Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kalpakatha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কল্পকথা
শ্ৰীমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
মূল্য আট আনা।
কান্তিক প্রস-২, কর্ণওয়ালিস ঐট কলিকাতা
হতে শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত এবং ইণ্ডিয়ান
ব্লিশিং হাউস-২২,কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট হইতে শ্রীমণিলা
গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
No text on this page.
পূজনীয়
শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
শ্রীচরণে
No text on this page.
এই গ্রন্থের অধিকাংশ গল্প জাপানী গল্পের
ভাব লইয়া রচিত। ছবিগুলিও জাপানী।
শ্ৰমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
কলিকাতা
২৫শে আশ্বিন ১৩৬
No text on this page.
সূচী
বৈরাগ্য
ep
প্রত্যাগমন
•••
৮০
৫০০
৮৪
১৭
•••
৩ঃ
মণি
হাকি
প্রাণের রং
मान
প্রজাপতি
৫৪
০ ০ ০
৬২ ৬৭
০
৭৩
মিলন
মােসকুয়া
re
No text on this page.
কল্পকথা
বৈরাগ্য
(১)
সমস্ত দিন বনে বনে ঘুরিয়া এক ব্যাধ
হতাশ মনে বাড়ি ফিরিতেছে—সে দিন সে
একটিও শিকার পায় নাই।
শীতকালচারিদিকে কন্কনে বাতাস।
পরিশ্রমে কাতর, ক্ষুধায় পীড়িত, তাহার উপর
শীতের বাতাস গায়ে ছুচ ফুটাইতেছে! ব্যাধ
অবসন্ন শরীরটাকে কোন রকমে বহন করিয়া
ঘরে ফিরিতেছিল।
পথে নদী। তাহার ঘােলা জলের স্রোতে
সাদা মেঘের মত এক জোড়া হাঁস ভাসিয়া
কল্পকথা
যাইতেছে। তাহাদের কণ্ঠের কল কল শব্দ
নদীস্রোতের ছল ছল শব্দে মিশিতেছিল।
হাঁস বধ করা বড় নিষ্ঠুর কাজ। কিন্তু
সে কথা বিবেচনা করা চলিল না—ব্যাধের
ক্ষুধা প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল।
বিপদ দেখিয়া দুইটা হাঁসই পালাইতে
গেল, কিন্তু একটা হাঁস ব্যাধের শরে মরিল ;--
সেখানকার জলটা একেবারে লাল হইয়া
উঠিল !
স্রোতমুখে টকটকে রক্তের একটা রেখা
ব্যাধের পদ স্পর্শ করিল। ব্যাধ শিহরিয়া
চোখ বুজিয়া ফেলিল।
(২)
হাঁসের মাংসে কোন রকমে ক্ষুধা মিটাইয়া
ব্যাধ সে রাত্রে ঘুমাইতেছে, স্বপ্নে দেখিল
এক পরমাসুন্দরী বালিকা তাহার শিয়রে।
২
বৈরাগ্য
পদ্মের মত তাহার সুন্দর মুখ খানি মান,
চোখে জল-বুকে দীর্ঘশ্বাস! দেখিয়া ব্যাধের
করুণা হইল।
বালিকা উচ্ছসিত হইয়া কঁদিতেছিল।
তাহার সে কান্নায় ব্যাধেরও চোখে স্বপ্নে জল
দেখা দিল।
বালিকা কাঁদিয়া কঁদিয়া বলিতে লাগিল
—“নিষ্ঠুর তুমি কি করলে--আমার কি সর্বনাশ
করলে! সে তােমার কি করেছিল—তুমি
তার প্রাণ নিলে ? নদীর বুকে আমরা কি
সুখেই ছিলাম—নির্দয়ের মত সে সুখস্বপ্ন তুমি
আমাদের কেন ভাঙলে ! তােমার তীর,
আমার বুক থাকতে, আহা! তার কোমল
বুকে কেন বাজল।”
ব্যাধের মনে হইল যেন এক একটি কথা
এক একটি বিষধর হইয়া তাহাকে দংশন
করিতেছে।
সে যাতনায় চীৎকার করিয়া
উঠিল—“থামাে থামে, আর বােলােনা।”
কল্পকথা বালিকা তখন গুন্ গুন্ করিয়া বলিতে লাগিল –“আমিই তাকে নদীতে ডেকে এনে- ছিলুম-হায় হায় কেন আলুম! কখনাে যে তাকে ছেড়ে থাকিনি ;-আজ কতক্ষণ সে আমার কাছে নেই;—আমি একলা—নিতান্তই একলা-ওহো একথা মনেও যে আনতে পারি না।” • তাহার পর আবার উচ্চস্বরে বলিল -“নির্দয় ব্যাধ! কিছু বুঝতে পারছ না তুমি কি অবস্থা আমার করেছ—তুমি কল্প- নায়ও তা আনতে পার না।-দেখাে কাল সকালে দেখাে, নদীতীরে—আমার কি দশা ।” বালিকা ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। ব্যাধের স্বপ্নও টুটিয়া গেল। সে জাগিয়া উঠিয়া দেখিল-চোখের জলে বিছানা ভিজিয়া গিয়াছে। তাহার চোখে তাে কখনাে জল আসে না—সে ভাবিল এ সেই বালিকারই ৪
বৈরাগ্য
চোখের জল। তাহার মন অনুশােচনার
আগুনে যেন দগ্ধ হইতে রাগিল। তাহার
কানে কেবলই বাজিতে লাগিল—“কাল
সকালে দেখাে নদীতীরে আমার কি দশা ।”
ব্যাধ সে কথা ভুলিতে পারিল না।
আজ তাহার অন্তরে এ কিসের প্লাবন।
সে কখনো তো কাহারাে জন্য দুঃখ বােধ করে
নাই-কাহারো দুঃখে সে কখনাে তাে কাতর
হয় নাই !—স্বপ্নে দেখা একটা বালিকার দুঃখে
কেন তবে তাহার প্রাণ দিতেছে ?
(৩)
ব্যাধ সকালে নদীতীরে গেল—আজ
তাহার হাতে ধনুর্বাণ নাই।
নদীর ঘােলা জলে ধূলাকাদা মাখা একটি
মাত্র হাঁস ভাসিয়া আসিতেছে। কাল সন্ধ্যা-
বেলা সে যে দুটি হাঁস এক সঙ্গে দেখিয়াছিল ।
সেই কথা, তাহার দেহের রক্তের সহিত
কল্পকথা হৃৎপিণ্ড হইতে বাহির হইয়া, সমস্ত শিরার মধ্যে ছুটাছুটি করিতে লাগিল। তাহারই উত্তেজনায় সে পাগলের মত হইয়া উঠিল। হাঁসটি ভাসিয়া ভাসিয়া তাহারই দিকে আসিতে লাগিল। কালকের মত তাহার কণ্ঠে আজ সে কলরব নাই-নদীর জলে সে ছলছল শব্দ নাই—ব্যাধের সে ক্ষুধাও নাই। ব্যাধ দেখিলেই হাঁস পালায় কিন্তু এখন সে নির্ভয়ে তাহার দিকে সমান অগ্রসর হই- তেছে। ব্যাধ অবাক হইয়া গেল। হাঁসটি ব্যাধের পায়ের কাছে আসিয়া স্থির হইয়া দাড়াইল। তাহার পর, ব্যাধের চোখের সামনে নিজের চঞ্চু দ্বারা নিজের বক্ষ একেবারে বিদীর্ণ করিয়া ফেলিল। ব্যাধ তাহা দেখিয়া চক্ষু মুদিল! ধনুর্বাণ সে ঘরে ফেলিয়া আসিয়াছিল ;- সে ঘরে আর সে ফিরিল না-সেখান হইতেই উদাসী হইয়া চলিয়া গেল!
segno
No text on this page.
প্রত্যাগমন
বন্ধু।
(১)
খুব ছেলেবেলা হইতে ওটির সহিত নেগা-
ওর বড় ভালবাসা ছিল—যেন এক বোটায়
দুটি ফুল ; তাহারা এক সঙ্গে থাকে, একসঙ্গে
খেলে, একসঙ্গে বেড়ায়।
আবার ওটির পিতাও নেগাওর পিতার
তাহাদের দুজনের মধ্যে এই মন্ত্রণা
ছিল যে, এই দুইটি ছেলেমেয়েকে বিবাহের
রাঙা সুতা দিয়া বাধিতে হইবে-ইহাদের যেন
ছাড়াছাড়ি না হয়।
কিন্তু একটি ব্যাঘাত ঘটিল। এটির যখন
বয়স পনেরো তখন হঠাৎ একদিন প্রকাশ
যে তাহাকে কালরোগে ধরিয়াছে—সে
বেশি দিন বাঁচিবে না। তখন বিবাহের কথাটা
একেবারে চাপা পড়িয়া গেল।
৭
কল্পকথা ওটি যখন বুঝিল তাহার ইহসংসারের খেলা শেষ হইতে আর বিলম্ব নাই, তখন এক- দিন নেগাওকে ডাকিয়া পাঠাইল,-তাহার কাছে জন্মের মত বিদায় চাহিয়া লইবে। নেগাও ওটির বিছানার পাশে আসিয়া বসিল। ওটি তখন বলিল—“নেগাও-সান্! আমরা চিরকাল একসঙ্গে কাটিয়েছি,-এবার বিচ্ছেদ,এখন বিদায় দাও।” কথাটা নেগাওর বুকে বাজিল। সত্যই ওটিকে বিদায় দিতে হইবে, একথা তাহার মন কিছুতেই মানিতে চাহিল না ;—সে বাধা দিয়া বলিল—“না, ওটি, না,—তুমি অমন কথা মুখে এনােনা। তুমি নিশ্চয়ই ভালাে হবে-শীঘ্রই সেরে উঠবে।” ওটি বলিল-“আমার বেঁচে কাজ নেই নেগাও, মরণই আমার ভালাে। যে রােগে ভুগছি তাতে যত দিন বেঁচে থাকবে ততদিন নিজে কষ্ট পাবো, আর সকলকেও কষ্ট দেবে।
প্রত্যাগমন
যদি কায়েক্লেশে কোন রকমে প্রাণটা থাকে
তাতে কি হবে ! তােমার গৃহিণী হলে এ
শরীরে তাে আর তােমার সেবায় লাগবােনা ;
বরঞ্চ আমার সেবা তােমাকেই করতে হবে-
তার চেয়ে মরা ভালো। আমি মরছি তাতে
আমার কোন দুঃখ নেই—তােমার বুকে মাথা
রেখে মরে আমার যে সুখ সে সুখ বেঁচে কখনাে
পাব না।”
নেগাওর চোখে জল আর বাধা মানিল
না। সে বালকের মতদিয়া ফেলিল।
ওটি বলিল-“কেঁদোনা নেগাও, কেঁদোনা,
আমার জন্য তুমি কেঁদোনা। তােমাকে ছেড়ে
যাচ্ছি তবুও আমার তত দুঃখ হচ্ছেনা,
কেন জান? এক আশা আমাকে শান্তি দিচ্ছে।
সেই কথা বােলবো বােলেই তােমায় ডেকেছি।
আমার প্রাণের ভিতর থেকে কে যেন বল্ছে
-আমাদের আবার মিলন হবে।”
মুখ হইতে কথাটা কাড়িয়া লইয়া নেগাও
,
৯
কল্পকথা বলিল-“নিশ্চয়। নিশ্চয় ! সে অনন্ত মিলন-তার বিচ্ছেদ নেই--সে শান্তিময় পুণ্যধাম!” ওটি বলিল—“স্থির হয়ে কথাটা শােনো। স্বর্গে মিলনের কথা আমি বলছিনা-এই মর্ত্যেই আমাদের মিলন হবে।” নেগাও অবাক হইয়া রহিল। ওটি বলিল—“বিশ্বাস করছনা? কিন্তু আমি বলে রাখছি, এ হবেই ! জানাে মরণ- কালের কামনা কখনো নিস্ফল হয় না।” নেগাও ওটির মুখের পানে চাহিল । সে প্রলাপ বকিতেছে না কি ? কিন্তু তাহা তো নয়! তাহার প্রাণের বিশ্বাস যেন তাহার মুখের উপর ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাহা দেখিয়া নেগাওর সন্দেহ দূর হইল। ওটি বলিল-“প্রিয়তম! অপেক্ষা করতে পারবে কি--সেই মিলনের দিন পর্যন্ত। নেগাও বলিল—“যুগযুগান্তর-জন্মজন্মান্তর
প্রত্যাগমন
শুধু তোমার অপেক্ষায়, তােমার প্রতীক্ষায়
থাকবে ওটি!”
