Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kishor Kishori
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কিশাের কিশােরী শ্ৰীচিত্তরঞ্জন দাশ
শ্রীসতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
বসুমতী কায্যালয়,
১৬৬নং বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা
মূল্য~এক টাকা
প্রচ্ছদপট
কে ভি সেন এণ্ড ব্রাদার্স লিমিটেড
১৩৩৬
পুকাংশ
আর্ট প্রেসে মুদ্রিত
কিশাের-কিশােরী : তিনের কথা
No text on this page.
কাছে কাছে নাই ৰা এলে--তফাৎ থেকে বাসব ভাল ;
দুটি প্রাণের আধার মাঝে প্রাণে প্রাণে পিদী জ্বল।
এ পার থেকে গাইব গান-ও পার থেকে শুনবে বলে,
মাঝের যত গণ্ডগােল ডুবিয়ে দেব গানের রােলে।
আশার মত চুমাের রাশ পরাণ হতে উডাইব ;
গানের সাথে তোমার ওই মুখে চোখে বুলাই।
পাগল যত পরশ-ভূষা কোমল হয়ে ভাসবে গানে ;
ফুলের মত ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেব তােমর পানে।
লাগবে যখন কোমল করে তরুণ তব প্রাণের পারে ;-
আশার মত-- ফুলের মত--পরাণ ঘের অন্ধকারে,
ভয় পেয়াে না চমকে উঠে, প্রাণের মাঝে চেয়ে থেক
ভেসে আসা প্রাণের নিধি প্রাণের-প্রাণে বেঁধে রেখ।
No text on this page.
আভায
No text on this page.
আভাষ (১) সে দিন নাহি গাে আর যাবে ভালবাসিতাম শুধু মাের হৃদয়ের ভালবাসারে ! ভালবাসি, ভালবাসি, মনে মনে কহিতাম। কারে ভালবাসি আমি নিজে নাহি জানিতাম ! হাসিতাম, কঁদিতাম, শুধু ভালবাসিতাম আপনারই হৃদয়ের ভালবাসারে। ৭ তিনের কথা কল্পনা-গগনালােকে উড়ে উড়ে ভাসিতাম । সত্য বলে ধরিতাম সেই কল্পনারে— মেঘের আড়ালে মাের মায়ানীড় বাঁধিতাম, স্বপন মন্থন করা ফুলে ফুলে সাজাতাম, কত দীপ জ্বলিতাম, কত গীত গাহিতাম, মেঘের আড়ালে মাের সেই মায়া আগারে। ৮ আভাষ কেহ ভালবাসে নাই! তবু ভালবাসিতাম, শুধু মাের হৃদয়ের ভালবাসারে ! ভালবাসা, ভালবাসা, বলে শুধু কাঁদিতাম, কারে কহে ভালবাসা তাও নাহি জানিতাম, মধুর প্রেমের মূর্তি মনে মনে গড়িতাম পূজিতাম দেহহীন সেই দেবতারে ! ৯ তিনের কথা সেই প্রেম নিরাকার কতদিন থাকে আর ? সব শূন্য হয়ে গেল জীবন-ভাণ্ডারে ! নিভিল সে দীপাবলী, ছিড়িল সে ফুলহার, নির্জন পরাণ ভরে উঠিল রে হাহাকার ! সে দিন বহিয়া গেল, যবে ভালবাসিতাম শুধু মাের হৃদয়ের ভালবাসারে। ১০ আভাষ (২) সেই সে প্রথম দেখা, সাঁঝের আঁধারে ! ধূসর গগন-তলে নব-শ্যাম-দূর্বাদলে, ক্লান্তদেহে ছুটে গেনু তােমা দেখিবারে ! সেই সে প্রথম বার দেখি তােমারে । অধরে অমল হাস, আঁখি-কোণে লাজ-ভাস, কে ডাকিল? ছুটে গে’ সাঁঝের আঁধারে ! ১১ তিনের কথা } ! সে কোন্ কুসুম সম, ফুটিলে মরমে মম, অকস্মাৎ একেবারে প্রাণের মাঝারে ! বর্ণে বর্ণে উজলিলে, গন্ধে গন্ধে ভরি দিলে, সকল সােহাগ শূন্য হৃদয়-ভাণ্ডারে ! ওগাে ফুল! ওগাে মিষ্ট। আমি ক্লান্ত, আমি ক্লিষ্ট ! কা’র ডাকে ছুটে এনু ?—দেখিনু তােমারে সেই সে প্রথম বার সাঁঝের আঁধারে। ১২ আভাষ ( ৩ ) কে দেখিল সেই দিন সন্ধ্যাকাশ তলে, সে কোন দেবতা ? কে শুনিল কাণ পাতি শ্যাম-দূর্বাদলে কাহার বারতা ? তুমি দেখেছিলে কিছু ?---আমি দেখি নাই। তুমি শুনেছিলে কিছু ?