Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Chinna-asha Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ছিন্ন-ঈশ।
“শশিনং পুনরেতি শৰ্বরী দয়িতা দ্বন্দচং স্বতঃম
ইতিতে বিরহান্তরক্ষমৌ কথমত্যন্তগত নমাইদহে
শ্ৰীযতীন্দ্রকুমার রায় চৌধুরী প্রণীত।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা
৬ চৈত্র, সন ১২৯৭ সাল।
No text on this page.
উপহার।
প্রিয় সুহৃদ
শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রবােধচাদ মিত্র।
সখে-
অনেক দিনের পর আমার আশালতায় আর
একটী ফুল ফুটিয়াছে ; আমার এই গুণহীন ফুলটি
কি লােকের নয়নরঞ্জন করিতে পারিবে ? ঈশ্বর
জানেন। প্রথমে যে ফুলটি ফুটিয়া ছিল, তাহা
এক জনকে সমর্পণ করিয়াছি; দ্বিতীয়টী কাহাকে
দিব ? এই ফুলটী আমার চক্ষে প্রথমটীর অপেক্ষা
বদ্ধিতায়তন ও সুন্দর হইয়াছে। এটী আমার অতি
আদরের ধন, তােমাকে সমর্পণ করিলাম, সাদরে
গ্রহণ করিও।
কলিকাতা।
৯ নং রামতনু বসুর লেন
৬ চৈত্র, ১২৯৭ সাল।
শ্রীযতীন্দ্রকুমার রায় চৌধুরী
সাং বারুইপুর ।
No text on this page.
ছিন্ন-আশা।
স্তোত্র।
প্রণমামি তব পদে বিশ্বরচয়িতা,
জানিনা কেমন দেহ,
কিবা মূর্তি কোথা গেহ,
কিবা নাম ধর তুমি,
কোথা বা জনমভূমি,
কোথা ব’সে এ ব্ৰহ্মাণ্ড করিলে সৃজন,
কত শক্তি ধর সর্ব কারণ কারণ ১
২
ছিন্ন-আশা।
কত লােকে কত নামে ডাকে তােমা সদা,
কেহ জগতের পিতা,
কেহ বা অন্তের ত্রাতা,
কেহ বিঘ্নবিনাশন,
কেহ বলে ভগবান্,
কেহ সর্বশক্তিমান্, অনাদি ঈশ্বর,
কত জনে কত আখ্যা দেয় হে তােমার ॥২
কিবা নাম বল দেব আমি তােমা দিব,
কি নামে ডাকিলে পরে,
এই ভব পারাবারে,
হবে না ডুবিতে আর,
ভেসে যাব অনিবার,
কি নামে ডাকিলে তােমা পাইব কাণ্ডারি,
বল প্রভু কৃপা করি ভব-ভয়হারী ॥৩
এক নামে দেব তােমা না পারি ডাকিতে,
সৃজন ভিন্নতা হেরে,
শত শত নামান্তরে
ডাকিতে তােমারে হয়,
কত লােকে কত কয় ;
স্তোত্র।
কেবল’হেরিয়া তব সৃজনের গতি,
কে জানে কখন কার কি হয় মূরতি ॥৪
ভােমার সৃজিত উষা হেরি হে যখন,
নিশির নীহার স্নাত,
তরুলতা কত শত,
মৃদু প্রাতঃ সমীরণে
দুলিছে আপন মনে,
বাহু প্রসারিয়া অন্যে ধরিবারে যায়,
অপর (ও) অমনি দুলে স্থানান্তর হয় ॥৫
বিফল উদ্যম হেরে সেই তরুগণ,
সন্ স রবে যেন,
ফেলে শ্বাস ঘন ঘন,
যে প্রশ্বাস বহমানে
কোটী কোটী নরগণে
নব জীবনের সনে হয় হে অধীর,
এ হেন সুন্দর ছবি হেরি প্রকৃতির ॥
সররানীরে কমলিনী হেরিয়া উষায়,
প্রাণপতি আগমন
বুঝিয়া, হরিষ মন
৪
ছিন্ন-আশা।
।
খুলিল শতেক দল ;
বায়ু ভরে পরিমল
চারিদিকে ছড়াইয়া সৌরভে মাতিল,
অমনি লম্পট ভৃঙ্গ চৌদিকে গুঞ্জিল ॥৭
ভ্রমরের রীতি হেরি যেন ঘৃণা ভরে,
পক্ষীগণ উচ্চস্বরে
সম্বােধিল তপনেরে,
ভূদ হস্তে পরিত্রাণ
করিতে পত্নীর মান,
চৌদিকে অটবী হতে পাখিতে ডাকিল,
প্রতিধ্বনি সেই শব্দ গাহিতে লাগিল ॥৮
ভ্রমরের উৎপীড়ন শুনিয়া শ্রবণে,
অরুণ লােচন ধরি,
পূৰ্বদিক পরিহরি,
দারুণ রােষের ভরে,
দহিবারে ভ্রমরেরে
উঠিল প্রচণ্ড রবি রক্ষিতে বামায় ;
পনে হেরিয়া ভয়ে মধুপ পলায় ॥৯
স্তোত্র।
৫
এ সকল যবে দেব হেরিহে নয়নে,
নাহি থাকে আত্মজ্ঞান,
তব প্রেমে মন প্রাণ
ভেসে যায় অনিবার,
ভুলে যাই এ সংসার,
ভুলে যাই এ জগতে অস্তিত্ব আপন,
সে সময়ে এক নামে ডাকে তােমা মন ॥১০
মধ্যাহ্বে তােমার প্রভু অপর মূরতি
হেরে, ভয়ে ভীত মন
হয়ে থাকে তানুক্ষণ,
সে রূদ্র মূরতি হেরে,
যেন জীব চরাচরে
বিষম প্রশান্ত মূৰ্ত্তি করে গাে ধারণ,
অস্থির তপন তাপে তাবৎ ভুবন ১১
উষাকালে যে তপনে মনের উল্লাসে,
পাখীগণ উচ্চস্বরে
ডেকেছিল প্রাণভরে,
এবে সে বিহগ গণ
ল’য়ে নিজ নিজ প্রাণ,
ছিন্ন-আশা
নীরবে নিস্তব্ধ ভাবে আপন কুলায়,
রয়েছে বসিয়া হের নিশ্বন্দের প্রায় ১২
পবন, তপন ভয়ে বহিছে না আর,
প্রকাণ্ড বিটপীচয়,
হয়ে সবে মৃত প্রায়,
রয়েছে দাড়ায়ে সবে
অতি ম্রিয়মান ভাবে,
একটী পল্লব তার কঁপিছে না আর,
এ সময়ে অন্য মূর্তি ভাবিহে তােমার ১৩
তপন তাপিত করি এ ভব মণ্ডল,
যবে পরিশ্রান্ত হয়ে
পশ্চিম গগনে গিয়ে,
ধীরে ধীরে অস্তাচলে,
বিশ্রাম লভিবে বলে
আপনার রূদ্ৰ মূৰ্ত্তি করে আবরণ,
অবসর বুঝি সন্ধ্যা দেয় দরশন ১৪
তখন সুধাংশু দেব গগনের ভালে,
তপন তাপিত জনে
তুষিতে অমৃত দানে,
স্তোত্র।
৭
লক্ষ লক্ষ অনুচর
সঙ্গে ল’য়ে আপনার,
উঠিল সুধার ভাণ্ড কক্ষেতে করিয়া
চকোর চকোরী প্রেমে উঠিল ডাকিয়া ॥১৫
বহিল অনিল তবে মৃদু মৃদু ভাবে,
সুধাকর-সুধা পিয়ে
আনন্দে বিভাের হয়ে,
পুষ্পের সৌগন্ধ হরি
নিজ তনু গন্ধ করি
ছড়াইয়া পরিমল চৌদিকে ছুটিল,
যুবক, যুবতী সনে রঙ্গেতে মাতিল ॥১৬
কোথাও, যুবতী কর্ণে গােপনে বলিল
‘তব পতি অন্য নারী
প্রণয়ে বক্ষেতে ধরি,
দেখে-এনু বিহারিছে,
প্রেম রঙ্গ রসে আছে”,
এই বলি উড়াইল যুবতী বসন,
লজ্জায় অবলা গাত্রে দেয় আবরণ ॥১৭
ছিন্ন-আশা।
পবনের রঙ্গ হেরি গগনের থালে
হাসিল চন্দ্রমা সুখে,
সে হাসিতে মন সুখে
গাহিল কোকিলে গান,
পঞ্চমে ঝঙ্কারি তান,
সে গানে, সুধাংশু সুধা লাগিল বষিতে
প্রেম-মূৰ্ত্তি এবে তব, পড়েহে মনেতে ১৮
আবার যখন দেব সমুদ্রের তীরে
দাঁড়াইয়া, এক মনে
চেয়ে দেখি হৃষ্ট প্রাণে,
সুবিশাল তাল সম,
অগণ্য লহরীগণ,
একে একে আসি তটে আঘাত করিছে
প্রতিঘাত পেয়ে পুনঃ আপনি ফিরিছে ॥১৯
বিশাল জলধি তাহা করি দরশন
আপনার সৈন্যগণে,
হারিছে তটের সনে,
বিষম রােষের ভরে,
পুনঃ অন্য অনুচরে,
স্তোত্র।
পাঠাতেছে অবিলম্বে তটেরে নাশিতে,
তাহাও নিস্ফল হ’লনারিল ভাঙ্গিতে ॥২০
এবার, এবার আর নাহিক নিস্তার,
জিগীষায় বাধা পেয়ে,
ঘাের রােষে মত্ত হয়ে
স্মরিয়াছে প্রভঞ্জনে,
যুঝিতে তটের সনে ;
তট সুশােভিত যত নগরীনিচয়,
এবার নিস্তার তব নহিক নিশ্চয় ॥২১
চেষ্টিছে
প্রকাণ্ড অর্ণবপােতে, সুদক্ষ কাণ্ডারী
নিজ প্রাণ পণ করি,
বাঁচাতে তার,
সকলি বিফল হ’ল,
তরিখানি না বাঁচিল,
বিষম তরঙ্গাঘাত নারিল সহিতে,
পশিল মুহুর্ত-মাঝে সাগর গর্ভেতে ॥২২
এতক্ষণ যুদ্ধ
করি
সমুদ্রের সনে,
নারিল রক্ষিতে আর,
কুল কুল আপনার,
১০ ১১
ছিন্ন-আশা।
এক প্রান্ত ভেঙ্গে গেল, '।
কত দেশ নষ্ট হ’ল,-
এ লীলা তােমার দেব হেরি হে যখন,
অন্য এক নাম তব ভাবিহে তখন ॥২৩
আবার যখন নাথ প্রকাণ্ড হিমাদ্রি
পাদদেশে, দাড়াইয়ে
স্থির নেত্রে থাকি চেয়ে,
স্থির নেত্রে সে মহান
দেহ হেরি, মন প্রাণ
অদ্রি সম সুবিস্তীর্ণ সুবিশাল হয়,
মন মাঝে অকস্মাৎ ভয় উপজয় ॥২৪
যখন তাহার সেই শ্যাম কলেবর
পানে, আঁখি তুলে দেখি
মেঘের বরণে মাখি
রয়েছে দাড়ায়ে, যেন
বসুধা করি বেষ্টন,
দূর হ'তে বােধ হয় ভীষণ মেঘেতে,
ঢেকেছে পৃথিবী যেন প্রলয় তরেতে ॥২৫
স্তোত্র
১১
এ এক মুরতি তব ; এ মূরতি যবে
নয়নে পথিক হয়
অন্য চিন্তা দূরে যায়,
হৃদয়, মানস, প্রাণ,
ঔদাসীন্য করে ধ্যান,
ইচ্ছা হয়, উদাসীন হইয়া জগতে
পুজি তব পাদ পদ্ম, পৰ্বত গর্তেতে ২৬
অভাগার শশী
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা নিশি। ১২৯৩।
কৌমুদী মাখিয়া আজি কেন হে আবার,
উঠিতেছ শশী তুমি গগণ উপরে,
কেন বা তারকা মালা, সােহাগের হার
পরিয়া দিতে ব্যথা, অভাগা অন্তরে ?
যাও বিধু ফিরে যাও আপন ভবনে,
হয়ােনা প্রকাশ আর মানব আঁখিতে,
হের তব অভুত্থানে সহস্র নয়নে,
প্রপাতের মত জল লাগিছে বহিতে ;
তুমি অস্ত যাও দেব জনমের তরে,
কঞ্চিৎ শান্তনা হবে অভাগা অন্তরে ১
অভাগার শশী।
আজিকার দিনে, গত বৎসর সময়
তুমিও উঠেছ চঁাদ, দেখেছ আমারে,
আজিও সে দিন পুনঃ, তুমিও উদয়
হইয়াছ, চেয়ে দেখ আমার অন্তরে,
সে দিনের মন আর আজিকার মন,
মানস নয়নে চাদ দেখ একবার,
সে দিন কি দশা ছিল, আজি বা কেমন
হইয়াছে, দেখে শশী করহে বিচার ;
সেই দিন ছিল বক্ষ আশাতে পুর্ণিত,
নৈরাশ্য তাহার স্থানে আজি বিরাজিত ২
জানি আমি এ জগৎ বিষাদের খনি,
জানি আমি এ জগতে নাহিক বিচার,
জানি আমি দ্যুতিমান আশীবিষ মণি,
ভীষণ ভীষণ তম গরল আধার ;
সেইরূপ তুমি চন্দ্র ফণি মণি প্রায়,
জগৎ নয়নে আজি অধিক উজ্জ্বল,
কিন্তু তব উজ্জ্বলতা, আমার হৃদয়
জ্বালাতেছে নিশি দিবা বরষি গরল,
১৪
ছিন্ন-আশা।
ঢেলনা ঢেলনা শশী বিষ ধারা আর,
কি হবে কাদায়ে বল প্রাণ তাভাগার ?
যে বিশাল বক্ষে তুমি করিছ বিরাজ,
তাহার (ই) সমান আজি হৃদয় আমার,
কিন্তু সে বিশাল মম হৃদয়ের মাঝ,
রহিয়াছে বিরাজিত ঘাের অন্ধকার ।
গগণের শুভ কায়া তারকা মতন,
আমার আঁধার হৃদে দুঃখ অগণিত,
আঁধার বসনে দেহ করি আবর,
বিভিন্ন মূরতি ধরি হের কত শত ;
শােক, তাপ, মনঃ ক্লেশ, ভীষণ মূরতি,
মৰ্ত্তিমা সবে যেন, ভয়ানক কাতি ॥ ৪
তাই বুঝি তুমি চন্দ্র সহস্র নয়ন
করিয়াছ বহির্গত, হেরিবার তরে ?
প্রত্যেক নয়নে বুঝি প্রতি একজন
হরিবে বলিয়া, এত আনন্দ অন্তরে ?
অভাগার শশী।
অধম পামর তুমি নীচ অতিশয়,
সুখ, দুঃখ, হিতাহিত নাহিক বিচার,
আপন আনন্দে, তব অধম হৃদয়
আনন্দিত অনুক্ষণ, অতি স্বার্থপর ;
কে বলে কোমল চন্দ্র সুধার আধার ?
পাষাণে গঠিত শশী, বিষের ভাণ্ডার ।৫
প্রত্যক্ষ তাহার তুমি দেখহ নয়নে,
গভীর কলঙ্ক কেন হৃদয়ে তোমার,
কেন হেন প্রীতিকর সুন্দর বয়াণে,
করিলেন জগদীশ কালিমা সঞ্চার ;
আবার যখন সেই গ্রহণের দিন,
বিকট বদনে রাহু গ্রাসিবারে যায়,
কেন বা সে দিন তুমি হইয়া মলিন,
ভিক্ষা কর নিজ প্রাণ হন্তারক পায় ;
দয়া মায়া হীন তুমি, পামর বলিয়া
শাস্তি পাও বিধিমতে রাহুর লাগিয়া ॥
সন্তাপির মনস্তাপে এই যে ধরণী
হয়েছে বিষম তপ্ত হের শশী চেয়ে,
ছিন্ন-আশা।
এখন শীতল যদি না হয় অবনী,
ত্বরায় নিশ্চয় তবে উঠিবে জ্বলিয়ে ;
নিভিবেনা সে অনল এ জনমে আর,
পুড়িবে তাবৎ ধরা তুষাগ্নির মত,
নন্দন কানন সম, এ হেন সংসার
ছারে খারে যাবে সব, হইবেরে হত ;
হবে না কাহার ও হৃদে আশার সঞ্চার
শুশশান সমান হবে সােনার সংসার ।।৭
অতএব তুমি শশী হইয়া উদয়
দিওনাকো ব্যথা আর অভাগা হৃদয়ে,
তােমার উদয়ে যদি কেহ ব্যথা পায়,
কি কাজ তােমার তবে গগনে উদিয়ে ?
