Majhu Public Library, Howrah

Swarup-siddhi

Saraswati,jogananda · 2010/02/25

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

MAJU. HOWRAHU
(UBLIC LIBRARY
PAJU
Estd. 1902.

No text on this page.

পা ঘড়িবেন না
Vedanta Seriesth issue.
স্বরূপ-সিদ্ধি।
শ্রীপরমহংস পরিব্রাজকাচাৰ্য্য
শ্রীমৎ স্বামী আত্মানন্দ সরস্বতী শিষ্য
শ্রীমৎ স্বামী যােগানন্দ সরস্বতী
কর্তৃক বিরচিত।
শ্ৰীশচীন্দ্রমােহন ঘােষ বি, এ,
যারা প্রকাশিত।
১৩১৯ বঙ্গাব্দ।
( অস্ত সৰ্বোধিকারী রাজশাসনানুসারেণ স্বায়ত্তীকৃতা:)
SWARUP-SHIDHI.
BY
Swami Yogananda Saraswati
DISCIPLE OF
Sci Paramhansa Paribrajakacharya
SRIMAT SWAMI ATMANANDA SARASWATI
Published by
SACHINDRA MOHUN GHOSH, B. L.
A. D. 1913
( All rights reserved. )

No text on this page.

8 ANNAS PER COPY
To be had of :
BABU LALIT MOLUN GITOSH M. 1. B.
College Squart, Calcutla.
l'inted by
GOSTO BEHARI DE,
Devakinandan Press
19501 Cornwalli's Street, CALCUTIA.

No text on this page.

উর্ধতন গুৰ্বাদির সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ক্রমিক নাম জন্মস্থান বিবিধ। ১। আনন্দানন্দ মহিশুর রাজ্যে ২। পরমানন্দ হায়দরাবাদ রাজ্যে ইনি গুজরাট প্রদেশে অবস্থিতি করিতেন। । অদ্বৈতানন্দ মালবদেশে ইনি নর্মদাতীরে অবস্থান করিতেন। ২। শঙ্করানন্দ গুজরাটের অন্তর্গত দর্শন এবং উপ- কাটিবারজেলায় নিষদের“দীপিকা” আখ্য টীকা লিখিয়াছেন। ৫। বিদ্যানন্দ কুর্গরাজ্য ৬। হরানন্দ রাজপুতনায় ৭। চিদানন্দ উজ্জয়িনীতে ৮। আত্মানন্দ আগ্রায় ইনি গুজরাটা নাগর ব্রাহ্মণ। কাৰ্য- ব্যপদেশে ইহার পিতা আগ্রায় আসিয়া বাস করেন। ইনি পূর্ণ বেদবিদ এবং তীব্র বিরাগী ছিলেন। জীবন্ধের একতা প্রতিপাদক একখানি পুস্তক এবং “সর্বব-ধৰ্ম্ম সমন্বয় নামে একখানি এবং ক্ষুদ্র কয়েকখানি পুস্তক লিখিয়াছেন। বৎসর বয়সে প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন। চারি বৎসর হইল ৯৫বৎসর বয়সে কান- পুরে ইহার দেহান্ত হইয়াছে। ১। যােগানন্দ বঙ্গদেশ ( বর্ধমান জেলায় ) ক্ষুদ্র আরও

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

4
Swami Atmananda Saraswati
এমৎ স্বামী আত্মানন্দ সরস্বতী।

No text on this page.

No text on this page.

স্বামী যোগানন্দ সরস্বতী
৩৮ বৎসর বয়সে গৃহীত প্রতিকৃতি )
Swami Jogananda Sarasvati

No text on this page.

No text on this page.

Swami Jogananda Saraswati. শ্ৰীমান স্বামী যােগানন্দ সরস্বতী।

No text on this page.

Opinions of the press * * * In the days that witnessed our civilization in its fairest flower,it was the allotted and the inviolate duty of every Indlan man and woman to turn in the evening of life on the path to God-knowledge, to retire to the tranquility of forest retreats.............. .Though the life lived by the main mass of the people to-day is so essentially dissimilar to that lived in the past, the continuing turning away of her choice spirits to the pursuit of God indissolubly links the India of the twentieth century with the India of the centuries gone by. We have been led on to these reflections by the perusal of two books that have for sometime been lying before us. One of them is "Vaidic Rahasya-Sandarbha" by Swami Yogananda Saraswati, another of our country; . men with modern education, who has found the problem of existence infinitely more absorbing than existence itself, and worth dedicating his life to. Here we have a great scholar, a pundit perfectly at home with the whole range of Sanskrit literature, attempting a naturalistic explanation of current indian beliefs regarding Pitri- ( 2 ) yajna, Pitri-loka and Pitri-jan, Deva-loka and Deva-jan, Preto-loka, cremation, the Sradh ceremony, the offering of pindas, the recitation of Vedic mantras, and life after dcath. The treatise represents an honest effort to rob the popular notions with respect to these matters, which so fully dominate the average Indian's Outlook on life, of that enevelope of supernaturalism wiich has formed round them through ages of lessening knowledge of our sacred books and of increasing superstition. We have the very Heaven of Indian inythology located, for iristance, on the solid earth, north of India. Needless to say, every explanation offered is supplemented by direct quotation from origiual sources. The learned writer has certainly opened up a most suggestive line of enquiry for scholars to take up. We would press this book also equally. carnestly to the notice of the public. Eight annas per copy, to be had at 8, College Square, Calcutta DAILY "BENGALEE" 9th March 1910. VADIC RAHASYA SANDARVA by Swami Yogananda Saraswati :-The author is a profound scholar of Vedantic Philosophy with a liberal Western education. He has devoted years to the study of the Vedas and ancient Indian Philosophy and discarded the comforts of home i 3 i life for the stndy of the secrects of Indian shastras. This book is an honest attempt to divert the popular mind from the fetters of ordinary uotions which prevail as regards Pitriyagna, Petri-loka and Pitri-jan. Devaloka and Devajan and:also what was understood by the sradh ceremony, the offering of "Pindas" and the chanting of “Mantras,” in the Vedic time. Every statement in this book is supported by quotations from original Sanskrit texts. The author has spared no pains to make the book acceptable to the public in general and has thrown a flood of light to illuminate the dark corners of wrong notions prevailing from Pauranic time. It will amply repay perusal to those inquistive minds who take delight in the study of our revered shastras and to know the real interpretations of the same. The book can be had from Babu Lalit Mohan Ghose, M. A,, B. L., 8, College Square, aod has been very moderately priced, annas copy. DAILY "AMRITA BAZAR PATRIKA" Friday 25th November 1910 8 a VADIC RAHASYA-SANDARVA-This is one of the many publications of Swami Jogananda Saraswati and deals with the Hindu ceremonies after death as mentioned ( 4 ) a in the Vedic literature. The Vedic language is long dead, and the number of scholars learned in it are few, It is, therefore, a pleasure to find the author, who is Sanyasi, devoting his time and labour in offering naturalistic explanations of the Vedic "mantras." The purpose of the book under notice is to dispel, according to the author, certain erroneous popular beliefs :rgarsling “Pitri- Jajna" "Ditriloka,” “Devaloka," "Devajan,” “Pitri-jan," "Pretaloka," etc. The Swami has supported his argur ments by quoting authorities from original sources, but the trend of his arguments runs counter to the current of popular beliefs which are deep-rooted in the mind of the orthodox Hindu and have, according to him valid sanction in rituals and religious usages which have been handed down from generation generation. Philological researches have proved that words used in ancient Hindu scriptures have as in all other ancient languages, undergone considerable changes in their meanings, and the different commentators of the Vedas have interpreted the "Mantras" in various ways. Of Panini's Grammar and Jaska's Nirukta afford considerable help to get at the proper explanations of the "mantras" but, then, the "mantra period of the Vedic literature is so far removed from the time when Jaska undertook to to course .. interpret the obsolte words used in the Vedas that it is not always safe to depend upon that authority of comparatively modern times. Any how the author has made a commendable effort to show that the Hindu Shastras are, after all, not so illiberal or inelastic as the orthodox community try to make them out to be : they are capable of very liberal interpretation and the more the Hindus resort to it with the evolution of the times, the better for the race and the religion. The book can be had from Babu Lalit Mohan Ghosh, M. A., B. L., 8, College Square, Calcutta, Price 8 annas, a copy, INDIAN DAILY News, 6th February 1910 স্বামী যোগানন্দ সরস্বতার সংক্ষিপ্ত জীবন-চরিত। ইহার পূর্বাশ্রমের নাম রাধিকাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন ১২৬৪ সালে আষাঢ় • শুক্লচতুর্দশীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান নলহাটী, ভাগিরথীর উপতীরস্থ একটা গণ্ডগ্রাম, বর্ধমান জেলার অন্তর্গত দাইহাট (lainhat, P. 0.) গোঃ আঃ অধীন কাটোয়া মহকুমায় অবস্থিত। পিতার নাম মহাদেব বন্দ্যেপাধ্যায়, এবং মাতার নাম চন্দ্রমােহিনী দেবী। অতি শৈশব- বস্থায় প্রসাদের মাতৃবিয়ােগ হওয়ায়, প্রসাদ মাতামহের (মৃত রামযাদব চট্টোপাধ্যায়ের ) আলয়ে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন। প্রসাদ রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ। সন ১২৮২ সালে ১৮শ বর্ষ বয়সে, দাইহাট নিবাসী মৃত মথুরানাথ পদরত্নের একাদশবর্ষবয়স্কা মধ্যম। কন্যা নগেন্দ্রবাল। দেবীর সহিত প্রসাদের বিবাহ হয়। প্রসাদের পিতৃদেবের সাংসারিক অবস্থা তত স্বচ্ছল না থাকায়, কালেজের অধ্যয়ন পরিত্যাগ করিয়া ২২ বর্ষ বয়সে প্রসাদ চাকরি করিতে নিযুক্ত হন, এবং ক্রমান্বয়ে শিক্ষক, বিদ্যালয়পরিদর্শক, পত্র- সম্পাদক এবং আচার্য প্রভৃতির কাৰ্যব্যপদেশে প্রসাদ প্রায় ১৭ বৎসর চাকরি করেন। বলা বাহুল্য যে, ইতিমধ্যে কোন মহা- পুরুষের সহিত প্রসাদের অলৌকিকভাবে সাক্ষাৎলাভ হওয়ায় * বৈদিক জ্ঞানকৰ্ম্মাধিকার পুরুষেষু মধ্যে যােগিন: পরমহংসাত্যন্ত মুত্তমমহাপুরুষত্বম্।

তবে তাহার উপদেশ অনুসারে প্রসাদ এতাবৎকাল গৃহস্থব্রহ্মচৰ্যাদি কতকগুলি অনুষ্ঠান যথাযৎ প্রতিপালন করিয়াছিলেন। ১৩০০ সালে ১৯শ বর্য বয়ষে প্রসাদের পত্নীর দেহান্ত হয়। তখন প্রসাদের বয়স ৩৫শ বর্ষ। দ্বিতীয়বার বিবাহ দিবার জন্য প্রসাদের পিতৃদেব সবিশেষ চেষ্টা করিয়া ছিলেন, এবং প্রসাদ সবংশঙ্গ, কূলীন এবং গুণবান যুবক বলিয়া তৎকালে অনেকেই যথেষ্ট অর্থাদি দিয়াও স্ব স্ব কন্যা সম্প্রদানে আগ্রহাতিশয় প্রকাশ করিয়াছিলেন ; এমনকি একস্থানে পুনৰবার বিবাহের দিন পর্যন্তও স্থির হইয়াছিল; কিন্তু প্রসাদ এ বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকায়, বিবাহের দুইদিন পূর্বে, পিতৃদেবের অজ্ঞাতসারে বাড়ী হইতে স্থানান্তরে চলিয়া যান ; তাই অব্যাহতি ইয়াছিলেন। এখানে এ কথা বলা আবশ্যক যে, যে কন্যার সহিত প্রসাদের বিবাহ হইবার কথা হইয়াছিল, সেই কন্যার ইতিমধ্যে বিবাহ হইয়া যাওয়ায়, প্রসাদ লােকশিক্ষার্থে, অগত্যা তাহার অব্যহিত কনিষ্ঠা ভ িশ্ৰীমতী হেমনলিনীর সহিত তাহার স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ দেন। সন ১০০২ সালে প্রসাদের পিতৃদেবের দেহান্ত হয়। এই ব্যাপারের অব্যবহিত পরেই প্রসাদ চাকরি পরিত্যাগ করেন, এবং তাহার বালকপুত্রদিগের রক্ষণাবেক্ষণার্থে কতকদিন নলা- হাটীর নিজবাড়ীতেই তাবস্থান করেন। এই সময়ে, কখন বাড়ীতে থাকিতেন, কথন বা তীর্থাদি দর্শনমানসে দেশপৰ্যটনে বাহির হইতেন, সংক্ষেপতঃ, এই প্রকাবে কতদিন বানপ্রস্থাশ্রমের

–
কাৰ্যাদি করিতে থাকেন, এইমতে কতকদিন অতিবাহিত হইয়া
গেল। পরে সন ১৩০৪ সালে অনেক তানুসন্ধানের পর, অযােধ্য।
প্রদেশর অন্তর্গত হরদুই জেলার মধ্যে সাহাবাদ নামক স্থানে সেই
মহাপুরুষ স্বামী আত্মানন্দ সরস্বতীর সহিত সৌভাগ্যবশাৎ প্রসা-
দের পুন সাক্ষাৎলাভ হয় এবং প্রসাদ তথায় তাহার নিকট
প্রব্রজ্যা বা চতুর্থ আশ্রম গ্রহণ করেন। প্রসাদের এই বর্তমান
আশ্রমের নাম যােগানন্দ সরস্বতী। স্বামী যােগানন্দ, গুরুদেবের
আজ্ঞানুসারে তাহার সহিত কতকদিন একত্রে অবস্থান করেন।
এবং এই সময়ে তাহার নিকট হইতে প্রস্থানত্রয় অর্থাৎ সভাষ্য
দশােপনিষদ, সভাম্যশারীরকসূত্র এবং সভাষ্য গীতা অধ্যয়ন
করেন। সমাজের কল্যাণার্থে স্বামীজী এই নয়খানি পুস্তক
প্রকাশ করিয়াছেন যথা-
১। পুনর্জন্ম রহস্য।
১। ক্রিয়াযােগ বা উপাসন।
৩। বেদোৎপত্তি এবং দেবতাবিষয়ক বিচার ।
৪। বলিদান এবং মাংসভ্যাভক্ষ্য বিচার।
৫. সৃষ্টিতত্ত্ব বা জগৎ ও জগদীশ।
৬। তদর্শন।
৭। জীবতত্ত্ববিবেক।
৮। বৈদিক রহস্য সন্দর্ভ।
৯। স্বরূপসিদ্ধি ।

। শেষোক্ত বেদাবিচারবিষয়ক পুস্তক চারি নি বর্তমান আশ্রমে লিখিত । স্বৰ্গঙ্গা মন্দাকিনা এবং গলকনন্দা প্রবাহিত অভ্রভেদী হিম- গিরির তুষারমণ্ডিত অধিত্যক। প্রদেশে কেদার এবং বদরিকাশ্রম দর্শনান্তে, স্বামীজী তিবতাবি দেখিবেন মনে করিয়াছিলেন, ইচ্ছা সে, ভৌম স্বর্গ রূপ প্রাচীন আৰ্যনিবাস বা পিতৃভূমির কিয়দংশ ও সন্দর্শন করেন। কিন্তু কোন বিশেষ প্রতিবন্ধ বশতঃ তাহা ঘটিয়া উঠে নাই। বলা বাহুল্য যে, স্বামীজীর আশ্রম চতুষ্টয় যথামতই প্রতিপালিত হইয়াছে। অত্যাশ্রমী বা অতিবর্ণা- শ্ৰমীর লক্ষণ সকল হাতে সদা দীপ্যমান দেখা যায়। শাস্ত্র বলেন, * যাঁহার চিত্ত ব্ৰহ্মধ্যানে কিঞ্চিৎকালও স্থিরত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহার সমুদায় তীর্থস্নান সুসংসাধিত হয় ; সমুদায় যজ্ঞকৃত হয় ; তাহার কুল পবিত্র হয় ; পিতা মাতা কৃতার্থ হন, এমন কি পৃথিবী পবিত্রা হয়। বলা বাহুল্য যে, স্বামী যােগানন্দের সম্বন্ধে তাহা স্বার্থক হইয়াছে। তাহার সন্তানের মধ্যে চারিটী পুত্র। তন্মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের শৈশাবস্থাতেই দেহান্ত হয়, তাহার জেষ্ঠ্যেরও অল্প- দিন হইল অনুঢ়াবস্থাতেই দেহান্ত হইয়াছে । এক্ষণে সর্বজ্যেষ্ট, এবং তাহার কনিষ্ঠ বা মধ্যম উভয়েরই সন্তানাদি হইয়াছে ; পিতৃদেবের আদেশানুসারে জ্যেষ্ঠই স্ত্রীপুত্ৰাদি লইয়া নলহাটীৰ পৈতৃক বাড়ীতেই অবস্থান করিতেছেন। * কুলং পৰিত্ৰং জননী কতাৰ্থ বিশ্বম্ভরা পুণ্যবতী চ তেন। গত বকচারণ ক্ষমাপংৈ মন প্রশ্ন না ।

স্বামী যােগানন্দের বয়স এক্ষণে ৫৫ বৎসর। সম্প্রতি স্বামীজী স্বকীয়পূজ্যপাদ গুরুদেবের পূর্বদেশানুসারে সর্বদাই নির্জন- প্রদেশে একাকী বেদান্তবেদ্য ব্ৰহ্মবিচারে নিমগ্ন থাকেন। দিনান্তে একবারমাত্র, অল্পসময়ের জন্য, সমাগত দর্শনপিপাসু ব্যক্তিব্যুহের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহাদের জিজ্ঞাসিত বিষয়ের মীমাংসাদি করিয়া থাকেন। স্বামীজী সুদীর্ঘজীবন লাভ করিয়া সদা জগৎ- হিতে-পামর এবং বদ্ধকে মােক্ষমার্গে উন্মুখকরণে নিরত থাকুন এই আমাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা। ৮ নং কলেজস্কোয়ার কলিকাতা প্রকাশকস্য। ২•শে চৈত্র ১৩১৯।

ভুমিকা। সহজ ব্ৰহ্ম স্বভাবই প্রপঞ্চ, কিন্তু প্রপঞ্চ স্বভাব ব্ৰহ্ম নহে। কথায়, ব্ৰহ্ম সায় এই প্রপঞ্চ বা জগৎ উদ্ভাসিত। অতএব রহ্ম জগতের পূর্ব বা পরম রূপ এবং জগৎ পর বা অপরমরূপ । এবম্বিধ প্রকারে ব্রহ্ম বা সেই পরম রূপ জনসাধারণের আভূত, সুপ্রসিদ্ধ এবং সুবিয়ে হইলেও, লােকে তাঁহাকে জানিতে পারিতেছে না, ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে। তাত, তুমি যদি সেই অরূপের রূপ—পরমরূপ দেখিতে ইচ্ছা কর, অস্বরূপ উপলব্ধি করিতে যদি তােমার ঐকান্তিক বাসনা থাকে, তাহা হইলে অগ্রে তাপম রূপ-অনাদর্শন, নিজদৈহিকরূপ, বিস্মৃত হও, ভেদসত্যত্ববুদ্ধি নিবারণ কর, সহজ কথায়, মনােনিবােধ কর, তােমাতেই, সেই পরমরূপের অভিব্যক্তি দেখিবে, সর্বত্র একাত্মসত্বার উপলব্ধি করিবে, তুমি যে, কৌন্তেয় কর্ণের রাধেয় হইয়াছ, পুরুষসিংহ এড়করূপ ধরিয়াছ, তাহা বুঝিয়া নিরতিশয় সুখ সং প্রাপ্ত হইবে। ইহারই নাম প্রপঞ্চ প্রবিলয়ে বা নিরােধবলে স্বৰূপসিদ্ধি সাধন। মুমুক্ষু জনগণের কল্যাণার্থে বক্ষ্যমান এই স্বরূপসিদ্ধিগ্রন্থে বিষয় সংক্ষেপে আলােচিত হইয়াছে। ভরসা করি, ইহা অনেককে প্রবুদ্ধ করিয়া অভীষ্টফল সংপ্রদানে সমর্থ করিবে। কিমধিক লেখেন বুদ্ধিমদর্য্যে। ৮নং কলেজস্কোয়ার কলিকাতা ২০শে চৈত্র ১৩১৯ প্রকাশক শীশচীন্দ্রমােহন ঘােষ বি, এল।

সূচীপত্র।
০ ০ ০
উপাসনাকাণ্ড
সূচনা
সাধনস্বরূপ নির্ণয়।
মনােস্বরূপ নির্ণয়।
৯-৪৫
০
৪৬৯
মােকা
নিরােধস্বরূপ নির্ণয়।

স্বরূপসিদ্ধি।
পাতা মুড়িবেন না
উপাসনা কাণ্ড।
প্রথমাধ্যায়।
সূচনা।
(গুরুশিষ্যের কথোপকথন )
সর্ববেদান্ত সিদ্ধান্ত গোচরং তমগােচর।
আত্মানন্দং সদানন্দং সদ্গুরু প্রণতােহস্ম্যহম্।
গুরু।—তুমি কে? কোথায় ছিলে? কোথা হইতে
আসিয়াছ? কোথায় যাইবে? তুমি কার? কি হেতু এ
-এ মর্ত্যধামে জন্মগ্রহণ করিয়াছ? ইহা কাহাতে প্রতিষ্ঠিত
কেমনে এই বিভ্রাণ ভূগােল শূন্যে অবস্থান করিতেছে? তুমি
?

স্বরূপসিদ্ধি। কেমনে কাহার বলে জীবিত রহিয়াছ? প্রাণাদি কি তদ্ব্যতিরিক্ত কোন পদার্থ তােমার জীবনের কারণ? সে ব্যতিরিক্ত পদার্থটী কি? তুমি দেহবান্ হইবার পূর্বে তাহা কোথায় ছিল? এবং তােমাব দেহপাতেই বা তাহা কোথায় গমন করিবে? ভূপতিত মৃতদেহে কি সে পদার্থ থাকে না? প্রাণী সকল জন্মগ্রহণ করিলে লােকে কেনই বা হৃষ্ট হয়, এবং মৃত হইলে কেনই বা ক্লিষ্ট হইয়া থাকে ? জন্ম এবং মৃত্যু বা আবির্ভাধ এবং তিরােভাব, উভয় কালেই অশৌচ-ব্যবস্থা ব্যবস্থাপিত এবং উভয়েতেই ভাব আছে। একে, আবিশ অর্থাৎ প্রকাশভাব এবং অপরে তিরস অর্থাৎ অপ্রকাশভাব। ভাববিকার হেতু জন্ম এবং মৃত্যু উভয়েই তুল্য—এক। একই শক্তির দ্বিধাস্ফরণ মাত্র। দেহাদি উপাধিবশাৎ প্রতীতি হইয়া থাকে। সম্যদর্শনে এই জনন এবং মরণ জীবের পক্ষে অমৃতসােপান-ব্ৰহ্মসান্নিধ্য বা স্বরূপসিদ্ধির অধিরােহিণী বিশেষ। তুমি কি তাহা বুঝ? কিম্বা কখন বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছ? দেহ না দেখিতে পাইলেই লােকে বলে অমুক মরিয়াছে। বাস্তবিকই কি সে মরিয়াছে। এ সংসার হইতে তাহার অস্তিত্ব কি এককালে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে ? কখনই না! ত্যক্ত নির্নয়ন অহিকে কি মৃত বলিবে ? ইহা লৌকিক বা ব্যব- হারিক কথা মাত্র। পরমার্থত, জীবিতাবস্থায় স্বরূপসিদ্ধির সমধিগমে স্কুলাদি দেহের অত্যন্ততিক বিস্মৃতির নামই মৃত্যু। ইহারই নাম জীবনমৃতি। জীবনমুক্তই জীবনমৃত নামে অভিহিত। । বদ্ধ নহে। সে. তাহা বুঝে না। সে দেহ-নাশনকেই মৃত্যু ?

সূচনা। বলিয়া জানে। রােরুদ্যমান মৃতপুত্ৰক পিতাই ইহার দীপ্যমান প্রমাণ। তাহার সমীপে জনন মরণ এক, একথা বলিলে সে তােমায় কি বলিবে ? পরম সুহৃদ হইলেও, পিতা তােমাকে দারুণ শত্রু ভাবিয়া জন্মেও আর তােমার মুখাবলােকন করিতে চাহিবে না। ব্যবহারিক এবং পারমার্থিকের পার্থক্য উপলব্ধি কর। বদ্ধ এবং মুক্তের ব্যবহার দেখ। প্রকৃতপক্ষে, জীব জন্মেও না, মরেও না। কেবল উপাধিবশাৎ প্রতীতি হয় মাত্র, জীবত্যক্ত দেহই যথাকালে মৃত হয়। কারণ, যাহা জন্মে তাহাই মরে। মই মৃত হয়, অমৃত নহে। চৈতন্য অমৃত বা নিত্যপদার্থ, দেহেন্দ্রিয়াদিযুক্ত হইলেই তাহার জীবসংজ্ঞা হয় মাত্র। অতএব তাত, জনন মরণ জনিত হর্ষে কিম্বা শােকে অনর্থক বিহবল হইয়া মর কেন? শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া তাহার নিদেশানুসারে মনােনিবােধ প্রণালী শিক্ষা করিয়া স্ব স্বরূপােপ- লব্ধি কর। আত্মবি হও। অনায়াসে এই জীবিতাবস্থাতেই, শােক সাগরের পর পারে যাইতে পারিবে, যেহেতু ব্ৰহ্মবিই সাক্ষাৎকৃতধৰ্ম্মা এবং পরমানন্দময়। তাহার আনন্দই অপরিচ্ছিন্ন, তাহার জ্ঞানই অখণ্ডিত—পরিপূর্ণ, সুতরাং তাহার চরণ সেবাই, দুঃখাসন্তিন্ন বা নিত্য সুখলাভের একমাত্র হেতু। ইহা ধ্রুব সভ্য। কত শত পিতা, মাতা, কত পত্নী, পুত্র আগত ও অতীত হইতেছে, তাহারা কাহার ? এবং তুমিই বা কাহার? এ সংসারে উপকার প্রত্যুপকার ভিন্ন কাহারও সহিত কোন পদার্থের পলিছি। বিশেষ একটা সম্বন্ধ কি? কাহার এ সকল আলােচনা করিবার সাধ্য নাই, কাহারও বা সাধ্য সত্বে অবকাশ নাই। এই মতই শুনা যায়। একাধারে উভয়ের সমাবেশ বর্তমানে এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যসমাজে মেলা ভার—অতি বিরল। তাই লােকের এত শােক, দুঃখ, এত লাঞ্ছনা-ফল পুনঃ পুনঃ জনন এবং মরণ। এই জনন আছে বলিয়া যেমন তুমি মরণ দেখিছে, তেমনি মরণ দেখিয়া অমরণও আছে বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। এই অমরণের অপর নাম অমৃত বা অপবর্গ। ইহাই জীবলীলার চরমপ বা অবধি। ব্রহ্মের একটী নাম অমৃত। মনােসমুদ্র মন্থন করিলে এই অমৃত উথিত হয়। দেবগণ এই অমৃত পান করিয়া অমর হইয়াছেন। দেবগণ ব্ৰহ্মবিদ, যেহেতু বিদ্বাংসােহিদেব, অতএব ব্ৰহ্মবিদ অমর। মরে না বলিয়া অমর নহে। যে জন্মে সেই মরে, কারণ মৰ্ত্ত কখনও অমৃত হয় না। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। কদাপি এ নিয়মের ব্যত্যয় সবে না। তাই ব্ৰহ্মাও মরণ- শীল। তুমি পরিচ্ছিন্ন (সাড়ে তিন হন্ত) নহ-অপরিচ্ছিন্ন। তুমি এড়ক নহ–সিংহ। তুমি শরীরী নহশরীরী। ইহা যদি জানিতে চাও, যদি অমর হইবার ইচ্ছা থাকে, জীবলীলার চরম পর্বে—সর্বোচ্চ সােপানে অধিরােহণ করিতে বাঞ্ছা কর, তাহা হইলে শ্রোত্রিয় ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গুরুর নির্দেশানুসারে মনােসমুদ্র মথন পূর্বক তলোথিত অমৃত পান কর—সহজ কথায়, মনােনিমােধ- প্রণালী শিক্ষা করিয়া স্বরূপােপলব্ধি কর। ব্রহ্মবিদ বরিষ্ঠ না। হও। জন্ম মৃত্যুর হস্ত হইতে এককালে অব্যাহতি পাইবে। মরিলে আর জন্মগ্রহণ করিতে হইবে না, অমর হইয়া যাইবে। আর জীবিতাবস্থায় ইহ সংসারে পরম শান্তিলাভ করিবে এবং দেহান্তকালে প্রাকৃত বা বদ্ধ ব্যক্তির ন্যায় মৃত্যু ভয়ে—স্থূলদেহ ত্যাগে ভীত হইতে হইবে না। বলা বাহুল্য যে, এ সংসারে যত কিছু ভয়ের কারণ আছে, তন্মধ্যে মৃত্যু ভয়ই সর্বাপেক্ষা অধিক। নাম শুনিয়াই লােকে স্তম্ভিত হইয়া যায়। এবম্বিধ ভয়ের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবার-অভয় হইবার একমাত্র ব্রহ্মাস্ত্র স্ব স্বরূপােপলব্ধিরূপ প্রাপ্তি। এইজন্য ব্রহ্মের একটী নাম অভয়। ইহা ত ব্যক্তিমাত্রেরই অভিীত। কিন্তু তাহা ঘটে কয়জনের অদৃষ্টে। দ্য কিম্বা শতাব্দান্তে + সমুদায় পরিত্যাগ করিয়া অবশ হইয়া যখন তােমাকে গমন করিতে হইবে নিশ্চিত, তখন তুমি জ্ঞানের এটী ভূমির মধ্যে শেষ ৪টী ভূমি বিদ্যা-বিষয়ক। ৪র্থ ভূমি প্রাপ্ত ব্যক্তি ব্ৰহ্মবিদ নামে খ্যাত। ৫ম ভূমি-প্রাপ্ত ব্যক্তি ব্ৰহ্মবির। ৬ষ্ঠ ব্ৰহ্মবিদ বরিয়া এবং ৭ম ব্ৰহ্মবিদ বরিষ্ঠ। শেষ ৩টী ভূমি অর্থাৎ ব্রহ্ম বির, বরিয়া এবং বরিষ্ঠ এই তিন জনেই জীবন্মুক্ত নামে খ্যাত সবিশেষ জীবত-বিবেকে স্বর্গ ও নরক তত্ত্ব ৩৩২ পৃষ্ঠা দেখ। + শতায়ু বৈ পুরুষঃ-ইহাই ভূগােল সকল দেশের সার্বকালিক আয়ুর মান। তবে স্থল বিশেষে কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম দেখা যায়। সবিশেষ জীবতত্ত্ব-বিবেকে—আয়ু অধ্যায়-২৬৯ হইতে ২৯১ পৃষ্ঠা দেখ। সমুদায় সন্দেহ নিরাকৃত হইবে।

৬ স্বরূপসিদ্ধি । ? কেন অনর্থে প্রসক্ত হইয়া স্বকীয় প্রয়ােজন সাধনরূপ স্ব স্বরূপাে- পলব্ধি বা আত্মলাভের জন্য যথাপূর্বক অনুষ্ঠানাদি সম্পাদন করিতে বিরত রহিয়াছ ? বিশ্রান্তি-বিহীন, আলম্বন-শৃন্য, পাথেয় বর্জিত অদৈশিক অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্গম মার্গে তুমি একাকী কি, প্রকারে গমন করিবে ? তুমি প্রস্থিত বা মৃত হইলে কেহই তােমার পশ্চাৎধাবন করিবে না। অধিক কি, যে দেহকে তুমি আমার আমার বলিয়া সাদরে সংরক্ষণ করিয়া থাক, তাহাকেও সঙ্গে লইতে পারিবে না। তাহ এই স্থানে—এই মর-জগতে পতিত থাকিয়া যথাকালে ভূম্যাদিতে প্ৰলীন হইয়া যাইবে ! তােমার কৃতকৰ্ম্মের সংস্কাররূপ মনই ( সাভাস লিঙ্গ দেহ ) কেবল তােমার সহগামী হইবে, তােমাকে পুনঃ দেহবান করিবে। বলা বাহুল্য যে, যতদিন জীব এই অনিত্য সংসার সুখে নিমগ্ন থাকিয়া রাগ দ্বেষাদির বশবর্তী হইয়া কেবল জীব-সাধারণ প্রবৃত্তি লক্ষণ ধৰ্ম্মের আচরণ করিতে থাকে, ততদিন এবম্বিধ প্রকারে পুনঃ পুনঃ জন্ম মৃত্যু প্রাপ্ত হয়, কদাপি শান্তি মিলে—অভয় ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার লাভ হয়। এই মতে কাৰ্য করিতে করিতে সুকৃতি সঞ্চয়ে কালে বিশুদ্ধকুলে জন্মগ্রহণ করে, এবং দুঃখ নিবৃত্তি উপায়ে আচাৰ্যবান হইয়া তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে, তখন অজ্ঞান নিবৃত্ত হয়, রাগ দ্বেষাদির অভাব হয়, সুতরাং ধৰ্ম্মাধর্মের উৎপত্তি না হওয়ায় নিবৃত্তি লক্ষণ ধৰ্ম্মের আবির্ভাব হয়, তাহাও কেবল আত্মলাভ জনিত সুখলাভার্থে কৃত হইয়া নিবর্তিত হয়। তখন জীব গলিত-কৰ্ম্ম হইয়া যায়। জ্ঞানী হইয়া উঠে। স্বরূপসিদ্ধি সুচনা। সমধিগত হয়। সমুদ্র যেমন সমুদায় জলের একায়ণ, জিহ্বা যেমন সকল রসের একায়ন, চক্ষু যেমন সমস্ত রূপের একায়ণ, বাক্য যেমন সমুদায় বেদের একারণ, জ্ঞান তেমনি সকল কর্মের একায়ণ। ঈদৃশ জ্ঞানে সকল কম্মেরই পরিসমাপ্তি হইয়া থাকে, সুতরাং এ সংসারে জ্ঞানের তুল্য পরম পবিত্রকারী পদার্থ আর কিছুই নাই। বিষয়রূপ উপাধির নানাত্ব লইয়াই এই একই জ্ঞানের নানাত্ব ভ্রম হয়, যেমন ঘটজ্ঞান হইতে পটজ্ঞান ভিন্ন, রামের জ্ঞান হইতে যজ্ঞদত্তের জ্ঞান ভিন্ন। বাস্তবিক জ্ঞান নানা নহে—এক। সেই এক অদ্বয় ব্রহ্মই স্বয়ং জ্ঞান-স্বরূপ। কারণ, উৎপত্তি বিনাশ রহিত চৈতন্যই জ্ঞান নামে অভিহিত। ভস্মাচ্ছন্ন বহ্নির ভস্মাপসরণ জনিত প্রকাশবৎ মনের পরিণামে (বৃত্তি নিরুদ্ধ হইলে) সেই আত্মজ্ঞানের অভিব্যক্তি হইয়া থাকে। সুতরাং জ্ঞান জন্ম-পদার্থ নহে -নিত্য। মনের পরিণামে—আবরণাপসরণে প্রকাশিত হইয়া থাকে মাত্র। ঈদৃশ জ্ঞানযােগে জীবের জন্ম মৃত্যু প্রবাহ নিবৃত্ত হয়। ভব নিরুদ্ধ হয়। জীবের চরম লক্ষ্য স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হয় ? তখন জীবিতাবস্থাতেই জীবে মুক্তি সুখ উপভুক্ত হইয়া থাকে। এগুলি কল্পিত বা বােচক বাক্য নহে। সাক্ষাৎ-দৃষ্ট-ফলপ্রসূ। ব্রহ্মবিদই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। সুতরাং পরীক্ষিতব্য। অতএব প্ৰেষ্ঠতাত, সংসার-সুখে নিমগ্ন থাকিয়া আয় কতদিন সহজসাধ্য প্রবৃত্তিলক্ষণ ধৰ্ম্মে নিরত থাকিবে? উঃ, অজ্ঞাননি দুর কর,-মুমুক্ষ হও। সংসার প্রবােহরূপ মনকে সৃষ্টবীজবৎ বরূপসিদ্ধি। করিয়া তাহার নিগ্রহ বা নিরােধ শিক্ষা কর। সংসার সুখ- দুঃখময়, আত্মলাভ হইতে আর শ্রেষ্ঠ লাভ কিছুই নাই, শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরু প্রাপ্ত হইয়া, দেহে প্রাণ থাকিতে থাকিতে এই বর্তমান জীবনেই, নিরােধ-যােগাভ্যাস পূর্বক তল্লাত দ্বারা কৃতকৃত্য হও। কারণ, অনিরােধে বা অনিগ্রহে দেহান্ত হইলে মহান অনিষ্টের কারণ হইবে সন্দেহ নাই। তাত, দেহাত্ম- প্রত্যয় তাপসৃত করিয়া চিন্ময় বা জ্যোতির্ময়পে—স্ব স্বরূপে অবস্থান করিতে শিক্ষা কর। এড়কত্ব ছাড়িয়া সিংহত্ব প্রাপ্ত হও। পরিচ্ছিন্নত্ব ভুলিয়া গিয়া অপরিচ্ছিন্ন হও। সশরীরী হইয়া তাশরীরী রূপ উপলব্ধি দ্বারা জন্মসাফল্য লাভ কর । ইহারই নাম স্বরূপ সিদ্ধি বা জীবন-মুক্তি। ইহাই সেই অদৈশিক পথের একমাত্র পাথেয়। তাত, আর কালবিলম্ব করিও না। তুমি সতত কালের করাল-কবল-গ্রস্ত হইয়া রহি- ছ, তাহা দেখিতেছ না ? কেবল পেষণের অপেক্ষা। নিরােধ অভ্যাস দ্বারা পেষণের হস্ত হইতে এককালে অব্যাহতি লাভ কর-জাগ্ৰৎ অজ্ঞান-নিদ্রা নাশ কর—কৃতকৃত্য হও। ইহাই সর্ব বেদান্ত সিদ্ধান্ত রহস্য,—ইহাই পরম পুরুষার্থ এবং সমস্ত কর্তব্যের সমাধান পৰ্য্যাবসীনত্ব। য এবং বেদ। ইত্যুপনিষৎ। ইতি পরমহংস পরিব্রাজকাচাৰ্য্য শ্রীমৎ স্বামী আনন্দ সরস্বতী শিষ্য শ্রীমৎ স্বামী যােগানন্দ সরস্বতী বিরচিত স্বরূপ- সিদ্ধিগ্রন্থে উপাসনা-কাণ্ডে সূচনা নামক প্রথমাধ্যায় সমাপ্ত।

দ্বিতীয় অধ্যায়। অনুবন্ধ এবং সাধন স্বরূপ নির্ণয়। অনুবন্ধ চতুষ্টয়ের কথা—এই স্বরূপসিদ্ধি গ্রন্থ বেদান্তের প্রকরণ অর্থাৎ বেদান্তের মুখ্য অংশের প্রতিপাদক। সুতরাং বেদান্তের যে অনুবন্ধ, ইহারও সেই অনুবন্ধ। অনুবন্ধ এবং নিমিত্ত একই কথা। সেই অনুবন্ধ চারিটী। যথা—অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ এবং প্রয়ােজন। এই বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের অধিকারী কে? ইহার প্রতিপাদ্য বিষয়ই বা কি? প্রতিপাদ্য বিষয় বা বস্তুর সহিত শাস্ত্রের সম্বন্ধ কি ? এবং ইহার প্রয়ােজনই বা কি? যেহেতু বিনা প্রয়ােজনে কেহই কোন কাৰ্যে প্রবৃত্ত হয় না। এই গুলি যথাক্রমে ক্রমশঃ আলােচনা করা যাইতেছে। প্রথমতঃ দেখা যাউক, এই গ্রন্থের অধিকারী কে? মহর্ষি ব্যাসদেব বেদান্তদর্শনের প্রথম সূত্রেই বলিয়াছেন,-“অথাতাে, 'ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসা” এই সূত্রস্থ “অথ” শব্দের অর্থ “অনন্তর”। এখন কথা হইতেছে যে, কিসের বা কাহার অনন্তর অর্থাৎ ব্রহ্মজিজ্ঞাসু মুমুক্ষুর ব্রহ্মদর্শন-লাভাৰ্থ-স্বরূপসিদ্ধির জন্য অগ্রে চিত্ত- চিকিৎসার প্রয়ােজন। গুরূপদিষ্ট অনুষ্ঠান দ্বারা চিত্ত-ভূমিকে যথায্যায়ে কর্ষণ করিয়া বিশুদ্ধ এবং যােগ্য কর, সংক্ষেপত অর্থে বরূপসিদ্ধি। যােগ্য অধিকারী হইবার উপায়, অনুষ্ঠান বা সাধনসমুহ শরীর দ্বারা অভ্যাস কর, অধিকার-সম্পন্ন হও, তবে ব্রহ্মের কথা জিজ্ঞাসা করিও ইত্যাদি। আচাৰ্য শঙ্কর এই বলিয়া সূত্রস্থ “অথ” শব্দের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। আর বেদেও লিখিত আছে যে, পরমব্রহ্মকে জানিতে হইলে—স্ব স্বরূপতত্ত্ব উপলব্ধি করিতে হইলে ব্রাহ্মণের (ব্রাহ্মণ শব্দ উপলক্ষণার্থে—সকলেরই ) শম দমাদি য-সম্পত্তিযুক্ত হওয়া আবশ্যক। নচেৎ কোনদিনও ব্ৰহ্মবিদ্যা লাভ হইতে পারে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত བ | হয় না। শিষ্য।—ব্রহ্মদর্শন ত স্বতঃসিদ্ধ, তাহার জন্য আবার সাধনের প্রয়ােজন কি ? আর এক কথা—সাধনাদি দ্বারা যদি জীব ঈশ্বরই হয়, তবে সে ঈশ্বরের ন্যায় ক্ষমতাশালী হয় না কেন? গুরু।—তােমার এ প্রশ্নের বিশেষত্ব ত কিছু দেখা যায় না, যাহা হউক নিম্নলিখিত প্রকারে তাহার উত্তর করা যাইতেছে। কারণ থাকিলেই কাৰ্য অবশ্যম্ভাবী, ইহা সাধারণ বিধি। কিন্তু হলবিশেষে ইহার ব্যতিক্রমও দেখা যায়। কারণ থাকিলেও,তাহার অজ্ঞাতে কাৰ্য্য নিষ্পন্ন হইতে দেখা যায় না। ইহা বিশেষ বিধি। মনে কর, তােমার বাসগৃহে একটী সর্প আছে, অথচ তুমি তাহা জান না, সুতরাং সর্প-ভীতির কোন লক্ষণই তােমাতে লক্ষিত হয় না, যেই তুমি তাহা জানিতে পার, অমনিই তােমাতে ভীতি-জনিত স্বেদ-কম্পাদির আবির্ভাব হইতে দেখা যায়। সেইমত জীবে পরমাত্মত্ব থাকিলেও উহা জ্ঞাত না হইতে পারিলে ১১ ; সাধন-দরূপ নির্ণয়। জীবে পরমাত্মার ন্যায় ক্ষমতাদি জন্মিতে পারে না। যেমন অপরিমিত ধন থাকিলেও, তাহা জানা না থাকিলে, প্রীতি জন্মে না, কিন্তু আমার অপরিমিত ধনরত্নাদি আছে, এবম্বিধ জ্ঞান হইলেই অতুল আনন্দ হইয়া থাকে, সেইমত মনের নিরােধ অভ্যাস বলে আমিই ঈশ্বর বা পরমাত্মা জীবন্মুক্তাবস্থায় জীবাত্মার এই প্রকার ঈশ্বরতা জ্ঞান হইলে নিজের ব্রহ্মাত্মত্ব বুঝিলে, এক অনির্বচনীয় প্রতি জন্মে ; সে প্রীতি অকথ্য, কিন্তু স্বসংবেদ্য এবং সঙ্গে সর্বশক্তিমাদি গুণাদিও জন্মে। বলা বাহুল্য যে, এ ঐশ্বৰ্য্যগুলি অচিরস্থায়ী হইলেও, স্বীয় ব্ৰহ্মাত্মত্ব স্মৃতিবলে ব্যুত্থানের পরও পুনঃ উদিতে হইতে দেখা যায়। প্রাচীনকালের কথা ছাড়িয়া দিলেও, বর্তমানের অনেক যােগী, সন্ন্যাসীর অদ্ভুত ক্ষমতাদির কথা শুনা যায়, এবং অনেক সময়ে আমিও তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। কিন্তু এ সকল স্বরূপানন্দের বিঘ্নকারী বলিয়া তানেকে তাহা সংগােপন করিয়া রাখেন। রাখাই উচিত। ভাল, তােমার প্রতীতির দাতার জন্য নিয়ে আরও কয়েকটী দৃষ্টান্ত দিতেছি। অবহিত হইয়া শ্রবণ করিতে * অনেকদিন হইল পূজ্যপাদ গুরুদেবের সহিত উত্তর-পশ্চিম, অযোধ্যা। এবং পঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশে পরিভ্রমণকালে কয়েকটা অদ্ভুত ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া তাহার গুহ অলৌকিক প্রভাবের পরিচয় পাইয়াছিলাম এবং নিরােধশক্তি প্রভাবে জীবে সব্বশক্তিমাদি গুণ জন্মে, জীব শিব (ঈশ্বর) হয়, তাহা বেশ উপলব্ধি করিয়াছিলাম। প্রসঙ্গাধীন ইহ উল্লেখ করিলাম মাত্র ।

