Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rup O Jouban

Ghosh,monmothonath · 2009/11/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কপ ও যৌবন
শ্রীমন্মথনাথ ঘােষ, বি-এ
নিরােগী-নিকেতন
১৯২এ, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

প্রকাশক-সতীশ মিত্র
৩৮, মাণিকতলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা
১৩৩৬
দাম : আট আনা
প্রিন্টার -ঐশশধর ভট্টাচাৰ্য,
মাসপয়লা-প্রেস
৯০৩ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা

রূপ ও যৌবন
মিলন
ভুলালে সে ভুলালাে-
ওই যেন, তার কালাে চিকুর
আকাশ কোলে ছড়ালাে,
সজল হাওয়ার আচলখানি .
আশােক-শাখে জড়ালাে।
ঐ যেন সে কাছে এসে
একেবারে মরম ঘেষে
সকল ভুবন আড়াল করে
দাড়ালে ওই দাড়ালো :-
মিলালাে তার কোলের ছায়ায়
নিখিল আলো মিলালাে।

রূপ ও যৌবন
নত আঁখির কাজল-মাখা পাখা ঝাড়িয়া
মরম দাহ সকলি মাের নিল হরিয়া।
হিয়ার মাঝে ঝলক দিয়া
গভীর গুরু গরজিয়া
বুলালো তার বুকের বিরল
পরশটুকু বুলালাে :
অনি আমার মুখর কুজন
ফুরালে ওই ফুরালাে—
ভুলালাে সে ভুলালো ।
রূপ
(১)
মধুর মধুর তব রূপ
জগতের অমৃত স্বরূপ।
মনে হয় তােমাতে মজিয়া
সুরাসুর মরি’ছে যুঝিয়া ;
মনে হয় তোমারে বেড়িয়া
অহরহ বেড়ায় ঘুরিয়া
লক্ষ কোটি রবি চন্দ্র তারা
শূন্যে শূন্যে তন্দ্রালেশ হারা ।

রূপ ও যৌবন
অস্তাচলে নিত্য চলে রবি
বুকে করি’ তব মুখচ্ছবি,
নত্য ওঠে মাধবী চাদিম।
মনে ল’য়ে তােমারি প্রতিমা ;
মলয় ছুটিছে র’য়ে র’য়ে
তােমার পরশ মাখি’ লয়ে,
ধরণীর অটুট যৌবন
বুকে ধরি’ ও রাঙা চরণ।
শত লক্ষ জন্ম জন্মান্তর
মানব ভ্ৰমিছে ধরা পর
তােমা তরে, শুধু তােমা তরে
দেবতারা মাটিতে বিহরে।
যত রূপ রস গন্ধ গান,
যত সুর যত ছন্দ তান,
বসন্তের অনন্ত যৌবন
বরিষার অশ্রান্ত ক্রন্দন
শরতের সুপ্রসন্ন হাসি
শিশিরের হেম অশ্রু রাশি
কেন আসে-যায়-আসে-যায় ?-
তােমারেই-তােমারেই চায়।
ব্রহ্মাণ্ডের কামনার শেষ
কল্পনার পারে তব দেশ।

৪
রূপ ও যৌবন
নিজে তুমি নিজের উপমা :
নহ কায়া-মানসী কল্পনা।
যেবা যাহা চায়—তাই তুমি :
চপলার চির লীলা অচলার ভূমি।
;
(২)
এই সেই : এইরূপ ভারে
পীড়িত মেঘের দল প্রথম আষাঢ়ে
খুলে ধরে কবিতার কুবের ভাণ্ডার
কবির কল্পনা-চক্ষে।
যক্ষের বিরহ
মেঘ-পুঞ্জুে সমাসীন ধায় অহরহ
এই রূপ লাগি’ দূর অলকার পানে।
বৃন্দাবনে কদম্বের বিজন বিতানে
এই রূপে বাজে বাঁশী শ্যামের অধরে
“রাধা রাধা রাধা রবে। এই রূপ তরে
সুখ স্বর্গলােক ছাড়ি’ স্বর্গের ঈশ্বর
দীন বেশে দেশে দেশে ভ্রমে নিরন্তর
কঠোর ধরার পরে। এইরূপে ভুলে
রাজকাৰ্য রাজা জাহ্নবী-কূলে কূলে
প্রান্তর কান্তার করে বিলাপে মুখর।
তপােধন এই রূপে হইয়া কাতর
তৃণসম আচম্বিতে দেয় বিসর্জন
আজন্মের তপস্যর সঞ্চিত রতন।

রূপ ও যৌবন
প্রতি পত্রে প্রতি ছত্রে পরতে পরতে
এইরূপ খেলা করে কত শত মতে,
শেণিতের রেখা পড়ে পাষাণের গায় ।
এই সেই : এই রূপখানি ঘিরি’ হায়
অনাদি অনন্ত কাল ফেলিছে নিঃশ্বাস;
কত ব্যথা কত কথা কত হা হুতাশ
কত সুখ কত হাসি কত অশ্রুজল
কত ঋদ্ধি কত সিদ্ধি সাধনা বিফল
জড়ায়ে রয়েছে সেই এই রূপরাশি
বিশ্বমানবের :-তাই এত ভালবাসি।
( ৩ )
নয়নে লেপিব ওই রূপেল অঞ্জন,
দেহ ভরি’ মাখি’ ল’ব ও-রূপ চন্দন,
বুকেতে আঁকিয়া ল’ব ও-রূপ মূরতি,
ধেয়ানে উদিবে সূক্ষ্ম ও-রূপের জ্যোতি।
বসন রঞ্জিত করি’ ও-রূপগৈরিকে
রূপের উদাসী হয়ে ধা’ব দিকে দিকে।
নয়ন ভাসা’য়ে ব’বে ও-রূপের ধারা,
নাচিব দু’হাত তুলে রূপের ফোয়ারা।
ও রূপে দেবতা গড়ি পূজিব সতত
পুড়িয়া সারাটী হ’ব ধূপ-শিখা মত।

রূপ ও যৌবন
( ৪ )
শরতের উদ্ভাসিত মেঘের মতন
সম্বরিতে নারে ওই তনু-অবরণ
রূপের চন্দ্রমা তব ; ভয় হয় পাছে
গণিয়া মিলিয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাছে
এখনি প্রকাশ হবে অসীম বিস্ময়
পূর্ণ গৌরবের জ্যোতি—দীপ্ত মহিমায়।
সে যে এক ক্ষণ বাধা বিঘ্ন পাসরিয়া
দশদিকে দশদিক যাবে প্রসারিয়া,
সপ্ত সিন্ধু সপ্ত কোটি লহর তুলিয়া,
ফুলিয়া ফুলিয়া ঘন উঠিবে দুলিয়া,
দেবতা তেত্রিশ কোটি দানব মানব
একত্রে মিলিয়া আসি’ দাড়াইবে সব
ঊর্ধ-নেত্র যুগপাণি বাসনা-বিরত,
মহাকাল চেয়ে র’বে স্তম্ভিত আহত।
( ৫ )
ফুটিয়াছে থরে থরে ও-রূপের ফুল
তনুলত খানি বেড়ি-জগতে অতুল।
ও আশ্রয়-হারা হয়ে আলােকের পারে
ফিরে যাবে আনন্দের কুবের-ভাণ্ডারে
অাবার আসিবে ফিরে বসন্ত-প্রভাতে,
সাজাবে যৌবন নব নবীন শােভাতে।

রূপ ও যৌবন
৭
গাহিবে নবীন পাখী নবীন আলােকে,
শিহরি’ উঠিবে ধরা নবীন পুলকে।
ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছে ওরূপ-পাথায়,
জনম জনম ভরি’ দিতেছি সাঁতার।
ওকি কভু ধরা যায় ওরে মূঢ় মন !
ওযে রূপ অপরূপ অরূপ রতন।
কভু ফুরাবে না ভবে ওই রূপ সুধা,
কভু মিটিবে না ভবে ওই রূপক্ষুধা।
৮।
কোথায় উঠেছে চাদ—কি জানি কেমন
দেহের আকাশে হাসে রূপের জ্যোছনা
উজ্জ্বল হয়েছে নব যৌবনের বন,
বক্ষ-বীণে কাপে মন্দ আনন্দ মূচ্ছ না।
উথলি উঠেছে হের নিভৃত তটিনী।
দেহ-তটে মৃদু মধু সোহাগ-আঘাতে
ক কল্ ছল্ ছল্ চলেছে মােহিনী
কনক কিরীট পরি’ কাহার সাক্ষাতে।
রূপের পরশে রূপসী উঠেছে জাগি,
অনিমেষে চেয়ে আছে আপনার পানে ;
সারা দেহখানি আহা কেমনে কি লাগি’
গুঞ্জরি’ উঠেছে স্বর্ণে বর্ণে গন্ধে গানে।
কোন্ দেবতার লাগি ফুটিয়াছে ফুল,
কি ফলের সূচনায় হয়েছে আকুল।

তিলােত্তমা
বিশ্বের সৌন্দর্য্য-সুধা তিল তিল আহরিয়া সুখে
একত্র ছানিয়া নিয়া একমনে মনে কৌতুকে
ধেয়ানে গড়ে’ছে তােমা লাবণ্যের ললিত কালনা
সৰ্বাঙ্গসুন্দরী করি'—পরিপূর্ণা অয়ি তিলােত্তমা !
তুমি ত মানবী নহ, তুমি চির মুৰ্ত্তির অতীত
কবির মানসী কন্যা অনস্ফুট প্রেয়সী কবিতা।
তুমি বিহরি’ছ সুখে অগঠিত নীহার ভুবন
কল্পনার লীলাকাশে ; মায়াময় সুবর্ণ স্বপন
লুকোচুরী খেলিতেছ নিদ্রিতের মুদ্রিত নয়নে,
এই আছ—এই নেই। পরশে সুবাসে প্রাণে মনে
বিজনে বিরলে পাই ক্ষণতরে তােমার আভাস,
বসন্ত-সমীরে কভু নীলাকাশে উদার উদাস
শিথিল অঞ্চল তব ভেসে যায় ছুয়ে প্রান্তখানি
অন্তরের একপ্রান্ত। শরতের চন্দ্রমা-শালিনী
চন্দ্রিকা স্ফুটিত চারু যামিনী সে চকিতের তরে
ভেসে যায় তব সুধা-বাঁশরীর সুস্বর লহরে
কোন্ স্বপ্নলােকপানে একটী নিমেষে।
তিলােত্তমে!
আকাঙ্ক্ষার মহাতীর্থ সৌন্দর্য্যের সাগর সঙ্গমে।
কত যাত্রী দিবারাত্রি রুদ্ধ তব মন্দিরের দ্বারে
ছুটিয়া আসি’ছে তব দর্শন-লালসে, রহি’ ভারে ভারে

