Bally Sadharan Granthagar
Diner Par Din Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দিনের পর দিন
*
শ্রীবিমল মিত্র
3rd graded author
কমলা পাবলিশিং হাউস
৮১-এ, হরি পাল লেন : কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
কার্তিক ১৩৫২
মূল্য : দুই টাকা
সত্যচরণ দাস কর্তৃক ৯/এ, হৰি পাল লেনস্থ আলেকজান্দ্রা প্রিন্টিং
ওয়ার্কস-এ মুদ্রিত ও ৮১, হরি পাল লেন হইতে প্রকাশিত
শ্রীবিশু মুখােপাধ্যায় সুবরেষু
দিনের পর দিন
বিগত বসন্ত
দেবাণীর সাধ
ক্রিয়াকাণ্ড
বিষ
শত্রু আসছে আবার
মরা পাখীর পালক
রঙ্গিলা নায়ের মাঝি
প্রেম নয়
দিনের পর দিন বাহান্নটি পরিবারের মধ্যে আমরা একটি। এত বড় বাড়ী; দু’মাইল দূর থেকে দেখা যায় বাড়ীটাকে। সারি সারি জানালা দরজার মিছিল- ধৰ্ম্মশালার কথা মনে করিয়ে দেয়। বাহান্নটি পরিবারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে বাড়ীওয়ালাকে নজর রাখতে হয়েছে। ইঞ্চি মেপে অঙ্ক করে ঘর- গুলাে তৈরী—অসুবিধে হবার কথা নয়। তবু যদি একটু আধটু কষ্ট হয় তো সে বাড়ীওয়ালার দোষ নয়—দোষ আমাদের উচ্চাকাঙ্কার। অফিস থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে পাড়ার খবর পাই। -তেরাে নম্বরের ফ্ল্যাটের ঘােষালবাবুর বউ নাকি দ্বিতীয়পক্ষের বুঝলে—আমি তাে অত জানি না। আজ দুপুরবেলা যে ওরা এসেছিল। শান্তিপুরের মেয়ে, কথা দেখেই ধরেছি—ভাজনঘাটে ওদের মসশ্বশুর থাকে। শাশুড়ী পাকা লােক ; বললে,-আমার প্রথম বউমা ছিল মাটির- মানুষ, সে শান্তিপুরের মেয়ে—এবারও ওই শান্তিপুরেই ছেলের বিয়ে দিলাম।-আমার বােনের শান্তিপুরে বিয়ে হয়েছে শুনে বউটি অনেক কথা বললে- সিড়ীতে উঠতে উঠতে একদিন হঠাৎ অপরিচিত লােকের মুখােমুখি এসে দাড়িয়ে পড়ি। আশুবাবু কোন্ ফ্ল্যাটে থাকেন—বলতে পারেন ? নতুন নতুন লােক—নতুন পরিস্থিতি। কাকেও চিনতে পারার সুযােগ পাওয়া যায় না। গরুর গাড়ী-বােঝাই লরী-বােঝাই জিনিষপত্র এসে না এক দরজায়—আর এক দরজায় মাল-বােঝাই মানুষ-বােঝাই হয়ে দিনের পর দিন । গাড়ী গেটের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায়। কতদিন মধ্যরাত্রে মানুষের চীৎকারে ঘুম ভেঙে গেছে। যে ঘরে সন্ধ্যেবেলা হারমােনিয়মে গলা মিলিয়ে মিহি গান শুনেছি-মধ্যরাত্রে সেই ঘরেই মৃত্যুর সংবাদ শুনে চমকে উঠতে হয় বৈকি। তিনতলার স্নেহ এসে বলে-খবর শুনেছ বৌদি বৌদি রান্নাঘরে রাঁধছিল। বললে,-কী খবর, শুনিনি তো -যােল নম্বরের সেই মেয়েটার বিয়ে হল না সেদিন—কাল রাত্তিরে তার বর এসেছিল—মদে একেবারে চুর হয়ে এসেছে--এবাও ঢুকতে দেবে -সে-ও ঢুকবে—কাল রাত্তিরে তাই অত হৈ চৈ হচ্ছিল-আজ টের পেলুম- আমাকে এসে বলে,—দাদা, আবার আপনি চেয়ারের ওপর ভিজে গামছা রেখেছেন—আমাদের বাড়ীতে আমি করলে বাবা আমারই পিঠে দুম্ দুম্ করে কিল বসিয়ে দিত—আচ্ছা দাদা- বললাম,-কী বল- -বায়স্কোপে যদি আমি প্লে করি আমাকে কি নেবে? আজকাল তো সবাই করছে—বেশ চারদিকে খুব নাম হবে—আমি তো গান জানিই— অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি রােদে এসে স্নানটা সেরে নিলাম। এক ফালি রােদ অনেক কসরৎ করে বারান্দায় এসে পড়েছে। মােড়ের ছােট পানের দোকানটা এখান থেকে দেখা যায়-দোকানের সামনে একটা টিয়াপাখী খাচায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। রাতে ওই পানওয়ালাটাই গান গায়। পাশেই এ-বাড়ীর দরােয়ানের ঘর। খড়ম পায়ে দিয়ে খট ঘট, করে হটেসশব্দে মন্তর পড়তে পড়তে স্নান করে—আর. মাসকাবার হলে বাড়ীভাড়ার টাকা চাইতে আসে ।
দিনের পর দিন নিত্যকার জীবন এখানে সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে সামনের বাড়ীটার আওতায় দৃষ্টিও প্রসার পায় না। বাধাগতি পা দুটে। অফিস থেকে বেরিয়ে ঘরের দিকে ছুটে আসে-ঘরে এসে বুঝি তারা সাময়িকভাবেও পঙ্গু হয়ে পঙ্গ, যায়। তবু এই আবহাওয়ায় অফিস যাওয়ার সময় দেখি-স্নেহলত। হাইহিল জুতো পরে মেয়ে-স্কুলের গাড়ীতে গিয়ে উঠলাে—পাউডার আর স্নাের গন্ধ নাকে এসে লাগে। স্ত্রী বলেন,-বড় পিসীমা পাঁচটা টাকা চাইতে এসেছিলো, দেবাে? সুরেনবাবুর স্ত্রী বয়সে অনেক বড়—এ-বাড়ীব পুরোনাে বাসিন্দা। সবাই বলে বড় পিসীমা। নিরুপমাও শিখেছে। লাঠি হাতে টুকটুকে রাঙা বালাপােষটি গায়ে দিয়ে সুরেনবাবু বিকেলবেলা বেড়াতে বেরােন। দেখা হলে নমস্কার করি। একেবারে পরমাত্মীয়ের মত দুই হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, নিরুপমা ভাল আছে—দেশের খবর ভাল- তারপর যেখানে যত কেউ আছে তাদের সকলের সুসংবাদ গ্রহণ করে তবে রেহাই দেন। কতবার দেখেছি বাজার থেকে দুটো আনারস-লিচু-কি আপেল —সুদৃশ্য মুখরােচক দু’একটি জিনিষ হাতে করে নিয়ে বাড়ী ফিরছেন। সুস্থ সুন্দর মানুষটি—কোথাও এতটুকু ফাক বা ফাকি নেই। হঠাৎ বড় পিসীমার টাকা চাওয়াতে মনটা বিস্বাদ হয়ে গেল। নিজের বিশ্বাসেরও ওপর আর শ্রদ্ধা নেই দেখছি- ট্রামে উঠে সেই কথাই ভাবছিলাম। ঘােষালবাবুর ছেলেমেয়েরা টাকার অভাবে ইস্কুলে পড়তে পায় না—সারা দুপুর পাড়ায় চীৎকার করে খেলা করে—সেই ঘােষালবাবু দেখি ট্যাক্সি চড়ে সস্ত্রীক সিনেমায় যান নিয়ম করে। যাদের যাদের বাড়ীর ছেলেরা খালি পায়ে টো টো করে দিনের পর দিন বেড়ায়—সেই ঘােষালবাবুর দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রীর পায়ে স্ত্রীর পায়ে জুতাের বৈচিত্র্য। ভাবছিলাম—নিরুপমার বড় পিসীমাকে পাঁচ টাকা ধার দেওয়া যায় কি না। নিজের অবস্থা-বিপর্যয়ে অনেকবার ধার করেছি—অফিস থেকে। বন্ধুদের কাছেও যে করিনি তা নয়। কিন্তু ধার চাইতে যে সঙ্কোচ, যে লজ্জা, যে হীনতা বােধ করেছি—তা কখনও ভুলিনি। কিন্তু সে লজ্জা কি এদেরও হয়—সে সঙ্কোচ কি এদেরও বিব্রত করে ? হয়ত করে-হয়ত করে না ; ট্রাম থেকে নেমে পড়লাম। সেদিন আরেকটি অপরিচিত লােকের মুখােমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম- —আশুবাবু কোন্ ফ্ল্যাটে থাকেন—বলতে পারেন ? কৌতুহল হােল। বললাম,-কেন বলুন তাে- —শ’দুয়েক টাকা ধার করেছেন—যে ঠিকানা দিয়েছেন—সে ঠিকানাই এ-বাড়ীতে নেই-- ভাবলাম-তা হলে আশুবাবু বলে কোনও লােক নেই। বাহান্নটা পরিবার—যে-কোন একটির আড়ালে আত্মগােপন করা শক্ত নয়। অফিস থেকে আসছি, বাড়ীর সামনে ভীড় দেখে থমকে গেলাম। উত্তেজিত ভীড়। আস্ফালন আর চীৎকারে বিরাট বাড়ীটার চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠেছে। চিন্তিত হলাম। নিশ্চয় কোন গুরুতর পরিস্থিতি। ওপরতলার লােকগুলি নীচের দিকে চেয়ে, আর নীচের লােকগুলি ওপরের দিকে হাত তুলে বিবাদের সম্ভাবনা ঘনিয়ে তুলছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ—একান্তে পাশ কাটিয়ে চলে আসবাে ইচ্ছে ছিল। বাড়ী গিয়ে স্ত্রীর কাছেই খবরাখবর পাব। কেমন করে জানি না
দিনের পর দিন
মেয়েদের কাছে সব খবরই আসে। কিন্তু বাধা পেলাম ঘোষালবাবুর
কাছে-
—আপনাদের কী মশাই, থাকেন ওপরতলায়—নীচে থাকার কষ্টটা
বোঝেন না তো
শুনলাম ওপর থেকে কেউ কলার খোসা ফেলাতে নীচের বাসিন্দাদের
কোনও ছেলে তাইতে পিছলে একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড বাধিয়েছে।
তারপর অভিযােগ উঠেছে ওপরতলার সব কটি বাসিন্দার নামে—তারা
নাকি এতাবৎকাল নানা জিনিষ ওপর থেকে নীচে ফেলে থাকেন—দুর্ঘটনা
আগেও যে ঘটেনি এ কেবল দৈবের অনুগ্রহ।
ভাবি নীচের লােকদের চিরদিনই ওপরওয়ালার দুর্ব্যবহার সইতে
হয়েছে—সে কেবল নীচের লােকদের নীচে থাকবার দোষে।—এ এমন
নতুন কথা কী।
পরিচয় ঘনিষ্ঠতায় দাড়িয়ে যায়, তারপর একদিন কে কোথায় চলে
যায় খোজ রাখবার দায়িত্ব নেই—মন্দ কি
ক'দিন ধরে নীচেকার একটি ফ্ল্যাট খালি পড়ে ছিল। একদিন দেখি
গরুর গাড়ী-বােকই মালপত্র এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে। সস্তা ভাড়ার ফ্ল্যাট
ওটা। বাসিন্দা ওটাতে থাকে আবার থাকে না। খালি থাকবার
অগৌরবই ওকে বইতে হয় ।
নতুন লােকের আগমনে আবার গুঞ্জন শুরু হোল ।
তৃতীয় দিনেই পরিচয়। একেবারে আমাদেরই বাসায় ।
নিরুপমার কাছে যারা সেলাই শিখতে আসে বউটি এল তাদের
সঙ্গেই।
অবস্থা সকলেরই সমান। রান্নাঘর আর শােবার ঘরের আয়তন বাঁধ।
দিনের পর দিন -হিংসা করবার অভিযােগ করার পন্থা নেই। পন্থা আছে স্বামীদের অবস্থার আর ছেলেমেয়েদের সংখ্যার তারতম্যে। সেলাই হয় সামান্য—গল্পই বেশী । পনেরাে নম্বরের গিন্নী বলেন,দু'নম্বরের বউ-এর কিত্তি শুনেছ বৌমা —কিছু শুনিনি তো মাসীমা -শোননি তো শুনে কাজ নেই বাছা, ও শুনলেও পাপ—ওই বউ-এরই আবার সােহাগ কত—বাপের বাড়ী যাবার নাম করে কোথায় গিয়েছিল মা ভগবানই জানেন—কত্তা আবার ধরে নিয়ে এসেছে—সেদিন রাত্তির বেলা মটরের শব্দ হােল-রাত্তির বেলা দরজার পাশে কান পেতে শুনি কত্তা শুধু পায়ে ধরতে বাকি রাখলে—ছিছি-ভদ্রলােকের পাড়ায় আমাদের নাম ডােবাবে মা–ও না শােনাই ভাল-ছিছি— নিরুপমা শােনে—সকলেই শোনে। পাশের ঘর থেকে আমারও কানে আসে। -নতুন চুড়ি ক’গাছা হাতে দেখছিনে বোমা—বাঁধা রেখেছ বুঝি— ওই ছটুলালের কাছে আমারও তিন সেট গয়না বাঁধা আছে আজ দু’বছর -ওঁকে বলি তাই—টাকা যখন রয়েছে নানা ছাড়িয়ে—উনি বলেন, থাক না, ও-সব পুরােনাে প্যাটানের গয়না, কাজে সে আর লাগবে না -না বাঁধা রাখিনি—তুলে রেখেছি—কাজ করতে হয়—খারাপ হয়ে যাবে, কোথাও এলে-গেলে তখন ভাল করেছ বৌমা, আমার ছােট মেয়েকে তাই বলি—দেখে আয় তেম বৌদিকে—বাজা মানুষ বটে, কিন্তু সৌখিন কেমন—জিনিষপত্তর করলেই হয় না, রাখতে জানা চাই।
দিনের পর দিন আর একজন বলে,—তা সৌখিন যদি বল মাসীমা তো সে আমার পিস্তুতে বােন-পয়সা আছে হবে না কেন, শশাভাবাজারের রাজারা আছেন। ওদেরই বাড়ীর বউ—তা এতটুকু দেমাক নেই–গাড়ী নিয়ে আমার কাছেই তাে আসে প্রায়--ছােট ছেলেটাও হয়েছে মায়ের মতন সিল্কের পাঞ্জাবী পরেই রান্নাঘরে বসে পড়ে, বলে—পান্তভাত খাব—বড়- মানুষের ছেলে—তা মাসীমা কত বড়লােকের সঙ্গেই তাে মিশলুম-বড়- মানুষ হলেই মনও বড় হয়— -হা মা, তুমি কিছু কথা বলছ না- নতুন বউটি লজ্জায় আধমরা হয়ে যায়। -তােমার স্বামী কী করেন মা- —কত মাইনে পান ? --শ্বশুরবাড়ীতে কে কে আছে ? -তোমার বরের কি এই প্রথম বিয়ে ? বাহান্নটা পরিবারের আস্তানা—তার চারগুণ লােক এ-বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। বহুদিন থেকে দেখছি, বহু কথা কানে শুনেছি-এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হঠাৎ কোন জিনিষই বিস্মিত করে না। প্রত্যেকে আছি, দেয়ালের আড়ালে বিচ্ছিন্ন হয়ে—কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের বিচ্ছেদ হয় না। আমরা পরস্পরকে নিয়ে বাচি পরস্পরকে নিয়ে মরবার জন্যে। পনেরাে নম্বরের গিন্নী একদিন নিরিবিলিতে এলেন। -হা বৌমা, ব্যস্ত আছ নাকি-না, অবেলায় আর বসবাে না, কাজের কথাটা বলি—সাত তাড়াতাড়ি আবার কার কাছে যাবাে বোমা, ভাবলাম পাশেই যখন তুমি রয়েছ—তুমি ছাড়া মাসীমাকে আর কে-ই বা নিরুপমা বলে,-কী বলুন না- দিনের পর দিন বিপদ মা বিপদ-বড়মাষের বাড়ী নেমন্তন্ন খেতে যাওয়া ঝক্মারী -আমার সেই বড়বাজারে এক বােনঝি আছে বলেছিলুম—তারই মেয়ের বিয়ে—আমি তাে বলেছিলুম যা আমার আছে তাই পরেই যাবে, তা উনি শুনবেন না, বল্লেন দু’দিনের জন্যেও নয়, দশ দিনের জন্যেও নয়-এক ঘণ্টার জন্যে চেয়ে নিয়ে পরে যাবে—তাতে লজ্জা কি—তা মা লজ্জা করে নাবুড়ী মাগী হতে চললুম- —ত কি চাই বলুন না- তােমার সেই নতুন চুড়ীর সেটটা আর সেই ঢাকাই শাড়ী-লজ্জাও করে বলতে ২ -লজ্জা কিসের মাসীমা- -বয়েস হােল তাে-বুড়ী হতে চল্লাম—আমায় কি মানায়—ওঁর যে কী সখ এ-মানুষগুলিকে দেখলে দুঃখ হয় না, ঘৃণা হয় না, মমতা হয়। কলেজের জীবনের কথা মনে পড়ে। সে-মানুষগুলি আজ কোথায় ? সরস্বতী পূজোর চাঁদার খাতায় যারা এক একটা আস্ত নােট দিয়েছে— সিগ্রেট, বিলিয়েছে দু’হাতে-কলেজের দরােয়ানকে পূজোর বখশিস্ দিয়েছে দু’টাকা ! তারাই কি সংসারের চাপে পড়ে এমন হয়েছে। এদের দেখে তো চেনা যায় না। নিজের ভাগ্যও এমন কিছু ফেরাতে পারিনি ; মােটা মাইনেটা পাই—ছেলেমেয়ের ভীড় নেই—আর নিরুপমাও হিসেবী মেয়ে নইলে নিজেকে তো আমি এদের ভীড়ে হারিয়ে ফেলতাম। