Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sumati

Chowdhury,bhairabachandra · 2009/11/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুমতি।
শ্রীভৈরবচন্দ্র চৌধুরী প্রণীত
ও
প্রকাশিত।
Good education is the foundation of happiness.
CALCUTTA:
PRINTED BY S. BHATTACHARYYA,
METCALFE PRESS
I GOUR MOHAN MUKERJI'S STREET.
1897.

No text on this page.

উপহার।
কারে দিব উপহার কে আছে আমার ?
সপ্তকোটি বাঙ্গালী যে সবি আপনার।
কেবল পরের তরে,
সদা যে যতন করে,
“সুমতি” তাহারি করে দিনু উপহার।
গ্রন্থকার

No text on this page.

বিজ্ঞাপন।
“সুমতি” বালক বালিকাগণের সুনীতি শিক্ষাদান উদ্দেশ্যে
প্রকাশিত হইল। পুস্তকপাঠে তাহাদের কোমলহৃদয়ে বিন্দু
মাত্র সুনীতি সঞ্চারিত হইলেই শ্রম সফল জ্ঞান করিব।
সুমতি প্রচারে ‘ভারতকোকিল’, ‘কবিতামুকুল’ প্রভৃতি
প্রণেতা, ‘বঙ্গজীবন সম্পাদক প্রিয় সুহৃদ শ্ৰীযুক্ত বাবু
তারিণীচরণ সেন মহাশয় যথেষ্ট যত্ন ও শ্রম স্বীকার করিয়া
ছেন, তাহার নিকট চির কৃতজ্ঞ রহিলাম ।
কিশোরগঞ্জ।
২৫ শে মার্চ,
শ্ৰীভৈরবচন্দ্র চৌধুরী
১৮৯*; ।

No text on this page.

সূচীপত্র । বিষয় পৃষ্ঠা ••• প্রভাত কি ফল • • । . . ••• . দোষী ও গুণী ••• •• ০ ০ ০ আকাক্ষা '। • • • ১০ শিবজীর উৎসাহ বাক্য মানব জীবন সিরাজ উদ্দৌলা ••• ১২ ৫০ সমীরণ ¢ ?? সহে না সে দিন ন + ক্ষুদ্র । । । ২৯ ৮ । # কে না চায়। অবিশ্বাস বিদ্যা ।। ৮ ক্রোধ ••• • ?? ৩১ ০৫। ৩৭ | মহাজন it th ৭৫।

yo পৃষ্ঠা। বিষয় প্রিয় মানব-মানচিত্র ৫ •• ৩৯ অনুরাগ ৪ ৪ মঙ্গল ৪ ৫ ৩০ এ এ এ ৫। * ৪৬ মন পাপের প্রলােভন বিচার ০ ০ ৪৭ : ৪৮ ৩০ । পাপের ফল, বালীর উক্তি হাসি ৫৮ . ধিক্‌ বালক চপলা ও বিমলা ••• ০ • ০ ০ ৪০ ০৮ সুখী ধনে নয় উপহাস নীতি-কথা }} ৭১.

সুমতি।
প্রভাত।
ঊযার মাধুরী বক্ষে মানস-মােহন,
ফুটিছে প্রভাত ওই নয়ন-রঞ্জন।
ফুটিছে মুকুল-দল,
সুধাময় পরিমল,
ভাসিছে জগৎবক্ষে সৌন্দৰ্য্য তরল,
মরি কিবা চারুশােভা ধরেছে ভূতল !
তরঙ্গিণী তর তর বহিছে মৃদুল,
রবি-কর-জাল বক্ষে লইয়া অতুল ।
দুলে দুলে বায়ু-রাশি,
হাস্যময় পুষ্পে পশি,
হাসাইয়া-ভাসাইয়া কুসুম-কাননে,
কোথায় চলেছে ছুটে আপনার মনে।

সুমতি ফুলে, ফুলে বসি সুখে ভ্রমর গুঞ্জরে, শিশির-মুকুতা-সিক্ত-মুখে মধু ঝরে। বিহঙ্গ ললিত-তানে, উচ্ছসিত প্রেম-গানে, ডাকিছে মধুর মরি বসি তরু পরে, ঢালিছে সুধার ধারা শ্রবণ-বিবরে । ৪ নাহি পাপ-তাপ-শােক, আনন্দ-নিবর- চিত্ত-গিরি ভেদ করি ঝরে ঝর ঝর বায়ু-ভরে তরু-লতা, কানে কানে কহে কথা, কি মধুর সেই ভাষা অনন্ত-সুন্দর, কত কমনীয় সেই দৃশ্য মনােহর। বৈদিক-ব্রাহ্মণ-কুল উদ্যানে, কাননে, তুলি ফুল রাশি রাশি অতীব-যতনে, পৃজিছে দেদ্ব-কুলে, ভকতির অশ্রু-জলে, পাতি দিব্য-সিংহাসন পবিত্রতাময়, সুমধুর-বেদ-গানে হইয়া তন্ময়।

কি ফল ?
অমূল্য-দুল্লভ ভবে এই শুভক্ষণ,
ত্যজি শিশু স্বপ্নময়-অলস-শয়ন,
স্মর তারে অনিবার,
এ বিশ্ব রচিত যার,
যাঁহার সৃজিত নর-পশু-পক্ষিগণ,
কর তার প্রেম-পূর্ণ-মূরতি পূজন।
কি ফল ?
কি ফল বিদ্যায়, যদি না থাকে বিনয় ?
কি ফল সে বলে, যার রিপু বশে নয় ?
কি ফল সে ধনে, যদি ভিখারী না পায় ?
কি ফল সে পণে, যদি ভাঙ্গে পায় পায় ?
কি ফল সাহসে, যার নাহি ধৰ্ম্মভয় ?
কি ফল বিশ্বাসে, যদি সতত সংশয় ?
কি ফল ভজনে, যার নাহি ভক্তিলেশ ?
কি ফল সে কাজে যদি নাহি হয় শেষ ?
কি ফল অশনে যদি ক্ষুধা নাহি যায় ?
কি ফল বসনে যদি শীতে কাঁপে কায় ?

সুমতি।
কি ফল সে বিদ্বানের মিথ্যা যদি কয় ?
কি ফল ধাৰ্ম্মিকে যদি অহঙ্কারী হয় ?
কি ফল সে বেদ-পাঠে, পাপে মতি যার ?
কি ফল সে দানে যদি যশােলিপ সার ?
কি ফল সে মিত্রে যদি অকপট নয় ?
কি ফল সে পুত্রে যদি মূর্খ, দুরাশয় ?
কি ফল শিক্ষকে যদি দুৰ্ম্মতি, নির্দয় ?
কি ফল সে ছাত্রে যদি দুর্বিনীত হয় ?
কি ফল সে ফুলে যদি সুবাস না রয় ?
কি ফল সে ফলে যদি কটু, তিক্ত হয় ?
কি ফুল নিদ্রায় যদি দুঃস্বপ্ন উদয় ?
কি ফল শয়নে যদি নিদ্রা নাহি হয় ?
কি ফল ভবনে যদি সদা সর্পভয় ?
কি ফল স্বজনে যদি করে অপচয় ?
কি ফল জীবনে যেই না ভজে ঈশ্বরে ?
পিতা, মাতা, গুরু-জনে সেবা নাহি করে।

গুণ।
গুণ।
}
কি করিবে ধনে জনে, আসনে, ভূমণে,
গুণ না থাকিলে বল কেবা তারে গণে?
নিগুণ-বয়স যদি বসে তুঙ্গাসনে,
কে তারে সম্মান করে আদরে, যতনে ?
গরুড় ভূতলে যদি, তবু তার মান,
বাসুকি স্মরিয়া তারে হয় কম্পমান।
আকরে মাণিক জ্বলে, রতন সাগরে,
সুদূরে--আঁধারে যদি কেন সমাদরে ?
নিগুণ-পলাশফুল কেহ নাহি চায়,
তুলসী পত্রের স্থান দেবের মাথায়।
গুণের আদর যদি না হবে ধরায়,
কুরূপ-কোকিল কেন এত মান পায় ?
রূপবান-মূখ কভু পায় কি সম্মান ?
বিদ্বানের সমাদর সর্বত্র সমান।

সুমতি।
দোষী ও গুণী।
দোষী যেই পর-দোষ করে উদঘাটন,
নিজ-দোষ প্রতি তার নাহি বিলােকন
যা করে সে তাই তার সবি গুণময়,
অপরের গুণ হেরি কভু তুষ্ট নয়।
মন্দ প্রতি দৃষ্টি, ভাল চাহেনা কখন,
দুগ্ধ ফেলি রক্ত খায় জলৌকা যেমন।
গুণী সেই পর-দোষ না করে দর্শন,
ঢকিতে পরের দোষ ব্যস্ত অনুক্ষণ।
গুণীর সকাশে মান পায় গুণী জন,
চুম্বকে চুম্বক যথা করে আকর্ষণ।
দাষ ত্যজি গুগুণ-ভাগ করে সে গ্রহণ,
নীর ফেলি ক্ষীরে মত্ত মরাল যেমন ।
আকাঙ্ক্ষা।
১
বাজায়-প্রজায় নর, ভ্রাতায়-ভ্ৰাতায়,
বন্ধুতে বন্ধুতে কিম্বা প্রতিবাসী সনে,
বিবাদ করােনা কে স্বার্থের আশায়,
যদিও প্রচুর-ক্ষতি ঘটে বা জীবনে।

আকাক্ষা
৭
সত্য-কথা বল সবে সুমিষ্ট-ভাষায়,
ভ্রমেও এনােনা মুখে মিথ্যা-কুবচন,
সত্যের আদর ভবে যথায় তথায়,
সত্যবাদী এ জগতে পায় উচ্চাসন।
পর-নিন্দা মহাপাপ যেমন ধরায়,
অাপনার যশােগান তেমনি অন্যায় ।
তাই সবে আন বশে আন রসনায়,
পর-নিন্দা, নিজ-যশ নাহি যেন গায়।
৪
ধন-জন-যৌবনের বৃথা আস্ফালন,
করিও না ওহে নর, নশ্বর-ধরায়।
এই আছে-এই নাই মানব-জীবন,
বিদ্যুতের বিভা যথা মুহূর্তে মিশায়।
কাহারে। নয়নে অশ্র করিলে লােকন,
প্রাণপণে মুছিতে তা’ করিবে যতন ;
পর-উপকার-ব্ৰত অমূল্য-রতন,
কণ্ঠে, শিরে সমাদরে কর হে ধারণ।

৮
সুমতি।
নিরাশ্রয়-পান্থ-জন আসিলে দুয়ারে,
ক্ষুধা-ক্লিষ্ট, তাপ-দগ্ধ হইয়া কখন,
পরম আদরে তারে প্রীতি-সহকারে,
আশ্রয় প্রদানে ক্লেশ করিবে মােচন।
৭
শয়নে, স্বপনে মনে রেখ দয়াময়,
যাঁর কৃপা-বলে তব মানব-জীবন,
ভুল না সে সদাশিবে যিনি প্রার্ণময়,
যাহার সৃজিত এই বিশ্ব বিমােহন।
মানবের এ আকাঙ্ক্ষা হবে কি পূরণ ?
অনিত্য-ভবের এই অনিত্য-বিভব,
তৃণবৎ ঠেলিবে কি দুপায়ে কখন ?
নিত্য-ধনে মত্ত-মন হবে কি মানব ?