রূপ ও যৌবন
৯
জন্ম-জন্মান্তের জপ তপ নিবেদন। কত ঋষি
বসেছে কঠোর যােগে ; স্বর্গ মর্ত্ত ব্যাপি দশ দিশি
দেবতা তেত্রিশ কোটি মগ্ন তব ও রূপ ধেয়ানে
কত গুণী জ্ঞানী আহা কত সাধু এক মন প্রাণে
অচিন্ত্য মহিমা নব চিন্তিছে সদাই। আত্মহারা
গড়িতে প্রতিমা তব কত শিল্পী হয়ে গেল সারা,
কত চিত্রে ভেসে গেল অশ্রুজলে, কত কবি হিয়া
দিগন্ত মুখরি’ সুখে তব স্তব স্তুতি-গীতি দিয়া
নীরব হইল শেষে।
--
হে সুন্দর হে চির-বাঞ্ছিত!
কোথা তুমি কোথা তুমি? নিখিলেরে করিয়া বঞ্চিত,
সকলের সম্পূর্ণতা, হে সম্পূর্ণ! করিয়া হরণ
কোথায় মিলা’লে বল ? অন্তহীন তাই আয়োজন,
তৃপ্তিহীন ক্ষুধিত পিয়াসা। তাই দীন উপবাসী হিয়া
দরিদ্র এ ধরণীর ধুলি তলে বিরলে বসিয়া
নিরানন্দ করি’ছে ক্রন্দন-শ্রান্ত সম্ভারের ভারে
ক্লান্ত অন্বেষণে।—কোথা তৃপ্তি হয় কোথায় সান্ত্বনা ?
তােমার সে সৃজনের মহা যজ্ঞে, অয়ি বিশ্বরমা ।
এ বিশ্ব আহুতি দেছে সৌন্দর্য্যের কোষ মাঝখানে
লুকানাে সে অনন্তের তিল সুধাটুকু। নিঃস্ব প্রাণে
দীন নেত্রে তাই আছে ভিক্ষা পাত্র মেলি’ রুদ্ধ দ্বারে ;
তৃপ্তিহারা ক্ষুধিত বাসনা যত ক্ষুব্ধ হাহাকারে
--

১০ রূপ ও যৌবন তোম পানে ছুটিতেছে ক্রন্দনের রােলে নিরন্তর শ্রান্ত ক্লান্ত শিরখানি লুটাইতে তব অঙ্ক পর গভীর বিশ্বাসে। খুলিবেন দ্বার, দেবে নাকি দেখা, এমনি ঘুরাবে শুধু পিছু পিছু মায়া মরীচিকা চির রাত্রি চির দিন ? ধন্য কি হবেনা বিশ্ববাসী তোমারে হেরিয়া চক্ষে, নিখিলের সৌন্দৰ্য-পিয়াসী তোমারে পাইয়া বাহুপাশে? মিটাইতে সসীমের ক্ষুধা অসীম দেবে না ধরা মূর্তিমতী সঞ্জীবনী সুধা? যৌবন এ বড় বিষম সুখ- এ ভরা যৌবনে সাজাতে সাজিতে নিতি নব রসে মজা’তে মজিতে পথপানে চাহি দেখাতে দেখিতে নিতি নব নব মুখ। পুষ্পিত মধুবন মধু ভরা তনুলতাখানি বেড়ে সারাটী প্রহর অলি করে রোল কিরণের নাচ মলয়ার দোল, জোছনার চুমাে বিবল বিফল ঘুমটুকু লয় কেড়ে।

রূপ ও যৌবন
১১
উন্মুখ হয়ে আছে নিশিদিন
শ্রবণ নয়ন মন
।
কুহক-পাথারে ভাসিয়া ভাসিয়া
গ্রহণ করিছে হাসিয়া হাসিয়া
নত ধরণীর আরতি-বাতি
আত্মার নিবেদন।
নিদ্রার তলে ঢেলে দিয়ে নিতি
দিনের বেদনা-ভার
নবীম উষায় নব আশা সনে
সূর্যের পানে চাই লঘু মনে,
নব ফুলে ফলে পল্লব-দলে
বিরচি’ নবীন হার ।
চুম্বন-রসে ভরে ওঠে রাঙা—
মদির অধর দুটী,
দু’বাহু মূল-মালার মতন
লতায় লতায় মাগে পরশন,
মুখখানি চাহে বুক-সরােবরে
কমল হইয়া ফুটি।

১২
রূপ ও যৌবন
বুকখানি যেন আগু হয়ে আসে
বুকেতে টানিয়া নিতে,
যৌবন তনু-পেয়ালা ভরিয়া
সারা রূপ রস বাস আহরিয়া
কনক মদিরালােলুপ অধরে
চাহে শুধু তুলে দিতে।
বসন—শাসনে বাধিবারে চাই
রাখিতে পারিনা রুখিয়া,
চরণ থাপিতে ধরণীর 'পরে
শতদল ফুটে ওঠে থরে থরে
রূপের আগুন লাগিয়া হাসিয়া
দশদিক ওঠে ভুখিয়া।
রূপের মলয়া ছুটে যায় বনে,
মুঞ্জরে শুখাে তৃণ তরু সনে,
ধেয়ান ভাঙ্গিয়া তাকায় তাপস
পুলক-আকুল প্রাণে,
নন্দীর বেত ভুলায়ে চেতন
অচেতনে টেনে আনে।

রূপ ও যৌবন ১৩ যেমন হিমানি-গিরি-বাসী মৃগ আপন নাভির ঘ্রাণে শুধু ছুটে আর ছুটা পিছনে কি পুলকে মাতি’ কে জানে কেমনে, তেমনি ভুবন পাগল করিয়া পাগল হয়েছি প্রাণে। তটিনীর মত ছুটে যেতে চাই ভাসিয়া ভসা’য়ে কুল, দাবানল সম পুড়া’য়ে পুড়িয়া, ঝটিকার মত উড়ায়ে উড়িয়া শেষ হয়ে যাই ছাই হয়ে যাই করি ছাই নিরমূল। এ কোন্ নেশায় ধরিল আমারে মাতা মাতা’বার লাগি ? এ কোন্ মদিরা কে করালে পান- জ্বলে পুড়ে গেল তনু মন প্রাণ কতদূর আর এর পরিণাম ? আর ত পারি না জাগি ।

১৪
রূপ ও যৌবন
কে আছ কোথায় কঠোর করুণ
রুদ্র রমণ এসে
বজ মুঠিতে ছিড়িয়া এ পাশ,
আমারে ছিনা’য়ে লহ তব পাশ,
শান্ত মধুর বাঁশরী বাজারে
এস একা দিবা-শেষে।
নিখিল-ভূবন আড়াল করিয়া
দাড়াও তােমার রূপে,
শতদল মম দেও গাে বেড়িয়া
এক চুম্বন-সুধায় ভরিয়া ;
তােমার পরশ-হরষ-লােলুপ
কর মােরে চুপে চুপে।
জানি তাহাতে কি মাধুরী আছে
কি জানি কত না সুখ :-
সাজা’য়ে ভবন সাজি নিতি সাজে
আশা-নিরাশার আলাে-ছায়া মাঝে
পরিচিত চারু চরণের ধ্বনি
শুনে কেঁপে ওঠা বুক।

রূপ ও যৌবন
১৫
বুঝি ভালো লাগে নিরিবিলি ছাতে
চাদ পানে চেয়ে চাঁদিনীর রাতে
একখানি মুখ ওলট পালটি
নিখিতে বারে বারে ;
অতীতের চাওয়া পাওয়া সুখগুলি
স্মৃতির নখরে খুটি খুটি তুলি
চরণ ছড়া'য়ে বসে বসে গাঁথা
গলায় পরিতে হার।
বুঝি ভালাে লাগে দুর্যোগ রাতে
ক্ষুব্ধ তটিনী-তীরে
ঘুমাইয়া থাকা নিরভয় সুখে
রচি দৃঢ় নীড় একখানা বুকে,
সারাটি
বুকের
প্রীতি-গীতি হাস
বিশ্বাস দিয়ে ঘিরে
এই যৌবন উন্মদ-হার
চরণে সপিয়া দিয়া উপহার
ভক্তি-নম্র শিরে যােড়করে
প্রসাদ ফিরিয়ে নেওয়া ;
তারিতােষ তরে দিয়ে তারি ধন
শান্ত মানসে নিতি আয়ােজন :
বুঝি সেই ভালাে বুঝি সেই মুখ
সেই বুঝি খাটি পাওয়া।

সখি !
কি গান বিরলে বাজে
গুন্ গুন্ হিয়া মাঝে ?
বিকচ কামিনী অমল ধবল
হাসে রসে বাসে তনু টলমল
মধু যামিনীর স্বপন বিহ্বল
গাহিতে নারে যা লাজে
সেই গান আজি বাজে
গুন্ গুন্ হিয়া মাঝে।
গাহে এস এস এস প্রিয়তম,
যৌবন কুঞ্জে এস অলি মম
এস অধিরাজ এস অনুপম
এস এ কক্ষে মাের ;
আমি যে বক্ষে নিভৃতে নিরালা
লুকায়ে রেখেছি তব ভােগ-থালা,
উদ্যত করি’ শত ভুজ-মালা
বন্দী করিতে চোর।
আমি ভীরু বালা-মরমে মরিয়া
সমীর পরশে উঠি শিহরিয়া,
তাই কিশলয় আচলে বেড়িয়া
লুকায়ে রয়েছি লাজে।
সেই গান আজি বাজে
গুন গুন হিয়া মাঝে।