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়—প্রচুর প্রত্যাশা নিয়ে পরের দিনের সকালের দিকে চেয়ে থাকি, সেই একই পুনরাবৃত্তি, একই প্রাত্যহিকতায় বাঁধা জীবনের আবর্তন। মন বিস হয়ে ওঠে। - দিনের পর দিন ছটুলালের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে থমকে গেলুম। এমন তো হয় না। দবােয়ানের আত্মীয় ছটুলাল, অজি বহুদিন থেকে এখানে বন্ধকী কারবার করে আসছে। ঘোষালবাবুর সঙ্গে কি তার হাতাহাতি বাধকে নাকি! ঢুকলাম। ছটুলাল এগিয়ে এল। বললে,-দেখুন বাবু, এই ঘড়িটা চোদ্দ টাকায় আমার কাছে আছে আজ সতেরো মাস—সুদে-আসলে দাঁড়িয়েছে আজ একুশ টাকায়--উনি আঠার টাকা এনে বলছেন—ঘড়ি দাও- ঘড়িটা দেখলাম—বহুদিনের চেনা জিনিষ-মনটা চল্ চল্ করে উঠলো— ঘােষালবাবু থামিয়ে দিলেন—তুই থাম্ বেটা,-বেটা ছােটলােক, ভদ- লােকের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় জানে না-শুনুন, আপনি এসে গেছেন ভালােই হয়েছে—আপনাকেই বুঝিযে বলি- ঘড়ির ইতিহাস শােনবার আগ্রহ ছিল না। মনে হােল নিরুপমাকে খবরটা না শােনালেই নয় । বিস্ময়ের আর অবধি রইল না। সমস্ত মনটা নিজেরও অজ্ঞাতে রি রি করে উঠলো। এমনও হয়। নিরুপমাকে বললাম—সমস্ত কাহিনী —অথচ সেদিন সুরেশবাবু চাকরটাকে মেবে তাড়ালেন—চাকর চুরি করছে বলে—আর এদিকে চোরাই মাল বেচাকেনা বাঁধা রাখা পর্যন্ত ১লছে-না নিরুপমা, এদের প্রশ্রয় দিলে আর চলবে না,টাকা ধার চাইলেও দিতে পাবে না, কাউকে না, তােমার বড় পিসীমাকেও নয়- মাসীমাকেও নয়- -কিন্তু আজই যে সকালে দু’টো টাকা ধার দিয়েছি
দিনের পর দিন
কাকে ?—বিস্ময়ের আর সীমা রইল না।
-নীচে যে নতুন ভাড়াটে এসেছে ওদের, নতুন বউটিকে।
কিছু বলবার ছিল না।
নিরুপমা বললে, তুমি কিছু মনে কোর না, সকাল বেলা কাঁদতে
কাঁদতে এসে যে-রকম করে বললে—তুমি হলে, তুমিও না দিয়ে পারতে না।
কানের গয়না খুলে দিতে এল—
শুনলাম আগে নাকি ওরা খােলার ঘরে ছিল। সেখানে রোজই অসুখ
লেগে থাকতো, এবার যুদ্ধের জন্যে পাঁচ টাকা মাইনে বেড়েছে বলে ওরা
এখানে এসেছে। ছেলেটির বয়েস কম, অল্প মাইনের চাকরী করে, দেখে
মনে হয়—সাধ আছে, সাধ্য নেই। ছেলেটি সকালবেলা বেরিয়ে যায়, আসে
অধিক রাত্রে।
নিরুপমা ছোট মেয়েটিকে কোলে করে এনেছে।
কে বল তো?
বললাম,-তুমি না বলে দিলে কী করে জানবো?
—নতুন বৌটির মেয়ে, দুধ খেতে পায় না তাে, কী চেহারা হয়েছে
দেখেছ? আমাকে মা’র মত দেখতে কি না, মনে করেছে মা’ব মতন
দেখতে হলে সবাইকে মা বলতে হয়—আমি তােব কে রে খুকী ?
দুঃখের সংসারে জন্মেছে খুকী—তবু মেকী আদর আর খাটি আদর
চিনতে পারে। আমি একটু আদর কবতেই কেঁদে উঠলো।
নিরুপমা বলে,—ওরা না খেয়ে থাকুক এই বুঝি তুমি চাও-ঘরে গিয়ে
একদিন যদি দেখাে-এক একদিন এক কণা চাল পর্যন্ত থাকে না, এমনি
অভাব ওদের।
অভাব নেই এমন সংসার দেখিনি। যুদ্ধের জন্য পাঁচ টাকা
দিনের পর দিন মাইনে যাদের বাড়ে তারা সে পাঁচ টাকা খরচ করে কেন? দোষ দেক কা’কে। ওপরতলা থেকে স্নেহলতার গলা শুনতে পাই। হারমােনিয়ম বাজিয়ে তার সঙ্গে গান গায় আজকাল। কতকগুলি ছেলে দেখেছি তার সঙ্গে আসে। গানের মাষ্টার বিনা পারিশ্রমিকে গান শেখায়। গান শিখছে- হয়ত নাচও শিখছে। শিখুক—তা শেখাই রীতি। কিন্তু পারিশ্রমিক নেয় কেন! এত উদারতা আমার কাছে যেন মূল্যহীন মনে হয়। এত অপব্যয় আমার ভাল লাগে না। স্নেহলতা আর গাড়ীতে ইস্কুলে যায় না। কাদের একটা মটর আসে-- বেনী দুলিয়ে পাউডার গোব গন্ধ ছড়িয়ে স্নেহলতা যায়--বােধ হয় ইস্কুলে-বােধ হয় ইস্কুলে নয় ! সেদিন দেখা হতেই সুরেনবাবু জড়িয়ে ধরলেন দুই হাতে। —চলুন আপনার বাসাতেই যাচ্ছিলুম-নিরুপমা ভাল আছে—দেশের খবর ভাল সকলের সংবাদ নেওয়া হলে জানালেন-বাবার বাৎসরিক শ্রাদ্ধ আপনাকে আসতে হবে—তারপর ভেতরে ঢুকে নিরুপমাকে লক্ষ্য করে বললেন,-তুমিও এসে মা, নইলে তােমাদের বড় পিসীমা রাগ করবেন। সেই সুন্দর সুস্থ আকৃতি—দেখেই মনে হয়—কোথাও একটুকু ফাক বা ফাকি নেই। রাঙা টুকটুকে বালাপােষটি গায়ে জড়ানাে। সৌন্দর্য্য আর স্বাস্থ্যের প্রতিমূর্তি। বাইরে থেকে দেখলে বড় আনন্দ হয়। —কোথায় গাে বৌ ?••••••এই যে, কাজ আছে আবার, তাড়াতাড়ি বলে নি।—কী ঝঞ্চাটেই যে পড়েছি বৌ, কি বলবাে, তােমার আগেকার পাঁচ টাকা আসছে মাসে বাের কথা আছে তাে। আর আজ হােল দিনের পর দিন গিয়ে এ মাসের তেইশে, আর পাঁচটা টাকা দাও তাে বৌ, আসছে মাসে একেবারে দশ টাকা একসঙ্গেই দিয়ে দেব- যাবার সময় আমার কাছে কৃত্রিম শাসনের ভঙ্গীতে বলে গেলেন- আজ পাচটা টাকা আবার নিয়ে গেলুম—তুমি যেন বৌকে কিছু বােল না বাপু, হা- কদিন ধরে লক্ষ্য করছি নিরুপমা কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। রাত্রে শুয়ে হঠাৎ বলে,-খুকী কঁদছে না? শুনতে পাচ্ছ?—যাই নিয়ে আসি— বিছানা ছেড়ে উঠতে যায়। ধরে রাখি—তারপর ঘুম ভেঙে যায়। নিরুপমার সে স্বাস্থ্য আর নেই। যদি বলি—তােমার কী হােল বলে। তাে-নিৰুপমা বলে,কিছু ভাল লাগে না আজকাল। সত্যি নিরুপমার ভাল লাগবার কী-ই বা আছে। সেই দিনের পর দিন কদর্যতা আর গ্লানি, মিথ্যা আর লজ্জা ! সমস্ত আবহাওয়ার সঙ্গে মনও যেন ধূমাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। পঙ্কিল হয়েছে পৃথিবী, জীবন, আকাঙ্ক্ষা। নিরুপম বললে,-তােমাকে এতদিন বলিনি-নতুন বউটির স্বামী আজ বহুদিন হােল আর আসছে না ; প্রথমে বলেছিল চাকরীর কাজে বাইরে গেছে—কিন্তু কতদিন হয়ে গেল, কই আসছে না তাে? চিঠিও লেখে না, টাকা-কড়িও পাঠায় না, কী করে ওদের চলে বল তাে ? ছেলেটা দুধের অভাবে খেতে পাচ্ছে না, আজই সকালবেলা এক বেলার মত চাল দিয়ে এসেছি—তুমি কিন্তু বকতে পাবে না, খুকীটার মুখ দেখলে আমি আর থাকতে পারিনে•• মনে হোল—কী প্রয়োজন এই অভাবের কাহিনী শােনবার। অভাব ‘আছে, দুঃখ আছে, দারিদ্র দুর্ভিক্ষ সবই পৃথিবীতে আছে। আমার তাতে ১২ দিনের পর দিন কী প্রয়োজন। আমি স্বার্থপর হতে চাই। তাই আমার ভালাে। এই দুঃখ-দারিদ্রের পরিবেশ ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যাবে যেখানে কোনও আর্তনাদ কানে আসবে না। সেদিন ভােরবেলা অন্ধকার থাকতে থাকতে পুলিশ এসে হাজির। নতুন ভাড়াটেদের বাড়ীর দরজা এসে ঘেরাও করলে। নিরুপমার চোখ দুটো ছন্ছন্ করে উঠলো। —ওরা কিছু করেনি—মিছি মিছি ওদির নামে কেউ নালিশ করে এসেছে—ওগাে তুমি একটু পুলিশ গিয়ে বুঝিয়ে বল না, ওরা কিছু করেনি নি—ওদের ঘরে যে পুরুষ মানুষ কেউ নেই—খুকীকেও ধরে নিয়ে যাবে নাকি- নিরুপমার সে কি অশ্রু-আচ্ছন্ন মুখ ! মনে হােল ছাড়া পেলে বুঝি এখনি ও ওদের কাছে ছুটে যাবে। চারিদিকে তখন তােক জমে গেছে । নিরুপমাকে গিিেবছানায় শুইয়ে দিলাম। নিরুপমা বালিশে মুখ গুজে কাদতে লাগলো। নীচে গেলাম। যা শুনলাম তাতে হতবাক হওয়া ছাড়া গতি কি? যেখানে চাকুরী করুত সেখানকার ক্যাশের টাকা ভেঙে পালিয়েছে। ভেতরে ঢুকে ঢুকে পুলিশ সব দেখলে। বউটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কঁদছিল- খুকীটা তার বিছানায় শুয়ে আঙুল চুষছে—চোখ দুটো বুজিয়ে চলে এলাম। কি আমার করবার ছিল। নিরুপমাকে এসে ভেবেছিলাম মিথ্যে বলবাে, কিন্তু খবর তাে পাবে সবই। -হ্যাগো, ওদের কি হবে? খুকীটা কি করছে দেখলে ? রাত্রে নিরুপমার আর এল। ১৬ দিনের পর দিন বড় ভাবনায় পড়লাম। জ্বরের ঝেকে চেঁচিয়ে ওঠে-ওই খুকী কঁদছে—শুনতে পাচ্ছে—যাই আমি—নিয়ে আসি- তারপর দিন অব একটু কমলো। মনে হােল, না এমন করে আর চলবে না। এমনি আবহাওয়ায় বাস করা আর যার কাছেই সম্ভব হােক, আমার কাছে অসম্ভব হয়ে উঠেছে। রাত্রে নিরুপমাকে বললাম—চল, এখান থেকে আমরা চলে যাই 'নি-- —কোথায় যাবে, অনেক দূরে ? বললাম—হ্যা অনেক দূরে—এখান থেকে অনেক দূরে —আমি খুকীকে ছেড়ে থাকবে কি করে? সত্যি সত্যি কিন্তু সেবার যাওয়া হােল না। যাওয়া বললেই কি যাওয়া হয় না কি? এমন করে আমরা জড়িয়ে পড়েছি। আমাদের নেশা লেগেছে। নিরুপমার দিকে চাওয়া যায় না। এমন করে তার স্বাস্থ্য খারাপ হােল কেন, কোনও প্রত্যক্ষ অসুখও তাে নেই তার। আরও বিস্মযজনক খবর পেলাম তারপরে। স্নেহলতার গানের শব্দ অনেকদিন শুনতে পাইনি। মনে হােত হয়ত পরীক্ষার জন্যে পড়াশােনায় ব্যস্ত। কিন্তু এমন হবে আশঙ্কা করিনি। খবরটা দিলেন ঘােষালবাবু- এ-পাড়ায় আর ভদ্রলােকের বাস করা চললাে না মশাই—তখনই জানতুম-অত গাে-পাউডার মেখে কেউ ইস্কুলে যায়—ছিঃ ছিঃ- আমারও খারাপ লেগেছিল—বিনা-পারিশ্রমিকে গান শেখানাে উদারতা আমার ভাল লাগেনি। সত্যি সমস্ত পরিবেশ যেন কলঙ্কিত হয়ে গিয়েছে। নিলজ্জতা, মিথ্যা আর ভণ্ডামির মুখােমুখি দাঁড়িয়ে আমরা জীবন ধারণ করছি—তবু বিদ্রোহ তো করছি না। ওই ঘােষালবাবু = দিনের পর দিন দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রীর পরে হয়ত আবার তৃতীয়পক্ষ গ্রহণ করবেন, রাঙা টুকটুকে বালােপােষ জড়িয়ে স্বাস্থ্যবান সুরেনবাবু স্ত্রীকে দিয়ে হয়ত আৰু কারাে বাড়ী টাকা ধার করতে পাঠাবেন—স্নেহলতার বােন বােধ হয় তেমনি করে স্নো পাউডার মেখে অন্য কোনও ছেলের কাছে বিনা- পারিশ্রমিকে গান শিখবে, ছটুলালের কাছে হয়ত কত ঘড়ি, কত গয়না বাঁধা পড়বে—এ সব আমরা নীরবে মুখ বুজেই সহ করছি-সহ করবােও —আমাদের শান্তির এতটুকু ব্যাঘাত এরা ঘটাতে পারবে না; এর। আমাদের গা-সহা হয়ে গিয়েছে—আমাদের নেশা ধরেছে। কিন্তু এমন আবহাওয়াও একদিন বাধ্য হয়েই ছাড়তে হােল। পাড়ায় বসন্ত শুরু হয়েছিল। একদিন বাহান্নটি পরিবারের এই বাড়ীতে এসে দেখা দিল। গৃহস্থ লােক হঠাৎ যাওয়া-আসা নড়াচড়া ভালবাসে না। তবু বসন্ত যখন দেখা দিয়েছে—এ-বাড়ীর দু’একটি লােকও বিদায় নিল। মুস্কিল হােল বাড়ীওয়ালার। তিনি হুকুম দিলেন -পাঁচ টাকা করে সকলের ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হবে। যারা চলে যাবার ব্যবস্থা করেছিল তার রযে গেল, যারা চলে গিয়েছিল তারা ফিরে এল। বসন্ত আসবে চলেও যাবে! ওকে ভয় করলে চলে ? আপাতত পাঁচ টাকা ভাড়া কমলো এটা কি কম কথা নাকি। যারা একদিন এই দোষ দেখত তার উল্টো সুর ধরলে। দু’তিনজনের মৃত্যুর খবরও এল- যারা রইলেন তারা পূর্ণ উদ্যমে টিকে নিলেন। এই দুর্ভিক্ষের বাজারে যদি খাওয়া পরা মিলেছে মারী-ভয়ও হাসি মুখে এড়ানাে যাবে। পাঁচ বছরের পুরােনো বাসা কেবল আমি একলাই ছেড়ে এলাম। দশজন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম—এবার একলাই বাঁচবাে। সম্পূর্ণ একখানা বাড়ী ভাড়া করেছি।
