Bally Sadharan Granthagar

Naba Badhu Ed. 3rd

Mitra, Sri Gajendra Kumar · 2009/10/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নৰধু
শ্রীগজেন্দ্রকুমার মিত্র
গ্রীগুরু লাইৱেী
০, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা-

তৃতীয় সংস্করণ
কার্ত্তিক ১৩৫২
সপ্তম সহ
—দুই টাকা আট আনা
ও লাইব্রেরী ২৪, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা হইতে শ্রীভুবনমােন
মজুমদার কর্তৃক প্রকাশিত ও পরিচয় প্রেস, বি, দীনবহু লেন,
কলিকাতৃ হইতে এ কী কতৃক মুক্তি।

এতিমা মিত্র समाविबार-

এই লেখকের
ভাড়াটে বাড়ী
প্রিয়াশ্চরিত্র
মনে ছিল আশা
রাত্রির তপ
মরণীয় দিন
প্রভাত
দুর্ঘটনা
সমান্তরেখা
পুরুষ ও রমণী
রজনীগন্ধা
বহুবিচিত্র
স্বর্ণমুকুর
নবযৌবন
চতুর্দোলা
কমা ও সেমিকোলন
সাবালক
শ্রেষ্ঠগল্প
কাছে আছে ধারা
মিলনা
জ্যোতিষী
রাত-মােহানা
পৃথিবীর ইতিহাস

আমার লেখা বিবাহের এবং পত্য-জীবনের চি
ওলিকে একত্রে গেথে বাের
কায় অনেকদিন
ধরেই বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে তাগিদ পেয়েছি।
এতদিন হয়ে ওঠেনি সে কুটির এ তাঁদের কাছে
ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এই সম্পর্কে আর একটা
প্রার্থনাও করে রাখি-এর মধ্যে দুটি অংশ এর আগে
আমার ভাড়াটে বাড়ী বইতে বেরিয়েছিল কিন্তু এই
ধরণের চিত্রগুলিকে একসঙ্গে সালাতে গিয়ে পাশ
রক্ষায় কথা বাধ্য হয়ে তাদের এর মধ্যে হন েিত ।
আশা করি পাঠকরা এ অপরাধ মানা করে।

No text on this page.

বিবাহের পূর্বদিন বিবাহের দিন ধার্য হইয়াছে শনিবার, শুক্রবার হইতেই বাড়ীতে কুটুম সমাগম শুরু হইয়াছে। পাত্র সুরেশ বহুদিন চাকরী করিয়া টাকা এমাইয়াছে, বিবাহেও অনেক টাকা পাওয়া যাইবে এমনি একটা জনশ্রুতি মুখে মুখে বহুদূর পর্যন্ত ছড়াইয়া গিয়াছিল বলিয়া আত্মীয়রা প্রায় সকলেই আসিয়াছেন। বাপ-মা নাই, বাড়ীতে অভিভাবক গৃহিনী বলিতেও কেই নাই, সুতরাং যাহারা আসিয়াছেন তাহাদের প্রত্যেকেই দৰী ঐ পদটির উপর। ছােটমাসী আসিয়াছেন বুধবার রাত্রে, তিনি বার বার সকলকে গুনাইতেছেন, ওরা আমাকে ভুলে থাকতে পারে, আমি কিন্তু কানে এনে চুপ করে থাকি কি করে বলাে দেখি। পেটের ছেলে ত? মা মাসী কি আলাদা? খবরটি যেতেই চলে এলুম, ওরা বাবার আর অপেক্ষা করতে পার না। কাজ যে আমারই, ওরা নেম করা পর্যন্ত কি আর চুপ করে বসে থাকতে পারি? সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন নিজের কাকে, গাড়ী ভাড়ার টাকাটা চেয়ে নিয়ে রাখলি কোথায়? সাবধান করে রেখেছিস ? পাচভূতের কাণ্ড ১ রেশৰা এই মাগীটিকে চোখে দেখে নাই পৰ্য্যন্ত, কি তা এতাদৃশ স্নেহের পর অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় কি? মামা ভাের বেলায় চার-পাঁচটি পুত্রকন্যাসহ সস্ত্রীক আসিয়া পৌছিয়াছেন, তখন হইতে উপদেশ দিতে শুরু করিয়াছেন, এখনও আছেন নাই। সুরেশকে ডাকিয়া বারবার বলিতেছেন, পিসি ফিসি এত জোটালি কেন? ওরা সব বুবলি বাবা, সব কেবল খাবার পাত্র আর নেয় পাত্র,-একতিল উপকার কারুর বার হবার সম্ভাবনা নেই। আর দরকারই বা কি, মামী রয়েছে তােদের মাথার ওপর, মাসীরা রয়েছে, যা কিছু কয়বার ওয়াই করবে। করবে। না, না, সুরেশ অনিল, তােমরা ছেলেমানুষী ফয়োনা ! এখন থেকে বুঝে চলতে না শিখলে পরে পস্তাতে হবে। পয়সা দুটো না হয় জমিয়েছ, তাই বলে কি বার-তের মধ্যে এমনি করে লুটিয়ে দিতে হবে। মিনিটখানেক পরেই কন্যাকে প্রশ্ন করেন, হায়ে খাবারটার তাে খেয়েছিস? চা টা পেয়েছি তা হারে ও ময়েশ, দে না কিন্তু মিষ্টি টিটি আনতে। তাের সব মামাতাে ভাই বোেন, মাসতুতো ভাইৰােন অতলে এসেছে, হাজার হােক একটা দিন আনন্দ করবে বৈ ত না। পয়লা হাড়, না কিছু খেয়ে আর খাইয়ে যে কটা দিন যায়। মিত এই বুঝি। মরেশ ব্যস্ত হইয়া টাকা বাহির করিয়া দেয়। অনিল রাগ কখিয়া পাড়ালে গজনা হয়, কিন্তু সুরেশ বলে, বাক-একটা দিন এসেছে আর রাগারাগি করে কাজ নেই- শিলিয়া আমার কাছেই থাকেন। ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনী সুন তাহার সসারে মােট সাইত্রিশটি—তিনি আসিয়া কহিলেন, আমায় বাড়ীতে রান্না-বান্নার পাট এ দুটো দিন বন্ধ রাখলাম বাবা, আমি আর বড় বৌমা দুজনকারই এখানে থাকা দরকার, নইলে সব করবে কে? তাের আতান্তরের মধ্যে পড়বি আর আমি বাড়ীতে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে খাব সে-ত হয় না। মামাই বল আর মাসীই বল বাবা সুরেশ, সব’ আজ দেখছি-আমি যে বাবা চিরকালের। দাদা বৌদি যখন পনেরাে দিনের আড়াআড়িতে মারা গেলেন, তখন ঐ অনিলকে মই দিয়ে মানুষ করতে হয়েছে যে আমাকে। বাপরে! সে দিনের কথা কি ভুলতে পারি। মনে করলেও মনটার ভেতর কেমন করে ওঠে। হারে সুরেশ, সেসব কথা তাের কি মনে পড়ে বাবা, ভােরবেলা উঠে তুই বলসি ‘পিসি, জিবেগঞ্জ দে’ আর অনিল পিসি বলতে পারত না, বলত “হিসি- সুরেশের মনে আরও অনেক কথাই পড়িল কিন্তু সে কথা এখানে বলা চলে না, সে উত্তর দিল, মনে পড়ে বৈকি পিসিমা, তা বেশ , এয়ার কদিন এখানেই খাওয়া দাওয়া করুক না, তােমার আর বড় বৌদির ত বাড়ী যাওয়াও হবে না। একদিন তােমাদের এখানে থাকা দরকার। আড়ালে অনিলকে ডাকিয়া কহিল, আরও সে-দেড়েক মাই চাই বোধ হয় । ভাগ্যিস একটা ঠাকুর বেশী আনা হয়েছিল। পিসিমার কন্যা নন্দরাণী কহিল, কি কাপড় চোপড় সৰ ফিলি, কৈ দেখলি না ত মু। দেখি না একবার। সুরেশ নিজেই গিয়া দেখাইতে বসে, গাত্র-হরিদ্রার রকমারি বাজার, কাপড়তলি হাঙ্গা সমই সে নিজে কিনিয়াছে। মেয়েদের কাপড় অনিল কাল কিনিতে পারে এইরূপ একটা খ্যাতি ছিল বলিয়া সে আর = ছোট ভাইয়ের উপবেই দিয়াছে। তা অনিল কাপড় কিনিয়াছেও বড় চমৎকার-চাপফুল বঙ্গের বেনারসী, গঙ্গাজলি গা, আসমানী রঙ্গের ঢাকাই, কংলা সিল্কের কাপড়, কালো জমির উপর সােনাশী জরির কাজ করা মাদ্রাজী, মযুকণ্ঠী, চাদের আলো, টিয়াপাখীর রং—নানা বর্ণের এবং মূল্যের বিচিত্র কাপড়। সে দিকে চাহিয়া চাহিয়া নৰয়াণীর দৃষ্টি সাপের চোখের মতই জলিয়া উঠিয়াছিল, তবুও সে প্রাণপণে আত্মসারণ করিয়া কহিল; তা বেশ হয়েছে, আবার কি! এত বেশ ঘটার গায়েহলুদের মতই বাজার হয়েছে।•••আবার তারা কি সব দেয় খে- মসচক্ষে এমনিই আরাে কতকগুলি ফুলশয্যার জিনিষ কল্পনা করিয়া রাণী কেন অন্তরে অন্তরে শিহরিয়া উঠিল। খানিকটা চুপ করিয়া থাকি শুধু কহিল, ও ঢাকাইখানার কত দাম নিয়েছে রে নিল?•••ষােল। বাবা! আমার এমনি একখানা ঢাকাই পরার সখ অনেক দিনের, কিন্তু আমাকে আর কে দেবে বল- সে উঠিয়া বাহিরে গেল। কিন্তু সুরেশ সেখানেই দাড়াইয়া রহিল। একদৃষ্টে প্রসাধন দ্রব্যগুলির দিকে চাহিয়া ভাবিতে লাগিল যে এই সব নৈবে সে যাহার জন্য পাঠাইতেছে সে কেমন কে জানে? সুরেশ নিজে মেয়ে দেখে নাই, শুনিছে সে সুন্দরী! ঠিক কি রকমটি সুন্দরী কল্পনা করিতে না পারিয়া আবছায়া এক তরুণীকে মনে মনে রূপ দিবার চষ্টা করে। আজও সেই চেষ্টা করিতে করিতেই ভাবিতে লাগিল যে, সেই সুন্দরী কিশােরীটিও কি আর নির্জনে বসিয়া তাহার কথাই চিন্তা করিতেছে। T . তাঁহার দিবা-শখে রূঢ়ভাবে আঘাত দিলেন পিসিমা, বুড়ো মঙ ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া কহিলেন, তাের মামার কি আকেল রে মুরু। চাকরটা যেমন খাবার নিয়ে বাড়ী ঢুকল, চ্যাঙ্গারীটা সুদ্ধ তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের আর তাের মাসীর ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিলে, আমার ঐ কুঁচো নাতী-নাতনীগুলো পাশে দাঁড়িয়ে রইল ঠা, তবু তাদের হাতে দিলে না। ওমা কি পিচে গাে•••বাইরে গিয়ে তা বাবা সুরেশ, তাের মামী বোধ হয় নিজে গােটা-ষােল রসগােল্লা একটা ডিসে নিয়ে যেতে বসেছে- সুরেশ ব্যস্ত হইয়া কহিল, যাকগে পিলিমা, অাজকের দিনে আরও সব কথা তুলে কাজ নেই-আমি আরও খাবার আনিয়ে দিছি কিন্তু সে বাহিরে যাইতেই মামা ডাকিয়া বলেন, বাবা সুরেশ, এমন করলে তুমি পারবে কি করে? ঠাকুর যত গাছ সঁতলে তুলছে সমস্তই তােমার পিসতুতো ভাইয়া চেয়ে নিয়ে নিজেদের ছেলেপিলেকে খাইয়ে দিচ্ছে। তারপর এই বাড়ীসুদ্ধ লােক ভাত খাবে কি আঙ্গুল ঠেলে ? সুরেশ মনে মনে ক্লান্তি অনুভব করিতে লাগিল, কিন্তু উপায় কি ? সে কোন মতে একটা জবাব দিয়া সেখান হইতে সরিয়া পড়িল। এমন ব্যাপার হইবে জানিলে সে হয়ত কাহাকেও সংবাদ পর্যন্ত দিত না। বড় মামাতাে ভাই আসিয়া বলেন, তাের ডাকবি না, আমার ওপর ফোন আর দিবি না, তা আমি কি করব বল? পাড়াসুদ্ধ লােক আমাকে বাজার করবার জন্যে ডেকে নিয়ে যায় অথচ তুই ভার দিলি অনিলের ওপর। কাপড়গুলো কিনতে যে টাকা ও খরচ করেছে, ওর অর্ধেক নামে আমি পেতুম -- শেষ কথাটা অনিলের কানে গেল। সে বলিয়া উঠিল, ঐ বেনারসী খানার দাম কত বলুন দেখি-খুব-ত কাপড় কেনেন। অনেকক্ষণ নাড়িয়া চাড়িয়া তিনি জবাব দিলেন, তােমার কাছ থেকে অন্ততঃ পঁচাত্তর টাকা নিয়েছে, না? অনিল কহিল, আপনি হলে কতয় আনতে পারতেন। তিনি জবাব দিলেন, আমি?-আমি হলে হয়ত পয়ষটি টাকাতে পেতুম। অনিল কহিল, আমি পঞ্চান্ন টাকায় কিনেছি। দাদার কাছে রসিদ আছে, দোকানের ঠিকানাটা জেনে নেবেন। সে আয় দাড়াইল । কিন্তু বড়দা রাগে আগুন হইয়া কহিলেন, দেখলি কথায় ছিরি? বেনারসী কাপড় সব সময় যােঝা যায় না- কিন্তু দেখি সব বাজারের হিসেব, আমি যদি সিকি দামে কিনতে না পারি ত আমার নামই নেই। সুরেশ তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা দিয়া কহিল, কেন ওর কথা শোনেন। ওকে কি জানেন না ? সে সরিয়া পড়িল আর একটা ঘরে। সেখানে নান্দীমুখের সমস্ত বাজার, পূজার উপকরণ সব এক জায়গায় রহিয়াছে, তাহারই মধ্যে এক বিধবা আত্মীয়া কি যেন করিতেছিলেন। সুরেশের পায়ের শব্দ পাই। মুখ তুলিয়া কহিলেন, দেখছিলুম সব এসেছে কি না— অনিল আমার খুব হুশিয়ার ছেলে, কিছু ভুল করেনি। সুরেশ পিছন ফিরিতেছিল, তিনি ডাকিয়া কহিলেন, আখ, বাবা সুরেশ, একটা কথা বলব রাখতে হবে।

তাহার পর তিনি কথা আর একটু মধুর করিবার চেষ্টা করিয়া কহিলেন,-আমার মেয়ে এই প্রথম তাের বাড়ী এসেছে, যাবার সময় অমনি একখানি ময়ুষ্টি রঙ্গের ফরাসডাঙ্গার শাড়ী কিনে দিতে হবে, ওর বড় সব সুরেশ জবাব দিল, নিশ্চয়ই দেব। দেব বৈকি, খাবার সময় সকলকেই দিতে হবে যে! সে পিসিমা বাড়ীর গৃহিনী-স্বরূপ হইয়া ছিলেন কিছুদিন যাবৎ, তিনি সুরেশকে ডাকিয়া ফিসফিস করিয়া কহিলেন, তত্বর জিনিষগুলো যে ঘরে আছে সে ঘরে একটা চাবি দিয়ে দে- সুরেশ আশ্চর্য্য হইয়া বলে, কেন? সবাই দেখছে--এখন চাবী নেওয়া কি ঠিক হবে ? মুখখানা বিকৃত করিয়া তিনি জবাব দেন, দেখছে বলেই ত বলছি। ওর কি কিছু থাকবে মনে করছিস? না ঐ অত খুচরো জিনিষের কোন হিসেব আছে ?•••••কার মনে কি আছে তার ঠিক কি ? ঠিক সেই মুহূর্তে বড় মাসী আসিয়া পড়িলেন। কহিলেন, কি সব তফের জিনিস পত্তর কেনা হয়েছে দেখলাম না । সেপিসি বলেন, দেখবে বৈকি ভাই, তােমরা দেখে শুনে অাদ করবে বলেই ত একটি জিনিষও আমি তুলতে দিইনি। সব সাজিয়ে মেখেছি-চল, চল, দেখবে চল। তিনি জাের করিয়া বড় মাসীর হাত ধরিয়া উঠাইয়া টানিয়া লইয়া গেলেন। আয়েশ কিছুক্ষণ তাঁহাদের অপসৃয়মান গতির দিকে চাহিয়া ভিত হইয়া দাইয়া রহিল। ব্যাপারটা যেন কিছুতেই তাহায় মাথায় ঢুকিতে চাহিল না। অনিল যখন একেবারে পাশে আসিয়া দাঁড়াইল তখন তাহার খেয়াল হইল। সে প্রশ্ন করিল, কী রে ? অনিল কহিল, টাকা আমার হাতে আর একটিও নেই। সকাল থেকে জলখাবার আনলুম বারাে টাকার ওপর-তারপর ছত্রিশবার শুধু বাজারে আমি চঞ্জুম কারুর বাড়ী, তোগায় যা খুশী হয় কয়ে। সুৱেশ ব্যস্ত হইয়া কহিল, টাকার দরকার থাকে নিয়ে যা, কিন্তু তুই গেলে কে দেখবে এসব। ওসব আমি একেবারেই সামলাতে পারব । এই নে, কুড়িটা টাকা রাখ। পাঠাতে হচ্ছে। সেখান হইতে সে একেবারে বাহির হইয়া আসিল। রাস্তায় তাহার নিজের বাড়ী হইতে খান-তিনেক বাড়ী পরে অপেক্ষাকৃত নির্জন একটা রফে গিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বহু অসিত অফিস যাইতেছিল, সে ঠাট্টা করিয়া কহিল, কিরে বুক দুর-দুর করছে, না? সবাইকারই এক অষস্থা, আমারও ঐ রকম গুরু হয়েছিল বিন সাতেক থেকে! আবার কাল দেখবি কি রকম মনে হয়- সে চলিয়া গেল, কিন্তু সুরেশ ভাবিতে লাগিল, সত্যইত, তাহার বনে এ কিসের কম্পন ! ভয় নহে, লজ্জা নয়, এই সমস্ত অনুভূতির অতীত কী এক আবেগ তাহার সমস্ত বুক দুরু দুরু পাইতেছে। সে কিছুতেই বি হইয়া থাকিতে পারিতেছে না- দুয় মাঠের ওপায়ের গেরুয়া রজের বাড়ীটার দিকে চাহিয়া সে। কল্পনা করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল, ঐ শাড়ীগুলির কোন্ খানিতে নব-বধুকে সবচেয়ে মানাইৰে। চাপাল রঙ্গের বেনামী কাপখানি এক গৌরী কিশােরী, সুঠাম সুন্দর তনুলতা বেষ্টন করিয়া উঠিয়াছে, তাহার আয়ত চক্ষু দুটি অপরিসীম লজ্জায় নত, মুখে আনন্দ, আশা ও লজ্জার হাসি। মানসচক্ষুতে এ দৃশ্য কল্পনা করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার সর্বদেহ রােমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। সেই যে সুন্দরী বধু যাহার জন্য এখানে এবং সেখানে নানা প্রকার অনুষ্ঠান ও অভ্যর্থনার আয়োজন চলিয়াছে, সেই তরুণীটি তাহারই-একান্তভাবে তাহা হইবে। তাহাকে ভালােবাসিবে, তাহার জন্য ভাবিবে, ছোটখাট সহ সেবাষকে তাহাকে সর্বদা বিরিয়া রাখিবে; স্নেহে, প্রেমে, আদরে, আবদারে তাহার জীবনকে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিবে। কিন্তু এসব কি সত্য? তাহার অদৃষ্টেও কি এই অসম্ভব সম্ভব হইবে? কে জানে••• বুকের মধ্য হইতে বিবর্ণ এক টুকরা কাগজ বাহির করিয়া সুয়েশ আর একবার ভাল করিয়া দেখিল । হাতের লেখা কেমন দেখিবার জন্য অনিল মেয়ে দেখিতে গিয়া একটা কাগজে দুই ছাত্র লিখাইয়া আনিয়াছিল-এ সেই কাগজখানা। শিখিবার সময় হাতের বাম লাগিয়া বােধ হয় কাগজটা খিজিয়া গিয়াছিল, তাহারই কিছু চিহ্ন তখনাে রহিয়াছে। সেই বেদ-চিহ্ন এবং ফশিত হস্তাক্ষরের মধ্য দিয়া সুরেশ যেন সেই ভীরু মনটির অনেকখানি দেখিতে পাইল। বহুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া কাগজটি সে আবার সযত্নে ভাজ করিয়া বুকের মধ্যে রাখিয়া দিল। ইচ্ছা আছে ফুলশয্যার রা এই কাগজটি অরুণাকে দেখাইবে। মনে মনে তাহার সল মিত মুখখানি কল্পনা করিয়া আপন মনেই সে হাসিয়া উঠিল।

সে পিসির ছেলে নরেনের ডাকাডাকিতে তাহায় স্বপ্ন জিয়া গেল। নরেন আসিয়া কহিল, বড়দা, মা আপনাকে ডাকছে, শিগগীর। সুরেশ আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, কেন, কি হয়েছে রে? নরেন মুখটা বিকৃত করিয়া জবাব দিল, আপনার ছােটমাসীমা রাগ করে চলে যাচ্ছেন সুরেশ তখনই ছুটিয়া ভিতরে গেল। সকলে একসঙ্গে কারণটা বােঝাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। সেই কলরব এবং মাসীমার অজস্র অশ্রুজলের মধ্যে যে সংবাদটি পাওয়া গেল, তাহা সংক্ষেপে এই বে- মাসীমা এখানে কন্যা-জামাতাকে নিমন্ত্রণ করিবার জন্য অনুরােধ করিয়াছিলেন। এই ভগ্নী কে, কবে তাহার বিবাহ হইয়াছে এবং কোথায় তাহার শ্বশুরবাড়ি, কোন সংবাদই তাহারা রাখিত না বলিয়া প্রথমে অনিল তাহাদের নিমন্ত্রণ করিতে সন্মত হয় নাই। তখন সুরেশই অনিলকে অনেক করিয়া রাজী করে এবং নিজে একখানা চিঠি লিখিয়া নরেনের হাত দিয়া নিমন্ত্রণ করিতে পাঠায়। সম্প্রতি সেই গ্রিটি শত্রয়া জানাইয়াছেন যে এই ধরণের নিমন্ত্রণে নাকি তাহার স্বামী অত্যন্ত অপমান বােধ করিয়াছেন, সুতরাং তাহার যাওয়া অসম্ভব। মাগী কাঁদিতে কাদিতে বলিলেন, জামাই যেখান থেকে অপমান হলেন সেখানে ত একটি দণ্ডও আমার থাকা উচিত নয় বাবা, এর পরে আমি জামাইয়ের কাছে মুখ দেখাব কি করে? না বাবা সুরেশ, আর আমাকে অনুরােধ করে না। অনিলের দিকে চাহিতে সে রাগ করিয়া জবাব দিল, এর চেয়ে ভাল করে নেমন্তন্ন করা আমাদের যারা সম্ভব নয়। তারা আমাদের নেম করেছিল কখনও। সুরেশ বিব্রত হইয়া কহিল, আচ্ছা আমিই যাচ্ছি, আপনি স্থির হােন মাসীমা, আমি যেমন করে হােক আপনার জামাইকে এনে দিচ্ছি- সে জামাটা কাধে ফেলিয়া তখনই বাহিরে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। সেপিসি রাগ করিয়া চুপিচুপি কহিলেন, এত আধিখ্যেতা কোথাও দেখিনি বাবা! তাকে পায়ে ধরে না নিয়ে এলে মহাভারত একেবারে অন্ধ হয়ে গেল! এইত আমার নাত-জামাই, একটি চিঠি লিখে দিয়েছিলুম-তয়া সব্বাই এসে হাজির হ’ল নিজেরাই-কই, একটা কথা বললে না? আয়েশ আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, তারা এসেছে নাকি সব? সগর্বে পিসিমা জবাব দিলেন, আসেনি আবার, সব্বাই এসে গেছে, ঐ ছানা বেরিয়ে সুরেশ আর দেখিল না, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বাড়ী হইতে বাহির হইয়া পড়িল। ট্রামে উঠিয়া ভগ্নিপতির বাড়ীর উদ্দেশে যাইতে খাইতে এক জায়গায় তাহার কানে গেল দূরাগত সানাইয়ের সুর। অকস্মাৎ সমস্ত পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত হইয়া তাহার মন আবার এক স্বর্গরাজ্যে চলিয়া গেল। সেখানে শুধু চোখে পড়ে খ্রীড়াৰনতা, সলজ্জা এক কিশােরী সখীদের পরিহাসে বিব্রত হইয়া মুখ নীচু করিয়া হাসিতেছে-আনন্দ ও লজ্জার অপূর্ব এক রঙ, তার গণ্ডে। সুশে স্থির করিল প্রয়ােজন হইলে সে ভগ্নিপতির পীয়ে পৰ্য্যন্ত গরিবে, তবু কাহারও মুখ সেদিন বিষন্ন হইতে দিবে না।

সমারােহ শ্যামলী অতি কষ্টে বাসর ঘর হইতে মুক্তি পাইয়া বাহিরে আসিয়া দাড়াল। নীচে তখন কোলাহল কমিয়া আসিয়াছে বটে, কিন্তু একেবারে বন্ধ হয় নাই। অত রাত্রেও বাহিরের মঞ্চ হইতে সানাইয়ের সুর ভাসিয়া আসিতেছে, বােধ হয় বখশীষের লােত একটু বেশীই দেখানো ইয়াছিল। ঠাকুরদের কাজও শেষ হয় নাই, তখনও পরিবেশক এবং আত্মীয়দের খাওয়া বাকী। কিন্তু এইসব সমারােহের যে কোন অর্থই আর শ্যামলীর কাছে ছিল । সে বরং তখন একটু নির্জনে বিশ্রাম করিতে পারিলে বাচে। একটা গতীর ক্লান্তি, অতিরিক্ত উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে যে ক্লান্তি গর্ব অনুভব করে, যেন তাহাকে গবসন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। বয়ায় অপেক্ষাকৃত অন্ধকার কোণে একটা থামে মাথা দিয়া চোখ বুজিয়া বাড়াইল। এই নির্জনতা, এতটুকু একটু ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য তাহার সমস্ত অন্তর এতক্ষণ লালায়িত হইয়াছিল। অথচ তাহার ক্লান্তি অনুভব করিবার কথা নয়। সতেরো আঠারো বছর বয়স তাহার, বাপের একমাত্র আদরিণী কালে। আৰু অনেক বুজিয়া রূপবান, সুশিক্ষিত, সন্ত্রান্ত পাত্র বাছিয়া আনিয়াছেন, এমন সুপাত্র অনেক ভাগ্যে পাওয়া যায়, একথা সকলেই জানাইয়া গিয়াছে শ্যামলীকে। খবচেব কোন ত্রুটি হস্তু নাই। সমারােহ আঙুরের কোন অভাব না থাকে সেদিকে আশুবাবুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল, এমন কি এই ব্যাপারে তাহার স্ত্রীর সহিত বচসাও হইয়া গিয়াছে। তা ছাড়া, কন্যার তরফ হইতে নব পরিণয়ে যে সকল কারণে উৎসাহহীনতা থাকে, সে সব কারণও শ্যামলীর ছিল না। আশুবাবু কন্যাকে স্কুলে পৰ্য্যও যাইতে দেন নাই, চিরকাল সযত্নে এবং সাবধানে মানুষ করিয়া- হেন—আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি যাতায়াতও বিশেষ ছিল না তাহাদের, সুতাং পূর্বরাগ-অনুরাগের কোন সুযােগই তাহার মেলে নাই। খােলা মনে, আকুল কামনায় স্বামীকে বরণ করিবারই কথা তাহার। তবে ? এ তবে জবাব শ্যামলী নিজেই পায় নাই। এ যেন কোথা দিয়া কি হইয়া গেল। এতগুলি বিপরীত ও বিভিন্ন অনুভূতি তাহাকে অকস্মাৎ আঘাত করিয়াছে যে, তাহার চিত্ত এখনও পর্যন্ত কোথাও কোন স্থিতিই খুঁজিয়া পাইতেছে না। অথবা ব্যাপারটি কিছুই নয়। পুকুরের ওপারে ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের কয়েকটি ছাত্র মেস করিয়া থাকে, সকলকারই অল্প বয়স, বাল্যের চপলতা এখনও তাহারা ভোলে নাই। কারণে অকারণে হল্লা করে, স্নান কৰিছে নামিয়া পুকুরে মাতামাতি করে, সৰ্ব্বদা পরস্পরের সহিত খুনসুটি মে এবং যে কোন সামান্য চুতায় হাসিয়া আকুল হয়। ইহাদের সহিত কোন প্রত্যক্ষ পরিচয় শ্যামলী থাকা সম্ভব নয়, ছিলও না। সে শুধু নিজের শয়নঘয়ের জানালা হইতে পর্দার আড়ালে থাকিয়া তাহাদের ছেলেমানুষী দেখিয়া আনন্দ পাইত। তাহাদের মধ্যে সবচেয়ে চঞ্চল যে ছেলেটি, নিল, সে ললিতকে সাঁতার শিখাইয়া দিয়াছিল, সেই সুত্রে তাহার নামটা শামলীর জানা ছিল, বাকী কাহারও নাম পর্যন্ত সে জানিত না। নির্মল ছেলেটি নাকি লেখাপড়াতেও ভাল ; বছর একুশ বয়স, শ্যামবর্ণের বলিষ্ঠ গঠনের দেহ তায়-এইটুকুর বেশী তাহায় সম্বন্ধেও শ্যামলীর কিছু জানা ছিল না। সহসা ঘনিষ্ঠতা হইল এই বিবাহ উপলক্ষ্যেই। আশুবাবু বিবাহে নিমন্ত্রিতদের যে ফর্দ তৈয়ারী করিতেছিলেন, একদিন সেদিকে নয় গঙ্গায় শ্যামলীই বলিয়াছিল, বাবা, পাড়ার সব বাড়িই যখন ফর্দে ধরলে ন ওবাহান্ন নম্বরটা বাদ দিলে কেন? বাহান্ন নম্বর। মানে ঐ মেটা? ওদের সঙ্গে ত আমাদের তেমন দােগাযােগ নেই, সেই জন্যেই—বছর বছর নতুন ছেলেরা আসে, সবাই অপরিচিত। সামাজিক ব্যাপারে ওদের ডাকা কি ঠিক হবে না? শ্যামলী মাথা নীচু করিয়া জবাব দিয়াছিল, দোষই-বা কি ? বেচারীর বাড়ি-ঘর ছেড়ে এসে এখানে পড়ে আছে, কতকাল ভাল করে খেতে পায়নি। রাস্তা করে ত ঐ উড়ে ঠাকুর, ওর আর দৌড় কত? শ্যামলীর মা-ও সায় দিয়া বলিয়াছিলেন, তা বটে বাপু, মায়ের বাহারা কি কষ্ট করেই পড়ে আছে এখানে। না পায় ভাল খেতে, মা আছে একটা যত্ন করার লােক। তােমার ত সাত শ লােক খাৰে, তার মধ্যে আয়ও কুড়ি-পচিশ জনের এমন কি বেশী খরচ পড়বে- নিমেৰে উদীপ্ত হইয়া উঠিয়া আশুবাবু বলিয়াছিলেন, ঠিক ঠিক, - ও কথাটা আমার মনেই ছিল না। আমি নিজে গিয়ে বলে আসৰ ওদের। ফর্দে ওদের নামগুলাে না ধরা আমার অন্যায় হয়ে গিয়েছে। ঐ জন্যেই ত আমার মা-মণিকে প্রত্যেক কথা জিগ্যেস করে নিই- ঐ পর্যন্ত। তাহার পর আর সে কথা শ্যামলীর মনেও ছিল না। একেবারে বিবাহের দিন সে তাহাদের সম্বন্ধে সচেতন হইয়া উঠিল । তাহার কারণ এ পাড়ায় দু’একজন তরুণ ছাত্র ছাড়া বাকী সকলেই মেসের ছেলেদের এড়াইয়া চলিত। আজ সহসা আগুবাবু, তাহার কন্যার বিবাহে নিমন্ত্রণ করাতে তাহাদের উৎসাহের সীমা রহিল । তখনই তাহারা স্থির করিয়া ফেলিল যে, ভলােক যখন এতখানি সৌজন্য প্রকাশ করিয়া তাহাদের নিমন্ত্রণ করিয়াছেন, তখন তিনি যাহাতে ফোন রকমে না অপদস্থ হন তাহা দেখা তাহাদেরই কর্তব্য। আর সেই সিদ্ধান্তের ফলেই তাহারা সেদিন উপাচক হইয়া অপরাত্নেই আসিয়া হাজির হইল এবং নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া কাজে লাগিয়া নেন। আর বাস্তবিক ছেলেলি খাটিতে পারে! আগুবাবুর লােকাভাব যথেষ্টই ছিল, সে জন্য তাহার উদ্বেগেরও সীমা ছিলু না; কিন্তু এখন এই ছেলেগুলিকে পাইয়া। তিনি যেন বাঁচিয়া গেলেন। বাড়ির ছেলেপুলেদের মতই নিজের বুঝিয়া সাথিয়া কাজ করিতে লাগিল তাহারা, আর সংখ্যাতেও ত কম নয়, পঁচিশ-ছাব্বিশ জন; সুতরাং আগুবাবু নিশ্চিত ইয়া শুধু অভ্যাগতদের আদর-আপ্যায়ন করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। মণী অবশ্য অপরাহের বহু পূর্বেই আটকা পড়িয়াছিল একটা ছেলেটি, ঘয়ে, তবু ইহাদের সব খবরই তাহার কাছে আসিয়া পৌছিয়াছিল। ইহাদের এই পরিশ্রম এবং আন্তরিকতাকে সে তাহারই উদ্দেশ্যে নিবেদিত শ্রদ্ধা-স্বরূপে মনে মনে গ্রহণ করিয়া একটু খুশীও হইয়াছিল বই কি। বিশেষ করিয়া ঐ নির্মল সে যেন একটা মানুষ দশটা হইয়া ছুটাছুটি করিতেছে। যে-ঘরে শ্যামলী বসিয়াছিল, তাহারই সামনের বারান্দা দিয়া একতলা হইতে তিনতলায় যাইবার পথ ; সেইখান দিয়া অনবরতই যাতায়াত করিতেছিল নিৰ্ম্মল। তাহার ঘর্মাক্ত মুখ এবং দ্রুত নিঃশ্বাসের বক আন্দোলন দেখিয়া শ্যামলীর মন মমতা ও কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া গিয়াছিল। বহু লােক চারিদিকে - শ্যামলী তাহারই মধ্যে, অসংখ্য পদধ্বনির মধ্য হইতে সেই বিশেষ পদধ্বনিটি বাছিয়া লইয়া বার বার গােপনে নির্মলকে দেখিতেছিল। শ্যামলীর দিকে ফিরিয়া চাহিবার অবসর নির্মলের ছিল না, তা না থাক—কিন্তু তাহার এই কর্ম- ব্যস্ততা-সে ত শ্যামলীকেই উপলক্ষ্য করিয়া! সে জন্য সে মনে মনে যেমন গর্বও অনুভব করিতেছিল, তেমনি তাহার অনুতাপেরও সীমা ছিল না ; আহা, বেচারীদের খাওয়াইবার জন্য ডাকিয়া কত কষ্টই দেওয়া হইল। তাহার পর সহসা এই নির্মল ছেলেটি কেমন করিয়া যেন একেবারে তাহার ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিল। সে-ও একটা অতিরিক্ত কৰ্ম্ম-ব্যস্ততার মধ্যে, চারিদিকে হৈ-চৈ যখন সকলের চেয়ে প্রবল হইয়া উঠিয়াছে ; শ্যামলীর জীবনের সেই চরম মুহূর্তে লজ্জার ভয়ে সে তখন অভিভূত, কোন অনুভূতিই তীব্রভাবে বােধ করিবার সময় সেটা তাহার নয় - তবু, তবু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সে সময় তাহার বুক ঐ ছেলেটিকে উপলক্ষ্য করিয়াই জুলিয়া উঠিয়াছিল।

