Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kamolaharon
Front matter
- सा
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কমলুহরণ
শ্ৰীমতী দুর্লভবালা দেবী
প্রণীত
কলিকাতা
৩৬নং কর্পোরেশন দ্বীট হইতে
চন্দ্রভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশিত
No text on this page.
কমলাহরণ
কলিকাতা।
১ নং অক্রুর দত্তের লেন
বী প্রেস হইতে
ঐপশুপতি ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত
শ্রী শ্রীদুর্গা
শরণং
সরস্বতীর আবাহন।
কতই যতনে মাগগা রাঙা পা দুখানি
পূজি নিত্য মানস-মন্দিরে শতদল
সিংহাসনে গােপনে গােপনে। কত আশা
এ পােড়া পরাণে লভিতে কল্পনাবলে
যশােরূপ ভাতি উজ্জ্বল উজ্জ্বল রূপে।
হে বরদে। তব পদ পূজি কবিগণ
অমর এ ভব মাঝে। কল্পনা-কাননে
ফুটেছে কতই ফুল, শোভার আধার।
দুহিতারে করােনা বঞ্চনা। কৃপণতা
নাহি কর, মাতৃস্নেহ দানে অনন্ত অপার।
নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ । পুরুষ করুণ রায় গুজরাটের বৃদ্ধ রাজা। কুমার দেব ঐ পালিত পুত্র ও সেনাপতি ও ছদ্মবেশী দেবগিরি রাজপুত্র রামদেব দেবগিরি রাজা। সৈন্যগণ, সভাসদগণ, সন্ন্যাসী ইত্যাদি। আলাউদ্দিন খিলিজি দিল্লীর বাদসা মােবারক ঐ পুত্রদ্বয়। সমসের মালেক কাফুর ঐ প্রধান সেনাপতি। সভাসদগণ, উগীর, সৈন্যগণ, দাসগণ ইত্যাদি। স্ত্রী উৰ্মিলা দেবী গুজরাট রাণী কমলা ঐ কনিষ্ঠা রাণী দেবল উৰ্মিলার কন্যা। মন্ত্রী-পুত্রী রাণীর পালিতা ও কুমার দেবের স্ত্রী। সখিগণ, নাগরিকগণ ইত্যাদি। সেলিনা প্রধান বেগম। আমিনা দ্বিতীয়া বেগম। সােফিয়া সেলিনার কন্যা বাইজীগণ ইত্যাদি। সীতা ভূমিকা সাহিত্য গগনে এত চন্দ্রসূৰ্য থাকিতে কেন যে এই ক্ষুদ্র খদ্যোতিকার আলাে জ্বালিতে সাধ হইল তাহা বলা কঠিন। মূঢ় পতঙ্গও আলােকের কিরণে মুগ্ধ হয়। অশিক্ষিতা বঙ্গবালাও অসীম কাব্যসমুদ্রের তরঙ্গ মাঝে ঝাঁপ দিতে অগ্রসর ; বিদ্যা- সমুদ্রের প্রাণােন্মাদকারী সফেন তরঙ্গ রাশিতে আমিও মুগ্ধ। একদিন ইতিহাস পড়িতে বসিয়া কমলাদেবীর অপূৰ্ব্ব কাহিনীতে প্রাণ ভরিয়া গেল ; তাতে কমলাদেবীকে বাদসার প্রধানা বেগম পদে বসান হইয়াছে। এ বড় লজ্জার কথা; হিন্দু কন্যা স্বয়ং কি যবনকে বিবাহ করিতে পারে ? নিজ স্বামী বর্তমানে দ্বিতীয় বার বিবাহ হিন্দুকন্যার অসম্ভব চিত্র। তাই কমলার কলঙ্ক-মােচনে প্রয়াসী হইয়া এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ লিখিতে বসিয়াছি। কমলা-চরিত্রের চিত্র ইতিহাসে ঘৃণিত। তাই সম্পূর্ণ দেবীচরিত্র না গড়িয়া একটু প্রণয়চিত্র কমলা-হৃদয়ে আঁকিয়াছি । দেবলের চরিত্র ইতিহাস আমার উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে কিনা একথা পাঠক পাঠিকাই বলিতে পারেন। কারণ, আমার এই উদ্যম সম্পূর্ণ নূতন। গঠিত। লেখিক। কলিকাতা, জানবাজার। রথযাত্রা, ১৩২২।
No text on this page.
উৎসর্গ
বাঙ্গালার প্রথম বি, এ, ভূতপূৰ্ব্ব ডেপুটি মাজিষ্ট্রেট
স্বর্গীয় তারাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়
পিতৃদেবতার শ্রীচরণকমলে
এই গ্রন্থখানি
ভক্তিপূর্বক উৎসর্গ করিলাম।
৩. kg
:..
No text on this page.
কমলা-হৰণ ২e-- প্রথমঅঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। গুজরাট রাজঅন্তঃপুরস্থ কক্ষ। রাজা। (রাজা, রাণী, কমলা ও উর্মিলা ) শুন প্রিয়ে ভীষণ বারতা ! রূপ-লালসায় উন্মত্ত সম্রাট ; রাজ্য- ধন আত্ম পরিজন রােষানলে হবে ছারখার। হিন্দু নাম রবে না ভারতে। রাক্ষস সে আলা, ভীষণ বিকট বেশে আসিবে এ পুরে। যবনের অত্যাচারে কলঙ্ক কালিমা উজ্জ্বল গৌরব রাশি করিবেক ম্লান। বৃদ্ধ আমি, কি করিব শক্তি হীন যবন-সংগ্রামে ? কুললক্ষ্মী লুটাইবে যবনের পদে ! এ বিপদে ১ কমলা-হরণ। নাহি ত্রাণ। গুজরাট হইবে শ্মশান! এই শােন যবন গর্জন। পরাজয় পরাজয় অদৃষ্ট লিখনে! যবনের সেনাদল জলদ গর্জনে রােষানলে করিবে হুঙ্কার, ক্ষুদ্র হিন্দু পতঙ্গের প্রায় ভস্মসাৎ হইবে অচিরে। চির স্বাধীনতা-খনি বীর প্রসবিনী রত্ন- গর্ভা ভারতজননী'-হাহাকারে যাবে তার দিন। লুটাইবে পদতলে স্বাধীন সন্তান। উৰ্মিলা। কি বলিলে মহারাজ ? বৃদ্ধ তুমি! শক্তি হীন গুজরাটপতি! তাই কি গাে রাজ- লক্ষ্মী দিবে উপহার যবনের পদ- যুগ মাঝে ? স্বাধীন এ রাজভূমি মাঝে ফেরুপাল করিবে ভ্রমণ ? নাহি কি গাে রাজপুত শােণিত হৃদয়ে, শিরায় কি নাহি বয় শােণিত-প্রবাহ ? বীর তুমি, নব বলে হও বলীয়ান ; রাজগণে করি আবাহন সম্মুখ সংগ্রামে দেহ কর বিসর্জন ; পশ্চাতে যাইব মাের তব পদ স্মরি। না ডরি যবনে নাথ, মােরা বীর নারী, নিজ মান নিজ করে রাখিব রাখিব ! হলে প্রয়ােজন ধরি ভীম তরবারি ছেদিব যবন, ছেদি নিজ হৃদিতল ঘুমাব সমরে। চিন্তা প্রথম অঙ্ক। নাথ অকারণ। ভগবানে স হাতরে করহ স্মরণ, প্রজ্জ্বলিত যুদ্ধানল কর এ ভারতে, নাশ হে আলার তৃষা সে বক্ষ বিদারি। কমলা। নরনাথ অভাগিনী ত্যজিবে জীবন কুলমান রাখিয়া যতনে। বিষ পানে ছারদেহ দিব বিসর্জন। যবনের ভয় না রহিবে, ঘুচে যাবে রূপতৃষা তার শ্মশান-অঙ্গার হেরিবে এ নব- কায়া মাঝে। নিভে যাবে নবীন যৌবনে নব আশা, নবীন মুকুল না ফুটিতে যাবে শুকাইয়ে। একটি তারার মত অতি সে সুদূরে আপনি নীরবে হায় যাব মিশাইয়ে দূর মহাশূন্য কোলে। আর হেরিব এই শ্যামলা মেদিনী, নব রূপে সুষমা আধার, না হেরিব ফুল শােভা বসন্ত কাননে, পিককূল আর নাহি করিরে ঝঙ্কার, প্রভাতের নব উষা সনে আর নাহি শুনিব সে রব পাপীয়ার, মুখরিত-কলতানে বন উপবন বিহগের মধুর সঙ্গীতে। মােহময় নবভাবে ভাের নবীন জীবন। হায় ভগবান ! ফুরাইল ভাগ্যলিপি ! ( মুচ্ছা)
৪
কমলা-হরণ।
রাজা। • একি একি প্রাণ-প্রিয়তমা অযতনে
ধূলায় লুটায় ! কি ভয় কি ভয় প্রাণ
দিব তােমা বিনিময়ে, রণরঙ্গে জীর্ণ
দেহ করিব বর্জন। শত শত বীর
ফণী করিবে গর্জন। যবনের ভয়
দেবি কর অকারণ।
কমলা। নাহি ভয়। বীর নারী
ভরে শমনে।
(বেগে প্রস্থান)
রাজা।
কোথা যাও প্রাণেশ্বরী ?
( প্রস্থান)
উর্মিলা। ওই রূপে পাগল রাজন, ওই রূপে
পাগল সম্রাট, ওই রূপে রাজ্য হবে
বন, ছি ছি, রমণী এমন যাদু জানে!
বেঁধেছে রাজনে এ বৃদ্ধ জীবনে ; নাহি
আর সে বীর হুঙ্কার। পুত্র হীন গুজরাট
রাজা, ভাবী অধিপতি অামার কুমার
দেব মেহের ভাজন। : জামাতার পদে তারে
করিব বরণ। কোথা তারা তাপ হরা,
তার মা সঙ্কটে, দেহ শক্তি রণজয়ে
কুমারে আমার ।
( প্রস্থান)
প্রথম অঙ্ক। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। গুজরাট প্রমােদ উদ্যান। (দেবল ও সীতা ) গীত। কেন প্রাণ কঁদে কে জানে। কি যে ব্যথা এই প্রাণে গােপনে গােপনে। আশার মূরতি ওই সে যেন জাগিয়া ঘুমাই স্বপনে কেন, যেন ধরি ধরি না হেরি না হেরি কোথায় লুকায় জানিনে। কোথা হ'তে আসে সকরুণ বাণী মলিন কোমল মধুর মুখানি আসে হেসে হেসে, স্বপন আবেশে, জাগিয়ে ঘুমাই কেমনে। সীতা। সই! সই। দেবল। কেন সই অমন ব্যাকুল হয়ে ডাকছাে কেন? সীতা। সই এই কি তােমার কঁদিবার সময় ? কি একটা চিত্র- পট দেখে পাগলামি করে এমন সুখের মানব জীবন- টাকে নষ্ট করতে বসেছ। ও রকম চিত্রপটের কি মানুষ আছে নাকি যে বে করবি। ও একটা ছবি মাত্র। দেবল। সই আমার প্রাণে যে কি রকম ব্যথা তা তােমায় কি করে জানাব। আমি জানি এ পাগলামি বৃথা, আমার হৃদয়-দেবতাকে আমি পাবাে না। কারণ, ৬ কমলা-হরণ। চিত্রপট বিক্রেতা বােলে ছিল এ যবনরাজপুত্র। তাই সই আমার এ সােণার স্বপ্ন অকালে কোন কুহক বলে ভেঙ্গে গিয়েছে। তুমি আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছ কেন ? সীতা। ( ঘৃণায় ) ছি ! ছি ! সই যে যবনের নামে হৃদয়ের মধ্যে ঘৃণার উদয় হয়, কেমন করে সেই চিত্র দেখে উন্মত্ত হয়েছ ? হিন্দু কন্যা তুমি পিশাচকে হৃদয়ে স্থান . দিও না। অঙ্কুরে এ প্রেম বৃক্ষ উৎপাটিত কর । কুমার দেবকে সে আসনে প্রতিষ্ঠিত করে পূজা কর। তােমার জন্ম সার্থক হবে। জান ত কুমার তােমার ভাবী স্বামী। দেবল। কুমার দেবতা। আমি তাঁকে বাল্যকাল হতে ভ্রাতৃ- জ্ঞানে ভক্তি করি, কই তাকে ত স্বামীর মত ভাল- বাসতে পারি না। সই এ প্রাণ আমার পাগল, সে বীর কেশরী এ পাগলিকে নিয়ে কি করবে ? সে দেবতা আমার নয়, সে সাধনাও আমার নাই। কুমারকে বলো অভাগিনী দেবলকে ক্ষমা কত্তে, আমি চিরদিন কুমারী সেজে ভগবান সাধনায় দিন কাটাব। সীতা। সই ! কুমার সামান্য সেনাপতি নয়। গুপ্তচর রাজার নিকট সংবাদ দিয়েছে। এই সেই পলায়িত দেবগিরি রাজকুমার । তােমার অসামান্য রূপ রাশি, শ্রবণ করে তােমার অভিলাষে এখানে আগমন করেছে। তােমার মন প্রাণ কি সেই প্রেমময় দেবতার পদে বিকাতে পারবে না ? ভিখারী প্রেমিক ছদ্মবেশী
প্রথম অঙ্ক |
৭
রাজকুমারকে কি ভিক্ষা দেবে ? যাঁর অসামান্য
রণ-কৌশলে সৌরাষ্ট্রবাসী মুগ্ধ ; যার শৌর্য, বীৰ্য্য,
বিনয়, উদার চরিত্র অতুলনীয় ; সেই বীর কি তােমার
প্রণয়ের অনুপযুক্ত! রূপে যিনি দ্বিতীয় অনঙ্গদেব,
প্রেমে যিনি শঙ্কর স্বরূপ, সেই মহাত্মা কি তােমার
চরণ ধুলারও অধিকারী নহে! তােমার জননী,
বৃদ্ধ দেব তুল্য পিতা কুমারকে এ বিপদে একমাত্র
সহায় জ্ঞান করেন, সে কুমারকে শক্তি হীন করাে না,
তাঁকে কাঁদিও না, তাকে পূজা কর।
দেবল। সই সই কুক্ষণে জন্মেছে অভাগিনী ।
নতশিরে পিতার আদেশে প্রেমভাবে
ভাবিতে কুমারে ভাসে আঁখি ভক্তিভরে,
পূজিতে চরণ চাহে হৃদি, দাদা বলে
রসনায় চাহে সম্ভাষিতে। হেরি তাঁর
মােহন মূরতি স্নেহভরে ধায় পােড়া
প্রাণ, মুদে আঁখি দুটি সরমে সজনী ।
কুমার দেবতা নহে মম প্রাণেশ্বর,
রাজ রাজেশ্বর তিনি তার কৃপায় ।
বীর বীর্যে রাজপুত কূলচুড়া, নমে
দাসী সে চরণ তলে। ভগবান দীনা
অনাথিনী তােমারি আদেশে পশি ভব
রঙ্গালয়ে, হাসি কাদি তব কৃপাবলে ।
তুমি সব আমি পিতা নিমিত্ত কেবল,
- -
কমলা-হরণ।
কর্মময় ধরা মাঝে কলঙ্ক কালিমা
মম ভাগ্যফল দেব কি দোষ তােমার।
দাও শক্তি হৃদয় মাঝারে তববলে
মৰ্ম্ম ব্যাথা ফেলি গাে মুছাইয়ে।
( কুমারের প্রবেশ
দেবল শুনেছ কি সংগ্রাম বারতা ?
আসিছে যবন প্রলয় তুফান সম
জলধি কল্লোলে আক্রমিতে মনােহর।
সুন্দরী নগরী, লতিতে চারু হাসিনী
কমলা লক্ষ্মীরে তাই আজি আসিয়াছি
প্রমােদ উদ্যানে, অনুচিত এ মম প্রবেশ
ক্ষমাে হীন কর্মচারী জ্ঞানে ক্রীতদাস
দোষী রাজপূরে।
দেবল। কুমার কুমার ভুলে যাও দুঃখিনীরে।
অভাগিনি আমি গুণমণি ! নাহি জানি
রাজার কুমার তুমি ছদ্মবেশী সাজে।
কত শত অপরাধ ও-রাজীব পদে।
হীন তুমি রাজার কুমার! দেবগিরি
বীরপ্রসু জনমের স্থান। কহ দেব !
হেন কর্মে কেমনে পশিলা কোন ছলে ?
কোন ছলে পিতারে আমার বাঁধিয়াছ
স্নেহ কারাগারে ? কেন গৃহ আঁধারিয়া
পরের আবাসে হীনবেশে কাটাইছ নবীন জীবন?
প্রথম অঙ্ক।
**
কুমার। (হাসিয়া) পাইয়াছ পরিচয় মম ?
গুপ্তচর রাজস্থানে করেছে ঘােষণা। প্রতারণা
ঘুচিল জীবনে। রাজার কুমার তব
তরে আজ্ঞাকারী নিমকের দাস, রূপ
ফাদে লাগিয়াছে ধাধা বাঁধা প্রাণ ওই
পদযুগে। চিত্রি তব চিত্রপট শত
চিত্রকর ভ্রমিতেছে দেশে দেশে, তাই
মােহবশে তােম আসে পশেছি গােপনে।
মেহের বাঁধনে বেঁধেছি রাজনে, চাহি
তার পদে পুরস্কার, রণ রঙ্গ হলে
অবসান লতিব ও জীবন প্রতিমা
এই আসা ধরি এ জীবনে।
দেবল। ( বিষাদে) কুমার, কুমার! পাষাণী দেবল,নাহি
গুণরাশি বাঁধিবারে কেশরীরে প্রেম
মায়াজালে। আমি পাগলিনী প্রেম হীন।
এ হৃদয় লয়ে নিরাশায় আত্মহারা
যাপি গাে যামিনী। হের ওই নীলাকাশে
শত তারা হাসে, শশধর আশে ওই
হের ব্যাকুলা রােহিণী, চুর্ণ মেঘমালা
সাজাইয়া ডালা এলাইয়া কুন্তলের
বেণী হের প্রাণেশে ভেটিতে আসে।
কুমার। এ সংসার প্রেমের পাথার । গগন
তপন, তরু, মেরু, বিহঙ্গম, তটিনীর
আনন্দ লহরী, সব যেন প্রেমে তাের।
কমলা-হরণ ।
নূতন জীবন লভি নবীন বালক
মাতৃ প্রেমে আবদ্ধ সংসারে, প্রণয়
সাগরে দম্পতি, আনন্দে ভাের, হের
ওই ধাতার সৃজন; বিহঙ্গম করে
কলতান প্রণয়িনী জাগায়ে আদরে।
প্রেম হীন কে আছে সংসারে ? গ ত কত
কতদিন স্নেহময় পিতার ভবন,
আনন্দের চির নিকেতন, পরিহরি
ছদ্মবেশে পশিনু হেথায়। রূপবতী
তুমি দেবী ভবে অতুলনা, নাহি তব
গুণরাশি ! নাহিক প্রণয় সুকোমল
হৃদয় মাঝারে ! হেন চিত্র চিত্রকর
করেনি রচনা। প্রাণহীন যে রমণী
তার প্রতিদানে প্রাণ বিনিময়ে তবে
কোন প্রয়ােজন। কার তরে সৈনিকের
সাজ ? পিপাসিত লােলুপ যবনে কার
তরে করি শিক্ষা দান! নবীন জীবনে
কার তরে শূন্য প্রাণ অশান্তি মগন ?
