Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nari

2009/11/7

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নারী
Sonnets of lovers are mad enough but
are valuable to the philosopher as are the
prayers of saints for their potent symbolism.
Emerson.
শ্রীগঙ্গাচরণ দাসগুপ্ত
অধ্যাপক, ডেঙিড় হেয়ার ট্রেনিং কলেজ
কলিকাত
m

শ্রীনীরজনাথ দাসগুপ্ত
প্রকাশিত
ব্যানার্জি প্রেস
২নং মহারাণী স্বর্ণমা নােড়,
কলিকাতা
মূল্য দেড় টাকা

এই
বইখানির প্রেরণা
তােমার কাছ হতেই এসেছে;
তাই
বইখানি তােমার হাতেই
অর্পিত হইল।

এই বইয়ের তিনটিমাত্র কবিতা পূর্বে ভারতীতে প্রকাশিত হইয়াছিল ; অন্যান্য কবিতা নূতন। কয়েকটি কবিতায় সামবেদীয় মন্ত্রব্ৰাহ্মণের কয়েকটি সূক্তের ছায়াপাত হইয়াছে। বইখানির হস্তলিপি কল্যাণীয়া শ্ৰীমতী জ্যোৎস্না দেবী প্রেসের জন্য লিখিয়া দিয়াছেন। তজ্জন্য তাঁহার নিকট ঋণী রহিলাম। প্রচ্ছদপটের পার- কল্পনার জন্য শ্রদ্ধেয় বন্ধু শ্ৰীযুত পূর্ণচন্দ্র ঘােষ মহাশয়কে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। • ২/৩ বালিগঞ্জ সাকুলার রােড, কলিকাতা। গ্রন্থকার। ১৩০১1

লীলা
অমৃত সাগরতলে অযুত লহরী
ছুটিছে টুটিছে কত! তাহার লীলায়
সবিতার রশ্মিমালা উঠিছে শিহরি
রচিয়া আনন্দলােক সিন্ধুনীলিমায়।
এ মহাসাগর বুকে জীব দলে দলে
শ্রোতােবাহী তৃণ-সম ছুটেছে ভাসিয়া ;
মুকুতা-রতন সম কেহবা অতলে
গোপনে সাগর বুক আছে উজলিয়া!
এই তীর্থভূমে যারা মিলিয়াছে আজ
যুগান্তের উপচিত প্রাণের চেষ্টায়,
তাহাদের মিলন-লীলা কত অপরূপ ।
কত দীপ্ত আনন্দের শান্ত প্রতিভায় !
সকল সংঘাতে শুনি আজ বিশ্বভরা
আনন্দময়ীর বীণা বাজে কলরা।

No text on this page.

আগমনী।
এসেছে, এসেছে আমার যৌবন,
নিখিল চিত্ত-মােহন!
এ কোন্ ঋষির তপস্যার আলো
চমকে হৃদয়ে গহন !
জানিনে আত্মার কোন্ গােপপুরে
কি রসের বাণী বাজে মধু সুরে ;
লহরে লহরে আকুলি’, উছলি’
মুখরে মুগধ মরম।
ওগাে, এসেছে আমার যৌবন ।
৭

আগমনী
;
এসেছে, এসেছে আমার যৌবন,
এ যে—অপূর্ব, অলােক কাহিনী।
আমি এ বারতা এ জগত-পুরে
কারেও এখনাে বলিনি।
হৃদয়ে মেঘের গুরু গরজন
মরমে মরমে শিখী-নর্তন
শ্রাবণ ধারায় ঝর ঝর ঝর
ঝরে বিজুলির বাণী ।
এ যে,—অপূৰ্ব্ব, অলােক কাহিনী !
ওগাে, এসেছে আমার যৌবন,
জীবন গিয়াছে ভরিয়া ;
উতলা হৃদয় সারাবিশ্বময়
ছুটেছে কাহারে খুঁজিয়া ?
প্রাণ বেপমান সৌন্দৰ্য্যলীলায়
গলিয়া যেতেছে মহানীলিমায় ;
বহি’ ধ্বনিভার নিখিলবীণার
কোটি তার উঠে বাজিয়া !

আগমনী
ওগো, এসেছে আমার যৌবন,
জীবন গিয়াছে ভরিয়া।
.
এ’ যে যৌবন বিশ্ব-শােভন,
পরশ যাহার পাবন ;
এ দেহের অণু-পরমাণু-বুকে
লীলায়িত যার স্পন্দন।
রঞ্জনা আজ ছুটেছে অসীমে,
কেশপাশ তার উড়িছে নীলিমে
বিজলি-তরল পরশে তাহার
উজলে চিত্ত-নন্দন।
এ যে যৌবন বিশ্বলােভন
পয়শ যাহার পাবন!
.

No text on this page.

জাগরণ
একি আজি? মর্মবধূ অকস্মাৎ উঠিল শিহরি’
খুলে গেল চিত্তে মাের কত শত আনন্দ-নগরী।
জানিনা কিরূপে আজি, কোন্ মন্ত্রে কোন্ কুহকিনী
জাগায়েছে ভােগবতী, প্রাণে প্রাণে সুধা সঞ্চারিণী !
১১

জাগরণ
রসে যার সৃষ্টিধারা শতমুখে উঠিছে উছলি,
প্রাণের বিপুল বন্ধ পলে পলে যাইতেছে গলি।
দৃষ্টি মাের গেছে খুলে, টুটে গেছে চিত্তের বন্ধন,
হেরিতেছি চরাচরে সনাতন প্রাণের স্পন্দন ।
প্রকৃতির নিত্য-নব, অপরূপ, বিমল আননে
একি এ পুলকরাশি উথলিছে বসন্ত-পবনে !
কি আনন্দে কেলিপরা, কলস্বরা ঋতুবালাগণ
রচিছে উৎসব-কলা পুষ্পভারে ভরিয়া অঙ্গন ;-
কান্ত কর্ণপূর-সম বিকশিত নব কর্ণিকার ;
কনক চম্পক-দাম, বর্ণে ভরা হরিণী উষার ;
সুন্দরী-হৃদয়-সম প্রাণরসে অরুণ-আশােক ;
স্বর্ণকোষে কেতকীর হিরন্ময় আনন্দ-আলােক ;
‘পূতশীল বিধবার সুদুর্লভ, পূত, স্নিগ্ধ হাসি
ছড়ায় অঙ্গনে মাের মৃদুগন্ধি বকুলের রাশি ;-
১২

জাগরণ
-
সুবিমল শরতের বিরহিণী, সংযমী বালিকা,
আঙিনার এক কোণে লুটাইয়া ওই শেফালিকা,
ঘন-পীত প্রেমরস যত্নে ঢাকি বক্ষে বিরহিনী,
যেন গাে অলােক-দীপ্ত হাস্যরাশে লুকায় আপনি ;
বর্ষা-সুন্দরীর অই অরুণিম হৃদি-শতদল
নীরব সরসীবুকে ফুটিতেছে রূপে ঢল ঢল ;-
এরা কি উৎসব আনে সুখ-শান্ত বুকে প্রকৃতির
তাহার আনন্দ-বেগে টুটে বুঝি এ মাের শরীর।
এ ভঙ্গুর দেহপাত্র প্রপীড়িত আনন্দে দুর্ভ,
শতদিকে চূর্ণ হয়ে পড়ে আজি যেন পৃথ্বী 'পর।
মধুমুখ এ পুলক, সুধাভরা বিপুল পীড়নে
একি এ উন্মাদলীলা জাগিয়েছে আমার জীবনে
যার চরাচরভরা সনাতন বীণার ঝঙ্কারে
মৰ্ম্ম মাের কুহরিয়া, শিহরিয়া উঠে শতধারে !
১৩

জাগরণ
আজি মাের জীবনের সুপাবন এ কোন্ লগনে,
একি এ অলকাপুরী হেরিতেছি ধরণী, গগণে !
সহস্র পরশ-রসে বুলাইয়া প্রাণতলে মাের
অবশ, আবেশ-ভরা সুখের অরূপ মধু ঘাের !
অপ্সরার প্রাণবেগ সুবাসিত কস্তুরী-চন্দনে
মলয়পবন হ’তে ঢলি যেন পড়িছে মরমে ;
সে পরশে সুবিজন সুপ্তিভরা হৃদয়-সীমায়
সহস্র স্বপন ফুটে দিকে দিকে বিলাস-লীলায়।
ওগাে এই নিখিলের প্রাণপূত যত অধিবাসী,
হের আজি বুকে মাের কত অশ্রু, কত স্বপ্ন, হাসি !
বিচিত্র রাগিণী-রাগ মূচ্ছনায় কত ঝলমলি’
মােহন মূরতি লয়ে ভরে আছে প্রাণের মুরলী !
১৪

জাগরণ
একি আকুলতা আজ ঘিরি মাের অন্তর বাহির
অণু হ’তে পি’তে চায় সােমরস, অমৃত মদির।
কৰ্ম্মস্রোতে লীলায়িত জগতের যত নর নারী,
সবে মাের প্রাণে আজি ঢালিতেছে ল’য়ে হেমঝারি
কল্যাণ-সৌন্দৰ্য-ধারা;-জ্বালাময়ী অপূৰ্ব্ব মদিরা
ছুটিতেছে পূর্ণ করি অন্তরের শিরা উপশিরা।
এত করিতেছি পান, চিত্ত মাের তবুও পাগল
জন্মান্ত থাকিতে ডুবি সে অনাদি প্রাণ-সিন্ধুতল ।
একি তৃষা জাগে বুকে ? প্রাণ-কোষ সবেগে বিদারি’
‘আরাে চাই, ‘আরাে চাই, কোটিকণ্ঠ উঠিছে চীৎকারি’;
সে বিপুল বেদনায় শরীরের সংকীর্ণ প্রাচীর
অবহেলে পার হয়ে আত্মা মাের হ’তেছে বাহির,
মুক্ত-রৌদ্রে জগতের, জ্যোৎস্না-পুত ধবল নিশাতে ;
পলে পলে উঠে কপি আনন্দের বিপুল আঘাতে।
১৫

জাগরণ
সকল শিরায় মম উচ্ছল ছুটে অনিবার
প্রাণের, প্রেমের ধারা,- সনাতন পাবন শিখার।
কি এক অব্যক্ত বেগ, তন্দ্রালস গভীর চেতনা,
আবেগে স্থগিতগতি সুমধুর প্রকাশ-বেদনা
গােপনে ফুটিতে চায় গন্ধে, বর্ণে, পরশে মধুর,
ভরি দিয়া নিমেষেই সুবিজন মাের অন্তপুর !
নাহি জানি যাব কোথা, স্বৈরগতি অমৃত সন্ধানে ;
বিচিত্র বিলাসবতী স্নেহশ্যামা ধরণীর পানে
চাই ছুটি দিবা নিশি ;-স্নেহবতী ধরার হৃদয়ে
সঙ্গোপনে প্রবেশিয়া সাধ যায় হেরি সবিস্ময়ে
রসের, প্রাণের লীলা,-জ্যোতির্ময় শত মায়াপুরী
ঋতুচ্ছন্দে উচ্ছসিত অপরূপ প্রাণের লহরী ;-
‘ভাবরাগে অরুণিম রসবতী জীব-নাট্যশালে
প্রাণ মাের দীপ্ত-পূত হয়ে উঠে সৌর রশ্মিমালে ।
১৬

জাগরণ
ভূতধাত্রী ধরণীর নিত্যনব উৎসবে মুখরা
মাের পর্ণশাল দ্বারে ছুটে আজি শত সরিদ্বরা !
নির্মল-চেতনাবহ শমভরা পরশে রামের
অহল্যার প্রাণশিলা যেইরূপে স্বপনে হর্ষের
পূর্ণ হয়ে, দীপ্ত হয়ে উঠেছিল নব জাগরণে,
তেমতি এ হৃদয়ের সুগহন চৈত্ররথ-বনে
কত রক্ত কিশলয়, ফলপুষ্প, বল্লরী, মঞ্জরী
আজি কি দুর্ভর হর্ষে, কার স্পর্শে জাগিছে শিহরি' ;
শুনিতেছি চারিদিকে বীণা-কণ্ঠে কিন্নরী, অপসরা
তুলিতেছে মধুভরা অনির্বাণ রাগিণী মুখ !
হারীত, চকোর, শুক, শতপত্র, ভৃঙ্গরাজ, পিক
কলস্বরে অনিবার মুখরিয়া তুলে শতদিক!

জাগরণ
হৃদয়ের সুবিপুল ঘননীল শৈল-সানুদেশে
কত সিদ্ধ-বিদ্যাধর খেলিতেছে তাপসের বেশে।
তাদের বিলাস-রসে, সুললিত প্রাণের হিল্লোলে
বিশ্ব মাের ভেসে যায়, ডুবে যায় কোন্ রসাতলে ।
এসেছে যৌবন ওগাে, অনুপম এসেছে যৌবন,
আলােকে ভরিয়া গেছে অলােকের নিত্য আয়তন।
একি এক আকুলতা করে মােরে অবশ, শিথিল।
কত ভাষে কথা কহে মাের সাথে অনন্ত নিখিল।
‘হেরিতেছি প্রাণতীর্থে ধীরে ধীরে উঠিতেছে জাগি
চিন্ময়ী প্রতিমা এক-দেবী তিনি,—ঘুরিছে মাগি
সকল হৃদয়-দ্বারে প্রাণপূত অঞ্জলি মধুর,
ত্যাগে যাহা দীপ্তিমান্,-সেবারসে যাহা ভরপুর।
১৮

জাগরণ
তাঁহার অঞ্চল-ভ্রষ্ট রাশি রাশি কুসুমে, কল্যাণে,
“বিশ্বের পূজার থালা ভরি’ উঠে অনন্তের পানে ;
তার কান্ত প্রতিভার দীপ্তিরাশি প্রশান্ত, উজ্জ্বল,
সত্যের সুবর্ণ-বেদী করি দেয় রূপে ঝলমল।
এই দেবী-প্রতিমার অলােক, পুষ্পিত রূপরাশি,
ফুটায়ে তুলিছে মাের প্রাণে শত চন্দ্ৰমার হাসি ;
আমার হৃদয়-পুরে সুগােপন রত্নবেদী 'পরে
দেবী যেন স্তব্ধ, নম্র ; হাসিভরা বিক্রম-অধরে
খেলে কত লােকাতীত হৃদয়ের স্ফুরিত বিলাস ;
নির্মল কপােলে রক্ত, রাগ-তপ্ত প্রাণের আভাস।
কঙ্কণ-রাগিণী মত্তা, তরঙ্গিত, কান্ত ভুজলতা
জগতেরে আলিঙ্গনে দিতে চায় সর্ব সফলতা।
পরিপূত দৃষ্টি তার দূরতম আকাশে নিলীন ;
মদালস দেহলতা সুতরল মদিরায় পীন।

জাগরণ
কভু তার পরিপূর্ণ, মুকুলিত, বিহবল নয়ন,
রসের সমুদ্রতলে সুবিজনে করিছে গাহন
ঘনস্নিগ্ধ সুবিপুল আনন্দের প্রবাহে মন্থর
সে দৃষ্টির অন্তরালে আছে যেন নীলিমা সাগর ।
সুবঙ্কিম ভুরুযুগ, ভ্রমরক সুগৌর ললাটে;
বিলম্বিত মুক্তবেণী, রত্নহার দীপ্ত কণ্ঠতটে ;
খচিত শ্রবণমূলে মণিবিন্দু, বিমল, উজ্জ্বল,
বিমার্গ অলক-গুচ্ছ মনােহর গ্রীবায় ধবল ;
বিপুল উদার দৃষ্টি–পূর্ণিমার কৌমুদী-উচ্ছসি—
ঢালে যেন স্বর্গ হ'তে উদাসীন পারিজাত হাস;
কভু বায়ু-তরঙ্গিত কেশপাশ গলিত-বন্ধন,
ঘিরি নিখিলের চিত্ত রচি দেয় মধুর বেষ্টন,
যেমন কজ্জল-কৃষ্ণ মেঘাশি দীপ্ত তারকারে,
নির্মল পরশে মৃদু নিভৃতে লুকায় বারে বারে ;
।