কারণ। কারণটা যেন মনের মধ্যে গােলমাল হইয়া গিয়াছে। শ্যামলী অতি কষ্টে মনে করিবার চেষ্টা করিল। হ্যা, সেটা সম্প্রদানের সময়েই বটে। তখন বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইয়াছে। বর আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ছাদনাতলায়। এইবার কনেকে প্রয়ােজন। কিন্তু পিড়ি কনেকে তুলিয়া আনিবে কে? তেমন কোন আত্মীয় ছিল না শ্যামলীর। একটি মাত্র मूब সম্পর্কের ভগ্নিপতি ছিলেন, আর যে সব মামাতো পিসতুতো ভাই ছিল, সকলেই ছােট ঘােট। আবার একবার ব্যাকুলভাবে চারিদিকে চাহিয়া কহিলেন, তাই ত, কে আনে এখানে !•••আবার সাত পাক গেরানাে। নির্মল কী একটা কাজে উপরে যাইতেছিল, কহিল, আমি ধরলে কোন আপত্তি হবে না ত? শুনেছি বিবাহিত আত্মীয়দেরই ধরতে হয়। ভগ্নিপতি সুরেশবাবু জবাব দিলেন, হঁা, তুমিও যেমন! অত বাছতে গেলে আর কাজ চলে না। বিশেষ এখন আর অন্য লােক কই?••••• অগত্যা নিৰ্ম্মলই সুরেশবাবুর সঙ্গে গেল। সুরেশবাবু কহিলেন, পাৰৰ ত দুজনে? না, আর কাউকে ডাকব? নির্মল নিজের ব্যায়ামপুর বলিষ্ঠ বাহুর দিকে একবার চাহিয়া লইয়া জবাব দিল, কিছু দরকার নেই। নির্মল ধরিল সামনের দিকে, সুরেশবাবু পিছনে। সহসা সেই বিশেষ মুহূর্তে কী রকম একটা গােলমাল হইয়া গেল। শ্যামলীর বুক আজ এই প্রথম পিয়া উঠিল। সে চোখ তুলিয়া চাহিতে পারিল না সত্য কথা, তবু নিৰ্ম্মলকে চিনিতে তাহার বিলম্ব হইল না। চারিদিকের কোলাহল, আলােকসজ্জা, অসংখ্য উৎসুক চোখের দৃষ্টিকোনদিকেই খামলীর আর লক্ষ্য রহিল না। সুধু বলি, স্বেদসিক্ত, শ্যামল একটি হাতের দিক হইতে সে যেন আর চোখ ফিরাইতে পারিল না। ভারী জিনিস ধরিয়া থাকার অন্য শিরাগুলি ফুলিয়া উঠিয়াছিল, তাহার উপরেই জমিয়াছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম, সেই দিকে চাহিয়া চাহিয়া অকস্মাৎ একবার সেই হাতখানি স্পর্শ করিবার ইচ্ছা শ্যামলীর মনে উগ্র হইয়া উঠিল। একবার সে ঐ কজির উপরটা চাপিয়া ধরিবে, একবার শুধু, আর কিছু নয়। কিন্তু—চারিদিকে অসংখ্য লােক, আর তা ছাড়া নিৰ্ম্মলই বা কি মনে করিবে? না, সে সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভবই হইয়া পড়িল-একটু পরেই। সুরেশবাবুর ডান হাতটা একটু ঝাপিয়া এক দিকের পিড়িটা হেলিয়া পড়িল। তাহার অনভ্যাসের ওই হউক, আর শ্যামলীর নাড়িয়া বসিবার চেষ্টাতেই হউক-ফলে শামলী পতনের সম্ভাবনাতে দিশাহারা হইয়া নিৰ্ম্মলেরই একটা হাত চাপিয়া ধরিল। সে এক মুহুর্ত, কি আরও কম। পরক্ষণেই শ্যামলী দারুণ লজ্জায় হাতটা ছাড়িয়া দিয়া মাথা অারও হেঁট করিয়া বসিল। সুরেশবাবুও ইতিমধ্যে সামলাইয়া লইয়াছিলেন প্রয়োজনও আর ছিল । এ একটা অতর্কিত, আকস্মিক ঘটনা, দুই-একটি মহিলা, যাহার মছেই ছিলেন, তাহার ছাড়া আর কেই লক্ষ্য করিল না; কিন্তু একটি মুহূর্তের সেই ঘটনা—পিচ্ছিল, তপ্ত, কঠিন একখানি হাতের স্পর্শ সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা আবেশে শ্যামলীর সময় অনুভূতিকে যেন বিবশ, বিল, করিয়া দিল।

সে বিবলতা ভাল করিয়া কাটিবার পুর্বেই শুভদৃষ্টির সময় আসিয়া পড়িল। সকলে চারিদিক হইতে উপদেশ বর্ষণ করিতে লাগিলেন, নাপিত ছড়া কাটাইতে লাগিল, তাহারই মধ্যে কানে কানে সখিস্থানীয় কে বলিল, ভাল করে চেয়ে দেখ, লো-দেখবার মত বর। চোখ লজ্জায় বুলিয়া আসে, তবু চাহিতে হইল। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, লম্বা-চওড়া চেহারার একটি ভদ্রলােক, দেখিলেই সন্ত্রম আসে মনে। সাধারণ হিসাবে সুপুরুষই বলিতে হইবে। কিন্তু তবু, স্বামীকে দেখিবার পরও, শ্যামলী মনে কোন উৎসাহ বোধ করি না, বরং যেন একটা সুগভীর ক্লান্তিই অনুভব করিতেছিল সে-নির্জনে কোথাও বিশ্রাম করিতে পারিলে বাচে। যদিও সে বিশ্রাম সে পাইল না, বিবাহের নানা অনুষ্ঠানের ঘূর্ণাবর্তে একটা কোলাহলের মধ্যে গিয়া পড়িল। এমন কি, বাসরঘরে গিয়াও নিস্তার নাই, চারিদিক হইতে আত্মীয়ার দল ঘিরিয়া রহিল। পরিহাসে ও উচ্ছলতায় সকলে মশগুল—সে সব রসিকতার কোন মূল্য, এই আনন্দ উৎসবের যে নায়িকা, তাহার কাছে আছে কিনা, দেখিবারও কাহারও অবসর নাই। শ্যামলী সে ঘূর্ণাৰৰ্ত্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছিল। নির্জনে বাইবার চেষ্টা সে প্রথমে করিয়াছিল খানিকটা, পরে একেবারেই দিয়াছিল হল ছাড়িয়া। তারপরে যখন সে ছুটি পাইল, তখন রাত্রি প্রায় দুইটা বাজে, উৎসবের কোলাহল অনেকটাই তখন কমিয়া আসিয়াছে। শ্যামলী বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইয়া নীচের দিকে যতটা দৃষ্টি যায় দেখিয়া লইল, তখনও ভােজনের পাট শেষ হয় নাই একেবারে, তবে অনেকটা কম পড়িয়াছে বটে। ও-ধারে যাহারা আহারে বসিয়াছে, তাহাদের মধ্যে ৭ পরিবেশকের ও কর্মকর্তাদের দলই বেশী। সে-দলে মেসেয় ছেলেরাও অনেকে রহিয়াছে, কিন্তু শ্যামলীর উৎসুক দৃষ্টি যাহাকে জিয়া বেড়াইতেছিল, তাহাকে কোথাও দেখা গেল না। কে একজন বাসর ঘর হইতে তাহাকে ডাকিতে আসিয়াছিল, শ্যামলী ক্লাস্তরে তাহাকে বলিল, আমাকে একটু ঠাণ্ডায় বঁড়াতে দাও কাকীমা, নইলে আর বাঁচব না। তিনি সহানুভূতির স্বরে, ‘আহা বাছারে, সত্যি বাপু, যা গরম, আর ঐ জড়ের মধ্যে বেনারসি কাপড় পরে বসা যায়? আচ্ছা, তুই একটু ঠাণ্ডা হয়ে নে মা বলিয়া চলিয়া গেলেন। একটু পরেই পিতা আসিয়া পড়িলেন। তাহাকে সেই প্রায়ান্ধকার কোণে একা দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, কে, মা-মণি, কী হয়েছে মা? ঈষৎ লজ্জিত কঠে শ্যামলী উত্তর দিল, কিছু না বাবা। বড় মাথাটা ছে- আরও ব্যস্তকঠে আশুবাবু কহিলেন, তাইত, তা এ্যাসপিরিন একটা , একটু ঠাণ্ডায় পড়ালেই মাথা ছেড়ে যাবে। তারপর মুহুর্ত খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, তােমায় খাওয়া হমেয়ে বাবা । আবাৰু হাসিয়া কহিলেন, দূর পাগলী, আমি কি এখন খেতে পারি, একটু মিষ্টি, আর একগ্লাস মােল খেয়েছি। একে এই গরম, তায় খাটা খাটুনি, তার ভিনেয় গ, খাওয়ার কথা মনে করাও যায় না। তৰ ভাগ্যিস ঐ ছেলেগুলাে ছিল-ওরা আর জন্মে তােরই ভাই ছিল না, নইলে এমন করে কেউ খাটতে পারে না। মরিয়া হইয়া শ্যামলী প্রশ্ন করিল, ওদের ভাল করে খাইয়েছ বাবা? আশুবাবু জবাব দিলেন, ওদেরও সব ঐ দশা। তবু জোর করে স্নান করিয়ে এখন বসিয়েছি। দুজন কিন্তু কিছুতে রাজি হল না, তাদের খাটুনিও গেছে বেজায় কি না—নিৰ্ম্মল ছেলেটি ত এক মিনিট বসেনি। নির্মল আর বিন, ওদের একটু কিছুও মুখে দেওয়ানাে গেল না- আরও কত কি আগুবাবু বকিয়া গেলেন, কিন্তু সেসব কথা শ্যামলীর কানেই গেল না। তাহার হৃদপিণ্ডটা ধ্বক্ করিয়া লাফাইয়া উঠিয়া যেন স্থির হইয়া যাইবার মত হইল। সে দুই হাতে বুকটা চাপিয়া ধরিয়া থামে মাথা রাখিয়া নিজেকে সামলাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। নির্মল কিছুই মুখে দেয় নাই, কাহারও কোন অনুরোধেও না। সে কি শুধু পরিশ্রম এবং গরমের কই। পৰিশ্ৰম ত অন্য ছেলেরাও কম করে নাই, তবে? তাহারা ত স্নান সামিয়া আসিয়া তবু বসিল - নির্মল একটা মিষ্টান্ন পৰ্য্যন্ত মুখে না দিয়া চলিয়া গেল কেন? শ্যামলীর কান-মাথা দিয়া যেন আগুন বাহির হইতে লাগিল। তাহার অঞ্চলের গােপন অন্তঃপুরে কে প্রশ্নটা মাথা তুলিতে চায় তাহার আভাসেও খামলীর ভয় করে। এ-আশা শুধু তাহার দুরাশা নয়, পাপ। হয়ত একেবারে অসম্ভব, সমতটাই তার কল্পনা—তবু ঐ কথাটাই মনে আনন্দ-বেদনার অীতে বার বার আঘাত করিতেছে—ইহার সহিত কি মণীর কোন যােগাযােগ নাই। যে এক-মুহূর্তের অতর্কিত স্পর্শে তি খামলীর দেহমনকে এখনও মধ্যে মধ্যে অবশ করিয়া দিতেছে, তাহা কি কোন গােপন অনুভূতিই বহন করিয়া লইয়া যাইতে পারে নাই নির্মলের মনে? শ্যামলীর বিবাহ কি কোন ব্যথা আগাইবে না সেখানে। ঈর্যাতুর কোন অব্যক্ত বেদনা?... এসব কথা শামলী স্পষ্ট করিয়া ভাবিতে পারে না, শুধু যেন বুকটা পিষিয়া ৰায় গুরুতার কোন সংশয়ের চাপে। মনে হয়, অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াই যাইৰে বুঝি সে। অকাং তাহার চমক ভাজিল অতিবাবুর করে, শরীয় কি খুব খারাপ বােধ হচ্ছে না? না হয় আমার মরে গিয়ে একটু শুয়ে পড়লি না কেন? ছি-ছি, এসব কি ছাইত ভাবিতেছে সে। জীবনে যাহার সহিত কোন যােগ নাই, কোন দিন থাকিবেও না, যাহার পরিচয় পৰ্যন্ত ভাল করিয়া জানা নাই, তাহাকে কেন্দ্র করিয়া এ-কোন অসম্ভব কল্পনা তাহার। না, সে বাসরঘরেই ফিরিয়া যাইবে। সে দৃঢ়কণ্ঠে কহিল, না বাবা, আমি বেশ আছি। আপনি যান। নিশ্চিন্ত হয়ে শুতে ত পারবাে না, এখনই ওরা এসে টানাটানি করবে- তার চেয়ে বরং এখানেই একটু থাকি- পরদিন সকালের অনুষ্ঠান শেষ হইয়া একটু অবসর পাইতেই শ্যামলী নীচে নামিয়া আসিল। আগুৰাৰু বহুক্ষণ মােন্নাঘুরির পর তখন সবে একটু বসিয়া সরবতের মাসে চুমুক দিয়াছেন, তিনি সয়েহে টানিয়া তাহাকে কাছে বসাইলেন। কহিলেন, বেহাইকে বলে ঠিক করেছি, সেই বারবেলা কাটিয়ে চারটের সময় যাবি একেবায়ে। ললিতকেও সঙ্গে দেৰ এখন, কাল বৌ-ভাত খেয়ে পরত নাগাদ ও ফিরে আসবে।

তাছাড়া, আমি রােজ বিকেলে একবার করে তাের খবর নেব।•••মােট
আটদিন ত, কেটে যাবে।
শ্যামলীর চোখে জল আসিয়া পড়িয়াছিল, সে জবাব দিল না। তখন
আশুবাবু অন্য প্রসঙ্গ পাড়িলেন, জিনিসপত্র অনেক বেঁচেছে-হিসেব
ঠিক করতে পারি নি। অনেক জিনিস নষ্ট
হবে-
তাহার পর সরতের গ্লাসটা নিঃশেষ করিয়া কহিলেন, অৰিখি
কিছু কিছু এবেলা কাজে লাগবে। কাল যারা খাটাখাটুনি করেছিল,
তাদের ত খাওয়াই হয়নি বলতে গেলে, এ বেলা তাদের ভাল করে
খাইয়ে দেৰ ঠিক করেছি।•••মেসের ছেলেদেরও বলে এসেছি।
তাছাড়া, ওদের জলখাবারের জন্য কিছু কিছু মিষ্টি পাঠিয়ে দিলুম।
আহা, কাল ওরা যা করেছে, তা তােলবার নয়—আপনার লােকেও
গমন করে না।
শ্যামলীর মা আসিয়া দাড়াইলেন—হ্যাগা, তুমি আর মাছ কিনতে
বলেছ কেন? মাছ ত চের রয়েছে।
আশুবাবু অপ্রতিভ হইয়া কহিলেন, হ্যা, তা বটে।
ছেলেদের বললুম কি না আবার। সব বাসি জিনিস খাবে—তাই
ভাবলুম••••আচ্ছা, না হয় বরং কিছু মাংস আনাও, তাহলে তবু
মানিয়ে যাবে। কি বলিস, মা?
গামলী সলজ্জাবে একটু হাসিল। কথা ছিল না বটে, কিন্তু
কে জানে কেন, পিতার প্রতি একটা অকারণ কৃতজ্ঞতায় তাহার মন
রিয়া গেল।
যেন তাহাই কোন না-বলা অনুরােধ তিনি রক্ষা
করিয়াছেন।
২৩

সে খুরিতে ঘুরিতে উপরের সেই জমিলাতে আসিয়া দাঁড়াইল। তখনও মেসের ছেলেরা সকলে ওঠে নাই। পূর্বদিনের পরিশ্রম ও রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত হইয়া ঘুমাইতেছে। একজন কি দুজন উঠিয়া ‘াতন করিতেছে মাত্র, কিন্তু তাহাদের মধ্যে নির্মল নাই, বােধ করি সে এখনও ওঠে নাই। জানলাটায় অভ্যাসমত সে বসিয়া পড়িল। গত বনীয় সেই একটা গােপন সংশয় এখনও মনকে পীড়িত করিয়া রাখিয়াছে। কথাটাকে সে জোর করিয়া মন হইতে তাড়াইয়া অন্য কথায় নিজেকে ভুবাইয়া রাখিতে চাহিতেছে, কিন্তু মন আবার ঘুরিয়া ফিরিয়া সেই কথাতেই ফিরিয়া আসিতে চায়। এক প্রকারের ক্ষত থাকে, তাহাতে হাত দিলে লাগে, তবু হাত নিজের অজ্ঞাতসারে সেখানেই বার বার পৌছায়। শ্যামলীরও সেই অবস্থা। নির্মলের গত রাত্রিতে একেবারে অভুক্ত অবস্থায় চলিয়া যাওয়ার সহিত তাহার বিবাহের একটা যােগ- বােগ ছিল, এই আশার পিছনে যেমন একটা ব্যথা আছে, রঙ্গীন ও একটা আছে। তাহার সেই অসতর্ক আকুল অবস্থায় অবলম্বন হিসাবে নির্মলকেই স্পর্শ করা হইতে শুরু করিয়া মন জাল বুনিতে বুনিতে বহুদূরেই যাইতে চায়। কে জানে তাহার আগেরও কৈান ইতিহাস আছে কি না; নির্মলের এই প্রাণঢালা পরিশ্রম শুধুই প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভুতি কি না, তাই বা কে জানে? যদি তা না হয়। কামলীর বুক কাঁপিয়া ওঠে। আহা, কত খেই তাহা হইলে সে কাল নিঃশব্দে চলিয়া গিয়াছে। শ্যামলীয় বিবাহ হাতে নিৰ্বিয়ে সম্পন্ন হয়, তাহার নিজের সমস্ত মুখ মনে দ চাপিয়া তাহা হইলে কত বড় আত্মনিপীড়নই না সে করিয়াছে। হাতে শ্যামলীর কল্যাণ হয়, সেই দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সে নিঃশবে কাজ করিয়া গিয়াছে, সেই কল্যাণে নিজের জীবনটা যে শুকাইয়া মরুভূমি হইয়া যাইবে, সে কথা সে একবারও ভাবে নাই। আকুল কান্নায় শ্যামলীর যেন করুদ্ধ হইয়া আসিল। সে জোয় করিয়া চোখ মুছিয়া রাস্তার দিকে চাহিল, পুকুরের দিকে। আচ্ছা, শ্যামলীর সহিত ত তাহার চাক্ষুষ পরিচয় হয় নাই কখনও, তবে? সে যে এই বাতায়নপথে বসিয়া প্রত্যহ তাহাকে লক্ষ্য করে, একথাটি কি নিৰ্ম্মল জানিত? আর তাহা আনিয়াই কি নিঃশব্দে, সবার অগােচরে সেই দুটি চোখের মিনতি সে গ্রহণ করিয়াছে। তাহারই ফল কি এই মৰ্ম্মদ কাপতি । শ্যামলী আর বলিয়া থাকিতে পারে না। এ-চিন্তা তার পরে অন্যায়, এটুকু জ্ঞান হইবার মত বয়স তাহার হইয়াছে। সে নির্জনে বসিয়া থাকিতে আর সাহস করিল না, থাকিলেই এই সৰ ছাইভ চিন্তা শুরু হইবে। সে নীচের কর্মব্যস্ততা, কোলাহল ও সমারােহের মধ্যে ফিরিয়া আসিল। সুন্দর স্বামী হইয়াছে তাহার, জীবনের উৎসবমঞ্চের যার তাহার সম্মুখে উন্মুক্ত, আনন্দের পথ সবে প্রসারিত হইয়াছে। তাহার সৌভাগ্যে চতুর্দিকের সমস্ত আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে আনন্দ ও ঈর্ষায় ঢেউ উঠিয়াছে-এই সমস্ত নাটকের ত সেই নায়িকা। সে উৎসবের অংশ গ্রহণের এই উচিত। ২৫ সহস্ৰ কৰ্ম্ম, বিদায়ের অসংখ্য আয়ােজন ও দেহের উচ্ছ্বাসের মধ্যে শ্যামলীর একটি কান ও একটি চক্ষু উন্মুখ হইয়াছিল পুকুরের দিকে। আন সারিয়া দল পাকাইয়া ছেলেগুলি যে আসিয়া পড়িয়াছে সে সংবাদটা তাহার অগােচরে ছিল না। সে একটু পরে কী একটা ছুতায় আরক্ত মুখে নীচে নামিতেছে এমন সময় আবাবুর সহিত সাক্ষাৎ। তাহাকে দেখিয়াই তিনি যেন ফাটিয়া পড়িলেন, পান্নাকে বললুম বার বার যে এ শৰ আনাড়ি ঠাকু দিও না আমাকে, অপদস্থ হতে হবে, তা কিছুতেই শুনলে না, এখন তাই হলো ত! শ্যামলী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কহিল, কী হলাে বাবা? হৰে আবার কি। ছেলেরা সব এসে পড়ল, আর আমার অপরাধই বা কি, এধারেও ত দেড়টা বাজে, তার ওপর বলতে গেলে ওদের কাল থেকে পাওয়াই নেই- শ্যামলী প্রশ্ন করিল, রান্না কি এখনও হয়নি সব? সব। মাংস এখনাে উনুনে। যার নাম এখনও একা। ছি ছি, চায়-চারটে ঠাকুর এখনও ক’টা লােকের রান্না করতে পারলে না। তাহার পরই দূরবর্তী গৃহিণীকে লক্ষ্য করিয়া তিনি হাঁক ছাড়িলেন, ওগো, এনই। তিনি কাছে আসিয়া প্রশ্ন করিলেন, কী হয়েছে। আবার জবাব দিলেন, হবে আর কি। এখনও রান্না হলো না। এদিকে ছেলেরা ও সব এসে পড়ল। অবিশ্যি ও বসবে খানিকটা কি ওদের মধ্যে দুটি ছেলের নাকি অপেক্ষা করার সময় নেই, ওদের এই আড়াইটার মধ্যেই কলকাতা পৌছতে হবে। যা হয়েছে তাই দিয়ে তুমি .

একটু ওদের খাইয়ে দাও। পিসিমাকেও বলেছি এই তেরের দালানে দুখানা জায়গা করে দিতে। তুমি দাড়িয়ে থেকে খাইও বাপু, ওরা কাল জলটুকু পৰ্য্যন্ত মুখে দেয়নি নিজের অজ্ঞাতেই শ্যামলীর মুখ দিয়া বাহির হইল, কে বাবা? ঐ নিল আর বিজন। নির্মূলের মুখখানা শুকিয়ে গেছে একেবারে, খাওয়া নেই একে, তায় ঐ অসঙৰ খাটুনি শামলী আবার ধীরে ধীরে উপরে উঠিয়া আসিল। নির্মল তিনটার আগেই চলিয়া যাইতে চায়, একেবারে কলিকাতাতে। তাহার মুখখানি শুকাইয়া গিয়াছে। সেকি শুধু উপবাসে আর পরিশ্রমে! সে যে কিছুতেই শ্যামলীর বিয়ের সময়টা এখানে, এমন কি, এদেশেই উপস্থিত থাকিতে চায় না, একথাটা শ্যামলীর কাছে পরিফার হইয়া গেল। তাহা হইলে শ্যামলীর অনুমান মিথ্যা নয় কিছুতেই, যেটুকু সংশয় ছিল, এই অঞ্চমুখ এবং পলায়নই তা নিঃশেষে দূর করিয়া দিল। একটা অসহ সুখের আবেগে শ্যামলীর সমস্ত রক্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। তাহার পূজা যথাস্থানে পেীহিয়াছে, এমন কি, সেখানে হইতে ফিরিয়াছে কিছু তাহার কাছে, ইহার অতিরিক্ত শ্যামলী কিছু চাহে না। এইটুকু আননই হয়ত বুকে মর্মস্থান অনেকখানি ছিড়িয়া, পিষিয়া চলিয়া যাইবে-তৰু তাহাই থাক শামণীর পাথের হইয়া। হঠাৎ কি একটা কাজে ললিত লাফাইতে লাফাইতে আসিয়া পড়িল। কহিল, দিদি, এখানে চুপটি করে বলে ৰে? ও-ঘরে তােকে সবাই খোজাখুজি করছে- শ্যামলীর কি মনে হইল, সে ললিতকে ধরিয়া কহিল, খােল ভাই, আমার একটা কাজ করবি? ললিত জবাব দিল, করব—কী কাজ বল। শ্যামলী কহিল, বাইরের ঘরে নিলবাৰু বসে আছে, তাকে একবার জিজ্ঞাসা করে আসতে পারিস--ৰে কী এত কাজ তার, এত তাড়াতাড়ি কলকাতা যেতে চাচ্ছে কেন? দেখিস, আমার নাম যেন করিস নি। লক্ষীটি- ‘আচ্ছা, বলিয়া ললিত আবার ছুটিতে ছুটিতে চলিয়া গেল। উত্তরটা দিতে গিয়া নির্মল কি রকম বিব্রত হইয়া উঠিবে, কল্পনা করিয়া আমলীর হাসি পাইল। তাহার মারক্ত মুখ পর্যন্ত সে যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখিতে পাইল। একটু পরেই ললিত ফিরিল। অতিরিক্ত ছুটাছুটির ফলে সে তখন হাঁপাইতেছে। তাহারই মধ্যে বলিল, ও-দিদি, উনি আর বিজনৰাৰু সিনেমায় যাবেন এলিটে। কাল থেকে টিকিট কেনা আছে এদের। আমাকে দেখালেন আর বলছিলেন আমার, তুমি যাবে খােবা। তার পরই শ্যামলীর দিকে চোখ পড়ায় সে উলিপ্ত হইয়া কহিল, ওকি, তাের কি হল দিদি। মণী চোখ বুজিয়া কহিল, কিছু নয়, মাথাটা বড় ধরেছে। ললিত চুপি চুপি কহিল, ওরা খেতে বসেছে, কী তাড়া, বাৰ।। আবার তিনটের শো সিনেমা দেখে কোথায় নাকি তাস খেলায় কপিটিশন আছে, সেখানে যাবে সন্ধেবেলা। ওরা দুজনে ফাইনালে ঠেছে কিনা ।

শ্যামলী প্রাণপণে আত্মসংবরণ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। জানলা দিয়া পুকুরের দিকে নজর পড়িতেই সে মুখটা ফিরাইয়া লইয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। নিচে তখন আগুবাবু কাহাকে বলিতেছেন, বলে দেবে গাভী বেশ করে ফুল দিয়ে সাজাতে-খরচার জন্যে ভাবনা নেই। আর ঠিক চারটের সময় গাড়ী চাই আমার।

