Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Chitra O Chitto
Front matter
No text on this page.
চিত্র
ও চিত্ত
গাধা-কাব্য ।
বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
মুল্য এক টাকা
প্রকাশক-হরিদাস চট্টোপাধ্যায়
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১/১ কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট,
কলিকাতা।
বসন্তকুমারের গ্রন্থাবলী
===
৮ ।
ঐ
কাব্যগ্রন্থ
গল্প ও উপন্যাস
মন্দিরা (২য় সংস্করণ) ॥ণ০
শাপমুক্তি
১০
lণo
পঞ্চপাত্র
পজিনা (যন্ত্রস্থ।
১০
পত্রচিত্র
ho
সপ্তসুরা(২য় সংস্করণ যন্ত্রস্থ) ১১ সুন্দরী
জোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতি
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১ কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা।
ত্যি
২।
১৫ রায়বাগান ধ্রুটি
রতি প্রেস হইতে
শ্রনীরদচন্দ্র Iেষ কর্তৃক মুদ্রিত
ভূমিকা এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট সমস্ত গাথাগুলিই পরিচারিকা, মানসী, মালঞ্চ, ভারতবর্ষ, মর্মবাণী, পুষ্পপাত্ৰ, আৰ্যাব, বিজয়া, শিল্প ও সাহিত্য, মানসী ও মর্মবাণী, মাসিক বসুমতী, বিচিত্রা, গল্পাঞ্জলি, মাতৃমন্দির প্রভৃতি মাসিকপত্রে ইতিপূর্বে প্রকাশিত হইয়াছে আমার মনে হয়, এ শ্রেণীর কবিতার গীতিকবিতার সহিত একত্র স্থান, শােভন নয়, তাই স্বতন্ত্র গ্রন্থে ইহাদের স্থান নির্দেশ করিলাম। এই কাব্যের প্রচ্ছদপদের পরিকল্পনা করিয়াছেন আমার আকৈশাের বন্ধু বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্র কুমার সেন । ইহার নিকট ঋণস্বীকার করিয়া ধন্যবাদ দিতে যাওয়া নিতান্তই হাস্যকর মনে হইতেছে, তাই সে চেষ্টা করিলাম না। বন্ধু আমায় অকৃতজ্ঞই মনে করুন। ইতি—সন ১৩৩৮ সাল ২৩শে কার্তিক ৪৫১এ বীডন স্ট্রীট, কলিকাতা শ্ৰীশ্ৰীশ্যামাপূজা ৮ই নভেম্বর, ১৯৩১ শ্রীবসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় সূচী পৃষ্ঠা বিষয় শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা ১ শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস ৪ ১. ১৭ ৩৪ ফাদূৰ্শী যবন হরিদাস গুরু-শিষ্য পণু-অভিশাপ প্রতীক্ষা নির্ণামিকা ধৰ্ম্মজ্ঞান দান-প্রত্যাখ্যান সংসারের মায়া পদত্যাগ খেলু হাজরা ব্যথা-বণ বিনী ১১ ৪৪ ৪৭ ৭৭ ৮৭ বী হাম্বির দেহ ও মে তপােবিনিময় বসন্ত-সেনা ধৰ্ম্মপত্নী পতিতা সুবিচার సిన ১০৪ ১০৮ পরমকল্যাণীয়- শ্ৰীমাবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘাৎ-
No text on this page.
চিত্র ও চিত্ত
শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা
(বােধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা হইতে)
শ্রাবস্তী মহানগরীর প্রতি দুয়ারে দুয়ারে কাশ্যপ
সারা দিনমান্ ফিরিছেন ডাকি সহি নিদারুণ তৃষাতপ
“অভিমানহীন কাহার হৃদয়, কে দিবে ভিক্ষা মােরে আজ?
মাগে ভগবান—শ্রেষ্ঠ
বস্তু, যার যাহা আছে মহীমাঝ ।”
পড়িল তুমুল কল-কোলাহল, জনপদ জুড়ি কালাে ছায়া-
শ্রেষ্ঠ বস্তু কার কি যে আছে, কার’ পরে তার কত মায়া !
নিরূপিতে গিয়া দেখিল সবাই যার যাহা আছে তাই তার
শ্রেষ্ঠ, নহিলে চলে না মােটেই—বড় একান্ত আপনার।
কি দিয়া কি-রাখে এই সমস্যা সমাধানে রত গৃহীগণ
তণ্ডুলকণা হ’তে কোষাৰ্থ সবেতেই সম-প্রয়ােজন।
নৃপ দিল এক শ্রেষ্ঠ হস্তী রতনমালায় বিভূষিয়া
প্রত্যাখ্যান শ্রমণ সে দান, চলি গেল মুখ ফিরাইয়া !
তীব্র পুঞ্জ-অপমান-সম দাঁড়ায়ে রহিল করি-বর
রবিকররেখা ঠিকরি রতনে ছুড়ে বিদ্রুপ খরতর।
চিত্রওচিত্ত ভাবি মনে মনে—দেখি জগতের এ-শােভা-রাজ্য অভিনব ভিক্ষুর মন মােহিবে, নিবে সে আমার এ সেরা বৈভব- শ্রেষ্ঠি পার্থবাহেরা আনিল নানা দেশানীত সম্ভার, বসন ভূষণ পাত্র অজিন শিল্প চিত্র কারু আর। বাঁকায়ে গ্রীবাটি বাম করে ঠেলি চলিল শ্রমণ গান গেয়ে দেশ-দেশান্ত-আনীত লজ্জা দেখিছে বণিক চেয়ে চেয়ে। মড়কের মত প্রতি ঘরে ঘরে নিমেষে জাগিল কল্লোল কি চায় ভিক্ষু, কি যে দিতে হবে, পড়িল নগরে মহা রােল ! থালে থালে ভরি সব সম্পদ নিঃশেষ করি কোষ তার নিয়ে এল ধনী প্রচুর অর্থ মণি কাঞ্চন ভারে ভার। কত পুরুষের সঞ্চিত এ যে প্রাণাধিক প্রিয় এই ধন বারেক ফিরেও চাহিল না, ওগাে, কেমন ভিখারী এই জন। শ্রান্ত তপন ডাকিছে তখন অস্তপারের পাটনীরে শেষ খেয়াখানি রাঙিয়া তুলিছে তিমির-তীরের তরণী এ! ব্যর্থ শ্ৰমণ উপজিল আসি নগরােপান্ত বনমূলে দূরে দূরে পিছে আসে নর-নারী বিস্মিত সব কায ভুলে। পথিপাশে এক নিশ্ব বিটপী, দেখিল শ্রমণ তারি তলে শয়ান একটি কুষ্ঠিনী, শুধু গলিত মাংসে আঁখি জ্বলে ! তীব্ৰ কুষ্ঠে কি পূতি গন্ধ ! গরলজারিত বহু দূর- মাঝে মাঝে আসি লােলুপ শৃগাল লেহিছে সে দেহ মােগাতুর !
শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা
–
নাহিক শক্তি নাড়িতে অঙ্গ, কহিল শ্রমণে সকাতরে-
“বাচায়ে রেখেছি একটি অনু, নিয়ে যাবে কিগাে দয়া করে?
কম্পিত করে দিল ভিক্ষুরে, সে ক’টি অন্ন যথাবিধি
উল্লাসে নাচি কহিল ভিক্ষু “পেয়েছি এবার মহানিধি !”
তপন তখনি ডুবিল সাগরে লাল মেঘালী পরপারে
উদগত জলবিন্দুনিচয় ফলিল গগনে তারাকারে।
শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস
(বােধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা হইতে)
একদা কপিলবাস্তু নগরের গ্রোধ-আরামে
উপজিল নৃপ নন্দ ভগবান বুদ্ধে নতি-কামে!
প্রসন্ন সুগত, নন্দে কহিলেন সাদর বচনে
“পুণ্য যদি চাহ বৎস্য, ভােগ রাগ বিলাস ব্যসনে
ত্যজি, লহ’ বৈরাগ্যের বৈজয়ন্তী চীবর-কেতন
জগতের কল্যাণেতে করে দাও আত্মনিবেদন।
আকর্ণ-আরক্তগণ্ড নিবেদিল নন্দ করযােড়ে-
“প্রব্রজ্যায় নাহি বাঞ্ছা, ক্ষমা কর প্রভু এবে মােরে।”
পূর্ণ এক বর্ষ পরে নানা দেশ ঘুরিতে ঘুরিতে
পুন প্রভু আসিলেন নন্দ মহারাজের পুরীতে ।
স্তবচ্ছন্দে বন্দি’ পদ নন্দ অভিনন্দিয়া সুগতে
পদব্রজে পিছে পিছে চলিতে লাগিল রাজপথে,
আশ্রমে পুরােপকণ্ঠে পৌছি দিতে বুদ্ধ ভগবানে
সুবিনীত, লক্ষ্যহীন নগরের মহােৎসব পামে!
পৌছায়ে সুগতে সঙ্ঘে, নন্দ যবে মাগিল বিদায়
নিবারিয়া ভগবান, বসিতে কহিলা ইসারায়।
৪
শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস “এত কেন ত্বরা বৎস, সংসার কি এতই সুখের ? দেখিছ না জরা মৃত্যু হাহাকার, আকর দুখের ? সম্পদ সে ইন্দ্রধনু! এ যৌবন-পৰ্ব্ব-বিধু চলে প্রতিপদে তিলে তিলে জরসী অমার সুকবলে! সর্ব শেষ আছে মৃত্যু—ফেলে যেতে হয় সব যত- সুখশ্রী ভঙ্গুর ভবে, বারাঙ্গনা-ভঙ্গের মত! সম্পদ, স্বজন, প্রিয়া, ভােগবাঞ্ছা যত দিন প্রাণ, দেহান্তে বিলীন সব! শুধু এক বৈরাগ্যই ত্রাণ।” নন্দের প্রবণ চিত্ত দোলাকুল সন্দেহ-দোলায় সুমন্দ-মারুত-মৃদু-আন্দোলিত লতিকার প্রায়। প্রাণ মন সৰ্ব্ব-অঙ্গ যে মন্দিরে বন্দী ও বন্দারু গুঞ্জরিছে সুন্দরীর চুম্বি’ মুখ-মকরন্দ-চারু যাহার বিরহে দেহ ভেঙ্গে পড়ে মৃত্যু-যাতনায় তার তরে লজ্জা কেন বচনের রচে অন্তরায় ? কহিল রাজেন্দ্র শেষে—“গৃহই আমার প্রিয়, প্রভু, ভাল হাে ম হােক, প্রব্রজ্যায় ইচ্ছা নাহি তবু।” ছাড়িয়া তবু বুদ্ধ দানিলেন বহু উপদেশ একান্ত সে অনুবােধ এড়াইতে নারিল নরেশ। প্রব্রজিত হ’ল নন্দ। পরিধানে কাযায় বসন পাত্র-পাণি, বনবাসী, মনােদুঃখে স্তম্ভিত বচন।
চিত্র ও চিত্ত প্রিয়ার চিন্তায় ধ্যানে যাপে দিন মদাহী ছলে তিতে বক্ষ নিরন্তর বেদনার তপ্ত অখিজলে! পূর্ণ হ’ল এক মাস। জাগে নন্দ প্রিয়াস্মৃতি নিয়া বিনিদ্র নিশায় হেরে তাপথ কান্তা আ গুলিয়া। দিন দিন পারুচি প্রিয়া-হারা (নহে বােধিধ্যানে ) দেখিয়া নন্দেরে প্রভু পুছিল। ডাকিয়া কাছ-পানে, এ ব্ৰত পরম ধর্মে মনস্থির হইয়াছে কি না। উত্তরিল অধীর নৃপতি-মরিতেছি প্রিয় বিনা! ফিরাইয়া লহ’দেব, এ নিষ্ঠুর করুণা তােমার, যেতে দাও গৃহে মােরে, কিম্বা দাও সঙ্গ দয়িতার। এ বৈরাগ্য-দীক্ষা যে গাে হত্যা সম নিষ্ঠুর ভয়াল, কুটিল হিংসার মত, স্বার্থসম সুনীচ, দয়াল!” কাটিল আরেক মাস। অপরাহ্ন। বহে মন্দানিল- নিঃসঙ্গ বসিয়া নন। উর্ধে শান্ত অম্বর সুনীল। অকিয়া কান্তার চিত্র গলিত গৈরিকে শিলাতলে মণ্ডি মনােমাধুরীতে কল্পনায় মিলনের ছলে, কহিল তন্ময় নন্দ—“সত্য প্রিয়ে, এই মিথ্যাচার। আমার সন্ন্যাস চেয়ে মিথ্য। তবে কিছু নাই আর। এ চীবর রক্ত বর্ণ, তব প্রেম-রাগ-মঞ্জিমায়, কাটি দিন ছদ্মবেশে, বঁচি শুধু তােমারি চিন্তায়।
শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস
অদুরে শুনিতেছিল কয় জন ভিক্ষু এ প্রলাপ
প্রভুর গোচরে আসি কহি’ দিল শ্রমণের পপি !
সহসা উদ্দীপ্ত হ’ল সুগতের বন-মণ্ডল,
পুলকে স্পন্দিল নেত্র, উপজিল চরণ-চঞ্চল।
গম্ভীর আননে প্রভু ভৎসিলেন নন্দ নরনাথে--
“উন্মত্ত হলে কি নন্দ ? বিসর্জিলে লজ্জা ধৰ্ম্মসাথে ?
অস্থি চৰ্ম্ম রক্ত মাংসে গড়া এই কু দেহতরে
দলিছ চরণে এ কি জ্যোতির্ময় অমর সুন্দরে ?”
==
কহিল অধীর নন্দ, সুন্দরীর বিরহের ভারে-
“ক্ষমা কর হে ঠাকুর, রূপহীন বলল না তাহারে
কপ-কামুকলতা, অনিন্দ্যা, সুন্দরী, সুলােচনী,
কুস্মিতা সে যে অপমানিবিড় স্তবক—স্তনী;
সুললিত লোল জ্বলতার সাবলীল লাস্যে যার
বিশ্ব কবে জয়, যার অনবদ্য বদন-শােভার
পরিমাণ-পরিমাপে শােভাকর হের চন্দ্রম -
তুলাদণ্ডে উন্ধে অধিরূঢ় অপিনার লঘুতায় !
“আমার বিহনে সে যে বিরহিণী চক্রবাকী হেন
চেয়ে আছে নিরুদ্দিষ্ট অন্ধকার দিগন্তরে যেন!
বিদায়-প্রারম্ভে তার সকাতর মৌন দৃষ্টিখানি
উপাড়িতে নারি আজো, শল্যসম বক্ষে আছে হানি!
চিত্রওচিত্ত “মণি রত্ন গজ বাজি রাজ্য সৌধ আমার সকল দয়িতা-পরশমণি-ইহলক্ষ্মী সে বিনে বিফল। প্রিয়াই আমার সুখ, ধ্যান, পূজা, লব সেই মম- দিগ্বিদিকে দেখি তাই—তারি কথা, তারি লিপি সম!” ধীরে ধীরে কহিলা সুগতবৎত মাের, এ যে ভ্রম। অকল্যাণ-মিত্র-মােহে ত্যজিবি কি কল্যাণ পরম ? রমণীয় কিছু নাই ভবে। মানবের অনুরাগ, আর এই চিরন্তন কামনা ও প্রার্থনার ফাগ লাগে যার গায় (হােক্ সে কুৎসিত যত এই ভবে) তারেই সুন্দর করে, প্রিয় করে মাধুৰ্য-গৌরবে ! মুছে ফেল’ এ মেহ-কলঙ্ক, ছিড়ে দেখ মায়া-ডাের- কি কুৎসিত বীভৎস সংসার দিয়াছ যাহারে ক্রোড়।” “দয়ার দেবতা যে গাে করুণার তুমি অবতার- এ কি বাণী তব মুখে, এ কেমন তব ব্যবহার ? ক্ষুদ্র নর আমি ভবে, বুঝি ও গাে ক্ষুদ্রতর কথা- সেই শ্রেষ্ঠ স্বর্গ তার, যার তরে বাজে যার ব্যথা! সন্তুষ্ট যে যেথা থাকে, থাকিবারে দাও তারে সেথা। পথিক সে নিজে খুজে লয় সুপথ তাহার যেথা। আমি যারে ভালবাসি সে আমার স্বর্গ মােক্ষ সব- আমারে যে ভালবাসে, সে আমার পরম বৈভব।”
শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস
“জনক ও জননীর যুগ্ম প্রেম প্রীতিরসায়নে
জন্মার গর্ভে যার ; বাৎসল্যের স্তন্যে ও চুম্বনে
নিয়ত বাড়িল যাহা ; বল্লভীর বাহুবল্পী যারে
একান্ত আগ্রহে ঘিরি রাখিয়াছে আলােঅন্ধকারে
সে কি পারে বিসজ্জিতে জন্মগত প্রতি ভালবাসা ?
পশুও পারে না যাহা, মানুষে তা কর’ তুমি আশা ?
কৃমি কীট জন্মে যথা, থাকে তারা সেথায় হরষে
বাঁচে না কখনাে তারা প্রাসাদের বিলাস-আলসে।”
এতেক কহিয়া নন্দ উন্মাদের মতন অধীর
বুদ্ধ-পদে রাখি চীর, সসমে আনমিল শির।
পরি নিজ পূৰ্ব বেশ চকিতে ছুটিল নরপতি
জনপদ পথ ধরি, আপনার মনােরথ-গতি।
*প্রেমই বৈরাগ্য শ্রেষ্ঠ কহিলেন প্রভু পুলকিত
“প্রিয় সেবা তােষে যাহা মহানন্দে হয় উপচিত,
মানবের মন-গােমুখীতে। এ প্রেমে যে আত্মহারা
কৌপীন তাহার মিথ্যা, সন্ন্যাসে সে সকলের বাড়া!
ফারদুশী
একদা কি এক খেয়ালের বশে মদিরা-রঙীন আঁখি,
কহিল বাশা গজনি নগরে কবিরে সভায় ডাকি
“হে কবি মাের দৈন্তে, আমার লজ্জায় নতমুখ,
ইরানের তুমি প্রিয় বুলবুল-তােমার সাজে কি দুখ ?
রমণ-রমণী যেথা তব গান রাখিয়াছে নিশি দিন
চুম্বন সম নিয়ত অধরে—সেথা তুমি দীন-হীন?
শুনাও আমারে নব নব গীত, দাও রসে প্রাণ ভরি।
হিসাব করিয়া প্রতি শ্লোকে দিব দিনার একটি করি ।
কেমনে জানাব’ কে সে সুন্দরী লুকায়ে তােমার গানে-
চিনি না, কিন্তু ওড়নাটি তার ছুঁয়ে যায় মোর প্রাণে ।*
মণি-কুটিমে বসি আজি কবি গর্বে কুলিছে বুক
জল-ভরা আঁখে, পুলকিত চিত স্তুতি প্রদীপ্ত মুখ ।
এ
“ভারত-বিজয়ী আমি যে মামুদ মুগ্ধ তােমার কাছে
হেন দুর্জয়ে বন্দী করার মন্ত্র তােমার আছে!
অসি—সে আজিকে মসীর চরণে নিবেদি’ শক্তি তার
মাগে পরাজয়-চিত্ত-বিজয়ে অক্ষমতায় তার।
বন্ধু তােমার কাব্য-মদিরা কোন্ সিরাজের চুরি ?