বিগত বসন্ত অফিস থেকে বেরিয়ে শশিকান্তর মনে হােল-মুক্তি। এতদিন পরে আজ তার মুক্তি এসেছে। অফিসের বড় গেটটা হাঁ করে রয়েছে। ওইখানে আর সকলের মত শশিকান্ত তার জীবনের সমস্ত কিছু আহুতি দিয়েছে—তার যৌবন, স্বাস্থ্য, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য-সমস্ত ! আর আজ ? আজ থেকে তার মুক্তি। শশিকান্ত একটা মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললে। মােড়ের মাথায় এসে শশিকান্ত শেষবারের মতাে অফিসটার দিকে পেছন ফিরে চেয়ে দেখলাে। রংটা লাল—ওই লাল বাড়ীর ঘরে ঘরে কালাে কালাে লােকগুলি সারাদিন কী খাটুনিটাই না খাটে! ওই অফিসের চেয়ারে বসে কাজ করতে করতেই কত লােককে পাগল হয়ে যেতে দেখেছে শশিকান্ত--সত্যিকারের পাগল। ফাইলের ওপর একটা পাখীর ছবি এঁকে রেখেছে—এ-ও ঘটেছে। কিন্তু শশিকান্ত এই পুরাে বিয়াল্লিশ বছর একভাবে একটানা কাজ করে এসেছে—নির্ভুল নিখুত। অফিসের লােকেরা বলত-বড়বাবু মানুষ নয়—মেসিন। মােড়ের পানের দোকানটার কাছে এসে দাঁড়াতেই পানওয়ালা নিত্যকার নিয়ম মত দু’খিলি পান এগিয়ে দিলে—একটু চুন দিলে—একটু দোক্তা দিলে—বিয়াল্লিশ বছর ধরে দিয়ে আসছে, ভুল হবার কথা নয়। শশিকান্ত জিগ্যেস করলে-আমার হিসেবটা হিসেব মেটানাের জন্যে পানওয়ালা ব্যস্ত নয়। বিয়াল্লিশ ধরে। বুকে পান দিয়ে আসছে—সকাল সন্ধ্যায়। হিসেব পড়ে থাকে আৰীয় সােথও হয়। বললে-থাকা বাবু—এক সময়ে দেখে রাখবে- কিমের পর দিন থাকবে না-শশিকান্ত শুধু প্রতিবাদ করলে !—দরকার কী! জীবনে কারো কাছে দেনা নেই। দেনা করা অভ্যেস তার নয়। দেনা করতে ভয় করে। অফিস থেকে মাইনে এনে নিজের খরচ চালিয়েছে—নিজের প্রয়ােজন মিটিয়েছে, দরকার হলে দেনা দিয়েছে, কিন্তু দেনা কখনও করেনি। ব্যাগ থেকে এগার আনা পয়সা মিটিয়ে দিয়ে শশিকান্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললে। এখান থেকেও অফিসটা দেখা যায়। সন্ধ্যে হচ্ছে। অফিসের লােকজন সব চলে গেছে পাঁচটায় ! সকলের সঙ্গে শেষ বিদায় নিয়ে কয়েকটা কাজ সারতেই শশিকান্তের দেরী হােল । তা’ দেরী একে বলে না! রাত্রে শুধু বাড়ীতে শােবার জন্যেই যেন আশা! রাত আটটা বেজেছেন’টা বেজেছে—দশটা বেজেছে—কাজের মধ্যে কতদিন শশিকান্ত ঘডি দেখতেও ভুলে যেত। অফিসের দরােয়ান এসে তবে তাকে সচেতন করে তুলেছে—তখন ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখেছে রাত দশটা। যা—এতদিনে মুক্তি। চলতে চলতে মনে হােল-রাস্তার ফুটপাথের এই পাথরগুলাে পর্যন্ত তার চেনা। রাস্তার কোন মােড়ে—কোন পাথরটা ভাঙ্গা—আজ আট বছর ধরে ভাঙ্গা ত’ শশিকান্ত জানে। এ-দোকানগুলাে তখন এখানে ছিল না—এখানে ছিল বস্তি—তার পাশেই পােড় জমি—ওইখানে গরমের দিনে কতদিন ওই পাথরটাতে বসে শশিকান্ত জিরিয়ে নিয়েছে। র একদিনের কথা মনে আছে। বর্ষাকাল। তিন দিন ধরে বৃষ্টির আর বিরাম নেই। অফিসে আসতে হয় কাপড় গুটিয়ে—এঙ্গে দিনের পর জামা খুলে শুকোতে দিতে হয়—আবার বাড়ী যাবার সময় সেই জামা ভেজানো। সেই ভিজে জামা নিয়ে সাহেবের কাছে ফাইল নিয়ে যাওয়া শশিকান্তর লজ্জা করতাে। কিন্তু অফিসের কাজ তাে বন্ধ থাকবে না তা বলে। অফিসের রাস্তায় জল জমে গেছে—অফিসে যখন শশিকান্ত পৌছল তখন এগারােটা—তারই মধ্যে সাহেব পাঁচ বার চাপরাশী পাঠিয়েছে। সাহেবের কী! গাড়ীতে তাে আসে। শেষকালে যা হবার তা হােল- অফিসে লােক এসেছিল কম—ছুটির পর যে যখন পেরেছে চলে গেছে। শশিকান্ত নিজের কাজে ডুবেছিল—যখন চোখ তুলে তাকালে—দেখলে লােকজন সব চলে গেছে! ফাইলও জমেছিল খুব, ভাবলে বৃষ্টিটা একটু কমলেই যাওয়া যাবে। কিন্তু রাত ন'টার সময় এমন বৃষ্টি এলাে যা কলকাতা শহরে কুড়ি বছরে হয়নি। তারপর সেই রাত্রে—মনে আছে—দরােয়ানের রুটি খেয়ে সারা রাত অফিসে কাটানো ! রাত দুপুরে মনে হয়েছিল—যেন কারা দুম দুম্ করে চলে বেড়াচ্ছে। ফাইলের পর ফাইল। ফাইলের পাহাড়। অদৃশ্য অশরীরীর পদক্ষেপে শশিকান্ত সারারাত আতঙ্কে অৰ্দ্ধমুচ্ছিত হয়ে পড়েছিল।—সে-রাতের কথা এক দবােয়ান ছাড়া আর কেউ জানে না। এমন কাজের নেশা কোথা থেকে পেয়েছিল শশিকান্তকে জানে। কিন্তু উন্নতি ওই বড়বাবু পৰ্যন্ত। কাজই করেছে শশিকান্ত—কাজের লােক হােতে পারেনি। সাতদিন আগে শশিকান্তর ফেয়ারওয়েল হয়ে গিয়েছে। ছােট খাটো একটি সভা, দু’চারজনের বক্তৃতা—ফুলের মালা পরা তারপর বড় সাহেবের সেই হাসিমুখে করমর্দন। g দিনের পর দিন সাহেব বললেন-তোমার শেষ জীবনে শান্তি কামনা করি শশি- এতদিন যেমনভাবে কাজ করেছ—অন্য কেরাণীদের কাছে তােমার চরিত্র একটা উদাহরণস্থল হয়ে থাকবে—শুনেছি শশি সারাজীবন তুমি অবিবাহিতই রয়েছ—রেল কোম্পানী তােমার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে—তার কৃতজ্ঞতার চিহ্ন-স্বরূপ কোম্পানীর তরফ থেকে একটা ফ্রী কার্ড পাশ দেওয়া গেল—যতদিন জীবিত থাকবে ততদিনের জয়ে। শশিকান্তর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্যথায় টন্ টন্ করে উঠল। বড় হঠাৎ! বড় হঠাৎ তার নিজেকে অসহায় দুর্বল মনে হােল! শশিকান্ত দুর অনেকদূর পর্যন্ত চেয়ে দেখলে। এই দোকান-পাট, এই ট্রাম-বাস রাস্তা পেরিয়ে আরো দূরে যেন সীমাহীন শূন্যতা! কোনও অবলম্বন নেই তার! কী নিয়ে তার দিন কাটবে! সেই শহরতলীর ছােট বাড়ীটা কথা মনে পড়লাে। সেই অল্পপরিসর বাড়ীতে আজ রাতটা হয় কাটলো—না হয় কাটলে দু’টো মাস দু’টো বছর-তারপর? সকাল বেলা—যখন লােকেরা বাড়ী থেকে অফিসে ছুটবে—তখন শশিকান্ত ঘবেব ভেতরে কী নিয়ে থাকবে! এতদিন অনলস আগ্রহে যার সেবা করে এসেছে আজ সে তাকে প্রত্যাখ্যান করল! শশিকান্তর মনে হােল- এ প্রত্যাখ্যান নয় তো কী । তার আর কোনও প্রয়ােজন নেই। কোম্পানীর কাছে সে আজ অনাবশ্যক। শশিকান্তর নিজেকে বড় নির্বোধ মনে হলাে। সমস্ত জীবন দিয়ে শুধু কোম্পানীকে সেবাই করেছে- প্রতিদানও চায়নি! যা প্রতিদান পেয়েছে তা সামান্যই ! কিন্তু তবু তারই জন্যে একটি মুহূর্ত সে বিলাসে বিশ্রামে উপভােগ করেনি। একটি পয়সা কোম্পানীর লােকসান হলে নিজের লােকসান মনে করেছে। সে যেন এক নেশা ; নেশার মধ্যে দিয়ে দিনগুলাে কেটে গেছে।
দিনের পর দিন আর আজ তার মুক্তি—শশিকান্তব মনে হােল—এমন মুক্তি কি সে চেয়েছিল! বড় হটার মধ্যে তার চেয়ার ঠিক সেই জায়গাতেই আছে-কালও থাকবে—কিন্তু কাল থেকে তাতে বসবে ভূপতিবাবু। ভূপতি লােক ভাল। আজ বলছিল—আপনি আজকেব দিনটাতে আর কাজ করবেন না বড়বাবু, একদিনের জন্যেও বিশ্রাম নিন্ একটু ভূপতি সত্যিই লােক ভাল। সেবাব শশিকান্তের অসুখেব সময় নিজেই কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ এনে খাইয়েছিল। কোনও দিন সেবা, মেহ, ভালবাসার প্রযােজন হযনি শশি কান্তেব-পাযও নি। সে সময়, সে অবসর শশিকান্তর ছিল না। কোম্পানী তাব পাওনাগণ্ডা সুদে-আসলে আদায় কবে নিযেছে। কবে একদিন আত্মীয়ের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করে বাড়ী থেকে শশিকান্ত পালিয়েছিল—সে কথা আজ মনে নেই—তারপর নাগপুব, বাপুব, বিলাসপুব সব শেষ করে হেড়, অফিসে কলকাতায় এসে হাজিব। যে ঘবকে অবজ্ঞা করেছিল—ঘর বাঁধা আর তার হােল না। কোম্পানী যখন তাকে বিদায় অভিনন্দন জানালে—তখনই শশিকাস্তেব মনে হােল—যেন বড় দেরী হয়ে গেছে। তাই শশিকান্ত সেই অল্পপরিসর ঘরখানার কথা মনে করতেই সংসারের অভাব বড় বেশী করে অনুভব করলে। চাপরাশীটার হাতে শশিকান্ত আসার সময় একটা টাকা দিয়ে এসেছে। চাপরাশীটা খুশি হয়েছে ! দুঃখও হয়ত একটু হয়েছে ! হওয়াই স্বাভাবিক। নিয়ম করে মাদ্রাজী টিফিম থেকে চা এনে দিত! বলতে হত । বিয়াল্লিশ বছর এমনি কেটে গেল। প্রতিটি দিন প্রখর নিয়মানুবর্তিত দিনের পর দিন ধাঁধা-প্রতিটি মুহূর্ত। প্রতি পদক্ষেপে শশিকান্ত এক-এক ধাপ এগিয়েছে -বিয়াল্লিশ বছর ধরে এগিয়েছে—শুধু শেষ হবার জন্যেই। রাত্রে কতদিন একক শয্যায় শশিকান্ত ‘দ্বিজপদ দ্বিজপদ বলে চেঁচিয়ে উঠেছে—দ্বিজপদ তার চাপরাশীর নাম। দ্বিপদ না হলে সাহেবকে ফাইল দিয়ে আসবে কে ? স্বপ্নে শশিকান্ত সাহেবকে ফাইল পাঠাতাে। শশিকান্তের মনে হােল—নিজের সন্তানের কথাও কেউ এত ভাবে না-- সন্তানের কথায়ও কেউ এত উদ্বিগ্ন হয় না । তখন সবে চোদ্দ বছরের ছেলে। সেই বয়সে বাড়ী থেকে পালিয়ে গেল সুদুর নাগপুরে! কাকার সঙ্গে ঝগড়া করে। একজনের কথা তার মনে পড়লাে সেই ট্রামবাস মুখরিত নগরীর জনারণ্যে—আগত প্রায় সন্ধ্যার অস্পষ্ট অন্ধকারে—কী জানি কেন—দূর থেকে অনেক দূরের বিস্মৃত প্রায় একটি মুখ—কচি অত্যন্ত কচি মুখ-কান্নায় ছল ছল-শশিকান্ত হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল কাকা বলেছিল—বিয়ে? বিয়ে করবি-তো খাওয়াবি কী? ডেপাে কোথাকার-এই বয়েসেই জাহান্নমে গিয়েছ—বেরিয়ে যাও বাড়ী থেকে- শশিকান্ত জাহান্নমে গেছে—সত্যিই সে জাহান্নমে গেছে। একটি মাত্র অবলম্বন ছিল—তাও গেল। শশিকান্তের মনে হােল—এ পথ যেন আর ফুরােবে না। যেন বাড়ীর পথে গিয়ে বৃত্তাকার একই পথে ঘুরছে। তার কোনও কাজ নেই আয়। আর সকলেরই কাজ আছে, আছে প্রয়ােজন, নেই শুধু তার। আ, কালই সে চলে যাবে। পাশ তাে আছেই। ট্রেনে উঠে বসবে।
দিনের পর দিন দুচোখ যতদুর যায়—ততদূর। কোম্পানী তাকে কৃপা কয়েছে—সে কৃপার মর্যাদা সে রাখবে। ট্রেনের সেই যাত্রা, দিন রাত্রি ধরে অবিরাম যাত্রা। কতদিন সে ট্রেনে চড়েনি। রেলের চাকরী তার—আশ্চৰ্য্য, সেই রেলে চড়েনি। হঠাৎ শশিকান্তর জ্ঞান হােল-তাইতাে। তার ড্রয়ারের চাবি সে তাে সঙ্গে করেই এনেছে ! কাল থেকে এ চাবি তত ভূপতির কাছে থাকবে। কাল এই চাবির অভাবে ভূপতির কাজ আটকে থাকবে যে ! শশিকান্ত ফিরিল। আবার সেই পথ! বিয়াল্লিশ বৎসরের পরিচিত—পথ— কাল থেকে তার সঙ্গে অফিসের সমস্ত সম্পর্ক শেষ ! বিচ্ছেদ। আজই চাবিটা ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে। দারােয়ানের হাতে সে দিয়ে আসবে—ভূপতিবাবু এলেই যেন পরদিন তাকে দিয়ে দেয়। বিয়াল্লিশ বছর কাজ করার পর—শেষ দিনে তার একি ভুল । সমস্ত অফিসটা অন্ধকার—কোন্ কোণে হয়ত একটা দুটো আলো জলছে। শশিকান্ত নিঃশষে ভেতরে ঢুকলো। দারােয়ানটা কোথায় কে জানে-হয়ত কাছেই কোথাও আছে। নিজের পরিচিত পরিবেষ্টনীতে এসে শশিকান্ত যেন তৃপ্তি অনুভব করলে। নিজের রাজত্ব তার। এখানে বিয়াল্লিশ বছর কেউ তাকে কিছু বলতে সাহস করেনি। শশিকান্ত নিজের চেয়ারটিতে এসে সেই ছােট টেবল ল্যাম্পটি আললে । তারপর চাবি দিয়ে তার আলমারী আর ড্রয়ার খুললাে। কাল তাকে ও সব ছেড়ে চলে যেতে হবে। কাল এই আলমারী এসেৰে অল্প একজন। শশিকান্তের মনে হােল-এ অন্যায়-এ অনধিকার প্রবেশ
দিনের পর দিন
চারিদিকে ফাইলের ভূপ—বড় চমৎকার দেখতে। এত আনন্দ
শশিকাও কোথাও গিয়ে পায় না। সেইখানে বসে শশিকান্ত একে একে
ড্রয়ার খুলে যতসব কাগজপত্র বার করতে লাগলাে। কতদিনকার কত
স্মৃতি-বিজড়িত—কত বিগততির বাহন—শশিকান্তর হঠাৎ বেঁচে
থাকতে ইচ্ছে হােল। মনে হােলপ্ৰকাণ্ড ভুল হয়ে গেছে। যদি সে
আবার নতুন করে জীবন আরম্ভ করতে পারতাে।
একটা ভাঙা খাবারের কৌটো, একটা টিচার আইওডিনের শিশি।
খানিকটা ছেড়া ন্যাড়াকত জিনিষই দিনে দিনে তূপীকৃত হয়েছে।
রাত এখন ক'টা? এমন সময়ে অন্যদিন শশিকান্ত নিজের মনেই
কাজ করে চলেছে!