নব-বধূ অকস্মাৎ নিচের তলা হইতে তুমুল ঝগড়ার আওয়াজটা আসিতে ইলিয়া যেন বাচিয়া গেল। সকলেই ছড়-দুড় করিয়া নিচে নামিয়া যাইতে সে এতক্ষণে একটু একা থাকিতে পারিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল। বাড়ীতে পা দিবার সময়ই সকলে মিলিয়া সিরিয়া ধরিয়াছিলেন, তবু তখন গুরুজনরা দলে ভারী ছিলেন বলিয়া ছােটরা ঘেসিতে পারে নাই। তাহাদের সৃষ্টির পরীক্ষাটাই চলিয়াছিল বেশী, সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে মৃদু মন্তব্য; কিন্তু কড়ি খেলা প্রভৃতি আচার-অনুষ্ঠানগুলি শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘােট ঘােট দেবর-ননদ ভাগ্নে-ভাগ্নী তারবি প্রভৃতির দল যে ঘিরিয়া ধরিয়াছে, এখনও পর্যন্ত একটু নিঃশ্বাস ফেলিবারও অবকাশ দেয় নাই। তাহাদের প্রশ্ন চলিয়াছে অবিরাম, তাহার অধিকাংশই হয়ত ছেলেমানুষী, কিন্তু তবু তাহার সবগুলির উত্তর দিতে গেলে বিব্রত হইতে হয়। ইন্দিরা উঠিয়া গিয়া বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়াইল। কী বিএ অবস্থাটাই হইয়াছে তাহার! ভারী বেনারসী কাপড়টা এখনও ছাড়া হয় নাই। একে গরম তায় এত লােকের ভীড় তাহার উপর এই ক কাপড়, ফলে অনবরত ঘামিয়া তাহার সমস্ত দেহ যেন ফ্যাকাশে হইয়া চুপ সাইয়া গিয়াছে। ভিতরের সাদা বডিসটা ত ভিজিয়াছেই, উপরের সিঙ্কের জামাটা পর্যন্ত সপসপে হইয়া উঠিয়াছে। কপালে চনছি অধিকাংশই ধুইয়া গিয়াছে, অরচিত কবরী হইতে অনেকগুলি চুল মাথায় কাপড় দেওয়ার অভ্যাসজনিত টানাটানিতে, নামিয়া আসিয়া কপালময় জড়াইয়া রহিয়াছে। তা ছাড়া, আসিবার সময় মা সিথিতে খানিকটা সিদুর লাগাইয়া দিয়াছিলেন, তারও অনেকখানি ঘামের সঙ্গে মিশিয়া তাহার শুভ্র কপালকে আপনা আপনি রক্তিম করিয়া তুলিয়াছে। আগের দিনের রাত্রি জাগরণ ও দুশ্চিন্তার ফলে চোখের কোলে গভীর কালিমা-এক কথায়, তাহার উপর দিয়া যেন একটা ঝড় বহিয়া গিয়াছে। কিন্তু তবুও, কপালের উপর হইতে ভিজা চুলগুলি একটা আঙুলে করিয়া সরাইতে সরাইতে ইশিরা ভাবিল, তাহাকে খুব খারাপ দেখাইতেছে না ত! বাপের বাড়ীতে চিরকাল সে শুনিয়া আসিয়াছে যে তাহার স্ত্রী-জনােচিত কমনীয়তার নাকি একান্ত অভাষ, তাই তার রূপ থাকা সত্ত্বেও, তাহাকে পছন্দ করা কঠিন। গেছােমেয়ে মলাটে ঘােড়ায়চঙ্গা মেয়েমানুষ এই সব তাহার চিরকালের আখ্যা। সুতরাং আশঙ্কা ছিল যে বধুবেশে হয়ত তাহাকে খুবই বেমানান দেখাইবে, কিন্তু হঠাৎ আজ সে আয়নার সম্মুখে দাইয়া আবিষ্কার করিল যে তাহাকে বধু সাজিয়া অন্যান্য নব-অনুরাগিণী বধুদের মতই দেখাইতেছে। কখন আর কী করিয়া ইহা ৰে সম্ভব হইল তাহা সে তাবিয়া পাইল না, শুধু আৰেশ- মুনেত্রে নিজের দিকে চাহিয়া রহিল।

তাহার মনে পড়িল স্বামী ললিতের কথা।লােকটি শুভদৃষ্টির সময় কিছুতেই ভাল করিয়া মুখ তুলিতেছিল না, অথচ একবার চোখাচোখি হইবার পর হইতে কতবার কত ছলেই না তাহার দিকে চাহিতেছিল। বাসরঘরে আত্মীয়াদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়া কেবলই যে তাহায় গােলমাল হইতেছিল, তাহার কারণটাও ইন্দিরা জানে, ললিতের মনটা ছিল নতমুখ নববধুর দিকেই। ইন্দিরা ইচ্ছা করিয়াই ললিতের দিকে অবগুণ্ঠন টানিয়া দিতেছিল আর তাহার জন্য বেচারার চোখে কী করুণ মিনতি।...ইন্দিরা আপন মনেই হাসিয়া উঠিল, আর সঙ্গে সঙ্গে সুখে ও লজ্জায় তাহার সুন্দর মুখে কে যেন খানিকটা আবীর ছড়াইয়া দিল। অকস্মাৎ আয়নায় আর একখান মুখ তাহারই মুখের পাশে প্রতিফলিত হইল। এ তাহার দেবর, ললিতের ঠিক পরেই যে ভাই, অসিত, একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া। আয়নাতে ইন্দিয়ার সহিত চোখাচোখি হইতেই লজ্জা পাইয়া তাড়াতাড়ি সন্থিয়া গেল। ইলিরাও এন্ড কইয়া ফিরিয়া আসিয়া যথাস্থানে বসিল। ছিঃ ছিঃ, না-জানি অসিত কি বিল। একটু পরেই তার কানে গেল অসিত চাপা গলায় বলিতেছে, আহা কী তােমাদের কেন মা? এত এসেছে একটা মা, এখনও সেই বেনারসী জড়িয়ে বসে রয়েছে-কাপড়টাও ছাড়াতে পায়নি। মুখহাত ধােওয়াৰে, জল খাওয়াবে—এসব কথাও কি তােমাদের মনে করিয়ে দিতে হবে।

তাহার শাশুড়ী জবাব দিলেন, মনে করিয়ে দিতে হবে কেন বাহ, সব মনে আছে। কী করব, একলা মানুষ, যে দিকটিতে না যাবে। সে দিকেই গােলযােগ বেধে বসে থাকবে। ওলো ও সরি, বিশী, তােদের কি একটু বিবেচনা নেই। এই খেটে মুখ দিয়ে রক্ত তুলছি, এর মধ্যে কি আবার আমাকেই গিয়ে বৌয়ের কাপড় ছাড়াবার বন্দোবস্ত করে দিতে হবে? তােরা কি একটা কাজও পারিস না? আর বড় বৌমাও ত রয়েছে, কাকে বলৰ বলো, সব হয়েছে সমান। তিনি আরও কিছুক্ষণ বকিয়া চলিলেন। ইতিমধ্যে সরি বিন্দী অর্থাৎ তাহার দুই যমজ কা হৈ হৈ করিয়া উঠিল, এরি মধ্যে অমনি নতুন বােয়ের কথা টুকুস করে কে লাগালে মায়ের কাছে, ছােড়। বুঝি? বাবা, বাড়ী না ঢুকতে ঢুকতেই এই। বড় বৌদি এসেছিল তবু একটু ময়লা, তাই এখনও কাপের বাড়ীতে ঠাঁই হচ্ছে, এবার সুন্দরী বৌ এসেছে, দেখছি এখানকার মায়া কাটাতে হবে। অসিত কী বলিল বােঝা গেল না। কিন্তু সরমা, বিনােদিনী ও বড়বৌ এবং তাহাদের সঙ্গে একপাল ছেলেমেয়ে আবার আসিয়া পড়িল। সরমা কহিল, চলগাে ঘরে, ঐখানেই কাপড়-টাপড় ছাড়বে। কলরও ঐ পাশে, মুখহাত খােও ত চলো। বড়বৌ এখনও বধু, সে ঘােমটার মধ্য হইতেই ফি কি করিয়া কহিল, বিশী ঠাকুরবি, ওর তােরটা দেখেছ, কী কাপড় চোপড় আছে ? বিশী মাড় নাড়ি চুপি চুপি জবাব দিল, দেখেছি ভাই। অনি খানকতক করে সব রম দিয়েছে। তােমার সঙ্গে যা কাপড় এসেছিল তার অর্ধেকও নেই। বৌদি ও বড়বে তেমনি ফিল ফিস্ করিয়া কহিল, তা হেৰু তাই, তাতে ত মােৰ ৰে না, এবারে যে মূল বৌ এসেছে- ইন্দিরা গাঢ় আরও নিচু হইয়া গেল। সয়না ব্যাপারটা বুঝিতে পারিয়া তাড়া লাগাইয়া কহিল, বিল, কী গড়িয়ে আছি শঙের মত, ৰা না, তােরল খুলে একটা দিশী কাপড় বার করে নিয়ে যায় না। টিপিয়া হাসিয়া বিলী বলিল, যাচ্ছি, যাবিলি সাবান- টান চাই । - সরমা অবাৰ দিল, ওসব কিছু দরকার নেই, কলরে এইমাত্র আমার নতুন সাবান রেখে এসেছি। চলগাে বৌদি সামান্য কিছু প্রসাধনের পর ইন্দিরা অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইল। ইহার পর একলাখাৰৰ আসিয়া পেীছিল। জল খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি। যাহারা অনুরােধ করিতেছে তাহারা সকলেই বিবাহিতা—সবাই জানে যে এ অবস্থায় পাওয়া যায় না—তবু পীড়াপীড়ির অন্ত নাই। যে এটাতে ইলিরা বসিয়াছিল সেটা নাকি ললিতেরই এর অর্থাৎ এখন যাইতে তাহারও। ইহার এক ফাকে ললিত একবার ব্যস্ততাৰে ঢুকিল, অকারণে রোটার -তিনটা টানা খুলিয়া কী নাড়াচাড়া করিল, আবার ব্যস্ততাৰে চলিয়া গেল। বড়বৌ আর বিলী তখন চুপি চুপি আপােরে আলাপ করিতেছিল; কিন্তু সরমা মুখ টিপিয়া হাসিল, আর ইন্দিরা লা লাল হইয়া উঠিল, লােকটার কী আসে। বুড়ি বিবেচনা যদি একটু আছে। দেয়াল হইতে কিছু একটা বাহির কমিয়া লইয়া গেলেও ত চলিত। ইতিমধ্যে নিচে আরও লােকে কয় শােনা গেল। আমীয়- কুটুখিনীয় দল একে একে আসিতেছেন। বিশী কহিল, মুঙ্গেরের পিসিমা এলেন বােধ হয়—ওলো সরি, শশা, আমাদের মােহিনীদি গলা না? চলে আসি- ফলে সকলেই নিচে নামিয়া গেল। ইন্দিরা আবারও একা, সে একটা আরামের নিঃশাস ফেলিয়া বিছানাতে গা এলাইয়া দিল। সমস্ত শরীর তখন ক্লান্তিতে ভাঙিয়া আসিতেছে, আর যেন বসিয়া থাকা যায় না। কিন্তু একটু পরেই লক্ষ্য করিল প্রান্তে অস্পষ্ট একটা ছায়া, কে যেন আড়াল হইতে তাহাকে লক্ষ্য করিতেছে। একটু খাড় ফিরাইতেই দেখিল বছর চৌদ্দ-পনেরাের একটি ছেলে, ললিতের সহিত মুখের এতই সাদৃশ্য কে চিনিতে ভুল হয় না—এ-ও তাহার একটি দের। সহসা চোখােচাখি হইতেই দারুণ লজ্জা পাইয়া জিতু পলাইতেছিল কিন্তু ইন্দিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া চুপি চুপি ডাকিল, এসো না তাই ঠাকুরপাে- জিতু অতিক্তভাবে হাসিতে হাসিতে ঘরে ঢুকিল। ইন্দিরা তাহার হাত ধরিয়া পাশে বসাইয়া বলিল, অমন চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছিলে যে, আমি বুঝি তােমার পর? ইন্দিরার ঠিক পরের যে ভাইটি, তাহার এমনিই বয়স, তাহার কথাই ইলিয়া, মনে পড়িয়া গেল। কিন্তু অত হইয়া কহিল, না, তা নয়। ভাবলুম আপনার শরীর খারাপ, শুনেছেন, মিছিমিছি ঘরে ঢুকলেই আবার হয়ত আপনি উঠ পড়বেন ইন্দিয়া কহিল, তা হােক।-তুমি বসো। কিন্তু তা বলে তুমি তাই আমাকে আপনি বলতে পারবে না, বড় যেন পর পর লাগে। জিতু বলিল, তবে কী বলব? কেন, তুমি’ বলবে। তােমার দাদাকে কী বলে? জিতু ঘাড় নিচু করিয়া কহিল, ৰা-রে! একদিনেই কি বলা যায়। এই সময়ে নিচে হইতে অসিতের গলা পাওয়া গেল, কিতু! ওরে মিতু। জিতু তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল, ছােড়া আছে বৌদি, আমি এখন আসি। বােধ হয় আবার কোথাও নেমন্তন্ন করতে যেতে হবে। ইন্দিরা হাসিয়া প্রশ্ন করিল, তুমিই বুঝি সব নেমন্তন্ন করছ? জিতু লজ্জা পাইয়া কহিল, না, তা নয়। ভাজ্জি মশাই যাচ্ছেন, আমাকেও সঙ্গে থাকতে হচ্ছে- জিতু চলিয়া গেল। কিন্তু ইন্দিরার আর শােওয়া হইল না। কারণ সেই সময়েই ওপাশের বারান্দায় আবার কাহার পদশব্দ শোনা গেল। ইন্দিরা মাথায় কাপড় টানিয়া দিয়া ভাল করিয়া বসিতে না বসিতেই গরে ঢুকিল, উনিশ কুড়ি বৎসরের একটি বিবাহিতা মেয়ে। মেয়েটির দিকে একবারমাত্র চাহিলেই নজরে পড়ে তাহার অস্বাভাবিক গৌরবণ এবং বড় বড় চোখ। কিন্তু আর যেন কোথাও কোন এ নাই, অত্যন্ত কঠিন ও পরুষ মুখের ভাব। সে কাছে আসিয়া প্রশ্ন করিল, তুমিই বুঝি নতুন বৌ এলে? ইন্দিয়া একটু বিস্মিত হইল, কিন্তু ঘাড় নাড়ি নাইল, হ। মিনিট কয়েক মিনিমেষ দৃষ্টিতে তাহায় দিকে চাহিয়া খাকিয়া কহিল, ভাল। ললিতা তোমাকে নিজে দেখেই এনেছে বোধ হয় ? পছন্দ হলেই ভাল। আয়ও কিছুক্ষণ সে তেমনি স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। ইন্দিয়া তাহার এই কঠিন দৃষ্টির সম্মুখে যেন অত্যন্ত সঙ্কুচিত হইয়া উঠিল ; সে নীরবে বসিয়া থামিতে লাগিল, কী আলাপ করিবে ভাবিয়া পাইল না। আরও একটু পরে সেই মেয়েটিই কহিল, শােন, মুখ তুলে চাও।••• আমি তােমার চেয়ে ফরসা না কালাে ? ইশিয়া অস্পষ্টস্বরে কহিল, ফরসা। তােমার চেয়ে ভালাে দেখতে না খারাপ? না, না, চুপ করে থেকো না, এবাৰ দাও। এ প্রশ্নের যাৰ দেওয়া যায় না। ইন্দিরা অনেক চেষ্টা করিয়াও এই মেয়েটির মধ্যে কোন ঐ জিয়া পাইল না। তবু মুখে কহিল, অনেক ই। তবু তােমাকে পছন্দ কমেই এনেছে। সে আর দাঁড়াইল না। চোখের দৃষ্টিতে যেন এক ঝলক অগ্নিবৃষ্টি ফরিয়া চলিয়া গেল। তাহার বাহির হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বয়ে ঢুকিলেন মুঙ্গেরের পিসিমার দল। পিসিমা, তাহার মেয়ে মােহিনী, কঁহাৰ পুত্ৰৰধু-একদল। সঙ্গে সঙ্গে সরি-বিলীও। ঘর ভরিয়া গেল। আবার সেই মুখ তুলিয়া দেখানে-জ্জায় চোখ বুজিয়া আসা। পিসি পুত্রবধুর দিকে কী যেন একটা অর্থপূর্ণ বৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, বাঃ, বেশ বউ হয়েছে আমাদের ললিতের, এ নে। ওর তটাই দে।

বলিয়া একজোড়া সােনার ঝুমকো বাক্স হাতে জিয়া দিলেন। মােহিনী এতক্ষণ পিছন হইতে একদৃষ্টে দেখিতেছিল, এখন কোলে ছেলেটা নামাইয়া দিয়া কাছে আসিয়া সহসা পাশে বসিয়া পড়িল, তাহার পর দুই হাত দিয়া ইলিয়াকে জড়াইয়া ধরিয়া দুই গালে দুইটা চুম্বন করিয়া কহিল, বেশ ভাই বৌদি, তােমাকে আমার বড় পছন্দ হচ্ছে। আমি যদি পুরুষমানুষ হতুম ত তােমাকে চুরি করে নিয়ে যেতুম, না হয় ললিতা শেষ পর্যন্ত পুলিশে দিত। সবাই হাসিয়া উঠিল। সরমা কহিল, আহ, আমাদের মােহিনীদি নতুন বৌ পেয়ে যে গলে গেলে একেবারে । এখন আর আমাদের দিকে নজর নেই—আগে ত আমাদের নিয়েই পালাবে বলতে। মােহিনী একটা ভালাে হাতীর দাঁতের শিহরকৌটা বাহির করিয়া খানিকটা সিহুর লইয়া ইন্দিরার সিথিতে লাগাইয়া দিল, তাহার পর কৌটাটা হাতে দিয়া কহিল, এই কৌটো থেকেই সিদুর নেবে রােজ; আমায় দেওয়া কৌটো, ওর পয় আলাদা। আমার শাশুড়ী সখা গেছে, দিদিশাড়ীও গেছে-আমিও যাব, দেখবে। সগৰ্ব্ব হাসিতে মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল তাহার, সে একবার উপস্থিত সকলের দিকে চাহিয়া লইয়া কহিল, সরি হাসছিস, দেখবি যাই কি-না ! ইতিমধ্যে বিনী কাছে আসিয়া ইন্দিরাকে ফিস ফিস করিয়া প্রশ্ন করিল, আমাদের আসার আগে ঐ যে ছুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, ও কিছু ছিল নাকি তােমাকে ? ইন্দিরা কী জবাব দিবে ভাবিয়া পাইল না, চুপ করিয়া বসিয়া

মহিল। বিনী তখন নিজেই বলিল, কী আম্পাজি, আর কি
সাহস! জানাে বৌদি, আমাদের মেজদাকে কি কম ফাদে ফেলেছিল
ও। মেজদা দিনকতক ওকে বিয়ে করার জন্যে ক্ষেপে উঠেছিল
একেৰাৰে। ছেলে এই বিষ খার ত এই বিষ খায়-কী কাণ্ড! তবে
নাকি বাবা ৰড় শক্ত মানুষ, তাই কিছুতে সুইল না। শেষে বেগতিক
দেখে ওর বাবা বিয়ে দিতে।...সাংবাতিক মেয়ে ও ।
সহসা ইন্দিরা মনে হইল মনের মধ্যে অনেকগুলি আশার আলো
একসঙ্গে নিভিয়া গেল। উৎসৰবাড়ীর যে রেশ তাহার মনের মধ্যে
প্রতিধ্বনিত হইতেছিল, তাহাও সৰ কয়টি তার অকস্মাৎ যেন বের
ৰাজিয়া উঠিল। সে বিবর্ণ মুখে একবার টোক শিলিল।
সমা কাছে আসিয়া চুপি চুপি কহিল, কার কথা বলছিস লা বিশী?
বিী কহিল, আমাদের হিমি, আর কার কথা, কেন দেখিনি,
আমরা যখন আসছি, হিমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
গালে হাত দিয়া সরমা কহিল, ওমা, তাই নাকি? কী সাহস বাবা,
কালামুখ এখানে বার করতে না করে না ওর।
বিলী কহিল, হা, ওর আবার লজ্জা। লজ্জা হবে একেবারে মলে।
মায়ের যেমন, ওদের বাড়ী আবার গেল নেমন্তন্ন করতে।
সরমা কহিল, তা ও বে কার এ তিটো পা দেবে, তা মা কেমন
করে নিবেন।
এখনও কি মোর আশা ছাড়তে পারেনি ও?•••
সহসা ইলিয়ায় বিবর্ণ মুখের দিকে চোখ পড়িতে মােহিনী কহিল,
বৌদির মুখটা অমন শুকিয়ে গেল কেন তাই। কোন অসুখ করছে কি?

ইন্দিরা নাড়িয়া জানাইল, না। কিন্তু মােহিনী শুনিল না, বলিল, তুমি ‘না’ বললে কি হৰে ভাই ও আমি জানি যে, আমারও ত বিয়ে হয়েছে, আর সে এমন বেশ দিনের কথা নয় যে ভুলে যাব।•••একে উপােষ, তায় ঘুম নেই, তায় এই ধকল, শরীরের যা অবস্থা হয় তা আমি জানি ত!•••ওরে তােরা চ’ দেখি- আমরা নিচে যাই ভাই বৌদি, মামিমার সঙ্গে এখনও দেখাই হয়নি বলতে গেলে তুমিও বরং একটু শুয়ে পড়ে। এই সরি বিন্দী ওঠ,-এখন আর বেচারীকে জ্বালাতন করিনি। মাগুটা মােহিনী একরকম জোর করিয়াই সবাইকে টানিয়া লইয়া গেল। গেল না ছােটর দল। তিন চারিটি ছেলেমেয়ে তখনও তাহাকে ঘিরিয়া চাহিয়া বসিয়া রহিল। সুতরাং ইন্দিরা গুইতে পারিল না, চুপ করিয়া বসিয়াই রহিল। যদিও তখন সত্যই তাহায় কিবরিয়া উঠিয়াছে— বারান্দার পথে কার যেন একটা ছায়া পড়িল। একটু পরেই অসিতেক গয়াগ্নি, এই বেবি, শােন- একটি বছর-আইক্লেমেয়ে সেই দলের মধ্য হইতেই সাড়া দিল, ছােটক চিফ) ১e সে উঠিয়া গেল, এবং একটু পরেই একখানা পাখা হাতে করিয়া বয়ে ঢুকিয়া তাহাকে সাড়াছাওয়া করিতে বসিল। তাহার তাব জীপিকা হলি আয়াত হইতে পাখাটা কাড়িয়া লইতে গেল কিন্তু সে নিতেই ছডি গে কিছুই বরং গভীর মুখে কহিল, ছােটকা ভারি বকাবকি করছে আমাকে, বলে তােরা অতগুলো পােক ই করে বসে রয়েছিস্ ওখানে, এ কথাটাও কি আবার বলে দিতে হবে, একটু বুদ্ধি নেই। সে হবে না কাকীমা, বাতাস আপনাকে আমি করবই- অগত্যা ইন্দিরা চুপ করিয়া রহিল। হাওয়াটাতে বাবিক বড় আরাম ৰােধ হইতেছিল তাহার। সঙ্গে সঙ্গে অসিতের প্রতি কৃতজ্ঞতা তেও তার মন ভরিয়া গেল; এখানে আসা পর্যন্ত এই অল্প সময়ের মধ্যেই লােকটির যেটুকু পরিচয় সে পাইয়াছে, তাহাতেই বুঝিয়াছে যে বাড়ীর মধ্যে এই লােকটিরই বুটি বিবেচনা সকলের চেয়ে বেশী। কিন্তু বেশীক্ষণ সে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পারিল না। যত আশা-আকাঙ্ক্ষা-বাসনা লইয়া সে এ বাড়ীতে আসিয়াছিল, তাহার বিকশিত কুমারীজীবনের মত কিছু স্বপ্ন-সমস্তই আনন্দমরীগুলি কিছুক্ষণ পরে সেই গৌরী মেয়েটির উষ্ণ নিঃশ্বাসে যেন পুড়িয়া বসাইয়া গিয়াছে, আর তাহারই অসহ-বেদনা করােধ করিয়া ধরি তেছে। সে আর স্থির থাকিতে না পারিয়া উঠিয়া দাড়াইল। ইতিমধ্যে, পান্তুয়া-ভাজা শুরু হইয়াছে এই সংবাদ পৌছিতে ছেলের দল সরিয়া পড়িয়াছে—ইনিয়া তখন একা। সে আস্তে আস্তে উঠিয়া বাগানের দিকের বারান্দায় গিয়া দাড়াইল। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে, তাহারই চমৎকায় মিথ ঝি-বিরে হাওয়ায় তাহার মাথা যেন অনেকটা পমিকার হইয়া আসিল। সে একটা লােহার থামে মাথা রাখিয়া চক্ষু বুজিল। উৎসর বাড়ীর কোলাহল সেখানেও কানে আসিতেছিল; বাগান হইতে আসিয়া আসা মিশ্র ফুলের গন্ধ মিটানে গন্ধের সহিত মিলিয়া বার বার তাকে স্মরণ করাইবার চেষ্টা করিতেছিল বে, এই আনন্দ-উৎসবের আয়োেজন চলিয়াছে তাহাকে কেন্দ্র করিয়াই, ইহার নায়িকা সে-ই-কিন্তু কিছুতেই তাহার মনে কোন উৎসাহ আগিল না। সামান্য একটুখানি ইতিহাস এই সবকিছুই তাহার কাছে অর্থহীন করিয়া দিয়াছে, মনে হইতেহে ইহার কোনও অর্থই কোনদিন সে খুঁজিয়া পাইবে না।••• বহণ সে এইভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। সে-নে কোন একটা বিশেষ কথা ভাবিতেছিল তাহা নয়, কোন বিশেষ আবাতের কথাও নয়, তবু কখন যে তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে শুরু হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এমন কি, কখন যে ললিত নিঃশব্দে তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহাও সে টের পায় নাই। সহসা তাহার চমক তালি ললিতের স্পর্শে। সে আস্তে আস্তে ইলিয়ার কাধের উপর একটা হাত রাখিয়া চুপি চুপি কহিল, তুমি এখানে একটি বাড়িয়ে কেন ই, তােমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে-ও কি, কাছ তুমি? ইন্দিরা চমকিয়া উঠিয়া তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়া চোখ মুছিয়া মাথার কাপড়টা ভাল করিয়া টানিয়া দিল। কিন্তু চোখেয় এল তাহার, বােকরি ললিতের স্পর্শেই আরে বিজোহী হইয়া উঠিল, সে কিছুতেই কান্না চাপিতে পারিল না। ললিত অত্যন্ত বিব্রত হইয়া উঠিল। স্ত্রীর সহিত পরিচয় ৰেীণের নহে, এমন কি পরিচয় নাই বলিলেও চলে, এক্ষেত্রে কী বলা কিংবা কিভাবে সানা দেওয়া উচিত তাহা সে বিয়া পাইল না। ৰে খানিকটা এদিক-ওদিক চাহিয়া ইন্দিরার একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে দুলিয়া লইয়া কহিল, কেঁদো না লক্ষ্মীটি। আজকের দিনে চোখের জল ফেলতে নেই, ছি।•••তােমার কি মায়ের জন্যে মন কেন করRেY এইত পাঁচ-ছটা দিন পরে আবার সেখানে যাবে। ভয় কি!•••এখানে কি কেউ কিছু বলেছে তােমাকে। ইনিয়া নামবে বাড় নাড়িল। তাহার পর বার বার মুছিয়া চোখের অলটাকে কতকটা সংৰত করিয়া লইল, এবং ললিতের হাত হইতে হাতটা টানিয়া লইয়া আবার ঘরের মধ্যে আসিয়া বসিল। ললিতও পিছু পিছু ঘরের মধ্যে ঢুকিল কিন্তু আর কাছে গেল না। সেখানেই দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া খানিকটা ইতস্তত করিয়া আপনমনেই কহিল, এরাই বা গেল কোথায় ছাই, কী সব আলে জানি না। বেচারীকে একলা রেখে...আচ্ছা দেখছি আমি, সরিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, ইন্দিরা প্রবলবেগে ঘাড় নাড়িয়া অস্পষ্ট মৃদুককে কহিল, না, না, আমি বেশ আছি। কাউকে ডাকবেন না। আরও দুজনে নীরব। খানিকটা পরে ললিত আস্তে আস্তে গিয়া চৌকীটারই একপাশে বসিয়া পড়িল। তাহার বুকে এ কিসের চঞ্চলতা, সে কিছুতেই ভাল করিয়া কথা কহিতে পারিতেছে না কেন?ইন্দিরারও মনে হইতেছিল যেন দম বন্ধ হইয়া যাইবে, তাহার বুকে যেন টেকির পাড় পড়িতেছে- ললিত চুপি চুপি কহিল, তােমাকে পেয়ে একটু আগে আমার নিজেকে কী সৌভাগ্যবানই যে মনে হচ্ছিল। কিন্তু তখন তােমার দিকটা ভাবিনি, তােমাকে পেলুম এই জনমেই মাতাল হয়ে ছিল। তুমি যে তেমনি আমাকে পাওয়া দুর্ভাগ্য বলে মনে করতে পারে।

৩
একথাটা তখন মনে এফেনি। সত্যিই ত, ফাই । আমার
পে।
কৈ জানে কেন, পলিতে গলার সুরে ইন্দিয়ার ক উপচাইয়া
কায়া বাহির হইতে লাগিল। সে কোনমতেই অশ্রু রােধ করিতে
পারিল না।
ললিত আবারও কী বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু নিচে হইতে তাহার
মায়ের কবর পাওয়া গেল। তিনি কাহাকে যেন চুপি চুপি বলিতেছেন,
তুইও যেমন, ৰৌ একলা আছে বলে দুর্ভাবনায় ত তাের ঘুম হচ্ছিল
।•••ওরা আজকালকার ছেলেমেয়ে, তা ভুলে যাস্ কেন?...ভাবলুম
নে এসে অৰ িত আমি একটি মিনিট অবসর পাইনি, যেতেও
পাখিনি, এখন একটু গিয়ে নতুন বৌয়ের কাছে বসি; ওমা, গিয়ে
দেখি ছেলে-বৌ আমার দিব্যি বারান্দায় দাত ধরাধরি করে গল্প
কমছে, যেন কতকালের পরিচয়। আমি লজ্জা পেয়ে পালিয়ে এলুম।
ইন্দিরা জিভ কাটিয়া ঘাড়টা আরও নিচু করিল। ললিতও আয়
লেন কথা বলিবার অবসর পাইল না, বিষম শতি ইয়া পাশের
বারান্দা দিয়াই পলায়ন করিল।
নিচে হইতে সৰিয় কবির শােনা গেল, ওমা তাই নাকি। বাক
করেছে। এখনও ত আজকালকার মেয়ে, কি এমন হেয়া-
কে যেন তাহার মুখ চাপিয়া ধরিল, মােহিনীনিই বােধ -লিল,
তুই থাম্ সরি। সবাইকেই চিনি, আর যাঁড়ের মত গলা বার করে
এত অহির করতে হবে না। তুই ত সময় থেকেই বয়ে এনে
লিলি করুত শুরু করেছিলি-

একটু পরেই মােহিনী উপরে আসিল। কোলের ছেলেটাকে মেতে নামাইয়া দিয়া বিছানার উপরেই বসিয়া পড়িয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, ওমা, তুমি ত একলাই রয়েছ, তবে যে ওয়া- তাহার পরই কথাটা চাপিয়া গিয়া তীক্ষদৃষ্টিতে ইন্দিরার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, তােমার চোখ এত লাল কেন ভাই, যেন মনে হচ্ছে কাদছিলে- ইনিয়া তাড়াতাড়ি মাড় নাড়িল। কিন্তু মােহিনী ছাড়িবার মেয়ে নয়, সে ডানহাতে তাহার চিবুকটা তুলিয়া ধরিয়া কহিল, উহু, তুমি বললেই আমি শুনৰ কেন? এষে দিব্যি কান্নার চিহ্ন দেখছি। ব্যাপার কি বলো ত, বাড়ীর জয়ে মন কেমন করছে? ইন্দিরা কথাটা চাপা দিবার জন্য সায় দিল। কিন্তু এই তীক্ষভৃষ্টি- শালিনী মেয়েটিকে তৰু ফাকি দেওয়া গেল না। সে মাথা নাজিম কহিল, না ভাই, আমার অত সহজে ঠকাতে পারবে না। আমি তখনই দেখে গেছি, হঠাৎ তােমার কী হল। ওহো.. সরি-বিলির কথাটা তােমার কানে গেছে, না? আ আমার কপাল !...নিশ্চয়ই তাই। ইলিরা ঘাড় হেঁট করিয়া বলি। মােহিনী কাছে আসিয়া তাহাকে একেবারে বুকের মধ্যে টানিয়া আনিয়া কহিল, ওরে পাগলী,বৌদিই হও আর যা-ই হও, বয়েসে আমার ছােটপাগলীই বল, ওসব কথা নিয়ে কি সুখু পেতে আছে। তখন সবে ও উঠতি বয়স আর মেয়েটাও ভারি পাজী, একে খাতে চেয়েছিল। তখন ঝোঁকের মাথায় কী বলেছিল সেই কথা কি ?