কোথা পেলে এত শােভা রস রূপ কোথা সে যাদুর পুরী ?
গাও, গাও, কবি, ল’য়ে চল’ মােরে সুদূর সে পরী-পুরে
ভিড়াও আমার বিত্ত-নিহিত চিত্ত গানের সুরে।”
ফারদুশী
মাথা তুলি কবি-স্বপ্নের শেষে চমকিয়া উঠে যেন
সন্নত দেহে করে কুর্নিশ রাজ-সম্মানে হেন।
হ-মালার কক্ষ-নিচয় করিয়া প্রকম্পিত
হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হইল বাশার জয় গীত!
শ্রোতা আর খ্যাতি ভিন্ন কবির জীবনে কাম্য কিবা ?
তাই ত’ কবিরা কমলারে ত্যজি বাণী পূজে নিশি দিবা !
লক্ষ্মীর দেওয়া রতন-কী নিষ্প্রভ যবে হবে
সরস্বতীর একটি দুর্বা তখনাে তাজাই রবে।
ফিরি গ্রামে কবি ফারুশী-তুষী আরাে জয়-প্রেরণায়
বষ্ঠিহাজার শ্লোকে “শাহনামা” রচিল বিরাট কায় ।
দুরু দুরু করে বক্ষ সরমে পুলকে গর্বভারে
লয়ে চলে কবি গীত-সওগাদ বাশার দরবারে।
সুদুল্লঙ্ঘ্য গিরি নদী কত বনভূমি পথহীন
রৌদ্র-তপ্ত মরু বালুরাশি দিগন্তসীমালীন ;
উতরি চলিল ফানুশী কবি ক্ৰক্ষেপ নাহি তা'য়
হিম-কণ্টক প্রাণ-সঙ্কট পথে খর দ্রুত পায়।
যদিও কবির দেহখানি দূরে, মনটি কিন্তু তার
খ্যাতির প্রণামী কুড়াতে ব্যস্ত পৌছিয়া দরবার।
গজনী শহরে উপজিল কবি; পড়ে গেল কোলাহল
সব কাজ ফেলি নাগরিকগণ ভরি দিল সভাতল।
নাহিক কোথাও এতটুকু ঠাই লােকে লােকে ঠেলাঠেলি
ধীরে ফেলে শ্বাস মৌন জনতা-গােল হয় পাছে বেশী।
;
চিত্র ও চিত্ত
নৃপ-সম্মুখে উচ্চ মঞ্চে দাঁড়াইয়া কবিবর
পড়ে সুর করি কাব্য তাহার, ভাব-কম্পিত স্বর ।
গুনিছে বাদশা নীরব অটল-মুখে নাই তার ছাপ
কুণ্ঠা-বিহীন প্রাণের প্রীতির, কাব্যের যাহা মাপ।
যেখানে মূর্ত ভাব ও ছন্দ আখরের পূত পীঠে,
কবি যেটি ভাবে রচনার সেরা, সবারি লাগিবে মিঠে,
পড়ি সেই ঠাই—চেয়ে দেখে কবি বাশার মুখপানে
গভীর-চিন্তা-বিমনা বাশা, পশেনিক’ তার কানে।
বাদশা ভিন্ন সােল্লাসে সবে গাইল কবির জয়
হেন অনাদর অপমান কবি কেমন করিয়া সয় ?
তবু পড়ে কবি শেষ করিবারে লাজে দুখে ম্রিয়মান
চায় মাঝে মাঝে বাশার মুখে, বেসুরা করিয়া গান।
ভাবে কবি–“কেন বিরূপ আজিকে বাদশা আমার প্রতি,
কই আনন্দ, সেই সাধুবাদ, সে দিনের সেই মতি ?
ছুটে গেছে বুঝি নেশা আজ তাই সাঙ্গ সে অভিনয়।
হৃদয়-দেবের হিন্দোলা-শেষ-ঝরে গেছে ফাগচয়!
মানস-দেয়ালী নিশায় ক্ষণিক খুলেছিল যেই ভার
বুঝি বা সেথায় লৌহ-কবাট পড়েছে পুনৰ্ব্বার।
‘দিয়ে অর্থের প্রলােভন মােরে, ভাবিছে কি নৃপ তবে
আমাকেও ক্রীত গীত-বরূদার-বাদা বাদী যথা সবে ।
ফারণী
‘কিম্বা আমার কাব্যের দাম কষিছে পণ্য সম
দিনারের দরে কেনা যায় কিনা হইয়া বিজ্ঞতম ?
কোন অপরাধ করি নি ত’ কারাে—কোথাও পাতি নি’ হাত,
বিপুল দৈন্য বহিতেছি শিরে গৌরবে দিন রাত !
‘নিজে গান গাই, থাকি দূরে দূরে, ধনের ধারি না ধার,
সহৃদয় জনে শুনাইয়া গান ভুঞ্জি সুখের সার।
কেন তবে মােরে করিয়া আদর, দেখায়ে অর্থ-লােভ,
করিলে হে রাজা, হেন অপমান, কেমনে যায় এ ক্ষোভ ?
ধনীর করুণা, বিলাসীর প্রেম, কাব্য ও অরসিকে-
অনুভূতিহীন তীক্ষ্ণ কামনা ঘােষিতে দম্ভটিকে।
চাহিনাক’ আমি দিনার তােমার মন দিয়ে শুধু শােন’
দৈন্ত আমার জীবনের মিতা ব্যথা দেয় না সে কোনাে ।
ভাবিতে কবির হৃদয়ে বাজিল গভীর হেলার বাথা
বুঝিল না কেউ কবির চিতের গােপন মরম-কথা !
শত করতালি মাঝে কোনমতে পাঠ-শেষ কবি কবি
বসিল আসনে অবনত শিরে—নিশ্চল যেন ছবি।
অপ্রসন্ন মুখভঙ্গীতে দিল নৃপ এ অাদেশ
“যত শ্লোক তত দিরহাম দাও, হােক আজি সভা শেষ !”
চিত্র ও চিত্ত ঘুচিল কবির সন্দেহ, কেন ছিল নৃপ মুখভার- কাব্যের চেয়ে স্বর্ণের দাম ঢের বেশী বাদশার ! যদিও বা লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রা করেন দান ভেবেছিল কবি, ফিরায়ে দিয়া তা’ রাখিবে ‘কবি’র মান। তা কোথা ? এ যে গো আরাে অপমান দিরহাম দিতে বলি। সেই সন্ধ্যার আঁধারে লুকায়ে এল কবি গ্রামে চলি। ব্যথা-জর্জর পথ-শ্রান্ত ফিরি আসি কবি ঘরে জ্বর-প্রতপ্ত অনাদৃত দেহ সঁপিল কন্যা-করে। বাদশা-দত্ত দিরহাম কবি অবমান করি জ্ঞান- ফেলে চলে গেছে, শুনি নৃপ প্রাতে প্রেরিল স্বীকৃত দান উষ্ট্রপৃষ্ঠে পৌছিল যবে মামুদের সওগাদ, তুষের তােরণে গর্জিল যবে বাশার জয়না, তথন কবির অপমানাহত হৃদয়ের ক্ষত ধারে জীবন-শােনিত ঝরিয়া ঝরিয়া নিঃশেষ একেবারে ! পূরিল কবির অন্তিম সাধ না-লওয়া রাজার দান কবির দৈন্যে রাজার মুকুট-দীপ্তি হইল স্নান! ১৪
যবন হরিদাস
ক্রুদ্ধ বাদশা-যবে হরিদাস হইয়া মুসলমান
কাফের হিন্দু-ধর্মে সাদরে করিল আত্মদান!
গােলামের জাতি ঘৃণিত হিন্দু, তাদের আবার ধর্ম ।
তাই কি না পুন করিবে বরণ, মুসলমানের এ কর্ম
ডাকিয়া বাদশা মুঢ় হরিদাসে দিল এ সদুপদেশ
“এখনও ছাড় দুর্মতি হেন, ঘুচাও কাফের-বেশ!
নহিলে তােমায় দুর্গতি বহু সহিতে হইবে, শুন—
মুসলমানের পুণ্য ধৰ্ম্মে শরণ লও গে পুন।
“অভাব তােমার ঘুচাইব আমি, রাখ আমাদের মান
বাশার জাতি গৌরবে কেন কর’ মিছে অবমান?”
কহে ধীরে ধীরে সাধু হরিদাস-“ক্ষমা কর’ মােরে প্রভু,
অমৃতের স্বাদ পেয়েছি হেথায়, ছাড়িতে নারিব কভু।
“তুমি কি বুঝিবে অভাব আমার, আমি চাই ধন কি যে ?
কোন বাদশার কোষে তাহা নাই, তুমিও জান না নিজে।
এক কণা যদি পাও তুমি তার, সব সেরা ধনী হবে
দীন দুনিয়ার বাদশাহী গদী চরণে ঠেলিবে তবে!”
চিত্ৰও চিত্ত
শুনিয়া বা অজ্ঞান ক্রোধে আদেশিল দাসগণে
“বাইশ বাজারে প্রহারে প্রহারে শিক্ষা দাও এ জনে!
মারিতে মারিতে হয় যেন শেষ বাতুলের হরি-ভজা
দেখুক সকলে হিন্দু হওয়ার কেমন বিষম মজা।”
বাদশা-অজ্ঞা রক্ষাকল্পে দুটিল হাজার দাস
শ্রোতৃবৃন্দ চমকি উঠিল, পাইয়া বিষম ত্রাস।
জল্লাদ সেও পালিতে আদেশ ফেলিল দীর্ঘশ্বাস
মৃত্যুদণ্ডে অটল কিন্তু নির্ভীক হরিদাস।
প্রহার দেখিয়া
মুছে
আঁখি-নীর শত্রু মিত্র সবে
হরিদাস করে হরিনাম যেন পরম মহোৎসবে
ধরণীর ধূলা রক্তেতে কাদা, জলভরা চোখে হরি
পীড়কের তরে মার্জনা মাগে হাত দু’টি ঘােড় করি ।
১৩
গুরু-শিষ্য
অজয় যেথায় আসি
জননী গঙ্গা-জীবনে শরণ লইয়া আঁচিল হাসি-
যুক্ত-বেণীর সেই উপকূলে
ধেয়ান-নিরত অশথের মূলে
সৌম্য শান্ত কেশব ভারতী
আঁখি মেলি চাহি দেখে-
পদতলে তার বসি করযােড়ে
কিশাের নিমাই ভাসে আঁখি-লােরে
সুন্দর তনু স্মর-সুকুমার
তরুণ মূরতি এ কে ?
ভুলে গিয়ে সব ধ্যান
চাহিয়া রহিল নিমায়ের মুখে—ফিরিল না সে নয়ান।
“এ কি দেবতার ছল ?
পণ্ড করিতে আমার জীবন-সাধনার পােবল ?
পুষ্প-পেলব এ চারু-বনে
পাঠাইলা হরি কিশাের-মদনে ?
একি হলাে ? বুক ভরিয়া উঠে যে
ফিরেনাক’ অাখি আর!
১৭
চিত্র ও চিত্ত একি আনন্দ, পুলক-তাড়িত একি তবে মাের চিক-আরাধিত? সেই বটে ওগাে এ নহে ছলনা একি রূপ ছলিবার ? সকল সাধনা-ধ্যান সার্থক করি দিতে আসিয়াছে-ইথে আর নাহি আন্।” ধরি ভারতীর পদ কহিল নিমাই, সুমধুর স্বরে প্রেমভাব গদগদ, “হে ধ্যানী মহা আসিয়াছি আমি শিষ্য হইতে তােমার, হে স্বামী, দাও হে শিক্ষা, দাও হে দীক্ষা হরিনাম মহাগান! সুদূর নদীয়া নগর হইতে এসেছি গাে আমি দীক্ষা লইতে দাও মােরে দেব সন্ধান সেই লভিতে শ্রেষ্ঠ দান। আমি অতি অভাজন- কর কৃপা, দাও সে বীজমন্ত্র মৃত্যু-সঞ্জীবন?” *এসেছ’ মন্ত্র নিতে ? এ কি মােহ ঘাের ঘনায়ে উঠিল এ সন্ন্যাসীর চিতে ? ১৮
গুরু শিষ্য
সব জপতপ বিসরি এ কি।
কে তুমি কিশাের তব মুখ দেখি,
দাও পরিচয়, ওরে মায়া-দত,
সুন্দর তরুণ !
তাপস-হৃদয় বিরােধ ঘর্ষে
ফেনায়ে উঠিল অসীম হর্যে,
তােমার সঙ্গ লাগি এ পিয়াসা
কেন জাগে সকরুণ ?
ও গাে দাও মােরে পরিচয় -
ভুলিয়া আমায় কি লাভ তােমার হবে ও গাে মহাশয় ?
চরণে লুটায়ে পড়ি
উত্তরে গােরা—“কর’ প্রত্যয়, হে ঠাকুর দয়া করি।”
কহিল ভারতী—“সাধনার পথে
অনেক বিপ্ন—তুমি কোন মতে-
নারিবে চলিতে-বড় কন্টক,
ঋষিরাও পড়ে পাছে-
তুমি তাে বালক নবীন বয়স
হৃদয় তােমার প্রবণ অলস,
কেন এ মার্গ-চ্যুত হয়ে শেষে
খােয়বে যে সুখ আছে ?
তুমি এখন চপল মতি--
পাকিলে বুদ্ধি বুঝিবে তখন—মাের কথা ঠিক অতি।”
চিত্রওচিত্ত
চরণ ছাড়ে না তবু
কাদিয়া ভাষায়, মুখে বলে—“তবে ছাড়িব না পদ কভু।”
মুণ্ডিত শিরে কৌপীন-ডােরে
পসারি দু’বাহু ডাকে “আয় ওরে
কে কোথা আছি শুচি কি অশুচি
শুনা রে হরির নাম।
জীবে দয়া আর সেবা নামে কুচি,
হরি-ভজা শুচি, অ-ভজা অগুচি,
নাহি কোন ভেদ দ্বিজ-চণ্ডালে
এই সমম্বয়ের সাম
গােরার কণ্ঠ-সুরে
সৰ্বত্যাগী প্রেমের ধর্ম ধ্বনিল জগত জুড়ে!
সারাটি নদীয়াবাসী
এসেছিল যারা ফিরাতে নিমায়ে, ফুটাতে শচীর হাসি,
ভুলে গেল সবে এসেছিল কেন
ইন্দ্রজালের মােহে তারা যেন
ছুটিল গােরার পিছু পিছু গেয়ে
হরিনাম, হরিগান।
২০
গুরু শিষ্য দেখিল ভারতী প্রেমই ধৰ্ম্ম সে সাধনা নহে একার কর্ম- নাহি ভােদ বাধা নাহি অভিমান বিশ্বের ভগবান ! ওগাে তাই বুঝি কয় গােরা- তসম হও, শুধু হরি কও, তৃণ হ'তে নীচ মােরা। কেশব ভারতী ভাবে নৰ প্রেমিকের এ নব ছলনা ডুবাতে আমারে পাপে! কোথায় পাইব আমি ও-চরণ তা’ না দিয়ে তুমি করিলে বরণ গুরু-পদে মােরে ? ওহে নারায়ণ, এ কি খেলা, প্রাণসখা ? আমার সকল সাধনা-গর্ব অশ্রু-পাথারে করিলে খর্ব জগৎগুরু গুরু করে’ মােরে দিলে বড় লাজ ব্যথা ! তাই গৌর যেথায় নাচে- লুটায়ে সে রজে গুরুর হৃদয় পুলকে শিহরি বাঁচে।
পণ-অভিশাপ
পনের বছর হইল যখন স্নেহর বয়ঃক্রম
ভেঙ্গে গেল সব আশার স্বপন ভেঙ্গে গেল সব ভ্রম!
আর তাে কন্যা রাখিলে চলে না—অরক্ষণীয়া কন্যা
যা’ করেই হােক বিয়ে দিতে হবে, নৈলে জাত যে র’!
উচ্চ শ্রেণীর কুলীন পাত্র, আর সৎকুলজাত
বর খোঁজে পিতা—আর যেন পায় দু'বেলা দু’মুঠা ভাতও
নাহি আপাতত পিতার বাঞ্ছা সুতারে করিতে রাণী-
তবু সব ঠাঁই ফিরে নিষ্ফল, কপালে আঘাত হানি!
এদিকে সমাজ লােক দেশাচার তাগাদা করিয়া নিত্য
বিত্ত-সহায়-বিহীন পিতার মথন করিছে চিত্ত।
সে যে দরিদ্র তাহাতে আবার কন্যার পিতা বলি
ঘৃণা উপেক্ষা গালি-জর্জর যথা যায় আসে চলি।
কিবা শিক্ষিত অশিক্ষিতও ছেলের গরীব বাপ
নাতােয়ান দেখি মেহর পিতায় দিতে ছাড়িল না চাপ।
ছেলের বাপেরা ভেবে বসে আছে ছেলের বিবাহ দিয়া
যা-হয় একটা করে নেবে কিছু বেয়ায়ে উদ্ধারিয়া।
কন্যার বাপ পথ পাবেনাক’ যা চাবে তাহাই দিতে
কেননা সে হল কন্যার বাপ—এই অপরাধটিতে।
পণ-অভিশাপ
সমাজ তাহারে ছাড়িবে বা কেন ? মেয়ের বাপের মাথে
পতনােত দুলিছে শাস্তি রাক্ষসী সাজা হাতে।
প্রভাত হইতে সন্ধ্যা অবধি গরীব মেহর পিতা
পাগলের মত ঘুরে ঘরে ঘরে, শুনি সেই একইকথা !
নব বসন্ত এসেছে ভুবনে মহীর বাসক-সেজে
চুতকলিকার কনক কিরীট, সােণালি কিরণে মেজে।
চঞ্চল মধুমক্ষিকাকুল, চঞ্চরী সঞ্চরে
পীত আর কালাে চুমকি যেমন অঞ্চলে সন্তরে।
নব পল্লবে মহীবল্লভ আসিল প্রিয়ার পাশে
শুধু তরুণ প্রেম করুণত। জাগিল মিলন আশে ।
আজি নবীন সবাই সতেছে, জীর্ণতা ফেলি দূরে
সেই জীর্ণতা পশিল একি এ মেহর পিতার পুরে?
গত মধুমাস গিয়াছে যেন বা দশ বৎসর পুরা-
মেহর জনক হয়েছে এবার এমনি পুরাণাে বুড়া
অথবা সে যেন খায় নাই কিছু আজ বহু দিন হতে
এমনি শীর্ণ হইয়া বৃদ্ধ ঘুরিতেছে পথে পথে !
শয়া সমাজ অজগর অহি গরল-দিগ্ধ খাস
মেলে মাঝে মাঝে ঢুলু ঢুলু আঁখি মেয়ের বাপের ত্রাস
হিন্দু-জীবনে এ যে গাে কালিয় সুগভীর বিষ্যুদ
যথা যায় বুড়া দেখে সেই চোখ—সেই কুণ্ডল স্মথ।
२७
চিত্র ও চিত্ত
“আমি ব’ব মােট, ঠিক হয়ে গেছে! গেহর বিবাহ হলে-
বাড়ী বেচে দিব বিবাহ আর কি? এসেছি ও সব বলে
কালই সকালে পাব টাকা, হবে কালই রেজেষ্টারী
পরশু নাগাদ দিন স্থির করে যাইব বেয়াই-বাড়ী।
রংমশালের আলােকে যখন রাঙিয়া মেঘের পথ
দীর্ঘ দিবসে ছুটি দিয়া গেল রবির অন্তরথ,
মধুরজনীর বৈতালিকেরা ধরিল ঘুমের গান
ঝিল্লী-নূপুরে দখিণা-চামরে গীতবাস করি দান,
ফিরিয়া আলয়ে গেহর জনক পত্নীরে কন্ ডাকি-
“হরিশ বাবুর ছেলের সাথেই করে এ পাকাপাকি!”
