Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Indumati
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
(কাব্য।
শীরসিকচন্দ্র রায় মহাশয় সাহিত্যার্ণব
প্রণীত।
৫৯নং নারিন্দা হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক
প্রকাশিত।
মূল্য এক টাকা মাত্র।
Printed by S. A. Gunny. At the Alexandra Steam Machine Press Dacca.
উৎসর্গ ।
বিক্রমপুর-তারপাশা-মহাশয়-বংশের
* *
শেষ-কীৰ্ত্তিমান-বংশধর
সঙ্গীত-সাহিত্য-শিল্প প্রভৃতি কলানুরাগী
পুণ্য-চরিত-আদর্শ-মহাত্মা
স্বগীয় রামচন্দ্র রায় মহাশয়-
.
পিতৃ দেবের
পবিত্র চরণেদ্দেশে এই ক্ষুদ্র
ইন্দুমতী-কাব্য-কুসুম
ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি
স্বরূপ
উৎসর্গীকৃত হইল।
No text on this page.
“বিক্রমপুরের-ইতিহাস” প্রণেতা ও “বিক্রমপুর” মাসিক পত্রিকার সম্পাদক সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক এযুক্ত যােগেন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখিত ভূমিকা কাব্য পৃথিবীর সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কাব্য হইতেই কবির পরিচয় পাওয়া যায়। সাহিত্যের ধারা যুগে যুগে পরিবর্তিত হইতে দেখা যায়, বর্তমান যুগেও সে লক্ষণ দেখা যাইতেছে—এখনকার দিনে কৰ্ম্মে ব্যস্ত নরনারী কাব্য ছাডিয়া খণ্ড কবিতার প্রতিই অধিক অনুরাগী, কাজেই মধুসূদন, হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্রের চিরমধুময় কাব্য অপেক্ষা লােকে খণ্ড কবিতা পাঠেই অধিকতর আনন্দ অনুভব করেন। এযুগ রবীন্দ্রীয় যুগ। এযুগে খণ্ড কবিতার অখণ্ড রাজত্ব, এহেন দিনে যাহারা কাব্য রচনা করিয়া সাহিত্য-জননীর চরণ-শতদলে ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি অর্পণ করিতে আসেন, তাহারা যে সাহসী বীর তাহাতে নিশ্চয়ই কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু আজ আমি ও এক খানা কাব্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখিতে অনুরুদ্ধ হইয়াছি, কিন্তু এই কাৰ্য্যে আমি যে সম্পূর্ণ অনধিকারী তাহা জানি, তবু বন্ধুজনের মেহের আব্দার এড়াইতে না পারিয়াই এই দুঃসাহসিক কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অতএব সুধীজন আমার এ ধৃষ্টতা মার্জনার চক্ষে দেখিবেন। ‘ইন্দুমতী' কাব্য মহর্ষি বাল্মিকী বিরচিত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাব্য-ইতিহাস রামায়ণের এক করুণ-চিত্র লইয়া রচিত হইয়াছে। ধাৰ্মিকাণ্য বিভীষণাত্মজ তরণী-সংহারের ঘটনাবলম্বনে এই কাব্য বিরচিত হইয়াছে। কাব্যের নাম তরণী-পত্নীর কল্পিত নামানুযায়ী প্রদত্ত হইয়াছে। কবি নানা ছন্দে এই বিষয়টীকে লইয়া অতি সুন্দর সরল ও সরস ভাষায় কাব্য খানি রচনা করিয়াছেন। লেখক প্রকৃত কবি, ভাব ভাষা ও ছন্দের উপর তাহার q অসাধারণ অধিকার। এই কাব্য প্রত্যেক সাহিত্য-রস-পিপাসু ব্যক্তির চিত্তরঞ্জন করিতে পারিবে বলিয়া ভরসা করি। ইহাতে ছনের এমনি একটা সহজ ও সরল গতি আছে যে উহা দ্বারা পাঠককে আপনা হইতেই কাব্যের প্রারম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত আকর্ষণ করিয়া লইবে। স্বর্গীয় আনন্দচন্দ্র মিত্রের মৃত্যুর পর পূর্ধ্ববঙ্গের আর কোনও কবি কাব্য পুস্পাঞ্জলি দ্বারা বাণী সেবা করিয়াছেন কিনা তাহা আমার জানা নাই, সে হিসাবেও এ কাব্যের বিশেষত্ব আছে। এখন লেখকের সম্বন্ধে দুই একটা কথা বলিব। রসিক বাবু বিক্রমপুরের প্রসিদ্ধ তারপাশা গ্রামের ভূম্যধিকারী রায়মহাশয় বংশধর। পদ্মা ইহাদের রাজ প্রাসাদতুল্য অনুপম বাস অট্টালিকা, জমিদারী ইত্যাদি স্বীয় কুক্ষিগত করিয়া এই বংশকে ঘােতর দারিদ্র্যের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়াছে, অর্থহীন হইলেও পূর্ববঙ্গীয় ব্রাহ্মণ-সমাজে ইহাদের স্থান অতি উচ্চে। লেখকের পরিচয়টুকু এই ক্ষেত্রে অনাবশ্যকীয় হইলেও উহার একটা সার্থকতা আছে বলিয়াই লিখিলাম। আমি এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখিতে বসিয়াও ভূমিকা লিখি নাই, শুধু একজন প্রকৃত কবিকে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য দেওয়ার জন্য যে সামান্য চেষ্টা করিয়াছি, তাহাকে সাধারণের সমক্ষে উপস্থিত করিবার যে সৌভাগ্য-সুখ লাভ করিয়াছি সে গৌরন টুকুই এখানে বিবৃত করিলাম। আশা করি সমালােচকগণ ও সাহিত্য রস-পিপাসুগণ কাব্য নাম শুনিয়াই নাসিকা সঙ্কুচিত না করিয়া কাব্য খানা অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিয়া মন্তব্য প্রকাশ করিবেন, ইহাই আমার সনির্বন্ধ অনুরােধ । ৫৪১নং নারিন্দা, ঢাকা। যােগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। বঙ্গাব্দ ১৩২৩, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ।
ইন্দুমতী-কাব্য ।
প্রথম সর্গ।
দেবেন্দ্র-বাঞ্ছিত রম্য রাবণ-আলয়
অতুল্য ভুবনে যেন সুষমা-ভাণ্ডার,
অম্বুধি পরিখা যার সৌধ হেমময়
নীলাকাশে ভাসে যেন ছবি চন্দ্রমার।
কনক প্রাচীরে ঘেরা, বিদ্যুতের ছটা
ঝলসিছে রবি-করে ধাঁধিয়া নয়ন,
সুনীল জলধি-জলে প্রতিবিম্ব-ঘটা
নবীন নীরদ-কোলে দামিনী যেমন।
দেউল উপরে রক্ষ সৈন্য অগণিত
নানা শস্ত্র-প্রহরণে সুসজ্জিত সবে,
সিংহদ্বার বজ্রসম লৌহ-বিনির্মিত
যমসম রক্ষীবৃন্দ ফিরিছে গরবে।
• {
ইন্দুমতী-কাব্য।
হ-চুড়ে হেমময় কুন্ত সারি সারি
সুশােভিত স্তরে স্তরে মাল্যের মতন
বিজয় কেতন রিপুগৰ্ব্ব-খর্বকারী
উড়িছে প্রাসাদোপরি মােহিয়ে নয়ন।
কর-শান-ভীত-চিত সদাগতি
মন্দার-সুগন্ধ অঙ্গে করি বিলেপন
প্রবাহিত অবিরত
মৃদুমন্দ
গতি
স্বর্গীয় সৌরভে হারে নন্দনকানন।
মন্দাকিনী-ধারা হেন সুদিব্য বিপণি
বহিছে সুপণ্য-বারি অনন্ত ধারায়
শঙ্খ, মণি, হীরা, শুক্তি, মুক্তা-প্রসবিনী
সুনীল নীরজ পণ্য নয়ন ভুলায়।
রাজবত্ম-পার্শ্বদ্বয় রহে সুসজ্জিত
নয়নরঞ্জন-কর নানা ফুল ফলে
বহে দধি, দুগ্ধ, ঘৃত ভার-সংস্থাপিত
স্রোতস্বতী-স্রোত যথা অবিরাম চলে।
পশু-শালে নানা পশু বিহগ-মন্দিরে
ধ্বনিত হতেছে কত সুমধুর তান,
যন্ত্রালয়ে যন্ত্ৰীগায় মল্লার গম্ভীরে
বিদ্যালয়ে করে প্রাজ্ঞ দ্বিজ সাম গান।
সুদিব্য ব্যায়ামালয়ে ভীম মল্লগণ
প্রতিদ্বন্দী সঙ্গে রঙ্গ-দ্বন্দে নিয়ােজিত,
প্রথম সর্গ।
রঙ্গমঞ্চে নাচে গায় নটী অগণন
নয়নে সুঠাম কাম-চাপ নিয়ন্ত্রিত।
অট্টালিকা চূড়স্থিত রাক্ষস-ললনা
সুসজ্জিতা মহামূল্য বসন-ভূষণে,
বিমুক্ত কুন্তলা হেরি অনিন্দিতাননা
চন্দ্রমা সলজ্জমুখ লুকায় গগনে।
প্রাসাদের প্রতিবিম্ব সরসীর জলে
খেলিছে তরঙ্গ সঙ্গে সুরঙ্গ-মাধুরী,
মৰ্ম্মর-সােপানে বসি রক্ষ-বালা দলে
মনােরঙ্গে খেলে সঙ্গে সঙ্গিনী সুন্দরী।
সে বিমল জলে ভাসে প্রফুল্ল কমল
প্রিয়-প্রেমে উন্মাদিনী নাচিছে উল্লাসে
সমীর-হিল্লোলে নাচে তরঙ্গের দল
কল কলে কলহংস বিচরে সভাষে।
নীর-কেলি-কৌতুকিনী কর-রমণী
তরুণ যৌবনছটা উদ্ভাসিছে গায়,
প্রেমােন্মাদে মন্মথের আলয়-রূপিনী
উন্মুক্ত-বসনা রঙ্গে ভাসিয়া বেড়ায়।
সে অক্ষি-কটাক্ষ হেরি তীরে কুরঙ্গিনী
দাঁড়ায়ে নিস্পন্দ-কায় পলক-বিহীন,
সমদৃষ্টি-সুখখান্মত্ত জলে পঙ্কজিনী
দর্শনে দর্শনাকৃষ্ট
তুলনে
মলিন।
ইন্দুমতী-কাব্য।
সর-তীরে মনােরম্য রাজে উপবন
রতিকান্ত খেলে নিত্য বসন্তের সনে,
পঞ্চমে কোকিল করে মধুর কূজন
বিলায় সুবাস-সুধা মন্দ সমীরণে।
অদূরে মন্দিরে গৌরী-মূর্তি প্রতিষ্ঠিত
সাধক নিয়তরত ইষ্ট-অর্চনায়,
শিব-ভক্ত নৈকষেয় ভক্তি অপ্রমিত
কর-অন্তরে প্রেম-পীযূষ খেলায়।
মন্দোদরী-মনােহর, মনােহর পুরী,
বিশ্বকর্মা স্বীয় করে সুচারু নিৰ্মিত,
ধন্য বীর নৈকষেয় যাই বলিহারি
ত্রিভুবনে কীৰ্ত্তি যার উপমা-বর্জিত।
যার প্রেম-পাশে বদ্ধ। নগেন্দ্র-নন্দিনী
উগ্রচণ্ডা খাণ্ডারে রক্ষে গৃহ-দ্বার
পার্থিব বৈভবে লঙ্কা-অতুল্য-অবনী
বিলাসের প্রতিমূর্তি বৈজয়ন্তী ছার !
হেন রক্ষাবাসে বক্ষ-স্যন্দন-বাসিনি
তরণী-ভবনে পশ,সুধার আধার
যথায় বিরাজে ইন্দুমতী সুহাসিনী,-
দেখাও নীরদ-মুক্ত-ছবি চন্দ্রমার।
গৃহ অভ্যন্তরে নানা চিত্র মনােহর
সুবাসিত ফুল-হার দেউলের গায়,
প্রথম সর্গ।
সুচিত্রিত ঊর্ধ্বভাগে চাদোয়া সুন্দর
ঝালরে মুকুতাপাতি সুষমা বিলায়।
সুবৰ্ণ পৰ্যঙ্কোপরি কোমল শয্যায়
বিরাজিছে তরণীর হৃদয়-প্রতিমা,
দাসীবৃন্দ শশব্যস্তে চামর দোলায়
সতত প্রফুল্ল সেই বদন-চন্দ্রিমা।
যৌবন-তরঙ্গ অঙ্গে পূর্ণ কলেবর !
বিচিত্র কবরী শশাভে সে চাচর কেশে,
শ্রবণে কুণ্ডল দোলে নেত্ৰ-তৃপ্তিকর
ইন্দু-দ্যুতি গজমতি ভাতে গল দেশে।
হরিমান-হারি কটি স্বর্ণ চন্দ্রহারে
ধরেছে কি চারু শােভা ।
কমল-কোমল কর বলয়ের ভারে
আমরি ! ভাঙ্গিছে যেন, চন্দ্রমা নখরে ।
অঞ্জন-রঞ্জিত নেত্রে বঙ্কিম সুঠাম
কি অপূর্ব দন্ত-ছটা জিনিয়া দামিনী,
স্তনে যৌবনের ধ্বজা উড়াইয়া কাম
কটাক্ষে নিক্ষেপে বাণ রূপে সৌদামিনী।
গন্ধ-বিজয়-লব্ধ রমণী রতনে
অর্পিয়া হৃদয়ানন্দে নন্দন-প্রতিম
রক্ষে স্বপ্রিয়তম সরমা-নন্দনে
রেখেছে গণ-প্রেম-কীৰ্ত্তি নিরুপম।
অলক্ত অধরে
৩
ইন্দুমতী-কাব্য।
A. - - - - -
নিশি হাস্যময়ী যথা শপ আগমনে
ভাসিল দম্পতি দেহে আনন্দের নীরে
প্রীতি-মন্দাকিনী বহে সরমার মনে
নিরখি মিলিত যেন কমল-মিহিরে।
সরল সুশীলা বালা জীবনে কখন
নাহিজানে বিষাদের কেমন যাতনা
বসন্ত-সম্ভোগশীলা প্রকৃতি যেমন
লীলাময়ী অমলিনা সহাস্য আননা।
বিগত নীশিথে হেরি অতি কুম্বপন,
কপিছে সভয়ে সতী আকুল অন্তরে,
প্রবেশিলে রুদ্রপীড় সমর-প্রাঙ্গন
কপিলা ঐন্দ্রিলা-বধূ যথা থর থরে !
সঘনে বহিছে শ্বাস মলিন বদন,
ঢাকিল চন্দ্রমা যেন কলঙ্ক অম্বরে
অশ্রুবিন্দু নেত্র-প্রান্তে দিল দরশন
অমলা সঙ্গিনী প্রতি কহিলা কাতরে -
“শুন অমলা স্বজনি, আমার হৃদয়খানি
থাকি থাকি মাঝে মাঝে
কাপি কেন উঠিছে।
যখন শুনিনু রণে,
মকরাক্ষ রাম-বাণে
মহানিদ্রা গিয়েছে
তদবধি মমপ্রাণ,
জ্বলে ইন্ধন-সমান
কত বিভীষিকা-সিন্ধু
উত্তালিত হৃদয়ে।
চিরতরে মহাবাহু
প্রথম সর্গ। দশদিশি শূন্য দেখি উড়েগেল পালিয়ে। কি স্বপন হেরিলাম রণ-বেশে বর্ণিল রাঘব-সমরে যাই” গল দেশে জড়িল সঘনে কঁপিল প্রাণ শুকাইল হৃদয়ে। নাচিছে দক্ষিণ আঁখি যেন প্রাণ-পােষাপাখী গত নিশিশেষ যাম ইন্দুর হৃদয় ইন্দু “প্রমদে বিদায় চাই, ভু-পাশে প্রেমাবেশে পতি কাল-রণে যান ধমনী-শােণিত মম যেন ছিন্নমূল লতা শশাঙ্ক সুনীল যেন হৃদয়ে দারুণ জ্বালা ভুজ-পাশে-স্বামী পাশে “তােমারে হৃদয়ে ধরি গভীর গহন বনে চাহি রাজত্ব ধন সুরম্য এ হর্মাোপরি ভ্রমি ভিখারিণী-বেশে ছায়ার আকার আমি নতুবা জলধিজলে দেহে মিলি এককালে আগে দিয়ে ভালবাসা পশিতে দিবনা নাথ। শােকে হনু অবনতা হল রাহু-উদয়ে। জড়ায়ে পতির গলা- বলিলাম বিনয়ে, সুনীল বারিধি তরি যাব আজি পালিয়ে। দাস দাসী আভরণ বাস নাহি করিব বনে বনে নানাদেশে সাথে সাথে চলিব। নীলাম্বুর অম্বুতলে প্রবেশিব গােপনে। নিরাশায় সপে আশা একা রণ-অঙ্গনে।
ইন্দুমতী-কাব্য।
কিম্বা দাও তরবারী
নিজমুণ্ড খণ্ড করি
তােমার সমক্ষে প্রাণ এখনি যে ত্যজিব।
তােমারে সমরে দিয়া একা ঘরে কিবা নিয়া
কোন্ প্রাণে ছাড় প্রাণ ধরি দিন যাপিব ?
চারিদিকে অলক্ষণ শকুনি গৃধিনিগণ
থেকে থেকে মাঝে মাঝে এপ্রাসাদে বসিছে,
দিবাভাগে ডাকে শিবা কাক নিশি ভাবে দিবা
সেধ্বনি অশনি সম হৃদয়েতে বাজিছে।
কক্ষোপরে রক্ষ-নারী পতি, পুত্র নাম স্মরি
স্বীয়বক্ষে কর হানি হাহাকার করছে।
মকরাক্ষ রমণীরে
হেরিয়ে বিধবাকারে
তদবধি পােড়া প্রাণ ঘন ঘন কাঁপিছে।
বলিতে বলিতে সখি আবিষ্ট হইল আঁখি
হতজ্ঞান হয়ে যবে
পড়িলাম ঘুমায়ে ;
পরে যা দেখেছি আর নাসরে রসনা তার
বর্ণন করিব কিবা
কম্প হয় হৃদয়ে।
যখন প্রভাত কালে
প্রিয়তম সভাস্থলে
লঙ্কেশ সান্ত্বনা তরে দ্রুতপদে চলিল,
মহাবীর পতি যার সেজানে অন্তর তার
কত দুর্ভাবনামম হিয়া মাঝে উদিল।
না জানি করে কথা কিমাের রয়েছে গাঁথা
ভবিতব্য অভাগীরে ভাসাবে কি পাথারে ?
প্রথম সর্গ। কি করেন হৈমবতী সকল নিয়ন্তা সতী অবলার ভেলা তিনি ভবসিন্ধু মাঝারে।” বীণা-বিনিন্দিত স্বরে এতেক কহিয়া পরে, ইন্দুমতী নেত্রে পুনঃ অশ্রু-বিন্দু ঝরিল, বরষি অমিয়রাশি সরলা অমলা বসি মৃদুস্বরে ধীরে ধীরে প্রবােধিতে লাগিল। “নাভাবিও প্রাণ সখি ! মুখ-পদ্ম স্নান দেখি দহে প্রাণ বিষাদ-দহনে, সুরাসুর বিদ্যাধর প্রকম্পিত কলেবর যার বাণে ত্রাসিত শমনে। মর্কট, নরের সনে যদি তিনি যান রণে হেলায় দলিবে রিপুদল, যশঃমাল্য গলে পরি ইন্দু-ফুল বক্ষে ধরি পিবে তার সুধা পরিমল। ‘স্বপন অলীক কথা ভাবিনা পাইও ব্যথা দিবা ভাগে যাহা ভাবে মনে যামিনীতে নিদ্রা-কূপে তাহারে স্বপনরূপে প্রতিবিম্ব যেমন দর্পণে। “বৃথা চিন্তা পরিহর, অন্তরে ধৈর্য ধর অজেয় সমরে ভব পতি চল প্রিয় সহচুরি, উদ্যানে ভ্রমণ করি দূরে যাবে মনের এগতি।
১০
ইন্দুমতী-কাব্য
বন-লতিকার সনে
কুসুমিত কুঞ্জবনে
গােলাপের উদ্বাহ ঘটাব,
কুহরিবে পিকবঁধু
ভ্রমর ঢালিবে মধু
বর-কৰ্ত্তা তােমায় সাজাব।
কন্যার জননী আমি
দুঃখ ভাই নাই স্বামী
কল্পনায় হইবে মিলন।
যদ্যপি ভাগ্যের বশে কুমার সে কুঞ্জে পশে
সপ্তপাক ঘুরাব তখন!
