Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Mahatma Shashthecharan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহাহা ভীতৰণ)
শ্রীদুর্গাবর মজুমদার
শিক্ষক, মিউনিসিপাল উচ্চইংরাজী বিদ্যালয়
প্রণীত।
চট্টগ্রাম।
১৯২৬ইং।
মূল্য আট আনা মাত্র,
No text on this page.
4
样
PS4
No text on this page.
মহাত্মা গাভীচরণ। ভূমিকা। মানব-জীবন ক্ষণভঙ্গুর। জগৎও মলীক। তাহা হইলেও প্রত্যেককে নির্দিষ্ট কাৰ্য্য করিতে হইবে। ভগবান্ নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তিনি সমস্ত কাৰ্য্য গুলি কবাইয়া লন। গৃথিবীতে যখন লােক স্বার্থপর ও ধর্মদ্বেষী হয়, তখন ভগবান স্বমং অবতীর্ণ হন অথবা তাহার ইচ্ছাক্রমে এমন পােক সমুদয় জন্মগ্রহণ করেন, যাঁহাদের, পূত জীবনচরিত আলােচনার দ্বারা জনসাধারণের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়। আমাদের মহাত্মা ষষ্ঠীচরণও এবম্বিজনের অন্যতম। তাঁহার অলােক সামান্য জীবনী পাঠ করিতে করিতে পাঠক মহাশয়গণ বৃষ্টিতে পারিবেন তিনি কতকগুলি সগুণের আদর্শ ছিলন! যে গুণাবলীর দ্বারা অন্বিত হইলে মানুষ মর-জগতে অমরত্ব লাভ করিতে পারে, তাদৃশ অনেকগুলি গুণ তঁাহার ছিল। তিনি যদি চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ না করিয়া কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করিতেন, অথবা কলিকাতার জন্য গ্রহণ না করিয়া লণ্ডন মহানগরীতে জন্মগ্রহণ করিতেন, তাহা হইলে ইয়ােরাপের নিয়মানুসারে তিনি আজ মহাপুরুষদের মধ্যে স্থান পাইতেন। কেহ সাধু বলিতেন, কেহ বিশ্ব প্রেমিক বলিতেন আর কেহ বা মহাত্মা বলিতেন। ভগবানের সৃষ্ট জিনিষ দিয়াই ভগবাকে পূজা করা হয়। আমরাও মহাত্মা ষষ্ঠীচরণের জীবনী আলােচনা করিয়া তাহার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতেছি। গ্রহকার।
উৎসর্গ পত্র । মালাকার কুসুমচয়ন করিয়া মালা প্রস্তুত করে। বাগান হইতে কুসুম চয়ন করা হয়। মালাকারের কৃতিত্ব হইতে যিনি বাগান সাজাইয়া রাখেন তাহার প্রশংসা বেশী। এই জন্যই এই পুস্তকখানা আমি চট্টগ্রামের শিক্ষাগুরু পূর্ণচন্দ্র মজুমদার মহাশয়কে ও তদীয় উপযুক্ত সহধর্মিণী দয়াময়ী দেবী মহাশয়ার হস্তে উৎসর্গ করিলাম। ষষ্ঠীচরণের কনিষ্ঠভ্রাতা পূর্ণ বাবু অনেক যত্ন সহকারে যাচরণের জীবনী সম্বন্ধে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন । তিনি ইংরেজীতে ষষ্ঠীচরণের জীবনীও লিখিয়াছেন। তবে অনেকগুলি কারণে ঐ : পুস্তকের প্রকাশ বর্তমানে স্থগিত রহিল। আমি ঐ পুস্তক হইতে প্রধান প্রধান ঘটনাগুলি । লইয়া এবং ষষ্ঠীচরণের যেসমস্ত পত্রাদি প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহার উপর নির্ভর কুরিয়া আমার এই পুস্তকখানা সাধারণ্যে প্রকাশ করিতে প্রয়াসী হইয়াছি। ইতি— গ্রন্থকার।
মহাত্মা ভীতল। বংশ পরিচয়। প্রায় তিনশত বৎসর পূর্বে যখন ভারতের বিজয়লক্ষ্মী কাহার অঙ্ক শারিনী হইবেন স্থির ছিল না, যখন কি ইংরেজ, *কি হবাটা, কি মােগল, কি আফগান এবং কি ফরাসী প্রত্যেকেই ভারতে প্রাধান্ত স্থাপনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, যখন গৃহবিবাদে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান রাজ্যগুলি ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যাইতেছিল, তখন চন্দননগরের অন্তঃপাতী চিত্রপুর গ্রামের প্রসিন্স দেববংশে মাণিকরাম জন্মগ্রহণ করেন। এই গ্রামের কানস্থ দেব বংশ এক সময়ে বিশেষ সঙ্গতিপন্ন ছিলেন। নাণিক রামের পিতামহ এক জন নায়েব ছিনেন। তিনি অনেক ভূসম্পত্তি অর্জন করেন। কিন্তু মাণিকের পি তা ব্যয় বাহুল্যের দ্বারা সম্পত্তির অধিকাংশ নষ্ট করিয়া ফেলেন। মাণিকরামের পিতা অবশ্য সংস্কৃত ও পারস্য ভাষার বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি পারস্য ভাষায় মুন্সী ছিলেন এবং সংস্কৃত ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। মণিকরান অধ্যায়ের দ্বারা তাঁহার পৈতৃক সম্পত্তির পুনরুদ্ধার করেন এবং নিজে ও কিছু কিছু সম্পত্তি অর্জন করিতে থাকেন। হুগলীর নেজামত আলী মােহাম্মদ খাঁ চট্টগ্রামের নায়েব নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তিনি অনেক বার মাণিকরামের গুণাবলীর পরিচয় পাইয়া- ছিলেন। প্রতিভা থাকিলে তাহা একদিন না একদিন ছড়াইয়া পড়িবে ।
11. উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নব-নিয়ােজিত নায়েব 'অসুবিধায় পড়িলেন। তখন চট্টগ্রামে আসিবার পথ বড়ই দুর্গম ছিল। পথে চোর ডাকাতের ভয়, এpইগ্রামেও কুকী ও মঘের উৎপাত। হিসাব নিকাশের সুবিধার মােহাম্মদ আণী একজন হিন্দু কৰ্ম্মচারীর বিষয় ভাবিতে ভাবিতে মাণিকরামের কথা মনে করিলেন। কি রাজ্য শাসনে, কি যুদ্ধ পরিচাল- নায়, সৰ্ব্ব বিষয়ে মুসলমান নৃপতিগণ হিন্দু মন্ত্রীর সাহায্য গ্রহণ করিতেন। মুসলমান সম্রাটদিগের মধ্যে মহামহিমান্বিত আকবর সাহ, মানসিং ও টোড়র মল্পের বুদ্ধিবলে ও বাহুবলে স্বীয় সাম্রাজ্য সুদৃঢ় রাখিতে সক্ষম ছিলেন। আলী, মাণিকরামের নিকট লােক পাঠাইয়া তাহাকে আনাইলেন। মাণিকরামকে দেখিয়া আলী মােহাম্মদ বলিলেন-আমি বহুবার তােমার গুণাবলীর পরিচয় পাইয়াছি। আমি চট্টগ্রামের নায়েব নিযুক্ত হইয়াছি। তােমাকে আমার সঙ্গে কেরাণী হইয়া যাইতে হইবে। তােনার উজ্জল চক্ষুদ্বয় ও পুশস্ত ললাট দেখিয়া আমার মনে হইতেছে তুমি আমার উপযুক্ত পরামর্শদাতা হইবে। মাণিকরাম এই পস্তাবে সম্মত হইলেন। এবং বাড়ী ফিরিয়া গিয়া তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। ইতঃপূর্বেই মাণিকের মাতা ও পিতা উভয়েই অমরধামে প্রয়াণ করিয়াছিলেন। মাণিক তাহার ছােট ভাইকে কোন রকমে বুঝাইয়া তাহারও অভিমত পাইলেন; তিনি নিজের জন্য সামান্য মাত্র সম্পত্তি রাখিয়া, আর বিষয়াদি তাঁহার ছোট ভাইকে উইল করিয়া দিলেন। তারপর এক শুভদিনে, চণ্ডীচরণ নামে জনৈক পুরোহিত, মদন নামে এক পরমাণিক এবং জয়গােপাল নামে জনৈক ভৃত্য লইয়া ১৬৮৮ সনে, মাণিক চন্দন, নগর হইতে হুগলীতে আসিয়া উপস্থিত হন। তথায়ু আলী মােহাম্মদ (১) ০ ( ৩ ) খাঁ নেজামতের সঙ্গে যা করিয়া যথাসময়ে চট্টগ্রামে উপস্থিত হন। আলী মােহম্মদ ও মাণিক এবং তাঁহাদের সহচরবর্গ কখনও পদব্রজে আর আর কখনও নৌকাযােগে অক্লান্ত পরিশ্রম সহকারে দশদিনে চট্টগ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। আলী মােহাম্মদ চট্টগ্রামে পঁহুছিয়াই মাণিকরামকে খাগড়িয়া প্রভৃতি ১২টী গ্রামের উপর “মজুমদার নিযুক্ত করেন। খাগড়িয়া প্রভৃতি ১২টী গ্রাম এখন সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত। নায়েব, মাণিকরামের কাৰ্য্যে এতদূর সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন যে, তিনি মাণিককে “মজুমদার” হইতে ‘নায়েব দেওয়ানেব” পদে উন্নীত করিয়াছিলেন। এই নব নিয়ােগে মাণিক ১৫টী গ্রামে রাজস্ব উসুল করিবার ভার পাইলেন। এখন হইতে মাণিককে, মাণিকরাম নায়েব দেওয়াঞ্জী বলা হইত। কালক্রমে মাণিকের উপর সন্তুষ্ট হইয়া, নায়েব আলী মােহাম্মদ তাহাকে “রায়” অর্থাৎ জমিদার উপাধিতে ভূষিত করিলেন এবং খাগড়িয়া গ্রাম জায়গীরস্বরূপ দান করিলেন। এখন মাণিকরামকে “রায় মাণিকরাম দেব মজুমদার নায়েব দেওয়ঞ্জিী” বলা হইত। মাণিকম খাগড়িয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করিলেন। তিনি সত্যবতী নাম্নী এক পরমা সুন্দরী রমর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। মাণিকরান একটি সুবৃহৎ পুষ্করিণী খনন করান। ইহার আয়তন প্রায় ছয় কাণি। এই পুষ্করিণীর পশ্চিম পারে তিনি সুবৃহৎ বাড়ী নিৰ্মাণ করাইয়াছিলেন। ঐ পুষ্করিণীকে এখন লােকে “নাণিক রায়ের পুনি” বলে। তাহার নয়টী সুসন্তান জন্মে। তাঁহাদের নাম যথা :- নিধিবর রায়, উদয়বর রায়, ফুলবর, গােবিন্দরাম, ভবানীচরণ, লক্ষণ, শিবরাম, কমলকুমার রায় ও শান্তিরাম রায়। মাণিক রায়ের মৃত্যুর পর, তাহার ছেলেরা বিষয়াদি লইয়া ঝগড়া করিতে লাগিল। এই ( ৫ ) ; নয় জনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান গােবিন্দরাম সংস্কৃত ও পারস্য ভাষার বিশেষ বুৎপন্ন ছিলেন। তিনি শুধু তাহার অংশের অস্থাবর সম্পত্তি লইয়া, চট্টগ্রানের পটীয়া থানার অন্তর্গত সুচক্ৰদণ্ডী গ্রামে চলিয়া আসেন। এই গ্রামে মাণিকরামের কিছু ভূসম্পত্তি ছিল। এই সব সম্পত্তি গােবিন্দরাম দখল করিয়া বসিলেন এবং এই গ্রামে তিনি স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করিলেন। তিনি নবাবী আমলে চট্টগ্রামস্থ খাসমহল আফিসের সেরেস্তাদার ছিলেন। তিনি পটীয়ার নিকটবর্ত্তী কিছু গান সংগ্রহ করিয়া আবাদ কবেন ; ঐ স্থানটি ‘গােবিন্দের খিল' বলিয়া পরিচিত হইয়াছিল। কালক্রমে ‘গােবিন্দের খিলের স্থানে উহা এখন ‘গােবিন্দার খিল' নামে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে। গােবিন্দার খিল’ এখন একটি সুন্দর গ্রাম। এই গােবিন্দরাম পটীয়া থানার অন্তর্গত গুয়াদণ্ডী গ্রামে একটা দীঘী খনন করান। ইহা মজুমদারের দীঘী” নামে খ্যাত হইয়াছে। ষষ্টীচরণ এই গােবিন্দরামের বংশধর। মাণিকরামের পঞ্চম পুত্র ভবানীচরণ ও ষষ্ঠ পুত্র লক্ষ্মণ স্বীয় স্বীয় নামে খাগড়িয়া গ্রামে দীৰ্ষিকা খনন করাইয়া গিয়াছেন। এখনও উক্ত গ্রামে “ভবানী মজুমদারের দীঘী” ও “লখাই বর্তমান থাকিয়া তাহাদের কীত্তি ঘােষণা করিতেছে। মাণিকরামের বংশধরদের মধ্যে বসন্তকুমার রায় ও নরােত্তম রায় এই দুই ভ্রাতা খাগড়িয়া গ্রামে ৩৯০ নং বসন্ত-নরােত্তম তরফ সৃষ্টি করেন। ঐ তরফের বর্তমান নম্বর ৫৬২ মাণিকরামের পুত্রদের মধ্যে যাহারা খাগড়িয়া গ্রামে ছিলেন, তাহাদের বংশ ক্রমশঃ বিস্তৃতিলাভ করিতে লাগিল। কালক্রমে আবার যখুন তাঁদের মধ্যে ঝগড়া আরম্ভ হইল, তখন কয়েকজন তাহাদের পৈত্রিক রাসভূমি চন্দননগরে ফিরিয়া গেলেন। মজুমদারের দীঘী” গােবিন্দরাম এখন বেশ অর্থোপার্জন করিতে লাগিলেন। তাঁহার বন্ধু বান্ধবও বেশ জুটিতে লাগিল। সকালে, বৈকালে তাহার বাড়ীতে লােকের বেশ জমায়েত হইত। হিন্দুর ঘরে প্রচলিত দোল, দুর্গোৎসবাদি তিনি সমারােহের সহিত সম্পাদন করিতেন। কিন্তু লক্ষ্মী "চঞ্চলতাহার মৃত্যুর পর, তদীয় একমাত্র পুত্র মাগনচন্দ্র বিষয় বুদ্ধির অভাবে সমস্ত বিষয় হারাইয়া ফেলিলেন। তখন গত্যন্তর না পাইয়া, গােবিন্দরামের পৌত্র পরশুরাম জনৈক তর্কপঞ্চাননের নিকট কিছুকাল সংস্কৃত ও আয়ুৰ্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া, কবিরাজী ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। তিনি ২৩ বৎসর বয়সে ব্যবসায় আরম্ভ করেন। তিনি প্রায় এক শত বৎসর পরমায়ু লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্র দয়ারাম, দয়ারামের পুত্র অনন্তরাম, অনন্তরামের পুত্র রামপ্রসাদ, রাম- প্রসাদের পুত্র রামবল্লভ এবং রামবল্লভের পুত্র কালিদাস ইহারা সকলেই পুরুষানুক্রমে কবিরাজী ব্যবসায় করিতেন। কালিদাস রামবল্লভের এক মাত্র ছেলে ছিলেন। কালিদাসের পিতামহ রামপ্রসাদের আরও ছয়জন ভাই ছিল। তাহাদের মধ্যে, ইন্দ্রনারায়ণ নামে একজন প্রসিদ্ধ উকিল ছিলেন। কালিদাসের রামলােচন ও ত্রিলােক নামে আরও দুই খুড়তুতে ভাই ছিলেন। কালিদাস অল্প বয়সে মাতাপিতা হারা হইয়া আয়ুৰ্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। কালিদাসকে সময়ে সময়ে অধ্যাপকের বাড়ীতে রান্না ও করিতে হইত। কালিদাস অধ্যাপকের বাড়ীতে শুধু খােরাকী পাইতেন। বাড়ী থেকে কিছুই পাইতেন না। কাজেই তাহার পােষাকাদির জন্য তিনি পুথিগুলি নকল করিয়া বিক্রয় করিতেন। তাহাতে তাহার হাত খরচ চলিয়া যাইত । তঁাহার হস্তাক্ষরও সুন্দর ছিল। এখনও তাহার বংশধরদের নিকট তাহার হস্তলিখিত অনেক পুথি আছে। ২২ বৎসর বসে কালিদাস দেশে ফিরিয়া আসিলেন।
। তিনি বাড়ীতে উপস্থিত হইবামাত্রই রামলােচন তাহাকে কর্জের একটা মিথ্যা হিসাব দিলেন। কিন্তু এই দিকে রামলােচন শ্বশুরের নামে উচ্চহারে মহাজনি করিতেন এই কথাও কালিদাস জানিতে পারিলেন। জানিয়াও কিছু বলিলেন না। রামলােচন কালিদাস হইতে বয়সে ছয় মাসের ছােট ছিলেন। রামলােচন পাড়ার প্রধান প্রধান লােক জনকে ডাকাইয়া সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সমান তিনভাগ করিলেন। কালিদাস স্বীয় ভাগের সম্পত্তি আবার তিন ভাগ করিয়া, দুই ভাগ দ্বারা তাহার ও ত্রিলােকের অংশের ঋণ শােধ করিলেন এবং অপর একভাগও ত্রিলোককে দান করিলেন। তাহার এই নিঃস্বার্থ দানে দেবােপম চরিত্রে সকলেই বিস্মিত হইলেন। কালিদাস তাহার অধ্যাপকের আশীৰ্বাদ স্মরণ করিয়া, পৈত্রিক কয়েকখানা পূথি মাত্র সম্বল লইয়া পৈত্রিক কবিরাজী ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। তঁাহার সরলতা ও দানের অনেক গল্প সুচক্রদণ্ডী গ্রামে প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে নিম্নে একটি উদ্ধৃত করিতেছি। সুচক্রদণ্ডী গ্রামের জনৈক ব্রাহ্মণের বাড়ীতে তিনি দ্বিপ্রহরে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ কালিদাসের নিকট অপূর্ণ লােচলে একটি কাঠের সিন্দুক চাহিলেন। পাঠকবর্গ জানেন. কালিদাস দানপত্র করিয়া সমস্ত সম্পত্তি ছাড়িয়া দিয়াছেন। তথাপি ব্রাহ্মণের চোখে জল দেখিয়া তখন তখন বাড়ীতে আসিলেন। বাড়ীতে আসিয়া তিনি পনর টাকা কোন রকমে সংগ্রহ করিয়া ব্রাহ্মণকে দিলেন। ব্রাহ্মণ ও সন্তুষ্ট হইয়া, দুই হাত তুলিয়া কালিদাসকে আশীর্বাদ করিতে লাগিলেন। তার পর ২১ দিন পরে কালিদাস পুথিগুলি লইয়া মুখে “শ্রীদুর্গা” “শ্রীদুর্গা” বলিতে বলিতে ত্রিলােকের মাতার পদধুলি গ্রহণ করিয়া বিষ্ণুমণ্ডপের চতুর্দিকে সাতবার ঘুরিয়া, এবং প্রতিবার ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া ভিন্ন গ্রামে কবিরাজী করিতে বহির্গত হইলেন। কালিদাস এখন পথের ভিখারী। একমাত্র কবিরাজী ব্যবসায়ই সম্বল। বাড়ী নাই। বিষয় সম্পদ কিছুই নাই। আছে কেবল ধৰ্ম্মে মতি; আর হৃদয়ে সরলতা। ভগবানের আশীর্বাদে কালিদাস অল্প সময়ের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিলেন এবং যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতে লাগিলেন। জগদীশ বিশ্বাস নামে সুচক্রদীর জনৈক কায়স্থ তদ্রলােক, কলিদাসের গুণপনার কথা শুনিয়া, তাহাকে তাঁহার প্রিয়ব্রতী নামী পরমাসুন্দরী কন্যা সম্প্রদান করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। কালিদাসও তাহাতে সম্মতি প্রদান করিলেন। কোন এক শুভ দিনে বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা হইয়া গেল। কালিদাসও সুচক্র দীর মধ্যভাগে জগদীশ বিশ্বাসের বাড়ীর উত্তর দিকে এক মনােজ্ঞ বাড়ী তৈয়ার করিলেন। প্রিয়ব্রতী অশেষ গুণবতী ছিলেন। তিনি শৈশবে মাতা পিতার আদরের পাত্র ছিলেন। তাহার সমবয়স্কা স্বালােকেরা তাঁহাকে বড় প্রীতির চক্ষে দেখিতেন। তিনি রন্ধন কার্যে , পরিবেশনে অন্নপূর্ণা সনা ছিলেন। স্থূণ কথায় প্রিয়ব্রতী কয়েক গ্রামের মধ্যে 'আদর্শ রমণী ছিলেন। এই বিবাহে কালিদাস কিছু ভূসম্পত্তি ও যৌতুকস্বরূপ পাইয়াছিলেন। কালিদাক্ষের সদগুণের কালিদাল্পে সদগুণের পরিচয় আমরা পূৰ্বেই পাইয়াছি। বিবাহের পর হইতে অর্থাগমের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দোল দুর্গোৎসবাদিতে বিশেষ অর্থ ব্যয় করিতে লাগিলেন। দেব দ্বিজে তাহার অচলা ভক্তি ছিল। তিনি স্বীয় গ্রামে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করিতেন এবং ভিন্ন গ্রামের ও ব্রাহ্মণ, দরিদ্র ব্যক্তি এবং স্কুলের ছাদিগের নিকট হইতে অর্থ লইতেন না। তিনি প্রতিমাসে যত টাকা উপার্জন করিতেন, তত আনা পয়সা গরীব ছাত্রদিগের মাহিয়ানা স্বরুপ দান করিতেন। কথিত আছে, দেবতা ও ব্রাহ্মণকে কোন জিনিষ নিবেদন না করিয়া তিনি তাহা খাইতেন না। চড়কপূজা উপলক্ষে, ১লা বৈশাখে, তিনি একটি মেলার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। তাই এখনও বর্তমান আছে। তিনি “জয়লাকুমারীর মন্দির স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। তঁাহাব প্রণীত “বেতাল পঞ্চবিংশতি” ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে কলিকাতা ‘সাহিত্য পরিষদ্ মন্দির’ হইতে প্রকাশিত ও সমালােচিত হইয়াছে। পুস্তকখানি কালিদাস বৈদ্য কৃত” বলিয়া লিখিত আছে। কালিদাস কবিরাজী ব্যবসায় কবিতেন, তজ্জন্য দেশে নি কালিদাস বৈদ্য নামে সুপরিচিত ছিলেন। এখনও তাঁহার বংশধরগণের নামের সঙ্গে ‘বৈদ্য’ শব্দ যােগ করা হয়। দেব’ এই বংশের কুলগত উপাধি মজুমদার নবাব প্রদত্ত উপাধি ; বৈদ্য’ ইহাদের ব্যবসায়গত উপাধি। জন্ম ও বাল্যকাল । বৎসরের পর বংসা করিয়া বৎসর চলিয়া গেল। কিন্তু প্রিয়ব্রতীর কোন সন্তান জন্মিল না। প্রিয়ব্রতীর মাতা ইহাতে বড়ই দুঃখিতা ছিলেন। তিনি দেবচ্চিনাদি ও মানতাদিতে যথেষ্ঠ পয়সা ব্যয় কবিলেন, কিন্তু কোন ফলােদয় হইল না। শেষে প্রিয়ব্রতীর মত হত,শের শ্বাস ফেলিতে ফেলতে চণ্ডীমণ্ডপের নিকট গিয়া চণ্ডীনার নিকট কান্দিয়া ফেলিলেন। সেই দিন ১লা বৈশাখ। তিনি মানত করিলেন-“যদি প্রিয়ব্রতীর গর্ভে এক বৎসরের মধ্যে কোন সুসন্তান জন্মে তাহা হইলে অামি শিব ও গৌরীর আরাধনা করিব।” বলা বাহুল্য সেই বাত্রেই গর্ভের সঞ্চার হইল। সেই দিন প্রিয়ব্রতীর ঋতু স্নানের পর বন্ধু দিবস। দেখিতে দেখিতে প্রিয় তীর সমস্ত দোহদলক্ষ প্রকাশ পাইল। প্রিয়ব্রতীর, মাতার এখন আনন্দ উছলিয়া পড়িতে লাগিল। ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দের ৬ই চৈত্র রাত্রি ৯ ঘটিকার সময় ষষ্ঠীচরণ ভূমিষ্ঠ হন। এই দিন চট্টগ্রামের একটি গৌরবের দিন। ১লা বৈশাখে চড়ক পূজা হইল। মেলা বসিল। এখনও ঐ পূজা ও মেলা চলিয়া আসিতেছে। কালিদাসের বাড়ীতে আর আনন্দ ধরে না। এক সপ্তাহ ধরিয়া উৎসব চলিতে লাগিল। জ্যোতির্বিদ পণ্ডিতেরা শিশু ষষ্ঠীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদির লক্ষণাদি দেখিয়া ও কোষ্ঠি বিচার করিয়া বলিলেন—এই শিশু একদিন দিকপাল হইবে। শিশুর বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সকলেই তাহাকে কোলে লইয়া খেলা করিতে লাগিল। ৬ই মাসে অন্নপ্রাশন, উৎসব সম্পাদিত হইল। তার কিছুকাল পরে হামাগুড়ি দিতে লাগিল ও অস্ফুট ভাবে কত শব্দ উচ্চারণ করিত। ইহাতে সকলেই আনন্দ পাইত। পঞ্চম বৎসর বয়সে যষ্ঠীচরণের হাতে খড়ি দেওয়া হইল। অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে যষ্ঠীচরণ পাঠশালার পড়া সমাপ্ত কহিলেন। তারপর জনৈক মুসলমান মৌলবীর নিকট পারত ভাষা শিক্ষা করিতেন। কিন্তু উক্ত মৌলভী যাহা তাহা গালাগালি করিতেন বলিয়া এবং মূল বিষয়ের বিপরীত অর্থ বুঝাইছেন বলির ষষ্ঠীচরণ পার ভাষা আর অধিক দিন না পড়িয়া সংস্কৃত ভাষা পড়িতে লাগিলেন এবং আয়ুর্বেদ শস্ত্রও আলােচনা করিতে লাগিলেন । ছেলে বেলায় তাহার নিকট যথেষ্ট গোঁড়ানি ছিল। তিনি একগুয়েও ছিলেন। ছেলে বেলার এই রদ্ধভাব তাহার উত্তর কালে সৎসাহসে পরিণত হইয়াছিল। এই সৎসাহসের গুণে তিনি অমরনাথ হইতে কুমারিকা, এবং পুরী হইতে সােমনাথ ( ১ ) সৰ্বত্ৰ একাকী পরিভ্রমণ করিয়াছিলে। এই সৎসাহসের বলেই, তিনি ভারতবর্ষের অনেক রাজন্যবর্গের অধীনে গৃহচিকিৎসকের কার্য করিতে পারিয়াছিলেন। সর্বশেষে তিনি ভূস্বর্গ কাশ্মীরের স্বাধীন নরপতি রণবীর সিংহের গৃহচিকিৎসক ও এ, ডি, 'কং (নৰ্ম্মসচিব) হইয়াছিলেন। ছেলে বেলায় এক দিন তাঁহার দুই জন বাল্য বন্ধু আসিয়া তাহাকে কোন একটি বিষয় মীমাংসা করিতে বলেন। তিনি মীমাংসা করিয়া দিলেন। তাহার মীমাংসা মত কাৰ্য্য করিতে একজন অস্বীকার করিলেন । ইহাতে তিনি রাগান্ধ হইয়া কাংস্য পাত্র নিক্ষেপ করেন। ইহাতে উক্ত বন্ধুর দক্ষিণ পায়ের গোড়ালি কাটিয়া যায়। যষ্ঠীচরণ এই অপরাধের জন্য বিশেষ ভাবে তিরস্কৃত হইয়াছিলেন। আর এক দিন ছেলে বেলায় কয়েকজন বন্ধুকে লইয়া একটা বড় পুকুরে সাঁতার কাটিতে গিয়াছিলেন। সকলেই কিছুদূর অগ্রসর হইয়া আবার ফিরিয়া আসিলেন ; কিন্তু তিনি কিছুতেই ফিরিলেন না; এবং সকলের বিস্ময় জন্মাইয়া পুকুরের অপর পারে সাঁতার কাটিয়া উপস্থিত হইলেন। এবম্বিধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্প হইতে আমরা ষষ্ঠীচরণের মনের দৃঢ়তা ও সৎসাহসের পরিচয় পাই। ১১ বৎসর বয়ঃক্রম কালে তিনি কবিরাজী করিবাব উপযােগী শিক্ষা পাইয়াছিলেন। তিনি ১২ (বার) বৎসর বয়সে “জয়মঙ্গলচণ্ডীর পাঁচালী” প্রণয়ন করিয়াছিলেন। শৈশবেও আমরা তাহার প্রতিভার পরিচয় পাই । প্রিয়ব্রতীর তার আয়ুষ্কাণ পূর্ণ হইয়া আসিতেছিল। ষষ্ঠীচরণকে বিবাহ করাইতে তাহার বলবতী ইচ্ছা হইল। প্রথমে কালিদাস ও ভদীয় পত্নী মত দিয়াছিলেন না। শেষে বাধ্য হইয়া মত দিলেন। ষষ্টীচরণের যখন বিবাহ হয়, তখন তাহার বয়স ১১ বৎসর ও তদীয় পত্নী সুপার বয়স ছিল ৬ বৎসর। বিবাহের পর ষষ্টীচরণ আরও • কিছুকাল কবিরাজী শিক্ষা করিয়াছিলেন এবং সংস্কৃত সাহিত্যও পড়িতেন। কালিদাসের আরও পাঁচটী সন্তান জন্মিয়াছিল। সাংসারিক খরচ অনেক বাড়িয়া গিয়াছিল। কাজেই কালিদাস একা সংসারের খরচ নিৰ্বাহ করিতে বেগ পাইতেন। তিনি মৃষ্ঠীচরণকে কবিরাজী ব্যবসায় করিতে আদেশ দিলেন। ষষ্ঠীচরণও চট্টগ্রাম সহরে ব্যবসায় আরম্ভ করেন। চট্টগ্রাম শহরে তিনি কিছুকাল তত্ৰত্য জজ আদালতের প্রসিদ্ধ, পূত চরিত্র ও সাধুহৃদয় উকিল গােলকচন্দ্র নন্দীর বাসায় ছিলেন। ইনি গােলক পেষ্কার নামেই বেশী সুপরিচিত। এইখানে ষষ্ঠীচরণ বেশ আয় করিতে লাগিলেন। অল্পকালের মধ্যেই যীচরণ চট্টগ্রামের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিরাজ হইয়াছিলেন। চট্টগ্রাম সহরে ব্যবসায় উপলক্ষে অবস্থান। চট্টগ্রাম সহরে ষষ্ঠীচরণ অনেক টাকা উপার্জন করিলেও তিনি তাঁহার পিতাকে বিশেষ সাহায্য করিতে পারিতেন না; কারণ সাধু, সন্ন্যাসী ও ফকিরকে তিনি সমস্ত টাকা দান করিয়া ফেলিতেন। তাঁহার সৌভাগ্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দানের কাৰ্য বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাইয়াছিল। তাহার এই ধারণা ছিল যে, যতক্ষণ তিনি দান করিতে করিতে রিক্তহস্ত না হইবেন, কতক্ষণ তাঁহার মুন সূত্রে ( ১২ ) '। অর্থাগম হইবে না। ইহার ভূরি ভূরি প্রমাণ তিনি স্বীয় জীবনে পাইয়াছিলেন ষষ্ঠী চরণের আয় বৃদ্ধি হইল বটে, কিন্তু কালিদাসের সাংসারিক অবস্থার কোন উন্নতি হইল না। যষ্ঠীচরণ সাধু সন্ন্যাসীদিগকে “য়-দেবতা জ্ঞানে পূজা করিতেন। তাঁহার বিশ্বাস ছিল, সাধুদের আশীর্বাদে তাহার উন্নতি অবশ্য- ম্ভাবী। পিতার অর্থাভাব দূর করিবার জন্য তিনি ওকাতি পরীক্ষা দিবার ই করিলেন। তখন উকিলের সংখগ খুব কম ছিল। উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্যতীত আর কেহ লেখা পড়া করিত না। সকলেই স্বীয় স্বীয় কার্যে সন্তুষ্ট থাকিত। বর্তমানের ন্যায় তখন অন্নকষ্ট ছিল না। অতিথিকে তখন দেবতাজ্ঞানে পূজা করা হইত। সাতা তপন সর্বত্র বিবাজ করি ত। বিলাসিতা ছিল না। (মাটা ভাত কাপড়ে দিন কাটাইত। ষষ্ঠীচষণের পরীক্ষার দিন নিকটবর্তী হইল। শষ্ঠাচ 1ণ বিশেষভাবে পরিশ্রম করিয়া পড়িতে লাগিলেন। তখন কলিকাতার সুপ্রিম কোর্টের জজ বাহাদুর ৮১০ টি প্রশ্ন করিয়া জেলা জজেব টি পাঠাইয়া দিতেন। জৈলা জজ পরীক্ষার্থীদিগকে ডাকাইয়া লেখা পরীক্ষা নিতেন। তখন শতকরা ৯ জনের উপর পাশ হইত । সেই বারের পরীক্ষক জেলা জব্দ অষ্ঠীচরণ. এক বৎসর পূর্বে জজ বাহাদুরকে 'কাঙ্গা ( (jatraia রোগ হইতে আরােগ্য লাভ করান। ষষ্ঠীচরণ ওকালতী পরীক্ষা পাকরিলেন। পরীক্ষা পাশ করিলেন বটে, কিন্তু একদিনও ওকালতী না করিয়া, পুনরায় স্বীয় পৈত্রিক ব্যবসায় কবিরাজী আরম্ভ করিলেন। যখন তাহার বয়স ২৩ বৎসর, তখন তিনি ভারত বর্ষের রাজধানী কলিকাতা নগরী দেখিতে ইচ্ছা করিলেন। তাঁহার মাতা পিতার অজ্ঞাতসারে তিনি বুলব্রাদার্সের কোন জাহাজে করিয়া কলিকাতায় উপস্থিত হইলেন। তিনি কলিকাতায় পঁহুছিয়াই চট্টগ্রামস্থ লয়াপাড়া গ্রাম নিবাসী যাত্ৰামােহন বিশ্বাসের ভবানীপুরস্থ বাসায় উপস্থিত ( ১৩ ) হইলেন। দুই জনের মধ্যে পূৰ্ব্বে কখনও পরিচয় ছিল না, তথাপি হঠাৎ দেখা হইবা মাত্র দুই জন, দুই জনের প্রতি বড়ই আকৃষ্ট হইলেন। দুই জনেই শ্ৰীশ্ৰীজয়কালী: বাড়ীতে গিয়া, গঙ্গার জল হাতে নিয়া আজীবন বন্ধুভাৰে থাকিবেন বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন। এই দিকে ষষ্ঠীচরণের পলায়নের সংবাদ যখন বাড়ী দেছিল, তখন সকলেই দুঃখে কান্দিয়া ফেলিলেন। যষ্ঠীচরণের পিতা কালিদাস ও কান্দিয়া ফেলিলেন। প্রিয়ব্রতী ও তাহার না মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করিবেন বলিয়া মানত কনিলেন। বাড়ীতে কান্নার রােল পড়িয়া গেল। এক মাস সকলেই মনঃকষ্টে ও নানা দুশ্চিন্তায় কইলেন । এক মাস পরে কালি দাসের নামে একখানা বেয়ারীং আসিয়া উপস্থিত হইল। চিঠি খান। যষ্ঠীচরণের নিজের হাতের লেখা। ঘঠীচরণের হাতের লেখা দেখিয়া কালিদাস ও পরিবারস্থ সকলে বিশেষ আন্দিত হইলেন। ষষ্ঠীচরণকে আনিবার জন্য লােক পাঠান হইল। ষষ্ঠীচরণ অনিচ্ছা সত্ত্বে বাড়ী আসিলেন। সকলেই আনন্দিত হানে। শষ্ঠীচরণ বিশ বৎসর বয়সে চট্টগ্রামস্থ কানুনগো পাড়ার ডেপুট কালেক্টর গোলক কানুনগো মহাশয়কে চিকিৎসা করিবার জন্য উক্ত গ্রামে যাইতেছিলেন। সুচক্ৰদণ্ডী হইতে ঐ গ্রাম ৭ মাইল উত্তরে। কানুনগাে মহাশয়ের বাড়ীর নিকট পুকুরের ঘাটে ১৩ বৎসরের সুন্দরী মেয়েকে দেখিলেন। তাহাকে দেখিয়া যুবক কবিরাজের মন আকৃষ্ট হইয়াছিল। তিনি উক্ত কানুনগাে মহাশয়কে এক সপ্তাহ চিকিৎসা করিরা আরােগ্য লাভ করান। ঐ গ্রামে তাঁহার একজন পরিচিত লােক ছিলেন। ঐ বন্ধুর নিকট ষষ্ঠীচরণ মেয়েটীর সম্বন্ধে সবিশেষ জানিতে পারি সন্তুষ্ট হইলেন। মেয়েটার নাম কাশীশ্বরী, বয়স ১৩ বৎসর, দেখিতে সুন্দরী, কাৰ্য্যে নিপুণা এবং জনৈক মধ্যবিদ কায়স্থ ভদ্রলােকের মেয়ে। কর্মস্থলে একটি
( ১৪ .}
ফিরিয়া আসিয়া যষ্ঠীচরণ দিনরাত কাশীশ্বরীর কথা ভাবিতে লাগিলেন।
মনের চঞ্চলতা বৃদ্ধি পাইল। এই চঞ্চলতা দূর করিবার জন্য ষষ্ঠীচরণ
অনেকগুলি কবিতা লিখিয়াছিলেন। নিম্নে একটা উৰ্দ্ধত করা হইল :-
কণকবরণী, যেন সৌদামিনী, কোমল শরীর আভা।
শশাঙ্ক রঙ্গিনী, জিনি কলিনী, শ্রীমুখ মণ্ডল প্রভা।
দস্ত মুক্তামালা, দাড়িম্ব শৃঙ্খলা, মধ্যে মধ্যে নীলমণি।
সহাস্য পলকে, অলকা ঝলকে, রঞ্জিত রক্ত নলিনী।
ভালে ভালে ইন্দু, সিদুরের বিন্দু, তাহে দীপ্তি মনােহর।
গৃধ্র জিনি কর্ণ, বেক্তিবর্ণ, শিমূলের দর্পহরা।
সুন্দর কবরী, শােভে শিরােপরি, সুবন্ধ নাগবন্ধন।
হৃদয় মন্দিরে, স্বর্ণকুট্টোপরে, নীলমণি সুদর্শন।
মৃণাল নিন্দিত, অতি সুশােভিত, ভূজযুগ সুগঠন।
জিনি চাপা কলি, অঙ্গুলি সকলি, নখরে তারকাগণ।
সুচারু উদরে, নাভি সরােবরে, সুসজ্জিত রােমশ্রেণী ;
লজ্জিত কেশরী, ক্ষীণ কটি হেরি, অতিগুরু নিতম্বিনী।
অয়ি রূপেশ্বরী, মম প্রাণেশ্বরী, কাশীশ্বরী, গুণেশ্বরী।
পতিপ্রাণা সতী, ধাম্মিকা সুমতি, মম শুভ সুখ করি ।
ইত্যাদি।
=
অবশ্য কাশীশ্বরী সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু উপরিউক্ত কবিতায়
কল্পনার আতিশা আছে। ষষ্ঠীচরণ আজীবন বঙ্গভাষার সেবা করিয়া-
ছিলেন। তাঁহার ভিতর যে কবিত্ব শক্তি ছিল, তাহা সুযােগের অভাবে
বিকাশপ্রাপ্ত হয় নাই। নানা অসুবিধার মধ্যে পড়িয়া ও ষষ্ঠীচরণ
সাহিত্য সেবা হইতে বিরত হন নাই। তিনি অনেকগুলি যাত্রার পালা
( ১৫ ) ও অনেক শ্যামা সঙ্গীত রচনা করিয়াছিলেন। তাহার সমস্ত গ্রন্থাবলী পুস্তকাকারে ছাঁপাইলে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার অধিক হইত। এই পুস্তকে শুধু কয়েকটা গান উদ্ধত করা যাইবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ষষ্ঠীচরণ কাশীশ্বরীর পাণিগ্রহণ করিলেন এবং প্রকৃতিস্থ হইলেন। ষষ্ঠীচরণের প্রথমা পত্নী সুরূপার গর্ভে ইতিমধ্যে দুইটা মেয়ে ও একটা সুসন্তান জন্মিয়াছিল। কিন্তু পুত্র সন্তানটী অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে মারা যায়। ষষ্ঠীচরণের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ও বঙ্গভাষার সেবা। ষষ্ঠীচরণ প্রায় দুইবৎসর তদীয় পত্নী কাশীশ্বরীর সঙ্গে কাটাইলেন। তারপর তাহার অসুখ হয়। চট্টগ্রাম সহরে যে তাঁহার বিপুল প্রসার ছিল তাহাও নষ্ট হইয়া গেল। তিনি জীবনের আশা বিশেষ করিলেন ক্রমশঃ শরীর নিস্তেজ হইতে লাগিল। মানসিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইল। তিনি মনে স্ফত্তি রাখিবার জন্য যাত্রাদল গঠন করিলেন এবং অনেকগুলি যাত্রা নিজে প্রণয়ন করিয়াছিলেন। কবিরাজী শাস্ত্রে ষষ্ঠীচরণ যে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। বাংলা ভাষার প্রতি ও তাহার অসাধারণ অনুরাগ ছিল। তিনি বাঙ্গলা ভাষায় নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলি প্রণয়ন করিয়াছিলেন :-জয় মঙ্গলচণ্ডীর পাঁচালী, উষাহরণ, শনি-চরিত, শুকাখ্যান লহরী, সদাসী সখীদাস-বৈষ্ণবের সং (প্রহসন), ভদী বিদ্যানিধির সং (প্রহসনং) সীতা- রাম-সম্মিলন ও ঐবৎস উপাখ্যান। এতদ্ভিন্ন তিনি হিন্দি ভাষায়
“মােগলানী নুরজাহানের সং” নামে একখানাপ্রহসন ও লিখিয়াছেন।
এই পুস্তকে সাম্রাজ্ঞী নুরজাহানের বিষয়ই আলােচিত হইয়াছে। এই
পুস্তক পাঠ করিলে হিন্দি ভাষায় যে ষষ্ঠীচরণের বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল
তাহ অবগত হওয়া যায়। তাহার রচিত কয়েকটী শ্যামাসঙ্গীত
আমার নিকট সগৃহীত আছে ; তন্মধ্যে কয়েকটী সঙ্গীত নিম্নে উদ্ধৃত
হইল।
[ ১ ]
রাগ বয়ােয়া ; আড়াঠেকা।
আমার কি হবে কালিকে।
জীবন যাত্রা শুত মাগাে কবি আজি কালিকে ।
মজে বিষয়সম্পদে
ভজিলেন ঐ পদে,
ডুবিলেম ঘাের বিপদে নৃমুণ্ড মালিকে।
এভবসিন্ধু অকূল ভেসে মা পাইনে কূল।
কূল-কুণ্ডলিনী কল দেও ইন্দুভালিকে |
প্রাণ যায়গাে সন্তরী পেলে মা চবণ-তরী
শ্ৰীষষ্ঠচরণ তরি ত্রিলােক-পালিকে ।
মা গাে ব্রহ্মময়ি সারাৎসারা !
ত্বং হি বিশ্বরূপা
ওহে চিৎস্বরূপ
নিরাকাবাকারা সাকারাকারা | ১
অনন্ত অদ্বৈত ত্বং হি বিশ্বমূলাধারা
স্থল সূক্ষ্ম মােক্ষরূপা বিরাট আকারা।
ত্রিগুণ পূরিত ত্রিগুণ জড়িত
ত্রি গুণ বহিত হে নির্বিকারা
( ১৭ )
---
রাগ x তাল ধ্রুপদ।
নমামি তারিণী তাবা!
এ দীনে তার গাে ওমা!
সুখমােক্ষ প্রদায়িনী,
ভৈরবী ভবানী ভীমা।
হরহৃদিলাসিনী, চামুণ্ডে মুণ্ড মালিনী,
যােগারাধ্যে, মহাবিদ্যে,
উমেশ মােহিনী উমা
সৰ্বানী গীৰ্বানী বাণী, নির্বাণ গুণ দায়িনী,
শ্ৰীষষ্ঠীচরণে কৃপা করগাে ঈশ্বরী শ্যামা।
কালিদাস তাহার বাড়ীর সামনে জ্বালাকুমারীর মন্দির প্রতিষ্ঠা কবিয়া-
ছিলেন। সেই মন্দিরের নিকটে ষষ্ঠীচরণ তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণচন্দ্রের
শিক্ষার জন্য একটি পাঠশালা স্থাপন করেন। কালক্রমে ঐ পাঠশালা
মধ্যবাংলা স্কুলে পরিণত হয়। শেষে সার্কেল স্কুলেও পরিণত
হইয়াছিল। ঢাকা নিবাসী রামেশ্বব চৌধুরী এই স্কুলের প্রধান প তের
পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ইনি সংসার ত্যাগী ছিলেন। শুধু গ্রাসাচ্ছা-
দনের জন্য চাকুরী করিতেন। তিনি গৈরিক
গৈরিক বসনে পবিত
থাকিতেন। তাহার হাতে সেতারও থাকিত।
তিনি গভীর রাত্রে
সুচক্ৰদণ্ডীর উত্তর প্রান্তে প্রসিদ্ধ ধনপােতা সেবা খােলায় ধ্যানে নিমগ্ন
থাকিতেন। ষষ্ঠীচরণ এই বিষয় অবগত হইয়া দুইজন বন্ধু সমভি-
ব্যহারে ঐ স্থানে গেলেন এবং রামেশ্বর চৌধুরী হইতে কিছুদূরে
উপবেশন করিলেন। ঐ স্থানের মাহাত্মে ও রজনী নিস্তব্ধতায়
ষষ্ঠীচরণের মন আনন্দে ও ভক্তিরসে আপ্লুত হইয়া উঠিল। তিনি স্বরচিত
একটি গান তখন নিস্তব্ধতা ভগ্ন করিয়া গাহিলেন :-
১৮ )
নমাে নমাে নম, পুরুষ উত্তম,
ওহে নিরঞ্জন! তব কৃপা অপার ।
তুমি চিত, নিত্য, এই ভবে সত্য,
ওরে চিত্ত। নিত্য সত্য কর সার।
অপথীর গতি, অকর্ণীর শ্রুতি,
অচক্ষীর প্রতি দৃষ্টি আছে যার।
যার মায়াখণ্ড, হয় এ ব্ৰহ্মাণ্ড,
বিশ্বব্যাপি যিনি চিন্ময় আকার।
সত্ব রজঃ, তম, ত্রিগুণ জড়িত,
তন্ময় শিকৎপরম পৃজিত
বট তেজ স্থল, অমল, অচল,
দীন ষষ্ঠী এবে ধ্যান কবে তার।
এই গান শেষ হইলে ষষ্ঠীচরণ ও তাহার বন্ধুদ্বয় বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন।
২১ মাসের মধ্যে কবিরাজ মহাশয় সম্পূর্ণ আরােগ্য লাভ করিলেন।
ষষ্ঠীচরণ নিজে আরােগ্য লাভ করিলেন। কিন্তু তাহাব মাতা
প্রিয়ব্রতী তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। প্রিয়ব্রতী তাহার মাতা খুলনাকে
শােকসংববণ করিতে বলিলেন। তঁাহার দৌহিবগণকে আশীৰ্বাদ কবিতে
বলিলেন। তারপর প্রিয়ব্রতী ছেলেগণকে ডাকাইলেন এব দশরথ
পুত্রগণের মত চলিতে উপদেশ দিলেন।
তারপর পুত্রবধুগণকে ডাকাইলেন। তাহাদিগকে তিনি বলিলেন -
তােমবা সহােদরার ন্যায় চলিও, আর আমার কনিষ্ঠপুত্র পূর্ণকে দেখিও।
সৰ্বশেষে প্রিয়তী সকলকে সরাইয়া দিয়া তাহার স্বামীকে ডাকাইলেন।
কালিদাস উপস্থিত হইলে প্রিয়ব্রতী তঁাহার চরণধূলি নিলেন। প্রিয়ব্রতী
( ১৯ ) বলিলেন-যদি জ্ঞাতসাবে বা অজ্ঞাতসারে কোন অপরাধ করিয়া থাকি তজ্জন্য ক্ষমা চাই। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার প্রাণ নির্গত না হয়, ততক্ষণ পৰ্য্যন্ত আপনার পদযুগল আমার মাথাব উপরে রাখুন। কালিদায় ও তাহাই করিলেন এবং বলিলেন—তুমি আগে চলিয়াছ। আমি পরে আসিতেছি। তুমি শান্তমনে অমরধামে প্রয়াণ কর। মাতৃবিয়ােগ প্রিয়ব্রতীর ঔদ্ধদৈহিক কার্ধ যথাৰীতি সম্পন্ন করা হইয়াছিল। “চন্দনধেনু ক্রিয়া সম্পাদন করা হইয়াছিল। ইহাতে ষষ্ঠীচরণ ঋণগ্রস্ত হা পড়েন । ৬ মাস পরে প্রিয়ব্রতীর ম৷ তা খুলনা ও মানবলীলা সংবণ করেন। শ্রাদ্ধাদি ব্যাপারে আরও কিছু টাকা ধার হয়। মােট ১৫০০ দেড় হাজার টাকা ধার । ষষ্ঠীচরণ তাহার কৰ্ম্মস্থলে চলিয়া গেলেন। কালিদাস স্বীয় আয়ের দ্বারা পরিবারের খবচ নিৰ্বাহ করিয়া ঋণ শােধ মােটেই করিতে পারিতেন না। কালিদাসের চাবি পুত্র ও একটি মেয়ে। ষষ্ঠীচরণ ১ম, নীলাম্বর ২য়, দিগম্বব ৩য় ও পূর্ণানন্দ ৪র্থ ও সৰ্ব্ব কনিষ্ঠ। পূর্ণচন্দ্র ব্যতীত আর সকলের বিবাহ হইয়াছিল। যষ্ঠীচবণ ও নীলাম্বরের ছেলেমেয়ে ও হইয়াছিল । কালিদাসের একমাত্র মেয়ে অনঙ্গমঞ্জুরীর বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। বাড়ীতে পরিবাবস্থ লােক সংখ্যা ছিল ২০ জনের উপর। কালিদাস বড় চিন্তায় পড়িলেন। নীলাম্বর বৈষয়িক ছিলেন। छिनि थाना বাসনাদি বিক্রয় করিয়া কতক ঋণ শােধ দিলেন। তিনি অলঙ্কারাদি
( ২০ )
বিক্রয় করিয়া আর কতেক ঋণ শােধ করিতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু
ষষ্ঠীচরণ তাহাতে বাধা দিলেন। কাজেই অর্ধেকের ও উপর ঋণ
শােধ করা হইল না। ষষ্ঠীচরণ একদিন কয়েকজন বন্ধুর সহিত চট্টগ্রাম
গোলপাহাড়ের শিখর দেশে বনভােজনে গিয়াছিলেন। সকলের মনে
আনন্দ ;
কিন্তু ষষ্ঠীচরণের মন আন্দোলিত। তিনি উত্তরাকাশে কোন
নক্ষত্র। দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া চাহিরা ভবিষ্যজীবনের ছবি আঁকিতে
ছিলেন। মনে বিষাদের ঢেউ উথলিয়া উঠিয়াছিল। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ
পর সকলেই স্বীয় স্বীয় আলয়ে ফিরিয়া আসিলেন। যষ্ঠীচরণ ফিবিয়া
আসিয়া নিম্নলিখিত গানটি রচনা করিয়াছিলেন--
সুরট একতালা।
কালী, করুণা করহে দীনে।
সহেনা যন্ত্রণা
কে দিবে মন্ত্রণা
সে প্রবীণ চরণ বিনে।
সাবদে ববদে শুভদে শঙ্করী বিষম বিষয় বিপদে কি করি,
ক্ষমা ভিক্ষা করি, ওমা ক্ষেমঙ্কবী,
নিস্তার দুস্তার ঋণে ॥
ভয়ে ভয়ে মরি, কি করি কি করি
তব কৃপা তরি ধরি জোর করি,
হেন মনে করি, মহাযাত্ৰা করি।
ষষ্ঠী সারা রাত্রি ঘুমাইলেন না। কখন ও আশায় উৎফুল্ল হইতে
লাগিলেন। কখন ও হতাশের আঘাতে জর্জরিত হইতে লাগিলেন।
কোন দেশে যাইবেন, কি করিবেন, কি করিলে ঋণ শােধ হইবে,
এই সব চিন্তা করিতে লাগিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে তিনি একজন