—আমি শুনি নাই। ১৩ তিনের কথা কে দেখিল বল বল, কারে দেখাইলে, কে চাহিল, কার লাগি বহিয়া আনিলে, সেই শ্যাম-দূৰ্বাদলে নীরব-গৌরবে, আনন্দ মূরতি ? ধ্বনিয়া উঠিল কিগাে মেঘমন্দ্র রবে, সন্ধ্যার আরতি ? ১৪ আভাষ আমি জানি নাই কিছু,তুমি জান নাই, বুঝিতে পারিনি আমি, তুমি বুঝ নাই, তবে কার ডাকে তুমি চলে এসেছিলে ? জেনে না শুনে কেন আমারে ডাকিলে কোন্ মহা-পরাণের নীরব-নির্জনে, বল কোন কাজে ? ১৫ তনের কথা জীবনের কোন্ কুঞ্জে বিরলে বিজনে, কা’র বাঁশী বাজে? নিৰ্বাক্ নয়নে সেই অন্ধকার তলে, কোন্ মহিমায়, শব্দহীন সন্ধ্যা,—সেই শ্যাম-দূর্বাদলে- কোন গীতি গায়? '১৩ আভূষ তুমি কি অবাক হয়ে শুনেছিলে তাই? আমি ত’ শুনিনি কিছু কিছু বুঝি নাই। তুমি কি আভাস পেলে পূজার গানের ? গন্ধ পেয়েছিলে বুঝি পূজার ধূমের ? তাই ছুটাছুটি করে, চলে এসেছিলে আকুল সন্ধ্যায়, ১৭ তিনের কথা সেই সে প্রথম দিন!-আমারে দেখিলে, দেখালে আমায়, আনন্দ মূরতি তব ! কাহার লাগিয়া, বল তব হৃদি-পদ্ম আছিল জাগিয়া ? কে চাহে পূজার ডালি, সাজাইছে কেবা, কাহার পূজার লাগি,-কে করিছে সেবা। ১৮ আভাষ (৪) আমি কেন ছুটে এ’? জানি না আপনি, যখনি দেখি তোমা, আসিনু তখনি । কোন ডাক শুনি নাই, তবু কে ডাকিল, কে যেন ঘুমা’তেছিল—সে যেন জাগিল । আমি ফিরে ফিরে চাই, দেখিতে না পাই, কোন ডাক শুনি নাই কেমনে বুঝাই, কেন যে আসিনু ছুটে ?--তুমি কি বােঝনা, এ নহে কথার কথা,~~-এ নহে ছলনা ? ১৯ " তিনের কথা তুমি কি ভেবেছ মনে ঠিক করেছি, আগে হতে ?—-আমি জেনে শুনে এসেছিনু, মােহিনী মূরতি তব দেখিবার তরে কৌতূহল-পর পরবশ বাসনার ভরে ? সামান্য তস্কর সম চুরি করি নিতে? সৌন্দৰ্য-সম্পদে তব মাের দৃষ্টি দিতে? চাও মাের আঁখি পানে, ও কথা ভেবনা, এ নাহে কল্পনা, --'ওগো, এ নহে ছলনা । ২৩.
কিসের কল্পনা বল, কিসের ছলনা ? কেমনে জাগিবে আজি বিল বাসনা বিগত যৌবনে ? মাের মাঝে নিরন্তর, হাসিত কঁদিত সেই যে চির-সুন্দর :- বাসনায় পূর্ণ প্রাণ, বুকে রক্তরাশি, আপনি উত্তাল হয়ে বাজাইত বাঁশী। মাথায় ফুলের মালা, ফুলধনু হাতে, ফুলের তরঙ্গ তুলি বসন্তের রাতে, তিনের কথা আপনি কঁপিত আর মােরে কঁপাইত। আপনি ভাসিত, আর মােরে ভাসাইত !--- সে ফুল তরঙ্গে ;-কোন্ অপারের পারে, লয়ে যেত ভাসাইয়া মােরে বারে বারে ? -- আঘাতি হৃদয় মাের আছাড়িত তীরে। আবার ভাসায়ে দিত, আসিতাম ফিরে। জীবন ভরিয়াছিল তারি মহিমায়, গরবে গৌরবে তারি, সুখে, বেদনায় ।
আভাষ চাহিলে ফুলের পানে, ভাবিতাম ফুল, এখনি ফুটিবে প্রাণে,করিবে আকুল, পরাণ মুকুল রাশি! ছুটিতাম তাই, হৃদয় মাঝারে মাের, যদি তারে পাই। যদি কভু শুনিতাম, কোন সুন্দরীর সৌন্দর্যের স্তুতিবাদ,অমনি অধীর বাসনার স্রোতে মােরে ভাসাইয়া নিত । তাহারি কল্পিত বুকে মােরে পরশিত।
তিনের কথা আমি সেই কল্পলােকে মুদিয়া নয়ন, তাহারই লাবণ্যের কুসুম চয়ন করিতাম মনে মনে ; মূরতি গড়িয়া, প্রাণে প্রাণে সাজাতাম পরাণ ভরিয়া । কত না সােহাগভরে মালা গাঁথিতাম, সেই মালা তারি অঙ্গে জড়ায়ে দিতাম মনে মনে ! ছুটিতাম তারি অভিসারে, ভাবিতাম, আসিবে সে, ধরিব তাহারে - = ২৪ আভায় সে চির-সুন্দর মাের, নাই আর নাই । বিগত যৌবনে তারে খুজিয়া না পাই । শিথিল হৃদয় আজি, নিষ্প্রভ নয়ন, বক্ষমাঝে রক্তধারা ছুটে না তেমন, উত্তাল উন্মাদ হয়ে ! কঁপে না অন্তরে, নির্বোধ বাসনাপুঞ্জ, পাতার মর্মরে, পুষ্পের পরশে ! সৌন্দর্যের কথা শুনে, উন্মত্ত হয় না হৃদি স্বপ্নজাল বুনে। ২৫ তিনের কথা তবু, কেহ আনে নাই তােমার বার, আমার কাণের কাছে ;-ওগাে কোন কথা, শুনি নাই অপরূপ, তােমার রূপের ! বাজে নাই কোন তন্ত্রী মাের মরমের, তােমা দেখিবার আগে! তােমার লাগিয়া ছিল না পরাণ মাের কঁপিয়া, চাহিয়া । সেই যে আসিলে সেই যে প্রথমবার, ধূসর গগনতলে,-সাঁঝের মাঝার!
