Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kheyal Ed. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
Q
-
খেয়াল
lemoen:
=====
=====
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
No text on this page.
খেয়াল
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
১ম সংস্করণ
মূল্য ৭০ বারআনা
প্রকাশক
ক্রীদেবেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ
পার্শনে এসিষ্টেন্ট,
ইষ্ট এণ্ড হাউস, উয়ারী, ঢাকা।
ABREUOUS TROU
কা-
নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে,
শ্রীরাধাবল্লভ বসাক দ্বারা মুদ্রিত।
Luenennsnee
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
(পুরুষ)
বনমালী দাস
রায় পাশার বিজন কুটীরের মালিক
৩ ০ ০
ঐ বন্ধু
অতুলানন্দ বসু
ধনঞ্জয় মাইতি
মতি
লাটু
অবিবাহিত প্রৌঢ় স্কুল শিক্ষক
বনমালীর ভৃত্য
অতুলানন্দের ভৃত্য
০ ০ ০
(স্ত্রীলােক )
ব্রজসুন্দরী
সমুজ্জ্বলা
কিঙ্কিণী
সরােজিনী
ব্রজসুন্দরীর ভ্রাতুস্পুত্রী, কলেজের ছাত্রী:
বনমালীর অভিভাবকত্বে পালিত
কিঙ্কিণীর শিক্ষয়িত্রী
. . .
প্রথমাভিনয় রজনী।
ইষ্ট এণ্ড হাউস, উয়ারী, ঢাকা
৯ই পৌষ, ১৩৩৪ সন।
প্রথমাভিনয় রজনীর অভিনেতা ও অভিনেত্রীগণ।
??
বনমালী দাস
অতুলানন্দ বসু
ধনঞ্জয় মাইতি
মতি
লাটু
ব্রজসুন্দরী
সমুজ্জ্বলা
কিঙ্কিণী
সরােজিনী
শ্ৰীমতী রাণীসুন্দরী (বর্ধমান )
শরৎকুমারী ( ভুবী)
সুরবালা
শ্রীনিত্যানন্দ দাস
শ্ৰীমতী মৃণালিনী (ফেলী)
গিরিবালা
মলিনাবালা
প্রফুল্লকুমারী (ভূতী )
রাজলক্ষী
| ০ +
১১
০ ০ ০
১৪
}
খেয়াল
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
(কলিকাতায় মীর্জাপুরের মােড়ে অতুলানন্দের বাড়ী-নানারকম
গৃহসজ্জায় সজ্জিত। টেবিলে সকলের চা, বিস্কুট ইত্যাদি, একটি প্লেটে
কয়েকটি ছানাবড়া। ভৃত্য লাটু সব ঠিক করিতেছে। ভিতরে গানের
সঙ্গে হারমােনিয়ম বাজিতেছে শােনা গেল।)
(অতুলের গান।)
আমি কারে যেন চাই
পাইনা যে !
মানসী প্রতিমা শুধুই রচিঃ,
ধরা নাহি দিল সে।
কাহার অভাব জাগে
বিফল জীবন কাহার
লাগিয়ে !
* খেয়াল *-
[ প্রথম অঙ্ক
পাগল মন খোঁজে
চারিদিকে,
হতাশে নিরাশে কহে
এ নহে, এ নহে!
( কিছু পরে হারমােনিয়ম থামিল এবং অতুল প্রবেশ করিল )
অতুল। কি গাইছিলুম শুছিলি, লাটু ?
লাটু।
জানালা দিয়ে আড়িপেতে শােনাটা কি ভদ্রতা
হ’তে, বাবু ?
অতুল।
তা’ ঠিক হ’তাে না বটে, তবে তাের সম্বন্ধে অন্য
কথা। তুই আর আমার অন্য চাকর কি সমান ?
হ—মাসীমার ছানাবড়া ঠিক তৈরী হয়েছে তাে?
মাসীমাতাে আছেন।
লাটু।
( প্লেট অগ্রসর করিয়া দিয়া) এই তাে।
অতুল।
( একটা ছানাবড়া লইয়া অদূরে সােফায় বসিয়া ) , ভালাে
কথা, লাটু ; সেইদিন যে বনানী বাবু আর রমেশ
বাবু এখানে খেলেন, সেদিন দেখলুম আটটা সােড়া
খরচ হয়েছে।
লাটু। হাঁ বাবু, আটা সােডা আর দু’টা লেমনেড,।
অতুল। লেমনেড়, তত আমরা খেলুমই না—তবু লেমনেড,
গেল ? মেয়েছেলে নেই, আইবুডাের বাড়ী—তুই-ই
তাে সব দেখে শুনে রাখবি ?
তা কি জানেন বাবু-আমার মুখের তো বাঁধ নেই
;
লাটু।
---
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল *
জানেনই——যারা বেশী পেট বােঝাই করে, পেট খালি
করবার জন্যে তাদেরই সােডার বেশী দরকার হয়
চাকর বাকরদের খালি পেট ভরবার জন্যে কি
দু’একটা মিঠাপানিও মঞ্জুর হবে না ?
অতুল। পাজি, তুই কি বলতে চাস্ যে তুই পেট ভরে
খেতেও পাস্না ?
লাটু।
, না, বাবু, তা কেন—তবে যেটুকু ফাঁক থাকে তার
চতুগুণ ভ’রে নেব এখন, এই গিন্নীমা একবার এসে
নিন্।
অতুল।
।
তার দেরী আছে। এখন যা তুই।
এখন যা তুই। লাটু নিষ্ক্রান্ত)
গিন্নী ঘরে আসার যে কি পৰ্য্যন্ত দেরী তাই ভাবছি।
দেরীটাকে হ্রস্ব করার দিকে তল নিজের কোনাে
তাড়া দেখছি না।
( লাটুর প্রবেশ ।)
লাটু।
বনানী বাবু এসেছেন।
অতুল।
(বনমালীর প্রবেশ—লাটু নিষ্ক্রান্ত।)
( হাসি তামাসাচ্ছলে গাইল)
আরে এস হে বনানী ।
বহুদিন আহা তােমায় দেখিনি।
৪
- খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
বন। আঃ! চুপ কর অতুল, কি আরম্ভ করেছ
আর ছেলেমাসি গেল না!
অতুল। আরে শােন, শােন, গানটা গেয়েই নেই।
বন। গাও, গাও, তােমার ইচ্ছে হয়েছে গাও।
( অতুলের আবাৱ গান)
সহরে এলে কার তরে,
সেটা জানতে ইচ্ছা করে।
বন।
অতুল।
, এ আর বরদাস্ত হয় না; ঢের হয়েছে, চুপ কর ;
(অতুল চুপ করিল.) ওরকম দু’চারটে চোরা ছেড়া গান
যে আমরাও না জানি তা মনে করাে না।
তাই নাকি, সত্যি নাকি -তাহলে দয়া করে আমার
কাণে একটু মধু বর্ষণ কর না !
আচ্ছা, শুনতে চাও শােন—আমি পিছপাও দেবার
ছেলে নই।
(বনমালীৱ গান।)
আমি ভালবেসে তাকে
ভালবাসাব।
আমি নিজে কেঁদে কেঁদে
তাকে কঁদাব।
প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল * অতুল। অতুল। (কিছুক্ষণ গাইতেই) আঃ, চুপ কর, চুপ কর ; এই গানের তুমি আবার এত জাঁক কচ্ছিলে, ছােঃ- যাক সে কথা; তারপরে, কেমন আছ হে বনানী ? সহরে কি করতে এলে ? ( ছানাবড়া খাইতে প্রবৃত্ত) আমােদ, আমােদ! তা ছাড়া আর কি জন্যে সহরে আসে লােক ? খাওয়াটা বরাবরকার মতই দেখছি চছে তােমার, অতুল ! ( গম্ভীরভাবে) আহারটা দস্তুর মত না হলে যে ভগবানের জীব-জগতটার অস্তিত্বই লােপ হয়ে যায়—সেটা কি একবার ভাব ? গেল ৰেস্পতিবার থেকে তুমি কোথায় ছিলে ? ওঃ! গ্রামে। সেখানে কি কর তাই ভাবি। সহরে এসে লােক নিজকে আমােদে রাখে, গ্রামে থাকলে অপরকে আমােদে রাখে, অবিশ্যি কাজটা বড় ক্লান্তিজনক। সেই অপরটি কে যাকে আমােদে রাখ তুমি ? এই প্রতিবেশী, প্রতিবেশী । তােমাদের নারাণপুরে খুব সুন্দর সুন্দর প্রতিবেশী আছে বুঝি ? ভয়ঙ্কর সুন্দর ! তাদের সঙ্গে কখখনাে আলাপ করতে যেও না। বন। অতুল। 'বন। অতুল। 'বন। অতুল। বন।
* খেয়াল
[ প্রথম অঙ্ক
অতুল।
কি আমােদটাই না জানি দাও তাদেরে তুমি।
(টেবিলের কাছে গিয়া একটি ছানাবড়া লইয়া) হাঁ, ভালাে
কথা, নারাণপুরেই তােমাদের বাড়ী তে ?
এা? নারাণপুর? হ, অবিশ্যি।
বন!
অতুল।
(কমিক গান)
আহা, কার তরে নারাণপুরে
প’ড়ে আছ এম্নি করে—
সেকি একটা গুবরে পােকা
নাকি একটা ঘুর ঘুরে !
আঃ, আবার আরম্ভ হ’লাে বুঝি ; চুপকর, শােন—
( উঠিয়া নিকটে গিয়া) হাঁ, এসব কি ? ছানাবড়া,
কেন? কারু আসার কথা আছে নাকি ?
অতুল। আর কেউ নয়—মাসী-মা আর সমুজ্জ্বল।
বন । চমৎকার।
অতুল।
হাঁ, চমৎকারই বটে—কিন্তু মনে হচ্ছে মাসীমা
এখানে তােমার উপস্থিতিটার অনুমােদন
করবেন না।
কেন, জিজ্ঞেস করতে পারি কি?
অতুল। যে ভাবে তুমি সমুজ্জ্বলার সঙ্গে ইয়ার্কি চালাও, তা
নেহাৎ লজ্জাস্কর! আর সমুজ্জ্বলাও যে ভাবে তােমার
সঙ্গে ইয়ার্কি চালায় সেটাও কম লজ্জাস্কর নয়।
প্রথম দৃশ্য ]
** খেয়াল *
৭
বন। আমি সমুজ্জ্বলাকে ভালােবাসি। বিয়েয় প্রস্তাবের
জন্যেই বিশেষ করে এবার সহরে আসা।
অতুল।
আমােদর জন্যে এসেছ ভেবেছিলুম। কিন্তু দেখছি
এটা তাে business বৈ আর কিছু নয়।
তুমি ভারি পদ্যময় !
অতুল। বিয়ের প্রস্তাবের মধ্যে যে পদ্যটা কোন্ জায়গায় তা
গে দেখতে পাচ্ছি না—আর বিয়েতেও পদ্য তত
শুধু কদৰ্য্য ছাপাননা কতকগুলাে প্রীতি-উপহারের
মধ্যেই। প্রস্তাব করতে গেলে কি কাব্য সব উড়ে
গেল, প্রেমের আরজি পেশ করলে, হয়ত তা মঞ্জুর
হয়ে গেল তারপর তাে সব স্থির নিশ্চিত, সেই
মান্ধাতার আমল থেকে যা চলে আসছেতাই
চলােতার মধ্যে কাব্য বল, উত্তেজনা বল, আর
কিছু মাত্র রইলাে না। সেইজন্যেই অনেকে বিয়ে-
টাকে—burial of all romance" বলে
থাকেন—(বনমালী যেন একটা ছানাবড়া নিবার চেষ্টা
করিল; অতুল তাড়াতাড়ি প্লেট লইয়া জানুর উপর রাখিল )
, না, এ ছানাবড়া ছুয়ােনা। বিশেষ করে মাসীমার
জন্যে করা হয়েছে। (একটা লইয়া নিজে খাইল )
বন। তুমি তাে নিজে বেশ ওড়াচ্ছ।
অতুল। সে আলাদা কথা। উনি তাে আমারই মাসীমা
( একটা রুটির প্লেট অগ্রসর করিয়া দিয়া) বরং কিছু রুটি
৮
- খেয়াল -
[ প্রথম অঙ্ক
নিতে পার। রুটি মাখন সমুজ্জ্বলার জন্যেই রাখা,
হয়েছে। রুটি মাখনের বড় ভক্ত সে।
(রুটি মাখন নিজের দিকে টানিয়া লইয়া) আর এ বেশ
বন।
রুটি মাখন।
অতুল। তবে যেন সবটাই খেয়ে ফেলবে এমন করে ,
খেতে আরম্ভ করােনা। তােমার আচরণে বোঝা
যাচ্ছে যেন তার সঙ্গে তােমার বিয়ে হয়ে গেছে।
কিন্তু তা তাে হয়নি, আর হবেও যে তাও তাে
আমার মনে হয় না ।
কেন ?
অতুল।
প্রথমতঃ, মেয়েরা যার সঙ্গে প্রেম করে তার সঙ্গে
প্রায়শঃ বিয়েটা ঘটে উঠে না। হয় মেয়েরা, না হয়
তাদের অভিভাবকেরা সেটা শেষে ঠিক সুরুচি সঙ্গত
বলে মনে করেন না বােধ হয়।
ওঃ! বাজে কথা !
তা নয়। খাঁটি সত্য কথা। এবং তা সত্য বলেই
উপযুক্ত বয়সের এত আইবুড়াে মেয়ে সহরে দেখতে
পাওয়া যায়; দ্বিতীয়তঃ, আমার মত নেই।
বন ।
অতুল।
বন।
তােমার মত!
আরে, সমুজ্জ্বলা আমার মাসীমার ভাইঝি তাে;
আমার মত না হলে চলবে কেন ? আর বিয়ের মত
দেবার আগে তােমার কিঙ্কিণী সম্বন্ধে সব কথা
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
পরিষ্কাররূপে জানতে হবে। ( উঠিয়া অগ্রসর হইয়া
কা’কে ডাকিল ). ওরে কে আছিসূরে—এদিকে
আয়তাে !
কিঙ্কিণী ! (নড়িয়া) কি বলছ তুমি? কিঙ্কিণীর
কথা আবার কি ? কিঙ্কিণী বলে কাউকে তাে
আমি জানি না।
( লাটুর প্রবেশ )
অতুল। লাটু, বনানী বাবু সে দিন যে সিগারেটের বাক্সটা
এখানে ফেলে গেছিলেন, সেটা আন্ত।
লাটু। যাই আজ্ঞে।
( নিষ্ক্রান্ত)
বন।
এতদিন কি সিগারেটের বাক্সটা এখানেই পড়ে ছিল ?
তুমি আমাকে জানাওনি কেন ? আমি কত
জায়গায় চিঠি দিয়েছি—পুরস্কার ঘােষণা
ভেবেছিলুম।
সেটা এখন আমাকে দিলেই হয়—আমার বড় টানা-
টানি এখন।
বন। যাক, এখন যখন পাওয়া গেছে তখন আর পুরস্কার
ঘােষণা কেন।
( লাটু সিগার কেই লইয়া আসিল ; অতুল লইল-লাটু নিষ্ক্রান্ত)
অতুল। এ তােমার ছােটলােকামি—ঘােষণার পুরস্কারটা
অতুল।
** খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
আমাকে দিয়ে দিলেই হয়। (কেই খুলিয়া পরীক্ষা
করিতে লাগিল) যাক-এতে কিছু এসে যায় না
কারণ এখন ভিতরের খােদা নাম দেখে জালুম যে
জিনিষটা আদতে তােমারই নয়।
নিশ্চয় এটা আমার। বহু দিন থেকেই এটা
আমারই দেখে আছ ; এর ভেতরে কি লেখা
আছে তা দেখবার তােমার কোনাে অধিকার নেই।
অপরের গােপনীয় সিগার কেইসের লেখা পড়া ভারি
বন।
অভদ্রতা।
অতুল।
বন ।
অতুল।
বন।
কিন্তু এতাে তােমার নয়। কিঙ্কিণী নামে কারু
কাছ থেকে এটা উপহার—তা কিঙ্কিণী বলে কাউকে
তুমি জানাে না সে তত বলেছই।
বেশ, তুমি যদি জানতে চাওতাে বলি—কিঙ্কিণী
আমার এক খুড়ী।
তােমার খুড়ী—বুড়ী থুখ থুড়ী ?
হাঁ, বেশ চমৎকার একটি বৃদ্ধা। বিষ্ণুপুরে
থাকেন। (তার কাছে গিয়া) দাও আমাকে অতুল।
( লইতে চেষ্টা )
( দূরে সােফার পিছনে সরিয়া গিয়া) কিন্তু “তােমার ছােষ্ট্র
কিঙ্কিণীর ভালবাসার চিহ্ন” লেখা যে! ছােট্ট
কিঙ্কিণী কেন ?
( কাছে গিয়া সােফার নিকট হাঁটু গাড়িয়া) তা ভাই,
অতুল।
প্রথম দৃশ্য ]
খেয়াল *-
অতুল।
এতে আর কি হয়েছে ? কোনাে কোনাে খুড়ী লম্বা
হন, কেউ হন্ বেটে। সেটা তাদের খুসি। তুমি
কি মনে কর যে সব মাসী খুড়ীরাই তােমার মাসীর
মত হওয়া উচিত ? (ছে। মারিয়া লইতে চেষ্টা) সে
তােমার ভারি অন্যায়। তােমার পায়ে পড়ছি—
কেইটা দিয়ে দাও। (সােফার উপরঝুকিল)
আচ্ছা, তােমার খুড়ী তােমাকে ‘কাকাং লিখছে কেন ?
“কাকা বনমালীকে” (বনমালীর সােফা ঘুরিয়া অতুলের
নিকট আসিবার চেষ্টা—অতুলের সরিয়া যাওয়া ) অবিশ্যি
কোনাে খুড়ীর বেটে হ’তে আমি কোনাে আপত্তি
করিনা—কিন্তু তার আকৃতিটা যেমনই হােক না
কেন, তার ভাসুরপােকে তিনি কাকা ডাকতে যাবেন
কেন—আর তােমার নাম তাে বনমালী নয়-বনানী ।
বনানী নয়, বনমালী। (নড়িল )
( সােফার চারদিকে ঘুরিয়া তুমি তাে বরাবর বনানী
বলেই তােমার পরিচয় দিয়ে এসেছ। আমিও
তােমার সেই পরিচয়ই সকলকে দিয়েছি। বনানী
বলে ডাকলে তুমি কথার উত্তরও দিয়ে এসেছ।
তােমার চেহারাতেও তাই বােঝা যাচ্ছে । এমন বন্য
চেহারা জীবনে আমি আর কারু দেখিনি; এই
নামে তােমার চিঠির কাগজ পৰ্যন্ত ছাপা রয়েছে-
এই তত একটা এখানেই আছে। (টেবিলের ড্রয়ার
বন।
অতুল।
১২
* খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
হইতে বাহির করিল) “শ্ৰীবনানী ভূষণ দাস—২৩নং
বেচু চাটার্জির স্ত্রী।” তুমি যদি কখনাে আমার
কাছে, কি সমুজ্জ্বলার কাছে কিম্বা আর কারু কাছে
তােমার বনানী নাম অস্বীকার কর, তখন তােমার
মুখ বন্ধ করবার জন্যে এই প্রমাণ আমি রেখে দিন।
(ডুয়ারে রাখিয়া চাবি বন্ধ করিল)
বেশ ; সহরে আমার নাম বনানী, আর গ্রামে
বনমালী—হলে তাে ? আর গ্রামেই সিগারকে
আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে।
অতুল। কিন্তু তােমার বিষ্ণুপুরের ছােট খুড়ী যে তােমাকে
কাকা সম্বােধন করলে, তার কারণটা কিছুই পাওয়া
গেলনা। (বলমালী বসিল—অতুল কেই বাহির করিয়া
পিছনদিকে রাখিল) বিষয়টা সব বলতে খুলে। আমি
বরাবর সন্দেহ করে আছি তুমি একটি আসল
‘রমাপদী'—সে সন্দেহ আমার এখন বদ্ধমূল হলাে।
বন। রমাপদী! সে আবার কাকে বলে ?
যে মুহূর্তে তুমি গ্রামে বনমালী এবং সহরে বনানী
কেন, আমাকে এই মূল্যবান হিয়ালীটির অর্থ ভেঙ্গে
বল্বে, সেই মুহূর্তে আমিও তােমাকে এই চমৎকার
কথাটির অর্থ বলব। (কাছে গেল)
বেশ, আগে সিগার কেইসটি দাও।
অতুল।.এই নাও। (দিল -এখন বল।
তুল।
বন।
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল **
বন ।
বুড়ো গঙ্গাধর সিংহ আমাকে শিশুকাল থেকেই
পেলেছিলেন, তার উইলে আমাকে তিনি তার
নাতনী কিঙ্কিণীর অভিভাবক করে যান। কিঙ্কিণী
আমাকে কাকা বলেই ডাকে, আমাদের গ্রামের
বাড়ীতেই সে থাকে—সরােজিনী নামে তার একটি
শিক্ষয়িত্রীও আছে সেখানে।
অতুল। (উঠিয়া নিকটে আসিয়া) হাঁ, ভালাে কথা, তােমাদের
সেই গ্রামটি না কোথায় ?
