Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pordeshi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পরদেশী।
(গীতিনাট্য)
( মনােনােহন থিয়েটারে অভিনীত
১.
প্রথম অভিনয়-রজনী।
১১ই পৌষ,১৩২৫ সাল।
পাঁচকড়ি চট্টোপাধ্যায়
প্রণীত।
কলিকাতা
২শে পৌষ, ১৩২৫ সাল।
মূল্য ॥ আট আনা।
PUBLISHED BY
NAGENDRA NATH MUKERJI,
35A, Mondal Street, Bye Lane, Catcutta.
Printed by
ASHUTOSH BANERJI
Metcalfe Press-79, Balaram De Street, Calcutta.
উৎসর্গ।
তুষভাণ্ডারাধিপতি, প্রজাপালক সাহিত্যানুরাগী
শ্ৰীযুক্ত গিরীন্দ্রমােহন রায় চৌধুরী
প্রতিপালকেষু-
পাঁচকড়ি চট্টোপাধ্যায়
No text on this page.
ভূমিকা। মাননীয় শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ ঘােষ, সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রীতিভাজন শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র বসু, নৃত্যশিক্ষক ও বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত সাতকড়ি গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়গণের একান্ত যত্নেই আজ “পরদেশী” মনােমােহনে “ঘরবাসী” এবং তাহাদিগকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইবার জন্যই এই ভূমিকা। বাণীর যে একনিষ্ঠ সাধক, ৩ পান্নালাল সরকার, আমার এই ক্ষুদ্র নাটকের সঙ্গীতগুলিতে মনােমুগ্ধকর সুরলয় সংযােগ করিয়াছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ নিয়তিনিয়মে আজ স্বৰ্গগত, তাঁর পবিত্র আত্মার উদ্দেশে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। অলমতিবিরেণ। গ্রন্থকার।
চরিত্র।
পুরুষ
তুরস্ক সম্রাট।
| ০ ০ ০
সােলেমান
নােমাজেস (পরদেশী)
পারস্য-সম্রাট-পুত্র
ফানালা
ঐ অনুচর।
মােবারিক
ওমরাহ-পুত্র।
ঐ অনুচর।
মাঝি, উদ্যানরক্ষক, ঘাতক, হকিম, হারবােলা, অন্যান্য সঙ,
রােগিগণ, প্রহরিগণ ইত্যাদি।
০ ০ ০
• !
E
সেরিণা
জেরিণা
সানিয়া
সাখিয়া
खी
তুরস্ক সম্রাটের জ্যেষ্ঠা কন্যা
ঐ কনিষ্ঠা কন্যা।
সেরিণার বাদী।
জেরিণার বাদী।
বাদীগণ, রঙ্গিণীগণ ইত্যাদি।
p এ ।
* ০ ০
পরদেশী ।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
নদী-তীরস্থ প্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যান।
জেরিণার গীত।
কুসুম সুন্দরী সখি, কারে তুমি বাস ভাল।
কাহারে খুজিছ তুমি, কে গাে হৃদয় এলো।
চেয়ে চেয়ে চেয়ে পলক পড়েনা,
কার ছবিখানি দেখিছ বলনা,
আমিও না, করনা ছলনা,
মাের কাছে প্রাণ খােল।
জেরিণা। আজ কি যেন একটা অজানা: আনন্দে হৃদয় উথলে
উঠছে। আজ বসন্ত উৎসব ব’লে কি এমন হচ্চে? না, বসন্ত উৎসব ত
প্রতিবৎসরই হয়, কখন ত এমন হয় না। তবে এবার ঘটাটা একটু বেশ,
২
পরদেশী
•
এ তে কি এসে যায় ? কাণে কাণে কে যেন বলছে আজ তুই তাের কোন
প্রিয়জনকে দেখতে পাবি। আমার ত সকল প্রিয়জনই এখানে বর্তমান।
আবার নূতন কাকে দেখব? দূর হাে’ক গে ছাই, একবার মেলার
দিকটায় যাই। সেখানটা কেমন সাজিয়েছে দেখিগে। [ প্রস্থান।
(সাখিয়ার প্রবেশ।)
সাখিয়া। বৎসরের মধ্যে একটা দিন বসন্ত উৎসব, রাজ্যময় আনন্দের
ছড়াছড়ি; কত রং বেরংয়ের তামাসা ভেল্কী ভােজবাজী কত কি হচ্ছে,
সবাই আহাদ আমােদ ক’চ্ছে।
( সানিয়ার প্রবেশ।)
সানি। কি রে সাখি, তুই একা এখানে?
সাখি। এই তাের আসার অপেক্ষা ক’চ্ছি ; কত রং বেরংয়ের রগড়
গড়িয়ে যাচ্ছে, আমি একা ব’লে ভােগ করে সুখ পাচ্ছিনে; এখন তুই
এলি অনেকটা ভরসা হ’ল। তা তুই একা যে? সাজাদী কোথায় ?
সানি। তুই একা যে ? সাজাদী কোথায় ?
সাখি। সাজাদী এতক্ষণ মেলায় গিয়ে বাঁদর নাচ দেখছেন।
সানি। আর আমার সাজাদী কুমড়াে গড়াগড়ি দেখছেন।
সাখি। কুমড়ে গড়াগড়ি কি ?
সানি। দুটো বিটকেল জোয়ান প্রথমটা খুব তাল ঠুকে আস্ফালন
কল্লে, তার পর কুমড়াের মত গড়াচ্চে।
সাখি। ও কুস্তি বুঝি, হঁারে এবারে নাকি নূতন রকমের সঙ
হয়েছে ?
সানি। হয়েছে বৈকি এবারে আর মুখােস্ পরা নয়।
সাখি। তবে ?
সানি। এলেই দেখবি, আমি আগে থেকে ভাঙ্গ চিনি। এখন দেখ
ঐ হরবােলা আসছে।
প্রথম অঙ্ক । = = ( হরবােলার প্রবেশ ও গীত) গামি সাগর-পারের হরবো। যদি শুনতে চাও কেউ পয়সা ছাড় আমি কর্পো নাকো ছেলে-খেলা। কুহু কুহু ডেকে আমি কাল কোকিলটে, ‘বউ কথা কও ডাকতে পারি সে বড় মিঠে, বকুম কু পারা ডাকি, কিচির মিচির চড়াই পাখী, কেঁকোৰ কেঁাকে” জলে ভরাই বাবুদের নােলা। যদি শুনতে চাও গো কেউ আমি কুত্তা হয়ে কর্তে পারি, “কেউ কেউ ঘেউ ঘেউ আবার দু বেড়ালের লড়াইয়েতে কাণ কৰি কলা পালা। কখনও হই ধিঙ্গি, ডাকি বাঘ। সিঙ্গি, আবার শেয়াল হয়ে “হুয়া হুয়া” ডাকি সন্ধ্যাবেলা। [ প্রস্থান। (সেরিণ ও জেরিণার প্রবেশ।) সাথি। এবারের বসন্ত উৎসব দেখ চি খুব জমকালাে হয়েছে, জ্ঞান হয়ে অবধি এমন ধারা দেখিনি। জেরিণা। হারে সাখি, সঙের দল চলে গেছে ? সাখি। এখনও এদিকে আসেনি—আজ সাজাদা, গফুরের কাণ্ড দেখে আর হেসে বাঁচিনি। জেরিণা। কেন সে কি করেছে ? সাখি। সে এক কিম্ভুত কিমাকার চেহারা করে এসে নাচ্ছিল ; সানি তাই না দেখে একেবারে আগুন, “দূরদূর” করে তাড়িয়ে দিলে। আমরাত হেসেই অস্থির। সেরিণ। সানিয়া গফুর জাতিসৎ। সানি। কেন নােবারিকও ত অতিমহৎ, তবে তুমি তাকে অমন ; সেরিণা। মােবারিক প্রণয়ী হওয়া সম্ভব হলেও সে ভাষা-জ্ঞানহীন = ৪ পরদেশী। মূর্ধ- সনন্দিনীর একেবারে অনুপযুক্ত। কিন্তু তুই কি দোষে গফুরকে ভালবাসিনি সানি ? সানি। ঠিক ঐ দোষে ; বান্দা হয়ে শুরুদ্ধ, কথা কইতে জানে না। সেরিনা। তুই নিজে যেমন মূর্থিণী, সেও তদ্রুপ। জেরিণা। সেরিণা, আমি মধ্যস্থ হয়ে দুজনকেই বলি, তােমাদের বড় অধ্যায়। এত ভালবাসার প্রতিদান কি একটুও নেই? বিশেষ সেরিণার যেন সব বাড়াবাড়ি। ব্যাকরণের জমিতে যে প্রেমের অঙ্কুর গজায়, তা এই তােমাতেই দেখছি। সেরিনা। কি কুরুচিপূর্ণ বাক্য বিন্যাস ! জেরিণা বিস্মৃত হয়াে না তুমি সম্রাট-নন্দিনী। জেরি। প্রতিবৎসর উৎসব হয় বটে, কিন্তু আজ যেমন আনন্দ হচ্ছে, বােধ হয় জীবনে কখনও এত আনন্দ উপভােগ কর্তে পারিনি, কিন্তু তােমার এই ব্যাকরণেই সব খােলা হয়ে যাচ্ছে। ও কি নদীতে কি একটা ভেসে আছে নয় ? (জেরিণা ও সাখিয়ার অগ্রসর হওন । সাখি। ওটা যে মানুষ। সেরিণা। (অগ্রসর হইয়া ) জীবিত না মৃত। সাখি। ঐ যে নড়ছে ! জেরি। ঢেউয়ে ভেসে এই দিকে অাছে। সেরি। উত্তোলনের কি কোন পন্থা নেই ? জেরি। দেখছি, আয় সাখি। সাখি। তাইতাে কি করা যায়! সাজাদী কে এঁকে তুলবে ? জেরিণা। আমাদের কি কোন যােগ্যতা নেই ? সেরিণা। এই মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে উদ্ধার কর্তে কি কেউ সাহায্য কৰ্ব্বে না?
প্রথম অঞ্চ
vAWWW.
(মােবারিকের প্রবেশ)
মােবা। কৰ্বে না কেন সেরিণা, তােমার জন্য যাতে প্রাণ দেবার
প্রয়ােজন, সে কাজ কর্তে মােবারিকই সৰ্ব্ব প্রথম ছুটে আসবে।
( জলে ঝম্প প্রদান ও নােয়াজেকে উত্তােলন)
সেরিণা। (স্বগত) কি রূপবান্।
জেরিণা। (স্বগত) কি সুন্দর।
মােবা। মরেনি--
সেরিণা। (নােয়াজেসের সংজ্ঞাশূন্য দেহ পরীক্ষাকালে পারস্য সম্রাটের
মােহরাঙ্কিত মণি-মুক্তাখচিত সুবর্ণপদক পাইয়া তাহা অন্যের অলক্ষ্যে
স্বকীয় বস্ত্রাভ্যন্তরে লুক্কায়িত করণান্তর) (স্বগত) পদকে দেখছি পারস্য
সম্রাট-পুত্রের নাম ! তবে কি এই ব্যক্তি পারশ্য-সম্রাটপুত্র। নিশ্চয়ই
তাই। নচেৎ এত সৌন্দর্য অন্যে কখনও সম্ভবে না। উপস্থিত এ
পদকের বিষয় গােপন রাখতে হবে। কারণ—না, থাক, প্রথম হতে
অন্যায় সন্দেহ মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়।
জেরিণা নিয়ে চল আর দেরী করাে না।
[ নােয়াজেকে লইয়া মােবারিক জেরিণাও সেরিণার প্রস্থান ]
সাথি। সানি অবাক হয়ে কি দেখছিস ?
সানি। বুঝি বাধলাে-
সাখি। কি বাধললা ?
সানি। কিছু একটা ঐ সঙ, আছে সাজাদীদের নসীবে, আর দেখা
য’টুলল না।
সাখি। হা হা হা সত্তিই যে এবারে নূতন।
[ গান করিতে করিতে পুরুষ বেশে সজ্জিত বাঁদীগণ এবং
নারীবেশে সজ্জিত বান্দাগণের প্রবেশ ]
বাদী। আমরা পুরুষ সেজেছি।
বালা। আমরা নারী বলেছি।
পরদেশী। a An উভয়ে। মিঞা বিবি সাধের জুটি হাওয়া খেতে চলেছি। বালা। এম্নি মােরা দুলিয়ে ফেণী হানবে। নয়ন বাণ, বাদী। এম্নি ধারা বাঁকা টেরী, দু আঙ্গুলে ঘুরবে ছড়ি, চলবে। এমি হেলে দুলে গায়েদে আচ কান। উভয়ে। মিঞা বিবির আদব কায়দা, কায়দা করে শিখেছি। বালা। মন মাতান মৃদু হাসি, পুরুষের গলা ফাসি, বাদী। কানাচ হতে শিষ দিয়ে দিয়ে মন মজাতে শিখেছি । বানা। আমীর ওমরাও নবাব বাদশা, করবো সাদী দেখে খামা, বাদী। আমরাও নইকো চাষা বেগম খুজতে চলেছি। বাল। মােৰা কৰ্ব এমি মান, তার উড়ে যাবে প্রাণ, কৰ্বে সে আচান বাদী। কথায় কথায় মেজাজ গরম রাখবে সদা নয়কো নরম, পান থেকে চুন খসলে বিবির হুমকি দিতে শিখেছি। উভয়ে। মিঞা বিবির প্রেমের লড়াই আখড়া দিয়ে সেধেছি । সানি। তােরা যে একেবারে পুরুষ হয়েছিস। সাখি। আর মিন্সে গুলাে মাগী ! ফি বছর মুখােদ, এবার একটু নূতন! তােরা এখন যেন আর এক দেশের মানুষ হয়েছিস ? বাদী। সত্তি, আমরা যেন তাই হয়ে গেছি। সানি। দেখ সাখি, আবার একটা কি ভেসে আসছে। সাখি। মানুষ! আজ দেখছি ভাসার পালা। ঐ যে নড়চে, আয় ওড়না ফেলেদি, যদি ধ’রতে পারে সবাই মিলে টেনে তুলবে— (তদ্রুপ করণানন্তর ফয়নাশাকে উত্তোলন) সানি। (স্বগত) কি রূপ । সাখি। (স্বগত) এমন রূপত কখনও দেখিনি। কে বাবা তােমরা ? সানি। দেখ চোনা এই গোঁফ। ফয়। ও বাবা মেয়ে মানুষের গোঁফ। সাখি। বুঝলে? অর্থাৎ মাদো ! দেখে বুঝচোনা মেয়ে মানুষের কি এমন গোঁফ গজায় ? সানি। পুরুষের কি এমন ননীর দেহ হয় ? 5 ফয়।
প্রথম অঙ্ক
ফয়। না।
১ম বাদী। পুরুষ কি এত ছােট হয় ?
ফয়। খুব কম ; গোঁফ। ওবাবা ইত।
সানি। আবার এ গোঁফের বিশেষত্ব এইটুকু এ বারােমাস থাকে না।
ফয়। বল কি ?
সানি। তবে আর মানুষের সঙ্গে প্রভেদ কি ? বসন্তকালে শুদ্ধ একটি
দিনের জন্য এই নূতনত্ব দেখা দেয়।
ফয়। বটে ! (স্বগত) মামদো ত কখন দেখিনি—হয় তাে--তবে কি
এটা মামদোর দেশ!
মানি। কি বুঝছো ?
ফয়। ওরে বাবারে বেগে প্রস্থান)
সানি। কি বেকুব !
হা-হা-হা-আয় দেখি কোথায় যায়।
( সকলের প্রস্থান)
তীয় দৃশ্য।
নােয়াজে।
নােরাজেস। তাইত! কোথায় যাচ্ছিলুম আর কোথায় এলুম !
পিতার মনােমত কন্যাকে সাদী কৰ্তে চাইনি, পিতা অসন্তুষ্ট হয়ে, একটা রূঢ়
কথা বলেছিলেন বলে, অভিমানে গৃহত্যাগ কর্ল ম; উত্তাল তরঙ্গময়ী বারিধি
অতিক্রম করে এসে, শেষে একটা ক্ষুদ্র নদী পার হতে নৌকা জলমগ্ন
হ’ল খােদার মেহেরবাণীতে প্রাণ পেলুম বটে, কিন্তু মনের মধ্যে কেমন
একটা কি হয়ে গেল! ফয়নাশা যে বেঁচেছে, এও একটা সুখের বিষয়।
পরদেশী।
•
(সেরিণার প্রবেশ )
সেরিণা। এখন বেশ সুস্থতা অনুভব কচ্ছেন ?
নােয়া। কৃতজ্ঞতা কেমন করে জানাবে—আপনাদের মেহেরবাণীতে
এ প্রাণ ফিরে পেয়েছি।
সেরিণা।
(স্বগত) ভাষা সম্পূর্ণ না হলেও অধিকাংশ মার্জিত।
( প্রকাশ্যে ) আপনার পরিচয় দানে আমায় অনুগৃহীত করবেন কি ?