আভাৰ তার আগে কেহ মােরে কহে নাই নাম, কোন ঘর আলো কর,--কোথা তব ধাম । ওই যে অধর ব সরলতা মাখা, সকল মাধুরী তার হাসি দিয়ে ঢাকা, সুখসূয্য-কর-সুতি কুসুম সমান : করুণায় ভরাভরা ওই যে নয়ান!~- তার কথা শুনি নাই ;-~~-এগাে মৰ্ম্ম-লতা আপনি আনিলে তুমি আপন বারতা ! ২৭ তবে কেন ছুটে গেনু দেখিতে তােমারে ? আপনি বুঝিতে নারি, নারি বুঝাবারে । সুধু মাের মনে হয়, কে যেন ডাকিল, ভােমার সম্মুখে আনি জাগাইয়া দিল । জ্বলন্ত প্রদীপ হ'তে যেমন জ্বালায়, আর একটী প্রদীপ আনি তাহারি শিখায়, তেমনি আমারে লয়ে ধরিল যখনি, তব রূপ-শিখাপরে অলিনু তখনি !
আভাষ কণ্ঠে মাের জড়াই গৌরবের মালা, কাঁপিতে কাঁপিতে ;—এই যে প্রদীপ জ্বালা, সর্ব প্রাণে, সৰ্ব্ব মনে, ওগাে সব অঙ্গে, ভাসিছি ডুবিছি তারি আলােক-তরঙ্গে। এ আলাে কাহার তরে ?—কেবা জ্বালাইল ? কা’র পূজা লাগি বল প্রদীপ জ্বলিল ? কোন্ দেবতার কোন মন্দিরের গায়, ঝুলে ঝুলে অলিতেছি দিবস নিশায় ? ২৯ তিনের কথা কেন হাস? মিথ্যা একি? অলীক ঘটনা? আমি কি করেছি শুধু স্বপন রচনা ? তবে কেন চিত্ত মাঝে আজো কেঁপে উঠে ? পরাণের কুঞ্জে কুঞ্জে কেন পুষ্প ফুটে ? এই যে দিবস নিশি মাের চারি পাশে হৃদয়ের অতস্তলে, আকাশে বাতাসে, সকল বিশ্বের মাঝে ফুলের সৌরভ। মিথ্যা এ আনন্দ ভাস? মিথ্যা এ গৌরব ?
আভাষ সকল পরাণে মাের সারা দেহময় এই যে দিবস নিশি কি যে কথা কয়, কত না জীবন্ত ভাবে কত শত সুরে, বাজিছে গানের মত এই প্রাণ পূরে! কতুবা গভীর কভু মধুর সরল, কভু কঠিন কভু করুণা তরল ! নিমেষে নিমেষে মােরে হাসায় কাঁদায় নিমেষে নিমেষে মােরে মরায় বাঁচায়।
তিনের কথা এও মিথ্যা ! আমি আছি, তাও মিথ্যা তবে? আমি নাই! তুমি নাই, কিছু নাই ভবে ! মিথ্যা তবে সে দিনের ধূসর গগন! তুমি মায়া, আমি মায়া ! মােদের মিলন মিথ্যা সে মায়ার খেলা! সেই মধু হাসি ? সেই যে অধরে তব উঠেছিল ভাসি? তাও ভুল? তাও স্বপ্ন ? তাও মিথ্যা তবে? চোখের চাহনি সেই ? তাও মিথ্যা হবে !
আভাষ সেই যে কি জানি কেন বক্ষের দোলনি । অবাক্ বিভাের সেই চক্ষের চাহনি। যেন কোন দূরাগত সঙ্গীতের বাণী সচকিত করেছিল সব দেহখানি। স্রোতে ভাসা দেহ মন তরঙ্গ মূরতি । সকল চাঞ্চল্যভরা, অচঞ্চল গতি ফুটিয়া উঠিল সেই—চিরদিন তরে, আমার বক্ষের মাঝে পঞ্জরে পঞ্জরে । ৩৩ তিনের কথা এও তবে মিথ্যা কথা ! শুধু স্বপ্ন বুঝি ? আমি তত হেরিছি সদা দুটি চক্ষু বুজি। হারাইয়া যায় বলে বক্ষ চেপে রাখি! আমি যে হেরিছি সদা—তাও মিথ্যা নাকি ? তবে মিথ্যা, মিথ্যা সেই আনন্দের ভাস, আমি মিথ্যা, মিথ্যা সেই, মায়া সন্ধ্যাকাশ ! মিথ্যা সেই মধুভরা শ্যাম-দূর্বাদল মিথ্যা সেই প্রাণভরা আঁখি ছলছল । ৩৪ আভাষ মিথ্যা সেই সত্য-রূপী মুরতি তােমার, আমি মিথ্যা, তুমি মিথ্যা, সবি মিথ্যাকার। জগৎসংসার মিথ্যা মায়ার ছলনা । বল কোন প্রবঞ্চক দৈত্যের রচনা? মিথ্যা সেই কোমলতা করুণা-রূপিণী । বুঝিবা চোখের দোষে দেখিতে পারিনি ভাল করে স্বল্পালােকে, সেই সে তােমারে, মায়া-মন্ত্রালােক-ঘেরা, সন্ধ্যার আঁধারে !