বন। তাতে তােমার দরকার কি ? তােমার সেখানে
কখনাে নিমন্ত্রণ হবে না জেনে রেখাে। জায়গাটি
ঠিক নারাণপুর নয়, তাও তােমাকে জানাতে
পারি।
অতুল। আমিও সেই সন্দেহ করেছিলুম। কারণ নারাণপুরে
আমিও বহুবার রমাপদগিরি চালিয়েছি। হাঁ, সহরে
বনানী আর গ্রামে বনমালী কেন ? ( ফিরিয়া বসিল)
অতুল, অভিভাবক হতে গেলে সব সময়ই একটু
উচু নৈতিক আদর্শ রেখে চলতে হয়। এই তার
কৰ্ত্তব্য। কিন্তু সহরে উঁচু আদর্শ রেখে চলা আর
মনের আমােদ স্ফুৰ্ত্তি সব নষ্ট করে দেওয়া একই
কথা, তাতে জানাে, কাজেই বনানী নামে সহরে
আমার একটি ছােট ভাই আছে, ২৩নং বেচুচাটার্জির
স্ত্রীটে থাকে এবং মাঝে মাঝে নানারকম মুস্কিল
১৪
** খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
বাঁধিয়ে তুলে—এই মিথ্যাটা বরাবর চালিয়ে আসতে
হয়েছে। কেমন, এখন শুনলে তাে ?
অতুল। শুলুম। তুমিও দেখছি রমাপদীতে
অতিরিক্ত অগ্রসর হয়েই গেছ।
কি বলছ তুমি ?
অতুল। হাঁ, এই যখন ইচ্ছা তখনই যেন সহরে আসতে পার,
বাম রটলে অন্যের স্কন্ধে চাপাতে পার, এই
উদ্দেশ্যে বনানী নামে এমন একটি ছােট ভাইয়ের
সৃষ্টি তুমি করে নিয়েছ। আর আমিও যখন খুসি
গ্রামে যেতে পারি সেই জন্যে রমাপদ নামে একটি
'চির রােগীর সৃষ্টি করে নিয়েছি। রমাপদটি অমূল্য।
এই রমাপদেরই একটু অতিরিক্ত অসুখ করাতেই তাে
আজ রয়েল হােটেলে তােমার সঙ্গে বেশ এক পেট
মারা যাবেনইলে এক সপ্তাহ আগেই যে মাসীমার
সঙ্গে আজ রাত্রে খাব কথা দিয়েছিলুম।
বন ।
আমার সঙ্গে আজ রাত্রে খেতে তাে তােমাকে
বলিনি।
অতুল । তা জানি। তুমি নেমন্তন্ন করা সম্বন্ধে নেহাৎ
অবিবেচক লােক। এ তােমার ভারি অন্যায়।
নেমন্তন্ন না পেলে মানুষ কেমন বিরক্ত হয়, তা তুমি
বােধহয় জান না।
বন। তুমি তােমার মাসীমার সঙ্গেই বরং খেও।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
অতুল ।
সে অভিপ্রায় আমার আদৌ নেই। সােমবারে তাে
একবার খাওয়া গেছে—সপ্তাহে একবারের বেশী
আত্মীয় বাড়ীতে খেতে নেই। তাতে সমাদর থাকে
! যাক, এখন যখন জালুম যে তুমিও একটি
রমাপদী, তখন রমাপদগিরি সম্বন্ধে তােমার সঙ্গে
কথা বার্তা চালাতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে—ইচ্ছে কচ্ছে এর
আইন কানুন তােমাকে সব শিখিয়ে দিই।
আমি মােটেই রমাপদী নই। সমুজ্জ্বলা যদি আমার
প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে আমার ভাইকে মেরেই
ফেলতে চাই ; বাস্তবিক, যাই হােক না কেন, তাকে
আমি মারবই। কিঙ্কিণীও তার সম্বন্ধে অতিরিক্ত
interest নেয় বুঝতে পারছি। সেটাও আমি বড়
পচ্ছন্দ করিনা। কাজেই বনানীকে এবার ছাড়তে
হচ্ছে। আর তােমাকেও উপদেশ দিচ্ছি-তুমিও
কি নাম তার—সেই অসুস্থ বন্ধুটি সম্বন্ধে সেই পথই
অবলম্বন কর।
অতুল । রমাপদকে আমি কিছুতেই ছাড়তে পারব না।
( বাহিরে শব্দ, সেদিকে গিয়া ) ঐ মাসীমা এসেছেন।
(বনমালীর নিকট ফিরিয়া) দেখ, মিনিট দশেকের জন্যে
মাসীমাকে অন্যত্র নিয়ে যাবে এখন, তখন সমুজ্জ্বলার
কাছে প্রস্তাবটা পেড়ে ফেলার সুযােগ পাবে-তাহলে
কি রয়েল হােটেলে তােমার সঙ্গে খেতে পারব ?
** খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
বন।
তাহলে পারতে পার।
অতুল। হাঁ, মনে থাকে যেন—এ বিষয়ে খামখেয়ালি করলে
চলবে না—খাওয়ার ব্যাপারে খামখেয়ালিটা আমি
মােটেই পছন্দ করি না; এতে চরিত্রের অগভীরতাই
প্রকাশ করে।
ব্রজ।
( লাটুর প্রবেশ।)
লাটু। ওঁরা এসেছেন।
(অতুল তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া আনিতে সেদিকে
অগ্রসর হইল—ব্রজসুন্দরী ও সমুজ্জ্বলার প্রবেশ।)
হারে অতুল, ভালাে রকম চছিস্ তাে?
অতুল। হাঁ, মাসীমা, ভালােই বােধ করছি।
ব্রজ। দুটা তাে আর এক জুিনিষ নয় ; ভালাে চলা ও তাতে
ভাল বােধ করা কদাচিৎ এক সঙ্গে দেখা যায়।
(বনমালীর প্রতি) আপনি যে ! কেমন আছেন ?
অতুল। (সমুজ্জ্বলার প্রতি—সমুজ্জ্বল ও বনমালীর মাঝে বাধা স্বরূপ,
দাঁড়াইয়া) তুমি তাে বেশ চালাক, সমু!
সমু। হাঁ, খুব। (সরিয়া বনমালীয় পাশে গিয়া দাড়াইয়া )
কেমন, না, দাস মশায় ?
বন। চমৎকার আপনি।
আমাদের কিছু দেরী হয়ে গেছে, অতুলকি
করব—পথে বিদ্যুতের বাড়ীতে একটু দেখা দিয়ে
} ১৭ প্রথম দৃশ্য ] # খেয়াল আসতে হয়েছে। (লাটু চা ইত্যাদি নিয়া আসিল) ওর স্বামী মারা যাওয়ার পর তার কাছে আর যাইনি মেয়েমানুষকে এত বলাতে আর কখনাে আমি দেখিনি—দেখতে না দেখতে যেন বুড়ী হয়ে গেছে ! একটু চা খাব—আর ছানাবড়ার কথাও তাে বলেছিলি তুই। (সমুজ্জ্বলার প্রতি) সমুজ্জ্বলা, এদিকে এসে বােস্ না। সমু। পিসীমা—এখানেই বেশ আছি। অতুল। (শূন্য প্লেট হাতে লইয়া) এ কি, লাটু! (লাটু কাছে আসিল, সমুজ্জলা ও বনমালী দূরে গেল ) ছানাবড়া নেই যে ? বিশেষ করে তাই তৈরী করতে তাে বলে- ছিলুম ! লাটু। কি করব বাবু, কাল বিকেলে বৌবাজারে একেবারে ছানা ছিল না, দু' বার গিয়ে ফিরে এসেছি। অতুল। ছানা ছিল না ? লাটু। না, বাবু—দ্বিগুণ দাম কবুল করেও কোথাও পেলুম । তা আর কি করা! ( লাটু নিষ্ক্রান্ত) ভারি কষ্ট হচ্ছে আমার মাসীমা, ছানা ছিল না, দ্বিগুণ দাম কবুল করেও পাওয়া গেল না। সে থাক, তাতে কি! বিদ্যুতের বাড়ীতে বাগ- বাজারের নবীন ময়বার রসগােল্লা খুব উড়ান গেছে। অতুল। ২
১৮
খেয়াল *
| প্রথম অঙ্ক
ব্রজ।
হাঁ, অতুল ; ঠিক সময়ে যাস্ আজকে কিন্তু আমাদের
বাড়ীতে-নন্দিতা আর তার স্বামীও আসবে।
অতুল। কিন্তু মাসীমা, সে সুখ তত আমার কপালে আজ নেই
বলেই মনে হচ্ছে।
কেন ? (সমুজ্জ্বল ও বনমালী কাছে আসিল)
অতুল। ভারি মুস্কিল—তার পেলুম্ আমার বন্ধু রমাপদের
অসুখ ভারি বেড়ে গেছে। (বনমালীর সহিত চোরা
দৃষ্টি বিনিময় )
ভারি আশ্চর্য্য তাে ! রমাপদের অসুখের চমৎকার
সময় জ্ঞান আছে দেখতে পাচ্ছি।
অতুল। বেচারি ভারি ভুগছে !
অতুল, তাের রমাপদটি বাঁচবে কি মরবে এতদিনে
তার সেটা ঠিক করে ফেলা উচিত ছিল।
এ নিয়ে হেলাফেলাটা ভালাে হচ্ছে না। আর
চিররােগীর প্রতি আজকালকার ছেলেদের দয়াও
আমার ভালাে ঠেছে না। অসুখ বিসুখকে এমন
ধারা উৎসাহ দিতে নেই। স্বাস্থ্যই হয়েছে জীবনের
শ্রেষ্ঠ কৰ্ত্তব্য। আমি তাের মেসসাকে তত সেই
কথাই বরাবর বলে আসছি, কিন্তু উনি সেদিকে কাণ
দেন না—ওঁর ব্যারামও ওঁকে ছাড়ে না। তাের
রমাপদটিকে বিশেষ করে আমার অনুরােধ জানা
আসছে শনিবারে যেন সে অসুখ বাড়িয়ে বসে না
১৯ প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল * সেদিন গীতবাদ্যের বন্দোবস্তের জন্যে তােকে বিশেষ দরকার আছে। অতুল। তা রমাপদকে বল্ব,মাসীমা যদি সে জ্ঞান না হারিয়ে থাকে—শনিবারে তার অসুখ করবে না তা তােমাকে ঠিক বলতে পারি। (চা লইল) অবিশ্যি গীতবাদ্যের বন্দোবস্তটা নিয়ে একটু মুস্কিলে পড়তে হবে। আমি একটা প্রােগ্রাম করিছি -মাসীমা, তুমি যদি একটু ওঘরে আস তাহলে তােমাকে সব দেখাতে পারি । সমু। রন। আচ্ছা, সে বেশ হবে। (অতুলের সঙ্গে যাইতে যাইতে ) প্রােগ্রাম বেশ চমৎকারই হবে নিশ্চয়—অবিশ্যি আমি কিছু কাটা ছাঁটা করে দিলে পর। (সমুজ্জ্বলার প্রতি) সমুজ্জ্বল, তুইও আয়। এই যাচ্ছি, পিসীমা। ( ব্ৰজ ও অতুল নিষ্ক্রান্ত) চমৎকার দিনটি করেছে আজকেমন, না ? দিনটিনের কথা আমাকে বলবেন না, দাস মশায়। চমৎকার দিনের কথা কেউ আমাকে বল্লেই মনে হয় তার পেটে অন্য কথা আছে—এটা কেবল তার মুখ- বন্ধ মাত্র—সেই মনে করেই আমার কেমন কেমন লাগে। আমারও অবিশ্যি অন্য কথা মনে আছে। সমু। বন ।
খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
সমু।
বন।
সমু।
বন।
সমু।
আমিও তাই ভেবেছিলুম।
আপনার পিসীমার অনুপস্থিতির এই সুযােগে
আপনার মনের কথা বলে ফেলা উচিত—কেমন, এই
কথা না ? আর পিসীমার হঠাৎ ঘরে ঢুকবার
দিকেও একটা ঝোঁক আছে।
(দরজার কাছে গিয়া দরজা বন্ধ করিয়া আসিল)
আপনাকে আপনাকে দেখা অবধি আপনিই
আমার দৃষ্টি ও মনের সমস্ত প্রশংসার অধিকারিণী
হয়ে বসে আছেন। ভাষায় তা প্রকাশ কৰ্ত্তে
পারি না।
ভাষা শুধু মনের ভাব ব্যক্ত কর্তেই ব্যবহৃত হয় না,
দাস মশায়! অব্যক্ত রাখতে—কিংবা অতিরঞ্জিত
বা মিথ্যা প্রকাশ কৰ্ত্তেও তার কম ব্যবহার হয় না ।
তবে আপনি আমায় ভালবাসেন সেটা আমি বেশ
জানি, প্রকাশ্যে এ কথাটা বলে ফেলেন সেটিও
বরাবর ইচ্ছা করে এসেছি। আপনার প্রতি আমার
মনের একটি অদম্য আকর্ষণ আছে। আপনার সঙ্গে
দেখা হওয়ার আগেও আপনার প্রতি আমি মােটেই
উদাসীন ছিলুম না। (বনমালী আশ্চৰ্য্য হইয়া তার
দিকে চাহিল) আপনি হয়ত জানেন, দাস মশায়,
আমরা এক আদর্শের যুগে বাস করছি। সে কথাটা
আজকালকার বড় বড় মাসিকে উচ্চকণ্ঠে ঘােষণা
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল *
২১
করা হয়। অযত্ন বিন্যস্ত সহজ বনপ্রকৃতির দিকে
ফিরে যাওয়াই হয়েছে আজকালকার নাগরিক
সভ্যতার আদর্শ-বনানী নামে কাউকে ভালােবা
বরাবর আমার আদর্শ ছিল তাই। এই নামটিতে
এমনি একটা কিছু আছে যা মনকে তার নািবড়
মায়া ও অপরিচিত রহস্যের দিকে টেনে নেয় ।
অতুল দা যে মুহূর্তে বল্লেন যে বনানী নামে তার
একটি বন্ধু আছে, সেই মুহূর্তেই বুঝলুম আপনাকে
ভালােবাসতেই আমার সৃষ্টি হয়েছে ।
সত্য আমাকে ভালােবাস, সমুজ্জ্বল ?
মনে প্রাণে।
সমু, তুমি জাননা কত সুখী করলে আমাকে।
( পাশে বসিল)
বনানী আমার !
বন ।
সমু।
সমু।
(গান)
তুমি কোন্ দেশের বনানী গাে,
শ্যামল ছবিখানি!
তােমার বনে আমার ফুল কি
ফোটে বল শুনি।
মলয় বায় দোলায় তায়,
ভে এসে চুমাে খায় !
* খেয়াল - [ প্রথম অঙ্ক ! সমু। বন। সমু। পাখীরা গায় মধুর তানে, কতই কি জানি। আলাে পাশে ছায়া বসে, করে মধুর কানাকানি। অবশ্য তুমি এ কথা বল্ছ না যে আমার নাম বনানী হলে তুমি আমাকে ভালোবাসতে না। কিন্তু আপনার নাম তত বনানীই। হাঁ, সেই। কিন্তু মনে করুন যদি অন্য একটা কিছু হয় ? আপনি কি বলতে চান তাহলে আপনি আমাকে ভালােবাসতে পারবেন না ? ওঃ ! সে একটা মনস্তত্ত্বের বিষম সমস্যা—তবে মনস্তত্ত্বের সমস্যার সঙ্গে প্রকৃত জীবনের ঘটনার কতটা সম্পর্ক সে তাে জানেনই। সত্য কথা বলতে গেলে আমার নিজের কিন্তু বনানী নামটা মােটেই ভালাে লাগেনা—এটা আমাকে মােটেই মানায় না । চমৎকার মানায়—সুন্দর নামটি। ঙ্গীতের মত মিষ্টি–শুনলেই কাণে মধু বৃষ্টি হয় ! কিন্তু এর চেয়েও সুন্দর নাম কত রয়েছে। যেমন- ধরুন না, বনমালী—চমৎকার নাম। বনমালী। না, এ নামে কোনাে সঙ্গীত নেই। এতে কাণে মধু ঢালে না। কয়েকজন বনমালীকে বন। সমু। সমু।
প্রথম দৃশ্য ]
— খেয়াল *
বন ।
আমি জানি ; বনমালী নাম শুনলেই আমাদের সেই
ঝাড়ুদার বনমালীর কথা আমার মনে হয়।
বনমালী আবার একটা নাম! বনমালী নামে কারু
সঙ্গে কেননা মেয়ের বিয়ে হলে তার বিষম দুর্ভাগ্য
কেমনবতে
হবে। বনানী ‘বনানী’
-কেমন
মিষ্টি! কবিত্বপূর্ণ !
তবে শীঘ্র আমার নাম বলে—না, না—আমাদের
মালা বদল করতে হবে—অর্থাৎ কিনা বিয়েটা শীঘ্র
হয়ে যাওয়াই ভালাে।
সমু। (বিস্মিত) বিয়ে, দাস মশায় ? (দু’জনেই উঠিল)
( হতবুদ্ধি ) হাঁ—সেইত। তুমি জাননা তােমাকে
আমি ভালবাসি, তুমিও আমার প্রতি একেবারে
উদাসীন নও, তাতাে বলেছ।
সমু! আমি আপনাকে প্রাণাধিক ভালােবাসি। কিন্তু
আপনি তাে এখনাে আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব
পাড়েন নি ! বিয়ে সম্বন্ধে তাে কোনাে কথাই
হয়নি—এ বিষয়টির কাছ দিয়েওতত যাওয়া হয় নি !
সে যে এখনও একটা সম্পূর্ণ অচিন্তিত ব্যাপার রয়েছে
আমার কাছে।
বন। আচ্ছ-এখন কি প্রস্তাবটা পাড়তে পারি ?
সমু। তার চমৎকার সুযােগটি পাওয়া গেছে বলে
মনে হয়। ( সােফায় অাবার বসিয়া) সন্তাবিত
২৪
খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
নিরাশার হাত থেকে বাঁচানাের জন্যে আপনাকে
পূর্ব হ’তেই বলে দিচ্ছি দাস মশায়, আমি
আপনাকে গ্রহণ করব বলেই কৃতসঙ্কল্প হয়েছি।
বন। তাহলে, সমু, তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
(জানু পাতিল )
সমু। অবশ্য করব, প্রিয়তম। (গলা জড়াইয়া ধরিল) এ
ব্যাপারে তােমার অভিজ্ঞতাটা কতদিনের ? খুব
বেশী দিনের নয় আশা করি।
বন। সমু, তােমাকে ছাড়া পৃথিবীতে আর কাউকে
আমি ভালােবাসিনি।
সমু। তাহলে ভলবাসাটা আপনাকে কেউ শেখায় নি
কিন্তু পুরুষেরা অভ্যস্ত হবার জন্যে অনেক সময়
বিয়ের প্রস্তাব করে থাকে। ওঃ! বনানীবাবু, কি
চমৎকার সুগভীর কালাে চোখ আপনার—যেন ওর
কূল নেই, তল নেই—অপার রহস্যের আধার !
এমন করেই যেন আপনি আমার দিকে সারা জীবন
?
চেয়ে থাকেন।
(ব্রজসুন্দরীর প্রবেশ ।).
ব্রজ। বনানীবাবু! (বনানী উঠিতে চেষ্টা করিল; সমুজ্জ্বল
বাধা দিল) উঠে পড়ুন। ভারি অভদ্র ভঙ্গী এটা!
সমু।
পিসীমা ! (বনানী উঠিতে চেষ্টা করিল ;. সমুজ্জ্বল।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেমাল -
বাধা দিল) তুমি একটু সরে যাও। এখন তােমার
প্রবেশের সময় হয় নি ! (আবার বনমালীর চেষ্টা )
আর দাস মশায় এখনাে কথা শেষ করেন নি।
ব্রজু। কি কথা শেষ করেন নি ?
সমু। সে জানতে পারবে এখন সময় মত ।
ব্রজ। তাহলে বলে দিচ্ছি তােকে যে এসব কথা আমিই
জান্ব আগে—তারপর তুই জানিস্ না জানিস্ তাতে
কিছুই এসে যায় না। আমি বুঝতে পেরেছি সব।
আমি বনানীকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস্ করছি;
ততক্ষণ তুই গিয়ে বরং নীচে গাড়ীতে বােস্।
সমু।
( বিরক্তির কঠে) পিসীমা।
ব্রজ। (আদেশের কণ্ঠে। নীচে-গাড়ীতে।
(বনমালী এতক্ষণে উঠিয়া পড়িয়াছে -ব্রজসুন্দরীর অলক্ষিতে
দু’জনে হাতে চুম্বন বিনিময় করিল। এদিক ওদিক চাহিয়া
কোথা হইতে শব্দ হইল—ব্রজসুন্দরী ঠিক বুঝিতে পারিল না)
যাই, পিসীমা।
( নিক্রান্ত )
ব্ৰজ। (বসিয়া) আপনি বসতে পারেন। ( নােটবই এবং
পেন্সিল বাহির করিল)
বন। , বেশ আছি।
ব্রজ। হ্যা, আপনাকে প্রথমেই বলতে হচ্ছে—উপযুক্ত
পাত্রের আমার এই যে লিষ্টি আছে তাতে আপনার
নাম নেই—সে যা হােক, প্রশ্নের জবাব মনােমত
সমু।
* খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
বন।
হলে আপনার নামটাও আমি টুকে নিতে পারি।
আপনি কি তামাক টামাক খান ?
সিগারেট, সময় সময় ।
বেশ, শুনে সুখী হলুম—পুরুষের হাতে একটা না
একটা কিছু কাজ থাকা চাই। দিনে দিনে কুড়ে
লােক বেড়ে যাচ্ছে দেশে। বিশেষ, স্ত্রীলােক যখন
পুরুষ মানুষকে, “মুখে আগুন” বলে আদর করে,
তখন তারা সিগারেট বা চুরুটের আগুনটাকেই
লক্ষ্য করে বলে—আচ্ছা আপনার বয়স কত ?
