Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mondar-kusum

2009/09/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মন্দার কুসুম।
(পৌরাণিক বিয়োগান্ত-দৃশ্য কাব্য)
‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু,
অনলে পুড়িয়া গেল ।
অমিয়া-সাগরে, সিনান করিতে,
সকলি গরল ভেল !”
জ্ঞানদাস।
কলিকাতা,
৩৭ নং, মেছুয়াবাজার স্ট্রীট-বীণাযন্ত্রে
শ্রীশরচ্চন্দ্র দেব দ্বারা মুদ্রিত।
শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কর্তৃক
প্রকাশিত।
সংবৎ ১৯৪০-৪১

No text on this page.

চঞ্জ
উৎসগ।
শ্রদ্ধাস্পদ
শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রমথনাথ মুখােপাধ্যায়
মহাশয়—সব জজ-বর্ধমান।
মহাশয়।
দেবের নির্মাল্য-কুসুম সকলে মস্তকেই অৰ্পণ করিয়া থাকে।
আমাদের হতভাগিনী পল্লীখানির মধ্যে যে কয়েকটী রত্ন আছেন,
আপনি তাহাদের চূড়া! সুতরাং একমাস কাল আরাধনার পর
মহর্ষি ব্যাসদেবের চরণ-প্রান্ত হইতে এই অভিনব নিৰ্মালটী সংগ্রহ
করিয়া আপনাকেই অৰ্পণ করিলাম, যথোচিত সমাদর প্রদর্শন করিলে
কৃতার্থ হইব।
আপনার
আসাম—শিলং।
১০ই বৈশাখ,
সংবৎ ১৯৪০-৪১।
।

No text on this page.

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ । পুরুষ। মদন। ভীষ্ম। ••• + । ০ ০ ০ জামদগ্ন্য। হােত্ৰবাহন ঋষি, কাশীরাজ-মহিষীর পিতা। অকৃতব্রণ জামদগ্যের শিষ্য । বিচিত্রবীর্য্য শান্তনুর কনিষ্ঠ পুত্র। শা সৌভপতি। পুষ্পকেতু শারে সহচর। কাশীরাজ ও অন্যান্য রাজগণ, কধুকী, সৈনিক-পুরুষ ও পরিচারক প্রভৃতি। স্ত্রীগণ। ০ ০ ••• রতি। সত্যবতী। অম্ব। অম্বিকা অম্বালিকা কাশীরাজের কন্যায়। সুরবালা মন্দাকিনী রাজকন্যাগণের সখী। কাশীরাজ-মহিষী ইত্যাদি।

No text on this page.

মন্দার-কুসুম প্রথম অঙ্ক। হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদাস্তর্গত একটি প্রকোষ্ঠ। (সত্যবতী ও ভীষ্ম আসীন ) ভীষ্ম।-না মা । আমাকে এ বিষয়ে ক্ষমা করুন। সত্য।—বাছা ! আমার অনুরোেধ তােমাকে রাখ- তেই হবে। (ভীষ্মের হস্তধারণ পূৰ্ব্বক) বাবা ! এই আমি তােমার হাতে ধরে বলচি, আমার এ কথাটি তােমায় শুনতেই হবে। ভীষ্ম ! তুমি প্রতীপবংশের চূড়ামণি—প্রতীপবংশের গৌরব—তােমাদ্বারাই সে বংশের সহস্র গুণে মুখ উজ্জ্বল হবে। আমি তােমার গভধারিণী নই বটে—কিন্তু তােমার মা ত?—তা বাছা! মার এ অনুরােধটী তােমাকে রাখতেই হবে। আমার বিচিত্রবীৰ্য্য কনিষ্ঠ“তুমি তার জ্যেষ্ঠ, তুমি থাকতে তার রাজ্যশাসন করা লােকতঃ ধৰ্ম্মত বিরুদ্ধ। অতএব ভীষ্ম । আমার অনুরােধ, তুমি ইচ্ছামত বিয়ে করে এইরূপে চির- মার-কুসুম। কাল তােমার পিতার সিংহাসন উজ্জ্বল কর। আমার বিচিত্রবীৰ্য্য চিরকাল তােমার আজ্ঞাবর্তী হয়ে থেকে, তােমার মনােমত কাজ করতে কখনই বিমুখ হবে না। ভীষ্ম ! একে আমি চিত্রাঙ্গদের শােকে জৰ্জরীভুত হয়ে আছি, তার উপর আবার এখন আমার এ অনুবােধটি অবহেলা করে আরাে দ্বিগুণ জ্বালা দিও না। আমি এত দিন তােমাকে এ অনুরােধ করিনি কিন্তু আজ কেন যে আমার মন এমন হয়েছে তা বলতে পারিনে, মনে হচ্চে যেন তুমি বিয়ে করে তােমার পূর্বপুরুষের সিংহাসনে বসে রাজ্যশাসন করলে, আমি তাতে পরম সুখী হব—চিত্রাঙ্গদের শােক-জ্বালা সমস্তই ভুলে যাব দুটী বউ নিয়ে রাজার মা হয়ে এই পৃথিবীর সকল সুখ উপভােগ করবে ? ভীষ্ম। মা ! ক্ষমা করুন। আমাকে বার বার আর এ অনুরােধ করবেন না। আমি কোন ক্রমেই আপ- নার এ আজ্ঞা প্রতিপালন করতে সক্ষম নই। জননি! আপনার কি স্মরণ নাই—পিতৃ-দেবের নিমিত্ত যখন আমি আপনার পিতার নিকট গিয়ে তার মনােগত অভি- প্রায় ব্যক্ত করি, এবং আপনার পিতার সন্তোষার্থে বহু- সংখ্য রাজা এবং অন্যান্য লােক সমূহের সমক্ষে আমি প্রথম অঙ্ক। যে প্রতিজ্ঞা-পাশে বদ্ধ হয়েছিলেম-“কখন রাজ্যের আশা এবং ইহ জন্মে কখন দার পরিগ্রহ ক’রবাে না— যতি-ভাবেই জীবন অতিবাহিত করবে। সে প্রতিজ্ঞা- পাশ কি এখন আমি ছেদন ক’রবাে? মা! আপনাকে অধিক আর কি বলবােযদ্যপি এই মুহূর্তে চন্দ্র সূৰ্য্য কক্ষভ্রষ্ট হয়ে ভূতলেপতিত হয়,—সুমেরুশৃঙ্গ ধূলিরাশির ন্যায় পবনপথে উডডীন হয়—তথাপি ভীষ্মের সে প্রতিজ্ঞা কখনই লজ্জন হবার নয়। মা ! আমি আপ- নার অনুরােধে অনেক করেছি আমার ইচ্ছা—আমার উদ্দেশ্যের বিপরীতেও প্রিয় বৎস বিচিত্রবীর্য্যের বয়ঃ- প্রাপ্তি পর্যন্ত এই রাজ্য-শাসন করতে স্বীকৃত হয়েছি, কিন্তু মা ! আজ আমাকে ক্ষমা করুন—আমি কোন প্রকারেই আপনার এ অনুজ্ঞা প্রতিপালন করতে সক্ষম নই। সত্য। ভীষ্ম ! তবে চিরকালই কি আমাকে এই নিদারুণ মনঃকষ্টে জ্বলতে হবে ?—আমার এ পােড়। অদৃষ্টে কি বিধাতা কোন সাধই মেটাতে দেননি ? (রেদিন) ভীষ্ম। মা ! শান্ত হােন্।—আপনার বিচিত্রবীৰ্য্যই একা এক সহস্র। আপনি অনুক্ষণ কেবল তারই কল্যাণ । ।

+ । । । ৪ মারু-কুসুম। কামনা করুন।কুমার এখন প্রায় বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে, আমি মানস করেছি যে অচিরাৎ কুমারের পরিণয় কাৰ্য্য সমাধা করে—তারে পিতৃ-দেবের সিংহাসনে অভিষিক্ত করে—আমার জীবনের সুখের চরম-সীমা উপভােগ ক’রবে। এক্ষণে আপনার অনুমতি হলেই আমি তার বিবাহের আয়ােজন করি। সত্য। ধৰ্ম্মাত্মন, ! তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হােক। কিন্তু একটি কথা,-কুমার কি তার জ্যেষ্ঠের মত অস্ত্র আর শাস্ত্র বিদ্যায় নিপুণ হয়েছে ? ভীষ্ম। মা ! ভীষ্ম যার অগ্রজ-ভীষ্ম যার কল্যাণ- কামনা করে—ভীষ্ম যার অস্ত্রশিক্ষাদাতা-তার বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। সত্য। বীর-চুড়ামণি ! তােমাকে আর কি আশীৰ্বাদ ক’রবাে? তুমি সকল প্রকার আশীর্বাদের অতীত ! ভীষ্ম ! তুমি যে আজ আমায় কি সুখী করলে তা ব’তে পারিনে। বৎস ! তােমার মত ধৰ্ম্মাত্মা বীরচূড়ামণি যারে মা বলে ডাকে, তার অন্তরে যে কি প্রকার আনন্দ হয়, তা সে নিজেই বুঝতে পারে না। এখন প্রার্থনা করি, বিচিত্র-বীর্যেরও যেন তােমার মত ধৰ্ম্মে মতি থাকে।

প্রথম অঙ্ক। ভীষ্ম। মা ! আপনার আশীৰ্বাদ অবশ্যই সফল হবে। কুমার যুদ্ধবিদ্যায় সুদক্ষ হয়েছে। এবং কুলা- চাৰ্যও বলেছেন যে শাস্ত্রেও সে উত্তমরূপ ব্যুৎপত্তি লাভ করেছে। অতএব মা! আপনার বিচিত্র-বীর্যের দ্বারা যে পিতৃদেবের সিংহাসন সমধিক উজ্জ্বল হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। সত্য। ভীয় ! তােমার এই সংবাদে যে আমি কি সুখী হ'লেম তা বলতে পারিনে। এই যে কুমার আমার এই দিকেই আসছেন। ধনুঃশর ও অসি প্রভৃতি অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত বিচিত্র বীর্যের প্রবেশ। বিচিত্র। আৰ্য! ভগবান কুলাচাৰ্য অদ্য আমার অস্ত্র-চালনা পরিদর্শন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এবং অনুরােধ করেছেন যে, রঙ্গস্থলে আপনিও উপ- স্থিত হয়ে তার আনন্দ বর্ধন করেন ভীষ্ম। কুলাচার্য্যের আজ্ঞা শিরােধার্য। তুমি তারে আমার প্রণাম জানিয়ে বলগে যে, আমি অচিরাৎ রঙ্গ- ভুমে উপস্থিত হয়ে তার চরণ সন্দর্শন করবে। বিচিত্র। আরে যা অনুমতি—(সত্যবতীর চরণে প্রণতি পূৰ্ব্বক) মা! আশীৰ্বাদ করুন।

মন্দার-কুসুম। সত্য। এস বাবা ! ( বিচিত্রবীর্যের মস্তকে হস্ত প্রদান পূৰ্ব্বক)সুরপতি তােমার সহায় হােন। (ভীষের পদধূলি লইয়া বিচিত্রবীর্যের প্রস্থান)। পরিচারকের প্রবেশ। পরি। (ভীয়েব প্রতি) কাশীরাজের কাছ থেকে একজন দূত এই পত্রখানি নিয়ে এসেছে। (পত্র প্রাদান) ভীষ্ম। আচ্ছা, দূতের যথােচিত অভ্যর্থনা করে উত্তমরূপ পরিচর্যা করগে, আমি শীঘ্রই রাজসভায় উপস্থিত হ’চ্চি। পরি। যে আজ্ঞা (প্রণিপাত পূৰ্ব্বক প্রস্থান) ভীষ্ম। (পত্র পাঠ করিয়া সহাস্যে) মা । প্রজাপতি বুঝি আমাদের মনােভিলাষ পূর্ণ করেন। কাশীরাজের তিন কন্যা স্বয়ম্বরের ইচ্ছা প্রকাশ করায়, বারাণসী-পতি পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করেছেন বসন্তোৎসবের দিবস স্বয়- স্বরের দিন স্থির হয়েছে। মা ! আপনার অনুমতি হলে আমি অচিরাৎ বারাণসী যাত্রা করে কুমার বিচিত্র-বী- ৰ্য্যের বিবাহের নিমিত্ত কন্যাত্ৰয় আনয়ন করে এ রাজ- পুরী উজ্জল করি। সত্য। ধৰ্ম্মাত্মন, এ বিষয়ে আর আমার অনুমতির অপেক্ষা কি? তােমার অভিপ্রায় সুসিদ্ধ হােক। .

দ্বিতীয় অঙ্ক।
ভীষ্ম-মা ! তবে এক্ষণে আমি রাজসভায় গমন
করি। আবার কুলাচার্য্যের আজ্ঞা প্রতিপালন করতে
হবে।
(প্রস্থান)
দ্বিতীয়
অঙ্ক।
সৌভ প্রদেশ, রাজবাটী সন্নিকটস্থ প্রমােদ উদ্যান।
D
দুই জন সৈনিক পুরুষের প্রবেশ।
১ম সৈ।“ওহে ভাই! ব্যাপারটা কি বলতে পার ?
২য় সৈ।আর ভাই। এতে আর তুমি আমি নই—
এ রাজা রাজড়ার কাণ্ড, ব্যাপার তাে লেগেই আছে।
১ম সৈ।—তবু শুনি? হঠাৎ মহারাজের এরূপ ভাবা-
স্তর হবার অবশ্যই কোন নিগুঢ় কারণ আছে। নইলে,
এমন ধাৰ্ম্মিক, সদগুণ-শালী প্রজারঞ্জক আমাদের
মহারাজ যে অল্প কারণে রাজকার্যে একবারে উদাসীনতা
প্রদর্শন করবেন, আমার ত ভাই এমন বিশ্বাস হয়
। গাম্ভীৰ্য-নিকেতন জলনিধি কি সুমন্দ সমীরণে

মন্দার-কুসুম।।
চঞ্চল হন ? হৃদয়দেশে তুমুল ঝটিকার সমাবেশ হলেই
সেই অপ্রমেয় গুণরাশির বিপৰ্যয় সংঘটন হয়ে থাকে।
২য় সৈ।—মহারাজেরও তাই হয়েছে ?
১ম সৈ।—কিন্তু তার হৃদয়াকাশে অবশ্যই কোন
গ্রহ-বিশেষের আবির্ভাবে.এ ঝটিকার সৃষ্টি হয়েছে বােধ
হয় ?
২য় সৈ।-হ্যা, তাতে কি আর সন্দেহ আছে ?
১ম সৈ।—সেটা কি ?
২য় সৈ।-কামিনী।
১ম সৈ।—বল কিহে? মহারাজ একটা সামান্য
নারীর জন্য এতদূর উন্মত্ত—এতদূর চঞ্চল হয়ে উঠেছেন ?
কি আশ্চর্য্য! যারা মনে করলে ঘরে ঘরে রাজপুত্রের
নৃত্য দেখতে পাওয়া যায়, তাদের আবার রমণীর জন্য
ভাবনা ?
২য় সৈ।“চুপ কর, পাগল ! কে আবার শুনতে
পাবে ?
১ম সৈ।—তা ভাই তুমি যে আমায় অবাক করে
দিলে ? যাহােক, এখন ওদিককার ধুম-ধামের বিষয়টা
কি বলতে পার ?
২য় সৈ। কে জানে ভাই! ও সব রাজা রাজড়ার

দ্বিতীয় অঙ্ক। কাণ্ড ! তবে বিধাতা কর্ণ দিয়েছেন, যে যা’ বলে শুনতে কোন আপত্তি করি না। ১ম সৈ।তবু এর কারণটা কি শুনি? আমিও তাে বিধাতা-দত্ত পঞ্চ-ইন্দ্রিয়-বিশিষ্ট ! ২য় সৈ।-মহারাজ নাকি পূৰ্ব্ব হতেই,কি প্রকারে জানি না,কাশীরাঙ্গের জ্যেষ্ঠা কন্যার প্রতি অনুরাগী হন। কিন্তু এতদিন সে অনুরাগ ভস্মাচ্ছাদিত অনলের ন্যায় হৃদয়মধ্যে লুক্কায়িত ছিল। সম্প্রতি বারাণসীপতির কন্যার স্বয়ম্বরসংবাদরূপ প্রবল বায়ু সংযােগে সেই অনল একেবারে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে। এবং সেই দিন হ’তেই মহারাজ রাজকার্যে শৈথিল্য প্রদর্শন ক’র- ছেন—কেবল সৰ্ব্বদাই নির্জনে বসে কি চিন্তা করেন। জনরব যে তিনি পত্রের সঙ্গে, রাজকুমারীও যে তাঁর প্রতি একান্ত অনুরাগিণী, এবিষয়ে কোন স্পষ্ট নিদর্শন পেয়েছেন। ২য় সৈ।-বটে, এমন? ১ম সৈ।—চল হে! এখন আমরা আপন আপন কর্মে যাই, সেনাপতির আজ্ঞা জান ত ? | [উভয়ের প্রস্থান।

মন্দার-কুসুম। ৫ পুষ্পকের প্রবেশ । পুষ্প।—রাজা রাজড়ার কাণ্ডই স্বতন্ত্র । কখন যে কোন্ রঙ্গে থাকেন, তার ভাব বােঝা ভার! এক এক সময় যেন ষড়রিপুজয়ী ঘাের তপস্বী হয়ে পড়ে সুখ- ভােগ স্পৃহা নাই—রাজ্য করেন প্রজার মঙ্গলের জন্য বিধাতার অভিপ্রায় সিদ্ধির জন্য ভােগবিলাসের প্রতি মর্মান্তিক দ্বেষ !-রমণীর নামে খড়গহস্ত !-নারী জাতি ধৰ্ম্ম উপার্জনের ভীষণ বৈরী !—এম্‌নি ভাব দেখান হয়, যেন মহাপুরুষ নিজে অযযানি-সম্ভব ! আবার পরক্ষণেই ঠিক্ তার বিপরীত !-যেন পূৰ্ব্বকার তিনিই নন। তখন নারীজাতির প্রশংসা আর এক মুখে ধরে না,-রমণী সংসারের জীবনের আধার ধৰ্ম্মের সঙ্গিণী – হৃদয়ের শােণিত-যে গৃহে নারী নাই সে গৃহ শ্মশান—হায়! হায়! রাজচরিত্রের এ অপূৰ্ব্ব প্রহেলিকার অর্থ কে করতে পারে ? এই আমা- দের মহারাজ আগে ত বিবাহ কররেনই না,এখন দেখচি ভঁরে থামিয়ে রাখা ভার!—এটা রমণীর জন্য একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন! রাজা রাজড়ার সবই স্বতন্ত্র—সব তাতেই বাড়াবাড়ি—একেবারে একটা নারীর জন্যে আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করেছেন কেবল

দ্বিতীয় অঙ্ক।
রাতদিন কি ছাই চিন্তা করেন !—আরে হতভাগা ! যদি
ইচ্ছে করি, তবে তাের আবার নারীর ভাবনা? মনে
করলে যে রমণীর রাসলীলা করতে পারিস !—তা বড়
লােকের সবই শােভা পায়।-আমরা হলে হয় ত পাগল
ব’লে এত দিন উন্মাদালয়ে অবস্থানের বন্দোবস্ত হত
যা’হাে’ক, মহারাজের এ রােগের প্রতিকারের ত এখন
কোন উপায় দেখিনে ?-কাশীরাজের কন্যার মত কি
আর রূপসী নারী এ পৃথিবীতে নেই, যে তার জন্য এত
উন্মত্ত ?—আর তাই যেন হােল-মালেম, সে অদ্বিতীয়
রূপসী! ভাল, তা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে
কাশীরাজের নিকট দূত পাঠালেই ত হয় ?—তাও হবে
না, তবে বৃথা এ পীরিতের পাক চড়িয়ে শুধু বসে বসে
হায় হায় করলে কি হবে ?—যাই, এখন দেখিগে,
কোথায় ব'সে, সেই নূতন প্রেমিক আবার কন্দর্পদেবের
উপাসনা করছেন।
[স্থান।
ক্ষণকাল পরে চিন্তিত ভাবে ধীরে ধীরে
শারাজের প্রবেশ।
শালু।—প্রণয়ে এত যন্ত্রণা ?-বিরহতপ্তহৃদয়ের জ্বালা
কি কিছুতেই জুড়াবার উপায় নাই? আছে, অহর্নিশ •

