Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Marmolekha

Shastri,nalinimohan · 2009/12/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মৰ্ম্মলেখা
শ্রীনলিনীমােহন শাস্ত্রী
১১)
ন
রায় চৌধুরী এও কোং
১১;
লেজ স্কোয়ার,
কলিকাতা।

১১, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
.
প্রিন্টারনারায়ণ চন্দ্র দাস
দি বেঙ্গল ইকনমিক্যাল প্রিন্টিং ওয়ার্কস
১২, ক্লাইভ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

সাগর তুমি, তােমার কাছে বিন্দুবারি অর্ঘ্য আনি
হে কবিগুরু, করিতে নতি আপন মনে সরম মানি।
কিন্তু রবি-পরশে যবে আলােকে হাসে দিগঙ্গনা,
বিন্দুদানে রাঙ্গিয়া উঠে কমল দলে শিশির কণা।

No text on this page.

সুচী বিষয়ু পৃষ্ঠা ১০. ১৭ ৩৯ ৪১ ••• ৪৬ সূচনা অশ্রুকণা প্রেমের শক্তি সম্মান রক্ষা, অপয়া সন্ধ্যা প্রদীপ পাষাণী পাষাণ রাণী বা ব্যর্থ সুযােগ সাধু কি বেশে এলে ফিরে। মালাকরের একদিন রূপকথা অভিষেক ••• এ পারে শেফালির অবতরণ নীরবে রহিল চেয়ে ৪৯ । ৭০, ৭৪ ৭৭. ৮০ -- bobi

do
বিষয়
পৃষ্ঠা
১৮
৯
';
১০১
ডাক, তায়ে
জল কেন আঁখি কোণে ?
• উৎকণ্ঠিতা
এ পথে এলনা ফিরে
আমার বনের মুক্ত হরিণটিরে
শ্রীসতীশ চন্দ্র ঘটকের মহাপ্রয়া,
১০৪
••• ১০৬
১০৭

s,
মৰ্ম্ম লেখা
মৰ্ম্মের লেখা
মৰ্ম্মের লেখা
কর্মের অবসরে !
অশ্রু জলের
মৰ্ম্মর রেখা
জীবনের প্রান্তরে !
সারি সারি সারি
দূর
সীমানায়
ওই তােমাদের দাগ দেখা যায়,
লুব্ধ নয়ন ঘুরে ফিরে চায়
ব্যাকুল বেদনা ভরে।
ওই পথে পথে ঝড়ের চিহ্ন
পােড় বাড়ী ভাঙাতট—
শিব মন্দির জীর্ণ ভিন্ন,-
বজ্ৰ দীৰ্ণ বট,
স্মৃতি বাঁধে বাসা ওরি খােপে খাপে,
উহারি বাতাসে শ্রুতি মম কঁপে,
দিলাম আজি সে আলাপ বিলাপে
বিশ্ব শ্রবণে ধরে।

২
মৰ্ম্ম লেখা
আজ ত সন্ধ্যা আসিল ঘনায়ে,
বৃথা আজ অভিমান,
শুষ্ক মাঠের রিক্ত এ বায়ে
ঘুরে উদাসীন তান!
আশা নিরাশার দিন নাই আর,
সাথীরা আমার আঁধার নিশার,-
হােক তােমাদের গােপন ভাষার
ঝঙ্কার ঘরে ঘরে।
মৰ্ম্মের লেখা মৰ্ম্মের লেখা
কর্মের অবসরে।
R

মৰ্ম্ম লেখা
অশ্রুকণা
একদা নন্দনে শচী-সঙ্গ ছাড়ি দিয়া
ইন্দ্র যান দূরে ; শচী উঠেন কঁদিয়া।
সঙ্গে ছিল যক্ষ কন্যা-কহে ডাক ছাড়ি’
‘দেবতা বলিয়া কিগাে সব বাড়াবাড়ি ।
অইত চলেন উনি ; এত কি দুঃসহ
পরাণে বাজিল ব্যথা—এত কি বিরহ ?
‘অহর্নিশ একসাথে উঠ, বস, জাগাে,
ঘুমাও, বেড়াও, তবু তৃপ্ত নহ, মাগাে,
অরুচিও হয় না কি? কি কহিবে দাসী ?
এত বলি’ উচ্চকণ্ঠে উঠে বালা হাসি।
সরােষে কহেন শচী—“আশঙ্কা এমনি
রহে দম্পতীর প্রেমে! হা মূঢ়
রমণি,
রাখিলি তার মান হাসিলি হেলায়।
এই পাপে স্বর্গচ্যুতি—নিবাস ধরায়
অবশ্য ভুঞ্জিতে হবে।

৪.
মৰ্ম্ম লেখা
বলিতে বলিতে
সৰ্ব্ব অঙ্গে দিব্য জ্যোতি লাগিল জ্বলিতে,
লাবণ্যমণ্ডিত গণ্ডে ফুটিল গৌরব
দীপ্ততেজে,—সচকিত দেবতা দানব !
নিৰ্বাক্ বাসব ফিরি’ দেখেন সম্মুখে
নতজানু যক্ষকন্যা ভীতিক বুকে
করিছে করুণাভিক্ষা ; কহেন ইন্দ্রাণী,
“মিথ্যা হইবার নহে দেবতার বাণী”।
তথাপি কোমল প্রাণ গলে করুণায়
কহেন বাসবে চাহি করিতে উপায়।
ইন্দ্র চিন্তি’ ক্ষণকাল ক’ন স্মিতমুখে
“সর্বশ্রেষ্ঠ যে সামগ্রী ধরণীর বুকে
যে দণ্ডে পশিবে ল’য়ে স্বর্গপুরদ্বারি
সেই দণ্ডে শাপ মুক্ত হবে তুমি, নারি”।
শুনিতে শুনিতে কথা হেরিলা বিস্ময়ে
যক্ষকন্যা, শচীশাপ মূর্তিমান্ হয়ে
অগ্রসরি স্বর্গ হতে খেদাইল তারে
অধােদেশে ! উতরি বৈতরণী পারে।

মর্শ লেখা
স্ত বালা, ধরাপৃষ্ঠে ঠেকিতে চরণ
হেরিলা সুদূরে রুদ্ধ অমরা তােরণ!
স্বর্গীয় রূপের ছটা মিলাইল গায়,
নারী হয়ে যক্ষকন্যা বিরাজে ধরায়।
সেইদিন হ’তে বালা খুজে খুজে ফিরে
পৰ্বতে, কন্দরে, বনে, গ্রামে, সিন্ধুনীরে
শ্রেষ্ঠবস্তু; মনােমত কিছুই না পায় ;
বসন্তে মলয়ানিল লাগে আসি গায়,
নবশােভা বিকশিত ধরণী উপরে,
শ্রবণ জুড়ায়ে যায় পিক কলস্বরে,
রসাল মুকুলগন্ধে অন্ধ অলিকুল
মধুর গুঞ্জন তুলি’ বনান্তে সঙ্কুল ;
ইহাদের মাধুরীতে ভরি’ লয়ে’ ডালা
স্বর্গদ্বারে পরীক্ষিতে উপনীতা বালা
দৃঢ় রুদ্ধ পূৰ্ব্ববৎ রহিল দুয়ার
বিফল বাসনা বালা ফিরিলা আবার।

মর্ম লেখা
খনির তিমিরগর্ভ হ'তে শ্রেষ্ঠ মণি
বাছি’ লয়ে পুনঃ তথা পশিলা রমণী ;
উত্তালতরঙ্গময় সাগরের তল
হ’তে লয়ে আসে কত মুক্তা ঢলঢল ;
মধুর সুন্দর যাহা শ্রবনে, নয়নে,
আম্রাণে, আস্বাদে, স্পর্শে পাইত ভুবনে
আঁতি পাতি করি নিত, ফেলিতনা কভু ;
খুলিলনা স্বর্গদ্বার কোনােমতে তবু।
কখনাে বা নদীতটে শিবের মন্দিরে
খুঁজে খুঁজে শ্রেষ্ঠদ্রব্য নারী যবে ফিরে,
দেখে কোনাে বিপ্রকন্যা অর্ঘ্য ল’য়ে করে
দেব পদ বন্দে মন্ত্রে প্রণত অন্তরে ;
সেই অর্ঘ্য—সেই মন্ত্র তুলি লয়ে আসে,
হােম যজ্ঞ ক্রিয়াফল লইলা সকাশে,
শক্তের লইল শক্তি-রাজার গৌরব,
ভক্তের লইলা ভক্তি-কুসুম সৌরভ,
লইলা সাধুর পুণ্য-ঋষির সাধনা
কোনমতে স্বর্গদ্বার তবু খুলিল না।

মর্ম লেখা ৭ এইরূপে বহুবর্ষ কাটিল বিফলে ; হতাশ হৃদয়ে নারী যা পায় ভূতলে তাই ল'য়ে যায় স্বর্গদ্বারে ; মুড়ি নােড়া খড় কুটা কাঠ ধাতু ছেড়া ভাঙ্গা পােড়া ফেলেনা কিছুই আর,—বাড়ে আকুলতা ; দুয়ার তেমনি রুদ্ধ আগে ছিল যথা। একদিন বায়ুস্নিগ্ধ মধু সন্ধ্যাবেলা তৃতীয়ার শিশুষ্ঠাদ করিতেছে খেলা নিৰ্ম্মল গগন-প্রান্তে যবে-স্বপ্নহারা দেবতার আঁখিসম দু একটি তারা যখন উঠেছে ফুটি—ফিরেছে যখন করি’ সারা দিনমান আহারান্বেষণ ক্লান্ত বিহঙ্গম সুখে নীড়ে আপনার গােষ্ঠ হ’তে ফিরিয়াছে গাভী, খুরে তার তুলি’ ধূলি বাড়াইয়া সান্ধ্য অন্ধকার যবে দিনান্তের ক্ষীণ অস্ফুট আলােকে পরপারে ঝাউবন ঠেকে আসি’ চোখে মুগ্ধ প্রকৃতির শ্যাম যবনিকা সম উদ্ধে লঘু, কৃষ্ণবর্ণ নিয়ে গাঢ়তম-

৮
মৰ্ম্ম লেখা
যক্ষকন্যা ভ্রমিতে ভ্রমিতে নদীতীরে
হেরিলা স্তিমিতালােক-মলিন কুটীরে
ব্রাহ্মণ অশীতিপর সজল নয়নে
মৃতপত্নী ল’য়ে কোলে বসে যােগাসনে
বুকে তার যত ব্যথা—মুখে নাহি বাণী
রয়ে যেন কায়াহীন ছায়ামূৰ্ত্তি খানি—
নেত্রবারি, শতধারে গণ্ডযুগে তার
ধৌত করি’ প্রবাহিত হৃদয়ে উদার—
নিস্পন্দ শরীর মন—যেন এক সাথে
ব্যাকুল ধাবিত হ’তে মৃতের পশ্চাতে!
বিস্ময়ে নির্বাক্ বালা রহে ক্ষণকাল,
স্বেদবিন্দু সিক্তকরে তার রক্ত ভাল,
বক্ষোঝে গুরুচাপ হয় অনুভব,
কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে বদনে নীরব।
বহিল মৃদুল মন্দ সাঁঝের বাতাস ;
বুকের পাঁজর ভাঙ্গা ফেলি’ দীর্ঘশ্বাস
অন্ধকারে যক্ষকন্যা মুছিলা নয়ন,
জানিলনা কেহ আর ; ভরিল বিজন
নদীতীর স্বগীয় কুসুম সৌরভে ;

মর্ম লেখা
ব্রাহ্মণের আঁখিজল তুলি লয়ে তবে
ধাইল স্বরগে বালাখুলি’ গেল দ্বার।
অশ্রুর অসীম শক্তি-শ্রেষ্ঠ অধিকার।

১০
মৰ্ম্ম লেখা
প্রেমের শক্তি
সারি’ ঝট পাট শত ঝঞ্চাট
কোন্ ভাের হ’তে উঠে ;
স্নান শেষে নারী গরীবের ঘরে
রান্না করিতে ছুটে ;-
বােড়া চালের বাড়া সে ভাত,
অমৃত বলিয়া খাবে ভরি’ পাত
বড় ছেলে ছুটি বুড়াটির সাথ
ক্ষেত হতে এসে জুটে,
ভাবিতে ভাবিতে গরীবঘরণী
রান্না করিতে ছুটে।
ছােট ছেলেগুলি যাবে পাঠশালে
এখনিত চাই ভাত ;
কোলের শিশুটি দুধ পায় নাই
যােড়া রহিয়াছে হাত;
কাপড় কাচিতে বাকি এতগুলি,
আনিতে হইবে শাক দুটি তুলি
ওই বিনা ফুয়ে নিবে গেল চুলি-
শিরে করে করাঘাত!
একফোটা জল ভােলা নাই ঘরে
কি দিয়ে বাঁধিবে ভাত।

মর্ম লেখা
১১
গুছাইয়া সব বিশু ছেলেটার
ছেড়া জামা দিল তালি ;
এদিকে কাপড়ে দাশু হতভাগা
মাখায়ে আনিল কালি ;
একরাশ কাঁথা সেলাই করিতে
সন্ধ্যা ঘনায়ে আসিল ত্বরিতে,
লাগিল রমণী শয়ন রচিতে
সন্ধ্যার দীপ জ্বালি ;
দেখিল মাথাটা করে টিপ, টিপ,
কেমনে উঠিবে কালি ?
চাষীদের তরে রাখিয়া পান্ত
তুলিয়া ফেলিল হাঁড়ি
মাড়টুকু রাখি ভাগাভাগি করি,
কহে নিঃশ্বাস ছাড়ি’
“বহেনা জীবন হৈমতে আর
চাহেনা বহিতে পায়ে দেহ ভার,”
হেন কালে হেরে ছেলেদুটা তার
স্বামী সনে ফিরে বাড়ী,
দাড়াল রমণী নিমেষের তরে
যবে নিঃশ্বাস ছাড়ি।

১২
অৰ্ম্ম লেখা
দেখিল চাহিয়া যুবাদের চোখে
বুড়ার চোখের ছবি--
সেই সে দরাজ বক্ষের ছাতি,
সেই হাসি-সেই সবি,
চাহিয়া চাহিয়া ভরে উঠে প্রাণ।
রমণী ফিরাতে পারেনা নয়ান
যেন শশানে কোন্ দূরাগত গান
অসীম শান্তি-লভি',
কহে—“বােঝা নহে খাটুনি আমার
হেরিলে এদের ছবি”।

মৰ্ম্ম লেখা
সম্মান রক্ষা
“রুদ্ধ দুয়ার রাণীর আদেশে
যাও ফিরে যশােবন্ত” ;-
শুনিয়া এ বাণী নতশির রাণা
ওষ্ঠে চাপিলা দন্ত
যুঝি অগণ্য মােগলের সনে
রাজপুত রাণা পরাজয়ী রণে
সেদিন নগরী দুর্গ তােরণে
দাড়ায়ে ক্ষুব্ধ বুকে ;
কহিলেন রাণী-পরাজিত রাজা
নগরে ফিরে কি মুখে ?”
ফিরিল সরমে রাজপুত বীর
অশ্বে মারিল কষা;
রাজপুত সেনা গরজে গভীর
“জয় রাণা মহাযশা,”
রাখাল তখন তরুতলে বসি
বাজাইছে বেণু উলসি বিলসি’ ;
রাজপুত করে ঝলসিল অসি
রবির দীপক রাগে ;
কতিপয় সেনা অগম সমরে
চলিল রাণার আগে।

১৪
মর্ম লেখা
চলে যায় দিন নগরী শ্রীহীন
বিষাদ মলিন পান্থ
ক্লান্ত কৃষক যায় মাঠে ভােরে,
ফিরে করি’ দিবসান্ত ;
ঘট কঁখে বধূ তড়াগের ধারে
চলে ধীরপদে জল আনিবারে ;-
যে যাহার কাজে যায় সারে সারে ;-
কোনাে কথা নাহি ভাষে ;-
ক্ষুন্ন হৃদয় মূক পুরবাসী
জাতি সম্মান নাশে।
সূৰ্য সেদিন অস্তে চলেছে
পশ্চিম মরুপারে ।
প্রাচী প্রান্তর হ’তে আসে ঘন
আঁধার দুর্গ দ্বারে ;
স্তব্ধ নগরী যেন পুরী হানা,
দুর্গশিখরে উড়িছে নিশানা,
নহবতে শুধু করুণ সাহানা
বাজিতেছে থাকি থাকি;
রাজপুত সেনা-এ আঁধারে কারে
বসনে আনিছে ঢাকি ?