রূপ ও যৌবন
১৭
গাহে এস এস এস ত্বরা করি,
মধু অবসর পাছে যায় সরি’,
একেলা বৃন্ত শয়ন উপরি
রয়েছি যামিনী জাগি;
আমি নব-বধু মধুরা যুবতী
লালসার শিখা মানসী মুরতি,
চিনি শুধু তােমা তুমি প্রাণপতি,
আমি যে তােমারি লাগি'।
তোমারি পিয়াস মিটাইতে, বঁধু
আগলিয়া আছি এ বিজন মধু,
তােমারি প্রণয়ে বন্দী এ বধূ,
তােমারি এ কারাগারে ,
বাহির হইতে ভয়ে কঁপে বুক
পাছে উড়ে যায় এ আড়ালটুক,
কেমনে তা হলে দেখা’ব এ মুখ,
তাই থেমে যাই দ্বারে ।
তুমি কেন এত নিঠুর বধির,
অধীর প্রাণের ভাষা কামিনীর
বুকফাটা মূক মরমের তীর
পশে না মরম-মাঝে।
সেই গান আজি বাজে
গুন গুন হিয়া মাঝে ।

১৮
রূপ ও যৌবন
ও সে
গাহে এস এস ছুটে এস পাশে
কত আনা গোনা মৃদু মধু হাসে,
গাও গান দোল দাও আশে পাশে
শিথিল করিয়া সাজ ;
সবলে ছিড়িয়া এস হে আড়াল
তােমারি তরে এ কিশলয়-জাল,
দৃঢ় মুঠি হ’তে কেড়ে লও মােরে,
লাজেতে লুকা’ক লাজ।
তব গুরু ভারে আকুল চপল
ঝরে যাক শােভ। মনােলাভা দল,
মােরে চরণ-তাড়নে কর হে সফল
এক চুম্বন-মাঝে ।-
সেই গান আজি বাজে
গুন গুন হিয়া মাঝে।
বালিকা-বধূ
মিলন-শয়নে শুয়ে আঁখি পরে আঁখি থুয়ে
মাধবী নিশায় তুমি বাজালে যে বঁাশীরে,
বুঝেছি বুঝেছি আমি, কেমনে—জানি না স্বামী,
কার’ মুখে হাসি দিতে ফুটিল ও হাসিরে।

রূপ ও যৌবন
বিরহ-যামিনী জাগি’ আছি আজি কার লাগি
নিশিদিন উদাসীন কেন দুটী আঁখিরে ।
দেখিতে দেখিতে ত্বরা
কেমনে পড়িল ধরা
আমার এ বনচারী ওগাে মন-পাখী রে ।
কে তুমি রাজার ছেলে হেসে হেসে পাশে এলে
ছুইলে সােনার সেই কাঠিখানি দিয়ারে,
তােমার সােনার চুম
ভাঙিল অসাড় ঘুম,
চমকি চাহিমু, সুখে শিহরিল হিয়ারে।
তুমি ভালবাস যাই,
আমি ভালবাসি তাই,
তােমার পিয়াসা মােরে করেছে পিয়াসীরে ;
তুমি ছুটে আস পাশে তাই চেয়ে থাকি আশে,
অধরে ধরিয়া সুধা হৃদে ক্ষুধা রাশিরে।
তুমি নত হয়ে আহা
গ্রহণ করিলে তাহ,
আমারে তুলিয়া নিলে তব সমভূমি রে
তাই না তােমার গলে এ ভূজমালিকা দোলে,
বুকে বুক দিয়ে আমি তাই বলে তুমি রে।
ছুটিয়া ছুটায়ে মাের
মনের আগল-ডাের
পাগল ! আমারে তুমি করিলে পাগলরে,
জলি’ জলি’ বনে বনে তুমি বিহারিছ মনে,
আমারে করেছে প্রাণ তব দাবানল রে।

२०
রূপ ও যৌবন
অলস অবশ সম
আজি এ মানস মম,
জড়ায়ে রয়েছি যেন স্বপনের ঘঘরে রে,
কি করি কি ভাবি মিছু বুঝিতে পারি না কিছু
কি যাদু করিলে তুমি ভুলিলাম মােরে রে ।
তুমি যে আমার তরে
হও ক্ষুদ্রতর ওরে
অমাতে পুরিতে চাও তােমার সকল রে ;
তুমি যে আপন সুখে
এলে এই ক্ষুদ্র বুকে,
হেলায় পরিলে পায় এ ক্ষীণ শিকল রে।
ভুলে ভাবি, পেতে ঈদ
আমি ধরিয়াছি চঁাদ
আমার এ দীনহীন গােষ্পদ কোলে রে ;
তাই ল'য়ে মেতে থাকি, ভুলে যাই এ যে ফাকি
শুধু মায়া শুধু ছায়া—ওই যাহা দোলে রে।
তাই হাসি তাই কঁদি
তাই প্রেম-ডােরে বঁধি
ভালবাসি তাই বলি আমার আমার রে ;
তাই মান অভিমান
এ গরব হেলা ভান
তােমাতে পাতিতে চাই চির-অধিকার রে।
ক্ষমিও ক্ষমিও, প্রভু,
ব্যথা যদি দিই কভু
নরম মরমে তব করুণতা মাখারে ;
আমার কি সাজে নাথ,
ধরি ও দু’খানি হাত
পাশে বসে হেসে হেসে ‘সখা’ বলে ডাকা রে।

মনে মনে
মনে মনে তুমি আমার মনের মত সই,
মনে মনে তােমার কানে মনের কথা কই।
ভােরের বেলা তােমার সনে
কুসুম তুলি কুসুম-বনে,
সন্ধ্যা বেলা জলকে চলি
তােমার পাশে রই।
শাওন ঘন গহন নিশা আমি তােমার সাথে,
তােমার বুকে বুকটী পাতি চৈত্র মধু-রাতে।
স্বপনে বা জাগরণে
তুমি আমার মনে মনে
তােমার মধু পানে বধূ
তিলেক বাধা কই ?
কাল ও আজ
কাল
পরে নি বালা কণ্ঠে মালা
তিলেক বাধা ডারিয়া,
তাহ’তে মােরে পৃথক করে
নিখিল গিরি দরিয়া ।
আজ

২২
রূপ ও যৌবন
হ’তে সাজ করেছে সাজ
সেরেছে কাজ একাটী
পােহাল’ রাতি নিবিল বাতি
তবু না মেলে দেখাটী ।
নিখিল ধরা আড়াল-করা
ছিল সে রূপ লবণ,
তাহার পাছে ফেলিয়া আছে
আঁখির আগে অবনী।
আজ
তুমি ও আমি
তুমি গিরি-নিঝরিণী উতল উছল,
আমি শঙ্খ লৌহ-বেড়ী নূপুর-উপল
পদে পদে বাধি ব্যথা বাজাই কেবল।
তুষি লক্ষ জ্যোতি-সূৰ্য্য রুক্ষ্ম তেজ রাশি,
জলদ-অঞ্চল আমি রয়েছি গরাসি
বঞ্চিত করিয়া লুব্ধ মুগ্ধ বিশ্ববাসী।
তুনি খর দীপ-শিখা দীপ্তির আগার,
আমি ছায়া সারা অঙ্ক করি অধিকার
তব দাহ হতে তােমা দিতেছি নিস্তার ।

রূপ ও যৌবন
২৩
অকাল বসন্ত তুমি উদ্দাম অশনি,
আমি নন্দী বেত্ৰপাণি উদ্যততর্জনী
‘চপল হ’য়াে না’ বলি পরমাদ গণি।
তুমি আত্মহারা মুক্ত মনের পিপাসা,
কৰ্তব্য—কঠোর আমি দুৰ্বার দুর্বাসা
কয়ে আসি বিধাতার রােষ বজ্রভাষা।
তুমি বিশ্ব-সংহারিণী শক্তি দিগম্বরী,
আমি ভােলা-মত্তপদ দুটী বক্ষে ধরি
ভুলা’য়ে রেখেছি মোহ-মন্ত্রে শান্ত করি।
সাথী
সাত সমুদ্র তেরাে নদীর ওপার হতে এসে
পক্ষীরাজের সওয়ার হয়ে রাজ পুত্তর বেশে
করিনি ভাই জয়
রাজকন্যা তােমার হৃদয়।
মমাদের প্রেম যাদুরকরের মায়া তরুর পারা
মায়া ছড়ির একটা দায় মুকুল মুল ছাড়া
এক নিমেষে অঙ্কুরিয়া করেনি নির্বাক
-ফুলে ফলে পল্লবেতে লাগিয়ে দিয়ে তাক।
এসেই হেসেই অনায়াসেই লুকিয়ে পরিচয়
করিনি ভাই জয়
খেলানা সম তােমার হৃদয়।

২৪
রূপ ও যৌবন
এ তরু ভাই অনেক দিনের অনেক কালের রােয়
অনেক হাসির আতপ-তাপ অনেক অশ্রু-ধোয়া ;
শিকড় গেছে চলে
অনেক ধূলাে অনেক মাটীর তলে।
শিয়র দিয়ে গিয়েছে ব’য়ে অনেক ঝড় বায়ু,
অনেক ডাল ভেঙেছে যার ফুরিয়ে গেছে আয়ু,
অনেক মিথ্যা মােহমায়ার উর্ণনাভের জাল
ছাপ হয়েছে ছেপে ওঠা পরগাছা জঞ্জাল ;
যা আছে তা সত্য হয়ে।কোন্ পাতালের কোলে
শিকড় গেছে চলে
অনেক ধুলাে অনেক মাটীর তলে।
যখন তােমায় চাই নি আমি তখনাে হে প্রিয়ে।
কল্পলােকের চূড়ায়—চুড়ায়—সােনার চুমা দিয়ে
লুকিয়ে ছিলে তুমি
কোন্ তুহিনের অগম মন-ভূমি।
তােমায় দিতে কাতর মাল চেয়ে ও নেছ গলে
কিম্বা হেসে কি কেঁদে কিম্বা কেড়ে বলে।
আজ ভাবি তাই কেমন ক'রে জড়িয়ে দিলে ফাসি
সেই মালা সেই কাড়াকাড়ি সেই কাদা সেই হাসি ।
খেলাঘরের ধূলির মাঝে তােমার অন্তরালে
লুকিয়ে ছিলে তুমি
কোন্ তুহিনের অগশ মন-ভুমি।