ওটির ম্লান মুখ আনন্দশ্রীতে ভরিয়া
গেল!
নেগাও তাহা লক্ষ্য করিয়া বলিল—
“জানােনা কি ওটি, আমাদের সম্বন্ধ শুধু এক
জন্মের নয়। আমাদের বিচ্ছেদ ও মিলন জন্মে
জন্মে ঘটছে-কখনাে তুমি আমার প্রতীক্ষা
করছ, কখনাে আমি তােমার প্রতীক্ষা
করছি—আবার দুজনে মিলছি।”
ওটি বলিল-“না,না তােমার এই জীবনেই
আমাকে তুমি পাবে—আমি আবার তােমার
কাছে আসবে-এ তুমি স্থির জেনাে।”
নেগাও বলিল-“প্রিয়তমে! তুমি আসবে
কিন্তু তোমার এ দেহ তাে আতে পারবে না,
—তােমার এ স্মৃতি তাে থাকবে না—কেমন
করে তবে আমাদের দুজনের পরিচয় হবে।”
ওটি তিরস্কারের স্বরে বলিল—*নেগাও !
কল্পকথা
দেহ দিয়েই কি আমাদের সম্বন্ধ ? একটু
স্মৃতিই কি আমাদের বন্ধন করে রেখেছে ?”
(২)
ওটি ইহসংসার ত্যাগ করিয়াছে। নেগাও
ওটিকে কত ভালবাসিত এখন বুঝিয়াছে।
দিনের মধ্যে সহস্রবার সে এখন ওটির অভাব
অন্তরে অন্তরে অনুভব করে—প্রাণের মধ্যে
একটা দারুণ জ্বল জ্বলিতে থাকে। ওটির
আশাবাণীই তাহার সান্ত্বনা !
ওটির একটা ছবি লেখাইয়া নেগাও
তাহাকে পূজা করিত ; ওটির শেষ বাণী
ছবিটিতে যেন আঁকা ছিল।
অপেক্ষা নেগাও করিতেছিল। কিন্তু এক
একবার সন্দেহ আসিয়া তাহার সেই আশার
উপর আঘাত
তখনই ৩টির সেই
বিশ্বাসভরা মুখখানি তাহার চোখের সামনে
দিত।
১২
প্রত্যাগমন জীবন্ত হইয়া ফুটিয়া উঠিত ; তাহার সেই আশার বাণী বাতাসের শব্দেসৈ শুনিতে পাইত। নেগাও পিতামাতার একমাত্র সন্তান বলিয়া তাহার অবিবাহিত থাকা চলিল না। অনিচ্ছায় তাহাকে বিবাহ করিতেই হইল। নেগাও এই বলিয়া মনকে প্রবােধ দিল যে, এ বিবাহটা নিতান্তই বাহিরের জিনিস, -এর সঙ্গে অন্তরের কোন সম্পর্ক নাই সে ওটির কাছে খাঁটিই আছে। তখন সে পূর্বের চেয়ে বেশি করিয়া ওটির শেষবাণী স্মরণ ও পাঠ করিতে লাগিল। কিন্তু অল্প- দিনের মধ্যেই স্ত্রীর জীবিত মুখের প্রেমালাপ ওটির অন্তিমকালের কথাটিকে চাপা দিল এবং তাহার সাক্ষাৎ মূর্তি ওটির স্মৃতিকে ছাইয়া ফেলিল।
কল্পকথা (৩) কয়েক বৎসর পরে দেশে মড়ক দেখা দিল। তাহারই স্রোতে দেশের অসংখ্য লােকের সহিত নেগার পিতা, মাতা, স্ত্রীও ভাসিয়া গেল ! যে গৃহের মধ্যে প্রত্যেক জিনিসের সহিত আত্মীয় স্বজনের স্মৃতি জড়িত হইয়া আছে, সে গৃহে বাস করা নেগাওর পক্ষে নিতান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। সে দেশ- ভ্রমণে বাহির হইল। ঈকাও সহরের এক চটিতে বসিয়া আছে, এমন সময় একদিন সকালে সেই চটির দাসী, এক বালিকা, এক পেয়ালা চা হাতে করিয়া নেগাওর ঘরে আসিল। নেগাও তখন অন্য মনে কি ভাবিতেছিল। প্রতিদিন সেই বালিকা চা দিয়া যায়, কিন্তু নেপাও তাহার পানে মুখ তুলিয়া তাকায় না। আজ অন্যমনে চায়ের পেয়ালা হাতে করিতে ১৪ . Sexus.
No text on this page.
প্রত্যাগমন
গিয়া হঠাৎ বালিকার মুখের উপর নজর
পড়িল। নেগাও চমকিয়া উঠিল ;-হাতের
পেয়ালা ঝ ঝন্ শব্দে মাটিতে পড়িয়া গেল।
আজ নেগাওর অনেক দিনের ভােলা-কথা
হঠাৎ মনে পড়িল। ওটির মূৰ্ত্তি নেগার মনে
তখন ছায়ার মত হইয়া আসিয়াছে ; তবু
তাহার মুখের কি-একটা-কেমন ভাব, যাহা
সে বারবার দেখিয়াছে, আজ তাহা এই বালি-
কার মুখে স্পষ্ট হইয়া ফুটিয়া উঠিল।
নেগাও
পাগলের মত ছুটিয়া গিয়াবালিকার হাত ধরিয়া
বলিল—“কে তুমি?”
বালিকা থতমত খাইয়া গেল। নেগাওর
মুখের পানে চাহিয়া দেখিল।
নেগাওর তীক্ষ্ণদৃষ্টি তখন বালিকার অন্তর
পর্যন্ত ভেদ করিতেছে। বালিকা সেই
থতমত অবস্থায় বলিয়া ফেলিল—“আমি ওটি!”
তাহার পর মূচ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেল।
*
১৫.
কল্পকথা
নেগাও সেই বালিকাকে বিবাহ করিয়াছে।
এখন তাহাকে নায় জিজ্ঞাসা করিলে সে কখনাে
বলে না—“ওটি।” ওটি নামে কেন সে নিজের
পরিচয় দিয়াছিল সে কথা সে বলিতে পারে না
এবং সে ঘটনাও তাহার মনে নাই।
কিন্তু নেগাও জানে যে এই বালিকাই
তাহার ওটি।
১৬
দোসর।
-
(১)
এক বিজন বন। তার মাঝে একটি
ভাঙা কুঁড়ে ছিল। সেই কুঁড়ের ভিতর এক
বৃদ্ধ, এক বৃদ্ধা আর কমলকলির মত এক
বালিকা থাকিত। কুঁড়ের সামনে এক ঝরণা,
তারই পাড়ে তিনটি গাছছিল ;-দুইটি বুড়ো
একটি চারা। বুড়ােবুড়ীর দেহ যেমন শুষ্ক
বুকের কাছে প্রাণটুকু শুধু ধু ধু করিত,
বুড়ো গাছ দুইটিরও ঠিক তেমনি অবস্থা।
আর বালিকার অঙ্গে যেমন লাবণ্য ঝরিত,
চারা গাছটিরও তেমনি সবুজ পাতায় সুন্দর
ফুলে দেহ ভরা ছিল। বুড়ো গাছ দুটির
মাথায় দুটি বুড়ো পাখী এবং চারাগাছটির
ঝােপে একটি ছানা পাখী বাসা বাঁধিয়াছিল।
কল্পকথা
বর্ষাকাল--অন্ধকার রাত।
একটি ছেলে, ঘােড়ার পিঠে সেই বনের
মধ্য দিয়া যাইতেছে। মুষলধারে বৃষ্টি—ঘন ঘন
বজ্রের হুঁকনি, বিদ্যুতের চমকানি,—যেন প্রলয়
উপস্থিত!
ছেলেটির শরীর অবসন্ন। ঘােড়াটা
নির্জীব।
অন্ধকারে পথ আর চেনা যায়
। সামনে ভাঙা কুঁড়ে খানি দেখিয়া
ছেলেটি যেন বল পাইল–ঘােড় হইতে নামিয়া
কুঁড়ের দরজায় ঘা দিল।
বুড়ী আসিয়া দরজা খুলিল। ছেলেটির
গায়ে মুখে হাত বুলাইয়া বলিল—“আহা,
কার বাছা এই দুর্যোগে বনের মাঝে একা
বেরিয়েছে।”
বুড়ীর মুখে আদরের কথা শুনিয়া,
তাহার স্নেহ-মাখা হাত বুলানােতে ছেলেটির
সকল কষ্ট এক নিমেষে দূর হইল। আজ
তাহার মনে অনেকদিনের-পাওয়া মার স্নেহ
১৮
No text on this page.
No text on this page.
দোসর
হঠাৎ জাগিয়া
উঠিল! সে
মা আজ
কোথায়! ছেলেটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিল।
ভাঙা কুঁড়ে। ঝর ঝর করিয়া জলে
ঘরের
চারিদিক ভাসিয়া
যাইতেছে।
ছেলেটির জন্য একটু শুকনাে জায়গা বুড়ী
খুঁজিয়া পাইল না। ভিজে কাকের মত,
বুড়বুড়ী দুজনে মুখখামুখী বসিয়া, রাত
কাটাইতেছিল। একটা কোণে
কোণে একটু
শুকনো জায়গায় মেয়েটি ঘুমাইতেছিল।
বুড়ী ছেলেটিকে সেইখানে বসিতে বলিল।
মেয়েটির শিয়রে মিটমিটে প্রদীপ।
তারই আলাের একটু রেখা মেয়েটির চাদ
মুখে পড়িয়াছে।
বাহিরের অন্ধকার আকাশে যেমন বিদ্যুৎ,
ছেলেটি দেখিল, এই অন্ধকার কুঁড়ের ভিতরও
তেমনি বিজলী খেলিতেছে। তার জ্যোৎস্নার
মত গায়ের রঙে ঘর আলাে !
কড় কড় করিয়া বাজ পড়িল। তারই
কল্পকথা
শব্দে চমকিয়া মেয়েটি জাগিয়া উঠিল। ঠিক
সেই সময় ভাঙা চালের ছিদ্র দিয়া বিদ্যুতের
একটু আলো ঘরে আসিয়া পড়িল ;—সেই
আলােটুকুতে চার চক্ষের মিলন হইল ।
(২)
বুড়োবুড়ীর আদর যত্নে, মেয়েটির মিষ্ট
কথায় ছেলেটির সে রাত অতি আনন্দেই
কাটিয়া গেল।
তাহারও এমনি এক বৃদ্ধ পিতা, এক
বৃদ্ধা মাতা, একটি ছােট বােন ছিল।
অনেক দিন তাহাদের স্নেহ হইতে সে
আজ হঠাৎ সেই স্নেহ পাইয়া
তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। ভাঙা কুঁড়ের
মধ্যে বাদলার বাতাস, জলের ছিটা, অনাহার
ও অনিদ্রাতেও সে একটা বিপুল আনন্দ
বঞ্চিত।
পাইল।
পরদিন সকালে আকাশ পরিষ্কার ;
দোসর
-সূর্যের সােনার কিরণে বন
কিরণে বন জাগিয়া
উঠিয়াছে।
বালক বিদায় চাহিল ;কিন্তু বড়
অনিচ্ছায়। এই কুঁড়ের মধ্যে সে যে সুখ
পাইয়াছে তাহার মত বাপ-মা-হারার ভাগ্যে
তাহা কি আর কোথাও মিলিবে।
তবু বিদায় চাই!
বিদায়ের পূর্বে ছেলেটির মনে একটা
ব্যাকুলতা জাগিয়া উঠিল। এই পরিবারটির
দৈন্য সে কি কিছুমাত্র
মােচন করিতে
পারে না ?