১২ মার-কুসুম। কেবল সেই প্রণয়িনীর প্রেমময় মূর্তির উপাসনা। তা’ নিষ্ঠুর বিধাতা মন্তকোপরি যে গুরুতর ভার অর্পণ করেছেন, তাতে যে ক্ষণকাল নির্জনে বসে হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে সেই অনুপম রূপ মাধুরির উপাসনা করবে, তা এ হতভাগ্যের অদৃষ্টে হয় না। রাজকুমারী অম্বা কি সত্যই আমার প্রতি অনুরাগিণী ?—বিধাতা সত্যই কি আমার নিমিত্ত সেই অনুপম স্বর্গীয় কুসুমটিকে সৃজন করেছেন?—আমি কি এতই ভাগ্যবান ?-কৈ অন্তরে ত সে প্রকার সুধাময় আশা নিঝরিণীর চিহু মাত্রও লক্ষিত হয় না ?বরং দিন দিন অপার অনন্ত ভীষণ নিরাশা-মরুভূমির সৃষ্টি হচ্ছে, বিরহতাপে অন্ত- রের অন্তস্তল পৰ্য্যন্ত দগ্ধ হয়ে যাচ্চে ! ভাল, কিছু তেই কি এ জ্বালা জুড়াবার উপায় নাই ?—মনুষ্যেরা কুসুমকে চিত্ত-বিনােদনের অমােঘ ঔষধি ব’লে তার সমাদর করে থাকে, এবং পুষ্প-কুলের মধ্যে কমলিনীর এই সম্বন্ধে অসামান্য গুণ থাকাতে তাকে ফুলকুলেশ্বরি বলে থাকে, কিন্তু নলিনী ত ভগ্ন-হৃদয়ের হৃদয়-জ্বালা জুড়াতে পারে না বরং সে জ্বালা আরাে বৃদ্ধি করে দেয়। এবং উপরন্ত চয়নকর্তার হস্ত কণ্টকে ক্ষত- বিক্ষত হয়ে যায় ! কমলিনীর তাও আরাম করবার দ্বিতীয় অঙ্ক। সাধ্য নাই। কিন্তু কামিনী-কুসুম সমস্ত ফুল-কুল অপেক্ষা কমনীয় ও নয়ন স্নিগ্ধকর।-কামিনীর বিরহে দগ্ধ-হৃদয় শতধা ভিন্ন হলেও কামিনী-কটাক্ষ রূপ স্বর্গীয় অমৃত-রাশি সিঞ্চনে মুহূৰ্তমধ্যে সেই হৃদয়ে নবজীবন প্রদান করতে পারে ।এখন ক্ষণকাল সেই সংসার- ললামভুতা, শাম্বের হৃদয়ের একমাত্র উপাস্য দেবতা, সেই কাশীরাজ তনয়ার অমৃতময় প্রতিমূর্তি খানি নয়ন ভরে দর্শন করে অন্তরকে স্নিগ্ধ করে হৃদয়ের অসহ জ্বালা জুড়াই!—(বক্ষঃস্থল হইতে একখানি চিত্র-পট বাহির করিয়া সাগ্রহে দর্শন পূৰ্ব্বক) কৈ, নয়নের ত তৃপ্তি হয় না, বরং দর্শন-পিপাসা ক্রমশঃ বৃদ্ধি হচ্ছে । —ভাল আজ নয়নকেই সন্তুষ্ট ক’র বৈ!--(একান্তে দর্শন) পুষ্পকেতুর প্রবেশ। পুষ্প।-এই যে! মহারাজ যে একেবারে বাহ-জ্ঞান শূন্য হয়ে বসে সেই মদন-মােহিনীর উপাসনা করছেন। (নিকটে গিয়া)-মহারাজ! এই দেখুন, আপনার তপ- প্রভাবে কন্দর্প-দেব সশরীরে এসে, আপনার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন ! শা।-কে ভাই পুষ্প!—এস !—ভাই অনঙ্গ যদি

মন্দার-কুসুম।
শরীরী হত, তা হলে আমি দ্বিতীয়বার তারে ক্রোধা-
নলে ভস্মীভূত করতে ত্রুটি করতেম না !
পুষ্প ।-বলেন কি মহারাজ!—তবে আপনার কাছে
আশাই বিপদ! কি জানি, পাছে কোন সময় আমাকেই
কর্প ভেবে ভস্ম কোরে ফেলেন !
শা।—(সহাস্যে)—না ভাই! তােমার সে ভয় নাই।
-তােমার ন্যায় মদনের রূপ হলে, রতিদেবী আজও
বিধবা থাক্‌তেন—হরকোপানলে-ভস্ম হবার পর তাকে
আর পুনর্জীবিত করতেন না।
পুষ্প। এবং তা হলে, আজ এমন ক'রে ব'সে
মহারাজকে আর একটা সামান্য নারীর জন্য কন্দর্পের
উপাসনাও করতে হত না!
রাজা।—কি বল্যে ভাই!—সামান্য নারী ?-ভাল,
এই চিত্র-পটখানি দেখ দেখি।—(দান)
পুষ্প।—দেখিয়া)—মহারাজ এ কোন্ দেবীর
প্রতিমূর্তি !-নন্দনকানন ভিন্ন এ কুসুম মর্তলােকে
কখনই প্রস্ফুটিত হয় না !
শা।-হা ভাই, তা যথার্থ !—এই প্রতিমূর্তিই
আজকাল শারাজের হৃদয়ের উপাস্য দেবী।
পুষ্প।-বলেন কি মহারাজ !—এই কি সেই কাশী-

দ্বিতীয় অঙ্ক। রাজকন্যা অম্বার প্রতিম তি?—আশ্চৰ্য্য !-নামহারাজ। আমার ত বিশ্বাস হয় না। শা।“ভাল, একি দেখ দেখি। (প্রতিমুত্তির চরণ প্রান্ত-প্রদর্শন ) পুষ্পা-একি ? কি লেখা যে ? দেখি, দেখি ? (পাঠ) “কাশীরাজ-বালা অম্বা চির-বিরহিণী গতিমতি সৌভপতি প্রেম ভিখারিণী !” কি আশ্চর্য্য!—মনুষ্যে এতরূপ অসম্ভব !-না মহা- রাজ, এ নিশ্চয়ই কোন দেবকন্যা আপনাকে উন্মুক্ত কর, বার জন্য ছলনা করেছেন ! শা।—হ ভাই! তাই সম্ভব !-আমার ন্যায় হত- ভাগ্যের অদৃষ্টে যে এমন নারী-রত্ন লাভ হবে, এমন ত বিশ্বাস হয় না ! পুষ্প।—কিন্তু মহারাজ ! এ প্রতিমূত্তি যার, তিনি যদি যথার্থই মানবী হন, আর সত্যই যদি আপনার মনােহারিণী সেই কাশীরাজকন্যা হন, তবে দেখচি আমাদের রাজসিংহাসনের জন্য মহারাজারও একটি প্রতিমূর্তি প্রস্তুত করবার আয়ােজন করতে হবে ! শা।-কেন ভাই ?

মন্দার-কুসুম.। পুষ্প।-তা বই কি!—মহারাজ কি আর এমন সুর- বালার সংগীতসুধা ত্যাগ করে সভাসদ-গােময়ােখগণের ভন্ ভনানি শুতে আসবেন ? শা।-(সহাস্যে)—না ভাই, সে ‘ভয় করাে না। এখন দেখ, মদনােৎসবের ত আর দিন নাই, সুতরাং আমি মনস্থ করেছি, যে কল্যই বারাণসী যাত্রা করব। —কিন্তু ভাই পুষ্প ! তােমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।—কি বল ? পুষ্প।তাই ত মহারাজ ! আবার ষােড়শােপচারে উদরদেবের পূজা করে আপনাকে বাধিত করতে হবে ?—হা, হা, হাতা চলুন, আজ হতেই তার মঙ্গলাচরণ ক’য়ে রাখিগে। [উভয়ের প্রস্থান।

তৃতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
জানুধীতীর।-কাশীরাজাপুরস্থ পুষ্পেদীন।
মন্দাকিনীর প্রবেশ।
মন্দা। কৈ এখানেও নেই। তবে গেলেন
কোথায়? এমন মেয়েও তাে দেখিনি, কি যে ভাবেন
তা’র ভাব বােঝা যায় না। এত প্রবােধ দিই, কিছু
তেই কান নেই! ভাল, প্রণয় কি কারাে হয় না ?
, এই তােমার নূতন ? আর যখন স্বয়ম্বরা হ’ষ্ট ;
তখন আবার ভাবনা কিসের? যার জন্য এত ভাচ,
তা’র গলায় মালা দিলেই ত সব জ্বালা মিটে গেল ।
তাও বােঝেন, না, বলেন আমার মনে যেন কত
খানা কু-ভাবনা আসে। কিসের কু-ভাবনা, শাম্বরাজ যদি
স্বয়ম্বর-সভায় না আসেন? তা, সে ভাবনা মন্দাকিনী
ভাবৈ না,মন্দা সে ভয় দূর করেছে !-যে মহৌষধ
পাঠায়েছে, তাতে শা-রাজ উম্মত্ত না হলে বাঁচি!
প্রিয়সখী তা জানে না,ভাবেন, মন্দা কেবল তারে

মন্দার-কুসুম। নিষ্ফল প্ৰবােধই দিয়ে থাকে !এখন রাজকুমারী যেমন শাশ্ব-রাজের জন্যে পাগল হয়েছেন, সৌভপতিও যদি এরে এম্‌নি ভাল বাসেন, তবে এ মিলনটি না জানি আহা কত সুখেরই হবে ?—এখন দেখিগে আবার তিনি কোথায় গেলেন ?—প্রিয়সখী যে দৃঢ় ব্রত সাধন করবেন, তাতে দেখবাে এবার, এগৌরীর তপস্যায় সে ভূতনাথ আবির্ভূত হন্ কি না? কিন্তু এবার মদন ভস্ম না হয়ে বরং সহস্র প্রাণ পাবে !– (প্রস্থান) কিয়ৎক্ষণ পরে অন্যমনে পুষ্প চয়ন করিতে করিতে ধীরে ধীরে অম্বার প্রবেশ অম্বা।-কৈ, প্রিয়সখী মন্দা যে বললে, প্রমােদ- কাননে খানিক বেড়ালে, প্রফুল্ল কুসুমের সৌরভে আমার মনের জ্বালা সব দূর হবে!—তা হ’ল কৈ?—এই ত সেই অবধি এখানে রয়েচিকতশত ফুল তুলে তুলে গন্ধ নিলেম, তা কৈ, তাতেও তাে কিছু হ’ল না ? বরং উত্তরােত্তর, সে জ্বালার, আরাে বৃদ্ধি হচ্ছে, তবে কি প্রিয়সখী আমায় বিদ্রুপ করলে ?-দূর হােক্, আর এ ফুলের বাস নিয়ে কি করবাে ?-অম্বার পক্ষে এ গুলাে এখন শেল বােধ হচ্চে !(পুষ্প গুলি ভুতলে নিক্ষেপ পূৰ্ব্বক) প্রিয়সখী বলে, যখন আমি স্বয়ম্বরা, হ’চ্চি, *= তৃতীয় অঙ্ক। তখন আমার আর কিসের ভাবনা?—তা আমিও বুঝি। কিন্তু আমার মন যে কিছুতেই প্রবােধ মানে ?-সে যে কত কি ভাবে ; বােধ হয় যেন এ পােড়া , অদৃষ্টে সুখসংঘটন নাই।—শাস্বরাজ কি তবে এ সয়ম্বর সভায় আবে না ?অভাগিনীর অদৃষ্টে কি আরও যন্ত্রণা আছে?—প্রাণেশ্বর !-“তুমি পুরুষ-রমণীর যে কত জ্বালা তা তুমি কি বুঝবে?—প্রিয়তমের অদর্শনে রমণী-হৃদয় যে কিরূপ দগ্ধ হয়—অন্তরের গভীর গহ্বরে প্রণয়-শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে,যে কিরূপ’অসহ্য যাতনা দেয়, তা রমণী ভিন্ন কে জাবে?—হৃদয় যদি দেখা’বার হ’ত- কিংবা যদি এমন কোন যন্ত্র থাক্ততা, যা দিয়ে হৃদয়ের স্তরে স্তরে সুন্দররূপে দৃষ্টি সঞ্চার হ'ত,—অথবা হৃদয়ের যন্ত্রণা-রাশি যদি মানুষের চিত্র করবার ক্ষমতা থাকতাে, তা হলে, প্রাণেশ্বর ! আজ দেখতে অভাগিনী অম্বা তােমার জন্যে দিবানিশি কিরূপ অসহ্য যাতনা ভােগ করছে !—অম্বার হৃদয় পাষাণ ব’লে আজও অক্ষুন্ন রয়েছে, অন্য কারাে হলে বােধ হয় এত দিন সহস্র খণ্ডে চূর্ণ হয়ে যেত!-(দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নে- পথ্যাভিমুখে দৃষ্টিপাত করতঃ)—এই যে প্রিয়সখী মন্দা এই দিকেই আচে।—সই মার- কুম। ! মন্দাকিনীর প্রবেশ। মন্দা। ভালা ভাই! এমন জায়গা নেই যে তােমায় খুজিনি । আমি আরাে ভাবছিলেম প্রিয়সখী বুঝি প্ৰে- মের পাখায় ভর করে তার প্রাণনাথ উদ্দেশে উড়েছেন ! অম্বা। ভাই মন্দা! মানুষের যদি পাখীর মত উড়বার শক্তি থাক্তাে, তা হলে কি আর ভাবনা ছিল ? তা হলে এ পৃথিবীতে দুঃখ জ্বলা বলে আর কোন কথাই থাকতাে না! কিন্তু বিধাতা মানুষকে সে সুখে বঞ্চিত করেছেন। মন্দা। যখন সে উপায় নেই, তখন আর তার জন্যে দুঃখ করে কি হবে? যাহােক ভাই। এখন এ প্রফুল কুসুমটীতে মনােমত মধুকর এসে মধুপান করলেই সক- লই সুখের হয় ! সখি ! জান তাে ফুল আপনা হতেই ফুটে, গাছ আলাে করে থাকে, ভ্রমরের নিকট যায় না, বরং ভ্রমরই কুসুমের কাছে এসে থাকে। অম্বা। হ্যা সখি তা যথার্থ, কিন্তু বল দেখি ফুল ফোটে কি জন্যে,ভ্রমরের জন্যেই ত? মন্দা। ভ্রমর কি জন্যে,-ফুলের জন্যেই ত। অম্বা। না সখি! এবার হ’ল না। দেখ ভ্রমরের কত ফুল আছে, কিন্তু ফুলের সেই এক ভ্রমর ব্যতীত '- তৃতীয় অঙ্ক। মন্দা।—কেন ভাই !-আমার কি দোষ ? ছি সখি!—এখন এ সব মান বৃথা নষ্ট করছো কেন ?- যখন যথার্থ আবশ্যক হবে, তখন আবার খুঁজে পাবে না। সুর-বালার প্রবেশ। সুর।সখি !দেখসে, দেখসে !—প্রমােদ-কুঞ্জে বড় চমৎকার শােভা হয়েছে তােমার সেই মালতী গাছটী আজ স্বয়ম্বরা হচ্চে !—গাছটীতে নূতন ফুল ফুটেছে বলে কত শত মধুকর ও ভ্রমর যে এসেছে, তার সংখ্যা নেই !তাদের একসঙ্গের গুণ গুণ শব্দ যে কি চমৎকার শুতে হচ্ছে, তা আর কি বলবাে ?-প্রিয়- সখী অধিকা আর অম্বালিকা সেখানে রয়েছেন- তােমাদের শীগগির ডাকচেন। মন্দা।--(অম্বার প্রতি) চল, সখি ! চল, চল। [প্রস্থান। নেপথ্যে !-ওলাে ! উলু দে উলু দে ।-দেখচিনে ঐ যে একটি ভ্রমর গিয়ে ফলের উপরে বসেছে!—ঐ দে স্বয়ম্বর হয়ে গেল !—আ মরণ, উলু দে না ! নেপথ্যে।“ওমা! তাই ত!-ওলল! উলু দে উলু দে। (নপথ্যে উলুধ্বনি)

28
মারকুসুম।
ܕ ܬ
পুষ্পভরণ-বিভূষিত পরস্পরের কুটি-দেশ আলিঙ্গন করতঃ মদন
ও রতির প্রবেশ।
রতি।-প্রাণের মদন!
মদন।
কেন মদন-মােহিনী ?
রতি।-এ কোথায় এলেম মােরা ?
মদন।
সে কি প্রাণেশ্বরি।
চিনিতে নারিছ মােরা এসেছি কেথােয় ?
রতি।
কেমনে চিনিব বল!—তুমি যে মদন ।
সন্মােহন শরে মরি চেনা আমার
হ’রেছিলে একেবারে কত রঙ্গ জান্ত,
জব ইচ্ছাধীন যেই, তাহারেও তুমি
কর, ফুলশর! তব শরের অধীন।
এখনও ভালমতে সামলিয়া নিতে
পারি নাই, প্রাণনাথ।কাজেই চিনিতে
পারিছিনা আসিলাম কোথায় আমরা!
মদন-রতির মুখচুম্বন করিয়া)
বিধুমুখে এত সুধা না ধরিলে কভু
মদনে রাখিতে কিহে চরণে বাঁধিয়া ?
দেখ তবে আঁখি মেলি মদন-মােহিনী।
সম্মুখে বিরাজে অই পূত প্রবাহিনী
উত্তর-বাহিনী গঙ্গা, শৈল-রাজ-বালা,

%
তৃতীয় অঙ্ক।
দুলাইছে ধীরে ধীরে তরঙ্গের মালা
বারাণসী-পদ-প্রান্তে ।
রতি।-(সহাসে)-
ওমা তাই ত !
এ যে কাশী রাজ পুরী ? ভাল ফুলবণ !
ভাল কথা মনে হলাে, তুমি না সেদিন
বলেছিলে. কাশীরাজ তনয় সকল
স্বয়ম্বরা হইবেক মদন উৎসবে ?
জীন ত প্রাণেশ তুমি !জ্যেষ্ঠা রাজবালা,
কত ভক্তিভাবে পূজে চরণ আমার ?
তাই সে আমার বড় আদরের ধন,
কত ভালবাসি তারে না পারি কহিতে!
দেখি নাথ একবার ! সে রাজ-বালার
প্রণয়ের চিত্র-পট লিখেছ কেমন ?
মদন।-(পুষ্পগুচ্ছ হইতে একখানি আলেখ্য বাহির
করিয়া)—এই দেখ আদরিণি !
রতি।—(সাগ্রহে চিত্র-পট হস্তে লইয়া ক্ষণকাল
দৃষ্টিপাত পূৰ্ব্বক)—একি প্রাণেশ্বর ।
(ভূমিতে নিক্ষেপ পূৰ্ব্বক অধােদনে স্থিতি),
মদন।-(ত্রস্তে)-
কেন, কেন, কি হয়েছে, মদনমােহিনি।
কিসের কারণে বল, হইলে মানিনী ? (তির চিবুক ধারণ)

২৬
মারকুসুম।
।"
রতি।
যাও নাথ সােহগেতে আর কাজ নাই,
যত ভালবাস মােরে জানিয়াছিবেশ !-
বলেছিনু বড়মুখে তােমারে মদন!
ভাল করি আঁকিতে এ প্রেম চিত্র-খানি।
বিরহ-বিষের বিন্দু ভ্রমে যেন তাহে
কখন পড়ে না; কিন্তু, সে মুখ আমার
রাখিয়াছ ভাল মতে !
;
মদন।
কই দৈখি দেখি?
(চিত্র-পট লইয়া দর্শন পূৰ্ব্বক সহাস্যে)
ওহহ বুঝিয়াছি,মনে হইয়াছে রতি।
যেরূপে এ চিত্র তব হয়েছে এরূপ।
তব আদেশেতে প্রিয়ে ! বসি’ ধীর মনে,
বাছিয়া বাছিয়া ল'য়ে কুসুম-পরাগ,
মন্দার আসব সনে মিলায়ে যতনে
সাবধানে সন্তর্পণে আঁকিতেছিলাম
তোমার অম্বার প্রেম-চিত্রপটখানি।
জানি আমি ভালমতে, অতুলা রূপসী,
প্রাণের অধিক তুমি ভালবাস তারে।
তাই প্রিয়ে সযতনে নিখুত করিয়া
চিত্ৰিলাম পটখানি,ভাবিলাম মনে
প্রেম-উপহার বলি’ তােমারে অর্পিব ।
লঞ্জ

তৃতীয় অঙ্ক।
এমন সময়, প্রিয়ে, সহসা আমার,
কঁপিল কুসুম-সুজ মস্তক উপরে,
কপিল কুসুম-চাপ, টঙ্কারিল গুণ,
তুণ মাঝে সন্মােহন উঠিল নাচিয়া ।
ধ্যানে জানিলাম, বসি' মন্দাকিনী কুলে-
পারিজাত উপবনে সুরেন্দ্রাণী সনে
সুরেশ স্মরেন মােরে। অমনি তুরস্তে
সামলি রাখিতে পুষ্প-পরাগ সকল
নিকটে বিরহ-বিষ আছিল ভাজনে
তুলিতে সহসা, শির হ’তে ফুল এক
খসিয়া পড়িল তাহে—বিরহ গরল
চৌদিকে হইল ব্যাপ্ত কুসুম-আঘাতে।
নিকটে আছিল তব এই চিত্র খানি,
লাগিল দু-এক বিন্দু উহার অঙ্গেতে।
রতি।
যাও, নাথ। কাজ নাই মিছে শঠতায়,
জানিয়াছি যত ভাল বাস হে আমায় !
মদন।
(রতির পদযুগল ধারণ করিয়া)
পায়ে ধরি, প্রাণেশ্বরি, পরিহর মান
মহ অজ্ঞান-কৃত অপরাধ কণা।
বলি তবে শুন, স্মর-মানস-মােহিনি।
চিত্রের এ দোষ যাহে হইবে, খণ্ডন।

মন্দার-কুসুম।
এই যে, কুন্তলে তব মন্দার-কলিকা
চুম্বিতেছে গণ্ডস্থল, অতুলা রূপসী !
যদি কোন রূপে অন্ধ পায় এ রতন,
চিত্রের অশুভ চিত্র হইবে খণ্ডন ।
রতি।
বুঝেছি মদন তব মনের যে ভাব।
ভেবেছ এ ফুল মম বড় প্রিয় ধন,
পারিব না দিতে
কভু পরাণ ধরিয়া
কিন্তু, নাথ, জান নাকি রমণীর লাগি
রতির আদেয় কিছু নাহি ত্রিভুবনে!
দিতে পারি হৃৎপিণ্ড ছিড়ি’ অনায়াসে
রমণীর তাহে যদি হয় উপকার।
অথবা তাহার চেয়ে আরাে প্রিয়ন্তর
জীবনসৰ্বস্ব ধন তােমারে মদন
যদ্যপি ত্যজিতে হয়, তাহাতেও রতি
টলিবে না এক পদ ; এ ত তুচ্ছ ফুল !
এই আমি চলিলাম অম্বার উদ্দেশে,
দিব এ কুসুমকলি তাহার কুন্তলে !
(প্রস্থানেদিত)
মদন ।
ধন্য তুমি রমণীর-মণি ! কিন্তু প্রিয়ে।
মদনের পুরষ্কার ?