ড্রয়ারের নীচে এককোণে একটা চিঠি—শশিকান্তই চিঠি! শশিকান্ত
চিঠিখানা আলােয় তুলে ধরলে। না—তারই তাে চিঠি। কোনও
সন্দেহ নেই। পঁয়ত্রিশ বছর আগে তার হাতে এসেছে। এতদিন
এ চিঠি খােলাই হয়নি। আশ্চৰ্য্য। অফিসের কাজে হয়ত ব্যস্ত ছিল
পরে পড়বে ভেবে ভেতরে রেখেছিল—তারপর সেই রাখাই আছে।
আশ্চৰ্য্য।
শশিকান্ত ক্ষিপ্রহস্তে খামখানা ছিড়ে ফেললে। চিঠিখানা অনেক
যায়গা ঘুরে তবে এসে পৌঁছেছিল তার হাতে—অনেক পােষ্ট অফিসের
দাগ !
চিঠির পাতায় চোখ বুলিয়ে শশিকান্ত যেন হতবাক হয়ে গেছে।
স্পন্দহীন দেহ কেন মুর্জিত হয়ে পড়বে।
চিঠি লিছে তিলােত্তমার বাবা!
শশিকান্ত এক নিঃশ্বসে পড়তে লাগলো
দিনের পর দিন বাবা শশিকান্ত- তােমার কাকা গত সংক্ৰান্তিৰ দিন দেহত্যাগ করেছেন। এখন তােমাদের পক্ষ থেকে তােমার সঙ্গে তিলােত্তমার বিবাহে কারাে আপত্তি উঠবেনা—আমার কোনও আপত্তি নেই-বরং সুখী হব—তুমি ছুটি নিয়ে এস-এই মাসের মধ্যেই বিবাহ যাতে হয় সেই ব্যবস্থাই কবছি--ইতি।” শশিকান্ত চিঠির তারিখ দেখলে, পুরােপুরি পঁয়ত্রিশ বছর আগের চিঠি। শশিকান্ত সেই চেয়ারের ওপর বসে একদৃষ্টে দেখতে লাগলাে চিঠিখানা। হঠাৎ তার চীৎকার করতে ইচ্ছে হােল। যেন সে পাগল হয়ে যাবে। সে প্রবঞ্চিত হয়েছে। প্রবঞ্চিত হয়েছে সে। সবাই যেন ষড়যন্ত্র করেছে তার সঙ্গে। পৃথিবীর আর পাঁচজন যে সুখভােগ করছে-তা থেকেও সে বঞ্চিত। এ ষড়যন্ত্র নয় তো কী। বিয়াল্লিশ বছর ধরে ষড়যন্ত্র চলছিল--আজ ধরা পড়ল যেন। আজ-যখন তার কোনও অবলম্বন নেই-নেই আশ্রয়—নেই স্নেহনীড়-নেই অভিযােগ করবার মানুষ। তারপর সেই অফিসের নির্জন ঘরের অভ্যন্তরে অনন্ত সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়লাে—দূর দূরান্তের শকুন এসে আকাশ কলঙ্কিত করে- আর বন্দর থেকে বাতাসে ভেসে আসা জাহাজের বাশীর শব্দে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়! এ পৃথিবী ছাডিয়ে স্বপ্নলােকের অলিনে দাড়িয়ে কে যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকতে থাকে। শশিকান্তের মনে হােল—গেল। সব গেল। জীবন তাে এমন ছিল না। এ কোন্ অনাস্বাদিতপূর্ব অকল্পিত পরিবেষ্টনী। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দিকচক্রবালের অন্তরাল ছড়িয়ে কে সৃন কোন আশ্চৰ্য্য প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিল—আর তার আলাে নেই, উত্তাপ নেই শুধু ধুমায়িত কলঙ্ক। আকাশ বাতাস সব বুঝি কলঙ্কিত হয়ে যায়।
দিনের পর দিন আর সেই মুহূর্তে রাত্রির অন্তর মথিত করে এক অপরূপ শব্দ উঠলো। সেই ক্ষীণ শব্দ ক্রমে ভয়ঙ্কর হােল—তারপর সেই শব্দের কল্লোলে জন্ম নিল অসংখ্য তরঙ্গ। মৃত্যুর আর জীবনের, আশার আর হতাশার, মিলনের আর বিচ্ছেদের অসংখ্য তরঙ্গ। সেই তরঙ্গের আঘাতে আঘাতে জীবন- মৃত্যু সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আর শশিকারে মনে হতে লাগলাে গেল, সব গেল- পরদিন প্রথমে দেখলে ঝাড়ুদার-ঘর ঝাট দিতে এসে। তারপর একে একে সবাই এল-কেরাণী, ভূপতিবার, দ্বিপদ সবাই শশিকান্তের উপস্থিতিতে সবাই যেন নির্বাক হয়ে গেছে। সবাই দেখলে শশিকান্ত চেয়ারের ওপর বসে-শশিকান্তর টেবলের ওপর ফাইলের স্তুপ আর শশিকান্ত নিরুদ্বেগ, নিশ্চঞ্চল—এক মনে কাজ করে চলেছে ; সেই নিস্পন্দ মূর্তির দিকে চেয়ে সহসা কেউ কথা বলতে সাহস করলে না—সকলেরই মনে হােল শশিকান্ত আজ অপ্রকৃতিস্থ—নিশ্চয় সে উন্মাদ হয়ে গেছে।
দেবরাণীর সাধ এখন এগারােটা বাজলাে। দেবরাণীর সমস্ত রান্না হয়ে গেছে ? লেই কোন্ সকালে উঠে রান্না ঘরে ঢুকতে হয়েছে; কী-ই বা রান্না। খেতে তাে মাত্র তিনটি লােক; তবু এটা ওটা কোরতে কোরতে দেব- আশায় অনেক বেলা হােয়ে যায়। এখন এগারােটা বাজলল—এ -এখনই ভাতটা চাপিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু দেবরাণীর মনে হয়-ওটা কোরলে হাত-ওবেলার জন্যে ডিমগুলো সেদ্ধ কোরে রাখলে ভাল হােত- করা মেখে বিকেল বেলার জন্যে খাবার কোরে রাখলে হােত কি উনি টোম্যাটোর চাটুনি ভালবাসেন—সেটাও কোলে হােত—অথবা মালােপাড়ার ভুষণ একটু আগেই একগাদা গদা চিংড়ী দিয়ে গেছে নগুলাে না- ভাজলে হয়ত খারাপ হয়ে যাবে- এছাড়া দেবাণীর আর কী চিন্তা থাকতে পারে? সেই ভাের বেলা উঠে স্বামীর জলখাবার কোরে দিয়ে তাড়াতাড়ি কুয়ােতলায় চান কোয়ে নিয়েছে—চান কোরতে এখন আর দেবরাণীর সেই আগের মত দেরী হয় ; কোলকাতায় থাকতে বাের্ডিং-এর সেই বাথরুমের কথা এখনও দেবাণীর মনে আছে,-টাবের ভেতর সমস্ত দেহ শিথিল করে এলিয়ে দিয়ে আরাম করে শুয়ে থাকা—সেই জল-বিলাস—বাইরে থেকে মেয়ের দলের সে কী দনুজা ঠেলা! সমন্ত দেহের অবগাহন ‘হলে গাঁন কোরে আরাম কোথায়? আর যাই হােক—ঘুম না খেলেও চলতো খাওয়া সেও দ্বিতীয়ত-সবার আগে মান; তখন দেবরাণ মঞ্চে হােত আগের জন্মে সে নিশ্চয়ই কোন জলজন্তু ছিল-মেয়েরাও তাই দিনের পর দিন বােলতাে। কিন্তু এখন? এখন কুয়ােতলার চারপাশে ভাল কোরে ঘেরাও নেই—চাটাই-এর বেড়া পচে পচে খসে গেছে—তার মধ্যে সত্যি সত্যি দেবরাণীর আবরু রক্ষা হয় না, হবার কথাও নয়! বেশ নিশ্চিন্তে নিবিয়ে সেখানে স্নান করা অসম্ভব—সমস্ত দেহ মার্জনা কোরতে হেলে লজ্জাহীন হতে হয়—তা দেবরাণী পারে না। খনকয়েক পাতা ইটের ওপর সাবধানে পা রেখে অতি সত্বর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেহের সমস্ত স্থান কোনও রকমে ভিজিয়ে নিয়ে নামমাত্র স্নান সেরে নিতে হয়! ঘরে গিয়ে কাপড় ছেড়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে দেবরাণী মােটা চিরুণী দিয়ে চুল আঁচড়ায়; লম্বা কালো কুচকুচে চুল—চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে দেবরাণী নিজের মুখখানাকে ভাল কোরে দেখতে থাকে। ফরসা ‘একখানি মুখ—আগে গালের দিকে লাল আভা ছিল—এখন দেবরাণীর মনে হয় যেন হলদে রং ধরতে সুরু হােয়েছে, সেই মুখে ওপরে ঠিক সিথির গােড়ায় সিদুরের দাগ লাগিয়ে কপালে একটি ছােট ফোটা দিয়ে দেবরাণীর মনে পড়ে এতক্ষণে উনুন ধরে যাবার কথা। দিনের মধ্যে কত কাজ দেবরাণীর! উঃ কত তার কাজ। এই সামনে বর্ষা আসছে, চোত মাসের বন্দরে আচারের শিশি, বড়ির হাঁড়িগুলাে শুকুতে দিতে হয়—ওপরের ঘরে কলাই আর মুগ রয়েছে—সেগুলো ছাদের ওপর পা দিয়ে ছড়িয়ে দিতে হয়—দুপুর বেলা ভিজে চুল মেঝেরু ওপর এলিয়ে দিয়ে, গায়ের কাপড় শিথিল কোরে দিয়ে, হাতে একটা কিছু বই কি মাসিক পত্র দেখা—এখানে আসা অবধি এটা একটা দেবরণীয় অভ্যেসের মধ্যে দাড়িয়ে গেছে। কিন্তু তবু শান্তি নেই-সায়া যাড়ীয় কাজকর্ম গতদিয়ে খেটে দুপুর বেলা দেবরাণী যে একটু ঘুমুৰে—কি কাউকে একটা চিঠি লিখবে তা’ত হবার যো নেই। সবে মাত্র দেবাণী ; দিনের পর দিন হয়ত গা-টা একটু এলিয়ে দিয়েছে, এই বােশেখের আম-পাকা দুপুরে দেহ-মন, বেশ-বাস অবিন্যস্ত কোরে দিয়ে একটা হাত-পাখা নিয়ে দেব চিৎ হয়ে শুয়েছে—ঠিক সেই সময় হয়ত দেখা যাবে কাদের একটা গরু কোথা দিয়ে উঠোনে ঢুকে শাক-সবজির ছােট বাগানটুকু নিঃশেষ করতে উন্মুখ-ধানিলঙ্কার চারা গৰুব পায়েব চাপে মরে মরো ; কানাইবাশী কলাগাছের সরু একটু কচিপাতা একেবারে মুড়িয়ে খেয়েছে, কিম্বা দেবরাণীর নিজের হাতে পোঁতা গাঁদার চারা গুলাের কোনও চিহ্নই নেই। এসব দেখলে রাগ হওয়াই স্বাভাবিক—দুটো দুটো চাকব ঝি, সবাই নিজের নিজের কাজ সামলাচ্ছে ; অগত্যা দেবরাণীকেই উঠতে হয় ; ওই বােন্দরে —ভাবে একবার-উঠোনে এসে গরু-তাডাননা! তাড়িয়ে দিয়ে খিড- কির ঝাপটা বন্ধ করতে হয়। খাওয়া দাওয়ার পর এই ওঠা-নামা সত্যিই অসহ। বিশেষ করে দেবরাণী আজকাল একটু মােটা হয়েছে বেশ মােটা হয়েছে। অবশ্য গিন্নীবান্নী মানুষের মােটা না হােলে মানায়ও না; সেই স্থূল বক্ষদেশের নীচে স্থূলতর মেদপিণ্ডের মাংসল শুভ্রতা—আর কিছু দিন পরেই তা দৃষ্টিকটু ঠেকবে! সত্যি সত্যি আগে দেবরাণীর ফিগার কেমন সুসমঞ্জস ছিল। সেদিন সেই হাল্কা শরীর নিয়ে দেবরাণী তেতলা বাের্ডিং বাড়াটা কতবার ওঠা-নাবা কোরেছেটাবের ভেতর জলম অবস্থায় কী লােভনীয় ছিল তার কাছে তার এই নিজের দেহ। ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেবরাণী কতবার নিজেই নিজের প্রেমে পড়েছে। শরীরের ওপম সেদিন কী তার অনুরাগ—বিছানার পাশে ছােট টিপয়টা কত রকমে টয়লেটু শিশিতে ভরে গিয়েছে, একটু সর্দি হয়েছে, কি কোমরে একটু ব্যাথা হয়েছে, তখুনি ডাক্তার চাই! আর এখন? প্রায় দিন ও সেমিজ ব্লাউজ না পরেই কাটায়—যে গরম, আর কেই বা তাকে ২ ;
; দিনের পর দিন দেখছে। এখানে ট্রাম বাসও নেই—সিনেমা-টকিও নেই—আর রাস্তার বাসে চলতে চলতে সুসজ্জিত যুবকদের ভিড়ও নেই কিন্তু আর যাই হােক, এত নির্জনতা, এত নিঃসঙ্গতা দেবরাণীর অসহ্য মনে হয়। স্বামী মানুষটি নিজের ডাক্তারী নিয়েই আছেন, আশেপাশের দশ বারেখানা গ্রাম তারই ওষুধের ওপর নির্ভব কোরে বেঁচে আছে! লােকটি যে কেমন ধাব। দেবরাণী আজ পর্যন্ত তার ঠিকানা পায়নি—দেবরাণীর দিকে, দেবরাণীর দেহের দিকে চোখ রেখে কোনও দিন তিনি কথা বলেছেন কিনা সন্দেহ। তঁার সময় কোথায় ? ম্যালেরিয়া কলেরা বসন্ত একেব পর এক মহামারী এসে চলে যায়, স্বামীর দিন রাত্রি কাটে বাইবে বাইরে ; ঘরের প্রাণীটি মরলাে কি বাঁচলো সে খবব রাখার কথা তার আদৌ মনে থাকে না। দুপুর-চচনে রদ্দর। মাঠ ঘাট ভেঙে ঘোড়ায় চড়ে শ্রীপতি এল ; দেবরাণী দূর থেকে দেখতে পেযেই সরবৎ পাখা জল সমস্ত কিছু সবঞ্জাম নিযে তৈরী হােযে আছে—আসামাত্রই যেন কর্তব্য সম্পাদনে এতটুকু দেরী না হয়। কিন্তু কতক্ষণ কেটে গেল, দেবরাণী চুপ কোরে মুহূর্ত গুণছে—সরবৎ গম হোষে এল,-শ্রীপতির আর দেখা নেই। শেষকালে ঝিকে ডিসপেনসারীতে খবর আনতে পাঠান হােল ; ঝি এসে খবর দিলে বাবু আবার বেরিয়েছেন আসতে তার দেরী হবে বলে গেছেন। আর বলে গেছেন দেবরণী যেন তার জন্যে বসে না থাকে-খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে, একটি কলেরা রুগী মরাে ময়রা। সেই অবস্থায় দেবরাণীর মনের অবস্থা কেমন হয়। অবশ্য প্রথম প্রথম দেবরাণী স্বামীর জন্যে এই রকম সমস্ত দিনই হয়ত উপােষ কোরে বসে থাকতাে, কিন্তু সে অনুরাগ কতদিন থাকে ? বাসি পেটে পিত্তি দিনের পর দিন পড়লে দেবরাণী আজকাল অসুস্থ হয়—অল উঠে গলা জ্বালা করে, ভাল হজম হয় না—মাথা টিপ টিপ করে, আরাে কত কি••দেবরাণীর শরীর খারাপ হােলে এ সংসার চলবে কেন ?