অমলার রস-ভাষে, ইন্দুমতী-হৃদাকাশে
সুখ-ইন্দু এবে সমুদিল,
সরলা সঙ্গিনী সঙ্গে
কথান্তর সুপ্রসঙ্গে
মনােরঙ্গে উদ্যানে পশিল ।
দ্বিতীয় সর্গ ।
বিচিত্র রাবণ-সভা অতুল ভুবনে
দেবশিল্পি-বিনির্মিত সুবর্ণে গঠিত,
স্বাচ্ছাদিত দিব্য-জাত-রূপ আস্তরণে
স্তম্ভমালা মহা মূল্য প্রবাল-মণ্ডিত।
সুরঞ্জিত আলােদান মণির প্রভায়
প্রদীপ্ত রয়েছে মরি! সুচারু দর্শন,
ঊর্দ্ধদেশে চন্দ্রাতপ সুষমা বিলায়
ঝালরে মুকুতা-মালা নক্ষত্র যেমন।
কৃতান্ত-কিঙ্কর সম দ্বারপাল গণ,
সুসজ্জিত বৰ্ম্মে-চৰ্ম্মে তীক্ষ্ণ অসিকরে
নির্ভয়ে রক্ষিছে দ্বার মূরতি ভীষণ
কর-শাসনে বেগে বায়ু না সঞ্চরে।
সুরম্য মন্দার-মাল্য বাসব-রচিত
দোলিছে অমরস-গর্বব-খব করি,
মকরন্দ-অন্ধ ভৃঙ্গ-গুঞ্জনে গুঞ্জিত,
বিজ্ঞাপিছে রক্ষেত্রের বীরত্ব-মাধুরী।
ইন্দুমতী-কাব্য।
কুবের স্বকর-কৃত যত্ন-সংস্থাপিত
রয়েছে বিচিত্র সাজে বিবিধ ভূষণ।
সশঙ্কে সভার বস্ত্র করে পরিষ্কত—
সুবিন্যস্ত করে নিত্য ছায়ার নন্দন।
অন্ত-কান্ত-গর্ব-অন্ত অশ্ব-বল্পাধারী
কৃতান্ত ত্রাসিতান্তর বিনম্র আননে
দ্বারেতে দণ্ডায়মান দণ্ড-মান হারি
পবন ব্যজন রত বিনীত বদনে।
পাত্র মিত্র সমবেত যুক্ত যুগ কর,
বন্দীগণ যথা স্থানে রয়েছে নীরবে
হেন কালে শঙ্খ-ধ্বনি হল ঘােরতর
রাজ-আগমন জানি দাড়াইলা সবে।
পূরিল স্বর্গীয় ঘ্রাণে সে সভা-ভবন
প্রবেশিলা সভা-তলে কবর দুর্বার
দশমুণ্ড বিশ আঁখি ভীষণ-দর্শন
নিবিড় দেহের বর্ণ নীরদ-আকার।
মণিময় সিংহাসনে সুবেশে সজ্জিত
উপবিষ্ট মহাকার নিকষা-নন্দন,
ছত্রধর ধরে ছত্র সুচারু চিত্রিত
দোলায় চামর দিব্য অনুচর গণ।
দানব-সভায় যেন শুম্ভ দৈত্যেশ্বর
রক্ষ রথী মাঝে রাজে লঙ্কেশ রাবণ,
দ্বিতীয় সর্গ । পুত্রশােকে আকুলিত সন্তপ্ত অন্তর নিস্তব্ধ বিমর্ষ ঘাের সজল নয়ন। শােকাকুল সভ্যবৃন্দ নির্বাক অচল উপবিষ্ট ভূমি পরে ত্যজিয়া আসন, চিন্তিত আকুল ক্ষুব্ধ রাজ-মন্ত্রী দল- রসনা অবশ ভাষে মলিন বদন। সুদীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ি বহুক্ষণান্তরে কহিলা নিকষাত্মজ সজল নয়নে, “বিধি প্রতিকূল যার ভুবন ভিতরে বিফল লাঞ্ছনাময় জীবন ধারণে! হায়রে! ক্রমশঃ যত লঙ্কা-অলঙ্কার ডুবিল এ ছার নর-সংগ্রাম-সলিলে, কোন্ লাজে ম্লান মুখ দেখাব সংসারে এলাঞ্ছনা ছিল শেষে রাবণের ভালে ? দুর্বার অরাতি-করে বন্দী শৃঙ্খলিত পূর্বে ছিন্ন হস্তপদ মস্তক তৎপরে। অন্তিমে সে প্রতিহিংসানলে প্রজ্জ্বলিত মরে যথা মনস্তাপে বীরত্ব স্ম’রে— তেমতি দুর্দশা মাের রাঘবের রণে ছিল যত অঙ্গ-শােভা অঙ্গজ গৌরব ছিন্ন শির বিলুষ্ঠিত কাল রণাঙ্গনে অচিরে জেনেছি স্থির হতে হবে শব।
১৪
ইন্দুমতী কাব্য।
কোথা ভাই কুম্ভকর্ণ অরাতি-দলন
জিনি অবহেলে স্বর্গ, মরত, পাতালে
স্থাপিলা সুযশঃ স্তম্ভ বীর-প্রলােভন
দুর্ভাগা হেরিয়ে মােরে ত্যজিলে অকালে !
কেমনে ভুলি'। আমি তােমার বদন
নিরাশায় আশা-বারি করিয়া সঞ্চার
এস ভাই এস বক্ষে জুড়াও জীবন
নৈলে রক্ষ-যশেঃ জ্বলে জ্বলন্ত অঙ্গার !
কোথা রলে অতিকায় দুর্জয় কুমার
নয়ন-নন্দন মম হৃদয়ের ধন,
নেহার সে মকরাক্ষ নাহি ভবে আর
স্বকরে শৈশবে যারে করেছ পালন।
আয় বাপ মকরাক্ষ অভাগা হৃদয়ে
না দেও উত্তর কেন ? জীবনের পাখি।
নাহি আর রণ-সাধ, তােমা বক্ষে লয়ে
যাব বনে, সবে মােরে দিয়ে গেলি ফাঁকি ?
না চাহি পার্থিব সুখ স্বর্গ-সিংহাসন
বৈর-নিৰ্যাতন ব্রত ভঙ্গ এত দিনে
লঙ্কার সুযশঃ ডঙ্কা হইল নিস্বন
সূর্পনখা-প্রতিশােধ বিলীন বিমানে।”
এত বলি রাক্ষসে উন্মাদের প্রায়
দশনে দশনে করে ভীম সংঘর্ষণ
দ্বিতীয় সর্গ।
১৫
কভু স্বকরে মুণ্ড উৎপাটিতে চায়
কভু বলে নীল-নীরে ত্যজিব জীবন।
বিবিধ বিধানে সুস্থ করি সভ্যগণ
নিকষা নন্দনে তােষি শত নমস্কারে
করযােরে বৃদ্ধ মন্ত্রী কহিলা সারণ
“জ্ঞানী-শ্রেষ্ঠ মহারাজ বিদিত সংসারে।
কি আছে অজ্ঞাত তব,অনিত্য সংসার
ধ্বংসাধীন জড় দেহ, নশ্বর স্বজন,
নহে নিত্য ঐশ্বৰ্যাদি সকলি অসার
মায়ার প্রপঞ্চে চিন্তি অক্ষয় আপন।
দেহীর শরীরে যথা কৌমার, যৌবন,
জড়তাদি যথা কালে দেহে সমুদ্ভুত
তদ্রুপ জীবাত্মা ছেড়ে দেহ পুরাতন
কাল পূর্ণে নব দেহে প্রবেশে নিয়ত।
করমের লীলা ভূমি এভব ভবন
জীবাত্মার দেহান্তর কৰ্ম্ম-অনুযায়ী,
তৃণান্তর তৃণে যথা জলোক-গমন
সূক্ষ দেহে প্রবেশে সে আত্মা চিরস্থায়ী।
প্রকৃতিতে পরাভাস সংযােগ-বিয়ােগে
জন্ম-মৃত্যু-উপলব্ধি মমত্ব-বিকাশ,
আত্মা, পরমাণু নিত্য অব্যয় প্রয়ােগে
যােগে জন্ম-মৃত্যু ভেদে,-ঘটাকার নাশ!
ইন্দুমতী-কাব্য।
কমলে কমল-বিম্ব উৎপত্তি সংস্থিতি
ক্ষণ অবস্থিতি অন্তে জলেতে বিলয়,
পঞ্চভূতে জড়দেহ অস্থায়ী উৎপত্তি
অন্তের প্রপঞ্চে পুনঃ পঞ্চে পঞ্চ লয়।
রূপান্তর ভেদ যদি শশাকের কারণ
সন্তানে নিরখি কার মানস বিকল
শৈশব, কিশাের, প্রৌঢ়, বার্ধক্য, যৌবন
কাল-ভেদে রূপ-ভেদে ফেলে অশ্রুজল !
এজগৎ রঙ্গমঞ্চে প্রপঞ্চের খেলা,
কৰ্ম্ম-অনুযায়ী জীব নব বেশ ধরে
আসে যায় বারংবার নিয়তির মেলা
কভু পুত্র, কভু পিতা, দয়িতা-আকারে।
জ্ঞান-অস্ত্রে মােহ-পাশ হলে বিখণ্ডিত
মহামায়া:মােহাচ্ছন্ন চঞ্চলাত্ম। মন
কভু নাহি শােক তাপে হয় বিচলিত
পদ্ম-পত্র-নীর প্রায় নির্লিপ্ত জীবন।”
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিল রাবণ
‘যা কহিলে সত্য মন্ত্রি !–ছার ভূমণ্ডল
সূতিকা-মন্দিরে জ্বলে সুখ-হুতাশন
জ্ঞান-চক্ষে অন্তিমের চিতার অনল ।
ক্রীড়া-পুত্তলিকা যথা চালক-ঈঙ্গিতে
সূত্ৰ-আকর্ষণে নাচে ক্ষণে বসে, ধায়
দ্বিতীয় সর্গ।
কৰ্ম্ম-সূত্র-অনুগামী তথা পৃথিবীতে
কে না জানে জীব মত্ত অনিত্য খেলায় ?
শ্মশান-বৈরাগ্যে মত্ত দাহক যেমন
স্থানের মাহাত্মে ভাবে অনিত্য সংসার,
দাহান্তে ভবনে করি প্রতি আগমন
পার্থিব বিষয়ে মত্ত হয় যে যাহার ;
তেমতি অবােধ প্রাণ প্রবোধ না মানে
এমনি বিচিত্র লীলা অব্যর্থ মায়ার
পশু, পক্ষী, নাগ, নর, গন্ধর্বের প্রাণে
অন-অতিক্রম্য যার প্রভাব বিস্তার।
একটি করতে কেহ টানিলে সবলে
অমনি গরজি উঠে মত্ত মাতঙ্গিনী ।
অবিরত হৃদি-রত্ন ডুবায়ে অতলে
কেমনে কাটিবে মন্ত্রি ! দিবা-নিশীথিনী ।
নিত্য নব শােক-বহি হয়ে প্রজ্জ্বলিত
দহিছে উপযুপরি অন্তর আমার
গেল মান, গেল সুখ, কীর্তি অন্তহৃত
স্বর্ণ-কিরীটিনী লঙ্কা শ্মশান-আকার ?”
কহে মন্ত্রী “পুত্র তব সম্মুখ সমরে
দলিয়া বিপক্ষ পক্ষ লভি বীর-যশঃ
নিবসে অনন্ত সুখে আনন্দ-নগরে
বীর-ধৰ্ম্মে হেন
মৃত্যু
ত্রিশােক-পপৗরষ ।
'১৮
ইন্দুমতী-কব্য
নিয়তির কাৰ্য ভবে জীবন মরণ
পার্থিব জীবের তাহে নাহি অধিকার
অপ্রতিবিধেয় কাৰ্য্যে ধীমান কখন
হয়ে লিপ্ত ছাড়ে কি সে কৰ্তব্য তাহার ?
সম্মুখে ভাষণ রিপু বিজয় হুঙ্কারে
কঁপাইছে মুহুর্মুহু সুনীল গগন,
পুত্র-হন্তা ভ্রাতৃঘাতী-তীব্র টিটকারে
কাপুরুষ সম থাকা সাজে কি এখন ?
বধিয়া কুলান্তকে অরাতি-শােণিতে
অনুজ তনয়-শােকে করহ তর্পণ
শান্তকর কান্ত-হারা-পতি-শােকাগ্নিতে
পড়ে যেন প্রতিহিংসা সলিল-সিঞ্চন।
উত্তরিল রৌদ্র-বেশে নিকষা-নন্দন
রাবণ-গম্ভীর নাদে অবনী কপিল
যেনরে পর্বতােপরি অশনি পতন
অথবা অকালে যেন জলধি গড্ডিল
সত্য ভাষে সন্তোষিলে অমাত্যপ্রবর
শশাকে ছিনু আত্মহারা অবলার প্রায়
বজ্রসম দৃঢ়তম এবে এ অন্তর
যাবৎ অরাতি-নাম লুকায় ধরায়
প্রতিহিংসা-ভীমানল তীব্র উদগীরণ
হয়ে অগ্নি সম হল অন্তর আমার
দ্বিতীয় সর্গ ।
সূর্পনখা-প্রতিশােধ জাগিল ভীষণ
প্রতিহিংসা দীক্ষা মন্ত্র, প্রতিহিংসা সার !
শােযিব তাম্বুধি-বারি তীব্র শরানলে
দহিব রাঘবদ্বয়ে তৃণের মতন
আনিব বাঁধিয়া দুষ্ট দেব আখণ্ডলে
কে আটে সমরে আজি দেখিবে ভুবন !
ইন্দ্রজয়ী ইন্দ্রজিৎ কুমার আমার
আদেশ সৈনিকবৃন্দে, সাজাও বাহিনী
তরণী স্বপ্রাণাধিক, সাজরে কুমার
বীরবাহু, বাহুবলে কঁপাও অবনী।
ঘুচাইব দেবেন্দ্রের চাতুরী সকলি
বাহুবলে উপারিব তামর নগরী
কাটি তিল সম করি বানর মণ্ডলী
বধিৰ যুগলে মরে পরশু প্রহারি ।
এত বলি রক্ষ-রাজ করে আস্ফালন
কুড়ি চক্ষে উগারিছে জ্বলন্ত অনল
কড়মড়ে প্রকম্পিত রত্ন-সিংহাসন,
পদভরে লঙ্কা যেন করে টলমল ।
দুর্জয় রাবণ-বাক্য করিয়া শ্রবণ
রক্ষ মহারথী সৰে করে সিংহনাদ,
সজল জলদ যেন বিদারি গগন
বায়ুভরে করিল সে ভীষণ নিনাদ
ইন্দুমতী-কাব্য।
বাজিল দুন্দুভি ঘাের বক্ষ সভাস্থলে
মাতিল অরুবৃন্দ বীরত্ব-গরবে
হয়, হস্তী, রথেরথী পদাতিক দলে
কপিল ত্রিদশ-নাথ সে ভৈরব রবে
তৃতীয় সর্গ।
পরম পবিত্র স্থান কৈলাস ভূধর,
কোটি শরদিন্দু সম প্রভা উদ্ভাসিত,
শিরে শােভে দ্রুম-মালা রম্য মনােহর
ধূর্জটি রয়েছে যেন জটা-বিভূষিত।
হরিতকী, হল্লাতকী, ধূস্তুর সুন্দর
হর-প্রিয় দেবদারু, রুদ্রাক্ষ শ্রীফল
ধাত্রী, নীলকণ্ঠ,নীলকণ্ঠ-নেত্রহর
তরুরাজি শশাভা পায় সুচারু শ্যামল।
মন্দার-সুগন্ধামােদে সদা আমােদিত
ত্রিদিবেন্দ্র মনােরম্য ভবেন্দ্র ভবন
প্রফুল্ল প্রসূন চারু ভূষণ-ভূষিত
অঙ্গর, কিন্নর, যক্ষ-প্রিয় নিকেতন।
মকরন্দ-লুব্ধ-অন্ধ নিত্য মধুকর
গুঞ্জনে গাইছে ভৰ প্ৰেম-গুণ-গান,
মােহন মধুর তানে বিহঙ্গ নিকর
বিভুর মহিমা ঘােষে বিমােহিয়া প্রাণ।
২২
ইন্দুমতী-কাব্য।
প্রেমােন্মাদে উন্মাদিনী লতিকা সুন্দরী
ভুজ-পাশ-আলিঙ্গনে তােষে তরুবরে
বিটপি স্ব-অঙ্গ ভূষা উম্মুচিত করি
সাজায় কুসুম-সাজে প্রীতি-উপহারে।
বংশ-রন্ধে, সমীরণ গুহাগত-গতি
কিন্নরী-গান্ধার-তানে ধ্বনে সমতান
লুষ্ঠিত অঞ্চলা যত গন্ধ যুবতী
চঞ্চল মানসে পশে ফুল-ধনু-বাণ
গণ্ড-কণ্ডুয়ন-রত মাতঙ্গিনী দল
শাল-সংঘর্ষণে দিব্য রিছে নিৰ্যাস,
সে সৌরভে মাতােয়ারা অপরী আমল
সবলে টানিছে গলে প্রণয়ের পাশ !
বসন্ত অনন্ত সুখে বিরাজে তথায়
পঞ্চমে কোকিল করে সদা কুহুধ্বনি,
বিহগ-কাকলি নিত্য পীযূষ বিলায়
সাগর-সঙ্গম-সাধে ঝতে মন্দাকিনী।
নিঝরিণী জল-কণা সদা মাখি গায়,
মনােরঙ্গে খেলে মৃদু মন্দ সমীরণ,
গতি-শীলা চমরীর বিচিত্র খেলায়
কিন্নরী-উম্মুক্ত-বক্ষে চামর-ব্যজন।
কটিতে নয়ন-হরা সৌদামিনী-খেলা
নবীন নীরদে সাজে মেখলা উত্তম,
তৃতীয় সর্গ।
-
শাখী-শাখে শিখী-শ্রেণী-পেখমের মালা
শত ইন্দ্র-ধনু বলি হয়ে যায় প্রম।
চক্রবাক দল-বদ্ধ স্পর্শিছে গগনে
যখন সে শ্রেণী রাজে অর্ধচন্দ্রাকৃতি
তােড়ন-শােভিনী মাল্য স্তম্ভের বিহনে
নিরালম্ব ঊদ্ধ পানে ঝুলিছে যেমতি।
করভ কেশরী—শিশু খেলে নিরন্তর
হরিণী বাঘিনী সনে অদ্ভুত মিলন,
নকুল-ভূজ-রঙ্গ দৃশ্য মনােহর
হিংসা দ্বেষ বিবর্জিত প্ৰীতি-নিকেতন।
মােহিনী প্রকৃতি যেন পরি নীলাম্বরী
ভুলাইল বাসবের সহস্র নয়ন
কহিল দেবেন্দ্র “আহা! বৈজয়ন্তী পুরী
শতাংশের তুল্য নহে নয়ন-রঞ্জন।
ইচ্ছা হয় দেববৃন্দ ত্যজিয়া অমরা
জগত-শরণ্য নিৱাকাঙক্ষ শঙ্করের
অনুসরি পদ-চিহু নিয়ত আমরা-
বীত-রাগী হয়ে দুঃখ-দাতা বিলাসের।
নেহার বিটপিতলে কত মুনিগণ
জানু-সমুদ্ভুত-দ্রুম-ক্লেশ বিবর্জিত
বিভু-পদ-কোকনদ-ধ্যানে মত্ত মন
ধৰ্ম্মের বিমল বিভা অঙ্গে উদ্ভাসিত।
২
ইন্দুমতী-কাব্য।
সংসারে পরম সুখী নির্লিপ্ত যে জন
সম্পদ বিপদ তার সমভাব জ্ঞান
স্বার্থে রত দেব ভালে হেন বিড়ম্বন
সম্ভোগ-বাসনা ঘাের নরক-সােপান !
এত বলি বজ্র-পাণি হলে অগ্রসর
দেখিলা অদূরে নন্দী ভীম শূল করে,
দ্বারে দ্বারী বেশে যেন দ্বিতীয় শঙ্কর
স্বাগত জিজ্ঞাসে ইন্দ্রে পরম সাদরে।
দেবেন্দ্র কহিল “ভ্রাতঃ কি কহিব আর
অধম দাসত্ব-বৃত্তি কলঙ্ক-কালিমা
সমঙ্কিত
দেবকুলে, লিপি বিধাতার
বিলুপ্ত কর্বর করে ত্রিদিব-গরিমা !
কহে নন্দী শান্ত চিতে “নন্দন বিহারি?