A:
তৃতীয় অঙ্ক।
২৯
রতি।
লও ইচ্ছামত ।
(মদন কর্তৃক মুখচুম্বন ও রতির প্রস্থান)
মদন।
কি করিব আমি আর থাকিয়া এখানে ?
যাই, দেখি কি হ’তেছে নন্দন-উদ্যানে ?
[প্রস্থান।
দ্বিতীয় গভাঙ্ক।
কাশীরাজ প্রাদান্তর্গত একটি প্রকোষ্ট্র।
অম্বিকা ও অম্বালিকা আসীন।
অম্বিকা !—দিদির কথা আর বলিসনে। তার
ভাব দেখে অবাক্ হয়েচি। কিসের যে এত ভাবনা
তা বুঝতে পারিনে।
অম্বালিকা।—বল কি দিদি ? কিসের নাকি ভাবনা ?
প্রণয়ে ত কখন পড়নি, সুতরাং তার জ্বালা জান
—তাই অমন কথা ব’লচ।
অম্বিকা।—প্রণয়ে আবার পাপড়ি কি, তা ত

মন্দার-কুসুম। ! - বুঝিনে! প্রণয় আমার, তা আগে থাকতে লােককে দিয়ে কেন জ্বালা সইব ?—যখন সময় হবে তখন প্রেমের প্রবাহ বহাবে ! অম্বালিকা।-তবে তুমি প্রণয়ের সুখ জান না। অম্বিকা।—দুঃখও জানিনে ! আগে প্রণয় দিয়ে যত সুখ তা ত দিদিকে দিয়েই দেখ চি?- অম্বালিকা।—আচ্ছা দিদি ! তােমাকে একটা কথা বলি, তুমি পূৰ্ব্বরাগের বিরােধিনী—ভাল বল দেখি,পূৰ্ব্ব- রাগ না থাকলে প্রণয়ে সুখ কোথায় ? এই তুমি ভাব, কারাে প্রতি তােমার প্রণয় নেই। ভাল বল দেখি, তােমার স্বামী যদি তােমার মনােমত না হন, তখন কি করবে ? অম্বিকা।যখন স্বয়ম্বরা হচ্চি, তখন আবার স্বামী মনােমত হবে না কেন? অম্বালিকা।—ভাল মালেম, তােমার স্বামী কল- পের মত রূপবান, আর রামের মত গুণবান্ হলেন, তুমি তারে প্রাণের চেয়েও ভালবাসলে, কিন্তু, বােন্! যদি তুমি সে ভালবাসার প্রতিদান না পেলে, তখন কি করবে ? অম্বিকা।-কেন ?-প্রাণপণে যাতে স্বামীর প্রণয়

pe
তৃতীয় অঙ্ক।
পাই, তার চেষ্টা করবাে,প্রেম-ভক্তিতে স্বামীর চরণ
অভিষিক্ত করবে, তাতেও যদি তার মন না পাই,
এততেও যদি তাঁর প্রণয়-সিন্ধু আমাকে কণামাত্রও
দিতে বিমুখ হয়, তবে এ জন্মের মত সুখ-সৌভাগ্যে
জলাঞ্জলি দিয়ে প্রেম-ব্রত উদযাপন করবো।
অম্বালিকা -তবে বােন্ দেখ দেখি ! আগে প্রণয়
দিয়ে বেশি জ্বালা না পরে? তবে তুমি বড় দিদিকে
কেন দোষ দিচ্ছিলে ?
অম্বিকা।-না বােন্ ! জ্বালা দুয়েতেই সমান,
কিছুতেই কম বেশি নেই।
অম্বালিক।-বাঃ—পূৰ্ব্বরাগের চেয়ে নিরাশ প্রণয়ে
বেশি জ্বালা নয় ?
সুরবালার প্রবেশ।
সুর। বেশ যা হােক, তােমরা ত ভাই বেশ,
এখানে নিশ্চিন্দি হয়ে বসে রয়েছ ? আজ যে তােমা-
দের সেই আদরের কুরঙ্গিণীর সঙ্গে একটী কুরঙ্গের বিয়ে
দেবে বলেছিলে, তা কি মনে নেই ? কঞ্চকি মহা-
শয় পশু-শালা থেকে বড় সুন্দর একটী হরিণ এনেছেন।
অামরা সেই অবধি বিয়ের উজ্জ্বগ, ক’রছিলেম, ফুল
4

৩২
মন্দার-কুসুম।
তােলা—মালা গাঁথা, সব শেষ হয়েছে। এখন তােমরা
গেলেই হয়।
অম্বিকা ও অম্বালিকা।-ওমা তাই ত?—আমাদের
যে কিছুই মনে ছিল না?—চল সখি! চল চল, বিয়ের
লগ্ন ফুরিয়ে গেল !
[সকলের প্রস্থান।
বিষন্নভাবে অম্বার প্রবেশ।
অম্বা।কেন এত নিরাশা ?—যতদূর মন যায়—
অন্তরের অন্তর মধ্যে ত কোথাও বিন্দুমাত্রও আশার
চিহ্ন দেখতে পাইনে?—কেবল চারিদিকে, নিরাশার
আগুন হু হু করে জ্বলচে ! এ আগুনের কি নিৰ্ব্বাণ
নেই ? ভাল, এ নিরাশার মূল ত কোনখানে দেখতে
পাইনে ? মন যে কেন এত হতাশ হচ্চে তার কি কোন
কারণ নেই ?—কত ভাবি মনকে দৃঢ় করবাে, এ নিরা-
শাকে মন থেকে দূর করবে—মনে আশা বাঁধিবাে,
কিন্তু তা পারি কই ?—কোথা হতে যেন নিরাশা আগুন
একেবারে অন্তর মধ্যে প্রজ্জ্বলিত হয়ে স্তরে স্তরে
অন্তরকে দগ্ধ করে ?—দূর হােক, এবার মনকে খুব শক্ত
করব। মন্দা যে বলে মনের বেগ একটু একটু করে
নিরাশার দিকে গিয়েছে বলে এখন ক্রমে তার স্রোত
••

তৃতীয় অঙ্ক।
বৃদ্ধি হ'চ্চে,এখন যত্ন করে ধীরে ধীরে সে বেগ ফেরালে
আশার দিকেই মন যাবে, তা মন্দার কথাই শুনবব,
দেখি, এত ক'রেও মনকে সুস্থ রাখতে পারি কি না?
(ক্ষকাল নিস্তব্ধভাবে অবস্থিতি
মন্দাকিনীর প্রবেশ ।
মন্দা।—সখি ! একী মালীদের মেয়ে এসেছে ;
ভাই, তার যে রূপ ! আ মরি মরি, ছােট লােকের ঘরে
এত রূপ আমি কখন দেখিনি ! যদি তুমি তারে
দেখতে চাও, তবে এখানে ডেকে নিয়ে আসি। তার
মিষ্টি কথা শুনলে তােমার শরীর জুড়িয়ে যাবে ।
অম্বা।কৈ তারে অন দেখি ?
( মন্দাকিনীর প্রস্থান।
নেপথ্যে ।--ও ভাই,মালীদের মেয়ে ! একবার এদিকে
এস তাে?—রাজকুমারী অঙ্গা তােমাকে ডাকচেন --
নেপথ্যে।—রাজকুমারী ডাকচেন ? ওমা, আমার
কি ভাগগি !
মাল্য কার-রমণী-বেশধারিণী রতিদেবীকে সঙ্গে লইয়া
মন্দাকিনীর পুনঃপ্রবেশ ।
অম্বা।-(রতিকে দেখিয়া স্বগত) ওমা তাই ত,
মন্দাকিনী ঠিক বলেছে—আহা, এমন রূপ ত কখন
দেখিনি, প্রকাশ্যে)-বােস ভাই, এখানে বােস ।

৩৪
মারকুসুম।
,
রতি।“রাজকুমারীর আজ্ঞা শিরােধার্য্য ! আজ
আমি পবিত্র হলেম।
অম্বা।-তােমার নামটী কি ভাই ?
রতি।-রাজকুমারি ! আমার নাম কুসুম-কুমারী।
অম্বা।-আহা, যেমন রূপ, তেমনি নামটীও সুন্দর ।
মন্দা।—হ্যা ভাই কুসুম! তােমার বাড়ী কোথা ভাই ?
রতি।—তামাদের মত গরিব মানুষের কি আর বাড়ী
ঘরের ঠিক আছে ? যখন যেখানে যাই, তখন সেই
খানেই বাড়ী।যখন যিনি দয়া করে আদর করে
ডাকেন, তখনই তার কাছে যাই।
অম্বা।—হ্যা ভাই !
তােমার কিসে চলে ?
রতি।—রাজকুমারি ! এই ফুল বেচে যা পাই
তাতেই কোন রকমে দিন কাটিয়ে দিই।
মন্দা।—তোমার স্বামী আছেন ?
রতি।-( সহাস্যে ) তা কি আমায় দেখে বুঝতে
পারছেন না ?
অম্বা।-হা কুসুম ! তােমার স্বামী, বোধ হয়,
তােমায় খুবই ভাল বাসেন?
রতি।—রাজকুমারি ! আমার পােড়া স্বামীর কথা
আর বলবেন না। তার জ্বালায় আমি ব’লে কেন বতে

তৃতীয় অঙ্ক। গেলে ত্রিভুবনের লােক জ্বালাতন হয় ! কেবল ফুল দিয়ে লােকের মন মজিয়ে বেড়ায় ; আমাকেও এক দণ্ড চোকের আড়াল করতে চায় না,রাত দিন কেবল এক সঙ্গে থাকে—যেখানে যাই সঙ্গে সঙ্গে ফেরে ! অম্বা।তবে ত তােমার স্বামী তােমায় খুব ভাল- বাসেন? রতি।-হ্যা রাজকুমারি ! রাজকুমারি ! পৃথিবীতে কেবল ঐ সুখটিই আছে। এই আপনারা স্বয়ম্বর হবেন শুনে বড় ইচ্ছে হলাে যে, এক এক গাছি মদন-মােহিনী মালা গেথে আপনাদের চরণে দেব, তাই কত কাণ্ড করে তবে এসেছি। মন্দা।—কৈ ভাই, কেমন মালা দেখি ? রতি।—এই যে। (বস্ত্রমধ্য হইতে একখানি ক্ষুদ্র ডালা বাহির করিয়া তন্মধ্য হইতে পুষ্প-মালা লইয়া অম্বার হস্তে দান ) অন্যা।-বাঃ! কি সুন্দর মালা ছড়াটি ! আ মরি মরি । মন্দা।--তাই ত? এমন সুন্দর ত কখন দেখিনি ? • '(মালা স্পর্শ করিয়া)—কি চমৎকার ! অম্বা।-হ্যা ভাই কুসুম ! এ মালা ছড়াটি কি তােমার নিজের হাতের গাঁথা ?

মন্দার কুসুম। রতি।-হা রাজকুমারি ! আমার স্বামী আগে গন্ধৰ্ব্ব-রাজের মালাকর ছিলেন, তিনি এ রকম বড় চমৎ- কার চমৎকার মালা গাঁথতে জানেন,--তা আমি তারই কাছে শিখেছি। অম্বা।—(রতির নিকটস্থ পুষ্প:ভাজনের প্রতি দৃষ্টি- পাত করিয়া)-ও দু’টা কি ফুল ভাই ? তাহা ! এমন ফুল ত কখন দেখিনি। রতি।-(পুষ্প হস্তে লইয়া) রাজকুমারি ! এই ফুল দু’টি আমার স্বামী গন্ধৰ্ব্ব-রাজ্য থেকে এনেছিলেন, এর যে কত গুণ তা বলা যায় না;-এ ফুল কখন শুকোয় না—আর যদি কোন হতাশ প্রণয়ী এ ফুল দুটী কুন্তলে পরেন, তবে তঁার আর বিরহের ভয় থাকে না। প্রেমের পাত্রের সঙ্গে শীগিগর মিলন হয়। তা রাজ- কুমারী যদি অনুগ্রহ করে এ দু’ট নেন, তবে দাসী আপনার কুন্তলে পরিয়ে দিয়ে কৃতার্থ হয়। অম্বা।-ভাই কুসুম ! তােমার এ ঋণ শােধবার নয়। রতি।-( অম্বার কুন্তলে পুষ্প প্রদান করিয়া) আ মরি মরি, কি সুন্দর দেখাচেঁ ! আপনার কুন্তলে উঠে ফুল দু'টির যেন আরাে শােভা বেড়ে উঠলাে ! i.

তৃতীয় অঙ্ক।
৩৭
অম্বা।-বাঃ! কি চমৎকার গন্ধ ! ফুলের এমন
গন্ধ ত আমি কখন দেখিনি।
মন্দা।তাই ত সই! ঘর যে আমােদ করেছে ।
অম্বা।-(তির প্রতি) তােমাকে এর জন্যে যে কি
দেব, কি দিলে যে এর উচিত পুরস্কার হয়, তা ভেবে
পাইনে। তা ভাই ! (গলদেশ হইতে মতির মালা
উন্মােচন করিয়া) এই সামান্য হার ছড়াটী তােমায়
নিতেই হবে ।
রতি।«রাজকুমারি ! ক্ষমা করুন। আমরা গরীব
মানুষ, এ মহামূল্য মতির মালা নিয়ে আবার কোন ফেরে
পড়বাে ? না না, এ দুঃখিনীর প্রতি আপনার অনুগ্রহ
থাকলেই যথেষ্ট হবে।
অম্বা।-না ভাই, তা হবে না। (মন্দাকিনীর প্রতি)
যাও সখি । কুসুমকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে উচিত
পুরস্কার করগে ।
মন্দা।-এস ভাই, আমার সঙ্গে এস।
রতি।--রাজকুমারি ! তবে বিদায় হ'লেম, দুঃখি-
নীকে মনে রাখবেন।
(মন্দাকিনীর সহিত প্রস্থান।
অম্বা!—(কুন্তল হইতে একটী পুষ্প লইয়া) এই
ক

মন্দার-কুসুম।
4
ফুল কুন্তলে পরলে বিরহের ভয় থাকে না ! হতাশ
প্রণয়ীর প্রেমের পাত্রের সঙ্গে শীঘ্রই মিলন হয় !তবে এ
ফল দুটী হতভাগিনী অম্বার পক্ষে মৃত-সৰ্জীবনী সুধা !
(পুষ্পটী পুনরায় কুন্তলে অর্পণ) তাই ত, এ দুটী একবার
মাত্র আমার শরীরে স্পর্শ হওয়াতে যেন একবারে সমস্ত
মনের জ্বালা জুড়িয়ে গেল ! কৈ, আর ত সে নিরাশার
বিন্দুমাত্রও দেখতে পাইনে? কিন্তু একি! হঠাৎ
আমার সর্ব শরীর এ রকম অবসন্ন হয়ে পড়ছে কেন?
আর যে বসতে পারিনে ! (হঠাৎ নিদাভিভূত হইয়া
শয়ন)
?
মদনের প্রবেশ।
মদন।-(সহাস্যে) হা, হা, রতিদেবী কিছুই বােঝেন
! বিরহিনীর হৃদয়-বেদনাতে যে মদনের কত আনন্দ
হয়, তা রতি জানে না !আর প্রণয়ে বিরহ না
থাকলে কি প্রেম এত মধুর হত ?—কনপের প্রণয়-
চিত্র রতিদেবী বৃথা করবেন ?—হা, হা, রতি 'তুমি
মদন-মােহিনী বটে, কিন্তু অদ্যাপি মদনের অন্তর টের
পেলে না ! এখন এই মন্দার-কুসুম নিয়ে দেখচি, রতি-
দেবীর সঙ্গে মদনের এক প্রলয় কাণ্ড হ'বে !—যাই
হােক, এখন ত কন্দপ তা’র উদ্দেশ্য সাধন করুক !
}

চতুর্থ অঙ্ক। ৪১ তা’র চক্ষে-কেউ জল দেখতে পাইনি—এখন সেই চক্ষু বর্ষার মেঘ হয়েছে। অম্বিকা,।-বলিস কি বােন ! এর কারণ কি? অম্বালিকা —বললেম ত, কারণ যে কি তা জিজ্ঞাসা করলে তিনি আপনিই বলতে পারে না তা আবার পরে কি জাবে বল ? অম্বিকা।-দিদির আগাগােড়া কাণ্ড সমস্তই আশ্চ- ৰ্য্য!—কিছুরই ভাব বােঝা যায় না। = সুর-বালার প্রবেশ । সুর ও সখি !-তােমরা না গেলে কিছুই আমােদ হয় না, সকলেই যন্ত্র হাতে করে কৌতুক-গৃহে বসে রয়েছে—বলবে যে তােরা না গেলে কেউ বাজাবে না -গাইবে না। অম্বিকা।—দিদি কোথায় ? সুর।—তিনি রাজ-মহিষীর কাছে আছেন, প্রিয়সখী মন্দাকিনী তারে ডাতে গিয়েছে ! অম্বিকা চল আমরাও যাই! রাণী ও অম্বর প্রবেশ। রাণী।-কেন মা অম্বা !-আজকের দিনে তুমি এমন 8२ মন্দার-কুসুম। ক'রে একলাটি বসেছিলে কেন মা?—আজ তােমরা তিন বােনে স্বয়ম্বরা হবে, কত দেশের কতশত রাজা রাজ- পুত্র তােমাদের জন্যে এসে রাজপুরী উজ্জল করে বসে আছে—রাজ্যশুদ্ধ লােক আহলাদে উন্মত্ত হয়েছে—তুমি কেন মা আজ এমন হয়ে রয়েছ ? অম্বা।-( সলজে )না, মা ! শরীরটে কেমন ক’র- ছিল বলে একটু নির্জনে বসেছিলাম। রাণী।—শরীরটে কেমন করছিল মা? কোন ত অসুখ হয়নি ? অম্বা।-না মা !—তা কিছু হয়নি। রাণী।তবে যাও মা!--কৌতুক-গৃহে কলে আ- মােদ আহ্লাদ করছে, সেখানে গেলেই তােমার সকল অসুখ সেরে যাবে। নেপথ্যে!—কৈ মা রাজমহিষী কোথায় গেলেন ? রাণী।--ঐ বুঝি পুরােহিত ঠাকুর এসেছেন, আমি যাই দেখিগে মদ-পূজার কতদূর আয়ােজন করা হলাে। যাও মা! তুমি তােমার সখীদের কাছে যাও। [প্রস্থান। অম্বা।-(স্বগত) কৌতুক-গৃহে গেলে সকল অসুখ সেরে যাবে :—যা’র, মনের মধ্যে তাগুন জ্বলছে তার

