Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Nimai-sannyas
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্রীনিমাই সন্ন্যাস।
(ক) "
শিশিরকুমার ঘােষ প্রণীত।
বাগবাজার, ২নং আনন্দ চাটুৰ্য্যের লেন হইতে
শ্রীপীযুষকান্তি ঘােষ কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা,
৭ নং শান্তিরাম খােষের জট, শ্যামবাজার,
কেশব প্রিন্টিং ওয়ার্কস,
প্রিন্টার~~-শ্ৰীশ্ৰীমন্ত রায় চৌধুরী।
মুল্য ॥ আট না।
No text on this page.
ভূমিকা।
চারিশত বৎসর হইল কাঞ্চননগরে ( কাটোয়া
অনিমাই পণ্ডিত সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সেই সন্ন্যাসের দিন
সেই স্থানে মহাপ্রভুর আকর্ষণে তাসংখ্য লােক সমবেত হয়।
সেই সময় কারুণ্য-রসের এরূপ তরঙ্গ উঠে যে, বহুতর লােক
তাহার সঙ্গে সঙ্গে সংসার ত্যাগ করে। তখন সে ক্রন্দনের
রােল উঠে তাহার প্রতিধ্বনি এখনও শুনা যায়। মহাজনগণ
এই অপূর্ব ও অদ্ভুত ঘটনা নাটকাকারে প্রকাশ করিয়াছেন।
এইরূপ ১৩৭ খানা নাটকের কথা শুনা যায় । যখন যেখানে
এই নাটক অভিনীত হইয়াছে, সেইখানেই দর্শকগণের মধ্যে
তরঙ্গ উঠিয়াছে ও তাহাতে তাহারা অভিভূত হইয়া পবিত্ৰকৃত
হইয়াছেন। দুঃখের মধ্যে এই সমূদার নাটকের মধ্যে স্থানে
স্থানে আনুমানিক কথা আছে। সেই দোষ সংশোধন করিবার
নিমিত্ত আমি এই নাটকখানি লিখিলাম ইহাতে প্রকৃত ঘটনা
লিখিত হইয়াছে, বিন্দুমাত্রও কল্পনা নাই।
শ্রীশিশিরকুমার ঘােম ।
No text on this page.
ANUS
নিমাই-সন্ন্যাস
নাটক।
প্রথম অঙ্ক।
-
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
নিমাই পণ্ডিতের টোলের সম্মুখস্থ রাস্তা।
(পড়ুয়াগণ)
১ম পড়ুয়া। ভাই, আমাদের অধ্যাপকের বয়স কম বলে অনেকে
আমাদের ঠাট্টা করে। কিন্তু এই নদীয়ায় তার মতন পণ্ডিত আর
কে আছেন? যখন কাশ্মীরের দিগ্বীজয়ী পণ্ডিত এলেন, তখন
বড় বড় অধ্যাপক মহাশয়েরা নদীয়া ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। তখন
আমাদের শিশু অধ্যাপকই নদীয়ার মান রক্ষা করেন। বড় বড়
পণ্ডিতের বড় বড় পেট, লঙ্কা ডিঙ্গাইতে মাথা করে হেঁট।”
২
নিমাই-সন্ন্যাস
২য় পড়ুয়া। ভাই, আর এক মজা দেখেছ ? আমাদের অধ্যাপক চঞ্চলের
শিরােমণি, কিন্তু যখন পড়তে বসেন, তখন কার সাধ্য মাথা তুলে
কথা কয় ? ঐ যে পণ্ডিত মশাই আসছেন।
( নিমাই পণ্ডিতের প্রবেশ ও পড় আগণের নমস্কার )
নিমাই। ভাই, চল সকলে পরে যাই। আজ অনেক জিনিস
আতে হবে।
১ম পড়ুয়া। কড়ি এনেছেন ত ?
নিমাই। গৃহে কপর্দক মাত্র নান্তি।
১ম পড়ুয়া। তাহলে কি ধারে কিনবেন ?
নিমাই। ধার কত্তে নেই। ধার করাকে আমি অধর্ম মনে করি। যদি
না শােধ করে মরে যাই, তবে চিরঋণী থাকতে হবে।
২য় পড়ুয়া। পয়সা নেই, অথচ ধারেও কিবেন না। তবে জিনিস
পাবেন কি করে ?
নিমাই। আরে ভাই যদিও পয়সা নিচ্চি না, তবুও এক বােঝা আশীর্বাদ
ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্চি। দেখি, যদি এই আশীর্বাদের বিনিময়ে কিছু
পাই। (হাস্য ও নেপথ্যে দেখিয়া ) ওকে যায় ? মুকুন না ।
দেখেছ দেখেছ ওর কাণ্ডটা দেখেছ? আমায় লুকিয়ে মাথায় কাপড়
দিয়ে পালাচ্চে, পাছে আমার হাতে ধরা পড়ে। চাটগেয়ে বাঙ্গাল
বদ্যিটা আমায় দেখে পালায় কেন, বলতে পার?
১ম পড়ুয়া। বােধ হয় বিশেষ কোন দরকার আছে।
নিমাই। তা নয়। বাঙ্গালটা বৈষ্ণব, কৃষ্ণভক্ত; আর আমি পাষণ্ড।
আমার সঙ্গ কল্লে ওর কৃষ্ণভক্তি হ্রাস হবে সেই জয়ে পালাচ্ছে।
( উচ্চৈঃস্বরে) ও-মুকুন্দ পালাস কেন? এই দিকে আয়। ভয় নেই
আমি তােকে ছোৰ না।
প্রথম অক।
(মুকুন্দের প্রবেশ ও প্রণাম)
মুকুন্দা, বাত কাইচ। “বাঙ্গাল মনুষ্য নয়, মস্ত এক জন্তু, লস্ক দিয়ে
গাছে ওঠে ল্যাজ নেই কিন্তু।* মুকুল, আমি তােমাগর দ্যাশে
গিমেলাম।
মুকুন্দ। “গিয়েলাম চাটগাঁয়ের কথা নয়।
নিমাই। তা যা মুকুন্দ, তুই আমায় দেখে পালাস কেন? তুই বৈষ্ণব,
আর আমি পাষণ্ড, তাই আমার কাছে আসতে তাের ভয় হয়, পাছে
তাের ধর্ম নষ্ট হয় না? কিন্তু দ্যা তোকে এক কথা বলে
রাখি—আমিও একদিন বৈষ্ণব হ’ব, কিন্তু সে তাের মত ভণ্ড বৈষ্ণব
নয়। আমি এমনি বৈষ্ণব হ’ব যে ব্ৰহ্মা ও মহাদেব পৰ্য্যন্ত আমার
দ্বারে উপস্থিত হবেন। তখন, তুই ঠিক জানিস, তােকে আমার
পেছনে ছায়ার মত বেড়াতে হবে।
(গদাধরের প্রবেশ)
এই যে গদাধর এসেছ। বেশ, বেশ। কালকে বিচারের শেষ না
হ’তেই তুমি পালিয়ে যাও। আজ আর তােমায় ছাড় চি না।
(হস্তধারণ) তুমি আমায় কালকের সেই ফাঁকিটার উত্তর দিয়ে যাও।
গদাধর। তােমার পায়ে পড়ি, আমার হাত ছেড়ে দাও, আমার ভারি
কাজ আছে। আমি শিগগির যাব।
নিমাই। বেশ, আমার ফকির উত্তর দিয়েই শিগগির চলে যাও।
গদাধর। তােমার একশো বার পায়ে পড়ি অামায় ছেড়ে দাও। আমি
কি তােমার সঙ্গে তর্কে পারি? তুমি বড় নির্দয়। আমি তােমায়
গুরুর মত মান্য করি, দাদার মত ভালবাসি, কিন্তু তুমি আমায়
দেখলেই জ্বালাতন কর।
৪ নিমাই সন্ন্যাস নিমাই। সে যাহ’ক। এখন ফকির উত্তর না দিলে তােমায় ছাড় চিনি। গদাধর। আমি তােমার সঙ্গে জোরে পারি না। আমার হাত ছেড়ে দাও (টানাটানি)। আমাকে দেখলেই উনি জ্বালাতন করেন (ক্রন্দন)। নিমাই। (হাত ছাড়িয়া) ছি গদাধর, তুমি নিতান্ত ছেলেমানুষ কঁদলে? আচ্ছা তর্ক এখন থাক্, চল পলারে যাই। (শ্ৰীবাসের প্রবেশ) । শ্রীবাস। কোথা যাও, উদ্ধতের শিরোমণি ? নিমাই। ( নমস্কার ) আজ্ঞে, আজ্ঞে শ্রীবাস। কথার উত্তর দাওনা যে, নিমাই ? নিমাই। আজ্ঞে, আমি মনে মনে একটা ধাতু সাধিতেছিলাম, সেইজন্য অন্যমনস্ক ছিলাম, তাই আপনাকে লক্ষ্য করিতে পারি নাই, ক্ষমা করুন। বাস। তোমার বৈকুণ্ঠবাসী পিতা জগন্নাথ মিশ্র আমার পরম বন্ধু ছিলেন। তুমি আমার অতি প্রিয়, তোমাকে ক্রোড়ে করিয়া বেড়াইয়াছি। তুমি এখন নবদ্বীপ-জয়ী পণ্ডিত হইয়াছ, ইহা আমার পরম গৌরবের কথা। কিন্তু বিবেচনা কর, তুমি যে বিদ্যাচর্চা করিতেছ, আর দিবানিশি মস্তিষ্কচালনা করিতেছ, ইহাতে তােমার লাভ কি? শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম-প্রাপ্তি জীবের পরম পুরুষার্থ, এই বিফল বিদ্যাচর্চা করিয়া তুমি কি শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম পাইবে? যেমন বিদ্যাচর্চা করিতেছ ঐরূপ শ্রীকৃষ্ণের ভজন কর। তােমার ন্যায় পণ্ডিতের এইরূপে জীবন-যাপন করাই উচিত। আমাদের বৈষ্ণব দল দুর্বল, তােমাকে যধি দলে পাই, তবে আমাদের বল শতগুণ বৃদ্ধি পাইবে।
প্রথম অঙ্ক। নিমাই। (মস্তক অবনত করিয়া) পণ্ডিত, আপনার উপদেশ-বাক্য শিরােধার্য। তবে কি না, আমার বয়স অল্প, জিগীষা বৃত্তিটা বড় প্রবল। এখন হেটে শ্রীকৃষ্ণের দিকে মন যায় না, কেবল ইচ্ছা করে তর্ক করিয়া সকলকে পরাস্ত করি। পণ্ডিত, আপনি কিছুকাল অপেক্ষা করুন, এইরূপ জয় করিয়া করিয়া আমার জিগীষা বৃত্তিটা ক্ৰমে ক্ষয় হইয়া যাইবে। তখন আমি ভাল লোক আনিয়া এমন ভক্ত হইব, (কাপড় দিয়া মুখ চাপিয়া হাস্য নিবারণ) যে, অজ ভৰ পর্যন্ত আমার দ্বারস্থ হইবে। (হ হো করিয়া হাস্য, শ্রীবাস ও সকলের হাস্য।) শ্রীবাস। বেশ লোককে সদুপদেশ দিতে গিয়াছিলাম। ভাল, নিমাই ভুমি পরমেশ্বরকে মান না ? নিমাই। শাস্ত্রে বলেন, “সােহহং তিনিও যে, আমিও সে। আমি যদি “তিনি” হইলাম তবে মানিব কাহাকে? আপনাকে ? আমিই ত পরমেশ্বর। শ্রীবাস। আমি চলিলাম, তোমাকে হারি মানিলাম। আমি সর্বদা প্রার্থনা করিয়া থাকি যে, তােমার শ্রীকৃষ্ণে মতি হয়। নিমাই। তা অবশ্য হবে, আপনার আশীর্বাদ কখন বিফলে যাবে না। { শ্ৰীবাসের প্রস্থান) চল ভাই, সকলে পসরে যাই। -[ সকলের প্রস্থান।
৬
নিমাই-সন্ন্যাস
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
বাজার।
(পড়ুয়াগণের সহিত নিমাই পণ্ডিতের প্রবেশ)
তাম্বুলিয়া। ঠাকুর, এদিকে আসুন, পানের খিলি লইবেন না ?
নিমাই। দিলেই লই, কিন্তু ভাই, আমার কড়ি নাই।
তাম্বু। (স্বগত) কড়ি নাই। কিন্তু বামুন ঠাকুরের কাছে কড়ি নাই
নিলাম। ( প্রকাশ্যে ) ঠাকুর, এই এক দোনা খিলি লউন, আমি
কড়ি চাই না।
নিমাই। আমি বিনামূল্যে তোমার নিকট খিলি কেন লইব?
তাম্বু। তাহা হইবে না ঠাকুর, আপনাকে লইতেই হইবে।
নিমাই। আমি বিনা কড়িতে কেন তােমার কাছে পান লইব ?
তাম্বু। কেন লইবেন বলিতেছি। আপনাকে আমার দিতে ইচ্ছা
করিতেছে। এমন কি, আপনি যদি পান না লয়েন, আমি এখনি খুন
হয়ে মরিব ।
১ম পড় । এ আবার কি রঙ্গ!
নিমাই। তবে দাও, তােমার প্রাণে মরা অপেক্ষা আমার পান লওয়া
সহজ।
২য় পড়ুয়া। কড়িও লাগিল না, আশীর্বাদ ও লাগিল না।
নিমাই। হাঁ, খিলি গুলি একেবারে অনি পাওয়া গেল। ( অগ্রসর)
তন্তুবায়। ঠাকুর, একবার আমার পসরে আসুন, উত্তম শান্তিপুরে শাড়ি
ও ধুতি আছে।
নিমাই। (তন্তুবায়ের পসারে যাইয়া) কই দেখি, তোমার কেমন শাটি
আছে। (দর্শন ও পরীক্ষা। এই শাটিখানি আমার পছন্দসহী,
প্রথম অঙ্ক ৭ মূল্য কি লইবে ? আর মূল্য জিজ্ঞাসা করিয়াই কি করিব? ইন্তে কপর্দক মাত্র নাই। সেজন্য ভাবছেন কেন ঠাকুর, মূল্য না থাকে ধরে লইয়া যান। নিমাই। ধারে! ধার কি করিতে আছে ? তন্তু। মূল্য নাই, অথচ ধারে লইবেন না, তবে শাড়ি লইবেন কিরূপে? নিমাই। তাইত, লওয়া আর হয় কই ? কিন্তু শাটিখানি বেশ। তন্তু। ঠাকুর, আপনি শাড়ি লইয়া যান, এক বৎসর পরে মূল্য দিবেন। নিমাই। সেও তত ধারে লওয়া হইল। তন্তু। ঠাকুর, আপনার পা ছুইয়া বলিতেছি, আমি আপনার নিকট এক কড়িও মুনফা লইব না, আমাকে ক্রয়ের মূল্য মাত্র দিবেন। নিমাই। আমি বলিলাম, আমার নিকট কপর্দক মাত্র নাস্তি। ভাই আমাকে ক্ষমা কর, আমি চলিলাম। তন্তু। তবে চলুন, আমি শাড়ি লইয়া আপনার বাড়ী যাইতেছি, সেখানে গিয়া আমাকে মূল্য দিবেন। নিমাই। বাটীতে কড়ি থাকিলে কি শূন্য হন্তে পসারে আসি ? তবে তাে আমি বড় বিপদে পড়িলাম। ঠাকুর, অপনি শাড়ি লইয়া যান, ইচ্ছা হয় মূল্য দিবেন, না হয় না দিবেন নিমাই। তাহার মানে, একপ্রকার ধারে লইতে হইবে ? তন্তু। তবে তো আমি বড় বিপদে পড়িলাম, আমি যে চারিদিকে অন্ধকার দেখিতেছি। ১ম পড়ুয়া। কেন হে পারি, তােমার বিপদ কি? পণ্ডিত না লয়েন তুমি অন্যের নিকট শাটি বিক্রয় করিবে। অন্ধকার দেখিতেছ তাহার কারণ কি? তন্তু। আমার মনের কথা শুনিবে ? আমি ব্যবসাদার, বিনামূল্যে শাড়ি ৮ নিমাই-সন্ন্যাস প্রাণান্ত দিতে পারি না। আবার ঠাকুর কি মন্ত্র জানেন জানি না, বস্তু উহাকে না দিলে আমার প্রাণ বাহির হইবে। (নিমাইকে সম্বোধন করিয়া ) ঠাকুর, তুমি শাড়িখানা অমনি লও, তুমি কেবল আমাকে আশীর্বাদ করিও, আমি আর কিছু চাই না। ১ম পড়ুয়া। সেবারের ন্যায় এবার একেবারে হইল না, কিছু আশীর্বাদ লাগিল, দেখিতেছি। (পড়, যার শাটি গ্রহণ ও তন্তুবায়ের নিমাইকে প্রণাম।) নিমাই। (তন্তুবায়ের প্রতি) তোমার মঙ্গল হউক। ( ছাত্রগণের প্রতি) চল শ্রীধরের ওখানে যাই, সেখানে যদি জয়ী হইতে পারি তবেই আমার জয়। (শ্রীধরের পসারে গমন) এই যে শ্রীধর। ভাল আছ তাে? শ্ৰীধর। (উঠিয়া দাঁড়াইয়া) পণ্ডিত, অামি ভালও নাই, মন্দও নাই। তোমার পায়ে পড়ি, আমি দরিদ্র বটে তবু ব্রাহ্মণ, আমার সহিত কোন্দল করিও না। নিমাই। (পড়ুয়াগণের প্রতি) এই যে শ্রীধরকে দেখিতেছ, ইনি আমার যোগানিয়া, ইনি অামার কলার পাতা, খােলা ও ঘােড় দিয়া থাকেন। লোকটা বড় কৃপণ, অনেক টাকা আছে। পর্ণকুটীরে বাস, কিন্তু কুটীর অর্থে পরিপূর্ণ। শ্রীধর। আমার ধন আছে? আমার যদি ধন থাকিবে তবে বামুনের ছেলে হইয়া খােলা বিক্রয় করিব কেন ? নিমাই। আর এক দোষ এই যে, তুমি দ্রব্যের দ্বিগুণ মূল্য লও। শ্রীধর। ভাল, আমি যদি দ্বিগুণ মূল্য লই, আমার পসারে আইস কেন? নিমাই। (পড়ুয়াগণের প্রতি জনান্তিকে) এই শ্রীধর পরম ভক্ত ও সত্যবাদী, কাজেই ইহার সহিত কোন্দল করিতে কাহার না ইচ্ছা হয় ? (শ্রীধরের প্রথম অঙ্ক প্রতি) আমি অন্য পসারে যাইব কেন, আমি যােগানে কেন ছাড়িব? ভাল শ্রীধর, তুমি যাহা লাভ কর তাহার অর্ধেক গঙ্গাকে দাও, আমাকেও না হয় কিছু দিলে! আমিও তােমার উপর কিছু দাবী রাখি। জান, তুমি যে গঙ্গাকে অর্ধেক দাও, আমি তাহার পিতা। শ্ৰীধর। (কর্ণে হস্ত দিয়া) বিষ্ণু! শ্রীবিষ্ণু! তোমার গঙ্গাকে করিয়াও কি কিছু ভয় নাই? লোকে গত বড় হয় ততই শান্ত হয়, তুমি ক্রমেই চঞ্চল হইতেছ। নিমাই। তা যাউক, তােমার অনেক পোতা ধন আছে, তাহা কি মিথ্যা ? শ্ৰীধর। দোহাই পণ্ডিত, আমার সহিত কোন্দল করিও না, আমি তােমাকে পাত, খােলা ও থোড় বিনামূল্যে দিব। তবে অার বিবাদ কি ? তােমার যে অপবাদ করেছি তাহা উঠাইয়া লইতেছি। তোমরা সকলে শুন, শ্রীধর কৃপণ নয়, তাহার টাকা পোঁতাও নাই, শ্রীধর অনেক মূল্যও বলে না। কিন্তু শ্ৰীধর, মনে থাকে যেন, বিনামূল্যে আমাকে থোড়, পাতা ও খােল দিতে হইবে। (পড়ুয়াগণের প্রতি) এবার আশীর্বাদে নয়, এবার কেবল ধমক দিয়া জয়ী হইয়াছি। নিমাই।
১০ নিমাই-সন্ন্যাস। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। শচীর অন্তঃপুর। মালিনী ও শচী। শচী। বিজয় দিবসে নিমাই গাধামে গেল, তা জান। পিতৃকাৰ্য্য করিতে যাবে বলিয়া যাইতে নিষেধ করিতে পারিলাম না। নিই চঞ্চল জানিয়া সঙ্গে তাহার মেসো চন্দ্রশেখর আচাৰ্য্যরত্ন গেলেন। তাহার নিজের অনেকগুলি পড়ুয়াও গেল। এই চারি মাস পরে অদ্য ফিরিয়া আসিয়াছে। মালিনী। নিমাই নির্বিঘ্নে ফিরিয়া আসিয়াছে বলিয়া এই নদীয়া নগরে নানাস্থানে আনন্দোৎসব! কেবল তুমিই বিমর্ষ। আমাকে ডাকিয়াছ কেন, কি হইয়াছে ? তুমি কেঁদে কেঁদে চক্ষু ফুলাইয়াছ কেন ? শচী। ভগিনী, তাই বলিতে তােমাকে ডাকিয়াছি। প্রথমে, পর পর আটটা মেয়ে হইল, সমুদায়গুলি মারা গেল। তাহার পরে পুত্র বিশ্বরূপ হইল। বিশ্বরূপের জন্মের দশ বৎসর পরে নিমাই জন্মিল। বিশ্বরূপ রূপে গুণে জগতে ধন্য, কিন্তু সে ষোল বৎসর বয়সে সন্ন্যাসী হয়ে কোথায় চলিয়া গেল, আর তাহাকে দেখি নাই। (ক্রন্দন মালিনী। চুপ কর, নিমাইকে লইয়া শান্ত হও। অমন পুত্র যার, তার আবার দুঃখ কি ? নিমাইয়ের যে মা, সে জগতে ধন্যা। শচী। শুন ভগিনী, স্বামী বৈকুণ্ঠে গেলেন, নিমাইয়ের মুখ চাহিয়া আমি প্রাণ স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম। তাহার পর নিমাইয়ের বিবাহ দিলাম, নিমাই দিঘীজয়ী পণ্ডিত হইল। এক রকম সুখে ছিলাম। বউমা আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। কিন্তু নিমাই বুঝি তাহার দাদার মত সংসার ছাড়িয়া যায়। সে বুঝি আর ঘরে থাকে না।
প্রথম অঙ্ক।
১১
মালিনী। দিদি, তােমার বয়স বােধ হয় বাহাত্তর হইয়াছে, কাজেই
তােমাকে বাহাত্তরে ধরিয়াছে, নিমাই নাকি আবার সংসার ছাড়িয়া
যাবে! ঘরে রূপবতী যুবতী স্ত্রী, নিমাই নিজে বিদ্যারসে উন্মত্ত ।
বিশ্বরূপের মত তাহার ধৰ্ম্মে তত অধিক আসক্তি নাই।
শচী। ভগিনী, নিমাইএর এখন আর সে ভাব নাই। নিমাইর আজ যে
ভাব দেখিলাম তাহাতে আমার প্রাণ খায়ে গিয়াছে। নিমাই
গয়া হইতে আর এক বস্তু হইয়া আসিয়াছে।
মালিনী। নিমাইর আবার ভাব কি? সর্বদা হাসিতেছে। সকলের
সহিত আমােদ, সাঁতার কাটিয়া তার এত আমােদ যে প্রত্যহ চারিবার
করিয়া গঙ্গাপার না হইলে নয়। নিমাই হটিতে জানে না, যখন
চলে তখন দৌড়াইয়া চলে, সেই নিমাই নাকি আবার সন্ন্যাসী হবে?
শচী। ভাই, নিমাই গয়ায় সে সব ভাব ফেলিয়া দিয়ে আসিয়াছে। এখন
নূতন মানুষ হয়েছে।
মালিনী। দিদি, নিমাই সম্বন্ধে তাহার এক ছাত্র যে কবিতা করিয়াছে তাহা
তুমি কি শুনিয়াছ? আমার মনে আছে, ছড়াটা বলিতেছি শুন:-
সরল প্রকৃতি।
বৃহস্পতি পতি।
কাঞ্চন বরণ।
অতি শিশুমতি
তাহে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি
সুধাংও বদন
সুবলিত অঙ্গ
কমল লােচনে
সেই গৌরাঙ্গ
মধুর বচন।
বহিতেছে বারি।
পরাণ হামারি।
১২ নিমাই-সন্ন্যাস সাড়ে চারি হস্ত অঙ্গ দৈর্ঘ্যে পরিমাণ। রূপ দেখি করে সবে দেব শিশু জ্ঞান নব্যকালে দিগ্বিজয়ী করিলেন জয়। সেই শ্রীগৌরাঙ্গ মাের প্রাণনাথ হয়। * সদা সঙ্গি সঙ্গে। গঙ্গার তরঙ্গে । কৌতুক রহস্য সাতারে আনন্দ নগর ভ্রমণ নৌকা বিহারাদি আমার গৌরাঙ্গ সেই গুণে মাের চপলের মত। দৌড়াদৌড়ি রত বড়ই চঞ্চল। পরাণ হরিল। রূপের সাগর মধুর প্রকৃতি ভালবাসা দিয়া অলপে সন্তোষ গুরুজনে দেখি ছােট বড় সবা তার কত গুণ গৌরাঙ্গ পাগল গুণের পর্বত। পবিত্র চরিত। গঠিত হৃদয়। দোষ নাহি লয় । তখনি প্রণাম। সমান সম্মান ॥ কহিতে না জানি করিল পরাণী ।
প্রথম অঙ্ক।
নিৰ্ম্মল শীতল
সদা যার মন।
মুখে মধু হাসি
প্রসন্ন বদন ৷
স্নেহ দিঠে চাহে
সকলের পানে।
সদা বিন্দু ঝরে
কমল নয়নে।
যার মধু ভাষে
জুড়ায় শ্রবণ ।
হেন শ্রীগৌরাঙ্গ
আমারি শরণ।
তাহার পর, নিমাই যত চঞ্চলই হউক তাহার হৃদয় খানি স্নেহে আর
দয়ায় পরিপূর্ণ, তোমার এই বৃদ্ধ বয়সে যে সে তোমাকে ফেলিয়া যাবে,
তাহা কখনই হইতে পারে না।
শচী। ভগিনী, নিমাই চারি মাস পরে বাড়ী আসিয়াছে, আনন্দে দৌড়াইয়া
বাহিরে গেলাম। যাইয়া দেখি যেন অন্যমনস্ক, প্রথমে যেন আমাকে
চিনিতে পারে না, আমি গলা ধরিলাম, তখন যেন তাহার ঘুম ভাঙ্গিল।
আর অমনি তটস্থ হইয়া আমাকে প্রণাম করিল। কথা কহিতে গেল,
কিন্তু কথা কহিতে চোখে জল আসে, মনের আবেগে কথা কহিতে
পারে না। নদীয়ার অনেক লােক তাহাকে সম্ভাষণ করিতে আসিয়া-
ছিল, তাহাদের সহিতও ঐ ভাব। যেন দীনের দীন, যাহার তাহার
পয় ধরিতে যায়, আর সৰ্ব্বদা মুখে কি নাম জপ করে, বােধ হয়
কৃষ্ণ নাম।
মালিনী। কেন, এরূপ হইল কেন?
শচী। আমি নিমাইর ভাব দেখিয়া তাহার মেসস ও সঙ্গিগণকে কারণ
জিজ্ঞাসা করিলাম। তাহারা যে কথা বলিল, শুনিয়া আমার প্রাণ
চমকিয়া গেল। ভগিনী, তুমি ঈশ্বর পুরীর নাম শুনিয়াছ? তাহার মত
ভক্ত আর জগতে কেহ নাই। তাহারা বলিল যে, গয়াতে নাকি
১৪
নিমাই-সন্ন্যাস।
এই ঈশ্বরপুরী নিমাইকে মন্ত্র দিয়াছেন। ঈশ্বরপুরী যেই মন্ত্র দিলেন
অনি নিমাই বিল হইল। সেই অবধি তাহার মুখে কেবল কৃষ্ণ
নাম, আর সম্পূর্ণ সহজ জ্ঞান হইল না।
মালিনী। তা দিদি, ভয় পাও কেন, ঘরে যে বউ আছে সেই তাহাকে
দু’দিনে ভুলাইবে। কৃষ্ণ নাম জপ, সে তাে ভাল কথা, তুমি মিছা
ভয় পাইও না, আমি বাড়ী চলিলাম।
[ মালিনীর প্রস্থান।
শচী। বেলা গেল, সংসারের কাৰ্য সকালে সারিয়া লইতে হইবে।
কোথা মা বিষ্ণুপ্রিয়া, একবার এদিকে এসাে। (বিষ্ণুপ্রিয়ার প্রবেশ)
মা, নিমাই চারি মাস পথে পথে। সকালে সকালে পাক সমাপ্ত
কর। আর তাহার যাহাতে সকালে শােওয়া হয় তাহা করিও।
শীঘ্র চুল বাঁধ, আর বেশ ভূষা কর, নুতন লেপটা পাড়িয়া লও।
প্রথম অঙ্ক।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
নিমাইয়ের শয়নকক্ষ।
(পালঙ্কে নিমাই বাম হস্তোপরি মুখ রাখিয়া উপবিষ্ট, শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়ার
চন্দনের বাটী ও ফুলের মালা লইয়া প্রবেশ)
বিষ্ণুপ্রিয়া। কি, বসে বসে ঘুমাইতেছ না কি ? (একটু পরে) কথা
কও না যে! কি, রাগ করেছ ? দেখি, মুখ দেখি ? (হস্ত দ্বারা
মুখখাত্তোলন) একি, তােমার চোখে জল কেন, তুমি কান্দিতেছ না
কি? তুমি কান্দ কেন? ওমা, একি!রােদন? চারি মাস পরে বাড়ী
আসিয়া আমাকে দেখিয়াই রােদন। কথা কও, কথা কও! হয়েছে
কি ? আমি কি অপরাধ করিলাম। যেন জ্ঞান নাই। একি
হইল ? মাকে ডাকিয়া আনি।
( দ্রুতবেগে প্রস্থান ও শচীর সহিত পুনঃ প্রবেশ)
শচী। নিমাই, তুই না কি কাদছিস ? ও নিমাই, নিমাই কথা ক'।
হলো কি ? দেখ নিমাই কেমন হয়ে পড়েছে। এই যে নিমাইর
নয়ন ধারায় বিছানা ভাসিয়া গিয়াছে। (মাথায় হাত দিয়া) বাপ,
তুমি কঁাদ কেন ? ও নিমাই, নিমাই, আমার মাথা খাইস কথা ক,
তুই কাদিস কেন? (মাথা অল্প অল্প ঝাকান)
বিষ্ণু। মা, বােধ হয় যেন অচেতন।
শচী। চোখে জলের ছাট, মারিতে থাকো। (জলের ছাট মারণ)
ও নিমাই, তুই কাদিস কেন ?