রূপ ও যৌবন
মােদের ভালবাসার 'পরে উষার রাঙা আঁখি
নীল আকাশের গভীর স্নেহ অচিন বন-পাখী
নিত্য নবীন সুর
ভালবেসে ঢেলেছে প্রচুর।
গিরি-কোলের নীরব নদীর—কলম্বরে
শ্যামল মাঠের উদারতায় বনের মরমরে
বাদল-দিনের বরিষণে মেঘের গুরুরবে
অলস মনের অবশ কল্পলােকের মহোৎসবে
মুক্ত সতেজ করুণ সে যে সহজ সুমধুর
নিত্য নবীন সুর
অনায়াসে লভিয়া প্রচুর।
'ভাই বলে তাই ডাকার একার আমার অধিকার
তুচ্ছ অতি উচ্চ অতি প্রাণের অধিকার।
আশৈশবের সাথী।
কোথায় বল আসন তোমার পাতি ?
তােমার আসন নয় অমরার মানস সরােবরে
মুগ্ধ হিয়ার কুহকগড়া কনক পদ্ম পরে,
তােমার আসন নয় নরকের ভােগের উপবন
লালসারি অনল ঘেরা সােনার সিংহাসন।
খেলাঘরের ভাগী আমার ধূলায় পরিচিত
প্রাণের চিরসাথী।
এই ধূলাতেই আসন তােমার পাতি।

হাত
সুডােল নিটোল হাত দু’খানি—আঙুল ক’টী চাপার কুঁড়ি
দখিন হাতে একটী শাখা—বামে একটী সােনর চুড়ী
আর কিছু না—শুধুই চিনি ওই দুখানি হাতের সুধা
নিত্য মােরে অমর করে নিত্য আমার মিটায় ক্ষুধা ।
লক্ষ্মী যেদিন উঠেছিলেন অমৃতেরি ভাণ্ড হাতে,
ওই হাতেতে বেটেছিলেন অন্য তিনি সবার পাতে।
ওই হাতেরি মকরন্দে মেতেছিলেন দিগম্বর,
দেবাসুরে দ্বন্দ্ব-যাহ চলছে আজো নিরন্তর।
ওই হাতেরি সুধার ছিটে পায়নি বলে মন্তবাসী
ঘােচেনি তার জরামরার দৈন্য—আছেই উপবাসী।
জরাম ক্ষুধা হারী ক্ষুধা বলে নেইক কিছু,
চাদের গুহায় গুপ্ত আছে-কল্পনা সে নেহাত মিছু ।
সুধা সে হয় হাতের গুণে শাকায় সে পরম সুধা,
প্রমাণ তাহার আছেন বিদুর খুদে মিটান হরির ক্ষুধা।
হাতের দোষে অরুচি হয় লুচি কোর্মা কাবায় শূলে,
অন্নপূর্ণা—দুয়ারে তাই ভিখারী শিব আছেন ভুলে।
সুডােল নিটোল হাত দুখানি আঙুল কটি চাপার কুড়ি
দখিন হাতে একটী শাঁখা বামে একটী সােনার চুড়ী।
আর কিছু না—শুধুই চিনি ওই দুখানি হাতের সুধা
নিত্য মােয়র অমর করে নিত্য আমার মিটায় ক্ষুধা।

রূপ ও যৌবন
২৭
বাজেনা তায় নিলাজ কাকন অহরহই আচম্বিতে
মান অভিমান সােহাগ-লীলা-ছলাকলার কি ইঙ্গিতে।
মৌন তাহার মহান বাণী, সেবার মাঝে লুকিয়ে শােভা
সেবা-চপল শীতল মধুর নয়ন মন মরম-লােভা।
শ্রান্ত শিরের নামায় বােঝা, আচল দিয়ে মুছায় জ্বালা,
জ্যোছনা রাতে ওই হাতেতে কণ্ঠে আমার পরায় মালা।
সিনান শেষে ওই হাতেতে তুলসী মূলে সলিল চলে,
কুটীর আঁধার হরণ করি’ নিত্য সাঁজের দীপটী জ্বলে।
আঁধার রাতে প্রদীপ হাতে গহন মাঝে দেখায় পথ,
নিচল হতে উচল যেতে পিছল পথে ধরে সে হাত।
ওই হাতেরি হাতছানিতে টানছে মােরে সুমুখ পানে,
ওই হাতেতে বাজায় বাঁশী নিত্য মধুর আমার কানে।
গীত-গোরিন্দ
ওগাে জয় দেব কবি ।
অজয়ের কূলে বসিয়া বিরলে
হেরিলে স্বপনে কিবা সে গােপন ছবি !
হেরিলে বিঘলা মাধবী যামিনী-
জ্যোছনা মাখিয়া গায়,

২৮
রূপ ও যৌবন
হেরিলে যমুনা উজল উছল
নব মাল দল তাল তমাল
নীপনিধুবন-তল ঝলমল
তীরে তীরে শােভা পায়।
উঠেছে চন্দ্র : সান্ধ্য গগন
বিশ্বভুবন তন্দ্রা-গগন,
বৃন্দা-বিপিন সুন্দরী ভালে
সিঁদুর-বিন্দু তায়।
হেরিলে ললিত লতিকা-পুঞ্জ
কোকিল-কূজিত মালতী-কুঞ্জ
মৃদুল সমীর,-ভ্রমরা-গুঞ্জ
ভাসিয়া আসিছে তায়।
ভেসে আসে মাধবিকা-পরিমল
মালতী-যূথিকা-সুরভি-তরল,
মুকুলিত চুত ফুল নিরকুল
বকুল-কলাপ-গন্ধ ।
চকিতে বাজিয়ে-উঠিল বাঁশরী
কি মধুর সুরে আ মরি আ মরি
গােকুলের কুল কী অকুল করি’
উঠিল উদার ছন্দ।
বঁশরী বাজিয়া উঠিল চকিতে
কি ব্যথা তিয়াষা জাগাইয়া চিতে,
হৃদয় তন্ত্রী আঘাতি’ নিভৃতে
বাজিতে লাগিল বঁাশী :

রূপ ও যৌবন
২৯
কাপিয়া উঠিয়া নব-নীপদল,
হরিণীর আঁখি হ’ল চঞ্চল,
উজান বহিল যমুনার জল,
জোছনা উঠিল হাসি।
মানুষ কখনাে শোনে নাই যাহা
শুনিলে তুমি সে বঁাশী,
হে কবি, হেরিলে হেরে নাই যাহা
কখনাে মরতবাসী।
হেরিলে উতলা দলে দলে
মিলিছে যুবতী নিধুবন-তলে
দিতে দেবতার চরণ-যুগলে
যৌবন-মন-ডালি।
হেরিলে হরষে মণ্ডল পর
কুণ্ডল-যুত গণ্ড-শ্রীধর,
চন্দনচর্চিত কলেবর
পীতবাস বনমালী,
হেরিলে সে গূঢ় লীলা অপরূপ
জনম জনম সুকৃতিস্বরূপ,
তনুমন প্রাণ রমণীর রূপ
কেমনে সফল হয় ;
হেরিলে হরির হসিত বয়ান
লাজ-নিমীলিত নলীন-নয়ান
অরুণ-গণ্ড বিহ্বল বসন
তরুণ সুষমা চয়।

৩০
রূপ ও যৌবন
হেরিলে নিভৃতে যমুনার তীরে
মঞ্জু বেতস কুঞ্জ-কুটীরে
বসিয়া আঁধারে সুধীর সমীরে
দীন হীনা রাধিকারে
পাতি’ কিশলয় কুসুম-শয়ন
চাহে দ্বার-পথে চকিত নয়ন,
বিষাদ নামিছে ঘিরিয়া বদন
নিরাশ অন্ধকারে।
অবিরল ধারে ঝরিয়া নয়ন
তিতায় বসন—তিতায় ভূষণ
গলে পয়ােধরে—উশীর-লেপন
চারু মৃগমদলেখা ;
ইন্দু-কিরণে ক্ষরিছে অনল
চন্দন-লেপে ঢালে হলাহল
শুকায় কোমল কুসুমিকাদল
বিরহ-নিশাসে একা ।
বিলাপিছে কভু হতাশে নিরালা,
গত কথা স্মরি’ কভু কঁাদে বা,
কভু জেগে ওঠে হিংসার জ্বালা,
জ্বলে পুড়ে যায় বুক।

রূপ ও যৌবন
পাগলের পার করে হায় হায়,
কভু আশা-বাণী কাণে কাণে কয়,
ওড়ে যদি পাখী—খসে পত্র চয়—
অমনি তুলিছে মুখ।
কখনাে মুখর ত্যজি’ মঞ্জীর
তিমিরে লুকায়ে চলেছে অধীর,
আঁধার বরণ পরি’ নীলচীর
শ্রীহরির অভিসারে ;
চলিতে পারে না খলিত চরণা
লুটায় ধরায় বিগত চেতনা,
তুমিও হে কবি, ভূলিলে আপনা
স্বপনে হেরিয়া তারে।
তুমি পরি’ কবি, দূতী-বেশ বাস
চলিলে ত্বরায় শ্রীহরির পাশ,
শ্রীরাধার দশা করিয়া প্রকাশ
কহিলে রহসি ডাকি,
শুনিতে শুনিতে সে কথা বিরলে
জলিল হৃদয় অনুতাপানলে,
দ্রব হ’ল চিত, ভরে গেল জলে
বিশাল নলিন-আঁখি।
মধুর বচনে তুষিয়া সবায়
যুবতীর দলে করিয়া বিদায়
অনুসারি’ হরি চলেন তােমায়
গহন কানন মাঝে ;
}

৩২ রূপ ও যৌবন মধুর বচনে নিশীথ-গগন প্রাঙ্গন ভরি রাধা নামে সাধা বাজিছে বাঁশরী, সুপ্ত বিপিন উঠিছে শিহরি’ উদাস বাঁশরী বাজে। কুটীর-দুয়ারে দাড়াইতে শ্যাম শ্রীরাধার হৃদে উগলিল মান, বসিল কুপিতা ফিরায়ে বয়ান গঞ্জনা দিল রুষি’ তুমি আসি’ পাশে হসিত আননে ভাঙি’ অভিমান রােষ-মলা লেষ মুছিলে যতনে বালিকার মন তুষি’! ওগাে কবি! তুমি সুনিপুন করে মনােহর সাজে সাজালে বালারে, ও রাঙা চরণ রাখি’ হিয়া 'পরে অলক্তে করি' অলা মণি-মঞ্জিরে শেভিলে চরণ কাঞ্চির দামে ওগুরু যঘন, গর্বিত বুকে দোলা’লে কেমন তরল মুকুতা মালা ! আঁকিলে বিরলে স্তন সুবিমল, উজ্জলি’ দিলে চোখে কজ্জ্বল, রঞ্জিত করি’ দু’টী পাণিতল- খুলে দিলে কেশপাশ ;