নােয়া। দেবার মত পরিচয় কিছুই নেই ; তবে এইমাত্র ব’তে
পারি, আমি একজন পরদেশী মােসাফের।
সেরিণা। (স্বগত) এ অশ্লীলতা ক্ষমার্হ (প্রকাশ্যে ) আমার পরি-
চয় জানিবার অভিলাষ আছে কি? আমি তুরষ্কাধিপতি সাহান সম্রাট
সােলেমানের কন্যা-নাম সাহাজাদী সেরিণা। দেখুন, মার্জিত ভাষা
প্রয়ােগ আমার অভ্যাস।
নােয়া। (স্বগত) প্রাণের একটা কোণে বেশ একটু অহঙ্কারের
কালীর দাগ! (প্রকাশ্যে ) বড়ই বাধিত হলুম সাহাজাদী।
সেরিণ।। (স্বগত) নিভুল না হলেও ব্যাকরণ শুদ্ধ ! ভাষার দোষটুকু
সৌন্দর্য্যের আবরণে আবৃত। মােবারিক সম্পূর্ণ নিগুণ। সাহাজাদীর
প্রাণের আকাঙ্ক্ষা কখনও নিম্নগা হওয়া সম্ভব নয়। (প্রকাশ্যে ) আপনার
সৌজন্য প্রশংসনীয়। আপনার সংসর্গও মনােরম।
নােয়া। কিন্তু ব্যাকরণ সঙ্গত নয়—আপনি সম্রাট-নন্দিনী,
আমি একজন অজ্ঞাতকুলশীল মােসাফের।
সেরিণা। (স্বগত) মধুর ব্যঙ্গোক্তির সহিত নম্রতার কি মধুর
সংমিশ্রণ! পরদেশীর অন্তরে বাহিরে সৌন্দর্য। (প্রকাশে) আমি
সানন্দে স্বীকার ক’ছি, সুজনের সহিত সুজনের এরূপ ব্যবহারই ন্যায্য।
(সানিয়ার প্রবেশ)
সানি। হাহাহা-
প্রথম অঞ্চ। NAMMA সেরিণা। কি হয়েছে সানি ? সানি। হি-হি-হি- সেরিণা। এমন অসময়ে হাস্যরসের অপব্যবহার করে অশ্লীলতার প্রশ্রয় দি—কি হয়েছে বল্। সানি। হু-হু-হু- সেরিণা। পুনরায় ? সাহাজাদীর আদেশ-নিবৃত্ত হ- সানি। হুঃ হুঃ হুঃ- সেরিণা। অসহ! সানি দণ্ডের ভয় রাখিসনি ? হাস্য সংবরণ কর, নইলে- সানি। ক’চ্ছি সাজাদী, ক’চ্ছি, সেই লােকটা হা-হা-হা- সেরিণা। আমার সঙ্গে থেকেও তাের ভাষা মার্জিত হ’ল নাকি পরিতাপ। সানি। আপশােয করনা সাজাদী,এত কালের অভ্যাস কি ছাড়া যায় ?—তবে চেষ্টা কৰ্ব্বো। এখন সেই লােকটার কথা- সেরিণা। হাস্য সংবরণ ক সানি। সানি। সম্মুরতে যে পাচ্ছিনে সাজাদী ; হাসিটে যে প্রাণের ভেতর চিড়ি মেরে উঠচে, বাবা লােকটা কি ভীতু। সেরিণা। কেন ? সানি। আর কেন, ভয়ে লােটা বাগানের কুয়ােটার দিকের বােপটার ভেতর গিয়ে লুকিয়ে বসে আছে। হা-হা-হা- নােয়া। কোন্ লােকটা! সানি। আপনার সেই গােলামটি আবার কে। হা-হা--- নােয়া। ভয় কিসের? সানি। মামদো মাদীর।
পরদেশী। দেখছি, ৫. নােয়া। ওর একটা ভুল সংস্কার হয়েছে, তার উপর ভীত প্রকৃতির আপনারা ব্যস্ত হবেন না, আমি সেরিণা। অগ্রসর হােন, আমিও আপনার অনুগমন কচ্ছি। [ সকলের প্রস্থান। (জেরিণা ও সাখিয়ার প্রবেশ) জেরিণা। পরদেশী গেলেন কোথায় সাখি ? সাখি। সাজাদী যে এরই মধ্যে অস্থির ? সাখিয়ার গীত। বুরা হায় লাগান। দিল কিসিসে নতিজা পান। বেগর উসকো সমঝে আপন কে আপ, সতানা। উল ফতে তড়পতে হয়ে আঁখােমে দরিয়া, কিমৎকী খুবই এয়াস ফুকারি পিয়া পিয়া, আগি কলিজামে কায়সা জমানা- মুম্বুরে দুনিয়া হায়, মুস্কিল দিল বহলনা। জেরিণা। সাথি, তুই আমায় ঠাট্টা ক’চ্ছিস্? তােব তােবা আমি একটা এক পয়সার বাঁদী—আমি তােমায় ঠাট্টা কৰ্বো। জেরিণা। তবে ঠেস্ দিয়ে অমন গান গাইলি কেন ? সাখি। ওমা ঠেস্ দিলুম কখন গো ! এমন দিব্বি ফাঁকে দাড়িয়ে--- জেরিণা। তুই বড় জ্বালাতন ক’চ্ছি। [ প্রস্থান। সাখি। সাজাদী প্রাণের কথা না ভাঙ্গলেও তিনি যে পরদেশীর প্রেমে পড়েছেন, এটা খুব ঠিক, কিন্তু আমার আবার হঠাৎ একি হলাে । মনিবটির মত ওঁর গােলামটিও কি যাদু জানে! এই যে গফুর আসছে, ছোঁড়া সানিকে ভালবাসে, ছোড়া বড় বােকা, একটু নাচাই। (গফুরের প্রবেশ ) গফুর তুই এখানে যে ? গফুর। এঁ—এ্যা—এই এসেছি--এসেছি—বিবি সাহেব কোথায় ? সাখি। কোন্ বিবিসাহেব ? সাখি।
প্রথম অঙ্ক।
A
গফুর। ঐ যে—
সাসা—সানিয়া বিবি।
সাখি। ও মা, তাও জানিনে বুঝি, তার যে শক্ত ব্যায়াে, রাতা-
রাতি বাড়াবাড়ি।
গফুর। , বল কি ? ব্যামাে।
সাখি। ব্যামাে বলে ব্যামাে, মাথার ব্যামাে, হকিমে এলে দিয়েছে।
গফুর। এ্যা, বল কি।তাহলে উপায় ?
একটা উপায় আছে, একজন গুণী লােক বলেছে
সানির যদি কেউ ভালবাসার লােক থাকে, আর সে যদি একডুবে একটা
পানকৌড়ী ধরে এনে অর রক্ত সানির মাথায় দিতে পারে, তাহলে সানি
গল হবে।
গফুর। ভাল হবে ?
সাখি। গুণীর কথা কি মিথ্যে হয় ?
গফুর। আচ্ছা, তবে দেখি ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
সাখি।
দৃশ্য।
তৃতীয়
উদ্যানের এক প্রান্তস্থ কুপ-সন্নিহিত লকুঞ্জ।
কুঞ্জ-অভ্যন্তরে ফুয়নাশা।
ফয়নাশা। আচ্ছা বিপদে পড়লুম বাবা—এ মামদো মাদীর হাত
থেকে বাঁচবাে কেমন করে। খােদা! নসীবে শেষে এই লিখেছিলে ?
ও বাবা এই যে একটা মাদো রে!
(উদ্যান রক্ষকের প্রবেশ )
উদ্যানরক্ষক। কে তুমি ?
ফয়। এমন ঝোপের ভেতর ঘাপটি মেরে আছি তবু নিস্তার
নেই বাবা।
পরদেশী।
কে তুমি ?
ফয়। আমি একটা কাছিম বাবা, নদীর জল থেকে উঠে এখানে
পড়ে একটু হাওয়া খাচ্ছি।
অমন মানুষের মত চেহারা কখনও কাছিম হয় ?
ফয়। হয় বাবা, হয় ; কাড়ে পড়লে শুধু কাছিম কেন? কত রকম
উ-রক্ষ। কাছিমে কি কথা কয় ?
ফয়। রাজকর দেবার ভয়ে কথা কয়না ; তবে বিপদে পড়লে
কয়ে ফেলে।
উ-রক্ষ। কাছিমের কি অমন লম্বা গোঁফ হয় ?
ফয়। তা বুঝি জাননা? রমজানের অন্ধকার রাত্রিতে যে কাছিম
জন্মায়, তার গোঁফ বেরােয়।
উ-রক্ষ। বেরােয় বুঝি ?
ফয়। দেখে বুঝছাে না ?
উ-ক্ষ। তুমি কাপচো কেন?
ফয়। জলের জানােয়ার কি না! দূষিত হাওয়া গায়ে লেগে গেছে।
উ-রক্ষ। তাহলে তুমি ঠিক ব’লচোতুমি কাছিম ?
ফয়। স্থলের জানােয়ারের মত জলের জাননায়ার মিথ্যে কথা
বলে না।
উর। গ হলে, কাছিম ভাই, আমি চম—
ফয়। যাবে বৈ কি, যাও যাও ; আর দেরী ক’বনা।
উ-রক্ষ। হ্যা, এখন নিশ্চিন্ত হয়ে চলুম, জাননা ত মনিবের কি কড়া
হুকুম, এ বাগানে কোন পাে মানুষের আসবার যােটি নেই, এলে তার
গর্দানা, আর আমার গর্দানা অমনি কুচ করে কেটে নেবে।
ফয়। বুঝেছি বুঝেছি বড় শক্ত হুকুম—এখন সরে পড়।
প্রথম অক।
উ-রক্ষ। হ্যা, চলুম চলুম (গমনােত)
(নােয়াজেস, সেরিণা ও সানিয়ার প্রবেশ)
নােয়া। কৈ কোথায় ?
সানি। ঐ যে, ঐ ঝোপটায়।
নােয়া । (উদ্যান রক্ষকের প্রতি) ওখানে একটা লােককে দেখলি ?
উ-রক্ষ। না হুজুর
নােয়া। কেউ নেই ?
উ-ক্ষ। আছে একটা কাছিম।
নােয়া। কাছিম ?
উ-রক্ষ। সে তাই বলে।
নােয়। কাছিমে কথা কইলে ?
উ-ক্ষ। আমার পেড়াপীড়িতেই কইলেনইলে রাজকর দেবায়
ভয়ে কয় না।
নােয়। তুই কি ব’ছি?
উ-রক্ষ। বান্দা মিথ্যা বলেনি।
সেরিণা। কচ্ছপ ?
সে কচ্ছপ কি না, তা জানি না। তবে সে যে কাছিম,
তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সানি। দেখাতে পারি!
উ-রক্ষ। ঐ যে ( অগ্রসর হইয়া) কাছিম ভায়া—ও কাছিম ভায়া---
ফয়। (স্বগত) এই সেরেছে—
নােয়া। ফয়নাশা-
ফয়। ও বাবা, এযে নাম ধরে ডাকে রে! খােদা !
নােয়া। ফয়নাশা বেরিয়ে আয়-
ফয়।
ও বাবা রে ! এইবার গেলুম, আমায় যে বেরুতে বলে রে।
১৪
পরদেশী
{ যখন মানুষ বলে চিনেছে, না বেরুলে টেনে বার কৰ্ব্বে, বেরুই যা নসীবে
আছে, হােক। ( বাহিরে আসিয়া কঁপিতে কঁপিতে) দোহাই বাবা
মামদো চাচা, আমার নাম ফয়নাশা নয়, আমি কাছিম বাবা-
নােয়া। (ফয়নাশার হস্ত ধরিয়া) ফয়নাশা-
ফয়। গেছি-গেছি গেছি কাছিম ধরে কি হবে বাবা, ছেড়ে
দাও না, জলের জীব আমি জলে চলে যাচ্ছি (কম্পন)
নােয়া। কঁপছিস্ কেন ফয়নাশা, এ যে আমি--
ফয়। সেই বুঝেই ত কঁপছি মামদো চাচা •
নােয়া। চোখ খুলে দেথনা আমি কে ?
ফয়। বাপরে, চোখ বুজেই যা দেখছি তাই যথেষ্ট, আর দগ্ধে মোেনা
বাবা, যা ক’ৰ্বার করে ফেল। (কম্পন )
নোয়া। কপিনি ফনাশা, এই আমি তােকে ছেড়ে দিচ্ছি,
ফয়। এই ভন ( দৌড়িয়া পলায়ন )
সেরিণা। কি ভীত প্রকৃতি।
নােয়া। আহাম্মুকের কাণ্ডখানা দেখুন না।
সেরিণ। অগ্রসর হােন দেখি কোথায় গমন করে।
[ নােয়জেস ও সেরিনার প্রস্থান।
সানি। ভয়টাও পুরুষের একটা সৌন্দর্য্য বেশ উপভােগ করা
যায়।
.সানিয়ার গীত।
ননা গুণ পুরুষজাতির ফোটাতে রূপের বাহার।
উচা কুলবালা মজে দেরী সয়না আর।
ছড়ায়ে হাসির রাশি, ক'রে নেয় চরণ দাসী,
ভীত করে চিত চুরি, পায়ে প্রেমের ফঁাসি ;
মূখ হয়ে বৃক্ষ তারে বাঁধে মন সে অবলার।
প্রথম অঙ্ক। । = (এক হস্তে একখানা ছুরিকা ও অপর হস্তে একটী পানকৌড়ী লইয়া ) (গফুরের প্রবেশ ) গফুর। এই দেখ, সানি, তাের জন্যে একদৌড়ে নদীতে গিয়ে এক- ডুবে বে এই পানকৌড়ীটে ধরে নিয়ে এসেছি -এখন ব’স, এর, রক্ত তাের মাথায় ঢেলে দিই। সানি। ম মুখপােড়া, কি বলছিস তুই ? গফুর। তুই এখনও বুঝলিনি সানি, আমি যে তাের জন্যে মরিচি~- তাের ব্যামাে শুনে আমি কি থাক্তে পারি ? সানি। আমার ব্যামাে কি রে ? গফুর। তাই যদি বুঝবি, তাহলে আর লােকে মাথার ব্যামে ব’বে কেন ? মাথার ব্যানাে কি নিজে বােঝা যায়—উপসর্গ দেখে পাঁচ জনে ধরে ফেলে। সানি। তুই কি বলছিস্? গফুর। ওই ওটাও একটা উপসর্গ, লােকে কিছু বলে বােঝা যায় । নে এখন ব’স- সানি। দূরহ মুখপােড়া গফুর। ওষুধ মাথায় দে সানি, নইলে আমি জীবহত্যে হবাে-- সানি। আমার ব্যামাে তােকে কে বলে ? গফুর। সে কথা ব’তে বারণ করেছে- সানি। আমায় ব’বিনি ? এই বুঝি তাের ভালবাসা ? গফুর। সাথি কম ধরালেও আমি তােকে ব’বাে, তুই আগে মাথা সানি। বটে, আর ব’তে হবেনা—তুই যা আমি শুতে চাইনে- গফুর। হা আল্লা একি ক’ল্লে ? [ প্রস্থান।
১৬
পরদেশী।
১০০%
চতুর্থ দৃশ্য।
উদ্যানের অপরাংশ।
বাদীগণের প্রবেশ ও গীত।
রােগে ধরেছে।
কোকার বাতিক হওয়া একেবারে মাথায় চ'ড়েছে।
ৰাত বিকার আর সান্নিপাত, হকিম তবু পায় গাে ধাত,
এবােগে নারী হাড়ে হকিম ভরে—বলে প্রেমে অরেছে,
ভাব দফা সেরেছে।
(ফয়নাশার প্রবেশ)
ফয়। কি ফ্যাসাদেই পড়লুম বাবা-পালিয়ে যাই কোথায় ? যে
দিকে যাচ্ছি সেই দিকেই মাদো মাদীর ঝাঁক। ও বাবা, এই এক
শালা !
(গফুরের প্রবেশ )
গফুর। তাইতাে ছুড়ীটের জন্যে কি শেষ কালটায় পাগল হবে !
কম।
এ ব্যাটা দেখচি পীরিতে পড়েছে। আমার দিকে নজরও
দেয়নি, আস্তে আস্তে গা ঢাকা দিইগমনােত)
গফুর। (স্বগত) এযে সেই পরদেশী মিঞার বাহী! (হাত ধরিয়া)
কি দোন্ত কোথায় চলেছ ?
ফয়। এইরে! (কম্পন)
গফুর। একি দোস্ত কঁপচো কেন? চোক বুজে কেন দোস্ত?
ফয়। মিগীর ব্যানাে দোস্ত-মিগীর ব্যানাে। ছেড়ে দাও, ছেড়ে
দাও।
গফুর। (স্বগত) একে বলে একটা উপায় হয় না ?. পরদেশী
লােক আমার সঙ্গে চালাকী কৰ্তে পাব্বে না বলেই" বােধ হয়। দেখি
বলে প্রকাশ্যে ) দোস্ত আমি বড় বিপদে পড়েছি-
প্রথম অঞ্চ। ১৭ WWW aaaaanwww.nawwand ফয়। আমার বিপদ আবার তােমার চেয়েও বেশী দোস্ত,তােমাৰ চেয়েও বেশী গফুর। আমার জান যায়- ফয়। আমার গেছে বল্লেই হয়- গফুর। তােমার কি হয়েছে দোস্ত ? ফয়। তােমারই বল না গফুর। আমি পীরিতে পড়েছি- ফয়। আমি পীড়নে পড়েছি গফুর। একটা উপায় ঠাওরাতে পার দোস্ত ? ফয়। নিজের উপায় ঠাওরাতেই পাচ্ছিনে, তা তােমার উপায়! ছেড়ে দাওনা দোস্ত, কথা কাটাকাটি ত অনেক হ’ল। ফয়। তাহলে ব্যাপারটা সক্ষেপে বল, আমি উপায়টাও চটক’রে দি- গফুর। এখনও কাপচো ? ফয়। মজ্জাগত রােগের ওই লক্ষণ, নাও কাজের কথা কও গফুর। ঐ সানিয়া বলে যে সাজাদী সেরিনার একটা বাঁদী আছে দানতাে ? ফয়। হঁা জানি ; তুমি তারই পীরিতে পড়েছ ? তুমি তাকে চাও, আর সে তােমায় চায় না—এই ব্যাপার ত? গফুর। হ্যা তাই- ফয়। এক কাজ কর, একদিন প্রাণের কথা তাকে খুলে বলে যে, যদি রাজী না হয়, তার কাণটা কি নাকটা কামড়ে দাও--মেয়ে মানুষ বশ কব্বার ঐ একমাত্র দাওয়াই-যাও সরে পড়– গফুর। সে চটবে না ? ফয়। চট্র যাে কি—একেবারে তােমার পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়বে যাও-- ২
১৮
পরদেশী।
•••••
গফুর। বড় বাধিত হলুম দোস্ত-সেলাম।
ফয়। হা হা যাও--
[ উভয়ের উভয় দিকে প্রস্থান
পঞ্চম দৃশ্য।
জেরিণার গীত।
নিমিষের দেখা চোখে চোখে আমি আপনা হারায়ে ফেলেছি।
কহিতে গিয়ে কথার কথ-মম গুলি ! সিয়াছি ।
কি ছিল লুকান নয়নে, অমিয় মধুর বচনে ;
আমি দেখিয়া শুনিয়া ভাবিয়া ভাবিয়া কি জানি কি যেন হয়েছি ;
সে যে গো আমার সাধনা কামনা তাকে প্রাণ মন সপেছি ।
(নােয়াজেসের প্রবেশ )
জেরিণা। একি আপনি এখানে ?