এই ত্রিশের প্রায় কাছাকাছি। (বসিল)
—সেই হয়েছে বিয়ের উপযুক্ত বয়স। পুরুষ যখন
বিয়ে করতে যায় তখন তার হয় সব জানা, নয় কিছুই
জানা উচিত—এই আমার চিরকালের মত।
আপনার কোষ্টা ?
আমার কিছু জানা নেই।
ব্রজ। শুনে সুখী হলুম। প্রকৃতিগত অজ্ঞতার পরিপন্থী
কোনাে কিছুকে আমি পছন্দ করি না! অজ্ঞতা
হয়েছে একটি সুকুমার ফুল, তাকে ছোঁবামাত্রই তার
সমস্ত সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। আচ্ছা, আপনার
আয় কত ?
বন । বছরে এই চার হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে।
ব্রজ। (নােটবুকে নােট করিয়া) জমি জমায়, না ব্যবসায় ?
বন।
প্রথম দৃশ্য ]
— খেয়াল *
বেশীর ভাগ ব্যবসায়।
ব্রজ। বেশ, বেশ। জমি জমায় লাভের দিন চলে গেছে।
জাম জমায় মানুষকে সমাজে উচ্চপদ দেয় বটে কিন্তু
সেই পদ বজায় রাখবার মত কিছু দেয় না। জমি-
জমা সম্বন্ধে আমার এই আপত্তি।
বন । দেশে আমার একটা বাড়ী এবং তৎসংলগ্ন কিছু
জমিজমাও আছে--কিন্তু সে আমার আসল আয়
নয়—তার উপর নির্ভরও করি না।
দেশে বাড়ী ? কখানা শােবার ঘর ? আচ্ছা, সে
পরে হবে এখন। (নােট করিল) সহরেও বাড়ী
আছে নিশ্চয় ? সমুজ্জ্বলার মত মেয়েতাে আর
গ্রামে গিয়ে থাকতে পারে না।
বন । হাঁ, গ্রে স্ত্রীটে আমার একটা বাড়ী আছে, কিন্তু
রাণী লীলাবতীর কাছে তা ভাড়া-অবিশ্যি ছ’মাসের
নােটিশে
তুলে দেওয়া যায়।
ব্রজ।
রাণী লীলাবতী ! কই, চিনিনে তাে!
উনি সমাজের লােক নন—কারু সঙ্গে বড় একটা
মিশেন টিশেন না—বয়স হয়েছে।
ব্রজ।
গ্রে-স্ট্রীটে—কত নম্বর ?
বন। ১৪৯নং।
ব্রজ। (নােট করিয়া বই বন্ধ করিল) জায়গাটা ভদ্রসমাজুের
২৮ * খেয়াল * [ প্রথম অঙ্ক বন। ব্রজ। বল্লেই যে নয়; যাক, সেটা বলে নেওয়া যাবে। এখন ছােট খাটো কথা। তােমার মা বাপ কি জীবিত ? কেউ জীবিত নেই। দু’জনেই গেছে ? একজনকে কারাগাে দুর্ভাগ্য বটে, কিন্তু দুজনকে হারাণে যে নেহাৎ অসাবধানতা! তােমার বাপ ছিলেন কে ? টাকা পয়সা ছিল মনে হয়! বুনেদি ঘরে জন্মেছিলেন, না ছােট থেকে বড় হয়েছিলেন ? সে জানি না। আসল কথা কি, আমি বলিছি— দু’জনকেই হারিয়েছি কিন্তু বেশী সত্য হবে একথা দু’জনে আমাকেই হারিয়েছিলেন। কোথায়—কার ঘরে আমার জন্ম আমি তা জানিই । আমি—আমি——আমাকে কুড়িয়ে পাওয়া গেছিল। ( উঠিল) কুড়িয়ে পাওয়া গেছিল। মৃত গঙ্গাধর সিংহ—খুব দয়ালু লােক তিনি—তিনিই আমাকে পেয়ে পেলেছিলেন। কোথায় পেয়েছিলেন ? একটা হাত ব্যাগের মধ্যে। হাত ব্যাগ! (গম্ভীর ভাবে) হাঁহ তি ব্যাগেই—একটু বড় রকমের চামড়ার-হাতল ছিল। বন। বন। ব্রজ। বন। =
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
ব্রজ।
এই বড় রকমের হাতলওয়ালা চাড়ার হাতব্যাগে
কোথায় তােমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিল গঙ্গাধর
সিংহ ?
বন।
বন ।
হাওড়া স্টেশনে—তার নিজের বলে ভুলে তাকে
এটা দেওয়া হয়েছিল।
আমাকে স্বীকার কৰ্ত্তে হচ্ছে এখন যা শুলুম তাতে
কিছু হতবুদ্ধি হয়ে গেছি। হাতব্যাগের মধ্যে
তার হাতল থাক আর নাই থাক—হাতব্যাগের মধ্যে
জন্ম নেওয়া, অন্ততঃ লালিত পালিত হওয়াটা, ভদ্র
নয়—আর রেলওয়ে স্টেশন চিরকালই সামাজিক,
অবিবেচনা লুকোবার একটা স্থান স্বরূপ বলে
বিবেচিত হয়ে আসছে।
আমাকে আপনি এখন কি উপদেশ দেন? সমুজ্জ্বলার
সুখের জন্যে আমি সব করতে পারি।
আমি শুধু এই উপদেশ দিতে পারি যথাসম্ভব শীঘ্র
দু’চারটি আত্মীয় যােগাড় করে ফেল—মাতা কি
পিতা, একটি অন্ততঃ বের করে ফেল—এই বছরটা
শেষ হবার আগেই বের করে ফেল।
সে যে কি করে পেরে উঠব তা’তে বুঝছি না।
হাতব্যাগ যে কোন মুহুর্তেই আমি এনে হাজির
করতে পারি। বাড়ীতেই রয়েছে। তাতেই আপনি
সন্তুষ্ট হবেন আশা করি।
ব্রজ।
বন।
* খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
আমি সন্তুষ্ট হব ? আমার সঙ্গে এর সম্বন্ধ কি, দাস
মশায় ? আমার আপন ভাইয়ের মেয়েশিশুকাল
থেকেই নিজের মেয়ের মত পেলেছি, কলেজে দিয়ে
লেখাপড়া শিখাচ্ছি, তাকে যে রেলওয়ে ষ্টেশনে
বিয়ে দেব এবং হাতব্যাগের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন
করব তা আপনি স্বপ্নেও ভাববেন না। যাই এখন
দাস মশায়।
( নিষ্ক্রান্ত )
(অতুলের প্রবেশ—গান গাহিতে গাহিতে )
অতুল।
(গান)
ওগাে, বিয়ের ফুল ফুটুল কি তাের ?
আই বুড়াে দিন ঘুচলল কি তাের ?
বন। ভীষণ রাগিয়া) নে, নে, থাম! গাধা কোথাকার!
অতুল। তাহলে কি সুবিধে হয়নি? সমুজ্জ্বলার মত
হয়নি নাকি ?
'বন।
আরে সে হয়ে গেছে—পিসীমাটিই বরদাস্ত হয় না—
যেন তারকা-রাক্ষসী! ভ্রাতুস্পুত্রীটি যে পিসীমার
মত হয়নি, রক্ষে !
অতুল। তুমি যে সহরে বনানী আর গ্রামে বনমালী, সে
সম্বন্ধে সত্য কথাটা সমুজ্জ্বলাকে বলেছ ?
বন। (গম্ভীর স্বরে) আরে, সুন্দরী শিক্ষিতা ও অবিবাহিত
কোনাে মেয়েকে বলবার মতন সত্য তাে এ নয়।
স্ত্রীলােকের সঙ্গে আচরণ সম্বন্ধে তােমার মত অদ্ভুত
ধারণা আমার নেই।
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল *
৩১
অতুল। স্ত্রীলােক সুন্দরী হলে তার সঙ্গে এক রকম আচরণই
সম্ভব—সেটা হচ্ছে তার সঙ্গে প্রেম করা ; আর
নিজকে সে বিষয়ে অনুপযুক্ত মনে কল্লেস’রে
পড়া !
বাজে কথা !
অতুল।
তােমার ভাইয়ের খবর কি? সেই দুশ্চরিত্র বনানীর
কথা ?
এই সপ্তাহ শেষ হবার আগেই তাকে আমাকে
ছাড়তে হবে ; সে সন্ন্যাস রােগে হঠাৎ পশ্চিমে
মারা গেছে বল্ব, কতলােক তাে সন্ন্যাস রােগে হঠাৎ
মারা যায়,—কেমন, যায় না ?
অতুল। হাঁ; কিন্তু রােগটা পুরুষানুক্রমিক—বিশেষ বিশেষ
পরিবারেই এর আক্রমণ দেখা যায়। বরং বলল
হঠাৎ ভীষণ ঠাণ্ডা লেগে একদিনেই ডবল নিউমােনিয়া
হয়ে মারা যায়। তা না হলে তােমার উপরও
ওপক্ষের একটা আশঙ্কা আসতে পারে।
'বন। ডবল নিউমােনিয়াটা পুরুষানুক্রমিক নয় তাে? তুমি
সেটা নিশ্চিত জানাে ?
অতুল। না, না, তা নয়।
বন। আচ্ছা, বেশ তাহলে। আমার ভাই বনানী হঠাৎ
পশ্চিমে ডবল নিউমােনিয়ায় মারা গেছে। শেষ
হ’ললা তাে ?
# খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
অতুল। কিন্তু তুমি যেন বলছিলে যে তােমাদের কিঙ্কিণী
তােমার ভাই বনানীটি সম্বন্ধে একটু অতিরিক্ত
interest নিয়ে থাকেন।
বন। ওঃ, তাতে কি! সে উপন্যাসের প্রেমিকা নয়-ক্ষুধা
তার প্রবল রয়েছে, হাটতেও পেির সে অনেক রাস্তা,
আর কবিতা লিখা বা ভাবাকুল নেত্রে চাওয়ার
অভ্যাস তার মােটেই নেই।
অতুল। কিঙ্কিণীকে দেখতে ইচ্ছা হয়।
বন । কোনদিন তাকে দেখতে না পাও সেই চেষ্টাই আমি
বিধিমত করব, জেনে রাখ—সে আশ্চৰ্য্য সুন্দরী,
বয়সও তার এই ষােল চলেছে।
অতুল। সমুজ্জ্বলাকে কি এই কথা বলেছ যে তুমি এমন একটি
অসম্পর্কিত মেয়ের অভিভাবক যে আশ্চৰ্য্য সুন্দরী
এবং যার বয়স এই ঘােল চলেছে ?
এসব কথা হাটে ঘাটে ঢাক পিটিয়ে বদ্বার মতন বােকা
কেউ নয়। কিঙ্কিণী ও সমুজ্জ্বলার খুব মিল হবে
নিশ্চয়।
দেখা হওয়ার পর আধ ঘণ্টা যেতে না
যেতেই তােমাকে বলছি তারা একজন আর জনের
সখী হয়ে উঠবে।
অতুল। (উঠিয়া চেয়ার পিছনে ঠেলিয়া) হ—সেটা বটে কিন্তু
আগে তারা একে অন্যের সব পেটের খবর বের করে,
তবে তারা সই পাতবে এটাও জেনে রেখাে।
বন।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
হ–সময় হয়ে এল, এই বেলাটাও রয়েল হােটেলে
যাওয়া যাক, চল না—বড় ক্ষুধা পেয়েছে।
বন। তােমার আবার ক্ষুধা না থাকে কখন!
অতুল। খাওয়ার পর কি করা যায়—থিয়েটারে যাবে ?
বন। , না। সে হবে না বাবা! পয়সা দিয়ে চোর!
একটু কথা বল্লেসিগারেট টালে—দশ শালা এসে
“অর্ডার” “অর্ডার করবে এখন। অমন আড়ষ্ট
হয়ে জড় ভরতের মত ব’সে, নাকি কথার ন্যাকামাে
শােনা আমার কর্ম নয় ।
চল, ক্লাবে যাই।
বন। না, সেও নয়—সেখানে যত বাজে কথার শ্রাদ্ধ !
অতুল।
তাহলে বিকেলের দিকে চললা সিনেমাতে।
না, না।
চেয়ে চেয়ে ক্লান্তি ধরে যায়। চোখ,
ব্যথা করে !
অতুল। তাহলে কি করা যাবে ?
বন। কিছুই নয়।
অতুল।
বন।
(লাটুর প্রবেশ।)
লাটু। দিদিমণি।
( সমুজ্জ্বলার প্রবেশ। লাটু নিষ্ক্রান্ত। দরজা খােলা রহিল।)
অতুল। ওসমুজ্জ্বলা !
সমু। (অতুলকে ঘুরাইয়া দিয়া) অতুলদা’, একটু ওদিকে
৩৪
- খেয়াল *
[ প্রথম অঙ্ক
ফিরে থাক। দাস মশায়কে একটু বিশেষ কথা
বলবার আছে আমার।
অতুল। বাস্তবিক, সমুজ্জ্বলা, এ আমি অনুমতি দিতে পারি
বলে মনে হয় না।
সমু। অতুলদা’, অনুগ্রহ করে একটু ফিরে থাক না।
(আবার তাকে ঘুরাইয়া দিল ) [ বনমালীর কাছে গিয়া ]
বনানীবাবু, আমাদের বিয়ে হবার কোনাে সম্ভাবনা
দেখছি না—পিসীমার মুখ দেখেই আমার সেই
আশঙ্কা হয়েছে। জানেন না, আজকাল অভিভাবক,
দের মেনে চলাই হয়েছে রীতি। এক সময় যৌবনকে
শ্রদ্ধা করা হতাে—আজকাল দেশ থেকে সে পাঠ
উঠে গেছে। পিসীমার উপর আমার যা কিছু
প্রভাব ছিল, সে আমার তিন বছরের সময়ই শেষ
হয়ে গেছে । কিন্তু যদিও তিনি এখন আমাদের
বিয়েতে বাধা দিতে পারেন,যদিও আমি অন্য কাউকে
বিয়ে করে ফেলতে পারি, তবু এটুকু মনে রাখবেন
যে আপনার প্রতি আমার সেই চিরন্তন আকর্ষণটি
তেমনি অটুট এবং অক্ষুন্ন আছে ও থাকবে ?
বন। ধন্য ! আদর্শ যুগের আদর্শ মেয়ে ! যদি দেশ
কখনাে উদ্ধার হয় তত আপনাদের দ্বারাই হবে !
সমুজ্জ্বলা ! আপনার এ সান্ত্বনার জন্যে অশেষ
.ধন্যবাদ।
প্রথম দৃশ্য ] -* খেয়াল * সমু। বন। আপনার উপন্যাসােচিত জীবনকথা নানা রকম বিরুদ্ধ মন্তব্যের সঙ্গে পিসীমার নিকট থেকে শুনে আমার প্রকৃতির গভীরতম অন্তস্থল পৰ্যন্ত নড়ে উঠেছে। আপনার বনানী নামটির অদম্য আকর্ষণ রয়েছে। আপনার চরিত্রের সরলতা আপনাকে আমার নিকট আশ্চর্য রকম দুজ্ঞেয় করে তুলেছে। ( কিছু দূরে সরিয়া) বেচুচাটার্জির স্ত্রীটের আপনার সহরের ঠিকানা আমার জানা আছে। (নোটবুক বাহির করিয়া ) আপনার গ্রামের ঠিকানাটা কি ? রায়পাশা—“বিজন কুটীর” হুগলি। (অতুল সার্টের কাফে ঠিকানাটা লিখিয়া-ঝাখিল তারপর রেলওয়ে গাইড, হাতে লইল কতদিন সহরে থাকবেন ? সােমবার পর্যন্ত। বেশ! অতুলদা’, এখন ফিরতে পার। হাঁ, আমি আগেই ফিরে গেছি। (অতুলের প্রতি) তুমি এখন লাটুকে ডাকতে পার। আমিই তােমাকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি? নিশ্চয়। ( লাটুর প্রবেশ) ( আগত লাটুর প্রতি) আমিই ওঁকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসব। সমু। বন। সমু। অতুল। সমু। সমু।
* খেয়াল
i প্রথম অঙ্ক
অতুল।
লাটু।
আচ্ছা, বাবু।
( বনমালী ও সমুজ্জ্বলা নিষ্ক্রান্ত )
{ লাটু অতুলের হাতে দুইটা চিঠি দিল—দেখা গেল
যেন দোকানের বাকীর “বিল”—অতুল পড়িয়া
ছিড়িয়া ফেলিল }
অতুল। হু! এ সময়ে আবার পাওনাদারের বিল। মরণ
আর কি! এক গ্লাস সরবৎ, লাটু।
লাটু। এই তো। (দিল)
অতুল। রমাপদগিরিতে বেরুব।
লাটু। আচ্ছা, বাবু।
হয়ত সােমবারের আগে আসব না। যা কিছু
প্রয়ােজন সব ঠিক করে রাখ।
লাটু। আচ্ছা, বাবু।
অতুল। কাল দিনটা ভালাে করলেই হয়।
সে আশা নেই।
অতুল। তুই কেবল মন্দ কথাই ভাবি।
(লাটু নিষ্ক্রান্ত)
(বনমালীর প্রবেশ)
বন। মেয়েটির চমৎকার বুদ্ধিসুদ্ধি—আর বেশ শিক্ষিত মন!
জীবনে এই প্রথম, মেয়েদের মধ্যে একেই মনে
ধরেছে। (অতুল খুব হাসিতে লাগিল) এত হাসির
উদ্রেক হচ্ছে কিসে?
লাটু।
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল *
অতুল। বেচারী রমাপদের জন্যে একটু চিন্তা হচ্ছে- আর
কিছু নয়।
সাবধান না হলে তােমার রমাপদী বন্ধুটি তােমাকে
একদিন বিপদে ফেল্বে।
অতুল। বিপদ আমি ভালােই বাসি। অন্ততঃ ওতে সুগম্ভীর
বলে কিছু নেই।
সব বাজে কথা—তােমার কথার কোনােদিন কোনো
অর্থ থাকে না ।
তুল। অনেকেরই থাকে না। আর তা ছাড়া অর্থহীন কথা
বতেই আমি ভালােবাসি। (বনমালী ঘৃণার সহিত
চারিদিকে চাহিয়া বাহির হইয়া গেল ; অতুল একটা সিগারেট
জ্বালাইয়া সার্টের কাফটা পড়িল এবং হাসিল )—“রায়পাশা,
বিজুন কুটীর, হুগলি”।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বিজন কুটীরের বাগান। বাগানটি পুরাণাে ধরণের
চেয়ার, টেবিল, টেবিলের উপর বই। সরােজিনী
বসিয়া আছে। কিঙ্কিণী ফুলগাছে
জল দিতেছে।
কিঙ্কিণীৱ গান।
আমি তরুলতার শ্যামল কোলে
আপন হারা হই।
দেখলে পরে ফুলের হাসি,
আমাতে আর আমি নই।
প্রকৃতির আপন গড়া,
কত বর্ণ, গন্ধে ভরা,
স্বরগের শোভা রাশি—
মরতে আর এমন কই
সরােজিনী। (ডাকিল) কিঙ্কিণী ! কিঙ্কিণী । গাছে জল
দেওয়াটা তােমার চেয়ে উড়ে মালীটারই বেশী কৰ্তব্য
কাজু। তােমার উপক্রমণিকা যে টেবিলে পড়ে
আছে। ২১ পৃষ্ঠা খােল ; কালকের পড়াটা আবার
দেখে নাও।
প্রথম দৃশ্য]
- খেয়াল *
কিঙ্কিণী। না, ও “টা ভ্যাম্ ভিন্নু ভ্যাম্ ভস্” আমার
একদম ভালাে লাগে না। কি বিখুটে ভাষা।
সংস্কৃত পড়ে কি হবে? আমি তাে আর টিকিধারী
বামুন পণ্ডিত হতে যাব না!
সরাে। তুমি তাে জানাে তুমি সব বিষয়ে উন্নতি লাভ কর সে
সম্বন্ধে তােমার অভিভাবকের কত ঐকান্তিক ইচ্ছা।
কাকে সহরে যাবার সময় বিশেষ করে তােনার
সংস্কৃত চর্চার কথাই বলে গেলেন।
কিঙ্কিণী। কাকা ভারি গম্ভীর লােক -এত গম্ভীর, যে আমার
অনেক সময় মনে হয় ওঁর মন ঠিক সুস্থ নয়। (জলের
ঝাড়ি রাখিয়া অগ্রসর হইল)
সরাে। তােমার অভিভাবকের স্বাস্থ্য উত্তম-ত্রিশ বছর বয়সে
এমন গাম্ভীর্য তাে প্রশংসারই কথা। তার চেয়ে
বেশী কৰ্তব্য ও দায়িত্বজ্ঞান কারু আছে বলে আমি
জানি না।
কিঙ্কিণী । (টেবিলের কাছে আসিয়া) হাঁ—তাই বােধ হয় আমরা
তিনজন যখন একত্র হই তাকে এমন বিরক্ত বিরক্ত
দেখায় ! হাসি খুসী থাকাটা বােধ হয় তিনি স্বভাব
থেকে একেবারে নাকচ করেই দিয়েছেন।
সরাে। কিঙ্কিণী ! তােমার কথায় বিস্মিত হচ্ছি! বনমালী
বাবু জীবনে অনেক দুঃখ ভােগ করেছেন। মিথ্যা
হাসি ঠাট্টা এবং বাচালতা তার কথাবার্তার মধ্যে
৪০
* খেয়াল
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
নেহাৎ অশােভন হতাে। তার সেই হতভাগ্য
ভ্রাতাটি সম্বন্ধে তার চিন্তা এবং অস্থিরতার কথাটাও
ভাবতে হয় তাে !
