পৃষ্ঠা। + Aw ••• ••• ৬৭ ভুবন-সঙ্গীত প্রতিহিংসা অয়ি প্রীতিময়ী প্রকৃতি। নিদ্রা .:. ৭০ ৫ , ০ ০ ০ প্রেম-বিহ্বলতা নির্দয়তা ০ ০ ০ ৮। ৭৩ হাহাকার ৭৭ অতৃপ্তি ০ ০ ০ ০ ০ ৭৮ আবাহন । এ ••• ১ ব্যবধান ৫। ০ ০ ০ ৮৪ বসন্ত-অবসানে ০ ৮৮ কোকিলের প্রতি . ০ ০ ০ ০ ০ ৯২ অনাদৃত উপেক্ষিত আয় সুপ্তি, আয়! ০ ০ ০ ২. ৯৪ অবসান . . . । এ
No text on this page.
প্রভাতী
পূজা।
হেরি’ উজ্জ্বল অরুণ-উদয়
নীল-নিৰ্ম্মল গগনে,
নবীন মুকুল উঠিল ফুটিয়া
আমার কুঞ্জ-কাননে।
ধীরে, সযত্নে কোমল পুষ্পগুলি
অঞ্চল’পরে গুছায়ে লইনু তুলি;-
আপন কুটীরে
আইলাম ফিরে
রচিবারে মালাগাছি।
গাঁথিলাম হার
প্রভাত-আলােকে
কণ্টকদল বাছি।
এসেছি তােমার মন্দির-দ্বারে
দুরাশা-দৃপ্ত হৃদয়ে ;
পূজিবার আশা অন্তরে বহি’
শরণ লয়েছি, অভয়ে !
প্রভাতী। । মন্দ পবন মন্থরে আসে বহিয়া, শত বিহঙ্গ গাহিছে রহিয়া রহিয়া জগতে আজিকে হেরি’ চারিদিকে বিকশিত উৎসাহ, ভিক্ষুকবেশে এসেছি জননি, করুণ নেত্রে চাহ। দাঁড়ায়ে রয়েছি অঘের থালি কম্পিত করে বহিয়া, লুব্ধ নেত্রে রয়েছি রক্ত- কমলচরণে চাহিয়া । চুম্বি চরণ মানসভৃঙ্গ মাের মধু পান করি’ হ’ল উন্মাদ ঘাের । পূজার ভবন ;-- কোন বিপত্তি নাহি। অনুমতি দেহ এবে পূজিবারে,-- শুধু ইঙ্গিত চাহি ! স্তব্ধ, বিজন চন্দ্রমা-বিভ-নিন্দিত মুখে আশ্বাসবাণী কহিয়া বিশ্বমােহিনী দেবি, মাের বুকে দিলে অমৃত ঢালিয়া!
প্রভাতী।
শ্রীপাদপদ্মে সঁপি’ দিনু হার শিহরি,
উঠিল চিত্ত অতুলানন্দে বিভােরি।
চরণের ছায়
লুটানু ধূলায়
ভাসিয়া অশ্রনীরে।
দয়াময়ি, তুমি কোলে তুলে নিলে
এ দীন ভক্তটিরে ।
প্রভাতী। আবেশ। ঘুমেতেছিলাম অচেতন। সহসা কোকিলকণ্ঠ জানাইয়া দিল মােরে বসন্তের শুভ আগমন। নয়ন মেলিয়া দেখি—নভােময় নবীনতা, জগময় জীবন্ত হরষ । উতলা মলয়ানিলে করিলাম অনুভব যেন কার হারানাে পরশ। অতীতের তাপ-ক্লেশ-নিমেষের মাঝে যেন- কোথা দিয়ে গেল মিলাইয়ে ; প্রকৃতির পূর্ণতায় কি মদিরা করি’ পান শূন্য প্রাণ উঠিল ভরিয়ে । হেরি’ এ উৎসবে আজি উচ্ছসিত চারিদিকে প্রীতি-পুণ্য শূন্যে, জলে, স্থলে,- এ মাের ব্যাকুল হিয়া দিগ্বিদিক হারাইয়া ডুবে গেল অজ্ঞাত অতলে।
প্রভাতী। সূচনা। আজি এ শুভ প্রভাতে, শান্ত শােভাতে, স্নিগ্ধ মেদিনী মােহিয়া, বিহঙ্গকুল-আনন্দাকুল- উঠেছে প্রভাতী গাহিয়া তপন-খচিত অম্বরতল স্বর্ণকিরণে খর-উজ্জ্বল। মন্থর নদী প্রেম-বিহ্বল চলে কল্লোলে বহিয়া- শিশিরসিক্ত-বায়ুহিল্লোলে স্নিগ্ধ, মেদিনী মােহিয়া ! – এই আজি ধীরে এ মাের নীরব, নিভৃত কুঞ্জে চম্পক-বেলা-মােতিয়া কোরকগর্ভে-ঘুমন্ত যত অন্তর দে’ছে মেলিয়া। মত্ত মধুপ গুঞ্জনগানে তাহে ব্যাকুলিয়া আসে মধুপানে! প্রকৃতি দিয়াছে মুগ্ধ পরাণে লাজ-অঞ্চল ফেলিয়া।
প্রভাতী।
তাই,
কুঞ্জে মধুর হাস্যমগন
চম্পক-বেলা-মােতিয়া ।
আজি
ধীরে,
জাগ্রত হেরি আশা-উৎসাহে
প্রভাতােজ্জ্বল ধরণী
ব্যাকুলচিত্তে, উচ্ছল জলে
চলিনু ভাসা’য়ে তরণী।
দু’ধারে বিটপী শিশির-ঝালরে
উঠিছে শিহরি’ উষাণ-করে।
গাহে বিহঙ্গ মঙ্গল-গীতি
জাগা’য়ে সুপ্ত ধরণী ।
বিহ্বলচিতে উছল নদীতে
চলেছি ভাসা’য়ে তরণী ।
আজি
একি
কবে
দুরাশা-কুহকে প্রভাত-আলোকে
তরণী চলিল ভাসিয়া !
কি মােহমন্ত্রে থামিবে যাত্রা
কোন্ মায়াপুরে পশিয়া
কে জানে কখন্ এ হিয়া-বেদন
হইবে লুপ্ত লভিয়া চেতন!
প্রভাতী।
কে জানে সমুখে সাধনার ধন
কখন দাঁড়াবে আসিয়া ।
কোথায় চলিল জীবন-তরণী
আজি এ প্রভাতে ভাসিয়া
এবে
প্রভাতী।
ফুলবালা ।
কে তুমি গাে ফুলবালা, বসি’ একাকিনী
চাহি’ছ গাঁথিতে শুধু একগাছি মালা ?
তােমারে মনেতে পড়ে—আধ’-আধ’ চিনি ;
কবে যেন তুমি বিশ্ব করেছিলে আলা !
আজ তুমি এ বিজনে
বসিয়া অনন্যমনে,
বকুল গাছের ছায়ে ছড়া’য়ে চরণ—
কাহারে ভাবিয়া যেন, করিছ যতন হেন
গাঁথিবারে ফুলহার, করিতে বরণ !
চারিদিকে দগ্ধমাঠে কৃষকেরা নাড়া কাটে,
পসরা লইয়া হাটে ছুটেছে পসারী,
খেয়াতরী-গান গেয়ে মাঝিরা চলে’ছে বেয়ে,
সুনীল অম্বরে বক উড়ে সারি সারি !
তারি মাঝে আছ বসে এলােচুল পড়ে খসে,
শিথিল অঞ্চলখানি মাটিতে লুটায় ।
সব ভুলে', একমনে তুমি গাঁথ নিরজনে
শুধু একগাছি মালা বকুলতলায়!
অম্লান মুখের’পরে স্বেদবিন্দু খেলা করে,-
প্রভাত-কমলে যথা শিশিরের কণা।
পরিপূর্ণ তনু-মাঝে বিশ্বের লাবণ্য রাজে;
তােমারি চরণে মাের লুটায় কল্পনা।
-
-
প্রভাতী।
৯
সভয়ে এসেছি কাছে সঙ্কোচে হৃদয় নাচে।
প্রসাদ-ভিখারী আমি অয়ি ফুলবালা,
বিসজ্জিব আপনারে
সৌন্দর্য্যের পারাবারে
শুধু বারেকের তরে পরি’ তব মালা।
১০
প্রভাতী।
মানসীপ্রতিমা।
হৃদয়ের বিম্বখানি পড়েছে আঁখিতে--
সেই আঁখি তুলে তুমি
দেখেছ আমায়।
বারেক চাহিয়া মুখে, অমনি চকিতে
বল অয়ি আকুলি, পলা’লে কোথায় ?
সরমে জড়িত তব চঞ্চল চরণ,
লাজে আধ’-গুঞ্জরিত দু'খানি নূপুর,
স্খলিত, শিথিল তব তনু-আবরণ,
অঙ্কিত রহিল চিত্তে অতি সুমধুর!
একাকী ছিলাম বসে দগ্ধ দ্বিপ্রহরে
তটিনীর তটপ্রান্তে বকুলতলায় ;-
কে জানিত সে বিজনে,—সেই অবসরে--
মানসীপ্রতিমা অয়ি, দেখিব তােমায় ?
কল্পনার প্রতিমূৰ্ত্তি তুমি গাে কুমারি,
মিথ্যা ভয়ে পলাইলে চিত্ত অধিকারি।
প্রভাতী।
১১
অপরিচিতা।
•
কত যে বাসিরে ভাল,-বুঝাব কেমন করে ?
প্রেমে প্রকাশিতে নারি আছে সে অন্তর ভরে’
তােমারে হেরিব বলে’ দিবানিশি বসে আছি।
তােমারে পাইব বলে সবে হৃদে রাখিয়াছি।
জগতের বিন্দুকণা কভু আমি নাহি ফেলি ;
সবারে রাখিয়া বুকে আছি পূর্ণ আঁখি মেলি ।
তােমারে পাইনা আমি,-তাই মাের ভালবাসা
আকণ্ঠ পূরিয়া আছে; না মিটি’ছে এ পিপাসা ।
সুদূর গগনতলে—সুনিবিড় নীলিমায়,
শুভ্র, স্নিগ্ধ, জ্যোৎস্নালােকে, রবিকর-প্রতিভায়,
প্রশান্ত প্রান্তর-কোলে,-মন্থর, মধুর বায়ে,
তরুচ্ছায়াসমাচ্ছন্ন আমােদিত কুঞ্জ-ছায়ে,
সবাতে তােমারে হেরি রয়েছ প্রচ্ছন্নে জাগি;
এ জগতে বাসি ভাল—সে শুধু তােমারি লাগি'।
দিবারাতি তব তরে আছি আমি পথ চেয়ে,
এ কি চিন্তা অবিরাম আমারে রেখেছে ছেয়ে !
এ জীবন, এ যৌবন, ব্যাকুল: এ হিয়াখানি
তােমারেই সঁপিয়াছি লাজ-শঙ্কা নাহি মানি’ ।
১২
প্রভাতী।
যদি ভুলে মনে পড়ে,বারেক আসিও কাছে ;
এ জীবন-মরুভূমে আর মাের কেবা আছে।
রে নিষ্ঠুরা, রে পাষাণি, রে মাের অপরিচিতা,
তােমারি তরে অন্তরে জ্বলিছে অন্তিম-চিতা!
