Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sir Gurudas Prasanga
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ
পদ্মনাথ ভট্টাচার্য্য
প্রণীত
এস, কে, লাহিড়ী এণ্ড কোং
এ ৪নং কলেজ দ্যাট, কলিকাতা
মূল্য আট আনা
18
Printed and published by J. C. Ghosh at the COTTON PRESS.
57, HARRISON ROAD, CALCOTTA,
for MESSRS 8. K. LAHIRI & Co.
মুখবন্ধ। পুণ্যশ্লোক স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয়ের স্বর্গ- রােহণের কিছুদিন পরেই “ভারতবর্ষ” পত্রে (আশ্বিন ও কার্তিক ১৩২৬ সালে) আমার নিকট লিখিত তদীয় পত্রাবলী প্রকাশিত করি। তারপরে “অৰ্চনা” পত্রিকায় (১৩৩২ সালের আষাঢ় ও ভাদ্র সংখ্যায়) তদীয় পুণ্যস্মৃতি প্রকাশিত হয়। তাঁহার জীবিত থাকার সময়ে ‘নব্যভারতে’ (মাঘ ১৩২৩) “বাকীপুর সাহিত্য সম্মিলন” শীর্ষক প্রবন্ধে প্রসঙ্গতঃ বিশ্ব- বিদ্যালয়ে ইদানীং বঙ্গভাষার প্রবর্তন কিরূপে কাহারদ্বারা হইয়াছে এই বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলােচনা করি। সেই আলাে- চনাংশ সুপ্রসিদ্ধ ‘প্রবাসী' পত্রে (চৈত্র ১৩২৩) “বঙ্গভাষার প্রবর্তক কে ?” এই শিরােনামে উদ্ভূত হইয়াছিল। ইহাতে স্যর গুরুদাস যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষার প্রবর্তনার্থ নানা ভাবে সবিশেষ যত্ন করিয়াছিলেন তাহাই প্রমাণিত হইয়াছে। এইগুলি সংগ্রহ করিয়া “স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ” প্রকাশিত হইল। * ইহা প্রথমতঃ বারাণসীস্থ সাহিত্য পরিষৎ শাখার এক অধিবেশনে পঠিত হইয়াছিল।
yo
পরন্তু এই সকল হইতে যদিও স্যর গুরুদাসের চরিত্র
মাহাত্ম, তাহার অনুষ্ঠিত কাৰ্য, বিষয় বিশেষে তদীয় অভিমত
ইত্যাদি কিয়ৎ পরিমাণে জানিতে পারা যায়, তথাপি তাঁহার
আদর্শ জীবনের ঘটনাবলীর ধারাবাহিক বৃত্তান্ত—তাহার শিক্ষা
দীক্ষা কাজ কর্মের বিবরণ--তাহার সন্তান সন্ততির কথা-
এইসব অতি অল্পই অবগত হওয়া যায়। এই নিমিত্ত ঐ সকল
বিষয় সমন্বিত তাহার জীবন চরিত অতি সংক্ষিপ্তভাবে লিখিয়া
ইহাতে সর্বাদৌ সংযােজিত করিয়া দেওয়া হইল।
এস্থলে কৃতজ্ঞতা সহকারে বিজ্ঞাপিত করিতেছি যে
স্যর গুরুদাসের জ্যেষ্ঠপুত্র—তদীয় গুণগ্রামের ভূরিভাগের
অধিকারী—শ্রীযুক্ত হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় হইতে
নানা প্রকারে সাহায্য লাভ করিয়াছি। “পত্রাবলীর
উপসংহারে এবং “পুণ্যস্মৃতির” অনেকস্থলে তঁাহার লেখা
উদ্ধত হইয়াছে। “জীবন চরিত” লিখিবার কালেও তঁাহার
নিকট হইতে অনেক কথা জ্ঞাত হওয়া গিয়াছে। এই
পুস্তক প্রকাশ বিষয়েও তঁাহার উপদেশে উপকৃত হইয়াছি।
কাশীধাম
ইতি-
শ্ৰাপদ্মনাথ দেবশর্মণঃ
শব্দাঃ ১৮৫ ০ ।
No text on this page.
অসুলভগুণযুক্ত পৰ্ম্মবনুরক্ত,
নিপিবুধবরেণ্যং ব্যবংশাবতঃস।
নৃপতিবিহিতমানং কামিং মহান্ত
গুরুবি গুরুদাসং ভক্তিপূৰ্ব্বং স্মরামঃ।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ প্রথম তাধ্যায়। স্যর গুরুদাসের সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত। কলিকাতার উপকণ্ঠে নারিকেল ডাঙ্গায় স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ইং ১৮৪৪ সনে ২৬শে জানুয়ারি ( শকাব্দ ১৭৬৫--১৪ মাঘ) তারিখে জন্ম গ্রহণ করেন। তাহার পিতার নাম রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বংশের আদি নিবাস ২৪ পরগণার অন্তবর্তী ‘বড়ে গ্রামে ছিল। গুরুদাসের পিতামহ মাণিক চন্দ্ৰ কলিকাতায় অর্থোপার্জনের নিমিত্ত আগমন করিয়া নারিকেল ডাঙ্গায় গৃহাদি নির্মাণ পূৰ্ব্বক সপরিবারে অবস্থান করেন। পিতা রামচন্দ্র ও কলিকাতায় চাকরী গ্রহণ করেন। তাহার বিবাহও কলিকাতায় শ্যাম পুকুরে রামকানাই গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা সােনামণি দেবীর সহিত হয়। বর্তমানে যেখানে স্যর গুরুদাসের বাড়ী ঐ খানেই পৈতৃক বাস ভবনও ছিল। গুরুদাসের বয়স যখন মাত্র ৪ বৎসর তখন তাঁহার পিতৃ- বিয়ােগ হয়। পিতা রামচন্দ্র সুপুরুষ ধৰ্ম্মিষ্ঠ এবং মিষ্ট-
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
ভাষী ছিলেন। হস্তাক্ষর তঁাহার অতি সুন্দর ছিল। গুরুদাস
পিতার এই সব গুণের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন। কিন্তু
যে সকল গুণের জন্য গুরুদাস স্মরণীয় এবং সর্বজন বন্দনীয়
হইয়াছিলেন—ঐ সকলের নিমিত্ত তিনি সৰ্ব্বততভাবে
তদীয় মাতৃদেবীর নিকটেই ঋণী। মাতা সােনামণি প্রকৃতই
দেবীস্বরূপা ছিলেন। ব্রহ্মচারিণী বিধবার কঠোর ধর্মানুষ্ঠান
তিনি যথাযথ সম্পাদন করিতেন। ল্যাবধি গুরুদাস এই
সংযত জীবন আদর্শ স্বরূপ পাইয়াছিলেন। মাতা সােনামণি
অতীব বুদ্ধিমতী ছিলেন-পুত্রের কিসে হিত হইবে তাহা
তিনি সম্যক্ অৰধারণ করিয়া তদনুরূপ আচরণ করিতে
তাহাকে সর্বদাই উপদেশ দিতেন। পুত্রের ব্যবহারে যদি
কদাপি কিছু ত্রুটী লক্ষিত হইত তিনি কঠোর ভাবে তাহার
সংশোধন করিতেন।
গীতায় ভগবান্
লিয়াছেন “শুচীনাং
এমতাং গেহে যােগভ্রষ্টাভিজায়তে” গুরুদাস তাদৃশ
“যােগভ্রষ্টই ছিলেন—তাই সাধু, মাতাপিতা লাভ করিয়া
পরিণামে পুণ্যশ্লোক হইতে পারিয়াছিলেন।
পঞ্চম বর্ষে যথারীতি বিদ্যারম্ভের পর গুরুদাস পল্লীস্থ
পাঠশালায় জননীকর্তৃক শিক্ষাৰ্থ প্রেরিত হইলেন। কিন্তু
অধিক দিন এ স্থানে পড়া চলিল না। অতঃপর কিছুকাল
জেনারেল এসেম্বিজ ইনষ্টিটিউশনে এবং গৌরমােহন আট্যের
ওরিয়েন্টে সেমিনারি ব্রাঞ্চ স্কুলে অধ্যয়ন করিয়া অবশেষে
হেয়ার সাহেবের স্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন।
ঐ স্কুল পটলডাঙ্গায় ভবানীচরণ দন্তের স্ট্রীটে ছিল।
প্রথম অধ্যায়।
বাড়ী (নারিকেলডাঙ্গা) হইতে এতটা দূর যাতায়াত বড়
কম কথা নহে--কিন্তু গুরুদাস কদাপি বিদ্যালয়ে যথাসময়ে
উপস্থিত হইতে অবহেলা করেন নাই। এখানে আসিয়া
তিনি এত গভীর মনােযােগ সহকারে অধ্যয়ন আরম্ভ
করিলেন এবং পরীক্ষাদিতে এমন কৃতিত্ব প্রদর্শন করিলেন
যে অষ্টম শ্রেণী হইতে পঞ্চম শ্রেণীতে এবং পর বৎসর
পঞ্চম শ্রেণী হইতে প্রথম হইয়া তৃতীয় শ্রেণীতে প্রমােশন
পাইয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে তিনি যখন যে ক্লাসে
পড়িতেন তাহাতে সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্র রূপে পরিগণিত হইতেন।
১৮৫৯ অব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়া
তিনি ১৮৬০ অব্দে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজ
হইতে ১৮৬২ অব্দে এফ, এ, এবং ১৮৬৪ অব্দে বি এ,
পরীক্ষা দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার পূর্বক
উত্তীর্ণ হন। ১৮৬ অব্দে গণিতে এম্ এ পরীক্ষায় ও
প্রথম স্থান অধিকার করিয়া (প্রথম শ্রেণীতে) পাস হন।
১৮৬৬ আব্দে বি এল পরীক্ষায়ও দিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হইয়া
পাস্ করিয়া স্বর্ণপদক পুরস্কার পান।
নিয়মমত লেক্চার শুনিয়া পরীক্ষা দিবার কাৰ্য এখানেই
এখন ক জীন আরম্ভ হইল। ইতােমধ্যে
বি এ পাস করিবার পরে এবং বি এল পাস করিবার
পূর্বে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে এবং জেনারেল এসেধিতে
অধ্যাপকের কৰ্ম্ম করিয়াও সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন।
১৮৬৬ অব্দে বহরমপুরে ল লেকচারার নিযুক্ত হইয়া সঙ্গে
শেষ হইল।
৪ শর গুরুদাস প্রসঙ্গ। সঙ্গে সেখানে ওকালতী করিবার জন্য বাড়ী ছাড়িয়া এই প্রথম বিদেশ গমন করিলেন। জননী প্রতিজ্ঞা করাইলেন- মাসিক ১০০ টাকা আয় হইতে পারে এমন সম্পত্তি অর্জিত হইলেই বাড়ী আসিয়া বসিতে হইবে। এখানে উল্লেখ আবশ্যক যে এন্টনিস পাসের অল্পপরেই গুরুদাসের বিবাহ হয়। বি এল পাসের পূর্বেই প্রথম সন্তান একটী কন্যা জন্মে। যাহারা মনে করেন বাল্য বিবাহে পড়া শুনার অনিষ্ট হয় তাহাদের এই ব্যাপারে আশ্চৰ্যবােধ হইতে পারে; কিন্তু মনে রাখিতে হইবে যে ছেলে এবং অভিভাবকের চাল চরিত্রের উপরেই বাল্য বিবাহের ফলাফল নির্ভর করে। বরং অনেক সময় ঐ রূপ বিবাহে অসংযমের পথ রুদ্ধ হইয়া কল্যাণ হইবারই সম্ভাবনা। নভেল পড়িয়া থিয়েটার বায়ােস্কোপ দেখিয়া চা চুরুট ডিম্ব মাংসাদি খাইয়া আজ কালকার অবিবাহিত কলেজের ছাত্রের স্বাস্থ্য ও প্রকৃতি যে সচরাচর স্পণীয় গােচের হইতেছে ইগ স্বীকার করিতে পারি না। শুনিয়াছি পদ্দশায় গুরুদাস পাঠ্য পুস্তক ব্যতীত নাটক নভেল পড়েন নাই। আর আদর্শ ব্রহ্মচারিণী জননী যে গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপে বিরাজমান ছিলেন সেখানে আহার বিহার প্রভৃতি সমস্ত ব্যপারেই যে একটা সংযম ছিল তাহা বলাই বাহুল্য। স্যর গুরুদাসের পুত্র পৌত্রেরাও অল্প বয়সে পড়াশুনার সময়েই বিবাহ করিয়াছেন অথচ কি স্বাস্থ্যে কি চরিত্রে কি শিক্ষা দীক্ষায় তাহার সকলেই প্রশংসনীয়।
প্রথম অধ্যায়।
বহরমপুরে গুরুদাস বাবু কেবল উকীল ও আইন
অধ্যাপক ছিলেন না, তাঁহাকে কলেজের গণিত শাস্ত্রেরও
অধ্যাপনা করিতে হইত। আবার তিনি সুপ্রসিদ্ধ পণ্ডিত
রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয়ের নিকট সংস্কৃত পড়িতেন।
পঠদ্দশায় কলেজে সংস্কৃত পড়েন নাই তবে বাড়ীতে কোনও
পণ্ডিতের নিকট সামান্য সংস্কৃত শিখিয়াছিলেন । এখন
এই অবস্থায় সংস্কৃত রীতিমত পণ্ডিতে আরম্ভ করিয়া তাহাতেও
বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন।
১৮৬৮ অব্দে সর্ব প্রথম প্রেমাদ রায়চাঁদ পরীক্ষা গৃহীত
হয়। তখন গুরুদাস বাবু ওকালতীতে যােগদান করিয়া
দুইবৎস: কাল প্র্যাকটিস, করিলেও ঐ পরীক্ষাটা দিবার জন্য
কয়েক দিনের মাত্র দুটি নিয়া কলিকাতায় যান। বাবু
আশুতােষ মুখােপাধ্যায় নামক এক প্রতিভাবান্ ছাত্র সেবার
ঐ বৃত্তি পান -- কিন্তু গুরুদাস বাবু তঁাহার অপেক্ষা মােটের
উপর অধিক নম্বর পাইয়াছিলেন—পরন্তু দুএকটি বিষয়ে
শতকরা ৪০ এর কম নম্বর পাওয়াতে ঐ বিষয় গুলির নম্বর
সমষ্টিতে যােগ না হওয়ায় আশুতােষই প্রথম হইয়া বৃত্তি
পান।# উত্তরকালে তিনি বলিতেন যে ভগবান্ যাহা করেন
সমস্তই আমাদের পরিণামে মঙ্গলের জন্য, এই দৃঢ় বিশ্বাস
আমাদের থাকা উচিত। যদি তিনি প্রেমাদ রায়চঁাদ বৃত্তি
পাইতেন, শীঘ্রই বহরমপুর ত্যাগ করিয়া কলিকাতা হাইকোর্টে
* এই আশুতােষ যে সুপ্রসিদ্ধ স্যর আশুতােষ নহেন তাহা বলাই
বাহুল্য; স্যর আশুতােষ ১৮৮৬ অব্দে প্রেমাদ রায়চাঁদ বৃত্তি পান।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
আসিতেন; তাহা হইলে এখানে তাহার প্র্যাকটিসের তাদৃশ
বৃদ্ধি হইত না। অধিকন্তু তিনি রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয়ের
নিকট যে সংস্কৃত শিক্ষা আরম্ভ করিয়াছিলেন, তাহাও
অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইত।
বহরমপুরে ভঁহার ওকালতীতে দিন দিন পরে বৃদ্ধি
হইয়াছিল—তাঁহার প্রতিভা দর্শনে নগ্ন হইয়া মুর্শিদাবাদের
নবাবসরকারও তাকে ঐ নবীন বয়সেই উকীল নিযুক্ত
করিয়াছিলেন। ওকালভীত সত ন্যায় পক্ষাবলম্বন করিয়া
চললেও অর্জন তিনি যথেষ্টই করিয়াছিলেন। কিন্তু কোনও
জায়গা জমি নলামে ডাকিয়া জমিদারী অর্জনের চেষ্টা করেন
নাই, অথবা ফুসীদের প্রলােভনে টাকা লগ্নীর কারবারেও
প্রবৃত্ত হন নাই।
বহরমপুরে তখন অনেক প্রসিদ্ধ সাহিত্যসেবীর সমাগম
হইয়াছিল তন্মধ্যে অক্ষয়চন্দ্র সরকার মহাশয়, তাঁহার পিতা
সাহিত্যরসিক গঙ্গাচরণ সরকার মহােদয় প্রভৃতির সহিত
মিলিত হইয়া গুরুদাস বাবু “নবরত্ন সভা” গঠন করেন। জজ
কোর্টের সেরেস্তাদারের কামরায় ইহার অধিবেশন হইত, তাই
ঐ সেরেস্তাদার ‘বিক্রমাদিত্য হন-গঙ্গাচরণ বাৰ ‘কালিদাস’
এবং গুরুদাস বাবু ‘বররুচি' হইয়াছিলেন। বিক্রমাদিত্যের
যেমন সমস্যাপূরণ ইত্যাদি হইত ইহাতেও তাহা
ঐ সভা যেমন রক্ষা কর্তৃক আক্রান্ত হইত এখানেও
অক্ষয় বাবু রাক্ষসের ভূমিকা গ্রহণ পূৰ্ব্বক মধ্যে মধ্যে জটিল
সভা
হইত ;
প্রথম অধ্যায়। ৭ সমস্যা দ্বারা নবরত্ন সভার সভ্যদিগকে বিব্রত করিয়া তুলিতেন।* বিক্রমাদিত্যের সভায় কালিদাস ও বররুচির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিত--এখানেও গঙ্গাচরণ বাবু ও গুরুদাস বাবুর মধ্যে সমস্যা প্রদান ও তৎপুরণার্থ প্রতিযােগিতা চলিত। ফলতঃ ইহাত গুরুদাস বাবুর সাহিত্যরসজ্ঞতারও সবিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। এইরূপে ন্যূনাধিক ছয় বৎসর কাল বহরমপুরে কাটাইয়া ইং ১৮৭২ অব্দের শেষভাগে গুরুদাস ব'বু হাইকোর্টে যােগ দিবার জন্য কলিকাতায় চলিয়া আইসেন। কলিকাতায় আসিয়া তিনি আইন বিষয়ক জ্ঞানের পরিপুষ্টি নিমিত্তে অধ্যয়নে মনােনিবেশ কেিলন। ১৮৭৬ অব্দে ‘অনার্স ই’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া পরবৎসরেই ডি এল উপাধি প্রাপ্ত হন। এইরূপে ঐ উপাধি গুরুদাস বাবুই সর্বপ্রথম প্রাপ্ত সেবার হাইকোর্টের সুপ্রসিদ্ধ উকীল বাবু ত্রৈলােক্য- নাথ মিত্র মহােদয়ও ডি এল উপাধি লাভ করেন ? পরবর্তী বৎসরে ১৮৭৮ অব্দে গুরুদাস বাবু ঠাকুর আইন অধ্যাপক নিযুক্ত হইয়া -- “বিবাহ ও স্ত্রীধন” বিষয়ে বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতা গুলি তাহার হিন্দুশাস্ত্রে প্রগাঢ় অধিকার * বঙ্গবাসী আফিস হইতে প্রকাশিত “বঙ্গ ভাষার লেখক” নামক গ্রন্থে পিতাপুত্র' প্রবন্ধে অক্ষর বাবু এই সভার বিস্তারিত বর্ণনা করিন্নাছেন কৌতূহলী পাঠক তাহা দেখিতে পারেন। • ত্রৈলে:ক্য বাৰু দশ বৎসর পূৰ্ব্ব (১৮৬৭ অব্দে। কলিকাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম ‘মনাস ইল’ পরীক্ষায় ॥াস করিয়াছিলেন ।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
واطر
১৮৮৫ অব্দ
সূচনা করিয়াছে এবং ঐ বিষয়ে প্রামাণিক নিবন্ধ বলিয়া
অদ্যাপি সমাদৃত হইতেছে ।
১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলাে
এবং বি এল পরীক্ষায় ‘হিন্দু ল’র পরীক্ষক হন।
খ্রীষ্টাব্দে তিনি অনারেরি প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট এবং
পরবৎসর বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউসিলের মেম্বর নিযুক্ত
হন। ১৮৮৬ হইতে ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দপৰ্যন্ত তিনি কলিকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিণ্ডিকেটের মেম্বর ছিলেন।
ডাক্তার গুরুদাস সত্বরই হাইকোর্টের একজন প্রধান
উকীল রূপে পরিগণিত হইয়া উঠিলেন। তখন তিনি বিশ্ব
বিদ্যালয়ের কাৰ্য আত্মনিয়ােগ করিলেন।
হইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলির নিয়মাবলী ও পাঠ্যাদিতে
অনেক পরিবর্তন ঘটে। ইহা প্রধানতঃ ডাক্তার গুরুদাসেরই
প্রযত্নের ফল। এই সময়ে তিনি ইণ্ডিয়ান ন্যাশনেল কংগ্রেসের
কাৰ্যেও যােগদান করিয়া ছিলেন। এই অবস্থায় গভর্ণমেন্টের
দৃষ্টি যে ভঁহার দিকে আকৃষ্ট হইবে তাহাতে আশ্চৰ্য্য বােধ
করিবার কোনও কারণ নাই। তাই ১৮৮৬ অব্দে গভর্ণমেন্ট
কর্তৃক তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কাউসিলের মেম্বর নির্বাচিত
হন এবং তাহাতেও স্বকীয় প্রজ্ঞা-প্রতিভার নিদর্শন
প্রদর্শন করেন।
অতঃপর তাঁহার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য, নিষ্কলঙ্ক চরিত্র, জন
হিতকর কাৰ্যে উৎসাহ, বিশেষত হাইকোর্টে তাহার বিলক্ষণ
প্রসার প্রতিপত্তি ইত্যাদি কারণে সরকার বাহাদুর