চতুর্থ অঙ্ক।
৪ ৩
শরীরের উপর জল ঢাললে কি হবে ?-(দীর্ঘনিশ্বাস
পরিত্যাগ পূর্বক )—মা গাে !
, মন্দাকিনী ও সুর-বালার পুনঃ প্রবেশ ।
উভয়ে।-অম্বকে বেগুন পূৰ্ব্বক গীত)
সিন্ধু-খাম্বাজ।—দাদড়া।
আজ কি কারণে, বল সুশোচনে
বিরস-বদনে, আছ বসি’ ?--
বিরহ-রজনী পােহ’ল সজনী,
তােল তােল ধনী, মুখ শশী ।
মনােমত পতি,
লভি' রসবতি
তােষ রতিপতি, সুখে ভাসি'।
হৃদয়ের জালা, গেল রাজবালা
দেবে প্রেম মালা নাথে হাসি।
অম্বা।-সখি ! তােমাদের পায়ে পড়ি ভাই, আর
আমারে জ্বালা দিও না।
মন্দ।।--না ভাই! তা কোন মতেই হবে না।—আজ
আমি কারাে কোন কথা শুবাে না।- এমন আল্লাদের
দিনে আজ আমাকে প্রাণ খুলে আমােদ করতে দাও।
অম্বা।–সখি ! বিধাতা তােমায় আমােদ দিয়ে গড়ি-
য়েছেন, তুমি আমােদ কর ; কিন্তু অভাগিনী অম্বা যাতে
মনে ব্যথা পায়, তা তােমার কি করা উচিত?
%

৪৪।
মন্দার কুসুম।
।
সুর।—কেন সখি !- তুমি কি শােন নি? শাল্বরাজ,
কত সৈন্য সামন্ত নিয়ে নগরে এসে উপস্থিত হয়েছেন ?
অম্বা।–সখি ! এতেও পরিহাস ?
সুর।-না সখি! যথার্থ বলচি। চল, বরং গবাক্ষ
দিয়ে দেখবে চল, তােমার প্রাণের নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে
পূর্ণচন্দ্রের মত শত শত রাজার মধ্যে বসে স্বয়ম্বর-সভা
উজ্জ্বল করে রয়েছেন ।
করুকীর প্রবেশ ।
কঞ্চকী।—রাজকুমারি ! মদন-পূজার সমস্ত আয়াে-
জন হয়েছে, রাজমহিষী সেখানে আপনাদের জন্যে
অপেক্ষা করছেন। আবার ওদিকে স্বয়ম্বর-সভায় সমস্ত
ভূপতিগণ উপস্থিত হয়েছেন, অতএব আর বিলম্ব কর,
বেন না। কন্দর্প-পূজা করতে শীঘ্র অাসুন।
মন্দা!--চলসখি ! আর বিলম্বে কাজ নেই।
[সকলের প্রস্থান।
( ক্ষণকাল পরে নেপথ্যে শঙ্খ ও উলুধ্বনি এবং তৎ সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীত)
বাহার-আখেটা।
কর নতি, রসবতি, অতিপতি চরণে,
ঘুচিবে বিবৃহ-জ্বালা প্রাণপতি মিলনে !

চতুর্থ অঙ্ক।
৪৫
হাসিবে সুখের পূর্ণশশী হৃদি-গগনে,
তুষিবে আশা-চকোরে সঙ্গ-সুধা বর্ষণে !
উথলিবে প্রেম-সিন্ধু ওলো ইন্দু-বদনে !
বহিবে আসঙ্গ-নদী খর-তর জীবনে।
দ্বিতীয় গভঙ্ক।
কাশীরাজপ্রাসাদ।-স্বয়ম্বর সভা।
(কাশীরাজ ও অন্যান্য ভূপতিগণ উপস্থিত)
(নেপথ্যে বৈতালিকগণ কর্তৃক সংগীত)
রামকেলী।—ঢিমে তেতালা।
দেখ ভূপগণ মেলিয়া নয়ন, দেখ দেখ, ওহে, চাহিয়া।
ত্রিদিবের শােভা রাশি,
ভূতলে উদয় আসি,
হের হের আঁখি ভরিয়া।
তৃষিত চাতক-প্রায় সুউৎসুক মনে,
একান্তে রয়েছ সেই মন-আরাধনে,
সে নব নীরদ-চয়,
কাশী রাজ কন্যাভ্রম
তুষিবেন আঁখি সব এখনি হে উদিয়া।
উজলিয়া রাজপুরী বরণ বিভায়,
চ’িছেন যেন মরি মলয়জ,বায়,

৪৬
মন্দারকুসুম।
করে লয়ে হেম থালা, প্রফুল্ল কুসুম- মালা,
স্বয়ম্বরে যান স্মরে পূজিয়া।
তুষিবেন ভাগ্যবানে, প্রেম-সুধা দানে,
দেবতাদুভ ধন অতুল ভুবনে,
হৃদয়ে হৃদয়ে হাসি,
উথলিবে সুখরাশি,
রতি-পতি রতি রবে চরণেতে পড়িয়া।
শা।—(স্বগত)—হৃদয়, শান্ত হয়ে। এত উতলা
হও না !—এখনিই তােমার আরাধ্য দেবীকে দর্শন
করে নয়ন চরিতার্থ কর। মন ! আশ্বস্ত হও, দৃঢ়ভাবে
আশা-রজ্জ, অবলম্বন কর !-
অগ্রে কঞ্চ কী ও তৎপশ্চাৎ সুবর্ণপাত্রে পুষ্প-মালা প্রভৃতি
লইয়া অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকার প্রবেশ ।
(নেপথ্যে হুলুধ্বনি ও শঙ্খ রব)
অম্বা।- (স্বগত)-মন ! সুস্থির হও, তােমার
সকল দুঃখ অবসানের সময় উপস্থিত হয়েছে।—হৃদয়,
এত অস্থির হ’চ্চ কেন ?
(সকলের প্রথম রাজার নিকট অাগমন)-
কঞ্চকী।
ভূতলে তা মরাবতী ভারতের মণি,
তুষারে ভূষিত দেহ, সৌন্দর্য্যের খনি।
।

চতুর্থ অঙ্ক।
৪৭
অভ্রভেদী গিরি চূড়া দৃশ্য মনোেহর,
কলনাদে নিঝরিণী গার নিরন্তর।
কুঙ্কুম-কুসুম চির সুবাস আলয়,
'ফোটে যা আমােদিয়া দিক সমুদয় ।
ভুবন-বিখ্যাত যেই কাশ্মীর প্রদেশ
দয়ার জলধি,ইনি তাহার নরেশ ;
সমরে সুধীর যেন সৌমিত্রি-কেশরী ;
বিদ্যা বুদ্ধে বৃহস্পতি, বাহুবলে হরি !
জনের প্রিয় বন্ধু, দুর্জনের যম।
কুমুদ-কান্তের প্রায় রূপে অনুপম।
(রাজকন্যাগণের দ্বিতীয় রাজার নিকট আগমন)
কঞ্চ কী।
মধুর সুরভি-বায়,
সৌরভ মাখিয়া কায়
কেলি করে যথা এলা-লতার সহিত !
চন্দনের চারু শাখা, দোলে প্রকৃতির পাখা,
বার-মাস ঋতুপতি-বদন হসিত !
সুনীল সরিৎ-পতি, পুলকে পূরিত মতি,
যাহার চরণ-প্রান্ত করয়ে চুম্বন,
স্মিতমুখি ইন্দীবর, হাসে যথা নিরন্তর
এই মহামতি সেই মলয়-রাজন!
বীরত্বেতে বজ্র পাণি, মান্ধাতা সমান মানী,
দানে সুর-পুর-জাত কল্পতরু প্রায়,

৪৮ মন্দার-কুসুম। শ্রীরামের সমতুল, পালেন প্রকৃতি-কুল, দিবাকর-ভাতি ম্লান ইহার প্রভায়”। ( রাজবালাগণের ভীষ্মের নিকট আগমন) দ্বিতীয় রাজা।-( সকলের অলক্ষ্যে হৃদয়ে হস্তাৰ্পণ করিয়া)—উহু হু, গেল, গেল, হৃদয়ের অস্থিরাশি চূর্ণ হয়ে গেল ! হা অদৃষ্ট ! এমন রত্ন লাভেও বঞ্চিত হ'লেম ? করুকী। পুণ্যবান্ মহাযশা হস্তিনাধিপতি শান্তনু-তনয় ইনি ভীষ্ম মহামতি । প্রতিজ্ঞায় অদ্বিতীয় ভুবন-ভিতরে, ভারত ভাতিছে যার যশ-শশধরে। বিক্রম, বীরত্ব, বীর্য্যে তুলনাবিহীন, জীবন মরণ যার ইচ্ছার অধীন। অসামান্য ক্ষিপ্রহস্ত শর-প্রক্ষেপণে, জানুবীর স্রোত রােধ করে যেই জন, সৰ্ব্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ধীর মতিমান, ভূতলে তুলনা নাহি ইহার সমান। ভীষ্ম।—(দণ্ডায়মান হইয়া) সভাস্থ ভূপালবৰ্গ! বুধ- গণ কর্তৃক অষ্টবিধ বিবাহ পদ্ধতির মধ্যে ধৰ্ম্মবাদী ব্যক্তিরা শত্রুপক্ষ দলন করতঃ কন্যা হরণ করিয়া বিবাহ করাকেই সৰ্বশ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করেন। অতএব হে ভূপতিগণ !

চতুর্থ অঙ্ক।
৪৯
আমি এই কন্যায়কে বল-পূৰ্ব্বক ইরণ করলেম, যদি
শক্তি থাকে প্রতিবন্ধকতাচরণ সম্পাদন কর, এখনিই
তার প্রতিফল প্রাপ্ত হবে! সমরে অগ্রসর হও, এই দেখ
ভীষ্ম অস্ত্র সজ্জিতই আছে, এখনি জয় বা পরাজয় লাভ
করবে ।
{ কন্যায়কে লইয়া প্রস্থান।
শা।– উঠিয়া) অসহ্য! অসহ্য ! ভীষ্মের এ
ধৃষ্টতা-এ অন্যায়-এরূপ গৰ্ব কখনই বীর-হৃদয়ে সহ
হয় না!--হে ভারতীয় রাজ্যেশ্বরগণ । আপনারা কি
এতই নির্বীৰ্য্য যে, গঙ্গানন্দনের এই গরিমাপূর্ণ বাক্যা-
বলি—এই অন্যায় ব্যবহার অনায়াসে অবতমস্তকে সহ্য
করবেন ? ক্ষত্রিয়গণ কি এতই অসার, অপদার্থ হয়ে
গেছে ? ক্ষত্রিয়-শরীরের হুতাশনবৎ উত্তপ্ত শােণিত
কি এখন একেবারে তুষারের ন্যায় শীতল হয়েছে ?
উঠুন রাজগণ ! চলুন, সেই গৰ্ব্বিত শান্তনু-তনয়ের গৰ্ব্ব
আজ সকলে মিলিয়া চূর্ণ করবাে ! এখনিই সেই দস্যকে
উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে ধৰ্ম্মের পথ নিকটক করবে।
[বেগে প্রস্থান।
অন্যান্য রাজগণ।-অসহ! অসহ্য !-ধর, সেই

মন্দার-কুসুম। t দস্যুকে ধর!-(কেহ “শীঘ্র রথ প্রস্তুত কৰ” কেহ “তরবারি দেও”। কেহঃধনুর্বাণ আনয়ন কর” ইত্যাদি চীৎকার করিতে করিতে বেগে প্রস্থান) কাশীরাজ।“হা, কি দুর্দৈব !—ভগবন, এমন দুর্ঘনা ত কখন কারাে অদৃষ্টে “ঘটেনি?হা অদৃষ্ট! এখন দেখিগে, এ অনল নিৰ্ব্বাণের যদি কোন উপায় করতে পারি । [প্রস্থান। পুষ্পকের প্রবেশ। শ পুষ্প।—একি কাণ্ড বাবা ! একি অন্যায়!—একে- বারে পাল শুদ্ধ তারিয়ে নিয়ে গেল !—তুই বাপু একা মানুষ, এতগুলাে স্ত্রী নিয়ে কি করবি ! (নেপথ্যে ধনু- ঘোষ ও নানাবিধ অস্ত্র-শস্ত্রের ঝণঝণা ধ্বনি এবং তৎ- সঙ্গে যুদ্ধনাদ) ও বাবা! এ যে প্রলয়কাণ্ড হয়ে উঠলাে । দেখি জয়-লক্ষমী, কার অদৃষ্টে ক্রীড়া করেন ! [প্রস্থা।

পঞ্চম অঙ্ক।
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
কাশী ।-সমরাঙ্গণ।
অসি-যুদ্ধ করিতে করিতে দুইজন পদাতিকের প্রবেশ।
১ম, পদা।-জয়, মহারাজ সিন্ধু-রাজের জয় !
২য়, পদা-হা মুখ জয় পরাজয় যদি মুখের
কথায় সিদ্ধ হতাে, তা হ’ত্রে ত এই মুহূর্তে তুই সমগ
ভারতের রাজা হতে পারতিস !—কিন্তু তা নয়, এই
দেখ, তরবারির মুখে কি নির্গত হয় !-(প্রথম পদা-
তিককে অসি আঘাত ও তাহার রক্ষা)
২য় পদা-ধন্য বীর !-আচ্ছা, এই বার রক্ষা
করতে বুঝবাে!—(অসি-আঘাতে প্রথম পদাতিকের
পতন)-নেও, এখন সুখে নিদ্রা যাও!
নেপথ্যে ভীষ্ম ।সারথি !—আর প্রয়ােজন নাই,
এক্ষণে হস্তিনাভিমুখে রথ চালনা কর। নৃপতিগণের
সমর-সাধ পরিতৃপ্ত হয়েছে।
নেপথ্যে শান্ধা-ভীষ্ম !–থাক, থাক, পলায়নে
বিরত হও। এখনও তুমি সম্পূর্ণরূপে বিজয়-লাভ

মার-কুসুম।
করতে পারনি !—এই দেখ, দ্বিতীয় কৃতান্তের ন্যায়
সৌভ-পতি তােমার প্রতি ধাবমান হচ্চে।
নেপথ্যে ভীষ্ম !-হা, হা, শাশ্বরাজ,-বালক !—এস,
এস, তােমারও সমর-কণ্ডয়ন নিবৃত্ত করসে।
নেপথ্যে শা।-ভারত দেখবে, আজ ভীষ্মদেব
এই বালকের হস্তের ক্রীড়া-পুত্তলী হবেন !—সারথি !
আমার অনুসরণ করে দ্রুত-বেগে রথ চালনা কর।
[ধনুর্বাণ হস্তে বেগে শা-রাজের প্রবেশ ও প্রস্থান।
(নেপথ্যে ধনুর্ঘোষ ও হুহুঙ্কার ধ্বনি)
নেপথ্যে ভীষ্ম।-সারথি ! অশ্ব-রজ্ঞা, সংযত কর।
4
দেখ সৌভপতি রথবিহীন হয়েছেন, আমিও অবতরণ
করে তঁারে যুদ্ধ প্রদান করবাে !
নেপথ্যে শাশ্ব।বীর!-ধৰ্ম্ম-যুদ্ধ- ন্যায়-যুদ্ধের নিয়-
মই এই।
ভীষ্ম।-(নেপথ্যে) শাশ্ব-রাজ !-লাবধান, সাবধান!
এই দেখ পঞ্চশত মৃত্যুবাণ মুখ ব্যাদান করে তােমার
প্রতি ধাবমান হচ্ছে !
শা।—(নেপথ্যে)-ভীষ্মদেব !–সৌভ-পতি মৃত্যু
ঞ্জয়াবাণ অজ্ঞাত নয়!—এই দেখ তােমার শর সমূহ
সমস্তই পরাভূত হয়ে প্রতিগমন করচে।

পঞ্চম অঙ্ক। ৫৩ ॥ ভীষ্ম।-(নেপথ্যে)-ধন্য বীর। কিন্তু শারাজ এই- বার বুঝবাে ! (নেপথ্যে মুহুর্মুহুঃ ধনু-নির্ঘোষ) অগ্রে ক্ষত-বিক্ষত-কায় শাশ্বরাজ ও কিঞ্চিৎ পশ্চাতে ভীষ্মদেবের প্রবেশ। ভীষ্ম।-কেমন মহারাজ! এখনও কি যুদ্ধ প্রার্থনা করেন ? শা।ভীষ্মদেব !—প্রাণবায়ু, বহির্গত না হওয়া পৰ্য্যন্ত শাল যুদ্ধ করতে বিমুখ হবে না !-(অসি নিকোষ পূৰ্বক)—আসুন! শীঘ্র প্রস্তুত হােন, শাল্বরাজ আর বিলম্ব করতে পারে না। ভীষ্ম।-(অসি নিষ্কোষ করিয়া)—বীর!ভীষ্মদেব প্রস্তুতই আছে। (অসি-যুদ্ধ করিতে করিতে উভয়ের প্রস্থান) ( মধ্য-পটোত্তোলন) (দৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র সন্নিকটস্থ প্রান্তর) (আহত রাজগণ কেহ শয়িত, কেহ অর্ধশয়িত অবস্থায় অবস্থিত) ১ম রাজা।—(সকাতরে) আর ভাই! শরীরে আর কিছুই নেই ! হাড়-গােড় সব চূর্ণ হয়ে গেছে! ২য় রাজা।-(সকাতরে )—ভাল রমণীর লােভেই

৫৪,
মন্দার-কুসুম।
এসেছিলেম, শেষে আপনার প্রাণ নিয়ে টানাটানি !
(উঠিবার চেষ্টা করিতে করিতে) ও মা! ও মা, !
যাই গাে !
৩য় রাজা।-(সরােদনে) আর ভাই ! কোন কালে
যে আর বিবাহ করতে হবে, তার দফা একেবারে শেষ
হয়েছে ! রাজ্য-রক্ষা চুলােয় যাক, বংশরক্ষার জড়
মেরে দিয়েছে। বাবা রে ! (রােদন)।
৪র্থ রাজা !—বল কি হে! একেবারে নিকেশ
করেছে ! কিছুমাত্র নেই?
৩য় রাজা।-(সরােদনে) কিছু না, ভায়া, কিছু না,
একেবারে গিছি। (কপালে করাঘাত পূৰ্ব্বক' এর চেয়ে
যুদ্ধে
দ্ধে আমার মরণ হ’ল না কেন ? (রােদন)।
পুষ্পকেতুর প্রবেশ ।
পুষ্প।ও বাবা ! এখানে আবার এ কি ব্যাপার !'
অা, এ কি ? এ সব বাণের আগায় উড়ে এসে, এখানে
গাদা হয়েছে নাকি ? অা কি সর্বনাশ !
১ম রাজা। কে হে, তুমি না সৌভপতির সহচর,
যুদ্ধের সংবাদ বলতে পার ?
পুষ্প। —আর সংবাদ ! যে ব্যাপার দেখে এসেছি।

পঞ্চম অঙ্ক।
'-
4
তাতে বােধ হয় আমায় একেশ্বর হয়ে দেশে ফিরে
যেতে হবে ! হা মহারাজ !-(আক্ষেপ)।
১ম রাজা।-কি হে ! সংবাদ কি বল দেখি?
পুষ্প-সৌভপতি সমস্ত সৈন্য-সামন্ত, রথ, ধনুর্বাণ
প্রভৃতি হারা হয়েছেন। নিজেও ক্ষত-বিক্ষত-শরীর
হয়েছেন কিন্তু এখনও ক্ষধিত সিংহের মত অসামান্য
বিক্রমের সহিত ভীষ্মদেবের সঙ্গে অসিযুদ্ধ করছেন।
১ম, রাজা।ধন্য শাশ্ব-রাজ।
পুষ্প।—যাহােক, (অপেক্ষাকৃত স্থূলকায় চতুর্থ
রাজাকে নির্দেশ পূৰ্ধক) একি ব্যাপার অা!—এ কি !
যুদ্ধে হাত, পা, না হয় বড় জোর প্রাণটাই গিয়ে থাকে,
কিন্তু এ বােম্বেয়ে রাজাটীর একি কাণ্ড বাবা! ইনি যেমন
বােম্বেয়ে মােটা, তেম্‌নি আজগুবি ধরণে আহত হয়ে-
ছেন। একি ?—মাথার চুল, দাড়ি গোঁপ, ভুরু ইস্তোক
চোকের ভােমা গুলো অবধি যেন কে ক্ষর বুলিয়ে
দিয়েছে ! একি কাণ্ড বাবা ! একি ?
২য় রাজা।“চুপ কর, পাগল ! ওসব অগ্নিবাণের
উত্তাপে
পুড়ে গেছে।
৪র্থ রাজা।-(সক্রোধে) কি ভীরু ! এত বড় স্পর্ধা ;
আমায় উপহাস ?