( ২১ ) ব্রাহ্মণ পাচক ও একজন চাকর লইয়া, ফেণীর প্রসিদ্ধ জমিদার গােলচন্দ্র রায় বাহাদুবের পিতা রামকান্ত চৌধুরীর বাড়ীতে চিকিৎসার জন্য গেলেন! চৌধুৰী মহাশয়ের বাড়ীতে তিনি একমাস কাল চিকিৎসা করেন। পাচক ও চাকরের বেতন ব্যতীত, তিনি আরও ২০০১ টাকা পাইলেন। ঐ টাকার কতেক অংশ তিনি বাড়ীতে পাঠাইয়াছিলেন। ফেণী হইতে নােয়াখালী যান। নােয়াখালীতে ২১ দিন অপেক্ষা করিয়া কুমিল্লা যান। তিনি কুমিল্লায়, চট্টগ্রামস্থ আনােয়াবার ডাক্তার কৈলাসচন্দ্র চক্রবর্তীর বাসায় ছিলেন। তথায় হা র জ্বর হয়। উক্ত ডাক্তার মহােদয় এই খবর ষষ্টীচরণেব পিতাব নিকট দেন। কালিদাস এই খবর পাইয়া ষষ্ঠীচরণের নিকট সে চিঠি লিখিয়াছিলেন, তাহার অবিকল নকল নিম্নে দেওয়া গেল :- শ্রীদুর্গা। পৰম শুভাশীৰ্বাদ পূৰ্ব্বক সমাচার :-- এইখানে: শ্ৰীশ্ৰীকৃপাতে সৰ্ব্বসঙ্গল। তােমাদের মঙ্গল সমাচার লিপি করিয়া তুষ্ট করিবা । করিবা। ব্যামুতে কষ্ট পাইতেছ শুনিয়া নিতান্ত দুঃখিত তােমার টেলিগ্রাফ প্রাপ্তে সম্বাদ অবগত হইয়াছি। একারণ শ্ৰীমান নিলাম্বরকে তথায় পাঠাইলাম না। একে জানিয়া আমার প্রতি বাসনা থাকিলে, শীঘ্রই বাড়ী আসিবা। আমার প্রাণ স্থির নাই। সাংসারিক কি অবস্থায় আছি তাহা তুমি জান । এসময়ে বিদেশ যাওয়া উচিৎ হয় না। শ্ৰীযুক্ত গােপী ও পনিয়ার বাড়ী সকল ভাল আছে। ইতি সন ১২২৭ ম ১০ই পোষ । আশীৰ্বাদক, শ্ৰীকালীদাস বৈদ্য ভারত ভ্রমণ। ষষ্ঠীচবণ ইহার পর স্বাধীন ত্রিপুরার গেলেন। সেখানে মহারাজের দেওয়ান পদ্মলােচন মজুমদারের সহায়তায় মহারাজের রাজসরকারে ১০ ০১ টাকা বেতনে গৃহ চিকিৎসকের কাৰ্যে নিযুক্ত হন। ঐখানে ২১ মাস কাৰ্য্য করিয়া ঢাকা চলিয়া যান। সেখানে চট্টগ্রামস্থ ছাত্রদিগের একটি আবাস ছিল। তিনি ঐখানে তাহার পূর্বপরিচিত নােয়াপাড়া গ্রামের বাবু অখিলচন্দ্র সেনের দেখা পাইলেন। এই অখিলচন্দ্র সেন পরবত্তী কালে এম, এ, বি, এল হইয়া হাইকোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল হইয়াছিলেন। এইখানে তিনি কিছুকাল ছিলেন। অখিলবাবুর কোন সহাধ্যাত্মীব বাড়া ঢাকা ছিল। ঐ বন্ধুটী ফেবঙ্গ রােগে ভুগিতেছিল। ঢাকাব সমস্ত ডাক্তার কবিরাজগণ রােগী রােগমুক্ত হইবে না বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। অখিলচন্দ্র ষষ্ঠীচবণের চিকিৎসা নৈপুণ্যের কথা জানিতেন। তিনি ষষ্ঠীচরণকে এই চিকিৎসার ভার সইতে অনুবােধ করিলেন। ষষ্ঠীচরণও ঐ ছেলের পিতার অনুমতি লইয়া চিকিৎসা আরম্ভ করিলেন । ষষ্ঠীচরণ ইতঃপূৰ্বে এক বার সীতাকুণ্ডে স্বয়ম্ভুনাথ দর্শন করিতে গিয়াছিলেন। তত্ৰত্য মােহান্ত গবিন বাবাজী, ষষ্ঠীচরণকে একটী বিল্বপত্র দিয়া কপালে তিনবার আঘাত দিয়া বলিলেন অদ্য হইতে তােমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইবে। অপর একজন অবধূত হইতে তিনি রােগের ঔষধ শিখিয়াছিলেন। সেই ঔষধ তিনি এইখানে প্রয়ােগ করিলেন। ভগবানের আশীর্বাদে রােগী রােগমুক্ত হইল। কবিরাজ বিশেষভাবে পুরস্কৃত হইলেন। সকলেই একবাক্যে তাহার প্রশংসা করিতে লাগিলেন। তারপর তিনি ঢাকা ত্যাগ করিয়া কুষ্টিয়ায় উপনীত হইলেন। কুষ্টিয়ায় তিনি তাঁহার পাচককে বিদায় দিলেন।
তাবপব তিনি কলিকাতায় আসিয়া তাহার বন্ধ যাত্রামােহন বিশ্বাসের বাসায় কিছুকাল কাটাইলেন। এইখানে তিনি সকালে গঙ্গাস্নান করিতেন, সায়াহ্নে তিনি ঐশ্রীকালীর মন্দিরে উপাসনা করিতেন এবং অপবাহ্নে ছােট, বড় সকলের সঙ্গে দেখা কবিতেন। এইবার তিনি বিদ্যাসাগর, গঙ্গাপ্রসাদ, গৌরীনাথ ও তালীগঞ্জ বাজার সঙ্গে পরিচিত হইলেন। তারপর তিনি কামরূপে গেলেন ; কামরূপ হইতে আবার কলিকাতায় আসিলেন ; কলিকাতা হইতে বৈতণী নদীতে স্নান কবিতে গেলেন ; আবাৰ কলিকাতা আসিলেন। পথে তারকেশ্বর, ভদ্রেশ্বর প্রভৃতি দর্শন করিয়া ও তাহাব পূর্বপুরুষেব বাসভূমি চন্দননগবে শােভা সন্দর্শন করিয়া, অবশেষ বর্ধমানে উপস্থিত হইলেন। বর্ধমান রাজসরকারে তিনি কিছুকাল কাজ করেন। তারপর কাসিম বাজারের দানশীলা মহারাণী স্বর্ণময়ীর বাড়ীতে গমন করেন এবং সেইখানে মাসিক ১৫০ টাকা বেতনে রাজবাড়ীতে কবিরাজ নিযুক্ত হন। বাণী স্বর্ণময়ীর বাড়ীতে যখন ষষ্ঠীচরণ গৃহ-চিকিৎসক নিযুক্ত ছিলেন তখন রাজীব লােচন বাবু বাণীব Privat Sentary ছিলেন। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ তীর্থ বারবকুণ্ডের কথা প্রসঙ্গক্রমে উত্থাপিত হয়। বাণী কবিবাজ মহাশয়কে একটা প্রশ্ন করিলেন। প্রশ্নটী এই :----জল ও আগুণ কি একসঙ্গে আছে, না জল একদিকে ও আগুণ অন্যদিকে ? কবিরাজ মহাশয় বলিলেন আগুণ ও জল একসঙ্গে আছে। রাজীব লােচন বাবু ইহাতে আপত্তি করিয়া বলিলেন সন্ন্যাসী মুখে শুনিয়াছি একদিকে জল আছে ও অন্যদিক হইতে আগুণ আসে। ইতে ষষ্ঠীচরণ মাতৃ ভূমিকে ও নিজকে অবজ্ঞাত মনে করিলেন। তিনি তখনই রাণীকে বলিলেন আপনি ইহার বিচার করুন, না হৰু আমি এই সবকাবে { ২৪ ) চাকরী করিব না। তখন রাণী বণিলেন আপনারা দুইজনেই আমার নিকট সমান যত্নের ও আদরের পাত্র। আমি দুইজনকেই চাই। ইহাতে কবিরাজ মহাশয় ব্যথিত হইয়া কাৰ্য্য ছাড়িয়া দিলেন এবং পুনশ্চ বর্ধমানাভিমূখে চলিলেন। ইহা হইতে পাঠকমহাশয়গণ ষষ্ঠীচরণের স্বদেশপ্রেম পরীক্ষা করিয়া লউন। বর্ধমানে যাইবার সময় ষষ্ঠীচরণ রাজমহুল দর্শন করিয়াছিলেন। বর্ধমানে উপস্থিত হইয়া তিনি তাহার চাকরকে বিদায় দিলেন। তারপর তিনি বরাকরে গেলেন, বরাকর হইতে পরেশনাথ পৰ্বতে গেলেন, পরেশনাথ হইতে বৈদ্যনাথে গেলেন। দীর্ঘপৰ্যটনে শরীর ক্লান্ত হইয়া পড়ায়, তিনি বৃক্ষছায়ায় নিদ্রাভিভূত হইলেন। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি একজন দসু্যর চীৎকারে জাগিয়া গেলেন। জাগিয়াই তিনি দেখেন যে ঠাহাব থলিয়া চুরি গিয়াছে। ইহাতে কয়েকখানি ধুতি, কিছু টাকা ও কতেক ঔষধ ও তার আরাধ্য শিবলিঙ্গ মূত্তি ছিল। তিনি শিবলিঙ্গের জন্য বড়ই ব্যথিত হইলেন। কিছুকাল অন্বেষণ করিয়া নিকটস্থ জঙ্গলে তিনি তাহাব থলিয়াটা পাইলেন। কয়েকটী টাকা ব্যতীত অন্য জিনিষপত্র ডাকাতেরা ফেলিয়া গিয়াছিল। ষষ্ঠীচরণ এখন রিক্তহস্ত। তারপর তিনি এক দোকানদারের নিকট গেলেন। ঐ দোকানদাব বহুদিন শূলবােগ ভুগিতেছিল। ষষ্ঠীচরণ ঐ রােগীকে তিনটা বড়ি দিলেন। রােগী একটী একট, করিয়া তিনটি বড়িই পাঁচ মিনিটের মধ্যে গিলিয়া ফেলিল। আধঘণ্টার মধ্যে তাহার রােগের অনেকটা উপশম হওয়াতে রােগী, কবিরাজ মহাশয়কে তাহার দোকানে থাকিয়া আর কিছুকাল তাহাকে চিকিৎসা করিতে প্রার্থনা জানাইলেন। প্রার্থনা মঞ্জুর হইল । দোকানদার হইতে ঔষধের মূল্য বাবত কিছু লইন্না, তিনি আবার বৈদ্যনাথ গেলেন। ষষ্ঠীচরণ বাড়ী হইতে বহির্গত হইবার সময়ে এক পয়সাও বাড়ী হইতে নিয়াছিলেন না। অথচ পৈত্রিক কবিরাজী ব্যবসায় সম্বল করিয়া ভারতের নানাস্থান পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। বৈদ্যনাথ হইতে তিনি পাটালীপুত্ৰনগর দেখিতে গেলেন। তথা হইতে গয়াধামে গেলেন এবং ফুঞ্জনদীতে স্নান কবিয়া পরে বাবাণসী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বাবাণসীতে উপস্থিত হইয়া, ষষ্ঠীচরণ গঙ্গাস্নান করিয়া বিশ্বেশ্বরের পূজা করিলেন। তারপব সাধু সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আলাপাদি করিয়া এবং রাজা মানসিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মানমন্দির নিবীক্ষণ করিয়া তযােধ্যায় গেলেন। তথা হইতে তিনি ফৈজাবাদে গেলেন, ফৈজাবাদ হইতে তিনি আবার বারাণসীতে আসিলেন এবং বারাণসী হইতে পুনৰ্বার প্রয়াগ তীর্থে গেলেন। এইখানে শাস্ত্রীয় নিয়মানুসাবে তিনি মস্তক মুণ্ডন করলেন এবং গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গমস্থলে স্নান কবিয়া শরীর পবিত্র করিলেন। তারপর তিনি লক্ষ্ণৌ গেলেন। লক্ষ্ণৌতে বামগঙ্গায় স্নান করিয়া তিনি কানপুরে গেলেন এবং কানপুর হইতে ধাক্সীব দিকে বওনা করিলেন। এইখানে কিছুকাল থাকিয়া তিনি আগ্রার অভিমুখে চলিলেন। আগ্রাম্বু তাজমহলের সৌন্দৰ্য্য ও কারুকার্য দর্শন করিয়া মুগ্ধ হইলেন। তিনি ফৈজাবাদ হইতে নৈমিষারণ্য দর্শন করিতে গিয়াছিলেন। আগ্রা হইতে তিনি মথুরা যাত্রা করিলেন এবং তথায় গােবর্ধনধারীর মূর্তি দেখিয়া বড়ই পুলকিত হইলেন। তথা হইতে তিনি দিল্লী উপনীত হইলেন। দিল্লীর প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মসজিদাদি দেখিলেন; কিন্তু হিন্দু রাজার আমলের ধ্বংশাবশেষ দেখিয়া বড়ই বিষয় হইলেন। তারপর জয়পুর রাজ্যে ১৬০ টাকা বেতনে ছয় মাস গৃহ চিকিৎসকের কার্য করেন। তথা হইতে উদয়পুব গিয়া মহারাণীর নিকট
পরিচিত হন। তথা হইতে দ্বাবকা গিয়া সােমনাথের মন্দির দর্শন
করেন। তথা হইতে বােম্বে গেলেন। পথে নর্মদা ও তাপ্তীতে স্নান
করিয়াছিলেন। নর্মদা নদী হইতে তিনি নিজে পূজা করিবার জন্য
নৰ্ম্মদেশ্বর শিব নিয়াছিলেন। বােম্বে হইতে তিনি হায়দবাবাদে
গিয়াছিলেন। তথা হইতে তিনি গােদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেবী নদীতে
স্নান করিয়া কুমারিকা অন্তরীপে গেলেন। সেখানে তিনি রামেশ্বর
শিবকে পূজা করিলেন । তারপর ভারত মহাসাগরের দিকে ধ্যানস্তিমিত
লােচনে কহিলেন ও কিছুকাল
পরে নিম্নলিখিত গানটী রচনা
করিয়াছিলেন ।
কি রূপ মাধু
হায়রে অঙ্গুরী,
রাম কবে কল বাস অনুক্ষণ।
আজি সুপ্রভাত,
ওহে দীন নাথ,
রাম নিদর্শন, হল দবশন ।
অঙ্গুলী
তােমাতে বামে সৌরভ,
এস হৃদে ধরি ক'রয়ে গৌরব,
প্রিয় কথা কও হনা নিব ;
ঐরাম মঙ্গল, করহ কীৰ্ত্তন।
ধন্য তােমার, নাথের অঙ্গুল ভূষণ,
লঙ্কায় এলে নিতে সীতার অন্বেষণ .
আর কি রামের বামে পাইব আসন
সেইদিন কি বিধি করিবেন ঘটন।
ধর, ধর, ধর বাছা! ধর শিরােমণি,
নেও এই নিদর্শন থায় রঘুমণি
~
২৭ )
যাও, যাও হে সত্বরে,
দি ও বাছ! রঘুবরে,
বলাে তারে প্রতিভরে করে দিয়ে মণি।
অঙ্গুরীর বিনিময়, শিরােমণি মনিময়,
করিলেন সুসময় জনক-নন্দিনী।
মম দুঃখ নিবেদন, করে প্রভুর সদন,
ওরে প্রিয় বাছাধন! বীর চুড়ামণি !
শ্রীরামে প্রণাম কবে,
বলি অতি সকাতরে,
বৈল, দুঃখ শােকে মরে অবলার মণি।
ষষ্ঠীচবণ কুমাবিকা অন্তরীপ হইতে যােধপুরে গেলেন।
তথা হইতে
পাতিয়ালায় গেলেন। এইখানে আবার তিনি বিক্তহস্ত ইলেন এবং
কিছু অর্থ সংগ্রহ করিবার জন্য মহাবাজার সরকারে গৃহ-চিকিৎসকের
কাৰ্য্য গ্রহণ করেন। কিছু অর্থ সঞ্চিত হইবার পর তিনি সিমলায়
গেলেন। সিমলা হইতে হরিদ্বার এবং হৰিদ্বাৰ হইতে অমর নাথ
গেলেন। অমরনাথ যাইয়া তিনি নিম্নোক্ত গানটী রচনা করিয়াছিলেন -
মা। ত্রিলােক প্রসবিনী, ত্রিলোক পালিনী ত্রিলােক তারিণী তারা।
গুণ সত্ব রজঃ তন, বেদশাস্ত্রাদি আগম, তােমা হতে নির্গম ভবদারা।
হরণ্যগর্ভাদি করি, পরমাণু অন্তে ধরি, তব তেজোপরি সবাৎসারা।
সৰ্ব্বসুখ প্রদায়িনী, সৰ্ব্বদুঃখ প্রণাশিনী, যষ্ঠীচরন কি মা ত্রিলােক ছাড়া ।
!
অমবনাথ, বদরীনাথ প্রভৃতি স্থান দর্শন করিয়া ষষ্ঠীচরণ পূনরায়
হরিদ্বাবে আসিলেন। পাঠক মহাশয়গণ চলুন একবাব কালিদাসের বিষয়
আললাচনা করি। কালিদাস এই বৃহৎ পরিবার সংরক্ষণ করিতে ও হিন্দুর
উৎসবাদি রক্ষা করিতে, বিশেষভাবে অর্থাভাব বােধ করিতে লাগিলেন।
তাহাব জ্যেষ্ঠপুত্র ষষ্ঠীচরণ তিন বৎসবে উপব বাড়ী হইতে নিরুদ্দেশ।
( ১৮ -- --- তিনি এই তিন বৎসরের মধ্যে মাত্র ৫৬ খানা চিঠি তাঁহার পিতার নিকট লিখিয়াছিলেন। তাঁহার শেষ চিঠিতে তিনি একমাত্র জানাইয়াছিলেন যে তিনি পাতিয়ালা হইয়া হরিদ্বাভিমুখে চলিলেন। তারপর কালিদাস ষষ্ঠীচরণের আর কোন খবর পান নাই। তিনি উদ্বেগে সময় কাটাইতে লাগিলেন। তিনি যে ষষ্ঠীচরণকে পুনৰ্ব্বাব দেখিতে পাইবেন, সে আশা ত্যাগ করিলেন। কালিদাস চিন্তা করিতে লাগিলেন--ষষ্ঠী আমার বড় ছেলে। আমার মৃত্যুর পর সে এই পরিবারের ভরণ পােষণ মােগাইতে সক্ষম; কিন্তু সে বিদেশে নিরুদ্দেশ। ২য় ছেলে নীলাম্বর সংসারিক জ্ঞান যথেষ্ট থাকিলেও একা কিছু করতে পারিবে না। ৩য় ছেলে দিগম্বর এখনও স্কুলের ছাত্র। ৪র্গ ছেলে পূর্ণচন্দ্র মাত্র ৬৭ বৎসর বয়স্ক । আমার মৃত্যুর পর এই পরিবারের কি অবস্থা হইবে। ষষ্ঠীকে কি জানি মা সৰ্বমঙ্গলার কৃপায় দেখিতে পাই কি না। ষষ্ঠীচরণের অদর্শনে কালিদাসের মস্তিস্ক বিকৃতি হইল। তিনি পুনঃ পুনঃ “শিব” “শিব” ও * ষষ্ঠা” “ধষ্ঠা” বলিতেন। আর কিছুই বলিতেন না। চারি মাসের মধ্যে কালিদাস ষষ্ঠীচরণের কোন পত্র নাই। তিনি মনে করিতে লাগিলেন- কি জানি ষষ্ঠী জীবিত আছে কিনা? জীবিত থাকিলে অবশ্য চিঠি লিখিত। এই কথা ভাবিতে ভাবিতে তিনি একদিন মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। অশ্রুধারা বহিতে লাগিল। পুত্রেরা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনেরা মূহুর্তে মূহুর্তে কালিদাসের জীবণের আশঙ্কা করিতে লাগিলেন। তখন একটা লােক ষষ্ঠীচরণ ফিরিয়া আসিয়াছে বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। যষ্ঠীচরণের নাম শুনিবা মাত্র, কালিদাস চক্ষু উন্মীলন করিয়া বলিলেন –এ; কিন্তু ষষ্ঠীচরণকে দেখিতে না পাইয়া বড়ই বিষ হইলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে অমরধামে প্রয়াণ করিলেন। কালিদাস ৬ বৎসর জীবিত ছিলেন।
-- কালিদাসের মৃত্যুতে যখন সমস্ত পরিবারস্থ লােক শশাকে ও দুঃখে নিতান্ত কাতর, তখন ষষ্ঠীচরণ হরিদ্বারে কুম্ভমেলা উপলক্ষে সাধু . সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ধর্মালােচনায় সময় কাটাইতেন। তিনি আরও সন্ন্যাসীগণ হইতে অবধৌতিক ঔষধ শিক্ষা করিয়াছিলেন। এই শিক্ষার বলেই তিনি উত্তরকালে দিগ্বিজয়ী কবিরাজ হইয়াছিলেন। गर একদিন এক পিয়ন (Peon) বাঙ্গালা অক্ষরে একখানা চিঠি লইয়া, সেই মহামেলায় চিঠির মালিককে তালাস করিতে লাগিল এবং বলিল - মােহান্ত বাবাজীর নিকট এক চিঠি এসেছে উহার সঙ্গে আরও এক চিঠি আছে। ঐ লেখা কেহ পড়িতে পারিতেছে না। ঐ লেখা কেহ পড়িতে পারে কিনা দেখুন ; যদি না পারেন, চিঠিখানা আমার নিকট ফেরত দিবেন। অনেক অনুসন্ধানের পর, মষ্ঠীচরণ যে স্থানে ছিলেন, সে স্থানে একজন লোক ঐ চিঠি লইয়া গেলেন। ষষ্ঠীচরণ কুতূহলী হই। সেই চিঠি পড়িতে লাগিলেন। ঐ চিঠি পাঠ করিয়া তিনি কান্দিয়া ফেলিলেন। তাঁহার চোখে জল দেখিয়া সাধু সজ্জনেরা ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। ষষ্ঠীচরণ তাহাদিগকে, তাঁহার পিতৃ বিয়ােগের কথা বলিলেন । সকলেই সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন । হরিদ্বাবে গঙ্গানদীর নীলধারার দক্ষিণতীরে অশৌচান্তে শ্রাদ্ধাদি করিয়া সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে কয়েকজনকে খাওয়াইলেন। তারপর ষষ্ঠীচরণ ভাবিলেন –পিতা মারা গিয়াছেন, ভ্রাতারা এখনও উপার্জন সক্ষম নয়। আমাকে ফিরিয়া যাইতে হইবে; নতুবা সকলেই অনাহারে মারা পড়িবে । আমি ভারতের সর্বত্র বিচরণ করিলাম ; কিন্তু কোথায়ও ত অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হইল না। দেখি একবার শ্রীনগব গিয়া অদৃষ্ট পরীক্ষা করিব। তারপর সুবিধা না হইলে দেশে ফিবিয়া গিয়া ব্যবসায় করিব। এতাদৃশ ভাবনা ভাবিতে ভাবিতে ষষ্ঠীচরণ ঘুমাইয়া পড়িলেন এবং ( ৩০ ) জাগ্রত হইয়া স্বরচিত একটি শ্যামা সঙ্গীত গান করিয়াছিলেন। গান শেষ হইবার পর তিনি সন্ন্যাসীদিগের নিকট ফিরিয়া গেলেন এবং তঁাহাদের সঙ্গে আরও দুইদিন কাটাইয়া, তাহাদের আশীৰ্বাদ লইয়া অমৃতসরে রওনা হইলেন। অমৃতসরে যাইয়া তিনি একখানি শীতবস্ত্র ক্রয় করিলেন। তথা হইতে তিনি লাহাের গেলেন। লাহাের হইতে মুলতানে, মুলতান হইতে সিয়ালকোটে গেলেন। সিয়ালকোটে তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিমদিকের শেষসীমা ছিল। এইখানে এক মুসলমান ফকিরের সঙ্গে তঁাহাব বড় প্রতি জন্মে। ফকির অহরহঃ বলিতেন-হিম্মৎকা কিস্মাৎ অর্থাৎ সৎসাহসই সৌভাগ্য জন্মায়। ষষ্ঠীচরণ ফকিরকে নমস্কার কবিয়া নিকট বসিলেন। ফকির কিছু বলিলেন না। তবে ষষ্ঠীচরণেব পিঠের উপর একটু আঘাত করিয়া, তাহাকে ভস্মের ন্যায় কতক সাদা সাদা জিনিষ দিলেন। ষষ্ঠীচবণ ঐ ভস্মেব ব্যবহার সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করিলেন কিন্তু কোন উত্তর পাইলেন না। কোন উত্তর না পাওয়াতে ষষ্ঠীচবণ ঐ জিনিষগুলি নিজের থলিয়ার মধ্যে বাখিয়া দিলেন এবং জয়পুর দেশীয় একটি বৌপ্য মুদ্রা ফকিরের সানে রাখিয়া জলযােগ করিবার জন্য এক দোকানে গেলেন। সিয়ালকোট হইতে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে গেলেন। আমরা নে সময়েব কথা বলিতেছি, তখন ভারতের সর্বত্র রেল ছিল না। পথে ডাকাতের উপদ্রব ও ছিল। এতাদৃশী অবস্থায় ষষ্ঠীচরণ প্রায় পদব্রজে যে ভারতের সমস্ত তীর্থস্থানগুলি দর্শন করিয়া ভূস্বর্গ কাশ্মীরে উপস্থিত হইয়াছিলেন, ইহা তাহার পক্ষে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয়। কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া ষষ্ঠীচরণ বড়ই প্রীতিলাভ করিলেন। তারপর ষষ্ঠীচরণ পেশওয়ারে গেলেন। পেশওয়ার হইতে তিনি আরও দূরে নাইতেন ( ৩১ তবে জাতি ললাপের ভয়ে আর অগ্রসর হইলেন না। তথা হইতে তিনি কাশ্মর স্বাধীন নাপতি গোলাপ সিংহের পুত্র রণবীর সিংহের রাজভবন দেখিবার জন্য সুতে গেলেন। এইখানে তিনি রাজ গুরু সুজায় বাবাজীর আশ্রমে আতিথ্য গ্রহণ করেন। এইখানে বৃষ্ঠচরণের দীর্ঘ পর্যটনের অবসান হইল । কাশ্মীরই কর্মক্ষেত্র। সন্ধ্যাৰ সময় আহারাগি কবিরা যষ্ঠীচর সিদ্দিষ্ট বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। পার্শ্বে রাজগুরুর বিছানাও ছিল। রাজ গুরু রুদ্রাক্ষের মালা জপিতে ছিলেন। শষ্ঠাচরণ ম্যাসাশ্রণ ও গৃহস্থানের কথা চিন্তা কবিতে লাগিলেন। ভাবিতে ভাবিতে তিনি জগদিশ্বর নাম উচ্চারণ করিলেন। তখন রাজগুক • জিজ্ঞাসা করিলেন---পাছা, তুমি এখনও ঘুমাও নাই কেন? ষষ্ঠীচবণ তঁাহার জীবনের ইতিহাসটি সংক্ষেপে বলিয়া দিলেন। গুৰুজি তাহার কথা আদ্যোপান্ত শুয়া উহাকে সংসাবাশ্রনে থাকিয়া পবিজনবগের ভরণপােয়ণ মােগাহ, উপদেশ দিলেন। দেখিতে দেখিতে রাত্রি প্রভাত, হইয়া গেল। গৰুণোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ী হইতে একজন লােক আসিয়া 'গুজার নিকট নিবেদন করিলেন-মরাজ বাহাদুর অাপনাকে লইয়া ইবার জন্য বলিয়াছেন। রাণীনাব মৃত্যু সন্নিকট। মহাৰাজের লোক হতে ষষ্ঠীচরণ জানিতে পারিলেন যে রণবীর সিংহেব কিনা তার কঠিন অশ্মরী রোগ হইয়াছিল। কবিরাজ, ডাক্তার ও কিমগণ, কি দেশীয় কি বিদেশী সকলেই তাহার জীবনের আশা ছাড়িয়া দিয়াছেন। রাজগুরু তাড়াতাড়ি তাহার প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া রাজবাড়ীতে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলে, ষষ্ঠীচরণ গুরুজীকে এই কথা বলিলেন যে—অবশ্য রােগ খুব কঠিন, ব মহারাজ যদি অনুমতি দেন ও ভগবানের আশীৰ্ব্বাদের জোর থাকে, "তাহা হইলে, আমি নিশ্চয়ই রাণীমার আবােগ্য বিধান করিতে পারিব । গুরুজী রাজবাড়ী রওনা হইলে, ষষ্ঠীচরণ ভাবিতে লাগিলেন মহারাজের এক হাঁ বা না এর উপর আমার ভবিষ্যজ্জীবনের অনেকটা নির্ভর করিতেছে। কি জানি কাশ্মীরই আমার কৰ্ম্মক্ষেত্র হয়, না চট্টগ্রামে আবার ফিবিয়া বাইতে হয় । গুৰুজী, মহারাজকে বলিলেন চন্দ্রশেখর হইতে একজন যুবক বাঙ্গালী কবিরাজ আমার আশ্রমে গতকল্য আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি রাণীমার আরােগ্য বিধান করিতে পারিবেন বলিয়া আশ্বাস দিয়াছেন। আপনার অনুমতি পাইলেই ' তিনি চলিয়া আসিবেন। রনবীর সিংহেব বিমাতাব চিকিৎসা করিতে আদেশ পাইয়া, যষ্ঠীচরণ তৎপর দিবস আজ গুরুর সঙ্গে ' মহারাজের ভবনে উপস্থিত হইলেন। রণবীর তখন দরবারে উপবিষ্ট ছিলেন। ষষ্ঠীচবণ যথারীতি মহারাজকে অভিবাদন করিলে, মহারাজ তাহাকে বসি আদেশ করিলেন। দরবারে ডাক্তার, কবিরাজ, কিম ও প:বিদ প্রভৃতি অনেক লােক ছিলেন। সকলকে বিদায় দিয়া মহারাজ, গুরুজী ও ষষ্ঠীচরণকে সঙ্গে লইয়া। অন্তঃপু। পাশ করিলেন। সেখনে রােগিনীর শুধু হাত দেখান হইয়াছিল। ষষ্ঠীচরণ রাণীর নাড়ী শীত করিয়া, সাহসের সহিত চিকিৎসা আৰম্ভ কৰিলেন। যষ্ঠীচরণ মহারাজকে দুইটি বিষয় নিবেদন করিলেন-~-১ম নিবেদন রােগ সৃশ্চিকিৎস্য। যদি অামার চিকিৎসায় কোন ফদেয় না হয়, তাহা হইলে আমার উপর ( ৩৩ ) যেন কোনরূপ অভিযােগ আনয়ন করা না হয়। ২য় নিবেদন আমার চিকিৎসা কালে ন আর কেহ চিকিৎসা করিবার অনুমতি না পায়। মহারাজ তথাস্তু বলাতে ধুমধামের সহিত রাণীমার চিকিৎসা আরম্ভ হইল। ৩০জন লােক কবিরাজ মহাশয়কে সাহায্য করিবার জন্য নিযুক্ত হইল। এখন চিকিৎসা করিবার সময়ে কবিরাজ মহাশয় বিশেষ অসুবিধায় পড়িলেন। তাহার কথা, মহারাজের লােকেরা বুঝিতে না পারিয়া, তিনি যাহা চাহিতেন, তাহা না আনিয়া অন্য জিনিষ আনিতেন। তিনি উপায়ান্তর না দেখিয়া নিজেই অনেক লােক লইয়া, হস্তিপৃষ্ঠে নিকটবর্তী কোন পাহাড়ের অগ্রভাগে যাইয়া তাহার প্রয়ােজনীয় সমস্ত ঔষধ সংগ্রহ করিতেন। ১৫দিন চিকিৎসা করিবার পর রােগিনী সম্পূর্ণভাবে রােগমুক্ত হইলেন। ষষ্ঠীচরণের নাম তখন বিদ্যুৎবেগে জোর সএ ছড়াইয়া পড়িল। অন্তঃপুরের মহিলারা প্রায় ৫০০০ পাচ 'জার টাকার জহর তালি উপহার দিয়াছিলেন এবং রাজপরিবারের ও অমাত্যবর্গ নগদ ৫ ০ ০ ৩ পাচ হাজার টাকা উপহার দিয়াছিলেন। ঘষ্ঠীচরণ নােট ১০০০০ দশ হাজার টাকা পাইলেন। রণবীর নিংহ খুনী হইয়া যুবক কবিরাজ যাচরণের মাথার উপর হাত বুলাইলেন এবং ষষ্ঠীচরণকে মাসিক ১৫০ টাকা বেতনে, তাহার গৃহ চিকিৎসক নিযুক্ত করিলেন। আর ও মহারাজ, উদয়পত্নী এবং যুববাজ তিনজনেই কবিরাজ হাশয়ের উপর সন্তুষ্ট হইয়া পৃথক পৃথক ভাবে তাহাকে তিনখানি স্বর্ণ নির্মিত ইষ্টক উপহার প্রদান করেন। কয়ে কবিরাজ মহাশয়ের কৃতিত্বের কথা লিখিত আছে মহারাজ, যুবরাজ ও রাণ; তার নাম ৩ তদুপরি খােদিত আছে।