প্রথম অধ্যায়। তাহাকে হাইকোর্টের বিচারাসন অলঙ্কৃত করিবার যােগ্য পাত্র বিবেচনা করিলেন; তাই ১৮৮৮ অব্দের শেষ ভাগে তিনি হাইকোর্টের জজেব পদে নিযুক্ত হইলেন। যিনি উকীল থাকার সময়েও সর্বদা ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করিতেন-তিনি যে বিচারকভাবে নিরপেক্ষ ন্যায়পরায়ণ বলিয়া যশােলাভ করিবেন, তাহাতে আশ্চর্য কি? আবার এই সময়ে তাঁহার মাতৃদেবীও তাহাকে বলিয়াছিলেন, “এতদিন ওকালতী কাৰ্য্যে তােমাকে কেবল একপক্ষ সমর্থন করিতে হইত, এখন বিচারকের কাৰ্য্যে তােমাকে দুই পক্ষের কথা শুনিয়া বৰ্ত্ত্য স্থির করিতে হইবে। এইকাৰ্য্য সহজ নহে। সেইজন্য কেবল তোমার নিজের দ্যিা ও বুদ্ধির উপর নির্ভর কপিও না। কিন্তু সর্বদা ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিবে, উভয়পক্ষের মধ্যে সভ্য কোথায় নিহিত আছে তাহা তিনি যেন তোমাকে দেখাইয়া দেন।” ফলে, জষ্টিস্ গুরুদাস জজিয়তীতেও সম্পূর্ণ সুনাম অর্জন করিয়াছিলেন। জজ হইবার সংৎসর কালের মধ্যেই তাহার মাতৃবিয়ােগ ঘটে। মাতৃভক্ত গুরুদাস বাবু শশাকে অভিভূত হইয়া পীড়াগ্রস্ত হইয়া পড়েন। মাতৃবিয়ােগের কিছুকাল পরেই ১৮৮৯ অব্দের ডিসেম্বর মাসে জঙিস ডাক্তার গুরুদাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইসচ্যাসেলার নিযুক্ত হন। সমগ্র ভারতবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইনচ্যাসে লারি পদ এই সর্বপ্রথম একজন ভারতীয় ব্যক্তির করতল- গত হইল। এই অতি দায়িত্বপূর্ণ কাৰ্যও তিনি যে স্বভাব- ১০ স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ। সুলভ বিচক্ষণতা সহকারে নির্বাহ করিয়াছিলেন, তাহা বলাই বাহুল্য। এই পদের নিয়ােগ দুই বৎসরের নিমিত্ত হয় ; বিশেষ যােগ্যতা প্রদর্শন করিলে আরো দুইবৎসরের জন্য পুনর্নিয়োেগ হইয়া থাকে। ডাক্তার গুরুদাসও পুনরায় উক্ত- পদে নিযুক্ত হন; কিন্তু এক বৎসর কাজ করিয়াই উহা স্বয়ং পরিত্যাগ করেন। ১৯০২ অব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি বিধানার্থে লর্ডকার্জন এক কমিশন গঠন করেন, তাহাতে ডাক্তার গুরুদাস সদস্য নিযুক্ত হন। অন্যান্য সদস্যের সহিত সম্পূর্ণ একমত হইতে না পারিয়া যে স্বতন্ত্র সারগর্ভ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন তাহাতে তদীয় নির্ভীক তেজস্বিতা সম্যক্ সূচিত হইয়াছিল। ১৯০৪ অব্দের প্রথমেই বয়ঃক্রম ৬০ বৎসর পূর্ণ হইবামাত্র তিনি জজিয়তী পরিত্যাগ করেন। ঐ সনে সম্রাটের জন্মােৎ- সব দিবসে তিনি নাইট হইয়া ‘স্যর’ উপাধির ভাজন হন। রাজকাৰ্য্য হইতে অবসর প্রাপ্ত হইয়া স্যর গুরুদাস কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনে কাউসিল অব এডুকেশন, বিজ্ঞান সভা, ইউনিভারসিটি ইনষ্টিটিউট, সাহিত্যপরিষৎ ইত্যাদি শিক্ষা সাহিত্য ও বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান গুলির সঙ্গে যােগ রাখিয়াছিলেন। তবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই তাহার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল --ইহাতে তিনি নানা ভাবে সংসৃষ্ট ছিলেন । ১৯০৮ অব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবিলী উপলক্ষে কয়েকজন শ্রেষ্ঠ মনীষী “অনারেরি ডক্টর” উপাধি লাভ প্রথম অধ্যায়। ১১ করেন, তন্মধ্যে সর্ গুরুদাস “পি-এইচ ডি” উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সসম্মানে সুখে ও শান্তিতে জীবনের শেষভাগ অতিবাহিত করিয়া স্যর গুরুদাস ইং ১৯১৮-২রা ডিসেম্বর (শকাব্দ ১৮৪০ ১৬ অগ্রহায়ণ ) তারিখে সজ্ঞানে ৩ গঙ্গাতীরে দেহ ও্যাশ পূৰ্ব্বক স্বর্গগত হইয়াছেন। তাঁহার রি পুত্র ও দুই কন্যা বর্তমান আছেন*-পুত্রগণ ও জামাতৃদ্বয় সকলেই সুশিক্ষিত ও স্বপৰ্ম্ম নিরত। জ্যেষ্ঠপুত্র শ্ৰীযুক্ত হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম এ, বি এল রিপণ কলেজে অধ্যাপনা করিতেন—ইদানীং কলিকাতা বিশ্ব- বিদ্যালয়ের কাজে আছেন—Secretary to the fPost- Graduate Science Council. fautu go a9 *55507 বন্দ্যোপাধ্যায় বাহাদুর এম এ, ডি এল ভারত গভর্ণমেন্টের আইন বিভাগের সহকারী সেক্রেটারী ছিলেন সম্প্রতি-- President of the Calcutta Improvement Trust Tribunal আছেন। তৃতীয় পুত্র শ্ৰীযুক্ত উপেন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম এ, বি এল একাউন্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করিতেন, অল্পদিন হইল পেন্শন নিয়াছেন। কনিষ্ঠ (অধুনা চতুর্থ পুত্ৰ শ্ৰীযু: সুরেন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম এ প্রেসিডেন্সী কলেজে বেটিনির প্রফেসর । প্রথম জামাত * উ.1র এs-টি পুত্র ও একটি * ন্য। অল্প বসে ময়া গিয়াছে, কন্যাটি তাহার প্রথম সন্তান এবং পুটি তাহার চতুর্থ পুত্র ছিল।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ। শ্ৰীযুক্ত মন্মথনাথ মুখােপাধ্যায় এম এ, বি এল ওকালতীতে যশােভাজন হইয়া এইক্ষণে হাইকোর্টের জজের পদ অলঙ্কত করিতেছেন। দ্বিতীয় জামাতা শ্ৰীযুক্ত সুধাংশুশেখর মুখােপাধ্যায় বি এল হাইকোর্টে ওকালতী করিতেছেন। মাতৃভক্ত স্যর গুরুদাস পুত্র, বিত্ত, যশঃ, সম্মান সমস্তই তদীয় পুণ্যবতী জননীর আশীর্বাদের ফল মনে করিতেন- পরন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সকল তাহারই পূৰ্ব্ব ও ইহজন্মের সুকৃতির ফল। কথায়ও বলে “স্ত্রী পুত্র জল--আপন কৰ্ম্মের ফল।” স্যর গুরুদাস নিম্নলিখিত পুস্তকগুলি প্রণয়নপূৰ্ব্বক স্বকীয় উচ্চশিক্ষার সার্থকতা সম্পাদন করিয়া গিয়াছেন :- (১) পাটীগণিত ইংরেজী ও বাঙ্গালা ) (২) জ্যামিতি ( ইংরেজী ও বাঙ্গালা ) (৩) বীজগণিত (৪) জ্ঞান ও কর্ম (e) A few Thoughts on Education. (9) The Educational Problem in India, জনক জননীর পরম ভক্তিমান্ সন্তান স্যর গুরুদাস কাশীধামে (৩৬ নং সােনার পুরায়) একটা বাটিক নির্মাণ পূৰ্ব্বক মাতাপিতৃনামস্মারক “শ্রীরামচন্দ্রেশ্বর” শিব প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছেন। জননীর নামে বিশ্ববিদ্যালয়েও * বঙ্গভাষায় এই পুস্তকখানির ন্যায় সারগর্ভ গ্রন্থ অতি বিরল ; স্মর গুরুত্বাসের প্রকৃত পরিচয় ইহা হইতেও লাভ করা যায়।
প্রথম অধ্যায়। একটা প্রাইজ’এর ব্যবস্থা করিয়াছেন। প্রতি বৎসর যিনি সংস্কৃত এম এ পরীক্ষার্থিগণের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত হইবেন, তিনি এই “সােনামণি প্রাইজ” পাইবেন। তাঁহার অকালমৃত পুত্র (যতীন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) হেয়ার স্কুলের একজন উৎকৃষ্ট ছাত্র ছিল : তাহার নামেও পুত্রবৎসল স্যর গুরুদাস মেডেল ও প্রাইজের ব্যবস্থা করিয়াছেন। এন্ট্রান্স ( বর্তমানে মেটিকুলেশন) পরীক্ষায় যে ছাত্র প্রথম হইবে সে “যতীন্দ্র চন্দ্র মেডেল” এবং হেয়ার স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে যে প্রথম স্থান অধিকার করিবে সে “যতীন্দ্র চন্দ্র প্রাইজ” পাইবে। তঁাহার স্বর্গারােহণের পর নারিকেলডাঙ্গায় একটি বত্ম “সর গুরুদাস বােড় এবং একটি প্রতিষ্ঠান “স্যর গুরুদাস ইনষ্টিটিউট” নামে অভিহিত হইয়া তদীয় পুণ্যস্মৃতি জাগরূক রাখিতেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়। স্যর গুরুদাসের পুণ্যস্মৃতি। ইংরেজী শিক্ষিত বাঙ্গালীর মধ্যে দুইজনের স্মৃতি আমি শ্রদ্ধা সহকারে পােষণ করিয়া থাকি, এবং মনে করি ইহারাই প্রকৃত পক্ষে আমাদের আদর্শ স্থানীয় হওয়া উচিত। তন্মধ্যে একজনকে দেখিবার সৌভাগ্য আমার হয় নাই অপর মহাত্মাকে বহুবার দর্শন করিয়া ধন্য হইয়াছি। উভয়েই ব্রাহ্মণ-কান্যকুজ হইতে আদিশূর কর্তৃক আনীত বলিয়া প্রখ্যাত ব্রাহ্মণের বংশজাত; একজন মুখ্য, অপর বন্দ্য। উভয়েই স্বীয় পঠদ্দশায় সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিলেন- একজন বিপত্নীক সংযমশীল পিতার উচ্চাদর্শে অনুপ্রাণিত এবং অসাধারণ পিতৃভক্ত; অপর বিধবা ব্রহ্মচারিণী মাতার পবিত্র আদর্শে গঠিত এবং অসাধারণ মাতৃভক্ত। উভয়েই শিক্ষানুরাগী, একজন শিক্ষা বিভাগেই সমস্ত জীবন কাজ করিয়া ঐ বিভাগের সর্বোচ্চ পদবীতে উন্নীত হইবার যােগ্য বলিয়া কর্তৃপক্ষের দ্বারা মনােনীত হইয়াছিলেন; অপর বিশ্ববিদ্যা- লয়ের সম্পর্কে কাৰ্য্য করিয়া ভারতবাসীর মধ্যে সর্বপ্রথম * প্রবন্ধটি লিখিয়া সর গুরুদাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীযুক্ত হরণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকট পাঠাইয়াছিলাম। তিনি কোনও কোনও বিষয়ে স্বীয় অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন- দনুসারে কিঞ্চিৎ সংশােধন করা হইয়াছে এবং মধ্যে মধ্যে তদীয় মন্তব্যও উল্লেখিত হইয়াছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়। • ভাইস চ্যানসেলর নিযুক্ত হইয়াছিলেন। উভয়েই সমাজ হিতার্থে সগ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন; একজনের আচার প্রবন্ধ” “সামাজিক প্রবন্ধ প্রভৃতি এবং অপরের “জ্ঞান ও কৰ্ম” বঙ্গ ভাষায় সৎ সাহিত্যের পরিপুষ্টি সাধন করিয়াছে। ভূদেব মুখােপাধ্যায় সম্বন্ধে আমার বক্তব্য অনেক প্রবন্ধে প্রকাশিত করিয়াছি। সৌভাগ্যবশতঃ তাহার জীবন চরিত যেরূপ বিস্তারিত ভাবে তদীয় উপযুক্ত পুত্র কর্তৃক লিখিত হইয়াছে, তাহাতে তাহার সম্পর্কীয় কথা সাধারণের আর অবিদিত থাকিবে না। কিন্তু স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের বিস্তৃত জীবন চরিত এ পর্যন্ত লিখিত হয় নাই, শুনিয়াছি তাহার তৃতীয় পুত্র তাহা লিখিবেন—জানি না কখন প্রকাশিত হইবে। * এই প্রবন্ধে তদীয় জীবন কাহিনী বিবৃত করিতে প্রবৃত্ত হই নাই, কেবল তাঁহার সম্পর্কীয় কতকগুলি কথার মাত্র যথাস্মৃত উল্লেখ করিব। তাহার সঙ্গে চিঠি পত্ৰও চলিয়াছিল—তন্মধ্যে কতকগুলি চিঠি “স্যর গুরুদাসের পত্রাবলী” শিরােনামে “ভারতবর্ষে” (১৩২৬ আশ্বিন ও কার্তিক সংখ্যায়) প্রকাশিত হইয়াছে। * সম্প্রতি জানিতে পারিলাম স্যর গুরুত্বাসের তৃতীয় পুত্র “Remiuiscences Speeches and Writings of Sir Goorooduss Bancrji" নামক একখানি ইংরেজি পুস্তক লিখিয়া প্রকাশিত করিয়াছেন। স্যর গুরুদাসের জীবন চরিতও ইতােমধ্যে একখানি বাহির হইয়াছে ; লেখক তঁাহারই একজন আত্মীয়, নাম শ্ৰীযুক্ত জ্ঞানানন্দ রায় চৌধুরী-গ্রন্থের নাম “পূজনীয় গুরুদাস।” এই গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে দ্রষ্টব্য।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
পূর্বে হাইকোর্টের জজ এ দেশীয় কেহ হইলে পত্রিকাদিতে
তাহার সচিত্র বিবরণী প্রকাশিত হইত। আমার যতদূর
স্মরণ হয় স্যর গুরুদাস জজ নিযুক্ত
গুরুদাস জজ নিযুক্ত হইবার পরেই
তাহার কথা প্রথম শুনিতে পাইয়াছিলাম। তখন ঢাকা
কলেজে বি এ
পড়িতাম।
আমার একজন সহাধ্যয়ী
ব্রাহ্ম বন্ধু প্রসঙ্গতঃ আমাকে বলিয়াছিলেন--“আরে তুমিও
আবার একটা হিন্দু জান কি গুরুদাস বাবু কত বড়
হিন্দু? কলিকাতায় যদি কেহ প্রকৃত হিন্দু থাকেন
তবে এই এক ব্যক্তি।” শুনিয়া, মনে মনে তাহাকে
ভক্তি সহকারে প্রণাম করিলাম। বস্তুত শুনিয়া বড়ই
আহাদ হইল—একজন প্রকৃত সদাচার সম্পন্ন হিন্দু একটি
স্পণীয় পদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। আবার নামটিতেও
আমার ভক্তি জন্মিয়াছিল—ইহা আমার (তদানীং অচির
স্বৰ্গত) ৩ পিতৃদেবেরই নাম অথবা উপনাম। আমার
পিতৃদেবের নাম ছিল “পঞ্চানন্দ’! তিনি যখন গুরুগৃহে
অধ্যয়নার্থ গেলেন তখন গুরুপত্নী প্রভৃতি পুরীরা তাহাকে
নাম ধরিয়া ডাকিতে পারিতেন না--কেননা গুরুদেবের
উপাধি ছিল ‘পঞ্চানন। তখন তাহারা পিতৃ দেবের অসাধারণ
গুরুভক্তি দর্শনে নাম দিলেন ‘গুরুদাস'। পাঠ সমাপনান্তে
গুরুদেব তাহাকে ‘তর্কপঞ্চানন' উপাধি দিয়া ‘পঞ্চানন্দ
নামটি
সমুজ্জল করিয়া
দিলেও পিতৃদেব রুদণ্ড
উপাধির সঙ্গে গুরুপত্নী প্রদত্ত গুরুদাস নামটি সর্বদাই
দ্বিতীয় অধ্যায়। ১৭ ব্যবহার করিতেন।* সেই সময় হইতেই তাহার সম্বন্ধে সবিশেষ খোঁজ খবর নিতে আগ্রহান্বিত হইয়া পড়িলাম। তাহার সদাচারনিষ্ঠা, তঁাহার অমায়িকতা, তাহার অসাধারণ মাতৃভক্তি এই সব ক্রমশঃ বিস্তারিত অবগত হইয়া বড়ই আহলাদিত হইতাম। তিনি যখন ভাইস চ্যানসেলার হইয়া কভােকেশনে প্রথম বক্তৃতা করেন, সংবাদ পত্রে তাহা প্রকাশিত হইলে এক প্রকার মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছিলাম- এত আগ্রহ সহকারে উহা পড়িয়াছিলাম। তখন গ্রাম দেশেও স্যর গুরুদাসের নাম যশঃ প্রসার লাভ করিয়াছিল। আমার এক আত্মীয় কালীঘাটে দেবী দর্শনার্থে গিয়া দেখিলেন একজন পট্টবস্ত্র পরিহিত ব্রাহ্মণ নিষ্ঠা সহকারে কালী মন্দির প্রদক্ষিণ করিতেছেন ।এক জন বলিল, “ইনি সম্প্রতি হাইকোর্টের জজ হইয়াছেন, খুব সাধু লোেক।” আমার আত্মীয় তঁাহার নাম ও তৎসম্বন্ধীয় নানা কাহিনী সংগ্রহ পূৰ্ব্বক দেশে আসিয়া যে সব গল্প করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে একটি এ স্থলে উল্লেখ করা যাইতেছে। একদিন গুরুদাস বাবু গঙ্গাস্নান করিয়া পদব্রজে বাড়ী ফিরিতেছিলেন। পথিমধ্যে এক গৃহস্থ তাঁহাকে বলিলেন * স্যর গুরুদাসের সঙ্গে আমার বহুবার সাক্ষাৎকার হইয়াছে, কিন্তু এই কথাটি কদাপি তাঁহাকে জানাই নাই; তিনি এই অধমের প্রতি এতটা স্নেহানুগ্রহ প্রদর্শন করিতেন যে, তিনি আমার পিতৃনামা এ কথাটা তাহাকে জানাইয়া সেহানুগ্রহের ভাব বর্জন করিবার প্রয়াস নিতান্ত অনাবশ্যক মনে হইত। ২
১৮
সুর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
“ঠাকুর, আমার গৃহদেবতার পূজক আজ অনুপস্থিত, কৃপা
করিয়া যদি আপনি পূজার কাজটি সম্পাদন করিয়া যান।”
গুরুদাস বলিলেন, “আমার বিশেষ জরুরী কাজ আছে, তবে
দেবতার পূজা হইবে না, তাহা হইতে পারে না; আপনি
সত্বর পূজোপকরণ দিন, আমি তাড়াতাড়ি কাজটি সারিয়া
যাইতেছি।” গৃহস্থ গুরুদাসের কথায় বুঝিলেন ব্রাহ্মণটি বড়ই
সাধু, পূজোপকরণ একটু প্রচুরই দিলেন—কেননা ইহা
পূজকেরই প্রাপ্য। গুরুদাস পূজা সারিয়া নৈবেদ্য না নিয়াই
দ্রুত চলিয়া যাইতেছেন দেখিয়া গৃহস্থ তাহা নিয়া তাহার
অনুসরণ পূর্বক ঐ সব নিবার জন্য অনুরােধ করিতে
লাগিলেন। গুরুদাস তাহা নিয়মিত পূজককেই দিতে বলিয়া
স্বয়ং গ্রহণে অস্বীকার করিতেছিলেন। এমন সময় একজন
হাইকোর্টের ব্যারিষ্টার ( টি পালিত বলিয়াই যেন শুনিয়াছি।
ঐ রাস্তায় টন্ টম হাঁকাইয়া যাইতেছিলেন, তিনি গুরুদাসকে
দেখিয়া মাথার টুপি খুলিয়া অভিবাদন করিলেন। গৃহস্থ তত
দেখিয়া অবাক্। তখন পরিচয় পাইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে
নিপতিত হইয়া ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিলেন।
গুরুদাস বলিলেন, “সে কি, আপনি তাে আমায় অন্যায় কিছু
বলেন নাই; আমি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণপাচিত কাজেই আমাকে
প্রবর্তিত করিয়াছেন, আমিও আজাদ সহকারে তাহা
করিয়াছি। আপনি বৃথা অনুতপ্ত হইতেছেন।”
* এই গল্পটি সত্য কি না, এ বিষয়ে স্যর গুরুদাসকে আমি জিজ্ঞাসা
কৰি নাই, কেননা সাক্ষাৎকার সময়ে কদাপি ইহা মনেই উদিত হয় নাই।