নােয়া । তটিনী-সৈকতে বসে সান্ধ্য প্রকৃতির শোভা নিরীক্ষণ
ক’চ্ছিলুম, অকস্মাৎ সান্ধ্য সমারণ ফোন বেহেস্তের সুধা সঙ্গীত ব’য়ে
এনে কর্ণকুহরে তামৃত রাশি ঢেলে দিলে, উন্মত্ত হয়ে সঙ্গীতের উৎপত্তি
স্থান অনুসন্ধান করতে এই দিকে ছুটে এলুম; একি আপনি লজ্জায় মুখ
নীচু ক’লেন যে? মধুরকে মধুর ব’লে তার প্রশংসা করা হয় না—এতে
লজ্জার কারণ কি আছে ? আমিই যদি লজ্জার কারণ হই—আমি
চলে যাচ্ছি।
জেরিণা। সে কি! যাচ্ছেন কেন, আমিত আপনাকে যেতে বলিনি
(সানিয়ার অন্তরালে প্রবেশ
সানি। এই যে দুটীতে আবার এক সঙ্গে জুটেছেন, দেখি কতদূর
গড়ায়। আবার সাজাদীকে খবর দিতে হবে।
নােয়। সুন্দরি ?
প্রথম অঙ্ক। ""~.. জেরিণা। কি ব’চেন! আমি সুন্দরী—ছি-ছি—ও কথা বলবেন -অপাত্রে অমন অযােগ্য সম্ভাষণ করূবেন না ! নােয়াজ। যার চোক আছে, সে আমার কথা মিথ্যা ব’বে না। জেরিণা। (স্বগত) সৌন্দৰ্য্য কোথায় ? আমাতে না পরদেশীতে ? বুঝি চঁদের জোছনা নিংড়ে নিয়ে এরূপ তৈরী হয়েছে- নােয়জ। সুন্দরি- জেরিণ। থামলেন কেন ? কি ব’তে যাচ্ছিলেন, বলুন (হস্ত ধারণ) সানি। (অন্তরাল হইতে) এ যে বেশ জমে যাচ্ছে, আর দেরী করা হবে না, সাজাদীকে বলিগে--- [ প্রস্থান। জেরিণা। চুপ করে রইলেন যে ? নােয়া। প্রাণের একটা অতি উচ্চ কক্ষা---বামন হয়ে চলা ধারণের সাধ- জেরিণা। মার মন আছে, তার আকাঙ্ক্ষাও আছে, এটাত নূতন কথা নয় পরদেশী । নােনা। পূর্ণ হ’বার আশা না থাকলে, তেমন অাকাঙ্ক্ষা হয় যন্ত্রণা, নয় মৃত্যুর কারণ হয়-- জেরিণা। এরূপ ক্ষেত্রে তাহলে সকলকেই জ্যোতি শিখতে হয় -- নেয়া। বুঝেছি সাজাদী আমারই হা’র— সেরিণা। (অন্তরাল হইতে সানি মিথ্যাবাদিনী নয়—জেরিণা আমার সর্বস্ব অপহরণােদ্যতা। নােয়া। কার পদশব্দ শুনতে পাচ্ছি--সাজদী–আমি চ’লুম- [ নােয়াজেসের প্রস্থান। (সেরিণার প্রবেশ জেরিণা। এযে সেরিণা—অন্তরাল হতে কি আমাদের দেখেছে ? সেরিণা। জেরিণা!
পরদেশ।
জেরিণা। ভগ্নি ?
সেরিণা। এ কিরূপ বিসদৃশ আচরণ তােমার ? জান তুমি কে ?
জেরিণা। জানি, কিন্তু বিসদৃশ আচরণটা কি দেখলে?
সেরিণা।
একজন অজ্ঞাত কুলশীল যুবকের সহিত নির্জন আলাপ
কি সম্রাটু-নন্দিনীর যােগ্য আচরণ ?
জেরিণা।
সে বিষয়ের বিচার ক’বার অধিকার তােমার নেই।
সেরিণা। ক্রোধের বশীভূত হয়ে অপরের ম্যাদার দিকে লক্ষ্য
করিতে বিস্মৃত হয়ােনা জোরণা।
জেরিণা। সমানে সমানে সে দাবী চলে না।
সেরিণা। কিন্তু তােমার আশা পূরণের পথে অনেক বাধা-
জেরিণা। মানুষ আশা ক’বার আগেই সে ভাবনা ভেবে থাকে।
সেরিণা। তবে তুমি কৃতসঙ্কল্প ?
জেরিণা। বুঝেছি সেরিণা, তুমিও তাকে ভালবেসেছ—তাহলে
- আমিও বলে রাখি, জেরিণা তােমা অপেক্ষা হীন প্রতিদ্বন্দ্বিনী নয়।
সেরিণা। বেশ, কাৰ্য্যেই পরিচয় হােক।
[ উভয়ের প্রস্থান
{ ফয়নাশার প্রবেশ)
ফয়নাশা। ভয়ে ভক্তি, না ভাবে ভক্তি ঝোপে ঝাপে আর
কঁহাতক লুকিয়ে কাটাবে! অনেক ভেবে চিন্তে এই সাখী মামদোর
সঙ্গে একটু আলাপ করেছি ; বেটীর চাল চলন দেখে যা বুঝছি বেটী এ
মামদো গুষ্ঠীর মধ্যে 'অহিংসা ব্রতধারিণী ফকিরণী। বেটীও আমায় পথে
বসাবার যােগাড়ে আছে, গ্র’কে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিযেন অন্য
মামদো মাদীর নজর থেকে লুকিয়ে রাখে। বেটী তাই কৰ্ত্তে রাজী
হয়েছে, তবুওত বাবা ধোকা যাচ্ছেনা! চব্বিশ ঘণ্টাই বুকটা ধড়াস্ ধড়াস
ক’চ্ছে। ঐ যে বেট এনিক আ’চে-বেটী চোখের আড়ালে থাকলে
তবু থাকি ভাল।
প্রথম অক।
(সাখিয়ার প্রবেশ )
সাখিয়া। এই যে প্রিয়তম! তুমি এখানে? আমি খুঁজে খুঁজে
সারা !
সাখিয়া।
ফয়নাশা। একটু সরে দাঁড়িয়ে কথা কও না প্রিয়তমে, আমার
বুকটা যে ধড়াস ধড়াস্ ক’চ্ছে এত খোঁজা খুজি কেন ? ভু
লেগেছে বুঝি?
এ প্রাণের ভুক কবে মিটবে প্রিয়তম !
ফয়শা। এই বুঝি তােমার প্রতিজ্ঞা রাখা প্রিয়তমে? দু’দিন না
যেতেই নােলায় জল স’রূললা ?
সাথিয়া। একি কথা বলচো প্রিয়তম, আমি যে তােমায় ভালবাসি।
ফয়নাশা। খুব বেসো, একটু দূরে থেকেই বেসসা, বেশী কাছে
ঘেসাে না।
সাখিয়া। আবার ঐ কপা।
ফয়নাশা। ব্যথা ত বুঝলে না প্রেয়সি, তুমি কাছে এলেই আমার
কেমন জ্বর আসে।
সাথিয়া আমায় দেখলেই অমন কাপাে কেন ?
ফয়নাশা। কি জান, লােক জন দেখলেই আমার অম্নি কাপা
অভ্যেস।
সাখিয়া।
যে যাকে ভাল বাসে তাকে দেখলে কি ভয় হয় ?—আমি
বাঘও নই—ভালুকও নুই যে গপ করে গিলে ফেল্বাে।
ফয়নাশা। ওরে বাবারে!
উভয়ের গীত।
সাখি। আমি বাঘ নই যে গিলবাে তােমায় গল্প করে।
তবে কেন আঁতকে উঠ জড় সড় মাের ভরে। (ও প্রিয়তম)
বাঘ হ'লেও ত ছিল ভাল মরতুম তবু লড়াই লড়ে।
এৰে মামলায় মাসী ও প্রেয়সী মুখ দেখে প্রাণ শিহরে।
২২ পরদেশী সাখি। কেন মুখখানি কি ভাল নয় ? এমন কুন্দ দন্ত নধর অধর সদা হাস্য ময়! ফ। যেন খাখর বাটীতে নারিকেলকুচি দেখলেই মনে হয় । সাখি। এমন বাশীর মতন নাকচী, ঠোট দুটি রাঙা টুকটুকে। ফয়। বাহুাব দেখে মনে হঃ বেন কে ধরিয়ে রেখেছে টিকে। সাখি। টুলটুলে এমন গাল দুখানি, চোক দুটী এমন টুলটুলে, তায় মধুর চাহনি মধুর হাসি কত জনার মন'ভুলে। ফয়। সে চোখ যদি থাকত আমার, থম্ তোমার পারতলে। এখন দোহাই তােমার রেহাই দাও- যাই ঘরের ছেলে ঘরে ফিয়ে। [ ফয়নাশার প্রস্থান। ( সানিয়ার প্রবেশ) একজন অজানা অচেনা পুরুষের সঙ্গে গােপনে আলাপ- চারি! দাড়াও সাজাদীকে বলে দিচ্ছি। সাখি। গ তে তাের অত গায়ের জ্বালা কেন! বুঝেছি তােরও তার উপর চোখ পড়েছে। সানি। কেন পড়বে না ? সে ত আর কারও কেনা সম্পত্তি নয় ? সাখি। কেনা না হলেও কিতে কতক্ষণ? সানি। নিলেমে সানিও ডাতে ছাড়বে না। সাখি। হাসলি সানি, হাসালি। সানি। হাসি কান্নাটা শেষ দেখে, এখন থেকে অত ঢলাঢলি কেন? সাখি। তাই দেখিস্ লাে; তাই দেখি। [ প্রস্থান । সানি। বেশ। (সেরির প্রবেশ) সেরিণা। শুনেছিস্ সানি, জেরিণাও পরদেশীর অনুরাগিণী—আমার প্রণয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিনী। E
প্রথম অঙ্ক।
২৩
সানি। হা হা হা বেশত দুবােনে বেশ লড়াই চলবে।
সেরিণা। একে আমি নিজের যন্ত্রণায় অস্থির, তার উপর তুই অশ্লীল
গ্রাম্য ভাষা প্রয়ােগ করে আমার যন্ত্রণার উপর দ্বিগুণ যন্ত্রণা দিতে কি
কিঞ্চিৎ মাত্রও দ্বিধা কচ্ছি না ? ধিক্ তােকে !
(মােবারিকের প্রবেশ)
মােবারিক। জরে—বক্তারে—নজুম্ সাজাদি জরে-বক্তারে—
নজুম্। এই দেখ সাজাদি আমি কতবড় একটা সাধুভাষা শিখে
এসেছি ।
সেরিণা। কাণ্ড-জ্ঞানহীন অপদার্থ দূরে অপহৃত হও প্রস্থান
মােবা। কাল সমস্ত দিন ধরে এত বড় একটা সাধু ভাষা, মুখস্থ
কলুম, তবু নসীব খুলাে না।
(গফুরের প্রবেশ)
গফুর। সানি আমি এসেছি, শুধু আসিনি দাওয়াই শিখে এসেছি।
ভালয় ভালয় রাজী হও, ভাল ; নইলে দাওয়াই ইস্তেমাল কলে’রাজী
হতেই হবে।
সানি। দূর হ মুখপোড়া, আমি একে নিজের জ্বালায় অস্থির, তার
আবার জ্বালাতন কৰ্তে এল, দূর হ—
গফুর। তবে আর আমার দোষ নেই, আমি দাওয়াই দোব—
( সানিয়ার নাক কাণ কামড়াবার উদ্যোগ)
সানি। ওরে বাবা রে, একি রে, এ যে কামড়ালাে রে ! (পলায়ন)
এ যে পালালাে । দোস্তও ঠকালে।
মােবা। তাই তাে, গফুর এ কি হল !
গফুর। তাই তে, হুজুর এ কি হল!
২৪
পরদেশী।
মােবা। তুইও আমার মত দুঃখী আয় দুজনে গলা জড়িয়ে একটু
কাঁদি।
গফুর। তাই আসুন হুজুর ! উভয়ে গলাগলি করিয়া ক্রন্দন।
(পট পরিবর্তন)
(বাদীগণের প্রবেশ ও গীত )
প্রেমে বমি হবে সুখী বােঝ আগে প্রেমটা কি।
নইলে মুখােমুখী গলাধরি বসি কাদলে হবে কি?
প্রেম যদি করতে চাও, আপন প্রাণ বিলিয়ে দাও।
নইলে সাথে কাঁদো পায়ে ধরে বুঝবে শেষে সব ফাকি ।
ঘৃণা লজ্জা ভয়, তিনটী থাকতে নয়,
পাগল সেজে আকাশ পানে চাইলে কি হয়,
প্রেম খাঁটি সােনা খাদ মেশেনা চলে না তায় বুজরুকী।
যে জন যারে চায়, পায় কি সে তায়,
ধরি ধরি করে ফেরে ধরতে না পারে।
যখন মনে প্রাণে বাধন পড়ে
তখন প্রেম এসৌদেয় উকি।
(ভুপ)
০
aver • •••••••••••••••••••
দ্বিতীয়
অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
অলিন্দ।
সানিয়া ও মাঝি।
সানিয়া। যদি পারি ত পাঁচ শশা আসরফি, কাজ বেশী শক্ত নয়,
নৌকার তলার একখানা তক্তা আগ্ন করে রাখবি,—মাঝ দরিয়ায় গিয়ে
সে খানা এমন চালাকি করে খুলে দিবি, যেন কেউ টের না পায়।
মাঝি। এত আর যাকে তাকে খুন করা নয়—একেবারে জাতসাপ
নিয়ে খেলা,-ঘুণাক্ষরে টের পেলে আর গর্দানা থাকবে না
সানি। যখন সাজাদী সেরিণা বিবি এর ভেতরে আছে, তখন তাের
ভয় কি ? পানসী চড়ে দরিয়ায় হাওয়া খাওয়া জেরিণা বিবির নিত্য
অভ্যাস,-পানসী কি আর ডােবে না? তাের কোন চিন্তা নেই এতে
আর কেউ সন্দেহটী পৰ্য্যন্ত কৰ্বে না ।
মাঝি। তাইতো বিবি, আমার যেন ভরসা হয়েও হচ্ছে না। আচ্ছা
বিবি, তােমাদের ত মতলব শুধু জেরিণা বিবিকে নিয়ে ! ওতে আবার
সাখিয়া বিবিকে জড়াচ্ছ কেন?
২৬
পরদেশী।
?
সানি। সেটা বুঝতে পার্লিনি? যদি সাখিয়া সঙ্গে না থাকে, লােকের
মনে করে একটা সন্দেহ হতে পারে এটা যড়যন্ত্র ; সে থাকলে আর
সেটুকু হবে না, তাছাড়া শত্রুর শেষ করাই ভাল। ও বেঁচে থাকলে
ব্যাপারটা সহজে চাপা দেওয়া যাবে না ।
মাঝি। বুঝেছি, টাকা এনেছ ?
সানি। এই নে বায়না, কাজ শেষ করে এলে বাকী। কিন্তু খুব
সাবধান!
মাঝি। সেলাম বিবি, চলুম, কাজ হাসিল করে তবে ফিবো।
[ প্রস্থান
সানি। এক ঢিলে দুই পাখী মাৰ্বো, সাখী মনে করেছে ফয়নাশা
তার হবে। যখন মাঝ দরিয়ায় কবর হবে, তখন বুঝবি ফয়নাশা কার।
(সেরিণার প্রবেশ)
সেরিণা। কি হ’ল সানি ?
সানি। সব ঠিক্ ; সানিয়া যে কাজে হাত দেয়, সে কাজ কখনও
অপূর্ণ থাকে ?
সেরিণা। কিন্তু একেবারে হত্যা ক’বি।
সানি। নইলে যে নিজেকে হত্যা হতে হবে। পরদেশীর ঝোঁকটা
এখন ওরই উপর পড়েছে। বেঁচে থাকলে যে ঝোঁকটা যাবে, তা ত
মনে হয় না। তা ছাড়া ও শত্রুর শেষ করাই ভাল।
সেরিণা। এ বিষয়ে তাের বুদ্ধি অতীব প্রখরা। তাের সঙ্কল্পের বিরুদ্ধে
আমি কোন কথা বলা আবশ্যক বিবেচনা করিনা। তাহলে আজই ?