কি বলিব পালক পিতারে জন্মদাতা
সম স্নেহে অনন্ত অপার, শিক্ষাদানে
বীর্যে জ্ঞানে অতুলনা করি কে করিল
খ্যাতি মান অবনী ভিতরে ? প্রেমহীনা
রমণীর তরে কর্তব্যের দিব বলি
দান ? নহে এ ক্ষত্রিয় ধৰ্ম্ম। ছার
প্রথম অঙ্ক।
১১
প্রাণ! কাল-রণে করিব বরণ, চিতা-
নলে হৃদি জ্বালা করিব নিৰ্ব্বাণ ।
( প্রস্থানােদ্যোগ )
দেবল। (হাত ধরিয়া) যেও না যেও না দেব ! ভ্রাতৃসম নিত্য
পূজি। আনন্দ অন্তরে ক্ষমা কর, সহােদর জ্ঞানে।
কুমার। না চাহি শুনিতে আর।
( প্রস্থান)
সীতা। কি করিলে প্রাণ সখি ? আশাতরু তার
হইতে মুকুলিত কুঠার আঘাত
ধরাশায়ী করিলে তাহারে ? রূপময়
গুণময় প্রেমের আধার, দীপ্ত বিভা
তনুচ্ছটা রমণীমােহন, মােহময়
আবেশ নয়ন, রমণীর দর্পহারী,
এ হেন কুমার নহে তব প্রণয়ের
ভাগী! হায় দূর ভবিষ্যৎ বিধিলিপি
হের ভয়ঙ্কর, বজ্রাঘাত সম যেন
ভীষণ গর্জন গ্রাসিতে আসিছে রাজ
পুরে, অচিরাৎ মনােবাঞ্ছা হইবে পূরণ !
দেবল। হায় সখি পরিণাম ভাগ্য ফল মম।
( উভয়ের প্রস্থান)
১২
কমলা-হরণ।
তৃতীয় গভঙ্ক।
গুজরাট অরণ্যমধ্যস্থ শিবালয় ।
(দেবল, সীতা, কমলা, উর্মিলা )
করযােড়ে গীত।
বিঘ্নহর বাঘার ভােলা ত্রিপুরারি,
আশুতােষ দিগম্বর শ্মশানবিহারী।
শিরে, কল কল নাদিত গঙ্গা তরঙ্গে,
লটু পট জটাজুট, বিভূতি অঙ্গে,
সর্প বিভূষণ, ডমরু বাদন, ভকতরঞ্জন হে,
দানবদলন, ভুবনমােহন, ঈশান ভীষণ ভয়হারী।
( সকলের প্রণিপাত )
উৰ্মিলা। দেখ কি সুন্দর নিবিড় গহন বন। ভগ্নী কমলা, ভগবান
স্বয়ম্ভর লীলাক্ষেত্র কেমন গম্ভীর, কেমন মহান দৃশ্য।
নিবিড় বিটপিকুল ছায়া দানে শীতলতা বর্ধন ক’ছে,
অদূরে নয়ন রাজি শস্য ক্ষেত্রের শ্যামল শােভা নীল
গগনের নীলিমা লহরীর কোলে মিশিয়া যাচ্চে।
বিশ্বপিতার স্নেহময় উদার আহ্বানে কাতর মানব
কেমন শান্তি লাভ করে, তা এই বন প্রদেশ দেখেই
অনুভব হচ্ছে। সুদূরে ভীম শৈলশ্রেণী উচ্চ শৃঙ্গ উত্তো-
লন করে সূর্য কিরণে কেমন ঝিক্ মিক্ কচ্চে।
আহা এই শান্তিময় ধামে নর-রাক্ষসের পদধুলিতে
প্রথম অঙ্ক ।
রক্তাক্ত হবে, প্রজাগণের আর্তনাদে, ভীষণ রণ
মিশে যাবে। এই কি আমাদের সুখ সম্মি-
লনের শেষ দৃশ্য !
কমলা। দিদি কই বিশ্বনাথ ত এ প্রাণের জ্বালা নিবারণ করি
লেন না। ভয়, যবনের ভয় ত ঘুচল না।
আমার প্রাণ কেমন আকুল হয়ে উঠচে, মন বলছে
আমার এই শেষ। হায়! কেন দুরাচার যবনগণ এমন
সুখের সংসারকে শ্মশান করে ? এ অত্যাচার এ ভীষণ
দৃশ্যের নিয়ােগকর্তা কি ভগবান, নয় ? তবে কেন
সমূলে সেই রাক্ষস বংশ ধ্বংস করেন না? তবে
কেন দীনের রােদন নিবারণ করেন না ? হায় !
ভগবান তুমি রক্ষা কর।
(রােদন )
উৰ্মিলা। ভগ্নী, মন স্থির কর, একমনে বিশ্বপিতার পদ যুগল
ধ্যান কর, তােমার কোন ভয় নাই। শত শত হিন্দু
রাজগণ গুজরাটে সমবেত হয়েছেন, অচিরাৎ ভীষণ
যুদ্ধানল প্রজ্জ্বলিত হবে, তাহার পরিণাম কি তাহা
ভগবানই জানেন। মানব নিজ কৰ্ম্মফল ভােগ
করবার জন্য জননী জঠরে জন্মগ্রহণ করে। আমরা
ক্ষত্রিয় রমণী, যবন ভয়ে ব্যাকুল হয়ে আত্মসম্মানে
জলাঞ্জলি যেন না দিই, যতক্ষণ একবিন্দু শােণিত এ
দেহে বৰ্তমান থাকবে যবন যেন স্পর্শে সক্ষম না হয়।
দেখাে ভগিনী দুৰ্ম্মদ আর রূপ লালসায় পদাঘাত
করে স্বর্গে গমন কর।
কমলা। হাঁ দিদি নিশ্চয়ই স্বর্গে গমন করব। ( সকলের প্রস্থান)
১৪
কমলা-হরণ।
চতুর্থ গভঙ্ক।
গুজরাট প্রমােদ উদ্যান।
( রাজা ও কমলা)
রাজা। আজই আমাদের এ আনন্দ নিকেতন পরিত্যাগ করে
দেবগিরি বনপ্রদেশে গমন ক’তে হবে। কত সুখের,
কত স্মৃতিময় রাজ প্রাসাদ পরিত্যাগ করে কোন
গহন বনে দিন যাপন ক’ব। হায় এই বৃদ্ধ বয়সে
কোথায় শান্তিতে কাল কাটাব, না ভীষণ ভয়াবহ
রণ সজ্জা। প্রিয়তমে! এই বােধ হয় আমাদের
শেষ মিলন, এ বৃদ্ধ বয়সে বৃথা যুদ্ধ সজ্জা। হৃদয়
শক্তিহীন ; দেহ জরাজীর্ণ ; ক্রমে কাল বশে কৃতান্ত
অগ্রসর হচ্ছে। সে যৌবনের উদ্দাম আবেগ ভরা
প্রাণ নাই, সে অদম্য উৎসাহ নাই, সে নব শক্তি
নাই। একদিন যে নবীন বলে অসি চালনা করে
নিজ স্বাধীনতা রক্ষা করেছি, আজি সেই আমি প্রাণ
ভয়ে ভীত, পলায়িত। হায় ভগবান, এ তােমারি
অনন্ত লীলা মাত্র। কমলা! কমলা! শুধু তােমারই
জন্য আমি কালরণে জীবন দিতে প্রস্তুত হয়েছি।
তুমি জান না প্রিয়তমে আমি তােমায় কত ভালবাসি।
এ পুত্রহীন গুজরাট রাজা, সােণার জন্মভূমিকে যবন
করে সপে দেবে ? না, তা পারব না। মৃত্যু নিশ্চিত।
কমলা, তােমার পিতৃভবন দেবগিরি তােমার সকল
ক্লেশ ভুলিয়ে দেবে, তখন আমায় কি মনে পড়বে
কমলা ?
',
প্রথম অঙ্ক।
কমলা। মহারাজ দাসী কি অপরাধিনী হয়েছে? কেন তার
নিৰ্বাসন দণ্ডাজ্ঞা ক’ছেন? আপনি স্বামী, আপনাকে
এই ভীষণ রণ মাঝে নিক্ষেপ করে পিতৃ-গৃহে
যাবার এই কি সময় ?
রাজা। প্রিয়ে, কুমারের আদেশে তােমাদের বন গমন ব্যবস্থা।
যবন যুদ্ধে জয় পরাজয়ের নির্ণয় নাই, সেই জন্য
কুললক্ষ্মী বৰ্জন ক’চ্চি। রাণী উর্মিলা, দেবল, সীতা
ও তুমি রক্ষকদিগকে সঙ্গে লয়ে বনে গমন করবে।
কমলা। না আপনি যুদ্ধে গমন করবেন না; চলুন দেবগিরি
লয়ে যাই। কুমার আপনার প্রতিনিধি হয়ে যুদ্ধ দান
করুন।
রাজা। আমার প্রাণাধিক কুমারকে এ কারণে একা রেখে
যাব না। রাণী, কুমার সামান্য সৈনিক নয়, দেবগিরি
রাজ পুত্ৰ কুমার দেব। আমার সার্থক, জীবন,
দেবলের বিনিময়ে পুত্র লাভ ক’ব।
কমলা। দেবগিরি রাজপুত্র কুমার দেব, হা ভগবান, একি
( মূচ্ছ।)
( কুমারের প্রবেশ )
মহারাজ রাণীমাদের লয়ে আপনি এ প্রদেশ ত্যাগ
করুন, আমার পিতা আপনাদের রক্ষা করবেন।
সন্তানের এ অনুরােধ উপেক্ষা করবেন না।
( পদ ধারণ)
১৬ কমলা-হরণ। রাজা। (আলিঙ্গন করিয়া) বৎস, চিরজীবী হও; তােমার বাক্য- পালনে যত্নবান হব। কুমার। এ কি দেবী ! কমলার মূচ্ছ। হ’ল কেন ? (ব্যজনে প্রবৃত্ত) কমলা। ( প্রলাপে ) কোথা মম শৈশবের মধুর জীবন? রঞ্জিত সুচারু চিত্রপট চিত্তপটে মম, মরি মরি সে চারু বয়ান শতই শােভা রাশি, সে নীল নয়ন দুটি প্রেমে সদা ভাের, কোথা সেই বাল্যসখা কোথা সে কুমার ? হৃদয় আসন মাঝে পূজি যে মূরতি, পুনঃ কি পাইব দেখা তার ? তরুণ অরুণ মাখা নব শােভারাশি এ ছার নয়নে হায় আর কি হেরিব । কুমার। দেবী জননী চিত্ত স্থির করুন, বন প্রদেশে যাবার সময় হল। রাজা। কমলা, তুমি তােমাদের রাজ পুত্রকে চিনতে পারছ না। কুমার। দেবী কমল, মাননীয় সচিববরের একমাত্র কন্যা। আমার সােদরাতুল্য। এক্ষণে পরম আনন্দের বিষয়, ভগ্নী আমার জননীর আসনে সমারূঢ়া। কমলা। উঃ! মহারাজ আমি যাই। (বেগে প্রস্থান)। রাজা। দেবী এমন ক্ষিপ্তের ন্যায় অগ্রসর হলেন কেন, যাই, বােধ হয় মনােমধ্যে যবনভয় উদয় হয়েছে।
প্রথম অঙ্ক।
১৭
কুমার। মহারাজ, আর সময় নাই, শীঘ্রই গমনের আয়ােজন
করুন, রাণীমা এবং অন্যান্য পুরনারীগণকে অগ্রেই
পাঠান কর্ত্তব্য।
রাজা। ( আনন্দে আলিঙ্গন করিয়া) বৎস! এ স্নেহের পুরষ্কার
আমার একমাত্র দুহিতা দেবলকে তােমার করে
সমর্পণ করে জীবন সার্থক করি। ভগবান যুদ্ধে
তােমার সহায় হন।
( উভয়ের প্রস্থান)।
কমলা-হরণ।
দ্বিতীয়
অঙ্ক।
প্রথম গভঙ্ক।
দিল্লী রাজসভা।
ঈশ্বরী।
( আলাউদ্দীন, পুত্রদ্বয়, সভাসদগণ, কাফুর )
অালা। মন্ত্রিবর!
শুনেছি সে রূপবতী গুজরাট রাণী
রূপে নাকি স্বর্গীয় অপ্সরা ? গুণবতী
ভুবনমােহিনী কমলা কমলতুল্যা ?
এ হৃদয়-সরে ফুটিবে সে কমলিনী
হৃদয়
সৌরভে তাহার, চির
শােভাময় এই দিল্লী সিংহাসন, নব
শােভা করিবে ধারণ। ক্ষুদ্র গুজরাট
কোলে শােভিবে সুন্দরী! দিল্লী কাঁদে তােমা
বিনা ! বাদসাহ আলা সাদরে পরিবে
হৃদে
স্বর্গীয়
সুষমা। সাজাও সাজাও
সৈন্যগণ, উঠুক গগনভেদি জয়
জয় রােল, ঘােরনাদে দাও ভেরীধ্বনি।
যাইব আপনি হেরিতে সে সৌন্দর্যের
খনি, গুজরাট করিব শ্মশান।
রাজপুত কি জানিবে প্রণয়ের খেলা !
দ্বিত য় অঙ্ক। ১৯ কমলা! কমলা! মম হৃদয় রতন। আমি বাদসাহ দিল্লীর ঈশ্বর। ময়ী সুন্দরী ভারত আমারি আমারি যবে লুটাইবে পদতলে, ক্ষুদ্র রাজ- গণ কাপিবে বসুধারাণী যবনের নাদে। ঘুচে যাবে হিন্দুর গরিমা, মুছে যাবে হিন্দু নাম ভারত ভিতরে। রাজ্য ধন আত্ম পরিজন, বীর গর্ব হিন্দু- কুলমান লুটাইবে মম পদতলে। ( হা! হা! হাস্য।) উজীর। জাহাপানা! কাফের রমণী আপনার যােগ্য নহে হইতে বেগম। তাতারের রূপবতী সৌন্দর্য্যের খনি, রমণীর শ্রেষ্ঠরূপ ভারত হইতে। আজ্ঞাধীন দাস আজি শত রূপবতী উপহার, দিবে শ্রীচরণে। হিন্দু নারী নহে তার একাংশ সমান। ক্ষুদ্র হিন্দু, ক্ষুদ্র দেশ, আছে কি তথায় হেন সুন্দরী রমণী ! দিল্লীর ঐশ্বৰ্য বেশভূষা মণিময় হীরক কাঞ্চন কোথা পাবে ক্ষুদ্র রাণী ? ক্ষুদ্র রাজা গুজরাট পতি? রমণীও তেমনি মােহিনী ! মিথ্যাবাদী গুপ্তচর করেছে ঘােষণা। আলা। ( সহাস্যে ) ভুলায়ে না মন্ত্রির প্রতারণা করি।
২০,
কমলা-হরণ।
হের চিত্র ; চিত্রকর একেছে যতনে
অনুপমা রমণী রতন, বাদসাহ
ভ্রম নাহি জানে, হিন্দুস্থানে আছে বহু
লুকায়িত মণি, তাতার রমণী বাদি
যােগ্য নহে পদে তার। বৃদ্ধ তুমি রূপ
কি বুঝিবে ? আঁখি মেলি হের চিত্রপট,
পুষ্প হস্তে বৃক্ষবাটিকায় একাকিনী
অভাময়ী নলিনীনয়না শূন্য পানে
কি যেন হেরিছে! ও নয়ন নহে এই
পৃথিবীর সৃজিত সুন্দর, স্বর্গ শােভা
পুষ্পনিত সুকোমল তনু, হরিণাক্ষি
নহে এ উপমা, ভাবময় ভাষাময়
নয়ন যুগল।
আধ হাসি বিশ্বধরে আবেশে খেলায় ।
চাই এ রমণী আমি,
নাহি চাহি উপদেশ বাণী,
কাফের রমণী হৃদয় ঈশ্বরী মম।
কাফুর, যাও ত্বরা সৈন্য সমাবেশে।
বীর বেশে যাইর পশ্চাতে।
কাফুর। যথা আজ্ঞা জাহাপনা।
(প্রস্থান)
উজীর। জনাব, এ বান্দা কিবা জানে উপদেশ ।
প্রভুর কৃপায়, দাস বলি মার্জনীয় সদা।
( অভিবাদন করিয়া প্রস্থান)
আলা। সােণার ভারতভূমি ঐশ্বৰ্য্যরূপিনী
"
দ্বিতীয় অঙ্ক ।
= =
লভিব এ বাহুবলে মম, অলস সে
উন্নতির আশা হৃদি হতে বিসজ্জিয়া
বৃথা ঘুরে মরে।
স্বকাৰ্য সাধনে এই প্রতিজ্ঞা আমার।
বৃদ্ধ খুল্লতাত রক্ত করিয়াছি পান,
লভিয়াছি সিংহাসন বিন সাধনায়।
রাজপুতানায় জাগাইব মহম্মদ নাম,
গুজরাট সনে, চিতােরের ভাগ্যলিপি
হবে ফলবান্। রাজপুত বীরগৰ্ব রবে না মহীতে,
পদানত হবে যত হিন্দুরাজগণ,
অধীনতা করিবে স্বীকার হিন্দুস্থান
অধিবাসী ম্রিয়মান রবে দীন হীনের মতন ;
নতশিরে আজ্ঞা মম করিবে বহন।
নহিলে আলার রােষ উদশারি অনল
ভীষণ শ্মশান ভূমি করিবে মহীরে।
মােবারক । কি আজ্ঞা পালিবে, দাস এ সমর মাঝে
করহ আদেশ পিত সন্তান যুগলে।
আলা। মােবারক, রাজধানী রাখিও যতনে,
শাসন পালন ভার জেন তবেপরে।
সমসের, গুজরাটে হও অগ্রসর ;
বনমাঝে রচিয়া শিবির, আক্রমণ
কর রাজধানী। চল যাই বিশ্রাম কারণে।
। মােবারক ও বাদসাহের প্রস্থান।)
( চিত্রপট লইয়া জনৈক চিত্রকরের প্রবেশ)
।
কমল হরণ ।
সাহাজাদা রচিয়াছি সযতনে
দেবল সুন্দরী গুজরাট রাজকন্যা
জগতমােহিনী। আপনার যােগ্য সেই
রমণীরতন। ওই উর্ধে নীলাকাশ
মাঝে স্বর্ণছটা তপন কিরণ ছায়া-
ময়ী শীতল প্রদেশ, ঘন শৈল বন
ভূমি ধূসর বরণ, ওই ক্ষুদ্র বন
বিহঙ্গম কলতানে গাহিছে সুন্দর ;
সুনীল নাদিনী ওই তটিনী সুন্দরী,
শিলাময় সােপান উপরে হের চিত্র
রমণী সুন্দর, বামগণ্ড করতলে
করিয়া স্থাপন কি যেন ভাবিছে বালা ;
অধরে ফুটিছে মৃদু হাসি ; নব শােভা
নবীন যৌবনে, বসন্তের ফুলরাণী
হ'তে শােভা নবীন মুকুলে। হের যেন
শারদ চন্দ্রমা, অস্তমিত দিনমণি
হেরি ধরাতলে এসেছে রমণী সাজে
•
ভুলাতে ভূবন।
সমসের। ( চিত্র হস্তে ) মরি মরি! চিত্রকর ধন্য শিল্প তব।
সার্থক জীবন মম এ হেন রমণী ধ্যানে।
হায় এ জীবনে বারেক কি হেরিব বালায় !