১৯ দ্বিতীয় অধ্যায়। ঈদৃশ পুণ্যশ্লোকের দর্শনের নিমিত্ত একটা আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক। বি এ পাস করিয়া সংস্কৃত কলেজে এম এ পড়িবার নিমিত্ত কিছুকাল কলিকাতায় ছিলাম। একদিন হাইকোর্টে গিয়া আমার আগ্রহ চরিতার্থ করি। তখনও তিনি জুনিয়ার জজ; তথাপি দেখিলাম নেহাৎ সাক্ষী গােপালের ন্যায় নিশ্চেষ্ট বসিয়া না থাকিয়া তিনি উকীলের সহিত বিচার্য বিষয়ের আলােচনা করিতেছেন। মূর্তিটি ছােট খাটো হইলেও প্রশস্ত ললাট, উন্নত নাসিকা ও আয়ত চক্ষুদ্বয় চিন্তাশীলতা, উচ্চাশয়তা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক বলিয়া দর্শকের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভক্তির ভাব উদ্রেক করিত। তবে তিনি যেরূপ নিরভিমান ছিলেন, তাহাতে ইহা নিতান্ত অসত্য বলিয়াও মনে হয় নাই। এ সম্বন্ধে শ্রীযুক্ত হারাণ বাবু লিখিয়াছেন- “ঘটনাটি সত্য কি না এবিষয়ে পিতৃদেবকে কখনও জিজ্ঞাসা করি নাই । তিনি আমার মাতৃদেবীকেও উক্ত ঘটনা সম্বন্ধে কিছুই বলেন নাই সুতরাং উহার যথার্থতা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত কিছু বলিতে পারি না। তবে আপনি যেরূপ অনুমান করিয়াছেন, আমিও সেইরূপ করি।” ঘটনা যদি সত্য হয় তবে তিনি কতদূর অবিকখন তাহা নিজের বাড়ীতেও উহা প্রকাশ না করাতে সূচিত হইতেছে। [ ইদানীং শ্ৰীযুক্ত জ্ঞানানন্দ রায় চৌধুরী প্রণীত “পূজনীয় গুরুদাস নামক গ্রন্থে দেখিলাম ঘটনাটি (১৯৭-৮ পৃষ্ঠায়) একটু পরিবর্তিতাকারে বিবৃত হইয়াছে। দেবপূজাৰ্থে আদানকারী এক বিধবা ব্রাহ্মণ। ব্যারিষ্টারের কথা ইহাতে নাই।
২০
শ্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
তৎপরে একদিন আলবার্ট হলে যশােহর-খুলনা
সম্মিলনীর বার্ষিক উৎসব সভায় স্যর গুরুদাস সভাপতিত্ব
করিবেন শুনিয়া সেখানেও উপস্থিত হইয়াছিলাম। সেদিন
আর এক মহাত্মাকে দর্শন করি, তিনি ঐ সম্মিলনীর তদানীন্তন
সেক্রেটারি ডাক্তার প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তবে তখন তাহার
তেমন নাম ডাক হয় নাই, বয়সও ৩৫ আন্দাজ ছিল ।
তথাপি একজন বিলাত ফেরত ডাক্তার-উপাধিক অধ্যাপককে
একটা সম্মিলনীর সম্পাদকগিরিতে নিযুক্ত দেখিয়া মনে
হইয়াছিল, অসামান্য পণ্ডিত হইয়াও লােকটির স্বদেশহিতকর
সামান্য কাজ করিতেও পরায়ুখতা নাই। অধুনা বৃদ্ধ
বয়সেও তাই স্যর পি সি রায় বন্যাপীড়িত নরনারীগণের
সাহায্য বিধান কল্পে ছাত্রদের সঙ্গে মিশিয়া টাকা পয়সা
সংগ্ৰহাৰ্থ কলিকাতার পথে বিচরণ করিতেও পশ্চাৎপদ
হন নাই।
সেই সভায় ২১ জন সাহেব ছিলেন—বােধ হয় পাদরী
স্যর গুরুদাস প্রথমতঃ তাহাদের বােধ সৌকৰ্য্যার্থে ইংরেজিতে
দুইচারি কথা বলিয়া বাঙ্গালা ভাষায় সভাপতির বক্তৃতা
প্রদান করিলেন।
সেই দিনই প্রথম তাহার বক্তৃতা
তদানীং হট্ট প্রভৃতি অনেক জেলারই ঈদৃশ সম্মিলনী” ছিল ।
তাহাতে প্রায়শঃ সম্পাদক একজন এম এ বা বি এল অধ্যে ছাত্রই
নিযুক্ত হইতেন, সভাপতি বা পৃষ্ঠপােষকরূপে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগণ
সম্মিলনীর সংসষ্ট থাকিতেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়। শুলিলাম, স্বরের স্বাভাবিক মিষ্টতাসংবলিত তদীয় উপদেশ ব্যঞ্জক কথাগুলি বড়ই হৃদয়গ্রাহী হইয়াছিল। তাঁহার বক্তৃতা শুনিবার জন্য আমার আগ্রহ এতদুর উদ্ৰিক্ত হইয়াছিল যে সিটিকলেজে রামমােহন রায়ের বার্ষিক অতি সভায় কেবল সেইজন্যই উপস্থিত হইয়াছিলাম—যদিও রামমােহন রায়ের প্রতি আমার কোনদিনই তেমন শ্রদ্ধা ভক্তি ছিল না। যে রামমােহন রায় মূর্তি পূজার বিরােধী সনাতন সমাজ- বিধ্বংসী ভাবের প্রচারক-ব্রাহ্মসমাজের প্রবর্তক, তাহার সম্বন্ধে নিষ্ঠাবান্ হিন্দু গুরুদাস কি বলেন এটা শুনাও একটা কৌতূহলের বিষয় ছিল। যতদূর স্মরণ হয়, তিনি রামমােহন রায় বঙ্গভাষার কিরূপ সেবা করিয়া গিয়াছেন প্রধানত সেই বিষয়েই আলােচনা করিয়াছিলেন। তারপর দীর্ঘ ১৬১৭ বৎসরের পর যখন এট্রাসের পরীক্ষক হইয়া সিনেট হলে গিয়াছিলাম, তখন তাহাকে ঐ হলের দ্বারদেশে অপর এক ব্যক্তির সহিত আলাপে ব্যাপৃত দেখিয়াছিলাম। সেই দিন সর্বপ্রথম তদীয় চরণস্পর্শ পূর্বক প্রণাম করিয়াছিলাম—কিন্তু তিনি আমার পরিচয় গ্রহণ করেন নাই—আলাপেই তাহার মন নিবিষ্ট ছিল। বৎসরখানিক পরে ১৯০৭ অব্দের এপ্রিল মাসে প্রথম এ অধমের প্রতি তাহার মনঃসংযােগ হয়, এবং সেই সময়েই দুই চারিটি কথাও আমার সহিত হয়। যে ব্যাপারে তাহার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকার ঘটে তাহা বলিতেছি।
২২
স্তর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ একাকীই টোলের আদ্য মধ্য
উপাধি পরীক্ষার কার্য পরিচালনা করিতেন। কোনও কারণে,
একটা বাের্ড গঠিত হইয়া ঐ সকল পরীক্ষার তত্ত্বাবধান
হয় অনেকেই এই মত পােষণ করিয়া, শিক্ষাবিভাগের
ডিরেক্টার বাহাদুরকে তদর্থে উদ্বুদ্ধ করেন। ডিরেক্টার
কয়েকজন সংস্কৃতজ্ঞ ব্যক্তি ও কতিপয় কলেজের সংস্কৃতা-
ধ্যাপককে পরামর্শ নিমিত্তে আহ্বান করেন, তাহাতে স্যর
গুরুদাসও ছিলেন ; রাজেন্দ্র শাস্ত্রী, দ্বারবঙ্গের মহারাজা-
ধিরাজ, স্যর আশুতােষ প্রভৃতি অনেকেই ছিলেন।
আচঁডেল আল তখন ডিরেক্টার। রাজেন্দ্র শাস্ত্রী মহাশয়
প্রস্তাব করেন যে বাের্ড গঠিত হউক। সংস্কৃত কলেজের
প্রিন্সিপ্যাল-এক্সঅফিসিও ( Ex-officio) সেক্রেটারি
এবং ডিরেক্টার প্রেসিডেন্ট থাকিবেন। সর্বসম্মতিক্রমে
বাের্ড গঠন ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের সম্পাদক বিষয়ক
প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর সাহেব হওয়া
সম্বন্ধে স্বয়ং ডিরেক্টার বাহাদূরই যেন একটু অনাগ্রহের
( বােধহয় ভদ্রতার খাতিরে ) দেখাইতেছিলেন। আমি
তখন বলি যে, “অবশ্যই টোলের পণ্ডিতগণ, যারা ইংরাজী
জানেন না, অনেকে বাের্ডের সভ্য থাকিবেন; এই অবস্থায়
একজন ইংরাজ প্রেসিডেন্ট, অপেক্ষা বােধ হয় জনৈক
সংস্কৃতজ্ঞ বাঙ্গালী—বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ—প্রেসিডেন্ট হইলেই
ভাল হয়।” স্যর আচঁডেল আল তখন আমাকে উৎসাহিত
করিয়া বলিলেন, “এমন একজনের নাম নির্দেশ কর।”
দ্বিতীয় অধ্যায়।
আমি তৎক্ষণাৎ স্যর গুরুদাসের নাম প্রস্তাব করিলাম।
স্যর গুরুদাস স্বাভাবিক বিনয় সহকারে নিজের অনবরত্ব
জ্ঞাপন করিলে রাজেন্দ্র শাস্ত্রী মহাশয় দ্বারবঙ্গের মহারাজা
ধিরাজের নাম প্রস্তাব করিলেন। মহারাজাধিরাজও
বলিলেন, তিনি কলিকাতার বাহিরেই প্রায়শঃ থাকেন,
বিশেষতঃ নিজেরই কাৰ্য্য বাহুল্যে তিনি বিব্রত থাকেন, তাই
তাঁহার পক্ষে এই কাৰ্যভার গ্রহণ করা অনুচিত হইবে।
এইরূপ বলিয়াই স্যর আশুতােষের নাম তিনি প্রস্তাব
করিলেন। আমি আজাদ সহকারে ইহা সমর্থন করলাম
এবং তদীয় যােগ্যতা সম্বন্ধেও বলিলাম যে, নবদ্বীপের
পণ্ডিতগণ যাহাকে “সরস্বতী” উপাধি দিয়া সম্মানিত
করিয়াছেন, তিনি ইহা গ্রহণ করিলে খুবই শােভন হইবে।
স্যর আশুতােষ তৎক্ষণাৎ বলিলেন “আমি ইহা গ্রহণ
করিলাম।”
সভাভঙ্গের পরে যখন স্যর গুরুদাসের সমীপবর্তী হইয়া
পাবন্দনা করিলাম, তখন মদীয় অধ্যাপক (ইদানীং স্বৰ্গত)
মহামহােপাধ্যায় কালীপ্রসন্ন ভট্টাচাৰ্য মহাশয় আমার
পরিচয় প্রদান করিলে, তিনি দুএকটি কথা আমার সঙ্গে
যালাপচ্ছলে বলিলেন। আমি বাড়ীতে গিয়া তাঁহার
* প্রকৃতপক্ষে ইহাই স্যর গুরুদাসের সঙ্গে আমার প্রথম
সাংকার ;
তাই অনেক অবান্তর বিষয় বিজড়িত হইলেও ইহা
বিরিতভাবেই বর্ণিত হইল।
২৪
স্বর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাই, এই অনুমতি প্রার্থনা করিলে
তিনি খুব আদ সহকারে তাহা প্রদান করিলেন।
তারপর ১০/১১ বৎসর তিনি জীবিত ছিলেন--যখনই
কলিকাতায় গিয়াছি, যেমন কালীঘাটে গিয়া কালীদর্শন
করিয়াছি, তেমনি নারিকেলডাঙ্গায় গিয়া তঁাহার চরণ বন্দনা
করিয়া তাহার সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে কিয়ৎকাল অতিবাহিত
করিয়াছি। নিয়ম ছিল, আমি প্রাতঃকালে ৮টার সময়
যাইতাম-ইতােমধ্যে তাঁহার প্রাতঃসন্ধ্যাদি সমস্ত কৃত্য হইয়া
যাইত, আলাপের সময়ও যথেষ্ট পাইতাম। আমার প্রতি
এতটা অনুগ্রহ ছিল যে আলাপ প্রসঙ্গে ঘণ্টারপর ঘণ্টা চলিয়া
যাইতেছে—তথাপি আমি চলিয়া যাই, ঘুণাক্ষরেও এমত
ভাব দেখাইতেন না। মধ্যাহ্ন প্রায় হইয়া গিয়াছে--জ্যেষ্ঠ
পুত্ৰ শ্ৰীযুক্ত হারাণবাবু আসিয়া করঘােড়ে আমাকে বলিতেন
“বাবার খাবার সময় হইয়া গিয়াছে।” আমি তখন একপ্রকার
জোর করিয়া চলিয়া আসিতাম। কোনও কোনও বার
অপরাহ্ন ৩ ঘটিকায় গিয়াছি-সন্ধ্যা হইলে ছুটি পাইয়াছি।
প্রথম যে দিন যাই, সেদিন গিয়া তাহার অস্ফুটবাক্
ভৃত্যকে “তিনি কোথায়” জিজ্ঞাসা করি এবং তদুত্তরে তিনি
বাড়ীর অভ্যন্তরে আছেন জানিয়া তাহাকে আমার খবর দিতে
বলি। আসিতে প্রায় আধ ঘন্টা বিলম্ব হইয়া গেল, তির
তজ্জন্য বড়ই অনুতাপ প্রকাশ করিলেন। আমি বলি।
ফেলিলাম—“কেন ? দেবদর্শন কি সত্বর ও সহজে হ।
তজ্জন্য বহুকাল তপস্যা করিতে হয়। তিনি একটু যেন »
দ্বিতীয় অধ্যায়।
২৫
হইয়াই বলিলেন, “এত বড় কথাটা বলিয়া ফেলিলেন?”
আমি একটু অপ্রতিভ হইলাম, মনে মনে ভাবিলাম,
'তােষামােদপ্রিয় হইলে ইনি ইহাতে
খুবই খুসী হইতেন—
কিন্তু তিনি তত সে ধাতের নন। তবে ইহাতে তাহার
প্রতি আমার ভক্তির ভাব দ্বিগুণিত হইল।
আমি তাহার পুত্রের সমবয়স্ক ; আমার জন্মের পূর্বে
তিনি পাঠ সমাপ্ত করিয়া ওকালতী ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইয়া
ছিলেন। “তুমি” বলাই তাহার পক্ষে শােভন হইত। তথাপি
তিনি “আপনি” বলিতেন। শুনিয়াছি কামার অপেক্ষা
অর্বাচীনকেও তিনি “তুমি” বলেন নাই, 'আপনি' বলিতেন।
কি বিনয় ! তঁাহার অমায়িকতা সম্বন্ধে এই বলিলেই যথেষ্ট
হইবে যে, কেহ দেখা করিতে গেলে তিনি কাহাকেও বিফল
মনােরথ করেন নাই। যতক্ষণ ঐ ব্যক্তির সমস্ত কথাটি বলা
হইয়াছে, ততক্ষণ নানা কাৰ্য্যের ত্যাঘাত হইলেও ধীরভাবে
উহার সহিত আলাপ প্রসঙ্গ করিয়াছেন; কেহ চিঠি লিখিলে,
ফেত ডাকে উত্তর পাইয়াছে। যে কেহ স্বপ্রণীত পুস্তক
উপহার পাঠাইলে, যথাসম্ভব সত্বর উহা পাঠ করিয়া প্রাপ্তি
স্বীকার ব্যপদেশে পুস্তকখানির সম্বন্ধে যতদূর অনুকূল মন্তব্য
প্রকাশ করা যায় ততদূর করিয়া গ্রন্থকারের উৎসাহ বন্ধন
করিয়াছেন।
তঁাহার সহিত আলাপ প্রসঙ্গে কত কথাই হইত। আমি
খুব কম কথাই বলিতাম। কোনও একটি প্রসঙ্গ ধরাইয়া
দিয়া-তঁাহার কথাগুলি কাণ পাতিয়া শুনিতাম-শুনিয়া
২৬
স্থর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
তৃপ্ত হইতাম। একটা কথা লক্ষ্যের বিষয় ছিল যে তিনি
কাহারও নিন্দাবাদ করিতেন না—সকলেরই গুণের ভাগ
বর্ণনা করিতেন, বরং দোষের বিষয় আলােচনা করিলে তিনি
সেই ব্যক্তির হইয়া তাহার পক্ষ সমর্থনার্থ যতটা বলা যাইতে
পারে, তাহা বলিতেন।
এইরূপ সাক্ষাৎকারের প্রথমাবধিই আমি তাহাকে
অনুরােধ করিতাম, যেন তিনি স্বকীয় জীবনচরিত লিখেন।
কেননা তাহার শৈশবকাল হইতেই বঙ্গদেশে সনাতন ধর্ম
বিরােধী এক প্রবল আন্দোলন চলিতেছিল—এবং তাহার
কেন্দ্রস্থল ছিল কলিকাতা। তিনি কলিকাতার অধিবাসী।
এবং এই আবহাওয়ার মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা লাভ করিয়া বর্ধিত
হইয়াছেন—তথাপি কেমন করিয়া পিতৃপিতামহের পথে
তিনি এরূপ নিষ্ঠার সহিত চলিতে পারিয়াছেন, এটা জানিবার
নিমিত্ত আমাদের কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেরূপ
বুদ্ধিমান্ বিবেকশালী ব্যক্তি, তিনি যে নিতান্তই না বুঝিয়া
গতানুগতিক শ্যায়ে জীবনপথে চলিয়াছিলেন, এমনটা কখনই
প্রত্যাশিত নহে। অতএব সনাতন ধর্মের
অতএব সনাতন ধর্মের অনুকূলে শত শত
বক্তৃতা অপেক্ষা এইরূপ একটি জীবন-কাহিনী ইংরেজী
শিক্ষিত মাদৃশ ব্যক্তির নিকটে অধিকতর উপদেশপ্রদ হইবার
কথা। এইরূপ সনির্বন্ধ অনুরােধেও তিনি আত্মচরিত
স্বয়ং লিখিতে সম্মত হয়েন নাই। পরন্তু মদীয় এই উপরােধ
তিনি তদানীং প্রকারান্তরে রক্ষা করিয়াছিলেন--তাহা “জ্ঞান
ও কর্ম” গ্রন্থ প্রণয়ন দ্বারা। এ বিষয়ে “স্যর গুরুত্বাসের
দ্বিতীয় অধ্যায়।
২৭
পত্রাবলী” প্রবন্ধে (ভারতবর্ষ আশ্বিন ১৩১৬) বিস্তারিত
বলিয়াছি, এস্থলে বাহুল্যভয়ে উল্লেখ মাত্র করিয়া বিরত
রহিলাম। তিনি বলিতেন, “এখন বৃদ্ধ হইয়াছি—এ বয়সে
অভিমান ত্যাগ করাই সঙ্গত—আত্মজীবনচরিত লিখিলে,
‘আমি এই করিয়াছি, সেই করিয়াছি’ এরূপ আত্মপ্রশংসার
কথা লিখিতে হয়—ইহা আমি উচিত মনে করি না। আমার
পুনঃপুনঃ অনুরােধে এবং অপর কেহ কেহও বােধ হয় ঈদৃশ
উপবােধ করাতে, পরিশেষে তিনি এইরূপ রফায় সম্মত হন,
যে তিনি নিজের কাহিনী বলিয়া যাইবেন—কেহ তাহা শুনিয়া
কোনও পত্রিকায় লিখিয়া প্রকাশিত করিলে তিনি কোনরূপ
আপত্তি করিবেন না। চৈতন্য লাইব্রেরীর গৌরহরি সেন
মহাশয়ের নিকট যখন তিনি প্রথম জীবনের কাহিনী বিবৃত
করেন, দৈবাৎ আমিও তখন উপস্থিত ছিলাম। গৌরহরি বাবু
নিজের ভাষায় ঐ কাহিনী “মানসী” পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
বােধ হয়, দুই কিস্তি (মানসী ১৩২০ আশ্বিন ও অগ্রহায়ণ
সংখ্যায়) প্রকাশিত হইবার পর উহা বন্ধ হইয়া যায়। অতঃপর
যখন স্যর গুরুদাসের সহিত দেখা করি তখন এইরূপ হঠাৎ
তদীয় জীবন-কাহিনী বন্ধ হইবার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া-
ছিলাম। উত্তরে জানিতে পারিলাম যে, ঐ মানসী পত্রে
তদীয় অনভিমত কি জানি একটা ছবি + প্রকাশিত হওয়াতে
* এই গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
শ শ্ৰীযুক্ত হারাণ বাবু এই ছবির সম্বন্ধে লিখিয়াছেন-“উহা
Cleopatra poisoning her self, এই ছবি। মূর্তিটি অর্ধনগ্ন ; তবে
২৮
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
তিনি ঐ পত্রিকায় তাঁহার সম্বন্ধীয় কথা ছাপাইতে গৌরহরি
বাবুকে নিযেধ করিয়াছিলেন।
এখানে একটি কথা বলিয়া রাখি। বহুবার তঁাহার সঙ্গে
সাক্ষাৎ করিয়া অনেক বিষয়ের আলােচনা করিয়াছি। কিন্তু
তখন মনে করি নাই যে এভাবে একদিন ঐ সকল আলােচনার
মর্ম লিপিবদ্ধ করিয়া সাধারণ্যে প্রকাশ করিতে হইবে।
তাই ঐ সকল আলােচনার কোনও নােট রাখি নাই।
আজ ঐ সব লিখিতে বসিয়া দেখিতেছি যে অতি অল্প কথাই
স্মৃতি পথে উদিত হইতেছে। যাহা হউক, এইরূপ প্রসঙ্গের
স্বল্পও ভাল মনে করিয়া, যেটুকু স্মরণ আছে তাহাই লিপিবদ্ধ
করিতেছি। এছাড়া এমনও অনেক কথা আলাপ-প্রসঙ্গে
আলােচিত হইয়াছে, যাহা তদীয় “জ্ঞান ও কর্মে” স্থান
পাইয়াছে । এবং “পত্রাবলীর মধ্যেও মৌখিক প্রসঙ্গের
অনেক বিষয় উল্লেখিত হইয়াছে। এ সকল কথা বাহুল্য
বিবেচনায় এই প্রবন্ধে পুনরুল্লেখ করা হইল না।
মাতৃভক্ত স্যর গুরুদাসের সহিত একদিন তাহার স্বর্গীয়া
মাতৃদেবীর সম্বন্ধে আলাপ হইল; তিনি পঞ্চমুখে তাহার
মার কথা বলিতে লাগিলেন; বিশেষতঃ, তাহার জননী কিরূপে
তাঁহাকে প্রতিযােগিতার রেষারেষি হইতে বিরত থাকিতে
ফাইন আর্ট হিসাবে objectiouble, কেহ কেহ এরূপ বলিতে
পারেন। পিতৃদেব এরূপ ছবির আলােচনা আধ্যাত্মিক উন্নতির
পরিপন্থী বলিয়া মনে করিতেন।”