মর্ম লেখা
রাণী কহে, “আয়, ওলল সহচরি,
দে লাে বিনাইয়া কেশ,
সির রাগে বসনে ভূষনে
করে দে লাে বধূবেশ ;
রাজপুত অসি সাধিয়াছে কাজ,
ফিরেছেন রাণা গৌরবে আজ,
দে লাে খুলে তাঁর সমরের সাজ,
আলাে বরণ করি”।
শিরে হানি’ কর “হায়, রাণি, হায়”
কেঁদে কহে সহচরী।
সেদিন নগরে ভবনে ভবনে
উথলিল রাজভক্তি ;-
ব্যর্থ হয়নি রাজপুত অসি—
ব্যর্থ বাহুর শক্তি ।
“জয় রাণা,” রাণী গৌরবে কহে ;
বধির শ্রবণ শনিবার নহে।
জয় জয় রবে মহাসমারােহে
খুলিল দুর্গদ্বার ;
রাজপুত মান রাখি’ রাজপুত
আলয়ে পশিল তার।

১৬
মর্ম লেখা
নিজ করে রাণী মালা দিয়া গলে
দুর্গে আনিল দেহ ;
কেহ দিল শিরে পুষ্প বরষি’
চন্দন দিল কেহ;
জ্বলিল শ্মশানে ধূ-ধূ করে চিতা,
বধূবেশে আসি ক্ষত্র দুহিতা
মৃত পতি পাশে হ’ল সহমৃতা
পতির গরবে ভাসি।
কঁদে সহচরী “হায় হায়” করি’
মৌনী নগরবাসী।

মর্ম লেখা
অপয়া
তারায় তারায় চলে আলাের কাপন!
পরাণে পরাণে টা—সে কোন্ গােপন
মরমের তনুতর আকাশ বাহিয়া
কে দিবে সন্ধান তার, দুটি চারু হিয়া
মিলে যাহে অচ্ছেদ্য বন্ধনে, প্রয়াগের
গঙ্গা যমুনার মত, সুখের দুঃখের
বেদনায় ?
অন্ধকার-মেঘনামে ভবে
ঝরিতেছে ধারাজলে ধরণী মগনা -
ওই ঘন বরষার জল কলরবে
আজ মনে আসে এক যথার্থ ঘটনা ;
এমনি নিশীথে বসি’ শুনেছি সে কথা-
এমনি প্রলয়মেঘ সেদিনাে আকাশে-
এমনি বিজলী জ্বালা-বর্জ্য ব্যাকুলতা
এমনি সে ঝঙ্কা ছুটে-বেশ মনে আসে।

মর্ম লেখা
‘পূজার ছুটিতে চল বেড়াইয়া আসি
আমাদের দেশে ;-ডাকি সখারে তাহার
কহিল নরেশ ; বিধু উত্তরিল হাসি’
‘সেত বড় বেশী কথা ; বিদেশ বিহার
এইরূপে নিরূপিত হইল বিধুর।
তখনাে বরষামেঘ অম্বরে মেদুর
ভাসে ঘন কৃষ্ণবর্ণ, আদ্র ধরণীর
গন্ধ নাসিকায় করে তখনাে প্রবেশ,
শ্লথ হয় নাই পূর্ণ বেগ তটিনীর,
শশীর সমলভাব হয়নি নিঃশেষ ;
দোয়েল তুলেনি তান ললিত সুস্বরে,
ফুটেনি তখনাে পদ্ম সব সরােবরে।
ইন্দ্রবাবু জমীদার; সুযশঃ সুনাম
ব্যাপিয়াছে সৌরভের মত ভরি’ গ্রাম,
দীনের কুটীর হ’তে শত সাধুবাদ
উঠিত অনন্তে উর্দ্ধে ; বহু আশীর্বাদ
উৰ্দ্ধ হতে দেবগণণা করিত বর্ষণ,
নহিলে এমন শান্তি মিলে কি কখন ?

মৰ্ম্ম লেখা
১৯
t
একমাত্র দীপসম কন্যা ছিল গেহে
উজলিয়া, পরদুঃখে বিগলিত স্নেহে।
আসিত ভিক্ষুক অন্ধ, বৃদ্ধ, যষ্টিকরে ;
আঁখি নাই,হেরে নাই মূর্তি বালিকার ;
তবুও কোমল কণ্ঠে করুণ ভরে
যখনি ঝরিত কর্ণে ধারা জিজ্ঞাসার
‘কি নাম? কোথায় ঘর ? কে আছে তাহার ?
বড় কি দরিদ্র তারা? জুটেনা আহার’ ?
তখনি সে দৃষ্টিহীন আঁখি করি স্থির
ভাবিত এ স্বর বুঝি বিশ্ব জননীর।
নীরবে কপােল বাহি’ ঝরিত আসার।
চঞ্চল হইত তাহে প্রাণ বালিকার ;
যা পেত আনিয়া দিত হাতে তুলে তায়,
বলিত, আশিষ লয়ে, ‘এস পুনরায়'।
প্রজাদের সুখ দুঃখে ভাগ নিত বালা,
দরিদ্র অনাথ শিশু জুড়াইত জ্বালা
কোলে তার ; স্বাধীন কুরঙ্গ শিশু সম
নিৰ্ম্মল নিরীহ কান্ত শান্ত নিরুপম
শৈশব এমনি তার ব্যগ্র কুতূহলে,
শাপভ্রষ্টা দেবী বুঝি ভাবিত সকলে।

२० মর্ম লেখা গ্রামে কোনাে নবমবর্ষীয়া বিধবার তাপিত জনক দেয় বিবাহ আবার গ্রামের প্রধান সব মিলি’ এক সাথে একঘরে করিবারে চাহে তারে ; তাতে ইন্দ্রবাবু প্রতিবাদী ;-শুধু এই দোষে পড়িলেন ইন্দ্রবাবু সমাজের রােষে। কহিলেন ইন্দ্রবাবু—“চাহিনা সমাজ ব্যথিতের নারায়ণে—ব্যথা দিয়ে আজ! সমাজ ছাড়িল তঁারে ; ছাড়িলনা তবু নিরক্ষর প্রজাকুল ;-দীন পারে কভু ছাড়িতে যে দীনবন্ধু, সেবা পরায়ণ রােগে, বিপদে সুহৃদ, দুঃখে সবেদন- হেন জনে? ছাড়িলনা আর সে নরেশ সেই নর-দেবতার ; তাঁর দয়ালেশ ভুলিতে পারেনা সে যে তাহারি লালিত, অনুগত সাথে সাথে সে সদা ফিরিত।

মৰ্ম্ম লেখা
২১
কন্যা মাধবীর রূপে দশদিক আলল,
আকাশ বাতাস গুণে মুখর ঘােরালাে ;
এতগুলি বসন্তের ফুলে গাঁথা মালা
যৌবনের মধুবনে উপনীত বালা ;
চিন্তিত জনক তার বিবাহের তরে ;
সমাজ পাণ্ডারা সাধে বাদ, ঘরে ঘরে
দেয় অপবাদ, ব্যস্ত করি তুলে তারে।
হেনকালে বিধুরে সে গ্রামে আনিবারে
নরেশ করিল আয়ােজন, যােগ্য ভাবি’
মাধবীর। মহাপ্রাণ উদার মেধাবী
সুশিক্ষিত বিধু ছিল সতীর্থ তাহার
তাহার স্নেহের দাবী নহে উপেক্ষার
তুচ্ছ নহে মাধবীর কান্তি' স্বরগীয়—
তুচ্ছ নহে শান্ত মৃদু বচন অমিয় !
একবার এই গ্রামে বিধু যদি আসে
মিলাইবে সমাজের বাধা অনায়াসে।

২২ মৰ্ম্ম লেখা শরৎ আসিল বঙ্গে সঙ্গে ল’য়ে আশা, জাগিল সে প্রবাসীর প্রাণে কি তিয়াষা । ফুটিল সে কত সাধ নবীন আকারে মুক্ত পক্ষ শ্রেণীবদ্ধ হেরি’ বলাকারে উড়িতে গগনােপরে! বায়ু ভরে ভাসি’ তাহাদেরি মত যায় তূলা মেঘ রাশি। শরৎ আসিল বঙ্গে-বাজিল বাঁশরী কত সুখস্মৃতি ল’য়ে আবাহন করি আনিল সে শারদীকে, ভরিল উৎসবে কানন প্রান্তর গৃহ অপূৰ্ব বিভবে ! আসিল সে বিধু ইন্দ্রবাবুর ভবনে লভি ছুটি; স্বাস্থ্য আশে সাধ মনে মনে একবর্ষ পড়া বাদ দিয়া র’বে সেথা দেখে যদি উপকার ; নরেশ বিজেতা রাজনীতিবিৎ সম তুষ্ট মনে মনে নিরমিছে কতরূপ প্রাসাদ গগনে। এমনি বিশ্বাস দৃঢ়, চিত্ত শঙ্কাহীন, সুখের কল্পনা নর কর কতদিন! সম্মুখেতে দেখ চেয়ে নিবিড় আঁধার- ভবিষ্যতে বৃথা হায় গণনা তােমার।

মৰ্ম্ম লেখা
২৩
মিলিল দুজনে
মাধবীর মৃদু বাণী
ভুলাল বিধুর মন ; প্রিয়মুখ খানি—
জ্যোৎস্না রাতে নির্মল শারদশশী ছায়া,
কঙ্কন ঝঙ্কারে তার কি বিছাল মায়া।
কি সুগন্ধ ভেসে যেত মধু স্নিগ্ধ বায়ে
তাহার অলকগুচ্ছ উড়ায়ে ছড়ায়ে !
কম্পিত চম্পক কলি মানিয়া বিস্ময়
দুলিয়া উঠিত ডালে হেরি পরাজয়।
কাহার চরণ শব্দ, কার শুভ্র হাসি,
কার প্রিয় আলাপন, সােহাগের রাশি,
ঢালিত স্বর্গীয় সুধা বিধুর শ্রবণে
দূর কুঞ্জে বাঁশরীর মত ক্ষণে ক্ষণে ?
অথবা যমুনা বক্ষে সঙ্গীত তরল
পূর্ণিমা নিশীথে যথা হৃদয় রঞ্জন
তেমনি সে ভাবরাশি, ভাষা সে সরল
অস্ফুট তথাপি সৰ্ব্ব ক্লান্তি বিনাশন।
কিংবা সরসীর নীরে দাড়ায় যখন
গ্রাম্যবধূ স্থির ভাবে স্নান তাবসরে
স্মরি’ প্রিযুকথা ত্যজি’ অঙ্গ-প্রক্ষালন,
ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে সলিলের 'পরে ;-

২
মৰ্ম্ম লেখা
তখন নিকটে যদি থাকে শুনিবার
সেই শব্দ—যদি কাছে থাকে দেখিবার
সে উদার ভাব, সেই মনােমত জন,
তার প্রাণে জাগে তবে যেই ব্যাকুলতা,
তার মনে ফুটে উঠে যে স্মৃতি মােহন,
সে কি স্বপ্ন, জাগরণ,—সে কি হর্ষ, ব্যথা
সে যেমন পারেনা বুঝিতে ; স্তব্ধভাবে
সুনীরবে স্মিতমুখে হেরে চারিধার
বিধুর তেমনি ভাব জলদ আরাবে
শিখী যথা মন্ত্রমুগ্ধ ; খুজিতে আহার
নব প্রস্ফুটিত কোনাে পদ্মের মৃণালে
প্রহার করিয়া চঞ্চু মরাল যেমন
রহে সচকিত যবে করিয়া গুঞ্জন
উড়ে পুষ্প অধিষ্ঠিত অলি ; সেই কালে
বিধুর ব্যাকুল আঁখি চমকিত মন
শুনি’ ধ্বনি তথা বক্ষ কঁপে মৃদু তালে
কমনীয় কর রাখি কপােলর পরে
কার কথা ভাবিত মাধবী, কার স্বরে
ঝরিত তাহার কর্ণে সঙ্গীত উদার,
ঘুরিত আঁখির কাছে হাসিটুকু কার ;

মর্ম লেখা
২৫
কার তরে পুষ্পশয্যা রচি কল্পনায়
বসিয়া থাকিত একা কার ভাবনায়
যাপিত সে সারাদিন ?
পূর্ণিমা নিশীথে
বিমল কৌমুদী যবে পড়ে ধরণীতে
তন্দ্রান্বিত, তরুশিরে আছে ফুলকুল
আঁখি মুদি শােনা যায় শুধু কুল কুল
তটিনীর ধ্বনি যেন কার প্রেম লাগি’
ধুম নাই সারারাত; আছে সাথে জাগি
ঝিল্লীকুল ঝাঁ ঝাঁ রবে ; জনহীন ঘাটে
একটি তরণী বাঁধা নত করি পাল
সরসী সলিলে ভাসে একটি মরাল
সঙ্গিহারা ; কোটি তারা গগন ললাটে
জলাকাশে আরাে স্থির ; মাঝে মাঝে ডাকে
বিনিদ্র পাপিয়া .কোনাে ; হেরি’ অচেনাকে
পথের কুকুর থাকি থাকি’ তুলে রব ;
মিলালে সে ধ্বনি ধরা দ্বিগুণ নীরব।
সে সময়ে কত কথা হইত উভয়ে,