সুধাইল প্রিয়া—কতয় হইল কও শুনি শেষ রফা!”
“ভয় নাই, তাও ভাবিয়াছি ঠিক আমাদের সারি দফা”-
জননী হৃদয়ে চমকিল এক শঙ্কা তড়িৎ-গতি
শিহরি কি এক গুরু আতঙ্কে, পুছে নারী দয়াবতী
“বাছার আমার হবে না তাে কোন কিছুর অকল্যাণ ?
দায়সারা করে সেরে যেন শেষে বধ’না মেয়ের প্রাণ।”
“না তা না গিন্নী, ভেবাে না আমায় পিশাচ সমাজসম
নিজের মেয়েরে বধিতে নারিব, নহি হেন নিরমম।
পুত্র-কল্প জামাত এখন বাজারে বিক্রী হয়
প্রেমের আসনে হেমের শাসনে হয়ে গেছে বিনিময়।
পণ-অভিশাপ
“সমাজ দিয়াছে জ্যান্ত নরের রক্ত মাংস খেতে
বানায়ে দিয়াছে বিশাল কশাইখানা আমাদের জেতে।
কুটী হানিয়া আস্ফালি সদা খুব পটু নিতে জাতি
নাহি জানে ক্ষমা, না আছে হৃদয় নাহি জ্ঞান দিবা রাতি।
যাহার আদেশে চলিয়াছে এই ক্রয় বিক্রয় প্রথা
কাঙালের ঘরে কি হবে উপায় ভাবেনিক’ সে এ কথা।”
সহসা নিশীথ গগন ছাইয়া মুছি বসন্ত-শ্রী
জ্বলিয়া উঠিল লেলিহ বহ্নি স্তম্ভিত দেব !
লক্ষ মানবসম্ফ-সেবিত সমাজ যে ভিক্ষুকে
পথে বসাইতে চেয়েছিল, তারে কন্যা রাখিল বুকে!
সার্থক-নামা স্নেহলতা বাপে নিজে প্রাণ বিনিময়ে
চিন্তা-মুক্ত করি চলি গেল, সব ব্যথা হরি লয়ে !
পুরুষের সব পৌরুষ বল অবমানি থুৎকারি,
কুলীনের মুখে লজ্জার কালি লেপিয়া ও ধিক্কারি
শক্তি-দৃপ্ত নারী-মহিমায় অগ্নিতে পশি বালা
লাঞ্ছিতাহত কণ্ঠে পরিল জয়-গৌরব মালা।
বেসুর করিয়া মধুনিশীথিনী বেহাগ-বাহার যুত
“চোখ গেল” বলি ফুকারি উঠিল ব্যথিত বিহগ দূত।
দিক-রমণীর হৃদয়ে লুটিয়া ফিরিতে লাগিল ব্যথা
“স্নেহ নাই, ভবে, স্নেহ নাই আর, পুড়ে গেল মেহল।”
উপাধান-তলে বাহিরিল চিঠি স্নেহর হাতের লেখা-
*প্রণাম জনক জননী আমার, হেথা এই শেষ দেখা।
চিত্রওচিত্ত
মাথা রাখিবার শেষ সম্বলও দিবে তুমি মাের তরে
আর আমি তাই দেখিয়া কেমনে যাইব শ্বশুর-ঘরে ?
রৌপ্য-ডালিতে বিকানাের আমি সহিব না অপমান
তাই শেষ গ্লানি-পাবকেরে আমি করিনু আত্মদান!
একে ত চলিছ কণ্টক-পথে দেখে বুক ফেটে যায়
এর পরে কি গাে এ নব আঘাত দিতে কভু প্রাণ চায় ?
তবু যদি মােরে যাইতে হইত করিতে শ্বশুর-ঘর
সে হতে আমার আমরণ মরা, নিবাস বহ্নিপর।
তােমার অশ্রু অভিশাপরূপে সব উৎসবে মিশে
মাের বিবাহিত জীবনে করিত তিক্ত দারুণ বিষে।
কুমারীর মনি রক্ষা করিতে, মুছিতে জাতির পাপ,
আলি আগুন পুড়ে ছাই হােক—এই পণ-অভিশাপ।
প্রতীক্ষা
দিক্ পরীগণ করে যেথা নিতি কেশ-বেশ-প্রসাধন
কিরণপুরীর দোলার তলায় মহীর রােমাঞ্চন
অস্ত-তপন যাহাদের পায় নিবেদিয়া অনুরাগ
ফুল হয়ে প্রাতে বিশে নিত্য, হিমে থুয়ে প্রেম দাগ ;
শতধারে ছুটে নদীর হৃদয়ে যাহাদের স্বেদনীর
যে নীল আঁখির আওতাতে এই শ্যাম-লেখা সুগভীর ;
যেথায় ধরণী পত্রে পুষ্পে রচিয়া তিলক চারু
পুষ্প-আসবে মভ, বিহগ-ঝক্তৃত লতা দারু-
জলদ-বলতী গিরি পুরে হেন এক দিকে এক পাশে
আছে খান কয় পাতার কুটীর, কোলেরা সেথায় বাসে।
উঠানে তাদের মহুয়ার গাছ, ফলে ভরা তার তল
চড়িছে অদূরে পরিবার-প্রিয় গাে-মহিষ-মেষ-দল ;
ঝাঁকড়া চুলের গােছাটি পিছনে দড়ি-বাঁধা পুরুষেরা
বসন-বয়ন-নিরত নারীরা সুতা কাটে লয়ে ঢোঁড়া।
আঙ্গিনা ছাড়িয়া যায়নিক আজ কোথা কোন নরনারী
আসিয়াছে রাজা শীকার করিতে তা পড়েছে তারি
চিত্রওচিত্ত
দেখেনিক তারা এত লােকজন কাপড়ের হেন ঘর
শােনননি কখনাে মারণযন্ত্রে অমন বিরাট স্বর ।
ভয়ে ভয়ে তাই শঙ্কামলিন পাণ্ডুর মুখে সবে
গাছের লতার ঝোপের ফাকেতে দেখিছে কি জানি হবে
শঙ্কিত নারী যায়নিক আজ ঝরনায় নিতে জল
মাথায় গাগরি কটি-কটি ধরি গানে ছেয়ে বনতল !
পুরুষেরা কেউ গুজেনিক ফুল বাঁধা কুঞ্চিত কেশে
বাজে নি মাদল, নাহিক শব্দ, কোলের কানন দেশে।
যায়নি বনকে কাল কাল ছােট কোলেদের ছেলেমেয়ে
চকিত আঁখির কুতুহলী দিঠি দেছে সারা তাবু ছেয়ে !
অকারণ ভয়ে যত নরনারী রুদ্ধ আপন ঘরে
শুধু গৃহে নাই মনিয়া পাগলি, বসে আছে পথ’পরে।
সে এক কাহিনী। হল আজ প্রায় অতীত বছর চার
মনিয়ার স্বামী শমরু গিয়াছে পাহাড়ের পরপার।
পাহাড়তলীতে বড় বড় কোঠা হেথা হতে দেখা যায়
শমরু প্রায়ই যেতাে সেথা, কেউ রাখিতে নারিত তায়।
মনিয়া সে দিন থাকিত বিরস করিত পথ ও ঘর
-ফেরা অবধি মনিয়ার কেউ শশানেনি কণ্ঠস্বর।
সমবয়সীরা করিত ঠাট্টা, গুরুজনে দিত গালি
অটল সে তাতে ঘর ছাড়ি পথে বসি র’ত চেয়ে খালি।
প্রতীক্ষা
ছিল কোলেদের এ উপনিবেশে মনিয়ার খ্যাতি প্রিয়
বচন-চাতুরী হেঁয়ালীতে গীতে নাচে সে অদ্বিতীয় !
বয়স মাত্র যােলটী বছর তখনি হয়েছে বিয়ে
বিবাহ করিয়া ছিল সে যে মােটে দু’বছর স্বামী নিয়ে !
তারি পর সেই গিয়াছে শমরু আজিও ফিরেনি দেশ
মনিয়াও মুখ করেছে বন্ধ, পথ চেয়ে এক-বেশ!
ঘরসংসৗর সকলি ছেড়েছে, ছাড়েনি কেবল পথ
যে-পথে গিয়াছে দয়িত তাহার—ফিরে পাবে মনােরথ ?
,
কাঠফাটা রােদ, অঝাের বাদল, ককনে হিমাওয়া-
একটা দিনের তরেও মনিয়া ছাড়েনি পথটি চাওয়া।
ধূলা জল রােদে পিঙ্গল চুল, কোটরনিলীন আঁখি
সুগােল দেহের কঙ্কালগুলি উকি মারে রূপে ঢাকি।
চিত্ত-সুখের অরুণ আভায় শাঁওল কান্তিখানি-
শীতে পড়-পড়’ পাতার মতন পতনেরে আনি।
বালকেরা তারে ডাকিত পাগলি তাই থেকে সবে তার
পাগলি আখ্যা দিয়ে ভুলে গেছে, তাহার গুণের ধার ।
ধা ধং ধা ধং ধিয়া ধিয়া ধং এখনাে মাদল বাজে
মনিয়ার কথা কারাে মনে নাই—সে থাকে পথের মাঝে।
জ্ঞাতি বন্ধুরা দিয়ে যেত নিতি ভাত দু’টি রাখি পাশে
কহিল তারাই আসি আজি সবে -রেতে যেন বাড়ী আসে।
৩১
চিত্রওচিঙ
এসেছে কাহারা কেমন মানুষ, কি জানি কি আছে ভাগে
আবার আসি করি যা খুশী, চলে যাক এরা আগে!
আনমনে নারী মাথাটি নাড়িয়া জানাল অস্বীকার
করুণ বারণ সাধাসাধি, সেই “না”-র কাজে চুমার।
রাজার আদেশে জলিল না বাতি সে রাতি কোলের ঘরে
সকল শব্দ স্তম্ভিত হয়ে রহিল রাজার ডরে।
বনবিহঙ্গ জাগেনি তথন, শুক্রতারাটি শুধু
আঙিনার পাটে নিরত যেমন একেলা বঙ্গবন্ধু!
তিমিররাণীর বসনাঞ্চল জড়িত হাজার পাকে
তরুলতাদের কাটায় খোঁচায়, শিশু যেন ধরে মাকে।
যামিনী তখনাে বিদায়ের ক্ষণে তন্ময় প্রেমাবেশে
রুদ্ধশ্বাসে চুম্বন-মুক প্রভাতের আশ্লেষে!
ধ্বনিয়া উঠিল বজ্র-আরাব সচকিয়া বনভূমি
আৰ্ত্তনিনাদে কাঁদিয়া উঠিল পাখীরা পক্ষ ধূনি।
বাহিরিল যত কোলের মরদ মুছিতে মুছিতে আঁখি
নারীরা সামালি ছেলেপিলেগুলি, দেখে আঙিনায় থাকি।
রাজার সহিত ছুটিল তাহার অনুচরগণ যত
দেখিল আসিয়া সে নহে হরিণী-মনিয়া হয়েছে হত!
কুষিয়া উঠিল কোলের ভীষণ, তীরেতে বিধিব কয়—
নিবারিয়া এক বৃদ্ধা দিল এ মনিয়ার পরিচয়।
৩২
প্রতীক্ষা “দয়িতের পথ করি প্রতীক্ষা ছিল এ হতভাগিনী নহে একদিন চারিটি বছর—এমনি দিনযামিনী উচ্ছ, ঙ্খল ছিল এর স্বামী, শমরু—তাহার নাম- এমন পত্নী চিনিতে নারিল, বিধি তারে হেন বাম। জানি মনিয়ার সব কথা আমি, কত কথা কয় লােকে- চারিটি বছর পূরেছে কালিকে—দেখেনি পতিরে চোখে ! ছিল সেথা রাজ-ভৃত্য শমরু শুনিতেছিল সে কথা খুলি বেশ ভূষা পাগলের মত লুটায়ে পড়িল তথা! নগরের মােহ-বিলাস-লালসে অর্থের আশে ভুলি গেছিল শমরু যাহারে ফেলিয়া, নিল তারে কোলে তুলি ! মরণসীমায় নিমেষ-নিহত মনিয়ার আঁখিপাতে পুণ্যের মত শুভ্র বাষ্প ভাসিয়া মিলাল তাতে। ক্ষীণ দুৰ্বল অসার বাহুটি কঁপিয়া কঁপিয়া উঠি জড়াল আসিয়া স্কন্ধ পতির, নড়িল ওষ্ঠ দু’টি। আধ-খানি আঁখি-তারকায় দেখে মনিয়া স্বামীর মুখ আর আধ-খানি গেল সতীলােকে নিতে তার ঠাই টু। বসিত যেখানে মনিয়া, তাহার নিকটে দেখিল ভূপ চৌদ্দশােঠ ইটের খুঁটির রয়েছে একটি স্তুপ!! ৩
নির্ণামিকা
(জৈন জাতক ত্রিষষ্টি-শলাকা-পুরুষ-চরিত্রের শ্রীযুক্ত অমূল্যচরণ
বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের ইংরাজী অনুবাদ হইতে)
নন্দিগ্রামে নাগিলার একে একে ছয় বার
জনমিল ছয়টি দুহিতা-
বিধাতা কি নিদারুণ নাহি রূপ নাহি গুণ
ছ’টি কন্যা অপূর্ব কুৎসিতা।
প্রাণান্তক পরিশ্রমে আনে যাহা কোনাে ক্রমে
পতি পত্নী মিলি দুই জনে—
আঁটে না তাহাতে তবু
পেট ভরে খেতে কভু
পিতামাতা রহে অনশনে।
দুরবস্থা-দৈন্য-দুখে থাকে লেহে ম্লান মুখে
দুর্ভাগ্যের মূৰ্ত্ত ক্রীতদাস,
নাগ সলজ্জা অতি হয়ে হেন কাবতী
সঙ্কুচিত সদা পতিপাশ।
নাগিলা কহিলা—“শুন, কন্যা যদি হয় পুন
এবার জঠরে তব, প্রিয়ে,
ছাড়িয়া সকল মায়া এ সংসার কন্যা জায়া
লব মুক্তি দেশান্তরে গিয়ে।”
নিমিক
অদৃষ্টের পরিহাস দশমাস গর্ভস
করি পুন জন্মিল দুহিতা,
পূৰ্ব্বজা ভগিনীসমা
কুরূপে অনুপমা
—জাগারে নাগশ্রী মূৰ্জিতা।
কপালে নিয়া কর নাগিলা ছাড়িলা ঘর
নিরুদ্দেশ দেশে দিল পাড়ি,
সপ্ত কন্যা লয়ে গলে
নাগশ্রী চোখের জলে
দাসীবৃত্তি করে বাড়ী-বাড়ী।
জন্মমাত্র পি যায়, ছাড়ি পলাইয়া যায়,
নাহি ঘরে অন্নের সংস্থান,
শেষ-বােঝ দুর্দশার, দরিদ্রে সন্তানর
দুর্ভাগ্যের অব্যর্থ সন্ধান।
কন্যা হেন অভাগিনী, হলেও সােহাগিনী,
মাতা তবু ছাড়িবারে নারে
অনাদরে অবজ্ঞায়, তবু মা’র মমতায়,
নামহীনা দিনে দিনে বাড়ে।
পতিহারা করিয়া যে, হানে বাজ বক্ষোঝে,
সতী তারে মার্জনা কি করে ?
কিন্তু এনে সু তার,
অযাচিত ক্ষমা মা’র
বিতরিল অম্লান অন্তরে।
জিওচিত্ত
নামহীনা কন্যকায় ‘নির্ণামিকা’ এ আখ্যায়
গ্রামবাসী ডাকিত সকলে,
ফিরিত সে সারাদিন দ্বারে দ্বারে শ্রান্তিহীন
ক্ষুধার তাড়নে আঁখিজলে।
কুৎসিত দেহের মাঝে অখণ্ড যে প্রাণ বাজে
সে যে চির মুক্ত নিত্য, হায়,
চাহে সে তত কত কি যে জাননা না বালা তা নিে
প্রকাশিতে কথা না জুয়ায়।
দেখি এক ধনিমুতে মিষ্টান্ন খাইতে পথে
জনমিল লােভ বালিকার,
জননীর গলা ধরি মাগিল মিনতি করি
অই বস্তু খেতে একবার।
অভাবে রােষে ও দুখে অক্ষম মলিন মুখে
উত্তরিল রূঢ় বাক্যে মাতা-
“পেটে ভাত নাহি যার এত লােভ কেন ?
মণ্ডা ছেড়ে খাও মার মাথা!
পেট ভরে খেতে নাই মিঠাই মণ্ডার খাই ?