বল।
===== =====
বল ।
ওহে জগদীশ ।
কি দিয়া পূজিব,
কি দিয়া ভূষি,
ও পদ-পঙ্কজ তব,
তাপম-সন্তানে,
কহ কৃপা-দানে,
জ্ঞানাতীত-ভবধব !
পাপের অনলে,
সদ। জ্বলে জ্বলে,
হইয়াছে দেহ ছাই,
বল কিসে হায়,
জুড়াইব কায়,
কতন যাতনা পাই।
ভব-কারাগারে,
মােহের আঁধারে,
কত কাল বন্দীপ্রায়,
র’ব বিশ্ব-পতি,
অগতির গতি,
বল বল সদুপায় !

সুমতি।
শিবজীর উৎসাহ বাক্য।
কেন মােহ ?—কেন স্বপ্ন ?-ভাঙ্গ ঘুম-ঘাের,
কি নিদ্রায় অভিভূত ওহে সৈন্যগণ !
দেখ চেয়ে আরঙ্গজেব দুরাত্মা, পামর,
মত্ত হস্তী সম দলে নগর, কানন।
নির্জীব, নিস্তেজ প্রায় কত কাল আর,
অলস-শয়নে পড়ি রবে অচেতন,
উঠ উঠ এবে, ছাড়ি’ গম্ভীর-হুঙ্কার,
দলে দলে রণক্ষেত্রে চল সৈন্যগণ ।
সাজ-সাজ-অশ্বারােহি, পদাতিকগণ ।
অসীম-সাহসে সবে আক্ৰম মােগল,
লহ পৃষ্ঠে শরাসন, করেতে কৃপণ,
পশি রণে বীরদর্পে নাশ শত্রু-দল।
৪
যেইরূপে ভীম-সৈন্য ভীম-ভুজ-বলে,
নাশিল অগণ্য-সৈন্য স্বদেশ রক্ষণে ;
সেইরূপে-সেই দর্পে আজি রণস্থলে,
নাশ এই মহাপাপী দুরাত্মা-দুৰ্জ্জনে।

শিবজীর উৎসাহ বাক্য।
১১
যেইরূপে আক্রমিল রজপুতগণ,
অসংখ্য আকবর-সৈন্য দৃঢ়-ভুজ-বলে ;
তেমতি এ পাপাত্মারে কর আক্রমণ,
সঞ্চালিয়া ভীম-অসি তােমরা সকলে ।
দূরে—দূরে রহ সবে পৰ্বত উপরে,
পাপাত্মরে পিষে ফেল পাষাণ-পেষণে ;
শাৰ্দল, মূষিক প্রায় তােমাদের করে,
হারাবে জীবন, এই পার্থিব-ভুবনে।
৭
কর চেষ্টা--হবে জয়, নিশ্চয়—নিশ্চয়,
জীবাত্মা অনিত্য নয়, কর দৃঢ়-পণ,
হও ব্ৰতী কৰ্ম্ম-ক্ষেত্রে, হও কর্মময়,
কৰ্ম্মাধীন জীব, কৰ্ম্ম কর সম্পাদন।
৮
চেষ্টায় সফল হয়, সিদ্ধি সাধনায়,
অবশ্য ভারত মুক্ত, হবে সৈন্যগণ ।
জন্মভূমি জননীর শুভ যেই চায়,
ঈশ্বর তাহার বাঞ্ছা করেন পূরণ।

সুমতি।
মানব-জীবন
মানব-জীবন ওই দু'দিনে ফুরায় ?
দু’দিনের হাসি, খেলা,
দু’দিনের ভব-মেলা,
দু’দিনের আশা-সুখ দু’দিনে মিশায়,
জীবনে জীবন-বিম্ব উঠে, ডুবে যায় ।
সব যায়—লয় পায়,—মানব-জীবন,
কোথা থাকে পরিজন,
ধন, জন, সে যৌবন,
অনন্ত-শ্মশানে সব পুড়ে অনুক্ষণ,
শ্মশানে কি পরিণতি হের জনগণ !
একটী পবন-শ্বাসে লয় যে জীবন,
একটী মৃত্তিকা হতে,
যে জীবন এ মরতে,
দম্ভ, গর্বেব-উঠে—ফুটে দলিয়া ভুবন,
শ্মশানের শান্ত-কোণে হের সে জীবন

মানব-জীবন।
৪
সব শূন্য-সৰ ফাকাসকলি অসার,
শুধু কীর্তি, শুধু যশ,
অকীৰ্ত্তি বা অপযশ,
অনন্তকালের তরে ভরি এ সংসার,
দোষ-গুণ পরকাশে অনন্ত-অপার।
হাসি অশ্রু, সুখ দুখ, সংসারের বুকে,
সতত জাগিছে হায়,
ক্ষণে পুনঃ নিবে যায়,
মলিনতা খেলে তার বুকে চ’খে, মুখে,
কেন দম্ভ, অভিমান কেন কোন্ সুখে ?
কবি,-কাব্য, এ মরতে শুধুই অমর,
মরিলেও কাব্য, কবি,
বিকাশি যশের ছবি,
সংসারের বুকে বুকে চিত্রি মনােহর,
রেখে যায় চিরতরে দীপ্ত-অনশ্বর।
৭
ভারতের কবি-গুরু কবিত্ব-ভাস্কর,
গেছে বাল্মীকি, ব্যাস,
গেছে কবি কালিদাস,

১৪
সুমতি।
গেছে ভবভূতি, মাঘ, ভারবি, শঙ্কর,
জয়দেব, বিদ্যাপতি, মধু-মধুকর।
৮
এদিকে পাশ্চাত্য কবি বাৰ্জ্জিল, হােমার,
মহাকবি সেক্ষপীর,
বায়রণ কবি ধীর,
গেছে ভেসে কাল-স্রোতে মিল্টন, কুপার,
রাখিয়া অক্ষয়-কীর্তি সংসার-আগার।
বীর-কুলে কত বীর উঠিল—ভাসিল,
গেল ভীমার্জুন বীর,
গেল ভীষ্ম, যুধিষ্ঠির,
গেল কর্ণ, গেল দ্রোণ, কত যে ডুবিল,
অশ্বত্থামা, অভিমন্যু অনন্তে মিলি।
মিশিল—ডুবিল বটে কাল-সিন্ধু-নীরে,
কিন্তু তাহাদের হায়,
কীর্তি রাশি ধরা-গায়,
অঙ্কিত রয়েছে, রবে উজ্জ্বল-অক্ষরে,
অনন্ত-অনন্ত-কাল বিশ্ব-চরাচরে।

মানব-জীবন। গেছে বােনাপার্টি, গেছে অদম্য-সিজার, কত শত বীরগণ, কাপাইয়া দিগঙ্গণ, অতুল-বীরত্ব-গর্বে ত্রাসি ত্রিসংসার, ত্যজিয়াছে অকাতরে ভব-কারাগার। ১২ দাম্ভিক সে নরপতি গেছে দুর্যোধন, জগতে অকীর্তি তার, ঘােষিতেছে অনিবার, অন্তরিত সে কলঙ্ক হবে কি কখন ? ভারতে ‘ভারত’ তার দীপ্ত-নিদর্শন। গিয়াছে রাবণ কিন্তু জানকী-হরণ- এ পাপ-বারতা হায়, ভুলিবে কি এ ধরায়, কেহ কভু, যত কাল রবে ‘রামায়ণ, যত কাল চন্দ্র, সূৰ্য ঢালিবে কিরণ। ১৪ গিয়াছে সিরাজ, কিন্তু সে নাম শ্রবণে, ভয়ে সতী থর থর, আজো কাঁপে নিরন্তর,

সুমতি।
অন্ধকূপ-অত্যাচার বারতা স্মরণে,
এখনাে ইংরাজ-প্রাণ কম্পিত সঘনে।
ক্লাইব গিয়াছে, তার প্রতারণা, জাল,
খুলি বক্ষ ইতিহাস,
করিতেছে পরকাশ,
জগৎ-সকাশে নিত্য সে কলঙ্ক-জাল,
উজ্জ্বল-অক্ষরে দীপ্ত রবে চিরকাল।
নন্দকুমারের ফাঁসি হইলে স্মরণ,
হেষ্টিংসের ব্যবহার,
জাগে প্রাণে অনিবার,
আরাে বা কত কি জাগে পাপ-আচরণ,
মুক্ত-কণ্ঠে ইতিহাস করিছে জ্ঞাপন।
১৭
গিয়াছে বেন্টিঙ্ক, তার কীর্তি অগণন,
আছে দীপ্ত ধরাতলে,
সতীদাহ-শােকানলে,
দহিতে হয়না আর কারে কদাচন,
অকারণ প্রাণী নাশ হয়েছে বারণ।

মানব-জীবন।
১৮
এইরূপ কতরূপ সংসার-সাগরে,
কত উৰ্ম্মি উঠে, পড়ে,
কত উৰ্ম্মি থরে থরে,
ভেসে যায়—ডুবে যায় কেবা সংখ্যা করে ?
ভবে তার ভাল, মন্দ শুধু থাকে পড়ে।
সকলেরি দোষ, গুণ স্মরি অনিবার,
কাহারাে কাহারাে তরে,
নয়নে প্রেমাশ্রু ঝরে,
কারাে নামে চাহে মন করিতে ধিক্কার,
রাজা হােক্, ঋষি যােক তবু বার বার।
তাই বলি কর নর, সুপথে গমন,
সাধু-কাৰ্যে মতি যার,
সুনাম-সুকৃতি তার,
দু’ দিনের যদি এই মানব-জীবন,
দু’দিনের নহে কীর্তি চিরস্থায়ী ধন।

১৮
সুমতি।
সিরাজ উদ্দৌলা।
নীতি-বাক্য কভু
কি ছিলে নবাব, আগে বলনা সিরাজ।
ভাব দেখি একবার কি হয়েছ আজ ?
ভাবিতে না ভবে কিছু চিরস্থায়ী নয়,
দেখিতে না শশাঙ্কের উদয়, বিলয়।
কাঁদালে কাঁদিতে হয়, হাসালে হাসিতে,
হায় রে এ
কি ভাবিতে ?
করেছ যে ব্যবহার নর-নারী-সনে,
তারাও করিবে তাহা ভাবিতে না মনে।
ধন, জন,
যৌবনের বৃথা অভিমান,
মরণ সময়ে ওরা শমন সমান।
তুমি যথা পাপাচারী, তােমার মতন,
ক্লাইব, জাফর আছে জাননি তখন।
জানিতে না নরগণ প্রলােভনময়,
স্বার্থ-তরে মিত্র শত্রু, শত্রু মিত্র হয়।
তাকি তুমি সাধারণে শিখাবার তরে,
দেখা’লে পাপের ফল কিবা হয় পরে ?
জানি দেব-শশধর রাহু-মুখে পড়ে,
“পুণ্য-তােয়া” যােগে কত পাপী মুক্ত করে
অথবা দেখায় শশী অহঙ্কারী, জনে,
পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র রাহুর বদনে।

মত্ততা।
তুমিও শশীর মত মহত, প্রধান,
দেখালে কার্যের ফল দিয়ে রাজ্য, প্রাণ
মত্ততা।
ফিরে কি উন্মত্ত ষাঁড় তৃণের আঘাতে ?
কোকিলের কুহুস্বরে,
ঝটিকা কি যায় স’রে ?
নিবে কি দাবাগ্নি কভু হীন-অশ্রুপাতে ?
কোমল-কুসুমাঘাতে থামে কি বারণ?
কুকাজে প্রমত্ত যারা,
সাধু-উপদেশে তারা,
কি পবিত্র-পথে করে বিচরণ ?