( ৩৪ ) এই দিকে কালিদাসের মৃত্যুর পর হইতে, পরিবার সংরক্ষণের ভার নীলাম্বরের উপর পড়িল। নীলাম্বর অতিকষ্টে সাংসারিক খরচ নিৰ্বাহ করিতে লাগিলেন। পরিবারস্থ লােকের মধ্যে কেহ কেহ মারা গিয়াছিলেন । দিগম্বর ও পূর্ণচন্দ্র, জজকোর্টের প্রসিদ্ধ উকিল গােলকচন্দ্র নন্দীর বাসায় থাকিয়া পড়িতেন। তবুও নীলাম্বরকে বেগ পাইতে হইয়াছিল। স্ত্রীলোকেরা দিনের বেলায় সাংসারিক কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিত এবং রাত্রিতে সূতা কাটিত। এই চরকায় কাটা সূতা দিয়া এক জোড়া কাপড় তৈয়ার করা হইয়াছিল। ঐ নূতন কাপড় জোড়া পূর্ণচন্দ্রকে দেওয়া হয়। পরিবারে তখনও ১৩জন লােক ছিল। নীলাম্বর অতিকষ্টে সংসার চালাইতে ছিলেন €ি ধারের উপর ধার করিতেছিলেন। যখন পরিবারের কষ্ট চরম সীমায় গেল, তখন একজন পোেষ্ট আফিসের পিয়ন আসিয়া নীলাম্বরকে, যষ্ঠীচরণের হস্তলিখিত একখানা চিঠি দিলেন। চিঠি পাইয়া সকলেই আনন্দিত হইলেন। চিঠি পাঠে সকলে অবগত হইলেন যে যষ্ঠীচরণ ১৫০ টাকা বেতনে জম্মু ও কাশ্মীরের স্বাধীন নরপ৮ি ৭৭ সিংহের গৃহ-চিকিৎসকের কাৰ্য্যে নিস হইয়াছেন। গ্রামের অশিগ ৩ লােকদের মধ্যে কেহ কেহ বহিতে লাগিলেন- জম্বুদ্বীপ সবার কি ? যমদ্বীপই হইবে। কি করে যষ্ঠিচরণ যমরাজাকে ভুলাইয়া তাহার রাজ্যের চিকিৎসক নিযুক্ত হইলেন। এই ভাবের অনেক কথা অশিক্ষিত লােকের মধ্যে চলিতে লাগিল। এই ভাবে কয়েক দিন চলিয়া গেল। নীলাম্বর উদরাময় রােগে ভুগিতে ছিলেন। নীলাম্বর সম্পূর্ণ আরােগ্য লাভ করিবার পর, যষ্ঠীচরণকে বাড়ী ফিরাইয়া আনিবার জন্য জম্বুদ্বীপে যাইতে মনস্থ করিলেন। নীলাম্বর ভগ্ন স্বাস্থ্য লইয়াও বিদেশে যাইতে ইচ্ছুক হইলেন। দিগম্বর বলিলেন—দাদা, আপনি যাইবেন না। আমি যাইব। আপনি কখনও বিদেশে একদিন ও কাটান নাই। অতএব আপনার পক্ষে এতদূরে যাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার হইবে। আমি, যাহা হউক, বিদেশে কিছুকাল কাটাইয়াছি। আমার যাওয়া উচিত হইবে। দুই ভ্রাতার মধ্যে এই বিষয় লইয়া তর্ক উঠিয়াছিল। গ্রামবাসীদের মধ্যে যাহারা বয়ােবৃদ্ধ তাঁহাদের পরামর্শ নেওয়া হইল। তাহারা দিগম্বরকে বিদেশে পাঠাইলে সুবিধা হইবে বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিলেন। কাজেই দিগম্বর কাশ্মীর যাত্রা করিবার জন্য উপযুক্ত আয়ােজনাদি করিতে লাগিলেন। পরদিবস যাত্রার দিন নির্দিষ্ট হইল। রাত্রি চতুর্দিক ঘেরিয়া ফেলিল। দিগম্বর আহারাদি কবিয়া ঘুমাইতে গেলেন। এই দিকে দিগম্বরের স্ত্রী বিরজা সুন্দরী, তাহাকে বিদেশে যাইবার সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে আদার করিতে লাগিলেন। দিগম্বর অনেক বুঝাইবার পর, তাঁহার পত্নীও শেষে অভিমত দিলেন। দেখিতে দেখিতে রাত্রি প্রভাত হইল। অরুণ উদিত হইলেন। যাত্রার সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। দিগম্বর মঙ্গল দ্রব্য স্পর্শ করিয়া চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বহির্গত হইয়া নীলাম্বরকে প্রণাম করিলে, নীলাম্বর দিগম্বরকে বলিলেন-স্নেহের দিগম্বর, আমার প্রতি যদি তােমার শ্রদ্ধা থাকে, তাহা হইলে তুমি আমার একটি কথা রক্ষা করিবা -কথাটি এই আমি কাশ্মীর যাত্রা করব। আর তুমি ইতিমধ্যে পরিবার সংরক্ষণ কর। অনেক কথার পর, দিগম্বর তাঁহার দাদাব কথায় সম্মতি দিলেন। নীলাম্বর মঙ্গল দ্রব্যগুলি স্পর্শ করিয়া, ভগবানে। নাম লইয়া বাহির হইলেন। পথে অনেক কষ্টভােগ করিয়া, পূর্ব বাঙ্গালার নীলাম্বর কাশ্মীর রাজ্যে উপনীত হইলেন। একদিন সকাল বেলা যষ্ঠীচরণ মহারাজের দরবারে যাইবার জন্য পােষাক পরিতে ছিলেন। দরবার দিনে দুইবার বসিত। সকালে ৮টা ( ৩৬ ) হইতে ১১টা। বৈকালে ৪টা হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া, কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়া না গেলে, মহারাজ কোন হিন্দু দরবারে প্রবেশ করিতে দিতেন না। সকলের মাথায় শিখা রাখিতে হইত। মহারাজের রাজ্যে অনেকগুলি দেবালয় নিম্মিত হইয়াছিল। আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি যে -সুপ্রসিদ্ধ নীলাম্বর মুখার্জীর ভ্রাতা হৃষীকেশ মুখার্জী বারিষ্টারী পাশ করিয়া, কাশ্মীর রাজ্যে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি চন্দনের ফোঁটা দিতেন না ও শিখা রাখিতেন বলিয়া, মহারাজ তাহার প্রতি বিরক্ত হন। ফলে তাহাকে চাকরী ছাড়িয়া যাইতে হইল। মহারাজ হিন্দুর হিন্দুয়ানী রক্ষা করিতে বিশেষ যত্নবান্ ছিলেন। ষষ্ঠীচরণ যখন মাথায় উষ্ণীষ পরিধান করিতে ছিলেন, তখন তিনি একজন লােককে, একটি বেগ হাতে করিয়া, তাহার ঘরের দিকে আসিতে দেখিলেন। ষষ্ঠীচরণ প্রথমে বিশেষ লক্ষ্য করেন নাই। তারপর যখন ঐ বেগধারী বাঙ্গালী যুবক, ধীরে ধীরে তাহার ঘরে প্রবেশ করিয়া প্রথমে একটি বেঞ্চের উপর বসিলেন এবং তারপর তাহাকে ভূনিগত প্রণাম করিলেন, তখন তিনি বাঙ্গালী যুবককে কিছু না বলিয়া, তাঁহাকে বিশেষভাবে দেখিতে লাগিলেন। তাঁহার ছােট ভাই নীলাম্বর যে একাকী এতদুরে আসিতে পারেন তাহা তিনি মনে স্থান দিতে পারিতেছেন না। তিনি মনে মনে অনেক ভাবিতেছিলেন। তখন নীলাম্বর বলিয়া উঠিলেন—দাদা, আজ সাত বৎসর ধরিয়া আপনি বিদেশে ঘুরিতেছেন। আপনি নিয়মমত চিঠি ও নিখেন না। আমি কত কষ্ট করিয়া আপনাকে পাইয়াছি। নীলাম্বরের কণ্ঠস্বর বুঝিতে পারিয়া ষষ্ঠীচরণ তাঁহাকে জড়াইয়া ধরিলেন। এবং কানিতে কানি মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। তারপর চেতনা লাভ করিয়া নীলাম্বরের স্নান ( ৩৭ ) ও আহারাদির বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। দ্বিপ্রহরে ভােজনান্তে দুই ভ্রাতার মধ্যে অনেক কথাবার্তা হইল। কথাবার্তার পর নীলাম্বর ষষ্ঠীচরণকে বাড়ী আনিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ষষ্ঠীচরণ বলিলেন -যে পর্যন্ত আনি আশাতীত টাকা সঞ্চয় করিতে পারিনা সে পর্যন্ত আমি বাড়ী যাইবনা। নীলাম্বর তঁাহার দাদার সঙ্গে আর তর্ক করলেন না। তিনি মনে মনে একটি উপায় স্থির করিলেন। নীলাম্বর ষষ্ঠীচরণের সঙ্গে দরবার দেখিতে গেলেন। এই বাঙ্গালী যুবক নীলাম্বর মুখার্জীর সাহান্যে ষষ্ঠী চরণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, মহারাজের নিকট ষষ্ঠীচরণের বাড়ীর দুর্দশার কথা সমস্ত বিবৃত করিলেন। মহারাজ দয়াপরবশ হইয়া, তখন তখন ষষ্ঠীচরণকে পূর্ণবেতনে ছয় মাসের অনুগ্রহ ছুটা দিলেন। এবম্বি ছুটি কেহ কখনও, কোন রাজ সরকারে পাইয়াছে কিনা জানি না। ষষ্ঠীচরণ ছয়মাসের ছুট, পাইয়া, নীলাম্বরের সঙ্গে বাড়ী যাত্রা করিয়া কলিকাতায় আসিয়া পেীছিলেন। কলিকাতা হইতে ষ্টীমারে দুইভ্রাতা চট্টগ্রামে পঁহুছিলেন। বঙ্গোপসাগরে তুফান তুফান হওয়াতে হওয়াতে বড় কষ্ট হইয়াছিল। দিগম্বর ষ্টীমার ঘাটে গিয়া অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিলেন কিন্তু কোন খবর না পাইয়া বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়াছিলেন। মেকেঞ্জীর আফিসে যে স্বীকারের খবর পাওয়া যায় তাহা জানিতেন না। কাজেই সূর্যাস্তের পর দিগম্বর উদ্বিগ্নমনে বাড়ী ফিরলেন। তারপর দিন দিবা দ্বিপ্রহনের পর স্ত্রীর আলিয়া চট্টগ্রাম পোছিল। দিগম্বর তাহার প্রাতৃদ্বয়ের মধ্যপথে সাক্ষাৎ পাইলেন। অনেকদিনের পর দেখা হওয়াতে ভ্রা তাদের আনন্দের আর সীনা রহিলনা। এইদিকে ষষ্ঠীচরণের বাড়ীর লােকেরা বিলম্ব দেখিয়া ও ঝটিকা হইয়াছিল বলিয়া, মনে মনে ( ৩৮ ) অনিষ্টাশঙ্কা করিতেছিল। কেহ জনার্দনকে ডাকিতেছিল। কেহ চণ্ডীমণ্ডপে গিয়া চীনাকে ডাকিতেছিল। কালিদাস রােগে শােকে সৰ্ব্বসময়ে সাহায্য করিতেন বলিয়া, হার বাড়ীর নিকটস্থ বেচারাম নামে একজন শূদ্র তাহাদের পরিবারের প্রতি বড়ই অনুরক্ত ছিল। নীলাম্বর কাশ্মীর যাত্রা করিবার সময় এই বেচারামের উপর পরিবারের তত্ত্বাবধানেব ভার দিয়া যান। বেচারাম ও তাহার কাৰ্য যথারীতি সম্পন্ন করিয়াছিল। এই বেচারাম ঝটিকার সময় আসিয়া ষষ্ঠীচরণের পরিবারস্থ লােকগণকে সান্ত্বনা দিতে লাগি লন। ষষ্ঠীচরণ চট্টগ্রাম পেীছিরা বড়ই পুলকিত হলেন এবং জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী ” এই বাক্যটি বার বার 'আওরাইলেন। দান, দয়া ও ধৰ্ম্ম এই তিনটিই তাহার জীবনের লক্ষ্য ছিল । যে দিন ঘষ্ঠীচরণ চট্টগ্রাম পৌছিয়াছিলেন, সে দিন রাত্রেই, তিন ভাই বাড়ী যাত্ৰা করিলেন যষ্ঠীচরণ রাত্রিতে ঘুমাইলেন না। মাঝীরা বসিসের আশায় খুব জোরে নৌকা বাহিতেছিল। পরদিন বেলা আটটার সময় নৌকা ইন্দুরীপােল নানক ঘাটে উপস্থিত হইল। সেই দিন ১২২৫ নঘির ২৭শে ফাগুন বৃহস্পতিবার ছিল। এইদিকে তাঁহাকে দেখিবার জন্য ঘটে লােকে লােকারণ্য হইয়াছিল। নৌকা হইতে তিনি প্রথম যে স্থানে অবতরণ করেন, সে স্থানে তিনি স্বীয় নামে ঐ ষষ্ঠীগঞ্জ ” হাট স্থাপন করেন। উক্ত হাট বৃহস্পতিবার ও রবিবার বসিয়া থাকে। অর্ধঘণ্টা ধরিয়া যষ্ঠীচরণকে কেহ অভিবাদন করিতেছিল আর কেহ আশীৰ্বাদ করিতেছিল। তারপর যষ্ঠীচরণ যে রাস্তা দিয়া আসিন্নাছিলেন সে রাস্তার কতক অংশ মেরামত করিয়া ও একটী পাকাপােল দিয়া ঐ রাস্তার নাম স্বীয় মাতার নামানুসারে প্রিয়ব্রতী রােড, ” ৫
৩৯ )
রাখেন। গ্রামের একদল লােক আনন্দ প্রকাশ করিতে করিতে
কালিদাসের বাড়ী পর্যন্ত আসিয়াছিল। রাস্তার দুই পার্শ্বের ঝােপ
হইতে স্ত্রীলােকগণ তাহাকে দেখতেছিল।
ষষ্ঠীচরণ পুনরায় স্বদেশে।
ষষ্ঠীচরণ বাড়ী ফিরিয়াছে। বাড়ীতে আনন্দের
রোল বহিয়া
যাইতেছে। আবালবৃদ্ধ বনি ৩া সকলেই তাহার প্রমণ বৃত্তান্ত শুনিতে
আসিতেন। সকলেই ঔৎসুক্যের সহিত তাহার ভ্রমণ কাহিনী
শুনিতেন। এই ভাবে ২।১ মাস চলিয়া গেল। তারপর একজন
ধনবান মুসলমান ক্ষয়রােগের প্রতিকার মানসে
প্রতিকার মানসে ষষ্ঠীচরণের নিকট
উপস্থিত হন। সম্পূর্ণ সুস্থ হইলে সষ্ঠীচরণকে ৪৫০ টাকা দিবার
চুক্তি হয়। অর্ধেক টাকা প্রপ দিনেই দেওয়া হইয়াছিল। ঔষধ
প্রস্তুত হইবার পূৰ্বেই রােগী হঠাৎ রক্ত বন কবি। মা মার।
উক্ত মুসলমান রোগীর বিধবা পত্নী পটা। মুন্সকোর্টে টাকা
ফেরত পাইবার জন্য নালিশ করে। ষষ্ঠীচরণ এই জবাব দিলেন
আনি যে টাকা পাইয়াছি দ্বারা ঔষধাদি ক্রয় করিয়াছি।
ঔষধাদি বাদিনী ফেরত পাইতে পারে। বিচারক যাচরণের বিরুদ্ধে
যে মােক মা দায়ের হইয়াছিল তাহা ডিসমিস্ করি। চিলেন , শষ্ঠাচবণ
বাড়ী আসিয়া ও বিশেষভাবে অর্থ উপার্জন করিতে লাগিলেন ।
ষষ্ঠীচরণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণচন্দ্র জ্বরে ভুষ্টিতে ভুগিতে প্লীহাক্রান্ত হন।
শেষে কুলােকুচি করিবার সময় পূর্ণচন্দ্রের মুখ দিয়া রক্ত বাহির হইত
( ৪ ) সৰ্ব্ব প্রকার চিকিৎসা নিরর্থক হইল, দিনে ৩০/১০ বার মলত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে রক্তস্রাব হইতে হইতে পূর্ণচন্দ্র এক প্রকার মৃত প্রায় হইলেন। এখন বাড়বানালে পাঞ্জাব জলন্ধর আখেড়ার প্রসিদ্ধ নাগা সন্যাসী ঐশ্ৰীশঙ্করপুরী স্বামী কিছুকালের জন্য বাস করিতেছিলেন। পূর্ণচন্দ্রকে সেখানে নেওয়া গেল। পূর্ণচন্দ্রকে দেখিয়া স্বামীজী তাহার প্লীহার উপর হাত বুলাইয়া দিলেন। সর্বাঙ্গে মালিশ করিবার জন্য কতক ভন্ম দিলেন। আর যষ্ঠীচরণকে স্বামীজী বলিলেন ওকে তিনবার ডুব দেওয়াইয়া স্নান করাইয়া আন। তারপর আমি ঔষধ দিব। জ্বরের উপর তিনবাব স্নান করাতে ষষ্ঠীচরণ একটু ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। ইহা বুঝিতে পারিয়া স্বামীজী বলিলেন কূচ, পরওয়া নেহি। যষ্ঠী চবণ পূর্ণচন্দ্রকে তিনবার স্নান করাইয়া আনিলেন। স্বামীজী তখন তঁাহার কমণ্ডলু হইতে জল লইয়া পূর্ণচন্দ্রের সঙ্গে নিক্ষেপ করিলেন এবং কতক জল ধুনীতে ঢালিয়া দিলেন। সকলে অবাক হইয়া তামাসা দেখিতেছিল। স্বামীজী পূর্ণচন্দ্রের কাণে একটী মন্ত্র বলিয়া দিলেন। ঐ মন্ত্র খাইবার পূর্বে জপ করিলে শরীর সম্পূর্ণ নিরাময় হইবে সেই দিন পূর্ণচন্দ্র সম্পূর্ণ সুস্থ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জ্বর আনিয়াছিল না। তারপর তাহারা পাল্কী করিয়া নিনে। পাল্কীর ঝাঁকিতে পূর্ণচন্দ্রের অবস্থা বেশী খারাপ হইল। জরের বিরাম ছিলনা। মুখ দিয়া রক্ত বাহির হইত। দন্তপংক্তির মাংসের টুকরা বাহির হইয়া পড়িত। দিগম্বরের পত্নী বিরজা সুন্দরী তাহাকে খুব শুশ্রুষা করিতেন। এইরকম শুশ্রুষা খুব কম দেখা যায়। তারপর পূর্ণচন্দ্রের প্রায়শ্চিত্তের বন্দোবস্ত হয়। পূর্ণচন্দ্রকে কোলে করিয়া দিগম্বর বসিয়াছিলেন। প্রায়শ্চিত্ত শেষ হইলে রােগী হয়তঃ বলিলেন। ছিলেন।
( ৪১ ) রােল উঠিয়া ক্রমশঃ আনােগ্যলাভ করে অথবা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। পূর্ণচন্দ্রের অবস্থা ও প্রথমে খারাপ হইয়াছিল। বাড়ীতে কান্নার গেল। যষ্ঠীচরণ বুক চাপড়াইতে লাগিলেন, দিগম্বর উচ্চতরালে কান্দিতে লাগিলেন। নীলাম্বর বহির্বাটা হইতে ভিতরে আসিয়া নাড়ী পরীক্ষা করিয়া বলিলেন-“ভয়ের কোন কারণ নাই। আপারা সকলে প্রকৃতিস্থ হউন”। দেখিতে দেখিতে পূর্ণচন্দ্র সংজ্ঞা দাভ করিল। যতদূর জানা যায় পূর্ণচন্দ্রকে আর কোন ঔষধ দেওয়া হইয়াছিল না। তিনি শঙ্করপুরী স্বামী প্রদত্ত মন্ত্র জপ করিতে করিতে ২১ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ আরােগ্যলাভ করিলেন। পূর্ণচন্দ্র অঞপূর্ণ লােচনে কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেন যে ষষ্ঠীচরণের ভালবাসা, নীলাম্বরের স্নেহ, দিগম্বরের ভ্রাতৃত্ব ও বিরজার যত্ন এই গুলির সমন্বয়ে তিনি কঠিন প্লীহা রােগ হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। বেশী অর্থাগমের আশাৰ নীলাম্বর এক দোকান। দিয়াছিলেন। দোকানে গুণাগারী পড়িয়াছিল। নীলাম্বর বাড়ীর তত্ত্বাবধানে রহিলেন। দিগম্বর পূর্ণচন্দ্রকে পড়াইবার জন্য চগ্রাম সহরে বাসা করিয়া রহিলেন আর ষষ্ঠীচরণ অর্থোপার্জনের জন্য বিদেশে গেলেন। প্রথমে কলিকাতা যাইয়া হাটখােলার দত্ত পরিবারের কোন লােককে হাঁপানি রােগ হইতে আরােগ্য লাভ করাইয়া বাড়াতে ৭০০ টাকা পাঠাইয়া দেন। তিনি কলিকাতার ব্যবহার করিবেন ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু আবার পরবর্তী মাসে শিম বাজারে যাইয়া রাণী স্বর্ণময়ীর সঙ্গে দেখা করিলেন এবং তপার মণীনভাবে ব্যবসা করিবেন বলিয়া স্থির করিলেন। তথায় প্রায় ৩ সি চলিয়া গেল। এই দিকে তাঁহার পরিবারের আবার দুর্দশার চরম সীমায় ( ৪২ ) পোছিল। নীলাম্বর অতি কষ্টে থালা বাসন প্রভৃতি বিক্রয় করিয়া ঋণ শােধ দিলেন। এইবার দিগম্বর ষষ্ঠীচরণকে আনিবার জন্য মুর্শিদাবাদে গেলেন। ষষ্ঠীচরণ আসিলেন না। তিনি বলিলেন যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতে না পারিলে বাড়ী ফিরিব না। বরং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিব। কাশ্মীরের মহারাজ রনবীর হইতে মাত্র ছয় মাসের ছুটী নিয়া আসিয়াছিলাম । এখন দুই বৎসরের উপর চলিয়া গিয়াছে। কি জানি আমার চাকরী তথায় আছে কিনা। মা জগদম্বাই সব জানেন। অনেক চিন্তার পর তিনি কাশ্মীর যাত্রা করিলেন এবং অনতিবিলম্বে মহারাজ রণবীর সিংহের নিকট ষষ্ঠীচরণ পুনরায় কাশ্মীরে উপস্থিত হইলেন।
ষষ্ঠীচরণ পুনরায় কাশ্মীরে।
মহারাজ, ষষ্ঠীচরণের উপর বিরক্ত হন নাই। মহারাজ একটু
হাসিয়া বলিলেন--বাবুজী এই কি তােমার ছয় মাস ? বােধ হয়
বাংলাদেশের একদিন আমাদের দেশের ৩০ দিনের সমান। গণনাঃ
একটু ভুল হইয়াছে দেখিয়া ষষ্ঠীচরণ তখন বলিলেন, প্রভু ৩০ দিন
নহে, ১২ দিন। ষষ্ঠীচরণের নির্ভীকতা দেখিয়া মহারাজ সন্তুষ্ট হইলেন
এবং তাহাকে ২৫০ টাকা বেতনে উন্নী তকরিলেন। বাড়ী হইতে
বরাবর টাকা পাঠাইবার জন্য চিঠি যাইত। তিনি তথা হইতে
আশাতিরিক্ত টাকা পাঠাইতেন। তিনি প্রায়ই অতিরিক্ত টাকা
পাঠাইয়া নিম্নলিখিত হিসাবে খরচ করিতে বলিতেন :-
টাকা।
২১
১\
শ্ৰীশ্ৰীবাড়ীর ঠাকুর প্রণাম
শ্ৰীশ্ৰজয়লা কুমারী
শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেব
শ্ৰীশ্ৰীপটীয়ার কালী
শ্ৰীশ্রীচট্টেশ্বরী
শ্ৰীশ্ৰীইষ্টদেবী ঠাকুরাণী
শ্ৰীশ্ৰীপাঠক মহাত্মা
শ্ৰীমতী বধূমাতাগণকে
শ্ৰীমতীদ্বয়কে (তাহার পত্নীদ্বয়কে )
শ্ৰীমতী অনঙ্গমঞ্জুরীকে (তাহার ভাগিনী) ।
৪.