•••একদিন যদি সে বিছানায় পড়ে থাকে—এত বড় সংসার সমস্ত নয়-ছয় হয়ে যাবে, স্বামী খেতে বসবার সময় কে পাখার বাতাস করবে, ঘরে আসা মাত্র তক্ষুণি কে হাতে সরবৎ তুলে দেবে ?—যে ভুলো মানুষ এতগুলাে লােকের দায়িত্ব শ্রীপতির হাতে, ডাক্তার নিজে সুস্থ থাকলে তবে তো লােকের চিকিৎসা কোরবে। সুতরাং এই কাজ এত ব্যস্ততা না কোরলে সংসাব কি চলে? সংসার তো আর ছেলেখেলা নয় ! দেবরাণীর তাই স্বস্তি নেই- —মনে শান্তি নেই। সংসার-চক্রের ঘর্ঘর শব্দে দেবরাণী ক্লান্ত। তা হােক, এই এখন এগারােটা বাজলো। এরি মধ্যে চারিদিকে বন্দরে ঝাঁ ঝাঁ করছে। রান্না তার সমস্ত হয়ে এসেছে—শুধু ভাতটা চাপিয়ে দিলেই হােল । রান্নাঘরের চারিদিকে স্কুল জমেছে-কতদিন পরিষ্কার করা হয়নি। হাঁড়িতে ভাত ফুটছে—অস্পষ্ট মৃদুমন্থর শব্দে ঘরের আবহাওয়া মুখর হয়ে উঠল ; পিড়ির ওপর বসে হাঁটুর ওপর হাতের কনুই রেখে দেবরাণীর সমস্ত অন্তর বাণীময় হােয়ে উঠছে, কালে লম্বা মতন—আলুথালু চুল-ভরা মাথা--ঋজু দেহ বেঁকিয়ে টেবলের ওপর ঝুকে পড়ে কী যেন পড়ছে,-বইয়ের পাহাড় চারপাশে-খাতার কাগজে তার হাতের অক্ষরগুলাে বেঁকে বেঁকে ছুটে চলেছে—পাতায় ছাপা অক্ষর গুলো ছবির মত পৃ% হয়ে উঠছে—কোনও দিকে তার মন নেই—তাকে ঘিরে, তাকে কেন্দ্র কোরে দেবরাণীর হঠাৎ সমস্ত অভিমান অভিযােগ ঘনীভূত হয়ে উঠল। কেন সে আসে না। সে একবার আসে না কেন? তবে কেন সে ভালবেসেছিল ? কী এমন তার কাজ—একবার কেন সে । ; ৩০ দিনের পর দিন আসে না! দেবরাণী কী এমন দোষ করেছে! সে-ও তাকে ভুলতে বসেছে। দেবরাণীর কেউ নেই। কেউ নেই দেবরাণীর! কেন এমন হয়। সেই রান্নাঘরের ভেতর—কি যে হােল-দেবরাণী কেঁদে ফেললে। যার জন্যে কাদা সে হয়ত জানতেও পারছে না। কেন তবে বেঁচে থাকা দেবরাণীর কেউ নেই। কেউ নেই দেবরাণীর। দেবরাণী আবার কাঁদতে লাগলো। সে যদি ভুলতে পেরেছে—দেবরাণী কেন ভুলতে পারবে না। ওরা সব পারে! সব পারে ওরা! হাঁড়ির দিকে চোখ মেলে দেবাণী বসে রইল-ভাত ফুটছে। বিকেলবেলা—চারিদিকে বেশ স্পষ্ট অন্ধকার। সৌরভীকে সঙ্গে নিয়ে দেববাণী পুকুর ঘাটে এল ! এই পুকুরঘাটটি হচ্ছে দেবরাণীর গড়ের মাঠ। দূরে মাঠের পর মাঠ—যতদুর চাও ধু ধু করছে মাঠ আর পশ্চিমদিকে ঘন আম কাঠালের বাগান। বাগান বা বন দুই-ই বলা চলে। সাবান আর গামছা নিয়ে সৌরভী ঘাটের শেষ সিড়িতে এসে বলো ! এই দু’জন ছাড়া ঘাটে আর কেউ নেই—দেববাণীর দুই চোখে যেন সেই পুরােন দিনের নেশা ফিরে এল ; সেই মাঠে মাঠে বেড়ান—সেই বাসে চড়ে মেয়ের দল বেঁধে লেকে যাওয়া সেই বায়স্কোপ, পিকনিক, সরস্বতী পুজো, শিবরাত্রির রাতে হল্লা করে কাউকে ঘুমুতে না দেওয়া, আর গরমের দুপুরবেলা ব্রীজ খেলা! দেবরাণীর চোখে আনন্দ উপচে পড়ছে—সমস্ত দেহ চঞ্চল হয়েছে—দেবরাণী গুনগুন করে গান গাইছে। জলের ভেতর দু’টো পা ডুবিয়ে দিয়ে দেবরাণী পিঠের কড়টা খুলে দিলে–সৌরভী সাবান ঘষতে লাগল। দেবরাণীর দেহ বেয়ে সাবানের ফেন জলে গড়িয়ে পড়ছে—পড়ে ভাসছে। পা দিয়ে সেই জল ছিটোতে ছিটোতে দেবরাণী চঞ্চল হয়ে উঠল। ঘাটে আজ কেউ নেই; এই ঝাপসা দিনের পর দিন অন্ধকারে দেবরাণীর হঠাৎ সাঁতার কাটতে ইচ্ছে হােল। এক ডুবে ওই ওই পৰ্য্যন্ত—ওই ওপারে দেবাণী যেতে পারে। অনেকদিন অভ্যেস নেই—দেবরাণী কি পারবে ? ঘাটে কেউ নেই—এপার থেকে ওপার সব দিক ভালাে করে দেখে নিলে-কেউ কোনও আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখছে না তাে! অবশ্য তার শরীরে সে যৌবন আর নেই—দেবরাণী এখন মােটা হতে আরম্ভ করেছে। আর বয়সও বাড়ছে ! বাড়ছে বৈকি! আর কতদিনই বা। দেবরাণী মরিয়া হােয়ে উঠল। হঠাৎ দেবরাণী ভালো করে কাপড়টা কোমরে জড়িয়ে বেঁধে নিলে— সঁতার কাটতে কাটতে ডুব জলে কাপড় খুলে গেলে লজ্জায় পড়তে হবে ! এখন, এই মুহূর্তে দেবরাণীর মােল বছর বয়েস আবার ফিরে এসেছে। সৌরভীকে বললে—দেখিস তাে সৌরভী, কেউ আসে কি না, এলে বলিস—আমি সাঁতার কাটবে। সৌরভী ভয় পেয়েছে ; বললে-সে কি মা, সন্ধ্যেবেলা, কাজ নেই, বাবু শুলে রাগ করবে—যদি কেউ কিছু মন্দ বলে? কোমরে কাপড় আঁটতে আঁটতে দেবরাণী বল্লে--আমি কার ভয় করি বল তো—আর ক’দিনই বা, আর দিন কতক বাদেই তো বুড়ী হয়ে যাব, তখন কি আর সাঁতার কাটতে পাবে—তুই বসে থাক—দেবরাণী ঝাঁপ দিয়ে জলে লাফিয়ে পড়লাে- কেবল অন্ধকার—দেবরাণী ভাসতে ভাসতে পুকুরের মাঝখানে এসে পড়েছে। এই জল পালকের মতাে নরম আর ঠাণ্ডা ! দেবরাণীর প্রত্যেক অঙ্গ এই জলের স্পর্শে উন্মাদ হয়ে উঠল। অনেকদিন অভ্যেস নেই—এখন শরীর আর তেমন হাল্কা নেই—দেবরাণী জলের ওপর হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে ভেসে রইল। আজ যদি তাকে কেউ এই অবস্থায়, ; দিনের পর দিন দেখে ফেলে। এই অন্ধ অনাবৃত অবস্থায় !••আজ দেবরাণীর লজ্জা নেই—ক’দিনই বা! নিজের লজ্জা আর আবরু বাঁচিয়ে দেবরাণী অনেক দিন কাটিয়েছে, তবু কিছুই তার লাভ হয়নি। সে একদিন ছিল যখন দেবাণী এই লজ্জায় এই আত্মপ্রবঞ্চনায় নিজেকে ঠকিয়েছে, ঠকিয়েছে পরকে। নইলে, আজ দেবরাণী হয়তাে এই পাড়াগাঁয়ের এক ডাক্তারের স্ত্রী না হােয়ে, হােত কোলকাতার একটি বাড়ীর বধু! ছেলেটি ঘরে বসে পড়তাে, এগজামিনের পড়া, টেলের ওপর ঝুকে বসে পড়তো, সামনে টেবলে ল্যাম্পের নীচে আলাের পােকার খেলা জুড়ে দিয়েছে। দেবরাণী পালিয়ে এসে, ছেলেটির পেছন দিকে টিপি-টিপি পায় এসে চুপটি করে দাড়িয়ে থাকতাে, তারপর তার উপস্থিতি জানাবার জন্যে একটু শব্দ কোরে নিঃশ্বাস ফেলতে—ছেলেটি উঠতাে চমকে—পড়া না ছাই-উ যেন কত পড়ায় মনােযােগ ! ছেলেটি চেয়ারে পেছন দিকে হেলান দিয়ে টপ, কোরে দুই হাত বাড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরতে ; দুষ্টুর শিয়ােমণি, সেই হাতের চাপে তার খোঁপা পড়তো খুলে—সেই চুলে ছেলেটিব মুখ অন্ধকার হােয়ে ঢেকে যেতে; আর দেবরাণী? হি হি কোরে হেসে উঠতে দেবরাণী—কত মজা তখন! দেবরাগী মুখখানা কিছুতেই নাবাবেনা ছেলেটিও ছাড়বে না—শেষ পর্যন্ত? শেষ পর্যন্ত ছেলেটিকে কি দেবরাণী ঠেকাতে পারতাে। দেবরাণীর গায়ে কি অত জোর আছে। যা আবদারে ছেলে সে, তার মুখের ওপর দেবরাণীর মুখখানা অন্তত একবারও নামাতে হােত—তারপর ?—তারপর সামনেই এগজামিন কটা দিন ধৈর্য্য ধরে থাকতে বলে দেবরাণী চলে আসতো; কিন্তু দেখ, দেবরাণীরও হয়তো ধৈৰ্য্য থাকতাে না—ঘণ্টাখানেক পরেই কাজ করতে করতে দেবরাণী আবার হয়তাে কোন ফঁাকে ছেলেটির চেয়ারের পেছনে দিনের পর দিন গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছে—দিনের পর দিন—এমনি কতবার! জলের ওপর ভাসতে ভাসতে দেবরাণী এই সব কথা ভাবছে। তারপর—তারপর এগজামিন হােয়ে গেল, সেই দুর্ভাবনার দিনগুলো যুগগুলাে সত্যি সত্যি চলে গেল? বাইরে থেকে বন্ধুরা আসততা বিকেল বেলা ডাকতে কি ময়দানে খেলা দেখতে যেতে, কি দুপুর বেলা ব্রিজ খেলতে—ছেলেটি ছােট ভাইকে দিয়ে বলে পাঠাতে-বলগে যা বাড়ী নেই। দার্জিলিং থেকে এক বন্ধু সেখানে যাবার জন্যে অনুরােধ করে চিঠি লিখতাে—ছেলেটি বলে পাঠাতে—শরীর খারাপ! ছেলেটি কি কম দুষ্টু। বাড়ীর কোনও কাজ নেই—বন্ধু-বান্ধব নেই—নেই পড়াশুনা, নেই খেলা-কাজের মধ্যে কাজ দেবরাণীর পেছনে লাগা। ভাড়ার ঘরের এক কোণে বসে দেবরাণী আপন মনে পান সাজছে—কোনও কাজ নেই হঠাৎ ঘােমটা-টোমটা খুলে দিয়ে—পান সুপুরি চুন একাকার কৈারে দিয়ে ঝড়ের মতাে চলে গেল। বিকেল বেলা যেই গা ধুয়ে এসে সবে মাত্র ঘরে ঢুকেছে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ কোরে কাপড় ছাড়ছে নিঃসঙ্কোচে, কোথাও কিছু নেই—হঠাৎ খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসে চুপি চুপি তার চোখ টিপে ধরেছে—চোরের মত তার চোখ দুটো জোরে টিপে ধরেছে ! সে ছাড়া এমন দুষ্টুমি আর কার ? বল তো কী লজ্জা। কাটাল আর আম বাগানের ভেতর অজস্র অন্ধকার। জোনাকি জলছে দু'একটা। কাছাকাছি কাদের কথাবার্তার টুকরাে-টানা টানা গানের সুর বাতাসে দূর থেকে ভেসে আসছে- দেবরাণীর মনে হােল : যদি এখন, এই এখনি সে ডুবে যায়। যদি তলিয়ে যায় তলায়। হােতেও তাে পারে এমন। ধর, কাপড়ে তার ।
দিনের পর দিন দু’টো জড়িয়ে গেল। যত সে ছড়াতে চেষ্টা করছে ততাে যাচ্ছে জট পাকিয়ে -শেষে আর তার দম নেই। নিঃশ্বাস নিচ্ছে জোবে জোরে মুখ দিয়ে আর নাক দিয়ে। কোনও রকমে সে ডাকতে পারলে, ‘সৌরভী, সৌরভী’! ঘাটে বসে সৌরভী ঝিমােচ্ছ (আর যে ঘুম ওর, সন্ধ্যে না হােতে হােতেই ওর দুলুনি ধরে) হয়ত শুনতেই পাবে না তার চীৎকার, আব যদিই বা শুনতে পায়, তাহলে হয়ত এই বিপদের আকস্মিকতায় কী কোরবে সে তাই হয়ত ভেবে উঠতে পারবে না ; তারপর ললাকে যতক্ষণে খবব পাবে, ততক্ষণে দেবরাণী হয়ত একেবারে জলের তলায় কাদায় আর পাঁকে মুখ ঘষছে—শেষ নিঃশ্বাসটুকুও তার তখনি বেরিয়ে গেল। সে খবব, তার মৃত্যুর খবর শ্রীপতি শুনবে ! শুনবে, চুপ কোরে থাকবে, তারপর একটু কঁদবে কি আর না ?