দ্বিতীয় অধ্যায়। বলিতেন, কোনও বিষয়ে অতিরিক্ত আকাঙক্ষা পােষণ করিতে নিষেধ করিতেন, ইত্যাদি বলেন। তাহার মাতৃদেবী বৃদ্ধা হইলেও তাহার একটী দাতও নাকি নড়ে নাই—একটি চুলও সাদা হয় নাই। তাহার মাতা ঠাকুরাণীর প্রতিকৃতি আছে কিনা, জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন যে, তাঁহার একখানি ছবি বাড়ীর মধ্যে রহিয়াছে। “ইহাকি কোনও পত্রিকায় ছাপান যায় না?” এই প্রশ্ন করাতে বলিলেন “না-না; আমার মায়ের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হইলে সেই ছবি যুক্ত কাগজ দ্বারা দোকানদার পুটুলি বাঁধিয়া জিনিস দিবে—তার পর হয়তাে ঐ কাগজ পথিমধ্যে নিক্ষিপ্ত হইয়া জনতাকর্তৃক পদদলিত হইবে— কল্পনায়ও এই কথা আসিলে আমার ক্লেশ হয়। তাই মার ছবি আমি কাহাকেও নিতে দেই নাই।” ধন্য মাতৃভক্তি। * এ সম্বন্ধে একটি ঘটনার কথা শ্ৰীযুক্ত হারাণ বাবু লিখিয়াছেন- “পিতৃদেব বি এ পরীক্ষার কিছুপূৰ্ব্বে অধিক রাত্ৰি পৰ্য্যন্ত পড়িতেন। আমার পিতামহী তাহাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করায় উত্তরে বলিয়া- ছিলেন যে, পরীক্ষাটি অতি কঠিন, অনেক গুলি বিষয় পড়িতে হয়। তখন আমাদের বাড়ীতে শ্ৰীযুক্ত ত্রৈলােক্যনাথ চট্টোপাধ্যায় নামক এক ব্যক্তি থাকিতেন, তিনি পিতামহীকে পিসি এবং পিতৃদেবকে দাদা বলিতেন। তিনি পিতামহীকে বলিলেন, “7িসি, দাদা যাহা বলিলেন তাহা সত্য বটে, কিন্তু ইহার ভিতর আর একটি কথা আছে। দাদা সকল পরীক্ষাতেই নীলাম্বরের (স্বর্গীয় নীলাম্বর মুখােপাধ্যায় মহাশয়ের) উপরে হইয়াছেন। এইটি শেষ পরীক্ষা, পাছে নীলাম্বর এই পরীক্ষায় দাদার স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ। শ্রীশ্রীজগন্মাতার ছবি সিগারেটের প্যাকেটের উপর দেওয়া হয়, তাহা রাস্তায় পড়িয়া পদদলিত হয়—আমাদের কোনও ব্যথা বােধ হয়না। আর ইনি তঁাহার মাতার ছবির বিড়ম্বনা কল্পনা করিতেও ক্লেশ বােধ করিতেন জননীর শিক্ষার ফলে তিনি প্রচুর অর্থাগম সত্ত্বেও বহরমপুর ছাড়িয়া কলিকাতায় আসিয়া হাইকোর্টে অল্পতর আয়ে ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হন। যখন জজ, হন, শুনিয়াছি, তিনি মাতাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, জজিয়তী নিবেন কিনা-- ইহাতে আয় কম হইবে। মাতা অনুমতি দিলেন; টাকা উপরে হয় এই জন্য দাদা এতরাত্রি পর্যন্ত পড়িতেছেন।” পিতামহী এই কথা শুনিবামাত্র পিতৃদেবকে বলিলেন, “তুমি প্রত্যেক পরীক্ষাতেই যে নীলাম্বরের উপরে হইবে এরূপ আকাঙ্ক্ষা করিতেছ কেন ? পরীক্ষায় সর্বপ্রথম হওয়া অদৃষ্টের উপর নির্ভর করে। যদি নীলাম্বর এই পরীক্ষায় তােমার উপরে হয়, আমি কিছু মাত্র দুঃখিত হইব না; কিন্তু যদি অধিক রাত্রি জাগিয়া তােমার পড়া হয় ও পরীক্ষা দেওয়া না ঘটে, তাহা হইলে আমার মনে কষ্ট হইবে।” { এই বিষয় গৌরহরি সেন মহাশয় লিখিত “স্যর গুরুদাসের জীবন স্মৃতি” প্রবন্ধেও ( মানসী, আশ্বিন ১৩২০) রহিয়াছে। ঐ প্রবন্ধে যে সব কথা আছে তাহা বাহুল্য, বিবেচনায় মদীয় বর্তমান প্রবন্ধে উল্লেখিত করি নাই—যদিও উক্ত প্রবন্ধের অধিকাংশ কথাই আমার সমক্ষে হইয়াছিল এবং এখনও স্মরণ আছে। তথাপি এবিষয়টি এস্থলে উল্লেখ যােগ্য মনে করিলাম, কেননা গৌরহরি বাবুর স্মৃতিতে ইহা যেরূপভাবে অঙ্কিত হইয়াছে, হারাণ বাবুর পড়ে তাহা হইতে কিছু স্বতন্ত্র ভাবে ইহা লিখিত হইয়াছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
পয়সা অপেক্ষা পদমর্যাদার গৌরব ও সম্মান অধিকতর
স্পৃহণীয়, ইহাও বুঝাইয়া দিলেন। জননীর এইরূপ সুশিক্ষার
ফলেই গুরুদাস ৬০ বৎসর বয়ঃক্রম পূর্ণ হইবামাত্রই জজিয়তী
পরিত্যাগ করেন—এবং তৎপরে ( অনেক অবসর প্রাপ্ত জজের
স্যায়) আর আইন ব্যবসায় করেন নাই। ভাইসচ্যানসে
লারিতে পুনর্নিয়ােগের সময়েও তিনি অত্যন্ত অনিচ্ছা প্রকাশ
করিয়াছিলেন—কেবল লর্ড ল্যান্সডাউনের সনির্বন্ধ অনুরােধে
উহা পুনশ্চ গ্রহণ করেন, কিন্তু একবৎসর পরেই ছাড়িয়া
দেন। ভাইচ্যানসেলারের পদে পুনর্নিয়ােগে অস্বীকৃতি
জ্ঞাপনের সময়ে তিনি ডাঃ মহেন্দ্র লাল সরকার প্রভৃতির নাম
করিয়া নাকি বলিয়াছিলেন যে, এই পদের উপযুক্ত এতদ্দেশীয়
আরাে ব্যক্তি রহিয়াছেন, তাহাদের কাহারও নিযুক্তি
দেখিলে তিনি সুখী হইবেন। হাইকোর্টের জজিয়তী
ছাড়ার কালেও তঁাহার অভিপ্রায় এইছিল যে তিনি এইপদে
জুড়িয়া বসিয়া থাকিলে অপর যযাগ্য ব্যক্তিদের জজিয়তী
প্রাপ্তির পথে বাধা থাকিবে। ভাইসচ্যালোরি পরিত্যাগ
করার পর তিনি আর সিণ্ডিকেটে ঢুকেন নাই —ইহাতেও
তাহার সংযতচিত্ততার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।
ইহা হইতেও বুঝা যায় কেন তিনি সংস্কৃত বাের্ডের সভাপতিত্ব
গ্রহণে অস্বীকার করিয়াছিলেন।
আমি একদা তাঁহার বাড়ী গিয়া দেখিয়াছিলাম মহারাজ
স্তর শ্রীযুক্ত মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বাহাদুর তাহাকে সনির্বন্ধ
অনুরােধ করিতেছেন, তিনি যেন ইণ্ডিয়া কাউন্সিলের
৩২
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
সভ্যপদ প্রার্থী রূপে দণ্ডায়মান হন—তাহা হইলে মহারাজ
এবং আরাে অনেকে তাহার হইয়া ভােট সংগ্রহ করিতে প্রস্তুত
আছেন। ব্যাপারটার ভিতরকার কথা আমার ঠিক্ স্মরণ
নাই—বােধ হয় অপর একজন বিশিষ্ট ক্ষমতাশালী লােক
ঐ পদপ্রার্থী ছিলেন। মহারাজের এমন ইচ্ছা ছিলনা যে
ঐ ব্যক্তি কৃতকার্য হন --তাই তিনি স্যর গুরুদাসকে এ
ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে দাড় করাইবার জন্য নির্বন্ধসহকারে
অনুরােধ করিতেছিলেন। তিনি স্বভাবসিদ্ধ বিনীতভাবে
মহারাজের অনুরােধ পালন করিতে অক্ষমতা জানাইলেন
এবং যাহারা প্রার্থী আছেন, তাঁহাদের একজন বােধ হয়
মহারাজও একজন প্রার্থী ছিলেন) সদস্য হইলেই তিনি সুখী
হইবেন --এরূপ ভাবই ব্যক্ত করিলেন। হায়, এরূপ অমানী
মানদ আর কোথায় দেখিব?
একদিন স্যর
গুরুদাস তাহার
আহার সম্বন্ধে গল্প
করিলেন। কোথায় সভা হইয়াছিল ; স্বর্গীয় ডাক্তার
ইন্দুমাধব মল্লিক মহােদয় আহার সম্বন্ধে ঐ সভায় বক্তৃতা
করেন; ইহা খাও, উহা খাও, বিশেষতঃ মাংসাহার অতীব
প্রয়ােজনীয়, ইত্যাদি ছাত্রদিগকে উপদেশ দেন।
গুরুদাস ঐ সভায় তাহার আহার সম্বন্ধে বক্তৃতা দিয়া এইটা
বুঝাইতে চান যে, আহার বিষয়ে মাংসাদির ব্যবস্থা দ্বারা
খরচ বাড়াইবার কোনও বিশেষ আবশ্যকতা আছে বলিয়া
বােধ হয় না। তিনি নিজে দিনের বেলা ১০টার সময়
সামান্য কিঞ্চিৎ আহার করিতেন—অল্প ভাত, কিঞ্চিৎ
শর
দ্বিতীয় অধ্যায়।
মুগডাইল, একটু মাখন ও একটু দুধ ; যতদিন তাহার মাতা
জীবিত ছিলেন—একটু মাছ পাতে দেওয়াইতেন, মাতৃ
অনুরােধে তাহা ছুইতেন মাত্র। এইরূপ খাইয়া হাইকোর্টের
কাজ করিয়া পথিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম সারিয়া,
সন্ধ্যায় নানা সভাসমিতির নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া রাত্রি ৯১০টায়
গৃহে ফিরিতেন। ইতােমধ্যে আর কিছুই খাইতেন না।
রাত্রিতেও সামান্যই খাইতেন। (দুঃখের বিষয় আমি তাহার
আহারের ফর্দষ্ট সমগ্র স্মরণ করিয়া রাখি নাই; কিন্তু
ইহা যেন কোনও স্থলে প্রকাশিত হইয়াছিল, অনুসন্ধিৎসু
পাঠক তাহা দেখিবেন)।
তিনি জারের মাখন তৈল ব্যবহার করিতেন না।
মাখন 'ই' । 'ন্য ঘরই মেয়েরা তৈয়ব করিতেন। বিশ্বস্ত কলু
তাঁহ, স্ব ঐ :: তৈল প্ৰস্তুত করিয়া দিত। আমি বলিয়া-
ছিলাম “ নখ ম হইতে তৈল আনাইলেই তাে পারিতেন ?”
তদুত্তরে তিন বেশ আমােদজনক একটা কথা বলিয়াছিলেন ।
কোন ৭ : লখার কর্মচারী (কি পরিদর্শক তঁাহার নিকটে
একদিন গল্প বলিয়াছিলেন যে, যত গুরুতর অপরাধী
ইহাদিগকে তেলের ঘানিতে নিযুক্ত করা হয় এবং এত সময়
মধ্যে এতটা তেল চাই, এই টাস্ক দেওয়া হয়।
দুর্বত্ত কয়েদি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল হয় নাই দেখিয়া নাকি
প্রস্রাব করিয়া তেলের পরিমাণ বাড়াইয়াছিল। সেই
অবধি স্যর গুরুদাস জেলের তেলের উপর একটা ঘৃণার ভাব
পােষণ করিতেন। সে যাহা হউক, স্যর গুরুত্বাসের খাদ্যের
৩৪
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
অধিক।
তালিকা উপলক্ষ্য করিয়া নাকি কোনও ডাক্তার (এবং তিনি
বাঙ্গালীই বটেন) বলিয়াছিলেন “এত কম খাইয়া একটা
লােক কিরূপে বাঁচিতে পারে, ইহা বড়ই বিস্ময়ের বিষয়।”
পরন্তু শত থিওরি অপেক্ষা একটা দৃষ্টান্তের মূল্য অনেক
স্যর গুরুদাসের আদর্শ আমাদের নিকট তাই এত
মূল্যবান্। কিন্তু হায়, চা, চপ, কাটলেট, বিস্কুট, পরেটা
ইত্যাদি যে ভাবে প্রসার লাভ করিতেছে, তাহা দেখিয়া
বাস্তবিকই আমি তাে একবারে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে হতাশ হইয়া
পড়িতেছি।
তিনি যেমন মাতৃভক্ত ছিলেন, তেমনই অপত্যবৎসলও
ছিলেন। একদিন সাক্ষাৎ করিতে গিয়া শুনিলাম তিনি
হাওড়া ষ্টেশনে গিয়াছেন। তাঁহার একটা পুত্র প্রবাস হইতে
ফিরিয়া আসিতেছেন স্বয়ং ষ্টেশনে গিয়া তাঁহাকে নিয়া
আসিবেন। তবে এমনটা সৰ্ব্বদাই যে করিতেন, তাহা নয়।
পরন্তু ষ্টেশনে না গেলেও ছেলে বাড়ীতে না পৌঁছা পর্যন্ত
অভুক্ত থাকিতেন, আসিলে পর তাহাকে লইয়া এক
ভােজন করিতেন।
“পুত্রে যশসি তােয়ে চ নরাণাং পুণ্যলক্ষণ”—তাই
তঁাহার ছেলেরাও অতি উচ্চশিক্ষিত ও সদাচার পরায়ণ
হইয়াছেন। ছেলে মেয়েদের অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সেই বিবাহ
দিয়াছিলেন অথচ তাহাদের সন্তানসন্ততি সকলেই বেশ সুস্থ
ও হৃষ্টপুষ্ট। বাল্যবিবাহের যাহারা বিরােধী তাহারা এ
বিষয়েও তঁাহার কাছ হইতে তাঁহাদের স্বীয় মতের বিরুদ্ধ
দ্বিতীয় অধ্যায়।
দৃষ্টান্ত পাইবেন। একদিন তিনি তাহার একটি পুত্রবধূ
(বােধ হয় জজ স্যর প্রতুল চন্ত্রের কন্যা) সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন
যে, এই বধূটীর একটু লিম্বে (বােধ হয় ১৯২০ বৎসর বয়সে)
গর্ভসঞ্চার হওয়াতে—প্রসবকালে বড়ই যন্ত্রণাভােগ করিতে
হইয়াছিল এবং এমনও বলিয়াছিলেন যে ডাঃ শ্ৰীযুক্ত কেদার
নাথ দাস মহাশয় নাকি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, অধিক বয়সে
গর্ভসঞ্চার প্রসবে ক্লেশাধিক্যের একটা কারণ।
একদিন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিয়াছিলাম,
“আপনি পরম নিষ্ঠাবান হিন্দু হইয়া ব্রাহ্মদের আহূত রাজা
রামমােহন রায়ের স্মৃতিসভায় অধিনায়কত্ব করিয়াছেন
কিরূপে?” তিনি তদুত্তরে বলিলেন, “রামমােহন রায়ের ধর্ম
সম্বন্ধীয় মতের সহিত আমার মতৈক্য না থাকিলেও তঁহাকে
একজন বড়লােক মনে করি, এবং সভার উদযােক্তবর্গ হার
আমাকে সভাপতির পদে আমন্ত্রণ করিয়াছিলেন, তঁাহাদের
সঙ্গে আমার কথা থাকে যে হিন্দুসমাজের বিরােধী fষয়ের
অবতারণা যেন কম হয় ; কেহ যেন বক্তৃতায় হিন্দু ধর্মের
নিন্দা না করেন। তদনুসারে ২১টা সভাও পরিচালিত
হইয়াছিল এবং এতদ্দর্শনে উৎসাহিত হইয়া কয়েকজন ব্রাহ্মণ
পণ্ডিতও একদা একটী সভায় উপস্থিত হন। কিন্তু জনৈক
ব্রাহ্মপ্রচারক হিন্দুসমাজকে আক্রমণ করিয়া এক বক, তা
দেন; তাহাতে বিরক্ত হইয়া ঐ সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সভাস্থল
পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যান। সেই সভার পর আমি আর
অনুরোেধ সত্ত্বেও রামমােহন রায়ের স্মৃতিসভায় যাই নাই।”
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
••
রাজা রামমােহনের প্রসঙ্গে রাজারামের কথা উঠিল।
তিনি বলিলেন, রাজারামের বাড়ী তাহার বাড়ীর কাছেই
ছিল। রাজারাম মােসলমান ছিলেন বলিয়া প্রবাদ থাকিলেও
তাহার স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর আর বিবাহ করেন নাই;
রমাপ্রসাদ রায়কে “ঠাকুর পাে” বলিতেন, এইরূপ তিনি
বাল্যে শুনিয়াছিলেন ।
স্য্যর আশুতােষের বিধবা কন্যার পুনর্বিবাহে তিনি
আমর্থিত হইয়াছিলেন কিনা জি এস করিয়াছিলাম –
বিবাহকালে তিনি অনু সহ ৩ ছিলেন, একথা
সংব পত্র
হইতে জানিয়াছিলাম।
গুরুদাস
উঃ রিলেন যে স্যর আশুতােষ স্বয়ং গিয়া তাহাকে
আণ করেন। ইহাতে তিনি যাহা বলছিলেন তাহার
মর্ম এই প্রথম বিধবা বিবাহকারী 4 শচন্দ্র বিদ্যা রত্নের
বির পর সমাজ বৃত্তির ( বা এই রূপ একটা কিছুর) অংশ
তাহাদের বাড়ীতেও আসিয়াছিল। তখন নাকি তাহার
মাতৃদেবী ঐ অংশবাহককে বলিয়াছিলেন--“এটা আমার
বাড়ীতে দিবেন না বিধবাবিবাহের সসৃষ্ট কিছু আমরা
গ্রহণ করিতে পারিব না।” অতএব এ সম্বন্ধে তাহার অগীয়া
জননীর এই প্রতিকূল অভিমতের বিরুদ্ধে তিনি কিছু করিতে
পারিবেন না। এইরূপে যথাসম্ভব মােলায়েম ভাবেই তিনি
নিজের অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিয়াছিলেন।
যখন স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা হইতে প্রথম দেশে
আইসেন তখন কলিকাতা শহরের হিন্দু অধিবাসিবর্গের পক্ষ
দ্বিতীয় অধ্যায়। ; হইতে একটা অভিনন্দন দিবার আয়ােজন হয় ; একজন কায়স্থ প্রধান তাঁহাকে ঐ ব্যাপারে যােগ দিতে অনুরােধ করেন। তদ্বিষয়ে তিনি বলিলেন, যদি “নরেন্দ্রনাথ দত্তকে আপনারা অভিনন্দিত করেন- আমি সাদরে এ ব্যাপারে যােগদান করিব-- কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দকে অভিনন্দিত করিতে আমি পারিব না।” অর্থাৎ সন্ন্যাসের অনধিকারী কাস্থ “স্বামীজি" সাজেন, ইহা তাহার মতবিরুদ্ধ ছিল। সর্বশেষে যেদিন তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে যাই সেদিন অপরাহু ২ ঘটিকার সময় গিয়া দেখি তাহার দ্বাবদেশে গাড়ী প্রস্তুত ; আমিও ফটকে ঢুকিয়াছি, তিনিও বহির্গমনার্থ সেইস্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, তিনি শোধহয় ) ভবানীপুরে যাইবেন। তাহার একটী প্রপৌত্র জন্মিয়াছে তাহাকে গিয়া দেখিবেন। এইটী তাহার প্রথম পুত্রের তৃতীয় পুত্রের পুত্র। ঈদৃশ প্রপৌত্র মুখ দর্শনকরা আজকাল কয়জনের ভাগ্যে ঘটে ? সে যাহা হউক, আমার সঙ্গে সেই গাড়ীর কাছে দাড়াইয়া প্রায় অর্ধ- ঘণ্টা কাল আলাপ করিলেন। কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উঠিল; তিনি একটু উত্তেজিত ভাবেই বলিলেন, “ইউনি- ভারসিটির কথা আর বলিবেননা—শুনিলাম অমুকের ছেলের নম্বর ফাষ্ট ক্লাসে না উঠা পর্যন্ত গ্রেস দেওয়া চলিয়াছিল ; ‘অমুক' লিখিলাম বটে কিন্তু তিনি নামই বলিয়াছিলেন ; ছেলেটী এম এ পরীক্ষা দিয়াছিল -উহার নম্বর ফাষ্ট ক্লাসে তুলিবার জন্য কেবল যে তাহাকেই ফাউ নম্বর দেওয়া ;
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
হইয়াছিল এমন নহে, উহার অপেক্ষা উচ্চতর স্থানাধিকারী
ছাত্রেরাও সঙ্গে সঙ্গে তরিয়া গিয়াছিল। তাঁহার সঙ্গে এই
শেষবারের আলাপে কেবল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর তদীয়
বিরক্তি ভাব দেখিলাম, এমন নহে—কথা প্রসঙ্গে তিনি ইহাও
বলিয়াছিলেন যে তাঁহার পৌত্রগণ যাহাতে আর চাকুরী
নাকরে তাহার ব্যবস্থা তিনি করিতেছেন। বােধ হয় কিছু
কৃষির বন্দোবস্ত করিবার কথাও তিনি তদুপলক্ষে বলিয়া-
ছিলেন।*
পূৰ্বেই বলিয়াছি, অনেক কথা বলিতে পারিলাম না--
কেননা, তাঁহার বহুকথা বিস্মৃত হইয়া গিয়াছি, আবার
অনেকটা অন্যত্র বলা হইয়া গিয়াছে। যাহা বলিয়াছি
তাহাতেও ভুল ভ্রান্তি থাকিবার সম্ভাবনা। অপিচ কোটেশন
চিহ্ন দিয়া যে সকল বাক্য স্যর গুরুদাসের বলিয়া লিখিত
হইয়াছে তাহাও ঠিক্ ঠিক্ কোন্ করা হইয়াছে, বলিতে
পারি না—কেননা, আমি ঐ সকল কথা তখন নােট, করিয়া
রাখিতে পারি নাই। ঐ সবও তদীয় উক্তির সার মর্ম
বলিয়াই যেন বিবেচিত হয়।
এই জীবনে অনেক বড় বড় লােকের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গ
শ্ৰীযুক্ত হারাণবাবু সম্প্রতি লিখিয়াছেন-“আমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে
তিনি ২৫ বিঘা জমি দমদমায় দিয়া গিয়াছেন; ইহাতে তাহার জীবদ্দশা
হইতেই সে ফসল ও ফুল উৎপন্ন করিতেছে। সম্প্রতি সে উক্ত জমি
একজন মালীকে ৯ বৎসরের জন্য lease দিয়াছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
করিয়াছি, কিন্তু একথা মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি, পুণ্যশ্লোক
স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ন্যায় এমন সৰ্বগুণ সম্পন্ন
ব্যক্তি আর তো দেখিলাম না! এমন সর্বশাস্ত্রদশী পণ্ডিত
অথচ এমন বিনয়ী নিরভিমান ব্যক্তি, এমন নিষ্ঠাবান্ কর্মী
অথচ এমন আড়ম্বরশূন্য মানুষ, এমন স্বধর্ম পালনে দৃঢ়ত
অথচ সৌজন্য বশতঃ সকল সমাজের সহিত এমন মিশুক
লােক আর দ্বিতীয় দেখা যায় নাই যেমন জীবনে তেমন
মরণেও তিনি সমস্তলােকের প্রশংসা ভাজন হইয়া গিয়াছেন