মন্দার-কুসুম।
পুষ্প-(স্তে কিছু দূরে যাইয়া) আর বাবা! পচা
আদায় ঝাল দেখাতে হবে না ! যার যত তেজ-যার
যত বিক্রম তা দরবারেই জানা গেছে !
৪র্থ রাজা।-তবে রে পাপাত্মা ! (উঠিবার চেষ্টা)।
সকলৈ।-হা হা ভায়া কর , কি ? ও মূখ, ভীরু,
পাগল ;-যুদ্ধের ব্যাপার ওর কাছে স্বপ্ন। তা, ওর
কথায় কি রাগ করতে আছে ?
শারাজের অচৈতন্য দেহ বহন করিয়া দুই জন
পদাতিকের প্রবেশ
জীবনের
পুষ্প।-একি একি, মহারাজ ?-হা মহারাজ, একি
হােল ।
১ম সৈ।–মহাশয়, শান্ত হােন। মহারাজ যদিও
অত্যন্ত আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন বটে, কিন্তু
কোন আশঙ্কা নাই, কেবল মূচ্ছিত হয়েছেন মাত্র ;-
কোন ভয় নাই, এখনিই চৈতন্য লাভ করবেন। ঐ
দেখুন নয়ন উন্মীলন করছেন।
পুষ্প-মহারাজ ! মহারাজ !
শালু।-হা, আমি কোথায় ?—অা? (ধীরে ধীরে
গাত্রোখান পূৰ্ব্বক) অ একি ?—কোথায়, সে দস্য,
4
-

পঞ্চম অঙ্ক । কোথায় ? একি সব? হা প্রিয়ে ! তােমাকে সে নিষ্ঠ- রের হাত হ'তে উদ্ধার করতে পারলেম না ? পুষ্প-মহারাজ ! শান্ত হােন্। এত উতলা হবেন । এই দেখুন, আপনার সর্বশরীর দিয়ে ভয়া নক রক্ত নির্গত হচ্ছে। শা।“ভাই ! যার অন্তস্তল সহস্র খণ্ডে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে,তা’র এ সামান্য বাহ্যিক যাতনায় কি কষ্ট বােধ হয় ?না, না, এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। অপেক্ষা রণস্থলে প্রাণ বিসর্জন ভাল ! (উঠিয়া) ভীষ্ম। থাক, থাক, পলায়নে বিরত হও।-শা-রাজ পুনর্বার যুদ্ধ প্রার্থনা করচে ! [বেগে প্রস্থান। পুষ্প ও সৈনিক দ্বয়।-মহারাজ ! করেন কি, করেন কি ?—ক্ষান্ত হােন, ক্ষান্ত হােন। (পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রস্থান।

৫
মার-কুসুম।
দ্বিতীয় গভঙ্ক।
হস্তিনাপুর।-রাজপ্রাসাদ।
অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা আসীনা।
অম্বিকা।-(অম্বার প্রতি)—দিদি কি বল ?
অম্বা।আমি আর কি বল্ববা বেন্ ! বিধাতা
আমায় জনম-দুঃখিনী করেছেন—কখন সুখের মুখ
দেখলেম না-দেখবােও যে, তার কোন আশা নেই!
অন্তরের জ্বালায় অন্তরেই জ্বলে মরচি !—প্রাণের কান্না
কেউ দেখতে পায় না কেউ শুনতে পায় না!—কিংবা
এ পােড়া পৃথিবীর স্বার্থপর লােকে দেখেও দেখে না—
শুনেও শােনে না।
অম্বিকা।—শুলি অম্বালিকা ?—দিদির ভাব দেখে
মরি ! কিসের যে এত জ্বালা, এত ভাবনা, তা’র ত
ভাব বুঝতে পারিনে!
অম্বা।-ভাব আর কি বুঝবে বো ?-পরের জ্বালা
যদি পরে বুঝতাে, তা হলে আর ভাবনা ছিল কি ?
অম্বিকা।-আচ্ছা দিদি !-তােমার কাছে কি

পঞ্চম অঞ্চ।
D
সৌভপতি এতই রূপবান হলেন !--কুমার বিচিত্রবীৰ্য্যকে
দেখেছ ত, তার কাছে কি তােমার শাশ্ব-রাজ দাঁড়াতে
পারেন ? আর গুণ-গরিমা ত যুদ্ধেই সব প্রকাশ হয়ে,
পড়েছে। ভীষ্মের
অম্বা।-চুপ কর বােন্!—আমি তােমার কাছে
উপদেশ নিতে আসিনি ! সৌভ-পতি যার-পর-নাই
কুরূপ—কুৎসিত-ভীরু হলেও আমার চক্ষে তিনি রূপে
কন্দর্প ও গুণৈ সুর-পতির সমান! তিনি ব্যতীত অম্বা
আর কারেও স্বামী সম্বােধন করতে পারবে না।
বােন্! জান ত, সাগর-গামিনী নদী কোন বাধাই মানে
না,অভেদ্য-পাষাণ-হৃদয় অটল অচল-রাজকেও দূরে
নিক্ষেপ করে !-ব’তে কি বােন্! যদি সমস্ত দেবগণ
এসে আমার এ প্রণয়ে বাধা দিতে যত্ন করেন, তথাপি
অম্বার মন কিছুতেই বিচলিত হবে না ! এর হৃদয়ের
প্রেম-প্রবাহ কিছুতেই বিলীন হ’বার নয় !
অম্বিকা।-আচ্ছা দিদি ! দেখবাে তােমার এ পণ
কতদূর রাখতে পার ।
ভীষ্মের প্রবেশ।
ভীষ্ম। -রাজ-বালাগণ ! আমার এস্থলে এরূপ
আগমনের জন্য ক্ষমা করবে। কোন বিশেষ প্রয়ােজন
২)

f
মার-কুসুম।
বশতঃ আমি তােমাদের নিকট এসেছি। সৃয়ম্বর-সভা
হ’তে সহস্র বিপক্ষ-রাজগণকে বিদালিত করে যে কারণে
তােমাদের হরণ করে এনেছি, তা বােধ হয় অবগত
হয়েছ। এখন জননী সত্যবতীর অনুজ্ঞাক্রমে আমি
তােমাদের নিকট উপস্থিত হ'লেম,—তার ইচ্ছা যে,
কুমার বিচিত্রবীর্য্যের সহিত তােমাদের শুভ পরিণয়-
কাৰ্য্য সমাধা করে কুমারকে পিতার রাজ-সিংহাসনে
অভিষিক্ত করেন। এক্ষণে এবিষয়ে তােমাদের অভিমত
আমায় অবগত করালে সেই ৰূপ কাৰ্য্য করা যাবে ।
অম্বালিকা ও অম্বিকা।-বীরবর!-আমরা রমণী—
আমাদের আর অভিমতি কি !—আমরা আপনার ইচ্ছাধীন
-আপনার যেরূপ অভিপ্রায়, যেরূপ ইচ্ছা, আমাদেরও
তাই।
ভীষ্ম।-সাধ্বি ! তােমাদের কল্যাণ হােক !-কিন্তু
রাজকুমারী অম্বা যে অবনত বদনে রইলেন? এর অভি-
প্রায় ত কিছু জানতে পারলেম না !
অম্বা।—বীরবর!—অধীনীর অপরাধ মার্জনা কর।
বেন! আপনি ধৰ্ম্মজ্ঞ ও সৰ্ব্বশাস্ত্রবিদ! এক্ষণে আমার
যা বক্তব্য তা অনুগ্রহপূর্বক অবধারণ করে, যা বিহিত
হয় করুন। মহারাজ! আমি সৌভপতি মহারাজ শাকে

ক্রি
পঞ্চম অঙ্ক।
৬৩
তােমার সৌভ-রাজ্যে যাবার জন্যে উপযুক্ত আয়ােজন
করতে ভীষ্মকে বলে দিয়েছি। এখন মা ! একটী
প্রার্থনা, তুমি তােমার বােনেদের রাজ-রাজেশ্বরী করে
কেন তােমার স্বামীর কাছে যাও না ? হ্যা মা! তাতে
তাে আর বেশী দিন বিলম্ব হবে না?
অম্বা।-(সলজ্জে)-মা ! আপনার যা ইচ্ছা।
সত্যবতী।-(সহাস্যে) তবে চল মা, অধিবাসের সব
উজ্জগ হয়ে রয়েছে তােমার বােনেদের আজ অধি-
বাস করাও গে। (অম্বিকা ও অম্বালিকার প্রতি) এস
মা! তােমরাও এস।
'
সকলের প্রস্থান।
**

ta
মন্দার-কুসুম।
(
ষষ্ঠ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
সৌভরাজ্য—রাজ প্রাসাদ।
পুষ্পকেতু উপস্থিত।
পুষ্প।–সাধে বলি রাজ-চরিত্র-প্রহেলিকার অর্থ করা
ভার ? আমি এত কাল এই মহারাজের সঙ্গে একত্র
রইচি, কিন্তু আজও তার অন্তর অথবা মনের ভাব কিছুই
বুঝতে পারলেম না!—কখন্ যে কি ভাবে থাকেন, তার
অন্ত পাওয়া ভার। মহারাজ আমাদের আগে ত বিবাহ
করবেনই না,-মধ্যে আবার সেই কাশীরাজের কন্যার
জন্য উন্মত্ত, এখন আবার যে সেই !
নন্! এখন রমণীর নামে বমন করেন। আবার দে-
খচি এরে সেই পূৰ্ব্বকার রােগে ধরেছে, এর প্রতিকারের
কি কোন উপায় নাই ?—এরূপ উদাসীন রাজা নিয়ে কি
আর রাজ্য চলে ? অর্থাৎ আমার ন্যায় পেটুক-চূড়ামণির
কি পােয় ? রাজমহিষী থাক্‌লে দিন দিন কত শত
যেন তিনিই

যষ্ঠ অঙ্ক।
প্রকারে যে উদর-দেবের ষােড়শােপচারে পূজা হয়, তার
ঠিক, নেই ! কিন্তু আমার এমন পােড়া অদৃষ্ট যে, রাজা-
টাও কপালক্রমে নপুংসক হ’লাে ! আরে, যে রমণীর
প্রতি এরূপ বিরাগী, সে নপুংসক না ত কি ?—যাহােক,
এখন মহারাজকে এ দারুণ ব্যাধি হতে মুক্ত ক’র বার কি
কোন উপায় নেই? দেখি, দেখি, আমার এ সূক্ষম
বুদ্ধিতে কিছু বার করতে পারি কি না ? (চিন্তিতভাবে
অবস্থান
পারে প্রবেশ।
শাল।—(সহাস্যে) কি হে ভাবুক-চূড়ামণি ! এরূপ
একান্তে বসে কি চিন্তা হচ্চে? কোন স্থানে উত্তম
মিষ্টান্ন দেখে এসেছ না কি, তাই এখন তার আরাধনা
ক’রচো?
পুষ্প।হ্যা, মহারাজ! তা একরূপ বটে।
শা।-একরূপ কি প্রকার ?
পুষ্পা-এই মহারাজকে যে বেগে ধরেছে, তা
হ’তে যদি আপনাকে কোনরূপে মুক্ত করতে পারি,
তা’র ঔষধের উদ্ভাবনের চিন্তা করচি। এবং মহারা এ
রােগ হতে মুক্ত হলেই সুতরাং আমার আহারের ঘর
বাঁধাবাঁধি হয়।

মন্দার-কুসুম। শা।-(সহাস্যে) মহাবীর সুমিত্রা-নন্দন শক্তিশেলে প'ড়লে, পবন-নন্দন হনুমান তা’র ঔষধের নিমিত্ত পৰ্বত ব্যবস্থা করে ছিলেন। এখন তুমি আবার আমার জন্য কি ব্যবস্থা করবে বল দেখি? তােমাদের জাতকেই যে ভয় হয় ! পুষ্প।—আপনার আবার জাতের ভয় কি ? হােক, মহারাজ !-লক্ষণ যেমন বীর, যেরূপ ঘাের সঙ্কটে পড়েছিলেন,“হনুমানও বীরের মত দেশ-কাল- পাত্র বিবেচনায় একরূপ উপযুক্ত ব্যবস্থাই করেছিলেন বলতে হয় !—কিন্তু এখন সেইরূপ বিবেচনা করলে আপনার এ সামান্য “ঘাড় ঘুরুণি” রােগে এরূপ বন্দো- বন্তের প্রয়ােজন হবে না, এতে কেবল কামিনীর করকমলের দুই একটী মুষ্টিযােগের ব্যবস্থা করলেই, তন্মুহূর্তে নিরােগী হবেন। শা।-না ভাই! সে ঔষধ সেবনের ভার তােমার উপরই দিলেম,-“সৌভ-পতি তা প্রার্থনা করে না। পুষ্প-ঔষধের বিষয়ে রােগীর আবার মতামত কি ?—ঔষধ সেবন কি আর প্রতিনিধিতে চলে যা হােক, মহারাজ! একটি কথা বলি, যদি নারী-জাতির উপর আপনার এই বিদ্বেষ থাকে, তবে মধ্যে আবার ষষ্ঠ অঙ্ক। সেই কাশী-রাজের কন্যার জন্য উন্মত্ত হয়েছিলেন কেন ? শাত্ব।-“উন্মত্ততা, -বুদ্ধি-ভ্রংশ,—আর কি বলবাে বল ?—তবে কাশী-রাজের কন্যাগণের সৃয়ম্বরে গমন করে নারী জাতি যে কত অনিষ্টের মূল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে আরাে কিছু শিক্ষা লাভ হয়েছে। পুষ্প।—(গত) শিক্ষালাভই বটে !–ভীষ্ম খুবই শিখিয়েছিলেন!—(প্রকাশ্যে) কেন মহারাজ! নারী- জাতি অনিষ্টের মূল তাতে কি করে জানতে পারলেন ? শা। মখ!-এও আবার জিজ্ঞাসা করছো ? দেখলে না প্রমণীর জন্য কি কাণ্ড হয়ে গেল?--কত শত নর-হত্যা,কত রাজ্য ভ্র,কত শত রাজা অপ- মানিত—পরাজিত—হত-আহত হয়েছিল? সে কেবল সেই পৃথিবীর আবর্জনা—ধৰ্ম্মপথের কণ্টক—অধর্মের সহচরী রমণীর জন্য বই ত নয় ? পুষ্প-মহারাজ ! আপনি নিশ্চয়ই বাতুল ! নইলে যে রমণী সংসারের জীবনের অবলম্বন- ধৰ্ম্মপথের সহচারিণীতা’দের এরূপ অযথা নিন্দাবাদ ক’রবেন কেন?—ভাল মহারাজ! একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, এখন যদি আপনার সেই পূৰ্ব্ব-চিত্তহারিণী কাশী- द কg

মন্দার-কুসুম।
রাজ-কন্যা আপনার প্রণয় আকাঙ্ক্ষা করেন, আপনি কি
করবেন ?
শাস্ব।—কাল ভুজঙ্গিনী জ্ঞানে দূর হতে পলায়ন
করি।
পুষ্প-মহারাজ ! আপনার ঘাের বিকার হয়েছে ।
শাস্ত্রে বলে রাজাকে বিশ্বাস করতে নেই, কিন্তু ষে
রাজা আবার সংসারের এমন বৈরী, সে যে কি ভয়ানক
জীব, তা বলা যায় না।-জান, মহারাজ! আপনাকে
আর বিশ্বাস নেই। (প্রস্থানােদ্যত)
শা।-(সহাস্যে হস্তধারণ পৰ্ব্বক) আরে পাগল ।
এত রাগ কেন?—বােস, বােস।
পুষ্প।-না মহারাজ!-আপনার ন্যায় নপুংসক
রাজার কাছে বসতে নেই।
[প্রস্থান।
শা।-যে উন্মাদ হয়, সে সকল বিষয়েই উন্মাদ!
প্রতিহারীর প্রবেশ ।
প্রতি।-মহারাজ! হস্তিনাপুর হতে একটী স্ত্রীলােক
এসে আপনার দর্শন প্রার্থনা করছেন, কি আজ্ঞা হয় ?
শা।-স্ত্রীলােক ? আচ্ছা, তা’রে সঙ্গে করে
নিয়ে এস ! ( প্রতিহারীর প্রস্থান) হস্তিনাপুর হ'তে

ষষ্ঠ অঙ্ক। ! স্ত্রীলােক ?—আমার দর্শন প্রার্থনা করে ?—এর অর্থ কি?-অম্বাকে সঙ্গে লইয়া প্রতিহারীর পুনঃ প্রবেশ ও প্রস্থান) অম্বা।—মহারাজ ! প্রাণেশ্বর ! (শালরাজের চরণ ধারণ পূৰ্ব্বক) আজ আমার হৃদয়ের জ্বালা সব দূর হলাে ! (রােদন) শা।—(শশব্যস্তে) এ কি, এ কি ! রাজকুমারি ! এ কি ! কুলবালা হ'য়ে এরূপ নির্লজ্জার ন্যায় আমার নিকট এরূপ ভাবে আগমনের কারণ কি ? অম্বা।কেন প্রাণেশ্বর !-সাগরগামিনী স্রোতস্বিনী কি কোন লােক-নিন্দা বা বাধা-বিপত্তি গ্রাহ্য করে থাকে ?—তাই আজ আপনার প্রণয়-ভিখারিণী জন্ম- দুঃখিনী অম্বা তার স্বামি-সহবাসে আতে লজ্জা করবে ?—(সহাস্যে) নাথ ! আপনি প্রণয়-পয়ােধি হয়ে একথা আবার জিজ্ঞাসা করচেন ?—এই কি আপনার প্রেম ? শা।-না রাজকুমারি ! অপ্রেমিক সৌভপতি আর তােমার প্রণয় প্রার্থনা করে না !—এক সময় আমি দুদ্ধি অথবা মােহবশতঃ তােমাকে হৃদয়ের উপাস্য দেবী ভেবে আরাধনা করেছিলাম বটে, কিন্তু এক্ষণে মন্দার কুসুম । পরমেশ্বর আমায় সে মহামােহান্ধকার হতে মুক্ত করে- ছেন!—বিশেষতঃ যখন তুমি অন্য-পূৰ্বা হয়েছ, তখন আমি কোন মতেই তােমায় গ্রহণ করতে পারি না । রাজকুমারি ! বলতে কি,—যখন ভীষ্ম তােমার কর- ধারণ করে আপন রথে উত্তোলন করেন, এবং যখন অসংখ্য ভূপতিগণ দ্বারা পরিবৃত হয়ে ঘােরতর সমরে প্রমত্ত থাকেন, তৎকালে তুমি ইচ্ছা করলে, অনায়াসে পলায়ন করতে পারতে; কিন্তু বােধ হয়, সে সময় ভীষ্মের অসাধারণ রণদক্ষতা দেখে, তােমার চিত্ত বিচ- লিত হয়েছিল। সেই জন্য তুমি সে সময় আপন উদ্ধা- রের কোন উপায়ই অবলম্বন কর নি। সুতরাং তুমি অন্য পূৰ্ব্বা!-শাস্বরাজ পর-প্রেম-প্ৰয়াসিনী কামিনীকে গ্রহণ করে না!—এক্ষণে তুমি যেখানে ইচ্ছা যেতে পার। অম্বা।—হা বিধাতঃ ! এ কি ?—এ কি প্রাণেশ্বর! আপনার মুখে এই কথা ? হায় ! যার জন্যে এতকাল দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করে জীবন কাটালেম—যা’র চরণে মনঃ প্রাণ উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম,আজ তার মুখে এই নিদারুণ কথা ?-মহারাজ! আমি ধৰ্ম্ম সাক্ষী করে ব’লচি, আমি নিরপরাধিনী! ভীষ্মের হরণের পরেই আমি রথে মুচ্ছিত হয়েছিলেম, সুতরাং সে বিষয়ে আমি % ষষ্ঠ অঙ্ক। কতদূর দোষী তা’ আপনিই বিবেচনা করুন। মহারাজ ! আমি দেবগণকে সাক্ষী করে বলচি, আমি পবিত্রা, আমার হৃদয়ে পাপের লেশমাত্র নেই। আর প্রাণে শ্বর ! যদি আপনি এ দাসীর অন্তর পরীক্ষার জন্যে এই উপায় অবলম্বন করে থাকেন, তবে ক্ষমা কর। বেন। শাস্ব।—না রাজকুমারি ! সৌভপতি প্রতারক নয়—কিম্বা তােমার অন্তর পরীক্ষা করছে না। সুতরাং আর মিথ্যা বাক্যব্যয়ে প্রয়ােজন নাই, শালুরাজ তােমার প্রায় প্রার্থনা করে না। অম্ব–(সরােদনে) মহারাজ! তবে সত্যই কি আপনি এ অভাগিনীর প্রতি নিদয় হলেন ? হা নিষ্ঠর বিধি ! এ হতভাগিনীর অদৃষ্টে কি তিলমাত্রও সুখ লেখ নি ? হায় ! আমি এত দিন যারে হৃদয়ের এক- মাত্র উপাস্য দেবতা ভেবে পুজা করলেম, এতকাল যা’র আরাধনায় জীবন কাটালেম, আজ তার নিকট এই অপ- মান?—আজ তার মুখে এই নিদারুণ কথা শুনতে হ’ল ? (শালের চরণ ধারণ পূৰ্ব্বক) মহারাজ! আমি এই আপনার চরণ স্পর্শ করে শপথ করচি, আমি পবিত্র আমার অন্তরে পাপের লেশমাত্র নাই ; এ দাসী আপ- !