নিমাই। (অল্প চেতন পাইয়া) মা, আমি, আমি-আমি, মা তুমি কি
বলছো ?
নিমাই-সন্ন্যাস শচী। বছি আমার মাথা আর আমার মুণ্ড! চারি মাস পরে বাড়া আসিলে, নদীয়ার সকলেই আনন্দিত, আর তুমি কঁদিতেছ ? তােমাব মনে কি দুঃখ ? তােমার অভাব কি ? তুমি অধ্যাপকের শিরােমণি, তুমি লােকের পূজ্য। তুমি কঁাদ কেন ? নিমাই। আমি কি কঁদিতেছি ? কই মা, আমি তো বড় আনন্দে আছি। শচী। আনন্দে তো খুব আছ। বে অবধি বাড়ী আসিয়াছ সে অবধি তুমি অন্যমনস্ক। চোখের জল নিবারণ করিতে যাইতেছ, পারিতেছ না। আমার সঙ্গে ভাল করিয়া কথা কও না। বউ মা ঘরে এলেন, ঐ দেখ, চন্দন ও ফুলের মালা পড়িয়া রহিয়াছে, আর তুমি কঁদিতেছ ? নিমাই। মা, তুমি ব্যস্ত হইও না। তুমি আমার নয়ন জল দেখিয়া দুঃখ পাইয়াছ, ইহাতে মনে বড় ব্যথা পাইলাম। কিন্তু আমার এ দুঃখের নয়ন জল নয়, অনিলের নয়ন জল। শচী । আনন্দের নয়নজল আবার কি ? নিমাই। মা, আমি ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। ঘুমাইয়া বড় একটী শুভ- স্বপ্ন দেখেছি। মা, শুনিবে তাে শুন। আমি স্বপ্নে দেখিলাম সে একটী কৃষ্ণবর্ণ যুবা পুরুষ, আহা তাহার রূপে জগৎ আলাে করিয়াছে, তাহার সমুদায় অঙ্গ দিয়া লাবণ্য টোয়াইয়া পড়িতেছে, গলে বনমালা। তিনি আমার কাছে আইলেন, আমার নিকটে আসিয়া আমার দিকে চাহিলেন। তাহার নয়ন দুটী পদ্মদলের ন্যায়, সে তো নয়ন নয়, যেন প্রেমের সরােবর। আমার দিকে চাহিয়াই আমার হৃদয়ী কাড়িয়া লইলেন, তিনি আমার প্রাণ, আমার প্রাণ, আমার- (ঢলিয়া পতন।) শচী। মা বিষ্ণুপ্রিয়া, শীঘ্র নিমাইকে ধর। দেখ, নিমাই আমার কেমন হইয়া পড়িয়াছে। স্থির নয়ন, নিমিষ নাই, নিমাই কি আমাকে .
প্রথম অঙ্ক। ১৭ ছাড়িয়া গেল ? ও নিমাই, নিমাই, কথা ক'। ঈশান, ও ঈশান, শীঘ্ন ঘরের ভিতর এস, আমার নিমাই কেমন হয়ে পড়লো। (ঈশানের প্রবেশ ) ঈশান। কি মা, কি হয়েছে ? শচী। বাপ, নিমাই আমাকে স্বপ্নের কথা বলিতেছিলেন, বলিতে বলিতে অমনি ঢলিয়া পড়িলেন। এই দেখ, চোখের তারা স্থির, নয়নে নিমিষ নাই। ঈশান। মা, অমন ভয় পাইতেছ কেন ? ঠাকুরের ওরূপ মাঝে মাঝে হয়ে থাকে। গয়া হইতে আসিতে পথে অনেকবার ওরূপ হয়েছে। আমি পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছি। একটু ধৈর্য্য ধর। এই দেখ নিশ্বাস চলিতেছে, ভয় নাই। (চোখে জলের ছাট মারণ ও নাম ধরিয়া ডাকা এবং কর্ণে কৃষ্ণনাম শুনান) নিমাই। (হরি হরি বলিয়া উঠিয়া ইতি উতি চাহিয়া মা, কি বলিতে- ছিলাম,-হা, মনে হইয়াছে। তিনি আমার প্রাণের প্রাণ, আমার দিকে একবার মাত্র চাহিয়াছিলেন, তাহাতে আমি আর আমাতে নাই। মা, তাহার পরে তিনি যাহা করিলেন, তাহা আমি বলিতে পারি না। তিনি আসিয়া আমাকে হৃদয়ে ধরিয়া আলিঙ্গন করি- লেন। সে গাঢ় আলিঙ্গন পাইয়া আমার সমস্ত শরীরে আনন্দ-বিদ্যুৎ খেলিতে লাগিল। মা, তিনি এখন কোথায় গেলেন ? তাহাকে না দেখিয়া তো আমি বাঁচি না। আমাকে যদি বাঁচাইতে চাহ, তবে তাঁহাকে আনিয়া দাও। (উর্দ্ধমুখ হইয়া ) ওগো, কে তুমি আমার চিত্ত চুরি করিয়া অদর্শন হইলে ? (পুনৰ্বার মুচ্ছিত ও শচীর ব্যস্ত হওন )
১৮
নিমাই-সন্ন্যাস
ঈশান। গয়া হইতে আসিতে ঠাকুর পথে এইরূপ কতবার মুচ্ছিত হইয়া-
ছেন। ভয় নাই, এখনই আরাম হইবেন, কৃষ্ণনামই ইহার ঔষধ।
আহা, চন্দ্রবদন মলিন হয়েছে।
চন্দ্রবদন মলিন হয়েছে রে।
হয়েছে রে, নয়ন ঝুরিছে রে।
নিরবে রােদন,
নমিত বদন,
তরঙ্গে এসুয়ে এলুয়ে অঙ্গ পড়িছে রে।
si un
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
সুরধুনী তীর-শ্রীনবদ্বীপের বারকোণা ঘাট।
ন্যায়রত্ন ও বিদ্যাবাগীশ তীরে আসীন।
ন্যায়রত্ন। ওটা কে আছেন? যেন নীলমণি। (নীলমণি তর্কবাগীশের
প্রবেশ) কিহে নীলমণি, কবে আসিলে ?
অদ্য পূর্বাহ্লাে।
ন্যায়। পাঠ সমাপ্ত হইল ?
নীল। এক প্রকার, কিছু বাকী আছে। আর থাকিতে পারিলাম না,
তাই দেশে শীঘ্র আসিলাম।
বিদ্যাবাগীশ। ভাল নীলমণি, তুমি দেশ ছাড়িয়া মিথিলায় পড়িতে কেন
গিয়াছিলে? এখন তো আমাদের নদীয়ায় ন্যায় পড়িবার বাধা
নাই, বরং সুবিধাই আছে। বাসুদেব সাৰ্বভৌম আমাদের সে দুঃখ
নীল।
২০ নিমাই-সন্ন্যাস। ? দূর করিয়াছেন। ত্রিহুতের নৈয়ায়িক পণ্ডিতগণ গৌড়ীয় ছাত্র গ্রহণ, করিতেন বটে, কিন্তু পাঠ সমাপ্ত হইলে পাঠ্য গ্রন্থ আনিতে দিতেন না; যদি কেহ চুরি করিয়া গ্রন্থ আনিত, তাহার নিকট হইতে গ্রন্থ কাড়িয়া লইতেন। ক্ষণজন্মা সাৰ্বভৌম সমগ্র ন্যায় পুস্তকখানি কণ্ঠস্থ করিয়া আসিয়া নবদ্বীপে ন্যায়ের টোল স্থাপন করেন। এই অমানুষিক ও অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি দ্বারা সার্বভৌম নবদ্বীপের দুঃখ দূর ও মানরক্ষা করিয়াছেন। নীল। যদিও ন্যায়ের গ্রন্থ আপনারা পাইয়াছেন, তথাপি অদ্যাপি ভাল অধ্যাপক পান নাই। ন্যায় শাস্ত্রের আকর স্থান,—ত্রিত। যে এক বাসুদেব সাৰ্বভৌম ছিলেন, তাহাকেও তো উৎকলের সম্রাট প্রতাপ- রুদ্র বৃত্তি দিয়া নিজ দেশে রাখিয়াছেন। নবদ্বীপে ন্যায়ের ভাল অধ্যাপক কই ন্যায়। কেন, কাণভট্ট ? সার্বভৌম নদীয়া ত্যাগ করিলে কাণভট্ট সেই স্থানে টোল করিয়াছেন। আর কাণভট্ট সার্বভৌম অপেক্ষা কোন অংশে নূন নহেন, বরং অনেকে তাহাকেই শ্রেষ্ঠ নৈয়ায়িক বলেন। নীল। কাণভট্ট কে ? ন্যায়। কেন, দীধিতির গ্রন্থকর্তা রঘুনাথের নাম শুন নাই ? নীল। শুনিয়াছি, কে না শুনিয়াছে ? তবে শৈশবাবধি মিথিলায় আছি, তাই সেখানে পাঠ-সমাপ্তি করিব ইচ্ছা করিয়াছিলাম, এমন সময় শুনিলাম, নবদ্বীপে কি প্রকাণ্ড কাও হইতেছে, তাই তাড়াতাড়ি আসিলাম। স্যায়। কি প্রকাণ্ড কাণ্ড? নীল। এ কথা তো জগতে রাষ্ট্র হইয়াছে যে নবদ্বীপে শ্রীকৃষ্ণ প্রকাশ পাইয়াছেন।
দ্বিতীয় অঙ্ক। ২১ একে ন্যায়। (হাস্য) শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হইবেন, এ কথা কোন্ শাস্ত্রে লেখা আছে ? কতকগুলি চ্যাঙ্গড়া নিমাই পণ্ডিতকে ভগবান্ করিয়া তুলিয়াছে। নিমাই লোক ভাল ছিল, বুদ্ধিও বেশ তীক্ষ্ণ ছিল, পাণ্ডিত্যও কিছু হইয়াছিল। কিন্তু দরিদ্রের সন্তান, ভগবানের পদ পাইয়াছে, ছানা ননী খায়, একেবারে তাহার মাথা ঘুরিয়া গিয়াছে। নীল। আমি বুঝিতে পারিলাম না। নিমাই পণ্ডিতের যদি ভগবান্ সাজিতে ইচ্ছা হয় তবে লােকে তাকে সে পদ দিবে কেন ? কেহ ভগবান্ সাজিতে গেলে লােকে না তাহাকে পদতলে দলিত করে ? অবশ্য অনেক লােক নিমাই পণ্ডিতকে ভগবান্ পদ দিয়াছে, আর লােকে তাঁহাকে না মানিলে জগতে এরূপ হুলস্থূল হইবে কেন? কোথায় আমি বিহুতে;-দেখানে পৰ্য্যন্ত সংবাদ গিয়াছে বিদ্যাবাগীশ। প্রকৃতই নিমাই পণ্ডিতের অসীম শক্তি আছে। দেখিতে পরম সুন্দর, বােধ হয় এমন রূপবান ত্রিজগতে নাই। তাহাতে নূতন যৌবন। পাণ্ডিত্যের অবধি নাই। তাহার ভক্তি দেখিলে প্রহ্লাদ কি শুকের প্রতি অবজ্ঞা হয়। এতগুলি গুণ যে আধারে আছে, তাহাকে লােকে ভগবান্ বলিয়া পূজা করিবে ইহাতে আর বৈচিত্র্য কি আছে ? ন্যায়। তুমিও কি নিমাই পণ্ডিতের দলে নাকি? কথাবার্তাতে তো সেইরূপ বুঝিতেছি। বিদ্যা। নিমাই পণ্ডিতকে অবজ্ঞা করিও না। একবার তাহার শক্তি দেখ। বয়সে শিশু, এই তেইশ বৎসর মাত্র। ইহার মধ্যে তাঁহার পদ কিরূপ হইয়াছে তাহাও একবার ভাবিয়া দেখ! যখন দিগ্বিজয়ী কেশব কাশ্মীরী আসিলেন, তখন অধ্যাপকগণ ঠাহার ভয়ে ঘরের বাহির হইতেন না। তিনি সেই শিশু-অধ্যাপকের নিকট পরাস্ত ২২ নিমাই-সন্ন্যাস হইলেন। এই নদীয়া নগরে অষ্টাদশবর্ষ বয়সে নিমাই টোল স্থাপন করিয়াছেন, ইহা কেহ কখন পারে নাই, আর তাহার যত ছাত্র, অত বােধ হয় আর কাহারও নাই। নদীয়ায় সহস্র টোল থাকিতে তাহার টোলে ছাত্র ধরে না, ইহারই বা কারণ কি? বুদ্ধিমত্তা খাঁ এক প্রকার নদীয়ার রাজা, তিনি সহস্র সহস্র অধ্যাপকের প্রতিপালক। সেই বুদ্ধিমন্ত খাঁ নিমাই পণ্ডিতকে ভগবান্ বলিয়া পূজা করিতেছেন। নদীয়ার কোটাল জগন্নাথ ও মাধব, যাহাদিগকে লােকে জগাই মাধাই বলে, এই নগরে তাহারা যথেচ্ছাচার করিত। ব্রাহ্মণকুমার হইয়া ও গােবধ, ব্রাহ্মণবধ, মনুষ্যবধ, খ্রীবধ ও মদ্যপান করিত, তাহারা না করিত এমন কুকাৰ্য্য নাই। লােকে বলিত, তাহাদের ন্যায় পাপী জগতে হয় নাই, হইবেও না। নিমাই পণ্ডিত তাহাদিগকে নিস্পাপ করিয়াছেন, এখন তাহাদের অনুতাপের রোদন দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়। তাহারা কাঙ্গালের কাঙ্গাল বেশ ধরিয়া প্রতিজনের পায়ে ধরিয়া ক্ষমা চাহিয়া থাকে। এই নগরের রাজপ্রতিনিধি চাদকাজি গৌড়ের পাতসার দৌহিত্র, তিনি তাহার পাঠান সৈন্য লইয়া নিমাই পণ্ডিত ও তাহার ভক্তগণকে শাসন করিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু পরিণামে হইল কি ? সেই পাতার দৌহিত্র এখন অনবরত কৃষ্ণনাম জপ করেন, আর তিনি নিমাই পণ্ডিতের পদানত হইয়াছেন। এরূপ লােককে সামান্য মানুষ কিরূপে বলা যায় ? মায়। রাখিয়া দাও তােমার নিমাই পণ্ডিত। উহার নাম শুনিলে আমার আপাদমস্তক জ্বলিয়া উঠে। লােকটা একেবারে দেশ মঙ্গাইল। বলে কি না “চণ্ডাললাপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ কৃষ্ণভক্তিপরায়ণঃ।” ব্রাহ্মণকে অপমান করিতে ও তেলী মালী বেনে প্রভৃতি ছােট লােককে শর্জা দিতেই তাহার জন্ম। তাহার ধর্ম প্রচার হইলে ব্রাহ্মণের পদ २८ থাকিবে না। আবার করে কি, তাহার ভক্তগণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ করিয়া চীৎকার কয়ে, ইহার ফল কি হইবে জান ? শ্রীভগবান্ হৃদয় মাঝারে নিদ্রিত আছেন ; চীৎকার করিয়া তাহাকে জাগাইলে তাহার ক্রোধ হইবে, আর তাহার ক্রোধ হইলে একটীও ধান জন্মিবে না, সমুদায় লােক অনাহারে মারা যাইবে। নীল। এই জন্যই কি আপনার নিমাই পণ্ডিতের উপর ক্রোধ ? তাহার ধৰ্ম্ম চলিলে নীচবর্ণের পদ বৃদ্ধি হইবে, এইজন্য তাহার উপর আপনার রাগ, না? এ নবদ্বীপে তাহার বিপক্ষ লােক আছে তাহা আমি জানিতাম না। ন্যায় ! আছে বৈ কি! আমরা সকলেই বিপক্ষ, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মধ্যে অধিকাংশই বিপক্ষ। তাই আমরা সকলে জুটিয়া কাজির কাছে নালিশ করিতে গিয়াছিলাম, যাহাতে সে অকাল কুষ্মাণ্ডটাকে শাসন করিতে পারে। কাজিও খুব উৎসাহের সহিত তাহার ভক্তগণের খােল ভাঙ্গা, প্রহার করা, প্রভৃতি নানা প্রকার শাসন আরম্ভ করিয়াছিল। কিন্তু নিমাই একদিন নগর-সঙ্কীৰ্ত্তনের ফন্দি বাহির করিল, তাহাতে লক্ষ লক্ষ লোক জুটিয়া গেল। নিমাই সেই দলবল লইয়া কাজির বাড়িতে গিয়া উপস্থিত। তখন কাজেই কাজি ভয়ে স্বীকার করিল যে, “তুমি ভগবান্।” সেই অবধি নিমাইয়ের প্রভাব আরও বাড়িয়া গিয়াছে। নীল। এইরূপ করিয়াই আমাদের দেশটা উৎসন্ন গেল। যদিও আমাদের হিন্দুর মধ্যে ঝগড়া থাকে তবে তাহার প্রতিবিধানের জন্য বিধর্মীর আশ্রয় লইতে আপনাদিগের একটু ঘণা বােধ হইল না ? ন্যায়। নিমাই পণ্ডিতকে হিন্দু কে বলে ? যে চেঁচাইয়া কৃষ্ণনাম করে, সে আবার হিন্দু কি ? শ্রীবাস পণ্ডিতের বাড়ী উচ্চ প্রাচীর দিয়া নিমাই-সন্ন্যাস ঘেরা, তাহাতে কপাট দিয়া আঙ্গিনার মধ্যে চেঁচাচেঁচি করে, বলে কি না ‘কৃষ্ণ কীৰ্ত্তন করি। কিন্তু সর্বৈব মিথ্যা। সেখানে কি যে করে তাহা মুখে আনিলেও পাপ হয়। মদ্য আনে, পঞ্চ কন্যা আনে, আরছি! ছি! কি বলিব মহাশয়, এখন আমাদের এ নগরে আর বাস করিবার যাে নাই। দিবানিশি খােল করতাল- ধ্বনি, হরিধ্বনি, আর “কৃষ্ণ, কৃষ্ণ” বলিয়া চীৎকার। একি ভদ্র- লােকে সহ্য করিতে পারে ? জগাই মাধাইয়ের একটী বেশ গুণ ছিল, হরিনাম সহ করিতে পারিত না, তাহাদিগকেও কি মন্ত্র বলে বশ করিয়াছে। আর উহাদের পায় কে? দেখিতেছি, আমাদের এ নগর পরিত্যাগ করিতে হইবে। ঐ শুন,-চেংড়াগুলা আসিতেছে। (দূর হইতে কীৰ্ত্তনধ্বনি।) নীল। বটে, বটে, দেখি কীৰ্ত্তন কিরূপ, আর নিমাইর ভক্তগণই বা কিরূপ? ( শ্রীধর, মুকুন্দ, গদাধর প্রভৃতির নৃত্য ও গীত করিতে করিতে প্রবেশ) গীত। আর ভয় নাই, ভয় নাই আঁধার গেল। নবদ্বীপ চাদের উদয় হল। ( আঁধার দূরে গেল রে) ঘাের আঁধার, ঘেরিল সংসার, ধৰ্ম্ম দূরে গেল, রইতে নারি প্রভু আপনি এলাে। ( জীবের মলিন দশা দেখে রে) পতিত দেখিয়া, কাঁদিয়া কাদিয়া,
দ্বিতীয় অঙ্ক।
জীবে করিল কোল।
শ্রীগৌরাঙ্গের জয় জয় বল।
( জয় জয় জয় বল রে)
হ’ল নয়নগােচর এত দিনে রে
জীবের প্রাণনাথ।
( তাপ ভয় দূরে গেল রে )
নীল। দেখেছ, দেখেছ, ইহারা আনন্দে গলিয়া পড়িতেছে। ইহারা
এত আনন্দ কোথায় পাইল ? এত আনন্দ যিনি দিতে পারেন,
তিনিই আনন্দময়। নিমাই পণ্ডিত আনন্দময়। ও গাে তোমরা
কারা গাে ?
মুকুন্দ। ও সই, আমাদের পরিচয় শুনিবে ? আমাদের কথা কহিতে
গীত আসে। গীত গাহিয়া পরিচয় দিতেছি, সই শােন।
গীত।
শুন সই পরিচয় মোদের দিতেছি।
কুলের বাহির হয়ে কৃষ্ণ অন্বেষণে এসেছি।
যমুনার কুলে বসি, প্রেমচন্দন ঘসি ঘসি
এই দেখ তিলক পরেছি,
আর সকল অঙ্গে কৃষ্ণ নাম লিখেছি।
হাসি কাঁদি নাচি গাই, বনে বনে বুলে বেড়াই,
লােকে বলে পাগল হয়েছি,
কাল ফুলের মালা গেঁথে সই,
গলে পরেছি, আমরা প্রেমে মজেছি।
নীল। তােমরা যে একেবারে ডুবে গিয়ছ। ইহা কিরূপে হইল বল, বল, বল।
নিমাই-সন্ন্যাস
গীত।
মুকুল।
প্রেমের পাথার নদীয়ায়,
গােরাদের উদয় ।
(এক দিন নয়—দু দিন নয়, নিতুই মােদের সুখেরি পাথার।
এমন সুন্দর ঠাকুর কোথা বা আছিল।
বহুভাগ্যে বিধি আনি মিলাইয়া দিল।
রাঙ্গা পায়ে সােণার নুপুর নাচি নাচি যায় ।
গােলকের চন্দ্ৰ আজি
ভূতলে
কত ধার ধারি তার বলিতে না জানি।
গােরা গোরা গােরা গোরা পরাণে পরাণী ।
উদয় ।
গীত।
নীল। তােমরা এ আনন্দ কোথায় পাইলে ? তােমরা কি কৃষ্ণকে
পাইয়াছ? তােমরা কি কৃষ্ণকে দেখিয়াছ? বল, বল, তােমাদের পায়ে
পড়ি, আমি মিথিলা হইতে দেখিতে, শুনিতে ও জানিতে আসিয়াছি ;
মুকুন্দ। (নাচিতে নাচিতে।
ফুটিল পীরিতের ফুল,
তাই, মজাইমু আমাদের কুল। ধ্রু।
যমুনায় গিয়াছিনু,
সেথা কুল ভাসাই ;-
খানি মাজিতেছি একা।
মাজিতে মাজিতে অঙ্গ
বিমল হইল গাে,
তবে তো শ্যাম আসি দিলেন দেখা।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
২৭
===== = =
আমারে চাহিয়া খাম
করুণায় বলে লো,
আঁখি জলে বুক ভেসে যায়।
আমারে ছাড়িয়ে প্রিয়ে,
কত কাল রবে গো,
আমি আছি তাের পথ চাই।
এই কথা কানে গেল,
হিয়া মাের বিদরিল,
শ্যামচাদে সপিলাম কায় ।
শ্যাম সে পরাণ ধন,
জীবনের জীবন,
কৃষ্ণ বলি নাচি আর গাই।
নীল। তােমাদের আনন্দ দেখে আমার একি দশা হইল ? আমি ও
সেই তরঙ্গে পড়িয়া গেলাম নাকি ?
ন্যায়। কি হে শ্রীধর, খােলা থোড় বেচা এখন বুঝি ছাড়িয়াছ ?
শ্রীধর। ছাড়িব না? এখন যে আশ্রয় পাইয়াছি, কুল পাইয়াছি,
প্রাণনাথ পাইয়াছি। এখন যে মনের মানুষ পাইয়াছি, আপনার
ধন পাইয়াছি, আমি যার তাকে পাইয়াছি ! একটু নাচিব না?
এই দেখ নাচি। (নৃত্য)
মনের মানুষ বুঝি নিমাই পণ্ডিত ?
মুকুল। হাঁ, তিনিই জীবনের জীবন।
( নেপথ্যে চলে আয় তােরা শীঘ্ন জায়” }
ন্যায়।
২৮
নিমাই-সন্ন্যাস
(শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারীর প্রবেশ)
ক্লাম্বর। (অধ্যাপকগণের প্রতি) আপনারা এখানে বসিয়া কি
করিতেছেন? (গদাধর প্রভৃতিকে দেখিয়া ) এই যে আমার
সখিগণ ! (মুকুন্দ, গদাধর, ও শ্রীধরকে গাঢ় আলিঙ্গন) কি
আনন্দ!
মুকুন্দ, গদাধর ও শ্রীধর। কি আনন্দ।
শুক্লা। (অধ্যাপকগণের প্রতি) আপনারা যে বসিয়া আছেন! চলুন,
যাই, প্রভুকে দেখি যাইয়া। আপনাদের শাস্ত্র গঙ্গায় ফেলে দিন।
কায়। ব্রহ্মচারি, তুমি তপস্বী ব্রাহ্মণ, তােমার এ দশা কেন ?
শুক্লাম্বর। (গীত)
চলে আয় ওরে পুরবাসিগণ, সুখের সমাচার শােন।
শুনি শচীর ঘরে, আলো করে সেই ঐনন্দের নন্দন।
যদি সত্য এসে থাকেন তিনি,
দেখিব কেমন মুখখানি,
নাচিব, গাইব, কঁদিব, হাসিব, চুমিব সেই শ্রীচরণ।
ফেলেদে তােদের সংসারের কাজ,
মিছে আর করিস না ব্যাজ,
কোন্দল করিব, পুছিব তাহারে জীবের এত দুঃখ কেন?
ভেবে দেখ মন আমার,
কি প্রকাগু ব্যাপার,
কোটী কোটী ব্রহ্মাণ্ডেশ্বর,
আজ আমাদের ভিতর,
দ্বিতীয় অঙ্ক।
২৯
( ভাই হরিবল সবে বদন ভ’রে )
( আনন্দের আর সীমা নাইরে ॥
দুঃখ নাই, ভয় নাই, পাপ নাই, তাপ নাই
বলরামের আনন্দ মন ।
শুক্লা। আমি আমার ব্রহ্মচারী। পৃথিবীর সমুদয় তীর্থ দর্শন
করিয়াছি, কিন্তু তাহাকে তো পাইলাম না, মনে শান্তি পাইলাম
! তাহার পরে শুভসম্বাদ শুনিলাম যে যাহাকে এ পর্যন্ত অন্বেষণ
করিতেছিলাম তিনি এখন এই নবদ্বীপে সর্ব-নয়নগগাচর হইয়াছেন।
দর্শন করিলাম, আর তাহাকে প্রাণটা দিলাম। এখন দেখি যে
আমরা নিতান্ত ক্ষুদ্র কীটামুকীট কি ভাগ্যবাতাস যেখানে উড়াইয়া
লইয়া যায় সেইখানেই যাই, তাহা নয়। এখন দেখিলাম আমরা
রাজার সন্তান। রাজরাজেশ্বরের সন্তান। অনন্তকোটী ব্রহ্মাণ্ডেশ্বরের
সন্তান। আমাদের পিতা এত সস্তানবৎসল যে অবুঝ উপায়হীন
সন্তানগণকে উপদেশ ও আশ্বাস দিবার জন্য স্বয়ং এই ক্ষুদ্রতম জগতে
আসিয়াছেন। আমরা একটু নাচিব গাহিব না? কি বল মুকুন্দ ?
ন্যায়। আচ্ছা ব্ৰহ্মচারি তুমি পণ্ডিত ও সুবােধ। তােমার কি বিশ্বাস
হয় যে 'সেই তিনি এই ধরাধামে আসিবেন ?
শুক্লা। কেন, শ্রীকৃষ্ণ তো আসিয়াছিলেন ?