২৬
মন্ম লেখা
কত উচ্চ অভিলাষ বিধুর পরাণে,
কত গল্প, কত হাসি প্রেম বিনিময়ে ;
বিধু কহে, “তুমি মম মান অপমানে
একমাত্র উপাস্য দেবতা; জীবনের
তুমি এক ধ্রুবতারা; তুমি মানসের
একমাত্র মানস প্রতিমা ; হে বাঞ্ছিতে ।
পাবনা কি—এজীবনে মিটিবেনা আশা
পাবনা কি, হে আরাধ্যা, তব ভালবাস
তুমি সিঞ্চিবেনা বারি তাপ দগ্ধ চিতে?
ভুলাবেনা দুঃখ রাশি মঙ্গল সঙ্গীতে ?”
স্থিরভাবে সুনীরবে শুনিত মাধবী,
শুনিত না, কি যে ভাবে রহিত বিহ্বল ।
যথা কোনাে কৃষক-দুহিতা পূতচ্ছবি
উৎস মুখে রাখি’ কুম্ভ ভরিবারে জল,
কে প্রবাসী তার তরে ভরিত কলস
ভাবিতে ভাবিতে শুনে কুম্ভ আসে ভরে ;
শুনেনা চাহিয়া রহে নয়নে অলস,
ভরিয়া উছলিবারি পড়ে ভূমি’পরে ;
কিংবা যবে নিশা হয়ে আসে অবসান
নবীন দম্পতী যথা তন্দ্রালস চোখে
;

মৰ্ম্ম লেখা
২
প্রাণটুকু পরস্পরে করে ফেলে দান
ঘুম ভেঙে অরুণের অস্ফুট আলােকে,
ভুলে যায় এ বিশ্ব সংসার আন মনে
উয়ার পাখীর গান শুনে ও শ্রবণে
শুনেনা, বাড়িতে বেলা দেয় ধীরে ধীরে
তাহাদের সুখময় শয়ন কুটিরে।
কখন কহিত বিধু কি প্রস্ফুট আশা
প্রাণে তার, অন্তরে কি দারুণ পিপাসা !
ইচ্ছা হয় কোনাে এক সাগরের তীরে ;
সলিল-কল্লোল-গীতি মুখর সমীরে’
রচিয়া কুটীর ক্ষুদ্র ল’য়ে মাধবীরে
বাহিবে জীবন ভার; শুক সারিটীরে
শিখায়ে প্রেমের গান স্বীয় মনােমত
দিবে ছাড়ি, বনে বনে গাইবে নিয়ত
সে সঙ্গীত ; সাগর কপােত দিবে সুর ;
বনান্তরে প্রতিষ্ঠান উঠিবে প্রচুর ;
হরিণী চকিত চোখে চাহিবে ফিরিয়া,
ক্ষণকাল শােহার যাবে বিস্মরিয়া ;
উড়িবে গুঞ্জিত অলি ; শুনিবে মােহিত
পাখী শাখা হতে মৃদু নূপুর শিঞ্জিত ;

মর্শ লেখা
থাকি থাকি’ দিবে তান বসন্ত কোকিল
হরষে উঠিবে পূরি’ এ বিশ্ব নিখিল ;
হেথা হােথা যুথিকার সারি মল্লিকার,
শ্রেণী ; গােলাপ কামিনী বেল সারে সার
রবে হােথা ; সরােবর হােথায় বিমল,
পদ্ম ফুটে রাশি রাশি কাকচক্ষু জল ;
অতৃপ্ত তৃষার মত নীলিমার দেশ
রবে চাহি’, বুকে করি লহরী অশেষ ;-
এইরূপ কত কথা রজনী জাগিয়া ;
পেচক মাথার পরে যাইত ডাকিয়া,
শুনিয়া চকিত দ্রুত বুকের স্পন্দন
মাধবী সুধাত মনে—“একি কুলক্ষণ ?”
মধ্যাহ্নে নিকুঞ্জ গৃহে বসিত মাধবী
জানালার মধ্য দিয়া লীলায়িত রবি
পড়িত পায়ের কাছে ; তুষার বরণ
সারস সরসী নীরে ভাসিত হরষে ;
বহিত ঈষৎ তপ্ত মৃদু সমীরণ ;
পড়িত সুবর্ণলতা রসাল উরসে ;
;

মৰ্ম্ম লেখা
২১
কহিত কতই কথা বিধু অনুরাগে
মাধবীর গ্রীবা করে, বেষ্টিয়া সােহগে
আসন্ন বিচ্ছেদ ভয়ে নয়নের জল
ভাসাইত মাধবীর কপােল যুগল ;
প্রকৃতি সে অশ্রু হেরি’ অক্ষুব্ধ হৃদয়ে
রহিত উদাস ভাবে ; অশােক বকুলে
শাখা নাড়ি করিত কলহ ; সে উভয়ে
হত দ্বন্দ্ব কার বেশী শােভা চারু ফুলে।
•
ইন্দ্রবাবু বুঝি বিধু মনােগত ভাব
একদিন করিলেন বিবাহ প্রস্তাব
বিধু মৌন নীরব হরষে ; হলাে স্থির
ফিরি দেশে সম্মতি লভিয়া জননীর
দিবে পাকা কথা; কিন্তু বিদায় চাহিতে
মাধবীর কাছে মুখে লাগিল বাধিতে।
মাধবী যাবার কথা শুনিয়া বিধুর
চিন্তিত ব্যথিত মনে বসে ছিল ঘরে,
গুঞ্জিয়া তুলিতেছিল কি করুণ সুর
আপনার মনে কত কাতরতা ভরে,

মর্ম লেখা
( বিহগ-কাওয়ালী)
‘স্নেহ বন্ধন টুটিয়া যে যায়
সে না কি আবার আসে।
অলি যায় ফিরে আসে কি আবার
দল-ঝরা ফুলবাসে?
পাখী উড়ে যায় কাননে সুদূর
সুখময় গীতি-স্মৃতিটি মধুর
পড়ে থাকে কোথা হৃদয়ে, প্রচুর
বাসনার কোন্ পাশে?
খালি খাঁচা হাতে যত ডাক তারে
‘আয়, পাখি, আয় আয়।
মায়া ছেড়ে গেছে বারেক যে চলে
সে কি আসে পুনরায় ?
জাগিয়া উঠিবে শুধু হা হুতাশ
তাপিত ব্যথিত পরাণে হতাশ,
ঘুরে ফিরে যাবে মত্ত বাতাস
নিদারুণ উপহাসে।”

মৰ্ম্ম লেখা
হেনকালে বিধু আসি কহিল তাহারে
“যাই তবে?—যেন শিরে অশনি প্রহারে
স্তম্ভিত চকিত বালা রহিল চাহিয়া ;
“যাবে ? আর কোনাে বেশী কথা না কহিয়া
রহিল নীরবে। কিন্তু বিধুর নিকটে
ওই একমাত্র কথা হৃদয়ের তটে
তুলিল কি আলােড়ন, যেন বুক চিরে
দেখাইল ভালবাসা কি আছে গভীরে,
করিল কি অনুরােধ, বিনীত মিনতি।
বাহিরে আসিল চলি বিধু দ্রুতগতি ;
কিন্তু তার শ্রুতিমূলে সকরুণ ভাবে
কাতরে বলিতে যেন লাগিল কে, “যাবে ?”
দীর্ঘ দশ মাস পরে আসিল ফিরিয়া
আপন ভবনে বিধু। মেঘ বরষার
শান্তিজল দিল ঢালি স্ববক্ষ চিরিয়া ;
জননীরি মত তারে জন্মভূমি তার
আবাহন করি নিল
নিল স্নেহময় বুকে।
দুটি স্থান আছে, নর, ধরণী ভিতরে,

মৰ্ম্ম লেখা
পাপ কর-পুণ্য কর—থাক দুঃখে সুখে,
যেখানে রাখিয়া মাথা অতি অকাতরে
ক্লান্ত শিশুটির মত ঘুমাও নির্ভয়ে।
জগৎ করেছে যদি তােমারে তাড়না,
যাও জননীর কাছে, সস্নেহ হৃদয়ে
সান্ত্বনার কথা ক’য়ে মুছাবে যাতনা।
বুকে কাঁটা বিধি,
পাখি, ফিরেছ বাসায়
অনাহুত তােমারে সে দিবেনা বিদায়।
মাতা আর জন্মভূমি, ইহাদের সম
কেহ নাই ধরাতলে–চরণে প্রণম।
সম্মতির তরে বিধু জননী সকাশে
কহে মাধবীর কথা সঙ্কোচে ও ত্রাসে ;
মাতা তাহে অসম্মত ;—তাহাদের কুলে
কলঙ্ক লেপন করা শুধু স্নেহে ভুলে ; ~
কেমনে দিবেন সায় করি উপেক্ষিত
লােকনত? এ তঁাহার অননুমােদিত।
কঠিন অটল তার মত। পাণ্ডুমুখে
চিন্তান্বিত বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে ঘরে ঢুকে

মৰ্ম্ম লেখা
আপনার, বিধু মেনি নিস্তব্ধ নিৰ্বাক্ ;
বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে জানালার ফঁাক্
উঠে ভরি’ আর্জ বরষার জলে ; পাছে
ব্যথা পায় মনে, লিপি মাধবীর কাছে
লিখিতে পারেনা বিধু, পাছে আশঙ্কায়
ভরে মন ; এমনি সে দিন চলে যায় ;
কহিলেন মাতা শেষে “থাকুক্ অন্তরে
বিবাহের কথা, হবে পরীক্ষার পরে”
পাঠরত বিধু করি’ রাত্রি জাগরণ
অতিরিক্ত পরিশ্রমে বিশ্রাম অভাবে
পড়িল বিম জ্বরে ; ঘাের অচেতন
কাটিতে লাগিল দিন রাত্রি সমভাবে।
হায় কভু স্নেহময়ী জননীর মত
প্রকৃতি করেনা ক্ষমা নিয়ম লঙ্ঘন ;
আপন অখণ্ড দণ্ড প্রচারে নিয়ত
কঠোর রাজার মত তাহার শাস

৩৪ মর্শ লেখা জননী বসিয়া কাছে সুধান কুশল, গায়ে হাত বুলাইয়া দেন শিরে জল, শতবার দেবতার নাম ল’ন মনে, বাধিল বিষম রণ মানবে মরণে। বাহিরে সে মেঘেজলে ভীম কোলাহল- রােগিকক্ষে নীরবতা রহে অচঞ্চল! ক্রমেই বাড়িছে জ্বর, দেহ খরতাপ, আরম্ভিল বিধু মৃদু চকিতে প্রলাপ, নিমীলিত নেত্র ক্ষীণ মুখ রক্তচ্ছবি, একনাম কহে শুধু “মাধবী” “মাধবী”, দেখি’ বুঝি এক স্বপ্ন শূন্যে উঠে চেয়ে! জননী ভাবিলা মনে অপয়া এ মেয়ে ; দ্বিগুণ কঠিন হ’ল মন তার প্রতি, তার সনে পরিণয়ে আরাে অসম্মতি, লিখিলেন লিপি ইন্দ্রবাবুর নিকটে এইরূপ দৈব লিপি বটে মানবের ভালে কবে লেখা হয়ে শেষে তাহার সকল আশা মিলায় নিঃশেষে। সেই মতে

মম্ম লেখা
দিনান্তে গগন প্রান্তে ডুবে ক্লান্ত রবি,
পাংশু মুখে শ্রান্ত চোখে শুনিল মাধবী
সে লিপির কথা। এক পাত্রের সন্ধান
করি’ ইন্দ্রবাবু তারে কন্যা দিতে চান।
কিন্তু সে বিধুরে কভু পারে কি ভুলিতে?
মৌন মুখ চাহে যেন কারে কি বলিতে,
দুটি কালাে আঁখি শুধু গােপনে বিরলে
থাকি থাকি’ চাপা দুঃখে ভরে উঠে জলে ।
আজি তার হৃদয়ের ভগ্ন স্মৃতিপটে
আসে সেই সব কথা ; সেই নদীতটে
ওই সে বকুল গাছ—নীরব নিঝুম
কুঞ্জগৃহ—হেলা ফেলা কামিনী কুসুম
তেমনি সে চাঁপাফুল পারুল মালতী
কপােত কপােতী বকে—উড়ে প্রজাপতি
ভ্রমর গুঞ্জরে—দাগা যেন দেয় প্রাণে
অতীতের সুখ স্মৃতি-বিষ ঢালে কানে
মধু রব—ক্ষীণ তনু ক্ষীণতর হয়
অকারণে ; জনকের জাগে মনে ভয়।

৩৬
মৰ্ম্ম লেখা
লাজে মৌনী
সারিয়া উঠিল বিধু ; শুনিল কি ভুল
বুঝে দিয়াছেন মাতা তার হৃদিমূল
উপাড়িয়া দূরে ফেলি’ ; বাজিতে বাজিতে
মধুতন্ত্রী বীণাযন্ত্রে ছিড়ে যায় যদি
সব তার, সে যেমন পারেনা ভুলিতে
কোনাে সুর,
মুগ্ধ নিরবধি
বিধুর তেমনি দশা; যেন বার বার
শুনিতে লাগিল কানে রােদন কাহার !
হুহু করে চারিধারে বহিছে বাতাস ,
একি কারাে দেশান্তরে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ?
শুনিল সে মাধবীর শুভ পরিণয়
হবে শীঘ্র ; ক্ষোভে ভরি’ উঠিল হৃদয়।
একদিন বসন্তের প্রথম আগমে
বহুবর্ষ পরে, যবে মলয় অনিল
ছুয়ে নদী গিরি তরু পশেছিল ক্রমে
চারিধারে ; ভরেছিল এ বিশ্ব নিখিল,
চারিদিক ছেয়েছিল অশােক বকুলে,
আসিল নরেশ ; বেড়াইতে নদীকূলে
গেল দুই বন্ধু মিলি ; মাধবীর কথা

মৰ্ম্ম লেখা
৩৭
সুধাইল বিধু তারে ; বিশুদ্ধ বদনে
ঊর্ধপানে সুনীরবে অঙ্গুলি চালনে
কি সঙ্কেত করিল নরেশ ; বড় ব্যথা
লাগিল হৃদয়ে ; হত চেতনের মত
বিধু রহে স্থিরভাবে নয়নে আনত ;
তপ্ত শলাকায় দহিয়া কে গেল বুক,
যেন তারি জ্বালা প্রাণে চেপে ধরে মুখ।
মর্মরিছে তরুপাতা মন্দ সমীরণে,
কে যেন করুণ ভাবে গাহিছে শ্রবণে,-
( বিহঙ্গকাওয়ালী)
“স্নেহ বন্ধন টুটিয়া যে যায়
সে না কি আবার আসে।
অলি যায় ফিরে আসে কি আবার
দলঝরা ফুলবাসে?
পাখী উড়ে যায় কাননে সুদূর,
সুখময় গীতি স্মৃতিটি মধুর
পড়ে থাকে করি’ হৃদি ভরপুর
বাসনার কোন পাশে।

মৰ্ম্ম লেখা
খালি খাঁচা হাতে যত ডাক তারে-
‘আয় পাখী, আয় আয়।
মায়া ছেড়ে গেছে বারেক যে চলে
সে কি আসে পুনরায় ?
জাগিয়া উঠিবে শুধু হা হুতাশ
তাপিত ব্যথিত পরাণে হতাশ ;
ঘুরে ফিরে যাবে মত্ত বাতাস
নিদারুণ উপহাসে!