মােহরের থলি বাহির করিয়া
সে বৃদ্ধার পায়ের তলায় ঢালিয়া দিল।
বলিল—“মা, আমি তােমার ছেলে আমার
প্রণামী লও।”
বৃদ্ধা ছেলেটির মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ
করিল।
মােহরগুলি ভিড়ামাটির কাদার মধ্য
হইতে পূর্বের চেয়ে চক চক করিয়া জ্বলিতে
কল্পকথা
লাগিল। এই ভাঙা কুঁড়ের মাটিতেই যেন
তাহাদের বেশি আনন্দ।
“বৃদ্ধা মােয় গুলি না তুলিয়াই বলিল
—বাবা, তােমাদের কাছে মােহর অমূল্য,
কিন্তু এই বনের মাঝে ওর আদর কেউ
বােঝে না।মােহরে এখানে কিছুই মেলে
।”
এই কথা শুনিয়া বালকের মুখ ম্লান
হইয়া গেল।
বৃদ্ধ। তাই দেখিয়া বলিল—“তুমি যদি
সত্যই আমাদের উপকার করতে চাও,
তা হলে এক কাজ কর—এই মেয়েটিকে
সঙ্গে নিয়ে যাও। বাছকে আমরা ভালো
করে খেতে পরতে, ভালাে জায়গায় শুতে
দিতে পারি না। আমাদের সকল কষ্ট সয়ে
গেছে; বাছার কষ্ট দেখে আমাদের বুক
ফেটে যায়।
মার আমার গায়ে একখানা
গহনা নেই, পরবার একখানা শাড়ী নেই।”
২২
দোসর
“আমরা আর ক দিন ? তার পর
বাছার কি হবে ? সেই আমাদের ভাবনা।
তুমি যদি ওকে আদরযত্নে মাখাে তা হলে
আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারি।”
বৃদ্ধার মুখে এমন কথা শুনিবে ছেলেটি
স্বপ্নেও ভাবে নাই। আনন্দে সে অধীর
হইয়া উঠিল।
মেয়েটিকে ঘােড়ার পিঠে বসাইয়া ছেলেটি
যাত্রা করিল। বুড়ো ও বুড়ী যত দূর পারিল
সঙ্গে সঙ্গে গেল। শেষে ছেলে ও মেয়েটি
সহরের দিকে এবং বুড়াে ও বুড়ী বনের দিকে
চলিয়া গেল ; কেবল সেই জায়গায় চার
জনের চার ফোঁটা চখের জল পড়িয়া রহিল।
(৩)
ছেলেটি নিজের বাড়ীতে মেয়েটিকে
আদরযত্নে
রাখিয়া দিল। সােনাদানার
২৩
কল্পকথা
তাহার অঙ্গ মুড়িয়া দিল। কিন্তু বনের
পাখী খাচায় আসিয়া যেমন ছটফট করে
মেয়েটিরও ঠিক সেই অবস্থা হইল। সােনার
কাকন, জরীর শাড়ী তাহার অঙ্গে বিধিতে
লাগিল। বনে বনে কাঠ কুড়ানাে, হরিণ
শিশুর সহিত খেলা, ঝরণার গান, পাখীর
মুখে গল্প--এই সব পুরানো কথা মনে করিয়া
দিনের মধ্যে সহস্র বার সে দীর্ঘশ্বাস
ফেলিত !
বালিকা দিন দিন ফুলের মত শুকাইতে
লাগিল।
বনের মাঝে কুঁড়ের সানে চারা গাছটিরও
পাতা ঝরিতে লাগিল।
বুড়ােবুড়ীর দ্বারে মৃত্যুর দূত আসিয়াছে।
—গাছ দুটিও ধরাশায়ী হইবার জন্য শুধু
অপেক্ষা করিতেছে।
আর এক দিন ঘাের
ঘাের বর্ষা। মেয়েটি
২৪
দোসর
রুগ্ন শয্যায়। ছেলেটি পাশে বসিয়া।
মিন্টু মি করিয়া প্রদীপ জ্বলিতেছে। কিন্তু
তার আলাে আজ আর মেয়েটির মুখে পড়ে
নাই ;-কেমন-একরাশ অন্ধকার সেই মুখের
উপর খেলা করিতেছে।
হঠাৎ একটা দমকা বাতাস জানালা
ভেদ করিয়া ঘরে আসিল। প্রদীপ নিবিয়া
গেল! ঘর অন্ধকার! বাহিরের আকাশে
তখনও বিদ্যুৎ খেলিতেছে কিন্তু তার আলো
আজ আর ঘরে আসিতেছে না!
ছেলেটি প্রদীপ জ্বলিল। কিন্তু মেয়েটির
আয়ুর প্রদীপ কই জ্বলিয়া উঠিল না।
সেই রাত্রেই ছেলেটি সন্ন্যাসীর বেশে
গৃহ ত্যাগ করিল। সেই বনের মধ্যে আবার
প্রবেশ করিল।
তখনও বৃষ্টি ঝরিতেছে—তখনও বিজলী
খেলিতেছে।
হঠাৎ একবার বিদ্যুতের আলােয় ছেলেটি
কল্পকথা
দেখিল, ভাঙা
কুঁড়েটিকে বুকে
করিয়া বুড়াে
গাছ দুটি মাটিতে পড়িয়া আছে—চারা গাছটি
তাদের চাপে দলিত।
বাতাস হায় হায় করিতেছে।
২৬
মণি (১) সে দেশে আর কোথাও পঞ্চমুখী শাখ ছিল না, শুধু এক জহরির ঘরে একটি ছিল। জহরি মনে করিত সে শখ তার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। শখেরই দৌলতে তার এত বাড়বাড়ন্ত! সে লক্ষ লক্ষ মুদ্রার জহরতের চেয়েও বেশি যত্নে সেই শাখটিকে সােনার কৌটায় ভরিয়া রাখিয়াছিল। সেই শাখটির উপরে দেশ- বিদেশের রাজারাজড়ার লােভ লাগিয়াছিল। সে শাঁখের জন্য জহরির শক্রর অন্ত ছিল না। কিন্তু জহরি সে সকল গ্রাহই করিত না। সেই দেশে এক দেবালয় ছিল। তারই পুরােহিত রাজার কাছে আবেদন করিল, -“মহারাজ! অমূল্য শাখটা একজন ঘাের
কল্পকথা
বিষয়ীর ঘরে পড়িয়া মাটি হইতেছে।
শাখের উপযুক্ত স্থান তো জহরির সিন্দুক নয়,
-দেবমন্দিরেই উহার শােভা পাওয়া উচিত।”
“অমন শাখটা দেশে থাকিতে দেবতার
পূজায় যদি না লাগিল তবে সবই বৃথা!
ঐ শাখের জলে যদি দেবতার পা ধােয়াইতে
পারি—তবে তার আশীর্বাদে দেশে স্বর্ণবৃষ্টি
হইবেই। তাতে দেশের মঙ্গল—আপনারও
গৌরব।”
রাজা শুনিয়া বলিলেন—“কথাটা ঠিক
বটে।”
তখনই জহরির কাছে হুকুম গেল, শাখ
হাজির কর।
জহরি রাজার কাছে আসিয়া জোড়হাতে
বলিল-“মহারাজ। আমি সর্বস্ব দিতে পারি
কিন্তু, মাপ করুন, শখটি নয়।”
রাজা বলিলেন—“ও শখ তত ধনীর
ঘরের শােভার জন্য নয়—ও শাখ দেবতার
-
No text on this page.
ܚܕ
ܢܕ
••• • • Al-.- - - - - -
মণি
১
2
পূজার। দেবতা চাহিতেছেন—তুমি দান
করিবে না ?”
জহরি
বলিল—“মহারাজ!
জানি না, রাজা মানি না—শাখ আমার প্রাণের
চেয়েও বেশি। আমার প্রাণ না গেলে
ও শাখ কেউ পাবে না।”
রাজা বলিলেন-“ওহে, তুমি ত কমলােভী
নও!”
সে কহিল-“হ মহারাজ, আমার লােভ
আছে কবুল করিতেছি।”
রাজা কহিলেন--“সেই লােভ দেবতার
কাছে বিসৰ্জন দাও।”
জহরি কহিল--“আজ পর্যন্ত তাহা ত
পারি নাই—রাজার হুকুমে
হুকুমে লোভ
ছাড়ে না।”
রাজা বলিলেন—শাখ আমার চাই-ই।”
জহরি বলিল-“আমার প্রাণ থাকিতে
নয়।”
২৯
কল্পকথা
রাজা বলিলেন-“তবে তােমার প্রাণ
দেবতার কাজেই বলি পড়ক!”
-“জাদ, জহরিকে বধ কর।”
(২)
শাখ দেবতার মন্দিরে আসিল।
রাজার মনে বিস্ময়ের উদয় হইল। একটা
শাখ-তারই জন্য জহরি প্রাণটা দিল ।
জিনিসটা এমনই বা কি যে প্রাণ তুচ্ছ করা
যায়! নিশ্চয় কোন গূঢ় রহস্য আছে।
সেটা কি?
রাজা এক দূতকে ডাকিয়া বলিলেন
—“দেখ, শাখের ইতিহাস গােপনে সন্ধান লও।
সঠিক সংবাদ আনিতে পারিলে বহু পুরস্কার
পাইবে।”
দূত সংবাদ আনিয়া রাজাকে গােপনে
বলিল—“মহারাজ! ও যে-সে শখ নয় !
মণি
বটে!
উহার মধ্যে এক অমূল্য মণি! পৃথিবীর কোনাে
দেশে কোনো রাজার ঘরে তেমন মণি নাই।”
রাজা বলিলেন—“ঠিক নইলে
শাখের উপর জহরির এত মমতা কেন?”
তারপর মন্ত্রীকে ডাকিয়া কহিলেন-“মন্ত্রী।
পঞ্চমুখী শখ আমার চাই।”
মন্ত্রী বলিলেন-“মহারাজ। দেবতার
জিনিস যে!”
রাজা বলিলেন—“তা হলই বা।”
মন্ত্রী কহিলেন-“মহারাজ, দেবতার
সামগ্রীতে লােভ রাখবেন না। জগতে
আপনার অভাব কি আছে।”
রাজা কহিলেন,-“আমার ঐ শখেরই
অভাব। তাই ঐ শাখেতেই আমার লােভ!”
মন্ত্রী শখ চাহিতে গেলেন। দেবালয়ের
পুরােহিত শখটিকে বুকের মধ্যে রাখিয়া
বলিলেন-“দেবতার জিনিস আমি কাউকে
দিব না।”
৩১
কল্পকথা মন্ত্রী বলিলেন--“রাজা যে চাহেন।” পুরােহিত বলিলেন--“রাজার চেয়ে দেবতাকে আমি মানি !” রাজা সেই কথা শুনিয়া রাগে জ্বলিয়া উঠিলেন। বলিলেন-“পুরােহিত রাজ- বিদ্রোহী! রাজবিদ্রোহীর দণ্ড প্রাণবধ!” তখনই পুরােহিতের মাথা মশানে লুটাইয়া পড়িল। (৩) দেবতার মন্দির হইতে শাঁখ রাজ-মন্দিরে আসিল। রাজা বলিলেন—“শাখ ভাঙো। মণি দেখিতে চাই।” সাত সমুদ্রের হৃদয়ের ধন সেই কঠিন পদ্ম- কলিটির মত আশ্চর্য্য শাখের উপরে বাড়ি পড়িল। স্তরে স্তরে তাহা ভাঙিতে লাগিল; ৩২ মণি —প্রভাতের আলাের মত তাহার শুভ্র আবরণটি দুই ভাগ হইয়া গেল, অরুণের আভার মত তাহার রক্তিম মৰ্ম্মস্থলটি বাহির হইয়া পড়িল। কিন্তু মণি কই ? আঘাতের উপর আঘাত পড়িতে লাগিল —দুর্লভ শাখটি টুকরা টুকরা হইল, চূর্ণ চূর্ণ হইল, গুড়া হইয়া ধূলা হইয়া গেল—অনন্ত নীল সমুদ্রতল হইতে যে রহস্য বহন করিয়া সে একদিন মানুষের ঘরে আসিয়াছিল অনন্ত- নীলাকাশে তাহা মিলাইয়া গেল। কিন্তু মণি কোথায় ?