সুমতি।
সমীরণ।
জীবের জীবন তুমি ওহে সমীরণ !
তােমা বিনে জীব-দল,
বাঁচে কি মুহূৰ্ত্ত, পল,
রহে কি এ ধরাতলে কভু সচেতন ?
তাই তুমি বিশ্ব-প্রাণ, জীবের জীবন।
২
কি যে তুমি—কিবা রূপ-মূরতি তােমার
কিবা বর্ণ, অবয়ব,
জানি না বুঝি না সব,
দেখিতে পাই না যবে তােমারে কখন,
পরশনে অনুভূত হও সর্বক্ষণ
নতুবা হে সমীরণ, অস্তিত্ব তােমার ।
মানিত কে এধরায়,
রূপ, রস, গন্ধ, কায়,
নাহি তব, নিরাকারে ধাও নিরন্তর,
ত্ব গ্ৰাহ তুমি কিন্তু চক্ষু-অগােচর

সমীরণ।
৪
চক্ষু-অগােচর বটে, প্রকৃতি তােমার,
বড়ই বিস্ময়কর,
দেখি কিন্তু নিরন্তর,
মতি-গতি, সদাগতি, বিভিন্ন-প্রকার।
ক্ষণে ক্ষণে ভিন্নভাব ধর কত বার ।
কভু শান্ত-কভু ধীর—কখন আবার,
অশান্ত-প্রকৃতি-বলে,
জলধির নীল-জলে,
মিশিয়া সাধিছ মহা প্রলয় সঞ্চার,
বিনাশিয়া বিশ্ব-সৃষ্টি, একি ব্যবহার।
অনল-বান্ধব তুমি ওহে সমীরণ !
অনলের গলা ধরি,
কত রঙ্গে প্রাণ ভরি,
কর ভস্মময় বিশ্ব তুমি হে কখন,
লঙ্কা-দগ্ধা মহাবীর-হনুর মতন।
৭
কভু কল্লোলিনী-বক্ষে পশি ফুল্ল-মনে,
নাচাও তাহার প্রাণ,
মিশায়ে আপন তান,

সুমতি।
তালে তালে গাও গান তরঙ্গিণী-সনে,
ভাসায়ে জগৎ-প্রাণ সুধা-কল-স্বনে।
কুসুমের কানে কানে কত কথা কও,
কত কি অস্ফুট-ভাষে,
শুনি তারা কত হাসে,
নিদ্রিত-কুসুম-দলে প্রভাতে জাগাও,
বহিয়া মৃদুল অঙ্গে কভুবা হাসাও।
তুমিই তাদের মান সতত বাড়াও,
ফুল-কুল-হৃদি-তলে,
পশি ধীরে কুতূহলে,
মধুর-সৌরভ রাশি বহিয়া বেড়াও,
জগৎ ভরিয়া তার গৌরব জানাও।
কে জানিত নতু তার অন্তর সুন্দর ?
মরমেও মধু ঝরে,
প্রাণে প্রাণে সুধা ক্ষরে,
সৌন্দৰ্য হেরিয়া কভু
মজিত কি নর ?
রুদ্ধ-নীর-নিঝরিণী কে করে আদর ?

সমীরণ।
২৩
১১
কখনাে নাচাও ধীরে তরু-পত্ৰ-দলে,
নাচাও সরসী-জল,
নাচাও কমল-দল,
আবার কখনাে রােষি, টানিয়া সবলে।
দৃঢ়-করে তরু-শিরে লােটাও ভূতলে।
অঙ্গারক হয়ে কর জীবন অঙ্গার,
কভুবতােমার দাপে,
প্রাণ যেন সদা কাঁপে,
কভু হও কেন হেন বিষের আধার,
পলে পলে এ প্রকৃতি কেন হে তােমার ?
সিরক্কোর-বেশে কভু ভীম-মরুস্থলে,
পথ-ভ্রান্ত-পান্থ-জনে,
বধিছ পাষাণ-মনে-
পশি হৃদে নাসা-পথে মুহূৰ্ত্ত-মাঝারে
কুসুমে পশিয়া কীট দংশে যে প্রকারে।
;
১৪
আবার মুহূর্তে তব প্রশান্ত-প্রকৃতি
বল বল বল কেন,
তােমার এ ভাব হেন ?

২৪
সুমতি।
সদাগতি, চিরদিন নহে সমগতি ?
কভু বলশালী, কভু বিহীন-শকতি।
অনিল তােমারাে যদি প্রলয়, বিলয়,
মােরা তবে ক্ষুদ্র প্রাণী,
কেন এত অভিমানী,
সত্যই কি ভবে তবে স্থির কিছু নয় ?
প্রতি দিন নয় পূর্ণ-শশীর উদয় ?
সুধা, বিষে মাখা নর তােমারি মতন।
কভু যতন করে,
কভু পরাণ হরে,
অসুর রাক্ষস কভু দেবতা কখন ;
মলয়, প্রলয় তুমি দুই (ই) সমীরণ!
মিছা নয় দধীচির কোমল শরীর,
কঠিন অশনি হয়,
কে জানে কিসে কি রয়,
কোমল, কঠিন কভু অস্থির, সুস্থির !
সবল, দুর্বল কভু ভীরু, মহাবীর।

সহেনা।
১৮
বুঝিয়াছি এ স্বভাব কেন হে পবন !
নরের শিক্ষার তরে,
বিভিন্ন-প্রকৃতি ধরে,
দেখাইছ গর্বিতের গর্বের পতন,
বিলয়, প্রলয়-কারী চণ্ড-সমীরণ !
সহেনা।
এক দিন শিরে মম বজ্রাঘাত ধরেছি,
বজ্রাঘাত ধরেছি
অহির দংশনে আমি প্রাণে বেঁচে রয়েছি,
প্রাণে বেঁচে রয়েছি।
দারুণ-রােগের জ্বালা কত বার ভােগেছি,
কত বার ভােগেছি ;
পাবকে পড়িয়ে পুড়ে প্রাণে প্রাণে বেঁচেছি,
প্রাণে প্রাণে বেঁচেছি
জলে ডুবে অচেতনে পুন প্রাণ পেয়েছি,
পুন প্রাণ পেয়েছি ;
অনাহার, অনিদ্রায় কত বার রয়েছি,
কত বার রয়েছি।

সুমতি।
বৈরিসহ বিবাদেতে কত দুঃখ পেয়েছি,
কত দুঃখ পেয়েছি;
কত হতাশার শােক পােড়া-প্রাণে সয়েছি,
পােড়া-প্রাণে সয়েছি।
কত ঝড়, ঝঞাবাত, শীলা শিরে ধরেছি,
শীলা শিরে ধরেছি ;
উপকারে অপকার হেসে হেসে লয়েছি,
হেসে হেসে লয়েছি।
সহিয়াছি পােড়া-প্রাণে যত আছে যাতনা,
যত আছে যাতনা ;
নিন্দুকের মিথ্যা-নিন্দা প্রাণে শুধু সহেনা,
প্রাণে শুধু সহেনা।
সেদিন।
সেদিন দেখেছি যথা রাজ-নিকেতন,
আজি দেখি সাগরের তরঙ্গ ভীষণ!
সেদিন দেখেছি হাসি বদনে যাহার,
আজি দেখি বিষাদের কালিমা সঞ্চার।
সেদিন যে নেত্রে ছিল প্রেমা তরল,
আজি দেখি সে নয়নে দুঃখ-অশ্রুজল।

সেদিন।
२१
সেদিন দেখেছি যার সাম্রাজ্য বিশাল,
আজি দেখি সে ভূপতি পথের কাঙ্গাল।
সেদিন যে দেহে ছিল রাজ-আভরণ,
আজি সেই নগ্ন-দেহে করে বিচরণ।
সেদিন দেখেছি যারে যােগী যােগে রত,
প্রকৃত-সংসারীরূপে আজি পরিণত।
সেদিন দেখেছি যারে মহা বলীয়া,
আজি সেই মহারােগে আকুল-পরাণ।
সেদিন দেখেছি শত দাস-দাসী যার,
আজি সে দাসত্ব-তরে ফেরে দ্বারে দ্বার।
সেদিন যে শিশু ছিল অস্ফুটবদন,
আজি সে পলিত-কেশ স্খলিত-দশন।
সেদিন যাহারা ছিল এক প্রাণ-মন,
আজি দেখি পরস্পর মৃত্যুর কারণ।
সেদিন দেখেছি যথা নৃত্য, গীত, হাসি,
আজি তা” উজাড়-ভিটা উড়ে বালি-রাশি।
সেদিন যে দেহ ছিল চন্দনচর্চিত,
আজি পূতিগন্ধময় সবার ঘৃণিত।
সেদিন দেখেছি যার সাধু-ব্যবহার,
আজি দেখি সেই ঘাের-দস্ত দুরাচার।
সেদিন দেখেছি যারে ধার্মিক-প্রধান,
আজি দেখি সেই জন নারকি-সমান।

২৮
সুমতি।
সলিলে অনল হেরি, অমৃতে গরল,
বুঝিলাম সংসারের সকলি চঞ্চল।
ক্ষুদ্র।
ক্ষুদ্রকে যে ক্ষুদ্র ভাবে সেই ক্ষুদ্র ভবে,
ক্ষুদ্রের সমষ্টি বড় উন্নত বিভবে।
ক্ষুদ্র-বারি-বিন্দু লয়ে বারিধি বিশাল,
সময়ের অণু-যােগে কত বর্ষ কাল ।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু-রেণু সৃজিয়াছে ভবে,
লােক-পূর্ণ, অতুলিত, সুসজ্জিত সবে।
ক্ষুদ্র-নক্ষত্রের পথ ছায়াপথ নভে,
ক্ষুদ্র-ফল শােভিতেছে অনন্ত-সৌরভে !
ক্ষুদ্র-অগ্নি-কণা এক মুহূর্ত-মাঝারে,
নাশে বিশ্ব প্রলয়ের ভীষণ-আকারে।
ক্ষুদ্র-বাষ্পকুল বক্ষে জীমূত গম্ভীরে,
ঝরে মরি জলদল ঝর ঝর ঝরে।
তাই চাই ক্ষুদ্র হতে এ বিপুল-ভবে,
বড় যদি হতে চাও, ক্ষুদ্র হও তবে।

অবিশ্বাস।
কে না চায় ?
নদী কিনা চায় কভু জলধিতে মিশিতে ?
কোকিল কি নাহি চায় সুবসন্তে গাইতে ?
ভক্ত কিনা চায় কভু দেব-পদ পূজিতে ?
নিশি কিনা চায় পূর্ণ-শশধর হেরিতে ?
পিপাসু না চায় কভু জল-পান করিতে ?
ক্ষুধাতুর চায়না কি সুধা-ভােজ্য খাইতে ?
শিশু কিনা চায় কভু মাতৃ-কোলে যাইতে ?
কে না চায় সুখময়-স্বৰ্গ ধামে পশিতে ?
অবিশ্বাস
সুদূর-প্রান্তর-পাশে যেই স্রোতস্বর্তী,
তর তর তর বেগে আপনার মনে,
যাইছে সাগর-পানে মৃদু-মন্দ-গতি,
ক্ষুদ্র-বীচি-মালা বক্ষে লইয়া যতনে।