অন্তরে ভাবহ দেব ভব শিবময়
ও পদ বিপদার্ণবে অকূলে কাণ্ডারী
অমর মরের করে অপরে অভয়।
সন্তোষে ছাড়িনু দ্বার পশ অন্তঃপুরে
নিরখিবে একাসনে হর-হৈমবতী।”
দেবেন্দ্র বিনয়ে কহে “আশ্বাসিত স্বরে
বহিল অন্তরে মম সুধা-স্রোতস্বতী।
দেবগণ-আগমনে আমােদ-বিহ্বল
ডাকিনী যােগিনী রঙ্গে উঠিল নাচিয়া
তৃতীয় সর্গ।
প্রেতিনী, বেতাল তাল যেনরে পাগল,
ভূতগণ-সঙ্গে নাচে “তাধিয়া তাধিয়া।”
রক্তাক্ত রক্ষে রণে শান্ত সুরগণ
উপনীত অন্ত-কান্ত কামান্ত-সদনে
নিরখি প্রশান্ত মূর্তি চন্দ্রা-ভূষণ
প্রেম-মন্দাকিনী স্রোত সঞ্চারিল মনে।
রত্ন-বেদী সমাচ্ছন্ন ব্যাঘ্র-চৰ্ম্মাসনে
তদুপরি উপবিষ্ট দেব মৃত্যুঞ্জয়,
ললাট দহিছে যেন তীব্র হুতাশনে
মস্তকে গর্জয়ে ফণী গরল-আলয়।
শিরে শােভে জটাজুট শৈলরাজি প্রায়
পতিত-পাবনী গঙ্গা যাহে বিরাজিত,
প্রদীপ্ত ললাট অর্ধ চন্দ্ৰমা-প্রভায়
ধবল জলদ-অঙ্গ ভস্ম-আচ্ছাদিত।
পরিধান বাঘাম্বর শিঙ্গা, শূল করে
অস্থি-মাল্য গ-দেশে উদর লম্বিত
ধূস্তুর কুসুম কর্ণে কিবা শােভা ধরে
প্রশস্ত নয়ন ত্রয় ধ্যানে নিমীলিত।
বিরজিতা শিব-পাশে দেবী হৈমবতী
শুভ্র মেঘ-কোলে যেন স্থিরা-সৌদামিনী
অষ্ট অঙ্গে দেবগণ, বৈজয়ন্তী-পতি
ক্রমে নমে মহেশ্বর, নগেন্দ্র-নন্দিনী।
ইন্দুমতী-কাব্য
“জয় শিব দিগম্বর ভুবন-কারণ
অনাদি অনন্ত দেব ত্রিগুণ-আধার
সৃষ্টি, স্থিতি লয়-কারী জয় ত্রিলােচন
সগুণে নিগুণাত্মক ব্রহ্ম নিরাকার।
ক্ষিতি, অপ, তেজ, ব্যোম, মরুত, ভাস্কর
অখিল, সংসার, সােম তােমার মূরতি-
সুমতি, কুমতি, বিদ্যা, অবিদ্যা-আকর
তােমাতে উৎপত্তি, লয়, তােমাতেই স্থিতি
সত্ত্ব, রজঃ, তমােগুণে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হর
ব্ৰহ্মারূপে করি সৃষ্টি পাল বিষ্ণুরূপে
সংহার শঙ্কর-রূপে শশাঙ্কশেখর
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড তব গুপ্ত রােমকূপে।
অচিন্ত্য, অব্যক্ত রূপ ব্যাপ্তি জগন্ময়
অনন্ত মহিমা তব কে বর্ণিতে পারে
আত্মারূপে সর্ব ঘটে বিরাজ চিন্ময়
প্রণমামি বিশ্বরূপি জগত-আধারে।
নীলকণ্ঠ, শ্ৰীনিবাস, ধূর্জটি, শঙ্কর
ব্যোমকেশ, ত্রিপুরারি, ত্র্যম্বক, ঈশান
বাঞ্ছাপূর, পঞ্চানন, যােগীন্দ্র, ঈশ্বর
নমি আমি দেব দেব পুরুষ-প্রধান।”
আশুতােষে তােষি হেন সহস্রলােচন
নমিলা তৎপরে গৌরী-পদ-কেকিনদে
তৃতীয় সর্গ।
--- - * * * * * * * * *
ভূমে বিলুষ্ঠিত প্রেমে পরিপ্লত মন
করিলা অশেষ স্তুতি অম্বিকা-পদে।
প্রণমামি ভােগবতি প্রকৃতি-পুরুষাকৃতি
মহামায়া জননী আকারে
গুণত্রয়-প্রসবিনী
মহানিৰ্বাণ-কারিণী
কুলকুণ্ডলিনী মূলাধারে
সার্ধ ত্রিবলয়াকারে
শয়-বেষ্টন করে
নিদ্রাগতা ডাকিনী সঙ্গিনী
তুমি মাতঃ সাধিষ্ঠানে
বিষ্ণু-শিব-সন্নিধানে
ষড়দলে শকতি রাকিনী।
দশদলে নাভী পরে
বিরাজ মা মণিপুরে
রুদ্রসঙ্গে লাকিনী মূরতি
অনাহতে দ্বাদশদলে কাকিনী হৃদি কমলে
ঈশ্বরী ঈশ্বর সনে স্থিতি
রাজ বিশুদ্ধ কমলে যােড়শ সরােজ-দলে
সাকিনী মা সদাশিব-রমা,
দ্বিদলে হাকিনী সাজে ত্রিবেণীতে মাঝে
পরঃ-ব্ৰহ্ম-প্রদায়িনী বামা।
শিব-শক্তি যুক্তাকারে
বিরাজ মা সহস্রারে
সহস্র সরােজ-দলে পরে,
সে কমলে চারুশােভা
দিব্য সুরক্তিম আভা
নাদবিন্দু নিম্নে শােভা করে।
২৮
ইন্দুমতী-কাব্য
সুবৰ্ণ কপাট খুলে
যদি কারু ভাগ্য-বলে
মায়া -যুক্ত
জীব মুক্তি পায়
ভব-জঠোর-যাতনা
বিষ-বিষয়-বাসনা
ঘুচেতার শমনের দায়।
তবু বদ্ধ মায়া-ডোের, বিশ্ববাসী নারীনরে
সদা করে অসার ভাবনা,
ভ্রমেও ভাবেনা ইষ্ট
অনিষ্টে ভাবিয়ে ইষ্ট
ভােগে কষ্ট নরক-যাতনা ।
নরে কি বলিব আর, অনন্ত প্ৰভব যার
কার সাধ্য রােধে তার গতি?
আবদ্ধ বিবুধকুল নিত্য বিমােহিতাকুল
ভােগে সদা কতবা দুর্গতি।
লভিয়া ইন্দ্ৰত্ব-পদ
ভুলিপদ-কোকনদ
বিপদ বিচরে ছায়া-কারে,
বর-বলে মহাবলী বলীরণে হীনবলী—
সুরমগ্ন বিষাদ-পাথারে।
সুন্দ, উপসুন্দ দৈত্য
নিত্য-কৃত্য দেব-নিৰ্যাতন
বৈজয়ন্তী পরিহরি পাতালে পয়ান করি
তবু সহি কত উৎপীড়ন।
হিরণ্যকশিপু শূর কেড়ে নিল স্বর্গপুর
ব্ৰহ্ম-বরে হয়ে বলীয়ান
ত্রিদিবে করিল নৃত্য
তৃতীয় সর্গ।
২৯
---- * * * * *
সহিনু যে সব ক্লেশ, দেব নামে জন্মে দ্বেষ
সবিশেষ আছে প্রণিধান।
না জুড়াতে দেহ জ্বালা, পরায়ে শৃঙ্খল-মালা
পশু প্রায় নিল গয়া’ যবে
ধিক্ সে দেবত্বে ছার ! এরে করে টিটকার
কোটি কল্পে কলঙ্ক রটিবে।
বৃত্র শঙ্করের বরে নিজ্জরে জরে শরে
ফেরু সম করে বিতাড়িত,
হয়ে ত্রিদিবের পতি, হরিল পৌলমী সতী
সে ঐন্দ্রিলাপদ-সেবারত।
কি আছে মা মনে আর বরে বলী বিধাতার
দুরাচার দুর্বার রাবণ,
বেঁধেছে দাসত্ব-পাশে মরতে মনুজ হাসে
নিত্য সেবি ভৃত্যের মতন।
আমি ইন্দ্র মালাকার,
বিরচি মন্দার-হার
আনন্দে সে সাজায় গলায়
অশন-সময়ে তার
বরষি বারিদ-ধার
যাতে প্রভু হৃদে তুষ্টি পায়,
মৃত্যুপতি অশ্বশালে সত্রাসে সে পশুপালে
ছায়া-সুত রজকের কাজে
পবন ব্যজনকরে
মন্দার-সম্পদ হরে
ততষিবারে রক্ষ মহারাজে।
ইন্দুমতী-কাব্য
কিকব দুর্ভাগ্য কথা,
তবু তার মৰ্ম্ম-ব্যথা
চলিনু মা! পূজিতে চরণ,
মায়ায় সন্ধান জানি ঘেরে রক্ষ-অনিকিনী,
মৃত-বৎ রেখেছে জীবন।
এত বলি সুরপতি নমি হৈমবতী সতী
বিমুক্তিলা অঙ্গের সুবাস।
হেরিয়া শােণিতাপ্লুত
সর্বাঙ্গে সায়ক-ক্ষত
জগন্মাতা ছাড়িলা নিশ্বাস।
ভকত দুর্দশা হেরি
ঝরিল নয়ন-বারি
ক্রোড়ে করি করিল সান্তুন।
ভব-রাণী আঙ্ক-স্পর্শে দুঃখ ত্যজি ভাসে হর্ষে
মাতৃ-অঙ্কে বালক যেমন।
বিষাদে বিষন্নমতি, কহিলা পার্বতী
‘করমের লীলাভূমি এভব ভবন
কেপারে রােধিতে বল প্রাক্তনের গতি ?
অলঙ্ঘ্য অটল ভালে বিধির লিখন।
কঠোর তপের বলে দুর্জয় রাবণ
যাবৎ সুফল ভােগ নাহি হয় ক্ষয়
বিধি, বিষ্ণু, হর নারে করিতে নিধন
আগত সংহার কাল, জানিবে নিশ্চয়।
উত্তরিলা শচী-কান্ত “নিয়তি রূপিণি
এতব ছলনা ; কিবা অনায়ত্ত্ব তব ?
তৃতীয় সর্গ।
বিরিঞ্চি-উপেন্দ্র-চন্দ্র-চূড়-প্রসবিনি
অণ্ডরূপে এব্রহ্মাণ্ড যাহাতে উদ্ভব !
প্রবৃত্তি রূপিনী পাপ-পুণ্য প্রদায়িনী
সুখ-দুঃখ দয়া-কোপ-চক্র-আবর্তন
তােমার ছলনে ভুলি না-চিনি জননী
ইচ্ছাময়ী ইচ্ছা সব কর্মের কারণ।
ত্রিদিব-পালন-ভার শিরে সমর্পণে
ডুবালে স্বার্থের ঘাের মােহময় কূপে
জ্ঞান-যােগ বিনে হেন গৃঢ় আবরণে
উদঘাটিতে স্বার্থ-দাস সমর্থ কিরূপে?
অসমর্থ স্বর্গপুর করিতে রক্ষণ
তরণী বরিত কালি সম্মুখ সংগ্রামে
ত্রিভুবন জয়ী বিষ্ণু-ভকতি-কারণ
শ্রীরাম আসক্ত চির প্রিয় ভক্ত-নামে।
তরণী অবধ্য যদি রাঘব-সমরে
রাবণের অন্তঃকাল না হবে উদয়
দাসত্ব-শৃঙ্খলাবদ্ধ রহিবে অমরে
অনন্ত কালের তরে জানিনু নিশ্চয়।
ব্ৰহ্মারআদেশবাণী দৈববাণী রূপে
বিজ্ঞাপিল ভয়াবহ ভীষণ বারতা
শ্রবণে কম্পিত-প্রাণ রক্ষিবে কিরূপে
পদাশ্রিত দেগণে কই জগন্মাতা ?
৩২
ইন্দুমতী-কাব্য।
যে মহা মায়ায় মুগ্ধ অখিল সংসার
সে করুণ-কণা মাত্র হলে বিতরণ
অনায়াসে হতে পারে তরণীসংহার
স্বগুণে রাক্ষস-ভীতি কর নিবারণ।
তরণী আগত হলে সম্মুখ সমরে
বিষ্ণু-দ্বেষ জন্মাইবে অন্তরে তাহার
নহে কি পাইবে ত্রাণ অমর নিকরে ?
বৈদেহী যাতনা মাগাে না ঘুচিবে আর ?
নতুবা শ্রীপদ-দাস করে চিরদিন
এ অধম সন্তানের কাটি স্বার্থ-পাশ।
ত্রিশােক-তারিণী-গুণে মােহ করে লীন
হৃদয়ে সঞ্চাল জ্ঞান-সুধা সুবাতাস।
বাসবের মিষ্টভাষে তুষ্ট হৈমবতী
করিলা স্বীকার, সুর-মঙ্গল-সাধনে
ধূর্জটি হইলা অতি বিষাদিত মতি
ভাবিলা মজিল লঙ্কা অহা ! এতদিনে।
মননাময়ী মনে উহা জানিয়া তখন
কহিলা শঙ্করে, “হের হের মহেশ্বর
কবর দৌরাত্মে অঙ্গে লােহ-প্রস্রবণ
মৃত প্রায় সমাগত অমর নিকর !
এতস্তুতি করে তােমা সহ-লােচন
তবু তুমি উদাসীন, ইষ্ট-চিন্তারত,
তৃতীয় সর্গ। সমভাবে তপ-মগ্ন দেব পঞ্চানন কিরূপে সাধিবে অন্য কাৰ্য্য সুবিহিত ? সদাকাল চিন্ত সুধু রাবণের হিত যে করে অমরে রত কিঙ্করের ব্রতে দেব দেব নামে তুমি করিলে অঙ্কিত অসীম কলঙ্ক-রেখা, ধিক বিশ্বপতে ! তবসঙ্গে দ্বন্দ্ব-রঙ্গ লিপি বিধাতার । তুমি যদি বিশ্বেশ্বর ত্রিলােক-তারণ সবজীৰে সমভাবে মমতা-বিস্তার- বিলক্ষণ, এনাম সুধু চাটুর বচন ! কহিতে দহিছে অঙ্গ,—যদি কাশীধাম মরে কোন মহাপাপী নারকী কুজন মৃত্যুকালে কর্ণে দিয়া দিব্য রাম-নাম নিজগুণে মােক্ষ-পদ করহ প্রদান স্থানান্তরে অন্তকালে কফ-রূপে বসি জ্ঞান-অন্ধ করে তারে প্রদান যন্ত্রণা ভুলাইয়ে ইষ্টচিন্তা কণ্ঠে দেও ফাঁসি কেন তােমা বিশ্বেশ্বর করিব বর্ণনা ? গঙ্গাধর যােগ্য নাম, ওহে বিশ্বপতি বল দেখি কোন্ পাপে পাপী দেবগণ ? বৈদেহীর কোন্ পাপে বল লঙ্কাপতি অশােক-কাননে করে হেন নিৰ্যাতন?
৩৪
ইন্দুমতী-কাব্য
প্রচেতার কোন্ পাপে নিগড় বন্ধন
শ্রীরাম কানন্-বাসী,বালীর নিপাত
পর উপকার-ব্ৰতে জটায়ু-নিধন
হিতভাষে বিভীষণ পায় পদাঘাত ?
যদি তুমি এর নাহি কর প্রতিকার
পাপীর উপরে যদি এহেন সদয়
রটাইব ঘরে ঘরে কেউ যেন আর
ডাকে বিপদে ব’লে জয় মৃত্যুঞ্জয় !
উমার এ তীব্ৰবাণী কৃশানু যেমন—
দহিল শঙ্করে ক্রোধে কঁপিল শরীর
জ্বলিল ললাট-বহি ভীষণ দর্শন
গরজিলা জহ্ন-সুতা জটাতে গভীর ।
রৌদ্রভাবে রুদ্রদেবে সচেতন হেরি
থরথরি মহাত্রাসে কাপে বৈকৰ্ত্তণ
নিরখি সংহার মূৰ্ত্তি শূলী ত্রিপুরারি
পড়িল সে পদে নমি সুপবান গণ।
মদন-দহন-বাৰ্তা উদিল স্মরণে
চিন্তিয়া সহসা ভক্তাধীন হৈমবতী
অভয়-ভাষণে তুষি ভীত দেব গণে
সহসা ধরিলা সূক্ষম মােহিনী মূরতি।
যে মহাশক্তির বশে মােহিত সংসার
সে শক্তি প্রবেশ মাত্র শঙ্কর অন্তরে
তৃতীয় সর্গ।
অন্তরিত ভীম ভাব, কি লীলা মায়ার
ধরিল প্রশান্ত ছবি প্রমথ অচিরে ।
শক্তির মহিমা হেরি
যুক্তযুগ কর
পড়িল সে পদে নমি সুমনসগণ
করিলা অশেষ স্তুতি দেবপুরন্দর
সন্তোষিতে শিব-দাতা শিব ত্রিলােচন !
বাষ্পকুল সুরবৃন্দ নিস্পন্দ ধমনী
নাসিকা নিশ্বাস হীন মুদিত নয়ন
বাসবে রােমাঞ্চ তনু হেরি শূলপাণি
অভয়-অমিয়-বাণী করিলা বর্ষণ
“যাও ইন্দ্র নিজধামে দুর্গতি ঘুচিল
ভক্ত-চূড়ামণি মম নিকষা-নন্দন
পূজে এতকাল মােরে আহা এই হল
বিপদে অন্তিমে তারে করিনু বর্জন !
দহে মন, রক্ষনাথে বিধাতা বিমুখ
নন্দীর সে মহাশাপ ফুলে কৰ্ম্মফলে
অচিরে ঘুচিবে সব বিবুধের দুঃখ
কৰ্ম্মসূত্রে জীব মাত্র মৃত্যু-পথে চলে।
তপস্বিনী বেদবতী প্রতি পাপাচার
দিলা শাপ সীতারূপে জন্মিয়ে ধরায়
রাবণ বধের হেতু হবে লঙ্কাপুরে
সেদিন আগত এবে কহিনু তােমায়।
ইন্দুমতী-কাব্য ।
ইক্ষাকু বংশীয় অনরণ্য মহীপাল
রাবণ-সমরে ঘাের হইয়ে লাঞ্ছিত,
শাপিলা এবংশধর জন্মিবে ভূপাল
যার করে রক্ষ-কুল হবে নিৰ্ম্মলিত।
ইন্দু-জ্যোতি রম্ভাবতী-সতীত্ব বিনাশে
দিলা শাপ তার পতি হয়ে কোপবান
সতী-প্রতি পাপ-মতি অবল-প্রকাশে
আয়ু-সূৰ্য্য রাবণের হবে তিরােধান।
চতুষ্টয় শাপ বহি হয়ে সম্মিলিত
দহিবে রাবণে তার কর্ম-অনুযায়ী
স্বকর্মের ফল ভােগ কে করে খণ্ডিত
অচিরে কবর-কুল হবে ধরাশায়ী।
মহেশ-আদেশ-বাণী করিয়া শ্রবণ
মহানন্দে ইন্দ্র করে শিবজয় ধ্বনি
আচম্বিতে সমাগত অপূর্ব দর্শন
জগত-মােহিনী মায়া সুদিব্য রমণী।
ভবেশ আদেশে তায়, রহ অনুক্ষণ
সুরেন্দ্রের হিতকর কাৰ্য্য সম্পাদনে ।
মৃত্যুঞ্জয় প্ৰদানিলা পিণাক ভীষণ
শৈলজা করিল বলি শক্তি সঞ্চারণে
ভক্তি ভাবে আখগুল বন্দি হৈমবতী
করি নতি শিব পদে মায়ার সহিত
সুদিব্য স্যন্দনে চাপি করিলেন গতি
প্রীতি-নীরে সুরবৃন্দ হয়ে নিমজ্জিত।
চতুর্থ-স্বর্গ।
বধূ সাজে বিভাবরী
দীপ-চন্দ্রহার পরি
ইন্দুর সিন্দুর-বিন্দু ভালে সুবিমল,
সুবাস-আতর অঙ্গে
সমীর ছড়ায় রঙ্গে
কোকিলা প্রেমদা প্রায় গায় সুমঙ্গল !
যেন বধূ আগমনে
প্রীতি-মাখা ফুল্লমনে
পাপিয়ার হুলু ধ্বনি ধ্বনিল গগনে,
প্রকৃতি এয়াের সাজে
কুসুম-ভূষণে-সাজে
অলি লাজ-মাখা আনত বদনে।
সুনীল গগন যেন
চারু চন্দ্রাতপ হেন
ঝালরে মুকুতা-মালা তারকার হার !
ইন্দুমতী-কাব্য
নহবত পাখী-স্বরে
দিগন্ত ধ্বনিত করে
বিটপি কুসুম দামে অর্পে প্রীতিহার
নীহার-মুকুতা চয়
নব বলা কিশলয়
শ্যামল বসন-প্রান্তে করে ঝলমল
বিধু-কর-সিধু-পানে
প্রমােদে আকূলপ্রাণে
বর-পক্ষ উপনীত চকোরের দল।
নীল-নীরে সৌধমালা
লইয়া সুষমা ডালা
নাচিয়া তরঙ্গ-বক্ষে করিছে বর্ণন
বীরত্ব-মূরতি আঁকা
বিমল মাধুরী-মাখা
যশঃ-কিরীটিনী-লঙ্কা রক্ষ-নিকেতন।
খুলিয়া গবাক্ষ-আঁখি
নিরখি সহ-আঁখি
জম্বুকের প্রায় করে রণে পলায়ন।
বিদ্রুপ হাসির ছলে
অসংখ্য অলােক জ্বলে
পশিলে অমর-বৃন্দ কৈলাস ভবন।
চতুর্থ সর্গ।
అని
= = =
জ, * --
= = = = = = = = = = = = =
জয়ধ্বনি সিংহনাদ সদস্তু হুঙ্কার
করির রথীগণ,
কোদণ্ডে ভীষণ স্বন
ফিরিল কর্বর বৃন্দ কাতারে কাতার।
মন্দার কুসুম-মাল্যে রম্যহম্ যত,
সুসজ্জিত, হরে চিত
হেম কুম্ভ অগণিত
পূর্ণিত পল্লবান্বিত দ্বারে সংস্থাপিত।
সুবর্ণে মণ্ডিত দিব্য বিজয় কেতন,
রিপু-গর্ব খর্ব করে
উড়িল প্রাসাদোপরে
বিজ্ঞাপিতে রক্ষ-কুল বীরত্ব ভীষণ।
হীরক, মুকুতা,
মণি খচিতাভরণে
করে, চারু অঙ্গ-শোভা
অনজের মনােলােভা
রক্ষাঙ্গনা বিরচিলা আপন চরণে।
কুঙ্কুমে কপােল চারু করে সুরঞ্জিত
নিরখিলা দরপণে
অঞ্জনের সম্মিলনে
নয়নে কুসুম-শর-চাপ-সংস্থাপিত।
ও?
