Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Manodarpan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মনােদর্পণ
No text on this page.
মনােদর্পণ
শ্রীসজনীকান্ত দাস
রঞ্জন প্রকাশায়
কলিকাতা
প্রবাসী বুক স্টল
১৪২, আশুতােষ মুখার্জি রােড,
কলিকাতা
১৩২৭
মুল্য এক টাকা
ভি,এম, লাইব্রেরী
৬১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা
হরিধনবাবু বিষ খাইয়া মারা গিয়াছেন, তঁাহার শবদেহ হাস- পাতালের শবব্যবচ্ছেদাগারের টেবিলে পড়িয়া। হরিধনবাবুর বিধবা পত্নী, অনুঢ়া কন্যা, শবব্যবচ্ছেদকারী ডাক্তার, পাড়ার পরােপকারী শববাহী যুবকবৃন্দ, শ্মশানের মুদ্দোফরাস, শৃগাল এবং শকুনি—এই শবদেহ সম্বন্ধে প্রত্যেকের মনে ভাবনা বিভিন্ন। প্রত্যেকের দুঃখ বেদনা ও লােলুপতা কাব্যের বিষয় হইতে পারে কিন্তু শবব্যবচ্ছেদ- কারীর নির্লিপ্ততাকে কাব্য করিয়া ভােলা কঠিন। ‘মনােদর্পণ” এই শবব্যবচ্ছেদের কাব্য। ইহাকে কাব্যরূপ দিবার জন্য গল্প ও নাটিকার সাহায্য লইতে হইয়াছে। ‘কাস্কাটুকা সাউথ অব লােপাকা -র সহিত কাস্কাটকীয় ছন্দ ও কবিতার কোনই যােগ নাই। এই কাস্কাটুকার অবস্থান আমার মনে। প্রবর্তক পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’ হইতে ইহার কয়েকটি কবিতা সত্যসত্যই কামস্কাকীয় কবিতার অনুবাদ-হিসাবে উল্কত করিয়াছিল বলিয়া একথা লিখিতে হইল।
No text on this page.
সূচীপত্র ৮ ০ ০ ০ ০ ০ ৩ কাস্কাটকীয় ছন্দ আধুনিক কাস্কাট্রীয় কবিতা মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য পুরস্কার রাজার হুকুমে পথে পথে তার বেদনা ঢোড়ে মনােদর্পণ কচ ও দেবযানী pur ৫৪ ৫, ০ ০ ০ ••• ••• ভাষা ও ছন্দ ব্যর্থ গজল সত্য-মিথ্যা ••• ৮ । অনাদ্যন্ত জলসা . . . এ এ . ১২১ যাদুকর চন্দ্রাবলী [ ‘অনাদ্যন্ত ছাড়া সবকটি লেখাই ‘নবপৰ্য্যায় শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হইয়াছিল।]
No text on this page.
মনােদর্পণ কামস্কাট্রীয় ছন্দ আজকাল বাঙলা ভাষায় নানা ভাষা হইতে ছন্দের আদর্শ লওয়া হইতেছে, ইহাতে বাঙলার কাব্যসম্পদ ক্রমশই বাড়িয়া চলিয়াছে। নিজের ভাষাতেই ছন্দের আদর্শ রক্ষা করা অতীব দুরূহ; ভাষান্তরের • আদর্শ বজায় রাখা কি ভয়ানক কঠিন তাহা একাজ যাঁহারা না করিয়াছেন তাহাদিগকে বােঝন অসম্ভব। আমি কামস্কাটুকায় অবস্থান কালে সে দেশের ভাষা শিখিয়া চমৎকৃত হইয়াছি। সে ভাষায় কয়েকটি অপূৰ্ব ছন্দ আছে। আমি কামস্কাটকীয় ভাষার ছন্দের আদর্শটি এক লাইন দিয়া বাঙলা ভাষায় তদনুরূপ দুএকটি কবিতার নমুনা দিতেছি। কবিতাগুলি আমারই রচিত। এই কবিতাগুলি লেখার সময়ে আমার কামস্কাটকীয় বন্ধু বিথলােতেলাচুংভিস্কী আমার যথেষ্ট সাহায্য করিয়া- ছেন। বাঙালী পাঠক-পাঠিকারা হয়ত প্রথমটা দুই একটা কবিতার ছন্দ আয়ত্ত করিতে পারিবেন না ; দুই একবার চেষ্টা করিয়া পড়িলেই কান ঠিক হইবে। কামস্কাটুকা সাইবীরিয়ার অন্তর্গত এবং লােপাকার সন্নিহিত হইলেও রাশিয়ান বা লােপাকীয়ান কোনাে ভাষাই সেখানে ব্যবহৃত হয় না। হয়ত এই ধরণের ছন্দ বাঙলাভাষায় (আরবী, ফারসী কিম্বা অন্যভাষার আদর্শে) দেখা গিয়াছে কিন্তু পাঠক-পাঠিকাগণ একটু মনােযােগ করিয়া দেখিলেই ইহাদের সঙ্গে একটু বিভিন্নতা উপলব্ধি করিবেন।
মনােদর্পণ
১। আদর্শ (কামস্কাটুকীয়ান)
লুঙ উষ
তুল ফাই
দিক্ শা
মিলি,
ঢুঙ, শূষ
টুল
মাই
হ্রি বা
পিলি।
( বাঙলা )
বল ভাই,
কাছে কার
শিখলি,
সেজে সং
নেচে যাই,
নাচে পার
শিলি।
শৃঙখল
থাক্ ঢের,
সাফ আছে
গলাটা,
মনােদর্পণ
আছে বল *
প্রভুদের
পাছে পাছে
চলাটা।
কেহ যেন মনে না করেন যে এই নমুনাটিতে আমাদের জাতীয়
দুরবস্থার বর্ণনা আছে।
শ্রেষ না শ্ৰোষ, শ্রীম্ না শ্রেষ, ট্রোষ না ট্রোষ দিঙ না সি।
ভাললারে ভাল এই ত ভালল কালাে ত কালাে
তাের তা কি ?
আছে যা আছে আমার আছে বাঁচে না বাঁচে
আমার স্ত্রী,
তাের তা কি ?
বাসি কি বাসি ভাল না বাসি খাই কি না খাই
তাহার চুম,
ওরেরে ওরে বল না ওরে নইলে যে কীল
মবি দুম ।
হয় না ঘুম ?
লেভুর লোঙ পিক ট্রাক।
ঈশ্বরচন্দ্র বিশ্বাস
ফেলছে দীর্ঘ নিশ্বাস,
* Strength.
মনােপণ
৪
বউটা করছে হাস্ ফঁস
ভুগছে বােধ হয় যক্ষ্মায়-
হেরম্ব সিং ডাক্তার
চতুর্দিকেই ডাক তার,
যেতে বল্ছে বার বার
কাশ্মীর কিম্বা মক্কায়।
৪। বিং বাল ল ।
শিং নেড়ে নেড়ে
তেড়ে এল বেড়ে
মােযটা,
পালা ওরে পালা,
যা ছিড়ে বালা-
পােষটা।
৫। হু হােল হুন্ গ্রোল উনে লাফা ব্রিল সূৰ কুট ব্যাস্ক সাে,
দু চোল দু ঢােল ভুনে সাফা গ্রিল র ছুট ল্যাঙ্ক হ্রো।
দূর ছাই দূর যাই দেশে থাকা ঠিক নয় দূর যাইরে,
গুড় খাই গুড় নাই এসে টাকা নি ছয় গুড় দ্যায় যে।
তা না হলে ‘খান’ চলে যাব আমি গুড়-আলা টাকা পান না,
চা না হলে পা না চলে যাব থামি, দূর কালাবােকা আন্ চা।
৬। বুণ্ডোরেলাে কানাকা।
পুণ্যস্রোতা জাহ্নবী-
আপনি মশাই খান সবি ?
মনােদর্পণ
খালাসিদের রান্না ?
ঝিনিদহের গাঙ্গুলী,
বলছেন কথা মুখ তুলি,
আমার পাচ্ছে কান্না।
গঙ্গার ওপর সব চলে,
পার পাবেন কি এই বলে ?
একঘরে যে করব।
কী, আপনার নেই কেয়ার,
মুগী যদি খান এবার
ঝাঁপিয়ে জলে ময়ূব।
৭। কাস্কাটুকা-ফিলিয়েনােলা।
থাক্ প্রাণটা
বাঁচিয়েছ ভাই।
যা কানটা
তাতে ক্ষতি নাই।
* এটি কামাইকার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় কবিতার প্রথম লাইন। কামস্কাটুকার সঙ্গে
রাভিতােষ্টকের যখন যুদ্ধ হয় (যে যুদ্ধে লােপাটুকা কামস্কাটুকার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা
করিয়াছিল) বিখ্যাত কবি :ওরল্যাংহাে ঐ কবিতাটি রচনা করিয়াছিলেন। ঐ গান
গাহিয়া শত শত কামস্কাটকীয়ান অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়াছিল। আমিও ঐ
আদর্শে আমাদের জাতীয় কবিতাটি লিখিলাম। কোনাে সুরবো উহাতে সুর-সংযােগ
করিলে জাতীয় যুদ্ধস্থল হইতে শত শত যােদ্ধা ঐ গান গাহিতে গাহিতে অকাতরে
পলাইতে পারিবে। পরিশেষে ইহাও বক্তব্য যে ঐ গানটি লিখিয়া বিখ্যাত কবি ওরাল্যাং-
হাে বিজেতা ম্লাডিভোেষ্টীয়দের হাতে প্রাণ হারাইয়াছিলেন।
মনােদর্পণ
বক্তৃতাটি
।
জমেছিল বেশ,
সব্বই মাটি
করে দিল শেষ।
সারজেন্টরা
যেই এল তেড়ে,
ভরা টেন্টটা
খালি হ’ল বেড়ে।
“ধ বন্দুক,
বােমা shell-গুলি
কর কন্দুক ;
ইংরেজ খুলি
পাকা বেলবৎ
ফাটাও ফটাস,
দিলে নাখৎ
চড়াও চটাস।”
ওকি, দুদ্দাড়
ছােটে কেন ওরা।
ওঠে “মামার *
‘ওই আসে গােরা।
৫
e
Murmur
'
,
৭ মনােদর্পণ নিয়ে প্রাণটা পালিয়েছ বেশ। গেছে কাষ্টা বেঁচেছে ত দেশ! বক্তৃতা পাবে শুতে তােমার- তা হলেই হবে দেশ উদ্ধার। এই কবিতাটি একটু টানিয়া টানিয়া পড়িতে হইবে। ৮। গুনােস টাকা। হুতােম পাচা শুনাে ডালে ডাক্ছে বসে ভর সাঁঝে, সেজে গুজে যাচ্ছ কোথা একটু দাড়াও পথমাঝে। আজকে হল ভাদ্র মাসের যােলই তারিখ ক্রবার।
মনােদর্পণ
ডাক শুনে কি
এমন দিনে
ঘর হতে কেউ
হয় গাে বার ?
৯। রাসী তছু বিটাপ।
গাজী আব্বাস
বিকেল।
কল্পি মহা খিটকেল!
লিখে ফেলি কাববি।
তাও আবার হাপবি?
ছাপলে তাও
কাটবে
কেউ কেউ তা চাটবে।
পাবি মহা সম্মান
তাের গান,
কাঙলা
দেশটা যে রে
বাঙলা !
১০। মিলহীন ছন্দ। এই ছন্দ লেখা একটু কঠিন। ইহাতে
মিলের গন্ধমাত্রও থাকিবে না, যাহারা এই ছন্দে লেখেন তাহারা
স্বভাবতঃ মিল আসিলেও তাহা গরমিলে পরিণত করেন। আদর্শের
নমুনা দিলাম না।
(ক) সমাক্ষর মিলহীন ছন্দ।
ওরে ওরে ইষ্টপিড,
এই তাের ছিল মনে?
সভায় গাইবি
শুতে সবাই
A
মনােদর্পণ
ফেলিলি আমায় ফেরে।
নিজে তুই চিঠি লিখে,
মাের নামে ছাপাইলি ?
চারী বুঝি-বা যায়!
আমি বড়সাহেবের
কাছে গিয়ে আজ, খুলে
সব বলিব নিশ্চয়।
ধরিব তাহার পদ,
দিয়ে নাকখৎ লম্বা,
ক্ষমা ভিক্ষা মাগি লব।
জানি না ওরে আমি
বাঙলার কেরাণী যে।
খ) অসমাক্ষর মিলহীন ছন্দ
দিকে দিকে ওঠে রণরণি,
বাজি উঠে দামামা ও ঢােল,
বাজে শিঙ্গা বাজে করতাল,
রবাব মৃদঙ্গ কত বাজিছে চৌদিকে।
থরে থরে চলে নর, গজ অশ্ব কাতারে কাতারে।
চারিদিকে মহা হৈ চৈ,
কত বাজি পুড়িল যে, কত বাজি হইল যে খোঁড়া,
কে করে গণন।
১০
মনােদর্পণ
ভাবিলাম কোনাে মহারাজ রাজচক্রবর্তী কেহ
শত্রু পক্ষে জিনি, বন্দী করি শত্রুরাজে
স্বরাজ্যে ফিরিয়া এল বুঝি।
শুধালেম এক পদাতিকে,
চমকিয়া উঠিলাম শুনি,
শীলেদের গদাধর বিবাহ করিয়া
আজি বৌ লয়ে ফেরে।
কী বীরত্ব কাজ।
তাই এই সমারােহ, এত আয়ােজন।
মাথা মাের ভক্তি ও শ্রদ্ধায়
আপনিই নত হল।
ধন্য গদাধর তুমি শীলবংশ-চুড়া।
১১। অসমছ
বর্তমানে কামঙ্কাকীয় এই ছন্দের অত্যন্ত ব্যবহার হইতেছে।
আমি ব্যাঙ,
লম্বা আমার ঠ্যাং,
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং।
আমি ব্যাঙ,
আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ ;
শ্রাবণ-নিশায় পরশে আমার সাহসিকা
‘অভিসারিকা
ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ।
মনােদর্পণ
;
আমি ডােবায় খানায় কাদায় ধূলায়
খাটিয়ার তলে—কিম্বা ব্যবহারহীন চুলায়,
কদলী-বৃক্ষের খােলেও কখনও রহি;
ব্যাঙাচি রূপেতে বাঁদরের মত লেজুড়েও আমি সহি।
আমি প্রাতে ও দুপরে বিকালে ও সাঁঝে
যখন ঝিল্লী ঝঝির কাননে কাননে বাজে,
গেয়ে যাই গান
‘আসমান’
ফেড়ে ফেড়ে
মিছে বলে লােক গলাটা আমার হেঁড়ে।
আমি ‘শির’ তুলে হেরি কেয়ার করিনে কারেও,
মােরে আঁটকাতে নারে কঁাটার বেড়ার তারেও,
আমি কচুর বনের আড়ালেতে রহি মাঝে মাঝে দিই লাফ,
গিন্নী মিছাই দেখায় যে ভয়, ‘সাপ ওগগা ওই সাপ’!
আমি সাপেরে করিনে কেয়ার,
দাড়াওলা যত কঁাঁড়ারা মাের এয়ার।
আমি ব্যাঙ, আমি বিদ্রোহী ব্যাঙ
আমি উল্লাসে কভু নেচে উঠি ড্যাং ড্যাং,
আমি ব্যাঙ
দুইটা মাত্র ঠ্যাং।
আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই,
আমি বুক দিয়া হাঁটি ইদুর দুচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।
মনােদর্পণ
১২
আমি ভীম
ভুজঙ্গ
ফণিনী দলিতফণা,
আমি ছােবল মারিলে নরের আয়ুর ‘মিনিট,যে যায় গণা
আমি নাগশিশু, আমি ফণীমনসার জঙ্গলে বাসা বাঁধি,
আমি ‘বে অফ, বিস্কে’ ‘সাইক্লোন’ আমি মরু সাহারার
‘আঁধি-
আমি বেদুয়ীন, আমি মহম্মদ ঘাের,
আমি কিশােরী মেয়ের নাকের নােলক
ঢাকীদের আমি সখের ঢোলক
সৌখীন যত মডার্ণ ছেলের West End হাতঘড়ি।
আমি বেলা কলুর ঘানি,
আমি খােদার ষণ্ড, নিখিলের নীল খিলানে যে ক্ষুর
হানি’
গলাধাক্কার ধমক’ আমি যে ঝরণার কুলকুচি
দাড়িম ফাটা’র অসহ্য ‘ক্ষুধা’ পুটি মােদকের লুচি।
আমি ‘ঝড় আমি ‘কড় কড় কড়', K. M. Dasএর চটি,
মেমসাহেবের cero pearls আমি মেছুনীর আঁশবটি,
আমি যুবতী মেয়ের গলার পুষ্পহার
আমি বাসর ঘরের মশক, আমি বাসক-তােষকে ছার ;
আমি নবীন, আমি যে কঁচা,
আমি বাহির হয়েছি ভাঙিয়া ফেলিয়া খাঁচা।
আমি ‘হে বিরাট নদী’ বৈশাখ আমি রুদ্র
তারকেশ্বরে সত্যাগ্রহী, আমি ভাইকম শূদ্র।
মলােদশ
আমি ‘এরােপ্লেন আকাশের বুক চিরি,
‘ওয়েষ্ট পেপার বাসকেট’ আমি গান্ধী-মার্কা বিড়ি,
আমি ‘কে সি এন’ * কত প্রেমিকের মান রাখি,
বাঙালী ছেলের ‘নােটবই আমি এজামিনের ফঁাকি।
আমি ভাদ্রের বান পৌষের শীত,
‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ আমি ; আমি কালােয়াতি গীত।
কচি শিশুদের কচি দাত আমি প্রৌঢ়া নারীর চুল,
আমি নন্দী, গায়ত্রী আমি ঘরের কোণের ঝুল।
চতুরঙ্গের আমি জ্যাঠা মহাশয়,
জগদীশ্বর মানিনেক আমি করিনে কাহারে ভয়,
মেসের পেটেন্ট ইলিসের ঝােল পুইচচ্চড়ি আমি,
আমি বেহারী চাকর, সাবিত্রী ঝি, নই আমি রামী বামী।
আমি প্রণয়ীর প্রণয়ের লিপি ‘shcl আমি ডিনামাইট
ঘাের পুন্নাম নরক আমি যে, আলােমাঝে ‘সার্চলাইট'-
আমি ছুচ হয়ে হেথা সেথা ঢুকে ফাল হয়ে বাহিরাই
আমি হুঙ্কার করি প্রথমে কিন্তু শেষ কালে চুমু খাই,
আমি গান গাই
গান গেয়ে গেয়ে ছুটিয়া ছুটিয়া চলি,
আমি চলিতে চলিতে ঢলি-
বিপ্ন বিপদ শ্যাওলার মত পদতলে যাই দলি।
=
* অর্থাৎ KCw
কিনা Potassium cyanide। আমরা যতদূর জানি
Chemical formula এই প্রথম কবিতায় ব্যবহৃত হইল।
মনােদর্পণ
১৪
মাঝে মাঝে কভু পিছলিয়া পড়ি আমি,
প্রেমিকার প্রেম-পাশে ধরা পড়ে, চলিতে চলিতে থামি,
আমি থামিতে থামিতে ঘামি,
কবে বেহেস্তে’ পহুছিব তাই ভাবি যে দিবস যামি।
আমার কোমল নারীর প্রাণ
নিমিষে নিমিষে পথে ঘাটে মাঠে
অকাতরে করি দান ।
ওগাে সুন্দরী
ওগাে কিশােরী,
বেলা শেষে ওগাে অবেলায়,
কটাক্ষ তুমি হেনাে মাের পানে
আমি মাতি রব ছায়ানট গানে
কেলে হাঁড়ি মাের টাঙ্গায়ে রাখিব শ্যাওড়া গাছের তলায়।
ওগাে প্রেয়সী, করুণা কোরাে,
আমার জটাপড়া চুল হেঁটে দেবব তাই খােয়র,
তুমি থেকো গাে ‘আদুল গায়,
আমি আপনারে টেনে টেনে
‘বহুত কোশিষ’ মেনে
তােমারে লক্ষ্য করিয়া ছুটেছি ঠাই দিও ফাটা পায়।
s
আধুনিক কামস্কায় কবিতা •• কামস্কাকার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য-সমালােচক আমার অকৃত্রিম সুহৃদ বিথলােতেলাচুংভিস্কী মহােদয় সম্প্রতি একটি পত্রে আমাকে জানাইয়াছেন যে, তিনি তথাকার শ্রেষ্ঠ মাসিক পত্রে আধুনিক বাংলা কবিতার একটা ধারাবাহিক পরিচয় প্রকাশ করিতেছেন। প্রসঙ্গক্রমে ইহাও জানাইয়াছেন যে, শ্ৰীযুক্ত বিনয়কুমার সরকার ও দিলীপকুমার রায়ের কবিতা কামস্কাটুকায় সবিশেষ আদৃত হইতেছে ; ‘রায়-সরকার ক্লাব নামক একটি সাহিত্যিক সঙ্ও তথায় গঠিত হইয়াছে, তাঁহারা সরকার ও রায় মহাশয়কে নিমন্ত্রণ করিয়া শীঘ্রই তথায় লইয়া যাইবার আয়ােজন করিতেছেন, এবং এবিষয়ে আমাকেও সাহায্য করিতে বলিয়াছেন। অচিন্ত্যবাবু ও বুদ্ধদেব বাবুব কবিতা তাঁহাদের ভাল লাগিলেও তঁাহারা বিস্মিত হন নাই, কারণ তাহাদের ধরণের কবিতা কামস্কাকীয় সাহিত্যে যথেষ্ট পাওয়া যায় । কামস্কাটকীয় সাহিত্যের কবিতা-সম্পদ নিতান্ত অল্প নহে। কামস্কাকা জাত-কবির দেশ। এবিষয়ে বাংলা দেশের সহিত কামস্কাটুকার মিল আছে। কামস্কাটুকার গদ্য এখনও ততটা উন্নতি লাভ করে নাই সত্য, কিন্তু কবিতার দিক দিয়া এই দেশ পৃথিবীর যে-কোনও দেশের সাহিত্যের সহিত পাল্লা দিতে পারে। কামস্কাটকীয় ভাষাটাই নাকি এমন ছাদ যে, কথার উপর কথা গাঁথিয়া গেলেই তাহা কবিতার মতো শ্রুতিমধুর হয়, তাছাড়া কামস্কাকীয়দের মনই একটু কাব্যঘেঁষা। অতি সাধারণ ঘরােয় ব্যাপারের মধ্যেই তাহারা ইন্দ্রিয়াতীত জগতের রহস্য-সন্ধান পায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে মনােদর্পণ পারে, একটি দশবৎসরের বালিকা আয়নার সামনে বসিয়া চুল বাঁধিতে বাঁধিতে হঠাৎ গাহিয়া উঠে পুন্তো পাররা জিন্তো হারাে মিস্তা নারাে বিস্তাসাং, লেঙ্গু পােষ জিয়ং ট্রোষ দিঙ্গা ভােস মিস্তা বাং! তােকাতাররা তােকাতাররা তােকাতারে তি। । ইহার অর্থ- যে নাগিনী-সম্প্রদায় কোন অজানিত বিবর হইতে বাহির হইয়া আমার মাথায় বাসা বাঁধিয়াছে, হে আমার কবরী, তুমি তাহাদিগকে বন্ধন করিতেছ, তুমি কম নও। আমি বারবার তােমার জয়-ঘােষণা করিতেছি। অল্প পরিসরের মধ্যে কামস্কাটকীয় কাব্যের ইতিবৃত্ত দেওয়া সম্ভবপর নহে এবং ইহা বিশেষজ্ঞের কাজ।. আমি সে চেষ্টা করিব । এইটুকু মাত্র বলিতে পারি যে, আদি কবি মিলাং হইতে অতি- আধুনিক কামাকা পর্যন্ত এই দেশে সহস্র সহস্র কবির আবির্ভাব ও তিরােভাব হইয়াছে। সকলেই পৃথিবীর কাব্যসাহিত্যের সম্পদ কিছু না কিছু বৃদ্ধি করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যাহারা শেপীর গ্যয়টে রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিদের সহিত একাসন দাবী করিতে পারেন। কামস্কাটকীয় ভাষা শিক্ষা করা অত্যন্ত দুরূহ বলিয়াই বহিঃপৃথিবীতে এই সকল কবির যথাযােগ্য সমাদর হয় নাই। আমাদের ভরসা আছে যে, অদূরভবিষ্যতে সমগ্র পৃথিবী ইহাদের পরিচয় পাইয়া ধন্য হইবে।
১৭ মনােদর্পণ কামস্কাটকীয় কাব্য-সাহিত্যে আধুনিক যুগ আরম্ভ হইয়াছে স্বর্গীয় কবি ওরল্যাংহাের সময় হইতে। তিনি উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার হাতেই কামস্কাটুকার কাব্য- সাহিত্য একটা নূতন রূপ পরিগ্রহ করে। ইহার জাতীয় কবিতা ও সঙ্গীতগুলি চিরদিন অমর হইয়া থাকিবে বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। ব্লডিভােষ্টীয়দের সহিত যখন কামস্কাটকীয়দের যুদ্ধ হয় তখন বিজেতা ব্লাডিভােষ্টকীয়দের হাতে এই অমর কবি নিহত হইয়াছিলেন; এই কবির কাব্যকে তাহারা এতই ভয় করিত যে, কামস্কাটুকা জয় করিয়াই তাহার সর্ব প্রথমে ওরল্যাংহাের অনেক শ্রেষ্ঠ কবিতা ধ্বংস করিতে প্রবৃত্ত হয়। এই কারণে ওরল্যাংহাের অনেক ভাল কবিতা আর পাওয়া যায় না। বন্ধু বিথলেতেলাচুংভিস্কীর কৃপায় আমরা ওরল্যাংহাের সামান্য কয়েকটি মাত্র কবিতা ও একটি কাব্যের ভগ্নাংশ পড়িতে পাইয়াছি। ওরল্যাংহাের পর হইতে আধুনিকতম বর্তমান পর্যন্ত যে সকল কবি কামস্কাটুকায় জন্মগ্রহণ করিয়াছেন তাহাদের সহিত আমাদের পরিচয় থাকা ভাল। একটু যত্ন করিয়া দেখিলে আমরা দেখিতে পাইব যে, রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কাব্য-সাহিত্যের সহিত আধুনিক কামস্কাটকীয় সাহিত্যের কিছু সাদৃশ্য আছে। এই সকল কবি আমাদেরই মত প্রাচীন convention অস্বীকার করিয়া চলিয়াছেন, ছন্দ ও ভাৰ উভয় দিক দিয়াই। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, সমিল ও মিলহীন অসচ্ছল সর্বপ্রথম কামস্কাকাতেই আবিষ্কৃত হয়। এবং সামান্য পাঁচ লাইন কবিতার মধ্যে গভীর অনুভূতিপূর্ণ একটি শব্দ দিয়াই ভঁহারা কবিতার জাত বাঁচাইয়া দেন। কবি বিসে। সাধারণ মলােদর্পণ গদ্যের মত কবিতা লিখিয়াছেন, কিন্তু ঐ গদ্যের মধ্যেই তিনি এমন সুকোশলে মিল বজায় রাখিয়াছেন যে, যাহারা নজর দিয়া পড়িবে তাঁহারা চমৎকৃত হইবেন। বাংলাদেশের রুচিবাগীশ সমালােচকদের মতে কামস্কাটকীয় অধিকাংশ কবিতাই অশ্লীল পৰ্যায়ভুক্ত হইবে। কুৎসিৎ কথা কোথায়ও নাই, কিন্তু মাঝে মাঝে এক একটা স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে যাহা পাঠ করিয়া রুচিবাগীশ পাঠক চমকাইয়া উঠিবেন। কিন্তু কাব্য রুচিবাগীশদের জন্য নহে, রসিকের জন্য। এবিষয়ে অধিক লেখা নিষ্প্রয়ােজন। কিন্তু আজ-কাল বাংলার সাহিত্যিক হাওয়া যেরূপ বিশুদ্ধ হইয়া উঠিতেছে, কচি কচি' বলিয়া যেভাবে সমালােচকের দল ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিতেছেন তাহাতে আমাদিগকে একটু সাবধান হইয়াই চলিতে হইতেছে। এই ভাবের বিশুদ্ধ হাওয়া বেশী দিন বহিতে থাকিলে চণ্ডীদাস ভারতচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের দেশে কাব্যকে বাঁচাইয়া রাখা দুরূহ হইবে। আমরা অতি ভয়ে ভয়ে শ্ৰীমতী মুতারিক রচিত দুই একটি কবিতার অনুবাদ দিলাম, আশা করি, স্ত্রীলােকের লেখা বলিয়া বাঙালী পাঠক ভড়কাইবেন না। দিস্ত, ওহার কবিতা যেন মূর্তিমান ব্যথার কবিতা। একটা তীব্র pessimism-এর রূপ কুচাহাের সমগ্র কাব্য-সাধনার মধ্যে ফুটিয়া উঠিয়াছে। এবিষয়ে তিনি কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সহিত তুলনীয়। শ্ৰীমান তুস্কো মাত্র অষ্টাদশ বর্ষীয় বালক, কিন্তু এই অল্প বয়সেই তিনি রক্তমাংসের প্রতি যে প্রীতি দেখাইয়াছেন তাহা বিস্ময়কর। বোদা একেবারে পথিক কবি, খালি পথ চলার কথাই তাঁহার কাব্যের বিষয়।
১৯ মাের্পণ কব-সঙ্গীত (ওরল্যাংহে) কথার উপরে কথা গেঁথে শুধু ছলনা করা, কে শুনিবে গান, কোথা আছে প্রাণ, পচিছে মড়া; আমি একধারে জ্বালাইয়া বাতি, একেলা জাগিয়া কাটাই যে রাতি, ঘুম আসে চোখে, হা হা করে নিশি ভয়ঙ্করা। তুষার-কবরে স্নান দীপালােক খুড়িছে মাথা, যতদূর চাই মৃত মানবের শয়ন পাতা। দীপশিখা সম কঁপিতেছে প্রাণ, একা শুনি আমি, তারা গাহে গান- মৃত্যু-পারের অমা-নিশীথের বিজয়-গাথা। দূরে গ্রামপথে পােষা কুকুরের আর্তস্বর, ভীমা রজনীরে করিতেছে আরাে ভয়ঙ্কর। মৃত্যু-আঁধারে জীবনের গীতি, পারি না গাহিতে, মনে জাগে ভীতি, নাচে মহাকাল, খল খল হাসি দিগম্বর। মাের চারিপাশে ওঠে প্রেতকুল কবর খুঁড়ে, আমারে ঘিরিয়া দিল তাণ্ডবনৃত্য জুড়ে।
মনােদর্পণ ২০ ৫ তাদের ছন্দ পশে মাের কানে, এত হাহাকার তাই মাের গানে, জীবনের গান তাই গাহি আমি মরণ-সুরে। উষ্ঠিত- (ওরল্যাংহাে ) ‘শােভ’পাহাড়ের পাদদেশে যেখা দেবদারু বন শেষ, আমার দেশের শত্রুরা সেথা ছড়াইছে বিদ্বেষ। তােমরা এখনও কুটীরের মাঝে, আগুন পােহাও, না মরিয়া লাজে- চটপটু ওঠ, সাজ বীরসাজে ডাকিছে তােমার দেশ, বুকের রক্ত কি ছন্দে বাজে লহ তার উদ্দেশ। , উনানের ধারে বসিয়া গাহিছ গভীর প্রেমের গান, প্রেয়সীর হাতে হাতখানি রেখে কর মান অভিমান। চুমার মূল্য আছে কি না আছে, বিচার তাহার করে নিয়ে পাছে, শাণিত অস্ত্রে তাজা খুন যাচে জননীর অপমান। প্রেমের নেশায় আছু মশগুল-হতভাগা সন্তান। * এই দেবদারুন কামাইকার উত্তর-সীমান্তনির্দেশক
২১
মনােদর্পণ
যুগ যুগ ধরে যারা নিতে চায় তােমাদের স্বাধীনতা,
তাদের রাজ্যে এখনাে সজীব প্রাণের চঞ্চলতা।
যে-মুখে তােমারে দেয় ধিক্কার,
সে-মুখ এখনাে ভাঙে নাই তার,
যে-ঠোটে ফোটায় হাসি রংদার,
বাক্যের চটুলতা-
সে-ও আজো তেমনি নিটোল, থামেনি রসের কথা ।
বাপের রক্ত দেহে নাই? তােরা দুধ খাস নাই মার?