আরে মােলাে কি লজ্জার কথা
সাধ্য থাকে বনে গিয়ে কাঠ কেটে আয় নিয়ে
বেচে কর দূর মনােব্যথা।
নিলামিক
নির্ণামিকা অভিমানে অস্বতিলক পানে
গেল চলি কাষ্ঠ-আহরণে
নাগশ্রী বসিয়া গেহে অক্ষম মাতা মেহে
ঝরে অশ্রু অবাধ নয়নে।
অরতিলক পরে
ভেটিতে চলিছে নরনারী
লয়ে কত অবদান
অপরূপ মূল্যবান
আ-যােজন আয়ােজন-সারি।
যুগন্ধর ঋষিবরে
কাষ্ঠবােঝ মাথে লয়ে
বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে
নির্ণামিকা নিৰ্ণিমেষে দেখে--
অফুরন্ত জনতার ভারে ভারে উপহার
বিচিত্র বসন ভূষা থেকে।
দাড়াইয়া পথ ছাড়ি দেখে বালা জন-সারি
লুব্ধ দৃষ্টি, রসনায় জল,
গানে গল্পে কোলাহলে
বিজপে ঠমকে ছলে
প্রফুল্লিত চলে যাত্রীদল ।
হেরি কেহ কুরূপারে ব্যঙ্গবাণ ছুড়ি মারে
কেহ মুখ ফিবায় ঘৃণায়,
কেহ ভাবে অমঙ্গল
নষ্ট হবে পুণ্যফল
অশুভ দর্শনে হেন, হায় ;
৩৭
চিত্র ও চিত্ত
ভুলি ক্ষুধা তৃষ্ণা শ্রম করে বালা অতিক্রম
দুরারােহ গিরিশৃঙ্গপথ
অভিভূত কৌতুহলে কি হােথা দেখিবে বলে
সকলের পিছে মুগ্ধবৎ।
উপজিল নির্ণামিকা
যেথা
অগ্নিশিখা
ঋষিবর বসি মৃগাসনে,
নগরের শ্রেষ্ঠ ধনী
আপানরণি
নরনারী প্রণত চরণে,
চৰ চোস্থ লেহ পেয়
খাদ্য কি অপরিমেয়
জমিয়াছে পর্বতপ্রমাণ,
নানা বস্ত্র অলঙ্কারে
ধন রত্ন উপহারে
গিরিগুহা অলকাসমান ।
উদাত্ত গম্ভীর স্বর কহিলেন বুগন্ধর
“এ আশ্রম কেবলি সাধুর
নীচমনা কি দরিদ্র হীন হােট অপবিত্র
যদি কেহ থাক, হও দূর।”
অস্ফুট গুঞ্জনধ্বনি সমুখিল শন’শনি
অকস্মাৎ ভক্ত-জনতায়
কে বড়, কে ছােট তার কোলাহল মীমাংসার
আরম্ভিল উদ্ধত স্পর্ধায়।
নির্ণামিকা
সকলেই আপনায় ভাবে শ্রেষ্ঠ সৰ্বধায়
কারাে চেয়ে কেউ ছােট নয়,
নিজের প্রতিষ্ঠাতরে মিলি সব নারীনরে
জুড়ি দিল কলহ দুর্জয় ।
বাহ্যজ্ঞান হারাইয়া নির্ণামিকা দাড়াইয়া
চোখে তার দিব্য বিভা জাগে,
কি অক্ষম কত, হীন, এ কথাটি এতদিন
জানিত না-সে তাে এর আগে!
r
নিণামিকা তাই ডরে দাড়াইল গিয়া সরে
আপনার ক্ষুদ্রতায় মরি ;
যতি যত মৃদু হাসে জনতা ততই আসে
ঋষির নিকটে অতি সরি।
সস্নেহ কটাক্ষ হানি ডাকিলেন দণ্ডপাণি
কুরূপারে যবে নিজ স্থানে
মুহূর্তে থামিল সব
শ্রেষ্ঠত্বের কলরব
স্ত সবে চেয়ে তার পানে।
যুগৰূর কন্ ধীরে--
“যাও সব ঘরে ফিরে
শেখ’ আগে মানুষে সম্মান,
নিজে নিজে বড় ভাবি হয় কি শ্রেষ্টত্ব-দাবী।
প্রেম কই, নহে অভিমান।
চিত্রও চিত্ত
“হােথা কাষ্ঠ-আহরিকা স্বণ্য কুণী নির্ণামিকা
সর্ব শ্রেষ্ঠ মহাপুণ্যবতী
পবিত্র সরল প্রাণ উদার নিরভিমান
ঈশ্বরের প্রিয় এই অতি।”
আকাশে উঠিল ঝড় অন্তরীক্ষে আড়ম্বর
ছাইল হঠাৎ গিরিশির
বায়ু-রথ আসে ধেয়ে মেঘ-ধূলি ফেলে ছেয়ে
ঘনহে বিদ্যুৎ-বাজীর।
ধর্মজ্ঞান
-
সম্রাট আকবর
মাতৃ-আজ্ঞা কোরানের চেয়ে
ভাবিত উচ্চতর।
বিরাট রাজ্য ইঙ্গিতে যার
হইত শাসিত, চিত্ত প্রজার
জিনিয়াছিল যে বিনা তরবার
এমন ভাগ্যবান
কূট রাজনীতি নখদর্পণে
আছিল বিদ্যমান।
শত নৃপতির পতি!
পদে যার নত উষ্ণীশ কত—
মার কাছে শিশু অতি।
প্রণমিয়া মায় নিত্য প্রভাতে
বাহিরিত পথে অথবা সভাতে,
ছিল না তর্ক মায়ের কথাতে ;
জননীর অভিলাষ
পূরাতে বাদশা করিতে পারিত
আপন সর্বনাশ।
চিত্র ও চিত্ত মােসলেম-দ্বেষী দেশে কোরানে করেছে ঘাের অপমান অন্ধ হইয়া ঘেষে । রাসভের পিঠে চড়ায়ে গ্রন্থ ফিরায়েছে সব নগর-পন্থ মত্ত জনতা আমােদে অন্ধ টিটকারি ইমে-- সংবাদ এল,-ক্ষুব্ধ বাশা প্রাসাদে দিল্লী ধামে। কোরানের গঞ্জনা সহিবে না বলি, পড়িল নগরে অস্ত্রের ঝনা। মাগে রাজাদেশ করিবে যুদ্ধ অরিলােহে হবে কোরান্ শুদ্ধ বাদশাজননী ভীষণ ক্রুদ্ধ পুত্রে কহিলা তাই- “তাদের ধর্মে লাঞ্ছি এমনি প্রতিশােধ নেওয়া চাই।”
ধর্মজ্ঞান
সম্রাট ধীরে কহে
“ক্ষম মা আমারে এমন আদেশ
তােমার মােগ্য নহে।
আমারে হিংসি, আমার ধর্ম
অবমানি যদি লভে সে শৰ্ম্ম,
অতি হীন সে মা-মানব-মৰ্ম্ম
ভক্তিতে পদাঘাত
করিতে নারিব। তাদের ধর্মে
করি আমি প্রণিপাত।”
দান-প্রত্যাখ্যান সদ্যজ্জিত রাজ্যশ্ৰীরে দেখিবারে আলেকজান্দার ৰাহিরিল একদিন পদব্রজে একা। চারিধার নগর প্রান্তর ভ্রমি পরিত্যন্ত অবসন্ন ক্রমে উপস্থিত নগরের উপকণ্ঠে এক দ্বিজাশ্রমে। নানা শুল্মলতাপালিবিরচিত ক্ষুদ্র সে কুটীর নাহি কোন’ গৃহসজ্জা, উপাংশু সে অংশ বনশ্রীর তরুচ্ছায়ে অন্ধকার—মানবের অজ্ঞাত সে স্থান- আলেকজান্দার তথা উপনীত ভুলি পথখান। ঢলিয়া পড়েছে রবি পশ্চিমের অস্তাচলতলে পাদপপলাশছিদ্রে দীর্ঘ সাচি কররেখাদলে রচিতেছে শরশয্যা ; অটবীচরণতট ছুয়ে চলেছে তটিনী নীল সিকতিল বেলাভূমি ধুয়ে । ৰজ্ঞকৃশ সাগ্নিকের সাঙ্গ হলাে দিনান্ত-আহুতি, যাচিল তৃষ্ণার্ত গ্রীক একটুকু জল, ক্লান্ত অতি । জলপানে সকৃতজ্ঞ অন্তরেতে আলেকজান্দার দিল বিপ্র স্বর্ণ মুদ্রা এক । উপেক্ষিয়া দান তার ৪৪
দানপ্রত্যাখ্যান
কহিল ব্রাহ্মণ—“দাতা, লয়ে যাও মুদ্রা তব ফিরে,
দাও গিয়ে নগরের দরিদ্র ও ভিক্ষুক কামীরে।
এ মাের আশ্ৰমখানি করিও না কলঙ্কিত আর
ছোয়ায়ে আরাধ্য তব ও অস্পৃশ্য স্বর্ণ রৌপ্য ভার।”
উত্তেজিত গ্রীকবীর ভাবিল—এ কি নগ্ন সন্ন্যাসী
সুবর্ণে ইহার নাই প্রয়ােজন, নহেক প্রত্যাশী ?
মিথ্যা কথা, ভাণ মাত্র! এ আমার কৃপ-প্রত্যাখ্যান
কিছু নয়—শুধু মােরে ঘৃণা আর ঘাের অবমান!
কহিল প্রকাশি তবে গ্রীক বীর ক্ষুব্ধ অভিমানে
“এ দান অতীব স্বল্প, যদি তব নাহি ধরে প্রাণে
বল, ফিরায় না তবু-আমি বীর আলেকজান্দার
অর্ধেক পৃথিবী-জয়ী, ভরি দিব তােমার ভাণ্ডার।”
কহিল ব্রাহ্মণ ধীরে, কণ্ঠস্বর নির্ভীক অটল,
নিষ্পলক স্থির আঁখি গােধুলির আভায় উজ্জ্বল
“যেই হও হে অতিথি, অতিথিই তুমি মাের স্থান
রাজা প্রজা উচ্চ নীচ মাের কাছে সকলি সমান।
অর্ধেক ধরণী জয় ছার, কর সমগ্র বিজয়,
এর বেশী সমাদর পাবেনাক’ হেথায় নিশ্চয় ।
কোন্ প্রলােভন তুমি দেখাইবে কি তুচ্ছ সােনায়
পঙ্ক চেয়ে সে মলিন, হীন, আমি জানি যে তাহায়।”
৪৫
চিত্র ও চিত্ত
সম্বরি উদ্যত ক্রোধ গ্রীক বীর কহে পুনৰ্ব্বার
“এত স্পর্ধা করিও না, ভাল নয় এত অহঙ্কার :
কার এই পৃথিবীতে অর্থে বল’ নাহি প্রয়ােজন ?
অর্থ নাই, তাই তব পশুসম ঘৃণ্য এ জীবন !”
উচ্চ হাসি কহে দ্বিজ—“পশু চেয়ে হীন আমি বীর
অর্থাভাবে নহে কিন্তু ; আছে তার কারণ গভীর,
এতটুকু জল পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে অধীর
তারে কই কৃতজ্ঞতা, যে নির্মিল পিপাসার নীর ?”
বিস্মিত বিজয়ী দর্পী শুনি উক্তি দীন সন্ন্যাসীর
লজ্জিত পুলকাঞ্চিত ফিরিল শিবিরে নতশির।
সংসারের মায়া
কেবল প্রাচীপকে উদিল রবি
ঘােষিল বৈশাখ দিনােপ,
নবীন কৃষকের দুয়ারে এল
অতিথি এক, শিরে জটাচাপ।
‘স্বাগত বলি রে নবীন দাস
লগ্নগলবাসে প্রণমিয়া,
চরণ ধােয়াইয়া আসন দিল
নূতন কুশাসন বিছাইয়া।
ঝাটায়ে নিজ হাতে খামারবাড়ী
আঙনে উনানটি দিল করি,
নীরবে সবিনয়ে আনিল ত্ব
যা ছিল চাল ডাল কাঠ খড়ি।
আনিল নদী হতে সিক্ত বাসে
কলস দুই জল বাবাজীর
দোহায়ে দিল দুধ, রহিল বসি
ভােজনশেষাবধি নতশির।
৪৭
চিত্র ও চিত্ত আহার পথশ্রমে অতিথি যবে শয়ন বিছাইল নিদ্রার, বীজন পদসেবা সাঙ্গ করি নবীন গেল ঘরে আপনার। তখন দিন-ছায়া দীর্ঘ পূবে করিতেছিল আলাে ঝিলিমিলি - উপােযী জায়া বসি, করিতেছিল ভাতের থালে মাছি কিলিবিলি। বিগত কালিকার অন্ন ক’টি খাইল দুই জনে হাসি মুখে অতিথি খাওয়াইতে একটা দিন ভাবিলে চলে কভু সুখে দুখে ? ছিল ত’ নবীনেরাে একদা বহু ধন ও সম্মান নামডাক- বছর দুই সে যে ভিখারী হেন কপালদোষে সব হ’ল খাক। উঠানে ছিলনাক’ একটু ঠাই মড়াই গােলা বেড়ে ঘেঁষাঘেঁষি, করিত ক্ষেত ঘর বারটি মাস খামারে ফসলের ঠেসাঠসি । ৪৮
সংসারের মায়া
ন’খানি লাঙ্গলের ছিল চাষ
ফলিত ক্ষেতে সােনা একদিন,
তুলিতে ধূলা-মুঠা উঠিত সােনা-
নবীন সেই আজি দীনহীন।
দেখি এ কৃষকের অতুল সুখ
পক্ষপাতে রুষি কমলার,
মিথ্যা মামলায় নীলামে নিল
দাসের জমাজমি জমিদার।
এখনাে প্রতিশোেধ লইতে দাস
করিয়া বসে কভু প্রাণপণ,
তখনি থেমে যায় যেমনি ভাবে
পত্নী নিরুপায় শিশুগণ ।
পরের কায করি যদিও তাহে
হয় না ছ’মাসেররা পেট-ভাত,
তবুও যাহা পায় তাই কে দেয় ?
বুঝিয়া করে দাস প্রাণপাত ।
বাকিটা বছরের করিয়া ঋণ
দিবস কাটাইছে করি দুখ—
গিয়াছে সবি তার যায় নি শুধু
মনের তেজোবল হাসিমুখ !
৪৯
:
চিত্র ও চিত্ত লইয়া ধনমান বয়ে পথে পারে নি নিতে যাহা জমিদার, নবীন তাই লয়ে একাকী গাঁয়ে পালিতেছিল নিজ পরিবার। দীনতা ছিল তার হীনতাহীন হৃদয় সুকোমল সহৃদয়, অভাবে না বেচিয়া বিবেক-প্রাণ- নবীন ছিল গ্রামে মহাশয়। সে দিন সাঝে আর খাবে না সাধু খাইয়া অবেলায় ক্ষুধা নাই, নবীন ছাড়িল না আনিল তবু দুধ ও ফল কিছু, খাওয়া চাই। নবীন ভেবেছিল—এ জন প্রাতে যাইবে চলি পুন কোথা আর, প্রমাদ গণিল সে দেখিল যবে সাধুর নাহি সাধ নড়িবার। ঘরের শেষ দানা অবধি কালি হয়েছে নিঃশেষ তবে আজ স্ত্রী ও ছেলেগুলি খাইবে কিবা ? সাধুরে খাওয়ায় বা কি? এ কি লাজ।
সংসারের মায়া বলিতে পারে না ত’ অতিথে যেতে করিতে ঋণ তাই গেল দাস ; কহিল মহাজন—“মশায় মােরা কোথায় টাকা পাব বারাে মাস ?” দুয়ার বহু ঘুরি, উচ্চ সুদে আনিল যাহা কিছু, সে টাকায় ঘরের একবেলা ঠিকানা করি, সাধুররা এক বেলা হল তায়। ক্ষুন্ন সন্ন্যাসী বিরস মুখে রহিল পেটে ক্ষুধা মুখে লাজ, অসুখ অজুহাতে না খেয়ে দাস ভাবিল—তবু যা হ’ল আজ।” তৃতীয় দিবসেও গেল না সাধু নবীন গেল হাটে কি করে ? ঘরের ঘটি বাটি বাজারে বেচি আনিল যাহা কিছু তবু ঘরে! এততে মিলিল যা হল না তাহে পাঁচটি শিশুদেরই পেটভরা, পত্নী মুড়ি খেয়ে কাটাল দিন- নিজে ত অনশনে আধমরা।
এদিকে সাধু রেগে দিতেছে গালি-
এমন দুরাচার সাধু ফেলে
অলীক দারা মুত মােহেতে মজি
চাহে না সাধুপানে আঁখি মেলে ?
“অতিথি উপবাসী রহিলে ঘরে
সে মহাপাতকের সীমা নাই ।
যাদের তরে তুমি করিছ এত
রবে কি পরকালে তাহারাই ?”
নবীন কহে ধীরে কৃতাঞ্জলি
“ঠাকুর, কর ক্ষমা সেবাটি ।
যে করে করি আমি জানেন তিনি,
যােগাড় দুই বেলা ভাত দু’টি ।
“দীনের দীন আজি কপালদোযে,
ছিল না কভু মাের হেন দিন,
বসেও পথে তাই পাতিতে হাত
মরমে মরে যাই, করি ঋণ ।
“ছেলেরা কচি শিশু ক্ষুধায় মরে
গৃহিণী মৃতপ্রায় অনাহারে,
পিতা ও পতি হয়ে নিত্য দেখি
কেমনে আছি বেঁচে, ক’ব কারে ?”
সংসারে মারা
দ্বিগুণ রােবে সাধু কহিল রুষি
“এই তাে হাটে গিয়ে নিয়ে এলে
খাওয়ায়ে নিজে খেয়ে, আছ ত বেশ
দুয়ারে উপবাসী সাধু ফেলে !
“তা হতে দিলে কোন্ একটা কণা
উপােষী কাল হতে ফকিরেই ?
আবার মিছে কথা কঁদুনী গেয়ে ?
পাইবি ফল এর অচিরেই !”
কহিল দাস----“প্রভু, বৃথা এ ক্রোধ
যা কিছু এনেছিনু হাট হতে
স্বল্প এত সে যে হ’ল না তাহে
এ বেলা ছেলেদেরই কোন মতে।”
“নিত্য তাহাদের কারণে আনন
তা’ হতে পারিতে ত’ কিছু দিতে ?
আমি ত’ চিরদিন রব না হেথা
এ তব স্বল্পের ভাগ নিতে।”
ত্বরিতে গম্ভীর কহিল দাস
মলিন মুখখানি নামাইয়া
“মাের যা দিতে পারি, নারিব দিতে
ছেলে বা পত্নীরে ভাড়াইয়া।
চিত্রওচিত্ত “দুদিন হতে মাের জুটেনি কিছু ক্ষুদ্র একটুও নহি তায়— সকল পরিবারে ক্ষুধায় মারি করিব সাধুসেবা, একি দায়? “বিবাহ হল যবে তখনি আ শপথ করি নিম্ন এ মাথায় সকল ভার যার খাওয়া ও পরা তারে না ধাওয়ায়ে কি থাকা যায় ? “ধম্মপত্নী সে আমাতে তার সকলি নির্ভর বাঁচা মরা, এখন আমি যদি না পালি তারে পতির ধর্ম কি হয় করা ? “ছেলেরা নিরুপায় অতীব শিশু যেমন করে হােক পালিবই- বাপের ধর্ম যে স্নেহ ও প্রীতি ইহাতে সব প্রাণ ঢালিবই। “আমারে ছাড়া এরা কারে বা জানে ? মুছাবে কে এদের আঁখিলাের ? বধিয়া অনাহারে জায়া ও সুতে সেবিতে সাধু মন নাহি মাের।
সংসারের মায়া
“আমার মূখগ্রাস তােমারে দিতে
কুণ্ঠা নাহি মম একেবারে,
কাল তা দিয়াছিও, আজিও দিয়া
আপনি আছি, র’ব নিরাহারে।
“আচরি পিতা-পতি-ধৰ্ম্ম পূরা
বঁচে যা’--অতিথির হে ভাগ।
নিজের তরে ইথে যদি না বাঁচে
গৃহীর নাহি তাতে খেদ রাগ।”
মূখ কৃষকের উক্তি শুনি
যুক্তি-ছল দেখি সন্ন্যাসী
কপালে দিল হাত!মুক্তি কোথা?
ঘিরেছে মায়া এরে অবিনাশী ।
কহিল—“গুন দাস, বাঁধিলে ঘর
সহিতে হইবেই উৎপাত
অভ্যাগত সাধু আসিলে কভু
তাদেরে দিতে হয় দুটি ভাত।
“তরুটি বড় হলে পাখীরা বাঁধে
তাহাতে আশ্রয়-তাই বলি
সে কি তা ঝেড়ে ফেলে, ভাবিয়া ভার।
বুঝিবে তুমি একি ? ঘাের কলি !
চিত্র ও চিত্ত
“গৃহীরই মঙ্গলকারণে মােরা
জগতে ঘুরে মরি, তারা কিনা
মােদেরে ভাবি হেন গলগ্রহ,
তাড়ায়ে দিতে চায় করি ঘৃণা ?
“চিরটা কাল, বাপু, তাদেরে নিয়ে
রয়েছ, রহিবেও ; যদি তায়
দিনেক সাধু সেবি তাদের ভাগে
হয়ই কম কিছু, কি তাহায় ?
“ধৰ্ম্ম এযে মহু, পুণ্য বহু-
মিথ্যা সংসার, কেবা কার ?
মায়ার রজুটি ভাবি মালা
ভাব’ কি পরকাল নাহি আর ?”