= ফয়ে বসে থাকে কেউ? তা ছাড়া পুরুষমানুষ, বিয়ের আগে এমন অনেক নেশা লাগে, তখন ত আর তুমি আসসানি ভাই, এমন ভাগ্যি কে হবে তা ও জানতও না।...নাও নাও, ওসৰ তুচ্ছ কথা নিয়ে তুমি মাথা ঘামিও না। একটু মাথা তুলে চাও দেখি আমার দিকে, মুখ তাে•••, এমন রূপ যায়, সে আর ঐসব ভেবে মন খারাপ করে।•••গুলাে বৌদি, আমারই যে মাথা ঘুরে যাচ্ছে তােমার দিকে চেয়ে, মেজদা ত তুচ্ছ। চিরকাল মাথা মুড়িয়ে এই পায়ে দাসধৎ লিখে বসে থাকবে দেখৰি- ইন্দিয়া তাহার ভাবভঙ্গীতে হাসিয়া ফেলিল। তখনও তার চোখের পাতা ভিজা, তাহারই মধ্যে এই হাসিটি শরতের আকাশের মতই ভারি মধুর লাগিল। মােহিনী তাহাকে একটা চুম্বন করিয়া কহিল, চল ভাই শেদি, আমরা নিচে যাই, ওদের কাছে গিয়েই বলিগে- ইন্দিয়া উঠিয়া মােহিনীর ছেলেটিকে কোলে তুলিয়া লইল। তাহার মন হাল্কা হইয়া গিয়াছে, কিছুক্ষণ পূর্বের বেদনায় কেন চিত্রও নাই। আবার উৎসৰবাড়ীর নেশা লাগিয়াছে তাহার মনে। মােহিনীর পিছনে পিছনে ললিত নত-মুখে সে নিচে নামিয়া গেল।

ফুলশয্যার ইতিহাস একে-একে সকলে বাহির হইয়া গেলে রমেন দোরে খিল দিয়া আলোটা কমাইয়া বিছানার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। দীপ্তি তখন মাথার বালিশের নিচে মুখ ও জিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া আছে, কিন্তু সে যে বু নয়, তা তাহার দ্রুত নিশ্বাসের শব্দেই বােঝা যায়। অত্র শয্যার সর্বত্র গােলাপের পাপড়ী ছড়ানাে, তাহার মধ্যে ফুটন্ত গােলাপের মতই দীপ্তির দেহখানি পড়িয়া আছে। পড়িয়া আছে’ বলিলে ঠিক বােঝানো যায় না, অত্যন্ত নরম সিকের ফা কাপড়ের মত তাহা এলাইয়া আছে। দীপ্তির দেহখানি ক্ষীণ, সুগােল, সুডৌল এৰং সুকুমার। সেদিকে চাহিবামাত্র মনে হয় এ দেহ এতই নরম যে বােধহয় কাহারও হাতের ভরও সহিৰে না।...এত সুকুমার দেহ ইতিপূর্বে কাহারও দেখিয়াছে বলিয়া রমেনের মনে পড়িল না। ট্রেনে আসিবার পৰে আগের দিন দুই-একবার চুরি করিয়া রমেন তাহার মুখটা দেখিয়া লইয়াছিল, উপসলিষ্ট মলিন মুখের মধ্যে আয়ত দুটি চক্ষু লজ্জা-বিজড়িত চাহনি কথা মনে করিয়া তাহার বুকের ভিতরটা যেন মােচইয়া ল; আজ সারাদিন সে কাজের ভিতর একবারও ভাল করিয়া প্তিকে দেখিতে পায় নাই সত্য কথা, কিন্তু গতকল্যকার কটাক্ষের পতিতেই সে মশগুল হইয়া আছে—সমস্ত কাজের মধ্যে সেই দুটি চোখের কথা বার বার তাহাকে উমনা করিয়া দিয়াছে। রমেন পকেট হইতে টর্চটা বাহির করিয়া একবার দীপ্তির মুখখানি তুলিয়া দেখিবার চেষ্টা করিল। দীপ্তি মুখ তুলিল বটে কিন্তু সে মুহূর্ত কয়েকের , তাও চোখ মেলিয়া চাহিতে পারিল না। রমেন একটা ছােট্ট দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বিছানার তলার দিকে আসিয়া বসিল। তাহার বয়স একটু বেশী হইয়াছে--এ কথা আজ কেহই জৰীকার করিতে পারিবে না; সাধারণ শিক্ষিত বাঙ্গালীর ধরে যে বয়সে বিবাহ , সে বয়সকেও সে বহুদিন পশ্চাতে ফেলিয়া আসিয়াছে। আজ, এই প্রায় যৌবনের প্রান্তসীমায় পৌছিয়া, ঐ পনেরো বছরের মেয়েটিকে বিবাহ করিয়া কি সে ভুল করিল না? দীপ্তির বয়স যে পনেরাের বেশী নয় তাহার প্রমাণ সে আগেই পাইয়াহিত, অাজ আরও নিঃসংশয় হইল তাহার মুখের দিকে চাহিয়া, একেবারে ছেলেমাযের মুখ। রমেনের মনে পড়িল বন্ধুবান্ধবরা এই অসমান বিবাহে বাধা দিয়াছিল, কিন্তু এই মেয়েটিকে সে নিজে দেখিয়া পছন্দ করিয়াছিল বলিয়া কাহারও কথা শােনে নাই। আজ তাহার মনে মনে কেমন একটা ওর হইতে লাগিল, সে কি পারিবে দীপ্তির মনের মতন হইতে। কিশােরীর প্রণয়লীলার মধ্যে তাহাকে কি নিতান্ত বেমানান দেখাইৰে সে একবার চকিতের মধ্যে তাহার এই চৌত্রিশ বৎসরের জীবনধাৰাৰ দিকে চাহিয়া লইল। অতি শৈশবে তাহার মাথায় এক বিপুল সংসারের তার পড়িয়াছিল ; অর্থ উপার্জন এবং ভাই-বােনদের মানুষ করার চিন্তার মধ্যে সে আর কোনও দিকে নজর দিতে পারে নাই; মা এবং বােন ছাড়া অন্য কোনও রমণীর স ব সাহচৰ্য্য তাহার অদৃষ্টে মিলে নাই। কোনও অভিজ্ঞতা, কোনও নই নাই তাহার এ বিষয়ে !•••যদি দীপ্তি তাহাকে ভালবাসিতে না পারে। যদি সে তাহাকে ভয় করে ? তাহার সঙ্গ যদি পীড়াদায়ক বলিয়া মনে করে। রমেনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল। সে জোর করিয়া মনকে দৃঢ় করিবার চেষ্টায় দীপ্তির তমুলতার দিকে চাহিল। সুশ্রী, সুগঠিত তাহার চরণ দুটির কাছেই সে বসিয়াছিল—একবার তাহার পায়ে হাত বুলাইবার লােভ সে সামলাইতে পারিল না। মাখনের মত নরম একখানি পা সে দুই মুঠার মধ্যে ধরিয়া ধীরে ধীরে চাপ দিল। মুহূর্ত খানেক স্থির হইয়া থাকিয়াই দীপ্তি পা সরাইয়া লইল। বােধ হইল কেন চাপা হাসিতে তাহার পিঠটা ৰার দুই বেশী করিয়া ফুলিয়াও উঠিল, কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ দিল না।••• রমেন জামাটা খুলিয়া নিজের বিছানায় উঠিয়া বসিল, তারপর দীপ্তির কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া চুপি চুপি ভাকিল দীপু, দীপ্তি। প্তি তেমনিই চুপ করিয়া বলি। হাওড়া জেলার এক দুর্গম পল্লীর অতি গরীবের ঘরে তাহায় জন্ম। তার জন্মের পরেই তার মা মারা যান এবং তাহার বাবার চাকরী যায়। সে চায়ী তিনি আর পান নাই। কোনও রকমে ছােট ভায়েদের মন জোগাইয়া এবং ভাদ্রবৌদের সংসারে খাটিয়া তিনি আজও বাঁচিয়া আছেন বটে কিন্তু সে থাকা যে মরার অধিক, এ কথা সে এই বয়সেই ভাল করিয়া বুঝিতে পারিয়াছে। সুতরাং সে ছেলেবেলা হইতেই সর্বত্র শুনিয়াছে যে তাহার মতন দুর্ভাগা আর নাই, নিজেও সে কথা বিশ্বাস করিয়াছে। তাহার চেয়ে যে সব মেয়েদের ভাল অবস্থা, যাহাদের সমস্ত শৈশব ও কৈশাের অবিরত লাঞ্ছনার মধ্য দিয়া কাটে নাই, তাহারাও উপযুক্ত অর্থের অভাবে কেহ মদ্যপের হাতে, কেহ বৃদ্ধের হাতে, কেহ অত্যাচারী লম্পটের হাতে পড়িয়াছে; তাহাদের দুর্দশা সে নিজের চোখেই দেখিয়াছে এবং শিহরিয়া উঠিয়া ভাবিয়াছে নিজের অদৃষ্টের কথা। কখনও ভাবিয়াছে যে তাড়াতাড়ি যাহা-হােক একটা হইয়া যাওয়া তাল, বিবাহিত জীবনে তবু একটা স্বাধীনতা আছে; আবার ভাবিয়াছে যে বাপের বাড়ীতে লাঞ্ছনার মধ্যে দুঃখ আছে বটে—অপমান নাই, কিন্তু স্বামীর কাছে গিয়াও অদৃষ্টে যদি নিৰ্যাতনই জোটে ত তাহায় অপমান সে সহিবে কেমন করিয়া? তাছাড়া বাপের বাড়ীর দুঃখ একদিন শেষ হইবেই, এই আশায় সে প্রাণ ধরিয়া আছে, কিন্তু শ্বশুরবাড়ীর সম্পর্ক যে আজীবন। এমন সময় একদিন কার্তিকের মত রূপ এবং অগাধ ঐশ্বৰ্য্য লইয়া সমেন নিজে আসিল তাহাকে দেখিতে। সেদিনের কথা তাহায় আজও মনে আছে। আগেই তার রূপ ও ঐশ্বর্যের কথা সে শুনিয়াছিল; মনে আছে যে, যে লােকটি মধ্যস্থ হইয়া এ সম্বন্ধ করে, জ্যাঠাইমা তাহাকে শিকার দিয়া বলিয়াছিলেন, কেন ও চেষ্টা করছ মিছিমিছি। বাদীর কী আহে পে করবে। শু এখাষ্টামে কেন?

তাহার উপর সেদিন তাহাকে সাজাইয়া দিবারও কেহ ছিল না, এমন কি কেহ তাহাকে একটা ভাল কাপড়ও পরাইয়া দেয় নাই। কী দুর্নিবার লজ্জায় সহিত লড়াই করিতে করিতে যে সেই পুরাতন দেশী কাপড়টিতে দেহ ঢাকিয়া রমেনের সামনে তাহাকে যাইতে হইয়াছে, তাহা একমাত্র তাহার অন্তর্যামীই জানেন। তাহার পর সে কেমন করিয়া দুরে জামরুল গাছের আড়াল হইতে রমেনকে দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিল এবং কী গভীর বেদনায় সন্ধ্যাবেলা তুলসীতলায় মাথা খুঁড়িয়াছিল তাহা সে আজও ভােলে নাই। সে চোখের জলে তুলসীমঞ্চের মাটি ভিজাইয়া বার বার জানাইয়াছিল, হে ঠাকুর, যেন আমার পছন্দ করে ! কিন্তু তবুও, ভগবান যে সত্যই তাহার দিকে মুখ তুলিয়া চাহিবেন তাহা সে কোনও দিনই আশা করে নাই। তাই যেদিন খবর আসিল যে রমেন তাহাকে বিবাহ করিতে রাজী হইয়াছে, তখন বাড়ীর অন্যান্য লােকের মত সে-ও সে কথা বিশ্বাস করে নাই। জ্যাঠাইমা এই সেদিন পৰ্যন্ত যখন বলিয়াছেন, ও তােকে ঠাট্টা করছে তখন সে না মুখে, না মনে, কোন প্রতিবাদই করিতে পারে নাই, শুধু গভীর রাত্ৰি পৰ্যন্ত, অন্যের অজ্ঞাতসারে মুখে কাপড় ও জিয়া কাঁদিয়াছে। তাহার পরে শেষ পর্যন্ত সেই দিনটিও জাসিয়া পড়িল, যেদিন আর কাহারও কোন সংশয় রহিল না। কাকী ও জ্যাঠাইয়ের দলের হইল ঈর্ষা, কারণ তাহাদেরও বিবাহযােগ্যা মেয়ে আছে। সুতরাং লাঞ্ছনার মাত্রা সেদিক দিয়া বাড়িয়া গেল। কিন্তু তা বাড়কে, সে লাঞ্ছনা তখন আর তাহাকে বেদনা দিতে পারে নাই; সে মনে মনে গৌরব অনুভব করিয়াছে। উপকথার রাজপুত্রের মত পক্ষীরাজ ঘােড়ায় চড়িয়া তাহারও স্বামী আসিতেছেন, নিমেষে এই সব বেদনা সােনা হইয়া যাইবে। আজ যত দুঃখই আসুক, তাকে সে গ্রাহ করে না। কিন্তু কোথাও কোথাও তাহার আরও বাড়িল। তার কাকার দুই মেয়ের বিবাহ হইয়া গিয়াছিল, তাহারা এতদিন ভাল করিয়া দীপ্তির সহিত কথা পৰ্য্যন্ত কহিত না, এইবার তাহারা দীপ্তিকে সিরিয়া ধরিল। নিজেদের বিবাহিত জীবনের নানা গল্প তাহার কাছে করিয়া, নানা উপদেশ দিয়া তাহাকে তৈরী করিতে লাগিল। মনে আছে বিবাহের ঠিক আগের দিনই অনিলা তাহাকে বলিয়াছিল, দেখিস চুড়ি, চট, করে যেন সােয়ামীর হাতে ধরা দিসনি। তাহলে দাম কমে যাবে। অন্তত তিন চারদিন খেলিয়ে তবে তার সঙ্গে কথা কইবি। তাহার বাবে অনুপম বলিয়াছিল, হ, খরা না দিয়ে পার পাৰে কিনা? আজকালকার ছেলেরা, পায়ে ধরে কেঁদে যেমন করে তােক কথা কওয়াবেই। বাব্বা, আমাদের মানুষটি যা কাণ্ড করলে-সব প্রতিজ্ঞাই ভেসে গেল। নিলাও হাসিয়া বলিয়াছিল, তা—যা বলেছিস, যা বেহায়াগিরি করে! মকর বলছিল যে ফুলশয্যার রাত্রিতে সে তার বরের সঙ্গে কথা কয়নি বলে শেষ পর্যন্ত বেচারা মাথা খুড়তে শুরু করেছিল, একেবারে কথাটা শুনিয়া তাহার সারা দেহ আবেশে কন্টকিত হইয়া উঠিয়াছিল, সারা রাত ঘুমাইতে পারে নাই। তাহার কথা, শুধু দুটি মুখের কথা শুনিবার অন্য একটা পুরুষমানুষ পায়ে ধরিতে পারে। এও কি সব? ঐ সুন্দর পুরুষটি, ধাহার অন্য সবাই তাহাকে ইতিমধ্যেই ঈর্ষা করিতে ২ শুরু করিয়াছে, যাহার বংশ এবং ঐশ্বর্য্যের খ্যাতি আজ এ গ্রামের সকলের মুখে মুখে, সে-ও তাহার পায়ে ধরিবে, তাহার কাছে মিনতি জানাইবে, শুধু তাহার মুখের কথা শুনিবার জন্য? তাহার সহিত কথা কহিয়া সমস্ত রাত্রি জাগিয়া কাটাইবে?... সে কিছুতেই এ সম্ভাবনাটা মনের মধ্যে ধারণা করিতে পারিল না, অথচ অবিশ্বাস করিতে গেলেও মনের ভিতরটা বেদনায় টন্ টন্ করিয়া ওঠে। এমনি করিয়া আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়া রাত্রি কাটিয়া গেল, তাের-রাত্রে তার ঘােরে স্বপ্ন দেখিল যে, সে অভিমান করিয়া একটা ঘরে বসিয়া আছে এবং তাহার স্বামী রুবারে মাথা কুটিতেছে। বিবাহের দিনই বা কী লাঞ্ছনা তাহার! গায়ে হলুদের তত্বের বেনারসী কাপড়খানার মূল্য যখন তাহার বিশ্বনিন্দুক ন’কাকীমা পর্যন্ত অন্তত একশ’ টাকা বলিয়া সাব্যস্ত করিলেন তখন আর কাহারও ঈর্ষা বাধা মানিল না। যত কিছু বা মুখােষ খুলিয়া ফেলিয়া সকলে একেবারে নিমূর্তি ধারণ করিল। কিন্তু সে সব কোনও দিকে তাহার তখন চিন্তা ছিল না, তাহার মনে সে এক অপরূপ সুর বাজিয়া চলিয়াছে, তাহাতেই সে আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। ঐ অসংখ্য দামী শাড়ী, ঐ রকমারী জামা, এবং বহুমূল্য সােনার হার আসিয়াছে শুধু তাহারই জন্য, একান্তভাবে ঐলি তায়ই। শুভদৃষ্টির সময় সে তাই সকল ল জুলিয়া চোখ মেলিয়া তাহার বামী, তাহার দয়িতের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল। রমেনের সৌম্যসুন্দর মুখের দিকে, তাহার সঙ্কোচ-তরা কুষ্ঠিত দৃষ্টির দিকে চাহিয়া তাহার সমস্ত মন ভরিয়া উঠিল; তাহার মত কিছু মানি যেন নিমেৰে ফুলের মালার মত রমণীয় হইয়া উঠিল। ছোটবেলায় শুনিয়াছিল, গৌরী মহাদেবকে পাইবার জন্য সহস্র বৎসর অনাহারে তপস্যা করিয়াছিলেন; তাহার মনে হইল যে সেও এই মাত্র পনেরো বছরের কৃছু সাধনেই মহাদেবকে পাইয়াছে। সে মনে মনে বার বার ভগবানকে বলিতে লাগিল, হে ঠাকুর, যেন তােগে হয়। তারপর তাহার শ্বশুরবাড়ীতে আসা। শুর, শাশুড়ী, দেওর, ননদ সকলের যত্নে ও স্নেহে গত চব্বিশ ঘণ্টা সময় যেন তাহার এক মধুর স্বপ্নের মধ্য দিয়া কাটিয়াছে। মনে হইল যেন সে সত্য সত্যই উপকথার রাজপুত্রের সঙ্গে কোন এক রাতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, আজ আর সে সংসারের সকলের অনাবৃত, লাঞ্ছিত, অনাবক আর মাত্র নয়-আজ সে রাজেন্দ্রাণী! বহুলােকের মুথ-সৌভাগ্যের নিয়ন্ত্ৰী সে। দীপ্তির সব কথাগুলি মনে পড়িয়া একবার সারা দেহ আনন্দে, আশায়, আবেশে শিহরিয়া উঠিল। কোন্ এক সুখানুভূতি তাহার বুকের মধ্য হইতে বাহির হইয়া দেহের প্রতি অণুপরমাণুতে ছড়াইয়া ক্রমে দেহের অতীত যেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়াইয়া পড়িল। বেদনার মতই টন্ টন্ করিতে থাকে, সারা বিশ্বের বীণায় ৰেহাগ সুরে শত করে। রমেন অনেক পিছনে নিঃশব্দে বসিয়া থাকিয়া তাহার গায়ে আরে আরে একবার হাত না রাখিল। দেখিল সে কাঁপিতেছে; তাড়াতাড়ি হাত সরাইয়া লইয়া মুখের কাছে মুখ আনিয়া আবার ডাকিল, দীপু, তোমার শীত করছে। শালখানা গায়ে দিয়ে দেব।

দীপ্তি মুখ টিপিয়া হাসিল, সাড়া দিল না। সে হাসি রমেন দেখিতে পাইল না। সে বিব্রত হইয়া উঠিল। আর একবার পিঠে হাত দিয়া কিছুক্ষণ স্থির হইয়া দেখিল ভীরু পাখীর মত তাহার বুক ধ্বক্ ধ্বক করিতেছে। তাহার মন মমতায় ভরিয়া উঠিল। ভাবিল, ছেলেমানুষ! ভয় পেয়েছে। সে শালখানা খুলিয়া দীপ্তির গায়ে ঢাকা দিয়া দিল। কিন্তু এত ভয়ই বা কেন? সে আজ পর্যন্ত যত বন্ধুবান্ধবদের ফুল- শয্যার কথা শুনিয়াছে কোথাও ত এরূপ ভয়ের কথা শােনে নাই। অধিকাংশ স্থলেই বরং শুনিয়াছে বধুরাই স্বামীর ভয় ভাঙায়। এই ত কালই ইন্দু বলিতেছিল যে, তাহার বউ ঘরে খিল দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে নাই, নিজেই আলাপ করিতে শুরু করিয়াছিল। তিন ঘণ্টায় এত কথা বলিয়াছিল যে বর্ধমানের রাজার মহাভারতের মত একখানা সহস্রপৃষ্ঠার বই হয় ! তবে কি দীপ্তি তাহাকে পছন্দ করে নাই? না, তাহার বয়সের কথাটা কাহারও মুখে শুনিয়াছে। তাহার নামে কেহ নিন্দা করে নাই ত। রমেন রীতিমত নার্ভাস হইয়া উঠিল, আর একবার হেঁট হইয়া জোর করিয়া দীপ্তির মুখখানা তুলিয়া ধরিয়া কহিল, দীপু, একবার চোখ চেয়ে দেখ, আমাকে কি তােমার পছন্দ হয়নি দীপ্তি চোখ খুলিল না। কিন্তু মুখও ফিরাইল না। তখন যেন মনে অনেকখানি বল আনিয়া তাহাকে একটি চুম্বন করিল–বিবাহিত জীবনের প্রথম চুম্বন। জীপ্তি এইবার মুখটা ফিরাইয়া লইয়া পুনরায় বালিশের তলায় মুখ ; গুলি। বিবাহের পূর্বেকার যতকিছু আশয়া সম্পূর্ণরূপে তাহার মন হইতে মুছিয়া গিয়াছে; মাত্র দুইদিন পূর্বে যে আশা সে কল্পনাতেও মনে স্থান দিতে পারে নাই, আজ সে ধরিয়া লইয়াছে যে, সে তাহার শুধু ন্যায্য প্রাপ্য মাত্র। সে অসহিষ্ণুভাবে মনে মনে বলিল, এ আর কি ঢং। এত ভয় কিসের? আরও কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল। পাশের ঘরের বড় ঘড়িটায় ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাতিল। আর মাত্র ঘণ্টা দুই তিন এ মরে থাকা চলিবে। রমেনও অসহিষ্ণু হইয়া উঠিল। কিন্তু এই চুপ করিয়া শুইয়া থাকার সহ সে কিছুতেই ভেদ করিতে পারিল না। জীলােক সম্বন্ধে নিজের কোন অভিজ্ঞতাই তাহার নাই, বন্ধুবান্ধবরা যতটুকু বলিয়া দিয়াছে সেই পৰ্য্যন্তই তাহার দৌড়; কিন্তু এরকম সম্ভাবনা ত কেহ তাহাকে বলিয়া দেয় নাই।...সে কি সত্যই এই ছোট মেয়েটিকে বিবাহ করিয়া ভুল করিল। আরও কিছুক্ষণ- তারপর সে ভয়ে ভয়ে দীপ্তির পায়ে আর একবার হাত দিল, মিনিট দুই নিঃশব্দে তাহার পা টিপিতে লাগিল। দীপ্তি বাধা দিল না, মনে মনে শুধু হাসিতে লাগিল, আৰিল যে এইবার ঔষধ ধরিয়াছে- রমেন তাহাকে এইবার জোর করিয়া নিজের দিকে ফিরাইল। দীপ্তির মুখখানিকে নিজের মুখের কাছে টানিয়া আনিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া তাহাকে চুন করিল, কিন্তু সে চুমন মরামানুষকে চুমা খাওয়ার মতই নিরর্থক বলিয়া মনে হইল। আর একটা মানুষ যদি নিতান্ত পাষাণের মতই পড়িয়া থাকে ত কেমন করিয়া তাহার কাছে প্রেম নিবেদন করা যায়। ৫, সে কিল, দীপু ! সাড়া নাই। পুনশ্চ কহিল, দীপু, আমার সঙ্গে কথা কইবে না? আমাকে কি তোমার ভয় করে ? দীপ্তি তাহার জবাবে আবারও পিছন ফিরিয়া শুইল। আসল কথা, তাহার হাসি পাইতেছিল। এই বুদ্ধি লইয়া লােকট। বিবাহ করিয়াছে ? সে ধরা কিছুতেই দিবে না তাহা স্থির, কিন্তু এ লােকটা কি কোনও দিন জোর করিয়া তাহাকে কথা কইতে পারিবে ? মনে ত হয় না। রমেন একটু থামিয়া কহিল, আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে, সত্যি ক'রে বলল। তবু ও পক্ষ হইতে সাড়া আসে না। রমেনের দেহে ঘাম দেখা দিল। কি বিপদ। এ কি বােবা নাকি? সে রাগ করিয়া শুইয়া পড়িল। অর্ধস্কুট স্বরে বগতােক্তি করিল, আমি ঘুমুই বাবা, কথা না কইলে ত বয়েই গেল। কিন্তু সেটা কথার কথা! ইয়া শুইয়া যেন শব্যাকটকী বােধ হইতে লাগিল। তাহার যােণ সতেরটি বন্ধুর আজ পর্যন্ত বিবাহ হইয়াছে, কিন্তু কৈ কাহারও অদৃষ্টে যে এরকমটি ঘটমাছে বলিয়াত শোনা যায় নাই। তাহারই দুর্ভাগ্যক্রমে কি এই মেয়েটি । যত কি বিপরীত আচরণ। ওরে দীপ্তিরও চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছিল। পাশের বনে ঘড়িটা ক্রমাগত টিক টিক শকে মিনিটের পর মিনিট যেন দুই হাতে করিয়া সরাইয়া দিতেছে। তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষা অরণীয় বিডি কি এমনি করিয়া নীরবে কাটিয়া যাইবে? রাত্রি প্রভাত হইতে আর দেরিই বা কি?••কিন্তু অনিলা, অনুপম, তাহাদের স্বামীরা পর্যন্ত পায়ে ধরিয়া সাধিয়া কথা কওয়াইয়াছে, আর সে-ই বিনা আয়াসে ধরা দিবে, অথচ তাহার মত স্বামী-সৌভাগ্য আর কাহারও কি হইয়াছে। রমেন ভাবিতেছিল, বড় মেয়ে হইলেও না হয় রাগারাগি করা চলিত, কিন্তু এ যে একেবারে বালিকা, ইহাকে লইয়া কী করা যায় ? সে নানা উপায় চিন্তা করিতে লাগিল কিন্তু দীপ্তির এই কঠিন নীরবতার কোনও কারণই সে খুঁজিয়া পাইল না। কারণ না জানিলে উপায় হয় কি করিয়া ? অনেকক্ষণ পরে সে শুইয়া শুইয়াই দীপ্তিকে নিজের কাছে জোর করিয়া টানিয়া আনিল, অকস্মাৎ তাহার মুখ, বুক, কঠ অজস্র চুম্বনে ভাইয়া তুলিল। দীপ্তি বাধা দিল না, সরিয়াও গেল না। অভিমানে তাহার চোখ দুইটি আলা করিতেছিল, মনে মনে সে বলিল, আমার দেহটার ওপয়েই শুধু যদি তােমায় লােভ হয়, তাই তুমি নাও, আমি চাই না কথা বলতে, চাই না তােমায় ভালবাসতে। মেনের সারাদেহ একাগ্র উত্তেজনায় তখন কাঁপিতেছে। সে দীপ্তির প্রতিটি অঙ্গে হাত বুলাইতে লাগিল, অকারণে তাহার হাতটা কঠিন মুঠার মধ্যে ধরিয়া নিপীড়িত করিতে লাগিল। কিন্তু একটু পরেই নিজের আচরণে লজ্জিত হইয়া তাহাকে ছাড়িয়া দিল। এ কী করিতেছে লে, কাণ্ডজ্ঞান কি তাহার লােপ পাইল! তাহায় লজ্জাটা কমে ক্রোধের আকার ধারণ করিল,-ঐটুকু মেয়েরই বা এত কিসের জেদ ? এত অহঙ্কার কেন ? দীপ্তি কি ভাবে রমেনকে বিবাহ করিয়া মাখা কিনিয়াছে ? সে পাশ ফিরিয়া দেওয়ালের দিকে মুখ করিয়া শুইল পাক দীপ্তি তাহার অহঙ্কার লইয়ারমেন আর সাখিবে না। দীপ্তিও বুঝিতে পারিল না, কোথা দিয়া কি করিয়া এমনটা হইল। সে চুপ করিয়া শুইয়া রহিল। ধারায় ধারায় তাহার চোখের জল ঝরিয়া পড়িয়া ফুলশয্যার নূতন বালিশ ভিজিতে লাগিল। এমনি করিয়া দুটি নববিবাহিত নরনারী অন্তরের অগাধ আশা আকাঙ্ক্ষা কামনা বুকে করিয়া নীরবে পাশাপাশি শুইয়া রহিল। এবং তাহাদের সেই বেদনাকে উপহাস করিয়াই যেন ঘড়িটা অন্ধকারের মধ্যে টিক্ টিক্ শব্দ করিতে লাগিল। ভােরের আলাে শাশির গায়ে লাগিতেই রমেন ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল। সেই ম্লান আলােতে প্রথমেই তাহার চোখে পড়িল —দীপ্তি কাদিতেছে। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে সমস্ত রাগ মন হইতে চলিয়া গিয়া সে জায়গায় পূর্বেকার আনন্দ আসিয়া জুড়িয়া বসিল। সে ব্যাকুল ভাবে তাহার হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে ধরিয়া কহিল, দীপু, কি হয়েছে আমায় বলল, লক্ষ্মীটি। বাপের বাড়ীর জন্যে মন কেমন করছে? না, আমারই কোন কাজে ব্যথা পেয়েছ? বল, লক্ষ্মীটি, তােমার পায়ে পড়ি। দীপ্তির চোখের জল বি বাড়িয়া গেল। এই কথাগুলি এতক্ষণ কোথায় ছিল? এমন করিয়া আগে বলিলে ত তাহার ফুলশয্যার রাত্রি ব্যর্থ হইয়া যাইত না। রমেন তাহাকে খানিকটা তুলিয়া বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া বলিল, আমাকে এমন করে কষ্ট দিয়ে তােমার লাভ কি হচ্ছে, দীপু এই ত। দীপ্তির বুক জ্বলিয়া উঠিল। অনিল অনুপমার দল যাহা বলিয়া দিয়াছে, এতক্ষণ পরে বুঝি তাহা মিলিতে চলিল। সে অধীর আগ্রহে অধিকতর মিনতির প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। কিন্তু রমেন আবারও ভুল বুঝিল। সে রাগ করিয়া তাহাকে নামাইয়া দিয়া এর হইতে বাহির হইয়া গেল। দীপ্তি কিছুক্ষণ কাঠ হইয়া শুইয়া রহিল। কিছুতেই সে তাহার দুর্ভাগ্যের কারণ বুঝিতে পারিল না। এমনি করিয়াই কি সারা জীবন অমৃতের পাত্র তাহার মুখের কাছে আসিয়া ফিরিয়া যাইবে ? এ কি তাহারই সূচনা? সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া শুষ্ক মুখে জানালার কাছে আসিয়া গড়াইল। বাহিরের পাণ্ডুর আকাশের দিকে চাহিয়া মনে মনে কহিল, ঠাকুর, একটিবার সে ফিরে আসুক, এবার নিজেই পায়ে ধরে তার কাছে মাপ চাইব। নীচের ঘরে বসিয়া তখন রমেনও ভাবিতেছে, অত রাগ না করলেও চলত। ছেলেমানুষ, আমারই উচিত ছিল, হাতে পায়ে ধরে তার ভয় ভাঙানাে। বিশ্বদেবতা পূৰ্বাকাশে বসিয়া হাসিয়া উঠিলেন।

প্রত্যহের স্পর্শ মালপত্র গুছাইয়া, বিছানা পাতিয়া দিতে দিতেই গাড়ি ছাড়িবার যা দিল। চাকর রামশরণ এ গাড়ি হইতে নামিয় যখন নিজের গাড়িতে গিয়া উঠিল, তখন ট্রেনখানা অল্প-অল্প চলিতে শুরু করিয়াছে। প্রতিমা কহিল, হা গা, ও ঠিক গাড়িতে উঠতে পারল ত? বিনয় খােলা দরজা দিয়া মুখ বাড়াইয়া কহিল, হা উঠেছে ঠিক। তাহার পর দরজাটা ভাল করিয়া বন্ধ করিয়া দিয়া প্রতিমার পাশে ধপাস করিয়া বসিয়া পড়িয়া কহিল, বিয়েটা আমাদের তাহলে হল শেষ পর্যন্ত। কি বলে? প্রতিমা লজ্জিত-তিমুখে বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল, কথা কহিতে পারিল না। বাস্তবিক, ব্যাপারটা অনুভব করিতে কিছু সময় লাগারই কথা। যে বাধা এবং লাঞ্ছনা সহ করিতে হইয়াছে তাহাদের, সমস্তগুলা লিপিবদ্ধ করিলে মহাভারতের মত একটা বিরাট পুথি হইয়া যায়। পর পর সব ব্যাপারটা যেন বিদ্যুৎলেখার মত একবার প্রতিমার চোখের সামনে দিয়া চলিয়া গেল। সে শিহরিয়া উঠিয়াবিনয়ের গা বেষিয়া বসিল।