१२ মার-কুসুম। = নাকে ভিন্ন আর কারেও জানে না, আপনিই কেবল এর হৃদয়-রাজ্যের একমাত্র অধীশ্বর। আর এতেও যদি আপ- নার প্রত্যয় না হয়, তবে এস, হৃদয়েশ ! তােমার ঐ সুশাণিত খঙ্গ দিয়ে অম্বার হৃদয় সহস্ৰ খণ্ডে বিদীর্ণ করে দেখ—এ পবিত্র কি না।-দেখ, হৃদয়ের স্তরে স্তরে তােমার ঐ মােহন-মূর্তি অঙ্কিত আছে কি না—প্রত্যেক শিরায় শিরায় তােমার ঐ অতুল্য প্রেম-প্রবাহের অমৃত- ময় স্রোত প্রবাহিত আছে কি না। শাল।—রাজকুমারি ! তোমার এ সকল বিলাপ কেবল অরণ্যে রােদন হচ্চে। সৌভপতি তােমার ও মায়াময় বাক্য-জালে বদ্ধ হ’বার নয় ! এক্ষণে তুমি যথা ইচ্ছা যেতে পার, শালরাজ তাতে কিছুমাত্র দুঃখিত বা ব্যথিত হবে না। অম্বা।—নিষ্ঠর! এই কি তােমার ইচ্ছা ? আমার উপস্থিতি তােমার এতদূর চক্ষুশূল হয়েছে ? ভাল, সেই ইচ্ছাই পূর্ণ হােক। কিন্তু ভাবার বলি, নির্দয় । অম্বা নিরপরাধিনী !—কেবল তােমারই প্রণয়ভিখারিণী ! কিন্তু, মহারাজ ! আজ এ অভাগিনী এখন তােমার নিকট জন্মের মত বিদায় হলাে।—আর এ লােকালয়ে মুখ দেখাবে না । যখন তার হৃদয়ের অধীশ্বর তারে

T"
ঘষ্ঠ অঙ্ক।
- "
এরূপ প্রত্যাখ্যান করলে, তখন জনমানবহীন
নিবিড় বনই তার উপযুক্ত আবাসস্থান হবে।
[বেগে প্রস্থান।
দ্বিতীয় গভঙ্ক।
কানন।-আলুথালু-বেশ অম্বার প্রবেশ।
অম্বা।—অভাগিনী অম্বা এখন আশ্রয়হীনা ?
বন-বাসিনী,?—হা নির্দয় বিধি !—এই কি তােমার
ইচ্ছে !আজ-কন্যা হয়ে আমার অদৃষ্টে এত দুঃখ ?
মা গাে !—এ সময় তুমি কোথায় আছ, মা! একবার
এসে দেখে যাও তােমার জনম-দুঃখিনী অম্বা এখন কি
ভাবে কি বেশে বনে বনে বেড়াচ্চে !—প্রিয়সখি মন্দা !
একবার দেখে যাও তােমার প্রিয়সখীর এখন কি দুর্দশা
হয়েছে! সখি ! তুমি বড় আশা করেছিলে আমি
রাজ রাজেশ্বরী হয়ে,স্বামী-সােহাগিনী হয়ে পৃথিবীর
সকল সুখ ভােগ করব,—কিন্তু এখন দেখসে নিষ্ঠুর
বিধাতা তা’র অদৃষ্টে কি আগুন জ্বেলে দিয়েছে !—তা’র
হৃদয়ের মধ্যে কি ভয়ঙ্কর শ্মশানের সৃষ্টি করেছে!
.
= =

মার- কুম। প্রাণেশ্বর শা! রমণী-হৃদয় যে কিরূপ প্রেম পােষণ করে তা তুমি বুঝলে না? দেখ নাথ ! এখনও তােমর জন্য দুঃখিনী অম্বার হৃদয়ের মধ্যে কিরূপ প্রণয়-শিখা প্রজ্বলিত হচ্ছে ! হায় । অভাগিনীর এখন কে আছে ! বিধাতঃ !—আমি তােমার চরণে কি অপরাধে অপরাধিনী যে, সেই জন্য এই দুঃসহ যন্ত্রণা দিচ্চ? নির্দয় ! পৃথিবীর ছার স্বার্থপর লােকের মত তােমারও রমণীর উপর এত অত্যাচার ? ওমা, মাগাে ! আর যে সহ্য হয় না !—কোথা রাজরাণী না বনবাসিনী । -বুক যে ফেটে যায় !-হা বিধাতঃ !-হা নিষ্ঠুর শাশ্ব- রাজ !হা সখি মন্দা মামা গাে-(মূচ্ছ। ও পতন) মহর্ষি হােত্র-বাহনের প্রবেশ। হােত্র।—একি ?—এই পবিত্র কানন-ভাগ আজ সহসা রমণীর আর্তনাদে পরিপূরিত হ’ল কেন ?—কোন দুরাত্মা দস্যু কি কোন নিঃসহায়া অবলার প্রতি অত্যাচার ক’র চে?—নতুবা এ ঘাের বিজনে সহসা এরূপ রমণীর ক্রন্দনধ্বনির ত কোন সম্ভব দেখি না ? (সহসা-ভূ- পতিতা অম্বাকে দৃষ্টি করিয়া)—একি ?—এই না একটি রমণী ধরাতলে নিপতিতা রয়েছে ?(নিকটে যাইয়া) ষষ্ঠ অঙ্ক। ৭৫ কেন এ হত- তাই ত; বােধ হচ্চে ইনি মুচ্ছিত হয়েছেন !—অহহ বিধাতঃ ! তােমার লীলা অসীম!—এ হেন নব-প্র- স্ফুটিত কুসুম-কলিকাটাকে দুঃখ-হুতাশনে দগ্ধ কর চো!. দেখি এই কমণ্ডলুর বারি লয়ে এর বদনে সিঞ্চন করে দেখি, যদি মচ্ছার অপনােদন হয়। (তদ্রুপ করণ ও কিঞ্চিৎকাল পরে অম্বার চেতনা লাভ ) অম্বা।—(চক্ষুৰ্মীলন পূৰ্ব্বক) মা গাে!—হত্ৰবাহনকে দৃষ্টি করিয়া) একি দেব ! আপনি কে ? ভাগিনীর মচ্ছভঙ্গ করলেন? এ যে অচৈতন্য অবস্থায় বেস ছিল,হৃদয়ের অনন্ত-দুঃখ-রাশির দুঃসহ যাতনায় ত কিছুমাত্র কষ্ট দিতে পারছিল না ;—আপনি কেন এ অভাগিনীর মুচ্ছাভঙ্গ করে পুনরায় এরে সেই জলন্ত অনল-শিখায় নিক্ষেপ করলেন ? হােত্র।--বৎসে !-শান্ত হওঁ, শান্ত হও !–এত উতলা হয়াে না।-দেখুঁচি তুমি সু-কুমারী বালিকা তােমার আকার-প্রকারে প্রতীত হ’চ্চে যে, তুমি অবশ্যই কোন রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছ। কিন্তু এরূপ ভয়- ঋর বিজন-বিপিনে এরূপ ভাবে তােমার আর্তনাদের কারণ কি? বৎসে ! তুমি কে? যদি কোন প্রতি- বন্ধক না থাকে, তবে তােমার এই দারুণ দুঃখের কারণ ;

মন্দার-কুসুম। আনুপূর্বিক বিবৃত কর, আমি এই বন-দেবতাকে সাক্ষী করে বলচি যে, যদি মনুষ্যের সাধ্যায়ভ হয়, তবে প্রাণ- পণে যেরূপে হােক, তােমার দুঃখ-অপনােফনের চেষ্টা করবাে। অম্বা।ভগবন্! এ অভাগিনীর কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করেন ?—আমার মত জনম-দুঃখিনী হত- ভাগিনী, বােধ হয়, এ ত্রিসংসারে আর নেই !-দেব! এই অভাগিনী মহারাজ কাশী-রাজের জ্যেষ্ঠা কন্যা-নাম অন্ধ ! হােত্র।—(অম্বাকে আলিঙ্গন করতঃ) হা বৎসে ! তুমি কি আমার সেই মাধবিকার জ্যেষ্ঠা কন্যা ? (ক্রোড়ে ধারণ করতঃ) এস কৎসে ! তােমাকে একবার ক্রোড়ে ধারণ করে হৃদয় পরিতৃপ্ত করি ! বৎসে ! আমি তােমার মাতামহ-হােত্ৰবাহন। অম্বা।–(সজল নয়নে হােত্ৰবাহনের চরণ ধারণ করতঃ)—দেব! আজ আমি পবিত্র হ'লেম!—এই দারুণ দুঃখের সময়ে আপনার চরণ দর্শন করে আমার হৃদ- য়ের সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা যেন একেবারে নির্বাণ হয়ে গেল! ভগবন্! আশীর্বাদ, করুন, এ হতভাগিনী যেন আপনার এই শান্তিময় চরণতলেই জীবন

সপ্তম অঙ্ক।
৭৭.
বিসর্জন দিয়ে চির-জীবনের মত হৃদয়ের জ্বালা
যুড়ােয় ।
হােত্র।--বৎসে ! শান্ত হও! শান্ত হও!“দেখ চি
বন-ভ্রমণে তুমি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়েছ, অতএব চল,
এক্ষণে আমার আশ্রমে গিয়ে শ্রান্তি দূর করবে, পরে
সময় মতে তােমার এই অভাবনীয় দুঃখের ইতিহাস
শ্রবণ করবাে। এস, বৎসে, আর বিলম্ব কোরনা।
[ অম্বার হস্তধারণ করিয়া প্রস্থান।
সপ্তম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
কানন মহর্ষি হােত্ৰবাহনের কুটীর।
হোত্র-বাহনও অন্ধা উপস্থিত):
হােত্র।-বৎসে!--শান্ত হও; শান্ত হও!
অম্বা।—(সরােদনে) যার হৃদয়-মধ্যে এরূপ ভয়ঙ্কর
অগ্নি-শিখা সৰ্ব্বদা প্রজ্জ্বলিত রয়েছে, তার আবার শান্তি,

মন্দার-কুসুম।
কোথায় ? ভগবন্! এ অভাগিনীর মনােবেদনা ত
সমস্ত শুনলেন, এখন যদি এর কোন প্রতিকারের
উপায় থাকে তা করুন। না হলে বলুন; আমি এই
মুহুর্তেই আপনার এই পবিত্র চরণে জীবন সমর্পণ
করে একেবারে সমস্ত দুঃখের অবসান করি !
হােত্র।—বৎসে! স্থির হও!—যদ্বারা তুমি এই
দুস্তর দুঃখজলধি হ'তে উত্তীর্ণ হতে পারবে,তার উপায়
বলচিবৎসে !—তুমি মহাত্মা জামদয়ের নিকট
গমন করে, তার কাছে তােমার দুঃখের এইরূপ আনু-
পূৰ্ব্বিক ইতিহাস কীর্তন কর, তিনি অবশ্যই তােমার
ইচ্ছা পূর্ণ করবেন। ভদ্রে!—তিনি আমার পরম
সখা। তুমি আমার নাম করে তার নিকট সমস্ত কথা
ব্যক্ত করলেই, তিনি প্রাণপণে তােমার হিতসাধনে
জটি করবেন না।অতএব বৎসে !—আমার বাসনা যে
তুমি অচিরাৎ সেই কালাগ্নি-সদৃশ মহাত্মা জামাদগ্যের
নিকট গমন কর। কিন্তু বৎসে ! একটী কথা;—তুমি
সু-কুমারী বালিকা—বিশেষতঃ কখন দুঃখের লেশমাত্রও
অবগত নও; অতএব আমি ভীত হ’চ্চি যে, পাছে
তুমি সেই সুদীর্ঘ-দুর্গম পথ অতিবাহন রূপ দুৰ্ব্বিষহ
কষ্ট সহ্য করতে না পার।
।।

সপ্তম অঙ্ক।
অম্বা।–বলুন, দেব! আজ্ঞা করুন,কোথায় সেই
ভুবন-বিখ্যাত ভার্গব অবস্থিতি করছেন। এই মুহুর্তেই
আমি তার উদ্দেশে গমন করবে।—তাতঃ ! অম্বা
এখন পাষাণ দিয়ে বুক বেধেছে, তার আর কোন স্থানে
যেতে শঙ্কা নাই !—সে দুল্য গিরিচূড়া হলেও
অক্লেশে অম্লানবদনে চরণ তলে বিদলিত করবে।
নিষ্ঠুর সংসারকর্তৃক পরিত্যক্তা অম্বা এখন আর সু-
কুমারী নয়—সে এখন পাষাণময়ী হয়েছে !
হােত্র।—বৎসে! সেই ত্রিলোেকবিখ্যাত ভার্গব
এক্ষণে মহেন্দ্র-শিখরস্থ মহাবনে সু-দুস্তর তপশ্চরণে
নিবিষ্ট আছেন। তুমি সেই স্থানে গমন করলেই তার
সন্দর্শন-লাভ করতে পারবে।
অম্বা।“ভগবন্! আজ্ঞা করুন, এই মুহূর্তেই এদাসী
তা’র উদ্দেশে গমন করবে।—(হােত্ৰবাহনের চরণ-ধুলি
গ্রহণ পূৰ্ব্বক)-দেব! আশীৰ্বাদ করুন।
হােত্র।-(মস্তকে হস্তাৰ্পণ পূৰ্ব্বক) কল্যাণী
তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হােক। দেবগণ তােমায় রক্ষা
=
করুন।
।
অকৃতব্রণের প্রবেশ।
অকৃত।“ভগবন্! প্রণিপাত করি।

১১। মন্দার-কুসুম । হােত।—(উঠিয়া আলিঙ্গন করতঃ) বৎস! “এস, এস : ইষ্টলাভ হােক।—এই কুশাসনে উপবেশন কর । (উভয়ের উপবেশন) অকৃত।—দেব ! আশ্রমের কুশল ? নির্বিঘ্নে তপ- শ্চৰ্য্যা হচ্চে ত? হােত্ৰ —গ, ভগবান ভবানীপতির আশীর্বাদে আশ্রমের সমস্ত কুশল !দেব-আরাধনায় কোন রূপ বিঘ্ন সংঘটন হয় নাই।এক্ষণে, বৎস !, আপন কুশল- সংবাদে সুখী কর।এক্ষণে কোন্ স্থান হতে আগমন হ’লল ?-অমিততেজা ভগবান জামদগ্ন এক্ষণে কোথায় অবস্থিতি করচেন ?—দেব-অরাধনায় ত কোনরূপ বিঘ্ন উপস্থিত হয় নাই ? অকৃত।ভগবানের আশীর্বাদে তপস্যায় কোন প্রকার বিবাধ সংঘটন হয় নাই ।-মহাতেজা ভগ- বান পরশুরাম এতকাল মহেন্দ্র-শিখরস্থ মহাবনে ঘাের তপস্যায় মগ্ন ছিলেন, এক্ষণে তথা হ’তে আপনার এই পবিত্র কাননে আগমন করেছেন। এবং বােধ হয়, অচিরাৎ আপনার এই পবিত্র কুটীরে আগমন করে আপনার সন্দর্শন লাভ করবেন। হােত্র।(অম্বার, প্রতি) বৎসে !—বােধ হয়, ভগবান ܝܢ সপ্তম অঙ্ক। তােমার প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করলেন ।তুমি যাঁ’র উদ্দেশে মহেন্দ্র-শিখর পর্যন্ত গমন করতে উদ্যতা হ'য়েছিলে, তিনি স্বয়ংই এখানে অচিরাৎ উপস্থিত । হবেন। অম্বা।—সকলি আপনার আশীর্বাদ। অকৃত।“ভগব।—এই কামিনীটি কে ?–এর আকার-প্রকার দেখে বােধ হচ্চে, ইনি কোন মহাকুলাে- দ্ভবা হবেন। অতএব এরূপ নবীন বয়সে ইনি কি জন্য সংসার পরিত্যাগ করে কাননবাসিনী হয়েছেন, শুতে অত্যন্ত অভিলাষ করি। হােত্র বৎস!—তােমার অনুমান, যথার্থ। ইনি মহারাজ কাশীরাজের জ্যেষ্ঠা তনয়া এবং আমার দৌহিত্রী।-ইনি সম্প্রতি কোন নিদারুণ মনােবেদনা প্রাপ্ত হয়ে, তৎপ্রতিকার হেতু আমার উপদেশ- ক্রমে, মহাতপা ভাবের শরণাপন্ন হ’বার ইচ্ছা করে- ছেন। অম্বা।—( অকৃতব্রণের প্রতি)-ভগবন্! আপনা- দের অনুগ্রহ ব্যতীত এ হতভাগিনীর আর উপায়ান্তর নাই। এ জনম-দুঃখিনীকে আপনারা কৃপা না করলে, আর কে করবে ?

মন্দার-কুসুম। অকৃত।-বৎসে! অনাথ-নাথ অবশ্যই তােমার প্রতি সদয় হবেন। পরশুরামের প্রবেশ। (সকলের সসম্রমে গাত্রোত্থান) হােত্র।আসুন, আসুন !আজ আপনার সন্দর্শনে পবিত্র হলেম !—আপনার চরণস্পর্শে আমার এই তপােবন পবিত্র হ’লাে !—আসুন, দেব ! এই আসনে উপবেশন করুন। (সকলের উপবেশন) পরশু।—(হোত্ৰবাহনের প্রতি )—ভগবন্!—আশ্র- মের কুশল ত ?—তপশ্চৰ্য্যা ত নির্বিঘ্নে সমাখা হচ্ছে ? হােত্র।-ভগবানের কৃপায় সমস্তই কুশল কোন বিষয়ে অসুবিধা নাই। বৎস অকৃতব্রণের প্রমুখৎ মহেন্দ্র-শিখরে আপনার তপঃসমাধার সংবাদে পরম পুলকিত হলেম। এক্ষণে ভগবন্! (অম্বার প্রতি নির্দেশ পূৰ্ব্বক)—এই অনাথিনী অবলার প্রতি কিঞ্চিৎ কৃপাদৃষ্টি করে আপনার সুমহৎ ব্রত-পালন করুন।—দেব! ইনি মূহুর্ত অগ্রে আপনার উদ্দেশে মহেন্দ্র-শৈল পৰ্য্যন্ত গমন ক’রতে উদ্যত হয়েছিলেন। পরশু।—(অম্বর প্রতি) বৎসে !—তুমি কে ?—কি .