আকাশের নীল চক্ষে তােদের ছায়া ফেলে নাই তার ?
তুষার-শীতল সাগরের নীরে,
বুকের রক্ত জমে গেছে কি রে,
ভুলে গেছ ভাষা? দেশ-জননীরে—
ডাক নাই, মা আমার’?
শােন নাই কভু গিরি-অরণ্যে শ্বাপদের হুঙ্কার।
জননী, এখনও পুরুষে ভুলাও পরি রমণীর বেশ ।
শিথিল এখনাে বুকের বসন, শিথিল এখনাে কেশ ;
• মদিরার বােঝ ফেল’ চোখ হতে
ঠেলে ফেলে দাও মৃত্যুর স্রোতে,
বুকে থাকে বল, উঠে’ পর্বতে
এনােদর্পণ দেখহ নির্নিমেষ তব প্রিয়জন-রক্তে তুষার লাল হাসি হাসে বেশ। লাল হাসি হাসে উদয়-অচলে প্রভাতের রবিকর, এ যেন দিনের বুকের রক্ত আঁধার বক্ষ পর। তুমি ওঠ জাগাে, কাটিছে আঁধার, রক্তের লাগি কঁদে তরবার, শত্রু-শােণিতে ধবল তুষার কর উজ্জ্বলতর— তুমি মর যদি, মরিও হে বীর, সে মৃত্যু মনােহর। রণ-সঙ্গীত (ওরল্যাংহাে) গ্রামের পথে বাজছে ভেরী ওঠ, ওরে ওঠ, নেইক দেরী, থাক্ বােতলে ভড়কা শেরী— শত্রু নিপাত হােক- দ্যাখ মেলে দুই চোখ। মূলতুবী রাখ, পরবগুলাে থাক্ নিভনাে ঘরের চুলল, হাত পা আছে, ন’সূতো মুলাে দুহাতে তাল ঠো। দ্যাখ মেলে দুই চোখ। এর চেয়ে কি আমােদ আছে, মরণ বুড়াে জীবন যাচে,
মনােপণ
গিলবি ভয়ে ঢােক্।
মুখ রেখে কি সার্শি-কাচে
দ্যাখ মেলে দুই চোখ।
দেখা পুরুষবাচ্ছা তােরা, বুকে তােদের আগুন পােরা,
নেই দুনিয়ায় তােদর জোড়া, বুঝুক সকল লােক।
দ্যাখ মেলে দুই চোখ।
পঙ্কজ
(অজ্ঞাত)
সব বন্ধন টুটিয়া,
রাজপথে এমু চলে,
বন্ধন নিয়ে বাছারে
তখন আসিলি কোলে।
সামান্য ভিক্ষা
( মিলানি)
কথা তুমি নেই বা কহ,
নয়ন মেলেই চেয়ে থেকো
নেই পাঠালে বার্তাবহ
সময় পেলেই মনে রেখাে।
তাতে আমার কি লাভ ক্ষতি,
ধাও? আমি মৌনব্রতী,
মুখে যদি জবাব মেলে
মুখের পানে চেয়ে দেখাে।
০
মনােদর্পণ
f
মনে তােমার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির হাওয়া যদিই লাগে,
পথের মাঝে কুড়িয়ে পাওয়া অনেক দিনের অনুরাগে-
চিত্ত যদি রাঙিয়ে ওঠে,
নাই যদি বা ভাষা জোটে,
মলিন হাসি ফুটলে ঠোটে,
রুমালে সেই হাসি ঢেকো।
ছাগল-ছানা
(অজ্ঞাত)
দুয়ার পাশে দাঁড়ায়ে ছিল বালা
আকাশ পানে আপন মনে চেয়ে,
পথে তখন পথিক ছিল নাকো,
শুধাই আমি, কহ গ্রামের মেয়ে,
করছ কি আজ বৃষ্টি-ঝড়ের ভয় ?
অনেক দূরে হবে আমায় যেতে
ম্লান হাসিয়া কহে গ্রামের বালা,
‘ছাগল-ছানা চরতে গেছে ক্ষেতে,
এখনাে যে ফিরুল না তাই ভাবি,
বাড়ীতে আর পুরুষ কেহ নাই।
‘মেয়েরা কেউ ?–‘সবাই গেছে হাটে,
একলা আমি বিপদ গণি তাই।
মনােদর্পণ
গৃহের পথে হ’ল না আর চলা,
বাহির হলেম ছাগল-ছানার খোঁজে,
কি হ’ল আর নাই বা কহিলাম,
সে সব কথা রসিক জনেই বােঝে ।
*,
তুষার-লিপি
(শ্ৰীমতী মুতারি)
ভাসিয়া আসিছে তুহিন শীতল স্রোতে,
তুষারের চাপ উত্তর মেরু হতে
দেখ দেখ সখি, কি লিপি তাহাতে লেখা,
গেছে প্রিয়তম হ’ল আজ কতদিন,
খরতর রােদ জ্যোৎস্নার মত ক্ষীণ
ব্যাধ বেশে মােরে চমকি দিল না দেখা।
শ্বেত ভালুকেরা তুষারের গুহা-কোণে,
প্রেম শেষ করে খেলে বাচ্ছার সনে-
একেলা আমার কাটে না দীর্ঘ রাতি।
বুকের রক্ত বুকে হয়ে গেল জল,
হ’লনাক হায় স্তনদুধ নিরমল,
আজো ভুলি নাই শিয়রে রাখিতে বাতি।
শুধু পশুললামে তপ্ত হয় না দেহ,
সাথীহারা স্বরে হাহাকার করে গেহ,
অনাের্পণ
সখি দেখ দেখ, তুষারের স্রোতধারা,
ঝাঁপ দিয়ে পড়ি করি না সখি মানা,
আছে বুঝি ওতে, গন্ধপরশ জানা-
নাই যদি তবে ভেসে এল কেন তারা ?
কৈফিয়ৎ
(শ্রীমতী মুতারি)
দুপুর বেলায় গিয়েছিলেম গাঁয়ের হাটে
সহজ ঠাটে,
সারাটা পথ একলা গেলাম, কেউ ছিল না
তুষার-বাটে।
সত্যি মাগাে, একলা যেতে
করছিল ভয়,
কেউ ছিল না ওৎটি পেতে
জিঙ্কোও নয় !
ডাকেনি কেউ, সত্যি মাগাে, বাঁশীর রবে
সুরের সাঁটে,
মিথ্যা তােমায় বলেছে কেউ কি দেখেছে
তুষার-বাটে।
মিথ্যে তুমি দেখছ মাগাে এমন করে
গায়ের জামা,
২৭
মনােদশ
ফিরে এলেম পিঠে নিয়ে দুই-মণী সেই
বেতের ধামা!
এমন করে একলা আমি
যাব না আর
খাব না আর দিবস-যামী
খোটা তােমার !
কেমন করে বুঝবে তুমি কি দুখে মাের
রাত্রি কাটে।
হায়রে যদি সত্যি হত, পেতেম দেখা
তুষার-বাটে!
লীলা
( আইভাননাভিচ,)
এক দুই তিন চার, নাহি যায় গণা,
তবু ভরিল না চিত্ত,
নূতনের লাগি তবু অসহ্য পিপাসা !
কে আড়ালে বসি’
মনে নিত্য জাগাইছে ক্ষুধা
তৃপ্তি পাব কিসে তার দেয় না সন্ধান;
আমি খুজে মরি।
মনােদর্পণ
২০
এক পাত্রে করি পান, জ্বলে মরি দুঃসহ জ্বালায়,
শান্তি খুঁজে ভিন্ন পাত্র পানে পুনঃ করি হস্ত প্রসারণ।
অর্থহীন লীলা।
ভুল
(বিসে।)
রাত্রি গভীর, স্তব্ধ সড়ক, তবু কাহার শব্দ পায়ের,
বক্ষে আমার হবেই বুঝি, চক্ষে আমার নিদ্রা নাহি।
দূরে কোথায় বাজছে বাঁশী, সুরে আমার মন কাঁদিছে,
মনের ভুলে দরজা খুলে বাহির হলেম একলা পথে ;
মনে হ’ল ছায়ার মত ঢাকিয়া কায়া অন্ধকারে,
পল্লীবালা লক্ষ শত অভিসারের যাত্রী বুঝি।
নিকটে যেতে মিলায় ছায়া, অজানা ফুল গন্ধ বিলায়
লজ্জা হ’ল, ফিরিয়া ঘরে, শয্যা’পরে বসন্ন একা।
সহজ
( বিসে।)
উত্তীর্ণ হয়েছে সন্ধ্যা, বন্ধ্যা অন্ধকার ঘিরিয়াছে দিগ্বিদিক,
প্রান্তরের মাঝে অশান্ত নেকড়ের দল পাছু নিল আসি।
অন্ধকারে বুকে চাপি সন্তানেরে, মুখে তার চাহি নিৰ্ণিমিখ
রাখিল স্লেজের কোণে, দ্বিধাহীন ; অন্যমনে ম্লান হাসি হাসি
মনােদর্পণ
M
কহিল চালকে, মর্ত্যলােকে সব চেয়ে প্রিয় মাের যাহা কিছু
সপি তােমায়। সবিস্ময়ে দেখিল চালক, অপলক আঁখি
রমণী নামিল ভূমে, লাগিল ছুটিতে; শ্বাপদেরা নিল পিছু।
ধন্য হ’ল বন্য সে প্রান্তর, জননীর পূত বক্ষরক্ত মাখি।
অশ্রুহীন
( দিস্ত, ওহা)
জন্ম যে দিন নিয়েছি সে দিন নিতান্ত অকারণে
কেঁদেছিনু, আজ কারণের নাই শেষ ।
সাগরের জল জমিয়া কঠিন, জলধারা আঁখি-কোণে
জমাট বেঁধেছে—নয়ন নির্নিমেষ।
অসময়
(শ্ৰীমতী আলুস্কা)
তুষার-বিছানাে মাঠখানা ধূ ধূ করে,
তারি মাঝখানে অলস দ্বিপ্রহরে
একেলা দাঁড়ায়ে, স্মরণে উদিল মম,
আমি অভাগিনী, নাহি মাের প্রিয়তম।
রিক্ততা মাঝে রিক্ত হৃদয়টিরে
কে দেখালে মােরে নির্মম করে ছিড়ে,
মনােদর্পণ
সহসা চমকি দেখিলাম এক ঠাই,
রক্তের ধারা জমাট তত বাঁধে নাই।
কার উপহাস ভাবিতে লাগিনু মনে,
দুঃসহ শীতে গােলাপ ফুটেছে বনে।
(
কপি-আলু-সীম
(কুচাহাে
রন্ধন হয়েছে সুরু, পাচক অলক্ষ্যে আছে বসি’
ধরণী-কটাহে করে অপরূপ ব্যঞ্জন রন্ধন,
পাচক জানে কি কভু, আলু কপি কি ব্যথা-আতুর,
সীমের বক্ষের মাঝে ভাষাহীন ভাবের স্পন্দন!
তপ্ততর হয়ে উঠে ধরণীর মৃত্তিকা-কটাহ,
উলটি পালটি দেয়, দগ্ধ হয়, সিদ্ধ হয় সবে,
কোথা নিমন্ত্রিত জন, আসিয়া পৌঁছেনি আজো তারা;
তাড়া নাই, রান্না চলে ধীরেসুস্থে নিশ্চিন্তে নীরবে।
ভ্রান্ত
(কুচাহাে )
হায়, মানুষের মন,
পাপীর লাগি’ প্রভু সদাই ফেরেন পথে পথে,
গির্জা-ঘরে কিসের আয়ােজন।
মােগা
প্রহরী ফেরে ধরিতে চোর,
চোরেরাে দেখি লেগেছে ঘাের,
ধরিবে প্রহরীরে।
ফিরিছে ব্যাধ শিকার খুঁজে
শিকারও দেখি চক্ষু বুজে
ব্যাধের খোঁজে ফিরে।
হায়, মানুষের মন,
প্রভুরে চাও, পতিতালয়ে হাজিরা দাও তবে,
কিম্বা খোজ শৌণ্ডিকভবন।
মরীচিকা
(ভলফ)
কঠিন তুষার শীত অবসানে
নরম হইল কাদার মত,
বসন্তরূপী যৌবন এল
তবু ভাঙিল না কঠোর ব্রত ।
কখন সহসা হ’ল ভূকম্প,
কি সে আলােড়ন বক্ষমাঝে,
যুগল পাহাড়ে সমতল ভূমি
সাজিল সহসা নূতন সাজে।
মনােদর্পণ
।
.
তুষারধবল বক্ষ-অচল
তুমি তারি মত অটল রহ,
শীতান্তে সখি, সুদূর হইতে
আসে নাই কোনাে বার্তাবহ।
পরশে তাহার বুকের শিখরে
কালাে-সবুজের বসেনি মেলা,
গলে নাই মন, সাগরের পানে,
ভাসে নাই তব দেহের ভেলা।
কেন এ কঠোর তপস্যা সখি,
ফুল ফুটায়েছে রিক্ত তরু,
বুক-ওয়েশিসে ঠাই দাও মােরে
ভিতরে জ্বলুক ধূ ধূ ধূ মরু।
স্থল
(নুডলফ)
হে চঞ্চলা,
ভালাে নাহি লাগে আর তব ছলা-কলা,
মিথ্যা প্রলােভন।
মন মাের স্বপ্ন দেখে, দেহ মাগে শােণিত-তর্পণ।
পারি বুঝিবারে--
সূৰ্যে কেন জলে লােহা বাষ্পের আকারে,
মনােপন গিরিশির বিলীন নিঝরে, গাছে ফোটে পুষ্প থরে থরে। জাগিছে আমার দেহে হিংস্র পশু-ক্ষুধা, দূর হতে বিলাইছ সুধা, সে সুধা সঞ্চিত থাক, যবে- দেহ মাের তৃপ্ত হয়ে, নিঃস্ব রিক্ত হবে- বায়ুভু সম- ধরা দিয়ে ধরা নাহি দিয়াে, হে নিৰ্ম্মম। আজি মাের প্রসারিত কর, দূরে থেকে সরে থেকে যদি লাগে ডর। স্বরূপ (লেভিন ) কারে তুমি বাস ভাল, হে প্রেয়সী, যে গৃহে তােমারে আমি ঘরণী করিয়া, রক্ষা করি বাহিরের সব বিপ্ন হতে সেই গৃহ। তােমারে সঙ্গিনী করি, দিয়ে মাের নামের সম্মান সমাজে যে ঠাঁই দিনু, ভালবাস তাই? মাের দেহ-শক্তিসার তােমারে আশ্রয় করি’ ফলায়েছে যে ফসল, তারে বাস ভালাে?
অনােদর্পণ
৩3
ভালবাসাে এই দেহখানা ?
এই মন ? তােমারে ঘিরিয়া নিত্য যে রচে স্বপন,
নাই যা তােমার, সে সম্পদে তােমারে সাজায়ে
মহিমা বাড়ায় তব।
আমি যে পুরুষ, শুধু এই সত্য জানি
বদ্ধ তুমি মাের কাছে ?
হায়, মিথ্যা প্রশ্ন করি-
আমি ভালবাসি শুধু আমার কল্পনা
দেহ নাই রূপ নাই তার।
তুমি ভালবাস তাই, যাহা তব লাগে ব্যবহারে,
ধন্য সৃষ্টি বিধাতার।
সত্য বর্তমান
(তুস্কো )
পতঙ্গে শিখাও বসে আলাে শুধু কয়লার গ্যাস,
বাম্পাকারে মলিন কাৰ্বণ,
‘মেদ-মাংস-রক্ত’—মােরে মিথ্যা কহ যত সব ট্র্যাস,
—নারী-দেহ আত্মার বন্ধন।
শুনেছি এ সব কথা, নিতান্তই ভেজাল পুরাননা,
লেখা আছে জব-সমাচারে,
রক্ত-মাংস তথ্য যদি শাস্ত্রবৎ সত্য বলি জানাে,
মাংসে কে সাজায় অলঙ্কারে।
৩৫
মনােদর্পণ
অ্যাডাম সাজাল ইভে, তার পর ইভের নন্দিনী,
সাজিয়াছে অপরূপ সাজে,
কভু নগ্ন ; কভু হয়ে সুকৌশলে বসনে বন্দিনী,
লজ্জা দিল আপনার লাজে।
বৃথা তর্ক, আমি চিনি বৰ্ত্তলিত বক্ষ মাংসময়,
লাজরাঙা নিটোল কপােল,
আর জানি, এই বস্তু নিত্য বা শাশ্বত কভু নয়,
অতএব করিয়াে না গােল।
স্পষ্ট
(তুস্কো)
তােমারে বক্ষেতে টানি আচম্বিতে করি চুম্বন,
করিলে না মানা
তারপর কি ঘটিবে, মৃত্যুবৎ নিশ্চিত তখন,
ছিল কি অজানা ?