কিঙ্কিণী। কাকা তাকে সময় সময় এখানে আসতে দেন না
কেন? আমরা হয়ত তাকে অনেক শুধরিয়ে নিতে
পারতুম—আপনি তাে নিশ্চয়ই পারতেন। (বসিল)
আপনি তাে জানেন, কটমট সংস্কৃত আর ইতিহাস
ভুগােলের কনিষ্ক কামাসকাটুকার মত নাম গুলো
মানুষের চরিত্র গঠনে কি সুন্দর কাজ করে থাকে।
তার জন্যেই বােধহয় পূজোয় ও বিয়েতে সংস্কৃত
উচ্চারণের ব্যবস্থা রয়েছে। যত বেশী কটমটে এবং
যত বেশী দুর্বোধ হবে, ততই যে চরিত্রের উপর বেশী
কাজ করবে! (তাহার ডায়রীতে কি লিখিতে লাগিল )
সরাে।
( মাথা নাড়িয়া) তার নিজের ভাই-ই যখন বলছেন যে
ওর চরিত্র শুধরাণাের অতীত, তখন আমিই যে কিছু
করে উতে পারব ভরসা হয় না। আর বাস্তবিক,
সেরূপ চেষ্টা করায় ইচ্ছাও যে আমার আছে তাই
বা কি করে বলি। খারাপ লােকে চট করে
ভালাে করে ফেলার আধুনিক বােগে আমাকে
পায়নি। তােমার ডায়রী এখন রেখে দাও, কিঙ্কিণী ।
ডায়রী লেখার কোনাে প্রয়ােজন আছে বলে তাে
আমার মনে হয় না।
৪১
প্রথম দৃশ্য ]
খেয়াল *
কিঙ্কিণী। আমার জীবনের আশ্চৰ্য্য গােপন কথাগুলাে লিখে
রাখবার জন্যেই আমি ডায়রী রাখি। না লিখে
রাখলে সব ভুলে যেতুম হয়ত।
সরো। কিঙ্কিণী, আমাদের স্মৃতিশক্তিই সেই এক মাত্র
ডায়রী যা আমরা আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই বহন করে
থাকি।
কিঙ্কিণী। কিন্তু তা এমন সব জিনিষের ছাপ রাখে, যা কখনাে
ঘটেনি এবং ঘটতেও পারত না। যে সব উপন্যাস
আজকাল লিখিত ও প্রচারিত হচ্ছে, তার প্রায় সব
গুলার জন্যে স্মৃতিশক্তিই দায়ী বােধহয়—অথচ সে
গুলির অনেকই ঘটেনি—এবং অধিকাংশই ঘটতে
পাৰ্ত্ত না।
সরাে। উপন্যাস সম্বন্ধে এমন হাল্কা কথা বলাে না। এমন
দিন ছিল যখন আমিও একটি উপন্যাস লিখিছি।
কিঙ্কিণী। আপনার উপন্যাস কি ছাপা হয়েছিল ?
সরে। না। পাণ্ডুলিপি দুর্ভাগ্যক্রমে হাত ছাড়া হয়।
থাক, এসব ব’কে আর লাভ নেই কিছু।
কিঙ্কিণী। ধনঞ্জয় বাবু যেন আসছেন বাগানের পথে।
“সরাে।
( উঠিয়া অগ্রসর হইয়া) ধনঞ্জয় বাবু! বেশ, বেশ !
(ধনঞ্জয় মাইতির প্রবেশ)
ধনঞ্জয়। কেমন আছেন সব ? (সরােজিনীর প্রতি) আপনি
বেশ ভালো লােগ ?
82
খেয়াল *---
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কিঙ্কিণী। উনি এখনি একটু মাথা ধরেছে বলে বলছিলেন।
বাগানে আপনার সঙ্গে একটু বেড়ালে বােধ হয় তার
বেশ উপকার হবে।
সরাে। কই, আমি তাে মাথা ধরার কথা কিছু বলিনি।
( বসিল)
কিঙ্কিণী। না, তা বলেন নি জানি; কিন্তু আমি অমনি নিজের
মন থেকেই বুঝতে পারলুম যে আপনার মাথা
ধনঞ্জয় বাবু যখন এলেন তখন আমি ঐ
কথাই ভাবছিলুম—আমার সংস্কৃত ব্যাকরণের কথা
ভাবিনি।
কিঙ্কিণী, তােনার পড়াশুনায় অমনোেযােগ নেই আশা
ধরেছে।
ধন।
করি।
ধন।
কিঙ্কিণী। তা’ বােধ হয় কিছু আছে, সেটা আর অস্বীকার করি
কি করে !
এ আশ্চর্য্য! (সরােজিনীকে দেখাইয়া) ওঁর ছাত্র হবার
সৌভাগ্য থাকলে তাে আমি সব সময় ওঁর ঠোটের
সুধা-বৃষ্টি গিতুম ! (সরােজিনী তারদিকে বিশেষ দৃষ্টিতে
চাহিল) অবশ্য—ঠোটের সুধাবৃষ্টি বলতে আমি ওঁর
মুখের কথাই বুঝিয়েছি-হাঁ, বনমালী বাবু এখনাে
সহর থেকে ফেরেন নি বােধ হয় ?
সরাে। সােমবার বিকেলের আগে তাঁর এখানে ফেরার,
সম্ভাবনা নেই।
৪৩
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
ধন। হাঁ, রবিবারটা তিনি সাধারণতঃ সহরেই কাটান। যে
সব যুবকদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়েছে
আমােদ করা, তিনি তাদের মধ্যে নন—যেরূপ শােনা
যায় তাতে তার দুর্ভাগ্য ভাইটিকে সেই দলের বলেই
মনে হয়। এবং তিনি যে দিন সহরে যান, সে
দিনই নাকি তার সেই ভাইটির উত্তেজুনা বৃদ্ধি পায়।
( উঠিয়া) কিন্তু এখন যাই—আর বিরক্ত করতে
চাইনা। সন্ধ্যার সময় আবার আসর।
সরাে। আসুন, আপনার সঙ্গে একটু ঘুরে আসি। মনে
হচ্ছে একটু মাথাই ধরেছে বেড়ানাে ভালােই হবে।
আশা করি।
সে বেশ তাে, চলুন ঘুরে আসি—স্কুল পর্যন্ত যাওয়া
যাবে।
সরো। চমৎকার হবে। কিঙ্কিণী, তুমি বসে বসে একটু
ইতিহাসখানা দেখ। ( ধনঞ্জয় ও সরােজনী নিষ্ক্রান্ত )
কিঙ্কিণী । (বই লইয়া টেবিলে ছুড়িয়া ফেলিল) চুলােয় যা ইতি-
হাস, ভূগােল—চুলােয় যা উপক্রমণিকা।
(মতির প্রবেশ)
মতি। বনানী বাবু এই মাত্র ষ্টেশন থেকে এসে পৌঁছেছেন,
সঙ্গে জিনীষপত্রও রয়েছে।
কিঙ্কিণী। বনানী বাবু ! কাকাবাবুর ছােট ভাই ! কাকাবাবু
যে সহরে গেছেন, তুমি বলেছ তাকে ?
ধন।
8 ঃ খেয়াল *- [ দ্বিতীয় অঙ্ক মতি। হ’ল। বলুন মতি। অন্য হাঁ, বলিছি। শুনে খুব নিরাশ হয়ে গেলেন বােধ আপনি মাষ্টারের কাছে বাগানে পড়ছেন। তিনি বল্লেন আপনার সঙ্গে তার গোপনে দু একটি কথা আছে। কিঙ্কিণী। এখানেই তাকে নিয়ে এস। আর দেখ, একটা ঘর পরিষ্কার করে তার থাবার জায়গা করে দাও। দিচ্ছি, দিদিমণি। (নিষ্ক্রান্ত ) কিঙ্কিণী । খারাপ লােকের সঙ্গে জীবনে কখনাে দেখা হয়নি— কেমন যেন ভয় ভয় কচ্ছে ! (নড়িয়া) দেখতে হয়ত দশ জনার মতই হবে। (অত্যন্ত স্ফুর্তিযুক্ত এবং হাল্কা ভাবে অতুলের প্রবেশ ) হাঁ, তাইতাে। অতুল। তুমিই বােধ হয় আমাদের ছােট্ট কিঙ্কিণীটি, না? কিঙ্কিণী। আপনার অদ্ভুত রকম ভুল হচ্ছে। আমি তাে ছােট্ট নই! আর এই বয়সের মেয়েদের পক্ষে আমি একটু বেশীই লম্বা বােধ হয়। তবে আমি আপনাদের কিঙ্কিণীই বটে। আপনি কাকাবাবুর ভাই- আমাদের সেই দুষ্ট কাকা বনানী। অতুল। আমি বাস্তবিক দুষ্ট নই, কিঙ্কিণী । তুমি কখ, খনন সে রকম মনে করাে না । কিঙ্কিণী। তা যদি না হন তাহলে আপনি নিশ্চয় এতদিন আমাদেরে ঠকিয়ে এসেছেন—এই দুষ্টমির ভাণ করে। আর সত্যি সত্যি ভালাে থেকে আপনি
প্রথম দৃশ্য ]
— খেয়াল *
০৫
অতুল।
বােধ হয় দুমুখাে জীবন যাপন করে আসছেন—না ?
সেটা যে ভারি কপটতা হয়েছে !
( আশ্চৰ্য্য হইয়া তার দিকে চাহিল) ওঃ! অবিশ্যি আমি
একটু উচ্ছ, ঙ্খলই ছিলুম।
কিঙ্কিণী। শুনে সুখী হলুম। উচ্ছঙ্খলতাটা আর যাই হউক,
কপটতা হ’তে সেটাকে আমি অনেক শ্রেয়ঃ জ্ঞান
করি।
অতুল। সত্যি, তুমি যখন একথা তুললে তখন আমাকে
বলতেই হবে যে আমি আমার ঘােট খাটো বিষয়ে
খুব খারাপই ছিলুম।
কিঙ্কণী। সেই সম্বন্ধে গর্ব অনুভব করবার যদিও কোনাে
কারণ নেই অবিশ্যি—বরং অনুতপ্ত হবার কারণ
থাকলেও থাকতে পারে, তবু তাতে বেশ মজা আছে
নিশ্চয়।
অতুল। তােমার কাছে এখানে থাকাতে তার চাইতে অনেক
বেশী আনন্দ আছে! (বসিল)
কিঙ্কিণী। আপনি যে কি করে এখানে এলেন আমি কিছুই
ঠাহর করে উঠতে পারছি না। কাকাবাবু তাে
সােমবার বিকেলের আগে ফিরছেন না।
অতুল।
তা শুনে, ভারি হতাশ হয়েছি, কারণ সােমবার
সকালে আমাকে ফিরতেই হবে।
কঙ্কিণী। কাকাবাবু ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনি থেকে
.৪৬
==
* খেয়াল *-
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
গেলেই ভালাে হয়। আপনার স্থান পরিবর্তন সম্বন্ধে
আপনার সঙ্গে ওঁর বিশেষ কথা থাকাই সম্ভব।
অতুল। আমার কি ? . (চকিত হইয়া )
কিঙ্কিণী। আপনার স্থান পরিবর্তন। উনি আপনাকে
করাচিতে পাঠাচ্ছেন।
অতুল। করাচি! (উঠিয়া পায়চারি ) তার চেয়ে যে মরণ
ভালাে !
কিঙ্কিণী। বুধবার রাত্রে খাবার সময় তিনি বল্লেন—এ জীবন,
পর জীবন কিম্বা করাচি—এর মধ্যে আপনাকে
একটা বেছে নিতে হবে।
অতুল।
আচ্ছা। ( ফিরিয়া বসিয়া) পরজীবন কিম্বা করাচি
সম্বন্ধে যতটুকু খবর জানতে পেরেছি, তাতে নােটেই
উৎসাহ হবার কথা নেই। কিঙ্কিণী, এ জীবনটিই
আমাকে মানায় ভালাে।
কিঙ্কিণী। হা, কিন্তু তার জন্যে যতটুকু ভালাে হওয়া দরকার
আপনি ত আছেন কি ?
তা হয়ত নেই। সেইজন্যেই ত তুমি আমাকে
শুরিয়ে নাও সেই কামনা কচ্ছি। কিঙ্কিণী,
তােমার যদি আপত্তি না থাকে তুমি সেটিকেই
তােমার জীবনের ব্রত করে তুলতে পার।
কিঙ্কিণী। কিন্তু আজ বিকেলে তার আমার সময় নেই।
অতুল। আচ্ছা, আজ বিকেলে আমাকে শােস্ত্রাণাের ভারটি
অতুল।
প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল * ৪৭ অতুল। হয় আমিই নিলুম, তাতে তো তােমার কোনাে আপত্তি নেই ? কিঙ্কিণী। তা দেখুন না চেষ্টা করে। অতুল। করব। এরি মধ্যে অনেকটা ভালাে হয়ে গেছি বলে বােধ করছি। কিঙ্কিণী । (উঠিয়া) আপনাকে বরং একটু বেশী খারাপই দেখাচ্ছে। সে আমি ক্ষুধার্ত বলে। কিঙ্কিণী। ওমা ! কি ভুলই হয়েছে ! (সরিয়া দরজার কাছে গেল ; অতুল পিছনে গেল) এ আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল—যে নাকি সম্পূর্ণ নূতন রকম জীবন যাপন করতে ইচ্ছে কচ্ছে, তার পক্ষে নিয়মিত চর্ব্য- চোষ্য-লেহ-পেয়ের খুব বেশী দরকার যে! আসুন। অতুল। বেশ। ( কাছে গিয়া ) তােমার খােপর একটা ফুল দেবে আমাকে ? কিঙ্কিণী । (একটু থামিয়া) এই নি। অতুল। না, এই সাদাটা নয়, লালটা চাই। কিঙ্কিণী । কেন ? অতুল। তােমার গায়ের রঙের সঙ্গে ওর সাদৃশ্য আছে তাই। কিঙ্কিণী। আপনার এ রকম ভাবে কথা বলা বােধ হয় ঠিক হচ্ছে না ; আমার শিক্ষয়িত্রী তাে এ রকম কথা আমাকে কখনাে বলেন না।
৪৮
;
* খেয়াল।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অতুল। ওঁর হয়ত বয়স হয়েছে কিম্বা চোখ নেই। (কিঙ্কিণী
গােলাপ দিল ; অতুল লইল) তােমার চেয়ে সুন্দরী,
কাউকে আমি এ পর্যন্ত দেখিনি।
কিঙ্কিণী। সেটা আপনার চোখের দোষ কি আমার চেহারার
দোষ, সেটা এখনও ঠিক বুঝতে
পাচ্ছিনা আমার.
শিক্ষয়িত্রী তাে বলেন যে স্ত্রীলােকের সুন্দর চেহারা
হয়েছে কঁাদ বিশেষ।
অতুল। হাঁ, এবং তাতে প্রত্যেক সুবুদ্ধি পুরুষেরই আকা
পড়া উচিত।
কিঙ্কিণী। ওঃ! সুবুদ্ধি পুরুষকে আটকাতে আমার যে খুব
চেষ্টা হবে তাতে বােধ হয় না। তার সঙ্গে কি
কথা বলতে হবে তাই তাে ভেবে পাবাে না।
( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
সরােজিনী ও ধনঞ্জয়ের প্রবেশ।
সরাে। (বসিয়া ; কিঙ্কিণী কই ?
কই ? আপনি
আপনি বড় একা
জীবনে, ধনঞ্জয় বাবু। আপনার বিয়ে করে ফেলা
উচিত। মানব-বিদ্বেষী বরং সম্ভব, কিন্তু স্ত্রী-বিদ্বেষী,
কি করে হয় লােক!
ধন। কারণ ঘটে বলেই বােধ হয় হয়ে থাকে, কিন্তু,
জীবনের উচ্চ আদর্শ বজায় রাখতে গিয়েই আমি
বিয়ে করিনি।
সরাে। বিয়ে করাটা কি সেই আদর্শের পরিপন্থী ?
৪৯ প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল *--- ধন। হয়ত সব সময় নয়—কিন্তু কোন্ সময় যে নয় তা জীবনের পথে বহুদূর অগ্রসর হয়ে হয়ত একদিন তার চোখে ফুটে ওঠে। তখন হয়ত আর ফিরবার পথ থাকে না। (সরােজিনীর দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে চাহিল।) সরাে। কিন্তু, কিঙ্কিণী কই গেল ? (উঠিয়া অগ্রসর ) ধন। ( উঠিয়া পিছনে গিয়া) হয়ত আমাদের পিছন পিছন বেড়াতে গিয়েছে। (বনমালীর প্রবেশ; তার মুখ মলিন, বেশ ভূষা অগােছানাে- সরােজিনী অগ্রসর হইয়া গেল। গেল। বনমালী চোখে রুমাল দিল।) সরো। ধন। সরো। বন। বনমাল বা বু বনমালী বাবু আশ্চর্য্য! সােমবার বিকেলের আগে তাে আপনি ফিরবেন না জাতুম। তাই ঠিক ছিল, কিন্তু আগেই চলে আসতে হল। ধনঞ্জয় বাবু, ভালাে আছেন ? হ! আপনি এমন কচ্ছেন কেন? কিছু কি হয়েছে ? আমার ভাই- উচ্ছ,ঙ্খলতার ফলে আমরা কি লজ্জার বােঝ ও ঋণ চাপিয়েছেন ? এখনাে কি একটুকুও শােধরালেন না? ধন। বন.। সরো। ধন। ৪- বন। বন। সরো। ধন। বন। * খেয়াল * [ দ্বিতীয় অঙ্ক মরেছে! (আবার চোখে রুমাল চাপিল) আপনার ভাই বনানী বাবু মারা গেছেন ? হাঁ। ঠিক শিক্ষার্টি হয়েছে। আশা করি এতে কিছু উপকার হবে ! আপনার তত কষ্ট হওয়ারই কথা। আপনি তাে সাধারণ ভাইদের মতন ছিলেন না—এমন দয়া এবং মহৎ অন্তঃকরণ। (রুমাল আরােপ ) হায়! বেচারি বনানী ! অনেক দোষ ছিল সত্যি, কিন্তু এমন দুঃখ আমার কপালে ছিল । দুঃখ বৈ কি। হাজার হলেও ভাইতাে ! শেষ সময় কি আপনি কাছে ছিলেন ? না, বিদেশে-পশ্চিমে মারা গেছে। আমি গত রাত্রে এক তার পেয়েছিলুম। কি করে মারা গেলেন লেখা ছিল কি তাতে ? ডবল নিউমােনিয়া—একদিনেই সব শেষ। শেষ তত সকলেরই আছে। মরে গেলে মানুষের জন্যে কষ্ট না হয়ে যায় না। গত সপ্তাহে স্কুলে মৃত্যু সম্বন্ধে এক বক্তৃতা করেছিলুম। এরকম কত কথাই বলেছি আমি। ছেলেদেরে এই শনিবারে মৃত্যু সম্বন্ধে এক প্রবন্ধ লিখতে দেব । ধন। বন। বন। ধন।
বন।
ধন।
'বন।
প্রথম দৃশ্য ]
--* খেয়াল *
হ, ভালাে কথা, আপনার ভাই-সেই যে ম্যাজিষ্ট্রেট
আপিসের কেরাণী বাবু-আছেন এখানে ?
হাঁ, এসেছে—দু’দিনের ছুটি।
কেন ?
'বন। নাম পরিবর্তনের একটা দরখাস্ত পাঠাতে হবে তাকে
দিয়ে।
কার নাম পরিবর্তন-স্কুলের কোনাে ছেলের কি ?
, আমারই নিজের।
ধন। আপনার নিজের ?
হ! ধরণী বাবুকে কখন বাড়ী পাওয়া যাবে
বিকেলে পাঁচটায় ?
ধন। হাঁ, পাবেন। (ঘড়ী খুলিয়া) বনমালী বাবু, এই
শােকমগ্ন গৃহে আর বেশীক্ষণ থেকে আপনাদের
অসুবিধা জন্মাতে চাই না। আমি শুধু এই অনুরােধ
কচ্ছি সংসারের শােকে তাপে বেশী মুহ্যমান হবেন
। যাহা আমাদের কাছে ভীষণ দুর্ঘটনা বলে
মনে হয়, তাই হয়ত দেবতার ছদ্মবেশী আশীর্বাদ ।
সরাে। এটি যে আশীর্বাদ সে তত পরিষ্কারই বােঝ।
যাচ্ছে।
( কিঙ্কিণীর প্রবেশ !)
কিঙ্কিণী। কাকাবাবু! ফিরে এসেছ
এসেছ দেখে সুখী হলুম।
তােমার মুখ চোখ এবং কাপড় চোপড়ের এমন ছিড়ি
কেন ? যাও, বলে এসাে।
৫২
- খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
সরো ।
কিঙ্কিণী !
কিঙ্কিণী । কি হয়েছে কাকাবাবু ? (বনমালী মুখ ফিরাইয়া চোখে
রুমাল দিল) এমন কচ্ছ কেন? আবার কি দাত
বেদনা আরম্ভ হ’লাে নাকি ? তােমাকে আশ্চৰ্য্য
করে দেবার মতন একটা জিনীষ আছে। (সরােজিনী
ও ধনঞ্জয় সরিয়া অন্যদিকে চলিয়া গিয়াছে) খাবার ঘরে,
কি বল তাে ? তােমার ভাই ।
কে ?
কিঙ্কিণী। তােমার ভাই বনানী। এই আধ ঘন্টা আগে
এখানে এসেছেন !