সানি। আজই গােধূলি লগ্নে শুভকাৰ্যটা সম্পন্ন করা হইবে—দেখ
সাজাদী, আমি সাধুভাষা শিখেছি।
সেরিণা। শিখবি বৈকি সানি অধ্যবসায়ে কি না হয়—এখন আয়।
[ উভয়ের প্রস্থান
দ্বিতীয় অঙ্ক। ২৭ ফয়। ( ফয়নাশার প্রবেশ) এ মামদো শালীর মতলব ত বেশ ভাল বলে বােধ হচ্ছে না। জেরিণা বিবি আর সাথিয়াকে মা’বার মতলব কেন? ওরা আছে বলে বােধ হয় আমাদের জবাই কর্তে পাচ্ছে না, তাই ওদের সরাবার চেষ্টা ক’চ্ছে ; কিন্তু মামদোরা কি জলে ডুবে মরে ? হয়ত এ মামদোর দেশের জলের অমি একটা গুণ আছে, তা যদি হয়, তা হলে আমিও এক চাল চালি। ঠিক হয়েছে। এই যে মামদো প্রেমিক আসছে, ওকে দিয়ে এদের মতলব ফাঁসাতে হবে। প্রেমের নেশায় মােলার জল শুকিয়ে গেছে বলেই একটু ভরসা। (মােবারিকের প্রবেশ ) মােবা। হা মার্জিত ভাষা। খােদা আমায় মার্জিত ভাষা শিখিয়ে দাও, মার্জিত ভাষা না শিখিলে যে সেরিণাকে পাবােনা। সেরিণা আমার হবে না—আমি দফেটে মরে যাবাে। ফয়। কি বাবা, মামদোর চাই, মুখ খানি যে শুকিয়ে আসি হয়ে গেছে? তােমাদের প্রেমের হিড়িত বড় কম নয় দেখচি ? মােবা। কি আর ব’র্বব মিঞা আমার কাঁদতে ইচ্ছে ক’চ্ছে। এস ভাই, আগে তমার গলা জড়িয়ে একটু কাঁদি। ফয়। সরে দাঁড়াও না চাই, নইলে এখনি আমায় পাতলা হতে হবে। তার চেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে যা মতলব দিই, শােন—আমার মতলব শুনলে তােমার প্রাণময়ী একেবারে তােমার শ্রীচরণের চুচি হয়ে যাবে। মােবা। মার্জিত ভাষা না শিখিলে কোন মতলবই খাটবে না। ফয়। তার জন্যে আর চিন্তা কি ? আমরা যে মার্জিত ভাষার দেশের লােক। সে দিন অত বড় একটা মার্জিত কথা শিখিয়ে দিলুম। মােবা। সেই জরে বক্তারে নজুম্ ত ? সে কথাটা শুনে মা’রতে বাকী রেখেছিল।
২৫ প । ফয়। তুমি তা হলে বলতে পারনি-ওটা ব’তে হবে জরেব- তারে-নজ,জুম অর্থাৎ তেটে কেটে গদী ঘীনা ধা। ঠিক তবলার বােলের মত, তবে সেটার মানে বােঝ’তে, যদি উচ্চারণই ঠিক না হ’ল বলে লাভ কি ? মােবা। বটে, আমি তা ত জানিনি- ফয়। জাননি—এইবার শেখ—আমরা মার্জিতভাষার দেশের লােক—আমি তােমায় গাদা গাদা মার্জিত ভাষা শেখাতে পারি দেখবে তমায় আর বিবির সাধ্যি সাধনা কৰ্ত্তে হবে না। মােবা। বটে-বটে-বটে! লিম্ দাও মিঞা, লিম্ দাও, আমি তােমার কেনা গােলাম’য়ে থাকবাে। ফয়। গােলাম হবার দরকার নেই: চাই, এই রকম মােলায়েম আচরণটা করলেই যথেষ্ট হবে। মােব। তাহলে তালি সুরু কর মিঞা। ফয়। আগে তাহলে আর একটা মাজ্জিত ভাষা লেখ—বল সখু—মার-এ-আস্তি—অর্থাৎ ক্ থুন্না একেবারে তবলার বােল - বল দেখি? মােবা। (বিকৃত ভাবে) সখু—মার-এ-আস্তি অর্থাৎ তা খুন্না ঠিক হয়েছে ? ফয়। কেয়াবাৎ—এমন না হলে সাগরে। নাও মুখস্থ করে ফেল। (মােবারিক কর্তৃক পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি) তােফা হয়েছে—এইবার যা পরামর্শ দিই কর। মােবা। কি বল- কয়। আজ ঠিক সন্ধ্যার সময় বাগানেরঘাটে একখানা পাসী থাকবে, যেখানা চড়ে সেরিবিবি সানিকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যাবে।
দ্বিতীয় অঙ্ক। : মােবা। সানি বেটী থাকলেত সুবিধা হবে না। সেরিণাকে একলা পেলে সুবিধা হবে কেন ? ফয়। আহা শােনই না—তুমি বােরখা পরে সানি সেজে সেই পাসীতে উঠে বসে থাকবে, তারপর সেরিবিবি তােমাদের চিন্তে না পেরে সেই পাসীতে উঠলে পাসী ছেড়ে দেবে। মাঝ দরিয়ায় গিয়ে প্রথমে আত্মহত্যা করবে বলে ভয় দেখাবে—তাতে যদি সম্মত না হয় তারপর মার্জিত ভাষা-রূপ নাগপাশে তােমার প্রণয়িনীকে আটে কাটে বেধে ফেলবে –ব, কেল্লা ফতে! পাবে ? মােবা। এ আর পাবাে না, খুব পাৰ্ব্বো- ফয়। দেখাে, যেন মাজ্জিত ভাষা ভুলােনা ? মােবা। কি ব’চো মিঞা, এই দেখনা সখুন—মা-এ-আস্তিন অর্থাৎ লক্ থুন্না তাকু–কেমন মনে আছে ত? ফয়। তােফা মনে আছে- মােবা।' তাহলে এখন আসি সেলাম। (সখুন মাএ আস্তিন পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করিতে করিতে প্রস্থান।) ফয়। স’রে পড়, সেলাম, ব্যস্ এইবার মামদো চাচাকে সেরিণা সাজাতে পা’রুলেইমামদো গুষ্ঠী একটু হাল্কা হয়। এই যে মেঘ না চাইতেই জল-এস দোস্ত এস- (গফুরের প্রবেশ) গফুর। যাও যাও - তােমার সঙ্গে আর কথা কইঝে না তুমি বড় ছােট লােক— এ কি বলচো দোস্ত আমি ঘােটলােক! কিসে দেখলে ? গফুর। যা মতলব দিয়েছিলে আমি নাক কামড়াতে গিয়ে একেবারে অপ্রস্তুত, বেটা চীৎকার করে পালালাে। ফয়। তা হলে তুমি কামড়াতে পারনি ? তা হলে আর আমার *-
৩০ ।
পরদেশী । .
দোষ কি বল ? কামড়ানাের পর যদি সে বশ না হত তাহলে আমার,
দোষ দিতে পাৰ্ত্তে।
গফুর। বটে। তা হলে মস্ত ভুল করে ফেলেছি দোস্ত ?
ফয়। করনি! এত বড় ভুল কেউ কখন করেনা।
গফুর। তা হলে উপায় ?
ফয়। আবার আমি তােমায় উপায় ব’লবাে? যা ব’লবাে তা তুমি ।
পার্ধেনা, অথচ আমার দোষ দেবে। তার চেয়ে কোন কথা না কওয়াই
ভাল, তাতে বরং দোস্তিটা থাকবে।
গফুর। রাগ করােনা দোস্ত, আমারই ভুল হয়েছে। মেহেরবাণী
করে একটা উপায় বলে দাও।
ফয়। না পারাে যেন আমার দোষ দিওনা।
গফুর। আমি কসম্ খেয়ে ব’চি, তােমার দোষ দেব না।
তা হলে আজ একটা সুযোগ আছে, সন্ধ্যার সময় সানিচুড়ি
সেরিণা বিবির সঙ্গে পার্সী চড়ে হাওয়া খেতে যাবে। সে পার্সীতে আগে
থাতে গিয়ে বসে থাকবে। তুমি সেরিণা বিবি সেজে বােরখায় মুখ
ঢেকে গিয়ে পাসীতে উঠবে। অমনি পানসী ছেড়ে দেবে। তারপর মাঝ
দরিয়ার গেলেই সানিকে ধরে তার নাকটা কি কাণটী--বুঝলে কি না?
গফুর। যদি পালায় ?
ফয়। মাঝ দরিয়ায় ঝাপিয়ে পালাবে মনে কচ্ছ নাকি ?
গফুর। ও তাও তত বটে। বেঁচে থাক দোস্ত বেঁচে থাকো।
( গীত )
৫
আজ মা দিয়া মিঞা মা দিয়া।
দিল পিয়ারা মিলনেকে আসান সলুক মিল, গিয়া।
তুম্ দোন্ত মেরা হে, তু খােয়াইস করােগে যাে-
জান দেনে ম্যায় তৈয়ার ই দেখো মতলব ক্যাদা দিয়া।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
AMA
গফুর।
তুমবড়া মেহেরব, তুম বড় মেহেরবান,
তায়া দোস্ত কাহা মিলেগা এয়াস। কদরূদান।
স্যায় জিন্দিগি ভর, গােলাম তেরা-মেরাজান তেরে লিয়ে।
মেরা দোস্তি মালুম হোগা আখের দেখিয়ে
চাচা! আখের দেখিয়ে।
{ উভয়ের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
3
(নদী সৈকতের উদ্যান বাটিকা, নদীতে একখানি পান্সী ।.
পালীতে মাঝি উপবিষ্ট )
(নারীবেশে মােবারিকের প্রবেশ)
মােবারিক। সখুন মার এ আস্তি অর্থাৎ তাক্ থুন্না তা।
(পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি) কায়দায় এনে ফেলেছি, আর ভাবনা নেই। এই যে
পাী ( নিকটে গিয়া ) এখন ও দেখছি সেরিণা আসেনি, ভালই হয়েছে,
আগে থাকতে উঠে বসে থাকি। (পার্সীতে উঠিয়া বসিল)
মাঝি। বােধ হচ্ছে এই সেই বাঁদাবেটী, এখনও সাজাদী আসেনি।
বাপ! গা টা কঁপচে, এতবড় একটা সয়তানি কাজ, কিন্তু পাঁচ শশা
আসরকি ! আর মাঝি গিরি কৰ্তে হবে না। সব ঠিক ঠাক করে রেখেছি
সাজাদি এলেই খেয়া মারি।
মােবা। সখুন মা এ আস্তি অর্থাৎ তাক্ থুন্না তাক্। (পুনঃ
পুনঃ আবৃত্তি করণ ) তাই লে এখনও আসচে না যে।
মাঝি। ঐ যে সাজাদী আচে তৈরী হই।
( নারী বেশে গফুরের প্রবেশ)
গফুর। এইবার দেখবাে সানি, তুই কেমন করে পালাস, এই যে
৩২
পরদেশ
winin
সানি পান্দীতে বসে আছে, এও দেখছি বােরখা পরে এসেছে। যাই
উঠে বসি। (উঠিয়া বসিল)
মাঝি। আর কেউ আসবে না সাজাদী! তাহলে পান্সী ছেড়ে দি?
যােবা। স্ত্রীকণ্ঠে) হ ছাড়বি বৈ কি। আর দেরী কচ্ছি কেন?
(মাঝি পার্শী ছাড়িয়া দিল)
নৌকা ছাড়িয়া বাদীগণের প্রবেশ ও গীত।
কিবা মনাের রাঙ্গা পুর ভাসে বলে।
আয় মােরা বাহি তরী রি কুতুহলে।
কালাে ফল কাল ফলেছে তুলে বিষ ঢেউ,
দেখি বেন ডুবিস নাকো বাচাতে নাই কেউ,
প্রেমের ঢেউ এ ধারা, করে নাকের জলে চোখের জলে।
প্রাণ নিয়ে টানাটানি হয় যে শেষ কালে।
[ প্রস্থান।
(পট পরিবর্তন।)
গফুর। (স্ত্রীকণ্ঠে) সানি।
মােবা। (স্ত্রীকণ্ঠে) কি সাজাদী
গফুর। (স্ত্রীকণ্ঠে) তুই কতক্ষণ বসে আছিস? কষ্ট হয় নি তাে।
মােবা। (স্ত্রীকণ্ঠে) আহা সাজাদী, তােমার জন্যে বসে থাকব না ত
আর কার জন্যে থাকব? তুমিই যে আমার সব (স্বগত) সখুন মাএ।
আস্তিন হু ঠিক মনে আছে।
গফুর। (স্বগত) আ মলল বেটীর প্রেমটা, কি সাজাদীকে গিয়ে
গড়াল নাকি। যা হােক অনেকটা ত এসে পড়েছি। এইবার দাওয়াইটা
পরখ করে দেখি। (স্ত্রীকণ্ঠে) সানি
মােবা। (স্বগত) কি সাজাদী।
গফুর। (স্ত্রীকণ্ঠে) ততকে, কাণে কাণে একটা কথা বলি শােন,
কাকেও বলিস নি।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
মােবা। (পূৰ্ব্ববৎ) আহা সাজাদী তােমার কথা নয়ত যেন মধু এক
বারুকাণে ঢকলে আবার বেরুবে ?
গফুর। (পূৰ্ব্ববৎ ) তবে শােন।
(গফুর। মােবারিকের কাণ, কামরাইয়া দিল, মােবারিক চীৎকার
করিয়া উঠিল এবং উভয়ে উভয়কে দেখিয়া বিস্মিত হইল)।
মাঝি। (স্বগত) এইবার তলা খুলে দিই।
(তথাকরণ ও জলে ঝম্প প্রদান )।
মােবারক। তাই সে কি করি গফুর ! (ইতস্ততঃ করণ )
জলে ঝাঁপিয়ে পড়ন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।
( উভয়ে জলে ঝম্প প্রদান )
(নােয়াজেসের প্রবেশ ।
নােয়া। তাইতাে জেরিণাতে এখানে নেই—ওকি জলে ডুবে উঠচে
ওটা কি। একটা মানুষ নয় ? মানুষই ত বটে; এম্নি ভাবে আমার প্রাণ
এরা একদিন বাঁচিয়েছিল। দেখি, যদি বাঁচাতে পারি।
(জলে ঝম্প প্রদান )
;
তৃতীয় দৃশ্য
হকিমের বাটী।
রােগগণের প্রবেশ ও গীত।
আমরা নুতন রোগে নূতন রোগী কল্পনা।
দেখে বাড়াবাড়ি তাড়াতাড়ি, এসেছি হকিম বাড়ী,
এ যাত্রা প্রাণটা বুঝি বাঁচে না।
১ম রােগী। আমার বেজায় রকম হাঁচি, গায়ে বসতে দেয় না মাছি, বাঁচি কিনা, বাঁচি
ফ্যাচ, কঁাচ, ফ্যাচে যেন কবুলে গৰু শিরটান।
৩৪
পরদেশী।
২াােেগ। আমার ঘুচে গেছে সখ, আমি কাসি খুক খুক খুক
দুঃখ দেথে বিবি আমার কথাটী কনা, তা প্রাতে ফর মা।
৩ রােগী। কাঁচা বয়সে প্রেমের ছিটে, বাত ধয়েছে গেটে গেটে
বিবি বেজায় খিট খিটে হায়! দেখেও দেখে না।
৪র্থ রােগী। আনি একটু খানি কালা, যেই ধান শুতে কান শুনি,
আমি পয়জারের ঠ্যাল,
পীটটে যেন বাসী ঘর, ঝাড় বহর সহে না।
এম রােগী। আমার হাই তোলাটাই রােগ থেকে থেকে তেউড়ে ওঠা বিষম কৰ্ম ভগ,
ধনুষ্টঙ্কার হলে শেষে আর ত আ'ম বাচবো না।
ষ্ট রোগী।
এমন ঢেকুর তােলে না ত কেউ ,
থাই না খাই পেট দস সদা হেউ কেউ।
উদরীর তোয় শেষে পটল তুলতে পাবো না।
৭ম রােগ। আমার চুলে মরা রােগ, উঠি হাটি দাড়াই বসি ফকীর বাবার যােগ,
নাকের কাছে ঝুলচে সিঙ্গে ফুকতে দেয়ী সইবে না।
৮ম রােগী। মি বমি সদাই করে গা, জল টুকু যে তলায় নাগাে বিষম ভাবনা।
এমি ধার কলে ওয়াক প্রাণটী বাকী থাকবে না।
ওগাে হকিম চাচা, মােদের মুলি হ'ল বাঁচা,
মরি যদি মামদো হবে তােমার বাড়ী ছাড়বেন।
[ প্রস্থান।
( সানিয়ার প্রশে)
সানি। (স্বগত) নিশ্চয়ই কেউ জেরিণা বিবিকে সাবধান করে দিয়েছে,
নৈলে বােজ বেড়াতে যায় কাল গেল না কেন? আর মাঝি বেটারই বা
কি আক্কেল, তুই ভাল করে না দেখেইবা নৌকা ছাড়লি কেন? যা ও
দিক্ দিয়ে আর কিছু হবেনা দেখছি। এখন সাজাদীর যুক্তিই ঠিক
জেরিণা বিবিকে দাওয়াই খাইয়ে তার রূপ নষ্ট করে দিতে হবে। তাহলে
পরদেশী আর তার দিকে ফিরেও চাইবে না। যখন সুরূপা যেচে সেধে
আসচে তখন কুরূপা কে চায়? ভালবাসা ফালবাসা সব কথার কথা। আমি
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩৫
তা হলে সাখিচুড়ীর করি কি? ভেবে দেখব। এখন যা কর্তে এসেছি,
করি। দাওয়াইটা সংগ্রহ করি। শুনেছি এই হকিমের কাছে এমন এক
দাওয়াই আছে যা খাবামাত্র মুখখানাকে একেবারে কালি মেয়ে দেয়।
প্রকাশ্যে ) ও হকিম সাহেব -হকিম সাহেব
হকিম। (গৃহাভ্যন্তর হইতে) কোন্ ফুকাতা হ্যায়।
সানি। মেহেরবানি করে একবার বাইরে এসেই দেখুন না।
( দ্বার খুলিয়া হকিমের প্রবেশ)
হকিম। ফমাইয়ে বিবি, ফরমাইয়ে।
সানি। বড় একটা জরুরী কাজের জন্য আজ আপনার শরণাগত
হয়েছি। এখন আপনার মেহের বাণীর উপর সমস্ত নির্ভর ক’চ্ছে।
হকিম। কেয়া কাম বিবি ফমাইয়ে, গােলাম হাজির।