প্রভাতী।
পূর্ণকাম।
দূরে থাকি’ শুধু তব ওই মুখখানি
ভালবাসিতাম সখি। ইচ্ছা হ’ত মনে
ব্যথাপ্লত বক্ষে মাের তােরে টানি আনি’
জুড়াইব সব জ্বালা। অতি সঙ্গোপনে
সে বাসনা পুষেছিনু অন্তরের কোণে।
তুমি প্রাণাধিকে, মাের নিকটে আসিয়া
বুঝিলে আমার তৃষ্ণা। সজল নয়নে
করুণার অশ্রুবিন্দু দিলে বরষিয়া
আমার বুকের’পরে। গেল দুঃখ-তাপ
বহুদূরে পলাইয়া।
শান্তির ছায়ায়
ভুলে’ গেনু অদৃষ্টের যত অভিশাপ।
আপনারে ধন্য মানি’ বিধ্বলের প্রায়
পড়িলাম ঘুমাইয়ে। জীবনে আমার
হ’ল নব-সঞ্জীবনী সুধার সঞ্চার।
১৪
প্রভাতী
নারীর প্রেম।
পবিত্র প্রণয় এই জগতের মাঝে
সন্তর্পণে, সঙ্গোপনে লুকাইয়া আছে
রমণী-হৃদয়ে।
তাহে, পুরুষের প্রাণ
নিশিদিন মহানন্দে রহে ভাসমান
নিৰ্ম্মল কমল সম। উন্মাদ পবন
ছুটিয়া আসিলে তার পানে,-সে তখন
দুলিয়া প্রিয়ার বক্ষে,—প্রেম-সরােবরে
চিন্নাত হয়ে, পুনঃ নবীনতাভরে
চেয়ে দেখে স্বর্গ-পানে। তাই, মনে হয়-
জগতে নারীর প্রেম পবিত্ৰতাময়,
পুরুষের পরম আশ্রয় । নারী বিনা
এ বিশ্বপ্রকৃতি শুষ্ক, আভরণহীনা।
শুধু রমণীর বিন্দু প্রেম করে চুরি
আজি প্রকৃতির এত বিচিত্র মাধুরী ।
---
প্রভাতী ।
প্রণয়-মাধুরী।
ভালবাসি,তাই দিনরাত
পড়ে আছি মুখপানে চেয়ে ;
দেখিতেছি—মাধুরীর ধারা
গড়ায়ে পড়িছে তােমা-ছেয়ে।
গাহ গান,-তাই গাহে পাখী,
হাস তুমি,—তাই ফোটে ফুল,
বিচরিছ,—তাই আজো বায়ু
ছুটিতেছে উন্মাদ, ব্যাকুল ।
তুমি যবে এলাইয়া দেহ
নগ্ন তব তনুদেহখানি-
তখনি সে জ্যোৎস্না ফুটে ওঠে
সুপ্ত হয় মােহনুগ্ধ প্রাণী।
তুমি পুনঃ মেল যবে আঁখি
তখনি আবার ওঠে রবি,
তখনি জাগিয়া সপুলকে
ধন্যগান গাহে যত কবি ।
পাই তােমারে কোন্ দিনে--
মনে নাই সে মিলন-ক্ষণ
লভি এবে ও স্নেহ-পরশ
পাইয়াছি নবীন জীবন।
প্রভাতী।
তুমি মােরে কাছে নিলে ডাকি
চারিচক্ষে কি যে হ’ল কথা!
পলকে অধরে কি বর্ষিলে ?-
এল প্রাণে স্নিগ্ধ সরসতা !
সেই হ'তে পড়ে আছি আমি
ওই রাঙা চরণের তলে ;
সেই হ'তে হেরিহে তােমায়
আকাশে, বাতাসে, জলে, স্থলে।
প্রভাতী।
প্রণয়ি-যুগল।
(পুরুষের উক্তি )
ছিলাম ব্যথায় বিকল-চিত্ত
স্বপ্নমগন, ক্ষুব্ধ-হিয়া !
তুমি সে তন্দ্রা ঘুচাইলে মাের
অধমে বক্ষে তুলিয়া নিয়া।
নব বিচিত্র বিমলানন্দে
অন্তর মাের উঠিল ভরি।
কি মােহমন্ত্রে, পলকের মাঝে,
আমারে লইলে তােমার করি'।
এবে হৃদয়ের প্রতি করে
স্নিগ্ধ, শান্তিসলিল ঢালা,
এবে ও কোমল, করুণ চক্ষে
নেহারি আশার প্রদীপ জ্বালা।
হে মহিমাময়ি, সুরসুন্দরি,-
কে জানে কখন ফুরাবে বেলা-
এস এইবেলা সাধ মিটাইয়ে
করি দুইজনে প্রেমের খেলা।
তুমি দিয়াে মােরেখেলিবার ছলে-
সরমে গ্রথিত একটি মালা ;
প্রতিদানে আমি আঁকিব অধরে
প্রণয়ের শুভচিনু বালা !
প্রভাতী।
(নারীর উক্তি )
ভালবেসে’ বঁধু, আছি তােমা’সনে,
ফিরি তাই সদা ছায়ার প্রায়,
জীবনে আমার যাহা ছিল নাথ,
দিয়াছি সঁপিয়া যুগল পায়।
রয়েছে কেবলি এক ফোঁটা লাজ,
কি ফল তােমার সেটুকু নিয়ে ?-
লভে না তৃপ্তি প্রণয়ীর প্রেম
সরমের বাঁধ ছুটায়ে দিয়ে।
লজ্জা-শিশিরসিক্ত এ প্রাণ
খুলে দিব আমি তােমার কাছে,
অরুণের নব স্বর্ণকিরণ
পড়ে ঝলকিবে তাহার মাঝে।
সেই তাে শােভন হে প্রিয় আমার,
সেই তাে সাজিবে তােমায় ভালাে ;
কমলের মত এ হিয়া-মাঝার
জ্বেলে দাও তব প্রভাত-আলাে।
সরম লইলে ঝরে যাব আমি ;--
কাষ নাই নাথ।
সুদূর গগনে বিরাজ’ হে দেব,
চাহিয়া আমার হৃদয়-পুরে!
এমনি দূরে
প্রভাতী ।
১৯
.
নিঃশেষ-দান।
তােমারে বুকেতে নিয়া দিগ্বিদিক্ হারাইয়া
দেখিতেছি অনিমিখে ওই মুখখানি ;-
ওই দুটি আঁখিমাঝে কি যেন লুকানাে আছে,
যেন কার সকরুণ বিদায়ের বাণী।
কে যেন আমার তরে
আজিও আশার ভরে
নিশিদিন বসে আছে মিলনের লাগি';
কে যেন গাে চিরকাল
ভাঙি বাধা-অন্তরাল
তােমাতে লুকায়ে ধীরে রহিয়াছে জাগি'।
কবে যেন নিজ করে
হৃদি-সিংহাসন’পরে
বসা’য়েছিলাম তারে মন-প্রাণ দিয়া,
আজো তাই থরে থরে
ওই দু’টি আঁখি’পরে
হেরি-তারি স্মৃতিগুলি আছে বিকশিয়া।
ব্যাকুলিয়া তােমাপানে অজানিত মােহ-টানে
তাই এ হৃদয় মাের উঠিছে উচ্ছাসি’ ;
স্মৃতির প্রদীপ আলি
তােমাতে দিলাম ঢালি’
অর্ঘ্যে অর্ঘ্যে আজি মাের প্রতি-পুষ্পরাশি।
२० প্রভাতী সর্বময়ী সেই তপ্ত দ্বিপ্রহরে, বকুলতলায় জীবনে প্রথম যবে দেখিনু তােমায় কল্পনা-সুন্দরি অয়ি, সেই দিন প্রাণে উচ্ছসি উঠিল যেন অজ্ঞাত সন্ধানে অপূৰ্ব আবেগভরে প্রেম-প্রস্রবণ। সেই দিন হ'তে এই নীরস জীবন স্নিগ্ধ হয়ে গেছে মাের। অয়ি প্রাণপ্রিয়া, সেই শুভ মুহূর্তেই এই দগ্ধ হিয়া তােমার চুম্বন-সুধা করিবারে পান ছুটেছিল তােমাপানে। গর্ব-অভিমান- যাহা-কিছু ছিল চিতে-তব মাধুরীতে সে সব মিশা’য়ে দিছি। অয়ি শুচিস্মিতে, তারপর বহুদিন হইল বিগত ;- কত ছল-চাতুরীর লীলা শত শত দেখাইলে তুমি। শেষে, এক ওভপ্রাতে আমারে হারা’য়ে আমি ফেলিমু তােমাতে, নদী যথা হারায় সাগরে। আজি আমি পরিপূর্ণকাম। এবে, শুধু দিনযামী
প্রভাতী।
তােমারে বসা’য়ে এই হৃদি-সিংহাসনে
গাহিতেছি তব বন’-গান। একমনে
সেবিতেছি তােমারে যতনে। আর আশা
কিছু রাখিনাক। স্নেহ-ভালবাসা
যেটুকু দিয়াছ মােরে, তাহে প্রাণ মাের
কৃতার্থ হইয়া গেছে। ওই বাহুভাের
সকল বাসনা-বহুি দে’ছে নিবাইয়া
সুমধুর আলিঙ্গনে।
পৃথিবী ব্যাপিয়া
হেরি শুধু তােমারি মুরতি। এ সংসারে
তাই আর কেহ মােরে বাঁধিতে না পারে
মায়ার বন্ধনে। এবে শুধু তােমা’ময়
আমার অস্তিত্বটুকু হয়েছে বিলয়।
२२
প্রভাতী।
দুর্দিন।
একি দুর্দিন আসিল আজিকে
কাপা’য়ে মেদিনী সহসা;-
ভীম হুঙ্কারে ত্রাসি দশদিশি
আইল মত্ত বরষা।
প্রভাত-সূৰ্য্য আবরি’ আঁধারে
কালাে মেঘরাশি নাচে চারিধারে।
ছুটে’ উন্মাদ বায়ু হাহাকারে
নাহি হেরি কোন ভরসা!
একি দুর্দিন আইল ঘনা'য়ে
কঁপায়ে মেদিনী সহসা।
চলেছিনু ধীরে বাহিয়া তরণী
নব বসন্ত-পবনে-
হেরি’ নিৰ্ম্মল, স্নিগ্ধ ধরণী
সজ্জিত নব ভূষণে।
অম্বরতল আলােকি’ তখন
উঠেছিল নব অরুণ-কিরণ ;
পিক-কুহুরব নবীন জীবন
আনি দিতেছিল ভুবনে ;-
তারি মাঝে আমি বে’য়েছিনু তরী
নব বসন্ত-পবনে।
প্রভাতী।
আশা ছিল-না’য়ে প্রিয়ারে লইয়া
গাব গান প্রাণ খুলিয়া,
তটিনী-উপরে তরণী চলিবে
ঈষৎ হেলিয়া দুলিয়া।
ভাবি নাই কভু—এমন সুদিন
মেঘরাশিমাঝে হইবে মলিন।
ভাবি নাই হায়,হ’ব আশাহীন
তরী’পরে পাল তুলিয়া !
বড় আশা ছিল—প্রেয়সীর সাথে
গা'ব গান প্রাণ খুলিয়া।
এবে ভাবি মনে,-মানবজীবনে
কোনই ভরসা নাহি রে।
চিরদিন হাসি-অশ্রুর মাঝে-
ডুবি’ছে ভিতরে, বাহিরে।
বড় আনন্দে ভাসাইনু’ তরী
শান্ত নদীতে আপনা-পাসরি।
এবে জলরাশি “খলখল” করি’
উঠে ভৈরবী গাহি রে !
তাই ভাবি মনে, মানবজীবনে
কোনই ভরসা নাহি রে !
২৪ প্রভাতী। দুর্দিনের আশীৰ্বাদ। সন্ধ্যাবেলা। শ্রান্ত হিয়া, মৰ্ম্ম ভারাতুর, সঙ্গীতের উন্মাদনে ছিলাম ভর্পূর। পৃক্ষীগুলি চিৎকারিয়া কুলায়পানে ধায় ; সঙ্গীহারা, ক্লিষ্ট, একা বসিয়া আছি না’য়। গভীর ব্যথা বহিয়া বুকে, অন্যমনে, একা ভাবিতেছিনু’—তাহার সনে পুনঃ কি হবে দেখা ? এমনকালে পূৰ্ব্ব হ’তে মত্ত হাহা’ রবে উঠিল মাতি’ বাদলবায়ু কঁপা’য়ে মােরে যবে, তখনি আমি অন্তচিতে চাহিনু' চারিধারে— পশ্চিমেতে নীরদঘটা হেরিনু পরপারে । এমনি করে’ অস্তাচলে রক্ত, আভাখানি ডুবিয়া গেল জলদজালে কেমনে নাহি জানি সহসা প্রাণে জাগিল ভয়, নয়ন গেল ভরি; লুটিনু আমি হতাশ-প্রাণে বাঞ্ছিতেরে স্মরি। ব্যথায় ভরা হৃদয়খানি চাপিয়া দুই করে ডাকিনু’ ধীরে, ভিন্ন-গলে তাহারে সকাতরে ;- “এসগাে দেবি, পরাণপ্রিয়া, এসগাে প্রাণময়ি, দুরন্ত এ দুর্দিনেতে আমারে কর জয়ী।” ধ্বনিল বাণী বালােকে ধাঁধিয়া দুনয়ন- “মরণ মাঝে লভিয়াে তুমি উজ্জল জীবন!
প্রভাতী।
অদৃষ্ট।
প্রত্যুষ হতে সন্ধ্যা অবধি,
শৈশব হতে মরণে,
তব বিচিত্র বিধানে বিশ্ব
লুষ্ঠিত তব চরণে!
বিশ্ববাসীরে বক্ষে তুলিয়া,
অদ্ভুতরূপে অট্ট হাসিয়া,
কভু স্নেহে, প্রেমে-শান্তি ভরিয়া
দিতেছ তাদের জীবনে,
কভু নিরাশায় ডুবাইছ হায়,
নির্দয় পাদ-পীড়নে।
একি অপূর্ব উৎসাহ তব
ওগাে দুর্দম প্রণয়ি।
জগতের সনে একি খেলা তব
হে দুর্দান্ত বিষয়?
তব অনন্ত ইচ্ছার সনে
বেঁধেছ সবারে মায়া-বন্ধনে ;
তুচ্ছ করি’ছ হাসি-ক্রন্দনে।
তুমি অদম্য বিজয়ী।
ত্রিলােকে নিত্য অপ্রতিহত
তুমি দুর্দম প্রণয়ী।
প্রভাতী।
-
কি মহান্ তব রুদ্র পিপাসা
অম্বরল আবরি’
নিখিলের প্রতি গুহা-করে
উঠিছে নিত্য শিহরি’!