সপ্তম অঙ্ক।
নিদারুণ মনঃকষ্টেই বা এরূপ বয়সে কানন-বাসিনী
হয়েছ ?বল, বৎসে বল ! মনুষ্যের সাধ্যাতীত না
হ'লে আমি তােমার দুঃখ-মােচনে প্রাণপণে চেষ্টা
ক’রবাে।
হােৰ।ভগবন্ , ইনি মহারাজ কাশীরাজের তনয়া
এবং আমার দৌহিত্রী।-ইনি মহারাজ সৌভপতির
প্রণয়াকাক্ষিণী হন; কিছু দিবস অতীত হ’লএদের তিন
ভগ্নীর স্বয়ম্বর উপলক্ষে উপস্থিত পৃথিবীর যাবতীয়
ভুপতিবর্গকে পরাজিত করে, শান্তনু-নন্দন ভীষ্ম তার
কনিষ্ঠ ভ্রাত বিচিত্রবীর্য্যের নিমিত্ত এদের হরণ করে
ল’য়ে যান এবং পরে ইনি শারাজের অনুরাগিণী, ইহা
অবগত হয়ে এরে তৎসমীপে গমন করতে অনুমতি
করেন।–সরল, শারাজের নিকট উপস্থিত হলে,
মহারাজ এরে অন্য-পূৰ্বা জ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইনি সেই দারুণ হৃদয়-বেদনাতেই এক্ষণে কানন-বাসিনী
হয়ে, প্রতিকার বাসনায় আমার উপদেশক্রমে আপনার
শরণাপন্ন হতে সঙ্কল্প করেছেন।
অম্বা।—দেব !-ভগবান্ পিতামহ যা বলেন, সে
সকলি এ অভাগিনীর প্রকৃত ইতিহাস।—এখন ভগব ।
আপনি এ দুঃখিনীর প্রতি কৃপা না করলে, এখনি

৮৪ মন্দার-কুসুম। আপনার চরণে প্রাণ-বিসর্জন দিয়ে সমস্ত দুঃখের অব- সান ক’রবাে-(সরােদনে)—নিষ্ঠর বিধাতা রাজকন্যা ‘ক’রেও আমার অদৃষ্টে এত দুঃখলিখেছিলেন !—দেব ! আর যে সহ্য হয় না । পরশু-বৎসে !শান্ত হও।—আমি এই মহর্ষি হােত্ৰবাহনের সম্মুখে আর আমার প্রিয়-শিষ্য, সুধাৰ্মিক অকৃতব্রণের সাক্ষাতে প্রতিজ্ঞা করছি যে, প্রাণপণে তােমার প্রিয়ানুষ্ঠান করবে। -এক্ষণে বল, এই অপ- রাধে কা’র শাস্তি প্রদান করা তােমার ইচ্ছা ? অম্বা।—আপনি ত সমস্ত অবগত হয়েছেন, এক্ষণে এর মধ্যে আপনার বিবেচনায় যে দোষী, তারেই সমুচিত শাস্তি দিন, এ বিষয়ে আমার মতামত জানাবশ্যক। পরশু।—আমার বিবেচনায় ভীষ্মই সৰ্ব্বাপেক্ষা দোষী। কেন না তিনি তােমায় হরণ না করলে, সৌভ- পতি কর্তৃক কখনই প্রত্যাখ্যাত হ’তে না। অতএব বৎসে ! আমি অচিরাৎ ভীষ্ম-সমীপে দূতদ্বারা পত্র প্রেরণ ক’রবাে,-যদ্যপি তিনি আমার বাক্যে সম্মতি প্রদর্শন পূৰ্ব্বক তােমাকে গ্রহণ করেন উত্তম, নচেৎ তারে সম্মুখ সমরে আহ্বান করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে তিলমাত্রও ত্রুটি করবাে না।—বৎসে ! আমি * 1

সপ্তম অঙ্ক।
৮৫
তােমাকে নিশ্চয় ব’লচি, ভীষ্ম পরমপূজা হলেও
আমার আদেশে মস্তক দ্বারা তােমার চরণ গ্রহণ ক’র
বেন।
অম্বা। দেব ! ভীষ্মের প্রতি আমার
কিছুমাত্র
আস্থা নাই। যদিও শাশ্ব-রাজ আমার চরিত্রে সন্দিহান
হ’য়ে আমায় প্রত্যাখ্যান করেছেন, তথাপি এ অভাগিনী
তাঁ’র জন্য হৃদয়মধ্যে এখনও অনন্ত প্রেম পােষণ করে।
দেব ! আপনার চরণে এ দুঃখিনী এখন এই প্রার্থনা
করে যে, আমি যা’র জন্য এরূপ অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত
হয়েছি—যার জন্য বনে বনে ভ্রমণ করে এতদূর অসহ্য
কষ্ট সহ্য করচি, তা’র সমুচিত শাস্তি দিতে ভগবান
যেন বিরত না থাকেন ।
পরশু।—বৎসে ! আমাকে আর অধিক ব’ল বার
আবশ্যক নাই। তুমি মহর্ষি হােত্ৰবাহনের যেরূপ
স্নেহের পাত্রী, আমার ও তদ্রুপ। তবে কিনা আমার
পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করে, যতদূর সাধ্য তােমার
প্রিয়ানুষ্ঠান করতে কিছুমাত্র ক্রটি করব না।
অকৃত।ভগবন্!—এই কন্যা আপনার আশ্রয়
গ্রহণ করেছেন, অতএব শরণাপন্নকে রক্ষা করা, তার
প্রিয়ানুষ্ঠান করা আপনার কর্তব্য। যদ্যপি ভীষ্মদেব

মন্দার-কুসুম। সমরে আহূত হয়ে পরাজয় স্বীকার করেন, তবে ইহার প্রীতিসম্পাদন ও আপনারও সত্য পালন করা হবে। দেব! আপনি পূৰ্ব্বে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ব্রহ্ম- দ্বেষীকে বিনাশ করবেন,ভীত ও শরণাপন্নদিগকে প্রাণপণে রক্ষা করবেন, সুতরাংএক্ষণে আপনাকে কোন ক্রমেই আপনার পুৰ্ব্ব-প্রতিজ্ঞা-পাশ ছেদন করতে হচ্ছে না। পরশু।—বৎস! তােমার পরামর্শানুযায়ী কাৰ্যই করা যাবে। আমি স্বয়ংই রাজকন্যাকে সমভিব্যাহারে লয়ে ভীষ্ম-সমীপে গমন করবাে। যদ্যপি তিনি আমার আজ্ঞানুযায়ী কাৰ্য্য করেন—উত্তম, নচেৎ সমুচিত শাস্তি দিতে কখনই বিস্মৃত হ’ব না। হােত্র।—দেব ! দিবা অবসান-প্রায় হয়েছে, কানন-বাসী তাপসগণ সকলেই সায়ংকালীন আরাধনা করতে সরস্বতী-তীরাভিমুখে গমন করছেন। চলুন, আমরাও প্রস্থান করি। পরশু।—(অকৃতব্রণের প্রতি)—চল, বৎস!—আরা- ধনার সময় অতিবাহিত হয়। [অম্বা ব্যতীত সকলের প্রস্থান।

সপ্তম অঙ্ক।
৮৭
D
দ্বিতীয় গভঙ্ক।
কুরুক্ষত্র।পরশুরামের কুটীর ।
(পরশুরাম ও অম্বা উপস্থিত)
ভীষ্মের প্রবেশ।
ভীষ্ম।ভগবন্! প্রণাম।দেব ! আপনার কুশল .
ত ?
পরশু।—(দণ্ডায়মান হইয়া দক্ষিণ হস্ত ভীষ্মের
মস্তকে অর্পণ করতঃ)-এস, বৎস এস! জয়লক্ষী
তােমার অঙ্ক-শায়িনী হােন।
ভীষ্ম।—দেব ! কি কারণে এ দাসকে আহ্বান
করেছেন?—আপনার কি কাৰ্য্য সংসাধন করতে হবে
আদেশ করুন, ভীষ্ম এই মুহূর্তেই তা সম্পাদন করে
আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করবে।
পরশু ভীষ্ম! বৃথা আড়ম্বরের প্রয়ােজন নাই,
যে উদ্দেশে তােমায় এস্থলে আহ্বান করেছি, তা’ শ্রবণ
কর। (অম্বাকে নির্দেশ পূৰ্ব্বক) এই কামিনীকে তুমি,
বােধ হয়, চিন্‌তে পারবে ?—মহারাজ!-ইনি সেই
কাশীরাজকন্যা অম্বা, যাঁ'রে তুমি স্বয়ম্বর-সভা হ’তে হরণ

মন্দার-কুসুম।
করে আন। এর বর্তমান অবস্থার বিষয় বােধ হয়, তুমি
অজ্ঞাত আছ। ইনি তােমার নিকট হতে সৌভপতির
উদ্দেশে গমন করলে, অপ্রেমিক নিষ্ঠুর শাশ্বরাজ
এরে অন্যাসক্ত জ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন।–সরল
রাজবালা মৰ্ম্মপীড়িত হয়ে নিদারুণ মনঃকষ্টে অনাথিনীর
ন্যায় বনে বনে ভ্রমণ করে আমার শরণাপন্ন হয়েছেন।
এক্ষণে ভীষ্ম ! আমার অনুরােধ, যে উপায়ে হােক,
তুমি এর স্বধৰ্ম্ম রক্ষা করে যথার্থ বীরের ন্যায় কাৰ্য কর ।
ভীষ্ম।গুরুদেব! ক্ষমা করবেন। আমি এ ক্ষণে
এ কন্যার জন্য কোন উপায়ই অবলম্বন করতে পারি না।
সত্য বটে, আমি এদের তিন সহােদরাকে স্বয়ম্বর-সভা
হ’তে হরণ করে আমরন করি, কিন্তু যে মুহূর্তে আমি
এর মূখে অবগত হ'লেম যে, ইনি পূৰ্বে হতেই মহারাজ
সৌভপতির প্রতি অনুরাগিণী, আমি তৎক্ষণাৎ জননী
সত্যবতী, অমাত্য ও ব্রাহ্মণগণের সহিত পরামর্শ করে,
এরে শাশ্ব-রাজ-সমীপে প্রেরণ করি। অতএব, দেব !
দেখুন এ বিষয়ে ভীষ্ম সম্পূর্ণ নির্দোষ।
পরশু।—তবে কি তােমার ইচ্ছা যে, এই রাজবা
অনাথিনীর ন্যায় চিরকাল এই ক্লেশ ভােগ করে ?
ভীষ্ম ।আমার ইচ্ছা কেমন করে?—রাজকন্যার
।

সপ্তম স্ক
৮৯
অদৃষ্ট-লিপি-বিধাতার ইচ্ছা ! বলুন, দেব ! আপনিই
বলুন, আমি এক্ষণে কি প্রকারে এই অন্যাক্তা রমণীকে
কুমার বিচিত্রবীর্য্যের হস্তে সমর্পণ করতে পারি ?
ভীষ্মদেব ভয়, দয়া অথবা কামবশতঃ কখনই স্বধৰ্ম্ম
পরিত্যাগ করবে না, এ তার চিরন্তন ব্রত।
পরশু।“ভাল, যদি কুমার বিচিত্রবীৰ্য্যকে এই
কন্যা দান করতে তােমার অভিলাষ না থাকে, তবে
স্বয়ংই গ্রহণ কর। বিবেচনা করে দেখ, ইনি তােমারই
জন্য ঈসিত পতি লাভে বঞ্চিত হয়েছেন—তােমারই
জন্য—শুদ্ধ তােমারই নিমিত্ত রাজকন্যা হয়ে এক্ষণে
বনে বনে ভ্রমণ করে এরূপ অসহ্য ক্লেশ সহ্য করছেন,
এর সকল দুঃখের মূল কেবল তুমিই একমাত্র !
অতএব আমার আজ্ঞা—তােমাকে অবশ্যই এ কন্যা গ্রহণ
করতে হবে ।
ভীষ্ম।গুরুদেব ! ক্ষমা করবেন—এমন অনু-
মতি করবেন না। ভীষ্ম কথনই, অাপন প্রতিজ্ঞা-
লঙ্ঘন অথবা তার অন্য যাচরণ করতে পারে না। দেব !
বলতে কি ?—স্বর্গ, মর্ত্য রসাতল—তিন লােকের রাজত্ব
অথবা তদপেক্ষা আরও অধিক যদ্যপি কিছু সৌভাগ্য
থাকে—সে সমস্তই লাভ করলেও ভীষ্ম কেবল মাত্র

৯০ মন্দার-কুসুম। সত্য ও ধর্ণের নিমিত্ত সে সমস্তকে চরণাঘাতে দূরে নিক্ষেপ করে। দেব ! যদ্যপি ভগবান্ সহস্র-রশ্মি আপন উষ্ণতা-বিহীন হন, বসুন্ধরা গন্ধহীনা,-সুর- পতি বিক্রম,-এবং ত্রিলােকারণ-ধৰ্ম্মরাজও ধৰ্ম্ম- চ্যুত হন, তথাপি ভীষ্মদেব আপন প্রতিজ্ঞা লজ্ঞান করবে না। পরশু-(সক্রোধে) কি পাপিষ্ঠ ! ভীরু ! একটী অবলা রমণীর প্রতি এতাদৃশ অত্যাচার করে—তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা দূরে থাক—অপ্রতিভ হওয়া দূরে থাক, —বরং অপিন তেজস্তি, অপর্ন ধৰ্ম্মানুষ্ঠান প্রদর্শন ক’রচো? আমাকে গুরু সম্বোধন করচো—অথচ আমার আজ্ঞার অবমাননাক’রতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হ’চ্চ না ?—কাপুরুষ !ভীরু !—কুরুবংশের কুলাঙ্গার ! —এই তােমার ধৰ্ম্ম-নিষ্ঠা—অবলা রমণীর প্রতি অত্যা- চার ?-এই তােমার বিক্রম?—ধিক্ তােমাকে ! তোমার প্রতিজ্ঞাকে ধিক,কুরুবংশে ধিক্“আর যিনি তােমারে গর্ভে ধারণ করেছিলেন—সেই ত্রিলোকপূজ্যা জাহ্নবী- কেও ধিক্ !-তুমি বীরের অধম। ভীষ্ম ! তােমার হস্তের ধনুর্বাণ দূরে নিক্ষেপ কর,—ও সকলের আর অবমাননা করো না।

; সপ্তম অঙ্ক। ভীষ্ম।—(উঠিয়া )-কর্ণ ! বধির হও।—বায়ু ! এ কলুষিত শব্দ বহন করতে বিরত হও।-পরশুরাম ! যথেষ্ট হয়েছে, এখনও সাবধান ! ভীষ্ম এরূপ গর্বিত, বচন—এরূপ কুৎসাবাদ কখনই সহ্য করে না। আমি এতক্ষণ তােমায় গুরুবলে মান্য করছিলেম, কিন্তু তুমি সেরূপ ব্যবহার করলে না—আপন মৰ্যাদা রাখতে পাল্যে না। অতএব তােমার এরূপ স্পর্ধার জন্য ভীষ্ম- দেব উপযুক্ত শাস্তি বা শিক্ষা দিতে কখনই পরাঘুখ হবে না। ভর্গিব ! প্রস্তুত হও, আজ ভীষ্মের বল-বীৰ্য্য জানতে পারবে। তুমি একবিংশতিবার পৃথিবী, নিঃ- ক্ষত্রিয়া করে, তাদের শােণিতে তােমার পিতৃ পুরুষের তর্পণ করেছিলে বলে, সৰ্ব্বদা গর্ব করে থাক,—কিন্তু বলতে কি, তৎকাল ভীষ্মের ন্যায় কোন ক্ষত্রিয়বীর পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে নি,তুমি কেবল তৃণ-গুচ্ছে অগ্নিসংযােগ করেছিলে মাত্র !–অতএব অদ্য তােমার সেই সমস্ত অহঙ্কার চূর্ণ করব !--তুমি পূৰ্ব্বে যেরূপ ক্ষত্রিয়-শােণিত-নদে তােমার পূর্ব-পুরুষের তর্পণ করে- ছিলে —অদ্য ভীষ্মদেব তােমার শােণিতে, তর্পণ করে সেই নিহত ক্ষত্রিয়গণের তুষ্টি সংসাধন করবে ! পুরশু।--(উঠিয়া)—আজ জালেম ভীষ্মের পরমায়ু !- ৯২ মন্দার-কুসুম। করু- শেষ হ'য়েছে !-মৃত্যু নিকটবর্তী হ'লেই পতঙ্গের পক্ষ উঠে থাকে। ভীষ্ম তােমার কালসন্নিকটে !–আজ স্বর্গস্থ সমস্ত দেবগণ সহায় হলেও জামদগ্ন্যর হস্তে তােমার নিস্তার নাই। এস, এস, ভীষ্ম !-আজ ক্ষেত্রেই তােমার সহিত সাক্ষাৎ করবে,—আজ শ্যেন- শৃগালে তােমার ঔদ্ধদেহিক ক্রিয়া সমাপন করবে। ভীষ্ম।—যে স্থানে ইচ্ছা চল, ভীষ্ম সেই স্থানেই তােমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবে। অদ্য তােমাকে বিনাশ করে ভীষ্মদেব ত্ৰিয়গণের ভীরুতার অপবাদ ক্ষালন করবে! [এক দিক দিয়া ভীষ্ম ও অপর দিক দিয়া পরশুরামের বেগে প্রস্থান। t, ৫ মন্দার কুসুম। তৃতীয় গভঙ্ক। কুরুক্ষেত্র ।–সমর-ভূমি । (যুদ্ধ-সজ্জায় সুসজ্জিত পরশুরাম ও ভীষ্ম উপস্থিত) পরশু।“ভীষ্ম ! তুমি বালক, সেই বিবেচনায় ভার্গব এত দিন তােমাকে স্পর্ধা প্রদান করেছিল— প্রকৃত যুদ্ধ করেনি, -কিন্তু তুমি সে স্পর্ধায় অত্যন্ত স্পর্কিত হয়ে উঠেছ, ভেবেছ পরশুরাম তােমার সম- তুল্য যােদ্ধা,অথবাতােমা অপেক্ষাও হীনবল। অত- এব, ভীষ্ম ! আজ তােমাকে আমার ভুজবল প্রদর্শন করাব, আজ দেখবে, এই একা জামদগ্ন্য মূর্তিমান সহস্র হুতাশনের ন্যায় তােমাকে নিমেষ মধ্যে ভস্মীভূত করবে। ত্রিলােক-পূজ্যা তােমার জননী জাহ্নবী সৰ্ব্বথা রােদনের অযােগ্যা হলেও, আজ তােমার বিরহে নয়নাসারে আপন কলেবর বৃদ্ধি করবেন। ভীষ্ম।—ভার্গব ! আর মিথ্যা বাক্য-ব্যয়ে প্রয়ােজন কি? সমরে অগ্রসর হও, এখনই কা’র কত বাহুবল— কা’র কিরূপ অস্ত্রশিক্ষা সমস্তই প্রকাশ হবে। যদি বাক্য কয়ে জয় পরাজয় সিদ্ধ হতাে, তা হলে, ভার্গব ! আজ মন্দার-কুসুম । তােমারই জিত ! কিন্তু প্রকৃত বীরপুরুষ সমর-নিপুণ ক্ষত্রিয়গণ সমরস্থলে বৃথা বাক্যবর্ষণ অপেক্ষা শরব- ণেরই সমাদর ও প্রশংসা করে থাকেন। জামদগ্ন্য ! তােমার ন্যায় বীরের নিকট যদি বাক্যই অমােঘ অস্ত্র হয়, তবে অগত্যা আমি পরাজিত হলেম। পরশু।—বুঝলেম, আজ তােমার মৃত্যু সন্নিকটে। আজ পুরন্দর-প্রমুখ সমস্ত দেবগণ তােমার পক্ষাবলম্বন করলেও পরশুরামের হস্তে কোন ক্রমে রক্ষা নাই। সাবধান, ভীষ্ম !--সাবধান —(আক্রমণ) ভীষ্ম।—( রক্ষা করিতে করিতে) ভার্গব ! ভীষ্ম সাবধানই আছে, কিন্তু তুমি নিজে সাবধান হও,এই দেখ তােমার ধনুগুণ ছেদন করলেম । পরশু।—(ধনুর্বাণ দূরে ক্ষেপণ পূৰ্ব্বক) ধন্য বীর ! বলতে কি ভীষ্ম ! এত দিনের পর আজ তােমার সঙ্গে যুদ্ধ করে যথার্থ সুখী হলেম !—কিন্তু বীর ! এইবার রক্ষা করতে বুললো! (অসি নিচ্চো পূৰ্ব্বক আক্রমণ) ভীষ্ম।(তদ্রুপ করণান্তর) এস বীর -ভীষ্মও প্রস্তুত আছে। (উভয়ের ক্ষণকাল অসি-যুদ্ধ ও সহসা পরশুরামের হস্ত হইতে অসি স্খলিত হইয়া ভূতলে পতন)