রূপ ও যৌবন :
অগুরু ও ধূপে সুবাসিত করি’
বিনা’য়ে বানালে মােহন কবরী,
যুথিকার মালা পড়িল আবরি—
পরালে চিকণ বাস।
প্রথম মিলন-সচকিত মন
লজ্জা-জড়িত কস্তু চরণ,
বালারে লইয়া চলিলে তখন
মাধবের মন্দিরে।
প্রসন্ন শ্রীহরি দিল পুরস্কার
রাধা নামে সাধা বাঁশী আপনার,
সম্রমে তারে রাখি’ শির পর
তুমি চলে এলে ধীরে।
'আসিয়া বাহিরে বসি’ দ্বার পরে
দেবতার বাঁশী রাখিয়া অধরে
বাজালে আ মরি আপন। পাশরি
বাজা’লে নিবিড় সুখে ;
সে গান শুনিয়া আকুল হরষে
মজিলেন হরি রাধা-প্রেম রসে,
এরা এলা’য়ে পড়িল আলসে
নাথের উদার বুকে।

৩৪
রূপ ও যৌবন
ভরি’ মন্দির-মন্দ আঁধার
ভরিয়া কুঞ্জ সুখে
ভরিয়া চৈত্র-নিশীথ-গগন
জল-কল্লোল উছল পবন
ভাসিয়া চলিল কবির স্বপন
বিশ্ব-বেদনা মুখে ।
শুনিল বিরহী বিরহ-শয়নে
নিল প্রণয়ী প্রণয় স্বপনে,
আধাে-শিহরণে ঘুমে জাগরণে
পশিল মরত-কাণে।
উড়িল সে সুর জলদের কোলে,
ডুবিল সে সুর জলধির তলে,
বিষাদে মুদিল সুখে উথলিল
মানবের প্রাণে প্রাণে।
শ্রীরাধামাধব অন্তরে চির
মাতােয়ার প্রেম-রসে,
ওগাে কবি! তুমি বাজাইছ বাঁশী
একেলা দুয়ারে বসে !
কভু ত্যজিবে না কিশাের কিশােরী,
কভু থামিবে না তােমার বাঁশরী,
মানব-হৃদয়ে উঠিবে লহরী
নিত্য নূতন ছলে।

রূপ ও যৌবন
৩৫
কভু ফুরাবে না এ মধু যামিনী,
এ বৃন্দাবন এ গােপ-কামিনী,
কভু ভাঙ্গিবে না এ স্বপন খানি
চমকি’ নয়ন-জলে।
ওগাে ও মুগ্ধ কবি,
থামিবে না তব স্বপন-বাঁশরী
ভাঙিবে না এই ছবি।
০
লােচন-লােরে তিতল বয়ান
কান্দিয়া কহত কাতর কান
কো’ধনী মাের হল জ্ঞান
হল মােহন বাঁশরী
বুঝিনু ভরমে কুসুম সাথ
সপলু বাঁশী কাহারু হাত
কাহা লুকাল না কহি’ বাত
চিত অথির সুমরি।
আর না সােহি বঁাশী সাধা
বাজব রাধা রাধা রাধা,
আর না রাধা ঠেলই বাধা
ধাওব বেকুল কিশােরী।

রূপ ও যৌবন
আর না যমুনা-পুলিনে বসি
গােপীক আঁচর পড়ব খসি’
গাগরী রঙ্গে যাওব ভাসি’
নাচই তরঙ্গ উপরি ।
আর না মধুযামিনী ভরি’
বৃন্দাবন মুখর করি’
উজান বহই যমুনা-বারি
উঠব সুর-লহরী।
আর না আওব বর-বধূ
বক্ষ ভরই পীরিতি-মধু,
পিয়া’তে গােপন পরাণ-বঁধু
কুলমান লাজ পাশরি’
কুসুম-ভূষণ ভূষিত অঙ্গে
আর না মাতব রাস-রঙ্গে,
নাচব গাওব খেলবি সঙ্গে
বিজন বিপিন মুখরি ।
আর না ধনী শাওন রাতে
অঝাের ধারে বজর মাথে
বাহির হওব তিমির রাতে
অভিসার-বেশে আভরি।

রূপ ও যৌবন
৩৭
যমুনা-তটে বেতস-কুঞ্জে
একলি বৈঠ’ আঁধার-পুঞ্জে
আর না চাহবি বিহগ-গুঞ্জে
সঙ্কেত পথ হামারি।
আর না উদার বাঁশরী তান
উদাস করব মানস-প্রাণ,
জীবন যৌবন করু উচাটন
আর না বাজব বাঁশরী ।
মায়া নাগ-পাশ কবলিত মন
ব্যাকুল না হােই তােড়ই বাঁধন
মজই বিষে করব কঁাদন
আর না বাজব বাঁশরী।
জগজনমন করই হরণ
আনন্দ বারতা করই শ্রবণ
দেখই পাপ মুকতি-শরণ
আর না বাজব বাঁশরী ।
মনমথ কহ কান্দিয়া রে
শ্যামের বাঁশরী হল যে
হামে দূরল হরল সে
ধরার আনন্দ-লহরী।

বিদ্যাপতি
সংসারের এক প্রান্তে লােকালয় পারে
বিজন যমুনা-তটে ঘন বন আড়ে
তুমি রচিয়াছ কবি, নিভৃত নির্জন
এ কি এ অপূৰ্ব্ব পুরী মধু বৃন্দাবন
প্রেমের বিলাস-কুঞ্জ ভােগের মন্দির!
নিৰ্বাসিয়া পাপ তাপ সুখ অশ্রু-লীর
ফুটাইয়া নিত্য নব বসন্তের হাসি
ছন্দে গন্ধে নৃত্য গীতে পুষ্পে রাশি রাশি
বিরল ভবন খানি রেখেছ ভরিয়া।
শুধু বিহগের পুঞ্জ অলি গুঞ্জ দিয়া
শুধুই জ্যোছনা ধারে বড় সাধ মনে-
মঞ্জুল মাধবী-কুঞ্জে কুসুম শয়নে
ধীর সমীরণে শুয়ে সেথা নিশি-দিন
প্রিয়া-সনে রবে মেতে বিচ্ছেদ বিহীন
মিলন-আনন্দ-ঘন চির কেলি রসে।
একাগ্র আগ্রহে তাই অত্যন্ত পিয়াসে
বুকে বুক মুখে মুখ নয়নে নয়ন
বাহুতে বাহুতে বন্দী চরণে চরণ
নিবিড় বেষ্টনে বাঁধি’ দৃঢ় আলিঙ্গনে
ভুলি দেশ কাল বােধ অতৃপ্ত চুম্বনে
মিটাইতে রত দোহে দোহার পিয়াসা
সম্ভোগের সিন্ধু নীরে।

রূপ ও যৌবন
৩৯
হায়রে দুরাশা।
হায় কবি, কেন তবু এ দীন ক্রন্দন ?
যতই নিবিড় করি’ বাঁধ না বন্ধন,
কেন শূন্য জেগে রয় ঘােচে না সংশয়
দূর-দূর বলি তবু কেন মনে হয়,
দুহু কোরে দুহু কঁাদো বিচ্ছেদ ভাবিয়া,
আধ তিল না দেখিলে যাও যে মরিয়া ?
এ কি কথা—এ কি ব্যথা—কি বিষাদ সুর
অজানা কারণ লাগি চিত্ত ভরপুর।
সহসা উঠিছে বাজি সাহানার তানে!
মিলনের মধু-কুঞ্জে মালতী-বিতানে
বিরহের রবি-রশ্মি কেন উঁকি দেয়
ওগাে মুগ্ধ কবি, এক অতর্ক হওয়ায় ?
মিলন মিলায় কেন মিলিতে মিলিতে
শুধু জেগে রয় স্মৃতি হৃদয়-বেদিতে ?
অন্তরের অন্তস্থলে সমস্ত স্বপন
স্বপনে মিলায়ে যায়, মনের গােপন
আঁধারে লুটায়ে কঁাদে অতৃপ্ত বাসনা
কঠিন মন্দির মূলে মাধবী জ্যোছনা
ঢালে হলাহলধারা, পত্ৰপুষ্প হার
বক্ষস্থল দংশে কাল সাপিনী আকার
লজ্জা দেয় সাজ সজ্জা বসন ভূষণ।
সাধের মন্দির ত্যজি অভুক্ত শয়ন

৪
রূপ ও যৌবন
ভাসায়ে যমুনা-জলে তিতি আঁখিনীরে
কোথায় ছুটিছ আজি গহন তিমিরে
অঝাের এ ভাদরের বাদর ধারায়,
ঘন দেয়া গরজনে অশনি মাথায়
কিসের সন্ধানে ? ফোটে কণ্টক চরণে,
ছিন্ন ভিন্ন হয় অঙ্গ, শ্রান্ত মন প্রাণ,
তবু কি বিরাম নাই—মেলে না সন্ধান ?
এসাে বন্ধু কোথা যাও ?—সে যে মরীচিকা-
সে যে বাসনার চির তৃপ্তি-হীন শিখা
জ্বালায়ে জ্বলিয়া চলে দিশি দিশি দিশি,
মনের বাসনা সনে সে যে রহে মিশি’
আপনা হারায়ে কে ধরিতে পারে তারে’
সে যে চির দিন কামনার সিন্ধু পারে
পূর্ণিমার পূর্ণ-ইন্দু হাসে নিজ পুরে
ভুবন-মমাহিনী হাসি। নিম্নে বহু দূরে
সুধা-প্রতিবিম্বখানি ভাঙিয়া গড়িয়া
ভ্রান্ত ধারণায় ভাবি—হারা'য়ে হরিয়া-
অশ্রান্ত তরঙ্গ ভঙ্গে গর্জে অনিবার
উন্মত্ত জলধি জল অতল অপার।
রূপ নেহারিয়া তাই জনম জনম
তিরপিত হয় কভু হয় না নয়ন।
লাখ লাখ যুগ রাখি’ হিয়ায় হিয়ায়—
তবুও হিয়ার তাপ জুড়ন না যায়।