সানি। একটু নিরিবিলি জায়গা না হলে ত ব’তে পারিনে।
হকিম। বহুত আচ্ছা, অরমে কোই হ্যায় নেহি অন্দরষে
আইয়ে।
(উভয়ের গৃহের মধ্যে প্রবেশ ও অপর দিক দিয়া সাখিয়ার প্রবেশ)
সাথিয়া। সানিছুড়ী এত সকালে বাদসার হকিম সাহেবের বাড়ী।
ব্যাপারটা কি। বাইরে কথা চলে না, অন্দরের ভেতর ফুসুর ফাসুর কর্তে
যাওয়া হল। নিশ্চয়ই কোন কুমতলব আছে। যাহােক্, একবার দেখি,
দৌড়টা কত! (অন্তরালে অবস্থান।
( হকিম ও সাখিয়ার বহিরাগমন)
হকিম। ইয়ে দাওয়াই লিজিয়ে বিবি, ঘােড়া সরবকা সাথ, পিল
দিজেয়ে ব্যস—বিবি একদম্ কাফ্রী বন্ যায়েগি।
সানি। বড়ই বাধিত হলুম হকিম সাহেব। এই নিন আপনার
ইনাম—সেলাম।
[ সানিয়ার প্রস্থান।
" পরদেশ। • * (সাখিয়ার প্রবেশ)। (সাখিয়াকে দেখিয়া হকিমের তাড়াতাড়ি মােহরের থলি লুকাইবার চেষ্টা ) সাখিয়া। ওকি হকিম সাহেব, ওটা লুকোচেন কি ? হকিম। (চমকিত হইয়া) ও কুচ, নেহি কুচ, নেহি, ও দাওয়াই। সাখিয়া। দাওয়াই কি আর থলিতে থাকে ? আমাকে লুকুচ্চেন কি ? আমাকে কি চিন্তে পাচ্ছেন না? সেই যে হারেমে যখন চিকিৎসা কর্তে গেছলেন, তখন আপনার সঙ্গে দেখা। পুরুষ এমনি নিষ্ঠুর বটে ; একবার দেখা দিয়ে প্রাণে আগুন জ্বেলে দিয়ে, এত শিগগির ভুলতে পুরুষ ছাড়া আর কেউ পারে না। হকিম। (স্বগত) ইয়ে কেয়া কইতি হ্যায়। প্রকাশ্যে সব ইয়াদ হ্যায়, বিবি, সব ইয়াদ হ্যায়, লেকিন ম্যায় গরিব। সাখিয়া। ভালবাসায় গরিব আমীর নেই হকিম সাহেব ? হকিম। কেঁও বিবি এ্যায়সা বাত কেঁও কহতি হাে ? সাখি। কি আর ব’বাে হকিম সাহেব, ঘরে আমার শত্রু, সানিয়া আমায় স্পষ্ট বলেছে “যদি তুই হকিম সাহেবের আশা ত্যাগ কর্তে না পারিস, তাহলে তাের মরণ আমার হাতে। হকিম। (স্বগত) সব উল্টা হােগিয়া তাে। আব, ম্যায় উকা মতলব সমঝ গিয়া হু। উও পহিলে যাে আয়া, উও জরুর দাওয়াই ইনিকো পিলায়েগি ( প্রকাশ্যে) বিবি ময় এক বড় কসুর কিয়া, উসকো ম্যয় এক দাওয়াই দিয়া আব, মালুম হুয়া উস্ দাওয়াই তুমরা ওয়াস্তে লেগিয়া । কুচ, পরােয়া নেই (গৃহমধ্যে প্রবেশ ও অবিলম্বে একটী মােক লইয়া পুনঃ প্রবেশ । ইয়ে দাওয়াই আপনে পা রাখাে আগর কোই সুরৎসে উও দাওয়াই তােমে পিলাইতে ইয়ে দাওয়াই পানিকে সাথ পিন ব্যস সব আচ্ছা হাে যায়েগা। লাখিয়া। আপনার বড় মেহেরবাণী। (স্বগত) যা ভাবনা গেল, দ্বিতীয় অঙ্ক। ৩৭ ( প্রকাশ্যে ) আচ্ছা হকিম সাহেব, এখন তবে আসি, সেলাম। মনে রাখবেন। হকিম। সেলাম (সাখিয়ার প্রস্থান) কেয়া তােফা ; এক সাথ রােপেয়া আউর আওরাৎ। [ প্রস্থান। (হকিমের বালক ভৃত্যদ্বয়ের প্রবেশ ও গীত ) ফুকে শিশ নয়কো আছে হকিম চাচার জমীগুলি। আস্ত মানুষ হজম করে বাকী রাখে গেঁফগুলি। লাথি জুতাে হজম করে গালাগালি কোন ছার- র আঁখি দেখে ভক্ত বকে কি বাহার ববির মুখ ঝামটা মন ভারি, শুকনাে আর সখ করি, হজম করে মেজাজ নরম বলে কোকিল কাকলী, শুনাে ধাতে সয়না যেটা সইতে পারে দাওয়াই গিলি। চতুর্থ দৃশ্য। নতাকুঞ্জ। জেরিণা। জেরিণা। তাইতাে একি হ’লল। বােজ, ঘুমথেকে উঠে সরবং খাই, আজও খেলুম--কিন্তু একি হলাে। এমন কদৰ্য রূপ হ’ল কেন—নিশ্চয়ই সরবতের সঙ্গে কেউ কিছু মিশিয়ে দিয়েছে, কি করি? পরদেশী আমায় অন্তরের সহিত ভালবাসেন। আমার রূপ দেখে তিনি ঘৃণা না ক’রূলেও, আমি ঘৃণায় তাঁর কাছে মুখ দেখাতে পা’রূববা না। তাকে দূর হতে। দেখবে—দূর হ’তে ভালবাম্বাে, তাঁর সংসর্গে থৈকে তায় সমস্ত জীবনটা বিষময় কর্তে পাৰ্বোনা। পরদেশী আমার জীবনে মরণে আমার,-এই সান্ত্বনাই আমার সুখ,-আমি স্বার্থ চাই না।
পরদেশী। . (নােয়াজেসের প্রবেশ তদ্দর্শনে জেরিণা অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিলেন) নােয়। জেরিণা, একি! মুখ ঢেকে রয়েছে কেন জেরিণা? জেরিণা। কিছু মনে কর না পরদেশী, লজ্জায় মুখ দেখাতে পা’বাে বলেই ঢেকে রেখেছি। নােয়া। লজ্জা, কিসের লজ্জা জেরিণা ? জেরিণা। আমি অতি কুৎসিতা - নােয়া। কুৎসি ! সুন্দরি কি ব’চো? বেহেস্তে এ সৌন্দৰ্য্য আছে কি না, জানি না—তবে পৃথিবীতে যে সৌন্দর্যের তুলনা হয় না, সেই অতুলনা সুন্দরী তুমি—তােমার মুখে আজ এ কি কথা জেরিণা? তােমার কথার অর্থ ত আমি কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। জেরিণ। সত্যই পরদেশী, আমি অতি কুৎসিতা। নােয়া। তুমি সুন্দরীই হও—আর কুৎসিতাই হও, তুমি আমার। অন্তরের সৌন্দর্যের কাছে বাহিরের রূপ? সে যে কাঞ্চনের তুলনায় কাচ! জেরিণা অবগুণ্ঠন উন্মােচন কর। জেরিণ। যদি মুখ দেখে আপনার ঘৃণা হয় ? নােরা। যে মুখচ্ছবি নিদ্রায় স্বপ্ন, স্বপ্নে শান্তি, জাগরণে তৃপ্তি, কল্প- নায় সুখ এনে দেয় তা দেখে ঘৃণা! জেরিণা তুমি কি উন্মাদিনী হয়েছ ? জেরিণা। আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখুন, আমি কত কুৎসিতা ( অবগুণ্ঠন উন্মােচন) নােয়া। কৈ প্রিয়তমে আমিত তােমার কিছু পরিবর্তন দেখছি না, দুনিয়ায় যদি কেউ আমার চোখ নিয়ে তােমায় দেখতে, তাহলে সে কেমন করে তােমায় কুৎসিত ব’লতাে, তা দেখ তুম। নােয়জেস তােমার অন্তরের সৌন্দর্য দেখে তােমার বাহিক রূপ দেখবার চোখ হারিয়েছে। লােকের চক্ষে তুমি যতই কুৎসিতা হও, এচক্ষে তুমি তার প্রাণময়ী ছবি। (হস্তধারণ) দ্বিতীয় অঙ্ক। ; সেরিণা। (অন্তরাল হইতে) এত কুৎসিতা, অথচ এত ভালবাসা। অসহ। [ প্রস্থান। জেরিণী। পরদেশী, পরদেশী ! কি ক’চ্ছেন আমার মত কুরূপার সংসর্গে সমস্তু জীবনটা বিষময় কৰ্বেন ; এ দুঃখ আমি কেমন করে সহ্য ক’ৰ্ব্ব । ( সরবতের গ্লাস লইয়া সাথিয়ার প্রবেশ ) সাখিয়া। তা কেন কৰ্তে হবে সাজাদী। তোমার এ নিঃস্বার্থ ভাল- বাসার কি একটুও পুরস্কার নেই? এই নাও প্রতিষেধক দাওয়াই এখনই খেয়ে ফেল। (বাদীগণের প্রবেশ ও গীত।) রূপের লাগিয়ে বেসেনাকে ভাল ভালবেসে সুখ পাবে না পাবে না। রূপম-নেশা ছুটে গেলে প্রাণে মিলনেতে সুখ হবে না হবে না। যৌবন হেরিয়ে যদি ভালবাসা, সে যে নিমেষের না পুরি। আশা। যৌবন ফুরাবে, ভালবাসা যাবে, বাঞ্ছত ফিরে চাবে না চাবে না। ধন বিনিময়ে প্রেমের কামনা, সে ত নহে প্রেম প্রেমের ছলনা, শুধু প্রাণ বিনিময়ে ভালবাসা বাসি, ধন দিলে প্রেম মেলেনা মেলেনা। নােয়া। এস জেরিণা, আমরা একটু নদীর দিকে যাই। উভয়ের প্রস্থান। পঞ্চম দৃশ্য। আরাম বাগান। (অপরূপ সাজে সজ্জিতা সেরিণার প্রবেশ) সেরিণা। (আপন অঙ্গ সৌষ্ঠব ও সাজ সজ্জার দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করিতে কবিতে) এরূপের নিকট জেরিণার রূপ ? যেন সদ্যঃ প্রস্ফুটিত ৪০ পরদেশী M গােলাপের তুলনায় ঘণ্টাকর্ণ কুসুম! (এমন সুশিক্ষিতের সম্মুখে এক অসভ্য অভব্য মুর্থিনী! যেমন মূর্তিমতী পরী সম্রাজ্ঞীর সমীপে আবিসিনিয়ার জঙ্গলের কাফ্রি রমণী ! দুনিয়ায় এমন পুরুষ কে আছে, যে এই শরদিন্দু- নিভাননার রূপ-রজ্জতে আকৃষ্ট না হয়? যে না হয়, সে মূখ অতি মূখ। শাখামৃগ যেমন মুক্তাহারের মর্ম জানে না, সেও তদ্রুপ কামিনীর কমনীয় রূপের মাধুৰ্য অনুভব কর্তে পারেনা। পরদেশী জেরিণার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে একটু ভাল বেসেছিল, এখন কুরূপা দেখেও ভালবাসে শুধু পূৰ্ব্বের নেশায় আমার এ ভুবন-মােহিনীরূপ দেখলে পরদেশী কি আর জেরিণার দিকে ফিরে চাইবে ? কখনই নয়। সে তাকে আঘ্রাত কুসুমের ন্যায় পদ- দলিত করে আমার চরণতলে লুটিয়ে পড়বে। আমার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ দেখে আমি নিজেই মােহিত হচ্ছি—পরদেশী ত পুরুষ। ৫ নােয়াজেসের প্রবেশ ও সেরিণাকে মুগ্ধনেত্রে দর্শন ) নােয়া। অতি সুন্দর। সেরিণা। এখন বলুন দেখি, কে সুন্দরী ? জেরিণা না আমি? এ রূপের তুলনায় জেরিপার রূপ কাফ্রি রমণীর মত নয় কি ? বলুন দেখি, এ সৌন্দৰ্য্য উপভােগ ক’ত্তে কি সাধ হয় না ? বলুন দেখি, যদি কেউ স্বেচ্ছায় এই রূপের ডালি আপনাকে উপহার দিতে আসে, আর বিনিময়ে একটু ভালবাসা চায়, তা হলে আপনি কি করেন ? নােয়া। কি করি! আতঙ্কে দূরে পালিয়ে যাই! সাজাদী রূপ- মূল্যে ভালবাসা কিতে চাও? এতক্ষণ বিস্ময়-বিমুগ্ধনেত্রে তােমার ঐ ভুবনমােহন রূপ দেখছিলুম-দেখলুম, ও রূপ নয়—জ্বলন্ত অগ্নিশিখা! দূরে থেকে দেখলে বড় মধুর, বড় তৃপ্তিকর। কাছে যাবার যাে নেই। স্পর্শ : করা দূরে থাক, কাছে গেলে উত্তাপে সৰ্ব্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে যাবে। আর ঐ রূপের অন্তরালে একটা জিনিষ লুকোনাে আছে, তােমরা তাকে বল হৃদয় ; আমি দেখছি, সে হৃদয় নয় বিষমাখা ছুরি! সাজাদী, দ্বিতীয় অঙ্ক। ৪১ তুমি জেরিণার রূপের তুলনা ক’চ্ছে ? সে রূপ কখন দেখবার মত দেখােনি তাই নিন্দা ক’চ্ছে। সেরূপ জ্যোত্মার মত সুন্দর-মলয়ের মত স্নিগ্ধ ! তাতে অগ্নির মত দাহিকা শক্তি নেই। আবার তার অভ্যন্তরের বস্তুটী যে কি সুন্দর, তা তােমায় কি ব’ল্ব! বেহেস্তে সে সৌন্দৰ্য্য নেই,তার উপমা দিতে ভাষার শক্তি নেই,—সে পবিত্র শান্তিময়, স্বর্গীয়। সাজাদী, গােস্তাকী মার্জনা কৰ্বেন,জেনে রাখুন, রূপের ফাঁদে মানুষে পড়ে না, শুধু পশুতে পড়ে। সেরি। (স্বগত) এত অপমান! এত অবজ্ঞা ! সম্রাট-নন্দিনীর অযাচিত প্রেমে এত হেনস্তা !( প্রকাশ্যে ) পরদেশী, এখনও বিবেচনা কর, কি ক’চ্ছাে বুঝতে পাচ্ছেনা। এখনও ভাল করে বিবেচনা করে উত্তর দাও। নােয়া। সাহাজাদী, উত্তর পেয়েছ—তবে যদি আবার শুতে চাও, শােনন। গর্বিতা, নারী, আমায় রূপের ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করনা, আমি মানুষ। ( গমনােস্থত) • সেরি। অপেক্ষা কর। নােয়া। প্রয়ােজন ? সেরি। তুমি আমার বন্দী- নােয়া ! কি অপরাধে ? সেরি। সম্রাটু-নন্দিনী সে কৈফিয়ৎ তােমাকে দেবে না। দিতে হয় সম্রাটের কাছে দেবে—কে আছিস্? (দুইজন খােজার প্রবেশ) বন্দীকর- (জেরিণার প্রবেশ) জেরিণা। খবরদার,-সেরিণা এত দিন তুমি আমার যে শত্রুতা করে এসেছ, মনে করূলে তােমারই সুখশয্যা হ’তে ঐ কারাগারে। আসুন পরদেশী-নােয়াজেসের হাত ধরিয়া প্রস্থান) [ অন্যদিক দিয়া খােজাদ্বয়ের প্রস্থান।
৪২ পরদেশী। (সানিয়ার প্রবেশ), সেরি। তুই এসেছিস ভালই হয়েছে, তােকেই আমি চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ! আমাদের উদ্দেশ্য কেউ গােপনে অবগত হয়েছে। সানি। দুটো গােবেচারার প্রাণ গেছ লাে আর কি ? সেরি। সানি, একে আমি পদাহ ভুজঙ্গিনীর ন্যায় মৰ্ম্মযাতনায় অস্থির, তার উপর তুই ভাষার শ্লীলতা নষ্ট ক’ছিস ?, পুনরায় উপায় উদ্ভাবন কর--অন্য উপায় না হয় হত্যা,যে আমার প্রণয়ে প্রতিদ্বন্দিনী তার মৃত্যুই শ্রেয়ঃ-অসহ নিতান্ত অসহ। সানি। যদি এতই অসহ্য হয় তাহলে গভীর রাত্রে যখন ঘুমুবে বুকে ছুরি বসিয়ে দিলেই হবে। সেরি। কে দেবে? সানি। এ কাজ বাইরের লােকের দ্বারা হবে না-যদি ভাষার হিড়িটা একটু বন্ধ করে একটু মুখের ভালবাসা জানাতে পারে- মােবারিক তােমার জন্যে সব কর্ডে পারে—আর যদি ধরা পড়ে সেই যাবে। সেরি। আমার জন্য নিরীহ বেচারার প্রাণ যাবে ? সানি। জ্বালাতনের হাত থেকে ত বাঁচবে সেরি। (চিন্তা করিয়া) ঠিক বলেছিস, আবশ্যক হয় আত্মরক্ষার জন্য তাকে ধরিয়ে দিতে হবে। একটু প্রেমের অভিনয় প্রয়ােজন, কেমন ? সানি। হ্যা, তাহলে তাকে ডেকে আনি। আর যেতে হ’লনা, ঐ যে তােমার প্রেমিক নাগর এইদিকেই আসছেন। আমি চঞ্জুম, তােমাদের প্রেমের পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়াবােনা। [ প্রস্থান। সাথি। ( নেপথ্যে) বেশ ষড়যন্ত্র চলেছে দেখছি যে-ভাগ্যে এই- দিকে এসেছিলুম-খােদ, তােমার অশেষ করুণা ! আর একটু থাকি। (লুকাইত হওন ) .
দ্বিতীয় অঙ্ক।
|
(সখুন মার এ আস্তি পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করিতে করিতে
মােবারিকের প্রবেশ )
মােবা। সাজাদী, এইবার গাদা গাদা সাধুভাষা নাও—সেদিন
সেটার উচ্চারণ ভুল হয়েছিল-তাও ঠিক করে নিয়েছি।
আর একটা
নূতন
শিখেছি। মার্জিত ভাষার দেশের একজন লােক পেয়েছি, সে আমায়
বােজ বােজ শেখাবে বলেছে, গাদা গাদা শিখবাে-
সেরি। (স্বগত) অপদার্থ (প্রকাশ্যে ) কি শিখেছ প্রিয়তম ?