মর্ম লেখা
৯
সন্ধ্যা প্রদীপ
ছিলাম সেদিন নদীর ধারে বসে আপন মনে,
দিচ্ছে উকি সাঁঝের তারা নীল গগনের কোণে ;
মলয় বাতাস মৃদুশ্বাসে ছড়ায় ফুলের বাস,
পদ্মবনের আশে পাশে চরে বেড়ায় হাঁস;
গ্রামের মাঠে ঝােপে-ঝাপে ঝিল্লী তুলে তান,
ডােবার পাশে কাদাখোঁচার কাৰ্য্য অবসান ;
কাদের দুটী ছেলেমেয়ে প্রদীপ ল’য়ে হাতে
জ্বালতে বাতি নদীর ধারে এল মায়ের সাথে।
আললে প্রদীপ নদীর ধারে ভাইবােনেতে মিলে,
কন্দ্র ছায়া পড়ল নদীর চঞ্চল সলিলে ;
উদ্ভাসিল বিমল হাসে তাদের কচি মুখ,
প্রদীপ দেখে হাসি দেখে মায়ের ভরে বুক,
গৌরবেতে পুলকরেখা সৰ্ব্ব গায়ে ফুটে,
মাতৃস্নেহ মহানন্দে নেত্র-ধারে ছুটে ;
ব্যাকুল মনে ভাইবােনেরে বক্ষে চাপে বালা ;
দেখেছিলাম নদীর ধারে সেদিন প্রদীপ জ্বালা।

3
মর্ম লেখা
আজকে বহুদিন পরে সেই নদীটীর ধারে
বসে আছি কতই কথা ভাবছি বারে বারে ;
রবি তখন যাচ্ছে ডুবে বেণুবনের পাশে
একটি দু’টি ফুটছে তারা বিমল সন্ধ্যাকাশে ;
কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে আমার সব,
বড়ই করুণ লাগছে কানে নদীর কলরব ;
প্রদীপ হাতে নদীর ধারে এল তখন বালা,
মনে হ’ল সেদিনের সে সাঁঝের প্রদীপ জ্বালা
.
মনে হ’ল কোথায় তারা প্রদীপ ল’য়ে হাতে
সেই যে দুটি ছেলেমেয়ে—নেই ত আজি সাথে ।
দারুণ ব্যথা দিল আঘাত হৃদয় গৃহ-কোণে,
‘কোথায় তারা? কোথায় তারা?’—সুধাই মনে মনে ;
মাতার শীর্ণ মুখের পানে দেখি কুতূহলে,
দুটি ফোটা অশ্রু ভেসে গেল নদীর জলে ;
গেল চলি সুখে থাকুক উচ্চারিয়া বালা ;
দেখছি বসে নদীর ধারে দুটি প্রদীপ জ্বালা।

মৰ্ম্ম লেখা
৪১
পাষাণী
অন্ধতমস নিশীথে ঝিল্লী
মুখরে পল্লীপথে ;
রাজার কুমার বাহিরায় চড়ি
একাকী স্বরথে ;
মনােরথ সম উদ্দাম-গতি—
বিদ্যুৎ যেন চলে বেগবতী—
দূরে
রাখি’ লােকালয়,
গিরি-তরু ফেলি’ পিছে ;
নিরখি সে যেন লাজে তারাগণ
লুকায় মেঘের নীচে।
উড়ে রথ
দূর যাহা ছিল নিমেষে সমীপ,
সমীপ যাইল দূরে ;
নীরব রজনী ভূতের মতন
বেড়িল বিশ্বপুরে ;

82
মৰ্ম্ম লেখা
কোমল পরশে বায়ু গায়ে লাগে,
নিশি-চম্পক ফুলের পরাগে
কুমারের প্রাণে উন্মাদ জাগে,
ঘন হয়ে আসে শ্বাস ;
গল্পের কোন অজানা পুরের
ধীরে ধীরে ছুটে আশ!
রশ্মি ছাড়িয়া করে কষাঘাত ;-
কোথা ঘাটকোথা পথ।
তেপান্তরের মাঠ পার হয়ে
ছুটিল সবেগে রথ,-
সহসা কোথায় বালুকার রাশে
চাকা বাধি’ রথ থির হয়ে আসে;
রাজার কুমার নামিল তরাসে,-
দিক্‌ হয়ে গেল ভুল!
বিশাল জলধি
নাহি দেখা যায় কুল।
সমুখে হেরিল

মৰ্ম্ম লেখা
রথ হ’তে খুলি অশ্বে চড়িয়া
বালিয়াড়ি হয়ে পার ;
-তরুমূলে দাড়ায় কুমার
আহ্বান শুনি কার।
সাগর দোলার তান পশে কানে
শত কিন্নরী রত যেন গানে।
প্রভু-ইঙ্গিতে লঙ্ঘি’ জলধি
ছুটিল অশ্বরাজ ;
ছুটিল তড়িৎ কুমারের দেহে
বীরের দর্পে আজ
চলিতে চলিতে এল কোন্ পুরে,
পাষাণ সকলি তথা !
পাষাণ মানব পাষাণ মানবী
পাষাণ বৃক্ষলতা!
রাজার প্রাসাদে সিংহদুয়ার
পাষাণ প্রহরী প্রহরায় তার।
হেরিয়া চকিতে দাড়ায় কুমার,
বিস্ময়ে ভরে আঁখি।
নিজ ধমনীতে শশানিত স্পন্দ
শােনা যায় থাকি থাকি।

৪
মৰ্ম্ম লেখা
বিশাল সে পুরে নাই কোনাে সাড়া,
কুমার অবাক রহি
পশিল ভিতরে অভিভূত ভাবে
হৃদয়ে আবেগ বহি’;
কক্ষের পর কক্ষের পরে
পাষাণ সাজানাে হেরে সারে সারে—
পাষাণের ফুল পাষাণের ঝরে,
পাষাণের শুক-সারি।
রাজার কুমার পরশি’ পরশি’
চলিল সকলি তারি।
কুমার যেখানে পরশে সেখানে
তখনি চেতনা জাগে !
ফুল ফুটে উঠে-পাখী গাহে গান
যেন নব অনুরাগে !
শেষ দূরে এক কক্ষে পশিয়া
হেরিল কুমার—বিস্মিত হিয়া -
শিলা-পালঙ্কে শিলা শেষ নিয়া
শায়িত পাষাণ রাণী ।
পাষাণ-তবুও অঙ্গলাবণ্যে
উজল কক্ষ খানি।

মর্শ লেখা
৪৫
.
অনিমেষ আঁখি রাজার কুমার!
হেরিয়া না মিটে সাধ!
মনে মনে বলে, ‘অয়ি অনিন্দ্যে
লইওনা অপরাধ !
এতকাল ধরে যা করেছি মনে
সুন্দর চারু যতনে গােপনে,
তারি সার তব অঙ্গ-গঠনে
কেমনে ভরিল আজ।
কল্পনা মম না জানি কেমনে
ধরিল মূর্তসাজ ?
মুখে বলে, “ওগাে চির-বাঞ্ছিতে
কোথা ছিলে এতদিন?
তােমার বিহনে ছিলাম কেমনে
গৃহহারা উদাসীন?
আসিয়াছি আজ নবীন মিলনে,
চির-পুরাতন অয়ি অতুলনে,
হের আঁখি মেলি, ঢাল এ শ্রবণে
তােমার অমিয় বাণী।
কুমার-পরশে চেতন সে পুরে
নীরব পাষাণ-রাণী। . **

৪৬
মৰ্ম্ম লেখা
পাষাণ-রাণী বা ব্যর্থ সুযােগ
?
আজকে তুমি কাহার লাগি
কি গান গাহ পাষাণ-রাণী
ব্যাকুল প্রাণে করুণ তানে
শুনিতে চাও কাহার বাণী ?
সেদিন শত সুযােগ তুমি
কেমন কর অবহেলা,
বেদন শতসাধন শত
তুচ্ছ ভাবি’ কাটাও বেলা।
রাজার ছেলে ঘােড়ায় চড়ি’
দাড়ায় এসে তােমার দ্বারে।
কি অনুরাগ! কত সােহাগ!
কেমনে হায় ফিরাও তারে ?
ঈশান কোনে বিষাণ বাজে
পাষাণ রাণী।—পাষাণ রাণী ।
রাজার ছেলে ফিরিয়া যায়;
কে বুঝিবে তােমার বাণী ?
বিফল প্রাণে সফল করি’
কে ফোটাবে তােমার আশা ?

মর্ম লেখা
৪৭
কঠিন মুখে মনের সুখে
কে ছােটাবে মধুর ভাষা?
কিসের ভুলে দুয়ার খুলে
নিলেনা তায় তােমার ঘরে ?
লগ্ন গেল ভগ্ন হয়ে
সেদিন তব স্বয়ম্বরে !
শ্মশান পুরী! শ্মশান পুরী!
পাষাণ রাণী! পাষাণ রাণী ।-
দরশ কোথা পাবে তাহার
সরস যাহার পরশ খানি?
সারিকা শুক বসিয়া মূক
রইবে চাহি উৰ্দ্ধমুখে,
প্রাচীর কারা, চন্দ্র, তারা,
কঁদিবে, হায় ; তােমার দুখে,
দুর্গদ্বারে স্বৰ্গলেহি
নিশান-খানি পড়বে ঢ'লে,-
বিদায় দেহ কঁাদায়ে যায়
পাবেনা তায় চোখের জলে।

.
মর্ম লেখা
নিত্য তুমি চিত্তময়ী
সত্যযুগের পাষাণ রাণী।
বুকে তােমার নিঝর কোথা
সেই কথাটি কেউনা জানি।
পাথর চাপা উৎস তব
ভস্ম চাপা বহ্নিসম
কে জানে কোন্ থরের তলে
প্রদেশ রহে নতম!
অজ্ঞাতে তাই আঘাত করি
নিত্য ফেরে রাজার ছেলে,
পাষাণ চাপা বিষাদ প্রাণে
পােষণ কর অবহেলে।

মৰ্ম্ম লেখা
৪s
সাধু
[ Parnellএর Hermitএর অনুকরণে ]
বৃদ্ধ এক সাধু ছিল গিরি গুহা বাসী
শ্বেত-শ্মশ্রু, শান্ত চোখ, মুখে মৃদু হাসি।
নিসর্গজ ফলমূল—নিঝরের জল
উন্মুক্ত পবন বনে-হৃদয়ে সরল
যথেষ্ট মানিত ; যেত বিনা-ভাবনায়
বাধাহীন দিনগুলি ; গ্রন্থ হতে, হায়,
জানিয়া সংসার-রীতি জাগিল সংশয়
ধৰ্ম্ম অধৰ্ম্মের বশ-অধর্মের জয়!
প্রশান্ত তড়াগে যথা বনভূমি, তীর ;
আকাশ, নক্ষত্র, চাদ প্রতিবিম্বে স্থির ;
কিন্তু তার মাঝে এক লােষ্ট্র নিক্ষেপিলে
ভাঙ্গা তীর তারা নভঃ কম্পিত সলিলে ;
তেমনি সাধুর মনে ভাঙ্গিল সংযম,
ভাবিল এ পুণ্য ধ্যান সবি তবে ভ্রম?