ব্যস্ত হইয়া বিনয় কহিল, কি হলো? এতিমা কহিল, কিছু না। বিয়ের কথাটাই ভাবছিলুম। বিনয় কহিল, তা বটে। তাহারও সব কথা মনে পড়িয়া গেল। রীতিমত উপন্যাস লেখা যায় তাহাদের বিবাহের ইতিহাসটা লইয়া। বিনয়ের বাবা ও প্রতিমার বাবা প্রতিবেশী হইলেও খুব বন্ধু কখনই ছিলেন না। মেয়েদের মধ্যে আসা- যাওয়া ছিল, সেটা তাঁহারা বন্ধ করিতে পারেন নাই—যদিচ সেখানেও একটা যে খুব প্রীতির সম্পর্ক ছিল তা নয়—কিন্তু পুরুষ দুটির মধ্যে সামান্য একটু সেঁতে হাসি ছাড়া কোন বাক্য বিনিময় হইত দৈবাৎ, হয়ত বৎসরে একদিন। প্রতিমার বাবা রমেশবাবু ছিলেন বিনয়ের বাবা সত্যবাবুর মতে=‘হাড় কেপ্পন' এবং রমেশবাবু বলিতেন সত্যবাবুকে ‘চামার’, ‘দেমকে মাটিতে পা পড়ে না ইত্যাদি সত্যবাবু বড় চাকরী করিতেন, সেই হেতু ভাল চাকরী যাহারা করে না, তাহাদের একটু কৃপায় চোখেই দেখিতেন তিনি। আর রমেশবাবুর ছিল সামান্য আরবিরাট সংসার চালাইতে হইত তঁাহাকে অনেক হিসাব করিয়া, সুতরাং মিতব্যয়ী না হইয়া উপায় ছিল না।•••উভয়ের মধ্যে সদ্ভাব ত’ ছিলই না, বরং সামাজিক ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ হইলে ঠোকাঠুকিও চলিত বেশ, যদিচ সবটাই হাসিমুখে। এহেন সত্যবাবুর একমাত্র পুত্র বিনয় যখন এম-এস-সিতে প্রথম হইয়া নিজেই তষি-তদারক করিয়া একটা মােটা সরকারী চাকরী বাগাইয়া বসিল, তখন সত্যবাবুর গর্ব ও আনন্দের অবধি রহিল না, তিনি মনে মনে জমিদারের কোন রূপসী কন্যার সহিত পঞ্চাশ হাজার টাকায় যৌতুকের স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু বিনয়ই দিল সব মাটি করিয়া-হঠাৎ সে বলিয়া বসিল যে, রমেশবাবুর কন্যা প্রতিমাকেই সে বিবাহ করিবে। আর ঠিক সেই সময়ে প্রতিমাও তাহার মাকে দিয়া রমেশবাবুকে জানাইল যে, সে সাবিত্রীর মত মনে মনে বিনয়কেই স্বামী ঠিক করিয়া রাখিয়াছে। রমেশবাবুও বলিলেন, ‘না’—সত্যবাবুও তাই। ব্যাপারটা হয়ত শেষ পর্যন্ত ঢাকুরিয়া লেকের ধারে হাস্যকর বিয়োগান্ত পরিণতিতেই পৌছিত, যদি-না দুটি বড় রকমের ভয় থাকিত। বিনয় তখনই পাঁচশত টাকা মাহিনা পাইতেছে—সে ভয় দেখাইল যে, সে পৃথক হইয়া স্বেচ্ছায় প্রতিমাকে বিবাহ করিবে এবং প্রতিমা ভয় দেখাইল যে, তাহার একুশ বৎসর বয়স হইয়াছে, সুতরাং বাবার বিনা অনুমতিতে বিবাহ করিলে তাহার আটকায় না, সে কথা সে জানে এবং বাবা পুনর্বিবেচনা না করিলে তাহাই করিবে। সুতরাং অনেক বকাবকি, অনেক অপ্রীতিকর আলােচনা, পরস্পরের প্রতি প্রকাশ্যে ও পরােক্ষে বহু বাক্যবাণ বর্ষণের পর উভয় পক্ষই নরম হইলেন এবং বিবাহের কথাটা পাকাপাকিও হইয়া গেল। তবু কি নির্বিল্পে কাজটা চুকিয়াছে ? শেষ মুহূর্তেও সত্যবাবু গৃহিণীকে দিয়া বলাইলেন যে, এ-বিবাহ যদি হয় ত’ একদিন তাহাকে গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করিতে হইবে। বিনয় সব কথা শুনিয়া বলিয়াছিল, তা বেশ ভ’, উনি যদি আমার ইচ্ছায় বাধা না দেন ত আমি ওর ইচ্ছায় বাধা দেৰ না। মােচ্ছ। বিষয়- আশয় কোথায় কি করে রেখে গেলেন, ভাল করে লিখে রেখে যেতে মা কাত্যায়নী শিহরিয়া উঠিয়া বলিয়াছিলেন, বলিস কীরে, মুখে উচ্চারণ করতে পারলি। ঐ রাক্ষুসী তােকে ও করেছে-নিশ্চয়ই। নইলে তুই ত এমন ছিলি না! বিনয় কহিয়াছিল, বাবাকে তােমার চেয়ে বেশী চিনি না, তাই বলতে পারলুম। সত্যই সে বেশী চিনিত। কথাটা গৃহিণীর মুখে শুনিয়া প্রখমটা সত্যবাবু কালিয়া উঠিয়াছিলেন, হয়ত সুযােগসুবিধা থাকিলে, তখনই কি করিয়া বসিতেন বলা যায় না; কিন্তু পরে বিষয়-আশয়ের কথা যতই মনে হইতে লাগিল, বিশেষ করিয়া এখন তিনি মরিলে ঐ ‘হাড় কেন রমেশটার কত সুবিধা হইতে পারে এবং না মরিলে হেলের আয় হইতে টাকা সুমাইয়া আরও বিষয়-আশয় বাড়ানো যাইতে পারে —এই সব কথা যতই মনে মনে তােলাপাড়া করিতে লাগিলেন, ততই মরিবার ইচ্ছা তাহার লোপ পাইতে লাগিল। ছেলের কথায় যে নিদারুণ ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা আসিয়াছিল জীবন সম্বন্ধে, তাহাকে দমন করিয়া নিমন্ত্রণের ফ করিতে বসিলেন। কিন্তু তবু, কতটা যে তাহাকে সহ করিতে হইল, তাহাও বিনয়ের অবিদিত ছিল না। সে কথা ভাবিতে ভাবিতে এক সময়ে বলিয়া ফেলিল, সত্যি, মা-বাপের বা অভিশাপ কুড়ােনাে হ’ল-ফল কী হৰে তাই ভাবছি। কথাটা খুবই হালকা সুয়ে সে বলিল-পরিহাস ৰলিয়াও মনে করা চলিত। তবু কোথায় যেন প্রতিমার দিবাস্বপ্নে আঘাত লাগিল। একটু মু-কণ্ঠে বলিল, তােমার কি এখন অনুতাপ হচ্ছে।

, ঠিক অনুতাপ নয়। তবে ভাবছি যে, এত কাণ্ডের কীই বা দরকার ছিল। এটা যেন জেদের মধ্যে পড়েই করা হ’ল না কি ? সত্যিই যদি তোমার অন্য জায়গায় বিয়ে হত, তাহলে কি ভয়ঙ্কর কিছু করতে তুমি? দু-চারদিন মনে একটু কষ্ট হত, তারপর আবার সব ভুলে মনের সুখে থাকা কমতে বিনয় হাসিল। প্রতিমাও হাসিবার চেষ্টা করিয়া প্রশ্ন করিল, আর তুমি। তুমিই কি আর ভয়ঙ্কর কিছু করতে। তাচ্ছিল্যের সুরে বিনয় বলিল, কিছু না, কিছু না। জীবনে এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় আছে নাকি? আমিও ঐ দুদিনেই তুলতুম। হঠাৎ প্রতিমার মুখের দিকে চোখ পড়িতে কণ্ঠে অস্বাভাবিক রকমের চাপল্য আনিয় বিনয় কহিল, সে যাক গে, যখন অত কিছু হয়নি তখন আর চিন্তা কি ? যা হয়েছে-তা না হলে কি হ'ত, সে কথা এখন থাক। বিনয় যত সহজে কথাটা উড়াইয়া দিল, প্রতিমা ততটা সহজে পারি না। সে মনে মনে গভীর আঘাত পাইল। সে বাঙালীর ঘরের মেয়ে হইয়া বাপ-মায়ের সম্পূর্ণ অমতে, লােক-লজ্জা বিসর্জন দিয়া, সমাজের ভয় না করিয়া একান্তভাবে বিনয়কে পাইবার অন্য নে সাধনা করিয়াছে-এই কি তাহার পরিণাম? কী না করিয়াছে সে। কোন লানা, কোন বাক্যবাণকে সে গ্রাহ্য করে নাই—ভবিষ্যতের কোন ভাবনা সে ভাবে নাই। সম্পূর্ণভাবে সেই পরের গােপিনীদের মতই নিজেকে সে সঁপিয়া দিয়াছে বিনয়ের পায়ে-সে কী এই জয়। তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িল। অথচ বিনয়, যে বিনয়কে গত দুই বৎসর ধরিয়া অহর্নিশি স্বপ্ন দেখিয়াছে সে, সে ত’ এমন ছিল না। প্রতিমার মনে পড়িল তাহার প্রথম কৈশােরের কথা। ঘরে পড়া হয় না বলিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে বিনয় ঘাের শীতেও ভােরবেলা ছাদে পড়িতে উঠিত-বই হাতে করিয়া সে পায়চারী করিত আর অমনভাবে মুখস্থ করিতে করিতে চাহিয়া থাকিত পাশের বাড়ির দিকে—কখন প্রতিমা তাহাদের ছাদে উঠিবে বা ভিতরের বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইবে এই আশায়। শুধু এইটুকুর জন্যই সে সন্ধ্যার পর অন্ধকার হওয়া সত্ত্বেও ছাল ছাড়িতে চাহিত না; ইহার জন্য মা কত অনুযােগ করিয়াছেন, হ্যারে, এত রাত অবধি হিমে থাকিস কেন? অন্ধকারে কী লেখাপড়া হয় ?সে সব কি শুধু স্বপ্ন? সব মিথ্যা। কাজে-কর্মে বা অন্য কোন প্রয়োজনে যখন দু’জনে দেখা হইত, প্রতিমার মনে পড়িল, বিনয় কোন কথা কহিতে পারিত না, শুধু নীরবে দাড়াইয়া মিত। কথা কহিলেও গলা ফাপিত তাহার। অথচ তখন প্রতিমা কতই ছােট, এ-সবের মর্ম সে কিছুই বুঝিত না। শুধু বিনয়কে দেখিতে তাহার ভাল লাগিত, এইটুকুই আনিত সে। প্রথম বিনয়ের কথা চিন্তা করিয়া বিনিরজনী বাপন করে যে দিনটিতে-সে দিনের কথা তাহাব আজও মনে আছে। সেটা বি-এস-সি পরীক্ষার সময়, বােধ কেমিস্ট্রী প্র্যাকটিক্যালের আগের দিন, বিনয়দের বাড়িতে সে আসিয়াছিল সিন্নি উপলক্ষ্যে, প্রশ্ন করিয়াছিল বিনয়কে; কেমন পরীক্ষা বিচ্ছ বিদা, ফাস্ট হতে পাৰে ত?

বিনয় উত্তর দিয়াছিল, ফাড়া আছে কালকের দিনটায়, যদি নার্ভাস না হই, তাহলে কোন ভয় নেই- তাহার পর একটু থামিয়া গলা নমাইয়া বলিয়াছিল, না, ভালই দেব। নাভাস বোধ করলে একবার চোখ বুজে তােমাকে ভেবে নেব মনে মনে প্রতিমা, তাহলে মনে হয় পাব। প্রতিমার কানের পাশ দুইটা সহসা উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল। বেশী কথা কহিতে পারে নাই, শুধু বাড়ি আসিয়া সেদিন সে সারারাত জাগিয়া ছিল, ঘুমাইতে পারে নাই। সেদিনই সে প্রথম অনুভব করে যে, বিনয়কে সে ভালবাসিয়াছে।••• তাহার পরের বৎসরই প্রতিমা মাটি কুলেশন পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার আগে সে বিনয়ের মাকে প্রণাম করিতে আসিয়াছিল এ- বাড়ীতে। মাকে প্রণাম করিয়া সে বিনয়ের ঘরেও ঢুকিয়াছিল, প্রণাম করিয়া উঠিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল, কৈ আশীর্বাদ করলে না, বিনুদা? বিনয় বসিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল, কি আশীর্বাদ করব? —এই আমি যেন ভাল করে পাশ করি। -সে ত করবেই-আমার যােগ্য হতে হবে ত তােমাকে। সামান্য কয়েকটি কথা-হয়ত বা অর্থহীন, তবু যেন সেইদিনই প্রতিমার ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হইয়া গিয়াছিল, সেই-দিনই যেন নিশ্চিতরূপে ঠিক হইয়া গিয়াছিল যে, প্রতিমার যত কিছু সাধনার একমাত্র লক্ষ্য বিনয়ই।•••সেদিন পরীক্ষা দিতে বসিয়া বারবার প্রতিমা উন্মন হইয়া গিয়াছিল, প্রশ্নপত্রের মধ্যে যেন ছাপার হরপে কথা কয়টা ফুটিয়া উঠিতেছিল বারবার—এবং হয়ত সেইজন্যই, প্রতিমার ফাস্ট ডিভিসনে পাশ করা হয় নাই।••• কথাগুলি আদ্যপান্ত ভাবিতে ভাবিতে প্রতিমা যেন মনে জোর পাইল। এমনি করিয়া তিলে তিলে যে প্রেম তাহাদের মধ্যে গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা কি একেবারে অর্থহীন হইতে পারে? না, না, কখনই না। সে যেন ঘুম ভাঙ্গিয়া উঠিয়া ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিল বিনয়ের দিকে। সবল, বলিষ্ঠ, সুন্দর স্বামী তাহার, আনন্দময় ভবিষ্যৎ তাহার সম্মুখে এসব কী ছাইভস্ম ভাবিতেছে সে?.. বিনয়ও যদি তাহার কথা অহনিশি না ভাবিত, যদি তাহাকে পাইবার জন্য যথাসর্বস্ব ত্যাগ করিতে প্রস্তুত না হইত, তাহা হইলে কি শুধু প্রতিমার ইচ্ছায় এ বিবাহ সম্ভব হইত। বিনয়ও ত কম লাঞ্ছনা সহ্য করে নাই।•••তাছাড়া এই যে ফুলশয্যার পরের দিনই এই ব্যবস্থা-এ সবই ত সে করিয়াছে। এখানে বধুকে ফেলিয়া রাখিয়া গেলে যে তাহার বাপ-মায়ের কাছে বহু গঞ্জনা সহ্য করিতে হইবে প্রতিমাকে, তাহা বিনয় নিত। তাই সে জোর কমিয়া এই ব্যবস্থা করিয়াছে। অফিসের ছুটি এখনও আছে, কিন্তু বিনয় মিথ্যাকথা বলিয়া ঠিক বৌ-ভাতের পরের দিনটিতেই যাত্রার ব্যবস্থা করিয়াছিল। বই অর্থব্যয় করিয়া ফাস্ট ক্লাস কুপে’ রিজার্ভ করা এবং দ্রুতগামী মেল ট্রেনের পরিবর্তে এক্সপ্রেস ট্রেনে যাওয়ার ব্যবস্থা করা, যাহাতে তাহার মধুচন্দ্রমা ক্ষুদ্র কামরার মধ্যে নিবিড়ভাবে জমে -এ সবই যে বিনয় করিয়াছে, তাহাতে ত সন্দেহ নাই। তাহার এত সাধনা, এত তপস্যার ফলকে বিনয় একান্ত করিয়া নিভৃতে অনুভব করিতে চায়।

অকস্মাৎ সশষ একটা উদার তুলিয়া বিনয় নড়িয়া চড়িয়া তাল করিয়া বসিল। সেও এতক্ষণ কী ভাবিতেছিল, বােধ হয় বাবার কথাই । সহসা এখন চমক ভাঙ্গিয়া প্রতিমাকে বলিল, ত ডাত ড়িতে, টগে খাওয়া কিছুই হয়নি। তােমার ও বােথ হয় তাই না? এতিমা লজ্জিত-নতমুখে ঘাড় নাড়িয়া জবাব দিল, খাওয়ার ইচ্ছাই কি আছে এখন? ওসব কথা এ ক'দিন মনেও ছিল না- তা বটে। মােজা ছুটোছুটি করে তেষ্টা পেয়েছে খুব। ফ্লাস্ক থেকে একটু চা ঢাললা দেখি। প্রতিমার মুখ শুকাইয়া উঠিল। ভয়ে ভয়ে কহিল, চা ত নেই এতে- নেই। সেকি। বিনয়ের কঠ তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিল। প্রতিমা অপ্রতিভ হইয়া কহিল, মাকে দু-তিনবার বলেছিলুম ; কিন্তু তিনি অত গ্রাহ করেননি। একেবারে বেরােবার সময় দেখলুম, তৈরি হয়নি তখনও- বেশ! অত্যন্ত বিরক্তকণ্ঠে বিনয় কহিল, বেশ হয়েছে। করে যেটা বলে দিলুম, সেইটেই হল না। ট্রেনে উঠলে আমার মুহু তেষ্টা পায়, তা ত জানেনা।তুমি ত আর এ বাড়িতে একেবারে নতুন নও, মাকে না বলে নিজেও ত করে নিতে পারতে। তুমি মা আমার সংসার চালাবে, তা এই নমুনাতেই বুঝেছি। প্রতিমা নতমুখে বসিয়া রহিল, জবাব দিল না। এ তিরস্কার তার প্রাপ্য নয়, সে এ বাড়ির পরিচিত মেয়ে হইলেও আজ সে নববধু, আই যদি গৃহিণীকে ডিঙাইয়া গৃহিণীপনা করিতে যায় তাহা হইলে চারিদিকে তার যে দুর্নাম রটিবে, তাহার সীমা-সংখ্যা নাই। এ সব কথাই সে বিনয়কে বলিতে পারি, কিন্তু তাহার প্রবৃত্তি হইল । সামান্য ক্রটিতে যে এমন মর্মান্তিক তিরস্কার করিতে পারে, তাহাকে কী-ই বা বলিবে সে। বিনয় তখনও আপন মনেই বকিয়া চলিয়াছে, সেই ব্যাণ্ডেলের আগে এ গাড়ি থামবে না, সেখানেও চা পাবে কি না, তার ঠিক কি? কোরের লােক কি আর এই ঠিকদুপুরে গাড়ির ধারে আসবে খোজ কতে? প্রতিমা একটু পরে কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করিয়া প্রশ্ন করিল, স্পিরিটল্যাম্প ত সঙ্গেই রয়েছে, জেলে চা করে দেবে ? পায়রা ত দাও না, শুনছই ত যে আমার বিষম তেষ্টা পেয়েছে টিফিনের ঝুড়িতে সে স্পিরিটল্যাম্প, শিশিতে স্পিরিট, টিনের দুধ, চা চিনি সবই গুছাইয়া লইয়াছিল। অবশ্য এ নির্দেশও বিনয়ের-ফুল- শয্যার রাত্রে সে এই সৰ নিৰ্দেশই দিয়াছে বেশি—অন্য কথা খুবই কম হইয়াছে তাহাদের। প্রতিমা ছােট প্যানটা করিয়া কুঁজা হইতে অল লইয়া চাপাইয়া দিল। বিনয় তখন টাইম-টেবল দেখিতে ব্যস্ত ছিল, সহসা মুখ তুলিয়া কহিল, বলি ও কি হচ্ছে। জানলাগুলাে বন্ধ করােনি, এই বাতাসে কতক্ষণে জল গরম করবে?আঁচ ত সব বাইরেই যাচ্ছে, প্যানের গায়ে লাগছে কে? প্রতিমা তাড়াতাড়ি উঠিয়া সার্সিগুলো বন্ধ করিয়া দিল। দোষ তাহারই, বাৰিক এ কথাটা তাহারই ভাবা উচিত ছিল আগে, তবু বিনয়ের তিয়ারের ভঙ্গিতে তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িল। সে বিনয়ের দিকে পিছন ফিরিয়া এল দেখিবার চুতা করিয়া গােপনে চোখ মুছিয়া ফেলিল।••• চা প্রস্তুত হইল। পেয়ালটা প্রতিমার হাত হইতে লইয়া একটা চুমুক দিয়া বিনয় আরামচক একটা ধ্বনি করিয়া কহিল, তােমার কৈ? প্রতিমা মৃদুস্বরে কহিল, আমি এখন খাবাে না। এমন সময়ে চা আমার ভাল লাগে না। বিনয়ের কতক্ষণ আরও দু-এক চুমুক পেটে পড়িয়াছে। সে অপেক্ষাকৃত স্নিগ্ধ কণ্ঠে কহিল, তবু একটু খেলে পারতে—কদিন যা ট্রেন যাচ্ছে, তার ওপর আজ সকাল থেকে ইড়োহুড়ির ত শেষ নেই।•••তোমার মুখটা বড্ডই শুকনাে দেখাচ্ছে, শােও না একটু। প্রতিমা ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, না। এত কাণ্ডের পর, জীবনে এই প্রথম তাহার নিভৃতে নিশ্চিন্তভাবে মিলিত হইয়াছে-সে কি খুমাইবার জন্য। চায়ের পেয়ালাটা নামাইয়া রাখিয়া বিনয় কহিল, তাহলে আমি একটু গড়িয়ে নিই, কি বলে? শােও না—বলিয়া প্রতিমা আর একটু ধারে সরিয়া বসিল। ভাবিয়াছিল বিনয় বোধ হয় তাহার কোলেই মাথা দিয়া গুইবে, কিন্তু বিনয় সে পার দিয়াই গেল না, বালিশ দু’টা ঠিক করিয়া সাজাইয়া সে বেশ ভাল করিয়াই শুছাইয়া ইল। এ-ও এতিমায় একটা স্বপ্ন ছিল বৈকি। কঁাথার মত ঘন কালো চুল বিনয়ের, কতবার প্রতিমার লােভ হইয়াছে ঐ চুলের মধ্যে আঙুল চালাইয়া বিনয়ের মাথায় হাত বুলাইয়া দেয়, কিন্তু এতদিন সুযােগ হয় নাই। এখন বিনয় তাহার কোলে মাথা দিলে সে নিশ্চয়ই তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিত, কিন্তু সামান্য বালিশের ব্যবধানে এমন একটা দূরত্ব রচিত হইল যে, তাহার ঠিক সাহসে কুদাইল না- মনে হইল কি জানি, যদি কিছু মনে করে বিনয় । এই কথাটাই ভাবিতেছে সে, সহসা বিনয়ের নাক-ডাকার শব্দে প্রতিমার চমক ভাঙিল। বিনয়ের যে নাক ডাকে—এটা প্রতিমা জানিত না। সে একটু বিস্মিত হইয়াই চাহিল বিনয়ের দিকে। অঘােরে ঘুমাইতেছে, ক’দিনের অত্যাচার আর রানি-জাগরণে চোখটা তাহার অনেকখানিই বসিয়া গিয়াছে, ফলে গালের উপরের হাড় দুইটা দেখাইতেছে বেশী রকমের উচু, আর নাকটাও যেন তাহার অস্বাভাবিক মােটা। ঘুমন্ত বিনয়ের মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া অকস্মাৎ প্রতিমার মনে হইল—এ যেন সে সুন্দর বিনয় নয়—এ যেন আর কেহ! ছি, ছি-এ কী ভাবিতেছে সে। প্রতিমা যেন নিজের উপরেই বিরক্ত এবং লজ্জিত হইয়া দাঁড়াইল। আজ তাহার কি হইয়াছে, এ সৰ কি ছাই ভন্ম তাহার মনে হইতেছে ?•••সে বাথরুমে গিয়া মুখে চোখে জল দিয়া আসিয়া বসিল। এবারে কাের করিয়া সে বাহিরের দিকে চাহিয়া থাকিবে, অন্য কথা ভাবিবে।•• ব্যাণ্ডেল স্টেশনে গাড়ি থামিতেই বিনয়ের ঘুম ভাঙিয়া গেল। ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া দেখিল প্রতিমা তাহার শিয়রে বসিয়া ৭২ বসিয়াই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। একবার বিল সে তাহাকে ডাকিয়া ভাল করিয়া শােয়াইয়া দেয়, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হইল তাহাতে ঘুম ভাঙিয়া যাইবার সম্ভাবনাই বেশী এবং একবার ঘুম ভাঙিলে লজ্জায় সে আর হয়ত ঘুমাইতে চাহিবে না। উপরি-উপরি তিন-চার রাত্রিই ত বলিতে গেলে জাগিয়া আছে বেচারী, ঘুমাইতে পারে ত ঘুমাক। রিফ্রেশমেন্টের চাপরাশী আসিয়া দাঁড়াইল। তাহাকে চা অানিতে ফরমাস করিয়া বিনয় একটা সিগারেট ধরাইল। ট্রেনে উঠিলেই তাহার মুহুর্মুহু চা লাগে। এমনিই সে চা যে একটু বেশী খায় তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। এই বদভ্যাসের জন্য আগে আগে বাবা কত তিরস্কার করিয়াছেন, তবু সে অভ্যাসটা ছাড়িতে পারে নাই।••• খাইতে বাবার কথাই মনে পড়িল। এ কয়দিন তিনি তাহার সহিত ভাল করিয়া কথাই বলেন নাই। আজও যাত্রার সময় সে যখন প্রণাম করিতে গেল তিনি তখন গম্ভীর হইয়াই রহিলেন, শুধু ‘গিয়ে চিঠি দিও' এই তিনটি শব্দ ছাড়া একটি কথাও কহিলেন । অথচ, বিনয়ের মনে পড়িল, বাবা বরাবরই তাহার সহিত গল্প করিতে ভালবাসেন। যখন সে নিতান্ত ঘােট, তেজারতির অ-আ-কও মানিত না, তখনই জাহারে বসিয়া বাবা প্রত্যই তাহার সহিত বৈষয়িক কথা আলােচনা করিতেন। একমাত্র ছেলে বলিয়া নয় শুধু, ছেলেটি তাঁহার বন্ধুর মতই আত্মার সহিত জড়াইয়া থাকিত বলিয়া—তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়া তাহার কত গর্ব, কত আনন্দ , বাবাকে বডই আঘাত করা হইয়াছে। কোথাকার জমিদারের চা খাইতে এক সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যা দেখিয়া তিনি পছন্দ করিয়া আসিয়াছিলেন, সেখানে কথাও একরকম দেয়া হইয়াছিল। কারণ তিনি জানিতেন, বিনয় কখনও তাহার ব্যবস্থার উপর কথা কহিবে না। অথচ-সে গৰ্ব তাহার ধুলিসাৎ হইল, মাথা হেঁট করিয়া তাহাকে জানাইতে হইল, এভাবে কথা দেওয়ার কোন অধিকারই তঁহার ছিল না।... সে মেয়ের ফোটোও বিনয় দেখিয়াছে। সত্যই সে রূপসী, আর নাকি অসম্ভব ঠাণ্ডা-অন্তত মা তাই বলেন। তাহার কাছে, বিনয় ঘুমন্ত প্রতিমার দিকে চাহিয়া দেখিল, প্রতিমা কিছুই নয়। প্রতিমার রূপ- গৌরব কোনদিনই ছিল না। রং বিনয়ের চেয়ে দুই-তিন পোচ কালাে, মুখেরও কোথাও কোন সৌষ্ঠব নাই! চোখ ছােট, খুৎনির কাছটা একটু বেশী সরু, চোখের কোলে অস্বাভাবিক কালী। না, রূপ দেখিয়া পছন্দ করার মত কিছু নাই। কীই বা আছে, গুণ? তাও ত এই যে বিনয় তাহার জন্য এতটা ত্যাগ স্বীকার করিয়া, এত কাণ্ড করিয়া, বলিতে গেলে সমস্ত সংসারের সহিত বিবাদ বাধাইল-তাহার সামান্যতম ইচ্ছাটাও মৰ্য্যাদা রাখিতে পারিল না প্রতিমা, সেখানেও এত ভুল। বাপ-মায়ের অভিশাপ কুড়াইয়া, সকলকে ত্যাগ করিয়া এক মাত্র তাহাকে বাছিয়া লইবার কী মূল্য দিল প্রতিমা? ছি !••• বিনয় আর একটা সিগারেট ধরাইয়া কাগজখানা টানিয়া লইল। এতিমা অঘােরে ঘুমাইতেছে, মুখটা ফাক হইয়া গিয়াছে, চোখের পল্লব অর্ধনিমীলিত, যেন মড়ার মত ঘুম। আশ্চর্য, ইহারই জন্য কি সে পাঞ্জাব মেলে না গিয়া পা এক্স প্রন বাছিয়া লইল, যাহাতে দীর্ঘ দুটি রাত্রি-দিন তাহার নিবিড় আনন্দে, অভিনব পরিবেশের মধ্যে কাটাইতে নমুনা। ৭) পায়ে-মুদীর্ঘ স্বপ্নের মত দুটি রাত্রি-দিন?••• প্রতিমা ত খুমেই অচেতন। এত ঘুম।•••এই অল্য বাধা-বিপত্তির পরে প্রথম মিলনের ক্ষণটিতে ঘুমাইতে পারিল সে ?•••অবশ্য বিনয় ও চোখ বুজিয়াছিল সত্য কথা, অতিরিক্ত পরিশ্রমে ও রাত্রি জাগরণে চোখটা না বুজিয়া পারে নাই, কিন্তু সে কতক্ষণই-বা, কয়েক মিনিট পরেই ত সে উঠিয়া বসিল। প্রতিমা আচ্ছা, কী দেখিয়া প্রতিমাকে এত ভালবাসিয়াছিল সে? ছেলে- মানুষী ত কম করে নাই প্রতিমাকে কেন্দ্র করিয়া!-কেন? প্রতিমার কণ্ঠস্বরের আভাসে তাহার বুক কঁপিয়া উঠিয়াছে গত চার বৎসরের প্রতিটি দিন-রাত্রি। এমন কী মূল্য আছে তাহার? বিনয় অনেক ভাবিয়া দেখিল, না, কোন মূল্যই নাই, এ তাহার নিজেরই প্রথম যৌবনের অপরিসীম তৃষ্ণা, হাতের কাছে আর কোন মেয়ে ছিল না বলিয়াই একমাত্র যে কিশােরী চোখের সামনে দেখা দিয়াছে, তাহাকেই কেন্দ্র করিয়া সে দিনের পর দিন মিথ্যা স্বপ্ন রচিয়াছে। কোন একটা স্টেশনের বাহিরে সিগনাল না পাইয়া গাড়িখানা হঠাৎ থামিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে বিনয়েরও যেন চমক তালি। ছি ছি, এ সব কি চিন্তা তাহার। এমন কথা তাহার মাথায় গেল কি করিয়া। প্রতিমার সম্বন্ধে এমন সব নিষ্ঠুর চিন্তা তাহার মাথায় আসে। আছে বৈকি প্রতিমার মূল্য।•••প্রতিমাও ত কম করে নাই তাহার জন্য। সে পুরুষ, মােটা টাকা মাহিনা পায়, বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান, তাহার পক্ষে বাপ-মায়ের সহিত ঝগড়া করা সােজা; কিন্তু প্রতিমার ত এ সব কোন সুবিধাই ছিল না। তবু সে করিয়াছে, সে কী একেবারেই নিরর্থক।