“পুণ্য মানিনা গাে ! ধৰ্ম্ম কি এ
নিয় ভণ্ডামি লােকাচার ?
প্রাণের প্রিয়গুলি ৩াসায়ে দিয়ে
বড়াই বড় কিগাে বাহবার ?
“ধম্ম সাধুসেবা, খুব সে ভাল,
কুলায় যদি তাহা ক্ষমতায়
শক্তি নাহি যার কেমনে বল
করিতে, মহাশয়, তারে তা’য় ?
সংসারের মায়া
“খাওয়ায়ে একবেলা, নিজে না খেয়ে
করেছি সাধুসেবা, আজি যবে
তাদেরি একবেলা হল না মােটে-
তুষিব কি দিয়ে গাে তােমা তবে?
“প্রাণের সব টান যেখানে বাজে
সেখানে ধৰ্ম্ম যে বড় কত
তুমি তা বুঝিবে কি, সন্ন্যাসি,
জগতে পুণ্য কি তার মত।
“মিথ্যা যদি হয় এতটা প্রাণ
এ প্রিয় বন্ধনহােক তাই!
তােমার সত্য সে তােমারি থাক্,
আমি এ মিথ্যারি জয় গাই ।
“আমি যে দেখি এই নিখিল জুড়ে
অমারি মিথ্যারে করে নতি,
দেবতারাও মাগে মানবরূপে
প্রাণের এ প্রয়াগে পরাগতি।”
পদত্যাগ
পরাণপণে খাটিত সদা প্রভুর কাযে রূপ
বাংলা সুবা দেওয়া তারি ! উচ্চ পদও খুব।
দক্ষ হেন কর্মচারী ক্লান্ত নহে কাযে
রাত্রি দিব। লেখনী যার সমনি চলিয়াছে।
প্রভুর তাহে সুবিধা বড়-বিলাস বাটিকায়
থাকেন তিনি বন্দী চির প্রিয়ার প্রহরায় ।
কচিৎ প্রভু বাহিরে আসি কহেন হাসি হাসি-
“রূপের মত লােকেরে আমি বড়ই ভালবাসি ।”
মিষ্ট বাণী, একটু হাসি সঙ্গী করি রূপ
উচ্চপদ-মদিরা পিরে খাটিত সদা চুপ।
মুষলধারে সেদিন প্রাতে বাদল দিল দেখা
মুছিয়া দিল পথের যত পধিকপদলেখা ।
সঘনে ডাকে বজ্র মেঘে বধির করি কাণ
নগরবাসী কাতর ঘরে কদ্ধ দিনমান।
সাঝেতে যবে বরষা ধার শ্রান্ত কৃশদেহ
জানাল’ দূত--পাল্কীবাহী এল না আজি কেহ।”
পদব্রজে দেওয়ান চলে, আঁধারঘন রাতি,
চরণ বাধে জলের তলে নিবিয়া গেছে বাতি ।
পথের পাশে কুটীরবাসে পুছিছে রজকিনী
স্বামীরে তার—এ ঘাের রাতে কাহার পদ শুনি?”
৫৮
পদত্যাগ
রঙ্গক কহে নিরীক্ষিয়—“দেওয়া মনে হয়”
শুধায় প্রিয়া—“যাবেন কোথা, এমন অসময় ?”
“ডেকেছে বুঝি বাদশা তাই হাজিরা দিতে চলে,
নহিলে যাবে চাক্রী, দেখ চারী কারে বলে !”
রজকী আরাে ব্যথিত হয়ে কহিল স্নেহভরে
“কুকুর সে-ও এহেন কালে নামে না পথ’ পরে।
অত যে মানী দেওয়ান কিনা এ দুর্যোগে ছােটে ?
চাকর হতে তবে ত’ মােরা অনেক সুখী বটে।
বেহারা বুঝি জোটেনি কেউ ?” “আসিবে কেন তারা?
চাকরী কারে করে ত’ না যে রহিবে ডাকে খাড়া।”
“দু’মুঠো ভাত, আহারে বাছা, পাবি না কিরে কোথা?
যে দেছে প্রাণ, দিবে না কিসে খাইতে, একি কথা?”
শুনিল রূপ দাড়ায়ে পথে করুণ সমব্যথা
“যে দেছে প্রাণ, দিবে না কি সে খাইতে, একি কথা?
খাওয়াই যদি এতই বড়, খাওয়ায় তবে কে সে?
চাকরী তবে করিব তারি—ইব তারি দেশে!
তখনি রূপ গােস্বামীজী উপজি রাজপাশ
ইস্তিয়াফা লিখিয়া দিয়া ফেলিল নিঃশ্বাস ।
পুছিল প্রভু-“পাগল, হাঃ হাঃ করিছ একি দ্বিজ ?
বেতন, বল, বাড়ায়ে দিব—বােঝ না হিত নিজ ?”
খেলু হজিরা #
বিপুল বেগে বান ডেকেছে অজয় নদের আজি
জলের তলে বরুণ দেবের উঠচে বিষাণ বাজি,
কত গিরি আসচে গলে ঘুর্ণা জলের সাথে,
ভাসচে দৈত্য-শিশুর খেলার ফেণার তরী মাথে।
ফুলিয়ে ছাতি আগলিছে গজি বিপুল নদ
তটের তরু ধানের ক্ষেত মাঠর দীঘির পথ
ভাসিয়ে দিয়ে, ফু দিয়ে আসে কি রাক্ষসী ক্ষিদে!
ছলছলিয়ে ঢুচে গায়ে রাস্তা কেটে সিদে।
ধাক্কা মেরে ফেচে বাড়ী শত্ত জলের ঢেউ
বাধন ছাদন কঁাদন দিয়েও রুখতে নারে কেউ।
গায়ের গরু ছাগল ভেড়া পি পাকে পড়ে
যাচ্ছে ভেসে কেইবা দেখে ? মানুষ নিজেই মরে।
ধপাস ধপাস পড়চে বাড়ী উঠান-ভরা জল
নর, নারী, রুগ্ন, সবাই ভিটেছাড়ার দল
উপায়বিহীন কোমর-জলে মরচে কেবল কেঁদে
মাথার উপর ভারে মেঘ আছে জমাট বেঁধে।
* বর্ধমানের বন্যায় ।
খেলু হাজরা
চলাে ভেসে ভাতের হাঁড়ি, ধানের মড়াই গােল
সমবেত একটু ডাঙ্গায় বামুন হাড়ি জোলা !
ভাসচে কাপড় ঘটি বাটি মাদুর বালিশ কথা
বরুণদেবের নিঠুর রঙ্গ, সাধ্য কে দেয় বাধা ?
আঁতুরঘরের প্রসূতি সব বসে মাচার পর
অনাবৃত আকাশতলে কঁপচে থথরথর ।
নাইক’ খাবার কি দেয় মুখে শিশু জননীতে—
একটু খানি মাটির অভাব মাটির ধরনীতে।
পাষাণ ঠাকুর দেওয়াচাপা পড়ে জলের তলে
কে আর তােলে ? মানুষ যখন দাঁড়িয়ে আছে জলে!
নাইক গৃহ নাইক অন্ন নাইক সাঁঝের বাতি
প্রহর-ডাকা নাইক শিয়াল, কুকুর বিড়াল আদি ।
ধনীর পুঁজি রইল ভরা বাক্স সিন্দুকেতে
ব্যর্থ বলীর বাহুর বল ; ভক্ত নিন্দুকেতে
মিল আজি আঁখির জলে, ডাচে অকৈতবে
নিরাশ্রয়ের সেই মহাশ্রয়-ভরসা এখন ভবে!
কি এক মহামহিমাময় ধ্বংশের এই খেলা
হাজার আর্ত চোখের উপর সর্বনাশের মেলা!
মৃত্যু যখন বিরাট রূপে ব্যাপ্ত চারিধার
কি এ মহামিলন তখন—সবার একাকার।
চিত্র ও চিত্ত
জন্মেজয়ের সর্পষজ্ঞ সর্পনিধন তরে,
এ কোন্ রাজার যজ্ঞ কেমন বাদ যে না কেউ পড়ে ।
পার্থ দাহি খাণ্ডববন তুষ বৈশ্বানরে
বরুণ দেবের পালা এবার বাংলা দেশের ঘরে।
দুই দিন দুই রাত্রি থেকে কল জলের খেলা
প্রলয়শেষে জাগল ধরা-কাদার ঢিবির মেলা।
আপনার লােক যার যেখানে ছুটল’ সবাই সেথ,
কেউ নাই যার নিঃস্ব কাঙাল রইল তারাই হেথা!
জোয়ান্ মরদ হাজরা খেলু খুবই ছােট জাতি-
নিকষ-কালাে সতেজ পেশী, দরাজ বুকের ছাতি!
তার কুঁড়েটিও ভেসে গেছে, নাইক’ চিহ্নটুক
চারটি ছেলে স্ত্রীটি নিয়ে চাপড়াচ্ছে বুক !
বয় সে খেলু কাদর-খালে পারাপারের খেয়া
সন্ধ্যা হলে বন্ধ করে আন্ত’ খেয়া দেওয়া।
রাজার দত্ত ক্ষেত দু’বিঘে, তারি করে চাষ
ফলিয়ে সকল ফসল তাতেই—কাটায় বার মাস।
মেহ দয়ায় উঠল ভরে দেশের লােকের হিয়া
গৃহস্থালীর জিনিষ সবাই হাজির যখন নিয়া,
আৰ্ত্ত আতুর গরীব ধনী সবাই এল ধেয়ে
একটি মুঠো চালের তরে ছেলে বুড়াে মেয়ে।
খেলু হাজ
জিজ্ঞাসিল হাজরাকে এক চাউল-দেওয়া বাবু
“শহর গেলে থাকতে সুখে, হেথায় কেন বাপু?
ক্ষিদেয় হিমে মরূবে নিয়ে কচ্চাকচি ছেলে
এই কাদাতে থাকবে কোথা? বাঁচবে সেথায় গেলে।
কইল খেলু বুকখানি তার চোখের জলে ভাসে
“এই গাঁ ছেড়ে কেউ কি কভু যেতে ভালবাসে?
হ’ক না আমার হাজার দুঃখ, গাঁয়ের কি তায় দোষ?
কপালে যা আছে, হবেই---গাঁয়ে মিছে রােষ।
*এই গাঁয়েতে এই মাটিতে, এই এ ভিটের পর
মানুষ আমার উপর পুরুষ—তাঁদের পাতা ঘর
এই ধুলােতে ছেলেবেলায় কতই গড়াগড়ি
দিয়ে মানুষ--ছাড় বাে তারে আজকে কেমন করি?
“সবাই যদি গ্রাম ছেড়ে যায়, ছাড় বাে নাক আমি !
বই’ ডােঙ্গা, খাটব খাব, মিলে স্ত্রী আর স্বামী,
কালকে হ’তে করব সুরু ছিটে বেড়ার ঘর
দিন দশেকে তুবাে আবার—এই-ই ভিটের পর।
“কত মড়ক মহামারি গেছে এ গ্রাম দিয়ে
কত আমার প্রাণের জিনিষ গিয়েছে সে নিয়ে !
লিখিত আছে এই ছাতিতে-খােক যেবার মরে,
গাঁ ছেড়ে সব পালিয়েছিল, আমি ছিলাম ঘরে।
চিত্রও ভিত্ত
মনে আছে ওবারকার দুর্ভিক্ষের দুখ
ভিক্ষে করেও চাল মেলে নি’, খেটেও পাইনি’ সু
তিন দিন সব উপােষ করে’, চারদিনের দিন প্রাতে
দেখনু মায়ের মরণ, তার যে হয় নি’ হাতে-ভাতে।
“দুর্ভিক্ষের আর মড়কের চেন্না আছে বুকে
তাই এখানে তবু আমি কতক আছি সুখে ;
এই ভিটেতে বাপ ছেলেকে ময়ূতে দেখা চোখে
এই মাটিতে মা মরেচে দারুণ ক্ষিদের শােকে ।
“তখন যখন যাইনি শহর, আজবা যাব কেন?
বাপের ভিটে ছেড়ে কেন পাপ কি হেন ?
দালান্ কোঠা চাইতে ভাল কাদার বেড়ার ছিটে
সাঁঝ-সতে পাবে আমার সাতপুরুষের ভিটে!”
ব্যথা-বরণ বড় আদরের রমা যে তাদের কেমনে দেয় বিদায়- আঁখির আড়াল করিতে যাহারে বাপ মা বেদনা পায়। এমন দুহিতা, কি নিঠুর বিধি, বিবাহে হল’ সে পর? কেন তবে আর এই সংসার? মিছে সম্পদ ঘর। কেমনে বা রমা এটুকু বালিকা শ্বশুরবাড়ীতে রবে ? বারটি বছর মাত্র বয়স, কি দশা তাহার হবে ? শ্বাশুড়ী ননদী করিবে যখন কঠোর তিরস্কার কোথা ঠাই তার কাঁদিয়া হৃদয় করিতে পরিস্কার ? চিরদিন সে যে সােহগে লালিত, শিখেছে কি কায কিছু সারাদিন সে যে রবে লজ্জায় মাথাটি করিয়া নীচু! গৃহস্থালীর কাৰ্য্যের ভার কেমনে বা নিবে শিরে? অক্ষম সে যে! গঞ্জনা-লাজে তিতিবে অশ্রনীরে ! এমনি কত না করি আশঙ্কা, সলিলে ভাসায়ে বুক- জনকজননী কন্যারে দিল বিদায় চুমিয়া মুখ! কত দেবদেবী আরাধনা হােম পীরের শিন্নি দিয়ে জন্মেছে এই কন্যা,তারেও জামাতা চলিল নিয়ে। কন্যাও এই চির-অধিকৃত স্নেহের দুর্গ ছাড়ি যাইতে কতই করিল অমত নৃতন শ্বশুরবাড়ী।
চিত্র ও চিত্ত
পরিণয়কালে ছিল সে যে সেথা মাত্র পাঁচটি দিন,
বিবাহহাৎসব ঘন জনতায় একাকী সঙ্গীহীন।
সে যেন বন্দী—কত অপরাধী, নাই কোন স্বাধীনতা,
সব তার মানা, কারু পানে চাওয়া, কারু সাথে কওয়া কথা।
কার সনে তার কি সম্বন্ধ জিজ্ঞাসি নিতে হয়
তার পরিচয় অন্যের নামে সে যেন কেহই নয় !
‘মা’ ডাকি তাহার হত না তৃপ্তি ‘বাবা’ও তেমনি পর,
তার বাপ মা-র মত এরা নয় বলিয়া লাগিত ডর।
নাই কোন সাথী, নাই কোন খেলা, কাপড় গহনা পরে’
বসিয়া থাকিত অপরূপ এক, রূপ দেখাবার তরে।
কঁদে রমা তাই দুই বছরের স্মরি পুরাতন কথা
আবার বন্দী হতে হবে সেথা—সে যে দুর্জয় ব্যথা !
উঠিল শিবিকা—শেষ বার চাপি পিতার কণ্ঠদেশ’
কঁদিল কন্যা, পিতার চোখেও ছিল না জলের শেষ?
নক্রীড়ার বাল্যসখীরা দু’ধারে করেছে ভীড়
পাল্কীর দ্বারে মুখটি বাড়ায়ে নােয়ায়ে ক্ষুদ্র শির।
আঁচলে কাহার বাধা আছে মুড়ি, গামছা কাহারাে কাধে,
খেতে খেতে কেউ এটো হাতে, কেউ দুধের ঘটিটি হাতে।
খিড়কির ঘাটে বাসন ফেলিয়া কতনা ঝি বউ মেয়ে
সকৌতুহলে সাশ্রনয়নে ফেলেছে ঠাইটি ছেয়ে !
ব্যখাবণ
আছিল রমার যার সাথে আড়ি, হল’ ভাব তার সনে,
পরিহাস-রস ফুটিল না আজ বেয়ানের সুবদনে।
চলিল পাল্কী—গ্রামপথ বাহি, দুয়ার খুলিয়া বালা
দেখিতে লাগিল—সেই ধুলাপথ, দোকান বিপণিমালা।
অই শিবতলা বসেছে বাজার, অই সে ময়নাদীঘি,
বিলের চরেতে চড়িছে গােপাল, রােদ করে ঝিকিমিকি।
গ্রামবধূগণ বাড়ী ফিরে নেয়ে কলস লইয়া কঁখে
ছােট পথটুকু ছেড়ে সরে গিয়ে দেখিছে ঘােটা ফাকে ;
সেই পরিচিত আঁখিপল্লবে সেই পরিচিত
যায় যেন সবে করিতে করিতে অতীত কাহিনী বৃষ্টি।
সিক্ত বসন অথবা কলস উছলি পড়িছে জল
কোথাও তাদের চরণচিহ্ন রহিয়াছে অবিকল ।
ভাবে রমা দেখি, সেও কত দিন এই ছােট পথ বাহি
করিয়া সিক্ত চরণাঙ্কিত বাড়ী গেছে অবগাহি।
অই বটতলে ‘বুধি’টি তাদের করে নােমন্থ শুয়ে
আ’লের উপর কৃষকপত্নী গিয়াছে অন্ন খুয়ে ;
লাঙ্গল থামায়ে ফিরে চায় চাষা কোমরে পাঁচন গোঁজা
রাখালেরা সব আসিতেছে ছুটে যে যেথা আছিল সােজা-
অশথের তলে ফেলি তালছাতা, হাতে বাঁধা এক পাখী,
‘ভুলাে’ কুকুরটি শুয়ে ছিল সেথা ছুটিল ছুটিতে দেখি।
গাইছিল কেউ ‘কণ্ঠে’র পদ—“সুখ চেয়ে দুখ ভাল”
ছাড়ি মধুপান কর্ণিকারের কেহ বা ছুটিয়া এলাে !
চিত্র ও চিত্ত
পাঁচটি বছর কেটে গেছে আজ শরণালয়ে রমা
যৌবন-মধু-পাৰ্বন-বিধু গ্রাসিতে আসিছে অমা!
নয়নের নীচে গাঢ় কাল ছায়া, সদা ছলছল আঁখি—
যেন দীপালীর শেষ দুটি দীপ রেখেছে কে কর ঢাকি।
পাকা আঙ্গুরের মতন সুড়ােল তনুখানি যুবতীর
নীল উপশিরাশতরেখাবলীলাঞ্ছিত সুগভীর।
এ যেন একটি রাজার প্রাসাদ অনাদৃত আছে পড়ি
উর্ণনাভেরা প্রতিটি কক্ষ ভরিয়াছে জাল গড়ি !!
শ্বশুড়ীননদীগঞ্জিত সদা বঞ্চিতগৃহসুখ
চির আদরের প্রতিশােধে যেন অনাদর উন্মুখ।
করে নি কখনাে, জানে নি কখনাে এমন কাৰ্য সবে
এখন রমারে করিতে হতেছে, করিতেও তারে হবে ।
নিপুণ গৃহিনী, শিখিয়াছে সব—তবুও তুষিতে নারে
শাসননদীরা রুক্ষ ভাষায় সদা গালাগালি পাড়ে।
নির্বাক রমা বলে না কথাটি নিজ হীনতার লাজে
সমবেদনায় অশ্রু আসিত, সখী সান্ত্বনা সাজে!
শুধু ছিল তার সবার আড়ালে দরদী দয়িত সাথী
নিভৃত নিশীথে বিস্মরি সব দিত সে নিত্য পাতি
প্রেমচুম্বনতলে কম্পিত লাঞ্ছিত চিত খান
ঘুচিত দৈন্য, লভিত পুণ্যঅভিষেকে নব প্রাণ!