ক্লান্ত জগৎ চরণে তােমার
বশ্যতা মানি’ নমে’ বার বার।
শুষ্ক, জীর্ণ হৃদয় তাহার
মরি’ছে গুমরি গুমরি';-
তবু তুমি তারে মুক্তি দিবে না,
রেখেছ চিত্তে আবরি’!
মহা রহস্যে মগ্ন রহিয়া,
অজ্ঞাত তব করেতে
মৌন মহিমা রেখেছ ব্যাপিয়া,
কি শুভ-সিদ্ধি-তরেতে ?
আদি কি অন্ত তােমার কোথায়
কল্পনা তাহা খুজিয়া না পায়।
শুধু প্রাণ মাের স্বপ্নের প্রায়
বুঝেছে—তােমারি বরেতে-
অতীতের মাঝে বিজড়িত সে যে
তব অজ্ঞাত করেতে।
প্রভাতী।
২৭
ব্যথিতের উক্তি।
==
এ সংসার নহেরে আমার।
যারে বাসিলাম ভাল তাহারি অন্তরখানি
কঠিন, লৌহের কারাগার !
পশিয়াছি কতবার কত পরাণের মাঝে,
হেরিয়াছি, শুধু মরীচিকা!
ধাইয়াছি কতবার কত সৌন্দর্যের কাছে,
সবি কিন্তু বাসনার শিখা।
যাহারে ধরিতে বুকে বাড়ায়েছি বাহু
সে তত ধীরে গেছে মিলাইয়া,
শূন্যতা আঁকড়ি’ বুকে নিয়েছি টানিয়া,
শ্রান্ত, ভিন্ন হইয়াছে হিয়া।
অসার, অনিত্য হেথা যাহা-কিছু দেখি,
শুদ্ধ প্রেম নাহিরে হেথায়।
নিমেষের তরে আসি সবি এ জগতে
নিমেষেতে লীন হয়ে যায়।
অনিত্যতে তৃপ্তি নাই।—একথা আজিও
প্রাণে মাের করেনি-আঘাত,-
বুঝি নাই
বলে মাের এত
প্রাণে,
তাই নিশি হয় না প্রভাত।
২৮
প্রভাতী।
কেমনে পঙ্কিল জলে মিটাইব তৃষা ?
প্রেম,সে যে স্বরগের সুধা !
সকলি বিষাক্ত হেথা, এখানে কেমনে
মিটাইব জীবনের ক্ষুধা ?
আকাশের চাঁদ হেরি’ ভাবিয়াছি মনে--
প্রতিবিম্ব পড়ুক হৃদয়ে ;
তারকা হেরিয়া, তারে চেয়েছি রাখিতে
অন্তরের নিভৃত আলয়ে ;
পবন বহিয়া গেছে মর্মরিত তানে
চুমিতে তাহারে গেছি ছুটে ;-
আশার সমাধি’পরে নিরাশা-কুসুম
হেনরূপে উঠিয়াছে ফুটে।
এবে এ জীবন-মরু বহুদূরব্যাপী,
রৌদ্র-তপ্ত দ্বিপ্রহর তাহে;-
নিদ্রার পাথারে নামি’ শান্তি-বারিকণা
প্রাণ মাের তাই পেতে চাহে
শান্তি কোথা! শান্তি কোথা এ পৃথিবীতলে ?
সবি মায়া, ছলনার ঘাের।
সবাই আপন স্বার্থে, আপনার নিয়ে
আপনাতে রয়েছে বিভাের।
প্রভাতী।
দুরন্ত ধরার মাঝে কে পারে বাঁচিতে
না লভিয়া বিন্দু সুখলেশ ?
কে পারে রহিতে স্থির যাহার জীবনে
যাতনার নাহি কোন শেষ ?
দ্বারে দ্বারে সকলেরে সাধিনু ঘুরিয়া
দিতে বিন্দু প্রেমভিক্ষা মােরে,
সবাই করিল দান—অতৃপ্ত বাসনা
মাের এই করপুট ভরে।
(২)
এখনাে বিশ্বাস মাের রহিয়াছে প্রাণে ;
সে স্বর এখনাে পড়ে মনে,
এখনাে শুনিতে পাই মৃদু প্রতিধ্বনি
যবে বসে থাকি নিরজনে।
সংসারে না পাইলাম শান্তির আভাস
খুজিয়াছি তন্ন তন্ন করে ;
আঁখি মাের অহীন হয়ে গেছে এবে,-
অন্তরেতে রহিয়াছি মরে।
যাও তবে হে সংসার, হে নির্দয় ধরা,-
যাও চলে,—ছেড়ে দাও দাসে ;
৩০
প্রভাতী।
অশান্তি বাড়া'য়ে আর প্রতিদিন মােরে
বাঁধিয়াে না শত মায়াপাশে।
হে মাের অন্তরতম বিশ্বাস মহান্,
ওরে মাের প্রতিধ্বনি বালা,
মূর্তিমান হও প্রাণে তােমরা দু’জনে,-
কর মাের এ অন্তর আলা!
যুগলমূরতি যথা হেরি’ বৃন্দাবনে
আকুলিত হত গােপনারী,
তেমতি বিশ্বাস, তুমি দাড়াও বামেতে
ল’য়ে মৃদু প্রতিধ্বনি তঁারি।
আমি হেরি’ ও যুগলে ভুলি দুঃখ-তাপ
নিমেষের—পলকের মাঝে,
যাই ভুলে মিথ্যা যত বাসনার জ্বালা,
ভুলে যাই যত মিথ্যা কাযে।
তখন সংসার আর পাবে না ধরিতে
আমারে একান্তে তার বুকে ;
তখন স্মরণে রাখি’ ও যুগলরূপ
বেড়াইব অবিকারে, সুখে।
কোন দুঃখে, কোন দৈন্তে, কোন অভিশাপে
তখন হ’ব না আমি নত ;-
সংসারে থাকিয়া আমি হ’ৰ দূরবাসী
সুপবিত্র তারাটির মত।
প্রভাতী।
;
জাপ তবে হে বিশ্বাস, অয়ি প্রতিধ্বনি,
মূৰ্ত্তি ধরে’ দেহে ওঠ ফুটি’
নির্লিপ্ত নেহারি বিশ্ব, তােমাদের পায়ে
মধু পান করি আমি লুটি।
প্রভাতী।
নিবেদন।
ক’দিনের খেলা নাথ, ক’দিনের প্রাণ
নিমেষে, ইঙ্গিতে তব সবি অবসান!
কেন তবে এত তর্ক, এত অহঙ্কার !
কেন তবে এত তৃষ্ণা--এত হাহাকার ?
কা’র তরে এত করি ভুলিয়া তােমায়,
কেন মিছে নিশিদিন ডুবি হে মায়ায় ?
কতদিন, কতবার, কত অসময়ে
তোমারে ভুলেছি প্রভু, বিষম সংশয়ে !
সারাবিশ্ব খুজিয়াছি শান্তিকণা তরে,
ফিরিয়াছি শুধু শেষে সন্তপ্ত অন্তরে।
তােমা-বিনা শান্তি আর নাই—নাথ, নাই ।
তােমাতেই তাপিতের জুড়া’বার ঠাই।
এস তবে হৃদয়েশ, হৃদি-সিংহাসনে।
পূজিব চরণদু’টি অসীম যতনে।
তােমা-পানে চেয়ে চেয়ে,—শুধু ভালবেসে
অঞ্জলিৰ মন-প্রাণ চরণ-উদ্দেশে।
অখিল ব্ৰহ্মাণ্ড যেথা আনন্দে নিয়ত
নাচিয়া নাচিয়া ফেরে বন্দনায় রত,
যে চরণে জন্ম পেয়ে প্রেম-মন্দাকিনী
শত শত ভকতের চিত-প্রবাহিনী,
প্রভাতী।
সেই স্নিগ্ধ পা’দুখানি রাখ হৃদিপুটে,-
মরুতে উঠু শত শতদল ফুটে।
আর কি চাহিব দেব ?—নাহি অন্য আশা ;
পূর্ণ কর এ অসহ প্রাণের পিপাসা।
৩৪
প্রভাতী ।
দুর্যোগে।
কতদিন বল প্রিয়,
আশা-পথ চাহি’
ভয় জীবনের শূন্য
তরীটিরে বাহি?
উন্মত্ত, চঞ্চল বায়ু
গর্জে চারিদিকে ;
একাকী রয়েছি বসি’
চাহি অনিমিখে।
সাগরের কোনধারে
অন্ত নাহি হেরি।
অম্বরে জলদপুঞ্জ
আসিয়াছে ঘেরি;
সজল, শ্যামল মেঘ
বীচিমালা’পরে
সুনিবিড় কাল ছায়া
অাকে থরে থরে।
তাণ্ডবে নাচি’ছে সিন্ধু
মত্ত ভীমরবে।
কহ নাথ, এ দুর্যোগে
দীনের কি হবে?
প্রভাতী।
কবে বল প্রিয়তম,
দরশন দিয়ে
যাবে মােরে সঙ্গোপনে
বুকে তুলে নিয়ে ।
আশা যে রাখিতে নারি
তরঙ্গ-পীড়নে।
মনে হয় বুঝি ডুবি
প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
উদ্দাম তরঙ্গ রঙ্গে
নাচিছে ভীষণ।
কর রক্ষা, পূ’র আশা,
হে দীনশরণ।
প্রভাতী।
অসহায়।
লক্ষ শত বাসনার তীব্র হাহাকার
রুধিয়া বক্ষের কোণে--হে বন্ধু আমার,
অবসন্ন হয়ে এবে ধরেছি চরণ ;-
তােমারে আপন জেনে সঁপেছি জীবন।
যদি দয়া কর তবে ঘুচিবে দুর্দশা,
অন্যথা জীবনে আর নাহিক ভরসা ।
প্রভাতী।
৩৭
উদ্বোধন।
কি লাগিয়া অশ্রুজল, কেন এ নিশ্বাস?
কেন করি নিশিদিন এত অবিশ্বাস
আপনারে ?
হে মহান, যদি কোনদিন
আপনারে করে থাকি অপূর্ণ, মলিন ;
যদি কোন প্রলােভনে হয়ে আত্মহারা
পাপে ডুবে’, কভু হয়ে থাকি তােমাছাড়া,
তবে সে অতীত-লাগি’ কেন নিরাশায়
প্রতিদিন ডুবিতেছি ? বিগত-চিন্তায়
কেন ভবিষ্যৎ মাের-ঘাের তমসায়-
করি নিত্য সমাচ্ছন্ন ?
এ ফুল ধরায়
ক’দিনের তরে নাথ, মাের আগমন ?
শুধু দু’দিনেরি খেলা করি সমাপন
আবার তােমারি কোলে ফিরে যাব।
তবে
আপনার কেন সদ্ভাব না রবে ?
কেন তবে হাসিমুখে কৰ্তব্য না সারি’,
শুধু ভালে কর হানি’, অদৃষ্টে ধিকারি’
ফিরিতেছি শুধু “হাহা” করি? এ জীবনে
নাহি কি কোনই আশা?
প্রভাতী।
তবে, এ ভুবনে
কেন আজো মাের কাছে ফুটিতেছে ফুল ?
কেন তবে আজো হেথা মলয় আকুল
করে মােরে আলিঙ্গন বন্ধুর মতন ?
কেন তবে চন্দ্রালােকে হয় না কৃপণ
আমারে আনন্দ দিতে? কেন তবে আজ
শত বিহঙ্গের কণ্ঠ এ শ্রবণ-মাঝ
পশিয়া, করি’ছে মােরে পুলকে বিভাের ?
যদি আমি এত ঘৃণ্য, পাপে হিয়া মাের
যদি গাে এতই হয়ে থাকে অসহায়,
তবে কেন এ ধরণী এত করুণায়
করি’ছে আমায় সিক্ত ? তবে কেন প্রাণে
এখনাে উপজে শান্তি যবে উর্ধপানে
নেহারি-নিৰ্ম্মল, নীল, স্নিগ্ধ নীলাম্বর ?
তবে কেন আজো যবে শুনি কলস্বর
পুণ্যতােয়া তটিনীর-ধীরে মনে হয়
যেন আশা শুনাইছে স্বপ্ন-মােহময়
মধুর সঙ্গীতধ্বনি।
তব দয়া যদি
এতভাবে, এতরূপে মােরে নিরবধি
করিতেছে সযত্নে পালন, তবে কেন চিতে
দাওনাক গভীর বিশ্বাস ?
সৃষ্টি-মাধুরীতে
প্রভাতী।
চিরদিন কেন তবে এই শ্রান্ত হিয়া
তােমারি মাঝারে সদা রহেনা মজিয়া
আপনাতে-আপনি-আকুল ?