বরূপসিদ্ধি। থাক। (১) কোন স্থানে একজন সুরসিক নায়ক আচ্ছ, তাহার হাব, ভাব, স্বরাদি অতি মধুর, রূপ, লাবণ্য ও বিদ্যাবাদি অনুপম ইত্যাদি ব্যাপার অবগত হইয়া কোন কামাতুরা কামিনী নায়কের নিকটে গিয়া তাহাকে দর্শন করিল, কিন্তু যতক্ষণ তাহার এই গুণ সকল প্রত্যক্ষগােচর না করে, ততক্ষণ সে যেমন পূর্ণতৃপ্ত। হয় না, সেইমত ব্ৰহ্মরূপে জীবের প্রকাশ থাকিলেও যতদিন পর্যন্ত ব্রহ্মের ব্রহ্মাদি গুণ জীবেই আছে, নিরােধ সাধনাদি দ্বারা এই মত অনুসন্ধান না হয়, ততদিন জীব ও ব্রহ্মে পূর্ণভাব বা অভেদ হইবার সম্ভাবনা নাই। (২) মস্তকে কাপড় বাঁধিয়া কিম্বা গলায় হার ঝুলাইয়া যাইতে যাইতে কাৰ্যব্যপদেশে তাহ ভুলিয়া গিয়া লােকে তদন্বেষণার্থে ইতস্ততঃ বিচরণ করিয়া থাকে। এ ঘটনাও বিরল নহে। এ প্রকার হয় কেন? হার কিম্বা কাপড় সমধিগত সত্ত্বেও তৎকালে অনধিগতবৎ উপলব্ধি হইয়া থাকে। অতএব বলা যাইতে পারে যে, আত্মদর্শন স্বতঃ- সিদ্ধ হইলেও অনাত্মদর্শন নিবারণার্থে সাধনের—মনােনিরােধা- ভ্যাসের অবশ্য প্রয়ােজন আছে, অতএব সাধন কদাপি ব্যর্থ নহে—সার্থক বটে। ক্রমে সেই সাধন-স্বরূপ-নির্ণয় করা যাইবে। এক্ষণে অধিকারীর কথা বলি, প্রথম অনুবন্ধ বা অধিকারীর কথা-মনুষ্যমাত্রেই তুল্য হস্তপদাদি-বিশিষ্ট হইলেও, বাহ্যাকারে সমান দেখাইলেও, সূক্ষদর্শনে, লিঙ্গদেহের বা মনের সংস্কার তারতম্যে সকলেই পৃথক। কেহ ছয়আনার মানুষ, কেহ দশআনার, পূর্ণ যােত সাধন রূপ নির্ণয়। আনার মানুষ কয়জন দেখ। মনােনিরােধ বা সংযমশক্তিপ্রভাবে বাহার সেই সংস্কার বা বাসনা যে পরিমাণে ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে, সে সেই পরিমাণে মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে, অতএব সকল মানুষ সমান নহে। কেহ পূর্ণ, কেহ অপূর্ণ। অপূর্ণেরই পূর্তির আবশ্যক। 'পরিপূর্ণের নহে। সাধনাদিই সেই পূর্তির মুখ্য উপাদান। যেমন কণা পরিমিত বহ্নিতে তৎসজাতীয় প্রকৃতির আপূরণে একটবহু বিস্তৃত বনও অচিরকাল মধ্যে মহা-বহ্নিতে পরিণত হইয়া থাকে, সেই মত সাধনাদি রূপ পূর্তির দ্বারা অপূর্ণ মানৰ—দুআনা, চাৰিআনার মানুষও ক্রমে পূর্ণের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। ইহা প্রকৃতির নিয়ম। সাধনাদি যে ব্যর্থ নহে—সার্থক, তাহা ভাল করিয়া বুঝ। এই প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে সাংসারিক মনুষ্যদিগকে সাধারণতঃ চারিশ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যথা—মুক্ত, মুমুক্ষু, বিষয়ী ৰা বন্ধ এবং মুঢ় তন্মধ্যে মুক্ত পুরুষের সম্বন্ধে বলিবার কিছুই নাই, যেহেতু তিনি স্ব-স্বরূপসিদ্ধি লাভে, প্রাপ্তব্যের প্রাপ্তিতে কৃতকৃত্য হইয়াছেন। তিনি উত্তমাধিকারী বলিয়া গণ্য। দ্বিতীয় মুমু। সংসার সুখ-দুঃখময়, আত্মলাভ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠলাভ আর কিছুই নাই, এবম্বিধ বিচারের বশবর্তী হইয়া বশীকার সংজ্ঞক (অপরা) বৈরাগ্যের উদয়ে ভােগাদিতে জলাঞ্জলি দিয়া সমুদায় পরিত্যাগ * বৈরাগ্য বিবিধ। যথা—অপর এবং পয়া। অপর বৈরাগ্য গুন চারিভাগে বিভক্ত। যথা—(১) যতমন, (২) ব্যতিরেক(৩) একেন্দ্রিয় এবং (৪) বশকার। এই অপরা-বৈরাগ্যই সাধকে 'প্রথম সাত হই।

১৪ স্বরূপসিদ্ধি। পূর্বক আত্মলাভার্থে, স্ব-স্বরূপােপলব্ধির জন্য সাগ্রহে শ্রোত্রিয় ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গুরুর শরণাগত হয়, সেই ব্যক্তিই মুমুক্ষু পদবাচ্য, মধ্যমাধিকারী বলিয়া কথিত এবং স্বরূপসিদ্ধি সাধনের যােগ্যপাত্র। তৃতীয় বিষয়ী বা বদ্ধ। যাহারা গুরু সম্প্রদায়রহিত অর্থাৎ গুরু বা আচাৰ্য-পরম্পরাগত আত্মজ্ঞান লাভার্থ—স্বরূপসিদ্ধি সাধনের জন্য যাহারা তাহাদের আশ্রয় গ্রহণ করে না, যাহারা অত্যন্ত বহির্মুখীন অর্থাৎ বাহ্যবিষয়ে যাহাদের মন অত্যন্ত আসক্ত, যাহারা প্রমাণাদি বিষয়ে অনভিজ্ঞ বা অল্পজ্ঞ, লৌকিক গ্রাহ্য- গ্রাহকরূপ দ্বৈত বস্তুতেই যাহাদের চিত্ত সদা নিরত, যাহারা বিধি পূর্বক * বেদান্তশাস্ত্র অধ্যয়ন করে নাই, তাহারাই বদ্ধ বা থাকে। জ্ঞানের চরম পরিপাকে পরাবৈরাগ্যের উদয়ে সাধকে অব্ৰহ্মস্তত্ব পর্যন্ত সমুদায় পদার্থ, সহজ কথায় সমগ্র জগৎ তুচ্ছীকৃত হইয়া যায়। সবিশেষ ৪র্থ অধ্যায়ে নিরােধ উপায় দেখ। মৈথুনাদি অসমাচরণ পূর্বক কেবল শ্ৰোত্ৰিয় ব্ৰহ্মনিষ্ঠের সমীপেই বেদান্তাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করা উচিত, নচেৎ তৎপ্রতিপাদ্য বিষয় কদাপি প্রতিফলিত কিম্বা সমধিগত হয় না। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমানকালে—এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজে জগতের এ সনাতনবিধি প্রায়শঃ উল্লষ্মিত হইতে দেখা যায়। আমরা কিন্তু এ বিধির পূর্ণ অনু- মােক। আমার মনে হয়, নবদ্বীপের প্রধান পণ্ডিত মৃত ভুবনমােহন বিদ্যারত্ব এবং পূর্বস্থলীর মৃত পণ্ডিত কৃষ্ণনাথ ন্যায় পঞ্চানন, উভয়ের সহিত কোন সময়ে সাক্ষাৎ হওয়ায় নানাকথা প্রসঙ্গে এ কথাটাও. উঠিয়া- ছিল।' তাঁহারা উভয়েই আমার মতেরই পােষণ করিয়াছিলেন। বুদ্ধ রসিক ব্যায়-পঞ্চানন এ সম্বন্ধে কয়েকটী হাজনক গল্পও করিয়াছিলেন।

সাধনম্বরূপ নির্ণয়। বিষয়ী নামে অভিহিত এবং অধমাধিকারী বলিয়া গণ্য। তাহা- দের মন সদা বিক্ষিপ্ত বলিয়া দহনান্তৰ্গত বীজবৎ, আত্মােপদেশ সদ্য বিনষ্ট হইয়া যায়। সুতরাং তাহাদের পক্ষে স্বরূপসিদ্ধি সাধন দুঃসাধ্য। চতুর্থ—পামর বা মুঢ়। যাহারা আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুনাদি জীব-সাধারণ বৃত্তিকেই সার ভাবিয়া তদুপ- ভােগাদিতেই সদা নিমগ্ন, তাহারাই পামর বা মূঢ় নামে খ্যাত এবং অধমাধম •অধিকারী বলিয়া গণ্য। বলা বাহুল্য যে ঈদৃশ পামর ব্যক্তিদের পক্ষে স্ব স্বরূপােপলব্ধি বা আত্মলাভ সুদূর পরাহত। তবে কোন কোন বন্ধ বা বিষয়ী ব্যক্তিকে সময়ে সময়ে তত্ত্বজ্ঞানের আলােচনা করিতে দেখা যায় সত্য, কাহারও কাহারও মনে সাময়িক বৈরাগ্যভাবের উদয় হইয়া থাকে। কিন্তু উপভােগ্য বিষয় সম্মুখে উপস্থিত হইলে আর তাহারা স্থির থাকিতে পারে না। তাহাদের সে মর্কট-বৈরাগ্য—সে লােক- দেখান তত্ত্বজ্ঞানের ভাব সব ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়। কাজেই তাহাদের সমল চিত্ত অমল হয় না—বৃত্তি নিরুদ্ধ হয় না। তাহারা মানচিত্র দেখিয়া দেশ কি নগরের জ্ঞানলাভ আর শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া ব্ৰহ্মবিদ্যালাভ তুল্য জাতীয় কথা। ব্ৰহ্মবিদ্যা নাম পরাবিদ্যা। (জগতের) নিখিল শাস্ত্র অপরা-বিদ্যা। অপরবিদ্যা দ্বারা পরীবিদ্যা কখনই লভ্য নহে। নারদ, সনৎকুমার সংবাদই তাহার দীপ্যমান প্রমাণ। বেদান্ত বাগীশ বা বেদান্তবিদ হইলেই ব্ৰহ্মবিদ হয় না। চুধু মুখু কিম্বা ভূষণ অলঙ্কারের কথা আর কি বলিব ? এখনকার লােকের যেমন কৰ্ম্ম, ফলও তৎ প্রাপ্ত হইতেছে।

পলিছি। জ্ঞানহীনই থাকিয়া যায় এবং অধমাধিকারী বলিয়া গণ্য হয়। কিন্তু সমধিক আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঈদৃশ বন্ধ বা বিষয়ী ব্যক্তিগণ অজ্ঞানের ক্রোড়ে নিত্যশায়িত থাকিয়াও আপনাদিগকে পণ্ডিতম—জ্ঞানী বলিয়া লােকসমাজে পরিচয় দিতে এবং, উপদেষ্টার স্থান অধিকার করিতে কিঞ্চিত্রও কুষ্টিত হয় না। বলা বাহুল্য যে, বিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজের অধিকাংশ উপ- দেষ্টাই (গুরুই) এই শ্রেণীর অন্তর্গত। অতিবর্ণাশ্রমী অত্যাশ্রমীই প্রকৃত এবং প্রকৃষ্ট গুরু এবং যথার্থ উপদেষ্টা স্থানীয়। অন্যে নহে। অতএব বলা যাইতে পারে যে, মুমুক্ষুই বেদান্তশাস্ত্রের এবং স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তির একমাত্র অধিকারী, মধ্যমায় স্থিত। আর বিষয়ী বা বন্ধ এবং পামর উভয়েই যথাক্রমে অধম এবং অধমাধম অধিকারী। এই ত গেল প্রথম অনুবন্ধ বা অধিকারীর কথা। ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ অনুবন্ধের কথা—এক্ষণে দ্বিতীয় অনুবন্ধ বা বিষয় কি তাহাই ৰিচাৰ্য। এই গ্রন্থের বিষয়—মুখ্য বা প্রধান প্রতিপাদ্যজীব ব্রহ্মের একতাপ্রতিপাদন, এতদুভয়ের অভেদ প্রদর্শন। সহজ কথায়, পরমাত্মাই উপাধিবণাৎ- দেহেন্দ্রিয়াদি যুক্ত হইয়া সংসারী হইয়াছেন, কৌন্তেয় কর্ণের রাধেয় হইয়াছেন, তাহাই প্রদর্শন। আর এই প্রতিপাদ্য বস্তু গুরুর সবিশেষ ব্যাখ্যা তদশনে দীক্ষা এবং গুরুমাহাত্ম্য ১৪৩ পৃষ্ঠা হইতে ২২৯ পৃষ্ঠা দেখ। এবং এই পুস্তকের ৩য় অধ্যায়ে *হ্মবিদ্যা এবং ৰহ্মবিদ ও লেখ।

সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। এবং শাস্ত্র এতদুভয়ের প্রতিপাদ্য এবং প্রতিপাদক কম্বা বােধ্য- বােধকরূপ ব্যাপারের নাম সম্বন্ধ। যেহেতু শাস্ত্র অসম্বন্ধ কথা বলেন না। এই ত গেল তৃতীয় অনুবন্ধ বা সম্বন্ধের কথা। এইক্ষণে চতুর্থ অনুবন্ধ বা প্রয়োজন কি তাহাই বলা যাইতেছে। স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তিই মুখ্য প্রয়ােজন অর্থাৎ যে অজ্ঞানতা বশতঃ জীব আপনার স্বরূপ রূপ বা ব্রহ্মাত্মভাব উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয় না, আপনার নিদুঃখতা বুঝে না, আপনাকে অনিত্য সুখ-দুঃখাদির ডােক্ত ও জন্ম-মরণবান ভাবিয়া বৃখা শােক মােহে অভিভূত হইয়া থাকে, সেই অজ্ঞান বা অধ্যাস নিবৃত্তি এবং তৎফলস্বরূপ স্বরূপসিদ্ধি ও স্বরূপানন্দ প্রাপ্তি, এইটাই এই বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের মুখ্য প্রয়ােজন। সহজ কথায়, স্বরূপসিদ্ধি বা একাত্মবিদ্যা-প্রতিপত্তি দ্বারা অনাদি অধ্যাসমূলক সমূহদুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তিহেতু নিরতিশয় সুখপ্রাপ্তিই সমগ্ৰ বেদান্ত-শাস্ত্রের বা অদ্বৈতবাদের এবং এই বক্ষ্যমাণ স্বরূপসিদ্ধি গ্রন্থের চরম লক্ষ্য। সেই অনাদি অজ্ঞানমূলক সৰ্বানর্থের হেতু অধ্যাসের কথা পরে বলা যাইবে। শিষ্য।—ভাল,“সিদ্ধ্যা কিং প্রয়ােজন”অর্থাৎ সিদ্ধির আবার প্রয়ােজন কি ? সিদ্ধি লাভ করিয়া কি হইবে? না করিলেই বা কি হয়? এই বিষয়টাই আগে বলুন। স্বরূপসিদ্ধির প্রয়ােজনীয়তা—প্রয়ােজন যথেষ্টই আছে। জীবের যাহা অভিীত—জীব যাহা চায়, তাহাই পাইয়া থাকে। জীব চায় দুঃখাসমন্তি সুখ। কই এত যত্ন,এত চেষ্টাতেও ১৮ স্বরূপসিদ্ধি। এবং ত তাহা জীবের অদৃষ্টে মিলিতেছে না। কেন মিলিতেছে না? অনিত্যে মজিয়া নিত্যসুখ কি কখন লভ্য হয় ? কখনই না। জীব তাহা বুঝিয়াও বুঝে না। পৃথিবীতে অবস্থিত হইয়া কদাপি পৃথিবীর ঘূরণ দেখা যায় না, তাহা দেখিতে হইলে পৃথিবী ছাড়িয়া গ্রহান্তরে যাওয়ার প্রয়ােজন হয়, এইমতে অনিত্য ছাড়িয়া নিতে মজিলে, সিদ্ধ হইলে নিত্যসুখপ্রাপ্তি নিশ্চিত। ইহা শ্রুতি-যুক্তি অনুভূতি সিদ্ধ। সুতরাং ধ্রুব সত্য, সবিশেষ বলিতেছি শুন দুঃখনিবৃত্তি এবং সুখবাপ্তি—আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তি এবং নিরতিশয় খাবাপ্তি এই দুইটাই মুখ্য প্রয়ােজন। এই দুইটীকে পুনঃ পাঁচভাগে বিভক্ত করিয়া স্বরূপসিদ্ধির অবশ্য প্রয়ােজনীয়তা বিশদভাবে প্রদর্শিত হইতেছে যথা—(১) জ্ঞানরক্ষা (২) তপঃ (৩) বিসম্বাদাভাব ( ৪ ) দুঃখনাশ এবং (৫) সুখ প্রাপ্তি। এখন কথা হইতেছে যে, শ্রবণাদি সাধনানুষ্ঠান দ্বারা উৎপন্ন তত্ত্বজ্ঞান কাহার দ্বারা এবং কি প্রকারে প্রবাধিত হইবে যে, তাহার রক্ষার প্রয়ােজন ? যােগশিটে দেখা যায় যে, তত্ত্ববিদ রাঘবের, চিত্তবিশ্রান্তি অভাবে অর্থাৎ মনােনিবােধ না হওয়ায় সংশয় বিপৰ্যয়াদি উৎপন্ন হইয়া সঞ্জাত-তত্ত্বজ্ঞানকে বিনষ্ট করিবার উদ্যোগ করিয়াছিল, সুতরাং সংশয়াদির দ্বারা উৎপন্ন তত্ত্বজ্ঞান যাহাতে বিনষ্ট না হয়—অবাধে স্থিতি করিতে পারে, তন্য মনােনিবােধ প্রয়ােজন। মনবৃত্তিশূন্য হইয়া নিরুদ্ধ হইলেই উৎপন্ন তত্ত্বজ্ঞান পুরুষে অনায়াসে রক্ষিত এবং অবাধে সাধন-স্বরূপ নির্ণয় । স্থিত হইতে পারে, তাই প্রথম “জ্ঞানরক্ষা” বলা হইয়াছে। (২) তপঃ—এখানে তপস্যা শব্দে কৃচ্ছ চান্দ্রায়ণাদি ব্ৰত নহে, যেহেতু তত্ত্বজ্ঞানীর পক্ষে তাহার কৃত্য পূর্ণভাবে সম্ভব। ইন্দ্রিয়াদির সহিত মনের একাগ্রভাবে অবস্থানকে পরম তপস্যা বা যােগ বলে যথা—“মনশ্চেন্দ্রিয়াণাং ঐকাগ্র্যং পরমং তপঃ” আর “ব্রাহ্মণস্য তপঃ জ্ঞান”—জ্ঞান লাভই ব্রাহ্মণের তপস্যা। (৩) বিসম্বাদাভাব বিসম্বাদ দ্বিবিধ-নিন্দারূপ এবং কাহরূপ। ক্রোধাদি বৃত্তি- ( ভর্জিত বীজবৎ ) রহিত জ্ঞানীর সহিত কোন ব্যক্তির কলহ কিন্থা নিন্দারূপবাদ হইবার সম্ভাবনা নাই। স্বরূপসিদ্ধির অব্যবহিত পূর্বসাধন মনােররােধ। মনােনিরােধের পূর্বসাধন তত্ত্বজ্ঞান লাভ। এবং তত্ত্বজ্ঞানের পূর্বসাধন শ্রবণাদি অর্থাৎ শ্রবণাদি সাধন দাবা প্রথমতঃ সাধকে তত্ত্বজ্ঞান সঞ্জাত হয়। তত্ত্ব- জ্ঞান জন্মিলেই মনােনিবােধ সুখসাধ্য হয়, অবশেষে মনের নিরােধে সাধকে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হয়। সাধক তখন আর সাধক নহে—সিদ্ধ। এখন কথা হইতেছে যে, অতি অর্বাচীন শ্রবণাদি-সাধকের--বিবিদিষা-সন্ন্যাসীরই ক্রোধাদি থাকিবার সম্ভাবনা নাই, তখন তাহা হইতে তিন ধাপ উন্ধে অতি উত্তমাধিকারী—স্বরূপসিদ্ধের, জীবন্মুক্তের বা বিদ্বৎ-সন্ন্যাসীর ক্রোধাদির সম্ভাবনা কোথায়? তাতএব বলা যাইতে পারে যে, যােগী এবং জ্ঞানীদিগের সহিত সাধারণ জনগণের কলহ কিম্বা নিন্দারূপবাদ হইবার কোনই আশঙ্কা নাই। (৪) দুঃখনাশ-- জীবন্মুক্ত বা স্বরূপসিদ্ধযােগী অপরােহ্মানুভূতিদ্বারা স্ব-স্বরূপ যখন বরূপসিদ্ধি। •• উপলব্ধি করিয়া পুত্রাদির জন্য কি অপর কোন প্রয়ােজন সাধনাৰ্থ স্বীয় শরীরকে কোন প্রকারে উত্তপ্ত বা ক্লিষ্ট করিতে প্রস্তুত হন না, তখন তাহার ঐহিক সমুদায় দুঃখের নাশ হয়; যেহেতু তিনি কর্তৃত্বাদি অভিমানশূন্যৰলিয়া তাহার দেহেন্দ্রি- যাদির দ্বারা যাহা কিছু কৃত হয়, তাহার ফলাফলরূপ পাপ পুণ্যের চিন্তা জনিত দুঃখাদির জন্য তিনি উদ্বেজিত হন না; কারণ তিনি জানেন, সমুদায় কৰ্ম্মজনিত পাপপুণ্যফল শরীরাভিমানমূলক। ইহাতে ভঁহার আমুষ্মিক বা পারলৌকিক দুঃখের নাশ হয়, সুতরাং ভব নিরুদ্ধ হয়, আর তাহার পুনরাগমন বা পুনঃ জন্মলাভ হয় না। (৫) সুখাবির্ভাব-ইহা ত্রিবিধ যথা—(ক) সৰ্বকামাপ্তি (খ) কৃতকৃত্য এবং (গ) প্রাপ্ত প্রাপ্তব্য। ব্ৰহ্মাদি স্থাবরান্ত সব দেহে সচ্চিদানন্দরূপে যে (ব্ৰহ্ম) চৈতন্য বিরাজিত থাকিয়া সব দেহের কামনা সকলের সাক্ষীস্বরূপে এবং তােক্তারূপে প্রতীয়মান হইয়া থাকে, সেই চৈত্যই“আমি”এবম্বিধ প্রকারে স্বকীয় আত্মার অনুসন্ধানপূর্বক স্বদেহের ন্যায় সর্বদেহের কামভােগাদির সন্দর্শন করিতে পারিলেই স্বদেহে ভােগাদি না করিয়াও সব সাক্ষীস্বরূপে ভােগসিদ্ধ হয়; ইহারই নাম অক মহতত্ব (শ্রোত্রিয়স্য চাকামহতস্য)। কাম দ্বারা অভিহত না হইয়াও কামভােগপ্রাপ্তি। সর্বভােগদোষদশী তবিদের এবধি প্রকারে সর্বতোক্তত্বসিদ্ধহইয়া সর্বকামাপ্তিত্ব এবং প্রাপ্ত প্রাপ্তব্যত্ব সিদ্ধ হয়, সুতরাং কিছুই তাহার অপ্রাপ্য থাকে না। বলা বাহুল্য যে, এগুলি কেবল নােচক বামাকনকে এখন • সাধন-রূপ নির্ণয়। এই সাধনাবস্থায়, এ ভাবগুলি তােমার উপলব্ধির অবিষয় সত্য, কিন্তু মনােনিরােধ দ্বারা সিদ্ধিলাভ কর, যাথার্থ্য উপলব্ধি করিবে সত্য বলিয়া বুঝিবে। গণ্ডুধু মাত্র সমুদ্রবারি পানে ভূগােল মুদ্র বৃহৎ তাবৎ জলাশয়ের জলপানসাধনবৎ স্বস্বরূপসিদ্ধি সাধন দ্বারা আত্মতত্ত্ব পূর্ণভাবে অবগত হইতে পারিলেই ক্ষুদ্র বৃহৎ যাবতীয় কর্তব্যের সমাধান হইয়া থাকে। পুরুষ তখন কৃত- কৃত্য বা কৰ্তব্যাস্ত হয়। বলা বাহুল্য যে, অন্য কোন প্রকারেই মানৰ কৰ্তব্যাস্ত হইতে পারে না, কারণ কর্তব্যের সংখ্যা অগণ্য, অসংখ্য, শত জীবনেও তাহাদের সমাধান হয় কি না সন্দেহ, কিন্তু ইহা অবগত হইয়াও, যে ব্যক্তি কেবল কৃত কৰ্ম্মাদিদ্বারা কৰ্তব্যান্তে প্রবৃত্ত হয়, সে অত্যন্ত মুঢ়ধী। ভাল, এখন সাধনাদির বিষয় বলা যাক। সাধনসম্পত্তির কথা—যে পূৰ্ত্তিবলে—প্রকৃতিরআপূরণে মাটী পাথর হয়, পাথর লােহা হয়, তেলাপোকা কাঁচপােকা হয়, মানুষ দেবতা হয়, সহজ কথায়, অপূর্ণ (ছয় আন, দশআনার) মানব ক্রমে পূর্ণের দিকে (যােল আনায়) অগ্রসর হইতে আরম্ভ করে, এক্ষণে সেই সাধনসম্পত্তিরূপ পূর্তির বর্ণনা করা যাইতেছে। বলা বাহুল্য যে, এই সাধনাই সুকৃতি। সামান্য হইলেও তাহা পুরুষকার। এই সাধনাই অনন্ত দুঃখের হ্রাস কারক। এবং অনন্ত সুখের বীজস্বরূপ। এই সাধনাই ধর্ম এবং পরকালের সম্বল। এই সাধনসম্পত্তির মধ্যে সাধনচতুষ্টয় এবং শ্রবণচতুষ্টয়ই প্রধান এবং তত্ত্বজ্ঞানলাভের একান্তউপযােগী। প্রথমতঃ সাধন- २२ স্বরূপসিদ্ধি । চতুষ্টয়েরই কথা বলা যাইতেছে, কারণ ইহারা সাধকের প্রথমা- বস্থার সাধ্য। এ সাধ্য সাধিত বা আয়ত্ত হইলে সাধক পরা বা ব্ৰহ্মবিদ্যার অধিকারী হয় এবং শ্রবণাদি সাধনে মনােনিবেশ করে। শ্রবণাদির ফল তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইলে ক্রমে আত্মসাক্ষাৎ- কার হয় এবং মনােনিবােধ অভ্যাস দ্বারা কালে স্ব-স্বরূপ-সিদ্ধি সমধিগত হয়। সাধন চতুষ্টয়ের কথা—(১) নিত্যানিত্য বস্তু বিচার অর্থাৎ ব্ৰহ্ম অকৃতবিদায় নিত্য এবং ব্রহ্মাতিরিক্ত তাবং পদার্থ (ব্রহ্মাণ্ড) কৃতবিধায় ঘটাদিবৎ অনিত্য, এবম্বিধ নিশ্চিতজ্ঞানের নাম নিত্যানিত্য বস্তুবিচার। (২) ইহামুত্রফল-ভােগ-বিগ’ বর্তমান দেহস্থিতিহেতু শাস্ত্র নিষিদ্ধ অন্নাদির অতিরিক্ত অর্থা গ্রহণে চিত্তবৃত্তির দাতা। ৩) ষট সম্পত্তি যথা—শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা, সমাধান ও শ্রদ্ধা এই ছয়টাতে একটী ( ক ) শমযেসকল লৌকিক এবং ব্যবহার শাস্ত্রো কাৰ্য্যাবলী তাত্মজ্ঞানের প্রতিকূল, সুতরাং মুমুক্ষুর নিজ অধি- কারের অনুপযুক্তহেতু অফলএবং ব্যর্থ বলিয়া তাহাদের ত্যাগের নাম শম। অথবা আপনার লক্ষ্য বস্তুতে মনের সংযতা- বস্থার নাম শম। (খ) দম-প্রােক্ত প্রকারে অফল এবং অনুপযুক্তত্ব বুঝিয়া চক্ষুরাদি এবং হস্তপদাদি উভয় হন্দ্রিয় দ্বারা ব্যবহার শাস্ত্রোক্ত বিষয়াদি ত্যাগের নাম দম অথবা কৰ্ম্ম এবং জ্ঞান উভয় ইন্দ্রিয়গণকে শব্দাদি বিষয় হইতে পরাবর্তনপূর্বক স্ব স্ব গাধারে সংযত ভাবে রক্ষা করাকে দম কহে। (গ) উপ- (৩) সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। রতি—বিষয় প্রবৃত্তি একবার নিবৃত্ত হইলে, যাহাতে তাহার আর পুনরাবর্তন না হয়, এবম্বিং কৃত্য বা অনুষ্ঠানের নাম উপরতি। অথবা বিধিপূর্বক কৰ্ম্মকাণ্ড পরিত্যাগানন্তর সন্ন্যাস-ধৰ্ম গ্রহণ বা চতুর্থাশ্রমী হওয়া অথবা বাহ্য বস্তুতে চিত্তবৃত্তির অনাব- লম্বনকেই উত্তম উপরতি কহে। (ঘ) তিতিক্ষা—দুঃখমাত্রেই দেহধৰ্ম্ম বুঝিয়া চিন্তা ও বিলাপ রহিত হইয়া অপ্রতীকারপূর্বক তাহা সহ্য করিতে অভ্যাস করাকে তিতিক্ষা কহে। (ঙ) সমা- ধাম—আত্মলাভের উপযােগী যে শ্রবণাদি তাহাদের বিরােধী নিদ্রাদি নিরােধদ্বারা চিত্তের যে অবস্থান তাহার নাম সমাধান, অথবা নিৰ্ম্মল ব্রহ্মে সর্বদা যে মনেরঅবস্থিতি অর্থাৎ আত্ম- সংস্থত্ব বা অমনীভাবের নাম সমাধান। (চ) শ্রদ্ধা-গুরু এবং বেদান্তবাক্য সত্যবােধে তাহাতে একান্ত বিশ্বাস। কেবল এই শ্রদ্ধা যথাবৎ অভ্যস্ত হইলে পরম বস্তু লভ্য হয়, তাই বেদে লিখিত আছে “শ্রদ্ধয়া সত্যমাপ্যতে।” (3) মুমুক্ষুত্ব—সংসার সুখ-দুঃখময়, আত্মলাভ হইতে শ্রেষ্ঠ লাভ আর কিছুই নাই, এবম্বিধ বিচার দ্বারা আত্মলাভাৰ্থ-স্ব-স্বরূপসিদ্ধি সাধনের জন্য আগ্রহাতিশয়। এই ত গেল সাধন চতুষ্টয়ের কথা, এই সাধন, চতুষ্টয় অভ্যস্ত হইলে সাধক পরাবিদ্যার অধিকারী হয়। সাধকে তত্ত্বজ্ঞান সঞ্জাত হয় মাত্র। শ্রবণাদি সেই তত্ত্বজ্ঞান লাভের সােপান। সেই শ্ৰবণ চতুষ্টয়ের কথা এক্ষণে বলা যাইতেছে। শ্রবণ চতুষ্টয়ের কথা—(১) শ্ৰবণ—সমগ্র বেদাষশাস্ত্রে দেহাদিব্যতিরিক্ত অথচ দেহেন্দ্রিয়াদি সকলের পরিচালক স্বপ্রকাশ ২৪ ধপসিদ্ধি। চৈতন্যস্বরূপ যে পদার্থ সৎ বা সত্য বলিয়া প্রতিপাদিত হইয়াছে তাহাই ব্ৰহ্ম—তাহাই তুমি। অহঙ্কারশূন্য এবম্বিধ ব্ৰহ্মাকার মনােবৃত্তির তাৎপৰ্য বা ফলিতাৰ্থ শ্রোত্রিয় ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গুরুমুখে বিধিপূর্বক শ্রবণ করার নাম শ্রবণ। কেবল কর্ণকুহরে শব্দ প্রবিষ্ট হইলেই শ্রবণ সিদ্ধ হয় না; কারণ কত শত বিষয়ই ত এত হইতেছ, কিন্তু তাহার কয়টা মনে রাখিয়াছ বল দেখি। বিচার দ্বারা গুরােপদিষ্ট বাক্যের ভাবার্থ জানিতে পারিলে ভ্রান্তি দূর হইয়া শ্রবণ সিদ্ধ হয়। কেবল গুরুর উপদেশ গ্রহণ করিলে বা করিবামাত্রই শ্রবণ সিদ্ধ হয় না—তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় । শ্রোত ইন্দ্র-বিরােচন-সংবাদই ইহার দীপ্যমান প্রমাণ। বেদান্ত অধ্যয়নমাত্রেই আত্মতত্ত্ব অবগত হওয়া যায় না, তাহা হইলে আর ভাবনা ছিল কি? বেদান্তবিদ মাত্রেই ব্ৰহ্মবি হইয়া যাইত। কাজে তাহা হইতেছে কি ? শত শত বেদান্ত- বিদের মধ্যে একজন ব্রহ্মবিদ মেলা ভার। (২) মননের কথা—শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর বাক্য, শ্রুতি এবং স্বীয় অনুভূতি অর্থাৎ উপদিষ্ট বাক্যের সহিত সযৌক্তিক মনের একতা, এই তিন ঐক্য করিয়া এত বিষয়ে চিত্তের সম্ভাবনা আধান বা আস্থা সংস্থাপন অর্থাৎ যাহ। গুরুমুখে শুনিয়াছ, তাহাই যথার্থ সত্য—প্রকৃত বা সার বস্তু, অবশিষ্ট সমুদায়ই অবস্তু- অসার। বিচার দ্বারা সেই উপদিষ্ট বাক্যের তাৎপৰ্যার্থ মনে মনে অনুক্ষণ প্রতীতি বা অবধারণ করার নাম মনন। ইহার পরিপাক ফল একাগ্রতা-বৃদ্ধি-লক্ষণ নিরােধসূচনা বা নিদিধ্যাসন।

সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। (৩) নিদিধ্যাসন—এবম্বিধ শ্রবণ এবং মনন দ্বারা যাহা ধ্রুব সত্য বলিয়া অবধারিত হইল, সেই ব্ৰহ্মবস্তুতে মনের স্থিরত্ব- সম্পাদন। সহজ কথায়, ঈদৃশ শ্রবণ এবং মননযুক্ত মনকে বৃত্তি আহরণদ্বারা পুনঃ চঞ্চল হইতে না দিয়া—তাহার লয় এবং বিক্ষেপক্ষ অবস্থা রহিত করিয়া তাহাকে অচঞ্চলভাবে রক্ষা করিতে অভ্যাস কর। ঈদৃশ তাভ্যাসপ্রভাবে বা পরিপাকে তমােপ্ৰভব ভ্রান্তিকল্পিত অনাকা স্বরূপ অসার স্থূল পদার্থ সমুহ,সহজ কথায়, দৃশ্য জগৎ ক্রমে ক্রমে মিথ্যা বলিয়া প্রতীত হইতে থাকিবে। মন আর তখন তাহা দর্শন করিতে চাহিবে না, সুতরাং গ্রাহাভাব হেতু মন সূক্ষমত্ব প্রাপ্ত হয়—মনের জগন্ময়ভাব লুপ্তপ্রায় হয়, কাজেই মনের রজোপ্রভব চাঞ্চল্য বিক্ষেপ বিনষ্ট হইয়া মন একাগ্র (এক + অগ্র = শ্রেষ্ঠ বা সত্য) হয় অর্থাৎ এক সত্য- স্বরূপে-চৈতন্যময়রূপে ভাসমান হয়। ইহাই নিদিধ্যাসনের কম। আর ঈদৃশ ক্রমের পরিপাকাতিশয়রূপ অবস্থানন্তরই সাক্ষাৎকার নামে খ্যাত। (৪) সাক্ষাৎকার—বলিলে চোখে দেখা নহে, কারণ নির- বয়ব ব্রহ্মসম্বন্ধে তাহা পূর্ণভাবে অসম্ভব। তবে মানস-প্রত্যক্ষ বটে। শ্রবণাদি সাধনানুসন্ধান পরিপাকফলে মনের জগৎ- বিকাশ ভাবের অর্থাৎ জগন্ময় মনের প্রবিলয়ে বা তিরােভাবে নিরাখ্যাত বা চিন্ময়মনে অথবা ব্ৰশালীন বা সত্বাবশিষ্ট প্রশান্ত মনের চারিটী অবস্থা যথা—লয়, বিক্ষেপ, কষায় এবং সম সবিশেষ ৪র্থ অধ্যায়ে মনের অবস্থা চতুষ্টয় দেখ।

স্বরূপসিদ্ধি। মনে যে নিরতিশয় সুখ অনুভূত হইয়া থাকে তাহার নাম সাক্ষাৎকার। বেদান্তশাস্ত্রে এবম্বিধ সাক্ষাৎকারকে কোথায় ব্ৰহ্মসংস্পর্শ, কোথায় বা অস্পর্শযােগ তাখ্যায় আখ্যায়িত করিয়াছেন। শ্রবণাদির ফল তত্ত্বজ্ঞান—এখানে বলা আবশ্যক যে, এই সাধনচতুষ্টয় এবং এবং শ্রবণচতুষ্টয় সাধনমার্গের একখানি অধিরােহণী ও বিশেষ। শমাদি এবং শ্রবণাদি তাহার ক্রম- সােপানাবলী—পৰ্য্যায়িক ধাপ বা পাদানস্বরূপ। তত্ত্বজ্ঞান লাভ ইহার চরম বা শেষ-সােপান , ধিরােহিণীতে উঠিতে হইলে লােকে যেমন পর্বে পর্বেব—ধাপে ধাপে উঠিয়া থাকে, একটা ধাপ ত্যাগ করিয়া তদোর্ধ ধাপে উঠিতে পারে না, উঠবার চেষ্টা করিলে পতন সম্ভাবনা থাকে। এ সাধনমার্গের অধিরােহণও শমের ধাপে উঠিলেই (শম অভ্যস্ত হইলেই ) দম স্বতঃই আসিয়া উপস্থিত হয়, কিন্তু শম ছাড়িয়া দমে উঠিতে চেষ্টা করিলে দম লাগিয়া চেষ্টা ত ব্যর্থ হয়ই, অধিকন্তু দমের জন্য পতনেরও সম্ভাবনা থাকে। অতএব বলা যাইতে পারে যে, লৌকিক অধিরােহণীর সােপানাবলীর ন্যায়, ইহারাও পরস্পর আপেক্ষিক, সুতরাং যুগপৎ অভ্যসনীয়। সাধকমাত্রেরই এটী সর্বথা স্মরণ রাখা অবশ্য কর্তব্য। ইহারা তত্ত্ব-জ্ঞানােদয়ের সুকর উপায় বা সহায়, সুতরাং ইহাদের অনভ্যাসে বা অভাবে কদাপি তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইতে পারে না। কথিত আছে যে, ঠিক তদৎ। * অধিরােহিণী ইত্যপি পাঠঃ।

সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। বিদুর বামদেবাদি ইহজন্মেই সাধন-সম্পত্যাদির অনভ্যাসে অনুষ্ঠান ব্যতিরেকেই তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন, একথা ধ্রুব- সত্য। বর্তমান সমাজেও এ প্রকার লােক বিরল নহে। জন্মান্তরীন সংস্কারই ইহার কারণ, অর্থাৎ পূর্বজন্মকৃত প্রবল অনুষ্ঠান-সংস্কার পরজন্মে শিশুর স্তন্যপানাভিলাষবৎ বিনা শিক্ষায় স্বতঃই প্রকাশ পাইয়া তাহাদিগকে তত্ত্বজ্ঞানী করিয়াছিল। সুতরাং অভ্যাস রা সাধন ব্যর্থ নহে—সার্থক। কোন এক জন্মে তাহা অবশ্য আনুষ্ঠেয় । অতএব বলা যাইতে পারে যে, নিত্যা- নিত্যবস্তু-বিচারাদি এবং শ্রবণাদি সাধন-সম্পত্তির অনধিগতে কিম্বা অনভ্যাসে বা অভাবে বিবেকের উদয় হয় না। বিবেকের অনুদয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় না এবং তত্ত্বজ্ঞানের অলাভে বাসনা ক্ষয় ও মনােনাশ বা মনােনিবােধ অসম্ভব, সুতরাং এমতাবস্থায় অধিকারীত্বই অপূর্ণ রহিয়া যায়। আর অপূর্ণ অধিকারী কদাপি মুমুক্ষুপদবাচ্য হতে পারে না। অপূর্ণ অধিকারী এবং অনধিকারী উভয়েরই পক্ষে স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি লাভ অসম্ভব। কেবল সাধন-সম্পত্তিযুক্ত মুমুক্ষুই ইহার একমাত্র অধিকারী। তত্ত্বজ্ঞানের কথা—উপরে যাহা যাহা বর্ণিত হইল,তদ্বারা আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতেছি যে, স্ব-স্বরূপসিদ্ধি সাধন বা জীব- “বিবেকে। নাম বিভজ্য নিশ্চয়ঃ” অর্থাৎ পঞ্চভূতাত্মক পদার্থ মাত্রেই ব্যবহার কালে উপাধি বা শরীর বৎ ভিন্ন এবং সত্যবৎ বােধ হইলেও উপাধি বিশ্লেষে তাহারা অনিত্য এবং মিথ্যা বলিয়া প্রতীয়মান হয়, এক কথায় ভেদজ্ঞান মিথ্যা, এবাধ নিশ্চিত জ্ঞামের নাম বিবেক।