জাগরণ
মধুব্রত নেত্রমূলে শরতের আনন্দ-নীলিমা
স্তব্ধ হয়ে আছে ওগগা, চিরদিন; কোথা তার সীমা ?
তাহারে চিনি আমি,মনে হয় তবু যেন চিনি ;-
জন্ম-জন্মান্তের পারে যত মুগ্ধ, মুখর রাগিণী
আমারে ফুটায়েছিল, সবি যেন দেবী-প্রতিমারে
পূর্ণ করি রাখিয়াছে ; সে ইঙ্গিত আসে বারে বারে
শিহরিয়া হৃদয়ের সুমঙ্গল নিরঞ্জনপুর ।
চির-পরিচিত-সম বাজে কত কিঙ্কিণী, কেয়ুর
তালে তালে ;-তার সাথে উন্মত্ত বিহ্বল হৃদয়
সৌন্দৰ্য-সিন্ধুর বুকে অসীমেরে খুজে বিশ্বময়।
যে দিন সে মধুমতী অকস্মাৎ হৃদয়-অঙ্গনে
দিলে দেখা, সেই দিন প্রকৃতির হিরণ্য-তােরণে
কত শত পুষ্পমালা, কত পিক ঘন আম্রবনে,
পুষ্প-বাটিকায় কত ছুটেছিল বসন্ত-উৎসব,

সাগরণ
অন্তঃপুরে সুমধুর কত পুণ্য কলকল রব,
রত্নপ্রাসাদের শিরে সুবিচিত্র কত ধ্বজপট,
চন্দনে, কুঙ্কুমে, লাজে অলঙ্কৃত কত রাজপথ !
মনােগৃহে কত ধন-ধান্যময়ী শ্যামা বসুন্ধরা,
বধূপুষ্ট নাট্যশালা, পল্লীবধূ হরিৎ-অম্বরা !
সে উৎসব-আনন্দের অনাবিল, বিচিত্র প্রবাহ
পূর্ণ করিয়াছে মােরে ;-বিশ্বজন, চাহ ওগাে, চাহ!
মরম-কুহর মাের পরিপূর্ণ অমৃতের রসে ;
আমি শুধু চেয়ে আছি’ নৰ্ণিমেষ পুলকে, রভসে,
বরণীয়া প্রতিমার দেব-দীপ্তি, অপূৰ্ব আনন,
বিভন্ন কটাক্ষশ্রেণী, দ্যুতিমান্ নয়ন-অঞ্জন ;
বহুপৰ্বমনােরম তারুচি কর-কিশলয় ;
বিশ্বততা বিসারী তাঁর লতায়িত বাহুর বলয় ;
বেপমান দেহলতা, অপরূপ আনত কর,

জাগরণ
অরুণ কপােল-কান্তি, মুক্তাফল দশন-শিখর ;
নবনীত সুকোমল স্নিগ্ধগৌর, কান্ত ক্ষীণােদরে
কি এক মােহিনী ভাষা সুকুমার বলিরেখা পরে ;
হৃদয়-অমৃত-রাশি পরিপূর্ণ সুবর্ণ কলসে
গােপনে সঞ্চিত যেন ; অনুলিপ্ত চন্দনের রসে
দেবীর উসতীর্থ ; পরিপূত পয়ােধর-ভার
উচ্ছ্বসিত হয়ে যেন অনন্তের দেয় সমাচার !
জগৎ-লাবণ্যরাশি যেন এক মহামন্ত্র বলে
স্তম্ভিত, স্থগিত হেথা ; দেহ তার শিহরে উছলে
প্রাণমুখী পুলকের সুমধুর অসহ পীড়নে ;
স্ফীতগৌর অনুরাগ স্তব্ধ হয়ে আছে যেন স্তনে?
তাহার উম্মুখ-বেগে টুটে যেন কথুক-বন্ধন,
মুক্তাহার ঘিরি যারে দেয় ক্ষণে শত আলিঙ্গন।
পরিপূর্ণ স্তনযুগে রহিয়াছে কত উপচিত

জাগরণ
নিখিলের স্নেহরাশি, শিশুমুখে ঝরিছে নিয়ত
সৃষ্টি-আদি-কাল হতে,-তবু তার যেন কোনদিন,
একটি কণিকামাত্র কোন মতে হয় নাই ক্ষীণ।
এমন পূর্ণতা বহি স্বরগের পূত মন্দাকিনী
কখনাে পারেনি হ’তে শতমুখে সাগর-বাহিনী।
দেবী তিনি চিত্তে মাের জাগরিত আজিকে প্রভাতে,
সকল হৃদয়-মন পূর্ণ করি’ বিশ্বের সভাতে ;
তাঁর পূত কটি-তটে কাঞ্চীরব পুণ্য গীতিময়
লীলায়িত ভুজ-যুগে রাগদীপ্ত ঝঙ্কৃত বলয় ;
অসংযত কেশপাশে মৃদুগন্ধ নব মালতীর ;
অপরূপ প্রাণে ভরা সুমধুর নিশ্বাস সমীর ;
শ্রোণীতট সুবিপুল ; ভাবে ভরা দীপ্ত শােধর ;
অঞ্জনে উৎফুল্ল আঁখি, সুমধুর আনন্দে মন্থর ;
২৪

জাপণ
ঊষার অরুণ-দীপ্তি হেমগৌর প্রসন্ন আননে;
• ধ্রুবের শাশ্বতকান্তি, গােরােচনা তিলক-চনে ;
নিরুদ্দেশ প্রাণগতি রজ্জেল সীমন্তসীমায়,
ঘন অন্ধকার সম তরঙ্গিত চিকুর লীলায় ;
নির্মল প্রসাদ-দীপ্তি অনুপম, হেমকান্তি ভালে,
কান্ত বৈজয়ন্তীমালা দিব্যগন্ধি বিলম্বিত গলে ;
স্বেদলবে শিশিরিত গৌরগলে, গ্রীবায়, উরসে,
ধবল মৃণাল হার পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ হিমরসে
দুজ্জয় জীবন-গতি করে যেন কিছু উপশম !
হৃদয়ে অরূপ ভাষা রচে কত প্রাণের স্পন্দন ;
বেদীমধ্য কটিদেশ আনমিত যৌবনের ভারে ;
ভুরুঙ্খ বিভঙ্গে তার কত যাদু নিমেষে উগারে ;
বিপুল প্রাণের মদে পরিপূর্ণ অরুণ নয়ন
নিখিল-বিহবল-করা রচে কত স্বর্গের স্বপন।
২৫

জাগরণ
সর্ব-অন্তরালে যেন ভাববেগে মৌন, মনােরম
কান্তি, পুষ্টি, চেতনার অপরূপ ত্রিবেণী-সঙ্গম ;-
তাহার বিকাশ শােভা অসীমের আভাষ বহিয়া
অনবদ্য অঙ্গ হতে প্রতিক্ষণে যায় ঠিকরিয়া ।
তার এই লােকাতীত সৌন্দর্য্যের উদার প্লাবনে
ধরণী হয়েছে ধন্যা ধ্রুব-শীলা পাবন-কল্যাণে !
মানব দিতেছে সঁপি সরবস্ব তারে অকাতরে
জীবন, যৌবন, ধন, সর্বশেষ আপন আত্মারে ।
দেবী তিনি পুণ্যবতী,—সব দান ভরি প্রাণপুটে
রয়েছেন চিরপূর্ণ। সনাতন জীবনের তটে।
‘নিখিল ঐশ্বৰ্যরাশি, দেবী তিনি রাজরাজেশ্বরী,
মানবের চিত্তনদে ঢালিছেন প্রাণপণ করি ।
প্রতি অণু-পরমাণু হৃদয়ের আজি সচেতন
কেমন উন্মুখ হয়ে দেবীমূর্তি করিছে বীক্ষণ ।

জাগরণ
সার্থক, সফল আজি প্ৰাণ মােৰ হেরি দেবতারে;
সমগ্ৰ হৃদয় আজি শতমুখে গাহিছে তাহারে।
আজ দেবীপ্রতিমার নেত্রচ্যুত সুবর্ণ কিরণ
গােপন মরমে মাের ঢালিতেছে দীপ্ত জাগরণ !
যুগান্তের নিদ্রালস সুগােপন শয়ন ত্যজিয়া,
কত দেব-বালা আজি চিত্তে মাের উঠিছে নাচিয়া ।
তাহাদের বিকশিত হিমতি নেত্ৰ-কুবলয়
আমারে ডুবায়ে আজ শতমুখে ঢালিছে বিস্ময়!
আজ আমি প্রতি রােমে পুলকিত, পূর্ণ বিকশিত ;
অপার ঐশ্বৰ্য্য এত, এতদিন কোথায় সঞ্চিত
ছিল মাের প্রাণতলে,ভাবি নাই কখনাে স্বপনে
আজ আমি জাগিয়াছি দেবতার মুক্ত বাতায়নে ;
নিখিল গাহিছে আজি শতকণ্ঠে,-“ধন্য ধন্য তুমি,
“দেবলগ্নে উপনীত যৌবনের পুণ্য দেবভূমি।
২৭

জাগরণ
“পাইয়াছ জগতের সনাতন জীবনের ধারা
“ঢেউ যার ছুটিয়াছে চরাচরে প্লাবি গ্রহতারা;
“স্রোতে যার নিত্য নব ভাঙে, গড়ে দৃষ্টির আড়ালে
“বহু লােক লােকান্তের স্বপ্ন-স্বর্গ ভরা ইন্দ্রজালে !
“স্পর্শে যার খসি পড়ে নাগপাশ মরণ, জরার,
“দগ্ধ মরু উৎসারিয়া হাসি ছুটে,-ফল পুষ্প ভার।
“আজ তুমি লভিয়াছ নিখিলের আত্মার নিশ্বাস,
“জাগিয়াছে দিকে দিকে প্রাণে প্রাণে শ্যামল আশ্বাস।
“যার বলে জীবহিতে সরবস্ব করি সমর্পণ
প্রাণের পাবন-বেদী বিশ্ববুকে করগাে রচন;
“মহামানবেরা যেথা থাকি সবে চির-প্রতিষ্ঠিত
“সত্যের, প্রেমের পাশে করিছেন নিখিল বিধৃত।
“সেথা তুমি উপনীত,—প্রাণের পাবন পুণ্যভূমি ;
“চরাচর হেরি তােমা গাহিতেছে,—“ধন্য ধন্য তুমি।”

নারী
জানিনা হৃদয় কেন কাঁপে বার বার,
হে রমণি! নিরখিলে মূরতি তােমার
ভাবময়ী, সনাতন প্রাণে ঝলমল!
যতই নেহারি তােমা, হৃদি শতদল

নারী
আনন্দে উৎপ্লুত হয়ে উঠে বিকশিয়া
বর্ণে, রসে, গন্ধে, মােহে মরম ছাপিয়া।
কোন্ মহাতীর্থ হ’তে তব আগমন,
কোন্ যােগীশের ধ্যানে তােমার জনম,
জানিনা কিছুই মােরা ; যখনি নেহারি
মূৰ্ত্তি তব অপরূপ,-অমৃতের ঝারি
শতমুখে উগারিয়া দেয় স্বপ্নধারা,
আমার সকল চিত্ত করি মাতােয়ারা।
অমৃত-সাগর-তলে পলে ডুবে যাই
দেশ, কাল পরিচ্ছেদ যার কিছু নাই।
৩০

নারী
স্বরগের দিব্য-জ্যোতি তব নয়নের,
তব মধুমতী বাক্ মােহন কণ্ঠের,
আমায় উজল করি রেখেছে হে রাণি !
প্রাণের সকল তৃষা, বাসনার বাণী
তুমিই করেছ শুদ্ধ ; লক্ষীর মতন
সুধার কলস শিরে ফিরিছ ভুবন,
কুন্তলে রচিয়া মালা শেফালি, বকুলে,
ঢাকি, মাের চিদম্বর বাসিত দুকূলে !
নিত্য নব অপরূপ আনন্দ তােমার
পলে মৰ্ম্মতলে মাের করে গাে সঞ্চার,
পুলকের ঢেউ শত বিপুল, গভীর ;-
যার সনাতন গতি প্লাবি দুই তীর
আনে শুধু সাগরের বিপুল উচ্ছসি,
প্রাণভরা কলরােল, উদার বাতাস।

নারী
যৌবনের সুধাগতি প্রথম যেদিন
তােমার হৃদয়-তটে ছুটিল স্বাধীন,
যে দিন গন্ধর্ব-লগ্নে গােপনে, পােপনে
নিখিলের সুধারাশি বসন্ত পবনে
বিচিত্র, ললিত রঙ্গে তরঙ্গিয়া ধীরে
সঞ্চিত হইতেছিল হৃদয়ের তীরে,
সে দিনের মধুব্যথা কত সুদুর্লভ !
অপরূপ স্বপনের কত কলরব
তব দেহ বীণাতারে হয়ে মুখরিত
বিশ্বের হৃদয়ে কত হয়েছে ঝকৃত।
আজো দেখি সে দিনের বিপুল রাগিণী,
তব প্রতি গতিভঙ্গে ওগাে মায়াবিনি,
অতর্কিতে উঠে বাজি কিঙ্কিণী, কঙ্কণে
নূপুরের মুগ্ধ মুখে বলয়-শিঞ্জনে।

নারী
সেদিন ফাল্গুন রাতি;—মুক্ত পূর্ণিমার
অলৌকিক, অপরূপ প্লাবন উদার
ধরণীরে রেখেছিল পরিপূর্ণ করি।
সেই শুভ্র মধ্যরাতে জাগ্রত প্রহরী
ছিনু আমি; ভাবাবেশে মুদিত নয়ন ;
কোথা হতে ঋষিদের বিরাট স্বপন
ভাসিয়া আসিল ধীরে মানসে আমার,
‘অপরূপ সুধাসিন্ধু, অতল, অপার ।
ব্রহ্মাণ্ডের নামরূপ ধবল অমৃতে
কোথায় মিলায়ে গেছে। বিপুল নিভৃতে
নারায়ণ নিদ্রারত অনন্ত-শয়নে ;
হেরিছেন লক্ষী তারে প্রাণাগ্র নয়নে!
স্বপ্নান্তে হেরিনু শুধু স্বপ্ন-জাগরণ
এক হয়ে পরিপূর্ণ আমার ভুবন।
৩৩
৩

নারী
যেদিন প্রথম দেখা তােমায় আমায়
সলজ্জ, কম্পিত বক্ষে মৌন দু’জনায়,
সে দিনের কথা আজি পড়িতেছে মনে।
শান্তি-বিজড়িত নীল নিশীথগগনে
ধ্যান-স্তব্ধ দেবতার স্তিমিত নয়ন
কোটি কোটি ;সংসারের ক্ষুধিত বেদন
স্থগিত, নিদ্রিত, লুপ্ত ; আমরা জাগিয়া,
দুইটি মাটির পাত্র অমৃতে পূরিফা
বিজনে দাড়ায়েছিনু বিধাতার দ্বারে ;-
দুই জনে নতশিরে পুলকের ভারে।
কাহার আশীষ ধীরে হ’ল বরিষণ
জানিনা কিছুই ;-এক ধ্রুব আলিঙ্গন
ছুটি আত্মা এক করি’ হল মূর্তিমান,
ধ্বনিয়া নিখিল ভরা শান্ত মধুসাম !
৩৪

নারী
জ্যোছনায় বিগলিত তখন ধরণী ;
কোথাও নাহিক শব্দ ; রজত-তরণী
মনে হ’ল সিন্ধুবুকে ছুটেছে নাচিয়া,
আমরা দু’জন যাত্রী চলেছি ভাসিয়া
কোন্ দেশে, নাহি জানি, কোন্ লােকান্তরে।
দুয়ে রহস্য-ভরা বিরাট অম্বরে
শুধু শান্তি, স্বচ্ছ শান্তি, নিবিড়, গহন ;
রজতপরশে শত প্রাণের স্পন্দন
সমুদ্রের, হয়ে গেল কত দীপ্তিমান।
হে দেবি, ও তব মুগ্ধ নয়ন, বয়ান
ধবল কৌমুদীজলে স্নাত, পরিপূত
প্রকাশিল শিবলােক চিন্ময়, অদভূত।
এ পুণ্য নিশীথ-লগ্নে হে দেবি, আমারে
এনে দিলে এই কোন্ নন্দনের দ্বারে ?

নারী
৭
দুয়ারে বসিয়া শুধু শুনিতেছি, রাণি।
উৎসবের শতমুখ মৃদু কাণাকানি;
বংশীরব অনাহত, বিহ্বলতাময়
ছুটেছে উদাস করি বিশ্বের হৃদয় ;
কত কিন্নরীর কণ্ঠ শাণিত, নির্মল,
বর্ষে রূপ-যৌবনের মদিরা তরল ।
হৃদয়ের বন্ধ টুটে ;-আনন্দে পুলকে
সহস্র দামিনীদীপ্তি রােমাঞ্চে চমকে।
শিথিল, অবশ দেহ; ওগাে বিশ্বরমে,
পশিনু এ কোন্ দিব্য অলােক ভবনে।
দুর্ভর আনন্দভরা আভাসে তােমার
যেথায় গলিয়া যায় সকল সংসার ;
শ্রান্ত আমি, অমৃতের প্রবাহে অসীম
জন্মজন্মান্তর তােমা করি প্রদক্ষিণ ।
.

নারী
জেগেছে, জেগেছে আজি নবীন উষার
তরল, অরুণ রাগে মৌন মহােৎসব ;
দিকে দিকে ছুটে যায় তরুণ প্রাণের
সদ্যোজাগরণভরা কত কলরব।
হৃদয়ের দ্বার মম খুলে গেল ধীরে
সবিতার রশ্মিপাতে,—শে মধুর ;
হেরি আমি সুবিজন মরমমন্দিরে
অনিন্দ্য মূরতি তব আনন্দে বিধুর।
তােমার সর্বাঙ্গ হ’তে বিদ্যুতের ধারা
চমকিয়া, ঝলসিয়া যায় চরাচর ;
তােমার বাণীর বেগে বিশ্ব মাতােয়ারা
প্রাণের বিপুল বেগে কঁপে থর থর ।
আমার সকল মৰ্ম্মে সকল পরাণে
জমেছে উৎসব নব তব জয়গানে।
৩৭

শারী
৯
তােমার হৃদয় হতে এক দেববালা
চকিতে হৃদয়, মন করি যায় আলা;
কভু সৌম্য, মনােহরা তপস্বিনী-বেশে
ভস্মকণা-শিশিরিত কুটিলা কেশে ;
কভু দেবী রমা সম প্রাণে ঢলঢল
আমারে অনন্তপথে করেগাে সফল।
সন্ধ্যার করুণ আঁখি পল্লীসরসীর
তরল, নির্মল প্রাণে যে লীলা রুচির
নীরবে আঁকিয়া যায়,—আমারাে হৃদয়ে
আঁখির পরশে তব কত ফুটি রহে
সুকুমার স্বর্ণপদ্ম, মণি-কুবলয় ;
তাদের লীলায় জাগে বিশ্বের বিস্ময়।
তুমি নারী, তুমি দেবী, তুমি মায়াবিনী,
অনন্ত জীবনপথে হয়েছ সঙ্গিনী।
.

নারী
১০
সত্য কহিতেছি ওগাে, আমি নিজ চোখে
হেরিতেছি দেবী এক মধ্যাহ্ন আলােকে,
তােমার হৃদয়ভূমে; জাগর-স্বপন
বলে কেহ,কেহ কহে দৃষ্টির বিভ্রম।
হৃদয় আমার জানে,আমার মরম ;
সে পাবন অনুভূতি,প্রত্যক্ষ, চরম।
* আমি শুনিয়াছি তার প্রাণপূত বাণী ;
হেরেছি নয়নে তার সুধা-নিৰ্বরিণী ;
প্রাণের সম্পদ তার মাহেন্দ্র নিমেষে
আমারে লইয়া যায় অনন্তের দেশে।
কত ক্ষুদ্র আমাদের রাজ্য বাস্তবের
ভাস্বর বুদবুদে ভরা, সেও পলকের।
তব সে মন্দির পুত, দেবতার দেশ,
* ত্রিভুবন-পূৰ্ণ-করা অনাদি, অশেষ ।

নারী
আমার হৃদয়-বেদী কনক-কিরণে
ধৌত করি’, পূর্ণ করি’, করি’ সমুজ্জ্বল,
ওগাে দেবি, বিলাসিনি, বিজনে বসিয়া
অপূৰ্ব্ব, অলােক রূপে কর কত ছল।
দুৰ্ভর যৌবন-বেগে তব দেহতটে
যে উচ্ছাস ঝলমলে স্বর্ণমদিরার,
দু’একটি বিন্দু তার অবশ পরশে
নিমেষে ডুবায়ে যায় সমগ্র আমার ।
তরল তড়িদ-গতি জ্যোতির প্রকাশে
সমগ্র মরম উঠে চমকি’, শিহরি',
আদিম ঊষার রক্ত, অপাঙ্গ-লীলায়
যেমন বিশ্বের স্তব্ধ প্রথম শর্বরী।
তুমি আনিয়াছ সাথে বসন্ত, বিস্ময়,
তােমার অঞ্চল ঘিরি এসেছে মলয় ।
৪০
{

নারী
তব শান্ত, সুবঙ্কিম জ্বলতা-লহরী
তব স্বচ্ছ প্রাণজ্যোতি-জড়াননা নয়ন,
পূর্ণ আবেশের ভারে শিথিল কবরী,
নিৰ্ম্মল অলক্ত-রসে রঞ্জিত চরণ,
দুর্ভর লাবণ্য-মদে চির কুতূহলী,
সেই তব প্রেমারুণ, স্ফুরিত অধর,
কুঞ্চিত-অলক-শােভী উদার ললাট,
দুর্লত মৃণাল-গৌর গ্রীবা মনােহর,
মােহন পরশ-ভরা অতি সুকুমার
তব বাহুবলয়ের ললিত বিলাস,
মুক্তির বিপুল গতি চরণে তােমার,
ঢালে বুকে শতমুখে অমৃত উচ্ছাস।
তােমার অধরস্পলে বিশ্বের হৃদয়
চমকি’ শিহরি’ উঠি হয় জ্যোতির্ময়।
৪১

নারী
প্রসন্ন মানসসরে রাজহংসসমা
গতি তব সুনিৰ্ম্মল সহজ, সুন্দর,
ব্রীড়া-বিলসিত তব অলক্ত-রঞ্জিত
চরণের মুগ্ধ লীলা আবেশ-মন্থর,
সান্ধ্যতারা সম মৌনী কজ্জ্বল তিলক ;
কপােল-চুম্বনরত কুঞ্চিত চিকূর ;
মুক্তাফলসম দন্ত, শুচিস্মিত হাসি,
গহন সীমন্ত-পথে উজ্জ্বল সিন্দুর
তােমার প্রাণের লীলা চির-অবন্ধন,
দেহভরা দেব-দীপ্তি কান্ত, সুশীতল,
অপাঙ্গ অমৃত-বর্ষী, ভঙ্গুর বীক্ষণ,
মদালস হৃদয়ের বিলাস বিহ্বল ;
তব স্তন-তট-লগ্ন একাবলী হার,
শ্রোণীবিম্বে দীপ্তি-রাশি মণি-মেখলার ;
৪২

নারী
ও তব বরাঙ্গ-ভরা মুখর, উছল,
বেপথু-বিলাসবতী শত কেলি-কলা,
আবেশে অবশ-বন্ধ আলিঙ্গন-সমা
বেদী-মধ্য কটিতটে স্থলিত মেখলা,
সকলি মিলিয়া আজ কহে শতমুখে
যৌবনে পেয়েছ কত ঐশ্বৰ্য্য তীর্থের ;
কত কান্ত দেবালয়, শ্ৰমণ-বিহার,
কত সুমঙ্গল মঠ, স্তব্ধ নিখিলের ।
তােমার হৃদয়তলে আছে গাে জাগিয়া
কত সিদ্ধ পুরুষের দীপ্ত পুণ্য রাশি;
তব প্রতি গতি-ভঙ্গে ঝলকি', চমকি’
বিশ্বের প্রাণের লীলা উঠে পলে ভাসি।
ভােমারে হেরিয়া দেবি ! হেরিয়া তােমায়
এই বিশ্ব উঠে হাসি প্রাণের প্রভায় !
৪৩

নারী
১৪
ওগাে দেবি! তব দেহে কত অপসরা,
কত রূপে অপরূপ নিত্য কেলিপরা ;
অলম্বুষা, মিশ্রকেশী, রম্ভা, তিলােত্তমা,
উর্বশী, অরুণা, আর শান্তা, মনােরমা
বিজনে বসিয়া বুকে জরা-মৃত্যুহীন
করে তব প্রাণভূমি সবুজ, নবীন ;
ঢালিয়া অমৃতধারা গােপনে, গােপনে
সরসিয়া দেয় বিশ্ব জীবনে, যৌবনে!
তাদের আনন্দলীলা হেরি তব প্রাণে
চিত্ত মাের মুখরিত তব জয়গানে।
এ নিখিল চমকিয়া গতি পুলকের
ছুটে চরাচর মুখে ; সুখের, হিতের
ব্ৰত রাশি উঠে জাগি মাের নিত্যকাজে,
তােমারে প্রতিষ্ঠা করি’ বিশ্ব-চিত্ত মাঝে।
৪৪

নারী
আমি যে তােমার কথা প্রকাশিতে নারি,
কি অতলে রাখিয়াছ ডুবায়ে আমারে,
যেথায় নিভৃত, স্নিগ্ধ বরুণ-আলয়,
মুকুতা-প্রবালে গড়া স্বপ্ন চারিধারে।
সে বিজনে অনন্তের কত চিত্র, গীত
আমার হৃদয়-তটে হয় প্রকাশিত।
৪৫

নারী
তুমি দেবি ! ধন্যা তুমি, তুমি সুমঙ্গলা,
আমার হৃদয়-পদ্মে তােমার অচলা
মূরতি রয়েছে জাগি ; ভবানীর মত
প্রাণে তব দীপ্ত কত কল্যাণের ব্রত।
আজি এ সুদূরে বসি বিশ্ব-সিন্ধুতীরে
হেরিতেছি আঁখি মুদি,-গহন তিমিরে
তােমার তৈজস মূৰ্ত্তি উঠিতেছে জ্বলি’
এ দেহের প্রতি অণু পলকে উজলি ;
তােমার মাধুরী-লীলা লহরে, লহরে
চিত্ত-তট কঁপাইয়া যায় কলস্বরে ;-
সে পরশ কি মধুর! কত সুবিজন।
প্রাণ মাের উঠে ভরি’ আনন্দে পরম।
আজ এ বিদেশে হেথা, এই নিরজনে
কত দিব্যরূপ তব জাগিতেছে মনে!
৪৬

নারী
হে দেবি ! সৰ্বাঙ্গ তব আতট প্লাবিয়া
একি ওগগা, পরিপূর্ণ প্রাণের উচ্ছাস !
নিমেষ নেহারি’ তােমা উঠিল ভরিয়া
সমগ্ৰ হৃদয়লীন দীপ্ত মহাকাশ ।
কোন সুগােপন পথে অমৃতের লীলা
আপনা প্রকাশে তব বিপুল উরসে ?
নিৰ্ম্মল কৌমুদী-স্নাত কোন্ ধ্রুবশীলা
তাপসীর তপােলা ললাটে বিকশে ?
নিখিলের সব গীতি, আনন্দ-বেদনা
শুধু যেন স্তব্ধ হয়ে সেই দেবভূমে,
উদার নয়ন মেলি’ বরিষে চেতনা,
পাবন পরশরাশি চর্চিত চন্দনে।
হেরিয়া তােমায় দেবি! মাের প্রাণমন
নবীন সাবিত্রলােকে লভিছে জনম।
৪৭

নারী
ছিনু আমি বহুদিন সুষুপ্তি-মগন,
বদ্ধ রাখি হৃদয়ের বাতায়ন-শ্রেণী ;
নিখিলের রূপ, রস, গন্ধে বিমােহন
উঠেনি ঝঙ্কৃত হয়ে আত্মার রাগিণী ।
তুমি দেবি ! কোন্ লগ্নে অমৃত পরশে
খুলে দিলে হৃদয়ের রুদ্ধ বাতায়ন ;
নিমেষে ভরিয়া গেল হাসিতে, উচ্ছাসে
হৃদয়ের সুনীরব শূন্য আয়তন !
নিখিলের সংখ্যাতীত তারকার আঁখি
জ্যোতিতে আনন্দরসে হয়ে উচ্ছলিত,
আত্মার অনন্তরূপী মহানীলিমায়
কি এক অলকা-লােক করেছে ফলিত।
হেরি আজি অপরূপ জীবনে আমার
মূৰ্ত্তি তব প্রাণময়ী প্রশান্ত, উদার ।
৪৮

নারী
১৮
তােমার সকল দেহে কত মধুরতা !
কি অব্যক্ত, মহামৌন, স্তব্ধ মধুকথা
তােমার হৃদয় হতে উঠি’ উৎসরিয়া
নয়নে, কপােল-তলে পড়ে মুরছিয়া !
তােমারে জড়ায়ে আছে জ্যোতির্ময়ী বাণী
উষসীর, রসবতী, আনন্দ-নিঝর ;
যার মাঝে স্বরগের সহস্র নন্দিনী
রচে দেব-দম্পতীর আনন্দ-বাসর।
দেবি! তুমি অনুপমা,—তব অতুলন
লাবণ্যের রসজ্যোতি নিখিল-লােভন
স্বর্ণ-শিরা শত ছটা চিদাকাশতলে
কি এক স্বপন-রাজ্য নিমেষে উজলে ।
ধূলিপাংশু মানবের জীবনে, মােহিনি।
ছুটায়েছ আনন্দের স্নিগ্ধ মন্দাকিনী।
৪৯
৪

নারী
হে আমার জীবনের নবীন প্রভাত।
অদ্বিতীয় ভােগভূমি সর্ব কামনার!
তােমার কল্যাণ-দীপ্তি, দৃষ্টি অভিজাত,
হৃদয়ের প্রতি রন্ধে হােমাগ্নি সঞ্চার
করিয়াছে ;—ছিল যাহা মৃন্ময়, মলিন,
শত অঙ্গারের স্পর্শে বিরূপ, শ্রীহীন,
সকলি পরশে তব আজ জ্যোতির্ময় ;
ভস্মরাশি,—তা'ও আজি বেদী হিরন্ময়।
হীন, তুচ্ছ, ছিল যাহা চিত্ত কারাগারে,
কোথায় পেয়েছে মুক্তি অমৃত সাগরে।
পরাভবি’ জগতের চিরদুঃখশােক,
জেগেছে অন্তরে আজ স্নিগ্ধ ঊষালােক।
তব সাথে আসিয়াছে নব জাগরণ
কোকিলের মুগ্ধ কুহু, বসন্ত-পবন।

নাৰী
কত ছন্দে, কত বর্ণে তব রূপরাশি
ফুটে, টুটে, পাইনা যে আদি অন্ত তার ।
রক্ত অধরের কোণে তব ক্ষুদ্র হাসি
নিমেষে জাগায় বুকে প্রাণের জোয়ার !
কোথা হতে আসে এত মুগ্ধ আকর্ষণ ?
কোন্ ছদ্ম মায়াবিনী যুগান্ত নবীনা
তােমার আড়ালে রহি’ আনে এ প্লাবন,
কিছুই বুঝিনা ওগাে, বুঝিতে পারিনা।
বেণুদণ্ডে সপ্তস্বরা বীণার ঝঙ্কার,
ধূলির ধূসর বুকে দীপতি মণির,
মৃৎপাত্রে এত লীলা বৈকুণ্ঠ সুধার,
সকলি, সকলি যেন খেলা মায়াবীর !
সত্য কহি, পারিবনা চিনিতে তােমারে,
জন্ম জন্ম ঘুরি যদি তােমার দুয়ারে।

নারী
জীবনের অভিনব মঙ্গল-উষায়
নিশান্ত-প্রদীপ-দীপ্ত, স্তব্ধ জাগরণে
তােমায় হেরেছি শুভে, আনন্দধারায়
স্নাতা-পূতা দেবী সম প্রাণের বিজনে।
৫২

নারী
আমার সর্বস্ব তুমি, বসি নিরালায়
করিছ নির্মল, শান্ত, করিছ উজল ;
অনিয়ত, বন্ধহীন যা কিছু আমায়,
সবা “পরে পরাতেছ সােণার শিকল
সংযমের, কল্যাণের। সুভগে, তােমার
সীমন্তে সিন্দুর-দীপ্তি, যুগে বঙ্কিম,
অপাঙ্গে বিদ্যুৎ-রেখা, ললাটে উদার
সেবা-স্নিগ্ধ আনন্দের বিলাস অসীম,
যে এক অলকাপুরী রচিছে গােপনে,
তাহার তুলনা কোথা এই ত্রিভুবনে।

নারী
প্রিয়তমে, প্রাণ আজি শুধু তব কথা,
তব গান, তব হাসি, তব পরশন,
আকণ্ঠ করিতে পান রয়েছে উন্মুখ ;
আবেশে মুদিয়া আসে কাতর নয়ন ।
সুদূর বিদেশে আজি একাকী পড়িয়া ;
শীত-বৃষ্টি-রৌদ্র-পাতে শ্রান্ত মাের দেহ ;
বিশ্রামনিমেষগুলি সযত্ন সেবায়
অখণ্ড করিয়া দিতে নাহি কাছে কেহ।
আজ হেথা রচিতেছি বসিয়া বিজনে
মূৰ্ত্তি তব অপরূপ আনন্দে-উজল ;
প্রাণের পরশ ভরা সেবায়, কল্যাণে
প্রেমের প্রদীপ তব নেত্রে ঝলমল ।
এ তব মানসী মূর্তি অসীমা, চিন্ময়ী,
আমার মানস লােকে আজ বিশ্বজয়ী।
৫৪

নারী
যে দিন বিবাহ-রাতে নব-বধূবেশে
প্রথম হেরিনু তােমা কুঞ্চিত লজ্জায়,
সে দিন সহস্র দেবী তারকার দেশে
আশীষ বর্ষিতেছিল মােরা দুজনায় ;

নারী
চারিদিকে গীতবাদ্য কল কল রব ;
থাকি থাকি বধূদের মত্ত হুলুধ্বনি ;
বেদীর দক্ষিণ পার্শ্বে পুরােহিত সব
ওজস্বী মন্ত্রের বলে, মােদের ধমনী
কম্পিত করিতেছিল! আজো পড়ে মনে
সে দিনের কি উৎসব বিবাহ প্রাঙ্গণে।
চিত্ত-পটে জাগে আজো মূরতি মন্ত্রের ;
মৰ্ম্মভরা শিহরণ বিলাসে ছন্দের ;
সে মন্ত্রের দুটি কথা শােনাব তােমারে
অর্থ যার রসে ভরা প্রাণের আধারে !
৫৬

নারী
২৪
হােমানলে উজ্জস্বল অগ্নিদেবগণ,
অন্তরীক্ষে বসু, রুদ্র, সবিতা, পবন,
পিতৃ-মাতৃগণ মিলি বিদেহ শরীরে
মােদের বিবাহ-বেদী ছিল যেন ঘিরে ;
হবির্গন্ধে আমােদিত পূত যজ্ঞশালে
দু’জনে দাড়ায়েছিনু গন্ধপুষ্পমালে ;
হােমপুষ্ট অনলের উজল শিখায়
কি আলােক জেগেছিল প্রাণের শিরায় ।
দিকে দিকে হতেছিল মরমে নাদিত
জীবনের জয়শঙ্খ সঙ্গীতে পূরিত !
উৎসবের হুলুরবে পুরনারীগণ
আত্মার বিজনে কত শান্ত শিহরণ
এনেছিল ;-আজো তার মােহময় ধ্বনি
কাঁপায়ে ছুটেছে যেন প্রাণের ধমনী!

নারী
পতিকুলে যেই দিন স্থাপিত সকলে
অচল-প্রতিষ্ট করি তােমায়, মণি।
সেই দিন অরুন্ধতী, সাবিত্রী, পার্বতী,
গৌরী, রমা, অনসূয়া, সােমের রােহিণী,
দময়ন্তী, স্বাহা, ভদ্রা, শচী, সীতা, সতী
হইতেন উপনীত মুক্ত ব্যোমপথে ;
দিতেন উজ্জ্বল করি তােমার হৃদয়ে
শ্রেয়ের নির্মল দীপ জীবনের তে।
পতিদেবতারা মিলি বিচিত্র-বরণ
রত্নকান্তি প্রাণসূত্রে সত্যগ্রন্থি দিয়া
নীরবে বাঁধিয়া দিত তব হৃদি মন ;
হে বধু, ললাটে তব উঠিত জ্বলিয়া
সােম, অগ্নি, গন্ধর্বের কান্তি জ্যোতির্ময়;
পর্ণশালা হয়ে যেত দেবতা-নিলয়।

নারী
মনে পড়ে সেই দিন দেবতার কাছে
বলেছিনু,-“হে সবিতা, বধূ সুমঙ্গলী
এসেছেন পরিহিতা আজি ক্ষৌমবাসে,
পতির হৃদয়-তীর্থে সপিতে অঞ্জলি।
তাহারে তুলিয়া লও জ্যোতির্ময় রথে,
মুক্ত করি সব দ্বার জীবনপথের ;
তব স্বর্ণরশ্মি-পাতে করগাে সফল
সকল আহুতিগুলি জীবন যজ্ঞের।
হৌক দেব, অপরূপ প্রাণের বন্ধন
যাহা উপেক্ষিয়া যাবে মৃত্যুর কৃপাণ ;
মােদের যুগল-কণ্ঠে করগাে ধ্বনিত
জগতের সনাতন অমৃতের গান !
আজি এই একতান হৃদয়-যুগল
পূর্ণ করি, বৃষ্টি হৌক বিশ্বের মঙ্গল।

নারী
২৭
৬
“কামদেব, তুমি এই অনন্ত নিখিল
পরিপূর্ণ করিয়াছ মধু মদিরায় ;
তব সঞ্জীবনী সুরা কত ঝলমলে
জগতের প্রাণপুরে আনন্দ লীলায়!
তব মাদকতা এই বধূর শরীর
দাও পরিপূর্ণ করি ; প্রাণের শিখায়
শাশ্বত রূপের আলাে ভােলাে জ্বালাইয়া
এ নিখিল দীপ্ত করি অলােক বিভা।
‘হে কামাগ্নে, সৃষ্ট তুমি তপস্যার তরে ;
তব স্নিগ্ধ ধূমজ্যোতি বধূর অন্তরে
নবীন নীলিমালােক করুক রচনা ;
জননীর স্বপ্নে ভরা আনন্দ-কল্পনা।
কামদেব, সুধাধারা তব সঞ্চারিণী
বধূরে প্লাবিয়া দিক্ দিবস যামিনী ।

নারী
২৮
“ওগাে দেব বিবস্বান্, বরেণ্য দেবতা,
তমার আলােকরশ্মি প্রাণে ভরপূর,
ঢেলে দিক্ স্বরগের আনন্দ-বারতা
যৌবন-জীবনে মত্ত হৃদয়ে বধূর।
সকল চিন্তায় তাঁর, সকল চেষ্টায়
তােমার আনন্দজ্যোতি হৌক উচ্ছসিত ;
জীবের সহস্র দুঃখে, কোটি বেদনায়
জাগুক পরশে তার শমের সঙ্গীত।
আৰ্ত্ত যারা, শ্রান্ত যারা, যারা দীনহীন,
মর্মবেদনায় যারা তিতে অশ্রুজলে,
পাক্ তারা আশা নব, অভয় নবীন,
আজি হতে পুণ্যবতী বধূর অঞ্চলে।
অঞ্জলি ভরিয়া ঢালল ওগাে বিবস্বান্
জগতের নিত্যনব, প্রশান্ত কল্যাণ।
৬১

নারী
“আজি এই নব বধূ দেব-বালা-বেশে
পতিলােকে বরিতেছে অমৃতের ব্রত,
তাহারে সার্থক কর, করগাে সুন্দর
সতীর গৌরবে তারে কর দীপ্ত-পূত।
যেই দেবযানপথে দেবর্ষি সকল
ছুটে ধ্রুবলােক পানে, আমরা দু’জনে
পারি যেন বহি’ শিরে বিশ্বের মঙ্গল
যেতে সেই ধ্রুব-পথে নব জাগরণে !
দূর হৌক্‌ পথ হ’তে, হৌক্‌ পরাজুখ
ক্ষুদ্র সুখে অপমৃত্যু, আত্ম-অপঘাত ;
নিত্য ‘আপনারে লয়ে নব নব দুঃখ
চিত্তে যেন কভু নাহি করে ছায়াপাত।
ওগাে দেব অমৃতের, মােদের পরাণে
বরিষ আশীষ তব বিশ্বের কল্যাণে।

নারী
“এই নব দম্পতির নেত্ৰপথ হতে
দূর কর ব্যসনের, ভােগের কুহক
হে সবিতা, চির-নব স্বর্ণরশ্মিপাতে
ফুটাও মােদের দুটি হৃদয়কোরক।
মােদের তরুণ-তপ্ত দুইটি হৃদয়
একান্তে অঞ্জলি রচি আছে উর্দ্ধমুখে ;
ঢাল দেব, তেজবতী কান্তি অনাময়,
শান্তা, সনাতনী পুষ্টি আমাদের বুকে।
আরক্ত কাষায়-বাসে থাকি লুকাইয়া
সুবৰ্চ্চা, পুষ্কর-জা, সৌম্যা দেববালা
বধুর সর্বাঙ্গে যেন থাকি’ জড়াইয়া
নবীন করিয়া রাখে বরণের মালা।
প্রতিদিন জগতের নব অনুষ্ঠানে
জীবন উঠুক ভরি’ নব গানে তানে!

নারী
“যে অমৃত-নগরীর বিরাট তােরণ
হে বধু, যেতেছে দেখা সৌন্দর্য্যে তােমার,
বৃহস্পতি, বায়ু, অগ্নি, বিশ্বেদেবগণ
বরেণ্য সবিতা দেব, অশ্বিনীকুমার,
তাহারে করুন রক্ষা ! শতদল সম
সকল ইন্দ্রিয় তব রসাতল হতে
রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ, করি আহরণ
সৌন্দর্য্যে ভরিয়া দিক্ সমগ্র জগতে।
তব অপরূপ রম্য এ পুণ্য-নগরী
উৎসবের কলগানে থাকুক মুখর,
দ্বারে দ্বারে জাগরুক দেবতা প্রহরী
আনন্দের ব্রতলীলা করুক সুন্দর !
তাহাদের অলৌকিক প্রভাবে পাবন
জাগুক পরাণে, মর্মে স্নিগ্ধ শিহরণ।
৬৪

নারী
৩২
“বিপুল সৌভাগ্য তরে করেছি গ্রহণ
সুকুমার পাণি তব হে বন্ধু আমার ।
ওগাে বিশ্বেদেবগণ, আজি শুভক্ষণে
মােদের হৃদয়-যুগে দাও উপহার
যা কিছু দেদীপ্যমান জগত-মাঝারে।
হৃদয়ের সর্বতৃষা, বরুণ-দেবতা,
পরিতৃপ্ত করে দাও স্নিগ্ধ সুধাসারে ;
মাতরিশ্বা, মুছে নাও মরমের ব্যথা
অন্তরীক্ষ-লােক-ভরা শীতল পরশে ;
অন্তর ভরিয়া দাও আনন্দের রসে
মধুকৰ্ম্মা প্রজাপতি ; হৃদয়-সীমায়
ওগাে সৌম্যা নন্দাদেবী, তব প্রেরণায়
এ বিশ্ব রম্যকপুরী, তােমার নিশ্বাসে
ভরুক হৃদয়-যুগ উৎসব-বিলাসে।

নারী
“এসস শুভে, এসাে দেবি, সৌম্য, সৌম্যতা,
ধৃতিরূপে, তৃপ্তিরূপে লাবণ্যে বিহবল ;
আমারে বরণ করি, করিয়া হরণ
বাসনা, কামনা কর সুন্দর, সফল।
যা কিছু আমার আছে নিৰ্ম্মল, মলিন,
অমৃত-পরশ তব মাগিছে কাতরে ;
এস দেবি, অনবদ্য। জীবনে আমার;
আলিঙ্গনে প্রাণ, মন সব লও হরে।
যায় যাক্ এই দেহ জ্ববিয়া, গলিয়া,
কোন ক্ষতি নাহি তাহে, কোন ক্ষতি নাই;
শাশ্বত আত্মার অণু-পরমাণু-তলে
তােমার পরশ-সুধা যদি শুধু পাই।
তুমি মাের হৃদয়ের সর্বস্ব জুড়িয়া
বসে থাক রাণী সমা দিক উজলিয়া।
৫
৬৬

নারী
৩৪
তােমার হৃদয় হৌক একান্ত আমার ;
সকল সাধন তব বিশ্ব-প্রাণমূলে
রূপে, রসে, গন্ধে, স্পর্শে, সঙ্গীতে উদার
আমারে বিহ্বল করি’ দিক্‌ ফলে, ফুলে!
যা কিছু আমার দেবি! সকলি, সকলি
করহ গ্রহণ ওগাে, করহ বরণ,
সকল ভরসা-ভরা হৃদয়ের কলি,
অসার সকল আশা, সকল মনন।
আমি সৰ্ব্ব-রিক্ত হয়ে নীলিমার তলে
রব চাহি তােমাপানে,—উদগ্র-হৃদয়ে ;
আমার সকল শূন্য দিওগাে ভরিয়া
অনিন্দ্য যৌবনে তব, বসন্তে, মলয়ে ;
পৌছিতে পারিগাে যেন আনন্দে অপার
পাবন প্রয়াগে তব প্রাণ-যমুনার।

নারী
“প্রাণের বলয়ে দেবি, হৃদয় তােমার
লইতেছি শত পাকে জড়ায়ে অন্তরে ;
অস্থি, মাংস, ত্ব, প্রাণ, ইন্দ্রিয় সকল
ধ্রুব হৌক, এক হৌক চিরকাল তরে।
মােদের হৃদয়-গতি, ভাবের উৎসাহ,
নব নব প্রাণ-পথে ছুটি প্রতিদিন,
জগতের নিত্য সুখ-দুঃখের প্রবাহ
দিক শিবতর করি’, করিয়া' নবীন।
মােদের মরম-গত মিলন-বন্ধন
আনন্দ-অশােক-পুষ্পে থাক বিকশিয়া ;
স্বর্গে, মর্তে, চরাচরে প্রাণদেবগণ,
হৃষ্ট হৌক্‌, পুষ্ট হৌক্‌, মােদেরে হেরিয়া
নিখিলের সুবিপুল আনন্দ-সরিতে
জীবনের জয়গীতি হোক চারিভিতে।”

নারী
প্রথম যেদিন তােমা হয়ে আত্মহারা
বলেছিনু—“মম ব্রতে দাও গাে হৃদয় ;
আমার চিত্তের পথে তব চিত্তধারা
ছুটুক অবাধ-গতি, শান্ত, অনাময়।”

নারী
সেদিন হইতে তুমি জগতে আমার
কি অপূৰ্ব্ব নব রূপ, নব রস, বল
আমার মানসলােকে করেছ সঞ্চার,
জানি আমি, জানি তাহা আমিই কেবল !
ধ্রুব দ্যুলােকের কত উৎসব মহান,
বা পৃথিবীর কত হরষের ধারা,
ধ্রুব-শ্যামা শৈলনীলি, নিৰ্ববরের গান
কতরূপে চিত্ততটে ছুটে মাতােয়ারা।
মমাদের জীবনপথে কল্যাণব্রতের
ধ্রুবত্ব রয়েছে বসে পাতি সিংহাসন ;
ধরণীর নিত্য-নব সুখের, দুঃখের
সুমধুর কতলীলা করে গুঞ্জরণ ।
প্রাণমূলে আঁকড়িয়া এই ধ্রুবভূমি
বিশ্বের হৃদয়ে দেবি! বিরাজিত তুমি
৭০

নারী
৩৭
জীবনের সেই পুণ্য প্রথম বাসরে
দেবতা আশীষ বহি’ যুগল হৃদয়ে
যবে বাহিরিনু মােরা জগত মাঝারে
চরাচর শিহরিল বিপুল বিস্ময়ে।
তার পরে, তার পরে, নব নব রূপে
সাজায়ে মঙ্গল-থালা প্রতি প্রতিদিন
সফল করেছ তুমি সকল কল্পনা ;
সব তৃষা, সব আশা, স্বপন অসীম।
নামে তব চিত্তে মাের ঘনায় উৎসব ;
দশে হৃদয়ে ফুটে তৃপ্তি-শতদল ;
স্বরে তব বাজে বাঁশী সকল মরমে ;
স্পর্শে তব ঝরে সুধা সর্বাঙ্গে শীতল।
মায়াবিনি। বিষ্ণুমায়া তােমায় ঘিরিয়া
কতলীলা রচিতেছে যুগান্ত ধরিয়া ।
৭১

নারী
৪o
ঢালল সুরা, ওগাে দেবি, ঢালাে আরাে সুরা
হৃদয়ে, পরাণ-পুটে, ধমনী-শিরায় ;
আমার সকলি দাও বিয়া, টুটিয়া
দীপ্ত শিখা সম তীব্র আনন্দজ্বালায় ।
৭৪

নারী
জ্বলে যাওয়া—সেও কত মধুর, মধুর
ধোয়া হয়ে উড়ে যাওয়া নীলিমার পানে;
সকল হারায়ে দিয়ে বিবশ, বিধুর,
সব শূন্য পূরে দিতে নব তানে গানে।
বুঝিব তখন এই উদার ভুবনে
কেহ নাই—তুমি, আমি ;-শুদ্ধ অনুভব
পলে, পলে ডুবে যাওয়া অতলে, বিজনে
যেথা সব নামরূপ পায় পরাভব।
ভুখন মােদের বুকে হবে হােলি-খেলা ;
কুঙ্কুমে, পরাগ-রাগে, চন্দনে, কেশরে
দিব ডুবাইয়া মােরা এই দেহ-ভেলা,
কিছু রাখিবনা চিহ্ন জীবনসাগরে।
তার পরে—সে বাসরে শিহরণভরা
অপূর্ব প্রকাশ-রসে রব মাতােয়ারা।

নারী
৪১
হয়েছি মাতাল আমি তােমার নেশায়,
ঘুরিতেছি প্রেমে তব বিভাের, বিকল,
টুটেছে সকল বন্ধ শরীরে, আত্মায়,
ছুটেছে হৃদয় হতে হাজার শিকল।
তােমারে লইয়া আমি চলেছি সুদূরে
কোন্ লােক লােকান্তরে-কোন্ অমরায়,
তিলেক খবর তার এই বিশ্বপুরে
জানেনা কেহই দেবি! নিখিল ধরায়।
মােদের সে অভিযান, মুক্ত প্রাণগতি
শঙ্করের নৃত্য সম টুটে বিশ্বতীর ;
প্রতি পদে উঠে বাজি আনন্দ-আরতি ;
শিহরণে কণ্টকিত প্রাণের শরীর।
এই লীলা বুঝিবারে হে দেবি আমার ।
তুমি ছাড়া এজগতে কেহ নাহি আর
৭৬

নারী
ওগাে দেবি। নাহি জানি হৃদয়ে তােমার
অভুক্ত অমৃতরাশি কত উপচিত।
নাহি জানি প্রাণতলে তব সুকুমার
কুসুম-কোমল কত আনন্দ-জগত
আছে লুকাইয়া ! তােমাপানে চাহি’, চাহি’
অনিমেষে কতদিন, পেয়েছি আভাস
সে রাজ্যের,—আদি যার, অন্ত যার নাহি ;-
যার দীপ্তি বিভবের ভুবন-প্রকাশ।
তােমায় ঘিরিয়া আছে শিরীশ-পেলব
কত কান্ত মধুরতা অমৃত-লক্ষমীর ;
তব স্নিগ্ধ অঞ্চলের উদার সৌরভ
আনেগাে শীকরসিক্ত, শীতল সমীর
পূত-মন্দাকিনী হ’তে ; তব আলিঙ্গন
আনে মম পূর্ণবুকে অন্তর্জাগরণ।
৭৭

নারী
সকল চিন্তায়, কাৰ্যে তােমার পরশ
প্রদীপ্ত হইয়া উঠে ওগাে মহারাণি।
অন্তরের মহামৌন অতল-গুহায়
জাগিয়া রয়েছে কত তব দৈববাণী ;
৭৮

নারী
যতই তােমারে আমি প্রকাশিতে চাহি,
সকল হৃদয়-মন উঠে অবগাহি
ক্ষীবােদ-সাগর হতে, লয়ে অপরূপ,
দেব-কান্তি সৌন্দর্য্যের সহস্র স্বরূপ।
কোথা আমি ? কোথা তুমি ? যুগল হৃদয়
চলেছে এ কোন্ তীর্থে,—পারিনে বুঝিতে;
বুঝি শুধু মৰ্ম্মতলে ঘনায় বিস্ময়
পূর্ণিমা-উচ্ছসিভরা উদার সঙ্গীতে।
মনে হয় ছুটিতেছে হর্ষে মাতােয়ারা
ছুটি দেবকন্যা যেন আনন্দ-ফোয়ারা,
মিশিতে যুগান্ত ধরি’ মধু আলিঙ্গনে
প্রাণসিন্ধু-সরিতের বিপুল বেষ্টনে।
৭৯

নারী
৪৪
এই বিশ্ব মাতিয়াছে সংগ্রামে কঠোর ;
ব্যথিত বিপুল ভারে মানব-হৃদয় ;
কত ছদ্ম ভদ্রবেশে, নেশায় বিভাের
ঘুরিছে আতুর, আৰ্ত্ত, ক্ষুধিত প্রলয় ।
প্রাণ যেন পরাভূত ছুটেছে অতলে ;
জীবে জীবে উঠে মাতি রুদ্র হানাহানি;
স্বার্থে আর অপঘাতে দলিছে সবলে
পরাণের অপরূপ সনাতনী বাণী।
কেহ যে ভাবেনা এর কোথা পরিণাম ;
খুজেনা সে লীলাময় অমৃতের ধাম ;
এই প্রলয়ের মাঝে মূরতি তােমার
নিমেষে ঘুচায়ে দেয় আর্তি, হাহাকার ;
মানবেরে দাও তুমি, নব রস, রূপ,
গানে, প্রাণে চিত্ত-পদ্ম ফুটে অপরূপ ।

নাৰী
৪৫
তখন তােমার দ্বারে সব আবর্জনা
শত কণ্ঠকের বেড়া, শত প্রতারণা,
শত বহুরূপী বেশ বজ্জন করিয়া,
মােরা কত অসহায় থাকি দাড়াইয়া ।
প্রাণবলে শুচি-দীপ্ত তাপসীর মত
তব দেবালয়ে তুমি লও ধীরে ডাকি ;
নেহারি' হৃদয়ে মনে ক্ষতচিহ্ন শত
প্রেমযজ্ঞ-অবশেষ ভস্মে দাও মাখি।
তােমার পরশে শুধু সৰ্ব্ব মলিনতা,
দূরে যায়, উড়ে যায় দিগন্ত-সীমায় ;
জেগে ওঠে মূৰ্ছাতুর সহস্র দেব
প্রাণভূমে তব নেত্ৰ-নিৰ্ম্মল-আভায়।
তখন আমায় তুমি বুকে নিয়ে টানি
কোন্ স্বর্গে চলে যাও কিছু নাহি জানি।

নারী
আঁখি মুদি শুনি শুধু হৃদয়ে বিজন
দুটি স্বর্গ-কপােতের নিভৃত কূজন ;
নন্দনের পারিজাত, লতা, কিশলয়
নিবিড় ঢাকিয়া রাখে মােদের হৃদয়।
নমেষে ঘনায়ে আসে আবেশে গভীর
বিহ্বল অধর-দল দেব-দম্পতীর ;
ধোয়া হয়ে উড়ে যায় এই সংসারের
শত কৃত্রিমতা-পূর্ণ যুগান্ত কালের
জঞ্জালের সুপরাশি ;-যাহার মাঝারে
মানবেরা প্রতিদিন বধে দেবতারে।
দুইটি হৃদয়-পুষ্প চন্দ্রমা কিরণে
বিপুল হইয়া ফুটে অমর-জীবনে।
মােদের সে দেবলােক অনুভূতিময় ;
জীবনে জাগায় কত নব সূর্যোদয় ।
৮২

নারী
৪৭
হে আমার নন্দনের সুবর্ণ-হরিণী,
করােনা করােনা আর পরশে, ঈক্ষণে
পুলকিত, জর্জরিত হৃদয় আমার
নিত্য-নব সুধা-জীবি বিপুল বেদনে।
তােমার নয়ন-গতি নিমেষে আমার
সর্বাঙ্গে তড়িদ-দীপ্তি তােলে জ্বালাইয়া ;
কি মধুর সেই জ্বালা, সে মধু দাহন।
আমার হৃদয়-বন্ধ যায় যে টুটিয়া !
তােমার অধররাগে অমৃত পিপাসা,
আরক্ত কপােলে তব স্ফীত অভিমান,
দুটি মুগ্ধ মনােহর প্রাণ-ভরা আঁখি,
মধুমদে প্রাণপদ্ম ঘন বেপমান,
যে লাবণ্য আনি দেয় প্রেয়সি । তােমায়
এ সংসারে তার ওগাে, তুলনা কোথায় ?
৮৩

নারী
৪৮
হে সৌষ্যা দেবতা মাের, পরম সুন্দর!
সুকুমার আননে তােমার
জাগিয়া রয়েছে কত জন্মান্ত-সুখের স্বপ্ন,
শত স্মৃতি শাশ্বত আত্মার !
৮৪

নারী
নেহারি যখন
ও পাবন মুখখানি,কত যুগ, যুগান্তের
বিমল সাধন-রাশি দীপ্ত করে মন!
আমায় লইয়া যাও, কোথায় কোথায়,
কোন্ দূর অনন্ত সীমায়,
নাহি জানি-নাহি জানি; চাহি, চাহি, শুধু চাহি
প্রশান্ত আননে তব, নেত্রনীলিমায়,
প্রাণ মাের ভরি’ উঠে সুখে ;
অনন্তের সুমধুর
আকম্পন জ্যোতির্ময়,
বিমল বিভাস কত জ্বলে ধীরে বুকে!
তােমার সৌন্দৰ্য-রাশে কার অধিষ্ঠান,
কোন্ দেবতার ?
আঁখির ইঙ্গিতে আসে কোথা হতে বৈকুণ্ঠের
এত সমাচার ?
৮৫

নারী
পলকে আপনাহারা দিব্য আকুল
ছেয়ে যায় সমগ্র হৃদয় ;
বিনিদ্র মায়ার যেন স্বপ্ন জালরাশি "
উড়ে আসে ছড়ায়ে বিস্ময়।
অরূপ রহস্য রাশি,—অমল কল্পনা
কবি বিধাতার,
সঞ্চিত হতেছে কত তােমার নয়নে
আননে তােমার!
শান্ত সরলতাভরা ধ্রুবজ্যোতি নয়নের
শুধু এক ক্ষীণতম রেখা আলােকের
আমার হৃদয়ে পড়ি অযুত চন্দ্ৰমালােক
প্রতিষ্ঠা করিয়া যায় যুগান্ত কালের।
আত্মায়, আত্মায় যেথা বিজন পরশ
নিঝরিয়া শত মুখে তােলে প্রাণ-রস।
৮৬

নারী
ক্ষীণতম প্রাণের স্পন্দন
যেথায় আনন্দবেগ করে অসহন ;
নিত্য নধ অলৌকিক জীবনযৌবন
জ্বলে স্বরগের আলাে ত্রিলােক-পাবন।
৮৭

নারী
শ্রান্ত, নিদ্রাতুর দেহে বসে আছি আজ ;
দূরান্তের বার্তা আসে বাতায়ন-পথে ;
নিৰ্ম্মল মধ্যাহ্ন-দীপ্ত গহন আকাশে
হৃদয় উড়িয়া গেছে অজানা জগতে।
৮৮

নারী
হেরিতেছি সুবিজন নীলিমার তীরে
ক্ষীরােদ-সরসী-নীরে ওগাে প্রিয়তম,
সুবর্ণ-সােপানে কভু, কভু ধারাগৃহে
নীরবে বসিয়া তুমি করিছ গাহন।
পড়িয়াছে গৌর দেহে সৌর রশ্মিমালা,
দিগন্ত ঝলসি যায় তার প্রতিচ্ছায় ;
অতর্কিতে পশি’ আমি সেই কল্পপুরে
অন্ধ হয়ে আছি বসে তােমার বিভায়।
বাসনা, কামনা মাের শরীর ধূলির,
উড়ে গেছে, টুটে গেছে যেন জীর্ণ চীর।
হেরি’ তব অনবদ্য জ্যোতি সুধাময়
গলে যায় প্রাণভূমি সারা বিশ্বময়।

নারী
৫০
অনন্ত আলােকঘাতে অন্ধ নেত্ৰতলে
নাহি জাগে সংসারের সহস্র কুহক ;
ভােগের, সুখের শত মরীচিকা-জালে
উদ্ভান্ত নাহি হয় প্রাণ অপলক।

নারী
মানস-অম্বর মাের গিয়াছে খুলিয়া।
সৌন্দর্য্যের দীপ্তি বহি শান্ত, স্থির-সার,
হে দেবি, যােগিনি মাের, নীরবে, গােপনে
খুলিয়া দিয়েছ তব দেবালয়-দ্বার।
তােমারি নূপুর রবে, কিঙ্কিণী, কঙ্কণে
শতমুখে উঠে বাজি দেবতা-আরতি ;
তােমার নয়নচ্যুত অপাঙ্গ-ইঙ্গিতে
নিমেষে স্থগিত হয় সব চিত্তগতি।
তব সে উদার ডাকে, অপার আহ্বানে,
সারাবিশ্ব আজি মুগ্ধ উৎসবের তানে।
|
৯১

নারী
বুঝে না জগৎবাসী তব দেবালয়ে
রহিয়াছে কত সুধা সঞ্চিত অপার!
তােমার মন্দির-মাঝে কভু প্রবেশিতে
যােগী ভিন্ন কারাে আর নাহি অধিকার।
সংযমের ব্রত-রাশি, বিলাস শান্তির
যাদের হৃদয়-গুহা আছে উজলিয়া,
দেবি, তারা একমাত্র পূজারি তােমার
জগৎ সার্থক করে তােমায় পূজিয়া।"
অবধূত, কাপালিক, কৌল বামাচারী
গােপনে পূজিয়া তােমা নানা উপচারে,
মানব-হৃদয়-ভূমি তীর্থ-শিলা করি’
সর্ব শেষ দেয় সঁপি তারা আপনারে।
রচি তব পদতলে তীর্থ নিখিলের,
তাহারা জ্বালিয়া রাখে প্রদীপ প্রাণের।

নারী
ছিনু কোথা ? মনে পড়ে সে কোন্ সুদূরে,
কোন্ ক্ষুদ্র পূতিগন্ধ অন্ধ কারাগারে ;
কত নিরাশায়, আর কত আর্তসুরে
ব্যথিয়া বিরাট বিশ্ব বৃথা হাহাকারে!
মনে পড়ে, ওগাে দেবি, শুধু একবার
হাসিভরা শােণাধরে স্বর্গের আলােক
বরষিয়া, আনিয়াছ যে রাজ্যে উদার
নাহি তথা দুঃখ, জরা, মৃত্যু, রােগ, শােক
যেথায় বিরাজে তব প্রাণে নিরমল
পরিপূর্ণ স্নাত-পূত নব দেবলােক,
যেথায় হৃদয়পুরে করে ঝলমল
প্রেমের পাবন শিখা বিরজ, অশােক।
আমায় ডাকিয়া লও, হে দেবি আমার,
সেই পুণ্য দেবলােকে সংসারের পার

নারী
তুমি আদ্যা প্রকৃতির প্রতিরূপ ছায়া।
তুমি বিদ্যা পরাপরা, জ্যোতির্ময়ী মায়া ;
তােমার নয়নভ্রষ্ট দ্যুতি কটাক্ষের
আভাষ আলিয়া যায় যে দিব্য লােকের
সে এক অরূপ দেশ, অপার, অতল,
যাতে ওতপ্রােত এই ভুবনমণ্ডল ;
যার প্রতি ধূলিকণা সুন্দর, শিবের
বহিয়া স্নিগধ জ্যোতি অনাদি কালের ..
গ্রহ-তারা-নীহারিকা-রূপে বিদ্যমান ;-
যার পরে প্রতিষ্ঠিত আনন্দ, কল্যাণ।
তব রূপে সে রাজ্যের আভাস নেহারি
কি এক অলােক টানে ছুটে যাই, নারি!
তব রূপ-মদিরার মােহন প্লাবনে
শুধু সে ভাস্বর নােক পড়ে মাের মনে।
৯৪

নারী
৫৪
একি ধর্ম যৌবনের ? পারিনে বুঝিতে।
উদ্দাম উচ্ছাস এত, এত আকুলতা
এত অমৃতের খেলা সহস্র ভঙ্গীতে
প্রতি দেহ-অণুতলে এত কলকথা

নারী
তােমার দেহের সীমা টুটে প্রতিদিন
হে মােহিনি ! স্বৈরগতি কটাক্ষে নবীন
শ্যামল করিয়া তােল চিত্তমরুভূমি ;
কি কুহকে রচে যাও আঁখিপাতে তুমি
প্রাণের সবুজ ছায়া দগধ উষরে ;
কি কৌশলে যুগকল্প নিমেষের 'পরে
চকিতে ঘনায়ে ভােলাে,বুঝিনা কিছুই।
মেধাবী, মনস্বী যারা, শুধু এক দুই
বসি’ বসি’ আজীবন গুণে প্রাণপণে,
শুধু কল্পনার জাল গড়ি, ভাঙি’ ক্ষণে
আকাশে উড়ায়ে দেয় ;—মিলি বিশ্বজন
কৌতুকের করতালি দেয় কতক্ষণ!
৯৬

নারী
ইঁহারা বারেক যবে নেহারে তােমায়,
তব রূপ-যৌবনের আনন্দ-লীলায়
ক্ষণিক ফিরায় শুধু আঁখির পলক,
তাদের সকল মৰ্ম্মে শিহরে পুলক ;
ভুলে তারা আপনার কল্পনা, গণনা,
বহু বরষের শত সঞ্চিত সাধনা।
নিমেষে স্থগিত হয় সব চিত্ত-গতি
হেরে তারা আত্মভােলা তােমার মূরতি ;
জ্ঞান-বিজ্ঞানের শত দীপ্ত ভাবধারা
একত্র সঙ্গত হয়ে ছুটে মাতােয়ারা
তােমার মূরতি পানে; কেন কে জানি না।
তখন তাদের বুকে বাজে নব-বীণা
শত কোটি রাগিণীর বাসন্ত উচ্ছাসে,
ত্রিশােক ভাসিয়া যায় মুক্ত প্রাণ-সে!
৯৭