মােবা। (স্বগত) বেঁচে থাকো দোন্ত—তবু এখনও বলিনি
শুষে বিবি, শুবে—কি শিখেছি শুবে ?
সেরিণা। বল প্রিয়তম, আমি শােনবার জন্য অতীব উৎকন্ঠিতা
মােবা। আবার উৎকণ্ঠা হচ্চে। বেঁচে থাকো দোস্ত বেঁচে থাকো।
ব’লবাে? না আর একটু দম দেব ? আগে পুরােনটা বলি ; না দুটোই
বলি (প্রকাশ্যে ) শােন :বিবি এই জরে-ব-রে • নজুম- অর্থাৎ
তেরে কেটে গদী ঘিনা ধা।
সেরিণা। (স্বগত) অকাল কুম্মাণ্ড! ( প্রকাশ্যে) আহা কর্ণে
যেন মধুবৃষ্টি হল।
মােবা। (স্বগত) বেঁচে থাকো বন্ধু ! (প্রকাশ্যে ) এতো পুরােনাে,
নূতনটা শুলে একেবারে মধুর দরিয়ায় নাকানিচোবানি ! শােন বিবি
সধুন-মার-এ-আস্তি অর্থাৎ তাক্ থুন্না তা কেমন ?
সেরি। (স্বগত) জাহান্নমে যাও। (প্রকাশ্যে) সত্যই তাই
প্রিয়তম ; আর শিখেছ ?
মােবা। আর শিখিনি বটে, তবে গাদা গাদা:শিখবাে, সেকি এদেশের
মানুষ! (স্বগত) সেদিন যদি পাসীখানা না ভুবত, আর বিবি যদি
থাকত, তা হলে ত সেই দিনই পােয়াবারাে হত।
সেরি। আচ্ছা মােবারিক তুমি আমায় ভালবাসাে?
৪8 পরদেশী। মােবা। বাসি না ? অতি ভয়ঙ্কর ভালবাসি, মরতে পারি বিবি, তােমার জন্যে মরতে পারি সেরি। সত্য তাই পার ? মােবা। দেখ (কটিদেশ হইতে ছুরিকা বাহির করিয়া নিজ বক্ষে মারিতে উদ্যত, সেরিণার বাধা দেওন) সেরি। থাক্ বুঝেছি। মােবা। দাড়াও বিবি, তমার পায়ের তলায় একবার গড়াগড়ি দিই। সেরি। ছি! প্রিয়তম, ওকি ক'ৰ্ত্তে আছে ! তুমি যে আমার সর্বস্ব মােবারিক- মােবা। অ-মেরা কলিজে। সেরি। (স্বগত) নিতান্ত অসহ, কিন্তু কৰ্তব্য! ( প্রকাশ্যে ) প্রিয়তম, একটা অনুরােধ রাখবে ? মােবা। বল। সেরি। দেখ প্রিয়তম, এরাজ্যের তুমি রাজা, আমি রাণী। পিতার দেহ ভগ্ন, কিন্তু জেরিণ আমাদের ঐশ্বর্যের অর্ধেকের অংশীদার। তােমাকে বঞ্চিত করে তাকে অর্ধেক অংশ দিতে হবে, এই চিন্তা আমায় বড় উদ্বিগ্ন করেছে। আমার এ উদ্বেগ দূর ক'ৰ্তে পারে প্রিয়তম। মােঝ। এ আর বেশী কথা কি, তােমার অনুমতি পেলে, আমি আজই তাকে দুনিয়া থেকে সরাতে পারি। সেরি। তা যদি পারাে প্রিয়তম, তা হলে আর কি বলবাে। মােবা। আর কিছু বলতে হবে না বিবি, আমি আজই শেষ । ক'ৰ্বো। সেরি। তা হলে আবার কখন দেখা হবে ? মােবা। কাজ শেষ হলে। এখন আসি বিবি। [ প্রস্থান। সেরি। ঠিক হয়েছে, এ পার্কে। সানিয়া বড় বুদ্ধিমতী। এই যে
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৫
।
সানিয়া (সানিয়ার প্রবেশ) সানিয়া, তাের বুদ্ধির প্রশংসা না করে
থাকতে পাচ্ছি না।
সানি। রাজী হয়েছ ত ?
সেরি। অতি সহজেই, এখন আয়, হাতে অনেক কাজ।
সানি। তুমি চল, গফুরের সঙ্গে একবার দেখা করে আমি এখনি
আ’সচি। (সেরিনার প্রস্থান) গােফয়ােকে হাত করে নিজের মতলবটা
হাসিল কৰ্ত্তে হবে। ধরা পড়ে, ছোঁড়া মৰ্বে—তখন দেখা যাবে, ঐ যে
আছে। (গফুরের প্রবেশ) প্রিয়তম! প্রিয়তম! এতক্ষণ কোথায়
ছিলে? তােমাকে দেখতে না পেয়ে আমার প্রাণ যে এতক্ষণ কি কচ্ছিল,
তা তােমাকে কি করে বােঝাব নিষ্ঠুর। (হস্তধারণ )
গফুর। (স্বগত) তাই তাে, এ বলে কি! দাওয়াইটাত দেখছি আচ্ছা
ঝাঁঝালাে, শুধু ওকে মনে করে হুজুরের কাণ কামড়ালুম, তাইতেই এতটা
যাক বাবা, কাজ ফতে। এখন সহজে ধরা দিচ্ছি না, একটু
খেলিয়ে নিই, বেটী আমাকে কম নাকালটা ক’বেছে ?
সানি। প্রিয়তম! প্রিয়তম !
গফুর। (মুখ ফিরাইয়া) এখন ঠ্যালা বােঝ, এ্যাদ্দিন খােসামােদ
করিয়েছ—এখন খােদমােদ কর।
সানি। গফুর প্রিয়তম! আর নিষ্ঠুর হ’য়ােনা।
গফুর। এ্যাদ্দিন যে নাকের জলে চোখের জলে করেছ চঁাদ।
সানি। প্রিয়তম! তুমি যে ব’তে, তুমি আমার ভালবাসে।
গফুর। তা’ত বাতুম্ এখনও বাসি কিন্তু তুমি কি আমায় কম
যন্ত্রণাটা দিয়েছ !
সানি। সে সব কথা ভুলে যাও প্রিয়তম, আমায় মার্জনা কর।
গফুর। যাক, এর উপর আর কথা চলে না। বিবি সাহেব, এখন,
আপােষে সব মিটমাটু। এখন একখানা গান শােনাও--
গড়াল!
* ।
পরদেশী।
*
সানি। তােমায় গান শােনাবাে না? আমি শোনাবাে, বাদীদের
ডেকে শােনাবাে--
সানিয়ার গীত।
তােমায় শােনাবাে বঁধু গান।
তুমি এক কামড়ে মায়েছ কেড়ে নিয়ে মন প্রাণ।
ধৰিব খাম্বাজ ঝিঝিট রাগিণ, মুখ বাদানি যেমন বাঘিনী,
তিনের আড়িতে কাপাবো মেদিনী হানি নয়ন বাণ ।
গফুর। মেরেছে বিবি মেরেছে একেবারে দফা সেরেছ।
সানি। এখনি হয়েছে কি প্রিয়তম-এখনও বাদীদের গান বাকী।
আচ্ছা প্রিয়তম, বাঁদীদের গান শােনার আগে একটা অনুরােধ কৰ্ত্তে
পারি কি ?
গফুর। অনুরােধ ব’চো কি বিবি, আদেশ বল—আর একটা কেন
দুশশা আদেশ কর—গােলাম হাজির।
সানি। ছি ও কথা বলতে নেই—প্রিয়তম, তােমার মত রত্ন লাভ
বােধ হয় আমার নসীবে সইবে না--
গফুর। কেন বিবি, কেন ?
সানি। আগে আমি তােমায় চাইতুমনা বটে, সাখি চাইতাে—এখনও
চায়—সে গুণ জানে, এখন যদি সে তােমায় গুণ করে তােমায় বশ
করে, আমি জানে মারা যাবে।
গফুর। আমি ত তাকে চাই না।
সানি। গুণ কৰূলেই চাইতে হবে, এই আমার হাল দেখেই বােঝনা
আগে কি আমি তােমায় চাইতুম ?
গফুর। তা বটে, তাহলে কি কর্তে বল ?
সানি। শত্রুর শেষ করাই ভাল, নইলে আমি তােমায় পেয়ে হারাতে
পাৰ্বোনা।
}
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৭
গফুর। বেশ কথা, আজই নাও, কাল সকালে শুবে সাখি দুনিয়া
থেকে সরেছে।
সাখি। (অন্তরাল হইতে) খােদার রাজত্বে মানুষ যা মনে করে,
সব সময় তা হয় না।
[ প্রস্থান।
সানি। বড় বাধিত হলুম প্রিয়তম, আজ তােমায় পেয়ে আমার যে
কি আনন্দ হচ্ছে, তা আর এক মুখে বলে উঠতে পাচ্ছিনে। ওরে বাদীরে
আজ আনন্দের দিনে তােরা কোথায় ? আয়, নাচ গা—আমােদ কর।
(বাদীগণের প্রবেশ ও গীত
ছুটা হায় দিল হামার তেরে পিছে পিয়ারা।
মেরে পিয়ারা হারে পিয়ার ।
চাদিনী রাতিয়া ইয়া উল করা,
সওয়ায় তেরে সবহি ধেয়া,
কলিজাকি রােশনী তুহি হে দিল পিয়ারা,
মেরে পিয়ারা হারে পিয়ারা।
খামুশ, রহনা এ বড় মুকিল, ঘড়ি ঘড়ি ঘড়ি ধড়ক দিল ;
গােয়ে ধরি, মার কাটারি, টুটাও না দিল হামার ?
মেরে পিয়ারা হয়ে পি
-
t
ষষ্ঠ
দৃশ্য।
জেরিণা নিদ্রিতা।
জেরিনা। (নিদ্রাভঙ্গে পরদেশী পরদেশী, কৈ কেউ নেই, তবে
কি স্বপ্ন! আজ আমার প্রাণটা এমন কচ্চে কেন ? গাটা যেন কি একটা
আশঙ্কায় ছম ছম্ ক’চ্ছে (সাখিয়ার প্রবেশ) সাখি, তুই এ সময় ?
সাখি। আমি সন্ধ্যা থেকে তােমায় খুঁজচি, জোর নসীব, তাই
সময় এখানে দেখতে পেলুম, সাজাদী পালিয়ে এসে
৪৮
পরদেশী।
.
সেরি। কেন ?
সাখি। ষড়যন্ত্র, তােমাকে আমাকে হত্যা ক’ব্বার ষড়যন্ত্র !
জেরি। কি ব’ছস্?
সাখি। ব’লছি ঠিক দেরী ক’রনা, আমার সঙ্গে এসে ; এখনি
হাতে হাতে দেখতে পাবে—
জেরি। বুঝি সেরিণার ষড়যন্ত্র !
সাখি। হঁ্যা, চলে এসাে
জেরি। কিন্তু তকে হত্যা করিবার উদ্দেশ্য ?
সাখি। উদ্দেশ্য আছে, এখন চলে এস, সময়ে ব’বাে-
জেরি। না সাখি, অসম্ভব
সাখি। সেদিন হাওয়া খেতে যেতে দিইনি, গেলে কি হতে এখন
বুঝতে পারছ তাে ?
জেরি। তাও কি সম্ভব ?
সাধি। সম্ভব অসম্ভব এখনই হাতে হাতে দেখতে পাবে ; এসাে
হলে এসো
জেরি। আমি সেরিণাকে মুখে শাসিয়ে ছিলুম বটে, কিছু করিনি ; সে
কচ্ছে কেন?
সাখি। তুমি যা চেয়েছিলে তা পেয়েছ বা পাবে, কিন্তু তার তা
পাবার আশাটুকুও নেই। সে জন্যে যা কিছু কৰ্বার আবশ্যক তা
তােমার নেই, তার আছে।
জেরি। বটে-
সাখি। এসসা, চলে এসাে
[ উভয়ের প্রস্থান।
(কিয়ৎক্ষণ পরে জেরিণার পােষাকে সজ্জিত একটী প্রতিমূৰ্ত্তি লইয়া
সাখিয়ার পুনঃপ্রবেশ।)
সাথি। জেরিণা বিবিকে একটা হাতে হাতে প্রমাণ না দিলে সে
দ্বিতীয় অঙ্ক।
89,
কখনও বিশাস কৰ্বে না। মােবারিক বা গফুরের মত দুজন কাণ্ডজ্ঞান
শূন্য উন্মাদের চক্ষে ধুলাে দিতে বেশী মেহনত কৰ্ত্তে হবে না। একটা
নিজের বিছানায় রেখে এসেছি, আর একটা সাজাদীর বিছানায় শুইয়ে
রাখি। (প্রতিমূর্তি পালঙ্কে রাখিয়া) এখন এই পাশের ঘরে গিয়ে
সাজাদীর কাছে বসে, মৃত্যুর আশাপথ চেয়ে থাকি। [ প্রস্থান।
(ধীরে ধীরে মােবারিকের প্রবেশ)
মােবা। ঘাের অন্ধকার! গাটা কেমন ছ ছ করছে। যা কর্তে
এসেছি নেহাত সােজা কাজ নয়, আর ওদিকে ভাবতে গেলে সম্রাট
নন্দিনী সেরিণাকে লাভ করাও নেহাত সােজা নয়। মার্জিত ভাষাও
শেখা চাই—আবার এই রকম এক আধটী কাজও করা চাই। পা দুটো
আবার এই সময় কাপতে সুরু করলে। যা থাকে নসীবে এগুই। বেশ
ঘুমুচ্ছে, এই সুযােগে দিই বসিয়ে, দোব? দুরছাই, হাতটা আবার কাঁপছে,
দিই বসিয়ে প্রতিমূৰ্ত্তির বক্ষে ছুরিকাঘাত) আর ওদিকে তাকাবাে না
ছুরি খানা থাক্, তুলবাে না, রক্তে দরিয়া হয়ে যাবে, পালাই- [ প্রস্থান।
( ধীরে ধীরে সেরিণার প্রবেশ )
সেরিণা। এইত জেরিণার কক্ষ।
যেন মৃতের মত নিস্তব্ধ। ঐ
না জেরিণা শু’য়ে, বক্ষে আমূল বিদ্ধ ছুরিকা ! হা-হা-হা এই বার
প্রতিদ্বন্দিনী! পরদেশী কার ?
(জেরিণার প্রবেশ)
জেরিণা। পরদেশী আমার
সেরিণা। সয়তানী সয়তাণী। সানিয়া সানিয়া [ বে প্রস্থান।
(সাখিয়ার প্রবেশ)
সাখিয়া। কি সাজাদী এখন বিশ্বাস হ’ল ?
জেরিণা। সাখিয়া, তাের ঋণ কখনও শুধতে পাৰ্বো না।
৪
পরদেশী।
।
সাখিয়া। তােমার মরণটা তাে দেখলে এখন আমার মরণটা দেখবে
এসাে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
( ধীরে ধীরে সানিয়ার প্রবেশ )
সানিয়া। এই যে মােবারিক দিব্বি ছুরিখানা জেরিণা বিবির বুকে
আমূল বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে, গফরাে এখনাে ফিলাে না কেন?
(প্রতি মূর্তির কাটা মুণ্ড লইয়া গফুরের প্রবেশ
গফুর। এই যে বিবি, তুমি এতদূর এসেছ—এই দেখ কাজ শেষ
করে এসেছি।
সানিয়া। তুই আমায় সত্তি ভালবাসি গফুর, দেখি মুণ্ডটা ?
( সাখিয়ার প্রবেশ )
সাখিয়া। আর দেখতে হবে না ও আমারই মুণ্ড-কাটা মুণ্ড
লইয়া) সাজাদী দেখবে এসসা, আমার কাটা মুণ্ড দেখবে এসাে।
সানি। এা একি! অন্ধ কি করেছি—এ যে মাটী !
গফুর। এ সেকি বিবি, তাহলে যে সব মাটী ? [ সকলের প্রস্থান।
বাদীগণের প্রবেশ ও
গত।
সৰ মাটী সব মাটী ।
দেখ হল কেমন সং মাটি।
অন যতই বােন ঘামিয়ে মাথা খাটবে না চালাকিটী।
আশায় বােনা জাল, জাল কলে নাজেহাল,
আপন জালে জড়িয়ে হ’ল যেন শুটী পােকাটা।
করতে গিয়ে এক, হয়ে গেল আর,
ওলট পালট এমনি ধারা ব্যাপার দুনিয়ার,
যে বুঝতে জানে বুঝে .দখে খোদার নাড়া কলকাটী ।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
শান্তিনিকেতন।
নােয়জেস ও জেরিণা ।
(বাদীগণের প্রবেশ ও গীত)
সুন্দর ধরণী সুন্দর তটিনী, সুন্দর মলয়বায়।
সুন্দর কমলে সুন্দর হাসি, সুন্দর বিহগ গায়।
সুন্দর কপােত কপােত পাশে, মুখােমুখী চেয়ে প্রেম আবেশে,
চিত্রিত প্রজাপতি, মধু মরাল-গতি সুন্দরী ঢলে সুন্দর গায়।
সুন্দরী দামিনী সুন্দর জলদলে, শিখি শিখিনী নাচে মুখে তালে তালে,
সুরে সুরে মিলন সুন্দর কেনা বল সুন্দর চায় ।
নােয়া। জেরিণা, তােমারি এ শান্তিনিকেতন সত্যই ঐ নামের
যােগ্য। তুমি জগতের সমস্ত সৌন্দর্যের তিল তিল করে নিয়ে এই
শান্তিনিকেতন নির্মাণ করেছে। প্রকৃতিও তােমার কাছে হার মেনেছে।
জেরি। এত সুন্দর শুধু তুমি আছ বলে, প্রতি পুষ্প হ’তে ভ্রমর গুঞ্জন,
তরু শাখায় পাখীর কুজন, তােমার আদর-মাথা প্রেমপূর্ণ সম্ভাষণের
পরদেশী।
র
প্রতিধ্বনি এনে দিচ্ছে। তাই এই শান্তিনিকেতন এত মধুর এত
তৃপ্তিকর, এত শান্তিময় হয়েছে।
নােয়া। তােমর নারী জাতি, হােটকে এত বড় কর্তে পারে, তবে
পুরুষকে বাধ্য হয়ে হার মানতেই হবে, কেননা যার সৌন্দর্যের কাছে
সৌন্দর্য্যের রাণী প্রকৃতি সুন্দরী লজ্জায় ম্রিয়মাণা, সে যদি জোর করে আর
এক জনকে শ্রেষ্ঠ কৰ্তে চায়, তবে ব্যাকরণ মতে অতিশয়ােক্তি অলঙ্কার
এসে দাড়ায়।
জেরি। আপনার ব্যাকরণে ত খুব ব্যুৎপত্তি দেখছি।
নােয়। হবে না ? যাঁর ভগ্নী ব্যাকরণ সঙ্গত কথা ভিন্ন অন্য কথা
কইতেই জানে না, তাঁর কাছ থেকে যদি ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তি না হবে ত
হবে কোথায় ?