শুধু কি তাই? মনে আছে একবার তাহায় মায়ের-অনুগ্রহ হইয়াছিল। খুব বেশী রকমের নয়, তবু প্রতিমার সে কী কান্না, আর কাছে থাকিবার জন্য সে কি আকুলতা! যে রােগে সবাই ভয় পায়, সে রোগের সেবা করিতে পারিল না বলিয়া প্রতিমার সেদিনের সে কান্না কি ভুলিবার? প্রতিমা তাহাকে খুবই ভালবাসে, হয়ত সর্বস্ব দিয়াই ভালবাসে, সামা ত্রুটি ধরিয়া সে প্রেমের অমর্যাদা করা অমানুষের কাজ। বিন চঞ্চল হইয়া নড়িয়া বসিল, অকস্মাৎ যেন তাহার সেই প্রথম যৌবনের আবেগের সঞ্চার হইয়াছে তাহার মনে---এতদিন পরে। প্রতিমার একান্ত প্রেমের সমন্ত নিদর্শনগুলি ভীড় করিয়া মনে আসিতেছিল। সে বােধ হয় গত বছরের কথা, কী একটা উপলক্ষ্যে দুটি পিতার মধ্যে বিবাদটা কিছুদিনের জন্য বেশী রকম পাকিয়া উঠিয়াছিল, দুইজনে বহুদূর হইতে ছাড়া দেখা-সাক্ষাৎ হইত না-সেই সময়েই একদিন হঠাৎ একটা নির্জন অবসরে দুটি বারান্দায় দাঁড়াইয়া দুইজনে মিনিট খানেকের এ কথা কহিবার অবসর পাইয়াছিল। প্রতিমা বলিয়াছিল বিনয়কে, আমি আমাদের গলির ঐ পাথরগুলোকেও আজকাল হিংসে করতে শুরু করেছি। বিশিত হইয়া বিনয় প্রশ্ন করিয়াছিল, কেন? -তবুত তুমি মােজ ঐ পাথরগুলো মাড়িয়ে যাও, ওরা ত তােমাকে তে পার। সেদিনের কণ্ঠস্বর আজও মনে পড়িয়া বিনয়ের সারা দেহে খােমা হইল।•••না, সে প্রতিমাকে বিবাহ করিয়া একটুও ভুল করে নাই।

সে কাগজটা ফেলিয়া দিয়া কোকের মাথায় একেবারে ঘুমন্ত প্রতিমাকে জড়াইয়া ধরিল। ওগো শুনছ। ওঠো না, কত ঘুমােবে? প্রতিমা গাঢ় ঘুম হইতে আচম্বিতে জাগিয়া প্রথমটা কিছুই বুঝিতে পারিল না। রক্তাভ বিঘল দৃষ্টি মেলিয়া আচ্ছন্ন ভাবে চাহিয়া রহিল বিনয়ের মুখের দিকে। বিনয়ের অসহিষ্ণু আবেগ এই মৃঢ় বিহবলতাতে ঠেকিয়া যেন ধাক্কা খাইল। সে অপ্রসন্ন মুখে প্রতিমাকে ছাড়িয়া দিয়া আবার নিজের কাগজটা তুলিয়া লইল। কিন্তু প্রতিমার সে আচ্ছন্নভাব মুহুর্ত-কয়েক পরেই কাটিয়া গেল। সে সবেগে চোখ দুইটি রগড়াইয়া প্রকৃতিস্থ হইয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিল ; তারপর লজ্জিতভাবে কহিল, বডড ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, না? বিরক্তি বিনয়ের কণ্ঠ পৰ্য্যন্ত ঠেলিয়া উঠিয়াছিল, অতি কষ্টে চিত্ত দমন করিয়া স্থির হইয়া বসিয়া রহিল, জবাব দিল না। প্রতিমাও তাহার অন্ধকার মুখের দিকে চাহিয়া আর কথা কহিতে সাহস করিল না। অপরাধটা সহসা এক মিনিটের মধ্যে কি করিয়া এবং কোথায় বটিয়া গেল বুঝিতে না পারিয়া মুখে চোখে জল দিবার জন্য বাথরুমে চলিয়া গেল। একটু পরে ফিরিয়া কতকটা ভয়ে ভয়েই কহিল, চা একটু তৈরি কব, পাবে। কাগজটা হইতে মুখ না তুলিয়াই বিনয় জবাব দিল, তুমি খাও ত করাে, আমার দরকার নেই। আবার চুপচাপ। পাশাপাশি বসিয়া দুজনে দু’দিকে চাহিয়া হিল। ট্রেন চলিতেছে হ-হ করিয়া, কোন্ স্টেশন পার হইয়া গেল প্রতিমার তাহা জানা নাই-এমনভাবে আরও দুইটা দিন কেমন করিয়া কাটিবে তাহা সে ভাবিয়া পায় না। ইহার চেয়ে বাড়িতে থাকিলে ঢের ভাল হইত, তবু হাতে কাজ থাকিত, এত কাছাকাছি, অথচ এত দূরে ভাল লাগে না। • একটু পরেই ট্রেনের গতি কমিয়া বর্ধমান স্টেশনে গাড়ি আসিয়া দাঁড়াইল। হৈ-চৈ, লোকজন, প্রতিমা তবু একটু যেন প্রাণ পাইল। রামশরণ আসিল খোঁজ করিতে, কিছু চাই কি না। বিনয় তাহাকে টাকা দিয়া বলিল, যা ঐ স্টল থেকে তাল মিহিদানা কিনে নিয়ে আয়, আর চা দিতে বল কোরের লোককে রামশরণ চলিয়া গেল। দুজনেই প্লাটফর্মের দিকে চাহিয়া বসিয়া -বিষম ভীড়, পেপিষি চলিতেছে সামান্য মাত্র স্থানের জন্য। একটি বৃ ভদ্রলােক তাহারই মধ্যে যেন দিশাহারা হইয়া আসিয়া তাহাদের গাড়ির হাতলে হাত দিলেন। বিনয়ের সমস্ত বিরক্তিটা তাহার উপর গিয়া পড়িল, ওকি মশাই, দেখতে পাচ্ছেন না এটা কাস্ট ক্লাস, কানা নাকি? কবর যেমন রুক্ষ, তেননি অপমানকর। বৃদ্ধটি একটু অপ্রতিত হইয়া কহিলেন, দেখেছি, আমার অবিশ্যি সেকেণ্ড ক্লাশ টিকিট, কিন্তু কি করব, জায়গা পেলুম না কোথাও। এখানেই উঠি, না হয় ফাস্ট ক্লাসের ভাড়াই দেব। যাবো সামান্য পথই, রাণীগঞ্জ পর্যন্ত। তিনি হাতল ঘুরাইয়া ফেলিয়াছিলেন। বিনয় উঠিয়া গিয়া কৰে তাঁহাকে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া দিয়া কহিল, দেখেছেন ত, আর একটু দেখতে হত! এটা রিজার্ভড়, গাড়ি। ভদ্রলােক অপ্রস্তুতভাবে কিছু মনে করবেন না বলিয়া আবার ভিড়ের মধ্যে ছুটাছুটি শুরু করিলেন। বিনয়ের এই অকারণ রূঢ়তায় এতিমার সমস্ত মনটা বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, সে আর থাকিতে না পারিয়া কহিল, ভদ্রলােক সামান্য পথ ত যেতেন, একটু উঠতে দিলেই হত।••"বুড়ােমানুষ হয়ত উঠতেই পারবেন না তেমনি তিক্ততার সহিতই বিনয় জবাব দিল, অত দয়া-দাক্ষিণ্য করবার জন্যে এক গাদা টাকা দিয়ে গাড়ি রিজার্ভ করিনি।...যত সব ননসেন্স। প্রতিমা চুপ করিয়া গেল। ইহার সহিত তর্ক করিয়া লাভ নাই। শােহনতাবােধ যুক্তি দিয়া মাথায় ঢোকানো যায় না। এই লােকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পরীক্ষা পাশ করিয়াছে—বিশ্বাস করিতেও যেন প্রবৃত্তি হয় না।•••অথচ, উচ্চশিক্ষিত স্বামীই তাহার আবাল্য কাম্য ছিল। সে যখন নিজে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়াছে সেই সময়ে বাবা একটি সম্বন্ধ আনিয়াছিলেন। পাত্রটি আই-এ ফেল, সরকারী চাকরী মাঝারী গৃহস্থ নিতান্তই সাধারণ পাত্র। সমস্ত গুনিয়া প্রতিমা নাক তুলিয়া বলিয়াছিল, কলকাতা ইউনিভার্সিটির আই-এ যে পাশ করতে পারেনি, তাকে বিয়ে করবার চেয়ে গলায় দড়ি দেওয়া ভাল বাবা। রমেশবাবু ঈষৎ অপ্রতিভভাবে বলিয়াছিলেন, লেখাপড়া শেখেনি বটে কিন্তু ছেলেটি ব ভ রে। করে।

হ্যা ভারি শু, লেখাপড়া শেখেনি সে আবার তন্দ্র। মেশবাবু খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া বলিয়াছিলেন, আমিও ত বেশী লেখাপড়া শিখিনি মা, তাহলে আমিও অভদ্র বন্! আমার মত বয়স যখন হবে তখন বুঝবি যে, অন্তত আমাদের দেশে শিক্ষা ও তা এক নয়- প্রতিমা অতিত হইয়া পড়িয়াছিল, জবাব দিতে পারে নাই। সে বিবাহ অবশ্য এর নাই, কিন্তু আজ এতদিন পরে সেই কথাগুলিই মনে পড়িয়া তাহার চোখে জল আসিয়া গেল।••• রামশরণ ইতিমধ্যে মিহিদানা লইয়া আসিল। প্রতিমা তাহার হাত হইতে চ্যাঙারীটা লইয়া প্লেটে করিয়া অর্ধেকেরও বেশী সাজাইয়া বিনয়ের সামনে দিল। রামশরণকেও একটা পাতায় করিয়া কিছু দিয়া বাকীটা সরাইয়া রাখিতেছে দেখিয়া বিনয় প্রশ্ন করিল, তুমি নিলে না? - প্রতিমা বাড় নাড়িয়া কহিল, আমার এখন খেতে ইচ্ছে নেই। বিনয় বিজপের সুরে কহিল, তা বটে।•••তােমাদের আবার খাবার ইচ্ছে না থাকাটাই চাল।•••আমি বাপু কিন্তু তােমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারব না। ট্রেনে উঠলেই আমার ক্ষিদে পায়- প্রতিমা শান্তকঠেই জবাব দিল, তুমি খাও না, সত্যিই আমার ক্ষিদে নেই- বিনয় তখন মুঠা মুঠা মিহিদানা মুখে পুরিতেছে। সেই অবস্থাতেই প্রায় বন্ধস্বরে বলিল, না খাও ত আমাকে আর দুটি দিতে পারো -নাও না। বলিয়া প্রতিমা তাহার প্লেট পুনরায় ভরিয়া দিল।

তাহার পর মৃদুকণ্ঠে কহিল, খাবারও ত চের রয়েছে সঙ্গে থাৰে কিছু। বার করে দেব। -না, বিনয় প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িল, ওসব খাওয়ার সময় ঢের পড়ে রয়েছে, এটা মিহিদানা খাকার ক্ষিদে, বুঝলে না প্রতিমা আর কথা না কহিয়া এক গ্লাস জল গড়াইয়া দিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বসিল। বিনয়ের সমস্ত মুখ-ভাবে যে একাগ্র লোলুপতা টিয়া উঠিয়াছে তাহা দেখা অন্তত প্রতিমার পক্ষে কঠিন। একটু পরেই জলের গ্লাসটা একনিঃশাসে শেষ করিয়া বিনয় কহিল, দাও, আর একটু জল দাও- বু ছােট, অলও বােধহয় পুরা ছিল না, তাহার উপর চা-পর্বে অনেকটা এল বাজে খরচ হইয়া গিয়াছে। এখন গড়াইতে গিয়া জাব গাসের বেশী হইল না। বিনয়ের কণ্ঠস্বর আবার তীক্ত হইয়া উঠিল, ওকি, জল আর নেই। প্রতিমা অপরাধীর মত নতমুখে জবাব দিল, না। আর এক পর্দা গলা চড়াইয়া বিনয় কহিল, তা সেটা বুঝি আর একটু আগে বলতে পারলে না। রামশরণকে দিয়ে আনিয়ে নেওয়া উচিত ছিল না তােমার ?•••মানুষের খাবার জল চাই; সেটাও ইস থাকে ?••সেই অণ্ডালে গিয়ে গাড়ি আবার থামবে—ততক্ষণ খাই কি?•• তুমি মানুষ না জন্তু। সে রাগ করিয়া মিহিদানার প্লেটটা সুদ্ধ জানলা গলাইয়া চুড়ি ফেলিয়া দিল। তার পর গ্লাসের জলটুকুতে হাত ধুইয়া চায়ের পেয়ালাটা তুলিয়া লইল।

এতিমা পাড় হইয়া বসিয়া রহিল-তাহার চোখের জলও এই তিরস্কারের কাঠিতে এবং আকস্মিকতায় বেন শুকাইয়া গিয়াছিল। গাড়ি হহ করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে। মধ্যাহ্ন অপরাহু গড়াইয়া পড়িল, অপরাঃ হইতে সন্ধ্যা। নির্জন গাড়ির মধ্যে দুইটি সদ্য বিবাহিত নারী তেমনি আড়ষ্ট হইয়া বসিয়া। অথচ এই যাত্রার কী এই না খিয়াছে ইহারা এই কয়দিন ধরিয়া। কেন এমন হইল, কাহার দেবে -তা কেহই বুঝিতে পারিল না। শুধু যে নির্জনতা আজ সকাল পর্যন্ত দুজনের একান্তকাম্য ছিল, এখন তাহাই যেন অভিশাপ হইয়া দাঁড়াইল। কে জানে, হয়ত তাহাদের বাসা বাঁধিবার কল্পনা, ভবিষ্যত জীবনের ও এমনি ভাবেই খান খান হইয়া দিয়া যাইবে।

সংশয় অতি সাধারণ একখানি চিঠি। সরকারী খামে মোড়া; বাহির হইতে যতটা বােঝা যায় চিঠির আয়তনও বেশী বড় নয়। টানা পুরুষালী হাতে ললিতার নাম-ঠিকানা লেখা। অর্থাৎ কোন প্রকার অসাধারণত্বের দাবী কোথাও তাহার মধ্যে ছিল না। আর, সমর যখন হাতে করিয়া চিঠিখানা লইল পিওনের হাত হইতে, তখনও সে তাহার জন্য এক মুহূর্তের বেশী মাথা ঘামায় নাই। অফিসের তখন বেলা হইয়া গিয়াছে, মানে নামিয়া সৰে একঘটি জল মাথায় ঢালিবে, এমন সময় কড়া নাড়ার শব্দ হইল। বিরক্ত হইয়া আর খুলিয়া দেখিল চিঠি-ঐ একখানি খামে মােড়া নিতান্ত সাধারণ চিঠি। তাও ললিতার নামে। সে অতি কষ্টে হাতের তেল বাঁচাইয়া টিমাত্র আঙুলের প্রান্তভাগ দিয়া খামখানা ধরিয়া হাঁক দিল, ওগো এছ। তাহার পর ললিতা উপস্থিত হইলে তোমার চিঠি বলিয়া খাম- খানা রকের উপর ছাড়িয়া ফেলিয়া দিয়া আবার কলতলায় চলিয়া গেল।...তাহার পর আর সে কথা তাহার মনেও ছিল না। ঠিক তেইশ মিনিটের মধ্যে জন, আহার, প্রসাধন সারিয়া বাসে চাপিতে হয় হাকে, তাহার পক্ষে আর মনে রাখা সম্ভবও নয়। কিন্তু তবু মনে পড়িল। অফিসে পৌছিয়া দেখিল হাতে কোন কাজ নাই। বেলা বারােটার আগে সেদিন সাহেব আসিবেন না, ফোন করিয়া জানাইয়াছেন; তিনি না আসিলে ডাকও খােলা হইবে , আর ডাক না খুলিলে তাহার কোন কাজও থাকিবে না। কারণ সে সাহেবের ব্যক্তিগত সেক্রেটারী। চিঠির জবাব দেওয়া, টাইপ ফয়, চিঠি পাঠানাে প্রভৃতি তাহার হাতে। যাহাই হউক-সে বেশ নিশ্চিত হইয়া টেবিলের প্রান্তে হাঁটু দুইটা তুলিয়া চেয়ারে কাৎ ইয়া খবরের কাগজটা চোখের সামনে মেলিয়া ধরিয়াছে, এমন সময় বেয়ায় আসিয়া একখানা চিঠি দিয়া গেল। তাহার নিজৰ চিঠি, অতি পরিচিত একটি হাতের লেখা, গােলাপী খাম। সমর সােলা হইয়া বসিল। সাতদিন ধরিয়া এই চিঠির প্রত্যাশা করিতেছিল সে- এইটুকুই এখন তাহার জীবনের একমাত্র রোম্যালে ঠেকিয়াছে। মাধবী তাহার বৌদিদির বােন। সে-বার অসুখ হইতে উঠিয়া ভাগলপুরে যখন হাওয়া বদলাইতে যায়, বৌদিদির বাপের বাড়িতেই মাস দুই থাকিতে হইয়াছিল। অবশ্য বৌদিদিই সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন, এক রকম জোর করিয়াই। সেই সময়েই মাধবীর সহিত তাহার পরিচয় হয়, কমে তাহা অন্তরঙ্গতায় দাড়ায়। দুজনের বিবাহের প্রস্তাবও হইয়াছিল একবার, কিন্তু সময়ের মা একবাড়িতে দুই কুটু করিতে রাজী হন নাই, বরং ভয় পাইয়া লেকে কলিকায় ফিরিতে আদেশ দিয়াছিলেন।

তাহার পর আর মাধবীর সহিত সময়ের বিশেষ দেখাসাক্ষাৎ হয় নাই-এক-আধবার দুই-একঘণ্টার জন্য হয়ত হইয়াছে, তাহাও সকলার সামনে। কিন্তু পত্র-ব্যবহারটা এখনও বক্ষায় আছে। প্রকাশ্যভাবে উভয়ের প্রেমালাপ কখন হয় নাই, চিঠিতেও সে রকম ভাষা কখনও লেখা হয় না, তবু দুজনের সম্পর্কের মধ্যে কোথায় যেন ব্যথার সুর একটু রহিয়া গিয়াছে। আর সেইটুকুই সময়ের মনে হয়, তাহাদের জীবনের রােমান্স!...সমর অবসর সময়ে একটু-আধটু সাহিত্যচর্চা করে, মাধবীরও সে রােগ আছে—দুজনের চিঠিতে সেই সব কথাই থাকে বেশী। সে হিসাবে চিঠিগুলি নির্দোষ, কিন্তু সময় সেই চিঠিগুলিকে কেন্দ্র করিয়াই কত কি রঙীন স্বপ্ন দেখেছি তা সার্থক হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। মাধবী এখনও কুমারী আছে বটে কিন্তু সময়কে বিবাহ করিতে হইয়াছে কতকটা বাধ্য হইয়াই- অবশ্য সে সময়ের বিশেষ দুঃখ নাই। ললিতাকে বিবাহ করিয়া সে এক রকম সুখীই হইয়াছে । এই দুই বৎসরে মাধবীকেও প্রায় সে ভুলিতে বসিয়াছে। হয়ত একেবারেই ভুলিয়া যাইত যদি এই পত্রগুলি কুড়ি-পঁচিশ দিন বা মাসখানেক অন্তত আসিতে থাকিত এবং সমরকেও কতকটা নেশায় পড়িয়া তাহার জবাব লিখিতে হইত। কিন্তু তবু, কে জানে কেন, এই চিঠিগুলির কথা সমর ললিতাকে জানাইতে পারে না। কিসের একটা সঙ্কোচ বাধা দেয় যেন। এমন কি আগে আগে চিঠি বাড়িতে আসিত, দৈবাৎ ললিতা দুল করিয়া একখানা চিঠি খুলিয়া ফেলায় সে মাধবীকে অফিসের ঠিকানাতেই চিঠি দিতে বলিয়াছে।... } সময় মাধবীর চিঠিখানা বার-দুই আদ্যোপান্ত পড়িল। ছােট চিঠি, তাহার চিঠিগুলি ক্রমেই ছােট হইয়া আসিতেছে। আর বাস্তবিক, বলিবারই বা কি আছে তাহাদের। সাহিত্য আর সাহিত্য, কত করা যায়। সমর একটু ম্লান হাসিল। দুইদিন পরে আরও হােট হইবে, আর ইতিমধ্যে যদি মাধবীর বিবাহ হইয়া যায় তাহা হইলে ত কথাই নাই, বাধ্য হইয়াই বন্ধ করিতে হইবে।... চিঠিখানা ছিড়িতে ছিড়িতে সহসা সময়ের মনে পড়িয়া গেল, সকালের চিঠিখানার কথা। কে লিখিল কে জানে। হন্তার সময়ের সম্পূর্ণ অপরিচিত, হয়ত কোন আত্মীয়-স্বজন হইবে, সময় এখনও ত সকলকে চেনে না। চিঠি ছেড়া শেষ করিয়া সময় আবার সংবাদপত্রে মন দিল। হিটলারের রাশিয়া অভিযান, চাচিলের বক্তৃতা, রুজভেল্টের কুটি এবং তােজোর চাতুরীর বহু সংবাদ পাঠ করিবার পরও মনটা ঘুরিয়া ফিরিয়া কিন্তু সেই চিঠিতেই ফিরিয়া আসিল। সত্যই ত, ললিতার বাপের বাড়ির এবং মামার বাড়ির প্রায় সকলার হাতের লেখার সঙ্গেই ত তাহার অল্পবিস্তর পরিচয় আছে, এত টানা শেখা কখনও ত চোখে পড়ে নাই। কে শিখিল ও চিঠি। ললিতাও অন্যদিন নিজেই বলে-কামুক চিঠি দিয়াছে’ ‘এই লিখিয়াছে, আজ ত কিছু বলিল না... না বলুক, সমর কখনই অপরের গােনর মধ্যে নাক-গলানো ভালবাসে না, ব্যক্তি-স্বাধীনতার সে বড় ভক্ত। তাহার চিঠিপত্র কেহ দেখিলে যেমন সে রাগ করে, অপরের চিঠি সম্বন্ধেও তেমনি কোনও ঔৎসুক্য তাহার নাই। সেবার ললিতা মাধবীর চিঠিখানা ভুল করিয়াই ছিড়িয়াছিল, তবু সমরের কাছে সে তাহাকে লাইন। সহিতে হয় নাই। অনেক কটু কথাই সে বলিয়াছিল, ললিতার চক্ষু সল হইবার পূর্ব পর্যন্ত সে তাহাকে রেহাই দেয় নাই। সময় আবার খবরের কাগজে মন দিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান মন্ত্রী কাপানকে ভয় দেখাইয়াছেন। চিয়াং কাই সেক চিঠি পাঠাইয়াছেন নেহেরুর কাছে—বাজে সব খবর!...আচ্ছা, ললিতার কোন বন্ধু পত্র দেয় নাই ত? নিজে ইংরাজিতে ঠিকানা লিখিতে পারে নাই বলিয়া স্বামীকে দিয়া শিখাইয়াছে, তাহাও ত হইতে পারে ?•••কিন্তু সে রকম কোন বর কথাও ত সমর ইতিপূর্বে শােনে নাই, না চিঠি আসিতেও দেখে নাই। কে লিখিত এ চিঠি কে জানে?... সাহেব আসিয়া পড়িয়াছেন, ডাক খােলা হইবে। সে তাড়াতাড়ি সাহেবের ঘরে গেল, হাতে নােট বুক ও পেন্সিল। সাহেব কতকগুলি চিঠি নীরবে পড়িলেন, সেগুলি ব্যক্তিগত চিঠি। কতকগুলি চিঠি সৰে পড়িলেন, এগুলির জবাব সমরই দিতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। আর কতকগুলি জবাব তিনি নিজেই বলিয়া দিলেন। কিন্তু সমর সেদিন যেন বড় বেশী অন্যমনস্ক, বার বার ভুল হইতে লাগিল। সাহেৰত মীতিমত মকই দিলেন একবার। সমর ললিত হইয়া নিজের সীটে কিরিয়া আসিল। কাৰ্য। কোথাকার কে একজন চিঠি লিখিল, তাহা ৰায় অপরকে, মাখান হইতে সময়ের এত মাথাব্যথা কেন? সে এই অনাবশ্যক কৌতুহলের জন্য নিজেকে মনে মনে যথেষ্ট তৎসনা করিল। এ কী অভদ্রতা। এই ত সে সেদিনও ললিতাকে শুনাইয়া গিয়াছে, চিঠি যাহারই আসুক না কেন, অপরের দেখা উচিত নয়। পােটকার্ড হাতে পড়িলেও না পড়িয়া অধিকারীকে দেওয়া উচিত। পরের চিঠি পড়া আর আড়িপাতা একই রকমের বদ অভ্যাস। আর আজ তাহার নিজেরই এই দুর্বলতা, ছিঃ। অবশ্য ললিতাকে একবার জিজ্ঞাসা করিলেই সব গােল চুকিয়া যায় বটে, কিন্তু এত কাণ্ডের পর এ কৌতূহল আর প্রকাশ করা যায়না। ললিতা কি মনে করিবে!...কথাটা ভাবিতেও সময়ের মুখ লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। বিবাহ হইয়া অবধি এই বিষয়টি লইয়া কম বক্তৃতা ত সমর দেয় নাই তাহাকে। বােধ হয় প্রত্যহ একবার করিয়া বলিয়াছে, আর সেদিন ত কথাই নাই--কী বলাই বলিয়াছে সে বেচারীকে। ললিতার শুধু কাঁদিতে বাকী ছিল। বাকী ছিল। • এত কাণ্ডের পর আর ললিতাকে জিজ্ঞাসা করা যায় না, চিঠিখানা কাহার। আর দরকারই বা কি। আর একবার সময় মনকে শাসাইল-কী একটা তুচ্ছ কথা লইয়া ভাবিতে বসিল সে। তাহার আজ মাথা খারাপ হইল নাকি?•••সে জোর করিয়া কাজে মন দিল। ফাজ তাহার কমই। সাহেব ঠিক তিনটায় চলিয়া যান, আর ঘণ্টাখানেক বলিয়া এটা-ওটা নাচাড়া করিয়া সেও উঠিয়া পড়ে। ওটুকু বসিতেই হয়, নহিলে অন্য কেরাণীদের চোখ টাটাইবে।•••সেখিন লে বরং মিনিট দশেক আগেই উঠিল। পখে এটা ওটা খুচরা বাজার সারিকা সে সােজা বাড়িতে ফিরিয়া গেল। এটাও জানিৰ ব্যাপার বলিতে হইবে, কারণ এদিন এখানে ওখানে আড়। দিয়া সে একেবারে স্যায় পয় বাড়ি ফেরে।

ললিতা অবাক হইয়া প্রশ্ন করিল, কী ভাগ্যি। এত যে সকল সকাল আজ? সমর জবাব দিল, এমনিই। বিশ্রী গরম পড়েছে, আজ আর ফুরতে ভাল লাগল না। তখনও যে তাহার চিঠিখানা সম্বন্ধে কৌতুহল ছিল, তাহা নিজের কাছেই স্বীকার করিতে তাহার লজ্জা করিতেছিল। কিন্তু তবু ছিল। কেন, তাহা সে নিজেই জানে না, তবু সমস্ত কথা, সমস্ত চিন্তায় কাকে ফাকে ঐ একখানি চিঠি বার বার উকি মারিতেছিল।•••অথচ কিছুতেই সে একটা নিতান্ত সাধারণ সহজ প্রশ্ন ভরসা করিয়া ললিতাকে বিলা করিতে পারিতেছিল না। নিজের বিবেকের কাছেই পায় মরিয়া যাইতে হইবে যে। অনেকক্ষণ পরে, মনে মনে বহুক্ষণ ছটফট করিবার পর হঠাৎ সে প্রশ্ন করিল, মায়ের চিঠি আসেনি আজ, না? সময়ের মা তাহার ছােট ভাইকে লইয়া বােনের বাড়ি গিয়াছেন দিনকয়েকের জন্য। এমনিই তিনি বড় একটা চিঠি দেন না, তাহার উপর সবে কালই একখানা চিঠি আসিয়াছে। প্রশ্নটা করিয়া ফেলিয়াই সমর লজ্জিত হইল। ললিতা বিস্মিত কণ্ঠে বলিল, কাল ত মার চিঠি এসেছে-আবার আজ ? তােমার কি মাথা খারাপ হলো। সময় বালিশটা ভাল করিয়া টানিয়া লইয়া শুইয়া পড়িয়া কহিল, মাথা খারাপ না হওয়াই লক্ষ্য। বাবা-মা কা পড়েছিল । গিয়ে পৰ্য্যন্ত আর মাথা তোলবার অবসর পাইনি। চিঠি এসেছিল সাহেবের কাছে প্রায় দেড়শ’—অতগুলির জবাব দেওয়া সােজা কথা।

ও ললিতা সেদিক দিয়া গেল না। সহানুভূতির সুরে কহিল,
সাহেবকে বলো না আর একটা লােক রাখতে, তুমি একা মানুষ
তারপর বলি, চা বে এখন? করব ।
বিসকণ্ঠে চক্ষু বুজিয়াই সমর বলিল, করো-
সে যেন ললিতার উপর একটু বিরক্তই হইয়া উঠিল। কথাটা
বলিয়া ফেলিলেই ত হয়, এই বা তাহার কি আশ্চর্য্য জেদ। স্বামীর
কাছে স্ত্রীর সমস্ত কথাই অকপটে খুলিয়া বলা উচিত। জিজ্ঞাসা না
করাটা যেমন সময়ের ভদ্রতা, ললিতারও উচিত নিজে হইতেই
কিন্তু ললিতা কিছুতেই বলিল না। সে তাহাকে চা, জলখাবার
দিয়া নিজে প্রসাধন করিতে বসিল। চলিল এটা ওটা খুচম গল্প।
কথা ললিতাই বেশী বলে, সমর শুধু হু হা দিয়া সারে। আর
সাধ্যমত সে চিঠিপত্রের কথায় ফিরিয়া আসে। কখনও বলে সরকার
আবার ডাক টিকিটের দাম বাড়াচ্ছেন’ কখনও বা বলে কাল মাদ্রাজেয়
এক জায়গায় ডাক লুট হয়েছে, আহা কত লােকের চিঠিপত্র
না হলো।
কি তবু ললিতার সে কথা মনে পড়ে না। সে প্রসাধন শেষ
ফরিয়া কলংয়ে চলিয়া গেল, তাহার পর রান্নাঘরে ঢুকিৰে। কি উনানে
শাচ দিয়াছে—এখন আর উপরে উঠিবার সম্ভাবনাও নাই।
সমর মােটা একখানা কেতাবে মন দিল। আধুনিক বিলাতী
উপস, বাজে বকুনীই বেশী তাহাতে, খানিকটা পড়িয়া আর কাল