মৰ্ম্ম লেখা
‘স্বচক্ষে দেখিব ধরা’ ভাবি মনে মনে
বাহিরিল পথে সাধু ; দুর্গম বিজনে
হেরিল যুবক এক অন্য পথ বাহি’
আসে আনন্দের গান আনমনে গাহি’ ;
হাসি হাসি মুখ খানি—নীলােৎপল চোখ,
প্রশস্ত ললাট শান্ত ;-ব্যথা লােগ শােক
করে নাই রেখাপাত পুষ্ট অবয়বে
ঢল ঢল সৰ্ব্বদেহ যৌবন গৌরবে
সাধুরে বন্দিল যুবা—জিজ্ঞাসিল পরে
‘কোথা গতি’ ? সাধু বলে—“জেগেছে অন্তরে
ঈশ্বরের করুণায় দারুণ সংশয়,
শুনেছি সংসারে নাকি অধর্মের জয়
স্বচক্ষে দেখিব তাই”। যুবা কহে তবে
“আমার বাসনা মনে হেরিব এ ভবে,-
এক সাথে যাই চল”। সাধু তুষ্ট মনে
যুবার বচন শুনি’ ; তত্ত্ব আলােচনে
ঘুচিল পথের শ্রান্তি ; কথায় কথায়
বিকাশে, মনের মিল ; সাধু মুগ্ধপ্রায়
শুনিতে লাগিল তার জ্ঞানগর্ভ বাণী
সূৰ্য্য গেল অস্তাচলে ; ঢাকিল বনানী
সান্ধ্য অন্ধকার ; অস্পষ্ট হইল বনপথ ;
;

মৰ্ম্ম লেখা
শ্রান্ত পান্থ-যুগ হেরে প্রাসাদ বৃহৎ
রম্য চারু কারুকার্যে খচিত সুন্দর
দাড়ায়ে সম্মুখে যেন মুক্ত করি কর
পথহারা পথিকেরে করিছে আহ্বান
আশ্রয় দিবার তরে মূর্ত সাম-গান।
তােরণে দ্বারীরে যুবা আগম বারতা
জানাইল দুজনের ; অতিথির কথা
শুনি’ গৃহস্বামী তথা আসিল ত্বরিতে
যথা রীতি বন্দি’ পদ ঘরে ডেকে নিতে।
দিল দোহে স্বর্ণথলে স্বাদু আহারীয়
করিতে ভােজন ; দিল সরস পানীয়
সােমরস স্বর্ণপাত্রে ; শয্যা দিল পাতি
নবীন কোমল শুভ্র কাটাইতে রাতি;
পরিচৰ্য্যা পরিতৃপ্ত সাধু ভাবে মনে
ধনীর এমন মন মিলেনা ভুবনে।
ভাের হ’তে ডাকে পাখী; আলাে, চারিদিক;
গৃহস্বামী করে প্রশ্ন সৌখ-শায়নিক ;
সানন্দে বিদায় নিয়া চলে পান্থদ্বয় ;
বহে মৃদু স্নিগ্ধ বায়ু ; এক দুঃখ রয়

৫২
মর্শ লেখা
গৃহস্বামী মনে,কোথা হারালো কি জানি
মিলিল না মহামূল্য স্বর্ণপাত্র খানি।
যেমন উদ্যতফণা সর্প নেহারিয়া
পথিপার্শ্বে পান্থ ভয়ে উঠে চমকিয়া,
সম্মুখে সরেনা পদ, নিরুদ্ধ বচন,-
সাধুর তেমতি ভাব যুবক যখন
পথিমধ্যে বাস হ’তে করিল বাহির
সেই পাত্র স্মিতমুখে ; সাধু নতশির ;-
দূরে যেতে চাহে তার বিদ্রোহী অন্তর ;
স্বপ্নভ্রান্ত সম তবু, রুদ্ধ ওষ্ঠাধর ;
যায় সাথে ; ভাবে মনে ‘একি অবিচার।
উদারতা লভে হেন হীন পুরস্কার!
•
চলিতে চলিতে পথে সূৰ্যে আবরিয়া
উড়িল প্রলয় মেঘ গভীর গর্জিয়া ;
সৃষ্টি বিনাশন বৃষ্টি ওই বুঝি আসে
পবন এ সমাচার কহে স্পষ্ট ভাষে ;

মর্শ লেখা
৫৩
পশু পক্ষী ছুটে নীড়ে; হেরি পান্থদ্বয়
ছুটিল নিকটে কোথা লভিতে আশ্রয় ;
হেরিল বৃহৎ সৌধ রুদ্ধ বাতায়ন,
তােরণ অর্গল-বদ্ধ ; শুধু কাঁটাবন
আশে পাশে ; জীর্ণ চালা নাহিক সংস্কার
এদিকে ওদিকে আছে-মরু চারিধার ;
শােষিয়া শােণিতসম দরিদ্রের ধন
করিয়াছে গৃহহারা নিম্মম কৃপণ।
তার দ্বারে পান্থযুগ উপনীত যবে
শিলাবৃষ্টি এল নামি’ ঘন ঘাের রবে ;
বজ্রঘােষে বিকম্পিত কানন প্রান্তর
আকাশের বুক ফাটা জ্বালা নিরন্তর ;
ঠেলিতে ঠেলিতে দ্বার করি’ কোলাহল,
ঈষৎ করুণা বুঝি করিল চঞ্চল
কৃপণের মন ; তাই সশব্দে কাতরে
অর্গল খুলিল দ্বারে অতিথির তরে
সেই সে প্রথম ; দিল অল্প পরিমাণ
অন্ন, তীব্র সােমরস,-কদৰ্য সে দান ;
আকাশ যেমনি কিছু হ’ল পরিষ্কার
অমনি বিদায় দিল করি নমস্কার।

৫৪
মৰ্ম্ম লেখা
সাধু মনে মনে ভাবে মানিয়া বিস্ময়
এত অর্থে কেন এত ঘৃণিত হৃদয়।
হে ঈশ্বর একি তব মিছে পক্ষপাত ;
এতধন অকারণ রাখ রুদ্ধ নাথ।
বিস্ময় কতই আরাে বাড়িল তাহার,
বাস অভ্যন্তর হতে যবে আপনার
দয়ালুর হৃত সেই স্বর্ণপাত্র খানি
কৃপণেরে দিল যুবা! মুখে নাহি বাণী,
সাধু চলে অভিভূত সংশয়িত মন ;
পাপ সেথা-হেথা একি মত্ত আচরণ।
পশ্চিম গগনে ক্রমে দিবা অবসান ;
খুঁজে পুনঃ উভে নিশা যাপনের স্থান ;
হেরিল সম্মুখে এক রম্য নিকেতন
অতিথির তরে মুক্ত,—পবিত্র ভবন,
অযথা দীনতা নাই—নাই আড়ম্বর ;
সুসজ্জিত চারিধার—শ্যামল প্রান্তর ;
গৃহস্বামী শান্তমূর্তিধর্মে রত মন,
নাশি পরদুঃখ করে জীবন যাপন,
নিৰ্ম্মল হৃদয় তার উদার সতত
উদ্যানের সদ্যস্ফুট পুষ্পটির মত।

মর্শ লেখা
৫৫
সাধু আসিয়াছে শুনি’ ত্বরা করি’ আসে
স্মিতমুখে করযােড়ে কহে নতভাষে,
যাহার কৃপায় চরে বিশ্ব চরাচর,
আলাে দেয় রবি শশী, পাষাণ ভূধর
মৰ্ম্মবারি করে দান, ফল শস্যে ভরা
বহিয়া যাহার অর্ঘ্য হাসে বসুন্ধরা,
তাঁর প্রেম দয়া স্মরি’ করি আবাহন
এ কুটীরে, কর সাধু আতিথ্য গ্রহণ।”
এত বলি’ বন্দি’ পদ পথিক যুগলে
বসাইল গৃহ মাঝে ; নানাবিধ ফলে
খাদ্য দিল সাধারণ—নাই বিলাসিতা,
করে নাই তবু কিছু কৃপণতা বৃথা ;
তৃষার সুপেয় দিল নিরমল জল,
বাহুল্য নাহিক তবু পৰ্যাপ্ত সকল।
অনন্তর বহুবিধ কহে ধৰ্ম্ম কথা;
পূত রামায়ণ গীতি-পুরাণ বারতা ;

মর্ম লেখা
রাত্রি হলে করি’ ইষ্টদেব আরাধনা
পদ্মনাভে স্মরি করে শয়ন রচনা ;
ভক্তিপূর্ণ গদ গদ সাধুর হৃদয়,
ধন্য মানে গৃহস্থের লভি পরিচয়।
রজনী কাটিল সুখে ; উষার আলােকে
যুবকে
হেরিল সাধু ভীতিপূর্ণ চোখে,
তস্করের সম যেতে গৃহস্থের ঘরে
অতি সন্তর্পণে ধীরে মৃদু পদ ভরে ;
গৃহস্থের একমাত্র আদরের ধন
যথা রহে শুয়ে ঘুমে অচেতন
দাড়াল যুবক তথা ; দ্বার ছিদ্র দিয়া
এক দৃষ্টে হেরে সাধু—কেঁপে উঠে হিয়া
অকস্মাৎ শিশুকণ্ঠ যুবক নিষ্ঠুর
চাপিল পাশব-বলে ; সাধু ভয়াতুর
চীৎকারি উঠিতে চাহে-মুখে বদ্ধ স্বর
রােমাঞ্চিত সৰ্ব্বদেহ—একি ভয়ঙ্কর।
মুহূর্তে আছাড়ি মুষ্টি গৃহস্থ-গৌরব
নীলমুখে শিবনেত্রে নিস্পন্দ নীরব।

মর্ম লেখা
৫৭
;
অবাক্ ব্যাকুল সাধু বাহিরিল পথে
দ্রুতপদে রুদ্ধশ্বাসে আর কোনাে মতে
চলিতে যুবার সাথে চাহেনা হৃদয় ;
উদাসী যুবক তবু সাথে সাথে রয়।
কাননে মিলেনা পথ ; ভৃত্য একজন
পথিক যুগলে করে পথ প্রদর্শন ;
কিছুদূর অগ্রসরি উত্তুঙ্গ পৰ্বতে
অপ্রশস্ত খরস্রোতা নদী পড়ে পথে,
ছুটিতেছে ঘূর্ণিপাকে সুগভীর জল,
মৃত তালবৃক্ষ-সেতু পারের সম্বল ;
আগে আগে চলে ভৃত্য সতর্ক পা ফেলে ;-
চকিতে পিছন হ’তে যুবা দিল ঠেলে
উঠিল সে জলােচ্ছাস-ভৃত্য দেহ তাহে
একবার গেল দেখা খর সে প্রবাহে
বাহু প্রসারিয়া করে বিফল প্রয়াস
নিমেষে মিলাল কোথা নয়নে হতাশ।

৫৮ মর্ম লেখা সব নেহারিল সাধু; পুঞ্জীভূত রােষ দীপ্ততেজে এতক্ষণে লভিল নির্ঘোষ- “ঘৃণিত পাষণ্ড, ওরে” বলিতে বলিতে যুবা আর যুবা নাই হেরে আচম্বিতে। হেরিল সে মুখে জ্যোতিঃ পুণ্য স্বরগীয়, হেরিল সে পূর্ণদ্যুতি নয়ন অমিয়, হেরিল সে স্নিগ্ধ কান্তি দীর্ঘ অবয়ব, বিকসিত সর্ব অঙ্গে অমরা বৈভব। স্বর্গীয় কুসুমবাস আসে বায়ুস্তরে, ব্যোম পথে যেন শত বীণাধ্বনি করে । মুখে এসেছিল যাহা রয়ে গেল মুখে নতজানু সাধু সেই মূরতি সম্মুখে। দিব্য মূৰ্ত্তি এতক্ষণে ভাঙি নীরবতা বীণা-বিনিন্দিত সুরে আরম্ভিল কথা, “তব জ্ঞান, আরাধনা, নিস্পাপ জীবন প্রভুর চরণে করে দীন আবেদন ; দেবতা সে আবেদনে গলি’ করুণায় মিটাতে সন্দেহ তব পাঠাল আমায় ; স্বর্গ পরিহরি’ তাই আসিয়াছি নামি’ করিও না নতি, তব সহভৃত্য আমি”।

যক্ষ্ম লেখা
৫৯
“দৈব নীতি মেনাে মনে মহা সত্যময়
আনিও না কভু আর হৃদয়ে সংশয় ;
সৃষ্টিতে স্রষ্টার রহে পূর্ণ অধিকার
কীট তুমি কেমনে তা করিবে বিচার ?
তঁাহার উদ্দেশ্য পূঢ় বুঝিবে কেমনে?
সাধিছেন কত হিত রহিয়া গােপনে।
আপনি আড়ালে রহি' করান যে কাজ
যশটুকু অন্যে লয়ে ফেলে রাখে লাজ,
সে লাজ মহিমা তার তাহাই গৌরব
বুঝিয়া করে দোষী অযথা মানব”।
“কি আর বিস্ময়কর ইহার অধিক
হেরিলে যা’ কুতূহলী স্বচক্ষে, পথিক।
সুবিস্তৃত জেনাে তবু তার ন্যায় পাশ
বুঝিতে পারনা যেথা করিও বিশ্বাস”।
“মহামূল্য আহারীয় দিল যে গর্বিত,
সাধুতা রহে না যার মনে বিকসিত,

৬০
মর্ম লেখা
যাহার ঐশ্বৰ্য্য দম্ভ কনক-কলসে
সমাদরে অতিথিরে নিত্য সােমরসে,
বিনষ্ট তাহার রীতি হেমপাত্র সনে ;
আতিথ্য এখনাে আছে, গর্ব নাই মনে”।
“আর সেই গাঢ়মুষ্টি কঠোর কৃপণ
তাহারে সুবর্ণপাত্র করি সমর্পন
এই শিক্ষা দিল তারে প্রভু দয়াময়,
নর যদি দয়া করে—দেবতা সদয় ;
আপন হীনতা স্মরি’ ভাসে আঁখিজলে
নিষ্ঠুর হৃদয় তার করুণায় গলে ;
এমনি বুঝিবা শিল্পী তাপ দিয়া শিরে
খনিজ ধাতুর মলা আনয়ে বাহিরে”।
“ধাৰ্মিক বন্ধুটি তব চলে ধর্মপথে
হয় নাই বিচলিত কভু কোনাে মতে ;
এমন উদার প্রাণ—পবিত্র জীবন
ভগবানে এত ভক্তি দেখনি কখন।

মর্শ লেখা
বার্ধক্যে এ শিশু তারে পুনঃ মায়াপাশে
সবলে টানিতেছিল সংসার সকাশে ;
মনের সংযম তার গিয়াছিল টুটি ;
শিথিলিত ধর্ম গ্রন্থি যেতেছিল ছুটি ;
অবসান হ’ত এর কোথায় কে জানে!
জনকে রক্ষিতে প্রভু নিলেন সন্তানে;
তুমি ভিন্ন সবে হেরে মৃত্যুহেতু রােগ ;
সাংঘাতিক এই কাৰ্য্যে আমার নিয়োেগ ।
চূর্ণ অহঙ্কার পিতা অবনত শিরে—
দণ্ড সমুচিত মানি’ মুক্তি পথে ফিরে”।
“কত ক্ষতি হত আজি নহে বলিবার
ফিরিত এ ভৃত্য যদি গৃহে আপনার ;
ধার্মিকের সব ধন হরিত সে রাতে,
কত শুভ-কাৰ্য, বল ব্যর্থ হত তাতে।
দরিদ্রের আঁখিজল মুছিত কি দিয়া
ওই ভণ্ড চোর যদি রহিত বাঁচিয়া!
নৈতিক নিয়ম, তাঁর এমনি ভুবনে,
যাও ফিরি’ অবিশ্বাস আনিও না মনে।
• •

৬২
মৰ্ম্ম লেখা
বলিতে বলিতে মূৰ্ত্তি মিশে বায়ুস্তরে ;
স্তম্ভিত নিৰ্বা সাধু যােড় করি’ করে
করে স্তব–“পূণ হােক, তােমার বাসনা
হে প্রভু জগতীতলে—তােমার কল্পনা
অব্যাহত হােক, দেব স্বরগে যেমন”।
এত বলি’ সাধু ফিরে গুহায় আপন।

মর্শ লেখা
৬৩
কি বেশে এলে ফিরে।
[ সার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের তিরােভাবে ]
*?
সেদিন তুমি বেরিয়েছিলে
কিরীটপরা শিরে,
বঙ্গ-সুধীসভার মণি,
কি বেশে এলে ফিরে ?
কঁদিছে সারা বঙ্গভূমি
মৌনী তুমি-বধির তুমি
‘নয়ন মেল বুধাগ্রণী
নয়ন মেল ধীরে,
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে ?
বিরাট তব রােমশ তনু
কৰ্ম্মপটু কত,
দপী তব মন্ত্রে তেজে
সপ অবনত।