ব্যথার
দিবসের গ্লানি হইতে না হ’তে অঙ্কিত বুকে তার
পতির সােহাগে ঝরিয়া পড়িত ঝরঝরি চারি ধার!
মধুর অতীত তলায় গিয়াছে কোন্ অতলের নীচে
ব্যথাঘেরা তবু বর্তমান এ সুমধুর তার কী যে !
ৰন্ধবিহীন মুক্তিতে আর নাহি আনন্দ আজ
সব গৌরব সংহত যেন নিবিড় বন্ধ ঝ।
লােক মুখে শুনি মেয়ের দুঃখ ক্রুদ্ধ কাতর পিতা
উপনীত আসি জামাতার গৃহে-মা যে উৎপীড়িত।
বেয়ানের সনে করিয়া কলহ মেয়ে নিয়ে যেতে চায়,
ঝঙ্কারি ব্যান্ স্পষ্ট সরল ভাষায় দিলেন সায়।
অর্ধদ্ধ দ্বাৰনেপথ্যে স্বেদে ও নয়ন জলে
স্থানুসমা রমা হেরিছে ধরণী ঘুরিছে চরণতলে।
জনক যখন কহিল সুতায় চলিয়া আসিতে সাথে-
পড়িতে পড়িতে রয়ে গেল রমা দরজা আঁকড়ি হাতে!
ফিরে চেয়ে পিতা দেখিল কন্যা দাঁড়ায়ে বিনত চোখে
আঁচলন্ত জড়ায়ে আঙ্গুলে মাটি খোঁড়ে পদনখে!
ভাবিনী
ক্ষুদ্র পল্লীপ্রান্তরবাল,
কঙ্করশিলা আবিল ধুয়ে
বয়ে যায় এক ক্ষুদ্র তটিনী
মুক্তামালার সীমানা থুয়ে।
বর্ষায় সে গো প্লাবি তীরভূমি
বহিয়া আনিত গুল্মলতা,
নিদাদে আবার যাইত হঠিয়া
ক্ষুব্ধ হতাশ প্রণয়ী যথা!
।
রামু মােড়লের নাতিনী ভাবিনী
ললিত সুঠাম কিশোরী মেয়ে-
এ নদীপাড়ের আমের বাগানে
যখন-তখন আসিত ধেয়ে ।
বড়ই গরীব রামু মণ্ডল
কোন মতে করে দিনাতিপাত ;
কেউ নাই ঘরে-আপনি, ভাবিনী
আর নাতি এক বছর সাত।
ভাবিনী
বৃদ্ধ রামু সে রাজার রাখাল,
হরিশ ছেলেটি ভুগিছে জ্বরে,
তবু সে তাদের মংলাকে নিয়ে
চরাইত নিতি বিলের চরে।
সন্ধ্যায় দিয়ে গােয়ালে সাজাল
ভাবিনী ঢুকিত রান্নাঘরে
“দাদা” আর ভা’য়ে খাওয়ায়ে, রাখিত
ভিজাইয়া ভাত প্রাতের তরে!
হরিশ যে দিন পাইত মজুরী
মংলারে নিয়ে ভাবিনী যেত,
সারাদিন ঘুরি বাগানে ও বেড়ে
খুটিয়া আনিত যা কিছু পেত।
কভূ দু’টি বেল, একটি কয়েৎ
গােটা কত নটে শুশুনি শাক
কিম্বা একটা ঝিঞে বা করলা,
রাত্রে তাহাই হইত পাক।
বড়ই কষ্ট রামু মােড়লের
কেউ তারে ফিরে চাহে না কভু;
পাতিত না হাত-মুখী ছিল সে যে
নিজনির্ভর গর্বে তবু!
চিত্র ও চিত্ত
সে দিন শ্রাবণ বর্ষা ভীষণ
দুৰ্যোগ ছিল সারাটি দিন
ক্ষণেকের তরে থামেনি দেবতা
সূৰ্য্য ছিলেন আঁধারে লীন।
মাঠে বাটে সব হাঁটুভরা জল
সাজেই অমার নিশীথ যথা,
রাজবাড়ী হতে ফিরিতে নারিয়া
মােড়লের বড় বাজিল ব্যথা।
ভাবিনী হেথায় ভারেরে খাওয়ায়ে
পাথরে দাদার অল্প ঢালি,
রহিল বসিয়া মাটির একটি
ছােট্ট প্রদীপ সমুখে জ্বালি।
ঘন গর্জনে ঘূর্ণি ঝঞ্চা
চূর্ণিছে কত তরুর শির
বর্ষার কেশ মুছে আঁকড়ি
নিস্ফল রােষে কি অস্থির।
পবন-আহত দ্বারের শিকলি
বাজে ক্ষণে ক্ষণে চকিত করি-
ঝাপটা বাতাস দুয়ার ঠেলিয়া
দিছে বালিকার চিত্ত ভরি।
৭২
শুনিছে ভাবিনী এ প্রলয়মাঝে-
বুড়ার কস্তু পায়ের ধ্বনি
অই বুঝি দাদা ক্লান্ত নিবা
দ্বারে কর হানে অনন্ ঝনি!
খুলে দেখে দ্বার—কই? কেউ নাই।
বায়ু করে যায় অট্টহাস।
রুধিয়া দুয়ার আসে ফিরে ফিরে
কত বার হেন ব্যর্থ আশ।
ভাবিছে ভাবিনী ধ্রুব বিশ্বাসে
-আসা দাদার হয় নি কভু,
আজিও আসিবে-দুৰ্যোগ আর
দূর পথে দেরী, আসিবে তবু!
হেরে যেন বালা-মাঝপথে দাদা,
একে এ আঁধার তাহাতে জল,
কোথা আ’ল, কোথা পথ ঠিক নাই।
পথ থৈ থৈ সুসমতল !
আমরা তাে বেশ আছি ঘরে বসে
এলেই তুমি করিতে ভাল
সরে না বাক্য শুষ্ক কষ্ঠে,
বিছ,-বাঁচিতে পাইলে আললা ?
চিত্রও চিত্ত তালের ছাতাটা উড়ে গেছে ঝড়ে ক্ষুধায় শক্তি নাহি তাে হাতে। খুজিছ কি তাই সানয়নে হাঁড়ি আঁধারে এ কাল রাতে ? রক্তের ধারা ঝরিছে চরণে ফুটেছে কত না কুশের আগা, সিক্ত সে চীর জলে শপট, চলিতে কেবলি হোঁচট লাগা ! হকিল তখন তৃতীয় প্রহর পল্লীপ্রহরী শৃগাল দলে, পড়িল লুটিয়া ভাবনাক্লান্ত ভাবিনীর মাথা মেঝের তলে। “যাই, যাই, দাদা,আহা মরে যাই- হয়েছে তােমার কষ্ট কত।” বলিতে বলিতে ছুটিল কিশােরী মুছি আঁখি দু’টি তন্দ্রাহত! “কই? কত দূরে? আলাে নিয়ে যাব। যাই, যাই, দাদা সবুর কর- ভয় কি ? এই যে আসিয়াছি আমি বলিয়া ভাবিনী ছুটিল খর। ৭৪ ভাবিনী থেমেছিল জল ; বাতাস তখনন রাগে এলােমেলাে সরাতে মেঘ শিশুর মতন জামা পরে তারে খুলিতে যেমন প্রকাশে বেগ ! ছুটিতে ছুটিতে আসিল ভাবিনী উৰ্ম্মি-ধূনিত নদীর ধারে ;- আরও গেল সে—নিকটে বা দূরে মিলাইল শেষে অন্ধকারে ! . ফিরিল মােড়ল তখনি ঊষায় হরিশ তখনাে ঘুমায় ঘরে, ঢুকিতে দুয়ারে কি যে এক বাধা পাইল বৃদ্ধ বাতাস ভরে’! করুণ হিয়ার বৃথা প্রতীক্ষা, মরণের ঘাের আর্তনাদ- বাড়ীর বাতাস করেছিল ভারী বৃদ্ধ তাহার পাইল স্বাদ ! “ভাবিনী—ভাবিনী” ডাকিল মােড়ল, ফিরিল সে ডাক নিরুত্তর। সে যে নাই’হেন কেন মনে হয় রােদন আসিছে নিরন্তর।
लिख७खि
নীরব নিজন—আসিল না কেউ!
সেবা-পরায়ণ সে দুটি হাত
অন্নের থালে রহিছে জাগিয়া
করে বুড়া ঘন দৃষ্টিপাত।
চরণ পাটুনী আসিয়া তখনি
আছাড়ি পড়িল আঙনতলে-
“ঘাটে এল যবে, জানি কি তখন
নিশিতে তাহারে পেয়েছে বলে ?”
মূচ্ছিত বুড়া পড়িল লুটিয়া
মেলিল না আর বারেক আঁখি।
জল-টুঙিবাসী কৃষকেরা বলে’-
আজো ফিরে সে যে দাদারে কি ।
৭৬
বীর হাষির বীর হাম্বির ভূপ- মল্লনৃপতি প্রবলপ্রতাপ ছিল না কেহ সে রূপ। পথে পথে তার কত অনুচর লুণ্ঠনে শুধু ছিল তৎপর ; হইত পূর্ণ রাজভাণ্ডার লুষ্ঠিত সেই ধনে ; কুষ্ঠিত তাহে ছিল না সে রাজা গর্বিত আরাে মনে। পণ্ডিত শ্রীনিবাস আসিছেন ফিরি নিজ গ্রামে, ত্যজি বৃন্দাবনপ্রবাস! সাথে ছিল আট গােশকট-ভরা পুথি কত শত, পড়িলেন ধরা দস্যুর হাতে ; লুটি নিয়ে গেল ধন ভাবি রাজকোষে। স্তম্ভিত দীন বৈরাগী কাঁদে সারারাতি পথে বসে !
लिख
চিত্ত
বিষয়বাঞ্ছা নাই।
জ্ঞানের মতন ধ্যানের বাসনা
নাই কেন—ভাবে তাই
বনপথে বহে শীতবায়ু জোরে
ক্রুক্ষেপ নাই, শীত লাজে মরে
ডাের-কৌপী-সম্বল সেই
লাগি সন্ন্যাসী দেহে
ভাসি আঁখিজলে
মাগে শ্রীনিবাস স্নেহে।
দর গতি
প্রত্যুষে রাজপুরে
মুণ্ডিতকেশ পণ্ডিত ছুটে
আঁকা-বাঁকা পথ ঘুরে।
দেখে হাম্বির বসি গম্ভীর
নাহিক বিন্দুলেশ দম্ভীর
সিক্ত নয়নে শশানে ভাগবত--
এই কি দস্যপতি ?
বিস্মিত চিত
দেখে বৈষ্ণব
অতি পুলকিত মতি।
মূখ কথক মুখে
ভ্রান্ত ব্যাখ্যা শুনিয়া রাজার
বেদনা বাজিল বুকে।
৭৮
নীয় হাষির . সত্য শুদ্ধ অর্থের তরে জনে জনে পুছে কাতরে সাদরে শ্রীনিবাস পাশে উত্তর পেয়ে পদ চুমি ভূমে লুটি জিজ্ঞাসে রাজা, পরিচয় তার যােড় করি কর দু’টি। নির্বাক ঐনিবাস- নির্যাতিতের হৃদয়ে জাগিল গভীর প্রেমােচ্ছাস! ভুজ-বন্ধন নিবিড় করিয়া হাম্বিরে নিজ হৃদয়ে ধরিয়া কহে শ্রীনিবাস—“হে রাজা আমার হইয়াছে কালি রাতে সৰ্ববিনাশ—আটগাড়ী পুথি গেছে দম্যর হাতে। “আপনার তারা দাস শুনি লােক মুখে এসেছিনু আমি ফিরে নিতে করি আশ। আপনারে দেখি কিন্তু এখন সব ফিরে আমি পেয়েছি যেমন!
চিত্রওচিত্ত ভক্তের দেখা, হরিনাম শােনা- বিপদের এই দান? পলে পলে তবে আসুক বিপদ, বিপদেই করি ধ্যান!* ধন-ভাণ্ডার খুলি দেখিল নৃপতি নহে সে অর্থ আছে শুধু পুথি গুলি। জীর্ণ দ্রষ্ট অতি পুরাতন গ্রন্থ কেবল ধূলার মতন তুলে নিতে হাতে পড়ে বুঝ, বিস্মিত দেখি ভূপ- বৈষ্ণব-মুখে চাহে একবার, আর দেখে এই স্তুপ । গােরার পার্শ্বচর এই আচাৰ্য্য শ্রীনিবাস, শুনি স্তম্ভিত অন্তর! সন্ত্ৰমে রাজা পদতলে পড়ি ক্ষমা মাগে আর যায় গড়াগড়ি ; ত্যজিয়া রাজ্য, কৌপীন নিল দুর্লভ যেন কত- ৮০
বীর হাষির
শিষ্য হইল রাজা, রাণী, প্রজা
মল্লভূমির যত।
শ্রীচৈতন্যদাস”
এই নামে বীর হাম্বির রাজা
হইল সুপ্রকাশ।
লুষ্ঠিত ধন রত্ন সে আজ
বর্নিত সব মানবের মাঝ,
অন্ন ও কূপ জলাশরে, আর
দীন-দেবতার নামে,
ছােট সে রাজ্য বিস্তৃত আজি
বঙ্গার এনে এমে।
ক
বিশ্বাস
বরষ পরে গুরু আসিয়া
কহিল--“আরে, এস, এ ধারে--
ভাল তাে মুটু ঘােষ ? সকল মলি ?
কেমন চাষবাস এবারে ?”
ঘােষজ পুলকিত তনুতে
চরণধুলী লয়ে মাথাতে
ঘষিয়া করে-করে কহিল সবিনয়ে
“সকলি ভাল হব দয়াতে।”
“এবার তবে আর কিছুরি
ওর করিও না বৃথা এ
ধারণ করি ফেল’
কি হবে মিছে কাল বীয়ে ?
“বছরে আছে ভাল, উনিশে
অমৃতযােগ গেছে পড়িয়া
এদিন মেলা ভার। ও-দিনে ভাবি তাই
ফেলি এ শুভ কাজ করিয়া।
“কি জানি কবে কার হয় কি।
পড়েছে দিন কাল এমনি
আজিকে দেখিযায় কালি সে নাহি, হায়,
স্বপন মনে হয় যেমনি।
“ঘাের এ কলি কি না? সে হেতু
চারিটি পাদ পাপ পূর্ণ !
নহিলে এ দেশের এ হেন দশা হয় ?
গেল এ রসাতলে তুর্ণ।”
রুদ্ধ শাসে নুটু শুনি এ
শঙ্কা গণে মনে-তাই ত
দেশটি রসাতলে যায় তাে কোনখানে
সপরিবারে আমি যাইব।
নীরব দেখি গুরু নুটুরে
ভাবিল কাজ বুঝি হইল,
কহিল “তবে তাই যােগাড় কর গিয়ে
উনিশে দিন ঠিক রইল।
ধরণী-নিবদ্ধ নয়নে
কহিল নুটুথােষ—“প্রভু গাে,
ছােট যে ছেলে ক’টি !
নারিব নিতে এবে কভু তাে!”
ইষ্ট-মন্তর
চিত্র ও চিত্ত
“পাগল হলে নাকি, বাবাজী ?
ছেলেরা ছােট তাতে কি ক্ষতি ?
মন্ত্র বিনা যে রে শুদ্ধ নহে দেহ
গুরুরে পাওয়া সে তত নিয়তি।
“যা কিছু কর কাজ সকলি
হলে গুণ নয় সিদ্ধ,
তীর্থ দান ধ্যান দেবতা দ্বিজ “জা
সবারি
মূল গুরু,
নিত্য
“গু যে কারে দেবতা
এ তৰ-নদী-পার-তরুণী!
চতুৰ্বর্গের ফল তাে হাতে-হাতে
করিলে গুরু-সেবা এমনি।
“ভক্তি কর যদি গুরুরে
কিছুরি প্রয়ােজন হবে না !
তীর্থধম্মের সবারি সার গুরু
তবের ভ র রবে না ।
“মাত্র একবার দিবসে
ইষ্টমন্ত্রটি স্মর’ ঠে-
মুক্তি তবে তব সাধ্য রােদে বাে?
যাবেও সশরীরে স্বরগে।”
৮৪
===
অশ্রদরদর নয়নে
ভক্তি-পুলকের আবেশে
কণ্ঠগদগদ
কহিল টু—“প্রভু
ক্ষম’ এ অবহেলা আদেশে।
“বছর দুই আরাে না গেলে
নারিব ও-আদেশ মাখিতে।
কেন তা শােন’ বলি, 'আমাবাে কাৰ সাড়া
তা হলে হয়ে যায় বাড়ীতে।
“তখন ছেলে দুটি ও
কাবের মত কিছু হইবে,
পারিবে দু’পয়সা
আনিতে ততদিনে
বধুও কাথ শিখি হবে।
“রাজার সাথে এই মামলা
চুকিবে ততদিনে, পাড়া
ভিটেটুকু, দু’খানা বয়ও তুলে দিৰ ;
বলদও জোড়-দুই বাড়াব।
“তা হলে ছেলেদের রবে না
অন্নবন্ত্রের দুঃখ
নহিলে কবে তারা চিরটাকাল ধ—ি
‘বাবাটা ছিল অতি মূৰ্থ।
:চিত্র ও চিত্ত
“ম-হারা, আহা, তারা বাল্যে---
পায়নি কোন সুখ জীবনে।
এখন আমি যদি কিছু না দিয়ে যাই,
বাচিবে তারা তবে কেমনে?
“আমিও জানি প্রভু সে কী
মুখ হইলেও বুঝিতে
ইষ্টমন্ত্রটি
জপিরা একবার
গুরুরে যেমনিই পুজিব’-
“অমনি রথ নামি আসিবে
স্বর্গে যেতে হবে চড়িয়া,
তাইতাে আগে হতে রাখিয়া যেতে চাই
এসব ঠিকঠাক করিয়া।”
উঠিল গুরুদেব শিহরি
দেখি এ বিশ্বাস অ,
আপন হীনতার
সরমে গেল মরি।
মন্ত্র একি নব-চ্ছন্দ।
দেহ ও প্রেম
শ্রেষ্ঠ নটী মােতিয়ার নাম অবিদিত কারাে নাহি আজ
মােহিছে যে পুর-জন-হিয়া দিয়া নিত্য নানা গীত নাচ।
কত ধনী বিলাসী পুরুষ পেতে বার তুচ্ছ অঙ্গসুখ
ব্যর্থ হয়ে নিন্দি মােতিয়ায় হয়ে আছে আজিও উন্মুখ ।
যে নারীর নূপুর-নিকণে মুগ্ধ হয়ে লালসা বিপুল
পণ রাখে সৰ্বস্ব নিমেষে দিতে পায় ঐশ্বর্য অতুল !
যে নটীর নৃত্য গীত রীতি কণ্ঠস্বর ভঙ্গী আদি যারে
কলাবৎ প্রশংসে সতত, নবীনেরা সদা অনুকারে !~-
আজি তার বুঝি শেষ দিন, শেষ বুঝি নটী-জীবনের,
আসে ছুটি দীর্ঘ অফুরান-ধরি হাত কম্প্ৰ মরণের !