নারী
সৃষ্টির প্রবাহ মাঝে যৌবন তােমার
মানবেরে ডাকি নেয় যে সিন্ধু অতলে,
তরঙ্গ-পরশ তার, প্রশান্তি উদার
মিলে শুধু জন্মার্জিত বহু ভাগ্যফলে।
১৮

নারী
যৌবন ? সে সনাতন জ্যোতি অলকার,
অযাচিত আসে নামি শরীরে, হৃদয়ে
টুটিয়া সকল সীমা নিখিল ধরার,
পূর্ণ করি’ চরাচর বিমল বিস্ময়ে।
সে জ্যোতি মাটির পাত্রে পড়িলে নিমেষ
ভাস্বর করিয়া তােলে রূপে ঝলমল ;
অনাদি সৌন্দর্য্যে তার পূর্ণ-পরিবেশ
হৃদয়ে ঝলকি দেয় রসের অতল।
শিবের ললাট-ভ্রষ্ট সেই জ্যোতিরসে
দীপ্ত তুমি,প্রাণ তাই শিহরে দরশে।

নারী
৫৭
তােমারে সম্রাজ্ঞীরূপে করিয়া বরণ
কৰ্ম্মভূমে করেছিল যারা প্রতিষ্ঠিত,
তারাই হেরেছে তব বিপুল হৃদয়ে
শাশ্বত সাম্রাজ্য এক দেবতা-রচিত।
যেথা দীপ্ত সিংহাসনে রহিয়া আসীনা
তুমি দেবি ! বিজয়িনী শিবানীর মত
অদ্বিতীয়া, অপরূপা, শান্তির প্রতিমা
জীবের কল্যাণ তরে থাক ধৃতব্রত।
তব স্বরাজ্যের কথা গিয়েছি ভুলিয়া ;
তােমায় করেছি বন্দী হাজার শিকলে ;
তাই আজ অন্নভূমে মােরা অন্নহীন,
রচি’ কোটি তীর্থ, ডুবি পাপের অতলে
তােমারে করেছি মােরা খেলার পুত্তলী ;
তাই বহিতেছি শিরে জগতের ধূলি।
১০০

নারী
৫৮
জগৎ দলিছে আজ ফেলি’ পদতলে
ভারতের বহুরূপী জাতি অগণন ;
কে উচ্চ, কে নীচ নিয়ে বিবাদে সকলে
মত্ত মােরা প্রাণপণ করিতেছি রণ।

নারী !
সবাই ভুলিয়া গেছি,নিজেরা মানব,
সকলের সনাতন এক পিতামহ;
সকলের ভােগভূমি বিশাল ধরণী,
সূর্য-চন্দ্র-তারকার আলাে প্রাণবহ ;
এক জ্ঞানময়ী শিখা শূদ্র ও দ্বিজের
জ্বলিছে ললাটপটে প্রশান্ত, উদার ;
একই সেবার স্পর্শ সকল জীবের
প্রাণপুট উছলিয়া পড়ে চারিধার ;
ভুলিয়াছি জীবে, জীবে রাজে মহেশ্বর,
এক প্রাণসূত্রে গাঁথা বিশ্বেকলেবর !
সকলি ভুলিয়া মােরা আজ অন্ধকারে
কৌলিন্যের প্রেতশিলা রচেছি সংসারে।
তােমরা এসগাে দেবি, লয়ে পূর্ণ প্রাণ
কর চূর্ণ জাতি-কূল-ধৰ্ম্ম অভিমান।
ক
১০২

নারী
কোথা সেই দেব-কান্তি হে নারি! তােমার,
যার ছটা উজলিত সমাজের শিরে,
জাগায়ে প্রাণের আলাে জীবের সেবায়
বিরাজিত ভারতের প্রাসাদে, কুটিরে ?
১০৩

নারী
ত্যাগের সহস্র শিখা সর্বতাে জালিয়া
ভােগেরে করিয়া দিতে প্রাণ-রসায়ন;
সুন্দর সীমন্ত-লগ্ন সিন্দুর-ছটায়
মৃত্যুরে পাঠায়ে দিতে অমৃতভবন।
আজ যে ভারত পুনঃ চাহিছে তােমায় ;
যেথা শত শাস্ত্রাচার শােষিছে শােণিত ;
যেথা মানবের আত্মা নিত্য উদ্বন্ধনে
মুমু, জড়ায়ে গলে স্বার্থ-উপবীত ;
জ্ঞানের পাবনপথ যেথায় দুর্গম
অনুষ্ট, ত্রিষ্টভের শূলে কণ্টকিত ;
বিচার-বিমুখ অন্ধ ভােগের শিকলে
মানবের সব গতি যেথায় স্থগিত।
এ দুর্গত দেশে দেবি। তােমরা আবার
সহজ প্রাণের পথ কর আবিষ্কার।
১০৪

নারী
যে পথে চলেছে ধীরে এই সৃষ্টিধারা
সহজ প্রাণের বেগে—বিচিত্র, সুন্দর,
যে বিধানে রহি বাঁধা কোটি গ্রহ-তারা
জ্বালিছে জীবনদীপ হর্ষে থর থর!
ফলে, পুষ্পে, কিশলয়ে, মুকুলে, অঙ্কুরে
প্রাণের যে মহালীল নিত্য লীলায়িত,
যার সঞ্জীবন-মদে রূপযৌবনের
মধুচ্ছন্দা সুধাধারা এত উচ্ছসিত।
বিশ্বের এ চিরন্তন প্রাণের উৎসবে
তােমরা শিবানী সমা অন্নভাণ্ড করে
আত্মার সকল ক্ষুধা পূরায়ে নীরবে
পুষ্টি, তুষ্টি, কান্তি আন সকল অন্তরে
সকল প্রাণের মাঝে তােমার বিজয়
গীত হোক প্রতিদিন সারা বিশ্বময়।

নারী
হে ভাবিনি, জ্যোতির্ময়! তােমার হৃদয়
আনন্দে ভরিয়া দিক জীবন আমার,
তােমার পরশে দেবি! বিপুল বিস্ময়
শিহরি’ উঠুক জ্বলি’ নিখিল ধরার
শান্ত চিদম্বরপুর করিয়া ভাস্বর।
সেথায় উঠুক গাহি আমার শঙ্কর :
“নিবিড় আনন্দরসে বিশ্ব চরাচর
ফুটিছে, টুটিছে নিত্য শতদলমত
বিপুল আনন্দ-বেগে কঁপি থর থর,
জীবশ্রোত কল কলে ছুটিছে নিয়ত ;
রৌদ্রছায়া ধরণীর, পাপপুণ্যধারা
বিপুল সিন্ধুর বুকে মিশে অভিরাম ।
ছােট, বড় দুঃখে, হর্ষে সবি’ মাতােয়ারা
কভু উচ্চে, কভু নীচে গায় মধুসাম।”
১০৬

নারী
তােমরা লক্ষমীর মত সৃষ্টির উৎসবে
সুধাপাত্র লয়ে শিরে, অগণ্য জীবের
শতকলরব মাঝে একান্ত নীরবে
পালিতেছ ব্ৰতরাশি সুখের, হিতের।
দুঃখ, তাপ, তােমাদের ইন্দ্রজালবশে,
হয়ে ওঠে জ্যোতির্ময় স্নিগ্ধ, কমনীয়,
তােমাদের হৃদয়ের পবিত্র পরশে
হেয় যাহা, হয়ে ওঠে চিরলােভনীয়।
তােমাদের প্রতিপদে উৎসবের ধ্বনি,
প্রতিবাক্যে উঠে জাগি অমৃতসঙ্গীত ;
যাহারা চিনিতে পারে তােমায় মােহিনি।
তাদের হৃদয়ে, জ্বলে, নব উপবীত।
তােমায় ঘিরিয়া দেবি। দেবাদল
শুধু আনন্দের লাগি ঘুরিছে বিহ্বল।
১০৭

নারী
ওগাে দেবি! পুণ্যবতী ব্রত-পরায়ণা,
সংযমে কর্ষিত-দেহা, প্রশান্ত-হৃদয়।
ভারতের গৃহাঙ্গনে তোমরা ললনা
ধন, ধান্য, পতি, পুত্র, সৌভাগ্য, অভয়,
আয়ু, কান্তি, যশােবল, পুণ্য, প্রীতি মাগি
নীরবে সাধন কর যেই ব্রত সব,
তার শিবতর জ্যোতি মানব সমাজে
অপরূপ, অভিনব, অতি অভিনব !
যারা হেরিয়াছে তব পূত কলেবর,
স্মিতমুখ, উপােষিত তনুর তনিমা,
স্নাত-অনুলিপ্ত দেহ, আরক্ত অম্বর,
যতবাক মুখ, রাঙা সীমন্তের সীমা,
তারাই করিবে মনে—তােমরা রমণি,
প্রাণের পাবন পাশে বেঁধেছ ধরণী।
।
১০৮

নারী
যখন তােমরা বসি’ পল্লীর ছায়ায়
আম্র-গুবাকের শান্ত শ্যামলিমা তলে,
মধ্যাহ্নের সুনিবিড় বিজন বেলায়
পবিত্র দুকূল বাসে, দূৰ্বাক্ষতজলে
পূজা কর এক মনে সাবিত্রী জননী,
আপন নিভৃত কক্ষে বসি একাকিনী,
মনে হয়, তােমাদের দেহজ্যোতি মাঝে
ভারতের বেদমাতা সাবিত্রী বিরাজে।
সত্য কহি, সত্য কহি, হেরিয়াছি আমি
শত পূর্ণেন্দুর কান্তি, ধবল-বরণী
জ্যোতির্ময়ী দেবী এক উরসে যাহার
হেমমুক্তা বিক্রমের একাবলী হার ;
বরাঙ্কশপাশাভয় যাঁর করতলে,
রতন-মুকুট-জ্বালা যার শিরে জ্বলে।

নারী
সংসারের সনাতন দুঃখের মাঝারে
হেরেনি ঐশ্বৰ্য্য যারা তােমার কল্যাণি ।
বড়ই দুর্গত তারা, তব রাজ্যে পশি’
ফিরে গেছে, না হেরিয়া তব রাজধানী।
প্রেমের আড়ালে যেথা তেজ অশনির
চমকি, ঝলকি যায় চির-চিরন্তন ;
যেথায় নিমেষজীবি শরীর দীপ্তির
অন্তরালে জ্বলি উঠে হােমাগ্নি নূতন।
তােমাদের প্রতিশ্বাসে বিকশে যেথায়
দুঃখের শাশ্বতরাজ্যে শত পারিজাত ;
জগতের সূচীমুখ সহস্ৰ জ্বলায়
ঝরে যেথা প্রেমঘন নিঝর-প্রপাত।
শতক্রুঢ় অভিঘাতে নিখিল বিশ্বের
তােমরা জালিয়া রাখ দীপ অনন্তের ।
১১০

নারী
যাহারা হয়েছে ধন্যা তােমাদের মাঝে
সবাই প্রসন্নমনে করেছে বরণ,
জগতের ছােট, বড় নিত্য সুখ, দুঃখ;
তারি মাঝে করিয়াছে ব্ৰত সমাপন।
যখন বিপাশি প্রলয়ের মত
উদ্যত রসনা মেলি গ্রাসিবারে চায়,
চারিদিক হতে ধীরে জ্যোতিষ্কমণ্ডলী
হৃদয় আকাশতটে ধীরে নিভে যায়,
তখন তােমরা দেবি, দ্রৌপদীর মত
ঊর্দ্ধ নেত্রে যুক্ত রহি অসীমের সনে
আপন হৃদয়-ভরা অতুল সম্পদ
রক্ষা কর অনন্তের শত আবরণে।
হে ভাবিনি, সে ঐশ্বৰ্য্য তব হৃদয়ের
দুঃখেরে সুন্দর করি দেয় জগতের।
১১১

নারী
বিজন অশােকবনে বিরহ-বিধুরা
একাকিনী সতী বুকে যে দীপ্ত অনল
সহস্র সংঘাত বায়ে উঠেছিল জ্বলি’
ভাস্বর হয়েছে তাতে বিশ্বের মঙ্গল ।
যাহারা অগ্নির মাঝে হেরেনি সীতার
দগ্ধমল হৃদয়ের কান্তি জ্যোতির্ময়,
ব্ৰহ্মবাদিনীর শান্ত নয়নের মত
সুধাস্রাবী, সমুজ্জল নেত্ৰ-কুবলয়,
যাহারা শােনেনি নিজ হৃদয়ের তলে
দীর্ঘ বনবাসক্ষীণা দেবী জানকীর
প্রত্যাখ্যানে, অপমানে, বিশাল ব্যথায়,
নিৰ্ম্মল অভয়-বাণী মাতা ধরণীর,-
তাদের এখনাে বাকী চিনিতে তােমায়,
অরূপ তব সে রাজ্য দীপ্ত মহিমায়।
১১২

নারী।
যাহারা জীবন-পথে অহল্যার মত
প্রেয় মাঝে খুজে খুজে পরশ ভূমার,
হৃদয়ের অন্ধবেগে হইয়া আহত
শিলাসম থাকে পড়ি অচল, অসাড়,-
নিথর দুঃখের তলে শত উপেক্ষায়
যাদের নয়ন হ’তে ঝরে অশ্রুজল,
যাহাদের অবরুদ্ধ সহস্র ব্যথায়
নিরমম শ্বাপদেরা হাসে খল খল,-
তাদেরে ডাকিয়া দেবি। কর নিমন্ত্রণ
প্রাণের পাবন যজ্ঞে অপিতে আহুতি ;
জাগাও পরশে তব নবজাগরণ ;
তাদের শরীরে মাখাে দেবতা-বিভূতি।
হোক্ তারা জগতের নবীন নন্দিনী,
দুঃখের পাবনভূমে নব পূজারিণী।
৮

নারা
হে দেবি আনন্দময়ি! ভূতলে, গগণে
যৌবনের যেই দিব্য লীলা সুকুমার
তােমায় সহস্র পথে, সহস্র ভুবনে,
অযুত আনন্দ-লােকে করিছে প্রচার,
১১৪

নারী
তার পরে দৃষ্টি পড়ে বহু ভাগ্যবশে;
যােগী যারা, পায় দেখা হৃদয়ের কূটে
মানবের মধু-নাড়ী কি অমৃত রসে
পুষ্ট হলে, প্রাণপদ্ম বিশ্বে রহে ফুটে।
যাহারা কৃপণ, অন্ধ, যারা অব্রাহ্মণ,
অন্তর্যামী যার মাঝে হয়নি প্রকাশ,
তারাই তােমারে শুধু পণ্যের মতন
ভাবি’ মনে-আপনারে করে উপহাস।
যখন খুলিবে দেবি। দৃষ্টি তাহাদের
তােমরা সার্থক হবে, জগৎ সফল ;
ধরণী হইবে ধন্যা, বিপুল সুখের
পরাণ-শীতল-করা পেয়ে শান্তিজল।

নারী
৭০
সংসারের নিত্যনব শত গৃহ কাজে
অনিন্দ্য মূরতি যাহা তােমার বিরাজে,
কল্যাণ-প্রসাদে তাহা অম্লান সুন্দর ;
তার অশরীরি কান্তি যুগ-যুগান্তর
ভারতের পর্ণশালে তীর্থের মহিমা
দিয়ে গেছে। রাখিয়াছ আজিও তােমরা
নিৰ্ম্মল সেবার তলে অতুল প্রেমের
শান্ত, সুমধুর স্পর্শ সুধারসে ভরা।
সংসারের অতি হেয়, অতি অকিঞ্চন
করম-প্রবাহে তব জ্যোতি সীমন্তের
বিম্বিত, ফলিত হয়ে কত কান্তরূপে
প্রকাশিছে প্রাণবেদী গৃহমেধিদের।
নিখিলের তীর্থ-শিলা তব প্রাণ-পীঠ ;
এবিশ্ব উজলে তব রূপের কিরীট।
১১৬

নারী
৭১
জীবনের কোন্ গুপ্ত গােমুখী হইতে
বাহিরি এসেছ দেবি ! ওগাে মায়াবিনি
কি আনন্দ-তীর্থ-জলে হয়ে স্নাতপূত
সর্বাঙ্গে করেছ স্তব্ধ রূপের রাগিণী ।
১১৭

নারী
কোন্ প্রজাপতি, কিম্বা কোন্ বৈশ্রবণ,
তােমারে করিছে ধ্রুব রমণী-জীবনে ?
মন্থর করিয়া দিছে সকল প্রবাহ
অপূৰ্ব আশ্রম রচি’ হৃদয়-নন্দনে ?
নবনীত সুকুমার তােমার উরসে
কি পুণ্য অমৃত-স হতেছে সঞ্চার :
ছন্দোময়ী গতিভরা তােমার নয়নে
একি স্নিগ্ধ আকাশের নীলিমা-প্রসার ?
অগ্নিগর্ভাশমী-সমা তােমার জীবন
কোন্ মহাযজ্ঞ তরে করে আয়ােজন।
১১৮

নারী
৭২
আজি কোন্ বৈকুণ্ঠের অনিন্দ্য ঊষায়
তব মুগ্ধ মদগতি যৌবন-সুলভ,
নিৰ্ম্মল ঔদার্যে এত, শান্ত মহিমায়
নব রাজ্য প্রকাশিছে আনন্দ-প্ৰভব ?
তব প্রাণ-গতি পরে ছন্দের শৃঙ্খল
হইতেছে কতরূপে আজি দ্যোতমান।
আনন্দব্রতের মাঝে অমল মঙ্গল
যজ্ঞান্ত দক্ষিণা সমা আজি জ্যোতিষ্মন্ ।
মনে হয় যেন দেবি। আনন্দে গভীর
কি এক নবীন রাজ্যে পশিতেছ ধীরে-
যেথা সৌম্য সার্থকতা নারী-পদবীর,..
শিশু-হাশ্যে ফুটে যেথা অযুত কুটিরে
শতদল সুখ-রাশি সহস্র স্বর্গের ;
যেথা ধ্বনি, তান, লয় সবি’ অনন্তের।
১১৯

নারী
৭৩
-
একি অপরূপ রূপ হে দেবি ! তােমার।
এযে মূর্তি সনাতনী নব জননীর !
উরসে শিশুর হাসি,-পূজাপুষ্পভার,
আশীষ-চন্দনে তব চৰ্চিত শরীর !
নিরমল ভবিষ্যৎ, ভূত, বর্তমান,
ত্রিধারা সঙ্গত হয়ে মিশেছে তােমায় ;
স্বরগের মাতৃগণ তব জয়গান
গাহিছে গান্ধারে আজি বিশ্বের সভায়।
স্নেহভারে আনমিত, সুধা পীনস্তনে ;
বাৎসল্যের শতদল নেত্রে বিকশিত ;
আনন্দের শতধারা অধরে, নয়নে
পলে, পলে, নব রূপে আজি লীলায়িত।
নিখিল-উজল-করা মহিমা তােমার
বিশ্বের মানব-শিশু নমে বার বার ।
১২০

নারী
৭৪
হৃদয়-গােমুখী হ’তে তব স্নেহরস
পান করিতেছে শিশু মুদিয়া নয়ন ;
যেন সে অমৃতসরে ডুবিয়া, ভাসিয়া
বুঝিতেছে বিপুলের প্রাণের স্পন্দন।
দেব-লােক-ভ্রষ্ট কত স্বপনের রাশি
শিশুর নয়নে মুখে রেখেছ জড়ায়ে ;
বিনিদ্র আননে তার ক্ষণ-লব হাসি
শরতের জ্যোৎস্নারাশি যেতেছে ছড়ায়ে।
তুমি তারে প্রাণপণে চাপি বক্ষতলে,
বরষি চুম্বনরাশি বিহবল নয়নে,
কোমল মলয়-স্পর্শে আবরি অঞ্চলে
নিখিল ভাসায়ে দাও সহস্র স্বপনে।
এমন স্বচ্ছন্দ সুখ, এমন অভয়
শাশ্বত জননী ছাড়া আর কারাে নয়।
১২১

নাৱী
৭৫
ভারত তােমার মাঝে হেরেছে দেবতা
পুরাকালে ; ঘিরি তােমা তাই ব্ৰত কথা
পল্লীর ছায়ায় এত উঠেছে ফুটিয়া ;
সংযম, শান্তির আলাে তােমায় ঘিরিয়া।
১২২

নারী
শিশুর মঙ্গল তরে তােমার হৃদয়
দেবতা খুজেছে কত সারা বিশ্বময়
চতুষ্পথে, বটতলে, বিজন দেউলে ;
প্রাণের অঞ্জলি রচি’ ব্রত-বেদী মূলে
মাগিছ তােমরা কত শিশুর কল্যাণ
সম্পদ, সৌভাগ্য, আয়ু, যশ, বল, মান !
শিশুর পরাণ-বিন্দু পরশে তােমার
নিমেষে উচ্ছ,সে যেই অগাধ সাগর,
বুকে তব কাণ পাতি শুনি বারবার,
তার সেই সমুদাত্ত মধু কলস্বর।
সে মহাসাগরতলে ডুবিয়া, ভাসিয়া
কোটি কল্প নিমেষেই যায় ফুরাইয়া।
১২৩

নারী
৭৬
সে সাগরে সনাতন পরাণের লীলা;
সে মহাপিবন তীর্থ জন্ম-জন্মান্তের,
যার তীরে মাতৃগণ শান্তা, ধ্রুবশীলা,
রচি গেছে ব্ৰত-বেদী নিখিল-হিতের।
জীব-জগতের শত বিচিত্র লহরী,
তােমার হৃদয়-পীঠে আঁকিয়াছে কত
কত সাম, কত ঋক চরাচর ভরি',
কত ঋষি, মেধাবীর কাব্য শত শত।
আজ আমি আঁখি মুদি হেরি চিত্তপটে,
“নিখিল গিয়েছে যেন ভাসি স্তন্য-ধারে;
ছুটিয়াছে যুগান্তের জন্মজরাহীন
অমর শিশুর দল কাতারে, কাতারে”;
তাদের আনন্দসরে করিয়া গাহন
জগৎ লভিছে নিত্য নবীন জীবন।
১২৪

নারী
৭৭
দেবি, তব প্রাণ-রসে পরিপূর্ণ ধর,
কি অপার ছায়া-স্পর্শ জীবনে তােমার
শতমুখ অর্থে, ছন্দে, ধ্বনির ঝঙ্কারে,
তুমি অনবদ্য কীৰ্তি কবি বিধাতার ।
তােমার নয়ন হ’তে বিমল অভয়
শিশুর হৃদয়-কলি ঘিরেছে বেষ্টনে ;
তােমার অঞ্চল-ভ্রষ্ট বিপুল বিস্ময়
অনিমেষ চেয়ে থাকে শিশুর নয়নে।
জ্যোতির্ময় শীতলতা চন্দ্রলােক হতে
তব দৃষ্টি-পথে ঝরে শিশুর হৃদয়ে,
প্রাণের ভঙ্গীতে তব নিমেষে জগতে
কত কাব্য, কত ছন্দে শিশুমুখে বহে।
আজ তব প্রাণ-নদী পাইয়াছে দেখা
ক্ষীবােদ-সিন্ধুর নীল চক্রবাল-রেখা।
১২৫

নারী
৭৮
বিরাজিত ছিল ওগাে, যেদিন ভারতে
ধনে, ধান্যে, ভােগে, সুখে, স্ফীত জনপদ,
ছিল যবে রাজর্ষির সর্বত্যাগ-ব্ৰত
সেবাধৰ্ম্মে দীপ্তিমান, অতুল মরতে।
১২৬

নারী
স্বচ্ছল, স্বাধীন ছিলে তােমরা তখন
ভারতেরে তীর্থভূমে করি পরিণত ;
তােমাদের মুক্ত-গতি চরণে প্রণত
সঁপিত সাধন-রাশি কত সিদ্ধগণ।
তখন ভারতে তব নূপুর ঝঙ্কারে
উঠিত অমৃতবাণী মৃত্যুর জিহ্বায় ;
অমৃতধামের পথ করিত জিজ্ঞাসা
তােমাদের শিশুগণ নব মহিমায় ।
সে হ'তে তােমার শুভ মূৰ্ত্তি জননীর
করিতেছে শিবতর প্রাসাদ, কুটির ;
আজো তার বহু চি তােমার জীবনে,
সার্থক, সুন্দর হয়ে পড়িছে নয়নে।
১২৭

নারী
৭৪
তােমরা জননীরূপে ভারত অঙ্গনে
এনেছ অভয় বাণী, ভরসা অপার ;
তােমাদের প্রাণবলে ছুটেছে জোয়ার
তরুণ হৃদয় ভরা কুটির-ভবনে।
এ ঊষায় অরুণিম নব জাগরণে
সীমন্তে ত্যাগের শিখা জ্বালায়ে উদার
তােমরা যে নববাণী করিছ প্রচার
তাহার তুলনা কোথা মিলে ত্রিভুবনে।
প্রাণ তব ভরপূর লাবণ্যের রসে ;
অখণ্ড প্রদীপ জ্বলি শিশুর শিয়রে
দিবা নিশি কতরূপে নূতন হরষে
চিত্ত তব গৃহতলে স্বচ্ছন্দ বিহরে ।
তােমার পাবনী মূর্তি নিয়ত বরষে
কত কল্যাণের ধারা দগধ উষরে।
১২৮

নারী
৮০
রূপ রাশি তেজোময়ী, গৌরব উদার
উঠিত বিকশি কত শ্মশানের তীরে,
রাঙিয়া ললাট-জ্যোতি সিন্দুর-শিশিরে
তােমরা পৌছিতে যবে জগতের পার।
নয়নে অঞ্জন মাখি শ্মশান-শিখার,
যখন পঁাড়াতে আসি সন্ধ্যার তিমিরে
মৃত্যু পরাজিত হয়ে দূরে যেত ফিরে ;
হ’তশিরে পুষ্পবৃষ্টি দূর অলকার !
তােমার প্রেমের গর্ব অনন্তের পানে
অযুত শিখায় জ্বলি’ রহিত উজ্জ্বল ;
ধরণীর বুক ভরি’ শত মধুনে
তােমার বিজয়-গীতি বাজিত কেবল ।
তব সেই তেজোরাশে, সে বিজয়-গানে,
জগত হউক পূর্ণ, হউক সফল।

নারী
যে সব মানব-শিশু তব হৃদয়ের
প্রাণভরি হােমানল করিয়াছে পান,
তাহারা ঘুচায়ে দেয় আঁখির ইঙ্গিতে
স্বর্গে, মর্ত্যে, সনাতন শত ব্যবধান।
তাহাদের প্রতিবাক্যে অনলের শিখা
দীপ্ত হয়ে ওঠে পূত পুরিয়া বিমান ;
তাহাদের প্রতি শ্বাসে যায়গাে উড়িয়া
সম্রাট উষ্ণীষ কত ধূলির সমান ।
সুখে, দুঃখে, ভােগে, রােগে জীবন তাদের
থাকে সদা আত্মদীপ, অনন্য-শরণ;
তাহাদের নেত্র হ’তে অনিমেষ বহে
অমৃতের মধুধারা প্রাণ-রসায়ন।
তেমন শিশুতে পূর্ণ হউক ভারত,
যারা সত্যে, প্রেমে রবে জীবিত, জাগ্রত।

নারী
মানবের পৌরগৃহে যেদিন প্রথম
দেখা দেয় দিব্য-কান্তি শিশু সুকুমার,
সেদিন হইতে তুমি কত স্নেহরসে
সেই নব অতিথিরে করগাে সকার ।
শিশুরে জড়ায়ে আসে স্বর্গের উৎসব,
মানব ঐশ্বৰ্য্য তারে করে আবাহন ;
দেবতার, মানবের দুই রাজ্য মাঝে
বচি রাখে শিশু এক সীমানা নূতন।
শিশুর সর্বাঙ্গ-ঘেরা বর্ণ-ধ্বনিময়
অলােক সাম্রাজ্য তুমি কর আবিষ্কার ;
পুলকে, বাৎসল্যে, আর কৌতুকে বিহবল,
প্রতিষ্ঠিত কর যেথা তব অধিকার ;
ধাত্রীরূপে, মাতৃরূপে তােমরা রমণি।
প্রাণের সুবর্ণ-সূত্রে বেঁধেছ ধরণী।
১৩১

নারী
শিশুর হৃদয়লগ্ন হৃদয়ে তােমার
যে অমৃত-প্রস্রবণ নিত্য উৎসরিত,
যে নিৰ্ম্মল অর্থভরা সহস্র রাগিণী
আত্মার অযুত তন্ত্রে অনিশ ঝক্কত,
যারা পাইয়াছে দেবি, তাহার আভাষ
তারা কোটি মধুকণ্ঠে গায় তব কথা ;
প্রাণের ভঙ্গিতে তারা নিমেষে, নিমেষে
নিখিলে প্রচার করে তােমার বারতা।
যত তৃপ্তি, যত শান্তি বিশ্বচরাচরে
সবি’ তব দৃষ্টি মাঝে পায় পরকাশ ;
যত কবি, যত শিল্পী তার কণা লয়ে
আনে মর-লােক মাঝে অমর আশ্বাস ।
বিপুল আনন্দরসে শান্ত, মনােময়
তব সে আনন্দমূর্তি বিশ্বের বিস্ময় ।

শারী
শিশুর হৃদয়পুরে পশিয়া নীরবে
থাক তুমি, যবে দেবি, আপনা-বিস্মৃত
অর্ধনিমীলিত-নেত্রে গভীর আবেশে
তব রূপে তৃপ্তি দেবী হন প্রকাশিত।
যার বুকে রহি লগ্ন বিশ্ব-চরাচর
অমৃতে, আনন্দরাশে, রসের প্রবাহে
লয়ে কোটি নামরূপ, বর্ণ, গন্ধ, ধ্বনি
অসীমেরে লক্ষ-পথে প্রকাশিতে চাহে।
যার স্পর্শে ফুলে, ফলে, পল্লবে, প্রসূনে
বিশ্বলক্ষী আপনারে নিজে দেন ধরা,
ভালাে মন্দে, প্রেমে দ্বন্দে স্বর্ণসূজে গাঁথি
রচিয়া পূজার থালা, সৌন্দৰ্য-পসরা।
তব অনবদ্য রূপে ভরি বিশ্বাকাশ
চিন্ময়ী আপন মূৰ্ত্তি করেন প্রকাশ !
১৩৩

নারী
৮৫
ভাবমুগ্ধা দেবি, তুমি মুদিত-নয়নে
যবে দৃষ্টিপাত কর হৃদয়ে শিশুর,
হের তুমি কত দিব্য সৌধশ্রেণীভরা
অনন্ত উৎসবে মত্ত নিরঞ্জনপুর,
যাহার বিদ্যুৎ-দীপ্ত দর্পণের তলে
কত স্নিগ্ধ ছবি ভাসে অনন্ত লােকের ;
যাহার হিরণ্য-বেদী উপরে রচিত
কত কল্যাণের মূর্তি সহস্র গৃহের !
যেথায় বিরাজে শত লােকলােকাস্তে
সুবিচিত্র আশা, সুখ, প্রাণের বিলাস,
হিরণ; দেউল কত, কত ভােগভূমি,
মৰ্ম্মর-রচিত কত আনন্দ-নিবাস!
শিশুর সম্পদ যত তােমার নয়নে
উঠে ভাসি, তুল তার মিলেনা ভুবনে।
১৩৪

নারী
শিশুর হৃদয়তলে তব মনােময়
সৃষ্ট হয় যত পুণ্য, জ্যোতির্ময় লােক
মঙ্গল-আশীষে তাহা স্নিগ্ধমনােহর
নাহি তথা জরা, ব্যাধি, নাহি মৃত্যু, শােক।
সেথা শুধু জ্যোতিরাশি মধুর-শীতল
শিশিরের বিন্দু সম পড়ে গাে ঝরিয়া ;
সেথায় সহস্ৰমুখে অমৃত-নিঝর
আনন্দে, কল্লোল-হাস্যে পড়ে মুরছিয়া।
সেথা শিহরণ-ভরা বিমল পরশ ;
অনন্তের অনিমেষ, উদার প্রকাশ ;
আত্মার বিজনতম বাতায়ন-পথে,
নিবিড় নীলিমা-রাশি ঢালে মহাকাশ।
এই সুবিপুল পুরে তব মনােময়,
দেশ, দি, কাল পায় নিমেষে বিলয়।
১৩৫

নারী
যবে তুমি সূৰ্য-সােমে স্মরণ করিয়া
বস পূজাবেদীমূলে কাষায়-বসনা,
ধ্যান কর প্রাণপদ্মে বিন্ধ্যবাসিনীরে,
যিনি গৌরী, শান্তিরূপা, সৰ্ব্ব-সুলক্ষণা,
পীনােন্নত-পয়ােধরা, করে বরাভয়,
দিব্যবস্ত্রপরিহিতা, প্রসন্নবদনা,
যার মুক্ত বাম কোলে শিশু জ্যোতির্ময়,
যার তনুদেহলতা চম্পক-বরণা ;
তখন তােমার দিব্য দেহকাতিলে
সিদ্ধ যােগিনীরা যেন রাজে সমুজ্জ্বল ;
তখন তােমর পূর্ণ হৃদি-সরােজলে
হাসে, ভাসে স্বরগের শিশু শতদল !
অলােক দেবত্বে পূর্ণ মূরতি তােমার
নিখিল বিহ্বল হয়ে নমে বার বার।
১৩৬

নারী
৮৮
যবে কৃতাঞ্জলিপুটে জানু পাতি ভূমে
অঞ্চল বিছায়ে মাগ দেবতার দান,
পুত্র, কন্যা, প্রিয়জন, ধৰ্ম্ম, ধন, যশ,
অন্ন, ভূমি, প্রজা, বিদ্যা, সৌভাগ্য, কল্যাণ,
যবে তুমি করপুটে দুৰ্ব্বাদল ধরি,
একাগ্রে বলিয়া যাও পুণ্য ব্রতকথা,
বাঙালার ছায়াস্নিগ্ধ কুটিরে নির্জনে
ঝরে কত সুনিবিড় তব নির্মল।
১৩৭

নারী
তব ব্রতকথা মাঝে কত স্বপ্নপুরী।
কত মহাসাগরের বিস্ময়-উচ্ছসি ।
কত স্বর্ণ-প্রাসাদের দীপ্ত বিজন।
কত মণিজালময় নিশীথ-আকাশ!
সবুজ আলােতে ভরা কত হৃদয়ের
বিমল উল্লাস কত! কত মধুগান!
পল্লীকুটীরের বুকে আমবনের
কত শান্তি, প্রীতিরস হয় বহমান।
কত ক্ষুদ্র জীবনের স্বর্ণসূত্রগুলি
তােমার কথার মাঝে ফুটে সুনির্মল !
কি বিচিত্র সুঃখ, দুঃখে, প্রীতি, প্রেম, স্নেহে
তব ব্রতকথা ফুটে বিচিত্র, উজ্জ্বল ;
নিসর্গের ছায়ালােকসম্পাতে মধুর
তােমার ব্রতের কথা রসে ভরপূর ।

নারী
শিশুরে জড়ায়ে বুকে তােমরা যখন
উদার, অপার নেত্রে নিরখ সংসার ;
কত সুবিচিত্র, কান্ত আশা, ভরসায়
তােমরা আচ্ছন্ন দেখ বিশ্বপরিবার ।
নিখিলের যত শিশু সকলের সাথে
যুক্ত হয় তােমাদের জননী-হৃদয়,
নিখিলের ছায়াতপে, মেঘে, বারিপাতে
হয় নিত্য তােমাদের নব পরিচয়।
মানবের প্রাণপণ স্বার্থের সংঘাতে
যবে মনেরাজ্য হয় ধূলি-ধূসরিত,
তােমরা শিশুর হাসি, নয়নে ঈঙ্গিতে ,
ঢাল কত প্রাণজ্যোতি-প্রদীপ্ত অমৃত।
কতসূত্রে, কত পথে স্পর্শ তােমাদের
সরস করিছে আত্ম বিরাট বিশ্বের ।
১৩৯

নারী
৯০
শিশুরে করিয়া বড়, সবল, স্বাধীন
যেই দিন নেহারিবে সমগ্র ভারত,
নব জননীরা মিলি রচিবে যেদিন
শিশুদের সত্যপূত আনন্দের ব্রত,
১৪০

নারী
সেদিন জাগিবে বিশ্বে জীবন নবীন।
আজ যে অগণ্য শিশু ভারত-অঙ্গনে
অনাহারে, কদাহারে ক্লিষ্ট, দীনহীন
ব্যথিয়া তুলেছে বিশ্ব আকুল বেদনে।
হাজার শিকলে ঘেরা তাদের চরণ,
জননীর স্পর্শ তারা মাগিছে কাতরে;
ততামাদের মধু স্পর্শে ঘুচাও বন্ধন,
প্রাণ পরিপূর্ণ হৌক অমৃত-নিঝরে।
আন সত্য; আন ঋত; আনন্দের ধারা
ঢালাে বুকে শিশুদের; করাে মাতােয়ারা।
দেশের, ধর্মের, আর হিতে জগতের
প্রবুদ্ধ করিয়া দাও হৃদয় তাদের।
তাহারা আনুক বিশ্বে নব সমন্বয়,
জাগুক তাদের বাক্যে জগতে অভয়।
১৪১

নারী
সার্থক হইব আমি—হইব সফল।
পশিয়া নিখিল-ভরা রসের অতল
গভীর প্রাণের ভূমি আঁকড়ি ধরিয়া
শান্ত অন্তরীক্ষবুকে থাকিব ফুটিয়া
ফুল্ল শতদল সম! হে দেবি আমার,
বুকে বহি স্নিগ্ধ জ্যোতি হরিণী উষার
আসিও নিকটে মাের,করিও পরশ ;
আমায় করিয়া দিও প্রকাশে বিবশ ;
আমি শুধু চেয়ে রব হৃদয় মেলিয়া ;
অদ্বৈত বংশীর রব উঠিবে জাগিয়া
বিশ্বের হৃদয়ে তব অঙ্গুলি-লীলায় ;
জগতের সনাতন প্রাণ-বেদিকায়
দুর লােক-লােকন্তের নর-নারীগণ,
সে গানে লভিবে এক নবীন জনম।
=
১৪২

নাৰী
মধুসাম
আজি পরিপূর্ণ ধরা জীবনে যৌবনে ;
প্রাণের অঞ্জন আজি লেগেছে গগনে,
মহানীলিমায় ;
চরাচর ভেসে যায়, ডুবে যায় অমৃত-ধারায়।
অই দূর দিগ্বলয়তীরে,
দেখা যায় পরিপূত পূজার মন্দিরে
নব পূজারিণী,
যান একাকিনী,
ধীরপদে—অলক্ত-চরণা,
কাষায়-বসনা ;
১৪৩

নারী
কেশপাশে বলয়িত চারু পুষ্পহার,
গলে তাঁর মুক্তামালা, করে উপচার
দেবতা পূজার !
জ্বলে তার ললাট সীমায়,
অলােক বিভায়,
শান্ত-সিন্দুরের সদ্য রাঙা প্রাণরস,
অধরে, কপােল ভাসে উযার পরশ !
আবেশে বিহ্বল তার মেঘলােকে উড়িছে অঞ্চল ;
নিখিলের স্বপ্নরাজি তার গতিভঙ্গে আজি
যেন কত উতলা চঞ্চল ;
অই তিনি ডাকিছেন মােরে
পৃজিবারে জগৃতের সনাতন প্রাণ-দেবতারে -
যিনি এই নিখিলের প্রিয়-প্রিয়তম
দেবতা পরম,
ত্রিলােক-পাবন ;
১৪৪

নারী
যাঁহার-পরশ রস অমল, মধুর,
বসন্ত-মলয় সম ফোটায় অঙ্কুর,
সবুজে, অরুণে, শ্যামে ডুবাইয়া প্রাণের প্লাবনে,
এ জগত ভরি দিয়া বর্ণে, গন্ধে, বিলাসে, বেদনে।
শােননা, শােননা, সনাতনী দেবী পূজারিণী,
অনন্ত জীবনপথে অদ্বৈত সঙ্গিনী,
বিশ্বের অন্তরতম পূজা-বেদিকায়
বাজান প্রাণের শাঁখ উদাত্ত লীলায়
অনন্ত সীমায়।
তাঁর সে আহ্বান
জাগাতেছে চিত্তে মম জন্মান্তের কত মধু তান!
সে ডাক পশিছে মাের মরম কুহরে;
প্রাণ আজি রােমে রােমে উঠিছে শিহরে।
আজ সে উদার ধ্বনি
পূজার আবেগ-ভারে পূরিছে ধরণী,
১৪৫

নারী
ভরিতেছে হৃদয়-ধমনী ;
পূর্ণ করি শতধারে, পরিপূর্ণ করি
যুগ কল্প ধরি’
৫
সকল হৃদয়,
করি’ শান্ত, করি’ অনাময়।
আমি আজ পূর্ণে পূর্ণ , আজ চিত্তপটে
কত স্বপ্ন, কত ছায়া ফুটে আর টুটে !
আমার আনন্দ-রাশে পূর্ণতা আমার,
পূর্ণতা ধরার।
পূর্ণ করি’ হৃদয়-কুহর
সেই পূত কণ্ঠ হ’তে আসে বহি প্রাণ-পূর্ণ
‘স্বরের লহর।
আমার হৃদয় আজি আবেশে বিহ্বল,
তলিয়ে যেতেছে যেন সাগরে অতল ;
১৪৬

নারী
চারিদিকে নিবিড়, বিপুল,
প্রাণের প্রকাশবেগ মধুর, অতুল
নেয় মােরে গভীরে, গভীরে
জ্যোতির্ময় নিরঞ্জনা-নীরে ।
আজ হিয়া মাের
নেশায় বিভাের,
এ নেশা প্রাণের নেশা গভীর, বিপুল, সুগহন
পূজিবারে চির-প্রিয়তম।
জগতের সুবিজন বসিয়া দেউলে,
রচিয়া প্রাণের অর্ঘ্য পূজাবেদীমূলে,
বাসিত দুকূল সম উড়াইয়া মন,
ধূপের ধোয়ার মতাে সকল জীবন
ছড়ায়ে অসীমে,
উড়ায়ে নীলিমে,
১৪৭

নারী
প্রাণপুটে প্রতিদিন রচিয়া অঞ্জলি,
বাসনা, কামনা, আশা সঁপিয়া সকলি,
ভরিয়া হৃদয়-পদ্ম বর্ণে, গন্ধে, গানে,
চেয়ে থাকা অনিমেষ প্রিয়তম পানে,
ডুবি তাঁর নেত্রচ্যুত পরা শান্তিরসে
জেগে থাকা মৰ্ম্মতলে, তাঁর সে পরশে
যুড়ে থাকা বিশ্বময় দিগন্ত-প্রসার,
পূজা যে আমার ।
পূজা আজ অন্তরে বাহিরে
শােনাে, বীজে আরতি মন্দিরে,
পূজার প্রদীপ, হের, উঠিতেছে জ্বলি’
জগত উজলি’;
তাহার প্রশান্ত আলাে আজ বিচ্ছুরিত
চরাচর করি’ শিহরিত,
১৪৮

নারী
গ্রহে, গ্রহে, তারায়, তারায়
অপরূপ পাবন-শিখায় ।
সে জ্যোতি পশিছে, হের, আজি প্রাণরূপে,
সকল জীবের বুকে নিত্য নব রূপে।
নিখিলের প্রকাশ-ধারায়
সে জ্যোতির রাগ-রেশ চমকিয়া যায়।
তাই আজ সকল মননে,
সকল স্বপনে
•প্রাণের পরশে ভরপূর
বাজে আজি কম্লান্তের কত লুপ্ত সুর
মধুর! মধুর!
১৪৯

নারী
নীরাঙ্গনা
একি মত্ততা হৃদয়ে আমার
একি নেশা প্রাণে, প্রাণে।
হরষ-বিহবল একি এ উচ্ছাস
ছুটেছে কাহার পানে।
ওগাে ভােলানাথ, নাচায়ে পিনাক,
সুরার পেয়ালা ঢাললা;
নব-তাণ্ডবে নাচিয়া নাচিয়া
রূপের ফোয়ারা জ্বালাে।

নারী
তব তপস্যা-তপ্ত প্রাণের
নৃত্যে নাচুক প্রাণ ;
হৃদয়-স্পন্দে বিহ্বল ছন্দে
শিহরি’ উঠুক সাম!
তব নয়নের ঈঙ্গিত-ঘাতে
জ্বলুক নেশার আলা;
শিরায়, শিরায় ছুটুক সুরার
সঞ্চারী শিখমালা।
তব বিহ্বল তাণ্ডব তরে
ওগাে শঙ্কর, ভােলা,
রয়েছে পড়িয়া জীব-হৃদয়ের
সকল দুয়ার খােলা।
নাচো রূপসীর রূপ-যৌবনের
উদার সিংহদ্বারে

নারী
অনুরাগ-ভরা গলিত প্রাণের
বিহবল অভিসারে।
তব কপূর-গৌর দেহের
কান্তি রজত-গলা,
নিখিল জীবের জ্বলুক হৃদয়ে
রূপের অগ্নি-ফলা।
রূক্ষ-পিঙ্গল জটাজুট তব
সেও যে নেশায় সিক্ত ;
স্নেহ মন্দাকিনী ছুটায়ে নিখিলে
এখনাে হয়নি রিক্ত
জগত-জীবন সবুজ ধারায়
মিত্য উঠিছে ভরি’
নেশায় বিহ্বল এই চরাচর
শঙ্কর, তােমায় হেরি'।
১৫২

নাৰী
দিবসে, নিশায় মানবের শিরে
ঢালিছ হে ভূতনাথ।
স্নিগধ-শীতল স্নেহমমতার
তপ্ত মদিরাপাত।
চরাচর ভরি’ যা কিছু মােহন
রঞ্জন, কমনীয়,
সকলেরি শিরে উড়িছে তােমার
গৈরিক উত্তরীয়।
কাপালিক তুমি, চিতার অনলে
করি’ পরিপূত স্নান
তপ্ত শ্মশান-ভস্ম নিঙাড়ি’
ছুটাও প্রেমেরবান।
তুমি অতুলন প্রেমের সাধক,
সিদ্ধ সাধনা তব,
১৫৩

নারী
মৃত প্রেয়সীরে স্কন্ধে চাপায়ে
মেতেছাে নৃত্যে নব ।
প্রাণের, প্রেমের পাবন শিখায়
নবীন যৌবন দানি,
পরপার হতে সতীরে তােমার
বক্ষে এনেছে টানি।
সনাতন সব নেশায় মজিয়া
আজ মৃত্যুঞ্জয় তুমি;
তব নিশ্বাসে হতেছে রচিত
প্রাণের পাবন ভূমি।
সিদ্ধির গহন, সুবিপুল ধূমে
মজাইয়ে আপনায়,
কোথায় উড়ায়ে দিয়েছ তােমার
অপরূপ মন, কায় ।
১৫৪

নারী
এই চরাচর, স্থাবর, জঙ্গম,
অণ্ডজ, জরায়ুজ,
সে নেশার ঘােরে মজায়ে রাখিতে
দিবানিশি শুধু খুজ।
ঢালিছ মুমুর্ষ, জীবনদীপের
শিখায় মুচ্ছতুর,
ক্ষণিক আশার বিলাস-মদিরা
হে মাতাল, তৃষাতুর!
খুঁজিছ বসিয়া কোন্ জীবাণুর
হৃদয়পেয়ালা খালি,
তুলিছ তাহার মৰ্ম্ম পূরিয়া
তপ্ত মদিরা ঢালি।
অপরূপ তুমি মায়াবি! সন্ন্যাসি।
ছেড়েছ সকলি নিজে,
১৫৫

নারী
তবুও নেশার অকূল অতলে
মত্ত রয়েছ কি যে।
সৃষ্টির গােপন গুহায় বসিয়া
কি নেশায় লােভাতুরা,
কেবলি ঢালিছ, ভরিছ আবার
প্রাণপাত্রে পূত সুরা।
একি সুরা শুধু? কিম্বা একি সুধা?
বুঝিনে তােমার মায়া ;
নিখিল ধরণী আবেশে তাহারি
রচে নিত্য নব কায়া।
তাহারি উছল উচ্ছাস-ঘাতে
কত লীলা জ্যোতির্ময়ী
কত রৌদ্রছায়ে সুবিচিত্র হয়ে
জীবন করিছে জয়ী।
১৫৬

নারী
নমি হে শঙ্কর, নমি পুনঃ তব
রূপ-যৌবনের খেলা!
বিপুল নেশায় ডুবাও অতলে
আমার প্রাণের ভেলা।
বিশ্বের অনাদি প্রাণ-সিন্ধু-বুকে
সহস্র ঘুর্ণিপাকে,
ঘুরি, ছুটিব, ডুবিব, ভাসিব
হে শিব, তােমার ডাকে।
আঁখিতে, বাণীতে, রােমকূপে মম
ঝলকি উঠিবে সুরা ;
নিখিল মায়ে বাজিবে হৃদয়ে
নব প্রাণ তানপুরা।
সে সঙ্গীত-রসে রহিবে মজিয়া
এই সৃষ্টি চরাচর;
১৫৭

নারী
আকাশ ছাপিয়া ঝরিবে আনন্দ
কল কল ঝর ঝর।
থাকিব জুড়িয়া সব দেশকাল
গূঢ় অনুভূতি-তলে ;
কত কল্পলোেক ফুটিবে, টুটিবে
প্রাণ-সরিতের জলে
১৫৮

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nari

Author
Not Available
Title
Nari
File name
Nari
Text
OCR done
Citation
1894
Published
2009/11/7
Publisher
Nirajnath Dasgupta,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
162
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Nari
DLI number
512984
Barcode
4990010020005.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
4YCWN5zZFDM
Download PDF

Nari