চল চিত্রকর মুদ্রা তব করিবে গ্রহণ,
অমূল্য হৃদয় মণি করিলে অর্পণ! ( উভয়ের প্রস্থান)
দ্বিতীয় অঙ্ক। ২৩ দ্বিতীয় গভঙ্ক। গুজরাট বন মধ্যস্থ যবন শিবির। ( বাদশাহ, কাফুর, সমসের, সৈন্যগণ ) বাদসাহ। যাও সৈন্যগণ বৃথা কালবিলম্ব করে না। এখনি রাজ- ধানী বেষ্টন করগে। যাও কাফুর উত্তর প্রদেশ সকলের গুপ্ত বন পথে সৈন্যগণকে লুক্কায়িত রাখিয়া স্বয়ং রাজধানীর অবস্থা পৰ্যবেক্ষণ করগে। সমসের! সম্মুখ যুদ্ধ গ্রহণ কর। যাও রণভেরীনাদে আমাদের আগমন গ্রামবাসীকে প্রচার কর। সাবধান সৈন্য- গণ! রণকুশলী রাজপুতগণকে অবহেলা করে যুদ্ধ দান ক’র না। এই সমর প্রাঙ্গনে অস্ত্রধারী বীর রাজগণের আবির্ভাব হবে। দেখাে, দেখাে, সবে যেন মহম্মদধৰ্ম্ম হীনপ্রত করো না। বীর দর্পে হিন্দুদলনে প্রবৃত্ত হও। একজনও যেন পলায়নে সক্ষম না হয়। দাও দয়া ধৰ্ম্ম স্নেহ মমতা বিসৰ্জন দাও, সংহার-মুর্তি ধারণ করে রণসাগরে অবতীর্ণ হও। হিন্দু নাম হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত কর। পাঠানের জয় ধ্বনি ঘােষণা কর। জাগাও জাগাও মহম্মদ নাম, জয় মহম্মদের জয়। সৈন্যগণ। জয় মহম্মদের জয়। আল্লা হাে ! (গুড়ুম গুড়ুম কামান গর্জন) সৈন্যগণ। জয় বাদসাহের জয়। ( সকলের প্রস্থান।)
কমলা-হরণ।
তৃতীয় গভঙ্ক।
গুজরাট প্রমােদ উদ্যান।
( গুপ্তদ্বারপথে কমলার প্রবেশ )
কমলা।
বারেক হেরিয়া তারে, চলে যাব আজি
হায় জনমের তরে। গােপনেতে আসি
এই উপবন মাঝে একাকিনী শেষ
দেখা দেখিব তাহায়, বনভূমি করি
অতিক্রম আসিয়াছি গুপ্তভাবে রক্ষি-
গণ নাহি জানে এ সব কাহিনী। কই
আমার কুমার ! বিফল বিফল আশা
তার! হেরি যেন সুখময় বাল্যস্বপ্ন
গাঁথা, হেরি যেন নূতন সংসার। এই
সেই প্রমােদ কানন, পিকগণ 'কুঞ্জ
বন করে মুখরিত, লতায় লতায়
তরুবরে করে আলিঙ্গন। শ,ন্যময়
রাজ উপবন, শুন্যময় স্বপ্নময়
আমার জীবন। এই শেষ জীবনের
সব লীলা খেলা, ফরাবে কি জীবলীল।
ঘবনের ভয়ে ! ভীষণ সংগ্রাম মাঝে
আমার কুমার ! আমি শান্তিময় ধামে
যেতেছি আদরে। কুমার! কুমার !
এস এস বারেক হেরিয়া চলে যাব
জনমের তরে, আর না হেরিব তায়।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
২৫
(বেগে কুমারের প্রবেশ।)
কই, কই মহারাণী? একি! একি! একা
কেন প্রমােদ কাননে ! হের হের মা গাে
আসিছে যবন বনপথ হােতে, হায়
পশি ছদ্মবেশে লুকাইয়া কাননের
কোলে কি ফল লভিলে বল ? চল, চল
ত্বরা, বিলম্বেতে বিঘ্ন বহুতর।
কমলা। আসিয়াছি প্রয়ােজনে উদ্যান ভিতরে।
আসিছে যবন, ভয় কি কারণ, প্রাণ
ভয়ে ভীত নহে ক্ষত্রিয়রমণী! মৃত্যু,
মৃত্যু মম অদৃষ্টলিখন।
কুমার। (বিস্ময়ে )
প্রয়ােজন কিবা তব, করিলে আদেশ,
নতশিরে আজ্ঞা তব করিব পালন।
জীবন হইতে শ্রেষ্ঠ, সতীত্বভূষণ,
রাক্ষস পিশাচ আলা, নির্দয় হৃদয়,
তাই বড় ভয়, কহ মাগাে! কি আদেশ তব ?
কমলা। কুমার, কুমার! ভুলেছে কি নিত্যসঙ্গী
শৈশবসঙ্গিনী ? কভু মনে পড়ে না কি
অভাগিনী বালা ? তব মুখ স্মরি হায়
কাতর পরাণে দিবানিশি ঢালে বারি-
ধারা ? ভাবী পতি তুমি প্রাণসখা, পিতৃ-
সত্য না করি পালন, ছদ্মবেশে পশি
৩
কমলা-হরণ।
হেথা রয়েছে গােপনে। সেই আমি,সেই
তুমি, কোথায় আমার জীবনের চির
সুখসাধ, বজ্রাঘাতে ভাঙ্গিলে অচিরে!
এসেছি গােপনে হেরিতে ওমুখখানি
হৃদয় ভরিয়া। ব্যথাভরে কত কথা
জাগে এ পরাণে, হেরিতে ও মুখশশী
পাগল পরাণ। চলে যাবাে জনমের
তরে, কার তরে এ সংসারে রব আমি
আর ? ল’য়ে হৃদি হাহাকার শােক-অশ্রু-
ল? মরণ সম্বল মম, তাই সখা
শেষ দেখা এসেছি দেখিতে।
কুমার। ( ঘৃণায় )
ছি ছি ঘৃণাভরে বিদরে হৃদয় । হ'য়ে
রাজরাণী, পিশাচিনী হইলে কেমনে ?
যবে ক্ষুদ্র শিশুরূপা জনক-অঙ্গনে
নাচিয়া খেলিতে রঙ্গে, ভাবিতাম মনে
স্বর্গের এ দেববালা মর ত ভুবনে।
রাখিতাম সহােদরা সম, প্রিয়তরা।
যদি না সে চিত্রকর ধরিত নয়নে
রাজার কুমারী-চিত্র দেবল সুন্দরী,
পিতৃসত্য পালিতাম যতনে আদরে।
কিন্তু হায়, পাগল পরাণে ছদ্মবেশে
পশিনু হেথায় ? আমার দেবল কই
দ্বিতীয় অঙ্ক :
২৭.
জীবন প্রতিমা, ভেঙ্গে গেছে সুখস্বপ্ন,
ফুরায়েছে সুখ-সাধ জনমের তরে।
কমলা! ভুলে যাও বাল। কথা, পাল নিজ
কৰ্ত্তব্য আপন, ধর্মে মন কর সমাপন,
পতি-সেবা সতীর ধরম!
কমলা। ভুলে যাবে ওই মুখশশী ? যাও, যাও
নিরদয় সখা ! ভীষণ শ্মশানসম
রাজপুরী মাঝে অদৃষ্ট পরীক্ষ। মম,
মরণ সুন্দর!
কুমার। (সরোষে )
রবে একাকিনী সুন্দরী রমণী, লাজ
নাহি জীবনে তােমার! হােয়ে রাজরাণী,
ঘৃণিত জীবন কেন না কর বর্জন ?
পর পুরুষের সনে হেন আচরণ
রমণীর শােভা নাহি পায়। লজ্জা রাখে
গােপনে রমণী। পিতার সমান শ্রেষ্ঠ
গুজরাটপতি, প্রতিনিধি আমি তার,
পুত্র আমি তব, যাও মাতা বনমাঝে,
হও অগ্রসর, পশ্চাতে যাইবে দাস
তব। চল শীঘ্র, বিলম্ব না সয়।
কমলা। জনমের শােধ আসিয়াছি বনপথ
হােতে, যবন হইতে আত্মরক্ষা
করিব নিশ্চয়। যাও তুমি, যথা ইচ্ছা হয়।
২৮
কমল হরণ।
কুমার। কি করিলে অভাগিনি সর্বনাশ মাের।
পুরী রক্ষা কে করিবে, সম্মুখসমরে ?
রক্ষিতে তােমারে রহিলাম উপবনে,
সৈন্যগণে কেবা দিবে সমাচার ?
( নেপথ্যে আল্লা আল্লা হাে)
কুমার। ওই, ওই আসিছে যবন। মহারাণি ! রাখ
নিজ মান, মৃত্যুপণে, সতীত্বের রাখ
সমাদর। রাখিতে রাজার মান, এই
নাও বিষ, সঙ্গে রাখ অভাগিনি। ( বিষদান।)
কমলা। (বিষ লইয়া)
সুখী হও চিরদিনে, মৃত্যু আলিঙ্গনে
মিটাই জীবনসাধ।
( সৈন্যগণ সহ মহীপালের প্রবেশ )
কুমার। যাও, যাও সখে, বাধা দাও যবনেরে,
একাকিনী মহারাণী উদ্যান মাঝারে
রাখ, রাথ মান ক্ষত্রিয় সন্তান, প্রাণপণে
রাখ আজি হিন্দুর ধরম, হিন্দুনারী
করই রক্ষণ।
( জয় কুমারের জয়।)
(নেপথ্যে আল্লা আল্লা হে।।)
কুমার। (কাতরে) কুক্ষণে জনম অভাগিনী, পাপগ্রহ
রূপে সর্বনাশ করিল রাজার।
ভগবান শক্তিদাও, রণজয়ে রাখ, রাখ সতীমান ।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
(বিজয়ী যবন সৈন্যের সহিত বাদসাহের প্রবেশ)
কুমার। ঝাঁপ দাও মহারণি, তটিনী সলিলে
রূপরাশি করহ গােপন। রাখ, রাখ
সতী দেহ।
কমলা। যাই, যাই, কোথা ভগবন্! ( জলে পতন )
বাদশাহ। যুদ্ধকর সৈন্যগণ, কোথায় রমণী ?
ওই, ওই হের নদীজলে।
( সৈন্যগণ সহিত হিন্দু সৈন্যের ঘােৱযুদ্ধ
ও কমলার অচেতন দেহ উত্তোলন)।
কুমার। (যুদ্ধ করিতে করিতে)
আরে, আরে যবন বৰ্ব্বর ! রমণীর
সর্বনাশে বাসনা তােমার, পুরস্কার করহ গ্রহণ।
( অস্ত্রাঘাত )
বাদসাহ। উঃ ! রক্ষা কর কে আছ হেথায়।
(বেগে সৈন্য সহ কাফুরের প্রবেশ।)
কাফর। কুমার, বৃথা অহঙ্কার তব,
ধর তরবারি, এই সহ অস্ত্রাঘাত
( কুমার অচেতনে পতন ও বন্দী।)
বাদসাহ। যাও, এই দুরাচারে শৃঙ্খল বন্ধনে
ল'য়ে যাও আঁধার কারায়। মম আজ্ঞা
বিনা, নাহি কেহ করহ প্রবেশ।
কাফুর, ল'য়ে যাও রমণীরে।
উপযুক্ত চিকিৎসার বলে, প্রাণ পাবে
কমলা-হরণ।
সুন্দরী রমণী, ল'য়ে যাও যতনে
শিবিরে। রাজগৃহে মণিমুক্তা কর
অন্বেষণ, গুপ্তধন আছে কোনস্থানে ?
বৃদ্ধরাজা কোথায় গােপনে,
কোন দেশে গেছে পলাইয়া।
চাহিনা তাহায়, কমলার তরে পূর্ণ আশা
রণ জয় মাের।
সকলে। জয় বাদসাহের জয়!
চতুর্থ গভঙ্কি।
দিল্লী রাজপ্রাসাদস্থ উপবন।
সিংহাসনে বাদসাহ পার্গে সেলিনা, আমিনা।
বাইজীগণের প্রবেশ ও গীত।
হাসে শশধর, ওই সুনীল গগন কোলে,
মলয় পবনসনে ফুল হাসে ঢলে ঢলে।
প্রেম হৃদয়ে মাখি কোকিল ধরিছে তান,
প্রণয়িনী প্রিয়সনে প্রেমে করে আলিঙ্গন,
সুখেরি স্বপন আজি, উজ্জলে মধুর সাজি,
কত আশা ভালবাসা সুখময় ভুমণ্ডলে।
বাদশাহ। অতি সুন্দর, অতি সুন্দর সঙ্গীত। লে আও সিরাজী,
লে আও সিরাজী, বদি, বদি, জলদি জলদি আও।
এমন সুখের স্বপ্ন, এমন সুন্দর জীবন, খােদা বাদসার জন্য
সৃজন করেছেন। যার জন্য এই উৎসবের আয়ােজন সে
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩১
আজি বিকারে অচেতনা। কমলা! কমলা ! জাগো,
জাগাে, বাদসাহের মনােবাসনা পূর্ণ কর। দিল্লী
সিংহাসনের শােভা বিস্তার কর। এ সুখময় আনন্দ
নিকেতনে আমার বড় সাধের ধন কমলা জ্ঞানহীনা।
ভিষগণ বলেছে, ভয় নাই প্রাণের আশা আছে।
তবে, তবে আবার সেই ভুবনমােহিনীকে আমার
বলতে পাবাে ? খােদা ! তােমার অপার কৃপা। পাঠান
জাতির উত্থানে হিন্দুর পতন অনিবাৰ্য। এ দুনিয়া অতি
সুন্দর, অতি সুন্দর। যাই, বিবিকে দেখে আসি।
( প্রস্থান)
আমিনা। বেগম সাহেবা! ও হিঁদুর বিবিটা দিনরাত এমন
চিল্লায় কেন ? ওর কি হয়েছে ? হায়, হায় ! ও হিঁদুর
বিবির গােলামী করতে হবে ? হামাদের কি নসীব।
আল্লা বাদসার বেগম করেছেন, এ আপদটা কোথা
হােতে এসে সব গােলমাল করে দিলে। দুনিয়ার
মালিক বাদসা, রাণীটার লেগে ছটফট করতেছে।
হায়, হায়, জান হায়রাণ হােয়ে গেলাে। বাপরে বাপ!
জঙ্গলি রাণীর এত নসীব জোর ?
সেলিনা। ( সহাস্যে ) আমিনা বিবি ! বাদসাহ হুকুম করেছেন,
ওই রাণীটার সেবা করতে হবে। গােলাপ জল ছিটাতে
হবে, পাথা করতে হবে। আতর মাখাতে হবে, কেশ
বিনাতে হবে। এ
এসব আমাদের করতে হুকুম দিয়ে-
ছেন। রাণী বড় বেগমসাহেব হবে। আমরা।
তাহার বাঁদিগিরি করবাে। পারবে তাে আমিনা ?