৪
( ৪৪ ) ৪। বিবাহিতা কন্যাগণকে ২১ (প্রত্যেককে ) ক্রমান যােগেন্দ্রকে (তাহার ছেলে) শ্ৰীমান শ্যামচরণকে (তাহার ভাগিনেয় ২ শ্ৰীমান উমেশকে (ঐ) শীমতী ছােট জেঠীকে (নীলাম্বরের অবিবাহিতা কন্যা) ২ যুক্ত রাজচন্দ্র চক্রবর্তীকে তঁাহার বাড়ীর গৃহ শিক্ষক) ৫ শ্রীরামদাস ঘরামিকে (বাড়ীর পুরাতন অবসর প্রাপ্ত ভৃত্য) ৩, প্রায় প্রতিমাসেই এবম্বিধ দানের তালিকা থাকিত। এতদ্ব্যতীত তিনি হার কম্মক্ষেত্রের ও চট্টগ্রামের অনেক দুঃস্থ পরিবারকে সাহায্য করিতেন। তাহা এইখানে লিখা হইল না। তিনি অনেক ছাত্রকে পঠব্দশায় ১০০০২০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থ সাহায্য করিয়াছেন। তিনি ১২৯২ বাংলার ৪ঠা পৌষ তঁাহার ছেলে যােগেন্দ্রমােহনের নিকট এক চিঠি লিখেন। ভাহা এই: বাবা ! তোমার কাকাজীগণকে আমার মত জানিও। তােমার খুড়ামাগণকে তােমার মা তার নতুন জানি ও। ১২৯৩ বাংলার ২রা ফাণ তিনি আর এক চিঠিতে লিখিয়াছিলেন বাবা পাঠ্যবিষয়ে মনোেযােগ রাথিও। ধর্মপুস্তকাদি চৰ্চা করিও। সৎস্বধর্মী ভদ্রগণের সঙ্গে ব্যবহার রাখিও। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে ক্ষণকাল ব্যায়াম করিও। বাবা! আমি তােমার চাকরী চাহি ; চতুরতা চাহি, স্বাস্থ্য চাহি, আনন্দ চাহি। ষষ্ঠীচরণ তাহার কনিষ্ঠা ? পর্ণ দু নিকট লিখিয়াছিলেন প্রাণাধিক পূর্ণ ! তুমি নাকি লন। ; ৪ ' । জানিয়া অতীব দুঃখিত হইয়াছি। তােমাকে বালকের মত সুনজিও দেখিলে যে আমরা (ভ্রাতারা) তৃপ্ত হইব, ( ৪৫ ) তােমার মনে কেন এ ধারণা নাই। একজোড়া দোশালা, একজোড়া লাল চাদর তােমার জন্য পাঠাইলাম। অবশ্য অবশ্য পরিধান করিয়া আমাকে তৃপ্ত করিবা । ১২৯০ বঙ্গাব্দের ২৯শে ভাদ্র ষষ্ঠীচরণ আর একখানা চিঠিতে লিথিয়াছিলেন :—“ভ্রাত! শ্রীনাদের শিখা পড়ার ত্রুটি, অভিযোগের ভাগী আনি তােমাকেই করিব। যদি সকল ঐনানই মূখ হইল, তবে আমার আর জীবনের কাজ কি ? মুর্থ পুত্রদের জল গ্রহণ আমি করিব না। এই বিষম সংসার শৈল মাথায় বহন করিয়া ভারতের প্রান্ত সীমায় প্রাণাস্তে কষ্টে বার্থ দিন কাটাইতেছি কেন ? বস্তুতঃ আমি শ্ৰীগানদের পড়ায় শৈথিল্য জানিয়া জড়দগব হইয়াছি। ভ্রাতঃ এখনও মাটী পাকে নাই। শ্রম করিয়া, যত্ন কবিয়া দেখ , ঘট বনে ত উত্তম ; নিতান্ত না হয় আমার মুখ তােমরা আর দেখিতে পাইবে না। ঐ নানগণ আণাকে বর্জন করিলেক।” উপরি উক্ত চিঠি গুলিতে যষ্ঠীচরণের অনেক গুলি সদ্গুণের পরিচয় পাওয়া যায়। অনুপম ভ্রাতৃপ্রেম, সে বদ্বিজে ভক্তি ও শিক্ষায় অনুবাগ। তিনি বিনী ও নিষ্ঠাবান্ হিন্দু ছিলেন। তিনি প্রতিদিন শিব ও শক্তিৰ পূজা করিতেন। তিনি সংবণী ও পূভাচারী ছিলেন। এমন কি প্রস্রাব করিবার পর ও হাত ও পা পরিষ্কার করিয়া ধুইতেন। ষষ্ঠীরণের ভ্রাতৃ বাৎসল্য দেখিয়া চট্টগ্রামের লােকেরা তাহাকে “শাপভ্রষ্ট মনে করিতেন। তিনি, তাহার পুত্র যােগেন্দ্রর নিকট ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১৬ই ভাদ্র লিখিয়াছিলেন :- বাবা ! আমি গৃহাবধৌত। গৃহাবধৌত। আমার কাশী. বাড়ী । সমান । যেখানে ভ্রাতৃগণ, পুত্রগণ, সেখানে আমার আনরাপুর। ব্য: আমি অতীব ভ্রাতৃবৎসল-ভ্রাতৃগত প্রাণ। তােমার বিমা তা দ্বীপান্তরের; ভ্রাতৃগণ ;
( ৪৬ )
একমার পেটের। শ্রীরামচন্দ্র বলিয়াছিলেন “তত্র দেশং ন পশ্যামি যত্র
ভ্রাতা সহােদর।” বাবা তাদৃশ আমার ভারত ভাই শ্ৰীমান নীলাম্বব
আমার লক্ষণ ভাই শ্ৰীমান দিগম্বর, অমার শত্রু ভাই শ্ৰীমান পূর্ণচন্দ্র,
ভ্রাতাদের সঙ্গে
পরামর্শ না করিয়া কোন কাজই
করিতেন না।
ৰষ্ঠীচরণ,
ষষ্ঠীচরণ পুনরায় চট্টগ্রামে।
আড়াই বৎসর কার্য করিয়া, ষষ্ঠীচরণ মহারাজ হইতে বিদায় লইয়া
বাড়ী আসিলেন। ষষ্ঠীচরণ বাড়ী আসিয়া আমোদে দিন কাটাইতে
লাগিলেন। তিনি স্বীয় গ্রামের অনেক গুলি ভরট পুষ্করিনীর পঙ্কোদ্ধার
করিয়াছিলেন এবং কয়েকটি নূতন [রিনী ও খনন করাইয়াছিলেন।
প্রত্যেকটাতে তিনি পাকা ঘাট তৈয়ার করাইয়া দেন। তিনি তাহার
মাতাপিতার চিতার উপর শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
স্ত্রীলােকদের
প্রত্যেককে বহুমূল্য অলঙ্কাবাদি উপহাব দেন।
বৎসর ৫০০ টাকা
মুনাফার ভূসম্পত্তি ক্রয় কবেন। . সুচক্ৰদণ্ডী গ্রামে “ষষ্ঠীগঞ্জ” নামে
হট স্থাপন করেন। স্থানীয় উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে অনেক টাকা
সাহায্য করেন।
( ৪৭ ) পুনরায় কাশ্মীরে। ছুটি শেষ হইয়া গেলে, ষষ্ঠীচরণ তাঁহার দ্বিতীয় পত্নী কাশীশ্বরীকে লইয়া কাশ্মীর যাত্রা করিলেন। দিগম্বর তখন চট্টগ্রাম সারে কালেক্টরীর ট্রেজারীতে কাজ করিতেন। তাঁহার তত্বাবধানে, যােগেন্দ্র মোহন তখন চট্টগ্রাম সইরে লেখাপড়া শিখিতেছিলেন। এইবার ও ষষ্ঠীচরণ বাড়ীতে বেশীদিন ছিলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন মহারাজ তাহার উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছেন; কিন্তু মহারাজকে যথন তিনি, অভিবাদন করিয়াছিলেন, মহারাজ তাঁহাকে খুব সাদরে গ্রহণ করিলেন এবং কিছুকাল আলাপ করিবার পর, ষষ্ঠীচরণকে অন্তঃপুরে যাই, রণবীরের বিমাতা, তদীয় পত্নী ও রাজকুমারীগণকে দেখিয়া আসিতে বলিলেন। ষষ্ঠীচরণ সেখানে গিয়া রণবীর সিংহের বিমা তাকে অভিবাদন করিলেন ও রণবীরের পত্নীকেও যথারীতি সম্মান দেখাইলেন। অন্তঃপুরস্থ মহিলারা সকলেই তাহাকে অনেকদিন পরে পাইয়া বড়ই আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহার অনুপস্থিতিতে, তাহারা কোন ঔষধ সেবন করেন নাই, সে কথাও বলিলেন। ষষ্ঠীচরণের অন্তঃকরণ এখন আশায় পুলকিত। প্রতিদিন সকালবেলা, তিনি রাজকুমারগণ ও মহিলাগণকে দেখিতে যাইতেন। মহারাজকে দিনে দুই বার দেখিতেন। সামান্য অসুখে ও তাঁহারা, যজচরণের পরামর্শ লইয়া ঔষধ সেবন করিতেন। ষষ্ঠীচরণ বাড়ী হইতে যাইবার ছয়মাস পরে, কাশীশ্বরী অন্তঃসত্ত্বা হইলেন। কয়েকমাস পরে কাশীশ্বরীর এক ছেলে হয় । কাশ্মীরে সকলেই আনন্দিত এমন সময়ে খবর গেল ষষ্ঠীচরণের প্রথম পত্নী সুপার পাঁচ বৎসরের একমাত্র ছেলে সন্ন্যাস রােগে মারা পড়িয়াছে। ত ১ s ( ৪৮ ) এই ঘটনার কিছুকাল পর কাশীশ্বরীর সদ্যোজাত শিশুটা ও মারা গেল। কাশীশ্বরী ও কয়েকদিনের মধ্যে মারা গেল। ষষ্ঠীচরণকে সৌভাগ্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলি শোক সহ করিতে হইয়াছিল । ষষ্ঠীচরণের পদোন্নতি উপযুপরি বিপদে ষষ্ঠীচরণ বড়ই ব্যথিত হইলেন। এই বিপদের সময় তিনি রণবীর সিংহ হইতে কিনারায় লাল রং এ রঞ্জিত এক চিঠি পাইলেন। চিঠি পড়িয়া নি জানিতে পারিলেন যে তাহাকে কাজ সরকারের দ্বিবিধ কার্য করিতে হইবে। প্রথমতঃ গৃহ চিকিৎসকের কাৰ্য। দ্বিতীয়তঃ যুবরাজ প্রতাপসিংহের এ, ডি, কং (নৰ্ম্মসচিব) এর কাৰ্য্য। এই পদ পূৰ্বে ছিল না। ষষ্ঠীচরণের জন্যই এই পদ সৃষ্টি করা হইয়াছিল। বলা বাহুল্য, কাশ্মীর রাজ্যের স্বাধীন, নরপতি রণবীর সিংহের মৃত্যুর পর, যখন যুবরাজ প্রতাপ সিংহ উক্ত রাজ্যের মহাবাজ। পদে অভিষিক্ত হন, তখন ও ষষ্ঠীচরণ, তাহার গৃহ চিকিৎসক ও এ, ডি, কং ছিলেন। তাঁহার ভ্রাতা নীলাম্বরের পুত্র গােবিন্দের মৃত্যু খবর ও এইবার তাহার নিকট পৌছিল। তাঁহার সৌভাগ্যোদরে কাশ্মীর রাজ্যের কয়েকজন ঈর্ষাপরায়ণ লােক তাহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র • আরম্ভ করিল। ষষ্ঠীচরণের এই নূতন নিয়ােগে রাজ্যের আমাতাগণ অতিশয় আপত্তি উত্থাপন করিল। রণবীরের দৃঢ় কটাক্ষপাতে ও বৃদ্ধ মন্ত্রী অনন্ত রাম ও পণ্ডিত বলরাম দেবের মধ্যবর্তীতায় সমস্ত গােযােগ মিটিয়া গেল বটে, কিন্তু ষষ্ঠীচরণকে গােপনে হত্যা করিবার জন্য গুপ্ত ঘাতক নিযুক্ত করা হইয়াছিল। একদিন মহারাজের দরবার হইতে ( ৪৯ ) # রাত্র ৮ ঘটিকার সময় যখন তিনি বাসায় ফিরিতেছিলেন, তথন কয়েক জন লােক তাহাকে আক্রমণ করেন। ষষ্ঠীচরণ এই যাত্রা কোন উপায়ে ভগবানের দয়ায় রক্ষা পাইলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা, তর্দেশীয় ভৃত্যগণকে তাহাকে হত্যা করিবার জন্য উত্তেজিত করে। ষষ্ঠীচরণ যথাসময়ে ইহা জানিতে পারিলেন এবং সাবধান হইলেন। ভৃত্যগণকে পারিতােষিক দানে বাধ্য রাখিলেন। এই সময় হইতে ষষ্ঠীচরণের নিরাপদের জন্য জিতু সিং ও চিতু সিং নামে দুইজন শরীর রক্ষক নিযুক্ত করা হয়। চিকিৎসা কাৰ্য্য বাতীত ষষ্ঠীচরণকে যুবরাজ প্রতাপসিংহের সঙ্গে ও দিনে কয়েক ঘণ্টা থাকিতে হইত। প্রতাপ সিংহের বয়স অল্প ছিল। এইজন্য মহারাজ ষষ্ঠীচরণের উপর প্রতাপের চরিত্রগঠনের ভার অর্পণ করিয়াছিলেন। প্র ৩াপকে সঙ্গে লইয়া ষষ্ঠীচরণ সময়ে সময়ে ভ্রমণে নির্গত হইতেন। একদিন রাজ পরিবারের গুরু রঘুনাথজীর আশ্রমে প্রতাপ ও ষষ্ঠী বেড়াইতে গিয়াছিলেন। রঘুনাথজীর সঙ্গে অনেক কথা হইবার পর, তিনি যষ্ঠীকে পুনর্বার দার পরিগ্রহ করিতে বলেন। ষষ্ঠী বলিলেন-আমার প্রথম স্ত্রী এখন ও বর্তমান। তাঁহার বয়স ৩৫, আমার বয়স প্রায় ৪০, আমার ১না স্ত্রীর গর্ভজাত দুইটী মেয়ে আছে। আমার দ্বিতীয় পত্নীর গর্ভজাত ১টা ছেলে ও একটী মেয়ে আছে। কাজেই বিবাহ নিস্পয়ােন। বিশেষতঃ বিবাহ করিতে চট্টগ্রামে যাওয়া আসায় দুইমাস সয় লাগিবে। টাকা ও অনেক খরচ পড়িবে । এই সমস্ত কথা শুনিয়া যুবরাজ প্রতাপ সিংহ বলিলেন-“আমি পিতা মহাশয়কে বলিয়া ছুটী মঞ্জুর করাইয়া দিব। আপনার বিবাহে যত টাকা খরচ পড়ে, সমস্ত রাজকোষ হইতে যাইবে।” কাশীশ্বরীর মৃত্যু সংবাদ বাড়ী পৌছিলে, যষ্ঠীচরণের ভ্রাতারা আর ( ৫০ ) একটী পাত্রী নির্বাচন করিয়াছিলেন। পা স্ত্রীর বয়স ১৫ বৎসর ছিল। কিন্তু তখন নিম্নলিখিত চিঠি খানা দিগম্বরের হাতে পড়ে। এই চিঠি থার্ম জম্বু উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের হেড, মাষ্টার শ্ৰীযুত উপেন্দ্রমােহন বসু মহাশয় লিখিয়াছিলেন। এই চিঠির নকল আমরা নিয়ে দিলাম- “শ্রীমতী শ্যামার মাতাঠাকুরাণীর স্বর্গ প্রাপ্তি হইলে মহারাজা ও রাজ পুত্র প্রভৃওি সকলে তাহাকে পুনর্বিবাহ করিতে বিশেষ উত্তেজনা করেন। কবিরাজ মহাশয়ের মত ছিল দেশে যাইয়া বিবাহ করিবেন। দিল্লী দরবার সময়ে মহারাজা ও রাজপুত্র অনেক বাঙ্গালী ভদ্রলােক দেখিয়া আবার বিবাহের কথা উত্থাপন করেন ; এমন কি মহারাজ। স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া নীলাম্বর বাবু প্রভৃতিকে কন্যা অনুসন্ধান এবং সত্বর বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা করিতে আদেশ করেন। সেই সময় কবিরাজ মহাশয় চট্টগ্রাম যাইতে ছুটী প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা করেন। কিন্তু মহারাজ কিছুতেই স্বীকৃত হইলেন না। এতদ্দেশেই বিবাহ করিতে জোর করেন। অগত্যা রূড়কী নামক সহরে প্রথম কথা হয়। সেই সময় কন্যার পিতা এবং অপরাপর আত্মীয় দিল্লীতে উপস্থিত ছিলেন। মহারাজ নিকটে আনাইয়া তাঁহাদিগকে বিশেষ যত্ন করেন, এবং একহাজার টাকা দিয়া কবিরাজ মহাশয়কে রূড়কী পাঠাইয়া দেন। তথায় যাইয়া কন্যার পিতার কুল পরিচয় অনুসন্ধান করায় জানা গেল, সে ঘর নীচ। পরিশেষে সাহারণ পুর নামক সহৱে শ্ৰীযুক্ত বাৰু জয়গােপাল বন্ধু মহাশয়ের কন্যার সহিত শুভ পরিণয় কার্য সমাধা হইয়াছে। কর বয়স দ্বাদশ বৎসর, নাম ঐমতী বিশ্বেশ্বরী। জয়গােপাল বস্তু এখানে একজন প্রসিদ্ধ বােক। তিনি যমুনা কেনাল অফিসের হেভ ক্লার্ক। ৯ টাকা ৰেক্তন পান। ইহার বাড়ী কলিকাতার নিকট পতা। আমার বাড়ী হইতে পাছ মাইল ব্যবধান। বঁহার ঘর খুব পুরাণা। ইঁহারা কায়স্থ বংশে ( ৫১ ) অতীব মাননীয়। ইনি ও আমি উভয়ে একবংশজ। আপনাদের উপস্থিতিতে বিবাহটি হইল না সেই জন্য কবিরাজ মহাশয় ও আমরা সকলেই দুঃখিত আছি। কি করা যায়। রাজাজ্ঞা উল্লম্বন করা দুরূহ ব্যাপার। ইত্যাদি। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে পিল্লী দরবার বসে। তখন ষষ্ঠীচরণ রণবীর সিংহের এ, ডি, কং হইয়া দিল্লী আসেন। এই দরবারের পর ষষ্টীচরণের বিবাহ হয়। তৎপূর্বে আর কোন চট্টগ্রামবাসী লােক, পশ্চিম বাঙ্গালার সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন নাই। কাশ্মীরে মহারাজ রণবীর সিংহ ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে কলিকাতা যুবরাজ এডওয়ার্ডের আগমন উপলক্ষে দেশীয় রাজন্যবর্গকে লইয়া যে এক দরবার বসে, তাহাতে নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছিলেন। এই দরবারে ষষ্ঠীচরণ, মহারাজের গৃহচিকিৎসক ও এ, ডি, কং হইয়া আসিয়াছিলেন। কলিকাতা হাইকোর্টের ভূতপূর্ব জষ্টিস চন্দ্ৰমাধব ঘােষ মহাশয় ( তদানীন্তন কালের উকিল,) কবিবর নবীনচন্দ্র সেন (তখন বি, এ, পাশ করিয়াছে,) চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার প্রসন্নকুমার রায় (তখন কলেজ ছাত্র,) কলিকাতা হাইকোর্টের উকিল অখিলচন্দ্র সেন মহাশয় ও অখিল বাবুর সতীর্থ ও হাইকোর্টের বেষ্ণক্লার্ক শশীভূষণ বসু মহাশয়গণ, কবিরাজ মহাশয়র সহায়তায় হিন্দুকুল-তিলক কাশ্মীরের স্বাধীন নরপতি রণবীর সিংহের সাক্ষাৎকার লাভ করেন। কলিকাতার দরবারের পর স্বরাজ্য প্রত্যাগমন কালে, কাশীধামে কিছুকাল অবস্থান করিবার সময়, মহারাজর স্মৃতি-রক্ষা করিবার জন্য, কবিরাজ মহাশয় বারাণসীধামে অনুছত্র ও সংস্কৃত চতুম্পাঠীর প্রতিষ্ঠার বিষয় মহারাজের নিকট প্রস্তাব করেন। কবিরাজ মহাশয় স্বীয় মনােনয়নক্রমে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে উক্ত চতুম্পাঠীর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। কবিরাজ মহাশয় কাশ্মীর রাজ সরকারে ( ৫২ ) f চাকরী গ্রহণ করিবার পূর্বে, তীর্থে তীর্থে পরিভ্রমণ করির সময়ে, হরিদ্বারে “চণ্ডী পাহাড়” ও “অঞ্জন পাহাড়ে” বিগ্রহাদির উপযুক্ত মন্দিরাদি নাই দেখিয়া মনে মনে বড় দুঃখিত হন। শেষে কাশ্মীর রাজুসরকারে চাকরী গ্রহণ করিবার পর, এ বিষয় রাজসমীপে নিবেদন করেন। কাশ্মীরাধিপতি রণবীর সিংহও : দেশে প্রত্যাগমন হরিদ্বারে উপস্থিত হন। এই সুযােগে এবিষয় কবিরাজ মহাশয় মহারাজকে বিশেষ ভাবে অনুরােধ করেন। ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে মহারাজ, কবিরাজ মহাশয়ের দ্বারা অনুরুদ্ধ ও উৎসাহিত হইয়া উপরিউক্ত প্রসিদ্ধ হিন্দুর তীর্থস্থানে দুইটি ইষ্টক নির্মিত মন্দির নির্মাণ করেন। স্বদেশে প্রত্যাগমন। বিশ্বেশ্বরীর বিবাহের পর, ষষ্টীচরণ একবার বাড়ী আসিলেন। বিশ্বেশ্বরীকে দেখিবার জন্য অনেক লােক একত্র হইয়াছিল। প্রায় ১ মাস ধরিয়া গ্রামের ও নিকটবর্তী স্থান সমূহের পুরুষ ও স্ত্রীলে'কেব। বিশ্বেশ্বরীকে দেখিতে আসিত। বিশ্বেশ্বরী পরমা সুন্দরী রমণী ছিলেন। পূর্ণলক্ষ্মীও ছিলেন। তাঁহার বিবাহের পর হইতেই ষষ্ঠীচরণের প্রভূত অর্থাগম হইতে থাকে। বিশ্বেশ্বরী বাঙ্গালীর মেয়ে হইলেও, বরাবর পাঞ্জাবে পরিবর্ধিতা ও শিক্ষিত হইয়াছিলেন। কাজেই তাহাকে, এই দেশীয় স্ত্রীলােকের সঙ্গে চলা ফেরা করিতে প্রথমতঃ কিছু বেগ পাইতে হইয়াছিল। কিছুকাল গেলে পর, এই বুদ্ধিমতী রমণী সকলকে আপনার করিয়া ফেলিলেন। তাহার সঙ্গে দিনে ২১ বার কথা বলিতে পারিলে অন্যান্য স্ত্রীলােকেরা নিজকে ধন্য মনে করতেন। - ( ৫৩ ) - -- ষষ্ঠীচরণ এইবারও যথেষ্ট অর্থ দান করিলেন। সাধু, সন্যাসী, ব্রাহ্মণ, গবীব, দুঃখী প্রভৃতিকে অকাতরে ধনদান ও অন্নদান করিলেন । এইবার তিনি । ঘর ব্রাহ্মণ স্থাপন করিলেন। বিষ্ণুমণ্ডপটা পাকা ইষ্টক নির্মিত করাইয়া তথায় “রাজরাজেশ্বর বিগ্রহ স্থাপন করেন। এই কাৰ্যে তাহার অনেক সহস্র টাকা খরচ হইয়া যায়। উপরিউক্ত বিগ্রহ সম্বন্ধে অনেক গুলি কথা প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে নিম্ন একটি বিবৃত করিলাম । পাঞ্জানের জলন্ধর আখড়ার মােহন্ত' নাগা সন্ন্যাসী শ্ৰী শ্ৰীশঙ্কর পুরী স্বামী একদিন প্রাতঃকালে শিষপরিবৃত হইয়া, নর্মদা- নদীর কূলে বিশ্রাম লাভ করিতেছিলেন। সঙ্গে চট্টগ্রামেরও কয়েকজন লােক ছিলেন। এই সঙ্গে পরৈকোড়ার দুর্গাকুমার ভট্টাচাৰ্য্য (সেরেস্তাদার ) মহাশর ও ছিলেন। স্বামীজীব শিষেরা নৰ্ম্মা নদীতে ডুব দিয়া অনেকগুলি শালগ্রাম উঠাইয়াছিল। কথায় কথায় শামীজি হাসিয়া বলিলেন যে ইহাদের মধ্যে একটি ও শিলাচক্র নহে। শিষ্যেরা তখন আশ্চর্যান্বিত হইলেন। শিষ্যদিগের বিস্ময় দূর করিবার জন্য তিনি যখনই এক একটি করিয়া শিলচক্রকে নমস্কার করিলেন, তখন একে একে সমস্ত শিলাচক্র ফাটি। গেল। তারপর আর এক জন শিষ্য আর একটি শিলচক্র নদী হইতে উঠাইলেন। এই শিলচক্রকে ও স্বাণীজী নমস্কার করিলেন । এই শিলচক্রটি ফাটিয়া গেল না। পরন্তু ঘুরিতে লাগিল। ইহা দেখির স্বামীজী আনন্দচিত্তে বলিলেন যে এই শিলাটিই প্রকৃত শালগ্রাম । তখন তিনি ঐ শালগ্রামটি মাথায় নিলেন ও ইহার লক্ষণাদি নিরীক্ষণ করিয়া ইহাকে “রাজরাজেশ্বর” নাম দিলেন। স্বামীজী তাহার কোন ব্রাহ্মণ শিষ্যের উপর ঠাকুরের পূজার ভার দিলেন। ঠাকুরের সেবা রীতিমত হয় না এই মর্মে শামীজী স্বপ্ন দেখিলেন। তখন f:নি “রাজরাজেশ্বর” শিলাচক্রটি তাঁহার প্রিয় শিষ্য ষষ্ঠীচরণকে দিলেন।
( ৫৪ ) ষষ্ঠীচরণের বাড়ীতে এখনও ঐ ঠাকুর আছেন। এই ঠাকুরকে ডাবের জলে স্নান করাইবার ও ভােগ দিবার মানত করিলে, মনস্কামনা সিদ্ধ হইয়া থাকে বলিয়া ৰষ্ঠীচরণের পরিবারস্থ লোকের ও গ্রামবাসীর বিশ্বাস। চট্টগ্রাম ট্রেজারীতে ষষ্ঠীচরণ একবার প্রায় দুই লক্ষ টাকার Currency notes ভাঙ্গাইয়া টাকা চাহিয়াছিলেন। তখন, সেই পরিমাণ টাকা ট্রেজারীতে ছিলনা। এই ঘটনা সিপাহিবিদ্রোহের কয়েক বৎসর পরে ঘটিয়াছিল । আপনারা জানেন সিপাহিবিদ্রোহের সমঃ অনেক টাকার নােট চুরি গিয়াছিল। গবর্ণমেন্ট ষষ্ঠীচরণের নিকট এত টাকার নােট আছে দেখিয়া বিঘ্নিত হইয়াছিলেন এবং কাশ্মীরের মহারাজের নিকট গােপনে টেলিগ্রাফ দিয়াছিলেন। সরকার বাহাদুর যখন জানিতে পারিলেন যে এই নােটগুলি কাশ্মীরের মহারাজেরই দান, তখন সরকার বাহাদুরের সন্দেহ দূর হইয়াছিল। এই ঘটনা লইয়া অনেকে অনেক কথা বলিয়া থাকেন। এখনও গ্রামের লােকেরা বলেন যে ষষ্ঠীচরণের নােটের টাকা সরকার বাহাদুর দিতে পারেন নাই। ষষ্ঠীরপ অল্প সময়ের মধ্যে অন্যন ২০ লক্ষ টাকা উপার্জন করিয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণের কনিষ্ঠ ভাতা পূর্ণচন্দ্রের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্গাবর কিছুকাল রাঙ্গামাটিতে গবর্নমেন্ট হাইস্কুলে শিক্ষকতার কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। দুর্গাবর একবার তত্ৰত্য রাজা ভুবনমােহনের সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলেন। রাজা মহােদয়, দুর্গাবরের পরিচয় পাইয়া, তাহাকে সাদর সম্ভাষণ করিলেন এবং এক অদ্ভুত প্রশ্ন করিয়াছিলেন। প্রশ্নটি এই :- আমি ছেলে বেলায় শুনিয়াছি যে যষ্ঠীচরণ কবিরাজ মহাশয় সােণা তৈয়ার করিতে জানিতেন। কথাটা সত্য কিনা? ইহার যথােচিত উওর দুর্গাবর, বাজাবাহাদুরকে দিয়াছিলেন। ইহাতে রাজার মনের একটা ভ্রান্তি দূর হইয়াছিল ।
( ৫৫ ) ৩ তিনি বড় দাতা ছিলেন। তিনি সাধু, সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণকে দান করিবার সময়ে এক মুতে যত টাকা ধরে অন্ততঃ ততটাকা দিতেন। বেশীও দিতেন, কিন্তু কম দিতেন না। কাশী, হরিদ্বার, গয়া, প্রয়াগ, এবং কাশ্মীরেই তিনি তাহার আয়ের তিন চতুর্থাংশ অর্থ দান করিয়াছেন। তাহার স্থায় দাহ চট্টগ্রামে অতীব বিরল। বিশ্বেশ্ববীকে বিবাহ করিবার পর ষষ্ঠীচরণের মাসিক বেতন ১••• টাকায় উন্নীত হইয়াছিল। ঐ টাকা 'হার বাসা খরচেই বায়িত হইত। তথাপি তিনি মাসে মাসে ১০,•••১২,••০ টাকা কোথা হইতে পাঠাইতেন, এই বিষয়ে লােকের মনে একটি সমস্যা রহিয়া গিয়াছে। ঐ সমস্যাৰ আজ সমাধান হইবে। ষষ্ঠীচরণ যে সময়ে কাশ্মীরের মহারাজের ন'গ্মসচিব ও গৃহ চিকিৎসকের কার্য্য করিতেন, তখন রণবীর রণবীর সিংহেরই রাজত্বকাল। তখন বৰ্ত্তমান মহারায় প্রতাপসিংহ যুবরাজ ছিলেন। কোন কারণে প্রতাপসিংহ দুশ্চিকিৎস্য রােগে আক্রান্ত হন। তাহাতে রণবীরসিংহ রাগান্বিত হইয়া, তাহাকে যুবরাজের পদ হইতে বরখাস্ত কবিলেন ও তঁাহাব দ্বিতীয় পুত্র রাসিংহকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করিবেন স্থির করিয়াছিলেন। প্রতাপসিংহ হতাশ হইয়া গেলেন এবং তাঁহার পিতার বন্ধু সঙ্গীচণের নিকট সমস্ত বিষয় নিবেদন করিলেন। ষষ্ঠীচরণকে প্র তাপসিংহ “ধৰ্ম্মপিতা” ডাকিতেন। রামসিংহ ও অমরসিংহ ( প্রতাপসিংহের ভ্রাতৃদ্বয়। কবিরাজ মহাশয়কে “কাকাবাবু” ডাকিতেন। ষষ্ঠীচরণ, প্রতাপনিংকে দুই সপ্তাহকাল চিকিৎসা কবিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ করেন পিতা ও পুত্রের মধ্যে মিলন ঘটান। প্রতাপসিংহ আবার যৌবরাজে। অভিষিক্ত হইলেন। প্রতাপসিংহের মাসিক নির্ধারিত বৃত্তি ৫• ••• টাকা হইতে ষষ্ঠীচরণকে মাসে ১,০০০ টাকা পারিিেষক স্বরূপ দিতেন। D এবং ( ৫৬ ) এই টাকা ষষ্ঠীচরণ বাড়ীতে পাঠাইতেন। তিনি private practice করিয়া * অনেক টাকা উপার্জন করিতেন। সে সমস্ত সে সমস্ত টাকা তিনি দান করিন। তাঁহার আয়ের আরও একটি প্রশস্ত পথ ছিল। তাহা এই :--আপনারা সকলেই জানেন কাশ্মীর খুব সুফলা ; কিন্তু কাশ্মীর রাজ্যের লাে কী ডিষ্ট্রিক্ট অফিসারেরা, জমিদারদের সঙ্গে একত্র হইয়া ফসল ভাল হয় না বলিয়া রিপাের্ট দিয়া জমিদারদের খাজানা অনেক বাকী রাগিয়াছিল । এ বিষয় মহাবাজ ষষ্ঠীচরণেব সঙ্গে আলাপ কবিলেন এবং তােক গােপনে অনুসন্ধান করিবার ভার ছিলেন। তিনি অনুসন্ধানে জানিতে পাবিলেন যে জমিদারদের নিকট যথেষ্ট অর্থ আছে, ফঁদ পাখিয়াছে মাত্র। হাজ যষ্ঠীচরণকে দুইদল সৈন্য দিয়াছিলেন। তিনি ইহাও আদেশ কয়ািছেন যে যষ্ঠীচরণ যেন জমিদারদের বাড়ী অবরােধ করিয়া রাজস্বের বাকী টাকা উসুল করেন। জমিদারদের অবস্থা খারাপ দেখিলে, খাজানা রেহাই দিবার ক্ষমতাও দিয়াছিলেন। এই আদায়ী অর্থ হইতে মহাবাজ, ষষ্ঠীচরণকে একটা অংশ অঙ্গকার করিয়াছিলেন। এ ভাবেও যষ্ঠীচরণ ৭ লক্ষ টাকা আয় কপিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য তাঁহার প্রায় অর্থই ' দানে বায়িত হইত। মষ্ঠীচরণের সৌভাগােদয়ে, কাশ্মীরে নূতন নূতন শত্রুব উদ্ভব হইতে লাগিল। এই বার ষষ্ঠীচরণব অনুপস্থিতিতে সুযােগ বুঝিয়া লচমন দাস ও ১৭য়াল সিংহ দুইজন নেয় কর্মচারী মহারাজ রণবীর সিংহের নিকট, ষষ্ঠীচবশেষ নিরুদ্ধে অনেক কথা বলিয়াছিল। প্রথমত মহারাজ গ্রাহ্য করেন নাই; কিন্তু শেসে যখন পূৰ্ব্বোক্ত কর্মচারীদ্বয় মহাবাকে.এইকথা বলিল যে মষ্ঠীচরণ যাদুমন্ত্রের প্রভাবে যুবা প্রতাপ সিংহকে করায়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে এবং সুযােগ পাইলে মহারাজের প্রাণ সংহার করিয়া, এবরাজকে রাজা করিয়া, যষ্ঠীচরণ রাজ্যের মধ্যে ( ৫৭ ) সর্বেসর্বা হইবেন, তখন রণবীর, ষষ্ঠীচরণকে কিছু কালের জন্য কর্মচুত করিয়া রাখিতে স্থির করিলেন। এইদিকে যষ্ঠীচরণ চায়িমাস কাল মাত্র বাড়ীতে থাকিয়া, সস্ত্রীক লাহােরে পৌছিলেন। এইখান হইতে তিনি মহারাজের ৭ যুবরাজের নিকট তাহাব আগমনের বিষয় জানালেন। সিয়ালকোট পর্যন্ত যষ্ঠীচরণ বেশ আনন্দচিয়ে ছিলেন। তারপর বৃদ্ধ দেওয়ান অনন্তরামের লােকমারফত চিঠি পাইয়া, ষষ্ঠীচরণের মনের প্রফুল্লতা চলিয়া গেল। ষষ্ঠীচবণ, মহারাজের দ্বিতীয় আদেশ পর্যন্ত লাহােরে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। ষষ্ঠীচরণের বিচার ও পুনর্নিয়োেগ । মহাবাজা নিজেই এই বিষয় পুত্থানুপুঙ্খরূপে তদন্ত করিতে লাগিলেন। যুববাজ প্রতাপসিংহ ও তার অধীনস্থ কর্মচারী ও ভত্যাদি গৃহদিতেও তদন্ত করা হইয়াছিল। যুবজে ও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হইয়াছিল। কিন্তু সঙ্গীচরণের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া গিয়াছিল না।. দেওয়ানের পরামর্শানুসারে যষ্ঠীচবণ লাহােব অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তিনি তথায় লাহাের কলেজের অধ্যাপক চন্দ্রনাথ মিত্র ও মহেশ চন্দ্র বােস মহাশয়দ্বয়ের বাসায় অস্থায়ী ভাবে বাস করিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে তিনি তঁাহাব নব পণিী ভার্যা বিশ্বেশ্ববীকে বাড়ী পাঠাইলেন। লাহাের হইতে ষষ্ঠীচরণ, মহারাজের নিকট সুবিচার প্রার্থী হইয়া এক আবেদন পাঠাইলেন। এই আবেদনের পর বিচার আরম্ভ হইল। মাসের পর মাস চলিতে লাগিল তথাপি কোন খবর নাই। দেওয়ান অনন্তরামের পত্র মাঝে ২ ষষ্ঠীচরণের অন্তরে আশার সঞ্চার করি।
( ৫৮ ) বিচার কার্য্য ছয় মাসে শেষ হইল। ষষ্ঠীচরণ বেকসুর খালাস পাইলেন। পণ্ডিত বলদেব, হীরাজী পুরােহিত এবং ফকিরাজী ও জিতুসিং নামে দুইজন শরীর রক্ষক, মহারাজের হস্তশিথিত একখানা চিঠি, লাহােবে আসিয়া ষষ্ঠীচরণকে দিলেন। চিঠির অনুবাদ নিম্নে দেওয়া গেল : আপনি আমার একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী। আপনার বিরুদ্ধে একখানা মিথ্যা মােকদ্দমা বিচার করিতে যাইয়া বড়ই দুঃখিত হইয়াছি। অভিযােগ সর্বৈব মিথা প্রমাণিত হইয়াছে। দুঃখিত হইবেন না। শীঘ্রই আপনাব কার্যে হাজির হউন। মহারাজের এই আদেশ পাইয়া, ষষ্ঠীচরণ শীঘ্রই জবাজ ভবনে উপস্থিত হইলেন। শত্রুণ পরাস্ত হইল। লচমন দাস কারারুদ্ধ। হইল। সওয়াল সিংহের চাকরী গেল। অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদেরও অধিক শাস্তি হইয়াছিল। এই সময় ষষ্ঠীচবণের খ্যাতি, কাশ্মীর রাজ্যের ঘরে ঘরে মুখরিত হইতে লাগিল। সমস্ত কাশ্মীর রাজ্যে তিনি একনামে পরিচিত হইলেন। কাশ্মীরের লােকেরা এখন হইতে তাহাকে ভক্তি ও ভয় করিতে লাগিল। তাহাদেব বিশ্বাস হইয়াছিল । যে মহারাজ ও যুবরাজ দুই জনেই ষষ্ঠীচরণের পরামর্শ লইয়া রাজ্যের অত্যন্ত গােপনীয় বিষয়গুলির মীমাংসা কতেন। এই বিশ্বাসের ভিত্তিও ছিল। গৃহচিকিৎসক হিসাবে যষ্ঠীচরণকে রাজ পরিবারের স্ত্রী, পুরুষ সকলেরই, প্রাতে ৭টা হইতে ৮টার মধ্যে নাড়ী পরীক্ষা করিতে হইত। ৮টা হইতে ১১টা পর্যন্ত রাজদরবারে সভাসরূপে, ষষ্ঠীচরণ উপস্থিত থাকিতেন। প্রায়শঃই ধর্মবিষয় লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মহারাজের সম্মুখে বাদানুবাদ হইত। ষষ্ঠীচরণ মধ্যস্থ হইয়া মীমাংসা করিয়া দিতেন। বেলা তিনটার পর তিনি সরকারী দাবাইখানাতে কাৰ্য্য করিতেন। পূৰ্ব্বে কাশ্মীরে ( ৫৯ ) কোন দাবাইখানা ছিল না। ষষ্ঠীচরণ বহু শ্রমসহকারে মহারাজের অর্থানুকুল্যে এই দাবাইখানার প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ধুবরাজকে সঙ্গে করিয়া, কখনও, কখনও মহারাজের সঙ্গে রাজগুরু রঘুনাথজীর আশ্রমে যাইতেন। এ, ডি, কং স্বরূপে, ষষ্ঠীচরণ যুবরাজ প্রতাপ সিংহকে অনেক বিষয়ে উপদেশ দিতেন। সময়ে সময়ে পর্ধাদি উপলক্ষে ষষ্ঠীচরণ মহারাজের সঙ্গে পাশা খেলিতেন ও কখনও মহারাজ ও কখন যুববাজার সঙ্গে মৃগয়ায় বহির্গত হইতেন। এই সময়ে ষষ্ঠীচরণের তৃতীয়া পত্নী বিশ্বেশ্বরীর গর্ভে শ্ৰীমান হরিরঞ্জনের জন্ম হয়। তারপর ষষ্ঠীচরণ, তাহার প্রথম পুত্র যােগেন্দ্র মােহনকে বিবাহ করাইবার জন্য পঞ্চাগ্নি যাগ প্রভৃতির অনুষ্ঠানের জন্য মহারাজ হইতে এক বৎসরের অনুগ্ৰহ ছুটি লইয়া বাড়ী আসিলেন। ষষ্ঠীচরণের প্রতিষ্ঠানাদি। ষষ্ঠীচরণ বহু অর্থব্যয়ে পঞ্চাগ্নি যজ্ঞ সমাপন করিয়া প্রায় বিশসহ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, শূদ্র, মগ এবং মুসলমানকে অকাতরে অনুদান করেন। দেশীয় লােকেরা বলেন যে এরূপ জাকজমকপূর্ণ পঞ্চায়ি যজ্ঞের কথা তাহারা কখনও শুনেন নাই। চট্টগ্রামের অনেক গণ্য মান্ত লােক এই যজ্ঞে উপস্থিত ছিলেন। তারপর যােগেন্দ্র মোহনের বিবাহ বিশেষ ধুমধামের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল । একমাস ধরিয়া ষষ্ঠীচরণের বাড়ী অন্নসত্রের ন্যায় হইয়াছিল। লােকে । লােকারণ্য যাত্রার অভিনয়ে, নর্তকীদের নাচে, বিবিধ রকমের বাজনার শব্দে সমস্ত গ্রামটি মুখরিত হইয়াছিল। হাজার হাজার লােকের দিন দিন ( ৬০ ) নিমন্ত্রণ থাকিত। এইবাবও চট্টগ্রামের অনেক গণ্যমান্য লােক উপস্থিত ছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে নিম্নে কয়েকজনের নাম করা গেল :--- নােপাড়াব জমিদার ত্রিপুচরণ বাবু, কলিকাতার লব্ধ প্রতিষ্ঠ উকিল বাবু অখিল চন্দ্র সেন, গৈড়লা গ্রামের জমিদার বাবু কাশীমােহন সেন, তখনকার সময়ের চট্টগ্রাম সহরের সমুদর ডেপুটী কালেক্টার ও মুনসেফ মহােদয়গণ ও পটীয়ার মুসেফগণ ও খাডিপুঢ়ী প্রভৃতি। ব্রাহ্মণ জমিদার বাবু উপেন্দ্র মােহন ভট্টাচাৰ্য্য ও উপস্থিত ছিলেন। বিবাহের দশদিনে অন্ন পনব হাজার লােক নিমন্ত্রণ খাইয়াছিল। তিনি স্বীয় নামে দীবিকা খনন, রাস্তা নির্মাণ, স্বীয় জননীর নামে রাস্তা নির্মাণ স্বীয়গ্রামে “ষষ্ঠীগঞ্জ” নামে হাট স্থাপন, চট্টগ্রামস্থ বাঁশখালী থানার অন্তর্গত উঁদপুরে হাট স্থাপন, চট্টগ্রাম সহরে শ্রীশ্রীচট্টেশ্বরীর বর্তমান ইষ্টক নিৰ্ম্মিত মন্দির নির্মাণ, স্বীয় মাতা পি তার চিতার উপর শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা, পঞ্চদেবতার মন্দির নিষ্মণ, ইষ্টদেবের চিতার উপর শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা, সীতাকুণ্ডে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা, সুচক্ৰদণ্ডী গ্রামে একটি নিম্নপ্রাইমারী স্কুল, একটি বালিকা বিদ্যালয়, একটি মধ্য-বাঙ্গাণা বিদ্যালয় এবং কাশ্মীরে “সরকী দাবাইখানা” নামে একটি ঔষধালয় স্থাপন করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি স্বীয় গ্রামে তিন সহস্র টাকা ব্যয় করিয়া “গিরীশ লাইব্রেরী” নামে একটি পুস্তকালয় স্থাপন করেন। অধিবাসী বৃন্দেব পানিয় জলের সুবিধার জন্য তিনি স্বীয় গ্রামে ও জমিদাবীতে ন্যূনধিক ত্রিশটি পুষ্করিণী খনন কইয়া ঝিছেন। কবি গজ মহ শর চট্টগ্রামস্থ বাঁশখালী থানার অন্তর্গত চান্দপুর নামক স্থানে জনৈক মুসলমান ফকিরেব , কববের উপর একটি সমাধি মন্দির নির্মাণ করিয়া দিয়াছেন। ষষ্ঠীচ ণ যখন এই ভাবে আনন্দে দিন কাটাইতে ছিলেন, তখন হঠাৎ একদিন দেওয়ান কানন্তরাম হইতে খবর আসি মহারাজ কঠিন ( ৩১ ) রােগে পীড়িত। আপনার ঔষধ বীত আর কাহারও ঔষধ খাইতে চাহিতেছেন না। শীঘ্র আনুন। নিম্নে টেলিগ্রাফের নকল ও দেওয়া 6919 :- “Maharaja is seriously ill. uongs for no other. Medicine excupt yours. Come sharp.” GafaETTE TEENS ষষ্ঠীচরণ সত্বর জন্ধ, যাত্রা করিলেন এবং যথাসময়ে সিয়ালকোট পৌছিয়া জানিতে পাখিলেন যে মহারাজা মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছেন। A ষষ্ঠীচরণ পুনরায় কাশ্মীরে। মৃত্যু সংবাদ পাইয়া, ষষ্ঠীচবণ বালকের ন্যায় কান্দিয়া ফেলিলেন। অনতিবিলম্বে সিয়ালকোট হইতে কাশ্মীরে যাইয়া, ষষ্ঠীচরণ যুবরাজ প্রতাপসিংহ, অন্যান্য কুমারগণ ও রণণীর নিংহেব পত্নীকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন। মহাজেব মৃতাব পাঁচ দিন পবে ষষ্ঠীচরণ কাশ্মীর পৌছিয়াছিলেন। অষ্টম দিবসে সুচতুর দেওয়ান বৃদ্ধ অনন্তম মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। কাশ্মীযে স্বাধীন নবপতি বীর সিংহো ও তদীয় দেওয়ান অনন্তরামের মৃত্যুতে কাশ্মীর রাজ্যে উচ্ছঙ্খলা আরম্ভ হইল। কুমারদের মধ্যে সিংহাসন লইয়া বিরােধ উপস্থিত হইল। এই অবস্থার ইংরেজ হস্তক্ষেপ করিলেন। কাশ্মীর স্বাধীনতা হারাইয়া মিত্রবাজ্যে পরিণত হইল। শ্ৰীযুক্ত নীলাম্বর মুখার্জী মহাশয় তঁাহাব কৰ্ম্ম ত্যাগ কবিলেন। একমাত্র ষষ্ঠীচরণই তাদের মধ্যে মিলন ঘটাইতে বদ্ধ পরিকর হইনে। প্রতাপ সিংহ কাশ্মীরের রাজা হইলেন, রাম সিংহ প্রধান সেনাপতি হইলেন। Powden সাহেব ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হইলে একটি শাসন পরিষদ ও গঠিত হইল। Plowden কিন্তু ও কুমার অমরসিংহ ইহার সভ্য হইলেন। মহারাজ প্রতাপসিংহ এই সভার সভাপতি হইলেন। ক্রমাগত ছয়মাস গোলযােগের পর কাশ্মীরে শান্তি স্থাপিত হইল। এই বিষয় উল্লেখ করিয়া ষষ্ঠীচরণ তাহার কনিষ্ঠভ্রাতা পূর্ণচন্দ্রের নিকট নিম্নলিখিত চিঠিখানা লিখিয়াছিলেন : “প্রাণ প্রতিম। তােমরা খবরী কাগজে যাহা জানিতেছ তাহা কিছু সত্য, কিছু রঞ্জিত। ইংরেজ এজেন্ট বসিয়াছেন সত্য ; কোনরূপ বিভ্রাটের বাষ্পও নাই। তবে নুতন রাজা হইলে সকল স্থানেই নানারূপ আন্দোলন হয় ; অনেক বিষয় উতপ্লত হয় নীলাম্বর বাবু, (শ্ৰীযুক্ত নীলাম্বর মুখার্জী) প্রভৃতি পদত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার পর মহারাজ শশাকে অধীর হন ; আমিও দেশে ফিরিয়া যাইব মনে কবিয়াছিলাম। কিন্তু রাজপুত্রগণ, রাজঅন্তঃপুরের মহিলাগণ, দেওয়ান উজীর প্রভৃতি বড় বড় দেশীয় রাজকর্মচারী বাধা জন্মাইতেছেন। যাহা হউক, তােমরা আমার সম্বন্ধে কোনও প্রকার আশঙ্কা ভাবিয়া মনে কষ্ট নিও না। রাজ্যে সৰ্ব্বপ্রকার শান্তি সুশৃঙ্খলা স্থাপিত হইয়াছে। ইতি ১২৯৩ বাং ১৮ই ভাদ্র।” যখন রণবীর সিংহের মৃত্যুখবর ষষ্ঠীচরণের বাড়ীতে পৌছিয়াছিল, তথন তাহার পরিবারস্থ সকলে শােক প্রকাশ করিলেন। ষষ্ঠীচরণের মনে এখন পূর্বের ন্যায় আনন্দ নাই। তিনি ভাবিতে লাগিলেন কি জানি তিনি পূৰ্ব্ববৎ সম্মান পান কিনা। যাহা হউক কিছুকাল পরে মনে শান্তি ‘আসিল। তিনি নুতন মহারাজার গৃহ-চিকিৎসক ও এ, ডি, কং হিসাবে কাজ করিতে লাগিলেন। এইভাবে একবৎসর চলিয়া গেল। তারপর একদিন নুতন মহারাজ প্রতাপসিংহ ও নুতন দেওয়ান গােপনে পরামর্শ করিয়া ষষ্ঠীচরণকে ডাকাইলেন। তাহারা তিন জনে ( ৬৩ ) পরামর্শ করিলেন যে মহারাজ প্রতাপসিংহের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য ভারত সচিবের যােগে বৃটিশ পার্সিয়ামেন্টের নিকট আবেদন করিতে হইবে। ষষ্ঠীচরণের উপরেই এই গুরুভার অর্পিত হইল। তিনি কলিকাতায় আগমন করিলেন। তিনি ভবানীপুর তেলিপারা রােড়ে বাসস্থান নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন। জষ্টিস চন্দ্রমাধব ঘােষ, বারিষ্টার ইভান্স সাহেব, ডাক্তার রাসবিহারী ঘােষ, শ্রীনাথ দাস প্রভৃতি আইনজ্ঞ লােক মহােদয়গণের সঙ্গে, ষষ্ঠীচরণ তাহার উপর অর্পিত কার্যের বিষয় আলােচনা করিলেন এবং মহারাজের পক্ষ হইতে মহামান্য ভারতসচিব মহােদয়ের যােগে পার্লিয়ামেন্ট মহাসভার দরখাস্ত দেওয়াইলেন। এই কার্যের ফল কয়েক বৎসর পরে পাওয়া গিয়াছিল। মহারাজের ক্ষমতা পার্সিয়ামেন্ট মহাসভা বাড়াইয়া দিয়াছিল। ষষ্ঠীচরণ কলিকাতায় তহার কর্তব্য যথাসত্বর সম্পাদন করিয়া বাড়ী আসিয়াছিলেন। এইবার বাড়ীতে বেশীদিন ছিলেন না। তিনি পুনরায় কলিকাতায় যাত্রা করিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণচন্দ্রও এইবার সঙ্গেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম কালেক্টরীতে স্থায়ীভাবে Assistant Accountant এর পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তখন মেন্ সাহেব Collector ছিলেন। সেই পদ পূর্ণবাবু ত্যাগ করিয়া ষষ্ঠীচরণের সঙ্গে কলিকাতা যাত্রা করিলেন। তিনি সেখানে আইন পড়িতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। চট্টগ্রামের ভূতপূৰ্ব Collector Mensen সাহেব ষষ্ঠীচরণের একজন বন্ধু ছিলেন এবং তাঁহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন। ষষ্ঠীচরণ একবার যখন চট্টগ্রাম কালেক্টরীতে নিলাম তাকিতে যান তখন Mensen সাহেব তাঁহাকে স্বীয় এজলাসের দক্ষিণ পার্শ্বে আসন দিয়াছিলেন। এতাদৃশ. সন্মান চট্টগ্রামে অদ্যাপি আর কেহই লাভ করিতে পারেন নাই।
( ৬৪ ) ষষ্ঠীচরণ তদীয় পত্নী বিশ্বেশ্বরী ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণচন্দ্রকে লইয়া ষ্টীমার ঘােগে কলিকাতায় পৌছিলেন। বিশ্বেশ্বরী এইবার তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কলিকাতায় উপস্থিত হওয়া মাত্রই, চতুর্দিকে “কাশ্মীর-রাজ-কবিরাজ” আসিয়াছেন বলিয়া একটি রব উঠিয়া গেল। এইবার তিনি কলিকাতায় ৮ মাস ছিলেন। এই খানে তিনি বিনা পয়সায় চিকিৎসা করিয়াছিলেন। বহুশত লােক এই ৮ মাসের মধ্যে তঁাহার প্রদত্ত ঔষধ সেবন করিয়া আরােগ্য লাভ করিয়াছিলেন। নিমে কয়েকজন প্রসিদ্ধ লােকের নাম দেওয়া গেল । ১। তালীগঞ্জের রাজা। ২। রাণী শরৎসুন্দরীর জামাতা। ৩। জষ্টিস্ চন্দ্ৰমাধব ঘােয় মহাশয়ের পত্নী। এই মহােদয়া বহুদিন রােগে ভুগিতেছিলেন। কলিকাতার তদানীন্তন সর্বপ্রধান ডাক্তার এবং কবিরাজগণ তদীয় পত্নীর চিকিৎসায় নিযুক্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু কেহই কিছু করিতে পারেন নাই। সৰ্বশেষে তাঁহার চিকিৎসার ভার ষষ্টীচরণ কবিরাজের উপর প্রদত্ত হইল। তিনি এক সপ্তাহ কাল চিকিৎসা করিয়া রােগিণীকে নিরাময় করেন। ৪। রেজিট্রেসন্ বিভাগের এসিষ্টান্ট ইনসপেক্টর জেনেরেল হরিচৈতন্য ঘােষ মহাশয়ের কন্যা। ৫। কলিকাতা হাইকোর্টের বেঞ্চক্লার্ক শশিভূষণ বােস মহাশয়ের পুত্র। ৬। সাহেবগঞ্জ চৰ্গয়ার জমিদার ব্রজভূষণ লাল অগস্ত্য। ৭। রেজিষ্ট্রেস বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনেরেলের এসিষ্টেন্টের ভগিনী। ইত্যাদি ( ৬৫ ) আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি ষষ্টীচরণ বিনাপয়সায় চিকিৎসা করিতেন। ইহাতে অনেক বিশিষ্ট কবিরাজের ও বিশেষ ক্ষতি হইয়াছিল। তৎপর তঁাহারা সকলে, তাহাকে টাকা লইয়া চিকিৎসা করিতে অথবা সেইস্থান পরিত্যাগ করিতে অনুরােধ করেন। তাঁহাদের সনির্বন্ধ অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করিতে না পারিয়া, ষষ্ঠীচরণ পুনরায় কর্মক্ষেত্র কাশ্মীরে চলিয়া যান। কলিকাতায় তাহার আটমাস কাল অবস্থান সময়ে পাল্কীতে ও গাড়ীতে কি স্ত্রীলােক, কি পুরুষ এত অধিক সংখ্যক লােকের সমাগম হইত যে, তাহাদিগকে তামাক ও পান দিবার জন্য তিনজন চাকরকে অবিশ্রান্ত খাটিতে হইত। কলিকাতায়, মহারাজের কাৰ্য্য সমাধা করিয়া কাশ্মীর যাত্রা করিবার জন্য ষষ্ঠীচরণ প্রস্তুত হইলেন এবং যাত্রার পূর্বে ষষ্টীচরণ তাহার পুত্র যােগেন্দ্রমােহনের নিকট নিম্নলিখিত চিঠিখানা লিখিয়াছিলেন— “মহারাজ ও রাজা রামসিংহের পত্র পাইয়াছি। আমার দ্বারাই রাজভ্রাতৃগণের মিল হইবার প্রধান উদ্দেশ্য হইয়াছে। আমি সত্বরই জন্ধু রওয়ানা করিব। ৩ কাশী ১০। ১২ দিন বিলম্বের সম্ভব। কোথাও অপেক্ষা করিবনা। শ্ৰীমান্ পূর্ণচন্দ্র বাণরস হইতে প্রত্যাগমন করিলে শ্রীমাকে বাড়ী পাঠাইয়া অগৌণে এখান হইতে যাত্রা করিব। বাবা জানিও আমি ভ্রাতৃবৎসল ও পুত্র বৎসল। শ্রীমান হরি তােমার পুষ্য দাস। আমি একদিনের জন্যও সাংসারিক কোন ও প্রকার ভাব ভাবি নাই। শ্ৰীশঙ্করপুরী স্বামিজীর কৃপায় সবই মঙ্গল হইবে। আমি প্রালব্ধবাদী, তথাপি পুরুষার্থ তৎপর।•••••••..” ষষ্টীচরণের উপরিউক্ত চিঠি হইতে এবং মহারাজ প্রতাপসিংহের ও অন্যান্য কুমারগণের চিঠি হইতে আমরা জানিতে পারি যে ষষ্টীচরণের নিকট যে সমস্ত চিঠি লেখা হইত, তাহাতে ষষ্ঠীচরণের নামের পূর্বে অন্য ( ৬৬ ) ১১টী এ লিখা হইত। প্রতাপসিংহ নিজের নামের পূর্বে—“সেবক পুত্র, দাস প্রতাপসিংহ” এই প্রকার লিখিয়া ধন্য হইতেন। অন্যান্য কুমারগণ তাহাকে কাকাবাবু’ ডাকিতেন। নিম্নে মহারাজ প্রতাপ সিংহের একখানা। চিঠির বাঙ্গালা অনুবাদ দেওয়া গেল। শ্রী, শ্রী, এ, ঐ, ঐ, ঐ, ঐ, ঐ, ঐ, 'ধৰ্ম্মপিতা শ্রীবাবুজি মহারাজ শ্ৰীবাবু ষষ্ঠীচরণজি আপনার কৃপাপত্র আপনার পুত্র প্রতাপসিংহের নিকট পঁহুছিয়াছে। আপনার পুত্র প্রতাপসিংহ অত্যন্ত প্রসন্ন হইয়াছেন। শ্ৰীবালামাই শ্রীগুরুজী শ্ৰীধৰ্ম্মপিতা শ্রীবাবুজি মহারাজের চরণের প্রতাপ আপনার প্রিয়পুত্র ৮৩ বৎসর আয়ুঃ সুখে ভােগ করিবে। সমুদয় দুঃখ শাপ, দুষ্টবােগ, নেত্রবােগ ইত্যাদি হইতে ৮৩ বৎসর আপনার প্রিয়পুত্রকে আপনি রক্ষা করিবেন। রামসিংহ ও অমর সিংহের উপর মহারাজার অত্যন্ত প্রতি এবং আমার উপর মহারাজের কোপ ও ভ্ৰম অত্যন্ত অধিক। মহারাজের কোপ যাহাতে বারণ হয় এবং মহারাজের প্রতি যাহাতে দাসের উপর অত্যন্ত অধিক হয়, তাহা আপনার করিতে হইবে। এই বিষয় সম্পূর্ণরূপে আপনার উপর নির্ভর করে। x প্রভু, প্রতাপসিংহ ভক্তি পূর্বক আপনার চরণামৃত পান করিবে। X প্রভু, ৮৩ বৎসর পর্যন্ত পুত্র প্রতাপ সিংহ ভক্তি ও প্রীতিপূর্বক আপনার ও গুরুজির চরণ সেবা করিবে। পুত্র প্রতাপসিংহের নমস্কার মালজির চরণে জানাইবেন। আপনার কৃপায় শুভ পুত্রেষ্টী ফল আপনার দাসী পাটানী পাইবে। x পুত্র প্রতাপসিংহের উপর কৃপা রাখিবেন। পুত্র প্রতাপসিংহ আপনার চরণের। দাস বটে। X X X X X X X X X X পুত্র সেবক দাস প্রতাপসিংহ।
( ৬৭ ) বারাণসী হইতে পূর্ণচন্দ্রকে ষষ্ঠী আনাইলেন এবং শ্রীশ্রীদুর্গাপূজার আনন্দভােগ করিবার জন্য বাড়ী পাঠাইলেন। তারপর তিনি বৈদ্যনাথ হইয়া জম্ব, যাত্রা করিবেন স্থির করিলেন। বৈদ্যনাথ পৌছিলেই, ষষ্ঠীচরণের রক্তামাশয় হয়। ঐ রােগ ক্রমশঃ দুশ্চিকিৎস্য হইয়া পড়ে। তিনি তাড়াতাড়ি বারাণসী যাত্রা করিলেন এবং তাঁহার বারাণসীস্থ ভবনে উপস্থিত হইলেন। বাড়ীতে যখন সকলই আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তখন নীলাম্বরের নিকট যষ্ঠীচরণের দুরারােগ্য ব্যাধির বিষয়ে তার আসিল। রােগীর মঙ্গলবিধানার্থ যাগযজ্ঞাদির সুসমাপ্তির জন্য পূর্ণচন্দ্রকে বাড়ীতে রাখিয়া, নীলাম্বর ও দিগম্বর, যােগেন্দ্র মােহনকে লইয়া কাশ্ম যাত্রা করিলেন। পূর্ণচন্দ্রের মানসিক অবস্থা সহজে অনুমেয়। পূর্ণচন্দ্র বাড়ীতে বসিয়া বসিয়া তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার স্নেহের বিষয় ভাবিতে লাগিলেন। ষষ্ঠীচরণ, পূর্ণচন্দ্রকে বাড়ী আসিবার সময় যে ভাবে দৃঢ় আলিঙ্গন করিয়াছিলেন, তিনি সে কথা মনে করিলেই, চোখে অশ্রু দেখা দিতে লাগিল। শরীরের অবস্থা ক্রমশঃ খারাপ হইতেছে জানিতে পারিয়া, ষষ্ঠীচরণ সমান চারিভাগে সম্পত্তি ভাগ করিলেন। চারি আনা সম্পত্তি নীলাম্বর পাইবেন, চারি আনা দিগম্বর পাইবেন। চারি আনা পূর্ণচন্দ্র পাইবেন ও তাঁহার পুত্রগণ—যােগেন্দ্র মােহন ও হরিরঞ্জন প্রত্যেকে দুই আনা পাইবেন—এই মর্মে 'উইল লিখিয়াছিলেন। কিন্তু ইহাতে, ষষ্ঠীচরণের ভ্রাতৃগণ ও দর্শকবৃন্দ অতিশয় আপত্তি উত্থাপন করিলেন। শেষে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত মৰ্ম্মে উইল পত্র স্বাক্ষর করিলেন—চারি আনা অংশ নীলাম্বরকে, তিন আনা অংশ দিগম্বরকে, তিন আনা অংশ পূর্ণচন্দ্রকে এবং যােগেন্দ্র মােহন ও হরিরঞ্জনের মধ্যে প্রত্যেককে তিন আনা অংশ দিলেন। সুরূপা ও বিশ্বেশ্বরীকে উপযুক্ত পরিমাণে মাসিক বৃত্তি দিলেন।
এই উইল পত্র স্বাক্ষর করিবার কয়েক ঘণ্টা পরে “ওঁ তারকব্রহ্ম ওঁ” বলিতে বলিতে ষষ্ঠীচরণ, ৫২ জন পরিপূর্ণ একটী সংসার শােকসাগরে .ভাসাইয়া, পুণ্যক্ষেত্র বারাণসী ধামে মানব লীলা সংবরণ করিলেন। তিনি বাৎসরিক ৭০০০ টাকা আয়ের ভূসম্পত্তি রাখিয়া গিয়াছিলেন। লক্ষ টাকার উপরে মহামূল্য জহরতাদিও রাখিয়া গিয়াছিলেন। ১২৯৬ বাংলার অর্থাৎ ১৮৮৯ ইংরেজীর ১৬ই ভাদ্র, ৫৩ বৎসর, ৭ মাস ও ১১ দিবস বয়সের সময় তিনি ভবলীলা সাঙ্গ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। ষষ্ঠীচরণ মরিয়াছেন আজ বহু বৎসর। তথাপি চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে প্রত্যেক নরনারীর মুখে তঁাহার পুণ্যনাম উচ্চারিত হইতেছে। তাহার গ্রামের অনেক লোক, এই সামাজিক ও সাংসারিক দুর্গতির দিনে কেহ তাহার দানের কথা, তঁাহার ধর্মের কথা, কেহ তাহার ত্যাগের কথা, কেহ তাহার ভ্রাতৃবাৎসল্যের কথা, আর কেহবা তাহার কীর্তি প্রতিষ্ঠার কথা কহিয়া আনন্দাশ্রু মােচন করেন। উপসংহারে, আমার বক্তব্য এই যে ষষ্ঠীচরণের ন্যায় সৰ্ব্বতােমুখী প্রতিভাবান্ ব্যক্তি চট্টগ্রামে আর কেহ জন্মগ্রহণ করেন নাই। তিনি একাধারে একটি স্বাধীন রাজার এ, ডি, কং (নৰ্ম্মসচিব) ও গৃহচিকিৎসক এবং তদানীন্তন সর্বশ্রেষ্ট কবিরাজ, সাহিত্যিক, পঞ্চাগ্নি প্রভৃতি যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা, হিন্দু- ধৰ্ম্মের সমর্থন কৰ্ত্তা, নানাপ্রকার সদনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, দানবীর, বহু অর্থ উপার্জন কৰ্ত্তা, সুদেশ সেবক, দরিদ্র ছাত্রের শিক্ষায় সাহায্যদাতা ও সৎসাহসেরু প্রতিমূর্তি স্বরূপ ছিলেন। কাশ্মীর রাজ্যের অধীশ্বর, আর কোথায় চট্টগ্রামের ষষ্ঠীচরণ কবিরাজ! ইহা চট্টগ্রামের অত্যন্ত গৌরবের বিষয় ; শুধু চট্টগ্রাম কেন, সমস্ত বাঙ্গালারই গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই।
( ৬৯ ) যে দিন কাশ্মীর রাজ্যের স্বাধীন নরপতি রণবীর সিংহের বিমাতাকে কঠিন অশ্মরী রােগের চিকিৎসা করিতে গিয়া প্রাচ্য ও প্রতীচ্য ডাক্তারগণ অপারগ হইয়াছিলেন, তখন সুদূর চট্টগ্রামের কবিরাজ ষষ্ঠীচরণ, রাজ- মহিষীর আরােগ্য বিধান করিয়া কি বাঙ্গালী জাতির মুখােজ্জল করেন নাই ? সেইদিন কি পৃথিবীর ইতিহাসে, বর্তমানযুগে অবজ্ঞাত, ঋষি প্রণীত আয়ুৰ্বেদ শাস্ত্রের বিজয়-নিনাদ ভারতমহাসাগর ও প্রশান্ত- মহাসাগর পার হইয়া ইউরােপ ও আমেরিকা পৰ্যন্ত শ্রুত হয় নাই ? কিন্তু চট্টগ্রামের সে গৌরবের দিন এখন আর নাই। আর আসিবে কিনা, কে জানে ? ষষ্ঠীচরণের মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া মহারাজ প্রতাপসিংহ বিশেষ শোক প্রকাশ করেন এবং তাহার শ্রাদ্ধের জন্য ৮০০০ টাকা পাঠাইয়া দেন। কবিরাজ মহাশয়ের মৃত্যু উপলক্ষে কাশ্মীর মহারাজ তদীয় রাজ্যের অফিসাদি এক দিনের জন্য বন্ধ দিয়াছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে মহারাজা প্রতাপসিংহ এক পুত্র রত্ন লাভ করিয়াছিলেন। এই খবর তিনি যথা সময়ে ষষ্ঠীচরণের পরিবার বর্গের নিকট তারযােগে জানাইয়াছিলেন । ষষ্ঠীচরণের পরিবারবর্গের পক্ষ হইতে ও তারযােগে আনন্দ প্রকাশ করা হইয়াছিল। শশাকের বিষয়, ঐ মহারাজকুমার শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হন। ষষ্ঠী-প্রসঙ্গ ১। কাশ্মীর রাজ্যে অবস্থান কালে, ষষ্ঠীচরণ লোেক মুখে শুনিতে পাইলেন যে কাশ্মীর রাজ্যের উত্তর সীমায় হিমালয় পর্বতের কোন ( ৭০ গহ্বরে একজন মহাত্মা বাস করেন। ষষ্ঠীচরণ তাহা শুনিতে পাইয়া জনৈক সন্ন্যাসির সঙ্গে উক্ত মহাপুরুষের সাক্ষাৎকার লাভ করিতে চলিলেন। অতিকষ্টে গহ্বরের কাছে গিয়া দেখেন যে সাধু সমাধিমগ্ন। তাহারা, তাহার বয়স প্রায় ১০০০ বৎসর হইবে বলিয়া অনুমান করিয়াছিলেন। কপালের চর্মের সঙ্গে গালের চর্ম প্রায় মিশিয়া গিয়াছে। চক্ষু প্রায় আবৃত। সমাধি অবস্থায় সাধু ৪ দিন কাটাইয়া দিলেন। ষষ্ঠীচরণের সঙ্গে খাদ্য যাহা ছিল, তাহা ফুরাইয়া গেল। পঞ্চম দিন সাধুর সমাধি ভঙ্গ হয়। তখন ষষ্ঠীচরণ সাধুর সঙ্গে আলাপ করিলেন। সাধু, তাহার সহিত আলাপ করিয়া সন্তুষ্ট হন ষষ্ঠীচরণের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া তাহাকে শুভ-দৃষ্টি দ্বারা আশীৰ্বাদ করেন। ষষ্ঠীচরণের ক্ষুধা নিবারণ করিবার জন্য, ঐ সাধু তাহাকে দুইটি গাছের পাতা দিয়াছিলেন। একটিতে ষষ্ঠীচরণের ক্ষুধা নিবৃত্ত হইয়াছিল। আর একটি তিনি রাখিয়া দিয়াছিলেন। কাল সহকারে তাহা হান্নান গিয়াছে। ২। ষষ্ঠীচরণ, তাঁহার পিতার শ্মশানের উপর শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন এবং তন্নিকটস্থ স্থানে “পঞ্চাগ্নি যাগ” সমাপন করিয়াছিলেন । তাহাদের বাড়ীতে একদিন এক ত্যাগী মহাপুরুষ আসিয়াছিলেন। তিনি লােকালয়ে থাকিতেন না। এই জন্য তঁাহার থাকিবার স্থান ঐ শিব মন্দিরেই করা হইয়াছিল। গভীর রাত্রিতে ঐ সন্ন্যাসী একজন স্ত্রী লােক দেখিতে পাইলেন। সন্ন্যাসী প্রথমে কুলবধু বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। পরে যখন তিনি দেখিলেন যে ঐ স্ত্রীলােকটি হঠাৎ অদৃশ্য হইয়া গিয়াছেন, তখন তিনি বুঝিলেন, যে ঐটী দেবতা। এই ঘটনা সন্ন্যাসী ষষ্ঠীচরণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণচন্দ্রকে বলিয়াছিলেন।
( ৭১ ) পাঞ্জাবে “লাড়ী বাবা” নামে একজন সিদ্ধ মহাপুরুষ ছিলেন। তিনি ষষ্ঠীচরণকে বড় স্নেহ করিতেন। ঐ সন্ন্যাসী সমাধি লইবার পূৰ্ব্বে, ষষ্ঠীচরণকে একটি স্বর্ণমণ্ডিত কবচ দিয়াছিলেন। তিনি এই কথাও বলিয়াছিলেন ধে ষষ্ঠীচরণ যেন, মৃত্যুর পূর্বে ঐ কবচ কোন যােগ্য ব্যক্তিকে দিয়া যান। ষষ্ঠীচরণ ঐ কবচ স্বনামধন্য জমিদার রায় প্রসন্নকুমার রায় বাহাদুর মহাশয়কে দিয়াছিলেন। ৪। ভারতবর্ষের দশনামী সন্ন্যাসীদের মধ্যে শ্রীশ্রীগঙ্গাগির স্বামীজির নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ যােগ্য। তিনি সাধক শ্রেষ্ঠ পৃথীগিরের শিষ্য ছিলেন। গঙ্গাগির অন্নপূর্ণা-সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। একবার তাহার পরিচয় পাওয়া গিয়াছিল। ষষ্ঠীচরণের বাড়ীতে একবার স্বামীজি কয়েকজন শিষ্য সমভিব্যাহারে আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণ অনেক পূৰ্বে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণের কনিষ্টভ্রাতা পূর্ণচন্দ্র তাহাদের সেবা করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছিলেন। একদিন রাত্রিতে ৫০ জন লােকের লােকের উপযােগী খাদ্যদ্রব্য স্বামীজিকে দেওয়া হইয়াছিল। স্বামীজি তাহার নিয়মানুযায়ী নিজে সমস্ত কাৰ্য্য করিয়া অন্নপূর্ণার ভােগ তৈয়ার করিয়াছিলেন। নিজে পরিবেশন করিয়া ২৫০ জন লােককে তৃপ্তির সহিত খাওয়াইয়াছিলেন। ইহার একটু বিশেষত্ব এই যে তিনি নিজে আহার করিবার পর আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনা। কাজেই সকলকে না খাওয়াইয়া তিনি নিজে কিছু মুখে দিতেন না। ৫। ষষ্ঠীচরণ বড় সাধুভক্ত ছিলেন। তাঁহার বাড়ীতে যে ভাবে সাধু সন্ন্যাসীর জমায়েত হইত, চট্টগ্রামের আর কোথাও তেমন হইত কিনা সন্দেহ। এক এক জমায়েতে ২০২৫৫০৬০ জন করিয়া সন্ন্যাসী তাঁহার বাড়ীতে আতিথ্য গ্রহণ করিতেন। পঞ্চাগ্নি যাগের সময়ে প্রায় ২০০ সন্ন্যাসী তাঁহার বাড়ীতে আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন।
( ৭২ ) ষষ্ঠীচরণের বাড়ীর সন্মুখের দুইটি বৃহৎ পুষ্করিণীর চতুর্দিকেই তাহাদের খুনি জ্বলিতেছিল। ষষ্ঠীচরণের বাড়ীর সম্মুখে কালীবাড়ী ও শিববাড়ী আছে। তদুপরি ২০০ সাধু সমাগম। সাধুদের আরতি, শিঙ্গাধ্বনি এবং স্তোত্রপাঠ প্রভৃতিতে চতুর্দিক মুখরিত হইতেছিল। তখন ষষ্ঠীচরণের বাড়ীটাকে “দ্বিতীয় বারাণসী” বলিয়া ভ্রম জন্মিত। ৬। ষষ্ঠীচরণ বড় মাতৃভক্ত ছিলেন। তিনি তাঁহার মাতৃদেবীর চরণ ধুলি না লইয়া কোন কার্নে হস্তক্ষেপ করিতেন না। প্রতিদিন মাতৃদেবীর চরণামৃত পান করিতেন। মাতৃআজ্ঞা কখনও লঘন করেন নাই। ৭। ষষ্ঠীচরণের শরীরের বর্ণ কাল ছিল। তিনি লম্বা ছিলেন। শরীর খুব সুদৃঢ় ছিল। তাহার হাত ও পা পদ্ম ফুলের মত লাল ছিল। তিনি খুব দাতা ছিলেন। তিনি একটাকা, দুই টাকা দান করিতেন না। সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণকে তিনি মুঠে মুঠে টাকা দান করিতেন। হাজার হাজার টাকা থাকিলেও তিনি বাক্সে বা সিন্ধুকে চাবি দিতেন না। কেন না তাহার গুরুজী বলিয়াছিলেন যে বাক্সে বা সিন্ধুকে তালা আটকাইলে তাঁহার অর্থাগমের পথ সুগম থাকিবে না। এইজন্য তিনি কখনও বাক্সে বা সিন্ধুকে তালা আটকাইতেন না। তাহার অত্যধিক দান দেখিয়া ষষ্ঠীচরণের তৃতীয় ভ্রাতা দিগম্বর তাহাকে বলিলেন “আপনি এত দান করিতেছেন। আমাদের মর্যাদা বাড়াইয়া দিতেছেন। অথচ আপনার অবর্তমানে আমরা কি করিয়া চলিব তাহার কোন বন্দোবস্ত করিতেছেন না।” ইহা শুনিয়া ষষ্ঠীচরণ বলিলেন- “আমি যত দান করি, আমার তত বেশী আয় হয়। আজ তােমরা তাহার পরীক্ষা কর। তারপর ষষ্ঠীচরণ, তাঁহার নিকট যত টাকা ছিল, সব দান করিয়া ফেলিলেন। কিন্তু এই দিকে “পঞ্চাগ্নি যাগ” ও তাহার ( ৭৩ ) জ্যেষ্ঠপুত্র যােগেন্দ্র মােহনের বিবাহের আয়ােজন করিতেছিলেন। টাকা পয়সার সঙ্গে দেখা নাই। তথাপি রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান। সকলেই বিস্মিত। প্রায় ৬০/৭০ হাজার টাকা খরচ পড়িবে । টাকা কোথায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে ২১ দিনের মধ্যে কাশ্মীরের মহারাজ হইতে নগদ ৫০,০০০ হাজার টাকা আসিয়া উপস্থিত। দরকার হইলে আরও ২০৩০ হাজার টাকা পাঠাইবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। এই সময় হইতে ষষ্ঠীচরণের ভ্রাতারা, তাঁহাকে দান ব্যাপারে বাধা দেন নাই। ৮। ষষ্ঠীচরণ ও কবি দুর্গাচরণ পাঠক, কোন সময়ে চট্টগ্রামে শ্রীশ্রীচট্টেশ্বরী দর্শনে গিয়াছিলেন । আজ বহুবৎসরের কথা। তখন চট্টেশ্ববীর কোন মন্দির ছিলনা। একখানা খড়ের ঘরে দেবী স্থাপিত ছিলেন। তখন সন্ধ্যার সময় একটা বাতি মৃদু মৃদু জ্বলিতেছিল। ঠিক সেই সময়ে উক্ত মহাত্মাদ্বয় সেইখানে উপস্থিত হইয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণ দুই টাকা ও পাঠক মহাশয় এক টাকা প্রণামি দিলেন। ইহা দেখিয়া পূজারি ব্রাহ্মণ বিস্মিত হইলেন। কারণ এযাবৎ কেহ চারি আনার উপর প্রণামি দেয় নাই। পূজারি ব্রাহ্মণ ষষ্ঠীচরণের নাম শুনিয়াছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে তাঁহাকে চিনিতে পারিয়াছিলনা। এই সময়ের কিছুকাল পরে, ষষ্ঠীচরণ ঐ খড়ের ঘরের স্থানে দুইসহস্র টাকা ব্যয় করিয়া ইষ্টক নির্মিত মন্দির নির্মাণ করিয়াছেন। চট্টেশ্বরীর বর্তমান ইষ্টক নির্মিত মন্দিরটি ষষ্ঠীচরণেরই কীর্তি। ৯। ষষ্ঠীচরণের চট্টগ্রামস্থ ভবনে, বিশ্বম্ভর ভট্টাচাৰ্য নামে জনৈক ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। নর্মাল ত্রিবার্ষিক পড়িতেন। তিনি ষষ্ঠীচরণের বন্ধু ছিলেন। নিদ্রাত্যাগ করিয়া, বিশ্বম্ভর মুগ্ধবােধ করিয়া, বিশ্বম্ভর মুগ্ধবােধ ব্যাকরণের সূত্র মুখস্থ করিতেছিলেন। ষষ্ঠীচরণ বলিলেন – “তােমার জন্য ঘুমাইতে ( ৭৪ ) পারিতেছিনা। তুমি কি পড়িতেছ ?” তুমি কি পড়িতেছ ?”, তখন বিশ্বম্ভর বলিলেন এ কবিরাজী ব্যবসায় নয়। তখন মুগ্ধবােধের সমস্ত সূত্রগুলি মুখস্থ বলিয়া, ষষ্ঠীচরণ, বিশ্বম্ভরের বিস্ময় উন্মাইয়াছিলেন। ১০। ষষ্ঠীচরণ মীমাংসাদি করিতে বড়ই সিদ্ধহস্ত ছিলেন ; সীতাকুণ্ডে মােহন্ত কিশােরবনের সঙ্গে তত্ৰত্য অধিকারিদিগের বহুবর্ষ ব্যাপী বিরোেধ চলিয়া আসিতেছিল। চট্টগ্রামের অনেক বিশিষ্ট লােক এই কলহ মীমাংসা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু কেহই সফলকাম হইতে পারেন নাই। কবিরাজ মহাশয় এই বিষয় সম্পূর্ণরূপে অবগত হইয়া সীতাকুণ্ড তীর্থে গমন করেন ও তথায় একটি বিরাট নিমন্ত্রণের আয়ােজন করেন। বহুসহস্র লােক' এই নিমন্ত্রণে যােগদান যােগদান করিয়াছিলেন। অবশেষে সীতাকুণ্ডের মােহন্তকেই অধ্যক্ষ পদে বরণ করা হইয়াছিল। এই ব্যাপারে কবিরাজ মহাশয়ের সহৃদয়তায় ও শিষ্টাচারে সকলেই মুগ্ধ হইয়াছিলেন। মােহন্ত ও অধিকারীদিগের মধ্যে মিলন করিয়া দিয়াছিলেন। শাল বিতরণ ষষ্ঠীচরণের জীবনের একটি প্রধান কার্য ছিল। তিনি শত শত সন্ন্যাসী, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য ও শূদ্রকে কম্বল, শাল ও আলেয়ান বিতরণ করিয়াছিলেন। ১২। চট্টগ্রামের কোন জমিদারের সঙ্গে, ভরট পুষ্করিণীর পঙ্কোদ্ধার উপলক্ষে, ষষ্টীচরণের মনােমালিন্য ঘটে। ষষ্ঠীচরণ একরাত্রিতে ঐ পুকুর খনন করাইয়া ফেলেন। ইহাতে সকলেই আশ্চর্যান্বিত হয়। দেশীয় কয়েকজন কুচক্রী লােককে শিক্ষা দিবার জন্য তিনি একরাত্রিতে স্বীয় গ্রামে প্রায় এক মাইল লম্বা রাস্তা নির্মাণ করান। এই সমস্ত ব্যাপারে কবিরাজ মহাশয়, তাঁহার দ্বিতীয় ভ্রাতা নীলাম্বরের বিশেষ সহায়তা লাভ করিয়াছিলেন। ১১। র ( ৭৫ ) ১৩। ষষ্ঠীচরণ কাশ্মীরে যাইবার পূর্বে চট্টগ্রামে কবিরাজী ব্যবসায় করিয়াও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। তখনকার দিনে সমাজের এই নিয়ম ছিল যে কোন সভায় কোন সম্মানাহঁ ব্যক্তি উপস্থিত হইলে, সভাশুদ্ধ লােক উঠিয়া দাড়াইত। ষষ্ঠীচরণ ও এতাদৃশ সম্মান বরাবর পাইয়া আসিতেছিলেন। তথাপি পটিয়া থানার অন্তর্গত গৈড়ল। গ্রামের কতিপয় ভদ্রলােক তাঁহাকে উচিত সমাদর করিবেন বলিয়া ঠিক করিয়াছিলেন। উক্ত গ্রামের যাত্রামােহন বিশ্বাসের বাড়ীতে বিবাহ উপলক্ষে ষষ্ঠীচরণ নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণ তথায় যাইবার পূর্বেই এই পরামর্শ করিয়াছিলেন যে, তিনি আসিলে তাহারা দণ্ডায়মান হইয়া, তাহাকে অভ্যর্থনা করিবেন না। তাহার বসিবার স্থানও সভার একপার্শ্বে নির্দিষ্ট করা হইয়াছিল। সেই বিবাহে চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ মুসলমান জমিদার আরালী খাঁ উপস্থিত ছিলেন। তিনি সভার শ্রেষ্ঠ স্থানেই উপবিষ্ট ছিলেন। ষষ্ঠীচরণ পাল্কী হইতে অবতরণ করিয়া সভায় প্রবেশ করিবামাত্র আর কেহ না উঠিলেও আনুরালী খাঁ সৰ্ব্ব প্রথম দণ্ডায়মান হইয়া, তাঁহাকে অভিবাদন করিলেন এবং “কাকু আসুন” বলিয়া ষষ্ঠীচরণকে স্বীয় গাদি ছাড়িয়া দিলেন। আনুরালী খাঁ দণ্ডায়মান হইবামাত্র ষড়যন্ত্র কোথায় ভাসিয়া গেল। সভাস্থ সকল লােক সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাড়াইলেন। ১৪। যষ্ঠীচরণ কি ভাবে লােক বশ করিতেন তাহা নিম্নলিখিত ঘটনা হইতে বুঝা যাইবে - তিনি কাশ্মীর মহারাজের গৃহ চিকিৎসক ও এ, ডি, কং ছিলেন। এ, ডি, কং শব্দের কি , অর্থ, তাহা, সাধারণ লােক জানিতেন না। তাহারা ষষ্ঠীচরণকে, জন্ধুমহারাজের মন্ত্রী বলিয়া জানিতেন। একদিন তিনি চট্টগ্রাম তিনি চট্টগ্রাম সহরে পাল্কী করিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহার পেছনে পেছনে অনেক লােক ছুটাছুটি করিতেছিল। তখন বিভাগীয় কমিশনারের Personal. Assistant এর বাসায় মুন্সেফ ও ডেপুটিগণ একত্র হইয়াছিলেন । তাহারা বিদ্রুপ করিয়া বলিয়াছিলেন – “এই বেটা আবার কে ?” এই কথা ষষ্ঠীচরণের কাণে লাগিয়াছিল। তিনি এই কথা শুনিয়া কোন প্রকারের বিরক্তি ভাব দেখান নাই। পরদিন প্রাতে তিনি ডেপুঢ়ী ও মুসেফ, মহােদয়গণকে, স্বীয় বাসায় নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। তাহারা সকলেই ষষ্ঠীচরণের আদর আপ্যায়নে সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। ষষ্ঠীচরণের চট্টগ্রামে অবস্থান কালে, তাহারা প্রতিদিন তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে যাইতেন। ষষ্ঠচরণের পুত্র ও ভ্রাতাগণ। ক পুত্রগণ : ১। কবিরাজ মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীযুক্ত যােগেন্দ্র মােহন মজুমদার মহাশয় দানে মুক্তহস্ত এবং পরােপকারী। তিনিও তাঁহার পিতার ন্যায়, ভারতের অনেক তীর্থ দর্শা করিয়াছেন। ২। ষষ্ঠীচরণের দ্বিতীয় পুত্র যুক্ত হরিরঞ্জন মজুমদার এম, এ, ভিষগাচাৰ্য্য মহাশয় ও কাশ্মীরের মহারাজ প্রতাপসিংহের নিকট হইতে ২০০ টাকা মুল্যের এক জোড়া শাল ও ৩০০ টাকা পুরস্কার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। হরিরঞ্জন যুক্ত প্রদেশের, গভর্ণমেন্ট কর্তৃক ম্যালেরিয়া কমিশনের সভ্যপদে নিৰ্বাচিত হইয়াছিলেন। তৎপূৰ্বে বিশিষ্ট ডাক্তার ব্যতীত কোন কবিরাজ এইপদে নির্বাচিত হন নাই। হরিরঞ্জন এখন দিল্লিতে কবিরাজী ব্যবসায় করিতেছেন। তথায় দেশীয় আয়ুৰ্বেদ কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত আছেন।
( ৭৭ ) ভ্রাতাগণ : ১। ষষ্ঠীচরণের দ্বিতীয় ভ্রাতা নীলাম্বর ও একজন বহুদর্শী কবিরাজ এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি দেশের মােকদ্দমাগুলি নিজেই মিমাংসা করিয়া দিতেন। তাঁহার বিচারে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকিত। তিনি জরীপের কাজে বড় বিচক্ষণ ছিলেন। ইনি পাঁচ সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিয়া একাগ্নি যজ্ঞ সমাপন করিয়াছিলেন। ইনি জাতিস্মর ছিলেন। বরিশালের কোন ব্রাহ্মণ জমিদার পুরীতে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দর্শনে গিয়াছিলেন। মন্দিরে মন্দিরে প্রবেশ করিয়া ঠাকুর দেখিতে না পাইয়া তিনি ধন্না দিলেন। তিনি রাত্রে এই মর্মে স্বপ্ন দেখিলেন যে তাঁহার পিতা মৃত্যুর কিছু পূৰ্বে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের দর্শনে যাইতে বিশেষ ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি ( ব্রাহ্মণ জমিদার) বাধা দিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা এই দুঃখ নিয়া মরিয়াছিলেন। ঠাকুর স্বপ্নে বলিলেন – “তােমার পিতা পরজন্মে চট্টগ্রামের অন্তঃপাতী পটীয়। থানার অন্তর্গত সুচক্রদণ্ডী গ্রামে কালিদাস কবিরাজের ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। নাম নীলাম্বর মজুমদার। যদি তাঁহাকে আনিতে তাহা হইলে, আমার দর্শন লাভ ঘটিবে, নচেৎ হইবে না।” ঐ জমিদার বাবু একদিন দিবা দ্বিপ্রহরের সময় একটি বেগ হাতে করিয়া, নীলাম্বরের বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নীলাম্বরকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলিলেন এবং নিজ খরচে নীলাম্বরকে পুরুষােত্তমে লইয়া যাইবার জন্য প্রার্থনা জানাইলেন। নীলাম্বর অসুস্থ ছিলেন বলিয়া গেলেন না, তবে ঐ জমিদার বাবুকে বলিলেন – “বাবা, আপনার উপর আমার কোন রাগ নাই। আমি সন্তুষ্টচিত্তে আপনাকে দেবদর্শনে অনুমতি দিলাম। যদি দর্শন নাপান, তাহা হইলে তার যােগে খবর দিবেন। আমিও পুরী যাত্রা করিব।” এইবার ঐ জমিদার বাবু পুরীতে গিয়া ঠাকুরের দর্শন লাভ করিলেন। নীলাম্বরের তিন পুত্র মহেন্দ্র, ইন্দ্র ও সুকুমার। পার, ( ৭৮ ) মহেন্দ্র ও সুকুমার ব্যবসায়ী। ইন্দ্রকুমার এফ, এ, পাশ করিয়া বারাণসী ধামে কবিরাজী শিক্ষা করেন। এখন চট্টগ্রাম সহরে কবিরাজী করিতেছেন। ২। তাহার তৃতীয় ভ্রা দিগম্বর চট্টগ্রাম কালেক্টরীর একজন সুদক্ষ কর্মচারী ছিলেন। ইনি তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ষষ্ঠীচরণের ন্যায় সমস্ত ভারতবর্ষ সন্ত্ৰীক ২/৩ বার ভ্রমণ করিয়াছেন। তাহার সাধুসেবা উল্লেখযােগ্য। ইনি বারাণসীতে শিব প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। দিগম্বরের একমাত্র পুত্র শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মজুমদার মহাশয় বি, এল, পাশ করিয়া পটীয়া মুন্সেফী আদালতে ওকালতী করিতেছেন। তিনি একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকীল। তিনি সাহিত্যানুরাগী এবং সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখিয়া থাকেন। ৩। ষষ্ঠীচরণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র একজন বিশিষ্ট শিক্ষিত লােক। তাহার বিনয়, শিষ্টাচার এবং স্বধর্ম নিষ্ঠা একান্ত প্রশংসনীয়। তিনি এক সময়ে চট্টগ্রাম কালেক্টরীতে কেরাণী ছিলেন; কিন্তু চিরদিন বিদ্যানুরাগী বলিয়া সেই পদ ত্যাগ করিয়া, তিনি পটীয়া হাইস্কুলে প্রায় ৪০ বৎসর যাবৎ শিক্ষকতা কাৰ্য করিয়া আসিতেছেন। তিনি একজন সুলেখক। তাঁহার রচিত “কল্পনা প্রসূন” একখানি সুন্দর কাব্য। ইহাতে যথেষ্ট মৌলিক আছে। তিনি ইংরেজীতে ও অনেক সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখিয়াছেন। তাহার ইংরাজী কবিতা পড়িয়া চট্টগ্রামের ভূতপূৰ্ব্ব কালেক্টর মিঃ ডিক্সন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ভূতপূৰ্ব্ব কমিশনার মিঃ লুস, তাহাকে English Poet অর্থাৎ “ইংরাজ কবি” বলিয়া সম্বােধন করিতেন। কিছুদিন হইল তিনি যুবক শিক্ষকদিগের সুবিধার জন্য শিক্ষা প্রণালী -720h - "The Teacher and the Art of Teaching to act একখানা সুপাঠ্য ও সারগর্ভ পুস্তক রচনা করিয়া সুধীবর্গের প্রশংসা ভাজন হইয়াছেন। ইণ্ডিয়ান রিভিউ, ইংলিশম্যান ও জ্যোতি প্রভৃতি la 1 (92) man 9faat The teacher and the Art of Teaching 7567 24842871 পূর্ণ সমালােচনা বাহির হইয়াছে। ইণ্ডিয়ান {রভিউ বলেন- It contains hints and suggestion for teaching. They are gathered with care and intelligence and would be of practical help, particularly to young teachers that hav: to teach young boys and children. Bofuatia 2007-"The teacher and the Art of 'i'cachiny", This book is the title of an interesting booklet, written by Babu Purna Cnandra Majumdar, teacher of the Patiya II. E. Sehool. It contains useful instruction regarding the mothod of teaching, and cannot be ignored by those who have taken to teaching as their jile profession. (571fo: 9691H : -We have received a small but a useful treatise named "On the Teacher and the Art of Teaching" by Purna Chandra Majundar, Second Master of the Patiya High English School. Babu Purna Chandra Majumular is a veteran educationist and any thing spoken or written by him in connection with the teaching of young boys is sure to coinmenile our highest respect. As a teacher, Babu Purna Chandra Majumdar has an admiration for his own profession and he describes a teacher ils one who svars in regions which ordinary men not approach, who respects the abstract and ignores the concrete, who rejects what is material and accepts what is mental, who las to deal with what is innocent and what is pure. This is really fascinating picture of the profession of tutors, who as a class are denounced as can (bo) men of no significance and devoid of practical commonsense. People of this country are generally in the habit of belittling the importance of the art of teaehing. Babu Purna Chandra Majumdar has, we are glad to see treated this subject in his interesting pamphlet as something belonging to the dominion of Psychology and Ethical science. He has put before his readers in an elegant language and chaste style the science of teaching young learners in a nut-shell. The book is in fact the product of a teacher's life-long experience and not a mere string of mew-fangled ideas of doctrinaire idealist or dilettante teacher who has adopted the tutorial profession only as it stepping stone to some other lucrative profession. There are many interesting hints of a novel character which will really be very useful to those who have taken to teaching as thrir profession in life. There are also many things in this little book which will be of immense help to young students. We strongly recommend this book to the notice of our students and teachers and the literary public who are interested in the promotion of education in a right line amung our boys. We are very glad to learn that some gentlemen belonging to several learned professions living so far off as Mysore the Central Provinces and the Punjab ordered for a few copies of the book. It is a far cry from Chittagong to Mysore, and this demand of the book from far off corners of our country shows that real merit is always applauded and appreciated everywhere.
( ৮১ ) পূর্ণ বাবুর সহধর্মিণী দয়াময়ী দেবী—বিদুষী, ধাৰ্মিকা, নিত্যধ্যানপরায়ণ পবােপকাবিনী, অতিথিসেবাতৎপ, পতিগত প্ৰাণা এবং মূৰ্ত্তীমতী দয়া ছিলেন। তিনি দেশের “মা” ছিলেন। গরীব দুঃখীকে অনুবিতরণ এবং রুগ্ন ব্যওিকে ঔষধ বিতরণ—তঁাহার জীবনের লক্ষ্য ছিল। তিনি কাশী, হরিদ্বার, গয়া, পুরুষােত্তম, কুরুক্ষেত্র, পুষ্কর, মথুরা, বৃন্দাবন প্রভৃতি অনেক তীর্থভ্রমণ করিয়াছেন। তিনি প্রতিদিন শিবাৰ্চ্চনা করিতেন এবং বিষ্ণকে সচন্দন তুলসী দিতেন। তিনি-অধিকাংশ পুরাণ নিজে পাঠ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতার নাম চণ্ডীচরণ গুহ। মাতার নাম নারায়ণী দেবী। পূর্ণ বাবুব তিন পুত্র-দুর্গাবর, বরদাবিনােদ ও নলিনীরঞ্জন । দুর্গাবব চট্টগ্রামে কালেক্টরীর কেরানী ছিলেন, কিন্তু শিক্ষার পক্ষপাতী বলিয়া ঐ পদ ত্যাগ করেন এবং শিক্ষাবিভাগে কাৰ্য করিতেছেন। বরদাবিনােদ কবিরাজী করেন। তিনি স্বীয় গ্রামে শ্ৰীশ্ৰী মগধেশ্বৰীর মন্দির নির্মাণ করিয়াছেন। তিনি উত্তরায়ণ-সংক্রান্তি উপলক্ষে একটি বিরাট মেলা ও স্থাপন করিয়াছেন। নলিনীরঞ্জন চট্টগ্রামে Bunah (Dil ('ompany তে কেরাণীর পদে নিযুক্ত আছেন। পূর্ণ বাবু তাহাব বচিত “কল্পনা প্রসূন” নামক কাব্যে বিধবার ‘আদর্শ জীবন” সম্বন্ধে কয়েকটি সুন্দর কথা বলিয়াছেন । তাহা নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল ? - বালিকা বিধবা বলে কিশােরী জীবনে, ডবে না কিশােরী, নাথ, স্বধর্ম পালনে ; শিক্ষিতা বিধবা সতী উত্তরা সুন্দরী, ১ ভাবিবে দৃষ্টান্ত, কান্ত, তােমার কিশােরী । থাকহ নিশ্চিন্ত নাথ, থাকহ নিশ্চিন্তে, তৰ বিদ্যমানে দাসী করিত যে চিন্তে,
( ৮২
)
করিবেনা ২,
করিবেনা, প্রভু,
সে চিন্তা বিহনে দাসী, অন্য চিন্তা কভু।
যে অাখি রাখিয়া গেছ কিশােরীর চোখে,
কিশােরীর আঁখি সদা সেই আঁখি দেখে,
যে পাদুকা রেখে গেছ কিশােরীর গেহে
আলিঙ্গিছে সে পাদুকা কিশােরীর দেহে।
যেই প্রাণ লয়ে গেছ অমর ভবন,
কিশােরীর প্রাণ তার লয়েছে শরণ!
হউক সুবর্ণ-পুরী সুন্দর গঠন,
করিবেনা তব দাসী তাহে পদার্পণ।
হউক ভবনে তব হিংসুকের বাস;
উপেক্ষিবে দাসী তায় স্বর্গ অভিলাষ,
রতনে : খচিত-গৃহ সহস্র মহল,
ভাবিবে কিশোরী তব নিরয়ের স্থল।
তােমার তৃণের ভগ্ন কুটিরের ধারে,
আলিঙ্গিবে সুখে দাসী বাদলে 'ভাস্করে,
চন্দ্র, সূর্য্য মত মণিময়
--- অলঙ্কার,
কিশােরীর পক্ষে সব কণ্টক বা চাড়।
বৈধব্য-উচিত-গঙ্গা-মৃত্তিকা-লিখিত,
“তব নাম-অলঙ্কারে” হবে পুলকিত ;
ইন্দ্রানীর পরিচ্ছদে মুছিবে না পদ
তব নামাঙ্কি ৩ পত জীর্ণ পরিচ্ছদ।
অথবা বল্কল থােক প্রাদেশ প্রমাণ,
ঢাকিবে কিশােরী লজ্জা, ভাবিবে গুমান,
(
৮৩
}
চন্দন, আতর, চুয়া, সুগন্ধি নিচয়,
কিশােরী পক্ষে সব
সব পূতিগন্ধময়।
বর্ষায় তােমার ভগ্ন কুটিরে শয়নে;
গায়েব কর্দম ঘ্রাণ জিনিবে চন্দনে,
অমল-রক্ষিত-সুধা হউক নৈবেদ্য,
কিশােরীর পক্ষে সব 'বৃণিত অখাদ্য।
তৰ কুটিবে শাক দিনান্তে ও যদি,
বটে কিম্বা নাই ঘটে, সাক্ষি থা’ক বিধি,
শুৰ নাম স্মৃতি-সুধাপানে যদি মপি,
সুধাপানে অমরত্ব ভাবিবে কিশােরী।
মণি, মুলা, হীরা শত সম্রাটের ধন
ভাবিবে কিশােরী তব স্ফুলিঙ্গ মতন,
রাজবাজেশ্বরী পদ শ্মশান তাহার,
তব নামে ভিক্ষা-ঝুলি প্রিয় চন্দ্রহার।
মানবেব শত বর্ষ আয়ু পরিমাণ,
তব ধ্যানে কিশােরীর মূহুৰ্ত্ত সমান,
দুরন্ত যৌবন কিম্বা শত প্রলােভন,
পালিবেনাসেই ধ্যান ভাঙ্গিতে কখন।
আজি হতে কিশােরীর ভাগ্য হবে যার
কিশােরী হইবে ভবে দৃষ্টান্ত তার,
ফলতঃ সাধের যত কিশােরী বিধুবা,
সম্ভবে কি সেই সাধ নরলােকে পূরা ?
গিয়েছ অমরে: নাথ আসিতেছে দাসী,
মিটাব মনের সাধ চিরসুখে পশি,
( ৮৪ )
এই উপহাব নাথ এই কথা গুলি
নাহি জানি আর দাসী, বল যদি বলি ।
থাকে যদি আরাে কিছু প্রিয়তব তব,
করিবে প্রতিজ্ঞা দাসী পালিবে সে সব !
কৃতজ্ঞতা সহকাবে এই উপহার,
অর্পিল কিশােরী নাথ চবণে তােমাব ।
নিশ্চিন্তে করহ কাস্থ স্বর্গে অবস্থান
রাখিবে কিশােৰী তব কুল, লজ্জা, মান।
নিম্নে পূর্ণবাবুর রচিত দুইটাইংবেজী কবিতা । দত করা গেল
VERNAL BLESSINGS
২
I.
The varili the moon have their , ay;
In their race they lo mot stay.
Su in the path sants have tror,
Give me strength to walk, O Lord!
11.
Air mives and is not at rost;
Timo flios l'ast as it can bset;
Let not this work hanil go udit
Give ine strength to work, () Lord!
III
I am sin, and burn in sin,
I do sin, and live in sin,
I sink in sin; so the rod
Give me strength to kiss, () Lord!
be) IV. I ain Sod and shall be Sud; My soul is Ghost, Ghost is (iod; At the call of heart I nod, Give me strength to wake, O Lord V. There roars the sky; ring the bell; There rills the brook; tolls the knell; All are un to sing of God; Give me strength to pray, () Lord; VI. As ralf with cow; laml) with dain; As babe with clame; all with mam; Young with hen; so with the World Give me strength to keep, () Lord ! VIl. All that hath life longs jor hoine- C'ellor dell or ien or dome; Mine is one to where I plod; Give me strength to get, O Lord! A PANEGYRIC. Thon Almighty Father to thee I pray, On ne bestow strength to compose a lay, A man there is, a man shall he e'or de ; Among thousands of his caste and creert Amidst countless men far beyond the ser Along he moves with heart open and freel. How noble heliots with eyes alw:ys bright
( boy )
Ilow gracious are his deals of public good.
How justice leads him to the path aright;
How pure are his thoughts in their native mood;
Conceived in an entight'ned womb of the west;
Lulled and rocked on the white Albion breast;
Attended, nursed by an angelic hand;
Vielded to the love lures of merry bandl;
Taught and trained with care by a master mind;
Onward he raced leaving rivals behind.
Off and on at leisure he played with matos ;
Never mixed with the naughty whom he hates.
Evangels were brought him by vicar bolil;
Soul was sanctified with a sacred holl:
Qujck to the thought he canght the ray of Light
Union of Tribuna of blissful sight.
Initiated he stood as a rock,
Right Reverend Dean preaching to his flork-;
Eager to hear the sermons in his sturk
Ind is lis destined field to act,
Civil Department to adorn
Sound duties truly to transact,
Sane laws to deal as Daniel Born.
(hattal is proud of such a heart.
Amidst its people mild and meek;
Many he would his mind keen and smart
On all sides younine truths 10 sech.
Come, fellow beings, come with glee
The great ideal mau tie see.
Lower your head before his face;
(b)
Anon bend on his traits to trace.
Candid thanks give him for his grace;
Do inark him model of his race.
A single man he lives to date,
A partner he hath none as mate
Troubles to partake of this earth;
Oh! how unknown to sweets of hearth !
Have you to know this noble name ?-
Enquire Clayton, well known to fame
Find in him a true patron of the poor;
How often for them is open his door;
A voice be raised in chorus for his rise
May guardian Deities keep Clayton wiee.
5. Ayet
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.