-আজ কালের দিনে এমন মরিতেই বা পারে কয়জন? ঠিক
যেন ভীষ্মদেব। একরকম ইচ্ছামৃত্যুই তিনি বরণ করিয়া
ছিলেন। ভাগীরথীর তীরস্থ হইয়া পুত্রের মুখে গীতাপাঠ
শুনিতে শুনিতে ভগবল্লাম গ্রহণ পূর্বক সজ্ঞানে দেহত্যাগ
করিয়া তিনি তাঁহার আদর্শ জীবনের আদর্শভাবেই অবসান
করিলেন। বঙ্গজননী যে উজ্জ্বল রত্নটী হারাইলেন—তেমনটি
যে আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবেনা ইহাই আক্ষেপের বিষয়।
পরিশিষ্ট •• শ্ৰীযুক্ত হারাণ বাবুর ( প্রাগুক্ত) পত্রের শেষার্ধ এস্থলে সাদরে সংযােজিত হইল ; ইহাতে মদীয় ক্ষুদ্র প্রবন্ধের গুরুত্ব ও উপাদেয়ত্ব সংসাধিত হইল। “পিতৃদেবের কয়েকটী উক্তি উদ্ধত করিতেছি, আপনি সমীচীন বােধ করিলে আপনার প্রবন্ধে সন্নিবেশিত করিবেন। ১। সুবিখ্যাত জজ দ্বারকানাথ মিত্রের সহিত পিতৃ দেবের যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তখন কথা প্রসঙ্গে তিনি পিতৃদেবকে এই প্রশ্ন করিয়া ছিলেন—“আমরা কোন কাৰ্য্য করিবার সময় দুই পাশে দেখি না উপর দিকে দেখি ?” ইহার উত্তরে পিতৃদেব বলিয়াছিলেন-“আমরা দুই পাশেই দেখি বটে; কিন্তু তাহার কারণ এই যে দুই পাশে এমন দুই একজন আছেন যাহার উপর দিকে দেখেন। যদি দুইপাশে এরূপ লােক একজনও না থাকিতেন, তাহা হইলে আমরা দুই- পাশেও দেখিতাম না। অন্যায় কাৰ্য্য করিবার প্রলােভন হইলে প্রথমেই সতর্ক হইবে এবং যাহাতে পথভ্রষ্ট না হও প্রাণপণে চেষ্টা করিবে। একবার ভষ্ট হইলে কোথায় যাইয়া পড়িবে তাহার স্থিরতা নাই। একবার পাঁকে পা দিলে পা ক্রমাগতই বসিয়া যাইবে। ;
দ্বিতীয় অধ্যায়।
৪১
যাহাতে অন্যের মনে কষ্ট হয় এরূপ কথা কখনও
বলিবেনা।
নান্তুদঃ স্যাদার্তোহপি ন পরদ্ৰোহকৰ্মধীঃ।
যয়াস্যো বিজতে বাচা নালােক্যাং তামুদীরয়েৎ।
মনুর এই বচনটী সৰ্ব্বদা স্মরণ রাখিবে। যাহাতে অন্যের
অনিষ্ট হইতে পারে এরূপ কৰ্ম্ম কদাচ করিবেনা এবং এরূপ
কৰ্ম্মের চিন্তাকেও মনে স্থান দিনে না।
৪। সেই ইচ্ছাময়ের ইচ্ছানুসারে নানাবিধ ঘটনা
চক্রে আমাদের কাৰ্যবিশেষের সফলতা সম্পন্ন হয়। এইটি
মনে রাখিয়া আত্মাভিমান সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করিবার চেষ্টা
করা কর্তব্য। এই সংসারে আমরা যাহা কিছু উন্নতি করি,
স্থির চিত্তে ভাবিয়া দেখিলে বােধ হইবে যে উহাতে আমাদের
নিজের কৃতিত্ব খুব কমই আছে।
৫। আমার কিছু চাহি না এরূপ বলিতে অভ্যাস
অযাচিত ভাবে যাহা পাইবে তাহাতেই যথার্থ আনন্দ
লাভ হইবে।
[ Sir Asutosh 7 tattoo Post-graduate
Science Councilor Secretary? Peste faze #172,
তখন পিতৃদেব আমাকে বলিয়া ছিলেন যে, আশুবাবু
তােমাকে অযাচিত ভাবে আদর করিয়া এই কাজটি দিয়াছেন,
ইহা তােমার জন্মান্তরের তপস্যার ফল মনে করিবে।
আনন্দভাবে পরিতুষ্টিমঃ সুশান্তসৰ্বেন্দ্রিয়বৃত্তিমঃ।
অহনিশং ব্ৰহ্মণি যে রমন্ত কৌপীনবন্তঃ খলু ভাগ্যবস্তঃ ।
৪২
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
পিতৃদেব উক্ত বচনটী প্রায়ই আবৃত্তি করিতেন এবং বলিতেন,
‘সুখী ব্যক্তির কি চমৎকার চিত্র।
৭। জড়তত্ত্ব যত শিখিতে পার শিখ, তাহাতে ক্ষতি
নাই; কিন্তু শেষ লক্ষ্য পরমার্থ, এই কথাটি কখনও
ভুলিওনা, প্রেয় লাভ করিতে পারিলেই যে শ্রেয়ঃ লাভ
হইল এরূপ মনে করিনা।
৮। (আমাদিগকে উদ্দেশ করিয়া বলিতেন, আমার
কোনও উপদেশ তােমাদের প্রকৃত পক্ষে হিতকর মনে করিয়া
পালন করিলে তবেই আমি প্রীত হইব। পিতার উপদেশ
পালনীয় কেবল এই মনে করিয়া আমার উপদেশ পালন
করিলে আমি তত প্রীত হইবনা।
[মৃত্যু শয্যায় তাহার দুই একটা উক্তি বিবৃত করিয়া
আমার বক্তব্য শেষ করিব।]
আমার যশােলাভের স্পৃহাছিল; কিন্তু যশােলাভ
হইলে কোন দুঃখ ছিল না। যশােলাভের স্পৃহা থাকা
উচিত নহে; কেবল কর্তব্য বােধে কৰ্ম্ম করিয়া যাওয়াই
;
উচিত।
১০ ।
গুরু পুত্র জিজ্ঞাসা করিলেন--“আপনি এখন কি
চিন্তা করিতেছেন?” উত্তরে পিতৃদেব বলিলেন-“জীবন
কি, তাহাই চিন্তা করিতেছি; জীবনই তিনি।” এই বলিয়া
গুরুপুত্রকে এই শ্লোকটি আবৃত্তি করিতে বলিলেন এবং
নিজেও আবৃত্তি করিলেন--
;
দ্বিতীয় অধ্যায়।
“ভিততে হৃদয়গ্রন্থিচ্ছিদ্যন্তে সৰ্ব্বসংশয়া।
ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে।”
১১। আমি একে একে সংসারের বন্ধন গুলি খুলিয়া
ফেলিয়াছি। একটি বন্ধন এখনও সম্পূর্ণ রূপে খুলিতে পারি
নাই- বােধ হয় শীঘ্রই পারিব। (আমার মাতৃদেবীর সহিত
বন্ধনের কথা উদ্দেশ করিয়াই বােধহয় এই কথা বলিয়াছিলেন।)*
১২। আর বাঁচিবার ইচ্ছা নাই, একথা বলিতে পারিনা,
কেননা
“অহহনি ভূতানি গচ্ছন্তি যমমন্দির।
শেষাঃ স্থিরত্বমিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যমতঃ পরম্।”
তবে আমার সমস্ত সাধ পূর্ণ হইয়াছে এবং যদি ভগবানের
ইচ্ছায় এখন আমাকে যাইতে হয়, তাহাতে আমার কিছু
মাত্র দুঃখ নাই।
১৩। (আমাদের সকলকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন)
তােমর এ সময়ে অধিক কাতর হইও না; একদিন সকলেরই
এই সময় আসিবে, এই মনে করিয়া মনকে শক্তকর এবং
এখনকার যাহা কর্তব্য তাহা পালন কর। এই তােমাদের
পরীক্ষার সময়।
শ্ৰীহারাণচন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
কিন্তু তাঁহার গুরুপুত্র শ্রীযুক্ত আশুতােষ ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের
90 Ifa Re-meniscenes Speeches and Writings of Sir
Gooroudass Banerjee নামক গ্রন্থের অন্তর্নিবিষ্ট হইয়াছে, তাহাতে
(p. 28+ } আছে—“আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, আপনার এখনও
একটি বন্ধন অবশিষ্ট আছে-সে বন্ধনটি কি? উত্তরে বলিয়াছিলেন,
অন্য কিছুই নহে কেবল আমি একটি পুস্তক রচনা করিতেছিলাম উহা
শেষ করিতে পারিলাম না।” ইত্যাদি। গ্রন্থকার।
তৃতীয় অধ্যায় ।
স্বর্গীয় স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয়ের পত্রাবলী ।
দেশপূজ্য বরেণ্য স্বর্গীয় স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
মহােদয়ের সহিত সৌভাগ্যক্রমে তদীয় স্বর্গতিব প্রায়
বার বৎসর পূর্বে আমার আলাপ পরিচয় ঘটে। তদবধি
যখনই ক'ৰ্যোপলক্ষে কলিকাতায় গিয়াছি, তাহার সঙ্গে
সাক্ষাৎকার না করিয়া আসি নাই। আমাদের পঠদ্দশা
হইতেই তাহার আচারনিষ্ঠা মাতৃভক্তি প্রভৃতি বিষয়ের
কথা শুনিয়া তাহার প্রতি একটা প্রবল শ্রদ্ধা জন্মে,
তাই তাহার মুখে সদালাপ শুনিবার জন্য ঐরূপ আগ্রহ
হইয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে তাঁহাকে একদিন বলিয়াছিলাম
যে, তদায় বাল্যাবস্থায় কলিকাতায় যেরূপ ধৰ্ম্ম ও সমাজ
বিপ্লব ঘটিয়াছিল, ইহাতে তিনি কিরূপে স্বপৰ্ম্ম বজায় রাখিয়াও
বিশ্ববিদ্যালয়ের একন অত্যুৎকৃষ্ট ছারপে এবং একজন
উচ্চদরের ব্যবহারাজীব রূপে পরিগণিত হইয়া জ্ঞানে ও কর্মে
সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা ভাজন হইতে পারিয়াছেন, তাহা
আমাদের সমাজের সকলেরই জানা উচিত; অতএব তিনি
একখানি আত্মচরিত লিখিলে সমাজের বড়ই উপকার হইবে।
আত্মচরিত লিখিতে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন,
এবং তাহার সঙ্গে এ বিষয়ে অনেক বাদানুবাদ হইবার পরে,
তৃতীয় অধ্যায়।
৪৫
আমার অনুরােধটা সম্বন্ধে চিন্তা করিয়া দেখিবেন, এই কথা
বলেন। কিছু কাল পরে, হিন্দু বিবাহ সংস্কার সম্বন্ধে একটা
প্রস্তাব হয়, আমি তদুপলক্ষে আমার মতামত জ্ঞাপনার্থ
প্রস্তাবের উত্তরে এক সুদীর্ঘ পত্র লিখিয়াছিলাম, এবং তাহা
যথাসময়ে যথাস্থানে প্রেরিত হইলেও তৎপরে কলিকাতায়
গেলে পূজ্যপাদ স্যর গুরুদাসকে উহার প্রতিলিপি খানি
পড়িয়া শুনাইয়াছিলাম। তিনি পত্রের যুঃ তর্ক শুনিয়া
বলিলেন, “শ্চৰ্য্য, আমি এ বিষয়ে যেরূপ চিন্তা করিয়াছি,
আপনিও দেখতেছি সেই রূপই চিও করিয়াছেন।” এই
বলিয়া এক ফৰ্ম্মা প্রুফ, আনিয়া একটা আমাকে পড়িয়া
শুনাইলেন। জিজ্ঞাসা করিম, ফকসের ? তখন
তিনি বলিলেন, “সেই যে আপনার অ.17ধ ছিল তাহা মনে
রাখিয়া এ খালি পুও লিখিয়াছি সত্বরই প্রকাশিত হইবে।
অবশ্যই এক খানি •াপনি পাইবেন । গ্রন্থের নাম জিজ্ঞাসা
করিয়া জানিলাম “জ্ঞান ও কম"। কিছুদিন পরে এক খণ্ড
“জ্ঞান ও কম” সহ নিম্নলিখিত পত্র খান পাইলাম ।
।
প্রতিপত্রের পূর্বে এইরূপ একটু ভূমিকা • দিলে ব্যাপারটা
বিশদ ভাবে বােঝা যাইবেন;-তাই মধ্যে ম ... ..., কথাও পাড়িতে
হইল। সঙ্গে সঙ্গে একটু আত্মখ্যাপনও অ .. '; '}} সহৃদয় পাঠক
সেইটুকুর অপরাধ গ্রহণ করিবেন না, এ • ১ অনুরাধ। প
গুলির যে সকল পদ টীকা মধ্যে মধ্যে , ওল যে আমার
নিজস্ব এটাও বলা আবশ্যক।
৪৬
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
শ্রীহরিঃ শরণম্।
(১নং পত্র)
নারিকেল ভাঙ্গা, কলিকাতা
৯ই ফান,
১৩১৬।
কল্যাণবরেষুE
অদ্য বুকপােষ্ট আপনার নিকট আমার জ্ঞান ও কর্ম” নামক
পুস্তক একখানি পাঠাইলাম। আপনি আমার এই পুস্তক প্রণয়নের
একজন প্রবর্তক। সুতরাং ইহা আপনার বিবেচনায় কিরূপ হইয়াছে
তাহা জানিবার নিমিত্ত আমার কিঞ্চিৎ ঔৎসুক্য রহিল। আশা করি
আপনি সৰ্বাঙ্গীণ কুশলে আছেন। ইতি-
শুভানুধ্যায়ী
ঐগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
পুস্তকখানি অতীব শ্রদ্ধার সহিত পাঠ করিলাম। সম্ভবত
ইহাই স্যর গুরুদাসের বাঙ্গালা সাহিত্য-গ্রন্থ রচনার প্রথম
উদ্যম, কিন্তু এই সপ্ততিবর্ষদেশীয় মহাত্মা যেরূপ অধ্যবসায়
সহকারে ইহা লিখিয়াছেন, কয়জন তরুণবয়স্ক ব্যক্তি তেমন
* এই নম্বর আমি দিলাম। আমার নিকটে উহার লিখিত পত্রাবলীর ইহাই যে
প্রথম, তাহাও বলিতে পারিনা। অনেক পত্র এখন আর খুঁজিয়া পাইতেছি
না। (হরিঃ শরণ” “নারিকেলডাঙ্গা” “কল্যাণৰনেযু, ভানুধ্যায়ী এইগুলি
সকল পত্রেই আছে। অন্যায় পৰে এই সৰ ৰাহুল্য বেধে লেখা হইবে না।
৪৭ তৃতীয় অধ্যায়। পারিবেন? যাহা হউক, তাঁহার পুস্তকের সম্বন্ধে তাহারই আদেশ অনুসারে আমি যেরূপ মতামত প্রকাশ করিয়াছিলাম তাহার অনেকটা তদীয় উত্তর হইতেই ব্যক্ত হইবে। এই চৈত্র, (২নং পত্র) ১৩১৬ আপনার গত ৩রা চৈত্রের প্রতিপূর্ণ পত্ৰ পাইয়াছি। আমার জ্ঞান ও কর্ম” নামক পুস্তকখানি আপনি এত যত্নের সহিত পাঠ করিয়াছেন, তৎসম্বন্ধে এতগুলি ভাল কথা বলিয়াছেন, এবং তাহার যে যে স্থানে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন বা সংশােধন আপনার মতে বানীয় বলিয়া বােধ হইয়াছে, তাহা এত সরল ও শান্তভাবে দেখাইয়া দিয়াছেন, ইহাতে আমি অতিশয় বাধিত ও উপকৃত হইলাম । আপনি লিখিয়াছেন ৪১ পৃষ্ঠায় ‘সংজ্ঞা স্থানে ‘অন্তর জ্ঞান ও ৪৩ পৃষ্ঠায় ‘আত্মজ্ঞান স্থানে “অহং জ্ঞান হইলে ভাল হইত। সংজ্ঞা’ শব্দটা সম্পূর্ণ মনের মত হইলেও ‘অন্তরজ্ঞান’ যে তদপেক্ষা ভাল হইবে ইহা স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহি। ‘আত্মজ্ঞান’ স্থলে ‘অহংজ্ঞান’ হইলে ভাল হইত, ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে এবং এ পুস্তকের যদি কখন দ্বিতীয় সংস্করণ হয়, তাহাতে এইরূপ পরিবর্তন করি * ইচ্ছা রহিল। তাঁহার নিকট আমি যে সকল চিঠিপত্র লিখিয়াছিলাম সেইগুলির প্রতিলিপি রাখি নাই, তেমন প্রয়ােজনই বা কি ? পাঠকবর্গের কাছে পুণ্যশ্লোক স্যর গুরুদাসের পত্রাবলীই সমাদরণীয় হইবে—আমার পত্র দেখিবার জন্য তাঁহাদের আগ্রহ না হইবারই কথা। তবে কখন কখন “কীটোইপি সুমনঃ সাদাৰােহতি সতাং শিরঃ”।
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ। বাঙ্গালায় বিশেষণের লিঙ্গ ভেদ থাকা উচিত কিনা আপনি এই প্রশ্ন তুলিয়াছেন। ইহা একটা কঠিন প্রশ্ন। আমি এক সময় মনে করিয়াছিলাম সংস্কৃত বিশেষণের পুংলিঙ্গে প্রথমান্ত রূপ বাঙ্গালায় মূলশব্দ বলিয়া লওয়া যাইতে পারে। আপনারও মত দেখিতেছি অনেকটা সেই দিকে। কিন্তু যদিও এই মত অনেক স্থলে চলে, ইহা সৰ্বত্ৰ চলিতে পারে না। ‘রূপবান নারী’ ‘শ্রীমান্ রাধা বােধ হয় কখনই চলিবেনা। অথচ আবার ‘উপযােগিনী শিক্ষা অনুযায়িনী প্রথা’ সংস্কৃতের বাড়াবাড়ি বলিয়া মনে হইতে পারে। এই ভাবিয়া ইভাগান্ত বিশেষণ ক্লাবলিঙ্গে হ্রস্বই কারান্ত রাখা ও অন্যত্র পূর্বোক্ত সাধারণ নিয়ম মত পুংলিঙ্গের প্রথমান্ত রূপ প্রয়োগ অর্থাৎ দীর্ঘ ঈকারান্ত রাখা এই মাঝম ঝি পথ অবলম্বন করিয়াছি, কিন্তু ইহু। যে শুদ্ধ বা সুগম পথ তাহা বলিতে পারি না। বিশেষ আপনার ন্যায় সংস্কৃতভাষায় সুপণ্ডিত এবং বাঙ্গালা রচনায় সিদ্ধহস্ত ব্যক্তির মত যখন অন্যরূপ, তখন ঐ সন্দেহ আরও গুরুতর হইয়া উঠিতেছে। এ বিষয় বিশেষ বিবেচনার সূল রহিল। দেখিব ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন্ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যুক্তিসঙ্গত। সংস্কৃত শ্লোক বা বাক্য ইচ্ছাপূর্বকই দেবনাগরাক্ষরে মুদ্রিত করাইয়াছি। আপনি দেখিতেছি বঙ্গাক্ষরের কিঞ্চিৎ পক্ষপাতী। সত্যবটে “জননা শ্ৰেষ্ঠাকন্যাকে অকাতরে তদীয় সম্পত্তি ব্যবহার করিতে দিয়াছেন” কিন্তু তাই বলিয়া সমৃদ্ধিশালিনী জননী কন্যার পরি পরিধান করিতে ইচ্ছা করেন না। বিশেষ যখন তাহার নিজের পরিচ্ছদ কখনও জীর্ণ বা মলিন হয় নাই, বরং কন্যার পরিচ্ছদ অপেক্ষা সৰ্বত্ৰ অধিকতর সুপরিচিত রহিয়াছে, তখন তাহা পরিবর্তনের প্রয়ােজন কি? আপনি যে দৃষ্টান্ত দেখাইয়াছেন তাহার বিপরীত দৃষ্টান্ত বােধ হয় অধিক আছে, যথা ম্যাসমূলার।
তৃতীয় অধ্যায়। : এবং গ্রীক কবিতা ও বাক্য গ্রীক অক্ষরে মুদ্রিত হইয়া থাকে। শূদ্রগণ অনাৰ্য্য কি না এ বিষয়ে আপনি সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। সকল শূদ্র অনাৰ্য্য না হইতে পারেন, তবে অনেকে অনাৰ্য বলিয়া বােধ হয়। এবং একথা শাস্ত্ৰদ্বারা প্রমাণ না হইলেও পূরুষসূক্ত বা স্মৃতি বা অন্য কোন শাস্ত্র বিরুদ্ধ কেন বলিব ? “রূপং রূপবিবর্জিত” ইত্যাদি শ্লোকটির প্রামাণিকত্বে আপনি সন্দেহ করিয়াছেন। আমি এ শ্লোকটী কোন্ পুস্তক হইতে উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহা লিখিয়া দিয়াছি। এ শ্লোক প্রমাণিত হউক আর না হউক, এই মৰ্ম্মের অনেক কথাই হিন্দু শাস্ত্রে ও হিন্দু ভক্তের মুখে পাওয়া যায়। ঈশ্বরের বিশ্বরূপ বা বির'মূর্ত ত এই কথাই প্রকারান্তরে বলা। ভক্ত রামপ্রসাদের কথা-কাজ কি আমার কাশী-শ্যামা মায়ের চরণতলে পড়ে আছে গয়া গঙ্গা বারাণসী” ও একটা প্রচলিত কথা— ‘মন চাঙ্গা ত কাঠমে গঙ্গা’—ঐ শ্লোকের একাংশের পােষকতা করে। পশু বলিদান সম্বন্ধে অনেক মতভেদ আছে। তবে আমি যাহা বলিয়াছি তাহার অনুকূলে শাস্ত্রে অনেক প্রমাণ আছে। তথাপি যদি এ বিষয়ে আমার কথা আপনার ন্যায় হৃদয়বান ব্যক্তির ব্যথাজনক হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমার মত অব্যাহত রাখিয়া ভাষার সমুচিত পরিবর্তন দ্বিতীয় সংস্করণে অবশ্যই করিব। আপনি আমার প্রতি প্রীতি প্রণােদিত হইয়া আমাকে আত্মজীবনী লিখিতে অনুরোেধ করিয়া:ছন। কিন্তু এ অনুরােধ রক্ষা করিতে আমি অক্ষম। আত্ম- জীবনী লিখিতে গেলে বােধ হয় কিঞ্চিৎ আত্মাভিমান সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া পড়িবে। কিন্তু এ বয়সে আত্মাভিমান যতদূর ছাড়িতে পারি ততই মঙ্গল। আর অধিক কি বলিব। আশা করি আপনি সর্বাঙ্গীণ কুশলে আছেন। ইতি- গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রথমেই বলিয়াছি যে ‘আত্মচরিত লিখিবার জন্যই আমার সাগ্রহ অনুরােধ ছিল। সেই অনুরােধের অবান্তর ফলস্বরূপ ‘জ্ঞান ও কর্ম’ পাইয়াও তৃপ্তি হইল না, আবার অনুবােধ করিয়াছিলাম। উত্তরে যাহা বলিলেন, পূৰ্বপত্রেই দেখা গিয়াছে। যাহা হউক এই উত্তরেও আমি সন্তুষ্ট না হইয়া যুক্তি তর্ক সহকারে তৃতীয়বার আমার অনুরােধ কানাইলাম, এবং তৎসঙ্গে শ্রীযুক্ত ডাক্তার প্রফুল্লচন্দ্র রায় মহাশয় যে তল্লিখিত “বাঙ্গালী মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার প্রবন্ধে হিন্দুসমাজের উপর আক্রমণ করিয়াছিলেন, তাহার উত্তরচ্ছলে “জাহ্নবী” পত্রিকায় প্রকাশিত মদীয় প্রবন্ধটি তাঁহার দৃষ্ট্যর্থে পাঠাইয়া দেই। পরবর্তী পত্রে ঐ দুই বিষয়ের কথাই আছে। ( ৩নং পত্র) ১২ই চৈত্র ১১ আপনার গত ৯ই চৈত্রের পত্র ও প্রেরিত “জাহ্নবী” পত্রিকার পপৗ খত একখানি পাইয়াছি। শ্ৰীযুক্ত ডাক্তার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের “বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার” প্রবন্ধ সম্বন্ধে আপনার প্রণীত উক্ত পত্রিকায় প্রকাশিত সমালােচনা যত্নের সহিত পাঠ করিয়াছি এবং পাঠ করিয়া অতিশয় প্রীত হইয়াছি। ডাক্তার রায়ের প্রবন্ধে লিখিত অনেক এই প্রবন্ধ পরিশেষে পুনর্মুদ্রিত হইয়া “বৈজ্ঞানিকের ভ্রাতি নিয়াল শিরােনামে গৌহাটী সনাতন ধর্ম সভা কর্তৃক প্রকাশিত “সমাজ সেৰৰ পুস্তকাবলীর ১ম সংখ্যারূপে প্রচারিত হইয়াছে।