রূপ ও যৌবন
৪১.
প্রিয়াকে পাইয়া পাশে মজি’ প্রেমরসে
কত মধু যামিনী যে গােঙালে রভসে,
সে মধু যামিনী তবু আসিবে না আর ।
এ জীবন বৃন্দাবনে খুজে মরা সার
খাটে বাটে বনে শূন্য কুঞ্জে কুঞ্জে তারে
সে বুঝি দাড়ায়ে মৃত্যু-যমুনার পারে।
দুষ্যন্ত
ফেনিল আবৰ্তময় আৰ্ত্ত উচ্ছঙ্খল
দূরে রাখি’ নগরের ক্ষুব্ধ কোলাহল
মায়া-মারীচের পিছু ছুটিতে ছুটিতে
শ্রান্ত দেহে ক্লান্ত পদে অবসন্ন চিতে
কোথা কবে গিয়েছিনু, কোন্ তপােবন
পল্লব-প্রচ্ছায় শ্যাম নিভৃত গহন
মেলি’ আলিঙ্গন খানি নিবিড় নিথর
কোমল কাকলী-সুরে করুণ কাতর
নীলিম নয়নে মোহ-অঞ্জন মাখিয়া
পথহারা পথিকের লইল ডাকিয়া
শান্তির শীতল নীড়ে। তাকাইয়া পিছে
যত যােজা যত বােঝা মনে হ’ল মিছে
জীবনের যতেক সঞ্চয়। ত্যজি’ রথ
হিংসুক কায়ুক অসি উষ্ণীষ উদ্ধত

৪২
রূপ ও যৌবন
হস্তী অশ্ব ঐশ্বর্যের দীর্ঘ পরিবার,
রাজ-সাজ লাজে দূরে করি’ পরিহার
দীনবেশে সসমে আনমিত শিরে
পুণ্য আশ্রমের দ্বার খুলি ধীরে ধীরে
ধীরে ধীরে ডুবিলাম অরণ্যের বুকে
সৰ্বাঙ্গ-অঙ্গুলি ভরি’ পান করি’ মুখে
শান্তির শ্যামলী ।
তখন পড়ি’ছে বেল
আশ্রম-জননী বসি’ রয়েছে একেলা
কখন্ আসিবে ফিরে বনান্তর হতে
তাপসের দল। জনহীন বনপথে
ঝিলিমিলি আলােছায়া করে জড়াজড়ি ।
দুপাশে আনত হয়ে উঠিল শিহরি
ফুটন্ত কুড়ির ভারে অগ্ৰলতাগুলি।
পত্র ঢাকা আশ্রমের গুপ্ত দ্বার খুলি
আমি চলিলাম কোন কল্পনার দেশে
অলস স্বপন সম ভেসে ভেসে ভেসে
অজানিতে মিলিতে কোথায়। যেন কারে
কি কথা দিয়েছি, তাই দীর্ঘ অভিসারে
যাত্র! করিয়াছি কবে, শ্রান্ত উপবাসী
এক পা এক পা করি’ পড়িতেছি আলি’
পথ-শেষে সঙ্কেতের স্থানে।

রূপ ও যৌবন ৪৩ ; মুক্ত করি’ হৃদয়ের নিভৃত বসন নিরালা সেচিতেছিল আলবালে বারি —জীবন-দায়িনী সুধা ; কক্ষে ল’য়ে ঝারি সে যেন ভ্রমিতেছিল বনের অপ্সরী বিকলিত প্রাণ-যন্ত্রে কি মন্ত্র বিতরি’ কি প্রেরণা শিরায় শিরায়। নির্নিমেখে ক্ষণেক রহিল চেয়ে বিদেশীরে দেখে মনে পড়িল না কথা লুন্ঠিত অঞ্চল এস্তে গুটায়ে ল’য়ে চকিত চঞ্চল- চরণে চলিয়া গেল। যেন কতবার কুরুবকে বেধে গেল বাকল তার, কণ্টক ফুটিল পায়ে, শত মত ছলে ফিরে ফিরে চেয়ে গেল, বনচ্ছায়া-তলে সুধীরে মিলায়ে গেল--উধাও সমীরে নিঃশ্বাসের মুখে ভাসি’ দীন অশ্রুনীরে ধারণার পর পারে ধেয়ানের কোলে। তারপর মনে পড়ে কত শত ছলে কতবার চলিয়াছি সেই পথ ধরি। দুটী পাশে কতবার উঠেছে শিহরি’ ফুটন্ত কুঁড়ির ভারে অগ্ৰলতাগুলি ; পত্র ঢাকা উদ্যানের গুপ্ত দ্বার খুলি’ ৪৪ রূপ ও যৌবন (নাচিয়া উঠেছে বাহু) গুপ্ত অভিসারে যাত্রা করিয়াছি কত। দেখিয়াছি তারে লুকা’য়ে বনের ছায়ে । কত শত বার নয়নে পড়েছে মোর নয়ন তাহার, পালা’য়ে গিয়েছি লাজে । আপনার মনে সেছিল নিভৃত-মন-গগনের কোণে সন্ধ্যার মরীচি-মেঘ সুদূর সুন্দর সকরুণ অরুণ-ছটায় । তারপর আসিয়াছে জীবনের মধ্যাহ্ন প্রখর কর্মহীন নৰ্ম্মহীন দীর্ঘ অবসর উদাস অধীর। পশি’ বিরস উষর প্রিয়াহীন লতাকুঞ্জে নীরব নিরালা পাশৱিত মালতীর স্নান শুদ্ধমালা তুলিয়া পরেছি কণ্ঠে। ব্যগ্র হিয়া 'পরে কতবার চাপিয়াছি তৃষিত অধরে ত্যক্ত মৃনালের বালা, নলিনী-শয়ন, উশীর-চন্দন-লিপ্ত তপ্ত শিলাসন, রক্ত দিয়ে হৃদয়ের ব্যথা নিবেদন- প্রণয়ের ভূর্জ-লিপি। পশে’ছে শ্রবণ আকুল ভ্রময়-গুঞ্জ, নিকুঞ্জের পিক মুহুর্মুহু কুহুস্বরে ব্যপ্ত করি’ দিক

রূপ ও যৌবন
৪৫
সহসা ভুলেছে ডাকা। সে নাই—সে নাই,
পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে, হয়ে গেছি ছাই।
তৃণে তৃণে জ্বলিয়াছে বিরহ-অনল,
আকাশের কক্ষে কক্ষে ছুটেছে গরল
উদ্বেলিয়া প্রদীপ্ত অতল।
তারপর
মনে নাই কত যুগযুগান্তের পর
কত সাধনার অন্তে এক দিবাশেষে
তারে পেয়েছিনু মেরি সর্বসিদ্ধি বেশে
অন্তিম পলকালােকে। সকল ভুলিয়া
'ক্ষণতরে চেয়েছিনু ; আসিব বলিয়া
পরক্ষণে এমু চলে—ছিল না সময় ।
তাই আজি মাঝে মাঝে শুধু মনে হয়
জন্মান্তের কথা মম—দুরে অতি দূরে
কোথা’ কোন্ চেতনার সুনিভৃত পুরে
আমার বিরহ বাজে। বিরহিনী প্রিয়া
একাকিনী বাম করে বাম গণ্ড দিয়া
বসিয়া রয়েছে দীনা কুটীর-দুয়ারে
ধীর প্রতীক্ষায়। ভুলিয়া গিয়েছি তারে।
ভুলে গেছি মৃদু ভীরু দৃঢ় পরশন,
মুহূর্তের মৌন মন অনন্ত স্বপন
মিশিয়া গিয়াছে এবে। বাহিরের ডাকে
আঁচল বাধিয়া যাওয়া কর্ণকীর শাখে

৪৬
রূপ ও যৌবন
মনে হয় কবেকার মনের বিকার !
কোথা’ কার কালাে ছিল দুটী আঁখি-তার!
কবে কার মুখখানি হাসিয়া হাসিয়া
সুধার ছুরিকা সম গিয়েছে বিন্ধিয়
মরমের মাঝখানে ! ভুলেছি সে মুখ ;
শুধু সে পােড়েনি ক্ষত, জুড়ায়নি বুক,
ফুরায়নি মরম-ক্রন্দন। তবু জানি,
নিমেষে চিনিব তারে, আপনার মণি
হৃদয়ে টানিয়া ল’ব—যদি কোনাে দিন
দুয়ারে দাড়ায় আসি’ অতিথি নবীন
সেই পুরাতন হান্তে রঞ্জিয়া অধর
সেই আঁখি দুটী তুলি বিহ্বল বিভাের।
আত্মসমর্পণ
আরেরে দিয়েছি দেহ তােমারে দিয়েছি প্রাণ,
আরেরে দিয়েছি কথা তােমারে দিয়েছি গান।
আরেরে দিয়েছি হাসি তােমারে নয়ন জল
সিক্ত কোমল রক্ত ব্যথিত মরম-তল,
আরেরে দিয়েছি ধরা তােমা পরে অভিমান,
আরেরে দিয়েছি দেহ তােমারে দিয়েছি প্রাণ।

রূপ ও যৌবন
৪৭
আরেরে টেনেছি কাছে তােমারে ঠেলেছি দূর,
আরেরে দিয়েছি গেহ তােমারে মরম-পুর।
ফুল তুলি’ গাথি’ মালা আলি’ উৎসব বাতি
আরেরে করেছি রাণী কনক আসন পাতি,
তােমারে দিয়েছি শান্ত নিশীথ-স্বপনে স্থান,
আরেরে দিয়েছি দেহ তােমারে দিয়েছি প্রাণ।
আরে মােরে কোলে টানে কভু রােষে দেয় ঠেলি,
তুমি শুধু চেয়ে যাও দীন আঁখি দুটী মেলি'।
কি নিঠুর নীরবতা কি এক করুণ ভুল
গভীর রহমাখা বেদনায় তুল তুল,
জুড়ে আছে আমাদের মাঝেকার ব্যাবধান,
আরেরে দিয়েছি দেহ তােমারে দিয়েছি প্রাণ।
বরষা-বিজয়
মেঘের পাছে মেঘ ছুটেছে গগনতলে
সঘনে দেয়া গরজে ঘন ঝিলিক জ্বলে।
তাই বলে কিলাে যাব না জলে ?
শূন্য আঁখে হতাস মনে বসিয়া র’ব নিরালা কোণে
হায়রে বারি-শূন্য ঝারি
চাপিয়া কোলে ?
বিফল আজি হবে এ বিকাল তাই কি বলে ?
যাব না জলে?