•••কাদবে বৈকি—মুখে কমাল চাপা দিয়ে কঁদবে, হয়ত সেদিন কিছুই খাবে না—রাতে ঘুম আসতে দেরী হবে একটু, তারপর সকালে উঠে আবার যে কে সেই। অবশ্য চিরকাল কে কাকে মনে রাখে। না, মনে রাখা যায়। তার শােকে শুধু কাদলেই তাে আর শ্রীপতির চলবে না। তার ডাক্তারী আছে, ডিপেনসারী আছে, নিজের শরীর আছে—ক্রমে ক্রমে তাকে ভুলে যাবে বৈকি! কিন্তু হঠাৎ—জোনাকি পােক। আর অন্ধকারের দিকে চেয়ে দেবরাণীর মিনতি-ভরা চোখে একটি কামনা জেগে উঠলাে। আর -আর একজন যেন তাকে মনে রাখে। সে যেন তাকে না ভােলে। তার সেই ছেলেটির মনে দেবাণী অক্ষয় হয়ে থাকে। একদিন দেবাণী তাকে কত ভাল বেসেছিল, কত রাত তার জন্যে দেবরাণীর চোখে ঘুম আসেনি, কত দিন বসে বসে তার জন্যে একলা আপন মনে নিঃশব্দে কেঁদে ভাসিয়েছে সে কথা সে যেন না ভােলে। সে যেন মনে রাখে, দিনের পর দিন তাকে এখানে আসবার জন্যে কতবার সে চিঠি লিখেছে, তাকে হারিয়ে দেবরাণীর জীবন কত ব্যর্থ হয়ে গেছে। যখন সে পড়াশােনা শেষ করে বিছানায় গিয়ে শােবে, শুয়ে আলো নিবিয়ে দেবে, তখন এক ফাকে দেবরাণীর কথা যেন তার ভাবতে ইচ্ছে হয়। যেন দেবরাণীকে স্বপ্নে দেখে মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যায়, আর শীতের রাতে আর বর্ষার রাতে বিছানা যখন তার ঠাণ্ডা হিম হয়ে আছে, তখন দেবরাণীকে মনে কোরে সে যেন একটা কবিতা লেখে। আর যেন দূর থেকে সৌরভী ডাকলে—মা- তীব্র নিখাদে সুর উঠেই হঠাৎ স্বরােদের তার ছিড়ে গেল। দেবরাণী প্রথম আবিষ্কার কোরলে রাত হয়েছে। তারপর বুঝলে অনেকক্ষণ হােল সন্ধ্যে উৎরে গেছে। দেবরাণীর মনে হােল : সত্যি সত্যি এত রাত করা তার উচিত হয়নি। কত কাজ তার পড়ে আছে সংসারের! উঃ কত কাজ! দেবরাণী সৌরভীকে বকতে লাগলাে-এতক্ষণ কেন ডাকিস নি তুই, দেখ দিকিনি কত দেরী হয়ে গেল সত্যি সত্যি দেবরাণীর দেরী হয়ে গেছে। এখন গিয়ে কখনই বা সে করবে রান্না, আর কখনই বা লােকে খাবে ! এতক্ষণ যদি শ্রীপতি এসে গিয়ে থাকে। অবশ্য এত শীঘ্রি শ্রীপতি খুব কম দিনই আসে, কিন্তু যদি এসে থাকে তো কী ভাবছে কে জানে। এই খাটুনি সারাদিন এই পরিশ্রমের পর বাড়ীতে এসে দেখবে দেবরাণী নেই ! জুতাে খুলে দেবে কে? হাত-পা ধােবার জল হয়ত দেওয়া হয়নি-মানুষ একলা অন্ধকার ঘরে হয়ত চুপ কোরে বসে আছে দেখ দিকিনি কাণ্ড! উনুনে অগুন দিয়েছে কি না, তুলসীতলায় সন্ধ্যে দেখানাে হয়েছে কি না—উ কত पिसमा भरिम কাজ সংসারের। একঘণ্টা সংসারে না থাকলেই এই—আর যদি সে একদিন কোথাও যায় তাহলে কী যে হবে দেবরাণী তা ভাবতেও ভয় পেলে। সন্ধ্যেবেলা ধােপ আসবার কথা ছিল, হয়ত এসে ফিরে গেছে। ময়লা হোয়েছে সমস্ত কাপড় চোপড়, এক ক্রোশ দূরে তার বাড়ী, আসতে আবার সেই সাত দিন। খিড়কীর দরজা দিয়ে দেবরাণী বাড়ী ঢুকলাে—ঢুকে দেখলে : সে যা ভেবেছে তাই। দরজা হাট কোরে খােল পড়ে আছে, যদি চোর-ডাকাত ঢুকতাে! রাগে দেবরাণীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠলাে। তাহলে পয়সা দিয়ে চাকর রাখা কেন? সে পয়সা থাকলে তাে সংসারের কত সাশ্রয় হয়। মানুষের রক্ত জল কোরে উপায় করা টাকা—এমনি কোরে তার অপব্যয়। কেন, কিসের জন্যে ? দেবরাণী চীৎকার কোরে চাকরের নাম ধরে ডাকতে লাগলো আর একদিন—সন্ধ্যেবেলায়--যে সন্ধ্যায় বাঙালী গেরস্ত মেয়েদের কাজের অন্ত থাকে না—সেই ধূসর সন্ধ্যায় দেবরাণী উনুনে আগুন দিয়ে গা-ধুয়ে সবে তুলসীতলায় পিদিম নিয়ে যাবে—তুলসীতলায় আলাে দেখিয়ে দেবরাণী রান্না ঘরে ঢুকবে—অর্থাৎ নিয়মমত যান্ত্রিক গতিতে তার রাত্রের কাজ শুরু করতে যাবে-এমন সময়-আঁচলের আড়ালে পিদিম নিয়ে সবে সে উঠানের সিড়িতে পা বাড়িয়েছে—এমন সময় খবর এল। খবর পাঠিয়েছে শ্রীপতি। জানিয়েছে—হয়ত রাত্রে শ্রীপতি বাড়ীতে "আসতে পারবে না, সুতরাং তার জন্যে ভাত যেন রাধা না হয়। এই বিকেল বেলা, সন্ধ্যার একটু আগে দেবরাণীর বাঁ-চোখটা নাচতে শুরু করেছিল। দেবরাণীর মনে হয়েছিল : কী এমন ঘটনা ঘটতে পারে বা তার পক্ষে মঙ্গলজনক। এমন হঠাৎ তার তাে বাঁ-চোখ নাচে না।
দিনের পর দিন 'কিন্তু তার ফলে যে এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পাবে, তা কে জানতো। দেবরাণীর মনের সমস্ত উৎসাহ নিবে এল-কার জন্যেই বা রাধা। কেনই বা তবে এই কর্মভােগ ! দেবরাণী উনুনের উপর হাঁড়িটা চাপিয়ে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে এল। এসে শ্রীপতির জন্যে একটা রুমাল সেলাই করতে বসলাে। শােবার খাটের ঠিক মাথার দিকে দেয়ালে টাঙাননা তাদের দু’জনকার ফোটো। পাশাপাশি শ্রীপতি আর দেবরাণী দাঁড়িয়ে-বিয়ের সময় তােল। তখন দেবরাণীর কেমন চেহারা ছিল—শ্ৰপতিও তখন একটু ছেলেমানুষ ছিল—ঠোটের ওপর পাতলা সরু একটুখানি গোঁফ-গায়ে চাদর, হাতে টোপর আর পায়ে পম্পসু ; এখনকার সুটপরা শ্রীপতিকে দেখলে ও শ্রীপতিকে অরে চেনাই যায় না—এত তফাৎ। সেই বিয়ের সময়ের আর একটা কথা দেবরাণীর মনে পড়লো— কথা ছিল বিয়ের আগের দিন সে আসবে। বাড়ীর পিছন দিকে বাগানের ভেতর হেমুহেনা গাছের আড়ালে সন্ধ্যেবেলা কেউ যখন থাকবে , সেখানে সে আসবে; কত কথা বলার ছিল—শেষ দেখা ; কত দিনের মতো, চির জীবনের মতাে শেষ দেখা ; শেষবারের মতাে বলতে ভুলে ’—শেষবারের মতাে বলতাে‘চিঠি দিও'—আর শেষবারের মতাে সে মুখ নীচু কোরে ঠোটের ওপর চুমু খেতে-দেবরাণী তাতে এতটুকু বাধা দিত না, আনন্দে আর ব্যথায় দেবরাণী তাকে কোলে টেনে নিতে—তাকে দিত সান্ত্বনা এই ছিল ঠিক। কিন্তু সব উলটে গেল ; সেদিন সকাল থেকে দেবরাণীর এমন জর হােল—সারাদিন অজ্ঞান, অচৈতন্য। দেহের তাপে বিছানা পুড়ে গেল। কী সে ভুল-বক! প্রলাপে সে কী যে বলেছে দিনের পর দিন কে জানে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এতখানি দীর্ঘ দিন কোন্ ফাক দিয়ে কখন চলে গেছে—দেবরাণীর হুস ছিল না। হুস থাকবে কি কোরে? অসহ্য যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে পড়েছিল তার দেহ-শুকনাে মুখ, শুকনাে দৃষ্টি —যেন সারা জীবন সে খায়নি, সারা জীবন সে চান করেনি । জন্ম থেকে যেন সে কেবল অসুখে ভুগছে। অসুখ যখন তার কিছু কমলাে, যখন তার একটু জ্ঞান হােল, তখন অনেক রাত হয়ত। তার মনে পড়লাে সেই কথা। সে যে আসবে বলেছিল; আজ যে শেষ দেখার দিন। ধড়ফড কোরে বিছানা ছেড়ে দেবরাণী উঠতে গেল, হঠাৎ সবাই মিলে তাকে ধরে শুইয়ে দিলে, তাকে সারা রাত ধরে পাহারা দিতে লাগলাে। বিছানা ছেড়ে তাকে তারা একবারও উঠতে দেয়নি। তার পরদিন দেবরাণীর বিয়ে হয়ে গেল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে দেববাণীর আর দেখা হয়নি। হয়ত সে সেদিন সন্ধ্যেবেলা হেনুহানা গাছের আড়ালে এসে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেবরাণীকে না দেখে ফিরে গেছে। হয়ত অভিমান কোরেছে। হয়ত আর সে আসবে না—তাকে হাজার ডাকলেও সে আর আসবে না। এই এখন—এই সন্ধ্যেবেলা—দেবরাণী রুমাল সেলাই করতে করতে ভাবতে লাগলাে : সে কী করছে। এতক্ষণ সে একটু বেড়িয়ে এসেছে- এসে লিখতে শুরু কোরেছে। লিখতে লিখতে যখন সে চেয়ার ছেড়ে ওঠে, উঠে ঘরের ভেতর পায়চারি করে—আর জালার বাইরে এক একবার অন্ধকার রাত্রির দিকে চেয়ে দেখে-তখন দেবীকে কি তার মনে পড়ে। পাশে ধবধবে শাদা বিছানা—সেই একক শয্যা যখন তার অসহ হােয়ে ওঠে, তখন তার পাশে দেবরাণীকে কল্পনা কোরে সে কি তৃপ্তি পায় সে কল্পিত বেরাণীর কানে কানে অশান্ত নীরব-প্রলাপ বকে বকে যায় ।
দিনের পর দিন সৌরঙী ঘরে এসে বললে—ভাত হােয়ে গেছে মা, ক্রমে রাত্রি আরও গভীর হল। এতবড় বিছানায় দেররাণী একলা শুয়ে ঘুমুচ্ছে! হঠাৎ অস্পষ্ট আর অস্ফুট শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা চমকে উঠলাে! শেষ রাত্রের চাদের মতাে টিপিটিপি পায় কে যেন ঘরে ঢুকলো— দরজা বুঝি খােলা ছিল—দেবরাণী বুঝি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল -কে-কে-কে—বলে দেবাণী বিছানায় উঠে বসেছে। হারিকেনটা নিবােতে ভুলে গিয়েছিল—সেটা জ্বলছে। সেই আলােয় দেবরাণী স্পষ্ট দেখলে সে এসেছে-এতদিন যাকে সে চাইছিলাে সে এসেছে। সে বললে—আমি এলুম দেবরাণী— দেববাণী। কী কোরে এলে তুমি ? কেউ টের পায়নি ? দরজা কে খুলে দিলে? পথ চিনতে ভুল হয়নি—সত্যি সত্যি কী কোরে এলে তুমি ? চাকরেরা কেউ জানতে পারেনি ?"তুমি কতক্ষণ এসেছো? সে। আমি কখন এসেছি রাণু, তিনটের গাড়ীতে এসে তােমার বাড়ীর চারপাশে ঘুরেছি—কেবল ঘুরেছি—যখন দেখলাম সবাই ঘুমিয়েছে, যখন তােমার উড়ে চাকরটার গান থেমে গেল, দরজা বন্ধ কোরে তােমার ঝিও শুয়ে পড়লােতখন আস্তে আস্তে আমি পাঁচিল বেয়ে উঠেছি, বাঘের মতাে সাবধানে এসে তােমার ওপরের ঘরে পোচেছি। তােমার ঘরে আলাে জ্বলছিল—জানলা দিয়ে দেখলুম ঘরে তুমি একা—আর কেউ নেই, সেলাই করতে করতে তুমি শুয়ে পড়েছ—কিন্তু তােমার স্বামী কোথায় রাখু—এপতিবাবু। দেবৱাণী। তিনি তত নেই, একটা কলেরা কেসে অনেক দূর যেতে য়েছে—আজ তিনি আসবেন না।••• সে। আসবেন না। ভালােই হােয়েছে—অনেক সময় পাওয়া ।
দিয়ে পর দিন গেল।—শিথ্রি কোরে যাও রাণু—অনেক দূর যেতে হবে আমাদের অনেক দূরে-যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না, জানবে না আমরা কে। হয়ত এক সমুদ্রের ধারে, নয় কোনও বনের পাশে আমরা ঘর বাঁধব। শিথ্রি কোরে নাও—বেশি কিছু মােট-মােটরি নিও না যেন-আমি বেশি বইতে পারবে না, একটা শুধু ছােট দেখে সুটকেস নাও-আর নাও তােমার জামা-কাপড়—টাকা আমার কাছে যথেষ্ট আছে। এত টাকা । শুধু এই জন্যে এতদিন ধরে জমিয়েছি, দিনের পর দিন কেবল টাকা টাকা কোরে বেড়িয়েছি, আজ আমার সে আশা মিটেছে—আর কোনও ভাবনা নেই রাণু, গাড়ী ছাড়বে রাত তিনটেয়, তার আগে সমস্ত নিয়ে ষ্টেশনে গিয়ে পৌছুতে হবে—তােমার কী কী নেবার নিয়ে নাও দেবরাণী। কোথায় যেতে বলছে আমাকে—কী বলছে?—কোথায় যাবে আমরা?•••আমি বুঝতে পারছি না যে তার কি ঠিক আছে যেখানে থােক গেলেই হােত অনেক দুরে, অনেক দূরে—এই পাঁচটা বছর কেবল ভেবেছি কোথায় যাবাে, কিছুই ঠিক করতে পারিনি, আজ যখন বেরিয়ে পড়েছি, তখন আর যাবার জায়গার অভাব হবে নাচল, চল- দেবরাণী নিথর নিশ্চল হয়ে শুয়ে রইল। সে আবার বললে সে কি উঠছে| না যে-যাবে না? তার চেয়ে দেবরাণী বললে : তার চেয়ে এখানেই তুমি থাকোনা। এই বাড়ীতে—এত ঘর পড়ে রয়েছে, এত জায়গা, কেউ আপত্তি কোরবে , আমার স্বামীও আত্মভােলা মানুষ—তুমি আরাম কোরে এখানে থাকবে যেদিন রাত্রে আমার স্বামী বাড়ী ফিরবেন না, আমি আস্তে আস্তে তােমার ঘরে যাবে—তুমি আমার যা আছে। তাই থাকবে। সে।