লাগিল না। সেটা রাখিয়া একটা বাঙলা মাসিক রিল, কিন্তু তাহাতেও ঠিক মন বসিল না। ঘুরিয়া ফিরিয়া কাটার মত খচ, খচ, করিতে থাকে ঐ একটা কথা—চিঠিখানা কার, কে লিলি তার স্ত্রীকে। অবশেষে এক সময় তাহাকে কৌতুহলের কাছে আত্মসমর্পণ করিতে হইল। অধ্যায়ই হউক আর লজ্জাকরই হউক-তাহাকে জানিতেই হইবে ব্যাপারটা। চিঠি জমানো ললিতার একটা রােগ, যেখান হইতে যত চিঠি আসে, সে সবগুলি একটা বড় কাগজের বাক্সে জমাইয়া রাখে। বাটি কোথায় থাকে, তাহাও সমর জানে। আলমারীর মাথায় লােকচক্ষুর অন্তরালে থাকে বাক্সটা সে নিঃশব্দে উঠিয়া আসিয়া অালমারীর সামনে দাঁড়াইল। নীচে গা-ধুইবার শব্দ হইতেছে, ঝিও নীচে কাজে ব্যস্ত, উপরে এখন কাহারও আসিবার সম্ভাবনা নাই। সমর ধীরে ধীরে বাক্সটা নামাইয়া উপরে ঢাকনিটা খুলিল—আম, পােষ্টকার্ড -হয়ে-কমের চিঠি সাজানাে আছে সেখানে কিন্তু সবই পুরানো, সেই বিশেষ চিঠিটি তাহার মধ্যে নাই। বাক্সটা যথাস্থানে তুলিয়া রাখিয়া সে দেরাজের টানালি খুলিয়া দেখিল, স্ত্রীর প্রাধনের জিনিষ যে তাকে সাজানাে থাকে সেখানেও জিল; কমে ক্রমে ঘরের সন্তৰ অসম্ভব সমস্ত স্থানই দেখা শেষ হইল, চিঠিখানার কিন্তু কোথাও পাতা মিলিল না। শেষ পর্যন্ত মনে হইল নে সে যখন ডাকিয়া চিঠিখানা দেয় ললিতা তখন রান্না করিতেছিল, রান্নাঘরেই ভুলিয়া ফেলিয়া রাখে নাই ত?...উপরের বারান্দা হইতে উকি মারিয়া দেখিল ললিতা তখনও কখয়ে, বি উঠানে বসিয়া বাসৰ আজিতেছে- নিঃশৰে নামিয়া আসিল নীচে। রান্নাঘরেও চিঠিটা নাই। ভাক-কুলুঙ্গী সবই খুঁজিয়া দেখিল সে, চিঠিখানার চিহ্নমাত্র নাই। চিঠি ত মিলিলই না, উপরন্তু অপ্রস্তুতে পড়িতে হইল। কতটা যে সময় চলিয়া গিয়াছে তাহা খেয়াল ছিল না, পিছন হইতে ললিতা আসিয়া পড়িয়া, প্রশ্ন করিল, ওখানে কী হাংড়াচ্ছ গাে? অপ্রতিভ ঞ্জাবে সমর জবাব দিল, একটু আদা খুঁজছিলুম-গলাটা কেমন মুক্ত সুড় করছে, বােধ হয় সর্দি হবে। আ আমার কপাল, আদা বুঝি তাকের ওপর থাকে।•••ওপরে যাও, আমি আদা দিয়ে আসছি- অগত্যা সমরকে চলিয়া আসিতে হইল। চিঠিখানা কোথাও নাই, নিশ্চয়ই ললিতা পড়িবামাত্র সেটা ছি ড়িয়া ফেলিয়াছে; কিন্তু কেন? ললিতা ত কখনও কাহারও চিঠি নষ্ট করে না, বিশেষ করিয়া এইখানাই না ছিড়িল কেন ? আর, তা ছাড়া, চিঠিটার কথা অমন বার বার সে এড়াইয়া যাইতেই বা চাহিতেছে কেন? কৰাৎ সময়ের কপালে ঘাম দেখা দিল। পাখার হাওয়াও যেন শেই নয়, এতই গরম বােধ হইতেছে। একটা কুটিল অথচ অস্পষ্ট ময় মনের মধ্যে কোথায় দেখা দিয়াছে, সে সংশয় তখনও বিভিন্ন কার নীহারিকার মধ্যে যেন সৃষ্টির অপেক্ষায় আছে, তখনও সেট। কল্পনা—তবু তাহার সেই অধর অস্তিত্বটাই এত আকস্মিক, এত অপ্রত্যাশিত যে তাহার আভাস মানেই সমস্ত বুকটা যেন বেদনায় পিবিয়া চুর্ণ হইয়া যাইতে চাহে। সে বেশ সারা দেহ নিয়ে, মুঢ় করিয়া দিয়া যায়। সমর আর কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না। তাহার মুক্ত বাতাস চাই, আর এখনই, নহিলে সে বাঁচিবে না। কিন্তু সে উঠিয়া যেমন খাট হইতে নামিতে যাইবে, আদা কুঁচি একটা রেকাবীতে করিয়া লইয়া ললিত প্রবেশ করিল। আসন্ন সন্ধ্যার আবছায়াতেও সময়ের মুখের পাণ্ডুরতা ললিতার চোখে ধরা পড়িল। সে দ্রুত কাছে আসিয়া কহিল, তােমার মুখ অত শুকনাে দেখাচ্ছে কেন গো?••র টর আসছে না ত। তার পর কপাল বুকে হাত দিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিল, রক্ষে।-পা বেশ ঠাণ্ডা আছে, ঘামও হচ্ছে। কিন্তু মুখখানা অত শুকনাে দেখাচ্ছে কেন? বিকেল থেকেই দেখছি কি রকম কি রকম- সমর জোর করিয়া কণ্ঠে স্বর আনিল, ও কিছু না। শরীরটা খারাপ বােধ হচ্ছে, একটু বাইরের হাওয়া লাগলেই ঠিক হয়ে যাবে। প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া ললিতা কহিল, না না, সে হবে না, আর আর বেরােনাে হবে না। চুপ করে শুয়ে থাকো, বরং আদা দিয়ে আর এক কাপ চা এনে দিই।•••অফিসের অত খাটুনী গেছে, একটু বিশ্রাম করা চাই । কণ্ঠস্বর তেমনিই আকুল। যেমন গত দুই বৎসর ধরিয়া সময় গুনিয়া আসিতেছে। কিন্তু আজ সে আকুলতাও তাহাকে বিচলিত করিতে পারিল না। সে জামাটা গায়ে গাইতে গাইতে শুরু ৰশি, হৰি তে পায় না, একটু ফাকা হাওয়া না গেলে শরীর আরও খারাপ ৰে। আমি চট করে দূরে আসছি আঃ-বাহিরের ঠাণ্ডা বাতাসে কা মুক্তি, কী শাস্তি! বাড়ি, বাহিরে আসিয়া সমর যেন নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল। রগ দুটা দপ দপ করিতেছিল, কান দিয়া তখন বাহির হইতেছিল আগুন, কিন্তু এখন সন্ধ্যার বাতাসে যেন মাথা একটু ঠাণ্ডা বােধ হইল। আছে, পৃথিবীতে বাতাস আছে। অনেকক্ষণ ধরিয়া যে বোঁ করিয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘূরিবার পর একটু ক্লান্তি বােধ হইল। সে কলেজ স্কোয়ারের একটা বেঞ্চের এক বারে বসিয়া শ্রান্তিতে চোখ বুজিল। কিন্তু এতক্ষণ জোর করিয়া শারীরিক পরিশ্রমের এচীরে মনের মধ্যে যে চিন্তাটাকে আড়াল করিয়া রাখা হইয়াছিল, এখন সেই চিন্তাটাই আবার মাথা তুলিল। আচ্ছা, কে আছে এমন লােক যে, তাহার স্ত্রীকে গোপনীয় চিঠি লিখিতে পারে। যদি তেমন কেহ থাকেই, আগে ত এ হাতের লেখা দেখা যায় নাই--এতদিন সে ছিল কোথায়? অথচ যদি গােপনীয় চিঠিই না হইৰে তাহা হইলে ললিতার গােপন করিবারই বা কি দরকার ছিল? না—আবার সেই চিন্তা শুরু হইল। সমর অস্থির হইয়া উঠিল। অমন হওয়া দরকার, নহিলে সে পাগল হইয়া যাইবে। আচ্ছা, পাশের বৃদ্ধ লােকগুলির কথাই শােনা যাক- ক। তারা অনেকক্ষণ ধরিয়াই বলিতেছেন, এতক্ষণ সময়ের । কমে যায় নাই। এবার সে জোর করিয়া মন দিল। একজন এর একজনকে বলিতেছেন, না, ও মেয়েদের চরিত্র পাহারা দিতে না যাওয়াই ভাল। স্বয়ং দেবতারা পারেন নি, মানুষ ত কোন হয়। আর একটি বৃদ্ধ সায় দিলেন, হ্যা। বলি সেই আরব্য-উপন্যাসের দৈত্যের কথা মনে আছে? সে সিন্দুকে পুরে সমুদ্রের মধ্যে রেখেও নিশ্চিন্ত হতে পারে নি। তার চেয়ে চোখ-কান বুজে থাকাই ভাল। ছি, ছি, এখানেও এই আলােচন'। সমর সেখান হইতে উঠিয়া আবার হাঁটিতে শুরু করিল। ভগবান তাহাকে কী পাপে এই অশান্তি দিলেন, সে কি ঘরে বাহিরে কোথাও শান্তি পাইবে না। সে ত কিছুই এমন করে নাই, শুধু মাধবীকে গােপনে চিঠি লেখে এই কি তাহার অপরাধ? কিন্তু তাহার মধ্যে ত কোন অার থাকে না। একটা নির্মল বন্ধুত্বের সম্পর্ক।•••তৰে? আরও খানিকটা হুঁটিবার পর নিশীথরাত্রির শৈত্যে মাথা যন আর একটু ঠাণ্ডা হইল, তখন সে একবার ললির দিক হইতেও যুক্তি দিবার চেষ্টা করিল। সত্য, শলিতারই বা এমন কি অপরাধ। অধু একখানা অপরিচিত হাতের চিঠি তাহার কাছে আসিয়াছে, এই ত? কি ব্যাপার, কাহার চিঠি কিছুই সমর জানে না, জিজ্ঞাসাও করে নাই, শুধু শুধু কি একটা নির্বোধ সংশয়ে কষ্ট পাইতেছে সে। ললিতার এত দিনের ভালবাসা, এতদিনের আন্তরিকতার কি কোন মূল্য নাই তবে? , এ শুধুই ছেলেমানুষী। সমৰ জোর করিয়া বাড়ির পথ ধরিল। ও এতটা সময়

আর ২
সে বাড়ি
বা কাটিল, আর কি কষ্টটাই না পাইল মনে মনে।
ফালা বেন কি, ৰার্থক্যের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দৃষ্টি হইতে সব
রঙ মুছিয়া গিয়াছে, তাই সব কিছুকেই কালাে দেখে।
ফিয়া ললিতার সহিত মিলে ভাকিয়া কথা বলিবে। সম্ভব হইলে
অপরাধ স্বীকার করিবে।•••সে একখান। চলন্ত ট্রামে চড়িয়া বসি,
আর বৃথা সময় নষ্ট করিবার প্রয়োজন নাই।
কি তবু
বাড়ির কাছাকাছি যত আসিতে লাগিল ততই সমস্ত সাধু বুজি
সেই একখানা সরকারী খামের নীচে যেন কোথায় তলাইয়া গেল।
মনে হইল শলিতার প্রতি না জানিয়া অবিচার সে করিবে না, তবু
তাহার সহিত আগেকার সেই মধুর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আর রাখা
সব না।
ললিতা যা খুলিয়া দিয়া অনুযােগের সুরে কহিল, বেশ লােক
যা খে। শরীর খারাপ বলে এই রাত দশটা অবধি কোথায়
কোথায় মারা হলো তাই শুনি। আমি এধারে ভেবে মরি।
একদিন মুফি আর আজ্ঞা না দিলে চলে না।
সমর কোন জবাব না দিয়া উপরে উঠিতে লাগিল। কিছুতেই সহজ
বইতে পারা যায় না যেন। আশ্চৰ্য্য! ললিতা শঙ্কিত কণ্ঠে কহিল,
ব্যাপার কি তােমার, সত্যিই বর বাধিয়ে বসলে নাকি?
এবার কাের করিয়া সময় সহজ ও শনিল, না না, অনেকটা
বেশ কয়েকছি।

= ললিতা বস্তির নিঃশাস ফেলিয়া কহিল, তবু ভাল। কিন্তু তবু মুখের চেহারা তোমার ভাল নয় বাপু, সকাল করে খেয়ে শুয়ে পড়াে- সময় কহিল, একটু পরে খাব, এখন বড় ক্লান্ত। জামা ছাড়িয়া মুখে হাতে জল দিল, তারপর পাখাটা খুলিয়া দিয়া সে চোখ বুজিয়া শুইয়া পড়িল। আঃ! অনেকটা ঘােরা হইয়াছে, আগে এতটা বােঝা যায় নাই। ললিত নীচে তখনও রান্নাঘর সারিতে ব্যস্ত। ভালই হইয়াছে, নহিলে এখনই হয়ত কথা কহিত, আর সে কথার জবাবও দিতে হইত সমরকে। কিন্তু চুপ করিয়াও শুইয়া থাকা যায় না, কী সব ছাই-ভস্ম চিন্তা আসে মনে। সে হাত বাড়াইয়া সেই ইংরেজী নভেলটাই টানিয়া লইল। কি বাজে কথাই বকিতে পারে এই নূতন লেখকগুলা। না আছে স্পষ্ট কোন বক্তব্য, না আছে কোন গল্প-শুধু বাজে বকুনি পড়া যায় কি করিয়া?••••••কিন্তু আর কোন বইও হাতের কাছে নাই। অগত্যা সেইখানাই খুলিল মাথার কাছেই আলো, শুইয়াই পড়া চলে। অন্যমনস্কভাবে বইখানা খুলিতেই ঠক্ করিয়া একখানা খাম পড়িল তাহার বুকের উপর। সহসা যেন তাহার হৃদপিণ্ড লাফাইয়া উঠিল। এ কার চিঠি-আরে, এ যে সেই খামখানাই। সেই হাতের লেখা, ললিতারই শিরােনাম। আশ্চর্য্য। সমর লাফাইয়া উঠিয়া বসিল। মনে হইতেছে যেন দেহের সমস্ত রক্ত মাথায় উঠিতেছে। হাত কঁপিতেছে থর থর করিয়া। চিঠিখানা খুলিয়া পড়া যায় না।

চিঠিখানা খুলিতেও যেন সঙ্কোচে বাধে, এত দিনের এত বক্তৃতায় পর। অথচ আর নিজেকে সংযত করাও যায় না। সে আঙ্গুল দিয়া কপালের ঘাম মুহিয়া খামখানা খুলিয়াই ফেলিল। সংক্ষিপ্ত চিঠি। ললিতা ছেলেবেলায় যে স্কুলে পড়িত, তাহার নিজস্ব ইমারত উঠিতেছে। টাকার দরকার, সেইজন্য সমস্ত পুরাতন ছাত্রীদের নিকটেই সাহায্য প্রার্থনা করিয়া চিঠি দেওয়া হইতেছে, এক টাকা, দু’টাকা, যা কিছু হয়। সেক্রেটারী মহাশয়ের স্বাক্ষরিত সেই মৰ্ম্মে একখানা চিঠি ললিতার নামেও আসিয়াছে। চিঠিখানা ললিতা বােধ হয় তাহাকে দেখাইবার জন্যই বিশেষ করিয়া তাহার বইয়ের মধ্যে গুজিয়া রাখিয়াছিল। পাতলা চিঠি, তাই দুপুর বেলা বইখানা খুলিয়া পড়িলেও তাহার নজরে পড়ে নাই। সে সমস্ত ঘরটাই তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়াছে, কিন্তু বইখানার কথা মনে হয় নাই একবারও।••• সামনেই তাহাদের বিবাহের দরুণ আয়না-বসানাে আলমারীটা বিদ্যুতালােকে ঝক ঝক করিতেছে, আর তাহাতেই প্রতিফলিত অত্যন্ত নির্বোধ একটি মুখের ছবি সমরকে নিঃশষে বিদ্রুপ করিতে লাগিল।

अकि
অনেক করিয়া বলিয়া-কহিয়া শ্ৰীনাথ সেদিন একটু আগে ছুটি পাইল।
অলকার বােঝির বিবাহ, বিশেষ করিয়া তাহারা বলিয়া গিয়াছে,
না যাইলেই নয়। আবার শ্রীনাথকেই লইয়া যাইতে হইবে, তাহাদের
লােকাভাব-সুতরাং একটু আগে না গেলে ঠিক সময়ে সেখানে
পৌছানো সম্ভব হইবে না।
বাহিরে আসিয়া শ্ৰনাথ একটা
নিঃশ্বাস ফেলিল।
সে চাকরীতে
অল্পদিনই ঢুকিয়াছে, সুতরাং দাসত্বের সূত্রগুলি: সব ঠিক এখনও
আয়ত্ব করিতে পারে নাই। অকারণে খােসামুদি করিতে গেলে
এখনও কপালে ঘাম দেখা দেয়। ঘণ্টাখানেক আগে বাহির হইবার
জন্য বড়বাবুর কাছে কত মিনতিই না করিতে হইল। বড়বাবু
কত, তিনজন বাবুকে লইয়া ডেসপ্যাচ বিভাগ, তাহারই আবার ইন
চার্জ। মাহিনা ত এতদিনে সত্তর টাকায় পৌছিয়াছে, তাহাতেই
কৃক্ত দেশা। হেঃ।
আর একটা বড় গােছর নিঃশাস ফেলিয়া সে গতিটা একটু
বাড়াইয়া দিল। সে কিছুতেই বেশীক্ষণ জোরে চলিতে পারে না,

কারণ হাঁটিতে তাহার এখনও কষ্ট হয় দস্তুর মত। সতৃষ্ণ নয়নে একটা প্রায়-খালি ট্রামের দিকে চাহিয়া সে মনে মনে হিসাব করিয়া দেখিল যে প্রায় এক বৎসর হইল সে ট্রামে বা বাসে চড়ে নাই। তবু হাঁটাটা অভ্যাস হইল না, আশ্চর্য্য। নাথ বড় লােকের ছেলে। তাহার উপর একমাত্র ছেলে বলিয়া লেখাপড়ার চাপ কোনদিনই কেহ দেয় নাই, থিয়েটার করিয়া, গান গাহিয়া এবং কিছু-কিছু পরােপকার করিয়াই দিন কাটিয়াছে। কিন্তু সহসা কেদিন মা এবং তাহার এক বৎসরের মধ্যেই বাবা মারা গেলেন সেদিন সে প্রমাদ গণিল। প্রমাদ গণিবার বিশেষ কারণও ছিল। খবর লইয়া জানা গেল যে তাহার বড়লােক বাবার ভাণ্ডারের তলা অনেক দিনই ফুটা হইয়া গিয়াছিল, তিনি মরিবার সময় বাড়ী খানা এবং এদিক ওদিকে হাজার কুড়ি-বাইশের বেশী টাকা রাখিয়া বাইতে পারেন নাই। অবশ্য তাতেও চলিয়া যাইতে পারিত, যদি সেই অবস্থাই এনাথ মানিয়া ইত। কিন্তু সে উঠিয়া পড়িয়া লাগিল চাকাটা বাড়াইবার জন্য। ব্যবসা বন্ধুটি কি, সে সম্বন্ধে তাহার কোন ধারণাই হিল না, শুধু শুনিয়াছিল যে অর্থ উপার্জনের উহা সহজ পথ। সুতরাং বাইশ হাজার টাকা নগদ ও বিয়াল্লিশ হাজার টাকার বাড়ী খাইতে বৎসর-দুইয়ের বেশী সময় লাগিল না। শ্রীনাথ ব্যবসাটা মন দিয়াই করিয়াছিল তাই, নহিলে এতদিনও লাগার কথা নয়। টাকা গেল বটে কিন্তু উৎসাহ গেল না। আরও বৎসর-দুই বিভিন্ন পথে বাণিজ্য-লীর ব্যর্থ সাধনা করিয়া, অলকার সমস্ত অলঙ্কার এবং দামী আসবাবপত্র শেষ করিয়া একদিন সে আবিষ্কার করিল যে, তাহার ধরে সবদিন আর ভাতের চাল পর্যন্ত থাকিতেছে না, সে সত্যই নিঃস্ব হইয়াছে। সে বড় কঠিন দিন। সেদিন আত্মীয়-বন্ধু বান্ধব কেহ কোথাও নাই, স্বপ্ন গিয়াছে ভাঙ্গিয়-উপার্জনের অন্য কোন পথ পৰ্যন্ত তাহার জানা নাই। অবস্থাপন্ন শশুরও তখন নাই। শালারা সকলেই মাঝারি চাকুরে, তবু তাহাদেরই চেষ্টায় আরও বৎসরখানেক পরে এই সামান্য চাকরীটি মিলিয়ছে। বড় অফিস তাই, অন্য অফিসে নব-নিযুক্ত ডাকবাবুর পক্ষে কুড়িটাকা মাহিনাই যথেষ্ট। এখানে সে তবু প্রথমেই চল্লিশ টাকাতে ঢুকিতে পারিয়াছিল। এই চার পাঁচ বৎসরে গােটা আষ্টেক টাকা বাড়িয়াছেও কিন্তু সে কতটুকু? এই শহরে ঘর ভাড়া দিয়া, দু-তিনটি প্রাণীর ভরণ-পােষণ চালাইয়া আর ট্রাম ভাড়া দেওয়া যায় না। তবু রক্ষা, বেশী ছেলে মেয়ে হয় নাই! এ অফিসে উন্নতির সুযােগ ছিল কিন্তু তাহার জন্য সামান্য কিছু লেখাপড়ার দরকার হয়, সেইখানেই নাকের সবচেয়ে ঘাটতি। তাহাকে হয়ত এই ডাক-বিভাগেই সারা জীবুন কাটাইতে হইবে, কে জানে! বিগত দিনের ছবি মনের মধ্য দিয়া যত দ্রুত বেগে সরিয়া যাইতে ছিল, গতিও হইয়া পড়িতেছিল তত মন্থর। সহসা এক সময় এই কথাটা লক্ষ্য করিয়া ক্রীনাথ আবার চলার বেগটা বাড়াইয়া দিল এবং মিনিট পনেরাে পরে ঘর্মাক্ত কলেবরে বাড়ীতে পৌছিল।

কিন্তু ঘরে পা দিয়া সে পথেই স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া গেল। এ কী কাণ্ড! অলকা এখনও কোন আয়ােজনই করে নাই। বরং অন্যদিন এমন সময়ে তাহার মাথা-বাঁধা গা-ধােওয়া শেষ হইয়া যায়, আজ সেটুকুও সারা হয় নাই—আলুথালু বেশে জানলার কাছে মেয়েকে লইয়া স্তব্ধ হইয়া বসিয়া আছে। এনাথ বাহিরে রান্না করার ঘেরা জায়গাটাতে উকি মারিয়া দেখিল। তােলা উনুনটাতেও যথারীতি আঁচ পড়িয়াছে। নাথের বুকের ভিতরটা গুরু-গুর করিয়া উঠিল। সে বেশ বুঝিল যে এই ব্যবস্থা-বিপৰ্যয় ঝড় ওঠারই পূৰ্ব্বলক্ষণ। কিন্তু তবু সহসা কোন প্রশ্ন করতে সাহস হইল না। কারণ অলকা আর আগের মত মধুরভাষিণী অলকা নাই। অভাব-অনটন, প্রতিদিনের দারিক্রে সে তিক্ত-বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছে, কথায় কথায় সে কলমুখর হইয়া ওঠে। এক সময় যে কণ্ঠস্বর মনের মধ্যে অপূর্ব মাধুৰ্য সঞ্চার করিত আজ তাহারই তীক্ষ্ণ শব্দে মাথা খারাপ হইয়া যায়- শ্রীনাথ অনেকক্ষণ পরে ঘরে ঢুকিয়া কোণে ছাতাটা রাখিয়া দিল। তাহার পর জামাটা খুলিয়া কাছে আসিয়া বসিয়া আস্তে আস্তে ডাকিল, গলফ মেয়েটা পাইয়া কোলে আসিল। কিন্তু অলকা কোন উত্তর দিল না। নাথ আবার ডাকিল, ওগাে শুনছ। এবার জবাব আসিল, কী ? সমস্ত লক্ষণই ঝড় ওঠার। কিন্তু ভয় করার সময় নাই। কোন মতে মাথাটা চুলকাইয়া শ্রীনাথ কহিল, এখনও তৈরী হয়ে নাওনি, ওখানে যাবে কখন? দেরী হয়ে যাবে যে।

এবার অলকা মুখ ফিরাইল, তীক্ষ্ণদৃষ্টি স্বামীর মুখের উপর নিবন্ধ করিয়া কহিল, কোথায় যাবো? সে চাহনির দিকে চাহিলে বুকের রক্ত জল হইয়া যায়। ক্ষীণকঠে শ্রীনাথ কহিল, বুলুর বিয়ে যে! ভুলে গেলে ? আমি যে ঐ জন্যে সকাল করে ছুটি নিয়ে এলুম- জবাব আসিল, তােমার মাথা খারাপ হতে পারে, আমার ত হয়নি। শ্ৰনাথ খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া বােকার মত প্রশ্ন করিয়া ফেলিল, কেন? কেন! অলকার কণ্ঠস্বর একেবারে সপ্তমে চড়িল, বলতে একটু লজ্জা করে না তােমার! তারা বড় মানুষ, কত সব বড়লােক কুটুম্ব আসবে, আর তার মধ্যে আমি যাবো কনের মাসী-ঝিয়ের মত সেজে, ? তােমার ঘেন্নাপিত্তি না থাকতে পারে, আমার ত আছে। শ্রীনাথ তবু কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিল না। ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া কহিল, কেন, তােমার সেই বেনারসী সাড়ীটা ত আছে- এবারে অলকা একেবারে বােমার মত ফাটিয়া পড়িল। চীৎকার করিয়া কহিল, এমন নইলে তােমার বুদ্ধি। তােমার ওরকম বুজি না হলে আর আমার আজ এই দুর্দশা হয়। আজ আমার দোরে কত- গণ্ডা ঝি খাটবে, না, আমিই সারা দিনরাত ঝিয়ের মত খাটুছি।•• গায়ে এক আনা সােনা নেই, আমি যাবাে পাঁচশ’ টাকা দামের বেনারসী পরে নেমতন্ন খেতে! ছিঃ, ছিঃ, ছি-আক্কেল-বিবেচনার মাথা খেয়ে বসে আছো একেবারে। নাথ আর কথা কহিতে পারিল না। অলকা একাই আরও খানিকটা ৰকিয়া একসময়ে চুপ করিল। এরূপ তিরস্কার মূতন নয়, এক- রকম গা-সহা হইয়া গেছে, চুপ করিয়া গেলে খানিকটা পরে অলকাই নরম হইয়া আসিবে মানভঞ্জনের প্রয়ােজন আর ঘটিবে না। কিন্তু আজ সে-জন্য অপেক্ষা করাও কঠিন। বড়লােক কুটুম্বের বাড়ী জীনবেশে যাওয়াও যেমন অপমানকর, না খাওয়াও তেমনি। তাহারা যে শুধু দারিদ্র্যের জন্যই গেল না, এ কথাটা সকলকার কাছেই স্পষ্ট হইয়া উঠিবে।•••তাহাদের মুখের সেই করুণা ও অবজ্ঞা মিশানাে হাসি নাথের মানসচক্ষে ভাসিয়া উঠিল । সে মিনিট পাঁচেক স্তব্ধ হইয়া বসিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে ডাকি, অলকা! সে কণ্ঠস্বরে এবার এমনই একটা আত্মগ্লানির সুর ছিল যে অলকা আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না, মুখ না ফিরাইয়াই কহিল, কি ? শ্রীনাথ ভরসা পাইয়া অলকার একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে টানিয়া লইয়া কহিল, আমার অপরাধের অন্ত নেই তা জানি, কিন্তু তুমি ত চিরকালই ক্ষমা করে এসেছ মিনু! আজও মানিয়ে নাও কোন রকম করে, নইলে এর পর আর মুখ দেখাতে পারব না যে। মি। প্রথম যৌবনের আদরের ডাক। এ নামে ঐনাথ কত- কাল ডাকে নাই। অলকার চোখে জল আসিয়া পড়িল। সে কোনমতে জবাব দিল, তা বলে আমি এ অবস্থায় ওদের বাড়ী যেতে পারব না। শ্ৰনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিল, সবই বুঝি মিনু, নেহাৎ তােমাদের দাঁড়াবার আশ্রয়টুকুও ঘুচিপে দিয়েছি, তাই, নইলে এক-এক সময়ে ইচ্ছে করে যে আত্মহত্যা করে এ অপমানের হাত থেকে অব্যাহতি নিই- অলকা শিহরিয়া উঠি। শ্ৰনাথ তাহার হাতটায় একটু চাপ দিয়া কহিল, সেখানে সােনা-দানা পরে অনেকে আসবে সত্যি কথা, কিন্তু তােমার মত জপ কার আছে তাই নি। সেখানে ত তােমার কাছে সবাইকে মাথা হেঁট করতে হবে। সজল চোখেই পুনরায় আগুন জ্বলিয়া উঠিল। অলকা এবার শ্রীনাথের দিকেই মুখ ফিরাইয়া কহিল, আমাকে ঠাট্টা হচ্ছে?"চেহারা কী হয়েছে তা কি কোন দিন চোখ মেলে দেখেচ? ভগবান আমাকে সব দিক দিয়ে মেরেছেন তাই, নইলে এমন লানাও আমাকে সইতে হয়!•••ওপরের ঐ মিসে বলে কিনা ‘যেমন হাড়গিলের মত চেহারা তেমনি গলার আওয়াজ!...উঃ! ভগবান, এত অপমানও লিখেছিলে অদৃষ্টে । অলকা কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। নাথ বাধা দিতে পারিল না, সান্ত্বনার কোন বাক্যও সহসা তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল না। এবারে সে সত্যই আঘাত পাইয়া- ছিল। বীকে সে আন্তরিক ভালবাসিত, বিশেষত অলকার অসামান্য রূপ লইয়া তাহার গর্বের সীমা ছিল না। তবে নাকি স্বামী-স্ত্রীর করিতে করিতে পরস্পরের কাছে একটা অভ্যাসের মত হইয়া উঠে, চেহারাটা ভাল কি মন্দ সে সম্বন্ধে কোন অনুভূতিই কিছুদিন পরে আয় কোন পক্ষের থাকে না, তাই নাথও এতদিন লক্ষ্য করে নাই যে অলকার চেহারাটা অভাবে ও দৈহিক কষ্টে এতটা খারাপ হইয়া গিয়াছে। আজ এতদিন পরে সেই অধঃপতন লক্ষ্য করিয়া সে স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল। সে অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। কিন্তু অলকা কাদিয়া কাঁদিয়া অপেক্ষাকৃত শান্ত হইয়া উঠিয়া বসিতেই সে আগেকার মত জোর করিয়া তাহাকে নিজের বুকের মধ্যে টানিয়া লইল, মাথাটা বুকে চাপিয়া ধরিয়া ঈষৎ রুদ্ধকণ্ঠে ডাকিল, মিনু। অলকা ভগ্নকণ্ঠে খুব চুপি চুপি উত্তর দিল, কি ? শ্ৰনাথ কহিল, তুমি অনেকদিনই আমাকে বিশ্বাস করেছ, আজকের দিনটিও একবার করে দেখ। আমি আজ নিজে হাতে তােমাকে সাজিয়ে দেবো, তুমি বাধা দিও না! ঋলকা উত্তর দিল না। কিন্তু নাথের কাছে সে উত্তর পৌছিল। সে তাহার ললাটে অনেকদিন পরে একটি চুম্বন করিয়া কহিল, আমি একবার বাইরে থেকে ঘুরে আসছি, তুমি চট করে মাথাটা বেঁধে গা-টা ধুয়ে নাও, লক্ষ্মীটি। অলকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সােজা হইয়া বসিল। নাও পুনরায় বাহির হইয়া পড়িল। প্রায় আধঘণ্টা পরে শ্রীনাথ ফিরিল কতকগুলি কি জিনিষ কিনিয়া লইয়া ; তাহার পর জানলার ধারে অলকাকে সাজাইতে বসিল। সে নিজে যখন থিয়েটার করি, তখন স্ত্রীলােকের ভূমিকায় নামিত। সেই সময় রূপসজ্জায় তাহার খ্যাতি ছিল অসাধারণ, আজ সেই বিদ্যটাই নাই। সে কাজে লাগাইল। বহু কাটিয়া গেল, স্যার অন্ধকার নাইয়া আসিল কিন্তু শ্রীনাথের হাত থামিল না। হারিকেনের ম্লান আলােতেই কাজ চলিতে লাগিল। অবশেষে এক সময় রং করার কাজ শেষ হইল। শেষ ‘শেডলি কিয়া দিয়া, পকেট হইতে সৰু সৰু চার গাছি গিলটির চুক্তি বাহির করিয়া হাতে পাইয়া দিল, তাহার পর কহিল, তােমর সেই শান্তিপুরের শাড়ীটা বার করে, সেই যে সাধের অলকা এতক্ষণ একটি কথাও বলে নাই কিংবা কোন বাধা দেয় সে যেন অভিভূত হইয়া গিয়াছিল। যে শ্রীনাথের সঙ্গে এতকাল ঘর করিয়াছে, এ যেন সে শ্ৰনাথ নয়। এতদিনে, অন্তত একটি বিদ্যারও পরিচয় দিবার অবসর পাইয়া, সে দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। অলকা তাহার নির্দেশ মত তাহাদের পুরাতন কালের একমাত্র আলমারী হইতে সাদা শাড়ীখানিই বাহির করিয়া আনিল। এনাথ কাপড়ও নিজে হাতে একেবারে হাল ফ্যাশানে পরাইয়া দিল, তাহার পর হাতে একখানা রুমাল জিয়া দিয়া কহিল, একবার আয়নার সামনে গিয়ে দাড়াও দেখি- সেই আলমারীর গায়েই পুরানাে বিবর্ণ আয়না বসানাে। তাহারই সামনে না হারিকেনটা উচু করিয়া ধরিল, তবু সেদিকে চাহিয়া অলকা নিমেষে মুগ্ধ হইয়া গেল। যেন কেমন করিয়া তাহার বাসা দশ বৎসর পিছাইয়া গিয়াছে। ঠিক আঠারাে বৎসর বয়সে যেমন দেখিতে ছিল সে, এ যেন তেমনিই। তেমনি অসামান্য রূপ, দেখিলে আর চোখ ফেরানো যায় না। আয়ত চোখে ঈষৎ কাজলের আভাস ; দৃষ্টিতে যেন প্রথম যৌবনের স্বপ্নের ঘোের টানিয়া আনিয়াছে। সে মুগ্ধকণ্ঠে কহিল, এ কী করে করলে গো! শ্ৰনাথ হাসিল। বিজয়ের হাসি, আনন্দের হাসি ; তাহার পর কহিল, নাও, এইবার চটুপটু সেরে নাও, ওদের গাড়ী দুবার ফিরে গেছে। তাহার পরের কাজ সামান্যই। খুকীকে সাজাইয়া নিজে একটা ধােওয়া কাপড় পরিতে পাঁচ মিনিট। ঘরে তালা দিয়া দুজনে গাড়ীতে গিয়া বসিল। বুলুর মা ভগ্নী-গর্বে ইহার পরই শুরু হইল অলকার জয়যাত্রা। যে সমস্ত নীগৃহিণীর দল করুণা দেখাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছিলেন, তাহাদের চোখে ফুটি উঠিল ঈর্ষ।। ছােকরার দল চঞ্চল হইয়া উঠিয়া অকারণে ঘােরাপুরি বাড়াইয়া দিল। কীত হইয়া দত্তগৃহিণীকে কহিলেন, মিনুর যে বয়স হয়েছে তা মােটে দেখায় না, না। মনে হয় যেন আর একবার বিয়ে দিয়ে আনা যায়। দত-গৃহিণী শেষ অবলম্বন ধরিয়া কহিলেন, এত রূপ, দুখানা গয়না পরতে পায় না বেচারী । কিন্তু দত্ত-গৃহিণীর কন্যাই ফোস করিয়া উঠিল, তুমি চুপ করে মা। আজকাল বুঝি তােমাদের অমিলের মত জব, কতকগুলাে সােনার তাল ঝােলানো আছে। এখনকার চালই যে ঐ! মিসুপিসী কি রকম সেজেছে দেখছ না, একেবারে কলেজে পড়া মেয়ে! ওয় ওপর গয়না পরলেই বিচ্ছিরি দেখাত । অগত্যা দ-গৃহিণী চুপ করিলেন। কিন্তু সেদিকে তখন অলকার পূজা। কানও ছিল না, সে যেন এক নেশায় মাতিয়া উঠিয়াছিল। চারিদিকেই যেদিকে যায়—সমস্ত পুরুষের চোখ প্রশংসায় ও মেয়েদের চোখ ঈর্ষায় চঞ্চল হইয়া ওঠে। সকলেই তাহাকে কাছে পাইতে চায়, সকলেই দলে টানে। অনেকদিন পরে অলকা সেই বাল্যকালের মত হাসিতে-খুশীতে গল্পে-গানে উজ্জল হইয়া উঠিয়াছে -ঠিক আঠারো বৎসর বসের মতােই। এতদিনের দাবি, অভাব-অভিযােগ তাহাকে যে নাগপাশে বাঁধিয়াছিল তাহা যেন কোন্ জাদুমন্ত্রে খসিয়া পড়িয়াছে। অবশেষে বিদায়ের সময় আসিল। তিন-চারজনে গাড়ীতে তুলিয়া দিয়া গেল। শেষ মুহূর্তেও নানা রকমের অনুরােধ। বিজয়-গর্বের শেষবিন্দু, সুধাটুকুও নিঃশেষে পান করিয়া অলকা মােটরের গদীতে মাথা হেলাইয়া একটা নিঃশ্বাস ফেলিল।••• খানিকটা নিঃশব্দে কাটিয়া যাইবার পর অপরাধীর মত কণ্ঠে নাথ কহিল, তুমি অমন করে নিঃশ্বাস ফেললে আমার বুকের মধ্যে কি রকম করে মিনু!••আমার হাতে পড়ে কত দুঃখই পেতে হচ্ছে তোমাকে, তা আজ যেমন বুঝতে পারলুম এমন আর কোনদিন বুঝিনি। অমন রূপ তােমার, একখানা গয়না অবধি রাখলুম না, আজ কিনা তােমাকে গিটির গয়না পরে যেতে হলাে। এর চেয়ে আমার মরে যাওয়াই ভাল ছিল। অলকা নিবিড়ভাবে স্বামীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া কঁাধে মাথা রাখিয়া কহিল, ছিঃ! অমন কথা বলতে নেই। কে বলেছে তােমার হাতে পড়ে আমি কষ্ট পেয়েছি। চাইনে আমার গয়না। গয়না নেই বলে আজ আমার আর কোন ক্ষোভ নেই। তােমাকে যে স্বামী পেয়েছে, তার স্পার কী চাই?