ইন্দুমতী-কাব্য
সুষমা-গরবে মনে গর্ব অতিশয়
মরাল,গমনে চলে
মেখলা নিতম্বে খেলে
পতির কৃতিত্বে আরাে উৎফুল্ল হৃদয়।
বিমুক্ত অল-গুচ্ছ স্খলিত চরণ
পীনােন্নত পয়ােধরা
যৌবন মাধুরী ভরা
প্রমােদে প্রেমদা কুল গায় সুমঙ্গল।
মকরাক্ষ-শােক যেন এলঙ্কা ছাড়িয়া
আমােদের উৎপীড়নে
ক্ষুব্ধ মনে সঙ্গোপনে
বিধবা রমণী-বক্ষে রহে লুকাইয়া।
নিশি ভােরে শঙ্খধ্বনি শুনি সভাতলে
তীক্ষ তরবারী পাকে
বিজলী উজলি ঝাকে
রক্ষেন্দ্র সদনে চলে রক্ষরথী দলে।
সগর্বিত পদক্ষেপে কম্পিতা ধরণী
বিচিত্র বসন অঙ্গে
কিরীট-হীরক রঙ্গে
রবি-করে খেলে যেন স্থিরা সৌদামিনী
চতুর্থ সর্গ।
৪১
শৈলেন্দ্র-সমাজে যথা হিম-নিকেতন
বসেছে রাক্ষস-রবি
ধরিয়া প্রচণ্ড ছবি
চৌদিক করিছে আলাে পাত্র মিত্রগণ।
ডুবালু প্রবাল-লুব্ধ সুনীলজীবনে
নক্রের কবল-ভাত
তেমতি ত্রাসিত চিত
রয়েছে সুরথীবৃন্দ নৃপতি-সদনে।
ছত্রধর ধরে ছত্র সুচারু চিত্রিত
উলঙ্গ কৃপাণ করে
নয়নে কৃশানু, ক্ষরে
দ্বারে ভীম দ্বারপাল কৃতান্ত কিঙ্কর,
কতক্ষণে রক্ষ--হরি কহিলা গরবে
অমর বিক্রম যত
আজি সবে দেখিলেত ?
হরি-ভাত ফেরু যেন রাক্ষস-আহবে।
একৃতিত্ব নিয়ে রটে “ত্রিদশ-ঈশ্বর”
অব্যর্থ অশনি-পাণি
বৃত্র যিনি অভিমানী
সমরে কম্পিত প্রাণ যেমন তস্কর।
82
ইন্দুমতী-কাঝ।
অভ্র-ভেদি শৃঙ্গ ভাঙ্গে যে পবন বলে
প্রবল প্রতিভা-শশী
কলঙ্কে করিল মসী
ডুবাইল কীর্তি-রত্নজলধির জলে।
শততধিক ফালানল-পূৰ্ণ-দণ্ড-ধর !
শিশু মাতৃ অঙ্কস্থিত
তারে করে কবলিতে
অব্যর্থ দণ্ডের প্রভা বিস্তারে বর্ববর।
পাষণ্ড যণ্ডের প্রায় কে আর এমন ?
সতীর হৃদয়-নিধি
কেড়ে নিয়ে নিরবধি
হৃদয়ে জ্বালায় তীব্র শােক-হুতাশন।
অমূল্য কোমল মনে শ্মশানের ছায়া
অম্লান প্রসূন প্রায়
অকালে শুকায়ে যায়
হেরি সমুৎফুল্ল-মতি সে নরক-কায়া।
যেমন পাষণ্ডতার দুর্দশা তেমন
কাঁপে যেন রস্তাপর্ণ
কোপে যবে ধরি কর্ণ
বিবর্ণ এ পদাঘাতে বিগত চেতন।
চতুর্থ সর্গ।
৪৩
অনন্তর স্থানান্তর বিহঙ্গম রূপে
পুনঃ পেলে সে পামরে
নরকের কারাগারে
রাখিব অনন্ত কাল পৃরি তমঃ-কূপে।
পাপী-ত্রাণ চির পন্থা করি আবিষ্কার ।
কৈলাস-প্ৰবেশতরে
সুসেতু নির্মাণ করে
বিমুক্ত শমনাতঙ্ক করিব সংসার !
নাক-গর্ব খর্বকারী পিণাকী-দর্শনে
মরতে ঘটিবে নাক
ছেদিব নাকের নাক
হবে নাক-নাক-জাক বিলীন গগনে।
রহিবে অতুল কীৰ্ত্তি অবনী-মণ্ডলে
রটিবে মানব, নারী
রক্ষে কে
সধিকারে চিরকাল দেব আখগুলে।
কেমন বৈরী
“ভুবন ব্যাপিত তব যশের কানন
উত্তরিলা মেঘনাদ
রক্ষসনে দেব-বাদ
বামনের সাধ যথা চন্দ্রগ্রহণ।
৪৪
ইন্দুমতী-কাব্য
সুর-নিৰ্যাতন ব্রতে ব্ৰতী চির দিন
দেবের দেবত্ব-শশী
ক্রমশঃ হইল মসী
একাৰ্য্যে নিৰ্ডর হবে চির বীৰ্য হীন।
মশক-দলনেত লভিবে পৌরষ ?
অর্পিবে শ্রবণে কর
সংসারের নারীর
অবলা-পীড়নে থাকে রথীর কি যশঃ ?
ভীত-প্রতিশােধে হবে অকৃতিভাজন
অরি যে মনুজ দ্বয়
অচিরে করহ ক্ষয়
রাঘব শাণিতে তৃপ্ত করহ জীবন।
অনুজ-নিহন্তা নহে আজি অন্ত-প্রাণ
বানরে বিজয় গায়
সে দুঃখে দহিছে কায়
কর তার সংহারের উপায়-বিধান।
‘হিত ভাষে সন্তোষিলে” কহিলা রাবণ
এ যুক্তি অমিয়-মাখা
বীরত্ব মাধুরী আঁকা
যােগ্যতম বাক্য তব কৃতিত্ব যেমন।
চতুর্থ সর্গ।
৪৫
চলিনু কৃতান্ত সম এবে এ সমরে
সাজ সাজ রথীগণ
কাঁপাও এ ত্রিভুবন
অৰ্পণ করিব নরে রণ-বৈশ্বানরে।
এতবলি রক্ষরাজ করে আস্ফালন
ভীষণ-বীরত্ব দাপে
সঘনে অবনীকাঁপে।
সদর্পে কহিলা তবে সরমা-নন্দন।
নাহি কি লঙ্কায় বীর যাইতে আহবে ?
কেন হেন হীন কাজে
যেতে দিবে মহারাজে ?
কেন রক্ষ-রথী বৃন্দ তােমরা নীরবে ?
নর-পশু-বধে যদি এত আড়ম্বর
কেন রগ-বাসে লঙ্কা
দেব-দানবাদি-শঙ্কা
বীরত্ব-সুযশঃ-ডঙ্কা নাদে দিগন্তর।
কোদণ্ড টঙ্কারে যার ত্রিভুবন টলে
ইন্দ্রজয়ী ইন্দ্রজিত
আছে হেতা উপনীত
বীরবাহু-বাহুবল ব্যাপ্ত ভূমণ্ডলে ?
ইন্দুমতী-কাব্য।
কুবের, পবন, যম, দীপ্ত দিবাকর
প্রচণ্ড বীরত্ব দাপে
সত্রাসে সতত কাপে
নহে অন্ত-প্রাণ সেই তরণী-কিঙ্কর ?
জীবিতে যদ্যপি যায় বংশের সম্মান
বহিয়া কলঙ্ক-ডালি
গৌরব করিয়া কালী
ধিক্ তার এ জীবনে মঙ্গল মরণ !
এখনও রক্ষ রথী তােমার নীরবে ।
রাঘব অক্ষত কায়
বানরে বিজয় গায়
কেমনে সহিছ হেন অপমান সবে ?
পরাজুখ সবে যদি লভহ বিরাম
একা দলি অরি-পক্ষ
যােদ্ধগণ লক্ষ লক্ষ
লঙ্কেশ-অনুজ-সুত রক্ষিব এনাম।
চাহি গজেন্দ্র, বাজি স্যন্দন সারথী
অশ্বারােহী পদাতিক
হীন রণে সে অলিক
ভীমগদাঘাতে হত হবে দাশরথী।
চতুর্থ সর্গ।
৪৭
অথবা সে গদা অস্ত্ৰে কিবা প্রয়ােজন
বাহুবলে উপারিয়া
শত গিরি একত্রিয়া
চাপিয়া মারিব যত অরাতি দুৰ্জ্জন।
থাকিতে লঙ্কায় এক রাক্ষস-কিঙ্কর
স্বমানে হানিয়া বাজে
মহাযশাঃ রক্ষরাজে
দিব বধিতে যেতে মানব-বানর।
তরণীর বীরদাপ দীপ্ত হুতাশন
সস্নেহে চুম্বিয়া শির
ইন্দ্রজিত মহাবীর
ধন্য ধন্য বলি প্রেমে করে আলিঙ্গন।
এক বাক্যে প্রশংসিল অমাত্য-মণ্ডলী
স্নেহ-নীরে পূর্ণ আঁখি
আদরে জীবন-পাখী
বক্ষে নিলা রক্ষ-রাজ হয়ে কুতূহলী।
ধরিলা বিচিত্র শােভা নয়ন-রঞ্জন
বসন্তে শ্যামল সাঁজে
যেমতি সুষমা রাজে
ভুবন ভুলান পূর্ণ চাঁদের কিরণ।
৪৮
ইন্দুমতী-কাব্য।
সস্নেহে রােমাঞ্চ তনু কহে লঙ্কেশ্বর,
যত পুত্র-শােকানল
তাের ভাষে হল জল
জানি তুই রক্ষকুলে বীরত্ব-ভাস্কর
জুড়ালে তাপিত প্রাণ প্রাণ-প্রিয়তম,
তাের বীৰ্য বল কথা
সুর-হৃদে চির গাঁথা
তবু প্রাণ কাপে বাছা হইয়ে নির্মম
কেমনে পাঠাব কাল সমর-প্রাঙ্গনে।
বিধাতা হয়েছে বাম
শােকে জ্বলি অবিরাম
আঁধার ঘরের আলাে কাঙ্গালের ধনে।
বধু সরমার তুমি নয়নের মণি
প্রাণাধিকা ইন্দুমতী
কামিনী কুলের ভাতি
বিধি-চক্রে কঁপে প্রাণ, দিবস রজনী।
নিষ্ঠর জনক তব ত্যজি দয়িতায়
সােণার প্রতিমা যেন
পুত্রবধু,—পুত্র হেন
জ্ঞাতি, বন্ধু, কুলমান, সােদর ভ্রাতায়,
চতুর্থ সর্গ।
দিয়ে জলাঞ্জলি সবে নর-পদ-তলে
বিক্রীত করেছে কায়
শুনে বুক ফেটে যায়
ভাসালে সরমা বধূ,
বিষাদের জলে।
শরদিন্দু সম দীপ্ত কবর-পরিমা
হায় সে আপন করে
অর্পিল কেমন করে
ঘৃণিত দাসত্ব-রূপ কলঙ্ক-কালিমা।
দেহান্তরে হেন দুঃখ রহিবে অন্তরে
তৃণ হেন যারে গণি
তারে
পূজে
“নরমণি”
রক্ষেশ-অনুজ-ভুজ নর-সেবা করে।
কুক্ষণে জন্মিল সূর্পণখা অভাগিনী,
পঞ্চবটি বনান্তরে
ছিন্ননাসা হলে পরে
কহিল বিষাদ- বাৰ্তা যবে বিষাদিনী।
শ্রবণে জ্বলিল দেহ অপমানানলে,
তাই যােগী-বেশ ধরি
জানকী আনিনু হরি
উপযুক্ত প্রতিশােধ দর্শা’তে ভূতলে।
•••••
৪
ইন্দুমতী-কাব্য
আহরণ না করিলে রাঘব-রমণী
ধিক্কারি বিদ্রুপ করে
হাসিত অমর নরে
দিগন্ত ব্যাপিত মম ভীরুত্বের ধ্বনি।
পদে দলি-বংশ-মান, ন্যায়ের বিচার
বৃথা অনুরােধ করে
কি দোষে অরাতি-করে
করিল অঙ্গর সম সােণার সংসার।
এতবলি রক্ষ-রাজ দিলা নীরবে
স্মরিয়া অনুজ, সুত
রথী যত রণে হত
একে একে মহাযশা শােকোচ্ছাসে সবে
নৈকষেয় অশ্রু-জল করি সন্দর্শন
করি যুক্ত যুগকর
রক্ষ-কুল-প্রভাকর
তরণী কহিল তাত শান্ত কর মন।
সীতা-আহরণ তব ন্যায্য কাৰ্য্য বটে
মানীর মৰ্যদা যত
মানহীনে জানে কত ?
নিস্তেজ সে কাপুরুষ হরণ” যে রটে।
চতুর্থ সর্গ।
যার করে পিতৃ-স্বসা হল হত মানী
সুরাসুর, বিদ্যাধর,
দানব, গন্ধ, নর
কার সাধ্য সে পুরুষ রক্ষিবে কামিনী ?
তেজহীন বীৰ্য্যহীন জীবন যাপন
তার চেয়ে শতগুণে
গলে বাঁধি কুম্ভ-গুণে
নীলাম্বুর অস্তুতলে মঙ্গল মরণ।
বীরের সন্তান মােরা বীর অবতার
থাকিতে দেহেতে প্রাণ
কেন সব অপমান
থাকিতে ধমনী-রক্ত করে তরবার ?
পাবেনা সে কাপুরুষ জানকী স্পর্শিতে
যদ্যপি সে যুক্ত করে
ক্ষমা ভিক্ষা নাহি করে
থাকিতে শশাণিতবিন্দু রক্ষধমনীতে।
লুকায় রাঘব যদি জলধির নীরে
ধরিয়া কুম্ভীর কায়
গ্রাসিব কবলে তায়
সিংহ-রূপে বিনাশিব পেলে শৈল-শিরে।
ইন্দুমতী-কাব্য
স্বর্গে যদি পশে দুষ্ট অমর-আশ্রয়ে
উপারিয়া বাহুবলে
বৈজয়ন্তী চাপি জলে
পাঠাব সুরেন্দ্র সহ শমন-আলয়ে।
পাতালে পশিলে সেই মানব দুর্বার
নরসিংহ-মূৰ্ত্তি ধরি
বজ্রনখে ছিন্ন করি
সূর্পণখা-প্রতিশােধ দর্শাব এবার।
জলদে প্রবেশে যদি মানব দুৰ্জ্জুন
গদাঘাতে ভয়ঙ্কর
বিচূর্ণি নীরদ-স্তর
অশনি-অনলে তারে করিব দাহন।
অরণ্যে পশিলে রাম তীব্র শরানলে
তৃণ যথা দাবানলে
ভম্মিব সদল বলে
প্রতিজ্ঞা আমার তাত, রক্ষ-সভাস্থলে।
হরি যথা করী-শিশু করে বিদীরণ,
হেলায় বিনাশি অরি
যশঃ-মাল্য গলে পরি
নমিব, নতুবা নাহি দেখাব বদন।
চতুর্থ সর্গ।
তােমার প্রসাদে তাত করি দিগ্বিজয়,
সানন্দে আশীষ দাসে
যেন যশঃ-ইন্দু হাসে।
সুনীল ভারতকাশে সদা হাস্যময়।
রক্ষিয়ে তােমার গর্ব ফিরিব সত্বর
দর্শাব জগত মাঝে
যে যবে সমরে সাজে
এ লঙ্কা-প্রসূত যত মহা ধনুর্দ্ধর।
রাঘব কৃতিত্বে রক্ষ কি উপকার ?
প্রতিদ্বন্দী প্রশংসায়
স্বকুল গৌরব ধায়
সংগ্রামে না উপরােধ মানিব পিতার।
তরণী সুযুক্তি উক্তি করিয়া শ্রবণ,
প্রমীলার-মনােহর
অমুকুটে বীরবর
সাজাইলা প্রীতি-অশ্রু করি বিসর্জন।
আলিঙ্গনে তােষি অঙ্কে রাখে লশের
সভ্যবৃন্দ একতানে
প্রশংসে পুলক প্রাণে
বিমানে কম্পিত-প্রাণ অমর নিকর।
৫৪
ইন্দুমতী-কাব্য
রাজ-অনুমতি মতে রক্ষ-রথী-গণে
জানুবীর পূত নীরে
সুবৰ্ণ ভৃঙ্গারে ধীরে
অভিসিক্ত করিলেন সরমানন্দনে।
ভীমনাদে রক্ষ সৈন্য করে আস্ফালন ।
চৌদিকে দুন্দুভি বাজে
কাপাইয়া দেবরাজে
প্রমাদ গণিল যত বিশ্ব-জীব-গণ।
স্বর্ণ লঙ্কা প্রকম্পিত কবর-প্রতাপে
মেঘনাদ-জয়নাদে
কাপাইলা মেঘ-নাদে
কোদণ্ড নির্ঘোষে ত্রাসে মেরুশীর্ষ কঁপে।
কুঞ্জর, সুন্দর বাজি, স্যন্দন সজ্জিত
তৃণ, ধনু, অসি, চৰ্ম্ম
শিরস্ত্রাণ, বাণ, বৰ্ম্ম
পুঞ্জে পুঞ্জে তুঙ্গাকার হল সংগৃহীত।
জানিয়ে প্রলয় কাল কাঁপিল মেদিনী:
সশঙ্কে লঙ্কেশাতঙ্কে
ত্যজিয়া দিবার অঙ্কে ,
ডুবিল পশ্চিমাচলে ভয়ে দিনমণি।
চতুর্থ সর্গ।
হেন কালে শঙ্খধ্বনি হল ঘােরর
গৌরবে পূর্ণিত কায়
ধরা হেরি সরা প্রায়
সভা ভঙ্গে চলে যত রাক্ষস-নিকর
পঞ্চম-সর্গ।
পশ্চিম গগনে ভানু রক্তিম ছটায়
সুরঞ্জিত মেঘ-মালা করিলা যখন
দিবা-সতী প্ৰাণ পতি বিচ্ছেদ-শঙ্কায়
চিন্তায় মলিনা মূৰ্তি করিলা ধারণ।
দিনমণি-শােকে দিবা সন্তপ্ত অন্তরে
পতি সহ অনুমৃতা হইবার আশে
জ্বালিছে যেনরে চিতা পশ্চিম অম্বরে
কলকণ্ঠে বিহঙ্গম সে শােক প্রকাশে !
ক্ষীণ-প্রত প্রভাকর নিরখি নয়নে
দিবা-সখী কমলিনী ঢাকিল বদন
প্রভাতের ব্যবহারে ঈর্ষাকুল মনে
কৌতুকিনী কুমুদিনী সহাস্য আনন।
শ্ৰম-শ্রান্ত ক্লান্ত-কায় শান্তিপূর্ণ মন
গ্রাম্য-গীতি অনুরক্ত কাম্য গেহ-পানে
হলস্কন্ধে কৃষকেরা করিছে গমন
নাচিছে গােবৎস সঙ্গে রঙ্গ-পূর্ণ প্রাণে।
পঞ্চম সর্গ।
গােধূলির অঙ্গরাগে গােধূলি রঞ্জিতা
তারা-হার গলে ভালে চন্দ্রমা-ভূষণ
তমসা-ধূসর-বাস দিব্য পরিহিতা
কুসুম-ভূষণে সাজে মানস-মােহন
দেবালয়ে শঙ্খ, ঘণ্টা, কংশ, করতাল
মধুর মৃদঙ্গ বাজে আরতি উৎসবে
বিভুর মহিমা গানে হয়ে সুমিশাল
সায়ন্তন কৃত্যে রত দ্বিজগণ সবে।
উদ্ভাসিত চন্দ্রমার সুস্নিগ্ধ কিরণে
তরণীর প্রিয়তম প্রমােদ উদ্যান
বামাকণ্ঠে পূরবীর সঙ্গীতালাপনে
সুধা-কণ্ঠী ইন্দুমতী বিমােহিছে প্রাণ।
বাসিত কুমকুল করিয়া চয়ন
বিচরিছে প্রমােদিনী সরস অন্তর
বিমুক্ত অলকাগুচ্ছ দোলায়ে পবন
কভু আবরিছে চারু মুখ-শশধর!