কি বছিস্ ! আমার তাে ভাই নেই!
কিঙ্কিণী। নাও, আর রাগ দেখাতে হবে না। যে রকম আচরণই
করে আসুক না কেন, তবু সে তােমার ভাই।
তাকে অস্বীকার করবার মতন নির্দয় কি করে হবে।
আমি তাঁকে বেরিয়ে আসতে বছি। তাকে
তােমার ক্ষমা করতে হবে। কেমন, করবে না
কাকাবাবু ?
( নিষ্ক্রান্ত )
ধন।
( অগ্রসর হইয়া) ভারি সুখবর তাে !
সরো। মরে গেছিল শু’নে একভাবে প্রস্তুত হয়ে
গেছিলুম—এখন ফিরে এসেছে, জেনে যে কেমন
কেমন লাগছে?
খাবার ঘরে আমার ভাই! এর মানে কি, কিছুই বুঝে
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
উঠতে পারছি না! অদ্ভুত ব্যাপার। (অতুল ও
কিঙ্কিণীর প্রবেশ) ওঃ হয়েছে ! ( হাতে ইঙ্গিত করিয়া
অতুলের প্রতি) যাও, যাও, চলে যাও।
অতুল। দাদা, সহর হতে এতদূর এলুম তােমার ক্ষমা চাইতে,
তােমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, আর দিতে চাই
—এখন থেকে আমি ভালাে হয়ে চলব—
(বনমালী কাছে না আসিয়া কম করিয়া চাহিয়া রহিল।
বন।
চলে যাও।
কিঙ্কিণী। ( নিকটে আসিয়া তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া ) কাকাবাবু,
তুমি তােমার নিজের
ভাইকে বাড়ী থেকে দূর
করে দেবে ?
বন । দূর করে দেবাে না তাে কি ? নির্লজ্জ কোথাকার!
কেন সে এলাে এখানে ? সে বেশ জানে এখানে
আসা তার কেমন কাজ হয়েছে !
কিঙ্কিণী। কাকাবাবু, ক্ষমা কর। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না
কিছু ভালাে আছে। বনানী কাকা বল্ছিলেন তিনি
কেমন তার এক চিররােগী বন্ধুকে প্রায়ই দেখতে
যান।
( বনমালী পায়চারি করিতে লাগিল।
অতুল। অবিশ্যি আমি স্বীকার করি দোষ সম্পূর্ণ আমারই।
কিন্তু এ আমাকে বলতেই হবে যে দাদার বিমুখতা
আমার কাছে অত্যন্ত যন্ত্রণাপ্রদ। এর চেয়ে ভালাে
৫৪
- খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অভ্যর্থনা এখানে পাব আশা করেছিলুম-বিশেষতঃ
এই যখন প্রথমবার এখানে এসেছি।
কিঙ্কিণী । (বনমালীকে টানিয়া অতুলের কাছে আনিয়া) কাকাবাবু,
তুমি যদি এর সঙ্গে ভালাে ব্যবহার না কর, তাহলে
তােমাকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না। ( দূরে
যেখানে সরােজিনী ও ধনঞ্জয় দাড়াইয়া ছিল সেখানে গেল।
তাহলে দেখছি কৰ্ত্তেই হবে।
এমন সুন্দর পুনর্মিলনটি দেখা বেশ আনন্দজনক !
ভাই দু’টিকে এখন একা রেখে যাওয়াই উচিত বােধ
ধন।
সরাে। কিঙ্কিণী, তুমিও আমাদের সঙ্গে এস।
কিঙ্কিণী । নিশ্চয় ! (বনমালী ও অতুল ব্যতীত সকলে নিষ্ক্রান্ত)
বন । ( অতুলের হাত ধরিয়া ) ওরে হতভাগা, লক্ষীছাড়া,
পাজি! যত শীঘ্র সম্ভব এখান থেকে তাের বেরিয়ে
যেতে হবে। এখানে আর রমাপদগিরি চালাতে
হবে না।
মতি।
(মতির প্রবেশ )
আজ্ঞে, বনানী বাবুর জিনীষপত্র আপনার ঘরের
পাশের ঘরেই রেখেছি, ঠিক হয়েছে তাে ?
কি ?
ওঁর জিনীষপত্র, আজ্ঞে। আমি সব সাজিয়ে গুছিয়ে
আপনার পাশের ঘরেই রেখেছি।
মতি।
প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল *-- অতুল। বন। মতি। অতুল। বন । অতুল। ( গায়ের চাদরটা আলনায় রাখিয়া ) কিন্তু দুঃখের বিষয়- এক সপ্তাহের বেশী থাকতে পারব না এখানে। (কিঙ্কিণীর সন্ধান করিতে লাগিল ) মতি,এখনি একটা গরুর গাড়ী ডেকে নিয়ে আয় তাে, বনানী বাবুর এখনি সহরে যেতে হবে, খবর এসেছে। যাই, আজ্ঞে। ( নিষ্ক্রান্ত) (বনমালীর দিকে ফিরিয়া) বনমালী, কিঙ্কিণী বেশ মেয়ে! তােমাকে কিঙ্কিণী’ ‘কিঙ্কণী করতে হবে না বলে দিচ্ছি—এ আমার ভালাে লাগেনা। যাও, তুমি একবার কাপড় চোপড়টা ছেড়ে এসােনা—তােমার অতিথি তাে রয়েইছে কিছুদিন। এখানে অতিথি ফতিথি হয়ে কিছুদিন থাকতে হবে না, তা তােমাকে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি। তােমাকে যেতে হবে এই চারটার গাড়ীতেই। তােমার শরীরটা ভারি খারাপ দেখাচ্ছে, এই অবস্থায় তােমাকে ছেড়ে হঠাৎ আমি চলে যেতে পারব না। ভেবে দেখতে তুমিই আমাকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে পারতে কি না? সে যে ভারি নিষ্ঠুরের মত কাজ হতো! আচ্ছা, বেশ—আমি চান্ করে কাপড় চোপড় ছেড়ে এলে তুমি চলে যাবে ? বন। অতুল। বন।
* খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অতুল।
হাঁ, খুব বেশী দেরী যদি না কর। তােমর মত চিলে
লােক খুব কম আছে জানাে তাে। অথচ দেরী করে
সাজগোজ করে তােমার যা চেহারাটি বেরােয়, দেখলে
কান্না আসে!
তােমার মত ফুলবাবু সাজার চেয়ে সে টের গুণে
(নিষ্ক্রান্ত )
অতুল। (স্বগত) কিঙ্কিণীকে আমি ভালােবেসেছি। দেখা না
করে তার সঙ্গে যাওয়া যায় না। (কিঙ্কিণীর প্রবেশ )
এ, এইতাে সে!
কিঙ্কিণী। ওঃ, আমি শুধু ফুলগাছগুলােতে জল দিতে
এসেছি। আমি ভেবেছিলুম আপনি কাকাবাবুর
কাছেই আছেন।
উনি আমার জন্যে গরুর গাড়ী ব্যবস্থা করেছেন।
একেবারে শিংওয়ালা জুড়ি গাড়ী করে আমায় বিদায়
কৰ্বেন !
কিঙ্কিণী। কেন, গরুর গাড়ী করে কি কেউ আবার বেড়ায়
অতুল।
নাকি ?
অতুল। আমাকে জিনিষপত্র শুদ্ধ স্টেশনে পাঠাবার উদ্যোগ
কিঙ্কিণী। তাহলে আমাদের ছাড়াছাড়ি হবে! (বসিল)
অতুল। (কিছুক্ষণ থামিয়া) তাইতাে মনে হয়। (পাশে বসিল)
প্রথম দৃশ্য ]
- খেয়াল
৫.৭
মতির প্রবেশ)
মতি। গরুর গাড়ী এসেছে, আজ্ঞে ।
কিঙ্কিণী। অকটু দাঁড়কি না, মতি! (উঠিল) এই পাঁচ
মিনিট।
মতি।
আচ্ছা—বলি গিয়ে। (নিষ্ক্রান্ত )
অতুল। (ঘড়ী খুলিয়া উঠিল) কিঙ্কিণী, তুমি সব রকমেই পূর্ণ
পরিণতির আধার একথা যদি তােমাকে বলি তাহলে
আশা করি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে।
কিঙ্কিণী। আপনার সরলতা প্রশংসনীয় ; যদি অনুমতি করেন
তাহলে আপনার কথা কয়টি আমি আমার ডায়রীতে
টুকে রাখি। (টেবিলের কাছে গিয়া ডায়রীতে লিখিতে
প্রবৃত্ত)
অতুল। তুমি কি সত্যি সত্যি ডায়রী রাখ ? (কাছে আসিয়া
বসিয়া) আমার ভারি দেখছে ইচ্ছে হচ্ছে। দেখব
কি ?
কিঙ্কিণী। না, না! (ডায়রীর পাতার উপর হাত রাখিল) এ শুধু
একটি ছােট্ট মেয়ের চিন্তা ও ভাবধারার অনুলিপি,
কাজেই দশজনের চোখে পড়বার মতন নয়। কিন্তু
দেখুন, আপনি থামবেন না, ব’লে যান-dictation
লিখতে আমার বেশ লাগে—“পূর্ণ পরিণতির আধার”
এই পৰ্যন্ত লিখেছি—তারপর বলে যান—আমি
প্রস্তুত।
* খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অতুল। { খুব দ্রুত বলিয়া যাইতে লাগিল) কিঙ্কিণী, তােমার
অত্যাশ্চর্য্য এবং অতুল্য সৌন্দর্য দেখা অবধি আমি
তােমাকে দুর্দম্য আবেগের সহিত আমার হৃদয়ের
পূত শ্ৰদ্ধাপ্রীতির পুস্পাঞ্জলি দিয়া হতাশভাবে
তােমাকে ভালােবাসতে আরম্ভ করিছি ।
কিঙ্কিণী। আমার মনে হয়, আপনি যে আমাকে দুর্দম্য
আবেগের সহিত, হৃদয়ের পূত শ্রদ্ধাপ্রীতির পুস্পাঞ্জলি
দিয়া হতাশ ভাবে ভালােবাতে আরম্ভ করেছেন,
সেটা বলা আপনার ঠিক হয়নি।
অতুল। কিঙ্কিণী:! ( উঠিয়া, টেবিলের উপর দিয়া ঝুকিয়া)
(মতির প্রবেশ)
মতি।
মতি।
আজ্ঞে, গরুর গাড়ী দাড়িয়ে আছে।
অতুল। (উঠিয়া নড়িয়া) আগামী সপ্তাহে, ঠিক এই দিনে, এই
সময়ে আসতে বলে দাও।
(কিঙ্কিণীর প্রতি চাহিল—কিঙ্কিণী কিছু বলিল না) আচ্ছা,
বলেদি।
( নিষ্ক্রান্ত.)
কিঙ্কিণী । (উঠিয়া নড়িয়া) কাকাবাবু এই কথা শুনে বিরক্ত
হবেন।
অতুল। তা হউক, আমি কেয়ার করি না।
তুমি ছাড়া আর
কারু কথায় আমার কিছুমাত্র এসে যাবে না। আমি
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল -
তােমাকে ভালােবাসি, কিঙ্কিণ্ঠ। তুমি আমাকে
বিয়ে করবে—কেমন, করবে না ?
কিঙ্কিণী। ভারি বােকা তাে আপনি! কেন, তিন মাস ধরেই
ততা সে কথা ঠিক হয়ে আছে।
অতুল। তিন মাস ধরে ।
কিঙ্কিণী। হাঁ। এই বেস্পতিবারে ঠিক তিন মাস হবে।
অতুল। (টেবিলের উপর বসিয়া) কিন্তু কি করে কথা ঠিক হয়ে
রইলো ?
কিঙ্কিণী। (সসাফায় বসিয়া) যেদিন থেকে কাকাবাবু বল্লেন
তার একটি দুষ্ট ছােট ভাই আছে, সেদিন থেকেইতাে
আপনিই আমাদের কথা বার্তার প্রধান বিষয় হয়ে
গেছেন! আর কথাবার্তার প্রধান বিষয় যে হয়, তার
আকর্ষণও বেশী থাকে। তার মধ্যে কিছু না কিছু
একটা রয়েছে লােকে ভাবে। অবিশ্যি আমার এ
ভারি বােকামি হয়েছে, কিন্তু সেদিন থেকেই তাে
বনানী বাবুর সঙ্গে আমি প্রেমে পড়ে গেছি।
অতুল। কিঙ্কি ! আর কথা কখন ঠিক হলাে ?
কিঙ্কিণী। কেন, গত ১৪ই এপ্রিল। আপনি আমার অস্তিত্ব
সম্বন্ধেই কিছু জানেন না, সেটা ভেবে ভেবে হতাশ
হয়ে একদিন ভাবলুম—অনেক অন্তযুদ্ধের পর ঠিক
কলুম যে আজই এপার ওপার একটা কিছু করে
ফেলব। সেই দিনই আপনার নামে একটা আংটী
.
* খেয়াল *-
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কিনে আলুম, এবং আমি আপনার কাছে—অবিশ্যি
কল্পনায় আপনাকে সামনে দাঁড় করিয়ে প্রতিজ্ঞা
করলুম যে আমাদের বাদানের চিহ্ন স্বরূপ এই
আংটী আমি চিরকাল যত্নের সহিত ব্যবহার করব।
অতুল। আমিই তােমাকে এ দিয়েছি নাকি ? : খুব সুন্দর
কেমন, না ?
কিঙ্কিণী । (উঠিয়া) হা.-আপনার চমৎকার রুচি। আপনার
দুষ্ট জীবন যাপন করার পক্ষে এই অজুহাতই তাে
বরাবর আমি দিয়ে এসেছি। (টেবিলের কাছে গিয়া )
আর এই বাক্সে আপনার সব চিঠিপত্র আমি রেখে
থাকি। ( জানু পাতিয়া বসিয়া বাক্স খুলিল এবং রেশমী
ফিতায় বাঁধা চিঠির তাড়া বাহির করিল )
আমার চিঠি! ( দাঁড়াইয়া) কিন্তু কিঙ্কিণী আমার,
আমিতাে তােমাকে কোনাে চিঠি লিখি নাই ।
কিঙ্কিণী। সে আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবার আর দরকার নেই।
সে আমি বেশ জানি যে আপনার চিঠি আপনার
হয়ে আমিই লিখতে বাধ্য হয়েছি। সপ্তাহে তিন
দিন লিখেছি, কোনাে কোনাে সপ্তাহে বেশী।
অতুল। আচ্ছা, কিঙ্কিণী, আমাকে এগুলাে পড়তে দেবে?
কিঙ্কিণী । (বসিয়া ) না, না, সে কি করে হয় ! পড়ে যে
আপনি গর্বে একেবারে ফুলে উঠবেন! (বাক্স বন্ধ
অতুল।
১%
!
প্রথম দৃশ্য।
* খেয়াল
অতুল।
( কাছে গিয়া জানু পাতিয়া বসিয়া) তুমি ভারি সুন্দর,
কিঙ্কিণী ।
কিঙ্কিণী। আমাকে সুন্দরী বলে আপনার ভ্রম হয়নি সে ?
অতুল। না, না, কিঙ্কিণী, এ যদি ভ্রম হয় তাহলে আমার
সারাজীবনটাই ভ্রম!
কিঙ্কিণী। তােমার চুলগুলাে ত বেশ সুন্দর কোকড়া,
আপনিই হয়েছে, না? (অতুলের চুলের ভিতর দিয়া
আঙ্গুল চালাইতে লাগিল)
অতুল। হাঁ, তবে একটু চেষ্টারও দরকার হয়েছে।
কিঙ্কিণী। বেশ! তুমি যে সুপুরুষ সেটা আমি স্পর্ধা করে
বলতে পারি।
অতুল।
আমাদের এই বাদান আর ভাঙবে না, কিঙ্কিণী ?
কিঙ্কিণী। না, কল্পনায় গড়া জিনীষ অনেক সময়ে বাস্তবের
আঘাতে ভেঙ্গে যায় বটে, কিন্তু এখন যখন দেখা
তােমার সঙ্গে, তখন আর ভাঙতে হবে কেন ? আর
তা ছাড়া তােমার নামটি ভারি চমৎকার !
অতুল।
( কিঙ্কিণীর কাধে মাথা রাখিয়া ) হাঁ, অবিশ্যি (একটু
থতমত খাইয়া )
কিঙ্কিণী। তুমি শুনে হেসাে না-কিন্তু আমার বালিকা বয়সের
এই স্বপ্নই ছিল বরাবর যে বনানী নামে কাউকে
ভালাে বাসবাে।
( উভয়ে উঠিয়া সরিয়া দাঁড়াইল)
নামটিতে একটি মােহ, একটি চমৎকার সঙ্গীত
৬২
খেয়াল
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অতুল।
আছে । যে সব বিবাহিতা স্ত্রীদের স্বামীর নাম
বনানী নয়, তাদের প্রতি আমার অনুকম্পা হয় ।
অতুল। কিন্তু, কিঙ্কিণী, তুমি কি একথা বলতে চাও যে আমার
যদি অন্য কোন নাম হতাে, তাহলে তুমি আমাকে
ভালােবাসূতে পারতে না ?
কিঙ্কিণী। অন্য কি নাম ?
এই-যে কোনাে নাম—মনে করনা, আতুলানন্দ
কিঙ্কিণী। না, এই অতুরানন্দ
ফতুরানন্দ আমার ভালাে লাগে
। (সরিয়া গেল—অতুল অনুসরণ করিল )
অতুল। কিঙ্কিণী, অতুলানন্দ নামে তােমার যে কি আপত্তি
হতে পারে তা-তাে বুঝছি না। এটা তাে তেমন
কিছু খারাপ নাম নয়। বরং একটু বেশ আভিজাত্যের
গন্ধ আছে এতে! কিন্তু সত্যি, কিঙ্কিণী, আমার নাম
যদি সত্যি সত্যি অতুলানন্দ হ’তাে, তবে কি তুমি
আমাকে ভালােবাসতে পারতে না ?
কিঙ্কিণী। আমি তােমাকে সম্মান করতে পারতুম, আমি
তােমার চরিত্রের প্রশংসা করতে পারতুন, বনানী
বাবু, কিন্তু তােমাকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালােবাসা
হয়ত সম্ভব হয়ে উঠতাে না।
অতুল। হু; আচ্ছা, কিঙ্কিণী, ম্যাজিষ্ট্রেটের আপিসের কেউ
থাকে এদিকে ?
;
প্রথম দৃশ্য ] - খেয়াল * কিঙ্কিণী। কেন ? ধনঞ্জয় বাবুর ভাই-ইতাে ম্যাজিষ্ট্রেট আপিসের কেরাণী। অতুল এই ধনঞ্জয় বাবুর ভাই ? হাঁ, আমার একটু দরকার আছে, ধনঞ্জয় বাবুর সঙ্গে একটু দেখা করে আসছি, এখনি ফিরব। ( নিষ্ক্রান্ত) কিঙ্কিণী। ভারি পাগলাটে! কখন কি মনে হয় ঠিক নেই! কি সুন্দর চুলগুলি তার ! সে যে প্রস্তাব করেছে আমার ডায়রীতে তা লিখে রাখতে হবে। (বসিয়া লিখিতে প্রবৃত্ত) ( মতির প্রবেশ।) মতি। সমুজ্জ্বলা নামে একজন স্ত্রীলােক বাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছেন। কাজটা নাকি খুব জরুরি। কিঙ্কিণী। উনি বােধ হয় ওঁর পড়বার ঘরে। , উনি ধনঞ্জয় বাবুর বাসার দিকে গেছেন। কিঙ্কিণী স্ত্রীলােকটিকে এখানেই নিয়ে এস। কাকাবাবু শীঘ্রই ফিরবেন। চা নিয়ে এস। মতি। আনছি, 'দিদিমণি। ( নিষ্ক্রান্ত) কিঙ্কিণী সমুজ্জ্বলা ! কল্কাতা কাকাবাবু যে সব জনহিতকর কাজ করে থাকেন তারি সংশ্রবের কোনাে বুড়াে মেয়েলােক হবে। এই জনহিতকর কাজে জড়িত মেয়েলােকদের আমি দু চোখে দেখতে পারি না। ওদের ন্যাকামি দেখলে রাগ হয় ! ( উঠিয়া পায়চারি ) মতি।
৬৪ — খেয়াল * [ দ্বিতীয় অঙ্ক (মতির প্রবেশ।) মতি। সমুজ্জ্বল ঠাকরুণ। (সমুজ্জ্বলার প্রবেশমতি নিষ্ক্রান্ত।) কিঙ্কিণী। (অগ্রসর হইয়া) আমার পরিচয়টা আপনাকে আগেই দিয়ে দিচ্ছি। আমার নামই কিঙ্কিণী। সমু। কিঙ্কিণী! ( কাছে গিয়া তার কাঁধে হাত দিয়া) কি মিষ্টি নাম! আমাকে যেন কিসে বলে দিচ্ছে আমাদের মধ্যে খুব ভাব হবে। তােমাকে যে কেমন ভালাে লাগছে তা মুখে বলতে পারি না। লােকের প্রথম যে ধারণা হয় তা কখনাে ভুল হয় না। কিঙ্কিণী। এই অল্পক্ষণের পরিচয়েই আপনি যে আমাকে এতটা পছন্দ করে ফেলেছেন, তাতে খুব খুসি হলুম। (থামিয়া) বসুন। সমু। সমু। ( এখনাে দাড়াইয়া) কিঙ্কিণী, আমি প্রথম থেকে তােমাকে ‘তুমি’ বলেই ডালুম। কিঙ্কিণী। সে বেশ তাে। ঘনিষ্টতার সম্বােধনই ত এটা। তুমিও আমাকে ‘তুনি’ বলল—কেমন, বলবে না ? কিঙ্কিণী। আপনার ইচ্ছা হলে বলব। সমু। তাহলে এই ঠিক হ’লল, কেমন ? কিঙ্কিণী। হাঁ। (উভয়ে থামিল—দু’জনেই পাশাপাশি বসিল) এখন আমি কে তােমাকে বলি। আমার পিতামাত সমু।
সমু।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
নেই; পিসেমশায় ব্রজসুন্দর বাবু কৌসিলের মেম্বার,
ধনী লােক। পিসীমা-ই আমাকে ছেলেবেলা থেকে
পাছেন, তুমি পিসেমশাইর নাম শােননি ?