৩০
সুমতি।
২
ভেবেছিল কে তাহারে, সময়ে আবার,
ভীষণ-আবৰ্ত্তময়ী ভীম-মূৰ্ত্তি ধরি,
গ্রাসিবে নগর, বন, সুরম্য-আগার,
বিস্তারি উত্তালময় অগণ্য-লহরী।
ওই যে বহিছে মৃদু মলয়-পবন,
কাপাইয়া ধরি ধরি তরু-পত্ৰ-দল,
সময়ে প্রচণ্ড-মূৰ্তি করিয়া ধারণ,
নাশে সে ঝটিকারূপে বিশ্ব-ভূমণ্ডল।
ক্ষীণ-অগ্নি-কণা—তাও বাতাসের বলে,
সহস্র-নগর, গ্রাম, করে ভস্মময় ;
এতই অসীম-শক্তি তার ধরাতলে !
বিন্দু-বারি-পাতে যার অস্তিত্ব বিলয়।
সামান্য-বিদ্যুৎ শুধু মুহূর্তৃেক তরে-
চক্ষে ধাঁধা দিয়া মেঘে লুকায় বদন,
আবার সে ভীমতম-বজরূপ ধরে,
ভীম-নাদে নাশে কত জীবের জীবন।

অবিশ্বাস। অচল-পাষাণণা কভু উগারি অনল, উগারি কর্দম-রাশি গম্ভীর-হুঙ্কারে, করে ভস্ম, কাদাময় কত রাজ্যস্থল, কত দেশ, জনপদ দেয় ছারখারে। প্রকৃতির এইরূপ বিভিন্ন-ব্যাভার, পদে পদে অবিশ্বাস, কখন কি হয় ? কখন কি ভাব ধরি’ অনন্ত-অপার- কে জানে কেমনে করে সৃজন বিলয় ? ৮ কি বিশ্বাস নরে তবে সকল সময় ? ক্ষণে ক্ষণে, পলে পলে প্রকৃতি যাহার, সতত-চঞ্চল যেই অস্থির-হৃদয় ? পদ্ম-পত্রে নীর যথা টলে অনিবার। = কি বিশ্বাস মানবেরে ? কালি যারে হায়, ধার্মিকের অগ্রগণ্য শান্ত-শুদ্ধ-চিত- দেখেছি, আজি সে কত হীন-ব্যবসায় সাধিছে সমাজ-বক্ষে চিন্তার অতীত।

সুমতি।
সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, সাধু, সদাশয়,
বুলিয়া বিশ্বাস ছিল যারে মনে মনে,
ওই দেখ রাজ-দ্বারে সে নীচ-হৃদয়,
অর্থ খেয়ে মিথ্যা-সাক্ষ্য দিতেছে কেমনে
দানে দাতাকর্ণ সম ছিল যারে জ্ঞান,
দেখ দেখ আজি সেই নিষ্ঠর-পামর,
ধন-লােভে কত শত অনাথের প্রাণ,
বিনাশিছে অকাতরে চক্ষের উপর।
বিধি-সৃষ্ট-বিশ্ব যবে অবিশ্বাসময়,
রাজধানী আজি, কালি সাগর খেলায়,
বিশ্বাস করনা তাই মানব-হৃদয়,
আজি যেই মিত্র, কালি শত্ৰু পুনরায় ।

বিদ্যা। ৩৩ বিদ্যা। বড় সুধাময় বিদ্যা, নামটী তােমার । শুধু কি নামেতে তুমি, সবার আরাধ্য-ভূমি, গুণে অগ্রগণ্য তুমি প্রধান সবার, ধন, জন, বিত্তরাশি সকলি অসার। তােমার পরশে তান্ধ, জ্ঞানের নয়নে, দেখে বিশ্ব-চরাচর, যথা, যা বিস্ময়কর, বধির শ্রবণ করে, মূকে কথা কয়, পঙ্গু জানে ত্রিলােকের কোথা কিবা হয় । শুনেছি পরশমণি, পরশি অয়স- সুবৰ্ণ-সুবর্ণ হয়, অয়সত্ব নাহি রয়, তেমতি পরশে তব মূখ, জ্ঞান-হীন, পণ্ডিত-পদবী পায় কত দুঃখী, দীন।

• ৩৪
সুমতি।
৪
তােমার পরশে নর, চপলা চঞ্চল,
অনায়াসে আনে ধরে,
বদ্ধ রাখে অকাতরে,
খাটায় ভৃত্যের মত যা ইচ্ছা যখন,
প্রভুর আদেশ পালে প্রভু-পরায়ণ।
অপার-করুণা তব, তােমার কৃপায়,
রজনীর তম নাশি,
কোটি-শশী পরকাশি,
বিমল-আলােক-স্রোতে ভাসায় নগর,
দিবায় আলােকে ধরা যথা দিবাকর।
যে ভাবে যে ডাকে তােমা যাও তার কাছে,
নাহি মান, অপমান,
নাহি মনে অভিমান,
ধনী হােক, দীন হােক সবারি সদনে,
গতি-বিধি নিরন্তর অম্লানবদনে।
৭
দীন প্রতি দয়া তব দেখি সমধিক,
লক্ষ-পতি-হৰ্ম্ম-তলে,
যাও কই কুতূহলে ?

বিদ্যা।
রাজা ছেড়ে, দীনে তুমি কর আলিঙ্গন,
মুক্তির, শক্তির হেতু তুমি একজন।
সাক্ষী রত্নাকর, সাক্ষী ব্যাস, কালিদাস,
কীৰ্ত্তিবাস-কৃত্তিবাস,
সাক্ষী তার কাশীদাস,
ভারতে ভারতচন্দ্র প্রকৃষ্ট-প্রমাণ,
বজ্জিল, হােমার, পােপ কত মতিমা।
কল্পনায় কল্পতরু শুনেছি যে নাম,
সে নাম তােমার জানি,
জনশ্রুতি সত্য-বাণী,
বিদ্যা নামে কল্পতরু আছে ভব-ধাম,
যাচক তােমার কাছে সদা সিদ্ধ-কাম।
চাও দেবি, দয়াতি, অধমের পানে ।
তব পদ-কোকনদে,
ডুবিয়া ভকতি-হ্রদে,
থাকে যেন মতিগতি সতত তাহার,
এই বর দাও দেবি, সন্তানে তােমার।

সুমতি।
- ও
ক্রোধ।
১
করিয়াছ ক্রোধ, তুমি কত অত্যাচার !
করেছ কানন কত রাজ-নিকেতন,
কত পিতা, মাতা, পুত্র করেছ সংহার,
করিয়াছ কত জনে চির-নির্বাসন।
ধার্মিকের পাপে পূর্ণ করেছ অন্তর,
গড়িয়াছ নরকের সুগম-সরণি,
অমরের নাম তুমি করেছ পামর,
যশস্বীর অপশে পূরেছ ধরণী।
হুতাশন, তব তরে যদি সর্বাশন,
চক্রধর চক্রধারী, হলধর হল,
ভুবন-বিনাশকারী মলয়-পবন,
বসুমতী ধরে যদি ভূকম্পের ছল,
৪
অধীর যদ্যপি শিব, যাদব, বাসব,
কেমনে মানব-প্রাণে রবে তবে জ্ঞান ?
দেবের অদম্য তুমি উৎসবে আহব,
ধন্য সে মানৰে, যাতে নাহি তব স্থান।

মহাজন।
৩৭
মহাজন।
বিতরে কি রবি কভু আলােক, আঁধার ?
সত্য বিনা মিথ্যা কথা নাহি মুখে যার,
কেবল বসন্তে করে কোকিল কূজন,
সভাতেই বলে যেই উচিত বচন,
হাসে চাদ রাহু-মুখে পতিত যখন,
বিপদে বিষাদ-হীন সতত যে জন,
অবনত ফলব পাদপ-নিচয়,
আপনি বিনীত যেই যবে অভ্যুদয়,
প্রবল-তরঙ্গ স্রোত ফিরাইতে নারে,
পরায়ুখ নহে যেই শত্রুর প্রহারে,
অনিল পুড়িয়া রাখে, অনল জীবন,
প্রাণ দেয় যেই জন বন্ধুর কারণ,
চুম্বকের আকর্ষণ যেরূপ লােহায়,
সেরূপ নিয়ত যার আসক্তি বিদ্যায়,
মিষ্টভাষী, মিতাচারী, ধৰ্ম্মপরায়ণ,
মনুজ-সমাজে শুধু সেই মহাজন।
৪

৩৮
সুমতি।
প্রিয়।
নীরব-নির্জনে গেলে মন যারে চায়,
ইহকালে, পরকালে সঙ্গে যেবা যায়।
বিপদে, সম্পদে মম সদা যে সহায়,
করুণা বিতরে যেই বিনা যাচনায়।
কেবল আমার তরে করিয়া যতন,
রচেছে যে রবি, শশী, বায়ু, হুতাশন।
খাদ্য-দ্রব্য, ফল, জল, নন্দন-চন্দন,
যাহা কিছু প্রয়োজন করেছে সৃজন।
রণে, বনে, রক্ষা করে সৈনিকের প্রায়,
পলেক অভাবে যার, এ জীবন যায়।
গালি দি’ বা নিন্দা করি তবু তুষ্ট রয়,
সর্ব গুণাধার যেই দীনে দয়াময়।
রক্ত, মাংসে, রােমে, হাড়ে মাখা যে আমার,
আমার কুশল তরে সদা মন যার।
ঢৰ্ম্ম-চক্ষু নাহি হেরে যাহারে কখন,
মনে মনে ধ্যানে যার পাই দরশন।
ত্রিলােকের ত্রাণকর্ত্তা, শমন-দমন,
সেই সে আমার প্রিয়, পতিত-পাবন ।

মানব-মানচিত্র।
মানব-মানচিত্র।
মানবের মানচিত্র কে দেখিবি আয় রে !
বিচিত্র-চিত্রিত-চিত্ৰ কিবা শােভা পায় রে !
মরি কি অপূর্ব ছবি,
কোন্ চিত্রকর, কবি,
চিত্রিল বিবিধভাবে জ্ঞান-তুলিকায় রে !
উপবন,
গিরি, নদী অগণন,
কত মাঠ, ঘাট, বাট, গণনা কি যায় রে ।
সাগর, নগর, গড়, গ্রাম, গৃহ তায় রে !
কত বন,
নানা রঙ্গে নানা স্থানে শােভিত সুন্দর রে !
কোথা ভীম-মূৰ্ত্তি হেরি শিহরে অন্তর রে !
কোথা শােক, কোথা সুখ,
কোথা অশ্রু, কোথা দুখ,
কোথা হাসি, কোথা কান্না তাহে নিরন্তর রে !
কোথা লজ্জা, কোথা ভয়,
কোথা হিংসা অভিনয়,
কোথা পাপ, কোথা পুণ্য, কোথা সমাদর রে !
কোথা ধৰ্ম্ম, কোথা জয়, অধৰ্ম্ম বিস্তর রে !