মার-কুসুম।
৯৫
ভীষ্ম।—(সহাস্যে)—বীরের বজ-মুষ্টিতে অস্ত্র-ধারণ
শিক্ষা করা উচিত।
পরশু।ভীষ্ম ! অস্ত্রই ভার্গবের নিকট শিক্ষালাভ
করে, ভার্গব কখন অস্ত্র-শিক্ষা করে না !ভীষ্মদেব !
এইবার তােমার শেষ, ব্রেহ্মাস্ত্র বাহির করিয়া) এই সময়
তােমর ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ কর !-(অস্ত্রত্যাগ ও
ভীষ্মের পতন)—হাঁ, এখন বীরের ন্যায় সমর-ভ, মির
শোভা বর্ধন কর !
[প্রস্থান।
অপর দিক দিয়া জাহ্নবীর প্রবেশ ।
গঙ্গা-হায়, হায় ! যা ভেবেছিলেম তাই হলাে।
(ভীষ্মকে ক্রোড়ে ধারণ পূৰ্ব্বক সজলনয়নে) বাছা! আমি
তােমাকে বার বার বারণ করেছিলেম, ও দুর্ধর্ষ ভাবের
সঙ্গে কলহ করাে না, তুমি তখন আমার কথা শুনলে না,
হায়! হায় !ভীষ্ম রে ! তােমায় এ অবস্থায় ভ তলে
পতিত দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে !–ওঠ বাছা, ওঠ !
হায় ! একি, একি!—একেবারে যে রক্তের স্রোত বয়ে
যাচ্চে !–(ভীষ্মের সশরীরে হস্তাপণ পূৰ্ব্বক)“হে
কৈলাসনাথ !—যদি তােমার চরণে আমার যথার্থ মতি
থাকে, তবে যেন এই মুহূর্তেই ভীষ্ম আমার সুস্থ হয়ে

৯৬ মার-কুসুম। উঠে !–(সুশ্রুষ ও ক্ষণকাল পরে ভীষ্মের চৈতন্য-লাভ ও গঙ্গাকে দেখিয়া সসন্ত্ৰমে উখান) ভীষ্ম।-একি জননি! আপনি এ সময় এসে আপনার কুলাঙ্গার সন্তানের প্রতি কেন এত স্নেহ প্রদ- শন করচেন ?—মা!—ভীরু-দুৰ্ব্বল ভীষ্মনরাধম ভীষ্ম আপনার এরূপ স্নেহের অযােগ্য ! হায় ! আজ আমি সমরে পরাজিত ?—হা, হা ! হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্চে ! আর সহ্য হয় না—সহ্য হয় না ! মা ! আজ্ঞা করুন, ভীষ্ম পুনৰ্ব্বত্র সেই ক্ষত্রিয়ের চিরশত্রু অহংকারী জামদগ্যের সহিত যুদ্ধ করবে ! বলুন দেবি কোন মহাপাপে আজ ভীষ্ম এরূপ অবমানিত-অপদস্থ হলাে ?—অ্যা ! ভীষ্ম আজ সমরে আহত—পরাজিত শত্রু কর্তৃক উপহসিত !–উঃ হু হু !-আর সহ্য হয় -সহ্য হয় না! ভার্গব ! এস,পুনৰ্ব্বার এস,ভীষ্ম সমর প্রার্থনা করচে। [বেগে প্রস্থান। গঙ্গা-বাছা ! ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও ! হায় ! হায় !-আজ দেখচি মহাপ্রলয়কাণ্ড উপস্থিত হবে। [পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রস্থান। ।

সপ্তম অঙ্ক। ৯ । উন্মাদিনী বেশে অম্বার প্রবেশ । অম্ব।—(উচ্চহাস্য করিয়া)—হা, হা, হা ! বেশ হয়েছে ! বেশ হয়েছে ! ভীষ্ম ! অসহায় অবলার উপর তুমি যেমন অত্যাচার করেছিলে—এর হৃদয়ে যে জ্বালা দিয়েছ, এখন তার ফলুভােগ কর ! ভেবেছিলে, সহায়- হীনা দুৰ্বলা রমণী তােমার কি করবে? কিন্তু এখন দেখ, পরমেশ্বর দুর্বলের বল—অনাথার আশ্রয় ! হা, হা, ভীষ্ম ! এই বুকে (হৃদয়ে হস্তাপণ পূৰ্ব্বক)—আমার এই বুকের মধ্যে যে জ্বালা জ্বালিয়ে দিয়েছ, আজ অম্বা, পিশাচীর মত,তা’র সেই জ্বালা, তােমার রক্তে জুড়বে! (ভূমি-পতিত ভীষ্মের রক্ত হস্ত দ্বারা উত্তােলন পূর্বক স্বীয় বক্ষে অৰ্পণ করিয়া) আঃ—হৃদয় শান্ত হলাে ! অন্ত- রের সেই দুরন্ত জ্বালার যেন কিঞ্চিৎ লাঘব হ’লাে ! হে অনাথনাথ ! অভাগিনীর অপরাধ নেবেন না। অম্বা এখন উন্মাদিনী ! সত্যবাদী ধার্মিক-চূড়ামণি--ভীষ্ম তা'রে উন্মাদিনী করেছে !—(নেপথ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া উচ্চহাস্যে) হা, হা, এই যে, আবার মজা বেধে গেছে ! আবার দেখচি দু’জনেই খুব যুদ্ধ করতে করতে এই দিকেই আছে! যাই আমি এখন এখান থেকে পলাই । (প্রস্থান।

মন্দার-কুসুম। { যুদ্ধ করিতে করিতে পরশুরাম ও ভীষ্মের পুনঃপ্রবেশ। পরশু।—ভীষ্ম ! অনুকম্পাবশতঃ তােমার জীবন সংহার করি নি, কিন্তু এবার আর রক্ষা নাই,এবার তােমার নিশ্চয়ই মৃত্যু। ভীষ্ম—ভার্গব ! ভীষ্ম মৃত্যুকে ভয় করে না ! আজ নিশ্চয় জাবে বসুমতী ভীষ্ম অথবা জামদগ্ন্য হীন হ'বে ! পরশুরাম ! সাবধান—এই দেখ তােমার কালপুরুষ উপস্থিত ! এই দিব্য অস্ত্র ব্যর্থ করতে বুঝবাে ! সাব- ধান, ভার্গব ! সাবধান!—(অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে উদ্যত, নেপথ্যে অব্যক্ত কোলাহল মেঘগর্জন ও বুজধ্বনি) আকাশবাণী। সম্বর সম্বর, বীর! সম্বর হে ক্রোধ। সম্বর সম্বর অস্ত্র নতুবা এখনি, রসাতলে যায় ধরা ইহার প্রভাবে ! (উভয়ে সবিস্ময়ে ঊর্ধ্ব দিকে দৃষ্টিপাত) (দেবর্ষি নারদের প্রবেশ ও উভয়ের মধ্যস্থলে আগমন করিয়া) নারদ। (ভীষ্মের প্রতি) বৎস! তোমার এ মহা- প্রলয়কারী অস্ত্র সম্বরণ কর। ঐ দেখ দেবগণ বিমান- মার্গে এই অস্ত্রপ্রভাবে পৃথিবী রসাতলে গমননান্মুখ দেখে উৎকণ্ঠিত-হৃদয়ে তােমাকে অন্ত্র ক্ষেপণে নিষেধ t সপ্তম অঙ্ক నన ক’রচেন। বীরগণ ! এক্ষণে তােমরা এ মহা অনর্থ- কারী সংগ্রাম হতে নিবৃত্ত হও ! উভয়ে।-(নারদকে প্রণাম করণানন্তর)—দেবর্ষির অজ্ঞা শিরােধার্য। নারদ।—বৎসগণ! ভবানীপতি তােমাদের কল্যাণ করুন ! [প্রস্থান। ভীষ্ম।—(পরশুরামের চরণে প্রণাম করিয়া) গুরু- দেব! অধীনের অপরাধ মার্জনা করবেন । পরশু (আলিঙ্গন করতঃ) বৎস! চিরজয়ী হও। [উভয়ের প্রস্থান। -----

মন্দার-কুসুম।
অষ্টম অঙ্ক।
t
সরস্বতী-তীর।
(একটী চিতাকুণ্ড প্ৰলিত)
গীত।
নেপথ্যে।
পাহাড়ী-আড়াঠেকা।
কেন রে দারুণ বিধি! এমন নিদয় হ'লে ?
কি দোষে হে দোষী দাসীতােয়ার চরণতলে ?
হয়ে রাজার নন্দিনী,
হইলাম নাথিনী,
পতি-প্রেম-ভিখারিনী, পাগলিনী ধরাতলে ।
জীবনের আশা যত,
সকলি হইল হত,
এ দুখ সহিব কত, মরি রে হৃদয় জ্বলে !
সহে না সহে না আর,
জীবন হইল ভার,
আজি দেহ ছারখার, করিব এ চিতানলে !
কতকগুলি শুষ্ক কাষ্ঠ হস্তে লইয়া উন্মাদিনীবেশা অম্বার প্রবেশ।
হা নিষ্ঠুর বিধাতা! এই কি তােমার ইচ্ছা ?
রাজকন্যা হয়ে বনে বনে, দেশে দেশে, অনাথিনীর
মত ভ্রমণ করে—এতকাল কঠিন তপস্যা করে
তথাপি তােমার করুণার পাত্রী হ’ল না? নিষ্ঠুর !
প্ন

% অষ্টম অঙ্ক। । * 4 সংসারের পাপী মনুষ্যের মত তুমিও এ অভাগিনীর প্রতি নির্দয় হয়ে রইলে?—এ অনাথিনীর করুণ- বিলাপে বধির হয়ে রইলে ? দুঃখিনী অম্বা তােমার চরণে কোন অপরাধে অপরাধিনী যে, সেই জন্যে তার প্রতি এমন নিষ্ঠরের মত ব্যবহার করলে ? সংসারের সকল আশা ভরসা যখন তার স্বপ্নের মত হলো, তখন আর সে কি সুখে, কি আশায় জীবনধারণ করবে ? হা, দেব পশুপতি! দেব ! এতকাল তােমার চরণ পূজা ক’র লেম, দুঃসাধ্য তপস্যা করে তােমার আরাধনা কর। লেম, তথাপি এ হতভাগিনীর প্রতি তােমার করুণা হ'ল ! দেব ? তবে আজ তােমার ও পবিত্র নাম হৃদয়ে আরাধনা করতে করতে এ অভাগিনী এই অনলকুণ্ডে জীবন-আহুতি প্রদান করবে ! মা, মা গাে ! এ সময় তুমি কোথায় আছ মা? আজ তােমার জনম দুঃখিনী অম্বা জন্মের মৃত তােমার চরণে বিদায় হ’ল ! মা গো! আজ হতে তােমার অম্বায় না এ পৃথিবী হতে লুপ্ত হলাে! প্রাণেশ্বর সৌভরাজ ! এই মরণ-কালে তােমার এ হতভাগিনীকে দেখা দাও! দেখ, নাথ! দেখ, তােমার প্রেম-ভিখারিনী অম্বার হৃদয়ে আজও তােমার ও মােহন-মূর্তি অঙ্কিত রয়েছে! আজও এর

%
মন্দার-কুসুম।
হৃদয়ের স্তরে স্তরে তােমার জন্য এ অনন্ত প্রেম পোষণ
করচে ! নাথ ! হৃদয়েশ! প্রাণেশ্বর ! (অগ্নিকুণ্ডে পতনাে-
খ)
মহাদেবের প্রবেশ।
মহাদেব।“বৎসে!” ক্ষান্ত হ্ও। আমি তােমার
প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। এক্ষণে অভিলষিত বর প্রার্থনা কর ।
অম্বা।—(চরণে নিপতিতা হইয়া) দেব।—আপনি
অন্তর্যামী, আমার মনের,—অন্তরের বাসনা সমস্তই
জানতে পারছেন। যদি এ অভাগিনীর প্রতি সদয়
হ'য়ে থাকেন, তবে এই বর দিন ;-আমি ইহজীবনে
যার জন্য এত জ্বালা সহ্য করলেম, জন্মান্তরে যেন
তার প্রতিশােধ দিতে পারি। দেব ! হতভাগিনীকে
ক্ষমা করবেন—অম্বা এখন উন্মাদিনী।
মহাদেব।—বৎসে! বিধাতারও ইচ্ছা তাই,
তােমার মনােভিলাষ পূর্ণ হবে ! (অন্তর্ধান)
অম্বা !—হাদের 'হতভাগিনীর প্রতি সদয় হয়েও
নিদয় হলে? তবে অার কেন, তবে বিধাতার ইচ্ছাই
পূর্ণ হােক। দেব-হুতাশন! এ জনম-দুঃখিনীকে কোলে
স্থান দেও। মা ! মাগাে। (অগ্নিকুণ্ডে পতন)
নেপথ্যে।—হায়হায়, কি হলাে ।

অষ্টম অঙ্ক।
১০
এক দিক দিয়া সবেগে আলুথালু-বেশা রতি ও তৎকিঞ্চিৎ
পশ্চাতে অপর দিক দিয়া মদনের প্রবেশ ।
e
রতি। (মদনকে দেখিয়া সবেগে যাইয়া গলদেশ
আলিঙ্গন করতঃ)-
কি হােল কি হোল, ন থ ! রতির জীবন।
হয় কি করিলে ? ওহে অম্বার কপালে ।
প্রেম-পরিণাম হলো ভীষণ এমন।
এই কি হে ভালবাসা রহিরে তােমার।
রতি প্রেমের, নাথ, এই পুরস্কার ?
আজন্ম তােমার পদ পুজি ভক্তিভরে
এই তা’র ফলঅম্বা পাইল হে যদি,
তবে আর কে করিবে রতিরে আদর,
রতিরে যখন তব এত অনাদর।
জানিতে ত, প্রাণেশ্বর, দুঃখিনী তন্বয়
প্রাণের পুতলি সম বাসিতাম ভাল,
তবে কেন বল, নাথ, কিসের লাগিয়া
এ নব-কুসুম-কলি পাষাণ-হৃদয়ে,
অনলে করিলে দান?-হা প্রাণেশ্বর !
জীয়ন্তে জ্বলন-জ্বালা জান ত কেমন ?
কি দোষ করিয়াছিল কাশী রাজ-বালা,
কি দোষে হেদোষী রতি তােমার চরণে ?
তাই, নাথ, হেন জ্বালা দিলে হে হয় ?
বিধিমতে জ্বালাইলে রতিরে তোমার ?
)
.

১০৪
মন্দার-কুসুম।
৫
কি ফল পাইলে ইথে,—কি সুখ লভিলে
হানিয়া রতির বুকে হেন শােক-শেল !
দেখাইতে পারি, নাধ, হৃদয় চিরিয়া
অম্বর লাগিয়া সেথা কি জ্বালা জ্বলিছে।
দেখিতে পাইবে নবে! হায় প্রাণেশ্বর !
কত আশা করি মনে অাপনি স্বহস্তে
(মস্তক হইতে একগাছী মন্দার মালা লইয়া) -
মার-কুসুমগুলি তুলিয়া যতনে
গাপিয়াছিলাম এই মালিক মোহন !
ভেবেছিনু অম্বা মোর,-যে দিনে তাহার
মিলিবে প্রাণেশ সনে, সেই দিন আমি
স্ব হস্তে দিব হে তা’র গলে দোলাইয়া !
মিশালে বিষাদ-বিষ সে সাথে আমার ?
বুক ফেটে যায়, নাথ, কি বলিব আর !
(মদনের বক্ষঃস্থলে বদন লুকাইয়া রোদন)
মদন।(তির চিবুক ধরিয়া)
কেন কঁাদ আদরিণি মদন মােহিনি!
সম্বর সম্বর, প্রিয় নয়নের জল!
বুক ফেটে যায়, রতি! ও তব নয়নে-
নিরখিলে অশ্রু-জল !--কি দোষ আমার,
বিধির অদৃষ্ট-লিপি জানিবে সকলি !
কা'র সাধ্য বল, তাহা করিবে খণ্ডন ?
(একখানি আলেখ্য প্রদর্শন পূৰ্ব্বক)
।
.
1,

অষ্টম অঙ্ক।
এই দেখ আঁখি মেলি, মদন-মােহিনি।
দেখাতে তােমারে, প্রিয়ে, ভবিষ্য ঘটনা
আনিয়াছি এই চিত্র বিধাতার ঠাই।
এই দেখ, ধরাধামে অতুলা রূপসী !
একি এ ভীষণ কাণ্ড! এই দেখ তব
প্রাণের পুতলি অস্থা কোথায় কি বেশে
কি কাৰ্য্য করিছে সিদ্ধ বিধির ইচ্ছায় !
রতি।—দেখিয়া ; চিত্রপটের এক স্থলে অঙ্গুলিদ্বার
প্রদর্শন পূৰ্ব্বক)• এ কি এ,
শােণিত-স্রোত ?
(চক্ষে হস্তাবরণ পূৰ্ব্ব )
ক্ষমা কর, নাথ।
দেথ্রিতে পারিনে আর, চিত্রপট তব,
দূরে ফেল, প্রাণনাথ ! মরি হে আতঙ্কে !
মদন।—দেখিলে ত, প্রাণেশ্বরি, আমার কি দোষ ?
বুঝিলে ত, অম্বা তব কিসের লাগিয়া
সহিয়াছে এত জ্বালা, ত্যজিয়াছে প্রাণ?
রতি।—দেখিছি বুঝিছি আর চাই না দেখিতে,
সুকাও তােমার, নাথ ! চিত্রপ খানি।
কিন্তু এক কথা বলি, প্রাণের মদন!
জানত বিশেষ, আমি অম্বারে কেমন
প্রাণের অধিক ওগো বাসিতাম ভাল ।
দেও, নাথ, অনুমতি এ মন্দার-মালা
অম্বার লাগিয়া যাহা গাঁথিয়াছিলাম,
অধার

মন্দার-কুসুম।
7
দিই তার চিতানলে ; তবুও আমার
হৃদয় হইবে স্নিগ্ধ কথঞ্চিতরূপে।
মদন।—পূরাও মনের সাধ, মদন-মােহিনি।
অনুমতি ইথে আর কিবা প্রয়ােজন?
রতি।—( অস্থার চিতানলে মন্দার-মালা অর্পণ
করিতে করিতে)
ধর ধর, রাজবালা জনম-দুঃখিনি।
রতির স্নেহের এই শেষ উপহার।
জন্মান্তর পক্ষে পুনঃ তোমারে, ভাবিনি,
করিব করিব মম প্রিয়-সহচরী।
যে ভক্তি করিতে তুমি এ জন্মে আমায়,
লহ এই অঞজনা প্রতিদান তার,
দিলাম তােমার, সই'! চিনল’পরে।
মদন।ধন্য সতি গুণবতি অতুলা রূপসি !
নারীর আদর্শ তুমি স্নেহের পুতলি !
চল চল, আদরিণি! হৃদয়রন।
সুরেশ্বরী আমাদের করেন স্মরণ,
এস এস যাই,সতি, অমর ভবন
এ দুখুর -নিকা হউক পতন!
[ রতিরে লইয়াপ্রস্থান।
যকনিকা পতন।
সমাপ্ত ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mondar-kusum

Author
Not Available
Title
Pouranik Biyoganta-drishya Kabya
File name
Mondar-kusum
Text
OCR done
Citation
1941
Published
2009/09/19
Publisher
Abinash Chandra Mukhopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
112
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Ambika
DLI number
512944
Barcode
4990010019969.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
3WqzLwakfN9
Download PDF

Mondar-kusum