ন্যায়। সে কালের কথা ছাড়িয়া দাও।
শুক্লা। বুঝিলাম, তুমি নৈয়ায়িক পণ্ডিত, শ্রীকৃষ্ণকে বড় একটা মান
। তুমি তাে ভগবানকে মানো, আর ইহাও মান যে তিনি
দয়াময় ?
ন্যায়। হাঁ, অবশ্য মানি। সর্বশাস্ত্রে তাহাকে দয়াময় বলে, মনও
তাঁহাকে দয়াময় বলে।
নিমাই-সন্ন্যাস শুক্লা। আপনারা তাহা বলেন না, কিন্তু আমরা বলি। আমরা বলি তিনি দয়াময়, তাই বিশ্বাস করি যে জীবের দুঃখ দেখিয়া কাতর হইয়া আপনি তাহাদিগকে আশ্বাস দিতে আসিয়াছেন। এতো সােজা কথা। আপনার মুখে বলেন দয়াময়, মনে বলেন না। তাই পৃথিবীতে তিনি অবতার হইয়া নিজে আসিতে পারেন তাহা বিশ্বাস করেন না। ন্যায়। নিমাই পণ্ডিত যে সেই ভগবা, তাহা জানিলে কিরূপে? শুক্লা। যাও না একবার তিনিই জানাবেন। সেখানে ফুটানি খাটিবে না। আমরা জানিয়াছি, সম্পূর্ণরূপে জানিয়াছি। না জানিলে এ আনন্দ কোথা পাইব? না জানিলে হিন্দু হইয়া তাহার শ্রীচরণে গঙ্গাজল, ফুলতুলসী দিয়া কেন পূজা করিব? ইচ্ছা করিয়া কি কেহ মানুষকে ভগবান বলিতে পারে? তিনি আমাদের চিত্ত অধিকার করিয়া তাহাকে ভগবান বলাইয়াছেন। (নেপথ্যে দেখেছি, দেখেছি।”) (মুসলমান দরজীর প্রবেশ) দরজী। দেখেছি, দেখেছি ! মশায় দেখেছি, দেখেছি। (নৃত্য) শুক্লা। এই দেখুন, এই ভাগ্যবান্ মুসলমান দরজীর ব্যবসায় করেন। ব্যবসায়ের জন্য শ্রীবাসের বাড়ী গিয়াছিলেন, সেখানে প্রভুকে দর্শন করেন। প্রভুকে কিরূপ দেখেন তাহা উনি জানেন, কিন্তু সে আজ সাত দিবসের কথা হইল, সেই অবধি ইহার আহার নাই, নিদ্রা নাই, কেবল “দেখেছি দেখেছি” বলিয়া সমুদায় নগর নৃত্য করিয়া বেড়াইতেছেন। গায়। দরজি, তুমি কি দেখেছ ? দরজী। নদে টলমল করছে, দেখছ না? দুলছে, এই দেখ সব দুলছে। আর মাঝখানে সুন্দর কৃষ্ণ নৃত্য কছেন। ( সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
নিমাই পণ্ডিতের বাড়ীর সন্মুখ।
{ নিমাই পণ্ডিত ও একটী বালক আসীন, কয়েকজন
নাগরিকের প্রবেশ ও প্রভুকে প্রণাম।)
প্রথম নাগরিক। ( করঘােড়ে) প্রভু, আমরা ভবসাগরে পিড়য়া
হাবুডুবু খাইতেছি. চরণতরী দিয়া আমাদের উদ্ধার কর।
দ্বিতীয় নাগ।
প্রভু, দীনের উপর তােমার বড় দয়া, কিন্তু আমার
মত অস্পৃশ্য পামর ত্রিজগতে পাইবে না। আমি জেনেছি, তুমি
আমাদের উদ্ধারের জন্যই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছ।
প্রঃ না। তা ঠিক কথা, সাধুলােকের তােমাকে প্রয়ােজন কি ? যে
রােগী সেই চিকিৎসকের শরণ লয়। আমরা ভবরােগে জৰ্জরীভূত
হয়েছি আমাদের রােগ মুক্ত কর।
নিমাই। তােমরা ওরূপ দৈন্য করিও না। তােমাদের দৈন্যে আমার
হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। কৃষ্ণ কৃপাময়, তিনি সকলকেই উদ্ধার
করিবেন।
বালক। ঠাকুর, আমি বালক বলিয়া আমাকে উপেক্ষা করিবেন না।
মরণ বৃদ্ধেরও আছে, বালকেরও আছে। এই যে বাবা রাগ করিয়া
আসিতেছেন।
(বালকের পিতার প্রবেশ)
বালকের পিতা। (বালককে লক্ষ্য করিয়া) হরে হরে, তুই এখন পাঠ
ছাড়িয়া দিয়া এখানে আছিস? আজ দু’দিন তােকে খুঁজিয়া পাই
নাই। চল বাড়ী চল, সেখানে গেলে তাের পিঠে ভাদ্রমাসের
তাল পড়িবে এখন।
নিমাই-সন্ন্যাস। বালক। বাবা, ক্ষমা দাও। আমি ঠাকুরকে পয়েছি, এখানেই আমার পাঠ সাঙ্গ, এখানেই আমার সাংসারিক জীবনের সমাপ্তি। বা পিতা। জ্যাঠামাে রেখে এখন আমার সঙ্গে চল। ও নিমাই পণ্ডিত, তুমি আমার ছেলেকে ভুলিয়ে রেখেছ কেন? প্রঃ না। আপনার ছেলে এখানে নিজেই এসেছে, আপনি এখন উহাকে নিয়ে যান। বাঃ পিতা। আপনি এসেছে বই কি! নিমাই পণ্ডিত, তুমি আমার ছেলেকে আমার অবাধ্য হ'তে শিখিয়েছ। ও আমার সম্মুখে কখন মুখ তুলে কথা কয় নাই। আমার ছেলেকে তুমি ছেড়ে দাও, নয়তাে তােমার ভাল হবে না। বালক। (নিমাইয়ের পা ধরিয়া) প্রভু, আমার পিতা আপনাকে জানেন , তাই কক্কশ কথা বলিতেছেন, তাঁহাকে ক্ষমা করুন। বাঃ পিতা। জানেন না কি রে! খুব জানি। নিমাই তো জগন্নাথের বেটা। অামরা নগরে পরামর্শ করেছি যে এই ভণ্ডটাকে শাস্তি দেব। বালক। বাবা, বল কি ? (পিতার চরণে পতন ) তুমি যাহাকে শাস্তি দিতে চাহিতেছ তিনি পূর্ণব্রহ্ম সনাতন। তিনি আমার পিতা, তিনি তােমার পিতা, জগতের পিতা! (পিতার চরণ ছাড়িয়া নিমাইয়ের চরণ ধরিয়া) প্রভু, বাবা তােমাকে জানেন না তাই ওরূপ দুৰ্বাক্য বলিতেছেন, আমি তােমাকে চিত্ত সমৰ্পণ করিয়াছি, আমাকে কৃপা করিয়া আমার পিতাকে ক্ষমা কর, ও তাহার নিকটে তােমার পরিচয় দাও। বাঃ পিতা। তাের ঠাকুরের পরিচয় তো আমি দিলাম, কাঙ্গাল জগন্নাথের বেটা। আমার নাম অগ্নিশর্মা, আমাকে নগরের সকলেই জানে। আমাকে আর রাগ নে। ও নিমাই পণ্ডিত, ও ভণ্ড, ও বালক- দ্বিতীয় অঙ্ক। চোর, তুমি নাকি ঠাকুর হয়েছ ? তােমাকে প্রহার করিলে তুমি কি করিতে পার ? নিমাই। (সহাস্যে) আচ্ছা, তুমি একবার হরি বল, বলিয়া আমাকে যত পার প্রহার কর। বালক। ( ক্রন্দন করিতে করিতে আবার প্রভুর চরণে পড়িয়া) আমার বাবার সর্বনাশ হইল। প্রভু ক্ষমা কর, তােমার পায়ে পড়ি, তুমি আমার পিতাকে ক্ষমা কর ও তাহার নিকট তােমার পরিচয় দাও। বাঃ পিতা। (ক্রোধে কঁপিতে কঁপিতে) আমি আজই তাের ভণ্ডামী ভাঙ্গিব। দেখি কে তােকে রক্ষা করে। ( যষ্টি লইয়া প্রহার করিতে উদ্যত } নিমাই। (হস্ত তুলিয়া) কৃষ্ণ তোমাকে কৃপা করুন ! তুমি ব্রাহ্মণ, তোমার চিত্ত সহজেই নিৰ্ম্মল হওয়া উচিত, তাহাতে মলিনতা কেন প্রবেশ করিল ? আমার বরে তােমার ভক্তি হউক। (বালকের পিতা স্থির হইয়া দণ্ডায়মান, পরে তাহার কম্প, মুখে অর্ধস্ফুট শব্দ, পরে মুচ্ছা ও পতন। প্রঃ নাগরিক। আহা মূচ্ছিত হইয়া পড়িলেন, কর্ণে কৃষ্ণনাম শুনাও। (বাল- কের পিতার কর্ণে উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণনাম করণ, বালকের পিতার গড়াগড়ি এবং পুনঃ পুনঃ কৃষ্ণনাম উচ্চারণ, পরে উঠিয়া প্রভুর চরণে পতন। বাঃ পিতা। প্রভু, একেই বলে দয়ার ঠাকুর। জগাই মাধাই তােমাকে মারিতে গিয়া তােমার কৃপা পাইয়াছিল, আমিও সেইরূপে পাইলাম। আমি চিরকাল গোয়ার। শুভক্ষণে আমার পুত্র জন্মিয়াছিল, শুভক্ষণে আমার পুত্র তােমাকে চিনিয়াছিল, শুভক্ষণে আমি পুত্রকে অন্বেষণ করিতে আসিয়াছিলাম, শুভক্ষণে আমার ঘাড়ে শনি চাপিয়া ছিল, তাই তােমাকে প্রহার করিতে চাই।
৩৪
নিমাই-সন্ন্যাস।
নিমাই। (বালকের প্রতি তােমার পরম ভক্ত পিতার সহিত তুমি
এখন গৃহে গমন কর। পাঠ বন্ধ করিবে কেন? পাঠ কর ও শ্রীকৃষ্ণ
ভজন কর।
বালক। আমার মার গতি কি হইবে?
দি নাগরিক। তােমার মায়ের ভার তুমি আর তােমার পিতা এহণ
কর। এখন প্রভুকে একটু আরাম করিতে দাও।
প্রঃ না। পতিতপাবন প্রভু, আমাদের উপায় কি হবে ?
নিমাই। তােমরা গৃহে যাও, গিয়া কৃষ্ণকীর্তন কর। আপনি করিও
ও অন্যকে করাইও। যদি তুমি একটী জীবকেও ভক্তিপথে আনিতে
পর তাহা হইলে শ্রীকৃষ্ণকে ক্রয় কবিবে।
নাগরিকগণ।
গীত।
নদের চাদের উদয় হয়েছে।
কি আনন্দে নদে ভাসিছে।
পাপী তাপী অন্ধ আতুর সারি সারি আসিছে।
{ সকলের প্রণাম করিয়া গীত গাহিতে গাহিতে প্রস্থান)
( হরিদাসের সহিত অবধূত নিতাইয়ের প্রবেশ )
নিতাই। (নিমাইর দিকে অঙ্গুলী হেলাইয়া নৃত্য ও গীত)
ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নামরে।
যে ভজে গৌরাঙ্গ চাদ সেই আমার প্রাণরে।
বিনষ্টে যে গাের নাম লয় একবার।
আমি তার চিরদিন, সে হয় আমার।
দ্বিতীয় অঙ্ক। ৩৫ নিমাই। গাত্রোখান করিয়া) শ্রীপাদ, শান্ত হউন। নিতাই। “ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে!” নিমাই। শ্রীপাদ, শান্ত হউন। (নিতাইয়ের ক্ষণিক শান্তভাব) হরিদাস। শ্রীপাদ অদ্য নাম প্রচারে বাহির হওয়া অবধি বিহ্বল হইয়া- ছেন। একেবারে বাহ্যজ্ঞান শূন্য হইয়া এইরূপ নগরে নগরে, ঘরে বরে, জনে জনে উপদেশ করিতেছেন। প্রভু রহস্য দেখুন, আপনাকে চিনিতে না পারিয়া আপনাকে ভজিবার নিমিত্ত আপনাকেই ঐরূণ উপদেশ করিতেছেন। নিতাই। (প্রভুর চিবুক ধরিয়া গীত} “ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গ নাম রে!” (নৃত্য) নিমাই। আমাকে সে উপদেশ দিতে হইবে না, জীব মাত্রেই আপনাকে আপনি ভজনা করিয়া থাকে, কিন্তু শ্রীপাদ, মিনতি করি শান্ত হউন। ( নিতাইয়ের নিপট্ট বাহ) নিতাই। (হা হা করিয়া হাস্য) এই যে প্রভু, আমি চিনিতে পারি নাই। আমি ভেবেছিলাম যে তুমিও আমার মত একজন সংসার দাবানলদগ্ধ জীব। নিমাই। শ্রীপাদ, আসুন আমরা বসি। সকলের উপবেশন) শ্রীপাদ আপনার সঙ্গে অামার বিশেষ পরামর্শ আছে। নিতাই। অজ্ঞা করুন। নিমাই। পাদ, জীবের ক্রমে ক্রমে কি দুর্দশা হইতেছে দেখিতেছেন? তাহাদের অবস্থা ভাবিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়। সকলেই অসার বিষয় লইয়া উন্মও। অল্পদিন পরে মরিতে হইবে তাহা জানে, কিন্তু জানিয়াও জানে না। শ্রীপাদ, তুমি আমার ব্যাথার ব্যথিত, তাই তােমাকে বলিতেছি।
নিমাই-সন্ন্যাস
নিতাই। প্রভু, তুমি যখন অবতীর্ণ হইয়াছ, তখন জীবের আর ভাবনা কি।
নিমাই। শ্রীপাদ, আমার দ্বারা আর জীবােদ্ধার হয় না। নগরে কি
পরামর্শ হইতেছে শুনিয়াছেন ? নাগরিয়াগণ আমাকে প্রহর
করিবে।
নিতাই। (কর্ণে হস্ত দিয়া) প্রভু, ও কথা বলিও না, ও কথা শুনি?
নরকভোগ হয়। যাহারা তােমাকে মারিতে চাহিয়াছে তাহার পশু
আহা, তাহাদের কি গতি হইবে ?
নিমাই। তাহাদের অপরাধ কি ? অপরাধ আমার।
নিতাই। তােমার অপরাধ এই যে তুমি গোলােক ছাড়িয়া এই মলিন
দুঃখময় ধরাধামে এসেছে। কেন? না জীবের মঙ্গলের জন্য ।
তুমি লোকের দুঃখ সহিতে পার না, তুমি পতিত জীব দেখিলে পুত্র
শােকাতুরের ন্যায় আকুল হইয়া রােদন কর। কাজেই তােমায়
বড় অপরাধ।
নিমাই। নগরবাসীর কি দোষ ? আমি হরিনাম বিলাইব, লােকে
দেখে আমার পট্টবস্ত্র পরিধান, গলায় সুবর্ণের হার, আহার দুগ্ধ,
ননী, ছানা। কাজেই তাহাদের রাগ হয়, আর আমার নিক
হরিনাম সইতে তাহাদের প্রবৃত্তি হয় না।
নিতাই। কেন, ননী ছানা ভােজন করিলে কি পতিত হয় ?
নিমাই! তাহা নয়, জীবের মনের প্রকৃতি এইরূপ। যাহারা গহস্থ
সুখে সুখী তাহাদের নিকট ধর্মশিক্ষা লইতে লােকে অনিচ্ছুক ।
ঐ পাদ, আমি সন্ন্যাসী হইব, হইয়া যাহারা আমাকে মারিতে চাহিয়া
তাহাদের অগ্রে দাড়াইয়া হরিনাম ভিক্ষা করিব।
নিতাই। প্রভু, একি তােমার মনের কথা ?
নিমাই। হ, দৃঢ় সংঙ্কল্প।
দ্বিতীয় অঙ্ক। ৩৭ নতাই। প্রভু, এ সর্বনেশে সংস্কল্প পরিত্যাগ কর। সন্ন্যাসী হও আমার কি, আমায় হাত ছাড়াইতে পারিবে না, তুমি যেখানে যাও সেখানেই আমি যাইব। কিন্তু মা’র কথা কি ভাবিতেছ ? তাহার বাহাত্তর বৎসর বয়স, তাহার তােম। বই আর নাই। নিমাই। মার দুঃখ হইবে বলিয়া জীব উদ্ধার হইবে না? আমার মা দয়াময়ী । তুমি দেখিও, তিনি স্বয়ং আমাকে সন্ন্যাসী হইতে অনুমতি দিবেন। আমি ছেড়াকথা গায়ে দিয়া কৌপিন পরিয়া, যারা আমাকে মারিতে চাহিয়াছে তাহাদের সম্মুখে যাইয়া যখন বলিব, “এই আসিয়াছি, আমাকে প্রহার কর, তখন আমার দশা দেখিয়া আর তাহারা আমাকে প্রহার করিবে না। আর ঐ অবস্থায় আমি যাহাকেই হরিনাম লইতে বলিব, সেই তখন নামগ্ৰহণ করিবে। নিতাই। প্রভু, ওরূপ নিঠুরালী করিও না। তুমি সন্ন্যাসী হইলে না গরিবেন, বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী মরিবেন, আর তােনার ভক্তগণ সব সেই সঙ্গে সঙ্গে মরিবে । নিমাই। শ্রীপাদ, আমার বৃদ্ধা জননীই আমার কণ্টক তাহা আমি বুঝি, কিন্তু যে জন্যই হউক, আমার গৃহে থাকিবার উপায় নাই। কৃষ্ণ আমার চিত্ত চুরী করিয়া লইয়া গিয়াছেন, আমি তাঁহার অন্বেষণে বৃন্দাবনে যাইব। হরিদাস। প্রভু, বলেন কি? যেখানে আপনি সেখানেই বৃন্দাবন। আপনি গৃহত্যাগ করিবেন এ কথা শুনিলে কেহই প্রাণে বাঁচিবে না। নিমাই। তােমরা বুঝিতেছ না, জননীকে কাঙ্গালিনী করিয়া তােমাদের ন্যায় প্রিয় বন্ধুগণকে ত্যাগ করিয়া আমি চলিয়া যাইব, ইহা কি আমার ইচ্ছা ? কিন্তু আমি গৃহে থাকিব এ কথা যেই মনে করিতেছি নিমাই-সন্ন্যাস অমনি আমার হৃদয়বিদীর্ণ হইতেছে। বন্ধুগণ, আমার দুঃখ তােমার দুঃখ দেখিও না, জীবের দুঃখ দেখ। ( উর্কে চাহিয়া ) হে কৃষ্ণ আমাকে কৃপা কর। তােমা ছাড়া আমি বাঁচি না, তুমি আমার প্রাণের প্রাণ! (পরে নিতাইয়ের প্রতি) লােকের জ্বর হইয়া থাকে, বন্ধুগণ, আমার কৃষ্ণ-বিরহজ্বর হইয়াছে। আমার উপর যদি তােমাদের কিছুমাত্র স্নেহ-মমতা থাকে তবে আমাকে ছাড়িয়া দাও, আমি এক দৌড়ে বৃন্দাবন যাই, গিয়া কৃষ্ণকে দর্শন করিয়া প্রাণ শীতল করি। গদাধর। প্রভু, সাহস করিয়া তােমার নিকট মুখ তুলিয়া কথা কহিতে পারি না। কিন্তু এখন আর ভয় কি? তুমি যদি যাও, তবে মা ও সকল প্রাণে মরিবেন। প্রভু, তুমি না জীবকে ভক্তিশিক্ষা দিতে অবতীর্ণ হয়েছ ? আচ্ছা, বৃদ্ধা মা জননীকে দুঃখ দিয়া কি কখনও কোন ধৰ্ম্ম হয়, না তাহা হইলে সকল ধৰ্ম্ম নষ্ট হয় ? তুমি যদি যাও তবে মাহুবধের দায়ী হইবে । নিমাই। গদাধর, তোমার কথায় বিষ মাখানো, তুমি আমার অন্তরে বেদনা দিতেছ। আমার যাইবার প্রধান কণ্টক মা। কোথায় তুমি যাহাতে আমি সেই বাধা হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারি তাই করিবে, তাহ না করিয়া যাহাতে আমার এই বাধাটী প্রবল হয় তাই করিতেছ। একি সুহৃদের কাজ ? তুমি কি জানিতেছ না যে আমার না গেলে নয়, আমি স্ব ইচ্ছায় বাইতেছি না। হে প্রাণাধিক সুহৃদগণ, আমার যাহাতে যাওয়া হয় তাহার সুবিধা করিয়া বন্ধুর কাৰ্য্য কর। কৃষ্ণ। আমি নিতান্ত নিষ্ঠুর তাই তােমাকে ফেলিয়া এখনও এখানে আছি। হে কৃষ্ণ, আমাকে ধর, ধর, ধর ! (হন্তোত্তোলন) আমি তােমার নিকটে যাব। (মুচ্ছিত হইয়া ভূমিতে পতন ) দ্বিতীয় অঙ্ক। { নিতাই। কি হলো! কি হলাে ! ( সকলের ব্যস্ত হওন, কেহ কাপড় দিয়া বাতাস, নিতাই কর্তৃক কর্ণে উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণনাম শুনান)। নিতাই! ( উচ্চৈঃস্বরে) প্রভু! প্রভু! প্রভু ! নিমাই। (চেতন পাইয়া ধূলায় গড়াগড়ি ও রােদন করিতে করিতে কৃষ্ণ, তুমি কোথায়? আমি আর বাঁচি না, আমার প্রাণ যে যায়! হা নাথ, তুমি কখন আসিবে? আমার প্রাণ গেলে কি তুমি আসিবে? আমাকে তােমরা ধর, আমি উঠিব। (গদাধরের ধারণ ও নিমাই উঠিয়া গদাধরের গলা ধরিয়া) গদাধর, আমার কৃষ্ণকে কি তুমি এদিকে লেখ নাই ? তিনি কোন পথে গেলেন ? গদাধর, আমার কৃষ্ণকে আনিয়া দাও, দিয়া আমার প্রাণ বাচাও। গদাধর। কৃষ্ণ তােমার বুকের মধ্যে আছেন। নিমাই। বল কি! তিনি বুকের মাঝে আছেন, তবে আর পলাইবেন কোথা? ( নখ দিয়া বিদীর্ণ করিতে উদ্যত এবং গদাধর কর্তৃক নিবারণ) গদাধর। (রােদন করিতে করিতে } একি হােলো। নখাঘাতে বুক দিয়া রক্ত পড়িতেছে। (বস্ত্র দিয়া মুছান ) নিমাই। কৃষ্ণ, আমি কি তােমাকে ফেলে থাকিতে পারি ? আমার বন্ধুগণ পাগল, তাই তঁাহারা আমাকে থাকিতে বলেন। এই যজ্ঞো- পবীত আমাকে সংসারী করিয়াছে, তুমি দূর হও। (যজ্ঞােপবীত খণ্ড খণ্ড করণ) এই আমি বৃন্দাবনে চলিলাম। (উঠিয়া গমনােদ্যত, নিতাইয়ের বাহু প্রসারিয়া ধারণ, নিমাই নিতাইর অঙ্গে ঢলিয়া পড়িয়া মুচ্ছিত হওন।) হরিদাস। আজ প্রভু আমাদের কি জন্মের মত ছাড়িয়া চলিলেন ? নিতাই। (প্রভুর কর্ণে উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণ নাম) প্রভূ, তোমার জীবে দয়া
৪০
নিমাই-সন্ন্যাস।
তাই আমাদের ত্যাগ করিতেছ, আমরা কি জীব নই? (নিমাইয়ের
চৈতন্য লাভ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া গড়াগড়ি ও রােদন।)
( নিতাই প্রভুকে উঠাইলেন, প্রভু দুই পদ বিস্তার করিয়া
গদাধরের অঙ্গে হেলান দিয়া বসিলেন।)
নিমাই। বন্ধুগণ ! আমার নিকটে এসো। (করযােড়ে। আমি
মিনতি করি আমাকে বিদায় দাও।
হরিদাস। (কঁদিতে কাদিতে প্রভুর পায় ধরিয়া) প্রভু, তুমি প্রাণ,
তুমি গেলে আমরা কেহ প্রাণে বাঁচিব না।
মুকুন্দ। (উচ্চৈঃস্বরে রােদন) প্রভু, তুমি যাবে ইহা কি হইতে পারে ?
তুমি প্রাণের প্রাণ, তুমি যাবে একথা মনেও করিতে পারি না।
{ প্রভুর চরণ ধরিয়া) প্রভু, জননীকে ত্যাগ করিও না, তিনি
মরিয়া যাইবেন।
তােমর শান্ত হও। আমি এখনই যাইতেছি না। এ সম্বন্ধে
আরও কথা হইবে।
নিতাই। ( গদাধরের প্রতি চল প্রভুকে স্নান করাইতে লইয়া যাই।
প্রভু বেলা হইয়াছে স্নানে চলুন।
( সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। শচীর অন্তঃপুর। ( শচীদেবী ও ঈশান) শচী। ঈশান, দেখ দেখি নিমাই সচেতন কি অচেতন ? সচেতন যদি থাকে তবে একবার ডাকিয়া আন। (ঈশানের প্রস্থান ও নিমাইর প্রবেশ) নিমাই। (গলায় বস্ত্র দিয়া যাষ্টাঙ্গে জননীকে প্রণাম ) মা, আমাকে ডাকিয়াছ? শচী। হঁ বাপ, বসো। (নিমাইর উপবেশন। বাপ, কি গুছি যে ! নিমাই। কি শুনছো মা? শচী। কি শুছি, তা আমার মুখে আসে না, সে কথা শুনে অবধি আমার মুখ বুক শুখিয়ে গিয়াছে। তুমি নাকি আমাদের ছেড়ে যাবে ? নিমাই। হঁ মা, আমি কোন পুণ্যস্থানে কৃষ্ণ ও কৃষ্ণপ্রেম অন্বেষণে যাবো। তাহাতে মা, তুমি দুঃখিত কেন? আমি আবার আসবো। শচী। ত, না। তুমি নাকি তােমার দাদা যাহা করেছে তাই করিবে । নিমাই। (অবনত বদনে) হা না, তাই বটে। তবে তােমাকে আবার দেখা দেব। শচী। আমাকে আবার দেখা দেবে বারে বারে এই আশ্বাস দিতেছ। কিন্তু তুমি তাহলে,-তাহলে (আমি উহার নাম করিতে পারি না। তুমি কৌপিন পরিবে, দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মেগে খাবে। আচ্ছা নিমাই, আমি বড় কঠিন, আমি তা জানি, তা না হলে আটট কন্যা মরিল,
৪২
নিমাই-সন্ন্যাস।
বিশ্বরূপের মত ছেলে সন্ন্যাসী হােলাে, তবু আমি বেঁচে আছি। কিন্তু
কোন্ মায়ে ইহা সহিতে পারে? নিমাই, তুমি আমাকে ত্যাগ
করে সন্ন্যাসী হবে?
নিমাই। মা, মা, আমি কি বলিব বুঝিতে পারিতেছি না। মা-
শচী। আমার ঘরে যুবতী বধূমাতা। পরের মেয়ে ঘরে আনিলাম, বল
দেখি তাকে কি বলে বুঝাবো ?
নিমাই। মা, তােমাদের কষ্ট হইবে জানি, সেইজন্য এতদিন যেতে পারি
নাই, এখনও যাইতে পারিতেছি না।
শী। তুমি যাবে, আর আমি মরিয়া যাইব। কিন্তু বউমার বয়স এই
চৌদ্দ বৎসর, তিনি কতকাল বাচিয়া থাকিবেন তাহার ঠিক নাই
সে বেচারীর উপায় কি হবে বল দেখি?
নিমাই। মা, আমার কথা তো তুমি বিশ্বাস করে থাকো? স্বরূপ কথা
শােন। তুমি আমাকে যেরূপ পালন করিয়াছ এরূপ কোন মায়ে
পুত্রকে পালন করে না। পিতা বৈকুণ্ঠে গমন করিলে, তুমি পালন
করিয়াছ, তুমি আমাকে অধ্যয়ন করাইয়াছ। আমি তোমাকে যে
ফেলে যাবাে ইহা কি স্বইচ্ছায় হইতে পারে ? মা, আমি আমার বশে
নই। আমি বাড়ী থাকিব, যখন মা, একথা ভাবিতেছি, তখনই
আমার হৃদয় যেন বিদীর্ণ হইতেছে। মা, কে যেন আমাকে টানিয়া
লইয়া যাইতেছে, আমি অবশে নাই। শ্রীকৃষ্ণ আমাকে লইয়া
বাইতেছেন, আমি ইচ্ছায় যাইতেছি না।
শচী। বাপ, মাতৃবধ করিও না, পাপ হইবে। আর পরের মেয়ে
বিষ্ণুপ্রিয়া, তাহাকে বিনাদোষে ত্যাগ করিলেও তােমার পাপ হবে।
বাছা, তুমি জগৎ বিজয়ী ভক্ত, তুমি এরূপ কাৰ্য্য করিবে কেন?