তিনের কথা কে দিল নয়নে মায়া-অঞ্জন বুলায়ে ? সকল অন্তর মাের কে দিল ভুলায়ে ? ওগাে আমি কারে বলি কারে হেরিলাম, নয়ন-পুত্তলি মম—আঁখি অভিরাম। তবে কি হেরেছি যাহা তুমি তাহা নহ ? ওগাে মায়া ! ওগাে মিথ্যা! সত্য ক'রে কহ। কোন্ দানবের সৃষ্টি দেবীর আকারে দেখা দিলে সেই দিন মােরে ছলিবারে।
আভাষ তবে কোন্ ছদ্মবেশী রূপসী রাক্ষসী আমার এ অন্তরের অন্তঃপুরে বসি যত না মাধুরী ছিল, ছিল যত প্রাণ, একই নিশ্বাসে সব করেছিল পান, চিরস্মরণীয় সেই সন্ধ্যাকাশতলে ? আনন্দ-আবেশ-ভরে নয়নের জলে আমি যে হেরিনু তব নিত্য মধুরূপ ;- প্রাণ-স্রোতে টলমল পদ্ম অপরূপ । ৩৭ তিনের কথা আজো হেরিতেছি তাই সেই সে তােমারে দিবালােক-মহিমায় নিশীথ আঁধারে । সকল জীবন ভরি’ প্রত্যেক নিমেষে, সকল কর্মের মাঝে সব কৰ্ম্ম শেষে। সেই সেই তরঙ্গিত পরাণ মূরতি সকল চাঞ্চল্যভরা অচঞ্চল গতি! সকল লাবণ্য-গড়া রূপে ঢল ঢল, পরাণ-তরঙ্গে সেই স্থির শতদল।
আভাষ সঘন। গগনে থির চপলার মত উজলি জীবন মাের জ্বলে অবিরত। সকল করম মাঝে সব কামনায়, সকল ভাবের মাঝে সব ভাবনায়!-- সকল ঘুমের মাঝে সব চেতনায়, সকল সুখের মাঝে সব বেদনায়, সকল স্বপন মাঝে সব সাধনায়, সকল ধ্যানের মাঝে সব ধারণায় ! ৩৯ তিনের কথা মিলনের মন্ত্রপড়া সেই সন্ধ্যাতলে সেই মধু জ্বল জ্বল শ্যাম-দূর্বাদলে, অবাক্ নয়নে তুমি দাঁড়ালে যখন অন্তহীন মহিমায় !' সেই সে তখন অনিত্য কালের মাঝে একটি নিমেষ, চমকি’ থমকি’ যেন আনন্দে অশেষ ফুটিল গৌরবভরে চির-নিত্য হয়ে ; ঘিরি তারে কালস্রোত যেতেছিল বয়ে! ৪০ আভাষ অফুরন্ত চিরসত্য অনন্ত অশেষ অনিত্য কালের মাঝে সেই সে নিমেষ ! চিরদিন জাগিবে সে আপন গৌরবে । তুমি আমি যত দিন তত দিন রবে ! সেই সে নিমেষ মাঝে তুমি দেখা দিলে তুমি কিগাে চিরকাল তারি মাঝে ছিলে ? কোন মহা-পরাণের বাঁশরী শুনিলে আপনার আবরণ খুলে ফেলে দিলে।
তিনের কথা সেই যে মুহুৰ্ত্ত মাের, তুমি মূৰ্ত্তি তার । নহ মিথ্যা! সত্য তুমি! সত্য রূপাধার ! সত্যই সে দিন আমি নয়নে হেরেছি, সত্যই পরাণ ভরে পরাণে তুলেছি ! অখণ্ড সুন্দর তনু মধুর গম্ভীর, রূপ রস গন্ধ ভরা আত্মার মন্দির। পদতলে কলকলে কাল উৰ্ম্মিমালা শিরে কোন্ দেবতার নিত্য দীপ জ্বালা। ৪২ আভাষ এই যে প্রত্যক্ষ মাের প্রাণ মাঝে জাগে তােমারে বুঝাতে নারি তাই ব্যথা লাগে কেমনে বুঝাব তােমা; ওগাে বক্ষবাসি, আমি সে মূরতি-স্রোতে দিবানিশি ভাসি। ; মনে হয় চিরকাল ভেসে ভেসে যাই কত জনমের সাধ বুকে লয়ে তাই সেই সে মূরতি-স্রোতে দিবানিশি ভাসি। এখনাে সন্দেহ তব ? ফের ওই হাসি ? ৪৩ তিনের কথা আরে আরে অবিশ্বাসি ! আরে রে নির্দয় । ওই তব বক্ষতলে নাহি কি হৃদয় ? সেদিন কি প্রাণে তাের ডাকে নাই বান? ফুলে ফুলে উঠে নাই সকল পরাণ ? ভেসে বহে যায় নাই সকল মরম, ডুবাইয়া সব কৰ্ম্ম, সকল ধরম, ওই কোথাকার সুধা সাগরের