৩২
কমলা-হরণ
আমিন। ( গর্জিয়া)
কি। বাদির কাম হামাদের করতে হােবে! জান যায়
সেবি আচ্ছা হয়, হাম বদিগিরি শিখবাে না। আমি
তাে বাদসা মােবারক সাহেবের মা; সাত পয়জার
মারি জঙ্গলি রাণীর মুখে।
( প্রস্থান)
সােফিয়ার প্রবেশ।
সােফিয়া। মাগাে! ওই আসে, ভেসে ভেসে রমণীর
করুণরােদন, শূন্য আঁখিতারা, ঝরে
বারিধারা, বেদনায় ব্যথা লাগে কায় ।
মরি, মরি ! এহেন সুন্দরী কেন মাগাে
নরক আবাসে ? কত হাসে, কত কাঁদে
অবােধ রমণী পাগলিনী যেন ভাবে
ভাের। বিকট শ্মশান ভূমি বাদসা
আগারে হেরি নিত্য পিশাচের লীলা।
বিলাসের স্রোতে ভেসে আসে নরকের
প্রেত। পাপমম শুন গো জননী! ধরি
মহম্মদবাণী, এ পাপিষ্ঠ জাতি হিন্দু-
ধৰ্ম্ম করিল বিলােপ ; এনহে আদেশ
তার। বিজাতি, বিধৰ্ম্মি দলি পদতলে
নিত্য করে পাপাচার শাসনের ভানে।
প্রজা কাঁদে করুণ বােদনে, সতী কাঁদে
পতিশােকে তিতিয়া বসন, শিশু কাঁদে
মাতৃহীন কঠোর শাসনে, এই শিক্ষা
দ্বিত য় অঙ্ক। এই ধৰ্ম্ম জননী আমার ? হা বিধাতঃ ! কেন হেন পাপিষ্ঠ সন্তানে বজ্রাঘাতে নাশনা সমূলে ? ( রােদন) সেলিনা। (কাতরে) চুপে চুপে মুছে বারি, পাপ রাজপুরী। যাইবে জীবন, যদি বাদসাহ শুনে। অকারণ না কর রােদন, ভগবানে রাখহ বিশ্বাস। দিল্লী সিংহাসন এই- রূপ কলঙ্ক ভূষণ, হিন্দুস্থান কাপে যার নামে সেই বাদসাহ পি তব, ভীষণ আকার। অবলা রমণী, পতি- দ্রোহী হব মা কেমনে! পতি ধৰ্ম্ম, পতি কৰ্ম্ম, জীবনে মরণে। কৰ্ম্মফল মম জীবনের, কৰ্ম্মফলভাগী তুমি সুতা অভাগিনী। ছলনায় রচিত প্রাসাদ, শত্ৰুপুরী স্বামীর আবাস। সােফিয়া। মাগাে! দণ্ড যদি মরণ সুন্দর, কেবা চায় দুখভার জীবন বহিতে! এইরূপ কতকাল বদ্ধ কারাগারে লীলাখেলা হেরিব ভীষণ, মৃত্যুপণে রমণীর মুছাব রােদন, ঘুচাইব শৃঙ্খলীর বেদনার ভার, ছেড়ে দিব বনপাখী স্বাধীন কাননে, যাবে চলি নিজালয়ে।
৩৪
কমলা-হরণ।
মুগ্ধপ্রাণে হেরিব সে সুন্দর মুরতি !
আজ্ঞা দেহ তনয়ারে তুমি ।
সেলিনা। হায় অভাগিনি আপনি মজিবে,
মজাইবে জননীরে !
সােফিয়া। ( সহাস্যে )
কৌশল, কৌশলজাল করিব বিস্তার।
বাদ সাহে পাড়াইব ঘুম, মাদকের
সুধাপানে হারাবে চেতন, মাতামহে
করিয়া সহায়, রত্নপণে রক্ষীগণে
বাঁধিব যতনে, উদ্ধারিব কুমারেরে,
বদিবেশে কমলারে পাঠাবাে যমুনা।
শূন্যহবে রাজনিকেতন, ভ্রাতা মম
বনদেশে করিবে গমন, আনিবারে
দেবল সুন্দরী, কাফুর যাইবে সাথে ।
মােবারক রাজস্থানে যাইবে অচিরে
সেনাদল সাথে করি পদ্মিনীর তরে
বাদসাহ আজ্ঞাবলে। ভগবানদয়া।
গগা জননী, শুভযােগ ললাট লিখনে !
ঘুচে যাবে জীবনের ভার, সতীনারী
অনুতাপ আর না শুনিব ।
সেলিনা। ভীষণ সাহস তব ! ভুজঙ্গ বিবরে
হস্তক্ষেপ বাসনা তােমার ! অগ্নিসম,
পাঠান অনল জ্বলিবে, জ্বলিবে ধু ধু
করি, কেমনে নিবে তায় ! ভস্মীভূত,
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩৫
হবে প্রজাগণ, রাজস্থানে রাজপূত
নাম, নাহি রবে ধরামাঝে। রূপতৃষা
বড়ই প্রবল, উত্তাল তরঙ্গ মালা
সাগর তুফান, নারে হায়, বাধা দিতে।
ভীম শৃঙ্গ শৈলমালাশ্রেণী অগ্নি-
ময় প্রচণ্ড পৰ্বত রােখিবারে নারে
তারে, রূপতৃষা হ’তে। এজগতে হৰ্ত্তা
কৰ্ত্তা তিনি সে বিধাতা, পাপপূণ্য
করেন বিচার।
সােফিয়া। মাগাে! তােমারি কৃপায় ধরি শক্তি হৃদি
মাঝে, সিংহ সনে সিংহিনী যুঝিতে পারে,
সিংহশিশু সিংহে নাহি, ডরে। ধৰ্ম্মবলে
ভগবান করে বলীয়ান, সাধুজনে ডরে পাপী।
( উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম গভঙ্কি।
দিল্লী রাজপ্রাসাদস্থ প্রমোদ ভবন।
কমলা শায়িত।
কমলা। ( প্রলাপে ) যাই, যাই কুমার! মেয়ােনা মেয়ােনা, ঘৃণা
কোরােনা, আমি পাপিনী, তাই লুকিয়ে তােমায়
দেখতে এসেছি। ওই যে যবন আসছে, বাদসা
আসছে, আমায় ধরবে। ধরুক, আমায় রাখতে তাে
পারবে না, আমি বিষ খেয়ে মরবাে, সত্যই মরবাে,
কমলা-হরণ।
কলঙ্ক ঘুচাবাে। রাজা কোথায়, একবার তো এলেন
না, পাপিনী বলে ঘৃণা করলেন, দয়া করলেন না?
আমার জন্য তার বড় কষ্ট হয়েছে। বনে বনে ঘুরতে
হােচ্চে, আর আমি কেমন চুপকরে সুখে ঘুমিয়ে
আছি, আঃ বড় কষ্ট বড় যাতনা! আমার সব কোথায়
গেল ? সােণার গুজরাট শ্মশান হােলাে! (নিদ্রামগ্ন)।
বাদসার প্রবেশ।
বাদশা। মরি, মরি, হৃদয় ঈশ্বরি, কল্পনায়
ধাতার সৃজন, নবনীত বিনিন্দিত
কিবা বাহুদ্বয় এলায়ে পড়েছে নিদ্র। -
ঘােরে, ক্ষণে ক্ষণে গভীর নিশ্বাস বক্ষ
তেদি উঠে ধীরে ধীরে। পয়ােধরভারে
কৃশােদরী কিবা শশাভা পায় ! কিবা ভুরু-
শােভ ধনুক আকার, ইন্দীবর নিন্দি
আহা আয়ত নয়ন। কে যেন মল্লিকা
পুষ্প রমণী-আকারে যতনেতে করেছে
সৃজন! অতি শুভ্র আরক্তিম কপােল
যুগল, ক্ষুদ্র বিশ্বধরে মৃদু হাসি
কেমন সুন্দর। মুগ্ধ মন প্রাণ, যেন
মৰ্ত্তধামে স্বর্গবাল। করিছে বিরাজ।
নাহি মানে মানা এ পরাণ, একবার
চুমি চন্দ্রানন।( অগ্রসর হইয়া), কমলা দেবি!
কমলা। ( জাগিয়া) কে তুমি !
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩৭
বাদসা। আমি বাদসাহ, দাস তব !
কমলা। আরে, আরে নরাধম, সতীদেহ
কর স্পর্শন, ভগবানে ভাব
দুরাচার। হও যদি পুনঃ অগ্রসর,
বিষপানে ত্যজিব জীবন। এইবিষ,
কররে দর্শন।
বাদসাহ। ( কাতরে )
ক্ষম দেবি! দেব আকাক্ষিত তনু হব।
রূপমােহে উন্মত্ত পরাণ, আত্মহারা .
হেরিয়া তােমায়, শিহরে পুলকে তনু
হেরিয়া মাধুরী ; এস, এস প্রাণেশ্বরি
বাদসাহে দাস বলি করহ মার্জনা
হৃদাসনে এস গুণবতি। ভাগ্যবতি,
তবপ্রেম মম অভিলাষ, ধনরত্ন
সিংহাসন, তব শ্রীচরণে করিলাম
সমর্পণ, এস হৃদে, এস প্রাণেশরি!
(হাত ধরিতে অগ্রসর)
কমলা। (সরােষে )
আরেরে বর্বর! জীবন অধিক ধন
সতীত্ব ভূষণ, ছার লােভে সতীনারী
করে বর্জন। যাহ শীঘ্র দুরাচার।
( বিষ পানােগ)
বাদসাহ। ( করষােড়ে)
রাখহ বচন, বিষপানে না ত্যজ
- -
৪
৩৮
কমল-হরণ।
জীবন, স্পর্শিব না কায়া তব, দিলাম
সময়, পীড়া অন্তে তনু তব ধরিব হৃদয়ে।
(বাদসার প্রস্থান)
(সেলিনার প্রবেশ )
;
সেলিনা। ( সহাস্যে) কি ভয়, কি ভয় মহারাণি বাদসাহে
সতীগর্বে করিলে বিজয়। ধন্য তুমি,
শতধন্য জীবন তােমার ! ভাগ্যবতি
তব পরশনে, তব দরশনে নারী-
জন্ম স ল আমার। পীড়াভানে নাহি
প্রয়ােজন, বাঁদিবেশে যাও যমুনায়
সঙ্গে যাবে অনেক প্রহরী ; আজিনিশা
গভীর সময়, মিলিবে কুমার তব
সনে। আদরে সিরাঙ্গী পানে, হৃদয়ের
ধনে সযতনে রাখিব নিদ্রায় , নাহি
ভয়, মুক্তি তব কারাগার হতে, বন
বিহঙ্গিনী তুমি। সুবর্ণপিঞ্জরে বদ্ধ
কেমনে থাকিবে বল ? নীলাকাশে স্বর্ণ
ছটা বিরাজে যথায়, যাও তথা পিঞ্জরবাসিনি।
( সাদরে আলিঙ্গন)
কমলা। ( আনন্দে )
দেবি ! তুমি জননী সমান। মুক্তিদান
তােমারি কৃপায়। কৃতজ্ঞতাঅ লহ
মম উপহার। অভাগিনী, গুজরাট
দ্বিতীয় অঙ্ক ।
রাণী ; জীবন মরণ তার একই
সমান। ঘৃণা ভরে নর নারী করিবে
দর্শন, পতিতা ঘৃণিতা জ্ঞানে, কুমার
করিবে'সম্ভাষ। নাহি স্থান জগতে
আমার। পতিগৃহ, পিতৃগৃহ, বান্ধব
সকল, কেহ নাহি দিবে স্থান চরণ
যুগলে। যবনে হ'রেছে যেইদিন,
সে রজনী কেনবা পােহাল, স্বপন
নিভিল, আঁধারে ভরিল হৃদাগার।
চলে যাব, বলে যাব কারে আর, কবে
কেবা সতী মােরে ? নহে সত্য কলঙ্কিনী।
সেলিনা। (শিহরিয়া)
কঠোর সে হিন্দুধৰ্ম্ম, বিনাদোষে
পতিতা রমণী! ভগব, ভগবন্
অবােধ বালায় মার্জনা করহ তুমি।
( উভয়ের প্রস্থান)
সােফিয়ার গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।
কীৰ্ত্তন সুর।
কোথাহে পতিত সখা
দাও দীনে দাও দেখা,
অনাথিনী ডাকে তােমারে।
তুমি আছহে জগতে ব্যাপিয়ে
কমলা-হরণ। - * * আমি ডাকিতে জানিনা নির্ভয়ে, তুমি মঙ্গলময়, বিরাজ হৃদয়ে আমি লয়েছি শরণ চরণযুগলে হে আমার হৃদয় বেদনা ঘুচায়ে। তুমি আলােক আঁধার, রূপেরি পাথার তাই ডাকিহে কাতরে, দাও ভবের বাঁধন খুলিয়ে, বিষাদ বেদনা ঘুচায়ে। ( প্রস্থান) ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক। দিল্লী কারাগার ; বন্দী কুমার। কুমার। ফুরাইল জীবলীলা জনমের তরে। তেজ গৰ্ব অলীক স্বপন, ছায়াময় মানব জীবন কৰ্ম্মফলে হাহাকার করে। ভীষণ এ কারামাঝে যমদণ্ড মম মৃত্যু নামে ? কে সে ? কোন রাজ্য তার ? অ!সে যায়, হাসে খেলে, নাচে গায়, নাট্য- শালা মত, এই তাঁর অভিনয় ? ধুলা খেলা অবসানে কোথায় মিশায় নর- আত্মা তার ? কি কাৰ্য তাহার ? রাজা কেবা ? কোথ। রাজধানী ? কোন অজানিত সেই সুরম্য প্রদেশ স্বর্গ নামে অধিকারী তথায় কি এইমত কুসুমিত তরু;
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪১
প্রেম মন্দাকিনী ধীরে বহে কলতানে ?
বীণাগানে স্বরগের তান অমরত্ব
জানায় আত্মারে ? কি খেলা খেলিতে তবে
এসেছি হেথায় ? রাজ প্রতিনিধি নামে ;
রাজলক্ষ্মী নারিনু রক্ষিতে, রাক্ষসেরে
দিনু উপহার, হায় ঘৃণিত ধরায়
কুমারের বীরনাম।
দেবল, দেবল!
তব মােগ্য নহে দুরাচার। মুছে যা
কুমারের নাম কারাগারে মৃত্যুসনে।
ঘােরাধার তমম যেন ভীষণ শ্মশানে
লয়ে যায় টানিয়া টানিয়া, আয় আয়
নরকের প্রেত, তীক্ষ্ণ দন্তে বিনাশিয়া
শান্তি দেরে মােরে। ভগবন্ ক্ষমাকর- (মুচ্ছা)
সন্ন্যাসিনীর গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।
ভব কারাগার মাঝে
কেনরে জীব অচেতন ?
জাগ জাগ নিদ্রা ত্যজি
ডাকরে পরম ধন।
ওই যে শীতল বায়, তাের ও কোমল কায়
মুছাবে
শিশির ধারে,
পাবে স্বাধীনতাধন।
এ সংসার কর্মভূমি, কি কৰ্ম্ম করিলে তুমি
পরিহরি মায়া নিদ্রা
হও শীঘ্র সচেতন।
৪২
কমলা-হরণ ।
কুমার। মা, মা, কে তুমি দয়াময়ি. দেবি ।
সন্ন্যা। বাবা, আমি উদাসিনী ; তােমার মা বুলি শুনতে
এসেছি। এসাে বৎস, কারাগার হতে মুক্তিলাভ কর।
কুমার। মা এ যবন কারাগারে ভীষণ প্রহরিগণ পাহারায়
নিযুক্ত রয়েছে; কেমন করে আগমন করলেন ? যদি
বাদশাহ সংবাদ পান, নিশ্চয়ই আপনাকে দণ্ডদান
করবে। না, মাতৃহত্যার পাতকে পাপী হব না,
যাও মা।
বাবা কুমার, মাতৃবাক্য পালন কর, বৃথা সময়
নষ্ট করােনা, পাপীর দণ্ডবিধান না করলে দেশ, গ্রাম,
জনপদ শ্মশান ক্ষেত্র হবে। যে বীর পাপীর দণ্ডবিধান
করে না সেতাে কাপুরুষ। যাও, যমুনাতীরে যাও।
বাঁদিবেশে কমলা দেবী তােমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
কিছুমাত্র বিলম্ব করােনা। শক্ত মাদকসেবনে নিদ্রিত,
প্রহরী মদিরা সেবনে জ্ঞানহীন। এসাে বীরবর, ভারত
মাতাকে রােদন হােতে নিবারিত কর।
কুমার। ( করযােড়ে) কে তুমি দেবি? কোন্ বংশ তব
উজ্জ্বল মহিমায় উদ্ভাসিত হােয়েছে ? বল মা আমি
আজীবন মাতৃমূৰ্ত্তি স্মরণ করে রাখবে।
সন্ন্যা। বৎস আমি বাদসাহ দুহিতা।
কুমার। (হিরিয়া) পকে পদ্মফুল গােঙ্গা, পাষাণে দয়ার
প্রত্ৰৰণ! মা কে তােয়ায় এমন ইশরমাখা সুন্দর
পরােপকার ব্রত বিবালে ?