হয়কি
(১)
সে কতশত বৎসরের কথা হইল।
জাপানে আকামাগোসেকিতে হয়কি নামে
এক অন্ধ থাকিত। বীণ বাজাইতে, গান
গাহিতে, গান রচনা করিতে সমস্ত জাপানের
মধ্যে তাহার মত আর কেহই ছিল না।
তাহার সেই বীণার তারে মূচ্ছ না, মন-গলানাে
কণ্ঠ ও ভাবে-ভরা কবিতা যে শুনিত সেই
ভুলিত। দেশে বিদেশে তাহার নাম রটিয়া
গিয়াছিল।
হিকি রাজা জলযুদ্ধে গিয়া মরিয়াছিলেন,
তাঁহার বংশে বাতি দিবার আর কেহ ছিল না,
এই কাহিনী লইয়া তাহার গান। হয়কির
কণ্ঠে সেই গান শুনিতে শুনিতে মনে হইত,
যুদ্ধটা যেন চোখের সামনে চলিতেছে।
৩৪
হয়কি
আবার মাঝে মাঝে এমনি দুঃখের কথা যে
শুনিয়া চোখে আর জল রাখা যায় না !
এমন কি প্রেতলােকের মানুষরাও তাহার
গানে কাদিয়াছে, ললাকে এমন কথাও বলে।
হয়কি বড় গরীব। কিন্তু সে এমন একটি
বন্ধু পাইয়াছিল যে কোনাে দিন তাহাকে
খাওয়া-পরার কথা ভাবিতে হয় নাই।
আমিজাদি দেবালয়ের বৃদ্ধ পুরােহিত গান
বড় ভালবাসেন। তিনিই যত্ন করিয়া
হয়কিকে দেবালয়ে রাখিয়াছিলেন। হয়কি
সেখানে প্রতিদিন দেবতার কাছে গান
করিত। তাহার দিন এমনি করিয়া বড়
সুখেই কাটিতেছিল।
একদিন গরমীকাল ; পুরােহিত শিষ্যদের
লইয়া এক মহাজনের বাড়ি দেবপূজায়
গিয়াছেন ; হয়কি দেবালয়ে একা। সেদিন
ভারি গরম ;-হাওয়া নাই, গাছের পাতাটি
কঁপেনা। পুরোহিত কখন ফিরিবেন পথ
কল্পকথা
চাহিয়া হয়কি বারাণ্ডায় বসিয়া আছে।
মাঝে মাঝে গুন্ গুন্ করিয়া গান গাহিতেছে।
সম্মুখেই বাগান। সেখান হইতে ফুলের গন্ধে
বারাণ্ডা ভরিয়া উঠিয়াছে।
রাত দুপুর হইল। পুরােহিত তখনো
ফিরিয়া আসেন নাই, হয়কি তখনাে জাগিয়া
বসিয়া আছে। এমন সময়ে কে একজন
বাগানের পথ বাহিয়া বারাণ্ডায় আসিয়া
দাড়াইল। হয়কি ত চোখে দেখে না।
পায়ের শব্দ শুনিয়া * মনে করিল বােধ হয়
পুরােহিত আসিতেছেন। কিন্তু পরেই তাহার
ভুল ভাঙিল। কে একজন ডাকিল—“হয়কি।”
তাহার গলাটা কেমন কর্কশ। মনিব যেমন
করিয়া হুকুম করে সে তেমনি জোরে
ডাকিল। হয়কি চমকিয়া উঠিল
পুরোহিত নয়,–এ আবার কেরে বাপু!
দেরী হইতেছে দেখিয়া সে লােকটা
আরো কড়া করিয়া ডাকিল—“হয়কি।”
।
হয়কি
উঠিল।
এবার হয়কির গাটা
ছমছম
করিয়া
সে আস্তে আস্তে কহিল—“আমি
অন্ধ, বুঝিনা কে আপনি।”
তখন সে
একটু নরম হইয়া বলিল
-“হয়কি! ভয় কোরােনা। আমাকে তুমি
চেনােনা। আমি এই দেবালয়ের নিকটেই
আছি। আমার প্রভু-এক দেশের রাজা
এখন ছদ্মবেশে এই কাছেই থাকেন। তিনি
হিকিরাজের সমাধি দেখতে এসেছেন।
তোমার নিজের মুখে হিকিরাজের গানের
পালা শুনতে তার ভারি ইচ্ছা। তােমাকে তাই
নিতে এসেছি। এসস, ওঠো, বীণ নাও।”
চুম্বক যেমন লােহাকে টানে তেমনি
কিসে যেন টানিয়া হিকিকে দাঁড় করাইল।
তখন সেই মানুষটা হয়কির হাত ধরিয়া পথ
দেখাইয়া লইয়া চলিল। হয়কির বােধ হইল,
সেই লােকটার সর্বাঙ্গে ঘাম ঝরিতেছে,
আর তাহার হাত হিমের মত ঠাণ্ডা !
৩৭
কল্পকথা
প্রথমে হয়কির বড় ভয় হইল। তার
পরে সে ভাবিল, ভয় কিসের! রাজার কাছে
গাহিতে যাইতেছি, রাজার যােগ্য শিরােপা ত
মিলিবে।
হয়কি এমনি নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে
চলিয়াছে। হঠাৎ সেই
হঠাৎ সেই লােকটা থমকিয়া
দাড়াইল। হয়কির মনে হইল যেন তাহারা
এক সাত-মহল বাড়ির সামনে আসিয়া
পৌঁছিয়াছে। তাহার সঙ্গের লােকটা যেমন
চীৎকার করিয়া উঠিল—“কয়মন।” অমনি
শব্দ করিয়া সিংহদুয়ার খুলিয়া গেল।
তখন তাহারা একটা বাগানের মাঝখান
দিয়া চলিল ;-বাগান পার হইয়া আর
এক দরজা তাহার সঙ্গী ডাক দিল
-“কে আছে ভিতরে—আমি হয়কিকে
এনেছি।”
তখন হয়কির বােধ হইল যেন একটি
মেয়ে আসিয়া তাহার হাত ধরিয়াছে।
৩
হয়কি
সেই মেয়েটি এক প্রকাণ্ড সিঁড়ি ভাঙিয়া
তাহাকে কোথায় লইয়া চলিল-পা পড়িতে
লাগিল যেন নরম মখমলের উপরে। চলিতে
চলিতে অনেকগুলি ছােট ছােট ঘর পার
হইল। শেষে একটি মস্ত দালানে আসিয়া
দাড়াইল।
মনে হইল, সেখানে অসংখ্য
লােক বসিয়া। তাহাদের চুপি চুপি কথার
ফি ফি ও পােযাকের খস খস্ শব্দে ঘরটা
ভরিয়া উঠিয়াছে।
কে একজন হয়কিকে
বসিতে বলিল।
হয়কি এক নরম মখমলের আসনে বসিল।
রাজসভায় যেমন সব কথা হয় তেমনি সেখানে
নানা রকমের কথা চলিতেছে। সকলেরই
গলার স্বর মৃদু।
হয়কি সেইখানে কিছুক্ষণ জিরাইয়া
লইল। তখন মেয়ের গলায় কে তাহাকে
বলিল-*এখন তবে হিকিরাজের পালা
বীণা বাজিয়ে সুরু করে দাও।”
কল্পকথা
গলার সুরে, কথার ভঙ্গিতে বােধ হইল,
বড় ঘরের মেয়ে বটে!
হিকিরাজের পালা সমস্তটা ত এক রাত্রে
শেষ করা যায় না, সেই জন্য হয়কি বলিল,
—“সবটা ত হবে না--আপনারা কোন্
জায়গাটা শুনতে চান, আজ্ঞা করুন।”
মেয়েটি বলিল—“যেখানে যুদ্ধ বর্ণনা
আছে আজ সেই জায়গাটি হােক।”
হয়কি তখন বীণার তারে ঘা দিতে দিতে
গান সুরু করিল। দেখিতে দেখিতে খুব
জমিয়া উঠিল এমন করিয়া তারের উপর
তাহার আঙুল পড়িল যে, বৰ্ম্মে বর্মে ঠ ঠন,
অস্ত্রে অস্ত্রে ঝন্ ঝন, নৌকার ঝপঝপ, তীরের
শন্ শন্ বীণার তারে তারে বাজিয়া উঠিল।
এমনি মনে হইতে লাগিল যেন কতশত
নৌকা ছুটিয়াছে, যুদ্ধ বাধিয়াছে—কেহ বা
পড়ে, কেহ বা মরণ যাতনায় কঁদিয়া উঠে।
শ্রোতারা শুনিয়া ‘বাহবা বাহবা,হায় হায়
৪০
হয়কি করিতে লাগিল। সকলে বলিল,-মরি মরি এমন গলা ত কখনাে শুনি নাই—এমন বীণাই বা কে বাজাইতে পারে। যত বাহবা পাইল হয়কির বুক ফুলিয়া উঠিল, তাহার গলার জোর বাড়িয়া গেল, তাহার গান আর থামিতে চাহিল না-গানের নদীতে যেন কোটালের জোয়ারে বান ডাকিয়া চলিল। তার পরে গানের সেই পালাটা আসিল যেখানে বড় দুঃখের কথা। ছোট ছােট ছেলেমেয়েরা অস্ত্র লাগিয়া মরিতেছে, কূল- বধূরা বুক ফাটিয়া কঁদিতেছে, শত্রুর হাত হইতে রাজকুমারকে বাঁচাইবার জন্য রাজরাণী জলে ঝাপ দিয়া পড়িতেছেন। হয়কি গান গাহিতেছে আর তাহার দুই চক্ষু জলে ভাসিয়া যাইতেছে। যাহারা শুনিতেছে তাহারা আর থাকিতে পারিল না, কাঁদিয়া উঠিল। শােক আর বাধা মানে না। ৪১
কল্পকথা
হয়কির কণ্ঠ দিয়া আর সুর বাহির হইতে চায়
;সে বীণা ফেলিয়া চুপ করিয়া কাদিতে
লাগিল।
ক্রমে সকলের কান্না থামিয়া গেল। ঘরে
আর সাড়াশব্দ নাই—চারিদিক গম্ গম্ করিতে
লাগিল !
যে মেয়েটি হয়কিকে গাহিতে আজ্ঞা
করিয়াছিল সে হয়কিকে কহিল—“বড় আগ্রহ
করেই তােমার গান শুনতে
শুনতে এসেছিলুম
—যেমনটি শুনলুম • এমন ত আশা করিনি।
আমাদের প্রভু মােহিত হয়ে গেছেন। তার
ইচ্ছা, আজ হতে দু’দিন ধরে রােজ রাত্রে তুমি
গান শোনাবে, তার পর তিনি এ জায়গা ছেড়ে
চলে যাবেন। আজ যেমন সময় এসেছ কালও
ঠিক সেই সময় এসাে। আজ তােমাকে যে
নিয়ে এসেছে কালও সে তােমাকে আনতে
যাবে। একটা কথা মনে রেখাে আজকের
কথা খবরদার কারো কাছে প্রকাশ কোরো
৪২
হয়কি
না। তাহলে বিপদে পড়বে। এখন তবে
বিদার হও।”
একজন দাসী আসিয়া তাহাকে বাহিরে
লইয়া আসিল। যে লােকটি তাহাকে
আনিয়াছিল সে সেখান হইতে তাহাকে
সঙ্গে করিয়া লইয়া দেবালয়ের বারাণ্ডায়
রাখিয়া চলিয়া গেল।
হয়কি যখন বাড়ি ফিরিল তখন প্রায়
সকাল হইয়াছে। কিন্তু পুরােহিত তখনো
ফিরিয়া আসেন নাই। পুরােহিত ফিরিয়া
আসিয়া দেখেন হয়কি ঘুমাইতেছে।
(২)
সে রাত্রে হয়কি আবার বারাণ্ডায় আসিয়া
বসিয়াছে—আজ আর পুরােহিতের অপেক্ষায়
নহে।
রাত যখন দুই প্রহর তখন সেই লােকটি
আসিয়া তাহাকে ডাকিয়া লইয়া গেল। সমস্ত
কল্পকথা
রাত গান চলিল—যখন ভােরের কাক ডাকিয়া
উঠিয়াছে তখন হয়কি বাড়ি ফিরিল।
হয়কি রাতে দেবালয়ে ছিল না—সে
কথাটা সেদিন কেমন করিয়া জানাজানি
হইয়া গেল। প্রভাতেই পুরােহিত তাহাকে
ডাকিয়া পাঠাইলেন, তিরস্কার করিয়া বলিলেন
—“কাল রাত্রে তোমার জন্য আমাদের
যে বড় ভাবনা হয়েছিল ! তুমি চোখে দেখ
—রাত্রে একা ঘরের বার হও কোন্দিন
বিপদে পড়বে যে ! যদি আমাকে জানাতে
সঙ্গে লােক দিতাম। তুমি গিয়াছিলে
কোথায় ?