২৮ বরূপসিদ্ধি। সহজ ০ মুক্তির জন্য অধিকারী মাত্রেরই এই দ্বিবিধ কম পৰ্য্যায়িক সাধন সমকালীন বা যুগপৎ অনুষ্ঠেয় বা অভ্যসনীয়, যথা তত্ত্বজ্ঞান এবং মনােনিবােধ। তত্ত্বজ্ঞানের সাধন শ্রবণাদি এবং মনােনিরােধ বা নাশের সাধন যােগ এবং জ্ঞান বা সম্যকদর্শন। কথায়, অধিকারী প্রথমতঃ শ্রবণাদি-সাধন অভ্যাস দ্বারা তত্ত্বজ্ঞান লাভ পূর্বক অল্পে অল্পে মনােনিবােধ অভ্যাস করিবে এই মনােনিয়ােধের পরিপাক-ফলই স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি। সবিশেষ “মনােনিবােধ স্বরূপ নির্ণয়” ৪র্থ অধ্যায় দেখ। এখন দেখা যা তত্ত্বজ্ঞান কাহাকে বলে। রূপ রসাদিময় জগৎ মায়িক মিথ্যা সুতরাং অবস্তু—অসার। ইহার অধিষ্ঠান সত্তা আই একমাত্র বস্তু—সার পদার্থ। এবম্বিধ নিশ্চিত বােধের নাম তত্ত্বজ্ঞান। তত্ত্বজ্ঞানােদয়ে সাধকের বােধ হয় যে, সচ্চিদানন্দময় অদ্বয় ব্ৰহ্মই একমাত্র বস্তু, অবশিষ্ট নামরূপাত্মক জগভিধেয় সমুদায়ই অবস্তু। এ বােধ বা প্রতীতি কেবল প্রতীতিমাত্র হইলে চলিবে না। ইহা কার্যে পরিণত হওয়া আবশ্যক। তত্ত্বজ্ঞানের অবাধ স্থিতির জন্য তৎ অনুষ্ঠান করিতে হইবে, অর্থাৎ উৎপন্ন তত্ত্বজ্ঞানের সঙ্গে অল্পে অল্পে মনােনিরােধের জন্যও প্রয়াস পাইতে হইবে। তত্ত্বজ্ঞানের অবাধ স্থিতি লাভ না হইলে, অর্থাৎ মন চঞ্চল থাকিলে “এজগতে নানা সত্য নহে, একই সত্য” কেবল মুখে এ কথা বলিলে কোন কালেও কিছু ফলােদয় হইবার সম্ভাবনা নাই। কেননা, রূপরদিময় জগৎ অন্তরে (মনে মনে) সত্য বলিয়া বােধ থাকায়, প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে তাহাদিগের সাধনরূপ নির্ণয়। ২১ সহিত ইন্দ্রিয়াদির সংযােগে তােমার ইচ্ছা না থাকিলেও তােমার চঞ্চল মনে বৃত্তি আৰ্হিত হইবেই হইবে—মন বহু-সত্য-গ্রহণে পরিপুষ্ট হইবে। সাধ্য কি যে তুমি সে গতি নিরুদ্ধ কর ? কাষ্ঠ প্রদানে বহিজালা যেমন নিবৃত্ত না হইয়া উত্তরােত্তর সম্বৰ্ধিত হয়, মনও তদ্বৎ ইন্দ্রিয়াদির সহায়ে পুনঃপুনঃ বিষয় গ্রহণ করিয়া পরিপুষ্টবৃত্তিক বা স্থূল হইয়া থাকে। যেমন বায়ু-সঞ্চা- লিত দীপালােকে অধ্যয়ন করা যায় না, এবং মণিমুক্তাদির লক্ষণও অবগত হওয়া যায় না; যেমন স্থূল খণিত্রাদির দ্বারা সূচীবৎ ছিন্ন বস্ত্র খণ্ডের সংযােজন অসম্ভব, সেই মত বহু সত্যে পরিপুষ্ট- বৃত্তিক স্থূল মনের দ্বারা অর্থাৎ বহু সত্যভাবে ভাবিত মনে এক সত্য ধারণ করাও তদ্বৎ অসম্ভব। এবম্বিধ প্রকারে বহু সত্য- ভাবে ভাবিতমনা সাধক “এ সংসারে নানা সত্য হে, একই সত্য, কেবল মুখে এ কথা বলিলে “যজমান প্রস্তাবৎ” দুইটা প্রত্যক্ষ বিরুদ্ধ পদার্থের উচ্চারণ ন্যায়ে সাধকের আচরণ মুখে এক এবং মনে আর হওয়ায়, সাধক যত বড় বেদান্তবিদই হউন , কদাপি তাহার তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইতে পারে না, এবং তত্ত্ব- জ্ঞানের অলাভে অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মতত্ত্বের উদয় হয় না, এবং ব্ৰহ্মতত্ত্বের অনুদয়ে বা অজ্ঞাতে কামাদি বাসনার নিমিত্তভূত মিথ্যা দৃশ্য বা জগতের সত্যত্ব প্রতীতিরূপ যে ভ্রম বা মিথ্যাজ্ঞান তাহা নষ্ট হয় না, অর্থাৎ দৃশ্য সত্য বলিয়া বােধ থাকায় বাসনারও ক্ষয় হয় না। সুতরাং“নেহ নানাস্তি কিঞ্চন”রূপ গলাবাজীই সার হয়। ফলস্বরূপসিদ্ধির অলাভ—পুনঃ পুনঃ জনন, এবং মরণ। বলা ০ স্বরূপসিদ্ধি। বাহুল্য যে, বাৰ্তমানিক প্রায় তাবৎ বেদবেদান্তবিদের অবস্থাই এইমত। শতেক বেদান্তবিদের মধ্যে একজন ব্রহ্মবি মেলা ভার। প্রতিবন্ধ জয়ের কথা-এখানে বলা আবশ্যক যে, সাধন- মাত্রেই অনুকূল এবং প্রতিকূল উভয়াক। এ যাবৎ অনুকূল সাধনের কথাই বলা হইল। এক্ষণে প্রতিকূল সাধন বা প্রতি- বন্ধের বিষয় বলা যাইতেছে। স্বরূপসিদ্ধিতে বা জীবমুক্তিতে প্রতিবন্ধবাহুল্য প্রত্যক্ষসিদ্ধ, তাহাতে বােধ হয় কাহারও সন্দেহ নাই। বিচার দ্বারা তত্ত্বজ্ঞান লাভ বা স্ব-স্বরূপ উপলব্ধি হইলেও প্রতিবন্ধ দূর না হওয়ায় পুরুষে সে জ্ঞান প্রতিফলিত হ, না - স্থিতিলাভ করে না। ভূত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান ভেদে এই প্রতিবন্ধ ত্রিবিধ যথা- অতীত প্রতিবন্ধ এবং সাধনালব্ধ সাধকেরকথা- অতীতকালের যে কৃতকর্মের সংস্কার বর্তমানে সূক্ষমাকারে মনােমধ্যে স্ফুর্তি পাইয়া স্বরূপসিদ্ধির অন্তরায় হইয়া থাকে তাহার নাম তাতীত প্রতিব, যেমন উপভুক্ত কামিনীবিষয়ক রাগ। এই রাগ শব্দের অর্থ উপভূক্ত সুখানুস্মৃতি এবং দুঃখানু- স্মৃতির নাম দ্বেষ। লােকে সচরাচর দেখা যায় যে, সুখ হউক বা দুঃখ হউক, ভােগ হইয়া পাওয়ার পরও তৎ পদার্থে রাগাদি থাকিয়া যায়, তাহার কারণ কি? কারণ ভােগাভ্যাস জনিত স্মৃতি বা সংস্কার। এই স্মৃতিই সেই উপভুক্ত পদার্থকে মনে জাগরুক করিয়া দেয়। কিন্তু ভােগ ত দূরের কথা, সাহা কখনও দৃষ্ট হয় নাই, শ্ৰত হইবামাত্র সে পদার্থ বা বিষয়েও জীবের রাগাদি , -ভূত বা সাধন:স্বরূপ নির্ণয় । হইতে দেখা যায় কেন ? ইহার কারণ কি? কারণ, পূর্ব জন্মে সেই বিষয় উপভােগ জনিত সঞ্চিত সংস্কারের স্ফুৰ্ত্তি। বর্ত- মান জন্মে ঈদৃশ স্ফুর্তি-প্রাবল্যে সাধক বিক্ষিপ্ত চিত্ত হয়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়ে। অনেক সময় সাধককে সাধন পথ হইতে বিভ্রষ্ট হইতেও দেখা যায়। বলা বাহুল্য যে, রাগজনিত এবম্বিধ বিক্ষেপ তাহার সাধন মার্গের সমূহ অন্তরায়। এখন কথা হইতেছে যে, এমতাবস্থায় সাধকের কি করা কর্তব্য ? উপভুক্ত বিষয় পুনঃ ভােগ করিবার জন্য এবম্বিধ তীব্র রাগাদি উপজিত হইলে, সাধক তদৃবিক্ষেপ নিবারণার্থে তাহার মনকে হঠাৎ উপভােগ্য বিষয় হইতে বিচালিত কিম্বা বলপূর্বক আকর্ষণ করিবেন না, কিয়ৎকাল নিবৃত্ত ( neutral) থাকিবে এবং পুনঃ পুনঃ ভােগ্য বিষয়ের দোষাদি দর্শন, শাস্ত্ৰসিদ্ধ অদ্বৈত ব্ৰহ্ম-তত্ত্বের অনুস্মরণ এবং ভােগ্য বস্তুর তাদর্শন ইত্যাদি প্রকারে বিচার করিতে থাকিবেক ; প্রবল ইচ্ছা হইলে বিচার সহিত * উপভােগ্য বস্তুর সাময়িক দর্শনাদিও করিতে পারে। এবম্বিধ আচরণে ; এখানে বলা আবশ্যক যে, যেমন বন এবং উপবন কিংবা নগর এবং উপনগর এক নহে—ভিন্ন। উভয়ে কিছু পার্থক্য আছে, সেইমত. ভােগ এবং উপভােগ এক নহে—ভিন্ন। উভয়ে কিঞ্চিৎ বিশেষ আছে। বিচার বহিত পশ্বাদিৎ ভোগের নামই উপভােগ, ইহাতে কদাপি তৃপ্তি হয় না। আর সবিচার হইলেই তাহাকে ভােগ বলে। আবশ্যক হইলে তৃপ্তির জন্য সাময়িক সবিচার ভােগই শ্রেয়। শাস্ত্রে ভোগের পরিবর্তে উপভােগ” শব্দের প্রয়ােগ এই জন্যই হইয়াছে।

রূপসিদ্ধি। কালে রাগ বা বাসনা ক্ষয়ানন্তর মন আপনিই পুনঃ সাধনােম্মুখী বা প্রত্যকপ্রবণশীল হইবে, তাহাতে আর অনুমাত্র সন্দেহ নাই। ইহাকে মনের কষায় অবস্থা বলে। সূক্ষদর্শনে ইহা বিক্ষেপেরই অন্তর্গত। সবিশেষ “মনের অবস্থা চতুষ্টয়”৪র্থ অধ্যায় দেখ। এখন এমন কথা বলিতে পার যে, দীর্ঘকাল ধরিয়া এমন কি দেহান্ত পর্যন্ত যদি উক্তবিধ রাগ বা বাসনা ক্ষয় না হয় তাহা হইলে উপায় কি? গত্যন্তর নাই। সে জন্মের সাধনের সেই স্থানেই ইতি দিতে হয়। এ প্রকার ঘটনাও বিরল নহে। সাধকই এইমতে অলব্ধসাধন হইয়া শেষে হা হতােস্মি করিয়া মৃত হয়। ভবিষ্যৎ প্রতিবন্ধ এবং যােগভ্রষ্টের কথা--জীবের জীবিতা- বস্থায়, বর্তমান জীবনে কৃত তাবৎ কৰ্ম্মসংস্কার দেহান্তকালে একতবিক ও হইয়া অর্থাৎ একই জন্মের কারণ হইয়া জীবকে অনেক (১) একটী কৰ্ম্ম একটা জন্মের কারণ হইতে পারে না, কেননা জন্ম গ্রহণ হইতে অসংখ্য কৰ্ম্ম কত হওয়ায় দোকালে তাহাদের ফলম- বিনি হেতু নিয়মিত হইতে পারে না, আর এপ্রকার হইলে কোন কালেও জীবের মুক্তি হয় না। সুতরাং ইহা অযুক্ত। (২) একটা কৰ্ম্ম অনেক অন্মেরও কারণ হইতে পারে না, কেননা, তাহা হইলে অবশিষ্ট কৃতকর্মের বিপাক বা ফলােম্মুখতায় কালের বা সময়ের অভাব প্রসক্তি হয়, সুতরাং ইহাও অযুক্ত। (৩) অনেক কর্ম অনেক জন্মেরও কারণ হইতে পারে না, কেননা, অনেক জন্মের যুগপৎ উৎপত্তি অসভব। উৎপত্তি কমপৰ্যায়েই হইয়া থাকে। সুতরাং ইহাও সদোষ।

সাধন:সরূপ নির্ণয়। দেহান্তর গ্রহণ করায়। সেই জন্মারক সংস্কার নূতন দেহে স্বরূপসিদ্ধির অন্তরায় হয় বলিয়া তাহাকে ভবিষ্যৎ প্রতিবন্ধ বলে। বামদেব ঋষির একই জন্মে এবং জড়ভরতের ক্রমান্বয়ে তিন জন্মে, এই ভবিষ্যৎ প্রতিবন্ধ পরিক্ষীণ হইয়া,তবে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হইয়াছিল। অতএব বলা যাইতে পারে যে, যে কাৰ্য্য স্বরূপসিদ্ধির জানুকুল নহে, প্রতিকুল বা প্রতিবন্ধ স্বরূপ, তাহা ( বিধিপ্রতিষেধমূলক শাস্ত্রোক্ত ) ধৰ্ম্মকাৰ্য্য হইলেও, স্বরূপসিদ্ধি সাধনেচ্ছু কদাপি তাহার তানুষ্ঠান করিবে না, যেহেতু তাহা তত্ত্ব- জ্ঞানের বিস্মারক সুতরাং বন্ধের কারণ স্বরূপ, তবে কথা কি যে, তত্বজ্ঞান কোনকালেও নিস্ফল বা ব্যর্থ হইতে পারে না। একজন্মে না হউক, প্রতিবন্ধ পরিক্ষীণ হইবামাত্রেই তাহা সাধকে প্রতিফলিত হইবে, এবং যথাকালে তাহা মুক্তি বা সিদ্ধিফল প্রসব করিবেই করিবে। তাহাতে অনুমাত্র অনুমাত্র সন্দেহ নাই। ভাল, একটা লৌকিক দৃষ্টান্ত দিতেছি শুন, বিষয়টা সহজগম্য হইবে। মনে কর, তুমি রেলগাড়ীতে বর্ধমান হইতে কাশী যাইতেছ, মধ্যপথে বৈদ্যনাথ দেখিবার জন্য অবতরণ করিলে, বৈদ্যনাথ দেখার পর, তথা হইতে কাশী দর্শনার্থ যাত্রা করিবে কি বর্ধমানে ফিরিয়া আসিয়া তথা হইতে যাত্রা করিবে ? আরম্ভ (৪) অত এব বলা যাইতে পারে যে, জীবের আমরণ তাবৎ কৃতকর্ম দেহান্তকালে একতবক অর্থাৎ এক জন্ম সঞ্চিত হয়। একই জন্মের উৎপত্তি করে। সবিশেষ “জীবতা বিবেক-কৰ্ম্মত এবং আয়ু T ২•••২১৪ এবং ২৮ ২৯০ পৃষ্ঠা দেখ।

৩৪ স্বরূপসিকি। मक्षिक হইতে যতটুকু পথ অতিক্রম করিয়াছ, তাহার পর (বৈদ্যনাথ ) হইতেই যাত্রা করিবে নিশ্চিত। সাধন রাজ্যের ব্যবস্থাও ঠিক এইমত। তুমি স্বরূপসিদ্ধির জন্য জন্মান্তরে যতটুকু সাধন করিয়া আসিয়াছ, যেমন লব্ধভূমিক হইয়াছ, বর্তমান জন্মে তাহার পর ভূমি হইতেই আরম্ভ হইবে। কদাপি প্রথম ভূমি হইতে নহে। কেন না, তানুষ্ঠান ফল ব্যর্থ হয় না। সাধন করিতে করিতে, যদি কোন বহিব্যাপারে আকৃষ্ট হইয়া সাধন হইতে বিরত হয়, কিম্ব লব্ধভূমিক (অর্থাৎ স্বরূপসিদ্ধি- সাধনে সিদ্ধ ) হইবার পূর্বেই দেহত্যাগ হইয়া যায়, তবে পরজন্মে জন্মান্তরীণ সাধনফলস্বরূপ বুজিযেগ প্রাপ্ত হয় এবং যােগ বা স্বরূপসিদ্ধি বিষয়ে অধিকতর যত্ন করে, বলা বাহুল্য যে, পূর্ব জন্মকৃত সাধনাভ্যাস তাহাকে বিষয় সুখ হইতে পরাবৃত্ত করিয়া স্বরুপসিদ্ধি-নিষ্ঠ করিয়া তুলে। ইনিই যােগভ্রষ্ট নামে অভিহিত। যােগভ্রষ্টের লব্ধফল ব্যর্থ হয় না। বমান-প্রতিবন্ধ এবং বিষয়ানন্দ ও ব্রহ্মানন্দের কথা- বর্তমান প্রতিবন্ধ খাবার চারিভাগে বিভক্ত যথা—(ক) বিষয়া- শক্তি (খ) মন্দবুদ্ধি (গ) কুতর্ক এবং (ঘ) বিপৰ্যয় অর্থাৎ মিথ্যা বিষয়ে দৃঢ় অভিনিবেশ। ইহাদের মধ্যে বিষয়াশক্তিই প্রধান। অবশিষ্টগুলি এই বিষয়াশক্তিরই অন্তর্নিবিষ্ট,অবান্তর ব্যাপার বিশেষ। প্রথমত দেখা যাক বিষয় কি? ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরু এবং ব্যোম এই পঞ্চমহাভূতের পঞ্চগুণধর্ম যথা গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ এবং শব্দ ইহাই বিষয়, সুতরাং বিষয় বলিলে, এই ।

'ধন-স্বরূপ নির্ণয়। বলি শুন । পরিদৃশ্যমান প্রপঞ্চকেই বুঝায়। টাকা, কড়ি, জমিদারী ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় এই বিশাল জগৎ বিষয়েরই অন্তর্গত। ঈদৃশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়াশক্তি-পরিবর্জিত ব্যক্তি প্রকৃত বিষয়ত্যাগী নহে, তবে সে প্রবৃত্তি প্রাপ্তবিন্দু ত্যাগে—নিবৃত্তিতে উপনীত হইবার আয়েন অভ্যাস করিতেছে মাত্র, প্রকৃত বিষয়ত্যাগী কে ? তাহা তত্ত্বজ্ঞানােদয়ে মনের নিরােধে তত্ত্বজ্ঞানের স্থিতি হেতু জগৎ মিথ্যা বলিয়া প্রতীয়মান হয়, তখন তার মনে জাগ- তিক সংস্কার—পদার্থাদিবিষয়কবৃত্তি নূতন করিয়া কহিত হয় না, যাহা থাকে তাহাও ক্রমে নিধৌত হইয়া যায়, সুতরাং তােমার জগন্ময়-মন তখন চিন্ময়রূপে প্রকাশ পায়—মন বিষয় পরিশূন্য হয়। ভনিরােধ হয়। ইহারই নাম বিষয় ত্যাগ। তখন তােমার বােধ হইতে থাকে যে, নামরূপান্তক এই বিশ্ব তােমার বাহিরে, তাহারা বিষয়, তুমি বিষয়ী, তাহার জ্ঞাত, তুমি জ্ঞাতা, তাহাৱা কৰ্ম্ম, তুমি কর্তা। অতএব সিদ্ধ হইতেছে যে, স্বরূপ- সিদ্ধি সমধিগত বা জীবন্মুক্ত পুরুষই প্রকৃত বিষয়ত্যাগী অন্যে নহে বা হইতে পারে না। যিনি ব্রহ্মাকে ঈদৃশ বিষয় ব্যতিরিক্ত বলিয়া জানিয়াছেন, তাহারই স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি সমধিগত হইয়াছে। ব্ৰহ্মানন্দ বা ভূমা (অপরিচ্ছিন্ন নিত্য) সুখ কেবল তাহারই ভোগ্য, আর যে ব্যক্তি তদ্বিপরীত বুঝিয়াছে, অর্থাৎ বিষয়ে বা জগতে নিমগ্ন থাকিয়া মেথরগিরি হইতে সচিব গিরিরূপ জাগতিক তাবৎ ব্যাপার সম্পাদন পূর্বক গল্প এবং অনিত্য বিষয়ানন্দ উপভােগ করিয়া ব্ৰহ্মজ্ঞানে জ্ঞানী হইতে শপসিদি। —স্বরূপ সিদ্ধি বা জীবমুক্তি সমধিগত করিতে প্রয়াস পাইয়া থাকে সে নিতান্ত মূঢ়ধী। সমুদায় আনন্দের আধার সেই ব্ৰহ্মা- নন্দ কদাপি তাহার লভ্য নহে। যেহেতু, সে বিষয়-অত্যাগী। জগতে নিমগ্ন—জাগতিক বাসনায় তাহার মন পরিপূর্ণ। বিষয়ানন্দ ব্রহ্মানন্দ হইতে ভিন্ন নহে—বস্তুতঃ এক-আত্মা যদি মনুষের নিকট পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাইত,তবে তাহার বিষয়- স্পৃহারূপ প্রতিবন্ধ থাকিত না। আত্মানন্দেই সে বিভাের হইয়া থাকিত, বিষয়-স্পৃহা বা বিষয়ানন্দ তাহার আদৌ থাকিত না। কোহিনুর হস্তে পাইলে কে অন্য ধনের প্রয়াসী হয়? বােধ হয় কেহই না। তবে কথা কি যে, তাদৃষ্টে থাকিলে ত? প্রবাদ আছে যে, দরিদ্র পথিক পথ চলিতে চলিতে ঠিক পথিনিপতিত টাকার থলির নিকট গিয়া অন্ধভাণে বা অন্ধসাজিয়া তাহা অতিক্রম করিয়া চলিয়া গিয়াছিল। প্রায় লােমাত্রেই দুই নৌকায় পা দিয়া রহিয়াছে। বিষয়ানন্দ এবং ব্রহ্মানন্দ উভয়ই তাহাদের যুগপৎ অভিীত। কিন্তু তাহা কি সম্ভব? ইহা শ্রুতি এবং যুক্তি বিরূদ্ধ কথা। তুমি পৃথিবীতে অবস্থিত হইয়া কদাপি পৃথিবীর ঘূরণ দেখিতে পাও না, তাহা দেখিতে হইলে, তােমার গ্রহান্তরে যাওয়ার আবশ্যক। এইমতে জগতে মজিয়া, কাগতিক বা বৈষয়িক বাসনায় পরিপূর্ণ-মানস হইয়া জগৎ বা বিষয়াতিরিক্ত ব্রহ্মানন্দ কি কখন লভ্য হইতে পারে ? কখনই । তবে এখানে এ কথা বলা আবশ্যক যে, বিষয়-সুখ ব্ৰহ্মানন্দের লেশমাত্র। একটী পরিচ্ছিন্ন, অপরটা অপরিচ্ছিন্ন।

সাধন স্বরূপ নির্ণয় । ৩৭ পরিচ্ছিন্ন বিষয়সুখ অপরিচ্ছিন্ন ভূমাসুখ হইতে বস্তুতঃ ভিন্ন পদার্থ নহে। বিষয়সুখ-স্বরূপ বা ভূমা-সুখের দ্বার-স্বরূপ। বিষয়রূপ দ্বার দিয়া সরূপের ছুট। বাহির হয় মাত্র। বন্ধ বা বিষয়ী তাহা বুঝিতে পারে না। সে বিষয়ােপভােগ করিয়া মনে করে যে, উপভূক্ত বিষয়েই বুঝি সুখ দিল। বাস্তবিক তাহা নহে। সুখ, দিলেন সুখময়-আত্মা। একটু প্রণিহিত চিত্তে—স্থিরভাবে বিচার করিয়া দেখিলেই -- আমাদের এ কথা- গুলির তাৎপৰ্যার্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবে। ভাল, সংক্ষেপে বলি শুন, একটী বিষয়সুখ উপভােগ কালে তােমার মনে বিষয়া- স্তরের স্মৃতি উদিত হইতে পারে না। উদয়ের অবকাশাভাব হয়, যেহেতু একমনে যুগপৎ -একই সময়ে, দুইটা বিষয় কদাপি উপভূক্ত হইতে পারে না। ইহা যুক্তি বিরুদ্ধ কথা। শতপত্র- ভেদ ন্যায়ই ইহার দীপ্যমান প্রমাণ। বিষয়েপভােগ কালে মন নিরুদ্ধবৎ হয় এবং ক্ষণকালের জন্য পরিণাম বা বিক্ষেপশূন্য হইয়া, তােমার অজ্ঞাতসারে স্থিরভাবে তাহার স্বরূপে পরমাত্মায় অবস্থান করে, সহজ কথায়, তােমার জগন্ময়-মন (অহং বা পরিচ্ছেদাভিমানা কচিৎ )-তখন চিয় হইয়া যায়, তাই সুখময়-আত্মার প্রকাশে সুখ অনুভূত হইয়া থাকে, এবং স্বীয় সম্মুখস্থ দর্পণে মুখ প্রতিবিম্ববৎ উপভূক্ত বিষয়রূপ দর্পণদ্বার দিয়া সুখময় আত্মচ্ছটা বাহির হয়। অতএব সিদ্ধ হইল যে, আত্মার স্বরূপাবস্থা বা তােমার শরীরি চিন্ময় রূপই স্বরূপ সুখের উৎস। বিষষসুখ সেই উৎসের মৃদু বা কণপ্রবাহ স্বৰূপসিদ্ধ। ও চকিত মাত্র। তােমার অরূপরূপ ( দেহেন্দ্রিয়াদি রূপ) দ্বার দিয়া প্রবাহিত যাইয়া থাকে। ভােগে ভয় অভােগে ভয়। ইহা সর্বজনবিদিত কথা—বদ্ধ বা অনিরুদ্ধমন ভােগী বিষয় সুখােপভােগে যৎকথঞ্চিৎ পরিতৃপ্ত হইয়াই আপনাকে অন্ততঃ তৎকালের জন্য কৃতকৃত্য মনে করিয়া থাকে। বাস্তবপক্ষে, বিষয় বা সাংসারিক সুখ পরিণাম, তাপ এবং সংস্কার এই ত্রিবিধ দুঃখবিজড়িত, সুতরাং বিষয়সুখভােগ জনিত সংস্কার ও দুঃখ প্রদ ইপিচ, বৈষয়িক সুখভােগকালে ও ভবিষ্যৎ দুঃখের ভয়ে সকলকেই অল্প বিস্তর ভাত থাকিতে হয়। অতএব বা যাইতে পারে যে বদ্ধ বা বিষয়ী বৈষয়িক সুখকে সুখ বলিয়া মনে করিলেও মুমুক্ষুর পক্ষে তাহা হেয় এবং বিষমিশ্ৰিত অন্নবৎ পরিত্যজ্য। পক্ষান্তরে, দৈত বা দুই জ্ঞানই দুঃগ বা ভয়ের কারণ এবং দ্বৈত বা এক জ্ঞানই অভয়ের কার, জগৎ দ্বৈতাদ্বৈতময় সুতরাং ভয়াভয়ের কারণ, আর যাহা তবিমুক্ত তাহাই ভয়। এই একমাত্র ভয়। আর ভয় কোথায় নাই। বিষয়মাত্রেই ভয়-সঙ্কল। ভােগে রােগ ভয়। কুলে চ্যুভিয়। বিত্তে ঢৌৰভয়। মানে দৈন্য- বলে রিপুভয়। রূপে ব্যাধিভয়। শাস্ত্রে বাদিভয়। কায়ে যময়। জাতে ভয় শূন্য স্থান বা বিষয় কোথায় ? ব্ৰহ্ম বস্তুই একমাত্র অতয়। অতএব বলা যাইতে পারে যে, ভােগে ভয় এবং অভােগে গভয়। মুমুক্ষুর ইহা সর্বদা স্মরণ রাখ। কর্তব্য।

সাধন-পরূপ নির্ণয়। বিষয়ী বা বদের কৃতকৃত -- সংসারস্থ বদ্ধ বা বিষয় মাত্রেই জন্মান্তরীন অজ্ঞানসংস্কার প্রাবল্যে গৌণ বা সংসার- মুখীন কৰ্ম্মাদি জনিত অস্থির বা অনিত্য সুখোপতভাগকেই পরম ঈসীততমের সমাগমরূপ স্বরূপ সুখের বা ব্রহ্মানন্দের উৎস বা নিত্য সুখ মনে করিয়া পরমশ্রেয় বিয়া, তাহাতেই নিমগ্ন থাকে এবং স্বীয় যােগ্যতানুসারে কৃষি, বাণিজ্য এবং সেবাদি বিবিধ ব্যাপারে নিযুক্ত থাকিয়া ধন, মান এবং যশ ইত্যাদি অন পূর্বক বিবিধ কাব্যের সমাধান দ্বারা আপনাকে কৃতাৰ্থমন্য মনে করে, প্রকৃতপক্ষে,পরমার্থতঃ সে অকৃতকৃত্যই রহিয়া যায়। এবং মাংসশূন্য শুগস্থ্যাবলেহী কুকুরবৎ প্রবণিত হইয়া থাকে। যেমন মলিন দর্পণে মলাদি প্রতিবন্ধ বশতঃ ত হাতে কোন পদার্থই প্রতিবিম্বিত হইতে পারে না, হইলেও তাহা অত্যন্ত অস্ফুট, সেই মত এই বন্ধ বা বিষয়ীদিগের চিত্ত বিষয়াতুরাগে সর্বদ। তাভিভূত হেতু ইহাদিগকে তত্ত্বজ্ঞানের কিম্বা স্বরূপসিদ্ধির উপদেশ প্রদান করিলেও, ইহাদের জ্ঞানের আবির্ভাব হয় না, হইলেও তাহা বিদ্যুৎ ঝলকবৎ ক্ষণস্থায়ী। তন্মুহুর্তেই ইহার অভ্যাসবশাৎ নিজ নিজ ভিীত ব্যাপারে প্রধাবিত হয়। তাত, কেবল তুচ্ছ বিষয়ানন্দে ময়াি তাহাকেই সার ভাবিয়া দুর্লভ মনুষ্য জন্মকে গবাদিবৎ অতিবাহিত করিতেছ কেন? উঠ, শ্রোত্রীয় ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গুরুর নিদেশানুসারে মনকে বৃত্তি বিরহিত করিয়া নিরুদ্ধ করিতে শিক্ষা কর। তন্নিরােধে কি প্রকার বিমলানন্দ অনুভূত হইয়া থাকে তাহা একবার বুঝ, তাতএব বরূপসিদ্ধি। এবং বুঝিয়া দেহে প্রাণ থাকিতে থাকিতে, তদনুষ্ঠানে মনােনিবেশ জন্মসাফল্য লাভ কর। কব্যান্ত হও। বলা বাহুল্য যে, মনােনিরােধাভ্যাস দ্বারা স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত ব্যতীত এ সংসারে কৃতকৃত হইবার তার দ্বিতীয় পন্থা নাই। যেহেতু কর্তব্যের সংখ্যা অগণ্য-তাসংখ্য, এক জীবনে কি, শত জীবনের কৃত্য দ্বারা তাহার সমাধান সম্ভব। সবিশেষ ২১ পৃষ্ঠা দেখ। (খ) মন্দ বুদ্ধি—যেমন উৰ্ধবিচরণশীল বায় পার্থিব জলে তরঙ্গ উৎপাদন করিতে পারে না, সেইমত গুরুমুগে বা শাস্ত্রমুখে বেদান্তাদির উপদেশ মন্দবুদ্ধি ব্যক্তির হৃদয়স্পর্শ করিতে পারে । বাক্যস্ফুর্তিপ্রায় বাহ বায়তেই বিলীন হইয়া যায়। সহজ কথায়, উচ্চ উপদেশ মন্দবুদ্ধি ব্যক্তির পক্ষে নিরর্থক। যেমন দূষিত মৃত্তিকায় বীজ বপন করিলে, ভাগ্যবলে বীজের অঙ্কুর উৎপাদন হইলেও, তাহা যেমন বীজানুরূপ হইতে পারে , সেইমত দূষিত বা আকৃষ্ণ-চিন্তে-বিবিধ-বৃত্তিযুক্ত বহু সত্য- ভাবে ভাবিত স্থূলমনে সদুপদেশ প্রদান করিলেও উপদেশানুরূপ জ্ঞান সমুৎপন্ন হয় না, সুতরাং তাহা নিরর্থক বলিতে হয়। (গ) কুতর্ক-- শ্ৰত্যানুসারণী মার্গ অবলম্বন করিয়া স্বকীয় সসীম বুদ্ধি দ্বারা অসীম হত এবং অচিন্ত্য বিষয় সকলের মীমাংসার জন্য শুদ্ধ বাক্য যােচনা করার নাম কুতর্ক। বিপৰ্যয় এবং তাহার হস্তুত প্রভাবের কথ:-- (ঘ) বিপৰ্যয়- * 'বিপণ্যয় এবং সংশয় দুই মিথ্যা জ্ঞানের দ্যোতক ইলেও, উভয়ে কিঞ্চিৎ পার্থক্য আছে যথা—এটা হ! কি না” এবম্বিধ অনিশ্চিত মিথ্যা সাধন স্বরূপ নির্ণয়। ১১ আত্মাতে অনান্য ধর্মের আরােপ করিয়া যুক্তি ব্যতীত তাহাতেই আস্থাবান হওয়ার নাম বিপৰ্যয়। সহজ কথায়,বিপৰ্যয় শব্দে মিথ্যা জ্ঞান,মিথ্যা-বিষয়ে দৃঢ় অভিনিবেশ,যেমন দেহে আত্মবুদ্ধি। প্রপঞ্চে নাজগতে সত্য জ্ঞান ইত্যাদি। ইহার পর পর্যায় বিপৰ্যাস। এ বিষয় সহজে বােধগম্য হইবার জন্য পৌরাণিক ঋভূ নিদাঘ সংবাদ নিম্নে সংক্ষেপে বিবৃত করা গেল। ব্রহ্মবিদ ঋভূ অত্যন্ত করুণাপরবশ হইয়া কৰ্ম্মজড় নিদাঘ গৃহে আগমন পূর্বক তাহাকে নানাপ্রকারে বুঝাইয়া বলিলেন যে, কৰ্ম্ম অনিত্য, মােক্ষ নিত্য। অনিত্যের দ্বারা নিত্য লাভ বা কৰ্ম্ম দ্বার! মােঙ্গ প্রাপ্তি অসম্ভব। কেন না, সংসাবে যত কিছু কৰ্ম্ম কৃত হয়, তাহার পরিণাম ফল চতুধি, পঞ্চবিধ নাই যথা—উৎপাদ্য, প্য, বিকাৰ্য, এবং সংস্কাৰ্য। যেমন কুষ্যাদি দ্বারা শস্যোৎপত্তি, অগ্নি সংযােগে সংশয়ে না ভোগ সুখ হয়, না মােক্ষলাভ বা স্বরূপ সিদ্ধি হয় । অতএ! মুমুক্ষু এক কালে সংশয় ত্যাগ করিবে। আর নিশ্চিত মিথ্য। জ্ঞানের নাম বিপর্যয়। বিপর্যয় থাকিও কদাপি স্বরূপসিদ্ধি বা মোক্ষলাভ হতে পারে না। তই স্মৃতিতে উক্ত হইয়াছে *অজ্ঞশ্চা- শ্রদ্ধাধন সংশয়াত্মা বিনত।” এখানে অশ্রদ্ধা শব্দের অর্থ বিপর্যয়। আব এই বিপর্যয়, প্রমাণ ( শাস্ত্রাদি) এবং বিকল্প লইয়াই জীবের ব্যবহারিক জাগ্ৰদাবস্থা। দেদর্শনহেতু ইহার নাম জাদাবস্থা। কিন্তু ভেদদশন মিথ্য। সুতরাং এ জাগরণও মিথ্যা, প্রকৃত নহে। জাগরণে প্রবুদ্ধ হইলে কিন্তু অভেদ দশন হয়। তখন প্রমাণাদি সব মিথ্যা বলিয়া বােধ হয়, যেহেতু তাহা মনােধৰ্ম্ম-মুলক। ৩য় অধ্যায়ে টিপ্পনীতে “প্রকৃত জাগ্র“ দেখ এবং ৪র্থ অধ্যায় “বৃত্তি সংখ্যা” দেখ। জ্ঞানের নাম সংশয়। প্রকৃত 82 স্বরূপসিদ্ধি। ধাতুমল সংস্কার। গমনাদির দ্বারা স্থানাব্যাপ্তি এবং অম্লাদি যােগে ক্ষীরাদির দধ্যাদিরূপ বিকার। আত্মা কিন্তু তনুৎপাদ্য, অসংস্কাৰ্য, অনাপ্তব্য বা অগ্রাহ্য এবং বিকাৰ্য্য। এহমতে চতুধি গুণধৰ্ম্ম ব্যতিরিক্ত ককৃত আত্মা কদাপি চতুধি গুণ- ধৰ্ম্মারূক কৃত-কর্মদ্বারা লভ্য নহেন। এবম্বি প্রকারে বহুধ। বুঝাইয়া, জ্ঞানামুক্তি বলিয়া, ব্রহ্মবিদ্যা বিষয়ে উপদেশ প্রদান পূর্বক গমন করিলেন। কিন্তু নিদাঘ তাহা বুঝিয়াও পূর্ব সংস্কার বশাখ উপদিষ্ট বিষয়ে তা শ্রদ্ধ: পূর্বক কৰ্ম্মাদি পরম পুরুষার্থের হেতু, এবম্বিধ বিপর্যয়ের বশবর্তী হইয়া থাপৃৰক কৰ্ম্মানুষ্ঠানেই প্রবৃত্ত হইল। শিষ্য স্বীয় গনতা বা মিথ্যাভান বণতঃ স্বরূপ- সিদ্ধি বা আত্মা ভরূপ পরমপুরুষার্থ হইতে ভ্রষ্ট হয় এই ভাবিয়া ব্রহ্মবিদ্ গুরু ঋভু পুনর্বার কৃপাকরিয়; শিষ্যগৃহে আগমন পূর্বক তাহাকে বিশেষ করিয়া বুঝাইলেন, তাহাতে ও নিদাঘের বিপৰ্যয় দূর হইল না। গুরুকর্তৃক এবম্বিং প্রকারে তৃতীয় বার প্রবুদ্ধ হইয়া নিদাণ স্বকীয় সংশয় দূর করিয়া স্ব-স্বরূপােলব্ধির দ্বারা চিত্তে স্বেৰ্য্য লাভ করিয়াছিল । প্রশান্ত মানস হইয়াছিল। বিপৰ্যাসের প্রভাব দেখ ! ব্ৰহ্মবিদ গুরুর উপদেশও ব্যর্থ হইতেছিল। ভাল একটা লৌকিক দৃষ্টান্ত দিতেছি শুন—এক খণ্ড কাষ্ঠে সুরাসার (spirit মাখায়া প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলেও, অগ্নি তাহাকে দগ্ধ করিতে পারে না, সুরাসার রূপ প্রতিবন্ধই তাহার কারণ। প্রতিবন্ধ দূর হইলেই কাষ্ঠখণ্ড দগ্ধ হইতে আরম্ভ হয়।

সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। বিপর্যয় নাশ—এই প্রপঞ্চ বা জগৎ যতদিন পর্যন্ত জীবের মনে সত্যবৎ প্রতিভাত হইতে থাকে, যতদিন পর্যন্ত জাগতিক সংশয় বিপৰ্যয়ােৎপন্ন তাসম্ভাবনা এবং বিপরীত ভাবনারূপ কাৰ্য্যাদি যেমন পৃথিবীর অচল, শবের সচল, প্রেতের বাক্যকথন, মনুষ্যের সমুদ্ৰশােষণ সহস্রবাহুবত্ব এবং কৰ্ম্মের মুক্তি-দাতৃত্ব ইত্যাদি প্রকৃত বলিয়া বােধ হইয়া থাকে, এবং তদনুসারে ব্যবহারিক কাৰ্যাদি বা সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে থাকে, ততদিন তাহার পক্ষে সংশয়চ্ছেদ এবং বিপৰ্যয় নাশ অসম্ভব। কিন্তু যাহার নিকট জগৎ ব্যবহারঃ সত্য হলেও পরমার্থতঃ মিথ্যা, সেই তত্ত্বজ্ঞানীর নিকট, এই সকল ব্যাপার তুচ্ছ—অলীক বলিয়া বোধ হয়, যেহেতু ইহার। মিথ্যা জগতেরই অন্তর্গত। কথিত আছে যে, শুকদেব তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়া চিত্তে স্থ্যৈ লাভ করিতে না পারায়, অর্থাৎ মনননিরােধ করিতে অসমর্থ হইয়া অত্যন্ত বিমর্ষভাবে উপবিষ্ট আছেন, তাঁহাকে এ প্রকার উন্মনা দেখিয়া তদীয় পিতামহ মহর্ষি পরাশর তাঁহার শান্তির জন্য বলিয়াছিলেন, তাত, সংশয় এবং বিপৰ্যয়ােৎপন্ন অসম্ভাবনা এবং বিপরীত ভাবনারূপ প্রতিবন্ধসত্বে ব্যক্তিতে প্রদীপ্ত জ্ঞানাগ্নি সঞ্জাত হইলেও, সে জ্ঞান তাহার চিত্তমল দগ্ধ করিতে পারে না। বিপৰ্যয়াদি নাশ হয় না। তত্ত্বজ্ঞানফল স্ব-স্বরূপােলব্ধি প্রতিবদ্ধ রহিয়া যায়---প্রকাশিত হইতে পায় না । অতএব, তাত, অগ্রে তাহা বিনষ্ট কর, চিত্তচাঞ্চল্য দুর হইবে।

s রূপসিদ্ধি। করিলে ও কোন সহজেই মন, নিরিন্ধন অগ্নিবৎ স্বযােনিতে উপশান্ত হইবে। অতএব বলা যাইতে পারে যে, সংশয় এবং বিপৰ্যয় নাশ না হইলে তত্ত্বজ্ঞান লাভ সুদুপরাহত। এবং তত্ত্বজ্ঞানের অনধিগতে মনােনিরােধও সম্ভবপর নহে। এবং মনােনিবােধের অভাবে স্ব-স্বরূপােলব্ধি সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পাবে না। ইহারা পরস্পর আপেক্ষিক এবং যুগপৎ সহ অভ্যসনীয়। কদাপি এক একটা করিয়া নহে। যেহেতু, ভােজন ব্যাপারে শাক, সূপ এবং ওদনাদি তান্নব্যঞ্জনের মধ্যে প্রত্যহ এক একটী করিয়া ভক্ষ! করিলে, যেমন ভােজনসিদ্ধ হয় না, তদৎ তত্ত্বজ্ঞান, মনােনাশ প্রভৃতি সাধন এক একটী করিয়া আমরণ অভ্যাস ফললাভ হয় সাধক মাত্রেই ইহা সর্বদা স্মরণ রাখিয়। অনুষ্ঠানাদি করিবে। সবিশেষ অর্থ অধ্যায়ে “তত্ত্বজ্ঞানাদি সাধনত্রয় যুগপৎ অভ্যসনীয়”—দেখ। সমূহ প্রতিবন্ধ নাণের উপায়—সাধন চতুষ্টয় এবং শ্রবণ চতুষ্টয় যথাবিধি অভ্যাস করিলে, তত্ত্বজ্ঞানের উদয়ে এবং মনো- নিরােধের প্রভাবে, প্ৰােক্ত সমুদায় প্রতিবন্ধ একে একে গন্তহিত হইয়া যায়, তখন দিব্য আত্মজ্ঞান শৈত্যাপগমে জল শৈত্যপ্রতিবন্ধ তেজ প্রকাশবৎ স্বতঃই প্রকাশিত হইয়া পড়ে। সাধনান্তরের তাপেক্ষা থাকে না। স্ব-স্বরূপেলব্ধি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুরক্ষিত হয়। ইহারই নাম স্বরূপসিদ্ধি বা জীবন্মুক্তি। অবশ্য ইহা দু দশদিনে সাধ্য নহে। পরাবৈরাগ্যের তারতম্যানুসারে ইহার বৈরাগ্য বিবিধ। বৈরাগ্যের তঞ্জস্য তার * পরা এবং অপর।

s সাধন-স্বরূপ নির্ণয়। অধিকারী প্রধানতঃ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত যথা—মৃদুসংবেগা, মধ্যসংবেগা এবং তীব্ৰসংবেগা। সংবেগ শব্দে বৈরাগ্য। তীব্ৰসংবেগা প্রহলাদ বীতহব্যাদি অল্পকাল বিচার দ্বারা স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত করিয়াছিলেন। কিন্তু মৃদুসংবেগ উদ্দালকাদি চিরপ্রয়াস দ্বারা তাহা লাভ করিয়াছিলেন। অতএব বলা যাইতে পারে যে, অভ্যাস বৈরাগ্যাদি যােগ্যতার তারতম্যানুসারে অন্যান্য সাধকেও নূন্যাধিককালে এইমতে সিদ্ধি সমধিগত হইয়া থাকে, বুঝিতে হইবে। এতদনুশাসন। ইতি শ্রীপরমহংস পরিব্রাজকাচাৰ্য শ্রীমৎ স্বামী আত্মানন্দ- সরস্বতী-শিষ্য শ্রীমৎস্বামী যােগানন্দ সরস্বতী বিরচিত স্বরূপসিদ্ধিগ্রন্থে উপাসনাকাণ্ডে সাধনস্বরূপনির্ণয় নামক দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত। সবিশেষ বিবরণ ৪র্থ অধ্যায়ে নিরােধ উপায় দেখ। যে জ্ঞানের পরি- পাকে আব্ৰহ্ম শুষ পৰ্য্যন্ত সমুদায় পদার্থ তুচ্ছীকৃত হইয়া যায়, তাহার নাম পরাবৈরাগ্য। অপরা বৈরাগই সাধকে প্রথম সাত হইয়া থাকে। অপরার পরিপাকাতিশয়রূপ অবস্থান্তরই পরাবৈরাগ্য।