সুরম্য এ গট্টালিক-মাঝে সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠে শয়ান
শঙ্খ-শুভ্র শয্যাততে নারী, যৌন, রুগ্ন—অলস নরান ।
শ্লথ দু’টি চরণের তলে নৃত্যতাল মাগিছে বিদায়
অঙ্গ ঘেরি রূপপরীগণ অশ্রুরাগে শেষ চাওয়া চায় !
চিত্র পুচ্চ স্যাটিক সজ্জার দ্যান রি ও-কর পরশ
সারা গৃহনিকে ভুল থাকিত না সঙ্গীতে সরস!
ললিত ডাক্তার পাশে বসি একখানি কাষ্ঠ-কেদারায়
হতাশ্বাসে গণিতেছে কাল—এই বুঝি ফুরাইয়া যায়!
শয্যাতলে নীরব রােগিনী পাশে র নীরব ডাক্তার
কারাে মুখে কোন কথা নাই—চাহে মুখে দুজনে দোহার
চিত্র চিত্ত
ভগ্ন কণ্ঠে কহিল মােতিয়া টানা-অাখ টানি উচ্চ করি---
“আর কেউ আছে কি এ ঘরে ? থাকে যদি যেতে বল সরি
“কেউ নাই তুমি আমি ছাড়া”—উত্তরিল ডাক্তার ললিত
উপাধানে ভর করি বসি কহে নারী কণ্ঠ বিকম্পিত
“আজি এই মরণের ক্ষণে অনুরাে একটি আমার
তােমারে তা রাখিতে হবেই, শেষ সাং এই পতিতার।
এই মাের অলঙ্কারগুলি স্ত্রীরে তব মাের উপহার
শেষ মেহমাশাব্বাদ সহ দিও—এই নাচনা আমার।”
এত কহি শব্যাতল হতে অলঙ্কারপূণ পেটিকায়
ললিতের হাতে তুলি দিতে আঁখিজলে দেখিতে না পায়।
“ভাবিও না নিন্দিতার দান সতীত স্পর্শিবে কেমনে--
বাধা দিয়া কহিল ললিত কৃতজ্ঞতা-সজল নয়নে--
“ওকি কথা? এবে অভিনব, তুমি আজ পাষাণ-কঠিন।
প্রকাশিতে ভাষা নাই মাের তব পাশে মাের কি যে ঋণ।
আজ মনে পড়ে মাের সেই আসি হেথা প্রথম যখন
কেহ না জানিত মােরে, কেহ মাের ডাকি পুছেনি কখন।
ছিল অন্নবন্ধুখ্যাতিহীন নগরী এ দরিদ্র জনায়
তুমি তারে করে দেছ হেন আশাভরা সুখ-পূর্ণিমার ।
এ অখ্যাতে তুমি স্নেহময়ী পরিচিত করাইয়া দিলে
আজ মােরে তাই চিনে সবে কি ধনী কি গরীবেরা মিলে।
দেহ ও প্রেম “হ্য কিছু আছে মাের আজি স্বল্প 1ন খ্যাতি কিম্বা গন ভাবিও না মিথ্যা চাটু ইহা—এ সকলি তােমারি যে দন! স্বার্থান্বেষী মানব আমরা স্বার্থতরে ক্রীতদাস হই- তাই বলে দেবীরে চিনিনা, হেন মৃখ আমি কভু নই। কে বলে পতিতা তােমা নারী ? তুমি দেবী অনিন্দিতা অয়ি, দেখিয়াছি, শুনিয়াছি যাহা, তাহে তুমি সতী স্নেহময়ী।” মৃতুচ্ছায়াপাণ্ডুর বদনে উদ্ভাসি কি বন বিভা চমকিল দেখি তা ললিত-উপেক্ষিতা কন্দরী সে কিবা । কিছুক্ষণে সুধাল ললিত—“ওগো মােরে ক্ষমা যদি কর সুই হােমারে এক কথা, জানিতে তা ইচ্ছা মাের বড়। --“কর প্রশ্ন, লও পরিচর, রাখিও না কোন কিছু ফাঁক দিব আমি সকল উত্তর নাহি আর মানলজ্জাক। “নহ তুমি ইন্দ্রিয়ের দাসী, নহ তুমি অর্থের কাঙালী— তবে কেন তুমি এই পথে আসিয়াছ, একি চতুরালী ? মনে হয় সতত আমার, দেবতার নির্মাল্য এ কোন্ ঝটকায় উড়ে-পড়া ছাড়া, পথে তার কিবা প্রয়ােজন ?” ত্ব কণ্ঠে কহিল মােতিয়া—“সত্য, বন্ধু, উড়ে-পড়া ফুল । আমিও যে ছি কুলবধু ভাগ্যদোষে হারাইনু কূল !” “কহ ওগাে, কহ বিবরিয়া, বড় বাঞ্ছা শুনি সে কাহিনী- কোন্ পশু সাধিল এ বাদ তব সনে,সুন্দরী কামিনি।” = } —“নিন্দিও না আজি আর বৃথা, হয়ে গেছে বহু দেরী এবে গুরুজন সে ব্যক্তি তােমার। থাক্, থাক্, কায নাই ভেবে।” গুরুজন সে ব্যক্তি আমার ? একি শুনি রহস্থ ভীষণ । কহ, নারি, কহ সত্য কথা, জ্বলে প্রাণে তীব্র হুতাশন । কৌতূহলে চিন্তায় উচ্ছাসে ললিতের বদনমণ্ডল যন পাংশু পার মলিন ললাটে ফুটিল স্বেদজল । উপাধানে মুখখানি রাখি, কহে নারী সসঙ্কোচে ধীরে “পিতা তব, শ্বশুর আমার, নমি য় ভক্তিনত শিরে এতদিন মিথ্যা মরে’ ছিনু, আজ মাের সত্য সে মরণ- বড় ভাগ্যবতী আমি তাই, পেনু আজ তােমার চরণ ।” বজ্রাঘাতে স্তম্ভিত যেমন, করুদ্ধ নিশ্চেতন প্রায় স্পন্দহান বসিয়া ললিত, কি বলিবে খুঁজিয়া ন' পায় ! ---“সেই দিন পর আমায় আনিতেছিলেন তার দর পদ্যে র যখন অসম্মানে হল অগ্রসর, পিতা তব প্রাণভয়ে নিজে পলাইল ফেলি বালবধু, কি করিব নিরুপায়—মাের বয়স তত চৌদ্দ বর্য শুধু। ভার লয়ে রক্ষক যে সাজে, সে যদি না রাখে অঙ্গীকার অর্পে যদি সে-ই করে, নিঃস্ব তবে বাঁচে কি প্রকার ? নাহি বল, নাহিক সম্বল, নিরুপায় আত্মসমর্পিতা তাজি যে পলায়, সে নিস্পাপ আর যত দোষী, উৎপীড়িত?
দেহ ও প্রেম
“বেশ ধৰ্ম্ম, বেশ সে সমাজ, নাহি বুদ্ধি বিবেচনা তথা
পুরুষেরা কাপুরুষ সব, অধৰ্মই ধর্মের বারতা।
নিত্য নব রচিয়া শাসন সেবার রমনীয় তরে
গর্জিছে নির্বিষ সর্পসম. দণ্ড ধরি বলহীন করে ।
সয় নারী, আসিতেছে স’যে, সহিবেও সৃষ্টি যত দিন
যত খুশী দাও তার শিরে, সৰ্ব্বসহা রবে অমলিন।
যাক সব বাজে কথা : শুন শেষে যবে পঁহুছিনু ঘরে
‘দূর দূর কলঙ্কিনী’ বলি- খুলা পা’য় খেদাইল মাের ।
কার দোষে ? কাহার ক্রটিতে হন্তু আমি ত্যজ্য কলঙ্কিনী ?
নিরুত্তর। ত্যজিয়া আশ্রিতে, নিজদোষ ঢাকিলেন তিনি।
*
“এড়াইয়া নানা বিন্ন বাধা কাটাইনু পথে পথে, হায়,
কত দিন, কত যে রজনী, জানেন তা নিঃস্বের সহায় !
প্রিয়তম, ছিলে সে দুর্দিনে অধ্যয়নে তুমি তাে প্রবাসে
মাের মিথ্যা শরণ সম্বাদ রটি গেল স্বজনসকাশে!
লুপ্ত হল বিশাল পৃথিবী একাকিনী বালিকার চোখে
কলঙ্কেরে করিয়া মুকুট চলিলাম নিকদ্দেশ লােকে !
কত বল কত প্রলােভন জিনিয়াছি তার পর হতে,
নিজ ভার নিতে নিজ করে শিখি গাে দাড়াইয়া পথে ।
কুরুরাজসভাতলে আমি নির্যাতিতা পাঞ্চালী সমান
দিনু ছাড়ি বস্ত্রশেষাঞ্চল—অবতীর্ণ হল ভগবান্ !
চিত্র ও চিত্ত
“এই দেখ ছবি তব মম আছে মাের গুপ্ত বক্ষতলে
এই সাক্ষী আছে মাের চির, পবিত্র রাখা যার বলে ।
“একদিন, শুধু একদিন, এ-জীবনে হয়েছি পতিতা
সেও যে গাে নহে মাের দোষে ! উপেক্ষিতা আমি উৎপীড়িত!
পঞ্চত্রিংশ বর্ষে আজি এই পেনু আমি পতি-দরশন
এ প্রথম, এই শেব, মার পরিচয়, আলাপ মিলন।
তুমি মােরে চিনিতে পারনি, চিনিয়াছি তােমারে ত’ আমি-
সে কি আজ ? বংশতি বরষ--আমি ছিনু পত্নী, তুমি স্বামী।
নৃত্যগীতকলাবিদ্যা শিখি অষ্ট্রিয়াছি অন্ন পুণ্য পথে
না হইয়া আত্মঘাত, আর জলাঞ্জলি দিয়া নারীব্রত।
}
“তবু ভাবে নিয় জগত—এ আমার প্রাণ আর দেহ
সব ভাণ অপমান হলো সুসজ্জিত বিলাসের গেহ।
“যেন হেথা নাহি পুণ্য কিছু --শঙ্খ রবে খুলে • দুয়ার,
কামনা ও কাঞ্চনেই হয় সন্ধ্যারতি চিতদেবতার ।
ক্ষম’ মাের প্রগত' তাজি, থেকো সুখে, ভূলে। এ দুঃস্মৃতি
করেনিক’ যারে কেউ ক্ষমা—তুমি তারে ক্ষম’, এ মিনতি।
দেহ মাের হয়েছে পতিত, প্রেম আছে চির অমলিন
গেছে ফুল যদিও শুকায়ে তবু ও সে নহে গন্ধহীন।”
“ওগাে বধু, ওগাে সতি, প্রিয়া, উপেক্ষিত। হে মাের দয়িতা,
কোথা যাও ? এস ফিরে, এস মাের প্রাণে হে প্রাণের মিত।”
উচ্ছসিত আবেগ-উন্মাদ শষ্যাতলে পড়িল ললিত
তনুলতা প্রিয়ার তখন প্রাণহীন আছিল পতিত ।
তপােবিনিময় নারদ- কে ছি ছি ঋষিবর, এত কাল এত যত্নে ব্রহ্মচর্য পালি,হারাইলে সেই রত্নে ? কার কন্যা, কোথা জন্ম-তারে, তপােধন, ঠাই দিয়ে কলঙ্কিলে পুণ, তপােবন ? প্রাণের আদেশে, মুনি, করিয়াছি যাহা-- পাপ হাে, পুণ্য হােক—ফিরব না ভাই। নারদ- এ তােমার মহা ভ্রম! সংসারী অজ্ঞান এই মারামােহে মজে তজে ভগবান । তাপসের হৃদে এই স্নেহের প্রতাপ তপােবিঘ্নকারী এ যে ক্ষমাহীন পাপ ! ক দয়ার জগতে, ঋষি, স্নেহ দয়া পাপ? আত্মার এ আত্মহত্যা—এ যে অভিশাপ ! স্নেহ প্রেম মহী হতে যদি চলে যায় সৃষ্টির তা হলে আর কি র’বে সহায় ?
চিত্র ওচিত্ত
জীবরক্তে কলঙ্কিত ব্যাঘ্রীর অন্তর
বাৎসল্যের ফস্রোতে পূর্ণ নিরন্তর ।
সর্পমাত ডিৰ তার কেন আঙুলায় ?
মেহের কর্তব্য রে স্নেহ যে শিখায় ।
হৃদিহীন স্বৰ্গনটী পণ্যদেহা নারী
সদ্যোজাতা বালিকারে বনমাঝে ছাড়ি
স্বর্গে গেছে চলি, জননীত্বে পদাঘাতি-
অবনীতে রাখি ঘাের স্বর্গের অখ্যাতি।
আপন সন্তান ত্যজে ত্রিদিব-পাষাণী—
পাখী ছলছল আঁখি, সে যে মৰ্ত্তপ্রাণী।
স্বর্গ করে শিলাবৃষ্টি গভীর হুঙ্কার
মর্তে জাগে মাতৃস্নেহ স্থির নির্বিকার।
সমর্পিয়া আপনারে মৃত্যুর কবলে
রক্ষিল শিশুরে পাখী ঢাকি পক্ষতলে।
বুঝিনু ধরাই স্বর্গ, স্নেহ শেষদ্বার
তির্যক দেবেরাে বাড়া প্রণম্য আমার ।
শুনিনু শকুন্তকণ্ঠে বিষ্ণুর আহ্বান
অনাথ শিশুরে তাই দিনু গৃহে স্থান।
তপস্যা-রত্নের সেই মহাস্বর্ণকার
গড়িছেন এই রূপে পুণ্য-অলঙ্কার
৯৪
তগােবিনিময় ঝুটা খাটি পরীক্ষার নিকষশিলায় বিচ্যুতি-সান্ দেখা কিবা ধরা যায়। হে সত্তম, দয়া প্রেম যদি চ্যুতি হয় হার দয়াল নাম কোথা হবে ব? নারদ- বুঝেও না বােঝ’ যদি, যাও তবে নামি পঙ্কিল ফেণিলাবর্ভে-নিরুপায় আমি। কঁদিলে পরের দুঃখে যদি পুণ্য যায়, যা পুণ্য, থাক্ পাপবরিব মাথায়। তুমি বুঝি ভাব, মুনি, তপক্ষ হিয়া নিৰ্ম্মম কঠোর আত্মমগ্ন, স্বার্থ নিয়া ব্যস্ত সদা, পরদুঃখে উঠে না যা’ কঁদি, সৌন্দর্যের পাদমূলে বিকায় না সাধি, ত্যাগভাণে এ সুন্দর জগতে বিমুখ সেই চিত্ত-শৈলে জন্মে স্বর্গের যা সুখ ? ক্ষমা কর’, হে দেবর্ষি, আমি ক্ষুদ্র মতি কল্পনা করিতে নারি স্বর্গে সে দুর্গতি। এত কাল এত যুগ দীর্ঘ এ জীবন ব্যয় করি, ক্ষয় করি, করিব সৃজন চিত্রও'চ সে অনন্ত হৃদিহীন অবরােধলােক— নাহি যেথা হাসি অশ্রু প্রেম দয়া শােক ? বৈচিত্র্যবিহীন সেই শুষ্ক স্তব্ধ পুরে জানিনা আনন্দ কী যে, বাধা কোন সুরে। নারদ- - বুদ্ধিভ্রংশ মুনি তুমি উঠ উঠ জাগি কাচ পেয়েই অবহেল’ কাঞ্চন কি লাগি ? মেহমােহ! এই শিশু টানিছে তােমারে গতিহীন মুক্তিহারা মায়ার সংসারে। ক- দেবাষ, জানেন মন সেই অন্তর্যামী--- দেবতা দানব ন’, তিনি দীনস্বামী। তপঃ সাধি যাহা তুমি চাহ’ বিসর্জিতে মহা পুণ্যফলে আমি পেয়েছি তা চিতে- দীনে স্নেহ, হীনে দয়া, বিনিময়ে যার দিতে পারি ফল মাের সর্ব তপস্যার। নারদ- । মুক্তি তব দূরপরাহত! ঋষিরাজ, লাজে হেঁট মাথা আজি তাপসসমাজ কঙ্কে তােমার।
তপােবিনি
কেন হইব লজ্জিত।
এই যে অনন্ত বি হেন সুসজ্জিত
তরুলতা ফুলে ফলে মরুঅটবীতে
জীবের সম্ভোগ্য করি, ব্যর্থ করি দিতে
তা সবায় শক্তি তাহি মাের। কোন্ প্রাণে
রব মুখ ফিরাইরা সে কাহার ধ্যানে ?
বেয়াই সুরে যেই, সৌন্দৰ্য্য এ সব
সেই ধ্যেয় পুরুষের আনন্দ-আসব।
মেহ প্রেম প্রীতি ভক্তি দয়া বিসর্জিয়া
শুফ হিয়া দিব তাঁর চরণে অর্পিয়া?
কেবল আকাঙ্খ তীব্র ব্যর্থ ও বিমুখ
জীবনের শূন্য সাজি, শুষ্ক মন্ত্রটুক
সম্বল করিয়া সেথা দাড়াইব গিয়া ?
উঠিবে না দেবলােক টিটকারী দিয়া ?
ক’কে নাকি উপহাসি—“যাও পুনরায়
শুধিয়া জন্মের ঋণ আসিও হেথায়।
রে মুখ, বাস্তব স্বর্গ ধরণীতে ফেলি
কার বাক্যে স্বর্গ-কামে মৃত্যুপুরে এলি ?”