তােমার তো ধৰ্ম্ম হইবে না, ধৰ্ম্ম নষ্ট হইবে ।
তীয় অঙ্ক।
৪৩
শচী।
নিমাই। মা, শ্রীকৃষ্ণ মিলন করেন ও বিয়ােগ করেন। তঁাহার বাহ!
ইচ্ছা তাহাই হয়। তােমার আমার চেষ্টা পণ্ডশ্রম মাত্র। মা শ্রীকৃষ্ণের
ভজন জীবের প্রধান কাজ, আর সমুদায় বিফল। মা, আমি যাহ
করিতে যাইতেছি, তাহাতে আমার ভাল হইবে, আমার ভাল হইলে
তােমার ভাল হইবে। তুমি আমাকে নিঃস্বার্থ ভালবাস, মা, তুমি
সামান্য মায়ামুগ্ধ জীবের ন্যায় আমার এই মহৎকার্যে বাধা দিও না।
শচী। বাপ, আমি তােমার কথা কখন ফেলি নাই ! তুমি যাহা বল,
তাহাই করিব, যদি আমার সাধ্যায়ই হয়। বল,
বল, কি করিব ?
নিমাই। মা, তুমি আমাকে সরল মনে বিদায় দাও। কারণ তােমার
মনে ব্যথা দিয়া গমন করিলে আনার অধৰ্ম্ম হইবে, এমন কি তােমার
মনে ব্যথা দিয়া আমি বাইতে পারি না।
তােমাকে বিদায় দিতে পারি, ও দিলাম, কিন্তু সরল মনে বিদায়
দিতে পারি না। কারণ আমি মা, আমার আর কেহ নাই, তুমি
আমাকে যাহা করিতে বলিতেছ, তাই। কেহ করিতে পারে না।
নিমাই। মা, তবে আমার যাওয়া হইল না, তবে আমি কৃষ্ণকে পাইলাম
না। মা জননী, মেহমষ্টি, তুমি যে মেহের জন্য আমাকে যাইতে
দিতেছ না, আমি তােমার সেই স্নেহকে নিবেদন করিতেছি, আমার
মনের সুখ, আমার চিরদিনের মঙ্গল, আমার ও আমার সকলের,
এমন কি জীবমাত্রের মত যাহাতে হয়, সেহমরি, তুমি আমাকে তাহ
করিতে দাও।
শচী। তবে তুমি যাবে, সত্যই যাব? যাও। এসো, তোমাকে কোলে
করি, আর জন্মের মত মুখখানি দেখিয়া লই।
[ নিমাইয়ের গলা ধরিয়া চুম্বন ও মূচ্ছ।।
নিমাই। কি হােলো, একি হােলে!! (জননীকে ক্রোড়ে করিয়)
৪৪ নিমাই-সন্ন্যাস শচী। মা উঠ, আমি যাব না। মা, তােমাকে বধ করিয়া আমি যাব না। কৃষ্ণ কৃপাময়, আমার বৃদ্ধা জননীকে শক্তি দাও। (শচীর কণে কৃষ্ণনাম শুনান, শচীর চৈতন্য লাভ।) ও নিমাই, নিমাই! (ক্রন্দন কৃষ্ণ কৃপাময়! আমি কিরূপে এই শূন্যগৃহে থাকিব? যে নিমাইকে এক তিল না দেখিলে মরি, তাহাকে ছাড়িয়া কেমন করে দিন রাত্রি কাটাবাে? না, আমি ভাল বলিলাম না। আমি আমার কথা ভাবিতেছি, আমি নিমাইয়ের কথা, সর্বোপরি মা বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা ভাবিতেছি না। নিমাই আমার ননীর পুতলী, সে কিরূপে বৃক্ষতলে মৃত্তিকায় শয়ন করিবে? তার পদতল যেন পদ্মফুল, সে কিরূপে পথে হাঁটবে ? সে ভিক্ষা মাগিয়া খাইবে, কৌপিন পরিয়া দ্বারে দ্বারে বেড়াইয়ে। কে তাহাকে বন্ধন করিয়া দিবে ? আমার নিমাই দিবানিশি কৃষ্ণনামে বিহ্বল, কে তাহাকে চেতন করাইয়া খাওয়াইবে? আর আমার বউমা লক্ষ্মী, তার বয়স এই চৌদ্দ বৎসর, মাকে আমি কি বলিয়া বুঝাইব ? মা আমার অগ্নি হইয়া বুকে ‘দানিশি জ্বলিবেন। হে অগতির গতি কৃষ্ণ, গতি দাও। নিমাই। শান্ত হও মা, আমি যাইব না। না বাপ, তাহা আমি বলতে পারি না। যখন তুমি বলিতেছ, কৃষ্ণ তােমাকে লইয়া যাইতেছেন, আর গেলে তােমার মুখ ও জগতের মঙ্গল, থাকিলে তােমার দুঃখ ও জগতের অনিষ্ট, তখন আমি তােমার এরূপ মা নই যে তোমাকে বাধা দিব । তুমি স্বচ্ছন্দে যাও, তবে আমার বুক যে ফাটিয়া যাইবে তাহার কি করিব? নিমাই। একটা কথা শুন। একটী ব্ৰহ্মণ ও ব্রাহ্মণী তাহাদের পুত্রকে রাক্ষসের মুখে দিতে হইবে বলিয়া রােদন করিতেছিলেন। সেই শচী।
দ্বিতীয় অঙ্ক। ৪৫ বাড়ীতে বনবাস কালীন কুন্তী পঞ্চপুত্র লইয়া ছিলেন। তখন কুন্তী ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর দুঃখ দেখিয়া আপনার পুত্র ভীমকে তাহার পুত্রের পরিবর্তে দিয়াছিলেন। মা, কুন্তী এইজন্য জগতে ধন্য। আমি একটা মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত যাইতেছি। মা, জীব হাহাকার করিতেছে। মা, তাহাদের দুঃখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়, আমি যাইতেছি বাহাতে তাহাদের দুঃখ দুর করিতে পারি, শ্রীকৃষ্ণের সহিত তাহাদের পরিচয় করিয়া দিব। মা, আমাকে বধ করিয়াও যদি জীবের মঙ্গল হয় তাহা কি তুমি করিবে না? আর তাহা হইলে কি কৃষ্ণকে তুমি ক্রয় করিবে না ? মা, আমাকে বধ করিতে বলিতেছি না। মা, আমি বাইব, আবার আসিব, তােমাকে প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি। শচী। বাপ, আমাকে তো বুঝাইতেছ, সেই বালিকা বধমাতাকে কি বলিয়া বুঝাইবে বল দেখি? নিমাই! সে স্বচ্ছন্দ মনে আমাকে বিদায় দিবে। শচী। তাহা হইতে পারে, কারণ তােমর শক্তিতে নদীয়া এখন আর একরূপ হইয়াছে। সকলে কৃষ্ণনামে উন্মত্ত, সকলে সংসারে উদাস। ভৰু বৌমা যে তােমাকে স্বেচ্ছাপূর্বক ছাড়িয়া দিবেন ইহা হইতে পারে না। নিমাই। তাহার যদি আমার উপর প্রকৃত মেহ থাকে তবে বুঝাইতে কষ্ট কি? আমি তাহাকে এক প্রকার বুঝাইয়াছি। আমি তাহাকে বলিয়াছি যে, “হে সা!ি তুমি আমাকে ভালবাসি, আমি তােমাকে ভালবাসি, আর তুমি থাকিবে, আমিও থাকিব, মনের মিলন যেমন তেমনি থাকিবে, তবে তুমি অধিক কি চাও? আমি সংসার ত্যাগ করিলে আমার মঙ্গল হইবে, এমন কার্যে আপনার মায়িক সুখের জন্য কি তুমি আমাকে বাধা দিবে ?” সে স্বচ্ছন্দে বলল “না।”
নিমাই-সন্ন্যাস।
তবে তাহার পক্ষ হইতে মা আমার একটা নিবেদন আছে। আমি
গৃহত্যাগ করিলে তাহার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ লােপ হইবে। তুমি এই
কাৰ্যটী করিও, তাহাকে কৃষ্ণনামে শিক্ষা দিও।
শচী। বাবা, তােমার ঘরণীকে কৃষ্ণনামে শিক্ষা কি আমাকে দিতে
হবে? বাপ, তার সহিত তােমার সম্পর্ক লােপ হবে, আমার সহিত
হইবে নাকি ?
ও নিমাই আমাকে কি আর তুই “মা” বলিবি না ?
নিমাই। শাস্ত্রমতে বলিতে নাই, কিন্তু আমি বলিব। ইহকালে পরকালে
তুমি আমার মা থাকিবে, ইহা আমি সত্য সত্য বলিতেছি।
শচী। তবে একটা কথা রাখ। তুমি কিছুকাল থাকিয়া যাও, আমি
তােমাকে প্রাণ ভরিয়া দেখিয়া ও বঁধিয়া খাওয়াইয়া লই।
নিমাই। মা, যে আজ্ঞ। আমি দ্যবধি সহজ মানুষ হইলাম ও
অন্যের ন্যায় গৃহস্থালী করিব।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
শচীর বাটীর প্রাঙ্গণ।
নিত্যানন্দ ও ভক্তগণ শচী, নিমাই। (নেপথ্যে হরি হরিবােল, হরিবোল।
( কয়েকটী ভক্তের প্রবেশ।)
ভক্তগণের গীত।
প্রভু দয়াল, সাধু মুখে আমি শুনেছি।
অকুল পাথারে পড়ে ডাকৃতেছি।
অস্পৃশ্য পামর আমি,
দয়ার ঠাকুর তুমি,
অগতির গতি প্রভু মনে জেনেছি।
করিতে পাততােদ্ধার,
এবার নদেয় অবতার,
আমার সমান পতিত প্রভু কোথা পাবে আর ।
তুমি দিয়ে চরণ তন্নী,
উঠাও হে কেশে ধরি,
আমি আশা করিয়ে চেয়ে রয়েছি।
৪৮ নিমাই সন্ন্যাস ( ভক্তগণের প্রভুকে প্রণাম ও করযোড়ে সম্মুখে দণ্ডায়মান।) নিতাই। প্রভু অদ্য যে সমুদায় নগর ভাঙ্গিয়া তােমাকে দর্শন করিতে আসিতেছে। নিমাই। (স্বগত) কারণ অদ্য আমি বিদায় হইব। নিতাই। প্রভু, কি বলিলে বুঝিতে পারিলাম না। নিমাই। ( ভক্তগণের প্রতি তােমাদের শ্রীকৃষ্ণে মতি হউক। প্রথম ভক্ত। অনুমতি করুণ, এই মালাছড়া আপনার গলায় দিব। নিমাই। অগ্রবর্তী হও। ( নিমাইয়ের নিজের গলার মালা ভক্তের গলায় প্রদান, ভক্তের নূতন মালা প্রভুর গলায় পরাইয়া প্রভৃকে যাষ্টাঙ্গে প্রণাম।) দ্বিতীয় ভক্ত। কিঞ্চিৎ দুগ্ধের সর আনিয়াছি। প্রভু, গ্রহণ করুন, আমার গােষ্ঠি উদ্ধার হউক। (সয়ের পাত্র রাখিয়া প্রণাম ।) তৃতীয় ভক্ত। আমি কিঞ্চিৎ দুগ্ধ আনিয়াছি। প্রভূ গ্রহণ করিয়া আমার কুলকে পবিত্র করুন। (দুগ্ধপাত্ত রাখিয়া প্রণাম। চতুর্থ ভক্ত। আমি কিঞ্চিৎ ননী আনিয়াছি, প্র গ্রহণ করুন। (ননী রাখিয়া প্রণাম) প্রভু, অমর কিরূপে ভবসাগর পার হই তাহার অনুমতি করুন। মাই। তোমরা নাম কীর্তন করিও। দশে পচে মিলে সংকীৰ্ত্তন করিবে, না হয় স্ত্রী পুত্র, পিতা মাতা, ভ্রাতা ভগিনী লইয়া কীৰ্ত্তন করিও। মৃদঙ্গ করতাল না থাকে শুধু হাতে তালি দিয়া নাম কীর্তন করিও। ইহাতে কোন নিয়ম নাই। শুচি অশুচি দিবানিশি কিছু মানিত হইবে না। সকলে। জয় শচীনন্দন ! জয় পতিতপাবন ! জয় কাঙ্গালের ঠাকুর
তৃতীয় অঙ্ক।
৪৯
নিমাই। আর তােমরা যতক্ষণ পার নাম জপ করিও। সে নাম এই
যথা,
হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ;
হরেরাম হরেরাম, রাম রাম হরে হরে।
ভুবন উজজ,
জনৈক ভক্ত।
জয় শচীনন্দন।
করুণা করিয়ে দাসে করহে অরণ।
তুমি আমার,
আমি তােমার,
ভুলিল মাের মন।
তৰ বদন কমল,
পরিমলে টলমল,
কোটী ইন্দু সুশীতল,
দেহি চরণকমল মধুপান।
তব বদনচন্দ্রমা,
শারদ পূর্ণিমা,
ছার চাদ কি উপমা,
বলরামে দাওহে ক্ষমা,
দেহি দেহি ভকতি দান।
(গীতের সময় প্রভু লজ্জিত ভাবে উপবেশন।)
সকলে। হরি হরিবােল।
প্রভু। তােমরা আমাকে কেন লজ্জা দাও।
( শ্রীধরের লাউ লইয়া প্রবেশ ও লাউ রাখিয়া প্রণাম।)
নিমাই। কি শ্রীধর, এত রাত্রে যে লাউ ?
শ্রীধর। শুধু হাতে দর্শনে কিরূপে আসিব, আর কিছু জুটিল না তাই
লাউ লইয়া আসিয়াছি।
নিমাই। অধিক রাত্রি হইয়াছে, যাও বাড়ী যাও। (স্বগত) রেক
নিমাই-সন্ন্যাস।
দ্রব্য নষ্ট হইবে তাহা হইবে না, অন্য রাত্রেই এই লাউ আহার করিতে
হইবে। (প্রকাশ্যে ) মা, দুগ্ধ পেলে, লাউ পেলে, পায়েস রধিতে
দাও। মা, আমার নিমিত্ত কেমন হার গড়াইলে দেখিলাম না।
আর শ্রীঅদ্বৈত আচাৰ্য্য যে অতি সূক্ষ্ম শান্তিপুরে ধুতি পাঠাইয়াছেন
তাহাও নিয়ে এস।
শচী। ( আনন্দের সহিত) যাই আমি বউমাকে পায়েস বধিতে
বলি। আর হার ও ধুতি আনিতেছি, এখনি পরিতে হবে। দেখিয়া
নয়ন জুড়াইব।
( শচীর প্রস্থান।
শ্রীধর।
গীত।
এ তরঙ্গে কুল দাও গােৱা গুণমণি।
কুলে কুলে ভেসে বেড়াই,
কোথা ওহে দয়াময়,
ধর ধর দাও দাও চরণ তরণী।
( শচীর প্রবেশ)
শচী। এই ধুতি এই হার ধর এখনি পর। আমি নয়ন ভরিয়া দেখি ।
নিমাই। (আভরণ ও বসন পরিতে পরিতে) হাঁ পরিব, (স্বগত) নতুবা
তােমার মনে বড় কষ্ট থাকিবে। (পরিয়া) দেখ মা কেমন দেখাইতেছে।
কিন্তু ইহা পরিয়া বাহিরে গেলে লােকে বিদ্রুপ করিবে।
শচী। কেন বাছা তুমি ত এখন শিশু বই নয়। নদীয়ায় তােমাকে
শিশু অধ্যাপক বলে। অন্ন প্রস্তুত, অধিক রজনী হইয়াছে, শীঘ্র
ভােজনে আইস। সকলকে বিদায় দাও।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। নিমাইর শয়ন কক্ষ। ( পালঙ্কে নিমাই উপবিষ্ট।) নিমাই। (স্বগত) হার পরিলাম, ধুতি পরিলাম, আর দুই চারি দণ্ড পরে দেশ ও সংসার ত্যাগ করি। না পরিয়া গেলে মার মনে এই বড় দুঃখ রইত যে এ নূতন দ্রব্য আমি একদিনও ব্যবহার করিলাম । বিষ্ণুপ্রিয়ার নিকট পূর্বে বিদায় লওয়া আছে। অন্য রজনী শেষে আমি গৃহত্যাগ করিব। একথা সেও জানে না, কেহ জানে না। অদ্য প্রেম তরঙ্গ উঠাইতে হইবে। অদ্য বিষ্ণুপ্রিয়াকে আনন্দ সাগরে ভাসাইব। অদ্য একবার যুবতী স্ত্রীর যুবক স্বামী হইয়া তাহার সহিত খেলা করিব। ইহার নিমিত্ত লােকে আমার নিন্দা করিবে। বলিবে “তাহাকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করিয়া যাইবার দিন প্রতি বাড়াইলে কেন ? ইহাতে তাহার স্বামীর বিরহ জনিত কষ্ট আরও বাড়িবে। আমার অদ্য রজনীর প্রীতি ব্যবহারে হয় ত তাহার বিরহ-অগ্নি বৃদ্ধি পাইবে। কিন্তু আমাকে সে শীঘ্র ভুলিয়া যায় একথা ত ভাল নয়। আমার প্রতি তাহার যাহাতে প্রীতির বন্ধন হয় তাহাই করা উচিত। স্ত্রীর উচিত, স্বামীর চিত্রটি হূর্তেও হৃদয় হইতে বিদূরিত না করে। আমার বিরহ জীবের, বিশেষত বিষ্ণুপ্রিয়ার, বহুমূল্য ধন নিমাই সন্ন্যাস। ( ফুলহার, চন্দন প্রভৃতি উপহার হন্তে শ্ৰীমতীর প্রবেশ ও কপাট বন্ধ ) নিমাই। ( সহাস্যে) এস এস প্রিয়ে। আমার প্রাণপ্রিয়ে। বিষ্ণুপ্রিয়া। আজ যে বড় আদর! এত আদর দেখে যে আমার ভয় করে। তুমি যখন শয়ন ঘরে এস তখন বিহবল থাক, আর “কৃষ্ণ কৃষ্ণ” বলিয়া রােদন কর। তুমি ঘরে আসিয়া প্রায়ই আমাকে লক্ষ্য কর না। আজ আমার ভাগ্য এত প্রসন্ন হইল কেন? নিমাই। দেখ, আমার মনে চিরদিনই একটা বড় সাধ আছে, সেইটা আজ পূর্ণ করিব, তাহাতেই মন বড় প্রফুল্ল। আজ আমি তােমাকে একবার সাজাবাে। বিষ্ণু। পুরুষ মানুষ নাকি আবার সাজাতে জানে? আচ্ছা তুমি আমাকে সাজাইও, তবে আগে তােমায় আমাকে সাজাইতে দাও। নিমাই। বেশ ত, সাজাও। বিষ্ণু। ভাল কথা। তুমি এ বেশ ভূষা কোথা পেলে ? দিব্য হার, দিব্য ধুতি। নিমাই। তুমি কি জান না, মা আমার জন্য এই হার গড়াইয়া দিয়াছেন, আর শ্রীঅদ্বৈতাচাৰ্য শান্তিপুর হইতে এই ধুতি পাঠাইয়া দিয়াছেন। বিষ্ণু। আমি শুনেছি, আমার দেখিবার সাবকাশ কই? দিবানিশি অতিথি সেবা, কত রন্ধন করিতে হয় তাকি তুমি জান ? দাও ও হারছড়া আমাকে দাও, আমি ভাল করে তােমাকে পরিয়ে দিই। নিমাই। আগে তােমাকে পরাইয়া দিই। (হার পরাণ) এত তােমার হার, পুরুষ মানুষে কি প্রবীণ অধ্যাপকে কি হার পরে? বিশেষত আমি ত আর এখন শিশু নই।
তৃতীয় অঙ্ক।
বিষ্ণুপ্রিয়া। তুমি যে আজই বড় প্রবীণ হইয়াছ, আর বৃদ্ধ হইয়াছ।
২৪ বৎসরও হয় নাই এখনি বুড়া? (হার পরাণ)
নিমাই। একি করিলে, আমার সহিত হার বদলাইলে? তবে তো তুমি
আমার হইলে ?
বিষ্ণুপ্রিয়া। পূর্বে বুঝি আর কাহারও ছিলাম?
নিমাই। তা কি জানি।
বিষ্ণুপ্রিয়। তােমার এ ভাব দেখিয়া সুথ ত হইতেছে না বরং ভয়
করিতেছে। তােমাকে তো এরূপ কখনও দেখি নাই। বলিতে কি,
আমি তােমাকে স্বয়ং ঠাকুর ভাবিতাম, ভয়ে কাছে যাইতে সাহস
হইত না।
নিমাই। ভয় হইত বুঝি কামড়াইয়া দিব ; কই, সাজাইলে না?
বিষ্ণুপ্রিয়া। এই দিই। কি সুন্দর মুখ, কি সুন্দর ছবি। (নিমাইকে
সাজান।)
নিমাই। এখন আমার পালা। (বিষ্ণুপ্রিয়াকে সাজান) (বিষ্ণুপ্রিয়ার
হস্তে দর্পণ দিয়া) দেখ, কেমন হইয়াছে ?
বিষ্ণুপ্রিয়া। (দর্পণ লইয়া নিমাইকে দিয়া) আগে তুমি দেখ তােমাকে
কেমন সাজাইলাম।
নিমাই। তােমার রূপ বর্ণনা করিয়া একটা ছড়া গাঁথিয়াছি। আমি
গাই, তুমি নৃত্য কর।
বিষ্ণু। স্ত্রীলােকে নৃত্য করিবে সে আবার কি ?
নিমাই। কেন, আমরা যখন বাহিরে কীর্তনে নৃত্য করি, তখন তােমরা
তো গৃহের মধ্যে নৃত্য কর।
বিষ্ণু। সে কথা তুমি কিরূপে জানিলে? তখন কি জ্ঞান থাকে, সকলে
৫৪ নিমাই-সন্ন্যাস। - অজ্ঞান হইয়া যায়। জ্ঞানশূন্য হইয়া তােমরা যেমন কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া কীৰ্ত্তন কর, আমরাও সেই সঙ্গে নৃত্য করি। নিমাই। তবে তুমি ধুয়া ধর, আমি ছড়া বলি। ধূয়াটা এই ;-চাঁদ- বদনী ধনী মৃগনয়নী। বিষ্ণু। বল কি? আমার লজ্জা করে। নিমাই। আমার কাছে লজ্জা করে, এ বড় অন্যায়। বিষ্ণু। কবে তুমি আমার লজ্জা ভাঙ্গিলে? তুমি আমার কাছে যখন এস ঠাকুর হইয়া এস, আমি প্রণাম করি। নিমাই। আচ্ছা, ছড়া গুন ;- সজনয়নী বালা মুখ নাই তােলে, পড়িল পড়িল ভ্রমর পদ্মমধু ভােল। হিঙ্গুলে রঞ্জিত ঠোট কাপে মৃদু মৃদু, প্রেম সয়ােবর আঁখি ঝরে বিন্দু বিন্দু। নয়নের তারা আধ পদ্মদলে ঢাকা। জনমের মত হিয়ার মাঝে রইল আঁকা। নানাভাব খেলে মুখে চঞ্চল চপল। কঠিন পুরুষ আমায় করিলে পাগল। বিষ্ণুপ্রিয়ার আজ্ঞা পেয়ে বলাই মালা গাঁথে। অঞ্জলি করিয়া দিল প্রিয়াজীর হাতে। নিমাই। তােমার চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু করিতেছে, এসো নিদ্রা যাই। বিষ্ণু। না, আমি নিদ্রা যাইব না। নিমাই। (স্বগত) তাহা হইলে আমি যাই কিরূপে? ( প্রকাশ্যে ) এসো, নিদ্রা যাই। প্রদীপটা ঢাক, যেন একেবারে অন্ধকার না হয়।
তৃতীয় অঙ্ক। বিষ্ণু। না, আমি ঘুমাইব না। নিমাই। সে কি ? অসুখ হবে। ঘুমাইবে না কেন? বিষ্ণু। তােমার ভাব দেখে আমার মনে ল’চ্ছে যে তুমি আমাকে অন্ত রাত্রি হাড়িয়া যাইবে, তাই এত আদর। আমি ঘুমাইব না। নিমাই। (স্বগত) তবে ত গােল। ( প্রকাশ্যে ) ঘুমাও এসে আমরা দুজনে শয়ন করি। বিষ্ণু। আমি কখন ঘুমাইব না। ঘুমাইলে তুমি আমাকে ফাঁকি দেবে। নিমাই। (স্বগত) তবে কি জীবে উদ্ধার হইৰে না? জোর করিয়া ঘুম পাড়াইতে হইবে। ( প্রকাশ্যে দৃঢ়তার সঙ্গে ) ঘুমাও! ঘুমাও। আমার আজ্ঞায় ঘুমাও! এখনি ঘুমাও! বিষ্ণু। একি গাে, এই যে আমার নয়ন ঘুমে জুড়িয়া গেল; আমি যে নিবারণ করিতে পাছি না। {করযােড়ে) হে নিদ্রাদেবী! আমাকে ক্ষমা দাও। তুমি ক্ষমা না দিলে প্রভু আমায় ফেলে যাইবেন। কই দিলে না? দিলে না ? তবে তুমি নারীবধের ভাগি হবে। নিমাই। প্রিয়ে তুমি ঠিক বুঝিয়াছ। আমি এখনি যাইব। তবে নিদ্রাদেবীকে তুমি সাঁপ দিতেছ, সে সাপ তাহাকে লাগিবে না। যেহেতু উদ্দেশ্য জীব উদ্ধার। প্রিয়ে মনে রেখে যে তােমার কষ্টে জীবের মঙ্গল। বিষ্ণু। পারিলাম না, পারিলাম না। ঘুমে অচেতন করিল। তােমাকে হৃদয়ে করিয়া ভুজলতায় বান্ধিয়া শুইব। (নিমাইকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া, তঁাহাকে লইয়া পালঙ্কে ঢলিয়া পতন।) (একটু পরে নিমাই ধীরে ধীরে উঠিলেন, আপনার পাশের বালিশ বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীর পায়ের ভিতর এবং মাথার বালিশ বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীর ক্রোড়ের নিকটে রাখিলেন, তাহার পর সুবর্ণের হার খুলিয়া রাখিয়া
নিমাই-সন্ন্যাস
এবং সূক্ষ্ম বস্তু পরিত্যাগ করিয়া মলিন ক্ষুদ্র বসন পরিধান করিলেন।
পরে প্রিয়ার কপাল চুম্বন করিয়া, প্রদীপ নিভাইয়া, দুয়ার খুলিয়া,
নিষ্ক্রান্ত হইলেন। *
বিষ্ণু। (চমকিত হইয়া উঠিয়া) কই প্রভু! (স্বামীকে ক্রোড়ে না
দেখিয়া পালঙ্কে হাত বুলান) কই তুমি কোথা গেলে? তুমি কি
বাহিরে গিয়াছ ?t দ্বার যে খােলা দেখিতেছি। (ঘরের বাহিরে
আসিয়া) কই, এখানেও তো নাই, তবে কোথায় গেলেন? ( আকার
ঘরে আসিয়া প্রদীপ জালিয়া) এই যে গলার হার পড়িয়া
আছে। ভাল ধুতিও পড়িয়া আছে,
অন্য ধুতি পরিয়াছেন।
কোথায় গেলেন? ওমা! তিনি না পূর্বে বলেছিলেন গৃহত্যাগ
করিবেন! ভাল কথা মনে হলাে,আর এইমাত্র না তিনি বলিলেন
যে এখনি যাইবেন। নিশ্চয়ই তবে আমাকে ছেড়ে গিয়াছেন।
হা কৃষ্ণ! দুঃখিনীর বন্ধু! এ আমার কি হােলাে? নিশ্চয়ই তিনি
চলে গিয়াছেন। তাই বুঝি এত আদর ? এখন বুঝিলাম যে
জন্মের মত একটা সুখের রাত্রি দিয়া যাইবার দিনে আমাকে এত
* নিদ্রিতা শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়ার শ্রীবাম চরণে।
পার্শ্বেপধানপরি করিয়া রক্ষণে।
বক্ষস্থলে নিজ গণ্ড উপাধান দিয়া।
বাহির হইল গােরা দ্বার উদঘাটিয়া।
বংশীশিক্ষা।
। এথা বিষ্ণুপ্রিয়া, চমকি উঠিয়া,
পাৰুে বুলায় হাত।
উঠিল কাদিয়া,
শিরে মারে করাঘাত।
প্রভু না দেখিয়া
তীয় অঙ্ক।
মুখে ভাসাইয়াছিলেন! আমার দিকে যে চাইয়াছিলেন, তাহা এখন
মনে পড়িতেছে। সে দেখা নয়, গুপ্ত রােদন। চোখে হাসি, কিন্তু
অন্তরে রােদন। ( ধীরে ধীরে শচীর গৃহদ্বারে গিয়া দ্বারে আঘাত )
মা উঠ, উঠ, ওমা!
শচী। (দুয়ায় খুলিয়া) কি, বউমা? নিমাই ভাল আছে ত?