PUBLIC LIBRARY
MAJU
Estd. 1902. }
MA! U,
LOWRAH.
তৃতীয় অধ্যায়।
মনােস্বরূপ নির্ণয়।
কোন বিষয়ের অস্তিত্ব সংস্থাপন করিতে হইলে অগ্রে নাস্তিত্ব
পক্ষ অবলম্বন করা উচিত, কেন না, পূর্বপক্ষ উত্থাপন দ্বারা
তাহার খণ্ডন করিয়া মীমাংসা করিলে, সে সিদ্ধান্ত স্থূণা-নিখনন
ন্যায়ে দৃঢ় এবং নিঃসন্দিগ্ধ হয়, কদাপি তাহাতে বিপৰ্যয়বুদ্ধি
হাসিতে পারে না, সহজকথায়, একবার “না পক্ষ” আবার
“হঁ পক্ষ অবলম্বন পূর্বক বিচার করিলেই বিচাৰ্য বিষয়ের সত্যার্থ
স্বতঃই নিষ্কাশিত হইয়া পড়ে। ভাল, প্রােক্তন্যায়ানুসারে
প্রথমতঃ “উভয়ারূকং মনঃ” ইহার বিচার করা যাক।
উভয়াত্মক মনের কথা।—উভয়া ব্যক মনের অর্থ কি ?
ভারতের অন্যান্য প্রদেশ অপেক্ষা পূর্ববঙ্গ বাসী এ বিষয়ে বিশেষ
পরিচিত। কারণ, তাহাদিগকে বৎসরের মধ্যে প্রায় পাঁচ মাস কাল
নৌকা যােগে যাতায়াত করিতে হয়। মাঝি, লগি (বাঁশ) পুতিয়া তাহাতে
নৌকা বাধিবার সময় লগি পুতে আবার তুলে। কয়েকবার এই মত
করিয়া লগি খুব দৃঢ় পােত করিয়া লয়। ইহারই নাম “ণা নিখনন।
যুণ (ধাতু , ডে, আপ) শব্দে খোটা বা লগি ইতি ভাষা।

মনােস্বরূপ নির্ণয়। ৪৭ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় এতদুভয় ইন্দ্রিয়ই কি মন ? না, ইহার অপর কোন অর্থ আছে ? সবিশেষ বলিতেছি শুন। যেমন একই মনুষ্য বিবিধ সংকল্প বশতঃ নানারূপ ধারণ করে, তার্থাৎ কখন কামিনী সঙ্গে কামুক হইয়া বিবিধ রস ভােগ করে, কথন বা সেই কামিনী সঙ্গে বিরক্ত হইয়া তাহা পরিত্যাগ করে, কখন বা তান্যান্য বিষয়ে আসক্ত হইয়া তাহা উপভােগ করে, সেইমত মন, চক্ষু প্রভৃতির সঙ্গ বণতঃ তাহাদিগের সহিত একীভাব প্রাপ্ত হইয়া দর্শনাদি ক্রিয়া সম্পাদন করে, কর্ণের সঙ্গ বশতঃ শ্রবণ ক্রিয়া সাধন করে, এইরূপে মনুষ্যাদির ন্যায় মনও নানারূপ হয়। মনের এবম্বিধ বিশেষ বিশেষ সামর্থ্য বা রূপ ধারণের কারণ গুণ ত্রয়ের (সত্ব, রজঃ এবং তমে) পরিণাম ভেদ। ণত্রয়ের কথা যথাস্থানে বলিব। অতএব সিদ্ধ হইল যে, মনই জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, এতদুভয় ইন্দ্রিয়ের সমুহ ব্যাপার সাধনের হেতু হইয়াও তব্যতিরিক্ত। অর্থাৎ মন জ্ঞানেন্দ্রিয় নহে এবং কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ও নহে। অথচ তাহাদের নিয়ামক। লােকে বলে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়গণ স্বীয় স্বীয় বিষয় অবলােকন করিয়া থাকে, তাহা অমুলক, যেহেতু ইন্দ্রিয়গণ কোন ক্রমেই স্ব স্ব বিষয় প্রত্যক্ষ করিতে সক্ষম হয় না, কেবল মনই প্রত্যক্ষ করিয়া থাকে। দেখ, চক্ষু, মন সংযােগেই রূপ সকল দেখিতে পায়, কেননা, মন ব্যাকুল হইলে—বিষয়ান্তরে ব্যাপৃত থাকিলে, রূপাদি বিষয় সকল চক্ষুর * দশের মধ্যে তুমি শ্রেষ্ঠ লােকে তােমায় কয় রাজালী। সদা নিচ সঙ্গে থাক তুমি রাজা বট রীতি পাজী।

রূপসিদি। অভিমুখীন হইলেও চক্ষু তাহা গ্রহণ করিতে সমর্থ হয় না। অপিচ সুষুপ্তি এবং সমাধি সময়ে মন উপরত হইলে, ইন্দ্রিয়বর্গের উপরতি হয়, তাহারা নিরাশ্রয় ভাবে কাৰ্যহীন হইয়া থাকে। মনই ইন্দ্রিয়বর্গের প্রাধান্য এবং প্রভাব বর্ধন করিয়া থাকে। অতএব মনই ইন্দ্রিয় সমুহের ঈশ্বর। মনই ইন্দ্রিয়গণের সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের কারণ। অতএব সিদ্ধ হইল যে, মনই সর্ববিধ বিষয়ােপলব্ধির কারণ এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্মেন্দ্রিয় এতদুভয়ের নিয়ামক হইয়াও তদ্ব্যতিরিক্ত পদার্থ। মন দেহেন্দ্রিয়াদি ব্যতিরিক্ত—তাহা প্রকারান্তে প্রদর্শিত হইতেছে—কি শারীরিক কি মানসিক, কোন একটা ক্রিয়ার রূপ চিন্তা করিলে,তাহাতে দুইটা শক্তির সমাবেশ দেখিতে পাওয়া যায় যথা—একটী কর্তৃশক্তি, অপরটী করণ শক্তি। কর্তৃশক্তি চেতন, করণ শক্তি জড়। কর্তৃশক্তিরূপ চেতনের ( তার) অধিষ্ঠান বশতঃই জড় করণাদি ক্রিয়াশীল হয়। যেমন ছদন কাৰ্য্যে দাত্রাদি করণ এবং ছেদক দেবদত্ত। উভয় শক্তির সমাবেশে ছেদন কার্য সম্পাদিত হইয়া থাকে। করণের ক্রিয়া নিপাদক থাকিলেও,তাহা কখনই অকক প্রযুক্ত হইতে পারে না অর্থাৎ কর্তৃশক্তি তাহার নিয়ামক। অতএব করণ, পরতন্ত্রশক্তি এবং কৰ্তা স্বতন্ত্রশক্তি। সকল কাৰ্যেই এই উভয়বিধ শক্তির স্মৃত্তি দেখা যায়। সেই স্বতন্ত্র শক্তিই আত্মা। তিনি দেহেন্দ্রিয়াদিযুক্ত হইয়া ব্যবহারিক জীব বা ভােক্তাদি স্বরূপে প্রতীয়মান হয়। এই ভােক্তা জীবের সহিত সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিষয়াদির সংযােজন হয় না, মনােস্বরূপ নির্ণয়। ৪৯ বিষয় বা অর্থের সহিত প্রথমতঃ ইন্দ্রিয়ের, ইন্দ্রিয়ের সহিত মনের এবং মনের সহিত অাত্মার সংযােজন হইয়া ভোগাদি নিপন্ন হইয়া খাকে। ' এই ভােগ, দেহাদি চেতন পৰ্যন্ত সমুদায় পদার্থের সাধারণধৰ্ম্ম। ইহার বিশেষ এই যে, আত্মা অপরিণামী বিধায় প্রতিবিৰগ্ৰহণ মাত্রই তাহার ভােগ। আর দেহাদি পরিণামী পদার্থের পুষ্টি সাধনকেই ভােগ বলে। অতএব বলা যাইতে পারে যে, দেহেন্দ্রিয়াদি সমুদায় করণ, এক মনের প্রভাবেই বা মন হইতেই—ইন্দ্রিয়গা, ইন্দ্রিয়গণ হইতে স্থূলদেহ, নামরূপ প্রাপ্ত হইয়াছে, স্তি লাভ করিয়াছে। অর্থাৎ এক মন বিবাকারে স্থূল, সূম, এবং কারণ দেহরূপে এবং ইন্দ্রিয়াদিরূপে প্রতীয়মান হইয়; তাকে। মন মস্তিষ্ক কি তাহার কার্য? এবং এক কি বহু ?—সাংখ্যশাস্ত্রে সৃষ্টি ক্রিয়। ঢারি পবে বি ওক্ত করিয়াছেন যথা—স্কুলভূত বা বিশেষ পর্ব—সূগনভূত বা বিশেষ পর্ব। মন (ব্যাবস্থা) বা লিঙ্গ পর্ব এবং মনরূপ অঙ্গ প্রকৃতি—অব্যাবস্থা—অলিঙ্গ পর্ব। সবিশেষ যথাস্থানে বলিব। মস্তিক বিশেষপর্ব। সুতরাং স্থূলভূতের অন্তর্গত, স্থূলভূতনিৰ্ম্মিত। স্থূলভূতনিৰ্মিত, চাক্ষুষ প্রত্যক্ষের বিষয়, অন্নরসের বিকার, তাহা মন হয় কেমনে ? তবে সত্তা লক্ষণযুক্ত ব্ৰহ্মস্বভাব কাশাদিতে অনুৰনমানব সত্তা লক্ষণ মনের স্বভাব মস্তিষ্কমধ্যে অতি সূক্ষভাবে অনুষ্যত থাকায়, মস্তিষ্ককে মন না বলিয়া মনের বিকাশভূমি মাত্র (Vehicle or passage) বলিতে পার। কোন প্রকার স্মৃতির উদ্বোধ করিতে যাহ। ৪ স্বরূপসিদ্ধি। হইলে সকলকেই এইজন্য মস্তিকের দিকে কতকট। লক্ষ্য করিতে দেখা যায়, এবং এইজন্যই অনেকে মস্তিকে—জ্ঞাচক্ৰাখ্যে মনের স্থান নির্দেশকরিয়া থাকে, কিন্তু সে নির্দেশও, হৃদ্মলে বিষ্ণাদির অধিষ্ঠান কল্পনাবৎ কল্পিত বা মিথ্যা। মন মস্তিষ্ক কিম্বা তাহার কাৰ্য, এ দুয়ের একটাও নহে, তবে মস্তিক মনের বিকাশভূমি মাত্র, নিম্নে কয়েকটা দৃষ্টান্ত দারা তাহা বিশদভাবে বলিতেছি শুন— (১) বালক কিম্বা গুনগ: মেন তাকাণে নিলীমাদির অারােপ করিয়া থাকে, এবং লি মাদি মবন কাচগোলকস্থ স্ফটিক স্বচ্ছ ভালােককে মলিন—এবং তা দেখে, সেইমত মনের ক্রিয়াদি প্রতিফলনের যন্ত্র বা বিকাশ ভূমিস্বরপ মস্তিকের বিকৃত হেতু তদ প্রতিফতি গিয়াদির ও বিকারি দেখিয়া, মনেই বিকার নিশ্চয় করিয়া থাকে, সুতরাং অদিগের এ ধাৰণ সর্ববথা মিথ্যা। হত এব মন মদি নহে—এতদ্ব্যতিক্ত। যেমন সূর্ণ ইদ্রিয়াধিষ্ঠাত্ দেবতা বা আলােকরূপে সমুহ প্রাণী জগতের চক্ষুগত হইলেও, তাহাদের চাক্ষুষ দোযাদি তাহাতে সংস্পশিতে পারে না, কেননা, প্রাদিগের চক্ষুর সহিত তালােকরূপে সূৰ্যের এ সংযোগ অস্ফুট বা অতি সূন ; সেইমত মনদেব ও স্মৃতি বা সংস্কাররূপে সহ প্রাণীজগতের মস্তিকে প্রতিফলিত হলেও, তাহাদের মস্তিগত ও দোযাদি, তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। কারণ, প্রাণীদিগের মস্তিষ্কের সহিত স্মৃতি বা সংস্কাররূপে গনের এ সম্বন্ধ অতি সূক্ষ, অতএব বলা (২) মনোস্বরূপ নির্ণয়। যাইতে পারে যে, মনদেব অন্নরসের বিকার মস্তিষ্কও নহে কিম্বা মস্তিষ্কের ক্রিয়া ও ( Function) নহে। মন এতদ্ব্যতি- রিক্ত। (৩), তুল্যবয়বীৰ্য বিশিষ্ট মাদকসেবনে অনভ্যস্ত চারিজন যুবককে কুল্য পরিমাণে কোন মাদক দ্রব্য সেবন করাইলে, দেখা যায়, চারিজন চারি প্রকার কাৰ্য্য করিয়া থাকে। কেহ নাচে, কেহ গায়, কেহ পাঠ করে, কে বা কাদিতে থাকে। তুল্য বা সমান কারণ হইতে সমান বা সনাতীয় কাৰ্য্যই উদ্ভূত হইয়া থাকে, কদাপি বিষম বা বিভিন্ন জাতীয় হইতে পারে না, ইহাই প্রাকৃতিক নিয়ম। তারাদি সংলগ্ন টেলিফে। যন্ত্রবৎ মস্তিষ্ক ও মনের বিকাশ- সন্ত্র, দ্বার বা পণস্বরূপ। এই পথ দিয়া মনােভাব সকল (সংস্কার রাশি) সাবাদি ক্রমে সঞ্চালিত হইয়া ইন্দ্রিয়পথে বহির্বিষয় যোগে ক্রিয়াশীল হয়। এবম্বিস প্রকারে বাহ্য পদার্থাদির সংযােগ- বিয়ােগ জনিত মনােভাব বা সংস্কার সমুদায় সকলের একরূপ নহে,ব। হইতে পারে না। বৃতিভেদই ইহার কারণ। এই বৃত্তি*ভেদ বশতঃই ব্যক্তি মাত্রেরই মন ভিন্ন বলিয়া প্রতীতি হইয়া থাকে। প্রকৃত পক্ষে মন কিন্তু একটী । যেমন একই আকাশ ঘটাদি উপাধির ভিন্নতা বশত: ভিন্ন বা অনেক বলিয়া বোধ হয়, মনও সেইমত এক হইলেও, বৃত্ত্যাদিরূপ উপাধির ভিন্নতা বশতঃ বহু বলিয়া অনু- বাস্তবিক তাহা নহে, কারণ, উপাধিভেদে তদ্বানের মিত হয়, * বৃত্তি মনেরই ধৰ্ম্ম। সবিশেষ ৪র্থ অধ্যায় “বৃত্তি মানস ধৰ্ম্ম- দেখ।

স্বরূপসিদ্ধি। অর্থাৎ উপাধি বিশিষ্টের ভেদ হয় না, বলা বাহুল্য যে, এই মতে যুবক চতুষ্টয়ের মধ্যে যাহার যে বৃত্তি বা সংস্কার প্রবল—জীবনে অধিককাল অভ্যস্ত, তাহাই তাহাদের অজ্ঞাতসারে—বাধে মাদক বিকৃত মস্তিকরূপ পথ দিয়া বাদি ক্রমে ইন্দ্রিয় সহায়ে বাহিরে বিভিন্ন ক্রিয়াফল প্রদর্শন করিয়া থাকে। অতএব ব:িতে হয় যে, বিকৃত আহারে কিম্বা অনাহারে মনের দ্বারস্বরূপ অন্ন সময় এই মস্তিষ্কই—বিকৃত হইয়া থাকে। মন নহে—মন এতব্যতি- রিক্ত, অতএব সিদ্ধ হইল যে, মন মস্তিষ্ক—কিম্বা মস্তিষ্কের ক্রিয়া এ দুয়ের একটীও নহে। (neither brain noi function of the brain, but beyond it ) | এবং মন বহুও নহে—এক। (৪) মন অন্নময় না হইলে অন্নময় এতির অর্থ কি ? যদি কোন সদ্য প্রসূত শিশুকে নির্ল্ডন প্রদেশে রক্ষা করা যায়, এবং তাহার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মুক ধাত্রী নিযুক্ত করা যায়, শিশু ধাইমা ব্যতীত যদি আর কাহাকেও দেখিতে না পায়, তাহা হইলে দেখিবে যে, সেই শিশু কালক্রমে বয়ােপ্রাপ্ত হইয়াও,পূর্ব- বই রহিয়াছে। পশ্যাদি তাপেক্ষ। তাহার মানসিক অবস্থা কদাচিৎ উৎকৃষ্ট বলিয়া বােধ হইবে।' মন ম্নরসের বিকার হইলে শিশুর শারীরিক উৎকর্ষ বিধানের সঙ্গে সঙ্গে, মনেরও উৎকর্ষ সংসাধিত হইত, কিন্তু তাহা হইল কি? শিশু ত বয়ে প্রাপ্ত হইয়াও বঃ- মানে পশু পেক্ষাও তাধম। তবে ঐতিতে যে মনকে অন্নময় বলা হইয়াছে কেন, তাহা বলি শুন—উদ্দালক স্বীয় পুত্র শ্বেত- কেতুকে বলিতেছেন, “তাম্নময়ং হি সৌম্য মন”। হে প্রিয়- মনােস্বরূপ নির্ণয় । = দর্শন! ভুক্ত তন্ন জাঠরাগ্নি দ্বারা পচ্যমান হইয়া ত্রেধা বিভক্ত যথা-স্থূলভাগ পূরীষরূপে নির্গত হয়, মধ্যম বা সূক্ষমভাগ রস-রক্তাদিক্রমে মাংসরূপ ধারণ করে এবং তান্বিষ্ঠ বা সূর্গমাদপি- সুমভাগ,হৃদয়ে নীত হইয়া সূক্ষন হিত্যাখ্য নাড়ীমধ্যে অনুপ্রবেশ পূর্বক বাগাদি করণের অর্থাৎ জিহ্বা, চক্ষু, কর্ণ, নাসিকাদি 'ইন্দ্রিয়গােলকের স্থ্যৈ সম্পাদন দ্বারা প্রকারান্তরে মনেরও উপচয় করিয়া থাকে। সুতরাং মন অন্নরসময়। প্রকৃতই কি মন হারাময়? অধ্যাত্মদৃষ্টিতে অসঙ্গত বা অসম্ভব নহে। কেননা, প্রােক্ত তি ত্রিবিংকরণেরই ভাবান্তর প্রকরণে উক্ত হইয়াছে। সেই মুল প্রকরণের অধ্যায় ত্রিবিকরণ-এই হিসাবে, মন এই তাবান্তর প্রকরণের অধ্যায়। তাই অধ্যাত্মভাবে হার্থাৎ ভূতপঞ্চকের বিধারক, সমূহ করণাদির নিয়ামক বলিয়া সর্বব্যাপক সেই মনেরই ভুক্ত রসের দ্বারা উপচয় হইয়া থাকে বলিয়া এতিতে উক্ত হইয়াছে,বুঝিতে হইবে। এই মন চিজ্জড়াভাসা ত্বক,তাহা ইতপূর্বেই বলা হইয়াছে, সুতরাং মন পরিচ্ছিন্ন এবং অনিত্য * শ্বেতকেতুর মনে সন্দেহ নিরাকরণের জন্য পুনরায় বলিতেছেন,—সেই ভুক্ত অন্ন উপচিত সামর্থ্য ষােড়শধা বিভক্ত হইয়া কাৰ্যকারণ সঘাত লক্ষণ, জীববিশিষ্ট দেহে যুক্ত হইয়া ষােড়শকল। } প্রাপ্ত হইয়াছে। অয়াদির উপযােগাভাবে কক্ষয়ে দেহেন্দ্রিয়াদির সামর্থ্য হানি হয় এবং উপযােগে বা সদ্ভাবে কলাস্থৈৰ্যে তাহাদের সামর্থ্য সিদ্ধ বা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সুতরাং ভৌতিক দেহেন্দ্রিয়াদির বীৰ্য্যই মন নিত্য, নিরবয়ব এই বৈশষিক মত খণ্ডিত হইয়াছে।

৫৪ স্বরূপসিদ্ধি। সহজ তান্নত। মনেও জড়াভাস আছে, এই উপলক্ষণে-অধ্যাত্মভাবে মানসবীৰ্য তারকৃত বা মন তান্নরসময় ঐতিতে এইমত উদাহৃত হইয়াছে, বুঝিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, লক্ষ্যার্থে—অধিদৈবতভাবে মন তান্নরসময় নহে—এতদ্ব্যতিরিক্ত সৎ এবং সৎ বা চিৎ ও জড় হইতে বিশিষ্টত্ব বা বিলক্ষণই মনের স্বরূপ। সবিশেষ ‘মনের স্বরূপ—সৎ কি তাস” দেখ। (৫) এই সমুদায় প্রত্যক্ষ প্রমাণ সত্ত্বেও, যদি তুমি মনকে মস্তিষ্ক কিম্বা তাহার কাৰ্য বল,তাহা হইলে দেহান্তের পর দেহের সঙ্গে মন ও ভূম্যাদিতে প্ৰলীন হইয়া যায় বলতে হয়। কথায়, এক জন্মেই সব মিটিয়া যায়—ওয়াশীল হয়, সুতরাং সৃষ্টি বন্ধ, মোক্ষ এবং সংসারের উচ্চাবচ দর্শন ইত্যাদি প্রশ্নসমুহ তামীমাংসিতই রহিয়া যায়। তরাং এ পক্ষেও অনেক গােল- যোগ। পক্ষান্তরে, যদি বল যে, মন দেহান্তের পর দেহান্তরে সঞ্চারিত হয়, তাহা হইলে আমাদিগের পক্ষই অর্থাৎ মন দেহে- ন্দ্রিয়াদি ব্যতিরিক্ত, তাহাই সমর্থিত হয়, এক কথায়, সব গােল- যােগই মিটিয়া যায়। অতএব বলা যাইতে পারে যে, মন অতি সূক্ষভাবে সবদেহে ‘আনখাগ্রে'ভ্যঃ আলেমেভ্য' অর্থাৎ মস্তকের কেশাগ্র হইতে পদাঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগ পর্যন্ত সব দেহে ব্যাপক ভাবে অবস্থানপূর্বক দেহেন্দ্রিয়াদির নিয়ামক হইয়াও তদ- ব্যতিরিক্ত। বলা বাহুল্য যে এতক্ষণ “নাপক্ষ” অবলম্বন—পূর্বক বিচাব করা গেল, এইক্ষণে “হপক্ষ” অবলম্বন করা যাক। সত্য মনােস্বরূপ নির্ণর। আপনিই নিস্কাশিত হইয়া পড়িবে—মনের স্বরূপ সহজেই বুঝা যাইবে। মনের স্বরূপ কি ? - সং কি সৎ?—বাশিষ্ঠে লিখিত আছে “মননাহি পুরুষঃ” অর্থাৎ মনই পুরুষ। পুরুষই ‘ধবাকারে মনরূপে প্রতীয়মান। পুরুষ পুরুষই আছেন, কতি গৃঢ়তাব্য। মন ভঁহাকে ভিন্নরকমে ব্যক্ত বা প্রকাশ করিতেছে। তএব মন তাহার প্রকৃতি-কাৰ্যাত্মভাব বা কাৰ্য জগৎ। প্রকৃতি তার মা একই বস্তু। প্রকৃতি সাধারণতঃ বাহিরের নাম এবং মন ভিতরের নাম। ইহাও ব্যবহারিক। সূক্ষনদনেউয়েই তুল—এক বপু। কেবল নামেমাত্র ভেদ। এই মন পুরুষ বা নিগুণ ব্রহ্মের বা ভূমাচেতন্যের সহিত তভেদ ভাবে—একদেহে হাবস্থিত হইলে অর্থাৎ সাম্যাবস্থায় কোন শব্দদ্বারা বাধ্য হয় ন--তাহর কোন নাম থাকে না বলিয়া তখন তাহাকে নিরখ্যাত, শবপদেশ্য বা ব্যক্ত বলে। হইলে-ঈশচৈতন্য ব, সগুণ গে৷ কাৰ্যরাপে প্রকাশ পাইলেই, তাহার নাম হয় প্রকৃতি এবং জীবচৈতন্যে তাহার নাম মন। ( মনের সরূপ এবং তারূপ প বিহিত ) লিঙ্গ মনই নি. ব্ৰহ্ম। সমষ্টি মনই ঈশ্বর বা সও-ব্ৰহ্ম এবং ব্যষ্টি মনই জীব। মন সমষ্টি ভাবে প্রকৃতিরূপে জগনিয়ামক এং ব্যষ্টিভাবে জীব- দেহের নিয়ামক। সমষ্টি শক্তি—কারণ এবং ব্যষ্টি শক্তি—কাৰ্য্য তাতএব ব্যষ্টি সমষ্টিরই অন্তর্ভূত। সমষ্টি দর্শনে ব্যষ্টি-সমষ্টি শরীরেই বিলীন হইয়া যায়, তখন তার তাহার পৃথক অস্তিত্ব স্বরূপসিদ্ধি। এত থাকে না। সমষ্টি ব্যষ্টি উভয়েই বস্তুত ভিট—এক। ভিন্নতা কল্পনা ব্যবহারিক। কনকের ধৰ্ম্ম কটকের ন্যায় কি। পুরুষের ধৰ্ম্ম প্রকৃতির ন্যায়, মন অারই (জ্ঞানেরই ) ধর্ম। ধৰ্ম্ম বা গুণেরই বিপরিণাম হইয়া থাকে। ধর্মী কিন্তু এক ভাবেই থাকে, তাহার কোন বিকার হয় ন। ধর্মী বা হা হা। যেমন তেমনই থাকে, তাহার ধৰ্ম্মরূপ মনের—কাৰ্যাস্তুবের রিয়াতে বিভিন। অভিব্যক্তি হয় মাত্র। তাই তের এত বৈচিত্র্য। কারণের আত্ম- ভূত শক্তি, এবং শক্তির মা ভূত কা, সুতরাং কানের পূর্বব ভাব শক্তি এবং শক্তিরই তাপর ভাব কাৰ্য্য। এক ভাব বা সত্তাই পোবনাপোৰ্যানুসারে শক্তি এবং কার্য নামে অভিহিত। গেল ব্যবহারিকের কথা। পরমার্থভাবে দেখিতে গেলে, এক পুরুষ বা তাহাই নির্বিক ভাবে সর্বত্র বিদ্যমান। তাহাতে কত ব গণ্যসিত। কতি বলি। মিঃ, সুতরাং মিথ্যা মনের ও দোকানি সন্তে সংসৃষ্ট হইতে পারে না। তাহার পর, অসং ঘট পটাদির ,মন লোকের দৃষ্টিগােচরীভূতও হয় না, সুতরাং তাহাকে সং বলিতে পার ন। আর কারণ রূপ হা হার বা সন্তের সাক্ষাৎকারে মনকে হার বৃথক্ পদার্থ বর্নিয়া বোধ হয় না। মন তন উপ্ত, গৌহপিণ্ড-প্রক্ষিপ্ত জলবিন্দুং বা গণি দশনে ভদোকতাবৎ করারীতে বিলীন হইয়া যায় সুতরাং তা সৎও নহে। তবে কথা কি যে, মন পদার্থ সং এবং অসৎ হইতে বিলক্ষণ এবং অষ্ট ও অনিরূপ হইলেও, ব্যাপুলৰং ৰা নরবিঘাণৰং এককালে মিথ্যা নহে। কিছু মনোস্বৰূপ নির্ণর । বটে, যেহেতু ইহা অাত্মা বা জ্ঞানেরই ধৰ্ম্ম বা প্রকার ভেদবিশেষ। তবে বাগাদির গােচরীভূত নহে, বলিয়া অনির্বচনীয় বলে। তার জীবচৈতন্য দেহেন্মিয়াদিযুহেতু পরিচ্ছিন্নবৎ প্রতীয়মান হওয়ায়, শালগ্রামে রিফু কানাবৎ জীবের হৃৎকমল, আজ্ঞাচক্র প্রভৃতি স্থান মনের অধিষ্ঠানরূপে পরিকল্পিত হইয়াছে, সুতরাং ইহা স্থূল দর্শনের কথা --ব্যবহারিক-মিথ্যা। পরমার্থতঃ, মন দেহাদি ব্যতিরিক্ত হইয়াও দেহের সর্বত্রে অতি সূক্ষমভাবে অবস্থিত। তত এ সিদ্ধ হইল যে, সৎ এবং অসৎ হইতে বিশিষ্ট বা বিলক্ষণই মনের স্বরূপ। মনসঃ স্বরূপ সদস্যাভ্যাং বিশেষ। মনই এই পঞ্চ ব ডগ-লোকিক দৃষ্টান্তে দেখা যায় যে, যাবৎ বিমান থাকে, তাবৎ তাহার উষ্ণতার উৎপত্তি বিষয়ে কালান্তরে তপক্ষ হয় না, এই জন্য লােকে উষ্ণতাকে অগ্নির নাৰিক ধৰ্ম্ম বলে। যতদিন অগ্নিা আছে, ততদিন উচ্চতাও আছে বলিতে হয়, কার: ধর্ম বিরহিত ধৰ্ম্মীর অস্তিত্ব তাসম্ভব। পিচ, দিনে উতাকে আর পৃথক্ পদার্থ বলিয়া বােধ হয় না। ইহা দ্বারা প্রতিপা হইতেছে যে, যে. পদার্থ বিমান থাকিতে, যে ধর্মের উৎপত্তি বিষয়ে কারান্তরের অপেক্ষা করে না, সেই ধর্মই সেই পদার্থের স্বভাব বা স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম।. মন বা জগৎও এই হিসাবে -এই মতে কারণের আর্থাৎ আর বা ব্রহ্মের স্বাভাবিক ধর্ম বলিতে হয়। স্বভাব এই শব্দার্থে তাহ। দ্যোতিত হইতেছে, যথা- শব্দে তাকা+তাব শব্দে স্বরূপসিদ্ধি। বিকাশ বা উৎপত্তি, অর্থাৎ আত্মার জীবাদিরূপে বা জগদাকারে উদ্ভব বা উদ্ভাসনের নামই স্বভাব। যেহেতু তাহাই জগতের নিমিত্ত এবং উপাদান উভয় কারণ। সহজ কথায়, তাত্মার বা ব্রহ্মের জগদাকারে উদ্ভাসনের বা বিকাশের নামই মন। অতএব মন বা জগৎ ব্রহ্মস্বভাব। স্বকীয়ে। ভাবঃ স্বভাব, তরা, ইহা নৈমিত্তিক কহে। তাহার বা ব্রহ্মের এ স্বভাব অর্থাৎ মন ব, জগৎপে প্রভাসমান হওয়া স্ফটিকের শুক্লাব •ায়, মণির বালকের ন্যায়, কিম্বা দেতোৰ হাসিব ন্যায় স্বাভাবিক ব স্বতঃসিদ্ধ। সেই অতু বা ব্রহ্ম তপ্তকান, হাতে কোন প্রকার স্পৃহাদি বা ভােগাদি সম্ভবে ন!,সুতরাং জগৎবকাশ-কাৰ্য্য তাহার স্বভাব- মনেরই ধৰ্ম্ম। যতদিন তিনি অাছেন, ততদিন মন বা জগৎ আছে, আবার তাহার দর্শনে মনে বা জগতের পৃথক্‌ অস্তিত্ব থাকে না। তিনি কূটস্থ নিত্য,জগৎ ব; মন প্রবাহরূপে নিত্য। সুপ্ত পুরুষের সম্বন্ধে জগৎ ও তাগাবাদি উপলব্ধি ন হইলেও, তাহার পার্শ্বোপবিষ্ট দ্বিতীয় জাহৎ ব্যক্তির সম্বন্ধে তখন ও ডগদাদি উপলব্ধি হইয়া থাকে। যেমন শিলামধ্যস্থ চক্র পদ্মাদি রেখ। অব্যক্ত অবস্থায় শিলামধ্যে বিদ্যমান থাকে, বহিৰ্যাপার দ্বারা তাহা ব্যাবস্থা প্রাপ্ত হয়, সেইমত ওযুপ্তাবস্থায় মনের মধ্যে এই জগদাবলী অতি সূক্ষম ভাবে বিদ্যমান থাকে, জাগরণে- হং জ্ঞানের স্মরণে ( পরিচ্ছেদাভিমানাত্মক চিৎস্বরূপের বা মনের প্রকাশে) তাহা ফুর্তি পায়—ভাসমান হয়। ইহা দ্বারা প্রমাণীত হইতেছে যে, জগৎ মনােনয়—মনেরই বিকার, কিন্তু অনিরুদ্ধমন।

মনোস্বরূপ নির্ণয়
সঞ্চালনায় ।
বদ্ধকে তাহা বুঝান কঠিন। কিঞ্চিৎ বুঝিলেও, বিরুদ্ধসংস্কার
বশাৎ-জগৎ সত্য বলিয়া
দৃঢ়
ধারণা থাকায়,তাহা তাহার প্রতীতি
হয় না। যেমন অঙ্কুর হইতে নির্গত হইয়া বৃক্ষ পত্রাদি বাহিরে স্বীয়
ভাব ধারণ করিতেছে, সেইমত পৃথুদি সম্বলিত এইজগৎ সংস্কার
রঞ্জিত মন হইতে মনের বিসর্গ * ধৰ্ম্মহেতু অধ্যাস বশা উদ্ভুত
হইয়া, বাহিরে তৎ পদার্থাকারে ভাসমান হইতেছে। সুবর্ণে
যেমন সুবর্ণ এবং কটকর উভয় ধৰ্ম্মই অবস্থিত, সেইমত মনে
দৃশ্যত এবং ব্রহ্ম ( চিৎ ও জড়) উভয় ধৰ্ম্মই বিদ্যমান, অর্থাৎ
মন চিৎ ও অচিৎ উভয়াক। যেমন সাগর হইতে উৎপন্ন
তরঙ্গ একরূপে জলময়, অন্যরূপে জলময় নহে—বাযাদি উদ্ভুত
এ মনও সেইমত চৈতন্যদৃষ্টিতে ব্রহ্মময় এবং
মনদৃষ্টিতে ব্রহ্মময় নহে-জন্ময়।
যাহার।
জলের সত্তা
বুঝিয়াছে, তাহাদের নিকট সমুদ্রতরঙ্গ, জলের অতিরিক্ত নহে,
আর যাহারা তাহা বুঝে নাই, তাহাদের নিকট ভলা ও তরঙ্গ
দুইটী বিভিন্ন পদার্থ। এই মতে, যাহারা মনের সত্তা খুবিয়াছে,
তাহাদের নিকট জগৎ মনোময়—মনের বিসর্গ ধর্ম বা আধ্যাস
মাত্র। যাহারা তাহা না বুঝিয়াছে, তাহাদের নিকট মন ও
জগৎ দুইটা ভিন্ন পদার্থ।, বদ্ধজীবের ইহা উপলব্ধির বিষয়।
কাজেই তাহারা ইহা অসম্ভব বলিয়া বােধ করে। বদ্ধ এবং
পামর স্বর্ণ-সিংহাসনস্থ স্বর্ণ-প্রতিমা দেখিয়া প্রতিমা ও সিংহাসন
* বিসর্গ-বি ( বিপরীত) + সর্গ (সৃষ্টি) সবিশেষ এই অধ্যায়ে
“অধ্যাস বা বিসর্গের কপা*--দেখ।

স্বরূপসিদ্ধি। জাতের সময় দুইটা পৃথক্ বস্তু মনে করে, কিন্তু মুমুক্ষুর চক্ষে উভয়েই এক সুবর্ণ ধাতু বলিয়া প্রতিভাত হয়, সেইমত ব্ৰহ্মসন্তাক দ্বৈত প্রঞ্চে জড়চেতনেরসমাবেশে—চেতন ও জড় নামক দুইটী পৃথক পদার্থরূপে আপাততঃ দৃষ্ট হইলেও, নিরুমন। ব্যক্তির চক্ষে, একমাত্র নিগুণ ব্রহ্মনিরখ্যাত বা নামক মনই বিসর্গ ধৰ্ম্ম বলাৎ—বিব পরিণামে সরূপে-গাকারে ভাসমান বা উদ্ভাসিত। চন্দ্রাদি প্রতিবিদের জলাদির তাপেক্ষাৎ, মনের সঙ্কোচ বিকচের অপেক্ষায় তুমিও কাঠদানি তাখ্যা প্রাপ্ত হও। এই জাহদাদি অবস্থায় যে, তােমার মনের ভাব বিকার- বিশ হইতে সময়মতে উদ্ভুত হইয়া থাকে, তাহা কি তুমি কখন উপলব্ধি করিয়াছ? বোধ হয় না। নিরূপ আব'্য হাসিতে আরম্ভ করিলে, প্রথমতঃ তােমার দেহেন্দ্রিয়াদি অস্থির হইয়া পড়ে, তাদের প্রকাশ বা কাৰ্য্য- কারিতা কমিয়া যাইতে থাকে,—কি যেন একটা পদার্থ সিয়া কটিতি তাদের শক্তি হরণ করে, তারা যেন তাভিভূত হইয় অন্ধকারে লুকাইয়া যায়। ইহা মনের মােভাব বিকার, মন সে দেহেন্দ্রিয়াদি ব্যতিরিক্ত হইয়াও, তাহাদের নিয়ামক ব্যাপক হাহা ইদার। তাহ। ইহারা বুঝিয়া মও। কিন্তু দেহাদি ব্যতিৰিক্ত তুমি সদা জা3ৎ। তাতএব জা3ৎ স্বপ্ন এবং মুপ্তি এ তিনই কল্পিত বা মিথ্যা। “তত্রয় তথা স্ত্রয় সুপাঃ।” সুতরাং বলতে হইতেছে যে, জগৎ থাকিলেই মন থাকিল। মন থাকিলেই ইন্দ্রিয়াদি ও রহিল, কাতেই জাগতিক পদার্থাদির এব’ মনােস্বরূপ নির্ণয়। ব্রহ্ম দিকে মন অল্প বিস্তর আকর্ষিত হইবেই হইবে। অতএব সিন্ধু হইল যে, এই ভাসমান প্রপঞ্চ বা জগৎ ব্ৰহ্ম স্বভাব। স্বভাবই প্রপঞ্চ। মনই সেই স্বভাব বা প্রকৃতি। অতএব মনই এই জগৎ বা প্রপঞ্চ। শিষ্য—ভাল, আপনি বলিতেছেন যে, এই প্রপঞ্চ ব মনই ব্রহ্ম প্রকৃতি, কিন্তু নিগুণ ব্রহ্মে প্ৰকৃতিত্ব সিদ্ধ হয় কেমনে? গুরু—মনই ব্রহ্ম প্রকৃতি—তাহা হইতে পারে, অসম্ভব নহে। সবিশেষ বলিতেছি গুন। কাৰ্য্যরপে বিক্রিয়মান অবস্থার নাম প্রকৃতি, সহজ কথায়, যাহা কাৰ্যরূপে পরিণত হয়, তাহার নাম প্রকৃতি, যেমন ঘটের প্রকৃতি মৃত্তিকা, যেহেতু ঘট মৃত্তিকারই বিকার। এই প্রকৃতি ব বিক্রিয়মান, পরিণাম এবং বিবও ভেদে দ্বিবিধ। পরিণাম-পরি সর্বতােভাবে নম্ ধাতুর অর্থ নমন বা তাবতরণ, সর্বতােভাবে অবতরণ তার্থাৎ সূক্ষমাবস্থা হইতে স্কুল বা দৃশ্যমান অবস্থায় আগমনই পরিণাম শব্দের অর্থ। যেমন দুগ্ধ হইতে দধি ইহা পরিণামবকার । আর বিব—বি অর্থ বিশেষ বা বিরুদ্ধভাব বৃৎ ধাতুর অর্থ বৰ্ত্তন (to exist) অতএব যাহা বিশেষরূপে ব বিরুদ্ধ ভাবে অবস্থিত তাহার নাম বিবস্ত্র বিকার, যেমন রঞ্জুতে সর্পদর্শন। ইতপূর্বেই বলিয়াছি যে, “মনােহি পুরুষঃ" অর্থাৎ সেই পুরুষ বা ব্রহ্ম মনেরূপে বিবর্তিত হইয়াছেন। যেমন রঞ্জু, রজ্জ্বই আছে, কিন্তু সর্পপে পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে, সেইমত ব্ৰহ্ম যেমন তেমনিই আছেন, অথচ মনরূপে—জগদাকারে ভাসমান। অতএব এই স্বরূপসিদ্ধি। ক্ষণে বলা যাইতে পারে যে, নিগুণ ব্রহ্মে পরিণাম বিকার সম্ভব না হইলেও বিব-বিকার অসম্ভব নহে। যেহেতু বিবৰ্তবিকারে ব্ৰহ্মপ্রকৃতি ননেরই বিক্রিয়মান-জগদাকারে ভাসমান প্রদর্শিত হই, অতএব সেই মনই ব্ৰহ্মপ্রকৃতি। মন সূক্ষন তাহং শক্তি—চিড় উভয়াত্বক—পুরুষ হইতে মন বিবৰ্ত্তাকারে প্রকাশ পাইলে তাহা অপূর্ণ এবং পরিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। পুর্ণ এবং পরিচ্ছিন্ন হইলেই, অর্থাৎ মন সম্বন্ধ- হেতু পরিচ্ছিন্ন চিং স্বপের অভিব্যক্তি প্রযুক্ত তথবা পুরুষের বা তার পরিচ্ছে 'ভিমান হেতু ঢিতে জড় দেখা দেয়। চিড়ের সমাবেশ হয়। ইহা মনের একটা বিশেষ ধ, ইহার নাম বিসর্গ বি ( বিপৰীত) --সর্গ (স) তথাৎ বিপরীত এবং ইহাই বিবৰ্ত বা অধ্যাসের সামর্থ্য। সবিশেষ পরে বলিতেছি। এই আমি চিনা, স্থানস্বরূপ, এইরূপ, যে কর্তৃত্বাভিমান বা পরিচ্ছেদ।ভিমান, তাহাই মনোরূপ বৃক্ষের বীজ। চিদচিৎ অংশমুক্ত, সৃষ্টির প্রথম সোপান বা বিকাশ। কারণ, তার পরিচ্ছদাভিমান বা হং ভাব সৃষ্টির কারণ, তার লোকেও দেখা যায় নৈ, সাংসারিক সমুদায প্রবৃত্তির বীজ বা নিদানই অহংকার। তএব বলিতে হয় যে, পরিচ্ছেদ- ভিমনাত্মক চিৎপরূপের অভিব্যক্তিই মন, সহজ কথায়, মন সূক্ষম অহংশক্তি বিশেষ, মুলাস্তান নামে অভিহিত এবং তাহা চিদচিং বা চিড় উভয়ক। এঘি মনই জগদাকারে ভাসমান, তাই জগতে চিড়ে সমাবেশ দেখ, যেমন সৃষ্টি।

মনোস্বরূপ নির্ণর ।
বিষমিশ্ৰিত-সন্ন বিষ-নামেই অভিহিত হয়, সেইমত সমুদায়
প্রবৃত্তিমূলক অহংকারকারণ মনকেই সমূহ জগতের কারণ
বলিতে হয়। আহ্বাভাসে মনের বিকাশ, মনের আভাসে
ইন্দ্রিয়গণ এবং ইন্দ্রিয়াসে এই স্থূল দেহ। সহজ কথায়,
আয় হইতে বিবাকারে মনের সৃষ্টি, মন হইতে সূক্ষমভূত
এবং সূক্ষমভূত হতে স্থূলভূত উৎপন্ন হইয়া জগদাকারে ভাসমান।
সংক্ষেপ: ‘অহং' এবং ‘মা’ এই দুই শব্দেই জগৎ ভাসমান এবং
তুমিও ভাসিত। মনদি দেহান্ত তাবৎ পদার্থই আহাচৈতন্যে
উদ্ভাসিত, তাই লােকে আগ্নিপ্রবিষ্ট লোহকে অগ্নিবৎ গ্রহণ
করার ন্যায়, এই স্থূল দেহকেই আত্মা বা আমি বলিয়া মানিয়া
লয়। ইহাই দেহে আভ্রান্তির কারণ, জগৎ বিকাশের হেতু।
অহংকাররূপী মনই ইহার অব্যবহিত কারণ।
চৈত্য এবং জড়ের পার্থক্য কখন ?—এই মনরূপী জগৎ
চিজ্জড় বা চি: চিৎ উ ভয়াত্মক হইলেও চিৎ বা চৈতন্যই ইহার
পূর্ববরূপ তা আগে চৈতন্য = চেতন। চাৎ জড়-জগৎ।
চেতন সত্তায় জড়ের প্রীতি। অতএব চেতন বা অধিষ্ঠান
সত্তা নিনিমিত্তক বা অনাপেক্ষিক, আর জড় নৈমিত্তিক বা আপে-
দিক। জড় এবং চৈতন্য যে বিরুদ্ধধৰ্ম্ম উপলব্ধি করিতেছ, উহা
পারমার্থিক নহে, ' ব্যবহারিক।
ব্যবহারক্ষেত্রে-সংসারদশায়
অর্থাৎ প্রবুদ্ধ হইবার আগে, মন নিরুদ্ধ হইবার পূর্বে, এই
প্রকার উপলব্ধি হইয়া থাকে। মন নিরুদ্ধ হইলে, একমাত্র
চৈতন্যই অবশিষ্ট থাকে। তৎকালে জড় থাকিলেও, নিরুদ্ধমনার