লাজে দুঃখে নিরুত্তর, ব্যর্থ সাধনায়
তখনি ফিরিতে হবে ঘাের নিরাশায়।
জিও অ ন জানলােক, প্রীতি-সায়নে রঞ্জিত অম-পূরী। ধরণীয় সনে চির-যুক্ত সে যে এগাে, ব্যক্তি কেম.. বিচ্ছিন্ন এ হী হতে? মানুষের সনে এতকাল একত্তরে বহি, যদি নারি ভালবাসিবারে স্বার্থের মমতা ছাড়ি, সেবিতে ভুষিতে এই স্বল্পে তুষ্ট জীবে— কোন্ উচ্চ পুণ্যে তবে বাছিব ত্রিদিবে? স্বেচ্ছায় করিনি বয় যেই বাক্য মাের পরদুঃখে ঘুরে নাই যে কণ্ঠ কঠোর সে পরুষ নিকক্ষণ বাক্যে মন্ত্র জপ তুষিবে না হিয়া তাৰ জেনে, মহাতপ । নারদ- তজ হও, করিও না আর বাড়ি, অষ্ট ঘাের ভণ্ড মুনি মিথ্যাপাপাচারী ! মুনি-ধর্মে অষ্ট হই ক্ষতি নাহি বড় প্রেম-ধর্ম সিদ্ধ হই আশর্বাদ কর।
বসন্ত-সেনা
নটী বসন্ত-সেনা--:
সঙ্গীতে রূপে নৃত্যে মােহিনী
নগরে সবারি চেনা ।
কেহ বুরে তার সঙ্গীত লাগি
কেহ বা নৃত্য-লীলা-অনুরাগী,
কেহ বা তাহার ফিরে রূপ মাগি
সবাই তাহার কেনা।
প্রতি নিশিদিন ধরি
নৰ নৰ তার স্তাবক-কষ্টে
উঠে জয়-পান ভরি।
স্তুপাকার ধন বসন ভূষণে
নিতি জমে ভেট, আনে ধনি জনে,
নটী কভু হা দেখে না নয়নে
এতটুকু কৃপা করি।
সেদিন রাজার পালা
বসন্ত-সেনা বাস, বি
মুখখানি কালিচাল।
পুছিলা নৃপতি—কেন সুন্দরি,
নিশিগন্ধার স্নান জল,
এ মধুর ক্ষতি কি দুখে গুমরি
সহ নপ্রাণএ জলা।”
हिच खि
বসন্ত-সেনা কহে
আমার এ ব্যথা শুনিয়া কি ফল,
এ যে গাে যাবার নহে।
তােমাদের এই কপট করুণা
দয়া করে আর কমােনা, করােনা,
আর শেলাঘাতে শসীরে মেরাে না-
মরিতেছি, প্রাণ দহে।”
কহে প্রমত্ত রাজা-
“চাও দিতে পারি অর্থ, অথবা
বুকের রক্ত তাজা।
নটী কহে ধীরে—“অর্থ আমার
যত আছে, নাই কোষেতে রাজার ;
বুকের রক্তে এই কারবার
ও সৰ দারুণ শাজা।”
নৃপ কহে আরাে জোরে
“যা বলিবে তাই নিশ্চয় দিব,
এবার বল, কি, মােরে।”
কহে নটী—“আছে নাম উদয়ন,
ভিক্ষুক এক দীন ব্রাহ্মণ,
ভিক্ষা আমার লয় না সে জন
আসে নাও--সাের দোরে ।
শে। “কত দিন আমি নিজে যাচিয়া ভিক্ষা দিতে গিয়েছি লয় নি’ সে ভেবে কি যে। ভিখারী অন্ধ অনাথ আতুর সকলেরে দিই ভিক্ষা প্রচুর, শুধু এই জন করে মােরে দূর- শাদা দাও এই দ্বিজে। নৃপতি হৃষ্ট মন, কহিল সােহগে—এই। এরি লাগি কেন এত আবেদন ?” রাজার আদেশে পরদিন প্রাতে, বাঁধিয়া আনিল দিয়া দড়ি হাতে উদয়নে, দূত রাজার সভাতে নর-নারী অগণন। রাজঅনুরােধ ক্রমে, আদেশ হইতে দণ্ডে উঠিল ঝঙ্কারি সপ্তমে। উদয়ন শুধু নতআঁখে রহি স্পর্ধার দান লইবে না কহি মৃত্যু-আজ্ঞা নির্ভয়ে বহি ফিরিল নিজাশ্রমে। ** বরষাবাদল রাতি ত্যনৃত্যে মাতি, নাচে নটনাথ ; নিবিড় আধার- ঘাট বাট মাঠ জলে জলাকার, বিদ্যুৎকশা-সনহার- শিহরে বিশ্ব-জাতি। বসন্তসেনা ধীরে নমি উদয়নে, সিক্ত বসনে উপজিল এ কুটীরে। বান ঙি দেখি দ্বিজ এ নিভৃতে, নদীর এ হেন প্রলয়-নিশীপে ইবিতে তারে কহিয়া বসিতে, দাড়াইল নত শিরে। রমণী কহিল কাদি “ক্ষম ব্রাহ্মণ, নির্বোধ নারী, আমি অতি অপরাধী। তেয়া সৰ ধন জন মন এসেছি রিক্ত তােমারি সন ইতে তােমার চরণে শ— দুটি পায় নি সাখি ।
বসত কহে উদয়ন--মাতা, আজি ৰ দান শব’ বহু মানে, অবনত করি মাথা। নারী যে চির-“মা”–গণিকা সে নয়, পণ্য-শালা কি ও দেহ-দয়, . প্রাণ যে-স্তন্ঠে মুকুলিত হয়, দেহে যে জীবন দাতা ?” বাহিরে তখন সুনীল গগন- ধরী জ্যোৎস্নাস্নাত।।
ধৰ্ম-পত্নী
রঞ্জন যখন গিয়েছিল তলিয়ে অতল তলে
প্রণয়িনীর কপট প্রেমের মায়া-সাগর জলে,
আপান করি প্রিয়ার প্রণয়, মদের মত,
যদের চেয়েও উগ্রতর শত,
প্রেমের নেশায় বকচ বাজে
অকারণ সে নানা কথার মাঝে
জিজ্ঞার্সিল যুবক রমণীৰে,
ধীরে অতি ধীরে
নিসিয়া মানের ভাণে,
করুণতর নয়ন দুটি তুলে নারীর পানে
বল দেখি আমায় কেমন ভালবাস লি ।
কুদ্ধ হয়ে উত্তরিল নারী দিগন্তরে মুখটি ফিরাইয়ে
-“এখনাে কি বুঝতে পারনি এ?
তে তে পড়লে নারীর কালাে আঁখির তপ্ত শ জল;
কইল যুব-সৰ বুঝিচি, সব বুঝিচি-ঠাট্টা, এটা হল।”
হ’ল আবার প্রেমের নুতন পরিচ্ছেদের সুৰু-
ভালবাসা কাহার লঘু, কাহারি বা গুরু।
সাক্ষী সাবু প্রমাণ
দুই জনেতেই কালাে জড়ো হিমালয়ের সমান।
सनी মীমাংসা তাে হলই নাক’ কিছু বরং আরাে প্রমাণ দেবে বলে’ পেল দু’য়েই, কেউ হবে না নীচু। আদর সােহাগ উঠল ক্রমে তর্কের সপ্তমে ; ভালবাসার পরিমাণের দিতে প্রমাণ-মাপ বার নব-যৌবন যেন বেরিয়ে এল তলােয়ারের মতন ত্যজি খাপ যুদ্ধ ঘােষণায় ; রক্তরঙে রঙীন খেলা দেখবে বাসনায় ব্যঙ্গ ভরে রঙ্গ-প্রিয়া রঙ্গিনীটি কয়— -“চের দেখেছি তােমায় মতন, বচনেতে কম তাে কেউই নয়। নিষ্প্রভ-ম্লান চক্ষু দু’টোয় যুবার জল আগুন দারুণ প্রতিজ্ঞার- করবে প্রমাণ জীবন দিয়েও ভালবাসা তার। কইল যুবক-“প্রিয়ে, তােমার তরেই নিঃস্ব আমি আজ, পত্নীপুত্র সব বিসর্জন দিয়ে ধন দৌলৎ সব দিয়েছি, শেষ-কড়িটিও রাখিনিক’ ঘরে, দেনার দায়ে ভিটেও যাবার দাখিল, স্ত্রীপুত্রেরা অনাহারে মরে। একটিবারও চাইনা তাদের পানে, তাদের কথা শুনিওনাক কানে, জানিও নাক’ ঠিক কে মল কে বেঁচে আছে, কি কব অধিক
তােমায় শুধু নিয়ে
তােমার প্রেমের পুণ্য-প্রয়াগ-তীর্থ নীরে মগ্ন হয়ে গিয়ে
বেঁচে আছি তােমায় ভালবেসে
আর কিনা সেই তুমিই আমায় চ্ছি দাগা এমন অবশেষে ?”
কইল নারী রুখে
অ-ভেজা ব্যঙ্গ বচন হানি, স্পন্দ-দোদুল বুকে-
-“অরণে কি পড়ে।
বলেছিলে সেদিন যে হে খুবই সাপট করে,
একদিনেক্সে ভরে তােমার স্ত্রীরে করে দেবে আমার বঁধুনি যে
কি হল ? গলে তাহার কাঁদুনীতে
প্রতিজ্ঞাটি গেছ’ তত বেশ ভুলে
আবার তবে কোন্ লজ্জায় কও কথা মুখ তুলে ?
এমনি তুমি লজ্জাহীনই বটে।
আর এসাে না আমার বাড়ী, এখান থেকে ওঠো।
ছুটল যুবা বাড়ীর পানে মুখটি করে নীচু,
কইল স্ত্রীরে-“শােননা ওগাে, কথা আছে কিছু।”
পী জবাব দিল কেঁদে—“আর কিছু নাই ঘৰে
কেল ক’খান দেড় কঁাথা মাটির ভাড় ঐ আছে কোণে পড়ে
পিতল সাগৰত নেছ, বাকী কেবল ঘটি
য়া করে নিনা একটি
স
ধর্মপত্নী
রঞ্জন কয়—“না, না, কিছুই চাইনা আমি, শােননা আমার কথা,
এই দণ্ডেই ঘুচে যাবে তােমার সকল ব্যথা,
পাবে প্রচুর অর্থ ও ধন--
ছেলেগুলােও খেয়ে-পয়ে’ পারে নূতন জীবন ।
আমিও ফিরে আসতে পারি
আবার নিজের বাড়ী
কেবলমাত্র এক অনুরােধ রাখ’ যদি, প্রিয়ে,
যাজ্ঞসেনীর মতন আমার প্রতিজ্ঞা-পাশ হতে উদ্ধারিয়ে
-“বল বল পামলে কেন?
কি কাজ হেন,
স্বামীপুতের জন্য নারী করতে কিবা নারে ?”—
পুলক-ভরা উৎকণ্ঠাতে জিজ্ঞাসিল পত্নী তাহার স্বামী-দেবতারে।
কইল স্বামী-“কথা এমন কিছুই এ নয়,
যাহােক দুটো ব্রাধতে তােমায় প্রত্যহই তাে হয়---
তাই-বলি-কি, একটি—শুধু একটি বেলার তরে
পায়ের ধুলাে দাও যদি মাের রঙ্গিণীর ঐ ঘরে!
সাধ হয়েছে বড়ই তার
তােমার হাতের মধুর রান্না খাবে সে একবার।
এই কামনা পূর্ণ হলে সে
ব্যবসা ছেড়ে, তরী তুলে চলে যাবে কাশী—বলেছে।”
স্বামীর কথায় বাক্যহারা নিমেষ-হুত আগুন-ভরা অাখি
পড়ল’ প্রিয়া সংজ্ঞাহীনা পতির পানে খানিক চেয়ে থাকি।
১০৭
পতিতা
যতই সুধান গাঁয়ের হাকিমগণ
ততই নারী মুখটি নামায়, জলে-ভরা ডাগর দু’নয়ন,
শিশুটিরে ততই জোরে আঁকড়ে ধরে বুকে,
জবাব কিন্তু দেয় না কিছুই মুখে।
পঞ্চায়েতের প্রপঞ্চেতে সেদিন গ্রামে তাই
স্থির হ’ল সে দুঃখিনীরে এ গ্রাম হতে তাড়িয়ে দেওয়াই চাই
কারণ তাতে গ্রামের বড়ই ক্ষতি
ওর দৃষ্টান্তে পাছে সবাই শ্রদ্ধা হারায় সতীত্বের প্রতি।
বিচারকদের বিচার হ’ল শেষ
দণ্ড নিল নারী, দষ্টি-নির্নিমেষ,
–দাও তাড়িয়ে, দেল ঢেলে ওর মুড়িয়ে মাথার কেশ।
সমাজ-পতি স্বামীরে তার বললে চারু-লতা
-“দোহাই খামি, শুনােনাক’ এদের কাৰু কথা ।
এরা সবাই মিথ্যা কথার ছলে
পতিহীনা দরিদ্র সে বলে,
কতে চাহে কলঙ্কিত—ব্যর্থ-কামী যত পশুর দল;
ক্ষুব্ধ নহে তে সেততা, আছেই অচঞ্চল।
কেবল স্বামীর ভিটের মায়াই তাকে
গায়ের সাথে বেঁধেছে তার মনটি শত পাকে।
এ চক্রান্তে ভূলবেও যে তুমি,
ভাৰতে সেটা, পায়ের তলে মাের যাচ্ছে স’রে ভূমি।”
বিজ্ঞ-ভাবে কইল পতি—“চা,
আমি গাঁয়ের হর্তা কর্তা, ভাব, এমন সাধ্যি আছে কারু
আমায় ঠকায় মিছে কথা বলে আমার পাশে ?
তােমার কথা শুনে আমার হাসিই কেবল আসে।
বিশেষ ভেবে দেখেছি তাে আমি,
কেমন করে দিন চলে ওর,নেইক’ বখন জমিদারী তেজারতী স্বামী?
এটা ছাড়া, সন্দ করেন শিরােমণি প্রভু,
যে-সে লােক তােত তিনি নহেন,
তার কথা কি ঠেলতে পারি কভু ?”
“কেবল কথা? সন্দ মাত্র? এই কি নারীর দাম ?
সত্যি হােক কি মিথ্যেই হােল্ক হলেই হল নাম?
অমনি নারী ভাঙে কাচের বাসন,
শূন্য করে গৃহের দর্ভ-আসন,
নির্বাসনের দণ্ড দিয়ে আস্তাকুঁড়ে যাবেন দেবী এই কি সমাজ-শাসন ?”
বৃথাই অনুযােগ
জবাব দিলেন হেসে স্বামী–“মহাপাতক ব্যভিচারের করুক ফল ভােগ।
পাঁচ বছরের মাঝে-
দেখল চারু কতই ব্যাপার গাঁয়ের এ সমাজে,
ধৰ্ম্ম-ধ্বজী সমাজপতির কথায় এবং কাজে।
কিন্তু তাতে মন তার ত দেয় না কোনাে সাড়া,
নিজের কথাই করে সদাই একলা নিজের মনে তােলাপাড়া।
স্বামী থাকেন গৃহান্তরে প্রণয়িণীর সহ,
চারু শুধুই একলা ঘরে কাঁদে, কেন কাঁদে অহৱহ।
'১০৯
চিওচিত্ত
বান ডেকেছেললিক গল্পের পথে
বের হওয়া তাে যায় না কোনােই মতে,
কাজেই নিরুপায়
স্বামী এলেন আস্তে আস্তে, চারুর ঘরে শয়ন-কামনায়।
যা’ করে হাে রাত কাটাতে হবে-
অধৈৰ্য্য ও অপােয়ান্তি-তাহার দেহে চক্ষে করবে।
এতদিনের পরে
স্বামীরে আজ আসতে দেখে হঠাৎ নিজের ঘরে
আদিতে শয্যার একধারে,
শুয়ে ছিল, ধড়মড়িয়ে উঠল চারু দাড়িয়ে একেবারে।
কইল স্বামী শুক্ষ গলায়—উঠছ কেন? শােও,
একি হল? যাচ্ছ কোথা? থােও, বালিশ থােও!
ভাবলাম বসে সন্ধ্যাকালে চারুরে মাের আজ
দেখব অনেক দিনের পরে, থাগে পড়ে অন্য সকল কাজ।”
শেষ না হতে স্বামীর সমাদর
চারু এসে করুণ দখল খিল লাগিয়ে তারই পাশের ঘর ।
অবাক এবং ক্রুদ্ধ হয়ে পতি
ভাবতে ভাবতে উঠল রেগে স্ত্রীর এ কাজে অতি
এ কি অসভ্যতা ?
এ রাত্তিরে আয় ঘরে খিল এট এ কেমন রসিকতা?
পতিতা
ধাক্স মেরে দোরে
লাগল পতি করতে শাসন পীরে সজোরে,
পাতিতত্য সন্দ তাহার উঠল হঠাৎ জেগে।
অশ্রু-চাপা ভারী গলায় কইল চারু রেগে
“পুরুষ যদি সৰ শুধু করে
নিরপরাধ নারীরে এক তাড়ায় গলায় ধরে
নারী তবে পারবেনাক’ কেন
তােমার মত ব্যভিচারী হেন
স্বামীর সঙ্গ এড়িয়ে এমন চলা।
হাে নাকো স্ত্রী যতই অবলা ।
পরের পুরুষ এখন তুমি, পতিব্রতার পরপুরুষের ছোঁয়া
লাগতে যে নেই—অটুট শুধু থাকুক হাতের নােয়া।”
গৌড়ের দরবারে
নিবিড় কালাে জমাট মেঘের ভারে
থম্ থমে ঘাের বজ্রগর্ভ আকাশ খানির মত
নিরুদ্ধ খাস পাত্র মিত্র সভ্যবৃন্দ মত
শুনতেছিল দরিদ্র এক নারীর করুণ অশ্রুসজল কী-
ভাষায় ভাবে ভঙ্গিমাতে যার চলকে যেন পড়তেছিল ব্যথা।
শঙ্কাতে আর সঙ্কোচে সেই কম্পিত দীপশিখা
কইল নাগরিকা,
রাজার কুমার কেমন করে তা’য়
দেখে একা পাতার কুঁড়েয় দীন দরিদ্র দুর্বল নিরুপায়
করুল হরণ তাহার পরম নিধি।
সব নারীকেই বিধি
করেছেন যা মন,
রাজেন্দ্রানী হতে ক্ষুদ্র কুটীরবাসী সবার সমান।
নত নয়ন আরো নত করে
সইল খাড়া ধর্ষিতা সে কম্পমতী ভরে।
***
নিথ কালে যেমন নীরব বিপুল মস্থল
সুবিচার ক্ষণেক পরে কোটাল কহে--“প্রভু আমি জানি, এ নয় সতী কভু ; এ অভিযােগ মিথ্যা, সত্য নয় এই কুরূপায় কুমার হবেন আসক্ত যে, কবে কে প্রত্যয় ? যাচ্ছে বােঝ বেশ দারিদ্র্যেরি ক্লেশ কতে লাঘব বের করেচে ফন্দী অভিনব- আজ্ঞা দিউ এমন দুষ্টে দূর করে দি’ রাজ্য হতে তুৰ।” টপটপিয়ে পড়তেছিল তপ্ত আঁখি-জল, ভিজিয়ে নারীর ছিন্ন শাড়ী, ব্যথায় দোদুল উরস্থল। রামপালদেব রাজা ভাবতেছিলেন সিংহাসনে বসে-কারে দিবেন শাজা, অপরাধী কে ? কুমার ? কিম্বা এই দুখিনী নারী বাদী বে৷ মন্ত্রী কহেন ধীরে- অর্থ কিছু ভিক্ষা দিউন’ যা এ ঘরে ফিরে পালবংশের কুল-প্রদীপ তরুণ যুবা কুমার শেষ হলাে না কথা। খুলে পিছন্ দুয়ার বেগে সভায় ঢুকলেন এসে অশ্রুমুখী রাণ— সভয়ে সব সভাসদগণ আসন ছেড়ে দাড়াল জোড়পাণি । রাণী কিছু বলার আগেই আজ্ঞা দিলেন রাজা “এ রাজ্যে যে নারীর মান না রাখে, মৃত্যু তাহার শাজা।” ৮ ওচিত্ত তডি-পৃষ্টের মত উঠল আঁৎকে সভাসদগণ যত। কহেন বাণী—“প্রভু, কর অবধান, ও আগে সন্ধান বল্লেন রাজা হাসি- এখনাে কি কেউ আছ’ অবিশ্বাসী ? এক বর্ণও মিথ্যা ইহার নয়-- সব শুনেছি, অনেক ভেবে করেচি প্রত্যয়। এ কলঙ্কের কথা- কোনাে নারীই কোনাে লােভে, বলে নাক’ যা আজ আমার তাই নারীর এমন সর্বনাশ যে কষে-মৃত্যু শান্তি তার, উপায় নাই গচ্চিা পাটরাণী- “এ অবিচাব—আমি এ না মানি- মন্ত্র ধীর বাণী কহে রাজা-*শােন, রাজেন্দ্রানি, এই অবিচার, আমি নিরুপায়— ধরে চল, রাজসভাতেমােক শােভা না পায়। যেতে যেতে বলে সেন রাজ- “অত্যাচারীর শূলই আসল গাজা।”
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.