৬১
মৰ্ম্ম লেখা
সে দেহ আজি অবশ হেন
আনিছে সবে বহিয়া কেন ?
সে তেজ আজি নিৰ্বাপিত
ভারতী মন্দিরে ?
বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে ?
?
এই বিশ্ববিদ্যালয়
চিনিতে নার তারে ?
আপন হাতে গড়েছ, রাজা
প্রহরী ছিলে দ্বারে ;
এখন তার দুয়ার-দেশে
শয়ান-দেহ লুটালে এসে,
কঁদিছে প্রতি-রেণুটি তার
তােমারে ঘিরে ঘিরে।
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে।

মৰ্ম্ম লেখা এই ত পথে জয়ীর মত গিয়েছ মাথা তুলে, আজ কি বেশে চলেছ সেথা ঢাকিয়া ফুলে ফুলে ? বন্দনা সে কে যাবে গাহি’? কাহারাে মুখে শব্দ নাহি ! বিশাল জনসংঘ হের তিতিছে আঁখিনীরে। কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে— কি বেশে এলে ফিরে। না না, দেব, ঘুমাও সুখে- বৃথা এ শােক আজ- আজ যে তুমি হৃদয়-জয়ী রাজার মহারাজ! আজ যে তব জয়ের সেরা বিজয় সারা বাংলা ঘেরা,- যাজ্ঞিকেরা তৈরী তব পতাকা নিতে শিরে যখন তুমি, হে শান্তনু, এ বেশে এলে ফিরে।

৬৬
মৰ্ম্ম লেখা
এই ত মাঠে নিত্য ভােরে
করিতে বিচরণ,
তরুরা ছায়া-নিবিড় হাতে
করিত আবাহন,
আজ সে তারা অবাক, চাহি,
পাখীরা কঁাদি উঠিছে গাহি',-
দুপুরবেলা কেন যে এলে
সুধায় সাথিটিরে ;-
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে !
ওই
ই
তব ভবন-হােথা
চাহিয়া পথপানে
অতীত-স্মৃতি-মগ্ন বালা
কপালে কর হানে-
সে ছিল ফুলশয্যা ওরে
কান্ত সুখ যুগান্তরে
এ কি এ ফুলশয্যা আজি ।
বুক যে গেল চিরে।
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে—
কি বেশে এলে ফিরে।

মৰ্ম্ম লেখা
৬৭
এই বাড়ীতে জড়ায়ে আছে
ভােমার স্মৃতি সব,
তােমার তরে এই বাড়ীটি
গ্রামের গৌরব
আজ এখানে নিবিল বাতি
নিবিল সারা গ্রামের ভাতি,
দুপুরবেলা আঁধার রাতি
ফেলিল পুরী ঘিরে।
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে।
ঢুকিয়া ঘরে খুলিলে না ত
তােমার রণসাজ,
ছেলেরা কোথা মেয়েরা কোথা
সুধালে না ত আজ,
আজ ত কারাে মিলে না সাড়া ।
রাণী মা ডাকে—তারি কি তাড়া?
স্নেহের ব্যথা-কৰ্ম্ম হ'তে
টানিয়া নিল ধীরে ?
কি বেশে তুমি বেরিয়েছিলে
কি বেশে এলে ফিরে।

৬ মৰ্ম্ম লেখা এই ত ভবদেহের তব যাত্রা হেথা শেষ। অসীম-সীমা-মিলন-ভূমি পবিত্র এ দেশ! হেমন্ত সে প্রথমে আসে, এই আকাশে—এই বাতাসে জড়িত পিতামাতার স্মৃতি, এই এ নদীতীরে রাণী মা ডাকে তাই কি তুমি এ বেশে এলে ফিরে ? পার্থিব সে ভস্ম হােক- পুড়িয়া হােক, ছাই! অপার্থিব সােণা সে তব মৃত্যু তার নাই।

মর্শ লেখা
যে বাতি তুমি জ্বেলেছ দেশে
বঙ্গবাসী দুহাতে এসে
ধরুক তুলে–এ শােক ভুলে
উজলি’ স্মৃতিটিরে,
মরণে হও মৃত্যুজয়ী
চেয়ে বাঙালীরে
রবেনা আর ভাবনা তবে
কি বেশে এলে ফিরে
ও

মর্ম লেখা
৭০
মালাকরের একদিন
ভােরের পাখীর কলরবে
রাজার বাগানে ফুল তুলি,
স্নান সারি’ উঠি ঘাটে যবে
মেয়েরা ঝাড়িছে চুলগুলি ;-
একে একে ভরিল গাগরী,
গেল চলি’ ঘট কাঁখে করি,
ফোটা জলে বাঁকা পথ ধরি।
বরশােভা ধরে পথধূলি ;
তারিণী রাজার দাসী শুধু
ছুতা করি’ বাঁধে চুল খুলি।
মাথায় রহিল ফুল তােল
আনমনে বেলা বেড়ে যায় !
ওই যে ছুটিয়া আসে ভােলা,
রাজা আজ রেগেছে বেজায় ;

মর্ম লেখা
৭১
তাড়াতাড়ি ভরি ফুলডালি,
দূর হ’তে শুনি গালাগালি
“পাজি ছুচো হতভাগা মালী”,
শুনি নাই
কতু
তারিণী ছুটিল ঘাট ছাড়ি
বাঁধিতে বাঁধিতে চুলগুলি।
মিঠে বুলি।
ফুল ল’য়ে ছুটি দুয়ারে
ভােলা বলে ‘হবে আজ খুব’
দাড়াই আঙিনার পারে
রহিনু ডালাটি হাতে চুপ।
বহুক্ষণ এসেছে পূজারি,
রাজা ক্রোধে ছুড়ে জলঝারি,
ললাটে লাগিয়া লােহবারি
বেগে ছুটে বক্ষ উঠে ফুলি’,
তারিণী রাজার দাসী শুধু
খুলে ফেলে বাঁধা চুলগুলি।

৭২
মৰ্ম্ম লেখা
সহসা উঠি রােষে রুখে
এতকাল সহিয়াছি সব
রক্ত দেখি’ হাসি এল মুখে
এই না কি পূজার উৎসব।
এই গেহে এই সমারােহে
এতকাল কাটানু কি মােহে !
দৃঢ় করে অসীম বিদ্রোহে
দাড়াইনু ঝারিখানি তুলি;
তারিণী রাজার দাসী দেখি
চেয়ে আছে আকুলি বিকুলি।
ফেলিলাম ঝরিখানি দূরে
ভগবান্ নিও প্রতিশোেধ
নয়নে আসিল জল পূরে,
ক্ষোভে কণ্ঠ হয়ে আসে রােধ!
সহসা হেরিনু দেহ টলে,
মাথা ঘুরে বসিনু ভূতলে,
রুধির প্রবাহ বেড়ে চলে
সারা বিশ্ব উঠে যেন দুলি’
তারিণী ফুকারি’ কাঁদে শুনি,
তার পরে গেনু সব ভুলি’!

মৰ্ম্ম লেখা
৭৩
হল যবে প্রথম চেতনা
মাথার উপরে পটি বাঁধা
সারা গায়ে হয়েছে বেদনা
কোথা আছি লাগিতেছে ধাঁধা।
চাহিতে সাহস নাহি মনে
কি জানি কি হেরিব নয়নে।
ভাবি কাল সকালে কেমনে
আবার আনিব ফুল তুলি’!
ক্ষতশিরে করি অনুভব
তারিণীর কোমল অঙ্গুলি।

৭৪
মৰ্ম্ম লেখা
রূপ-কথা
রাখাল ছেলে খেলে ফিরিত বনে বনে,
রাজার মেয়ে চেয়ে রহিত আনমনে,-
কাননে কত ফুল,
কোয়েল, বুলবুল,
বাতাসে দুলদুল
নবীন-পল্লব ;
নিঝর ঝঙ্কারে,
কূজনে, হুঙ্কারে
উঠিছে চারিধারে
মুক্তি-কলরব ;
খেলিছে মৃগশিশু, ময়ুরী নাচে তালে ;
রাজার মেয়ে ভাবে রাখিয়া হাত গালে :-
“রাখাল ছেলে খেলে ফিরিছে নিজমনে
আমার মন কেন ঘুরিছে তারি সনে?”

মর্শ লেখা ২ ৫ রাখাল ছেলে খেলে দাড়াল আনমনে- রাজার মেয়ে চেয়ে বসিয়া বাতায়নে,- পড়িয়া রহে খেলা, চাহিয়া বাড়ে বেলা ভাবনা জুটে মেলা মনের কোণে তার প্রাসাদে কত ঘর খচিত মৰ্ম্মর! উৎস ঝরঝর ঝরিছে চারিধার- টবেতে ছটা ফুল খাঁচাতে পােষা পাখী। রাখাল ছেলে ভাবে গাছেতে ভরু রাখি— “রাজার মেয়ে চেয়ে বসিয়া বাতায়নে আমার মন কেন বাঁধা সে তারি সনে”।

মৰ্ম্ম লেখা
উপরে প্রজাপতি হাসিল প্রাণ ভরে,
অতনু বাঁকা ধনু ভরিল ফুলশরে;
কাননে ফুলগুলি
উঠিল দুলি’ দুলি,
মুক্তি দিল খুলি
বাঁধনে শতদ্বার ;
প্রাসাদে মণি হাসে
ঝলকি দীপ-হাসে,
বাঁধন নাগপাশে
মুক্তি পরে হার ;
বাহিরে অন্দরে হােলল সে কোলাকুলি
মুক্তি দিল ধরা বন্ধ গেল খুলি’
রাখাল ছেলে ফেলে আসিল খেলা তার,
রাজার মেয়ে ভাঙে প্রাসাদ-কারাগার।

মৰ্ম্ম লেখা ৭৭ অভিষেক ; নূতন ঘরে আজকে রাণীর নূতন প্রতিষ্ঠান : চারিধারে কি বন্দনা গান! আনন্দেতে ঢেউ খেলে যায় রাণীর বুকে আনন্দেতে মুক্তা ঝরে গৌর মুখে— বিম্বাধরে করছে খেলা তরুণ আভা ডেকেছে ওই অরুণ আলাের বান! নূতন ঘরে আজকে রাণীর নূতন প্রতিষ্ঠান ;- কেউ এনেছে সারি শ্যামা, কেউ আনে ভীমরাজ- কেউ এনেছে অমল মুক্তাঝারা কেউ এনেছে সপ্তস্বরা, কেউ বীণা এস্রাজ কেউ এনেছে চিত্র ফুলের চারা; কি ভিড়! কতই ঠেলাঠেলি সভাঘরে । কার উপহার উঠবে আগেই রাণীর করে ?

৭৮
মৰ্ম্ম লেখা
;
রিক্ত হাতে দাড়িয়ে কবি ;—সবাই সুধায়-
কি, করিবে দান?
কবি বলে-
‘একটি শুধু গান।
ব্যঙ্গ ফুটে সকৌতুকে হাজার চোখে,
হেসে ওঠে সভার লােকে –
নীরব কবি দাড়িয়ে রহে সভা কোণে
আপন মনে।
সিংহাসনে দাড়িয়ে রাণী রতনে ঝলমল
সবার হাতে নিলেন উপহার ;
আশায় আশায় ব্যথিয়ে ওঠে নীরব সভাতল,
কি প্রতিদান ভাগ্যে আছে কার !
সবায় তুষি রাণী বসেন সিংহাসনে ;
শূন্য সভা এক নিমেষে তৃপ্ত মনে ;
মৌনী কবি দাড়িয়ে তবু সভা কোণে ;
রাণী সুধায় “কি চাও তুমি-
কি করেছ দান?”
কবি কহে লজ্জানত মুখে
“একটি গা’ব গান”।

মৰ্ম্ম লেখা
৭১
সে গানে হয় নাই কামনা—শুধুই দেওয়া,
আত্ম নিবেদন,
সকল পরাণ সুরে উঠছে ঘিরে
রাণীর সিংহাসন ;
হৃদয় যেন তরল হয়ে ফুটছে গানে,
আনন্দেতে ঝরছে রাণীর প্রতিষ্ঠানে।
অবাক, রাণী সে গান শুনে, পরশমণির
পরশ পেলে প্রাণ।
রাণী ভাবে “আজকে আমার নূতন ঘরে
সফল প্রতিষ্ঠান।”
সকল দেওয়া শেষ যে তখন অস্তমিত রবি,
রাণী ভাবে “কি করিব দান” ?
সিংহাসনের নিম্নে চাহি দাড়িয়ে তখন কবি
শুনায় শুধু একটি প্রাণের গান।
নিজের করে গাঁথল মালা নিজেই রাণী,
মনে মনে কইল কতই সােহাগ-বাণী।
গানের শেষে ঝঙ্কারিয়া কাকণ দুটি—
মালা দিয়া বাড়াল তার মান ;
নূতন ঘরে ধন্য হ’ল রাণীর
নূতন প্রতিষ্ঠান।

মৰ্ম্ম লেখা
এপারে
নদী সেথা চলে খাসা
কুল, কুল;
ঝােপে ঝাপে বাঁধে বাসা
বুল, বুল,,
নাই সের-নাই পােয়,
বিনিমূলে দোয়া নােয়া,
চারিধার ধোঁয়া ধোয়া-
ভুল ভুল!
এ পারে তরুণ কবি
করে বাস,
পরাণে অরুণ রবি,
মুখে হাস—
চোখে তার সুর আঁটা,
কিছু নাই তাল কাটা,
মনে হয় চোর কাটা
ফুল ফুল!
নদী ছুটে,—নাই ভাটা
কুল, কুল,!

মর্শ লেখা
৮১
ওপারে
বুড়ার দল
সাবধান,
গণিতে
সে করতল
খরসান,
ফুলে মধু কত ফোটা
কঁটাহীন কিনা বোঁটা—
খুজে চোখে গােটা গােটা
জুল জুল!
নদীর থামেনি ছােটা
কুল, কুল।
ক্ষ্যাপারা বসিয়া ছিল
আনমন!
কবির ইসারা দিল
জাগরণ,
প্রাণের কবাট খােলা,-
আগুপিছু সব ভােলা
হৃদয়ে লাগিল দোলা
দুল দুল।
নদী ছুটে বুক ফোলা
কুল, কুল,!