কেন নাথ,
এ জীবনে আননাক নির্মল প্রভাত
নব নব স্ফুট আশা-সনে ? অন্ধকারে
পারিনা বাঁচিতে আর। এত হাহাকারে
তব গাঢ় অনুভূতি হয়না রাজন্ !
দাও শান্তি, দাও প্রীতি, দাও শ্রীচরণ,
সাধিব তােমার কৰ্ম্ম। দাও দেখাইয়া
কোস্থানে রহিয়াছে মরমে মরিয়া
আমার আমিত্বটুকু। দাও গাে বুঝা’য়ে
বর্জনাদে ভয়ঙ্কর,-কণা-কণিকায়
তােমারি অস্তিত্বরাজে। এই বিশ্বময়
তােমারি অনাদি সত্তা নানারূপে রয়
তােমারি ইচ্ছার বলে। হেথা তােমা-বই
আর অন্য গতি নাহি। যে নিশ্বাস লই
এও সে তােমারি দান। এই যে শরীর
এও নাথ, তােমারই পবিত্র মন্দির।
চেতনা উঠুক জাগি’ এ নীরস প্রাণে
শৈলমাঝে নিঝরিণী সম।
তব টানে
প্রভাতী।
সপুলকে ছুটে যাই জগতের মাঝে
আপনাতে-আপনি-অটল। সব কাযে
যেন কভু না ভুলি তােমায়। নিরাশায়
যেন নাহি ডুবি আর। আপনার পায়
যেন গাে দাঁড়াতে শিখি। ব্যর্থ আশঙ্কায়
যেন গাে কর্তব্য কায না ভুলি হেলায়
লজ্জা-ভয়-বিকম্পিত প্রাণে। এ ধরায়
আমিও তােমারি পুত্র। কখনাে হেথায়
হেঁটমুথে কাটা’ব না কাল। নিজবলে
সাধিব বীরের মত কর্তব্য সকলে
আত্মসম্রমের বম্মে আবরিয়া দেহ।
কর আশীৰ্বাদ প্রভু, অযাচিত স্নেহ
সর্বদা এমনি যেন এ দীনের’পরে
রহে তব। আশীৰ্ব্বাদ কর ক্ষণতরে ।
দেখ দেব, কোন্ বলে হয়ে বলীয়া,
তুচ্ছ করি’ হিংসা, দ্বেষ, শূন্য অভিমান,
তােমারে রাখিয়া হৃদে, নবােৎসাহ ভরে
অক্ষম এ পুত্র তব পুনঃ কার্য করে
তােমার আদেশ মত।
হে বিশ্বদেবতা,
ক্ষুদ্ৰপ্ৰাণ হতে পারি,-তবু যথা তথা
এত অপমানজালা না পারি সহিতে।
প্রভাতী।
৪১
আপনার সনে দ্বন্দ্ব করিয়া তিষ্ঠিতে
বল দেব, পারে কোন্ জন।
তােমারি কৃপায়
এ জীবন ল’য়ে আজো বঁচিহে হেথায়
সেই দান করি’ অবহেলা, কোন্ মুখে
লাঞ্ছনার ডালি বহি’,-ম্লান অধােমুখে
রয়েছি দাঁড়ায়ে ? প্রভু, আর নাহি পারি!
আমিও অমৃত-পুত্র নহি গাে ভিখারী!
অতীতের ম্লান স্মৃতি ফেল উৎপাটিয়ে
পূর্ণানন্দে ভরুক হৃদয়।
পুনঃ উল্লাসিয়ে
ধেয়ে মেতে চলে যাই কর্তব্যের টানে
মদোন্মত্ত ঐরাবত সম।
তব পানে
এমনি করিয়া নাথ, বাঁধিয়াে আমায়
যেন আর এ জীবনে কোন ক্ষুদ্রতায়,
সংশয়ের সমস্যার কোন প্রতিঘাতে
নাহি ছেড়ে সে ৰন্ধন।
উজ্জ্বল প্রভাতে
নব আশাসনে প্রাণে হও হে উদয়।
যা’ মিশে অন্তরের কম্প-লজ্জা-ভয়,
ব্যর্থ বাসনার এই তীব্র হাহাকার
পরিপূর্ণ প্রশান্তির স্নিগ্ধতামাঝার!
৪২
প্রভাতী।
অনুতাপ।
কেন মিছে?—দূর হৌক শূন্য অভিমান।
চাহি’ছে লভিতে স্বাস্থ্য এ জীর্ণ পরাণ!
আকাশ-কুসুম প্রায় অশেষ বাসনা,
তৃপ্তিহীন, শান্তিহীন আত্মপ্রতারণা,
অবিশ্বাস সন্দেহের গর্বিত সঞ্চয় ;
তিলে তিলে ছাইয়াছে এ জীর্ণ হৃদয়।
আমি আজ তবু মিছে দৃপ্ত দম্ভভরে
মুঠি মুঠি ধূলি ফেলি লােকচক্ষু’পরে।
সবারে ছলিয়া আমি রিক্ত আপনাতে,
মলিনতা বহিতেছি শুধু মাের মাথে।
এ পাপের সমুচিত প্রায়শ্চিত্ত তরে
আজি মাের তপ্ত চিত্ত চাহে সকাতরে।
হে মাের অন্তরতম বিশ্বাস মহান্,
আমার সুযােগ্য শাস্তি করহ বিধান।
প্রভাতী। ৪৩ নিবারণ। ক্ষান্ত হও বীণা মাের, গাহিও না গান। ও গানে ব্যাকুল হয় শুধু এ পরাণ! নিবৃত্তির সুখসুপ্তিমাঝারে পশিতে ও গান আমারে কহে নীরবে, নিভৃতে। চাই জাগরণ, চাই স্নিগ্ধ স্বাধীনতা। শান্তি ;—চাই চিত্তে স্থির নির্ভীকতা। রাত্রিদিন নতশিরে পারিনা বাচিতে, চাই সঁপিবারে প্রাণ জগতের হিতে। তােমার করুণ সুরে, নিত্য গৃহকোণে পলে পলে লভিতেছি সঙ্কীর্ণ মরণে। থাম তুমি বারেকের তরে একবার, সে সুযােগে সারি লই কৰ্ম্ম আপনার ; সেই অবকাশে—দূরে ফেলি অহঙ্কার- সর্বোপরি রাখি চিত্তে মৰ্যাদা আত্মার !
৪৪
প্রভাতী।
বর্ষ-আবাহন।
আসে ওই
নূতন বরষ!
দূর করি’ দিব মােরা যত শ্রান্তি জীবনের,
যত সব কল্পনা অলস।
হের- পরি নবভূষা হাসিয়া আসিছে উষা
গাহি গান নবীন সুস্বরে,
হের কলকরবে
জাগিয়া উঠিছে ভবে
শুভ হাস্য প্রতি ঘরে ঘরে।
নিৰ্ম্মল অম্বর-তলে মেঘ’পরে পলে পলে
ইন্দ্রধনু করিয়া রচনা,
জ্বলন্ত উৎসাহে মাতি অরুণ উঠিছে ভাতি
ভুলাইতে জীবের যন্ত্রণা।
“কুলুকুলু” ধ্বনি করি’ স্মৃতির বাহিনী—মরি
তরঙ্গে রঞ্জিয়া রবিকর
পিছে রাখি’ কুয়াসারে ছুটে আসে অভিসারে
নব-আশে প্রফুল্ল অন্তর!
অন্ধকারে নিমগন
গতবর্ষ পুরাতন
আজি যেন মুচকি হাসিয়া
অনন্ত অতীত সনে মিশে যায় ক্ষণে ক্ষণে
নূতনে রাজত্ব সমর্পিয়া।
প্রভাতী।
অনিল-প্রবাহে আজি নবরাগ উঠে বাজি।
বিশ্বমাঝে বহিয়া হরষ
আসিল সুখের দিন, শােক-দুঃখ হ’ল লীন।
ওই এল নূতন বরষ!
এস এস নূতন বরষ!
অসাড়, নির্জীব প্রাণে নব-সঞ্জীবনী দানে
আন বিশ্বে বিমল সন্তোষ!
অদৃষ্টের অভিশাপে জীর্ণ মােরা শশাকে তাপে ;
আমাদেরে তােল জাগাইয়া ।
রুদ্র রাগিনীর গীতি গাহ তুমি নিতি নিতি
কর্মক্ষেত্রে লহ মাতাইয়া।
বীজমন্ত্র জীবনের বলে দাও আমাদের,
-কৰ্ম্মযােগী কর পদানতে।
আনন্দে উন্নত কর, অবসাদ অপহর’,-
পূর্ণ কর ক্ষুব্ধ মনােরথে।
ওই এল নূতন বরষ!
নূতনে বরিয়া আন ; ছাড় কণ্ঠে একতান,
জীবনেরে করহ সরস।
পুরাতন হ’ল গত ; জীবনের ক্রটি যত
তারি সাথে—অতীতের মাঝে-
ডুবাইয়া দাও ধীরে ; জীর্ণ, ম্লান স্মৃতিটিরে
ভুলে যাও জগতের কাযে।
৪৬
প্রভাতী।
চেয়ে দেখ—কি উজ্জ্বল সুপ্রভাত সুবিমল ।
কি অমৃত পিক-কণ্ঠে ঝরে।
কি আশা করিতে পূর্ণ দুঃখরাশি আজি চূর্ণ,
—আনন্দ বিরাজে ঘরে ঘরে ।
আজি অতীতের কথা বন্ধ কর যথা-তথা ;
আজি শুধু আশার বচন
সমবেত একতানে
উইক অম্বর-পানে
মধুময়, মৃত-সঞ্জীবন!
আজি শুধু শুদ্ধ প্রাণে চাহিয়া অনন্তপানে
ক্ষুদ্র সব সুখ-দুঃখ ভুলে’-
আশাপূর্ণ প্রাণখানি আমরা রাখিব আনি
সে অভয় চরণ-মূলে !
তারপরে একবার সাজা’য়ে কুটীর-দ্বার,
স্থাপি’ শুভ মঙ্গল-কলস
কহিব উৎফুল্ল মনে “পূর্ণ সাফল্যের সনে
এস এস নুতন বরষ !”
প্রভাতী।
৪৭
টাণ্ডার-জলপ্রপাত।
অচলের শির’পরে
অসীম করুণাভরে
উছলি’ পড়িছে ঝরে’
স্বচ্ছ জলরাশি ;-
অজ্ঞাত আলয় হতে আনন্দ-উদ্বেল স্রোতে
বাহিরিয়া আসিয়াছে
নবীন সন্ন্যাসী ।
ছিল ধ্যানে নিমগন ; লভিয়া অমূল্য ধন
আবেশে আছিল পশি’
নিভৃত গুহায়,
সুন্দর, শ্যামল বনে
বিহঙ্গেরা একমনে
যেথায় গগন ছানি’
অমৃত ছড়ায়।
সহসা না জানি হায়, উদ্দাম উন্মাদ প্রায়
কোন্ মহা জাগরণে
ছাড়ি’ সে নিলয়,
আকাশের পানে চাহি কল-স্বরে গান গাহি
ছুটিয়া আসি’ছে যােগী
ঘােষিয়া অভয়।
আমরা পঙ্কিল কূপে প্রতি পলে চুপে চুপে
গুমরিয়া মরিতেছি
৪৮
প্রভাতী।
রুদ্র পিপাসায়,
নাহি শান্তি! নাহি সুখ !- বেদনায় পূর্ণ বুক।
শুষ্ক হিয়া জীর্ণ-শীর্ণ
উগ্র বাসনায়।
জানিয়া এ দুঃখ-কথা
মহতের অধীরতা
উছলিয়া উঠিয়াছে
মহা করুণায় ;
ভাই, হেন ক্ষুব্ধ বেগে সন্ন্যাসী উঠেছে জেগে
ধাইয়া আসি’ছে নামি
পঙ্কিল ধরায়।
আছাড়িয়া শিলারাজি প্রেমেতে পাগল সাজি”
লাফায়ে ঝপায়ে আজি
পড়িছে ঝরিয়া,
মথিত তুলার মত
স্ফীত হয়ে লক্ষশত
ফেনপুঞ্জ অবিরত
ঝরে গরজিয়া ।
শুভ্র ফেনপুঞ্জ'পরে
উজ্জ্বল তপন-করে
সপ্তবর্ণ ইন্দ্রধনু
কভু বিকাশিত।
কভু দেখি, মধুরাতে
চাদের কিরণ সাথে
ঝলকিয়া নানা মতে
লীলাখেলা কত ?
প্রভাতী।
৪৯
নিম্নে পুনঃ রারিরাশি একত্র মিলিছে আসি’
করুণার কলধ্বনি
সেথা ওঠে জাগি’ ;-
চারিধারে গুল্মলতা মূর্তিমতী সজীবতা !