সন্দেহ
( অজ্ঞাত )
ভাবিতেছিল বালা,
বিবাহ যবে হয়নি তখন
ফুত কি ফুল কাননে,
গাঁথত সে কি মালা।
মনােদর্পণ
চিরন্তন পথিক
(বোদা)
একদা দুৰ্যোগ দিনে
অন্ধকার পথ চিনে,
যে আলয়ে নিলাম আশ্রয় ;
যাত্রাশেষ অনুমানি, কেমনে তা নাহি জানি,
বাঁধি সেথা আপন আলয়।
সহসা পড়িল মনে,
চরম শান্তির ক্ষণে,
আরাে পথ রহিয়াছে বাকী,
আপনি রচিয়া মায়া
আশ্রয় করেছি ছায়া,
মিথ্যা তাহা স্বপ্ন ভুল কঁকি।
টুটিয়া বন্ধন তাই
পুনঃ পথে বাহিরাই
কোথা যাই না পাই উদ্দেশ,
তবু একা পথ চলি,
গিরিদরি বনস্থলী
আজো পথ হয় নাই শেষ।
মিলেছে আশ্রয় কত
এন্তি দেহ আশাহত,
সে আশ্রয় ফেলিয়াছি পিছে,
পিছনের অন্ধকারে চাহিতে পারি না হা রে
সুমুখে কে আমারে টানিছে।
কত দ্বিধা কত ভুল,
কত কাটা কত ফুল,
থমকিয়া থামা আমনে,
আবার জাগিয়া ওঠা, পাগলের মত ছােটা,
ভঙ্গ আজো দিই নাই রণে।
৩৭ মনােদর্পণ বোদা পৰ্যন্ত আসিয়া কামস্কাটকার আধুনিক কাব্য-সাহিত্য সমাপ্তি লাভ করিয়াছে। তারপর অতি-আধুনিক যুগ। এই যুগের শ্রেষ্ঠ কবি কাট্টাকা আজিও বিপুল বিক্রমে কামস্কাকার কাব্য-সম্পদ বৃদ্ধি করিতেছেন। আধুনিক ও অতি-আধুনিকদের মধ্যে এভাবে পার্থক্য রেখা টানা যায় কি-না, অনেকে সন্দেহ করিবেন। কিন্তু বিচারের প্রয়ােজন আছে।
মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য (পদ্যানুবাদ) -ওহে ছ ? হন্ হন্ করে পার্ক সার্কাসের দিকে চলেছি, হঠাৎ ফিরিঙ্গী কবর- খানার কাছে পেছন থেকে কে একজন হেঁকে বললেন,“ওহে শুছ ? পরণে শতছিন্ন ‘সেলারে’র কোট-প্যান্ট, চাপদাড়ি, প্রৌঢ় ভদ্রলােক। ভারী বিরক্তি বােধ হ’ল। একে ভাদ্র মাসের গুমােট গরম, তার ওপর খানিক আগেই একটা উকীলের চিঠি পেয়েছি আমার কোন লেখায় নাকি এক বেঁটে টেকো লােকের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর মৃগীর ব্যায়রামের কথা লেখা হয়েছে, উলুবেড়ের রামহরি লস্কর অপমানটা গায়ে পেতে নিয়ে শাসিয়েছেন—বিশ হাজার টাকার খেসারৎ দিলে তিনি মানহানির মামলা আনবেন ; রামহরি লস্করের দ্বিতীয় পক্ষের শ্যালক থাকেন পার্ক সার্কাসে, চলেছিলাম তারই সন্ধানে, হঠাৎ পথে এই বাধা! একটু থেমে মুখ না ফিরিয়েই বাম, কে মশাই আপনি? দেখছেন বিশেষ কাজে চলেছি, অমনি পিছু ডেকে বলেন? তাছাড়া, সম্পূর্ণ অপরিচিত ভদ্রলােককে ‘তুমি’ বলেন কোন সাহসে? আচ্ছা অভদ্র তাে আপনি। দু পা এগিয়ে যেতে না যেতেই আবার ডাক শুনলাম—মিনিট দু’ তিন দেরী করতে পার না? স্বরটা ভারী করুণ ঠেল। ভালাে জ্বালায় পড়লাম যা হােক।
৩৯ মনােদর্পণ —কি বলবেন চটপট বলে ফেলুন। নরেন্দ্র দেবের ঠিকানাটা বলে দিতে পার ? ‘মেঘদুতে’র অনুবাদ পড়া ইস্তক নরেনদা’র ওপর ভারী শ্রদ্ধা হয়েছিল। বাম, তা আর পারি না? নরেনদা’ কালীঘাটে থাকেন। -কালীঘাটে ? তা হলে আর হল না। একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল। চমকে উঠলাম। -হতাশ হয়ে গেলেন যে! ব্যাপারটা কি বলুন তাে? নরেনদার খোজ কেন ? দরকার ছিল। কিন্তু কালীঘাটে তাে যেতে পাব না। আমি খ্রষ্টান হয়েছিলাম। তা চেহারাতেই মালুম হচ্ছিল। বললাম, কালীঘাট নয়, তিনি থাকেন ঠনঠনে কালীতলার কাছে। -সে একই কথা। নরেন্দ্র দেবকে একদিন এদিকে আনতে পার? আমার বিশেষ দরকার। এ বলে কি? পাগলের পাল্লায় পড়লাম না তাে! বললাম, এদিকে তিনি আসবেন কি দুঃখে? তার নামে তো আর কেউ-যাক গে, কি দরকার আমাকে বলুন। আমি তাকে খবর দিতে পারি। এই সুযােগে নরেনদা’র সঙ্গে যদি দেখাটা হয়ে যায় মন্দ কি ভদ্রলােক করুণ কণ্ঠে বলেন, আমি একটা কাব্য লিখেছিলাম- বাপ রে! আর অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কোট-প্যান্ট, চাপদাড়ি আর কাব্যের combination মারাত্মক! হয় তত আমাকেই কাব্য শােনাতে চাইবে। বলাম, মিথ্যে চেষ্টা। নরেনদা বলেছেন, ভারতবর্ষে তাঁর কোনও হাত নেই। হরিদাস চাটুযয যা হুকুম করেন, জলধর দাদা
.
মনােদর্পণ
তাই করেই খালাস। আপনি বরঞ্চ হরিদাসবাবুর কাছে বইটা নিয়ে
যান। পছন্দ হলে ভারতবর্ষে
ভদ্রলােকের মুখে ম্লান হাসি দেখা গেল। বললেন, ছাপার জন্যে
নয়। সে অনেক দিন ছাপা হয়ে গেছে।
-সমালােচনা? সম্পাদকের নামে রেজেষ্ট্রী করে এক কপি—দু’
কপি হলেই ভাল হয়-
-তাও নয়। সমালােচনাও ঢের হয়েছে।
তবে কি ? গুরুদাস লাইব্রেরীকে এজেন্সী দেবেন ?
ভলােক মাথা নাড়লেন।
-তাও না? আমি পা চালাতে সুরু করলাম।
—আর এক মিনিট। নরেন্দ্র দেবকে কি একবার খবর দেবে যে,
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার খোঁজ করছিলেন ?
মুগপৎ ক্রোধ ও বিরক্তিতে মন ভরে গেল। সকাল বেলায় ভালাে
পাগলের পাল্লায় পড়লাম যা হােক! একটু হেসে বললাম, বেশ, বেশ,
তা বলব। আপনার ঠিকানাটা ?
ভদ্রলােক কাছে সরে এসে আমার হাত চেপে ধরলেন; বরফের
মত ঠাণ্ডা ! এবার ভয়ে আমার সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল। ভালাে
করে তার মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম-মাইকেলই বটে। আমার
মূৰ্ছার উপক্রম হ’ল। কাছাকাছি লােকানও কাউকে দেখলাম না।
ভয়ে ও সন্ত্ৰমে তার পায়ের ধূলাে নিয়ে বললাম, মাপ করবেন, চিতে
পারিনি। অজানতে অনেক অশিষ্টতা করেছি।
মাইকেল মান হাসি হেসে বললেন, না না, রাগ করব কেন? তুমি
ততা না জেনে করেছ, জেনে-নেও অনেকে অনেক অপমান করেছে,
সব সয়েছি। রাগ করবার পথ তত আমি রাখিনি।
৪১
মনােদর্পণ
ভারী লজ্জা হ’ল। কথাটা পাণ্টাবার জন্যে বাম, আপনি কি
মেঘনাদবধের কথা বলছেন?
-হ্যা। অনেক পরিশ্রম করে বইটা লিখেছিলাম, কিন্তু কেউ
পড়লে না। দেবেনবাবুর হােট ছেলে পড়েছিলেন, কিন্তু তার শ্রদ্ধা ছিল
। তাই ভাবছিলাম, নরেন্দ্রবাবু যদি ওর একটা অনুবাদ করেন আর
হরিদাসবাবু ছবি-টবি দিয়ে ছাপেন তাহলে
অবাক হয়ে বললাম-ও তাে বাংলায় লেখা,
আবার
অনুবাদ ?
-বাংলা হলেও বড় শক্ত বাংলা। ছন্দটাও একঘেয়ে, অমিত্রাক্ষর
এ যুগে একেবারে অচল। তাই বলছিলাম যদি আজকালকার চটুল
আমার লােভ হ’ল। মাথা চুলকে বললাম, যদি অনুমতি করেন,
আমিও একটু আধটু কবিতা লিখে থাকি। আমার পথ চলতে ঘাসের
ফুল’টা পড়ে দেখবেন। অনুবাদ নয়, কিন্তু ধরণটা
মাইকেল আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন, অগত্যা। বেশ,
চেষ্টা করে দেখ। তবে নরেন্দ্র দেব হ'লেই ভাল হত।
মাইকেল আমার ডান হাতটা ধরেছিলেন, হাতটা তখনো
অসাড় ছিল। হাত নাড়বার ব্যর্থ চেষ্টা করে অভিমানের সুরে
বললাম, বেশ, পছন্দ না হয়, ছাপব না। তবে আমার আশা আছে-
-মেঘদূতের মতো করে ছেপাে কিন্তু। ওই যে কি কাগজ
বলে তােমাদের—তাতেই! আর লেখা হলেই আমাকে একবার
দেখিও। ওইখানে খোজ কোরাে।
মাইকেল দূরে তাঁর
তার কবরটা দেখালেন। ব্যস, কোথায়
কি! ট্রামের ঘণ্টায় চকিত হয়ে উঠলাম।
মনােদর্পণ
৪২
রামহরি লস্করের শ্যালকের সঙ্গে বােঝাপড়া হয়ে গেল। বাড়ী
এসে জীর্ণ মেঘনাদবধ’খানা বের করে অনুবাদ করতে বলাম।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই খানিকটা অনুবাদ হয়ে গেল। নরেনদা’র
অনুকরণে নানা ছন্দে লিখেছিলাম। জিনিষটা কেমন দাড়াচ্ছে
দেখাবার জন্যে সেদিনই বিকেলে একবার মাইকেলের কবরখানায়
হাজির হলাম। কা কস্য পরিবেদনা! সেই চিরপরিচিত
দাড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব
বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল এ সমাধি-স্থলে-
ক্ষণকাল ছেড়ে ঝাড় দু'ঘণ্টা কাল সেখানে মশার কামড় খেয়ে
দাড়িয়েছিলাম। কোথায় মাইকেল? মাটি আর পাথরের ঢিবি।
তবু লেখা যখন হয়েছে, ছাপতে দোষ নেই। খ্রীষ্টান হলেও
মাইকেলের আত্মা ছিল, তার হয় তাে তৃপ্তি হবে। মাইকেলের
যদি আবার দেখা পাই গােটা মেঘনাদবধখানার অনুবাদ শেষ
করে কিছু পয়সা খরচ করে ছবি-টবি দিয়ে ছাপিয়ে, বিয়ে আর
শ্রাদ্ধের উপহারের উপযুক্ত করে বের করব। নইলে এই পর্যন্তই।
আমার কেরামতি দেখাবার জন্যে মুল কবিতাটি প্রত্যেক
কবিতার সঙ্গে ফুটনােটে দিলাম। কিন্তু মাইকেল কি দেখতে পাবেন?
মেঘনাদবধ কাব্য
প্রথম সর্গ
সমুখ আহবে
পড়ে আহা, যবে,
সেরা বীর ভবে
বীরবাহু সে,
ধরণীর কোলে
ত্যজি দেহ-খােলে,
প্রাণ তার চলে
গেল বেহুসে
নেহাৎ অকালে
যমের মহালে ;
কোন্ সে ছাওয়ালে
রক্ষঃপতি,
রাঘবের অরি,
কহ বাগীশ্বরী
ভেজে পুনঃ করি
সেনা-সারথী? (১)
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর চূড়ামণি
বীরবাহ, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ হে দেবি অমৃত-ভাষিণি।
(১)
মনােদর্পণ
==
কোন্ সে কৌশলে কহ
মেঘনাদে, অহাে অহ।
রাক্ষস-ভরসা ইন্দ্রজিতে,
অজেয় যে এ জগতে
তারে নাশি’ কোন্ মতে
উৰ্মিলার বিলাসের মিতে
ইন্দ্রের ভাঙিল শঙ্কা,
কঁদাইল স্বর্ণলঙ্কা,
বিবরিয়া কহ সুচরিতে। (২)
তােমার চরণ-পদ্মফুলে
করছি নতি,
লজ্জা কি মা, বলছি খুলে,
মলমতি
কোন্ বীরবরে বনি সেনাপতি পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি ?
কি কৌশলে রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে- অজেয় জগতে-
উৰ্মিলা বিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?
(২)
৪৫ মনাের্পণ নেহাৎ আমি, তােমায় আবার ডাছি সতি, ভুজ দুখানি শ্বেত যে তােমার হেই ভারতি! (৩) O বসিলে যেমন মাতা, বাল্মীকির রসনাতে ( যেন স্বচ্ছ সরসীর বিকশিত পদ্মপাতে।) গহন কাননমাঝে যবে শরে খরতর। ক্রৌঞ্চ-বধুসহ ক্রৌঞ্চে বিধি কৈল জরজর নিষ্ঠুর নিষাদ সেই, তেমতি এ দাসে মাতা কর দয়া এস এস মসীময়ী হােক খাতা! (৪) -পাঁচ- এ ভব-মণ্ডল মাঝে মহিমা তব কেই বা জানে। রত যে জন চৌৰ্য-কাজে সৈই নরাধম নরের প্রাণে, বন্দি চরণারবিল, অতি মন্দমতি আমি, ডাকি আবার তােমার, খেতভুজে ভারতি। (৪) যেমতি, মাতঃ বসিলা আসিয়া, বাল্মীকির রসনাঃ (পদ্মাসনে যেন ) যবে খরতরশরে গহন কাননে ক্রৌঞ্চ-বধুসহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিধিলা, তেমতি দাসেরে, আলি, গয়া কর সতি।
মলােদর্পণ
৪৬
তােমার প্রসাদ পরশ লেগে,
মরণ-ভীতি গেল ভেগে,
মৃত্যুঞ্জয়ী উঠল জেগে,
উমাপতি শিব শ্মশানে !
হে বরদে, তােমার বরে
কবি যে চোর রত্নাকরে,
সুচন্দন গন্ধ ধরে
বিষের তরু, শােভা দানে।
পুণ্য তেমন নাই মা দাসে,
গুণ কিছু নাই তবু আশ এ,
মা যে অধিক ভালবাসে
মূঢ়মতি কুসন্তানে! (৫)
(৫)
উর তবে উর দয়াময়ি,
বিশ্বরমে, উর উর অয়ি ।
কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে ?
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌৰ্যে রত, হইল সে তােমার প্রাদে
মৃত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বনে চোর নােকর
কাব্যরত্নক কবি। তােমার পরশে
সুচন্দন বৃক্ষ শােতা বিষবৃক্ষ ধরে।
হায়, মা, এ হেন পুণ্য আছে কি এ বাসে?
কিন্তু যে গাে গুণহীন সন্তানের মাঝে
মুটুমতি। অননীয় মেহ তার প্রতি
সমধিক।
৪৭
মনােপন
গাইব গম্ভীর মহাগীতি,
বীররস-সরােবরে তিতি ;
দসে দেহ দেবি, পদছায়া
কল্পনা-মধুকরী বুলাও মায়া।
কবির চিত্ত-ফুলবন-মধু
লয়ে রচে মৌচাক এ দীন মধু,
গৌড়জন নিরবধি যাহে,
মধুপান সুখে কাল অতিবাহে। (৬)
স্বর্ণময়সিংহাসনে
বসে দশানন বলী,
হেমকূট হৈমশিরে
তেজঃপুঞ্জ শৃঙ্গাবলি।
পাত্রমিত্রসভাসদ
চৌদিকেতে শত শত,
স্ফটিকে গঠিত সভা
নাহি ভবে তার মত।
(৬)
উর তবে, উর দয়াময়ি
বিশ্বরমে। গাইৰ মা, বীররসে ভাসি
মহাগীত; উরি দাসে, দেহ পদছায়া।
-তুমিও আইস, দেবী তুমি মধুরী
কল্পনা! কবির চিত্ত-ফুলবন-মুধু
লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাই
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি
অনাের্পণ ৪ তাহে শােভে রত্নরাজি, যেন মান-সরােবরে, সরস কমলকুল বিকশিত থরে থরে। (৭) f -ট- শ্বেতর নীল পীত স্তম্ভসারি চারিভিত উচ্চ স্বর্ণ ছাদে ধরি রহে, বিস্তারি অযুত ফণা দেখায়ে আদরপনা ফণীন্দ্র যেমতি ধরা বহে। (৮) ঝুলছে ঝালর ঝলমলিয়ে মুক্তা হীরা পান্না নিয়ে। কনক আসনে বসে দশানন বলী হেমকুট হৈমশিনে শৃঙ্গর যথা তেজপু। শত শত পাত্রমিত্র আদি সভাসদ নত ভাবে বসে চারিদিকে। ভূতলে অতুল সভা ফটিকে গঠিত ; তাহে শােভে রত্নরাজি, মানস-সরসে সরস কমলকুল বিকশিত যথা। যেত রক্ত নীল পীত ও সারি সারি ধরে উচ্চ স্বর্ণ ছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি বিস্তানি অযুত ফণা, ধরেন আদরে ধরে। (৮)
মনােদর্পণ
( যেমন) মুকুল-ফুলে পল্লবেরে
ব্ৰত-বাড়ীতে দেয় ঝুলিয়ে। (৯)
ক্ষণপ্রভা সম
হাসিল মুহুর্মুহু,
রতন হ'তে বিভা
ঝলকি’ আঁখি, উহু! (১০)
* চামর চারু, চারু-লােচন কিঙ্করী ঢােলায়-
চন্দ্রাননা আনন্দে ভুজ-মৃণালটি দোলায়। (১১)
ছত্র ধরে ছত্রধারী, হরের কোপানলে,
দগ্ধ মদন আবার যেন দাঁড়ায় সভাতলে।(১২)
(১)
ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা,
পদ্মরাগ মরকত হীরা ; যথা বলে
( খচিত মুকুলে ফুলে। পল্লবের মালা
শ্ৰতালয়ে।
ক্ষণপ্রজা সহ মুই হাসে
রতনসম্ভবা বিভা ঝলসি নয়নে।
সুচা চামর চালােচনা কিঙ্কনী
চুলায় ; মৃণালভুজ আনন্দে আলােলি
চাননা।
ধরে হত্ৰ ছত্রধর, আহা,
হরকোপানলে কাম যেন রে নাড়ি
দাড়ান সে সভাতলে ছত্রধররূপে!
(১১)
(১২)
মনােদর্পণ
।
,
ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মূরতিখানি
পাণ্ডবশিবিরে যথা রুদ্রেশ্বর শূলপাণি ! (১৩)
মন্দ মন্দ আনিছে গন্ধ বহি,
বসন্তবায়ু চিরদিন রহি রহি,
রঙ্গে রঙ্গে কাকলী লহরী আনে
গােকুল-বিপিনে বাঁশী যেন বাজে কানে। (১৪)
হে ময়দানব, কি ছার ইহার কাছে,
ইন্দ্রপ্রস্থে তব হাত গড়িয়াছে
সভামণিময়, তুষিবারে পৌরবে,
তার চেয়ে এই সভা বড় গৌরবে। (১৫)
(১৩)
(১৪)
ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি,
পাণ্ডবশিবিদ্বারে রুখের যথা
শূলপাণি!
মনে মনে বহে গন্ধে বহি
অনন্ত বসন্ত বায়ু রঙ্গে সঙ্গে আনি
কাকলী লহরী, মরি মনােহর যথা
বাঁশরী স্বরলহরী গােকুল-বিপিনে।
কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি
ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা
শহন্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে।
(১৫)
মনােদর্পণ -যােল- সভায় বসে বাক্যহীন রক্ষঃকুলপতি, পুত্রশোকে ঝরছে আখি অবিরল সে অতি, ভিজল বসন, চোখের জলে, যেমন তীক্ষ্ণস্বরে, আঘাত পেয়ে-চুপ-সে কঁাদে সরস তরুবরে ! (১৬) কর দুটি জোড় করি ভগ্নদূত সম্মুখে দাঁড়ায়, ধূলিধূসরিত অঙ্গ, আর্দ্র ত শােণিত-ধারায়। বীর বাহু সহ যত বীর যােদ্ধা শত শত সমরে হইল রত- একমাত্র বাঁচে বীর হায় কালস্রোতে সবে গ্রাসে বহুক্লেশে সেই প্রাণ পায় (১৭) (১৬) (১৭) এ হেন সভায় বসে রক্ষ-কুলপতি বাক্যহীন পুত্র-শােকে। ঝর ঝর ঝরে অবিরল অশ্রুধারা-তিতিয়া বসনে, যথা তৰু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে বাজিলে কাঁদে নীরবে। কর ঘােড় করি দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত ধূসরিত ধূলায়। শশাণিতে আত্ৰ সৰ্বকলেবর। বীরবাহু সহ যত যােধ শত শত ভাসিল রণ-সাগরে, তাসবার মাঝে একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাম-তরঙ্গে গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে- = বাপণ আঠার-- বেঁচে ফিরে এল রক্ষ নাম তার মকরাক্ষ কহে যেন রাজ্যক্ষ নিদারুণ সব বাক্য। (১৮) দূতের মুখে শুনি প্রিয় সুতের নিধনকথা নৈকষেয় রাজার মনে জাগল গভীর ব্যথা ; রাজার দুখে সভার লােকে দুঃখী হ’ল সবে- জগৎ আঁধার ঘন মেঘে সূৰ্য্য ঢাকে যবে। কতক্ষণে চেতন পেয়ে বিষাদে শ্বাস ছাড়ি মনের কথা কইল রাজা রাবণ রাঘবারি। (১৯) -কুড়ি- ওরে দূত, নিশার স্বপন সম তাের এ বারতা রে, অমরবৃন্দে যার ভুজবলে কাতরায়, (১৮) রক্ষা করিল রাক্ষসে- নাম মকরাক্ষ যে, বলে যক্ষপতি সম। (১৯) এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন, হায়, শশাকাকুল আজি রাজকুল-চুড়ামণি নৈকষেয়। সভাজন দুঃখী রাজদুঃখে। আঁধার জগৎ মরি, ঘন আবরিলে দিননাথে। কতক্ষণে চেতন পাইয়া বিষাদে নিঃশ্বাস ছাড়ি কহিলা রাবণ-
মনােদর্পণ
ওরে দূত,
রাঘব-ভিখারী রণে বধিল কি তারে ?
ওরে দূত,
ফুলদল দিয়া শেষে কাটিল কি হয়
শাল্মলী তরুবরে সে কি বিধাতারে ?
ওরে দূত! (২০ )
(২০)
নিশার স্বপন সম তোর এ বারতা
রে দূত! অমরবৃন্দ যার দুজলে
কাতর, সেই ধনুর্দ্ধরে রাঘব ভিখারী
বধিল সম্মুখ রণে। ফুলদল দিয়া
কাটিলা কি বিধাতা শালী তরুবরে ?