কিঙ্কিণী। বােধ হয় না।
ছেলেবেলা থেকে কলকাতায় মানুষ হয়ে বাহিরের
পৃথিবী সম্বন্ধে অনেকটা অজ্ঞই রয়ে গেছি। মনের
দৃষ্টি এবং চোখের দৃষ্টি দুটিই ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ ; চশমার
ভিতর দিয়ে মানুষকে অনেকক্ষণ মনােযােগ দিয়ে
দেখাটা আমার অভ্যাস, কিছু মনে করােনা।
কিঙ্কিণী। না, কিছু মনে করব কেন ! কেউ আমার দিকে
চেয়ে থাকে সে আমার ভালােই লাগে।
( অনেকক্ষণ পরে কিঙ্কিণীকে ভালাে করিয়া দেখিয়া ) তুমি
এখানে কিছুদিনের জন্যে আছ বােধ হয় ?
কিঙ্কিণী! না, না ; আমি এখানেই থাকি।
সমু।
( কঠিন ভাবে ) তাই নাকি ? নিশ্চয়ই তােমার মা
কিম্বা বেশী বয়সের তােমার কোনাে আত্মীয়। এখানে
তােমার সঙ্গে থাকেন।
কিঙ্কিণী। না, না! আমার মা নেই—কোনাে আত্মীয়াও নেই।
সমু।
কিঙ্কিণী। আমার অভিভাবক, শিক্ষয়িত্রী সরােজিনী দিদির
সাহায্যে এখানে আমার তত্ত্বাবধান করেন।
সমু। তােমার অভিভাবক ?
সমু।
ওঃ!
৬৬
সমু।
— খেয়াল -
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কিঙ্কিণী । হাঁ, দাস মশাই-ই আমার অভিভাবক।
(স্বগত) কই, তিনি যে কারু অভিভাবক একথাটিততা
আমাকে বলেন নি ! এত গােপনীয়তাই বা কিসের ?
ওঁর সম্বন্ধে রহস্য যে ঘণ্টায় ঘণ্টায়ই বেড়ে যাচ্ছে।
এই খবর শুনে যে আমি অবিমিশ্র আনন্দ উপভোগ
কচ্ছি-তা নিশ্চয় করে বল্তে পারি না।
(উঠিয়া
পায়চারি ) ( উচ্চে) তােমাকে আমার বেশ লাগে,
কিঙ্কিণী ! কিন্তু এখন যখন জালুম যে তুমি দাস
মশায়ের তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হচ্ছ, তখন
তােমাকে একথা না বলে পারি না যে এরচেয়ে
তােমার বয়স বেশী দেখলেই আমি খুসি হতুম—আর
তােমার চেহারাটি এমন সুন্দর না হলেই ভালাে।
ছিল ! আর সত্যি, সরলভাবে যদি বলি -
কিঙ্কিণী। তাই
বলুন !
আমি জানি অপ্রীতিকর কিছু বলতে
গেলে লােকের সরল হওয়াই উচিত।
হাঁ, সরল ভাবে বলতে গেলে, কিঙ্কিণী, এই কথাই
বলতে হয় যে তােমার বয়স পঁয়ত্রিশ এবং বয়সের সঙ্গে
চেহারাটিও নেহাৎ সাদাসিধে গােছের হলেই আমি
খুসি হতুম। বনানী বাবুর বেশ দৃঢ়, ঋজু প্রকৃতি।
যা সত্য এবং খাঁটি তাই তার প্রাণ ! কিন্তু মহত্তম
নৈতিক চরিত্রের লােকেরাও শারীরিক সৌন্দর্যের
মােহ কাটিয়ে উঠতে পারে না।
সমু।
প্রথম দৃশ্য 3 — খেয়াল *- ১৭ কিঙ্কিণী। কি, কি বল্লেন আপনি ? ‘বনানী বাবু বল্লেন না ? সমু। সমু। সমু। কিঙ্কিণী । কিন্তু বনানীদাস তাে আমার অভিভাবক নন্ ! তার ভাই--তার বড় ভাই। বনানী বাবু তাে আমাকে কখনাে বলেননি তার এক ভাই আছে ! কিঙ্কিণী। দুঃখের বিষয় দুই ভাইয়ের মধ্যে অনেকদিন থেকেই প্রীতির ভাব নেই। হাঁ, সেই কারণই হবে, এখন মনে হচ্ছে—তাকে কখনো ভাইয়ের কথা উল্লেখ করতে শুনিনি—বিষয়টা অনেকের কাছেই রুচিকর নয়। তুমি নিশ্চয় করে বছাে তত যে শ্ৰীযুক্ত বনানীদাস তােমার অভিভাবক নন্ ? কিঙ্কিণী। নিশ্চয়। (থামিল) তবে আমিই তার আভভাবক -না, না, সংস্কৃত ব্যাকরণ ভুলে যাচ্ছিলুন— অভিভাবিকা হতে যাচ্ছি। ( জিজ্ঞাসার সুরে) কি রকম ? কিঙ্কিণী। (একটু লজ্জিত হইয়া । দিদি, তােমার কাছে গোপন করব না। বনানী বাবুর সঙ্গে আমার বিয়ের কথা ঠিক হয়ে গেছে। সমু। উঠিয়া নড়িয়া অত্যন্ত নম্র ভদ্রভাবে ) বােন্ কিঙ্কিণী আমার, আমার মনে হয় তােমার একাধটুকু ছােট- সমু।
৬৮ * খেয়াল *- [ দ্বিতীয় অঙ্ক খাটো ভুল হয়ে থাকবে—শ্ৰীযুক্ত বনানীভূষণ দাসের সঙ্গে আমারই বিয়ের কথা ঠিক হয়ে গেছে। কিঙ্কিণী । ( উঠিয়া নড়িয়া নম্র ভদ্রভাবে ) আমার মনে আপনারই একটা ভ্রান্ত ধারণা হয়েছে। বনানী বাবু এইমাত্র দশ মিনিট আগে আমার কাছে প্রস্তাব করেছেন। (ডায়রী দেখাইল) সমু। ( যত্নপূৰ্ব্বক চশমার ভিতর দিয়া ডায়রী পরীক্ষা করিয়া) ভারি মজার কথা তাে ! কাল বিকেলে সাড়ে পাঁচটায় যে তিনি আমারই কাছে এই প্রস্তাব করলেন ! আপনি যদি তার প্রমাণ চানতে দেখুন । আমি ডায়রী না নিয়ে কোথাও যাই না! (ডায়রী বাহির করিল ) আপনি একটু নিরাশ হতে পারেন- কিন্তু দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে আমারই অগ্রবর্তী দাবী। কিঙ্কিণী। আপনার যদি মানসিক কোনাে যন্ত্রণা উপস্থিত হয়ে থাকে তাে জানবেন আপনার প্রতি আমার হৃদয়ের সম্পূর্ণ সহাসুভূতি আছে, কিন্তু এ কথা আমি বলতে বাধ্য যে আপনার কাছে তিনি যদি আগে প্রস্তাব করেই থাকেন, তবে পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে যে তিনি পরে তার মত বলিয়েছেন। সমু। ( চিন্তা করিয়া) বেচারি যদি প্রবঞ্চিত হয়ে নির্বোধের মত কোনাে অঙ্গীকার করেই থাকে তত আমার - প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল - কর্তব্য হবে তাকে এই মুহূর্তেই উদ্ধার করা—দৃঢ়, নির্মম হস্তে উদ্ধার করা। (কিছু নড়িয়া দাড়াইল) কিঙ্কিণী। (চিন্তিত এবং দুঃখিতভাবে কিছু নড়িয়া) আমার প্রিয়টি যদি দুর্ভাগ্যক্রমে পূর্বেই কোনাে ফাঁদে জড়িয়ে থাকে, তবে আমাদের বিয়ে হওয়ার পর এই নিয়ে তাকে আমি তিরস্কার করতে চাই না। সমু। ( নড়িয়া ) আপনি কি আমাকে ইঙ্গিত কচ্ছেন ফাঁদে জড়ানাের কথা বলে ? এ আপনার ধৃষ্টতা। রকম ব্যাপারে নৈতিক কর্তব্য হয়েছে মন খুলে কথা বলা—আর সে রকম বলাতেই সুখ। কিঙ্কিণী। (নড়িয়া সমুজ্জ্বলার কাছে গিয়া ) আপনি কি এই ইঙ্গিত কচ্ছেন যে বনানী বাবুকে আমি প্রতারিত করে এতে জড়িয়েছি ? কোন সাহসে আপনি একথা বল্লেন ? এ-রকম সময় ভদ্রতার পাতলা মুখােস পরে থাকা আমার কৰ্ম্ম নয় । তা আমার স্পষ্ট কথা। (মতির প্রবেশ—হাতে একটি ট্রেতে চা, জলখাবার জিনীষ ইত্যাদি-- সমুজ্জ্বলা কি প্রত্যুত্তর করিতে যাইতেছিল—উভয়েই মতিকে দেখিয়া চাপা ক্রোধে গুরাইতে লাগিল। (ব্যঙ্গের সুরে) এ আমি জানিয়ে দিচ্ছি যে গ্রাম- জনােচিত স্পষ্ট কথা বলার অভ্যাসটা আমার কোনাে কালেই নাই। আমরা দুই বিভিন্ন সমু।
মতি।
• : খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
সমাজেই লালিত পালিত হয়েছি, সে তত স্পষ্টই
বােঝা যাচ্ছে।
চা, খাবার কি বরাবরের মত রেখে যাব, দিদিমণি ?
কিঙ্কিণী । ( দৃঢ় কণ্ঠে ) , বরাবরের মত।
( মতি সব ঠিক করিয়া রাখিতে লাগিল । উভয়ে অনেকক্ষণ নীরক
রহিয়া পরস্পরের দিকে আড় চোখে চাহিতে লাগিল, তারপর সুদূর
ভদ্রতা রক্ষা করিয়া কথা চলিতে লাগিল।)
(নড়িয়া চারিদিকে চাহিয়া) বাগানটি তত বেশ!
কিঙ্কিণী। আপনার ভালো লেগেছে শুনে খুসি হলুম !
বাগানে যে ফুল আছে তা আমার মনে হয় নি।
কিঙ্কিণী। পাড়াগাঁয়ে ফুলের অভাব কি—কাতায় এক
ঝুড়ি মাটিও যে পয়সা দিয়ে কিনতে হয় কি না,
সেখানে ফুল জন্মান কষ্টকর বই কি ?
সমু।
সমু।
( নানারকমের খাবারের প্লেট লইয়া অন্য একটি ভূত্যের প্রবেশ।
সব রাখিয়া ভৃত্য নিষ্ক্রান্ত।)
সমু।
আমার নিজের মনের কথা বল্তে গেলে বলতে হয়,
পাড়াগাঁয়ে যে কেউ থাকতে পারে না, অবশ্যি সে
কেউ যদি যে-কেউ না হয়। পাড়া গাঁ দেখলেই
তাে আমার গা জ্বলে যায়! ( বসিল)
কিঙ্কিণী। তাহলে এত চেষ্টা করে পাড়াগা দেখতে না
এলেই হ’তে ! সহুরে লােকদের এ রােগ আছে
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
৭১
সমু।
শুনিছি ! একটু চা খাবেন কি ? (বসিয়া চা ঢালিতে
লাগিল)
( অতিরিক্ত ভদ্রতার সহিত ধন্যবাদ! (স্বগত) কি
ঘৃণ্য ছুড়ীটা! কিন্তু চা চাই যে !
কিঙ্কিণী। (মধুরভাবে) চিনি ?
সমু।
( উদ্ধতভাবে ) না, দরকার নেই। চিনির Fashion
নেই আজকাল।
( কিঙ্কিণী একটু ক্রোধের সহিত তার দিকে চাহিল এবং
চারি চামচ চিনি মতি কর্তৃক ধৃত পাত্রে ঢালিল।)
কিঙ্কিণী । (কঠিনভাবে ) কেইক, না রুটি মাখন ?
সমু। ( বিরক্তির ভঙ্গীতে) রুটি মাখন দিন্ (কিঙ্কিণী ট্রেতে রুটি
মাখন রাখিতে প্রবৃত্ত ) আজকালকার ভদ্র সমাজে
কেইকটা বড় দেখা যায় না। (কিঙ্কিণী কেইক মতি
কর্তৃক ধৃত ট্রেতে রাখিল , মতি চা, প্লেইট ইত্যাদি দুইদিকে
সাজাইয়া ঢালিয়া গেল--সমুজ্জ্বলা চাতে চুমুক দিয়াই বিকট
মুখভঙ্গী করিয়া উঠিল এবং পেয়ালা রাখিয়া দিল; পরে হাত
বাড়াইয়া প্লেইট টানিয়া দেখিল তাহাতে কেইক ; তখন সে
রাগিয়া উঠিয়া পড়িয়া দূরে সরিয়া গেল।) আপনি
আমার চাতে ঢেলা ঢেলা চিনি ফেলেছেন, আর
পরিষ্কার কণ্ঠে আমার রুটি মাখন চাওয়া সত্বেও
আপনি আমাকে কেইক দিয়েছেন! (দু’জনেই তাদের
পেয়ালা রাখিয়া দিল) আমার ব্যবহারের নম্রতা এবং
৭২
— খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
আমার প্রকৃতির অসামান্য মাধুর্যের কথা সকলেই
জানে, কিন্তু আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি
বাড়াবাড়ি করবেন না।
কিঙ্কিণী । (উঠিয়া) নির্দোষ বেচারিকে অন্য যে কোনাে
মেয়ের অন্যায় কৌশল থেকে রক্ষা করতে আমি সব
করতে পারি।
সমু।
আপনাকে প্রথম দেখা অবধিই আপনার প্রতি
আমার মন বিরূপ হয়ে যায়। তখনই আমি
অনুভব করি আপনি শঠ, প্রতারক। এসব বিষয়ে
আমার কোনাে দিনই ভুল হয় না। মানুষ সম্বন্ধে
আমার প্রথম ধারণা প্রত্যেক জায়গায়ই ঠিক হয়।
(পায়ে মাটিতে আঘাত করিয়া)
কিঙ্কিণী। মনে হচ্ছে আপনার মস্তিষ্কের কিছু গােযােগ
ঘটেছে! দরকার বােধ কল্লে মাথায় কিছু জল দিয়ে
আসতে পারেন।
( সমুজ্জ্বল রাগিয়া তারদিকে চাহিতে চাহিতে দূরে
গেল—বনমালীর প্রবেশ ।)
বনানী বাবু! বনানী বাবু! (তার উপর গিয়া পড়িল)
সমু আমার ! ( চুম্বন করিতে উদ্যত )
সমু। (সরিয়া গিয়া ) দাড়ান! এই মেয়েটিকে আপনি বিয়ে
করবেন বলে কথা দিয়েছেন কি না, তা কি আমি
জিজ্ঞেস করতে পারি ?
সমু।
সমু। প্রথম দৃশ্য ] # খেয়াল * ৭৩ ( হাসিয়া) আমাদের ছােট্ট কিঙ্কিণীকে! কি যে বল ! নিশ্চয়ই নয় ! তােমার মাথায় একথা চুল কি করে ? আর দরকার নেই—এখন পার। ( চুম্বনের জন্য গাল অগ্রসর করিয়া দিল। কিঙ্কিণী । (মধুরভাবে ) আমি জান্তুম একটা ভুল হয়েছে। যে ভদ্রলােকটি আপনাকে এখন আদর করলেন, তিনিই হচ্ছেন আমার অভিভাবক—শ্ৰীযুক্ত বনমালী দাস। সমু। কি বল্লেন ? কিঙ্কিণী। ইনিই আমার কাকাবাবু—বনমালী দাস। সমু। (কয়েক পা পিছাইয়া) বনমালী। এ! (অতুলানন্দের প্রবেশ ।) কিঙ্কিণী। এই তত বনানী বাবু! অতুল (অন্য কাহাকেও না দেখিতে পাইয়া সােজা কিঙ্কিণীর কাছে গেল) প্রিয়ে। (চুম্বনােত) কিঙ্কিণী । (সরিয়া গিয়া) দাড়ান! বনানী বাবু, এই মেয়েটিকে আপনি বিয়ে করবেন বলে কথা দিয়েছেন কিনা, তা কি আমি জিজ্ঞেস্ করতে পারি ? অতুল। ( চারিদিকে চাহিয়া ) কোন মেয়েটিকে ? সমুজ্জ্বল। ( হাসিয়া) কি যে বল ! নিশ্চয়ই নয় ! তােমার মাথায় একথা চুল কি করে ?
৭৪ * খেয়াল *-- [ দ্বিতীয় অঙ্ক সমু। যে ভদ্রলােকটি অতুল। কিঙ্কিণী। আর দরকার নেই। এখন পার। এখন পার। (চুম্বনের জন্যে গাল অগ্রসর করিয়া দিল ; অতুল চুম্বন করিল ) ( অগ্রসর হইয়া) একটা কিছু ভুল হয়েছে তা আমি আগেই ভেবেছিলুম। আপনাকে এখন আদর করলেন, তিনি আমার অতুল দা’ শ্ৰীযুক্ত অতুলানন্দ বসু। কিঙ্কিণী । (অতুল হইতে কয়েক পা সরিয়া গিয়া) অতুলানন্দ বসু ! এ! আপনার নাম কি অতুলানন্দ ? -আমি অস্বীকার করতে পারি না। কিঙ্কিণী। ওঃ! সমুজ্জ্বলার কাছে গেল ; দু’জনেই দু’জনের দিকে অগ্রসর হইয়া এবং যেন উভয়ের রক্ষার জন্য পরষ্পর গলা : জড়াইয়া ধরিল) সমু। আপনার নাম কি সত্যি বনমালী ? ( গর্বিত ভাবে দাঁড়াইয়া) ইচ্ছা করলে তা অস্বীকার করতে পারতুম ইচ্ছা করলে সব কিছু অস্বীকার করতে পারতুম ! কিন্তু আমার নাম সত্যি বনমালী। বরাবর বনমালীই ছিল। কিঙ্কিণী । (সমুজ্জ্বলার প্রতি) আমাদের উভয়কে ভীষণ প্রতারণা করা হয়েছে ! সমু। হায়-বেচারি বােন্ কিঙ্কিণী ! কিঙ্কিণী। হায়-প্রতারিতা সমুজ্জ্বলা দিদি আমার ! সমু। ( ধীরে এবং গম্ভীর ভাবে) তুমি আমাকে বরাবর দিদি বন ।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল
৭৫
ডাকবে, কেমন ?-(উভয়ের আলিঙ্গন-বনমালী এবং
অতুল গােংরাইয়া এদিক ওদিক পায়চারি করিতে লাগিল)
কিঙ্কিণী। (একটু হাসিখুসি ভাবে। আমার অভিভাবককে একটা
প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবার আমি অনুমতি চাচ্ছি।
( অতুল এবং বনমালী কাছে আসিল)
সমু।
চমৎকার খেলেছে মাথায় ! দাস মশায়, আপনাকেও
একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবার আমি অনুমতি চাচ্ছি।
আপনার ভাই বনানী কোথায় ? আমাদের উভয়েরই
আপনার ভাই বনানীর সঙ্গে বিয়ের কথা ঠিক হয়েছে;
কাজেই বর্তমানে আপনার ভাই বনানীটি কোথায়
জানাটা আমাদের কাছে একটু বিশেষ প্রয়ােজনীয়ই
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন । ( ধীরে এবং সঙ্কুচিত ভাবে)
সমুজ্জ্বলা -কিঙ্কিণী
( নিকটে গিয়া) সত্য বলতে বাধ্য হওয়াটা একটু
কষ্টকর। জীবনে প্রথম এই মুস্কিলের অবস্থায়
পড়িছি, কাজেই এ ধরণের অভিজ্ঞতা আমার মােটেই
হয়নি। যা হােক, আমি এখন সরল ভাবেই বত্ব যে
বনানী নামে আমার কোনাে ভাই নেই। ভাই
আমার মােটেই নেই—কখনাে ছিলনা, আর
কখনাে হােক সেই ইচ্ছাও আমি মােটেই রাখিনা।
(অতুল চেয়ারে বসিয়া ছিল -এখন ঘুরিয়া বসিল)
কিঙ্কিণী । ( বিস্মিত) মােটেই ভাই নেই ?
!