মর্শ লেখা
বুড়ার ভ্রুকুটি রেখা
মিছে হায়!
কেতাব হিসাব লেখা
ভেসে যায়।
সাদা মেঘে চাদ ভাসে,
কাঁটায় গােলাপ হাসে,
গান মুখে করে আসে
চুল চুল ?
নদী দুই কূল নাশে
কুল, কুল,!
ন

মৰ্ম্ম লেখা
শেফালির অবতরণ
সেদিন উষাকালে
আকাশ ভরে
উড়ে ঘন মেঘ পিঙ্গল,
নামিছে বর্ষা মঙ্গল
সুপ্ত নগরীতে
জ্বলিছে দীপ
তখনাে ভবনে ভবনে,
মও হারবে কাঁদিয়া যায়
বাদল ভাদর গগনে,
তখনাে বাসা ছাড়ি উড়েনি পাখী
তুলে নাই কল সঙ্গীত,
পূৰ্বদিক দিয়ে
সেই সে সবে
ফুটিছে অরুণ ইঙ্গিত,
শেফালি বালিকা শঙ্কিত
লজ্জা বিজড়িত বদনে কহে
“নামিব না আমি
ক্ষমহ মােরে স্বামী।

8
মর্ম লেখা
কহিল ক্ষিতিতল নীরব হাসে-
“বুঝনা নিপট নির্দয়
পরের বেদনা দগ্ধয় ;
উতলা চঞ্চল
হৃদয় ব্যথা
আঘাতে না তব বক্ষে;
পরের দুখ হেরি করুণা বারি
গলে না নিঠুর চক্ষে ;
পিপাসা বুকে যার বুঝিতে পারে
সে কভু কি জ্বালা তৃষ্ণায়,-
চাতক বুঝে কভু
নিদাঘ কালে,
চকোর না পেলে জ্যোৎস্নায় ;
আয় বালা নেমে আয় আয়”।
অমনি মাথা নাড়ি
শেফালি কহে,
‘নামিব না আমি
ক্ষমহ মােরে স্বামী-
.
.

মর্ম লেখা
৮৫
বাজিবে বুকে-
“কঠিন ক্ষিতিতল
বাজিবে কঠোর প্রস্তর,
মরণ নামিবে সত্বর।”
কহিল ক্ষিতিতল—
“সিক্ত জলে
কোমল করেছি অঙ্ক”;
সুধাল শেফালিকা
সজল দলে
লাগিবে তাহলে পৰু”।
আকাশে ঘাের হাসি
বরবে
ছুটিল, কাঁপিল কন্দর,
ধাঁধিল দশদিক্ ক্ষণিকালােকে,
বিহগ চকিত-অন্তর,
কপিল কানন প্রান্তর ;
কহিল ক্ষিতিতল সপ্রতিভ,
নাম ললা বালিকা
নাম লাে শেফালিকা,

৮৬
মৰ্ম্ম লেখা
৪
শীতল করে
“বৃক্ষ শিরে রহি’ বৃথায় যাবে
তব যৌবন-গৌরব
শুকাবে কোমল সৌরভ।
হাসিল ফুলকলি, “অনিল অলি
যাবে কি ফিরিয়া কাননে ?
জলদ জল, হায়,
বুলাবে না কি এ আননে?
তারকা শশী রবি
হেরিবে না মানি’ বিস্ময় ?
বৃথায় যাবে মম সুরভিভার
কহিলে কেমনে মৃন্ময় ?
হায়, মিছে তব সংশয়।
জননী বুকে রহি সে সুখ তব
সহেনা কি স্বামী ?
নামিব নাহি আমি”।
কাটিলে মেঘ

মর্ম লেখা
৮৭
নীরব ক্ষণকাল
রহিয়া কহে
ক্ষিতিতল মৃদু সুস্বর
“শুন বালা দেহ নশ্বর,
কি কাজে দিবে বল যদি না দিলে
দেবতার পূজা লাগিয়া ?
সাধনা এত তব, এত যে তপ
সঞ্চিত নিশি জাগিয়া
কি ফুল যদি, হায়,
বিফলে যায় ?
নাম লাে, কি কাজ লজ্জায় ?”
শুনিয়া ফুলবালা
নামিবে কি না
ভাবিতে কাঁপিয়া মজ্জায়
দুলিল বৃন্ত-শয্যায় ;
অমনি দশদিকে
ফুকারে পাখী
নিবে দীপশিখা ;
ঝরিল শেফালিকা।

১৮
মৰ্ম্ম লেখা
নীরবে রহিল চেয়ে
তখন সাঁঝের বাতি জ্বলিয়া উঠেছে ঘরে,
কুলায়ে পশেছে সুখে পাখী তরু শাখা পরে,
আঁধারে ভূতের মত দাড়ায়ে বিটপি-দল,
বেড়ার আড়ালে ঝিঝি করিতেছে কোলাহল,
মাঠে মাঠে থামিয়াছে রাখালের বেণুরব,
ফিরিয়াছে গােষ্ঠ হ’তে তৃণতৃপ্ত ধেনু সব,
অভিমানিনীর কাছে তখন গিয়াছি ধেয়ে ;
সে শুধু আমার পানে নীরবে রহিল চেয়ে।
বিদ্রোহী নয়নে তার ফুটিয়া উঠেনি ক্ষমা,
চাপা দুটি ওষ্ঠে তবে মহারােষ ছিল জমা,
আমারে হেরিয়া দ্বারে বিজলী খেলিল চোখে,
উন্নত নাসার অগ্রে দর্প ফুটে সে আলেকে,
তখন তাহার কাছে করুণ বিরহ গাছি
দাড়ায়েছি অবিচল সুচির বিদায় চাহি;
তখন নদীর বাঁকে তরণী চলেছে বেয়ে;
সে শুধু আমার পানে নীরবে রহিল চেয়ে।

মর্শ লেখা
৯
ফিরেছি বিরাগ ভরে বহি’ বুকে গুরুচাপ,
হেরেছি বদনে তার ফুটিয়াছে অনুতাপ,
উদ্ধত তাহার শির নমিয়া পড়েছে ধারে,
আকুল বুকের ব্যথা বাতাসে কাঁদিয়া ফিরে।
সাঁঝের গগনে তবে হাসিল তারার দল,
প্রতিবিম্ব ল’য়ে বুকে বহিল নদীর জল,
মাথার উপরে গেল নিশাচর গান গেয়ে ;
সে শুধু আমার পানে নীরবে রহিল চেয়ে।
যখন পথের বাঁকে মিলাল আমার ছায়া,
আঁধার রজনী ধীরে বিছাল ঘুমের মায়া,
যখন বুকের মাঝে ভেঙ্গে গেল সব আশা,
তখনাে মুখেতে তার ফুটেনি একটি ভাষা ;
বহিল মৃদুল মন্দ তবে
নৈশ সমীরণ ;
সুদূরে দুলিল সুখ হিল্লোলে পিয়াল বন,
ঘুমালে বিশ্বের প্রাণী সে মধু পবন পেয়ে ;
সে শুধু পথের পানে নীরবে রহিল চেয়ে।

মৰ্ম্ম লেখা
কল্পনা
হে মম মানসী দেবী কল্পনা সুন্দরী
কবে কোন শুভ লগ্নে মর্ত্যে অবতরি
কোন উচ্চলােক হতে হ’ল পরিচয়
তােমাতে আমাতে সখি ? ভুলিবার নয়
সে দিনের মধুগীতি কূজন গুঞ্জন
বকুল কলিকা ঘিরি’ উঠিল যখন,
যখন সে গিরিনদী কলনাদ করে
বাহিরিল দ্রুত পদে মধুর নিঝরে,
রজনী গন্ধার গন্ধে হয়ে আমােদিত
সন্ধ্যা যবে এল নামি’ ; পাপিয়া-কূজিত
যখন নামিল বিশ্বে নৈশ অন্ধকার,
প্রদানিল পরিচয় প্রথম তােমার।
তােমার পরশ পেয়ে বুঝিলাম মনে
ভাষা আছে তটিনীর মধুর নিকণে,
কত অশ্রু, কত হাসি, আলাপ কৌতুক
দুৰ্দাম হঠত কত, কত দুঃখ সুখ

মৰ্ম্ম লেখা
নিত্য চলে ভেসে; চূত মুকুলের শির
মিলন বিরহ কত অগােচরে ফিরে
পুণ্যের রচেছ স্বর্গ—পাপে দেছ সাজা,
রাজারে করেছ ভিক্ষু—ভিক্ষুরে সে রাজা।
তুমি বাজায়েছ বীণা ; শুনেছি মােহিত
যুগান্তরগত গাথা;-নূপুর শিঞ্জিত
সহস্র বর্ষের পরে আসিছে ভাসিয়া
ধীরে ধীরে ;-হেরিতেছি পান্থজনপ্রিয়া
চরণে অলক্তরাগ, লীলাপদ্ম করে ;
কল মলিন চোখে বাতায়ন পরে
বসি’ বসি’ কান্তের উদ্দেশে তন্দ্রালসা;
হেনকালে দ্বারদেশে পথিক সহসা
করে করাঘাত শুনি’ উঠে দ্রুতগতি,
অপ্রস্তুত চোখে জাগে বিনীত মিনতি।
অথবা সে বিরহিণী বিরহের তাপে
সন্তাপিত দীর্ঘ দিবা ক্লিষ্টনিশা যাপে,
পদপত্রে লিখি স্বীয় কাহিনী করুণ
পাঠায় প্রিয়ের কাছে—রচনা নিপুণ
উত্তরের প্রতিক্ষায় রহে আনমনা
আকাশে বাদল নামে-বৃথা সে সান্ত্বনা।
.

মৰ্ম্ম লেখা
এইরূপে দেখায়েছ দেখি নাই যাহা
শুনায়েছ সে সঙ্গীত যা কখনন, আহা,
শুনি নাই; যুগে যুগে নব বেশ ধরি’
হইয়াছ উপনীত ; গিয়াছি পাশরি’
তােমার করুণাময়ী অসংখ্য মূরতি,
জানিনা কেমনে আজি করিব আরতি।
হৃদয় কানন শূন্য ; বেলা, শেফালিকা
নাই সেথা, কিসে তব গাঁথিব মালিকা?
ভূমিষ্ট হইনু যবে, চকিত চঞ্চল
যবে বিশ্বজগতের ক্লিষ্ট কোলাহল
সমুদ্রগর্জন সম পশিল শ্রবণে,
শীত বায়ু রূঢ়ভাবে অঙ্গপরশনে
কঁপাইল সদ্যোজাত আমার বয়ান,
প্রথম আলােকে যবে ধাঁধিল নয়ান,
যখন ক্ষিতির গন্ধ পশিল প্রথম
নাসিকায় তীব্রভাবে, ছিলনা সম্ভ্রম
হস্ত পদ সঞ্চালনে, অবাধ স্বাধীন
ছিলাম কাটিত তবু যবে নিশিদিন

মৰ্ম্ম লেখা
পরমুখ চেয়ে, জগতের বাক্যরাশি
একান্ত অবােধ্য ছিল যবে, কান্নাহাসি
অকারণ, কি যে ছিল জানি নাই যবে
দুঃখ সুখ, জননীর মূর্তি ধরি তবে
নিলে কোলে তুলে, করাইলে স্তন্যপান,
শিয়রে দানি’ হাত গুঞ্জরিয়া গান
পাড়াইলে ঘুম ; আকাশের তারাগুলি
নিদ্রিত শিশুর পানে চাহি’ মুখ তুলি
নেহারি গৌরবময় তােমার বদন
কি ভাবিল ? তার পর হ’লে জাগরণ
কহিলে কতই সুখ সােহাগের কথা
শিশু আমি বুঝি নাই সে সব বারতা ;
অক্লান্ত হৃদয়ে তুমি করেছ সহন
শিরে শত অত্যাচার দুঃখ অগণন,
দাওনি লাগিতে আঁচ শিশুর শরীরে ;
সংসারের রৌদ্র বৃষ্টি হতে ধীরে ধীরে
ক্ষুদ্র পক্ষপুট দিয়া ঢেকেছ তনয়ে ;
বহেছিলে কত স্নেহ তােমার হৃদয়ে

৯৪
মৰ্ম্ম লেখা
জানি নাই, বুঝি নাই ধ্রুবতারা সম
চাহিয়া রজনী দিবা মুখপানে মম
কত সুখ উপজিত তব! লয়ে বুকে
পরম আনন্দ ভরে অসহ্য কৌতুকে
যত কিছু শুভ ইচ্ছা সুমঙ্গল বাণী
কেবল আমার শীর্ষে প্ৰদানিতে আনি।
তার পরে নিজ মনে ল’য়ে মাটি ঢেলা
শৈশবে একদা যবে করিতেছি খেলা,
অকস্মাৎ ফিরে দেখি অতি চুপে চুপে
আসিয়াছ পার্শ্বে মম সােদরার রূপে;
কপালে দিতেছ ফেঁটা, যমের দুয়ারে
কাঁটা দিয়া দীর্ঘজীবি করিছ ভ্রাতারে
বর্ষে বর্ষে দ্বিতীয়ায় ; নিঃস্বার্থ তােমার
বাঞ্ছা দেবাশিষ সম নামিছে ভ্রাতার
শিরে শিরে ; শৈশবের একমাত্র সাথী
হে কল্পনে, জাগিয়াছ সারা দিবারাতি
আমার খেলার ঘর সাজাবার তরে,
দিয়াছ বিবাহ পুতুলের কন্যাবরে,

মর্ম লেখা
s
কোথায় রাজার বাড়ী করেছ নির্দেশ
চিলের ছাদের কোণে, উত্তর প্রদেশ
লক্ষ্য করি’ চলে মেঘ-বুভুক্ষুর ক্ষুধা
মিটাইতে শালপত্রে, কোথা রহে সুধা
কোন বৃক্ষতলে, তব অনুগ্রহে বটে
অজ্ঞাত ছিল না কিছু আমার নিকটে।
একদিন যৌবনের প্রথম বিকাশে
প্রেয়সীর রূপ ধরি’ দাড়াইলে পাশে
কনক কঙ্কণ হ’তে উঠিল কিঙ্কিণী—
চরণে বাজিল মৃদু নূপুর-শিঞ্জিণী ;-
তরুশাখা হতে সুখে কপােত যুগল
মিলনের কলরবে করে কোলাহল,
খঞ্জন আবরি ধরা নাচিয়া বিহরে,
চক্রবাকী রজনীর দ্বিতীয় প্রহরে
অসহ্য বিরহক্লেশে, কাঁদে অনিবার
প্রিয়-সম্ভাষণ-রাশি শুনিয়া তােমার ;
চন্দ্রালােক পড়ে তরু-বীথিকার শিরে,
উঠেছে ফুটি” সরসীর
সরসীর নীরে,
মন্দ সমীরণ বহে, তুমি কাছে কাছে
ফিরিছ ছায়ার মত ; কণে মম বাজে
কুমুদ উঠেছে ফুটি