পুরস্কার আঙুলে ; ছিন্ন শাড়ীর পাড় পড়েছিল শাকার বাঙলার ইবসেন হাওয়া খেতে চলেছেন লাল পাঞ্জাবী গায়ে ভােরের স্নিগ্ধ বায়ে গায়ে খড়ি, চুল কটা, তখন প্রভাত নটা শব্দারণ্য মাঝে, চলেছেন কবি, লাজে পাড়ার ;-জানালা আড়ে নিজ পতি-দেবতারে উর্ধে চাহিয়া কবি ভারতীয়, মরু গবি বিশ্ব-ব্যথার গানে সঘন চুরুট টানে মিল খুঁজে ভাবাকুল খাড়া হয়ে ওঠে চুল প্রাণহীন নিঃসাড়, পটলডাঙ্গার মােড়ে ; কবি শিহরণ সেন অভ্যাসমত ভােরে। বুজ ষ্টকিং পায়ে, উড়িছে চাদর নীল-- আংটি ছটা, টুড়ি কবিতার মিল অতি অপরূপ সাজে লাজিছে কিশােরী যত কবিরে নেহারি ঠারে নিদিল কত মত! চলেছেন যেন ছবি যেন সেই পথখানি; খিল ধরে আসে প্রাণে, চোখে বাহিরায় পানি। আঁখি দুটি ঢুলুঢুল ভাব-বিদ্যুৎ ছুয়ে।
মনােপ দেহ-দীপশিখা-ভাগে বেদনা, বেহাগরাগে “আমারে বেসেছে ভালাে বিশ্বের যত আলাে- স্বপনে খেয়েছে চুমা মিলেছে প্রেমের ভূমা, থমকি, চমকি চায় ভাঙা হুকাটির প্রায় যেন হংসের ছানা কাটিয়া বানাল ‘খানা; ধূলায় রয়েছে প'ড়ে, এল কি শরৎ-ভােরে হায় বিধি নিদারুণ, দিলে কেন ? ডাহা খুন অতীব যতন মানি বক্ষে লইল টানি নয়নে বন্যা বহে, কবি মনে মনে কহে ধিক্ নিষ্ঠুরা নারী আজ ফেলিয়াছে ছড়ি, সলিতা পাকায়ে হায়, ছাকিল চা পেয়ালায়, বাসা বাঁধিয়াছে কাগে; বাহিরায় চুয়ে চুয়ে- বােগা মােটা সাদা কালাে করা কামিনীর কুল, কত রাধা কত উমা, পীরিতি-বারিধিকূল ; পথে গড়াগড়ি যায়, ছিন্ন শাড়ীর পাড়। ফুটা ফুসফুসখানা, যেন পাঁজরার হাড় পটলডাঙ্গার মােড়ে ; শ্রাবণ-মেঘের কালাে। ভাব-গালে কালিচুন- এর চেয়ে ছিল ভালাে হাতে তুলে পাড়খানি নিখিল-ব্যথার কবি। ডুবিয়া কাব্য-দহে “ব্যথা ব্যথা ব্যথা সবি যার ছিল এই শাড়ী শত টুকরায় ছিড়ে ; পােড়াল দীপশিখায় অথবা পাকাল বিড়ে; ক মনােদর্পণ সেলাই করেছে দুচে, ফেলিয়াছে নাহি পুছে, অথচ সে একদিন আছিল অঙ্গে লীন ; ছিল এরি অঞ্চল! ভরপুর ছল ছল ব্যথিত যখন হিয়া আঁখিজল মুছি নিয়া ভয়-কম্পিত-মনে যখন সংগােপনে বাঞ্ছিতজনে কেহ, ভুলিত পতির গেহ, তখন খেলিত নাকি ? নিমেষ ভুলিয়া আঁখি আঁচলে চাবির ছড়া- বার-দরজার কড়া অফিস-ফেরত স্বামী চকিতে নীচেতে নামি শেষে যবে নিরুপায় দূরে ওই চমকায় ব্যথিত প্রেমিকজন শােনা যাবে ঝন ঝন্ ন্যাতা করে ঘর মুছে হায়রে নারীর মন! এই শাড়ী ফি ফিন্ বক্ষের আবরণ যবে হৃদি চঞ্চল প্রণয়-পীড়ন-সুখে। এরি খুটখানি দিয়া কাদিত মনের দুখে। বাতায়নে নিরজনে, * হেরিত ঘােটা আড়ে কাপিত সে তনুদেহ বিদ্যুৎ পাড়ে পাড়ে তখন কি থাকি থাকি চাহিত না অনিমিখ । ভুলে যেত নড়াচড়া করিত কি তারে দিক। বাহিরে উঠিত ঘামি খুলিয়া দিত কি দ্বার। সরে যেত নারী হায়। শাড়ীর একটু পাড় ; খুজিত শুভক্ষণ- আঁচলের চাবি বাজে বঁধু ফেরে তাকে-তাকে, ঘােমটার ফাকে ফাকে শাড়ী মেলিবার ছলে অধীর বক্ষতলে টুটিত ঘােটা-পাশ একটু দীর্ঘশ্বাস- শুধু আঁখি-কোণ দিয়া দূর হতে ‘প্রিয়-প্রিয়া শাড়ী হ’ত সহকারী হইত বিধুরা নারী সেই শাড়ীখানি কি না পড়ে আছে গীতহীনা হায় নারী নিরদয়া, কিম্বা পরেছ নয়া- ধিক্ তােমা শতবার টুটিবে অহঙ্কার মিলাবে রূপের রাশি তখন রবে না হাসি এতেক কহিয়া কবি দাড়াইল’যেন ছবি দূরে কাছে বাতায়নে হেরে প্রফুল্ল মনে মনোদর্পণ বধূ-আঁখি খোঁজে তাকে দিনের নিত্য কাজে। ছাতে যবে নারী চলে নাচিত শােণিত-ধারা- খুলিত বক্ষবাস, হায় হায় গৃহ-কারা ! মিলিত যুগল-হিয়া চোখে চোখে দূর-ভােগ ছাতেতে গােপন-চারী মনে মনে মনােযােগ। ছিন্নতন্ত্রী বীণা পথের ধূলায় আজি। প্রেম কি লভেছে গয়া ? শাড়ী নব সাজে সাজি। দিমু অভিশাপ-ভার, এই ছেড়া শাড়ী সম হবে সুরহীন বাঁশী ওগাে নারী নিরমম।” শাড়ীর পরশ লভি নির্বাক অনিমেষ ;- পাড়ার যুবতী জনে কবির মােহন বেশ।
অনােদর্পণ
শুনি খিল খিল হাসি
হৃদয়ে বাজিল বাঁশী
আবেগে তাকাল যাই,
বলে কবি, “ছিছি ভাই,
মরমে লাগিল ফাসী
ভুলিল শাড়ীর পাড়
মাথায় পড়িল ছাই,
এই কি পুরস্কার।”
রাজার হুকুমে পথে পথে তারা
বেদনা চেঁড়ে
ব্যথার তাড়নে হতাশ তরুণ লিখিছে ছড়া,
বেদনা খুজিয়া ঠুকরিয়া ফিরে সারাটা ধরা।
গায়ে ওড়ে খড়ি, চোখে লােহু পানি
ঘন ঘন শ্বাসে ছেড়ে ‘ছিনাখানি,
ব্যথা ব্যথা শুধু, সারাটা দুনিয়া ব্যথায় ভরা।
ব্যথার সায়র, শুধু মিলিল না কলসি-দড়া।
মায়ে বৌদিরে তাড়া দিয়ে খেয়ে উদর পূরে’
ব্যথার ‘ডিপােয় চলেছেন কবি কলেজ ঘুরে।
দুনিয়ার যত ব্যথিতের দল
মিলিয়া সেথায় করে কোলাহল,
কেহ ছড়া কাটে, কেহ গান গায় সুরে বেসুরে ;
চায়ের পেয়ালা বিড়ি ও চুরুট কত যে ওড়ে।
ব্যথা-সম্রাটু বসে র’ন সেথা কী সমারােহে।
ব্যথাহত দলে ডাকিয়া সহসা কারে কহে,
মনােদর্পণ
৬০
“অলিতে গলিতে যাও হে তােমরা
দুনিয়ার যত ব্যথার ভােমরা,
সদরে গােপনে যত ব্যথা আছে চুষে এস হে।
পতিতার ব্যথা, ব্যথা বিধবার পতি-বিরহে।
“পতির গেহেতে সতী বুকে কত বেদনা বহে,
অজানার প্রেমে কুমারী কত না বেদনা সহে,
দেখে এস ব্যথা মুটেমজুরের
কাছের বেদনা বিরহে দূরের,
মদের বােতলে ছিপি-আঁটা কত ব্যথা যে রহে,
লেখ কথা-গাথা, ডুব দিয়ে এসে অঞদহে।”
=
রাজার হুকুমে পথে পথে তারা বেদনা টোড়ে,
ভাত আগুলিয়া হেথা ঘরে মাতা মাথা যে খোঁড়ে।
বাতায়ন আড়ে কাঁদে বিরহিণী-
ঘর ছেড়ে কোথা কঁদিছে রােহিণী।
মজুরাণী কোথা ছেলে ফেলে আছে বােতল ধরে,
পাটের কলেতে হয়েছে মজুর সিধেল চোরে।
শহরের শােকে হা-হুতাশ করে গাঁয়ের মাটি,
প্রজার মাথায় পড়িছে কোথায় রাজার চটি,
মনােদন প্রেয়সী রমণী কোথা যেন কার- ঘরে বাঁধা পড়ে করে সংসার। কুলী মজুরের ব্যথা দূর করে মদের ভাটি ; সমাজ কোথায় আছে আগুলিয়া সুখের ঘাঁটি। - পথে যেতে যেতে আনমনে ফিরে চাহিল ও কে, পাহাড়-প্রমাণ ব্যথামাখা তার দুইটি চোখে। মনে ভাবে কবি, চিনি বুঝি চিনি— বুঝি ও-পাড়ার মুখি-গােয়ালিনী ? বেরাল কোথায় কেঁদে ফিরে যায় মাছের শােকে, কার ভগিনীরে কে দিল কোথায় ফুলের ‘বােকে’! ‘নামহীন কামশিশু’রে জননী করে না মায়া- পথের মজুর নাহি পায় হায় গাছের ছায়া। বৌদি কোথায় দেবরে তাহার ভুলায় না দেহে তুলিয়া বাহার, নিশা-শেষে কোথা গড়াগড়ি যায় তবলা বাঁয়া, কোন্ আলিসায় শুকায় কাহার ইজের সায়া । মাটি কেটে কোথা হয় পথ ঘাট, পাটের কল, কোথা সাঁকো-বাঁধা ব্যথায় কঁদিছে নদীর জল।
মমােদপণ
পাড়ার ঝিয়েরা কে জানে কোথায়-
আধ-ধরা দিয়ে ছল ক'রে যায়,
সারা দুনিয়ায় থৈ থৈ ব্যথা, নাহিক কুল !
ব্যথা দেখে দেখে ফিরিল ব্যথিত কবির দল।
ক্ষুধার ব্যথায় নাড়ী চুই চুই, কি করে কবি
‘ডিপাে’ তেয়াগিয়া ঘরে এল যেন ব্যথার ছবি ।
‘হায় হায়, ছি ছি, এ কি অবিচার’-
দুবেলা কবির চাই যে আহার,
কলেজের ফি, জুতা ও বস্ত্র, নাপিত ধােবি,
আয়না চিরুণী ট্রামের পয়সা চাহি যে সবি ।
দাদা তাড়া দেয়, তাড়া দেয় মাতা, ‘পারিনে আর।
কবির বেদনা কেহ কি বােঝে না, কি অবিচার।
মিছে কি সমাজ-সংসার পিছে,
কবিরা সকলে আগুন জ্বালিছে ।
মিছে কি লেখায়, ‘বেদিয়া” সাজিয়া হানিছে মার ?
বুকে কি বৃথাই বহিছে ধরার বেদনা-ভার!
মনােদর্পণ (মনস্তত্বমূলক একাঙ্ক গীতিনাট্য) কুশীলবগণ- কবি-অল-তরুণডাঙ্গা ব্যথিক ক্লাবে’-এর একজন বিশিষ্ট সভ্য, অবিবাহিত, এখনাে ছাত্র। কবিপ্রতিভা উত্তরে হারিসন খােচ্ছ, দক্ষিণে মির্জাপুর স্ত্রীট, পূৰ্বে ঢাকার পল্টনের মাঠ ও পশ্চিমে লক্ষ্মণাবতী বা লক্ষৌ পৰ্য্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে। নারী—স্থানীয় ভদ্রমহিলা, ‘এ টি বি সি’র সভ্যদের সহিত সাক্ষাৎ- পরিচয় না থাকিলেও তাহাদের অত্যধিক প্রীতির উচ্ছাসে ত্যক্ত- বিরক্ত। এই সভার সভ্যদের নিকট ইনিই চিরন্তনী নারীর প্রতীক। ফকীর-সন্ধ্যার পরে কেরােসিনের ডিবা জ্বালাইয়া যাহা মুশকিল তাহা আসান’ গাহিয়া বেড়ায়। [ স্থান—তরুণডাঙ্গা। কাল সায়ংসন্ধ্যা। কবি ক্লাব-ঘরের বারান্দায় বসিয়া আছেন। পথে লােকচলাচল কিছু কম। রাস্তায় গ্যাসের আলাে সবেমাত্র জল হইয়াছে। ক্লাব-ঘরের দরজা ভিতর হইতে বন্ধ ] কবি। (স্বগত) চানাচুরআল হানা দিয়ে যায় দূরে, পলকের মাঝে জ্বালা হ’ল গ্যাসালােক-
মনােদর্পণ
বসে বসে সারা এ মরু সাহারপুরে
বাতায়নবনে ফুটিল না কালাে চোখ।
এখনাে এ পথে এলাে না প্রেয়সী শশী
বেথুনের বাস’ পাশ দিয়ে গেল কই ?
আর কত খন আনমনে রই বসি—
উড়ে যায় শশাকে হৃদি-মড়ায়ের ছই।
[ পথের উপরের একটি বাড়ীতে ইলেকটিক আলাে জ্বলিয়া উঠিল,
কবির ব্যগ্র চক্ষু সেদিকে দেয়ালের গায়ে গজালের মত নিবদ্ধ হইল,
কবি চশমাজোড়া খুলিয়া রুমালে মুছিয়া আবার পরিলেন ও সঙ্গে সঙ্গে
গান ধরিলেন ]
ওকি ওই
উদিল সোঁদাল শশী ?
জ্যোছনা জরিণ-শাড়ী
ভূতলে
পড়ল খসি?
চিপা ওই গলির বাঁকে
পােলারে নিয়ে কঁাখে
চাহিল ঘােষ্টা ফঁাকে—
না জানি
কোন্ প্রেয়সী।
বলছি-
[ এমন সময় নারী’ বড়রাস্তায় ট্রাম হইতে নামিয়া গলির মােড়ে
আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কবি তাহাকে দেখিয়া চকিত হইয়া গান
থামাইলেন ]
দূর গগনে
মনােদন কৰি। (স্বগত) আপনার মনে ছিনিমিনি খেলি, বিকিকিনি সারাবেলা বুকের তলায় কখন পড়িয়া ওড়াবে দেহের ঢেলা, বুঝিতে পারি না ঠিক, মৃত্যু আঁধার তখনই ঘনায় আঁখি যবে অনিমিখ। আমি যবে ছিঃ আমনা,তুমি ম-বনে দিলে ‘পাড়া কুসুম-দলন ব্যথায় শিহরি উঠি লক্ষ্মীছাড়া। ছিনু তার ঘােরে- সাত্ৰ আঁধারে নিঃসাড়ে এসে আঘাত করিলে দোরে। এই গােপনতা নহেক তােমার আমি যে তােমার লাগি অতন্দ্ৰ নভে করা সম পথ পরে একা জাগি। নারী। (স্বগত) ভালাে জ্বালাতন কৰূলে যা হােক- আচ্ছা ছিনে জোক। গিলতে যেন চাইছে মােরে, কঁাড়া-হেন চোখ ! [ কৰি এদিক ওদিক চাহিয়া পথ নির্জন দেখিয়া মাথা চুলকাইয়া নারীকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন ] কবি। অনেক দুরে গিয়েছিলেন বুঝি- বেরিয়েছিলেন হ’ল অনেক ক্ষণ, পথে কোথাও কষ্ট হয়নি কিছু বদন-কমল দেখায় বিবরণ।
নারী। কবি। অনাের্পণ নারী। (স্বগত) আঃ মলাে যা-আচ্ছা বিপদ দেখি। [ পরে একটু মজা করিবার ইচ্ছায় ] একটু ক্লান্তি বেড়িয়ে এলেই হয়- আপনি হেথায় এলা যে আজ বসে। দেখছি আমার জানেন পরিচয়। অনেক দিনই দেখেছি দুর হতে আলাপ করার ছিল অনেক লােভ; ক্লাবের সভ্য কেউ ত আজ আর নাই, তাতে আমার নেই কোন ক্ষোভ। একটু দাঁড়ান প্রাণ খুলে আজ দেখি- দেখার অন্ত হবেই না তা জানি, আজকে আমার বড়ই কপাল জোর একটু দাঁড়ান, দেখি বদনখানি- [ একদৃষ্টে দেখিতে দেখিতে কবির মহান্ ভাবাবেশ হইল, স্থান-কাল- পাত্র ভুলিয়া তিনি ব্যাকুলভাবে বলিয়া উঠিলেন ] কবি। নিজেরে জানাে না ওগাে অপরূপা নারী সুমুখে দাড়াও রে মােহিনী মনােহারী, জড়-দর্পণে নিজেরে দেখেছ তুমি; কি ছায়া ধরিল মনােদর্পণ-ভূমি, ক্ষণেক দাড়াও, তােমারে শােনাই সখি—
৬৭
মনাের্পণ
নারী। (স্বগত) দেখি এ বাঁদর কত যেতে পারে বকি।
কবি।
তােমারে নেহারি সখি মন-মুকুরে
গাগরী মিথুন ভাসে বুক-পুকুরে।
শিখীর কলাপ তােমারে ঘিরিয়া আছে,
দেখিতে পাও কি তােমার আয়না-কাচে।
সাড়ীতে তােমার ঝলিছে উদয়তারা,
ও কেশ-কলাপে নবঘন জলধারা-
নারী। ভাল ভাল বেশ, শুনিয়া হলেম খুসী
(স্বগত) ঘরে গিয়ে বাছা খাও খােল আর ভূষি।
কবি।
কবির নয়নে নারীর গােপন রূপে
উশীর শিহরি ভরে প্রতিবােমকূপে।
হে নারী ললিতা, ওগগা নারী নিরুপমা-
আসি তবে আজ, করুন আমারে ক্ষমা।
কবি।
দেখেছ কি মােরে নয়ন মেলিয়া হায়,
বুকে কত ব্যথা পলে পলে মুরছায়
নারী।
মনােদর্পণে আমিও কি যেন দেখি—
আর কেহ হবে কি আপনি সে কি ?
দেখেছ, হে সখি, মােরে বিবরিয়া কহ,
স্মরণে রাখিব তব কথা অহরহ।
নারী।
মন-আয়নায় আপনারে হেরি, কবি
লেজ-বিশিষ্ট শাখা-হরিণের ছবি।
নারী।
কবি।
কােণ কবি। চোখেতে চশমা এই জোড়াটাই বটে, কেন হেম ছবি ভাসে মাের মন-পটে ? হৃদয় আমার কলি কি প্রতারণা। থানে নিই, আমি আর শুনিব না। নারী। (ব্যঙ্গের সহিত) আমার পিছনে পেখম দেখেছ ?নয় ? তব পিছে আমি হেরি তৰ পরিচয়, জড়দর্পণে নিজেরে দেখেছ তুমি ধরে এই ছায়া মনােদর্পণ ভূমি! (স্বগত) ছি ছি ছি তােমরা এমনি বাঁদর জাতি, উচিত শাস্তি তােমাদের মুখে লাথি। [ সরােযে প্রস্থান ] [ আহত কবির দুরায়মানা নারীর দিকে অনিমেষে চাহিয়া থাকিয়া সহসা ব্যথা, ব্যথা, ব্যথা, বলিয়া আৰ্ত্তকঠে চীৎকার করণ, পতন ও মূচ্ছ।] ফকির। ঘঁহা খুলি ভঁহা আসান- রাখখাে ইয়াদ ব ইলান।
কচ ও দেবযানী ( অতি-আধুনিক সংস্করণ) [ স্বর্গের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হইয়া দেবগুরু বৃহস্পতিপুত্ৰ কচ পিতার আদেশে ও দেবগণের অনুরােধে সঞ্জীবনী-বিদ্যা শিখিবার জন্য মাঝে আগমন করেন। নগর কলিকাতা তখন সকল বিদ্যার ডিপাে ছিল। তথায় গমন করিয়াও ফচ প্রথমটা সঞ্জীবনী বিদ্যার সন্ধান পান না। নিরুপায় হইয়া কচ এক কলেজে আই.এ. পড়িবার জন্য ভর্তি হন ও এক হােষ্টেলে অবস্থান করেন। ইতিমধ্যে লােক-পরম্পরায় তিনি জানিতে পারেন যে, মর্ত্যের শ্রেষ্ঠবিদ্যা হইতেছে গণবিদ্যা, সঞ্জীবনী বিদ্যা অনেক নিম্নস্তরের। এখানে দেবযানীর সহিত তাহার পরিচয় হয় ও তাহাকেই গুরু করিয়া কচ মর্তের শ্রেষ্ঠ বিদ্যা শিখিতে আরম্ভ করেন। শুক্রাচার্যের উল্লেখ মৰ্ত্তপুরাণে নাই। এদিকে, দেবগুরু বৃহস্পতি কচের উত্তরােত্তর ব্যয়বাহুল্য ও লিপি- কার্পণ্য দেখিয়া ও স্বর্গগত মর্ত্যজনের নিকট তাহার বেচালের কথা অবগত হইয়া একটি বেকুমারীর সহিত কচের বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির করিয়া ফেলেন এবং তাহার মাতার সাংঘাতিক শখ এই মিথ্যা ওজুহাত দেখাইয়া তাঁহাকে স্বর্গে ফিরিবার জন্য টেলিগ্রাম করে। কচের তখন ‘ল কোস’ সমাপ্ত হইয়াছে। দেবযানীর নিকট হইতে বিদায়কালীন ব্যাপার নিয়ে লিখিত হইল। বলা বাহুল্য, কচের বিবাহ স্বর্গে খুৰ সমারােহের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল ; কচ জের হাজার টাকা পণ পাইয়াছিলেন। পাঠকদের অবগতির জন্য ইহাও জানাইতেছি, যে,
এনােদর্পণ
৭০
বিবাহের অত্যল্পকাল মধ্যে কচের পত্নী ভীষণ রােগাক্রান্ত হইয়া
বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন কিন্তু অমরী বিধায় তাহার মৃত্যু হয়
নাই। কচ পত্নীর রােগের ওজুহাতে পুনৰ্বার বিবাহ করেন। সম্প্রতি
ঢাকায় আবিষ্কৃত একটি উৎকীর্ণ প্রস্তর-ফলকে এই পৌরাণিক
আখ্যানটি পাওয়া গিয়াছে। ]
বিদায় ;
দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, পিতৃলােকে দাস
করিবে প্রয়াণ। আজি মর্ত্যলোেকবাস
সমাপ্ত আমার। প্রসন্নবদনে দেবি,
দেহগগা তােমার চরণ সেবি,
যে বিদ্যা লভিনু, তাহা যেন চিরদিন
স্মরণে বিরাজে—যেন তব ভক্ত দীন
মর্ত্যের এ বিদ্যা মহীয়সী স্বর্গলােকে
বহি নিয়া, তব স্মৃতি, প্রেমা-পুলকে
হৃদয়ে ধরিয়া রাখে। কর আশীর্বাদ,
তব কাছে শিক্ষা পাওয়া এই গণবাদ
চির দিন স্বর্গলোকে বহুক, উজল
মাৰ্ত্তও কিরণ সম।
দেবযানী।
হয়েছে সফল
বাঞ্ছা তব ওহে সৌম্য, মর্ত্যের অমৃত
সযত্নে আহরি তুমি হইয়াছ প্রীত,
ফিরিতেছ পিতৃলােকে আজি সগৌরবে
দেবাজনাগণ স্বর্গে প্রতীক্ষিছে সবে,
••
৭১
মনাের্পণ
কণ্ঠে হুলুধ্বনি, মাল্য ও চন্দন হাতে
উৎকণ্ঠিত। কই সত্য বিদায়-বেলাতে
সকল বাসনা তব পরিপূর্ণ আজি ?
কামনা অস্ফুট কোনাে ওঠে না কি বাজি
গােপন অন্তরে তব ? দেখ অবগাহি।
সকল কামনা পূর্ণ, আর কিছু নাহি।
দেবযানী। কিছু নাই? না, না, সখা, অন্তরের কথা
কহ সত্য করি। এই বিদায়-বারতা
শুরু কটু অতি।
কট।
হায়, মানব-নন্দিনী।
মনে জাগে পুঞ্জীভূত অনেক কাহিনী,
থাক তাহা আজি, সখি।
দেবযানী।
এ পংবৎসর
নিতান্ত যে ছিল তব দাসী অনুচর,
ভুলিবে তাহারে যদি, যাইও ভুলিয়া।
কিন্তু যে কুটীরখানি দুয়ার খুলিয়া
তােমারে বুকের মাঝে টানিয়া যতনে,
স্তিমিত আলােকে কত স্বপন-বপনে
তুষিয়াছে চিত্ত তব, তারে যাবে ভুলে।
স্বর্গে গিয়ে এ মর্ত্যের বিস্মৃতির কুলে
ঠেলিয়া ফেলিবে তারে ?