তৃতীয় অধ্যায়। গুলি কথার প্রতিবাদ আবশ্যক, এবং আপনি যেরূপ সুন্দর ভাবে তাহার প্রতিবাদ করিয়াছেন তাহা সকলের না হউক অধিকাংশ বাঙ্গালীরই প্রীতিকর হইবে। প্রতিবাদ দুই এক স্কুলে একটু তীর হইয়াছে, কিন্তু কোনও স্থলেই অন্যায় হইয়াছে বলা যায় না। সমালােচনার ভাষা তেজের বটে কিন্তু প্রবন্ধকারের প্রতি অসম্মানসূচক নহে। এবং সমালােচনায় যে সকল যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়ােগ হইয়াছে তাহা প্রায়ই অকাট্য। আমার প্রতি প্রযুক্ত আপনি যেরূপ আগ্রহ সহকারে ও প্রীতিপূর্ণ বাক্যে আমাকে আত্মজীবনী লিখিতে অনুরােধ করিয়াছেন তাহা আমার পক্ষে অতীৰ শ্লাঘার বিষয় এবং তাহার বিরুদ্ধে কিছু বলিতে প্রাণ চাহে না। তবে দুই একটা কথা না বলিয়াও কান্ত থাকিতে পারিনা। যদিও সময়ে সময়ে অবস্থার গতিকে লােককে উপদেশ দিতে হইয়াছে এবং আত্মীয় জনগণের নিকট উদাহরণ স্বরূপ নিজ জীবনের ঘটনা বিবৃত করিতে হইয়াছে, কিন্তু সাধারণের নিমিত নিজ জীবনী লিখিতে গেলে আমার জীবন বৃত্তান্ত সাধারণের জানিবার যােগ্য ইহা কাৰ্যতঃ বলিতে হয়, এবং তাহা বলাতে কিঞ্চিৎ আ- ভিমান প্রকাশ পায়। এই জন্যই আমার এ বিষয়ে এত অনিচ্ছা। আর অধিক কি বলিব। শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯১ অব্দে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ উপাধিধারী দিগকে কে দুইজ দুইজন ‘ফেলাে’ নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়, তখন নিয়ম ছিল যে নির্বাচকগণ ম্যাজিষ্ট্রেটের সাক্ষাৎ উপস্থিত হইয়া ভােটিং পেপারে নাম লিখিবেন। পশ্চাৎ ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে সঙ্গে মােনসেফ, সবগণকে এই স্যর গুরুদাস এস। অধিকার দেওয়া হয় যে তাঁহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াও ভােটিং পেপার পরিপূরণ করা যাইতে পারে। নূতন রেগুলেশন জারি হইলে কেবল রেজিষ্টার্ড গ্র্যাজুয়েটরা ভােঢ় দিবেন, এই নিয়ম হইল। তখন তদানীন্তন ভাইসচ্যানসেলার মহামান্য স্যর শ্ৰীযুক্ত আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহাশয়কে অনুরােধ করিয়াছিলাম যে ম্যাজিষ্ট্রেট, মােনূসেফ, ও সবজজদের ন্যায় শিক্ষা বিভাগের কর্মচারীদের সম্মুখেও ভােটিং পেপারে নাম লেখা যাইতে পারে এইরূপ বিধি হওয়া উচিত। আশুতােষ তাহাতে সম্মত না হওয়ায় পূজ্যপাদ স্যর গুরুদাসকে এ বিষয়ে একটু আলােচনা করিতে অনুরােধ করি। পরবর্তী চিঠিতে এই বিষয়ই আছে। স্যর ( ৪নং পত্র) ৩০শে কার্তিক ১৩১৭ আপনার গত ২৮শে কার্তিকের পত্র অন্য পাইয়াছি। আপনার মঙ্গল সমাচার জ্ঞাত হইয়া সুখী হইলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সভ্য- নিৰ্বাচনে কলেজের অধ্যাপকদিগের সম্মুখে ভোটিং পেপার সহি করিলেই চলিবে, এই নিয়ম বিধিবদ্ধ করণার্থে শ্ৰীযুক্ত আশুবাবুকে ও শ্ৰীযুক্ত দেবপ্রসাদবাবুকে কিছুদিন পূর্বে বলিয়াছিলাম, কিন্তু তৎসম্বন্ধে তাঁহাদের নিকট কোনও আশা বা উৎসাহ পাই নাই। তথাপি আর একবার বলিয়া দেখিব। আমি ভাল আছি এবং আমার বাড়ীর সমাচার আপাততঃ সমস্ত মাল। শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃতীয় অধ্যায়।
অতঃপর বােধ হয় একবার তাহার বাড়ীতে এই বিষয়ে
মৌখিক আলােচনা হয় এবং আমি রেজিষ্ট্রার সাহেবের
নিকটে নিয়মমত আবেদন করিব, এইরূপ বলিয়া আসি।
ইতােমধ্যে মদীয় “প্রবন্ধাষ্টক” নামক পুস্তক প্রকাশিত হয়।
তাহাকে একখানি এবং তদীয় জ্যেষ্ঠপুত্ৰ শ্ৰীযুক্ত হারাণচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে একখানি উপহার প্রদান করি।
হারাণবাবুর সঙ্গেও সেই সময়ে বিশেষ আলাপ পরিচয় হয়।
যেমন পিতা তেমনই পুত্র—অতি অমায়িক ও সাধুপ্রকৃতির।
পুস্তক পাঠাইয়া সঙ্গে সঙ্গে রেজিষ্ট্রারের নিকট আবেদনের
খসড়াও পাঠান হইয়াছিল। পরবর্তী পত্রে উভয় জিনিসেরই
উল্লেখ আছে।
(৫নং পত্র)
২রা জ্যৈষ্ঠ
১৩১৮
আপনার পত্র ও প্রেরিত প্রবন্ধাষ্টক” নামক পুস্তক দুইখানি
পাইয়াছি। হারাণের নামীয় পুস্তকখানি হারাণকে দিয়াছি এবং
আমার নামীয় পুস্তকখানি সাদরে গ্রহণ করিয়া ধন্যবাদের সহিত তাহার
প্রাপ্তি স্বীকার করিতেছি। পুস্তকের কিয়দংশ মাত্র পাঠ করিবার সময়
পাইয়াছি। যেটুকু পড়িলাম তাহাতে দেখিতেছি আপনার রচনা
যেরূপ হওয়া আশা করা যায় সেইরূপই হইয়াছে। গ্রহের আভােপাৰ
পাঠান্তে যদি আর কিছু বলিবার থাকে পরে বলিব।
রেজিষ্ট্রারের নিকট আবেদন পত্রখানি যথাযােগ্য হইয়াছে, দুই এক
সূলে দুই একটা কথার পরিবর্তন করিলে ভাল হয়, তাহা পেনসিলে
লিখিত হইল। আবেদন পত্রখানি এই সঙ্গে ফেরৎ পাঠাইলাম।
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
৫৪ র গুরুদাস এ। আবেদন পত্র রেজিষ্ট্রারের নিকটে যথারীতি প্রেরিত হইলেও তখন উহাতে কোনও ফল হয় নাই। পশ্চাৎ এ বিষয়ে যে অনেকটা সফলতা লাভ হইয়াছিল, যথাস্থানে তাহা বিবৃত হইবে। “প্রবন্ধাষ্টক” সম্বন্ধে তাহার সঙ্গে পত্রালাপ আর হয় নাই। কিছুকাল পরে সাক্ষাৎকার হইলে তিনি তদীয় মতামত মৌখিক বলিয়াছিলেন। পুস্তকখানি বিশ্ব- বিদ্যালয়ের আই এ-তে বাঙ্গালা রচনা রীতির আদর্শ গ্রন্থাবলী- ভুক্ত করিবার জন্য তিনি অনুগ্রহপূর্বক প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ ন্যায়ানুগত অপক্ষপাতিত্ব প্রণােদিত হইয়া তিনি “কালিদাসের কাহিনী” বৰ্জন করিয়া তালিকা ভুক্ত করিতে প্রস্তাব করিয়াছিলেন, কিন্তু প্রস্তাব গ্রাহ্য হয় নাই। কালিদাসের কাহিনীতে আদিরস ঘটিত কতকগুলি শ্লোক থাকাতেই তিনি তাহা বর্জনীয় মনে করিয়াছিলেন। তারপর প্রায় তিনবৎসর কাল পত্র ব্যবহার হইয়া থাকিলেও পত্রগুলি হারাইয়া গিয়াছে। ঐ গুলিতে তেমন কোনও উল্লেখযােগ্য বিষয়ের আলােচনা হইয়াছিল বলিয়া স্মরণ হয় না। ১৩২০ সালের সম্ভবতঃ পৌষমাসে মাননীয় স্বর ডাঃ যুক্ত দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী মহােদয় ল-কলেজ পরিদ- শনােপলক্ষে গৌহাটীতে আইসেন। তঁাহার সঙ্গে ভােটিং পেপার দস্তখত সম্বন্ধে সবিশেষ আলােচনা হয়। পূর্বে স্তর * পুস্তকখানি বঙ্গ ও আসামের সর্ববিধ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর গ্রন্থাবলীর অন্তনিবিষ্ট হইয়াছিল। সম্প্রতি প্রায় নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে।
তৃতীয় অধ্যায়।
গুরুদাস যে সকল যুক্তি প্রয়ােগ করিয়াছিলেন তাহাও তিনি
স্মরণ করিয়া আমার প্রস্তাবটীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন
করিলেন। পরে যখন তিনি ভাইসূচ্যানসেলর হইলেন, তখন
একখানি আবেদনপত্র প্রস্তুত করিয়া পুজনীয় স্যর গুরুদাসের
নিকটে পরীক্ষার্থে প্রেরিত হইল। তদুত্তরে তিনি যাহা
লিখিলেন, পরবর্তী পত্রে তাহা দৃষ্ট হইবে।
(৬ নং পত্র)
২২শে ভাদ্র
১৩২১
আপনার গত ১৭ই ভাদ্রের পত্র ও তৎসহ প্রেরিত বিশ্ববিদ্যালয়ের
রেজিষ্ট্রারের নামীয় একখানি চিঠির খসড়া গত ২০ শে ভা সন্ধ্যার
সময় পাইয়াছি। ঐ খসড়ার ৬ দফায় লিখিত কথা* সম্বন্ধে আমি
কিছুই অবগত নহি, সুতরাং এ দফায় কোন পরিবর্তন করিতে পারা
যায় না। অন্যান্য দফায় পেনসিলের লেখায় দুই একটা সামান্য পরিবর্তন
করিয়াছি। খসড়া খানি এই পত্র সহ ফেরৎ পাঠাইলাম। ঈশ্বর করুন
আপনার আবেদন সফল হউক। এখানকার সমাচার আপাততঃ সমত
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই আবেদন পত্রখানি যথা সময়ে প্রেরিত হইয়াছিল,
ইহাতে আমাদের কলেজের যে সকল অধ্যাপক রেজিষ্টার্ড,
ফায় একটা শােনা কথা লেখা গিয়াছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোগণ কাউন
সিলের মেয় নির্বাচন সময়ে ভােট দিবার কালে নাকি পূর্বে এইরূপ কােটি পেপার
বতি বিশেষের সাক্ষাৎ সহি করিতেনশতাং ঐ এ পরিবর্তিত হইয়াছিল।
না এ বিষয়ে গত এক মাতে এই বার দেয়া হয়।
সর গুরুদসি প্রসঙ্গ। গ্র্যাজুয়েট ছিলেন, সকলেই সানন্দে যােগ দিয়াছিলেন। ইহার কোনও জবাব পাওয়া যায় নাই। কিন্তু যখন ভােটিং পেপার আসিল তখন দেখাগেল যে নিয়ম একটু পরিবর্তিত হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলাে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত যে কোনও কলেজের প্রিসিপাল, ভােটিং পেপার কাউন্টার- সাইন করিবার অধিকার পাইয়াছেন। বহুদিনের আন্দোলনে কতকটা সফলতা লাভ করিয়া স্যর গুরুদাসের নিকটে হর্ষ প্রকাশ পূৰ্ব্বক পত্র লিখিলাম, উত্তরে তিনিও আনন্দ প্রকাশ করিলেন। (নং পত্র) ১লা পৌষ, ১৩২১ আপনার গত ২৬শে অগ্রহায়ণের প্রীতিপূর্ণ পত্ৰ পাইয়াছি। আপনি যে বিষয়ের জন্য এতদিন যত্নবা তাহাতে আপনার যত্ন সফল হইয়াছে দেখিয়া পরম আনন্দিত হইয়াছি। এবং আমি একা নহি রেজিষ্টার্ড গ্র্যাজুয়েট সকলেই আনন্দিত। কারণ এই নিয়ম পরিবর্তনে আমাদের সকলেরই সম্মান ও সুবিধা বৰ্ধিত হইয়াছে। আর এজন্য শ্ৰীযুক্ত ডাক্তার দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী মহাশয়ের নিকট আমরা সকলেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি। ইতি শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। * অধ্যবসায়ের আংশিক সফলতার জন্যই যে এই হর্ষ এমন নহে; এতিয়া করিয়াছিলাম, ব্যবস্থার পরিবর্তন না হইলে আর নির্বাচনে যােগ দিব, তাই প্রায় ১০ বৎসর কাল ভােট দেই নাই।
তৃতীয় অধ্যায়। এখন অপর এক অধ্যায়ের আরম্ভ হইল। মফস্বল হইতে বড় কেহ ফেলো নির্বাচিত হইতে চান না, কেননা পরাজয় ধ্রুব। তথাপি মধ্যে মধ্যে এক আধটা চেষ্টা করাও ত আবশ্যক। তাই ফেললা পদপ্রার্থী হইব মনে করিলাম। পরাজয় নিশ্চিতই, তবে পুণ্যশ্লোক গুরুদাস আমাকে “নমিনেট” করুন এই আকাঙ্ক্ষা হইল। উদ্দেশ্য, অন্ততঃ লােকে যেন এই না বুঝে যে কোথাকার কে একটা অর্বাচীন লেক ফেলাে হইবার স্পর্ধা করিতেছে। চিঠি দিয়া আকাঙ্ক্ষা জ্ঞাপন করিলাম। এবং বঙ্গভাষায় গ্র্যাজুয়েটদিগের নিকট চিঠি লেখা যুক্ত কিনা তাহাও জিজ্ঞাসা করিলাম। তদুত্তরে এই চিঠি পাইলাম। (৮ নং পত্র) ২৮শে ভাদ্র, ১৩২২ আপনার গত কল্যকার পত্ৰ পাইয়া আপনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারিগণ কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের সভ্য নির্বাচিত হইবার ইচ্ছা করিয়াছেন, ইহা জ্ঞাত হইয়া অতিশয় আহলাদিত হইলাম। আপনার স্থায় সুযােগ্য ব্যক্তি সভ্যরূপে নিৰ্বাচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আপনাকে “নমি:নট” করিবার জন্য আমাকে লিখিয়াছেন, কিন্তু দুঃখিত হইতেছি যে আমি আপনার সেই কথাটা রক্ষা করিতে পারিব না। তাহার কারণ এই যে যুক্তিসিদ্ধ হউক আর না হউক আমি বহুদিন হইতে স্থির করিয়াছি, কোন ভূতপূর্ব ভাইস চ্যানসেলারের পক্ষে ব্যক্তিগত প্রতিযােগিতার স্থলে কোন পক্ষাবলম্বন ভাল দেখায় না, এবং সেই অনুসারে আমি এ পর্যন্ত কাহাকেও “নমিনেট করি নাই, অনেক আত্মীয়ের অনুবােধ এড়াইয়াছি। কেবল একবারমাত্র ইহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল, কিন্তু তাহার বিশেষ কারণ ছিল, এবং তাহাও অনেক দিন শর গুরুদাল এ। হইয়া গিয়াছে ; তাহার পর গত দশ বৎসরের মধ্যে আর কোনও ব্যতিক্রম ঘটে নাই। আমি নির্বাচনে ভােট দিয়া থাকি, তবে ভােট দেওয়া ও “নমিনেট” করার প্রভেদ এই যে ভােট দেওয়া সকল প্রার্থীর নাম জানিয়া তন্মধ্যে যােগ্যতমকে নির্বাচন করা, এবং “নমিনেট” করা অগ্ৰেই একজনের পক্ষাবলম্বন করা। এতে আমার বিশেষ করিয়া বলা আবশ্যক যে আপনি যেন মনে না করেন আপনার যােগ্যতার প্রতি আমার কোনরূপ সন্দেহ আছে এবং সেই সন্দেহ আপনার কথা রক্ষা না করার আর একটা কারণ। প্রকৃতপক্ষে আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সভ্যের যে সকল গুণ থাকা আবশ্যক আপনার তাহা প্রায় সমস্তই পূর্ণমাত্রায় আছে। আপনি * আশা করি আপনার চেষ্টা সফল হইবে। বাঙ্গালা ভাষায় পত্র লিখিবার যে মানস করিয়াছেন তাহাতে কোনও দোষ দেখি না। তবে যে সকল উপাধিধারীর মাতৃভাষা বাঙ্গালা নহে, যথা বিহারী গ্র্যাজুয়েট, তাহাদিগকে বােধ হয় ইংরেজী ভাষাতেই পত্র লিখা উচিত। আপনার কুশল সমাচার ভাত হইয়া সুখী হইলাম। এখানকার সমাচার আপাততঃ এক প্রকার মঙ্গল। ইতি - শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। । এই পত্রে উৎসাহিত হইয়া বাঙ্গালা ভাষায় রেজিষ্টার্ড গ্র্যাজুয়েটগণের নিকটে একখানি পত্রের মােসাবিদা করিয়া তদীয় অনুমােদনাৰ্থ পাঠাইয়া দিলাম। তাহাতে তাহার নামােল্লেখ পূর্বক আমার সম্বন্ধে তদীয় অভিমতটুকু উদ্ধৃত করিয়া দিয়াছিলাম। যে কারণে তাহার নমিনেশন” * নিজের কথা যথেষ্ট বলা হইতেছে, তথাপি এই বিশেষণগুলি এলে এচালিত করিয়া অপরাধের মাত্রা বার বাড়াইতে চাই না।
তৃতীয় অধ্যায়। চাহিয়াছিলাম, সেই কারণেই তাঁহার কৃত প্রশংসাবাক্য ঐ চিঠিতে দেওয়া আবশ্যক মনে করিয়াছিলাম। যথা সময়ে উত্তর পাইলাম যে, আমার সম্বন্ধে তাহার মন্তব্যটা প্রকাশ পত্রে উল্লেখিত হইতে দিতে তিনি সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক। দুঃখের বিষয় সেই পত্রখানি হারাইয়া গিয়াছে। যাহা হউক ঐ পত্রে যে সকল কথা ছিল পরবর্তী পত্রখানিতেও প্রায় সেই সকল যুক্তি তর্কই রহিয়াছে। আমি সেই পত্রখানি পাইয়া একটু বিরক্তি ও অভিমান প্রদর্শন পূর্বক চিঠি লিখি। তাহাতে তিনি যে উত্তর দেন, তাহা পরবর্তী চিঠিতে দেখা যাইবে। ( ৯নং পত্র) ১৮ই আখিন আপনার ১১ই আশ্বিনের পত্রখানি পাঠ করিয়া দুঃখিত হইলাম। আমি পুৰ্ব্ব পত্রে যে সকল হেতু দৰ্শাইয়া আপনার আবেদন পত্র হইতে আমার মন্তব্যটা উঠাইয়া দিতে অনুরােধ করিয়াছি, তাহা সমস্তই যে আপনার ন্যায় ধীরবুদ্ধি বিচক্ষণ ব্যক্তির নিকটে একেবারে অসঙ্গত বলিয়া বােধ হইয়াছে, ইহা আমার পক্ষে বড়ই আক্ষেপের বিষয়। ইহাতে দেখিতেছি এ বিষয়ে আপনার ও আমার মতের এত মৌলিক পার্থক্য যে যুক্তি দ্বারা আমি আপনাকে আমার মতে আনিতে পারিব এ আশা করা বৃথা। কিন্তু আবার ইচ্ছা করি না যে আপনার তুল্য একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি মনে করিবেন আমি লােককে অসঙ্গত 'এখনি হোয়াইয়া গিয়াছে তাহা পূর্বেই বলিয়াছি।