৬১ স্বরূপ-সিদ্ধি। সম্বন্ধে অগ্রহণহেতু তাহার পৃথকত্ব কিছু উপলব্ধি হয় না। সুতরাং থাকিয়াও নাই বলিয়াই বোধ হয়। প্রকৃতপক্ষে জড় ও চৈতন্যে যে কি ভেদ,বন্ধু বা বিষয়ী তাহা বিনির্ণয়ে সম্যক অনুপযুক্ত। জ্ঞানের বিপরীত অজ্ঞান এই লৌকিক সংজ্ঞাবং, চৈতন্য জড়ের বিপরীত, এ কথা বলা ধৃষ্টতা এবং বিড়ম্বনানা ত্র। তুমি কেমন করিয়া জানিলে যে, চৈতন্য জড়ের বিপরীত বস্তু? হায়ার (চৈতন্যের ) অস্থি মাংসাদি নাই এবং মানবচক্ষুর অগােচর, কেবল ইহাদ্বারা তার পূর্ণ জড়ত্ব প্রমাণত হয় না, কারণ হিমাংদির অসদ্ভাব এবং চর্মচক্ষুর অগােচর গুণ সকল বায় এবং তড়িৎ সম্বন্ধে পূর্ণ ভাবেই প্রযুক্ত হইতে পারে, পথচ তাহারা জড় বলিয়াই প্রথিত। আর ‘কারণভাবাং কার্যভাবঃ ৩র্থাৎ উৎকারণ- রূপ চৈতন্যের সহিত জড়ের বা কাব্যজগতের নিত্য সত্তা সামান্যের অভেদ রহিয়াছে হা উভয়ে সমান কারণত:একই চৈতন্য নিত্য বিরাজিত। জড়ের মধ্যে নিত্য চৈতন্যসম্বন্ধ বিদ্যমান। অপিচ, জড়ের একটা পৰ্য্যায়িক নাম প্রকৃতি অর্থাৎ প্র (পূর্ববঙ)+কৃতি (কারণ), এমতাবস্থায় ভাড় চৈতন্যের সে কি ভেন,অনিরুদ্ধমন; তােমার পক্ষে তাহা নিরূপণ কর। ৩ঃসাধ্য। ভেদ বুঝিতে চাও, মন নিরুদ্ধ কর। উভযের পার্থক্য অনায়াসে উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইবে। গুণ ( স, রজঃ এবং তমঃ) বা শক্তিরই সত্তা তুমি উপলব্ধি করিয়া থাক এবং ঐ গুণ বা শক্তি হইতে উহার ধারস্ব:প জড় পদার্থের কল্পনা অতএব জড় জ্ঞান লৌকিক। যদি তুমি কাষ্ঠ পাষাণাদি তথা নহে।

মনোস্বরূপ নির্ণয়। জড় বিধায় ব্রহ্ম হইতে অতিরিক্ত বােধ কর, তাহা হইলে উহারা চেতন কিম্বা জড় দুয়ের একটীও হইতে পারে না। চৈতন্য না থাকিলে, আবার কাষ্ঠ পাষাণাদির উপলব্ধি হয় না, কেননা, পর- স্পর সাদৃশ্য সম্বন্ধ না থাকিলে অর্থাৎ উভয় পদার্থে চৈতন্য না থাকিলে উপলব্ধিই অসম্ভব। যেহেতু চৈতন্য স্বয়ংই জ্ঞান স্বরূপ এবং বস্তু জ্ঞানের নিদান। পাষাণাদিকে কেবল জড় বলিয়া স্বীকার করিলে, উহাতে চৈতন্য নাই বলিতে হইবে, সুতরাং উহার জ্ঞান কিরূপে হইবে ? পক্ষান্তরে, কাষ্ঠ পাষাণাদি ত লােকে প্রত্যক্ষ করিতেছে, লােকের জ্ঞানগােচর হইতেছে। তার জড়ের সহিত চৈতন্যের সত্তা সামান্যের অভেন রহিয়াছে, অর্থাৎ উভয়ে সমান কারণত রহিয়াছে, সহজ কথায়, একটী মৃত্ত পদার্থে যে জড়চেতনের সমাবেশ দেখ, তাহাদের উভয়ের কারণ ভূমা বা ব্যাপক চৈতন্য, কেননা, চৈতন্যই জগতের পূর্ববরূপ, জড় পররূপ, অর্থাৎ ভূমা চৈতন্যে, তােমার মনের বিধৰ্ম্মবশাং বা অধ্যাবলে তুমি জড় দেখিয়া থাক। অতএব সাদৃশ্য সম্বন্ধে সাম্য ভাবাপন্ন বস্তুদয়ের যখন উপলব্ধি যখন উপলব্ধি স্থির হইল অর্থাৎ উভয় পদার্থে চৈতন্য না থাকিলে যখন উপলব্ধি অসম্ভব হয়, তখন উপ- লব্ধির বিষয় নিখিল, পদার্থই অজড় বলিয়া জানিবে—চৈতন্যই একমাত্র বস্তু বলিয়া বুঝিবে। যখন চিৎ বা চৈতন্য চৈত্যরূপে ( পরিচ্ছিন্নরূপে ) কল্পিত হইয়া মন হয়, তখনই উহার চিদংশ অজড় ও চেত্যগংশ জড়। এই চিদংশই-বােধাংশ—বস্তু উপলব্ধির কারণ এবং চেত্যাংশ জড়রূপে দৃষ্ট হয়,অতএব নিরুদ্ধা- স্বরূপসিদ্ধি। মিথ্যা। বস্থায়—সম্যক দর্শনে জড় বলিয়া পদার্থ থাকে না, এক চৈতন্যই সর্বত্র বিরাজিত ; অতএব সিদ্ধ হইল যে, পদার্থের জড়ত্ব এবং দ্বিত্ব বােধ সাজ্ঞান বিভূতি-অনিরুদ্ধ মনের কাৰ্য। মনই মুল অজ্ঞান বা মায়ার স্বরূপ—ইতিপূর্বেই বলিয়াছি যে, মন অস্বাভাসে উদ্ভাসিত, সুতরাং তাহা তাপূর্ণ এবং পরিছি। যাহা অপূর্ণ এবং পরিছিঃ তাহা বিনাশশীল, তাহা পক্ষান্তরে উপাধিক, পরিছিন্ন শক্তিই মিথ্যাজ্ঞানের কারণ, সুতরাং পরিছিন্ন শক্তি এবং মিথ্যা জ্ঞান একই কথা। মন পরিছিন শক্তি, সুতরাং তাহা এই মিথ্যা জ্ঞানের বা অজ্ঞানের কারণস্বরূপ। এই মিথ্যা জ্ঞানের অপর পায় বৃত্ত্যধীন জ্ঞান। জাগতিক বা সাংসারিক যাবতীয় স্থানই এই বৃত্ত্যধীন জ্ঞান বা মন হইতে সস্তৃত। সুতরাং বলিতে হয় যে, মনই সমুদায় ভেদ-জ্ঞানের কারণ-দ্বৈত বুদ্ধির হেতু। মনােমূলক এই মিথ্যা জ্ঞান তাত্ত্বিক এবং প্রাধানিক ভেদে দ্বিবিধ। তানিত্য এবং অনায় স্কুল ভূতাদির জ্ঞান—জাগতিক দৈ জ্ঞান এই তাত্ত্বিক মিথ্যাজ্ঞানমূলক। এই স্থান আরও কিঞ্চিৎ পরিছিম্নত্ব বা স্কুল প্রাপ্ত হইলে, শুক্তিতে রজৎ দর্শন, স্থাণুতে (মুড়াগাছে) পুরুষ ভ্রম হয়। ইই প্রাধানিক বা প্রসিদ্ধ মিথ্য। জ্ঞান- অধ্যা নামে খ্যাত। এই অধ্যাসের কথা পরে বলিতেছি। এবম্বিধ মন লইয়াই জীব জন্ম গ্রহণ করিয়াছে, জগতের জন্ম হইয়াছে, সুতরাং বলিতে হয়,জাগতিক সমুদায় জ্ঞানই মনােমুক —মন হইতে উদ্ভুত। ইহ। (মনােমূলক অজ্ঞান) অদ্বৈত মনেরূপ নির্ণয়। । জ্ঞানের তুলনায়, পরমার্থতঃ মিথ্যা হইলেও, জাগতিক বুদ্ধিতে অর্থাৎ বন্ধাবস্থায় বা মনের অনিরুদ্ধাবস্থায় এই মিথ্যাজ্ঞান- কেই সত্য বলিয়া গ্রহণ করাই জীবের প্রকৃতি। তাই অনিরুদ্ধ- মনা.বা বন্ধু তুমি, ইহার যাথার্থ নিরূপণ করিতে পার না, সহজ কথায়, মিথ্যা জ্ঞানকে মিথ্যা বলিয়া বুঝ না। অথচ এবম্বিধ জ্ঞানের বা অজ্ঞানযুক্ত মনের বলে, তুমি সমুদায় সংসার কাৰ্য্য নির্বাহ করিয়া থাক। বিচারপতিরূপে—সত্যমিথ্যার বিচার কর। প্রচারকরূপে সত্যধর্মের উপদেশ কর। যাকমুর্তিতে যজমানকে স্বর্গে তুল! আরও কত কি করিয়া থাক, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। কিন্তু যে দিন, এই মিথ্যাজ্ঞান বহুজন্মের সুকৃতি বলে—গুরু প্রসাদাৎ মনােনিবােধ দ্বারা প্রকৃতই মিথ্যা বলিয়া বোধ হইবে, সে দিন তাবৎ জাগতিক ব্যবহার চল হইয়া যাইবে। সব ক্রিয়াদি স্থগিত হইবে। তাহাই পারমার্থিক সত্য জ্ঞান, মনের বা মিথ্যাজ্ঞানের আশ্রয়রূপে লুক্কায়িত এবং অদ্বৈতজ্ঞান নামে অভিহিত। তাহা জাগতিক যাবতীয় দ্বৈত জ্ঞানের নিবক এবং পরমানন্দপ্রদ। যে পৰ্যন্ত জীবে সরূপসিদ্ধিরদ্বারা এই অদ্বৈত জ্ঞানের স্থিতিলাভ না হয়, তাবৎ মনােমুলক মিথ্য। জ্ঞানকেই সত্য ভাবিয়া সংসার যাত্রা নির্বাহিত হইয়া থাকে। ইহাই জীবের স্বভাব, তাহার জীবত্ব এবং সংসারিত্বের হেতু। পক্ষান্তরে, কোন নিরুমনা বা সমাহিত মনা ব্যক্তি কৃপা পরবশ হইয়া তােমার এবম্বিধ আচরণের দোষ দেখাইয়া দিলেও, তােমার প্রমত্ত মন তােমাকে তাহা বুঝিবার বরূপসিদ্ধি। অবসর দেয় না। অতএব সিদ্ধ হইল যে, মনােহ্যবিদ্যা ভব বন্ধ হেতুঃ অর্থাৎ মনই মুল অজ্ঞান, মায়া বা অবিদ্যা নামে কথিত এবং সংসার বন্ধনের হেতু। অধ্যাস বা বিসর্গের কথা—মনের বিসর্গধৰ্ম্ম এবং অধ্যাস একই অর্থের দ্যোতক, পার্থক্য কেবল শব্দ বিন্যাসে। সবিশেষ বলিতেছি শুন। মহাভারত মােক্ষধৰ্ম্ম প্রকরণে মনের এই দশটী পৰ্য্যায়িক নাম লিখিত আছে যথা-(১), মহান বা প্রকৃতি, (২) মতি (৩) ব্রহ্মা (৪) পৃদ্ধি (৫) খ্যাতি (৬) ঈশ্বর (৭) প্রজ্ঞা (৮) সংবিং (6) চিতি এবং (৩) স্মৃতি, একই মন এই দশটী বিভিন্ন নামে শাস্ত্রাদিতে অভিহিত হইয়াছে। তাই কেহ মনকে ব্ৰহ্মা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, কেহ ঈশ্বর বলিয়াছেন, কেহ বা প্রকৃতি নামে আখ্যাত করিয়াছেন। আর এই মনের নয়টী গুণ বা ধৰ্ম্মের কথাও মহাভারতে উল্লিখিত আছে যথা- (১) ধৈৰ্য্য (২) উপপত্তি (৩) ব্যক্তি (স্মরণ বা আমি চিনত্ব। বলিয়া বোধ ) (৪) বিসর্গ হার্থাৎ বিপরীত সৃষ্টি বা ভ্রান্তি (৫) কল্পনা (৬) ক্ষমা (৭) সৎ (বৈরাগ্যাদি) (৮) অসং (রাগাদি) এবং (৯) আশুতা (চঞ্চলতা)। এক পদার্থে তাত পদার্থের ও তৎ ধৰ্ম্মের অবভাসকেই অধ্যাস করে। যেমন রঞ্জুতে সর্প দর্শন। স্থাণুতে (মুড়াগাছে। পুরুষভ্রম ইত্যাদি। রঞ্জু থাকিলেই, যেমন সংস্কার বা কল্পনা বলে তাহাতে সর্পাদির জ্ঞান সমুপস্থিত হইয়া থাকে, সেইমত মনের যে শক্তি পরিকল্পনা দ্বারা ব্ৰহ্মরূপ সদায়তনে বা সৎপ্রতিষ্ঠায় জগৎরূপ বিকার সংস্থানাদির মনােস্বরূপ নির্ণয়। . • প্রতীতি হইয়া থাকে তাহার নাম অধ্যায়। সুতরাং এই ধ্যাস মনেরই একটা ধৰ্ম্ম। ইহার অপর নাম বিসর্গ বি ( বিপরীত )+সর্গ (সৃষ্টি) অর্থাৎ বিপরীত সৃষ্টি। বলা বাহুল্য যে, ঈদৃশ বিকারসংস্থান প্রতীতি হেতু সতে (ব্ৰহ্মপদার্থে) কোন দোষ সংস্পৃষ্ট হয় না, কেননা, বিকার জাত পদার্থমাত্রেই বাক্যের অবলম্বন মাত্র, ব্যবহার কালে সত্যবৎ প্রতীতি হইলেও পরমার্থতঃ মিথ্যা।' সংই একমাত্র সত্য, ততএব জগৎ ব্যবহারিক সত্য—পরমার্থতঃ মিথ্যা। জগৎ মিথ্যা—একথা স্থূল দৃষ্টিতেও ভ্রমাত্মক বলিয়া বােধ হয়। কাৰ্যতঃ হয়ও তাই। তাই বন্ধ বা বিষয়ী ব্যক্তিগণ জগৎকে অনিত্য বলে, কিন্তু মিথ্যা বলিতে প্রস্তুত হয় না। অপিচ, জগৎ আদিতেও ছিল না এবং অন্তেও থাকে না। কেবল মধ্যবর্তী কালে বিকশিত মাত্র। একই পদার্থের আদি এবং অন্ত মিথ্যা হইলে, মধ্য সত্য হয় কেমনে ? মনের বিসর্গ বা আধ্যাস ধর্মবণাৎ ব্যবহারকালে সত্যবৎ বােধ হইলেও পরমার্থতঃ মিথ্যা। এই অধ্যাস বা বিসর্গ মনােমুলক—মনেরই অবান্তর ব্যাপার বিশেষ। মিথ্যাজ্ঞান নামে কথিত। ইহা সর্বানর্থের মুল, সংসার প্রবর্তের কারণ, জগৎ সত্যত্ব প্রতীতির হেতু। এবং জ্ঞান, মায়া, বিদ্যা ইত্যাদি বিবিধ নামে আখ্যাত। ইহা মনােমুলক বলিয়া মনের সরূপ ( জড় বা জগন্ময় রূপ) উদ্ভিন্ন হইলে, মন নিরােধ করিলে, দ্বৈত প্রপঞ্চের প্রবিলয়ে—জগৎ বিকাশের অভাবে, একাত্মসত্বার প্রকাশে, ইহার প্রভাব সহজেই সপসিদ্ধি। ৭ মন্দীভূত বা লুপ্তবৎ হইয়া যায়, তখন জগৎরহস্য ভিন্ন হয়। সহজ কথায়, অধ্যাস পদার্থ টী কি এবং কেন হয়? ইহা সম্যক অবগত হইতে হইলে মনােনিবােধ প্রয়ােজন। তাই অনিরুদ্ধ- মন বদ্ধ ইহার বিষয় কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, জগৎবৈচিত্র্য দেখিয়া কেবল চকিত হয় মাত্র। সুতরাং সৃষ্টিরহস্য তাহার নিকট রহস্য রূপেই রহিয়া যায়—উদ্ভিন্ন হয় না। তবে এখানে একথা বলা আবশ্যক যে, এই অধ্যাস বা মিথ্যা জ্ঞানের আধারটী সত্য, কিন্তু প্রতীতি মিথ্যা। মনে কর, যেমন রজ্জুতে সর্পজ্ঞান। এখানে রঞ্জুরূপ আধারটা সত্য, কিন্তু সর্প প্রতীতি মিথ্যা। প্রতীতি মিথ্যা হইলেও, সর্প দ্রষ্টার কিন্তু সর্পদর্শনজনিত ভীতি হেতু সেদ কম্পাদি হইয়া থাকে, অর্থাৎ দর্শন মিথ্যা হইলেও, দর্শন ফলে, সত্যবৎ কাৰ্যাদি কিন্তু হইতে দেখা যায় । বাহুল্য যে, মিথ্যাদশীর এইমতে স্বেদ কম্পাদি রূপ ভােগ হইয়া থাকে, কিন্তু সম্যকদর্শী, যাহার বস্তু জ্ঞান সত্য, অর্থাৎ যে রকে রক্ষ্মই দেখে, তাহার স্বেদ কম্পাদিরপ দুঃখভােগ বলা যাইতে পারে যে, মিথ্যাদর্শনজনিত উপভােগ সম্যকদর্শনে সংস্পৃষ্ট হয় না, সহজ কথায়, মিথ্যা দশীর ভােগ সম্যকদর্শাকে লাগে না। এই রঞ্জু সর্প অধ্যাস ন্যায়ে বলা যাইতে পারে যে, অনিরুদ্ধ মনা বন্ধ এবং পামর ব্যক্তিগণ ব্ৰহ্মধ্যস্ত মনােময় জগৎ দেখিয়া হা হতােস্মি করিয়া মরে, যেহেতু তাহারা মিথ্যাশী। তার নিরুদ্ধমনা মনোময় জগদাধার ব্ৰহ্মবস্তুকে সন্দর্শন করিয়া নিরতিশয় সুখানুভব করিয়া থাকে, বলা অসম্ভব। গত এব মনােস্বরূপ নির্ণয় । ৭১ যেহেতু তাহারা সম্যকদর্শী। সম্যকদর্শী, সমাহিত বা নিরুদ্ধ- মনা-সুতরাং তামনা। সম্যকজ্ঞানে একত্ব বা অভেদ-দর্শন হেতু নিরূপভােগ, আর মিথ্য। জ্ঞানে বহুত্ব বা ভেদদর্শন হেতু উপ- লােগ। অতএব বলা যাইতে পারে যে, সাংসারিক সমস্ত অনর্থের "হেতু এই অধ্যাস বা বিসর্গের কারণ মন। এবম্বিধ অধ্যাস বা মিথ্যা জ্ঞানযুক্ত মন লইয়া জীব জন্ম গ্রহণ করিয়াছে। এই মনের জন্যই জীবের জীব, সুতরাং আধ্যাস জীবের সহজাত। যাহার মন আছে, তাহার ধ্যাস আছে আর যাহার মন নাই যে অমনা হইয়াছে—উপায় বলে অমনীভাব সম্পাদন করিয়াছে, মন ধাতু যাহার প্রসন্ন হইয়াছে, তাহার ধ্যাস দূর হইয়াছে। তিনি বীতশােক হইয়াছেন। সুতরাং তাঁহার সম্বন্ধে ( জগৎ উপলব্ধি রূপ) ভোগাদি অসম্ভব। তঁাহারই স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হইয়াছে। তিনি ভূদেব বা বিশ্বদেব নামে খ্যাত এবং সতত পূজাই। ঐশ্বৰ্যকামী গৃহীগণ পাদপ্রক্ষালন, নমস্কার এবং শুশ্রুষাদিয়া দ্বারা সতত ইহাদের পূজা করিবে। শিষ্য-লােকে দেখা যায় যে, দৃষ্ট বা প্রত্যক্ষীভূত পদার্থেই অধ্যাস হইয়া থাকে। যে পদার্থের কোন সংস্কার নাই, যাহা কখনও প্রত্যক্ষীভূত হয় নাই,এ প্রকার অপ্রত্যক্ষীভূত আকা বস্তুতে অধ্যাস হয় কেমনে ? সবশেষ ৪র্থ অধ্যায়ে “বৃত্তি অমনীভাব কাহাকে বলে ? নিরােধােপায়ের” টিপ্পণী দেখ।

৭২
স্বরূপসিদ্ধি।
গুরু—তাহা হইতে পারে। অসম্ভব নহে। সবিশেষ
বলিতেছি শুন। আহ। অবিষয় সত্য,
আহঅবিষয় সত্য, কিন্তু যে প্রকারে
হাতে বিষয়ের বা বিষয়ধর্মের অধ্যস হইয়া থাকে, তাহ।
বলিতেছি—আহ। যে নিতান্ত তাবিষয়, কোন প্রকারে বিষয়
বা জ্ঞান গােচর নহেন, তাহা বলতে পার না। আত্মজ্ঞান
আছে, তাহা স্মৎ প্রত্যয়েয় গােছর তর্থাৎ এই জীবাবস্থায়
তাহাতে আমি এই মত ভাবের গােচরতা আছে, তার প্রত্যাগত্যা
বা অন্তরাত্মারূপে প্রসিদ্ধ বা ভাসমান বলিয়া অপরােত।
ও আছে। সহজ কথায়, আব্বা যখন “অহং” আমি এইমত
জ্ঞানের বিষয়, তখন আর তাহাকে একান্ত বিষয় বল কেমনে ?
এবং তাহা উৎপন্ন জ্ঞান ও নহে; অধিকন্তু আত্মা পরােক্ষ বা
প্রত্যক্ষ, একপা ও বলিতে পার না। কারণ চৈতন্যমাত্র
স্বভাব আতা প্রকৃতপক্ষে নিরুপাধিক এবং বিষয় হইলেও,
মন (জ্ঞান) কল্পিতে "তাহং” উপাধির দ্বারা বিষয়ত্ব প্রাপ্ত
হইয়াছেন—অহং জ্ঞানের গােচরীভূত হইয়াছেন। জীবের
সমাহিত অবস্থায়—বিবেককালে-- তান্যাস সময়ে, তিনি নিরু-
পাধিক বা নিরংশ,—কিন্তু বিবেককালে-বুখান বা অসমাহিত
তাবস্থায়—ধ্যাস সময়ে, তিনি সােপাধিক এবং সাংশ। ইহা
দ্বারা আরও বুঝা যাইতেছে যে, আত্মা “অহংজ্ঞানগম্য” কদাপি
ইদং জ্ঞানগম্য নহেন। কারণ, তাহঃ জ্ঞানের গোচর এক এবং
ইদং জ্ঞানের গোচর বহু। তার সেই সঙ্গমায় তাহং
জ্ঞানের যােগেই জীবরূপে প্রতীয়মান, এটাও স্মরণ রাখা উচিত।

মনােম্বরূপ নির্ণয় ।
৭৩
তােয়াস গম্য
তার এক কথা, যাহা চক্ষুরাদির দ্বারা প্রতীতি বা গ্রাহ্য হয়,
তাই প্রত্যক্ষ, এবং এইমত প্রত্যক্ষেই বিষয়ান্তরের অধ্যাস হইয়া
থাকে, অন্যত্র হয় না। এমন কিছু নিয়ম নাই। মনেকর,
তাকাশ। আকাশ পদার্থ চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ না হইলেও, তাহাতে
তজ্ঞজনগণ নিলীমাদির আরােপ করিয়া থাকে। তােমার এই
স্থূল দেহ পরিচ্ছিন্ন, ইহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ। ইহা বুঝাইবার জন্য
যেমন প্রমাণান্তরের তাবশ্যক হয় না, সেইমত আরা সাক্ষাৎ
প্রত্যক্ষ না হইলেও তােমার অন্তরতমত্ব বিধায় একবারে
তাপ্রত্যক্ষ নহেন, তবে তাহা বুঝা তাবশ্য অনুষ্ঠান সাপেক্ষ।
নহে। শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর নিদেশমতে
কতকদিন যথামত অনুষ্ঠান করিলেই তাহ! তুমি উপলব্ধি
করিতে পারিবে। তােমার সামান্য স্মৃতি জাগরিত বা উক্তি
হইবে : বিশেষ স্মরণে পরিণত হইবে। তুমি কৃতার্থ হইবে।
কারণ, সকলেরই আবিষয়ক সামান্য স্মরণ আছে, যেহেতু
সামান্যের বাধ কখন হয় না।
জাগতিক সমূহশাস্ত্রের অধাসমূলকত্ব কখন—দেহে-
ন্দ্রিয়াদির উপর তাহং সমাদি 'ভাব ন্যস্ত না
হইলে,
সহজ কথায়, দেহেন্দ্রিয়াদির অভিমান পরিত্যক্ত হইলে,
জীবভাব ও তৎ কাদি কিছুই থাকে না। জীবভাব না
থাকিলে, চক্ষুরাদির বিষয় গ্রহণে প্রবৃত্তি হয় না। ইন্দ্রিয়-
গণ নিরাশ্রয়ে-দেহাদির আশ্রয় ব্যতীত কাৰ্য্য করিতে পারে
না। ইন্দ্রিয়দিগকে ছাড়িয়া দিলে অর্থাৎ অহং মমাদি জ্ঞান

৭৪ বরূপসিদি। ইহা দ্বারা বজ্জিত হইলে, কি দিয়া কেমন করিয়া দেখিবে এবং শুনিবে? সহজ কথায়, স্থূলদেহের অস্তিত্ব (জ্ঞান) ভুলিয়া গেলে, ইন্দ্রিয়গণ কোথায় থাকিয়া, কি করিয়া আপনাপন কায্যাদি করিবে ? যেদেহে অহং মমাদি জ্ঞান নাই—নিবৃত্ত হইয়াছে, সে দেহের দ্বারা কোন জীব কি কোন কাৰ্য্য করিতে পারে ? কখনই না। তাদৃশ দেহ নিশ্চেষ্ট বা নিব্যাপার থাকে। সমাধি, সুষুপ্তি এবং মুচ্ছাকালে দেহাদিতে “অহং” মমাদি জ্ঞান থাকে না, সে জন্য তৎকালে জীবভাব ও লুপ্ত থাকে। সুতরাং ইন্দ্রিয়- গণ ও সে সময় নিশ্চেষ্ট এবং নিব্যাপার থাকে। প্রতিপন্ন হইতেছ যে, অসঙ্গ-আত্মা অহংবৃত্তির যােগে জীব হইয়াছেন, এবং ইন্দ্রিয়াদিতে অধ্যসিত হইয়। তদাশ্রিত অঙ্গদিগকে পরিচালন করিয়া থাকেন। অতএব বলা যাইতে পারে যে, অধ্যস্ত ভাব ব্যতীত অসঙ্গস্বভাব আর কর্তৃত্ব ভােক্তাদি সম্ভব হয় না। আর কর্তৃক বােধ ব্যতীত যখন প্রমাণাদির প্রবৃত্তি দেখা যায় না, তখন ইহ। অবশ্য স্বীকার্য যে, প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ ও বেদাদি শাস্ত্র সমুদায়ই অজ্ঞান (মন) আশ্রিত জীবের বিষয়—জীবভাবের অন্তর্গত। অনুষ্ঠান দ্বারা দেহে অহং মমাদি জ্ঞান নিবৃত্ত জীব বা জ্ঞানী স্বীয় সমাহিত অবস্থার স্মৃতিবলে, বুথান কালে, অহং মমাদির যােগে, সংক্ষেপতঃ জীবভাবে সমাধি স্মৃতি ফল সমূহ ইচ্ছা হইলে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করিতে পারেন বা করিয়া থাকেন, তাই সমাজে সত্য গ্রন্থের প্রচার। সুতরাং বলিতে হয় যে, ভূগােল অখিল : সশাস্ত্র সমাহিতের মনোরূপ নির্ণয়। বুত্থানকালে পরিকল্পিত বা লিখিত। তাতএব বলা যাইতে পারে যে, শাস্ত্রীয়, শাস্ত্রীয় সমুদায় ব্যবহারই জীবাশ্রিত হেতু অজ্ঞান মূলক বা মনকল্পিত। সুতরাং উহাদের ব্যবহারিক ব্যতীত পারমার্থিক সত্যতা নাই। তবে পারমার্থিক সত্যের কতকটা দ্যোতক বলিতে পার। পারমার্থিক সত্যজ্ঞানের উদয়ে বা প্রকাশে (যেহেতু এ জ্ঞান জন্মেনা, মনের পরিণামে বা নিরােধ জন্য অভিব্যক্তিতে) বেদ অবেদ হইয়া যায়। তত্র বেদা অবেদা ভবন্তীতি। কবির বলিয়াছেন—বেদ নকল কহে যে জানে”। ঈদৃশ সমাহিত ব্যক্তিই ব্ৰহ্মবিদ। ব্রহ্মবিদ ও ব্রহ্মে জাভেদ বপু-এক। ব্ৰহ্মবেদ ব্রহ্মেব ভবতি ই ইহার প্রমাণ। জ্ঞানী ও আমি উভয়ে অভিন্নদেহ-এক। জ্ঞানী বায়ৈব মে মত। এবম্বিধ জ্ঞানী বা আপ্তপুরুষের বাক্যই বেদ। তাই বেদ ব্ৰহ্ম বাক্য। কেবল বেদ কেন ? সমাহিতের বাক্যই ব্ৰহ্মবাক্য, বেদ, বাইবেল, কোরাণ, পুরাণ স্থানীয়। তবে বেদে কিম্বা বাইবলে কি অসমাহিতের বাক্য নাই? এই জন্যই সকল সমাজে সমাহিতের বা আপ্ত পুরুষের বাক্যের এত সমাদর। তা হওয়াই উচিত। কিন্তু বর্তমানে এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজে, অধিকাংশ স্থলেই এ বিধির বিপৰ্যয় দেখা যায়। এখন সমাহিত জ্ঞানীগণ, ঋষি, মুনি আচাৰ্য্যগণ “old fool” এর মধ্যে পড়িয়াছেন বলিলেই হয়। শিশ্নোদর পরায়ণ অসমাহিতমনা বদ্ধ বা বিষয়ী রাম শ্যাম, হগ, ডগ, হিদার দিদার প্রভৃতি এখন সমাহিত জ্ঞানীদিগের আসন গ্রহণ করিয়াছে, প্রায় সকলদেশের ৭১ স্বরূপসিদ্ধি। সর্বত্রেই,এই মত দেখা যায়। এবং তাহাদিগের লিখিত পুস্তকাদিই এখন সমাজে সমধিক সমাদৃত। ব্ৰহ্মবিদ্য। এবং ব্রহ্মবিগুরুর কথা-ব্রহ্মবিদ্যা লাভার্থ মনােনিরোধের পূর্বে আহসংস্থ হওয়া আবশ্যক, যেহেতু ইহা নিরােধযােগের, রাযােগের * বা স্বরূপসিদ্ধির প্রশস্ত রাজপথ আবার আত্মসংস্থত্বের জন্য তার্থাৎ তাহার ক্রমটী যথাযথভাবে অব গত হইবার জন্য দেহাদি ব্যতিরিক্ত প্রত্যক চৈতন্যকে জানা আব- শ্যক, তার এই প্রত্যক চৈতন্যকে নিঃসংশয়িতভাবে বিদিত হইবার জন্য গুরুকরণ অবশ্য প্রয়ােজনীয়, কেননা, ব্রহ্মবিদ গুরু দেহাদির আত্মত্ব প্রত্যাখ্যান করিয়া, যাহা অবশিষ্ট থাকে সেই প্রত্যক (সবদেহ ব্যাপী) চৈতন্যকে দেখাইয়া দেন । নারদই ইহার দীপ্যমান প্রমাণ। শাস্ত্রম্ভ নারদ অশেষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া ও দেহাদি ব্যতিরিক্ত অথচ সবদেহব্যাপী সেই প্রত্যক চৈতন্যকে জানিতে পারেন নাই, হ্মবিদ হইতে পারেন নাই। যেহেতু মন্ত্রবিদ ( বহু শাস্ত্রজ্ঞ ) হইলেই ব্ৰহ্মবি হয় བ| অতএব মুখের কথা কি বলিব, শাস্ত্র ও কদাপি স্বতন্ত্রভাবে ( গ্রন্থ পড়িয়া নিজে নিজে ) ব্ৰহ্মত্যান্বেষণ করিবে রাজযােগের বিশেষ বিবরণ ৪র্থ অধ্যায়ে “বৃত্তিনিরোধেরূপের প্রকাশ বা রাজযোগ” দেখ।

মনােস্বরূপ নির্ণয়। না। ব্ৰহ্মবি আচার্যের নিকট হইতেই তাহা জ্ঞাত হইবে। ইহাই বিধি। ইহাই বেদোপনিষৎ। সেই ব্রহ্মবিদ ঋষি, মুনি এবং আচাৰ্যদিগের ‘ক্রমে ক্রমে অন্তর্ধান হেতু, আচাৰ্য পরম্পরাগত ব্ৰহ্মবিদ্যা ছিন্নসম্প্রদায় হইয়া কালে লুপ্তবৎ হইয়া যাইবে, তাহা অনুমান করিয়াই আচাৰ্য যাস্ক তাহার নিরুক্ত গ্রন্থে ইহার ঈঙ্গিত করিয়া গিয়াছেন, গ্রন্থ বাহুল্য হেতু তাহা আর এখানে উদ্ধত, করা গেল না। আচার্যের বহুশতাব্দী পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও ভাজার সময়ে অনেক ঋষি, মুনি জীবিত থাকিলেও গীতায় (৪র্থ অধ্যায় দেখ ) ঠিক্ আচাৰ্য প্রােক্ত অভিমতই প্রকাশ করিয়াছেন, সুতরাং বলিতে হয় যে, আজ প্রায় পাঁচ হাজার বৎসর হইল গুরু বা আচাৰ্য পরম্পরাগত ব্ৰহ্মবিদ্যা সমগ্ৰভারতে ছিন্ন সম্প্রদায় হইয়াছে। বলা বাহুল্য যে, তৎকালিক সমাজে ও ব্রহ্মবিদ্গুরু বিরল হইয়াছিল। ইহা এভগ- বানের মুখেরই উক্তি। কিন্তু বর্তমান ভারতে,এই বিংশ শতাব্দীর সুসভা সমাজে, ইহার বিপরীত দেখা যাইতেছে। এখন হাটে ঘাটে, মাঠে পুলপিঠে, গুরু গড়াগড়ি যাইতেছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। সমধিক আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বর্তমান সমাজে যিনি ব্রহ্মচারী বলিয়া পরিচয় দেন, তিনিও গুরু। যিনি গৃহী তিনিও গুরু। বনী থাকিলে তিনিও নিশ্চিত এ কাঞ্চন সুযােগ ছাড়িতেন না। যত আশ্রমী সকলেই সুযােগমতে গুরু সাজিয়া বসিয়াছে। এবং শিষ্য সংগ্রহার্থে বিবিধ কৌশল অবলম্বন করিতেছে। শাস্ত্র কিন্তু বলেন, যিনি ৭ স্বরূপসিদ্ধি। । কোন আশ্রমীই নহেন-অত্যাশ্রমী বা অতিবর্ণাশ্রমী, তিনিই উত্তৰ গুরু। * শ্রোত্রিয়ব্রহ্মনিষ্ঠই প্রকৃতি গুরু—মুণ্ডকোপনিষদে লিখিত আছে যে, এই সংসার অনিত্য, ঈদৃশ সংসারের কৃত- কৰ্ম্মাদির দ্বারা অকৃত পরমাত্মা কদাপি লভ্য হন না। ইহা পুনঃ পুনঃ বিচার করিয়া বৈরাগ্য দৃঢ় কর। শমমাদি সম্পন্ন হও, তদনন্তর ব্রহ্মবিদ্যা লাভার্থে সমিপাণি হইয়া (যেহেতু রিক্ত হস্তে গুরু সমীপে যাওয়া নিষিদ্ধ ) শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরু সমীপে গমন কর। গুরু তােমায় যথাবৎ ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ প্রদান করিবেন। এই তোপদেশ দ্বারা নিম্নলিখিত অবশ্য বিজ্ঞাতব্য বিষয়গুলি প্রতিপাদিত হইয়াছে, যথা (১) গুরুকরণ অবশ্য প্রয়ােজনীয় (২) সেই গুরু শ্রেত্রিয় এবং ব্রহ্মনিষ্ঠ, এই দ্বিবিধ বিশেষণে বিশিষ্ট হইবেন, কারণ সংসারে কেবল শ্রোত্রিয় অর্থাৎ শাস্ত্রজ্ঞানযুক্ত অনেক ব্রাহ্মণ দেখা যায়, পাছে শিষ্য বা মুমুক্ষু কেবল শ্রোত্রিয়কেই গুরু পদে বরণ করে, এই আশঙ্কায় দ্বিতীয় বিশেষণ “ব্রহ্মনিষ্ঠ” বলিয়া শ্ৰোত্ৰিয়সাধারণকে প্রত্যাখ্যান করিতে বলিয়াছেন। (২) কোন ব্যক্তি শাস্ত্রজ্ঞ হইলেও, বিনা * সবিশেষ বিবরণ দর্শন নামক গ্রন্থে দীক্ষা এবং গুরু মাহাত্ম্য নামক অধ্যায় দেখ। সমুদায় সন্দেহ নিরাকৃত হইবে। ১৪৩ পৃষ্ঠা হইতে ২১৮ পৃষ্ঠা।

মনােম্বরূপ নির্ণয় ৭৯ গুরুকরণে, স্বয়ং, স্বতন্ত্র বা স্বাধীনভাবে যেন ব্ৰহ্মবিদ্যা লাভের চেষ্টা না করে। (৪) যাহার এককালেই অধ্যয়নাদি নাই,কিম্বা স্বল্প অধ্যয়ন আছে, এবং ধ্যান বৈরাগ্যাদি কিছুই নাই, এপ্রকার ব্যক্তিকে কদাপি গুরু বলিয়া গ্রহণ করিবে না। প্রমাদবশতঃ গৃহীত হইলেও, তাহাকে পুনঃ বৰ্জন করিবে। তাহাতে কিছুমাত্র প্রত্যব্যয় নাই। (৫) সাধন চতুষ্টয় সম্পন্ন বিরক্ত শিষ্যেরই কেবল ব্রহ্মবিদ্যায় অধিকার আছে, অন্যের নহে। (১) ব্রহ্মবিদ্যা অনন্ত মুখ বা অসীম বিধায় গুরুকারুণ্যরহিত শিষ্যে কেবল বেদাদি শাস্ত্রাধ্যয়ন মাত্রেই তাহার বিকাশ বা প্রকাশ সম্ভবে না। ন বহুনা তেন ইত্যাদি! সূৰ্য যেমন বিশ্বস্থ তাবৎ তেজের আকর, বারিধি যেমন ভূগােলস্থ নিখিল জলের আশ্রয়, আকাশ যেমন স্থূলাদি সমগ্র ভৌতিক পদার্থের আবকাশ. সেইমত ব্ৰহ্মবিদ্যা জগতস্থ তাবৎ বিদ্যার প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। সুতরাং ব্রহ্মবি সর্বববিদূসকল বিদ্যায় বিরান। অতএব, বলা যাইতে পারে যে, সমগ্র ভূগােল জ্ঞানের তুলনায়, বঙ্গদেশের কোন এক জেলার জ্ঞান যেমন তুচ্ছাদপি তুচ্ছ, তেমনি সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান (university learning " ব্ৰহ্মবিদ্যার তুলনায় তুচ্ছাদপি তুচ্ছ- তা-জ্ঞান নামেই অভিহিত। . উপাধিধারি, তুমি কি তাহা বুঝ? যদি বুঝিতে চাও, অভিমান ত্যাগ করিয়া যাজ্ঞবল্ক্যপদে জনকের ন্যায়, তুমিও ব্রহ্মবিদের পদতলে মস্তক অবলুষ্ঠিত কর। মন ত্রিগুণ—ত্রিগুণের ব্যাখ্য—যেমন শিলা মধ্যস্থ প্রতিমা এবং তিলস্থ তৈলের উপাদান শিলা ও তৈলে স্বনিষ্ট গুণ ৮০ স্বরূপসিদ্ধি। এয়াকত্ব আছে,সেইমত জগৎ উপাদান মনেও (মনাখ্য প্রকৃতিতে) গুণ ত্রয়াত্মকত্ব আছে। সে গুণত্রয় সত্ব, রজঃ এবং তমঃ। তাই ত্রিগুণ মনে গুণত্রয়ের ভাব আছে বলিতে হয়। ত্রিগুণের ভাব থাকিলেও সত্ত্বই মনের মুখ্য উপাদান; রজঃ এবং তমঃ উপাদান সহকারী সুতরাং উপম্ভক বিশেষ। সহজ কথায়, সই বিবর্তাকারে রজঃ ও তমােরূপে ভাসমান। সত্ত্বগুণেস্থিতি, রজে জন্ম বা আবির্ভাব এবং তমে বিনাশ বা তিনােভাব। একই শক্তির ত্রিধা স্ফুরণ—ত্রিমুর্তি নামে কল্পিত। এই ত্রিমুর্তি হইতেই ব্রহ্মাদি দেবয়ের কল্পনা। ইহ। উপাসনার জন্য নহে, এটী স্মরণ রাখিব।। এই গুণত্রয় তানন্য মিথুন (universally co-existing ), জাগতিক তাবৎ পদার্থে নূন্যাতিরেকভাবে বিদ্যমান। এই গুণ- ত্রয়ের পরিণামে জাগতিক নিখিলভূত ভৌতিক পদার্থ মুক্তি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু কথা হইতেছে যে, একরূপ কারণ হইতে বিবিধ বা বিচিত্র কার্যের উৎপত্তি হয় কেমনে ? পূর্বকই কাৰ্য গুণ হইয়া থাকে। কারণের বৈচিত্র্য বশতঃ কার্যের ও বৈচিত্র্য হয়, অর্থাৎ কারণ নানারূপ হইলে কাৰ্যও নানারূপ হইয়া থাকে। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু জগদাদি সৃষ্টির কারণ রূপ মন এক হইলেও, তাহার গুণত্রয়ের সাধ এবং বৈধৰ্ম রূপ পরিণামের বৈচিত্র্য বশতঃ, জগৎ কাৰ্য্যের বিচিত্রতা পরিদৃষ্ট হইয়া মনে কর, যেমন চঞ্চল, ইহা রজঃ গুণের সাধ্য কিন্তু সত্ব ও তমাে গুণের বৈধ। লবু, ইহা সত্ত্ব গুণের সাধ, কিন্তু রজ এবং তমম গুণের বৈধ ইত্যাদিবৎ সাধৰ্ম্ম বৈধৰ্ম কারণ গুণ থাকে।