কভুবা গােলাপ শাখে জড়ায়ে বসন
রসিক পবন কত করে রস-কেলী
উম্মুচিতে কম করে করিলে ধারণ
মারুত-সােহগে শাখা পড়ে হেলি চলি।
বিনাসুতে গাঁথি হার অমলা সঙ্গিনী
সাজায় মােহিনী বেশে রমণী রতন
ইন্দুমতী-কাব্য।
দেবধাম পরিহরি ত্রিদিব-কামিনী
সৌন্দৰ্য্য স্বমূর্তি হেন করিল ধারণ।
সান্ধ্য-সখী রাখি দূরে রজনী সুন্দরী
অলক্ষ্যে পশিল যেন উদ্যান-অন্তর
অতুল সুষমা যেরি আপনা পাসরি
কোকিলা করিল গানে আকূল অন্তর
সুধাংশুর অংশুমালা মাখিয়া যতনে
নিরখি স্বঅঙ্গ-আভা পাপিয়া মাতিল
সুরবে অমিয় ঢালি মাতা’য়ে গগনে
শাখী পরে সুখ
সারি অমৃত বর্ষিল
সহচর-মুখে শুনি প্রীতি-সম্ভাষণ
প্রমােদিত মনে মধু পশিল উদ্যানে
রণ-বাদ্য-রবে মত্ত যথা বীর-মন
মীন-কেতু সমাগত বসন্ত-আহ্বানে।
সখী সনে লতা কুঞ্জে চারু শীলাতলে
বসি হার গাঁথে ইন্দু সােহগে গলিয়া
মন-আশ চারু হার দোলাইলে গলে
প্রীতির তরঙ্গ তার উঠিবে নাচিয়া।
হেন কালে ফুল-ধনু-সায়ক-সন্ধানে
যুবতী কাতরা অতি পতির বিরহে
অশ্রু-আখি বিধুমুখি ভ্রমে পুষ্পবনে
প্রমােদিনী উন্মাদিনী অনঙ্গ-প্রদাহে
পঞ্চম সর্গ।
ব্যাকুলা কহিলা সখি প্রমােদ কানন
হুতাশন হেন কেন দহে সীমন্তিনী
গ্রাসিতে উদিল যেন রােহিণী-রঞ্জন
কাল ভুজঙ্গিনী সম একাল যামিনী।
রাজিল নয়ন-প্রান্তে অশ্রু-ষিন্দু যবে
নীহার-মুকুতা যেন পঙ্কজের দলে
অমলা কহিলা ব্যঙ্গ-বীণার আরাবে
অলি কি ভূলিবে সখি ফুটন্ত কমলে ?
বিশ্ব-বিমােহিনি,তব রূপের কিরণ
অবলার প্রাণ, মন করে সমাকুল
কতক্ষণ রবে আর যুবকরতন
অদর্শনে শান্ত মনে কেন চিন্তাকুল ?
বিচর লাবণ্যময়ি !—পুলকে উদ্যানে
কেন ভ্রান্ত প্রাণ-কান্ত আসিবে এখনি
তােষিবে তৃষিত চিত প্রেম আলিঙ্গনে
চুম্বি অরবিন্দোপম ও বদন খানি।
অদূরে পিধানে ধ্বনে কৃপাণের ধ্বনি
শুনি চমকিত অতি অমলার মন
অঙ্গুলি সঙ্কেতে সতী জানায় তখনি
“পতি সমাগত,কর প্রীতি-সম্ভাষণ”।
ভাঙ্গিল সুষুপ্তি যেন,-চকিত নয়ন
অন্তর আনন্দ-সিন্ধু করিয়া মথিত
ইন্দুমতী-কাব্য।
সরল কটাক্ষ করে অমিয় বর্ষণ
হইল অপূর্ব ভাবে দেহ কণ্টকিত।
নিরখি সে সুধা-দৃষ্টি তরণীর মন
কাঁদিল হায়রে ভাবি সম্মুখ সমরে
গত-প্রাণশুনি এই অম্লান প্রসূন
শুকাবে অমনি তীব্র শােক-রবিকরে
অধীর হইলা ধীর, নয়ন-আসারে
আররিল চারুদৃষ্টি, টলিল চরণ
কাঁপিলা হৃদয়াবেগে, যেন হিমাধারে
কাপায় বিশেষ শেষ-শির-প্ৰকম্পন
ধন্যরে দাম্পত্য-প্রেম! কি তাের প্রভব!
বজ সম দৃঢ় যেই বীরেন্দ্র হৃদয়
রমণী-উপম-কম সুবিকাশে তব
পাশ-বদ্ধ সিংহ-সম প্রাণি সমুদয়।
ভাবিলা বিষন্ন মনে যুবক তখন
সরলা অজ্ঞাত তার প্রেম-পরিণাম
মরু-মৃগতৃষ্ণিকায় যথা পান্থজন
প্রপঞ্চে বঞ্চিত ইন্দু,বিধিতার বাম
তৃষিত সতীর চিত ধায় পতি-পানে
যত্নে দমি হৃদাবেগ রহে সীমন্তিনী
অঞ্চলে আবরি ফিরে রক্তিম নয়নে
প্রণয়ী নীরব হেরি মানে অভিমানী।
পঞ্চম সর্গ।
ইন্দুমতী মৌনব্রতী, নিরখি তখন
চিন্তিলা অমলা এযে নব অভিনয়
নহে সমুচিত থাকা এথায় এখন
সরমে না হবে নব রসের উদয় ।
সুচতুরা হেন মনে করিয়া বিচার
কৌতুক দর্শন-সাধ থাকি অন্তরালে
কহিলা চলিনু সখি ।-বারি আনিবার
না হবে রচিত হার,-কুসুম শুকালে !
“রজনীতে ফুল শুষ্ক” উত্তর বিহনে
ব্যঙ্গ-বাণ হানি নেত্রে সখী অন্তঃহৃত
জারজে অঙ্গজ বলি আদর দর্শনে
মাতা হাসে যথা জানি পতি প্রতারিত
হেন কালে কোকিলের পঞ্চম ঝঙ্কার
ভাঙ্গিল সুষুপ্তিঘাের রক্ষ চমকিত
উপপতি-অঙ্ক-স্থিত। প্রাংশুলা বামার
পতি-শব্দে আচম্বিতে যথা নিদ্রাগত।
সিন্ধু-নদ-ধার যথা প্রাবৃট-প্লাবনে
ছুটিলা তরণী যথা সুধার আধার
অধােমুখি ইন্দুমতী মুখাবগুণ্ঠনে
ভুজ-পাশে গলদেশ বাঁধে প্রেমদার
চতুর চঞ্চল দৃষ্টি সুধা-বৃষ্টি করে
প্রক্ষালিত মান-মসী করি অবলার
ইন্দুমতী-কাব্য
উম্মুক্ত করিয়া রক্ষ বদন-অম্বরে
নিরখে শিশরুমুক্ত ছবি চন্দ্রমার।
প্রেমােচ্ছাসে সতী-নেত্রে বহে অশ্রুজল
পতি-আলিঙ্গন-স্রোতে রহিতে না পারে
যেমতি নীহার-পূর্ণ পঙ্কজের দল
স্পর্শন-পীড়নাশক্ত ঝরে দর ধারে।
গড়াইয়া গণ্ড-বাহী সে নীর-প্লাবন
প্লাবিত করিল যবে প্রিয়-বাহু দ্বয়
তরণী অন্তরে ছােটে শােক-প্রস্রবণ
বক্ষে নিল রক্ষ-বলী আকুল হৃদয়
রক্ষ-ইন্দু-অঙ্কাকাশে ইন্দুর প্রভায়
ভুব-রঞ্জন শােভা ধরিলা তেমন
হিমান্তে চিত্রার সনে চৈত্র-পূর্ণিমায়
প্রদীপ্ত শিশির-মুক্ত হিমাংশু যেমন।
রসনা অবস ভাষে ভাবাবেশে তাের
কম্পিত রােমাঞ্চতনু তােষে প্রেমদায়
ইন্দু-মুখ-সুধা-মত্ত
তরণী-চকোর
কপােল-পীড়নে দ্রুত বিরহ পলায়
স্বকরকমলে করি চিবুক ধারণ
কোকিল-কাকলি সম মধুপম, স্বরে
কহিলা কি হেতু প্রিয়ে ও বিধু-বদন
বিরত অমৃতময় সুহাস সঞ্চারে ?
পঞ্চম সর্গ।
কপােল রক্তিম যেন কুঙ্কুম-লেপনে
সাপিনী-তাপিনী বেণী উম্মুক্ত আকুল
মানিনী রূপিনী হয়ে পতিত বদনে
যেন চন্দ্রে আবরিল নীরদের কুল।
কেন নিমিলিত চারু নলিনী-নয়ন
রসনা অলস কেন পীযূষ বর্ষণে
আসার অঞ্জন-রাগ করে প্রক্ষালন
অন্তর দহিছে কেন দুঃখ-হুতাশনে ?
কি দোষে বঞ্চিত প্রিয়ে সুভুজ-বেষ্টনে
তরণী হৃদয়ানন্দে, বক্ষ-বিহারিনী
কেন হেরি চন্দ্রোজ্জ্বল অম্লান বদনে
ভীষণ বিষাদ-ছায়া হৃদি-বিদারিনী।
লাজ-মাখা অর্ধস্ফুট মধুর বচনে
পতি-বক্ষে ইন্দুমতী লুকায়ে বদন
কহিলা—তবু যে মােরে পড়িয়াছে মনে
বলি হারি!-ভালবাসা পিয়াসী কেমন ?
সারাদিন অদর্শনে কত আশঙ্ক্ষায়
কাটায়েছি জানেন দেব মহেশ্বর
কিভুলে ভুলিলে নাথ ?-প্রশংসি তােমায়
ক্ষণ অদর্শনে হৃদি কাপে থর থর !
কালরূপী রণক্ষেত্র-ভীমা-কুস্তিরিণী
বদন বিস্তারি সদা গ্রাসে রক্ষ-মীনে
ইন্দুমতী-কাব্য।
জানিবে কি ?—সশঙ্কিতা দিবস যামিনী
কি আছে অবলা গতি প্রিয় পতি বিনে?
“বৃথা এ আশঙক্ষা তব” কহিল তরণী
সামান্য মানব রাম,ছার কপিগণ !
যার বীর দাপে কাপে সুর-অনিকিনী
তার পক্ষে তুচ্ছতম নর-পশু-রণ!
অচিরে তাড়া’তে চিন্তা সদূর অন্তরে
সুসজ্জিত রণ-সাজে করিতে সমর
যশঃ-মাল্য গলে পরি বধি দুষ্টনরে
নিশ্চিন্তে করিব কেলি সরস অন্তর ।
হরষে বিদায় দেও আনন্দ-দায়িনি
করে মঙ্গল-কুম্ভ করহ স্থাপন
দেখাও হৃদয়-বল বীরেন্দ্র-রমণি
কেন হীনা নারী সম করিছ চিন্তন ?
ভীষণ স্বপনবার্তা হইলে স্মরণ
শিহরিলা ত্রাসে সতী পতির বচনে
শিরে অকস্মাৎ যেন অশনি-পতন
পড়িলা বিটপি যখা ঝটিকা-তাড়নে !
পতির পদারবিন্দ হৃদয়ে ধারণ
করিয়া কহিলা সতী সকরুণভাষে
যে বচনে হত সদা অমিয় বর্ষণ
আজি কেন তায় মরি গরল বরষে ?
পঞ্চম সর্গ।
যতনে পালিত সেই বন-বিহঙ্গিনী
রাখিতে আদরে সদা হৃদি-পিঞ্জিরায়
তােষিতে সােহাগে কত দিবস যামিনী
কোন প্রাণে স্বকৃপাণে বিনাশিবে তায় ?
স্বকর-রচিত যেই প্রমােদ উদ্যান
বিকসিত ফুল্ল ফুলে হ'লে সুসজ্জিত
কেবল আপন করে করে উৎপাটন ?
কি পাষণ প্রাণ তব ?-হইনু বিস্মিত,
এত যদি ও অন্তরে ছিল প্রাণেশ্বর
কেন নিরমিলে প্রেম-প্রণয়-প্রতিমা
নিমজ্জিতে বিচ্ছেদের সাগর-অন্তর
রাহুতে সপিতে কিবা প্রণয়-চন্দ্রিমা ?
না দিব সমরে যেতে থাকিতে জীবন,
যদ্যপি যাইতে সাধ বধ অধিনীরে
কেমনে ভুলিব নাথ ও চারু বদন,
কহ নাথ,-কহ স্বরা,কহ তা দাসীরে।
এত বলি ইন্দুমতী কাদিলা নীরবে
যতনে হৃদয়ে তুলি হৃদয়-রতনে
কহিলা তরণী যেন বীণার আরাবে-
ঝরিল প্রণয়াবেগে আসার নয়নে।
কঠিন প্রণয়-পাশে হৃদয়-মন্দিরে
চির কারাবদ্ধ আমি আনন্দদায়িনি
৩৬
..
ইন্দুমতী-কাব্য
প্রীতিপূর্ণ বাণী, যেন প্রহরী বিচরে
প্রেমময় মুখ-ইন্দু, কোমল চাহনি ;
ধরা মাঝে বীরসিংহ কে আছে এমন
বলীয়ান প্রেম-পাশ করিতে বিদার?
স্বেচ্ছায় ধ্বতন-হার কে করে অর্পণ
কে বল জলধি মাঝে,—হেন দুরাচার ?
কিন্তু প্রিয়ে সেনাপতি-পদে অভিসিক্ত
করেছেন জ্যেষ্ঠতাত যাইতে আহবে
সজ্জিত কর-সৈন্য,-হ’য়ে প্রেমাসক্ত
কেমনে অবলা প্রায় রহিব নীরবে ?
সিংহের রমনী হয়ে জন্ধুকীর প্রায়
কেমনে কাটাবে কাল জীবন-জীবন
চির কাল এ কলঙ্ক রটিবে ধরায়
“রণ-সাজে সেজেছিল তরনী যেমন,
অতএব বৃথা চিন্তা কর পরিহার
করহ প্রফুল্ল মুখে যাত্রা-আয়ােজন
সুখ-দুঃখ জন্ম মাত্র লিপি বিধাতার
প্রমায়ুর অবসানে অবশ্য নিধন।
বিচিত্র মায়ার মায়া কে বুঝে সংসারে
বিমােহিতা ইন্দুমতী বীরাঙ্গনা-প্রায়
আলিঙ্গনে তােষিলেন সরমা-কুমারে,
ধমনীতে উষ্ণতর শােণিত খেলায়।
পঞ্চম সর্গ।
বীরত্ব-গৌরবে মত্ত, মত্ত মাতঙ্গিনী
ধরিলা ভৈরবী-মূৰ্ত্তি আরক্ত নয়ন
চম্পক-বরণী হল রক্তিম রঙ্গিনী
নিক্ষেপিলা ভূমে সর্ব কুসুম-ভূষণ।
দানব-তনয়া ভীমা রাক্ষস-ললনা
বিকট রাক্ষসী-বেশে নিরখি তখন
বসন্ত সে রতিকান্ত লইয়ে অঙ্গনা
আতঙ্কে উদ্যান ত্যজি করিল গমন।
বামাকণ্ঠে ভীম নাদ শুনিয়া শ্রবণে
অমলা দৌড়িল তথা সেরূপ নিরখি
কপিল সভয়ে, মুদি যুগল নয়নে
বীরমদে আরক্তিম হেরি পদ্ম-আঁখি।
পতির পিধান-অসি টানিয়া সবলে
সদর্পে কাঁপায়ে ধরা, বলে ভীমরবে—
“কেন নাথ যাবে হেন হীন বণস্থলে
মূহুর্তে নাশিব যত অরিগণ সবে”।
হৃদয় রঞ্জন নহে রমনী-প্রকৃতি
সৰ কাৰ্য্যে সমভাবে অংশী যে যাহার
সম্পদে-বিপদে নারী না হইলে সাখী
সতীর কর্তব্য রক্ষা পায় কি তাহার ?
বাসনা যৌবন সঙ্গে হইবে বিলয়
বিমল দাম্পত্য-প্রেম অনশ্বর স্থির
ইন্দুমতী-কাব্য।
যে প্রেমে বিভুর প্রেম হয় অভ্যুদয়,
কদিন রহিবে হেন অনিত্য শরীর ?
থাক তুমি এ উদ্যানে আমি যাব রণে
নিমিষে নাশিব যত অরাতি দুৰ্জ্জন
উড়াব বিজয়-ধ্বজা সিংহল-গগনে
রক্ষিব সুনাম তব, অরি নিসূদন।
ধাইল সবলে বামা উগ্রচণ্ডা-প্রায়
উলঙ্গ কৃপাণ করে আলু থালু কেশ
অসুর বিনাশে যেন মহেশ-মায়
বীর-মদে মাতােয়ারা ধরে কালী-বেশ ।
বহিল তরনী হৃদে সুখ-প্রস্রবন
ছুটিয়া নিবারে জোরে উন্মত্ত বামায়
সপ্রেমে কপােল করি কতবা চুম্বন
আলিঙ্গনে তুষিলেন স্বর্ণ প্রতিমায় ।
মধুর বচনে তুষি তরনী তখন
কহে তরনীর তুমি সুর্যোগ্যা রমণী
কিন্তু যদি নারী করে অরাতি-পতন,
কর-কলঙ্ক-ধ্বনি রটিবে ধরনী।
রহ প্রিয়ে শান্ত মনে এ শান্তি ভবনে
আনন্দে বিদায় দেও সদানন্দময়ি
দেখাও হৃদয়-বল অতুল্য ভুবনে
ভাব পরমেশে যেন হই রণ-জয়ী।
পঞ্চম সর্গ ।
পতির আদেশ-বাণী অলঘ্য অটল
ধরি পদ ধূলি শিরে যাত্রা-আয়ােজনে
সখী-সঙ্গে চলে চির-সঙ্গের সম্বল
কে পারে মায়ার মায়া খণ্ডিতে ভুবনে?
ভবনে পশিয়া সতী পতি পদে পড়ি
নমিয়া,সুবর্ণ কুম্ভ করে সংস্থাপিত
সিন্দুর পল্লবে তায় সুসজ্জিত করি
ত্বরায় মঙ্গল দীপ করে প্রজ্জ্বলিত
পতি সনে সপ্তাের করি প্রদক্ষিন
দম্পতি নমিলা যবে উদ্দেশ্যে শঙ্করী
ইন্দুর সিন্দুর-বিন্দু নিরখি মলিন
তরনী ভকতি, প্রেমে স্মরিলা শ্রীহরি।
প্রকম্পিত বাম আঁখি অতি অলক্ষণ
নিশীথে বায়স করে অশিব ঘােষণা
বাম বাহু আচম্বিতে আরম্ভে স্পন্দন
চৌদিকে হেরিলা রক্ষ অমঙ্গল নানা।
মায়ার প্রপঞ্চে মুগ্ধা সতী ইন্দুমতী
স্বকরে সায়ক ভূণে করিয়া পূরণ
অশ্রু-পূর্ণ নেত্রে বক্ষে ধরে রক্ষপতি
তরনী চলিলা করি অন্তিমালিঙ্গন।
ষষ্ঠ-সর্গ।
সুহাসিনী নিশিথিনী কবর আলয়ে
তারা-হারে সুসজ্জিত সুনীল গগন
প্রদীপ্ত চন্দ্ৰমালােকে,-সরসী-হৃদয়ে
প্রেমােন্মত্ত কুমুদিনী সহাস্য বদন।
চকোর দম্পতি রত স্নিগ্ধ সুধাপানে
উজলিছে দীপ-মালা নক্ষত্রের প্রায়
তামসী-ধূসর-বাস অদৃশ্য নয়নে
যামিনী সুপরিণতা করিছে দিবায়।
বাজিছে বাদি নানা অম্বিকা-মন্দিরে
কাংশ, ঘণ্টা, করতাল, দিব্য শঙ্খনাদে
প্রেমের তরঙ্গ খেলে অরু-অন্তরে
গাইছে গায়ক-বৃন্দ নাচিয়া আহলাদে।
রসনে প্রতিষ্ঠিত দেবীর মূরতি
হেম, রত্ন, মণিময় ভূষণ-ভূষিতা
চতুভুজা মুক্তকেশী মহা ভীমাকৃতি
নৃমুণ্ডমালিনী শ্যামা রুধির রঞ্জিতা
যষ্ঠ সর্গ
কর-পদ-নখে কোটি চন্দ্রমা উদয়-
মুফলিত বিম্বফল অধরে প্রকাশে
নীল সৌদামিনী-ছটা রূপে অভ্যুদয়
অলকা ঝলকে ঘন তিমির বিনাশে
লম্বােদরা বাঘারা বিমুক্ত কবরী
বরাভয় মুণ্ডকরে উলঙ্গ কৃপাণ
পীনােন্নত পয়ােধরা ঘােরা দিগম্বরী
পদশায়ী শব রূপি সৰ্ব্বেশ ঈশান।
সুবৰ্ণ মঙ্গল কুম্ভ পল্লব-অম্বিত
সির-রাগ-রঞ্জিত চৰ্চিত চন্দনে
প্রফুল্ল প্রসূন-চারু-ভূষণালব্ধত
সন্তোষে নাসিকা-তৃপ্ত বাস বিতরণে
অতসী, অপরাজিতা, কিংশুক, কাঞ্চন,
মল্লিকা, মালতী, যুথী, বেলী, নাগেশ্বর
ভূচম্পক, কুরুবক, মাধবী, রঙ্গন,
রক্তোৎপল, শতদল, গােলাপ, টগর।
আশােক, বকুল, যাতি, জবা, কৃষ্ণকেলী,
সুবৰ্ণ চম্পক, কত প্রফুল্ল মন্দার
পুঞ্জে পুঞ্জে তুঙ্গাকার সুফলের ডালি
শ্রেণীবদ্ধ পূজাযযাগ্য সামগ্রী সম্ভার
সচন্দন বিলুদল দুর্বা অগণন
বাসিত পানীয় নানা রয়েছে সজ্জিত
•
૧૨
ইন্দুমতী-কাব্য।
হেম পাত্রে দিব্য অন্ন সউপকরণ
ধূপ-দানে ধূপ,ঘৃতে দীপ প্রজ্জ্বলিত।
সুপট্ট বসনে ভূষি পবিত্র আসনে
ভক্তি ভরে উপবিষ্ট। সরমা সুন্দরী
তনয়-মঙ্গল-আশে বিবিধ বিধানে
তােষিতে অরিষ্ট-হরা দেৰী মহেশ্বরী।
আর্দ-চিত্ত রােমাঞ্চিত সিক্ত নেত্ৰ-নীরে
কৃতাঞ্জলিপুটে স্তুতি করে রক্ষরমা
ত্রিদিবে কম্পিত-প্রাণ অমর নিকরে
কাতরে প্রেরিলা ত্বরা মায়া মনােরমা
সহসা সরমা সতী নিদ্রায় কাতর
হরিলা ভকতি জ্ঞান সুষুপ্তি-রূপিণী
ঘােতর নিদ্রাবেশে আসন উপর
শয়ন করিলা এবে দনুজ ভামিনী।
নড়িল মঙ্গল-কুন্ত পদ সঞ্চালনে
পূজাভঙ্গে মনােরঙ্গে মহেশ-মহিষী
চলিলা কৈলাস-পানে ত্বরিত গমনে
সিদ্ধ নির্জরের কাৰ্য, পরম উল্লাসী।
অলক্ষ্যে ভৈরবী চলে মরাল-গামিনী
রুনু রুনু ধ্বনি মাত্র নূপুরে বাজিল
নিদ্রারূপী মায়া-দেবী সহাস্য বদনী
ধীরে ধীরে সরমার সদন ত্যজিল।
যষ্ঠ সর্গ।
অপূর্ব মায়ার মায়া কে বুঝে সংসারে ?