৪।
সুমতি।
কোথা স্নেহ,ভালবাসা, কোথা বা সম্মান রে !
কোথা প্রীতি, কোথা দয়া, কোথা অভিমান রে !
কোথা শান্তি নিরন্তর,
কোথা ক্রোধ ভয়ঙ্কর,
কোথা কাম, কোথা লােভ, কোথা ভক্তি, দান রে
কোথা মুক্তি, কোথা শুচি,
কোথা শ্রদ্ধা, অভিরুচি,
কোথায় বাসনা, আশা, কোথা,অপমান রে !
কোথা ঘৃণা, কদাচার, পদে পদে মান রে !
৪
মানবের মানচিত্র বিচিত্রময় রে ।
কত দৃশ্য আছে তার কে করে নির্ণয় রে !
কোথা দস্যু দুরাচার,
রতন-ভাণ্ডার কার,
লুঠিছে সর্বস্ব, তায় করি নিরাশ্রয় রে !
আবার কেহ বা কার,
অর্থ লােভে অনিবার,
গলায় দিতেছে ছুরি নির্ভয়-হৃদয় রে !
পদে দলি অকাতরে দয়া, ধৰ্ম্ম, ভয় রে !
অবিরল-রক্ত স্রোতে কোন স্থান হায় রে ।
ভাসমান খরধারে রক্তগঙ্গা প্রায় রে ।

মানব-মানচিত্র।
৪১
কোথা মৃত সৈন্যগণ,
পড়ে আছে অগণন,
অর্ধমৃত-সৈন্য কোথা পড়িয়া ধরায় রে !
কাটা-মুণ্ড স্তুপাকারে,
পড়ে আছে চারি ধারে,
আহত সৈনিক শত ভীম-যন্ত্রনায় রে !
ভীষণ-চীৎকারে হায়, মেদিনী কাঁপায় রে !
কোথা আত্মহত্যা ঝােলে বিটপি-শাখায় রে !
কোথা কেহ প্রভুবক্ষে ছুরিকা বসায় রে !
সূচ্যগ্র মেদিনী তরে,
কেহ কার প্রাণ হরে,
কেহ কার বধে প্রাণ সামান্য কথায় রে !
কোথা কত ভাই ভাই,
অবিরত ঠাই ঠাই,
কোথা কত পিতৃহন্তা, মাতৃঘাতী তায় রে ।
পাশব-ব্যাভারে প্রাণ নরকে ডুবায় রে !
৭
আবার কোথাও হের প্রীতির বন্ধনে রে !
প্রাণে প্রাণে মিশামিশি সুখের ভবনে রে !
নাহি তথা হিংসা, দ্বেষ,
অশান্তির নাহি লেশ,

সুমতি।
প্লাবিত সে স্থান যেন সুধা বরিষণে রে !
পতি-প্রাণে সতী-নারী,
ঢালে প্রীতি-সুধা-বারি,
পৃত করি অবিরত পবিত্র-জীবনে রে !
ক্ষুদ্র স্বর্গরাজ্য যেন পার্থিব-ভুবনে রে !
কোথায় শ্মশান-বহ্নি ধক ধক্ জ্বলে রে !
পাপিনী-ডাকিনী-দল নাচে দলে দলে রে !
পতি-শােকে কাঁদে সতী,
হইয়া অনন্যগতি,
বন্ধুর বিহনে কেহ ভাসে অশ্রু-জলে রে !
এ দিকে কেহ বা হাসে,
কত কিবা নব-আশে,
নব-দম্পতীর ওই সুচিত্র-যুগলে রে !
প্রীতি-স্রোত অবিরল মৃদু মন্দ চলে রে !
কোথা কত রাজা বসি রত্ন-সিংহাসনে রে ?
পুত্র-সম প্রজা-পুঞ্জে পালিছে যতনে রে !
কোথা কোন নরপতি,
অর্থ লােভী দুষ্টমতি,
প্রজা-রক্ত চুষি খায় নিরদয়, মনে রে ?

মানব-মানচিত্র।
৪৩
কেহ রাজা, প্রজা কেহ,
দীন-দুঃখী, ক্ষীণ-দেহ,
কেহ রাজ-ভােগে রুষ্ট, কারাে বা জীবনে রে ।
দিনান্তে শাকান্ন কভু জুটে না বদনে রে !
কোথাও বিজন-বনে যােগী রত ধ্যানে রে ?
ধ্যান-নিমীলিত-নেত্রে দেখে ভগবানে রে !
কোথা বা সুকবিগণ,
( প্রফুল্ল-পরাণ-মন, )
কল্পনার রথে চড়ি যাইছে বিমানে রে !
সুখী কত সুধীগণ,
শাস্ত্র পাঠে নিমগন,
ভাসে কত মধুরিমা কমল-বয়ানে রে !
কত চিত্র মনােহর শােভে কত স্থানে রে !
কার মন-উপবনে ভালবাসা-ফুল রে !
কার হৃদে কাম, ক্রোধ বন্য-পশু-কুল রে !
কার মনে হিংসা, দ্বেষ,
কেহ ভাবে পরমেশ,
পরের ব্যথায় কার পরাণ ব্যাকুল রে !
কেহ পর-প্রপীড়নে,
সদা সুখ পায় মনে,

৪৪
সুমতি।
সতের দুর্দশা হেরি আনন্দ অতুল রে !
কেহ বা শত্রুর দুঃখে কাঁদিয়া আকুল রে !
মানবের মানচিত্র বিচিত্র-দর্শন রে !
তােমার আমার মত নহে অন্য জন রে !
বিভিন্ন মানবগণ,
বিভিন্ন আকার, মন,
তুমি যাহা, আমি তাহা নহি কদাচন রে !
আমি যাহা ভালবাসি,
তাহাতে তােমার হাসি,
তব প্রিয় ধন মম ঘৃণার কারণ রে !
মানবের মানচিত্র বিচিত্র-দর্শন রে !
অনুরাগ।
রবির প্রখর-করে,
কমল কি ভয় করে ?
হিমাংশুর হিমে কভু কুমুদ কি ভরে রে !
সূৰ্য্যমুখী সারা দিন,
ঘুরে ঘুরে তনু ক্ষীণ
তপন-তাপের জ্বালা সহেনা কি অন্তরে ?
আছে কত নদী, নদ, সরসী, সাগর, হ্রদ,
তার জলে তৃপ্ত কই চাতকের প্রাণ রে !

মঙ্গল।
৪৫
তবু ভিজে বৃষ্টি জলে,
সতত সে কুতূহলে,
ধারা-জল (ই) সদা তারে করে সুধা-দান রে !
তানলে পুড়িতে হয়, জেনেও পতঙ্গচয়,
সে অনলে কোল কভু দেয় না কি সাদরে ?
সদা যিনি হৃদি-স্থলে, সে বিভুর পদতলে,
ঢালিতে পরাণ, মন, সদা কেন শিহরে ?
মঙ্গল।
মিথ্যা,
বঞ্চনায় শুধু
দাতার মঙ্গল যদি দুঃখি-জন পায়,
কৃপণের সুমঙ্গল না চাহিলে তায়।
পাপীর
মঙ্গল,
মঙ্গল গরল সহ মিশিলে গরল।
চোরের আঁধার-নিশি মঙ্গল ঘটায়,
সাধুর মঙ্গল যদি সৎসঙ্গ পায় ।
শত্রুতা মঙ্গল মিত্রে যদি অবিশ্বাস,
শত্রুর মঙ্গল যদি কাটে লজ্জা-পাশ
শােকাত্তের নিদ্রালাভ বড়ই মঙ্গল,
পান্থের মঙ্গল পথে পেলে তরুতল।
রাজার মঙ্গল যদি প্রজা তুষ্ট রয়,
প্রজার মঙ্গল রাজা হইলে সদয় ।

৪৬
সুমতি।
চাষীর মঙ্গল যদি বর্ষে ধারা-জল,
দয়াশীল হলে প্রভু, ভৃত্যের মঙ্গল।
যােগীর নির্জনে-বাস মঙ্গল কেবল,
মুখের জীবন চেয়ে মরণ মঙ্গল।
মন।
ওরে অকৃতজ্ঞ-মন, কেন ভুল তারে ?
দিয়াছেন যেই জন চেতনা তােমারে।
কেন মুখে নাই সেই মধুময়-নাম ?
যে নাম লইলে পূর্ণ হবে মনস্কাম।
কেন না ভাবিস্ মনে তারে সদাকাল ?
ক্ষণেক ভাবিলে যারে না পরশে কাল।
কেন না হেরি তারে জ্ঞানের নয়নে ?
দূরে যায় মৃত্যু-ভয় যার দরশনে।
কেন রে মনের কথা না বলি তারে ?
জানেন যে জন যবে যা ঘটে সংসারে।
কেন না করিস্ মন, তঁাহারে স্মরণ ?
না ভুলেন যিনি তােরে বিপদে কখন।
কেন না তাহার সনে করিস্ প্রণয়,
অন্তরে, বাহিরে যিনি, যিনি প্রাণময়।

পাপের প্রলােভন ।
৪৭
মন রে, কি ভয় যেতে তাহার সদন,
দয়ার আধার যিনি
মৃতের
জীবন ।
পাপের প্রলােভন।
বড়িশে গাঁথিয়া টোপ লাল টুক টুক,
মানব, যেমতি তুমি মৎস্য-জলচরে
ভুলাইছ, সেইরূপ করিছে কৌতুক
পাপদল, তব সহ সংসার-সাগরে।
পাপ-প্রলােভনে ভুলি হারায়েছ সব,
হারায়েছ উচ্চ-ভাব-আশা সমুদায়,
শান্তি, প্রেম, পবিত্রতা, রতন-বিভব,
দিয়াছ সকলি ঢালি পাপ-পদে হায় !
আরাে দিবে যাহা আছে, দিবে সমুদায়,
সাবধান হও তাই থাকিতে সময়,
অমূল্য:জীবন তব যায়-যায়-যায় ।
দিওনা হৃদয়ে কভু পাপেরে আশ্রয়।

৪৮
সুমতি।
বিচার।
বিচার, তােমার ওই নামটী শ্রবণে,
প্রাণে যেন কিবা এক, বলিব কেমনে ?
ভাবের তরঙ্গ ছুটে,
উঠে পড়ে, পুন উঠে;
শুকায় অন্তর-আত্মা, হৃদয় শুকায়,
চ’খে, মুখে ভীতি-বহ্নি ফেটে পড়ে হায় !
२
যে যেখানে ভাল মন্দ, পাপ পুণ্যচয়,
সুকৃতি দুষ্কৃতি, প্রীতি ভীতি-অভিনয়,
করুক অজ্ঞাতসারে,
গােপনে নির্ভয়াগারে,
সবি যেন তব দীর্ঘনিশ্বাসের টানে,
দূর হতে আসে দ্রুত তব সন্নিধানে।
কি যে বৈদ্যুতিক-শক্তি হৃদয়ে তােমার,
অজ্ঞান-মানব মােরা কি বুঝিব তার ?
অথবা কি মন্ত্রবলে,
যথা যা, এ বিশ্বতলে,
সাধিত হতেছে, তুমি জান সমুদয়,
সর্বত্র সমান দৃষ্টি সকল সময়।