৬ গ বন। সমু। — খেয়াল [ দ্বিতীয় অঙ্ক ( উৎসাহিত ভাবে ) নেই ! সমু। ( কঠিন ভাবে তার নিকটে গিয়া) কোনাে রকম ভাই কি কোনাে সময় ছিল আপনার ? বন । কখনাে নয়। কোনাে রকমই নয়। (সরিয়া গিয়া। অতুলের নিকট বসিল ) কিঙ্কিণী, তাহলে এ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে আমাদের কারু সঙ্গে বিয়ের কোনাে কথাই কখনাে হয় নাই। ( কিঙ্কিণীর কাছে সরিয়া গেল ) কিঙ্কিণী। বিবাহযােগ্য। মেয়ের পক্ষে হঠাৎ এই অবস্থায় পড়াটা খুব সুখের নয়—কেমন, সুখের কি ? সমু। চল, আমরা বাড়ীর ভেতরে যাই! (কিঙ্কিণীকে ধরিয়া অগ্রসর ) ওরা আমাদের পেছন পেছন ওখানে যেতে আর সাহস পাবে না। কিঙ্কিণী। না, পুরুষগুলো ভারি ভীরু-কেমন, না? ( ঘূণাব্যঞ্জক দৃষ্টি চোখে ফুটাইয়া উভয়ে নিষ্ক্রান্ত) ( বনমালী অতুলকে লাথি মারিল ; অতুল প্রতিদান দিল) এই রকম করাটাকেই তুমি রমাপদগিরি বল, না ? অতুল। ঘঁ, খুব আশ্চৰ্য্য রমাপদী! এই রকম রমাপদী অবস্থায় জীবনে কখনাে পড়া যায়নি। "বন। দেখ, তােমার এখানে রমাপদগিরি চালানাের কোনাে অধিকার নেই। অতুল। বাজে কথা—যেখানে খুসি রমাপদগিরি চালানাে যায়।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল -
বন।
অতুল !
প্রকৃত রমাপদীরা—হু! ( উঠিয়া রাগে গড় গড় করিয়া
এদিক ওদিক পায়চারি ( নিকটে আসিয়া) তবে শােন,
এই বিশ্রী ব্যাপারে আমার একমাত্র সান্তনার কারণ
এইটুকু যে তােমার বন্ধু রমাপদটি এবার একেবারে
বিনষ্ট হলাে ! আর তুমি যখন খুসি পাড়াগাঁয়ে
দৌড়াতে পারবে না। সে ভালােই হয়েছে !
(বনমালী দূরে সরিয়া গেল )
তােমার ভাইটিরও আর পূর্ব অবস্থা রইলাে না।
কেমন—না, বনমালী ? যখন ইচ্ছ। আর সে
কলিকাতার অরণ্যে গিয়ে গালুকি দেবে, সেটি আর
হয়ে উঠছে না—সেটি মন্দ হয়নি ।
কিঙ্কিণী সম্বন্ধে তােমার আচরণের কথা বলতে
গেলে বতে হয় যে তুমি একটি সরল, সুন্দর,
নিরীহ মেয়েকে প্রতারণা করে যে কাজ করেছ, তা
ক্ষমারও অযােগ্য। আমি তার অভিভাবক সেকথা
নাই আলুম।
বন।
অতুল।
সমুজ্জ্বল সম্বন্ধে তােমার আচরণের কথা বলতে গেলে
বতে হয় যে তুমি একটি বুদ্ধিমতী, চতুর,
সুশিক্ষিতা মেয়েকে প্রতারণা করে যে কাজ করেছ,
তার কোনাে জবাব নেই । সে আমার মাসীমার
ভ্রাতুস্পুত্রী সে কথা নাই বলুম । ( বসিল)
৭৮
-
- খেয়াল *
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
-
বন।
বন ।
বন। আমি সমুজ্জ্বলার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছিলুম
আর তাে কিছু নয় ! আমি তাকে ভালােবাসি।
অতুল। আমি তাে শুধু কিঙ্কিণীকে বিয়েই করতে চেয়েছিলুম,
তার বেশী কিছু নয়। তাকে আমি ভালােবাসি।
কিঙ্কিণীকে তােমার বিয়ে করবার কেননা সম্ভাবনা
নেই। (বসিল)
অতুল। বনমালী, তুমিও যে সমুজ্জ্বলাকে কখনাে বিয়ে কর্নে
পারবে, তারও কোনাে সম্ভাবনা নেই (টেবিলের কাছে
বসিয়া কেইক খাইতে লাগিল।
এমন বিপদে পড়া গেছে—তুমি বসে বসে শান্ত
ভাবে যে কি করে কেইক খাচ্ছ তাই ভাবছি !
হৃদয় বলে কোনো পদার্থই নেই তােমার ।
দেখ, খাওয়াটা কখনাে উত্তেজিত অবস্থায় স্বাস্থ্যের
আসুকুল নয়।
বন। বর্তমান অবস্থায় খাওয়াটা হৃদয়-হীনতারই পরিচায়ক ।
অতুল। আমি যখন বিপদে পড়ি, তখন খাওয়াই একমাত্র
জিনীষ—যা নাকি আমাকে সান্ত্বনা দেয়। বাস্তবিক
আমাকে যে জানে, সে হলফ করে বলতে পারবে যে
সেই অবস্থায় খাদ্য এবং পানীয় ছাড়া আর সমস্তই
আমি প্রত্যাখ্যান করে থাকি। বর্তমানে আমি
অশান্তিতে পড়িছি বলেই খাওয়া শুরু করিছি।
অতুল।
প্রথণ দৃশ্য ]
* খেয়াল *-
৭৯
বন।
অতুল।
বন।
আর তা ছাড়া কেইক জিনীষটা আমি একটু পছন্দও
করি বেশী। (কেইক খাইতে লাগিল।
( উঠিয়া ) কিন্তু সে জন্যে এমন রাক্ষসের মতন কেউ
খায় না! (অতুলের নিকট হইতে প্লেট ছিনাইয়া লইল)
( রুটির প্লেট লইয়া বনমালীকে দিয়া) তুমি বরং রুটি
নাওরুটিটা আমি পছন্দ করিনা।
বটে ! আমার নিজের বাড়ীতে নিজের কেই
খাবার অধিকারও কি আমার নাই ?
অতুল। কিন্তু তুমি তাে এখনি বলেছ কেইক খাওয়াটা হৃদয়-
হীনের কাজ।
আমি বলিছি এই অবস্থায় কেই খাওয়া হৃদয়-
হীনের কাজ। সে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
অতুল ।
তা হতে পারে। কিন্তু কেইক তাে আরাে রয়েছে।
(তাহারা প্লেইট পরিবর্তন করিয়া লইল)
'বন। দেখ অতুল, তুমি এখন চলে যাও, সেই আমার
'বন।
অতুল।
তা পারব না। আমি ধনঞ্জয় বাবুর নিকট ঠিক করে
এসেছি সাড়ে পাঁচটায় তার ভাইয়ের কাছে যাব ;
নাম পরিবর্তন করে ‘বনানী করবার জন্যে
ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট দরখাস্ত পাঠাতে হবে। (উঠিয়া
সােফায় বসিল)
দেখ, বাজে ব’কো না। আমি আজ সকালে ধনঞ্জয়
৮০
* খেয়াল *-
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
বাবুর সঙ্গে ঠিক করিছি তার ভাইয়ের কাছে সাড়ে
পাঁচটায় যাব—আর ‘বনানী নাম গ্রহণ করা আমার
পক্ষেই স্বাভাবিক। সমুজ্জ্বলারও তাই পছন্দমত
হবে। দু’জনের নাম ‘বনানী’ হতে পারে না- সে
অসম্ভব। আর তা ছাড়া, নাম পরিবর্তন যদি করতেই
হয় তাে সে আমারই—কারণ আমার নাম কে
রেখেছিল তার ঠিক নেই—পিতা মাতা রাখেনি
এখন আমার খুসিমত তার পরিবর্তন করাটা
অস্বাভাবিক নয়। তােমার আলাদা কথা। তােমার
পিতামাতাই তােনার নাম রেখেছেন।
অতুল। তবে এতদিন একনামে চলার মধ্যে কোনাে সুখ
নেই। পরিবর্তনটা সকলেই চায়—বিশেষ, ভালাের
দিকে।
সে কথা বল্লে চলবে কেন ?
অতুল। কিন্তু ভেবে দেখ তােমার এখন এসব খেয়ালের সময়
নয়—জানাে তত তােমার একটি পরমাত্মীয় ইদানীং
পশ্চিমে হঠাৎ ডবল নিউমােনিয়া হয়ে মারা গেছে
তােমার শশাকের সময়। (বনমালী কেইক খাইতেছে )
একি! আবার যে কেইক ধরলে—না, সে হচ্ছে না।
( লইয়া গেল। আমি তাে তােমায় বলিছি যে কেইকটা
আমার মুখে যেমন ভাল লাগে এমন আর কারু মুখে
লাগতে পারে না।
বন।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
৮১
বন। অতুল, তােমাকে আমি বারবার যেতে বলিছি।
আমি তােনাকে এখানে চাই না। কেন যাচ্ছনা
তুমি ?
অতুল।
বন ।
অতুল
বন।
অতুল।
( বসিল) আমার চা টা তাে এখনো শেষ করিনি।
(অতুল বনমালীর পেয়ালা লইয়া খাইতে লাগিল।
তুমি যে আমার চা খাচ্ছ ?
চা তােমার নয় -তুমি আমার কেইক খেয়ে ফেছ--
এ তোমার কেই নয়—চল-চল, আর ন্যাকামো
কৰ্ত্তে হবে না।
তা যাচ্ছি—কিন্তু কেইক ছেড়ে যাওয়া হবে না-
( পকেটে কেই ভরিতে লাগিল )
ওকি কচ্ছপকেটে কেইক ভছ কেন ? এ আবার
কোন্ কায়দা ?
আজকালের গার্ডেন পার্টিতে গিয়ে এই বিদ্যাটি
শিখেছি—সেখানে এ আদব কায়দার যথেষ্ট
অনুশীলন হয় !
(খাইতে খাইতে ও পকেট ভর্তি করিয়া অতুলের ও
তৎপশ্চাতে বনমালীর প্রস্থান।)
বন।
অতুল।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বিজন কুটীর।
( জানালার কাছে সমুজ্জ্বল ও কিঙ্কিণী)।
সমু। তারা যে আমাদের পেছন পেছন বাড়ীর ভেতর
এসে ঢুকেনি তা’তে বােঝা যাচ্ছে লজ্জা বলে একটা
জিনীষ তাদের আছে। এই অবস্থার তা হলে
এসে ঢুকে পড়তাে।
কিঙ্কিণী। তারা কেই খাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে তাদের
অনুতাপ হয়েছে !
তারা আমাদের দিকে চেয়ে আছে—কি নিলজ্জ !
কিঙ্কিণী। ঐ তারা আছে ; মােটেই ভীরু নয় ওরা।
(বনমালী জানালা অতিক্রম করিয়া গেল ; পিছনে অতুল।)
সমু।
চল আমরা সুগম্ভীর মৌন অবলম্বন করে থাকি।
কিঙ্কিণী। নিশ্চয়—এখন তা ছাড়া আর কি করা যাবে !
( উভয়ে সরিয়া দাড়াইল)
( শিষ্য দিতে দিতে বনমালী ও অতুলের প্রবেশ।)
সমু।
এই সুগম্ভীর মৌনব্রত অবলম্বন করে যেন ভাল কাজ
হচ্ছে না। (বনমালী ও অতুল সরিয়া আসিল।)
কিঙ্কিণী। ভারি বিশ্রী ।
'সমু।
কিন্তু আমরা আগে কথা বলব না
সমু।
•
৮৩
সমু।
প্রথম দৃশ্য ]
খেয়াল *
কিঙ্কিণী। নিশ্চয় নয়।
( নিকটে গিয়া) দাস মশায় !
বিশেষ একটা কথা
আপনাকে জিজ্ঞেস্ করবার আছে। আপনার
জবাবের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
কিঙ্কিণী। (অতুলের কাছে গিয়া ) বস্তু মশায়, অনুগ্রহ করে
আমার প্রশ্নটির উত্তর দেবেন—আপনি আমার
অভিভাবকের ভাই বলে মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলেন
কেন ?
অতুল। আপনার সঙ্গে দেখা করবার সুযােগ পাবার জন্যে।
কিঙ্কিণী। (সমুজ্জ্বলার কাছে গিয়া) জবাবটা সন্তোষজনকই মনে
হচ্ছে—নয় কি ?
(বনমালীর কাছে গিয়া ) দাস মশায়, আপনার এক
ভাই আছে বলে ভাণ করার কি উত্তর দেবার আছে
আপনার ? সহরে এসে আমাকে ঘন ঘন দেখবার
সুযােগ পাওয়ার জন্যেই কি আপনার এই মিথ্যার
সমু।
সৃষ্টি ?
সমু।
নিশ্চয় ! আপনি ঠিক বলেছেন।
জবাবটা সন্তোষজনকই মনে হচ্ছে—নয় কি ?
(কিঙ্কিণীর কাছে যাইয়া) চল আমরা এই কৌচে বসি—
দেখি ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়। (দুজনেরই কৌচে উপবেশন)
(“আজ বিকেলেই নাম পরিবর্তনের দরখাস্ত
দেব” এই বলা পর্যন্ত বনমালী এবং অতুল
৮৪ সমু । ** খেয়াল * [ তৃতীয় অঙ্ক দু'জনেই ঠিক একরকম ভঙ্গী এবং নড়াচড়া করিয়া কাজ করিতে লাগিল। প্রথম তারা সােফার সম্মুখে গেল, পরে হাত জোড় করিল, তারপর ছাদের দিকে চোখ তুলিল, তারপর হাটু গাড়িয়া আবার সােফার নিকট বসিল, দুই হাত বুকে দিল, দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িল, রুমাল দিয়া চোখ পুছিল—তারপয়ে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।) ( কিঙ্কিণীর কাছে গিয়া ) তাদের জবাব সম্পূর্ণ সন্তোষ- জনকই হয়েছে মনে হয়—তাদেরে ক্ষমা করা উচিত মনে কর ? কিঙ্কিণী একত্রে) হ—না, আমি বলতে চাচ্ছিলুম, না। সমু সমু। ঠিক ! আমি ভুলেই গেছিলুম! এর ভিতর তাে- principleএর কথা রয়েছে—সে তাে ছাড়া যায় না! আমাদের মধ্যে কে ওদেরে বলবে ? কাজট! প্রীতিকর নয়। কিঙ্কিণী। দু’জনেই একসঙ্গে বল্লে হয় না? বেশ, বেশ, তাই হবে! ঠিক একসঙ্গে আরম্ভ করতে হবে। আগে পাছে না হয়। কিঙ্কিণী। ।।-এক, দুই, তিন উভয়ে উভয়ের প্রিয়পাত্রের সম্মুখে গিয়া দাড়াইল) সমু।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *
৮৫
সমু
(একত্রে) আপনাদের নামইত বিয়ের বাধা হয়ে
} আপনে কত কি
কিঙ্কিণী আছে ! আর কোন প্রতিবন্ধক নেই।
(উভয়ে সরিয়া গেল )
অতুল। চল একসঙ্গে উত্তর দিই-ঠিক একসঙ্গে হওয়া চাই—
এক—দুই-তিন-(দু’জনেই তমুহূর্তেই দু’জনের প্রিয়পাত্রীর
সম্মুখে গিয়া হাজির হইল)
(একত্রে) আমাদের নাম! আর কোন বাধা নেই
সমু।
বুন।
তাতুল তো ? আমরা আজ বিকেলেই নাম পরিবর্তনের
দরখাস্ত দেব !
বনমালীর প্রতি) আমার জন্যে এই ভয়ঙ্কর কাজ
করতে আপনি প্রস্তুত আছেন ?
নিশ্চয় !
কিঙ্কিণী। (অতুলের প্রতি ) আমাকে খুসি করবার জন্যে এই
ভীষণ পরীক্ষার সম্মুখীন হতে আপনি প্রস্তুত ?
অতুল। নিশ্চয়।
সমু। স্ত্রী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা কি বােকামি।
আত্মােৎসর্গের কথা যখন উপস্থিত হয়, তখন পুরুষেরা
আমাদিগকে কোথায় অতিক্রম করে চলে যায় ।
(বনমালীর প্রতি) প্রিয়! (হাতে হাত দিল)
অতুল। (কিঙ্কিণীর প্রতি) প্রিয়ে ! (হাতে হাত দিল )
* খেয়াল *- [ তৃতীয় অঙ্ক ( মতির প্রবেশ ; অবস্থা দেখিয়া উকি ঝুকি মারিয়া কয়েকবার জোরে কাসিল ) ব্রজসুন্দরী ঠাকরুণ এসেছেন। মতি। বন। এ! সমু। ( ব্রজসুন্দরীর প্রবেশ। তারা এতক্ষণে ছাড়াছাড়ি হইল। মতি নিষ্ক্রান্ত।) ব্রজ। সমুজ্জ্বল ! এর মানে কি ? মানে শুধু এইটুকু, পিসীমা, দাস মশায়ের সঙ্গে আমার কথা পাকা হয়ে গেছে—এখন শুধু তােমার অনুমতির অপেক্ষা! ব্রজ। বােস্! (সােফা দেখাইয়া দিয়া বনমালীর দিকে ফিরিল ) —বিশ্বাসী দাসীর কাছ থেকে সমুজ্জ্বলার হঠাৎ পলায়নের খবরে চকিত হয়ে কোনো রকমে একটা মাল গাড়ীতে চড়ে তবে এর পিছন নিয়েছি। এই মুহূর্ত থেকে আপনার সঙ্গে আমার ভ্রাতুস্পুত্রী সমুজ্জ্বলার সব রকম সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হ’ললা—দেখা শুনা এবং চিঠিপত্র ব্যবহারও একেবারে নিষিদ্ধ। সব বিষয়ে যেমন, এ বিষয়েও তেমনি দেখবেন, আমি ভীষণ কড়া লােক ! আমি সমুজ্জ্বলার সঙ্গে বিয়ের পাকা কথা দিয়েছি। আপনার পাকা কথায় তাে আর কিছু এসে যাবে চুপ! ( ফিরিয়া অতুলের দিকে মুখ করিল) এখন অতুলের কথা—অতুল ! অতুল । কি, মাসীমা ! ?
৮৭:
ব্রজ।
প্রথম দৃশ্য ]
# খেয়াল -
তােমার চিররােগী বন্ধু রমাপদ এই বাড়ীতে থাকে
কিনা জিজ্ঞেস্ করতে পারি কি?
অতুল। না, না ! রমাপদ এখানে থাকে না। রমাপদ
বর্তমানে অন্য কোথাও আছে। বাস্তবিক, রমাপদ
মরেই গেছে!
ব্রজ। মরে গেছে ? কখন্ রমাপদ মরূলে? তার মৃত্যুটা
অত্যন্ত আকস্মিক হয়েছে বলতে হবে !
অতুল। রমাপদ গেছে—অর্থাৎ-ওঃ,আজ বিকেলে রমাপদকে
মেরে ফেলেছি। (ব্রজ সুন্দরীর দৃষ্টি ) অর্থাৎ কিনা—
আজ বিকেলে রমাপদ মারা গেছে। আমি বলতে
যাচ্ছিলুম ডাক্তারেরা দেখলে রমাপদ আর বাঁচতে
পারে না—কাজেই রমাপদ মরে গেল।
কিঙ্কিণীর হাত ধরিল; বনমালী সমুজ্জ্বলার গা ঘেসিয়া
দাড়াইল)
ব্রজ।
বাস্তবিক, তার দেখছি ডাক্তারের অভিমতের উপর
একান্ত নির্ভর ছিল ! যাক, শুনে খুসি হলুম।
অবশেষে রমাপদ যে একটা নির্দিষ্ট কিছু করবার জন্য
মনস্থির করেছিল, আর যা করেছিল ডাক্তারের
উপদেশ নিয়েই করেছিল। রমাপদ যখন আর নেই
আমি এখন জিজ্ঞেস করছি, দাস মশায়, কোননা
প্রয়ােজন না থাকা সত্ত্বেও আমার বােপােটি ঐ যে
একটি মেয়ের হাত ধরে আছেন, সেটি কে ?
(অতুল
৮৮
* খেয়াল -
[ তৃতীয় অঙ্ক
বন।
ঐটি কিঙ্কিণী। আমিই তার অভিভাবক।
অতুল। আমি কিঙ্কিণীকে বিয়ে করতে চাই, মাসীমা।
কি বলে ?
কিঙ্কিণী। উনি বলেন, আমার সঙ্গে ওঁর বিয়ের কথা ঠিক
হয়েছে।
( কঁপিয়া) উঃ, এ অঞ্চলের আবহাওয়ায় নিশ্চয়ই কিছু
মারাত্মক রকম উত্তেজক আছে বােধ হয়, নইলে
এখানে বিয়ের প্রস্তাব সমগ্র দেশের তুলনায় এমন
বেমালুম বেড়ে উঠবে কেন! আচ্ছা, কিছু খবর
নিয়েই দেখা যাক আগে। দাস মশায়, এ কিঙ্কিণীটি
বন।
(বনমালী ভীষণ রাগিয়া উঠিল, কিন্তু নিজকে দমন করিল।
(পরিষ্কার শান্ত সুরে) কিঙ্কিণী, রায় বাহাদুর গঙ্গাধর
সিংএর পৌত্রী, বনধর সিংএর প্রপৌত্রী, হলধর
সিংএর বৃদ্ধ প্রপৌত্রী -হলধর সিংএর পিতা এ
অঞ্চলের জমীদার ছিলেন।
ব্রজ।
এ পর্যন্ত বেশ সন্তোষজনকই বােধ হচ্ছে।
কবে কোথায় ওর জন্ম, কবে টীকা হয়েছিল, কবে
ঘুংড়ী কাসি হয়েছিল, টাইফয়েড হয়েছিল—সে সময়
কোন্ কোন ডাক্তার দেখে, ক’জন সাহেব,
ক’জন
বাঙ্গালী—সব আমার খাতায় লেখা আছে--দরকার
হলে আপনাকে দেওয়া যাবে।
বন।
'..