দর্পণ
१२
কভু ভুলিব না,
নিত্যকাল বুকে মাের এ অনুশােচনা
জ্বলিবে তুষাগ্নি সম-চলিলাম ছাড়ি,
মর্ত্যের অমৃতগন্ধী এই তব বাড়ী,
ক্ষুদ্র মুখ-নিকেতন।
দেবযানী।
এই শয্যা মম
ঘৰ্ম্মলিয় বিমলিন কঠিন নির্মম,
তবু হেথা দিবসের কর্ম-অবসরে
যখন আসিতে তুমি তাপিত-অন্তরে
মেলিয়া সে ব্যগ্র বাহু লইত টানিয়া
তােমারে আপন বলে, বলিতে হাসিয়া,
‘দু-ফেননি শুজ সুরভি শয়নে
নন্দনের, শান্তি নাহি চাই, হে শােভনে,
এত এ মধুর শয্যা
সব মনে আছে।
পারিজাত-দলাকীর্ণ শয্যা এর কাছে
তুচ্ছ অতি ; কতদিন মধ্যাহ্ন বেলায়
আসিয়াছি পাঠ ত্যজি যে অবহেলায়,
মনে পড়ে তাহা ; ডাক দিত বারে বারে,
‘এস এস মাের বক্ষ 'পরে। সে শব্যারে
ভুলিতে পারি না। হে আমার পরিচিত
বহুবল্লভের বহু স্বপন-বাঞ্ছিত
৭
শয্যাখানি, এই মাের অন্তিম মিনতি,
এত কাল তােমারে যে করিল আৱতি--
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে, তব সুগন্ধি মােহন
জাগ্রত ব্যথিত বঙ্গে কৰি আহরণ
মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে রাত্রে ; তারে ভুলিয়াে না।
কত পান্থ গৃহহীন ভাবুক উন্মনা
এর পরে আসিবে হেথায়, স্নেহভরে
ব্যগ্র বাহু প্রসারিয়া ওবঙ্গের পরে
টানিও সবায়।
কত ছাত্র কত দিন
আসিবে ফেলিয়া পাঠ্য পুথি, দীনহীন
ভিক্ষুকের মত লভিতে দুলভ শিক্ষা।
অয়ি শয্যা মনােরমা, এই মম ভিক্ষা
তব কাছে, তাহাদেরে দিও স্নেহচ্ছায়া,
শুধু রেখাে মাের প্রতি বিন্দু তব মায়া।
জানি আমি সন্ধ্যা যবে আসিবে ঘনায়ে
গণবিদ্যা-অভিলাষীদল মৃদু পায়ে
লুকাইয়া মুখ পরস্পরে, ভিড় করি
দাড়াইবে রাজপথে, ইষ্টনাম স্মরি,
চক্ষু দুটি মুদি পশিবে কুটীর মাঝে
তঙ্করের মত তারা, শিহরিবে লাজে
মহাজনপদচিহ্ন হেৰি গৱে তব;
তবু জানি, মানিবে তােমারে অভিনব।
৭০
মলােলগণ
শুনিবে তাহারা চারিদিকে কোলাহল
বিছাইয়া তব বক্ষ পরে নিরমল
দেহ। দেখিবে এসব চিত্র ; তারি মাঝে
এ পুরানাে বন্ধু যেন স্মরণে বিরাজে।
দেবযানী। মনে রেখাে এই মাের মেনি বেরালেরে
স্বহস্তে কাটিয়া লেজ করেছিলে বেড়ে
একদা যাহারে।
মিষ্ট মিউ মিউ ধ্বনি,
চিরদিন বাজিবে শ্রবণে, জেনাে ধনি।
কভু ভুলিব না। মাঝে মাঝে তুমি যবে
মাতিতে পাশের ঘরে উদ্দাম উৎসবে,
আমি একা বসে বসে চটিতাম শেষে
মিউ মিউ করি মেনি মাের কাছে এসে
করিত কত না খেলা; ভুলিতে কি পারি।
দেবযানী কত পান, কত সােডা জোগাল দেওধারী
ভুলিবে কি তাহা ? কত বিড়ি কত সিগারেট,
হাস্যমুখে বহুবার দিয়ে গেছে ভেট,
যদিও নিয়েছে মূল্য।
সে পানের দোনা,
সেই হাসি-হাসি মুখ কভু ভুলিব না।
দেবযানী। এ পাড়ার সকলের প্রিয় হরি খুড়াে,
চপ, কাটলেট বেচে হইয়াছে বুড়ো
৭৫
এইখানে। কতদিন মদ্য-অনুপানে
তারি চপ, কাটলেটে অমৃত-বাখানে
প্রশংসিলে; সযত্নে তাহার হাতে বাঁধা
কারীমাংস।
এ হৃদয় সেথা আছে বাঁধা
খোটায় গরুর মত।
দেবযানী।
পড়শীর দল
তােমারে দিয়েছে সঙ্গ; করি কোলাহল
বেদনার আবর্জনা তব চিত্ত হতে
ভাসায়ে দিয়েছে তারা কলহাস্য-স্রোতে।
তুমি সখা তাহাদের ছিলে অতি প্রিয়
স্বর্গে গিয়ে তাহাদের স্মরণে রাখিও।
টগর ডালিম কালাে পুটি বিনােদিনী,
চিরদিন রবে তারা মরম-সঙ্গিনী
তােমারে ঘিরিয়া মম অন্তর মাঝারে।
তাহাদের প্রতি মাের অশ্রুর পাথারে
দুর স্বর্গধামে, সখি, জাগিয়া রহিবে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ সম। তাদেরে কহিবে,
স্বল্প আনন্দেরে যারা মাের জীবনের
সঙ্গ দানে করেছে মধুর, তাহাদের
স্মৃতি, কভু মুছিবে না।
৭৬
আমােণ
দেবযানী।
দেখ আরবার,
তিক্ত হােক মিষ্ট হােক হউক অসার
আর কারাে স্মৃতি তব হৃদয়-গহবরে
মান দীপালােক সম—
কট।
চিরদিন ধরে
প্রদীপ্ত ভাস্বর সম উজ্জ্বল সে স্মৃতি,
ব্যর্থ স্বর্গে দহিবে আমারে নিতি নিতি।
ক্ষম মােরে দেবযানী, গুহ সে বারতা
অন্তরের, থাকু তাহা।
দেবযানী।
সেই অধীরতা
আজো মনে পড়ে। হয়েছে উত্তীর্ণ সন্ধ্যা,
শ্রাবণ গহন রাত্রি, ধীরে ধীরে বন্ধ্যা
অন্ধকার আবরিল দিখিদি তুমি
প্রবেশিলে ধীরে—হোয় কি না ছোঁয় ভূমি
চরণ তােমার ; উন্মাদ আগ্রহভরে
ভেবেছিলে মাটি বুঝি কাপে থরে থরে।
হাতে পুথি একখানি, কি তাহাতে লেখা
আজো তাহা সখা মােন হয় নাই শেখা
অনারী আমি।
কট।
তুমি প্রসাধন-শেষে
আলুলিয়া কেশপাশ—মালা বাঁধি কেশে,
৭৭
কালাে জ্যাকেটের 'পরে নীলাম্বরীখানি,
মুখে ধন-প্রজ্জ্বলন্ত সিগারেট টানি
ছিলে রসালাপমত্ত টগরের সাথে ;
যেমনি দেখিনু তােমা গ্যাসের আতে
রহি চাহিয়া কত মুখ বিস্ময়ে,
মনে হ’ল অকস্মাৎ এরি পরিচয়ে
লভিব দুলভ বিদ্যা, যাহার লাগিয়া
নিয়ত তপা মম, যে বিদ্যা মাগিয়া
আসিনু স্বর্গের শিশু এ মর্ত-নিবাসে।
বক্ষে টানি নীলাঞ্চল ধীর মৃদুভাবে
কি কহিলে নাহিক স্মরণ।
দেবযানী।
পুছিলাম,
কতক্ষণ রবে তুমি, কত দিবে দাম?
স্বপ্নসম মনে হয় সে দিনের কথা,
কেন নিরবিলে সখি?
দেবযানী।
পেলে যেন ব্যথা
অকস্মাৎমুঢ়সম মাের পানে চেয়ে
কহিলে, ভিতরে চল। বৃষ্টি এল ছেয়ে,
মুহুর্মুহু বজপাতে তামগ্ন দিশি
ক্ষণে ওঠে চমকিয়া; অন্ধকারে মিশি
এবল এব-খায় মামিল ধরায়,
আর কিছু মনে নাই।
কচ।
মনােপশ
৭-
কট।
ধীরে ধীরে, হায়,
গুরু করিলাম তােমা তুমিও অজ্ঞাতে
ধরণীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যা লাগিলে শিখাতে।
যত দিন যায়, পুঁজি মাের হয়ে ওঠে ভারী,
অমৃত-আস্বাদ দিলে তুমি মনারী
দেবের নন্দনে। মনে জেনাে সুলােচনে,
কৃতজ্ঞ পথিক তােমা রাখিবে স্মরণে।
দেবযানী। দুম হােক কৃতজ্ঞতা,-আর কিছু নাই।
কোন দিন সন্ধ্যাকালে বাজেনি সানাই
চিত্তে তব, মাের এই কুটীর স্মরিয়া?
দেহ মন ক্লান্ত যবে পড়িয়া পড়িয়া,
বিদ্যাভারাক্রান্ত তব রুক্ষ মাথাখানি
আপন বক্ষের মাঝে কে লইত টানি
সপ্রেম আগ্রহে; সখা, পরম সােহাগে
বসিয়া নিশ্চিন্তে কেবা তব বাম ভাগে
শিথিল বাহুটি দিয়া ধরিত জড়ায়ে
কম্বুকখানি তবকে দিত পায়ে
গলায় গড়ের মালা, চরণেতে জুতাে ?
ভিন্ন কাজে ব্যস্ত তবু করি নানা ছুতাে
কে আসিত বারবার তােমার সমীপে
চঞ্চল বাতাসে কেবা নিবাইয়া দীপে
মনােল
পুষ্পিত লতার মত বিকশিয়া দেহ
উজাড় করিয়া দিত যত প্রেম-স্নেহ
তােমার উন্মুক্ত বক্ষে, আশ্লেষে চুম্বনে।
চমকি জাগিয়া উঠি প্রভাত কিরণে
দেখিতে কাহার মুখ। প্রতিদিন সাঁঝে
কে দাড়াত দ্বারপাশে ফেলি সব কাজে
তব প্রতীক্ষায়। কতদিন এই ঘরে
কাটায়েছ বিনিদ্র রজনী অঙ্ক 'পরে
কার? শ্রাবণ নিশীথ কত, জ্যোৎস্নাময়ী
শারদ যামিনী-বরষার জল থৈ থৈ
বসন্তের উন্মাদ পবন—হিম-ঢাকা
হেমন্তের দিন—শীতে
মুদে-আসা-পাখা
সায়াহ্ন মাঘের—এ সবের মধু-স্মৃতি
কার স্মৃতি সাথে মিশে জাগাইছে প্রীতি
অতীত দিনের ?
কচ।
আছে তাহা মৰ্ম্ম মাঝে,
বাহিরে টানিয়া তারে অপমানে লাজে
ধিত করিতে চাহি না ক'।
দেবযানী।
জানি সখে,
তােমারে দেখেছি আমি প্রেমের আলােকে
সহজ সরল—তবে, কাজ নাই প্রিয়
০
স্বর্গে ফিরে গিয়ে, যুগ্ম প্রেমে রমণীয়
স্বর্গ হােক ধরা।
নহে, নহে দেবযানী।
দেবযানী। কেন নহে? সুদুলভ প্রেমে অবমানি
কে কোথায় সাধিয়াছে কৰ্তব্য আপন?
আমি জানি মন তব, জানি অনুক্ষণ
তােমার নিগুঢ় চিত্ত আমারে খুজিয়া,
ফিরিতেছে—একবার দেখহ বুঝিয়া
চিত্ত আর তব চিত্ত নাই।
শুচিস্মিতে,
সাতটি বৎসর ধরি এ ম-পুরীতে
এরি লাগি করেছি সাধনা? ছিল পণ,
সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে স্বর্গের নন্দন
ফিরি স্বর্গধামে তাহা করিব প্রচার
তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যা পাই তােমার
চরণ সেবিয়া দেৰি, সে বিদ্যা কেমনে
রাখিব করিয়া রুদ্ধ আপনার মনে,
কারেও না দিয়া। দেহ গাে বিদায় আজি,
গুরুর গৌরবময় পুণ্য স্মৃতিরাজি
তােমারে ঘিরিয়া রবে মনে।
দেবযানী
শুরু স্মৃতি
নাহি চাহে মর্ত্যের দুহিতা। যে পীরিতি
৮১ মনােদর্পণ দুই দেহ এক করে নিগূঢ় বন্ধনে, যে পীরিতি ব্যথা দিয়ে ব্যথা পায় মনে, যে পীরিতি প্রিয়জনে প্রাতে দিয়ে ঠেলে সন্ধ্যা-অন্ধকারে বসি ব্যগ্র বাহু মেলে আবার কামনা করে, নিগূঢ় যে প্রীতি মানে না অশ্লেষা মঘা দিনক্ষণ তিথি, নামমাত্র মূল্যে যাহা আপনা বিকায়, সৰ্বস্ব ঢালিয়া দিয়া ধুলিমুষ্টি চায়, যে প্রীতিতে এক নারী সহস্রবল্লভা, সন্ধ্যা-অন্ধকারে যাহা ধরি নব শােভা মৃতজনে মারে বার বার। গঙ্গাজল যে প্রেম-গ্লানিরে নিত্য করে নিরমল, নীড়হারা যেই প্রেম, ফিরে পথে পথে কভু পদব্রজে কভু ঘর্ঘরিত রথে, যেই প্রেম আপনারে আপনি হানিছে, বিষ অণু পরমাণু যে প্রেমে টানিছে তীব্র যন্ত্রণার রসাতলে, সেই প্রেম- অকস্মাৎ পথে-পাওয়া সে দুর্লভ হেম লভিয়াছ তুমি, সেই প্রেমে অবমানি অসহায় নারী-বক্ষে তীক্ষ্ণ শেল হানি’ 'প্রেমস্পর্শহীন স্বর্গে যেও না ফিরিয়া, খুলহ পাদুকা।
মৃনােদর্পণ
৮২
কেন মিথ্যা ব্যথা দিয়া
ব্যথা পাও নিজে, নিতান্তই হবে যেতে।
দেবযানী। ক্রুর ব্যাধ সম তবে কেন জাল পেতে
লুব্ধ করেছিলে মােরে ? কেন প্রতিদিন
প্রেমের গুঞ্জনে তব বিরামবিহীন,
আমারে করেছ প্রতারণা? স্বার্থলােভী
দেবতানন্দন! কেন দেখাইলে ছবি
দূর নন্দনের, কেন মিথ্যা বলেছিলে
বাঁধিয়া রাখিবে মােরে চাকুরী মিলিলে,
যাইবে না স্বর্গেতে ফিরিয়া। আনজনে
কেন সখা দিলে ফিরাইয়া প্রলােভনে
ভুলায়ে আমারে। মনে ছিল এত যদি,
তব খাতে কেন বহাইলে চিত্তনদী।
লােষ্ট্র হানি অচঞ্চল সরসীর বুকে,
কেন ঢেউ তুলে দিলে। মুখ রাখি মুখে
কেন মিথ্যা প্রেমারুণ নয়নের ভাষে,
হাস্যে লাস্যে পরিহাসে বচন-বিলাসে
জাগালে জর্জর বক্ষে দুরন্ত কামনা।
অকস্মাৎ কহ আজি, আর থাকিব না।”
কেন থাকিবে না? সুকঠিন এ বন্ধন ৫
বহুদিনে গড়ে-তােলা বহু পিতৃধন
মনােদর্পণ বিনিময়ে ক্রয় করা—এক নিমিষেই ছিন্ন করি দিবে ? প্রেম-পরিণাম এই। কচ। ফিরে যেতে পণবদ্ধ আমি নিরুপমা। দেবযানী। যাবে যাও, জেনাে আমি করিব না ক্ষমা। নিপীড়িতা অনাদৃতা রমণীর ক্রোধ তােমার সকল পথে তুলিবে বিরােধ। যে বিদ্যা শিখিয়া তুমি ফিরিছ নন্দনে, যে বিদ্যা বিচ্ছিন্ন করে মাের প্রিয়জনে মাের কাছ হতে—যদিচ আমারি দান- যে বিদ্যার লাগি মাের এই অপমান, আমি অভিশাপ দিনু—সে বিদ্যা তােমার হবে না আপন কভু। তুমি বারবার হইবে অক্ষম নিজ বিদ্যার প্রয়ােগে শুধু প্রচারিবে তাহা লেখনী-সংযােগে নানা পত্রিকার পাতে—সরস ভাষায় উপন্যাস গল্প ছন্দহীন কবিতায়, পড়ি তাহা স্বর্গলােকে তরুণের দল ক্ষিপ্ত কুকুরের মত হইবে চঞ্চল, গােপনে করিয়া পাঠ স্বর্গ-তরুণীরা ভুলিবে দেবীর ধর্ম তেয়াগিবে ব্ৰীড়া, তােমার রচনা পড়ি যখন সকলে মাতিবে উন্মাদ হর্ষে মর্ত্য-কোলাহলে,
মনােদর্পণ
৪
তুমি ব্যর্থ আশাহত শুধুই দেখিবে,
মর্ত্যের দিবস স্মরি অশ্রু উথলিবে
চক্ষে তব। আমারে স্মরণ করুি তুমি
মানিবে নন্দন বলি এই মর্ত্যভূমি।
দেহ-ধর্ম গম্লান্যাসে পাবে পরিণতি
অক্ষমজনের যাহা একমাত্র গতি
সেই গতি তব। আমি দিনু অভিশাপ
ভূর্জপত্রে দিবে ঢালি দেহের উত্তাপ
লেখনী ও মসীযােগে। বিদ্যা মনােহারী
ভুঞ্জিতে নারিবে তুমি, শুধু হবে দ্বারী।
তুমি সুখী হবে নারী, আশীর্বাদ করি--
নব নব বিদ্যার্থীর হবে সহচরী।
ভাষা ও ছন্দ
যেদিন তিব্বত হতে নামি আসে অশ্বতর দল
পার্বত্য ভেড়ার লােমে কুজপৃষ্ঠ, চরণ বিকল,
অতিক্রমি সুদুর্গম গিরিশৃঙ্গ, কালিম্পং ধামে,
রংফুরে পশ্চাতে রাখি, ভুটান পাহাড়ে রাখি বামে,
একে একে দেখা দেয় উলের গুদাম সন্নিকটে,
অশ্বতর ক্ষুরাঘাতে ধূলিজাল গগনের পটে
যেমতি আবৰ্ত্তি উঠে আঁধারিয়া দিচক্রবাল,
ধূলিসমাচ্ছন্ন গিরি; মনে হয় যেন মহাকাল
তাণ্ডব করেছে সুরু, উমা-হারা হয়ে অকস্মাৎ
দক্ষালয়ে যজ্ঞভূমে; সেই মতাে কবি ভুতনাথ
উত্তপ্ত প্রভাত বেলা, পটলডাঙ্গার পূর্ব মােড়ে
অশান্ত উদ্বেগভরে ভ্রমিছেন পীত লুঙ্গি পরে
নিতান্ত একাকী—একা ; বক্ষে তার তরঙ্গ কল্লোল।
অদূরে মাধব চাকী বারান্দায় বাজাইয়া খােল
কীৰ্ত্তন করেছে সুরু, কানে তঁার পশে না আওয়াজ
উন্ধে জানালার চিক ফঁাক করি ত্যজি ভয়লাজ
পাড়ার কুমারী যত নিত্য অধ্যয়ন-অবসরে
তাহারে হেরিতেছিল। উপেক্ষি’ মদন পঞ্চশরে।
মনােদর্পণ
واسه
কবি ভ্ৰমিছেন খালি, ছন্দ তালময় পায়চারি
আবর্তিয়া মুখে মুখে নব নব সৃষ্টি তারি,
উষার প্রাক্কালে অদ্য কণ্ঠে যাহা হৈল আবির্ভাব
নিতান্ত সহসা আসি, গাববৃক্ষে যথা ফলে গাব ;
তেমতি সে নবছন্দ ভারতীর লাউ-খােল ত্যজি’
স্বর্গ হতে মর্ত্যধামে উত্তরিল; কভু পূর্ণগজী-
কভু-বা ইঞ্চেক মাত্র, ছন্দ সে নিতান্ত আধুনিক
নাহি মাত্রা, নাহি যতি, মিলের নাহিক কোনাে ঠিক ;
নহেক পয়ার তাহা ত্রিপদী কি চৌপদী তােটক,
নহে ভাষা প্রচলিত, ছন্দ ভাষা সম্রাট-জোটক।
ভাবে কবি, এ যে ছন্দ আবির্ভূত অকস্মাৎ আসি
মার্জিত জিহ্বাগ্রে তার, দিব্য দীপ্ত বিভা পরকাশি’
তারে লয়ে করিবে কি, অনাহুত আসার কি মানে,
কোথা হতে তােড়া তােড়া স্বর্ণমুদ্রা আকাশ-বিমানে
কে যেন আনিল বহি। বলা নাই কহা নাই কিছু,
ছন্দটি আসিল অগ্রে ভাষা এল তার পিছু পিছু।
তাজ্জব ব্যাপার বটে, নিতান্তই জটিল ঘটনা।
এই ছন্দে কোন মহাকাব্য কবি করিবে রচনা
ভাবিয়া আকুল হ’ল। ছন্দরূপী এ শিশু-ভোঁদড়
কোনাে নীড় রচিবে কি, কণ্ঠ হতে দিবে কি ভোঁ দৌড়
পুন স্বর্গপানে ইহা, কবি হ’ল ভাবিয়া আকুল।
উর্ধে বাতায়ন হতে একটি টোপাল’ টোপাকুল
৫-৭
মনােদর্পণ
কে যেন বর্ষিল মাথে, খেয়াল নাহিক কিছু তার ;
বিধাতা যাহার স্কন্ধে চাপাইয়া দেন ছন্দ-ভার
তার কি দেখিলে চলে কে কোথায় ভেংচাইছে তারে,
অথবা গােপনে বসি ভাসে কেবা নয়নাধারে
তাহারে কামনা করি ; কাব্য যার শিরে করে ভর
কলেরা হয় না তার, নাহি হয় ম্যালেরিয়া জ্বর।
সে শুধু মিলের পরে পথে ঘাটে মিল গেঁথে যায়,
মিল যার নাহি জোটে বীণাপাণি তাহারাে উপায়
করিয়া দিলেন অদ্য, কবি পেল সেই ছন্দ নব,
অকস্মাৎ প্রাতঃকালে উদ্ভাসিয়া ক্ষুব্ধ চিত্তনভ
নবসূৰ্য্য হইল উদয়। রৌদ্র হ’ল খরতর
বেথুনের বাস টেনে ফিরে গেল যুগ্ম অশ্ববর,
কবি তবু রহে আনমনে, কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নাহি।
অফিসের বাবুকুল সহসা বাহিরে দেখে চাহি
তীর্থ-ধ্বক্ষবৎ কবি পাড়ায় আসিয়া দিল হানা,
তাহারা আফিসে গেলে যুবতীরা শুনিবে কি মানা,
কবিরে হেরিবে নাকো ! হেরে যদি তা হলেই গােল,
ভাজি হবে পােড়া-পােড়া, স্বাদহীন হবে মৎস্য-ঝােল।
কবি তত একেলা চলে ক্ষিপ্ত শীর্ণ সারমেয় যথা
আনমনে ফেরে পথে, নয়নে ভাবের উজ্জ্বলতা।
বেলা বাজে দ্বিপ্রহর, ঝিয়েরা বাহির হ’ল পথে
হস্তে অন্নথালা, আলু বেগুন লুকায় কোনাে মতে
মনােদর্পণ
বস্ত্র-অভ্যন্তরে সাধ্বী।
নবােদিত অকুণের মত
হেনকালে সম্পাদক দেখা দিল, পদক্ষেপ শ্লথ,
দৃষ্টি উদ্ধ, তরঙ্গ-কল্লোল-চিহ্ন নবােদ্ভিন্ন টাকে,
ব্যথা-মনুমেন্ট যেন লভে গতি অজানার ডাকে
কবিরে নেহারি সেথা চমকিয়া পুছে সম্পাদক,
শুনিনু পুটির মুখে স্বৰ্গ হ’তে নব ছন্দোদ
অবতীর্ণ স্কন্ধে তব, তারে লয়ে কি করিবে কবি,
কোন্ ম-পাবলােভার, কোন্ স্বর্গ-উর্বশীর ছবি
বর্ণিয়া নূতন ছন্দে কাব্য-লােকে দিবে অমরতা ?
রাজপথে বিরাজিত দুপুরের প্রশান্ত স্তব্ধতা।
মধ্যাহ্ন-আহার শেষে পান খেয়ে ফেলিবারে পিক
আসি বাতায়ন-পাশে, যুবতীরা দেখে অনিমিখ—
এক ছিল দুই হ’ল আসি।
ভাবােন্মত্ত কবিবর
শুনি সম্পাদক-কথা চক্ষে বহে অশ্রু ঝর ঝর,
ম্লান হাসি কহে ধীরে, ‘তুমিও এমন কথা কহ
আত্মভােলা সম্পাদক, হে তরুণ ব্যথা-বার্তাবহ,
উর্বশী-পাবলােভা-কথা অনুক্ষণ জপিছে সকলে ;
রবীন্দ্র উৰ্বশী লেখে, হের আজ তাহার নকলে
মনােৰ্পণ
ছেয়ে গেল বঙ্গ-রঙ্গভূমি, পাবলােভা-বন্দনা-গীতি
সংস্কার বিমুগ্ধমনে অনুক্ষণ সঞ্চারিছে প্রীতি,
দেখ নাকি এ-বঙ্গের বড় বড় শিল্পী কবিদল
মিথ্যার বন্দনা-গানে আপনারে করেছে বিকল!