সবেগে, নিষ্কামব্রতে
চলেছে বৈরাগী ।
প্রভাতী।
হিমালয়-বক্ষে।
চৌদিকে অম্বর চুমি’ তরঙ্গিত
শ্যাম শৃঙ্গগুলি
অসীমের পানে, দূরে চলিয়াছে
করি’ কোলাকুলি।
মাঝেতে সবুজবৰ্ণ, সুগভীর
হ্রদ সুনির্মল,-
স্বচ্ছ, শুদ্ধ বারি তাহে নাচিতেছে
করি’ ‘কল-কল’!
প্রত্যহ তপন সেই বীচিরাশি
রঞ্জিয়া কিরণে,
বিহঙ্গ-সঙ্গীত রবে, মন্দবাহী
শীতল পবনে,
অক্ষু আবেশে নিত্য রসলীলা
করে রঙ্গে, সুখে ;--
অপূর্ব সৌন্দৰ্য্য ফুটে তাহে সেই
হিমাচল-বুকে!
মনে হয়, যেন সেথা বিছাইয়া
সবুজ বসন
* নৈনিতাল-দর্শনে লিখিত।
প্রভাতী। প্রকৃতি-সুন্দরী তাহে বসাইছে ‘চুমকি’ ভূষণ। কভু মনে হয়, যেন কুবেরের ঐশ্বৰ্য সকল স্ত পীকৃত হয়ে সেথা অলিতেছে করি’ ঝলমল! অথবা, যেন রে কোন নবােগ- যৌবনা ষােড়শী খল-হাশ্যে, সকৌতুকে মহাকায় দৈত্য-কোলে বসি, অসীম সােহগে, প্রেমে, সচঞ্চলে করে লীলাখেলা ;--- অঙ্গ-সঞ্চালনে সেথা বসা’য়েছে সৌন্দর্য্যের মেলা! সংখ্যাতীত বৃক্ষরাজি প্রসারিয়া বাহু-সন-সনে’ গাহিছে প্রেমের গান বিহঙ্গের সাথে সে নির্জনে। ‘ঝর-ঝর’ কল-স্বরে নেচে নেচে শত নিঝরিণী চলিয়াছে লােকালয়ে গাহি সেই প্রণয়-কাহিন।
প্রভাতী।
সুগম্ভীর হিমাদ্রির বক্ষে কিবা
বিমল মাধুরী!
পাষাণে রেখেছে ঢাকি’ প্রেম-উৎস
করিয়া চাতুরী।
বিশাল, নিশ্চল, স্তব্ধ হিমালয়
কিবা মনোেহর !
নীরস পাষাণ-প—অফুরন্ত
অমৃত-আকর!
সংসারের চিন্তামগ্ন, অবসন্ন,
সুখহারা মন
এই নির্জনতা মাঝে লভে তৃপ্তি
মৃত-সঞ্জীবন!
বিষয়-বিক্ষিপ্ত চিত্তে হেথা আসে
পূর্ণ একাগ্রতা।
ধন্য ধন্য হে গিরীন্দ্র, মূৰ্ত্তিমান
গাঢ় নির্জনতা!
বহুদূর হ’তে আমি এসেছি হে
জাগ্রত দেবতা,
জাগা’তে এ জীর্ণ প্রাণে মুহূর্তৃেক
সুপ্ত স্বাধীনতা।
মােহন, বিরাট রূপ হেরি তব
ওহে যােগিবর,
প্রভাতী।
ভাবিতেছি পুলকিত হয়ে, এই
ক্ষুদ্র অবসর
তােমারি শ্যামাঙ্কে শুয়ে কাটাইয়া
দিব নিরালায়--
বিস্মরিয়া সংসারেরে শান্তি-স্তব্ধ,
মৌন মহিমায়।
বিশ্বের কল্যাণচারী, প্রেমময়
ওহে গিরিরাজ,
দগ্ধ এ হৃদয় মম জুড়াইতে
আসিয়াছি আজ।
যে নিষ্কাম স্নেহ তব ঝরিতেছে
অনন্ত-নিঝরে,
যে স্নেহ এ বিশ্বজনে নিরন্তর
সঞ্জীবিত করে,
যে স্নেহে ভােলারে তুমি বেঁধেছিলে
আছেদ্য বন্ধনে,-
সেই মেহ-বিন্দুকণা দেহ এই
দীন-হীন জনে!
আমি তাপদগ্ধ এই সংসারের
বিচিত্র বিভ্রমে
দিশাহারা,
অনুতপ্ত, শ্রান্ত আজি
ব্যর্থ পরিশ্রমে।
প্রভাতী
দুরাশে বিমুগ্ধ হয়ে মরীচিকা-
লুব্ধ মৃগ সম
ভ্ৰমিয়া সুখের আশে লুপ্ত এবে
প্রেম, শক্তি মম।
অক্ষম, দুৰ্বল জনে হে মহান,
ওহে শক্তিমান্,
ত্যজিও না ঘৃণাভরে,-পদ-তলে
দেহ দেহ স্থান।
দু’দণ্ড রহিব কাছে-চাহি শুধু
এই অধিকার,
শুধু দেখে যাব তব ধ্যান-স্তব্ধ
মূর্তি নির্বিকার।
বিশাল, মহােচ্চ, তব অভ্রভেদী,
গম্ভীর মূরতি
হেরিলে বারেক তরে লভে জীব
অক্ষয় শকতি।
সঞ্চিত করিয়া সেই মহাশক্তি
ফিরে যেতে চাহি;
হে উদার অদ্রি, অন্য বাসনাও
মাের কিছু নাহি।
কি বিচিত্র ভীম-কান্ত রূপ তব
প্রশান্ত, নিৰ্ম্মল।
প্রভাতী।
কি সুন্দর কোমলতা তব বক্ষে
স্নিগ্ধ, সুশ্যামল !
কি অনন্ত জ্ঞান তব! জটাচ্ছন্ন
ওহে হিমালয়,
নির্বিকার, ধ্যানমগ্ন, ওহে যােগী,
জয় তব জয়!
তােমারি মুখেতে চাহি এ ধরণী
অনিমেষ আঁখি !
কৃপা-কণা লভি তব চিন্তাহীন
যত পশু-পাখী।
তুষার-মণ্ডিত, তব মহােজ্জল
মুকুটের’পরে
সূর্যের প্রথম রশ্মি প্রেমভরে
আলিঙ্গন করে।
প্রথম হিল্লোলে বায়ু তােমারেই
ব্যজন করিয়া,
কল্যাণ বিতরে এই বিশ্বজনে
আনন্দে মাতিয়া !
সৃষ্টিমাঝে তুমিই অনাদি, জ্ঞান-বৃদ্ধ
ওহে শিবময়,
তুমি শুষ্ক পাষাণ-গঠিত—তবু স্নিগ্ধ
প্রেমের নিলয় ।
প্রভাতী।
জাগরণ।
মাগাে,
sy
তব মঙ্গল-মূরতি নেহারি
উঠেছি পুলকে জাগিয়া,
করুণ তােমার অরুণ-নেত্রে
আশ্বাসবাণী লভিয়া।
অন্তবিহীন করুণা তােমার
অন্তর’পরে ঝরে অনিবার।
সঙ্গীতে তব আজিকে আশার
নব ঝঙ্কার শুনিয়া,
জাগিয়াছি মােরা ঘুমঘাের হতে
উঠিয়াছি মােরা জাগিয়া ।
মাগাে
মাগাে,
আজি
আজি অপূর্ণ বাসনা মােদের
সফল করিতে জীবনে,
এসেছি তােমার দীন সন্তান
প্রণমিতে তব চরণে।
নব উৎসাহে, তব কটাক্ষে
মােরা মিলি’ সবে লক্ষে লক্ষে,
তােমার লাগিয়া অযুত বক্ষে
বরিয়া লইব মরণে!
বল দাও শুধু বিফল বাসনা
পূর্ণ করিতে জীবনে!
মাগাে,
প্রভাতী।
মাগাে,
সেই
বিমল তােমার শ্যামাঙ্গখানি
পাশব, হ্রিংস্র আঘাতে
রুধির-ধারায় রক্তবরণ
করি’ছে শুভ্র প্রভাতে,
স্পর্কিত, হীন কাপুরুষদলে
ক্ষুব্ধ পরাণে, সিংহের বলে-
পিষ্ট করিব আমরা সকলে
ধৰ্ম্মের ধ্বজা উড়াতে।
বিমল তােমার শ্যামাঙ্গিখানি
ক্ষত-বিক্ষত আঘাতে।
মাগাে,
মাগাে,
অজি
যবে
বাসনা করেছে সন্তান তব
নব উৎসাহে জাগিয়া
বসাবে তােমারে হৃদয়-পদ্মে
শুধু স্নেহাশীষ মাগিয়া
বিহগকণ্ঠে, সমীরের তানে,
জীমূতমন্দ্রে, তব জয়গানে
ধা’বে সঙ্গীত অম্বর-পানে
সব কলঙ্ক মুছিয়া ;-
পূরিবে মােদের সকল কামনা,
যাবে সব দুঃখ ঘুচিয়া !
তবে
৫৮
প্রভাতী।
শ্ৰীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
পরম পূজাই ওহে বিচারকবর,
এ পাপ-পঙ্কিল ভূমে তুমিই অমর।
করেতে শাসনদণ্ড, প্রাণ পূর্ণ প্রেমে,-
আসিয়াছ হে মহান্, স্বর্গ হতে নেমে।
দেবতার চরণের নির্মাল্যের প্রায়
আলােকিত বঙ্গভূমি তােমার প্রভায়।
বিমল, পবিত্র তুমি ; হে পরার্থপর,
তােমারে হেরিলে নিত্য পুলকে অন্তর।
সকল কর্মের মাঝে-অক্ষুন্ন প্রতাপে
হও নাই নত তুমি অদৃষ্টের শাপে।
চিরদিন সত্যপথে এসেছ চলিয়া
আত্মার মর্যাদাখানি মাথায় রাখিয়া ।
ধন্য তুমি কৰ্ম্মবীর। হে সফলকাম,
করি তব চরণেতে অসংখ্য প্রণাম।
প্রভাতী।
শ্ৰীযুক্ত অশ্বিনীকুমার দত্ত।
জনমিলে—প্রাণখানি প্রেমে পূর্ণ করি’
সাধিতে সকল কর্ম সে চরণ স্মরি’!
শিখাইছ সরলতা সকলেরে ডাকি-
সত্যের অক্ষয় মূৰ্ত্তি হৃদয়েতে রাখি।
পাপের কালিমামাখা এ পঙ্কিল দেশে
পুণ্যালােকে উদ্ভাসিছ সকলের মন।
কে জানে গাে স্বপ্নসম কোথা হতে এসে’,-
আলােকিয়া মাতৃভূমি করিবে গমন।
যাহারা তােমারে হায়, চিনিলনা আজো
তাহাদের প্রতি তুমি নহ তত বিমুখ ;-
সবারে বাসিয়া ভাল আনন্দে বিরাজ’
তুচ্ছ করি’ হীন হিংসা, ঘৃণ্য স্বার্থ-সুখ।
সংসারে থাকিয়া তুমি নহ আত্মহারা,
পবিত্র উজ্জ্বল ওগাে গগনের তারা।
প্রভাতী।
ব্যক্ত বাসনা।
রমণীর মত আমি
তােমারে পূজিব স্বামী,
মন-প্রাণ দিয়া ।
তুমি মাের কাছে এসে,
আশীৰ্বাদ কোর’ শেষে ;
বুকে তুলে নিয়া।
প্রভাতী।
ভিতরে-বাহিরে।
--
মেঘ-ভাঙা রাঙা রবির করে
কা’র রূপে যেন নয়ন ভরে।
প্রভাতে বিহগ করয়ে গান,
চিত করে তাহে অমিয় পান।
“কুলুকুলু” নদী বহিয়া যায়,
তাহে প্রাণ মাের তলা’তে চায়।
চাদেরে নেহারি’ আকাশতলে
কারে যেন চিনি পলকে পলে।
তিমিরে আকাশে তারকা হেরি
আভাস পাই সে অনন্তেরি।
ভাই-বােন মিলে সুখেতে থাকি,
মধু-বরষিয়ে ‘মা’ বলে ডাকি।
পিতারে পুজিগগা ভকতি দিয়ে,
সখানে মাতি’ মাধুরী পিয়ে।
প্রিয়ারে পরম আদর করি’
রাখি সযতনে হৃদয়ে ধরি।
এমন মধুর প্রিয় পরিবার
এমন মধুর মাের চারিধার,-
১৩ ৪ সনে রচিত।
৬৪
প্রভাতী।
এ হেন শান্তি-পাথারে নামি’
তারে পাই আমি দিবস যামী।
এমনি করিয়া দিবস-রাতে
পরাণ আমার মজেছে তাতে।
এবে দূরে যেতে বাসনা নাই ;
ভিতরে-বাহিরে যেদিকে চাই,
সবা-মাঝে হেরি’ লুকায়ে তিনি
নিতেছেন মাের হৃদয় জিনি'।
প্রভাতী।
“যা খুসি করিও।”
যে জন জীবন নাথ, তােমার চরণ’পরে
দে’ছে উপহার
যে জন তােমারি লাগি নিশিদিন সঙ্গোপনে
ফেলে অশ্রুধার ;-
তাহারে ভুলা’তে প্রভু, এত কেন আয়ােজন
কর অবিরত ?