দিনের পর দিন তােনাতে আমাতে থাকবে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্বন্ধ। আর স্বামী। স্বামীকে আমি ভক্তি কোরব, শ্রদ্ধা কোরব-স্নেহ কোরব, সেবা কোরব- তাইতাে বেশ! ওগাে, তাই বেশ—আর কোথাও গিয়ে কাজ নেই- বুঝেছ—এই এখানেই থাকো সে বললে—কেন তবে তুমি আমায় আসতে লিখেছিলে, যদি তুমি আমার সঙ্গে না যাবে, কেন এই পণ্ডশ্রম ! বুঝেছি, তােমাদের প্রেম শুধু লােক-দেখানো, শুধু মুখের প্রেম—একটু ঝড় বইলেই, তােমাদের প্রেম নিবে যায়, একটু ঢেউ উঠলেই তােমাদের প্রেম ডুবে যায় ! জানাে—এই পাঁচটা বছর কী কোরে কাটিয়েছি, কী কোরে এত টাকা জোগাড় কোরেছি—সব তােমার জন্যে রাণু—আর আজ তুমি বলছ—যাব না ! কেন তুমি তবে আমাকে আসতে লিখেছিলে? আপত্তি তোমার কোথায় ? কেন তুমি যাবেনা ?••• দেবরাণী কী বলবে! দেবরাণী অনেকক্ষণ চুপ কোরে রইলাে! কী তার বলবার অাছে। একটু পরে বললে—আমি কেমন করে যাই বল তাে? আমি গেলে এ সংসার কে চালাবে? একঘণ্টা বাড়ীতে না থাকলে সমস্ত যে নয়-ছয় হােয়ে যায়। আমি যদি না দেখি তাে এ ঘর-দোর-বাড়ী কে দেখবে, তুমি বলে দাও- উনি যে মানুষ, আমি যদি সামনে একদও না থাকি, তাহােলই চিত্তির—ভাত খাবার সময় কে পাখার বাতাস কোরবে? সরবৎ কোরে দেবে কে? নিজের জামার বােতাম ওর দিনে সাতবার হারিয়ে যায়—ওর মাথার চুল তাও আমাকে আঁচড়ে দিতে হয়-জুতাের ফিতে খুলে দিতে হয়। আমি কেমন কোরে যাই—তুমি এখন বলাে? আমি , গেলে কি চলে? এই পাঁচ বছরের নিজের হাতে গড়া সংসার—তুমি দিনের পর দিন যাচ্ছিনে; তাে জানােনা—এ সংসার ভাঙতে আমাদের কত ব্যাথা লাগে। এর প্রত্যেকটি জিনিষ আমার কাছে প্রিয়—এই বিছানা বালিশ থেকে আরম্ভ কোরে ওই একটা ভাঙা ইটের টুকরােটি পর্যন্ত। কেমন কোরে যাই বলাে? সে। বেশ, তবে তাই হােক, স্বামীই তােমার আপন হােক, আমি তােমার আজ থেকে কেউ নই। সত্যি সত্যি আমি আর বাড়ী ফিরে যদি কোনও দিন কোনও এক মুহূর্তে সমুদ্রের দিকে চেয়ে তােমাকে মনে পড়ে, আমি চলে যাব অরণ্যে—যদি বনের পাখীর গানে তােমার কথা মনে পড়ে—আমি চলে যাবাে মরুভূমিতে, যদি নীল আকাশের মেঘের দিকে চেয়ে তােমার চোখ মনে পড়ে, আমি আমার চোখ দুটো বুজে থাকবে—যদি আমার বাগানের ফুলের গন্ধ তােমার চুলের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, আমি বাগান ভেঙে ফেলবাে-যদি তাতেও তােমাকে ভুলতে না পারি আমি আত্মহত্যা কোরব, বেশ, তাই হােক, । আমি যাই এখন দেবরাণী। না, যেও না, শােন, তুমি এখানেই থাকো, এই ঘর, এই বাড়ী, এখানে সমস্ত তােমার আপনার, কেউ কিছু বলবে না, আমি শুধু তােমায় সারাদিন দেখতে পাবাে, তােমার কাছে থাকতে পাবদা, তােমার সঙ্গে কথা কইতে পাব, তুমি যেও না, তুমি গেলে আমি বাঁচবে , ভেবে দেখ তুমি, এদের ছেড়ে কেমন কোরে আমি যাই, তুমি তাে অবুঝ নও—আমি না হােলে এদের চলবে না; তুমিও থাক, এরাও থাকুক—আমি যে কাউকে ছাড়তে পরিনে, সেই ভালাে—কোথায় কোন্ পথে মাঠে-ঘাটে ঘুরবে, আমি এখানে তােমায় আঁচলের ছায়ায় আরামে রেখে দেব—তুমি থাকো—এখানে থাকো আমার কথা শােন- দিনের পর দিন সে। সে হয় না রাণু, আমাকে পেতে হলে তােমার স্বামীকে ছাড়তে হবে, তােমার সংসার ছাড়তে হবে, তোমায় বাঁধন ছিড়তে হবে- তা’ যখন তুমি পারবে না তখন আমি যাই, কিন্তু মনে রেখাে, একবার যদি চলে যাই তবে আর আমি আসবাে না অন্ধকারের ভেতর তার চেহারা অস্পষ্ট হহয়ে এল। সে চলে গেল। দেবরাণী হঠাৎ গুমরে কেঁদে উঠলো! নিজের কান্নাতেই দেবরাণীর ঘুম ভেঙে গেছে। সত্যি সত্যি দেবরাণী এবার উঠে বসলে! তবে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো। স্বপ্নের ঘরে দেবরাণী এতক্ষণ কেবল কেঁদেছে নাকি!-দেবী চোখে হাত দিয়ে দেখলে চোখ ভিজে ফুলে উঠেছে, এই সারা রাত সে বােধ হয় অবিশ্রান্ত কেঁদেছে। বাইরে সকাল হােয়ে এসেছে—বেলা হয়েছে। অন্যদিন এর অনেক আগে দেবরাণী ঘুম থেকে উঠে পড়ে। কিন্তু সারা রাত এ কী দুঃস্বপ্ন! আচ্ছা, যদি সে সত্যি সত্যি আসতো। কাল রাতে একলা ঘরে পাঁচিল ডিঙিয়ে সিড়ি বেয়ে যদি সে আসততা! কেন সে এল না, কেন অমন রাত বিফলে চলে গেল। সে এলে কী এমন দোষ হোত! ওরা কী করে ভুলে থাকে। কী কোরে ওরা ভুলতে পারে। তাকে কেন্দ্র কোরে দেবরাণীর সমস্ত অভিযােগ সমস্ত অভিমান ঘনীভূত হােয়ে উঠতাে আবার। কেন সে আসে না! সে একবার আসে না কেন? তবে কেন সে ভালবেসেছিল? কী এমন তার কাজ। দেবরাণী কী দোষ করেছে। সে-ও তাকে ভুলতে বসেছে। দেবরাণীর কেউ নেই—কেউ নেই দেবরাণীর! কেন এমন হয় সেই ভাের বেলা-অস্পষ্ট অন্ধকার আর অসীম আকাশের দিকে চেয়ে দেবরাণীর মনে হােল-কেন এমন হয়। দেবরাণীর কী যে হােল—সে কেঁদে ফেললে। যার জন্যে কঁাদা সে হয়ত জানতেও পারছে দিনের পর দিন । কেন তবে বেঁচে থাকা। দেবরাণীর কেউ নেই, কেউ নেই দেবরাণীর। দেবরাণী আবার কাঁদতে লাগলাে। সে যদি ভুলতে পেরেছে, দেবরাণী কেন ভুলতে পারে না। ওরা সব পারে—সব পারে ওরা। জানলার বাইরে একটুকরাে শিমুল তুলাে হাওয়ায় উড়তে উড়তে অনেক অনেক দূরে চলে গেল—দেবরাণী চেয়ে রয়েছে। ঘরের ভেতর হারিকেনটা তখনও জ্বলছে- হঠাৎ দেবরাণীর মনে হােল--তাইতাে। এই সকাল পর্যন্ত কোন আক্কেল সে শুয়ে আছে। কত তার কাজ পড়ে রয়েছে যে। সংসারে ছােট বড় সমস্ত কাজ। এই এখুনি শ্রীপতি এসে পড়বে—জলখাবার চাই। চান করবার জল চাই দু’ বালতি। তারপর বাসি-কাপড় কেচে চান কোরে আবার রান্নার জোগাড় দেখতে হবে, চাকরকে বাজার আনতে পাঠাতে হবে—সৌরভী মাছ কুটতে বসবে—শ্রীপতির জন্যে মিছরি ভিজিয়ে রাখতে হবে-কাল থেকে চাল বাড়ন্ত, মুদীকে চাল পাঠাতে বলে দিয়ে আসতে হবে, কাঠ ফুরিয়ে গেছে—গয়লানী কাল আধ পােয়া দুধ কম দিয়েছে সে কথা আজ সে এলে বলতে হবে—কাজ কী কম। সংসার তো আর ছেলেখেলা নয় ! দেবরাণী বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাে। উঠে বসতেই দেবরাণীর নজরে পড়লে তার বিছানার ওপর বুকের কাছেই কালকের রাতের আর্থ- সমাপ্ত রুমালটা পড়ে আছে, আর তারই ওপর লাগানো রয়েছে একট। ছুঁচ। সেলাই করতে করতে সে কাল কখন ঘুমিয়ে পড়েছে হুস ছিল । যদি চুঁচটা তার বুকে ফুটে যেতাে! কী হােত তাহলে—দেবরণী বিছানায় বসে বসে ভাবতে লাগলো : কী হােত তাহ'লে ? ওই এক ইঞ্চি দেড় ইঞ্চি লম্বা চক্চকে চুঁচটা যদি তার নরম বুকে বিঁধে যেতাে।
দিনের পর দিন বিধে গেলে সে কি বাঁচতে ! ভাগ্যিস বেঁধেনি-দেবরাণীর বরাত ভালাে । কিন্তু একবার বিধলে কি আর রক্ষা থাকতো। সে কি বাঁচতে। দেবাণী সেই বিছানার ওপর বসে বসে কোন্ অদৃশ্যশক্তিকে লক্ষ্য কোরে প্রশ্ন কোরতে লাগলাে—সে কি বাঁচতো! ওই চক্চকে চুঁচটা তার নরম বুকে বিধলে সে কি বাঁচতে ক্রিয়াকাণ্ড টাউন-ইস্কুলের অবিনাশ মাষ্টারের নাম ডাক আছে। ছেলে ঠেঙাইয়া মানুষ করিতে অবিনাশ মাষ্টার ওস্তাদ। এতটুকু ফাকি দিবে না—প্রবণ্টা পড়াইতে গিয়া ভুল করিয়া তিন ঘণ্টা পড়াইয়া বসিবে। পান নয়—নস্যি নয়-তামাক নয়—সম্পূর্ণ খাটি মানুষটি-কাহারাে সাতে নাই, পাঁচে নাই -মাসকাবারে ইস্কুল হইতে তিরিশটি টাকা লইয়াই সন্তুষ্ট। -অবিনাশ মাষ্টারকে কেহ কোনদিন হাসিতে দেখে নাই। মােটা চশমার ফাক দিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা•••ছেলেদের দিকে তাকাইয়া কী অনবরত বকিয়া । এই অবিনাশ মাষ্টারই একদিন কৃষ্ণচরণের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হইয়া গেল। সকালবেলা বাড়ীতে খবরের কাগজ আসে। চান করিতে যাইবার আগে অবিনাশের চোখ দু’টি তাহারই উপর ঘােড়-দৌড় শুরু করিয়া দেয়। কোথায় কি যুদ্ধ হইল, কে কি বক্তৃতা দিল, তাহা লইয়া অবিনাশ কোনও দিন মাথা ঘামায় নাই--তবু নেশা। -নেশা করিয়া লােকে কতদিকে কত পয়সা উড়াইয়া দেয়—ওই নেশার জন্য প্রত্যহ দু'টি আনা অবিনাশের নির্জলা খরচ হয়। খবরের কাগজ পড়িতে পড়িতে এক জায়গায় আসিয়া অবিনাশ দাড়াইয়া গেল। গ্রামের নাম মধুহাসি। নামটা তাহার পরিচিত। অবিনাশ দ্রুত পড়িয়া চলিল—কে একটি পাগলী-মেয়ে বাড়ীর ছাত হইতে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়াছে, পড়িয়া মরিয়া গিয়াছে।•••ইত্যাদি ইত্যাদি।••• পড়িতে পড়িতে অনেকদিন আগে একটি মেয়ের কথা অবিনাশের দিনের পর দিন হঠাৎ মনে পড়িল। পড়িল। একটি আদুরে মেয়ে—লেখাপড়া শিখিতে চাহিত না—কেবল যত রাজ্যের খুনসুড়ি করিয়া তাহাকে উদ্বস্ত করিয়া তুলিত। স্নান করিয়া আসিয়া দেখিত জামা নাই—ঘুম ভাঙিবার আগে কে জল ছিটাইয়া পলাইয়া যাইত—তারপর ধরা পড়িলে কোথায় অপরাধের জন্য লজ্জিত হইয়া উঠিবে তা নয়—হাসিয়া লুটাপুটি খাইত।•••খবরের কাগজ রাখিয়া অবিনাশ সেই সব দিনেব কথা ভাবিতে লাগিল।••• অবিনাশ দুর সম্পর্কের একরকম আত্মীয় হইত। কর্তা উমানাথ বলিলেন—তুমিও পড়–নাতনীটাকেও একটু একটু পড়াও। সেইদিন হইতেই সুধা অবিনাশের ছাত্রী হইয়া গেল। মেয়েটি বেয়াড়া হইলেও তাহাকে মানুষ করা যাইত, কিন্তু সুধা মানুষ হইবে না বলিয়া পণ করিয়া বসিল। নেশা বৈকি—খবরের কাগজ পড়িয়া রহিল—অবিনাশ ভাবিতে লাগিল—এতদিন সুধা কেমন হইয়াছে একবার দেখিলে হয়। ছেলে পুলে হইয়া ঘর ভরিয়া গিয়াছে হয়ত—গিন্নী সাজিয়া চারিদিক তদারক করিয়া বেড়ায়। তাহার কি এখন কিছু ভাবিবার সময় আছে ? বৃহৎ পরিবার—সেই রকম দুষ্টু মেয়েটিকে এখন গিন্নী সাজিলে কেমন দেখাইবে তাহাই কল্পনা করিতে গিয়া অবিনাশ খুব খানিকটা হাে হাে করিয়া হাসিয়া ফেলিল। সেই সব দিনের একটি তুচ্ছ ঘটনা অবিনাশের মনে পড়িল- সকালবেলা পড়িতে বসিবার কথা। কিন্তু বেলা হইয়া গেল—তবু সুধার আসিবার নাম নাই। শেষে অবিনাশ উঠিয়া নিজেই খুঁজিয়া আনিতে গেল। বাড়ীর ভিতর অবিনাশের অবাধ গতি। সুধা যে ঘরে শুইত সেখানে নাই—জ্যাঠাইমা বলিলেন—সেকি আর এখন ঘুমােয় অবিনাশ কোন সকালে উঠে গিয়েছে।•••অতঃপর বাড়ীর ভিতর কোথাও নেই—অবিনাশ বাড়ীর বাহিরে খুঁজিতে গেল। বাহিরবাড়ীর পিছন দিকে ফলের এবং ফুলের বাগান। জাম তখন পাকিয়াছে—নিশ্চয় সেখানে গিয়াছে মনে করিয়া অবিনাশ গিয়া দেখে বাগান শূন্য কেহ নাই। অবিনাশ বড় মুস্কিলে পড়িল। এই রকম যদি ছাত্রীকে বােজ খুঁজিয়া আনিয়া পড়াইতে হয় তবেই হইয়াছে।•••পাড়ায় হয়ত কাহারাে বাড়ী গিয়াছে এই ভাবিয়া অবিনাশ পাড়াটাও ঘুরিয়া আসিতে যাইতেছিল। কিন্তু ভাগ্য তাহার সুপ্রসন্ন।