রক্ত-মাংস-মেদ-মজ্জা-কায়াহীন মানসীর পিছে
টো টো করি ফেরে নিত্য, কেহ বসি টেবিলের নীচে
লাবণ্যের করে ধ্যান, সব যেন পুরুষত্বহীন।
বুঝিতেছি এ-সাহিত্যে আসিয়াছে ভীষণ দুর্দিন,
যেমতি মহিলা ছন্দ, তেমতি মহিলা ভাবভরা
কবিদের কাব্য যেন ধার-করা স্বর্গের পসরা।
মর্ত্যের এ অপমানে শেষে দেখি তুমি যােগ দিলে।
রক্ত-মাংস-জয়-গানে সাথী নাই এমৰ্ত্ত-নিখিলে,
আমি একা—নিতান্ত একাকী। বিত্তের বন্দনা গান,
সৃষ্টির প্রারম্ভ হ'তে আজোতক কাব্যে পায় স্থান
নবাব-হারেম আর রাজ-অন্তঃপুর পরিপাটি,
ধনীর বিলাসকথা, কোথা অন্তরের কথা খাঁটি।
কে রচিবে গণকাব্য, পুরাতন ছন্দ-ভাব ত্যজি,
ফুটকি-ড্যাসে ভাঙা ভাঙা, উপমার ভারে লজগজী
নূতন পুরুষ-ছন্দে শহরের গণিকার গাথা ;
কে হেরিবে কত রূপ ধাঙড়-কুমারী সদ্যস্নাতা
ধরে বরদেহে তার ; কে দেখেছে ঝাপ তুলি ধীরে
কাব্য কত প্রতিদিন সৃষ্টি হয় খােলার কুটীরে,
;
৯০
অনােদর্পণ
তেলকলে, পাটকলে ; কে গেয়েছে মজুরের জয় ;
গণতন্ত্র-ব্যাধি যত কেবা তার দিল পরিচয়
বেদনার অশ্রুজলে। কি মহৎ ব্যথার আবেশে
চৌর্যবৃত্তি করি চোর জেলে যায় শেষে ;
রহিমের পত্নী লয়ে হয় কেন গফুর উধাও;
কাহার বদন স্মরি মাঝ-গাঙে মাঝি বাহে নাও ;
সে কোন্ জেলের বধু টেড়িকাটা কুমাের-কুমারে
ভাবিতে ভাবিতে মনে স্বামী লাগি পান্তাভাত বাড়ে।
হারাণ মােক কেন খামারের আম গাছে বসি
মশার কামড় খায়; তেলীদের বিধবা রূপসী
কোন্ পথে যায় ঘাটে, ঘাটে গিয়ে অনাবৃত দেহে,
কেয়ার ঝােপের আড়ে সচকিতে বুকঢালা স্নেহে
চায় কেন বার বার—এ সকল মহাকাব্য কথা
কেহ আজো করেনি রচনা। উপাধি-ঐশ্বৰ্য্যরতা
ছিল বাণী এতকাল, উপযুক্ত ছন্দ আর ভাষা
নামিয়া আসেনি মর্ত্যে, মিটে নাই মর্ত্যের পিপাসা।
সে ছন্দ আসিল অদ্য, ভাষা পেল কবি-কণ্ঠে মম,
হে তরুণ সম্পাদক, হে নিষ্ঠুর অহহ হহ নিৰ্ম্মম,
তুমি কিনা বল মােরে উৰ্বশীর করিতে বন্দনা।
কি দোষ করিল সখা পটলিকা ডালিম চন্দনা।
সুমধুর গদ্যছন্দে প্রচারিবে মর্ত্যের মহিমা
এই স্থির করিয়াছি মনে, লঘিয়া মাটির সীমা
মনােদর্পণ
স্বর্গ পানে মাের ছন্দ না যাতে উঠিতে পারে
এ মর্থ্যের সুবিপুল মেদ-মজ্জা-রক্ত-অস্থি ভারে,
করহ উপায় তার। মহাকাব্য করিব রচনা
মর্ত্যের নায়কে ল’য়ে, সে হবে না ভাবুক উন্মনা
দেহহীন কাব্য-ধোঁয়া। রক্তে মাংসে গঠিত মানুষ,
মিথ্যাভাবলােকে কভু উড়াবে না কল্পনা-ফানুষ,
হাসি পেলে হাসিবে সে, রাগ হলে চেল কাঠ ল'য়ে
পত্নীর ফাটায়ে মাথা, নাস্তা খাবে আপন আলয়ে,
ও-পাড়ার কদমেরে চোখে যদি লাগে তার ভালাে
ধরিয়া করিবে সাঙ্গা, উচ্চকণ্ঠে কহিবে, নিকালাে,
সখ মিটে গেলে তার—হে ভাবুক গুণী সম্পাদক,
কল্পনার সরােবরে ওহে শুভ্র ধর্মরূপী বক।
মানস-বিমানে চড়ি এ নিখিল ভ্রমিয়াছ তুমি,
সহস্র নারীরে সখা, বাজায়েছ যেন ঝুমঝুমি,
দেখেছ মর্ত্যের লীলা, তুমি মােরে করহ নির্দেশ,
কাহারে নায়ক করি নবাৰ্জিত এ-ছন্দে সরেশ
রচিব মহান কাব্য। কারে দিব সে মহা সম্মান ?
সম্পাদক কহে ধীরে, কলাবাগানের বাবুজান।
‘জানি আমি জানি তঁারে শুনেছি তাহার কীর্তিকথা,
কহিলেন কবি, ‘তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,
৯২
মনােদর্পণ
সকল ঘটনা তার, সে মহিমা রচিব কেমনে?
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগিতেছে মনে।
সম্পাদক কহে হাসি, সেই সত্য যা রচিবে তুমি,
কলাবাগানের চেয়ে সত্য কবি তব মনােভূমি।
বস্তি কথা রচিলেই কাব্য তব হইবে বাস্তব।
চলি গেলা সম্পাদক। সম্মুখে উঠিল কলরব,
স্কুলের হইল ছুটি, কৌতূহলী বালকের দল
কবিমুখে স্বপ্নাবেশ নেহারিয়া করে কোলাহল,
বাতায়ন-অন্তরালে যুবতীরা করে হাসাহাসি,
“আ ম, মিসে যে হেতা এখনাে দাড়িয়ে উপবাসী,
হন্ঠে কুকুরের মতাে, ঝেটা মার’ ঝেটা মার’ মুখে।”
প্রণমিয়া তাঁহাদেরে, মৃদু হাসি ভাবােদ্বেল বুকে
কবি ফিরে এসে ‘মেসে’ বসিলেন স্তব্ধ ধ্যানাসনে;
সহসা লেখনী কাপে রবীন্দ্রের, উত্তর-অয়ণে ।
ব্যর্থ গজল
=
(১)
অতল তল অগাধ নীর
গজল গান গাইছে বীর ;
পূবের বায় উড়িছে, হায়,
প্রান্ত তার উত্তরীর।
শুনি সে সুর মধুর ক্ষীণ
মাঝিরা সব ভালীন
এলায়ে চুল যুবতীকুল
কুলে বাজায় আঁখির বীণ।
হানি নজর কবি আকুল
বিধিল তঁায় মদন-হুল,
কপিল সুর লােভে 'আতুর
হাঁকিল বীর, ‘ভিড়াও কূল।
লাগিতে গায় তরীর ঢেউ
লাজে নয়ন মুদিল কেউ
বুকে কবির ছুড়িয়া তীর
তীরে পলায় সকল এউ *
এয়াের অপভ্রংশ
মনােদর্পণ ৯৪ বুড়ীরা কয়, “আরে রে মরু ছুয়ে বা দেয় দূরেতে সর’- কুমারী-দল করিয়া ছল টানে আঁচল বুকের 'পর। মিঠা গজল বঁধু-বধুর ঘাটের পর গাহে মধুর, শুনিয়া তান নদী উজান বালা-কিশাের ভাব-বিধুর। সকল গাছ হ’ল কদম ফুটিল ফুল কি মনােরম। (২) কেশে পালক গােপবালক দাড়ায়ে ওই—হইল ভ্রম। ‘ঢাকাই হয় বৃন্দাবন, যমুনা-বৎ গঙ্গা বন- লুকায়ে বাস কেলি-বিলাস কলি-কবির করিতে মন। কুমারী এক উঠিল তীর নিকটে ধায় হেলায়ে শির কবি যে কয় হৃদয়ময়- শতেক যুগ রয়েছে থির।
৯৫
মনােদর্পণ
ঢুড়িয়া তাই ফিরি ধরায়
সকল ক্লেশ সফল হয়
আমি রাধার প্রাণ আধার
একথা তার মনে কি নাই ?
গােপাল ঘেঁয় রাখার হাত
হ’ল কি তাই বজর পাত--
চোখে কবির বহাল নীর
আয়ান ঘােষ এসে হঠাৎ।
কহে আয়ান ইতর ভাষ,
‘নাকে দে খৎ ভাল ত চা,
এলে আবার প্রাণ যাবার
আছয়ে ভয় জানিয়া যা।
প্রহৃত বীর ফিরিয়া যায়—
গিয়ে খানিক পিছনে চায়
ভাবেতে ভাের সে ননী-চোর
বধূ-গজল আবার গায়।
সত্য-মিথ্যা
"
লিখেছে তরুণ কবি,
“বস্তিবাসিনী ছবি,
পরিয়া গামছাখানি ঠুটো
বকুলের মালা গলে
ধীরে এল কলতলে,
তখন দুপুর বাজে দুটো।
যদিচ পথের কল,
সবে নিতে আসে জল,
ছবির চেহারা ছিল ভালাে,-
সে যখন এল কাছে, দশে কল ঘিরে আছে ;
ছি ছি। কি বেহায়া মেয়ে কালাে।
কহিল ছবিরে হাসি,
‘সাধ হয় হয়ে দাসী
সেবিব চরণ দুটি তাের,
কি খেয়ে আছি বেঁচে, আজো তা না পাই এচে
মেয়ে হয়ে মােরই লাগে ঘাের।
ছেড়ে দে নয়না-হানা, রাখ, ঢেকে বুকখানা-
নহিলে আমরা সই মরি ;
তাের ও গতর-নদী
সবারে ভাসায় যদি,
মােরা ঘাঁচি কোন্ লগি ধরি,
ফুলায়ে বুকের ছাতি
বিকশিত করি ছবি কহে,
কুন্দ দন্তপাতি
মনােদর্পণ
‘কত যে জানিস্ রঙ, বচিনেরে দেখে ঢঙ,
ম’ল কত তাের কালিদহে
হিসেব রাখিস তার ? রঙ্গ রাখ, পথ ছাড়,
উনুনে চাপিয়ে এনু হাঁড়ি।
কি ভাবিয়া ছবিরাণী দীরঘ নিশাস টানি
আবরিল বুক তাড়াতাড়ি।
চকিতে দেখিল কালাে,
রাজপথ করি আলাে
আসিতেছে ছছাট বাবুজান,
কুঞ্চিত সুকৃষ্ণ কেশ, রেশমি লুঙ্গিটি বেশ,
লাল চোখে সুরমার টান।
বাবুজান সেথা এসে
থমকি চমকি কেশে,
হেরিল ছবির স্বল্পবাস,
লাজে তার কান দুটি লাল হ’ল গুটি গুটি
সঘনে সে ছাড়িল নিঃশ্বাস।
প্রেমে দুরু দুরু বুক
আনত করিয়া মুখ,
দাড়াইল রাজপথ-বাঁকে,
চরণ চলে না তার,
দেহ হ’ল মহাভার--
ঘটলম ছবির বাঁ-কঁখে
স্থাপন করিল আনি,
আনমনে রহিল সে চেয়ে।
ছবি লাজে হল লাল, টেবাে টেবাে দুটি গাল
আবীরে কুঙ্কুমে গেল ছেয়ে।
প্রেমাতুর চিত্তখানি
৯,
মনােদর্পণ
দেখি তারে দোনামনা কালাে গালে মারে ঠোনা
কাক যেন ঠুকারিল পীচে।
‘দান্তে তাের দ্যাখ, ওই লাজে হল মাটি-সই,
কৃপা কর সখি বিয়াত্রিচে।
প্রেমাহত পুণ্ডরীক কেঁদে কি ভাবে দিক,
মহাশ্বেতা এত কি পাষাণ।
কিম্বা সখী শকুন্তলা
—ইদো ইদো সহি হলা—
রাজবুকে মারিবে না বাণ?
তাের লাগি লবেজান এই দ্যাখ, বাবুজান,
জান্ তাের গলিবে না সখি ?
ইত্যাদি করুণ ভাষে ছবি আঁখিজলে ভাসে
বলে, ‘থা, মিছে যা বকি।
কাটা ঘায়ে নুন-ছিটে লাগে না ক’ ভাই মিঠে,
মরারে মারিস্ কেন খাড়া ?”
;
চুপ করে বাবুজান
শুনে যায় গল্পখান,
এবার উঠিল করে তাড়া,
স্বস্তির এহেন ছবি একেছে সে কোন্ কবি ?
ঠিকানাটা দাও তার বাবু,
বুঝায়ে আসিব তারে প্রেম-করা কয় কানে,
যারা প্রেম করে খেয়ে সাবু
ఎ.
মনােদর্পণ
তাহারা বস্তির নহে, মেসে কি হােটেলে রহে,
এই সব কেচ্ছা লেখে বুঝি ?
দূর থেকে ঠোট চাটে,
শুয়ে শুয়ে ভাঙা খাটে
স্বপ্ন শুধু তাহাদের পূজি।
বাবুজান করে কি যে,
বুঝয়ে
আসিব নিজে,
সহিব না এই অপমান।”
এত কহি রাগ-ভরে
বস্তি-ব্যথিকের ঘরে
চলিল বস্তির বাবুজান।
বাকী কথা ইতিহাসে -ইঙ্গিতে না-আভাসে
নাহি লেখা যতদূর জানি,
শুধু জানি পাকবাবু লিখে লিখে হ’য়ে কাবু
দৈনিকে লভিছে দানাপানি।
অনাথ
[ গৈরিশীছন্দে লিখিত মহানাটক ]
নারী সময়—সকাল
কুশীলবগণ
স্থান-সৰ্বলােক
[ ঘটনাটি খৃষ্টীয় বিংশ শতাব্দীর কলিকাতার একটি মেসে সংঘটিত
হইতেছে। নারী এস্থলে মেসের ঝি ; বয়স, ত্ৰিশ বা তদূর্ধ্ব।
নর-একটি ছাত্র, অপ্রাপ্তবয়স্ক। .
মেসের একটি ছােট্ট কুঠরী। চৌকীর উপর বিছানা পাতা ;
মেঝের উপর একটি ষ্টীল ট্রাঙ্ক ; বইয়ের শেফে কতকগুলি বই।
নূতন একজোড়া ও তালি-সংযুক্ত দুই জোড়া জুতা ও একজোড়া চটি
চৌকীর নিয়ে অবস্থিত। ঘরের কোণে একটি ষ্টোভ। টেবিলের
উপর ভুক্তাবশিষ্ট চা সমেত পিরিচ ও পেয়ালা ; একটি ডিজ লণ্ঠন এবং
পাতা খােলা একটি খাতা। ডিক্সনারীর উপর কাৎ করিয়া বসানাে
একটি আয়না। নর বিছানার উপর বসিয়া-জানালার দিকে তাহার
মুখ ; ডান হাতে ফাউন্টেন পেন, বাম হাতে একটি জ্বলন্ত সিগারেট।
জানালার বাহিরেই একটি বকুল গাছ। গাছে কতকগুলি চড়াই
পাখীর কিচির কিচির শােনা যাইতেছে।
সময় প্রাতঃকাল। নারী দরজা ঠেলিয়া ঘরে ঢুকিয়া কোণে
অবস্থিত জলের কুঁজাটি বাহিরে রাখিয়া ঘর ঝাট দিতে সুরু
করিয়াছে। নর একবার করিয়া সিগারেট টানিতেছে—মাঝে মাঝে
খােলা খাতায় কি লিখিতেছে এবং মাঝে মাঝে নারীর পানে চাহিয়া
কলাপণ
কটাক্ষ করিতেছে। নারী একবার বাহিরে আসিয়া পুনরায় ঘরে
প্রবেশ করিল এবং মেঝের উপর বসিয়া পড়িয়া খোঁপা খুলিয়া বিনুনী
ছাড়াইতে বসিল। ঝাঁটাটি চৌকীর নীচে রহিল। ]
নারী।
কেন তুমি বার বার মাের পানে চাই,
অনিমিখ আঁখি তব আমার ধ্যেয়ানে--
নাহি জানি কি যে কর ধ্যান।
ওগাে, বড় লাজ বাসি মনে।
মাের লাগি ‘নেখাপড়া কর না’
প্রাতঃসন্ধ্যা হাওয়া খেতে হও না বাহির,
আধখানা হয়ে গেলে দেখিতে দেখিতে।
ভাত দৈ মেখে খেতে খেতে,
ডাল ঢাল তাতে আমি যবে সম্মুখেতে যাই।
মােরও কি করেছ দশা, জান কি, নিষ্ঠুর।
কাটিতে কাটিতে মাছ, তব আঁখি ভুল যে ঘটায়
আঙুল কাটিয়া ফেলি।
বাজার করিতে যাই, কলা কিনিবারে হায়,
কচু কিনে ফেলি, ফিরে এসে শুনি অনুযােগ।
দস্তুরি লইতে হয় ভুল! আমি যে অভাগী ওগাে,
কি কুক্ষণে এসেছিনু এই মেসে, যেথা আছ তুমি,
প্রেমের ডালিটি তব রেখেছ সাজায়ে,
পারি না ছাড়িয়া যেতে ; কাচপােক যেন
তেলাপােকারে ধরেছে।
মনােদর্পণ
১০২
নর।
আহা, কেন বসিয়াছ ওগাে ধরার ধুলায়-
এস মাের শুভ্র শয্যা 'পরে, ক্ষণেকের তরে আমি
করি অনুভব, স্বপনবাঞ্ছিত প্রিয় সান্নিধ্য তােমার।
দ্বার তত ভেজানাে আছে। ভয় ?
ভয় আমি করিনে কারেও যদি-যদি-
তুমি মােরে ভালবাস শুধু!
ব্রীড়া অবনতমুখে, সহাস্য বদন তব ঈষৎ স্ফারিয়া,
প্রেমঘােলা আঁখি মেলি মাের পানে চাহি
বল একবার প্রিয়ে, মােরে ভালবাস।
ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ, সব ভুলে পড়িব লুটায়ে
শতদল সম তব রাতুল চরণে।
হা নিষ্ঠুর! ভালবাসি কি না বাসি
বুঝিতে পার না? হায়, নারী করি গড়িল বিধাতা,
লজ্জা দিল অন্তরে বাহিরে-বুক যবে ফাটে তার
মুখ যে ফোটে না। নারী কি কহিতে পারে
প্রাণ তার মজিল কোথায় ?
সুরসিকজন অনুভবে বুঝিবারে পারে।
[ হস্ত প্রসারণ করিয়া নারীকে ধরিতে গিয়া দূরে পদশব্দ
শুনিয়া দরজার দিকে সভয়ে চাহিয়া হাত টানিয়া লইয়া ।
তবু, তবু, তবু একবার,
লজ্জা বিসর্জিয়া প্রিয়া অস্ফুট গুঞ্জনে
অমৃত সিঞ্চন কর অভাগার কানে
নারী।
১০৩
নারী।
মনােদর্পণ
গােমুখীর মত তব অধরােষ্ঠ হতে, ঝরিয়া পড়ক
স্বর্গ-মন্দাকিনী-ধারা, সুধা নিস্যন্দিনী
চাতকের মত পান করি মিটায়ে পিপাসা !
ছি ছি। দুষ্ট তুমি অতি, শুনিবে আমারি মুখে ?
তােমরা পুরুষজাতি, নির্মম, নিষ্ঠুর
লজ্জিতার লজ্জা কাড়িবারে, সতত সচেষ্ট জানি;
শুনেছি বেহুলা-কথা, স্বামী-শবদেহ ক্রোড়ে,
স্বর্গধামে ইন্দ্রসভাতলে সতী প্রবেশিল যবে
নিষ্ঠুর দেবতা অবহেলি সতীর বেদনা,
লােলুপ রহস্যে তারে•আজ্ঞা দিল নৃত্য করিবারে।
তুমি সে পুরুষ জাতি, কুলিশ-কঠিন
নিষ্করুণ অবলার প্রতি। পত্র অন্তরালে
আপনারে সঙ্কুচিত করি, কোরক-জীবন তারে
যাপিতে দিবে না। মদোন্মত্ত ব্যগ্র হস্তক্ষেপে
ছিন্নভিন্ন করিবে তাহারে। ধূলায় বিকীর্ণ করি
জগতের চক্ষে তার করিবে লাঞ্ছনা।
একথা বােলাে না প্রিয়তমে।
কাব্যে ইতিহাসে আমি অনেক পড়েছি ;
অসুরদলনী সংহারিণী মূর্তি আমি দেখেছি নারীর
পুরুষ শঙ্কর চরণে দলিত শক্তিহীন।
দেখেছি চামুণ্ডা মূর্তি পটাঙ্কিত
সিংহবাহিনীর ছবি অনুভবি অন্তরে বাহিরে।
নর।
•
আদর্শণ
১০৪
এ তাে গেল পুরাণ-কাহিনী। স্বর্গের অপ্সরা
উর্বশী মেনকা রম্ভা—এরা কি নির্মম নহে?
পুরুষের হৃপিণ্ড লয়ে খেলিয়াছে ছিনিমিনি খেলা ;
যােগীশ্রেষ্ঠ মুনিজনে সে কী প্রতারণা,
সে কী নিষ্করুণ হয়ে আহত করেছে এরা
মদন-আহবে। অতীতের কাব্যকথা ইহা।
বাসবদত্তার কথা—তাও জানি। পড়িয়াছি
সক্রেটিশ-পত্নী সেই জ্যান্টিপির কথা,
লুক্রেসিয়া বর্জিয়ার রােমাঞ্চ কাহিনী
রেণ-লেখনী আজো করিছে প্রচার।
রুষিয়ার ক্যাথারিণে জানি—ইংলণ্ড-মহিষী
এলিজাবেথের কথা, স্কটের পুস্তকে পড়িয়াছি।
নহ প্রিয়তমা তুমি, অবলা রমণী, কটাক্ষ আয়ুধ তব,
বিষাক্ত ভীষণ ; হিল্লোল-বিলাস-স্য
অন্ধ্রপ্রস্ফুটিত ওই বরাজে তােমার,
তােমারে করেছে শক্তিমতী। আমি শক্তিহীন,
মুখপানে চেয়ে তব রয়েছি পড়িয়া
চুনমুখে হতভাগ্য জোঁকের মতন।
পুরুষে নারীতে দ্বন্দ্ব চিরন্তন ইহা
থাকুক বিবাদ, ধু বল, ভালবাস মােরে।
ওগাে প্রিয়তম, মুখে কি বলিতে হবে,
‘তােমারে বাসি যে ভালাে’-পারিব না সখা, তাহা।
নারী।
মলােপ
সমস্ত শোণিত মম শিথিল অঙ্গের
শুষ্ক মুখে এসেছে ছুটিয়া। লজ্জা, লজ্জা,
লজ্জা নিদারুণ আমারে দিতেছে বাধা
আমি পারিব না উচ্চারিতে ‘ভালবাসি’ কথা।
[ লজ্জায় অপােবদন; মস্তকে ঘােমটা টানিয়া দিল ]
[ আবেগে চৌকীতে চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িল-মাথাটি
নারীর দিকে চৌকীর বাহিরে ঝুলিতে লাগিল। এই অবস্থায়
নারীর দিকে চাহিতে চেষ্টা করিয়া কাতরভাবে ]
নারী।
বল, বল, বল প্রিয়তমে—
কি বলিব, কি শুনিবে কথা ?
[ দূরে কোথায় কে একজন মিহি গলায় গাহিয়া উঠিল-বালিকা
বয়সে ছিলাম অবশে’–ইত্যাদি। নর চমকিত হইয়া সােজা হইয়া
বসিয়া টেবিলস্থিত খাতার দিকে অখণ্ড মনােযােগ স্থাপন করিল।
নারী একটু হাসিয়া নড়িয়া চড়িয়া বসিল। ]
ভয় নাই ওগগ কিছু। হরিপদবাবু স্নানে চলেছেন,
এ সময়ে গানে পায় তারে। বড় ভাল গলা ওঁর
লােক ভাল ততােধিক। মাের প্রতি স্নেহ ভঁর খুব।
সেদিন সকালে ন’ আনার খাবার আনিতে
দিলেন একটি টাকা। ফিরিয়া পয়সা বাকী
ফিরাইয়া দিতে গেনু। মৃদু হাস্য করি
কহিলেন, “থাক্, থাক্, বাবুরে তােমার
নারী।
মনােদর্পণ ১০৬ নারী ॥ খাবার আনিয়া দিও। শুনিয়া লজ্জায় মরি। কহিলাম, “আপনারা বাবু মাের-নাহি অন্য কেহ। অন্য বাবু সত্য কি গাে নাই ? ছি ছি। আজো অবিশ্বাস? বুঝিতে পার না কিছু ? অন্ধ তুমি, অন্ধেরে আলাের কথা বুঝাব কেমনে? ভাল যদি বাসিতে আপনি এই অভাগীরে— বুঝিতে পারিতে ভালবাসি কি না বাসি। মনে কি পড়ে না তব, সেদিন সকালে সাবান দিতেছি যবে গেঞ্জিতে তােমার ম্যানেজার বাবু মাের করিলেন কি লাঞ্ছনা! বলিলেন, অন্য বাবু নাই, ক্ষীরােদবাবু কি শুধু বাবু? কি সে চাপা হাসি উঠিল প্রত্যেক ঘরে— তুমি তা জান না ! স্মরণে কি আছে তব সেদিন সন্ধ্যায় তেল নিয়ে অমৃতবাবুর- তব হারিকেনে ভুলে দিলাম ঢালিয়া! পরিপাটি করি তব কে পাতে আসন, লবণের পাত্র রাখে আসনের ধারে ? ছত্রিশ বাবুর কাজে ব্যস্ত সদা তবু এক কর্ণ কার নিত্য জাগ্রত রয়েছে শুনিতে তােমারি কথা, কে সদা বিলা; তােমার মুখের পানে চাহি? তবু অবিশ্বাস। অদৃষ্টের পরিহাস।
মনােদর্পণ [ নর নারীর কাছে সরিয়া গিয়া তাহার মুখটি তুলিয়া ধরিল। নারী কিয়ৎকাল নতমস্তকে থাকিয়া একটি বিলােল কটাক্ষ হানিয়া নরের গলা জড়াইয়া ধরিয়া,চৌকীর উপর উঠিয়া বসিল।] নর। কী সুন্দর কী সুন্দর, তুমি। কি মদিরা নয়নে তােমার। হায়, যদি চিত্রবিদ্যা কিছু জানিতাম, ও মােহিনী মূর্তি তব রাখিতাম একে। না, থাক্ তাহা হৃদয়ের নিভৃত পরতে সকলের দেখিবার নহে ও মূরতি। ছি ছি, কি ছাই চেহারা মাের- আমি কি জানি না ? কেন মােরে লজ্জা দাও। নারী। [ নরের বুকে মুখ লুকাইল। তাহার উন্মুক্ত কেশরাশি নরের পৃষ্ঠে ও বক্ষে ছড়াইয়া পড়িল-তাহাতে পচা নারিকেল তেলের গন্ধ। নর নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া চুলগুলি লইয়া খেলা করিতে লাগিল। ক্ষণপরে নরের মুখের দিকে মুখ তুলিয়া আবদার কম্পিত স্বরে ] হ্যাগাে, দেখ, ও বাড়ীর পাঁচী দিদি সেদিন বলিল, আমারে মানায় নাকি ভাল পাছাপাড় নীলাম্বরী শাড়ী। কত কি বলিল আরাে আবােল তাবােল সেই মুখপুড়ী। দুত্তদের দারােয়ান সেও কিন্তু বলিল ও-কথা। বলে, তাের বাবু তােরে এত ভালবাসে গেমি, তুই কি না সাদা পেড়ে কাপড় পরিস?