লিষ্ণু। আমি ঘুমাইয়াছিলাম, জেগে উঠে দেখি তিনি ঘরে নাই। *
ঘরে যে ধুতি পরিয়াছিলেন তাহা পড়িয়া আছে, গলার হার রহিয়াছে।
শচী। ( দ্রুত প্রদীপ জ্বলিয়া বিষ্ণুপ্রিয়ার সহিতে ঘরের বাহির হইয়া
চলিয়াছেন। এই যে বাহিরে দ্বার খােলা। ও নিমাই, ও নিমাই,
তুই কোথা গেলি? ও নিমাই, ফিরে ঘরে আয় ! নিমাই ও নিমাই,
বাপ আমার ! । আর আমি তােকে সঙ্কীর্তনে বাধা দেব না।
(বিষ্ণুপ্রিয়াকে) মা, রাজপথে তােমার যাওয়া ভাল নয়, আমি বাহিরের
দুয়ারে বসি, তুমি ভিতরে যাও। (বিষ্ণুপ্রিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ)
* শচীর মন্দিরে আসি, দুয়ারের পাশে বসি,
ধীরে ধীরে কহে বিষ্ণুপ্রিয়া ।
শয়ন মন্দিরে ছিল, নিশাযােগে কোথা গেল,
মাের মুণ্ডে বজর পাড়িয়া।
+ গৌরাঙ্গ জগয়ে মনে নিদ্রা নাহি দু'নয়নে,
শুনিয়া উঠিল শচীমাতা।
আলু থালু কেশে ধায়,
বসন না রহে গায়,
শুনিয়া বধুর মুখের কথা।
ত্বরিতে জালিয়া বাতি দেখিলেন ইতি উতি,
কোন ঠাই উদ্দেশ না পেয়ে।
বিষ্ণুপ্রিয়া বধু সাথে কাদিতে দিতে পথে,
ডাকে শচী নিমাই বলিয়ে।
বা ঘােষ।
৫৮
নিমাই-সন্ন্যাস।
ঈশান!
এ দিকে এসাে, আমার কঁকাল ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে।
(ঈশানকে হেলান দিয়া উপবেশন) ও ঈশান! (সঙ্কেত দ্বারা দেখান
যে নিমাই চলিয়া গিয়াছে।)
( বাসের প্রবেশ)
শ্রীবাস। মা, কেন বাহির দুয়ারে ?
(শচীর সঙ্কেত দ্বারা দেখান যে, নিমাই গিয়াছে।)
(অন্যান্য ভক্তগণের প্রবেশ। *)
নিতাই। ব্যাপার কি ?
শচী। বাপ সকল, আমি কিছুই জানি না। আমার ঘর ধন-ধান্তে
পরিপূর্ণ, তােমরা সমুদায় ভাগ করিয়া লও, আর আমি গঙ্গায় প্রবেশ
করি, তােমরা নিষেধ করিও না। নিমাই চলিয়া গিয়াছে।
ব্যস্ত হইতেছেন কেন? কিসে ঠিক জানিলেন যে তিনি
একেবারে গৃহত্যাগ করিয়াছেন ? একটু স্থির হােন, আমরা একটু
পরামর্শ করি। ( নিত্যানন্দের প্রতি। আসুন, আমরা একটু দূরে
যাই। (দুরে গমন) = পাদ, আপনার কি বােধ হয় ?
নিতাই। আর কি বােধ হইবে, যাহা হইবার হইয়াছে। আমার বােধ
হয় প্রভু গৃহত্যাগ করিয়াছেন।
শ্ৰীবাদ। আমারও তাই বােধ হয়। আমাদের সকলেরও সংসারে জলাঞ্জলী
দিয়া প্রভুর পশ্চাৎগামী হওয়াই উচিত। তবে একবার অন্বেষণ
করিয়া দেখা কর্তব্য। পৃথিবীর যেখানে যেখানে সন্ন্যাসের স্থান
* সকল মহান্ত মেলি, সকালে সিনান করি,
আইল গৌরাঙ্গ দেখিবারে,
গৌরাঙ্গ গিয়াছে ছাড়ি,
বিষ্ণুপ্রিয়া আছে পড়ি,
শচী কানে বাহির দুয়ারে।
শ্রীবাস।
তৃতীয় অঙ্ক।
আছে সেই সকল স্থান নির্ণয় করা হউক। আমরা স্থান ভাগ
করিয়া লই। প্রত্যেক স্থানে চারি পাঁচজন প্রভুর অন্বেষণে গমন করুন।
নিতাই। কিন্তু, আগে একবার কাটোয়ায় খোঁজ করিয়া দেখা যাক।
প্রভু আমাকে একদিন কথাচ্ছলে বলেছিলেন যে, তিনি কাটোয়ায়
কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করিবেন। আমি জনকয়েক
বিজ্ঞলােক লইয়া সেখানে চলিলাম।
চলুন, শচীমার নিকট
বলিয়া যাই।
( শচীর নিকট আগমন।
প্রভু কোথা গিয়াছেন বােধ হয় আমি জানি, আমি সেখানে চলিলাম।
আমি আপনার নিকট প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, তাঁহাকে আনিয়া
আপনার সহিত মিলন করাইয়া দিব। মা বিষ্ণুপ্রিয়া কোথায় ?
ঈশান। তিনি তাঁহার শয়ন-পালঙ্কের তলে মৃত্তিকায় অচেতন হয়ে
পড়ে আছেন।
নিতাই। আমরা প্রভুকে আনিতে চলিলাম, তাকে বলি ও।
চতুর্থ অঙ্ক।
গর্ভাঙ্ক।
তুমি ?
প্রথম
কাটোয়া সুরধনী তীর।
(বটতলায় কেশব ভারতী ধ্যানে মগ্ন, নিমাইর প্রবেশ।)
নিমাই। স্বামী, আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। (যাষ্টাঙ্গে প্রণাম )
ভাৱতী। (ধ্যানাতে) কে গা তুমি? ( একদৃষ্টে নিরীক্ষণ) কে গা
তুমি কি মনুষ্য না দেবতা? তুমি আমাকে প্রণাম
করিতেছ, কিন্তু তােমার তেজ দেখিয়া বােধ হইতেছে তুমি মনুষ্য
নও, আমারই তােমাকে প্রণাম করা উচিত।
( সম্রমে গাত্রোত্থান।)
নিমাই। (করযােড়ে) আমি, আমি সামান্য সংসার-বদ্ধ জীব, ভবসাগরে
হাবুডুবু খাইতেছি। আমাকে আপনি উদ্ধার করুন।
ভারতী যেমন দেখিতেছি, তাহাতে বােধ হয়, তুমি মনুষ্য নয়, দেবতা,
তুমিই আমাকে উদ্ধার করিতে পার।
চতুর্থ অঙ্ক। নিমাই। ঠাকুর, ও কথা বলিবেন না। আমাকে লােকে নিমাই বলিয়া ডাকে, নবদ্বীপে বাড়ী। ঠাকুর প্রতিশ্রুত আছেন যে আমাকে আপনি সন্ন্যাস দিবেন। ভারতী। বটে, আমার স্মরণ হইল। তুমি নিমাই পণ্ডিত, নব- দ্বীপের অবতার ? গােলােক ত্যাগ করিয়া, জীব উদ্ধারের নিমিত্ত নদিয়ায় উদয় হইয়াছ? আমি তােমার বাড়ীতে ভিক্ষা করি, আর তােমাকে সন্ন্যাস দিব এ কথা স্বীকার করি। কিন্তু, তুমি সন্ন্যাস চাও কেন? তােমার তাে সন্ন্যাসে প্রয়োজন নাই, যাহা দেখিতেছি তাহাতে যুঝিতেছি যে তুমি সন্ন্যাসী অপেকা অনেক শ্রেষ্ঠ। নিমাই। ঠাকুর, আমি শ্রীকৃষ্ণকে হারাইয়াছি, তাঁহার অন্বেষণে বৃন্দাবনে যাইব। (উদ্ধে চাহিয়া ) কৃষ্ণ কৃপাময় ! আমাকে দেখা দাও। আমার প্রাণ আকুল, তােমা বিনা এ ভুবন অন্ধকার। ভারতী। তুমি শ্রীকৃষ্ণকে অন্বেষণ করিতে যাইবে শুনিলে হাসি পায়। তুমিই তো শ্রীকৃষ্ণ! নিমাই। (শিহরিয়া) ঠাকুর, বলেন কি? ও কথা কি বলিতে আছে ? ভারতী। তুমি যে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ! তােমাকে যে দিন নদীয়ায় দর্শন করি সেই দিনই আমি তাহা জানিতে পারি, এখনও তাই দেখিতেছি। তােমার এ আবার কি লীলা? তুমি সন্ন্যাস করিবে, শ্ৰীমতী কি আবার মান করেছেন ? কলিযুগে আবার কি কৃষ্ণলীলা আরম্ভ হইল ? নিমাই। উহু! উহু! আমি একে কৃষ্ণকে হারাইয়া মরিয়া আছি, তাহার পর স্বামী আবার এইরূপ কথা বলিয়া আমার মৰ্ম্মস্থানে আঘাত করিতেছেন। প্রভু, আমাকে আর ছলনা করিবেন না, আমাকে সন্ন্যাস দিন, আমি বৃন্দাবনে চলিয়া যাই। কৃষ্ণ! আমি এলাম, নিমাই-সন্ন্যাস আমি এখনি এলাম। আমাকে খালাস করিলেই আমি এক দৌড়ে তােমার চরণে উপস্থিত হইব। ভারতী। আমাদের সকলের তােমাকে প্রণাম করা উচিত। তুমি আমাকে গুরু বলিয়া প্রণাম করিবে আর তােমার চরণধূলী গ্ৰহণ করিবার যে সুখ, তাহা হইতে আমাকে বঞ্চিত করিবে। শুধু কি তাই, তুমি সকলের প্রণম্য, তুমি আমাকে প্রণাম করিয়া আমার সর্বনাশ করিলে। যাও, আম হইতে তােমার সন্ন্যাস হইবে না। নিমাই। আপনি প্রতিশ্রুত আছেন, যে সন্ন্যাস দিবেন। ভারতী। তা আছি, কিন্তু সন্ন্যাসের এ সময় নয়, তােমার কচি বয়স। আগে পঞ্চাশ বৎসর উত্তীর্ণ হও, তখন আসিও। নিমাই। ঠাকুর, আমার প্রাণ বাহির হইতেছে, তুমি কৃপা করিয়া আমাকে খালাস করিয়া দাও। তুমি আশা দিয়াছিলে, সেই আশায় নির্ভর করিয়া আমি তােমার আশ্রয়ে আসিয়াছি। ভারতী। আমি জানি, তােমার বৃদ্ধা মাতা আছেন, তরুণী ভাৰ্য্যা আছেন, ইহাদিগের প্রাণবধ করিয়া তুমি সন্ন্যাস লইবে। এ কাব্যে আমা হতে তােমার কোন সাহায্য হইবে না। (গ্রামস্থ লােকের কমে আগমন) নিমাই। ঠাকুর, আমি কি আবার স্মরণ করাইয়া দিব যে আপনি প্রতিশ্রুত আছেন ? ভারতী। (রুক্ষ্মভাবে) তুমি বার বার আমাকে ঐ কথা বলিতেছ, আমি কি এই মাঘ মাসেই তােমাকে সন্ন্যাস দিব ইহাই বলিয়াছি ? ( ক্রমে জনতা বৃদ্ধি।) নিমাই। (বােদন করিতে করিতে) আমার যাওয়া হইল না। হা কৃষ্ণ চতুর্থ অঙ্ক। কৃপাময় । আমি কি করিব, আমি কোথায় যাব ? আমি কোথা গেলে তােমাকে পাবাে ? আমি বৃন্দাবনে গেলে তােমাকে ধরিতে পারিতাম। (ক্ৰমে জনতা বৃদ্ধি।) ভারতী। নিমাই, সন্ন্যাসের যে কি কষ্ট তা তুমি জান না। আমাদের কঠিন প্রাণ বলিয়া বাঁচিয়া আছি, তােমার দেহ নবনীর ন্যায় কোমল, তুমি কেমন করিয়া মৃত্তিকায় শয়ন করিবে? তুমি অল্পদিনের মধ্যেই মারা যাইবে। নিমাই, তােমাকে দর্শনমাত্র তােমাতে আমার পুত্র-বাৎসল্য জন্মিয়াছে। আমরা সন্ন্যাসী সমস্ত মানসিক কোমল ভাব ধ্বংস করিবার চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু তুমি সন্ন্যাস লইবে শুনিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। চেয়ে দেখ দেখি কাহারা আসিয়াছে, আর তাহারা কি বলে ? ঐ দেখ নিমাই, স্ত্রীলােকেরা কলসী কাখে করিয়া দাঁড়াইয়া তােমাকেই একদৃষ্টে দেখিতেছে। কুলবধুগণ অবগুণ্ঠনের ভিতর হইতেও তােমার দিকে চাহিয়া আছে নগরবাসীগণ সকলে প্রাত্যহিক নিত্যকর্ম ভুলিয়া একে একে আসিয়া তােমার চারিপাশে ঘিরিয়া দাড়াইতেছে একজন বৃদ্ধ। কে গা বাছা তুমি? তােমার কি মা আছেন ? তুমি তাহাকে প্রাণে মারিয়া সন্ন্যাস নিতে এসেছো? বাছা, বাড়ী ফিরে যাও, মাথা খাও, বাড়ী ফিরে যাও। মাতৃবধ করিও না। জনৈক রমণী। শুনিলাম, তােমার নাকি ঘরণী আছেন ? তুমি সন্ন্যাসী হবে, তাহার কি করে এলে ? এমন নিষ্ঠুরতা কোর না। ( গদাধর, নিত্যানন্দ, মুকুন্দ ও নিমাইর মেশাে চন্দ্রশেখরের প্রবেশ) নিতাই। (চীৎকার করিয়া) এই যে প্রভু! এই যে প্রভু! (দ্রুত আগমন ও প্রভুর সম্মুখে মৃত্তিকায় পতন।)
৬৫
নিমাই-সন্ন্যাস।
নিমাই। এসেছো? বেশ হয়েছে। আমি এখনি খালাস হইব। মুকুল
একবার কৃষ্ণমঙ্গল গীত গাও, আমার কর্ণ উপবাসী আছে, আমি
কতকাল কৃষ্ণ গুণ গান শুনি নাই।
মুকুল। যে আজ্ঞা, আমি আরম্ভ করিতেছি।
( নাগরিকগণের খােল করতাল লইয়া প্রবেশ)
রহস্য দেখ, প্রভু কীৰ্ত্তন শুনিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, অমনি খেল
করতাল উপস্থিত।
হরি হরয়ে নমো, কৃষ্ণায় যাদবায় নমঃ
যাদবায়, কেশবায়, গােবিন্দায় নমঃ,
বল গােপাল গােবিন্দ রাম শ্রীমধুসূদন।
( সকলের গীত ও প্রভুর বাহু তুলিয়া ভঙ্গী করিয়া নৃত্য।)
ভারতী। (গাত্রোখান করিয়া নিমাইকে পরিয়া) নিমাই, শান্ত হও,
আমার একটা কথা শ্রবণ কর। তােমরা সকলে নৃত্য-গীত করিতেছ
কেন ?
মুকুন্দ। আমরা গাহিয়া নাচিয়া ভজন করিয়া থাকি।
আমাদের যে
ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণ তিনি আমাদের প্রাণনাথ । তাহার নাম ও গুণগান
করিতেছি, একটু নাচিব গাহিব না ?
ভারতী। আচ্ছা, নিমাই, পৃথিবীতে লােকে যাহা যাহা প্রার্থনা করে,
যেমন, রূপ, বিদ্যা, ভাৰ্যা, পদ ইত্যাদি তাহা তােমার সকলই আছে,
তাহা পরিত্যাগ করিয়া তুমি পথের কাঙ্গাল হইতেছ, তােমার এজন্য
কলন করা উচিত। তুমি নাচ কেন ?
চতুর্থ অঙ্ক।
৬৫
মুকুন্দ। উনি নাচিবেন না কেন, উনি যে আনন্দময়।
ভারতী। তা বটে, সৰ্বম্ব ত্যাগ করিয়া, বৃদ্ধা মাতা ও নবযুবতী ভাৰ্য্য।
ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস আশ্রম লইবার সময় লােকে নৃত্য-গীত করে ইহা
জগতে এই প্রথম হইল। গাও, গাও, আমার শরীর এলাইয়া
পড়িতেছে।
হরি হরয়ে নমো কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ,
নমাে যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ ;
গােপাল গােবিন্দ রাম শ্রীমধুসূদন।
(প্রভুর নৃত্য)
ভারতী। একি, আমিও যে আর থাকিতে পারি না। আমারও
চরণ নাচিয়া উঠিতেছে।
(নৃত্য)
(নিমাই ও ভারতীর গলা ধরাধরি করিয়া নৃত্য)
নিতাই। (উভয়কে ধরিষা) আপনারা বিশ্রাম করুন।
ভারতী। (চমকিত হইয়া) এ কি করিলাম ! নৃত্য করিলাম? লােকে
কি বলিবে ? এই যে অনেকে উপস্থিত। তা হউক, অদ্য শরীর
জুড়াইল। ভাল নিমাই, তুমি সন্ন্যাস কেন চাও? আমরা ভবসাগর
পার হইব বলিয়া সন্ন্যাস লইয়াছি, তুমি দেখিতেছি স্বয়ং কাণ্ডারী।
তােমার সন্ন্যাসের কি প্রয়ােজন?
নিমাই। (চরণে পড়িয়া ক্রন্দন করিতে করিতে) একে আমি মরিয়া
আছি, আর আমাকে অবৈধ স্তুতি করিয়া বধ করিবেন না।
ভারতী। আমি তােমাকে সন্ন্যাস দিয়া বধ করিতে পারি না। তােমার
আকিঞ্চনে আমি হারি মা নলাম, কিন্তু তোমার ঘরণীর ও জননীর
নিমাই-সন্ন্যাস।
নিমাই।
সম্মতি লইয়া এস। মনে থাকে যেন, মনের সঙ্গে সম্মতি চাই।
তােমার যে তেজ, তাহাতে কেহ তােমার অবাধ্য হইতে পারে না,
আমি তাহাদের স্বেচ্ছাপূৰ্ব্বক যে সম্মতি, তাহাই চাহি।
নিমাই। খামিন, তাহারা সম্মতি দিয়াছেন।
ভারতী। তাহা হইতে পারে, কারণ তােমাকে রােধ করে পৃথিবীতে
এমন কেহ নাই। তুমি ফিরিয়া যাও, গিয়া আবার তাহাদের সম্মতি
লইয়া এস।
এ বড় কঠিন আজ্ঞ। তথচ আমি এ আজ্ঞা পালন করিব।
আমি তাহাদের সম্মতি লইতে চলিলাম। (গমন)
ভক্তগণ। প্রভু, দাড়াও, আমরাও আসি। ( নিমাই দাড়াইলেন)
ভারতী। (স্বগত) তুমিও যেই যাবে, আমিও এ স্থান ছাড়িয়া পলাইব।
হয়, কি করিতেছি ? সরল বালককে বঞ্চনা করিতেছি ? আর
আমি সন্ন্যাসী ? ছি! ( প্রকাশ্যে ) নিমাই, তুমি ফিরিয়া এস, আমি
তােমাকে সন্ন্যাস দিব।
নিমাই। স্বামিন, আমি জানি, আপনি দয়াময়। বােল হরিবােল !
(নৃত্য)
একজন নাগরিক। (নিমাইর প্রতি) বাবা বাড়ী যাও, তােমাকে দেখে
প্রাণ কাঁদিতেছে।
দ্বিঃ না। একবার তােমার মা ও স্ত্রীর কথা মনে কর; আহা, তাদের
কি দশা হবে?
নিমাই। বাপ সকল, তােমরা আশীর্বাদ কর যে আমি প্রাণনাথ
ঐকৃষ্ণকে পাই।
একজন প্রবীণ। স্ত্রীলােক। (চীৎকার করিয়া, কাদিয়া) ও বাপ, কি
চতুর্থ অঙ্ক। হেলো ! বাবা বাড়ী যা, বাবা বাড়ী যা! তাের মা এতক্ষণ হয়তো মরিয়া গিয়াছে। অপরা স্ত্রী। (অবগুণ্ঠনবতী) ওমা, প্রাণ যায়, প্রাণ যায় । ওগো তােমরা ওকে ভাল করে বারণ কর। ভারতী। কি আশ্চর্য্য! এ সমস্ত লােক কোথা হইতে আসিতেছে ? যেন পৃথিবী ভাঙ্গিয়া লােক আসিতেছে। এত লােক কি কাটোয়া নগরে ছিল? আমার তাে চিরকালের সাধন নষ্ট হইল। আমাদের নাচিতে নাই, নাচিলাম। এতদিন সাধনা করিয়া মায়ামােহ ত্যাগ করিয়া হৃদয় দৃঢ় করিলাম, আজ স্ত্রীলােকের ন্যায় কঁদিতেছি। শুধু আমি তো নই, সকলেই যে কঁদিতেছে! একি করুণা-রস সাগর যেন সহসা উছলিয়া উঠিল। (ভক্তগণের প্রতি আপনারা জানেন, সন্ন্যাসের জন্য দধি, ঘৃত, দুগ্ধ, মিষ্টান্ন, বস্ত্র, পুষ্প, পুষ্পমাল্য এবং কৌপিন বহির্বাস প্রভৃতি এই সমস্ত দ্রব্যাদি প্রয়ােজন, আর একজন নাপিতের প্রয়োজন। নিতাই। ঐ দেখুন, দ্রব্যসম্ভার আপনি আপনিই আসিতেছে। ( দধি, মিষ্টান্ন বস্ত্র ইত্যাদি লইয়া ক্ৰমে লােকের আগমন।) ভারতী। ইহারাই বা কিরূপে জানিল যে, এই সকল দ্রব্য এখনই প্রয়ােজন হইবে ? নিতাই। ঐ তো আমাদের প্রভুর রঙ্গ। প্রভু সন্ন্যাস লইতেছেন, তাই জগৎ কঁদিতেছে, আর সন্ন্যাসগ্রহণের উপকরণ যে আপন হইতে উপস্থিত হবে তাহা বিচিত্র কি? ভারতী। কি হে হরি প্রামাণিক ! তুমিও আসিয়াছ? বেশ, তােমার ক্ষৌরকাৰ্য্য করিতে হবে। হরিস। আমার দ্বারা এ কাৰ্য্য হইবে না।
নিমাই সন্ন্যাস
}
ভারতী। কেন ?
হরি। ও মাথায় কে হাত দেবে ? দেখ দেখি কেমন চুল! অমন
চুল জন্মে দেখি নি। ও চুল মুড়ান আমাকে দিয়ে হবে না।
নিমাই। হরিদাস, আমাকে খালাস করে দাও, আমি বৃন্দাবন যাবে।
শ্রীকৃষ্ণ তােমার ভাল করিবেন।
হরি। তা হােক, সে ভাল আমি চাই না। এই কাটোয়ায় অনেক
নাপিত আছে, ডেকে আনে। আমি ও মাথায় হাত দিতে পারিব না।
নিমাই। কেন, তােমার আপত্তি কি? প্রামাণিক, আমার হৃদয় বিদীর্ণ
হইতেছে, আমাকে শীঘ্ন খালাস করিয়া দাও।
হরি। আমারও বুক ফেটে যাচ্ছে। এই চুল আমি ক্ষৌর করিব ?
তােমাকে সংসারের বাহির করিব? আমা হ'তে তা হবে না।
আমি যদি মরি, আমার পুত্র যদি মরে, আমি যদি নরকে যাই, তবু
আমি পারিব না। * আমার প্রাণ চিরদিন বড় কঠিন, কিন্তু সেই
কঠিন প্রাণ আজ ফেটে যাচ্ছে। ( ক্রন্দন )
নিমাই। (নাপিতের গায়ে হাত দিয়া) শান্ত হও, কৃপা করিয়া আমাকে
খালাস করিয়া দাও।
হরি। দেখিতেছি, তুমি যে সে নয়, আমরা যে ঠাকুরকে পূজা করি,
তুমিই সেই ঠাকুর, আমাকে বধ করিতে ধরাধামে এসেছে। আচ্ছা
ঠাকুর, আমরা নাপিত, মাথার চুল কামাই, পায়ের নখ ফেলি।
তােমার মাথার চুল ফেলিব, আবার সেই হাত কাহার পায়ে দিব ?
যাহার পায়ে হাত দেব তাহার সর্বনাশ হইবে, আমারও সর্বনাশ
হইবে।
নিমাই। তাহার ভাবনা কি ? আমার বরে তােমার আর নাপিতের
# চৈতন্য মঙ্গল।
চতুর্থ অঙ্ক। ৬৯ ব্যবসায় করিতে হইবে না। তুমি মধুমােদক হইবে, আর তােমার ইহকালে ও পরকালে সর্ব প্রকারে মঙ্গল হইবে। হরি। ঠাকুর মঙ্গল অমঙ্গল বুঝি না, তবে তােমার কথা ফেলিতে পারিতেছি না। যে ঠাকুর সকলের বড়, তুমি সেই ঠাকুর কিনা! আমি মুখ বলিয়া তাই এতক্ষণ নানাকথা বলিতেছি। (সকলের প্রতি) ওগাে মহাশয়েরা, আপনার কঁদিতেছেন, আমিও কঁদিতেছি। আমি ক্ষৌর করিলে আপনারা রাগ করিবেন, কিন্তু আমি আর ঠাকুরের কথা ফেলিতে পারিতেছি না। এসাে ঠাকু, বসস, ক্ষের কার। একজন যুবক। রাখ প্রামাণিক, অত ব্যস্ত হইও না। ওগো ভারতী গোঁসাই, তুমি সােণার পুতুল নবীন যুবকটীকে ঘরের বাহির করিতেছ, তােমার কষ্ট হইতেছে না? না, বুঝি একটী শিকার পাইয়াছ? ভারতী। না বাপু, আমার ইচ্ছা নাই। কিন্তু উনি সামান্য তােমার আমার মত মনুষ্য নহেন। উহার কথা উপেক্ষা করিতে পারিতেছি না। দ্বিতীয় যুবক। না, মিষ্ট কথায় হবে না। এসসা, সকলে এই সন্ন্যাসী- টাকে বধ করি, তাহা হইলে আপদ চুকিয়া যায়। ভারতী। (করফোড়ে) বেশ কথা, আমাকে বধ কর, তাহা হইলে আমিও বাঁচি। যুলক। কেন, তুমি ওকে বল না যে, আমি তােমাকে সন্ন্যাস দিতে পারি না, তুমি বাড়ী যাও? ভারতী। বলিয়াছি, কিন্তু উনি গেলেন না। উহার কথা অগ্রাহ করিতে আমার সাধ্য নাই। তােমরা কেন বল না । বৃদ্ধ। আচ্ছা, আমি বৃদ্ধ, আমার কথা ফেলিতে পারিবেন না, আমি বলিতেছি। ওগাে নবীন অধ্যাপক, তুমি বাড়ী যাও। তােমার জননী ও পত্নী এতক্ষণ আছেন না আছেন!
নিমাই-সন্ন্যাস। নিমাই। (করযােড়ে ) ঠাকুর, আমি কৃষ্ণ অন্বেষণে যাইতেছি, ইহাতে বাধা দিবেন না। কৃষ্ণ অন্বেষণ জীবের প্রধান কাজ। বৃদ্ধ। তা বটে, তুমি বেশ করিতেছ। আমাদেরও তােমার সঙ্গী হওয়া উচিত, কিন্তু আমরা মায়ামুগ্ধ জীব, পারি না। তুমি স্বচ্ছন্দে সন্ন্যাস কর, করিয়া জীবের মঙ্গল কর। বৃদ্ধা। আপনি যান, আপনি তো ওঁকে উৎসাহ দিচ্ছেন। আমি বলছি। ওগাে বাছা, তােমার মা যে এতক্ষণ প্রাণে মরিলেন, মাতৃবধ ক'রে কি ধৰ্ম্ম হবে? বাছা, বাড়ী ফিরে যাও। তুমি আমাদের কেহ নও, তবু তােমার জন্য এই সমস্ত লোক ধৈৰ্য্যহারা হয়ে কঁদিতেছে, আর তােমার মায়ের কি দশা হয়েছে, একবার ভেবে দেখ। নিমাই। মা, আমি কৃষ্ণভজন করিব, সেই ভাল ; না সংসারে থাকিয়া বিষয়ে উন্মত্ত হওয়া ভাল ? আমি যদি ভাল হই, তবে আমার মায়েরও অবশ্য ভাল হবে। আমার মা যদি আমার শক্র হন তবে বাধা দিবেন, যদি হিতৈষী হন, তবে আমাকে সাহায্য করিবেন। বৃদ্ধা। তা বটে, আমরা কঁদিতেছি, কিন্তু তােমাকে দেখিয়া, তােমার কাজ দেখিয়া আমাদের মন ভাল হইতেছে। তুমি বেশ করিতেছ। তুমি স্বচ্ছন্দে সন্ন্যাস লও। সংসার তো মিথ্যা, চোখ বুজিলে আর সংসার কি? নিমাই। তবে প্রামাণিক, আমাকে খালাস করিয়া দাও, আমি বৃন্দাবনে যাই। (নাপিতের নিমাইর অগ্রে উপবেশন) নাপিত। উহু! উহু! আর পারি না। (মৃত্তিকায় পড়িয়া গড়াগড়ি ও সকলের ক্রন্দন ) নিমাই। (নাপিতের গাত্রে হস্ত দিয়া) উঠ, হরিদাস, শান্ত হও। !