জেরি। তর্কবাগীশকে তর্কে হারানাে আমার কৰ্ম্ম নয়। এখন
ওসব কথা ছেড়ে দাও—আচ্ছা ফয়নাশার কি আজও ভয় গেল না? বেশ
লক্ষ্য করে দেখেছি, ও সাখীকে আর ততটা ভয় করে না। তবে অন্য
লােককে দেখলে ভয়ে তেমি কাঁপতে থাকে।
নােয়া। সাখীকে যে ভয় করে না, তার বােধ হয় একটু মানে
আছে।
জেরি। আমারও তাই মনে হয়—একটু মানে আছে। ফয়শাকে
আমার বেশ ভাল লাগে, সে যেমন ভীতু আবার তেমনি সরল ! ঐ দেখ না
আসছে যেন কত সশঙ্কিত।
(ফনাশার প্রবেশ)
নােয়া। কি রে ফয়নাশা—এদিক ওদিক কি দেখছিস ?
ফয়। যে রাজ্যেতে এসেছেন হুজুর, এখানে আর নিশ্চিন্ত হয়ে পথ
চলবার ঘােট নেই। সমস্ত দিন আড়ালে একরকম থাকি ভাল, সন্ধ্যার
ঝোঁকে একটু বেরুই—অমি পড়বিত পড় তারই সামনে ?
৫
তৃতীয় অঙ্ক। ৩ । এ ? নােয়া। কার সামনেরে ? ফয়। যাকে সব চেয়ে বেশী ভয় করি। নােয়া। সব চেয়ে বেশী ভয় করি কাকে ফয়শা? ফয়। ঐ সানি মামীকে, বাপ, বেটীর চেহারাখানা দেখলেই আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। জেরি। আর সাখীকে বুঝি মােটেই ভয় করিসূনে। ফয়। -ভয় আবার করিনে, করি তবে অতটা নয়। জেরি। কেন? ফয়। বেটী কসম খেয়ে বলেছে, যে সে আমার উপর মেহেরবাণী করে অহিংসা ব্রত নিয়েছে। জেরি। হঠাৎ তাের উপর তার এতটা মেহেরবাণী কিসে হল। ফর। বােধ হয় আমার দুঃখ দেখে। এমামদো গুষ্ঠীর মধ্যে দেখছি ঐ বেটীর মনটা একটু সরল। জেরি। তা হলে তার দিকে তাের একটু ফয়। (বাধাদিয়া) হুজুর আমি এখন চলুম, একটু সাবধানে থাকবেন। ঐ সানি মামদী তার মনিবের সঙ্গে ফুস ফুস করে কি বলছিল—আমায় দেখে থেমে গেল—তাদের মুখ দেখে মনে হ’ল আবার কোন নুতন মুতলব আঁটছে। [ ফয়শার প্রস্থান। জেরি। আবার নূতন মতলব ! না আর সহ কৰ্বো না, এত দিন তােমার অনুরােধে কিছু করিনি। কাল প্রাতেই আমি সম্রাটের কাছে আবেদন কৰ্বো, বল এবার আর আপত্তি কৰ্বে না। নােয়া। কোন আপত্তি নেই। সত্য জেরিণা, মানুষে আর কত সইতে পারে ? পাঁচবার বিপদে ফেলবার চেষ্টা কৰ্ত্তে কৰ্ত্তে একবার সত্যই বিপদে ফেলবে। তুমি সম্রাটকে নিজের অভিপ্রায় জানাও; ভগ্নীর নামে অভিযােগ করে তাকে বিপদে ফেলে না।
৫৪ পরদেশী t জেরি। (স্বগত) তুমি এত মহৎ ? (প্রকাশ্যে ) বেশ যা বলছে। তাই কৰ্বো। নােয়। বেশ! এখন ভাবী কৰ্তব্য ভবিষ্যতে কোলে গচ্ছিত রেখে বর্তমানের সদ্ব্যবহার কর,তােমার বীণাবিনিন্দিত মধুর কণ্ঠে একখানি গান শােনাও। জেরি। শুনলে যখন তুমি সুখী হও, তখন আর আমার শােনাতে আপত্তি কি? গীত। ওগাে জীবন মণ সাথি। তােমারই কারণ হৃদয়-আসন দেখ হে রেখেছি পাতি। মম হৃদয়-গগন-রবি ওগো বাঞ্ছিত, মম পূর্ণ-প্রেম-বারিধি দেখ তােমা তরে সখা সঞ্চিত,- কর রঞ্জিত নব আলােকে, মাতাও হর্ষ পুলকে- (ওগাে) চড়ায়ে বিমল ভাতি। (অনতি দূরে সােলেমান ও সেরিনার প্রবেশ) সেরি। ঐ দেখুন পিতা, আমার অনুযােগ সত্য কি মিথ্যা--- নােয়া। জেরিণা-সম্রাট। জেরি। এ-( সােলেমান ও সের্ণাি নিকটে আসিলেন) স্লোলে। ব্যভিচারিণী, তাের এই কাজ? জেরি। পিতা। সােলে। চুপ কর, তাের মুখে এ সম্ভাষণ শুনূতে আমার স্বণা বােধ হচ্চে। কে আছিস? (দুইজন রক্ষীর প্রবেশ) সয়তানটাকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ কর, কাল এর প্রাণদণ্ড হবে, ঘাতক দ্বারা হত্যা করাই সয়তানের দুস্কৃতির যােগ্যদণ্ড। জেরি। পিত, এর কোন অপরাধ নেই, অপরাধী আমি। বিনা অপরাধে একে দণ্ড দেবেন না—দণ্ড দিতে হয় আমাকে দিন- সােলে। চুপ কর সয়তানী! বিচারের ভার সম্রাটের, তাের নয়। ২
তৃতীয় অঙ্ক ।
যা নিয়ে যা, আর সেরিণা, তােমার কুলটা ভগ্নীকে হারামের খােজা প্রহরী
দিয়ে নজরবন্দী রেখাে।
[ প্রস্থান।
জেরি। খােদা এ কি কল্পে।.
নােয়া। আক্ষেপ করাে না জেরিণা, এ মৃত্যু আমার সুখমৃত্যু।
[ একদিক দিয়া রক্ষীর সহ নােয়জেস ও অন্যদিক দিয়া সেরিণ ও
[ জেরিণার প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
পথ।
(বেগে ফয়নাশার প্রবেশ )
ফয়নাশা। ওরে বাবারে-গেছি, বেটী ধরে ফেলেছেরে--কেন এমন
বেমৎকায় বেরুলুমরে (পতন }।
( সানিয়ার প্রবেশ।)
সানিয়া। আ’মর মিসে এখানে পড়ে। ফনাশা—ফয়নাশা।
ফয়নাশা। (স্বগত) চুপ করে চোখ বুজে পড়ে থাকি বাবা,
বেটি হাজার ডাকুক সাড়া দেবোনা, বেটি তাহলেই মনে কৰ্ব্বে হোঁচট
খেয়ে পড়ে মরে গেছে।
সানি। ফয়নাশা—ফয়না-~-আমর সাড়াও নেই শব্দও নেই,
মিনসে ম’লল নাকি ?
ফয়। (স্বগত) তাই মনে করে সরে পড় না বাবা-
সানি। (পরীক্ষা করিয়া) নিশ্বেস ত পড়ছে—এর কি মীগীর
ব্যামাে আছে নাকি? কিন্তু মীগীতে ত হাত পা ছােড়—প্রথমটা চুপ
করে পড়ে থাকে বটে কিন্তু-(ফয়নাশা হাত পা ছুড়িতে লাগিল) ও মা
পরদেশী।
কৰ্বো।
হাত পা ছুড়চে যে—তাহলেত এ নিশ্চয়ই মীগী! আহা বেচারা
এম্নি করে মরে যাবে—একটু জল এনে মুখে চোখে দিই। [ প্রস্থান।
ফয়। (উঠিয়া) বাপ, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম। হুজুরের সম্বন্ধে একটা
দুঃসংবাদ শুনে, কথাটা সত্তি কি না সন্ধান নিতে এলুম, মাঝে থেকে এই
বিপদ! কিন্তু সন্ধানটা নিতেই হবে, যতটা পাবদা গা ঢাকা হয়ে চেষ্টা
[ প্রস্থান ।
(জল লইয়া সানিয়ার প্রবেশ)
সানি। ও মা! মিসের ভিটকিলেমী-দেখ দিকি, চোখে ধূলাে
দিয়ে স’রেছে। একেই ত বলি রসিকতা—আর এই জন্যেই ত আমি
ওকে চাই।
( সাখিয়ার প্রবেশ)
সাখিন্না। আর এই জন্যেই তােমার মুখে দেবাে ছাই।
সানি। কি তাের যত বড় মুখ তত বড় কথা। আমার সঙ্গে
লাগতে এসেছিস্?
সাখিয়া। কেন লাগবে না ? তাের ভয়ে নাকি ? তাের মনিবও
একটিকে পেটে পুরেছেন। এটীকেও তাের আস্ত গেলবার ইচ্ছে না কি?
সেটি হচ্ছে না—তাের চোখরাঙ্গানী কোন ছার, আমি বাদসাকেও ভয়
করিনে—দুসয়তানীতে মিলে সাজাদীর এতবড় সৰ্ব্বনাশটা করেছি বলে,
মনে করিসনে সাথির কোন যােগ্যতা নেই; দেখিস, যে আগুন জেলেছি
সেই আগুনে তােদের আলিয়ে পুড়িয়ে জাহান্নামে দোব।
সানি। ছােট মুখে বড় কথা শুনে হাসি পায়।
বেঙে লাথি মারে যেন সাপের মাথায়।
হা - হা-হা-হা-হাসালি সাখি হাসালি। যার যত শক্তি, যার
যত বিদ্যে বুদ্ধি তা এক আঁচড়েই বােঝা গেছে। বলি এতই যদি ঘােগ্যতা
ত মনিবকে আর মনিবের সেই তিনিটিকে বাঁচা।
;
। তৃতীয় অঙ্ক। ৫৭ সাখি। সে জন্যে তাের মাথাব্যথা কেন? আমার যােগ্য থাকে আমি বাচাবাে, তােরা তো তোদের কাজ করেছি। : সানি। বলি গুমাের ত ভেঙ্গেছে। গীত। সানি। বড় মটু মটাচ্ছিলি যে, গুমােরে মট মটাচ্ছিলি যে। এখন ভাঙ্গলো মাের দেখলি চেয়ে গুগলি চোখ দিয়ে। পাখি। আমার খামাের তুই ভাবি? মিছে ডডবানী তাের। হাতের পাঁচটা কেড়ে নিয়ে করবে বাজী তাের, থােত মুখ হলে ভোতা মৰি তখন আপাশাষে। সানি। মুখের কথায় হক্কা পঞ্জা হয় না খেলার বাজীতে। তাের গােমড়া মুখে ঝড় মারি ধিক্ তাের কাজীতে। সাখি। চালতা গালীর রূপের বড়াই ক্ষান্ত দাও গাে রূপসী, চোখ আছে যার বলবে দেখে, মানুষ কি মামদোর মাসী। দেখনা তবে ঝাড় বহর চুললামুখী চোখ চেয়ে। সাখি। এই ঝাড়ুর বহুর সামলা না দেখি তুই কেমন মেয়ে। (ফয়নাশার প্রবেশ) ফয়। লেগে—লেগে মামদো বংশ এমনি করেই নির্ধ্বংশ হােক। আমাদেরও হাড়ে একটু বাতাস লাগুক। যাই এখন হুজুরের কি দশা হােল দেখিগে। [ প্রস্থান। সানি। * - তৃতীয় দৃশ্য। কারাকক্ষ। মােয়াসে। নােয়া। কি আশ্চর্য্য পরিবর্তন, পারস্যসম্রাটপুত্র সাজাদা নােয়াজেস মহম্মদ আজ এক ঘৃণ্য অভিযােগে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে বন্দী।
পরদেশী। ? ? কাল ঘাতকের হস্তে তার জঘন্যভাবে মৃত্যু! কি সুন্দর পরিণাম। এর জন্য আর চিন্তা কেন ? নিজের জন্য কোন চিন্তা নেই, শুধু এক। জনের ভাবনা ভাবতে প্রাণ বড় অস্থির হয়ে উঠছে। সে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, আর আমি তার কিছু কন্ট্রে পান্নুম না! এ সময় যদি তার একটা উপকার কর্তে পাণ্ডুম! জানি না আমার জন্য আজ তার কি নির্যাতন হচ্ছে। না, অসহ্য নিতান্ত অসহ। ( ধীরে ধীরে সেরিণার প্রবেশ) একি! এযে রমণী । এ গভীর নিশীথে কে তুমি রমণী ? সেরিনা। আমায় কি আবার নূতন করে পরিচয় দিতে হবে পরদেশী নােয়া। কে সাজাদী তুমি ? এখনও কি তােমার মনােবাসনা পূর্ণ হয়নি? আবার কি অভিলাষে এসেছ সাজাদী সেরি। পরদেশী, আমি তােমার অনিষ্ট চেষ্টায় আসিনি নােয়া। তা জানি সাজাদী, বিনা দোষে ঘৃণ্য অভিযােগে অভিযুক্ত করা যদি ইষ্টসাধন হয়, শুধু অভিযােগ কেন, মিথ্যা অভিযােগের ফলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করান যদি মঙ্গল কামনা হয়, তাহলে সতাই সাজাদী তুমি আমার পরম হিতাকাঙ্ক্ষী। ফিরে যাও সাজাদী, তােমার হিত ইচ্ছা একেবারে চরম সীমায় উঠেছে,—আর প্রয়ােজন নেই। সেরি। সত্য পরদেশী আমায় বিশ্বাস কর- নােয়া। বরং কালফণীকে বিশ্বাস করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তােমার মত প্রতিহিংসাপরায়ণা নারী বিষধরী অপেক্ষাও ভয়ঙ্করী, আর বিরক্ত করােনা যাও। সেরি। পরদেশী, এখনাে অনুধাবন করে দেখাে, আমি ইচ্ছা কল্পে তােমায় মুক্তি দিতে পারি। নােয়া। আমার আর সে ইচ্ছা নেই সাজাদী। যদি একান্তই ।
তৃতীয় অঙ্ক।
aA
উপকার ক’ৰ্বার সখ হয়ে থাকে, নিজের ভগ্নীকে অপমানের হাত থেকে
সেরি। তুমি মুক্তি চাওনা ?
নােয়া। তােমার কাছে।
সেরি। তাতে দোষ কি ?
নােয়া। যে বারাঙ্গনার মত রূপ মূল্যে ভালবাসা কিনতে চায়, তার
কাছে মুক্তিলাভ কৰ্তে গেলে একটা কিছু বিনিময় দিতে হয়।
সেরি। তা যদি না দিতে হয় ?
নােয়। তবুও নয়।
সেরি। তুমি কি প্রাণের মমতা কর না?
নােয়া। না।
সেরি। পরদেশী, পরদেশী, আমায় রক্ষা কর, দেখ আজ চির উন্নত,
শির নত করে তােমার সমীপে নতজানু হয়ে যাঙ্ক্ষা' কচ্ছি-একবার করুণা,
নয়নে চাও পরদেশী।
নােয়া। সয়তানী আমার সম্মুখ হতে সরে যাও, তােমার আগমনে
এ জঘন্য কারাগৃহও কলুষিত হয়।
সেরি। এত স্পর্ধা তবে মর।
[ প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
অলিন্দ।
(ফনাশার প্রবেশ )
ফয়নাশা। সানি, আর সাখি দুবেটীতে লেগেছে বেশ। লাগুক
এততেও ত মামদোর গুষ্ঠী হাল্কা হচ্ছে না। দু’টোতে এবার আমায়
৬. পরদেশী। WA যে রকম টানাটানি আরম্ভ করেছে-তাতে পৈত্রিক প্রাণটা প্রায় কথাগত হয়ে পড়েছে। একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে, একবার সেই মাদো চাচাকে পেলে হয়, তাহলেই ওরা ওদিকে লাগবে-আমি সেই অবকাশে একবার হুজুরের উদ্ধারের চেষ্টা দেখব। এক একবার মনে হচ্ছে মরিয়া হই,—তা মনে হলে কি হবে—চোখ দুটো যে মূর্তি দেখে মাথাটাকে গুলিয়ে দেয়। হা নসীব, যদি একটু সাহস থাক্তাে। এই যে সেই গুণধর—এস দোস্ত এসাে। (গফুরের প্রবেশ) গফুর। যাও দোস্ত আমার ঘেন্না ধরে গেছে। ফয়। ঘেন্নাই যদি ধলাে, তবে আবার এদিক মাড়াচ্ছ কেন? গফুর। তাকি জান, একটা দরকারী কাজে এই দিকে যাচ্ছিলুম, ভাবলুম, তােমার সঙ্গে অনেক দিন দেখা শুনাে হয়নি ফয়। আর তােমার সঙ্গে কেন, তার সঙ্গেই বলনা বন্ধু। আমরা মার্জিত ভাষার দেশের লােক, এসব ব্যাপার গুলাে এক আঁচরেই ধর্তে পারি। গফুর। তাহলে তুমি ঠিক ধরেছ কিন্তু বন্ধু আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি, তবে মন বােঝাতে পারিনে, তাই মনে মনে সঙ্কল্প করেছি, মাঝে মাঝে এক একবার এসে তাকে দেখে যাবাে, এই আমার সান্ত্বনা। ফয়। তার চেয়ে এক কাজ কর না বন্ধু- গফুর। আর কিছু কওেঁ—প্রবৃত্তি নেই বন্ধু। ফয়। আহা কথাটাই শােন না, বেটী যেমন তােমায় এ্যাদ্দিন তার পেছনে পেছনে যােরালে, তুমিও দিনকতক বেটীকে তােমার পেছনে পেছনে যােরাও- গফুর। তাতে লাভ? ফয়। লােকসানই বা কি? বেটীকে জব্দ করাও হবে অথচ শােধ .