রহিল মঙ্গলকুম্ভ যথা-সংস্থাপিত
পূজোপকরণ যত সুসজ্জিত মতে
অম্বিকা-মন্দির-দ্বার রহে অর্গলিত।
লঙ্কার সীমান্তে এলে হর-মনােরমা
রােধিলা গমন-পথ রক্ষ-ভক্তি আসি।
শুভ্র অঙ্গ, শুভ্র বেশ শরদিন্দু সমা
বিমল বদনে যেন অমিয়ের রাশি।
কহে সতী,—“হৈমবতি ভকত বৎসলা
বর্ণন করয়ে যত সাধক সুজন
কেমনে শিখিলে হেন কপটের ছল?
পাষাণ-নন্দিনী হেরি পাষানী যেমন!
প্রিয় ভক্ত নৈকযেয়,অকুল সাগরে
তুমি মাত্র এ বিপদে পরিত্রাণ-ভেলা
কোন প্রাণে সে সন্তানে ত্যজি হর্ষ ভরে
চলিছ কৈলাসে মাতঃ, একি তব খেলা ?
উত্তরিলা ভােগবতী “বৃথা দোষ সতি
কি না জান তুমি ভবে, সৰি কৰ্ম্মাধীন
জন্ম-মৃত্যু শুভাশুভ ফলদা নিয়তি
দোষের পশরা মােরে চাপে তর্বাচীন।
প্রাক্তন-পীড়নে জীব চলে মৃত্যু-পুরে
শঙ্খিনী-কবলে যথা কাকোদর-গতি
৪
ইন্দুমতী-কাব্য।
করস্থিত রঞ্জু যথা সৰ্প-রূপ ধরে
দংশে গত-আয়ু জনে নিরখি নিয়তি।
কি আছে শকতি মাের কহ গুণবতি
চিরদিন আমি তব বাধা প্রেম-পাশে
তােমার মনের টানে রুদ্ধ মম গতি
বল কি কামনা দেবি আমার সকাশে ?
কহিলা ভকতি তবে “জগত বন্দিনি-
চল একবার যথা নিকষা-নন্দন,
দিগন্ত ব্যাপিত যার ভকতি-কাহিনী
হেন ভক্তে চিরতরে করিতে বর্জন
কি দুঃখ তােমার মাতঃ, জানি ভাল মতে;
বিধি-লিপি কে করিবে কিরূপে খগুন ?
তথাপি এ চিত্র মাতঃ দেখাও জগতে
ভক্তাধীন তুমি বলি ব্যাপ্ত ত্রিভুবন !
যেমতি চুম্বক করে লৌহে আকর্ষণ
তেমতি চলিলা গৌরী ভকতির টানে
ত্রিদিবে কম্পিত-প্রাণ সুপাণ-গণ
মায়ায় প্রেরিলা স্বীয় অভিষ্ট-সাধনে !
পশিল গােপনে বামা রাবণ-ভবনে
সুবৰ্ণ পৰ্যঙ্কে যথা লঙ্কা-অধিপতি
সুষুপ্তির অঙ্কে সুপ্ত বিংশতি-লােচনে
অলক্ষ্যে কহিলা তায় দেবী হৈমবতী
ষষ্ঠ সর্গ।
প্রাণােপম ভক্ত বক্ষ, হৃদয়ের ধন
ভক্তি-ডােরে বদ্ধ আমি রক্ষিনু আলয়
পূর্ব বর-বাৰ্তা বাছা কররে স্মরণ
“ত্যজিব ভবনে হ’লে নর-অভ্যুদয়” !
বড় ভালবাসি তাের মনােম পুরী
তাই মহানন্দে ছিনু, নর-আগমনে
সীতা সতী তপ্ত শাসে এবে জ্বলে মরি
চলিনু অন্তিম দেখা এই তাের সনে।
নিদ্রায় সে ইন্দ্রজাল-ময়ী দেবী-বাণী
পশিলে শ্রবণে তবু মােহিত মায়ায়
বারত্ৰয় উচ্চারিল “যাও ভব-রাণি”
রক্ষে বিবসেন্দ্রিয় স্বীয় রসনায় ।
রাবণের সুখ-দীপ করিয়া নির্বাণ
চলিলা নীরবে কাঁদি হর-মনােরমা
স্বপনে আকুল হেরি রক্ষেন্দ্রের প্রাণ
আবার পশিলা গৃহে ভক্তাধীন বামা।
ভক্তি-বলে মায়া-পাশ কাটিয়া অমনি
“কোথা মা তারিণী” রক্ষ ডাকে উচ্চৈঃস্বরে
অন্তরে অন্তরময়ী উদিলা তখনি
কহিলা নিকষাত্মজ যুক্ত যুগ করে।
“রাবণ-সম্বল তুই জীবন মরণে
কেমনে সন্তানে মাগাে করিবি বচ্চন
{
ইন্দুমতী-কাব্য।
হৃদয় মন্দিরে তােরে রাখিব যতনে
কুপুত্র কি মাতৃ পাশে বিরূপ ভাজন ?
“সম্মুখ সমরে যদি করিস স্মরণ”
কহে গৌরী ‘‘যত্নে অঙ্কে করিব অমনি
রক্ষ ভক্তি পাবে দীপ্তি এ তিন ভুবন
নিয়তির গতি রােধে অশক্ত বাছনি”।
এত বলি হৈমবতী হলে অন্তর্ধান
নিরাশা-বারিধি-মগ্ন রক্ষোজ্জ্বলরবি
নিদ্রা-মােহে সমাচ্ছন্ন কর্বর প্রধান
স্মৃতি-দরপণে হেরে বিষাদের ছবি
সুষুপ্তি-রূপিণী মায়া জগত-মােহিনী
হরিলা ভকতি, জ্ঞান, মােহিত রাবণ
ত্রিদিবে চলিল মায়া লইয়া যামিনী
রক্ষেত্রে বিষাদ-জলে করি বিসর্জন।
শ্রীহীন অম্লান লঙ্কা,—তারিণী বিহনে,
কমলা বিহনে যথা ত্রিদিব দুর্গতি,
অথবা দেহীর প্রাণ হরিলে শমনে
মৃত দেহ ধরে যথা ভীষণ মূরতি !
সপ্তম-সর্গ।
প্রভাত হইলে নিশি প্রকৃতি সুন্দরী
বৈদেহীর যন্ত্রণার অবসান তরে
পবিত্র ধবল বাস পরিধান করি
পূজে যেন পুষ্প-নীরে ত্রিলােক-ঈশ্বরে
স্বীয় কুলকুল-বধূ কর-আলয়
ভুগিতেছে অবিরত যাতনা ভীষণ
নিরখি বিষাদে মগ্ন ক্রোধিত হৃদয়
পূরবে উদিল রবি লােহিত বরণ।
পড়িল সােনালি ছটা নীল সিন্ধু জলে
স্নাত-কায় সুশীতল বহিল পবন
নাচিল তরঙ্গরূপে যেন কুতূহলে-
প্রচেতা,অচিরে জানি লঙ্কার পতন
কুমুদিনী মনােদুঃখে ঢাকিল বদন
নীহার-নয়ন-বারি ঢালিয়া নয়নে
পতি-হেরি কমলিনী সমুৎফুল্লমন
শিশিরে শােভিল তরু মুকুতা-ভূষণে
ম্লান মুখ চন্দ্রমার করি নিরীক্ষণ
স্বখেদে ডুবিল তার বিমান-পাথারে
৭৮
ইন্দুমতী-কাব্য
পতি-অঙ্ক অনিচ্ছায় করিয়া বর্জন
যুবতী ঢাকিল আঁখি সলজ্জ অম্বরে।
দিবা-ভীত অন্ধকার আশ্রয়ের তরে
মহৎ সদনে ত্বরা করে পলায়ন
উচ্চ নীচে, সম যেই মমত্ব বিস্তারে
রক্ষে গিরি গুহা-বক্ষে, -উন্নত জীবন।
স্খলিত দলিত শুষ্ক কামিনীর মালা
ঘুম-ভাঙ্গা রাঙ্গা আঁখি রাজে বাতায়নে
ললিত রাগিনী তানে মানস উতলা
বিভুর মহিমা গায় বৈতালিকগণে
চলিলা সন্যাসীকুল ত্যজিয়া নগর
ছিন্নচীর শিরাে’পরে করি সংস্থাপন
দ্বিজগণ রক্তজবা ধরি দুই করে-
অর্পিছে তােষিতে রাঙ্গা সহস্র-কিরণ।
ত্রিযামার অবসানে ভীম কোলাহলে
গর্জিলা করবৃন্দ প্রচণ্ড বিক্রমে
সে গম্ভীর নাদ যেন পূর্ণ হলাহলে
মিলি বিদ্ধ শবােপম সরমা-মরমে।
চমকি উঠিলা সতী উন্মাদিনী প্রায়
ব্যাধ-শরবিদ্ধ যথা সুপ্তাকুরঙ্গিনী
তেমতি ধাইলা বামা ঘাের আশঙ্কায়
প্রাণােপম সুত-পানে মণিহারা ফণী
সপ্তম সর্গ।
নানাস্থান ভ্রমে সতী বিমুক্ত কুন্তলা
বসন অঞ্চল তার ললাটায় ধূলায়
অশ্রু-মুখি রাঙ্গা আঁখি বিবশা ব্যাকুল।
অশিব ভাবনা-সিন্ধু অন্তরে খেলায়।
হতাশে পশিয়া কক্ষে নিরখি নন্দনে
ভূষিত সমর-সাজে পৰ্য-উপর
পড়িলা বিটপি যেন ঝটিকা-তাড়নে
কপিল সরমা-অঙ্গ ভয়ে থর থর।
মাতৃভক্তিরসােন্মত্ত অন্তরে তরণী
বন্দি সে পদারবিন্দ যুক্ত যুগ করে
কহে পুনঃ পদ-প্রান্তে “কি হেতু জননি
ঢালিছ অজস্র অশ্রু অধৈৰ্য অন্তরে।
হের মা কিরীট শিরে সুবর্ণ মণ্ডিত
ভূষণ নহে মা উহা বিজয় কেতন
ইন্দ্র-জয়ি ইন্দ্র-ভূষা এনে ইন্দ্রজিত
প্রীতি-ভরে দাদা মােরে করেছে অর্পণ।
সাজাইলা ভ্রাতৃবধু প্রমিলা সুন্দরী
স্বকরে সমর-সাজে ধন্য বীরাঙ্গনা
জ্যেষ্ঠ তাত অর্পে অসি রাণী মন্দোদরী
পরাইল মণিময় হালঙ্কার নানা।
তব পুত্রবধু করে উলঙ্গ কৃপাণ
উন্মত্তা স্বকরে অরি করিতে বিনাশ
৮০
ইন্দুমতী-কাব্য।
কাপায় বীরত্ব-দাপে দিগন্ত বিমান
বিদায় প্রদানে হাসি মনে রণােল্লাস।
আর তুমি বীর-পত্নী,-বীরের জননী
রক্ষেন্দ্রের ভ্রাতৃবধূ, গৌরব-আলয়
ইন্দ্রজয়ী ইন্দ্রজিত পিতৃব্য-ঘরণী,
পুত্র-রণ-বার্তা শুনি ত্রাসিত হৃদয়।
ছি ছি ! মাতঃ, বড় দুঃখ উপজে অন্তরে
যার বীর-দাপে-কপে-অমর নিকর
হেন বীরে যে জননী ধরেছে জঠরে
সমরের নামে তার ত্রাসিত অন্তর ?
উঠ মাতঃ,উঠ ত্বরা কেশরী-বিক্রমে
দীক্ষা দিয়ে রণ-মন্ত্রে জাগাও ধমনী
কাঁপিবে, কাঁপিবে,—তব পুত্র-পরাক্রমে
আতঙ্কে অরাতিকুল, প্রসাদে জননী।
সরমা সুনন্দনের উত্তেজক বাণী
উরগ-নিসৃত বিষ অনুমানি মনে
সুত-অঙ্কে করি কাঁদে স্নেহাবেগে রাণী
অশিব-ভাবনা দহে দাব-হুতাশনে
সরমা কহিলা বাছা এ কাল সমরে
সজ্জিত, বধিতে কিরে অভাগা জননী
দুঃখিনী-অঞ্চল-নিধি স’পে দস্যু-করে
কেমনে ধরিব প্রাণ কহ যাদুমণি
সপ্তম সর্গ।
হিত-ভাষ শুনাইলে জনক তােমার
রক্ষ-রাজ-পদাঘাতে হ'য়ে অপমানী
ত্যজিলা সখেদে যবে সােণার সংসার
তােমাধনে বক্ষে নিয়ে রহে অভাগিনী।
কত ক্লেশে রক্ষপুরে রহি,বাছাধন,
সতত শঙ্কিত মন, রণ-সিন্ধু-জলে-
কখন নিক্ষেপে পাপী জীবন-রতন
শঙ্কা-ক্রমে বিষফল ফলে কর্ম-ফলে।
চির অস্ত হবে রক্ষ-গৌরব-তপন
অচিরে মজিবে পাপে মন্দোদরী-পতি
রক্ষ-বংশ-ধ্বংস-ভরে রাম-নারায়ণ
অবতীর্ণ ধরাধামে,কে রােধে নিয়তি ?
নহে কে শুনেছে কবে শীলা জলে ভাসে,
জলধি-বন্ধন করে বনের বানরে,-
মারুতি-নীরধি-লঙ্ঘি প্রতিভা-প্রকাশে,
দেবেন্দ্র-বাঞ্ছিতলঙ্কা ভস্মাকার ধরে ?
যে সকল মহাবীর লঙ্কা-অলঙ্কার
অবহেলে জিনে ছিল শমন-বাসবে ।
রাঘব-সমরে কেহ না ফিরিল আর
একে একে সকলেই পরিণত শবে
বীর-প্রসবিনী লঙ্কা এবে যােধ-হীন
সর্বত্র ধর্মের জয় বিধির বিধান
শ
২
ইন্দুমতী-কাব্য
রাক্ষসের গর্ব-রবি ক্রমশঃ মলিন
ঘেরিল কলুষ-মেঘে না হেরি কল্যাণ।
ছাড়, ছাড় রণ-বেশ অবােধ কুমার,
কে আছে এভবে জিনে জানকী-জীবনে-
বিষ্ণু-দ্বেষী মহাপাপী হ’লে দুরাচার
কে তারিবে বল বাছা শমন-তাড়নে ?
কাৰ্য্য নাই এ ঐশ্বর্যে তােমা বক্ষেয়ে
শরণ লইব রাম-পদ-কোকনদে
নিস্পাপ হইবে দেহ পূজিলে শ্রীহরি
কি করিবে মােহময় পার্থিব সম্পদে ?
অশ্ৰ-পূৰ্ণ নেত্রে সতী চুম্বি সুত-মুখে
খুলিল সরমা সর্ব সমর-ভূষণ
অলঙ্ঘ্য জননী-বাক্যে ভাসি মনােদুঃখে
স্মরিলা মানসে বীর, পতিত-তারণ।
ভক্তিভাবে মাতৃপদ করিয়া ধারণ
কহিলা তরণী, “মাতঃ এভব সংসারে
জন্ম, মৃত্যু জন্ম-মাত্র বিধির লিখন
না হ’তে প্রমায়ু অন্ত কে বধিতে পারে ?
কর্মক্ষেত্র-ভবভূমি নাট্টের ভবন !
যে যার নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম সম্পাদন তরে
বারং বার পাম্ভর করয়ে গ্রহণ
কৰ্ম্মান্তে নিরতি মতে নব বেশ ধরে।
সপ্তম সর্গ।
=
কেবা কার পিতা, মাতা, দুহিতা, নন্দন।
কেবা কার শত্রু, মিত্র, ভ্রাতা, বন্ধু জায়া
পরমাত্মারূপে ব্ৰহ্ম সর্বঘটে রন,
জীবাত্মা উহার মাত্র ভ্রমাত্মক ছায়া।
পঞ্চভূত সৰ্বজীব-দেহ-উপাদান
একাত্মার অংশ যদি রহে সর্ব ঘটে
আকার-বিভাগে মােহে জন্মে ভেদ-জ্ঞান
মমত্বের ধ্বংস মাত্র একত্ব সংঘটে।
যদি মাের কৰ্ম্ম-লীলা নাহি হয় শেষ
হলেও রাঘব বিষ্ণু, ব্ৰহ্ম বিশ্ব-পতি
পরম পুরুষ তিনি,—জান সবিশেষ
আসিতে অন্তকাল বধে কি শকতি ?
যদি মম নিয়তির এ অন্ত-সময়
বিধি, বিষ্ণু, মহেশ্বর নারিবে রক্ষিতে
বৃথা-চিন্তা করি কেন বিষয় হৃদয় ?
মহাজ্ঞানবতী তুমি এ রক্ষ-পুরীতে।
অভিসিক্ত রণে আমি না গেলে সমরে
এ অকীৰ্ত্তি চিরকাল রবে ধরাধামে
হাসিবে রমণীবৃন্দ নিরখি তােমারে
কলঙ্ক অৰ্পিৰ কেন অকলঙ্ক নামে ?