চতুর্থ অঙ্ক।
৭১
নাপিত। (উঠিয়া, অট্ট অট্ট হাস্য করিতে করিতে) আজ আমার কি
আনন্দ! আজ আমি ঠাকুরের নাপিত হইলাম।
( ভঙ্গি করিয়া নৃত্য কহিতে করিতে পশ্চাতে হটিয়া
আবার নিমাইর সম্মুখে আগমন)
নিমাই। প্রামাণিক, শান্ত হইয়া উপবেশন কর, আমাকে খালাস করিয়া
দাও। ( নাপিতের উপবেশন ও ক্ষৌরকার্যের উদ্যোগ) হরিদাস,
তিষ্ঠ, আমি একবার নৃত্য করিয়া লই।
( উঠিয়া নৃত্য)
ভারতী। সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস লইবার সময় আনন্দে নৃত্য, এ
কেবল স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ পারেন।
নাপিত। ঠাকুর, বেশ বলিয়াছেন। আমারও এখন মনস্থির হয় নাই,
ক্ষৌর করিতে মাথায় রক্তপাত করিব? একটু নৃত্য করিয়া শান্ত
হই, আমার হাত কঁপিতেছে।
( নাপিতের নৃত্য ।
নিমাই। হরিদাস, এ দিকে এসো। { হরিদাদের হস্তধারণ ও উভয়ে
হাত ধরাধরি করিয়া নৃত্য)
ভারতী। নিমাই, শান্ত হও। এ দিকে লগ্ন উত্তীর্ণ হইয়া যায়।
( নিমাইর উপবেশন, নাপিতের ক্ষৌর করিতে যাওয়া, হস্ত
কম্পন, পরে একটু স্থির হইয়া ক্ষৌর করণ)
( সকলের উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন )
ভারতী। নিমাই, গঙ্গাস্নান করিয়া এসো।
৭২ নিমাই-সন্ন্যাস (নিমাইর গমন ও ভারতী ভিন্ন অঙ্গ সকলের নিমাইর পশ্চাৎ গমন, নাপিত ক্ষুর ইত্যাদি মাথায় করিয়া নৃত্য করিতে করিতে গমন *) নাপিত। (ক্ষুর ইত্যাদি গঙ্গায় নিক্ষেপ করিয়া) আজ থেকে ক্ষৌর- কার্যের শেষ হলাে। এসব আর দরকার নাই। নিমাই। (স্নান করিয়া আসিয়া ভারতীর প্রতি) কৌপীন দিতে অজ্ঞা হউক। (ভারতীর কৌপীন ও বহিৰ্বংস প্রদান ) ( নিমাই কৌপীন মস্তকে স্পর্শ করিয়া, উপস্থিত জনগণের তি) হে আমার সুহৃগণ, হে মাতঃ, হে পিতঃ, তােমরা সকলে আমাকে অনুমতি কর, আমি কৌপীন পরিধান করিয়া কৃষ্ণের দাস হইব। ( সকলের ক্রন্দন ও হরিধ্বনি) হে বন্ধুগণ, পিতা, মাতা, আশীর্বাদ কর যে ব্ৰজে যেন কৃষ্ণ পাই। (রােদম ও হরিধ্বনি। ভারতী। নিমাই, আমার বামে এই আসনে উপবেশন কর। নিমাই। (উপবেশন করিয়া) স্বামি, আমি স্বপ্নে এক সন্ন্যাসের মন্ত্র পাইয়াছি। শ্রবণ করুন, সেটা কেমন। ( ভারতীর কর্ণে মন্ত্র কথন) * তথন নাপিত আসি, প্রভুর সম্মুখে বসি ক্ষুর দিল সে চঁাচর কেশে। করি অতি উচ্চ রব, কানে যত লােক সব, নয়নের জলে দেহ ভাসে। হরি হরি কি না হইল কাঞ্চন নগরে। যতে নগরবাসী, দিবসে দেখয়ে নিশি, এবেলি শােকের সাগরে। মুণ্ডন করিতে কেশ, হৈয়া অতি প্রেমাবেশ, নাপিত কালয়ে উচ্চরবে। রসিকানন্দ।
চতুর্থ অঙ্ক।
ভারতী। (আশ্চর্যে) এ মহামন্ত্র তুমি কোথায় পাইলে ? আমাদের
মন্ত্র তাে প্রকাশ হইবার কথা নয়। ওঃ বুঝিয়াছি, তুমি যে অন্তর্যামী,
তুমি যে সকল হৃদয়েই অধিষ্ঠান কর, তােমার অজ্ঞাত কি আছে ?
নিমাই। প্রভু, আবার কেন ঐ কথা বলিয়া আমাকে অপরাধী
করিতেছেন ?
ভারতী। বুঝিলাম, তুমি জীবের নিকট মন্ত্র লইবে কেন, তাই তুমিই
আমাকে দীক্ষা দিয়া শিষ্য করিলে। আহা, কি দাময়! তুমিই
তো সকলের শুরু। *
মুড়াইয়া চাচর চুলে, স্নান করি গঙ্গাজলে,
বলে দেও অরুণ বসন
গৌরাঙ্গের বচন, শুনিয়া ভকতগণ
উচ্চৈঃস্বরে করয়ে রােদন।
অৰুণ দুখানি কাশি, ভারতী দিলেন আনি,
আর দিল একটি কৌপিন
মস্তকে পরশ করি, পরিলেন গৌরহরি,
আপনাকে মানে অতি দীন।
তোমরা বান্ধব মাের, এই আশীর্বাদ কর,
নিজ কর দিয়ে মাের মাথে ।
করিলাম সন্ন্যাস, নহে যেন উপহাস,
ব্ৰজে যেন পাই ব্ৰজনাথে ।
এত বলি গৌররায় উৰ্দ্ধ মুখ করি ধায়,
দিক বিদিক্ নাহি মানে।
ভক্তগণ সবে পাছে, লােটাৱে লােটায়ে কান্দে,
বাসুদেব হাঁকান্দ কানে।
৭৪
নিমাই সন্ন্যাস
নিমাই। এখন মন্ত্র দিতে আজ্ঞা হয়।
(কর্ণে মন্ত্র প্রদান )
ভারতী। এখন তােমার নামকরণ করিতে হইবে। তােমার উপযুক্ত
নাম কি ভাবিতেছি, (নিমাইর বুকে হস্ত দিয়া) তুমি সকল জীবকে কৃষ্ণ
নামে চৈতন্য করাইলে, অতএব তােমার নাম হইল “শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য।”
নিকটস্থ কতিপয় ব্যক্তি। কি নাম, কি নাম?
ভারতী। ঐকৃষ্ণ চৈতন্য
সকলে। জয়, শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের জয় ! (হরিধ্বনি)
ভারতী। নিমাই, দণ্ড কমুণ্ডল ধর। (নিমাইর দণ্ড কমুণ্ডল হস্তে
দণ্ডায়মান ও সকলের প্রণাম )
সকলে। জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য । জয় পতিতপাবন! জয় কাঙ্গালের
ঠাকুর।
নিমাই। (সকলের প্রতি) হে বন্ধু ণ, হে মাতা ও পিতাগণ! আশীর্বাদ
কর যে আমি ব্ৰজে গিয়া কৃষ্ণ গই। (হরিধ্বনি) আমি এখন
সন্ন্যাসী ভিক্ষুক, তােমাদের দ্বারে আমার এই ভিক্ষা, আমি কাঙ্গাল,
আমাকে ভিক্ষা দিবে না ?
সকলে। দিব, দিব
নিমাই। আমার এই ভিক্ষা করষোড়ে) তােমর সেই মঙ্গলময়
কৃষ্ণকে ভজনা কর। কযােড়ে আমার এই ভিক্ষা। তবে আমি
বৃন্দাবনে চলিলাম। হে কৃষ্ণ, এই আমি এলাম-{ (দণ্ড কমুণ্ডল
ফেলিয়া গমনোপ্তত )
ভারতী। কৃষ্ণ চৈতন্য, দাঁড়াও, দাঁড়াও, তােমার দণ্ড কমুগুল লইয়া
যাও, আর আমিও তােমার সঙ্গে যাবে।
চন্দ্রশেখর। (দুই হাতে পথ আটকাইয়া) একবার আমাদিগকে মনে কর।
৩
চতুর্থ অঙ্ক।
৭৫
নিমাই। (চন্দ্রশেখরকে দেখিয়া) কে বাবা? বসাে।
(আপনি উপবেশন) বাবা, আমি বৃন্দাবনে যাইতেছি, কৃষ্ণ আমাকে
ডাকিতেছেন। আমার মা রহিলেন। হে ৰন্ধুগণ, তােমরা আমার
জননীকে বলিও, যেন তিনি আমাকে মার্জনা করেন। लिनि
আমাকে এক তিলে যে সেবা করিয়াছেন, সে ঋণ আমি কোটা যুগেও
শােধ করিতে পারিব না। মা যেন আমার অপরাধ না লয়েন,
কারণ তিনি মা আর আমি সন্তান। মাকে বলিও যে লােকের বিধবা
কন্যাও থাকে, আমি তাহার বিধবা কন্যা। লােকের অন্ধ, খঞ্জ, পঙ্গু
সন্তান থাকে, আমি তঁাহার সেইরূপ বৃথা সন্তান। আমার দ্বারা
তাহার প্রতিপালন হইল না। মাকে এই প্রণাম দিও। ( প্রণাম )
আমি চললাম। কৃষ্ণ, এ আমি চঝিলাম এলাম, : এলাম।
(বলিতে বলিতে দৌড় )
নিতাই। দাড়াও, দাঁড়াও, আমি আসিতেছি
মুকুন। দাড়াও, আমি আসিতেছি।
জনৈক ব্যক্তি। দাড়াও, দাড়াও নবীন সন্ন্যাসি!
অন্যজন। আর সংসারে ফিরিব না। দাড়াও, দাড়াও।
| চীৎকার করিয়া “দাড়াও!” বলিতে বলিতে সকলে পশ্চাৎ ধাবমান।
। •
শচীর গৃহ।
শচী ঈশানকে হেলান দিয়া বসিয়া, বিষ্ণুপ্রিয়া শয়ন করিয়া, পার্শ্বে
তার সখী উপবিষ্টা।
শ্রীবাস। ঠাকরুণ অদ্য দুই দিবস এক স্থানে বসিয়া, মুখে জল পর্যন্ত
দিলেন না, আপনি মূখে জল না দিলে বধূমাতাও দিবেন না। ঐ
বালিকার মুখ চাহিয়া আপনি মুখে দুটি অন্ন দিউন। প্রভু ভাসের
নিমাই-সন্ন্যাস। বশ ; কোথা আছেন, কে জানে? আপনি অত চিন্তিত কেন হন ? জানেন ত, তিনি কি বস্তু? তাহার নিমিত্ত আর ভয় কি ? ঠাকরুণ, শান্ত হউন। শচী। পণ্ডিত, বেলা অনেক হয়েছে। দেখ, সেই অতি সকালে কৃষ্ণকে গােঠে পাঠিয়ে দি। বলে দিলুম, বাপ তোমাকে আমি পলকে হারাই, বিলম্ব করিও না। তা কৃষ্ণ বড় নিঠুর ; একেবারে খেলায় উম্ম। আমি যে পথ চেয়ে আছি, তাহা ভুলিয়া গিয়াছে। শ্রীবাস। (স্বগত) কি সর্বনাশ ! ঠাকরুন যে পাগল হয়েছেন। পাগল হলেন নাকি? ( প্রকাশ্যে ) ঠাকরুন আপনার পায়ে পড়ি আপনি স্নান করুন ( শচীর পদধারণ।) শচী। আমি স্নান করিব ? কৃষ্ণ বাড়ী না এলে তা কি পারি! আগে সে আসুক, এলে তাহাকে ঐ উদূখলে বাধিবো, যখন সে মা মা বলিয়া কান্দিবে তখনি ছাড়িয়া দিব ; দিয়া তাকে স্নান করাইব, মুখে ননী দিব। মুখে অলকা তিলকা দিয়া চিত্র করিব, তবে আমি স্নান করিব। ( উকি মারিয়া) পণ্ডিত, দেখ তাে কৃষ্ণ অসিতেছে কি না? শ্রীবাস। (বিষ্ণুপ্রিয়ার নিকটে যাইয়া) দেৰি, তুমি উঠ, উঠিয়া ঠাকুরাণীকে সান্ত্বনা কর। তুমি তাে জান, আমাদের প্রভু স্বয়ং কৃষ্ণ, জীবের দুঃখ দূর করিষার নিমিত্ত এই ধরাধামে এসেছেন। তুমি আর শচী- ঠাকুরাণী তাহার সেই মহৎকার্যের সহায়। দেখ, শচী-ঠাকুরাণী পাগলের মত প্রলাপ বকিতেছেন। প্রভু এখন গৃহে নাই, তাহার স্থানে তুমিই ঠাকুরাণীর রক্ষণাবেক্ষণের ভার পাইয়াছ। উঠ মা উঠ, জীবের দুঃখ ভাবিয়া তােমাদের দুঃখ লাঘব কর। আমি একটু বাহিরে যাই, তুমি ঠাকরুণকে উঠাও। তাঁহাকে সান্ত্বনা করিতেন পার, অন্ততঃ তাঁহার মুখে ও মাথায় একটু জল দাও। (উৰ্দ্ধমুখ
চতুর্থ অঙ্ক।
৭৭
হইয়া) প্রভু! হে আমাদের প্রাণের প্রাণ! তুমি জীবের দুঃখের
নিমিত্ত ব্যাকুল, একবার মায়ের দশা দেখ।
গীত।
(বিষ্ণুপ্রিয়ার প্রতি) দেবি উঠ, আমি একটু বাহিরে দাড়াই, তুমি
ঠাকরুণকে সান্ত্বনা কর।
সখি ।
দেবি উঠ, মাকে সান্ত্বনা কর, তুমি ভিন্ন আর কেহ পারিবে না।
বিষ্ণু। (উঠিয়া ) সখি, তিনি না কৃষ্ণ ? তাহাই যদি হ’লতবে আমি
কি রাধা ?
সখি। তাহার আর সন্দেহ কি ?
বিষ্ণু। তবে কৃষ্ণ মথুরায় গিয়াছেন, তাই তো?
সখি। হাঁ, কৃষ্ণ মথুরায় গিয়াছেন, আবার আসিবেন।
বিষ্ণু। তবে আমি কৃষ্ণ-বিরহিণী ? সখি, তুমি রাধার বিরহ বর্ণনা করিয়া
একটী গীত গাও, দেখি আমার কি ভাব হয়। তুমি গীত গাও, আর
আমি উহা শুনিয়া বিরহ-যন্ত্রণা লাঘব করি।
সখি। আচ্ছা শ্রবণ কর।
গীত।
প্রাণনাথের পথ চেয়ে আঁধল আঁখি।
ছটফট করে আমার পরাণ পাখী।
সে বিনা প্রাণ বাঁচে না, সে তাকি সই জানে না,
জানিয়া সে দুঃখ দেয় কি করি সখি!
আমার মত কত জনা, করে তার উপাসনা,
আমি থাকি আর মরি সখি, তার ক্ষতি কি?
সে তো মােরে খোজে না, তা তাে মন বুঝে না,
তবু সখি, তার লাগি ঝুরে দু-আঁখি।
যত মােরে দুঃখ দেয়, তত মায়া বেড়ে যায়,
বলরামের গৌর বিনা আর উপায় কি ?
৭৮ নিমাই-সন্ন্যাস বিষ্ণু। (শচীর গলা ধরিয়া ক্রন্দন মা, শান্ত হও, তােমার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তা কি তুমি জান না ? শচী। (অট্ট অট্ট হাস্য) কৃষ্ণ, এসেছিস? আজ তােকে বাঁধবে। আমি তােক না দেখিলে আমার পলকে প্রলয় হয়, আর তুই নিঠুর, মার প্রতি তুই এত নিদয় ? দাড়া, আগে আমি একগাছি জড়ি নিয়ে আসি। বিষ্ণু। ( ক্রন্দন করিয়া) মা, পাগল হেলে? ( উৰ্দ্ধমুখে চাহিঙ্গা প্রভু দয়াময়, মায়ের প্রতি করুণ। কর। হে দীন দয়াল, তুমি আমাকে যে দুঃখ দেবে দাও, কিন্তু মা আমার বৃদ্ধা, সহিবেন কি করিয়া ? প্রভু, মাকে সান্ত্বনা কর। শচী। (চেতন পাইয়া) কে, মা বিষ্ণুপ্রিয়া ? মা, নিমাই কোথা ? ওমা, আমার নিমাইকে তুমি কেন ছেড়ে দিলে ? (শাশুড়ী ও বধু গলাগলি হইয়া রােদন) ও নিমাই, তুই না কৃষ্ণ? ও কৃষ্ণ কৃপাময়, আমরা স্ত্রীলােক, তােমার ভঙ্গী কি বুঝি? (শচীর মূচ্ছ।) বিষ্ণু। (শচীকে ধরিয়া) সখি, শীঘ্র জল নিয়ে এসাে, মুখে দাও, মা চেতন হারা হয়েছেন। দেখি—এই যে দাত লাগিয়াছে। } =0-
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
(বটবৃক্ষ তলে বৃক্ষ হেলান দিয়া নিমাই উপবিষ্ট।)
(কেবল কৌপিন পরিধান, বহিৰ্বাস নাই।)
নিমাই। ( বাম হস্তে গও রাখিয়া স্ত্রীলােকের ন্যায় বিনাইয়া বিনাইয়া
রােদন) হে কৃষ্ণ, একবার আমাকে দেখা দাও। একটা বার !
তারপর তুমি শতবর্ষ অদর্শন থাকিও। আমার প্রাণ যে যায় ।
আমাকে কোথা ফেলে গেলে, হে নাথ, তুমি তাে দয়াময়, আমাকে
দয়া কর। আমি বড় দুঃখী, কেননা তােমাকে হারায়েছি। কৃষ্ণ।
তােমা ছাড়া আমার আর কি আছে, তোমা বিহনে ভুবন অন্ধকার।
( নিতাই, চন্দ্রশেখর, মুকুন্দ ও গােবিন্দের প্রবেশ) প্রাণ যায়, প্রাণ
যায়!
(ধুলায় গড়াগড়ি)
নিতাই। এই যে প্রভু ! ( ভক্তগণ ধরিয়া বসাইলেন, নয়ন মুদিত প্রভু
হেলান দিয়া) প্রভু কাল আমাদের ফেলিয়া কোথায় গিয়াছিলে ?
সমস্ত রাত্রি তল্লাস করিয়াছি, তােমার চােদন শুনিয়া এদিকে
আসিলাম।
চন্দ্রশেখর।
ওরূপ করুণার ক্রন্দন ত্ৰিজগতে আর কেহ পারে না।
আহা মরি, শূশ্য গাত্রে এই শীতে রাত্রি যাপন করিছ ?
ও জীব! একবার দেখিয়া যা। দেখ, তােদের জন্য আমাদের
প্রাণের যে প্রাণ তাহার দুঃখ দেখ। প্রভু তুমি তাে জীব উদ্ধার
করিতেছ না, জীব বধ করিতেছ। এরূপ দৃশ্য দেখিয়া কে বাঁচিয়া
থাকিবে ? আমরা কঠিন বলিয়া বাঁচিয়। আছি। হইল ভাল। যিনি
নিতাই।
নিমাই-সন্ন্যাস।
পূর্ণ ব্ৰহ্ম সনাতন তিনি এখন কৌপীন পরিয়া কাঙ্গাল বেশ ধরিয়া
দ্বারে দ্বারে জীবের নিমিত্ত ভিক্ষা করিয়া বেড়াইবেন, দেখি এখন
কঠিন জীব কি করে?
গীত।
তােরা আয়রে পুরবাসিগণ,
আনন্দেতে করি সংকীৰ্ত্তন।
লেদের, ভবের মেলায় ধূলা খেলায় হারানে জীবন রতন,
(ভেবে দেখ ও তাপিত জীব)
তােদের সম্মুখে দাড়ায়ে ঐ পূর্ণব্রহ্ম সনাতন।
( দেখরে ঐ কাঙ্গাল বেশে )
তােদের গোলকধামে লয়ে যেতে এসেছেন জীবনের জীবন।
(দেখরে ঐ চেয়ে দেখ )
(দুইজন রাখালের প্রবেশ ও প্রভুকে দেখিয়া হরিধ্বনি, হরিধ্বনি
শুনিয়া নিমাইর নয়নােন্মীলন)
নিতাই। (প্রভুর মুখ নিরীক্ষণ করিয়া) প্রভু নয়ন মেলিয়াছেন বটে,
কিন্তু এখনও ব্যহ্যজ্ঞান হর নাই। দেখেছ, রাখালগণ কি বুঝে, কিন্তু
প্রভুকে দর্শন মাত্র উহাদের মুখেও হরিধ্বনি আসিল। (নিমাই
উঠিয়া বসিলেন) (রাখালগণ আবার হরিধ্বনি করিল।
নিমাই। (উঠিয়া দাঁড়াইয়া) কে মধুর নাম করিল ?
( ইতি উতি নিরীক্ষণ)
নিতাই। (মুকুলের প্রতি) অদ্য প্রভুও আমাদের চারিদিন উপবাস।
এই চারিদিন কাহারও আহার, কাহারও নি ঘা, কাহারও জলপান
পর্যন্ত হয় নাই। প্রভু এই চারিদিন একেবারে অচেতন। কত
চতুর্থ অঙ্ক। ৮১ ডাকিয়া, কত চেষ্টা করিয়া আমরা চেতন করাইতে পারিলাম না। ক্ষুধা, তৃষ্ণায়, অনিদ্রায়, পথশ্রমে, শচী বিষ্ণুপ্রিয়ার বিরহে, কিছুতেই যাহাকে চেতন করাইতে পারিল না, যাই কর্ণে হারধ্বনি প্রবেশ করিল অমনি তিনি সজীব হইলেন। এরূপ শক্তি মনুষ্যের সম্ভবে না। (রাখালগণের হরিধ্বনি)। নিমাই। ( ইতি উতি চাইতে রাখালগণকে দেথিয়া) বাপ, তােমরা কারা ? তােমরা এই মধুর নাম কোথায় পাইলে ? তােমরা বুঝি ব্ৰজের রাখাল হইবে, নতুবা এ দুর্লভ নাম কোথায় পাইবে? বাপ, ( রাখালের মাথায় হস্ত দিয়া) আমার কর্ণ এতক্ষণ উপবাসী ছিল, তােমরা মধু ঢালিয়া দিয়াছ। বাপ, আবার ঐ নাম বল। (রাখাল- গণের হরিধ্বনি) বাপ, আমি মরেছিলাম, তােমাদের মধুর মুখে হরিনাম শুনিয়া প্রাণ পাইলাম। কৃষ্ণ তােমাদের মঙ্গল করুন। আবার এক বার বল। (হরিধ্বনি) বাপ আর একটি উপকার কর, অামি বিদেশী পথ চিনি না। বৃন্দাবন কোন্ পথে যাব, কৃপা করিয়া বলিয়া দাও। ( নিতাই পশ্চাৎ হইতে রাখালগণকে শান্তিপুরের পথ দেখাইতে সঙ্কে করিলেন। রাখালগণের সঙ্কেতানুসারে সেইদিকে পথ নির্দেশ করণ ও নিমাইর অবনত মস্তকে, টলিতে টলিতে, নির্দিষ্ট পথে গমন। নিতাই। (চন্দ্রশেখরের প্রতি আমি প্রভুকে ভুলাইয়া শান্তিপুরে লইয়া যাইব। আপনি দ্রুতপদে শান্তিপুরে গমন করুন। সেখানে গিয়া শ্ৰীঅদ্বৈতকে বলুন যেন তিনি এ পারে নৌকা লইয়া ঘাটে আমাদের নিমিত্ত অপেক্ষা করেন। (চন্দ্রশেখরের পাশ কাটাইয়া বস্ত্রে মুখ আচ্ছাদন করিয়া শান্তির পথে প্রস্থান।)
নিমাই-সন্ন্যাস। নিমাই। (দাড়াইয়া চিন্তা) অবন্তী নগরের বি প্রই সাধু। তিনি সমুদয় ত্যাগ করিয়া শ্ৰীবৃন্দাবনে যাইয়া শ্রীকৃষ্ণ ভজন করিয়াছিলেন। আমিও সেই পথ অবলম্বন করিব। সাধু! সাধু! বিপ্র তুমিই ধন্য। নিতাই। (সঙ্গীগণের প্রতি) প্রভুর এখন সহজ জ্ঞান হইয়াছে। বােধ হয় আমাকে চিনিতে পারিবেন। (পথ রােধ করিয়া দণ্ডায়মান)। নিমাই। (মুখ উঠাইয়া) কে আপনি? আপনাকে যেন চিনি চিনি করিতেছি ! (একটু থাকিয়) যেন শ্রীপাদ নিত্যানন্দ ? নিতাই। হঁ, আমি সেই অধমই বটে। নিমাই। আমি বৃন্দাবনে যাইতেছি, তুমি কি করিয়া এখানে আসিলে ? নিতাই। প্রভু তুমি বৃন্দাবনে যাইতেছ শুনিয়া আমি তাড়াতাড়ি আসিয়া তোমার লাগ পাইলাম। নিমাই। বটে, বটে, বড় সুখের কথা; এখন দুজনে যাইয়া শ্ৰীবৃন্দাবনে মুকুন্দ ভজন করিব। (একটু থাকিয়া ) পাদ, শ্রীকৃষ্ণ ত আমাকে দেখা দিবেন? নিভাই। (স্বগত) আবার কপাল পুড়িল। ঐ সব কথা তুলিলে প্রভু আবার অচেতন হইবেন। (প্রকাশ্যে) প্রভু, ও সকল কথা এখন থাক। ক্ষুধায় তৃষ্ণায় মরিতেছি, আগে ক্ষুৎ পিপাসা নিবৃত্তি করি। তােমার কি ? প্রেমসুধা পান করিয়া চিরদিন থাকিতে পার, আমরা কিন্তু ক্ষুদ্র জীব। নিমাই। বৃন্দাবনে যাইয়া ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তি করিবে। বৃন্দাবন আর কত রে ? নিতাই। (স্বগত) প্রভুর মনের ভাব এই যে তিনি বৃন্দাবনের নিকটে আসিয়াছেন, নতুবা আর কত দূর” বলিবেন কেন? সম্মুখে সুরধুনী, উহাকে কেন যমুনা বলিয়া বুঝাই না ? ওপারে শান্তিপুর, এপারে
চতুর্থ অঙ্ক।
অবশ্যই শ্রীঅদ্বৈতকে নৌকার সহিত পাইব। ( প্রকাশ্যে) বৃন্দাবনে
ত আসিলাম, অধ্যই বৃন্দাবন যাইব।
নিমাই। শ্রীপাদ, বল কি ? আমার ভাগ্যে কি বৃন্দাবন দর্শন আছে ?
নিতাই। আমি তােমাকে এখান হইতে বৃন্দাবন দেখাইতেছি। ঐ একটী
নদী দেখা যায়, দেখিতে পাইতেছ? আর তাহার তীরে একটা বট
বৃক্ষ দেখিতেছ?
নিমাই। (নিরীক্ষণ করিয়া ) হ দেখিতেছি।
নিতাই। ঐ বট বৃক্ষটী বংশীবট, আর নদীটি শ্ৰীযমুনা।
নিমাই। যমুনা! যমুনা! ঐ যমুনা ? তবে আর কি, এখনি শ্রীকৃষ্ণকে
দেখিব। এই আমি চলিলাম। (উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়)
মুকুল। ঠাকুরকে বঞ্চনা করিলে, হয়তাে তিনি রাগ করিবেন।
নিতাই। এই প্রবঞ্চনা করায় যদি আমার নরকভােগ করিতে হয়, তাহা
করিতে আমি স্বীকৃত আছি। প্রভু অদ্য পাঁচদিন মুখে জলবিন্দু দেন
নাই, তবুও তাহার তেজ দেখ ও দৌড়িবার ক্ষমতা দেখ। চল,
আমরাও দৌড়াই,
যতদূর
পারি।
[ সকলের প্রস্থান।
এ এক
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
(সুরধুনীতীর, ঘাটে নৌকা, নিমাই যমুনাভ্রমে সুরধুনীতে সুনান্তে
একপাশে দাড়াইয়া ও অদ্বৈত একপাশে দাঁড়াইয়া।
নিমাই। { যমুনাস্তোত্র সুর করিয়া পাঠ)।
চিদানন্দ ভাননাঃ সদানন্দ সুননাঃ পরপ্রেমপাত্রী দ্রবত্ৰহ্মগাত্রী।
অঘনাং-লবিত্র জগৎক্ষেমধাত্রী পবিত্রীক্রিয়ান্নো বপুর্মিলপুত্রী।
( নিত্যানন্দ প্রভৃতির প্রবেশ )
অ।ৈ এই আমাদেব সেই নবীন নগর প্রভুর একি দশা?
(উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন )
নিমাই। (নয়ন মেলিয়া অদ্বৈতকে লক্ষ্য করিয়া) আপনি কে? শ্ৰী গদ্বৈত
আচাৰ্য না ?