যেন কিছুই ঘটে নাই এমনি ভাবে হয়কি
কহিল—“কিছু গােপন কাজ ছিল।”
পুরােহিত জিজ্ঞাসা করিলেন—“গােপন
কাজটা কি ? সেটা কি শুনতে পারি ?”
হয়কি কিছু কড়া করিয়া বলিল-“না!”
হয়কি আজ পর্যন্ত পুরােহিতের কাছে
৪৪
হয়কি
কিসে ?
কখনাে কিছু গোপন করে নাই। আজ
তাহার ব্যবহারে তিনি বড় ব্যথা পাইলেন।
হয়কির মুখের সে মিষ্ট কথা কোথায়? সে
সরল ভাবই বা কই ? এমন বদল হইল
কি তাহার এত গােপন কাজ ।
আর বন্ধুর কাছেই বা এত গােপন কিসের?
এমনি পাঁচ-সাত ভাবিয়া পুরােহিত তাহার
চাকরদের বলিয়া দিলেন হয়কির উপর তাহারা
নজর রাখে যেন—কোথায় যায় দেখিতে
হইবে।
(৩)
তাহার পরদিন রাত্রে চাকররা দেখিল
হয়কি একলা দেবালয় হইতে বীণা হাতে
কোথায় বাহির হইয়া চলিল। তাহারাও
লণ্ঠন লইয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে গেল। তখন
রাত্রি ঘাের অন্ধকার—অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ি-
তেছে। হয়কি এত জোরে চলিয়াছে যে
৪৫
কল্পকথা
চাকরর। আর তাহার সঙ্গ রাখিতে পারিল না।
যে যে বাড়িতে হয়কির যাওয়া-আসা ছিল
সৰ্ব্বত্রই তাহারা তাহাকে খুঁজিতে লাগিল।
শেষকালে কোথাও না পাইয়া যখন ফিরিয়া
আসিতেছে তখন শুনিতে পাইল হিকিরাজের
সমাধির দিক হইতে যেন বীণার আওয়াজ
পাওয়া যায়।
লণ্ঠন লইয়া সেখানে গিয়া দেখিল, কোথাও
একটি জনমানব নাই ;-অন্ধকারে মাঝে মাঝে
কেবল আলেয়ার আলো জ্বলিয়া উঠে
সমাধির দিকে মুখ করিয়া একা হয়কি
হিকিরাজের যুদ্ধের পালা গাহিতেছে। তাহার
চারিদিকে স্থির আলেয় মিট মিট করিয়া
জ্বলিতেছে।
-“হয়কিসা ! হয়কিসা! ওঠো,
এসাে !
বলিয়া মন্দিরের লােকেরা
চীৎকার করিতে লাগিল। কিন্তু অন্ধ এমনি
একমনে গান করিতেছিল যে সে কিছুই
৪৬
--
No text on this page.
হয়কি
শুনিতে পাইল না। তখন তাহারা হয়কির
হাত ধরিয়া সবলে নাড়া দিয়া কহিল
-“হয়কিসা! শীঘ্র আমাদের সঙ্গে এসাে।”
হয়কি চটিয়া উঠিয়া বলিল—“বেয়াদব!
রাজার সামনে গান গাইচি—দেখছিসনা?”
অনুচরেরা আশ্চর্য হইয়া গেল। মাঠের
মধ্যে জনমানব নাই এখানে রাজা কোথায় ?
ভাবিল, হকিসানের মাথার গােল হইয়াছে।
তখন তাহারা আর কিছু না বলিয়া
হয়কিকে জোর করিয়া দেবালয়ে ধরিয়া লইয়া
আসিল। পুরােহিত তখন কাছে ডাকিয়া
তাহাকে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিলেন।
হয়কি ভাবিয়াছিল কিছু বলিবে না। কিন্তু
দেখিল তাহার বন্ধু বড় ভয় পাইয়াছেন। তাই
তাহাকে আশ্বাস দিবার জন্য সকল কথা
খুলিয়া বলিল।
পুরােহিত শুনিয়া বলিলেন—“বন্ধু হয়কি।
এ যে তুমি মহা বিপদে পড়েছ দেখছি। এ
৪৭
কল্পকথা সকল কথা যদি আমাকে আগেই বলতে। রাজা কোথায়। সে সমস্তই মিথ্যা! তুমি হিকিরাজের সমাধির সামনে একা বসে গান গেয়েছ, তােমাকে অন্ধ পেয়ে কোন সব অপ- দেবতা ভুলিয়ে নিয়ে গেছে! যদি তাদের কথা মেনে আবার গান গাইতে যাও তাহলে মারা পড়বে যে! আজ থেকে সাবধান হও, —যা বলি শােনন। আজ আবার আমাকে এক স্থানে পূজা করতে যেতে হবে। আমি তােমার গায়ে কতকগুলি মন্ত্র লিখে দেব, তাহলে প্রেতেরা তােমার কোন মন্দ করতে পারবে না। (৪) পরদিন সন্ধ্যার সময় পুরােহিত ও তাহার এক শিষ্য হয়কির গায়ে, বুকে, পিঠে, হাতে, পায়ে সর্বাঙ্গে মন্ত্র লিখিয়া দিল। পুরােহিত হয়কিকে বলিলেন-“আজ আমি ৪৮
হয়কি
গেলেই তুমি বারাণ্ডায় এসে বসে থেকো।
অন্য দিনের মত আজও একজন লােক
তােমাকে ডাকতে আসবে, কিন্তু তুমি কিছুতেই
উত্তর দিয়োন—একচুলও নােড়ােনা। যদি
কথা কও কিম্বা নড় চড় তা হলেই আর
রক্ষা নেই! তুমি যদি আমার উপদেশ মত
কাজ কর তাহলে তােমার বিপদ কেটে যাবে,
আর কখনাে তােমাকে ভুতের উপদ্রব সইতে
হবে না।”
সন্ধ্যার পরেই পুরােহিত দেবালয় হইতে
বাহির হইয়া গেলেন। হয়কি বারান্দায় আসিয়া
বীণাটি পাশে রাখিয়া বসিল। অতি সন্তর্পনে
সময় কাটাইতে লাগিল। পাছে শব্দ হয়
বলিয়া নিশ্বাসও ধীরে ধীরে ফেলিতে লাগিল।
এই ভাবে তিন চার ঘণ্টা কাটিয়া গেল।
হয়কি বসিয়া আছে। রাত দুই প্রহর।
এমন সময় দূরে পায়ের শব্দ শােনা গেল।
ক্রমে সেই শব্দ হয়কির কাছে আসিতে
৪১
৪
কল্পকথা
লাগিল। শেষে হয়কির মনে হইল কে
একজন আসিয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়াছে।
যে আসিল সে অতি গম্ভীরস্বরে ডাকিল
-“হয়কি!”
কিন্তু হয়কি একেবারে চুপ।
গলায় আবার শব্দ হইল
“হয়কি!”
তবু হয়কির মুখে কথা নাই।
সে লােকটা বিরক্ত হইয়া জোরে জোরে
পা ফেলিতে ফেলিতে এদিক ওদিক খুজিতে
লাগিল। তার পর বলিল—“কৈ, হকি কৈ ?
তার বীণা পড়ে আছে দেখছি-কিন্তু সে গেল
কোথা?
এ তাে হবেনা! তাকে খুঁজে
বার করা চাইই।”
কিছু পরেই আবার বলিলে—“এ দুটো
কি ?—এতো মানুষের কান! ও-বুঝেছি !
হয়কি উত্তর দেবে কি করে? তার আর
কিছুই নেই যে! শুধু কান দুটি পড়ে আছে।
হয়কি
কান ত আর কথা কইতে পারে না।
—যাক, এই কান দুটোই নিয়ে যাই—প্রভু
জানবেন তাঁর আজ্ঞা পালন করেছি।
সেই সময় হয়কির বােধ হইল, কে
একজন অতি কঠিন হাতে তাহার কান ধরিয়া
জোরে টানিতেছে। যন্ত্রণায় তাহার প্রাণ
ছটফট করিতে লাগিল, কিন্তু অত কষ্টেও সে
একটু টু শব্দ পর্যন্ত করিল না। শেষে সে
লােকটা কান দুইটি একেবারে ছিড়িয়া লইল।
-হয়কি চুপ করিয়া সে যন্ত্রণাও সহ্য করিল।
সে লােকটি চলিয়া গেল ;—ক্রমে তাহার
পায়ের শব্দও আর শােনা গেলনা। হকির
কাটা কান হইতে দরদর করিয়া রক্ত পড়িতে
লাগিল।
সে মুচ্ছ গেল।
কল্পকথা
(৫)
সকালে যখন পুরােহিত আসিলেন, হয়কির
তখনো ভাল করিয়া জ্ঞান হয় নাই—রক্তে
সেখানকার মাটি ভাসিয়া গিয়াছে।
পুরােহিত আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন-“হয়কি। একি হয়েছে ভাই ?
তােমার চোট লাগলাে কোথায় ?
বন্ধুর কথা শুনিয়া হয়কির জ্ঞান হইল।
এতক্ষণ সে মড়ার মত পড়িয়া ছিল—যেন
তাহার সাড় ছিল না। এখন তাহার বেদনা
বাড়িয়া উঠিল, সে ছােট ছেলের মত কাদিতে
লাগিল। শেষে, একটু ঠাণ্ডা হইয়া রাত্রের কথা
পুরােহিতের কাছে আগাগােড়া সমস্ত বলিল।
পুরােহিত শুনিয়া বলিলেন-“হয়কি ।
তুমি আমাকে মাপ কর। দোষ আমার
—সম্পূর্ণই আমার ! আমি তােমার শরীরের
সকল স্থানেই মন্ত্র লিখেছিলাম, কিন্তু তােমার
৫২
হয়কি
কান বাদ গিয়েছিল। যা হবার হয়ে গেছে।
এখন যাতে তােমার ঘা শীঘ্র সারে তাই করা
চাই। বিপদ তােমার কেটে গেছে,-প্রেতের
হাত থেকে তুমি রক্ষা পেয়েছ।”
(৬)
বৈদ্য আসিয়া ঔষধ লাগাইল ;-ঘা শীঘ্রই
শুকাইয়া গেল।
হয়কির কান ছিড়িয়া লওয়ার কথা চারি
দিকে রটিয়া গেল, সেই সঙ্গে তাহার গানের
খ্যাতিও চারিদিকের লােক শুনিতে পাইল।
নানা দেশ হইতে কত জ্ঞানী, কত ধনী লােক
তাহার গান শুনিতে আসিতে লাগিলেন।
কয়েক বৎসরেই হয়কির ঘরে আর টাকা
ধরেনা। কিন্তু তাহার কান খােওয়া যাওয়ার
পর হইতে আর কেহ তাহাকে শুধু হয়কি
বলিয়া ডাকিত না-তাহার নাম হইয়াছিল
‘কানকাটা হয়কি।
প্রাণের রং
(১)
এক চিত্রকর ছিল। সে মাত্র একখানি
ছবি লিখিয়াছিল। কিন্তু তারই সময়কার
অসংখ্য চিত্রকর অগণ্য ছবি লিখিয়াছিল। তার
ছবিতে শুধু এক রঙ ছিল—একটু লাল আভা।
ন্য চিত্রকরদের ছবিতে বিচিত্র বর্ণ ছিল।
কিন্তু যে সেই এক-রঙা ছবিখানি দেখিত
সেইই বলিত—“আহা এমন সুন্দর ছবি
কখনাে দেখিনি—চোখ জুড়িয়ে যায় !”