চারিদিকে রাখিয়াছ কেন কর-কমলের
চিহু শত শত ?
যেদিকে ফিরাই আঁখি,-যেদিকে নিবিষ্ট হই
বারেকের তরে
সেখানেই হেরি-যেন কাহার অঙ্গুলিরেখা
কঁপে থরে থরে।
সুনিবিড় নীলিমায়—গগনের মধ্যভাগে
মুগ্ধ চেয়ে থাকি,
হেরি—যেন কা’র হস্ত ঝটিতি মিলায়ে যায়
মােরে ধীরে ডাকি।
নবস্ফুট পুষ্পটিরে যতনে চুম্বিতে অলি
ছুটে বারম্বার,-
সেথায়-সে কুসুমেতে একি হেরি প্রাণেশ্বর,
এ বর্ণ কাহার ?
প্রভাতী।
অলির নিকটে যাই—তাহার সে ঘন-কৃষ্ণ
ক্ষুদ্র দেহখানি
সুস্পষ্ট দেখিতে পাই—মসৃণ করিয়া যেন
দেয় কার পাণি।
অস্তগামী সূৰ্য-করে ঝলসিত শস্যক্ষেত্র
কাঞ্চন-বরণ,
নেহারি--তাহারি মাঝে কাহার দুখানি হাত
করে গাে স্পন্দন।
এমনি করিয়া নাথ, নিশিদিন—অহরহ
বিশ্বচরাচরে-
নব রসে, নবভাবে তােমার অনন্ত সৃষ্টি
চিত্ত মাের হরে।
কোথাও লুকা’তে নারি,—কোথাও নিস্তার নাহি।
হে পরাণপ্রিয়,
সৰ্বস্ব হরণ করে যদি আশ নাহি মেটে--
যা খুসি করিয়াের
প্রভাতী।
ভুবন-সঙ্গীত।
তুমি গান করে’ছ রচনা,
আমি তাহে লাগায়েছি সুর ;
সে সঙ্গীত করি’ আলাপনা
এ জগৎ হয়েছে মধুর।
লােকালয়ে, গভীর কান্তারে,
গগনে, জীবনে—সেই গান
ঝঙ্কৃত হ’তেছে বারে বারে ;
তাই সৃষ্টি সুন্দর, মহান্ !
প্রভাতী।
প্রতিহিংসা।
প্রকৃতি-সপত্নী মাের এ বক্ষ হইতে
চুরি করে নিয়ে গেছে মাের অজানিতে
আমার বুকের ধন।
তাই, দিনরাত
ঘুরে’ ফিরিতেছি ডাকি’—“কোথা প্রাণনাথ,
পরাণ-পরশমণি।”—নাহি পাই সাড়া।
শুধু শুনি-দূরাগত ক্ষীণ ব্যঙ্গধ্বনি
কঁদিয়া ফিরিয়া আসে। এত ‘মুখ-নাড়া
সপত্নী-নিকটে শুনি’ এ বক্ষ অমনি
বিরহে জ্বলিয়া উঠে।
সহ নাহি হয়।
জীবনসৰ্ব্বস্ব ছিল হৃদি’ আলাে করি’
হেরি—তারে বিচ্ছুরিত সারা বিশ্বময়
পারিনা সহিতে অপমান।
বক্ষ ভরি’
ছিনু যাঁ’র-এবে তঁা’র চরণেরাে তলে
বসিবার ঠাই নাহি।
বহু চিন্তা-ফলে
আজি তাই এতভাবে, এত যত্ন করে’
যুড়িয়া দুখানি হস্ত, বন্দনার স্বরে,
দিগন্ত ধ্বনিয়া আমি গাহিতেছি গান
প্রকৃতির পদ-প্রান্তে।
=
প্রভাতী।
শুনি’ কোন তান
যদি সপত্নীর মন হয় উল্লসিত,
যদিবা করুণা করে মাের আরাধিত
দেয় মােরে ফিরাইয়া,—দেখাই তাহলে
কেমন সে সুচতুরা ;—এই পদ-তলে
দলিয়া তাহারে রাখি দাসীর মতন
অবজ্ঞায় জীর্ণ করি’!
হায়রে এমন
সুদিন আসিবে কিরে ?-হেথা কি আমার
জীবন-বাঞ্ছিত ধনে পাইব আবার।
প্রভাতী।
অয়ি প্রীতিময়ী প্রকৃতি।
হে প্রকৃতি,
নিশিদিন নব নব প্রতি
সঞ্চারিয়া শুষ্ক হিয়া’পরে,--
কেন তুমি লুকাইছ সলাজ-অন্তরে
তব গুপ্ত ধন ?
আমি যে লভিতে আজ এসেছি তােমারি কাছে
নবীন জীবন ;-
মিছে,—তবে কোর’না গােপন
হেন ভাবে অকারণে, প্রাণপনে, সযতনে
তব গুপ্ত ধন।
জানি তুমি চুরি করে নিয়াছ আমার
জীবনের সার ;
তবু, অভিমান মাের রেখেছি দলিয়া
অবসাদ দিয়া।
তােমা’মাঝে আজ শুধু দেখে যাব একা
-বারেকের দেখা
সে কেমনে রহিয়াছে আমারে ভুলিয়া
তব কোলে গিয়া।
প্রভাতী।
৭১
জীবনের দেখা!
বারেক, নিমেষ লাগিদেখে যাব আজ আমি
নিরালায় একা!
এ মাের মিনতি
রাখিও রাখিও তুমি এই মধুমাসে
হে প্রকৃতি সতি।
বারেক ও তনুখানি রাখি’ দাও খুলি’
পূর্ণ পূর্ণিমায়,
কোকিলের ঝঙ্কারিত সকরুণ সুরে,
স্নিগ্ধ নীলিমায়
মলয়ের গন্ধ-ভরা, স্বপ্নলস স্রোতে,
রেণুর মাঝারে
একাকী মিশিয়া গিয়া-অতলের তলে
দেখে আসি তারে।
;
কেহ জানিবে না।
ব্যাপ্ত হয়ে যাব আমি তােমার মাঝারে যবে-
কেহ চিনিবে না !
দেখে ল’ব তব কাছে কি মােহিনী শক্তি আছে,
যাহে সে এমন
রহিয়াছে বন্দী হয়ে তব গুপ্ত অন্তঃপুরে
মােহমুগ্ধ-মন!
৭২
প্রভাতী।
দেহ মােরে দয়া করে’ পলকের তরে দেবি,
পশিতে সেথায় ;-
বিস্তারিয়া ফেলি মাের এ আবদ্ধ অস্তিত্বেরে
অনন্তের গায় ।
প্রভাতী।
নিদ্রা।
ঘুমা’য়েছিলাম প্রিয়ে, বিমুগ্ধ হইয়ে
শান্ত, স্নিগ্ধ সুধাংশু-কিরণে। এলাইয়ে
পড়েছিল তনু। পরিহিত বস্ত্র মাের
স্রস্ত হয়ে পড়েছিল দূরে। জ্যোৎস্না-খাত
প্রকৃতির মত শােভে’ছিল এ দেহ, সুন্দর!
গিয়েছিনু ঘুমঘােরে, অতি দূরে—অবিজ্ঞাত
মায়া-রাজ্য মাঝে। সেথায় সকলি
আনন্দে, আবেশে নিত্য উঠিছে উচ্ছলি,
-মেঘ-ভাঙা অস্তগামী সূৰ্য-রশ্মি-জালে
বিম্বিত তরঙ্গ প্রায় !-তারি তালে তালে
ডুবেছিনু একা আমি শান্তি-পারাবারে
একান্ত ব্যাকুল চিত্তে, হারা’য়ে আমারে ।
কোথা গিয়াছিনু তাহা কহিতে না পারি ।
শুধু, যেই তুমি প্রিয়ে, দু’বাহু প্রসারি’
আলিঙ্গি’ আমারে, ধীরে চুম্বিলে অধর,
তখনি আইনু’ ফিরে’ অবশ-কাতর,
মাের এই পিঞ্জর-মাঝারে। তুমি ধীরে
শুধালে কি কথা?—তাহা চঞ্চল সমীরে
ভেসে গেল শুধু; আমি বুঝি নাই হায়,
৭৪
প্রভাতী।
একটি বর্ণেরাে অর্থ তা’র! মৃতপ্রায়
ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে ছিলাম তখন,-
স্বপ্নবিষ্ট, ক্লিষ্ট রােগী সম। এ দেহ আপন
ছিল না আপন বশে। এ জীবনে কভু
লভি নাই হেন নিদ্রা। বুঝি, মাের প্রভু
নিয়ে গিয়েছিল মােরে সাগর-সঙ্গমে!
তুমি কেন চেয়ে আছ অয়ি মনােরমে,
আমার মুখের পানে ? নিরর্থ প্রলাপ
ভাবিতেছ—কহিতেছি আমি ঘুমঘােরে !
বুঝাবার হলে—দূর করি মনস্তাপ—
দিতাম বুঝায়ে সত্য এ সকলি তােরে।
কিন্তু হায়,—ওই দেখ, জগতের সৰে
ইঙ্গিতে কহিছে মােরে রহিতে নীরবে!
প্রভাতী।
৭৫
প্রেম-বিহ্বলতা।
পুরাতন বন্ধু তুমি ওহে প্রিয়তম,
তুমি চিরন্তন-ধন। তাই, এ অধম
এই ঝিল্লী-মুখরিত চঞ্চল সন্ধ্যায়,
এ বর্ষা-সলিলাপ্লত ভগ্ন গৃহ-ছায়,
বায়ু-ক্ষিপ্ত প্রকৃতির সিক্ত বক্ষে বসি’-
সহসা তােমারে লভি’—আনন্দে উল্লসি,
সংরুদ্ধ প্রেমের স্রোত-সংঘাত-সঙ্কুল
চিত্ত-মাঝে আলিঙ্গিতে পারেনি তােমায়
আপন উন্মাদবলে। তাই, বাষ্পকুল,
বিরহ-বেদনাপূর্ণ, দীন নেত্রে হায়,
পারেনি চাহিতে দেব, তব মুখপানে!
বহুদিন পরে লভি’ তােমারে, পরাণে
লজ্জান-অভিমানে মুগ্ধ হয়ে গেছি,
চুম্বিতে ও বিদাধর তাই কপিতেছি।
৭৬
প্রভাতী
নির্দয়তা।
কেন মােরে পাঠাইলে এ দুরন্ত ভবে,
প্রচণ্ড স্বার্থের ক্ষেত্রে, একান্ত একলা ?
পাঠাইলে যদি, কেন মাের সাথে তবে
এতভাবে, এতরূপে করিতেছ খেলা ?
ব্যথাপূর্ণ হিয়া মাের, তৃষা-শুষ্ক তালু,
ব্যাপ্ত চারিদিকে মরু, -মরীচি চঞ্চল,
হেথা কেহ কোথা’ নাই, উড়ে তপ্ত বালু,
কাতরে ঝরিছে চক্ষে অশ্রু অবিরল।
এমন দুঃখের মাঝে—রে নিষ্ঠুর প্রভু,
কত ছলে ডাক এসে’ খেলিবার তরে ;
-ক্লিষ্ট আমি, উপেক্ষিতে ছাড়নাক তবু
খেলিতে নিকটে গেলে দূরে যাও সরে'।
এ কেমন লীলা তব বুঝিনা গাে স্বামী
নির্দয় তােমারে তাই ভাবিতেছি আমি।
।
প্রভাতী।
৭৭
হাহাকার।
একা আমি আমার জগতে।
আমি শুধু এক ফুৎকার,-
এ পৃথিবী বংশীখানি যেন,
বাজিতেছি তাই চারিধার।
বিশ্ববংশী-মাঝে আমি বায়ু,
তাই আমি পাই দিনরাত
এই দীন, ক্ষুদ্র আমা’ময়
নন্দনের অস্ফুট সংবাদ!
তবে কেন রহে ব্যবধান ?
দূর হৌক বাঁশরীর বাঁধ ?-
বায়ু আমি, পুনঃ তােমা’ময়
লীন হব—এ আমার সাধ।
হে অনন্ত, হে অসীম নভঃ,
হে সুন্দর, হে নিৰ্ম্মল নীল,
মিশে র’ব তােমা’মাঝে আমি,
হৌক তাহে ধ্বংস এ নিখিল।
তুমি মাের চির-আরাধিত,
তুমি মাের একান্ত আপন ;
রাখ মাের এ মিনতিটুকু-
ঘুচাইয়া দাও গাে স্বপন।
৭৮
প্রভাতী।
অতৃপ্তি।
বহুদিন আ’স নাই বলে
যদি আমি করি অভিমান,
হিয়া মাের কেন ওঠে জ্বলে ?-
কেন তাহে উথলে পরাণ?