দ্বিতীয় অঙ্ক। ४७ সন্ন্যা। এজগতে কি শিখিবার নয় কুমার ? সেই জগত- পিতার প্রতিমূর্তি স্বরূপা দয়াময়ী ধৰ্ম্মরূপা জননী আমার ; এ জ্ঞানহীনা রই অসীম ধৰ্ম্ম পিপাসার এক কণা মাত্র লাভ করেছে। যখন প্রভাতের তরুণ তপনের নবীন সৌন্দর্য্যে প্রকৃতি ভাবে বিভাের হয়ে থাকে, তখন সেই নিরাকার ব্রহ্মমূর্তির নবীন বিকাশ বােলে আমার অনুভব হয়। নবীন মুকুলে, নব দুৰ্ব্বাদলে, নব পত্রপুষ্পে, সীমাহীন আকাশের নীল লহরীতে ভগবানের নাম গাঁথা। উন্নত পৰ্বত- মালা জীব উপকারে রত হয়ে নিঝরিণী রূপ জল- ধারায় নদীরূপে প্রবাহিত হয়। বৃক্ষ শস্য জীবের জীবন; এমন দয়াল প্রভুর সন্তান হয়ে আমরা জীব নির্যাতনে প্রবৃত্ত হয়েছি! একবার স্মরণ হয় না এ পাপ খেলা কয়দিনের জন্য ? ভগব, পাপিনীকে পাপভার হতে মুক্ত কর। জীবের বােদন নিবারণ কর। (বােদন ) কুমার। মা, আমি তােমায় কাঁদালুম! তুমি পিশাচ কুলের দেবী, তােমার পুণ্যে তােমার পিতৃ আত্মা সদগতি লাভ করবে। চল মা। ( উভয়ের প্রস্থান)
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দিল্লী, যমুনাতীর প্রান্তর ভূমি।
একাকী ছদ্মবেশী কুমার ও কমলা।
কুমার। (ঘৃণায়) আসিয়াছ কোন্ লাজে অয়ি অভাগিণি।
ছিলে রাজ্যেশ্বরী, এবে যবন কিঙ্করী,
বাদসার বিলাস আগারে রাজপুত
শিরােমণি সুখে নিদ্রা যায়। ঘৃণাভরে
বিদরে হৃদয় ; এখনাে কঠিন প্রাণ
আছে দেহে তব ! যাও যথা প্রাণ তব
চায়, কি কারণে এসেছ হেথায় ? আর
কিবা আছে অভিলাষ, রমণী নহিলে
অস্ত্রাঘাতে সুকোমল তনু খণ্ড খণ্ড
করি ফেলিম যমুনা সলিলে।
( কমলা পদতলে বসিয়া কাতরে।)
কমলা। কুমার! কুমার ! রাজপুতসুতা হায়
এই অভাগিনী জীবন অধিক ধনে
করেছে রক্ষণ। স্পর্শেনি যবন, সত্য
এ বচন মাের। তব বাক্য শিরােধার্য্য
মম, অমৃত সমান করিয়াছি বিষ
পান, আর না হেরিতে হবে যবনের
দাসী। অভিলাষী চাদমুথ দরশনে
: তৃতীয় অঙ্ক। ৪৫ তব, তাই প্রাণ এখনাে এদেহে আছে। বিষ হেরি বাদসা কাপিত ভরে। আজি প্রাণভয়ে সুধা বলে খেয়েছি যতনে। মৃত্যু, মৃত্যু বড়ই সুন্দর বন্ধু, আত্ম- পরিজন পতিতা বলিয়া সবে দিল বিসর্জন, অসময়ে তাই সখা দিয়া আলিঙ্গন শান্তিদান দিল অনাথারে! কূমার! আছে কিছু বলিবার ? কমলা চলিল চিরতরে, কলঙ্কঘঘাষণা করােনা ক’বােনা মাের। বাল্যবন্ধু, ক’র . উপকার, মুক্তকণ্ঠে করিও প্রাচার, সতী, সতী, নহে কলঙ্কিনী। ইতিহাস মিথ্যাবাদী সত্য সনাতন হিন্দুগণ কর বিশ্বাস। ( ভূতলে শয়ন) কুমার। (কাতরে) যাও দেবি স্বর্গরথে করহ প্রস্থান। নন্দনের পারিজাতমালা এ মরতে শােভা নাহি পায় । কহ সতি, কোন্ ছলে সে পাপাত্মাকরে লভিলে নিষ্কৃতি ? মাগাে কহ বিবরিয়া। কমলা। ছলনায় করিয়া আশ্রয় অচেতন, প্রমােদ আগারে, প্রলাপ বচনে কভু বিভীষিকা দিয়া দেখা ব্রাসিত করিত সতত যতনে দেবী সেলিনা সুন্দরী
৪৬
কমলা-হরণ।
হিন্দুবাদী রাখি নিজে করেন শুশ্রুষা।
অকস্মাৎ একদিন বাদসাহ আলা,
এসেছিল সর্বনাশ করিতে আমার ;
কিন্তু, হেরি বিষ মম করে, অব্যাহতি
দিলে দুরাচার।
ছায়া তার পরশন
করিনি কখনাে, হেরিনি বদন কভু
ঘৃণা লজ্জা রােষে। রাজপুতসুতা আমি
বীর প্রণয়িনী! ছার প্রাণ সতীরত্ন বিনে।
কুমার।
( কাতরে) ক্ষম মাগাে অধম সন্তানে, কুবচনে
ব্যথা কত দিয়াছি অন্তরে। কেন তবে
বিসজ্জিলে নবীন জীবন রাজরাণি
গুজরাট শােভার আধার। কোন দুঃখে
পলাইলে ? অনাথিনীবেশে নিরাশ্রয়
পথিকের মত ধুলিশয্যা করিয়া
আশ্রয় !
কমলা। (কাতরে নিশ্বাস টানিয়া)
কুমার! কুমার! নহি আর রাজরাণী।
এবে ভিখারিণী কলঙ্কিনী যবনের
দাসী। কহিবে জগতে সবে, হরেছিল।
কমলায় দুরাত্মা যবন, কবে সবে
কলঙ্কিনী মােরে। হা অদৃষ্ট ! বিধাতার
দারুণ লিখন, এ কলঙ্ক তাই মম
ভাগে। যাই সখা, চিরদিন তরে তব
তৃতীয় অঙ্ক
৪৭
চিত্র ধরি বক্ষপরে, অনন্ত প্রকৃতি
কোলে যতনে ঘুমাব। কোন্ সুখে যাব
ফিরি সে রম্য আগারেতােমা বিনা শূন্য
হেরি জগত সংসার। প্রণয় সাগরে
ভেসেছিনু স্মরিয়া তােমায়, নবরবি
শােভাময় সুন্দর মুরতি, একেছি
হৃদিপটে সতত যতনে। ভেঙ্গে গেল
সে সুখ স্বপন, ভাগ্যদোষে গুজরাটে
চির নির্বাসিতা। কেন পুনঃ জাগাইলে
সুমােহন বেশে নবসেনাপতি রূপে
প্রণয় কাননে। শ্মশান সংসার মাঝে
জ্বলিয়া জ্বলিয়া যাই নিভে ক্ষুদ্র তারা
মত অতি সে সুদুর নভােস্থলে। যাই
ভেসে অজানিত দেশে পথ ভ্রান্ত পান্থ
প্রায় ভ্রমে আত্মহারা। ক্ষমা কর, ঘৃণা
কর পরিত্যাগ, দুর্বল মানব ধরে
কতই শকতি, রিপুজয়ে আত্মশক্তি
করিতে প্রচার ! বাল্যবন্ধু বীরবর!
তুমি মহামতি, লজ্জা নাহি দিও আর
লজ্জহীনা জনে।
ভগব, পরিত্রাণ
কর অনাথায়, দুৰ্বল সন্তান জ্ঞানে
ক্ষমিও চরণে। মহারাজ, অনাথিনী যায়
আজি জনমের তরে।
{ মৃত্যু)
:৪৮
কমলী-হরণ।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
যমুনাতীরস্থ শ্মশান ভূমি।
প্রজ্বলিত চিতা সম্মুখ ।
কুমার। (বিষাদে) এই শেষ মানবের চিতা ভস্ম সার।
রূপ, গৰ্ব্ব, ধন, মান, ধুলিকনা মত
ধুলিতে মিশায় পুনঃ শ্মশান প্রাঙ্গনে।
রাজা, প্রজা থাকেনা বিচার ; চিতাশয্যা
চরমে আশ্রয়। জীর্ণকশায়ী ভিক্ষু
লক্ষপতি সনে এক আত্মা বন্ধু যেন
হেন আলিঙ্গনে সুখেতে ঘুমায় আসি
শ্মশান মাঝারে। তাই তােরে ভালবাসি
রে মহাশ্মশান, সাধকের তীর্থস্থান,
তাপিত আশ্রয়। ভুলিয়াছে গতচিন্তা
পুত্রহারা মাতা, ভুলেছে যুবতী পতি
দিয়া বিসর্জন, ভুলেছে দুঃখীর দুঃখ
তােমার আলয়ে। ওই যে যমুনা নাচে
মধুর সুনে, উচ্ছাসে প্রেমেতে মাতি
ধায় সিন্ধু পানে আঁধারি দিগন্ত আসে
গ্রাসিতে তােমায়। অভ্রভেদী শৈলশ্রেণী
বিকট আঁধারে তমসার আবরণে
দৈত্যপতি যেন দাড়াইয়া দ্বারদেশে
প্রহরী তােমার, রে শ্মশান! বন্ধু তুমি
মম। হৃদি ভেদি হাহাকার করে মােচন।
তৃতীয় অঙ্ক।
৪৯
(জনৈক সন্ন্যাসীর গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।)
সাথের ঘুমে সেনারে বাদ।
ও যার ঘুমাতে বাসনা, কেন তারে প্রতিবাদ।
জাগরে দুদিন ভবে, আপনি ঘুমাতে হবে,
জীবন যৌবন ভবে, অনিত্য এ অবসাদ।
এ সংসারে মিছে মায়া, ত্যজিবে সুন্দর কায়া
ভবে নিত্য আসা যাওয়া, কৰ্মসূত্রে বিসম্বাদ।
( সন্ন্যাসীর প্রস্থান)
কুমার। কমলা, কমলা! একাকিনী ঘুমাও গাে
এ ঘাের শ্মশানে, নিভে যা হৃদিজ্বালা
তব। একবৃন্তে ফুটেছিনু দুটিফুল
বনে, আজি তাই সঙ্গীহারা সংসার
তাড়নে নীরবে ঝরিলে মহীপরে।
তাই হেরি শূন্য প্রাণে তােমার বিদায়।
চলে যাই পুনঃ ভগ্ন গৃহে। যথা দেবী
রাজ্যেশ্বরী রূপে একদিন করেছিলে
আলােক প্রকাশ, এবে তথা আঁধার,
আঁধার। ক্ষমা কর, ক্ষমা কর স্বর্গীয়
ঈশ্বরি।
( কুমারের প্রস্থান।)
কমলা-হরণ।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দেবগিরি বনপথ।
( সমসের, কাফুর ও সৈন্যগণ।)
সমসের। কোথা সে সুন্দরী রাজবালা লুকায়েছে
কোন দূর গহন কাননে। এইত সে
দেবগিরি গহন কানন। সৈন্যগণ।
ছদ্মবেশে কর অন্বেষণ ; পুরষ্কার
পাইবে দ্বিগুণ।
কাফুর। যুবরাজ ! কি রম্য কানন হের নব
শােভ। ধরি। ফুলে ফুলে আকুলিত তরু
শাখা গুলি, অলিকুল মধুলােভে ধায়।
দিগন্ত বিস্ত, ত হের শ্যামল প্রান্তর,
নীলাকাশ যেন ছত্রধর, রাজরাণী ,
প্রকৃতির মস্তক উপরে। ফুলভূষা
পরেছে সুন্দরী, ললিত লতিকা বালা
কবরী বেষ্টনে। অবিরত সুমােহন
তনু রবিছবি করজালে। গুণগান
করে বৈতালিক বিহঙ্গম জাগাইছে
সােহগেতে শােভনা প্রকৃতি।
কাঠুরিয়া গণের প্রবেশ ও গীত।
হায় হায় কাঠকাটা কি হলাে দায়।
ক্ষিদের চোটে প্রাণটা ফাটে, রােদে প্রাণ যায়।
চুপটি সাড়ে, ঘুপটি মেরে (ওগাে) গিন্নী ঘুমােয় ঘরে,
তৃতীয় অঙ্ক আমরা মরি বনে বনে, প্রাণ বাঁচে কেমন করে, আবার চাইলে ভাত, কুপােকাৎ কত খিচঁন সইতে হয়। কাফুর। কাঠুরিয়া গণ ! আমরা গুজরাটবাসী বণিক পথহারা হােয়েছি, আমাদের রাজকন্যা দেবল দেবী কোথা আছেন বলতে পার ? খুব জরুরি খবর আছে। প্রথম কাঠুরে। বণিক মশাই, রাজকন্যা এই সামনের গিরি গুহায় বাস কচ্চে। চলাে তােমাদের নিয়ে যাই। বক- সিস্ মিলবে। । (পুনশ্চ গীত) কাজ সেরে ভাই ঘরকে চলল যাই। ঐ আসছে আঁধার ঘিরে, রাঙা মেঘ নাই। ফুর ফুর ফুর বইছে রে হাওয়া, প্রাণটা করে আই ঢাই যায়নারে সওয়া, মনে পড়ে পেঁচামুখী, তুলছে কত হাই। ( সকলের প্রস্থান।) চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। দেবগিরি গুহা সম্মুখ। দেবল। গীত। আমি পাগল প্রাণে কাঁদি হাসি ভালবাসা ভালবাসি। নিশিদিন কি স্বপনে জাগে তার রূপরাশি।
কমলা-হরণ।
নীরবে প্রাণের মাঝে প্রেমবশী সদ। বাজে
ভুলি ভুলি মনে করি তবু ব্যথা রাশি রাশি।
কি জানি কি মােহ ঘােরে, আবৃত রেখেছে মােরে
নিরাশা তমসা ঘেরে নাশিছে আলােক রাশি।
( ছদ্মবেশে সমসেরের প্রবেশ।)
দেবল। কে তুমি যুবক, সুরক্ষিত গুহামাঝে
করিলে প্রবেশ, শত শত অস্ত্রধারী
দাড়ায়ে দুয়ারে। কোন্ ছলে আসিয়াছ,
কহ সত্যবাণী ।
সমসের। ও জরাটবাসী আমি, বস্ত্র ব্যবসায়ী
আছে ভীষণ সংবাদ, রাজ্যনাশ, বন্দী
বীর কুমারসুন্দর।
রাজরাণী গেছে
ল’য়ে যবন সম্রাট ।
দেবল। ভগব কি হ’লা, কি হ'লে।।
( মূচ্ছ।)
সমসের। ( মৃদুহাশ্যে ) এই বার বন্দী করি হৃদয় ঈশ্বরী
( বংশীধ্বনি করণ ও যােদ্ধাগণের যুদ্ধ দান )
সীতার বেগে প্রবেশ ।
সীত।। দেবল, দেবল, একি উঠ উঠ যবন আসছে।
(দেবল উঠিয়া )
দেবল। নহেত যবন, সখি, গুজরাট বাসী।
হায় মাতা কমল। আমার পিশাচের
করে আজি হইলে পতিত । বীরবর
তব ভালে এই লেখা লিখেছেন ধাত! (রােদন)
তৃতীয় অঙ্ক।
সীতা।
ছদ্মবেশী যবনসকল আক্রমণ
করেছে সৈনিকে ; বন্দী তােমা করিবে নিশ্চয়।
কহ কি উপায় আছে আর !
পলাইব কোনস্থানে আমরা দুজনে।
দেবল।
সমসের (সহাস্যে )
দেবল সুন্দরি, বাদসা তনয় আমি,
তােমারি কারণে, এই হের ছদ্মবেশ
মম। চল দেবি সম্রাট আদেশ, দাস,
আমি, আজ্ঞা তার পালনীয় সদা।
দেবল। (ঘৃণায় ) শাহাজাদা! ছলিতে রমণী, ধয়িয়াছ
হীন ছদ্মবেশ ? বীর তুমি, হেন কাৰ্য্য
উচিত না হয়। অভাগিনী দেবলের
ভাগ্যলিপি আজি ফলিল কি যবনের
করে ? রাজপুতসুতা হবে যবনের
বাদী ?
সমসের। নহে বাঁদী, হৃদয় ঈশ্বরী তুমি। প্রেম
সিংহাসনে যতনে করিব পূজা,
রাখি
হৃদিপরে। এসো এসাে পূর্ণশশী মম।
সীতা। শাহাজাদা, মুক্তি দান করহ আমায়,
চিরদিন গাব গুণ গান।
সমসের। যাও দেবী, যথা ইচ্ছা তব
রক্ষীসনে করহ প্রস্থান।
('সীতার পরিচারিকা সহ প্রস্থান)
কমলা-হরণ। দেবল। ভগব, ধন্য তব লীলাখেলা, মুঢ় আমি, কি মতে বুঝিব। সমসের। চল দেবি, বিলম্বে কি ফল ? (রােদন ) ( সকলের প্রস্থান) পঞ্চম গভঙ্ক। দেবগিরি রাজসভা। রামদেব, গুজরাটরাজ, সভাসদগণ ও কুমারের প্রবেশ । কুমার। ( পিতৃ পদতলে বসিয়া।) পিতা, পিতা অবােধ সন্তানকে মার্জনা করুন। রামদেব। এস বৎস! তােমার বীরত্বে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তােমা হ'তে রাজবংশ উজ্জ্বল গৌরবে পূর্ণ হলো। বৎস, যুদ্ধের সংবাদ কি বল । কুমার। কাপুরুষ কুমারের নাম মুছে যাক ধরা হ'তে বীরগৰ্ব অতল জলধি জলে হােক নিমগন। রাজলক্ষ্মী দিয়া বিসর্জন, এসেছি ফিরিয়া পুনঃ নিজ পিতৃগৃহে। সতীবিভা উজলিয়া দেবী বিষপানে রেখেছেন সতীত্ব গরিমা। বাদসার লালসায় করি পদাঘাত, গিয়াছেন স্বর্গধামে অমর ভবনে। বন্দী আমি নরাধম রাজ প্রতিনিধি, শতধিক বীর গর্বে, শতধিক হীন- তৃতীয় অঙ্ক। প্রাণে মম ; পিতা, পিতা, গুজরাট নাহি আর, দানবের পূর্ণ অত্যাচারে শ্মশান হয়েছে রাজপুরী। গুজরাট পতি। কমলা, কমলা তুমি স্বর্গে ? ওহহ! যাও দেবী পাষণ্ড আলার রূপলালসায় পদাঘাত করে স্বর্গে যাও। এ মৰ্ত্ত তােমার স্থান নহে। এ কাপুরুষ হীনপ্রাণ করুণ রায় তােমার উপযুক্ত পতি নহে। (মুচ্ছা) পরিচারিকা ও রক্ষীগণের প্রবেশ। সীতা। সৰ্ব্বনাশ হয়েছে, যবনগণ প্রতারণা করে দেবলকে হরণ করে নিয়ে গেছে। কুমার। (সরােষে ) দেবল, দেবল, তুমি নাই ? পারিজাত- মালা দৈত্যদল পরেছে গলায় ? আরে, আরে দুরাচারগণ, সতী দেহ ক'রো না স্পর্শন ; বজ্রাঘাত পড়িবে অচিরে। অরে আঁখি না কর বােদন! প্রতিহিংসা, প্রতিহিংসা জ্বলুক হৃদয়ে, ধ ধ অগ্নিকণা বরষ নয়ন। শােণিতের ধারা নাচ ধমনী উপরে, প্রলয়ের তরঙ্গ হিল্লোলে, অরে হৃদি আন্দোলিত হও ঘন ঘন। যাই সৈন্য সমাবেশে। (বেগে প্রস্থান।)
কমলা-হরণ।
;
গুজরাট রাজা। (মুচ্ছাভঙ্গে উন্মাদের মত )
দেবল, দেবল, তােকে হরণ করে নিয়ে গেছে ?
আয় মা বৃদ্ধের জীবন সৰ্বস্ব, আয় মা নয়ন তারা, গৃহে
ফিরে আয় । আয় তােকে বুকের ভেতর লুকিয়ে
রাখি। যবন, আর আমায় কাঁদাস, নে ; দে, দে, এ
বৃদ্ধের হৃদয়ে তীক্ষ্ণ তলােয়ার বসিয়ে দে। দে, দে,
তােরা হৃদয়কে শ্মশান করে দে। আমি হীনপ্রাণ,
আমি কাপুরুষ। কমলা, তুমি স্বর্গে গেছে ; দেবলকে
ডাক, নইলে তাকে কে ডাকবে, নইলে তাকে কে
রাখবে। রাজপুত সতী কেমন করে বাদী হবে ?