৮৯ প্রথম দৃশ্য ] * খেয়াল * আঃ! একেবারে বিচিত্র ঘটনাপূর্ণ জীবন যে ! এতটুকু মেয়ের জীবনে এত ঘটনা! অল্প বয়সে এত অভিজ্ঞতার পক্ষপাতী আমি নই। (সমুজ্জ্বলার প্রতি) সমুজ্জ্বল, আমাদের যাবার সময় হয়েছে। আর দেরী করলে চলবে না, (উঠিয়া পড়িল ) হাঁ! দাস মশায়, কিঙ্কিণীর বর্তমানে সঙ্গতি কিরূপ আছে—সেটা জানাই আমার বেশী দরকার তা’তাে বুঝতেই পারেন। বন । এই হাজার পনর টাকা ব্যাঙ্কে আছে—আর কিছু নেই। (ব্রজসুন্দরী বসিল) আমি এখন আসি। আপনাকে দেখে ভারি খুসি হয়েছি। একটু থামুন, দাস মশায়। হাজার পনের টাকা— ব্যাঙ্কে ? এখনই প্রকৃত পক্ষে মেয়ে দেখলুম- কিঙ্কিণীকে বেশ সুন্দরীই মনে হচ্ছে। (কিঙ্কিণীর প্রতি) এস তাে মা এখানে। ( কিঙ্কিণী অগ্রসর হইল বনমালী সােফার পিছনে গেল ) তােমার পােষাক এমন সাদাসিধে কেন ? আর চুলগুলােও, নেহাৎ অযত্নে রেখেছ। কিন্তু এসব আমাদের হাতে পড়লে থাকবে না। এদিকে ফিরে তাে মা। কিঙ্কিণী ; ফিরিল) অতুল ! অতুল। ব্রজ। কি, মাসীমা ! ( নিকটে গিয়া ) সমাজের অনেক কাজ হতে পারবে একে দিয়ে বােধ হচ্ছে।
* খেয়াল *
[ তৃতীয় অঙ্ক
অতুল।
অতুল।
হাঁ, তাই হবে মনে করেই তাে আমি
দেখ মা, অতুল তাে ঋণে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে-
যাক, বিয়ের ব্যাপারে এই সব টাকার অঙ্কের কথা না
ভােলাই ভালাে। আমার যখন বিয়ে হয় তখন
এসব কথা আমরা মােটেই আমলে আনিনি।
বিয়েটা শীঘ্র শীঘ্র হয়ে গেলেই ভালাে।
হাঁ, আমারাে তাই মত।
সত্যি বলতে গেলে—কথা ঠিক করে অনেকদিন
অপেক্ষা করে থাকার আমি পক্ষপাতী নই; তাতে
উভয়ের চরিত্রের অনেক খুঁত, চোখে পড়ে যায়
বিয়ের আগে সেটা হওয়া আমি মঙ্গলকর মনে
করি না।
(সােফার পিছন হইতে আসিয়া) আপনাকে একটু বাধা
দিয়ে আমি পারছি না—এই বিয়ের প্রস্তাবের
তাে মানেই নেই, আমিই হয়েছি কিঙ্কিণীর অভিভাবক
-আমার অনুমতি ছাড়া সে বিয়ে করতে পারে না।
সেই অনুমতি দিতে আমি সম্পূর্ণ অস্বীকৃত।
কি কারণে জিজ্ঞেস্ করতে পারি কি ?
আপনার বােপপ সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলতে
আমার সঙ্কোচ হয়—কিন্তু তার চরিত্র প্রশংসনীয়
বলে আমার মনে হয় না।
(অতুল এবং কিঙ্কিণী তার দিকে বিস্মিত হইয়া চাহিল
কন।
প্রথম দৃশ্য ]
** খেয়াল *--
ব্রজ। প্রশংসনীয় নয় ! আমার বােপা অতুল।
অসম্ভব ! বিদ্যায় এবং চরিত্রে কালেজের বিশেষ
প্রশংসা নিয়েই যে সে এম, এ, পাশ করে
বেরিয়েছে।
বন। সে সম্বন্ধে কোনাে সন্দেহ নেই অবিশ্যি। কিন্তু
চরিত্র বিষয়ে একটু বল্লেই যথেষ্ট হবে যে আজকেই
অমাির অনুপস্থিতির সুযােগে আমার ভাই বলে
পরিচয় দিয়ে আজ সে আমার বাড়ীতে ঢুকেছে
একটা ছদ্মনাম নিয়ে আমার সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধানে রক্ষিত
এই কিঙ্কিণীর মন সে কোনাে রকমে অধিকার করে
বসেছে। তারপরে সে বিনানুমতিতেই চা খেয়েছে
এবং অভদ্রের মত সমস্ত কেইক নিঃশেষ করেছে।
তার আচরণ শত গুণে অন্যায় হয়েছে আরও এই
কারণে যে সে পূর্ব থেকেই জানতে আমার কোনাে
ভাই নেই, কোনদিন ছিল না কিম্বা কখন হবার
সম্ভাবনা নেই। কাল আমি তাকে স্পষ্টই সে কথা
জানিয়েছি।
ব্রজ। দাস মশায়, অনেক চিন্তার পর আপনার প্রতি
আমার বােপাের আচরণের বিষয় আমি দৃকপাত
করব না ঠিক করিছি। কারণ আপনি জানেন এ
জগতে চিরকাল একটা অনুল্লঙ্ঘনীয় আইন চলে
আসছে,
GUY 3055 necessity knows no
-
— খেয়াল
[ তৃতীয় অঙ্ক
law ( কিঙ্কিণীর প্রতি) এস তাে মা এখানে, ( কিঙ্কিণী
গেল ) তােমার বয়স কত মা ?
কিঙ্কিণী। এই চৌদ্দ, পনর, যােল এরকম হবে।
ব্রজ।
( চিন্তার ভাবে) আঠারাে হতে তােমার আর বেশী
দেরী নেই—তখন তুমি অভিভাবকের অধীন হতে
মুক্ত হবে।
বন। আমি আবার বাধা না দিয়ে পারছি না—ক্ষমা
করবেন, তার পিতামহের উইল অনুসারে আইনশত
সে পঁয়ত্রিশ বৎসরের আগে সাবালিকা হবে না।
ব্রজ। সেটা খুব আপত্তিজনক বলে মনে হয় না। পঁয়ত্রিশ
বৎসরটা তত চমৎকার বয়স। সেই বয়সে বিয়ে
হলে সমাজে অনেক কল্যাণ হয় ।
কিঙ্কিণী । (অতুলের কাছে গিয়া) আমার পঁয়ত্রিশ বৎসর হওয়া
পৰ্য্যন্ত কি আপনি অপেক্ষা করতে পারবেন ?
অতুল। তা পারব বৈ কি, কিঙ্কিণী। তুমি জাননা আমি
পারব।
কিঙ্কিণী। হাঁ, আমি তা মনে মনেই অনুভব করিছি, কিন্তু আমি
এতদিন অপেক্ষা করতে পারব না।
অতুল। তাহলে কি করা যায়, কিঙ্কিণী ?
কিঙ্কিণী। জানি না। (কিঙ্কিণী টেবিলের পাশে গেল ; অতুল গেল
বনমালীর কাছে)
ব্রজ। দাস মশায়, কিঙ্কিণী যখন স্পষ্ট বলছে যে সে পঁয়ত্রিশ
প্রথম দৃশ্য ] খেয়াল *-- বন। বৎসর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে না, তার এরকম বলার মধ্যে একটি অধীর প্রকৃতিরই সন্ধান পাচ্ছি। যখন সে একথা বলেছে, তখন আপনাকে আবার একটু ভাবতে অনুরােধকচ্ছি। বিষয়টা আপনার হাতেই সম্পূর্ণ আছে। যে মুহূর্তে সমুজ্জ্বলার সঙ্গে আমার বিয়ের মত দেবেন, সেই মুহূর্তেই আমি খুসি হয়ে আপনার বােপপার সঙ্গে কিঙ্কিণীর বিয়ের মত দেব। ( উঠিয়া) দাস মশায়, আপনি জানেন তা অসম্ভব তাহলে আপনিও জেনে রাখুন কিঙ্কিণীর বিয়েতে মত দেওয়াও আমার পক্ষে অসম্ভব। (বনমালী এবং অতুল পায়চারি করিতে লাগিল ) ( অতুলের প্রতি) তাহলে আমাদের দুজনেরই কপালে আছে ভবিষ্যতের জন্যে সীমাহীন মরুভূমির মত এক দুস্তর অবিবাহিত ব্রজ। বন । জীবন ! ব্রজ। (চেয়ারের পিছনে কিঙ্কিণীর নিকট গিয়া দাঁড়াইল। সমুজ্জ্বলার ভবিষ্যৎটিকে অন্য রকম চেহারা দেবারই আমি মনে রাখি। অতুল অবশ্যি নিজের যা খুসি করতে পারে। (সমুজ্জ্বলার প্রতি) এস তাে ! ( সমুজ্জ্বলা উঠিল । আমাদের এখন যেতে হবে। (ধনঞ্জয়ের প্রবেশ) আমার ভাই অপেক্ষা করে আছে। ধন।
৯৪ ** খেয়াল - [ তৃতীয় অঙ্ক ব্রজ। বন । কার জন্যে ? এই দুটি ভদ্রলােকই আমার ভাইকে দিয়ে নাম পরিবর্তনের দরখাস্ত দেবেন ঠিক করেছেন। নাম পরিবর্তন ? কেন ? অদ্ভুত ! অতুল, আমি তােকে নিষেধ কচ্ছি; আর তাের মেলােমশায়ও শুনলে ভারি রাগ করবেন বলে দিচ্ছি। তাহলে কি আপনারা যাচ্ছেন না ? ধনঞ্জয় বাবু, ব্যাপার এখন যে রকম দাড়িয়েছে, তাতে যে আমাদের কারুই নাম পরিবর্তনের দরকার এবং উপকারিতা আছে তা বােধ হয় না। যাই, বলি গিয়ে। আবার সরােজিনী ঠাকরুণ আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছেন। ( চমকিয়া উঠিয়া) সরােজিনী ! আপনি কি ‘সরােজিনী বল্লেন ? ( বনমালী সমুজ্জ্বলার পাশে এবং অতুল কিঙ্কিণীয় পাশে গিয়া দাড়াইল) হুঁ, তার কাছেই যাচ্ছি আমি। ( উদ্বিগ্ন ভাবে) আপনাকে একটু আটকিয়ে রাখছি, ক্ষমা করবেন। এই ব্যাপারটা আমার স্বামী এবং আমার কাছে খুব প্রয়ােজনীয় বলেই প্রকাশ পেতে পারে। এই সরােজিনীটি কি বদ চেহারার একটি মেয়েলােক- -লেখাপড়া কিছু জানে বলে অভিমান আছে ? ধন।
প্রথম দৃশ্য ]
* খেয়াল *~-
ধন। ( রাগিরা) ওঁর মত শিক্ষিত ভদ্র মেয়েলােক আমি
বড় একটা দেখিনি।
ব্রজ।
( চিন্তিতভাবে ) পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে, সেই হবে।
আপনার গৃহস্থালীতে কোন্ পদে তিনি আছেন
জিজ্ঞেস করতে পারি কি।
ধনঞ্জয়।
( কঠিনভাবে ) আমি বিবাহিত। কাজেই
গৃহস্থালী বলে আমার কিছু নেই। (সরিয়া দাঁড়াইল)
'বন।
( বাধা দিয়া) সরােজিনী নামে একটি মহিলা গত
তিন বৎসর যাবৎ কিঙ্কিণীর শিক্ষয়িত্রী এবং সঙ্গিনী
রূপে এখানে আছেন।
ব্রজ।
এই সরােজিনীটিকে আমার এক্ষুণি দেখতে হবে।
তাকে ডেকে পাঠান্ তাে।
( বাহিরে চাহিয়া ) উনি আসছেন—নিকটেই।
( দ্রুত সরােজিনীর প্রবেশ )
সরাে। ( ধনঞ্জয়ের প্রতি । শুলুম আপনি আমার জন্যে
এখানে অপেক্ষা করছেন—আমি আপনার জন্যে
পৌণে দুই ঘণ্টা ধরে ওঘরে ছিলুম।
(ব্রজসুন্দরী স্থির কঠিন দৃষ্টিতে সরােজিনীকে দেখিতেছিল,
সরােজিনী হঠাৎ ব্রজকে দেখিয়া কাপিয়া উঠিল,
তার মুখ ফ্যাকাশে হইল—সে পলাইবার
চেষ্টা করিল।)
( কঠিন বিচারের কণ্ঠে) সরােজিনী !
সরে।
ব্রজ।
* খেয়াল *
[ তৃতীয় অঙ্ক
( লজ্জায় মাথা নােয়াইয়া) ব্ৰজ ঠাকরুণ ।
এখানে এস, সরােজিনী । ( সরােজিনী বিনীত ভাবে
অগ্রসর হইল) সরােজিনী ! সেই শিশুটি কোথায় ?
( সকলের বিস্ময় ও ভয় ; ধনঞ্জয় সচকিত হইয়া কয়েক পা
পিছাইয়া গেল ; অতুল এবং বনমালী দু’জনেই কিঙ্কিণী ও
সমুজ্জনাকে যেন এক কেলেঙ্কারীর কথা শুনা হইতে রক্ষা
করিতে উদ্বিগ্ন হইল—সরােজিনী কোনাে জবাব দিল না )
পঁচিশ বৎসর আগে, সরােজিনী, তুমি আমার বাড়ী
থেকে পালিয়েছ—বড়বাজারে তখন আমরা ছিলুম
একটি শিশু ছেলেকে ঠেলাগাড়ীতে করে তুমি
রাস্তায় বেরিয়েছিলে, আর ফেরনি-কয়েক সপ্তাহ
পরে পুলিশের তদন্তে মির্জাপুর পার্কের এক কোণে
ঠেলা গাড়ীটি পাওয়া যায়। তার মধ্যে এক
উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ছিল—তার মধ্যে নানা রকম
সব অদ্ভুত কথা ছিল! (সরােজিনী অনিচ্ছাকৃত ক্রোধে
দীপ্ত হইয়া উঠিল) কিন্তু শিশু তাতে ছিল না।
সরােজিনী, সে শিশু কোথায় ? ( সকলে সরােজিনীর
দিকে চাহিল )
আমি যথেষ্ট লজ্জিত ও অনুতপ্ত আছি, কিন্তু
বাস্তবিক আমি তা জানি না—জানলে ছিল ভালাে।
ঘটনা যা হয়েছিল তা এই—আপনি যে দিনের কথা
বল্লেন,
সেই দিন সকালে—এখনাে সে দিনের কথা
!
সরো।
প্রথম দৃশ্য ] - খেয়াল ৯৭ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে-আমি প্রতি- দিনের মত ঠেলা গাড়ীতে শিশুকে নিয়ে বেরলুম। সে দিন বেড়াতে বেড়াতে আমি হাওড়া স্টেশনের দিকে গেলুম; ষ্টেশনে যেয়ে আমার একটি বহু পূর্ব পরিচিতার সঙ্গে দেখা হ’ল—তিনি পশ্চিমে যাচ্ছেন বেড়াতে। তার সঙ্গে কথায় কথায় অন্যমনস্ক হয়ে, ঠেলা গাড়ীটি সেইখানে রেখে, তিনি। যে গাড়ীতে উঠবেন সেই গাড়ীর দিকে চলে গেলুম —গাড়ী ছাড়লাে পরে ফিরে এসে দেখি আমার সে ঠেলা গাড়ীটি সেখানে নেই, শিশুও নেই—আমি পাগলের মত খুঁজতে লাগলুম, কোথাও পেলুম না অনেক খুঁজলুম, কোথাও পেলুম না—ভয়ে, লজ্জায়, কাউকে কিছু বলতেও পালুম না, তারপরে আর বাড়ী ফিরলুমনা-কলকাতা ছেড়ে পালালুম। আমার ডায়েরীটিও ঐ ঠেলা গাড়ীতে ছিল, সেটা প্রায় উপন্যাসের আকারই ধরেছিল—এক মুহূর্তের আত্ব বিস্মৃতিতে এমনটা ঘটলাে -যার জন্যে আমিই আমার নিজকে ক্ষমা কর্তে পারি না। (এতক্ষণ মনােযােগ দিয়ে সব শুনিতেছিল) থামুন, যে ঠেলা গাড়ীতে আমাকে পাওয়া গেছিল, সে গাড়ীতে একখানা হাতের লেখা বইও পাওয়া গেছিল- সেখানি আমার নিকটেই আছে, এই আমি এখনই বন।
---* খেয়াল
[ তৃতীয় অঙ্ক
নিয়ে আসছি—দেখবেন ত ওটা আপনারই লেখা
কিনা।
( প্রস্থান)
এতক্ষণে সব পরিষ্কার বােঝা যাবে মনে হচ্ছে-
ব্রজ।
( বনমালীর প্রবেশ )
( সরােজিনীর প্রতি) এই যে সেই বই—দেখুন তাে
এটা আপনারই কিনা ?
সরাে। (থামিয়া) হাঁ—এটা আমারই হস্তলিখিত ডায়েরী
বটে, তাতে আর কোনই সন্দেহ নাই। আপনি
বাস্তবিক কে ঐ মহিলাটি তা বলতে পারবেন।
(পিছাইয়া ধনঞ্জয়ের কাছে গেল এবং তার সঙ্গে কথা কহিতে লাগিল)
বন । (একটু পরে ব্রজসুন্দরীর প্রতি) মাসীমা, তাহলে আপনি
আমার সবিশেষ পরিচয় নিশ্চয় জানেন। আমি
কে অনুগ্রহ করে কি জানাবেন ?
ব্রজ। তাহলে সেটা এখন খুলে বলি— উঠিয়া) তুমি
আমার সই অলকা বসুর ছেলে। তােমার বাপ মারা
যাওয়ার পরে তােমার মা আমার এখানেই আশ্রয়
নিয়েছিলেন।
বন। এতদিনে সব খট্কা ভাঙ্গল! তাহলে জাতি, কুল কিংবা
সামাজিক পদমর্যাদায় আমি সমুজ্জ্বলার অনুপযুক্ত
নই ?
ব্রজ।
, এখন তাে তা মনে হয় না !
সমু। সমু। প্রথম দৃশ্য ] = খেয়াল * (বনমালীর প্রতি ) তােমার কি নাম ছিল আগে ? বন। আরে যা! ভুলেই গেছিলুম। মাসীমা, আমার হারিয়ে যাবার আগে আমার একটা নাম তাে ছিল। ব্রজ। নিশ্চয়, আদরের দুলাল ছিলি তুই। বন । তাহলে নামও একটা ছিল ! সে সম্বন্ধে কোনাে সন্দেহ নেই। কি নাম ছিল মাসীমা ? বােধ হয় বনানীই ছিল ? কেমন, না ? ( খুব মিনতির দৃষ্টিতে ব্রজসুন্দরীর দিকে চাহিল।) ব্রজ। ( থামিয়া) হ—মনে হচ্ছে যেন বনানীই ছিল। বনানী ! আমি প্রথম থেকেই মনে মনে জেনেছি বনানী ছাড়া তােমার আর কোনাে নাম হতেই পারে না । বন। এই বারে মেরে দিয়েছি কেল্লা—আর চলবে না কোন হল্লা—এস বুকে আমার সমুজ্জ্বলা! যাও অতুল- এখন আমি পরম হর্ষচিত্তে কিঙ্কিণীর সহিত তােমার বিয়ে অনুমােদন কচ্ছি—তবে তােমার নামের জন্য যদি সে পিছপাও হয়, তবে সেটা অবিশ্যি আমার দোষ নয় ! (ব্রজসুন্দরীর প্রতি) মাসীমা,-তাহলে আমারই কি এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে ! তুমি এর কোনই প্রতি- বিধান করবে না ? তুমি তাে বনমালী বাবুর একটা হিল্লে করে দিলে—আর আমিই বুঝি পড়ে থাকব ? আচ্ছা, তাই হবে! তাের তাে একমাত্র নামের জন্যই ঠেকা——আজ থেকে তাের এই মাসী তাের আদরের নাম দিল “বনানী”। শতুল।
খেয়াল *- [ তৃতীয় অঙ্ক অতুল। বাহােবা । তাহলে এইবারে পেলুম পেলুম আমার “কিঙ্কিণী।” (কিঙ্কিণীর হাতে হাত দিল) যাক্, আজ থেকে আমি হলুম বনানী নং one, আর তুমি হলে বনানী নং two হ; একটা মার্কা থাকলে ভালােই হয় না হলে হতে পারে ভুল! (বনমালী ও সমুজ্জ্বলা এক দিকে, অন্য দিকে অতুল ও কিঙ্কিণী, মাঝে ব্রজসুন্দরী—মৃদু হাসিতে লাগিল।) (বনমালী ও অতুল এক সঙ্গে—সমুজ্জ্বল ও কিঙ্কিণী এক সঙ্গে) ডুয়েট গান পুরুষ। পাষাণের কোলে ঘুমায় নিঝর স্বপনে দেখে সে কাহার মুখ! কার প্রেমে বল খােলে তার আঁখি, ফুলে উঠে তার উন্মেষ বুক ? পু। পাষাণ কারা, ভাঙ্গিয়া বলে! স্ত্রী। উপল-নিগড় খুলিয়া ছলে ! পু। ছােটে প্রিয় সনে মিলিতে, হয়না তাহাকে পথ দেখাতে ! পু। আপনার পথ আপনার বলে নেয় সে যতনে রচিয়ে। জগতে এমন নাইকো বাঁধন, রাখিবে তাহায় বাঁধিয়ে ! বাঞ্ছিত ৰুকে সে মিলাইবে বুক আপনা হারাবে এই তার সুখ ! স্ত্রী। স্ত্রী। স্ত্রী। যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.