গােপনেতে বেসেছি ভাল,
ভেবেছিনু’--কেহ জানিবে না।
গুপ্তগৃহে রবে পূর্ণ আলাে,
বাহিরের কেহ দেখিবে না।
একা যাব নিভৃত নিশীথে
ধীর পদে সে সঙ্কেত-স্থানে,
স্তব্ধ সবে র’বে চারিভিতে
শুনে’ মাের প্রণয়ের গানে।
হায়-হায়, সে আশা আমার
নিৰ্ম্মলিত হয়ে গেছে এবে !
শত বাধা-বিঘ্ন চারিধার,
একা আমি মরি ভেবে ভেবে
প্রভাতী।
আগে যদি জানিতাম আমি
মজাইয়ে যাবে তুমি চলে,
ভালবেসে শেষে দিনযামী
ভাসিতে হইবে আঁখি-জলে ;-
আগে যদি বুঝিতাম আমি
প্রেম-পথে বিপ্ন নিত্য নব ;-
কে তাহলে আসিত গাে স্বামী,
পরিহরি’ সুখ-শান্তি সব ?
আনি’ মােরে নিরালা এ ঠাই
পলাইলে,
হায় রে নিঠুর !
কোনদিকে দিশা নাহি পাই,
কে জানেগাে তুমি কত দূর!
গৃহ-কাজ করিতে না পারি,
সব কাজে হই আনমনা।
সবে করে আঁখি-ঠারাঠারি,
মােরে মন্দ কহে যত না।
নিঃশ্বাস ফেলিতে বক্ষে মাের
অসহ বেদনা ওঠে জাগি।
অশ্রুজলে হইগাে বিভাের
শয্যাতলে বাঞ্ছিতের লাগি।
প্রভাতী।
পূর্ণিমা নিশীথে “কুহু” তানে
ব্যাকুল হইয়া
ভূমে লুটি!
হাস্যালাপে—সভা মাঝখানে
কঁদিয়া-পলা’য়ে আসি ছুটি’
বহুদিন চলে গেছ প্রভু,
শূন্য মাের প্রেম-সিংহাসন।
কে জানে গাে এ জীবনে কভু
পাব কিনা দেখিতে চরণ!
যে চরণ বিম্বিত জগতে,
যে চরণ ভূমণ্ডলময়,-
সে চরণ ক্ষীণ দৃষ্টি-পথে
পুনরায় হবে কি উদয় ?
অভিমান করিবারে চাই,
দূরে যায় শূন্য অভিমান ;-
স্বপ্নে শুধু শুনিবারে পাই
বিশ্ব-ছন্দে নূপুরের তান!
প্রভাতী।
৮১
আবাহন।
আশা দিয়ে গেছ বহুদিন হল—
আসিবে ফিরিয়ে পুনঃ এ গেহে ;
সে আশা-কুহকে বেঁচে আছি আজো,
এবে প্রাণ বুঝি রহে না দেহে।
নিশিদিন কত যতন করিয়া
বাসিত কুসুমে তনু সাজাই,
আপনি খসিয়া পড়ে সেই সাজ ;
মরম-বেদনে মরিয়া যাই।
কেমনে বুঝাব কত ভালবাসি,
কত যে প্রাণের তুমি আমার ?
অধীনার প্রেম দেখাবার নয়,
তুলনা জগতে নাহিক তার।
প্রথম মিলন-নিশীথে হে নাথ,
আকাশে ইন্দু চাহিয়াছিল।
মলয় পবন প্রসূন-সুবাস
বিলাইয়া,—তােমা মিলায়ে দিল
মৃদু-মন্থরে যমুনা বাহিনী
যেতেছিল বহি’ ছুঁয়ে চরণ ;
প্রভাতী।
তারি তরঙ্গে ঝলসিতেছিল
সুধামাখা ঐ সােনার বরণ !
সে মধুযামিনী মাঝারে তােমায়
লাজ-ভরা চোকে দেখিয়াছিনু;
চমকি’ স্বপনে,—কি জানি কেমনে,
অধরে অধর মিলা’য়ে দিনু’
সেই নিশি হায়, গিয়াছে ফুরা’য়ে,
-গিয়াছে ফুরা’য়ে অতীত মাঝে ;-
তবু কেন হায়, পারিনে ভুলিতে।
মনে হলে কেন বুকেতে বাজে ?-
ঘবে মনে হয় সে সুখের কথা
হিয়া মাের কেন পুলকি’ উঠে,
পলকে কেন সে কাতরে
-কেন ঝরে ফুল যদি সে ফুটে।
লুটায় ?
দেবতা আমার, হৃদি-বল্লভ,
চেয়ে দেখ আজ প্রকৃতি পানে ;-
জ্যোছনা মাখিয়া আবিষ্ট চোকে
মগন সে আজি কাহার ধ্যানে।
ডাকিছে পাপিয়া ভাসা’য়ে গগন,
কাননে কুসুম ফুটিছে গাছে।
প্রভাতী।
আজি এস দেব, বুক জুড়াইয়ে ;
ফুল-শয্যা সেথা বিছানাে আছে।
আজি পূর্ণিমা ! সকলি শােভন,
‘ঝিরিঝিরি বায়ু বহিছে মৃদু।
ঘুম পায় আজি হেরি’ এ ধরণী।
ঘুমে ঢুলু-দুলু” হাসিছে বিধু!
এস এস নাথ, বিধাতা আমার,
তােমার কোলেতে ঘুমায়ে পড়ি।
জীবনের সখা,-এস এস বুকে !
কঁদে হের দাসী চরণে ধরি।
প্রভাতী। ব্যবধান। চাহিনা মিশিতে প্রভু, চাহিনা তােমারে আমি ; রয়েছি অনন্ত সুখে যে ভাবে রেখেছ স্বামী। . পাইনে তােমায়, তবু আশায় বাঁচিয়া আছি বিরহ-অনলে প্রভু, মন-প্রাণ সঁপিয়াছি। কারণ জানিনে বঁধু, কঁদিয়া লুটাই ভূমে ; তবুও অপার শান্তি পাই সে ধরণী চুমে। এই যে নিখিল ধরা কৰ্ম্মপাকে ঘুরিতেছে, ওই যে গগনমার্গে কোটিগ্রহ ছুটিতেছে, সমগ্র নক্ষত্র-লোকে যে শক্তি চালিত আজ-
প্রভাতী।
rি
প্রতিক্ষণে মাের দেহে
সে শক্তি করিছে কাষ।
অণু-পরমাণু হতে
গ্রহ-উপগ্রহ আদি
একি শক্তি-সূত্রে গাঁথা,
তবু শান্ত, নিৰ্বিবাদী।
এমন শান্তির দেশে
হে নিখিল পরমেশ,
নাহি মাের দুঃখফেঁটা,
নাহিক যন্ত্রণা লেশ।
আনন্দে রয়েছি আমি
কোটি রবি-রাসনে ;
সবারি মাঝারে যেন
তােমারে পড়িছে মনে।
সমস্ত বিশ্বের তলে
কে যেন লুকা’য়ে আছে ;
আমি যেন ’রি খোঁজে
ছুটিয়াছি পাছে পাছে।
এই যে ছুটেছি আমি
এই যে কঁদিগাে নিতি,
প্রভাতী।
ইথে মাের দুঃখ কোথা ?-
পাই অতুলন প্রীতি।
আকাশে, বাতাসে যেন
গন্ধ পাই দিবানিশা ;
জলে, স্থলে কি যে হেরি
করিতে পারিনে দিশা।
অন্তরে বাহিরে যেন
আনন্দের স্রোত বহে।
মানস-নিকুঞ্জে পাখী
তাহে কত কথা কহে।
মনােবিহঙ্গের বাণী
শুনিয়া কি যেন বুঝি,
কুটিল সংসার-পথ
মনে হয় সােজাসুজি।
আমি আছি—আছ
তুমি,
নাহি কোন ব্যবধান ;
তােমারি প্রেমের বাণে
শােক-তাপ অবসান ।
কোন চিন্তা নাহি মাের,
আছি আমি ভরপূর ।
প্রভাতী।
হৃদয়ে রয়েছ ধা,
কভু তুমি নহ দূর।
চাহিনা চাহিনা নাথ,
মিশিয়া যেতে তােমাতে
এমনি করিয়া মােরে
রেখে তব সাথে সাথে।
প্রভাতী।
বসন্ত-অবসানে।
মধুর বসন্ত চলি’ গেল। তবু, মাঝে মাঝে
কেন পাখী গান গেয়ে ওঠে ?
সে গান শুনিয়া ছুটে আসে যত মধুকর,
গাছে তবু ফুল নাহি ফোটে।
বায়ু আসে মন্দ বাহি’ সহসা চাহিয়া দেখে,
গাছে আর কোন ফুল নাই!
তখনি সে ক্ষুব্ধবেগে উদ্ভান্ত হইয়া গর্জে ;
কহে—হেথা গন্ধ কোথা পাই ?
তটিনী মন্থর-গতি আসে নেচে’ অভিসারে,
এসে দেখেনভঃ মেঘময় !
সহসা সে নিরাশায় বায়ুসনে ওঠে মাতি’
ঘটাইতে অখণ্ড প্রলয়!
কেন তবে ভ্ৰমবশে মধুকণ্ঠে গাহে পিক ?
কেন তবে দুরাশা-ছলনে
সমস্ত বিশ্বের প্রাণ টানি আনি’-নিরাশায়
দাহিতেছে মিথ্যা, অকারণে?
তবে কেন মিছে কবি, বসে আছ আনমনে ?
কেন তবে আজো ব্যাকুলিয়া
নেহারিছ চারিপাশে ঝঙ্কারি’ বীণার তার
বিগত বসন্ত-স্মৃতি নিয়া!
প্রভাতী।
৮৯
কে শুনিতে চাহে বল তােমার বিলাপ-ধ্বনি,
—কে তােমায় করিবে বিশ্বাস ?
অসময়ে কোনকিছু ভাল নাহি লাগে আর ;
স্মৃতি শুধু আনে দীর্ঘশ্বাস।
বসন্তে লভিয়াছিলে সে সম্পূর্ণ প্রীতিটুকু
আজি তার হ’ল অবসান!
নীরবে রহিয়া তবে-রুদ্ধ কর মনে তব
নৈরাশ্যের যত দুঃখ-গান !
প্রভাতী।
কোকিলের প্রতি।
পাখি, তুই গা’নেরে গান ;
দিবা আজ হ’ল অবসান!
আমার পরাণসনে
একি রুদ্র খেলা তাের
নিঠুর, কঠোর ?--
নিবে’ যায় আজি দিনমান।
তবে তুই বন্ধ ক গান।
শােন্-অয়ি বসন্তের প্রিয়া,
বসন্ত তাে গিয়াছে চলিয়া,
তবু কেন থেকে থেকে আহ্বান করি তারে
সঙ্গীত-ঝঙ্কারে ?
ওই গানে মাের জীর্ণ হিয়া
জাননা কি ওঠে ব্যাকুলিয়া?
==
অতীতের সুখ-স্মৃতি মাের
ভেসে ওঠে ওই গানে তাের।
ভুলে গিয়া নিজ ব্যথা, তাই, আজো বীণাখানি
ধীরে তুলে আনি’
গাহি গান হইয়ে বিভাের।
কি মােহিনী শক্তি কণ্ঠে তাের।
প্রভাতী।
থা,-তুই বন্ধ কর গান ;-
শ্রান্তি মোর ছে’য়েছে পরাণ।
তবু যদি গাবি তুই, যা রে তুই দূরে,যথা
নাহি কোন ব্যথা
যেথা গান-জ্যোস্নানে মিশি’
প্লাবিয়া রেখেছে দশদিশি।
যারে তুই সেই মহাদেশে ।-
যেথা গেলে প্রতি-উৎস এসে
দিবে তাের বক্ষখানি সুখ-শান্তি দিয়ে ভরে
চিরদিন তরে
বসন্তের' মধুর আবেশে।
যারে তুই সেই মহাদেশে !
আমি শুধু আশাহীন হয়ে
থাকি হেথা নিরাশারে লয়ে।
দীর্ণ বক্ষে হানি’ কর,
শুধু হাহাকার করি
রহি গৃহে পড়ি;-
অভিশপ্ত ধরণীর মাঝে
মগ্ন হয়ে শত মিথ্যা কাযে।
প্রভাতী।
অনাদৃত।
বসন্তেরে ভালবেসেছি
সে গিয়েছে চলি’
চকিতে থামিয়ে গেছে যত
পাখীর কাকলি ;
কুসুম ফোটেনা কুঞ্জে আর,
কুঁড়িগুলি ধীরে
ঝরে গেছে তপ্ত বৈশাখের
চঞ্চল সমীরে।
আমি যারে আজীবন ধরে
করিনু সাধনা
সে বারেক এসে–গেল চলি
করিয়ে ছলনা!
বসন্ত-প্রসূনে গাঁথা মাের
প্রণয়ের হার
বড় যত্নে রচেছিনু আমি
আশায় তাহার।
তা’রে মালা নারিনু পরা’তে
মালা গেছে ঝরি’ ;
এবে তাই চক্ষে মাের সদা
অশ্রু আছে ভরি’!