শর গুরুদাস প্রসঙ্গ। অনুরােধ করি বা যুক্তিযুক্ত কাৰ্যে বিরত, বা আপনার মনন্তুষ্টির জন্য একটা মন্তব্য লিখিয়া তাহা সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে সঙ্কুচিত । আমি যে মন্তব্যটা লিখিয়াছি তাহা আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস মতে ঠিক, এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে আমি তাহাই বলিব। আপনিও আপনার বন্ধুগণকে তাহা জানাইয়াছেন, তাহাতে বিশেষ ক্ষতি হয় নাই। কিন্তু আপনার সাধারণ আবেদন পত্রে সেই মন্তব্য প্রকাশ ও অযাচিত ভাবে তাহা নিৰ্বাচকগণের নিকট প্রচার, আপনার পক্ষে আমার প্রতি অযথা গৌরব আরােপ, এবং আমার পক্ষে তাহা নিবারণ না করা অমিত আত্মগৌরব প্রদর্শন। তাহা আমার পক্ষে অতি ক্লেশকর। আপনি লিখিয়াছেন, আমার মন্তব্যটি না প্রকাশ করিতে পারিলে আপনার ‘বিরত হওয়াই উচিত। তাহা কেন হইবে। ইহাতেই দেখিতেছি আপনি আমার মন্তব্যের উপর অসঙ্গত অধিক মূল্য নির্দেশ করিতেছেন। কিন্তু অপরে তাহা করিবে না বরং আপনি যেরূপ আড়ম্বরের সহিত তাহা প্রকাশ করিতে চাহেন তাহাতে তাহা অনেকের নিকট হেয় হইবে। আমার পূর্ব পত্রে প্রকাশিত হেতুর বিরুদ্ধে আপনি লিখিয়াছেন, “নিজের যােগ্যতা সম্বন্ধে সাধারণের মতই তাে াপনীয় ও আদৰণীয়। নিজের মত অপেক্ষা সাধারণের মত অবশ্যই অধিকতর গ্রাহ। কি একজনের মত তো সাধারণের মত নহে এবং মত অপেক্ষা মতের মূল বা হেতু, অর্থাৎ যে সকল কাৰ্য্য বা অবস্থা দৃষ্টে সেই মত উৎপন্ন হইয়াছে, তাহাই অধিকতর গ্রাহ। আমার মতের হেতু ছাড়া কেবল আমার মতটা অন্যের নিকট বিশেষ কাৰ্য্যের না হইতে পারে। কোন ভূতপূৰ্ব্ব ভাইসচ্যানসেলারের পক্ষে ব্যক্তিগত প্রতিযােগিতা খুলে কোনও পক্ষাবলম্বন উচিত নহে এই কথা আমি পূর্ব পত্রে তৃতীয় অধ্যায়। বলিয়াছি। আর এজন্য আমি আপনাকে নমিনেট করিতে অস্বীকার করিয়াছি এবং আরও কয়েকজনকে নমিনেট করিতে অস্বীকার করিয়াছি। তাহার পর আপামর সাধারণের নিকট আবেদন পত্রে আমার মন্তব্য প্রকাশিত হইলে আমি যে দোষ এড়াইতে চাহি সেই দোষ আরও অধিক মাত্রায় ঘটিবে, একথার প্রতি আপনি বিশেষ লক্ষ্য করেন নাই। তাহার কারণ এই যে ইহাতে দোষ আছে বলিয়া আপনি স্বীকার করেন না। কিন্তু ভাইসচ্যানসেলারদের পদের গৌরব রক্ষার্থে, ভাগ্যক্রমে যিনি ঐ পদ প্রাপ্ত হন তাহার পক্ষে পরে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা ও তজ্জনিত সম্ভাবনীয় বিরােধ স্কুলে একটু তফাতে থাকাই বােধ হয় কি ভাল নয় ? আপনি বলিয়াছেন, আমি একদিন পাঠ্য নির্বাচক সমিতির সভাপতি ছিলাম, তাই বলিয়া কি আমি পাঠ্য সম্বন্ধে মত দিব না, না দিই না? প্রকৃত অবস্থা জ্ঞাত থাকিলে আপনি এ কথা বলিতেন না। প্রকৃত পক্ষে যে সকল পুস্তক নির্বাচন জন্য ঐ সমিতির নিকট যাইবে জানি বা যাওয়া সম্ভবপর মনে করি, তৎসম্বন্ধে আমি মত প্রকাশ করি না ইহা অনেকেই জানেন। তবে যদি কেহ পুস্তক ঐ সমিতিকে পাঠাইবেন না এই কথা বলিয়া আমার মত লয়েন এবং পরে আপন অভিপ্রায় পরিবর্তন করেন তজ্জন্য আমি দায়ী হইতে পারিনা। আমার মন্তব্যটা আপনি যে ভাবে প্রকাশ করিতে চাহেন তাহাতে আপনার বিশেষ উপকার হইবেনা এবং আমার কিঞ্চিৎ, অপকার হইবে, এই বিশ্বাসে আমি আপনার পত্রের মুসাবিদা হইতে তাহা উঠাইয়া দিতে অনুরােধ করিয়াছি এবং এখনও করিতেছি। আমার অপকার এই যে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্থলে আমি যে রূপ নিলিপ্ত থাকিতে ইচ্ছা করি তাহার ব্যাঘাত ঘটিবে, যাহাদিগকে নমিনেট করিতে অস্বীকার করিয়াছি, তাহাদের মধ্যে অনেককে কৈফিয়ৎ দিতে হইবে এবং কাহারও কাহারও নিকট একটু অসঙ্গত কাৰ্য করা দোষে
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
দোষী বলিয়া পরিগণিত হইতে হইবে। আপনার হিতাহিত বিবেচনার
কর্তা আপনি। কিন্তু যথাজ্ঞান আমার হিতাহিত বিবেচনার ভার
আমার উপর। এই ভাবিয়া আমার অনুরােধটি রক্ষা করিবেন। আর
অধিক কি লিখিব। আপনি মুসাবিদার নকল রাখিয়াছেন এই মনে
করিয়া আপনার পূর্বপত্র সহ প্রেরিত মুসাবিদা খানি ফেলিয়া দিয়াছি,
এবং খুঁজিয়া তাহা পাইলাম না। অতএব দুঃখিত হইতেছি তাহা
ফেরৎ পাঠাইতে পারিলামনা। বলা বাহুল্য এত কথার পর আপনি
“ফেললা” নির্বাচনে সফল প্রযত্ন হইলে সুখী হইব।
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
এত কথার পরে আর তদীয় মন্তব্য আবেদন পত্রে রাখা
কোনও ক্রমেই সঙ্গত হইত না; তথাপি তাহার সঙ্গে
সাক্ষাৎ করিয়া তাহার নামটি গােপন করিয়া মন্তব্যটা রাখা
যায় কিনা, এই চেষ্টা করিবার বাসনা হইল। তাই লিখিলাম
যে, অভিমানপূর্বক যাই বলিয়া থাকি না কেন যখন বন্ধু
বান্ধবদিগকে জানাইয়াছি যে নির্বাচনে দাড়াইব, তখন তাহা
ধ্রুব পরাজয়ের সম্ভাবনা সত্বেও করিব। কিন্তু তৎপূর্বে
পূজার বন্ধে তাহার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করিতে হইবে।
কখন পর্যন্ত গেলে তাঁহাকে বাড়ী পাওয়া যাইবে, জিলা
করি। তদুত্তরে এই পত্র লিখেন।
তৃতীয় অধ্যায়।
(১০ নং পত্র)
১৯শে আশ্বিন
১৩২২
আপনার গত কল্যকার পত্র অন্য বৈকালে পাইয়াছি। আপনার
পূৰ্ব্বকার দুইখানি পত্রের উত্তরে যে পত্ৰয় লিখিয়াছি তাহাতে
আশীর্বাদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ যথেষ্ট ছিল, এবং তজ্জন্য কিঞ্চিৎ
অসুখী হইতে হইয়াছে। আপনার এই শেষ পত্রের উত্তরে নিরবচ্ছিন্ন
আশীৰ্বাদ লিপিবদ্ধ করিতে পারিলাম, ইহা বড়ই সুখের বিষয়।
আপনি ঈপ্সিত বিষয় হইতে বিরত হয়েন নাই, ইহা যথাযােগ
হইয়াছে। বিরত হইলে আমার উপর অভিমান করিয়া ঐরূপ
করিয়াছেন এই মনে করিয়া আমি অবশ্যই ক্ষুন্ন হইতাম। শারদীয়
পূজার বন্ধে আপনি কলিকাতায় আসিলে আপনার সহিত সাক্ষাৎকার
লাভে সুখী হইব। আমি পূজার পর শুরু চতুর্দশী পৰ্যন্ত বাড়ীতেই
থাকিব। তাহার পর অল্পদিনের জন্য মধুপুর যাইতে ইচ্ছা আছে,
কিন্তু যাওয়ার ঠিক নাই। এবং গেলেও এক সপ্তাহ পরেই ফিরিয়া
আসিব। এখানকার সমাচার আপাতত সমস্ত মঙ্গল। ইতি
শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
।
কলিকাতায় গিয়া সাক্ষাৎ করিয়া ঠিক করিলাম যে
তঁাহার নাম না লইয়া “কলিকাতার কোনও দেশমা,
বরেণ্য ব্যক্তি” এইরূপ লিখিলে তাহার কোনও আপত্তির
* স্বাভাবিক বিনয় সহকারে ঐ বিশেষণ দ্বয়েরও তিনি প্রতিবাদ
করিয়াছিলেন কিন্তু তাহা রাখিয়া দিয়াছিলাম; নচেৎ মন্তব্য
মূল্যহীন হইত।
৬৪
স্তর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
কারণ থাকিবে না। প্রতিযােগিতায় সর্বনিম্নে স্থানলাভ
করিয়া পূজনীয় স্যর গুরুদাসকে অবস্থা জানাইয়াছিলাম।
অপিচ, তৎসমকালে আর একটী বিষয়ে তাহার অভিমত
জানিতে চাই। পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষকসমূহের নিয়ােগ
হইঙ্গেই সংবাদ পত্রগুলিতে নাম প্রকাশিত হইত। সেইবার
(১৯১৩ অব্দে) তাহা হয় নাই। এজন্য কে পরীক্ষক হইগেন,
কে হন নাই, সহযােগী বা প্রধান পরীক্ষকই বা কে হইলেন,
ইত্যাদি জানিতে পারা যায় নাই। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে
আবেদন করিব সংকল্প করিয়া তাহাকে ফেলাে নির্বাচনের
ফল জানাইবার সঙ্গে সঙ্গে ঐ বিষয়ও লিখি তদুত্তরে
পরবর্তী পত্রখানি পাইলাম।
(১১নং পত্র)
১লা ফান,
আপনার গতকল্যকার পত্র পাইয়াছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য
নির্বাচনের ফল সম্বন্ধে নূতন কথা কিছুই বলিবার নাই। পরীক্ষকগণের
নাম প্রথমে প্রকাশ করা যাইত। পরে কিছুদিন তাহা বন্ধ থাকে।
তাহার পর বােধ হয় ১৯০৫ সাল হইতে আমার প্রস্তাবে পুনরায় নাম
প্রকাশ হইয়া আসিতেছিল। এ বৎসর কি কারণে সে প্রথা রহিত
হইল জানি না। আমার বিবেচনায় নাম প্রকাশ হওয়াই কর্তব্য।
কারণ তাহা হইলে সকল পরীক্ষার্থীই নাম জানিতে পারে এবং তাহাতে
কোন বিশেষ অনিষ্ট হয় না। কিন্তু নাম অপ্রকাশ রাখিলে তাহা
সম্পূর্ণ অপ্রকাশ থাকে না, কতকগুলি পরীক্ষার্থী জানিতে পারে তবে
তৃতীয় অধ্যায়।
সকলে পারে না, এবং সেই বৈষম্য গর্হিত। এ সম্বন্ধে কোনরূপ
আন্দোলন করিবার পূর্বে একবার ভাইসচ্যান্সেলর মহাশয়কে লিখা
উচিত। ইতি-
ঐগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাঁহার আদেশমতে স্তর শ্রীযুক্ত দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
মহাশয়কে চিঠি দিয়াছিলাম এবং স্যর গুরুদাসের চিঠিখানিও
তদীয় অবলােকনাথ প্রেরণ করিয়াছিলাম। তিনি
লিখিয়াছিলেন—
"The University has nothing to do with the
publication of Examiners' list in the newspapers.
It all depends upon newspaper enterprise. Any
newspaper that applies for the list gets it and
publishes it.”
তাঁহার এই মন্তব্য “বঙ্গবাসী,” “সঞ্জীবনী” প্রভৃতি
বহু পত্রিকায় পাঠান হইয়াছিল—কেবল “বঙ্গবাসী”
সেইবার (১৯১৩ সনে) পরীক্ষকের লিষ্ট ছাপাইয়াছিলেন।
পরবৎসরও “বঙ্গবাসী” এই অর্ডারের নকল নিয়াছিলেন।
কিন্তু আর পরীক্ষক তালিকা তদবধি কোনও কাগজে দেখা
গেল না। এই ব্যাপারের এখানেই যবনিকা পতন হইল।
অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলাে নির্বাচন সম্বন্ধে কয়েকটী
প্রস্তাব করিয়া একখানি আবেদন পত্র প্রস্তুত করি, এবং
তদ্বিষয়ে পূজ্যপাদ স্যর গুরুদাসের অভিপ্রায় জানিবার নিমিত্ত
আবেদনের কাগজপত্র তাহার নিকটে প্রেরণ করি। ইহাতে
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
মােটামুটি এই কয়টি কথা ছিল নির্বাচন প্রথার সৃষ্টি
অবধি উকীল শ্রেণীই প্রায়শঃ নিৰ্বাচিত হইয়া আসিতেছেন,
তারপর ডাক্তারগণ ; কিন্তু অধ্যাপকগণ অতি কদাচিৎ কেহ
নির্বাচিত হইতে পারিয়াছেন। অপিচ মােফসলের কেহ
কোনওদিন (কেবল বােধহয় বাকীপুরের উকীল গুরুপ্রসাদ
সেন ব্যতীত) নিৰ্বাচিত হন নাই। অতএব এইরূপ নিয়ম
হওয়া উচিত যে দুইজন নিৰ্বাচিত ব্যক্তির অন্ততঃ একজন
যেন অধ্যাপক হন; এবং মধ্যে মধ্যে মােফঃসন্সের জন্য একটি
ফেলােশিপ রিজার্ভ করা আবশ্যক। এছাড়া আরও দু একটা
কথা ছিল সেগুলি তেমন উল্লেখযােগ্য নহে।
স্যর গুরুদাস তদুত্তরে লিখিলেন –
(১২নং পত্র)
১৩২২
আপনার গত ৬ই চৈত্রের পত্র কল্য পাইয়াছি। আপনি যে বিষয়ে
আবেদন করিবার মানস করিয়াছেন, তৎসম্বন্ধে আমি কোনও পরামর্শ
দিতে ইচ্ছা করি না। অতএব আপনার প্রেরিত কাগজগুলি এই
পত্রসহ ফেরৎ পাঠাইলাম, তজ্জন্য কিছু মনে করিবেন না। আপনার
কুশল সমাচার জ্ঞাত হইয়া সুখী হইলাম। ইতি
শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই বিষয়ে তদীয় অভিপ্রায় স্পষ্ট বােঝা গেল না, কেননা
ইহাতে তিনি যুক্তি তর্কের কোনও অবতারণা করেন নাই।
এসম্বন্ধে তাহার সঙ্গে বিচার বিতর্ক করাও সঙ্গত মনে
করিলাম না। তবে ফলাফল কি হইবে তাহা স্পষ্টই
৬৭ তৃতীয় অধ্যায়। বুঝিলাম। কিন্তু “কৰ্ম্মণ্যবাধিকারন্তে মা ফলেষু কদাচন- শ্রীভগবাক্য স্মরণ করিয়া যথা সময়ে আবেদন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরিত হইল। এবিষয়ের বিচারের জন্য একটা ক্ষুদ্র কমিটিও নাকি হইয়াছিল। তারপর যেমন হইবার তাই হইয়াছে- অর্থাৎ মূল বিষয়ের কিছুই হয় নাই। কিন্তু তখনও অপর একটী বিষয়ে কিঞ্চিৎ লেখাপড়া করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক নিয়ােগ বিষয়ে অনেক খামখেয়ালী হইয়া থাকে। দুই একজন সিণ্ডিকেটের মেম্বরও স্বয়ং নানা বিষয়ে প্রশ্নকর্তৃত্বের ও পরীক্ষকতার ভার গ্রহণ করিয়া বেশ দু পয়সা উপার্জন করিয়া থাকেন—এদিকে অনেক যোগ্য ব্যক্তি হয়তো তদ্বিরের অভাবে পরীক্ষক হইতে পারেন না। আমার প্রস্তাব মােটামুটি এই ছিল - (১) সিণ্ডিকেটের মেম্বর বা বাের্ড অব ষ্টাডিজের মেম্বর কাহারও পারতপক্ষে পরীক্ষক ( এবং প্রশ্নকর্তা) নিযুক্ত হওয়া উচিত নহে। তবে বিষয় বিশেষে পরীক্ষক দুলভ হইলে, এবং উচ্চতর পরীক্ষাগুলিতে (যথা এম্ এ, পি-এইচ ডি, ইত্যাদিতে) হইতে পারেন। (২) টেবুলেটারগণ হেড় এগজামিনার হইতে পারিবেন , এবং এক হেড় এগজামিনার একাধিক প্রশ্নপত্রের চার্জে থাকিতে পারিবেন না। (৩) কলেজের অধ্যাপক যাহারা আছেন ও ছিলেন তাঁহারা ভিন্ন ( বিশেষ বিষয় ব্যতীত) অপর কেহ পরীক্ষক হইতে পারিবেন না।
৩৮
স্বর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
(৪) একজন একাধিক বিষয়ে পরীক্ষক হইতে পারিবেন
; তবে উচ্চতর পরীক্ষাগুলিতে পরীক্ষকের দুলভ ঘটিলে
বিষয় বিশেষে পারিবেন।
পূজনীয় স্যর গুরুদাসকে আমার প্রস্তাবের খসড়াখানি
তদীয় অবলােকনর্থ প্রেরণ করিলে তিনি যে উত্তর
দিয়াছিলেন পরবর্তী পত্রে তাহা দৃষ্ট হইবে।
( ১৩নং পত্র)
১৭ই জ্যৈষ্ঠ
১৩২৩
আপনার গত ১৪ই জ্যৈষ্ঠের পূত্র ও তৎসহ প্রেরিত একখানি
মন্তব্যের খসড়া অদ্য পাইয়াছি। পরীক্ষক নিযুক্তকরণ বিষয়ে আপনার
মন্তব্য লিখনের প্রস্তাব আমি অনুমােদন করি নাই এবং এরূপ আভাসও
দিয়াছিলাম যে, আমি আপনার উক্ত বিষয়ের মন্তব্য দেখিব না।
আপনি বৃথা কষ্ট করিয়া ঐ মন্তব্য আমাকে দেখাইবার জন্য
পাঠাইয়াছেন।
এই সম্বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশনের ২৫ অধ্যায়ের ১৪ ধারা
দ্রষ্টব্য, কেবল এই মাত্রই এস্থলে বলিলাম ।
মন্তব্য দেখিলাম না বলিয়া কিছু মনে করিবেন না। ইহা আদৌ
আমি অনুমােন করি না। মন্তব্যখানি এই পত্রসহ ফেরৎ পাঠাইলাম।
শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
* এবিষয়ে ই পূর্বে তাহার বাড়ীতে গিয়া প্রসঙ্গক্রমে মৌখিক আলোচনা
করিয়াছিলাম। তখন যদিও তিনি উৎসাহ দেন নাই, তথাপি তাহাকে পুঝে না
দেখাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয় সমীপে আবেদন পাঠাইব না একথা ভঁহাকে
বলিয়া হাসিয়াছিলাম।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
রেগুলেশনের ২৫ অধ্যায়ের ১৪ ধারাটি এই যে সিণ্ডি-
কেটের অথবা বাের্ড অক্ ষ্টাডিজ, এর কোনও মেম্বরের
পরীক্ষকতা গ্রহণ নিষিদ্ধ হইবে না। ঐ রেগুলেশনের পূর্বে
ইহারা পরীক্ষক হইতে পারিতেন না—এখন হইতে তাহা
হইতে পারিবেন। এই নিষেধ রদ কেন হইল, বুঝিতে
হইলে রেগুলেশনের বিধাতা কাহারা ছিলেন, ইত্যাদি নানা
বিষয়ের আলােচনা করিতে হয়। তাহা এস্থলে অনাবশ্যক।
ফলকথা, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা স্বতন্ত্র। দুঃখের বিষয়
স্যর গুরুদাস হইতেও প্রত্যাশিত উৎসাহ লাভ করিতে পারি-
নাই। ফলাফল তাে জানা কথা বলা বাহুল্য।
অতঃপর আর একটা বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে হইয়াছিল,
যাহাতে স্যর গুরুদাস তাঁহার অজানামতে আলােচনার
বিষয়ীভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন। বাকীপুর সাহিত্য সম্মিলনে
মাননীয় বিচারপতি স্যর আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহােদয়
সভাপতি ছিলেন। সভাপতি বরণের সময়ে অনেক অতি-
শয়ােক্তি শুনা গেল তন্মধ্যে একটী এই যে স্যর আশুতোেষ
বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙ্গালা ভাষার প্রবর্তন করিয়াছেন। আবার
সম্মিলনের সাহিত্য শাখার অধিবেশনে শ্ৰীযুক্ত অজরচন্দ্র
সরকার মহাশয় “বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গভাষা” নামক একটা
প্রবন্ধ পাঠ করেন, তাহাতেও স্যর আশুতােষেরই জয়
ঘােষণা হইয়াছিল। আমি “নব্যভারতে” (মাঘ, ১৩২৩)
“বাকীপুর সাহিত্য সম্মিলন” প্রবন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গ
ভাষার প্রবর্তন সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া প্রদর্শন করি যে
৭০
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
পূৰ্বে বাঙ্গালা ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল ভাবেই ছিল—মধ্যে
প্রায় লােপের মত হইয়াছিল ; তবে সমষ্টিভাবে সাহিত্য