পানে, পেতে পেতে নাহি পাওয়া কাহার সন্ধানে ? ৪৪ আভাষ আমার পরাণ ভরে কি গীত গুঞ্জরে । মরমের প্রতি পত্রে কি ফুল মুঞ্জরে ! বুঝাতে পারি না তােরে তাই কাদে প্রাণ, পরাণ ছাপায়ে তাই ভাসে দু’নয়ান! ওগাে মর্মলতা! মরমে জড়ায়ে থাক। আমার বক্ষের মাঝে রাখ মুখ রাখ ! তবে যদি নীরবে গাে পারি বুঝাইতে আজো যাহা পাই নাই হেরিতে শুনিতে । ৪৫ তিনের কথা রাখ বুকে বুক! করগাে হৃদয়ঙ্গম! প্রাণ-গঙ্গা মাের কোন্ সাগর-সঙ্গম পানে বহি চলিয়াছে, দিবসরজনী, কার পিছে পিছে, শুনি কার শঙ্খধ্বনি। বুঝিতে পার না কিছু ? থাক তবু থাক আমার বক্ষের মাঝে লইয়া থাক । তােমারে হৃদয়ে রাখি মাের মনে হয় কে যেন আমার মাঝে সদা কথা কয়। ৪৬.
অভাষ কে যেন ডাকিছে কত মধুর মন্তরে আমাদের দুজনের অন্তরে অন্তরে। কে যেন গাে এসে এসে ফিরে চলে যায়, হেসে হেসে জীবনের বিজন তলায়। ওগো মর্মলতা ! থাক তবু থাক আমার মৰ্ম্মের মাঝে জড়াইয়া থাক। তুমিও শুনিবে প্রাণ ! আমি যদি শুনি ! সেই তার নূপুরের মধু রুণুরুণী ! ৪৭ তিনের কথা তুমিও হেরিবে প্রাণ ! আমি হেরি যদি । চিত্ত-মাঝে রবে বাঁধা নিত্য নিরবধি। দেখিব দেখাবাে তােরে মরমে মরমে জীবন-মরণ ভ'রে জনমে জনমে ! ৪৮ (৬) কেমনে উঠিবে ফুটি শুধু এক দিনে ? আরে ! আরে! ফুল যবে হেসে ফুটে উঠে শ্যাম পল্লবের বুকে, সুখ-সূৰ্য-করে, একটি প্রভাত লাগি, এক নিমেষের মাঝে, সেকি শুধু সেই মুহূর্তের লীলা ? তার তরে করেনি কি আয়ােজন সমগ্র জীবন-লীলা যুগ যুগান্তের, জন্ম জন্মান্তর ধরে ? অনন্ত কালের শুভ সঙ্গীতের মাঝে উঠে সে ফুটিয়া। ফুটে ফুটেনা ফুল শুধু এক দিনে! ৪৯ তিনের কথা সেই যে মিলিনু দোহে সন্ধ্যাকাশতলে সে কি শুধু মুহূর্তের মিলন-উৎসব ? অকস্মাৎ অকারণ সামান্য ঘটনা? মুহূর্তে আরম্ভ তার মুহূর্তেই শেষ ? সেই যে দরশ তব, আঁখি অনিমেষ, সে যে মাের শুভ-দৃষ্টি জনমে জনমে চির পরিচিত। সে যে অনন্ত কালের! যােগভ্রষ্ট যােগযুক্ত যুগ যুগান্তের ! তােমারে দেখেছি শুভে ! কত শত বার। আবার দেখিনু সেই সন্ধ্যাকাশতলে ?
যােগভ্রষ্ট আমি! কেমনে বর্ণিব বল অনন্ত কালের সেই মাধুৰ্য-কাহিনী? যুগে যুগে কেমনে যে পরশ লভেছি। জনমে জনমে কেন হারায়ে ফেলেছি। কেনবা পাই সেই সন্ধ্যাকাশতলে । ফুটিয়া উঠিলে মরি ! মধু-জ্বলজ্বল উজল রসের মূর্তি! কত না কল্পনা করিছে, জীবন যেন স্বপন-বাহিনী! যেন ধরা দেয়, শত শত জনমের কত না হাসির ধ্বনি কত অশ্রুজল । ৫১ তিনের কথা জীবন-লীলার সেই প্রথম প্রত্যুষে মনে হয়, ছিনু মােরা শিলাখণ্ড দুটি ! অগাধ আঁধারে যেন ভেসে ভেসে উঠি দুইটি উপল খণ্ড সৃষ্টি পারাবারে ! বুকে বুক লাগা, সেই যে প্রথম জাগা প্রাণদীপ্ত মন্ত্রমুগ্ধ নিৰ্বাক্ অবাক্ দুইটি পরাণ ! কে দিল তরঙ্গ তুলি? আবার ডুবিনু কেন আঁধার নির্জনে ? তরঙ্গসঙ্কুল সেই গভীর অর্ণবে জীবন-লীলার কোন্ প্রথম প্রত্যুষে ?