৪৮ রূপ ও যৌবন ময়ূর নাচে। আজি বদ্ধ ঘরে রুদ্ধ প্রাণ কেমনে বাঁচে? নিবিড় ঘন হেরিয়া মন- ছুটিব আজি পুলক-পাখে কলসী কাখে বিজলী-পারা চকিতে হারা পথের বাঁকে। আজি ছুটীব সুখে ঝড়ের মুখে বনের বুকে উড়িবে আঁচল উড়িবে চিকুর বাজিবে বলয় বাজিবে নূপুর ; বাজাইব মেঘমল্লার সুর ত্বরিত তালে, যাব’ না জলে? চল্ চল্ সবে ছুটিয়া চল্ দলে দলে দলে জলদ দল। কৌতুক-উজল চপল অঙ্গে নয়নে চপলা খেলিবে রঙ্গে, সহসা সমর-রঙ্গে মাতি সাহসে চল। আয় আয় ওরে ত্বরিতে আয় । উড়ায়ে ঝরা পাতার ধ্বজে দশদিক ওই আঁধারি রজে আসি’ছে ঝড় করকা-শর হানিবে গায় ; তরুর শাখা আছাড়ি’ পাখা লুটীবে পায় । ধাঁধিয়া আঁখি বিদারি কান পড়িবে বাজ, জ্বলিবে তালীবনের মাথায় অনল-তাজ । ত্রাসে উল্লাসে শিহরি’ সুখে ঝাপায়ে পড়িব তটিনী-বুকে তটিনীর সাথে হ’ব পাগল উঠিব ছুটিব টুটি’ আগল, ••• সাপিনীর মত আহত নীর ফুলিয়া কঁপিয়া ছাপায়ে তীর রূপ ও যৌবন ৪৯ নৃত্য করিবে লহরীগুলি মেঘপানে ফণা শতেক তুলি; সেই ফণাদল-মাথায় চড়ি’ নাচিব রঙ্গে স সহচরী, পিশাচের হাসে উল্লাসে ভরি তুলিব তান- আজি পরাণ ভরি’ বরষা-বারি করিব পান, বাঁচা’ব প্রাণ। আয় তবে দলে দলে! সম্বনে দেয়া গরজে ঘন ঝিলিক জ্বলে তাই বলে কি গাে যাব না জলে? ; কখন্ সন্ধ্যা আসিবে নামি অন্ধকারে, কখন্ বরষা যাইবে থামি’ শ্রান্তি ভারে ; আঁধার ভরা সে আঁধার বারি ভরি তনু মন ভরিয়া ঝারি আঁধার বসন জড়ায়ে দেহে আঁধার পথেতে চলিব গেহে পঙ্কিল পথ পিছল অতি সাবধান পদে মৃদুল গতি আঁকিয়া বাঁকিয়া ছুটিয়া জল কল্ক রবে বাহিয়া চল, দাদুরী হরষে ফুল’য়ে ছাতি গীত-উৎসবে উঠিবে মাতি, খাকিয়া থাকিয়া বরষা মাখা খসিয়া হাওয়া ঝরা’য়ে পাখা, সিক্ত মাটির সৌরভ ওঠে, আঁধারে নীপকুসুম ফোটে দু’টী নীপ ল’য়ে পরিব চুলে–বরষা-বিজয়-পতাকা তুলে বিজয়ী নারী সকল সাহসিনী সেনাদল চলি যাবাে মােরা সদল বলে- আয় সবে তবে আয়রে চলে!

রূপ ও যৌবন
মেঘের পাছে মেঘ ছুটেছে গগন তলে—
তাই বলে কি গাে যা’ব না জলে ?
বিফল হ'লে আজি এ বিকাল তাই কি বলে ?
বা’ব না জলে ?
পাপ
সত্য কি স্বপনে
একদা গভীর রাতে
সে এল গােপনে ?
শুধু হর্ষ স্পর্শরূপে
দেখা দিল চুপে চুপে
আঁধারের আবরণে ঢাকা
অদর্শন পাপ,
লাজে ভয়ে শিহরিয়া
তাই যাই নি সরিয়া,
দেখি নাই আলিঙ্গনে তার
কলঙ্কের ছাপ।
বরষের পিপাসিত ধরা
ঝর ঝর রবে
নিবিড় বরষা ধারে
ডুবাইয়া আপনারে

রূপ ও যৌবন সে রাতি মাতিয়াছিল যেন গানের উৎসবে । ভাবিলাম এই ভুল- এ এক হাওয়ার ফুল- নেই রূপ নেই এর মুল অলস স্বপন ; ভাবিলাম ?—ভাবনার কোথা সময় তখন? দিবালােকে সৰ্বাঙ্গ চাহিয়া লাজে ভয়ে হারা- জগতের পথ হতে লুকাইতে কোনােমতে কি করিব কোথা যাবাে ওগাে, তাই ভেবে সারা। ধুয়ে দিল সৰ্বাঙ্গ সলিলে সৰ্ব্ব অঙ্গে ঢালি’ ; কিন্তু তার অন্তস্থলে শিরায় শিরায় চলে নাড়ীতে জড়িত দ্রুত-চারী শােণিতের কালী । অবশেষে মূরতি ধরিয়া উঠিল সে কুঁড়ি অতি কঁচা নিরমল অসহায় অশ্রুজল- নন্দনের অমৃত-বাসিত মন্দারের কুঁড়ি।

রূপ ও যৌবন
তবু তীব্র—অতি তীব্র সে যে
একান্ত আমার :-
সে যে মাের অভিশাপ চির-লজ্জা চির-পাপ
ক্ষীণক বজ্রের নির্ঘোষে
করিল প্রচার।
শিহরিনু সভয়ে,
নিমেষে
কম্পমান করে-
আটিয়া বজ্রের মুঠি
চেপে ধরিলাম টুটি,
সে কণ্ঠ নীরব হ’ল আহা
চিরকাল তরে।
তারপর
বুকচিরে লুকায়ে নীরবে
বুকচেরা ধন
অহীন মূক শশাকে বুকে জ্বলা চিতালাকে
চুপে চুপে
অতি
চুপে তারে
করেছি দাহন।
অহর্নিশ আমারে বেড়িয়া
"চিতাগ্নির মালা ।
পুড়িয়া না পােড়ে ছাই, জ্বালাইতে জ্বলে যাই,
কোথা’ মৃত্যু—আরত পারি না,
আলা-বড় জ্বালা।

দলিতা ধুলার মাঝারে কুড়ায়ে পেয়েছি চলিতে চলিতে পথে, কেহ পদতলে দলিয়া গিয়াছে কেহ পিষে গেছে রথে । খসিয়াছে দল ঝরিয়াছে সুধা, ফেলে গেছে হেলে মিটে গেলে ক্ষুধা, কেউ ত তাহারে চাহে নাই সে যে ভেসেছে লালসা স্রোতে কামনা-অনলে ইন্ধন ঢেলে রূপ তার মনলােভা গিয়েছে জীবন গেছে যৌবন দেব-দুর্লভ শােভা। তবু মনে পড়ে ছিল একদিন- অমলধবল কমল নবীন, কে তারে টানিয়া আনিল হেথায় ছিড়িয়া বৃন্ত হতে ? কোন্ উৎসবে সেজেছিল সাকী একটি রজনী তরে কুমারী বুকের অমথিত মধু ভােগের অধরে ধরে। থামি, উৎসব-নিভে গেল আলাে, ছুটে গেল নেশা—দেখে সব কালাে, ক্ষত বিক্ষত রক্ত-লেপিত পড়িয়া রয়েছে পথে। সকলে মিলিয়া দলিয়া মথিয়া তুলিয়াছে হলাহল, আবিল করেছে মরণ বরণ সুধাধারা নিরমল। পরম ঘৃণায় বসি পদতলে করিয়াছে পান সেই হলাহলে, ততই মজেছে যতই ত্যজেছে—সরে গেছে দূর হতে।

৫৪
রূপ ও যৌবন
নরক ?
এ নরক তবে কে করে জন ? কে করে প্রথম পাপ ?
অশুচি কি কভু ঘােচ না মুছিলে—ধুলে না জুড়ায় তাপ ।
কেহ সখা সম তা’রে ধীরে ধীরে
সাবধানে টেনে তুলিলে না তীরে
হাতখানি ধরি’ আপন দরদে পিছল উচল পথে ?
ধূলার মাঝারে কুড়ায়ে পেয়েছি চলিতে চলিতে পথে,
কেহ পদতলে দলিয়া গিয়াছে কেহ পিষে গেছে রথে ।
হে ভগিনি! আমি তােরে বুকে করে
নিয়ে যাবাে মাের আপনার ঘরে,
আমি ত দেবতা নহি ত্রিদিবের, দোষী আমি শত মতে।
মূক তব বুক-গলানাে বেদনা বুঝি আমি নিজ বুকে,
ধুয়ে দেব সব পাপ-তাপ জ্বালা দরদের ধারে সুখে ।
এ কথাটী কভু ভুলিবার নয়—
তােমাতে আমাতে কোনাে ভেদ নয়,
আমিও হতেম তুমি, তুমি আমি পড়িলে অপর পথে,
কেহ পদতলে দলিয়া যাইত—কেহ পিষে যেত রথে ।
.
এখনাে
এখনাে পড়েনি হৃদয়-কুসুম ঝরে
এখনাে মলিন হয়নি মালিকা করে,

রূপ ও যৌবন এখনাে নয়নে ঘােচেনি আবেশ, মােছেনি পরাণে পিরিতির রেশ যায়নি সময় স’রে। স্বপনের মাঝে এখনাে স্মিরিতি হায় থাকি থাকি থাকি’ উকি ঝুকি দিয়ে যায়, এখনাে শিথানে আলি’ দীপ-শিখা ভুলে চেয়ে থাকে বাতায়নে একা, যামিনী জাগরে যায়। এখনাে মেটেনি মেটেনি প্রাণের ক্ষুধা, এখনাে আগুলি’ বসিয়া রয়েছে সুধা ; এখনাে মলয় করে আনাগােনা, অলি গুন্ গুন্ বুঝি যায় শােনা বহেনি তুহিন বায় । অকালে দেবতা গিয়েছে দেউল ছাড়ি’ ধূপ-দীপ-বাসে এখনো মােদিত বাড়ী ; এখনো মুদিয়া রয়েছে নয়ান, ধারনা গিয়েছে ভাঙেনি ধেয়ান- ভেঙ্গনা নিঠুর ঘায় : এখনাে ঝরেনি হৃদয়-কুসুম হায় ।