নিতাই। হা প্রভু, তিনিই বটে।
নিমাই। কি আনন্দ! এখন বৃন্দাবনে তিনজনে মনের সুখে মুকুন্দ ভজন
করিব। (একটু থামিয়া) কিন্তু আমি একি স্বপ্ন দেখিতেছি ?
পঞ্চম অঙ্ক। ৮৫ শ্রী আচাৰ্য্য! তুমি আমার আগে কি করিয়া আসিলে ? আমি কিছু বুঝিতে পারিতেছি না। আমি বৃন্দাবন যাইতেছি, পথে দেখি, শ্রীনিত্যানন্দ ! তাহার পর যমুনায় স্নান করিয়া উঠিয়া দেখি, সেখানে তুমি দাড়াইয়া। আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। (নিপট্ট বাহ) বুঝেছি, এ যমুনাও নয়, বৃন্দাবনও নয়। এ সুরধুনী, আর ও পারে শান্তিপুর। ভাল শ্রীপাদ নিত্যানন্দ, এ কাজটি কি ভাল হইল ? তুমি কৃপা করি আমাকে ছোট ভাই বলি থাক, আর ভূমি ভাই হইয়া আমাকে বৃন্দাবনে যাইতে দিলে না, ভুলাইয়া শান্তিপুর লইয়া আসিলে ? সকলেই বৃন্দাবনে গেল, কেবল আমারই বন্দাবন যাওয়া হইল না। (নােদন) আমি শ্রীকৃষ্ণকে পাইব বলয় সন্ন্যাসী হইলাম, তাহাকে আর পাইলাম না। শ্রীঅদ্বৈত। প্রভু, আপনাকে কি কেহ প্রতারণা করিতে পারে? আপনি ত্রিজগতের প্রাণ, অন্তর্যামী। আপনি নিজ ইচ্ছায় আসিয়াছেন, কারণ, আপনি কি জানিতেছেন না যে, আপনার কোটী কোটী ভক্ত প্রাণে মরিতেছে ? একবার দেখা দিয়া তাহাদের প্রাণ দান করুন। প্রভু শ্ৰপাদও মিথ্যা কথা বলেন নাই, শাস্ত্রে বলে যে গঙ্গায় পশ্চিম পারে যমুনা বহিতেছেন। নিমাই। আচ্ছা, তাহা যেন হইল, শ্রীপাদ বলিলেন যে এই বৃন্দাবন, তাহার কি ? এ বৃন্দাবন নয়? অবশ্য বৃন্দাবন। তুমি যেখানে, সেইখানেই বৃন্দাবন। প্রভু, এ লীলা সংবরণ কর। আজ পাঁচদিন উপবাসী। আজ, দরিদ্র ব্রাহ্মণের বাড়ী পদার্পণ করিয়া একমুষ্টি অন্ন গ্রহণ করিয়া তােমার কোটী ভক্তের প্রাণ রক্ষা কর। চল। (প্রভুর হম্ভধারণ) অদ্বৈত।
৮৬ নিমাই-সন্ন্যাস। নিমাই। (নিত্যানন্দের প্রতি) এই নিমিত্ত বুঝি তুমি মিথ্যা কথা বলিয়া আমাকে শান্তিপুরে ভুলাইয়া আনিয়াছ ? নিতাই। মিথ্যা কথা বলেছি আমি—তােমার কি ? আমিই নরকভােগ করিব। কিন্তু প্রভু তােমারই বা বিবেচনা কি? তােমার দুঃখিনী মা, তােমার কোটী ভক্ত প্রাণে মরিতেছে। তুমিই না হয়, মায়াতীত ভগবান, দয়া মায়া নাই। কিন্তু আমরা মায়মুগ্ধ জীব, জ্ঞামরা কি করিয়া ইহা সহ্য করি? প্রভু, ক্ষমা দাও, চল এখন শ্রীঅদ্বৈত আচার্যের বাড়ী যাই। ( আর এক হস্ত ধারণ করিয়া লইয়া যাওয়া )।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। শ্রীঅদ্বৈতের বাড়ী। মহাপ্রভু অদ্বৈত হরিদাস প্রভৃতি। হরিদাস। দ্বারে আটজন বলবান দ্বারা রাখিয়া ভালই হইয়াছে, নতুবা প্রভুকে দর্শন করিতে সে ভিড় হইতেছে, তাহাতে এ বাড়ী ঘর দুয়ার সমস্ত চুর্ণ হইত। মুকুন্দ। শীপাদ নিত্যানন্দ শচা ঠাকুরাণীকে নিতে গিয়াছেন, তাঁহার সহিত শ্রীনবদ্বীপের ভক্তগণ আসিবেন, বােধ হয় শান্তিপুরে লােক ধরিবে না। আর আচার্যের বহু অন্ন ব্যয় হইবে। হরিদাস। তাহাতে ভাবনা নাই, শ্রী আচার্যের অক্ষয় ভাণ্ডার।(নেপথ্যে হরিধ্বনি) বুঝি নদেবাসিগণ আসিতেছেন। (মুহুর্মুহু হরিধ্বনি)। নিমাই। মা জননী আসিতেছেন। (দোলায় শচীকে লইয়া ভক্তগণের প্রবেশ) শী। (দোলা হইতে মুখ বাজাইয়া) কই আমার নিমাই কই, আমার নিমাই কই, আমার বাপ! (প্রভুর জননীকে প্রণাম)। অদৈত। সন্ন্যাসীর কাহাকেও প্রণাম করিতে নাই, প্রভু স্বয়ং ভগবান, সকল নিয়মের বাহির। শচী। (নিমাইকে কাছে বসাইয়া) এই অল্প বয়সে নিমাই, কে তোর মাথার চুল ফেলিল? যে পোড়া নাপিত চুল ফেলিল তাহাকে ধিক্। তার প্রাণে কি দয়া মায়া নাই ? আমার বড় সাধ ছিল কিছুদিন নদী- যায় বসতি করিব, কেশব ভারতী ঠাকুর তাহা করিতে দিলেন না। নিমাই। তাহাদের দেৰি দাও কেন মা, সব দোষ আমার। আমার মতিচ্ছন্ন হইয়াছিল, তাই সন্ন্যাস লইলাম। কৃষ্ণ প্রেম জীবের পরম পুরুষার্থ, তাহা সন্ন্যাস না লইলেও অর্জন করা যায়।
৮৮ নিমাই-সন্ন্যাস শচী। নিমাই। আমার কত কথা মনে উঠে। দ্বাদশ বর্ষ বয়সে তুমি পিতৃহীন হইলে, আমি স্ত্রীলােক, তবু তােমাকে পালন করিলাম, বিদ্যাধ্যয়ন করাইলাম ? নিমাই এইজন্য কি তােমাকে শ্ৰীভাগবত পড়াইয়াছিলাম ? বাছা, তুমি আমাকে অনাথিনী করে দেশান্তরে যাবে, বল দেখি, হতভাগিনী সরলা বিষ্ণুপ্রিয়ার কি হবে? আমি তাের বৃদ্ধা মা জীবিত, তুই এখন ডাের কৌপীন পরিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মাগিয়া খাইবি ; ইহা অল্প কাহারও সহ্য হয় না, আমি মা হইয়া কেমন করিয়া সহ করিব ? নিমাই। (করযােড়ে) মা অবােধ সন্তানকে ক্ষমা করুন। মা তুমি অামাকে যেরূপ পালন করিয়াছ, এরূপ কোন কালে কোন জননী পারেন নাই। আনি তাহার শোধ দিলাম যে তােমার অন্তরে নিদা- রুণ আঘাত করিলাম। মা আমাকে ক্ষমা কর। আমার ধর্ম নষ্ট হউক, আমি তােমাকে যে দুঃখ দিয়াছি, তাহার প্রায়শ্চিত্ত কঠিন। মা, আমি সন্ন্যাস লইয়াছি, এখন তুমি আমাকে যাহা বল তাহাই করব, যেখানে থাকিতে বল, সেইখানে থাকিব, এমন কি যদি বল যে “সন্ন্যাস ত্যাগ করিয়া আমার গৃহে চল,” তাহাই যাইব, ইহা আমি সত্য সত্য প্রতিজ্ঞা করিলাম। মা আমাকে ক্ষমা কর, রােদন)। শচী। (কান্দিতে কান্দিকে অঞ্চল দিয়া চক্ষু মুহান) চুপ কর, চুপ কর। অদ্বৈত। মা জননী এখন অভ্যন্তরে আগমন করুন। শচী। তাই চল যাইতেছি। আমি রাঁধিব, আর তো রাধিয়। নিমাইকে খাওয়াইতে পারি না। (শচীর প্রস্থান) নিমাই। একবার কৃষ্ণমঙ্গল গীত গাও। শ্রীবাস। মুকুন্দ, বাসুদেব, এসস হৰিকীৰ্ত্তন করি।
পঞ্চম অঙ্ক। ৮৯ গীত। নিমাই। হরিবল হরিবল হরিবল ভাই। ( সংকীৰ্ত্তনান্তে নিমাই মুচ্ছিত ভক্তগণের সন্তর্পণে চেতন লাভ) বন্ধুগণ, আমার নিবেদন শুন। আমি সন্ন্যাস করিয়া জননীকে বড় দুঃখ দিয়াছি। তাহার দুঃখ তােমরা স্বচক্ষে দেখিলে। আমি তাহার দুঃখ দেখিয়া দারুণ প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। অর্থাৎ তিনি আমাকে বাহা করিতে কি বেখানে থাকিতে বলেন তাহাই করিব। এমন কি, যদি বাড়া ফিরিয়া যাইতে বলেন, তাহাও যাইব। তােমরা জন কয়েক প্রবীণ তাহার নিকটে যাইয়া তাহার অভিপ্রায় অবগত হও। আমি যাইব না, কারণ আমার সম্মুখে তাঁহার স্বাতন্ত্র্য থাকে না। বলিও, যেন তিনি একটুও কুণ্ঠিত না হন, তিনি মনােমুখে যাহা করিতে বলেন, তাহাই করিব। নিতাই। ঠাকুর, একি তােমার মনােগত কথা ? নিমাই। আমি কি জননীর সহিত রহস্য করিতেছি ? নিতাই। তবে আচাৰ্য্য আর শ্রীবাস চল যাই, জননীকে জিজ্ঞাসা করি।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। শচী আসিনা। নিতাই অদ্বৈত ও শ্রীবাবের প্রবেশ। নিতাই। মা, বড় শুভ সংবা, এখন তুমি বলিলেই প্রভুকে বাড়ী নিয়ে যাই, তিনি তোমার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেছেন। প্রভু বলেছেন কি যে, যদি তুমি বল, তবে তিনি সন্নাস ত্যাগ করিয়া ও বাড়ী যাইবেন। অদ্বৈত। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ, তুমি কেন জননীর স্বাতন্ত্র হরণ করিতে ছ ? আমরা প্রতিনিধি আমাদের কর্তব্য যে প্রভু যেরূপ আজ্ঞা করিয়াছেন, ঠিক সেইরূপ করি। শ্রবণ করুন, জননি। প্রভূর সন্ন্য সে আপনার যে দুঃখ ইহা দেখিয়া প্রভু কাতর ও ইয়াছেন, তাই আমাদিগকে আপনার নিকটে পাঠাইয়াছেন। তিনি আপনার সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন যে, আপনি যাহা বলিবেন, হাই করিবেন, যেখানে থাকিতে বলেন সেইখানে খাকিবেন, এমন কি যদি বলেন “সন্ন্যাস ত্যাগ করিয়া বাড়ী চল, তাহাও যাইবেন। তিনি আপনার অভিপ্রায় অবগত হই- বার নিমিত্ত স্বয়ং আসিতেন, কিন্তু পাছে তিনি আসিলে আপনার স্বাতন্ত্র্য যায় এই নিমিত্তই আমাদিগকে পাঠাইয়া দিয়াছেন। আপ- নার কি ইচ্ছা তাহা বলুন, প্রভু তাহাই করিবেন। নিতাই। জননীর আবার কি ইচ্ছা হইতে পারে ? জননি বলুন যে, প্রভু সন্ন্যাস ত্যাগ করিয়া বাড়ী চলুন। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ, এ আপনার অন্যায়। জননি শুনুন। আপনি ও সব কথা শুনিবেন না, আপনি যাহা ভাল বুঝেন তাহাই করুন। অদ্বৈত।
পঞ্চম অঙ্ক। শী। (খানিক নীরব থাকিয়া) তিনি আমার গৌরব বাড়াইবার নিমিত্ত আমার অনুমতি চাহিয়াছেন। তিনি কি বস্তু তাহা আমি জা'ন না। কিন্তু আমি কি বস্তু, তাহা তিনি জানেন। তিনি যে আমার মত চাহিয়াছেন, তিনি বেশ জানেন, আমার মত কি হইবে, আর সে এক ব্যতীত দুই নয়। তিনি গৃহে চলুন, এ কথা আমি কখনও বলিতে পারি না। নি তাই। (বাধা দিয়া) জননি বলেন কি ? আপনার ইচ্ছা কি সে, প্রভুকে ভাসাইয়া দিবেন ! সখন সুবিঃল পাইয়াছেন, অাপনি যাহা বলিবেন, তিনি তাহাই কবিবেন। সেখানে এ সব কথা বলিতেছেন কেন? আপনি কি মা হইয়: তাঁহাকে বাড়ীর বাহির করিবেন ? শচী। আমি কি ম হইয়া তাহার পর কাল নষ্ট কৰিব ? শাম যেরূপ মা নই। আমি জ্বলে পুড়ে মরে যাই, সেও ভাল, তবু নিমাইর অকল্যাণ হয় এমন কাজ করিব না। সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া অাবার উহা ত্যাগ করিলে সে পতিত হয়, আমি এখন আপনার সুখের জন্য নিমাইকে পতিত কৰিব ইহা হইতে পারে না। আমার কি ইচ্ছা ? কে না বুঝে যে আমার ইচ্ছা নিমাইকে বাড়ী লইয়া যাই। নিমাই তাহা শানে, আর ইহাও জানে যে অামি নিমাইর মা, তাহার ধনষ্ট কয় এমন কোন কাজ করিতে তাহাকে আমি বলিব না। তিনি সন্ন্যাস সইয়াছেন, আর উহার উপায় নাই। এখন আর বাড়ী যাইতে পারেন না, এমন কি গ্রামেও বাস করিতে পারেন না। তবে নদীয়ার নিকটে কোন স্থানে থাকিলে আমি যাইয়া মাঝে মাঝে তাহাকে দেখিতে পাইতাম। কিন্তু তাহা ভাল নয়। তিনি গ্রামের নিকটে বাস করি- বেন, আমি যাইব, তুমি যাইবে, সকলে যাইয়া বাড়ী চল বাড়ী চল” বলিয়া তাহাকে বিরক্ত করিবে। অতএব আমি বােধ করি, তিনি
৯২
নিমাই-সন্ন্যাস
পাইব।
ক্ষেত্রে বাস করুন, তাহা হইলে তাহার সংবাদ আমি মাঝে মাঝে
তােমরা যাইতে পারিবে, তিনিও গঙ্গাস্নান করিতে
আসিতে পারেন। অতএব তিনি সেখানে থাকুন।
অদ্বৈত। এইজন্য স্বয়ং ভগবান তোমার গর্ভে জন্ম লইয়াছেন। এরূপ
নিঃস্বার্থ ভালবাসা কেবল ঠাকুরের মাতারই উপযুক্ত।
শ্রীবাস। তুমি যেরূপ অনুমতি করিলে, এরূপ জগতে কোন জননী
পারে না। আর সকলে বলিত গৃহে চল।
শচী। (কান্দিয়া উঠিয়া) নিমাই, নিমাই, ওরে নিমাই, তাের কেমন
মা দেখে যা। আমি মা হইয়া তােকে ঘরের বাহির করিয়া দিলাম।
আমার বাছার তো কোন দোষ নাই। সে ত আমার উপর ভার
দিয়াছিল। নিমাই। নিমাই! নিমাই! (মুচ্ছিত)।
।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। নীলাচল, সমুদ্রতীর। নিমাই সন্ন্যাসী ও অবধূত নিই। নিতাই। প্রভু তােমার দশা দেখিয়া হৃদয় বিদীর্ণ হয়। কি ছিলে, কি হয়েছ, তোমার প্রকাণ্ড দেহ, অসীম বল, এখন দাড়াইলে ঘুরিয়া পড়। তুমি আমাদের প্রাণ, প্রাণের প্রাণ, জগতের প্রাণ, তােমার এ অবস্থা দেখিয়া আমরা কিরূপে স্থির থাকি? তুমি প্রত্যহ সাগর- পরিমাণ নয়ন জল ফেলিয়া আপনার প্রাণ হত্যা করিতেছ। নিমাই। শ্রীপাদ ! অামার যে দুঃখ, তাহা বলিবার স্থান তােমার ন্যায় ব্যথিত ব্যতীত আর নাই। আমার দুঃখের সীমা নাই, আমি দুঃখ সাগরে ভাসিতেছি। নিতাই। তােমার আবার দুঃখ কি প্রভু ? তােমার দুঃখ তুমি অাপনি স্বীকার করিয়া লইয়াছ। জীবে হরিনাম লইল না বলিয়া তাহাদের কঠিন হৃদয় বিগলিত করিবার নিমিত্ত তুমি সন্ন্যাস লইলে। সুতরাং সন্ন্যাসজনিত দুঃখ তুমি ইচ্ছা করিয়া আপনার স্কন্ধে লইয়াছ। কেমন করিয়া কৃষ্ণের জন্য কান্দিলে ভঁহাকে পাওয়া যায়, এই জীবকে শিক্ষা দিবার জন্য তুমি সৰ্ব্বদা ক্রন্দন করিয়া থাকে। তোমার এ সব দুঃখ তুমি যাচিয়া লইয়াছ। নিমাই। শ্রীপাদ, আমার দুঃখ দুই প্রকার। এক আমার নিজের নিমিত্ত, আর এক অন্যের নিমিত্ত। নিতাই। তােমার নিমিত্ত দুঃখ কি শুনি? নিমাই। দুঃখ এই যে কৃষ্ণকে পাইলাম না, তাঁকে পাইয়া হারায়েছি। দেখিতেছ না, শ্রীগোবিন্দবিরহে আমার নয়ন মেঘের স্বরূপ হইয়াছে ?
৯৪ নিমাই-সন্ন্যাস। নিতাই। প্রভু, এ কথা থাকুক। তােমার মন তুমি জাননা, কৃষ্ণ বিরহ বস্তু কি তাহা দেখাইবার নিমিত্ত এই বিরহ তুমি স্বীকার করিয়া লইয়াছ। অতএব সে কথা থাকুক। তােমার অন্যের নিমিত্ত দুঃখ কি তাই বল, শ্রবণ করি। নিমাই। পাদ, জীবের দুঃখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। যায়। অথচ তাহাদের দুঃখ তাহারা অনায়াসে মােচন করিতে পারে। যে কৃষ্ণনাম সেই কৃষ্ণ। এই নাম করিলে অনায়াসে তাহার শ্রীচরণ প্রাপ্তি হয়। অথচ জীব তাঁহাকে ভুলিয়া ভব সংসারে ডুবিয়া আই ঢাই করিতেছে, ইহা ভাবিয়া হৃদয় বিদীর্ণ হয় ? নিতাই। প্রভু, তুমি জগত উদ্ধার করিতেছ, করিয়াছ। তােমার কৃপায় হরিনামে পৃথিবী ভাসিয়া গিয়াছে। কি সেতুবন্ধ, কি গৌড় সৰ্ব্ব স্থানে তোমার কৃপার যে তরঙ্গ উঠিয়াছে, ঐরূপ কোন দেশে, কোন যুগে হয় নাই। নিমাই। ঐপাদ, আমার হৃদয়ের কথা শ্রবণ কর। এ কথা সত্য যে আমি হরিনাম বিলাইতেছিলাম, কিন্তু তাহাতে বাধা পড়িল, তাই জীব উদ্ধার হইল না, আর সেই কথা মনে করিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। নিতাই। বাধা কি? নিমাই। শ্রীহরিনামের অসীম শক্তি। আমি সেইনাম বিলাইতে গেলাম, কি বলিব, বলিতে লজ্জা করে, শ্রীকৃষ্ণ জীবমাত্রের হৃদয় প্রেমের আকর স্থান করিয়া রাখিয়াছেন। আমি হরিনাম বিলাইতে গেলে হৃদয়ে তরঙ্গ উঠিল, আর আমি উহাতে ভাসিয়া যাইতে লাগিলাম। আমার দ্বারা আর জীব উদ্ধার হইবার সম্ভাবনা নাই।
পঞ্চম অঙ্ক।
( নিতাইর গলা ধরিয়া বারসিয়া সুরে)
আমার মন যেন আইজ, করে রে কেমন।
আমায় ধর নিতাই,
(ও নিতাই ), জীবকে হরিনাম বিলাইতে,
উঠল ঢেউ প্রেম নদীতে,
সেই তরঙ্গে আমি এখন ভাসিয়া যাই।
( ও নিতাই ), যে দুঃখ আমার অন্তরে,
এমন ব্যথিত কেবা কব কারে,
জীবের দুঃখে আমার হিয়া বিদরিয়া যায়।
( আমার), সঞ্চিত ধন ফুরাইল,
তবু জীব উদ্ধার না হলো,
মহাজনের দায়ে আমি বিকাইয়া যাই।
শ্রীপাদ ! গােলক হইতে, কৃপাময়ী শ্ৰীমতী রাধার নিকট যে ধন
লইয়া আসিয়াছিলাম, তাহা ফুরাইসা গেছে, এখন জীবের উপায়
কি বল?
নিতাই। এই জগতে তােমার প্রকাশে যে তরঙ্গ উঠিয়াছে, তাহাতে সমস্ত
দেশ উদ্ধার হইয়া যাইবে। স্ত্রী, পুরুষ, বালক, ম্লেচ্ছ, পতিত, ইত্যাদি
কেহ বাকি থাকিবে না।
নিমাই। ঐপাদ, সন্ন্যাস লইয়া আমি দেশ ত্যাগ করিলাম। তুমি ত
আমার মেহে আবদ্ধ হইয়া আমার সঙ্গে আইলে। ইহাতে কি হইল না
গৌড়দেশ আর উদ্ধার হইল না। তুমি ব্যতীত সে কাৰ্য কে করিবে ?
নিতাই। প্রভু তোমার আজ্ঞা কি, বল। তােমার নিমিত্ত আমি শতবার
প্রাণ দিতে পারি, তা তুমি ত জাননা।
আমার এই মিনতি তুমি গৌড়দেশে ফিরিয়া যাও।
নিমাই।
৯৬ নিমাই-সন্ন্যাস। নিতাই। এটা আমি পারিব না। আমি তােমাকে একতিল ছাড়িয়া থাকিতে পারিব না। নিমাই। শ্রীপাদ আমাদের নিজ সুখ বাঞ্ছা করার অধিকার নাই। আমরা যদি নিজ সুখ বাঞ্ছা করি তবে আর জীব উদ্ধার হয় না। নিতাই। যদি প্রচারের নিমিত্ত সেখানে কোন ভক্ত পাঠাইতে হয় তবে আর কাহাকে পাঠাও। তােমার ত লক্ষ লক্ষ ভক্ত আছেন। পাঠাইবার প্রয়ােজনই বা কি ? সেখানে ত শ্ৰীঅদ্বৈত আচাৰ্য আছেন ? নিমাই। শ্রীপাদ, গৌড় বড় কঠিন স্থান, সেখানে জ্ঞান লইয়া জীবে উন্মত্ত, শ্রী আচার্যের জ্ঞানে সেখানে তত ফল হইবে না। সেখানে, যাহারা তোমার ন্যায় প্রেমে মাতোয়ারা হইয়াছেন,তাহারাই কৃতকার্য হইবেন। নিতাই। বুঝিলাম না। নিমাই। গৌড়ে বহুতর মহাজ্ঞানী লােকের বাস। সেখানে কোন জ্ঞানের কথা বলিলে, তাহারাও ঐরূপ জ্ঞানের কথা বলিবেন। তাহাতে কেবল তর্ক হইবে, কোন ফল হইবে না। কিন্তু তুমি ত আর তা করিবে না। যদি কেহ নাম না লয়, তবে তুমি কান্দিয়া তার পা ধরিয়া পড়িবে, আর তখন সে জ্ঞান দূরে ফেলিয়া দিয়া শ্রীকৃষ্ণের শরণ লইবে। নিতাই। প্রভু তােমার পায়ে পড়ি, আর কাহাকে পাঠাইয়া দাও । তােমাকে ছাড়িয়া গেলে আমি প্রাণে মরিব । নিমাই। ( নিতাইর হাত ধরিয়া ) শ্রীপাদ বিতণ্ডা করিও না। আমার জীবে স্নেহ আর কতটুকু? আমার যা কিছু জীব প্রেম আছে, তাহা তােমার নিকট শিখিয়াছি ও পাইয়াছি। তুমি গৌড়দেশে যাও, যাইয়া দুঃখী জীবকে উদ্ধার কর। শ্রীপাদ আমি তােমাকে অতি কাতরে মিনতি করি। (ক্রন্দন ) পঞ্চম অঞ্চ। নিতাই। (ন্দন) আমি দেহ, তুমি প্রাণ, সুতরাং আমার স্বাতন্ত্র মাত্র নাই, যাহা অজ্ঞা কর, তাহাই করিতে হইবে। নিমাই। শ্রীপাদ, জীবের নিমিত্ত আমি সন্ন্যাস লইয়াছি, কিন্তু তােমাকে আমা অপেক্ষা কোটীগুণ ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে। নিতাই। সে কি রূপ? নিমাই। তুমি অবধূত। সংসার ও কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করিয়াছ। তােমার আবার সংসারে আসিতে হইবে। তােমার বিবাহ করিয়া গৃহী হইতে হইবে। নিতাই। তাহাতে কি হইবে? তাহাতে শাস্ত্র মতে তুমি পতিত হইবে। সমাজের মতে পৃথি- বীর মধ্যে তুমি সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হইবে। লােকে তোমাকে বিদ্রুপ করিবে, ঘৃণা করিবে, ভণ্ড বলিবে, তােমাকে ছি ছি করিবে। নিতাই। এ সব আমায় করিতে হইবে কেন? নিমাই। শ্রবণ কর। আমি সংসার ত্যাগ করিলাম, তুমি ত পূর্বে করিয়াছ। সুতরাং জীবের এক বিশ্বাস হইয়াছে যে, সংসার ত্যাগ না করিলে শ্রীকৃষ্ণ-ভজন হয় না। এরূপ বিশ্বাস হইলে কেবল উদাসীন লােকেই শ্রীকৃষ্ণের ভজন করিবে, আর তাহাদের মধ্যে বিস্তর ভণ্ড হইবে। নিতাই। তার পর? নিমাই। তাই তােমার আবার গৃহী হইয়া দেখাইতে হইবে যে, শ্রীকৃষ্ণ- ভজনে সংসারত্যাগ প্রয়োজন নাই। জীবের কেবল প্রয়ােজন শ্রীকৃষ্ণপ্রেম, তাহা হইলেই হইল। তুমি গৃহী হইলে তবে লােকে বুঝিবে জনসাধনে সংসারত্যাগ সব সময়ে কর্তব্য নয়। নিতাই। প্রভু, বুঝিলাম, তুমি শচী মাতাকে ও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে, জীবের উদ্ধার নিমিত্ত, বধ করিয়াছ। আমি ক্ষুদ্র, আমাকেও সেইজন্য ব ৭ নিমাই-সন্ন্যাস। করিতে চাও। তাহাই হউক, আমার সর্বনাশ হউক, কিন্তু জীব উদ্ধার হউক। ( ক্রন্দন ) নিমাই। দেখ ঐ পাদ, তােমার ঐ পবিত্র অসীম শক্তি সম্পন্ন দেহ দ্বারা কত কাৰ্য্য সম্পন্ন হইবে। আমি আগেই বলিতেছি যে, তুমি গৃহী হইলে তােমাকে বহুতর লােকে গ্লানি করিবে। তখন ভাবিও যে আমাদের কাৰ্য্য এই যে, নিজ স্কন্ধে দুঃখ লইয়া অন্যের দুঃখ মােচন করিব। নিভাই। জীবের দুঃখ মোচন করিতে যে দুঃখ সে ত দুঃখ নয় মহাসুখ, আমাকে সে দুঃখ যথেষ্ট পরিমাণে জাও। নিমাই। তা জানি, তুমি দয়াল শিরোমণি । তবে ঐপাদ আমার আর একটা নিবেদন আছে। নিতাই। বল তােমার কি অজ্ঞ, সমুদায়ই প্রাণপণে পালিত হইবে। নিমাই। যখন গৌড়দেশে হরিনাম বিলাইবে, তখন লােক বাছিয়া উহা বিলাইতে পারিবে না। যাহাকে সম্মুখে পাইবে, তাহাকেই উদ্ধার করিবে। একটী কথা স্মরণ করাইয়া দেই। যাহারা সুস্থ, তাহাদের চিকিৎসক কি ঔষধের প্রয়ােজন নাই। তুমি যদি কেবল সাধু দেখিয়া উদ্ধার কর, তবে সুস্থ লােককে চিকিৎসা করা হইবে। কিন্তু তাহা নয়, যে যত পতিত ও পাপী, সে তত তােমার কৃপার ভাজন হইবে। অগ্রে পাপ পরে অন্য, বুঝিলে ত? আরো এক কথা আছে। নিতাই। বল, বল, আর বিলম্ব করিও না, আমি চলিলাম, তােমার অজ্ঞা পালন করিতে এক দৌড়ে গৌড়দেশে যাবাে। নিমাই। শ্রীপাদ ! যাহারা পণ্ডিত লােক, যাহাদের মনে বিশ্বাস যে তাহারা খুব জানে, তাহাদের জানিবার আর কিছু নাই; কিম্বা যাহারা দাম্ভিক, যাহাদের মনে বিশ্বাস যে, তাহারা খু সাধু কি ভক্ত, তাহাদের ন্যায় !