প্রভাতী।
উপেক্ষিত
নয়ন মানে না বাধা-ঝরে অশ্রুধার !
হৃদয়ে সান্ত্বনা নাই—শুধু হাহাকার !
জগতী বৈচিত্ৰ-হীন! স্মৃতি স্নানবিভা!
প্রভাতে ঘনান্ধকারে নিবে যায় দিবা।
আজি বীণা তন্ত্রীহীনা—নাহি গাহে গান।
বিরহ-বিধুর, শ্রান্ত, অবসন্ন প্রাণ!
বসে আছি পথ-চাহি’ বঁধুয়ার তরে
শ্লথসজ্জা, আলুথালু, ভগ্ন, শূন্য ঘরে।
দুরাশে জ্বালিত দীপ নিবে নিবে আসে,
কুসুম-রচিত শয্যা ছিন্ন চারিপাশে ;-
একাকী রয়েছি বসি’! রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে
মাঝে মাঝে ডাকিতেছি হৃদয়-ঈশ্বরে
“এস এস প্রাণনাথ !” ডাকি কি লাগিয়া ?-
সে স্বর অনন্তমাঝে যেতেছে মিলিয়া ।
৯৪
প্রভাতী।
আয় সুপ্তি, আয়!
আয় তন্দ্রা, আয়!
শুভ্রবাসে তনু ঢাকি
যুথিকা-সুবাস মাখি’
কোমল, সুগৌর পক্ষ খুলি মন্দ বায়,
নব বধূটির মত
লাজভরে মাথা নত,
মৃদু হাস্যময় আস্ত ভরি মহিমায়,
এ তৃপ্ত অন্তর’পরে
অনন্ত করুণাভরে
বুলায়ে অঞ্চলখানি সিক্ত জ্যোছনায়,
আয় তক্রা, আয়!
---
আয় সুপ্তি, আয়!
প্রগাঢ়, গভীর প্রেমে স্বর্গ হতে এস নেমে’,
এস প্রীতিময়ি, এস নামি’ এ ধরায়।
চিন্তায় দহি’ছে হিয়া দেহ বহি নিবাইয়া ;
বিস্মৃতি-প্রলেপ দেহ লেপিয়া তথায়।
স্নিগ্ধ করি’ তপ্ত প্রাণ, দুঃখ করি, অবসান,
আলােকি’ আঁধার হৃদি’ মাধুরী-প্রভায়
আয় সুপ্তি, আয়।
প্রভাতী ।
আয় নিদ্রা, আয়!
দুৰ্ব্বহ চিন্তার ভার
সহ নাহি হয় আর,
মস্তক পড়িছে ঢলি’ দারুণ ব্যথায়,
ভার-পিষ্ট শির মম
লহ তুলি’ নিরুপম,
ওই তব শান্তিময় ক্রোড়ের ছায়ায়।
অতলে ডুবায়ে মোরে দেহ ক্লান্তি দূর করে,
নিবিড় বিশ্রাম শুধু দিও হে আমায়,
আয় নিদ্রা, আয়!
আয় দেবি, আয় !
একান্ত ডুবাও ধীরে অনন্ত সাগর-নীরে,
কাতরে কঁদিছে প্রাণ ঘাের নিরাশায়।
ডুবায়ে অতল-তলে
গভীর সে নীল জলে
যদি এ বিরহী চিত্ত কভু শান্তি পায়,
যদি স্বপ্নলােকে ভঁরে পাই কভু দেখিবারে,
যদি হৃদি ভরে ওঠে নবীন শােভায়।
আয় দেবি, আয় ।
প্রভাতী
অবসান।
আসে ঘুম আঁখি পাতে।
আশা আছে,
তা’র সাথে
পুনঃ দেখা হবে।--
যাই ধীরে ডুবে যাই,
কোলাহলে কায নাই
বৃথা আর তবে !
শ্রীদেবকুমার রায়চৌধুরী-প্রণীত
অপর গীতিকাব্য
অরুণ।
(২০১ কর্ণওয়ালীস্ স্ট্রীট, শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের দোকানে ও
কলিকাতার অন্যান্য প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য।)
ছাপা, কাগজ, বাঁধাই অত্যুৎকৃষ্ট। মূল্য,-সিল্কে বাঁধানাে এক
টাকা, কাগজে বাধানাে আট আনা মাত্র।
যাবতীয় মাসিক ও সংবাদপত্রে “অরুণের সমালােচনা বাহির
হইয়াছে। এস্থলে মাত্র কয়েকটি মতামত উদ্ধৃত হইল।
* * * * অনেকদিন পরে প্রাণের কবিতা পাঠ করিয়া আমরা
সত্য সত্যই শান্তিলাভ করিলাম। দেবকুমারবাবু সৌন্দর্য্যের সেবক
কিন্তু সে সৌন্দৰ্য্য দেবােপভােগ্য, তাহাতে অন্য কোন গন্ধ নাই।
বসুমতীতে স্থানাভাব, নতুবা দেবকুমারবাবুর কবিতাগুলি এক একটি
( ২ )
করিয়া তুলিয়া দেখাইতাম যে, কেমন সরলসুন্দর তাহার কবিতা,
কেমন প্রাণস্পর্শী তাহার ব্যাকুলতা, কেমন ননসুবাসে তাহার কুঞ্জ
আমােদিত।
-বসুমতী, ১৫ই জৈষ্ঠ, ১৩০৯।
« *** প্রথম রচনা হইলেও ইহাতে দেবকুমারবাবুর যথেষ্ট
কবিত্বশক্তি প্রকাশিত হইয়াছে, এবং আমরা পাঠ করিয়া প্রীত
হইয়াছি।
কালে দেবকুমারবাবু কবিবর্গমধ্যে যে উচ্চাসন লাভ
করিবেন, তাহার “অরুণ” যে কালে মধ্যাহ্-সূৰ্য্যে পরিণত হইবে,
তাহা তাহার এই রচনাতেই বুঝা যাইতেছে।
৩০শে জৈষ্ঠ, ১৩০৯।
-সময়,
“তরুণ কবির অরুণ কাব্য পাঠ করিয়া প্রীত হইয়াছি।
কবির মৌলিকতা * *
** মৃগনাভির মত সৌরভসম্পদশালী।
অরুণালােকে যে, তরুণ কবিপ্রতিভার মুকুল লক্ষিত হইল, চর্চায়,
তাহার পূর্ণ বিকাশে বাঙ্গালী পাঠক আনন্দলাভ করিবেন।
—প্রতিবাসী, ৯ই ভাদ্র, ১৩০৯।
6* * * In obcdience to the present fashion of printing
poems and poetical pieces in the best of styles, on thick and
glazed paper and nicely bound, the volume before us has been
so nicely got up as to leave nothing to be desired. The pieces
embrace a variety of subjects, and the way they have been
( ৩ )
handled certainly does credit to the young poct, who may,
without our running the risk of being contradicted, be called a
dawning genius.”—The Amrita Bazar Patrika, March, 1902.
“যিনি বাল্যে অথবা শৈশবে এই প্রকার বীণাঝঙ্কার করিতে
শিখিয়াছেন, পরিণত বয়সে তাহার বংশীধ্বনিতে যে সমগ্র বঙ্গভূমি
উন্মাদিনী হইবে, তাহা নিশ্চিত। * * * আমাদের আশা আছে,
ভারতীর সুসন্তান প্রিয় কবিবরের প্রতিভা বয়ােবৃদ্ধির সহিত পূর্ণভাবে
বিকাশিত হইয়া বঙ্গদেশে সুধা-বর্ষণ করিবে।
-বিকাশ,
১৩ই জৈষ্ঠ, ১৩০৯।
p
« ‘অরুণের যে বাহ সৌন্দৰ্য্যই আছে তাহা নহে, উহার
আভ্যন্তরীণ শােভাও মনােহারিণী। * * * কবিতাগুলি বাস্তবিকই
চিত্তাকর্ষিণী, উচ্ছাসময়ী, উন্নতভাবপ্রকাশিকা। গ্রন্থকারের
ভাষাও সরল এবং প্রাঞ্জল। * কবি ‘অরুণে’ যে কৃতিত্ব
দেখাইয়াছেন তাহাতে আশা করা যায়, একদিন তিনি কাব্যসংসারে
শ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করিবেন।
-বাঁকুড়াদর্পণ, ২৩শে
জুলাই, ১৯৭২।
*
“পাঠ করিয়া দেখা গেল, কবিতায় লালিত্যের পারিপাট্য আছে,
* * রচনা ভাব-রসযুক্ত। পাঠ করিয়া আমরা প্রীতিলাভ করিয়াছি।
-জন্মভূমি, আষাঢ়, ১৩১০।
( ৪ ) “নবীন কবি দেবকুমারের মৌলিকত্বের অভাব নাই; সেই মৌলি- কতা সরস, সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। -নবযুগ। “সমালােচ্য কাব্যখানিতে কোথাও প্রণয়-প্রলাপ না পাইয়া আমরা হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছি। কবির কুসুমচয়ন দেবােদ্দেশ্যে হইয়াছে, প্রিয়ার কণ্ঠহারের জন্য নহে। বড় মধুর লাগিল। বরিশাল-হিতৈষী, ১লা আশ্বিন, ১৩০৯। "* * * The volume before us is rich in the promises of a distinguished poetical career ; for, the author of which, we. trust, will be dedicated to the services of his country. To no higher mission can a poet address himself than to be the guide and instructor of his people and to lead them upwards and onwards to a higher and nobler life. Dante was the creator of modern Italy. Who is to be the poet of the regenerated India ? Hem Chandra Banerjee and Nabin Chandra Sen have shown the way. Will the representatives of a younger generation follow their lead, fill their places and still further stimulate the generous emotions and the patriotic ardour which responded the music of their verses ? To thc young poet, whose verses we are reviewing, we can offer no nobler career or one more worthy of the gifts, of which there is so much evidence in the book before us. The style of the author is simple and sonor-
( ৫ )
ous, his thoughts pure and elevating. We commend the poem
to the favourable notice of the public * **"-The Bengalee,
1, Nov., 1903.
“বাহ সৌন্দর্য্যের সহিত ভিতরেরও বেশ মিল আছে।
অরুণের কবি চিন্তাশীল ও ভাবুক।
* * * কবির প্রাণের ভিতর
প্রবেশ করিতে আয়াস পাইতে হয় না।
* * * ভারতীর চরণে
কবির নিবেদন বড়ই আশাপ্রদ ; ভগবানের নিকটে প্রার্থনা করি,
কবির মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হউক।”-উৎসাহ।
কবিতাগুলি সরল ও সুন্দর। পাঠ করিলেই নবােগত
কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
* »—বঙ্গভাষা,
চৈত্র, ১৩১০।
ভাল,
দেবকুমার দেবশিশু, কাব্য রাজ্যের আনন্দিত স্ফুট
কুসুম। দেবকুমারের ভাষা রুচি ভাল, শিল্প-নৈপুণ্য
ভাল। * * * গ্রন্থকারের ভবিষ্যৎ বড় উজ্জ্বল।
নব্যভারত, অগ্রহায়ণ, ১৩০৯।
* * * * অরুণের লেখা যেমন প্রাঞ্জল তেমনি মধুরতাপূর্ণ।
-কাশীপুরনিবাসী, ৭ই শ্রাবণ, ১৩০৯।
(y) so* * * The young author, in his first attempt at authorship has, however, not only shown that he has in him those tendencies of life which can stimulate and inspire the higher instincts of man, and contribute towards the their steady growth and development, but also that he has in him the instinctive genius of a poet- that nature had sown in him with all the care of a kind mother, the secds of a life, which is preeminently fit for metrical composition. His sweet and simple style, his chaste and elegant thoughts and sentiments are the unmistakable index of the poetic talents which he possesses. * * * “Arun” is verily the dawn of that glorious day. Keats, who charmed the world by the heavenly music of his silver pipe and who was, in fact, the soul of the age he lived in, lias sung in his "Emdymion" A thing of beaty is joy for ever, Its loveliness increases ; it will never Pass into nothingness, but still will keep A bower quite for us, and a sleep Full of sweet dreams, and health and quict breathing." And it can, perhaps be rightly said that the work under review although It is the first fruit of the young author, will livc, for it is *** verily a thing of beauty.”—The Indian Mirror, November, 1903. ‘অরুণ তরুণ কবির প্রতিভারুণের অরুণালােক। ইহার ভাষাটি সহজ ও সুখবােধ্য,কবিতাগুলিতে সরস্বতীর
( ৭ )
ক্রীড়াশীল পদের মঞ্জীরধ্বনি শুনা যায় না—কিন্তু শান্ত, সৌম্য,
ধীর গমনে তিনি যেন তরুণ কবির কুঞ্জে আসিয়া তাহার ললাটে
ভাবী সুশের স্বপ্ন আঁকিয়া দিতেছেন।
—ভারতী,
পৌষ, ১৩১০।
.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.