মলােদর্পণ
Sob
সত্যি মাের বড় লজ্জা করে—কেমনে বলিবে বল,
অভিমানী নারী বাবু তারে ভালবাসে, মুখে শুধু
নহে প্রাণে প্রাণে। [ কটাক্ষ ]
নর। [ আত্মগত ] সত্যই তো কিছু আমি পারি
যে দিতে।
আমার গরবে গরবিনী, মােরই লাগি লজ্জা পায় ।
এ মাসের কলেজের ফিস, এখনাে রয়েছে ব্যাগে,
দিই তা উহারে, পরুক স-পাছ নীলাম্বরী
প্রণয়িনী মাের।
নারী। হঁাগাে, কি ভাবিছ ? হয়েছে কি রাগ মাের প্রতি ?
আমি অভাগিনী কেন বলিলাম পাঁচীদির কথা যত ;
না না, আমি চাহি না ত কিছু। তুমি মােরে
ভালবাস
এই মাের লাভ—অন্য কিছু নহেক প্রার্থনা।
[ বালিশের নীচে হইতে মণিব্যাগ বাহির করিয়া সাতটি টাকা
বাহির করিয়া নারীর হাতে দিতে গেল। নারী হাত সরাইয়া লইল ]
নর। জানি জানি সামান্য এ, তবু ইহা
প্রেমিকের প্রেম-অর্ঘ্য দান। বিমুখ হইয়া, প্রিয়া,
অপমান করিবে কি মােরে ? আমি সহিবারে পারি
কিন্তু প্রণয়ের সহে না ত অপমান।
[ নিতান্ত অনিচ্ছার সহিত টাকা কয়টি অঞ্চল-প্রান্তে বাঁধিয়া ]
নারী। ছি ছি ছি, লজ্জায় মরি।
নর।
মনােৰ্পণ
অমূল্য প্রেমের প্রিয়া
মূল্য দিতে পারে
হেন মহাজন আছে কি কোথাও।
[ নর আবেগে নারীকে কাছে টানিতে গেল এমন সময় দূরে
কে যেন কাহাকে ডাকিল। নারী ‘এই যাই বলিয়া বস্ত্র সংযত
করিয়া টেবিলস্থিত আয়নাতে একবার মুখ দেখিয়া লইল। তারপর
চৌকীর নীচ হইতে ঝাঁটা গাছটি তুলিয়া লইয়া তাহার অগ্রভাগ দ্বারা
নরের গণ্ডদেশে প্রেমের মৃদু আঘাত দিয়া কটাক্ষ করিতে করিতে
বাহির হইয়া গেল। যুবক বিছানায় স্তব্ধ হইয়া পড়িয়া রহিল।
সামনের বকুল গাছে একটি কাকের ‘কা কা’ শােনা যাইতে লাগিল ]
জলসা এত বাধা ও ভয় প্রদর্শন সত্ত্বেও সাইমন কমিশন ৩রা ফেব্রুয়ারি তারিখে বােম্বাইয়ে জুতাৰ্পণ করিবে জানিয়া মনটা খারাপ ছিল ; ‘সমবেত শক্তি, জাতীয়তা, সাইমনী চাল ইত্যাদি বচন আত্মশক্তি, বাংলার কথা, আনন্দবাজার প্রভৃতি পত্রিকায় পড়িয়া পড়িয়া বুকটা দশ হাত হইয়াছিল।--একমাত্র ভরসা হরতাল-কিন্তু ভয়ের কারণ শ্রীমান এন্ এন্ সরকার, শ্রীযুক্ত ষ্টেপল্টন ও uncle রহিম! ডাক্তার সেন এমন সময় আসিয়া আমার নাসিকাগ্রভাগে আঙ লের টোকা মারিয়া বুলিল, কি হে কেবল, তােমার এমন বৎসহারা গাভীর মত চেহারা কেন? দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলাম—সাইমন কমিশন! সেন চশমা জোড়া আঁচল দিয়া মুছিতে মুছিতে বলিল, দূর তাের ছাই-মন কমিশন-জলসায় চল, একটু চাঙ্গা হয়ে আসা যাক! উৎসুক হইয়া বলিলাম, জলস? সে আবার কি হে? ডাক্তার বিরক্ত হইয়া বলিল, দেশশুদ্ধ ছেলেবুড়ো ক্ষেপে উঠেছে, জলসা জলসা করে, তুমি বছ, সে আবার কি? চল, চল, একেবারে হাসির হরর, নৃত্যের লহর, গানের গণতন্ত্র ! আমি চিরকালই গণ-মন্ত্রের উপাসক ; গণতন্ত্র শুনিয়া যাইতে ইচ্ছা হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, মুফৎ ? পয়সা খরচ করতে পারব , বাপু! সেন বলিল, তা জানি, প্রেস-টিকেট আছে। তেড়ীটা বাগাইয়া ও জুতাটা বুরুষ করিয়া উঠিয়া পড়িলাম। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিলাম, জাওয়ালা কারা? সেন অক্সফোর্ড প্যাটার্ণ জুতা দিয়া মনােদর্পণ মেজেতে একটা ঘুষি মারিয়া বলিল, কমিশনের হিসাব ত রাখ, খবরের কাগজ পড় না? এই দেখ। বলিয়া সে সেদিনের একখানা বাঙলা সংবাদপত্র আমার নাকের কাছে ধরিল। কাগজখানা হাতে লইতে লইতে বলিলাম, কমিশনের খবরটা রাখতে হয় ভাই। ছাপােষা লােক, শুধু মাইনেতে কুলােয় না—বিজ্ঞাপনের কমিশন, কাগজের কমিশন, সাইমন কমিশন পর্যন্ত। কাগজখানা খুলিয়া বুঝিলাম, জলসার খবরটা সত্যই এতদিন জানা উচিত ছিল। বড় বড় অক্ষরে কাগজের খােমায় নহে, একেবারে সার পাতায় আসার বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনটি সাহিত্য হিসাবেও যেমন মূল্যবান, বিজ্ঞাপন হিসাবেও তেমনি, আদ্যোপান্ত তুলিয়া দিলাম। “এক ঢিলে দুই পাখী ঘূৰ্ত্তির নায়গারা প্রপাত—দেশপ্রেমের হলদিঘাট সংগীত জলসা চিরবাঞ্ছিত ও বহুবঞ্চিত তরুণ সাহিত্যিকদের পােষাক-দারিদ্র্য দূর করিবার জন্য শ্ৰীযুক্ত রৈবতক সাহার বিপুল আয়ােজন। বাণীর ঐকান্তিক সেবায় যে সকল তরুণ সাহিত্যিক আত্মনিয়ােগ করিয়াছেন, যাহারা বুকের রক্ত, মাথার মগজ দিয়া দেশপ্রাণতার উদ্বােধনে তৎপর, তাহাদিগকে সপ্তাহাধিক কাল একই কোর্তা কি নিমাস্তি গায়ে দিয়া থাকিতে হয়—ঘরে একদিন নিশ্চিন্ত বসিয়া থাকিয়া জমা জলকাচা করিবার সুযােগও তাঁহাদের ঘটে না, কারণ খ্যাতির অনুপাতে সভা-সমিতি মজলিশ ইত্যাদিতে তাহাদের যােগ দিতে হয়—বিশেষ কারণে সেই বহুব্যবহৃত জামা গায়ে দিয়া মহিলা- সমাজে যাহারা যাইতে পারেন না তাহাদের জামার কষ্ট দূর করিবার জন্য এই আয়ােজন।
মনােবল তরুণ সাহিত্যিকদের ভাষাতেই তাহাদের কষ্ট শুনুন, দেখুন আপনাদের মন কাদে কি-না ? “এই দীন মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগােপন করে। দেশে দেশে প্রোপাগাণ্ডা করা ত দূরের কথা, বাড়ী ছেড়ে পথে দাড়াতে লজ্জা করে। কিছুতেই হেঁড়া জামার তালিগুলােকে লুকোতে পারিনে। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে বসে সর্বদাই মন খুত খুঁত করে।” কাজী নজরুল ইসলাম ব্যথিতের ভগবানকে স্মরণ করিয়া নৃত্য-গীতের এই জলসায় যােগদান করুন, বুকের রক্ত দিয়া কেরাণীগিরি করিয়া উপার্জিত অর্থের কিঞ্চিৎ ব্যয় করিয়া একটি সন্ধ্যা চিত্তবিনােদন করুন, আপনার সহানুভূতিতে দরিদ্র সাহিত্যিকদের অবাস উজ্জ্বল হইয়া উঠুক। সাহিত্যসম্ভারে দেশ পরিপূরিত হােক। আন একজন, আসুন সকলে- আয়ােজনের ত্রুটি নাই, শ্ৰীমতী বাড়বা বড় যে, শুক্লা সেন, মাজুক মজুমদার, ব্রয়ােদশী ত্রিবেদী, চিকণ চাকী, পেটিকা পাত্র, পাংশুলা পাণ্ডে, কবরী বর্ধন, মিস টুনটুনি, ডলি প্রভৃতির নিঃসঙ্গ অথবা সস গান। শ্ৰীযুক্ত বুদবুদ বটব্যাল, বিকৃতিবান তরফদার, অরিষ্ট সান্যাল, চৌতাল চক্রবর্তী, মাষ্টার বাটুল, লালু প্রভৃতির আলাপ শেষ কিন্তু বেশ, উদ্যোক্তা রৈবতক সাহার গজল ও অন্যবিধ গান। গাজি আব্বাস বিটকেলের ‘ভাণ্ডারী হুসিয়ার মনােদর্পণ সুবিখ্যাত বিম্ববতী নাহার ‘হাঘরে নৃত্য ১ আসুন, দেখুন, শুনুন, কল্পনার জাল বুনুন- অদ্য সন্ধ্যা ছটায় তরুণডাঙার বাণীকুঞ্জে প্রবেশমূল্য যথাক্রমে ১৩১৫ ৩, ২, ও ১১। ১০ টাকা ও ৫১ টাকা ছাড়া অন্য টিকেট বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। বিলম্বে হতাশ হইবেন } বিজ্ঞাপন পড়িতে পড়িতে মন একই সঙ্গে হাসি-কান্নায় উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। জননী বীণাপাণি, তােমার সহিত তােমার প্যাচাবাহিনী সতিনীর বিবাদ কি মিটিবে না মা ! তােমার একনিষ্ঠ সেবার কি এই ফল! আহা বাছারা ! ভাল করিয়া জামা গায়ে দিতে পায় না, হয়ত সিগারেট খাওয়ার পয়সাও জোটে না!সুবুদ্ধি বলিয়া উঠিল, পয়সা দিয়া জলসায় যাও। কুবুদ্ধি অমনি মাথা উচু করিয়া জানাইল, ভায়া, পয়সা দিয়া এত মজা লুটিলে ত সুখ পাইবে না, পয়সা দিলে ব্যথা প্রকাশ পায় বটে কিন্তু মজা হয় না! কু’ বাবাজির জয় হইল, প্রেস-টিকিট লইয়া জলসা দেখিতে গেলাম। কাতারে কাতারে তরুণেরা তরুণ-ডাঙার দিকে চলিয়াছে—বুঝি মল্লিক-বাড়ীর কাঙালী-বিদায় হইবে। “হাঘরে নৃত্যের কথায় মন বিবাগী হইয়া উঠিতে লাগিল। বাণীকুঞ্জের সম্মুখে আসিয়া দেখি ঘন তরুণারণ্য। এখানে সেখানে এক আধটা বুননা, ভাসা কঁচাপাকার ছিটে, ইহারা তরুণের দলে আত্মগােপন করিয়া আছে।
শার্পণ ১১৪ তরুণের গুতা খাইতে খাইতে কোনাে প্রকারে কুঞ্জ-হাতায় প্রবেশ করিলাম। সেই অবস্থাতেই গেটের উপর টাঙ্গানাে সাইনবাের্ডে লিখিত একটি বয়েৎ চোখে পড়িল- চির-তরুণের চির-মেলায়। আয় বেহেশতে কে যাবি আয়। যুবা-যুবতীর সে-দেশে ভিড়, সেথা যেতে নারে বুঢ়ঢ়া পীর- শাস্ত্র-শকুন জ্ঞান-মজুর যেতে নারে সেই হুরী-পরীর শরাব সাকীর গুলিস্তায় যেতে নারে তারা এ জলসায়। আয় বেহেশতে কে যাবি আয়। ভয়ে ভয়ে একটি তরুণের চশমার কাছে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখিয়া লইলাম। না, এখনাে তরুণ বলিয়া চলিয়া যাইতে পারি। সামনেই একটি টেবিলে গাদা করা বই-শুনিলাম সেদিনকার প্রােগ্রাম। চোদ্দটি পয়সা টাক হইতে বাহির করিয়া একখানি প্রােগ্রাম কিনিয়া ভিতরে ঢুকিলাম।, একটি বিশেষ চিহ্নিত তরুণ আমাদের টিকিট লইয়া আমাদিগকে যথাস্থানে বসাইয়া দিল। প্রথমেই নজর পড়িল রঙ্গমঞ্চের প্রচ্ছদপটের প্রতি মহারাণা প্রতাপসিংহের অরণ্যবাস। মহারাণা-পুত্রের হইতে ইহুরে রুটি লইয়া পলাইতেছে-মহিষী • বেলন লইয়া মারিতে ছুটিয়াছেন, মহারাণা ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া আছেন। দৈনিক পত্রের বিজ্ঞাপনে ‘হলদিঘাট’ স্মরণ হইল। সকলের অজ্ঞাত ০ ১১৫ মনােদর্পণ সারে একটি নমস্কার করিলাম রাণাকে কি এই ইদুরকে ঠিক স্মরণ নাই। তারপর যেদিকেই চাই, উর্ধে-বামে উর্ধে-দক্ষিণে, সম্মুখে পশ্চিমে, বামে দক্ষিণে, তরুণ আর তরুণী, ফিফি গুজ-গুজ, কল-কল খলখল ধ্বনি, প্রােগ্রামের পাতা উল্টানাের খসখস আওয়াজ, বলয়ের নিক্কণ, জুতার খট-খ-সিগারেটের ধোঁয়া ; কুঞ্জমঞ্চ মুখর। নিজের প্রােগ্রামখানি পকেটে রাখিয়া পাশের একটি ছােকরার প্রােগ্রাম দূর হইতেই পড়িতে লাগিলাম। এদিকে নানা ধরণের পরিচয়জ্ঞাপক বাণী কর্ণ কুহরে ঢকিতে লাগিল। ওই রৈবতক বাবু, ওই বিকৃতবদন বাবু, আব্বাস বিটকেল। চাহিয়া দেখি রঙ্গমঞ্চের পক্ষ ভেদ করিয়া দুই ঝাঁক তরুণ-তরুণী বালক বালিকা আসিয়া রঙ্গমঞ্চের ফুটলাইটের কোল ঘেসিয়া স্ত্রীপুরুষ ভেদে দুই দল হইয়া বসিল। আব্বাস মিয়া ও বিকৃতদনবাবু পরস্পর মাথা নাড়িয়া ফিসফিস করিয়া গল্প করিতে লাগিলেন। আব্বাস মিয়ার মস্তক-আন্দোলন ও অর্ধব্যক্ত হাসি দেখিবার জিনিষ! সহসা গেটের দিকে একটা তুমুল কোলাহল উখিত হইল। কুস্থ সকলেই ব্যাপার কি মশায়। ব্যাপার কি মশায়! বলিয়া অনির্দিষ্ট ব্যক্তিগণকে সম্বােধন করিতে লাগিলেন। মহিলারা সন্ত্রস্থ ও চকিত হইয়া উঠিলেন। এমন সময় একজন স্কুল-কসমের তরুণ পাইতে হাঁপাইতে আসিয়া বলিলেন, দেখেছেন মশাই আস্পর্ধা, বুনো বুড়ো হয়ে এখানে আসতে চায় । চারিদিক হইতে রব উঠিল, কে? কে? বের করে দাও। হট্টগােলের মধ্যে যেটুকু বুঝিলাম তাহা এই-বৃদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ও আধাবৃদ্ধ ?
মনােদর্পণ ১৬ শরৎচন্দ্র লুকাইয়া জলসায় আসিতেছিলেন, ধরা পড়িয়া লাঞ্ছিত হইয়াছেন, পিছনে শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্র ও হেরম্বরচন্দ্র মৈত্র মহাশয় তাহাদের দুরবস্থা দেখিয়া সার্জেন্ট-তাড়িত দেশ-প্রেমিকের ন্যায় কলেজ স্কোয়ার অভিমুখে দৌড় মারিয়াছেন। হঠাৎ ঢং করিয়া একটা আওয়াজ হইল ও সঙ্গে সঙ্গে শাঁখ বাজিয়া উঠিল। রৈবতক বাৰু হারমােনিয়ামে সুর দিতেই তরুণের। তারস্বরে গাহিতে সুরু করিলেন- সেদিন সুদূর রাশিয়া হইতে আসিল কাদের বিজয়বার্তা কাদের মহিমা বর্ণিল কবি অসম ছন্দে ব্যাপিয়া চার তা, পঙ্কে ডুধিয়া পঙ্কতিলক কাটিল কাহারা সকল গাত্রে, ব্যথাতুর চিতে গভীর নিদ্রা হয় না কাদের দিনে ও রাত্রে। তারা যে তরুণ নবারুণ-সম যুগে যুগে তারা মারিছে টেক্কা আঁস্তাকুড় ও বস্তি বাহিয়া ছুটেছে বেঘােরে তাদের একা। কৃমি ও কীটের বেদনা কাহারা অনুভব করে নিয়ত চিত্তে, ফোটা ও কুঁড়িতে করে সমজ্ঞান সমান আদর তেল ও পিত্তে। দারিদ্র-দুখে কঁদিছে কাহারা পুষ্ট হইয়া বাপের অন্নে, কাদের লাগিয়া তপস্যা করে দুনিয়ার যত অনূঢ়া কন্যে। নারীদেহে কারা খুজিয়াপেয়েছে কামরূপ,জেরুজালেম, Mecca, তাহারা তরুণ সারাদেশ জুড়ি’ ছুটিয়া চলেছে তাদের একা।
১৭ মনােদর্পণ কাদের বাসনা সকল বিশ্বে টানিয়া নামাতে গভীর পঙ্কে, মনের মানসী খুঁজে ফেরে কারা বারবনিতার লালসা-অঙ্কে। নেশা করে পথে গড়াগড়ি দেওয়া ভাবে কারা মহাবীরের কর্ম, মানুষ হইয়া ঘৃণা করে সদা পালিয়া চলিতে মানুষ-ধৰ্ম্ম- তারা যে তরুণ বচনে-বাক্যে দিকে দিকে তারা মারিছে টেকা, চাকাহীন তবু ছুটিয়া চলেছে দিদিগন্তে তাদের একা। ভগবান বুকে কারা মারে লাথি, শালগ্রাম শিলা ডুবায় মদ্যে- ভাবে শুড়িখানা এই এ দুনিয়া কাহারা ওমরখায়েমী পদ্যে, আপনারে কাম-সন্তান ভেবে, মা’র সতীত্বে করে কটাক্ষ, যীশু ব্যাসদেব কুন্তীপুত্র দিতেছে কাদের কথার সাক্ষ্য- নারীদেহে কারা পাইল খুজিয়া কামরূপ জেরুজালেম মেকা, তাহারা তরুণ, ক্লেদ ও পঙ্কে ছুটিয়া চলেছে তাদের একা। গান শেষ হইলে ঘন ঘন করতালি ধ্বনিতে সকলে প্রশংসা জ্ঞাপন করিলেন। মাষ্টার বাটুল অমনি একটি তেলেনা আলাপ শুরু করিলেন। সেই মধুর আলাপে চারিদিক নিস্তব্ধ হইল, কেমন একটা আবছা অন্ধকার চারিদিক ঘিরিয়া ফেলিল। আব্বাস মিয়ার দোলন ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাইলাম না। এই ভাবটা কাটিতে সময় লাগিল, ইতিমধ্যে কে একজন কি একটা আবৃত্তি করিয়া গেলেন, একটা বৈষ্ণব কীর্তন ও আর একটি রাগিণীও আলাপ করা হইল।
মলাদগণ ১১৮ শ্ৰীযুক্ত চৌতাল চক্রবর্তী ও অরিষ্ট সান্যালের ডুয়েট গানে আমার চমক ভাঙিল । কে উদাসী বনগাঁবাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে, বাঁশী-সােহগে ভিমি লাগে, বর ভুলে যায় বিয়ের কনে। ঘুমিয়ে হাসে দুষ্ট, খােকা, বেরিয়ে আসে দাতের পােকা (বােকা-চঁাদের লাগল ধোকা খােকা-কবির বাঁশীর স্বনে।) খােকা-চঁাদের লাগল ধোঁকা শ্যাওলা-পড়া নীল গগনে। লজ্জাবতীর লুলিত গালে-জোনাকী-যুবা সােহাগ ঢালে, পলিতা জ্বলে ললিতা-ভালে, দলিতা বালা সুখ-স্বপনে! কুকুরবালা অনেকরাতে দেয় না ক’ মুখ এটোপাতে, বিড়াল-বধূ দুধ ও ভাতে তেয়াগি, কঁদে হেসেল-কোণে। সাবল হাতে সিধেল চোরে—ভাসে সে-সুরে নয়ন-লােরে, দোহাই তােরে আর বেঘােরে মারিও না ক’ গরীব জনে। ‘এক্কোর এঙ্কোর!’ ধ্বনিতে সভা মুখর হইল। বিকৃতবদন তরফদার মহাশয় হারমােনিয়ামে হাত দিতেই চারিদিক নিস্তব্ধ হইল। তরফদার মহাশয় প্রারম্ভে একটি মুখভেংচি দিয়া সুরু করিলেন- রকম দেখে ‘বকম বকম করছে পায়রাগুলাে, বগি-বিন্দীর চুলােচুলি হীরা’ বাজায় কূলে। সেজেগুজে ইন্দিরা তার চলল শশুরবাড়ী- কালাদীঘির ডাকাতিতে ঠেলে পরের হাঁড়ি।
মনােদগণ সুচরিতার বর যে হবে টাছে বসে হুকো, আসমানী কয় দিগগজেরে ‘বিলে পােড়ারমুখো। চারু অমল ‘প্ল্যান’ করিল সখের বাগানখানা- রােহিণীকে নিয়ে সেথায় গােবিন্দ খায় খানা। গায়ে গিয়ে নিলে হ’ল বােঠান বিনােদিনীর “কালির বােতল’ শুনে দেখ ফুর্তি সুভাষিণীর। প্রেমের টানে জগৎসিংহ উঠল গিয়ে গাছে, রাজলক্ষ্মী মুজরাে নিয়ে রাজার বাড়ী নাচে। চার ইয়ারে কইল কথা সকল ইয়ার শশানে, নবকুমার ঘুরে বেড়ায় সাগরতীরের বনে। ঐবিলাসের রকম দেখে কমলমণি হাসে, তিলােত্তমা কঁদছে শুয়ে দেবদাসের পাশে। গঙ্গারামের পা লাগিল কাজি খুড়াের পায়ে, শৈবলিনী তাই উঠিল ফষ্টরেরই নায়ে। ব্যথা পেয়ে উপীনদাদা মরল যক্ষ্মাকাশে, নােট চিবিয়ে খেল ভুটে, মন ওঠে না ঘাসে। A চারিদিকে হাসির তুফান বহিয়া গেল। হাসি থামিতেই রৈবতকবাবু উঠিয়া বলিলেন- ‘বিরতি দশ মিনিট রঙ্গমঞ্চ অন্ধকার হইল। ধোয়া, গল্পগুজব, হাসি উচ্ছ্বাস, তাকাতাকি, হাঁকাহাঁকি- দশমিনিট দেখিতে দেখিতে কাটিল।
মনােদর্পণ ১২০ আবার ঘন্টা বাজিল, শাখ বাজিল, গায়ক-গায়িকা আসিলেন, রৈবতকবাবু স্বয়ং গজল ধরিলেন- তেপায়ায় টাকঘড়ি তুই টিটিকিয়ে ক’স কি নিশিদিন । কচি সব পাড়ার ছুড়ি—ওই যা থুরি, বালিকা I mean। তারা সব হয়নি বড়, জলদি কর, বাড়াও বয়স ভাই এখনও বুঝতে নারে ঠারেঠোরে চোখের আলাপি। আজো যে ঐ পরে হায়, ঘুরে বেড়ায় চায় না আঁখি তুলে, কবে যে ঘােটা চিরি আসবে ধরি, বাজবে অাঁখি-বীণ। কবে যে দখনে হাওয়ার বুঝবে power প্রেম-tower-এ উঠে, কালাে ঐ চোখের তারায় হাত ইসারায়, পিই দারু ফিন্। দেখিয়া পথ নিরজন বুকের বসন আপনি খুলে যাবে ঘড়ি তুই চল ছুটিয়া টিকটিকিয়া বাড়িয়ে গতি ক্ষীণ। তােরে যে ফি বছরে অয়েল করে যতন করি কত, সময়ে পারিস নাকি দিতে ফঁাকি ওরে সুই-জীন। ‘এস্কোর এঙ্কোর’ চীৎকার করিয়া শ্রোতারা কুঞ্জ তােলপাড় করিয়া দিতেই গানটি ফিরিয়া গাওয়া হইল। ইহার পর দুই চারিটি সুরের আলাপ হইল। রৈবতকবাবু অকস্মাৎ উঠিয়া দাড়াইয়া বলিলেন, এবার ‘হাঘরে’ নৃত্য। গায়ক-গায়িকারা সকলে ভিতরে গেলেন। রঙ্গমঞ্চ অন্ধকার হইল। দর্শকদের অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম, ইহারই প্রতীক্ষায় সকলে উৎসুক হইয়া ছিলেন। আমারও ঔৎসুক্য কম ছিল না, নিশ্বাস রুদ্ধ করিয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম, কিছু যেন বাদ না যায় !