পঞ্চম অঞ্চ। । দুঃখী ও হতভাগ্য জগতে আর নাই। দেখ গৌড়দেশে অনেক পণ্ডিত পাইবে, যাহারা শাস্ত্র লইয়া বাক্যের বিকিকিনি করেন, অথচ ভগবৎ-প্রেম কি ভক্তি হইতে একেবারে বঞ্চিত। তাহাদের প্রতি বিশেষ কৃপা করিবে। ( গদাধর দাস, বাসুদেব ঘোষ ও রামদাস প্রভৃতি ভক্তের প্রবেশ ও প্রভুকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করণ । ) নিমাই। কে হেদাধর দাস, কে হে রামদাস আসিয়াছ, কে হে বায় ? এসো, এসো, আমি তোমাদের স্মরণ করিতেছিলাম। ভাগ্যে তােমরা আসিয়াছ। শ্রীপাদ গৌড়দেশ উদ্ধার করিতে যাইতেছেন, তােমরা উহার সঙ্গে গমন কর। নিতাই। প্রভুর অজ্ঞা শ্রবণ কর। প্রথম অজ্ঞ যে, যে সম্মুখে পড়িবে, তাহাকেই উদ্ধার করিতে হইবে। নিতীয় যে যত পাপী, তাহাকে তত কৃপা করিতে হইবে। আর তৃতীয়তঃ বে বড় পণ্ডিত ও জ্ঞানী ও ধর্মভিমানী, তাহাদিগকে সর্বাপেক্ষা বেশী কৃপা করিতে হইবে। বা। যাকে দেখিবে, তাহাকেই উদ্ধার করিবে, এরূপ আজ্ঞা কেবল শ্রীভগবান্ স্বয়ং করিতে পারেন। আমরা যদি নিজ শক্তিতে এ কাৰ্য্য করিতে যাই, তবে কেহই হরিনাম সইবে না। আজ্ঞা লইয়া যাইতেছি, কাহার সাধ্য তাহা অতিক্রম করে ? যাহাকে হরিনাম দেওয়া হইবে সে ব্যক্তি তদণ্ডে গ্রহগ্রস্ত ব্যক্তির ন্যায় উহা গ্রহণ করিবে। নিতাই। উঠ, তবে চল যাই :- ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম । যে ভজ গৌরাঙ্গ চাদ, সেই আমার প্রাণ। { সকলের প্রস্থান। কিন্তু প্রভুর পঞ্চম গর্ভাঙ্ক। নদীয়া, সুরধুনী তীর। (ন্যায়রত্ন ও বিদ্যাবাগীশের প্রবেশ। কার। মাতাল গুলা আসিয়া গৌড়দেশ ঝালাপালা করিয়া ফেলিয়াছে। বিদ্যা। হ চারিদিকে কেবল হরিধ্বনি, দেশটা পবিত্র করিয়া তুলিল। কেমন পবিত্র করিল আগে গুন। কৃষ্ণচৈতন্য নীলাচল হইতে ১•১ জন পাগল এই গৌড়দেশে পাঠাইলেন। কেননা জীবকে উদ্ধার করিবার নিমিত্ত। অথচ ইহারা সকলে পাগল। গদাধরদাস এই দলের একজন। সে পানিহাটীর কাজীর বাটী যাইয়া বলে, “ওরে কাজী বেটা, বেরাে আর হরি বল, নতুবা তাের মুণ্ড ছিড়িব।” কাজী ক্রোধে অধীর হইয়া,“কেরে বেটা” বলিয়া, তাহাকে ধরিতে ও মারিতে আসিল। কিন্তু তাহাকে দেখিয়া অমনি নম্র হইল। ভাগ্যে সে কিছু বলিল না, কিন্তু সে যবন তাহার নিকট তােমার ওপ পাকামী করিতে যাওয়া কেন ? বিদ্যা। পাকামী ঠিক নয়, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য উহাদিগকে কি শক্তি দিয়া পাঠাইয়া দিয়াছেন, তাহাতে ইহাদিগকে দেখিয়া লােকে দ্রবীভুত ও ভক্তিমান হইতেছে। ব্যায়। তােমারও কপাল পুড়েছে না কি ? বিদ্যা। কপাল পােড়া নয়। গুন, ইহাদের আহার নাই, নিদ্ৰা নাই, আরাম নাই ; ইহারা যেন দিবা নিশি আনন্দে গলিয়া পড়িতেছে। ফলেন পরিচীয়তে। উহায়া আসাবধি লক্ষাধিক লােক ধৰ্ম্মপথে আসিয়াছে। সুতরাং ইহারা যদি পাগল হয় তবে কাজের পাগল। ব্যায়। কেন? এরা কি পণ্ডিত ? এরা কি শাস্ত্র জানে ? এরা কি তপস্যা করিয়াছে? কেবল নাচিয়া ও গান গাহিয়া বেড়ায়। (নেপথ্যে গীত)
পঞ্চম অক।
দেখ কে আসিতেছে বােধ হয় উহার। (একজন ভক্ত নাচিতে ও
গাহিতে গাহিতে প্রবেশ)।
“হরিনাম দিয়া জগৎ মাতালে আমার একলা
নিতাই।
সঙ্গে গৌর থাকলে কি না হত।”
ন্যায়। এসো, কে তুমি একটু দাড়াও, মা তলামি করিতেছ কেন?
ভক্ত। (দাঁড়াইয়া গীত) সঙ্গে গৌর থাকলে কি না হত।”
ন্যায়।
গৌর
থাকলে
কি হত?
ভক্ত। ঠাকুর এক। নিতাই জগত মাতালেন, সঙ্গে গৌর থাকলে কি না
হত।
বিদ্যা। তােমার নিতাই কি করিতেছেন?
ভক্ত। নিতাই একেবারে সমভুমি করিতেছেন। বড়কে ছােট, ছছটকে
বড়। যে পাপী, তাহাকে পরম ভক্ত; যে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, তাহাকে
তৃণাপেক্ষা দীন করিতেছেন। ব্রাহ্মণ শূন্দ্রের পাদোদক পান করি-
তেছে, স্ত্রীলােক আচার্যের কাৰ্য্য করিতেছে, আর ভুবন মঙ্গল হরি-
নাম জগতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে।
খায়। তােমার নিতাইকে একবার এখানে আনিতে পারো? তাকে বল
যে সে আমার সহিত বিচার করুক। শুধু মাতলামি করিলে হয় না।
ভক্ত। শ্রীনিত্যানন্দ বিচার করিবেন? তিনি যে এখন মালী হইয়া-
ছেন। গুন্বে ?
(গীত।)
ধর নাওসে কিশােরীর প্রেম নিতাই ডাকে আয় ।
নিতাই ডাকে আয় আয়, অদ্বৈত ডাকে আয়। (নৃত্য)
আমার নিতাই মালী, মাথায় ডালি, প্রেমফল বিলায়।
(ছড়াইয়া দেয় গাে)
১০২ নিমাই-সন্ন্যাস আবার নিই কি করিতেছেন শুন। (গীত ও নৃত্য) “এ প্রেম কলসে কলসে বিলায় তবু ন! ফুরায়। (যত বিলায় তত বাড়ে), ( ফুরায় না ফুরায় না।”) আর এক কথা শুন নাই, দেশে যে বন্যা আসিয়াছে। (নৃত্য ও গীত) “প্রেমে শান্তিপুর ডুবু ডুবু নদে ভেসে যায়।” বিদ্যা। (ভঙ্গস্বরে) এ সমুদয় দেখিয়া শুনিয়া প্রাণ কেমন করে । (ভক্তের হাত ধরিয়া) বাপু হে তুমি এরূপ মনের ভাব কোথায় পেলে ? ভক্ত। কি ভাব? বিদ্যা। এই যে আনন্দে ডগমগ করিছে ? যায়। খানিক মদ খেয়েছে আর কি। বিদ্যা। তা নয়। মদ খেয়ে যারা মাতাল হয় তাহাদিগকে দেখিলে ঘৃণা হয়। ইহাদের দেখিলে যে প্রাণ কান্দিয়া উঠে। তায়। বিদ্যাবাগীশের হইয়া আসিয়াছে। দেখো সামল, টলিয়া পড়ে। , মাথায় খানিক জল দেব ? বিদ্যা। (ভক্তের প্রতি তােমার নিত্যানন্দ প্রভু কোথা? ভক্ত। তিনি এই পথে যাইবেন, ঐ গুন কীৰ্ত্তনের রােল । ( দূরে কীৰ্ত্ত- নের ধ্বনি) (নিত্যানন্দ ও ভক্তগণের কীৰ্ত্তন ও নৃত্য করিতে করিতে প্রবেশ)। ভগণ। (নৃত্য করিতে করিতে গীত) হরিবল, হরিবল, হরিবল ভাই। নাম বিনা কলিযুগে আর গতি নাই। (ও দিন বয়ে গেল রে ) ( মিছা কাজে তাের দিন বয়ে গেল রে।) পূৰ্ব্বকার ভক্ত। (নিত্যানন্দের প্রতি) ঠাকুর শান্ত হও, এখানে দুটি জীব আছেন ইহাদিগকে উদ্ধার করিয়া যাও।
পঞ্চম অঞ্চ।
১০৩
নিতাই।
নিতাই। বটে ত। প্রভুর আজ্ঞা যে যাহাকে সম্মুখে পাবে, তাহাকেই
হরিনাম দিবে। সমুদয় পথ বন্ধ কর, যেন কে না পলায়ন করে।
(বিদ্যাবাগীশের হাত ধরিয়া) তুমি বুঝি সেই দুজনের একজন ?
তােমাকে পরীক্ষা করিতেছি। তুমি কি মনে মনে ভাব যে তুমি
বড় পণ্ডিত ?
বিদ্যা। না, আমি কিছুই জানি না।
নিতাই। বেশ! তুমি কি মনে ভাব তুমি বড় সাধু?
বিদ্যা। না, আমি বড় অধম।
তবে তুমি এখন থাকে। তুমি ছাড়াইয়া যাইতে পারিতেছ না,
কারণ সন্মুখে পড়িয়াছ। যাহা হউক তােমার পীড়া তত গুরুতর নয়,
তােমার চিকিৎসা একটু পরে হইলে চলিতে পারে।
বিদ্য। বুঝিলাম না।
নিতাই। তবে বােঝে। আমার ঠাকুর শ্রীগৌরাঙ্গ প্রভু, তাহার আজ্ঞা
এই যে যাহাকে সম্মুখে পাইবে তাহাকে উদ্ধার করিবে। তুমি সম্মুখে
পড়িয়াছ, অতএব তােমার আর অব্যাহতি নাই।
বিদ্যা। এই যে বলিলেন, আমার পীড়া তত গুরুতর নয়, অতএব
আনার চিকিৎসার নিমিত্ত অপেক্ষা করা যাইতে পারে। তাহার
মানে কি ?
নিতাই। ওন, তিনি আর কি বলিয়াছেন। যিনি দাম্ভিক, তাহাকে
সর্বাগ্রে উদ্ধার করিতে হইবে। প্রভুর এই আজ্ঞা। তুমি দাম্ভিক নও,
অতএব তােমা উদ্ধার এখন থাকুক।
বিদ্যা। না তাহা হইবে না। আমি যে এই মাত্র পরিচয় দিলাম যে আমি
দীন,-সে কপটতা, আমার মন অভিমানে পূর্ণ। অতএব আপনি
এখনি আমাকে উদ্ধার করুন।
নিমাই-সন্ন্যাস। নিতাই। আচ্ছ, তাই হউক। তবে তােমাকে আর উদ্ধার করিব কি ? তুমি যে উদ্ধার হইয়া আছ। তুমি যে প্রভুর নিজ জন। তোমার যে হৃদয় ভক্তিপূর্ণ। তোমাতে যে প্রভুর সম্পূর্ণ কৃপা। বিদ্যা। ( ক্রন্দন করিতে করিতে) আপনি আমাকে উদ্ধার করুন। নিতাই। ভাল, হরিবল। বিদ্যা। হরিবােল, হরিবােল হরি। নিতাই। (বিদ্যাবাগীশের হাত ধরিয়া) এসাে, হরিবলি আর নৃত্য করি। (এইরূপ মুখে হরিবােল ও উভয়ের নৃত্য) (বিদ্যাবাগীশের পতন ও মুচ্ছা) নিতাই। (চিৎকার করিয়া) প্রভু। প্রভু! এই আর একটা দাস লও। ১ম ভক্ত। এই যে আর একজন বাকি আছেন। আমাদের ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়। নিতাই। তাইত, লুকাইয়া আছেন বুঝি? লুকালে চলিবে না। এখন তােমার পালা। আজ্ঞা শুনিয়াছ? যাহাকে সমুখে পাবে যায়। শুন, আমার এদিকে এসাে না, এলে ভাল হইবে না। নিতাই। খুব ভাল হবে, তােমারও ভাল হবে, আমারও হবে। ন্যায়। এই দেখ, আমার হাতে দণ্ড, আমার কাছে আসিলে আমি প্রহার করি। নিতাই। ডাল, প্রহার আমার অঙ্গের ভূষণ। তুমি কেন, অনেকে আমাকে প্রহার করিয়াছে। তা যাউক। আপনি কি পণ্ডিত ? ব্যায়। হা আমি পণ্ডিত, তােমাদের ন্যায় মূখনই। নিতাই। আপনি কি বড় সাধু? ন্যায়। হাঁ সাধু, তােমাদের অপেক্ষা ঢের সাধু গেমাদের ন্যায় ভণ্ড নই। নিতাই। তবে ত হয়েছে। তুমি যে বড় কপার পাত্র। তােমার যে পঞ্চম অঞ্চ। বেশ অভিমান আছে, যাহার অভিমান আছে সেই শ্রীভগবান্ হইতে বহুদূরে। অতএব তােমাকে উদ্ধার করা সর্বাগ্রে কর্তব্য। প্রভুর এই আজ্ঞা। ন্যায়। রেখে দাও তােমাদের ভণ্ডামি, আমি তােমাদের প্রভূকে মানি না। নিতাই। তুমি প্রভুকে মান না? বােধ হয় তাহাকে দেখ নাই, তাঁহার কাৰ্য্য দেখ নাই। এই তঁাহার বয়স ২৭ বৎসর। রূপ শ্রীকৃষ্ণের ন্যায়, পাণ্ডিত্যের অবধি নাই। দুঃখে জীব দেখিলে কান্দিয়া মূচ্ছা যান। এভ জীবকে কৃপা করিয়াছেন যে, কোটী কোটী লােক এই দুই তিন বৎসরের মধ্যে তার শরণাগত হইয়াছে। তাহাকে মন না ? ন্যায়। না মানি না নিতাই। তাহার শক্তি দেখ। এই বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের কর্ণে হরি- নাম বলিলাম, আর অমনি প্রেমে মৃচ্ছা গেলেন, একি ভগবৎ শক্তি ব্যতীত হয়? এইরূপ কোটী কোটী জন আমার প্রভুর কৃপায় কৃষ্ণ প্রেম পাইয়া উদ্ধার পাইতেছে। ন্যায়। বিদ্যাবাগীশ বুঝি উদ্ধার হইলেন। তবে বিদ্যাবাগীশ ! (গা ঝাকান) কত দূর উদ্ধার হইলে? নিতাই। অমন করে চেতন করাইতে পারিবেন না। আমি চেতন করাইতেছি। (বিদ্যাবাগীশের কর্ণে উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণনাম করণ। এইরূপ করাতে বিদ্যাবাগীশের নয়ন উন্মীলন, পরে উঠিয়া দুই বাহ তুলিয়া “হরিবােল” হরিবােল” বলিয়া নৃত্য)। ন্যায় কি হে বিদ্যাবাগীশ খেপে উঠলে নাকি ? বিদ্যা। (নৃত্য করিতে করিতে) খেপেছি। খেপেছি! খেপেছি ! আমি খেপেছি, তুমিও খেপ, জগত এইরূপে খেপুক। কি আনন্দ। এখন নিমাই-সন্ন্যাস দেখিতেছি শ্রী ভগবান মঙ্গলময় : তিনি আমার, আমি তার, তিনি আমার প্রাণের প্রাণ । নিতাই। (ন্যারালঙ্কারের প্রতি) দেখিলে শ্রীকৃষ্ণকে আশ্রয় করিবার ফল ? ইনি বিখ্যাত অধ্যাপক, অটল, গভীর ও জ্ঞানময় । এখন আনন্দে নৃত্য করিতেছেন। এ আনন্দের মূল্য ষে প্ৰণাপেক্ষা অধিক। ন্যায়। তা হউক, অামার নিকট আসিও না। নিতাই। তুমি কি ছাড়াই সাথে না কি? তা হইবে ন', প্রলুব এরূপ আজ্ঞা নয়। ন্যায়। বিব বই কি? নিতাই। আর যেতে হয় না ! ভায়। মানি হরিনাম না লইলে তুমি কি করিবে ? নিতাই। এই দেখ, কি করিব। (কষাড়ে ):ঠাকুর! হরিনাম গ্রহণ কর, তােমাকে মিনতি করিতেছি। ন্যায়। যাও যাও আমি লইব না । নিতাই। (সুরে “এসো ভাই করি বুকে, হরিনাম বল সুখে”। ( সহজ স্বরে হরিনাম বলাে, বলিয়া আমাকে একবারে কিনিয়; লও, আমি তােমার দাস হবে। (দন্তে ও হস্তে তৃণ ধরিয়া) ভাল এই আমি দন্তে ও হস্তে তৃণ ধরিয়া তােমাকে প্রাণের সহিত মিনতি করিতেছি, হরিনাম গ্রহণ কর, করিয়া অনায়াসে তরিয়া যাও, তুমি হরিনাম লইয়া দয়াময় কৃষ্ণকে কৃপা কর। ঝায়। যাও, আমাকে বিরক্ত করিও না, আমি পারিব না, আমি গৃহে যাই। নিতাই। (জানু পাতিয়া ) ভাই এরূপ সৌভাগ্য কেন ছাড়িবে? হে ভগবান! হে শ্রীকৃষ্ণ ! হে গৌর! এই ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়কে গ্রহণ !
পঞ্চম অঙ্ক।
কব। (রোদন) ভাই এসো, সকলে মিলিয়া অামাদের প্রাণনাথকে
ভজনা করি। তুমিও যার, আমিও তার। আমি তাকে ভজনা
করিব, অব তুমি করিবে না, ইহা কি রূপে হয় ?
ন্যায়। তা হউক, আমি বিবেচনা করিয়! দেখি, এখন আমি বাড়ী
যাই।
নিতাই। শুকার্যে আর বিলম্ব কি? হলো না, হলো না, হে
শ্রী ভগবান! এই লঙ্কার মহাশয়কে গ্রহণ কর। (মৃত্তিকায় গড়া-
গড়ি) প্রাণ যায়, প্রাণ যায় । হে ভগবান্ তুমি যদি এই ন্যায়া-
লঙ্কার মহাশয়কে এখনি গ্রহণ না কর, তবে সত্য সত্য আমি মাথা
কুটিব, কুটিয়া প্রাণ ত্যাগ করিব।
এ জাবার কি ভাগ ? আজ কেন থাকুক না ? এই দেখ
অামার ক্রন্দন অপিতেছে। লোকে কি বলিবে? আমি যদি এখন
হ, ঐলি, ইবলি, হমিবনি, তবে সে বিদ্রুপ করিবে। হরি এখন
বলিব না! (চেঁচাইয়া) হরিবোল হরি, কখনও বলিব না, হরিবােল
হরি। মুখে যে অাপনি আইন। এ কি ভোগ, হরিবােল হরি।
নিতাই। (উঠিয়া ন্যায়ালঙ্কারের হাত ধরিয়া} এস ভাই নৃত্য করি।
( হাত ধরিয়া নৃত্য) (ন্যায়সঙ্কারের নৃত্য)।
ন্যায়। বাচিলাম! আমি ন্যায়ালঙ্কার আমি বাঁচিলাম! হে শ্রীগৌরাঙ্গ।
আমাকে নাচাইলে, আমাকে এখন ক্ষমা কর। হে প্রভু! এই দীন ভক্তি
শুষ্ক, কঠিন, নাভিমানী নির্বোধকে চরণে গ্রহণ কর।
( মূচ্ছ।)
নিতাই। একজনকেও ছাড়ব না। এসো ভাই আমাদের নূতন কৃষ্ণের
দাসকে ঘিরিয়া নৃত্য করি। ( সকলে হাত ধরাধরি করিয়া ন্যায়--
লঙ্কারকে ঘিরিয়া নৃত্য ও গত)।
নিমাই-সন্ন্যাস।
সকলের গীত।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হে।
(একবার উদয় হও হে।)
রাম রাঘব রাম রাঘব রাম রাঘব পাহি মাম।
কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব কৃষ্ণ কেশব রক্ষ মাম্।
पर्छ
গর্ভাঙ্ক।
নিময়ের বাড়ী।
(তণ্ডুলপূর্ণ ও শূন্য দুটা মালসা সম্মুখে শ্রীমতী, বিষ্ণুপ্রিয়া জপে আসীন।
শ্ৰীমতী। কাঞ্চন। এ দিকে আয়। (কাঞ্চনার প্রবেশ) আজ একটা
আশ্চৰ্য্য দেখিয়াছি।
কাঞ্চনা। ঠাকরুণ! তুমি কথা কহিতে ক্ষান্ত দাও। এক ফেরা মালা
জপিবে, আর একটী করিয়া তণ্ডুল উঠাইয়া রাখিবে, সেই কয়েকটা
তণ্ডুল তােমার সমস্ত দিনের আহার। তুমি যে কেবল এক ক্ষুদ্রমুষ্টি
তঙুলের অন্ন গ্রহণ করিয়া এতদিন
এতদিন জীবিত আছ
আছ ইহা কেবল
প্রভুর কৃপা।
শ্ৰীমতী। তা হােক। আজ ৫ বৎসর প্রভু সংসার ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন,
সেই সঙ্গে সঙ্গে আমারও ইহকালের মুখ ফুরাইয়াছে। কিন্তু আজ
আমার অন্তর আনন্দে পরিপ্লত হইতেছে, আমার বাম আঁখি নৃত্য
করিতেছে, ইহার বা কারণ কি বুঝিতে পারিতেছি না।
কাঞ্চনা। ঠাকরুণ তুমি যেরূপ কঠোর ব্রত অবলম্বন করিয়াছ, এরূপ
কেহ কখনও করে নাই। নিশ্চয়ই প্রভু আসিয়া তােমাকে দর্শন
দিবেন।
মতী। অদ্য গঙ্গাস্নান করিতে গিয়া দেখিলাম কি
কাঞ্চন।। তুমি যখন গঙ্গাস্নান করিতে যাও, তখন শচী মায়ের আঁচল
ধরিয়া যাও। তােমার নয়ন দুটী তখন মায়ের পাদপদ্মে নিবিষ্ট থাকে,
তুমি দেখিলে কিরূপে?
শ্ৰীমতী। আমি হরিধ্বনি শুনিয়া মুখ তুলিলাম। শুনিলাম যেন কোটী
কোটী লােক ব্ৰহ্মাণ্ড ভেদ করিয়া হরিধ্বনি করিতেছে
১১০ নিমাই-সন্ন্যাস। দেখি যে ওরে, কুলিয়া নগরে, কোটী কোটী লােক বাহু তুলিয়া রিধ্বনি ও নৃত্য করিতেছে। তখন ভাবিলাম, অবশ্য প্রভু ইহার মাঝে অছেন, প্রভু ব্যতীত এ কাৰ্য কে করিবে ? তখন দেখিলাম, আমার ভ্রম কি না তাহা বলিতে পারি ন', যেন সেই কোটা লােকের মধ্যস্থলে একজন নৃত্য করিতেছেন, আর ভঁহাকে ঘিরিয়া সকলে মৃত্য করিতেছে। যদি বল দেখিলাম কিরূপে? তাহার কারণ তিনি সকলের অপেক্ষা দীর্ঘকায় ও সকলের অপেক্ষা সুন্দর। কাঞ্চন। ৩২ তিনিই যে আমাদের ঠাকুর, তাহার আর সন্দেহ নাই। কারণ কোটা লােকের মধ্যস্থলে দাঁড়াইলে দেখা যায়, এরূপ সুদীর্ঘ গুরুষ তিনি ব্যতীত আর কে ? আর তুমি বলিতেছ, সুন্দর পুরু, খামাদের ঠাকুরের বর্ণও কঁচা সােণ্যর ন্যায়। এরূপ বর্ণ আর কাহারও নাই। (নেপখো কোলাহল ও হরিধ্বনি, একজন ভক্তের প্রবেশ) ভক্ত। কই-কোথা, শচী মা কোথা? প্রভু আসিতেছেন! ( শ্ৰীমতীর অভ্যন্তরে প্রস্থান ও শচীর প্রবেশ শচী। কি বলছো বাপু? তার কি শুভদিন উপস্থিত, ঠাকুর বাড়ী আসিতেছেন। শচী। তুমি কি আমাকে বঞ্চনা করিতেছ? তিনি সন্ন্যাসী, তিনি কিরূপে ঘরে আসিবেন। (নেপথ্যে হরিধ্বনি) ভক্ত। ঐ গুন, তি'ন আসিতেছেন ! ঠাকুরাণি, তুমি কি জাননা যে সন্ন্যাস করিলে একবার জন্মভূমি দর্শন করিতে হয়। সেই নিয়মানুসারে প্রভু আসিতেছেন।
পঞ্চম অঙ্ক । ১১১ (প্রভু ও ভক্তগণের প্রবৃশ ) শচী। এই কি আমার বাপ নিমাই ? এসো বাপ, আমার কোলে এস। ( প্রভুর প্রণাম ) প্রভু। মা আমি তােমার অবুঝ সন্তান, আমার দ্বারা তােমার কোন সাহায্য হইল না, কোন সুখই পাইলে না। শচী। ছি বাপ, অমন কথা বলিও না, তুমি যায় সন্তান, তার আবার দুঃখ কি ? আমার মরণ সময় উপস্থিত হইয়াছে, আমি এটা বুঝিয়াছি, যে তোমার গভবানী বলয়। শ্রীকৃষ্ণের কৃপা পাই। তবে আর দুঃখ কি ? প্রভু। (উঠিয়া মা আমি চলিলাম । শচী। বাপ, এখানে আজ ক্ষ। কর, আমি একবার মন করিয়া তোমাকে মনের মতন খাওয়াই। প্রভু। মা তু ম শ্রীঅদ্বৈত আচায্যের বাটীতে যাও আমি ও সেখানে যাই- তেছি। সেখানে আমি তোমার হস্তে ভিক্ষা করিব। ( সর্বাঙ্গ বন্ধে আচ্ছাদিত হইয়া শ্ৰমতীর প্রবেশ ও প্রভুকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত ) প্রভু। ( পশ্চাতে দু পা হটিয়া) কে তুমি? কি চাও? শ্ৰীমতা। আমি আপনার দাসীর দাসী। প্রভু তোমার কৃপায় ত্রিতের সবাই উদ্ধার পইয়া গেল। কেবল হতানি বিষ্ণুপ্রিয়া পড়িয়া ব? প্রভু আম আর তোমার নিকট কি প্রার্থনা করিব? আমার অভাব কি? ম ম গৃহে থাকি,তুম বনে থাক । আমি বন্ধু পার- ধান করি, তােমার কৌপীন মাত্র সম্বল। তবে কি না ; অমি কালে তােমার চরণ প্রাপ্ত হই, এই আমার প্রার্থনা।
১১২
নিমাই-সন্ন্যাস
প্রভূ। শ্রীকৃষ্ণ কৃপাময়, তাহাকে ভজনা কর।
শ্ৰীমতা। আমি তােমাকেই জানি, শ্রীকৃষ্ণকে জানি না। তুমি আমাকে
এমন কিছু দিয়া যাও যে, যে কয়দিন জীন ধারণ করি, তােমার
স্মরণে ও মননে কাল কাটাইতে পারি ।
প্রভু। ( একটু চিন্তা করিয়া) আচ্ছা তাহাই হউক, আমার পরিবর্তে
আমার এই দুইখানি খড়ম তোমায় দিলাম। তুমি ইহা গ্রহণ কর।
( খড়ম প্রদান )
শ্ৰীমতী। (খড়মকে প্রণাম করিতে করিতে। তুমিই আমার প্রভু,
তােমাকে আমি পূজা করিব। তােমাকেই হৃদয়ে ধারণে আমার
বিরহ যন্ত্রণা দূর করিব।
( খড়ম চুম্বন ও হৃদয়ে ধারণার মশুকে লইয়া ধীরে ধীরে প্রস্থান ও
সকলের হরিধ্বনি)।
যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.