স্বার্থ শূন্য হও বিধু দেখিবে তখন,
তাবত্ অভাগা ভবে পুজিবে তােমায়,
অভাগা দেবতা শীর্ষ স্থানে পাবে স্থান,
আর না শপিবে তােমা সন্তাপি নিচয় ;
অভাগা পুর্ণিত এই বিশাল ভূবনে,
পূজিবে তােমারে সবে অতি হৃষ্ট মনে ||৮
অভাগার শশী।
১৭
প্রণয়ীর তরে তুমি হয়েছ সৃজিত
প্রণয়ী প্রাণেতে তব হবে বাসস্থান
প্রেমিক হৃদয় তােম পুজিবে নিয়ত
হাসিবে তােমারে হেরে প্রেমিক নয়ন ।
তাদের অন্তর কত আশাতে পূর্ণিত,
নব নব আশা উঠে নব নব দিনে,
দুরাশার (ও) দাস ভবে আছে কত শত,
আকাশ কুসুম যারা ভাবে মনে মনে ।
তাহাদের স্থানে তুমি আদৃত হইবে,
নিতি নিতি সুধাকর কত মান পাবে ।
;
আমিরে অভাগা আজি বিশাল জগতে,
প্রণয়ীর মত নহে হৃদয় আমার ;
আমারও শােন শশী, প্রাণের মাঝেতে
ছিল এক দিন বহু আশার সঞ্চার ;
তখন তােমারে দেব গগন উপরে
হেরে কত হয়েছিল আনন্দ অপার,
জানি না তখন মনে, বৎসরেক পরে
বজ্রাঘাত হবে সেই আনন্দ উপর,
১৮
ছিন্ন-আশা।
মূল সহ আশালতা হবে উৎপাটিত
মরুভূমে হৃদি মম করি পরিণত ১০
এখন উদাস্ হৃদি, আমিও উদাসী,
সংসার স্বপন সম মম মনে হয়,
সংসার সুখেতে আর নহি অভিলাষী,
সংসারে থাকিতে প্রাণ আর নাহি চায় ;
দিব্য চক্ষে দেখি যেন কেমন সংসার,
যত দেখি তত মন উদাসীন হয়,
যত ভাবি, তত দেখি সকল (ই) অসার,
সকল (ই) দুদিন তরে, চির স্থায়ী নয় ;-
সংসারের অসারত্ব যত ভাবি মনে,
তত যেন মন মাঝে বিতৃষ্ণা জনমে ॥১১
যে নয়নে আমি আজি হেরিছি সংসারে,
সে নয়নে সেই জন দেখিবেরে তায়,
মম যম দুখী সেই জগত মাঝারে,
অবশ্য অবশ্য হবে জানিও নিশ্চয় ;
অভাগার শশী।
১৯
হায় শশী, কেন মম হেন দশা হল
কি হেতু পরাণ মম সংসার না চায়,
সংসারের প্রতি সেই মায়া কোথা গেল ?
কেন বা জগৎ আজি শূন্য বোধ হয় ;-
বলিলে না, শুনিলে না, বচন আমার,
যাব শশী ছাড়ি ত্বরা এ পাপ সংসার ॥১২
যাব শশী ছাড়ি ত্বরা এ পাপ সংসার !
কোথা যাব ? কোথা গেলে মম স্থান হবে ?
এ জগতে হেন স্থান আছে কি আমার,
যাইলে যেখানে মম হৃদয় জুড়াবে ?
যদি থাকে, স্থান লয়ে কিবা মম হবে,
প্রয়ােজন মম সেই সুধার আধার,
সেই সুধা বরিষণে এ জালা নিভিবে,
সেই জন বিনা মম নাহিক নিস্তার ;-
তুমি যদি সুধারাশি ঢাল নিরন্তর,
নিভিবেনা সে সুধায় আমার অন্তর ১৩
জান তুমি বল শশী কোথা সে আমার,
এখনি মিশিব গিয়া তাহার সদনে,
ছিন্ন-আশা।
ছিড়েছি মায়ার জাল, বন্ধন সংসার,
থাকিব সেখানে সুখে মােরা দুই জনে ।
সুদূর সে স্থান এই ভবধাম হতে
নাহিক যেখানে কোন অন্যায় বিচার ;
যেখানে শমন দুষ্ট নারে প্রবেশিতে,
যম-ভয়ে ভীত নয় অন্তর কাহার ;-
চির পুণ্যবতী আহা অমর নগরী
জ্ঞান সূৰ্য্য চির নভে নাহিক সৰ্বরী ॥১৪
বল শশী, বল শশী, বিলম্ব না সয়,
পলকে প্রলয় জ্ঞান হ’তেছে আমার,
দারুণ বিরহানলে বুঝি প্রাণ যায়,
বাঁচাও বারতা কহি আজি সুধাকর ;
হৃদয় সমুদ্র মম চিন্তার বায়ুতে
ঘােতর উদ্বেলিত অজি হইয়াছে,
তাপ জীর্ণ হৃদি মম সে ঘাত সহিতে
মুহুর্তের তরে হায় আর না পারিছে,
ভাঙ্গিল ভাঙ্গিল বুঝি হৃদয় আধার,
মরি তাহে ক্ষতি নাই, কোথা সে আমার ॥১৫
মাধবী সম্ভাষণ
মাধবি লে-
হৃদয়ে আমার কত যে যাতনা
হতেছে সহিতে, কত যে ভাবনা
উদিছে সদাই, বিরাম জানেনা
সুধু না মাধবী তােমার তরে ।১
সংসার গহনে তােমারি কারণ,
তব প্রেম রঞ্জু করিয়া ধারণ,
কত ঝঞ্চাবায়ু বজ্রের পতন,
সহিছি নিয়ত তােমার (ই) তরে ॥২
ছিন্ন-আশা।
দুলিয়াছে দেহ কুলীশ পতনে,
দুলিয়াছে দেহ যোর প্রভঞ্জনে,
পাইয়াছি ব্যথা শাখার ভঞ্জনে,
এখন সে ব্যথা পরাণে বাজে ।৩
দারুণ সে ব্যথা কখন যাবে না,
এ পোেড়া হৃদয় প্রশান্ত হবে না,
এ ঘাের অনল কভু নিভিবে না,
এবে ছেড়ে যাও এই কি সাজে ?৪
তুই লাে মাধবী, আমি সহকার,
আমার এ তনু আশ্রয় তােমার,
তােমা বিনা অন্য দিব না ক' আর
তথাপি কি হেতু শুখায়ে যাও।৫
উঠ ধনি ওঠ, খােলরে নয়ন,
কত নিদ্রা যাৰে শােনরে বচন,
আলিঙ্গন দাও জুড়া পরাণ,
অমিয় বচনে প্রাণ জুড়াও।
মাধবী সম্ভাষণ।
নিশি শেষ, পিক কুহরিল,
পূরব গগনে অরুণ হামিল,
আমার শিরেতে হেমাভা ভাতিল
এখন নয়ন মুদিত তব ।।৭
কত নিশি আসে কত যায় চলে,
তথাপি মাধবী তুমি না চাহিলে,
মুদিত নয়ন কভু না খুলিলে,
হায় এ যাতনা কাহারে কব ।।৮
নিশাকালে আমি শিশির রূপেতে,
কত যে কেঁদেছি তােমার বক্ষেতে,
কর প্রসারিয়া ও চাদ মুখেতে
যতনে প্রণয়ে চুমিতে যাই।
আমার সে আশা সফল হয় না
তব মুখ শশী স্পর্শিতে পাই না,
তৃষিত হৃদয় শীতল হয় না
কাদিয়া দিয়া নিশি কাটাই ॥১॥
২৪
ছিন্ন-আশা
তুমি লল। মাধবী জড়াইতে চাও,
স্মৃতির বায়ুতে পুনঃ ছিন্ন হও,
দীন হীনা বেশে ভুগেতে লুটাও
মস্তক তুলিতে পার না আর ॥১১
ভুলিবারে যাই আমি সযতনে,
পুনঃ স্মৃতি বায়ু বহে লাে সঘনে,
দূরে যাও তুমি প্রতি ক্ষণে ক্ষণে,
বদন ঢাকিয়া করেতে তোর ॥১২
কর পদ্ম তব গঠিত লতায়,
জড়িত রয়েছে লতায় পাতায়,
হায় রে মরি কি সুন্দর দেখায়,
লতার বদন লতার কায়া ১৩
কেন রে পবন সে লতা ছিড়িলি,
সহকার প্রাণে অশনি হানিলি,
কেন রে এমন কুকাজ করিলি,
কে বুঝে জগতে তােমার মায়া ২৪
মাধবী সম্ভাষণ।
২৫
আয়রে মাধবী হৃদয়ে আমার
ডাকি সকাতরে তােরে বারম্বার,
এত কি নিদয় হৃদয় তােমার ?
তবু না শুনিছ আমার বাণী ॥১৫
জানিতাম মনে রমণী হৃদয়,
সুকোমল অতি কুসুমের প্রায়,
প্রেমের আধার, সরলতাময়
মূর্তিমান স্নেহ বলিয়া জানি ১৬
তুই ও মাধবী নারীবংশজাত,
কোথা সে প্রণয়, কোথা সরলতা,
কোথা ভাল বাসা, কোথা সে মমতা,
রমণী-মাহাত্ম কোথায় গেল?১৭
রমণী কোমল, রমণী সরল,
রমণীর প্রাণে নাহি হলাহল,
জানেনা রমণী কেমন গরল
এ বিশ্বাস মম আজি ঘুচিল ॥১৮
ছিন্ন-আশা
নতুবা মাধবী কি হেতু বল না
রমণী হইয়া বচন গুন না,
রমণী হইয়া প্রণয় জান না,
নয়ন বারিতে আনন্দ পাও ১৯
এত দিন আমি এত সকাতরে
দিবস রজনী ডেকেছি তােমারে,
শয়নে স্বপনে কেঁদেছি অন্তরে,
তথাপি বারেক ফিরে না চাও।২৫
এত ডাকিয়াছি আর না ডাকিব,
প্রেম-তরু-মূলে কুঠার মারিব,
জীবনের সুখে জলাঞ্জলি দিব,
আর না বাসনা রাখিব মনে।২১
বাসনা রাখিলে কে তাৱে পূরায়
আমার মাধবী আমার সে নয়,
মরম বেদনা জানাইব কায়,
উদিলে মানসে বাজেরে প্রাণে ২২
মাধবী সম্ভাষণ।
তােরে লে মাধবী বিলায়েছি মন,
মম মন এবে নহেরে আপন ;
আপনার ধন অপরে গ্রহণ
করেছে, উপায় নাহিক তার ২৩
বিলায়েছি যাহা ফিরায়ে লব না,
আর প্রতিদান কে দেবে বল না,
প্রতিদান দিতে রমণী জানে না,
আমার হৃদয়ে সহে না আর ২৪
কেন না সহিবে, অবশ্য সহিবে,
যাতনা সহিতে শিখেছে, শিখিবে,
অনেক স’য়েছে, এখন সহিবে,
যাতনা সহিতে কাতর নহি।২৫
কত ঝড় বৃষ্টি, কত উল্কাপাত,
কত ভূকম্পন, কত বজ্রাঘাত,
কত যে সয়েছি, কত যে উৎপাত
সকলি কাননে দাঁড়ায়ে সহি ২৩
২৮
ছিন্ন-আশা।
যা রসাতলে প্রণয় আমার,
এ স্বর্গীয় ধন কারে দিব আর,
অপাত্রে দিব না প্রণয় আমার,
দিব না কখন থাকিতে প্রাণ ২৭
ভিখারী যেমন রতন চেনেনা,
সংসারী যেমন ঈশ্বরে ভাবেন,
তেমতি প্রণয় কেমন জানেনা,
কঠিন অবলা রমণী মন ২৮
এ অমূল্য ধন কোথায় রাখিব,
হৃদয়ে বহিতে আর না পারিব,
জ্বর জ্বর হৃদি কত আর সব,
প্রণয় রাখিতে আধার চাই ২৯
কোথায় আধার ? কার করতলে
প্রাণের রতনে আর দিব তুলে,
তাই বলি প্রেম যা রসাতলে,
চিরদিন তরে প্রাণ জুড়াই ৩০
মাধবী সম্ভাষণ।
২৯
জুড়াবে প্রাণ আর এ জনমে,
যে কাল অনল জ্বলিতেছে মনে,
জর্জরিত প্রাণ যাহার দহনে,
নিভাইতে তারে সলিল নাই ॥৩১
জুড়াবে প্রাণ বিনা সে জীবন,
কোথা সে জীবন প্রাণের রতন,
যে বারি সিঞ্চনে, সহকার প্রাণ
আছে এত দিন, তাহারে চাই ৩২
কোথা সে বারিদ কোথায় পাইব,
আর কি জীবনে সে মেঘে দেখি,
সেই শ্যাম কান্তি সদাই হেরিব,
সহকার প্রাণ নিয়ত চায় ॥৩৩
হেরি যেন তারে সদা হয় মনে,
আলুলিত কেশা সংসার গহনে,
সেই মৃদু হাসি অধরের কোনে,
এখন যেনরে ভাসিয়া যায় ৩৪
ছিন্ন-আশা।
এখন যেনরে সে মেঘ মাধুরী
সহকার সনে করিছে চাতুরি,
কখন লুকায়, কখন বা হেরি,
কখন কোথায় চলিয়া যায়।৩৫
কোথা চলে যায় না পাই দেখিতে,
অভাগার প্রাণ থাকেরে কঁদিতে,
প্রেমবারি তরে কাতর প্রাণেতে,
বারিদে বারি দে বলিতে হয় ৩৬
যাচিব না প্রেম আর কার করে,
তেমন প্রণয় কে দেবে আমারে,
সহকার তরু জ্বলিবে অন্তরে,
অপর উপায় নাহিক তার ৪৩৭
আপনি জ্বলিব, মরমে মরিব,
প্রণয়ের তরে ভিক্ষা না করিব,
প্রাণ দিতে হয় দ্বিধা না ভাবিব,
তবু না যাচিব প্রণয় কার ৩৮
শব-সম্বােধন!
“নব পল্লবসন্তরেহপি তে মৃদুদুয়েত যদঙ্গমর্পিতম্।
দিদং বিসহিতে কথং বদ বামােক চিধিরােহণম।”
কালিদাস।
কে তুমি বলনা ধনি কেন এ দশায়
নয়ন মুদিত করি
লােকালয় পরিহরি
রয়েছ শায়িত হেথা খট্টাঙ্গ উপরে,
রমণীসুলভ লজ্জা নাহিক অন্তরে।
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, আদি মুহুর্তের তরে
পারে নাই, যে বদন
করিবারে দরশন,
সামান্য পথিক (ও) আজি, হায় সেই জন
পা দিয়া চলি যায় ফিরায়ে বদন ২
কাহারে কাদায়ে বল এসেছ চলিয়া
কার গৃহ শূন্য করি,
কার হৃদে শেল মারি,
এখানে শরীর তব বিশ্রাম লভিছে,
দেখে এস গৃহে তব কি গোল উঠেছে ॥৩
৩২
ছিন্ন-আশা।
তােমার বিহনে ধনি, তােমায়ি সংসারে,
দেখে এস একবার
পড়িয়াছে হাহাকার,
পতি, পুত্র, কন্যা তব হয়েছে অজ্ঞান
ভীষণ হয়েছে দৃশ্য শ্মশান সমান ॥৪
রমণী কোমল প্রাণ, বলনা কেমনে
পতি প্রাণে ব্যথা দিয়ে
এখানে নীরব হয়ে
স্বচ্ছন্দে নয়ন মুদি রয়েছ শুইয়া,
হাহাকার করি পতি বেড়ায় কাঁদিয়া ৪৫
বালিকা বয়স তব, কেন এ বয়সে
তেয়াগি সংসার আশা,
পতিপ্রেম, ভালবাসা,
অনন্ত অচিন্ত্য সুখ, কিসের কারণ
জলাঞ্জলি দিয়া কোথা করিছ গমন ৬
সুচিকণ কেশপাশ এলায়ে পড়েছে,
যতন বিহনে তারা,
সতত চুমিছে ধরা
শব-সম্বোধন।
বাঁধিতে যাহারে সদা কতই আদরে,
আজি সে চিবুর তব লুণ্ঠিত ধূসরে ॥৭
কর তুলি তােল ধনি সে চিকুর দাম ;
পারি না দেখিতে আর
এতেক দুর্দশা তার ;
আদরের ধনে যদি অনাদর হয়
বিষম আঘাত পায় আমার হৃদয় ৮
এত ডাকি কেন তবু না শুনিছ বাণী
এখন নীরব হয়ে,
কেমনে রয়েছ গুয়ে ?
ডাকি আমি বারে বারে কাতর অন্তরে,
কেন না উত্তর তবু দিতেছ আমারে ।৯
বুঝেছি বুঝেছি আর কারেই বা ডাকি,
কে দিৰে উত্তর আর,
কে তুলিবে কেশভার,
কালপুর্ণ এত দিনে হইয়াছে বলে
ঘুমায়েছে অভাগিনী ধরমের কোলে ১০
৩৪
ছিন্ন-আশা।
যায় নাই স্বইচ্ছায় তেজিয়া সংসার,
স্বইচ্ছায় পতিধনে
ত্যেজে নাই হৃষ্ট মনে,
কি করিবে ? অনিচ্ছায় তেজেছে সংসার,
কালের কঠোর করে নাহিক নিস্তার ॥১১
এখন, এখন দেখ বদন কমলে
রয়েছে বিষাদরেখা,
স্পষ্টতর যায় দেখা
স্পষ্টরূপে বােধ হয়, যেনরে মনেতে
ছিলনা তিলেক বাঞ্ছা সংসার ছাড়িতে ॥১২
সুবৰ্ণ বরণ এবে পাংশুর আকার
হইয়াছে তব কায়,
প্রাণে না সহিছে তায়,
প্রচণ্ড মার্তণ্ডপে মলিন হয়েছে,
জানি কতই ক্লেশ হৃদয়ে হ’তেছে ॥১৩
বিন্দুমাত্র ঘর্ম হলে, শতেক ব্যজনী
দুলিত যাহার পাশে,
সেই জন কি আয়াসে
শব-সম্বোধন।
৩৫
রয়েছে শায়িতা হেথা আজি একাকিনী,
কোথায় চামর এবে কোথা বা সঙ্গিনী ॥১৪
উঠ ধনি চেয়ে দেখ মেলিয়া নয়ন
কি দশা হয়েছে এবে,
কোথা ছিলে কোথা যাবে,
হেরিয়া আজিকে তব মুদিত নয়ন
আত্মীয় স্বজন সবে করিছে লােদন ॥১৫
সাধের ভবন তব সাধের সংসার
কি সাধে ছাড়িয়া যাও ?
যাও ধনি ফিরে যাও,
যাহার আবাস স্থান নন্দন কানন
উচিত না হয় তার শ্মশানে শয়ন ১৬
ওই দেখ ধুলিরাশি ঘেরিল অম্বরে,
ওই দেখ আসে যায়,
এখনি পড়িবে গায়,
সুন্দর বয়ান খানি মলিন হইবে,
কোমল হৃদয়ে তব বড়ই বাজিবে ॥১৭
ছিন্ন-আশা।
===
পরেছ বিন্দুর ধনি মস্তক উপরে, .