বিচার।
৪
বিজন-বিপিনে কিম্বা গিরি-গুহাতলে,
ভূগর্ভ-মাঝারে, শূন্যে, সলিলে, অনলে,
নিদ্রিতে কি জাগরণে,
সাবধানে, সঙ্গোপনে,
দিবায়, নিশায় মােরা যা করি যখন,
চক্ষের উপরে যেন ভাসে অনুক্ষণ।
জান তুমি হৃদে মম সুধা কি গরল,
আমি ত না জানি মম পাপের কি ফল ?
পরাণে নাশিলে পরে,
জানি না কি হবে পরে,
ভাবি, গােপনের পাপ সদা অপ্রকাশ,
ফলে না পাপের ফল, অটল-বিশ্বাস।
তা’ নয় বিচার, তুমি জান সমুদায়,
পরের বধেছি প্রাণ, বধিবে আমায়।
যে যেমন কৰ্ম্ম করে,
সেই ফল পায় পরে,
কেবল তুমিই জান যথা বিধাতায়,
তাই পাপ, প্রবঞ্চনা ঢাকা নাহি যায়।

সুমতি।
সে দিন না অন্ধকারে নিশীথ-f
রুদ্ধ করি কক্ষ-দ্বার নীরবে, গোপনে,
করেছি যে কত পাপ,
সহিতেছি তার তাপ,
আশ্চৰ্য, জানিলে তুমি জানি না কেমনে,
দেখে নাই যাহা রবি, শশী, হুতাশনে।
দেখিতে না পায় যবে মানব-নয়ন,
সমস্ত সংসার যবে অন্ধের মতন।
তখনি পাপাত্মাগণ,
করে পাপ আচরণ,
তাহাও দেখ যে তুমি বিচিত্র লােকন ।
কি তব নয়নে, যেন সর্বজ্ঞ-নয়ন।
করি,
প্রতিদিন কত পাপ, ভাবি মনে মনে,
ভস্ম করি পর-পুরী অনল-দাহনে,
কভু
ভাবি চুরি
কিম্বা পর-প্রাণ হরি,
মিথ্যা ভাযে বাঞ্ছা কভু বঞ্চনা করিতে,
একটীও তব তরে পারি না সাধিতে।

বিচার।
জ্ঞান-জ্যোতি সমুজ্জ্বল ন্যায়দণ্ড করে,
ফিরিছ ঘুরিছ তুমি বিশ্ব চরাচরে।
ছােট বড়, ধনী দীন,
পণ্ডিত কি জ্ঞান-হীন,
সমভাবে ন্যায়দণ্ড দীপ্ত-দিনকর,
চালাও সতত স্থির সবার উপর ।
আত্মপর ভেদাভেদ দেখিতে না পাই,
পক্ষ টানি কারো প্রতি ক্ষমা, দয়া নাই।
ন্যায়ের উজ্জ্বল ভাতি,
কিবা দিবা কিবা রাতি,
জ্বলিছে সমান, তার উজ্জ্বল-আভায়,
পাপের আঁধার রাশি সব মুছে যায়।
১১
স্বার্থপর উপকারী, নির্দয় সদয়,
কৃপণ সে দাতা, লােভী লােভ-হীন হয়।
শুধু তােমা করে ভয়,
চোর সাধু সদাশয়,
পাপিষ্ঠ ধাৰ্মিক, দস্যু দুর্বলের বল,
মিথ্যাবাদী সত্যভাষী, কুটিল সরল ।

৫২
সুমতি।
তুমি যথা, জ্বলে তথা পাপের হৃদয়,
সত্যের আনন্দ তথা ধর্মের বিজয়।
দাতার দীনতা নাশ,
কৃপণের হা হুতাশ,
দুর্বল সবল হয়, দস্যুর নিধন,
জিতেন্দ্রিয় ইন্দ্রাসনে, দুষ্টের পতন।
১৪
বিচারক যদি কভু রত অবিচারে,
তাহাবাে নিস্তার নাই এ ভব-সংসারে।
ন্যায়দণ্ড সঞ্চালনে,
কত অবিচারিগণে,
নরকের অগ্নি-কুণ্ডে করিছ ক্ষেপণ,
পাপীর তাড়ন-কৰ্ত্তা তুমি এক জন।

পাপের ফল।
পাপের ফল।
নও,
বল বল সহদেব, পাণ্ডুর কুমার !
স্বর্গপথে যেতে কেন পতন তোমার ?
যুদ্ধে
পরাজিত
তবে কেন পড়ে রও,
কি আছে অজেয় যার নাই প্রতিকার ?
নাই প্রতিকার ভবে সম্ভবে কখন ?
সমরে বিজয়ী জন,
অকারণ অচেতন,
কেন কেন বল তবে হেন দুর্ঘটন?
বুঝিয়াছি মিছা নয় শাস্ত্রের বচন,-
বীর কিম্বা হও প্রভু,
পাপে না ছাড়িবে কভু,
জীবনে ক'রেছ কভু সত্যের গােপন,
তাই সে স্বর্গের পথে তােমার পতন।
२
নকুল, তুমিও কেন হলে অচেতন ?
জানি আমি নিস্পাপীর নাহিক পতন।
তুমিও করেছ পাপ,
তাই হেন পরিতাপ,

৫৪
সুমতি।
সােদরের সহায়তা করনি’ তখন,
কর্ণ-শরে যুধিষ্ঠির ব্যথিত যখন।
তাই সে তােমার হায়,
অর্ধপথে প্রাণ যায়,
সশরীরে নয় তাই স্বর্গ দরশন।
পরশি গাণ্ডীবী হে তােমায় শমন,
ভুবন-বিজয়ী বীর,
রহিতে নারিলে স্থির,
তােমার জন্মিয়াছিল পাপ-প্রলােভন,
স্ত্রীবাক্যে অজ্ঞা জ্যেষ্ঠে করেছ কখন
মহাযােদ্ধা মহাবল অসীম-সাহস,
একি দেখি ভীমসেন, তুমিও অবশ ?
ভীষ্মের অব্যর্থ-বাণে,
ভীত নাহি হলে প্রাণে,
বধিয়া সে দুর্যোধনে রাখিয়াছ যশ
তােমায় করেছে নাকি কলুষ পরশ ?
বীরত্বের অভিমানে ;
ধরা দেখ তুচ্ছ জ্ঞানে,
তাই সে পাপের ফল ফলিল এখন।
বলী দেখে পাপ নাহি করে পলায়ন।

পাপের ফল।
সত্যই সত্যই তবে,
এক দিন হবে হবে,
ধনী-জন-দৌরাত্মের অবশ্য দমন,
সত্য সত্য আছে তবে পাপের পীড়ন ?
8
যুধিষ্ঠির, তব কেন অন্ধ দুনয়ন ?
পুণ্যফলে স্বর্গে এসে কেন জ্বালাতন ?
অসংখ্য পুণ্যের কাজ,
করিয়াছ মহারাজ,
কেন তবু আজি হয়, না পাও দর্শন ?
তুমিও করেছ নাকি পাপ আচরণ ?
তুমিও কি মিথ্যাকথা,
ব’লে দ্রোণে দিলে ব্যথা,
তা’না হলে এ দুর্দশা কেন হে রাজন্ ।
কণিকা গােমূত্রে নষ্ট দুগ্ধ শত মণ।
সামান্য পাপের দায়,
জীবন বিফলে যায়,
ক্ষুদ্র ছিদ্রে জলজান সাগরে মগন,
ক্ষুদ্র পাপে বড় তাপ, সত্য এ বচন।

সুমতি।
বালীর উক্তি
তারার সে ভাবি-বাণী ফলিল নিশ্চয়,
লঙ্ঘিয়া সতীর কথা,
হৃদয়ে বজ্রের ব্যথা,
বাজিছে, আমার মৃত্যু অন্যথা না হয়।
২
বসন্ত মলয়ানিলে কে জানে প্রলয়,
সুগন্ধি গােলাপ-সনে,
কে জানিত সঙ্গোপনে,
তক্ষকের বিষদন্ত লুক্কায়িত রয় ?
শরতের শশাঙ্কের এত যে কলঙ্ক,
দেখে না বিশ্বাস হয়,
রাম এত নিরদয়,
কৌস্তুতে শােভিত নয় গােপালের অঙ্ক ?
* ৪
রত্নাকরে হলাহল কে বিশ্বাস করে ?
দেবের অজ্ঞাত যাহা,
কেমনে বুঝিব তাহা,
কেমনে বুঝিব লক্ষমী দারিদ্র বিতরে ?

বালীর উক্তি।
৫৭
মণি-গর্ভে ফণী জন্মে বুঝিব কেমনে ?
দশরথ মহাত্মার,
হেন পুত্র দুরাচার,
জীবনে বিশ্বাস নয়, নয় রে স্বপনে।
ক্ষত্রাধম, নরাধম নহে ত শ্রীরাম,
জিতেন্দ্রিয় জানি যারে,
সে কেন এ অত্যাচারে,
শাখামৃগ বধে ? মৃগ বধে যে বিরাম।
৭
জানি আমি শ্রীরামের রূপ বিমােহন,
আকৃতি যেমন যার,
প্রকৃতি তেমন তার,
সুন্দর শশাঙ্ক নয় শঙ্খের মতন।
৮
কেন আজি দেবতার হ’ল এ বিকার ?
আমি যে মরিয়া যাই,
তাতে কিছু দুঃখ নাই,
শুন রাম, এ কলঙ্ক রটিবে তােমার।

৫৮ সুমতি। বিধাতা বিবেকহীন, মিছা কথা নয়, শশধর কলঙ্কিত, কমল সে কণ্টকিত, বধিল নির্দোষ বালী, রাম দয়াময় । হাসি। বড় ভালবাসি হাসি, সতত তােমায়, নিরখি যখন- শিশুর রক্তিমাধরে, নাচ, দোল প্রীতি-ভরে, ক্রীড়া কর কত রঙ্গে বিমল, তরল ; সুবর্ণে, হীরক যথা করে ঝলমল। পাশরি সংসার-জুলা, শােক, তাপ যত, মুহূর্তে তখন। তাই বড় ভালবাসি, বিনিময়ে সুধা-রাশি, শিশুর সরল-হাসি চিত্ত-বিনােদন, নিরখি কানা বল জুড়ায় নয়ন ?