তৃতীয় অঞ্চ। নেওয়া হবে—আমি হলে শােধ না নিয়ে ছাড়তুম না। এত করে বশ করুলে তুমি আর একটা কাজ কর্তে পাল্লে না বলে অমি চটে গেল এ কি রকম ভদ্রতা ! আমিত বলি বেটী ছােটলােক। বেটীকে জব্দ করাই উচিত। তা ছাড়া আর একটা দুঃখের কথা বলবাে কি, এমন সােণার চাদ দোস্ত আমার, যে দোন্ত প্রাণ দিয়ে বেটীকে ভালবাসে, আমার তেমন দোস্তকে ছেড়ে বেটা আবার আমাকে চায় ? আমি অমন বেটীর মুখে গুণে বিশ পয়জার মারি-বন্ধু তুমি বেটীকে জব্দ কর ! গফুর। বল কি দোন্ত এত দুর! দোস্ত আমায় মতলব বলে দাও । আমি বেটীকে নিশ্চয়ই জব্দ কৰ্বো। ফয়। কিছুই নয়, খুব সাদা কাজ, এসাে তােমাতে আমাতে পােষাক বদল করে ফেলি, তারপর যা কৰ্ত্তে হবে তােমায় সব শিখিয়ে দেবাে,. দেখ আস্তানাটীও বদলাতে হবে। গফুর। কিন্তু এ চেহারাখানা ? ফয়। আঃ ব্যস্ত হচ্ছে। কেন, এসােনা সব বন্দোবস্ত কচ্ছি। [ উভয়ের প্রস্থান। (সাখিয়ার প্রবেশ) সাখিয়া। তাইত, ফয়নাশা কোথায় গেল। এ যে দেখছি শেষকালে আমায় পাগল করে তুললে। দেখতে দেখতে এ আমি হলুম কি ? ভাল- বাসার যে এত কনুনী তা জান্তুম না। চব্বিশঘণ্টা নাকে দড়ি দিয়ে ঘােরাচ্চে গা ? সাখিয়ার গীত। আশিফ মেরা কাহে সতায়ো করতে হহ মুঝে পরেন। কো জমান নােয়বে। পিটবে। জিন্দিগী কঁৰু গুজরা। চমকি লা দুনিয়া রােশনি, নয়নকী রােশনি বিষ্ণু অধো ; দিল্লিগী দিনকী, টুটানে দিন কো, দিন চুয়াণা কাহে মেরী জান। [ প্রস্থান;
৬২ পরদেশী পঞ্চম দৃশ্য। । জেরি। কারাকক্ষে নােয়াজেস, কক্ষদ্বারে জেরিণা ও ঘাতক। অনতিদূরে সেরিণা দণ্ডায়মান। নােয়া। জেরিণা, প্রিয়তমে আর পিতার অবাধ্য হয়ােনা, রাজ- দ্রোহিণী হয়ােনা, ঘাতককে তার কাৰ্য্য কৰ্তে দাও। যে পিতা কন্যার মমতা করে না, যে রাজা ন্যায়ের দণ্ড হাতে নিয়ে ন্যায় বিচার করেন না, সে পিতার অবাধ্য হলে পাপ হয় । সে রাজার আদেশ অমান্য কল্লে রাজদ্রোহিতা করা হয় না। পর- দেশী প্রিয়তম, আমায় মার্জনা কর। আমি প্রাণ থাকতে দ্বার ত্যাগ কৰ্বোনা, ঘাতকের সাধ্য থাকে, আগে আমায় বধ করুক, তারপর কারা কক্ষে প্রবেশ করুক। নােয়া। জেরিণা, আমার জন্য কেন অকারণ প্রাণ দিতে চাচ্ছ, দ্বার পরিত্যাগ কর, আমি অপরাধী, আমার শাস্তি হােক। জেরি। তুমি অপরাধী! এখন আমি মুক্তকণ্ঠে বলছি, আবার মরণের পরপারে লােকান্তরে গিয়ে যদি সেখান থেকে বলবার উপায় থাকে, তাহলেও বলব পরদেশী, অপরাধী তুমি নও-সেৰিণা। সেরি। ঘাতক তােমার কাৰ্য কর, রাজদ্রোহিণী যদি স্বেচ্ছায় দ্বার পরিত্যাগ না করে, পদাঘাতে তাকে দূরে নিক্ষেপ কর। জেরি। সম্রাটনন্দিনী, একটা ছােটলােকের উপর এত বড় একটা শক্ত কাজের ভার দিলে তার সাহসেই কুলােবেনা, সাধ্য থাকে ভারটা নিজেই নাও। সেরি। অবাধ্য নফর, এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে, সম্রাটের আদেশ পালন কর-বন্দীকে হত্যা কর। ঘাতক। সাজাদী দ্বার পরিত্যাগ করুন।
তৃতীয় অঙ্ক।
জেরি। খবরদার! এগিওনা।
সেরি। বন্দিনীর স্তব স্তুতি শােনবার প্রয়ােজন নেই। তােমার কাৰ্য্য
কর। না পারাে আমি তােমার নামে অভিযােগ আনবাে, তুমি রাজদ্রোহী
তােমার শাস্তি মৃত্যু।
ঘাতক। সাজাদী, আমি নতজানু হয়ে প্রার্থনা কচ্ছি। আমায় বল
প্রকাশ করাবেন না।
জেরি। নইলে উপায় নেই। ঘাতক! আমায় বধ না করে এক
পাও এগুতে পাৰ্বে না।
সেরি। রাজদ্রোহী জল্লাদ
ঘাতক। চোখ রাঙ্গাবেন না সাজাদী, আমি আপনার চোখরাঙ্গানী
ভয় করিনে। আমি রাজার নফর রাজার আদেশ পালন কৰ্বো, সম্রাটের
আদেশ বন্দীকে হত্যা কৰ্ত্তে, সাজাদীকে নয়। আমি তাঁর দ্বিতীয়
'আদেশের অপেক্ষা কৰ্ব্বো।
( সােললমানের প্রবেশ)
সােলে। আর অপেক্ষা কত্তে হবে না ঘাতক, হত্যাকর। আমিই
তােমার বাধা সরিয়ে দিচ্ছি। জেরিণা, তাের মৃত্যুর পূর্বে তাের বিরুদ্ধে
আরও কিছু অভিযােগ শুনতে হবে কি? হয় দ্বার পরিত্যাগ কর, নয়
সােজা হয়ে দাড়া।
জেরি। সম্রাট, আমি সােজা হয়েই দাঁড়িয়েছি।
সােলে। মুখ ফিরিয়ে নে।
জেরি। নিয়েছি সম্রাট।
সােলে। এই বার তাের জীবনের শেষ মুহূৰ্ত্ত, একবার খােদাকে
ডেকেনে।
জেরি।. (কিয়ৎক্ষণ যোড় হস্তে উর্ধ্বমুখী হইয়া) ডাকা শেষ হয়েছে
সম্রাট।
৬৪ পরদেশী। সােল। তবে মর- (কক্ষের গরাদে ভাঙ্গিয়া রক্তাক্ত হস্তে নােয়জেস বাহির হইয়া বজ্রমুষ্টিতে সম্রাটের উদ্যত তরবারী ধারণ করিলেন।) নােয়া। বন্দীর একটা প্রার্থনা সম্রাট, আগে আমায় হত্যা করুন। সেরি। (স্বগত) কি পবিত্র কি স্বর্গীয় ভালবাসা ! দু'জনে মরণের পথে দাঁড়িয়ে, অথচ কেউ কারও মৃত্যু দেখতে চায় না। রূপ মূল্যে এই ভালবাসা কিনতে গেছলুম ! (আমার হৃদয় প্রেমহীন মরু। আমি ভালবাসতে জানিনি, ভালবাসতে পারিনি। শুধু একটা মােহের ঘােরে কাণ্ডজ্ঞান শূন্য হয়ে পাপের মাত্রা বৃদ্ধি করেছি। ছােট হলেও জেরিণা আমার চেয়ে ঢের বড়। আমি প্রায়শ্চিত্ত কৰ্বো। (সম্রাটের নিকট নত জানু হইয়া) পিতা, সম্রাট! এদের মার্জনা করুন, আমি মুক্তকণ্ঠে নিজ-দোষ স্বীকার কচ্ছি। যে অপরাধে আজ এরা অভিযুক্ত, সে অপরাধে অপরাধী আমি। এর সম্পূর্ণ নির্দোষী—যথার্থ দোষীকে শাস্তি দিন। পাশ্যের সাজাদার প্রতি অবিচার কৰ্ব্বেন না। সােলে। একি হেঁয়ালি সেরিণা, তাের কথা আমি কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনে-পারশ্যের সাজাদা কি ? সেরি। এই দেখুন (পদক প্রদর্শন) যখন নদী-স্রোতে সাজাদা ভেসে আসেন, তখন এই পদক ওর অঙ্গ থেকে আমি হস্তগত করি। (জেরিণার প্রতি) জেরিণা ভগ্নি, তােমার রাক্ষসী ভগ্নীকে মার্জনা কর (নােয়াজেসের প্রতি) পরদেশী, আমি রূপমদে মত্ত হয়ে যে পাপ করেছি, সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত নেই, আমার মার্জনা চাইবারও সাহস নেই, তুমি কি সয়তানীকে ক্ষমা কৰ্ব্বে পরদেশী ? সােলে। পারস্য-সম্রাট-পুত্র ! আমার বন্ধুপুত্র ! কি সর্বনাশ কচ্ছিলুম ! কি সৰ্ব্বনাশ কচ্ছিলুম! নােয়াজেস, বৎস, তােমার পিতৃ- বন্ধু বৃদ্ধকে মার্জনা কর, সেরিণ হতভাগি! কি কচ্ছিলি—কি কচ্ছিলি।
তৃতীয় অঙ্ক।
মার্জনা চা মার্জনা চা। সােদর-প্রতিম নােয়াজেসের কাছে মার্জনা চা।
নােয়াজোল'তুমি রাজদ্রোহী নও, তবে তার চেয়ে আরও গুরুতর অপরাধ
করেছ। তােমার সেই গুরুতর অপরাধের আজ উপযুক্ত দণ্ড দেকে,
{নােয়াজেস ও জেরিণার হাত ধরিয়া) নােখাজেল এই তােমার
অপরাধের শাস্তি।
[ প্রস্থান।
সেরিণা। (নতজানু হইয়া) সাজাদা. নােয়জেস, আমায় মার্জনা
কর—সব ভুলে যাও।
নােয়া। নােয়জেস কেন সেরিণা? আমি তােমার পরদেশী, ভাই।
সেরি। (মুক্তার হার খুলিয়া) এই নে ঘাতক, ভাের তিরস্কারের
T
এই পুরস্কার।
=
ঘাতক। মা, আর পুরস্কারে কাজ নেই আমার কাজে ঘেন্না, ঋরে,
গেছে।
সেরিণা। নিয়ে যা এ মায়ের আশীর্বাদ।
[ ঘাতকের প্রস্থান।
{ফয়না-বেশী মুখাবৃত গফুরকে টানিতে টানিতে সানিয়া
ও সাখিয়ার প্রবেশ)
সানি। সাজাদী, ও আমায় সাদী কৰ্ব্বে বলে স্বীকার করেছে।
সাখি বাধা দিচ্ছে।
সাখি। সাজাদী, ও আমায় সাদী কৰ্ব্বে বলে স্বীকার করেছে, সানি
বাধা দিচ্ছে।
গফুর। সাজাদী, আমি আইবড় থাকৰাে বলে মনস্থ করেছি।
সেরিণা। তােদের দেখছি আমাদের দশা হয়েছে।
নােয়। দেখে শিখেছে নৈত নয়—
জেরি। যাক্ ও সব কথা, এখন তােমরা শালিসী থেকে এদেয়
গােলমালটা ত মিটিয়ে দাও।
পরদেশী।
সেরি। আমি বলি পুরুষের ইচ্ছার উপর বিয়েটা হােক। কি বল
পরদেশী ?
নােয়। সেই ভাল।
জেরি। কিন্তু আমাদের সামনে যা হয়ে যাবে, তার উপর আর কেউ
কথা কইতে পাবেনা কি বলিস তােরা।
সানি ও সাখি। আমাদের ঐ মত।
গফু। তবে আমি সানিকে বে কৰ্বো।
জেরি। তাই কর, আচ্ছা তুই যে সাখীকে ভালবাসতিস্?
গফুর। একটু একটু বাসতুম বটে, কিন্তু এখন ওর উপর চটে গেছি—
ও পরের হাত ধরে টানাটানি করে।
সানি। (মুখের আবরণ উন্মােচন করিয়া) আ’মর এযে গফরাে।
গীত।
সানি। বা নদীর বা!
গফুর। যার নসীবে যেমন ছিল মিলে গেছে তা ।
সানি। কালাে ভালাে নয়কো ৰ'লে খুলেছিনু সাদা।
পােড়াকপাল পুড়ে গেল মিললাে একটা গাধা।
গফুর। গাধা হলেও প্রাণটা সাদা।
তােমার তরে প্রাণ দিতে তার নাই কোন বাধা।
সানি। তাতে। চ'খে দেখেছি, তবু পায়ে ঠেলেছি,
গফুর। এখন সে সব ভুলে পায়ে রেখ হয়ে গেছে যা ।
সানি। পায়ে ঠেলা হৃদ-রতন।
ছাড়বাে নাক করব যান।
কনার প্রবেশ ও
ফয়। বল দো! মতলবটা দিচ্ছি কেমন বাই বাবা?
(কথায়) লােভ কেমন মতলব দিয়েছি।
তৃতীয় অঞ্চ।
Www
(একতারা লইয়া মােবারিকের প্রবেশ)
সেরি। একি মােবারিক, এবেশ কেন ? কোথায় চলেছ ?
মােবা। আর ভাল লাগছে না ভাই, ফকিরী নিয়ে মক্কা চলেছি-
যাবার সময় একবার তােমার সঙ্গে দেখা কর্তে এলুম্।
সেরি। আর তােমার ফকিরীতে কাজ নেই মােবারিক, আমি আমার
মৃত বলেছি, তােমার অমূল্য ভালবাসার প্রতিদান দেবে, তােমাকে সাদী
কৰ্বো।
মােবা। সে কি! সত্তি বলছাে না আমার সঙ্গে ঠাট্যা কচ্ছে ?
সেরি। সত্য বছি মােবারিক, আমি তােমার
মােবা। কিন্তু আমি যে মনস্থ করে বেরিয়েছি।
সেরি। আর মনস্থ কৰ্ত্তে হবে না মােবারিক, আমায় মার্জনা কর
মােবা। আর মার্জিত ভাষা মুখস্থ ক’তে হবে না ত ?
সেরি। না মােবারিক, আমার সে সখও মিটেছে, আমার নুতন
চক্ষু খুলেছে। বুঝেছি ব্যাকরণে মানুষকে মানুষ করে না, শুধু হৃদয়
মানুষকে মানুষ করে। এখন চল জেরিণা প্রমােদ-উদ্যানে এ মিলন-আনুন
উপভােগ করিগে। [ ফয়নাশা ও সাখিয়া ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
সাখিয়া এমন সাদীর হিড়িকে শুধু আমিই বুঝি আইবুরাে
থাক্বাে, তা হচ্ছে না, ফয়নাশা আমায় সাদী কৰ্ত্তে না চায়, আমি জোর
করে ওর গলায় মালা দেব।
ফনাশা। ও বাবা এ আবার কি ! শেষে গলায় দড়ি! হারে
এই বুঝি তাের অহিংসা ব্রত।
সাথিয়ার গীত।
আরে হারে বেইমান।
তৰিয়ৎ ঘৰ মেরা আগিয়া তুঝগর কাহেকো পাষাণ।
নামে কুৰ্ব্বাণ কিয়া,
দিলীগী মে দিল মিয়া,
পরদে।
ঘড়ি ঘড়ি পল, পল জল, ফল, মরা খানে মিলা
বানায়া বাতে বৎ তুম মুঝকো দিউয়ান সমক,
সতারা দুষমন এয়সা ইশক মেরা মুস্তুর সমর,
শুয়া গুঝতা নেহি, রােলারী নােতি মহি,
মনেমে হাসতে হা আপনা ছিপার।
হর ঘড়ি দুখিয়া, ফুকারি সাথিয়া,
বেদৱীকে গিয়ে জানা হয়রাণ।
ফয়। (মাল্যগ্ৰহণ করিয়া) না মানুষ হয়ে শেষে মামদী বিয়েটা
নসীৰে ছিল দেখছি। এখন চল, ভাল করে মস্তকটি চর্বণ করবে চলাে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
উজ্জ্বল দৃশ্য।
বাদীগণের গীত।
আজ মাধবী সহকারে বেড়িল ।
গগনে হাসিল শশী, কাননে কুসুম হাসি।
সুগন্ধ সুষমারাশি ছড়ায়ে দিল।
মধুর পবাম সুরে, পাখী ভাকে শাখা পরে।
অমর ভ্রমরা মুখে গুলি।
নৰ বিকসিত কলি, হেৰি ধেয়ে এল অলি।
আবেশে বিভােরা ধনী ঢলে পড়িল।
( যবনিকা )
No text on this page.
No text on this page.