দেবল, আয় মা আমরা মায়ে পােয় ঘুমিয়ে পড়ি। সে
ঘুম কেউ ভাঙ্গাতে পারবে না।
হবে না।
( রােদন )
সে ঘুমের কেউ বাদী
রামদেব। বৃথা রােদন করবেন না। ধৈৰ্য্য ধরুন।
প্রতিকার ক’ত্তে হবে। সমবেত সকলে মিলিত হয়ে
তাদের দণ্ডদান করবে। আবার দেবলকে ফিরে
পাবেন। চলুন পরামর্শ করিগে।
( সকলের প্রস্থান।)
তৃতীয় অঙ্ক।
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক ।
দিল্লী রাজ প্রসাদ
সিংহাসনে বাদসাহ পার্শ্বে সেলিনা ও আমিনা।
বাইজীগণের প্রবেশ ও গীত।
ফুলে ফুলে করি খেলা, ফুলে ফুলে গাথি মাল।।
আদর করে সােহাগ ভরে কেশে পরি দুটি বেলা।
তাড়িয়ে অলি আশে পাশে, ফুলভূষা পরি হেসে,
গলা ধরে মনচোরে বেঁধে রাখি প্রেমাসে,
যতন করে, করে করে খেলি কত সারাবেলা।
বাদস।। সত্যই কি, সুন্দরী কমলা
বিষপানে ত্যজেছে জীবন ?
সেলিনা। সত্য, সত্য, জাহাপনা 1
বাদসা। চলে গেছে প্রাণ করে চুরি। মরি মরি !
গরলেরে দিলে আলিঙ্গন, বাদসাহ
পদতলে সপিল জীবন। কমলা,
কমলা, সৌন্দৰ্য্য ঈশ্বরী তুমি, অবসাদে
কাদে এ পরাণ। স্বরগের পূর্ণশশী,
মধামে শােভা তব হইবে কেমনে ?
যাও স্বর্গে, দেববালা পবিত্র রতন।
-~-
.
খােজার প্রবেশ। জাহাপনা!
বন্দী কুমার, দেবী পলায়ন করেছে, গুজরাটিগণ নগর
আক্রমণ করেছে।
৫৮
কমল -হরণ ।
বাদশাহ। প্রতারণা, প্রতারণা।
(বেগে প্রস্থান)
সেলিনা। ভগব আমার সমসের কে রক্ষা করাে।
(সেলিনার প্রস্থান)
আমিনা। আমি মােবারক বাদসার মা হবে ;
বেগম সাহেবের অহঙ্কার চূর্ণ করবাে। ( প্রস্থান)
সম গভঙ্কি।
প্রমােদ উদ্যান
( দেবলের প্রবেশ ও গীত।)
আমি ভাল বাসি যারে, সেকি চায় আমায়।
আদরে সােহাগ ভরে রাখি হৃদয়ে হৃদয়।
প্রেম সােহগে ঘুমায়ে থাকি,
আবেশে অলসে মুদিয়া আঁখি,
থাকি স্বপন ঘােরে, প্রেমসাগরে ভাসে দুটি কায় ।
দেবল। ছি ছি এখনাে প্রেমের খেলা খেলছি। সাধ করে
যুবনের দাসী হতে বসেছি। না, আর ভাল বাসবাে
, প্রাণকে বেঁধে রেখে দেবে। না পারি, গরলে,
সলিলে এ জ্বালা জুড়াবে। মা কমলাদেবি, তুমি
সতী, আমি রাজবংশের পিশাচিনী। হায়, প্রাণের
বােঝা বয়ে পাপের ভার ক্রমেই বাড়াচ্চি।
(সমসেরের প্রবেশ )
সমসের। দেবল, দেবল ! এতদিনে পরিপূর্ণ
হৃদয় বাসনা। আশার ছলনা আর
তৃতীয় অঙ্ক।
নাহি কাদাইবে মােরে। আমি ভালবাসি,
তুমি কহলাে আমারে, দাস হ'য়ে তব
পদে রব চিরদিন।
দেবল। বীরবর! অবলা রমণী, বন্দী আমি
কিন্তু প্রাণ বন্দী নহে মম। আমি হিন্দুতা
কেমনে বরিব যবনেরে পতি বলি
কেমনে বা দিব আলিঙ্গন। ছারপ্রাণে
কিবা প্রয়ােজন ? মরণেরে করিব
বরণ, ঘুচে যাবে হৃদয়ের জ্বালা।
সমসের। ক্ষম প্রাণেশ্বরি, কাপুরুষ যবনেরে
কি কাজ বরিয়া। চাহ মুক্তি, গােপনেতে
দিবলাে ছাড়িয়া, যথা ইচ্ছা করিও
গমন। প্রাণের বেদন সহিব লাে
প্রাণে প্রাণে। ফকিরের সাজে ধরামাঝে
করিব ভ্রমণ। ভালবাসা শিখাইব
বনপাখীগণে, শিখাইব কুরঙ্গেরে
বাঁধিতে সঙ্গিনী। প্রেম নহে মােহজাল,
পবিত্র পরম ধৰ্ম্ম, বিবাহ বন্ধন।
ধাতার মিলন এক আত্মা নরনারী।
প্রণয়ের নাহি জাতিভেদ, পাত্রপাত্র
নাহিক বিচার, আত্মাসনে আত্মপ্রেম
ঢালিয়া ধরায় বিলাইব জীবগণে।
ভালবাসা ঢেলে দিব অনন্ত নিঝরে,
কমলারইল । জয় পায় ছবি হেবি সুন্দর । যাও দেবি নরাধমে দলি পদতলে, যাও তব বাসস্থানে। ( মূচ্ছ।) দেবল। উঠ, উঠ বীরব, অনুতাপ হৃদি হতে ফেলিব মুছিয়', আত্মজনে যাব ভুলে তােমার কারণে, নিশিদিন মিশি প্রাণে, অনন্ত মিলনে, প্রেমলীলা, প্রেম- খেলা করিব দুজনে। আজীবন তব চিত্র হৃদয় কন্দরে, গােপনে করেছি নিত্য পূজা, সতী আমি দ্বিচারিণী নাহি হবাে শুনাে গুণমণি। ধাতার লিখন- বশে অদ্ভুত মিলন, ধাতার চালিত জীবগণ, কৰ্ম্মফল স্মরি নিশিদিনে। সমসের। ( আনন্দে ) এসাে এসাে প্রাণেশ্বরি। ( মাল্য পরিবর্তন) ( উভয়ে সিংহাসনে উপবেশন ও সখীগণের প্রবেশ ও গীত।) প্রাণ দিয়ে সই প্রাণের ব্যাধা রাখ গােপনে। আমরা অবলা কুলবালা, ভালবাসি প্রাণে প্রাণে। প্রাণের মাঝে প্রেমের বাতি রাখ লো জ্বেলে, ফুটবে আলাে, খুলবে ভাল মিলনের কালে, আদর করে হৃদে ধরে, থাক লাে সই নিশিদিনে
চতুর্থ অঙ্ক ।
৬১
(বাদসা ও সেলিনার প্রবেশ )
বাদসা। আজি এই দুটি চাদে খেলিছে কাননে
পুর্ণিমা রজনী সনে জ্যোছনা কিরণে।
পূর্ণ মনস্কাম মম, কুমারের বীর
দর্পচূর্ণ এত দিনে।
যবনের পুত্র
বধূ দেবলসুন্দরী ! এ'স বৎস লহ
হৃদে উপহার মালা, যশােমান পূর্ণ
হক ধরার মাঝারে ।
( হীরকহার দান )
সেলিনা। এ’স বসে লহ গলে,
উপহার মালা
পতিব্রতা পতিধৰ্ম্ম হউক উজ্জ্বল।
( হীরকহার দান )
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
রণস্থল,
দিল্লী নগর দ্বার।
কুমার ও সৈন্যগণ, সমসের ওসৈন্যগণ।
কুমার। (সরােষে ) আরে, আরে কাপুরুষ যবন বৰ্ব্বর,
ছদ্মবেশে হরিলি রমণী, দেবালয়ে
দৈত্যাধম করিলি প্রবেশ, নন্দনের
ফুলরাশি দলিলি চরণে ! স্বৰ্গশােভা
৬ কমলা-হরণ দেববালা রাজপুত মণি, ছলনায় ডুবাইলি জলন্ত নরকে? আয়, আয়, প্রতিশােধ কর রে প্রহণ। (যুদ্ধ দান ) সমসের । ( হাসিয়া) প্রতিদ্বন্দ্বী আমি তব প্রণয়সাগরে। হৃদয়েশ্বরী মম দেবল সুন্দরী। বৃথা, বৃথা রণ আশা, হারাইলে মণি- ভূষা অকুল পাথারে। কুমার ! কুমার ! বীরগ চূর্ণ তব এতদিন পরে । ( কুমার সমসেরকে বন্দী করিয়া ) কুমার। নরাধম! শমনমন্দিরে যাও স্মরি ভগবানে। উপহাস, উপহাস ত্যজ রে বর্বর। (বেগে মালেক কাফুরের সৈন্য ল’য়ে প্রবেশ।) কাফুর। সৈন্যগণ! শাহাজাদা বন্দী হয়েছেন, তােমরা জীবনপণ করে রণসাগরে অবতীর্ণ হও। কুমার। (হাসিয়া) কাফুর, কাফুর, কাপুরুষ নরাধম তুমি রে বব্বর। হিন্দু হয়ে হিন্দুসুতা করিলি হরণ ; দাসত্বে সপিলি মন- প্রাণ। পরস্বার্থে ধৰ্মধনে করিলি বৰ্জন! দুরন্ত নরক হতে না পাবি নিস্তার, রবে না রবে না যশোমান। যমদণ্ডে যেই দিন ত্যজিবি সংসার
চতুর্থ অঙ্ক।
কেবা যাবে সাথে সাথে তব! চিতাভস্ম
রবে ভবে, বীরত্বনিশানা। ধিক্, ধিক
মালেক কাফুর, ছার প্রাণ কালরণে
কর রে বর্জন। শমন তােমার আমি
এসেছি লইতে, কালপূর্ণ ভবমাঝে,
হের রে বর্বর।
( কাফুরের সহিত যুদ্ধ ও যবন সৈন্যের পলায়ন)
সকলে। জয় কুমারদেবের জয়।
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দিল্লী উপবন।
দেবল। (কাতরে) এখনাে প্রাণে দারুণ বেদনা ;
দগ্ধপ্রাণে হেরি সুধু নিরাশার ছবি।
ওই হাসে তারারাশি সুনীল গগনে,
নীলাম্বরে ভাসে শশী আপনার মনে
আপনার রূপে মজি।
মলয় অনিল
ফুলবাস চুমিছে, হরিছে অলি লুটি
মধুরাশি। ওই নাচে যমুনা আপনি
ঢলঢল যৌবনে বিড়ােল, কল কল
গাহে প্রেমগীতি। তবে কেন হেরি এই
প্রকৃতির হাসি ? মনে পড়ে জনকের
আনন্দ ভবন ? জন্মভূমি মায়াময়,
৬৪
কমলা-হরণ।
স্নেহময়ী জননী আমার ? মনে পড়ে
কুমারের অনন্ত প্রণয়, মনে পড়ে
শৈশবসঙ্গিনী সীতা। সেই চিন্তাশূন্য
নিরমল প্রাণে আবার ভ্রমিতে সাধ
জনক কাননে। হায় অভাগিনী আজি
ছার প্রেমে মজি যবনের দাসীরূপে
ঘৃণিত ধরায়! মাগাে সুতিকা গৃহেতে
কেন না নাশিলি মােরে বিষদান করি।
(বেগে জনৈক পরিচারিকার প্রবেশ )
পরি। দেবি ! সর্বনাশ হয়েছে, শাহাজাদা সমসেরকে কুমারদেব
বন্দী করে নিয়ে গেছেন।
দেবল। কি, কি, সমসের বন্দী? হায় প্রাণেশ্বর আমাকে
অকুল সাগরে ভাসাও না।
( রােদন )
পরিচারিকা। আসুন, এই গুপ্তদ্বারপথে অগ্রসর হন আপনাকে
কুমারদেবের নিকটে ল'য়ে যাই। অবশ্য তিনি
শাহাজাদাকে মুক্তি দেবেন।
দেবল। কুমার বীরপুরুষ। সে অভাগিনীকে অবশ্যই দয়া
করবে। তবে চল শীঘ্র যাই।
( উভয়ের প্রস্থান)
চতুর্থ অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
( বনপথ )
সীতা দেবল ও পরিচারিকা
(সীতা) সই, সই, আবার চল তেমনি করে গলা ধরে খেলা
করিগে। আমাদের রণজয় হয়েছে, শাহাজাদা বন্দী
হয়েছে, এ সব তােমারই জন্য। তােমার জন্য কুমার
উন্মত্ত প্রায়, আর তাকে কাদাইও না।
দেবল। ভুলে যাও সখি, আমি যবনী, ঘৃণিতা যবনী, আমায়
ছুমােনা, তােমাদের জাত যাবে।
সীতা। (শিহরিয়া) দেবল, সই! উপহাস ক'রােনা একি সত্য
কথা না প্রলাপবাণী ?
দেবল। সত্যকথা, আমি শাহাজাদাকে বিবাহ করেছি।
হিন্দুসুতা হয়ে যবনকে আত্মবিক্রয় কত্তে ঘৃণা
হ’লােনা। তুমি যে বড় ধৰ্ম্মের গৌরব কত্তে, তুমি যে
স্বদেশকে ভক্তি কত্তে, তুমি যে পিতামাতাকে
প্রাণাপেক্ষা প্রিয়জ্ঞান কত্তে, সেই তুমি, সত্যই যবনী ?
দেবল। সই, আর ব’লােনা ; অনেক কেঁদেছি, প্রাণকে বেঁধে
রেখেছি, আর পারলুম না, যবনপ্রণয়ে আত্মহারা হয়ে
মরতে বসেছিলুম, মরণ হ'লােনা। (যােদন )
( বেগে কুমারের প্রবেশ )
কই, কই, হৃদয়েশ্বরি। দেবল! দেবল!
( আলিঙ্গনে উদ্যত )
সী।
কমলা-হরণ।
দেবল। (সরিয়া) ছুয়ােনা কুমার, আমি যবনী, পরস্ত্রী।
কুমার। আবার ছলনা, একি উপহাস করবার সময় ? দেবল,
পাষাণি তােমার জন্য আমি পাগল হােয়েছি।
কাদাইও না।
এস চিরসন্তাপিত হৃদয়কে শীতল
( ধরিতে অগ্রসর )
দেবল। (সরিয়) আমি শাহাজাদাকে বিবাহ করেছি, আমি
সত্যই যবনী, ক্ষমা কর।
কুমার। ( ঘৃণায় সরিয়া, উন্মাদের ন্যায় )
যবনবিবাহ, হিন্দুনারীর যবনবিবাহ অসম্ভব বাণী,
দেবল, পাষাণি ! মােহনী রূপে পিশাচিনি, আমার
সৰ্ব্বনাশ করলি। ওহো হৃদয়, একটু স্থির হ ! কি
করিল দেবল, সুবর্ণ মন্দির আমার শ্মশান করে
দিলি? ওহহ কে তােরা আমার নন্দনকাননকে দাবা-
নলে পুড়িয়ে ফেললি ? কে আমার প্রেমের সিংহাসনে
আগুণ জ্বেলে দিলে, কে আমার উব্বরভূমিকে
মরুভূমিতে পরিণত করলে? তুমি দেবল, সত্যই যবনী ?
যে কুলের রাজলক্ষ্মী কমলা বিষপান করে মহত্ত্ব বিকাশ
করেছে, সেই কুলের কলঙ্কিনী দেবল যবনকে হৃদয়
দান করেছে। হিন্দুসুতা যবনের বাদী হয়েছে ! কি
ঘুণা কি দারুণ লজ্জা ; দেবল ! মৃত্যুকে বরণ করে এ
কলঙ্কমোচন কর। যাও, সম্মুখ হতে দূরে যাও।
রমণী, নহিলে এখনি অসিঘাতে হৃদয় বিদীর্ণ করতুম।
চতুর্থ অঙ্ক।
দেবল। (পদতলে জানুপাতিয়া)
ভাই কুমার, ঘৃণিতা কলঙ্কিনীর অপবাদ মােচন কর
এই বক্ষে ওই তীক্ষ্ণ অসি বসিয়ে দাও।
কুমার !
}
ওহাে অসহ!
(বেগে প্রস্থান)
দেবল। সই, কুমার চলে গেলো, আমায় পতিভিক্ষা দিলে না ?
, ছি ছি, সত্যই এ কলঙ্ক মােচন করবাে। এই
যমুনার কালজলে দগ্ধ হৃদয়ের তাপ নিক্মাণ করবে।
সীতা। আর কেন দেবল, পাপের ভার বাড়াবে। চল শিবিরে
যাই, কুমারের দেখা পাবে।
দেবল। (গীত )
সে আমার হৃদয় জ্যোছনা রাশি।
ভালবাসা এত জ্বালা, তবু তারে ভালবাসি।
কেঁদে কেঁদে বুক বেঁধে
এসেছি তাহারে নিতে
সে আমার, আমি তার, দুখ তবু রাশি রাশি।
সরমে বেদনা লয়ে
কতনিশি গেছে বয়ে
এখনো তাহারি ছবি উজ্জ্বল হৃদে প্রকাশি।
( সকলের প্রস্থান )
কমলা-হরণ
চতুর্থ
গর্ভাঙ্ক।
গুজরাট শিবির।
(কুমার ও দেবল।)
দেবল। (জানুপাতিয়া )
পতি ভিক্ষা চাহি বীরবর। ক্ষমাকর,
দয়াকর ভগিনী বলিয়া। চিরদিন
গাহিব সুনাম, গাঁথা রবে তবকথা
অন্তরমাঝারে। ভ্ৰাতৃভাবে পূজি নিত্য
হৃদয়করে, এবে দেবসম মানি তমা।
কুমার। ( উচ্ছাসে) আবার আবার, কেন নবীন বিজলী ?
এসেছে কি পূর্ণশশী ধরার মাঝারে,
রমণীর বেশ ধরি মােহিতে মানবে ?