হাসি।
ঊষার বিমল-বুকে ফুটে থাক যবে,
মানস-মােহন!
মধুময়-ফুল-দলে,
নাচ তুমি কুতূহলে,
ঢল ঢল পরিমল সৌরভ-সাগর ;
বড়ই নিৰ্ম্মল, হাসি, তােমার অন্তর !
8
দেবতার আশীর্বাদ লইয়া মস্তকে,
ভক্তিসহকারে,
ফুল-দল ভর করি, দেবতার পদে পড়ি,
শিখাও মানবে সদা ভক্তি-প্রীতি-দান
ধন্য হাসি, ভবে তুমি শিক্ষার নিদান ।
হাসিভরা চাদে মােরা বলি পূর্ণচাদ,
মরি কি সুন্দর !
শুধু কি চকোর হাসে, হেরিয়া পুলকে ভাসে,
দেবতা, দানব, নর হাসিতে পাগল ;
বিশ্বরাজ্যে হাসি, তুমি সুখের সম্বল।
হাসিমাখা-তারাদল নীল-নভস্তলে,
মরি কি উজলে ।
তােমারি তরল-বিভা, পেয়ে তারা হাসে কিবা,

সুমতি।
হাসায় ভূতল, স্বর্গ, কানন, অচল,
হাসিতে মুকুতা ঝরে বিমল, উজ্জ্বল।
৭
কোথা সুখ, কোথা শান্তি, হাসি-হীন-মুখে ?
জীবন বিফল !
হৃদয় তাহার শুধু,
দিবা নিশি করে ধূধূ
বারি-শূন্য-মরু যথা ভীষণ কেবল,
মানব-জীবন তার বিফল,—বিফল !
এসেছি জগতে হায়, কাঁদিতে-কাঁদিতে,-
হাসিব এবার,
হাসিতে হাসিতে ভবে, হাসা হাসাব সবে,
দুই হাতে অশ্রু-জল মুছায়ে সবার,
গলাগলি ধরি হাসি, হাসিব আবার !

ধিক্।
ধিক্।
ধিক তারে পরমেশে মতি নাই যার,
পিতা মাতা ভক্তি-হীনে ধিক্‌ শতবার।
ধি তারে নাই যার বিদ্যালাভে মন,
ধিক্ সে উদ্যমহীনে অলস যে জন।
ধিক্ তায় শত্রু-পদে নত যেই জন,
শতধি মুখে যার অপ্রিয়-বচন।
পরাধীনে ধিক্‌, যার অভিমান মনে,
লজ্জা পেয়ে সজ্জা করে ধিক্ রে সে জনে।
আপন ক্ষমতা কত জানেনা যে জন,
ধিক্ তারে করে যেই প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন ।
কলঙ্কে শঙ্কিত নয় সদা যেই জন,
মিষ্টভাষী, মিথ্যাবাদী ধিক্কার-ভাজন।
আশায় নিরাশ হলে ধিক্ সে জীবনে,
ধিক্ ধিক শতধিক ধনাঢ্য-কৃপণে।
এ হতে অধিক সেই ধিক্কার-ভাজন,
অর্থ পেয়ে মিত্ৰজনে ভুলে যেই জন

সুমতি।
বালক।
আমিও ছিলাম শিশু, তােদের মতন,
হাসি না ধরিত মুখে,
কত সুখ-সিন্ধু বুকে,
অবিরত তােলপাড় করিত তখন,
নিজ্জল-মরুর সম হয়েছে এখন।
আমারাে এমন দিন ছিল একদিন,
কত খেলা খেলিয়াছি,
কত রঙ্গে নাচিয়াছি,
কত গান গাহিয়াছি বাজাইয়া বীণ,
সে সুখ-তরঙ্গ এবে হয়েছে বিলীন।
পল্লি-বাল-দলে
মিলি নিত্য অবিরত,
ঠুলি, ধূলি, গােল নিয়ে,
কাননে, প্রান্তরে গিয়ে,
ছুটাছুটি, হুড়াহুড়ি করিয়াছি কত,
স্মরিলে তা মনে হয় স্বপনের মত।

বালক।
৬৩
৪
গলায় গলায় প্রীতি ছিল পরস্পর,
কেহ কার কাছ ছাড়া,
হইলে আপনা হারা,
হতেম পাগলপ্রায়, ব্যথিত-অন্তর,
ভুলিয়া আহার, নিদ্রা হায়, নিরন্তর।
সুখে ‘লুকোচুরি খেলা খেলিয়াছি কত,
খেলিয়াছি কত খেলা,
ঊষা, সন্ধ্যা দুই বেলা,
‘হাডুডু খেলেছি কত হয়ে উল্লসিত,
হাসি পায় মনে হলে, লজ্জা পায় চিত।
জল-ক্রীড়া করিয়াছি জলেতে নামিয়া,
মিলি সবে দলে দলে,
ভাসাইয়া ফুল-দলে,
আগে কে ছুইতে পারে প্রতিজ্ঞা করিয়া,
সাঁতার কেটেছি কত আমােদে মাতিয়া।
৭
পাখীটি উড়িয়া গেলে ধরিতে তাহারে,
কত কষ্ট, কত ক্লেশ,
সহিয়াছি নাহি শেষ,

সুমতি।
রােদে রােদে ছুটে ছুটে কান্তারে, প্রান্তরে,
ভ্রুক্ষেপ করিনি তায় মুহূর্তৃেক তরে।
৮
বসনে, ভূষণে, ধনে ছিল না যতন,
ঠিক রে তােদের মত,
খেলায় ছিলাম রত,
হৃদয় সরল ছিল তােদের মতন,
এখন হয়েছি যেন কেমন কেমন।
সংসারের জ্বালা-পােড়া বুঝিনি’ তখন,
বুঝিনি রে বাল-রবি,
কালে ধরে খর-ছবি,
বুঝিনি’ উষার হাসি, তপ্ত হুতাশন,
বুঝি নাই সুধা, বিষে প্রভেদ কেমন !
মান, অপমান-বােধ ছিলনা তখন,
বিষয়, বিভব-তরে,
কারাে সনে রােষ-ভরে,
বিবাদ, কলহে কাল করিনি’ যাপন,
লজ্জা, সম্ভ্রমের কথা, ভাবিনি কখন।

বালক।
১১
ছিলনা এ হৃদে মম কূট-কপটতা,
শত্রু, মিত্র সমজ্ঞান,
ছিল সবি একপ্রাণ,
চ’খে ছিল সম দৃষ্টি, হৃদয়ে মমতা,
স্বভাব নিৰ্ম্মল ছিল, প্রাণে পবিত্রতা।
এখন সে হৃদে, শুধু, হায় হাহাকার,
সংসারের দাবানলে,
অবিরল জ্বলে জ্বলে,
হয়েছে শ্মশান সম হৃদয়-আগার,
কিছু নাই সব গেছে সব শূন্যাকার।
এই আশীর্বাদ আমি করি অনিবার,
থাক্ রে বালক মত,
করিয়ে সংসার-ব্রত,
হ’নে আমার মত পশু নরাকার,
এ ব্রতে ভীষণ-জ্বালা দুঃখ-দুর্নিবার।
১৪
সানন্দে সরল-প্রাণে পবিত্র-মানসে,
এ মরতে এই মত,
থাক্ তােরা অবিরত,

সুমতি
সংসারের কুৰাতাস যেন না পরশে,
এই কাল আসে যেন বরষে, বরষে।
}
শুক্লা-দ্বিতীয়ার চঁাদ যথা নভস্তলে,
তােরাও সেরূপ সুখে,
থারে সংসার-বুকে,
জানিনে পূর্ণচন্দ্র রাহুর কবলে !
কি কাজ হইয়া বড় নশ্বর-ভূতলে ?
কিম্বা ক্ষুদ্র তারা সম থাকরে ফুটিয়া,
বড় হয়ে কিবা ফল,
দুঃখ তাহে অবিরল,
সদাই কম্পিত বড় সাগরের হিয়া,
বড়র বাসনা তাই যা তােরা ভুলিয়া।
১৭
পারি যদি, দেহ, প্রাণ বিনিময় করি,
এখনি ত্যজিয়া তবে,
সমান-বয়সী সবে,
আবার তােদের মত বাল-রূপ ধরি,
সংসারের দুঃখ-জালা সমস্ত পাশরি ।

চপলা ও বিমলা।
চপলা ও বিমলা।
চ।
চপল। দিদি, এই পাখী কেন বনে যেতে চায় ?
বিমলা। বন-পাখী বনে গিয়ে বড় সুখ পায়।
কে নিবে বৃষ্টিতে, রৌদ্রে মন্দির-ভিতর ?
বি। চায়না মন্দির পাখী, চির-বনচর।
এখানে ত দুধ ভাত, সেখানে কি খায় ?
বি। খুটে খুটে দানা-কণা যখন যা পায়।
কেন দিদি, হেথা পাখী থাকিতে না চায় ?
বি। স্বাধীনতা, জন্মভূমি কে ছাড়ে ইচ্ছায়।
পর-হৰ্ম্মতল হতে অতি শ্রেষ্ঠতর,
আপনার ক্ষুদ্র পর্ণ-কুটীর সুন্দর।
আপন শাকান্ন ফেলে পরা কে খায় ?
দুঃখী ভবে, থাকে যেই পর প্রত্যাশায়।
চ।
কেন।
সুন্দর শশাঙ্ক হায়, কেন কলঙ্কিত ?
গােলাপ, কমল কেন চির-কণ্টকিত ?
অন্ধকারময় খনি কেন অবিরল ?
কেনবা লবণময় জলধির জল ?

সুমতি।
দারিদ্র্য-অনলে কেন দহে কবিচয় ?
সুখের নিদ্রায় কেন দুঃস্বপ্ন উদয় ?
চপলা চঞ্চলা কেন ? ইন্দিরা সুন্দরী
কেনবা অস্থিরা ভবে, পূর্ণিমা শরী?
আবিলতাপূর্ণ কেন পূত ভাগীরথী ?
অঙ্গ-হীন জগন্নাথ, যক্ষ ধনপতি ?
কেন পুষ্পে কীট, কেন অকালে মরণ?
নরের আকাঙক্ষা কেন হয় না পূরণ ?
পুণ্যবান পাণ্ডুপুত্র, শ্রীরাম, লক্ষণ,
নলরাজা, সুনীতির কেন নির্বাসন ?
স্বর্গচ্যুত হরিশ্চন্দ্র, দাতা বলী ধীর,
রাজত্বে বঞ্চিত কেন ভীষ্ম মহাবীর ?
পতিব্রতা-সাবিত্রীর স্বামীর নিধন,
জানকীর বনবাস কেন অকারণ ?
শিবের শ্মশানে বাস কেন অনিবার,
জীবশ্রেষ্ঠ মানবের কেন পাপাচার ?