সেই লাল রংটি দেখিয়া আর সকল চিত্র
করাে বলাবলি করিতে লাগিল-এ রং ও
পায় কোথায় ? এমন রং তো কোথাও
দেখিনি।”
তাহাকে যখন জিজ্ঞাসা করিল, সে একটু
হাসিয়া বলিল—“জানি না।”
৫৪
No text on this page.
bertemu
প্রাণের রং
তারপর ঘাড় হেঁট করিয়া ছবি আঁকায়
মন দিল।
সকলে বলিল-“দেখছ, লােকটার কি
অহঙ্কার।”
কিন্তু চিত্রকর এ কথায় কর্ণপাত করিল
। প্রশংসা বা নিন্দায় তাহার মনই ছিল
।
(২)
কোন্ রঙে সে এমন করিয়া ছবি রাঙায়
সে রহস্য বাহির করিবার জন্য চিত্রকরের দল
উন্মত্ত হইয়া উঠিল। কেউ বিজ্ঞানের বড় বড়
বই উলটাইয়া নানা রকমের লাল রং আবিষ্কার
করিল; কেউ দেশবিদেশে রঙের সন্ধানে বাহির
হইয়া নানা রং সংগ্রহ করিয়া আনিল, তাহাতে
ছবিও আঁকা হইল, কিন্তু তেমন লাবণ্য ফুটিয়া
উঠিল কৈ ?
এ দিকে সেই চিত্রকর এ সকল ফোন
কল্পকথা
খবরই রাখিল না। আপনমনে ছবিই আঁকিতে
লাগিল।
ছবির গায়ে লাল রং যতই ফুটি উঠিতে
লাগিল, তার নিজের গায়ের রং ততই সাদা
হইতে থাকিল।
অবশেষে একদিন সকলে দেখিল ছবিখানি
আঁকা শেষ হইয়াছে; কিন্তু চিত্রকর সেখানি
বুকে আঁকড়াইয়া মরিয়া আছে।
যত চিত্রকর ছিল সকলে খবর পাইয়া
ছুটিয়া আসিল। তার কুঁড়ে ঘর খানি তন্ন তন্ন
করিয়া খুঁজিতে লাগিল-যদি সে রঙের কোন
সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু কোন খোঁজই
পাওয়া গেল না।
তার পর, তাহাকে যখন চিতার উপর
শােওয়াইল তখন সকলেই দেখিল তাহার বুকের
উপর এক ক্ষত চিহ্ন!—সে যে কতদিনের
তার ঠিক নাই।
No text on this page.
No text on this page.
দান.
(১)
সব দেবালয়েই ঘণ্টা ছিল, কিন্তু সে
দেবালয়ে ছিল না। গ্রামের সকলে বলিল,
ঘণ্টা না হইলে কি চলে?—ঘণ্টা একটা
চাইই !
কিন্তু দেশে যে পিতল নাই।
এক চাষার মেয়ে বড় ভক্তিমতী ছিল। সে
বলিল—“পিতল অভাবে দেবতার আরতি
হইবে না? এই নাও আমার আয়না, ইহার
পিছনে অনেকটা পিতল আছে।”
মেয়েটি দেবালয়ের ঘণ্টা তৈরির জন্য
নিজের আয়না দান করিয়াছে, এই কথা যখন
গ্রামে প্রকাশ হইয়া পড়িল, তখন সেখানকার
যত রমণী সবাই নিজের নিজের আয়না দান
কল্পকথা
করিতে লাগিল। পূজার দালান আয়নার
ভরিয়া উঠিল।
চাষার মেয়েটি আপনার আয়নাখানি বড়
যত্নে নিজের কাছে রাখিয়াছিল। সে আয়নাটি
তাহার মা মারা যাইবার সময় তাহাকে দিয়া
যায়। তাহাতে তাহার মায়ের মা, তার মা
পর্যন্ত মুখ দেখিয়াছে। সেখানি চোখের
সামনে ধরিলে সে যেন দেখিতে পাইত তার
মার হাসিহাসি মুখখানি তাহাতে ফুটিয়া
উঠিয়াছে। মার শােক প্রবল হইলে সে সেই
আয়নাখানির উপর চাহিত, তাহাতেই তাহার
শােক দূর হইত। সেখানি সে প্রাণ থাকিতে
কাহারো হাতে তুলিয়া দিতে পারিত না,শুধু
দেবতার কাজে লাগিৰে বলিয়া তাহা দান
করিয়াছে।
কিন্তু দান করিয়া অবধি তাহার মনে সুখ
নাই। আয়নাখানির জন্য তাহার প্রাণ ছটু-
ফটু করিতেছে। যতই দিন যায় তাহার
৫৮
দান
ব্যাকুলতা কেবল বাড়িয়াই উঠে। আয়নাখানি
হইতে মন সে কিছুতেই ফিরাইতে পারে না।
আয়না ত অনেক জমিয়াছে-এখন
পিতলের ত অভাব নাই—তবে ঐ একখানা
আয়না ফিরাইয়া লইলে দেবতার হাতে ক্ষতি
কি? কিন্তু দেবতা যাহা গ্রহণ করেন তাহ
আর ফিরিয়া পাওয়া যায় না।
আয়নাটি দিনান্তে একবার না দেখিলে
তাহার চলে না। সে প্রতিদিন দেবালয়ে
গিয়া দূর হইতে আয়নাখানি দেখিয়া আসিত।
তাহার ইচ্ছা হইত যে সেখানি চুপিচুপি বুকে
লইয়া দেশ ছাড়িয়া পালায়। কিন্তু দেবতার
জিনিস সে কেমন করিয়া চুরি করিবে ?
কিন্তু তাহার মন যে চুরি করিতেছে।
দেবতাকে সে যাহা হাতে করিয়া দিয়াছে
তাহার মন যে তাহা ছাড়িয়া দিতেছে না! এত
বড় লজ্জার কথা সে কাহারো কাছে মুখ
ফুটিয়া প্রকাশ করিতে পারে না—এই বেদনা
কল্পকথা
সে দিনরাত্রি হৃদয়ের মধ্যে লুকাইয়া বেড়ায়।
কেবল দেবতাকে ডাকিয়া জোড় হাত করিয়া
বলে—“হে দেবতা আমার এই মমতা কেমন
করিয়া কাটিবে ! কবে কাটিয়া যাইবে।”
(২)
=
ঘণ্টা তৈরি হইবার জন্য আয়নাগুলি
কারখানায় পাঠানাে হইল। কারিগরেরা
আগুন জ্বালাইয়া পিতল গলাইতে লাগিল।
কিন্তু আগুন যতই জ্বলে একখানি আয়নার
পিতল কিছুতেই গলিতে চায় না। সে যেন
কঠিন বজ্ৰ দিয়া তৈরি! আগুনে সে কেবল
যেন লজ্জায় আরো রাঙা হইয়া উঠে, কিন্তু
নরম হয় না-তাহার উপরে যতই হাতুড়ি
পড়ে সে যেন কঠিন কণ্ঠে বলিতে থাকে
না, না, না! তাহাতে কোন চিহ্বও পড়ে না।
তখন দেবালয়ের পুরােহিত বলিলেন
“এ আয়না যে দান করিয়াছে সে ভাল মনে
দান
দেয় নাই—অনিচ্ছায় দিয়াছে। কে এমন
পাপিষ্ঠা যে দেবতাকে একটা সামান্য জিনিস
প্রাণ খুলিয়া দিতে পারে না!”
এই কথা শুনিয়া মেয়েটি মরমে মরিয়া
গেল। সে কহিল-“এ কি কঠিন আসক্তি।
এ যে একেবারে প্রাণের সঙ্গে জড়িত হইয়া
আছে! দেবতাকে আমার এই প্রাণটা না
দিলে ঐ আয়নাও দেওয়া হইবে না।”
এই বলিয়া সে তখনই দেবতাকে স্মরণ
করিয়া সেই অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিল। তাহার
দেহ দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল।
সেই আগুনে
আয়নার পিতল গলিয়া
গেল।
প্রজাপতি (১) সােসাঞ্জি সমাধিক্ষেত্রের ঠিক পিছনে একটি কুটীয় ছিল। সেখানে জনমানব ছিল না, কেবলমাত্র এক বৃদ্ধ বাস করিত। বৃদ্ধের নাম ছিল তাকাহামা। তাকাহামাকে সকলেই বড় ভালবাসিত। তার স্বভাবটি এমনি মধুর, তার ব্যবহার এমনি কোমল ছিল যে, তাহাকে যে দেখিত সেই মুগ্ধ অনেকে তাহাকে পাগলাটে বলিত। কেননা, দশজনে যেমন করিয়া জীবন কাটায় সেরকম করিয়া সে চলিত না ;সে কেমন- এক-ধরণের ছিল। বিবাহ সে করে নাই। সংসারে আপনার বলিবার, বড় কেহ ছিল না। কুটীরে সে
No text on this page.
事!
Mart
-
--
প্রজাপতি
একলাই থাকিত। নিজের হাতে সব কাজ
করিত। কাহারো কাছে কিছু সাহায্য চাহিত
। গ্রামের আমোদআহলাদ পালপার্বণের
মধ্যে তাহাকে কখনো মিশিতে দেখা যাইত
। সে নিজের একলা ঘরের ছােটখাটো
কাজ লইয়াই সমস্ত দিন কাটাইয়া দিত।
সন্ধ্যাবেলা বারান্দায় ছােট এক মাদুরে বসিয়া
সে আরাম করিত। আকাশের পানে চাহিয়া
আনমনে কি যে ভাবিত তাহা কেহ বলিতে
পারে না।
সারা জীবন সে এই ভাবেই কাটাইতেছিল।
(২)
একদিন হঠাৎ বেচারার ব্যামো হইয়া
শরীর ভাঙিয়া পড়িল। কে তাহার সেবা
করে ? গ্রামের কাহাকেও সে ডাকিল না।
বিছানায় একলা পড়িয়া রােগযন্ত্রণা ভােগ
করিতে লাগিল।
কল্পকথা
অতি দূর সম্পর্কে কে একজন তাহার
আত্মীয়া ছিল। লে বিধবা। গ্রামের লােকে
হকে সম্বাদ দিল। সে একদিন তার ছােট
ছেলেটিকে সঙ্গে লইয়া তাকাহামার ঘরে
আসিয়া উপস্থিত হইল।
যত দিন যায় তাকাহামার অবস্থা ক্রমেই
খারাপ হইয়া উঠে।
এক দিন গ্রীষ্মের বৈকালে তাকাহামা
অবসন্ন হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। বিধবা
ও তাহার ছেলে বিছানার পাশে বসিয়া
আছে। কোথা হইতে একটা সাদা প্রজাপতি
তাকাহামার মাথার বালিসে আসিয়া বসিল।
ছেলেটি পাখার বাতাস করিয়া তাহাকে
উড়াইয়া দিল, সে আবার আসিয়া সেইখানে
বসিল। ছেলেটি যতবারই তাড়ায় ততবারই
প্রজাপতি সেই বালিসে আসিয়া বসে! সে
যেন কিছুতেই নড়িবে না।
শেষে ছেলেটি তাহাকে অনেক কষ্টে
৬৪
প্রজাপতি
তাড়াইয়া বাগানের মধ্যে লইয়া গেল।
প্রজাপতি তখনও ঘুরিয়া ঘুরিয়া বার বার ঘরে
প্রবেশের চেষ্টা করিতে লাগিল। কোনােরকমে
সেখানে যাইতে পারিলেই সে যেন বাঁচে।
কিন্তু ছেলেটিও কিছুতেই ছাড়ে না। সে
তাহাকে শীঘ্রই বাগান পার করিয়া রাস্তায়
আনিয়া ফেলিল।
প্রজাপতি তখন একবার যেন হতাশ হইয়া
কুটীরের দিকে ফিরিল, তার পর উড়িয়া চলিল।
ছেলেটিও কৌতূহলে পড়িয়া তাহার সঙ্গ ধরিল।
শেষে তাহারা সেই কুটীরের পিছনে
সমাধিক্ষেত্রের মধ্যে আসিয়া পড়িল। সেখানে
অসংখ্য স্মৃতিস্তম্ভ। একটির পর একটি পার
হইয়া প্রজাপতি এক স্তম্ভের নিকট আসিয়া
থামিল ; তার পর কোথায় মিলাইয়া গেল।
ছেলেটি অনেক খুজিয়াও তাহাকে আর বাহির
করিতে পারিল না।
ছেলেটি দেখিল, সেই স্তম্ভের গায়ে
কল্পকথা
একটি নাম খোদা আছে। সহজে পড়া
যায় না—ভারি অস্পষ্ট! ছেলেটি অনেক
কষ্টে পড়িল—“আকিকো।” আঠারো বছর
বয়সে সে মারা যায়।
গােরটি বহুদিনের পুরাননা। কিন্তু দেখিলে
বােধ হয় কে যেন বড় যত্ন করিয়াই সেটিকে
নির্মল রাখিয়াছে।
(৩)
ছেলেটি ফিরিয়া আসিয়া দেখে তাকাহামা
তখনও চক্ষু মুদিয়া আছে,—মুখে একটুখানি
হাসি তখনও লাগিয়া আছে, কিন্তু নিশ্বাস
আর বহে না, বুকের কাপুনি থামিয়া গেছে।
সে তার মাকে সকল কথা বলিয়া জিজ্ঞাসা
করিল—“আকিকো কে মা ?”