বেনারসী ছােট্ট একটি ঘর এবং তাহারই সামনের কটুকু ঘিরিয়া লইয়া রান্নার জায়গা-এইত নীলিমায় গৃহস্থালী কিন্তু তাহাকেই হরিশ আখ্যা দিয়াছিল সাম্রাজ্য। এবং সেইটুকুর এই দিনরাত সম্রাজ্ঞী নীলিমার যেন নিবাস ফেলিবার অবকাশ থাকে না। আর বাস্তবিক, যদি প্রত্যেকটি পাচফোড়নের শিশি এবং চিনি- রাখা টিনের কৌটাকে দিনের মধ্যে পাঁচবার ঝাড়িয়া মুছিয়া সাজাইয়া রাখিতে হয় তাহা হইলে অবসর মেলাও কঠিন। সারাদিন ধরিয়া সেই সামান্য গৃহের কয়েকটি মাত্র আসবাব ও গৃহস্থালীর উপকরণ নাড়া-চাড়া না করিলে নীলিমার তৃপ্তি হইত না। এক বিছানাই পাচ-ছয়বার ঝাড়িতে হইত, কেহ দেখা করিতে আসিলে কি। বাড়ীর অন্যান্য ভাড়াটেরা গল্প করিতে আসিলে তাহাদের বিছানার উপর বসিতে না দিয়া উপায় ছিল না, অথচ একবার কেহ বসিয়া উঠিয়া গেলেই বিছানার চাদরে যে ভাজ পড়ে তাহা নীলিমা সহিতে পারিত না। মানুষটি নিজেও খুব ফিটফাট সৌখীন, মাঘ মাসের । 9. Henry গলে আসে রচিত।

শীতেও সে সন্ধ্যায় রান্না সামিয়া সাবান মাখিয়া প্রত্যহ গা ধুইত এবং যত রাত্রিই হউক না কেন, তাহার পর পাতা কাটিয়া শাখা বাঁধিয়া মুখে সন্তা-দামের পাউডার কিংবা কাে মাখিত। হরিশ তাহার এই অতিরিক্ত সৌখীনতার বিরুদ্ধে একটি কথাও কোনদিন বলে নাই। বরং ভাবিত যে আহা, এই সব লইয়া যদি ভুলিয়া থাকে ত থাক। আঠার বছর বয়স নীলিমার, এই বয়সে মেয়েরা কত সাধ-আহলাদ মিটাইয়া লয়, সে সব ত কিছুই উহার মিটিল না, যেমন করিয়া সুখে থাকে থাক! হরিশ যখন বিবাহ করিয়াছিল তখন তাহার তেইশ বছর বয়স, নীলিমার মাত্র পনেরো। সেদিন পৃথিবী তাহাদের চোখে কী রঙ্গীনই ঠেকিয়াছিল। বি-এ পাশ করিয়া এম-এ পড়িতেছে সে, মন তখন নানা কল্পনার আনন্দে পরিপূর্ণ, সমস্ত সংসার চোখের সামনে অভিনব দীপ্তিতে ঝলমল করিতেছে। হয়ত অত তাড়াতাড়ি বিবাহ করা তাহার উচিত হয় নাই, কিংবা ইচ্ছাও হয়ত ঠিক ছিল না, কিন্তু মা যখন বােনের বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়া নীলিমাকে দেখিয়া আসিয়া জোর করিয়া ধরিয়া পড়িয়াছিলেন তখন সে বাধাও দেয় নাই; কারণ আর্থিক কষ্ট বলিতে যা বুঝায় তা তাহাদের কখনই ছিল না, সুতরাং ওদিকটা চিন্তা করিবার কিছু ছিল না। তার পর অকস্মাৎ একদিন সব গােলমাল হইয়া গেল। বিবাহের এক বৎসরের মধ্যেই মা মারা গেলেন এবং আরও মাস-চায়েক পরেই দাদা লাহােরে বদলী হইয়া সপরিবারে চলিয়া গেলেন। তাহার উপর পরীক্ষার ফল বাহির হইতে জানা গেল, সে এম-এতে ফেল করিয়াছে।

দাদা যাইবার সময় আবাস দিয়া বলিয়া গেলেন, খরচা আমি মাসে মাসে তােমায় পাঠাব, তবে পড়তে আর পারব না। তুমি চারী- বারীর চেষ্টাই দেখ একটা। দেখ একটা। আর এ বাড়ীটাও এতটাকা ভাড়া দিয়ে যাবার দরকার নেই, বাড়তি ফার্ণিচারগুলো বেচে ফেলে তােমরা কোথাও একটা ঘর কিংবা খুব ছােট একটা ফ্ল্যাট খুঁজে atel ইহার পর দাদা ঠিক ছয় মাস তাহাকে পঞ্চাশ টাকা করিয়া খরচ পাঠাইয়াছিলেন। তিনি টেলিগ্রাফ অফিসে মােটা মাহিনায় কাজ করিতেন, পঞ্চাশ টাকা তাঁহার পক্ষে কিছুই নয়; এটা তিনি যে কোনওদিন বন্ধ করিবেন, তাহা হরিশ কল্পনাও করিতে পারে নাই। সেইজনুই সে ঘরভাড়া করিয়া থাকিবার হীনতা স্বীকার না করিয়া একটা ফ্ল্যাটই লইয়াছিল এবং মায়ের সাধের আলমারি-সিন্দুকের মায়া কাটাইতে পারে নাই। নিজে একটা গােটা-কুড়ি টাকার ট্যুইশনী করিত সুতরাং তাহাদের সংসার একরকম স্বচ্ছন্দেই চলিয়া যাইত। কিন্তু ঠিক ছয়মাস পরে সহসা টাকা আসা বন্ধ হইল। খানদুই চিঠি লিখিয়াও যখন কোন ফল পাওয়া গেল না তখন হরিশ উদ্বিগ্ন হইয়া টেলিগ্রাম করিল। দিন-তিনেক পরে চিঠির জবাব আসিল। দাদার বড় ছেলেটি কলিকাতার সেন্ট জেভিয়ার হােস্টেলে থাকিয়া কলেজে পড়িতে আসিয়াছে, তাহার ষাট টাকা খরচা, মেয়ে দুটি স্থানীয় ইস্কুলে পড়ে, তাহাদের পড়াশুনার জন্য প্রায় সত্তর টাকা খরচ হয়, আরও পাচ ছয়টি ছেলেমেয়ের তিনি ভয়সা রাখেন সুতরাং তাহাদের লেখা- পড়ার এ তাহার প্রত থাকা দরকার। তা ছাড়া মানুষের ১১ জীবন-মৃত্যুর ব্যাপার যে কত অনিশ্চিত সে সম্বন্ধে তাহাদের বাপমাকে দেখিয়াই জ্ঞান হওয়া উচিত-অতএব সেজন্য ও, যেমন করিয়াই হউক কিছু সঞ্চয় করা আবশ্যক। এমনিই রকমারী অজুহাত দেখাইয়া দাদা লিখিয়াছিলেন যে মাসে মাসে পঞ্চাশটি টাকা করিয়া খরচ কবা তাহার সাধ্যাতীত, এই ছয়মাসেই তিনি ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন। সে ঋণ শােধ যে কি ভাবে হইবে তাহা একমাত্র ভগবানই জানেন। এই আঘাতটা হরিশের পক্ষে যে এত সাংঘাতিক হইবে তাহা বােধ করি নীলিমাও বুঝিতে পারে নাই। সেই দিনই রাত্রি হইতে হরিশের অর-বিকার দেখা দিল। সে যে কী অবস্থা তাহা বে'ঝাইবার নয়। সেদিনের কথা মনে হইলে নীলিমার অঙ্গও জ্ঞান থাকে না। ঐ রােগী, ভরসাব মধ্যে একটা ঠিক। ঝি, আর নীলিমার তখন মাত্র সতেরো বছর বয়স। নীলিমার বাপের বাড়ীর অবস্থাও খুব খারাপ, তবু সংবাদ পাইয়া তাহার বাবা যখন আসিয়া পেীছিলেন তখন একটা ফ্ল্যাটে একলা ঐ রােগী লইয়া নীলিমা মুহমন্ হইয়া পড়িয়াছে। দাদাকে টেলিগ্রাম করা হইয়াছিল, তিনি টেলিগ্রামেই কুড়িটি টাকা পাঠাইয়া দিয়াছিলেন, আর কোন খবর লন নাই। নীলিমা ও তাহার বাবা কোন মতে ইরিশকে বাঁচাইয়া তুলিলেন বটে কিন্তু বিপুল ঋণ হইয়া গেল। মায়ের অত সাধের আলমারী, সিন্দুক, টেবিল, বাসন প্রভৃতি বিক্রয় করিয়াও অর্ধেক ঋণ শােধ হইল না—নীলিমার হারটিও তাহার সহিত চলিয়া গেল। ইহার পর মাসিক আট টাকা ভাড়ায় এই একতলার ঘরটিতে চলিয়া আসিতে হইল এবং প্রাণপণ চেষ্টায় যখন পয়ত্রিশ টাকা মাহিনার বর্তমান মাষ্টারীটা সংগ্রহ হইল তখন ১১৫ আর নীলিমার অলঙ্কার বড় বেশী অবশিষ্ট নাই। প্রাইভেট ট্যুইশানটি অসুখের সময় ছাড়িয়া গিয়াছিল এবং আর যোগাড় করিতে পারে নাই। মাষ্টারী পাইবার পর দুই-একটি ট্যুইশনের সন্ধান পাইয়াছিল বটে কিন্তু নীলিমা তাহার শরীর খারাপ বলিয়া কিছুতে করিতে দেয় নাই। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, বর্তমান অবস্থায় নীলিমা মােটেই অসুখী নয়। সে গরীবের ঘরের মেয়ে, বাসন মাজা বা রান্না করার মধ্যে কষ্টকর বা অগৌরবের কিছু সে দেখিতে পাইত না। হরিশ জোর করিয়া মাসিক এক টাকা মাহিনাতে বাসন মাজার একটা ঠিক। বি ঠিক করিয়াছিল বলিয়া বরং সে অসন্তুষ্ট, প্রায়ই বলিত, এইত দুটো লোকের বাসন, খামকা এর জন্য ঐ একটা বাজে খরচা। তা ছাড়া ও মাগী যা বাসন মাজে, দেখলে ঘেন্না করে। কিন্তু এই একটি বিষয়ে হরিশ অবিচলিত ছিল। গহনা বা দামী শাড়ীর জন্য নীলিমার কোন আকাঙ্খাই নাই বলিয়া মনে হয়। সে তাহার নিজ সংসারের মধ্যে একটু পরিচ্ছন্নভাবে বাস করিতে পারিলেই সুখী। কেবল একটি স্থানে একটু দুর্বলতা তাহার হিল। বিবাহের লাল বেনারসী তাহার ঠিক পছন্দ হয় নাই বলিয়া শাশুড়ী মরিবার মাত্র আট দিন আগে একখানি চাপাধুলরঙের জরির উপর রূপালী অরির কাজ করা বেনারসী শাড়ী কিনিয়া দিয়াছিলেন। সে কাপড়টি কখনও পরা, হয় নাই, এমন কি তাহার ব্লাউজ পীস কাটিয়া আমা করানো পর্যন্ত ঘটিয়া উঠে নাই। সেই কাপড়টি নাড়া ১১০ চাড়া করিবার সময় একটা ছােট দীর্ঘশ্বাস সে কিছুতেই চাপিতে পারিত না, এমন কি হরিশের সামনেও না। তাহার এ বেদনার কথা হরিশ জানিত, কিন্তু সেটা এতদিন পর্যন্ত তেমন ভাবে তাহাকে আঘাত করে নাই যেমন সেদিন করিল। প্রত্যহ সে ইস্কুল হইতে বাহির হইয়া গড়ের মাঠ পর্যন্ত খানিকটা ঘুরিয়া সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরিত-এ তাহার চিকিৎসকের নির্দেশ। অন্যমনস্ক ভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে একটু বেশীই দেরী হইয়া গিয়াছিল বলিয়া প্রথমটা নীলিমার মুখভার এবং ম্লান হাসির ঠিক অর্থটা ধরিতে পারে নাই। তারপর জামাটা ছাড়িয়া নীলিমার হাত ধরিয়া কাছে টানিয়া আনিয়া পরিহাসের সুরে বলিয়াছিল --যেখানে চাকরী করি তারাও ‘লেট’ মাপ করে নীলু কিন্তু তােমার কাছে মার্জনা নেই। ও ঘরের ঘড়ি দেখে এস বরং-এ-কিঙ্করের কুড়িটি মিনিটের বেশী দেরি হয় নি। নীলিমাও পরিহাসের সুরেই জবাব দিল-নিশ্চয়ই না, আটটা-নটা কখন বেজে গেছে। কিন্তু তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া হরিশের সন্দেহ হইল। তারপর ভাল করিয়া মুখের দিকে চাহিয়া দেখিতেই তাহার ছলছল চোখ দুইটি নজরে পড়িল। এ দৃশ্য এতই অভাবনীয় যে কিছুক্ষণ হরিশ, বোধকরি একটা অজানা বিপদের আশঙ্কাতেই, কোন কথা কহিতে পারিল না। তারপর কোনমতে ঢোক গিলিয়া প্রশ্ন করিল—কী হয়েছে নীলু? নীলিমা হাতটা ছাড়াইয়া লইবার চেষ্টা করিতে করিতে কহিল—কি আবার হবে। ছাড়, তােমার চা তৈরী করে আনি- হরিশ তাহাকে জোর করিয়া বুকের উপর টানিয়া আনিয়া কহিল- আমাদের ত আর কোথাও কেউ নেই নীলু, তুমি যদি আমার কাছেও কথা গােপন করে তাহলে বাঁচবে কি করে? এবার আর নীলিমা নিজেকে সামলাইতে পারিল না, তাহার দুই চোখ হইতে ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। তাহার এতদিনের সমস্ত দুঃখ সেদিন যেন আর বাধা মানিতে চাহিল না। তাহার সেই বুকফাটা কান্নার মধ্য হইতে একটু একটু করিয়া হরিশ যে তথ্যটুকু সংগ্রহ করিল তাহা সংক্ষেপে এই : উপর তলার পারুল তাহার স্বামীর সহিত কোথায় নিমন্ত্রণে যাইতেছিল বিবাহের বেনারসী শাড়ী পরিয়া। সিড়ি দিয়া নামিবার সময় নীলিমার সহিত দেখা হয়, এবং দুই একটি খুচরা আলাপের মধ্যে নীলিমা একবার কাপড়টা পরীক্ষা করিবার মানসে আঁচলটি তুলিয়া ধরিতেই পারুল বলিয়াছে--হাতে তেল ছিল না ত ভাই ? দামী কাপড়, একবার দাগ ধরলেই মুস্কিল। দাম ত বড় সােজা নয়, তেতাল্লিশ টাকা নিয়েছে। কথাটা সামান্য, কিন্তু তাহার আঘাত যে কত সুগভীর তাহা হরিশের বুঝিতে বাকী রহিল না। সে নিঃশব্দে বসিয়া তাহার পিঠে হাত বুলাইতে লাগিল, কিন্তু নীলিমার চোখের উষ্ণ জল তাহার বুকের উপর যেখানটায় পড়িতেছিল সেইখানটা ভিতরে ভিতরে যেন উগ্র দাহনে পুড়িয়া যাইতে লাগিল। নীলিমাই একটু পরে মুখ তুলিয়া বলিল—তোমরা গায়ে-হলুদে যে কাপড়টা দিয়েছিলে সেটার শুনেছি প্রায় দেড়শ’ টাকা দাম, আর ঐ নতুন বেনারসীটা ত আমার সামনেই কেনা, বড়ঠাকুর নিজে আশী- টাকা গুণে দিয়েছিলেন; আমাকে ও তেতাল্লিশ টাকার কাপড় দেখায়।

হরিশ ম্লান হাসি হাসিয়া কহিল—ও কাপড় এখন আশীটাকা বললে ওরা বিশ্বাস করবে না। আমরা আট টাকার ঘরে থাকি । স্বামীর কাছে কান্নাকাটি করিয়া বুকের ভার অনেকখানি লাঘৰ হওয়ায় নীলিমা শীঘ্রই আবার সহজ হইয়া উঠিল, এবং দুই-একদিনের মধ্যেই কথাটা ভুলিয়া গেল। কিন্তু এত সহজে ভুলিতে পারি না হরিশ। এত বড় অবস্থান্তরেও যে স্ত্রী কোনদিন এতটুকু দুঃখ প্রকাশ করে নাই, তাহাব এই অপমান হরিশের বুকে নিদারুণ ভাবেই বি বিল। কিন্তু উপায় কি ? তখনও কাপড়টার ব্লাউজ পর্যন্ত তৈরী করা হয় নাই ; ইতিপূৰ্বেই হরিশ দুই একটি দজ্জির দোকানে খোজ লইয়াছিল, আড়াই টাকার কমে কেহ জামা তৈয়ারী করিতে রাজী হয় নাই। শুধু তাহাই নহে, কাপড় পরিয়া নীলিমা যাইবে কোথায় ? হরিশ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনদের নিকট হইতে অজ্ঞাতবাস করিতেছিল, এ অবস্থায় কোন আত্মীয়ের সহিত সম্পর্ক রাখা সম্ভব নহে। একমাত্র উপায় হইতেছে সিনেমায় যাওয়া। কিন্তু অত দামী কাপড় পরিয়া ন আনার সীটে বসা যায় না, অন্তত একটাকা দু- আনার টিকিট কাটিতে হইবে। সেও দুজনার দু টাকা চার আনা। তাহার পর যাইবার সময়ে ত ট্যাক্স করিয়া যাইতে হইবে। তাও কোন না টাকা-খানেকের ধাক্কা। সুতরাং হরিশ বহু হিসাব করিয়া দেখিয়াছে যে টাকা ছয়-সাত খরচা না করিলে কিছু করা যাইবে না। অথচ তাহার বর্তমান আয়ে মাসে চার আনা পয়সাও বাঁচে না। নীলিমার মাথার দিব্য দেওয়া আছে--সকাল সন্ধ্যায় ছেলে পড়াই- ১৫ খারও উপায় নাই। ছয় সাতটা টাকা তাহার কাছে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কি। দিন-পনেরো ধরিয়া চিন্তা করিতে করিতে অকাৎ একটা উপায় হইয়া গেল। ফাস্ট ক্লাসের একটি ছেলে তাহার কাছে টিফিনের সময় মাস-তিনেক একটু আধটু দেখাইয়া লইতে চাহিল। সে গরীবের ছেলে, রীতিমত মাষ্টার রাখিবার সামর্থ্য নাই, কিন্তু দু-একটা বিষয়ে সে নিতান্তই কাচা। হরিশ যেন অন্ধকারে সহসা আলো দেখিতে পাইল, সে ব্যগ্র কণ্ঠে কহিল--তা কিছু ত দিবি, কত দিবি বল্ দেখি । ছেলেটি একটু ইতস্ততঃ করিয়া কহিল—টাকা-তিনেক হলেই ভাল হয়। হরিশ খপ করিয়া তাহার হাতটা ধরিয়া কহিল-দেখ, তিনটাক। করে হলে তাের তিনমাসে ন'টাকা হয়, কিন্তু আমি তিনমাসে সাত টাকাই নিতে রাজী আছি, যদি এই মাসকাবায়ে সাতটি টাকা আগাম দিস—ভাল করে ভেবে দেখ। ছেলেটি তাহার অভিভাবকের সহিত কথা কহিয়া এই অদ্ভুত প্রস্তাবেই সম্মত হইল। হরিশ ক্যালেণ্ডারের দিকে চাহিয়া প্রত্যহ দিন গণিতে লাগিল, মাসকাবারের আর কত দেরী। কিন্তু ইহারই মধ্যে বিধাতা অলক্ষ্যেআর একটি পরিহাস করিলেন। হরিশের ঘড়ি ছিল না, তাহার নিজের হাত-ঘড়িটি অসুখের সময়েই বিক্রি হইয়া গিয়াছিল। বােতাম ও বড়ি থাকিতে নীলিমার কোন গহনা বিজয় করিতে কোন মতেই সে সম্মত হয় নাই। প্রথম প্রথম খড়ি যাওয়াতে খুবই অসুবিধা হইয়াছিল বটে, কিন্তু কমে তাহা সহিয়া গিয়াছিল। সামনের বড় ঘরের ভাড়াটেদের ঘড়ি দেখিয়া সে ইস্কুলে যাইত। ইতিমধ্যে সেই ঘড়িটা সারিতে যাওয়ায় উপরি-উপরি তিন-চার দিন হরিশের লেটু হইয়া গেল, এবং হেডমাষ্টার মহাশয় তাহাকে ডাকিয়া কড়া মন্তব্য প্রকাশ করিলেন। হরিশ ম্লানমুখে ফিরিয়া আসিয়া কথাটা নীলিমাকে জানাইয়া কহিল -কাল থেকে খুব সকাল করে ভাত দিও, একঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকতে হয় সেও ভাল। নীলিমা বহুক্ষণ ভাবে তাহার পাশে বসিয়া থাকিয়া তাহার বা হাতের কব্দিটি নাড়াচাড়া করিতে করিতে কহিল--তখনই তােমায় বলেছিলুম যে ঘড়িটা থাক—তা তুমি ত শুনলে না।•• এখনও তােমার কজির এ-জায়গাটা ফরসা রয়েছে, ঘড়ির দাগ মিলেনি। তাহার পর কতকটা অসংলগ্ন ভাবেই. কহিল-আচ্ছা কত টাকা হলে তােমার ঘড়ি হয় ? হরিশ ঠাট্টা করিয়া কহিল-কেন, কিনে দেবে নাকি? তাহার পর বলিল—সে অনেক টাকা। চলনসই ঘড়ির মধ্যে জন্-ব্যারেলটা মন নয়, তা তাতেও অন্ততঃ চোঙ্গ-পনেরো টাকা পড়বে নীলিমা আর কোন কথা কহিল না। ইহার দিন-চারেক পরেই হরিশ একদিন সকাল করিয়া ইস্কুল হইতে ফিরিয়া কহিল-ওগো, তােমার সেই কাপড়টা বার করে , পীস’টা কেটে নিই- নীলিমা যেন সহসা চমকাইয়া উঠিল, কহিল-কাপড়। কি কাপড়। .

অসহিষ্ণুঙাৰে হরিশ কহিল-আহা, ঐ যে তােমার সেই নতুন বেনারসীটা। শিগগির বার করে দাও, দর্জিকে দিয়ে আসি; তা নইলে পরশুর মধ্যে সে দিতে পারবে না। নীলিমা ভয়ে ভয়ে কহিল-কিন্তু সে যে অনেক খরচ, টাকা পাবে - রহস্যজনক ভাবে হাসিয়া ইরিশ কহিল—সে তখন দেখা যাবে। নীলিমা তাহার হাত ধরিয়া জোর করিয়া বসাইয়া কহিল- আচ্ছা সে হবে এখন। এখন একটু ব’স ত, একটু সুস্থ হও তারপর দেখা যাবে। বিছানার উপর বসাইয়া জামাটা খুলিয়া লইয়া খানিকটা বাতাস করিল, তাহার পর কি জানি কিসের কৌতুকে মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল দ্যাখাে একটা কাজ করেছি, বলো রাগ করবে না। হরিশ বিস্মিত হইয়া কহিল--কি কাজ? ছেলেমানুষের মত ঘাড় নড়িয়া নীলিমা কহিল, আগে বলো যে রাগ করবে না। তােমার দু’টি পায়ে পড়ি, কিছুতেই তুমি রাগ কমতে পারবে না- হরিশ আরো আশ্চর্য হইয়া কহিল, কিছুতেই আমি যে রাগ করি না তোমার ওপর তা ত তুমিই জানােই, কিন্তু ব্যাপারটা কি ? নীলিমা তখন ব্লাউজের মধ্যে হাত ঢুকাইয়া বুকের কাছ হইতে একটি সুদৃশ্য সুন্দর বা বাহির করিল, তাহার পর সলজ্জ হাসি হাসিয়া কহিল -আজ তােমার জন্মতিথি, মনে নেই। বাটি খুলিতেই ভিতরের ভেলভেটের উপর সুরক্ষিত, সুন্দর জোমিয়ামের ঘড়িটি বিবি করিয়া উঠিল। প্রখমটা সেদিকে চোখ পড়িতেই মুহূর্তের জয় হরিশের দৃষ্টি উল হইয়া উঠিল, কিন্তু খড়ি নামটা দেখিয়া তাহার মুখ শুকাইয়া গেল। ব্যাকুল-ভাবে নীলিমার হাতের চুড়ি গাহির দিকে চোখ বুলাইয়া লইয়া সে কহিল-কিন্তু এ যে অনেক দাম নীলু, এ কি করে পেলে তুমি। নীলিমা হাসিয়া কহিল-ভয় নেই, আমি চুড়ি ৰেচিনি। হরিশ কহিল-তবে? এবে অন্তত বিশ-বত্রিশ টাকার খেলা। বিস্ময়ে চোখ দুইটি বিস্ফারিত করিয়া নীলিমা এষাৰ দিল— বলেই ত? বিশ টাকাই নিয়েছে। পারুলের বরকে দিয়ে নিয়েছি, এ এড়ির দোকানে কাজ করে কি না? হরিশ কহিল-কি টাকাটা এল কোথা থেকে নীলিমা তাহার কোচার কাপড়টা আঙ্গুলে হইতে কাইতে নতমুখে কহিল-সেই নতুন বেনারসীখানা বেচে ফেলেছি উদভ্রান্ত বিহ্বল দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকি৷ হরিশ কহিল-কী বেচেছ? বেনারসী। সেই নতুনটা••• নীলিমা কতটা অসংলগ্নতাৰে কহিল-তুমি রাগ করবে না বললে বে।• কি আয় হ'ত, ওটা কবেই বা পরতুম বলো? তার চেয়ে এই তাল হ’ল। কিরণ পিসির বােনর বিয়ে, তিনি কাপড় বাচাই করে নিয়ে আমাকে পয়ষটি টাকা দিয়েছেন। কাপড়খানা তার খুৰ পহল হয়েছে। তাহার পর সহসা নিবিড়ভাবে হরিণে গলা খাইয়া ধরিয়া কহিল -আর সেই যে টনিকটা, তোমায় ডাক্তার খেতে বলেছিল, সেটাও এক বোতল নিয়ে রেখেছি। এইবার ওটা তােমায় নিয়মিত খেতে হবে।

তা বলে দিচ্ছি। বাকী টাকা কটা বাজে খরচ করতে আমি কিছুতেই হরিশ বিমুঢ়ভাবে বসিয়া রহিল।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Naba Badhu Ed. 3rd

Author
Mitra, Sri Gajendra Kumar
Title
Naba Badhu Ed. 3rd
File name
Naba Badhu Ed. 3rd
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/10/14
Publisher
Bhubanmohan Mazumdar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
136
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Essay
Keywords
Naba
DLI number
512966
Barcode
4990010019989.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
3eFI1RZOfSE
Download PDF

Naba Badhu Ed. 3rd