উপহাস।
৬১
সুখী ধনে নয়।
রােগে, শােকে, চিন্তানলে, দহে যেই পলে পলে,
পুত্র-শোকে জর জর হৃদয় যাহার,
কোটি কোটি ধনে তার,
বসন-ভূষণে ছার,
কি করিবে, শুকাবে কি নয়ন-আসার ?
মনে সুখ নাহি যার,
বৃথা তার অলঙ্কার,
বৃথা তার ধন, জন, জীবন, যৌবন ;
মন যার শান্তিময়,
হােক দীন নিরাশ্রয়,
সেই সুখী, ধন নয় সুখের কারণ।
উপহাস।
মুটে লিখে ‘জমিদার’ ‘রাজা-বাহাদুর,
বায়স বৈকুণ্ঠে যায়,
মূক যদি গান গায়,
ওরি নাম উপহাস, সাঁতারে আতুর।

সুমতি।
২
চোরে সাধু বলে যদি, দুর্বলে সবল,
মাতঙ্গ পতঙ্গচয়,
কাচে যদি হীরা কয়,
ওরি নাম উপহাস, বুঝে না তা খল।
অমানিশি আলােময়ী,নবনী কঠিন,
জয় হয় পাপ করে,
গােপাল গগনে চরে,
ওরি নাম উপহাস, নবীন প্রবীণ।
৪
তেঁতুলে আতপ চালে যদি মেশামিশি,
শীতে যে সমীর বয়,
তা যদি মলয় হয়,
ওরি নাম উপহাস, উপহাস হাসি।

নীতি কথা।
নীতি কথা।
কালের কুটিল গতি ভাবিও মানব,
আজি যেই রাজা, কালি শ্মশানের শব।
ভাল যে মানব তারে সবে ভাল বলে,
কেবা কবে নিন্দা করে গােলাপ, কমলে ?
পরে বিনাশিতে আগে যায় নিজ প্রাণ,
পতঙ্গ, প্রদীপ দেখ তাহার প্রমাণ।
-
পণ্ডিত মুখের কাছে পরাজিত হয়,
অঙ্গার ধুইতে জল মলিনতাময়।
যশ যার আছে সে ত মরিয়া অমর,
বাঁচিয়াও মৃত ভবে কলঙ্কিত নর।
ধৰ্ম্ম বিনিময়ে পাপী চায় পাপরাশি,
তস্কর পূর্ণিমা দিয়া অমা অভিলাষী।
বধির কি বুঝে কভু সঙ্গীত-সুতান?
বুঝে কভু মূখ, কত সুখী সে বিদ্বান্ ?
দশানন দুৰ্য্যোধন কেন রে নিৰ্ম্মল,
গৃহের বিবাদ শুধু অনর্থের মূল।

সুমতি।
মূর্খ নিয়ে স্বর্গ-বাসে সুখ কেবা পায় ?
কি ফল চন্দনে যদি পুরীষ তাহায় ?
বহুভাষী মানবের কথা সত্য নয়,
দ্রুতগতি স্রোতস্বতী মলিনা নিশ্চয়।
নবীন-যৌবনে তেজ সকলেরি হয়,
খরতর দিবাকর মধ্যাহ্ন সময়।
ঈশ্বরে ভক্তের প্রেম হয় না মলিন,
সম্বন্ধ চুম্বক-লৌহে ভাঙ্গে কোন্ দিন ?
?
দুধে চিনি ভাল বটে সােহাগা সােণায়,
সত্য সহ মিষ্ট কথা আরাে শােভা পায়
নিগুণ মানবে কেবা করে সমাদর,
মধুহীন ফুলদলে বসে কি ভ্রমর।
পরিচয় না থাকিলে কে করে সম্মান ?
সুবৰ্ণ পিত্তল বলে পায় অপমান।
পঙ্কেও পঙ্কজ কভু মলিন না হয়,
শুক্তির ভিতরে মুক্তা উজ্জ্বল কি নয় ?
নিজে কষ্ট পেয়ে সাধু পর-সুখ চায়,
আপনি ঘুরিয়া চাকা অপরে চালায়।

নীতি কথা।
চপল মানব কভু সাধু নাহি হয়,
চঞ্চল সলিল সদা আবিলতাময়।
ঔষধে রােগীর বল রুচি কবে হয় ?
হিত-কথা মানবের কভু প্রিয় নয়।
সুগন্ধি-গােলাপে কার অন্তর না হরে ?
রতনে যতন ভবে সকলেই করে।
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

পরিশিষ্ট পদ্যছন্দোবদ্ধ রচনার নাম পদ্য ; পদ্য দ্বিবিধ, মিত্রা- ক্ষর ও অমিত্রাক্ষর। মিত্র--অঙ্গার নির্মল বাসে মালিন্য বিতরে, গুণহীন পরণে দোষারােপ করে। অমিত্র--অঙ্গার নির্মল-বাসে বিতরে মালিন্য, গুণহীন পরগুণে করে দোষারােপ। প্রতি ৮ম ও ৬ষ্ঠ অক্ষরে যতি নির্দেশ করিয়া পদ্য লিখি- লেই অমিত্রাক্ষর রচনা হয়। যথা- চল যাই মৃত্যু যথা- অসার সংসারে, কেন করি হাহাকার ? বিধি নিদারুণ-- নিদয়-নিঠুর, তাই এ যন্ত্রণা ভবে সদা মানবের। মিত্রাক্ষরে পয়ার ও ত্রিপদীই প্রধান ; এই দুইটীর অব- লম্বনে বহুবিধ ছন্দ রচিত হয়। পয়ার দুই চরণে। ইহার প্রতি চরণে ১৪টী অক্ষর থাকে। উভয় চরণের অন্ত্যবর্ণ ও তৎপূর্ববর্তী স্বরবর্ণদয়ের পরস্পর মিলন ও পূৰ্বৰৰ্তী ৮ম ও পরবর্তী ৬ষ্ঠ অক্ষরে যতি পতন আবশ্যক ; যথা- দরিদ্রের খ্রিষ্ট মুখ, নাহ'লে বিপদ, কাল-কোকিলের শুধু, সুস্বর সম্পদ। এখানে ৮ম ও ৬ষ্ঠ অক্ষরে যতি পতন ও শেষ বর্ণদ্বয় ও তৎপূৰ্ব্বস্থ স্বরবর্ণদ্বয়ের মিলন হইয়াছে। ';

অন্যথা-নাহ'লে বিপদ মিষ্টমুখ দরিদ্রের,
সম্পদ কাল কোকিলের শুধু সুস্বর।
কখন কখন চারি চরণে, কখন কখন ১৫শ ও১৬শ অক্ষরে
এবং কখনও বা চরণার্ধের দ্বিরুক্তি দ্বারা, পয়ার রচিত হয় ;
যথা-
অসুরের সুধা লাভে কেন বৃথা আশ,
বাসনা অমর হতে হয় কি পূরণ,
বাঙ্গালীর রাজ্যলাভে বিফল প্রয়াস,
বামন ধরেছে চাদ শুনেছ কখন ?
অথবা
বাসনা অমর হতে হয় কি পূরণ,
অসুরের সুধালাভে কেন বৃথা আশ,
বাঙ্গালীর রাজ্য লাভে বিফল-প্রয়াস,
বামন ধরেছে চাদ শুনেছ কখন ?
১৫শ অক্ষরে যথা-
কৃপণ ধনাঢ্য দীনে, দেখিয়াও দেখেনা,
সুখী সে দুঃখীর দুঃখ বুঝিয়াও বুঝেনা।
১৬শ অক্ষরে যথা -
যত পায়, তত চায়, সদা মানবের মন,
যত লােভ, তত ক্ষোভ, চির-সত্য এ বচন।
দ্বিরুক্তি যথা---
কি করিব ভেবে আর, কি করিব ভেবে আর,
এ জীবন হইয়াছে দুঃখের আধার।
ত্যজিলে এ পােড় প্রাণ, ত্যজিলে এ পােড়া প্রাণ
দুঃখের অনল হ’তে পাই পরিত্রাণ।

ত্রিপদী-লঘু ও দীর্ঘ। লঘু ৪০ বর্ণে ও দীর্ঘ ৫২ বর্ণে সম্পন্ন হয়। পয়ারের ন্যায় প্রথমার্ধের শেষ বর্ণের সহিত শেষার্ধের শেষ বর্ণের মিলন আবশ্যক। লঘু ত্রিপদীতে প্রত্যেক ভাগের ৬ষ্ঠ বর্ণদ্বয় ও দীর্ঘ ত্রিপ- দীর ৮ম বর্ণদ্বয়ের মিলন হয়। যথা- লঘু-বিভু দয়াময়, কেন তারে ভর, পাতকী পাবন যিনি, যবে যাহা কর, নহে অপাের, সর্বগ-সৰ্ব্বজ্ঞ তিনি। ৪ দীর্ঘ-দীনে সদা দয়াময়, কেন তারে কর ভয়, পতিত পাবন পরমেশ, পাপ কিম্বা পুণ্য কর, নহে তার অগােচর, স্মরণে বারণ মনােক্লেশ। নিয়ে আরও কয়েক প্রকার ত্রিপদীর উদাহরণ দেওয়া গেল। যথা- পতিত-পাবন, 1) করুণা-সাগর, করুণা করহ দীনে, পেতেছি যাতনা, বাবে আর কত দিনে ? জনম অবধি, তােমার মতন হরি, কে আছে দয়ালু ভবে, কে শুনে পাপীর হাহাকার ?

10 কে আছে আমার মত, মহাপাপী নরাধম, তােমা ছাড়া দুয়া পা’ব কার ? জেনেছি সকল, ধাধাই কেবল, বল সে বিফল, ধরম বিনে, দামিনীর মত, ধন, জন যত, ভালবাসি সে'ত, তাপস-দীনে। পয়ার ও ত্রিপদীর সংমিশ্রণে অনেক ছন্দ উৎপন্ন হয় । যথা- মরুভূমে ওয়েসিশ, তােমার কৃপায়, করুণা-নিদান, কর কৃপা দান, তােমার সন্তান বিভাে, কেন দুঃখ পায় ? গেল কত নিশি দিন, ভেবে তনু হ’ল ক্ষীণ, তবু কেন তঁার সহ হয় না। মিলন ? যে চায় যাহারে সে কি পায় না কখন ? বাঙ্গালায় বহুবিধ ছন্দ আছে; কিন্তু সে গুলি লিখিতে হইলে বহুবিস্তৃত হইবে , তাই নিয়ে মাত্র দুই একটীর উদাহরণ লিখিত হইল ; যথা- একাবলী (১১শ অক্ষরে)- যাবনা যাবনা যাবনা আর, পেয়েছি যাতনা, বুঝেছি সার ; কাচের বরণ, উজ্জ্বল যত, ভিতরে রতন, নহে রে তত ; দুঃখদ স্থানের সুখদা গতি, সহজে ধাবিত কুপথে মতি। । }

1/০
১২শ অক্ষরে
উঠ রে বালক, উঠেছে তপন,
নিশি বিনে দিনে কে করে শয়ন ?
কাননে উঠেছে পশু পক্ষিগণ,
মানবের ছেলে কেন অচেতন ?
ললিত ( দীর্ঘ )
কে বলে খাপদচয়, ভয়ের কারণ হয়,
তারা ত বলে না মিছা, করে না ত বঞ্চনা ;
হরে না পরের ধন, করে না ত জ্বালাতন,
সতীত্ব-রতনে আহা, কভু তারা হবে না।
ঘু«
কোথায় কানাই,
মােরা তবে যাই,
পাই কি না পাই, পুনঃ দেখিব,
পৰ্বতে, কাননে,
বনে, উপবনে,
নগরে, নির্জনে তারে খুজিব।
মণিকর্ণিকা--
প্রতি পংক্তি ১২শ অক্ষরে, প্রতি তৃতীয় বর্ণগুরু (১)
হইবে ; যথা-
ভজ মানব শান্তি নিকেতন হে,
স্মর ঈশ্বর মোচন কারণ হে।
অনুস্বার ও
(১) দীর্ঘস্বর ও দীর্ঘস্বরযুক্ত বর্ণের পূর্ব বর্ণ গুরু।
বিসর্গ যুক্ত বর্ণও গুরু। অন্ত্য বর্ণও গুরু বলিয়া গণ্য হয়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sumati

Author
Chowdhury,bhairabachandra
Title
Sumati
File name
Sumati
Text
OCR done
Citation
1897
Published
2009/11/6
Publisher
Bhairabachandra Chowdhury
Language
Sanskrit
Pages
96
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Chowdhury,Bhairabachandra
DLI number
513361
Barcode
4990010020346.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
4P6wbRvqd2I
Download PDF

Sumati