মা বলিল—“আকিকো এই গ্রামেরই এক
মেয়ে ছিল। তাকাহামার সঙ্গে তার বিবাহের
ঠিকঠাক এমন সময় হঠাৎ সে মারা যায়।”
৬৬
ছবি
(১)
তার নাম ছিল টোকি। কিয়ােটো সহরে
সে থাকিত।
সবে মাত্র সন্ধ্যা নামিয়াছে—চোখে ভালো
দেখা যায় না-তখনো বাতি কেউ জালে
নাই—আঁধারে সবই অস্পষ্ট—এমন সময়
একদিন টোকি পথ চলিতেছিল।
সামনে একটা পুরানাে জিনিসের দোকান।
তার মধ্যে নানা রকমের ভাঙা ছেড়া জিনিস
সাজানো রহিয়াছে। সে দোকানে একটা
কাগজের পরদার উপর টোকির হঠাৎ নজর
পড়িল। পরদার গায়ে একখানি ছবি আঁকা।
ছবিটি তার বড় ভালো লাগিল। সেখানি সে
কিনিয়া লইল।
কল্পকথা
আঁকা!
আঁধারে সে ছবিখানি ভালাে করিয়া
দেখিতে পায় নাই, ঘরে আসিয়া বাতির
আলােয় দেখিয়া মােহিত হইয়া গেল।
ছবিটি একটি মেয়ের বয়স বছর পনেয়ে।
কি যােলো। চমৎকার
বলিয়া মনেই হয় না। যেন আসল মানুষটিকে
পর্দার গায়ে কে আঁটিয়া দিয়াছে । চোখ দুটি
যেন দুখানি পদ্মের পাতা। মুখখানি ঢলঢলে।
টুকটুকে ঠোঁটের আগায় হাসিটি লাগিয়া
আছে। মাথার
যেন বাতাসে
উড়িতেছে! চোখের পাতা যেন নড়ে!
মুখের কথা যেন ফোটে-ফোটে।
টোকি তন্ময় হইয়া দেখিতে লাগিল।
যতই দেখে, ছবি যেন ততই তাহাকে পাইয়া
বসে—ছবি হইতে আঁখি সে ফিরাইতে
পারেনা !
।
ছবি
(২) '
ঘরের বাতি পুড়িয়া নিবিয়া গেল।
ভাবে এতই বিভাের যে সে তাহা লক্ষ্য
করিল না। ঘরের মধ্যে স্তরে স্তরে অন্ধকার
জমিতে লাগিল। সে অন্ধকার ভেদ করিয়া
দেখে কাহার সাধ্য! ছবিটিকে পাশে রাখিয়া
টোকি জাগিয়া রহিল-তাহার দেখে ঘুম
নাই। সে তখন আত্মহারা সব ভুলিয়া
কি কথা যেন ভাবিতেছে!
এমনি করিয়া সময় কাটিতে লাগিল।
টোকি তাহা খেয়াল করিল না।
রাত্রি তখন খুব ঘনাইয়া আসিয়াছে।
হঠাৎ টোকি দেখিল পরদার গা হইতে মেয়েটি
বাহির হইয়া আসিয়াছে ;-পাশে বসিয়া
তাহার মুখের পানে চাহিয়া আছে।
টোকি চমকিয়া উঠিয়া তাহাকে ধরিতে
কল্পকথা
গেল। সে একটু সরিয়া বসিয়া বলিল
—“ছুয়ােনা, চুয়ােনা।”
মুখের কথা শুনিয়া
টোকির আনন্দ
আর ধরে না ! সে এক নিশ্বাসে তাহাকে
কত কথাই বলিয়া ফেলিল ;-প্রাণের মধ্যে
কিছু গােপন রাখিল না!
তখন টোকি শুনিল মেয়েটি যেন
বলিতেছে-“টোকি! তুমি আমাকে এত
ভালােবাসো ?”
টোকি অনেক চেষ্টা করিয়াও সে কথার
উত্তর করিতে পারি না।
মেয়েটি আবার বলিল—“কিন্তু তােমার
এ ভালােবাসা কি চিরদিন থাকবে ?”
টোকি ব্যগ্র হইয়া উত্তর করিল-“কেন ?
কেন? কিসের সন্দেহ ? আমার প্রাণ কি তুমি
বােঝাে না ?
মেয়েটি একটু হাসিয়া বলিল-“বুঝি বই
কি।”
ছবি
টোকি সেই হাসির অর্থ বুঝিল, মেয়েটি
তার কথা অবিশ্বাস করিতেছে। টোকি তখন
ব্যাকুল হইয়া উঠিল। ছুটিয়া তার পা
ছুইয়া শপথ করিতে গেল। কিন্তু মেয়েটি পা
দুখানি কোথায় লুকাইয়া ফেলিল, সে আর
দেখিতে পাইল না। টোকিব মনে বড় ব্যথা
লাগিল, সে আর সামলাইতে পারিল না,
-কাঁদিয়া ফেলিল।
তখন মেয়েটি টোকির খুব কাছ ঘেসিয়া
বসিল। টোকির মনে হইল মেয়েটির গায়ের
বসন যেন তার গায়ে আসিয়া ঠেকিতেছে,
মাথার কেশ তার কপােল চুইয়াছে, নিশ্বাসের
বাতাস যেন বুকে লাগিতেছে, এক ফোঁটা
তপ্ত চোখের জলও যেন হাতে আসিয়া
পড়িল ;-মেয়েটি তার বুকের মধ্যে মুখ
লুকাইয়াছে।
হঠাৎ টোকি চাহিয়া দেখে ভােরের
৭১
কল্পকথা
আলাের ঘর ভরিয়া গিয়াছে। মেয়েটি
কাছে নাই।
পরদার গায়ে দাঁড়াইয়া
হাসিতেছে!
====nce,
====
૧૨
মিলন
(১)
এক জমিদারের বাড়ি সে কাজ করিত।
একদিন হঠাৎ সেই জমিদার সর্বস্ব খােওয়াইয়া
পথের কাঙাল হইয়া বসিল। সঙ্গে সঙ্গে
তাহারও দুরবস্থার শেষ রহিল না।
তার স্ত্রী ছিল রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।
নিজের হাতে সমস্ত দিন তাত বুনিয়া সেই
দুর্দিনে সে স্বামীর আহার জোগাইতে লাগিল।
স্বামী চাকরির সন্ধান করে, কিন্তু চাকরি
কিছুতে মেলেনা। একদিন সে সন্ধান পাইল
এক বড় ঘরের মেয়ে আছে তাহাকে বিবাহ
করিলে একটা ভালাে চাকরি হয়।
ৰাচবিচার না করিয়া সেই মেয়েটিকেই বিবাহ
করিয়া ফেলিল।
৭৩
কল্পকথা
নূতন স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া সে বিদেশে চাকরি-
স্থানে গেল। প্রথম স্ত্রী সেইখানে পড়িয়া
রহিল। যাইবার সময় স্বামী তাহার দিকে
একবার ফিরিয়াও তাকাইল না।
তাহার স্বভাব এতই কোমল ছিল যে মুখ
ফুটিয়া স্বামীর উপর সে কোনাে কথা কহিতে
পারিল না। স্বামী চলিয়া গেলে ধূলায় লুটিয়া
কাদিতে লাগিল।
(২)
নুতন বিবাহ করিয়া অবধি কিন্তু তাহার
মনে শান্তি নাই। অর্থের কষ্ট রহিল না বটে
কিন্তু মনের কষ্ট শতগুণ বাড়িয়া উঠিল
নূতন স্ত্রীর সহিত কিছুতেই তাহার মনের মিল
হয় না। প্রতিদিন সহস্রবার প্রত্যেক খুটি-
নাটি লইয়া সে স্বামীর মনে কেবলই আঘাত
দেয়। তাহার মন কিছুতেই পাওয়া যায় না।
সে আপনার খেয়ালে আপনিই থাকে ;—স্বামীর
৭৪
মিলন
কোনাে খপরই রাখে না। স্ত্রীর এই ব্যবহারে
তার মনে বিন্দুমাত্র সুখ ছিল না।
তখন তাহার মনে সেই পুরানো দিনের
কথা কেবলই জাগিত;—প্রথম স্ত্রী যে সমস্ত
দিন স্বামীর সেবা ভিন্ন আর কিছু জানি না,
'আহা, সে কেমন ছিল ! সে কি সুখেরই
দিন! সবই হেলায় হারাইয়াছি।
যখনই এই সব কথা মনে পড়িত তখনই
সে ভাবিত—“যাহাকে আমি পায়ে ঠেলিয়া
চলিয়া আসিয়াছি সে যে শুধু আমার পায়ের
সেবা করিতে পাইলেই সুখী ছিল। বিনা
দোষে সেই সতীলক্ষ্মীকে ত্যাগ করিয়াছি।
হায়, হায় ! আমার মত নিষ্ঠুর কি আছে! সে
শুধু আমার মুখের পানে চাহিয়া ছিল আমি
তাহার মুখ চাহিয়াছি কই ?”
এই অনুশােচনায় সে দগ্ধ হইতে লাগিল।
যাহাকে সে কোনাে দিন আদর করে নাই
—যাহার প্রতি কখনো সে কোনো মমতা
৭৫
কল্পকথা
দেখায় নাই এখন তাহার মন তাহারই দিকে
টানিতেছে। রত্ন ফেলিয়া সে কাচের লােভে
ছুটিয়াছিল, এখন সে যে রত্ন চিনিয়াছে, আর
কি স্থির থাকিতে পারে !
(৩)
তখন গভীর রাত্রি। গ্রাম নিস্তব্ধ। পথে
সােক চলে না। আজ কত বছর পরে এই
রাত্রের অন্ধকারে সে নিজের বাড়ির দরজায়
আসিয়া ঘা দিল।
বাড়ির সে অবস্থা নাই। ফুলের বাগান
জঙ্গলে ভরিয়া গিয়াছে-ঘরের চালে গাছ
গজাইয়াছে। চারিদিক হ হ করিতেছে।
জনমানবের চিহু নাই।
দরজার গায়ে দুইবার ঘা পড়িতেই জীর্ণ
রজা আপনি খুলিয়া গেল।
খুলিয়া গেল। সে ভিতরে
প্রবেশ করিল।
বাড়িতে আলাে নাই ;-ঘর সব শূন্য।
মিলন
ভাঙা জানালার ভিতর দিয়া নিশার বাতাস
সুর ধরিয়া
ঢুকিতেছে।
চামচিকাগুলাে কালাে কালো ডানা মেলিয়া
ঘরের এধার ওধার করিতেছে।
বাড়ির অবস্থা দেখিয়া সেখানে যে কেহ
বাস করে তাহা বােধ হইল না।
সে কি তবে নাই ?—দেখা কি মিলিবে
না? এই কথা মনে করিয়া সে ছটফট করিতে
লাগিল!
আজ সে হৃদয় ভরিয়া যে অর্ঘ্য সাজাইয়া
আনিয়াছে তাহা কি বৃথা যাইবে !
বাড়ি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া সে কোথাও
তাহাকে পাই না। সে তখন মাথায় হাত দিয়া
মাটিতে বসিয়া পড়িল!
ঘরের মধ্যে বাতাস হা-হা করিয়া ছুটিয়া
বেড়াইতেছে। তাহার প্রাণের মধ্যেও
হাহাকার উঠিয়াছে। তাহার প্রাণ কাদিয়া
কাঁদিয়া বলিতেছে—ওগাে, এসাে, এসাে !