৯৬
মর্শ লেখা
তব সােহাগের বাণী ; রােমাঞ্চিত দেহে
রুদ্ধকণ্ঠে তব মুখ পানে মুগ্ধ স্নেহে
চেয়ে থাকি লুব্ধ আঁখি, তুমি হে কল্যাণি,
পুষ্পশয্যা রচ মম বাসরের রাণি,
শিখাও প্রেমের মন্ত্র ; দুটি প্রাণে প্রাণে
একাকার, হে কল্পনে, তােমারি কল্যাণে।
তার পরে একদিন কন্যারূপ
আসিলে বার্ধক্যে মম গৃহ আলাে করি,
দিয়া তব ভীত ক্ষুদ্র কোমল অন্তর
ছুটালে পাষাণ প্রাণে করুণ নিঝর ;
সেইদিন দুটি চক্ষে লয়ে জলভার
হেরিলাম অয়ি শুভে পূর্ণতা তােমার ;
ক্ষুদ্র কণ্ঠে শুনিলাম বিশ্বের সঙ্গীত,
দেখিলাম ক্ষুদ্র চোখে জ্যোতিঃ বিকশিত,
ক্ষুদ্র দেহে বিশ্বরূপ উথলিয়া উঠে,
ক্ষুদ্র প্রাণে বিশ্বের চেতনা বুঝি ফুটে !
বৎসলতা ভরে তার মুখখানি চুমি
বুঝিলাম, দেবি, কত লীলাময়ী তুমি

মৰ্ম্ম লেখা
অবশেষে একদিন জীবনের শিখা
নিৰ্বাপিত হবে যবে, মৃত্যু কুহেলিকা
বিশ্বের আলােক রাশি ফেলিবে ঢাকিয়া,
শকুন মাথার কাছে যাইবে ডাকিয়া,
রূপ রস স্বাদ গন্ধ যাবে মুছে যবে
কোন্ মূৰ্ত্তি ধরি তুমি দেখা দিবে তবে?
তখন কি শুচিস্মিতা, হে কল্পনা-রাণি,
প্রচারি গম্ভীর কণ্ঠে আদেশের বাণী
ঘুচাইয়া জীবনের দীর্ঘ অলীক
উদিবে হৃদয়-রাজ্যে জীবন দেবতা
সত্যরূপে ? তখন কি শান্তি-মূর্তি
সৌম্যমুখে শিখাইবে সুপথ বিস্মরি’
ভ্রান্ত পথিকের মত ভ্রমেছি কেমন ?
তখন কি করি’ দিয়া ভ্রম-সংশােধন
দেখাবে মূরতি তব মহানন্দময়,
রহিব নিস্তব্ধ মনে মানিয়া বিস্ময়
ক্ষণকাল, ঘুচে যাবে ভেদ, এক য়
দাড়াইব বিশ্ব মাঝে আমরা উভয়

at
মর্শ লেখা
ডাক তারে
ডাক্তােরা তারে—‘আয় ;
সে যে সুখনিশা শেষে : গেল হেসে হেসে
সে যে
ফিরিল না পুনরায় ;
সে যে ভেঙে গেল আশ
দিয়ে হা-হুতাশ
শুধু রেখে গেল আঁখিজল,
ওগাে ছিল যাহা মনে রয়ে গেছে মনে
জানাতে পারেনি তায় ;
সেকি ফিরিবে না বলে গিয়াছিল চলে,
আহা এত ছিল মনে তার ।
সে যে বড় দিল কঁকি, কি রাখিল বাকি
দীন আমাদের তরে, হায়!
কভু

মৰ্ম্ম লেখা
জল কেন আঁখি কোণে ?
আজি জল কেন আঁখি কোণে ?
কে যেন গাে নাই থেকে থেকে তা
বাজিছে ব্যাকুল মনে ;
থামিয়াছে আজি কার বীণাখানি
নীরব আজিকে কি অমিয় বাণী
ছেড়ে কোন শাখী কোন্ প্রিয় পাখী
গেল উড়ে কোন্ বনে!
আজি জল কেন আঁখি কোণে ?
দূর অচলের কোলে ধীরে ধীরে
তটিনী বহিবে যবে,
কোন্ প্রিয়তম তরে নতশিরে
বিষাদ বসিয়া রবে।
কোমল চরণ অবধান ভরে
ফেলিবে, কহিবে কথা মৃদুস্বরে !
একি সংস্কার। হায় হতভাগা,
মৃত কভু ধ্বনি শশানে?
আজি জল কেন আঁখি কোণে ?

১০০
মৰ্ম্ম লেখা
জানি আমি বটে মিছে আঁখিজল
মরণ শােনে না কথা ;
শুনিয়া কার কল কোলাহল
প্রাণে তবু বাজে ব্যথা !
যে তুমি কহিছ ভুলিতে তাহারে
তােমারি নয়ন সিক্ত আসারে-
রয়েছ শুষ্কমুখে চেয়ে তুমি
আকাশে শূন্য মনে ;
আজি জল কেন আঁখি কোণে ?
নীরব আজিকে যে সুরব বীণা
স্মৃতিটুকু তার ভুলিতে পারি না।
নাই সে যে নাই—থেকে থেকে তাই
বাজিছে ব্যাকুল মনে।
A

মৰ্ম্ম লেখা
১০১
উৎকলিতা
•?
কেন আসিলনা—আসিলনা কেন ?
আসিল আসিল ওই।
বার বার মনে বুঝাই গােপনে
তবু সে আসিল কই ?
সূৰ্য ঢলিয়া পড়িল গগনে,
কাজ সারি’ সবে
ভবনে,
একাকিনী শুধু
আমি বাতায়নে
আনমনে চেয়ে রই ;
কমল মুদিল আঁখি দুটি তার
অলি সে ফিরিল কুলায়ে,
কপােত কূজন করে নিজ নীড়ে
কপােতীর মন ভুলায়ে ;
দিবা অবসান—পাখী খুজে বাসা
মাঠ হতে ঘরে ফিরে এল চাষা;
কত সাধ মনে-কত মনে আশা
কার কাছে তাহা কই?

১০২
মৰ্ম্ম লেখা
বার বার মনে বুঝাই গােপনে
প্রিয় বুঝি আসে ওই ।
যত পড়ে বেলা—আঁধারের মেলা
তত বাড়ে উৎকণ্ঠা ;
দূরে নদীতীরে—শিব-মন্দিরে
বাজিছে আরতি ঘন্টা ;
তরু মর্মরে চমকিয়া মরি,
শ্বাপদের পদ ধ্বনিতে শিহরি,
অনিমেষ আঁখি জলে উঠে ভরি’
তাড়াতাড়ি মুছে লই ;
বার বার মনে বুঝাই গােপনে
ওই প্রিয় আসে ওই !
চারিধার হতে পবনের স্রোতে
মধুর মদির মন্ত্রে
সন্ধ্যার প্রিয় পূরবী রাগিণী
পশিছে কর্ণ রন্ধ্রে ;
জনহীন পথ নীরব নিথর

মৰ্ম্ম লেখা
গণিতেছি বসি’ অতীত প্রহর,
কৌমুদী জলে নিশা সরােবর
সুখে করে থই থই ;
এত আকুলতা
আমার পরাণে
কই—প্রিয় আসে কই ?

১৪
মৰ্ম্ম লেখা
এ পথে এলনা ফিরে
এই পথ দিয়ে গেলাে=এপথে এলনা ফিরে
রেখে গেল স্মৃতিটুকু ব্যাকুল নয়ন নীরে।
এইখান হ’তে তারে বহি’ নিল নানা যানে
নিয়ে গেল কতদূরে কতদূর ব্যবধানে।
দূরে ছিল রুগ্নদেহ-মন ছিল আশে পাশে
দিন দিন ব্যগ্র লিপি সে কথাটি পরকাশে!
আজ তারে বাম্পাকারে বহি’ কোন বাষ্পপােতে
আশা নিরাশার পারে কে ভাসাল কাল স্রোতে ?
দেখিতে পাবনা তারে জীবনের এই তীরে ?
যে পথে সে গিয়েছিল—সে পথে এলনা ফিরে।
এই পথ দিয়ে গেলাে—এ পথে এলনা আর।
দেখিল না চোখে হেথা কত রুদ্ধ হাহাকার।
অবােধ বালক চাহে সকলের মুখপানে,
সকলে সান্ত্বনা কহে বুঝেনা তাহার মনে!
হায় সদ্যো মাতৃহারা—হায়রে অভাগা ছেলে
স্তব্ধ হয়ে বসে আছ আপনার খেলা ফেলে।

মৰ্ম্ম লেখা
১০৫
মা যবে বিদেশ যায় কঁদিয়া আকুল প্রাণ
বুঝিতে পারে না আজ কতদূর ব্যবধান!
আজ রাখে পথপানে ভীতিকুণ্ঠ আঁখিটিরে
এই পথ দিয়ে গেলাে—এ পথে এলনা ফিরে!
এই পথ দিয়ে গেলো—এলনা ফিরে এ পথে ।
রেখে গেলাে স্মৃতিটুকু কত ব্যর্থ মনােরথে !
কত সুখ-কত দুঃখ-কত তার ভগ্নদেহ
অপরের তরে তবু একটানা শুধু স্নেহ।
মূর্তি ধরি’ ছিল গেহে শুধু করুণার রাশি—
শুধু সেবা—শুধু দান—স্বরগের পুণ্যহাসি !
আজ মনে পড়ে প্রতিদিনের ঘটনা সব
আজ তার সব শেষ—আজ মিছে কলরব ।
সে দিন পশিল গেহে-মনে পড়ে বধূবেশ,
আজ কতকাল গত! পাকিল সকল কেশ ।--
আজ তার ভরা ঘর-কোথা লক্ষ্মী গেল ধীরে ?
পথ দিয়ে গেলাে—এ পথে এলনা ফিরে ।

মৰ্ম্ম লেখা
আমার বনের মুক্ত
হরিণটিরে
আমার বনের মুক্ত হরিণটিরে
কে বিধিল—কে বিধিল শরে!
সঙ্কুচিত—চাইছে ফিরে ফিরে
শম্প কবল পড়ছে মুখে ঝরে!
আনন্দ নাই চোখের চাহনীতে,
চরণ নেচে উঠেনা ভঙ্গীতে,
মৌন ব্যথায় স্তব্ধ চকিত চিতে
মন্থরিত ক্লান্ত তনুর ভরে !
চেয়ে চেয়ে ক্লিষ্ট কাহার মুখে
ছন্দোদোদুল আতে গেল হাসি
ব্যথা নিবিড় নিরীহ কৌতুকে
রইল বুকে রক্ত অশােক রাশি ।
অহিংস সে হ’লনা কার মনে?
দারুণ ব্যথা দিল অকারণে
বনের অশােক রইল পড়ি বনে
আনন্দ তার লুটায় ধূলির’ পরে ।
1.

মর্শ লেখা
সতীশ চন্দ্র ঘটকের মহাপ্রয়াণে
শৈশবের সাথী মাের—হে আমার প্রিয়,
শােননি করুণ ডাক্ ‘দিও সাড়া দিও
অনন্তের যাত্রাপথে ? বাজে নি কি ব্যথা
ছাড়িতে মােদের সভা? আজ তুমি কোথা ?
উৎকর্ণ উৎকণ্ঠ প্রাণ চাতকের মত
তৃষার্ত তােমার আশে তাকায় সতত।
হে সুকণ্ঠ আজ তব উঠিবে না বাণী
আমাদের গৃহাঙ্গণে? সেই মুখখানি
চিরপরিচিত ঘুরে যাবে না কি ঘরে ?
সেই নিরমল হাসি কৌতুকের ভরে
আবার দিবেনা দেখা ? হে শান্ত হে প্রিয়
চির নিমীলিত তব নয়ন অমিয়?
শৈশবের সাথী মাের—যৌবনের সখা
বার্ধক্যে ভরসা ছিল আঁখির তারকা।

jot
মৰ্ম্ম লেখা
আজ ঘন অন্ধকারে ঢাকিয়া আকাশ
চলিলে কোথায় তুমি ?—জাগে মনে ত্রাস।
কূলঙ্কষা নদীতীরে আকুল পথিক
যেই দৃঢ় তটভূমি আঁকড়ি নির্ভীক
দাড়ায় বিশ্বস্ত মনে—সে পড়িলে ধসে
নিৰ্বাক্‌ বিহ্বল যথা থাকে চেয়ে বসে
মােদের তেমনি ভাব তােমার অভাবে।
সে সাহস—সে উৎসাহ মন কোথা পাবে
প্রতিপদে তুমি যাহা দেছ অনিবার
যােগাইতে ভারতীর পূজার সম্ভার ?
হে বাণীর বরপুত্র একাগ্র সাধক
সুরসিক এনেছিলে হাসির ঝলক্ ।
রােদন-বহুল সদ্মে-পদ্ম রাশি সম
বেদনার অশ্রুজলে শান্ত নিরুপম
ফুটে ছিল রঙ্গ-ব্যঙ্গ ; নাই কি হে আর
মুছিতে নয়ন-জলে সে শক্তি তােমার ?
মেল ভাই চোখ, মেল—একি নিদ্ৰাবেশ।
একি মৌন বধিরতা! কঁদে সারাদেশ!

মৰ্ম্ম লেখা
হে তাপস হে সুযন্ত্রী ভাবিতে পারি না
বিফল তােমার আজি মধু-তন্ত্রী বীণা।
মনে হয় এই বুঝি উঠিবে বাজিয়া।
নীরবতা ভাষে ভাই-ভেঙে যায় হিয়া।
রস শুধু, যশঃ নহে তোমার সাধনা,
তা’ দিয়ে আবার দেশে আনাে উন্মাদনা।
না ভাই কর ভোগ অর্জিত বিশ্রাম,
সহিয়াছ এজীবনে ক্লান্তি অবিরাম
আজ সে বিরতি হােক্ তার। শিরে তব
চামর দুলা ধীরে নিত্য অভিনব
অনন্তের দেশ হ'তে সুরভি পবনে,
সাগর সঙ্গীত সুর তুলুকূ শ্রবণে,-
মুখপানে চেয়ে থাক্ বৃদ্ধ হিমালয়,
ঘুমাও সে ঘুম যাহা ভাঙিবার নয়।
সাগর-কপােত কেঁদে যাক্ কলরবে
‘কোথা তুমি? কোথা তুমি ? কোথা তুমি?
সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Marmolekha

Author
Shastri,nalinimohan
Title
Marmolekha
File name
Marmolekha
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2009/12/11
Publisher
M.m.roychowdhury,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
128
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Shastri,Nalinimohan
DLI number
512921
Barcode
4990010019949.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
4UHC53kS7ID
Download PDF

Marmolekha