পরিষদ এবং ব্যক্তিগতভাবে স্যর গুরুদাস চেষ্টা করিয়া ইহার
পুনঃ প্রবর্তন করাইয়াছেন।*
আমার হস্তলিপির অস্পষ্টতায় (কতকটা মুদ্রাকর প্রমাদ
বশতঃ ও) “নব্যভারতের প্রবন্ধে কয়েকটা মারাত্মক ভুল
হইয়াছিল। স্যর গুরুদাস তাহা দেখিলে হয় তাে বিরক্ত
হইবেন, এই আশঙ্কায় তাহাকে উক্ত ভুলগুলি জানাইয়া
দেই এবং অনুরােধ করি যে “নব্যভারতের প্রবন্ধটী যেন
অবশ্যই তিনি পড়েন, এবং যেন প্রদর্শিত ভুলগুলি সংশােধন
পূৰ্ব্বক তাহা পাঠ করেন। তদুত্তরে নিম্নোক্ত পত্র খানি
পাইলাম।
(১৪ নং পত্র)
৬ই ফান
১৩২৩
আপনার গত কল্যকার পত্র পাইয়াছি। আমি “নব্যভারত” পত্রিকার
গ্রাহক বটে, কিন্তু নিয়মিত পাঠক নহি। যদি গত মাঘের সংখ্যা খুঁজিয়া
পাই তবে অবশ্যই পাঠ করিব। অন্ততঃ যে অংশে আপনার প্রবন্ধ
আছে তাহা পাঠ করিব। “নব্যভারত” সম্পাদক আপনার লেখা
পড়িতে না পারিয়া অনেক স্থানে যে ছাপিতে ভুল করিয়াছেন, তাহা
* “বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গ ভাষার প্রবর্তক কে ?” ইতি শীর্ষক যে
প্রবন্ধ এই গ্রন্থে (চতুর্থ অধ্যায়ে) যােজিত হইয়াছে তাহাতে এ বিষয়ের
ঐ আলােচনা রহিয়াছে।
তৃতীয় অধ্যায়।
৭১
আশ্চর্যের বিষয় নহে। আপনি আমাকে শ্রদ্ধা করেন এবং মধ্যে মধ্যে
পত্র লিখেন, তাহাতে আপনার লেখা আমার এক প্রকার সুপরিচিত
তথাপি আপনার পত্রপাঠ করা সহজ ব্যাপার বলিয়া মনে হয়না।
অনেকবার এই কথা আপনাকে বলিবার ইচ্ছা হইয়াছিল, এবার সুযােগ
পাইয়া সেই ইচ্ছা পূর্ণ করিলাম।
শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রবন্ধটিতে তঁাহার সম্বন্ধে যে সকল কথা লেখা হইয়াছিল,
তাহা ঠিক লেখা হইয়াছে কিনা, ইহা জানা আমার আবশ্যক
ছিল।
কেন না ঐ প্রবন্ধের প্রতিবাদ হইবে, তাহা প্রত্যা-
শিত ছিল। তাই, প্রায় তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করিয়াও যখন
তঁাহার কোনও পত্র পাইলাম না, তখন “নব্যভারত” তিনি
খুঁজিয়া পান নাই, ইহাই ধারণা হইল। তাই আমার
“নব্যভারতখানি সংশােধন করিয়া পাঠার্থে তাহার নিকটে
পাঠাইয়া দেই। তদুত্তরে তাঁহার নিকট হইতে পরবর্তী
চিঠিখানি পাওয়া গেল।
(১৫ নং পত্র)
২৯শে ফান
১৩২৩।
আপনার পত্র ও প্রেরিত “নব্যভারত” পত্রিকার মাঘমাসের সংখ্যা
পাইয়াছি। পত্রিকাখানি আপনি যত্ন করিয়া পাঠাইয়াছেন, তজ্জন্য
আপনার নিকট বিশেষ বাধিত বােধ করিতেছি। আপনার রচিত
প্রবন্ধটা পাঠ করিয়াছি। তাহার ভাষার পারিপাট্যে ও রচনা নৈপুণ্যে
আপনার সিদ্ধ হন্তের লেখা যেমন হয় সেইরূপই হইয়াছে। কিন্তু
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ। প্রবন্ধের বিষয় সম্বন্ধে আমার কিছু বলা উচিত নহে, কারণ তাহা আমাকে লইয়াই। তবে এই পর্যন্ত বলিতে পারি, এ প্রবন্ধটী না লিখিলেই আমার পক্ষে ভাল হইত। আর অন্ততঃ ইহার বিষয় বাহুল্য ও ভাষার তীব্রতা না থাকাই উচিত ছিল। আপনি যাহা লিখিয়াছেন, সত্যের অনুরােধেই লিখিয়াছেন, তাহা আমি জানি। আমি ইহাও জানি যে আমি আপনাকে লিখিতে অনুরােধ করি নাই, এবং আমি আরও জানি আপনি কাহারও অনুরােধে কোনও কথা লিখিবার লােক নহেন। কিন্তু যাহারা আপনাকে ও আমাকে না জানে তাহারা সহজেই মনে করিতে পারে আপনি আমার অনুরােধে এই প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, কারণ এরূপ লেখা অনেক স্থলেই ব্যক্তি বিশেষের অনুরােধে হইয়া থাকে, সত্যের অনুরােধে হয় না। যাহা হউক গতানুশােচনা বৃথা। পত্রিকা খানি অদ্য ডাকে ফেরৎ পাঠাইলাম। ইতি গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অতঃপর যে পত্রখানি প্রকাশিত হইতেছে ইহা আমার নিকটে তদীয় শেষ পত্র। একজন ব্রাহ্মণজায়া বারবনিতা কর্তৃক বিপথ গামিনী হইয়া তিনমাসের অধিককাল বেশ্যাবৃত্তি করিয়াছিল। পুলিশের সাহায্যে উদ্ধার লাভ করিলে ঐ নারীকে সমাজে উঠাইবার নিমিত্ত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণসভার সম্পাদক মহাশয় এবং কতিপয় উচ্চশিক্ষিতব্যক্তি আন্দোলন করেন, এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আমার নিকটে এ ব্যবস্থাটা ভাল বােধ হইলনা। প্রতিবাদের আয়ােজন করিয়া, যে সকল সম্রান্ত সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি জুজুকে বিচলিত না হইয়া ধৰ্ম্মবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত তৃতীয় অধ্যায়। ৭৩ হন, তাঁহাদের মধ্যে কয়েকজনের মত সংগ্রহ করি। পূজ্যপাদ স্যর গুরুদাসের অভিমত জিজ্ঞাসা করিলে তিনি যে উত্তর দেন তাহা পরবর্তী চিঠিতে দৃষ্ট হইবে। ( ১৬ নং পত্র) ২৪শে শ্রাবণ ১৩২৫। আপনার গত ২২শে শ্রাবণের পত্র অন্য পাইয়াছি। আপনি যে বিষয়ে আমার মত জানিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, সে বিষয়ে নানা কারণে মত প্রকাশ করিতে আমি ইচ্ছা করিনা। তবে ব্যক্তিগত ভাবে বিশেষ করিয়া কিছু না বলিয়া সাধারণ ভাবে এই কথা বলিতে পারি যে, যদি কোনও স্ত্রীলােক যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াও বলদ্বারা নিতান্ত পরাভূত ও আত্মরক্ষায় অশক্ত হইয়া পরপুরুষ কর্তৃক উপভুক্ত হয়, এবং তাহার স্বামী বা অন্য অভিভাবক তাহাকে গৃহে গ্ৰহণ করিতে ইচ্ছা করে, তাহাতে অন্যের বাধা দেওয়া উচিত নহে। কিন্তু সমাজে তাহাকে গ্রহণ করার পক্ষে একটা প্রবল বাধা এই যে সেই গ্রহণ করার ফল সমাজের পক্ষে অশুভকর হইবার সম্ভাবনা। ঐ রূপ স্থলে স্ত্রীলােকটা নির্দোষী এবং ঐ দুর্ঘটনা তাহার দুরদৃষ্ট ও তাহার জন্য সকলের হৃদয়ই ব্যথিত হইবে। কিন্তু তাহার ভাল করিতে গিয়া সমাজের মন্দ করা হইবে কিনা ইহা বিশেষ চিন্তার বিষয়। সংক্রামক রােগগ্রস্ত ব্যক্তিরও দোষ নাই, তাহার দুরদৃষ্টমাত্র, কিন্তু সমাজ তাহার সংশ্রব ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। ইতি শ্রীগুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। * প্রতিবাদ প্রবন্ধ “ব্রাহ্মণ সভার মুখপত্র “ব্রাহ্মণ সমাজে” প্রেরিত হইয়াছিল; এবং যদিও প্রেরণের পূর্বে সম্পাদকীয় অনুজ্ঞা লাভ করিয়াছিলাম, তথাপি প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় নাই—চাহিয়া ফেরতও পাওয়া যায় নাই।
৭৪
স্যর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
উপসংহার
মহাত্মা স্যর গুরুদাসের মৃত্যুর পূর্বেই শ্ৰীযুক্ত হারাণ
বাবুকে তদীয় জীবন চরিতের জন্য মাল মসল্লা সংগ্রহ
করিতে অনুরােধ করিয়াছিলাম । মৃত্যুর পরে যখন এ
বিষয়ে কি করা হইতেছে, জিজ্ঞাসা করিলাম, এবং আমার
কাছে যে সকল চিঠি আছে, সেগুলি ব্যবহারােপযােগী মনে
করিলে তাহা দিতে প্রস্তুত আছি, এ কথা জানাইলাম, তখন
হারাণ বাবু যে চিঠিখানি লিখিয়াছিলেন, তাহারও প্রতি-
লিপি এখানে দিলাম। কিন্তু যদিও উত্তরে চিঠিগুলি প্রয়ােজন
মতে নিবেন জানাইলেন, তথাপি সব গুলিরই যে ব্যবহার
হইবে, তাহার সম্ভাবনাই বা কি, অথচ সত্বর সদ্ব্যবহার না
হইলে এই সকল চিঠি ক্রমশঃ লুপ্ত হইয়া যাইতে পারে, তাই
ভবিষ্যতের উপর নির্ভর না করিয়া এ ভাবেই স্বর্গীয় মহাত্মার
চিঠিগুলির যতটা আছে প্রকাশ করা হইল।
শ্ৰীযুক্ত হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের পত্র।
হরিঃ শরণম্।
নারিকেলডাঙ্গা
২৫শে মাঘ ১৩২৫।
নমস্কার পূর্বক নিবেদন,
আপনার ২৩শে মাঘের পত্র পাইয়া সমস্ত অবগত হইলাম।
আপনার পূর্বকার পত্র ও পাইয়াছিলাম, উত্তর দেওয়া আবশ্যক মনে
করি নাই।
আমার তৃতীয় ভ্রাতা পিতৃদেবের বিস্তৃত জীবনধারা
৭৫ তৃতীয় অধ্যায়। লিখিতে আরম্ভ করিয়াছে। পিতৃদেব সম্বন্ধীয় Important Correspondence সমস্তই উহাতে প্রকাশিত হইবে। আপনার নিকট যে সকল চিঠি আছে, আবশ্যক বিবেচনা হইলে পাঠাইয়া দিতে লিখিব। আপনি তাহাক যে সকল চিঠি লিখিয়াছেন তাহা তিনি রাখেন নাই। আমার শরীর বড় ভাল নাই। মনে কিছুমাত্র উৎসাহ নাই। অত্ৰত্য এক প্রকার মঙ্গল। ইতি ভবদীয় শ্রীহারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। * সম্প্রতি ইহা ( ইংরেজীতে) প্রকাশিত হইয়াছে, নাম “Reminiscences Speeches and Writings of Sir Gooroo Dass Banerjee."
চতুর্থ অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষার প্রবর্তক কে ? বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হইতে ১৮৬৮ অব্দ পর্যন্ত বঙ্গ ভাষা বি এ পরীক্ষায়ও পাঠ্য ছিল—বি এতে পুরুষ পরীক্ষা, প্রবােধ চন্দ্রিকা, বত্রিশ সিংহাসন, কাশীদাসী মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণ ইত্যাদি গদ্য পদ্য সাহিত্য এবং ব্যাকরণও ছিল। তৎপর ১৮৬৯ হইতে ১৮৮৪ পর্যন্ত বাঙ্গালা পুরুষ-পরীক্ষার্থীর জন্যে এন্টন্সি পরীক্ষা ব্যতীত অন্যান্য পরীক্ষায় উঠিয়া গেল। এণ্টান্সে সংস্কৃতের সঙ্গে একটা ইংরেজী হইতে বাঙ্গালা অনুবাদের পরীক্ষা গৃহীত হইত। ১৮৮৫ হইতে পরীক্ষা প্রণালীর অনেক পরিবর্তন ঘটে কিন্তু বাঙ্গালা তেমনই থাকিয়া গেল। কেবল ১৮৮৬ অব্দ হইতে এন্টান্স পরীক্ষার অনুবাদের সঙ্গে বাঙ্গালা রচনা লেখার প্রথা প্রবর্তিত হইল। ১৮৯১ অব্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভােকেশনে তদানীন্তন ভাইস চ্যানসেলার পুণ্যশ্লোক স্যর শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলিয়া ছিলেন- “I also deem it not merely desirable but necessary that we should encourage the study of those Indian Vernaculars that have a literature, by making them compulsory subjects of our ==
চতুর্থ অধ্যায়।
৭৭
examinations in conjunction with their kindred
classical languages. The Bengali language has
now a rich literature that is well worth study.
* * * In laying stress upon the importance of
the study of our Vernaculars I am not led by
any mere patriotic sentiment excusable as such
sentiment may be, but I am influenced by more
substantial reasons. I firmly believe that we
cannot have any thorough and extensive culture
as a nation unless knowledge is disseminated
through our own Vernaculars."
বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গ ভাষার প্রবেশ অথবা পুনঃ প্রবেশ
ব্যাপারের শুভ স্বস্তিবাচন এই সদাচার পুত ব্রাহ্মণের দ্বারা
হইল।
পূজ্যপাদ স্যর গুরুদাস এখানেই ক্ষান্ত হইলেন না।
ইহার অল্প দিন পরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ সংস্থাপিত
হইল। পরিষদের (১৮৯৮ অব্দের ২৬শে আগষ্ট) তারিখের
অধিবেশনে শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও স্বর্গীয় রজনী কান্তগুপ্ত
মহােদয় দ্বয়ের পত্রানুসারে পরিষদে প্রস্তাব উপস্থাপিত হইল
যে, প্রবেশিকা পরীক্ষার্থিগণের গণিত, ভূগােল ও ইতিহাসের
পরীক্ষা তাহাদের মাতৃভাষায় গৃহীত হউক; এবং এফ, এ ও
বি এ পরীক্ষায় সংস্কৃতের সহিত বাঙ্গালা প্রভৃতি ভাষার পাঠ্য
পুস্তক নির্ধারিত হউক। এই প্রস্তাব উপলক্ষে তর্ক বিতর্ক
হইয়া “অবশেষে স্থির হইল যে, মাননীয় শ্ৰীযুক্ত গুরুদাস
বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ
৭
স্বর গুরুদাস প্রসঙ্গ।
ঠাকুর, শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত গুপ্ত ও শ্রীযুক্ত নলকৃষ্ণ বসু মহাশয়
দিগকে অনুরােধ করা যাউক যে, তাহারা এ বিষয়ের অনুকুল
ও প্রতিকূল পক্ষ প্রদর্শন পূর্বক একটী নির্দিষ্ট প্রস্তাব
পরিষদের নিকট উপস্থাপিত করুন। করিলে পরিষদ তৎ
সম্বন্ধে যাহা কৰ্তব্য বােধ করেন, তাহা করিবেন” ।
এই কমিটী একটী সকূলার পত্র শিক্ষানুরাগী প্রধান
প্রধান ব্যক্তি দেখিয়া প্রায় ২০০ জনের নিকটে প্রেরণ করেন
এবং তাহাদের উত্তর পাইয়া একটী রিপাের্ট পরিষদের
সভাপতির নিকটে দাখিল করেন। (যাহারা সেই রিপাের্ট ও
তৎসম্বন্ধীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি গণের অভিমত দেখিতে চান,
তাহারা সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা দ্বিতীয় ভাগ, দ্বিতীয় সংখ্যার
পরিশিষ্ট দেখিবেন।) উহা পরিষদে ১৩০২ সালের ৩০শে
ভাদ্র তারিখের অধিবেশনে উপস্থাপিত হইলে স্থির হইল যে,
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিণ্ডিকেট সমীপে পত্র লেখা হইবে; এবং
সেই পত্রের মােসাবিদা করিবার ভার স্যর গুরুদাস গ্রহণ
করিলেন। ১৮৯৫ অব্দের ২৫শে সেপ্টেম্বর তারিখে সেই
চিঠি * বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার নিকটে প্রেরিত হইল।
পরবর্তী বর্ষের মার্চ মাসে ফেকালটি অব আর্টস এর
অধিবেশনে স্বয়ং স্যর গুরুদাস ঐ আবেদন পত্র পেশ করেন,
এবং বহু আলােচনার পরে এতদ্বিষয়ে কর্তব্য নিদ্ধারণ কল্পে
একটা কমিটি গঠিত করা হয়, তাহাতেও স্যর গুরুদাস
সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, প্রথম ভাগ ২য় সংখ্যা ১২২ পৃষ্ঠ।
+ সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, দ্বিতীয় ভাগ তৃতীয় সংখ্যা ৩৯৯ পৃষ্ঠা
৭৯ চতুর্থ অধ্যায়। ছিলেন। উপরি উক্ত ফেকালটির ১২ই ডিসেম্বরের অধিবেশনে কমিটি রিপাের্ট দাখিল করেন—তাহাতেও স্যর গুরুদাসের নাম সর্বাদৌ দৃষ্ট হয়। আবার স্যর গুরুদাসেরই প্রস্তাবে এবং স্বর্গীয় নীলমণি মুখােপাধ্যায় মহােদয়ের সমর্থনে উহা পরিগৃহীত হয়। অবশেষে ১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে সিনেট সভাতে রায় শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী মহাশয়ের প্রস্তাবে এবং স্যর গুরুদাসের সমর্থনে এই নির্ধারিত হয় যে, এফ এ ও বি এ পরীক্ষায় বাঙ্গালা ভাষার রচনা পরীক্ষা গৃহীত হইবে, কিন্তু উত্তীর্ণ না হইলেও কাহারও এফ এ ও বি এ পাশের ব্যাঘাত হইবে না—উত্তীর্ণ হইলে সাটিফিকেটে তা উল্লেখিত হইবে। লর্ড কর্জনের আমলে যে ইণ্ডিয়ান ইউনিভারসিটি কমিশন গঠিত হইয়াছিল, তাহাতে পূজনীয় স্যর গুরুদাস সভ্য ছিলেন। এই কমিশন যে রিপাের্ট দেন, তাহাতে আছে - “The vernacular languages should be introduced (as at Bombay) in combination with English as a subject for M. A. Examination. The M. A. Examination in the vernacular should be of such a character as to ensure a thorough and scholastic study of the subject, The encouragement of such study by graduates who have coinpleted their general course should be of great advantage for the cultivation and development of vernacular languages. * * * We hope that যুর গুরুদাস প্রসঙ্গ। the inclusion of vernacular languages in the M. A. course will give an impetus to their scholarly study:*** We also think that vernacular composition should be made compulsory in every stage of the B. A, course although there need be no teaching of the subject." ইহাতে স্যর গুরুদাসের হাত স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। এই কমিশনের রিপাের্ট গভর্ণমেণ্ট, অব, ইণ্ডিয়ায় পেশ, হইবার পরে ইণ্ডিয়া ইউনিভারসিটি এক্ট পাশ হয় ; তার পরে ঐ রিপাের্ট এবং এক্ট অনুসারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের “নিউ রেগুলেশন” হয়।* “নব্যভারতে” (এবং “প্রবাসী” পত্রেও) এই প্রবন্ধাংশে স্য আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহােদয়ের কথা নানা স্থলে উল্লেখিত ছিল তাই এই প্রসঙ্গে অনাবশ্যক বলিয়া পরিত্যক্ত হইল। ছিল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.