অথবা যেমন বসুমতী পতি আশে
সাজে রূপবতী
ফুলভূষ
বেশে; অথবা যেমন রতি মদনের
আশে সেজেছে প্রেমের ফাঁদে নন্দন
কাননে। অথব। যেমন উষ। রবির
ইকরণে লাজমাখা ছবিখানি রঞ্জিত
সুন্দর। তেমনি, তেমনি সাজে কে তুমি
সুন্দরি। কাদাইছ অভাগারে ! জাননা কি
হৃদয় আমার পাগল, পাগল প্রাণ।
পরি নব
চতুর্থ অঙ্ক। আরে পাগলিনী কি ভিক্ষার আশে গতি তব ? আমি রে ভিখারী হারায়েছি মণি - ময় অমুল্য ভূষণ অতল সাগর- তলে চিরদিন তরে। দেবল, দেবল, ঝলসে নয়ন, অরুণ অধর হেরি তব। ভাগ্যবান যবনসন্তান, বিনা যত্নে লভিয়াছে অমূল্য রতনে। দেবল। ভুলে যাও দুঃখিনীরে। বীর তুমি, প্রেম তব খেলনা সুন্দর। ঢাল দেশবাসী- গণে অনন্ত প্রণয়, পূর্ণসুখে হও সুখী বীরত্ব প্রভায় । ভূলে যাও অভাগিনী দেবলে। কুমার। পাষাণী দেবল। ক্ষণেকের তরে রূপ মােহে আচ্ছন্ন নয়ন। কর্তব্য হইতে ভ্রষ্ট না হবে কুমার। প্রেম নহে ক্রীড়া- বস্তু, অনন্ত গভীর সিন্ধুসম, তল নাহি পাবে তার। আত্মবিসর্জন দানে প্রতিদান প্রতারণা, প্রতারণা সুধু। কে জানিবে তীব্র এই দাহনের জ্বালা ? মরমের অদম্য উচ্ছাস কে বুঝিবে নিরাশপ্রণয় ? বালিকা দেবল, তুমি শিখিয়াছ ছলনা সুন্দর। ভুলি যদি
কমলারহণ।
ওই মুখখানি, আঁধার ধরণী হায়
আমার নয়নে। মরি মরি রাহুগ্রাসে
পূর্ণশশী ধাতার সৃজন। ভগবন্
ধন্য তব প্রণয়কৌশল।
দেবল।
ভিক্ষা দাও বীরবর, পতিধনে মম।
কুনার।
তােমারি কারণে দণ্ডি সে পাপাত্মা বীরে।
আর কার তরে বন্দী করিব তাহায় ?
যাও ল'য়ে যবন সন্তানে, এই শেষ
দেখা তব সনে। মনে করে, যদি কভু
পাও হৃদি ব্যথা, মনে করাে উপকারী
বন্ধু জ্ঞানে তব। আজীবন এই স্মৃতি
করিব ধারণ, কৰ্ত্তব্য পালনে চিত্ত
করিব বিজয়। যবনীরে রাজপুত
দিবে বিসর্জন, যেই চিত্র নিরমল
পবিত্র সুন্দর, একেছিনু সযতনে
প্রেমের প্রতিমা, আজি তার বিজয়।
দশমী। যাও, যাও, না কর রোদন
হেরিতে না পারি আমি তব আঁখিজল।
( কারার চাবিদান )
বেল। দেবতা সমান তব চরিত্র সুন্দর
ভাই, ভাই মনে রেখে অভাগী দেবলে।
কুমার। শ্মশান, শ্মশান হক হৃদি।
( প্রস্থান)
( প্রস্থান)
চতুর্থ অঙ্ক ৭১ পঞ্চম গভঙ্ক । গুজরাট শিবির। ( বন্দী সমসের ; দেবলের প্রবেশ) এস এস প্রাণেশ্বর ! তব তরে নাহি মম মান অভিমান। আসিয়াছি ভিক্ষা আশে কুমার সকাশে। আসিয়াছি এই ভীম আঁধার ভেদিয়া, ত্যজিয়া প্রমােদ- ভুমি আলােক ভবন। ঘৃণা লজ্জা দূরে ফেলি প্রেমের কারণে, আসিয়াছি নিজ পিতৃগৃহে। ভালবাসি তাই সখা পাই এ বেদন। সম্রাট তনয় তুমি, শত রূপবতী এখনি লুটিবে পদতলে। দীন আমি, কৃপানেত্রে করােনা বঞ্চনা। সমসের। ( আনন্দে ) দেবি, দেবি চিরদিন তব ছবি ধরি হৃদিপরে, কাটাইব নশ্বর জীবন। শত প্রলােভনে না ভূলিবে কভু হৃদি। এ ছার নয়নে না হেরিবে কোন নারী মােহের কারণে। তব রূপে মাতােয়ারা পাগল হৃদয় ; তবগুণে বাঁধা হৃদি জনমের তরে।
৭২
কমলা-হরণ।
উভয়ে। ভগবন, মঙ্গল নিদান !
পূর্ণ হােক বাসনা তােমার।
( প্রস্থান )
যই গর্ভাঙ্ক।
দিল্লী দরবার সত।
(বাদসা, পুত্রদ্বয়, সভাসদগণ। )
বাদসা । পুত্রগণ, রাজপুতানার রাজধানী চিতাের আক্রমণ
করবার জন্য সৈন্য সকল প্রস্তুত হতে আমার আজ্ঞা
প্রচার কর। রাজপুত গৰ্ব চূর্ণ করবার জন্য আবার
অসি ধারণ করে রণসাগরে অবতীর্ণ হবাে। কমলা-
দেবীকে হরণ করে আমার মনােবাসনা সফল হয়
নাই। সে অভাগিনী বিষপানে নিজ জীবন পরিত্যাগ
করেছে। বাদসাহের হৃদয়মাঝার বিদীর্ণ করেছে।
একবার দর্শন আশাও মিটাতে পারি নাই। শুনেছি
পদ্মিনী দেবী ত্রিলােকললামভূত রমণী। আমি
নিশ্চয়ই সে ললনাকে নিজ করগত ক’রবাে। না পারি,
যুদ্ধানলে রাজগণের জীবন আহুতি দান করবে। যাও
মালেক কাফুরকে সৈন্য সমাবেশে প্রস্তুত হতে বল।
আমি কল্যই চিতাের আক্রমণে গমন করবাে।
মেবােরক, সাবধানে দিল্লী রাজ্য রক্ষা করাে। সমসের
তােমার রাজ কাৰ্য্যে সহায়তা করবে। যতদিন না
চিতাের হতে দিল্লীতে প্রত্যাগমন করি, ততদিন
চতুর্থ অঙ্ক।
পৰ্যন্ত খুব সাবধান। শুনিতেছি, কুমারদেব গুজরাটে
রাজা হবে। সে কালসৰ্পকে আর পদাঘাত করাে না।
পুত্রদ্বয়। পিতার আদেশ নত মস্তকে পালন করবাে।
বাদসা। বৎসগণ, যাও বিশ্রাম করগে।
উজীর। জাহাপনা, কল্যই কি গমনের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন?
বাদসা। হাঁ মন্ত্রি ; কি বলবে বল।
উজীর। কুমারদেব যদি পুনরায় দিল্লী আক্রমণ করে, তবে
কুমারগণ কি প্রতিযােগিতায় পারদর্শী হবেন ?
বাদসা। হা, হা ! (হাস্য।)
উজীর, তুমি বৃদ্ধ, তাই যুদ্ধের নামে ভীত হ’চ্চ।
সিংহশিশু হস্তী শিকারে অক্ষম হবে না।
সাধ্য কি,
ক্ষুদ্র কুমার বাদসার বিদ্রোহী হবে ?
উজীর। জনাব! এ দীনের হস্ত একদিন রাজকার্য্যে সহায়তা
করেছে, এখন আমি সত্যই বৃদ্ধ ; কিন্তু বীৰ্য্যহীন
নহি।
বাদসা। (হাসিয়া) মন্ত্রিবর, রাগ করাে না; তুমিই বালকগণের
হর্তা কর্তা। রাজকার্য্যের ভার তােমার উপরেই
দিয়ে যাব, ওরা উপলক্ষ্য মাত্র। অপ্ত সভঙ্গ
হক, বিশ্রামের বিশেষ প্রয়ােজন আছে।
সকলে। জয় বাদসার জয়।
( সকলের প্রস্থান।)
৭
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
গুজরাট-রাজ-উপবন ।
( কুমারের প্রবেশ)
কুমার। শূন্যময় রাজ উপবন, নাহি ফুটে
ফুলকলি আঁধার বিজনে। গরােনীরে
মুদিত কমল, রবি আশে আর নাহি
চাহে। বিনা সেই সরােজিনী, ঘনঘাের।
আঁধার যামিনী, দামিনী ঝলকে যেন।
কই, কই আমার দেবল, অকলঙ্ক
পূর্ণশশী হাসি, কাল রাহুগ্রাসে আজি
হইল পতন। সেই তনু কমনীয়,
বালার্ক কিরণ, মৃদুহাসি-সুধাময়
নলিনী অধরে, পঙ্কজনয়না আহা!
জানি কোথায় ? কি কুহকে ভুলাইল
যবন বৰ্বর। সে যে সারল্য প্রতিমা,
জানে না তাে ছলনা বঞ্চনা। জানে না তাে
কাদাইতে মােরে। প্রেমের কোকিলা মাের
কার মায়াফাদে বন্দী আজি, ভয়াবহ
পঞ্চম অঙ্ক। ৭৫ লোহার পিঞ্জরে ? ছেড়ে দে রে অভাগার অমুল্য রতন, যতনে সঞ্চিত, বহু- দিনে। না, না, একি ভ্ৰম ? কার তরে আরে আঁখি কর বরিষণ, হৃদি ভেদি তপ্ত অশ্রু জল ! পাষাণী দেবল অনাদরে পদতলে দলিয়াছে মোরে। রাজপুত- পুত্র আমি, যবনীর প্রেমে উচিত কি এত আত্মহারা ? নিশিদিনে, কি স্বপনে, যাহার প্রতিমা অধিষ্ঠাত্রী দেবীজ্ঞানে পূজেছি যতনে, আজি সেই পিশাচিনী কালসর্পী হয়ে হৃদি মাঝে করেছে দংশন। নিশীথে জগত মাঝে সুষুপ্ত, মানব শান্তিতে মগন সবে, দুর্ভাগ্য কুমার সুধু ফিরে বনে বনে। এ হেন রজনী সনে প্রেম আলাপনে যবন- সন্তান সনে দেবল আমার। আরে স্মৃতি হও রে বিদায় হৃদিক্ষেত্র হতে মম, বিস্মৃতির নীরে ডুবাও, ডুবাও চিত্র তব। নয়নের নীর ঘৃণাভরে অগ্নিকণা কর বরিষণ, পুড়ে যা মােহিনী সংসার। ওহহ হৃদি ভুলে যাও পাষাণী দেবলে, কলঙ্কিনী পতি তারে কর বিসর্জন। ( অধােমুখে উপবেশন।)
কমল-হরণ।
( সীতার প্রবেশ।)
সীতা। (কাতরে ) মলিন সকলি যেন নীরব নিশায় ;
প্রিয়পাথী গেছে পলাইয়া। শুখায়েছে
সাধের নিকুঞ্জ বন। ফুলকলি নাহি
আর সৌরভ বিলায়। সেইমত চাদ
নাহি হাসে, হাসি কুমদিনী প্রেম-আশে
চায় বিধুরে। ভুলেছে প্রেমের গীতি
কোকিল কোকিলা, নীরব সে বীণাধ্বনি
প্রমােদ উদ্যানে। হায় সখি, আর কিলাে
পাব তোর দেখ। এ ছার জনম মাঝে
মম? আর কি গাহিব গীত সে মধুর
তানে ?
কুমার। (চমকিয়া) সীতা, নিশীথে কি প্রয়ােজনে
উদ্যান-মাঝারে ?
সীতা। তােমার কারণে হেথা মম আগমন,
রাজরাণী মহারাজ চাহেন দর্শন;
আছে বহু প্রয়ােজন গােপন সংবাদ।
কুমার। কহ, কহ, কিবা প্রয়ােজন ?
রাজ-আজ্ঞা ধরি শিরােপরে।
সীতা। মহারাজ রাজকার্য্যে ল’য়ে অবসর,
শান্তিময় তপােবনে যােগ আচরিয়া,
দুরন্ত সংসার হতে লভিবে নিস্তার।
রাজ্যভার তােমার উপরে।
পঞ্চম অঙ্ক।
'৭৭
'
কুমার। আমি রাজা! অসম্ভব বাণী। সীতা, সীতা,
নাহি চাহি রাজ্য, রাজধানী নাহি চাহি
উচ্চ যশােমান। সন্ন্যাস-আশ্রম মম
জীবনে সম্বল। ধরি শিরে জটাজুট,
তপস্বীর বেশে যথা ইচ্ছ। ভ্ৰমিব
ধরায়। মানবের দীক্ষা শিক্ষা করিব
বর্জন, আপনি তাহার ধ্যানে রহিব
বিভাের। রাজকাৰ্য পাগলে না শশাতে।
সীতা। ( উপহাস্য) বীরের কর্তব্য তব অতীব সুন্দর,
ভ্রমক্রমে মহারাজ পালিল তােমারে।
পরপুত্রে হেন ভালবাসা ; প্রতিদানে
সম্বল রােদন। ভাগ্যহীন রাজারাণী ;
নহিলে কি পাষাণী দেবল জনকেরে
করে পরিত্যাগ।
( সীতার প্রস্থান)
কুমার। ওহহ! নিয়তির একি লিপি ?
( প্রস্থান
৭৮
কমলা-হরণ ।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
গুজরাট রাজসভা।
( সিংহাসনে রাজারাণী, সভাসদগণ )
কুমারের প্রবেশ।
কুমার। ( রাজপদে জানু পাতিয়া )
পিতা, পিতা, জন্মদাতা সম আজীবন
করেছো পালন ; কহ দেব কি আদেশ,
ধরি শিরোপরে ?
রাজা। কুমার, কুমার, পুত্ৰাধিক বন্ধু পুত্র
তুমি, বহু যত্নে পুত্রসম সতত
আদরে পালন করেছি তােমা। আজি
চাহি বিদায় বিদায়। রাজকাৰ্য জীর্ণ
ভগ্ন দেহের মাঝারে দাহন করিছে
সদা। চাহি তাই শান্তির আশ্রয়। যদি
পারিকভু সেই দেবলে ভুলিতে, যদি
পারি কলঙ্কিনী-স্মৃতি বিসর্জিতে, শান্তি
তবে পাইব ধরায়। রাজবংশষশাে-
মান কলঙ্ক-সাগরে ডুবিয়াছে হায়
আজি চিরকাল তরে। সে পাষাণী গেছে
ভুলে বংশের গরিমা, গেছে ভুলে খেতে
সেই অমৃত গরল। রাজপুতসুতা
পঞ্চম অঙ্ক।
৭৯
হায় যবন কিঙ্করী! ছিল আশা, তব
সনে রাজ সিংহাসনে দেবল বসিবে
বামে ; গুজরাট নবশশাভা জাগাইবে
পুনঃ, কিন্তু বিধি, হায়, ভাগ্যদোষে চির
বাম মম প্রতি। অমৃতে উঠিল তাই
ভীম হলাহল। তাই বৎস, পুত্ররূপে
বসি আজি রাজ সিংহাসনে, হৃদিজালা
করহ নিৰ্বাণ। গুণবান সদাশয়
তুমি।
কুমার। মহারাজ ! অক্ষম পালিতে, দাস হেন
রাজ্যভার। অবশ চিন্তায় তনু, জীর্ণ
দেহ মাঝে নাহি হবে নবশক্তি পুনঃ।
যােগী বেশে যাব চলি গহন কাননে,
নিরজনে আরাধিব জগৎ-ঈশ্বরে।
আজ্ঞা চাহি পদতলে তব।
রাজা। আয়, আয়, আয় মা দেবল, বেঁধে রাখ
কুমারেরে স্নেহ-কারাগারে। পারিবে না
পলাইতে সে দৃঢ়বাঁধনে। (রাজার মুচ্ছা)
রাণী। (কুমারের হাত ধরিয়া)
হের বৎস, শােকাতুর মলিন শরীর,
রাজ্যভার নাহি বহে ও রাজ-হৃদয়ে।
রাখ, রাখ বাণী, মরমের ব্যথা দে রে
৮০ কমলা-হরণ। বাপ মুছাইয়া। যাই ভূলে দেবলেরে, যাই ভুলে মরমের তীব্র সে দাহন। কুমার। (কাতরে রাজপদ ধরিয়া) আজি হতে কৰ্ত্তব্যে বাঁধিব প্রাণ, আর নাহি অনুতাপে দহিবে হৃদয়। পিতঃ ! শিরােধার্য্য তব বাণী, জীবনে মরণে। রাজা। (শির চুম্বন করিয়া) আশীৰ্বাদ করি আজি আনন্দ অন্তরে। ( কুমারকে সিংহাসনে বসাইয়া মুকুট দান ) (রাণীর প্রস্থান এবং সীতাকে লইয়া পুনঃ প্রবেশ) (কুমারের হাতে সীতার হাত দিয়া।) আজি হতে সীতা রাণী গুজরাট রাজ- সিংহাসনে। মন্ত্রীসুতা দেবলের বাল্য সাথী সীতা, স্নেহের সাগরে মম এক বৃন্তে দুটি ফুল সম, পালন করেছি সদা। আজি তার শেষ উদযাপন, পিতৃ- মাতৃহীনা বালা, সরলা কোমলা, নারী কুলােত্তমা, আজি উপযুক্ত পতিধনে করিনু অর্পণ। সুখী হও চিরদিনে। ( সখীগণের প্রবেশ ও গীত ) আহা সেজেছে ভাল, আহা সেজেছে ভাল। রতিপতি সনে সতী আজি মিলিল।
পঞ্চম অঙ্ক।
চাদ ভাসে ওই সুনীল গগনে,
তারা সবে দিশাহারা ছুটে সঘনে,
প্রেম ঝরিছে, হাসিছে, খেলিছে দুটি নয়নে
আহা মিলেছে ভাল, আহা মিলেছে ভাল।
আজি যুগল মুরতি যেন করেছে আলাে।
( নাগরিকগণের প্রবেশ ও গীত )
আজি যতনে গেঁথেছি নব ফুলহার।
আহা খুলেছে বাহার, আহা খুলেছে বাহার।
এনেছি মতিয়া, এনেছি বেলা, এনেছি যুথিকা ফুল,
এনেছি মধুর মলয় পবন,
করিবে প্রাণ আকুল,
এনেছি অর্থ ভক্তি-বারি প্রেম-গঙ্গাজল,
থােয়াইব পদতল, কেশজালে ওগাে মুছাবাে যতনে
নবীন রাজনে নবীন সাজনে খুলিবে কি বাহার।
( উভয়কে ফুলমালা পরাইয়া দেওন )
(পট পরিবর্তন)
কমলা-হরণ। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। দিল্লী প্রমােগৃহ। ( মােরকের প্রবেশ।) মোবারক। প্রেম-ফঁাদে বন্দী আজি করিব দেবলে। রব সুখে নিশিদিন প্রেম-আলাপনে, সৌন্দৰ্য-সাগরে ডুবাইব মনেপ্রাণ। ছলে কিম্বা বলে নিজ কার্য্য উদ্ধারিব করিয়া যতন। বিদ্রোহী বলিয়া বন্দী করিব ভ্রাতায়। কে সে সমসের ? মম বিদ্যমানে লবে রাজ-সিংহাসন ? দপ তার পদাঘাতে করিব চুরণ, তীক্ষ্ণ ধার অসিধারে মিটাইব সাধ। নাহি পিতা বৰ্ত্তমান, সুদর সে রাজপুত- ভূমে রণমাঝে হয়েছে মগন। হেন যােগাযােগ খােদার মহিমায় হেরি। ( সমসেরের প্রবেশ।) সমসের। কহ ভ্রাতঃ, অসময়ে কি হেতু স্মরণ। কোন্ অর তুলেছে মস্তক ? পদাঘাতে দণ্ডি তারে। মোবারক। নহে কেহ অরি, বিদ্রোহী আপনজন, কহে জনে জনে ।
পঞ্চম অঙ্ক।
সমসসর। কে সে কুলাঙ্গার, হেন করে পাপাচার ?