শবরী
ধরণী যখন তরুণী ছিল দীর্ঘ রজনী শেষ,
পরাণে আছিল স্বপন আবেশ নয়নে স্বপন-রেশ,
অরুণ-কিরণে রঙীন গগন স্নিগ্ধ সতেজ মন,
কুসুম-গন্ধে বিহঙ্গ গীতে মুগ্ধ কানন-বন,
সাজাইয়া ডালা গাঁথি লয়ে মালা বসিয়েছিলেন একা
দিবস-যামিনী হে হৃদয়স্বামী! তখন দেওনি দেখা।
এলে নাক তুমি অমল-কমল-শুভ্র শারদ প্রাতে
পিক-কুহরিত মলয়া-বীজিত ফুল্ল মাধবী রাতে,
ঘন বরষায় ঘাের তমসায় কেন গাে আসিলে আজি?
শবরীর সাধ পড়েছে যে ঝরি’ শূন্য হয়েছে সাজি।
বিদায়ের বেলা কোন্ সে অতীতে মনে নাই সে যে কবে
কানে কানে গুরু ক’য়ে গিয়েছেন বর্জ গভীর রবে,
“শবরী, তাের এ পর্ণ কুটীরে আসিবে জগৎ-পতি,
তিলেক এ ঠাই যেখােন ছাড়িয়া বসে থাক এক মতি।”
সেই হতে প্রাণে সতত বাজিছে-বসে আছি এক মতি।
“আসিবে আসিবে শবরী তাের এ কুটীরে জগৎ-পতি।”
ধুয়ে মুছে তাই মন্দিরখানি নতি করি শতবার
বন ফল মূলে অর্ঘ্য সাজায়ে প্রতি দিন গাঁথি হার।

রূপ ও যৌবন
ঘসিয়া মাজিয়া যৌবনখানি সাজায়ে রেখেছি দেহ,
আসিবেন হেথা জগতের পতি-সামান্য নহে কেহ।
সারাটী দিবস বসিয়া রয়েছি দুয়ারে পাতিয়া কান,
পাতাটী খসিলে পাখীটী ডাকিলে চমকি’ উঠেছে প্রাণ।
শতবার করি তাকাই বাহিরে নদীপারে বনশিরে
গুরু গুরু ধ্বনি ওই বুঝি শুনি-রপধ্বজা হেরি কিরে!
আমার কাণ্ড দেখিয়া কেহবা হাসিয়া গিয়াছে চলে,
কেহ গরবিণী, কেহ অভাগিণী, কেহ উন্মাদ বলে।
কেহ বা কয়েছে-“শবরী, তুমি যে চণ্ডাল হীনমতি,
তােমার কুটীরে আসিরেন রাম—স্পর্ধা এ বড় অতি।”
কেহ বা কয়েছে—“শবরী, তুমি যে কুৎসিত কদাকার,
জগতের নাথে ডাকিতে তােমার কিবা আছে অধিকার ?”
কেহবা কয়েছে—“শবরী, কেন এ যৌবনে যােগব্রত,
অনাদরে হিমে শুকায়ে যেতেছ বনের কুসুম মত ?”
হে হৃদয় রাজ ! কহিতে কি লাজ ? ভেবেছিনু বুঝি আমি
আমার তপেতে রূপেতে তােমার টানিয়া আনিব স্বামী।
দিনের পিছনে গিয়েছে রজনী, রজনী পিছনে দিন,
মাসের পিছনে চলে গেছে মাস, বরষ হয়েছে ক্ষীণ।
ক্ষীণ হয়ে গেল যত আশা—তত যৌবন হ’ল ক্ষীণ
দলগুলি ধীরে পড়ে গেল ঝরে লাবণ্য হ’ল লীন।

রূপ ও যৌবন
বরষের পিছে গিয়েছে বরষ, যুগ গেছে যুগ পরে
আজো আশা-বোঁটা রয়েছি আকড়ি’ এখনাে পড়িনি ঝরে
দেহে নাই সেই বয়সের তেজ, বুকে নেই সেই বল,
নেই সে মনের অদম শকতি মধুগত-শ্লথদল ।
গেহখানি তাই পড়িছে খসিয়া সদা করে টলমল,
পারি না। ইহারে বাঁধিয়া রাখিতে-চোখে আসে শুধু জল।
গােদাবরী হ’তে কমল তুলিয়া ভরিতে ফুলের সাজি
আগ ডাল হ'তে বাছা ফুল ফল পােিড়তে পারি না আজি।
কি দিয়ে তােমারে তুষিব হে প্রিয়, এলে না থাকিতে দিন,
আজিকে আঁধার ঘেরে চারিধার দৃষ্টি হয়েচে ক্ষীণ।
চির বাঞ্ছিত চির বঞ্চিত কল্পিত রূপধারা-
চির আরাধ্য দেবতারে হেরি’ হইব আত্মহারা ?
এস শরীর হৃদয়-দেবতা, হৃদয়ে এস হে তার,
শবরী দেখিবে মিলা’য়ে তােমারে সহিত কল্পনার।
যে রূপ হৃদয়ে ভাবিতে ভাবিতে ঘুমা'য়ে পড়েছি রাতে,
যে রূপ নয়নে উঠেছে ভাসিয়া সহসা জাগিয়া প্রাতে,
যে রূপ হেরেছি শয়নে স্বপনে নিদ্রা কি জাগরণে,
যে রূপ মূরতি ভেঙেছি গড়েছি ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে,
যে রূপ ফুটেছে নীহারিকা সন কুমারী হৃদয়াকাশে,
কৈশােস্ফুরে অট কামনায় ঢাকিয়া রেখেছি বাসে

রূপ ও যৌবন
যে রূপ যৌবনে নিখিল ভুবনে বুলাল রঙের তুলি
ছড়া’ল আকাশ বাতাশ ভরিয়া ফাগ,গুগগুল গুলি,
শশী তারকায় নীলাকাশ গায় যে রূপ পড়েছে ঝরি’
শ্যামল কোমল কান্তার কোলে যে রূপ রয়েছে ভরি,
কুসুমে ফুটিছে তড়িতে ঝুলিছে ছুটিছে নদীর ধারে
মলয়ার দোলে নাচিছে যেরূপ হাসিছে রবির করে,
প্রভাতে যেরূপ ফুটিয়া উঠিয়া প্রদোষে যেতেছে মুছে
প্রদোষে যেরূপ ফুটিয়া উঠিয়া প্রভাতে যেতেছে ঘুচে,
মানস-কমলে মুরতি ধরিয়া দাড়াল সে রূপ আজ,
শবরীর আজ মিটিল সাধন হেরিল সে রাজ-রাজ।
কাণ্ডারী তা’র তরী বেয়ে লয়ে হাসি মুখে দিবা শেষে
এ ভব সিন্ধু পারের বন্ধু ঘাটে উতরিল এসে।
যৌবন দিতে চেয়েছিলি, আজ সারাটা জীবন দিয়ে
পূজা ক তাের জীবন-নাথেরে চরণে লুটায়ে গিয়ে।
সকল দীনতা সকল হীনতা সব বিফলতা ল'য়ে,
বারি ঝর ঝর ভাদর নিশীথে অশ্রু-পসরা বয়ে
সে চরণ-তরী ভরসা করিয়া ভাসা’বে জীবন ভেলা,
পাবি ওরে কূল অতল অকূলে, ঘুচে যাবে হেলা ফেলা।
সে দিন আসে নি ভালই হয়েছে, আসিলে রিক্ত চিতে
পারিতাম কিগাে এমনি করিয়া আপনা মুছিয়া দিতে ?
জীবনের আধা রয়ে যেত বাকী সাধনা হত না শেষ,
ফুল দিয়ে শুধু করিতাম পূজা ফল সে নিরুদ্দেশ !

পূজারিণী
ওগাে পাথরের দেবতা!
ভালবেসে তােম কি দিয়ে পূজিব
তুষিব কেমনে ক’ব তা?
মথিয়া বুকের যৌবন-সুধা
নিবেদি' চরণে মিটাইব ক্ষুধা,
কেমনে বুঝাব মূঢ় মানবের
পিয়াসী প্রাণের বারতা ?
তুমি যে পাষাণ, তুমি উদাসীন
পলক নাহি ও নয়ানে,
স্পন্দনহীন বক্ষ তােমার,
বিকার জাগে না বয়ানে।
তােমার যুগল চরণ ঘিরিয়া
ধূপ ধূনা মরে পুড়িয়া পুড়িয়া,
জ্বলে জ্বলে’ দীপ নিবে যায়—জাগি
একেলা আঁধার শয়ানে।
কত ফুল তব পড়ে থাকে পায়ে
হাসি মুখে মুখ হেরিয়া !
কত মালা তব গলাটী জড়ায়ে,
কত ডাের বাহু বেড়িয়া।

রূপ ও যৌবন
ক্ষণে ক্ষণে তারা ঝরে ঝরে পড়ে
ঋসিয়া খসিয়া পাদ-পঠ ভ'রে,
ব্যর্থ সাধনা নিষ্ফল আশা
সিংহাসন সদা বিরিয়া।
সাক্ষী তাহার রয়েছে দাড়ায়ে
যুগ যুগ তার মাঝারে,
মৈনাক সম অচল অটল
আকুল অশ্রু পাথারে।
ও নয়ন-কোণে নাহি অশ্রু-লেশ
পাষাণে বাসন-শােণিতের রেশ
তুহিন-শীতল তেমনি পরশ
সেই হাসি আঁকা অধরে।
[ তাই ।
জগতে লুকায়ে গিয়েছিল তার।
তােনারে পরাণ সপিতে,
পাষাণে ঠেকিয়া ফিয়ে গেল ধন
কৃপণের নিজ ঝাঁপিতে।
তাই তবহেলা অনাদরে ফল
শুখা’য়ে লুটায়ে হ’ল নিষ্ফল,
ঝরে গেল সুধা—যত চেয়েছিল
আঁচিলের কোণে ঝাপিতে।

No text on this page.

No text on this page.

Rup O Jouban

Author
Ghosh,monmothonath
Title
Rup O Jouban
File name
Rup O Jouban
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2009/11/27
Publisher
Satish Mitra,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
68
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Ghosh,Monmothonath
DLI number
513176
Barcode
4990010020178.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
4Uef6nDsKkV
Download PDF

Rup O Jouban