মনােস্বরূপ নির্ণয়। ? নয়। মুলক। পরিণাম দ্বারা জগৎ বৈচিত্রের উৎপত্তি। এখন কথা হইতেছে যে, এই গুণত্রয়ের গুণ পদার্থটা কি ? এই গুণকে কেহ পারি- ভাষিক বলিয়াছেন, কেহ বা পুরুষপশুবন্ধনের রজ্ঞস্থানীয় বলিয়াছেন, কিন্তু এ সকল কেবল বা পারিপাট্য ভিন্ন আর কিছুই গুণ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি ? আকাশের যেমন শব্দ গুণ, তেমনি মনের গুণ সত্ত্বাদি। গুণপদা কাৰ্যাত্মভাব বা মুর্ত ক্রিয়া বিশেষ। ক্রিয়া বলিলে, শক্তিরই বিকশিত অবস্থামাত্র বুঝিতে হয়। অতএব দৃশ্য পদার্থ বা দ্বৈতমত্রেই সত্ত্বাদি গুণ পদার্থের মুৰ্ত ক্রিয়া বিশেষ। সহজ কথায়, দ্বৈত মাত্রেই মনাে- তাহ। ক্ৰমে প্রদর্শিত হইতেছে। দ্বৈতমাত্রেই সাদি দ্রব্যের গণবিক সঞ্চালনােদ্ভুত মূৰ্ত ক্রিয়া- ইতপূর্বেই বলিয়াছি যে, আভাসে মনের সৃষ্টি হইয়াছে, মন হইতে সূক্ষন ভূত। সেই মন ত্রিগুণ, অতএব ত্রিগুণ অর্থাৎ সত্বাদি গুণত্রয় হইতে সূক্ষ ভূত বা শব্দ স্পর্শাদি তন্মাত্র । এই সূক্ষম ভূত বা শব্দাদি তন্মাত্র হইতে স্থূলভূত বা এই স্থূল জগৎ উৎপন্ন হইয়াছে। ঈদৃশ সৃষ্টির প্রথম পর্ব হইল মন বা প্রকৃতি, দ্বিতীয় পর্ব, প্রকৃতির বিকৃতি বা পঞ্চতন, তৃতীয় পর্ব, বিকৃতির বিকৃতি পঞ্চ স্থূলভৃত। বিকৃতির বিকৃতি স্থূল ভূতােৎপন্ন এই দেহকে আমি ভাবিয়া যথাবৎ পালন করিয়া, সহজ কথায়, তৃতীয় পর্বে অবস্থিত হইয়া, বিনা অনুষ্ঠানে, বিনা গুরূপদেশে, প্রথম পর্বের বিষয় বা পৰ্বাতীতের বিষয় অবগত হইবার চেষ্টা, প্রাংশু (লম্বা মানুষ ) লভ্য ফলগ্রহণে বামনের এবং

৮২
বরূপসিদ্ধি।
হস্ত প্রসারণবৎ ব্যর্থ। এবম্বিধ দেহাত্মজ্ঞান লইয়াই লােকে
জাগতিক তাবৎ ব্যাপার নির্বাহ করিতেছে, সব বিষয় জানিতে
ইচ্ছা করে।
ফল ও তদ্বৎ হইতেছে। যত দিন দ্বৈত প্রপঞ্চ
জীবের মনে
বর্তমান থাকে, ততদিন তাহার সংশয়
নিবর্তিত হয় না। সুতরাং ব্ৰহ্মতত্ত্বাবধােধও হয় না। অতএব
দ্বৈত প্রপঞ্চের প্রবিলয় আবশ্যক। ঐ যে বৃক্ষটা দেখিতেছ,
উহা কি ? উহা কেবল শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রসাদি গুণের সমবেত
ফলমাত্র। শব্দ স্পর্শাদি প্রসিদ্ধ গুণপদার্থ। অর্থাৎ মূর্ত
ক্রিয়া বিশেষ। ইহারা সূক্ষমভূত, তন্মাত্ৰাত্মক
সূক্ষমভূত, তন্মাত্ৰাত্মক এবং সত্যাদি
হইতে উদ্ভুত। জাগতিক পদার্থ বা জগৎরচণাবিষয়ে শব্দ
স্পশাদির পৃথক উল্লেখ না করিয়া, ইহাদের উৎপত্তি কারণ
সাদিত্রয়েরই বিচার করা যাইতেছে। অর্থাৎ এই সত্যদি ত্রিগুণের
বিপরিণামে জাগতিক পদার্থ সমূহ কেমনে মুক্ত বা সংপিণ্ডিতা-
কারে প্রতীয়মান হইয়া থাকে, ক্রমে তাহাই বলা যাইতেছে।
সত্ব, রজ এবং তমের মধ্যে তমই প্রধান। এই তমােগুণের
পরিণাম প্রাবল্যে পদার্থদি
জড়রূপে
ইন্দ্রিয় গ্রাহাবস্থা
এপ্ত হয় এবং ভেদজ্ঞানের কারণ হয়। এই ভেদ জ্ঞানই
দুঃখের হেতু, এইজন্য তমঃ মােহ বা দুঃখত্মক বলিয়া উক্ত
. We freely admit that what we mean by a tree
is merely a congeneries of qualities that are visual,
tactual and perhaps adorous, sapid and sonorous.
! Fiskis Cosmic Philosophy Vol. I, Page 80 )

মনােরূপ নির্ণয়। ৮৩ হইয়াছে। ফল- গুণ পরিণামের প্রাবল্যে মন যতই বিকৃত হয় বা বিকার ভাব প্রাপ্ত হয়, ততই তমােগুণের বৃদ্ধি পায়। জড় বা স্থূল উপাধির প্রতীতি হেতু ভেদ জ্ঞান-সংসারের সত্যুহু প্রতীতি এবং তদাসক্তির দাঢ্যতা। ইহাই জীব সাধা- রণের জাগ্ৰদাবস্থা। ভেদ সত্যত্ব বুদ্ধি অনিবারকত্ব হেতু অর্থাৎ মনুষ্য, পশু, পক্ষ্যাদি রূপ ভেদজ্ঞানই সত্য-মিথ্যা নহে। এই ভেদ সত্য প্রতীতি হেতু, ইহাকে জাগ্ৰদাবস্থা বলে, সুতরাং ইহা তােমার পারমার্থিক বা প্রকৃতজাগ্ৰৎ * নহে ব্যবহারিক। এই ব্যবহারিক জাগ্ৰদাবস্থায়, মন স্থূলদেহে যুক্ত থাকিয়া,ঐন্দ্রিক সুখ দুঃখাদি উপভােগ দ্বারা কখন হর্ষিত কখন বা ক্ষোভিত হয় এবং অনুক্ষণ সবেগে বহিব্যাপারে ধাবিত হয়। কদাপি দমিত বা নিগৃহীত হয়। ইহার নাম স্থলাভিমানী বহির্মুখীন মন। পামর এবং বদ্ধ ব্যক্তিদিগের মনই এইমত। নিরােধযােগ বা স্বরূপসিদ্ধি ইহাদের পক্ষে এককালে অসম্ভব। অতএব বলা যাইতে পারে যে, ভ্রান্তিকল্পিত অনাত্ম স্বরূপ স্থূল পদার্থাকারের হেতুই হইল তমো। সুতরাং দৃশ্য পদার্থ সকল বা • ইন্দ্রিয়াদি জাগ্রৎকালের ন্যায় ও স্ব গোলকেই থাকিবে। সুষুপ্তেয় স্যায় গােলক পরিত্যাগ করিবে না, অথচ তাহাদিগের দ্বারা বিষয়াদি গৃহীত হইবে না, চক্ষু উন্মিলিতই শাকিবে, অথচ তাহা বস্তু (ব্রহ্ম) ভিন্নঅব( বিষয় বা জগৎ) দর্শন করিবে না এবং দেহাদিতে সংহতত্ত্ব বুজি পরিশূন্য হইবে। ইহারই নাম প্রকৃত জাগ্রৎ। সবিশেষ জীবতত্ত্ব বিবেক-জাগ্ৰদাদি অষস্থাতত্ব” দেখ--১৯১ পৃষ্ঠা।

৮৪ বরূপসিদ্ধি। সহজ জড়বর্গ উপেক্ষিত হইলে--মিথ্যা বলিয়া প্রতীতি জন্মিলে,তমে ক্রমে অভিভূত হইতে থাকে, তমের অভিভবে,স্থূলমন সূক্ষমত্ব প্রাপ্ত হয়। রজঃ—পদার্থাদির এবম্বিধ মুর্তিনির্মাণের বা আবির্ভাবের প্রথম স্ফুরণ বা সহায়। তাই রজ রাগ বা দুঃখাত্মক। রজের অভিভবে মনের চাঞ্চল্য বিনষ্ট হইয়া মন একাগ্র হয়। এবং সব কেন্দ্র বা সন্ধিস্থান, স্থিতির জ্ঞাপক এবং সুখাত্মক। আবির্ভাব এবং তিরােভাবাত্মক রজো এবং তমােগুণদ্বয়ের ধারক। সত্বরূপী এই অবিলােপী পদার্থের আশ্রয়ে রজ এবং তম ক্রিড়া করিয়া থাকে-অর্থাৎ বিবিধ পরিণামে পরিণত হইয়া থাকে। কথায়, জগৎবৈচিত্র্য উৎপাদন করিয়া থাকে। বলা বাহুল্য যে,এই সত্ত্বাদিত্রয় জড়পদার্থ, জড় চিরকালই পরতন্ত্র এবং নিয়ম। সুতরাং ইহারা স্বতন্ত্র বা স্বাধীনতাবে কোন কার্য করিতে পারে না। চৈতন্য বা আত্মাই ইহাদের নিয়ামক এবং স্বতন্ত্র কা। নিখিল জড়শক্তি এই আহ্বাধীনে ক্রিয়াশীল হয়। এটী সর্বদা স্মরণ রাখিবে। মনেব স-রূপ এবং অরূপের কথা—এই সত্যাদি গুণত্রয়ের পরমরূপ দৃষ্টিগােচরীভূত নহে। যাহা কিছু দেখা যায়, তাহা মায়িক, সুতরাং পরমের তুলনায় অতীব তুচ্ছ। নিম্নে সংক্ষেপে তাহার কিঞ্চিৎ আভাস প্রদত্ত হইল। ইতপূর্বেই বলিয়াছি যে, সহে স্থিতি, রজে আবির্ভাব এবং তমে তিরােভাব। বিশ্বের সকল পদার্থেই এই ত্রিবিধ প্রবৃত্তি নিত্য বিদ্যমান। আমরা যাহা কিছু অনুভব করি, তাহা এই প্রবৃত্তি (সত্বাদি গুণ) মনােথরূপ নির্ণয়। ৮৫ এবং সত্বে সতত ত্রয়ের পরিণামভাববিকার। অতএব ভাববিকার মাত্রেই ত্রিগুণাহাক। তবে সকল ভাব বিকারে গুণত্রয়ের পরিণাম সমান নহে, বা হইতে পারে না। ন্যূনাতিরেক আছে। কোথায় রলো বহুল, কোথায় তমাে বহুল এবং কোথায় বা সত্ব বহুল পরিণাম, এই মাত্র ভেদ। আর এক কথা, রজে আবির্ভাব বা জন্ম। “জন্মে” বলিলেই পূৰ্ব বিদ্যমান পদার্থের অস্তিত্ব উপলব্ধি হইয়া থাকে। কারণ, অবিদ্যমানের জন্ম বা আবির্ভাব অসম্ভব। সুতরাং বলিতে হয় যে, মৃত্তিকায় ঘটাদি- ভাব বিকারের অস্তিত্ব, জম্মদিভাব বিকার ( রঃ এবং তমঃ), সর্বার্থপ্রসবশক্তিমান সর্বাগ্রগুণাধার বিদ্যমান, সুতরাং সর্বার্থপ্রসবশক্তিমান সই, ক্রমে রজ এবং তমােরূপে স্ফুর্তি পায়। তখন স্থূল সৃষ্টি আরম্ভ হয়। স-রূপ বা জগৎ বিকাশ রূপ প্রকাশ পায়। দ্বৈত বুদ্ধি উপজিত হয়। ইহাই বন্ধেব অবস্থা। পক্ষান্তরে, রজঃ এবং তমের অবিভবে কেবল সত্বেরই বিকাশ অবশিষ্ট থাকে, ইহাই সূক্ষম সংস্কারশিষ্ট মন, বা মনের অরূপ। তখন স্থূলসৃষ্টি লােপ পায়, মনের স-রূপ নাশ হয়। অদ্বৈত বুদ্ধি উপস্থিত হয়। ইহা জীবম্মুক্তের বা স্বরূপসিদ্ধের অবস্থা। আবার বিদেহ মুক্তিকালে সেই সূক্ষন সংস্কার শিষ্ট মন (সত্ব মাত্র) বা মনের অরূপ অর্থাৎ দগ্ধ রঞ্জুর ভস্মাকার রূপবৎ শিষ্টজগৎরূপ ও উত্তপ্ত লৌহপিণ্ডে প্রক্ষিপ্ত জলবিন্দুর শােষণবং স্বতঃই স্বকারণরূপ ভূমা চৈতনে বিলীন হইয়া যায়। ইহারই নাম মনের অরূপনাশ, মনের বরূপসিদ্ধি। তখন দেহ ধৃত হয় না এবং পাতে ও পুনঃ লাভ হয় না। ইহারই নাম “পরান্তকাল বা নিদানকাল।” “পরান্তকালে পরিমুচন্তি সর্বে। সম্প্রজ্ঞাত সমাধি বিজ্ঞাপক যােগশাস্ত্ৰ এইখানেই পৰ্যপসিত হইয়াছে। ইহাই স্বরূপসিদ্ধির বা রাজযােগের পরমঅবধি এবং পরাগতি। জগৎ ভাবাভাবময় হইল কেন ?-সহাদির বিশেষ ভাব বিকায়ই তাহার কারণ। সবিশেষ বলিতেছি শুন। বিকার মাত্রেই আপেক্ষিক বা সপ্রতিযােগিক অর্থাৎ ভাব থাকি- সেই অভাব ও আছে স্বীকার করিতে হয়। “হ” থাকিলেই “না” ও আছে, সুতরাং এই দৃশ্য বা জগৎ ভাবাভাবময় সদ- সদাত্মক। কিন্তু ইতপূর্বেই বলিয়াছি যে, মন সদসদ হইতে কিঞ্চিৎ বিশিষ্ট ; জগৎ কিন্তু সদসদাত্মক, সুতরাং জগৎ মনেরই ধর্মমনান্তৰ্গত, অতিরিক্ত নহে। এখন কথা হইতেছে যে, এপ্রকার হইল কেন? ইহার কি উত্তর করিবে । যদি কেহ তােমায় জিজ্ঞাসা করে যে, ব্যাকরণে তিনটী লিঙ্গের কথাই আছে। তিনের অধিক ও নাই কমও নাই। ইহার কারণ কি? তদুত্তরে তাহাকে কি বলিবে? এখানে বলা আবশ্যক যে, ব্যাকরণের লিঙ্গত্রয় সাদিগুণত্রয় হইতেই হইয়াছে। তিনটা, সুতরাং লিঙ্গও তিনটী। নচেৎ স্ত্রী কিম্বা পুংস্ত চিহ্ন দেখিয়া পদার্থের লিঙ্গ নির্ণয় হয় নাই। আর তাহা হওয়াও অসম্ভব। তৰে স্থূলদর্শী অনভিজ্ঞ ব্যক্তি তাহা মনে করিতে পারে। মনেকর, খট্টা কি বৃক্ষ শব্দ। ব্যাকরণ মতে, খট্টা শব্দ স্ত্রীলিঙ্গ ; গুণ মনােরূপ নির্ণয়। ৮৭ এবং বৃক্ষ পুংলিঙ্গ। কিন্তু খট্টাতে কি স্ত্রীত্ব চিহ্ন দেখিয়া বৈয়াকরণ ইহাকে স্ত্রীলিঙ্গ বলিয়াছেন, এবং বৃক্ষতে পুংস্ত চিহ্ন দেখিয়া কি পুংলিঙ্গবলিয়াছেন ? কখনই না। এলিঙ্গ নির্ণয় গুণত্রয়ের ভাব বিকার দৈখিয়া কথিত হইয়াছে। পতঞ্জলিকৃত ব্যাকরণ মহাভাষ্যে লিখিত আছে যে,সূতে পুমান ইতি অর্থাৎ যিনি •প্রসব করেন, যিনি প্রবৃত্তিধৰ্ম্মযুক্ত, তিনি পুরুষ। পুরুষ কর্তৃসাধন। আর স্ত্যায়ত্যস্যাং গর্ভ ইতি অর্থাৎ যাহাতে গর্ভ সংঘাত প্রাপ্ত হয়—পদার্থ মুরূপে প্রতীয়মান হয়, তাহা স্ত্রী। স্ত্রী অধিকরণ সাধন। অতএব অধিকরণসাধন স্ত্রী ৰা তমাে এবং কর্তৃধন পুরুষ বা রজঃ, উভয়েই ত্রিগুণ মনের ভাৰসাধন এবং যথাক্রমে সংস্তান ও প্রবৃত্তি এই অর্থদ্বয়ের দ্যোতক। ইহারা অনন্যমিথুন-যুগলরূপ। দম্পতীবৎ নিত্য একত্রাবস্থিত। একটী ছাড়া অপরটা থাকেনা। আর এই রলো এবং তমাে, ভাব ও অভাব,অথবা জন্ম ও বিনাশ,এতদুভয়ের অন্তরালাবস্থাকে স্থিতি কহে। ইহা সত্ব, সহ সুতরাং নপূংসক লিঙ্গ। তাই ব্যাকরণে ত্রিবিধ লিঙ্গের কথাই শুনা যায়, তিনের অধিক ও নাই কমও নাই। বলা বাহুল্য যে, যেমন স্বাদিগুণ ত্রয়ের ভাব বিকার দেখিয়া ব্যাকরণের লিঙ্গ নির্ণীত হইয়াছে, সেইমত নিগুণব্রহ্ম মন (মায়া) প্রভাবে সগুণব্রহ্ম, বা ঈশ্বররূপে যত প্রকার ভাব বিকারে বিবর্তিত হন, জগদাকার ধারণ করেন, ভাবে ততই অভাব প্রতীয়মান হয়। ইহা মনের বিসর্গ ধৰ্ম্মের স্বভাব। অতএব বলিতে হয় যে, জগৎ ভাবাভাব- ৮৮ স্বরূপসিদ্ধি। ময় রূপে প্রকাশ পাইবার কারণ, সগুণ ব্রহ্মের স্বভাব, যেহেতু সুভাষ—মন—ত্রিগুণময়, ভাবাভাব যুক্ত। মনের সংগ্রহ সার কখন—ইতপূর্বেই মনের স্বরূপ নির্ণয়- কালে বলিয়াছি যে, মন সূক্ষম অহং শক্তি, পরিচ্ছেদাভিমানাত্মক চিৎ স্বরূপ অর্থাৎ অহং বৃত্তিরূপ উপাধিযােগে বিবৰ্তাকায়ে উদ্ভাসিত চিৎই মন। সহজ কথায়, আমি চিদাত্মা এবম্বিধ বােধই মন। মনের এ গুণের বা ধর্মের নাম ব্যক্তি বা সংজ্ঞান। মনসর্বপ্রাণী দেহে ওতপ্রােতভাবে অবস্থিত হইয়াও তৎব্যতিরিক্ত এবং তাহার নিয়ামক। তাই ইহার একটী নাম মহান বা মহত্তত্ব। ইহাই সামান্য অহংকারের স্যক্তি বা প্রকাশ। এই সামান্য অহংকার অর্থাৎ “আমি মাত্র বােধই” কিঞ্চিৎ স্থূলত্ব প্রাপ্ত হইয়া “আমার বােধে” বিশেষ অহংকাররূপে প্রতীত হয়। দ্বৈত বুদ্ধি উপজিত হয়। আর ও কিঞ্চিৎ স্থূলত্ব প্রাপ্ত হইয়া তােমায় দেহেদ্রিয়াদিযুক্ত-সাড়েতিহস্ত প্রমাণ করিয়া তুলে, সুতরাং দ্বৈত জগৎ প্রকাশিত হয়। ইহা দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, সামান্য এবং বিশেষ অহংকার সমষ্টি বা মনই তােমাকে দেহবানরূপে প্রতীয়মান কয়াইয়াছে, এইজন্য মনকে ধাতু বলে- শরীরস্য ধারণাৎ। জগৎ প্রকাশ পাইয়াছে। যেহেতু ব্যষ্টি তুমিই সমষ্টিভাবে জগৎ। এখন কথা হইতেছে যে,এই সামান্য এবং বিশেষ অহংকার * দয় (মন—কেননা, ইহাদের সমবায়ই মন) ইহার প্রণালী চতুর্থ অধ্যায়ে প্রকারান্তর নিয়ে উপায়” ।

মনােম্বরূপ নির্ণয়। উপায় বা সাধনবলে নিরুদ্ধ করিতে পারিলেই—তুমি স্বস্বরূপে- অদেহরূপে অবস্থিত হইতে পারিবে। তােমার পূর্ণত্ব উপলব্ধি করিবে, যেহেতু স্বাতিরিক্ত ব্যবচ্ছেদকের অভাবই পূর্ণ। স্বরূপসিদ্ধি তোমার করতলস্থ হইবে। সে উপায় বা সাধনের মাম মনােনিবােধ। তাই সাধন অধ্যায় উপাসনাকাণ্ড এবং 'নিরােধ অধ্যায় মােকা নামে অভিহিত হইয়াছে। এইক্ষণে মােক্ষ বা স্বরূপসিদ্ধি প্রতিপাদক সেই নিরােধের বিষয়ই বল। যাইবে। ইতি বেদানুবচন। ইতি শ্রীপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীমৎস্বামী আত্মানন্দ- সরস্বতী শিষ্য শ্রীমৎ স্বামী যােগানন্দ সরস্বতী বিরচিত সরূপসিদ্ধি গ্রন্থে উপাসনাকাণ্ডে মননস্বরূপ নির্ণয় নামক তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত

চতুর্থ অধ্যায়।
( মােক্ষ কাণ্ড)
নিরোধ বৰূপ নির্ণয়।
স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তির সাধন—মনােনিরোধ বা মনােনাশই
জীবন্মুক্তি বা স্বরূপসিদ্ধির মুখ্যসাধন। সমুদায়বাসনা ক্ষয়েও তাহা
সমধিগত হয়। সবাসনাক্ষয়াল্লাভঃ। সেই বাসনায় আবার
মনােনাণ বা মনের
মনের বৃত্তিনিরােধ দ্বারা সুসংসাধিত হইয়া
থাকে, কেননা, বাসনামত্রেই মনােমুলক।
মনােলক। পূর্ব পূর্ব
অভ্যাসেনচিত্তে বাস্যমানহাৎ বাসনা, অর্থাৎ পূর্ব পূর্ব অভ্যাস
জনিত চিত্তগত সংস্কারের নামই বাসনা। অতএব মন
অধিষ্ঠান, বাসনা প্রত্যধিষ্ঠান। যেমন অঙ্গ নিরপেক্ষ হইয়া
প্রত্যঙ্গ থাকিতে পারে না, সেইমত অধিষ্ঠান নিরপেক্ষ হইয়া
প্রত্যধিষ্ঠান ও কখন থাকিতে পারে না। সহজ কথায়, মনের
নিরােধে বা অভাবে বাসনার ও অভাব হয়। ভাল, তাহাই যদি
হইল, তবে অনেক স্থলে বাসনাক্ষয়ের পৃথক উপন্যাস দেখা যায়
কেন? তদুত্তরে আপাততঃ এই বলিলেই পৰ্যাপ্ত হইবে যে,

নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। বসনামাত্রেই কামনা বা মননামুলক সুতরাং মনােনিগ্রহ দ্বারা তাহারা নিঃশংসয়িত রূপে ক্ষয় হইলেও,মনােনিগ্রহ অতীব দুঃষ্কর বিধায়, প্রথমতঃ বিবেকোদয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ দ্বার—আদৌ কতক রাসনা ক্ষয় করিতে পারিলে,কালে স্বতন্ত্রভাবে মনােনিবােধ দ্বারা বাসনায় সুরক্ষিত হয় এবং মনােনিবােধের অনুষ্ঠান প্রণালীও অপেক্ষাকৃত সুগম হয়। এইজন্যই কেহ কেহ স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তির সাধন স্বরূপ বাসনা ক্ষয় এবং মনােনিবােধ এতদুভয়েরই উল্লেখ কৰি থাকেন। বলা বাহুল্য যে, জীবমুক্তির মুখ্য সাধন কিন্তু মনােনিবােধ। ভাল, অগ্রে বাসনার স্বরূপ এবং তৎক্ষয়ের কিঞ্চিৎ আলােচনা করিয়া, পশ্চাৎ মনােনিগ্রহের বিষয় বলা যাইবেক। বাসনার সংক্ষেপ বিবরণ-বাসনা সাধারণত দ্বিবিধ যথা— শুদ্ধ বাসনা এবং মলিন বাসনা। শুদ্ধ বাসনা জন্ম বিনাশিনী এবং মলিনা পূনর্জন্মের কারণ। এই মলিনা বাসনা আবার ত্রিবিধ যথা-(১) লােক বাসনা (২) শাস্ত্র বাসনা এবং (৩) দেহ বাসনা। ক্রমে সবিশেষ বলিতেছি- (১) লােক বাসনা-কেহ যেন আমার নিন্দা না করে, সকলেই যেন আমার প্রশংসা করে, ইত্যাদি প্রকার অভিনিবেশ ৰা মিথ্যা জ্ঞানযুক্ত হইয়া সংসার যাত্রা নির্বাহ করার নাম লােক বাসনা; কিন্তু ঈদৃশ ব্যবহার প্রাপ্তি কি কাহারও পক্ষে সম্ভবপর ? যেহেতু জগৎকে সন্তুষ্ট করা কাহারও সাধ্যায়ত্ত নহে বা হইতে পারে না। অন্যের কথা কি বলিব, অন্যের কথা কি বলিব, পুরুষসিংহ মহারাজ রাম- ;

৯২ স্বরূপসিদ্ধি। চন্দ্রের পতিব্রতা শিয়ােমণি সহধৰ্ম্মিণী সীতার ও শ্রবণাশ্য জনাপবাদ শুনা যায়। পুরুষােত্তম শ্রীকৃষ্ণের ও নিন্দুক ছিল। এইজন্যই মােক্ষশাস্ত্রে নিন্দা এবং স্তুতি তুল্য * বলিয়াছেন অর্থাৎ জ্ঞানী এতদুভয়ের পরিণাম একই 'দেখিবেন। উভয়েই বাক্য স্ফুর্তি, বায়ুতে লীন হইয়া যায়। অভিমানী তাহাতে ব্যথিত হয়, আর নিরভিমানীর হাতে কিছুই হয় না। (২) শাস্ত্র বাসনা—ইহা আবার ত্রিবিধ যথা (ক) পাঠ ব্যসন ( খ ) শাস্ত্র ব্যসন এবং অনুষ্ঠান ব্যসন। ব্যসন ব্যসতি শ্ৰেয়োমাগাং ব্যসনং দোযঃ। দুর্জিয়া, কামজ এবং ক্রোধ ভেদে এই দোষ অষ্টাদশ প্রকার। সবিশেষ “স্মৃতি শাস্ত্র দেখ। (ক) পাঠ ব্যসন—ইংরাজিতে ইহাকে Fookivorm বলে। * লোকে বলে চলন বিষ্ঠার সমজ্ঞান। এ প্রবাদের প্রকৃত অর্থ কি ? চন্দন সুগন্ধ পদার্থ এবং বিষ্ঠ। দুর্গন্ধ। এরূপ বিরুদ্ধ ধৰ্ম্মী পদার্থ সম বা এক হয় কেমনে ? উভয়ের পরিণাম এক মৃত্তিকা ইহাই বুঝা অর্থাৎ চন্দনই কালে বিষ্ঠা (মৃজিকার রূপে পরিণত) হইতেছে এবং বিষ্ঠা (মৃদ্বিার) হইতে চন্দন হইতেছে। ইহাই নাম সম বা এক জ্ঞান। অথবা "সম” শব্দে নিৰ্বিশেষ বস্তু—ব্রহ্মকে বুঝায়। সেই নিৰ্বিশেষ ব্ৰহ্মবস্তুই জগৎ এবং জগত তাবৎ পদার্থের সত্তা। পদার্থাদির নিজের কোন পৃথক সত্তা নাই, তাহারা ব্ৰহ্ম সস্তায় কেবল ভাসমান মাত্র। ব্যবহারত–উপাধিবশাৎ পৃথক দেখাইলেও, পরমার্থতা নিরুপাধিক এবং হেয় উপাদেয় পরিশুন্য সুতরাং সম*। s নিবােধস্বরূপ নির্ণয়। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে—লিখিত আছে যে, ভরদ্বাজ মুনি ৭৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত অধ্যয়ন করিয়া ও তাহার অধ্যয়ন—পিপাসা নিবৃত্ত হয় নাই। পরিশেষে ইন্দ্রদেব করুণাপরবশ হইয়া তাহার অধ্যয়নের শ্যত্ব বুঝাইয়া দিয়া ব্ৰহ্মবিদার উপদেশ প্রদান পূর্বক তাহাকে অধ্যয়ন ব্যসন হইতে প্রতিনিবৃত্ত করিয়াছিলেন। (খ) শাস্ত্র ব্যসনকাবেশেয় গীতায় লিখিত আছে যে, দুর্বাশা নামে কোন মুনি বহুবিধ শাস্ত্র পুস্তকের ভার লইয়া মহাদেবকে নমস্কার করিবার জন্য তাঁহার সভায় সমাগমন করিলে, নারদ মুনি কর্তৃক তিনি ভারবাহী গর্দভ বলিয়া তিরস্কৃত হইয়াছিলেন। নারদ বাক্যে দুর্বাশা অত্যন্ত কুপিত হইয়া সমুদায় শাস্ত্র পুস্তকের তার, ভাবীকে সমুদ্র জলে নিক্ষেপ করিতে বলিয়া স্বয়ং মহাদেব সমীপে ব্ৰহ্মবিদ্যা শিক্ষার্থে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। (গ) অনুষ্ঠান ব্যসন—যােগবাশিস্টে লিখিত আছে যে, দাসুর অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাড্য হেতু অনুষ্ঠানাদি করিবার জন্য কোথায় ও মনােম শুদ্ধভূমি বা স্থান প্রাপ্ত হন নাই। বিষ্ণু পুরাণের “ঋভু নিদাঘ সংবাদ” ও অনুষ্ঠান ব্যসনের দীপ্যমান প্রমাণ। সবিশেষ ২য় অধ্যায়ে—“বিপর্যয়ের প্রস্তাব” ৪১ পৃষ্ঠা দেখ। (৩) দেহবাসনা—ইহা ত্রিবিধ যথা (ক) দেহাবুদ্ধি অর্থাৎ এই পূল দেহই আত্মা এবম্বিধ বােধ। (থ) গুণধােন এবং (গ) দোষাপনয়ন। এই গুণাধান এবং দোষাপনয়ন লৌকিক এবং শাস্ত্রীয় ভেদে দ্বিবিধ যথা—গান করিবার সময়, কিম্বা অধ্যয়ন বা বক্তৃতার সময়, কণ্ঠস্বর সুমধুর করিবার জন্য ১৪ বরূপসিবি। লােকে মরিচাদি ভক্ষণ করিয়া থাকে। বলা বাহুল্য যে, এবম্বিধ আচরণে অতি অল্প সংখ্যক লােকই—ধ্বনি সৌষ্ঠব লাভ করিতে পারে। মৃদুস্পর্শ (sensitive) লােক দেহের পুষ্টি বিধানার্থে নানাবিধ পুষ্টিকারী ঔষধ ভক্ষণ করিয়া থাকে। কিন্তু তাহাতে কয়জনের দেহপুষ্টি হইয়া থাকে। এ গুলিলৌকিক গুণাধান। আর শাস্ত্রীয় গুণাধান যথা–গঙ্গাস্নান। তীর্থপৰ্যটনাদি শোচ এবং আচমনাদি শাস্ত্রীয় দোষাপনয়ন। এখানে বলা আবশ্যক যে, লােকবাসনা, শাস্ত্রবাসনা এবং দেহবাসনা রূপ এই মলিন বাসনালয়, অবিবেকি মূখ জনগণের উপাদেয় স্বরূপ প্রতীয়মান হইলেও, বিবেকি এবং মুমুক্ষুর পক্ষে ইহারা হেয়,যেহেতু ইহারা মুমুক্ষুর বেদানােৎপত্তির এবং বিদ্বানের জ্ঞান প্রতিষ্ঠার নিতান্ত বিরােধী। রজোগুণের আতিশয্যে অর্থাৎ চঞ্চলমনে এই মলিন বাসনাত্রয় সতত সমধিক ক্রিয়াশীল হইতে দেখা যায়,অতএব যে কোন সুগম উপায়ে হউক,সর্বাগ্রে ইহাদের ক্ষয় বা বিনাশ সাধন করা মুমুক্ষুর অবশ্য কর্তব্য, কেননা, ইহার জ্ঞান বিকাশের সুতরাং স্বরূপসিদ্ধির বা জীবমুক্তির সমূহ অন্ত- রায় বা প্রতিবন্ধ। নিম্নে বাসনাক্ষয়ের সুগম উপায়ের কথা বলা যাইতেছে। বাসনায় প্রযত্ন সাধ্য-আন্তর এবং বাহ ভেদে বাসনা দ্বিবিধ। ইহা ভিন্ন তৃতীয় প্রকার বাসনা নাই। কিন্তু তাহাদের অবান্তর ভেদ সংখ্যায়, তাহারা অনন্ত এবং তাহারা অমু। এখন কথা হইতেছে যে, এবম্বিং অনন্ত এবং অমূর্ত বাসনা সকলকে নিরোধস্বরূপ নির্ণয়। গৃহস্থ আবর্জনাদিবং সমার্জনী দ্বারা কেমনে দেহগৃহ হইতে উদ্ধত করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিবে? এমতাবস্থায় কোন ব্যক্তি এক জীবনে প্রযত্ন সহকারে কি তাহার সমগ্র বাসনা ক্ষয় করিতে সমর্থ হয় ? কখনই না। সুতরাং প্রযত্ন ব্যর্থ বলিতে হয়। সমগ্র প্রযত্ন কদাপি ব্যর্থ হইতে পারে না। আংশিক ফলােদয় হইবেই হইবে। ভাল, তােমায় জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রোক্ত তাবৎ ঔষধ কি একই ব্যক্তি সেবন করিতে সমর্থ ? কিম্বা একই দেহের সমুদায় ব্যাধি কি তাহা দ্বারা আবােগ্য হয় ? কখনই না। ব্যর্থ বলিয়া রােগ নিবারণার্থে কি রােগী কখন কোন ঔষধ সেবন করিবে না ? তাতএব বলা যাইতে পারে যে, ফল সমগ্র বা আংশিক যাহাই হউক, প্রযত্ন সহকারে বাসনা ক্ষয় এককালে সম্ভব নহে বা হইতে পারে না। সবিশেষ বলিতেছি শুন। উপবাস এবং জাগরণ শ্যায়ে ইহার উপপত্তি হইয়া থাকে। মনে কর, ভােজন ক্রিয়। এবং নিদ্রার কোন প্রকার মুৰ্ত্তি না থাকিলে—অমূৰ্ত হইলেও, কোন ব্ৰত কি কোন পর্বে। পলক্ষে সংকল্প করিয়া, লােকে যেমন উপবাস এবং জাগরণরূপ, উপায় বলে, অাহার নিদ্রা অনায়াসে পরিত্যাগ করিয়া থাকিতে, পারে, বাসনা ত্যাগ ও সেইমত সংকল্প করিয়া করিতে হইবে। উপবাস হেতু শাক, সূপ এবং ওদনাদির সন্নিধিত্যাগের ন্যায়, সংকল্প করিয়া স্রক চন্দন বনিতাদির সন্নিধিত্যাগ করিতে হইবে। আর রাত্রি জাগিয়া পুরাণ ও গীতাদি শ্রবণে চিত্ত আকৃষ্ট হেতু যেমন তাহাতেই তুষ্ট থাকায়, লােকে তৎকালের জন্য ক্ষুধা,তৃষ্ণা, স্বরূপসিদ্ধি। নিদ্ৰাদি একবারে বিস্মৃত হইয়া যায়, মৈত্রাদি ভাবনা দ্বারা তােমার চিত্ত বা মনকেও সেইমত ভাবে গঠিত করিয়া তােমাকেও তােমার মনের স্ব—পর (বিপরীত) কতকগুলি বৃত্তি বিস্মৃত হইয়া যাইতেহইবে। ইহা কিছু সম্ভব নহে। ঔৎসুক্যের প্রাবল্যামু- সারে একদিন, এক মাস, কি এক বর্ষ পরে, এবধি আচরণের প্রভাব বুঝিতে পারিবে। তখন দেখিবে যে, মনােনাশের পূর্বে, অনেক বাসনা ক্ষয় হইয়া তােমায় কতকটা শাস্তি প্রদান করিবে এবং তলে পরে, মনােনিরােধ বা নিগ্রহ প্রণালীও অনেকটা সুগম বা সুখসাধ্য হইবে। বাসনাক্ষয় তত্ত্বজ্ঞান সাধ্য—প্রতিকূল বাসনা উৎপাদনের দ্বারা যেমন ক্রোধের উদয় হইলে ক্রোধ বৃত্তি, উপজিত করিতে হয়। কামে—অকাম। লােভে-অলােভ ইত্যাদি। মনে কর, তুমি সশরীরী এবং অশরীরী উভয় রূপেই বিদ্যমান। স-শরীরীরূপে তুমি কামময়, তুমি ক্রোধময়, তুমি লােভময় ইত্যাদি এবং অশরীরীরূপে তুমি অকামময়, তুমি অক্রোধময়, তুমি ভালােভময় ইত্যাদি । বৃত্তি সমুহের স্ব-পর ( বিপরীত ) উভয় ভাবই তােমাতে বিদ্যমান অর্থাৎ উভয় ভাব সংশ্লিষ্ট সংস্কারই তােমাতে অবস্থিত। আর এই স্ব ও পর ভাব ও বাসনাক্ষয় হয়। সুখ সম্ভোগাপন্ন ব্যক্তির সহিত মিত্রতার নাম মৈত্রী। দুঃখিত ব্যক্তির প্রতি দয়া করাকে করুণা বলে। পুণ্যশালী ব্যক্তির প্রতি হৃষ্ট থাকার নাম মুদিতা এবং অপুণ্যশালী বা পাপীর প্রতি মধ্যস্থ তাবৈ (কিছুই না বলিয়া) অবস্থানের নাম উপেক্ষা।

নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। সকল অনন্যমিথুন—যুগলরূপ অর্থাৎ একটী ছাড়া অপরটী থাকিতে পারে না। ধৰ্ম্মায় নমঃ, অধৰ্ম্মায় নমঃ। বৈরাগ্যায় নমঃ, অবৈরাগ্যায় নমঃ। ঐশ্বর্ডায় নমঃ, অনেশ্বৰ্য্যায় নমঃ ইত্যাদি বাক্যোচ্চারণপূর্বক যাজক তোমাকে যে মন্ত্রী পাঠ করাইয়া থাকেন, তাহার তাৎপৰ্যটী একবার স্মরণ কর। বৃত্তি সমুহের স্ব এবং পর উভয় ভাবই যে তােমাতে বিদ্যমান, তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবে। এমতাবস্থায়, বিক্ষিপ্তচিত্ত প্রাকৃতবুদ্ধি তুমি সাধারণত বাহিরে ( Superficially) কাম ক্রোধাদিকে হেয় জ্ঞান করিলেও, উদ্বোধক কোন কারণ উপস্থিত হইলে, সঞ্চিত সংস্কারবশাৎ তাহার। তােমার মনকে অধিকার করিয়া তৎক্ষণাৎ প্রকাশিত হইয়। পড়ে। অনুষ্ঠান-পরিশূন্য-তুমি তৎকালে তাহা প্রতিনিবৃত্ত করিতে পার না,সহজ কথায়,বৃত্তিনিচয়ের স্বভাব স্থানে—পর ভাবের উদয় করিতে পার না! তাই তােমার কাম কি ক্রোধ উপজিত হইলে সকাম, কি ক্রোধ আসে না, কিন্তু যদি তানুষ্ঠান দ্বারা তােমার বিক্ষিপ্তচিত্তের সার্থতা (সকল বিষয়ে লাগা) নষ্ট করিয়া একাগ্রতা (এক+গগ্র (শ্রেষ্ঠ ) এক বিষয় বা একতত্ত্ব-প্রবণশীলতা বৃদ্ধি করিতে পার, সকল সময়েই যদি চিত্তের সেই একতত্ত্ব বিষয়ক একাগ্রতা নিশ্চল হয়, সহজ কথায়, যদি তত্ত্বজ্ঞান বা অদ্বৈত জ্ঞানের আবির্ভাব হয়, তখন দেখিবে যে, ক্রোধাদির কারণ উপস্থিত হইলেও, তাহারা উদিত হয় না এবং হইলেও, কিঞ্চিৎকাল আভাসব প্রতীয়মান হইয়া তখনই অস্তমিত হইয়া থাকে, যেহেতু তনু অনুষ্ঠান ৭ ১৮ স্বরূপসিদ্ধি । দ্বারা তাহারা দগ্ধবীজবৎ হইয়া গিয়াছে। তাহাদের ক্ষয় বা বিনাশ সংসাধিত হইয়াছে। ভৃষ্ট (ভাজা) ব্ৰীহাদি বীজ যেমন রুচিকর ম্ন-সমাধানে কিম্বা শস্যোৎপাদনের অনুপযুক্ত, কেবল লােকদেখানি স্বীপ কুশূলপূর্ণ (গােলাজাত) হইয়া, থাকে, এই সমুদায় বৃত্তিও সেইমত কেবল দেহৰাত্ৰানিবাহােপ- যােগীরূপে তখন তােমাতে অবস্থান করিবে। তাহাদিগের দ্বারা তখন ধর্মাধর্মাদি উৎপত্তির কোনই সম্ভাবনা থাকিবে না, যেহেতু অভিমানীরই ধৰ্ম্মাধর্মরূপ কৰ্ম্ম লেপ হয়—নিরভিমানীর নহে। সুতরাং জন্মাবেরও হেতু হইবে না। এ বিষয়ে একটী লৌকিক দৃষ্টান্ত দিতেছি শুন, তােমার প্রতীতি দৃঢ় হইবে। কোন প্রান্তরে একটী প্রকাও বিষধর সর্প বাস করিত, সে ক্রোধাদি বৃত্তিবিজ্ঞাপকরূপ ফণ-উত্তোলন কাৰ্য এককালে পরিত্যাগ করিয়াছিল, তাহা শুনিয়া সেই পথ দিয়া যাইবার সময়ে, প্রায় সকলেই, এমনি গরুটা বাছুরটা পৰ্যন্ত, তাহাকে অল্প বিস্তর প্রহার করিয়া চলিয়া যাইত। ক্রমে প্রহারের আতিশয্যে তাহার দেহযাত্রা নির্বাহ ভার হইয়া উঠিল, এমন কি তাহার দেহান্ত হইবার উপক্রম হইল। ইতিমধ্যে দৈবাৎ সেই পথ দিয়া একদিন একজন মহাপুরুষ যাইতেছিলেন। তিনি সর্পের ঈদৃশ দূরাবস্থা দেখিয়া এবং তাহার কারণ শুনিয়া বলিলেন, বাবা, ক্রোধাদির প্রকাশরূপ ফণা-উত্তোলন-কাৰ্য এককালে পরিত্যাগ করিলে চলিবে না, দেহযাত্রা নির্বাহ কঠিন হইবে। এমন কি দেহান্ত হইবারও সম্ভাবনা, অত এব দেহমাত্রা সুখসাধ্য করিবার নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। জন্য দেহান্ত পৰ্যন্ত,এক একবার সময় মতে ফোস ফোঁস্ করিও। বলা বাহুল্য, যে জ্ঞানী পুরুষে কাম ক্রোধাদি বৃত্তিনিচয়ও এইমতে আভাসমাত্ররূপে-ভৃষ্টবীজবৎলােকদেখানিস্বরূপে দেহগােলায় অবস্থিত, যথাকালেই প্রােক্ত সর্পবৎ কেবল ফেস ফোস করে মাত্র। কিন্তু অজ্ঞ বা মুখ তাহা বুঝিতে না পারিয়া, তাহাকেও নিজের মত, কাম ক্রোধাদিবান ভাবিয়া, অবজ্ঞা করিয়া থাকে। তত্ত্বজ্ঞানাদি সাধনত্রয় যুগপৎ অভ্যসনীয়—তত্ত্বজ্ঞান, বাসনা ক্ষয় এবং মনােনাশ, এ তিনটী সমকালে বা এক সময়ে অভ্যসনীয়, কদাপি বিচ্ছিন্ন ভাবে নহে। কেননা—বিচ্ছিন্নভাবে অর্থাৎ এক একটী করিয়া চিরকাল অভ্যাস করিলেও অনুষ্ঠান বৃথা হয়, তাহার সিদ্ধিপ্রদানে সমর্থ হয় না। মনে কর, মন্ত্রের সমস্ত ভাগ অর্থাৎ সন্ধ্যাবন্দনায় মনের সহিত “আপাে হিষ্ঠেতি করিয়া যে তিনটী মন্ত্র বা ঋক আছে, তন্মধ্যে এক একটা মন্ত্র প্রত্যহ পাঠ করিলে, মন্ত্র-সঙ্কীর্ণতা হেতু যেমন শাস্ত্রানুষ্ঠান সিদ্ধ হয় না, অথবা লৌকিক শাক, সূপ ওদনাদি সংমিশ্রণে। যে ভােজনব্যবস্থা আছে, প্রত্যহ হােজনকালে তাহার এক একটী করিয়া আহার করিলে যেমন ভােজন সিন্ধ হয় না, সেইমত তত্ত্বজ্ঞান, বাসনায় এবং মনােনাশ এককালে অভ্যস্ত না হইলে ফলপ্রদ হয় না। শত বৎসরেও, স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি সমধিগত হয় না, তাই বলিতেছি যে, এই তিনটী সহ অভ্যসনীয়। মৃণাল ছেদন করিলে যেমন তদভ্যন্তরস্থ সূত্র সকল ছিন্ন হইয়া পরূপসিদ্ধি যায়, সেইমত তত্ত্বজ্ঞানাদি সাধনত্রয় যুগপৎ সুদীর্ঘকাল অভ্যস্ত হইলে, তবে, বহু বহু জন্মের সঞ্চিতসংসারভােগ-বাসনাদি সংস্কার পরিক্ষীণ হইতে পারে, কালে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হয়। অতএব সৌম্য, তুমিও সাধন চতুষ্টয় সম্পন্ন হইয়া পুরুষকার, দ্বারা ভােগ বােসনাদি দূরে নিক্ষেপপূর্বক যুগপৎ তত্ত্বজ্ঞানাদি ত্রিবিধ সাধনের অনুষ্ঠান করিতে থাক, যথাকালে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হইবে, তাহাতে অনুমাত্র সন্দেহ নাই। তত্ত্বজ্ঞানের বিষয় ত ইতিপূর্বেই বলিয়াছি, বাসনাক্ষয়ের কথা ত এই বলিলাম, এক্ষণে মনের নাশ বা তাহার নিরােধ-প্রণালী এবং তাহার প্রয়ােজনীয়তা বলা যাইবে। বলা যাইবে। প্রথমতঃ নিরােধ-প্রয়ােজনীয়তা নিরূপণ করা যাইতেছে । মন নিরােধের প্রয়ােজন কেন ?—মনের নিরােধ-প্রণালী বলিবার পূর্বে, কয়েকটা কথা আবশ্যক বােধে বলিতেছি, এই নিরােধের পর নাম অসংপ্রজ্ঞাতসমাধি। যােগশাস্ত্রে , যে পঞ্চ ক্লেশের উল্লেখ আছে, যাহার জন্য জীব পুনঃ পুনঃ জন্ম মৃত্যুর বশবর্তী হইয়া, অশেষ দুঃখাদি ভােগ করিয়া থাকে, সেই ক্লেশের নিরতিশয় ক্ষয়ের জন্য মনােনিবােধরূপ অসংপ্রজ্ঞাত যােগের প্রয়ােজন। বলা বাহুল্য যে, মনননিরােধ ভিন্ন, অন্য কোন উপায় দ্বারা এই অবিদ্যাদি ক্লেশপঞ্চ ক্ষয়ের সম্ভাবনা নাই। যেহেতু ক্লেশ মনােমূলক। অতএব মুঢ়ের কথা আর কি বলিব, শ্রবণাদি সাধন পরিপাকে উৎপন্ন তত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানীরও স্বীয় ক্লেশক্ষয় করনার্থ মনােনিরােধের প্রয়ােজন এবং এজন্য বিদ্বৎসন্ন্যাসেরও নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। কেবল । অপো আছে। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যই ইহার দীপ্যমান প্রমাণ। কর্মী এবং গৃহী যাজ্ঞবল্ক্য মনােনিরােধে তসমর্থ হইয়া, তাহার পত্নীদ্বয়কে সাদরে সম্ভাষ্ণ পূর্বক বলিয়াছিলেন যে, আমি ব্ৰহ্ম- বিজ্ঞানে সুস্থিরস্থিতিলাভাৰ্থ বিদ্বৎসন্ন্যাস করিয়া তােমাদের হইতে পৃথকভাবে কত দিন অবস্থান করিব স্থির করিয়াছি। তােমরা যেন আমার বিচ্ছেদ জনিত শশাকে অভিভূত হইও না ইত্যাদি প্রকারে তাহাদের শােক নিবারণার্থে বিবিধ উপদেশ প্রদান দ্বারা মহর্ষি পত্নীয়কে পরিতুষ্ট করিয়া বিসন্ন্যাসের ফল জীবমুক্তি লাভাৰ্থ একান্তে মনােনিরােধে অভিনিবিষ্ট হইয়াছিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য কেন, বীতব্য, প্রহলাদ, শুকদেব, উদ্দালক প্রভৃতি অনেক প্রাচীনযােগ্য ব্যক্তিগণই বহু আয়াসসাধ্য হইলেও, চিরশান্তিখাদিরূপ নিরােধফল লাভ লালসায় মনােনিবােধার্থে প্রয়াস পাইয়াছিলেন, এবং স্ব স্ব যােগ্যতা বা যােগসামর্থানুসারে অল্পকালে বা দীর্ঘকালে কৃতকাৰ্য্য হইয়াছিলেন। অতএব বলা যাইতে পারে যে, মনােনিগ্রহ দুঃসাধ্য হইলেও তাহার নিগ্রহেপায়ে যত্ন করা ব্যক্তি মাত্রেরই অবশ্য কর্তব্য। পাঁচ প্রকার চিত্ত-ভূমির কথা—২য় অধ্যায়ে অধিকারী নির্ণয়ে চারিপ্রকার অধিকারীর কথা বলিয়াছি যথামুক্ত, মুমুক্ষু বন্ধ এবং পাময় (১২ পৃষ্ঠা দেখ)। এই চারি শ্রেণীর অধিকারীর মন বা চিত্তভূমি পাঁচশ্রেণীতে বিভক্ত যখমুক্তের চিত্ত (১) নিরুদ্ধ, মুমুক্ষুর চিত্ত (২) একাগ্ৰ, বন্ধের চিত্ত (৩) স্বরূপসিবি। । বিক্ষিপ্ত এবং পামরের চিত্ত (৪) ক্ষিপ্ত এবং (৫) মৃঢ়। ইহার মধ্যে মুক্তের সম্বন্ধে বলিবার কিছুই নাই, যেহেতু যিনি কৃতকৃত্য, তাহার চিত্ত নিরুদ্ধ। সুতরাং অবশিষ্ট ভূমি চতুষ্টয়ের বিচার করা যাইতেছে। (১) সদা নিদ্ৰাতন্দ্রাদিগ্রস্ত চিত্তই মূঢ়। (২) দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ ইত্যাদি আনুর- সম্পযুক্ত এবং শাস্ত্র ও দেহবাসনাদিতে সদা নিরতচিত্তকে ক্ষিপ্ত কহে। (৩) আর ক্ষিপ্ত হইতে কিঞ্চিৎ বিশিষ্ট কদাচিৎ মননাদিতে (ধ্যানাদিতেও রত চিত্ত বিক্ষিপ্ত নামে অভিহিত। ক্ষিপ্ত এবং মৃঢ় চিত্ত নিরােধের অযােগ্য সুতরাং তাহাদের পক্ষে স্বরূপসিদ্ধি এককালেই অসম্ভব। বিক্ষিপ্ত চিত্তও প্রায় তদ্বৎ, যেহেতু তাহা সর্বদাই চঞ্চল—বিক্ষেপযুক্ত হেতু দহনান্তর্গত বীজবং মনন নিদিধ্যাসনাদি বিষয়ক প্রদত্ত উপদেশ সদ্য বিনাশ- প্রাপ্ত হয়। অবশিষ্ট (৪) একাগ্র চিত্ত এবং (৫) নিরুদ্ধচিত্ত। বলা বাহুল্য যে, একাগ্রচিত্তই সাধনচতুষ্টয় এবং শ্রবণ চতুষ্টয় অনুষ্ঠান দ্বারা ক্লেশ এবং কর্মবন্ধন সকল শিথিল করিয়া ক্রমে নিরােধভিমুখীন হয়। সুতরাং কেবল একাগ্রচিত্তই মনো- নিরােধের যােগ্য বা প্রকৃত অধিকারী, এবং নিরােধফলরূপ স্বরূপসিদ্ধি কেবল এতদুভয়ের সমধিগম্য। অন্যের নহে। কথাকি যে, গর্ভ হইতে কয়জন কপিলাদিবৎ নিরুদ্ধমনা হইয়া নিষ্ক্রান্ত হয় ? লক্ষের মধ্যে একজনও কিনা সন্দেহ! ক্ষিপ্তাদি মন লইয়াই অধিকাংশ লােক এ সংসারে জন্ম গ্রহণ করিয়া থাকে, কারণ এ সংসারে এবম্বিধ লােকের বা অসুরের সংখ্যাই অধিক তবে নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। (জ্যায়সা 'অসুরাঃ ) একাগ্র এবং নিরুদ্ধমনা বা দেবতার সংখ্যা অত্যল্পই দেখা যায়। (কানীয়স। এ দেব। তবে এ কথা সত্য যে, সাধনবলের তীব্র প্রভাবে কালে ক্ষিপ্তাদি মনও একাগ্র বা নিরুদ্ধ হয়। আর এপ্রকার দৃষ্টান্তও বিরল মহে। সিতার পিতা শিখীধ্বজ জনক কিছু একদিনে সিদ্ধিলাভ কৰিয়া বিদেহ আখ্যা প্রাপ্ত হন নাই (পৃষ্ঠা দেখ)। আগরার তাজমহল কিম্বা ইলােরার প্রস্তরউৎকীর্ণগৃহ (rock-cut-temple) কিছু একদিনে নিৰ্ম্মিত হয় নাই। শুকদেবও কিছু একদিনে নির্বাণ লাভ করেন নাই। সিদ্ধিলাভার্থে তাহাকে অনেক দিন ধরিয়া অভ্যাস করিতে হইয়াছিল (পৃষ্ঠা দেখ )। এই সকল পৰ্যালােচনা পূর্বক আপনাপন যােগ্যতানুসারে ভাবী কল্যাণ- হেতু সকলেরই স্বকীয় চিত্তভূমি কর্যণার্থ যত্ন করা অবশ্য কর্তব্য। আশুতা বা চাঞ্চল্য মনের একটী ধৰ্ম্ম—ইতপূর্বেব মনের যে নয়টী ধর্মের কথা বলিয়াছি, তন্মধ্যে আশুতা বা চাঞ্চল্য একটা ধর্ম। কিন্তু মন যে কেবল চঞ্চল তাহাই নহে, তাহার উপদ্রবে ইন্দ্রিয় এবং শরীর পর্যন্ত সদাই ক্ষোভিত হইয়া থাকে। তাহাই নহে। মনের যাহাতে আগ্রহ হইবে, সে তাহা করিবেই করিবে; সাধ্য কি যে বন্ধু বা অনিরুমন তুমি তাহার গতিরােধ করিতে পার? সে মত্ত হস্তীবৎ এমনিই বলবান যে, কিছুতেই তাহার অভীষ্ট দিক হইতে তাহাকে ফিরাইতে পার জন্মজন্মান্তরের আশেষ সংস্কাররাশি মনকে এমনি দৃঢ় করিয়া রাখিয়াছে যে, তাহা ছেদন কিম্বা মর্দন করা অতীব কেবল ।

১০3
অরূপসিদ্ধি।
মনের
তীব্র
?
কঠিন।
প্রবল বায়ুর গতি রুদ্ধ করা যেমন কঠিন অব্যাহত
গতি চঞ্চল স্বভাৰ মনকেও নিরু করা তেমনি কঠিন।
তীব্র গতির নিকট জাগতিক তাবৎ গতিই পরাস্ত হয়।
হইলেও. উপায়বলে সে মনকে আয়ত্তাধীন করা যায়, এক্ষণে সেই
উপায়ফ্রম বলা যাইবে।
দ্বিবিধ নিরােধ বা নিগ্রহের কথা—যথা হটনিগ্রহ এবং
ক্রম নিগ্রহ। এখন জিজ্ঞাস্য এই যে, মনননিগ্রহে কোনটা
প্রশস্ত, হটনিগ্রহ কি ক্রমনিগ্রহ ? প্রাক্ত অবস্থাপন্ন মনকে
তাহার চিরাভ্যস্ত বা বহুদিনের কৃত কর্মাদি হইতে সহস। অর্থাৎ
মানসিক অবস্থা বা বলের পূর্বাপর বিচারপরিশূন্য হইয়া
প্রত্যাহরণ পূর্বক বিষয়ান্তর—ধ্যানাদিতে একা করিতে
উদ্যত হইলে, তােমার সমগ্র যত্ন নিস্ফল হইবারই সমধিক সন্তা-
বনা, প্রত্যুত তুমি কোন প্রকাবে সফলকাম হইলেও, তােমার
শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভঙ্গহেতু তুমি উৎকট কোন
বাধ্যাদি দ্বারা আক্রান্ত হইয়া চিরকালের জন্য অকর্মণ্য হইয়াও
যাইতে পার। মানসিক অবস্থা বা বলের পূর্বাপর বিচার
পরিশূন্য হইয়া, হঠাৎ মনকে তাহার উপভােগ্য বিষয় হইতে
প্রত্যাহৃত করণের চেষ্টার নাম হটনিগ্রহ বা হটযােগ। এবম্বিধ
হটকারিতা দ্বারা মনকে নিরুদ্ধ করিবার চেষ্টা কেবল মুঢ়
বুদ্ধির পরিচায়কমাত্র। অতএব শিষ্ট এবং মুমুক্ষুর ইহা পরিত্যজ্য।
যে মুঢ়ব্যক্তিগণ হটাৎ মনেজয় করিতে উদ্যুক্ত হয়, তাহাদের
প্রযত্ন মদমত্ত হস্তীকে মৃণালসুত্রে বন্ধনের ন্যায় বিফল হইয়া থাকে।

নিরোধপরূপ নির্ণয় । কখন p মুমুক্ষু মনকে নিরুদ্ধ করিবার জন্য সদা ক্রমনিগ্রহের আশ্রয় গ্রহণ করিবে। ক্রমনিগ্রহ কি তাহা বলিতেছি—অভিভাবকের অজ্ঞাতে গৃহনিষ্ক্রান্ত কোন চঞ্চল বালককে পুনঃ গৃহে লইয়া যাইতে হইলে, যুগপৎ যেমন নানা কৌশল অবলম্বন করিতে হয়—একবার বা মোদক প্রদর্শন, ক্ষণিক চুম্বন বা স্নেহাবমর্যণ, পরক্ষণেই মৃদুতাড়া বা ভৎসন এবং প্রহারার্থে বারেক লগুড়াে- ত্তলন ইত্যাদি প্রকারে অনুগ্রহনিগ্রহের সংমিশ্রণ ভাবাপ্ত ত্র্যস্ত বালক যেমন আস্তে আস্তে সসম্ভ্রমে গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হয়, মন বালককেও ঠিক তৎ, করিতে হইবে। সাময়িক সবিচার ভােগ দ্বারা, কখন বা চিরাভ্যস্ত ভােগ্যের প্রলােভন মাত্র দেখাইয়া, মনকে বহিৰ্য্যাপার হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া তাহাকে অল্পে অল্পে বা শনৈ শনৈ দেহগৃহে প্রবিষ্ট করাইতে হইবে, সহজ কথায়, তাহার বিষয় গ্রহণ বা জাগতিক পদার্থ গ্রহণরূপ বহির্মুখীন স্বভাব প্রত্যাহরণ করিয়া তাহাকে অন্তর্মুখীন করিতে হইবে। এই কাৰ্যগুলি সহসা না করিয়া যুক্তি সহকারে ক্রমে ক্রমে বা শনৈ শনৈ করিতে হয় বলিয়া ইহার নান ক্রম নিগ্রহ। ইহার অনুষ্ঠান ক্রম বা ভূমিগুলি ক্রমে বলিতেছি। বলা বাহুল্য যে, এই ক্রম নিগ্রহই শিষ্টের এবং মুমুক্ষুর গ্রহণীয় এবং সুষ্ঠেয়। অনুষ্ঠান-পরিপাকে কালে সরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি সমধিগত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহা হইলে অনেকে মনােনিগ্রহের নাম শুনিয়াই ভীত হয়। কেহ বা ইহা দুষ্কর ভাবিয়া তদনুষ্ঠানে বিরত হয়। কাজেই জন- কি হয়, স্বরূপসিদ্ধি। স্তব নহে। সমাজে ইহা লুপ্তপ্রায় হইতে চলিয়াছে; অপেক্ষাকৃত সুকর তুচ্ছ উপায় গুলিই ইহার স্থান ক্রমে ক্রমে অধিকার করিয়া বসিয়াছে। তাই লােকে রাজপথ ছাড়িয়া কাটাবনে চলিয়াছে। (৭৭ পৃষ্ঠ দেখ) উদ্যোগীর নিকট দুষ্কর ও সুকর হয়—উদ্যোগী পুরুষ পুরুষের, মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সুতরাং বলা যাইতে পারে যে, মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং প্রমথনশীল হইলেও, তাহাকে উপায় বলে বশীভূত বা নিগৃহীত করা যাইতে পারে, পুরুষসিংহের নিকটে তাহা এককালে কাস- এ বিষয়ে একটা আখ্যায়িকা বলি শুন—সমুদ্রের বেলাভূমি সন্নিকটে কোন পক্ষী বাসা নিৰ্মাণ করিয়া তাহাতে কয়েকটী ডিম্ব প্রসব করিয়াছিল। একদিন সমুদ্রবারি বেলা- ভূমি অতিক্রম করায় ডিম্বসহ বাটী সমুদ্রজলে ভাসিয়া যায়। পক্ষী সায়ংকালে আসিয়া দেখিল যে,ডিম্বসহবাসাটী সমুদ্র ভাসাইয়া লইয়াছে। তদ্দর্শনে পক্ষী অত্যন্ত কুপিত হইয়া প্রতিজ্ঞা করিল, যে, যে কোন প্রকারে হউক, সমুদ্রবারি শােষণ করিয়া ফেলিবে— এই বলিয়া চঞ্চুপুটরূপ ক্ষুদ্র এঞ্জিন যােগে এক বিন্দু করিয়া . জল লইয়া দূরে নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। ইহা দেখিয়া অপরাপর পক্ষীগণ তাহাকে উপহাস করিয়া, এ প্রকার অসাধ্য কাৰ্য্য হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইবার জন্য বহুবার বলিল, কিন্তু সে কাহারও কথায় কর্ণপাত না করিয়া যথাপূর্বক বারিবিন্দু উত্তো- লন করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিতে লাগিল, এবং তাহার আত্মীয় জনগণকে বরং তাহার কাৰ্য্যে সহায়তা করিতে বলিল। মহর্ষি নারদ এই ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়া কৃপাপরবশ হইয়া গরুড়কে নিরোধস্বরূপ নির্ণয়। ১৭ ডাকিয়া বলিয়া দিলেন যে, তুমি তােমার পক্ষবাত দ্বারা শীঘ্র সমুদায় সমুদ্রবারি শােষণ করিয়া ফেল। তচ্ছ বণে সমুদ্র অত্যন্ত ভীত হইয়া পক্ষীকে তাহার অণ্ডগুলি প্রত্যর্পণ করিল। বলা বাহুল্য যে, মনােনিবােধরূপ পরম ধর্মে প্রবৰ্তমান যােগীও, এই মতে পক্ষীরায় বহিৰ্যাপার দ্বারা অনুগৃহীত হইয়া থাকে। মনকে নিগৃহীত করিবার সময় মধ্যে মধ্যে তাহাকে তাহার অমুকুল বিষয় ভােগও করিতে দিতে হইবে, নচেৎ অত্যধিক কর্ষণে—টানে রঞ্জুছিবং মন এককালে অকৰ্ম্মণ্য হইয়া যাইবে। এক গ্রাস তান্ন মুখে দিয়া পরে চব, চুষা, লেহদির আস্বাদন গ্রহণবৎ মনকেও নিগৃহীত বা বিষয় হইতে প্রত্যাহরণ করিবার সময় তৎ করিতে হইবে, তাহাকেও কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ ভােগ্য প্রদান করিতে হইবে। একবারে নিরুপভােগে বা নিরাহারে রাখিলে চলিবে না। এটা যেন সাধকমাত্রেরই বিশেষ স্মরণ থাকে। সবিশেষ “ক্রমনিগ্রহ দেখ। অতএব বলা যাইতে পারে যে, মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং দুঃনিগ্রহ হইলেও, উপায় বলে তাহাকে নিগৃহীত করা যাইতে পারে। এক্ষণে সেই নিগ্রহক্ৰমই ক্রমে বলা যাইবে। মনােনিয়ােধ বা চিত্তশুদ্ধির কথা বলা বাহুল্য যে, একই ব্যক্তির পাচক পাঠক আখ্যাবৎ, মন ও চিত্ত একই বস্তু, কেবল বৃত্তিভেদে আখ্যা ভিন্ন মাত্র। অপরম যেমন পরম সাপেক্ষ দ্বৈত যেমন অদ্বৈত সাপেক্ষ, অমরণ যেমন মরণ সাপেক্ষ, তেমনি অজিও শুদ্ধি সাপেক্ষ। অর্থাৎ শুদ্ধি বলিলেই অশুদ্ধিও রূপসিদ্ধি। ? আছে, স্বীকার করিতে হয়। এখানে যদ্যপি শুদ্ধি কি তাহাই প্রতিজ্ঞা—বলিবার মুখ্য বিষয়, কিন্তু আশুদ্ধি এবং শুদ্ধি উভয়ই শাস্ত্র প্রত্যয়কারত্ব মুলক, সুতরাং অশুদ্ধি কি তাহাই প্রথমতঃ দেখা যাক। কারণ অশুদ্ধিরই শােধন আবশ্যক। আবার শােধন কি? বিদিত বিদ্বের বিদ্যাশিক্ষার ন্যায় তাহা ব্যর্থ। পিষ্টপেষণ মাত্র। এক্ষণে দেখা যাক, চিত্তের বা মনের অশুদ্ধি কি ? যেহেতু শুদ্ধি শোধন হইলে—ময়লা ছুটিলে চিত্ত বা মন আপনিই শুদ্ধ হইয়া যাইবে। মন যে কিপ্রকার বস্তু তাহা মনের স্বরূপ নির্ণয়ে ৩য় অধ্যায়ে সবিস্তারে ব্যাখ্যাত হইয়াছে, এক্ষণে সেই মনের স্বরূপ রূপটা একবার স্মরণ কর, কেননা তাহা হইলে অনায়াসে বুঝিতে পারিবে যে, মন যে মললেপ দ্বারা অশুদ্ধ হয়, সে মল কি প্রকার পদার্থ ? ভৌতিক কি অভৌ- তিক ? যােগ দর্শনে লেখা আছে যে, “সস্তু পুরুষয়ে। শুদ্ধি সাম্যে কৈবল্য” অর্থাৎ সত্ত্বদ্রব্যের বা বুদ্ধির এবং পুরুষের শুদ্ধি হইলেই মােক্ষ লাভ হইয়া থাকে। ইহার ভাষ্যে ব্যাস দেব বলিয়াছেন যে, বুদ্ধি বা চিত্তের শুদ্ধি হইল বৃত্তিহীনতা অর্থাৎ চিত্তকে নিবৃত্তিক করিতে পারিলেই তাহার শােধন হয়, অতএব বৃত্তিই চিত্ত-মল-বৃত্তিরূপমলদ্বারা চিত্ত অশুদ্ধ বা কালুষ্য প্রাপ্ত হয়। আর পুরুষ স্বয়ং আভােক্তা, কিন্তু দেহেন্দ্রিয়াদি যুক্ত হওয়ায় ভােক্তারূপে প্রতীয়মান হয়, ইহাই পুরুষের ভােগ। অতএব পুরুষের এ ভােগ কল্পিত, এই কল্পিত ভােগই পুরুষের মল বা অশুদ্ধির কারণ,সুতরাং কল্পিত এই ভােগশূন্যতাই পুরুষের নিরােধস্বরূপ নির্ণয়। শুদ্ধি। এইটা বিশেষরূপে অবগত হইয়া তদ্বৎ কাৰ্য্য করিতে শিখিলেই চিত্তশুদ্ধি হয়, শেষে স্বরূপসিদ্ধি সমধিগত হয়- জীব শিব হয়। অপিচ শ্ৰতি বলেন “আহার শুদ্ধো সন্তু শুদ্ধি” আহারের দ্বারা সত্ত্ব বা চিত্ত শুদ্ধি হয়। এখন কথা হইতেছে যে, চিত্ত অম্নময় বা অন্নরসের বিকার হইলে, আহার দ্বারা তাহার শােধন সস্তাবিত, কিন্তু চিত্ত ত অনুময় বা অন্নরসের বিকার নহে, তাহা ত ৩য় অধ্যায়ে “মনের স্বরূপ নির্ণয়ে” অন্নময় শ্রুতির ব্যাখ্যাকালে প্রতিপাদিত হইয়াছে দেখ। সুতরাং শাস্ত্রোক্ত, সাত্ত্বিক বা বিশুদ্ধ অন্নাদির আহার দ্বারা তাহার শােধন অসম্ভব। তবে এখানে আহার শব্দের অর্থ কি ? “ইন্দ্রিয়েবিষয়াণামাহরণং গ্রহণমাহারঃ”—অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় গ্রহণ করার নামই আহার,-তাহ শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রসাদি বিষয় বিজ্ঞান নামে খ্যাত। ইহারাই মুখ্য আহার, এবম্বিধ আহার-শুদ্ধির দ্বারাই চিত্ত শুদ্ধি হয়—অন্যথা নহে। শুদ্ধির ক্রমটী বলি শুন, ক্ষিত্যাদি পঞ্চ পৃথকভাবে শব্দাদি গুণরূপে—বিষয়াকারে*পরিণত হইয়াছে, সুতরাং শব্দাদিরূপ এ সকল জগৎ বিষয়ের পৃথক্‌ সত্ত্বা বা অস্তিত্ব নাই, এক ব্রহ্মসাতেই ইহারা ভাসমান। এবম্বিধ প্রকারে শব্দাদি, বিষয়, সকল ইন্দ্রিয়সহায়ে মনদ্বারা গৃহীত হইলেও চিত্তে এজন্য আর পৃথক বৃত্তি হইতে পায় না, সুতরাং ইন্দ্রিয়কাৰ্যও সিদ্ধ হয় না। ইহারই নাম আহারশুদ্ধি, বিষয় কি ? ইহার বিশেষ বিবরণ ২য় অধ্যায়ে বর্তমান প্রতিবন্ধ ও বিষয়ান এবং ব্রহ্মানন্দ দেথ।

বরূপসিদ্ধি। এবম্বিধ আহার-শুদ্ধি দ্বারা চিত্ত-শুদ্ধি হয়—অন্যথা নহে। অতএব এক্ষণে বুঝা গেল, যে চিত্তশুদ্ধি বলিলে চিত্তকে বৃত্তিবিরহিত করা বুঝায়। সহজ কথায়, চিত্তের জগন্ময় রূপ বা স-রূপ নাশ করিয়া চিন্ময়রূপে অবস্থানেব নামই চিত্তশুদ্ধি। তাই স্মৃতি- শাস্ত্রতে লেখা আছে,-”মনে সত্যেন শুদ্ধতি” সত্য অর্থে ব্ৰহ্ম- রূপতার মনন। আর মনননিরােধ বলিলেও তাহাই বুঝায় অর্থাৎ মনকে বৃত্তিবিরহিত করিয়া তাহার আত্মমাত্র নিষ্ঠৰূপে অব- স্থানের নামই মনােনিবােধ। এখন বুঝ, চিত্তশুদ্ধি এবং মনো- নিরােধ একই অর্থের দ্যোতক কিনা? অতএব সিদ্ধ হইল যে, বাহ কোন প্রকার ক্রিয়া-কৃত্যাদি দ্বারা কদাপি চিত্তশুদ্ধি হইতে পারে না। বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, ব্যক্তিমাত্রেরই ধারণা, কিন্তু ইহার বিপরীত। প্রায় সকলেই জানে যে স্থূল বাহ-ক্রিয়াদির সম্পাদনেই চিত্তশুদ্ধি বা মন পরিষ্কার হইয়া থাকে, অথচ মন যে কি পদার্থ এবং আপন আপন দেহে কি ভাবে তাবস্থিত, তাহা তাহারা জানে না। এই ত গেল চিত-শুদ্ধির কথা । একণে চিত্ত অশােধনের কারণ চিত্তল স্বরূপ বৃত্তির বিষয় বিচার করা যাইবে। বৃত্তি মানস-ধৰ্ম্ম। সূৰ্য্যাদি জ্যোতিয়ান পদার্থের আলােক কোন বস্তু প্রকাশকালে তন্তুর আকারবিশিষ্ট হইয়া থাকে, নচেৎ সে বস্তু প্রকাশিত হয় না। চিত্ত বা মন ও সেইমত ইন্দ্রিয়াদির সহিত বাহ বিষয়ের সংযােগ হইলে তদাকারে আারিত হয়-তদবিষয়াকারে পরিণত হয়। নচেৎ তদ্বিষয়ের ।

নিরোধস্বরূপ নির্ণয় । ১১১ জ্ঞান হয় না। যেমন জবাপুষ্পের লােহিত্যাদি গুণ স্বচ্ছ- স্ফটিকে সংক্রামিত হয়, মনেও ঠিক তদ্বৎ বিষয় গুণাদি সংক্রামিত হইয়া থাকে, তবে উভয়ের পার্থক্য এই যে, স্ফটিক সমীপ হইতে জবা অপসারিত হইলে স্ফটিকে সে সংক্রামিত গুণের (লােহি- ত্যাদির) কোনই চিহ্ন দেখা যায় না, কিন্তু একবারমাত্র অনুভূত বা কৃষ্ট বিষয় মনের সমীপ হইতে অপসারিত বা লুক্কায়িত হইলেও—পদার্থের অনুপস্থিতিতেও মন ( চিহ্নস্বরূপ) তাহার পূর্বানুভূতি ফলের বলে তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া থাকে। এই অনুভূতি ফলরূপ স্মৃতি বা সংস্কারের নামই বৃত্তি। সহজ কথায়, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই পঞ্চ বিষয়ে যে কর্ণ, ত্বক, চক্ষু, জিহ্বা ও নাসিক। এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যে আলােচনা বা জ্ঞান তাহাই বৃত্তি। অথবা বিষয়েন্দ্রিয় সংযােগ হেতু মনের যে পরি- ণতি সংঘটিত হয়, তাহার নাম বৃত্তি। বৃত্তি মনের ধর্ম হইলেও ধৰ্ম্ম-ধৰ্মীর ভেদ কল্পনায় বৃত্তি সমষ্টিই মন বা মনকে বৃত্যাত্মক বা হইয়াছে। যেমন সংকল্প মনের ধৰ্ম্ম হইলেও মনকে সংকল্লাত্মক বলা যায়, এবং সত্ত্বের ধর্ম সুখ এবং রজের ধর্ম দুঃখ হইলেও ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্মীর ভেদ কল্পলায় সহ সুখাত্বক এবং রজো- দুঃখাতুক বলা যায় তৎ! এই ত গেল বৃত্তির সুত্র বা সূচনা। এইক্ষণ তাহার সংখ্যা নিরূপণ করা যাইবে। বৃত্তি অসংখ্য হইলেও সসংখ্য—মনের বৃত্তি অসংখ্য হইলেও তাহ। প্রধান পাঁচভাগে বিভক্ত যথা-(১) প্রমাণ, (২) বিপর্যয়, (৩) বিকল্প, (৪) নি। এবং (৫) স্মৃতি। ইন্দ্রিয়াদির স্বরূপসিদ্ধি। দ্বারা উপলব্ধ মনের অনুভূতি বিশেষের নাম প্রণাণ। এই প্রমাণ আবার ত্রিবিধ যথা-শব্দ প্রমাণ ( শাস্ত্র), প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং অনুমান প্রমাণ। তনু ( পশ্চাৎ ). মান (জ্ঞান) পশ্চাৎ জ্ঞানই অনুমান, যেহেতু অনুমান প্রত্যক্ষমুলক অর্থাৎ প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকিলে তনুমান সিদ্ধই হইতে পারে না। আত্মা, ইন্দ্রিয়, মন এবং ইন্দ্রিয়ার্থ ( বিষয়) একত্রীভূত হইবার সময় যে বুদ্ধি অভিব্যক্ত হয় তাহার নাম প্রত্যক্ষ। প্রত্যক্ষ প্রতিগত মক্ষি ইন্দ্রিয়ং যত্র।” ক্ষি শব্দে কেবল চক্ষু নহে, চক্ষু উপলক্ষ্য মাত্র। ইন্দ্রিয়মাত্রই বুঝিতে হইবে। সুতরাং প্রত্যক্ষ একটা যাহারা প্রত্যক্ষকে তানুমিত্যায়ক বলে, তাহারা নিতান্ত ভ্রান্ত। আর এতদুভয়ের কাৰ্যও ভিন্ন, যেহেতু প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা সন্নিহিত বস্তুর অবধারণা জন্মে, এবং অনুমান দ্বারা অপ্রত্যক্ষীভূত বস্তুর জ্ঞান জন্মে। কিন্তু ইহা সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত যে, যে ইন্দ্রিয়াদির দ্বারা তুমি প্রত্যক্ষ করিবে, সেই ইন্দ্রিয়াদিই তােমার প্রত্যক্ষ। সুতরাং বদ্ধ বা নিরুদ্ধমনা তােমার প্রত্যক্ষ সর্বদা ভ্ৰম প্রমাদশূন্য নহে বা হইতে পারে না। (২) বিপৰ্যয়—মিথ্যাজ্ঞান সবিশেষ স্বতন্ত্র প্রমাণ। প্রমাণের সবিশেষ বিবরণ-জীবত বিবেকে প্রমাণতে শব্দ প্রমাণ” এবং প্রমাণতত্বে “প্রত্যক্ষ ও অনুমান প্রমাণ” – ৪০৫ পৃষ্ঠা হইতে ৪৭৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দেখ। t (ক) অতিদূরত্ব, (খ) অতি সামীপ্য (যেমন লােচনস্থ অঞ্জন) গ) ইন্দ্রিয়ের নাশ, (ঘ) অমনােযােগ, (ঙ) অতিসূক্ষতা, (চ) অভিব নিরোধস্বরূপ নির্ণয়। ২য় অধ্যায় ৪১-৪৫ পৃষ্ঠা দেখ। (৩) ঘােড়ার ডিম, বন্ধ্যার পুত্র, নর বিষাণ ইত্যাদি শব্দ শ্রবণে তত্তাবতের প্রকৃতার্থাভাবে কোন পদার্থ অনুভূত না হওয়ায়, একটী অলীক চিন্তান্মাত্র মনােপধ্যে উদিত হইয়া থাকে, তাহার নাম বিকল্প। সহজ কথায়, মূলে বস্তু নাই, কিম্বা বস্তুর স্বরূপ অপেক্ষা না করিয়া শব্দজনিত জ্ঞানানুসারে যে এক প্রকার বোধের উদ্বোধ হইয়া থাকে তাহার নাম বিকল্প। (৪) পূর্বানু- ভূত সংস্কার হইতে যে জ্ঞানের উৎপত্তি হইয়া থাকে, তাহার নাম স্মৃতি। (৫) যে তমােগুণের গভীর আবেশে প্রমণাদি বৃত্তি নিচয় ফুর্তি পায় না, তাদৃশ চিত্তবৃত্তির নাম নিদ্রা। বলা এবং (ছ) সমানাতিহার অর্থাৎ স্বাতীয়েব সহিত সন্মিলন হেতু অপ্রকাশ (যেমন মুগ রাশির মধ্যে নিক্ষিপ্ত মুগ)। এই সাতটী চাক্ষুষ প্রত্যক্ষের প্রতিবন্ধ বা অন্তরায়। ইহার। যে রূপ প্রত্যক্ষের কেবল নিবৃত্তি জনক এমন নহে, মূল বিশেষে বিপর্যয় বেদের ও কারণ হয়। পাঠশালায় শিখিয়াছ যে, ৯ দন্তী কিম্বা ১:৮• বহবে এক কড়া হয়, সত্য। কিন্তু এক দী কিম্বা এক বহর কি চক্ষে কখন দেখিয়াছ? একটা মুদগ বা সর্ষপ বীজ, মুগ বা সর্ষপেয় স্তপের (গাদির) মধ্যে কেলাইয়া দিয়া তাহা পুনরায় চিনিয়া আনিতে পারকি ? কখনই না। যিনি পারেন, তাহার পক্ষে প্রত্যক্ষমেব প্রমাণং বলা যাইতে পারে, অতএব বদ্ধ বা অসমাহিতমনা তুমি, তোমার সমুদায়.থতাক্ষ সত্য নহে বা হইতে পারে না, মন নিরু করিলে, বা সমাহিত হলে এ কথার যাথার্থ্য উপলব্ধি করিতে পারিবে, অন্যথা নব।

সিনি। বিষয় বা দৃশ্য। বাহুল্য যে, মনে যত প্রকারের বৃত্তি আহিত হউক না কেন, তাহা এই পাঁচ প্রকারের অতিরিক্ত নহে বা হইতে পারে না। নিয়ােধউপায় বা চিত্তচিকিৎসা-চিত্তের ব্যাধি কি ? বিষয়ােপরঞ্জন অর্থাৎ বিষয়গদ্বারা চিত্ত উপরঞ্জিত বা অধিবাসিত হওয়াই চিত্তের ব্যাধি বা কালুষ্য, সুতরাং ব্যাধির হেতু অভেদে ভেদ দর্শন। দর্শন ফল- দর্শন ফল—বৃত্তিসংগ্রহ বা আহরণ-সংক্ষেপঃ পুনঃ পুনঃ জনন মরণ। ব্যাধির ঔষধ তঙ্কেতু বিষয় বা দৃশ্য নিবারণ—মনােনিরোধ দ্বারা বিষয়ের বা দৃশ্যের কালীকত্ব প্রতীয়মান দৃঢ়ীকরণ, ব্রহ্মাতিরিক্ত গ্রাহাভাব সংলাপন, সংক্ষেপ কামনীভাব বলে তাসংস্থমানসে আমীন সাব এবং অ অসংগৃত্ব কাহাকে বলে ? আত্মাই একমাত্র সং বা সত্য পদার্থ, শ্রবণল ঈদৃশজ্ঞান, মনন এবং নিদিধ্যাসন দ্বারা নিশ্চিত হইলে, মন হইতে জগং বা জাগতিক পদার্থ সমূহের সংকল্পের অভাব হয় এবং মিথ্যা ও অলীক বোধে মন আর তখন তাহাদিগকে গ্রহণ কষিতে চায় না। ঈদৃশ মানসিক ভাবে পরিপাকাতিশয়ৰূপ অবস্থা করের নামই অমনীভাব। ঈদৃশ অমনীভাবেস্থিতি এবং আত্মসংস্থ সুতরাং অমনীয়াৰ অভাবে আত্মসংস্থত্ব আত্মসংণের অভাবে বরুপসিদ্ধি সমধিগত হয় না। এই আত্মসংস্থা ধারণা এবং ধ্যান সমষ্টি ফল। এখানে বলা আবশ্যক যে, আত্মসংস্থানে অনুষ্ঠানাদি অতি দুরূহ এবং দুঃসাধ্য বােধে, অনেকেই উপাসনাকালে আয় সংয়ের পরিবর্তে হয় নাভিচক্রাদি সংস্থই অভ্যাস করিয়া থাকে, এ্যালবলে পরিণামে ধোপদার্থে স্থানে, তাহাদের মনোমধ্যে তৎ তৎ সং শাদিই উদিত হইয়া থাকে যা কালীসংহী কালী দেখে, অসম্ভব এবং নিরােধক নির্ণয়। অবহিতকরণ। ইহাই স্বরূপসিন্ধি সমধিগমের উৎকৃষ্ট পন্থা। রাযোগের পরমবিধি। রাজযােগের কথা পরে বলিব। ঔষধের অনুপান অভ্যাস এবং বৈরাগ্য। যােগ্য ভিষকের নিদেশানু- সারে ঈদৃশ অনুপান সহযোগে ঔষধ সেবন করিলে চিত্ত নিশ্চয়ই ব্যাধি-বিনিমুক্ত হয়। বিষয় স্পৃহা দূরে পলায়ন করে। ব্যাধি বা বৃত্তিনাশ বা নিরােধ হেতু নিরিন্ধন অগ্নিবং চিত্ত স্বসত্তাত্রে উপশমিত হয়। চিত্তের স্বরূপ—আত্মরূপ প্রকাশিত হয়। ইহাই আবােগ্য—চিত্তের স্বাস্থ্য। তখন পুরুষ (আত্মা) মেঘ বিনিমুক্ত আদিত্যবৎ প্রকাশিত হইয়া পড়েন। তাই ভিষক বরিষ্ঠ মহর্ষি পতঞ্জলি, প্রত্যক্ষ ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের কথা না বলিয়া, ভঙ্গক্রমে বলিয়াছেন যে, চিত্তের বা মনের বৃত্তি নিরুদ্ধ হইলেই দ্রষ্টা পুরুষ আপন স্বরূপে অবস্থান করেন। বলা বাহুল্য যে, মনােনিবােধ দ্বারা প্ৰােক্ত প্রকার মনীভাব না হইলে কোন কালে কিছুতেই চিত্তের ব্যাধি প্রশমিত বা আরােগ্য হইতে পারে না। এবং ব্যাধির অপ্রশমনে বা অনায়ােগ্যে স্বরূপসিদ্ধির সমধিগমরূপ শান্তিও মিলে না। মিত্রই বল, আর আত্মীয়ই বল, চিত্তকে কটিক সংকী স্ফটিক দেখে নাভি সংস্থানাভি দেখে ইত্যাদি। কিন্তু তাহা- দের একবার ভাবা উচিত যে, জাগতিক অনিত্য পদার্থে স্থিতি করিয়া বা তাহা মনে ভাবিয়া কি কখন জগদাতিরিক্ত পদার্থের সাক্ষাৎকার হয়? কখনই না। অতএব বলা যাইতে পারে যে, আত্ম সাক্ষাৎকারের প্রকৃত এবং প্রকৃষ্ট উপায়ই আত্ম সংস্থ, অবশিষ্ট সমুদায় সংস্থাই-ব্যামােহমূলক, অসম্প্রসাদ বিশেষ। সুতরাং শিষ্টজনত্যজ্য। আত্ম সংশ্বের বিষয় ৩য় অধ্যায় “ব্রহ্মবিদ্যা এবং ব্রহ্মবিদ গুরু” দেখ।