সমুজ্জ্বল হবে লঙ্কা বীর-প্রসবিনী
এ হেন সুযশঃ কেন হারাব হেলায়
৪
ইন্দুমতী-কাব্য।
বীর-মাতা বলি খ্যাতি রবে গােরবিনী ;
সন্তোষে সমরাদেশ প্রদান আমায়
হেরিব নয়নে মাতঃ, রাজিব-লােচন
শ্যামল জলদ-তনু গােলক-ঈশ্বর
চিরারাধ্য পিতৃ পদ করিয়া বন্দন
পবিত্রিব মােহময় কলুষ-অন্তর
অচিরে পূরা’তে ভক্ত তরনী-বাসনা
মায়াদেবী প্রবেশিল সরমা-অন্তরে
ভুলিলা পার্থিব ভাব অশিব-ভাবনা
জাগিল বিবেক-জ্ঞান নিমিষ-ভিতরে।
ভক্তিভাবে পুত্র-অঙ্গে রাম-নাম-মালা-
লিখিলা সরমা সতী পবিত্র চন্দনে
“রণজয়ী হও বৎস” বলি আশীষিলা
নমিলা ভকত রক্ষ জননী-চরণে।
কক্ষান্তরে পিতৃদেব-পাদুকা যুগল
অর্চিত কুসুম, ধূপ, দীপ, সচন্দনে
বারত্ৰয় প্রমিলা লােটা’য়ে ভূতল
বিজ্ঞাপিলা পিতৃ-ভক্তি ত্রিলােকের প্রাণে
পুনঃ রণসাজে রক্ষ স্যন্দন উপর
বসিয়া সদর্পে করে ভীম হুহুঙ্কার
কপিল ত্রিদিবে যত অমর নিকর
গজ্জিল ভৈরবারাবে জলধি অপার।
অষ্টম-সর্গ।
স্বর্ণ-লঙ্কা-প্রান্ত-গলে রথ-শ্রেণী-হার
দোলায় চৌদিকে যত রাঘব-বাহিনী
বিরঞ্জিত সন্দনের ধ্বজ-পতাকার
কম্পন-তরঙ্গে খেলে রণ-তরঙ্গিণী
অশ্ব, করী, রথীকুল, তৃণের মতন
তরঙ্গ-আবর্তে-রঙ্গে ভাসিয়া বেড়ায়
শিবির-আকারে যেন কূৰ্ম্ম অগণন
সলিল-উন্নত-শিরে উকি দিয়ে চায়।
সীতা-শোকে সন্তাপিত বিষন্ন বদন
নিষঃ পশ্চিম-প্রান্তে রাঘবেন্দ্ৰবলী
সঙ্গে মিত্র বিভীষণ, অনুজ লক্ষণ
অঞ্জনা নন্দন আর জাম্বুবান শূলী।
ভল্লুক সৈনিক বৃন্দ শৈল-মালা প্রায়
বিবিধ আয়ুধ করে নিয়ত সজ্জিত
ভীম দৰ্পে, ভীম তেজে, বীরত্ব-প্রভায়
স্তম্ভিত, প্রদীপ্ত, করে গগন কম্পিত
পূৰ্ব দ্বারে মহাবীর নীল সেনাপতি
দক্ষিণে অঙ্গদ সঙ্গে বানর-বাহিনী
৮৬
ইন্দুমতী-কাব্য।
---*শ ।
উত্তরে কিস্কিন্দা-নাথ সুগ্রীব সুমতি।
পঙ্গপাল-দল প্রায় মর্কটের শ্রেণী।
নীলাম্বুর উৰ্ম্মি সম নিত্য-প্রবাহিত
স্রোতস্বিনী-স্রোত যথা অবিরামগতি
তেমতি রাঘৱ-সৈন্য নিত্য নিয়ােজিত
সাধিতে শ্রীরাম-কাৰ্য্য তােষিতে শ্রীপতি।
চারি দ্বারে চারি দল প্রচণ্ড বিক্রমে
হুহুঙ্কারে প্রকম্পিত করিছে গগন
কোটি কোটি রথে রথী, পদাতি আক্ৰমে
বহির্গত রক্ষ বীরে, কৃতান্ত যেমন ।
শােক-মেঘে-আভাহীন রাম-প্রভাকর
সঞ্চালিয়া রক্তস্রোত কামিনী-কারণ
রােল্লাস-বিরহিত সন্তপ্ত অন্তর
নিরন্তর ঝরে চারু কমল-নয়ন।
অকস্মাৎ লঙ্কা-মাঝে বিজয়-নিনাদ
সৈনিকের আস্ফালন কোদণ্ড-টঙ্কার
করীর বৃংহতী ঘাের, অশ্ব-হ্রেষা-ব্রাদ
বিশ্ব বিনাশিতে যেন রােষে বিশ্বাধার !
শ্রবণে, ভীষণ ধ্বনি কঁাপায় বিমান
জানকী-রঞ্জন কহে অঞ্জনা-নন্দনে
মকরাক্ষ-শােক-বহি না হ’তে নির্বাণ
কে সজ্জিত ঝম্প দিতে রণ-হুতাশনে ?
অষ্টম সর্গ।
৮৭
গুপ্তভাবে গুপ্তবেশে প’শে লঙ্কাপুরে
সবিস্তার সে বৃত্তান্ত করহ বর্ণন।
রাম-পদ ধরি শিরে পুলক অন্তরে
জয়-রাম-নাদি হনু হল অদর্শন।
সূক্ষতম করি সেই প্রকাণ্ড শরীর
ভীষণ সে তেজ-পুঞ্জ গােপনে লুকায়
জলদ-আবৃত যেন প্রদীপ্ত মিহির
ভস্ম-সমাবৃত শিব কিম্বা শােভা পায় ।
অতি দ্রুত উপনীত হেম-নিকেতনে
নিরখিলা অগণিত সৈন্য-দল-মাঝে
সুরক্তিম বাজি-যুক্ত
নীলিম স্যন্দনে
তারকা-বেষ্টিত যেন চন্দ্রমা বিরাজে
শঙ্খ-নাদে কাঁপে তার দিগন্ত বিমান
মস্তকে কিরীট দিব্য, করে তীক্ষ্ণ অসি
বিবিধ আয়ুধ রথে পর্বত প্রমাণ
তেজে দীপ্ত দিবাকর-কর-লুপ্ত-মসী।
সর্বাঙ্গে ভূষিত তার রাজ-আভরণ
সাজায় কটক ঠাট
ভুবন
অস্থির
হস্তী, অশ্ব, ধরণীর উজ্জ্বল রতন
মাতায় বীরেন্দ্ৰবৃন্দ কম্প পয়ােধির।
মুখে মাখা মৃগমদ সুগন্ধ কস্তুরী
নানাবর্ণ মণিহার গলে ঝলমলে
ইন্দুমতী-কাব্য।
নীরদের অঙ্কে কিবা স্থিরা সৌদামিনী
রত্ন-খণ্ড-সুমণ্ডিত রথ-ধ্বজদলে।
বৰ্ঘরে চলিল রথ মাণিকের চাকা
প্রভা প্রভাকর-প্রভা করিছে বিলয়
কেতনে শমুন-অন্ত রামনাম আঁকা
হুঙ্কারি ঘােষিলা বীর শ্রীরামের জয়।
ভুবন-বিজয়ী করে কাৰ্ম্মক ধারণ
সদর্পে রথীন্দ্র দিলে কোদণ্ড-টঙ্কার
“তরণী-বিজয়-নাদে” রক্ষরথিগণ
কাঁপাইলা সুরপুরী কম্প দেবতার !
এসুযােগে সিদ্ধ করি স্বীয় মনস্কাম
স্বঅঙ্গ বর্ধিত করি পর্বত-প্রমান
লক্ষ ত্যাগে পড়ে হনু বলি জয়রাম
প্রপাতে বসুধা সতী হল কম্পমান।
শিবিরে পশিয়া প্রেমে অঞ্জনা-নন্দন।
নমিলা জানকীকান্ত শ্রীরাম-শ্রীপদে,
প্রনমিয়া পূজ্যতম উৰ্মিলা-রঞ্জন,
বন্দিলেন নরপতি সুগ্রীব-অঙ্গদে।
বিভীষণে করি প্রীত, প্রীতি-সম্ভাষণে
তােষিলেন ক্ৰমে রঘু-সেনাপতি সবে
জাম্বুবানে করি তৃপ্ত প্রেম-আলিঙ্গনে
শ্রীরামের পদ-তলে বসিলা নীরবে।
অষ্টম সর্গ।
সস্নেহে হনুর করি মস্তক-আঘ্রাণ
কহিলা মৈথিলী-নাথ স্নেহ-মাখা স্বরে
কহ বৎস কোন বীর কাঁপা’য়ে বিমান
হুঙ্কারি পশিছে রণে ঘাের আড়ম্বরে।
ভক্তিভরে-যুক্ত করে বন্দিয়া-চরণ
মারুতী কহিলা প্রভাে শুন সীতা-পতি
অঙ্গে রঙ্গে খেলে কত শশাঙ্ক-কিরণ
কভু নাহি হেরি হেন রাক্ষস-মূরতি !
পূর্ণ-সুধাকর-সম প্রফুল্ল বদন
বীরত্ব-প্রতিভা যেন ফুটিয়া পড়িছে
কমলজ-সুকোমল-দল দুনয়ন
বিভু-প্রেম-রসে যেন মগন রয়েছে।
নৃপেন্দ্র-লাঞ্ছিত অঙ্গে বিচিত্র বসন
ললাটে তিলক, অঙ্গে লেখা রাম-নাম
অগণ্য সায়কে পূর্ণ সুদিব্য সৃন্দন
রসনা-উচ্চারেশঘােরে জয়-জয় রাম ।
“জয়ব্রহ্ম-সনাতন” অঙ্কিত নিশানে
সঙ্গে রঙ্গে সাজে কোটি অশ, রথ, হাতী
পিপীলিকা-শ্রেণীরথী কঁাপায় বিমানে
শমন-কিঙ্কর-সম অসংখ্য পদাতি।
সবিশেষ পরিচয় আমি নাহি জানি
তরণী উহার নাম শুনিনু শ্রবণে
১০
ইন্দুমতী-কাব্য
রক্ষে-আত্মজ হেন বেশে অনুমানি
অঙ্কে করি সদা রাখি এ বাসনা মনে।
ছুটিল শ্রীরাম-মনে স্নেহ-প্রস্রবন
হইল রােমাঞ্চ তনু,-অবশ শরীর
কাঁদিল কোমল প্রাণ, ঝরিল নয়ন
বিভীষণে ক্ষুন্নমনে কহে রঘুবীর।
কহ মৈত্র কোথা বাড়ী, কাহার নন্দন
কি সম্পর্ক তার হয় লঙ্কা-অধিশ্বর,
কেমন প্রকৃতি তার, বীরত্বে কেমন ?
বিবরিয়া পরিচয় কহ মৈত্রবর।
উত্তরিল বিভীষণ শুন রঘুপতি
বিষ্ণুভক্ত, মহাবীর, রাবণ-পালিত
রক্ষেন্দ্রের ভ্রাতুস্পুত্র নিকট্য সে জ্ঞাতি
যার রণে সুরাসুর সতত ত্রাসিত।
নানা শাস্ত্রে পারদর্শী, বিজ্ঞ, বিচক্ষণ
রক্ষেন্দ্রের প্রাণ-সম রক্ষ-ইন্দু মানে
রাজভক্ত, শান্ত চিত্ত, সুচারু দর্শন
করিবে সমর সবে অতি সাবধানে।
তরণী সদগুণ-বাৰ্তা করিয়া শ্রবণ
কহিলা শ্রীরাম তবে অনুজ লক্ষণে
হেন বিষ্ণু-ভক্তে স’পে শমন-সদন,
কি সুখে এ শূন্য প্রাণ রাখিব ভুবনে ?
p
অষ্টম সর্গ।
৯১
-' অ = «h. - * * * *
* * * r = +
ত্যজিব জীবন ভাল নীলাম্বুর জলে,
সপিব সীতায় ঘাের পাতকীর করে,
তবু ভক্ত-অঙ্গ দহি তীব্র শরানলে,
বিজয়-বাসনা মম নাহিকো অন্তরে।
হায়! আমি বৃথা করি জলধি-বন্ধন,
তুচ্ছ নারী তরে আসি এ ঘাের সংগ্রামে
কত যে অমূল্য রত্ন দিনু বিসর্জন,
কলঙ্ক অর্পিনু রঘু-অকলঙ্ক-নামে।
এত বলি কেঁদে রাম ফেলি ধুনুর্বাণ
উপবিষ্ট ত্যজি সব সমর-ভূষণ,
কহিলা শ্রীরামে তবে মন্ত্রী জাম্বুবান
দয়ার আধার প্রভাে ব্যাপ্ত ত্রিভুবন।
কিবুঝাব নিজে, জ্ঞানহীন পশুজাতি
তুমি ব্ৰহ্ম সব ঘটে বিরাজ চিন্ময়,
কায়া-ভেদে হেরি মাত্র বিভিন্ন মূরতি,
ভক্তাভক্ত-সৃষ্টা তুমি, তােমাতেই লয়।
ভক্তের নিয়তি যদি এ অন্ত-সময়
তােমার কি অপরাধ, উপলক্ষ তুমি
নিজে নিজ-মৃত্যু জাব টেনে অঙ্কে লয়,
নিয়ন্তা বা বিধানের তুমি অধিস্বামী।
এক দিন যে বিধান করেছ স্থাপন
লঙ্েিত না পারি নিজে ধর নরকায়
১২
ইন্দুমতী-কাব্য।
নৈলে এ ব্ৰহ্মাণ্ড যেই করেছে সৃজন
সে কি দীন বেশে নাথ বিপিনে বেড়ায়?
লভেছ জনম এবে ক্ষত্রিয়ের কুলে,
ক্ষত্রিয়ের ধৰ্ম্ম রক্ষা উচিত, তােমার
যুদ্ধ-নীতি রূণ-ক্ষেত্রে ভা’সালে অকূলে,
এ অকীৰ্ত্তি চিরকাল ঘােষিবে সংসার।
তােমার আশ্রিত যত রাঘব বাহিনী
রণাদেশ-প্রতীক্ষায় রয়েছে নীরবে
দিলে সমরাদেশ রক্ষ-অনিকিনী
নির্বিরােধে একে একে বিনাশিবে সবে !
তােমার সমক্ষে তব স্নেহাশ্রিত জন
থাকিতে বিপুল শক্তি হবে হত-প্রাণ
আর তুমি ক্ষত্র হয়ে করিবে দর্শন
এই কি বৈদেহী নাথ নীতির বিধান ?
অতএব বৃথা চিন্তা কর পরিহার
স্বকরে করহ প্রভে ঝাৰ্ম্মক ধারণ
হের ঐ রক্ষ-সৈন্য করি মার-মার
আসিছে কৃতান্ত-সম ভীষণ দর্শন
জাম্বুবান-হিতকর শুনিয়া বচন
পুলক-পূরিত-মনে প্রশংসিলা সবে
শ্রীরাম সমরাদেশ করিলা অর্পণ
মাতিল রাঘব-সৈন্য সমর-উৎসবে।
নবম সর্গ।
সমর-দুন্দুভি বাজে স্বর্ণ-লঙ্কাপুরে
কাপাঁইয়া নীর-নিধি সুনীল গগন
মৃদঙ্গ, দামামা, কারা, শঙ্খ, সিঙ্গাপুরে
কম্পিত প্রান্তর, গিরি, বন, উপবন
লক্ষ লক্ষ জয়-ঢক্কা, কাংশ, করতাল,
সানাই, সমর-ভেরী, জগঝম্প, ঢােল,
স্বনােন্মত্ত-ত্রাস-গতি শ্বাপদের পাল
আতঙ্কে মৃগেন্দ্র পায় মাতঙ্গের কোল।
ভিন্দিপাল, শেল, শূল, মুষল, মুদগর,
পরশু, পটিশ, গদা, অসি, খরশান
সজ্জিত রাক্ষসবৃন্দ,সংহারের চর
বিবিধ আয়ুধে যেন বীরত্ব-নিশান !
অশ্বারােহী গজচর স্যন্দন-বিহারী
নানাবর্ণ হয়, হস্তী সঙ্গে রঙ্গে চলে,
সিংহনাদে সুরবৃন্দ
কাঁপে থর-থরি,
ভীত-প্রাণ জলচর প্রবেশে অতলে।
৯৪ ইন্দুমতী-কাব্য। পঙ্গপাল-দল যথা আবরে মেদিনী পশিল সমরে যত ক র দুর্বার কোদম্ভ-টঙ্কারে বিশ্ব-লয়-অনুমানি গজ্জিল ভীষণ রবে জলধি অপার ! তারকা-বেষ্টিত যেন পূর্ণ শশধর স্যন্দনে সম্মুখ-গামী সৈন্য-মধ্যভাগে “রাম জয়” ভীমনাদে কাপাঁয়ে অম্বর- তরণী স্মরিলা রামে প্রেম-অনুরাগে ভীষণ নিনাদে তার রঘু-সৈন্যগণ প্রকম্পিত মনে কত পড়ে রসাতলে শ্মশানের রাম-ধ্বনি শ্রবণে যেমন অন্তিম-আতঙ্কে নর কম্পিত ভূতলে। কান্ত-শশধর-কান্তি চিত্ত-বিনােদন অন্তরে তরঙ্গ-লীলা প্রেম-পয়ােধির গাম্ভীৰ্য নগেন্দ্র-সম নেত্র-প্রলােভন চারুচিত্র-শালা যেন নিসর্গ-রাজ্ঞীর। হেরি রক্ষে সীতা-কান্ত বাৎসল্যে মগন কাঁদিল কোমল প্রাণ,রােমাঞ্চ শরীর নীহার-আসার-সিক্ত কমল-নয়ন বিভীষণে ক্ষুন্ন মনে কহে রঘুবীর। চৌদিকে নেহারি মিত্র নানা অলক্ষণ নিমগ্ন মানস মম ঘাের নিরাশায়, ।
নবম সর্গ।
অবিরত বাম নেত্রে স্পন্দন-পীড়ন
বিষাদের সিন্ধু যেন অন্তরে খেলায়।
সমীরণ স্বনে কর্ণে কি যেন হারাই,
অমঙ্গল-অট্টহাসি বিকট আননে
করে নৃত্য, কহে ভীমা কি যেন কি নাই,
বিহিত বিধান কর বাহিনী-রক্ষনে।
আশ্বাস-ভাষণে তােষি জানকী-রঞ্জনে
কহিলেন বিভীষণ রঘু-রথিগণ
রাঘবে বিষন্ন হেরি কেন ক্ষুন্ন মনে ?
দ্বিগুণ বিক্রমে রক্ষে কর আক্রমণ।
জ্বালাও সমর-বহ্নি দাবানল প্রায়,
কাপও বীরত্ব দাপে সিংহল গগন,
উড়াও যশের ধ্বজা বীর-প্রতিভায়,
দাড়াও সম্মুখ রণে কৃতান্ত যেমন।
প্রতিরথী সনে বীর পঞ্চাশ হাজার
ক্রমে আক্রমণে কর রক্ষ-বল ক্ষয়
আতঙ্কে কম্পিত-অঙ্গ কর বসুধার
ত্রিভুবন গণে যেন আগত প্রলয় ।
বিভীষণ সে ভীষণ উত্তেজক বাণী
শ্রবণে রাঘব-সৈন্য করে সিংহনাদ
রণমদে সমুন্মত্ত বাঘব-বাহিনী
দশরথি ক্ষুগ্ন-মতি গণে পৰমাদ,
ইন্দুমতী-কাব্য
নীলগিরি-সম-কান্তি বিচিত্র দর্শন
ধাইল বীরেন্দ্র নীল সসৈন্যে সবলে
বিটপি পর্বত করে সমর-প্রাঙ্গন
সমাকীর্ণ হল যেন অনন্ত অচলে।
মুহুর্মুহু অবিরাম পাদপ পীড়ন
বক্ষে বক্ষ মুণ্ডে মুণ্ড হানে পরস্পর
ঘন ঘন আস্ফালনে ধ্বনিত গগন
অচিরে ঘর্মাক্ত নীল অশক্ত কাতর।
শৈল-অঙ্গে গৈরিকের যথা নিস্বরণ
নাসারন্ধে রুধিরের বহে নিঝরিণী
বীর-চূড়ামণি নীল লােহিত বরণ
তরণী-পবনে উড়ে মর্কট-বাহিনী
বৃষস্কন্ধ কিস্কিন্ধার সুগ্রীব,নৃপতি
দীর্ঘ-গ্রীব উচ্চৈঃশ্রবা হয়-গ্রীব-সম
ভীম গদা করে হেরি নীলের দুর্গতি
আক্রমিল রক্ষ-সিংহেকৃতান্ত-উপম।
গম্ভীরে জীমূত যথা গরজে অম্বরে
গর্জিলা কবর-হরি প্রকোপে ভীষণ
গদার সম্পাতে ঘন স্বন ভয়ঙ্কর
তড়িদ্দাম-সম-দ্রুত অগ্নি উদগীরণ।
অবিশ্রান্ত ভীম দন্তে দন্ত-সংঘর্ষণ
পদ-নিপীড়িত মহী কম্পিতা অধীর
নবম সর্গ।
১৭
---
=
কুম্ভ-চক্রাকার-দ্রুত দেহ-আবৰ্ত্তন
সমুন্থিত ধূলি রােধে প্রভৰ দৃষ্টির।
তুহিনাদ্রি-শির-স্থিত মত্ত পঞ্চানন
প্রমত্ত বারণে যথা দলি হুহুঙ্কারে,
কর-কেশরী করি ঘাের নির্যাতন
সুগ্রীবের বক্ষোপরি সিংহনাদ ছাড়ে।
ভূপতিত নৃপতির দুর্গতি দর্শনে
ক্রোধারুণ নেত্রে বীর অঞ্জনা-নন্দন
জলদগম্ভীর-নাদে কঁপায়ে গগনে
প্রচণ্ড বিক্রমে রক্ষে করে আক্রমণ।
নিরখি সহাস্য মুখে কহে নিশাচর
মৃত্যু-তরে পিপীলিকা বিহরে অম্বরে
শঙ্খিনী-বিবরে পশে ভ্রান্ত কাকোদর
আয়ু-হীন-মৃগ স্পর্শে কেশরী-কেশরে!
উড়ুপে সাগর-ত্রাণ হয় কি সম্ভব ?
পঙ্গুর বাসনা কেন গিরি উল্লঙ্ঘনে ?
সাজে কি কোকিল-নীড়ে কাকের উৎসব
কেন যাবি মতি-ভ্রান্ত কৃতান্ত-সদনে ?
বিক্রপ-ব্যঞ্জক-ভাষে হাসিয়া মারুতি
কহিল রাক্ষস-জাতি বচনে পণ্ডিত
আড়ম্বরপূর্ণ বাণী রাক্ষস-প্রকৃতি
বক্তৃতায় উচ্চ ভাষা, কাৰ্যে বিপরীত ।
৭
ইন্দুমতী-কাব্য।
রাম-রণ-তরঙ্গিনী-অসিত-সলিলে
নিয়তি আবৰ্ত্ত-চক্রে ডােবে নিশাচর
কোন লাজে বল সিংহ-আবাসে অচলে
মাতঙ্গের মদগৰ্বৰ স্পৰ্দ্ধান্বিত স্বর?