•••মনে হইল পালেদের রথের ভেতর হইতে কে যেন উকি মারিতেছে—ও নিশ্চয় সুধা! প্রকাণ্ড রথ নীচের তলায় একেবারে অন্ধকার—অবিনাশ গিয়া ডাকিও সুধা, সুধাতােমায় পড়তে হবে না—বেরিয়ে এসএস—কিছছু বােলব না—বেরিয়ে এস—কিন্তু সুধা কথায় ভুলিবার নয়—উচ্চবাচ্য কিছু নাই।•••অবিনাশ জাম গাছ হইতে পাকা পাকা জাম সমেত একটি ডাল বাড়াইয়া দিল—এবার ফল ফসিল- যেমন ভালে টান পড়িয়াছে অমনি অবিনাশ অন্ধকারের ভিতর হাত বাড়াইয়া তাহার গলা ধরিয়া ফেলিয়াছে—ধরিতেই ব্যা ব্যা শব্দ করিতে করিতে একটি ছাগলছানা বাহিব হইয়া আসিল।অবিনাশ দস্তুর মত ঠকিয়াছে। যাক্ কেহ কোথাও দেখিতে পায় নাই—কিন্তু যাহার জন্য এত—অবিনাশ ঘরে আসিয়া দেখে সে অখণ্ড মনােযােগ সহকারে পড়িতেছে—She can fly but the fox cannot ভাবিতে ভাবিতে হুস হইল—বেলা হইয়া গিয়াছে। তাড়াতাড়ি কুলুঙ্গির শিশি হইতে এক খামচা তেল লইয়া মাথায় দিতে দিতে চীৎকার করিয়া বলিল—ও কেষ্টা—ভাত দিতে বল- পাগলা মাষ্টার বলিলে ছেলেরা অবিনাশকেই বুঝিত।•••টিফিনের ঘণ্টায় ছােট মাষ্টাররা সবাই আসিয়া ছােট্ট ঘরখানিতে অষ্ট হয়। অবিনাশ ভিতরে দিনের পর দিন আসিয়া কোণের দিকে জায়গা করিয়া লইল। স্কুলের মাঠময় ছেলেরা হৈ হৈ করিয়া দৌড়ঝাপ লাগাইয়া দিয়াছে। ঘােট ঘর—গরমে সর্দিগৰ্ম্মি হইবার জোগাড়। দু’খানি পাখা, তাহাই হাত হইতে হাতে ফিরিতেছে।•••হেড পণ্ডিত একটি কাগজের বাণ্ডিল দেখাইয়া বলিলেন—পূজো এখন কোথায় ঠিক নেই—এরি মধ্যে দশ টাকা ফাকা খরচ হয়ে গেল। বৃদ্ধ রাইচরণবাবু বলিলেন—পরিবারের জন্যে কি কি নিলেন পণ্ডিত মশাই পণ্ডিত মশাই বাণ্ডিলটি খুলিতে খুলিতে বলিলেন—দশটি টাকায় ক’ গণ্ডা জিনিষ হবে আবার—ওই একটি তাও কি মনের মত হােল! এই দেখুন না— পণ্ডিত মশাই শাড়ীটি খুলিয়া লম্বা করিয়া ধরিলেন। ধরিয়া সকলের মুখের দিকে চাহিলেন। আশা করিয়াছিলেন সকলেই হয়ত ‘বেশ’ কিবা অমনি একটা কিছু বলিবে—কিন্তু হিংসুকের দল-জাত হিংসুক—কাপড়টা হাত দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া সকলেই দেখিল—দাম লইয়া আলােচনাও চলিল—কিন্তু ভুলিয়াও কেহ ভাল বলিল না—হেড পণ্ডিত নিরাশমনে বাণ্ডিলটি আবার বাঁধিতে লাগিলেন। কথার মােড় অন্যদিকে ফিরিল। রাইচবণবাবু বলিলেন—ছুটি এবার পিছিয়ে গেল শুনেছ বােধ হয়— সকলেই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল—কেন—কেন- রাইচরণ বলিলেন—ছেলেরা মাইনে দেয়নি একজন ছােকরা মাষ্টার বলিল—ওসব ভয় দেখান—সত্যি কি আর ছুটি পেছোয়ও রকম ঢের শুনে আসছি—হেড মাষ্টারের হুমকি । - • দিনের পর দিন হেড পণ্ডিত এতক্ষণ নিজের দুঃখে বিমর্ষ ছিলেন--এসব কথায় কান দেন নাই—হঠাৎ ছুটি পিছাইয়া যাইবার কথাটা কানে যাইতেই চকিত হইয়া বসিলেন, বলিলেন—ছুটি পিছিয়ে গেল-তাই নাকি?-কেন ?-দেশে যে আমি চিঠি লিখে দিয়েছি—জিনিষপত্র কিনেশেষে হেড পণ্ডিত মশাই বাহির হইয়া গেলেন।অবিনাশের পাশে বসিয়া পরিতােষবাৰু তামাক খাইতেছিলেন, বলিলেন—দেখলে অবিনাশ তৃতীয় পক্ষের বিয়ে করে পণ্ডিত পাগল হয়ে গেছে-চিঠি দেখনি?•••থামে চিঠি লেখে হে—এই বুড়ো বয়েসে—এতে মাগ্যির বাজারে—নীল খামে অবিনাশ হা-হু কিছু করিলনা দেখিয়া পরিতােষবাবু রাইচরণকে মুরুব্বি ধরিলেন। বলিলেন-বুঝলেন রাইবাবু—এ ঘর থেকে নাকি তামাক খাওয়া উঠিয়ে দেবে, সি ড়ীর নীচে ঘরখানায় তামাক খাবার ঘর হবে—এত ইস্কুলে মাষ্টারী করে এলাম মশাই—এমন আইন তাে কোথাও নেই- রাইবাবু বললেন—দিন হুকোটা বাড়িয়ে—আজ তামাক খেতে দেবেনা -কাল বিডি খেতে দেবেনা-শেষকালে কোনদিন ছােকরা মাষ্টারটি কথা শেষ করিলেন—শেষকালে কোনদিন বলবে মাথায় টেরি কাটতে পারবে না-বললেই হােল ছেলেরা খারাপ হয়ে যাবে—বলিয়া ছােকরা মাষ্টার নিজের চুলের উপর সযত্নে হাত বুলাইয়া লইলেন অবিনাশ ছাড়া সকলেই হাসিয়া উঠিল। হেড পণ্ডিত ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন—বলে এলাম।-মশাই ছুটি না দেন—রিজাইন দিতে হবে ছুটির পর অবিনাশ হেড পণ্ডিতকে ধরিল বলিল—পণ্ডিত মশাই কাপড়টা 'কোন দোকান থেকে কিনলেন—আমার যে একটা দরকার পণ্ডিত মশাই এই অবিনাশকে খাটি লােক ভাবিতেন। এত মাষ্টার আসিল গেল—তাহারই চোখের সম্মুখে—কিন্তু এমন নিরহঙ্কারী এমন নির্লোভ মানুষটি আর তিনি দেখেন নাই। বলিলেন-কাকে দেবে, পরিবারকে বুঝি? আজ্ঞেতা ছাড়া আর কে- পণ্ডিতমশাই চট্ করিয়া বলিলেন—দিও দিও—দেবে বৈকি–দেবে বৈকি। আমাদের তাে কত পয়সা কত দিকে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে—কত পয়লা—যাচ্ছে না ?—এই একটা পয়সাই কি কম?-এই যে তুমি পান খাও না—তামাক খাওনা—ওইতেই কি কম পয়সা বাঁচে ভেবেছ?- হিসাব করে দেখলে তাইতেই একটা বাড়ী ভােলা যায়--তাই ভাবি- ছােটবেলায়—মালেই খেলেছি কত পয়সার—আজে-বাজে খেয়েছিই কত কী—চিরস্থায়ী কিছু নেই—তা-ই জমালে আজ কত পয়সা ভাবদিকিনি ভাবদিকিনি একবার : অবিনাশ আপনমনে সেই কথাই ভাবছিল। সুধা তখন বড় হইয়াছে।-চড়কের মেলা দেখিতে গিয়া—অবিনাশ সুধাকে একটি বিলাতী মােমের পুতুল কিনিয়া দিয়াছিল—দাম নিয়াছিল দু’টাকা। দু’টাকা—এখন ভাবিলে অবিনাশের গায়ে জ্বর আসে। ন দেবায় ন ধৰ্মায় দু’টি টাকা একটা পুতুলের জন্য ব্যয়!' লােকে বলিবে কি ?-কিন্তু তখন ওই পুতুলটি সুধাকে কিনিয়া দিয়া অবিনাশ, যে আনন্দ পাইয়াছিল—সে আনন্দ আর জীবনে পায় নাই। জ্যাঠাইমা বলিয়াছিলেন—ও অবিনাশ—এ করেছ কি—এই আখকুটে মেয়ের হাতে দিনের পর দিন ওই দিয়েছ—ওকি আর থাকবে ভেবছ ?—এখুনি রাত না পোয়াতে ভাে করে ফেলবে- } কিন্তু সে পুতুল ভাঙে নাই। সেই পুতুলের পােষাক তৈরী হইল— পাড়ারই কোন একটি মেয়ের পুতুলের সঙ্গে আবার তাহার বিবাহ হইল অবিনাশ সে বিবাহে নিমন্ত্রণ খাইয়া আসিয়াছে। অবিনাশ বলিল-ছছাটবেলায়—বুঝলেন পণ্ডিত মশাই—বয়স তখন যােল সতের—আমি আমার এক জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ীতে থেকে পড়তুম -সেই সময়ে বােকামি দেখুন দু’টাকা দিয়ে একটা পুতুল কিনে দিয়েছিলাম একটি মেয়েকে হেড পণ্ডিত মশাই লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন—দু’টাকা-পুতুলের দাম—কি পুতুল হে?-এই তাে সেদিন আমার শালীকে দিয়েছি একটা কিনে—তা চার আনার কমে ছাড়লে —তা বলে দু’টাকা পুকুলের দাম—ঠকিয়ে নিয়েছে—ছেলেমানুষ দেখেছে—ঠকিয়ে নিয়েছে— রাত্রিবেলা খাওয়া দাওয়ার পর অবিনাশ বিছানার উপর চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। এক বছরের পরে আবার দেশে যাওয়া। সত্যবালা এখন অন্ধকার রান্নাঘরের দাওয়াটার উপর ঝাঁধিতেছে বােধ হয়। রান্নাঘর হইতে শােবারঘরের মেঝেটা নজরে পড়ে। টুকুটা হারিকেন জ্বালাইয়া গুন্ গুন্ করিয়া দেহ দোলাইয়া একমনে পড়িয়া যাইতেছে। মিমু হয়ত হারিকেনের কাছে অালাের পােকাগুলি লইয়া খেলা জুড়িয়া দিয়াছে।
দিনের পর দিন সত্যবালা চীৎকার করিয়া বলিতেছে—আর পড়তে হবে না—ছেলের খুব পড়া হয়েছে—সারাদিন দস্যিপনা করে রাতের বেলা তেল পুড়িয়ে পড়া—দে আলো নিবিয়ে দে-তেল বড় সস্তা না?—আসুক না সে সব ভােলা রইল—তখন খেয়ে মার— মিনু মার বাধ্য—বলিতে না বলিতে সে আলাে নিবাইয়া দিয়াছে। টুকু ভয়ে আকাইয়া উঠিয়া ভীষণ চীৎকার করিয়া একেবারে হাউ মাউ করিয়া প্রায় অজ্ঞান হইয়া পড়িবার জোগাড়। রান্নাঘর হতে সত্যবালা ছুটিয়া আসিয়া টুকুকে বুকের মধ্যে পুরিয়া বলিলেন—কি হয়েছে বাবা- এই তাে আমি রয়েছি—এই তো-তারপর মিনুর উপর মার। মেয়ে যেন দিন দিন ধিঙ্গী হয়ে উঠেছেন। যাবেন তাে পরের বাড়ী-লাথি ঝাটা খেয়ে মরবে সেখানে।কাজ নাই তো কেবল নষ্টামি আর খুনসুড়িতে ওস্তাদ। ছোট টিনের বাড়ী—চারিদিকে জঙ্গলে ভরিয়া গিয়াছে। বঁশঝাড় আসিয়া রান্নাঘরের চালের উপর ঝুকিয়া পড়িয়াছে। বর্ষার দিনে টিনের চাল দিয়া জল পড়ে—উই ধরিয়া বাশের ও শালের খুঁটি গুলি সব শেষ করিয়া দিয়াছে—তিরিশ টাকা মাহিনীর উপর সমস্ত নির্ভর। দেশে কতখানি দেনা বাড়িয়াছে—পূজোর মাসটা যাক—দশটা টাকা দিয়া সত্যবালার জন্য একখানা শাড়ী সে লইয়া যাইবে। কিছুই সে দিতে পারে নাই—দু’টি ছেলেমেয়ের জন্য সামান্য কিছু লইলেই চলিবে। রাত্রি তখন অনেক হইয়াছে।—তক্তপােষের তলায় ইদুরের নাচন চলিয়াছে-একটু যা ঘুম আসিয়াছিল—তাহাও ভাঙিয়া গেল।•••অবিনাশ ভাবিতে লাগিল। মধুহাসির সেই ঘরটিতে সে এমনি করিয়া শুইয়া থাকিত।স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে কখন ভাের হইয়া যাইত-সুধা আসিয়া দিনের পর দিন ঠেলিয়া ঠুলিয়া ঘুমকে দিত নিৰ্বাসন।—কিন্তু তবু তাহাই অবিনাশের ভাল লাগত। একটা দিনের কথা মনে আছে। সুধার বিবাহের কথা হইতেছে। কাহারা দেখিতে আসিবে। লােকজন আসিয়া গিয়াছে।•••বাড়ী হৈ চৈ পড়িয়া গিয়াছে— সিল্কের জামা পরিয়া বাহিরের ঘরে কয়েকজন লােক আসিয়া হাজির হইল। জ্যাঠামশাই অবিনাশকে বলিলেন-অবিনাশ দেখ ভেতরে কতদূর কী হােল—কিন্তু অবিনাশ ভিতরে গিয়া দেখে—সকলেই ভয়ে আতঙ্কে বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া আছে—সবই প্রস্তুত—সুধাকে পাওয়া যাইতেছে । আশ্চৰ্য্য কাণ্ড অমন মেয়ে যে আগেভাগেই এরূপ কাণ্ড বাধাইয়া বসিবে তাহা পূৰ্বেই সকলের জানা উচিত ছিল—কিন্তু তখন আর উপায় নাই। অবিনাশ সারাবাড়ী অলি-গলি খোঁজাখুঁজি করিল।•••ওদিকে দেরি হইয়া যাইতেছে—এমন কেলেঙ্কারীর কথা তাহাদেরও বলা যায় —জ্যাঠামশাই বাহির হইতে তাগাদা দিতেছেন—ও অবিনাশ দেরি কেন ? অবিনাশ বলিয়া আসিল—আর একটু দেরি হবে জ্যাঠামশাই- একটু—কিন্তু তখনও মেয়ে পাওয়া যায় নাই। রথতলা দেখা হইল- বাগান দেখা হইল—ডাকাডাকি যতটা সম্ভব হইল—কিন্তু মেয়ে যে কোথায় লুকাইল তাহার আর পাত্তাই নাই। বাড়ীতে আর একটা মেয়ে নাই যে তাহাকে দেখান হইবে। কী হইবে, কী হইবে হইতেছে—এমন সময়ে অবিনাশ নিজের ঘরে আসিয়া দেখে—তাহারই খাটের উপর তাহারই লেপ চাপা দিয়া সুধা চুপ করিয়া পড়িয়া আছে। লেপ খুলিতেই সুধা কাতরস্বরে বলিয়া উঠিল—ও মাষ্টার মশাই আপনার ।
নিরপর দুটি পায়ে পড়ি—কাউকে বলবেন না—দু’টি পায়ে পড়িগ্যাