Makardah Saraswat Library, Howrah
Swapna-sambhab Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্বপ্ন-সম্ভব
No text on this page.
স্বপ্ন-অব
ফু
ব
ন
ল
রজন, পাবলিশিং হাউস
২৫।২ মােহনবাগান রে, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণফান ১৩৫৩
মূল্য তিন টাকা
শনিরঞ্জন প্রেস
২৫।২ মােহনবাগান রা, কলিকাতা হইতে
সৌরীন্দ্রনাথ দাস কতৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
১২-১১, ৩, ৪৭
শ্রীমান সৌরেন বসু
কল্যাণীয়েষু
আমাদের স্বপ্ন যদি কোনও দিন সম্ভব হয়, তা হলে তা
তােমাদের মত আদর্শনিষ্ঠ কর্মীর জন্যেই হবে। আমার
এই ক্ষুদ্র কাব্য যদি তােমার কর্মে প্রেরণা যােগাতে পারে
তা হলে আনন্দিত হব।
}
বলা
পশী, ১৩৩
No text on this page.
যতীন কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। প্রতিদিন খবরের কাগজ আর সে পড়িতে পারিতেছিল না। সেদিনকার কাগজটা নামাইয়া রাখিল। মনে হইল, মনুষ্যত্ব অবলুপ্ত হইয়া গেল নাকি! এই বিংশ শতাব্দীতে সমস্ত দেশ জুড়িয়া মানুষের যাহা করিতেছে, তাহাতে পিশাচেরাও যে লজ্জা পায় ! হিন্দু আর মুসলমান••• অনেক কথাই মনে হইতেছে। সিপাহী বিদ্রোহের সময় এই হিন্দু-মুসলমান এক ছিল। নানাসাহেবের প্রধান সহকারী ছিলেন আজিমুল্লা খান। বেরেলির বাহাদুর খান ঘােষণা করিয়াছিলেন, আমরা কোরবানি বন্ধ করিয়া দিব। দিল্লীর সম্রাট গাে-হত্যা বন্ধ করিবার হুকুম দিয়াছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি যুদ্ধ করিয়াছিল। প্রত্যেক বিদ্রোহী বাহিনীতে মৌলভী ছিলেন, পুরােহিতও ছিলেন। মুসলমানের মহরমে হিন্দুরা যোগ দিতেন, হিন্দুর হােলিতে মুসলমানের অংশ গ্রহণ করিতে বাধিত না। দেখিতে দেখিতে কি হইয়া গেল। ইংরেজ-শাসনের মহিমায় মুসলমান সহসা আজ সচেতন হইয়া উঠিয়াছে, তাহারা পৃথক ‘নেশন’। সব মুসলমানেরা হয় নাই, নিরক্ষর অসহায় কৃষকের দল বােঝেও না, ‘নেশন’ বলিতে কি বুঝায়। যতীনের কয়েকটা ছবি মনে পড়িল। পলাশীর প্রান্তর, ক্লাইব ও মীরজাফর। উভয়ে উভয়ের পরম বন্ধু। তাহার ঠিক এক শত বৎসর পরে সিপাহী-বিদ্রোহের অবসানে ক্যাপ্টেন রবার্টস্ লিখিতেছেন, পাজি মুসলমানদের ভাল করিয়া বুঝাইয়া দাও যে, ইংরেজরাই এ দেশের হর্তাকর্তা বিধাতা। নবাবেরা ফাসিকাঠে ঝুলিতেছেন। শাহাজাদাদের সারি সারি দাড় করাইয়া গুলি করা হইতেছে। ফতেপুরের পাঠান- বস্তি আক্রান্ত, ব্রিটিশের গুলিতে দলে দলে নিরীহ মুসলমান মরিতেছে, ব্রিটিশ সৈন্য দুই হাতে মুসলমানের সম্পত্তি লুণ্ঠন করিতেছে। নির্বাসনে দিল্লীর বাদশাহ ভাঙা খাটিয়ায় শুইয়া অন্তিম নিশ্বাস ফেলিতেছেন।
বঃশব ০০০ •তাহার পর এক শত বৎসর এখনও অতীত হয় নাই, ইংরেজের সঙ্গে মুসলমানের বন্ধুত্ব আবার জমিয়া উঠিয়াছে। ইংরেজ এখন মুসলমান মাইনরিটির স্বার্থরক্ষা করিতে ব্যাকুল। মুসলমানের দুঃখে চার্চিলের চক্ষে নিদ্ৰা নাই। কিন্তু দেশের সকলে এ কথা জানে না, এ কথার তাৎপর্য কে তাহাদের বুঝাইয়া বলিবে? এখানেও নাকি দাঙ্গা বাধিবার উপক্রম হইয়াছে। বাতাসে বিষ সঞ্চারিত হইতেছে। সাধারণ মানুষ এ সবের প্রকৃত অর্থ জানে না। একটু আগে মেজদি আসিয়াছিলেন, দেশের কথা ভাবিবার সামর্থ্যই তাহার নাই। নিজের অতি-তুচ্ছ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার তুচ্ছতম খুঁটিনাটিই তাহার নিকট একমাত্র সত্য। নিজের কথাই সাতকাহন বলিলেন। তাঁহার অনেক দুঃখ। যতীনের মনে হইল, আমার দুঃখও কিছু কম নয়। মেজদি নিজের দুঃখের কথা পাঁচজনকে বলিয়া মনের ভার হালকা করিতে পারেন, আমি তাহা পারি না। আমার দুঃখের স্বরূপ কেহ বুঝিবে না। আমি যে স্বপ্নলােক সৃষ্টি করিয়া তাহাকেই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিতেছি, রূঢ় বাস্তবের আঘাতে তাহা বার বার ভাঙিয়া যাইতেছে বলিয়া যে কষ্ট পাইতেছি, তাহা কে বুঝিবে, কাহাকে বুঝাইব ? মেজদির কথাগুলাই যতীনের মনে পড়িতে লাগিল। শুধু মেজদির নয়, মধ্যবিত্ত বাঙালী- জীবনের গ্লানিকর ছবির টুকরাগুলা আবর্জনার মত তাহার স্বপ্ন- লােককে ম্লান করিয়া তুলিতেছে। সে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই সৃজন করিতে পারে না, কিন্তু বাস্তবের আঘাতে সে স্বপ্নও অক্ষুন্ন থাকিতে পাইতেছে না। হঠাৎ মনে পড়িল, সমর নােয়াখালি চলিয়া গিয়াছে। রুমিকে আজ দেখিতে আসিবে। রুমির এখনও বিবাহ হয় নাই বলিয়া সেজদার চিন্তার অন্ত নাই। বহু চেষ্টা করিয়া তিনি একটা পাত্র জুটাইয়া আনিয়াছেন। এখানেও দাঙ্গা বাধিবে নাকি? সহসা তাহার বাল্যবন্ধু মহীউদ্দিনের কথা মনে পড়িল। সেও কি বিশ্বাস করে, সে আলাদা ‘নেশন’? মেজদি বলিতেছিলেন, মহীউদ্দিনের বউটি নাকি ভারি লক্ষ্মী। মেজদি সকলের খবর রাখেন। নিজের পাড়ার তাে বটেই, অপর পাড়ারও। কাহার বউ কবে পলাইয়া গিয়াছে, কোন্ মেয়ে বুড়া বাপকে আলুভাতে ভাত খাওয়াইয়া আপিসে বিদায় করিয়া দিয়া দুপুরে বন্ধুবান্ধব ডাকিয়া বাড়িতে আড্ডা জমায়, কাহার ছেলে চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়াছে, কে কাহার গরুকে খোঁয়াড়ে পাঠাইয়াছে, কুকুর-কামড়ানাের ভাল দৈব ঔষধ কাহার জানা আছে••• যতীনের স্বপ্নলােকে আবার মেজদি ঢুকিয়া পড়িলেন। যতীন প্রাণপণে তবু মনটাকে ফিরাইবার চেষ্টা করিল। ভাবিতে লাগিল, আমি এখন জগতে আছি, যে জগতে থাকিতে চাই, সেখানে মেজদির এই সব কথা অতিশয় বেমানান। অথচ সকলের চক্ষে মেজদিই বাস্তব, আমার চক্ষেও কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলেন, কিন্তু এখন মনে হইতেছে ঠিক উল্টা, মেজদিই অবাস্তব অস্বাভাবিক। ওই সদ্য-ফোটা অপরাজিতার পাপড়িতে বসিয়া যে নীল পরীটা দোল খাইতেছিল, যাহার অতি সূক্ষ্ম ওড়নাখানা প্রচ্ছন্ন কম্পনে নীল পরীর মনের ইঙ্গিতময় ভাব প্রকাশ করিতেছিল, আমার চোখে এখন ওই নীল পরীটাই বাস্তব, মেজদি নয়। নীল পরীর অতি- সূক্ষ্ম ওড়নাখানাকে বাস্তববাদীরা মাকড়সার জাল বলিয়া ভুল করিবে। পরীরা যে ওড়না কাপাইয়া মনের কথা প্রকাশ করে, এ কথাও কেহ বিশ্বাস করিবে না জানি; কিন্তু ইহা সত্য। যে সােনার নৌকায় চড়িয়া নীল পরী অপরাজিতার সবুজ কুঞ্জে ভিড়িয়াছে, সেই সােনার নৌকাটাই এ জগতে মানায় ভাল; মেজদির নাকী সুরের কান্নাটা নয়। নৌকাখানাই সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিতেছিলাম। সােনার অথচ স্বচ্ছ, ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তন করে। একটু আগেই ঠিক নৌকার মত ছিল, কিন্তু যেই আমি লক্ষ্য করিতে শুরু করিয়াছি অমনই টের পাইয়া গিয়াছে, আত্মগােপন করিতে চায়, দেখিতে দেখিতে লম্বা রেখার মত হইয়া গেল। আমার কাছে এখন কিন্তু লুকানাে শক্ত। অপরাজিতার পাপড়িতে দোল খাইতে খাইতে ওড়না কঁপাইয়া নীল পয়ী ইঙ্গিতে সব কথা আমার কাছে প্রকাশ করিয়া দিয়াছে। এখন আর আমাকে । • ফাকি দেওয়া চলিবে না। নীল পরী এখন আমার পক্ষে। আগে যখন বাস্তববাদী ছিলাম, তখন আমিও ওটাকে এক টুকরা রােদ বলিয়া জানিতাম। এখন বুঝিয়াছি, সেটা ভুল। আসলে ওটা সােনার তরী, নীল পরী উহাতে চড়িয়া পাড়ি দেয় অরূপলােক হইতে রূপলােকে, সত্য হইতে স্বপ্নে, অসীম আকাশে অদৃশ্য তরঙ্গের শিখরে শিখরে। আর আমার পক্ষে সর্বাপেক্ষা আশ্বাসজনক ঘটনা—নীল পরী ইঙ্গিতে আমাকে জানাইয়াছে, অপ্রত্যাশিত পথে সে একদিন আসিবে, আসিয়া আমাকে লইয়া যাইবে, লইয়া যাইবে সেই রহস্যলােকে—যেখানে জ্যোৎস্না ফুল হইয়া ফোটে, ফুলেরা প্রজাপতির মত উড়িয়া বেড়ায়, যেখানে সমস্ত সৌন্দর্যের উৎসমুখে চাপা আছে একটি রহস্যময় মণি- যে মণি কেহ'খুলিতে পারে না, যাহা আপনি মাঝে মাঝে একটু একটু করিয়া খােলে আর নব নব সৌন্দর্যের প্লাবনে নিখিল বিশ্ব ভরিয়া যায়। ঠিক তাহাৰু পাশেই পাতালপুরীর সুড়ঙ্গ আছে, অদ্ভুত অন্ধকার সুড়ঙ্গ, কোথায় কতদূরে চলিয়া গিয়াছে কেহ জানে না—অতল অশেষ। এই সব কথা নীল পরী আমাকে বলিয়াছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার নীল পরী নীলও নয়, পরীও নয়। আজ নীল পরী সাজিয়া আসিয়াছে, কাল আসিয়াছিল কাঠঠোকরার বেশে—মাথায় ঝুটি, লম্বা সরু ঠোঁট, গলার কাছটা বাদামী রঙের, পিঠে ডানায় সাদা-কালো ভােলা ভােরা, ক্ষণে ক্ষণে মাথার ঝুটিটা ফর করিয়া খুলিয়া যায়। ওই যে ভ্রমর, ওই যে টিকটিকি—উহারাও হয়তাে নীল পরীর ছদ্মরূপ। যে বেশেই আসুক, আমি উহাকে চিনি, উহাকে ঘিরিয়াই নূতন জগৎ গড়িয়াছি,,, সেই জগৎটাই আমার কাছে সত্য, মেজদি নয়।••• আবার মেজদি আসিয়া পড়িলেন। তাহার মূর্তিটা আবার চোখের উপর ভাসিয়া উঠিতেছে, তাহার কথা শুনিতে পাইতেছি। আজ একটু চলতে গেলেই হাঁপ ধরছে বড়, বুকের ভেতরটা ধকধক করছে, হাতুড়ি দিয়ে পিটছে যেন কেউ। আর এই বাঁ দিকের শিরটা এমন টেনে ধরেছে, যেন বঁড়শিতে গেঁথেছে। লােকের কাছে ৫ বলেও পারি না, সবার কাছে বলতে আবার লজ্জাও করে, সবাই বিশ্বাস করবে কেন, নিজের ঘরের লােকই করে না।••• মেজদি নাকটা ঈষৎ কুঁচকাইয়া চশমাটা ঠিক করিয়া লইলেন। এটি তাঁহার মুদ্রাদোষ। চশমা ঠিক করিয়া আবার শুরু করিলেন- উনি মনে করেন, বুড়াে মাগীর হিস্টিরিয়া হয়েছে। হয়তাে হিস্টিরিয়াই।একটু হাসিলেন, তাহার পর একটু থামিয়া আবার বলিলেন, যে নামই দাও তােমরা, কষ্ট তাে হয়। এই দেখ না, বা দিকের রগটা সমানে দপদপ করে চলেছে, অথচ হাত দিয়ে দেখ ঠাণ্ডা হিম, সমস্ত বা অঙ্গটাই ঠাণ্ডা। আশ্চর্য, নয়? যখন যেদিকটার দপদপানি বাড়ে, অমনই সেদিকটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।••• মেজদির ফোকলা দাতের হাসি বড় মিষ্ট। কিন্তু এই মিষ্টতা এখন মনে আর সে মাধুর্য সঞ্চার করিতে পারে না, আগে যেমন করিত। এই মেজদির সঙ্গে আমাদের কোন রক্তের সম্পর্ক নাই। উনি, পাড়ার সকলেরই মেজদি। ছেলেবেলায় এই মেজদির কাছে কত আগ্রহে কত রূপকথাই না শুনিয়াছি! কিরণমালার গল্পটা কত রঙে রাঙাইয়াই না বলিয়াছিলেন, এখনও একটু একটু মনে পড়ে। এখন মেজদিকে একটা অদ্ভুত অস্বাভাবিক ব্যাপার বলিয়া মনে হয়। সবুজ ক্ষেতের মাঝখানে কিম্ভুতকিমাকার কি একটা যেন! খড়ের তৈয়ারি দেহ, লম্বা হাত পা, গায়ে বেমানান একটা জামা, মাথায় কালাে হাঁড়ি, তাহার উপর চুন দিয়া চোখ মুখ নাক আঁকা। পাখিরা দেখিয়া ভয় পায়। শুধু মেজদি নয়, সকলেরই এই অবস্থা। হাসি পায়, দুঃখও হয়। আর একটা কথা ভাবিয়া আশ্চর্যও লাগে। বাড়ির মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আমি—আমার চেয়েও ছােট অবশ্য আছে একজন, আমাদের একমাত্র ছােট বােন রুমি —কিন্তু আমিই কেবল দিব্যদৃষ্টি লাভ করিয়াছি। আমিই কেবল বুঝিয়াছি, বাহিকের এই এত বাহাড়ম্বর, এই দেশব্যাপী দাঙ্গা কলহ, রুমির রােমান্স, বড়দার আভিজাত্য, মেজদার অহঙ্কার, সেজদার ঠাকুর- ঘর, পাড়ার শৈলেনদার কমিউনিজম প্রতিটি লােকের নানা আজগুবি ; আচরণ, যাহা বাস্তববাদীদের বিচারে বাস্তবিক, বস্তুত তাহার প্রত্যেকটিই অলীক। বাস্তবিক কেবল নীল পরী—যে নীল নয়, পরী নয়, যে যখন-যেমন-খুশি-বেশে দেখা দিতে পারে এবং দেয়। কিন্তু মেজদিরা থামিবেন না••• আবার মেজদির কথাগুলা শুনিতে পাইতেছি। পাশের ঘরে ভাের থেকে লুচি ভাজা হচ্ছে, পেঁয়াজ ভাজা হচ্ছে, চা হচ্ছে, গন্ধ পাচ্ছি; কিন্তু বেল পাকলে কাকের কি বল, আমি আমার ঘুটের উনুন ধরিয়ে চাটুকু করে নিলাম। চা করতে গিয়ে দেখি, চিনি নেই। তােমার বউদি কাল যে লক্ষ্মীপূজোর বাতাস প্রসাদ দিয়েছিল, তাই ছিল দুখানা—তাই দিয়েই করলাম, বেশ লাগল।••• মেজদি আর হাসিলেন। আবার নাক কুঁচকাইয়া চশমাটা ঠিক করিয়া লইলেন। ভাবিয়াছিলাম, প্রত্যুত্তর না করিলে মেজদি বুঝি চলিয়া যাইবেন। কিন্তু মেজদি প্রত্যাশাভরে দাড়াইয়া রহিলেন। আমি চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না। জিজ্ঞাসা করিতে হইল, চিনির অভাবে বাতাসা দিয়ে চা খেতে হ’ল ? চিনি আনিয়ে রাখেন নি কেন ? কনট্রোলে তত চিনি দিচ্ছে আজকাল। তা তাে দিচ্ছে। আমাকে কে আর এনে দেবে, বল ? নিজেকে গিয়েই তাে আনতে হবে দোকান থেকে। যা ভিড়, দাড়িয়ে থেকে থেকে ফিরে এলাম কাল। কেন আপনার নাতিরা ? নাতিরা! তবেই হয়েছে। কি বললে জান আমার বড় নাতি? আমাদের কল থেকে জল নিও না, বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে বুড়ী ডাইনী—এই সব কথা ভদ্দরলােকের ছেলেরা বলে কখনও তার ঠাকুমাকে? শুনেছ কখনও? শুনেছ কখনও? ঘরের কথকত আর বলি । এই সব বলছে, আর তার মা ফিকফিক করে হাসছে দরজার গােড়ায় দাড়িয়ে। দেখেছ কখনও এমন কাণ্ড ? মেজদির কথায় বিস্ময় খেদ ব্যঙ্গ যুগপৎ প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল। ছেলে ঘােষাল মশায়ের উচিত নাতিদের শাসন করা। তা করলে ভাবনা কি ছিল, উনি কিছু বলবেন না। ইহার পরই মেজদির সুর বদলাইয়া গেল। ঘােষাল মশায়ের পক্ষ সমর্থন করিয়া তিনি ওকালতি শুরু করিলেন। কি করেই বা বলবেন বল ভাই। শােকাতাপা মানুষ। বুড়াে বয়সে অত বড় ঘা খাবার পর কি আর শাসন করতে ইচ্ছে হয় কাউকে ••• মেজদি ঘাড় ফিরাইয়া বোধ হয় উদগত অশ্রুটাই গােপন করিতে চাহিলেন। পুত্রশােকে অশ্রুপাত করা এমন কিছু লজ্জাজনক ব্যাপার নয়, কিন্তু মেজদি কিছুদিন হইতে অশ্রুটা গােপন করিতেছেন, কেন জানি না। বােধ হয় লােকের সহানুভূতি এড়াইবার জন্য। লােকের সহানুভূতি অনেক সময় বড় কষ্টদায়ক। কিছুদিন পূর্বে মেজদির উপযুক্ত পুত্রটি মারা গিয়াছে। বড় চাকরি করিত। বিধবা পুত্রবধূ এবং তাহার একপাল ছেলেমেয়ে লইয়া প্রদ্যোত ঘােষাল বৃদ্ধবয়সে সত্যই বড় বিপন্ন। তিনি নাতি-নাতনীদের শাসন করিতে পারেন না। পুত্রবধূকে কিছু বলা তাহার পক্ষে নাকি আরও কঠিন। তাহার বিধবা- মূর্তি দেখিলেই তিনি এমন অবসন্ন হইয়া পড়েন যে, তাহাকে কিছুই বলিতে পারেন না। তাহার সমস্ত আবদার সহ্য করিতে হয়। সে শাশুড়ীকে অপমান করে, ডাইনী বলে, তাহাকে আলাদা হেঁসেল করিতে হইয়াছে, তাহার বাক্যের জ্বালায় মেজদির বাড়িতে টেকাও দুষ্কর, পথে পথে তিনি ঘুরিয়া বেড়ান, পাড়ার লােকে বলে—বউটা বিধবা হইয়া যেন সকলের মাথা কিনিয়াছে। ঘােষাল মহাশয় কিন্তু চুপ করিয়া থাকেন। প্রাণ ধরিয়া কিছু বলিতে পারেন না। শুধু তাই নয়, যাহা কিছু উপার্জন করেন সব ওই পুত্রবধূকেই আনিয়া দেন। মেজদিকে বলেন, পয়সা নেড়ে-চেড়ে তবু যদি ভুলে থাকে থাক আহা! ইহার পর মেজদি যে প্রসঙ্গটি তুলিয়াছিলেন, তাহা প্রবলভাবে স্বপ্ন-সম্ভব যতীনের আবার মনে পড়িয়া গেল। যাইবার পূর্বে মেজদি বলিয়া গেলেন, যাই নীলিদের বাড়ি, দেখি সেখানে কতদূর কি হ’ল, আত্মীয়- স্বজনরা তাে কেউ আসবে না শুনছি। তুমি যাবে তাে?••• আজ নীলার বিয়ে। সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া নীল পাড়ার একটি বয়াটে ছােকরা প্রবালকে বিবাহ করিতেছে। আত্মীয়- স্বজনরা এতদিন নীলার সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন, কেহ তাহার সুশিক্ষার বা বিবাহের ব্যবস্থা করেন নাই, সকলের সঙ্গে যথেচ্ছ মিশিবার অবারিত সুযােগও দিয়াছিলেন। এখন সকলের মনে ধর্মভাব জাগিয়াছে। সগােত্রে বিবাহ তাহারা কিছুতেই হইতে দিবেন না। অতি -দূর-সম্পর্কের বিনয়বাবু বৰ্মা হইতে প্রচুর অর্থোপার্জন করিয়া ভাগ্যে কিছুদিন পূর্বে ফিরিয়াছেন, তিনিই দাড়াইয়া বিবাহ দেওয়াইবেন। তাহার মতে জ্বণ-হত্যা করাটা বােকামি। বাঙালী হিন্দুরা যে জীবন-যুদ্ধে হটিয়া যাইতেছে, তাহার একটা কারণ—তাহার মতে—ভদ্র হিন্দুরা ক্রমশ সংখ্যায় কমিয়া যাইতেছে। সংখ্যা বাড়িবে কি করিয়া ? অধিকাংশ ভদ্র হিন্দু-নারীর জীবনই নিস্ফল। শিক্ষিত ভদ্রলােক সমাজকে জীবনযুদ্ধের উপযােগী সমর্থ সন্তান দিতে পারেন, বিলাস ও স্বার্থপরতার কবলে পড়িয়া তাহারা বিলাতী উপায়ে জন্মনিরােধ করিতেছেন, কুমারীদের বিবাহ হইতেছে না, বিধবারা তাে আছেই। ইহাদের মধ্যে দুই-একটা যদি জীবনের প্রাবল্যে সমাজের বাধা-বিপ্ন তুচ্ছ করিয়া ফলবতী হইতে চায়, মন্দ কি বিনয়বাবুর ইহাই মত। নীলাকে তিনি সাহায্য করিবেন। আজই বিবাহ। যতীন নীলার কথাই ভাবিতে লাগিল—মনের কি অদ্ভুত ক্ষমতা! কত দিনের ঘটনা দুই মিনিটে ভাবিয়া ফেলিতে পারে। নীলা! নীলার রাজরাণী হইবার যােগ্যতা ছিল, কিন্তু কাঙালিনীর মত সে সবার দ্বারে দ্বারে ফিরিয়াছে। আমার কাছেও আসিয়াছিল, আমিও তাহাকে লইয়া কবিতা লিখিয়াছি।' শুধু আমি নয়, অনেকেই লিখিয়াছে। হয়তাে বিনয়বাবুও। আমি শুধু কবিতা লিখিয়াই ক্ষান্ত যে সব ?
স্বপ্ন-সম্ভব হই নাই, তাহাকে বিবাহ করিতে চাহিয়াছিলাম। যদিও সে অন্য জাত, তবু বউদিদিদের দিয়া বাবার মত করাইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। বড় বউদিদি বাবাকে কাশীতে পত্র লিখিয়াছিলেন। বাবা মত দিলেন । তবু আমি নীলাকে চাহিয়াছিলাম যাক সে কথা••• একটা কথাই কেবল মনে হইতেছে, শেষ পর্যন্ত প্রবালের মত ছেলেকে ফাদে ফেলিয়া নীলাকে মাতৃত্ব অর্জন করিতে হইল! জীবনের প্রবাহকে তত কেহ রােধ করিতে পারে না। তুমি যদি অস্বাভাবিক আইনের বাধ তুলিয়া তাহাকে আটকাইতে যাও, বারম্বার সে বাঁধ ভাঙিয়া যাইবে। মানুষ নিজেকে ভুলাইতে গিয়া একটা কথা ভুলিয়া যায়- প্রকৃতি কোন বঞ্চনাকেই কখনও প্রশ্রয় দেয় না। তাহার নিয়ম অমােঘ, পরিণাম অব্যর্থ। আত্মবঞ্চনা শেষ পর্যন্ত শােচনীয় হইয়া উঠে।••• আত্মবঞ্চনার কথায় নিভাননীর কথা মনে পড়িতেছে। বিধবা নিভাননী। বছর দশেকের একটি ছেলে লইয়া সে খুড়ার আশ্রয়ে থাকিত। কিছুদিন পরে কানাঘুষা শােনা গেল, সে নাকি সন্তানসম্ভবা। সমস্ত চিহ্নও সর্বাঙ্গে ক্রমশ পরিস্ফুট হইয়া উঠিতে লাগিল। নিভাননী নির্বিকার। নির্বিকার থাকিয়া কিন্তু লােকের মুখ বন্ধ করা যায় না। খুড়া মহাশয় বিচলিত হইলেন। খুড়ীমার মারফৎ সকলের সন্দেহটা নিভাননীর গােচর করিলেন। নিভাননী সােজা অস্বীকার করিল। বলিল, আমার পেটে মাংস বাড়িতেছে। কেন বাড়িতেছে, বলিতে পারি না। ডাক্তার ডাকা হইল। নিভাননী স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়াই ডাক্তার ডাকাইল। ডাক্তার যখন সত্য কথা বলিলেন, তখন, নিভাননী হাসিয়া উঠিল ডাক্তারের মুখের উপরই বলিল, আপনি কিছু জানেন না। খুড়া মহাশয় বিপন্ন হইলেন। তিনি ছাপােষা গৃহস্থ লােক। ঘরে কয়েকটি বিবাহযােগ্য কন্যা আছে। একটা কেলেঙ্কারি হইয়া গেলে তিনি অকূল সমুদ্রে পড়িয়া যাইবেন। তিনি নিভাননীকে দূর করিয়া দিলেন। নিভাননী আমাদের বাড়ির পাশের গােয়াল-ঘরটাতে আসিয়া "আশ্রয় লইল। কাঁদিতে কাদিতে নয়, হাসিতে হাসিতে। অবুঝ শিশুর অসঙ্গত ৫ ১০ আচরণে বয়স্ক ব্যক্তি যে হাসি হাসে, নিভাননীর হাসিটা সেইরূপ। প্রথম হইতেই নিভাননী ব্যাপারটাকে হাসিয়া উড়াইয়া দিতে চাহিয়া- ছিল। কোন সমালােচনা, কোন গালাগালি গায়ে মাখে নাই। কেন সে এরূপ করিয়াছিল, জানি না। নিজেই সে সম্ভবত ব্যাপারটাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করিতে পারে নাই। কিন্তু তাহার দশ বৎসরের ছেলে বিশুর পক্ষে ব্যাপারটা মর্মান্তিক হইয়া দাড়াইয়াছিল। প্রথমটা সে কিছুই বুঝিতে পারে নাই। মােটরে চড়িয়া বড় ডাক্তার আসিয়া ঘরে খিল বন্ধ করিয়া মাকে যখন পরীক্ষা করিয়া গেল, তখন সে অবাক হইল। মায়ের কি হইয়াছে ? সকলে বলিল, মায়ের অসুখ করিয়াছে। তাহার পর দাদু যখন মাকে দূর করিয়া দিলেন, মাকে একটা সঁতসেঁতে পড়াে গােয়লে আসিয়া আশ্রয় লইতে হইল, তখন বিশু কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খাইয়া গেল। মাকে জিজ্ঞাসা করিল, তােমার অসুখ করেছে, তবু তােমায় দাদু তাড়িয়ে দিলে কেন মা? নিভাননী উত্তর দিল, তােমার দাদুর মাথা খারাপ। তাহার কিছু সঞ্চিত অর্থ ছিল, তাহাতেই দিন চলিতে লাগিল। বিশু যেমন স্কুলে যাইতেছিল, যাইতে লাগিল। স্কুলেরই একটি ছেলে আসল কারণটা একদিন তাহার নিকট ব্যক্ত করিল। বলিল, তাের মাকে কেন তাড়িয়ে দিয়েছে জানিস? তাের মায়ের ছেলে হবে। বিস্মিত বিশু স্কুল হইতে ফিরিয়া আসিয়া নিভাননীকে প্রশ্ন করিল, আচ্ছা মা, অবুদা আজ বলছিল যে, তােমার নাকি ছেলে হবে, তাই দাদু তােমায় তাড়িয়ে দিয়েছে। হঁ্যা মা, সত্যি? নিভাননী ছেলেকে ধমক দিল, না, মিছে কথা। ওসব ফাজিল ছেলে সঙ্গে মিশতে যাস কেন তুই?••• যথাসময়ে নিভাননী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিল। পাড়ার লােকে দেখিতে আসিল। নিভাননীর লজ্জা নাই। সে যেন নিজেই সর্বাপেক্ষা বেশি বিস্মিত হইয়াছে। সকলের সমক্ষেই সে দুই হাত জোড় করিয়া সদ্যোজাত শিশুটাকে প্রণাম করিল। তাহার পর সকলকে বলিল, একে তােমরাও প্রণাম কর, ইনি যীশুখ্রীষ্ট। পাড়ার লােকেরা মুচকি হাসিয়া গা-টেপাটেপি করিতে করিতে চলিয়া স্বাসভব ১১ গেল। নিভাননী আত্মপ্রবঞ্চনা করিয়া হয়তাে আত্মরক্ষা করিতে পারিয়াছিল, কিন্তু বিশু পারে নাই। একটা চিত্র মনে পড়িতেছে। স্কুলের সমস্ত ছেলেরা হাততালি দিতে দিতে সমস্বরে বলিতেছে, বিশুর মায়ের ছেলে হয়েছে-দুয়াে, দুয়াে•••। বিপন্ন বিশু কোথায় যে মুখ লুকাইবে, ভাবিয়া পাইতেছে না। নিভাননী পাগল নয়, পাগল হয়ও নাই। কাশীতে গিয়া সে সুখেই বাস করিতেছে শুনিয়াছি।••• এই পর্যন্ত ভাবিয়া যতীনের সহসা মনে হইল, এমনভাবে একটানা ভাবিয়া চলিয়াছি কেন? যাহা ভাবিতেছি, কাগজ কলম লইয়া তাহা লিখিয়া ফেলিলেই তাে হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হইল, কত লিখিব? জীবনের প্রতি মুহূর্তে যাহা ঘটিয়াছে, ঘটিতেছে এবং ঘটিবে, তাহার আলেখ্য আঁকিতে পারি, এত রঙ তাে আমার নাই। এ নাটক যে মহা-নাটক! অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এ নাটকের দৃশ্যপট, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ইন্দ্রিয়াতীত সমস্ত কিছুই ইহার পাত্র-পাত্রী। ইহা কি লিখিয়া শেষ করা যায় ? বিস্ফারিত নয়নে সে খােলা জানালার দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। বিস্তৃত নীলাকাশে সাদা মেঘের অপরূপ আস্তরণ। ওখানে কি অভিনয় হইতেছে ? অদৃশ্য নাটকের অদ্ভুত অভিনয় তাহার চোখের সম্মুখে মূর্ত হইতে লাগিল। এতক্ষণ বুঝিতে পারে নাই যে, সে নিজেও একজন অভিনেতা-অজ্ঞাতসারে অভিনয় করিতেছিল। এইবার সচেতনভাবে করিতে লাগিল। কে উহারা !••• একটা গুনগুন করিয়া একটা ভ্রমর ঘরে ঢুকিল। ০ । যতীন। এস'নীল পরী ভ্রমর। '[ বিস্মিত ] নীল পরী! সে আবার কি? এতকাল আমাকে ভ্রমর, অলি এই সব নামে ডাকতে, হঠাৎ আজ নূতন নাম কেন ?
স্বপ্ন-সম্ভব
যতীন। পুরােনাে জিনিস বড় একঘেয়ে। নূতন নাম দিয়ে
পুরাতনকে আধুনিক করবার চেষ্টা করছি।
ভ্রমর। নাম বদলালেই আধুনিক হয় নাকি? আমার নাম
বদলাবার দরকার নেই, আমি এমনিই আধুনিক, কতই বা আমার
বয়স, একটিমাত্র বসন্ত তাে উপভােগ করেছি ।
বাহিরে কুড়রুক কুড়রুক শব্দে একটা পাখি ডাকিয়া উঠিল।
ভ্রমর। ওই শােন, আমাকে ডাকছে, আমি চললাম।
যতীন। প্রায়ই ওর ডাক শােনা যায়, কে বল তাে?
ভ্রমর। পাখি।
যতীন।
তা তাে জানি। কি পাখি ?
ভ্রমর। ওর বেশি আমিও জানি না। তােমরাই তাে সবাইকে
নাম দাও। তুমিই বল না, কি ওর নাম?
ওর সঙ্গে তােমার খুব বন্ধুত্ব নাকি?
ভ্রমর। বন্ধুত্ব কাকে বল ? ও কথারও মানে বুঝি না। তবে
ওকে ভাল লাগে—ছােট্ট সবুজ পাখিটি, কিন্তু গলায় কেমন সুর !
যতীন। আলাপও নেই ?