११
কল্পকথা
আমার প্রাণের প্রাণ এসাে ! না বুঝে না
জেনে অপরাধ করেছি-একবার এসে শুধু
ক্ষমা করে যাও।
(৪)
বাড়ির এক কোণে একটি ছােট ঘরে
মলিন বিছানার উপরে শুইয়া কে ? স্নান
মুখে চাদের আলো পড়িয়াছে -দেহখানি যেন
মাটিতে মিশাইয়া আছে!
সে ছুটিয়া সেই ঘরে প্রবেশ করিল।
তখনই তাহার স্ত্রী উঠিয়া বসিল। স্বামীকে
দেখিয়াই তাহার মান মুখ আনন্দে ভরিয়া
গেল। সে আদর করিয়া হাত ধরিয়া স্বামীকে
বসাইল ;--মুখে অভিমানের চিমাত্র নাই।
স্বামী দেখিয়া অবাক হইয়া গেল।
সে কাতরকণ্ঠে কহিল-“সহস্র অপরাধ
করেছি—ক্ষমা করো!”
৭৮
মিলন
স্ত্রী বলিল-“অপরাধ তুমি করেছ?
-না, না!”
স্বামী কহিল—“সত্যই আমি অপরাধী।
-তােমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি—সেই জন্য
আমার প্রাণ এখন কাদছে;-ক্ষমা করবে না?”
স্ত্রী কহিল –“ওকি কথা! তুমি কি আমার
ক্ষমার পাত্র—তুমি যে আমার দেবতা !
—আমায় কেন অপরাধী কর।”
স্বামী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে বলিল
—হায়, হায় কি করেছি! কাকে অবহেলা
করেছি।
তার পর দুইজনে মুখখামুখী হইয়া বসিল।
আজ তাহাদের সত্যই মিলন—এমন পূর্ণ মিলন
তাহাদের মধ্যে কখনো ঘটে নাই
তাহারা দুজনে প্রাণ খুলিয়া কথা কহিতে
লাগিল, সে
কত অতীতের কথা--কত
ভবিষ্যতের কথা !
স্বামী মনের আবেগে যখনই নিজের
৭৯
কল্পকথা
দোষের কথা--স্ত্রীর প্রতি তার অবহেলায়
কথা তােলে তখনই স্ত্রী তাহা চাপা দেয়। সে
বলে-“আজকের এ আনন্দের দিনে মনগড়া
দুঃখের কথা কেন তােলে?-ও সব কিছু না।”
কথা কহিতে কহিতে কখন যে তাহার
ঘুমাইয়া পড়িল তাহা জানিতেও পারিল না।
যখন সে জাগিয়া উঠিল তখন জানালার
ছিদ্র দিয়া ঘরে রৌদ্র প্রবেশ করিতেছে।
কিন্তু এ কি !—সে ধূলায় পড়িয়া কেন?
স্ত্রী কোথায় ?-পাশে তাে নাই ! সে ঘরে যে
বহুদিন কেহ প্রবেশ করে নাই।
তবে কি কাল রাতের কথা শুধু স্বপ্ন।
৮
য়ােসকুরা
(১)
সেই মােসকুরা গাছটির কাহিনী সবাই
জানে।
এক গ্রামের কিনারায় সেই প্রকাণ্ড
গাছটি ছিল। তাহাতে যখন ফুল ফুটিত
তখন বাতাসে রাঙা রাঙা ফুলের পাতাগুলি
উড়িয়া গ্রামটিকে ছাইয়া ফেলিত। পথ,
ঘাট, মাঠ লালে লাল হইয়া যাইত।
তারই তলায় ছােট কুঁড়ে ঘরে একটি
চায়ের দোকান ছিল। গ্রামের মুটেমজুর
চাষারা যখন ভােরবেলা কাজে বাহির হইত
তখন তাহারা সকলেই এই দোকান হইতে
এক এক পেয়ালা চা পান করিয়া লইত।
দোকানী ভারি গরীব ছিল। চা বেচিয়াই
তাহার সংসার চলিত। ক্রমে ক্রমে তাহার
কল্পকথা
পর বাড়িতে লাগিল ;-দোকানে খরিদ্দার
ধরে না! ভাের হইতে না
হইতে না হইতেই
মােসকুরার তলা ললাকে ভরিয়া যায়।
তাহার স্ত্রী ও ছােট মেয়েটি ছুটাছুটি করিয়া
চা পরিবেষণ করে। দুজনে বিলি করিয়া
পারিয়া উঠে না;-দোকানী কেবল পয়সা
কুড়ায় !
দেখিতে দেখিতে দোকানী বেশ দু পয়সা
জমাইয়া ফেলিল । তখন সে কুঁড়ে ভাঙিয়া
কোঠা তুলিল। লক্ষ্মী তাহার ঘরে বাঁধা
পড়িলেন।
সকলে তখন বলিল ঐ মােসকুরার
দৌলতেই ওর ভাগ্য ফিরে গেল। সে
নিজেও তাই বিশ্বাস করিত। যাহার কল্যাণে
তার দুঃখের দিন শেষ হইয়াছে সেই
গাছটিকে সে দেবতার মত ভক্তি করিত।
দুঃখের সাথী ছিল বলিয়া তার প্রতি কেমন
একটা মমতাও
মমতাও ছিল। সে
ছিল। সে অতি যত্নে
৮২
য়োসকুরা
নিজের হাতে তার সেবা করিত। গাছের
গায়ে কাহারাে হাত দিবার হুকুম ছিল না।
তার এই সৌভাগ্যের কথা দেশে বিদেশে
ছড়াইয়া পড়িল ;-দেশবিদেশের লােক
সেই গাছটিকে দেখিতে আসিত। সর্বত্র
রটিয়া গেল যে ঐ গাছের একটা ডাল
যদি কাহারাে ঘরে থাকে তত লক্ষ্মীও তাহার
ঘরে বাঁধা।
(২)
একদিন দুপুর বেলা সে একলা বসিয়া
আছে, এমন সময় একজন লােক আসিয়া
হাজির;—পরণে তার সৈনিকের সাজ, কোমরে
তরবার। লােকটার চেহারা দেখিয়া বােধ
হয় না যে তাহার মধ্যে এতটুকু কোমলতা
আছে—যেন গোয়ার গােবিন্দ। সে খামকা
কহিল-“মােসকুরাগাছ দেখতে এসেছি।”
তাকে চোখে দেখা মাত্রই দোকানীর
কল্পকথা
মনে কেমন ভালাে বােধ হয় নাই; তাহার
পর কথার স্বর শুনিয়া তাহার অঙ্গ জ্বলিয়া
গেল, সে বলিল,-“দেখতে এসেছ, দেখনা
বাপু! গাছ
তাে আমি সিন্দুকে পুরে
রাখিনি।”
লােকটা বলিল-“গাছ শুধু দেখতে
আসিনি-একটা ডাল চাই! আজ পর্যন্ত
এত করেও তাে এক কাণাকড়ি ঘরে আনতে
পারলুম না। লােকে যে বলে ঐ মােসকুরার
ডাল ঘরে থাকলে পয়সার ভাবনা থাকে না,
তা একবার পরখ করতে হচ্ছে!”
দোকানী বলিল—“সে সব হবেনা বাপু!
ও গাছ আমি কাউকে ছুতে দেবে না।”
লােকটা একটু হাসিয়া বলিল—“আমাকে
তেমন লােক পাওনি যে এক কথাতেই ভেঙ্গে
যাব। আমি মনে যা করি কাজেও তাই।”
দোকানী বলিল-“হতে পারে, কিন্তু
এখানে তা হচ্ছে না।”
৮৪
No text on this page.
Ewy
ry
W
Seri
য়ােসকুরা
এই কথা শুনিয়া, লােকটাকে দেখিয়া মনে
হইল, সে রাগে থর থর করিয়া কাঁপিতেছে।
সে একটি কথা কহিল না। কোষ হইতে তরবার
খুলিয়া ফেলিল—গাছের পানে ছুটিয়া গেল।
দোকানীও দৌড়িয়া গেল, চেঁচাইয়া
বলিল-“খবরদার!”
সে কথা সে গ্রাহই করিল না। তরবারি
উঠিয়াছে-গাছের গায়ে পড়ে। দোকানী
স্থির থাকিতে পারিল না, বিদ্যুতের বেগে
ছুটিয়া গিয়া দু হাত দিয়া গাছটিকে আঁকড়াইয়া
ধরিল। তরবারি আসিয়া তাহারই গায়ের
উপরে পড়িল!
(৩)
দোকানী মারা যাইতেই চায়ের দোকান
উঠিয়া গেল। তাহার স্ত্রীকন্যা মনের দুঃখে
দেশত্যাগী হইল! বাড়িঘর ভাঙিয়া গেল।
মােসকুরার তলা শূন্য পড়িয়া রহিল।
৮৫
কল্পকথা সে যেন দিনে দিনে শুকাইতে লাগিল। তখন সে জায়গাটার অবস্থা দেখিয়া গ্রামের লোক সবাই চোখের জল ফেলিত। কি ছিল—কি হল! যে লােকটার জন্য এত কাণ্ড এই ঘটনার পর হইতে তাহার আর দুরবস্থার সীমা রহিল। । অর্থের অভাব আরো বাড়িয়া উঠিল- দুবেলা দুমুঠা আহার জোটে না। খুন করি- য়াছে বলিয়া দেশের লােক তাহাকে দূর ছাই করে। তাহার জীবন ভার হইয়া উঠিল। লােকে বলিল-“য়ােসকুরার গায়ে হাত তুলেছে ওর কি আর নিস্তার আছে।” সে শুনিয়া রাগিয়া কহিল--তবে মােসকুরাকে আমি সমূলে নির্মূল করব!” তাহার বুড়ো বাপ ছিল সে বলিল—“না বাবা, অমন কাজ করিসনি-আরা কি হবে কে জানে।” সে বাপের কথা শুনিল না।
!
যােসকুরা
সেই রাত্রেই সে সেই গাছতলায় গেল।
সেখানে তখন জনমানব নাই। ঘাের অন্ধকার।
চারিদিক খা খা করিতেছে। তাহার মনে
হইল যেন নিৰ্ম্মল হইবার ভয়ে গাছটা থর থর
করিয়া কাঁপিতেছে! তাহার ভারি আনন্দ
হইল। সে খুব জোরে হো-হো করিয়া হাসিয়া
উঠিল। সেই বিকট হাসির শব্দ য়ােসকুরাগাছের
পাতায় পাতায় প্রতিধ্বনি তুলিতে লাগিল
সে তখন শুনিল মানুষের গলায় গাছটা
বলিতেছে—“মেরােনা, আমায় মেয়ােনা
তা হলে তােমার ভালাে হবে না বলছি।”
গাছ মানুষের গলায় কথা কয় শুনিয়া সে
চমকিয়া উঠিল। তাহার গাটা কেমন ছমছম
করিতে লাগিল !
সে তাহা গ্রাহ্য না করিয়া কহিল-“ভালই
হােক, মন্দই হােক—আজ আমার হাতে তাের
নিস্তার নেই।”
গাছ আবার বলিল—এখনও সময় আছে,
৮৭
কল্পকথা
হাসিল।
এখনও ফেয়াে। নইলে তােমার দুর্গতির
অন্ত থাকবে না!”
এই কথা শুনিয়া সে আরাে একবার
সেই হাসিতে অত বড় মােসকুরা
গাছটা কাপিয়া উঠিল
তারপর সে কোষ হইতে তরবারি খুলিয়া
গাছের গায়ে আঘাত করিল। মানুষের
গলায় গাছটা দারুণ আর্তনাদ করিয়া উঠিল।
তখন তাহার কঠোর প্রাণটাও কি-জানি-কেন
একটু কঁপিয়া উঠিল।
যােসকুরার মাথার উপরে তখন চার
উঠিয়াছে। তারই আলােয় সে দেখিল তাহার
তরবারি রক্তে ভরা!
সে ভাবিল একি
আশ্চর্য! এমন ত কখন দেখি নি। গাছের
গায়ে মানুষের রক্ত। তার পর চাদের আলো
যখন আরো উজ্জ্বল হইয়া উঠিল তখন দেখে
রক্তে মাখা একটা ছিন্ন মানুষের দেহ পড়িয়া
আছে! সে কে ? সে তার বুণে বাপ!
৮
No text on this page.
No text on this page.