মােবারক। দুর্ভাগ্য আমার, শুনিলাম তব নাম।
অতি গুপ্তভাবে বিদ্রোহের কর
আয়ােজন।
সমসের। (ঘৃণায়। হেন বাণী নাহি কহ আর। কাপুরুষ
নহি নরাধম, পিতৃদ্রোহী নহি হায়
শপথ এ বাণী।
মােবারক। সত্য সত্য বিদ্রোহসংবাদ পাইয়াছি
গুপ্তচর স্থানে, এই দণ্ডে বন্দী তােমা
করিব নিশ্চয়।
সমসের। (পদাঘাত করিয়া) আরে, আরে, মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠ
বর, রসনায় হক বজ্রাঘাত।
(মােবারকের বংশীধ্বনি করণ ও সশস্ত্র সৈনিকগণের প্রবেশ ।
সমসের অস্ত্র লইয়া মােবারকের সহিত যুদ্ধ ও বন্দী।)
( সকলের প্রস্থান)
৮৪
কমলা-হরণ ।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দিল্লী উপবন।
দেবলের গীত।
আমি ডুবেছি অতল জলে
প্রণয়-রতন কুড়াবাে বলে।
তাই তাহায় ভালবাসি, যাই আপনা ভুলে।
হেরে তাই শশী হাসি, সুখ-নীরে সদা ভাসি
রাখি চোখে চোখে, দেখা পেলে যাই গলে।
মােবারকের প্রবেশ।
মােবারক। দেবল, দেবল, এতদিনে মনােআশা
হইল পূরণ। এস এস মনােরমা
সুচারুহাসিনি, প্রধানা বেগম পদ
পাইবে অচিরে।
( ধরিতে অগ্রসর )
দেবল। (সরিয়া) পিশাচ, ভাতৃবধূ উপরেতে কর
অত্যাচার! বজ্রাঘাত হ’ তব শিরে।
আরে! পাপী বীরপ্রণয়নী আমি, হের
এই গুপ্ত ছুরি, হের মম করে, অগ্রসর
হও যদি, ত্যজিবে জীবন।
মােবারক। রাক্ষসী রমণী, তুই আলােকরূপিনী।
( প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক।
সােফিয়ার প্রবেশ ।
সােফিয়া। এস দেবি ভ্রা তা বন্দী মােবারক করে।
ঘাতকের তীক্ষ্ণ অসি দুলিছে মস্তকে।
ধর এই ভীম অসি, গুপ্তভাবে
কারাগারে করিব প্রবেশ।
দেবল। যাই, যাই, ভগব করহ রক্ষণ।
( উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম গভঙ্ক ।
( দিল্লী কারাগারে বন্দী সমসের।)
সমসের। ধন্য, ধন্য নিয়তিতাড়ন। বাদসার
পুত্র আমি, ঘৃণিত কারায় কারাবাসী-
পরিচ্ছদ করেছি ধারণ। আসে নিশি
গ্রাসিতে আমায়। পুতি গন্ধে নরকের
চিত্র পড়ে মনে। আসে যেন যমদুত
বিকট মুরতি, অট্টহাসি ওই যেন
হাসে। কোথা সে সুবর্ণ বিভা দীপাবলি
দুটী, কোথা সে কুসুম শয্যা রত্নময়
গৃহে ; কোথা সে ন কী-বৃন্দ সুধাকন্তী
সবে। প্রাণপ্রিয়তমা কোথা দেবল
আমার। এই শেষ দুরাত্মার করে।
কুমার, ফলিয়াছে তব বাণী, মৃত্যুকালে মম
৮
কমলা-হরণ।
( ঘাতকের সহিত মােবারকের প্রবেশ।)
মােবারক। এই দণ্ডে শিরচ্ছেদ করহ উহার।
সমসের। আয় দেখি, আয় রে ঘাতক।
(বেগে দেবলের প্রবেশ ; মােবারকের সহিত অসি যুদ্ধ ;
এবং ঘাতকের সহিত মােবারকের পলায়ন।)
দেবল। (সমসেরকে আলিঙ্গন করিয়া )
প্রাণেশ্বর, চল যাই
দর দেশে দীন
বেশে কুটীরেতে যাপিব জীবন।
সমসের। চল দেবি অভাগার নিয়তির সনে।
রাজকন্যা, রাজপুত্রবধূ দারিদ্রের
কঠোরতা সহিবে কেমনে?
দেবল। পতি ধৰ্ম্ম পতি কৰ্ম্ম, জীবনে মরণে,
যথা যাবে পদসেবা করিবে কিঙ্করী।
( উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক। ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক । গুজরাট-রাজ-প্রসাদ। ( সীতা ও কুমার।) কুমার। পরিণয়ে বিষবৃক্ষ হইল রােপন ক্ষমা কর সীতাদেবি, অভাগা কুমারে। দেহ ছেড়ে, স্নেহ-কারাগার হ'তে ; মুক্ত বিহঙ্গম মম, নীলাকাশে ভাসি মুগ্ধ হ’ব প্রকৃতির শ্যামল অঞ্চলে শুয়ে নবদুৰ্ব্বাদলে বিভূগুণগানে। নাহি- রবে চিন্তার তাড়না; বেড়াইব গিরি নদ নদী মহারণ্য, হেরিব নয়নে তার বিচিত্র কৌশল। সীতা। (পদে ধরিয়া) নাহি চাহি ভালবাসা দাসী হয়ে রব পদে, সাঁপি কায়মন। রাজা তুমি ; কহ দেব, দীন প্রজাগণ কে দেখিবে ? কে বা দিবে অনাথায় সান্ত্বনার বাণী। রাজা রাণী গেছে তপবনে, কে রাখিবে রাজ- সিংহাসন ? স্বার্থে নাহি প্রয়ােজন মম, অনাথ। বলিয়া অর্থে নাহি আকিঞ্চন, আজীবন তব চিত্র পূজি নিশি দিনে কেবা জানে হৃদিব্যথা মম। দেবসম ভক্তিপুষ্প দিছি উপহার।
৮৮
কমলা-হরণ।
কুমার। পতিব্রতা তুমি সুলােচনে। কিন্তু হায়,
এখনাে সে যবনীর চিত্র কলুষিত
করিতেছে অন্তরমাঝার। তাই চাহি
বিদায় বিদায়। এ জনমে ফুরাইয়াছে
আশা ভালবাসা। শ্মশান সংসারে বল
রহিব কেমনে! কহ দেবি, হেন পতি
চাহ কি কারণ, পাপ সদা যাহার
অন্তরে ?
সীতা। সুন্দরী দেবল ; নহি তার পদতল
সম, নহি গুণবতী নারী অনাথায়
কে করিবে দয়া ; রূপহীনে বৃথা আশা
পাগল সমান। যাহ দেব, যথা ইচ্ছা
যথা প্রাণ চায়, গরলেরে আলিঙ্গন
করিব যন্তনে। অনাথা বলিয়া দয়া
করিবে শমন।
কুমার। (লজ্জায় ) গুণবতি, ধন্য তব প্রেমরাশি।
তরে আবার আসিব সুখে সংসার
মাঝারে। প্রেম নহে রূপমােহবিকার
নাহিক তাহে চাহে আত্মজনে।
সীতা।
ভগব অনাথার তুমিই রক্ষক।
প্রাণেশ্বর, শতদোষে দোষী তবপদে।
(পদতলে পতন)
পঞ্চম অঙ্ক।
৮৯
{
কুমার। (হাত ধরিয়া ) এস এস প্রাণেশ্বরি। শ্যামশােভা
ধরাভরা অনন্ত ভাণ্ডার। শ্যামলতা,
শ্যামপাতা, শ্যম দুৰ্ব্বাদল, মুকুলিত
বনফুল, শ্যামবন মাঝে। যবে লতা
আদরিণী বেড়ে তরুবরে, প্রেমভরে
তরু পুনঃ করে আলিঙ্গন। শ্যামল
লতিক। তুমি আমি বনতরু বাঁধ লাে
প্রণয় পাশে কঠিন বন্ধনে। ভুলে
যাই সংসারের শত হাহাকার, নব
শ্যাম শােভাময়ী রমণী আমার। ( উভয়ের প্রস্থান)।
সপ্তম গভঙ্ক।
অরণ্য মধ্যস্থ কুটির।
( সমসের ও দেবল।)
সমসের। দেবল আর তো পারি না; এ ভিক্ষার চেয়ে মৃত্যু
শ্রেয়। সব গহনাতে ফুরালাে। এবার কি হবে । টাকা
কোথা। তুমি গুজরাটে আবার ফিরে যাও, কুমার
অবশ্য আশ্রয় দেবে। কেন কষ্ট সহ্য কচ্চো।
দেবল। না, না, আর ফিরে যাবাে না। আমার জন্য রাজপুত্র
বনবাসী হয়েছে, আমি মৃত্যুকে বরণ করবে। এ ছার
রূপরাশি গােপন ক’রবাে; মানবের ভয় থাকবে না।
কমলা-হরণ।
সমসের। না দেবি তা হবে না। চল আবার দিল্লীতে ফিরে
যাই ; বােধ হয় পিতা আগমন করেছেন।
দেবল। না না, মােবারক ভীষণ শত্রু সেখানে যাবনা।
( দুইজন বণিকের প্রবেশ।)
•
•০
বণিকদ্বয়। ওগাে আমরা পথ ভ্রান্ত পথিক ; আমাদের
আশ্রয় দাও।
সমসের। আসুন, বন্ধুগণ এ দরিদ্র কুটীরে আশ্রয় গ্রহণ করুন।
প্রথম। আপনি কি জাতি ? আপনাকে দেখে বােধ হয়, কোন
ভদ্র অধিবাসী।
সমসের। হ মহাশয় ; দারিদ্র্যতাড়নে এই অদৃষ্ট পরিবর্তন ;
আজন্ম ভিক্ষুক নহি, সবই খােদার মর্জি।
প্রথম। আপনি কি যবন, তবে আমার এখানে থাকা হলাে
; আমরা হিন্দু রাজপুত।
দ্বিতীয়। মহারাজ, এ রাত্রিকালে কোথায় আশ্রয় পাবাে, দেখি
চলুন।
সমসের। কে উনি, কে মহারাজ ? প্রতারণা করবেন না বলুন।
দ্বিতীয়। গুজরাট রাজা কুমারদেব।
দেবল। উঃ ভগব, কি হােলল।
(মুচ্ছা)
প্রথম। মহাশয়, উনি কি আপনার পত্নী ; মুচ্ছ। গেলেন কেন ?
সমসের। হ মহাশয় ; উহার ব্যায়াম আছে।
প্রথম। তাইতাে ; তবে থাকতে হ’ল, দেখি, কেমন আছেন ?
একি, একি, কে তুমি দেবল, দেবল তােমার এ দশা
আমায় দেখতে হলাে। তবে আপনি শাহাজাদা
-
.
পঞ্চম অঙ্ক।
৯১
সমসের উদ্দিন ?
কেন আপনার এমন হ’লাে বলুন
বলুন, দয়া করে বলুন।
সমসের। ( লজ্জায় ) কুমার, মােবারকের ভীষণ প্রতিহিংসায়
আমায় নির্বাসিত করেছে। আমি শত্রু, এখন যাহা
ইচ্ছা করতে পারেন। আমি ক্ষমার অযােগ্য।
কুমার। শাহাজাদা আজি হতে আপনি আমার বন্ধু। আমি
ঘাতক নহি। বীর পুরুষ বীরের আদর কত্তে জানি।
আসুন গুজরাটে আপনার যথাযােগ্য অতিথি সৎকার
করবাে।
সমসের। ধন্য আপনার মহত্ত্বে, ধন্য হিন্দুর ধৰ্ম্মে।
(মােবারক ও সৈন্যগণের প্রবেশ।)
কুমার। কে তােরা দস্যুদল ? এ দরিদ্ৰকুটিরে কি রত্ন-আশে
এসেছিস। যা যা, নহিলে দণ্ডদান করবাে।
মােবারক। দেবল দেবল, অমুল্য রতন ; আমি মােবারক
খিলিজি ; তুই কে কাফের ? বাদসাপুত্রকে দস্যু
বলিস ।
কুমার। কুমার আমার নাম, শােন রে বর্বর
যার নামে দিল্লীশ্বর আলা নিশীথে
নিদ্রিত নাহি হয়।
মােবারক। (হাসিয়া ) তাই বুঝি আসিয়াছ প্রেম সম্ভাষণে,
ছদ্মবেশে লইতে দেবলে ? ভ্রাতা এবে
দীন হীন কুটিরনিবাসী। ভাল তব
ছদ্মবেশ হেরি।
কমলা-হরণ
কুমার। (সরােষে তরবারি লইয়া )
নহি দস্যু তাের মত পিশাচ আকারে,
নহিরে ঘাতক রূপি ভ্রাতৃহন্তা
নর, দুরাত্মা পামর, শমন রূপেতে
মােরে কর দরশন। মম বিদ্যমানে
হেন নারী অত্যাচার কভু নাহি
সহিব জীবনে।
মােবারক। লইব রমণী আজি নিজ বাহুবলে ।
( উভয়ে তরবারি যুদ্ধ ও মােবারকের সৈন্য সহিত পলায়ন)
সমসের। {
উঠিয়া )
কুমার, কুমার আজি হ’তে ভুলে যাব
জাতি ভেদ, ভুলে যাব বিজাতি বিদ্বেষ,
ধরিব হৃদয়-মাঝে প্রেম আলিঙ্গনে।
এস বন্ধু এস আজি সন্তাপিত প্রাণে
ঢাল সখে,
শান্তি-বারিধারা, ভুলে যাই
সংসারের শােক-তাপ-জ্বালা পবিত্র
}
হৃদয় পরশনে।
কুমার। আজি হ'তে ভুলে যাব শত্রুতা তােমার ;
প্রেম আলিঙ্গনে সখে বাধিব তােমারে ।
( উভয়ে আলিঙ্গন ও পট পরিবর্তন)
পঞ্চম অঙ্ক।
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
( গুজরাট উপবনে ফুলময় সিংহাসনে
দেবল, সমসের এবং কুমার ও সীতা।)
সখিগণের প্রবেশ ও গীত।
প্রেমে হায় ধরা ভেসে যায়,
সেজেছে নবীন সাজে প্রেমে ভাসে কায়,
আপন ভুলে গেছে মিলে
হিন্দুবন বাদ ভুলে,
দুটি চাদে আহা কি খেলে
অরি হায় কে চায় ভবে মােহিনী ধরায়।
প্রেমে ওই গাহে পাখী,
ফুলে ফুলে ঢাকে শাখী
আহা প্রেমতরঙ্গে রঙ্গেতে ওই নদী গেয়ে যায়।
চাদে ঝরে সুধারাশি কুমদিনী হাসে হাসি,
হাসে আজি জগৎবাসী প্রেমেরি ছটায়।
নবম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-হিমালয় পৰ্বত ।
( সন্ন্যাসী বেশে রাজা ও রাণী।)
রাজা। এইত সে সাধনার স্থান। স্থির,
ধীর, অচল পাষাণ গভীর ভাবেতে
ভাের, যেন যােগী মগ্ন মহাযােগে। দূরে
দুরে অনন্ত তুষার রাশি, তলদেশে
কমলা-হরণ।
বারিধিগর্জন।
শুভ্র ফেন উর্মিমালা
নাচে তালে তালে। ভগবন! প্রেম তব
সিন্ধুবারি ধরণীশােভন। মহাশূন্যে
কোটী কোটী তারা তােমারি আদেশে ফিরে,
জ্যোতির্ময় তবতরে জ্বলন্ত ভাস্কর।
সুধার আধার শশী তােমার কারণে।
মূঢ় আমি, না চিনিনু তব শ্রীচরণে। ( ধ্যানমগ্ন )
( যুক্তকরে । ভগবন, ভক্তি দাও অনাথারে। (ধ্যানমগ্ন
( জনৈক সন্ন্যাসীর গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।)
রাণী।
কোথা মঙ্গল আলয়
পূর্ণব্রহ্ম চিদানন্দ পরমাত্মাময়।
এস হে হৃদয়াসনে,
শতদল সিংহাসনে
আত্মাসনে একত্রিত হও হে চিন্ময়।
ভক্তিপুজা সচন্দনে
সাজাইব শ্রীচরণে
মানসে এস হে পিতঃ ডাকি কাতরে তােমায়।
যবনিকা পতন।
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.