যতীন।
ভ্রমর।
।
যতীন।
তবে যে বললে, ডাকছে তােমাকে।
ভ্রমর। (যা আমার ভাল লাগে, তাই আমাকে ডাকে, তার কাছেই
আমি যাই। আলাপ থাকবার দরকার কি! তােমরা কথা বলে বড়
সময় নষ্ট কর।
ইলেকট্রিক সুইচের ব্র্যাকেটের আড়াল হইতে একটি টিকটিকি বাহির
হইয়া আসিল এবং উদ্গ্রীব হইয়া উৎসুক দৃষ্টিতে ভ্রমরটির দিকে
নির্নিমেষে চাহিয়া রহিল।
যতীন। আমরা কথা কই, তােমরা গুনগুন কর। হঠাৎ এলে
কেন বল দেখি?
ভ্রমর। তােমাদের খবর নিতে।
যতীন। কি খবর?
ভ্রমর। তােমাকে দেখতে পেলাম, এই তো একটা খবর।
চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া উড়িতে লাগিল।
টিকটিকি। [ নীরব ভাষায়, যতীনকে ] ভােমরাটাকে কথায়-
বার্তায় অন্যমনস্ক করে আমার দিকটায় আনতে পার একটু যদি-
যতীন। কেন, কি করবে ?
টিকটিকি। খপ করে ধরব, তারপর চিবিয়ে খাব।
তাহার টুকটুকে লাল জিবটা বার দুই বাহির করিল।
যতীন। (স্বগত ] কি ভয়ানক! [ প্রকাশ্যে ] ও আমার অতিথি,
ওকে নাই বা খেলে।
টিকটিকি। আমিও তাে তােমার অতিথি, আমার খাবার ব্যবস্থা
কর তা হলে।
যতীন।' আমার ঘরে এত জিনিস আছে, খাও না।
টিকটিকি। আমি পাউরুটিও খাই না, সিগারেটও খাই না, পােকা
খাই। তােমার ঘরে কদিন থেকে আলাে জ্বলছে না, পােকাও আসছে
, অনাহারে আছি।
ভ্রমর তাহার কথা শুনিতে পাইল কি না, বােঝা গেল না। অন্তত
তদনুসারে সে কিছু করিল না। ঘরের চতুর্দিকে গুনগুন করিয়া উড়িয়া
বেড়াইতে লাগিল। তাকের উপর একটা ‘টাইপিস’ ছিল, সেইটাই
১৪
স্বপ্ন-সম্ভব
সম্ভবত তাহার কৌতূহল বেশি উক্তি করিয়াছিল, সেইটাকেই সে
বারম্বার প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল।
টিকটিকি। ভােমরার প্রতি তােমার যে বেশি পক্ষপাতিত্ব, তা
আমি আগে থেকেই জানি। অতিথি-সৎকারের বড়াই করলে কিনা,
তাই বাজিয়ে দেখলাম একবার।
যতীন। হ্যা, সত্যিই তাই, কেন বল তাে?
টিকটিকি। তােমাদের মতে ও যে সুন্দর, [ সশ্লেষে ] মানুষের
বিশেষত্বই তো ওই। পক্ষপাতিত্ব। তারা সাম্যের ভান করে, কিন্তু
কিছুতেই সম-দৃষ্টি হতে পারে না।
যতীন, তােমাদের কাছে সুন্দর কুৎসিত বলে কিছু নেই নাকি?
টিকটিকি। আমাদের কাছে যা প্রয়ােজনীয়, তাই সুন্দর। ওই
ভােমরাটা আমার চোখেও সুন্দর, কিন্তু খাদ্য হিসাবে। আমার
সঙ্গিনী—কোথায় গেল সে—তাকে দেখলে তুমি ঘৃণায় আঁতকে উঠবে।
আমার চোখে কিন্তু সে রমণীয়। তােমার এই কাঠের ব্র্যাকেটটিও বেশ
সুন্দর, এর ফঁাকে বেশ নিরাপদে ঘুমুতে পারি। প্রয়ােজনের বাইরে
তােমরা কেন যে আর এক দল সুন্দর কুৎসিত সৃষ্টি করে অকারণ
পক্ষপাতিত্ব কর, তা আমাদের বুদ্ধির অগম্য।
অশরীরী ফ্রয়েড প্রবেশ করিলেন।
অশরীরী ফ্রয়েড। মানুষের সৌন্দর্যবােধের মূলেও প্রজনন-স্পৃহা
বর্তমান।
টিকটিকি। [ সবিস্ময়ে ] তাই নাকি?
যতীন। তা হলে টিকটিকির আমাদের মত সৌন্দর্যবােধ নেই
কেন ?
অশরীরী ফ্রয়েড। ওর প্রজনন-স্পৃহা লুকিয়ে রাখবার দরকার হয়
স্বপ্ন-সম্ভব
। সভ্য মানুষই তা লুকিয়ে রাখে এবং রূপান্তরিত করে প্রকাশ
করে সেটা বহু বাসনায়, বহু ভঙ্গীতে, বহু বৈচিত্র্যে—কখনও জ্ঞাতসারে,
কখনও অজ্ঞাতসারে ।
যতীনের তর্ক করিবার ইচ্ছা হইল, কিন্তু কিছু বলিবার পূর্বেই অশরীরী
ফ্রয়েড অন্তর্হিত হইলেন। লােকটাকে কাঠখােট্টা বলিয়া মনে হইল।
ভ্রমর উড়িয়া টিকটিকির সামনে আসিল এবং তাহার লােলুপ চোখের
সামনে বেশ একটু দূরত্ব রক্ষা করিয়া বৃত্তাকারে ঘুরিতে লাগিল। ভাবটা
যেন—ধর না দেখি, ধর না দেখি! মনে হইতে লাগিল, সে যেন
যতীনের সহিত টিকটিকির কথাবার্তা সব শুনিয়াছে।
ভ্রমর। [ যতীনকে ] ভারি ভীতু লােক তাে তুমি। কি বলে
ওই ঘূণ্য টিকটিকিটাকে আমার জন্যে অনুরােধ করলে !
ওদের কি
আমরা গ্রাহ করি নাকি ?
যতীন। কর না?
ভ্রমর। বাঃ, দেখছ না, আমাদের ডানা আছে যে।
বাহিরে আবার কুড়রুক কুড়রুক শব্দ হইল।
ভ্রমর। আমি চললাম।
বে। করিয়া বাহির হইয়া গেল। যতীনের মনে হইল, টিকটিকির দেহ
হইতে একটা রক্তবর্ণ দন্তর ছায়া ডানা মেলিয়া ভ্রমরের পশ্চাদ্ধাবন
করিল। যতীন দেখিল, কায়াবান টিকটিকি বেশ হাসিমুখে বসিয়া
আছে।
টিকটিকি। ডানার গুমরে কিন্তু একটা কথা ভুলে গেল বেচারী।
ওই ডানা-ওয়ালাদেরই বােজ আমরা খাই।
স্বপ্ন-সম্ভব
যতীন। সেটা ওরা আলাে দেখে তন্ময় হয়ে পড়ে বলে।
তােমাদের কৃতিত্ব তেমন নেই।
টিকটিকি। তােমরা যখন আলো জ্বলতে শেখ নি, তখনও আমরা
পােকা ধরেই খেতাম। অনাহারে থাকি নি কখনও। তবে তােমাদের
আলােতে আমাদের সুবিধে হয়েছে তা অস্বীকার করছি না। আলাে
জ্বাললেই ঝাঁকে ঝাঁকে এসে পড়ে ওরা। আচ্ছা, আলাে জ্বালছ না
কেন আজকাল ?
যতীন। ডাক্তারের মানা। রাত্রে ভাল ঘুম হয় না, তাই তিনি
আলাে জ্বালতে বারণ করেছেন।
টিকটিকি। এ আবার কি বেয়াড়া চিকিৎসা! আলাে না জ্বেলে
ঘুম হচ্ছে ?
যতীন।
।
একটা দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দে যতীন চমকাইয়া উঠিল। ইলেকটিক
টেবিল-ল্যাম্পটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিতেছে। শ্বেতপ্রস্তর-নির্মিতা নগ্ন।
তরুণীটির দিকে যতীন সবিস্ময়ে চাহিয়া রহিল। উথিত বাহুর উপর
ইলেকট্রিক বালবটা দীপ্তিহীন ম্রিয়মাণ। তরুণীটির চোখের দৃষ্টিও
বেদনাময়, কিন্তু অগ্নিগর্ভ।
যতীন। তুমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে ?
প্রস্তর-তরুণী। হুঁ।
যতীন। কেন?
প্রস্তর-তরুণী। বাইরে থেকে মনে হয়, আমি তোমার রাতের
অন্ধকারকে আলােকিত করবার ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু আমার
কোন, ক্ষমতা নেই। আমার উধ্বেখিত বাহুতে,যে প্রদীপ দিয়েছ,
তা তােমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় জ্বলে নেবে। সুইচ তােমাদের হাতে।
আমি সামান্য জড়, [ সহসা উদ্দীপ্ত কণ্ঠে ] জড় করে রেখেছ আমাকে।
স্বপ্ন-সম্ভব ১৭ যতীন। কে বললে, তুমি জড়? আমি জানি, তােমার দেহের প্রতি অণু-পরমাণুতে বহ্নিকণা আবর্তমান, তুমি নিজেকে জড় বলে ভাবছ কেন ? প্রস্তর-তরুণী। তােমার ভাষার ছটায় বহ্নিদীপ্তি আছে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের সম্বন্ধে যখন কথা বল তখন সেটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তাও জানি। তাও জানি। আমাদের মধ্যে যে বহ্নি আছে তা তােমাদেরই প্রদীপ্ত বর্ণনায় শুনেছি, নিজের মধ্যে তা অনুভব করবার সুযােগ দাও নি কখনও। রক্ষা করেছ, বন্দনা করেছ, দলিত করেছ, সত্যিকার স্বাধীনতা দাও নি। টিকটিকি। ঠিক ঠিক ঠিক। চতুর্দিক কেমন যেন ঝাপসা হইয়া আসিল। সেই স্বল্পান্ধকারে অশরীরী সীতা, অহল্যা, দ্রৌপদী ও জোয়ান অব আর্ক প্রবেশ করিলেন। সীতা। আমি আজও পাতালে আছি। অহল্যা। আমারও পাষাণত্ব ঘােচে নি এখনও। গৌতমের দাসী ইন্দ্রের অনুগৃহীতা পৌরাণিক কল্পনাটাই রামচন্দ্রের পদস্পর্শে সঞ্জীবিত হয়েছিল, আমি নয়। দ্রৌপদী। কৌরবের রাজসভায় দুঃশাসন আমার কেশাকর্ষণ করে । উলঙ্গ করবার চেষ্টা করেছিল, দুর্যোধন উরু দেখিয়েছিল, খলখল করে হেসে উঠেছিল কর্ণ, তবু আমি আত্মরক্ষা করতে পারি নি। আমি যে অপমানিতা, তা প্রমাণ করবার জন্যে ধর্মরাজের সঙ্গে তর্ক করতে হয়েছে। প্রতিশেধকামনায় কঁদতে হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের কাছে, শরণাপন্ন হতে হয়েছে অর্জুনের, উত্তেজিত করতে হয়েছে ভীমকে। কুরুক্ষেত্রের সমরানলে যা প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছিল, তা পৌরুষের অহঙ্কত বহ্নি। তখন বুঝি নি কিন্তু এখন জেনেছি, আসলে তা নারীর আত্মসম্মানের ১৮ স্বপ্ন-সম্ভব চিতা। দুঃশাসনের তপ্ত-শােণিতে বেণী বন্ধন করেছিলাম, কিন্তু দুঃশাসনের বক্ষ বিদীর্ণ করেছিলেন ভীম, আমি নয়। আমার অন্তরের জ্বালা প্রদীপ্ত করেছে পুরুষকে, আমি শুধু হাহাকার করেছি। জোয়ান অব আর্ক। তা ছাড়া আমরা আর কিছু পারি না বােধ হয়। আমি যুদ্ধে নেবেছিলাম, কিন্তু ওরা আমায় পুড়িয়ে মেরে ফেললে। এখন মনে হয়, ওদেরই আগুন আছে, আমাদের আছে বােধ হয় শুধু দেহটা। পুরুষ সৈনিকদের মনে আমার জীবন্ত যৌবনের স্পর্শ যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তা আমার আগুন নয়, আমার প্রভাব। আমার শীতল প্রস্তরমূর্তিটা আজও সে প্রভাব বিকীর্ণ করছে ক্ষীণভাবে। আমরা কেউ নই। আমরা পুরুষদের মনে যে ভাব জাগাই, তাই আমাদের পরিচয়। পথ হাতড়াইতে হাতড়াইতে স্খলিত-চরণ গান্ধায়ী প্রবেশ করিলেন। ৪০০ গান্ধারী। অন্ধকার, চতুর্দিক অন্ধকার•••চোখের কাপড়টা সরাতে পারছি না•••মনের সামনেও অন্ধকার যবনিকা দুলছে•• যতীন। কিন্তু আপনারা যে স্বাতন্ত্র কামনা করছেন, তা পেলেই কি সুখী হতেন ? বলুন না, কি চান আপনারা? কোন উত্তর না দিয়া ধীরে ধীরে সকলে চলিয়া গেলেন। এতক্ষণ যে পাখির করুণ কণ্ঠস্বর অস্পষ্টভাবে উক্ত দৃশ্যের পটভূমিকা রচনা করিতেছিল, তাহা স্পষ্টতর হইয়া উঠিল। ফটিক জলফটিক জল— ফটিক জল। মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া তাহা বাতায়ন-পথে প্রবেশ করিল যতীন। ফটিক জল কি জিনিস বল তাে? দেখেছ কখনও? পাখির সুর। সুর। চোখে দেখি নি, স্বপ্নে দেখেছি। যতীন। কি রকম শুনি?
১৯
পাখির সুর।
পাখির সুর। স্বচ্ছ কঠিন পাথরের বুকের ভিতর টলমল করছে
তরল জ্যোতির বিন্দু।
যতীন। তাই চাও তুমি ?
অন্য কিছুতে তৃপ্তি নেই।
টিকটিকি।
ওসব কবিত্ব অনেক শুনেছি দাদা। আমি নিজে
তােমায় পুকুরের জল খেতে দেখেছি। সত্যি কথা হচ্ছে, পিপাসার
সময় যে কোনও জলই ফটিক জল, ক্ষুধার সময় যে কোনও খাদ্যই
সুখাদ্য।
পাখির সুর। সুখাদ্য নয়, খাদ্য। ওই সুই তাে স্বপ্ন সৃজন করে।
তাই তাে মাটি ছেড়ে ডানা মেলে আকাশে উড়েছি।
টিকটিকি। [ সশ্লেষে
ঠিক ঠিক।
হইল, প্রস্তর
প্রস্তর-তরুণীর দীর্ঘনিশ্বাস আবার শােনা গেল। যতীন তাহার দিকে
ফিরিয়া চাহিল এবং নির্নিমেষ হইয়া রহিল। তাহার মনে
ভেদ করিয়া অশরীরী নীলা বাহির হইয়া আসিতেছে। যতীন সবিস্ময়ে
চাহিয়া রহিল। পাখির সুর ধীরে ধীরে বাতায়ন-পথে বাহির
হইয়া গেল।
নীলা। যতীনদা, আমি এসেছি।
যতীন। : নীলা!
নীলা চুপ করিয়া রহিল। তাহার চোখের দৃষ্টিটা শুধু বাত্ময় হইয়া
উঠিল। তাহা যেন, নীরবে বলিল, হঁা, ভাল করে চেয়ে দেখ,
আমি নীলাই।
যতীন। তােমার আজ বিয়ে না ?
নীলা। হ্যা।
স্বপ্ন-সম্ভব । যতীন। তবে,এলে যে এখন? নীলা। ক্ষমা চাইতে এসেছি। যতীন। [সবিস্ময়ে ] কিসের ক্ষমা ! নীলা। এতদিন তােমাকে প্রলুব্ধ করেছি বলে। যতীন অধীর হইয়া কি একটা বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু নীলা তাহাকে থামাইয়া দিল। নীলা। প্রতিবাদ করাে না, তােমার চেয়ে আমি ভাল জানি, আমাকে বলতে দাও। হঁ্যা, প্রলুব্ধই করেছি, ইচ্ছে করে নানা ছলে তােমাকে আমি প্রলুব্ধ করেছি এতদিন। কিন্তু এইবার সব শেষ। হাসি কথা রূপ যৌবনের মায়ালােক সৃষ্টি করে তােমাকে আকুল করে তুলেছিল যে নীলা, তার মরণ ঘনিয়ে এসেছে এবার। মৃত্যুর নিবিড় অন্ধকারে অবলুপ্ত হয়ে যাবার আগে তাই সে ক্ষমা চাইতে এসেছে। তােমাকে ঠকিয়েছিলাম। তােমার মুগ্ধ কল্পনায় যে লােলুপ আশা মূর্ত করে তুলেছিলাম, তা পূর্ণ করবার সামর্থ্য আমার নেই। কোনদিনই ছিল না। রাঙতা-মােড় যে জিনিসটা দেখে তুমি প্রলুব্ধ হয়েছিলে, তা মাটির ঢেলা, সন্দেশ নয়। আমি আলাে নয়, আলেয়া। | হাসিয়া ] অদ্ভুত মনে হচ্ছে, না? মরীচিকা ক্ষমা চাইছে পথ-ভ্রান্ত পথিকের কাছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি মরীচিকাই- এই আমার স্বরূপ—আমি অন্যরকম হতে পারতাম না। ক্ষমা চাইবার অধিকার আমার আছে, কারণ আমি নিজেকে জেনেছি এবং অকপটে স্বীকার করেছি সব। আমি যা করেছি, তা অনিবার্য ছিল আমার পক্ষে। আমায় ক্ষমা কর তুমি। যতীন' ক্ষমা করবার কোনও প্রশ্ন তাে ওঠে না নীলা। আমিও তো তােমাকে ভােলাতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দুজনে মিলে এক অপূর্ব স্বর্গলােক সৃষ্টি করব এই মাটির পৃথিবীতে। কল্পনা স্বপ্ন-সম্ভব ২১ করেছিলাম, আমাদের নন্দন-কাননে যে পারিজাত ফুটবে তার পাপড়িতে থাকবে তােমার রূপ, পরাগে থাকবে আমার সৌরভ- যে সঙ্গীত মূর্ত হয়ে উঠবে আমি হব তার কথা, তুমি হবে তার সুর। তুমি যদি আসতে, এ স্বর্গ সম্ভব করে তুলতে পারতাম। তুমিই তাে এলে । তুমি যদি আসতে, সকলের অমতেও আমি বিয়ে করতাম তােমায়। আসি নি তার কারণ নিজেকে আমি চিনি। আমাকে বিয়ে করলে তােমার বাবা তােমায় ত্যাজ্যপুত্র করতেন। আমি জানি, আমাকে নিয়ে দারিদ্র্য বরণ করতেও আপত্তি ছিল না তােমার, কিন্তু নিজের নিঃস্বতায় ভয় পেয়ে গেলাম। আমার কি আছে যে তােমাকে দেব, তােমার স্বর্গসৃষ্টির কণামাত্র উপকরণও যে আমার মধ্যে নেই। যৌবনের জোয়ার যখন নেবে যাবে তখন শিথিল-পেশী এই দেহপিণ্ডটার মধ্যে কাদা আর আবর্জনা ছাড়া যে আর কিছুই থাকবে না। দারিদ্র্যের মধ্যে সেই ক্লিন্ন গ্লানি নিয়ে তুমি যে স্বর্গসৃষ্টি করতে পারবে না তা আমি জানতাম, তাই আসি নি। যতীন। কিন্তু প্রবালের কাছে তাে গেছ, সেও তাে দরিদ্র ? নীলা। প্রবাল স্বর্গসৃষ্টি করতে চায় না, আমাকে চায়---মানে, আমার এই দেহটার বেশি আর কিছু কাম্য নেই তার। আমিও আমার দেহটার বেশি আর কিছু নই। সে যা চেয়েছে তাই পাবে, ঠকবে না। যতীন। কিন্তু নীলা সত্যিই কি তুমি দেহটা ছাড়া আর কিছু নও? তুমি যা এতক্ষণ বললে, তা কি একটা মাংসপিণ্ডের উক্তি ? নীলার ঠোট দুইটা সহসা কঁপিয়া উঠিল। যতীনের ভয় হইল, চোখের কোণে এইবার জল দেখা দিবে বুঝি। কিন্তু জলের বদলে আগুন দেখা দিল। নীলা। মাংসপিণ্ডের একটা বক্তব্য থাকতে পারে' বইকি। তােমার মুখেই একদিন শুনেছিলাম যে, জড়ের মধ্যেও বিদ্যুৎ আছে, ২২ স্বপ্ন-সব তারও প্রতি পরমাণুতে সৌরজগতের বৎসব বর্তমান। মাংসপিণ্ডও বিদ্যুৎ-পিণ্ড, তার বক্তব্যও চমকপ্রদ হওয়া অসম্ভব নয়। আমি কিন্তু চমকপ্রদ কিছু করতে আসি নি, ক্ষমা চাইতে এসেছি। তুমি ক্ষমা করেছ, এইটুকু জানতে পারলেই চলে যাব। যতীন। ক্ষমা করার প্রশ্ন উঠছে কি করে, তাই আমি বুঝতে পারছি না। তােমাকে আমি চেয়েছিলাম, পাই নি। তুমি যাকে বেছে নিয়েছ, সে যে কিসে তােমার যােগ্য, তাও আমার বুদ্ধির অগম্য। আমি একটা প্রহেলিকার মধ্যে দিশাহারা হয়ে আছি, ক্ষমা করার কোনও সঙ্গতি তত আবিষ্কার করতে পারছি না। তুমি সহজ ভাষায় আমাকে বল, কেন তুমি আমাকে চাও নি, কেন তুমি সকলের দ্বারে দ্বারে রূপ-যৌবনের পণ্যপসরা নিয়ে ঘুরে বেড়ালে, কেনই বা অবশেষে আত্মসমর্পণ করলে প্রবালের কাছে ? টিকটিকি। [ জনান্তিকে, ফিসফিস করিয়া ] এস এস, এইবার এস। ভেঙে দাও হাঁড়িটা হাটের মাঝখানে। বিরাট একটা মুণ্ড বাতায়ন-পথে প্রবেশ করিল। আকৰ্ণবিস্তৃত মুখ, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড তীক্ষ্ণ দত, লালায়িত রসনা, দুই কশ বাহিয়া লালা ঝরিতেছে, চক্ষুর দৃষ্টি লােলুপ। নীলা তাহাকে দেখিয়া ভয়ে বিবর্ণ হইয়া গেল। যতীন। [ চমকাইয়া ] কে তুমি? আগন্তুক মুণ্ড। আমি লােভ, [ নীলাকে দেখাইয়া ] ওর লােভ। আমিই ওকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছি। হি-হি-হি-হি...শাড়ি গাড়ি গয়না•••হি-হি-হি•••বড় চাকরি, ব্যাঙ্কে মােটা টাকা•••রুই কাতলা গাঁথবার চেষ্টায় ছিল•••হি-হি•••পারলে না, টোপ গিললে না কেউ... তুমি গিয়েছিলে, কিন্তু তােমার বাবা ত্যাজ্যপুত্র করবেন ধলাতে ভেস্তে গেল সব•• বঁড়শি খুলে নিয়ে অন্য ঘাটে ছিপ ফেলতে হ’ল আবার••• হি-হি-হি•••
স্বপ্ন-সম্ভব
২৩
যতীন। প্রবাল তাে রুইও নয়, কাতলাও নয়।
লােভ। মাছই নয়—কাদা। সেখানে গিয়েছিলেন নাচতে—হি-
হি•••পিছলে গেলেন, এটেল মাটির চটচটে কাদা মাখামাখি হয়ে
গেল সর্বাঙ্গে, লুকোবার আর উপায় রইল না, ধরা পড়ে গেল।
আহা! বড় সাধ ছিল—শাড়ি গাড়ি গয়না—তিন সেট গয়না-ব্যাঙ্কে
মােটা টাকা—প্রকাণ্ড তিনতলা বাড়ি-গেটে দারােয়ান থাকবে•••
হি-হি-
লালায়িত রসনা বাহির করিয়া উপরের ও নীচের ঠোট বীভৎসভাবে
চাটিতে লাগিল। মুখে অদ্ভুত হাসি। যতীন নির্বাক হইয়া চাহিয়া
রহিল। লােভ ধীরে ধীরে বাতায়ন-পথে বাহির হইয়া গেল। যতীন
নীলার দিকে ফিরিয়া দেখিল, তাহার চোখে মুখে আগুন জ্বলিতেছে।
নীলা।
শুনলে তাে, তােমার উপর আস্থা স্থাপন করতে পারি
নি বলে তােমাকে ত্যাগ করেছিলাম।
যতীন। বুঝতে পারলাম না।
নীলা। জীবনে আমার যা কাম্য, তা পূর্ণ হবার সম্ভাবনা ছিল
তােমার বাবার টাকায়। পিতৃধনবঞ্চিত তােমার উপর আমার কোন
ভরসা ছিল না।
যতীন। কেন, তুমি কি মনে কর, আমি কিছু রােজগার করতে
পারব না ?
নীলা। পারতে, যদি উনবিংশ শতাব্দীতে জন্মাতে। তখন
তােমার এম. এ. ডিগ্রীর বাজার-দর ছিল, এখন কিছুই নেই। ক্ষুদিরাম
যেদিন মজঃফরপুরে বােমা ফৈললে, সেইদিন থেকেই শিক্ষিত বাঙালী
হিন্দুর কপালে ফাটল ধরল—এ কথা তাে তােমার মুখেই শুনেছি।
সুতরাং তােমার উপর নির্ভর করব কোন আশায় ?
যতীন। চাকরি পাব না তা ঠিক, করবারও ইচ্ছে নেই, কিন্তু
২৪ স্বপ্ন-সম্ভব ? এমন অনেক স্বাধীন ব্যবসা আছে, যা ঠিকমত করতে পারলে অনেক উপার্জন করা যায়। নীলা। সেটা অনিশ্চিত। অত সবুর আমার সইত না। যতীন। শাড়ি-গয়নাটাই তােমার কাছে বড় হ’ল নীল? ভালবাসাটা তােমার কাছে কিছু নয় ? নীলা। [ সবিস্ময়ে] কে বললে, আমি তােমায় ভালবেসেছিলাম ? আমি তাে তােমায় ভালবাসি নি, আমি তােমায় ভুলিয়েছিলাম। যতীন। কিন্তু বেশ মনে পড়ছে, তুমি নিজের মুখে একদিন বলেছিলে যে, আমায় ভালবাস। নীলা। তখনই তােমার সন্দেহ করা উচিত ছিল। ভালবাসার কথা মুখ ফুটে বলে না কেউ কখনও। যতীন। কিন্তু আমি যে তােমায় ভালবেসেছিলাম, সেটা তাে তােমার অজ্ঞাত ছিল না, তার কি কোনও মূল্য নেই? মূল্য আছে, কিন্তু নিছক ভালবাসাকে মূল্য দিতে হলে অন্তত ডজন খানেক ভালবাসাকে মূল্য দিতে হয়। ঘেয়াে কুকুরের পিছু পিছু একপাল মাছি যেমন ভনভন করে ওড়ে, রূপসী যুবতীর পিছু পিছু উড়ে বেড়ায় তেমনই একপাল ভালবাসা। তার মধ্যে কোটা স্বর্গীয় কোটা পার্থিব তা বিচার করবার প্রবৃত্তিও থাকে না, সামর্থ্যও থাকে না। আর্থিক মাপকাঠি দিয়েই মাপতে হয় তাদের। টিকটিকি। ঠিক ঠিক। ঘেয়ে কুকুরের উপমাটা কিন্তু ঠিক হ’ল । বলা উচিত ছিল, কার্তিক মাসে কুকুরী যেমন বলিষ্ঠতম প্রণয়ীর কাছেই আত্মসমর্পণ করে, আমিও তেমনই মালা দিতে চেয়েছিলাম শ্রেষ্ঠ ধনীর গলায়, কারণ বর্তমান যুগে অর্থই শক্তি। ভাল করে গুছিয়ে বল। যতীন। [ নীলাকে] ছি ছি, তােমারও ওই মত নাকি ? নীল। [ নির্বিকারভাবে ] সন্দেহ করছ কেন? যতীন। • ভালবাসার কথা না হয় ছেড়ে দিলাম, কিন্তু ঐশ্বর্যই নীলা ।
একমাত্র কাম্য তােমার জীবনে ? উচ্চতর আর কোনও আকাক্ষা
নেই।
নীলা।
নীলা। আছে কি না জানি না। ক্ষিধেয় পেট জ্বলছে, তৃষ্ণায়
ছাতি ফেটে যাচ্ছে, মনের ভিতর কোন উচ্চতর আকাক্ষা আছে কি
না তা অনুসন্ধান করবার অবসর পাই নি এখনও।
যতীন। কিন্তু ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে ঐশ্বর্যই চাই? সাধারণ
খাদ্য-পানীয়ে তা মিটবে না ?
। আমি যে অসাধারণ। তুমিই তাে একদিন
বলেছিলে, আমি কোহিনুর। যেখানে সেখানে কি কোহিনুর মানায় ?
তার স্থান স্বর্ণমুকুটের মাঝখানে, পচা আঁস্তাকুড়ে নয়।
যতীন। আঁস্তাকুড়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে এসেছ কেন
তবে ?
নীলা।
আমরা যে মায়ের জাত, আঘাত পেয়ে কেউ যখন উহুহু’
করে ওঠে, তখন আমরা থাকতে পারি না, ছুটে যাই। এ ক্ষেত্রে
আরও বিশেষ করে এসেছি, কারণ আঘাতের হেতু আমিই। তাই
ক্ষমা চাইছি। তােমার গলায় মালা দিতে পারি নি বলে তােমার
ব্যথাতেও হাত বুলিয়ে দিতে পারব না? সে অধিকার যে সব মেয়েরই
জন্মগত অধিকার।
যতীন। [ হাসিয়া ] আঁস্তাকুড়ে এসে কেন অপবিত্র করছ
নিজেকে। আমার কোনও আঘাত লাগে নি, যাও তুমি।
• নীলা। সত্যি লাগে নি ? [ হাসিয়া ] তােমাদের শিশুত্ব
কোনকালে ঘােচে না, আশ্চর্য ! একটা অদ্ভুতরকম অবাস্তব লােকে
বাস কর তােমরা। কাব্যের ক্লিওপেট্টাকে নিয়ে তােমরা উন্মত্ত, কিন্তু
বাস্তবজীবনে তার সামান্য ছোঁয়াচটুকু পর্যন্ত সইতে পার না।
যতীন। পারি কি না, তা জানবার সুযােগ তত তােমার’হ’ল
। সাহস করে যদি আসতে, আসল পরিচয় পেতে পারতে
হয়তাে।
y
২৬ স্বপ্ন-সম্ভব নীলা। বরাবর অমনই ভদ্র পােশাকী ভাষায় আহ্বান করেছ বলেই আরও যেতে পারি নি। ভয় হয়েছে, বাইরের ওই রঙিন লেফাফাটার ভিতরে হয়তাে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। সহসা সমস্ত অবলুপ্ত হইয়া গেল। অপূর্ব দিব্য আলােকে চতুর্দিক উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। বাতায়ন-পথে যতীন দেখিতে পাইল, অদূরে মহাগিরি রৈবতক। দেবার্চনা সমাপন করিয়া বসুদেব-দুহিতা সুভদ্রা গিরি প্রদক্ষিণ করিতেছেন। অকস্মাৎ তিনি সচকিত হইয়া, ঘাড় ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন•••দূরাগত অশ্বক্ষুরধ্বনি পার্বত্য শান্তি বিঘ্নিত করিতেছে•••এক অশ্ববাহিত রথ প্রচণ্ড বেগে রৈবতক অভিমুখে আসিতেছে••দেখিতে দেখিতে আসিয়া পড়িল•••সুবর্ণ-কিঙ্কিণী- জালালঙ্কৃত প্রজ্বলিত হুতাশনকল্প দিব্যরথ•••রথে বসিয়া আছেন মহাবীর অর্জুনক্ষত্রবীর্যের মূর্ত প্রতীক•••চোখের দৃষ্টি নির্ভয় একাগ্র••• পরিধানে কবচ, বর্ম, অঙ্গুলিত্ৰাণ। আশায় আশঙ্কায় আনন্দে উত্তেজনায় সুভদ্রা শিহরিয়া উঠিলেন; কিন্তু চীৎকার করিলেন না, পলায়নও করিলেন না•••মুহূর্তমধ্যে রথ নিকটবর্তী হইল•••অর্জুন রথ হইতে নামিয়া সুভদ্রাকে রথে তুলিয়া বায়ুবেগে অদৃশ্য হইয়া গেলেন•••অশ্ব- ক্ষুরােখিত ধূলিজালের দিকে যতীন সবিস্ময়ে চাহিয়া রহিল•• তাহার পর একটা কোলাহল শােনা গেল•••ভােজ, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় বীরগণ আস্ফালন করিতেছেন••• তাহাও ক্রমশ থামিয়া গেল••দিব্য আলােক অন্তর্হিত হইল•••। যতীন দেখিল, নীলা তাহার দিকে চাহিয়া আছে, ; নীলা। [ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) যদি আমাকে সবলে অধিকার করে অভিমজননীর মর্যাদা দিতে পারতে, তা হলে এ দুর্দশা হত না আমার। বীরভােগ্যা আমরা, তােমাদের অক্ষমতায় আজ বর্বরভােগ্যা হয়েছি। আমার উপর রাগ করাে না যতীনদা, আমার ব্যথাটা বােঝবার চেষ্টা কর। চললাম।•••
স্বপ্ন-সব
২৭
অশরীরী নীলা অন্তর্হিত হইল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যে ব্যক্তিটি প্রবেশ
করিলেন, তাহার মূর্তি ভয়ঙ্কর। আকৃতি দীর্ঘ, বর্ণ কৃষ্ণ, সমস্ত মুখমণ্ডল
কৃষ্ণ কুঞ্চিত রােমে সমাচ্ছন্ন। চক্ষু দুইটি অতিশয় প্রদীপ্ত। মনে
হইতেছে, দুইটি হীরকখণ্ড যেন কালাে মখমলের আবেষ্টনীতে
জ্বলিতেছে। আগন্তুকই প্রথমে কথা কহিলেন।
আগন্তুক। আমি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। পাছে ভুল বােঝ, তাই আমাকে
আসতে হ’ল। অজুন যা করেছিল, তা সেকালে নিন্দনীয় ছিল না।
শশালার টোপর পরে বিয়ে করা এখন যেমন তােমাদের বর-ধর্ম, নারী
হরণ করে বিয়ে করাটা তেমনই সেকালের বীর-ধর্ম ছিল। সুভদ্রা-হরণে
প্রলুব্ধ হবার আগে অজুন হতে হবে, এই কথাটা মনে করিয়ে দিতেই
আমি এসেছিলাম।
অকস্মাৎ অদৃশ্য হইয়া গেলেন।
টিকটিকি। [ হাসিয়া ] লােকটা ভারি বেরসিক তাে, সব ভেস্তে
দিয়ে গেল !
যতীন। তুমি কি ভেবেছিলে, আমি নারীহরণ করতে চাই!
টিকটিকি। লুণ্ঠনের সপক্ষে একটা যুক্তি পেয়ে মনে মনে একটু
খুশি হয়ে উঠেছিলে বইকি। তােমাদের ওই যে এক মহদ্দোষ, পেটে
ক্ষিধে মুখে লাজ।
যতীন। ওটা দোষ নয়, গুণ। মনুষ্যত্বের লক্ষণ। নিছক পশুর
মৌখিক লজ্জা থাকে না।
টিকটিকি। থাকবার দরকার কি, তাও তত বুঝি না।
অশরীরী ডারবিন আবির্ভূত হইলেন।
২৮ স্বপ্ন-সম্ভব ডারবিন। মনুষ্যনামধেয় পশুর জীবনযুদ্ধে ওইগুলােই দামী উপকরণ। লজ্জা, ক্ষমা, অহিংসা অর্থহীন মানস-বিলাস নয়, নিপুণ যােদ্ধার উৎকৃষ্ট অস্ত্র ওগুলাে। নখদন্তেরই বিবর্তিত রূপ। সে আত্ম- এ বিষয়ে যতীনের মন বহু দিন হইতেই প্রশ্নাকুল ছিল। সম্বরণ করিতে পারিল না। যতীন। আমার একটা কথার জবাব দেবেন? ডারবিন। কি বল ? টিকটিক। [ অর্ধস্বগত ] ক্রমাগত দেড়ে লােকের আমদানি হতে লাগল। স’রে পড়া যাক। টিকটিকি ধীরে ধীরে ব্র্যাকেটের অন্তরালে আত্মগােপন করিল। তবে যতীন। লজ্জা, ক্ষমা, অহিংসা এই সব বিবতিত অস্ত্র নিয়ে কি মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবন-যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে? ডারবিন। [ হাসিয়া ] তা ঠিক জানি না। মানে, জীবনটা যে কতদুর বিস্তৃত, দেহের সীমা ছাড়িয়েও তার অস্তিত্ব আছে কি না, থাকলেও কতদূর আছে, তা এখনও ঠিক করতে পারি নি আমি। এইটুকু শুধু বলতে পারি, সব মানুষ একজাতের নয়, সব অস্ত্রও সকলের মনুষ্যত্বেরও নানা স্তর আছে, প্রত্যেক স্তরের আকাক্ষা- আদর্শও ভিম, অস্ত্র-শস্ত্রও ভিন্ন হতে বাধ্য। তা ছাড়া অস্ত্র পেলেই ততা ব্যবহার করা যায় না। তার জন্যে শিক্ষা চাই, সাধনা চাই, স্বাভাবিক প্রবণতাও চাই। বােলতা তার হুলকে কাজে লাগায়, তুমি সে হুল হাতে পেলেও তেমন ভাবে ব্যবহার করতে পার না, তােমার বন্দুক বােলর কাছে অর্থহীন। মানুষদের মধ্যেও ঠিক তেমনই। অহিংসা একজনের কাছে শক্তি, আর একজনের কাছে অক্ষমতা। জন্য নয়।
স্বপ্ন-সম্ভব
২৯
বাতায়ন-পথে একটা দমকা হাওয়া ঢুকিল। ডারবিন চলিয়া গেলেন।
খবরের কাগজটা টেবিল হইতে উড়িয়া গেল। ফুলের গন্ধে সমস্ত ঘর
ভরিয়া উঠিল। যতীন খবরের কাগজটা তুলিয়া দেখিল, বলিষ্ঠ ঝাঁকড়া
চুল-ওয়ালা একটি দৈত্য ফুটফুটে সুন্দরী একটি মেয়েকে কাঁধে করিয়া
দাড়াইয়া আছে। মেয়েটিকে কঁাধ হইতে নামাইয়া দৈত্যটা মাথা
নাড়িয়া এক ঝটকায় ঝাঁকড়া চুলগুলাে চোখমুখ হইতে সরাইয়া ফেলিল।
তাহার চক্ষু দুইটি হাস্যদীপ্ত, তাহা হইতে শিশুসুলভ সরলতা যেন
উপচাইয়া পড়িতেছে। আকৃতিতে দৈত্য হইলেও, প্রকৃতিতে সে যেন
ওই ছােট মেয়েটিরই সঙ্গী।
দৈত্য। যাঃ চ'লে—এ কোথায় এসে পড়লে? বললাম, চল
মাঠের মাঝখান দিয়ে হু-হু করে ছুটে গঙ্গার চর পেরিয়ে, ধানের ক্ষেতে
ঢেউ তুলে, পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে, সাত সমুদ্র তেরাে নদীর ওধারে গিয়ে
খবর নিয়ে আসি। ঘরের কোণে ঢুকলি কেন?
মেয়েটি। দাড়াও না, খুজে নিই এখানটা। শুনলে তাে, এই
ঘরেই ঢুকেছিল।
নে তা হলে চটপট। উফ-দমবন্ধ হয়ে আসছে এখানে।
দৈত্য।
হাত দিয়া নিজেকে বাতাস করিতে লাগিল।
মেয়েটি। [ যতীনকে ] ভােমরা এসেছিল এখানে ?
যতীন। এসেছিল একটু আগে। এখন তাে নেই।
মেয়েটি। কোথা গেল বলতে পার?
যতীন। ওই জানলা দিয়ে তাে বেরিয়ে গেল। ভােমরাকে খুঁজছ
কেন ?
মেয়েটি। ফুল ডেকেছে তাকে। অনেকক্ষণ থেকে খুজছি।
জামগাছের কোটরে তার বাসা, সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি, বেরিয়ে
স্বপ্ন-সম্ভব গেছে। মাঠের মাঝে বাবলা-বুড়ী দাড়িয়ে ছিল, সে বললে, এই দিকে উড়ে এসেছে। তারপর দেখা হ’ল গঙ্গাফড়িঙের সঙ্গে, তােমার বাগানে রঙ্গনগাছের উপর বসে আছে, সে বললে, ঢুকেছে তােমার ঘরে। তুমি বলছ, জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। [ সন্দিগ্ধভাবে ] কোথাও লুকিয়ে রাখ নি তাে? । যতীন। মেয়েটি সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে যতীনের দিকে চাহিয়া রহিল। মেয়েটির দিকে চকিতে একবার চাহিয়া দৈত্যটাও ঘাড় ফিরাইয়া ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে যতীনের দিকে চাহিল। দৈত্য। [ মেয়েটিকে ] চেয়ার টেবিল খাট বিছানা উলটে দিই দেখবি খুজে ? জিজ্ঞেস করে সময় নষ্ট করবার দরকার কি? দেব? মেয়েটি। [ ধমক দিয়া ] না। ভদ্রলােকের বাড়িতে গুণ্ডামি তা ছাড়া ওলটপালট করে দিলেই কি খোজা হয় ? করতে হবে না। দৈত্য সঙ্গে সঙ্গে ভালমানুষের মত মুখ ফিরাইয়া হাত দিয়া নিজেকে আবার বাতাস করিতে লাগিল। মেয়েটি। [ যতীনকে ] কিছু মনে করাে না তুমি, ওর স্বভাবই ওই রকম দুরন্তপনা করা, যতীন। ও কে ? মেয়েটি। ও? ও আমার বাহন। [ হাসিয়া ] ওর অনেক নাম। যতীন সবিস্ময়ে দৈত্যটার দিকে চাহিয়া রহিল। মুখে কিছু বলিতে না পারিলেও তাহার মনের কথা চোখের দৃষ্টিতে মূর্ত হইয়া উঠিয়াছিল। দৈত্যও তাহার দিকে চাহিয়া ছিল। দৈত্যের মনের ভাবও তাহার
স্বপ্ন-সব
চোখের দৃষ্টিতে মূর্তি পরিগ্রহ করিল। টিকটিকি সন্তর্পণে ব্র্যাকেটের
তলা হইতে বাহির হইয়া আসিল।
যতীনের মনের ভাব। কি আশ্চর্য, তােমার মত একটা লােক
এমন সুন্দরী মেয়ের বাহন !
দৈত্যের মনের ভাব। ওকে বহন করবার একমাত্র অধিকার
আমারই আছে।
যতীনের মনের ভাব। কেন ?
দৈত্যের মনের ভাব। কারণ আমার শক্তি আছে। শক্তিমানই
সৌন্দর্যকে বহন করবার অধিকারী। আমি ওকে বহন করি, রক্ষা
করি, প্রচার করি। আমি পবন, ও সুরভি।
টিকটিকি। ঠিক ঠিক ঠিক। পবনদেব, আমার প্রতি একটু দয়া
করবে ? ক্ষিধেয় মরে যাচ্ছি, দাও না কিছু খাবার যােগাড় করে
তুমি ইচ্ছে করলেই পার।
টিকটিকির উক্তিটা ভিখারীর আবেদনের মত শুনাইল। ধনী যেমন
দরিদ্রকে পয়সা ছুড়িয়া দেয়, পবন ঠিক তেমনই ঔদাসীন্যভরে বাহির
হইতে একটা ছােট কীট উড়াইয়া আনিয়া টিকটিকির মুখে ফেলিয়া
দিল। টিকটিকি লুব্ধ আগ্রহে সেটা চিবাইয়া খাইতে লাগিল।
সুরভি। এখানে যখন ভােমরা নেই, তখন চল আমরা যাই।
খুঁজে বার করতেই হবে তাকে তাড়াতাড়ি বেলা তত শেষ হয়ে
এল, ফুল বেচারী কতক্ষণ আর অপেক্ষা করবে, সন্ধ্যে পর্যন্ত তাে তার
মেয়াদ।
পবন।
চল।
১
উভয়ে চলিয়া গেল। যতীনের মনও তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়া গেল
অতীতলােকে।••• জতুগৃহে আগুন লাগিয়াছে। সুড়ঙ্গপথে জননীসহ
স্বপ্ন-সম্ভব
পঞ্চপাণ্ডব চলিয়াছেন। সুড়ঙ্গপথ অন্ধকার উপলাকীর্ণ। ভীম
ব্যতীত আর কেহই সে বন্ধুর পথে চলিতে পারিতেছেন না, মুহুর্মুহু
আর সকলেরই পদস্খলন হইতেছে। রাত্রি-জাগরণে সকলেই অবসন্ন।
কিন্তু দুর্যোধনের চরের চতুর্দিকে ঘুরিতেছে, বিলম্বে সর্বনাশ ঘটিবে।
মহাবলপরক্রান্ত ভীম তখন মাতাকে স্কন্ধদেশে এবং নকুল-সহদেবকে
ক্রোড়ে তুলিয়া লইলেন, তাহার পর যুধিষ্ঠির ও অজুনের হস্তদ্বয়
ধরিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।••• যতীন মুগ্ধ-বিস্ময়ে চাহিয়া
দেখিতে লাগিল। ইনিই পবননন্দন ভীম, যে পবন সুরভিকে বহন
করিবার অধিকারী:••যে সুরভি••• হঠাৎ ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজিয়া
উঠিল। যতীনের মন মুহূর্তে বর্তমানের পটভূমিকায় ফিরিয়া আসিল।
অ্যালাম।
চল চল চল চল চল চল•••
যতীন উঠিয়া অ্যালার্মটা বন্ধ করিয়া দিয়া ঘড়িকে প্রশ্ন করিল।
যতীন।
যতীন। কি বলছ, কোথায় যাব?
ঘড়ি।
কোথা যাবে, তা তুমিই জান। আমাকে মনে করিয়ে
দিতে বলেছিলে, মনে করিয়ে দিলাম।
আমার তাে কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না, লিখতে
বসার কথা ছিল।
ঘড়ি। কোন কিছু করা মানেই—চলা।
তােমার এ ভাষা তাে শুনি নি কোনদিন এর আগে!
ঘড়ি। নতুন কান পেয়েছ আজ। শুধু কান নয়, চোখও।
যতীন।
9)
ধীরে ধীরে ঘড়িটা একটা মানুষের মুখের মত হইয়া গেল। অদ্ভুত সে
মুখ ! সীমাবদ্ধ, কিন্তু অসীম সম্ভাবনাপূর্ণ। ললাটে যেন অনন্ত
মহাকাশের ইঙ্গিত, দৃষ্টিতে অসংখ্য সূর্যের আভাস, ওষ্ঠাধরে অভাবনীয়
ভাবের আকতি, রসনাতে অগণিত বাণীর আগ্রহ। তাঁহার সুদূরপ্রসারী
স্বপ্ন-সম্ভব দৃষ্টি যতীনের মুখের উপর নিবদ্ধ হইতেই যতীন বুঝিতে পারি, দেবতার আবির্ভাব ঘটিয়াছে। যতীন। [ সসম্ভমে ] কে আপনি? দেবতা। আমি মহাকাল। অভিনব শ্রবণশক্তি পেয়েছ, একটা কথা শােন। আদর্শকে স্বপ্নে নিবদ্ধ না রেখে বাস্তবে মূর্ত কর। স্বপ্নলােকে স্বার্থপরের মত তুমি একা বিচরণ করছ, তার দ্বার খুলে দাও। সকলে সেখানে প্রবেশ করুক, তােমার আদর্শ সকলের আদর্শ হােক, চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান ঘুচে যাক। তবেই তােমার বিদ্রোহ সার্থক। যতীন। আমি কি বিদ্রোহী ? জানতাম না তাে। দেবতা। নিশ্চয়ই, বিদ্রোহী বইকি। বিদ্রোহী নানা জাতের বস্তুত প্রত্যেক মানুষই বিদ্রোহী, প্রত্যেক মানুষই নিজের পারিপার্শ্বিককে ছাড়িয়ে মাথা তুলতে চেষ্টা করছে। ওই দেখ••• হয়। যতীন প্রথমটা কিছুই দেখিতে পাইল না। চোখের সম্মুখে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নাই। সুচীভেদ্য অন্ধকার। একটু পরে মনে হইল, খানিকটা অন্ধকার যেন নড়িতেছে। সবল একটা অন্ধকার-পিণ্ড যেন গুড়ি মারিয়া অগ্রসর হইতেছে। সে সবিস্ময়ে চাহিয়া রহিল, কিছুই বুঝিতে পারিল না। একটু পরে কিন্তু বুঝিতে পারিল এবং বুঝিতে পারিয়া আরও বিস্মিত হইল। যাহাকে ইনি বিদ্রোহী বলিয়া দেখাইয়া দিলেন, সে একটা চোর। অন্ধকারে গুড়ি মারিয়া বসিয়া সিধ কাটিতেছে। অন্ধকার একটু স্বচ্ছ হইল। যতীন শিহরিয়া উঠিল... অসংখ্য বিদ্রোহী কিলবিল করিতেছে•••। কেহ কাহারও বুকে ছুরি বসাইয়াছে, কেহ নারী-ধর্ষণ করিতেছে, কেহ লুণ্ঠনরত। একটি মেয়ে হাসিমুখে স্বামীর খাদ্যে বিষ মিশাইতেছে••• ০ ৩৪ ধাতব যতীন। এরা বিদ্রোহী ? দেবতা। হ্যা, এরা বিদ্রোহী। সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থায় এর কেউ সুখী নয়, প্রচলিত আইন অমান্য করে তাই এরা প্রত্যেকে সুখের সন্ধান করছে আপন আপন রুচি অনুসারে। আর এরাও- অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া একটা সন্ধানী আলাের রেখা আকাশ পর্যন্ত প্রসারিত হইয়া গেল। যতীন দেখিল, সেই আলােকরেখা ধরিয়া বিরাট মিছিল চলিয়াছে। কয়েকজনকে সে চিনিতে পারিল। যীশুখ্রীষ্ট, বুদ্ধ, লেনিন, মহাত্মাজী, সুভাষ বসু, অ্যাব্রাহাম লিংকন•••আরও অনেকে••• দেবতা। সমসাময়িক সমাজ-ব্যবস্থায় এরাও কেউ সন্তুষ্ট নন। এরাও সব উলটে দিতে চান, উলটে দিয়ে আনন্দ পেতে চান। কিন্তু একা একা আনন্দ ভােগ করে তৃপ্তি হয় না এদেয়। এরা প্রত্যেকেই নিজের আদর্শ অনুযায়ী সমগ্র সমাজটাকে ভেঙে গড়তে চান, সকলেই যাতে সুখী হয়। তাই করবার জন্যে সারাজীবন কৃচ্ছসাধন করে চলেছেন। এই দেখ, তার এক জাতের বিদ্রোহী:.. • sh সন্ধানী আলাের রেখা মিলাইয়া গেল। যতীন দেখিল, দিব্য আলােকে এক অপূর্ব দৃশ্য মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে। নির্মল আকাশে যেন নীলকান্ত মণির দ্যুতি••• দিগন্তপ্রসারী প্রান্তর যেন সবুজের স্বপ্ন দেখিতেছে••• দূরে পাহাড়ের শ্ৰেীঅদ্ভুত রহস্যময়•••আঁকিয়া বাঁকিয়া একটা নদী বহিয়া চলিয়াছে কোন্ সাগরের উদ্দেশ্যে কে জানে•••নদীর তীরে ঘােট ছোট পল্লী, শান্তির ছােট ছােট নীড় যেন•••পাখি ডাকিতেছে—পিউ কঁহা পিউ কাহাফটিক জলফটিক জল•••বহু কবি বৈজ্ঞানিক ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন•••যতীন কয়েকজনকৈ চিনিল•••প্লেটো, টস্টয়, রুসসা, ভলটেয়ার, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ড্যালটন, ফ্যারাডে••••• স্বপ্ন-সম্ভব ৩৫ দেবতা। এরাও প্রচলিত বিধি-ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব না করতে পেরে নির্জন মানসলােকে সংহরণ করেছেন নিজেদের। কিন্তু এরা পলাতক নন। এরা তপস্বী। এরাই যুগান্তরকারী অবতার। তপস্যাবলে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেন যুগান্তরকারী যন্ত্র, কবি আবিষ্কার করেন যুগান্তরকারী মন্ত্র। যতীন চুপ করিয়া রহিল। দৃশ্যপট ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল। দেবতা। সব তাে দেখলে, এইবার মিলিয়ে দেখ নিজের সঙ্গে। ঝড়াে হাওয়া, অনুর্বর জমি, আলাের অভাব সত্ত্বেও যে স্বপ্নের কুঁড়িটি ধরেছে তােমার মনে, তাকে বাঁচিয়ে রাখ। বাস্তবের পুষ্পে তা মূর্ত হােক—রূপ নিক। অদৃশ্য হইয়া গেলেন। টাইপিসের পুরাতন ডায়ালটা আবার স্পষ্ট হইয়া উঠিল। কিন্তু তাহার টিকটিক শব্দে যতীন শুনিতে লাগিল রূপ নিক, রূপ নিক। দ্রুতপদে সশরীরে রুমি আসিয়া প্রবেশ করিল। বাইশ বছরের তরুণী। রূপসী। শুধু দেহের রূপ নয়, মনের রূপও তাহার চোখে মুখে ঝলমল করিতেছে। রুমি। আমি বিদেয় করে দিয়ে এলাম লােকটাকে ছােটা। তুমি কি করছ একা একা এই তেতলার ঘরে বসে? যতীন। কোন্ লােকটাকে ? রুমি। যিনি আমাকে দেখতে এসেছিলেন। [ হাসিয়া ] কোন অভদ্ৰতা করি নি, কেবল বললাম, যতদূর মনে হচ্ছে, আপনি রাধুনী কিংবা চাকরাণী খুঁজতে বেরিয়েছেন। আমাদের বাড়িতে সে রকুম তাে কেউ নেই আপাতত। যতীন। [ সবিস্ময়ে ] এই কথা বললি তুই! কি বললে তারা?
স্বপ্নসাব
রুমি। কি আবার বলবে, মুখ কালাে করে ব’সে সন্দেশ গিলতে
লাগল, আমি উঠে চলে এলাম।
যতীন। সেজদা ছিল না?
রুমি। হ্যা, বড়দা, মেজদা, সেজদা সবাই ছিল।
যতীন। সেজদা কিছু বলে নি ?
রুমি। বড়দা আর মেজদার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে নি,
কিন্তু চোখের দৃষ্টি থেকে যা ফুটে বেরুচ্ছিল, তা মনুর পঞ্চম অধ্যায়।
মেজদা কিন্তু বেশ মজার কথা বলেছে একটি, যদিও বড়দার কাছ থেকে
ধমক খেলে বেচারী সে জন্যে।
যতীন। কি কথা?
রুমি। মেজদা প্রথমে একটি কথা বলেন নি, কিন্তু আমি ওই
কথা বলে উঠে আসবার পরই একজন বললেন, আমাদের বাড়িতে
গিয়ে আপনাদের মেয়েকে অবশ্য রাখতে হবে না, বাসনও মাজতে হবে
। কিন্তু মানুষের অবস্থা বলা তাে যায় না, কার কখন কি হবে কে
বলতে পারে ? আপনাদের মেয়ে ইতিহাসে এম. এ. পাস, সে কথা
তাে জানিই আমরা, কিন্তু ভগবান না করুন, যদি
দুঃখের
তখন হাতা বেড়ি ধরতে পারবে কি না, তা জানতে চাওয়াটা কি
অন্যায় ? মেজদা তখন বললেন, না, কিছুমাত্র অন্যায় নয়। আপনারাও
আপনাদের ছেলেকে আশা করি মসলা-পেশা কাঠ-চ্যালানন কুয়াে থেকে
জল তােলা প্রভৃতিতে দক্ষ করেছেন। সত্যিই তাে, কখন কি হয় কে
বলতে পারে ? মেজদার চোখ দুটো বাঘের মত জ্বলছিল। আমি
পাশের ঘরে জানলা দিয়ে দেখছিলাম তাে সব।
যতীন। বড়দা কি বললেন ?
রুমি। বড়দা মেজদার দিকে ফিরে বললেন, ও-রকম কথা বলছ
কেন তুমি? তােমাদের অভদ্র ব্যবহারে মাথা হেঁট হয়ে গেল আমার।
তারপর ওঁদের দিকে ফিরে বললেন, খুবই লজ্জিত আমি, আমাদের ক্ষমা
করুন। আচ্ছা, নমস্কার। ওঁদের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন গিয়ে।
দিন আসে,
৩৭ বাড়িতে এসে সেজদার সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, তােমার পছন্দর প্রশংসা করতে পারলাম না। রুমির বিয়ের জন্যে ভাবতে হবে না তােমাকে। তুমি তােমার ঠাকুরঘর নিয়েই থাক। যতীন। [ হাসিয়া ] যাক, এ যাত্রা নিস্তার পেয়ে গেলি। সে আগাইয়া আসিল এবং টিকটিকির কিঞ্চিৎ ক্ষুন্নিবৃত্তি হইয়াছিল। রুমিকে পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল। রুমি। ০ রুমি। [ আবদার করিয়া ] আমার একটা উপকার করবে ছােটা? যতীন। কি ? বেশ ভাল করে একটা অ্যাপীল লিখে দেবে? •অ্যাপীলের বাংলা কি—আবেদন ? লিখে দাও না, তুমি তাে বেশ লিখতে পার। যতীন। কিসের আবেদন ? রুমি। বাংলা দেশের সমস্ত কুমারী মেয়েদের একটা সমিতি গঠন করতে চাই আমি-অনেকটা ট্রেড ইউনিয়ন গােছের। তার উদ্দেশ্য হবে কুমারী মেয়েদের সম্মান রক্ষা করা। বাংলা দেশের পুরুষদেরই তা করা উচিত ছিল, কিন্তু তা যখন তারা করেন নি, করবার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, তখন আমাদের নিজেদেরই তা করতে হবে। বাংলা দেশের সমস্ত কুমারী মেয়ে যদি সত্যিই আমার দলে যােগ দেয়, তা হলে বাংলা দেশের পুরুষদের শিক্ষা দিয়ে দিতে পারি। কোনও মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কোনও রকম অসম্মানজনক প্রস্তাব করে যদি কেউ, তাকে বয়কট করব আমরা। বাংলা দেশের কোনও মেয়ে তাকে বিয়ে করবে না। আমরা নিজেদের অত্যন্ত সস্তা করে ফেলেছি বলেই ওরা ভুলে গেছে যে, বিয়ে করাটা শুধু আমাদেরই প্রয়ােজন নয়, ওদেরও প্রয়ােজন। এ দেশের মেথর, মুচি, ধােবা, নাপিত, কুলি, কেরানী, সবাই নিজেদের দর বাড়িয়ে নিয়েছে ধর্মঘট করে, কেবল আমরাই প'ড়ে আছি মূল্যহীন অবহেলিত, অপমানিত। অথচ আমরাই গার্হস্থ্যের 3 স্বপ্ন-সব ভিত্তি, ভবিষ্যৎ সমাজের জননী, আমাদেরই অসম্মানের পঙ্ককুণ্ডে ডুবিয়ে রেখেছ তােমরা, আর ভণ্ডামির মুখােশ পরে সতীলক্ষ্মী-মহিমার বাঁধা বুলি আউড়ে চলেছ শতাব্দীর পর শতাব্দী। এ আর সহ্য করব না আমরা, সহ্য করা উচিত নয়। এই কাজেই আত্মনিয়ােগ করব ঠিক করেছি। তুমি আমাদের সমিতির উদ্দেশ্যটা বেশ ভাল করে গুছিয়ে লিখে দাও ছােটদা—দেবে? তা না হয় দেব। কিন্তু জিনিসটা ভাল করে ভেবে দেখা উচিত কিছু করবার আগে। যতীন। রুমি অধীরতাসূচক একটা ভঙ্গী করিল রুমি। ও ভাবাই আছে। যান। ধর, যে সব মেয়ে সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, তাদের ভরণ-পােষণের একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো? রুমি। নিশ্চয়। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, উপার্জনের ব্যবস্থা থাকবে, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে, তাদের প্রত্যেকের বিয়ের ব্যবস্থা করবে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিমণ্ডলী। ছেলের বিয়ে দিতে হলে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেই হুড়মুড় করে মেয়ের বাপেরা ফোটোগ্রাফের বােঝা নিয়ে গিয়ে হাজির হবে না তখন, হ'লেও কোনও ফল হবে না। সকলকে ছেলের বিয়ের জন্যে যেতে হবে ওই প্রতিনিধিমণ্ডলীর কাছে। সেখানে কোনও রকম অসম্মানজনক প্রস্তাব করেন যদি কেউ, তা হলে সমস্ত বাঙালী মেয়ে স্টাইক’ করবে—সে ছেলের বিয়ে হবে না যতক্ষণ না সে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। টিকটিকি। ঠিক, ঠিক সবই ঠিক। কেবল ওই, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারটায় একটু খটকা লাগছে। ও বিষয়ে বেশি কড়াকড়ি করতে গেলে অনেক মেয়ে পালাবে, আর ঢিলে দিলে অনেক মেয়ে কেলেঙ্কারি করবে। জানি তাে সব••• স্বপ্ন-সৰ টিকটিকির কথা রুমি শুনিতে পাইল না। যতীন পাইল। যতীন। তােমার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাটা কি রকম হবে ? রুমি। [ হাসিয়া ] কারাগারে বন্দী করে রেখে ‘ফিডিং বলে’ উপদেশ পান করিয়ে কতদিন আর বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের ? অন্ধকূপ হত্যা হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ না? বাইরের আলাে-বাতাসের অভাবে ভেপসে পচে মলুম যে আমরা! তালাটা খুলে দিলে ক্ষতি কি?—দু- চারজন পথ হারিয়ে মরবে হয়তােতা মরুক, অধিকাংশই কিন্তু বাঁচবে। তা হলে রক্ষণাবেক্ষণের কোনও প্রয়ােজন নেই বলছ ? রুমি। বাইরে থেকে কেউ কি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পেরেছে কখনও কাউকে ? সিন্দুকের ভিতর বন্ধ করে রেখেও পারে নি। টিকটিকি। ঠিক ঠিক। যতীন। রুমি শুনিতে পাইল না, বলিয়া চলিল- রুমি। রুমি। সেই দৈত্যের গল্পটা ভুলে গেছ—সেই যে, একটা দৈত্য সিন্দুকের ভিতর একটা মেয়েকে পুরে মাথায় করে নিয়ে বেড়াত? যতীন। ও গল্প জানি, তােমার সঙ্গে আমার মতদ্বৈধও নেই- তােমার ‘স্কীম’টা কি, তাই শুধু জানতে চাইছি। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে বলছ, সেটা কি রকম হবে ? মেয়েরা তাদের বাপ-মায়ের কাছেই থাকবে যেমন আছে, কেবল তাদের আমাদের সমিতিতে যােগ দিতে হবে এবং প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, বিয়ের ব্যাপারে অসম্মানজনক কোন কিছু তারা সহ্য করবে । সমিতি তাদের সে বিদ্রোহ সমর্থন করবে। আমরা যেখানে যেমন দরকার শিক্ষার ব্যবস্থা করব, উপার্জনেরও ব্যবস্থা করব, কিন্তু ওই একটি শর্তে। * বিয়ের ব্যাপারে আত্মসম্মান অক্ষুন্ন রাখতে হবে, প্রয়ােজন হলে সে বিষয়ে কতৃত্ব করবে আমাদের প্রতিনিধিমণ্ডলী। মেয়েদের বাপ-মাকে নিয়েই প্রতিনিধিমণ্ডলী হবে অবশ্য।
৪০ স্বপ্ন-সম্ভব যতীন। কিন্তু যাদের মেয়ে আছে, তাদের ছেলেও আছে। মেয়ের স্বার্থের কাছে ছেলের স্বার্থ বলি দিতে রাজি হবে কি সবাই ? রুমি। আমার বিশ্বাস অনেকে হবে। ছেলেদের স্বার্থকে বলি দেব কেন আমরা? তাদের স্বার্থ তাে আমাদেরই স্বার্থ। সমাজ মেয়েদের উপর যে অত্যাচারটা করছে, সেইটে নিবারণ করাই শুধু আমাদের উদ্দেশ্য। যতীন। ধর, যদি বাপ-মায়েরা রাজি না হয় ? রুমি। তখন তাদের নিয়ে আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়বার চেষ্টা করতে হবে। যতীন। তাতে কি পরিমাণ টাকার দরকার, তা ধারণা আছে চলবে না রুমি। আছে, অনেক টাকার দরকার। কিন্তু সেই ভয়ে থামলে না। আরম্ভ করতে হবে। যতীন। আমার বিশ্বাস, রাজশক্তি সাহায্য না করলে এক-আধ- জনের চেষ্টায় এ হওয়া অসম্ভব। বিদেশী রাজার কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে না, আমাদের পঙ্গুতাই তার কাম্য। সুতরাং স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে সকলের আগে। দেশ স্বাধীন না হলে কিছুই হবে না। রুমি। সে চেষ্টা তাে চলছে, এটাও চলুক। না ছােটা, তুমি ঝগড়া লাগাবার চেষ্টা করছ খালি। কোনও বাধা আমি মানব না। যতীন। [ হাসিয়া কোনও বাধাই না? ধরু, যদি কথাটা বলিতে গিয়া যতীন থামিয়া গেল। সমরের সম্বন্ধে রুমির মন যে ব্যাব্রিনীর মত সজাগ, তাহা যতীনের জানা ছিল। সমরকে লইয়া কোনও রসিকতাও সে সহ্য করিবে না। কিন্তু যতীনের মনের ভাব তাহার চোখের দৃষ্টিতে মূর্ত হইয়া উঠিল। রুমির মনের ভাবও মূর্ত হইল রুমির চোখের দৃষ্টিতে।
বসব ৪১ যতীনের মনের ভাব। ধন, যদি সমর এতে আপত্তি করে ? রুমির মনের ভাব। সমর আপত্তি করবে? সমরকে চেন না তামরা। সােনায় মরচে ধরতে শুনেছ কখনও? যতীনের মনের ভাব। শুনি নি, কল্পনা করছি। যদি আপত্তি করে, কি করবি তখন তুই ? রুমির মনের ভাব। সমরের মুখদর্শন করব না কখনও তা হলে। মূর্ত মনােভাব দুইটি অদৃশ্য হইল। যতীন দেখিল, রুমি তাহার দিকে গহিয়া আছে। তাহার চোখের দৃষ্টিতে বহ্নি-দীপ্তি। রুমি। কোনও বাধাই আমি মানব না ছােটদা। প্রাণ দিয়েও আত্মসম্মান রক্ষা করব। যতীনের মনে হইল, রুমির সমস্ত দেহটাই যেন স্বর্ণ-শিখার মত জ্বলিতেছে। দেখিতে দেখিতে সে শিখা আকাশবিসপী হইল—দিগ- দিগন্ত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল অপূর্ব জ্যোতির্ময় দীপ্তিতে। সেই দীপ্তি ভেদ করিয়া ঝঞ্চার বেগে একটি অশ্ব যেন ছুটিয়া আসিতেছে•••কাছে আসিয়া গ্রীবাভঙ্গী করিয়া অশ্বটি দাড়াইয়া পড়িল•••যতীন সবিস্ময়ে দেখিল, অশ্বপৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া রহিয়াছে মূর্তিমতী তেজঃস্বরূপিণী এক নারী••তাহার উত্তোলিত হস্তে তীক্ষ্ণ তরবারিসে বলিতেছে, মেরি ঝালি নেহি দেউঙ্গি, নেহি দেউজি, নেহি দেউজি••• দৃশ্য মিলাইয়া গেল। রুমি। আমি চললাম ছােদ।—লিখে রেখাে, বুঝলে? আমি আসব আবার।। যতীন। আচ্ছা। রুমি চলিয়া গেল।
৪২
স্বপ্ন-সব
টিকটিকি। নানা গােলমালে একটা কথা চাপা পড়ে গেছে।
যতীন। কি কথা?
টিকটিকি। নীলার কথাটা। সে যে তােমাকে অক্ষম বলে অত
বড় একটা বিদ্রুপ করে গেল, সহ্য করে থাকবে সেটা? তুমি কি
একটা কেউ-কেটা নাকি! আর কেউ না জানুক, আমি তাে জানি,
তােমার শক্তি কত •••
যতীন চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর চোখ বুজিয়া ভাবিবার চেষ্টা
করিল, সত্যই কি তাহার কোন শক্তি আছে ? থাকিলে তাহা
কিরূপ?•••চোখ খুলিয়া দেখিল, একটি কঙ্কাল সম্মুখে দাড়াইয়া আছে।
কঙ্কাল। আমিই তােমার শক্তি।
যতীন। তুমি !
কঙ্কাল। খেতে পাই না।
যতীন। কেন, আমি খাই তাে। জীবনে কখনও খাওয়ার কষ্ট
পেয়েছি বলে তাে মনে পড়ে না।
কঙ্কাল। ওইখানেই তােমার ভুল। তুমিই তােমার শক্তি নও,
সে রকম তপস্যা তােমার নেই। দেশের সম্মিলিত শক্তিই তােমার
শক্তি•••তােমার শক্তি•••
কঙ্কালের দাতগুলা সহসা কড়মড় করিয়া উঠিল। অক্ষিকোটর হইতে
অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটিয়া বাহির হইল•••
কঙ্কাল। তােমার শক্তি ? লজ্জা করে না বলতে? এর মধ্যেই
কি করে ভুলে গেলে যে, তােমার শক্তি একমুঠো উচ্ছিষ্ট অল্পের জন্য
মাথা কুটে মরেছে প্রত্যেকের দ্বারে দ্বারে, ‘ফ্যান দাও’ ‘ফ্যান দাও' বলে
হাহাকার করে বেড়িয়েছে শহরের গলিতে গলিতে, পুলিশের গুলিতে
মরেছে হাজারে হাজারে, ঝড়ে উড়ে গেছে, আগুনে পুড়ে গেছে, বানে
স্বপ্ন-সম্ভব
৪৩
ডুবে গেছে ?•••[ করুণ কণ্ঠে ] কিছু নেই—অল্প নেই, বস্ত্র নেই, শিক্ষা
নেই, আদর্শ নেই। সমস্ত নিয়ে গেছে। চামড়া ছিড়ে নিয়েছে, মাংস
কেটে নিয়েছে, চোখ উপড়ে ফেলেছে। বাকি আছে শুধু হাড়
কখানা•••বাঁচাও এগুলােকে•••এখনও এ দিয়ে বজ্র তৈরি হতে পারে।
যতীন। [ সাগ্রহে ] বল, কি উপায় তার?
টিকটিকি। কি ভণ্ড, কিছু জানে না যেন!
কঙ্কাল। উপায়-ত্যাগ, স্বার্থত্যাগ, আত্মত্যাগ, ভালবাসা। শুধু
নীলাকে ভালবাসা নয়, সকলকে ভালবাসা। সকলকে ভালবাসতে না
পারলে নীলার ভালবাসাও টিকবে না। বিশাল হৃদয়ের বলিষ্ঠতাই
নীলাকে নির্ভয় করতে পারে, বিশাল গাছের শাখাতেই পাখি নীড়
বাঁধে, মাটির উপরই গৃহ নির্মিত হয়। তােমার উদারতার অভাব ঘটেছে
বলেই দেশজোড়া এই অশান্তি, এই হানাহানি, তােমার সঙ্কীর্ণ প্রেমের
ভিত্তিও নড়ে উঠেছে তাই। বাঁচাও আমাকে—এখনও বাঁচাতে
পার•••বাঁচাও•••বাঁচাও...
কঙ্কাল ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হইল। দূর হইতে কেবল শােনা যাইতে
লাগিল, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও
টিকটিকি। এই মরেছে!
যতীন। কি হল?
টিকটিকি। [ সানুনয়ে ] আমাকে চট করে একটা গিলে-করা
আদ্ধির পাঞ্জাবি, এক জোড়া বাটারফ্লাই গোঁফ, আর এক জোড়া গ্লেজড়
কিডসের পাম্পশু দিতে পার? দাও ভাই চট করে।
যতীন। | সবিস্ময়ে ] কেন ?
দেখ, টিকটিকিনীর কাণ্ড!
টিকটিকি।
ওই দেখ,
যতীন সবিস্ময়ে দেখিল, পাশের দেওয়ালে টিকটিকিনী সত্যই
অদ্ভুতবেশে সাজিয়া আসিয়াছে। ঠোটে রঙ, মুখে পাউডার, পরনে
৪৪ চটকদার হাওয়াই শাড়ি। আঁকিয়া বাঁকিয়া ওরিয়েন্টাল নাচ নাচিতেছে। টিকটিকি। দাও চট করে—আদ্ধির পাঞ্জাবি, বাটারফ্লাই গোঁফ আর ভাল একজোড়া পাম্পশু; না হলে তাে ওকে ভােলানাে যাবে না। দাও না। যতীন। আমার কাছে নেই। টিকটিকি। আঃ, বিপদে ফেললে দেখছি। পাশের বাড়িতে থিয়েটারের আখড়া আছে না? সেখানে পাওয়া যেতে পারে, দেখি চেষ্টা করে। ত্বরিতপদে বাহির হইয়া গেল। টিকটিকিনীও নাচিতে নাচিতে তাহার অনুসরণ করিল। যতীন চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বাঁচাও বাঁচাও শব্দটা আবার শােনা গেল। স্পষ্টতর হইয়া ক্রমশ সেটা নিদারুণ হাহাকারে পরিণত হইল। সহসা খবরের কাগজের পাতা হইতে ননায়াখালি ও কলিকাতার অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের দল পিলপিল করিয়া বাহির হইয়া আসিল। মনে হইল, চতুর্দিক যেন ভরিয়া গেল। আকাশ লাল হইয়া উঠিয়াছে•••ঘর পুড়িতেছে•••গ্রাম পুড়িতেছে। বাঁচাও বাঁচাও-কে কোথায় আছ, বাঁচাও•••চীৎকার-ক্রন্দন- হাহাকারের মধ্যে কে যেন অট্টহাসি হাসিতেছে! যতীন এতক্ষণ প্রাণপণে যে বিভীষিকাকে নিজের মগ্নচৈতন্যের মধ্যে ডুবাইয়া রাখিবার, চেষ্টা করিতেছিল, তাহা অতিশয় নগ্নরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। কাগজে পড়িয়া তাহার মনে যে কৌতূহলটুকু জাগিয়াছিল, তাহা এই বিরাট জনতায় দিশাহারা হইয়া গেল। তাহার ভয় করিতেছিল না, সে বিভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। চতুর্দিকে জনতা, চীৎকার, হাহাকার, অট্টহাসি, আগুনের হলকা, শবদাহের গন্ধ আর ধোয়া। হঠাৎ সে দেখিতে পাইল, এক বিরাট পুরুষ ভিড় ঠেলিয়া অগ্রসর হইতেছেন•••যতীনের স্বপ্ন-সম্ভব ৪৫ একটা ছবি মনে পড়িয়া গেল যেন লিলিপুট-জনতার মধ্যে গালিভার আবিভূত হইয়াছেন। বিরাট পুরুষ অগ্রসর হইয়া আসিয়া তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। বিরাট পুরুষ। বিভ্রান্ত হয়াে না, এর স্বরূপ বাইরে থেকে অমন এলােমেলাে করে দেখলে ঠিক বােঝা যাবে না। ঠিক করে দিচ্ছি, দাড়াও। যতীন। আপনি কে ? বিরাট পুরুষ। আমি ইতিহাস। | ০ ০ ইতিহাস জনতার মধ্যে কি যে করিলেন, যতীন ঠিক বুঝিতেপারিল না; অদ্ভুত একটা রূপান্তর ঘটিল। জনতার বিশৃঙ্খলা আর রহিল না। •••এক ধারে কতকগুলি বন্দিনী নারী সারি সারি দাড়াইয়া আছে ••মানুষ নয়, যেন প্রাণহীন নিস্পন্দ পুতুলের সারি—চোখের দৃষ্টিতে ভাষা নাই, সজীব আতঙ্কও নাই, সমস্ত জমিয়া যেন পাথর হইয়া গয়াছে•••আর এক ধারে বন্দী পুরুষের দল•••মৌন ঘৃণা আর ভয় তাহাদের চোখের দৃষ্টিতে মূর্ত হইয়া আছে•••দুই দলের মধ্যে কয়েকটি শশু•••কিছু দূরে নরমুণ্ড ও কবন্ধের প•••তাহারই পাশে একটা অগ্নিকুণ্ড দাউদাউ করিয়া জ্বলিতেছে, তাহাতে পুড়িতেছে একটা জীবন্ত মানুষ•••আর এই সমস্তটা স্পর্ধিত নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করিয়া নড়াইতেছে একটা অদ্ভুত পশু। পশুটার আকৃতি ভয়াবহ। মুণ্ডটা হায়েনার, বীভৎস দাতগুলা রক্তাক্ত। হাত দুইটা হাত নয়, সাপ। আঙুল নাই, আঙুলের স্থানে ফণা। বুকটা যেন শ্যাওলা-ধরা পাথর, তাহার উপর অসংখ্য শুয়া-পােকা সঞ্চরণ করিয়া বেড়াইতেছে। হইটাও মানুষের নয়, শ্বাপদের। মাথায় একটা লােহার হেলমেট। কোমরে একটা ছােরা গোঁজা। অস্পষ্ট দুইটি মূর্তি নেপথ্যে বন্দুক কঁাধে করিয়া দাড়াইয়া আছে••• মনে হইতেছে, তাহারা যেন এই পা
৪৬
স্বপ্ন-সম্ভব
পশুটার দেহরক্ষী। ইতিহাস কখন অদৃশ্য হইয়া গিয়াছিলেন যতীন
বুঝিতে পারে নাই।•••পশুটা আগাইয়া আসিয়া বন্দী নর-নারীদের
মধ্যস্থলে কোমরে হাত দিয়া দাড়াইল। দুইটা সাপের ফণা দুই দিকে
উদ্যত হইয়া রহিল।
পশু। তােরা মানবি কি না এখনও বল্••• যদি মানিস জিন্দা
থাকবি, আর যদি না মানিস—
শ্বান্ত নিষ্কাশিত করিয়া ভয়ঙ্কর কুটি করিল একটা। সর্পরূপী বাহু-
যুগল কুঞ্চিত প্রসারিত হইতে লাগিল। চোখের দৃষ্টি হইতে আগুন
নয়, খানিকটা পুজ যেন গলগল করিয়া বাহির হইয়া আসিল।•••
পশু। [ সগর্জনে ] মানবি কি না বল, জলদি বল, (পুরুষদের
দিকে চাহিয়া) জলদি।
একজন পুরুষ। না, মানব না।
পশুটা হাসিয়া উঠিল। অদ্ভুত সে হাসি ! কোন শব্দ হইল না।
মুখ-গহ্বরটা কান পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়া গেল কেবল।
পশু। [ সহসা উচ্চৈঃস্বরে ] এই, আয় তােরা।
সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকটা পশু ছুটিয়া আসিল। কাহারও মুণ্ড
শৃগালের মত, কাহারও কুকুরের মত, কাহারও শকুনির মত•• |
পশু।
। নিয়ে আয় মাংস আর রক্ত।
একজন গিয়া মাংস ও রক্ত লইয়া আসিল।
পশু। খাওয়া এই ব্যাটাকে শালা, হারামির বাচ্চা•••
৪৭ যে পুরুষটি আপত্তি করিয়াছিল, তাহাকে সকলে মিলিয়া জোর করিয়া মাটিতে ফেলিল এবং মাংস ও রক্ত মুখে পুরিয়া দিল। পশু। এইবার মার জুতাে শালার মুখে। মুখে জুতা মারা হইল। পশু। কাট এবার। ওঃ-ওঃ- কাটিল। তাহার মাথাটা পিছন দিকে ঝুলিয়া পড়িতেই ছিঃ শিরামুখ হইতে ফিনকি দিয়া রক্তের ফোয়ারা ছুটিয়া বাহির হইল। ওঃ-ওঃ-ভগবান বন্দিনী মেয়েদের মধ্যে একজন হাহাকার করিয়া উঠিল। নিহত ব্যক্তি তাহারই স্বামী। মেয়েটির চীৎকারে যতীন আত্মস্থ হইল, এতক্ষণ তাহার চিত্ত যেন অসাড় হইয়া গিয়াছিল—সেও চীৎকার করিয়া উঠিল, চীৎকার করিয়া বারণ করিল। কিন্তু কোন ফল হইল না। পশুরা তাহাদের কাজ ঠিক করিয়া যাইতে লাগিল। জননীদের আর্তনাদ অগ্রাহ্য করিয়া তাহারা শিশুদের মধ্যে কাহাকেও অগ্নিকুণ্ডে ছুঁড়িয়া দিল, কাহাকেও আছড়াইয়া’মারিল, কাহারও দুই পা ধরিয়া চিরিয়া ফেলিল। যতীন আর সহ্য করিতে পারিতেছিল —সে হুঙ্কার দিয়া উঠিল। পশুরা নির্বিকার। যে বন্দিনী হাহাকার করিয়া উঠিয়াছিল, একটা পশু তাহার দিকে চাহিয়া একটা পৈশাচিক হাসি হাসিল। এ হাসি নিঃশব্দ নয়—মনে হইল, গলার ভিতর খলবল করিয়া জল ফুটিতেছে। বন্দিনী। আমাকেও মেরে ফেল তােমরা•••আমাকেও মার তােমাদের পায়ে পড়ছি, দয়া করে আমাকে মার•••আমার ছেলেকে মেরেছ, স্বামীকে মেরেছ•••আমাকেও মার••• পশু। তােমাকে মারব না সুন্দরী, অঙ্কশায়িনী করব••• ৪৮ বন্দিনী। নানা-না- পশু। না বললে শুনছে কে! ওরে ধর- কয়েকজন পশু আসিয়া মেয়েটিকে চিত করিয়া মাটিতে ফেলিল। একজন আগাইয়া গিয়া পা দিয়া তাহার মাথায় আঘাত করিল, হাত ভাঙিয়া দিল। তাহার পর তাহার চুলের ঝুটি ধরিয়া টানিতে টানিতে লইয়া গেল। ক্ষণপরেই ধর্ষিতা নারীর হাহাকারে চতুর্দিক শিহরিয়া উঠিতে লাগিল। নেপথ্যে যে দুইটি অস্পষ্ট মূর্তি বন্দুক কাঁধে করিয়া দাড়াইয়া ছিল, তাহারা নির্বিকারভাবে দাঁড়াইয়াই রহিল।•••্যতীনের হস্ত মুষ্টিবদ্ধ, নাসারন্ধ্র স্ফীত, চক্ষু রক্তাক্ত হইয়া উঠিয়াছিল—দেহের সমস্ত শক্তি একত্রিত করিয়া তারস্বরে আবার সে প্রতিবাদ করিয়া উঠিল। কিন্তু পশুদের কার্যকলাপে এতটুকুও ছেদ পড়িল না। বরং তৎক্ষণাৎ তাহারা আর একটি মেয়ের চুলের ঝুটি ধরিয়া ভূপাতিত করিয়া ফেলিল। যতীন আর দেখিতে পারিতেছিল না, বুকফাটা হাহাকার শােনাও আর সম্ভব ছিল না তাহার পক্ষে। নিরুপায় হইয়া সে চোখ বুজিয়া কানে আঙুল দিলকোনরূপে আত্মরক্ষা করিয়া নরক-যন্ত্রণা ভােগ করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার পর ধীরে ধীরে আবার চোখ খুলিল। দেখিল, ইতিহাস তাহার সম্মুখে পুনরায় মূর্ত হইয়াছেন। ইতিহাস। কেন বৃথা চীৎকার করছ ? যতীন। মেয়েদের এই নির্যাতন চুপ করে দেখব? কি বলছেন আপনি। ইতিহাস। [ হাসিয়া ] মেয়েদের নির্যাতন চুপ করে দেখাই তাে তোমাদের অভ্যাস। t যতীনের চোখের সম্মুখে নূতন দৃশ্য উদঘাটিত হইল চিত। অলিতেছে। চিতায় পুড়িতেছে একটি মৃত পুরুষের সহিত একটি জীবন্ত নারী। মেয়েটি -সব হাত জোড় করিয়া মৃত স্বামীর পা দুইটা মনে মনে জড়াইয়া ধরিয়া নিদারুণ যন্ত্রণাটা ভুলিয়া থাকিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু পারিতেছে ; চেষ্টা সত্ত্বেও মুখ দিয়া আর্তনাদ বাহির হইয়া পড়িতেছে। সে আর্তনাদকে চাপা দিয়া গর্জন করিয়া উঠিতেছে ঢাক ঢােল দামামা রামশিঙার তুমুল নির্ঘোষ। এ দৃশ্য অবলুপ্ত হইয়া গেল, আর একটা দৃশ্য ফুটিয়া উঠিল •••একসঙ্গে শত শত নারী সি থির সিদুর মুছিয়া হাতের শাঁখা ভাঙিয়া বৈধব্য-বেশ ধারণ করিতেছে—একটিমাত্র কুলীন ব্রাহ্মণের মৃত্যুতে এতগুলি মেয়ে পতিহীনা হইয়াছে, অদূরে নিষ্ঠুর-মূর্তি একটা পাণ্ডা দাড়াইয়া আছে, সকলের টু টি টিপিয়া জোর করিয়া নির্জলা একাদশী করাইবে।•••এ দৃশ্য মিলাইয়া গেল, আর একটা মূর্ত হইল। পতুগীজ বণিকের জাহাজে সারি সারি মেয়ের দল উঠিতেছে, প্রত্যেকের কোমরে দড়ি। পর্তুগীজ বণিকেরা উহাদের কাহাকেও লুণ্ঠন করিয়া আনিয়াছে, কাহাকেও কিনিয়াছে।•••জাহাজ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হইল একটি নৌকায়। নৌকার গলুইয়ের উপর ম্লানমুখী একটি কিশােরী বসিয়া আছে-ভরার মেয়ে•••ভরার মেয়ে দেখিতে দেখিতে রূপান্তরিত হইল স্নেহলতায়•••স্নেহলতার সর্বাঙ্গে আগুনের শিখা••• স্নেহলতাকে দগ্ধ করিয়া আগুনের শিখা ধীরে ধীরে স্তিমিত হইয়া আসিল•••সেই স্তিমিত আলােকে যতীন দেখিতে পাইল, প্রেতিনীর মত সারি সারি আসিয়া দাঁড়াইয়াছে পণ্য-রমণীর দল•••তাহাদের নিষ্পলক দৃষ্টিতে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ••এ দৃশ্যও ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল•• যতীন দেখিল, ইতিহাস তাহার দিকে চাহিয়া আছেন। যতীন। অতীতে কিছু করি নি বলে বর্তমানেও চুপ করে থাকব, এ আপনার কেমন যুক্তি ? ইতিহাস। বর্তমানেও তােমরা চুপ করে আছ। ওই দেখ । অশরীরী নিভাননী ছুটিয়া আসিয়া প্রবেশ করিল। চোখের দৃষ্টিতে সিপ্রতিভ ছদ্ম হাসি। ৭ নিভাননী। [ হাসিয়া ] আমার উপর করুণা প্রকাশ করে কেন যে সময় নষ্ট করছ, বুঝি না। আমার কোন দুঃখ নেই, তােমরা আমার দুঃখটা বুঝলে না, কিন্তু স্বয়ং বাবা বিশ্বেশ্বর আমাকে পায়ে ঠাই দিয়েছেন। বরং তােমাদের কথা ভেবেই দুঃখ হয় আমার•••ঠিক আমার বিশুর মতই অবুঝ গােমরা•••ওই যে আসছে—আর পারি না ওকে নিয়ে। অশরীরী বিশু আসিয়া প্রবেশ করিল। মাথার চুল অবিন্যস্ত, পরিধানে ময়লা হাফপ্যান্ট, ছেড়া কামিজ। চোখের দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। গালের উপর অশ্রুর ধারা শুকাইয়া রহিয়াছে। নিভাননীকে দেখিয়া সে স্থির হইয়া দাড়াইয়া রহিল। কিছু বলিল না, কেবল নির্নিমেষে চাহিয়া রহিল। নিভাননী। আচ্ছা, তুই অমন করছিস কেন বল দিকি ? বিশু। [ অস্ফুটকণ্ঠে ] মা! তাহার দুই চোখ আবার জলে ভরিয়া উঠিল নিভাননী। কতবার বােঝাব তােকে! এ কি আমার নতুন হয়েছে, এ রকম অদ্ভুত কাণ্ড কতবারই তত হয়েছে পৃথিবীতে মহাভারত খুলে দেখ না। বিনতার দুই ছেলে অরুণ আর গরুড় জমেছিল ডিম থেকে, গান্ধারী প্রসব করেছিলেন একটা মাংসপিণ্ড, সেটা ঘৃতকুণ্ডে রাখবার পর তবে তার থেকে শত পুত্র জন্মাল, দ্রোণও জন্মেছিল কলসী থেকে, শরস্তম্ভ থেকে কৃপ কৃপী, আগুন থেকে অগ্নিবেশ, দ্রৌপদী, ধৃষ্টদ্যুম্ন•••রামায়ণ পড়েছিস তাে-সীতা মাটি থেকে জায় নি?—কি অবুঝ ছেলে বাবা, কিছুতেই বুঝবে না—চ বিশুকে নিভাননী টানিতে টানিতে লইয়া চলিয়া গেল।
সম্ভব অশরীরী মেজদি প্রবেশ করিলেন। মেজদি। কাণ্ডখানা দেখে এস একবার। তােমার মেজদা পা ছড়িয়ে বসে আছেন, আর ওই বিধবা বউ তাঁর উরুতে গরম তেল মালিশ করছে। আচ্ছা, এমন অনাছিষ্টি কাণ্ড শুনেছ কখনও? পুত্রবধূ অবশ্য মেয়ের মত তা মানি, কিন্তু সােমত্ত মেয়েকে দিয়েও কেউ উরুতে তেল মালিশ করায় নাকি ? আমি মালিশ করে দিতে গেলুম, তােমার মেজদা বললেন, তােমার হাতে জোর নেই, তুমি পারবে না। মানে স’রে এলুম-নিজের মান নিজের কাছে—আঁ, কি বল ? কিন্তু এমন অনাছিষ্টি কাণ্ড বাপের জন্মে শুনি নি কখনও বাপু! দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। একবার অসহায়ভাবে এদিক ওদিক চাহিলেন। তাহার পর নাক কুঁচকাইয়া চশমাটা ঠিক করিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। মেজদি। আমি মুখ্য-সুখ মানুষ, কতটুকুই বা বুঝি, কিই বা জানি ! [ একটু হাসিয়া ] আর এটাও ঠিক, হাতে কিছু জোর নেই আমার কিছু না। সর্বাঙ্গ কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে দিন দিন একটু জোরে মালিশ করে না দিলে কামড়ানি কমবেই বা কেন? [ পুনরায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া ] যাই, তেলটুকু নিয়ে আসি, জীবু দোকান বন্ধ করে দেবে আবার—তেলের শিশিটা সকাল থেকে তার দোকানে পড়ে আছে—অন্ধকার হয়ে এল•••যাই। চলিয়া গেলেন। একটি সিনেমা-অভিনেত্রী ধীরে ধীরে ছায়ালােক হইতে নামিয়া আসিলেন। অদ্ভুত রূপসী। অভিনয়ের সময়ে যতীন ইহাকে অনেকবার দেখিয়াছে। চোখে-মুখে-কথা চটপটে চটুলা যতীনের ইহাই ধারণা ছিল। এখন দেখিল, তাহার চোখের দৃষ্টি বড় করুণ।
সিনেমা-অভিনেত্রী। আমার শিল্পচর্চার অন্তরালে কি শশাচনীয় অপমান—কি নিদারুণ বেদনা যে প্রচ্ছন্ন আছে, তা যদি দেখতে পেতে। সঙ্গে সঙ্গে তাহার পাশে একটি লােলচর্ম লােলুপদৃষ্টি বৃদ্ধ মূর্ত হইল। গায়ের শাল এবং হাতের আংটি দেখিয়া মনে হয়, লােকটার আর কিছু থাক, টাকা আছে। কণ্ঠে ] তােমার বৃদ্ধ। কি করছ এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ? অভিনেত্রী। [ অনুযােগভরা আবদারমাখা জন্যেই তাে অপেক্ষা করছি কতক্ষণ থেকে। বদ্ধ। ও। চল তা হলে এই চল তা হ'লে—এই ভূপৎ সিং••• । নিঃশব্দে প্রকাণ্ড একখানা মােটরকার আসিয়া দাড়াইল। অভিনেত্রীকে লইয়া বৃদ্ধ তাহাতে প্রবেশ করিলেন। মােটর অন্তর্হিত হইল•••ধীরে ধীরে এবং অনিবার্যভাবে আর একটা দৃশ্য ফুটিয়া উঠিল। ছােট একখানি ঘর। দেখিলে মনে হয়, কিছুক্ষণ আগেই তাহাতে লক্ষ্মী-শ্রী ছিল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভাব এখনও আছে; কিন্তু ঘরের চতুর্দিকে জিনিসপত্র ছড়ানাে। ঘরের এক কোণে একটা ভােলা উনুনে ভাত ফুটিতেছে। ঘরের মেঝেতে হাত-পা-বাঁধা একটি নারী, তাহার পাশেই হাত-পা-বাঁধা একটি পুরুষ। পুরুষটির গায়ে মাথায় তেল দেখিয়া মনে হয়, সে বােধ হয় স্নান করিতে যাইতেছিল। সেই পশুটা আসিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। পশু। কি ঠিক করলি? নারী। [ করুণ কণ্ঠে ] ও জ্বরে ভুগছিল, তিন দিন খায় নি কিছু। আজ পথ্য করবে চারটি। ভাত হয়ে গেছে, আগে ওবে খেতে দাও তােমরা, তারপর সব হবে।
শশব
পশু। [ পুরুষকে | আমার কথা মানবি কি না?
পুরুষ।
।
পশুটা তাহার মুখে থুতু দিল, লাথি মারিল। ইহাতেও তৃপ্ত না হইয়া
শেষে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়িটা তুলিয়া সমস্তটা তাহার মুখের উপর উপুড়
করিয়া দিল।
যতীন। এই—এই—এই—কি করছ তুমি ?
পশুটা যতীনের কথায় কর্ণপাত করিল না। মেয়েটার চুলের ঝুটি
ধরিয়া টানিতে টানিতে বাহির হইয়া গেল।
ইতিহাস। তুমি বৃথা চীৎকার করে মরছ ।
ও তােমার একটি
কথা শুনতে পাচ্ছে না।
যতীন। শুনতে পাচ্ছে না।
ইতিহাস। ।
যতীন। শুনতে না পাবার কারণ?
ইতিহাস। কারণ ও মানুষ নয়, যন্ত্র। তুমি মাথা খুঁড়ে মরলেও
ও থামবে না, থামবার শক্তিই নেই ওর। তােমার ঘড়িতে এখন
পাঁচটা বেজেছে, ধর, কেউ যদি কাটা সরিয়ে দুটো করে দিত, আর তুমি
যদি ঘড়ির দিকে চেয়ে ক্রমাগত চীৎকার করে যেতেএখন দুটো নয়,
পাঁচটা বেজেছে, কি করছ তুমি? তা হলে তা যেমন হাস্যকর হত,
তােমাৰু এ চীৎকারও তেমনই হাস্যকর।
যতীন। কিছু করা যাবে না তা হলে?
ইতিহাস।(যাবে, যে হাতটা ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়েছে, সেই
হাতটাকে যদি প্রভাবিত করতে পার, কিংবা ঘড়িটা নিজের আয়ত্তে
এনে নিজেই যদি কাটা ঘুরিয়ে ঠিক করে দাও, তা হলে যাবে।
৫৪ স্বপ্ন-সভব । যতীন। তার উপায় কি ? ইতিহাস। উপায় বার করবে তােমরা। [ হাসিয়া ] আমি শুধু তার বিবরণটা সংগ্রহ করে রেখে দেব, যেমন রেখে আসছি বরাবর। আমার প্রাচীন অভিজ্ঞতার ছবি দেখাতে পারি খানিকটা, দেখ, তার থেকে যদি বার করতে পার কিছু। যতীনের চোখের সম্মুখে পর পর ছবির পর ছবি ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। শত নদীর তীর, মহাবীর আলেকজাণ্ডারের অসংখ্য অশ্বারােহী সৈন্য সমাবিষ্ট হইয়াছে••• মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত গ্রীক শিবিরে সমর-কৌশল শিখিতেছেন••• বাংলা দেশে গঙ্গারাঢ়ীদের বিরাট হস্তি-বাহিনী সজ্জিত হইতেছে•••'বৈদিক সভ্যতা তখনও অবলুপ্ত হয় নাই.•• গঙ্গার তীরে তীরে মহাসমারােহে তখনও যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হইতেছে••• যজ্ঞাগ্নি ধীরে ধীরে মন্দীভূত হইল....রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গােপনে গৃহত্যাগ করিতেছেন••• বােধিক্ৰমমূলে অমিতাভ বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় সারা ভারতবর্ষ যেন স্বপ্ন দেখিতেছে.... বৌদ্ধ শ্ৰমণ, বৌদ্ধ বিহার, বৌদ্ধ রাজা•• অশোকের সাম্রাজ্য••• আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী:•• গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও, সত্যনিষ্ঠ হও, অহিংস হও—সর্বত্র এই বাণী প্রচারিত হইতেছে—সুদূর দাক্ষিণাত্যে, তাম্রপর্ণী নদীর তীরেও••• সিংহলে, গ্রীসে, ঈজিপ্টে, সিরিয়ায়••• ধীরে ধীরে অন্ধকার নামিতেছে••• অশােকের বিশাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভাঙিয়া পড়িতেছে••• বিন্দুসার অযােগ্য পুত্ৰ••• চারিদিকে বিশৃঙ্খলা•••বিরাট সাম্রাজ্য খণ্ড খণ্ড হইয়া গেল••• বৃহদ্রথকে তাহার ব্রাহ্মণমন্ত্রী পুষামিত্র হত্যা করিয়া সুঙ্গ সাম্রাজ্য স্থাপন, করিতেছে••• তাহার পর কা, তাহার পর অন্ধ্র.... বাহিরের শত্রু আক্রমণ করিল•• গ্রীক, তাহার পর শক, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তক্ষশিলায় পার্থিয়ান সাম্রাজ্য স্থাপিত হইল। “শকেরা, উজ্জয়িনী অধিকার করিয়াছে•• সমস্ত ভাসিয়া গেল কুশান-আক্রমণের বন্যা- বিপ্লবে: হিন্দুকুশ অতিক্রম করিয়া দলে দলে ছুটিয়া আসিতেছে , কুশান অশ্বারােহীরা••• গান্ধার, তক্ষশিলা, পাঞ্জাব, ক্রমে ক্রমে সব গেল••• নর্মদার তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হইল কুশান সাম্রাজ্য••• তৃতীয় কুশান সম্রাট কণিষ্ক কিন্তু আর অশ্বারােহী দস্যু নন•••তিনি ভারতবর্ষীয় সম্রাট•• সর্বধর্মসমন্বয় করিতে ব্যস্ত•••জরথুস্ত্র, হিন্দু, গ্রীক, পারস্য সকলের দেবতাই তঁাহার আরাধ্য••• কিন্তু শেষ বয়সে তিনি বুদ্ধের শরণ লইতেছেন••• রাজধানী পুরুষপুর বৌদ্ধমন্দিরে অলস্কৃত হইতেছে••• কাশ্মীরের কুন্তলবনে মহাযান বৌদ্ধগ্রন্থ তাম্রলিপিতে খােদিত হইয়া প-মধ্যে রক্ষিত হইতেছে••• বৌদ্ধ সম্রাট কণিষ্কের যুদ্ধপিপাসা কিন্তু মেটে নাই.••সারাজীবন ধরিয়া তিনি যুদ্ধই করিতেছেন•• কাশগড়, খােটান, ইয়াৰখণ্ড, চীনকণিষ্কের সৈন্যেরা সর্বত্র বিজয়পতাকা হস্তে বিরাজমান••• যুদ্ধের আলায় পাগল হইয়া শেষে তাঁহার সেনাপতিরা কণিষ্ককে গলা টিপিয়া হত্যা করিল... কোলাহল, অন্তদ্বন্দ্ব, অন্ধকার••• একশতাব্দীব্যাপী অন্ধকার.... ধীরে ধীরে অন্ধকার আবার স্বচ্ছ হইয়া আসিতেছে••• চন্দ্রগুপ্ত গুপ্তসাম্রাজ্য স্থাপন করিতেছেন••• লিচ্ছবি-রাজকুমারী কুমারী দেবীর যােগ্য সন্তান সমুদ্রগুপ্তের কিরণে সমস্ত ভারতবর্ষ উদ্ভাসিত-• তিনি শুধু সম্রাট নন, তিনি কবি, পণ্ডিত, সুরশিল্পী:•• দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত•• কুমারগুপ্ত স্কন্দগুপ্ত•••ফাহিয়ান ভারত ভ্রমণ করিতেছেন••• অজন্তার গুহায় শিল্পীরা প্রাচীর-চিত্রণে রত••• হুন দস্যরা ভারত আক্রমণ করিল••• গুপ্তসাম্রাজ্যের সমস্ত ঐশ্বর্য, সমস্ত সৌন্দর্য অবলুপ্ত হইয়া যাইতেছে••• দস্যু তােরমান মহারাজাধিরাজ হইলেন... তাহার পর মিহিরগুলা... মালবের অধিপতি যশােধর্মণ মগধের অধিপতি বালাদিত্যের সহিত মিলিত হইয়া মিহিরগুলাকে পরাজিত করিলেন••• তাহাকে বন্দী করিলেন, কিন্তু হত্যা করিলেন না••• মিহিরগুলা কাশ্মীররাজের আতিথ্য গ্রহণ করিতেছে: বিশ্বাসঘাতক মিহিরগুলা••• কাশ্মীর-সিংহাসন অধিকার করিল••• হাহাকারে চতুর্দিক পূর্ণ... মিহিরগুলার অত্যাচারে বুদ্ধ-খ্রমণ-শ্ৰমণীরা সন্ত্রস্ত••• বৌদ্ধ ভূপ, বৌদ্ধ মন্দির ভাঙিয়া পড়িতেছে ৩০০ •••হুন-প্ৰতাপ নির্বাপিত হইয়া আসিল•• দ্য হুন অবলুপ্ত হইয়া রূপান্তরিত হইল ভারতবর্ষের রাজপুত জাতিতে•• হর্ষবর্ধন••• গৌড়াধিপতি শৈব রাজপুত্র শশাঙ্ক থানীশ্বররাজ বৌদ্ধ হর্ষবর্ধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিতেছেন•••হিউয়েন সাং••• তাহার পর অন্ধকার••• আবার যুদ্ধ যুদ্ধ·•• গৃহবিবাদ•• চীৎকার••• হাহাকার•••আবার আলাে••• বিরাট জনতা এক বিরাট সিংহাসন মাথায় করিয়া বহিয়া আনিতেছে•••সিংহাসনের উপর প্রজা-নির্বাচিত রাজা গােপালদেব.•• ধর্মপাল দিগ্বিজয়ে বাহির হইয়াছেন••• দেবপাল••তাহার পর আবার অন্ধকার••• কাবুলে শাহী-বংশীয় জয়পাল মাথা তুলিতেছে••• সবুক্তগীন ভারতবর্ষ আক্রমণ করিল••• চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়িয়াছে••• কাণ্যকুজ চৌহান চল্লে সকলে ছুটিয়া আসিতেছেন: সবুক্তগীনকে কিন্তু রােধ করা গেল না•••সিন্ধুনদের তীরে তীরে সবুক্তগীনের বিজয়- পতাকা উড়িতেছে••• গজনী হইতে ছুটিয়া আসিল আর এক দস্যু••• সুলতান মামুদ••• আবার জয়পাল তাহাকে বাধা দিতে অগ্রসর হইলেন •••পারিলেন না ক্ষোভে অপমানে তিনি স্থির করিতেছেন—প্রাণ দিব, কিন্তু মান দিব না••• জীবন্ত জ্বলন্ত চিতায় আরােহণ করিলেন••• সুলতান মামুদের লুণ্ঠন-লিগা মিটিল না••• বারম্বার আসিতেছে... বারম্বার আক্রমণ করিয়া হত্যায় লুণ্ঠনে ধ্বংসে বিচূর্ণিত দেব-মন্দিরে ভারতবর্ষে মুসলমান-বিদ্বেষ বপন করিয়া যাইতেছে••• মুলতান, থানেশ্বর, সােমনাথ সব গেল.•• সুলতান মামুদের সৈন্যবাহিনী হইতে সহসা একটি লােক বাহির হইয়া আসিলেন। যােদ্ধা নয়, পণ্ডিত। যতীনের, দিকে চাহিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন••• যতীন। কে আপনি? লােকটি। আমার নাম আলবেরুনি। একটিমাত্র খবর দিতে চাই কেবল। সে সময় তােমাদের দেশে সাহিত্য-দর্শন খুব উচুদরের ছিল•••কিন্তু একটা কি জিনিস দেখেছিলাম জান ? তােমরা মানুষের স্বপ্ন-সম্ভব মধ্যে ‘মেচ্ছ’ আবিষ্কার করেছ। বিদেশী চুলে জল তাে বটেই, আগুনও অপবিত্র হয়ে যেত। কি ভয়ানক। ৪০০ | ০ ০ আলবেরুনি অদৃশ্য হইয়া গেলেন। আবার ছবির মিছিল শুরু হইল। •••বৃদ্ধ দীপঙ্কর অতীশ হিমালয় লঙ্ঘন করিয়া তিব্বতে চলিয়াছেন•• বঙ্গদেশে সেন-বংশ রাজত্ব করিতেছে••• কর্ণাটের সেনবংশ বাংলায় আসিয়া বৌদ্ধ-দলনে নিযুক্ত•• বিজয় সেন•••বল্লাল সেন•••কাণ্যকুজ হইতে পঞ্চ ব্রাহ্মণ আসিয়া কৌলিন্য স্থাপন করিলেন••• অন্ধকার লক্ষ্মণ সেন••• বাংলায় পাঠান সৈন্য প্রবেশ করিতেছে•••সপ্তদশ অশ্বারােহীর পুরােভাগে বক্তিয়ার খিলিজি••• খিলিজিবংশের রাজত্ব শুরু হইয়া গেল,•• পিতৃব্যরক্তরঞ্জিত হস্তে আলাউদ্দিন খিলজি সিংহাসনে আরােহণ করিল.•• গুজরাটের রাণী কমলা দেবী বন্দিনী হইয়া আলাউদ্দিনের হারেম-কারাগারে প্রবেশ করিতেছেন•••রূপসী হিন্দুনারীর লােভে পাঠান পাগল হইয়া উঠিয়াছে••• মেবার আক্রমণ করিল••• চিতােরে দলে দলে মেবারী সৈন্য প্রাণ দিতেছে•••একজন পুরুষ বাঁচিয়া থাকিতে তাহারা চিতােরে পাঠানকে প্রবেশ করিতে দিবে না:•• গােরা কিশাের বাদলও সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দিল...কিন্তু চিতাের রাখিতে পারিল না...পাঠান সৈন্য অগণিত—চিতােরে প্রবেশ করিয়া আলাউদ্দিন দেখিল, পদ্মিনী নাই.• দাউদাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে•••জহরতের জহর খিলিজি-বংশকে ছারখার করিয়া দিল... পদ্মিনীর চিতার আগুনই যেন লেলিহান শিখায় মূর্ত হইল তৈমুরলঙ্গে চতুর্দিক শবাকীর্ণ..নরমুণ্ডের পাহাড়•• রক্ত-কদমে দিল্লীর সুলতান- বংশ ধরাশায়ীরাজ গণেশ মাথা তুলিয়াছেন••• খ্রীষ্টান ইউরােপীয় বণিকেরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করিল•• পতুগীজ জলদস্যরা অত্যাচার করিয়া বেড়াইতেছে লােদী-বংশ•••তাহাও বেশি দিন টিকিল না••• পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লােদী বাবরের নিকট পরাজিত হইল••• মােগল সাম্রাজ্য•• হুমায়ুন•• শের শাহ••• হুমায়ুন নিজ ভ্রাতা স্বপ্ন-সম্ভব কামরানের চক্ষু উৎপাটন করিতেছেন••• আকবর•••আকবরের রাজ্য- বিস্তার••• বাংলার পাঠান-নায়ক হিমু পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবরের নিকট পরাজিত হইলেন—বৈরামের হস্তে তাঁহার মুণ্ড স্কন্ধচ্যুত হইতেছে••• গুজরাট, খাণ্ডোয়ানা, আহমদ-নগর, অম্বর, সব গেল••• অম্বরপতি ভগবানদাস সম্রাট আকবরের শ্যালক হইলেন তাঁহার পুত্র মানসিংহ হইলেন যুবরাজ সেলিমের শ্যালক। পাহাড়ের মত মাথা উচু করিয়া রহিলেন কেবল উদয়পুরের রাণা প্রতাপসিংহ••• আকবরের খুশরােজ•••সম্রান্ত হিন্দু-পুরনারীরা আকবরের উদ্যান- উৎসবে সমবেত হইতেছেন••• সেলিম জাহাঙ্গীর হইল•• বর্ধমানের শের আফগান•••স্বামী-হন্তা জাহাঙ্গীরের পাশে নূরজাহান শােভা পাইতেছেন••• ইংলণ্ডরাজ প্রথম জেমসের দূত সাটমাস রাে জাহাঙ্গীরের সভায় আসিয়াছেন•• শাহজাহান•••নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা খসরুর চক্ষু উৎপাটন করিয়া পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া সিংহাসন অধিকার করিলেন•••কনিষ্ঠ ভ্রাতা শারিয়রও রক্ষা পাইলেন না••• ইংরেজ বণিক হুগলিতে কুঠি স্থাপন করিতেছে.•• ময়ুর-সিংহাসন••• তাজমহল ভ্রাতৃরক্তে স্নান করিয়া বন্দী পিতার চোখের সামনে ঔরঙ্গজেব ময়ুর সিংহাসন দখল করিতেছেন•••এক হাতে কোরাণ আর-এক হাতে কৃপাণ••• জিজিয়া কর পুনরায় প্রবর্তিত হইতেছে••• পর্বতের শিখরে শিখরে গৈরিক পতাকা উড়িতেছে••• মহারাষ্ট্রবীর ছত্রপতি শিবাজী মাথা তুলিয়াছেন•••অশ্বারােহণে চতুর্দিকে ছুটিয়া বেড়াইতেছেন••• ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে, গেলেন•••দাক্ষিণাত্যেই তাঁহাকে শেষ-শয্যা পাতিতে হইল••• মােগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি শিথিল হইয়া আসিতেছে... নাদির শাহ...দিল্লীর লােমহর্ষণ হত্যাকাণ্ড.••সারি সারি মৃতদেহ••সারি সারি উট চলিয়াছে...বহু অশ্ব•••কাতারে কাতারে গাড়ি•• ময়ুর- সিংহাসন, কোহিনুর, কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা—ভারতবর্ষের বিপুল ঐশ্বর্য নাদির শাহ বহিয়া লইয়া চলিয়াছে••• মারাঠার অভ্যুদয়••• পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ•• সারি সারি তিন শত তােপ, দ্বাদশ সহস্র তােপরক্ষক ।
তাহার পিছনে চল্লিশ সহস্র ভােসলে, বিংশ সহস্র আরব, ত্রিশ সহস্র হাবসি, চল্লিশ সহস্র পাঠান, জাঠ, রােহিলা, সিন্ধি, জাদব, বহু রাজপুত, জকোজি সিন্ধিয়া এবং মহলর রাও হােলকারের নেতৃত্বে আহমাদ শাহ দুরানির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান•••মধ্যস্থলে সেনাপতি ভাউসাহেব•••ঈর্ষাদগ্ধ বিশ্বাসঘাতক বলবন্ত রাও সেঁচলের চোখে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়া উঠিতেছে••• মহারাষ্ট্রশক্তির পরাজয় ঘটিল••• আবার অন্ধকার•••ইংরেজ বণিকের দল•••ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি•••ফরাসী বীর ডুপ্লে•• প্রথম কর্ণাট যুদ্ধ•••দ্বিতীয় কর্ণাট যুদ্ধ·••রবার্ট ক্লাইভ•••সিরাজদ্দৌলা•• মীরজাফর•••পলাশীর যুদ্ধ·••ওয়ারেন হেস্টিংস••নন্দকুমারের ফাঁসি লর্ড ডালহৌসি••দেখিতে দেখিতে সব লাল হইয়া গেল••সিপাহী বিদ্রোহ••• রুটি ও লালপদ্ম••• সিপাহী-বিদ্রোহের অবসান ঘটিল•• ইংরেজের ভীষণ প্ৰতিশােধ••• বিশেষ করিয়া মুসলমানদের উপর অত্যাচার•••দিল্লীর হত্যাকাণ্ড নির্মমতায় নাদির শাহকে অতিক্রম করিল সুরেন বাড়•ে••কংগ্রেস••বঙ্গবিচ্ছেদ•••সাগ্নিক বিপ্লবীর দল••• এক হাতে গীতা, আর-এক হাতে বােমা••• সারি সারি সি- কাঠে অসংখ্য মড়া ঝুলিতেছে••• অরবিন্দ, সুভাষ বসু, চিত্তরঞ্জন••• জালিয়ানওয়ালাবাগ বুকে হাঁটিয়া সকলকে পথ অতিক্রম করিতে বাধ্য করা হইতেছে••• চাবুকের চোটে সকলের পিঠের চামড়া ক্ষত- বিক্ষত হইয়া গেল••চতুর্দিকে হত্যা আর হাহাকার••• যতীন আর সহ করিতে পারিতেছিল না। ৫০০ যতীন। আর তাে দেখা যায় না•••এ ছাড়া আর কিছু নেই। ইতিহাস। না, এরাও আছে- এক জ্যোতির্ময় পটভূমিকায় আসিয়া দাড়াইলেন—বাল্মীকি, ব্যাস, কপিল, কণাদ, গৌতম, সাতঞ্জল, জৈমিনি, চরক, নাগাজুন অশ্বঘােষ, বসুমিত্র, হরিসেন, কালিদাস, ভবভূতি, ভাস, শঙ্করাচার্য রামানুজ,
স্বপ্নব
বাণভট্ট, সুবন্ধু, ভাবী, শ্রীহষ, মাঘ, কহন, বিন, নন্দী, আর্যভট্ট,
বরাহমিহির, ভাস্করাচার্য, খনা, লীলাবতী, রঘুনন্দন, মাধবাচার্য, রামানন্দ,
কবীর, নানক, গুরুগগাবিন্দ সিং, চৈতন্য,
ফৈজি, আবুল ফজল,
টোডরমল, তানসেন, বীরবল•••তাহার পর কিছুক্ষণ অন্ধকার•••পটভূমিকা
আবার উজ্জ্বল হইয়া উঠিল•••দেখা গেল রামমােহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র,
শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ•••তাহার পর ধীরে ধীরে ফুটিয়া
উঠিল মহাত্মা গান্ধীর ছবি.••অসহযােগ অন্দোলন•••চম্পারণ সত্যাগ্রহ•••
দাণ্ডি অভিযান•••শীর্ণকান্তি খর্ব ব্যক্তিটি লাঠির উপর ভর দিয়া হাঁটিয়া
চলিয়াছেন•••নগ্নগাত্র পরিধানে শুভ্র খদ্দরের কটিবাস••পশ্চাতে
বিরাট জনতা আব্রাহ্মণ চণ্ডাল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সব চলিয়াছে•••
জনতার ভিতর হইতে গুঞ্জন উঠিতেছে•••জনতার দৃশ্য মিলাইয়া গেল।
ইতিহাসও অদৃশ্য হইলেন। কিন্তু গুঞ্জনটা থামিল না। ঘাড় ফিরাইয়া
যতীন দেখিল, ভ্রমরটা ঘরের ভিতরে গুনগুন করিয়া বেড়াইতেছে।
কখন ঢুকিয়াছে, সে টের পায় নাই।
যতীন। তুমি আবার এলে যে?
মর। আমি খুঁজছি।
যতীন। কাকে ?
ভ্রমর। তাকে।
যতীন। কে সে ?
ভ্রমর। তা তাে জানি না।
যতীন। যাকে জান না, তাকে খুঁজছ ।
ভ্রমর। জানি, কিন্তু তােমাকে বােঝাতে পারব না।
আর
বাহিরে পাখির সুর শােনা গেল-ফটিক জল, ফটিক জল।
একটা দৃশ্য চকিতে ফুটিয়া মিলাইয়া গেল। নােয়াখালির জঙ্গলে
স্বপ্ন-সম্ভব
মহাত্মাজী অন্ধকারে কি যেন খুঁজিয়া বেড়াইতেছেন—সঙ্কীর্ণ সাঁকো
পার হইবার চেষ্টা করিতেছেন।
যতীন। আমি কিন্তু যা জানি, তা তােমাকে বােঝাতে পারি।
ভ্রমর। তার মানেই, ঠিক জান না।
যতীন। জানি না ? বল কি ?
অন্তরের গভীর অনুভূতি কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়?
ভ্রমর।
সহসা এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটিল। ভ্রমর দেখিতে দেখিতে উপনিষদের
ঋষি-মূতি পরিগ্রহ করিল। তপ্তকাঞ্চনসন্নিভ বর্ণ, পিঙ্গল কেশ, নীল
নয়ন, ঋজু সমুন্নত দেহ, জ্যোতির্ময়।
উপনিষদের ঋষি। যস্যামতং তস্য মতং মতং যস্য ন বেদ সংযে
ভাবে, আমি জানিয়াছি, সে জানে নাই ; যে মনে করে, আমি জানি
, সে-ই জানিয়াছে।
•
ঋষি ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হইলেন।
লাগিল।
ভ্রমর আবার ঘুরিয়া বেড়াইতে
যতীন। অজানাকে খুজবে তা হলে কোন্ পথে ?
ভ্রমর। অজানা পথে।
যতীন। কিন্তু তুমি তাে ঘুরে বেড়াচ্ছ আমার ঘরের মধ্যে, এর
সমস্তই তাে জানা তােমার।
ভ্রমর। জানার মধ্যেই অজানা থাকে। আপাত-তৃপ্তির মধ্যেই
লুকিয়ে থাকে যেপিপাসা, সেই অজানা পথের সন্ধান দেয়।
বাহিরে শােনা গেল-ফটিক জলফটিক জল
স্বপ্ন-সম্ভব
ভ্রমর। আমি চললাম। তােমাকে বলা রইল, একটু খোজ
রেখাে।
যতীন। কিসের খােজ রাখব, তাই তাে বুঝতে পারলাম না!
ভ্রমর। খোঁজ পেলেই বুঝতে পারবে। চললাম।
ভ্রমর চলিয়া গেল। অশরীরী মেজদি প্রবেশ করিলেন।
মেজদি।
ও মিছে কথা বলে নি। আমারও মনে হচ্ছে, এই যে
আমার মাথার দপদপানি, হাতের কনকনানি, বুকের ভেতর হু-হু
করছে, এর আসল কারণ, তাকে খুঁজে পাই নি। দেখি—
-
অসহায়ভাবে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, তাহার পর ধীরে ধীরে
বাহির হইয়া গেলেন। সশরীরে রুমি প্রবেশ করিল। মুখ অতিশয়
গম্ভীর, মনে হইতেছে, যেন চোখে মুখে ঝঙ্কা স্তব্ধ হইয়া আছে।
রুমি। আজকের পত্রিকাটা কি এখানে ?
যতীন। হ্যা।
কুমি। নােয়াখালির খবর পড়েছ ?
যতীন। পড়েছি।
কুমি। আমি নীচে বাংলা কাগজটায় পড়লাম। কি ভয়ানক!
একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ঘনাইয়া উঠিল।
রুমি। এখানেও দাঙ্গা লেগেছে। নীচে বৈঠকখানায় প্রকাণ্ড
মীটিং। বড়দা মেজদা দুজনেই ক্ষেপে গেছেন। সেজবউদির ঘন ঘন
ফিট হচ্ছে-নীলু-বিলুর কোনও খবর আসে নি।
যতীন। নীলু-বিলু নােয়াখালি থেকে ঢাকায় চলে এসেছে হয়তাে,
ওদের সকলেরই তাে ঢাকা আসার কথা।
সুখ-শব রুমি। কেন যে সেজবউদি ওদের মামার বাড়ি পাঠাতে গেল এখন! যতীন। ছুটিতে বেড়াতে গেছে, এমন হবে কে জানত? রুমি। তুমি ওটা কি লিখেছ ? যতীন। না, এখনই চাই নাকি? রুমি। না, থাক্, এখন দরকার নেই। ও পরে হলেও চলবে। এখন [ একটু ইতস্তত করিয়া ] আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবে ছােটা। হাতে টাকা আছে তােমার? যতীন। কেন? রুমি। আমি মােয়াখালি যাব। যতীন। নােয়াখালি! একা ? রুমি। হ্যা, একাই। সেখানে নীলু বিলু আছে, তা ছাড়া মেয়েদের উপর যে ভীষণ অত্যাচার হয়েছে, তা শুনে এখানে স্থির হয়ে বসে থাকা অসম্ভব আমার পক্ষে। আমাকে যেতেই হবে। যতীন। চল, আমিও না হয় যাই তাের সঙ্গে। তা গেলে তাে ভালই হ'ত, কিন্তু এখন তােমার যাওয়া হবে না। বড়দা মেজদা ঠিক করেছেন এখনই বেরিয়ে যাবেন, সেজদা ঠাকুরঘরে গিয়ে খিল দিয়েছেন। কেউ বাড়িতে থাকবে না, বড়দা ঠিক করেছেন, তােমাকেই বাড়ি আগলাতে হবে। পাড়ায় কোথায় কোন্ ভলান্টিয়ার থাকবে, তাই ঠিক হচ্ছে। এই ফাঁকে আমি চুপিচুপি চলে যেতে চাই স্টেশনের দিকে খিড়কি দিয়ে। ট্রেন ছাড়বার আগে ওঁরা যেন ঘুণাক্ষরে জানতে না পারেন, দেখােত হলে কিছুতেই যেতে দেবেন না আমাকে। আমি কিন্তু যাবই—টাকা আছে তােমার কাছে স্কলারশিপের টাকাগুলাে তাে তােমাকে রাখতে দিয়েছিলাম, কোথা রেখেছে সেগুলাে? যতীন। টাকা আছে। কিন্তু তােকে ওই বিপদের মধ্যে যেতে দিতে আমারও ইচ্ছে করছে না রুমি। রুমি। । তাে ? আমার
রুমি। [ দৃঢ়স্বরে) আমি কিন্তু যাব।
যতীন। [ হাসিয়া ] টাকা যদি না দিই ?
রুমি। হেঁটে যাব। কি করে বলছ তুমি এ কথা ছােটা।
মেয়েদের এতবড় অপমান সহ্য করব ঘরে বসে বসে ?
যতীন। গিয়েই বা কি করবি তুই ?
রুমি। সমস্ত প্রাণ তুচ্ছ করে ঝাপিয়ে পড়ব তাদের মাঝখানে,
সমস্ত বুক দিয়ে আগলাব, সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করব।
যতীন। কিন্তু
রুমি। দাও, টাকা দাও। না দিলে এই দেওয়ালে মাথা ঠুকে
মরব আমি। উঃ, কি অসহায় করে রেখেছ তােমরা আমাদের।
যতীন। পুরুষের কর্তব্য নারীদের রক্ষা করা, তাই বলছি।
রুমি। তােমরা নিজেদেরই রক্ষা করতে পার না, আমাদের রক্ষা
করবে কি করে? রক্ষা করবার অজুহাতে পঙ্গু করে রেখেছ শুধু।
দাও, [ প্রায় চীৎকার করিয়া ] দাও না
যতীন। দিচ্ছি, দিচ্ছি। দাদারা বেরিয়ে গেলে তবে তাে যাবি,
ব্যস্ত কি?
রুমি। ট্রেনের বেশি দেরি নেই। আমি খিড়কি-দরজা দিয়ে
এখনই বেরিয়ে যেতে চাই।
যতীন।
তাের ভয় করছে না ?
রুমি। ভারতবর্ষের মেয়েরা আবার ভয় করেছে কবে! গার্গী
মৈত্রেয়ী থেকে শুরু করে অহল্যাবাঈ, রাণী ভবানী, কস্তুরবা গান্ধী,
সরােজিনী নাইডু, কমল নেহেরু, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, বীণা দাস,
প্রীতি ওয়ার্দার, সুচেতা কৃপালনীর যা ইতিহাস, তা কি ভয়ের
ইতিহাস?
রুমির চোখ মুখ হইতে এক অপরূপ আলো বিকীর্ণ হইতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে তাহার সমস্ত দেহটাই জ্যোতিতে রূপান্তরিত হইয়া
বংশব
গেল। সেই জ্যোতি ভেদ করিয়া আবিভূত হইলেন রাণী দুর্গাবতী
ও চাঁদ সুলতানা
রাণী দুর্গাবতী। তােমরা এর মধ্যেই কি করে ভুলে গেলে যে,
এই সেদিনই সম্রাট আকবরের বিপুল বাহিনীকে তুচ্ছ করে সামান্য
রাজপুতানী আমি সম্মুখসমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, প্রাণ দিয়েছিলাম,
কিন্তু মান দিই নি ?
চাঁদ সুলতানা। মান দেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না ভারতবর্ষের
নারীরা। তারা জানে, নারীদের অপমান করে যে শয়তানরা, আসলে
তারা দুর্বল ভীরু। তাদের হুমকিতে ভয় পায় নি কখনও আত্মসম্মানবতী
ভারতরমণী। তাই শয়তান মােরাদের বিরুদ্ধে ভগ্ন দুর্গ-প্রাকারে দাড়িয়ে
অসিহস্তে যুদ্ধ করতে করতে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছিলাম নির্ভয়ে।
কারণ মুসলমানী হলেও আমি ভারতরমণী। প্রাণ দিয়েছিলাম কিন্তু
মরি নি, আজও আমরা বেঁচে আছি এদের মধ্যে
হস্ত প্রসারিত করিলেন। জ্যোতির্ময় দৃশ্য মুছিয়া গেল। যতীন
দেখিল, রুমি সম্মুখে দাড়াইয়া আছে—প্রদীপ্তনয়না, স্ফুরিতাধরা,
বি
রুমি। আমি আর দাড়িয়ে থাকতে পারি না ছােটা, দেবে
তে দাও।
যতীন। এই যে দিচ্ছি। আজ ডাক আসে নি ?
রুমি। আমার একখানা চিঠি এসেছিল শুধু।
যতীন। কার চিঠি ?
রুমি। উষা লিখেছে।
যতীন।
সমরের বােন উষা?
রুমি। হঁ্যা।
৯
স্বপ্নসম্ভব
যতীন। সমরের খবর কি ?
রুমি। সমর নােয়াখালিতে গুণ্ডার হাতে মারা গেছে।
সে কি!
যতীন।
যতীন নির্নিমেষে রুমির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। রুমির মুখের
একটি পেশীও বিচলিত হইতেছে না•••চোখের দৃষ্টি কঠোর প্রদীপ্ত।
শাণিত অসির মত।
রুমি। কতক্ষণ আমাকে দাড় করিয়ে রাখবে ছােটদা?
যতীন। এই যে দিচ্ছি।
তাড়াতাড়ি উঠিয়া টাকা বাহির করিয়া দিল। রুমি চলিয়া গেল।
যাইকর সঙ্গে সঙ্গে যতীন কেমন যেন অস্বস্তি বােধ করিতে লাগিল।
তাহার কেবলই মনে হইতে লাগিল, সকলে, এমন কি রুমিও, কর্তব্যে
তৎপর হইয়া উঠিয়াছে, সে-ই কেবল অলসের মত বসিয়া স্বপ্নের জাল
বুনিতেছে। পাড়ার শৈলেনবাবু আসিয়া প্রবেশ করিলেন। শৈলেন
তথাকথিত কমিউনিস্ট।
শৈলেন। তুমি কি করছ হে যতীন, তেতলার ঘরে বসে ? যুদ্ধে
যাবে না। তােমার দাদারা তাে সম্মুখসমরের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন।
যতীন। সম্মুখসমরের জন্যে ! তাই নাকি?
শৈলেন। হ্যা, ওদের বস্তিটা আক্রমণ করবার আয়ােজন হচ্ছে।
যতীন। আপনিও যাবেন?
শৈলেন। আমি ? [ হাসিলেন ] না, আমি যাব না। [ গম্ভীর
হইয়া গেলেন। পুনরায় হাসিয়া ] যেতাম, যদি তোমার বড়দার মতের
সঙ্গে সায় দিতে পারতাম। কিন্তু পারলাম না। আমি মনে করি,
মুসলমানদের পাকিস্তানের দাবিটা সঙ্গত দাবি। সেটা মেনে নিলে
৫
স্বপ্ন-সব আর ঝগড়া থাকে না। হাজার মারপিট করেও কোন ফল হবে না, যতক্ষণ না আসল সমস্যাটার সমাধান হচ্ছে। তােমার কি মত? যতীন। আমার তাে মনে হয়, আপাতত আমাদের আসল সমস্যা পরাধীনতা। আমাদের সকলেরই আগে চেষ্টা করা উচিত তার থেকে মুক্তি পাবার। স্বাধীনতা-অর্জনের চেষ্টায় যারা বাধা দেবে, তারাই আমাদের শত্রুতা সে হিন্দু মুসলমান যেই হােক। শৈলেন। পাকিস্তান যারা চায়, তারাও ঠিক ওই কথা বলছে। কিন্তু স্বাধীনতা পাবার আগে তারা জানতে চায়, ভবিষ্যতে স্বাধীন ভারতে তাদের অবস্থাটা কি হবে অর্থাৎ তাদের ধর্ম সংস্কৃতি অক্ষুন্ন থাকবে কি না! যে দেশে শতকরা পঁচাত্তর জন হিন্দু, সেখানে তাদের এ দাবিটা কি অগ্রাহ্য করবার মত? যতীন। দাবিটা গ্রাহ্য করবার মত হলে কেউ তা অগ্রাহ করত , করতে পারত না। ইতিহাসের দিক দিয়ে পাকিস্তানের কোন ভিত্তি নেই। ভৌগােলিক ঐক্য যে নেই, তা আশা করি আপনিও মানবেন। পূর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের মধ্যে সহস্র মাইলের ব্যবধান, দক্ষিণ ভারতের হিন্দুপ্রধান হায়দ্রাবাদ ওসমানিস্তান হবে নাকি শুনছি। সংস্কৃতির দিক থেকেই বা ঐক্য কোথায় ? পেশােয়ারী মুসলমান আর নােয়াখালির মুসলমানের সংস্কৃতি কি এক? ষষ্ঠ শতাব্দীর ইসলাম-সংস্কৃতি কি কোন দেশে আছে এখন আর? বর্তমান ইসলাম-জগৎ অনেক দিন তার থেকে বহুদূরে সরে গেছে, প্রত্যেক ইসলাম-দেশের এখন আলাদা চেহারা, আলাদা আদর্শ। মিশরে অর্ধরাজতন্ত্র, প্যালেস্টাইনে গােলযােগতন্ত্র, সিরিয়াতে প্রজাত, আরবে ইবন সাউদের ইচ্ছাতন্ত্র, ট্রান্সজর্ডনে আমিরতন্ত্র। ইরাকের শিশুরাজাকে কেন্দ্র করে যে রাষ্ট্র গড়ে উঠছে, তা কি ইসলাম-রাষ্ট্র? আফগানিস্তান কার ইঙ্গিতে চলেছে। সুতরাং পাকিস্তানের দাবির যুক্তি কোথায় ? রাষ্ট্রগঠনের পটভূমিকায় যে সব জিনিস থাকা দরকার ভৌগােলিক ঐক্য, সংস্কৃতির ঐক্য, আদর্শ-নিষ্ঠা, আদর্শের সার্বভৌমিকতা স্বপ্ন-সম্ভব -পাকিস্তানের তা আছে কি? যাঁরা আজ পাকিস্তানের পরিকল্পনা করছেন, তাঁরাই কি আচারে ব্যবহারে কর্মে চিন্তায় ইসলাম-আদর্শকে অনুসরণ করেন ? তা ছাড়া আরও একটা কথা। রাশিয়াতে মুসলমান আছে, চীনে মুসলমান আছে, কই, সে সব দেশে তাে পাকিস্তান হয় নি, আর হয় নি বলে যে সে দেশে মুসলমান-সংস্কৃতি লােপ পেয়েছে তাও নয়। শৈলেন। সবচেয়ে বড় যুক্তি-ওরা ভয় পাচ্ছে যে, স্বাধীন ভারতে হিন্দুর প্রাধান্য হলে ওদের অবলুপ্ত হয়ে যেতে হবে। যতীন। [ হাসিয়া ] ভয়টা ওদের নয়, ভয়টা আসলে ইংরেজদের। মুখখাশটা তাে খুলেই গেছে এখন। ওদের মাইনরিটির জন্যে চমৎকার চিন্তা আসলে যে ওদের অচিন্তাচমৎকার, তা আর বুঝতে কারও বাকি নেই। মজ্জমান ইম্পীরিয়ালিজম পাকিস্তান-খড় আঁকড়ে বাঁচতে চাইছে। শৈলেন। সেটা তােমরা বলছ বটে, কিন্তু হিন্দু মেজরিটির হাতে ওরা যে নিরাপদ নয়, সে কথা মানতেই হবে। যতীন। ইতিহাসের নজির কিন্তু অন্য রকম। মােগল সাম্রাজ্যের গৌরবের দিনেও কোনও মুসলমান কি সংস্কৃতিলােপের ভয়ে হিন্দুরাজ্য ত্যাগ করেছে? মানসিংহ রাজমহলে মুসলমানদের জন্য মসজিদ করিয়েছিলেন, রাজা জয়সিংহ করেছিলেন জয়পুরে। মালবের হিন্দু রাজারা মুসলমান প্রজাদের জন্য মক্তব করিয়েছিলেন, মুসলমান মৌলভীদের বৃত্তি দিতে দ্বিধা করেন নি। ঔরংজেবের অত্যাচারেই বরং শিয়া মুসলমানেরা দাক্ষিণাত্যে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। হিন্দুরাজ্যে যৌথভাবে মুসলমাননারী-নির্যাতনের কটা দৃষ্টান্ত দিতে পারেন আপনি? ঔরংজেব-মহিষী শিবাজীর হাতে বন্দিনী হয়েও সসম্মানে স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। খোঁজ করে দেখুন, প্রত্যেক হিন্দু রাজার অধীনে 'সব সময়েই মুসলমানের স্বেচ্ছায় সৈ-বিভাগে চাকরি করত। মারহাট্টারাই বিজাপুর-গােলকুণ্ডা-পতনের পর আশ্রয় দিয়েছিল ত 10) মুসলমানদের। বার-ভুইঞার মধ্যে মাত্র তিনজন মুসলমান ছিলেন। চান রায়ের ভগ্নী সােনামনিকে হরণ করেই তাে ইসা খা মুসা খাঁর রাজ্য ধ্বংস হ’ল। মুসলমান রাজত্বের অবসানে মুসলিম অত্যাচারের ভয়ে মধ্যভারত থেকে মুসলমানরা দলে দলে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে—হিন্দুরাজ্যে। বিচার করে দেখলেও এটা বােঝ। শক্ত নয় যে, হিন্দুধর্ম ই একমাত্র ধর্ম, যা শুধু ইসলামকে কেন, যে কোন ধর্মকেই প্রসন্নচিত্তে আশ্রয় দিতে পারে। কারণ সনাতন হিন্দুধর্মের কোনও গণ্ডি নেই, কোনও বেড়া নেই, অসীম উদারতাই এর বিশেষত্ব। মুসলমানদের ভয়টা অমূলক, অখণ্ড ভারতে ওর আনন্দেই থাকবে। শৈলেন। [ হাসিয়া ] দেখ ভায়া, যা আওড়ালে তা, কেতাবের মুখস্থ বুলি। হিন্দুধর্মের উদারতার নজির দেখতে পাবে পাড়াগাঁয়ের পুকুরঘাটে গেলে। হিন্দুর ঘাটে মুসলমান জল নিতে পায় না, হিন্দুর গ্রামে মুসলমানের কোরবানি করবার উপায় নেই। হিন্দুধর্মের উদারতার ঠেলায় আর একটা নতুন জাতই তৈরি হয়ে উঠছে শিডিউলড কাস্ট। যতীন। সেটা হিন্দুধর্মের দোষ নয়, অশিক্ষার দোষ। বহুদিন পরাধীন থেকে আত্মবিস্মৃত হয়েছি। শিডিউলড কাস্ট—এখনকার বুলি। ভারতের সনাতন ধর্ম যে অস্পৃশ্যকে ঘৃণা করে নি, তার প্রমাণ কবীর, নানক, দাদু, রজ্জব, কত নাম করব ? না, স্বাধীন ভারতে ভারতধর্ম ই প্রতিষ্ঠিত হবে, অস্পৃশ্যতা বলে কিছু থাকবে না। থেকেই তা দূর করবার চেষ্টা চলেছে। সফলও হবে সে চেষ্টা। ওর জন্যে ভারতবর্ষকে টুকরো টুকরাে করার দরকার নেই। অখণ্ড ভারতই আমাদের কাম্য। শৈলেন। 'আচ্ছা, হঠাৎ আজ তােমরা অখণ্ড ভারতের ধুয়াে তুলেছ কেন, বুঝি না। অখণ্ড ভারত কি ছিল কোনকালে ? রামায়ণ- মহাভারতের আমল থেকেই দেখ না, পঞ্চাশটা দেশের পঞ্চাশটা রাজা ৭ ৭ বাব: পরস্পরের মধ্যে মারামারি করছে। আরও এগিয়ে এস, থানীশ্বরের সঙ্গে মৌখরী, গৌড়ের সঙ্গে থানীশ্বর, পৌণ্ডের সঙ্গে বঙ্গ, বঙ্গের সঙ্গে সমতট—কেবল যুদ্ধ আর যুদ্ধ। আর সকলের মূলে ওই সেলফ- ডিটারমিনেশন—প্রত্যেকেই নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে চায় এবং প্রচার করতে চায়। কারও দেবতা বিষ্ণু, কারও শিব, কেউ বৌদ্ধ, কেউ শাক্ত। এ ছাড়া আর কি আছে? ক্রমাগত দেখে যাও, এই পাবে। এই যাদের ইতিহাস—মানে, দেশের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-হঠাৎ তাদের আজ অখণ্ড ভারত বলে চীৎকার করবার মানে ? যতীন। কারণ ওইটেই আদর্শ। ইতিহাসেই দেখা গেছে, যখনই ভারত অখণ্ড হয়েছে কিংবা অখণ্ডতার কাছাকাছি এসেছে, তখনই তার সমৃদ্ধি। চন্দ্রগুপ্ত, অশোেক, হর্ষবর্ধন, ধর্মপাল, আকবর প্রভৃতি তার উদাহরণ, এমন কি ইংরেজ-রাজত্বের নিষ্ঠুর শােষণ সত্ত্বেও আমাদের যা কিছু উন্নতি তা ভারতের অখণ্ডতার জন্যে—ভারতের স্বাধীন রাষ্ট্রতন্ত্রে তাই আমরা অখণ্ডতা চাই। শৈলেন। কিন্তু এই ছত্রিশ জাতের মধ্যে অখণ্ডতা রাখতে হলে যে নিরপেক্ষতার প্রয়ােজন, তা কি ওই হিন্দু-মেজরিটি স্বাধীন রাষ্ট্রতন্ত্রে থাকবে? বিদেশী ইংরেজের পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা অসম্ভব ছিল তবু কতকটা। সুতরাং মুসলমানদের ভয়টা অমূলক নয়। মেজদা প্রবেশ করিলেন এবং শৈলেনবাবুর কথার খানিকটা শুনিতে পাইলেন। মেজদা। মুসলমানদের ভয়? কে মুসলমানদের ভয় করছে ? যুগল উত্তোলন করিয়া এমনভাবে চাহিলেন, যেন মুসলমান-ভীত কোনও লােকের সান্নিধ্য তিনি সহ করিতে প্রস্তুত নন।
স্বপ্ন-সব
তা না
শৈলেন। [ হাসিয়া ] না, মুসলমানকে ভয় করছে না কেউ।
আমি যতীনকে শুধু বােঝাচ্ছিলাম যে, মুসলমানদের পাকিস্তানের
দাবিটা অসঙ্গত নয় নিতান্ত।
মেজদা। [ অপ্রত্যাশিত রুক্ষকণ্ঠে ] দেখ শৈলেন, তোমার ওই
কমিউনিস্টিক বুজরুকি নিয়ে সরে পড় মানে মানে বলছি।
হলে অপমানিত হবে।
শৈলেন। [ সবিস্ময়ে ] হঠাৎ আমার উপর রাগের কারণ ।
[ হাসিয়া ] যাঃ বাবা!
মেজদা। কারণ তােমাদেরও আমি মুসলমান বলে মনে করি।
মেটিয়াবুরুজে তােমরা যা করেছ, তা কাগজে প'ড়ে অবধি আপাদমস্তক
জ্বলছে। তুমি পাড়ার ছেলে, অনেকদিনের আলাপ, [তিক্ত হাসি
হাসিয়া ] হিন্দু কিনা, তাই এ দুর্বলতাটুকু কাটিয়ে উঠতে পারি নি
এখনও, কিন্তু ব্যারােমিটার যে রকম নাবছে তরতর করে, কি হয়ু বলা
যায় না। স'রে পড়।
শৈলেন। মেটিয়াবুরুজে কোথায় কে কি করেছে তার জন্যে
আমার উপর ঝাল ঝাড়বে! আশ্চর্য বিচারবুদ্ধি তােমার।
মেজদা। সেদিন গােখরাে সাপটা মারবার বেলায় তােমার
বিচারবুদ্ধিও এই রকম ছিল। সে তাে তােমায় কামড়ায় নি কিংবা
কাউকে কামড়াতেও যায় নি, খড়ের গাদায় লুকিয়ে ছিল। মারলে
কেন তাকে ?
শৈলেন। উপমাগুলাে একটু ভদ্রলােকের মত দিলেই ভাল হয়।
মানুষের সঙ্গে সাপের তুলনা যে চলে না, সে বুদ্ধিটুকু তােমার কাছে
প্রত্যাশা করি অন্তত মেজদা।
অনুকম্পাভরে একটি সবজান্তাগােছ হাসি হাসিল
মেজদা। [ সহসা সপ্তমে চড়িয়া ] বেরিয়ে যাও এখান থেকে।
৭২
স্বপ্ন-সম্ভব
ঠাস করিয়া তাহার গালে একটা চড় মারিলেন। শৈলেনবাবু পড়িয়া
যাইতেছিলেন, যতীন ধরিয়া ফেলিল এবং চেয়ারটায় বসাইয়া দিল।
যতীন। ছি ছি, মেজদা, কি করলে তুমি ?
মেজদা। বেশ করেছি। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দূর করে দে। সাপের
জাত। তােকে যা বলতে এসেছিলাম, শে। বড়দা আর আমি
বেরিয়ে যাচ্ছি, এখানেও গােলমাল শুরু হয়েছে, তােমার সেজদা
পূজোর ঘরে, কখন বেরুবেন ঠিক নেই। তােমার উপরই বাড়ির ভার
রইল, কোথাও বেরিও না যেন।
যতীন। আচ্ছা।
৫
মেজদা চলিয়া গেলেন। কিন্তু অশরীরী বেশে তখনই আবার ফিরিয়া
আসিলেন। যতীন শৈলেনবাবুর দিকে চাহিল, দেখিল, তিনি
আশ্চর্যরকম সামলাইয়া লইয়াছেন। এমনভাবে জানালার দিকে
চাহিয়া বহিদৃশ্য দেখিতেছেন, যেন কিছুই হয় নাই। অশরীরী মেজদার
অস্তিত্ব তিনি তানুভবই করিতে পারিলেন না। যতীনের মনের ভাবও
অশরীরী বেশে মূর্ত হইল এবং অশরীরী মেজদার সহিত আলাপ করিতে
লাগিল। শৈলেনবাবু কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। বাহিরের দিকে
চাহিয়া চুপ
করিয়া বসিয়া রহিলেন।
অশরীরী মেজদা। দেখ যতীন, আমার ওই শৈলেনের কাছে
ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পারছি না।
যতীনের মনের ভাব। খামাখা কেন তুমি ওঁকে অপমান করতে
গেলে মিছিমিছি।
অশরীরী মেজদা। কারণ ওকে ঘৃণা করি। [ একটু থামিয়া ] শুধু
ওকে নয়, সকলকে—হিন্দু মুসলমান খ্ৰীষ্টান বাঙালী বিহারী সাহেব
মাড়ােয়ারী আত্মীয় অনাত্মীয়-সক্কলকে। নিদারুণ ঘৃণার উত্তপ্ত
স্বপ্ন-সম্ভব
ঘূর্ণাবর্তে সারাজীবনটা নাকানিচোবানি খাচ্ছি, সর্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে
খাক হয়ে গেল, কিন্তু কি করব- নিজের যুক্তিকে অতিক্রম করতে
পারি না।
যতীনের মনের ভাব। যুক্তি মানে ?
অশরীরী মেজদা। যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখেছি, কোথাও
এতটুকু ভাল দেখতে পাই নি। ধার্মিকের মধ্যে ভণ্ডকে, স্বদেশসেবীর
মধ্যে স্বার্থপরকে, সাহিত্যিকের মধ্যে যশাকাক্ষীকে, বীরের মধ্যে
গোয়ারকে দেখেছি, মাতৃস্নেহেও প্রত্যক্ষ করেছি পাশবিক ক্ষুধা,
পত্নীপ্রেমে যৌন-লালসা, নিপুণ অতিথিপরায়ণতার মধ্যে দেখেছি
বাহাদুরি প্রকাশের চেষ্টা, উপকারীর মধ্যে দেখেছি মতলববাজকে
কোথাও একবিন্দু আলাে দেখতে পাই নি—কোখাও না। এখন যা
করতে যাচ্ছি তা ভাল বলে নয়, বড়দাকে ভয় করি বলে।
যতীন। কিন্তু আললা তাে অনেক আছে মেজদা, তুমি দেখতে
পাচ্ছ না কেন ?
বিস্ফোরণের মত একটা শব্দ হইতেই যতীন ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল,
একটি রক্তবর্ণ ক্ষুদ্র বামনমূর্তি দাঁড়াইয়া আছে—তাহার সর্বাঙ্গ দিয়া
স্পর্ধার লাল আভা বিকীর্ণ হইতেছে। বিস্ফোরণের শব্দটা বােধ হয়
বিস্ফারিত নাসারন্ধ্র হইতে নির্গত হইল।
হইতে নির্গত হইল। চোখের দৃষ্টিতে
ঔদ্ধত্য মূর্ত।
বামন। আমি দেখতে দি নি।
যতীন।
কে আপনি?
বামন। আমি ওর অহঙ্কার।
যতীন। মেজদার অহঙ্কার-বামন !
বামন। বাপের সম্পত্তি ছাড়া আর কি আছে ওর? সারাজীবন
উদ্বাহু হয়ে আছে চাঁদ ধরবে বলে, কিন্তু নাগাল পায় নি, চাদের
.
৭৪ কলঙ্কটাকে নিয়েই মাতামাতি করছে তাই। তােমাদের মধ্যেও আমি আছি, কিন্তু ভিন্ন রূপে। ( হাসিয়া ] চিনতে পারই না তােমার নীল পরীকে? তােমার চোখে আমিই পরিয়েছি স্বপ্নের অঞ্জন, আমিই সুবর্ণখচিত পুষ্পকরথে চড়িয়ে তােমার তােমার বড়দাকে নিয়ে গেছি আভিজাত্যের অলকাপুরীতে, তােমার সেজদাকে বেঁধেছি স্বেচ্ছাবৃত কৃচ্ছসাধনে। | আবার চোখে মুখে স্পর্ধা মূর্ত হইল ] আমিই অসম্ভবকে সম্ভব করি, স্বয়ং বিধাতার সৃষ্টি-প্রেরণার মূলেও আমি বর্তমান। সহসা অদৃশ্য হইয়া গেল। যতীনের চোখে চকিতের মধ্যে আর একটা দৃশ্য ফুটিয়া উঠিল। অন্ধকার গভীর অরণ্য••• একটা জটিল শাখাপত্র- বহুল গাছে একটা ঘড়ি টাঙানাে আছে•••তাহাতে দুইটা বাজিয়াছে••• পাচটা বাজা উচিত•••অরণ্য ভেদ করিয়া অতিকষ্টে মহাত্মাজী অগ্রসর হইতেছেন, ঘড়িটাকে ঠিক না করা পর্যন্ত তিনি থামিবেন না।•••এ দৃশ্যও ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল।---যতীন দেখিল, অশরীরী মেজদা তখনও দাড়াইয়া আছেন। অশরীরী মেজদা। না, কোথাও আলাে দেখতে পাই না। সূর্যের স্পটগুলাের কথাই আগে মনে পড়ে, মেঘের মধ্যে ধূলিকণার অস্তিত্ব কল্পনা করি। বুঝতে পারি যে, আমার মধ্যেও গলদ আছে, কিন্তু স্বীকার করতে পারি না। শৈলেনের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত, কিন্তু পারছি না। চললাম। অশরীরী মেজদা চলিয়া গেলেন। যতীন দেখিল, শৈলেনবাবু ঠিক তেমনিভাবে জানালার দিকে চাহিয়া বসিয়া আছেন। যতীন। [ অতিশয় সঙ্কোচভরে কিছু মনে করবেন না শৈলেন- দা। মেজদা একটু শৈলেন। [ এক মুখ হাসিয়া ] আরে, ওতে মনে করবার কি আছে! তােমার মেজদাকে চিনি না? ছেলেবেলা থেকে দেখছি, চিরকালের গোয়ার-গগাবিন্দ লােক। রাস্তায় একটা বাড়ে যদি তিয়ে দিত, কি আর করতাম। বড়দা প্রবেশ করিলেন। তাঁহার হাতে দুইটি বন্দুক। বড়দা। যতীন, দুটো বন্দুক রেখে যাচ্ছি তােমার কাছে। বাড়ি থেকে এক পা নড়বে না। আমরা দুটো বন্দুক নিয়ে যাচ্ছি, তােমার কাছে দুটো থাক। একটা তােমার জন্যে, আর একটা তােমার সেজদার জন্যে। তােমার সেজদা পূজোর ঘরে, তাই তার হাতে দিয়ে যেতে পারলাম না, তােমার কাছেই থাক্, যদি চায় দিও। ইদানীং পূজো নিয়ে মেতেছে, কিন্তু ও-ই আগে সবচেয়ে ভাল বন্দুক চালাত। আচ্ছা, যাই তা হ'লে। খুব সাবধানে থেকো। ০ বড়দা শৈলেনবাবুর উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়া চলিয়া যাইতেছিলেন। শৈলেনবাবু কিন্তু এ তাচ্ছিল্য সহ করিতে পারিলেন , গায়ে পড়িয়া আলাপে প্রবৃত্ত হইলেন। শৈলেন। আপনারা চললেন তা হলে ? বড়দা। [ অভিজাতসুলভ নম্রতাসহকারে ] যেতেই হবে, না গিয়ে উপায় নেই। তুমি কি এখানেই থাকবে ? মেয়েদেরও নিয়ে এস না হয় এখানে। তােমাদের অঞ্চলটায় ওরা আছে দু-এক ঘর- শৈলেন। না, আমি বাড়ি যাব। [ হাসিয়া ] আমার সে সব ভয় বড়দা। ও, তাহলে সেই ভাল। চা খেয়ে যাও তা হ'লে, চা কি এখানে পাঠিয়ে দিতে বলব? শৈলেন। সে হবে এখন। কিন্তু একটা কথা ০
৭৬
স্বঃ-সব
বড়দা চলিয়া যাইতেছিলেন, কিন্তু কথাটা শুনিবার জন্য ঘুরিয়া
দাড়াইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।
শৈলেন। আমার খুবই আশ্চর্য লাগছে যে, আপনার মত
লােকও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব করতে যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন
ভেবে দেখেছেন কি একবারও?
বড়দা। আমার ব্যক্তিগত ভাবনার স্থান এতে নেই। ডাক
এসেছে, যেতেই হবে। [ হাসিলেন ]
শৈলেন। আপনাদের এই উৎসাহ যদি দেশের প্রােলিটারিয়েটদের
উন্নতি-সাধনে লাগাতে পারতেন, তা হলে একটা কাজের মত কাজ
হত। অ্যারিস্টক্র্যাটদের চাপে মরে গেল যে বেচারারা !
বড়দার চোখের কোণে একটা আলাের দীপ্তি ক্ষণিকের জন্য অলিয়া
উঠিল, কিন্তু পরক্ষণেই হাসির আভায় তাহার জ্বালা নিবিয়া গেল।
শৈলেনের সঙ্গে তর্ক করিয়া তিনি নিজেকে অবনত করিতে চাহিলেন
, একটু মুচকি হাসিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
যতীন। একটু চা খেয়ে যান।
শৈলেন। তা যেতে পারি, কাল থেকে চা খাই নি। আমাদের
বাড়িতে চা ফুরিয়েছে কাল থেকে। [ হাসিয়া ] দোকান-পাট বন্ধ,
কিনতেই পারি নি। একটু তাড়াতাড়ি পেলে ভাল হত, বাড়ি থেকে
অনেকক্ষণ বেরিয়েছি, মেয়েরা ভাবছে হয়তাে।
যতীন। হ্যা, এই যে ছট্ট, চট্ট-এই বেহারী- ওরে, কে
আছিস? 'সব পালিয়েছে বােধ হয়। ওরে ছট্ট
সহসা দ্বারপ্রান্তে অশরীরী বড়দা প্রবেশ করিলেন। তাহার হাতে
রূপার ট্রে, ট্রের উপর অতিশয় মূল্যবান টী-সেট। ট্রেটি সামনের
স্বপ্ন-সব ৭৭ তেপায়ার উপর রাখিয়া নিজহস্তে তিনি চা ছাঁকিতে লাগিলেন। উৎকৃষ্ট দার্জিলিং চায়ের গন্ধে চতুর্দিক আমােদিত হইয়া উঠিল। এক কাপ চা ছাঁকিয়া তিনি শৈলেনের দিকে আগাইয়া দিলেন। বলা বাহুল্য, শৈলেনবাবু কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। যতীনের অশরীরী- মনােভাবের সহিত বড়দার নীরব আলাপ শুরু হইল। •• যতীনের মনােভাব। বড়দা, তুমি কেন চা আনতে গেলে ? অশরীরী বড়দা। কেন, তাতে ক্ষতি কি? অতিথিকে সেবা করলে আভিজাত্য ক্ষুন্ন হয় না। তা ছাড়া আর একটা কারণে এলাম, শৈলেন প্রােলিটারিয়েটদের কথা তুলেছিল। ওর মুখের ওপর জবাবটা দিলে অশােভন হত তাই দিই নি ; তােকে বলে যাচ্ছি, তুই যদি পারিস আভাসে ইঙ্গিতে বলে দিস, [ হাসিয়া ] অভদ্রতা করাে না যেন। আভিজাত্যের সঙ্গে অভদ্রতা মানায় না। আচারে, ব্যবহারে, চিন্তায়, কর্মে যা নিখুঁত, তাই আভিজাত্যের ভিত্তি। আভিজাত্য আদর্শবাদী, কোন কারণেই তার সুর নেবে যায় না। এরা ইংলণ্ডের চার্লস, ফ্রান্সের লুই, রুশিয়ার নিকোলাস আর পরাধীন ভারতবর্ষের জনকতক হঠাৎ-বড়লােক ডাকাত রাজা-জমিদারদের দশ-হাত-ফেরতা ইতিহাস মুখস্থ করে আসল আভিজাত্যের স্বরূপ ভুলে গেছে। রাজর্ষি জনক বা রাজা হরিশ্চন্দ্রের নাম এদের কচিৎ মনে পড়ে, আর যখন পড়ে তখন এদের কাণ্ড দেখে দুঃখ হয়। আদর্শ রাজা রামচন্দ্রের বিষয়ে রচিত জনপ্রিয় নাটকে আজকাল রামের চরিত্র যে ভাবে আঁকা হয় এবং তা দেখে লােকে যে রকম হাততালি দেয়, তাতে জনতার রুচিবােধের প্রশংসা করতে পারি না। সীতাকে বনে পাঠিয়ে রামচন্দ্র কুলগুরু বশিষ্ঠের সামনে অশিষ্টের মত দাপাদাপি করছে আর সামা কেরানীর মত হাউহাউ করে কঁদছে, এই দেখে সবাই মহা খুশি। এর থেকে মনে হয়, আভিজাত্যের স্বরূপ এরা ভুলে গেছে। অর্থলােলুপ ইহলােকসর্বস্ব বণিকসভ্যতার আওতায় বহুকাল বাস করার ফলে এদের ৭ স্বপ্ন-সব ধারণা হয়েছে যে, নিছক পশুত্বের চর্চা করাটাই পরমার্থ, আর যেন তেন-প্রকারেণ টাকা জমাতে পারলেই বুঝি আভিজাত্য হয়। ইংরেজী ‘অ্যারিস্ট্যাসি’ শব্দটারও ব্যাকরণ যদি এরা অনুধাবন করত, তা হলে বুঝতে পারত যে, যে প্রাচীন আর্য গ্রীকজাতি থেকে সমস্ত ইয়ােরােপীয় সভ্যতার জন্ম, সেই গ্রীক ভাষার ‘অ্যারিস্টস' শব্দ থেকে অ্যারিস্ট্যাসি কথাটা উৎপন্ন হয়েছে ; ‘অ্যারিস্টস’-এর অর্থ—যা সর্বোৎকৃষ্ট। অসভ্য কোটিপতিরা নয়, যারা সর্ববিষয়ে সর্বতােভাবে সর্বোৎকৃষ্টপন্থী তারাই ‘অ্যারিস্ট্যাট। বিদুর অ্যারিস্ট্যাট, ধৃতরাষ্ট্র নয়। কিন্তু আজকাল কেউ ব্যাকরণ পড়তে চায় না, নােট মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করে। ব্যাকরণের মধ্যে জাতীয় সংস্কৃতির যে ইতিহাস লেখা আছে, তা জানতে চায় না কেউ আজকাল—কষ্ট করে কার্ল মার্কস পড়ে, পাণিনি পড়ে । তাই আমাদের জাতীয় জীবনের ভিত্তি কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত তা জানে না কেউ, আভিজাত্যের স্বরূপও অজ্ঞাত তাই অনেকের কাছে। এরা মনে করে, পৃথিবীতে দুটি মাত্র জাত আছে—ধনী এবং দরিদ্র, এবং এই ধনী-দরিদ্রদের কোন রকমে একটা কটাহে চড়িয়ে বিদ্রোহের আগুনে গালিয়ে, বিজ্ঞানের ফ্যাক্টরিতে অর্থনৈতিক ছাঁচে ঢালাই করে ফেলতে পারলে পিলপিল করে বাজারে যে মানুষ বেরুবে, তাদের মধ্যে আর কোন বৈষম্য থাকবে না, ছাচে-ঢালাই-করা পুতুলের মত সব সমান হয়ে যাবে, জগতে সাম্য স্থাপিত হবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র যে সূর্য-চন্দ্রের মত সব সমাজে চিরকাল আছে, চিরকাল থাকবে, তা এরা বােঝে না; মনে করে, কোনও একটা বিশেষ ফরমুলায় ফেলে দিলেই সব বুঝি একাকার হয়ে যাবে। ওদের সসাভিয়েট রাশিয়ার দিকেও ভাল করে চেয়ে দেখে না ওরা, দেখলে দেখতে পেত, সেখানেও এই চতুর্বর্ণ বিরাজমান। সােভিয়েট রাশিয়ার দিকে তাকালে আমার আনন্দ হয়, নবজাগ্রত জাতির জীবন্ত শক্তির মহিমায় ওরা ভরপুর, ওরা জেগেছে, ওরা বাড়ছে। ওরা ভাঙবে গড়বে বদলাবে, কত কি করবে ! ওদের নকল করে আমাদের দেশে এই যে খব অদ্ভুত একটা জগা-খিচুড়ি হয়েছে, এদের দেখলৈ দুঃখ হয়, হাসি পায়। আমাদের বেচু খানসামার কথা মনে পড়ে, গত যুদ্ধের সময় খবরের কাগজ দেখে সে কাইজারের মত গোঁফ রেখেছিল। এরাও শ্রমিকের দুঃখে বিগলিত হয়েছে। দুঃখীর দুঃখে বিচলিত হয়ে যাঁরা আত্মবিসর্জন করেন, তাঁরাই তাে প্রকৃত আভিজাত্যমণ্ডিত মহাত্মা, মহাত্মা গান্ধীই বর্তমান যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিজাত ব্যক্তি। কিন্তু এ রকম মহাত্মা যুগযুগান্তরে দু-একজন আবিভূত হন,-বুদ্ধ চৈতন্য অলিতে গলিতে ক্লাবে থিয়েটারে কিলবিল করে বেড়ায় না কখনও। সর্বহারা শ্রমিকদের দুঃখে বিগলিতচিত্ত এদের দেখলে মনে হয়, এদের চিত্ত যে বিগলিত সে সম্বন্ধে সন্দেহ নেই, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শ্রমিকের দুঃখে নয়, ফ্যাশানের মােহে এবং ভােগের লােভে। সত্যিই যদি এরা শ্রমিকদের দুঃখে বিচলিত হত, তা হলে এদের ব্যবহার মনকে ক্ষুব্ধ করত না, মুগ্ধ করত। মতের সঙ্গে না মিললেও মুগ্ধ করত। আমি এদের শ্রদ্ধা করবার চেষ্টা করেছি, পারি নি। বার বার মনে হয়েছে, তা হলে এরা এত বিলাসী, এত উচ্ছল হত না। (ইটের উপর বসে মাটির গ্লাসে বাজে চা খায় যারা, তাদের দুঃখে বিগলিত হয়ে এরা যখন গদি-আঁটা চেয়ারে বসে দামী কাপে উৎকৃষ্ট দার্জিলিং চা অনর্গল পার করে, তখন, সত্যি বলছি, সন্দেহ হয়। অতীত গৌরব, জাতীয় সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা সমস্তই মূল্যহীন এদের কাছে—তাই শৈলেন অনায়াসে প্রশ্ন করলে, আপনি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব করতে যাচ্ছেন কেন? না গেলেই যে অন্যায় হ'ত, সে বােঝবার বুদ্ধি ওর নেই— আত্মসম্মানের কোনও ধার ও ধারে না। বার বার কপচে প্রােলিটারিয়েট কথাটা মুখস্থ করেছে কেবল। এংগেলসের কথা বেদবাক্য বলে মনে করে, গীতা ওর কাছে মূল্যহীন। হত্যাকাণ্ড’ ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে চীৎকার করছে তাই। যুদ্ধে চিরকালই নিরীহ লােক মারা যায়। আমরা যুদ্ধ করতে চাইও না, কিন্তু বাড়ি চড়াও হয়ে নিরীহ ছেলেমেয়েদের মারবে, আমরা আত্মরক্ষাও করব না? বেদান্ত, উপনিষদ, গীতা, চণ্ডীতে
স্বপ্ন-সব
আমরা আস্থাবান, কাউকে মারতে বা বাঁচাতে পারি এ অহঙ্কার
আমাদের নেই, কর্তব্যপথে নির্ভয়ে নিরাসক্তচিত্তে অগ্রসর হওয়াটাই
পৌরুষ বলে মনে করি, এবং তাই আমরা শক্তির উপাসক। মহাত্মাজীর
অহিংস শক্তি যদি ব্যবহার করতে পারতাম, তা হলে তাই করতাম ;
কিন্তু দেখলাম, তা পারব না। তাই যা পারব তাই করতে যাচ্ছি—কারণ
agtato 166652-Where there is only a choice
between cowardice and violence I would advise
violence.... এখন চুপ করে বসে থাকাটা ভীরুত হবে—পারিস
তাে বুঝিয়ে দিস ওকে এসব।
অশরীরী বড়দা অন্তর্হিত হইলেন।
ছট্ট, চা লইয়া প্রবেশ করিল।
যতীন। বড়দা-মেজদা চলে গেলেন ?
ছট্ট,। হাঁ হুজুর।
যতীন। রুমি কোথা?
ছট্ট,। তিনি আগেই বেরিয়ে গেছেন।
ছট্ট দুইজনকে চা দিয়া বাহির হইয়া গেল। শৈলেন চায়ে একটা
বড়-গােছের চুমুক দিয়া যেন সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল। যতীন
অন্যমনস্কভাবে ধীরে ধীরে চা খাইতে লাগিল।
শৈলেন।
দেখ যতীন, তােমার মেজদা যে আমাকে অপমান
করলেন তাতে আমার দুঃখ নেই, কারণ কমিউনিস্ট হয়েছি যখন,
তখন অপমানই আমাদের অঙ্গের ভূষণ। [ হাসিলেন) তা ছাড়া
মেজদাকে ছেলেবেলা থেকে দেখছি তাে, চিরকালই ওই রকম। কিন্তু
চড়ের চেয়ে বেশি লাগল কি জান ? ।
যতীন। কি ?
।
স্বাসভব ৮১ শৈলেন। তােমার বড়দার মুচকি হাসিটা। ছুরির চেয়েও মেজদার সঙ্গে ঘুষােঘুষি করে কোনদিন হয়তাে তাঁকে আমাদের দলে টানলেও টানতে পারি, কিন্তু তােমার বড়দা সাংঘাতিক। ঘাড় ফিরিয়ে নির্নিমেষে চেয়ে আছে অতীতের দিকে, কিছুতেই সে ঘাড় ফেরানাে যাবে না। বেশি জোর করলে ভেঙে যাবে, তবু নুইবে না। পাথরের তৈরি বিরাট একটা ‘ফসিল’ যেন। আচ্ছা যতীন, তুমি তাে এ যুগের ছেলে, তুমিও কি বিশ্বাস কর না যে, সামাজিক বৈষম্য দূর করাই আমাদের সর্বপ্রধান কাজ হওয়া উচিত? সাম্য না হলে স্বরাজের কোনও মানে হয় । যতীন। বৈষম্য কোনও দিন দূর হবে বলে মনে করি না। তবে যে স্বরাজ আমি কামনা করি, তাতে সাম্য না থাকলেও প্রতিটি লােকের স্বাচ্ছন্দ্য থাকবে। খাওয়া, পরা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অভাবে কেউ কষ্ট পাবে না, সকলেই সমান সুযোেগ পাবে বড় হওয়ার। আর সবচেয়ে বেশি কি চাই জানেনপ্রত্যেকটি ভারতবাসী ভারতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবে। লােভে লালায়িত হবে না, হিংসায় জর্জরিত হবে না। ঐশ্বর্য নয়, শান্তিই হবে তার কামা) শৈলেন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকলে কি কোনও সমাজের উন্নতি হয় ? ভা যতীন। (ভারতবর্ষের শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, উচ্চতম আকাক্ষা থাকবে। আধিভৌতিক নয়, আধ্যাত্মিক ; ভােগে নয় জ্ঞাগে।) শৈলেন। তুমি দেশসুদ্ধ সবাইকে তা হলে লেংটি পরিয়ে সন্ন্যাসী বানাতে চাও নাকি? যতীন। [ হাসিয়া ] আমি বানাতে চাইলেও হবে না, সন্ন্যাসী হওয়া অত সহজ নয়। তবে ত্যাগের আদর্শকে শ্রেষ্ঠ আদর্শ ব'লে যদি মেনে নেয় সকলে, তা হলে সন্ন্যাসী হতে পারলেও অনেক ভদ্রলােক হবে, সমাজে শান্তি থাকবে। ঐশ্বর্য লােটবার জন্যে
২
পৃথিবীব্যাপী এই যে কদর্য হুড়ােহুড়ি মারামারি রক্তারক্তি চলেছে, এর
থেকে রক্ষা পাবে সমাজ।
শৈলেন। তােমার ত্যাগের আদর্শ অন্য দেশকে যদি উদ্বুদ্ধ না
করতে পারে। তারা যদি এসে আক্রমণ করে ?&aic
যতীন। ত্যাগের আদর্শ থাকবে বলে যে দেশরক্ষার ব্যবস্থা
থাকবে না, তা তাে নয়। আদর্শ ক্ষত্রিয়সমাজ গড়ে তুলতে হবে। তারা
যুদ্ধ করবে নিজের দেশ রক্ষা করবার জন্যে, অপর দেশ লুণ্ঠন করবার
জতে নয়।
শৈলেনবাবু কিছুক্ষণ স্মিতমুখে চুপ করিয়া রহিলেন।
শৈলেন। তােমার এই স্বপ্ন সফল হবে বলে মনে কর?
যতীন। আশা করি।
শৈলেন। কি করে হবে, শুনি?
যতীন। শিক্ষা-পদ্ধতির আমূল সংস্কার করে। তা করবার
আগে অবশ্য দেশের স্বাধীনতা চাই।
শৈলেন। কি উপায়ে পাবে সে স্বাধীনতা ?
যতীন। সহিংস অ-হিংস যে কোনও উপায়ে।
শৈলেন। এর মধ্যে কোনটা ভাল মনে কর তুমি ?
যতনি। ভারতবর্ষের আদর্শই হচ্ছে প্রেম। সুতরাং অহিংস
উপায়টাই ভাল বলে মনে করি। কিন্তু সকলের পক্ষে সে পথে
চলা সম্ভব না-ও হতে পারে। না যদি হয়, তা হলে সহিংস উপায়
অবলম্বন করেও স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। মােট কথা, স্বাধীনতা
চাইই-স্বাধীনতা না পেলে কিছুই হবে না।
ইউ প্রবেশ করিল।
ছটু। শৈলেনবাবু, আপনাকে বাড়ি থেকে ডাকতে এসেছে। মাইজীরা ভয় পেয়েছে বড়। শৈলেন। ও, আচ্ছা, উঠি তা হ'লে ভাই। উঠিলেন। যতীনও উঠিয়া দাড়াইল। শৈলেন। তােমরা সব মহৎ লােক, আকাশচুম্বী তােমাদের আদর্শ। আমরা মাটির মানুষ, আমাদের কারবার ঘােটলােক নিয়ে। আমাদের তােমরা ঘৃণা করতে চাও, কর- যতীন। কি যে বলেন শৈলেনা। তাঁহাকে জড়াইয়া ধরিল। তা কি যতীন। আপনাকে ঘৃণা করতে পারি কখনও? আমাদের সঙ্গে মতে না মিললেও সারাজীবন আপনি যে দেশের কাজই করেছেন, ভুলতে পারি কখনও ? তা ছাড়া ঘৃণার কোনও স্থানই নেই আমার আদর্শে, আমি কাউকে ঘৃণা করি না। শৈলেন। তুমি কাউকে ঘৃণা কর না? যতীন। না। শৈলেন। কথাটা শুনতে ভাল, কিন্তু আচ্ছা, চলি। যতীন। রাগ করে যাচ্ছেন না তাে শৈলেনদা ? [ পুনরায় জড়াইয়া ধরিয়া ] বলুন, আপনি বলে যান শৈলেন। না না, রাগ করব কেন? আহা, ছাড় না। কি যে অবুঝ তুই নিজেকে ছাড়াইয়া লইয়া বাহির হইয়া গেলেন। বাহিরে গিয়া হাত দিয়া চোখটা মুছিয়া ফেলিলেন। যতীনের ব্যবহারে সঁহার চোখে
৪
ফিরিয়া
জল আসিয়া পড়িয়াছিল। যতীন দেখিল, টিকটিকি
আসিয়াছে। বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া আছে।
টিকটিকি। আচ্ছা, তােমার
তােমার ওই শৈলেনবাবু আমার কিছু
উপকার করতে পারবেন ।
যতীন। কেন, কি হ’ল তােমার ?
টিকটিকি। আমার টিকটিকিনী পালিয়ে গেল।
যতীন। কোথায় ?
টিকটিকি। আর একটা টিকটিকির সঙ্গে। [ সক্ষোভে ] তােমরা
কেন যে জানলার ওপরে টিনের ‘সান-শেড লাগাতে গেছ, বুঝি না।
একটা গুণ্ডা এসে আশ্রয় নিয়েছে।
যতীন।
টিকটিকি। হ্যা গাে। ইয়া কেঁদো মােটা গুণ্ডা একটা।
ওদিকের সমস্ত দেওয়ালটা জুড়ে রাহাজানি করে বেড়াচ্ছে, কারও
ঘেঁষবার উপায় নেই। টিকটিকি তাে নয়, যেন কুমীর একটা।
যতীন। কই, দেখি নি তাে !
টিকটিকি। [ সশ্লেষে, তাহার কথার অনুকরণ করিয়া ] কই,
দেখি নি তাে ! তুমি আবার আমার দুঃখ কবে দেখতে পাও? নিজের
দিকেই তাে সারা দৃষ্টি ফিরিয়ে বসে আছ সর্বক্ষণ। স্বার্থপর
কোথাকার! একটু আলাে জ্বেলেও তাে উপকার করতে পার না।
খেয়ে খেয়ে রােগা হয়ে গেলাম। খেতে পেলে আমিও অমনই,
কেঁদো মােটা হতাম। তা হলে কি আমার টিকটিকিনী পালায়।
আমার এ দুর্দশার জন্যে দায়ী তুমি।
যতীন। আমি! বল কি ?
টিকটিকি। হ্যা, তুমি ছাড়া আবার কে?
যতীন। আমার আলাের উপর ভরসা করে বসে আছ কেন?
বাইরের পৃথিরীতে চরে বেড়াও না, যেমন আর সবাই করছে।
৮৪
টিকটিকি। তা পারলে আর ভাবনা ছিল না। ঘরে বাইরে সব
জায়গায় আমাদের এলাকা ঠিক করা আছে, একজনের এলাকায় আর
একজনের প্রবেশ নিষেধ। বাইরে যাব কি, তােমার ওই জানলার
চৌকাঠের কাছ পর্যন্ত ঘেঁষবার জো নেই, ওত পেতে বসে আছে
গুণ্ডাটা। একমাত্র উপায়—গায়ের জোর বাড়ানাে, কিন্তু খেতে পাচ্ছি
, জোর বাড়বে কি করে ? তােমার উপর আর ভরসা নেই, দেখি
শৈলেনবাবুর সঙ্গে আলাপ করে—শুনেছি উনি অনেক অত্যাচারীকে
জব্দ করেছেন।
যতীন। মানুষ-অত্যাচারীকে জব্দ করেছেন। টিকটিকি-অত্যাচারীর
বিরুদ্ধে কিছু করেছেন বলে তাে শুনি নি।
টিকটিকি। মানুষ-অত্যাচারীর বিরুদ্ধেই আমি নালিশ করব।
ওকে বলে তােমাকে বাধ্য করব আমি আলাে জ্বেলে রাখতে। হেঁ-
হেঁ, আজকাল আর সেদিন নেই যে, যা খুশি তাই করবে। তুমি
কিনেছ বলে ও আলো যে একলা তােমারই, সে আইন নেই আজকাল
-হেঁ-হেঁ—শৈলেনবাবুকে ধরে দেখ না
যতীন। [ হাসিয়া ] শৈলেনবাবুকে ধরবার দরকার নেই, আমি
আলাে জ্বেলে রাখব।
টিকটিকি। [ গদগদ ] রাখবে? সত্যি? সত্যি বলছ ?
যতীন।
রাখব।
টিকটিকির মনের আনন্দ পুচ্ছে প্রকট হইল।
টিকটিকি। [ সানুনয়ে ] আর একটি উপকারও কর না তা হলে।
যতীন। আবার কি?
টিকটিকি। ওঁই গুণ্ডাটাকে তাড়িয়ে দাও না। তােমার ওই
জানলার টিনটার পাশে বসে আছে। তুমি উঠে এক তাড়া দিলেই
পালাবে। তােমার ওই লাঠিটা তুলে যদি খোঁচা দাও একটা,
তা হলে তাে বাছাধন একেবারে
স্বপ্ন যতীনের মনে হইল, টিকটিকিটার উপযুপরি রূপান্তর ঘটিতেছে। (প্রথমে সে হইল জয়চন্দ্র, তাহার পর বলবন্ত রাও, তাহার পর মানসিংহ, তাহার পর উমিচাদ, তাহার পর মীরজাফর)যতীনের সমস্ত চিত্ত গ্লানিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল, সে আর চাহিয়া থাকিতে পারিল না, চোখ বুজিল। তাহার সমস্ত অন্তর যেন নীরব ভাষায় বলিতে লাগিল, হে সুন্দর, কোথায় তুমি, এস, আর কত বিলম্ব ? বাহিরে অনেক দূরে শােনা গেল-ফটিক জলফটিক জল। অনেকক্ষণ চোখ বুজিয়াই বসিয়া রহিল। তাহার পর যখন চোখ খুলিল, তখন অস্তায়মান সূর্যের আরক্তিম কিরণে সমস্ত ঘর উদ্ভাসিত•••এবং সেই স্বর্ণালােক- পরিবেষ্টনীতে দাড়াইয়া আছে পুরুষবেশিনী একটি নারী। অপরূপ রূপসী। নয়নে বহ্নি, পৃষ্ঠবিলম্বিত কেশদামে ঝঙ্কার মেঘ, মস্তকে মুকুট, হন্তে কৃপাণ, অঙ্গে বর্ম, এবং সমস্ত মণ্ডিত করিয়া এক অপূর্ব পবিত্রতা-নির্মল, অপাপবিদ্ধ। ? যতীন। কে আপনি রূপসী। আমাকে চেন না? যতীন। মনে হচ্ছে চিনি চিনি, কিন্তু মনে করতে পারছি না ঠিক। রূপসী। [ ঈষৎ হাসিয়া ] ছেলেবেলায় চিনতে খুব, দক্ষিণাবাবু আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, মনে পড়ছে ? আমি রূপকথার কিরণমালা। অরুণ-বরুণের বােন। অরুণের তলােয়ারে মরচে ধরেছে, বরুণের ধনুকের ছিলে ছিড়ে গেছে। মায়ার মােহে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তারা সব হয়ে গেছে এখন পাথর। আমি চলেছি তাদের উদ্ধার করতে। তােমার জয়চন্দ্র উমিচাদ মীরজাফররাও পাথর হয়ে পড়ে আছে সেখানে। সবাইকে উদ্ধার করে আনব। যতীন। কোথায় সে জায়গা। রূপসী। সব ভুলে গেছ দেখছি। মায়া-পাহাড়, যেখানে রূপাের গাছে সােনার ফল ফলে, মুক্তা-গলা জল ঝরে মুক্তিঝরনা থেকে, হীরের গাছে সােনার পাখি গান গায়, যেখানকার রাস্তায় কাকর নেই, তার বদলে ছড়িয়ে আছে চুনি পায়া মণি মাণিক্যের দানা। এই সবের লােভে সবাই ছুটে গিয়েছিল সেখানে, কিন্তু মাথা ঠিক রাখতে পারে নি, প্রাণহীন পাথরে পরিণত হয়ে গেছে সব। আমি চলেছি তাদের উদ্ধার করতে। মুক্তি-ঝরনার মুক্তা-গলা জল ছিটিয়ে তাদের বাঁচাব—তারপর ডঙ্কায় দেব ধা। চললাম। ভেবাে না, সবাই বাঁচবে আবার। ঘড়ি। রূপ নিক, রূপ নিক, রূপ নিক, রূপ নিক•• বড় বউদি কিরণমালা চলিয়া গেল। যতীনের মনে হইল, ওই যে আকাশের গায়ে বহুদুরে দেখা যাইতেছে—মেঘের স্থূপ নয়, মায়া-পাহাড়। দুর্গম, দুরারােহ। অন্ধকার নামিতেছে•••অন্ধকারে আত্মগােপন করিয়া আছে ঝন্ধা মেঘ, বিদ্যুৎ বজ্র, সরীসৃপ শ্বাপদ, পিশাচ প্রেতিনীর বিভীষিকা। কিরণমালা চলিয়াছে, কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই, নিষ্কম্প অগ্নিশিখার মত আঁধার ভেদ করিয়া চলিয়াছে সে••। দ্বারপ্রান্তে শব্দ হইল। যতীন ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, বড় বউদি প্রবেশ করিতেছেন। ঈষৎ স্থলাঙ্গিনী। ধপধপে ফরসা রঙ। কপালের মাঝখানে হােট একটি উলকির টিপ। টকটকে লালপেড়ে শাড়ি, মাথা-ভরতি সিদুর। হাতে কয়েকগাছা করিয়া সােনার চুড়ি আছে, কিন্তু শাখাটাই সর্বাগ্রে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হাতে একটি পানের ডিবা। পরিপুষ্ট গােল মুখখানিতে মাতৃত্ব যেন মূর্ত। চোখের দৃষ্টিতে শঙ্কা বা ক্ষোভ নাই, অধীরতাও নাই। বরং একটা শান্ত অথচ সকৌতুক ঔৎসুক্য চোখের কোণে, উকি দিতেছে। ভাবটা যেন—সাড়ম্বরে তােমরা অনেক আয়ােজনই তাে করিলে, শেষ পর্যন্ত কি কর দেখি ! তিনি নির্নিমেষে কয়েক মুহূর্ত যতীনের দিকে চাহিয়া রহিলেন, তাহার পর একটু হাসিলেন। তাঁহার ভাব-ভঙ্গীতে কেমন যেন একটা চাপা গােপন ভাব। যেন প্রয়ােজন হইলে তিনি যাহা করিবেন, ঠিক করিয়া
স্বাসব
ফেলিয়াছেন এবং সেইজন্য নিশ্চিন্ত হইয়া আছেন—কিন্তু সে কথা
কাহারও কাছে প্রকাশ করিতে চান না।
বড় বউদি। ছােট বীরপুরুষটির খবর নিতে এলাম।
যতীন। [ হাসিয়া ] আমি ঠিক আছি।
বড় বউদি। আমরাও বেঠিক নেই। আচ্ছা, রুমি কোথা গেল,
তাকে দেখতে পাচ্ছি না।
যতীন। [ একটু ইতস্তত করিয়া ] সে নােয়াখালি চলে গেছে।
বড় বউদি। ওমা, সে কি! কখন ?
যতীন। এই একটু আগে।
বড় বউদি। তােমাকে বলে গেল?
যতীন। হ্যা।
বড়
বউদি। মানা করলে না?
যতীন। করলাম, শুনলে না।
একটা সূক্ষ্ম গর্বের আভা বড় বউদির সারামুখে ছড়াইয়া পড়িল।
ভাষায় কিন্তু তিনি যাহা বলিলেন, তাহা অন্যরকম।
বড় বউদি। একলা এমন ভাবে যেতে দেওয়া ঠিক হয় নি।
তোমার দাদারা শুনলে রাগ করবেন।
যতীন। কি করব, জোর করে চলে গেল। চেন তাে তাকে।
বড় বউদি। চিনি না আবার, ডাকাত একটা।
অমল বিমল কোথা?
বড় বউদি। তােমার দাদা তাদের রেখে গেছেন নাকি। তারাও
পা বাড়িয়েছিল, বলামাত্রই দু ভাই বল্লম নিয়ে তৈরি। [ হাসিলেন ]
বাবা ভাগ্যে এ সময় কাশীতে, তিনি থাকলে কক্ষনাে যেতে দিতেন না
ওদের। আর তাই নিয়ে এক কাণ্ড হ’ত বাড়িতে। তােমাকেও
যতীন।
৮৯ ৩ যেতে হত, কেবল আমাদের আগলাবার জন্যে তােমাকে রেখে গেলেন। আমাদের নিয়েই বিপদ তােমাদের, আমরা হয়েছি তােমাদের পায়ের বেড়ি। বেড়ি না পরলে চলেও না যে তােমাদের, [ হাসিয়া ] তােমার জন্যেও বেড়ির যােগাড় করতে হবে এবার একটা। বংশ রাখতে হবে তাে। আমার ছেলে দুটি তাে যুদ্ধে গেল, ফিরবে কি না ভগবানই জানেন। তােমার মেজ বউদির যা ভাবগতিক, মনে হচ্ছে, দশ বছরেও হ’ল না যখন, তখন আর হবে না বোধ হয় কিছু। আর সেজ বউয়ের ছেলে দুটি তাে নােয়াখালিতে মামার বাড়ি গেছে। যা খবর এসেছে, তাতে যতীন। খবর এসেছে নাকি? বড় বউদি। এখনই পেলাম। তােমার সেজদা সেজ বউদি শােনে নি এখনও। [ চুপিচুপি ] পরেশবাবুর স্ত্রী এসেছিলেন এখনই, তাঁর মুখেই শুনলাম। পরেশবাবু নিজের বােনের খবর আনতে ছুটেছিলেন কলকাতায়, সেখানে নােয়াখালির কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাদের একজন নাকি বলেছে যে, সেজ বউয়ের বাপের বাড়ির একটি প্রাণী বাঁচে নি, পুড়ে মরেছে সবাই। নির্নিমেষে গম্ভীর মুখে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর একটু হাসিলেন, কিন্তু নির্নিমেষে চাহিয়াই রহিলেন। যতীন। বউদি, তুমি নীচে গিয়ে বেহারী কিংবা ছট্ট-কাউকে দিয়ে খিড়কির দিকে বৈঠকখানার ছাতটায় বাঁশের সিড়িটা লাগিয়ে দিতে বল। বড় বাদ। | কেন, কি হবে ? যতীন। আমার ঘর থেকে কাঠের সিড়ি দিয়ে বৈঠকখানার ছাতে নামা যায়, সেখান থেকে কাঠের সিড়ি দিয়ে খিড়কি-দরজায় যাওয়া যাবে।
বড় বউদি। তা না হয় যাবে, কিন্তু কেন? যতীন। যদি বাড়ি ঘিরে ফেলে, তা হলে খিড়কি দিয়ে আমরা সরকারদের বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারব। বড় বউদি। ও, পালাবার বন্দোবস্ত! আমি তাে প্রাণ থাকতে পালাব না। অনেকদিন বেঁচেছি, কি হবে আর বেঁচে ? সবাই যদি মরে যায়, আমি একা বেঁচে করবই বা কি? [ হাসিয়া ] আমার ভয় নেই। যতীন। আসল ভয় প্রাণের নয়, মানের। বড় বউদি। [ হাসিয়া ] সে ভয়ও নেই। মান রাখতে জানলে কেউ নিতে পারে না। [ ডিবা খুলিয়া এক খিলি পান মুখে পুরিলেন ] তুমি নেবে নাকি এক খিলি ? বীণা কি যে ছাই করে সেজেছে পানগুলাে, দেখি, ভাল করে নিজেই সাজি গিয়ে। তুমি তাে কাব্য নিয়ে থাকবে। আমরা পান চিবুই ব'সে ব'সে, কি আর করব! রান্নাঘরেও যেতে হবে একবার। সকালে তাে জানি না, এত কাণ্ড হবে, মাংস আনিয়েছিলাম। [ হাসিয়া ] তােমার দাদা পােলাও-মাংসের ফরমাশ দিয়ে গেছেন। ফিরে এসে খাবেন। ফিরে এসে নােয়াখালির খবর শুনলে খাওয়া অবশ্য মাথায় উঠবে জানি, কিন্তু বেঁধে রাখতে হবে। [ মুচকি হাসিয়া ] চেন তাে মানুষটিকে, হুকুমের নড়চড় হবার উপায় নেই। যাই। আর একটু চা পাঠিয়ে দেব নাকি ? যতীন। না, এখন থাক, এই তাে খেলাম। তুমি সিড়িটা লাগিয়ে দিতে বলে। সাবধান থাকাই ভাল। বড় বউদি। আচ্ছা। কি বীরপুরুষের উপরই ভার দিয়ে গেছেন কর্তারা। আর একবার মুচকি হাসিয়া চলিয়া গেলেন। • যতীন স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার চোখের সম্মুখে ধীরে ধীরে মূর্ত হইয়া উঠিল সেজদার দুই ছেলে-নীলু ও বিলু। অনিন্দ্যকান্তি কিশাের দুইটি ।
১১ জীবন্ত প্রাণের উন্মুখ আগ্রহ তাহাদের সর্ব অঙ্গে পরিস্ফুট। চোখের দৃষ্টি জ্বলজ্বল করিতেছে। তাহারা কি যেন বলিতে যাইতেছিল, সহসা আগুনের শিখা আসিয়া তাহাদের ঘেরিয়া ফেলিল। তাহাদের চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময় ফুটিয়া উঠিল—হঠাৎ আগুন কেন! তাহারা যতীনের দিকে চাহিয়া আরও আশ্চর্য হইয়া গেল। তাহাদের চারিদিকে আগুন, অথচ ছােটকাকা নির্বিকার হইয়া বসিয়া আছেন। ? নীলু। উঃ-উঃ-এ কি! চারদিক বন্ধ যে-কোথা যাই? ছােটকাকা, কপাটটা খুলে দাও, কপাটটা খুলে দাও। বিলু। ছােটকাকা, ও ছােটকাকা, উঃ, কি করি আমরা? নীলু। কাপড়ে আগুন ধরে গেল—বাঁচাও-পুড়ে যাচ্ছি— বিলু। বাঁচাও ছােটকাকা, তােমার দুটি পায়ে পড়ি—শুনতে পাচ্ছ না? বাঁচাও আমাদের, বাঁচাও বাঁচাও আগুনের লেলিহান শিখা লকলক করিয়া তাহাদের গ্রাস করিয়া ফেলিল। শিখা ভেদ করিয়া চীৎকার উঠিতে লাগিল—বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও। মনে হইল, স্বয়ং অগ্নিই যেন তারস্বরে আর্তনাদ করিতেছেন। যতীন উত্তেজনাভরে উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু পরমুহূর্তেই লজ্জিত হইয়া বসিয়া পড়িয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিল। নিরুপায় ক্ষোভে তাহার সমস্ত চিত্ত মথিত হইতে লাগিল। চোখের সম্মুখে সমস্ত দৃশ্যটা ফুটিয়া উঠিতেছে, অথচ কিছু করিবার উপায় নাই। বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও- চীৎকার এখনও থামে নাই। বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও- চীৎকার তীব্র হইতে তীব্রতর হইতে লাগিল। আকাশে বাতাসে, নদীতে প্রান্তরে, উধ্বে নিম্নে, অন্তরে বাহিরে কেবল বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও-বাঁচাও। আগুন নিবিল, কিন্তু চীৎকার থামিল না। অবশেষে চীৎকারটা যেন মূর্তি ধরিয়া অগ্নিপ হইতে বাহির হইয়া আসিল••• সমস্ত দেহ জ্বলন্ত-অঙ্গারময়। সেই জ্বলন্ত অঙ্গারময় মূর্তি যতীনের দিকে আগাইয়া আসিল।
। অঙ্গারমূর্তি। এখনও বসে আছ ? বাঁচাও আমাদের সর্বাঙ্গ বলে গেল যে, জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল। মরে গেছি, কিন্তু জ্বালা কমছে না। বাল কমিয়ে দাও, শিগগির আলা কমিয়ে দাও। যতীন। [ অসহায়ভাবে ] কি করলে কমবে, তা তাে জানি না। অঙ্গারমূর্তি। [ সশ্লেষে ] এখনও জান না? যতীন। । হাহাকার করিতে করিতে অঙ্গারমূর্তি অদৃশ্য হইয়া গেল। অগ্নিকাণ্ডও ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হইল। যতীন বুঝিতে পারিল, যাহা সে এতক্ষণ লেলিহান অগ্নিশিখা বলিয়া মনে করিতেছিল, আসলে তাহা রক্ত-কিরণ- রঞ্জিত সন্ধ্যার মেঘ-খােলা জানালা দিয়া দেখা যাইতেছিল। সূর্য অস্ত গিয়াছে•• চতুর্দিকে অন্ধকার নামিতেছে। সমস্ত ঘর অন্ধকারে ভরিয়া গেল। নিবিড় অন্ধকারে আত্মনিমগ্ন হইয়া যতীন কি যেন খুঁজিতেছিল। সহসা শুনিতে পাইল-আলাে জ্বাল। হাত বাড়াইয়া ‘সুইচ’ টিপিতেই প্রস্তর-তরুণীর উধ্বেখিত বাহুর উপর বাব’টা অলিয়া উঠিল। যতীন দেখিতে পাইল, আলােকিত দেওয়ালে টিকটিকি লােলুপ আগ্রহে বসিয়া আছে। টিকটিকি। কতক্ষণ থেকে বলছি, আলাে জ্বল, আলাে জ্বাল শুনতেই পাচ্ছ না। আশ্চর্য! ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে, পােকাগুলাে সব চ'লে গেল বােধ হয় এদিকে ওদিকে। একটা মানসিক অবসাদ যতীনকে যেন আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছিল। কিছুই করিতে না পারিয়া এবং করিবার আশা নাই অনুভব করিয়া তাহার পৌরুষ যেন ধীরে ধীরে অবসন্ন হইয়া পড়িতেছিল। নিজের পৌরুষকে মর্যাদা দান করিবার জন্যই সে টিকটিকির উপকারে প্রবৃত্ত হইল।
যতীন। ব্যস্ত হচ্ছ কেন, অনেক পােকা আসবে এখনই।
গুণ্ডাটাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি আমি। কোনখানে আছে বললে ?
টিকটিকি। [ সাগ্রহে ] দেবে? দেবে ? ওই ‘সান-শেড’টার
ঠিক নীচেই আছে, লাঠিটা নিয়ে যাও।
যতীন উঠিয়া জানালার কাছে গেল এবং ‘সান-শেড'এর নীচে বলিষ্ঠ
টিকটিকিটাকে দেখিতে পাইল। অদূরে টিকটিকিনীও রহিয়াছে।
যতীন। তােমার টিকটিকিনীও রয়েছে। দুজনকেই তাড়িয়ে দেব?
টিকটিকি। আরে না না, টিকটিকিনীকে তাড়াবে কেন, গুণ্ডাটাকে
তাড়িয়ে দাও।
তুলিয়া লইল এবং বলিষ্ঠ
যতীন ঘরের কোণ হইতে ছড়িটা
টিকটিকিটাকে নীচে ফেলিয়া দিল।
প্রস্তর-তরুণী। অন্যায় করলে।
যতীন চমকাইয়া তাহার দিকে চাহিল।
টিকটিকি। হি-হি-হি-হি-
অদ্ভুত একটা হাসি হাসিতে লাগিল।
যতীন। [ প্রস্তর-তরুণীকে] অন্যায় করলাম নাকি ?
প্রস্তর-তরুণী। অন্যায় করলে না? এই একই অপরাধে গুণ্ডাদের
‘পিশাচ’ বলেছ তােমরা—তারাও তেতলার ছাদ থেকে মানুষ ছুড়ে
ছুঁড়ে ফেলেছে নীচে।
টিকটিকি। [ প্রস্তর-তরুণীকে ] তােমার আস্পর্ধা বড্ড বেড়েছে
১৪ স্বপ্নসম্ভব দেখছি। নির্জীব পাথর হয়ে বেশ তাে জীবন্ত প্রাণীদের সমালােচনা করে যাচ্ছ! তােমার পাথুরে বুদ্ধিতে যা অন্যায়, আমাদের জীবন্ত বুদ্ধিতে তা অন্যায় নয়। [ যতীনের দিকে চাহিয়া | কি বল! যতীন কোন উত্তর দিল না। তাহার চোখের সামনে পর পর দুইটা ছবি কেবল মূর্ত হইয়া মিলাইয়া গেল—মিস্টার চার্চিল এবং জেনারেল স্মাট। চতুর্দিকে নীরবতা ঘনাইয়া আসিল। যতীনের মনে হইল, সব যেন ক্রমশ ঘন হইয়া আসিতেছে••• আকাশ বাতাস সব পাথর হইয়া গেল বুঝি••• একটা নিরুদ্ধ নির্বাক আকুলতা আত্মপ্রকাশের বেদনায় যেন টনটন করিতেছে••• এইবার ফাটিয়া যাইবে বুঝি••• প্রস্তর-তরুণী কথা কহিয়া উঠিতেই যতীন সম্বিৎ ফিরিয়া পাইল। প্রস্তর-তরুণী। [ সানুনয়ে ] জীবন্ত করে তােল আমাকে। কিরণমালাকে ডাক, মুক্তি-ঝরনার জল ছিটিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে তুলুক। যতীন। সে কি আর আসবে ? প্রস্তর-তরুণী। তুমি ডাকলেই আসবে। এই উপকারটি কর আমার, এত লােকের এত উপকার কর তুমি টিকটিকি। ঠিক ঠিক,ভারি উপকারী লােক। সভ্য মানুষের লক্ষণই ওই। হ্যা, ভুলে যাবার আগে কথাটা বলে ফেলি তােমাকে। উপকারের ঋণটাও কিছু শােধ হয়ে যাক। [ চুপিচুপি ] তােমার বউদিকে লক্ষ্য করেছিলে ভাল করে ? যতীন। লক্ষ্য করবার মত কিছু ছিল নাকি? টিকটিকি। ছিল বইকি। পেট-কাপড়ের তলায় চকচকে ছােরা ছিল একটা। যতীন। কই, দেখি নি তাে ! টিকটিকি। [ সশ্লেষে ] তা দেখবে কেন, ওই পাথরের মূর্তিটার দিকেই হাঁ করে চেয়ে আছ কেবল সর্বক্ষণ, আর বেফয়দা বকরবকর করছ ওর সঙ্গে••• থাম থাম, পােকা এসেছে একটা।
স্বপ্ন-সম্ভব দেওয়ালের গায়ে একটা ছােট কালো পােকা আসিয়া বসিয়া ছিল । টিকটিকি সন্তর্পণে সেই দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। প্রস্তর-তরুণী। কিরণমালাকে ডাক। তুমি ডাকলে ঠিক আসবে। তােমাদের ডাকে উর্বশী উঠে আসে সিন্ধু থেকে, গঙ্গা নেমে আসে স্বর্গ থেকে ধরণীর ধূলিতে। কিরণমালাও আসবে, তুমি ডাকলেই আসবে। [ সানুনয়ে ] ওগাে, আমাকে সঞ্জীবিত কর, লােভে, মােহে, অশিক্ষায় পাথর হয়ে আছি কতকাল থেকে, উদ্ধার কর আমায়, দয়া কর, ডাক, কিরণমালার সােনার ঝরিতে করে নিয়ে আসুক সে মুক্তি-ঝরনার জল, ছিটিয়ে দিক আমার সর্বাঙ্গে। চুপ করে আছ কেন? [ অধীর- ভাবে ] ডাকছ না কেন? ডাক। যতীন। ডাকলে আসবে না, সময় হলে আসবে। পরিবেশ অনুকূল হ'লে নিজেই আসবে সে। সহসা চতুর্দিকে শঙ্খ ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। যতীনের মনে হইল, কিরণমালা বুঝি আসিতেছে, তাহারই বুঝি এ অভিনন্দন••• সে সাগ্রহে দ্বারের পানে চাহিয়া রহিল••• কেহ আসিল না••• শঙ্খঘণ্টারব উগ্র হইতে উগ্রতর হইয়া উঠিল••• অভিনন্দন নয়, একটা ভীত আর্ত হাহাকার যেন মূর্ত হইয়া উঠিতেছে। অন্ধকারকে চিরিয়া তীক্ষ্ণ তীব্র স্বরে বাঁশী বাজিয়া উঠিল কয়েকবার। জয় হিন্দ, 'বন্দেমাতরম', ‘জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম, ‘জয় হিন্দ', 'বন্দেমাতরম’-শতকণ্ঠ হইতে উৎসারিত হইয়া মুখরিত করিয়া তুলিল আকাশ-বাতাস-অন্ধকারকে। আলুথালু বেশে মেজ বউদি ছুটিয়া আসিয়া প্রবেশ করিলেন। বন্ধ্যা নারী। দেখিলে মনে হয়, বয়স উনিশ-কুড়ির বেশি নয়। আঁটসাট গড়ন। সুশ্রী। নিপুণ প্রসাধনের জন্য আরও সুশ্রী দেখাইতেছে। তাঁহার বিস্ফারিত বড় বড় চোখের দৃষ্টিতে আতঙ্ক।
স্বপ্ন-সম্ভব
মেজ বউদি। শুনছ ঠাকুরপাে, ছট্ট বলছে, গুণ্ডার দল ঢুকে
পড়েছে আমাদের পাড়ায়।
যতীন। ভয় কি, ঢুকুক না।
মেজ বউদি। আমার বড় ভয় করছে।
যতীন। পাগল নাকি, ভয় কি ? বড় বউদি কোথায় ?
মেজ বউদি। তিনি পােলাও চড়িয়েছেন, তাঁর ভয়-ডর নেই,
রান্নাঘরে বেশ নিশ্চিন্ত মনে মাংসের আলু কুটছেন বসে বসে। আর
সেজ বউ আপাদমস্তক ঢাকা দিয়ে মড়ার মত শুয়ে আছে, তােমার
সেজদা ঠাকুর-ঘরে। আমার একলা বড় ভয় করছে।
যতীন। চাকরগুলাে কোথা?
মেজ বউদি। তারা গেটের কাছে বর্শা বল্লম নিয়ে বসে আছে
লুকিয়ে।
ব্যতীন। তবে আর ভয় কি, আমার কাছেও বন্দুক আছে, একটা
নয়, দু-দুটো। ভয় কি?
বাহিরে শঙ্খ, ঘণ্টা, জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম আরও উদ্দাম হইয়া
উঠিল••• মেজ বউদি যতীনের বিছানার উপর শুইয়া পড়িলেন•••হঠাৎ
বাহিরের উদ্দাম শব্দটা থামিয়া গেল••• একটা মােটরকারের শব্দ স্পষ্ট
হইয়া উঠিল••• যতীন তাড়াতাড়ি স্মেলিং-সল্টের শিশিটা আলমারি
হইতে বাহির করিয়া মেজ বউদির নাকের কাছে ধরিতেই তিনি উঠিয়া
বসিলেন••কাপড়-চোপড় সামলাইয়া লজ্জিতভাবে উঠিয়া দাড়াইলেন।
যতীন। উঠলেন কেন, শুয়ে থাকুন না।
মেজবউদি। না, আমি যাই। [ উৎকর্ণ হইয়া শুনিলেন ] আর
তত কিছু শােনা যাচ্ছে না। সব থেমে গেল, নয়? ও কিছু নয়
বােধ হয় তা হলে, নয়? [ ভীত হাসি হাসিয়া ] আমাদের পাড়ায়
কিছু হবে না বােধ হয়, নয়? আমি যাই, দিদি একলা আছেন নীচে।
স্বপ্ন-সব যতীন। ভয় করে তাে এইখানেই থাকুন না। মেজ বউদি। না, আমি যাই। মেজ বউদি চলিয়া গেলেন, কিন্তু অশরীরী বেশে পুনরায় প্রবেশ করিলেন। অশরীরী মেজ বউদি। আমার ভয় দেখে হেসাে না আমার ভয় দেখে হেসাে না ঠাকুরপাে। আমার ছেলে মেয়ে নেই, বিদ্যা বুদ্ধি নেই, দেহটা ছাড়া আর আমার কিছু নেই। এই দেহটাকেই ঘষে মেজে, সাজিয়ে গুছিয়ে তােমার মেজদার মত অসুরকে বশ করে রেখেছি। এই দেহটাই আমার যথাসর্বস্ব, সামান্য ফোড়া হলেও তাই আমি ভয়ে মরি। এই দেহটাকে নিয়ে গুণ্ডারা হেঁড়াছি ড়ি করবে, এ আমি কল্পনাও করতে পারি না••• এ ছাড়া যে আমার আর কিছু নেই ঠাকুরপাে! হেসাে না, দয়া কর আমাকে••• মিনতি-ভরা করুণ দৃষ্টি তুলিয়া ক্ষণকাল দাড়াইয়া রহিলেন•••তাহার পর অদৃশ্য হইয়া গেলেন। যতীন গুণ্ডাদের কথাই ভাবিতে লাগিল। তাহারা মানুষ নয়? মানুষ কি করিয়া এত নৃশংস হইতে পারে ?••• সামনের দেওয়ালেই যতীনের পুস্তকের আলমারি ছিল। আলমারির কপাট খুলিয়া এক দীর্ঘাকৃতি পুরুষ বাহির হইয়া আসিলেন। হঠাৎ দেখিলে মনে হয় আব্দুল গফফর খাঁ। পরিধানে মূল্যবান মখমলের জরিদার পােশাক, মাথায় মুসলমানী টুপি। চোখের দৃষ্টি আভিজাত্য- মণ্ডিত। । দীর্ঘাকৃতি পুরুষ। ০ ওরা মুসলমান নয়, ওরা মেওয়াটি। আমার রাজত্বকালে ওরা একবার মাথা চাড়া দিয়েছিল, চাবুকের চোটে শায়েস্তা করে দিয়েছিলাম সবাইকে। দিল্লীর তখতে কে আছে এখন ? ঘুমুচ্ছে নাকি লােকটা? তারই উচিত এদের শাসন করে দেওয়া। ১৩ স্বপ্ন-সম্ভব p যতীন। মুসলমানদের বদনাম দিচ্ছ কেন,-এরা মুসলমান নয়, হতে পারে না, -মুসলমান ইমানদার জাত। কে আপনি? দীর্ঘাকৃতি পুরুষ। আমি দিল্লীর সুলতান ঘিয়াসুদ্দিন বলব। আমার শাসনকালে বাংলা দেশে বিদ্রোহ করেছিল তুলি। আমার তখন সত্তর বছর বয়স, তবু আমি নিজে গিয়ে সে বিদ্রোহ দমন করেছিলাম। গৌড়ের বাজারে দু’ধারি ফাঁসিকাঠ পুতে লটকে দিয়েছিলাম বদমাশ তুভ্রিলের চরদের। বদমাশকে কখনও খাতির করি নি, কখনও না। এরা মুসলমান নয়, এরা কাফের। বাদাউনের এক আমীর একবার চাবুকের চোটে তার এক গরিব চাকরকে মেরে ফেলে। চাকরের বিধবা আমার দরবারে নালিশ জানাতে আমি কি করেছিলাম জান? ওই বিধবার সামনে সেই আমীরকে চাবকে হত্যা করেছিলাম। মুসলমান বলে খাতির করি নি। সে মুসলমান নয়, সে কাফের। [ চীৎকার করিয়া ] দিল্লীর সুলতান পাঠান ঘিয়াসুদ্দিন বলব আমি-আমি বলছি, ওরা মুসলমান নয়, ওরা বদমাশ কাফের,- বেতমিজ, বেইমান। চীন থেকে স্পেন পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল যে মুসলমান, তারা কাপুরুষ নয়, তারা বীর, তারা খােদার খিদমৎগার, আজাদীর উপাসক••• তাঁহার বাহুর উদ্বোৎক্ষেপে যতীন নিমেষে যেন সুদূর অতীতে ইসলাম- ধর্মের মর্মমূলে নীত হইল। •••আরবের মরুভূমি ধুধু করিতেছে। কাছে দূরে ছােট বড় অসংখ্য বালির পাহাড়। আর কিছু নাই, কেবল মরুভূমি আর মরীচিকা। দূর চক্রবালরেখায় আকাশ নামিয়া আসিয়াছে। নীল নির্মল মহাকাশ। সেই মহাকাশের পটভূমিকায় কণ্টকসমাকীর্ণ একটি গােলাপগাছ•••তাহাতে গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তরাঙা গােলাপ ফুটিয়া আছে••• দূরে একটি, উট চলিয়াছে•••উটের পিঠে বসিয়া আছেন ইসলাম-জগতের হর্তাকর্তা বিধাতা খলিফা ওমর।
স্বপ্ন-সব তিনি বৃদ্ধ, কিন্তু অসমর্থ নন। সােজা বসিয়া আছেন, দৃষ্টি সুদূর আকাশে নিবদ্ধ। সঙ্গে একটিমাত্র চাকর, এক বােরা যব, কিছু খেজুর, এক মশক জল এবং একটি কাঠের থালা। আর কিছু নাই। •••আরব- সৈন্য জেরুজালেম অবরােধ করিয়াছে। জেরুজালেমের পপটিয়ার্ক একটি শর্তে আত্মসমর্পণ করিতে সম্মত হইয়াছেন—তিনি খলিফা ওমরের কাছে আত্মসমর্পণ করিবেন, আর কাহারও কাছে নয়। খলিফা ওমর তাই চলিয়াছেন। উষ্ট্রপৃষ্ঠে ছয় শত মাইল পথ অতিক্রম করিতে হইবে। তা হােক, কর্তব্য সর্বাগ্রে। •••জেরুজালেমের বাহিরে আরব-সেনাপতিরা তাহাকে সম্বর্ধনা করিবার জন্য সমবেত হইয়াছেন। উট আসিয়া থামিল। খলিফা ওমর সবিস্ময়ে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন—ইহারা কাহারা! বহুমূল্য সজ্জায় সজ্জিত অশ্বের সারি, সেনাপতিদের পরিচ্ছদে মখমল রেশম, তাহাতে হীরা মুক্তা জ্বলিতেছে। বৃদ্ধ আর সহ্য করিতে পারিলেন না, সড়াক করিয়া উটের পিঠ হইতে নামিয়া পড়িলেন এবং মাটি হইতে ঢেলা তুলিয়া তাহাদের দিকে ছুঁড়িতে লাগিলেন। তাহাকে এতবড় অপমান? এই সব জরি- জড়ােয়ার অর্থ কি ? তাহার যােদ্ধারা কোথায়? কোথায় সেই মরুচারী বেদুঈনরা? তিনি এই সঙের দল লইয়া জেরুজালেমে প্রবেশ করিবেন না। ইহাদের কাছে আত্মসমর্পণ না করিয়া পেটিয়ার্ক ঠিকই করিয়াছেন। চিল হইতে আত্মরক্ষা করিয়া সুসজ্জিত সেনাপতি- বৃন্দ দূরে সরিয়া গিয়াছিলেন। নিজের ভৃত্যটিকে মাত্র সঙ্গে লইয়া খলিফা ওমর একাই নগর-প্রবেশ করিলেন। প্রবেশ করিবার পূর্বে যতীনের দিকে একবার ফিরিয়া চাহিলেন। তাহার দৃষ্টি যেন বলিয়া উঠিল—ইসলামধর্ম ভােগী গুণ্ডার ধর্ম নয়, ত্যাগী শহীদের ধর্ম। তাহা দুর্বলকে পীড়ন করে না, তাহা অসত্যের কবল হইতে জান কবুল করিয়াও সত্যকে মুক্ত করে।••• ধীরে ধীরে আর একটি ছবি ফুটিয়া উঠিল—হুগলির হাজি মহম্ম মহসিন•••অতিশয় নিষ্ঠাভরে স্বহস্তে কোরাণ নকল করিতেছেন•• অগাধ সম্পত্তির মধ্যে বাস করিয়াও তিনি ফকির••• স্বজাতির উন্নতির জন্য সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়া গেলেন।••• এ দৃশ্যও মিলাইয়া গেল।••• পর পর কয়েকটা ছবি ফুটিয়া মীর মশাররফ হােসেনের ছবি ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনা করিতেছেন••• ‘অগ্নিবীণা হাতে করিয়া দাড়াইয়া আছেন কবি কাজি নজরুল ইসলাম••• আবিদ মিঞা—চমৎকার রামায়ণ গান করিত••• উঠিল। প্রস্তর-তরুণী। আমাকে মুক্ত কর, মুক্ত কর, মুক্ত কর••• যতীন ফিরিয়া দেখিল, উন্মুখ দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া আছে প্রস্তর-তরুণী নয়, বন্দিনী সীতা। এ তাে তাহার ঘর নয়, এ যে অশােক বন। রাবণ স্মিতমুখে অদূরে দাড়াইয়া আছে। রাবণ। [ সীতাকে ] যাদের উপর নির্ভর করে এতদিন তুমি আমার দিকে ফিরে চাও নি, এবার সেই রাম-লক্ষ্মণকে নাগপাশে বেঁধেছি, ওই দেখ— শরপ্তময়। লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্ৰ ধীরে ধীরে মূর্ত হইয়া উঠিল। অসংখ্য শবাকীর্ণ বিরাট প্রান্তর। বহু সৈন্য বিনষ্ট হইয়াছে। নাগপাশ-বদ্ধ হত-চেতন রাম-লক্ষ্মণকে ঘিরিয়া বহু বীর বিলাপ করিতেছেন। রাম-লক্ষ্মণের বর্ম বিধ্বস্ত, শরাসন বিক্ষিপ্ত, সর্বাঙ্গ শরবিদ্ধ, মনে হইতেছে, যেন তাহারা অসংখ্য নাগ শররূপ ধারণ করিয়া তাঁহাদের আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। অদূরে রাবণ দাড়াইয়া হাসিতেছে•••তাহার- দশ মুণ্ডে কামনালুব্ধ লক্ষ চক্ষু জ্বলজ্বল করিয়া জ্বলিতেছে•••ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত রূপান্তর ঘটিতে লাগিল••রাবণের রূপটা প্রথমে ক্লাইব, পরে লর্ড ডালহাউসিতে পরিণত হইল"বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা অযােধ্যা বেরার পাঞ্জাব সব একে একে নাগপাশে বাঁধা পড়িতেছে•••রাম-লক্ষ্মণ হিন্দু-মুসলমানে রূপান্তরিত হইল। তাহার পর অন্ধকার। গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইতেছে। দূরে ওটা কিসের শব্দ। রাবণের স্বপ্নসম্ভব হাসি, না ইংরেজের কামান? সমস্ত নিস্তব্ধ হইয়া গেল আবার। ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। তাহার পর ঝড় উঠিল, কোথা হইতে ছুটিয়া আসিল কালাে কালাে বিশাল মেঘ, মেঘের বুকে জ্বলিয়া উঠিল বিদ্যুৎবহ্নি। চরাচর প্রকম্পিত হইয়া উঠিল, মনে হইল, যেন ভূমিকম্পে বসুধা বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে ; আকাশেও আলােড়ন ; সপ্ত-সমুদ্র গর্জন করিতেছে•••বিরাট পক্ষ সঞ্চালন করিয়া উড়িয়া আসিলেন বিনতা-নন্দন গরুড়•••গরুড়কে দেখিয়া সর্পকুল পলায়ন করিতেছে•••নাগপাশমুক্ত রাম-লক্ষ্মণ পুনরায় ভীম-পরাক্রমে যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন।•••গরুড় দেখিতে দেখিতে রূপান্তরিত হইল সিপাহী- বিদ্রোহে•••পরাধীনতার নাগপাশ খুলিয়া খুলিয়া গেল••হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি যুদ্ধ করিতেছে•••নানাসাহেব, আজিমুল্লা খান৷•••সিপাহী- বিদ্রোহ রূপান্তরিত হইল কংগ্রেসে•••সেখানেও হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বদরুদ্দিন তায়েবজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহম্মদ রহিমতুল্লা সয়ানী, আর. এন. মুধলকর, নবাব সৈয়দ মামুদ, হাকিম আজমল খান, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মৌলানা মহম্মদ আলি, মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ।•••সহসা একটা প্রচণ্ড শব্দ হইল•••কংগ্রেস মিলাইয়া গেল•••লঙ্কার প্রান্তরে রাম হাহাকার করিতেছেন•••রাবণ লক্ষ্মণের বুকে শক্তিশেল হানিয়াছে। রামের হাহাকার ক্রমশ যেন শঙ্খধ্বনিতে পরিণত হইল•••চারিদিকে আবার শখ বাজিয়া উঠিয়াছে••• আবার হাহাকার•••জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম,গুড়ুম গুড়ুম•••বন্দুকের আওয়াজ শােনা গেল••জয় হিন্দ বন্দে মাতরম, জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম্••আবার সব স্তব্ধ••একটা মােটুর আসিবার শব্দ শােনা গেল। ৪০ প্রস্তর-তরুণী। আমাকে মুক্ত কর, মুক্ত কর, মুক্ত কর••• ১২ স্ব-সম্ভব যতীনের মনে হইল, তাহাদেরই বাড়ির গেটের সামনে কলরব উঠিয়াছে। সে তড়িৎস্পৃষ্টবৎ উঠিয়া দাড়াইল। বড়দা যে বন্দুক দুইটা রাখিয়া গিয়াছিলেন, তাহারই একটা তাড়াতাড়ি তুলিয়া লইতে গিয়া সে এক কাণ্ড করিয়া ফেলিল। বন্দুকের নলের ধাক্কায় প্রস্তর- তরুণী মেঝেতে পড়িয়া গিয়া সশব্দে চুরমার হইয়া গেল। অন্ধকার। •••্যতীন হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া দেওয়ালের কাছে গিয়া আর একটা সুইচ টিপিতেই আলােটা জ্বলিয়া উঠিল। আলাের ঠিক নীচেই এক সারি ছবি ছিল—মহাত্মা গান্ধী, বিবেকানন্দ, চিত্তরঞ্জন, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র। ইহারা সকলেই যেন তাহার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। গান্ধীজীই প্রথমে হাসিমুখে সম্বর্ধনা করিলেন, তঁাহার ফোকলা দাতের হাসিতে শিশুর সরলতা ফুটিয়া উঠিল। মহাত্মা গান্ধী। তুমি একটু আগেই যা দেখলে তা স্বপ্ন নয়, সত্য, দেশজোড়া এই যে বিক্ষোভ, সত্যিই তা লক্ষ্মণের শক্তিশেলে রামের বিলাপ। কিন্তু রাম আজ আত্মবিস্মৃত। লক্ষ্মণের বুকে রাবণ আজ যে শক্তিশেল হেনেছে, তা যে হিন্দুবিদ্বেষ তা সে বুঝতে পারছে না। সেই বিদ্বেষের বিষে আজ মুছিত হয়ে পড়েছে সৌমিত্রি। তাকে বাঁচাতে হবে। শক্তিশেলে লক্ষ্মণ যখন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, তখন রাম তাে তার বুকে গুলি করতে যায় নি। তােমার হাতে তবে বন্দুক কেন ? যতীন লজ্জিত হইয়া পড়িল। মহাত্মা গান্ধী। [ হাসিয়া ] মহর্ষি বাল্মীকি বলে গেছেন, গন্ধমাদনেই এর ওষুধ আছে। গন্ধমাদন পাহাড় নয়—গন্ধে যা চতুর্দিক আমােদিত করে অথচ যা পর্বতের মত দৃঢ়, সেই বিশুদ্ধ মানব- চরিত্রের নামই-গন্ধমাদন। বিশল্যকরণীও গাছের শিকড় নয়—ওসব
স্বপ্ন-পব
রূপক—যা সত্যিই মানুষকে বিশল্য অর্থাৎ বেদনামুক্ত করে, তার
নাম—ভালবাসা, প্রেম। এই গন্ধমাদনের ভার যিনি বহন করতে
পারবেন, তিনি শাস্ত্রবিৎ মহাশক্তিশালী আত্মত্যাগী মহাবীর। বন্দুক
নয়, তারই এখন প্রয়ােজন। তিনি না এলে সীতা উদ্ধার হবে না।
গান্ধীজীর পাশেই বিবেকানন্দের ছবি। যতীন দেখিল, বিবেকানন্দের
আয়ত-নয়ন প্রদীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। নীচে কলরবটা বাড়িয়া উঠিল
•••কিন্তু সমস্ত ছাপাইয়া গমগম করিয়া উঠিল বিবেকানন্দের উদাত্ত
কণ্ঠস্বর। যতীন নড়িতে পারিল না, মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনিতে লাগিল।
বিবেকানন্দ।
শােন বন্ধু, শােন শােন, কহিতেছি অন্তরের কথা,
আমার জীবনে আমি বুঝিয়াছি এই সত্য সার।
ঝঞ্চাক্ষুব্ধ এ সমুদ্রে চারিদিকে তরঙ্গ ভীষণ,
একটি তরণী আছে, যা শুধু করিতে পারে পার।
নহে তন্ত্র, নহে মন্ত্র, নহে, জপ, নহে প্রাণায়াম,
বিজ্ঞান দর্শন নহে, নহে কোন বিধান বা বিধি,
নহে ত্যাগ, নহে ভােগ, মায়া ওর ছদ্মবেশী কাম।
ভালবাসা ভালবাসা একমাত্র ওই শ্রেষ্ঠ নিধি।
অমৃতের পুত্র তুমি, অনন্তের প্রতীক মহান
অফুরন্ত প্রেমসিন্ধু তােমারই অন্তরে উথলায়।
দাও-দাও-দাও শুধু চাহিও না কোন প্রতিদান,
প্রতিদান চাহিলেই মহাসিন্ধু বিন্দু হয়ে যায়।
মহত্তম ব্রাহ্মণ বা ক্ষুদ্রতম
কীট
পরমাণু
সকলেরই মাঝে তিনি প্রেমের ঠাকুর নারায়ণ।
দেহ প্রাণ শন আত্মা দাও, বন্ধু, সর্বস্ব তােমার
তাঁহারই চরণে সব ভক্তিভরে কর সমর্পণ।
১০ স্বল্পসম্ভব নিখিল বিশ্বের মাঝে হের তার বিচিত্র প্রকাশ এরে অবহেলা করি মুক্তি কোথা রছ সন্ধান। উচ্চনীচনির্বিশেষে ভালবাস—শুধু ভালবাস ওই মুক্তি, ওই মন্ত্র, ওই পূজা, ওই ভগবান। বিবেকানন্দ থামিতে না থামিতেই দেশবন্ধুর কণ্ঠ শােনা গেল। দেশবন্ধু। ওই যে বাঙালী কৃষক সমস্ত দিন বাঙলার মাঠে মাঠে আপনার কাজ ও আমাদের কাজ শেষ করিয়া দিবা অবসানে ঘর্মাক্ত- কলেবরে বাঙলার কুটিরে কুটিরে গান গাহিতে গাহিতে ফিরিতেছে, উহারা মুসলমান হউক শূদ্র হউক চণ্ডাল হউক উহারা প্রত্যেকেই যে সাক্ষাৎ নারায়ণ। অহঙ্কারী, মাথা নােয়াও। অবিশ্বাসী, তােমার প্রাণে বিশ্বাস জাগাও, জাগাও-তােমার সম্মুখে যে নারায়ণ। আততায়ী, তােমার হাতের ছুরি ফেলিয়া দাও, জন্মের মত ফেলিয়া দাও—তােমার সম্মুখে যে নারায়ণ। ডাক ডাক, সবাইকে ডাক। প্রাণের ডাক শুনিলে কেহ কি না আসিয়া পারে ? ওঠ, জাগ, আপনার কল্যাণকে জাগাও••• রবীন্দ্রনাথের চক্ষু হইতে বহ্নি বিচ্ছুরিত হইতেছিল। শাণিত ছুরিকার মত তীক্ষ কণ্ঠ যেন অন্ধকারকে বিদীর্ণ করিয়া দিল। রবীন্দ্রনাথ। শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মান-ভার মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার। নত করি আঁখি দেখিবারেও নাকি নেমেছে ধূলার তলে হীন পতিতের ভগবান অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। তবু ।
বংগব
দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাড়ায়েছে বারে
অভিশাপ আঁকি দিল তােমার জাতির অহংকারে
সবারে না যদি ডাকো
এখনও সরিয়া থাকো
আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান
মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতা-ভম্মে সবার সমান।
বঙ্কিমচন্দ্র। [ স্মিতহাস্যসহকারে ] বন্দে মাতরম্।
আলাের নীচেই ছােট একটা টেবিল ছিল। তাহার উপর একখানা
বই ছিল—ব্রাদার্স কারামাজোভ। সেই পুস্তকের ভিতর হইতে একটি
মূর্তি বাহির হইয়া আসিল। রুশদেশীয় কৃষকের মূর্তি। অন্তর এবং
বাহিরের বহুবিধ উৎপীড়নের কাহিনী তাহার চোখের দৃষ্টিতে লেখা
রহিয়াছে। যতীনের দিকে চাহিয়া সে দৃষ্টি ঈষৎ হাস্যদীপ্ত হইল।
মূর্তি। অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে জীবন কেটেছে আমার,
সাইবেরিয়ায়, জেলে, গরিবের কুঁড়েতে, চোরের আড্ডায়, ধনীর
প্রাসাদে-বহু জায়গায় ঘুরেছি। বইও পড়েছি অনেক রকম ; কিন্তু
জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা কি লাভ করেছি জানার চেয়ে বড় সত্যের
সাক্ষাৎ জীবনে আর পাই নি, কি তা জান ?
যতীন। না।
মূর্তি। কথাটি বাইবেলে আছে—লাভ দাই নেবার। প্রতিবেশীকে
ভালবাস।
যতীন। আপনি কে?
মূর্তি। ফিয়ডৱ উস্টয়েভসকি।
ডস্টয়েভসকি অদৃশ্য হইয়া গেলেন। সিড়িতে পদশব্দ শােনা গেল।
দ্রুতপদে মেজ বউদি প্রবেশ করিলেন। তিনি অতিশয় উত্তেজিত।
১:
১০৬
স্বপ্ন-সব
?
মেজ বউদি। শুনেছ, কি কাণ্ড হয়েছে। উঃ।
যতীন। কি
মেজ বউদি। নীলার আজ বিয়ে ছিল, জান তাে? বিয়ে হচ্ছিল,
এমন সময় হৈ-হৈ করে একদল গুণ্ডা তাদের বাড়িতে ঢুকে প্রবালকে
মেরে ফেলেছে, যােগেন পুরুতকেও মেরে ফেলেছে— নীলাকে পি'ড়ে
থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের ভলান্টিয়াররা রীতিমত লড়াই
করে কেড়ে নিয়ে এসেছে তাকে। দুজন ভলান্টিয়ার-ছকু বীরেন
লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছ।
যতীন।
সে কি। নীলা কোথায় এখন?
মেজ বউদি। মােটরে করে আমাদের বাড়িতেই তাকে দিয়ে
গেল যে। মােটরের শব্দ শুনতে পেলে না? নীচে শুইয়ে দিয়েছি
তাকে। একটি কথা কইছে না, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে খালি।
যতীন কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হইয়া রহিল।
যতনি। বড়দা-মেজদার কোনও খবর এসেছে ?
মেজ বউদি। হ্যা, ওই ভলান্টিয়াররাই বলে গেল। তাদের
কোনও বিপদ এখনও হয় নি, তবে তারা এখনও ওই ভিড়ের মধ্যেই
আছেন। ওঁরা কখন যে ফিরবেন! ভাল লাগে না বাপু আমার
এ সব।
যতীন। বড় বউদি কি করছেন ?
মেজ বউদি। তিনি রান্নাঘর থেকে এই তত বেরুলেন। নীলাকে
একটু গরম দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করছেন।
যতীম। চলুন, দেখি গিয়ে।
মেজ বউদি। না, তুমি যেও না। বড়দি তােমাকে যেতে মানা
করলেন এখন।
স্বপ্ন-সব
১০৭
এত দুঃখের মধ্যেও মেজ বউদির মুখে বউদি-সুলভ ব্যঙ্গের মৃদু হাসির
ঝিলিক একবার দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল।
মেজ বউদি। বড়দি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি খাবে এখন?
রান্না হয়ে গেছে।
যতীন। না, খাব না। সেজদা পূজোর ঘর থেকে বেরােন নি
এখনও?
মেজ বউদি।
। আমি জানলার ফাক দিয়ে দেখেছিলাম
একটু আগে। চোখ বুজে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে—মনে হয়
বাহ্যজ্ঞানশূন্য।
সেজ বউদি ?
মেজ বউদি। বীণাও তেমনই আপাদমস্তক মুড়ে শুয়ে আছে।
ওঠাতেও সাহস হচ্ছে না। বুঝতে পেরে গেছে বােধ হয়। মায়ের
প্রাণ তাে•••ভাল লাগে না বাপু এ সব। [ কেমন যেন অন্যমনস্ক
অস্থির হইয়া পড়িলেন ] তুমি তা হলে খাবে না? আমি যাই তা
হলে।
যতীন।
চলিয়া গেলেন। যতীন স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল। আলমারির
অন্ধকার কোণ হইতে অশরীরী একটি মূর্তি বাহির হইয়া সম্মুখে
দাড়াইল। দেখিলে মনে হয় রাজপুত।
যতীন। কে আপনি?
অশরীরী মূর্তি। আমি একজন মুসলমান নেতা।
যতীন। মুসলমান নেতা ?
অশরীরী মূর্তি। হঁ্যা। তুমি যা ভাবছ, তার জবাব দিতে
এসেছি। [ দাতে শত চাপিয়া নিরুদ্ধ আক্রোশে ] মুষ্টিমেয় বলে
ভয় পাবার লােক নই আমরা। মনে নেই, গজনীর মামুদ মাত্র
এক হাজার সৈন্য নিয়ে এসে কি কাণ্ড করেছিল?
Sobo
যতীন। ( হাসিয়া ] এখন আর সেদিন নেই জনাব। এখন
ভারতবর্ষের এক প্রান্তের খবর আর এক প্রান্তে নিমেষে পৌছয়।
দরকার হলে এক প্রান্ত থেকে হাজার হাজার লােক উড়ে চলে যাবে
আর-এক প্রান্তে এক ঘণ্টার মধ্যে। তা ছাড়া গজনীর মামুদের নজির
দেখিয়ে তুমি আস্ফালন করছ কেন মিঞা সাহেব? তার সঙ্গে তােমার
রক্তের তাে সম্পর্ক নেই কোনও, রক্তের সম্পর্ক আছে বরং আমাদেরই
সঙ্গে। নােয়াখালিতে আজ তােমরা যেমন অসহায় লােকদের জোর
করে মুসলমান করছ, ওই গজনীর মামুদরা তেমনই এককালে ভয় কিংবা
লােভ দেখিয়ে তােমাদের বাপ-দাদাদের মুসলমান করেছিল।(তােমরাও
তাে এ দেশেরই লােক ভাই। তােমাদের সঙ্গে আমাদের এইটুকু মাত্র
তফাৎ, গনীর মামুদেরা তােমাদের মুসলমান করতে পেরেছিল,
আমাদের পারে নি। তােমরা যদি আবার আমাদের মধ্যে ফিরে
আসতে চাও, আমরা রাজি আছি। না যদি আসতে চাও, তাতেও
আপত্তি নেই—যেমন আছ তেমনই থাক মুসলমান ধর্মও ভাল ধর্ম,
কোনও ধর্মই খারাপ নয়। তবে আস্ফালন করাে না। এটা
হাস্যকর
হঠাৎ হা-হা করিয়া কে যেন হাসিয়া উঠিল। তাহার পর আলমারির
আর এক দিক হইতে বাহির হইয়া আসিল পাগল নজরুল ইসলাম।
নজরুল। “হিন্দু না ওরা মুসলিম?”—ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন
কাণ্ডারী, বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মাের মা’র!
দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।
ইহারা দুইজন অদৃশ্য হইবার পর আর একটি তৃতীয় মূর্তি আবির্ভূত
হইল। কুড়ি বৎসরের ছেলে একটি। চোখে নির্ভীক দৃষ্টি।
স্বল্পসম্ভব যতীন। আপনি কে ? , ছেলেটি। আমার নাম বিভূতিভূষণ সরকার। আমি ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে বােমা দিয়ে ছােট লাটের গাড়ি ওড়াবার চেষ্টা করেছিলাম। কেন জান? তার কিছুদিন আগে জামালপুরের মেলায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। সে দাঙ্গায় রাজপুরুষরা মুসলমানদের সাহায্য করেছিলেন। এই ইংরেজদের তাড়াতে না পারলে হিন্দু-মুসলমানের মিলন হবে না। বিভূতি সরকার অদৃশ্য হইবার সঙ্গে সঙ্গে আর একটা দৃশ্য মূর্ত হইল, —একটা সাপুড়ে সাপ খেলাইতেছে। সাপুড়ের মুখটা মিস্টার চার্চিলের মুখের মত। •••এ দৃশ্যও অন্তর্হিত হইল। যতীন দেখিল, দেওয়ালে অসংখ্য পােকা আসিয়াছে, টিকটিকি উন্মাদের মত পােকা শিকার করিতেছে। টিকটিকিনী সন্তর্পণে ওদিকের কোণ হইতে মুখ বাড়াইল, কিন্তু টিকটিকির সে দিকে চাহিবার অবসর নাই.•• সে ক্রমাগত খাইয়া চলিয়াছে। সহসা একটা গম্ভীর উদাত্ত ধ্বনি শূন্যে ভাসিয়া আসিল। কেমনে ভুলিলে হে ভাই, কেমনে তুমি ভুলিলে হে আজি মাতৃসম নিত্য যারে সেবিতে আদরে। হে রাঘব-কুল-চূড়া, তব কুলবধূ রাখে বাঁধি পৌলস্তেয় ? না শাস্তি সংগ্রামে হেন দুষ্টমতি চোরে, উচিত কি তব এ শয়ন- বীর-বীর্যে সর্বভূক সম দুর্বার সংগ্রামে তুমি—উঠ ভীমবাহু••• আবৃত্তি করিতে করিতে মাইকেল মধুসূদন প্রবেশ করিলেন। পিছনের দিকে দুই হস্ত সিদ্ধ। আপনমনে আসিলেন এবং চলিয়া গেলেন, কোনদিকে ফিরিয়া চাহিলেন না।•••সিড়িতে পদশব্দ শােনা গেল। পাড়ার একজন ভলান্টিয়ার-অশােক, দ্রুতপদে আসিয়া প্রবেশ করিল।
১১০
স্বপ্ন-সব
তাহার সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত। কপালটা কাটিয়া গিয়াছে। মুখের হাসি
কিন্তু ম্লান হয় নাই, চোখের দৃষ্টি নির্ভীক। বয়স বেশি নয়, কিশাের।
অশােক। আপনার কাছে টিঞ্চার আইডিন আছে যতীনদা?
যতীন। ইস, কি হল?
অশােক। অন্ধকারে বোঁ করে একটা ঢিল এসে লেগে গেল।
হয়তাে আমাদেরই কেউ ছুড়েছে। [ হাসিল ]
যতীন আলমারি হইতে তুলা ও টিঞ্চার আইয়ােডিন বাহির করিয়া
অশােকের কপালে লাগাইয়া দিতে লাগিল। অশােক অবিচলিত
হইয়া দাড়াইয়া রহিল।
যতুন। বড়দা-মেজদার খবর জান ?
অশােক। বড়দার ডান হাতে চোট লেগেছে। মেজদা তাঁকে
নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। উঃ, বড়দা মেজদা দুজনেই কি লড়াটাই
লড়েছেন! ওঁরা না থাকলে নীলাদিকে ঠিক নিয়ে চলে যেত।
যতীন। বড়দার হাতের চোট খুব বেশি নাকি
অশােক। না, খুব বেশি নয়। বড় জোর ফ্র্যাকচার হতে পারে,
আবার কি হবে?
?
বড়দার হাতের আঘাতটা যে কিছুই নয়, এই ভাব প্রকাশ করিয়া ভুরু
নামাইয়া অশােক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসিল। যতীন তুলা ও একটা
রুমাল দিয়া তাহার মাথাটা বাঁধিয়া দিল।
যতীন। এইবার শুয়ে পড় গিয়ে।
অশােক। [ বিস্মিত ] শােব কি! ওই মােড়ে আমার ডিউটি
রয়েছে এখন। আর একটা খবর শুনেছেন যতীনদা, ভারি মজার
স্ব-সব
১১১
খবর। শৈলেনবাবুকেও ওরা খুন করেছে। আমি চলি যতীনদা,
মােড়ে কেউ নেই।
ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। যতীন যেন কিরণমালার কণ্ঠস্বর শুনিতে
পাইল••• বহুদূর হইতে ভাসিয়া আসিতেছে।
রহস্য
কিরণমালা। [ বহুদূর হইতে মায়াপাহাড়ের
করেছি। আসছি আমি-আসছি—
যতীন উৎসুক নয়নে ঘরের দিকে চাহিল। কিরণমালা আসিল না,
বড় বউদি প্রবেশ করিলেন। তাঁহার হাতে একটা থালা। থালার
উপর একটা বাটি।
বড় বউদি।
বড় বউদি। তােমার খাবার দিয়ে গেলাম। আমি হাসপাতালে
যাচ্ছি।
যতীন। হাসপাতালে কেন?
তােমার দাদাদের খাইয়ে আসি। তােমার বড়দাকে
খাইয়েই দিতে হবে বােধ হয়। ডান হাত ভেঙেছে শুনছি। [ হাসিলেন]
যতীন। ওঁরা আসবেন না হাসপাতাল থেকে ?
বড় বউদি। রামদীন এসে বললে, ডাক্তারেরা রাতটা ওইখানেই
থাকতে বলেছে।
যতীন। মােটর তাে খারাপ, তুমি যাবে কি করে? ভাড়া-
গাড়িও তাে পাওয়া যাবে না এখন।
বড় বউদি। রামদীনকে সঙ্গে করে হেঁটেই চলে যাব।
কতটুকুই বা !
যতীন। চল, আমিই না হয় যাই তােমার সঙ্গে।
বড় বউদি। না না,
না, তুমি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেও না।
১১২ তােমাকে এখান থেকে এক পা নড়তে মানা করে গেছেন। তােমাকে যদি হাসপাতালে দেখেন, বাঁ হাত দিয়েই হয়তাে গুলি করে বসবেন। [ হাসিয়া ] চেন তত মানুষটিকে। দরকার নেই তােমার গিয়ে। দু-চারটে গুণ্ডা শুনছি নীলার সন্ধানে ঘুরছে এখনও। তুমি থাক বাড়িতে। রামদীন আমার সঙ্গে থাকবে, কিছু ভয় নেই। রুমি নােয়াখালি দৌড়তে পারল, আর আমি এটুকু যেতে পার না! নীলা ঘুমুচ্ছে—তুমি এখন নীচে যেও না যেন, মেজ বউ রইল তার কাছে। বৈঠকখানার ছাতে বাঁশের সিড়ি লাগিয়ে দিইয়েছি। খাবারটা এই টেবিলে রইল। গরম গরম খেয়ে নাও না বাপু, তুমি মাংসের যে যে পীস ভালবাস, তাই দিয়েছি বেছে বেছে। আচ্ছা, চললুম আমি। চলিয়া গেলেন। যতীন চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। মনে হইতে লাগিল, বড় বউদি যেন তাহার মা। মেজ বউদির সঙ্গে ঠিক এই সম্পর্ক তাহার নয়। তাহাকে সে এখনও ‘আপনি’ বলে। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। কতক্ষণ তাহার খেয়াল ছিল না। একটা শব্দ হইতে সে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল-পাশের ঘরের খােলা দরজা দিয়া ছাতটা দেখা যাইতেছে—বৈঠকখানার ছাত হইতে কাঠের সিড়ি দিয়া কে সন্তর্পণে উপরে উঠিতেছে। যতীন। কে ? কোনও সাড়া নাই। মূর্তিটা সিড়ি দিয়া উঠিয়া আসিয়া পাশের ঘরের খােলা দরজাটার সামনে আসিয়া দাড়াইল। যতীন ত্বরিত হস্তে বন্দুকটা তুলিয়া লইল। যতীন। কে—জবাব দাও, তা না হলে গুলি করব। মূর্তি। ভাই যতীন, আমি মহীউদ্দিন।
১১০ যতীন। মহীউদ্দিন। মহীউদ্দিন। আমায় তুমি বাঁচাও ভাই, আমার বাল্যবন্ধু তুমি। যতীন পাশের ঘরে গিয়া আলােটা আলিয়া দিল। মহীউদ্দিন দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া ঠকঠক করিয়া কাঁপিতেছে। ভয়ে তাহার চোখ মুখ বিবর্ণ। যতীন। মহীউদ্দিন? তুমি! ভেতরে এস। যতীনের বন্দুকটার দিকে মহীউদ্দিন বার বার চাহিতে লাগিল। যতীন। ভেতরে এস। মহীউদ্দিন। তােমার হাতে সে আর কথা শেষ করিতে পারিল না, বিস্ফারিত চক্ষে বন্দুকটার দিকে চাহিয়া বজ্রাহতবৎ দাড়াইয়া রহিল। যতীন। বাইরে কেন, ভেতরে এস না! মহীউদ্দিন। ভাই- সহসা দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। যতীন। [ আগাইয়া গিয়া হাত ধরিয়া ] এসএস মহীউদ্দিন। [সভয়ে পিছাইয়া গেল না-না-না- যতীন। ওসুমি, বুঝি ভয় পাচ্ছ, আমি তােমায় ঘরে পুরি মেরে ফেলব। সে ইচ্ছে থাকলে এতক্ষণ ফেলতাম। আশ্রিতকে রক্ষা করাই আমাদের ধর্ম যে ভাই। শুধু আমাদের ধর্ম নয়, তােমাদেরও ১১. ধর্ম। আমাদের যুদ্ধ গুণ্ডাদের বিরুতে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে নয়, ভুল করে না। এস, ভেতরে এস, বস। মহীউনি তবু ভাইয়া রহিল। যতীন। আচ্ছা, তােমার ভয় ভাঙিয়ে দিচ্ছি। দ্বিতীয় বন্দুকটি বাহির করিয়া আনিয়া তাহার হাতে দিল। যতীন। এই নাও, এইবার হ’ল তাে? আমি যদি তােমাকে আক্রমণ করি, তুমি আত্মরক্ষা করতে পারবে। এসব’স। মহীউদ্দিন ভিতরে আসিয়া বসিল। মহীউদ্দিন। আমি খেতে বসেছিলাম, এমন সময় শুরু হয়ে গেল। উ-উ- দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিতে লাগিল। যতীন। খাবে কিছু খাবার আছে। পােলাও মাংস আনিয়া তাহার সামনে ধরিয়া দিল। যতীন। খাও, খেয়ে খিল দিয়ে শুয়ে পড় তাড়াতাড়ি। কেউ যদি এর্কে দেখে ফেলে তােমাকে, তা হলে একটু মুশকিলে পড়ে যাব বুঝতেই পারছ। আমি বিছানা দিচ্ছি—বেশ করে খেয়ে দেয়ে শুয়ে এক কোন ভয় নেই। বিছানাটা পাতি, থাম।
১১৫ যতীন বিছানা পাতিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িল। মহীউদ্দিন নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার দুই গণ্ড বাহিয়া কেবল জল পড়িতেছিল। সহসা উঠিয়া সে আবেগভরে যতীনকে আলিঙ্গন করিল। তাহার মুখ হইতে অক্ষুটকণ্ঠে বাহির হইল—ভাই! ০ অনেকক্ষণ কাটিয়া গিয়াছে। মহীউদ্দিন পাশের ঘরে খিল দিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। যতীন একটা ঈজি-চেয়ারে ঠেস দিয়া চোখ বুজিয়া শুইয়া আছে। তাহার মন ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতের আকাশে উড়িয়া বেড়াইতেছিল -যে ভারতে পারি নাই, নীচতা নাই, হিংসা নাই, নাই, যাহা বহু শতাব্দীর পঙ্ককে অতিক্রম করিয়া রূপে রসে গন্ধে শতদল পদ্মের মত ফুটিয়া উঠিয়াছে••• যে ভারতে মানুষ কামনা করে, ধন নয়, মান নয়-আনন্দ আনন্দ আর শাস্তি। •••দ্বারপথে একটা শব্দ হইতেই যতীন চোখ খুলিয়া দেখিল, নীলা দাড়াইয়া আছে। কপালে বনে-চন্দন, পরনে চেলী। নীলা। আমি আবার ফিরে এলুম যতীনদা। ধীরে ধীরে সে ঘরে প্রবেশ করিল এবং যতীনের পায়ের কাছে উপুড় হইয়া পড়িল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা গুঞ্জনরবে চতুর্দিক পূর্ণ হইয়া উঠিল। যতীন দেখিল, অশরীরী ভ্রমরটা মনের আনন্দে গুনগুন করিয়া বেড়াইতেছে। অশরীরী ভ্রমর। একটা সুখবর তােমায় দিতে এলাম—আমি তার দেখা পেয়েছি যতীন কোন উত্তর দিল না। নির্বাক হইয়া বসিয়া রহিল শুধু।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.