আভাষ তারপরে কত কাল কত যুগ ধরে কালের তিমির-স্রোত বহে চলে যায় কোন্ চিহ্নহীন পথে? আলােকবিহীন কোন্ ঘন-তমসায় ? কোন্ স্মৃতিহীন, পুঞ্জীভূত অন্ধকার অরণ্যের মাঝে হয়ে যায় লীন! সেই মহা শূন্যে যেন অট্ট হাসে পূর্ণ করি দিক দিগন্তর নৃত্য করে উন্মত্ত সে কোন্ দিগম্বর। তারি মধ্যে তুমি আমি ছিনু কি নিদ্রায় কত দিন কত কাল কত যুগ ধরে ?
তিনের কথা তারপর হেসে উঠে নব-বসুন্ধরা ফলে পুষ্পে ভরা ভরা ! কৌতুকে অপার চাহিল নয়ন মেলি নব সূৰ্যপানে। মােরাও জাগিনু দোহে! মধুবন মাঝে আমি বনস্পতি ওগগা! তুমি বনলতা। কি আনন্দে কি গৌরবে মেলিলাম আঁখি! আঁকড়িয়া ধরিলাম কঠিন হৃদয়ে, মধুর কোমল কান্তি সেই লতিকারে। গলাগলি জড়াজড়ি মিলন রভসে ! হেসে হেসে উঠিল সে নব-বসুন্ধরা ! ৫৪ আভাষ সেই বার সেই মাের ভ্রমর জনম ! গুন্ গুন্ গাহি গান ভ্রমি বনে বনে! বুকে লয়ে জন্মান্তের বিরহ-বেদন গুন্ গুন্ গাহি গান ভ্রমি আনমনে। অকস্মাৎ এক দিন কানন-প্রান্তরে অপূৰ্ব কুসুম-রূপে উঠিলে ফুটিয়া ! আনন্দেতে আগুসারি মিলন-তৃষায় যেমনি আসিনু কাছে, কোন্ ঝটিকায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে তুমি কোথায় লুকালে! খুঁজিতে খুঁজিতে গেল ভ্রমর-জনম।
তিনের কথা তারপর মনে আছে ? ভেলায় ভাসিমু তুমি আমি নরনারী জীবন-সাগরে । আশ্চৰ্য্য অবাক হয়ে আমি চেয়ে ছিনু, কি জানি কেমন করে তুমি চেয়ে ছিলে । কুসুমিত মুখকান্তি ; মধু দেহলতা; দোল দোল জ্বল জ্বল রূপের গৌরবে? সে কি প্রেম? ভালবাসা ? আকাক্ষা? বাসনা ? কোন্ টানে চেয়ে থাকা এমন নীরবে ? চাহিতে চাহিতে কেন উঠিল তুফান ? তুমি আমি ডুবিলাম সে কোন্ সাগরে ?
তারপর ? পশুপক্ষী করিনু শিকার ; ভীষণ অরণ্য মাঝে ব্যাধের জনম। একদিন বনপ্রান্তে ত্রস্ত। সে হরিণী যেমনি ফেলি তারে বাণবিদ্ধ করে, সজল সরােষ আঁখি ভরা বেদনায় কোথা হতে বাহিরিলে বন আলাে করে ! নতজানু হয়ে কত ক্ষমা চাহিলাম, কহিলে না কোন কথা, ছুটে চলে গেলে! ওগাে বনলতা! ওগাে করুণা-রূপিণী । সে জনমে আর কভু করিনি শিকার।
তিনের কথা বন শকুন্তলা তুমি বনের মাঝারে লতা-পাতা-ঘেরা ক্ষুদ্র মােদের কুটীর ! এ জনমে কাঠুরিয়া কাঠ কাটিতাম ফল মূল জল তুমি বহিয়া আনিতে। একদিন আক্রমিল কৃতান্তের মত নিষ্ঠুর দস্যর দল ঘাের অন্ধকারে ! শানিত ছুরিকা লয়ে কঁপিতে কঁপিতে তােমার আমার বক্ষে বসায়ে দিলাম। সেদিন একত্রে মােরা যাত্রা করিলাম কোন্ টানে কি আশায় নিশার মাঝারে ।
পরজন্মে জনমিলে মধু পদ্ম-আঁখি রাজার নন্দিনী হয়ে ! তব মালঞ্চের আমি ছিনু মালাকর! প্রভাতে সন্ধ্যায় গাঁথিতাম মালা, তুলি ফুল কাননের ! কি জানি কি বহে যেত শিরায় শিরায় ! কত হাসিতাম, কাঁদিতাম থাকি থাকি । একদিন মালা দিতে কি দিনু কি জানি ! ধরা পড়ে গেনু! পরদিন বধ্যভূমে যবে নিবু নিবু প্রাণ, উর্দ্ধে চেয়ে হেরি জ্বলিছে গবাক্ষে দুটি অশ্রুভরা আঁখি।
তিনের কথা সৈনিকের বন্ধু তুমি সে কোন্ জনম ? ছিলে মাের বক্ষ ভরে। দেহ মন গড়া অনলে বিদ্যুতে ফুলে ! চোখে হােমশিখা ! চপলা চমকে বুকে ! অঙ্গের লাবণি কুসুম-স্তবক সম মধুর কোমল ! অকস্মাৎ রণভেরী উঠিল বাজিয়া ! শত্রুর কৃপাণ যবে লাগিল হৃদয়ে, একবার ভয় হ’ল পাছে যত্নে রাখা, চিত্ত মাঝে তব মূর্তি ছিন্ন হয়ে যায় ! পরক্ষণে হাসিলাম ; ফুরাল জনম !