কহে রক্ষ জ্বলি অপমান-হুতাশনে-
রামসঙ্গে বর্বরতা না খণ্ডে বর্বরে
মলয়ে চন্দন-সার ধরে দ্রুম গণে
বংশ যথা বংশ-দোষ কভু নাহি ছাড়ে!
এত বলি মহাবলী রক্ষ-ধনুর্ধর
লত্যাগে শত্ৰু-ব্যহ-অন্তরে পশিল
হৰ্যক্ষ আক্রমে যথা প্রমত্ত কুঞ্জর
আঞ্জনেয় রণ-রঙ্গে সরােষে মাতিল।
মহীরুহ বিঘুর্ণনে ভীম প্রভঞ্জন
বহিল প্রবল বেগে উড়িল বাহিনী
ধ্বনিল গগনে ধ্বনি সুন্, স্ব, স্ব
প্রপাতে বহিল বেগে রক্ত-তরঙ্গিনী।
ঘুর্ণা-বাতে চূর্ণ-কায় যেমতি ভবন
পড়িল মর্কট-সিংহ রাক্ষস-বিক্রমে
প্রমত্ত বারণ যথা দলে তৃণ-বন
দলিত বানর-বৃন্দ, অনন্ত-বিরামে
সমুজ্জ্বল অগ্নি-অঙ্কে যে দ্রব্য অর্পিত
বিপরীত কৃষ্ণ-কায় সুষমা বিহীন
নবম সর্গ।
রক্ষ-ণ-অগ্নি-বক্ষে হয়ে নিপতিত
অঙ্গদ, সুসেন, নল নিষ্প্রভ মলিন।
স্বতেজে তিমির-পাশ ছেদিয়ে যেমন
প্রভাতে উদিত দেব দীপ্ত দিবাকর
দলিয়া বিপক্ষ-পক্ষ অরি-নিসূদন
তরণী সম্মুখগামী কবর-ভাস্কর।
কৃতান্ত-উপম রিপু হেরি বিদ্যমান
লক্ষণ হানিলা গদা রক্ষ-বক্ষোপরে
তরণী “শ্রীরাম-জয়ে” কাপাঁয়ে বিমান
কহে দ্রুত ক্রোধান্বিত কম্পিত-অধরে
ধন্য ক্ষত্ৰ-কুল-গ্লানি ঊর্মিলা-রঞ্জন
আমি নহি সূর্পনখা নিরশ্রয়া নারী
বীরত্ব দেখাবি করে অবলা-পীড়ন
ইক্ষাকু-কুলের ধ্বজা আহা বলিহারি ।
এরক্ষ-সমরে যম যম-সম গণে
ইন্দ্র ধায় মহাসে বৈজয়ন্তী হতে
কি সাহসে এলি রক্ষ-সমর-প্রাঙ্গণ
তারা-প্রায় ঊর্মিলারে দেবরে অর্পিত ?
উত্তরিলা বীর-দাপে সৌমিত্রী-সুমতি
যুবতী যে কুলাঙ্গন বিজন কান্তারে-
মােহিতা কুসুম-শরে হেরি পর-পতি
“নাক কাটা” যােগ্য খ্যাতি তাহার সংসারে।
ইন্দুমতী-কাব্য
উৎকলে
মর্কট-কুলের
ভ্রাতৃকরে নিজ রাজ্য শত্রু-করে জায়া
গুরুতর কর্তব্য উদ্ধার-সাধন
কিস্কিন্ধ্যার চিত্রে দেখ রাজনীতি ছায়া
লঘুতর পাপ বলি, বালী-নিসূদন।
দেবর পতি শাস্ত্রের বিধান
উহা আছে চিররীতি
পরম পণ্ডিত রাম করুণা-নিদান
রাক্ষসে বুঝিবে কিসে রাম-রাজনীতি ?
মানীর মৰ্যদা-বােধ মানীর সদন
ইতরে কি জানে কভু
মহিমা উহার,
চন্দ্রচূড় করে শিরে চন্দ্রমা-ভূষণ
সে চন্দ্রে কবলে গ্রাসে রাহু দুর্নিবার ।
জলদ গম্ভীর-নাদে কহে রক্ষ-বীর
নীতি-শাস্ত্ৰ ধৰ্ম্ম-মৰ্ম্ম উচ্চ আলােচনে
তাের সঙ্গে নিরর্থক, কলঙ্কী অধীর
কে বলে ধৰ্ম্মের নীতি-তস্কর-সদনে ?
ভুবন-বিদিত যার যশঃ-সমুজ্জ্বল
অকলঙ্ক রক্ষবংশ সম্মুখ-সংগ্রামে
ঔদ্ধত্যের উপযুক্ত দিব প্রতিফল
বর্বরতা দোষ যেন দমে পরিণামে ।
এত বলি মহাবলী কবর প্রবল
হানিলে সৌমিত্রী-বক্ষে মুষল ভীষণ
নবম সর্গ।
ইন্দ্ৰ-বজে পড়ে যথা মৈনাক-অচল
সশব্দে পড়িলা ভূমে সুমিত্রা-নন্দন।
অন্তরীক্ষে দেব-বৃন্দ করে পলায়ন,
ভয়ে ভীত দিনপতি জলদে লুকায়,
হাহাকারে কঁদিলেন রাম-বিভীষণ
ভ্রাতা-অঙ্কে কম অঙ্গ ধরণী-লােটায়!
হতজ্ঞান জামান আদি মহারথী
ছিন্ন-মূল-দ্রুম-সম পতিত ভূতলে
গত-প্রাণ মত্ত হস্তী বিরথ সারথি
সমরে প্রবল রক্ত-প্ৰবাহিণী চলে।
বিলুপ্ত খদ্যোত যথা তপন কিরণে
ক্রমে যত রঘু-রথী হল অদর্শন
সতেজে সমরচলে আরক্ত নয়নে
উদিল রক্তিম-আভ কর তপন।
ধ্বজ-বজ্রাঙ্কুশ চিহু-অম্বিত শ্যামল
বিমল মাধুরী রাম-দেহ-লতিকায়
অমিয় অন্তর-দ্যুতি বদনে উজ্জ্বল
পূর্ণ-শশধর-কান্তি চরণে বেড়ায়।
হেরি রক্ষ প্রেম-পূৰ্ণ-সজল নয়নে
বন্দিলা বিরিঞ্চি-বন্দ্য নিত্য-নির্বিকার
বিভীষণে পূজে মনে ভকতি-চন্দনে
আতঙ্কে কম্পিত-তাঙ্গ স্বর্গে দেবতার।
ইন্দুমতী-কাব্য।
অন্তরীক্ষে আখগুল চিন্তায়-বিহ্বল
ভক্তিভরে যুক্ত করে ভাবে মহামায়া।
তরণী-নিধন আশা হইল নিস্ফল
স্বগুণে বিপদে মাতঃ দেহ পদ-ছায়া।
নিয়তি-রূপিণী কালী মহামায়া-রূপে
পশিল তরণী-হৃদে হেরি অন্তকাল
ডুবিল বিবেক-জ্ঞান মত্ততার কূপে
ধরিল ভীষণ মূৰ্ত্তি কালান্তের কাল ।
রুদ্র-বলে ভীম শূল করি উত্তোলন
ত্রিশূলীর প্রায় ধায় মহাক্রোধে জ্বলে
অন্তিমে ভীষণ-কায় কৃতান্ত যেমন
কপিল সভয়ে বিশ্ব, বাসুকি পাতালে
রক্ষরথ হ’তে বিষ্ণু হল অন্তর্প্যান
গর্জিল অররু-বৃন্দ ভীষণ আক্রোশে
মাতিল রাঘব-রথী কঁাপা’য়ে বিমান
লাগিল শ্রবণে তালি কোদণ্ড-নির্ঘোষে
মৃগেন্দ্ৰ আক্ৰমে যথা প্রমত্ত কুঞ্জরে
কোপান্ধ রাক্ষস গর্জে মহাভয়ঙ্কর
ভীষণ ত্রিশূলাঘাতে রাঘব কাতরে
পড়ে যথা বজ্রাহত মন্দার-শিখর।
বহিল কোমল-অঙ্গে রক্ত-নিঝরিণী
বহু ক্ষণে সচেতন জানকীরঞ্জন
নবম সর্গ।
কোদম্ভ-টঙ্কারে কঁপে রাক্ষস-বাহিনী
রণে মত্ত যমােপম বালী-নিসূদন।
দশ-দিশি অন্ধকার জলদ-গর্জন
সঘন অশনি-নাদে কম্পিত মেদিনী
তাড়িত ত্বরিতে ধাঁধে,—শক্ত দর্শন
ভীম প্রভঞ্জন-স্বনে আকুল সেনানী।
প্রাবৃটের বারিধারা বর্ষণে যেমন
মুহু মুহু অগণিত সায়ক-পতনে
শােণিতাক্ত ত্যক্ত-প্রাণ রাম-রথিগণ
লক্ষ লক্ষ চলে দ্রুত শমন ভবনে।
চৌদিকে রাঘব-সৈন্য শােণিত-ধারায়
বহিছে তরঙ্গময়ী রক্ত-তরঙ্গিনী
সন্তিরছে হস্তী, অশ্ব,-তরঙ্গের ঘায়
ক্ষণে ভাসে ক্ষণে ডুবে রাঘব-বাহিনী।
শকুনি, গৃধিনীকুল পুলকে পৃর্ণিত
পাখ-শাটে তাড়াইছে সম-লােভী জীবে
শিবার বিকট নাদে গগন ধ্বনিত
দশনে টানিছে রথী সজীব নিৰ্জ্জীবে ।
অচিরে সমর-ক্ষেত্র প্রেত-ক্ষেত্রে প্রায়
সমাগত ভূতগণ হাহা-হিহি-রবে
রঙ্গে ভঙ্গে নৃত্যশীল কবন্ধ বেড়ায়
প্রেতের প্রভব ঘাের বিভৎস-উৎসবে।
১০৪
ইন্দুমতী-কাব্য।
আগত প্রলয় জানি কঁপিল মেদিনী
গর্জিল অনন্ত সিন্ধু মহা ভীমাকার
চিন্তিত ত্রিদশ-নাথ স্মরিলা শিবানী
এ বিপদে মহামায়া কর সমুদ্ধার।
কহে মায়া শচীকান্ত রহ সুস্থমন
অতি দ্রুত তরণীর এল অন্তকাল
বিষ্ণু হতে ভক্ত বড় অজেয় ভুবনে
প্রদর্শিতে দামােদর ক্ষেপে মায়াজাল ।
নবীন শ্যামল কান্তি রাম-জলধর
তরণী-সায়ক-নব-তপন-কিরণে
ধরিল অরুণ-আভা বিচিত্র সুন্দর
শৈলেন্দ্র রক্তিম যথা গৈরিক-ক্ষরণে।
সঘনে কম্পিত অঙ্গ কহে বিভীষণে-
অতি অলক্ষণ মিত্র এ রক্ষ-সমরে
বিহিত বিধান কর রক্ষ-নিবারণে
রথীহীন নহে হব এ অরাতি-করে।
প্রবল কৰ্ত্তব্য-রূপি-ভীম-প্রভঞ্জন
স্নেহের নীরদে যেন বেগে উড়াইল,-
রক্ষ-হৃদাকাশে জ্বলি দামিনী যেমন
তাড়িতে-ত্বরিত-জ্ঞান-নয়ন ধাঁধিল ।
কম্পিত অধরে রামে কহে রক্ষ-বীর
ব্ৰহ্মবরে রক্ষ-সিংহ মহাবলবান
:
নবম সর্গ। . ত্রিভুবন এর রণে কম্পিত অস্থির “ব্রহ্ম-বাণে তবকরে তরণী-নির্বাণ “ব্রহ্মবাণ” উচ্চারণে রক্ষের অন্তর পদ্ম-পত্ৰ-নীর প্রায় সঘনে কপিল অচল-হৃদয়ে দ্রুত স্নেহ-নীরধর- বর্ষণে নয়ন-কোণে অশ্রু সঞ্চারিল,- কাদিল পরাণ স্মরি নন্দন-বদন ইন্দুমতী সুতজায়া স্মৃতি-দরপণে নিরখি, অলক্ষ্যে বীর আবরে আনন দমিলা হৃদয়াবেগ অশেষ যতনে। মিত্রে সচঞ্চল হেরি ত্রাসে রঘুপতি- কহিলা তুমিহে বন্ধু এবিপত্তিকালে তােমার দয়ায় যদি পাই অব্যাহতি নতুবা ডুবিবে রাম রণ-সিন্ধুজলে । এতবলি মহাশূর কোদণ্ড-টঙ্কারি ব্ৰহ্মবাণ চাপে যবে চাপিল সুমতি গর্জিল ভীষণ অস্ত্র অনল উগরি বাণ-অগ্রে সূক্ষরূপে রাজে মৃত্যু-পতি স্বীয় মৃত্যু-বাণ হেরি তরণীর মন কপিল সভয়ে বীর ছাড়িল নিশ্বাস স্মরিলা অন্তিম জানি সরমা-চরণ ইন্দুমতী মুখ-ইন্দু ভাবিয়া হতাশ।
ইন্দুমতী-কাব্য। কহিলা তরণী খেদে ক্ষত্র চূড়ামণি হেন বীৰ্য বল নিয়ে রক্ষ-সনে রণ একশূলাঘাতে ভীরু পড়িলা ধরণী লক্ষ শূল বক্ষে মম তৃণের পীড়ন, চির-অনাতঙ্ক হৃদি-নগেন্দ্র-বিবরে এত দিনে শঙ্কা-ফণী কৌশলে পশিল প্রমত্ত বারণ-দন্ত বিধি-চক্রে পড়ে মৃনালিণী-আকর্ষণে অকালে ভাঙ্গিল। সপ্ত জন্ম তপস্যায় মিত্র বিভীষণ বিপদ-বারিধি-ভেলা বিধি মিলাইল মৃত্যু-সন্ধি-দীক্ষা-মন্ত্রে করে পরিত্রাণ, শিবার বীরত্ব-ধ্বজা সিংহলে উড়িল। অন্ধের নয়ন-মণি-সিন্ধু-নিসূদন অজাত্মজ পিতা করে অজত্ব-বিকাশ বালী-গুপ্তহত্যাকারী সুপুত্র তেমন অজ-কুল-কৃতিত্বের করিলে প্রকাশ। দ্বিতীয় ডঙ্কার ধ্বনি লঙ্কার সমরে,- সমুখিত ভীমরবে তরণী-নিধনে, যার যশঃ-রবি দীপ্ত অখিল সংসারে সেকিরে ডড়ায় ভীরু অনন্ত-শয়নে ? নিমিষে সে বাণ-বহুি কালানল সম। ছাইল, বিমান পথে ;-ঘাের ধূমাবৃত- নবম সর্গ । = বজ-সম তরণীর ভেদিল মরম সর্বাঙ্গে বহিল ঘাের শােণিতের স্রোত। তত্ত্ব-জ্ঞান জনমিল সুকৃতির ফলে হেরিলা অন্তিমে রামে বিষ্ণু-অবতার তরণী শমন-জয়ি-রাম-নাম বলে ছাড়িল অর-দেহ পার্থিব আকার। ভীষণ সে শােক-বহ্নি হয়ে প্রজ্জ্বলিত- গ্রাসিতে আগত যেন রক্ষ-বিভীষণে, চৌদিকে নেহারে ধূম-তমসা-আবৃত নিরাশা-ভ্রুকুটি রাজে করাল বদনে। হিমাধার সম যেই ধৈর্য-আলয় শােক-ভূকম্পনে আহা সঘনে কপিল শূন্য প্রাণে, শূন্য জ্ঞানে, আকুল হৃদয় “হা পুত্র” বলিয়া বক্ষ ভূতলে পড়িল। “হায় কি করিলে মিত্র মৃত্যু-সন্ধি বলি? প্রাণের তরণী মম হৃদয়ের ধন মিত্র-পুত্র, ভক্ত-বধি কলঙ্কের কালী নিৰ্ম্মল ইক্ষকুকুলে করিনু অর্পণ ? এর চেয়ে শত গুণে তরণীর করে ছিল শ্রেয় রণক্ষেত্রে অনন্ত-শয়ন কি ফল এ অনুতপ্ত ছাড় দেহ ধরে জয়াশা-মােহিনী-মােহে অকৃতি ভাজন”
১০৮
ইন্দুমতী-কাব্য।
এতবলি রামচন্দ্র ফেলি ধনুর্বাণ
ভীষণ শশাকের অঙ্কে পড়িলা ভূতলে,
বিগলিত অশ্রু-ধারা আকুলিত প্রাণ।
ভাসিল ঊর্মিলাকান্ত বিষাদের জলে।
পড়িল রাক্ষসদলে ঘাের হাহাকার।
শােক-সিন্ধু-নীরে- মগ্ন বাঘব-বাহিনী
গরজে সঘনে ঘন শােক-পারাবার
কাদিলা আকুল-প্রাণে লঙ্কা-বিষাদিনী।
নাদিল দুন্দুভিধ্বনি বৈজয়ন্তীপুরে
নাচিল দিগ্বধূ-বৃন্দ আমােদে অধীর
মাতিল উৎসব মদে অমর নিকরে
হেরি চির-রাহু-গ্রস্থ কর-মিহির।
রক্ষ-রাজ শির-স্থিত কিরীট সুন্দর
সহসা পড়িল খসি স্মরিলা শঙ্করে,
সরমার হাহাকার-পূর্ণ সৌধ’পর
অমঙ্গল সংঘােষছে শধুনি নিকরে ?
কনক-প্রতিমা যেন প্রসাদ-শিখরে
রণক্ষেত্র-গত-নেত্র অচঞ্চল স্থির
তড়িতি ইন্দুমতী আকুল অন্তরে
গণেছে তরঙ্গ যেন রণ-জলধির
বিন্দু বিন্দু অশ্রুবিন্দু শােভিল বদনে
নিশার কমলােপরি হিম-কণা-সম,
নবম সর্গ। ; ক্লান্ত সুধা-কর-কান্তি কল্পনা-নয়নে হেরি ভ্রান্ত, নিয়তির প্রকৃতি নির্মম। অকস্মাৎ সমুন্থিত অমঙ্গল ধ্বনি, সঙ্গে সঙ্গে যূথ-ভ্রষ্ট মাতঙ্গ যেমন- হাহাকারে ধায় যত রাক্ষবাহিনী লঙ্কাপুরী শােকাম্বরী করিলে ধারণ, সেধ্বনি অশনি-সম পশিয়া শ্রবণে তারিত-প্রবাহ প্রায় রােধিল ধমনী ইন্দুমতী ম্লান-দ্যুতী কম্পিত চরণে দাড়াইলা বাণ-বিদ্ধা-সুপ্তা কুরঙ্গিনী ; আলুথালু মুক্তকেশ যেন উন্মাদিনী বিষাদিনী হেরে ঘাের রক্তিম নয়নে- ভীষণ তমসাময়ী শােকের যামিনী- গ্রাসিছে যেন রে বিশ্ব করাল বদনে। অসীম অনন্ত সেই ঘাের অন্ধকার চৌদিকে ধ্বনিছে বায়ু,—নাই, নাই, নাই অমনি চমকি সর্ত করিয়া চীৎকার কহে দিয়ে করতালি নাচি ধাই-ধাই। ঐ আছে !—জ্যোতির্ময় দিবা বেশধারী দেবেন্দ্র দোলায় গলে মন্দারের হার উলু দেয় দিগঙ্গনা দাড়াইয়া সারি কি অপূর্ব ছবি আহা! হৃদি-দেবতার।
ইন্দুমতী-কাব্য
দিব্য শঙ্খনাদে তৃপ্ত যতেক অমর
ঐ যে স্তনে হাসি-লহরী খেলায়
প্রফুল্ল বদনে দীপ্ত পূর্ণ সুধাকর
ঐ যে নয়ন-কোণে কহিছে আমায়
“এস এস প্রমময়ি, হৃদয়ের রাণি
জীবন-সঙ্গিনী মম প্রফুল্ল বদনে
ত্যজিতে কি পারি তােমা দিবস-যামিনী
চির-অঙ্ক-লক্ষী তুমি জীবন-মরণে।
কি মধুর ! কি মধুর! সম্মােহিনী বাণী।
কেড়ে নিল অলক্ষিতে মনােবুদ্ধি-প্রাণ
রূপ রস, শব্দ, স্পর্ণ, গন্ধ-সঞ্চারিণী
সঞ্জিবনী-শক্তি যেন হয় তিরােধান।
ঐ যে ছুটিল রথ বিদ্যুৎ গমনে
ক্রমে ঊর্ধপানে, খ, ক্রমে খর্বকায়
মিশিল, মিশিল বুঝি, অনন্ত-গগনে
চিরতরে চারু ছবি দিব্য নীলিমায়,
দাঁড়াও দাড়াও নাথ নবীন নীরদ,
এই যে উড়িল তব দাসী চাতকিনী
বলিমাত্র বৃন্ত-চ্যুত ইন্দু-কোকনদ
বিশুষ্ক গড়ায় ভূমে সুবর্ণ-নলিনী।
-
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.