বরূপসিটি। , ওন। তার বিষয় যক্ষের আক্রমণ হইতে মুক্ত করা ব্ৰহ্মবিদ গুরু ভিন্ন তাপর কাহারও সাধ্য নাই। এবং আত্মসংস্থই ইহার একমাত্র ক্রম। অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের কথা—এইক্ষণে মনােনিরােধের উপায় স্বরূপ অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের বিষয় সবিশেষ বলিতেছি স্বভাবতঃ বহিঃপ্রবহণশীল মনকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ইয়া সর্বতােভাবে নিরুদ্ধকরণার্থ যে মানসিক উৎসাহ বা যত্ন বিশেষের পুনঃ পুনঃ আবৰ্তমান তাহাকে অভ্যাস কহে। দৃষ্ট এবং আনুবিক বিষয়ে বিতৃষ্ণার নাম বৈরাগ্য । এই বৈরাগ্য অপরা এবং পবা ভেদে দ্বিবিধ। এই অপরা বৈরাগ্যই সাধকে প্রথম সাত হইয়া থাকে। ইহা চারিভাগে বি:ক্ত যথা যতমান, ব্যতিরেক, একেন্দ্রিয় এবং বশীকর। (ক) এই জগতে সার (সৎ) পদার্থ কি তাহা গুরু এবং শাস্ত্র উভয় মুখে অবগত হইবার জন্য উদ্যোগ বিশেষের নাম যতমান। (খ) ইহা জানিবার পূর্বে মনোমধ্যে যে সকল দোষ ছিল, জানার পর তদভ্যাসবলে কতগুলি বিনষ্ট হইয়াছে এবং অবশিষ্ট কত- গুলিই বা আছে,তাহাই মনে মনে বিচার করার নাম ব্যতিরেক গ) দৃষ্ট এবং আনুবিক (যাহার বিষয় শুনা যায়, যেমন স্বর্গফলাদি) বিষয় প্রবৃত্তি মাত্রেই দুঃখসঙ্কুল, সুতরাং তাতে প্রবৃত্ত না হইয়া মনে মনে ঔৎসুক্যরূপে সে তৃষ্ণা রক্ষা করাকেই একেন্দ্রিয় বলে। (ঘ) এবম্বিধ প্রকারে, ক্ৰমে সমূহ বিষয়ে—গত বা জাগতিক দৃশ্য পদার্গে যে বিতৃষ্ণা জন্মে, তার নাম বগীকার। এবিং, অপরা বৈরাগ্যের পরিপাকাতিশয়রূপ অৰান্তরের নামই নিয়োধরূপ নির্ণয়। শঙ্কর পরাবৈরাগ্য। এই পরাবৈরাগ্যের আবির্ভাবে বা প্রভাবে আব্ৰহ্ম- স্তম্ব পর্যন্ত সমুদায় পদার্থে বিতৃষ্ণা জন্মে। সহজ কথায়, পুরুষের সাক্ষাৎকারে–পূর্ণ জ্ঞানের বিকাশে,সাধকে যে ভাবের উদয় হয়, তাহার নাম পরাবৈরাগ্য। এই পরাবৈরাগ্য প্রভাবেই চৈতন্য অবলাল। ঐ .ম সমুদ্র গলে ঝাপ দিয়াছিলেন। কাপালিকের খড়গ আত্মসমর্পণ করিতে কিছুমাত্র ও ভীত হন নাই। বু নিঃশঙ্কচিত্তে রাজ্য ছাড়িয়া অত্যাশ্রমী হইয়া- ছিলেন, এখন একবার মনে মনে বিচার করিয়া দেখ যে, পরা- বৈরাগ্যের উনয়ে সাধকের এক সত্যভাবে ভাবিত মনে জাগতিক বৃত্তি হিত হইতে পারে কি? কখনই না! বৃত্তি বিরহিত মনই নিরুদ্ধ। পক্ষান্তরে, সমাহিত এবং নিরুব্ধ একই কথা। সহিতাবস্থায় বৃত্তি আৰ্হিত হওয়া অসম্ভব, কেননা, তাহা হইলে সমাধিই সিদ্ধ হয় না। আর বুত্থানকালেও সমাধি জ্ঞানের স্মৃতি থাকায়, গ্রাহাভাব হেতু, এক কথায়, অমনীভাবের স্থিতিজন্য পার্গের পৃথক বৃত্তি অহিত হয় না,কাজেই মন, ভোজন বা ভিক্ষা অনাদি কালব্যতীত তখনও আত্মমাত্রনিষ্ঠ হওয়ায় সমাহিত ব, নিরুদ্ধ। অতএব সিদ্ধ হইল যে, ব্রত্তি-বিরহিত বা একসত্য ভাবে ভাবিত মনই নিরুদ্ধ বা সমাহিত। অভ্যাস এবং বৈরাগ্যই সেই নিরোধের প্রশস্ত উপায়। আর ঈদৃশ নিরােধ বা সমাধিই মনের স্বরূপরূপ-সার্বভৌমধৰ্ম্মরাজযােগ নামে অভিহিত। গৎ রূপ তাহার কালুষ্য। এইক্ষণে সেই স্বরূপরূপের বা গাযােগের কথা বলা যাইবে।

রূপসিটি। বৃত্তিনিরােধে স্বরূপের প্রকাশ এবং রাজযােগের কথা- কোনরূপ বৃত্তি প্রতিবিম্ব যখন মনকে আশ্ৰয় করিতে পারে না, তখনই মন অর্থাৎ স্বীয়রূপে-আত্মস্বরূপে অবস্থিত হয়। ইহাই মনের স্বরূপরূপ। ঈদৃশ অবস্থায় স্থিতিই স্বরূপসিদ্ধি বা রাজযোগ নামে অভিহিত। যেমন ব্রহ্মবিদ্যা সকল বিদ্যার প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয় হেতু শ্রেষ্ঠতম বিধায় ইহার নাম রাজবিদ্যা,তেমনি মনীভাৰ বলে আত্মসংস্থ হওয়া, সহজ কথায়, অভ্যাস এবং বৈরাগ্যবলে মনের তাবৎবৃত্তিনিরােধ কর বা মনকে নিবৃত্তিক করা আকামাত্রনিষ্ঠমন হওয়াই স্বরূপসিদ্ধির প্রশস্যতম উপায় বলিয়া ইহার নাম রাতযােগ। ইহার প্রভাবে অনেকসম্মসহ সঞ্চিত ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মাদিরূপসমুলকৰ্ম্ম ক্ষণমাত্রে ভস্মীভূত হইয়া যায়। সুতরাং ইহা রাজবিদ্যাবৎ তাবং শুদ্ধিকারণের মধ্যে পরমপবিত্র ৰা শুদ্ধিকারণ। এখন কথা হইতেছে যে, ঈদৃণ পরমপবিত্রানুষ্ঠানে লােকে আগ্রহ প্রকাশ করে না কেন ? প্রভূত আয়াসসাধ্য এ রাতযােগ সাধনে-মনননিরােধদ্বারা স্বরূপসিদ্ধিলাভে বহু বহু অম্মের সুকৃতি বৎ কদাচিৎ কোন বিরল ব্যক্তিকে উক্ত হইতে দেখা যায়। তাই স্বল্পফলপ্রসু সুকর তুচ্ছ ক্ষুদ্র তানুষ্ঠানাদিতেই লােকসাধারণ ব্যস্ত। অপিচ শরীরদিকে ধারণ করে বলিয়া মনের নাম ধাতু। এই মন ধাতু প্রসন্ন হইলে-স্বীয়রূপে অবস্থান করিলে, আত্মারূপ প্রকাশ পায়। এই আহ্বরূপ এবং মনের স্বরূপরূপ এক-অভিন্ন। মন যে , সাধক তখন তাহা উপলব্ধি করিয়া অপার আনন্দ সাগরে নিমগ্ন, নিরোধণরূপ নির্ণয়। হয়। ( ধাতু প্রসাদাৎমহিমান মায়ানঃ )। ভাল, তােমার বােধ- সৌকাৰ্য্যার্থেকথাট। আর ও একটু বিশদভাবে বলি শুন—যখন দর্পণে জাগতিক নিখিল পদার্থের মধ্যে কোন একটার ও প্রতিবিম্ব পতিত না হয়, তখন সেই দর্পণ, যেমন দর্পতারূপ স্বীয় অবস্থা। প্রাপ্ত হয়, যেইমত মন যখন সর্বপ্রকার বৃত্তি প্রতিবিম্ব রহিত হয়, সহজ কথায় আমি, তুমি ও জগৎ এই সকল দৃশ্য পদার্থের সন্ত্রম পূর্ণ ভাবে উপশান্ত হয়, তখন মন আর কিছুই দর্শন করে না, তখনই মনের স্বরূপরপ—আ ত্মরূপ বা মন ব্রহ্মরূপ প্রকাশ পাইয়া থাকে। অতএব তাত, যােগ্য ভিষকের নির্দেশানুসারে অভ্যাস এবং বৈরাগ্যরূপ অনুপান যোগে মনােনিবােধরূপ ঔষধ পান কর, মন নিবিষয় হইবে-ব্যাধি প্রশমিত হইবে। পরূপসিদ্ধিরূপ রাজযােগ ফল সমধিগত হইবে। ইহা সত্য পরীক্ষিত এবং প্রত্যক্ষ-ফলপ্রদ। অতএব বলা যাইতে পারে যে, বৃত্তিযুক্ত মনে স্বরূপসিদ্ধি বা রাজযােগ সমধিগত হয় না, কোন প্রবল সুকৃতিবশাৎ হইলেও তাহা স্থির থাকে না, সুতরাং বৃত্তিযুক্ত মন বন্ধের কারণ। ইহাই জনসাধারণের মন। আর বৃত্তি বিরহিত মনে তাহা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় বলিয়া তাহা মােক্ষের কারণ। ইহাই বিরল বা অসাধারণ জনের মন। অতএব মনেই বন্ধ এবং মনেই মােক্ষ। পার্থক্য কেবল ব্যবহারে—সমলে, এবং সমলে। এইত গেল স্বরূপসিদ্ধিরূপ রাজযােগের কথা। স্বরূপ- সিদ্ধি বা এই রাজযােগের সাধনরূপ নিরােধাভ্যাস কতদিন এবং কেমনে করা আবশ্যক, এইক্ষণে তাহাই বলা যাইবে।

রূপসিদ্ধি। বরূপসিদ্ধি সাধনে বা রাজযােগে কতদিন এবং কেমনে নিরোধ অভ্যাসেয় প্রয়ােজন ?—এখন কথা হইতেছে যে, মনন- নিরােধার্থে অত্যাস এবং বৈরাগ্যের অনুষ্ঠান বা সাধন কতদিন ধরিয়া করিতে হইবে ? সব ফল প্রাপ্তি পর্যন্ত অর্থাৎ নিরােধ, যােগাভ্যাস ফল সংপ্রাপ্তিই ইহার অবধি। যেমন অশ্বারােহী পুরুষ গন্তব্য স্থান প্রাপ্ত হইলে, আর অশ্বে আরােহণ করিয়া থাকে না—অবতরণ করে। এ নিরােধ-অভ্যাস-যােগও ঠিক তত্ব! সহজ কথায়, নিরােধযােগাভ্যাস ভূমি দৃঢ় বা অবিচালিত করার্থ—অর্থাৎ কোন প্রবল বিষয় সুখ বাসনা কিম্বা গুরু দুঃখ বাসনা দ্বারা যেন সাধনকালে সাধক তাহার অভীষ্ট বিষয় বা ধ্যেয় পদার্থ হইতে বিচলিত না হয় ( ন দুঃখেনগুরুনাপি- বিচালাতে) এমনভাবে দীর্ঘকাল, নিরন্তর সৎকার সহিত অভ্যাস করিতে হইবে। সৎকার শব্দের অর্থ—দর। এ আদর, মনের লয়, বিক্ষেপ কষায় এবং রসাস্বাদ এই অবস্থা চতুষ্টয় রাহিত্যকে বলে। ইহার বিশেষ বিবরণ “মনের অব। চতুষ্টয় দেয়। কথিত আছে যে, সিতার পিতা শিখীধবঙ্গ জনক সিদ্ধগীত। শ্রবণনাত্রেই তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন, এবং বৎসর ত্রয়ের মধ্যেই নিরোধ ভ্যাসদ্বারা স্বরূপসিদ্ধিরূপ রাজযােগ সাধন ফলে অবিচলিত অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন,সহজ কথায় যােগা- • রামায়ণে দুইজন জনকের নাম পাওয়া যায়, একজন মিরপুর ও উদাষমুর পিতা। অপর দু রোমার পুত্র ও সিতার পিতা। মির অপর নাম জনক, ইহা হইতেই এই বংশের সকল, রাজার সাধারণ গান, নিরােধপ নির্ণয়। রূঢ় হইয়াছিলেন। এখানে বলা আবশ্যক যে, এই নিনােযােগা- ভ্যাস ক্রমান্বয়ে—অজস্র অর্থাৎ একটানাঅভ্যন্ত না হইয়া বি.দযুক্ত হওয়া (কতদিন থামিয়) আমরণ অভ্যস্ত হইলেও কোন ফল হয় না। কেননা, ক্রমিক কতদিন যাবৎ অভ্যাস ধা। যে সকল যোগ সংস্কার সাধকে সমুৎপন্ন হয়, বিচ্ছেদকালীন উৎপন্ন বুথান সংস্কার দ্বারা তাহা অভিভূত হইয়া যায়, সুতরাং কার •ায়ে সমাধি বা নিরোধ জন্য সাধকের পূর্ববশ্রম সবই নিরক হয়। অ ই ব স্বরূপসিদ্ধিরূপ রাজযোগে অবিচালিত স্থিতি ব শেগ ? না হওয়া পর্যন্ত নিরােধের নিরন্তর অষ্ঠান করা অবস্থ ক ব্য। কদাপি বিচ্ছিদ্যভাবে নহে। সবশেষ “তত্ত্বজ্ঞানত্রিয় সহ অভ্যসনীয়” দেখ। এইক্ষণে সেই নিরােপের অন্তরায় এবং তৎ প্রতিবিধানের কথা বলা যাইবে। কেননা, অন্তরায় দূর হইলে মন স্বতঃই প্রত্যক প্রবাশীল হইয়া নিরুদ্ধ হইবে। (title) এন । মি,পর ধারা মিথিলা সংস্থাপিত হয়। সি তার পিতা শিখ ধই এক নামে খ্যাত। শতপথ ব্রাহ্মণের মতে ইনি বিদেহে একজন রাজা ছিলেন। বিদেহ শব্দের একটী অর্থ দেহ শূন্য (Out side the budy). Although a King, he had' entirely forgotten that he was a body, he felt that he was a spirit all, the time. ইহা দ্বার অনুমিত হয় যে, জনক ( সিতার পিতা) গানে ৫ম ভূমি অসং সক্তি অর্থাৎ দেহাদির অতিমান পরিশূন্যবস্থা) প্রাপ্ত হইয়া- হিলেন, ব্ৰহ্ম'বদবর ইয়াছিলেন, বরিয়া বা বরিষ্ঠ হইতে পারেন নাই। দুই পৰা ভূমি বাকি ছিল।

এপসিটি। ০ মনের অবস্থা চতুষ্টয়-এবং অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা নিরােধ অন্তরায় দূরীকরণের কথা—মনের অবস্থা প্রধানতঃ দুইটা যথা লয় এবং বিক্ষেপ। ইহাই সাধারণতঃ চারিভাগে বিভক্ত হইয়াছে। যথা (১) লয় (২) 'বিক্ষেপ (৩) কষায় বং (৪) সম। সুষুপ্তিকালেই মন লীন হইয়া থাকে। এই (১) লয় দ্বিবিধ যথা (ক) অর্পলয় এবং ( খ ). সমগ্ৰলয়। অর্ধয়ে বিষয়াকার বৃত্তি থাকে না, কিন্তু স্বগত সুখ, দুঃখ, মােহাকার বুদ্ধিবৃত্তি থাকে, ইহা স্বীকার না করিলে মুপ্তি হইতে উখিত ব্যক্তির “আমি সুখে নিদ্রিত ছিলাম” এ প্রকার অনুস্মরণ হইতে পারে না। আর ইহা সন প্রসিদ্ধ কথা। অত এব বলিতে হয় যে, সুষুপ্তিকালে অৰ্ব্বজ্ঞান থাকে। ( মুগ্ধেংসম্পত্তিঃ ইতি ব্যায়াৎ)। আর মুচ্ছামণানিতে যেরূপ বুদ্ধির বৃত্তি থাকে না, সমগ্ৰ লয়াখ্য’ সুষুপ্তিতেও সেইরূপ হইয়া থাকে, তখন কোনরূপ বুদ্ধি বৃত্তিই থাকে না, তাহা না হইলে, সমাধি, সুষুপ্তি এবং মােনের মাজপতা এই কপিল বাক্যে বিরোধ হয়। অর্থাৎ অসম্প্রহ্মসমাধি, সমগ্র মুপ্তি এবং বিদেহকৈবল্য এই ত্রিবিধ অবস্থাতেই পুরুষের ব্ৰহ্মরূপঠা, প্রকাশ পায়, অর্থাৎ এই অৰ অয়ে বুদ্ধিবৃত্তির বিলয় বশতঃ ঔপাধিক পরিচ্ছেদাদির ও বিলয় হইয়া স্বরূপপূর্ণতা অবস্থায় আর অবস্থিতি হয়। অতএব এই পুরুষ বা আয়ার স্বরূপ তাব। এবং তাহার মনস্বভাব কল্পিত, পরিচ্ছেদাতিমান প্রমুক্ত সুতরাং প্রাতিভাসিক। অতএব বির হইল যে, অন্ধলয় নিদ্রারূপ সহজ এবং অনুষ্ঠান নিরপে।

নিরােধকাপ নির্ণয়।
আত্মসং অত্যাসকালে সাধকের মন প্রথমতঃ এই প্রকারেই লীন
হয়, অর্থাৎ সাধক ধ্যেয় পদার্থ ভুলিয়া গিয়া নিদ্রিত হইয়া পড়ে।
প্রথমতঃ (ক) নিদ্রারূপলয় এ লয় (ধ্যান) মনন বিরােধী
'হেতু সাধক মাত্রেরই ইহা অভ্যাস দ্বারা নিরােধ করা নিতান্ত
আবশ্যক। আত্মসংসুকালে নিদ্ৰা আসিলেই সাধক প্রথম স্বীয়
আসন হইতে উখিত হইয়া ইন্দ্রিয়ছিদ্রগুলি, যেমন চক্ষু কর্ণাদি,
শীতল জল দ্বারা ধৌত করিবে এবং স্বয়ং কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ বিচরণ
বা পাচারি করিবে। পরে আসনে উপবেশন পূর্বক কয়েকবার
প্রাণায়াম করিবে। এবম্বিধ প্রকারে চিত্তের জাভ্যাদিদোষ
বিনষ্ট করিয়া চিত্তকে কিঞ্চিৎ প্রবুদ্ধ বা বা সজাগ করত
পুনরায় উপাসনা করিবে।
বগ।
বাহুল্য যে, লয়কালীন
কয়েকদিন এইমত অভ্যাস করিলেই আর আত্মসংস্থের সময়
নিত্ৰা আসিবে না। মনীন হইয়া ধ্যেয় আত্ম বিস্মৃত
হবে না। এবম্বিধ আচরণেও যদি লয় নিরুদ্ধ না হয়—নিদ্রা
আপিতে থাকে, ধ্যেয় বিষয়ের বিস্মৃতি হয়, তাহা হইলে যথা-
যথভাবে লয়কারণগুলি নির্ণয় দ্বারা তাহাদের প্রতিবিধানের
চেষ্টা করিবে। যেহেতু ইহারা স্বরূপসিদ্ধির সমূহ বিঘ্নকারী।
অন্তরায় বিশেষ। সাধারণতঃ লয়ের কারণ এই ছয়টা যথা
(ক) অসম্পূর্ণনিদ্রা, (কাচা ঘুম ভাঙ্গা) (খ) শারীরিক শ্রম
গ) বহুভোজন (ঘ) অজীর্ণ (ঙ) জনতার মধ্যে বাস এবং
(চ) তৃষ্ণ।
ইহাদের বিপরীতগুলি অত্যন্ত হইলেই লয়
কারণে প্রতিবিধান করা হইবে, সেগুলি এই যথা—(ক)

রূপসিদ্ধি। নিদ্রা (খ) শ্ৰমত্যাগ (গ) স্বর ভোজন (ঘ) সুজীর্ণতা (৬) নির্জন প্রদেশে বাস এবং (চ) নিস্তৃষ্ণা। দ্বিতীয়তঃ (খ)ধ্যেয় পদার্থে লয়-এষণ লব্ধ ধ্যেয়(সৎ)পদার্থে মন লীন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এবং এই জন্যই আত্মসংস্থত্ব দ্বারা মনােনিরােধের প্রয়ােজন,এবং ইহারই নাম সমগ্ৰলয় বা নির্বীজ সমাধি। ইহার পরিপাক ফা-বিদেহমুক্তি (২) বিক্ষেপ-সাধারণত; বহিঃ প্ৰবহনশীল মন ভােগাদির অন্য এক বস্তু হইতে অন্যবস্ব গ্রহণ করে, তাহাতে তৃপ্তি না হইলে, তৃতীয় বস্তুর অন্বেষ—েদেহ-গৃহ হইত সবেগে ধাবিত হয়, সাধ্য কি যে তৎকালে তুমি তাহার বেগ নিরুদ্ধ বা মন্দীভূত করিতে পার ? মনে কর, অনিরুদ্ধমনা তুমি উপাসনা করিবার অন্য দিব্য রচিত আসনে উপবিষ্ট হইয়াছ। তুমি বাহ্যতঃ বসিয়া আছ সত্য, কিন্তু তােমার মন তােমার জ্ঞাতসারে বা কিঞ্চিৎ জ্ঞাতসারে তৎকালে হয়তঃ কাশী দেখিতেছে, কিম্বা কলিকাতায় হার্ট কোম্পানির দোকানে ঘােড়া কিনিতে বাহির হইয়াছে। মনের এধি ব্যাপারে নাম নিক্ষেপ, ইহা স্বরূপসিদ্ধিৰ সমুহ বিল্পকারী, অন্তরায় বিশেষ। সুতরাং ইহা নিরােধ করা আবশ্যক। বিক্ষেপ নিরোধের উপায় যথ। (ক) বিবেকিজন প্রসিদ্ধ ভােগ্য বস্তু গত সমুহ দুঃখের অনুস্মরণ (খ) শাস্ত্রসিদ্ধ জম্মদিরহিত অদ্বিতীয় তবের আলোচনা (গ) এবং ভোগ্য বস্তুর অদর্শন বা সাময়িক র্শন ইত্যাদি প্রকারে বিষয় হইতে বৈরাগ্যাদি দ্বারা বহিপ্রবহণ • লৌকিক এবং অলৌকিক এই বিবিধ উপায়ে আসনশুদ্ধ সিদ্ধ । আসনােপরি কেবল মন্ত্রপূতঃ গণ্ডুষমাত্ৰ জল প্রক্ষেপম্বার। তাহা এজ হয় না। সবিশেষ বিবরণ বৈদিকরহ.সন্দর্তে ৯৫ পৃষ্ঠা অব্য।

নিরােধকাপ নির্ণয়। হইবে না। শালমনকে অল্পে অল্পে পুনঃ পুনঃ প্রত্যাহৃত করিয়া আত্মসংস্থ হইবার চেষ্টা করিবে, মনকে অহংজ্ঞানগম্য-আত্মায় লাগাইবে। তােমার যােগ্যতা বা যােগসামর্থানুসারে মন শীঘ্র কিম্বা বিলম্বে নিরুদ্ধ হইবেই হইবে। কাপি তােমার চেষ্টা ব্যর্থ বা বিফল যেমন একনিষ্ক নিনিষ্কাদি ক্রমে বণিক বাণিজ্য দ্বারা কালে লক্ষপতি বা ক্রোড়পতি হইয়া থাকে, অধ্যেতা মানবক যেমন পাদাংশ অর্থপাদ,ঋক বর্গাদিক্রমে সমগ্ৰবেদ অধ্যয়ন করিয়া দ্বাদশ বৎসরের মধ্যে অধ্যাপক হইয়া থাকে, তুমি ও তদ্বৎ অভ্যাস বৈরাগ্যাদি দ্বার' বহিঃপ্রবহণশীল মনকে অল্পে অল্পে প্রত্যহ এক মুহু, এক ক্ষণাদি ক্ৰমে ভোগ্য বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া অহংজ্ঞানগম্য-আ আয় সংস্থাপন রূপ নিয়োেধ অভ্যাস করিলে, দেখিবে যে, এক বৎসরের মধ্যে নিরোধরূপ যােগকাল অনেক বন্ধিত হইয়াছে এবম্বিধ প্রকারে লয় এবং বিক্ষেপ নিরুদ্ধ হইলে, মন উপরতবৃত্তিক হইয়া যথাকালে আকারে ভাসমান হইবে। তােমাকে যােগারূঢ় করিবে। তুমি কালে নিরোধে বা স্বরূপ সিদ্ধিরূপ রাজযােগে অবিচলিত স্থিতিলাভ করিতে পারিবে, এক কথায় ভােগী হইতে যােগী হইবে সাধক—হইতে সিদ্ধ হইবে। ইহা কদাপি অসম্ভব এবং অসাধ্য নহে। এক নােচক বাক্যও নহে, ইহা পরীক্ষিত এবং ধ্রুব সত্য। এখানে বলা আবশ্যক, যে, এই নিরােধ (অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি) অভ্যাসকালে সাধকে বৈদিক এবং লৌকিক,দ্বিবিধ বাক ব্যাপার এবং ইতর কৃতভাগাদি ব্যাপার লুপ্ত হইয়া যায়, যেহেতু ইহা মনােনিরােধরূপ বিদ্বৎ সন্ন্যাস সাপেক্ষ।

পলিটি। (৩) কষায়-লয় বিক্ষেপ রহিত অথচ তীব্র রাগ: দ্বেষদি বাসনাগ্রস্ত মনই কদাচিৎ সমাহিতের ন্যায় বােধ হইলেও,বাস্তবিক তাহ সমাহিত নহে, তাসমাহিত। ইহারই নাম কষায়। বিবেক দ্বারা তাহা অবগত হইয়া লয় বিক্ষেপাদিবং তৎ প্রতীকারের চেষ্টা করা আবশ্যক। ইহার বিশেষ বিবরণ ২য় অধ্যায়ে “অতীত প্রতিবন্ধ” ৩০ পৃষ্ঠা দেখ। সুগম দর্শনে এই কষায় ও বিক্ষেপেরই অন্তর্গত-অবান্তর ব্যাপার বিশেষ। এইক্ষণে সম কাহাকে বলে দেখা যাক। “রসাস্বাদের কথা” পরে বলিব। (৪) সমপ্রাপ্তি-এইক্ষণে “সম প্রাপ্তির বিষয় বিচার করা যাইতেছে--মনের লয়, বিক্ষেপ এবং কষায়রূপ নিরােধঅন্তরায় প্রােক্ত প্রকারে অভ্যাস এবং বৈরাগ্যাদি নুষ্ঠান দ্বারা পরিহৃত হইল মনের স-রূপ নাশহেতু মন উপরত-বৃত্তিক হইয়া সত্বমাত্র শিষ্টরূপে অতি সূক্ষকার ধারণ করে। ইহাই মনের রূপ- রূপ। দিবালােকে দীপালােকের অস্তিমাত্ৰ থাকিলেও, তৎ- কাৰ্যকারিত্বের লােপে যেমন সেই দীপালােক আলােকদৃষ্টিতে সাবিত্র তেজরূপেই প্রকাশ পায়, সেই মত মনেরও নিরােধহেতু সরূপ নাশে সত্বমাত্রশিষ্টরূপে বা রূপরূপে দগ্ধরঙ্গুর ভস্মাকাররূপবৎ মনের অস্তিত্ব মাত্ৰ থাকিলেও, তাহা ব্ৰহ্ম বা চৈতন্য দৃষ্টিতে ব্রহ্মাকারেই ভাসমান হয়। ইহাকেই মনের সমপ্রাপ্তি বলে। সম শব্দের তাৰ্থ নিবিশেষ। নির্বিশেষ নির মনের রূপ এবং অরূপের বিশেষ বিবরণ ৩য় অধ্যায় ৪৮ পৃষ্ঠা দেখ।

নিরােরূপ নির্ণয়। ( নাস্তি )—বিশেষ (ভেদ) অর্থাৎ ভেদশূন্য-অভেদ, সর্বভাব বিকার বিরহিত। যাহা নির্বিশেষ,যাহা ভেদ—সর্বভাব বিকার বিহিত, তাহা এক। যাহা এক, তাহা উৎকৰ্ষাপকর্ষবত্ব রহিত, সুতরাং সর্বভূত বিলক্ষণ স্বভাবব, কেননা, ভূতের ভাব সবিশেষত্ব, এবং পরমের ভাব নিৰ্বিশেষত্ব। অতএব বলা যাইতে পারে যে, সর্বভাব বিকার বিরহিত, এক অদ্বিতীয়ই নির্বিশেষ শব্দের অর্থ, তাহা একব্রহ্ম ভিন্ন আর কি হইতে পারে ? সুতরাং “সম প্রাপ্তি” বলিলে ব্রহ্মরূপে বা ব্রহ্মাকারে ভাসমান বুঝিতে হইবে, অর্থাৎ ইনৃশ নির্বিষয় মনই জ্ঞান স্বরূপ, নিত্য অসঙ্গ ব্ৰহ্ম নামেই অভিহিত। তার ব্রহ্মের একটী নামও আছে “সম”। যথা (নির্দোষং হি সমং ব্ৰহ্ম ইত্যাদি) অতএব সিদ্ধ হইল যে, সমভাবই ব্ৰহ্মভাব। বহুবহু জন্মের সাধন এবং সুকৃতি সঞ্চয়ে নিরোধ বলে মনের স-রূপনাশে একবার মনের এই সম প্রাপ্তি সমুপস্থিত হইলে আর তাহাকে বিষয়াভিমুখীন হইতে দিবে না, অতি যত্নের সহিত সে ভাব ধারণ করিয়া রাখিবা, বলা বাহুল্য যে এবম্বিধ ধারণ ফলে বা মনের অবস্থিতিতে (অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলে) * যথাকালে গুরু প্রসাদাৎ তােমাতে ব্ৰহ্মস্বরূপভূত এই অসম্প্রজ্ঞাতসমাধি জ্ঞানের ৭টা ভূমিব শেষ তিনভূমি বিষয়ক। মসংশক্তি ভূমি ইহার আরম্ভ এবং তুৰ্য্যাগাভূমি ইহার অবধি। মধ্যবর্তী ভূমিব নাম পদার্থ বিনী। প্রথম ভূমিদ্বয় জীবতি বিষয়ক। শেষ ভূমিতৈ—বিদেই মুক্তিকালে ইহা নিজ আখ্যা প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ ভূমিত্রয়ানুসারে, ক্রমশঃ বাসনা কর্মাদি বন্ধ কারণের ক্ষ হইয়া শেষে পরূপসিদ্ধি। পরমানন্দ সম্যক্ অবিভূত হইবেই হইবেই। হে সৌম্য ইহা সবিশেষ পরীক্ষিত, ধ্রুবসত্য সুতরাং অনুষ্ঠেয় । বিষয়টী অতিশয় গৃঢ় বিধায় তােমার বোপসৌকার্যার্থে এবং প্রতীতির দাঢ্যতার জন্য আরও একটু বিশদভাবে বলিতেছি শুন— মনে কর, যেমন ঘট উৎপন্ন হইবার সময় তান্তব বা হাকাশ দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়াই উৎপন্ন হইয়া থাকে, পশ্চাং পুল প্রত্ন দ্বারা তাহা জল তণ্ডুলাদি দ্বারা পরিপূরিত হয়, জল নিঃসরিত করিয়া দিলেও, তাহার অভ্যন্তরস্থ আকাশ তবিধিতে তু কিন্তু নিঃসারিত হয় না; রহিয়াই যায়। ঘটের মুবি নিরুদ্ধ করিয়া দিলেও তাহা সংসাধিত হয় না। এই মতে, ६३ माठ, जिद ना गन চৈত্য হইতে বিবৰ্ত্তাকারে উদ্ভাসিত হইবার সময় তা চৈত দ্বারা অন্তর বাহ্য পূর্ণ হইয়াই প্রকাশ পাইয়া থাকে। ঈদৃশ পরিচ্ছিন্ন চিত্ত ধর্মাধর্মাদি বশাং মুষ। নিষিক্ত দ্রুত তাম্রবৎ অর্থাৎ দু'চে ঢালা গলা তামার ন্যায় বট, পট, রূপ, রস, । বং নির্বীজ আখ্য প্রাপ্ত হয়। নিরোধ-অবন্ত মাত্রই নহে; এই অপারে পাহলে এই অসম্প্রতি সমাধিকে নব্বীজ অর্থং হাতে কেন পক'র বাসনা কর্মাদি বদ্ধ কারণ থাকে না, এই মত উক্ত ইয়?ছ বুঝ1, অন্যথা বুথান বা সমাধিদের অনুপপত্তি হয় কমণ লাজক্ষয়ে। ভন • ৩) এই অসম্প্রতি সমাধি প্রাপ্ত যােগী ভূমৰয়াস'রে যপ কম ব্রহ্ম পর, এবি বলিয়ন এবং ব্রহ্মবিদ বরিষ্ট খায় অপায়িত হয়। শংকন। জ্ঞান ও অজ্ঞানভূমির সবিশেষ বিবরণ শীব ওই বিবকে “বঃ ও ক ৩ ০২ পৃষ্ঠা দেখ।

নিরোধস্বরূপ নির্ণয় । সুখ দুঃখাদি বৃত্তিযুক্ত হইয়াই প্রকাশ পায়, তখন সাধন বা অভ্যাসবলে রূপ রসাদি অনাত্মকার বা মনের স-রূপ ‘নিরুদ্ধ হইলেও, ঘটস্থ আকাশবং নিনিমিত্তক চিদাকার কিন্তু প্রকট বা অনিরুদ্ধই রহিয়া যায়। সূর্ণন সংস্কারশিষ্ট বা সমাত্রাবশিষ্ট অরূপ মনরূপ উপাধিযুক্ত এই চিদাকার বা চৈতন্যই সাক্ষী চৈতন্য নামে অভিহিত। এই সাক্ষীচৈতন্য বা সত্ত্বমাত্রশিষ্ট সূক্ষ বা প্রশান্ত মন দ্বারাই ব্রহ্মানন্দ অনুভূত হইয়া থাকে । ( সূক্ষময়া সূক্ষমদর্শিভিঃ, অথবা প্রশান্ত মনসংহেনং ইত্যাদি)। ইহাই জীবন্মুক্তের বা স্বরূপসিদ্ধের অবস্থা, মনের স-রূপ নাশে বা নিরােধে ইহা সমধিগত হয়। এবং অসম্প্রদাতসমাধির প্রথম ভূমিদ্বয় বিষয়ক। স্বরূপসিদ্ধের বা জীবন্মুক্তের চরমাবস্থার–বিদেহ মুক্তিকালে—তুগাভুমির অভ্যাসপাটবে অগ্নিদর্শনে তদোষ্ণতার এখানে तना সিদ্ধ রাম প্রসাদ এই জীবন্মুক্তের ভাবে ভাবিত হয় ব্রহ্মানন্দ বসাস্বাদ করিয়া চিনি হওয়া“অর্থাৎ বিদেহমুক্ত হওয়া অপেক্ষ!*চিনি খাওয়া অর্থাৎ জীবনমুক্তই ভাল—এই মত বলিয়াছিলেন। অবশ্য ক যে, অসম্প্রজ্ঞাসমাধি প্রারম্ভকালে প্রপঞ্চ প্রবিলা হেতু ব্ৰহ্মানন্দ হইতে ভিন্ন অথচ তচ্ছটা বা আভা বিশেষে, বিশেষ এক প্রকার. আনন্দ সাধককে অনুভূত হইয়া থাকে, তদাস্বাদন এবং বর্ণনাদি রূপ আসক্তির নাম “রসাস্বাদ' বা “সুস্বাদ, ইহা সবিকল্প জ্ঞান বা অজ্ঞান মূলক বলিয়া মুমুমুর পবিত্যজ্য। তাই “নাস্বাদয়েৎ সুখ তত্র ইত্যাদি বাক্য শাস্ত্রে লিখিত আছে। নচেৎ ব্রহ্মানন্দ রসাস্বাদ করিতে নিষেধ করা হয় নাই, তবে যোগ্য শিষ্য ব্যতীত স্বরূপসিদ্ধযােগী সে সুখানুস্মৃতির বিষয় অপর কাহারও সমীপে কদাপি বর্ণনা করিবে না ।

১৩০
স্বরূপসিদ্ধি।
লয়বৎ সত্ত্বমাত্রশিষ্ট সূক্ষ্মন মন ও (মনের অ-রূপও) পরমপৗবন অমল
—ভূমাচৈতন্যে লীন হওয়ায়, কেবল খকৈরস চিদাকার বা
চৈতন্য মাত্রই রহিয়া যায়। ঈদৃশ চৈতন্যের কোন নামই নাই।
ইহা নামক। ইহা নিরা খ্যাত। ইহাই বেদান্তের প্রহ্ম বা ভূম
পদার্থ। হে সৌম্য, ঈদৃশ সর্বাধিষ্ঠান নির্বিশেষ পদার্থই
আছেন এবং আমরা তাহা অবগত আছি। ইহাই পৰম পদার্থ।
ইহা অপেক্ষ: পবন তার কিছুই নাই। (নাতঃ পরম মীতি )।
নিরােধকল—মনের স-রূপ এবং অরূপ * এতদুভয়ের নাশে
ব; নিরােধেই অসম্প্ৰজ্ঞাত সমাধি বিজ্ঞাপক যােগশাস্ত্র পর্যবসিত
হইয়াছে। মনের স-রূপ নশে স্বরূপসিদ্ধি বা জীবম্মুক্তি। ইহাই
নিরােধের প্রান্ত ব' প্রথমফল। এবং অরূপ নাশেবিদেহমুক্তি,
ইহা নিবােধের অবধি বা চরম ফল। স্ব : পসিদ্ধযােগী নিরােধবলে,
জীবন্মুক্তাবস্থায় এ ফলগুলি ও প্রাপ্ত হইয়া থাকেন যথা—অভয়,
দুঃখক্ষয়, প্রবােধ এবং শাস্তি। বলা বাল্য যে, মনে-
নিরােধই স্বরূপসিদ্ধির পরমবিধি, চরমগবধি এবং পরাগতি।
তাই নিরােধরূপ এ অসাত সমাধি রাজযােগ নামে অভিহিত।
তাত, তােমার প্রতীতিব দঢ় তার জন্য পুনরায় বলিতেছি যে,
মনােনিরােধরূপ অসম্প্রদ্যাগে বা নির্বাহমাধি ব্যতীত অন্য
কোন উপায়েই স্বরূপসিদ্ধি বা জীবমুক্তি এবং বিদেহমুক্তি সমধিগত
হয় না। জীব শিব হয় না।
হয় না। • দুঃশাসন্তিয় সুখ মিলে না।
* মনের স-রূপ এবং অরূপের সবিশেষ ৮৪পৃঃ এবং ১২৯পৃঃ দেখ।
৪:
শিবের মদন প্রবাদ –সংকঃ মনের ধয় ইলেও যেমন

নিরােধস্বরূপ নির্ণয় । ১৩১ ব। । অক্ষয়শান্তি সংপ্রাপ্তি হয় না। ইহা পরীক্ষিত সুতরাং ধ্রুব সত্য। ইহাই উপদেশ। এবং ইহাই আদেশ। অতএব সিদ্ধ হইল যে, স-রূপে মনে। নাশে সরূপসিদ্ধি সাধনমিতি স্থিত। উপসংহার।-উপক্রনে বা গ্রন্থ প্রারম্ভে ব্রহ্মেরই, কৌন্তেয় কর্ণের রায়েৎ জীবরূপ প্রদর্শিত হইয়াছে, এবং উপসংহারে বা গ্রন্থপরিসমাপ্তিকালে নিরােধনােগবলে—স্বরূপসিদ্ধিসাধনদ্বারা সেই জীবেরই অমৃতত্ব ব্ৰহ্মরূপ প্রতিপাদিত হইল। সংক্ষেপ, আদি, মধ্য এবং তা এই অবস্থায় বা তিনকালে এক ব্রহ্মই পদার্থ বা বস্তু, এবং ব্রহ্মাতিরিক্ত তাবৎ অপদার্থ বা অবস্তু, তাহাই উপপন্ন হইল। ঈদৃশ ব্রহ্মে, ব্রহ্মবিদে বা স্বরূপসিদ্ধে কোন ভেদ নাই—অভেদ-একব। সুতরাং স্বরূপসি সাৎকৃতধৰ্ম্মা এবং পরমানন্দময়। তাহার আনন্দই ধম্মীর অভেদ কল্পনায় মনকে সংকল্পাত্মক বলে, সেইমত মদন (মদনাৎ মোহনাম্বা) মনের ধর্মহতু মনকেও মদনাত্মক বা মন ও মদন এক, বলা যাইতে পাবে। অপিচ, মদন মনের মনসিজ ( মনসি –জন্ ধাতুর অর্থ জাত উৎপন্ন অর্থাৎ মনে জাতে—কামদেব:) বা মন'সশয় (মনসি---গী ধাতু শয়ণকর) এই পৰ্যাসিক নাম প্ৰয়েই সুপ্রকাশ রহিয়াছে। পক্ষান্তরে যিনি শিব, তিনি শুদ্ধস্বরূপ। (হমুঃ পুরুষঃ শুভ্রে ইত্যাদি) যিনি শুদ্ধস্বরূপ, তিনি অমনা, (অপ্রাণে। হমন: শুভ্রো ইত্যাদি) এদিকে জীবন্মুক্ত এবং বিদেহমুক্তও অমন। সুতরাং জীবন্মুক্ত জীবই শিব বা শিবরূপ । যথা— শান্তং শিব অদৈতং স আত্ম। ইত্যাদি। অতএব সিদ্ধ হইল যে, শিব অমন'—মনশূন্য, নিরুদ্ধমনা বা ভস্মীভূত মদন । সন্ম তাই। মনের বা ;

১৩২ স্বরূপসিদ্ধি। অপরিচ্ছিন্ন, তঁাহার জ্ঞানই অখণ্ডিত এবং পরিপূর্ণ। তিনিই। পূর্ণভ, পূর্ণ বা আদর্শ পুরুষ। হে সৌম্য, যদি তুমি পূর্ণবিকশিত হইতে চাও. যদি পুর্ণ বা আদর্শ পুরুষ বা ষােলআনার মানুষ হইবার তােমার বাসনা থাকে, যদি নিতিশয় সুখ লাভের লালস: কব, তাহা হইলে তাহার মুগ্য বা মূল উপায় স্বরূপ স্বরূপসিব্ধি সাধনে যত্নবান হও। স্বরূপসিদ্ধের আশ্রয় গ্রহণ কর, প্ৰপন্ন হও, তাহার চরণতলে আত্মসমর্পণ কর, যেহেতু তাহার চরণসেবাই পুর্ণপুরুষ হইবার এবং নিরতিশয় সুখলাভের একমাত্র সুখকরহেতু। ইহা রেচক বাকা নহে, পরীক্ষিত, সুতরাং ধ্রুব সত্য। সবদেশে, সবকালেই ইহা * অবিসম্বাদিতভাবে গীত হইয়া আসিতেছে। অতএব, তাত, ঈদশ স্বরূপসিদ্ধ গুরু প্রাপ্ত হইয়: প্রােক্তপ্রকারে মনােনিরােধ : পুর্বক ব্রহ্মবিচার দ্বারা স্ব- . It is quite beyond man's power to determine with certainty what could make him happy. Omniscience alone could solve this question for him. ( The Metaphy-ics of Ethics by Kant l'age 30 ) + বিশ্বদৃষ্টি মনোনিবেধের বা মদন ভস্মের অবাস্তব ফলের মধ্যে এখানে দুই একটীর মাত্র উল্লেখ করিতেছি যথা--পুরুষে অতি সূক্ষ্ম, বাবহিত অর্থাৎ গৃহদিব অভ্যন্তরে কিম্বা ভিত্তাদির অন্তরালে স্থিত এবং দূবদেশে স্থিত—পদার্থেব জ্ঞান জন্মে অর্থাৎ সাধক যায় আসনে উপবিষ্ট থাকিয়াই অনায়াসে ইহা বলিতে বা জানিতে পারেন, ইহার নাম বিশ্ব বা বিরাট দৃষ্টি। ইহা পরীক্ষিত সুতরাং ধ্রুবসত্য। সাধক কদাপি যেন এ বিভূতিতে মুগ্ধ না হয়। ইহাতে আকৃষ্ট হইলে তাহার ব্রহ্মানন্দ লহ সদুরপরাহত হয়।

নিরােধস্বরূপ নির্ণয়।
স্বরূপসিদ্ধি সাধনানন্তর কৃতকৃত্য হও, জন্মসাফল্য লাভ কর।
ইহাই সববেদান্ত সিদ্ধান্ত রহস্য এবং কর্তব্যাস্ত। এবং ইহাই
পরমপুরুষার্থ। য এবং বেদ। য এবং বেদ। অতএব বলা
যাইতে পারে যে, যােগীশ্বর শ্রেষ্ঠাং পপপ্রয়ােজনােপেতায়।
স্বরূপসিদ্ধে কোহপি বিঘ্ন ইতি সিদ্ধম।
ইতি শ্রীপরমহংস পবিব্রাজকাচাৰ্য শ্রীমৎ স্বামী আত্মানন্দ
সরস্বতী শিষ, শ্রীমৎ স্বামী যােগানন্দ সরস্বতী
বিরচিত স্বরূপসিদ্ধি গ্রন্থে মােক্ষকাণ্ডে
নিরােধ স্বরূপনির্ণয় নামক চতুর্থ
অধ্যায় সমাপ্ত।
সম্পর্ণোহয়ং শ্রীমৎ যােগানন্দ সরস্বতী প্রণীতে।
স্বরূপসিদ্ধ্যাখ্য গ্রন্থ।
LUBLIC LIBRARY
MAL
; •।। 1902.
' U,
HOWRAH

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Swarup-siddhi

Author
Saraswati,jogananda
Title
Swarup-siddhi
File name
Swarup-siddhi
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2010/02/25
Publisher
Sachindra Mohan Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
174
Library
Majhu Public Library, Howrah
Classification
Hinduism
Keywords
Saraswati,Jogananda
DLI number
511506
Barcode
4990010018645.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
3srCv49wQPV
Download PDF

Swarup-siddhi