আভাষ আমি কবি, রাজগৃহে গাহিতাম গান প্রহরে প্রহরে ! কত শত জনমের মিলন বিরহ-ব্যথা সুখ দুঃখ আশা ফুটিয়া উঠিত যেন সেই জনমের প্রত্যেক গানের মাঝে ! কারে খুজিতাম ? একদিন হেরিলাম লতার আড়ালে কাল’ কাল’ দুটি চোখ, ঢাক ঢাক যেন এলােমেলাে চুলে! সেই দৃষ্টি, সেই হাসি ! সেই কত জনমের চেনা চেনা ভাব । চমকিয়া উঠিলাম! বন্ধ হ’ল গান। ০ তিনের কথা তারপর ? পরজন্মে আমি চিত্রকর, রূপসী রমণী তুমি ধনীর সংসারে ! বহুজনসমাকীর্ণ বিপুল সে পুরী ! একদিন তােমারই আলেখ্য আঁকিতে আমারে লইয়া গেল নয়ন বাঁধিয়া কত রাস্তা গলি ঘুচি কত সিংড়ী দিয়া একটি কক্ষের মাঝে ! সম্মুখে দর্পণ, তারি মাঝে ভাসিতেছে প্রতিবিম্ব তব । হৃদয়ের রক্ত দিয়া আঁকিন্তু সে ছবি ! হেরি কহে সবে, অপূৰ্ব্ব এ চিত্রকর ! ৬২ আভাষ মনে কি পড়ে না সেই শিবের মন্দির ? আমি যে পূজারী ছিনু সেই দেবতার। তুমি সেবাদাসী! কোথা হতে এসেছিলে নাহি জানি! দিবারাত্র মন্দির-প্রাঙ্গণে ফুল্ল কুসুমের মত রহিতে পড়িয়া। সেই ঢল ঢল ঢল অঙ্গের লাবণি ! একদিন পূজা শেষে, আকুল অধীর মওপ্রাণে যেই তােমা বক্ষে বাঁধিলাম, চূর্ণ হয়ে পড়ে গেল মস্তকে আমার সেই জনমের সেই শিবের মন্দির।
তিনের কথা একি সত্য? একি মিথ্যা? জানি না জানি না জানি শুধু এই লীলা অনন্ত কালের ! জানি আমি জন্মে জন্মে তােমারে পেয়েছি, লভেছি পরশ কত ভাবে কত বার । তারি চিত্রগুলি যেন ভেসে ভেসে আসে আলােক ছায়ার মত মাের চিত্ত-বাসে। তােমারেই পাই ওগগা, বারে বারে বারে তরঙ্গের মত মাের মরম বেলায়। মিলনে বিরহে কত! আর তারি সনে যেন বেজে উঠে অনাদি কালের বীণা। ৬৪ আভাষ অনন্ত কালের লীলা নহে একদিনে । সৃষ্টির প্রথম হ’তে চির প্রসারিত মাের বাহু দুটি, জন্ম জন্ম করি ভেদ বিদ্ধ করি ব্যাপ্ত করি যুগ যুগান্তর ! তারি আলিঙ্গন মাঝে, ধরা পড়ে গেলে সেই দিন! যেন কোন্ মহাদেবতার মহা-মিলনের তরে মিলেছি আমরা! যুগে যুগে জনমে জনমে বার বার । তাই সন্ধ্যাকাশতলে উঠিলে ফুটিয়া; ফোটনি ফোটনি প্রাণ, শুধু একদিনে। ৬৫ তিনের কথা (৭) জীবন সাধন ধন তুমি যে আমার । কত জন্ম পরে তাই হেরিনু আবার, এমন মধুর করে এমন পরাণ ভরে। কোন দিন হেরি নাই পাই নাই কোন দিন; এস নাই কোন কালে ফোট নাই কোন দিন, আভাষ . এমন মধুর করে এমন পরাণ ভরে। সব শূন্য পূর্ণ করে এমন মরম ভরে। তুমি যে মধুর ! তুমি যে বঁধুর তুমি যে মধুর মধু মাধুরী আমার । এমন হারাণ ধন পেয়েছি আবার।