আগেকার মত, হায়
কেন নাহি প্রভা তায়,
কি হেতু মলিন হেরি তােমার মস্তক,
কেন প্রভাশূন্য আজি সিন্দুর তিলক ॥১৮
যে নয়ন অঞ্জনের বিচিত্র শােভায়
সদাই রঞ্জিত হয়ে
হেরিত পতিরে চেয়ে,
যে নয়ন হেরি পতি পাগল হয়েছে,
কেন সে নয়ন আজি আর না মেলিছে ৷১৯
তাম্বুল রাগেতে রঞ্জি বিশ্বধর তব,
হাসিরে লইয়া মনে,
হাসিতে পতির পানে,
কোথা সেই হাসি আজি নয়ন রঞ্জন,
হাস একবার দেখে জুড়াই নয়ন। ২০
উড়িছে দুকুল তব বায়ুর আঘাতে,
কেন নাহি কর ভুলে
রাখিছ আপন স্থলে,
শব-সম্বােধন।
কাল-পরশিত তুমি হেরিয়া নয়নে,
করিছে প্রভুত্ব সবে আপনার মনে (২২
একটি চিকুর যদি স্থানান্তর হ'ত,
অমনি বদন পরে
দেখতে দর্পণ ধরে,
দেখিতে দর্পণ ধরি কত শত বার,
স্বভাব মুকুরে আজি দেখ একবার ২৩
ওই হের অভাগিনী আত্মীয় স্বজন
আসিছে লইতে তোরে,
শােয়াইবে চিতাপরে,
অনন্তু শয্যায় এতে অনন্ত শয়ন
কর এত দিনে ধনি জন্মের মতন ২৪
হবে না উঠিতে আর শয্যা তেয়াগিয়া,
ভাঙ্গিবে না ঘুম-ঘাের,
আর না হইবে ভাের,
আর না হইবে কভু মেলিতে নয়ন,
আর না দেখিতে হবে স্বামীর বদন ২৫
৩৮
ছিন্ন-আশা।
তুলনা তুলনা আহা চিতার উপরে, .
কেমনে শুইবে তায়,
বিষম লাগিবে গায়,
কুসুম শয্যায় ব্যথা লাগিত যাহারে,
কেমনে সে জন শশাবে চিতার উপরে ॥২৬
কেহ না শুনিল বাণী, অভাগা বচন
কেহ না শুনিল কানে,
শােয়াইল চিতাসনে,
অমনি চৌদিক হতে দেব হুতাশন
উঠল গর্জিয়া তায় করিতে ভক্ষণ ॥২৭
ভীষণ রবেতে অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল,
চাচর চিকুর কেশ,
মুহূর্ভে হইল শেষ,
ক্ষণেকের মাঝে হায় সকলি ফুরাল,
পঞ্চভূত আত্মা পঞ্চ ভূতেতে মিশিল ॥২৮
রূপ, গুণ, সমন্বিত সুন্দর বয়ান,
অবিদ্যার অহঙ্কার,
কালেতে । রবে আর,
শব-সম্বােধন 1,
৩৯
সুন্দর কুৎসিৎ, যুবা বৃদ্ধেতে মিলিয়া,
অবশ্য হইবে ভস্ম এখানে আসিয়া ২৯
সকলি অনিত্য এই অনিত্য সংসারে,
মৃত্যুই জগতে সত্য,
মৃত্যুই জগতে নিত্য,
অনিত্য জগত (ও) কালে হইবে বিলয়,
এই মাত্র মানবের নিয়তি নিশ্চয় ৩০
সমীরণ।
১৫ ফান ১২৯৩ সাল
কোথা যাও সমীরণ বারেক দাড়াও,
গগনে উধাও হয়ে,
নিয়ত যেতেছ ব’য়ে,
চঞ্চল চঞ্চলা প্রায়,
তব প্রাণ স্থির নয়,
এই আছ এই স্থানে এই নাই আর,
কোথায় পলাও সম স্বপন নিশার।।১
মূরতি নাহিক তব নিরাকার তুমি,
মানব নয়ন তায়,
দেখিবারে নাহি পায়,
অঙ্গে মাত্র অনুমান
করহে মানব প্রাণ,
অনুমানে তব দেহ করি অনুমান
জীবন দায়ীকা তুমি জগতের প্রাণ।২
সমীরণ।
৪১
জগত্ তােমার তরে অধীর অন্তর,
তুমি যেথা নাহি বও
তুমি যেথা নাহি রও,
হেন স্থান এ ভুবনে,
দেখি না শুনি কাণে,
সৰ্বত্ৰ তােমার গতি এ তিন ভুবনে,
কখন কোথায় আছ না জানি কেমনে ॥৩
কত লােক, কত গ্ৰহ, কত বা ভূবন,
কত দেশ দেশান্তর,
নিয়ত ভ্রমণ কর,
কত দৃশ্য মনােহর,
নব নব নিরন্তর,
কত জীব কত জন্তু কর দরশন,
কত স্থানে কত শোভা হের অনুক্ষণ ॥৪
মিনতি তােমার ঠাই আছে এক মম,
হৃদয় পিঞ্জরে শারি,
পুষেছিনু যত্ন করি,
৪২
ছিন্ন-আশা।
প্রেম স্বর্ণ শৃঙ্খলেতে
বাঁধি তারে, হৃদয়েতে
কতই আদরে আমি রেখেছিনু তারে,
কত বুলি বলিত সে হাতে আমারে ॥
কখন গাহিত পাখী হৃদয়ে আমার,
প্রেমের মধুর গান,
শুনিয়া জুড়াত প্রাণ,
এখন এখন যেন,
শুনি তার সেই গান,
সেই সুললালিত কণ্ঠ এখন যেনরে
গাহিয়া পাগল মােরে করিছে অন্তরে ॥
সে গান যখনি মম পড়েরে মনেতে
বীণা নাহি মনে লয়,
কুহুম্বরে ঘৃণা হয় ;
সেই কণ্ঠপ্রেমাম্বত
পানে, প্রাণ বিমােহিত
হয় মম, অন্য স্বর নাহি চায় প্রাণ,
হৃদয় অস্থির হয় শুনিতে সে গান ।৭
সমীরণ।
৪৩
হৃদয় অস্থির যবে হইত আমার,
অমনি শান্তনা গান,
গাহিয়া জুড়াত প্রাণ,
কত যে শান্তনা মােরে
দিত পাখী প্রাণভরে,
সে প্রবােধে মম প্রাণ প্রবােধিত হত
শান্ত আমি হেরে পাখী কতই গাহিত ৮
আবার যখন আমি কঁাদিতাম দুখে,
আমার ক্রন্দন সনে,
পাখীও কঁাদিত প্রাণে ;
বসিয়া মম হৃদয়ে,
অধরেতে চঞ্চ দিয়ে,
কত মতে কত কথা আমারে বুঝাত,
যদবধি নিরানন্দ ভাব নাহি যেত ।
হায় সে পাখিটী মম গিয়াছে কোথায়,
কত দিন গত হ’ল,
আর নাহি ফিরে এল ;
৪৪
ছিন্ন-আশা।
।
হৃদয় পিঞ্জর পানে,
চাহিতে বাজেরে প্রাণে,
সাধের শারির স্থান শূন্য পড়ে আছে,
ছিন্ন সে শৃঙ্খল এবে পিঞ্জরে রয়েছে ১০
সৰ্বত্ৰ তােমার বায়ু গতিবিধি আছে,
যদি দেখা পাও তার
কোন স্থানে একবার,
বল বল মম কথা
পেতেছি যে ঘাের ব্যথা,
কি দুঃখে কি দোষে মােরে গিয়াছে ছাড়িয়া,
জিজ্ঞাসিও সমীরণ যেওনা ভুলিয়া ১১
সুৰ্যলােকে তুমি বায়ু করহে পয়ান,
দেখ সেথা অন্বেষণ
করি মম প্রাণধন,
নাহি তারে পাও যদি,
যেও যথা দ্বিষম্পতি,
ব’ল ভরে সবিনয়ে মিনতি জানায়ে,
তার রাজ্যে থাকে যদি পাঠাতে ফিরায়ে ॥১২
সমীরণ।
৪৫
পর যবে তুমি যাবে চন্দ্রলােকে
দেখ সেথা ভাল করে
মম প্রাণ শারিকারে,
শারিকা আমার অতি
ভালবাসে নিশাপতি
কত দিন শশাঙ্কের কৌমুদী হেরিয়া,
গেয়েছিল কত গান হৃদয় ভরিয়া ॥১৩
যদি দেখা পাও সেথা প্রাণের পাখীরে,
বুঝাইয়া বল তারে,
পুনঃ যেন আসে ফিরে,
কিম্বা অতি সাবধানে
লয়ে তারে, নিজ সনে
এস’ বায়ু, দেখ, যেন পুন না পলায়,
ব’ল তার তরে কত সহিছে হৃদয় ১৪
ভূলােক, দ্যুলোেক, কিম্বা এ তিন ভুবনে
যখনি যেখানে যাবে,
মম শারি অনুষিবে,
৪৬
ছিন্ন-আশা।
কোথা আছে এনে দাও,
তাপিত প্রাণ জুড়াও
বৎসরেক হ’ল আজি দেখি নাই তারে,
জানি না কেমনে কোথা আছে কার ঘরে।১৫
প্রাণের বিহগ মম আছে যার ঘরে
হয় ত জানে না তারা,
মেহের যত্নের ধারা,
যে যতনে দিবানিশি
রেখেছিনু তারে পুষি,
সে যতন সে আদর যদি নাহি পায়
বিষম দুঃখেতে তার কাদিবে হৃদয় ॥১৬
কাজ নাই সে দুঃখেতে ব’ল বিহগেরে,
হৃদয়ে 'আসিতে পুনঃ
রাখিব করি যতন,
যত দিন চলে গেছে,
শূন্য হৃদি পড়ে আছে,
তাহার বিহনে প্রাণ কঁদিছে নিয়ত,
এতদিন সহিয়াছি আর সব’ কত ॥১৭
সমীরণ।
৪৭
আমার আদর পাখী যদি নাহি চায়,
ব’ল তারে সবিনয়ে,
মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে
যায় যেন অভাগারে,
এতদিন যার তরে,
পিঞ্জর শৃঙ্খল ল’য়ে রয়েছি বনিয়া,
সাধ পুনঃ শারিকারে রাখিব বাঁধিয় ১৮
মানসের সাধ মম রহিল মানসে,
পুরিল না বুঝি আর,
কোন সাধ অভাগার,
সকলে পড়িল ছাই,
আর সাধে কাজ নাই,
যার সাধে মম সাধ এবে সে কোথায়,
কার তরে তবে সাধ করিবে হৃদয় ।১৯
নাধ, আশা, শূন্য হৃদি মরুর সমান
যদি পৃথি রসাতলে,
ডুবিবে অনন্ত জলে,
৪৮
ছিন্ন-আশা।
অথবা দাবাগ্নি প্রায়,
ব্ৰহ্ম-অণ্ড জ্বলে যায়,
পতঙ্গ সমান জীব যদি দহে তায়,
মরুভুমে ক্ষতি কোন হবে না নিশ্চয় ২০
যা তবে ত্রিজগত যা রসাতলে,
সূৰ্য আদি গ্রহ যত,
ঘুরিতেছে চক্ৰমত,
পরস্পরে ছিন্ন হয়ে,
ঘাত প্রতিঘাত পেয়ে,
বিষময় বিশৃঙ্খলা করুক্ জগতে,
ডুবুক অনন্ত রাজ্য কারণ বারিতে ২১
প্রাণীশূন্য হ’ ধরা, শ্মশানের প্রায়
নয় অস্থি মজ্জা মাংসে,
চতুর্দি যাক ভেসে,
জীব যেন নাহি রয়,
হক মরুভূমি প্রায়,
কাদিতে কাহারা যেন কেহ নাহি রয়
গ্রাসুক বিশাল ধরা ঘাের তমিশ্রায় ২২
সমীরণ।
৪১
কিছু না দেখিতে পারি সমগ্র ধরায়,
বােধ হয় হলাহল,
পূর্ণ এই
ভূমণ্ডল,
সুখ না দেখিতে পারি,
অন্তরে জ্বলিয়া মরি,
জ্বলে যায় প্রাণ মম বিষের জ্বালায়
পূর্ণ হৃদি হিংসা স্রোতে, সদা বয়ে যায় ॥২৩
বৎসর হইল পূর্ণ আজিকার দিনে,
এই দীর্ঘকাল তরে,
বারেক দেখিনে তারে,
সেই দিন কেন হ’ল,
কেন নিশি পােহাইল,
কেন সূৰ্য্য উঠেছিলে গগন প্রান্তরে
হারাইনু সেই দিন প্রাণের পাখী ৪২৪
পাব না তাহারে আর জেনেছি নিশ্চয়,
ত্রিজগৎ অন্বেষিতে,
যাও বায়ু দূতরূপে,
৫০
ছিন্ন-আশা।
দেখা পেলে সাথে করে
এননা, যদি আসে ফিরে,
নাহি আসে ব’ল তারে প্রাণের যাতনা
যাও ত্বরা সমীরণ বিলম্ব সহে না ॥২৫
বিধাতার প্রতি
বিপৎ সিন্ধুং বন্ধুং বিগলিতজলং নেত্রযুগল
সশােকং ভূলােকং ভুবন বলয়ং খেদ নিলয়ং।
অনঙ্গং নীরঙ্গং বিঘটিতবনং কোশভবনং
বিধাতুং কিংধাতস্তব হৃদি ন লজ্জা প্রভবতি ?
জ্ঞান বিবর্জিত দেব মানস আমার,
তব তত্ত্ব আলােচনে ব্যাকুল হয়েছে,
কিন্তু হায়, মম এই সংকীর্ণ অন্তর,
কোন তত্ত্ব আলােচিতে প্রয়াস পাইছে ?
যেই জন তত্ত্বময় এ তিন ভুবনে,
তাঁর তত্ত্ব আলােচিতে পারে কোন জনে।
নির্বোধ মনুষ্য মােরা পশুর সমান,
কোন্ কাৰ্য্যে, কিবা হেতু কিছুই না জানি,
৫২
ছিন্ন-আশা।
;
না বুঝি সামান্য বুদ্ধি, কর্মের কারণ,
দোষিয়া তােমারে, পাপে মজিছে আপনি ;
যিনি সর্বশক্তিমান্ দয়ার সাগর,
অসম্ভব তার কাছে হবে অবিচার ॥২
কিন্তু দেব এক কথা জিজ্ঞাসি তােমায়,
সামান্য মানব বুদ্ধি বুঝিতে না পারি,
অজ্ঞানতঃ যদি দোষ হয় হে আমার,
পুত্র ভাবি অপরাধ ক্ষম’ কৃপা করি।
সদা ভয়ে শঙ্কিত হৃদয় আমার,
জ্ঞানে বা অজ্ঞানে দোষ করিহে তোমার ॥৩
বল শুনি, শােন দেব বচন আমার,
সৰ্বশক্তিমান্ তুমি এভব মণ্ডলে,
আবার তােমারে নাথ, দয়ার সাগর
বলি যত নরগণ ডাকিছে সকলে,
কিন্তু দেব, পাপী আমি বুঝিতে না পারি,
দুই গুণ তব দেহে আমি নাহি হেরি ॥৪
বিধাতার প্রতি।
সৰ্ব্ব-শক্তিমান্ বটে তুমি এ জগতে,
অসীম ক্ষমতাধর জানি আমি মনে ;
কিন্তু দয়া সিন্ধু নাম, বিশাল ভবেতে
কেমনে অর্জিলে তুমি, বল কোন গুণে ?
কেন লােকে দয়াময় বলে যে তোমায়,
ভাবিয়া আকুল মম হ'তেছে হৃদয় ৫
আজি দেব ব সনে প্রতি ঘরে ঘরে
ঘূরিব দেখিব আমি করিব বিচার,
বিতরিলে এত দিন কত দয়া কারে,
কতই বা আশা করে নিকটে তােমার ;
সত্য যদি দয়াবান হও এ জগতে,
সাক্ষ পাব’ শত শত প্রত্যেক গৃহেতে ॥
সুন্দর প্রাসাদ ওই হের অদূরেতে,
কৌমুদী বসন শুভ করি পরিধান,
অপরূপ শােভা ধরি মানব আঁখিতে
দেখাইছে যেন আহা স্বর্গের সমান,
চল প্রভু তব সনে আজি হােথা যাব,
দর্শন শ্রবণ ইন্দ্রে বিবাদ মিটাব ৭
৫৪
ছিন্ন-আশা
একি হেরি ! কেন দেব এ সুন্দর পুরে,
মানব আনন্দ ধ্বনি না করি শ্রবণ,
সকলেই বলে হের বিমর্ষ অন্তরে,
বহে সঙ্গীত স্রোত কিসের কারণ ?
শ্মশানের মূর্তি আজি হেরিয়া এখানে
বিষম আকুল আমি হ’তেছি পরাণে ॥৮
ওই শােন, ওই শােন, ক্রন্দনের ধ্বনি
হ’তেছে অশ্রুট রবে, শােন মন দিয়া,
২
কে বিলাপে হেন কালে আকুল পরাণী,
চল দেব দেখে আসি, কিসের লাগিয়া ;
কি তাপে তাপিত আহা আজি এই জন,
এ হেন নিশিথে হায় কঁাদে কি কারণ ॥
কষিত কাঞ্চন সম হের প্রভু চেয়ে,
উজ্জ্বল বরণ কে ও ষােড়শী রূপসী,
আহা, কি দারুণ ব্যথা পাইয়া হৃদয়ে
যাপিছে কঁাদিয়া হায় হেন মুখ নিশি
পূর্ণ ইন্দু সম মরি সরস বদন,
এখায়ে মলিন ভাব করেছে এর ॥১)
বিধাতার প্রতি।
আলু থালু কেশ পাশ উড়িছে পবনে,
তাম্বুল চৰ্ব্বণে দন্ত বিমুখ হয়েছে,
সিমন্তে সিন্দুর নাই, অঞ্জন নয়নে,
সাধের গহনা আজি আর না শােভিছে,
বিধবার বেশ আহা করেছে ধারণ,
না জানি কত যে কষ্ট পাবে কত দিন ১১
শয্যায় নাহিক স্থান, কণ্টক সমান,
কভু উঠে, কভু বসে, কভু বা শুইছে,
হৃদয় মরুর সম, ভাবে অকারণ,
কি যে ভাবে দিবানিশি তাও না জানিছে-
শূন্য মনে, শূন্য চক্ষে, রয়েছে চাহিয়া,
আঁখি জলে বক্ষঃস্থল যেতেছে ভাসিয়া ১২
আহ সে সৌন্দৰ্য্য এবে গিয়াছে কোথায়,
আরক্তিম গণ্ডস্থল পাংশুর মতন,
নয়নে সে জ্যোতি নাই, নিরাশ হৃদয়,
বাহু গ্রস্ত শশী সম হয়েছে মলিন ;
হৃদয়ের অন্তস্থল করিয়া বিদার
কাদিয়া বলিছে শােন যাতনা ইহার ॥১৩
ছিন্ন-আশা।
‘কোথা নাথ কোথা নাথ, হৃদয় ঈশ্বর,
অভাগী দাসীরে ফেলি রয়েছ কোথায় ?
কি করিব কোথা যাব বল প্রাণেশ্বর,
কোথা গিয়ে জুড়াইব তাপিত হৃদয় ?
বিশাল সংসারে মম স্থান নাহি আর,
কে আর সাদরে যত্ন করিবে আমার ॥১৪
“কাজ নাই সে যতনে এস প্রাণেশ্বর,
অযতনে তব পদে চিরদিন রব,
প্রণয় ভিখারী নয় এ দাসী তােমার,
দাসী হয়ে চিরদিন চরণ সেবিব,
এত ভালবাসা তব, কোথায় এখন
দুখিনীরে ফেলি হায়, করিলে গমন॥১৫
বিপদ সাগরে, নাথ আজি হে তােমার
ভাসে তব প্রণয়িনী আকুল হৃদয়,
কে আর কাণ্ডারি বল আছে গাে আমার
উদ্ধারিতে ভব নদী পাপের নিলয়,
তরণী কাণ্ডারী শূন্য ভাসে সিন্ধুজলে,
কে আর রক্ষিবে তায় তুমি না রাখিলে ১৬
বিধাতার প্রতি।
৫৭
“আরে রে দারুণ বিধি এ কোন বিচার ?
অবলা বধিতে হেন বিধি কি কারণ,
নিদারুণ ভুমি অতি, হৃদয় ভােমার
কঠিন পাষাণ হ’তে জানিনু এখন।
এত কঁাদি নিশি দিবা তােমার চরণে,
দয়া যে কেমন তব হৃদি নাহি জানে ॥১৭
হের দেব, হের দেব সম্মুখে তােমার
ঈদে এই অভগিনী আকুল হৃদয়,
নবীন রয়সে এর, সুখের সংসার
কণ্টকিত করিয়াছ তুমি হে নির্দয় -
আর এ যাতনা আমি না পারি হেরিতে
চল যাই অন্য স্থানে তােমার সনেতে ॥১৮
সমুখে কুটীর ওই চল হােথা যাব,
দেখিব, দেখিবে তুমি গৃহবাসী জনে,
অলক্ষিতে থাকি মােরা হৃদয় বুঝিব
বিষাদে কাটায় কাল কি সুখ মনে ;-
প্রাসাদের মুখ যত হেরিনু নয়নে,
পর্ণ গৃহে কাল কাটে দেখিব কেমনে ॥১৯
ছিন্ন-আশা।
এখানেও সেই দৃশ্য ! কি দেখিব আর,
নয়নে বাতনা আমি না পারি হেরিতে
শ্রবণ বধির হও, বিলাপ ইহার
বজ্ৰ সম বিদ্ধ মম হ’তেছে বক্ষতে,
হেথা কঁাদে বৃদ্ধ পিতা, জননী হােথায়,
শিশু পুত্র হের হােথা কঁদিছে ক্ষুধায় ২০
কঁদে শিশু
‘ক্ষুধায় কাতর মাগাে কি দিবি খাইতে,
কি আছে, কোথায় আছে বলনা আমায়,
বড় ক্ষুধা, আর যে মা পারি না থাকিতে,
দুই দিন অনশনে, আজি প্রাণ যায়,
কালি মা গো বলেছিলি কালি এনে দেব,
আজ (ও) দিন অবসান, আর না ভুলিব ॥২১
কা
“কেন মা কাঁদি তুই, বলনা আমায়,
আর আমি চাহিব না, কাঁদি না আর,
ঘুমাইব তাের, কোলে আয় মাগাে আয়,
ঘুমাইলে আর ক্ষুধা পাবে না আমার”-
বলিতে বলিতে আহা জননী কোলেতে,
মুদিল নয়নদ্বয় অনন্ত নিদ্রাতে ॥২২
।
বিধাতার প্রতি।
অঙ্কেতে শায়িত মৃত প্রাণের কুমারে,
হেরে মাল সকাতরে উঠিল কাঁদিয়া,
একেবারে শত বজ্র মস্তক উপরে,
অকস্মাৎ যেন আহা পড়িল খসিয়া,
প্রাণের তনয়ে যত্নে ধরিয়া বক্ষেতে,
শতবার ওষ্ঠ চুমি লাগিল কাদিতে ২৩
“আয়, বাছা কোথা গেলি ছাড়িয়া আমায়,
তাের তরে ভিক্ষা হেতু যাব ঘরে ঘরে,
ভিক্ষালব্ধ বস্তু আনি দিব রে তােমায়,
নয়ন উন্মিলি বা বাঁচাও আমারে ;-
ঘুমাইতে এলি বাছা কোলেতে আমার
ডাকি আমি মাতা তাের, চাও একবার ॥২৪
‘‘তুইরে দুখিনী ধন বাপরে আমার,
তােকে ছেড়ে কোন প্রাণে রব ধরাতলে,
তুই বিনা এ জগতে কে আছে রে আর,
কে আর ডাকিবে হায় আমাকে ‘মা’ ব'লে,-
জনমের শােধ বাছা মা বলিয়া ডাক্,
একবার ডাক শুনে পরাণ জুড়া ২৫
ছিন্ন-আশা।
“কি দোষ করেছি বিধি তােমার চরণে,
যে হেতু এ ঘাের শাস্তি দিলে গাে আমারে,
অনশনে দিন গেছে, তবু সুখ মনে
ছিলাম বক্ষেতে করি প্রাণের কুমারে,
মম বক্ষ শূন্য করি কেন নিলে তায়,
ফিরে দাও দুঃখিনীরে মিনতি তােমায় ॥২৬
‘সবে বলে দয়ালিন্ধু জগৎ ঈশ্বর,
কিন্তু, দয়া নাহি হেরি আমি কাঙ্গালিনী,
কণামাত্র যদি দয়া থাকিত তাহার,
কাদিত না তবে আজি এই ভিখারিণী
কোথা দয়া ? নাহি দয়া তাহার অন্তরে,
ভিক্ষুক, ভিক্ষুকে ভিক্ষা দানিবে কি করে ?”২৭
আর দেব যাইব না আমি তব সনে,
বুঝিয়াছি তব হৃদি যত দয়া ধরে,
যে ঘাের যাতনা জীবে সহিছে জীবনে,
হেরিয়া কাঁদিছে মম অন্তর ভিতরে,
যদি দয়া থাকিত হে হৃদয়ে তােমার,
অবশ্য বিহিত তুমি কবিতে তাহার।।২৮
কোকিলের প্রতি।
কি বােল বলিস পার্ষী বকুল শাখায়,
প্রত্যেক ঝঙ্কারে তাের,
হৃদয়ের তন্বী মাের,
অঙ্গুলি প্রহারে যেন সতত কপার,
কি বােল বলিস্ পাখী বল না আমায় ।
কি কারণ তাের গানে,
আমার হৃদয় টানে,
শুনিবারে তাের গান কেন প্রাণ চায়,
বলনা আমায় পাখী, বলনা আমায় ॥
কেন পাখী স্বর তাের এত মনােহর ?
কালির বরণ তাের,
নহে আঁখি ভুপ্তিকর,
কিন্তু ভুই মম চক্ষে অতীব সুন্দর,
কাল অতি বাবে ভাল আমার অন্তর,
৬২
ছিন্ন-আশা।
দুই কাল বাসি ভাল,
মেঘের () বরণ কাল,
তাহারেও বাসি ভাল আমি নিরন্তর,
কালতে পাগল করে আমার অন্তর ২
ওই দেখ ওই পাখী সরসী সলিলে,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীচিমালা,
কেমন করিছে খেলা,
সদাই চঞ্চল মরি, মলয় হিল্লোলে,
হাসিতেছে সরঃ যেন প্রেম কুতুহলে ।
কি শােভা হয়েছে মরি,
দেখরে নয়ন ভরি,
উখিত তরঙ্গগুলি, যুবতী হাসিলে,
শােভিছে তরঙ্গ সম তাহাদের গালে ৩
।
কি গান গাইতেছিলি পুনঃ শুনি গা-রে,
তােমার সঙ্গীত শুনে,
অন্য স্বর পড়ে মনে,
'কোকিলের প্রতি।
সে-ও গাহিত কত সুমধুর স্বরে
এখন সে গান মম বাজিছে অন্তরে।
তব সম তার স্বর,
নাহি কোন ভেদান্তর,
তাই বুঝি তােৰ্ব গান ভাল লাগে মােরে,
মনে হয় সেই যেন কহিছে আমারে।৪
কাল যে কি গুণ ধরে কে জানিবে তায় ?
তােমার বরণ কাল
কালিদাস (ও) ছিল কাল
কিন্তু যে মধুর ধারা বষিল ধরায়
এখন বিভাের সবে পিয়ে সে সুধায়,
নাহি চাহি রূপ আমি,
ভাল আমি বাসি গুণী,
আমার (ও) প্রাণের পাখী ছিল শ্যাম-কায়
গুণে সে বাঁধিয়াছিল আমার হৃদয়।
কিন্তু পাখী এজগতে সবাই সুন্দর,
কদাচন নাহি হেরি,
এই দুখে কেঁদে মরি।
৬৪
ছিন্ন-আশা।
তুই পাখী কাল’ কিন্তু স্বর মনােহর
বায়সের রবে কেন হেরে অন্তর ?
তুইও ডাকি যবে,
বায়স (ও) ডাকেরে তবে,
একের কুজনে সুধা বহে নিরন্তর,
অপরের রবে বিষ বর্ষে শতধার ॥
গাও পিক্ পুনঃ শুনি ভরিয়া হৃদয়,
তাের সে মধুর বােল,
হৃদয়ের অন্তস্থল
করিয়া বিদার মম পশু সেথায়,
জুড়াকৃ তাপিত প্রাণ পাখীর কথায়।
এতক্ষণ কত গান,
গাহিছিলে ভরি প্রাণ,
কিহেতু নীরব হলি বা আমায়
গাওরে আবার পাখী গাও পুনরায় ৭
ওই শােন বায়সেতে ডাকিল আবার,
শুনিতে না পারি তায়,
শ্রবণ বধির প্রায়,
1কোকিলের প্রতি।
যত আমি নাহি চাহি বায়সের স্বর,
ততই সে হতভাগ্য জ্বালায় অন্তর ;
তুমি পাখী কর শুনি,
মধুর বীণার ধ্বনি,
বায়ন নীরব হ’ক শুনি তব স্বর,
লজ্জায় না সরে যেন বচন তাহার [৮
পার যদি বল পিকূ কিসের কারণ,
তুমিও সৃজিত যার
বায়স (ও) সৃজিত তার,
কেন তােরে এতগুণে করিল সৃজন,
কর্কশতা কেন কাকে করিল অর্পণ ?
তােমার মধুর স্বর,
প্রেমপূর্ণ পারাবার
তাপদগ্ধ হৃদয়ের শীতল জীবন,
অভাগার একমাত্র শান্তি নিকেতন ॥৯
নীল গগনে হের জলদ উদিছে,
কিবা অপরূপ শােভা,
হৃদি প্রাণ মনােলােভা,
ছিন্ন-আশা।
কালমেঘ নীলাম্বরে আচ্ছন্ন করিছে,
পূর্ণিমার চন্দ্রে যেন রাহুতে গ্রাসিছে।
বিদ্যুতে হাসিতে হেরে,
যেন মেঘ ক্রোধভরে
অবলা চাঞ্চল্য তরে গজ্জন করিছে,
বিদ্রুপিয়া মেঘে সতী আবার হাসিছে ১০
নরলােকে নিরখিতে সে হাসি সুন্দর,
প্রাণ ভরি নাহি পায়,
নয়ন মুদিত হয়,
চপল চঞ্চল গতি, মেঘের ভিতর
কোথায় লুকারে যায় নাহি দেখি আর ।
পলকে দর্শন দিয়ে,
মন প্রাণ কঁাদাইয়ে,
কোথা যে লুকায় বা তনু আপনার,
ইচ্ছামত সে বালারে নাহি পাই আর ॥১১
সেই মত তুই পাখী ডাকি একবার,
শুনায়ে মধুর গান,
উল্লাসিয়া মন প্রাণ,
কাকিলের প্রতি।
কেন পুনঃ নিরবিলি, ডারে আবার,
তাপিত প্রাণের আশা পুরারে আমার।
দহে হৃদি অনিবার,
দিনে আহুতি আর,
ওই সুধা বিনা প্রাণ জুড়াবেনা আর,
তুই বিনা অন্যগতি নাইরে আমার ॥১২
বিশাল জগতে কত আসে কত যায়,
চেয়ে দেখ সরঃ পানে,
প্রত্যেক লহরী গণে,
একের নিধনে পুনঃ অন্যের উদয়
হইতেছে অবিলম্বে নাহিক ব্যত্যয়,
আজি সূর্ষ অস্ত যাবে,
কালি পুনঃ প্রকাশিবে
কালি আর নাহি রবে অন্ধকারময়,
ভালুকরে উজলিবে জীবের হৃদয় ১৩
একটি আশার পর অন্য আশা আসে,
হার অবর্তমানে,
অন্য আসে তার স্থানে,
ছিন্ন-আশা।
।
এইরূপে নরহৃদে কত যায় আসে,
জীবিত মানব প্রাণ যাহার আশ্বাসে।
আশার আশায় ভুলি,
দেখ পাখী জীবগুলি,
পাষাণ ভিত্তিতে কত গভীর বিশ্বাসে
গঠিতেছে অট্টালিকা হৃদয় আকাশে ১৪
আকাশ কুসুম সম ভাবেনা মনেতে,
মুহুর্ভে বিলীন হবে,
কোন আশা নাহি রবে,
ঢাকিবে হৃদয়াকাশ ঘাের তমিস্রাতে,
চাদের চাদিমা তায় নারিবে লুকাতে,
আশার কুহুকে ভুলি,
প্ৰেম পারিজাত তুলি,
পরাইছ সযতনে যাহার গলেতে,
অদৃশ্য হইবে সম স্বপন নিশিথে ॥১৫
সেই মত আমি পাখী আশার ছলনে
পড়ি, হয়ে পথহারা
চিন্তারথে ভ্রমি ধরা,
কোকিলের প্রতি।
৬৯
কত যে গড়িয়াছিনু আপনার মনে,
ভেবেছিনু পুরাইব সবে দিনে দিনে ;
দিবে দিন ভগবান,
পূর্ণ হবে মনস্কাম,
সকলি বিফল ; হায় জানিনু এক্ষণে,
মানবে গঠিবে, বিধি নাশিবে সঘনে ॥১৬
?
পার কি বলিতে পাখী বিধির বিধান
কিহেতু কঠোর হেন,
কেন বিধি নিদারুণ,
সুখের তরুতে মরি কিসের কারণ,
করিলেন প্রাণহারী কীটের সৃজন ?
প্রাণ যারে সদা চায়,
কেন তারে নাহি পায়,
যে যাহারে বাসে ভাল, হায় কি কারণ,
সবারি আগেতে তারা করে পলায়ন ? ১৭
?
সাবিত্রী সম্ভাষণ- যম-“সম্বর সম্বর মাতঃ রােদন তােমার, মৃতপতি করি কোলে কি হেতু কাননে- বৃথা কেন অশ্রুধারে তনু আপনার নাশিতেছ নিশিদিব, যাও নিজস্থানে। “গতজীব সত্যবান কিফল কঁাদিয়া ? বৃথা কেন মায়া মােহে ভুলিছ আপন, পদ্মনন তুলি সতী, হের নিরখিয়া কৃতান্ত দাড়ায়ে কৰ্ম্ম করিতে সাধন” ॥২ সাবিত্রী--ক্ষম পিতঃ, ক্ষম দেব, ক্ষম অধিনীরে, কোথা যাব ফেলি পতি এ ঘাের বিজনে কার কোলে পতিধনে জনমের তরে, সমর্পি গৃহেতে যাব, বল কোন প্রাণে ? ||৩
5াবিত্রী সম্ভাষণ।
৭১
৭১
“ধরমের পতি তুমি জগত্ ঈশ্বর,
কোন্ দোষে দোষী দাসী তােমার চরণে
আর কত সবে দেব অবলা অন্তর,
ভিক্ষা চাহি তব ঠাই দেহ ত্যবানে” ॥৪
যম-‘বৃথা এ সাধনা দেবী মম সন্নিধানে
আয়ুঃ-অন্তে যাবে সবে কৃতান্ত নগরে,
ল’য়ে যাব সত্যবানে বিধির বিধানে,
নিশ্চয় নারিবে তুমি রক্ষিতে তাহারে।
“দাস আমি প্রভু মম বিশ্বের ঈশ্বর,
বিশ্বভার হরিবারে আদেশ তাহার,
পালিব ভাহার আজ্ঞা যথা সাধ্য মাের,
রােধিতে কৃতান্ত কৰ্ম্ম নাহি সাধ্য কার ।
*
“হের সতী দূত মম দাড়ায়ে সুদূরে,
সতী তুমি, তব অঙ্গ নারিছে স্পর্শিতে,
এসেছি আপনি আমি সত্যবান তরে,
দেহ মােরে দিব্য রথে লইব স্বর্গেতে ॥৭
৭২
ছিন্ন-আশা।
সাবিত্রী-“বৃথা না সাধনা দেব তব সন্নিধানে,
ভুলায়ােনা অভাগীরে, ভিক্ষা দাও মােরে,
জানি আমি আয়ুঃ-অন্তে তােমার সদনে
যাবে সবে বিধাতার বিধি অনুসারে ||৮
“পরম বিচারী তিনি বিশ্বের ঈশ্বর,
তার দাস তুমি দেব ধরমের পতি,
অবলা বধিতে তার এ কোন বিচার,
কাঙ্গালিনী প্রতি কেন এতেক দুর্গতি ?
‘আনিয়াছ দিব্য রথ মম পতি তরে,
শূন্য রথ ও পুনঃ আপন ভবনে,
রাখিব হৃদয় ধনে, হৃদয় মাঝারে,
দিন থাকিতে প্রাণ, প্রাণপতি ধনে ১
-“আমার আদেশ বৎসে করনা হেলন,
রাখ বাণী, দেহ ছাড়ি মৃতপতি কায়া,
বারে বারে বলি আমি ক’রনা লঙ্গন,
ভেবে দেখ ভুমণ্ডল পূর্ণ মােহ মায়া ॥১১
সাবিত্রী সম্ভাষণ।
৭৩
সকলি অনিত্য হের বিশাল সংসারে,
এই আছে এই নাই, ছায়ার মতন;-
কিছুই রবেনা চির জানিও অন্তরে,
নশ্বর মানব কিবা ? নহে মরুৎবােম্ ১২
“আকাশে চন্দ্রমা, সহ লক্ষ অনুচর,
শূন্যদেশে সৰ্বগামী মলয় পবন
মরতে বিজন কিম্বা সাগর ভূধর,
একদিন হবে জেনাে সবার নিধন।১৩
“রবেনা মানব তবে আর এ জগতে,
রবেনা জগৎ তবে সৃষ্টির মাঝারে
মিশাবে তাবত্ সৃষ্টি, সৃষ্ট পঞ্চকুতে
মিশাইবে পঞ্চভূত ঈশ্বর আকারে ॥১৪
“কেন তবে বাদ তুমি, কেবা তব পতি?
তুমি কঁাদ যার তরে কাতর হইয়া,
হের সেই জন, তব এতেক দুর্গতি
হেরিয়া, বারেক ভরে দেখেনা চাহিয়া ১৫
কর ।
৭৪
ছিন্ন-আশা।
“কেহ কার পতি নয় জানিও জগতে
সকলের পতি সেই জগতের পতি,
ডাক তারে নিশি দিবা প্রাণের সহিতে
* শেষ দিনে পাবে ত্রাণ, পাইবে নিষ্কৃতি।১৬
“বিলম্বিতে নারি আর, ছাড়ি পতি কায়া
যাও সতী নিজস্থানে, হয়ােনা কাতর ;
পতি, পুত্র, জেনাে সব ঘাের মােহমায়া
সত্যবানে লব আমি স্বর্গেতে সত্বর” ॥১৭
সাবিত্রী-“তবাদেশ লজ্যিবারে কি সাধ্য আমার,
কিন্তু মম প্রাণেশ্বরে দিবনা তােমায়
ভিখারিণী ভিক্ষা চাহে চরণে তােমার,
অভাগিনী প্রতি দেব হ’য়ােনা নিদয় ॥১৮
ত
‘‘ব’লনা বলনা আর এ দারুণ বাণী,
দুখিনীরে দুখ দিয়ে কি লাভ তােমার
অন্য রত্ন নাই মম আমি কাঙ্গালিনী,
পতি বিনা এজগতে কিছু নাই আর ॥১১
সাবিত্রী সম্ভাষণ।
৭৫
‘একটী রতন মম আছে এ জগতে,
অমূল্য জানিয়া তারে রেখেছি যতনে
কেমনে বলনা কাল, কঠিন প্রাণেতে
হরিতে উদ্যত আজি দুখিনীর ধনে ?২০
ওঁঠ নাথ চেয়ে দেখ মেলিয়া নয়ন,
একাকী যেওনা ফেলি বিজনে আমায়,
হের চেয়ে, ভীমমূর্তি নিষ্ঠুর শমন
শিয়রে দাঁড়ায়ে তব, হরিতে তােমায় ॥২১
“ভয়ে প্রাণ কাপে সদা না পারি রহিতে,
পারি অর্পিতে তােমা নিষ্ঠুর শমনে,
ত্যজিয়াছি রাজ্য ধন তােমার তরেতে,
কি কাজ এছার প্রাণে প্রাণপতি বিনে ॥২২
“ফাটে বুক হেরি তব মলিন বদন,
কোন্ দোষে দোষী দাসী চরণে তােমার
পদে ধরি ক্ষমা কর রাখ হে বচন,
কথা কয়ে প্রাণদান দাওহে আমার” ॥২৩
৭৬
ছিন্ন-আশা।
যম—‘‘আশাতীত রত্ন সতী দিবগাে তােমারে,
কুবের ভাণ্ডার খুলি অর্পিবে তােমায়,
সসাগরা ভূমণ্ডল, তব অধিকারে
দিব আমি, পণ সত্যবান বিনিময় ২৪
“যেখানে যে রত্ন আছে এতিন জগতে,
অনুমতি কর মােরে আনিব হেথায়,
মানব অসাধ্য বস্তু তােমার করেতে
দিব আমি, পণ সত্যবান বিনিময় ২৫
‘‘তপস্যা নিরত যােগী শতবর্ষ ধরি,
অভিষ্ঠিত বর হের তবু নাহি পায়,
মনােমত বর তব করযুগ ধরি
দিব আমি, পণ সত্যবান বিনিময় ॥২৬
-“লও বর অভিষ্ঠিত, সতী সীমন্তিনী
যাহা চাবে তাহা দিব জানিও নিশ্চয়,
স্থির জেনাে মৃষানয় কভু ধৰ্ম্ম বাণী,
লও বর পণ সত্যবান বিনিময়” ॥২৭
সাবিত্রী সম্ভাষণ।
৭৭
সাবিত্রী—জানি আমি মিথ্যা নয় কভু ধৰ্ম্ম বাণী,
ছাড়ি দিনু পতিকায়া লও ধৰ্ম্মরাজ,
সতী আমি, যাচি বর দেহগগা এখনি,
অবিলম্বে গৃহে যাই, বিলম্বে কি কাজ” ২৮
যম-“যাহা চাবে তাহা দিব জানিও নিশ্চয়,
বল কিবা অভিরুচি করিব পূরণ ?
রাজ রাজ্য রত্নরাজি যেবা ইচ্ছা হয়,
মুহুর্তে পুরাব তাহা বিনা সত্যবান” ২৯
সাবিত্রী-“সম্ভব হইবে সূৰ্য্য পশ্চিমে উদয়
সম্ভব উদিবে চন্দ্র আমার নিশিথে,
সম্ভব টলিবে অদ্রি মৃদুল বাত্যায়,
অসম্ভব মিথ্যা বাক্য ধর্মের মুখেতে ॥৩০
“দাও বর, কর তব প্রতিজ্ঞা পূরণ
সতী আমি, রেখ মনে, রাখ নিজ বাণী,
পূর্ণ কর অভিলাষ, শুনহে শমন,
শত পুত্র প্রসবিব, হইব জননী,” ৩১
৭৮
ছিন্ন-আশা
যম—“ধন্য সতী, ধন্য সতী, বাখানি তােমায়,
সতীত্ব প্রভাবে আজি আপনি শমন,
হারাইয়া দেবজ্ঞান, মূঢ় জন প্রায়
বিমুগ্ধ বিস্মৃতি পাশে, বিধি বিড়ম্বন [৩২
‘যতদিন রবে গঙ্গা ভারত মাঝেতে,
যতদূর রবে’ গঙ্গা কল কল রবে,
ততদন, ততদূর, মধুর রবেতে,
সাবিত্রী সতীত্ব গাথা নিরন্তর গাবে ॥৩৩
“বনের গাহক যত বিধির সৃজন,
বিহঙ্গ চঞ্চুতে স্বর যত দিন রবে,
জাগাতে প্রকৃতি সতী, উদয়ে অরুণ,
সাবিত্রী সতীত্ব গান, প্রথমেতে গাবে ॥ ৩৪
“জগত্ লােচন রবি, গগন প্রান্তরে
ত্যজিয়া উদয়াচল যখন উদিবে ;
সতী নারী থাকে যদি জগত্ মাঝারে,-
তব ম জপি মনে শয্যা তেয়াগিবে ৩৫
==
বিত্রী সম্ভাষণ।
সনাতন আৰ্য্যধৰ্ম্ম বিশাল জগতে,
মম বরে, জেন’ সতী রবে যতদিন,
সমম্বরে আৰ্যমুত, প্রফুল্ল মনেতে,
সাবিত্রী সতীত্ব কথা গাবে ততদিন ||৩৬
“সতীত্ব অমূল্য রতু রেখরে যতনে,
বিধাতার একমাত্র আদরের ধন,
একবার হারাইলে এ হেন রতনে,
প্রাণ দিলে ফিরে তারে পাবেনা কখন ॥৩৭
“অনন্ত সাগরােপম অসীম রতন,
সুবিস্তির্ণ রাজ্য যদি হারায় তােমার
ফিরে পেলে পেতে পার, করিলে যতন ;
এ ধন হারালে ফিরে পাবেনাক’ আর ॥৩৮
“হেন নিধি হারায়ােনা রােরে যতন,
পতি পদে কর দান রক্ষা হেতু তার,
সুযােগ্য প্রহরী তার নহে অন্য জন !
পতি বিনা নারি গতি নাহি অন্য আর ॥৩৯
ছিন্ন-আশা।
“পতি জ্ঞান, পতি ধ্যান, পতিগত প্রাণ,
পতি ধৰ্ম্ম, পতি কৰ্ম্ম, পতি পদে মতি,
পতি পদে দেহ তনু, পতির (ই) জীবন,
তবে জেন’ ভবার্ণবে পাইবে নিষ্কৃতি ॥৪০
“ফিরে লও পতি তব সতী সিমস্তিনী,
পূর্ণ হবে অভিলাষ আদেশে আমার,
শত পুত্র প্রসবিবে হইবে জননী,
জগত গাহিবে সতী সতীত্ব তােমার ॥৪১
বাসি কি, না বাসি ভাল, না জানি
তােমায়।
যে এ পােড়া প্রাণ ভাল বালে তােরে,
আ মা র কি হেন সাধ্য বর্ণিতে তাহারে।
তত রে এত বাসে ভাল কেন যে হৃদয়,
কি বা লাভ আছে তার জানিনা নিশ্চয়।
হাসি হাসি মুখ খানি, শারদ চন্দ্রিমা
বি না, আর এ জগতে কি দিব তুলনা ?
শােভা হেরি মন প্রাণ তােরে সদা চায়,
না জুড়াব কবে তাপিত হৃদয় ?
AI
ল
३
আ হা মরি কি সুন্দর চঞ্চল নয়ন,
অম মনে যেন যুগল খঞ্জন,
ক বি চয় দেখে নাই এদুটি আঁখিরে,
অ ধি ক প্রশংসা তাই করে হরিণের।
ছিন্ন-আশা।
আ মি তােরে ভালবাসি জীবনে মরণে,
কি লাগি নিষ্ঠুর তুমি অভাগার পানে।
তব প্রতিদান প্রণয়ে আমার,
কোন দোষে দোষী নিকটে তােমার।
ই
A
न
চা
চা হি রাজত্ব ভবে অসীম রতন,
চা হি না ইত্ব স্বর্গে অমর জীবন।
ভু
লে ছি হৃদয় ব্যথা প্রাণের বেদনা,
যে বিষম শােক শেলের যাতনা।
র বদন খানি নিয়ত হেরিলে,
র কি যাতনা কোন পড়েরে মনেতে ?
যে পা প জগতে যত করুক যে জন
দিনে ক্ষয় হবে তার হেরি ও বদন।
বি ষ
অ বি. রত হেরি আশা ঐ চন্দ্রানন,
সম বসুন্ধরা বিনা দরশন।
হ বিরহ তব নারি সহিবারে,
নে বলনা আছ নিৰ্ম্মম অন্তরে ?
বাসি কি, না বাসি ভাল, না জানি তােমায়। ৮৩
কি জ্বলে প্রাণের প্রাণে বুঝিতে পারি না,
জ্বলে যায় বুঝি প্রাণ প্রেম বারি বিনা।
ন অন্তর তব বলনা আমায়,
প্রাণে মরি তব প্রাণে দয়া নাহি হয়।
নি দা রুণ ভুমি অতি হৃদন কঠিন,
দারু ণ প্রণয় তব আমি ভাগ্যহীন।
ম ন প্রাণ সঁপিয়াছি করেতে তােমার
এ জ্বা লা সহিতে প্রাণ পারেনাকো আর।
মি লা ব প্রেমের বারি, প্রেমের বারিতে,
যা য় যাবে দিব প্রাণ প্রণয় তরেতে ।
হতাশ হৃদয়।
হৃদয় উদাস যবে হইল আমার,
বাসনা করিনু মনে, সংসার ত্যজিয়া
উদাসীন সম ভ্ৰমিব সদাই এই
বিশাল জগতে ; উদাসীন সন্ন্যাসীর
সম, সুখে দুখে পােহইবে জীবনের
নিশা ! বিসর্জি প্রাণের আশা, জীবনের
বাসনা নিচয়, বাঁধিনু হৃদয় মম
দিলাম আহুতি ঘাের নিরাশ বহ্নিতে
হৃদয়ের কোমলতা, মায়া, প্রেম, আদি
যত ; পুড়িল সকল (ই) পাবক শিখায় ।
• দহিল হৃদয় মম, দহে যথা পর্ণ
গৃহে বায়ুর সহায়ে, বৈশাখে কালান্ত
বহ্নি, পুড়িল তেমতি তাপিত অন্তর
সে কাল অনলে। কিন্তু না পুরিল আশা-
হতাশ হৃদয়।
৮৫
শত শত বাধা, বিধি সৃজিলেন পথে,
নারিনু যাইতে আর, ফিরিতে হইল
বিষের আধার পুনঃ এ পাপ সংসারে।
ফিরিয়া পশ্চাতে দেখিনু নুতন ধরা।
ছিল আগে যেই স্থানে প্রেম প্রস্রবন,
যাহার শীতল নীরে, করিয়াছি স্নান
কত প্রাণের উল্লাসে, স্বগীয় সম্পদ
ভাবিতাম তুচ্ছ যার তরে, শুষ্ক সেই
আলবাল ও সুধার ঝরনা সেথা আর
না ঝরিছে, কল কল নাদে বহিছেন।
আর প্রেমের তটিনী। বাসিতাম ভাল
যেথা থাকিতে দিবস নিশি, এবে প্রাণ
কাপে সেথা যেতে, পাপীর হৃদয় যথা
শুনিয়া মৃত্যুর নাম ; হায় শুষ্ক এবে
প্রেম পূর্ণ আলবাল। জ্বলে নিশি দিব।
বিষম বিরহ বহি ভৈরব গজ্জনে,
কার সাধ্য হইবারে সম্মুখীন্ তার
বিপরীত সব (ই) হেরি, ধরি কঠোরতা
কঠোর মুরতি, বিরাজিত দয়া স্থানে,
নাহি মায়া মায়াময় বিশাল জগতে।
ছিন্ন-আশা।
সবিস্ময়ে চাহিনু চৌদিকে মম, চাহে
যথা শুনিয়া বেণুর বাণী অকস্মাৎ,
কুরঙ্গ কুরঙ্গী গণে বিজন বিপিনে।
দেখিলাম নাহি স্থান জগতে আমার ।
হৃদয় নাহিক মম, পুড়েছে অনলে,
সহৃদতা নাহি পাই, জ্বলে যায় প্রাণ,
জ্বলায়েছি সে অনল আপন ইচ্ছায় ।
মুখ নাই, শান্তি নাই, প্রাণেতে আমার।
কত দেশ, কত স্থান, করেছি ভ্রমণ
আমি শান্তির আশায়, নাহি পাই তারে।
নব স্থানে যাই, নব দৃশ্য হেরে কেঁদে
উঠে প্রাণ, না পারি তিষ্ঠিতে আর,
পারে তিষ্ঠিতে, যথা বারিশূন্য দেশে
মীন ক্ষণেকের তরে, ফিরে যাই পুনঃ,
প্রভাতে তপন, যবে অরুণ লােচনে
আলােকিত করে যত জীবের হৃদয়,
যাহার সুবর্ণ করে, সুবর্ণ-মূরতি
ধরি প্রকৃতির চারু শােভা দ্বিগুণিত
হয়, যার করে কমলিনী বিকসিত
সরবী সলিলে, সেই করে কাদে প্রাণ।
হতাশ হৃদয় ।
ভাবি একাধিক দিন হ’ল হারায়েছি
কোথা প্রাণের রতনে। কভু ভাবি মনে,
কি হেতু বিলাপি আমি কিসের সংসার ?
মায়াময় এ জগত ; করেন পুত্তলি
ক্রীড়া বিশ্বের নিয়ন্তা ; বালক বালিকা
পরস্পরে খেলে যথা পুত্তলির সনে।
জলবিম্ব সম, এই আছি এই নাই,
জন্ম মৃত্যু বিবিধ বিধান; জন্মিয়াছি
যবে, অবশ্য মরিতে হবে, কেন তবে
এ যন্ত্রণা ? সাধ্যহীন মনুষ্য জগতে।
মানবের ভাগ্যসূত্র বিধাত'র করে,
তাঁহার বাসনা মত ফিরিতেছি মাের।
ফিরে যথা অশ্ব আদি, সারথির ইচ্ছা
অনুযায়ী; অবহেলে সুত্রের বাসনা
যারা, পড়িবে পাপের কুপে সুনিশ্চয়।
কভু ভাবি মনে, আর কেন এ সংসারে ?
কার তরে সহি এ ঘাের যন্ত্রণা ভ;
আর না রহিব এই দুঃখের আকর
সম মরতভূমিতে। উদাসীন হয়
লােকে ঈশ্বরে ডাকিতে, আমার ঈশ্বর
৮৮
ছিন্ন-আশা।
নাই, কাহারে ডাকিব ? ডাকিব প্রাণের
সেই প্রাণের রতনে। পরম পিতারে
বষে বর্ষে, যুগে যুগে ডাকিতেছে যােগী
গণ, কিন্তু নাহি পায় দেখা, আমিও কি
সেই মত নাহি পাব তারে ? নাহি পাই,
করিব অনন্ত যােগ অনন্ত বৎসর
বাল্মীকি মুনির সম, মিশিবে মাটিতে
মাটির নির্মিত দেহ আয়ু অবসানে।
জানি আমি মায়াময় নশ্বর জগত্ ;
বিড়ম্বনা মাত্র এই ভবের জীবন।
কিন্তু এ অবােধ প্রাণে না পারি বুঝতে,
সব (ই) জানি, সব (ই) বুঝি, হ্র যে কেমন
মায়া, না পারি এড়াতে ; দেখি দিব্য চক্ষে
লভিৰ বিশ্রাম যবে, কালের কোলেতে,
জগৎ ব্যাপারে শ্রান্ত ঘুমাইবে যবে
চঞ্চল নয়নদ্বয় চিরকাল তরে,
কোথা রবে তবে আত্মীয় স্বজন মম ?
অনিবাৰ্য সেই দিন আসিবে নিশ্চয়
পলায়ে নিস্তার নাই, সুকায়ে নাহিক
ত্রাণ, কেন বা লুকাব? কে আর প্রকৃত
হতাশ হৃদয়।
বন্ধু আছে এ জগতে সেই জন বিনা ?
সুখে দিব আলিঙ্গন, আসিবে যখন
লইতে অভাগা প্রাণ আপনি শমন।
প্রাণের পরাণ মম আছে যেই স্থানে
লুকাব যাইতে সেথা ? কে চাহে রহিতে
স্বর্গে স্বর্গ সুখ বিনা ? আত্মহত্যা মহা-
পাপ, স্বইচ্ছায় নারি বিসর্জিতে প্রাণে।
নিয়ত নিয়তি আমি পূজি কায়মনে,
ভাগ্যলিপি যেন মম করেন খণ্ডন।
জর্জরিত হৃদি মম, না পারি সহিতে
আর, ছিল যত বাসনা হৃদয়ে মম,
নিভিয়াছে একে একে, আকাশে নক্ষত্র
সম ভানুর উদয়ে। আর কি উদিবে
তারা ? নহে এ জীবনে। কে পারে বিনাতে
বেণি ছিন্ন অলকায় চিরদিন তরে ?
ছিড়িয়াছে যেই গ্রন্থি, বাঁধিবে না আর,
ছিন্নভাবে চিরদিন উড়িবে বাত্যায়।
আশা-
১৫ই ফান-১২৯৪।
“প্রাসাদে সা দিশিদিশি চ পৃষ্ঠতঃ সা পুরঃ সা
পৰ্যঙ্কে সা পথিপথি চ সা তদিয়ােগাতুরস্য।
হং হাে চেতঃ প্রকৃতিরপরা নাস্তিমে কাপি সা সা
না সা সা সা জগতি সকলে কোহমদ্বৈতবাদঃ ॥”—
.
কেন আশা কুহুর্দিনী হৃদয়ে আমার
মায়ার মােহন মন্ত্র করে উচ্চারণ,
দূরে যাও, দূরে রও এস’নাক’ আর,
হৃদয়ে আমার তব আর নাহি স্থান;
ছিল বটে এ জীবন তােমার জীবন,
ভাগ্যদোষে আজি বিধি অনুকুল নন্ ॥১
কত যে প্রভুত্ব তব ছিল এ জীবনে
অবিদিত নহে তব আশা মায়াবিনী,
ক্লরেছ রাজত্ব একা হৃদয় আননে
অনুগত ছিনু তব দিবস রজনী ;
সে দিবস গত এবে কালচক্র সনে,
ডুবেছে আশার আশা এ পাপ জীবনে ॥২
আশা।
উদিবে না সুখ সুৰ্য্য আর এ আকাশে,
আঁধারে আবৃত হৃদি চিরদিন রবে,
হাসিবে না আর প্রাণ আশার আশ্বাসে,
মায়ার মােহন রূপে আর না ভুলিবে।
চিরদিন, যতদিন রব’ এ জগতে,
রহিল জীবন মম ঘাের তমিস্রাতে ৪৩
নহে সে ভম সম অমার নিশির,
দ্বিতীয় নিশিথে যথা চন্দ্রের বিকাশ,
নাহি উঠে সে আঁধারে তারকার হার,
খদ্যোতের দীপাবলি না হয় প্রকাশ
নরক সমান ঘাের গভীর আঁধার
ঘেরিয়াছে এ জীবনে, অন্ত নাহি তার ৪
হৃদয় পূজিতা দেবী হৃদয় আসনে
ছিল যবে, ছিলে আশা সহচরী তার,
পূজেছি তােমারে নিত্য সে দেবীর সনে,
তুষিতে প্রাণের আশা প্রাণের আমার ।
পালন করেছি সদা তােমার তখন ;
যে আদেশ যে মুহুর্তে করেছ যখন ॥৫
ছিন্ন-আশা।
জানিতাম মনে ভাল, ভুষিলে তােমায়
সদয় হইবে তব প্রাণ সহচরী,
প্রসন্ন করিতে তারে তুষেছি তােমায়,
ভেবে দেখ ছিনু তব নিত্য আজ্ঞাকারী ;
আমার প্রাণের প্রাণে যে আশা যখন
হয়েছে উদিত, তাহা করেছি পূরণ ॥
বল আশা, কোথা এবে প্রিয়সখী তব,
কোন প্রাণে একা তুমি এসেছ হেথায়?
তাহার বিহনে তোমা কভু না সেবিব,
তুষিতে তাহারে সুধু, তুষেছি তােমায় ;
এবে তারে নাহি হেরি বিশাল জগতে,
কি হেতু পুজিব তােরে, কাহারে ভুষিতে ?
মানস নয়নে সদা হৃদয় মাঝারে
হেরি তারে, ভাবি যবে মুদিয়া নয়ন ;
১ব আশে মেলি আঁখি, আশা দেখিবারে,
চৰ্ম্ম চক্ষে নাহি হেরি, হয় অদর্শন,
আর তুমি সহচরী নহেত তাহার,
বৃথা আশে কেন প্রাণ কাদাও আমার ?৮
আশা।
৯
ওই হের নিশানাথ গগন উপরে
হাসিতেছে ব্যঙ্গভাবে যেন মম পানে,
হেরিয়া যাহারে, কত আনন্দ অন্তরে
কত আশা পুষেছিনু, হায়রে দুজনে
সে আশা বিফল আজি নিরাশ হৃদয়,
শােকানলে জ্বলে প্রাণ কেঁদে দিন যায় ৯
হায় সে সুখের দিন পড়ে যবে মনে,
আত্ম হারা হই আমি পাগলের প্রায়,
ভুলে যাই এ জগত্ অস্তিত্ব জীবনে,
কে জানে প্রাণের মাঝে কেমন যে হয়,
বিষধারা বয় হৃদে অদ্ভুত বেগেতে,
চিতাসম জ্বলে প্রাণ না পারি নিবাতে ॥১০
থামিবে বিষের ধারা নিভিবে অনল,
শুইব যখন শেষে চিতার উপরে,
প্রজ্জ্বলিত প্রাণ তবে হইবে শীতল,
জুড়াইবে দগ্ধ হৃদি জনমের তরে,
জানি কি পাপে সহি এত বিড়ম্বনা
কে জানে কপালে ছিল এঘাের যন্ত্রণা ॥১১
৯৪
ছিন্ন-আশা।
সাহারা মরুর সম হৃদয় আমার,
নাহি তাহে আশাতরু পথিক জীবন,
মরীচিকা ভ্রমে, প্রাণ পান্থ কতবার
পেয়েছে অশেষ ক্লেশ, বিধি বিড়ম্বন,
কত যে যাতনা প্রাণ পায় কতবার,
জানি কেমনে সহে হৃদয় আমার ?১২
মানস দর্পণে, তার বদন সুন্দর
নিয়ত মানস নেত্রে দেখিবারে পাই,
চর্মচক্ষে নাহি হেরি, বিদরে অন্তর,
অলীক স্বপনে প্রাণে শান্তি নাহি পাই।
আকাশ কুসুমে আর বল কত কাল,
হৃদয়ে স্থাপিবে শান্তি ঘুচাবে জঞ্জাল ।১৩
বৃশ্চিক দংশন সম স্মৃতির যাতনা,
জাগরণে নিরন্তর হতেছে সহিতে,
নিদ্রায় নিস্তার নাই, তাহার (ই) ভাবনা,
তাহার(ই) বদন হেরি স্বপনে নিশিথে,
স্বপ্নান্তে অদৃশ্য যবে হয় সে বদন ।
মনে হয় শয্যা যেন কন্টক সমান ॥১৪
আশা।
স্মৃতির অস্তিত্ব যদি না থাকে জগতে,
অথবা অলীক যদি না হ’ত স্বপন,
আজি এ যন্ত্রণা ঘাের হ’ত না সহিতে,
পুড়িত না স্তরে স্তরে হৃদয় জীবন ।
ভুলিতাম হৃত রত্ন স্মৃতির বিহনে,
অথবা পেতাম ফিরে সুখের স্বপনে ॥১৫
কিন্তু বিধি বিধাতার অতি নিরদয়,
দুখ দিতে ঐকান্তিত বাসনা হার,
জেছেন চিন্তা, স্মৃতি দীপ্ত বহ্নিময়,
মানব জীবনে শীঘ্র করিতে অঙ্গার,
ক্ষুদ্র প্রাণে দুখ যদি না করিনু দান,
কিসের ক্ষমতা তবে কিসের প্রধান ?১৬
প্রবল ঝটিকা যথা না পারি টলতে,
অভ্রভেদি গিরিশৃঙ্গ তুষারে মণ্ডিত,
ক্ষুদ্র প্রাণ তরুপরে, বিষম বেগেতে
পড়িয়া সমূলে তারে করে উৎপাটিত
তেমতি বিশ্বের পতি সর্বশক্তিমান
সুখী অতি ক্ষুদ্র নরে করি দুখ দান ॥১৭
ছিন্ন-আশা।
জানে না নিষ্ঠুর সেই বিশ্ব রচয়ি,
বিরহে কত যে কষ্ট দারুণ যন্ত্রণ,
নির্দয় পাষাণ হৃদি নাহিক মমতা,
প্রণয় কিরূপ বস্তু কখন ভাবে না;
সৃজন করেছে মাত্র প্রণয় রতন,
না জানে স্বয়ং কিন্তু প্রণয় কেমন ॥১৮
প্রেমের অঙ্কুর যদি থাকিত তাহাতে,
তা হলে হত না আজি বিরহ সৃজন,
বিরহে কত যে কষ্ট পারিত জানিতে
জগতে হত না আজি বিচ্ছেদ সাধন।
সামান্য হৃদয় ব্যথা পায়নি যে জনে,
কেন না হাসিবেক বজ্রের পীড়নে ?১৯
বিদাই তােরে আশা জনমের তরে,
বিদাও আমারে তুমি, এল’নাক’ আর,
মম আশা তব আশা দুরাশা অন্তরে,
সহি পায় স্থান যেন হৃদয়ে তােমার।
ভুলিলাম ভুত কথা আর না ভাবিব,
ভবিষ্যতে তােৰু তরে আর না কাঁদিব ।২০
শান্তি
বিশাল ভারত, বিশাল সংসার,
উন্নত হিমাদ্রি, সাগর অপার,
নিশিথে চন্দ্রমা, দিবসে তপন,
চজাতপ সম অসীম গগন,
ফুঞ্জ নলিনী, প্রেমের আধার,
কোকিল কুজন, ভ্রমর ঝঙ্কার,
স্বভাবের শােভা, মানস রঞ্জন,
বন বিহারিণী বিকচ প্রসুন,
কিছুতে হৃদয়ে বিরাম নাই ॥
যে দিকে তাকাই সব (ই) শূন্যাকার,
যুগল নয়ন না দেখে সংসার,
দেখে সম্মুখে পবিত্র প্রণয়,
রমণী বদন কোমলতাময়,
যাহার বিহনে বিশাল ভুবন,
৯
ছিন্ন-আশা।
সাধ আশা শূন্য শ্মশান সমান
হইত, হত না আশার সঞ্চার
মানব হৃদয়ে, জীবনের সার,
কিছু না নয়নে দেখিতে পাই ॥২
যেন অন্ধকারে আবৃত ধরণী,
দিবা দ্বিপ্রহরে যেনরে রজনী,
চারিদিকে ঘাের নিবিড় আঁধার ;
অন্ধতম মম অন্তর ভিতর
দারুণ যন্ত্রণা, নরক সমান
স্মৃতি হুতাশনে,সদা জ্বলে প্রাণ,
এ পােড়া হৃদয়ে কত আর সবে,
কত দিনে বিধি এ জ্বালা নিভিবে,
কত দিনে হায় শান্তি পাব ।৩
‘শান্তি ?”-
মনে হয় যেন স্বপন সমান,
জানি কোথায় “শান্তি” বিদ্যমান ;
‘শান্তির অস্তিত্বে নাহিক প্রত্যয়,
‘শান্তি” নাম যেন নব বােধ হয়,
শান্তি।
জানি কেমন কিরূপ আকার,
কোথায় বসতি কিরূপ প্রকার,
বায়ুর মতন না পারি ভাবিতে,
অনুভবে তারে প্রাণের মাঝেতে,
হায় এ যন্ত্রণা কোথা জুড়াব ! ৪
খুঁজেছি প্রণয়ে, রমণী বদনে,
নদীর তরঙ্গে, শশাঙ্ক কিরণে,
কোকিল ঝঙ্কারে, বসন্ত হিল্লোলে,
সৌদামিনী মাঝে জলদের কোলে,
সদা শান্তিময় যােগীর আশ্রয়,
খুঁজেছি উন্নত পৰ্বতগুহায়,
দেশ দেশান্তরে কত পােবন,
ভ্রমেছি সদাই করি অন্বেষণ,
তথাপি কোথাও না পাই তারে ৫
কোথায় পাইব ? অস্তিত্ব যাহার,
জানে না মানবে জানে না সংসার,
জানি পাব কি অপর জনমে
জানি কি হবে দেহ অবসানে,
১০০
ছিন্ন-আশা।
শুনিয়াছি না কি পুণ্য সেই স্থান,
পাপী জন হ্রাস, সুবর্ণ সােপান
ধৰ্ম্ম-আত্মাজনে, জ্বলে দীপাবলি
নাশি তমােরাশি, স্বর্গ সৌধাবলি
উপনীত যাহা ত্রিদিব দ্বারে।
এক মাত্র স্থান সেই এ জগতে,
খ্যাত চরাচরে শ্মশান নামেতে,
যেখানে মানব করিলে শয়ন
শান্তির শান্তনা পায় অনুক্ষণ ;
রােগ শােক আদি জীবনে প্রসূনে
নাশিতে সৃজিত যারা এ ভুবনে,
পারে না। যেখানে করিতে প্রবেশ,
পুণ্য সেই স্থান মমতার লেশ
মায়া দয়া আদি কিছুই নাই !৭
সংসার দহনে মানব জীবন,
ক্লান্ত হয়ে সেথা করিলে শয়ন,
ক্রোড়ে করি যবে, বিরাম দায়িনী
বসে চির নির্জা, জগত জননী,
শান্তি।
১০১
থাকে ভাবনা না থাকে বেদন,
ভাবেনা ভবের অনিত্য বন্ধন
বিষয় প্রপঞ্চ নাহিক যেথায়,
অপত্য কামনা রমণী প্রণয়,
ধৰ্ম্ম মােক্ষ বিনা কিছুই নাই ॥ ৮
যে যায় সেথায় সুখী সেই জন
পশ্চাতে যাহারা করুক ক্রন্দন,
কাদিতে এসেছে কেঁদে দিন যাবে,
এ জনমে কভু শান্তি নাহি পাবে;
যে বহ্নি জ্বলিয়া শ্মশান মাঝেতে
বষে শান্তিধারা একের প্রাণেতে,
কেন সে পাবক হায় নিরন্তর,
জীবিত জীবনে করিতে অঙ্গার,
জ্বলে নিশিদিবা ভীষণ রবে । ৯
পােড়ে সে পাবকে প্রাণের বাসনা,
পােড়ে সে বম্নিতে মায়ার ছলনা,
প্রেমতরু তাহে বিগত জীবন,
হয় উদয় আকাশ কুসুম,
১০২ ছিন্ন-আশা। হয় হৃদয়ে আশার সঞ্চার- মর্ড-মরীচিকা, অনিত্য অসার, জ্ঞান চক্ষু তাহে উন্মীলিত হয়ে, স্বভাবের নগ্ন মূরতি দেখায়ে, বুঝায় সকলি অনিত্য ভবে! ১০ - • ঘাের সে মূরতি অতি ভয়ঙ্কর, হেরিলে আতঙ্গে বিকল অন্তর, নাই অলঙ্কার মূরতি মােহিনী, মায়া, মােহ আদি আশা কুহকিনী ; আশায় নৈরাশ্য, মায়ায় যাতনা, দয়ায় কাঠিন্য, মােহেতে বেদনা, প্রণয়ে বিচ্ছেদ, সৌন্দয্যে অনল, ভালবাসা স্থানে বিরহ গরল, শান্তি মাত্র যেন দেহেতে নাই । ১১ যে মূর্তিমতী দুঃখ প্রসবিনী, বসন বিহীনা প্রকৃতি রমণী, শ্মশান বহিতে জ্ঞানের নয়নে ঘাের সে মূরতি হেরিয়া, জীবনে
শান্তি।
১০৩
নাহি থাকে আশা বাসনা সংসারে,
দিব্য নেত্রে যেন পাই দেখিবারে,
সকলি অসার ধরণী মাঝায়,
অনিবাৰ্য মৃত্যু
বিনা এ ধরায়,
নিশ্চয় নিয়তি কিছুই নাই। ১২
ওই যে অনল ভৈরব গর্জনে,
গ্রাসিছে যে তনু আপনার মনে,
শুনেনা জীবের হৃদি বিদারণ,
মৰ্ম্মঘাতী শেল সমান ক্রন্দন,
হাসিতে হাসিতে প্রফুল্ল অন্তরে,
করিছে ভক্ষণ শত জিহ্বা ধরে,
জানেনা নির্দয় ভাবেনা মনেতে,
যে অগ্নি জ্বালিল অন্যের প্রাণেতে,
নিভিবে না তাহা সাগর জলে। ১৩
সে দিন কুদিন তব হে পাব,
মুনি শপে যবে হলে সৰ্ব্বভুক,
সেই দিন হতে না করি বিচার,
শুদ্ধাশুদ্ধ সৰ্ব্ব করিছ সংহার,
১০৪
ছিন্ন-আশা।
তোমার দহনে কত যে হৃদয়,
জ্বলিতেছে সদা বিষম জ্বালায়,
জান না অনল যে কাল অনল
জেলেছ হৃদয়ে, নিভাইবে কাল
শুইব যখন, তাহার কোলে । ১৪
অহো, সেই দিন; ভাৰি যবে মনে
পারি বুঝিতে জীবিত কেমনে,
সুধাংশু সদৃশ মরি সে বদন,
আছি এতদিন না করি দর্শন,
না জানি কেমনে ছেদিয়া হৃদয়,
রয়েছি জীবিত এ পাপ ধরায়,
প্রাণের পুতলী জীবনের সার,
কোথারে এখন সরযু আমার,
কোথারে আমার আঁধার মণি ? ১৫
ননীর পুতলী, স্নেহের আধার,
হৃদি মরুভূমে সরদী আমার
হৃদয়ের ধন জীবনের আশা,
অতুল ঐশ্বৰ্য্য ভবের ভরসা,
শান্তি। ১০৫ কাঙ্গালের ধন নয়নের মণি, এক মাত্র তুই ছিলিরে বাছনি, বলনা কেমনে কঠিন হৃদয়, হরিয়া এ ধনে বিধি নিরদয়- কাদালি আমারে, কিহেতু শুনি। ১৩ = আশার কাননে একটা প্রসূন ছিল অবশেষে, করিয়া যতন রেখেছিনু তারে, ছিল বড় সাধ- সে সাধে বিধাতা সাধিল রে বাদ, শুখাল অকালে সরযু আমার, যথা রবি করে পূর্ণ সরােবর, নিদাঘের ফল, অন্ধের নয়ন, নিৰ্মম অন্তর বিধি নিদারুণ, করিয়া হরণ কাদালে মােরে। ১৭ আয়, বাছা আয়, হৃদয়ে আমার, আর যে সহেনা, এ পােড়া অন্তর পুড়িতেছে সদা বিষম জালায়, ক্ষতােপরি যথা লবণ ছিটায়,
১০৬
ছিন্ন-আশা।
না জানি কেমন করে যে পরাণ,
হৃদয়ে রাখিতে সদা চায় প্রাণ,
আয়রে বাছনি আয়,একবার,
জুড়াই তাপিত জীবন আমার,
জুড়াই নয়ন বারেক তরে । ১৮
অথবা বাতুল আমি, নিদারুণ
বিধি যার প্রতি, তাহার জীবন
জুড়াবে কি কভু এ জনমে আর ?
পুড়ি দিনে দিনে হইবে অঙ্গার,-
পাইয়াছি ব্যথা হারানু যখন,
হৃদয় সৰ্বম্ব অর্ধেক জীবন,
বজ্রাঘাত সম দারুণ যাতনা
সয়েছি তখন, তখন (3) জানিনা
এ হতে অধিক যাতনা আছে। ১৯
তৃখন (ও) জানিনা এভব সংসার
ঘাের মায়ারূপী, বিভিন্ন আকার
পারে ধরিবারে, ভুলাতে হৃদয়,
যখন যেরূপ আবশ্যক হয়,
শান্তি।
১০৭
যথা কামরূপী নরক,দুয়ার,
কভু অগ্নিময় কভু বা তুষার,
কভু ভয়ঙ্কর ভীষণ দর্শন,
কভু স্বর্ণময় স্বর্গের সােপান
সুবিস্তীর্ণ পথ পড়িয়া আছে। ২০
পাপীয়সী আশা কুইক মন্ত্রণা
বলিল শ্রবণে, “নিরাশ হয়োেনা,
“পাইবে সুদিন, দুহিতা বদন
“করি নিরীক্ষণ ধরহ জীবন,
ভুলিনু তাহাতে, শুনি সে বচন
শ, আশা হৃদে করিনু পােষণ,
জানিনা তখন অশান্তি আকর
আশার আশ্বাস, এখন সংসার
তিমিরে আবৃত যে দিকে চাই ॥ ২১
ভাঙ্গিয়াছে এবে সুখের স্বপন,
হারায়েছি কোথা দুহিতা রতন,
বুঝেছি এখন এ পাপ সংসারে,
আসে জীব-আত্মা কৰ্ম্ম ফল তরে,
১০৮
ছিন্ন-আশা।
নহে এ জগৎ সুখের কারণ,
সুখ শান্তি আশা সব প্রলোভন,
জানিনু নাহিক বিশাল ভুবনে,
শান্তির অস্তিত্ব পাইব কেমনে,
জগতে যে ধন কোথাও নাই। ২২
নিরাশ প্রণয়।
তারিখ—১৬ই আষাঢ় ১২৯৭ সাল।
“কৈতব রহিতং প্রেম ন ভবছি মানুষ লোকে।
যদি ভক্তি কস্য বিরহে বিরহে তৰত কেৱীৰতি ।
কে তুমি বল না আকাশ প্রান্তরে
চকিতে চমকি চলিয়া যাও ।
ডুবায়ে জগতে দ্বিগুণ আঁধারে,
নয়ন ঝলসি অদৃশ্য হও।
এই যে চকিলে, লুকালে কোথায়?
এই যে দেখিনু মেঘেতে ভােরে,
এই যে তােমার প্রদীপ্ত শিখায়,
হেরিনু জগতে নয়ন পরে । ২
১০
১১০
ছিন্ন-আশা।
একবার হাসি মন ভুলাইয়া
কেন বল পুনঃ অদৃশ্য হও!
নয়নের কোণে কটাক্ষ হানিয়া
কত কথা মনে জাগায়ে দাও। ৩
ঘাের ঘনজাল নিবিড় আঁধার,
মরি কি সুন্দর গরজে তায়,
সে নব বারিদে হায় রে তোেমার
সুবিমল হাসি ভাসিয়া যায়। ৪
বিধাতার বিধি কে পারে বুঝিতে,
এ হেন সৌন্দৰ্য্য চিরস্থায়ী নয় ;
ক্ষণে দেখা দিয়ে মানব আঁখিতে,
কে জানে কোথায় লুকায়ে যায়। ৫
তপাপি না পারি পরাণ ভরিয়া,
দেখিতে তােমায় মেঘের গায় ;
চমক যেমনি কেঁদে উঠে হিয়া,
তরাসে নয়ন মুদিত হয় ॥ ৬
নিরাশ প্রণয়।
১১১
তাই বলি-কে তুমি বল না আকাশ প্রান্তরে,
চকিতে চমকি চলিয়া যাও;
ডুবায়ে জগতে দ্বিগুণ আঁধারে,
নয়ন ঝলসি অদৃশ্য হও। ৭
;
ক্ষণপ্রভা তুমি; সৌন্দৰ্য্য তােমার
বিখ্যাত জগতে, প্রবাদ প্রায়,
নারীর গৌরব, নারী অহঙ্কার,
নারীকুলে ধন্যা রূপ-তুলনায় ৮
সত্য বটে তুমি রূপের ইন্দ্রাণী,
গরবিনী সদা রূপের ভরে ;
কিন্তু হায়, বিধি ভীষণ অশনী
কি হেতু সৃজিলে হেন অন্তরে ? ৯
হেরি যবে তােরে জীমূত মাঝারে
হাসিতে, ভুলাও মানব মন ;
কে ভাবে তখন, এ হেন অন্তরে
নিহিত আছে গরল ভীষণ ॥ ১০
১১২
ছিন্ন-আশা।
নরদােকে বাস, নরলােক মাের,
নারীর সৌন্দর্যে মোহিত হই।
নারীর(ই) অন্তর কালকুটে ভরা
নারীর(ই) অন্তরে মমতা নাই।১১
হাসি মাখা মুখে, খঞ্জন নয়নে,
আসি যবে তারা পুরুষ পাশে,
চাহে তুষিবারে প্রেম সুধা দানে,
ভাবি যেন স্বর্গ করেতে আসে। ১২
নির্বোধ মানব ভাবে না তখন,
বিষাক্ত সপিনী নিকটে তার,
ভাবে না মনেতে, দংশিবে যখন
নারিবে ঔষধি বাঁচাতে আর ॥ ১৩
ওই যে চপলা চকিল গগনে,
জগত্ হাসান হাসিতে হাসি,
উজলি ভুবনে আপন কিরণে,
পলকে বিনাশি তিমির রাশি। ১৪
নিরাশ প্রণয়।
কে ভাবে তখন এ হেন অন্তর,
বজ্রের নিলয় কঠিন স্থান ;
হের মুখে হাসি, হেরহ অন্তর
অশনী, নাশিতে মানব প্রাণ # ১৫
দেবলােকে বাস, দেবীর (ও) অন্তর
নারীর মতন, পূর্ণ খলতা,
দেবীর (ও) বয়ান হের কি সুন্দর
হেরহ অন্তর, নাই মমতা। ১৩
নহে নরলােকে; এ তিন ভুবনে
অবলা অন্তর একই আয়,
অমিয় বচন শুনিবে বদনে
হৃদয়ে বিষের প্রবাহ হয় ৷৷ ১৭
রমণী অবলা? মূখের বচন ;
প্রফুল বদনে হৃদয় পরে,
যুগ্ম গিরিবরে করিছে ধারণ,
অবলা তাহারা ধরণী পরে ?
১১৪
ছিন্ন-আশা।
কটাক্ষে যাহারা পারে নাশিবারে
বিশাল ভূবন, নয়ন-বাণে,
চিরজয়ী বীর কাপে থরথরে
হানে যুবে তারা মদন বাণে। ১৯
সে যদি অবলা, কেবা বলবা
নিখিল জগতে, জানে কি তারা ?
বলু তাহারা জানে না যে জন,
রমণী তবলা স্নেহের ধারা ২০
আমি মর জ্বলে দুঃখের জ্বালায়,
আমি মরি ঘুরে প্রণয় ভরে ;
আমি জ্বলি কার ক্ষতি কিবা তায় ?
প্রেম কেমন নারী জানে না রে ।। ২১
ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র রমণী অন্তর,
কত ভালবাসা ধরিতে পারে ?
সীমাবদ্ধ হৃদি নাই পরিসর,
প্রণয় রবে মুষ্টি কারাগারে ? ২২
?
নিরাশ প্রণয়।
নিঃস্বার্থ প্রণয়, রমণী হৃদয়
জানে না কেমন, ভাবে না তায়,
খায় পরে তাই অকৃতজ্ঞ নয়,
ভালবেসে মুখে, প্রেম দেখায়। ২৩
আমার প্রণয়ে সীমা নাই যার,
মাথার উপরে আকাশ যথা,
নারীর অন্তর প্রতিদান তার
করিতে পাইবে প্রণয় কোথা ? ২৪
পরাইনু যারে প্রেম পারিজাত,
জানে না সে জন আদর তার,
প্রেম অযতনে পেতেছি আঘাত,
সন্তাপে কঁদিছে হৃদি আমার ॥ ২৫
সাধের জীবন, সাধের প্রণয়,
দিলাম যতনে বালিকা করে ।
আশা, ভালবাসা পাব বিনিময়,
যতনে রাখিবে প্রেমেতে মােরে।।২৬
ছিন্ন-আশা।
কোথা সে প্রণয়, কোথা ভালবাসা ?
অদৃশ্য হইল স্বপন সম,
মিটিছে প্রাণেতে, প্রাণের পিয়াশা;
পূরিল না সাধ জীবনে মম। ২৭
এ জনমে সাধ আর না পুরিবে,
হৃদি আশালতা বিশুল্ক প্রায়,
এ প্রাণ যখন তিমিরে ডুবিবে
সে বালা তখন হাসিবে তায় ।। ২৮
তাই বলি--আমি মরি জ্বলে দুখের জ্বালায়,
আমি মরি ঘুরে প্রণয় তরে;
রমণী অন্তরে মমতা কোথায় ?
তাইত’ চপলা নিন্দাই তােরে ॥২৯
একটী চিত্র
তারিখ-২৬ আষাঢ় ১২৯১ সাল।
“দীর্ঘাপাঙ্গবিসারিনেত্রযুগলং লীলাঞ্চিতলতং
দস্তান্তঃপরিকীর্ণহাসকিরণজ্যোৎস্নাবিলিপ্তাধর।
কর্কন্ধুতিপাটলােষ্ঠরূচিরং ভস্যান্তদেভমুখং
চিত্ৰেপ্যালপতীব বিভ্রমলসৎপ্রােভিন্নকান্তিদ্রবম্ ॥”
কালিদাস।
বাখানি সে চিত্রকরে, তুলিকা যাহার
আঁকিল মূরতি হেন,
জীবিত রয়েছে যেন,
যেন কোন দেববালা পথভ্রান্ত হয়ে,
চেয়ে আছে অনিমিষে শূন্যেতে দাড়ায়ে ॥১:
১১৮
-"শা।
জীবিত অথ"; ". না পারি বুঝিতে,
"; নই মুখ,
অধরে । চবুক,
সেই সে অল রাশি ঈষদ কুঞ্চিত,
মৃদুল পবনে যাহা সদা নাচিত। ২
সেই কৃষ্ণ যুগ্মভুরু তিলক শােভিত,
নয়নে অঞ্জন রেখা
সেই মুখ হাসি মাখা,
নাশা প্রান্তে সেই মুক্তা তেমনি শােভিছে,
কর্ণ আভরণ কর্ণে তেমনি দুলিছে। ৩
সেই হার মুকুতার, শােভিত গলায়,
সেই স্বর্ণ আভরণ,
সেই বস্ত্র সুশােভন,
সেই সব, কিন্তু হায় জীবন কোথায় ?
জীবন বিহনে জীব কে জানে কি হয় । ৪
ইচ্ছা হয় ওই ওষ্ঠ কম্পিত হইয়া
কহিবে প্রাণের কথা,
জুড়াবে হৃদয় ব্যথা,
একটী চিত্র।
অনিমিষ নয়নেতে পলক পড়িবে,
আবার যেমন ছিল তেমনি হইবে। ৫
আবার যেমন ছিল তেমনি হইবে ?
ধন্য আশা মায়াবিনী,
কি কুহকে নাহি জানি
ভুলাও মানব মন, এমন কঠিন,
কঠিন হলেও
তবু তােমার অধীন। ৬
বল দেখি চিত্রকর, কোথায় শিখিলে
হেন বিদ্যা অপরূপ,
নাহি যায় অনুরূপ,
হৃত বন্তু পুনরায় দেখাও নয়নে,
এক মাত্র আছে যাহা হৃদয় আসনে। ৭
মানস দর্পণে চাহি মিলাই যখন,
সুন্দর আলেখ্য খানি
কেঁদে উঠে এ পরাণি
ওই মুখে মৃদুহাসি না করি দর্শন,
উথলে শােকের সিন্ধু হৃদি বিদারণ। ৮
১২০
ছিন্ন-আশা।
পার যদি হাসিবারে, হাস একবার ;
ভূষিত চাতক প্রাণ,
বারি বিন্দু করি পান
জুড়ায় যেমতি, হায় আমার অন্তর,
জুড়াবে হেরিয়া তব সে হাসি সুন্দর ॥ ৯
ওই মুখে সুধাধ্বনি বর্ষিতে যখন,
মনে আছে সেই দিন,
বাজিত হৃদয়ে বান,
নাচিত পরাণ মম সে মধুর গানে,
ময়ুর ময়ুরী যথা মেঘের গর্জনে। ১০
চিত্রকর, আঁকিয়াছ অপূৰ্ব্ব প্রতিমা ;
মানিলাম তব শক্তি,
দেখিলাম সেই মূর্তি,
কিন্তু তবু পূর্ণ তৃপ্তি, হ’ল না দেখায়,
চিত্ৰতে চৈতন্য দিতে কে পারে ধরায় ১১
কেন হেরিনু তােমায়।
ভারিখ—৩০ আষাঢ় ১২৯৭ সাল।
কেন হেরিনু তােমায় ?
যে দুখ অন্তরে তাহা কহিব কাহায় !
অভাগার প্রতি হেন,
বিধি যে নিদয় কেন,
কিবা দোষ করিয়াছি না জানি নিশ্চয়,
যার তরে এত জ্বালা সহিছে হৃদয় ॥ ১
কেন হেরিনু তােমায় ?
জ্বর জ্বর মন প্রাণ বিরহ জ্বালায়।
দেখি নাই ছি ভাল,
কেন বিধি দেখাইল
তােমার বদন খানি, অতুল ধরায়,
শয়নে স্বপনে যাহা সতত জাগায় ॥ ২
১১
ছিন্ন-আশা।
কেন হেরিনু তােমায় ?
হেরি তাহে ক্ষতি নাই প্রাণ যে যায়।
হেরিয়াছি যদবধি,
মন প্রাণ তদবধি,
আমার হয়েও যেন আমার সে নয়,
কে জানে কেমন করে গিয়াছে কোথায়। ৩
কেন হেরিনু তােমায় ?
চখে দেখে এত জ্বালা কে জানে তাহায় ?
মৃণালে কমল ফুল
ফোটে যবে, অলিকুল
মত্ত হয়ে গুঞ্জরিয়া তার (ই) পানে ধায়,
তেমতি আমার প্রাণ কেন তােরে চায় ? ৪
কেন হেরিনু তােমায় ?
চকিতে চমকি তুমি লুকাও কোথায় ?
পিপাসী চাতক মত,
চেয়ে থাকি অবিরত,
হেরিতে সে চাননে প্রাণ যারে চায়,
হৃদয় করিয়া চুরি পলাবে কোথায়। ৫
কেন হেরিনু তােমায়।
কেন হেরিনু তােমায় ?
প্রাণেতে রাখিতে তােরে সদা প্রাণ চায় ;
হদি পদ্মে বসাইয়া,
প্রণয় প্রসূন দিয়া,
প্রাণের বাসনা আজি পুজিতে তােমায়,
পুস্পাঞ্জলি, মন প্রাণ দিনু তব পায়। ৬
.
কেন হেরিনু তােমায় ?
ভালবেসে প্রাণে মরি একি হ’ল দায় ;
আমি তােমা বাসি ভাল,
তুমি না বাসিলে ভাল,
সংসার শ্মশান সম কি লাভ বাচায় ?
ভাবি, ধরা সমাচ্ছন্ন ঘাের তমসায়। ৭
কেন হেরিনু তােমায় ?
কত আশা মনে মনে হয়রে উদয় ;
বল দেখি প্রিয়তম,
আকাশ কুসুম সম
হবে কি আমার যত বাসনা নিচয় ?
দিব কি চিরদিন(ই) প্রেমের জ্বালায় ?৮
ছিন্ন-আশা।
কেন হেরিনু তােমায় ?
নিজ দোষে ভালবেসে কঁাদানু হৃদয়।
কত যে যাতনা মনে,
সহিতেছি দিনে দিনে,
যদিলাে জানিতে তুমি, তােমার (৩) হৃদয়
পাষাণ হ'লেও হ'ত কুসুমের প্রায় ৯
কেন হেরিনু তােমায় ?
কে বলে পাষাণী তুমি নিঠুর হৃদয় ?
কোমল নবনি সম,
ননির পুভুলি মম,
আমার(ই) ভাগ্য দোষে বিধি নিরদয়,
তােমারে নিন্দিলে পােড়া প্রাণে নাহি সয় ॥১০
কেন হেরিনু তোমায় ?
কি আর লিখিব? আর নাহি যে জুড়ায়।
বিরলে লিখিয়া লিপি,
তব কর পদ্মে পি,
দেখাে প্রিয়ে রেখাে মনে ঠেলােনাক’ পায়,
তাপিত প্রাণের ব্যথা জানানু তােমায় ॥ ১১
হতাসের বিলাপ।
তারিখ-১৪ই ভাদ্র ১২৯৭ সাল
কে তুমি, লো শশীমুখী নিন্দিয়া শশীরে,
রূপে আলাে করি ধরা,
প্রাণে করি মাতােয়ারা,
পাগল করান হাসি হাসিয়া অধরে
বিধিতেছ হৃদি মম অনঙ্গের শরে? ১
ভ্রমরে বিপি যবে ওকর কমলে
কঙ্কণ কিঙ্কিনী ধ্বনি,
শ্রবণ বিবরে শুনি,
হৃদয়ের বেগ হৃদে না পারি ধরিতে
বিষম তুফান বয় প্রাণের মাঝেতে। ২
১২৬
ছিন্ন-আশা।
কে জানে, কি বাে বলে সুবর্ণ কঙ্কণ,
যে ধ্বনি পশিলে কানে,
ছুটে যাই বাতায়নে,
শত কৰ্ম্ম থাকে যদি না পারি থাকিতে,
শত কৰ্ম্ম বিসর্জিব তােমারে দেখিতে। ৩
অন্য কৰ্ম্ম কিবা মম আছে এ জগতে,
বিনা তব চন্দ্রানন,
ভাবিবারে অনুক্ষণ;
উপায় থাকিত যদি, বিদারি হৃদয়,
দেখাতাম কার মূর্তি বিরাজে সেথায়। ৪
ইচ্ছা হয় প্রসারিয়া একর যুগল,
তােমার বয়ান খানি,
হৃদয় উপরে আনি
অধর সুধায় পােড়। প্রাণেরে জুড়াই,
জ্বলন্ত পাবকে প্রেম সলিলে নিভাই। ৫
হতাসের বিলাপ।
১২৭
ভাবে না অবােধ মন, পাগল অন্তর,
এত আশা যার তরে,
প্রাণ সদা কেঁদে মরে,
সে যে ভাল নাহি বাসে, না পারে দেখিতে,
আঁখিশূল সম মােরে ভাবে সে মনেতে। ৩
ফেলিতে আঁখির জল এসেছি হেথায়,
বিধি বিধি কে খণ্ডাবে,
কেঁদে দিন কেটে যাবে,
এতদিন কাদিয়াছি, আজিও কাঁদিব,
হৃদয়ের খেদ, কঁাদি হৃদয়ে মিটাৰ। ৭
বােঝে না পাগল মন, কি করি উপায় ;
যথা শিশু মাতৃকোলে,
শশাঙ্ক ধরিবে বলে,
কত আসে আকাশেতে বাহু প্রসারয়,
তেমতি আমার আশা বিফল নিশ্চয় ।৮
১২৮
ছিন্ন-আশা।
দিব না থাকিতে স্বার্থ আর এ অন্তরে,
সাধ আশা তেয়াগিয়ে,
প্রণয় আহুতি দিয়ে,
নিজ হস্তে হৃদি পিণ্ড করি উৎপাটন,
তােমার সুখের তরে দিনু বিসর্জন | ১
সুখে থাক, ভাল থাক, চিরজীবি হয়ে,
জগত্ পিতার স্থানে,
ভিক্ষা মাগি কায়মনে,
একটী কণ্টক যেন না ফোটে চরণে,
আশীৰ্বাদ করি সুখে থাক এ জীবনে ॥ ১০
- --------
প্রাণের ব্যথা।
তারিখ-৩রা আশ্বিন ১২৯৭ সাল।
cA
“হা হা হম্ভ স্ফটতি হৃদয়ং সুংসতে দেহবন্ধঃ
শূন্যং মন্তে জগদবিরতজালমন্তজলামি।
সীদন্নন্ধেতমসি বিধুয়াে মজ্জতীবান্তরাত্মা
বিঘােহঃ মৃগয়তি কথং মন্দভাগ্যঃ করােমি।”
ভবভূতি।
কে জানে পরাণ করিছে কেমন,
থাকিয়া থাকিয়া শিহরিছে যেন,
কেন মন আজি এত উচাটন,
কেন কাদে প্রাণ বুঝিতে নারি। ১
যে ব্যথা আজিকে সহিছে হৃদয়,
নাহি জানি ভাষা বুঝাতে তাহায়,
জানি সে ব্যথা বিশাল ধরায়,
অন্তরে অন্তরে কঁদিয়া মরি। ২
১৩০
ছিন্ন-আশা।
অস্ত্রের আঘাতে, আত্মীয় নিধনে,
শরীর বিকলে, অনল দহনে,
অশনী সম্পাতে, রােগের পীড়নে
যে ব্যথা মানব হৃদয়ে পায় । ৩
সামান্য সে ব্যথা, ইহার সহিতে
তুলনা করিলে, হাসিতে হাসিতে
অম্লান বদনে পারি সে সাহিতে
সামান্য পিপিলী দংশন প্রায় ৪
জ্বলে যায় প্রাণ দারুণ জ্বালায়,
সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফুকারিছে তায়,
ঝলকে ঝলকে শােণিত মুখায়,
ক্ষীণে ক্ষীণতর করিছে মােরে । ও
এ ব্যথা যখন হৃদয়ে পশিবে,
তিল তিল করি জীবনে নাশিবে,
সাধের সংসার আঁধার দেখাবে
রবেনা মম জীবন পরে ॥ ৬
প্রাণের ব্যথা।
১৩১
হৃদয় ভিতরে শূন্য মনে হবে,
আঁখি মেলি রবে, কিন্তু না হেরিবে,,
শ্রবণে শুনিবে, সঙ্গা নাহি হবে,
প্রফুল্লতা ভয়ে পলায়ে যায় ॥ ৭
হাস যদি তবে করিয়া প্রয়াস,
লাগিবে না ভাল সে হাসি নিরশ,
দিনে দিনে মন হইবে উদাস
অস্থির দেহ হইবে তায়।। ৮
এ ব্যথা যখন হৃদয়ে পশিবে,
সুধাংশু কিরণে মনেরে জ্বালাবে,
সঙ্গীত লহরী প্রাণে না মাতাবে,
আশার আশ্বাস রবেনা মনে ।। ১
ভূত কথা মনে হবে না উদয়,
ভবিষ্য আকাশ পূর্ণ নিরাশায়,
বর্তমান ঘাের অন্ধকারময়,
বিপরীত সব হইবে প্রাণে ১০
১৩২
ছিন্ন-আশা।
এ কেমন ব্যথা কোথা হতে এল,
হৃদি অন্তস্থল দগ্ধ হয়ে গেল,
জীবনের সাধ বুঝিবা মিটিল,
ডুবিল অতল জলধি জলে।১১
কে জান ঔষধি বাঁচাও আমায়,
এ যম যাতনা আর নাহি সয়,
এ ব্যথার ব্যথী কে আছ ধরায়,
কিবা প্রতিকার দেহ গাে বলে । ১২
১
বিদায়।
তারিখ-২৫শে আশ্বিন ১৯৯৭ সাল।
স্থান-১৯১ নং রামতনুর বসুর লেন।
“গচ্ছতি পুরশরীরং ধাবতি পশ্চাদসংস্থিতং চেতঃ।
চীনাংশুকমিব কেতােঃ প্রতিবাতংনীয়মানস্য”।
কালিদাস।
আজি যাচি গাে বিদায়-
হাসিমুখে ফুল্লাননে, প্রণয় পিরীতি মনে
জনমের মত আজি বিদাও আমায়,
এ জীবনে দেখা সাধ ঘুচিল ধরায় ১
আজি যাচি গাে বিদায়,
ঈশ্বর জানেন মনে, কত দুখ সহি প্রাণে,
কত দুখ সব প্রাণে না হেরি তােমায়,
জীয়ন্তে রহিব মরা, জীবিত দশায় ।। ২
১৩৪
ছিন্ন-আশা।
আজি যাচি গাে বিদায়,
হবে কি না হবে দেখা, কি আছে কপালে লেখা,
বিধির দারুণ বিধি অন্তরে কঁাপায়,
ভবিষ্য জঠর প্রাণ নিরখিতে চায়। ৩
আজি যাচি গাে বিদায়,
ধূমকেতু সম হেথা,
উদিয়া কত যে ব্যথা
দিয়েছি হৃদয়ে তব, ক্ষমিও আমায়,
নিজ গুণে ভুলে যেও এই অভাগায়। ৪
আজি মাচি গাে বিদায়,
আর দেখা নাহি হবে, আর মােরে না হেরিবে,
আর না লুকাতে হবে হেরিয়া আমায়,
আনন্দে ভ্ৰমিও এবে যথা প্রাণ চায় ॥ ৫
আজি যাচি গাে বিদায়,
সুদুর গগন থালে, ওই হের তারা খেলে,
আপনা আপনি হেরি, আপন হারায়,
কি সুন্দর দেখ দেখ গগনের গায় । ৬
বিদায়।
১৩৫
,
আজি যাচি গগ। বিদায়,
তারায় তারায় মিলি, হের কত কুতুহলী,
কেন সবে মম পানে অনিমিষে চায়,
কেন তারা এত হাসে, হেরিয়া আমায় ।।৭
আজি যাচি গাে বিদায়,
হৃদাকাশে তুমি মম, উজ্জ্বল তারকা সম,
তুমি অত’ হাসিও না বিদ্রুপি আমায় ;
তােমার বিদ্রুপে প্রাণে বড় ব্যথা পায়।[৮
আজি যাচি গাে বিদায়,
সুশােভিতা তারাহারে, ওই হের ক্ষপাক্ষরে,
নীলনভে হাসি হাসি আমারে তাকায়,
সেও কিরে এত সুখি কঁাদাতে আমায় ? ৯
আজি যাচি গাে বিদায়,
বিধি পদে কত দোষী, বিশাদ সাগরে ভাসি,
প্রাণের উল্লাস আজি গিয়াছে কোথায়,
প্রাণ ভরে কঁদিবারে সদা প্রাণ চায় ॥১০
১৩৬
ছিন্ন-আশা।
আজি যাচি গাে বিদায়,
হৃদয়ের অন্তস্থলে আঁখি দৃষ্টি নিক্ষেপিলে,
কিবা দেখি সেথা? অহে, পূর্ণ নিরাশায়,
উচ্ছাস বিহীন যেন অনন্ত নিরয় ॥ ১১
আজি যাচি গাে বিদায়,
যে দিকে ফিরাই আঁখি, যেন বিষে পূর্ণ দেখি,
গােলাপে সৌরভ নাই, জাতি মল্লিকায়,
অগ্নিকণা সম যেন, মলয়ের বায় । ১২
আজি যাচি গাে বিদায়,
আপন দেহের ভার, বহিতে না পারি আর,
কি সুখে জীবন ধরি এ পাপ ধরায়,
কি ফল হইবে বাঁচি, এমন বাঁচায় । ১৩
আজি যাচি গাে বিদায়,
কত আশা মনে ছিল, একে একে নিভে গেল,
ডুবায়ে জীবনে মম ঘাের তমিশ্রায়,
আমার আঁধার এত ভয়ঙ্কর নয় । ১৪
বিদায়।
১৩৭
আজি যাচি গাে বিদায়,
দ্বিতীয় বাসনা নাই, এই মাত্র ভিক্ষা চাই,
বারেক দর্শন দিও বিদায় সময়,
বারেক হাসিও, দেখে হইব বিদায় || ১৫
.
আজি যাচি গাে বিদায়,
হাসি মুখে ফুল্লাননে,
প্রণয় পিরীতি মনে,
হতভাগ্যে, সুবদনে দেহ গাে বিদায়,
জনমের শােধ আজি বিদায় বিদায় ।। ১৬
আকুল প্রাণ
তারিখ-১৫ই ফাল্গুন ১২৯৭ সাল।
স্থান-৯ নং রামতনু বসুর লেন।
সজল নয়নে, আকুলিত প্রাণে
কাদিতে কাদিতে জীবন গেল ;
হৃদি সরসীতে, আশা পঙ্কজিনী,
একে একে হায় সবে শুখাল ।। ১
আশার আশয়ে, মজিয়ে তখন
কত তাশা হৃদে করেছিনু রে
কে জানে তখন, আশার আশ্বাস
মরীচিকা সম ভব সংসারের ।। ২
আকুল প্রাণ।
১৩১
এখন যে দিকে
ফিরাই নয়ন
কেমন কেমন মনেতে হয় ;
মনে হয় আজি,
আজির সংসার
আগেকার মত যেন রে নয় । ৩
মনে হয় যেন,
এ হৃদয় মম
সে হৃদয় নয়, আগে যা ছিল,-
এ হৃদয় যদি, সে হৃদয় হত
তবে সে উল্লাস কোথায় গেল ? ৪
এ হৃদয় মম,
সে হৃদয় হলে,
আশায় সতত নাচিত প্রাণ,
বসন্ত আগমে, হৃদয়ের বীন
পঞ্চমে ঝঙ্কারে ধরিত তান॥ ৫
এ হৃদয় মম, সে হৃদয় হলে,
স্বভাবের শােভা নেহারি চখে
দারূণ হতাশ
অন্তর অন্তরে
বিষম দুখে। ৬
কঁাদত’না কভু
১৪০
ছিন্ন-আশা।
এ হৃদয় যদি সে হৃদয় হ'ত
বিশ্বাস থাকিত সংসার পরে,
বিশ্বাস থাকিত আপনার প্রাণে,
বিশ্বাস থাকিত ঈশ্বর পরে ॥ ৭
কিন্তু হায় হায়, এ কেমন হল
অন্তরে বাহিরে যে দিকে চাই,
শূন্য মনে হয়,
আঁধার দেখায়,
মনে হয় যেন কিছুই নাই । ৮
মনে হয় যেন বিপুল ধরিত্রী
দুখের নিলয়, নরক ঠাঁই,
কে বলে সংসার। সুখের আকর ?
সুখ, শান্তি, আশা, সংসারে নাই ॥ ৯
তবে যদি তারে
পাই রে আবার,
জানি কি হয় প্রাণের প্রাণে,
হয়ত আবার এ পােড়া পরাণে
বাজিবে বাঁশরি নূতন তানে। ১৫
আকুল প্রাণ।
১৪১
তবে যদি পুনঃ পাই দেখিবারে,
হাসি হাসি সেই বদন শশী,
অপাঙ্গের কোলে,
অধরের মূলে
বিকসিত যদি হয় সে হাসি। ১১
হয়ত তাহলে, আমার(ও) হৃদয়
হাসিবে আবার হেরিয়া তারে,
হয়ত তাহলে, আজির সংসার
আগেকার মত হইবে ফিরে ॥ ১২
আশা পথ পানে, চেয়ে চেয়ে আমি
হয়েছি নিরাশ হয়েছি সারা,
যে পথে সে গেছে, কত জনে গেল,
ফিরিল না কেহ (এ) কেমন ধারা? ১৩
মনে হয় যাই, সেই পথ ধরি,
হয়’ত হলে পাইব তায়-
যে যায় সে পথে কেন নাহি ফিরে ?
জানিতে সতত পরাণ চায় ॥ ১৪
১৪২
ছিন্ন-আশা।
যাই যাই করি কেমনে যাইব ?
কে পথ দেখাবে যাইতে সেথা
কে আছে কাণ্ডারি, কে হবে রে সাথী,
কার সনে যাব ? যাব বা কোথা ? ১৫
হ’লনা হ’লনা, যাওয়া ত’ হ’লােনা,
নেওত এল’না ফিরিয়ে আর,
কোথায় যাইব, কোথায় পাইব,
কেমনে দেখিব বদন তার ? ১৬
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.