মনােদর্পণ ঢং করিয়া ঘণ্টা বাজিল, প্রচ্ছদপট উঠিল—আবছা আলােতে এক বিরাট মরুভূমির দৃশ্য চোখে পড়িল-তরঙ্গায়িত বালুকারাশির উপর মনে হইল যেন কিসের কালাে ছায়া নড়িতেছে--ছায়ার সঙ্গে সঙ্গে কায়া পরিলক্ষিত হইল, অন্তরালের ক্ষীণ ঐকতান সঙ্গীত স্পষ্ট হইল, দেখিলাম শ্ৰীমতী বিম্ববতী রাহা চামড়া রঙের সাড়ী পরিয়া ‘হাঘরে’ বা বেদুঈন বালিকার বেশে দেহখানির কোমর পর্যন্ত স্থির রাখিয়া উৰ্দ্ধভাগ দুলাইয়া দুলাইয়া নৃত্য করিতেছেন- অপূৰ্ব। অস্পষ্ট অন্ধকারে মনে হইল বুঝি বা বেহেশতেই আসিয়াছি, ভগবানের-খাস হুরীর নৃত্য দেখিতে। গানের তালে তালে তঁাহার দেহ তরঙ্গায়িত হইতেছে। গানটি এইরূপ- একী অপরূপ মরুডাঙা মাঝারে নাচে একা ‘হাঘরে’ বালা- নাহি নর-পশু-পাখী, হীরক-গুড়ান বালুফৗগ শুধু রহি রহি উজালা। উলটি-পুলটি নারী-বেশবাস ফেলে ছাড়ি যতদূর চলে আঁখি ভূমে গাে- উলঙ্গ মরুবায়ু-ভাবে যাবে যা আয়ু প্রাণপণ করি চুমে, চুলে, ঘুমে গাে। নভে দিগম্বর হাসি-মত্ত বালুকারাশি, দূবে ওয়েসিসে খাসী বহিছে বিরহ-জ্বালা। ম্যা ম্যা রবে পাঁঠা যত—হ’ল কুর্দন রত দেখে গো
আদর্পণ
১২২
জলভারে ভারী হৃদি--দেখিল উঠু-দিদি,
মানবীর নাচ দেখে কত শেখে গাে।
‘হাঘরে’ বালিকা সুখে , নাচে কর ছানি বুকে,
বর-পাড়ানি ছন্দ মরুতে হ’ল বুঝি বেতালা।
সেই সুবিশাল বালু-পরিপূর্ণ মরুর পাশে বুঝি wings-ওয়েসিস
হইতেই খাসী ও পাঠাদের মুখ বাহির হইতে লাগিল। হাঘরে
বালার নৃত্যে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল।
ইহার পর দু’একটা অভিজাত-রাগিণী আলাপ হইল এবং
পরিশেষে কবি গাজী আব্বাস বিটকেল অনডবিক্ৰীড়িত-ছন্দে
গান ধরিলেন-কোরাসে রৈবতকবাবু প্রভৃতিও যােগ দিলেন।
চোর ও ছাচোড় ছিচকে সিধেলে দুনিয়া চমৎকার—
তলপি-তলপা, তহবিল নিয়ে ভাণ্ডারী হুসিয়ার!
বাজার করিয়া চাকর বাবাজি ভারী করে ফেরে ট্যাক—
ঘি-তেল চুরীতে বামুন ভায়ার হয়েছে বিষম ‘ন্যাক’
ভাত নিয়ে যবে বাড়ী যায় দাসী আঁচল তাহার দ্যাখ,
মজাদার ভারী এ-দুনিয়াদারী, সালিয়ে চলা ভার।
চোর ও ছাচোড়
গয়লার মন ময়লা অতীব দুধে ঠেলে দেয় জল
ময়দার সাথে চা-খড়ি মিশায় এমনি ময়দা কল
কোঠা বাড়ী যার সেও ভিখ, মাগে আঁখি করে ছলছল,
নেহাৎ বেচারা ভাবিছ যাহারে সে পাকা পকেটমার
চোর ও ছাচোড়
৫
=
প
৪৮
১২৩ মনােদগণ শ্যামের নামেতে পড় যে গল্প লেখক তাহার রাম- নূতন বলিয়া কিনিলে যে জুতা পুরানাে তাহার চাম— সেলেতে সস্তা জিনিষ কিনিতে দিলে ঠিক দুনাে দাম, ধােপা ব্যাটা ভুল ঠিকানা রাখিয়া হইল পগার পার— চোর ও ছাচোড় চোরা-মার্কেটে যাবে যদি যেয়াে, সামলিয়ে নিজ জেব- চট করে ট্যাঁক খুলিয়া ফেললা না দেখ যদি দ্বিজ-দেব, অনেক ঠেকিয়া অনেক শিখেছি কহিতেছি অতএব মাথায় হস্ত যে বুলাবে তব মতলব আছে তার চোর ও ছাঁচোড় ০ ০ ০ যে বাঁশে ভাবিছ নিখুত নিরেট ধরেছে তাহাতে ঘুণ, সমঝিয়ে চলাে সেই সাধু লােকে খেয়েছে যে তব নুন, বাসরশয্যা ভাব যেথা সেথা গড়াগড়ি যায় খুন, ( হিয়ার, হিয়ার) আছে ত উপায় কর সমবায় ক’সে পড় “ভাণ্ডার চোর ও ছোচোড় ছিচকে সিধেলে দুনিয়া চমৎকার তপি তপা তহবিল নিয়ে ভাণ্ডারী হুশিয়ার! হাসি-হুল্লোড়-কোলাহলের মধ্যে অলস। শেষ হইল। পথে ট্রামে জলসার আন্দোলন শুনিতে শুনিতে বাড়ী ফিরিলাম। সেই দিন হইতে প্রত্যহ ‘হাঘরে নৃত্যের স্বপ্ন দেখিতেছি।
যাদুকর s [ নাটিকা ] ভূমিকা [ এই নাটিকার পাত্র-পাত্রীগণ নির্দিষ্ট নহে। যাহার যাহা খুসী বলিবেন বা করিবেন। কেবল মাত্র যাদুকর-তিনিই এই নাটকের নটরাজ, মাদ্রাজী নটরাজের মত এক ঠ্যাঙ্গে বিশেষ মুদ্রায় অবস্থান করিলেও মুদ্রার জন্য নটরাজ হইবেন—তিনিই থাকিবেন নির্দিষ্ট। অনেকে ভুল করিয়া ভাবিবেন, বুঝি এই যাদুকরের ভেল্কির হাড় নাই, তাঁহাদের অবগতির জন্য বলিয়া দেওয়া আবশ্যক যে, যাদুকর ওস্তাদের হাড় দিয়া চশমার রীম তৈয়ারী করিয়া লইয়া কৌশলে তাহা ব্যবহার করেন। এই নাটিকায় দুইটি সঙ্গীত যােজনা করা হইয়াছে, কিন্তু কে গাহিবে বলিয়া দেওয়া হয় নাই। ইহাই আধুনিক আর্ট। দলের মধ্যে যাহার ধৈৰ্য বেশী সে রঙ্গমঞ্চের উপর হাঁ করিয়া দাড়াইয়া বা বসিয়া থাকিবে এবং দলের মধ্যে যে সব চাইতে ভাল গান গায় সে wings-এর অন্তরালে চা তৈরী করিতে করিতে গান গাহিবে, হাঁ-করা ব্যক্তিকে গান অনুযায়ী মুখ নাড়িতে হইবে। রঙ্গমঞ্চের দুইটি অংশ, যাদুকরের মঞ্চ ও দর্শকগণের মঞ্চ। কখনো যাদুকর কথা কহিবেন, কখনাে দর্শকেরা। দর্শকদেরও আবার দুই ভাগ-একভাগ, যাদুকর সম্বন্ধে অতি বিশ্বাসী, অন্য ভাগের এখনও কিছু সন্দেহ আছে। স্মরণ রাখিতে হইবে যে, যাদুকরের বাড়ী যৌবনে ছিল ময়মন- ১২৫ মনােদর্পণ সিংহে। গানের সময় সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র বন্ধ থাকিবে। কেবল যাদুকরের কথা শেষ হইলেই ঢং করিয়া একবার ঘণ্টা বাজাইতে কাছাকাছি ঘণ্টা না থাকিলে কাঁসার থালা বজাইলেও চলিবে। আরাে একটি কথা এখানে বলিয়া রাখা আবশ্যক-রঙ্গমঞ্চটি এমন ভাবে নিৰ্মাণ করিতে হইবে যেন নক্ষত্রখচিত খানিকটা আকাশ দেখা যায়। বর্ষাকালে এই নাটিকা অভিনয় করা চলিবে না । -তাই নাকি? -হ্যা, হ্যা। -আশ্চৰ্য্য তত! ব্যাঙের ছাতা থেকে একেবারে জ্যান্ত ব্যাঙ, আর কাঠচাপার গাছ থেকে কাঠবেরালী ? এও বিশ্বাস করতে বলেন ? —বিশ্বাস জিনিষটা আপনি আসে মশাই। দুটো চোখ আছে তাে আপনার! বাইরের দৃশ্য পদার্থের একটা inverted image আপনার retina-তে- -বুঝেচি মশাই, বুঝেচি। আজকের programme-টা কি ? —আপনি বােঝেন নি, বুঝতে পারেন না। আইনষ্টাইনের নাম শুনেছেন ? —নাম শুনিনি বটে তবে দেখেচি। সেই তো লম্বা হানে। যাদুকর পথ ভুল হয়ে গেল, পথ ভুল হয়ে গেল! ওগাে আমার জীবন- দেবতা, জন্মাবার পূর্বেই যদি আমাকে এক জোড়া গোঁফ দিতে তা হলে বেরালের মত অন্ধকারেও পথ চিনে নিতে পারতেন। প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য! আহা! নবকুন্দধবল- মনাের্পণ -কি হচ্ছে মশাই ? -দেখতে পাচ্ছেন মা, ওস্তাদকে স্মরণ করছেন। যাদুকর ওয়ান, টু, থি। আপনাদের কারু কাছে একটা রুমাল আছে ? থাক-দরকার নেই। দেখুন জ-গম্ ধাতু ড—চলছে তাই জগৎ- নিত্য পরিবর্তনশীল। ছিল মন্দির, মসজিদ হ’লআজ যে আলমগীর, কালই সেই জীবানন্দ। আজ রাজা ও রাণী, কাল ভৈরবের বলী। বেশ বলেন। -বলবেন না ? শােনেন কত ! যাদুকর কাদছেন না হাসছেন? ঘুমুচ্ছেন না জেগে আছেন ? ওয়ান টু খি-দেখেছেন ঘােড়? -তাই তাে! ঘােড়াই তাে ! হবে না, ঘােড়া হতেই হবে। A horse, a horse, a kingdom for a horse.জানেন ? যাদুকর কিন্তু, ঘােড়। নয়। অন্য কিছু, অন্য কি যে, অন্য কে তা জানে! সত্যিই তাে ঘােড় নয়, তবে?
১২৭
মহােদশ
(গান)
দেখছ যা তা সত্য নহে, কাহার প্রতিবিম্ব,
আমি দেখছি জগন্নাথে, তুমি দেখছ নিম্ব।
আমি দেখছি বৃত্তাকার, তুমি দেখছ লম্বা,
কেমন করে বলবে নহে আঙুল ফুলে রম্ভা।
নামে কি-বা যায় বা আসে
প্রেম করে কেউ, ভালবাসে
কেউ বা কহে মাকাল ফল, কেউ বা কহে বিশ্ব।
আমি দেখছি জগন্নাথে তুমি দেখছ নিম্ব।
অরূপ রূপের ঠিকানা পাও শুকে তাহার গন্ধ
ভূমির ধূলা জুতায় ঢেকে পাও যে ভূমানন্দ!
দুঃখ আসে শ্রাবণ হয়ে,
মােটর-টায়ার যায় যে ক্ষয়ে
ঘােড়া তাে নয়, চোখ মেলে চাও, নয় কি অশ্বডিম্ব ?
আমি দেখছি জগন্নাথে তুমি দেখছ নিস্ক।
==
হায় হায় !
-অহহ! হাে!
2
(২)
-বুঝলেন কিছু?
অপূর্ব !
অনােদর্পণ ১২৮ —ছাই বুঝেছেন ? কেমন ধ্যান-গম্ভীর প্রশান্ত মূর্তি। —তাতে দেখছি। কিন্তু লেজটা ? যাদুকর ওয়ান টু থি-চাদ কই, চাদ কই? • জেগে আছেন, না ঘুমিয়ে আছেন ? দু ফাক করে দাও দেবতা, দু ফাক করে দাও। তীক্ষ্ণধার তরবারি দাও- -এবার কিছু বুঝতে পারছি না। -বুঝবেন কি করে ? প্রােগ্রাম কিনেছেন চার আনা দিয়ে ? না তাে। = যাদুকর তােমার রথের চূড়া দেখতে পেয়েছি, হে রথী, সমস্ত বিশ্বের উপর দিয়ে ঘর্ঘরিত রবে তােমার রথ ছুটুক। বংশীধর, বংশ রক্ষা কর। —উঠছেন যে ! প্রােগ্রাম একটা কিনে আনি। কিছু মাথায় ঢুকছে না। যাদুকর পাহাড় গলিয়ে নদী সৃষ্টি কছ প্রভু, চাল ফুটিয়ে ভাত ! তুমি অসীম, তুমি অসীম! -যাদুকরের বেল-চালের মতো শােনাচ্ছে না তো! –ম, মশায় মন্ত্র ! , যাদুকর উত্যং জাতবেদসং বহন্তি কেতবঃ দৃশে বিশ্বর সূৰ্যম্। ঘুমিয়ে আছেন না জেগে আছেন? ওয়ান টু থি—দেখতে পাচ্ছেন?
মনােদর্পণ
(গান)
ভাঙছ তুমি, গড়ছ প্রভু, করছ তুমি সৃষ্টি
জলের বাষ্প মেঘ না হয়ে করছে জলবৃষ্টি।
শুকিয়ে নিয়ে তামাকপাতা
চিটে গুড়ে মাখিয়ে নে তা
ছিলিম সেজে টেনেই দেখ খােলে কেমন দৃষ্টি-
ভাঙছ তুমি, গড়ছ প্রভু, করছ তুমি সৃষ্টি।
যাদুকর
ওয়ান টু থি-ঘুমিয়ে
থি-ঘুমিয়ে আছেন, না জেগে আছেন? ঘােড়া
কোথায় ? শেষের রাত্রি হ’ল গৃহপ্রবেশ, গােড়ায় গলদ হ’ল শেষরক্ষা,
বৌ ঠাকুরাণীর হাট হ’ল পরিত্রাণ। প্রভু
তােমার নেশায় তুমি মেতে ভাঙছ এবং গড়ছ,
উজাড় ভাণ্ডে ডিম্ব প্রসব কেবল তুমি করছ
শেষ প্রতিভা আছে সময়,
টাটকা দুধে বাসি গােময়।
থামাও প্রভু থামাও তব নতুনতরাে কৃষ্টি,
ভাঙছ তুমি, গড়ছ প্রভু, করছ তুমি সৃষ্টি।
যাদুকর
ওয়ান টু থি-জেগে আছেন, না ঘুমিয়ে আছেন? কৰ্ম্মফল হ’ল
শােধবােধ, শারদোৎসব—ঋণশােধ, রাজা ও রাণী-ভৈরবের বলি,
ভৈরবের বলি—তপতী। প্রভু তরবারি দাও, তরবারি দাও ।
মাের্পণ
-দেখছেন ?
-ব্যস্ত হবেন না, আরাে আছে। ছবি আছে।
আছে না কি ?
হায় হায় !
=
অহহ হহ!
-বল হরি, হরিবােল ।
যবনিকা পতন
চন্দ্রাবলী (গীতি-নাটিকা) ভূমিকা [ জালন্ধররাজকুমারী চন্দ্রাবলী কোটাল-পুত্র ভীষ্মক দেববর্মার নিকট একটি আদিরসাশ্রিত লিপি প্রেরণ করিতে গিয়া রাজমহিষীর প্রধান পরিচারিকা কর্তৃক ধৃত হইয়া রাজমহিষী ও মহারাজের হস্তে যৎপরােনান্তি লাঞ্ছিত হন এবং মনে মনে এই লাঞ্ছনার প্রতিশােধ লইবার জন্য বদ্ধপরিকর হন। প্রতি বৎসর বাসন্তী-পূর্ণিমা রাত্রে অন্তঃপু-উদ্যান-বাটিকায় অন্তঃপুরিকার যে অভিনয় করিতেন, রাজ- কুমারী প্রতিশোেধরূপ সেই অভিনয় পণ্ড করিতে মনস্থ করেন। অভিনয়ের ব্যবস্থার ভার সম্পূর্ণ তাহার উপরেই ন্যস্ত ছিল। বাসন্তী-পূর্ণিমার দিন অভিনয়মঞ্চে সপারিষদ মহারাজা উপস্থিত ছিলেন। অন্তঃপুরিকারা সকলেই দর্শক ছিলেন। রাজমহিষীর পিত্রালয় হইতেই কয়েকজন কুটুম্ব ও আসিয়াছিলেন। সকলেই উদগ্রীব হইয়া অভিনয়ের প্রতীক্ষা করিতেছেন এমন সময় রাজকুমারী ও তাহার সখিগণ, রঙ্গমঞ্চের অভ্যন্তরে আর একটি রঙ্গমঞ্চ সৃষ্টি করিয়া সেখানে নৃত্য-গীতচ্ছলে তাহার অবমাননার বার্তা দর্শক ও শ্রোতাদিগের নিকট জ্ঞাপন করিতে আরম্ভ করেন। ফলে তিনি নির্বাসিত হইয়া একটি দ্যদল গঠন করিয়া তাহার নেত্রীত্ব গ্রহণ পূর্বক জালন্ধর-রাজ্যে মহা বিশৃঙ্খলতা আনয়ন করেন। কিন্তু এ সকল ইতিহাসের কথা ]
মনােদর্পণ
১৩২
স্থান-জালন্ধর-রাজের অন্তঃপুর উদ্যান
কাল—ভগবান তথাগতের জন্মের একশত বৎসর পূর্বে। বাসন্তী-
পূর্ণিমা-রাত্রি, তৃতীয় প্রহর।
কুশীলবগণ
চন্দ্রাবলী—জালন্ধর রাজকুমারী
ঐ সখিগণ
রঙ্গমঞ্চস্থ দর্শকবৃন্দ
নেপথ্য
১ম দৃশ্য
[ যবনিকা উঠিতেই একটি সুদৃশ্য কক্ষ দৃষ্টিগােচর হইল। মেঝেতে
বায়া-তবলা, সারঙ্গী, প্রভৃতি। কয়েক জোড় ঘুঙুর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত
পড়িয়া আছে। কোণের কুলুঙ্গিতে একটি এলাম টাইমপি। দেওয়ালে
পেরেকের উপর একটি সােলার হাট। রাজকুমারী চন্দ্রাবলী ও সখিগণের
প্রবেশ ]
১ম সখী। তবে কি হবে?
২য় সখী। তাই ত গা, কি হবে ?
৩য় সখী। কিসের কি হবে লা? রাত হবে, দিন হবে, ছেলে হবে,
মেয়ে হবে, তারপর বিয়ে হবে।
৪র্থ সখী। মালবিকা, তাের ভাই সবতাতেই রসিকতা। ভারী
বিপদ যে !
৩য় সখী। বিপদের কথাই ত শুধােচ্ছি লা? কি হবে, কি হবে
করে চঁাচালে যে শুধু মরণই হবে।
[ ১ম ও ২য় সখী ইত্যবসরে একজোড়া করিয়া ঘুঙ র পায়ে বঁধিয়া
নাচিতে নাচিতে গাহিতে লাগিলেন ।
মনােদর্পণ
তাইরে নাইরে নাইরে না;
তবে কি হবে, তবে কি হবে ?
সখী চলে যাবে না জানি কবে ?
ওকি ওকি ওকি—চলে যাবে সখী,
তেছ নয়নে চাইবে না,
কোথা এবে সখী দেবে যে পাড়ি,
বিভুই বিদেশে অবলা নারী—নারী—নারী-
চুল না বাঁধিবে,
ঝােল না রাখিবে,
হেলে দুলে নেচে গাইবে না।
কোন্ সে বিদেশে কারে ভালবেসে
প্রেমের উজানে বাইবে না।
৩য় সখী। হ্যা রাজকুমারী, তাই নাকি ভাই ?
২য় সখী। তুই কি আকাশ থেকে পড়লি লা! শুনি নি বুঝি ?
বিদূষকের কাছে কাছে ছোক ছোঁক করে ঘুরে বেড়াবি, তুই আবার
৩য় সখী। তা ভাই, বিদূষক চৰ্মচেটকের চাইতে ভাল ! কি বলিস
ভাই, অগ্ধর?
৫ম সখী। রাজকুমারীর বিপদ, এখন রসিকতা ভাল লাগে না
ভাই।
৩য় সখী। [ রাজকুমারীর সম্মুখে নতজানু হইয়া ] সখি, তােমার
কি বিপদ আমায় বল ।
চন্দ্রাবলী। দুঃখের কথা থাক, ভাই । আজকের এই মধুরাত্রির
উৎসবকে স্নান করতে চাই না বরং একটা গান গাই ।
১৪
সখিগণ সকলে সমস্বরে। অনেকদিন তােমার নাচ দেখিনি—দুঃখ
যখন ভুলতেই চাচ্ছ- একটু নাচ হােক না।
চন্দ্রাবলী এ রঙ্গালয়ে অনেক নাচই নাচলাম ভাই, এখন
বাঁচতে চাই। আচ্ছা, বিদায় নেবার আগে তােদর কথাই রাখি।
[ রাজকুমারীর নৃত্য ও গীত। সখিগণের সারঙ্গী তবলা বায়া
ইত্যাদি বাদন ]
আমারে আর গাইতে বলল না,
মিছে হেথা নাচের ছলনা।
ঘরের কোণে ছিলাম ব’সেবাধন কখন পড়ল খ’সে,
ডাক দিল কে বাঁশির সুরে, বাইরে এস যাদু-সােনা।
সে ডাক শুনে আঁধার হিয়া, ছুটল পথে কুল ভুলিয়া-
আমি চাইনি কিছু, চাইনি পিছু,
ছুট করে নয়ন নীচু
ছিল না ক’ লাভের আশা, তাই না ছিনু দোনা-মােনা।
আপন মনে এলেম নেচেপেলাম গরল সাগর সেছে,
প্রেমের মূল্য যে কলঙ্ক
মাখনু গায়ে সেই সে পঙ্ক,
আনমনা মন-গালে আমার গুরুজনায় মারল ঠোনা।
তাই ত যাব বিদায় নিয়ে—যার চরণে মন দিছি এ ;
—এ সংসারে কতই জ্বালা
প্রেম নিয়ে কে খ্রয় নিরালা ;
হেথা দুধ ভেবে যে ভাড় ধরেছি দেখি তাতে শুধুই চোনা।
১৩৫
মনগণ
[ নেপথ্যে সন্দেহজনক শব্দ। সখীরা সকলে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল।
মহারাজ রঙ্গমঞ্চ ত্যাগ করিয়া গিয়াছিলেন। রাজকুমারী সভার
চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া গান থামাইলেন ]
দর্শকগণ।' এঙ্কোর এক্কোর।
[ সহসা ক্রোধােন্মত্ত অবস্থায় রঙ্গমঞ্চে মহারাজের প্রবেশ ও প্রথম
অঙ্ক শেষ হইতে না হইতেই যবনিকা পতন )
প্রবাসী প্রেসে, ১২০২ আপার সাকুলার রােড, কলিকাতা, সজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত, রঞ্জন প্রকাশারের পক্ষ হইতে সজনীকান্ত দাস কর্তৃক প্রকাশিত
No text on this page.
No text on this page.