তিনের কথা বারে বারে সেই পাওয়া না-পাওয়ার মাঝে কত কি যে ফুটেছিল কত ঝরিয়াছে! কত ফুল কত হাসি, কত ভালবাসা-বাসি, কত দুখ কত সুখ, কত ভুল কত চুক, কত-না অজানা ত্রাস, কত বাঁধনের পাশ, مان আভাষ কত সােহাগের কথা, কত বুকূ-ভাঙ্গা ব্যথা, কত আশা কত গান, কত নিরাশার তান, মিলনের ভাতি বিরহের রাতি ; যুগে যুগে সেই পাওয়া না-পাওয়ার মাঝে কত কি যে গড়েছিল কত ভাঙ্গিয়াছে। ৬৯ তিনের কথা জনমে জনমে পাওয়া না-পাওয়ার মাঝে যত কিছু ঝরেছিল সবই ফুটিয়াছে— মরণের পরে পারে এক সঙ্গে একেবারে, এমন মধুর করে এমন পরাণ ভ'রে । যত ভাঙ্গা গড়েছিল, যত গড়া ভেঙ্গেছিল, সবই যে গো প্রাণপুটে রাঙ্গা হয়ে ফুটে উঠে, অকস্মাৎ একেবারে সেই আলাে অন্ধকারে। প্রাণ ঢল ঢল। আঁখি-ভরা জল ! শত জনমের পাওয়া ন-পাওয়ার মাঝে যতনা হারাণ ধন, সবই মিলিয়াছে। ৭১ তিনের কথা যাহা কভু পাই নাই, যার ওরে আশা না জেনে না শুনে প্রাণে বেঁধেছিল বাসা। জনম জনম ধ'রে ৪ গুন গাহি গান ল ল দুনয়ন খুজিত খুজিত যারে ? ওগো পাইলাম তারে। * ৭২ স্বাভাষ সেই সন্ধ্যাকাশতলে নব শ্যাম-দূর্বাদলে, একেবারে অকস্মাৎ ভরির প্রাণপাত । ওগো তুমি সেই । তুমি সেই, সেই । যারে পাই নাই কও? যার তরে আশা, জীবন কমল-বনে বঁধছিল বাসা ।
তিনের কথা জন্মে জন্মে ঘুরে ঘুরে এই যে মিলন। এর তার ছিল নাকি প্রাণে আকিঞ্চন শতেক জনম ধ'রে সকল পরাণ ভবে ? সকল জনমে আখি চাহেনি কি থাকি থাকি কোন্ সুরের পানে ভরা বর্ণে ফুলে গানে। ৭৪ আভাষ তারি চিত্র স্বপ্ন বেয়ে ছিল নাকি মৰ্ম্ম ছেয়ে ? তারি গন্ধ চিত্ত-হারা করেনি কি আত্মছাড়া ? গীত কাতরতা, মিলন-বারতা আনে নাই থাকি থাকি ? হে প্রাণ-রতন। শত জনমের চাওয়া এ মধুমিলন! ৭৫।
তিনের কথা যে ফুল ফোটেনি কভু, তারি গাঁথা মালা। যে দীপ জ্বালিনি ওরে! সেই দীপ জ্বালা ! অন্তরের অঙ্গে অঙ্গে কে দিল দুলায়ে রঙ্গে ? যে ফুল ফোটেনি আগে সেই ফুলে গাঁথা মালা ! এই যে হৃদয় মাঝে কি সুন্দর কুঞ্জ রাজে! ৭৬ যে দীপ জ্বলেনি আগে ওরে! তারি আলাে জ্বালা ! যত সাধ সাধনার যত গীত অজানার, ফোটে কি মরমে শতেক জনমে ? আঁখি মুদে চেয়ে দেখ, কি শােভন মালা ! প্রাণে প্রাণে চাও প্রাণ! কি আলােক জ্বালা। ৭৭.
তিনের কথা ওরে দেখ দেখ দেখ কি জানি জেগেছে। হৃদয়-কমল মাঝে কি ধূম লেগেছে ! ভাটায় ফোটে যে ফুল মাের ফুলে যে ফুটেছে। ফুলে ফুলে ফুলাকুল ফুলে ফুলে ফুটেছে । লালে লালে রাঙ্গা হয়ে ফুটে ফুটে উঠেছে। ৭৮ আভাষ কে নেয় রে মধু লুটি হেসে হেসে কুটি কুটি ? তালে তালে মধু ঢালি কে দেয় রে করতালি ? মধুর তরঙ্গে কে নাচেরে রঙ্গে ? ওরে দেখ দেখ দেখ কি ধুম লেগেছে। পরাণ-কমল মাঝে কে জানি জেগেছে । ৭৯ তিনের কথা যুগে যুগে পাওয়া পাওয়া না-পাওয়া মিলন যেন রে স্বার্থক হ’ল! পূরিল জীবন! ওগাে ফুল ওগগা মিষ্টি। ধন্য ধন্য সব সৃষ্টি । * ধন্য আমি ধন্য তুমি পুণ্য সে মিলন-ভূমি ! কে বলে রে ধন্য ধন্য ? কে দেয় রে করলি ? be . আভাষ তােমার আমার মাঝে অপর কেহ কি আছে ? । কে বলেরে ধন্য ধন্য, এ কা’র নৃপুর বাজে? কার পদরজঃ পরাণ পঙ্কজ শোভা করে ? হে মিলিত! হে মধু-মিলন। হে পূর্ণ অপূর্ণ তুমি ! ধন্য এ জীবন ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.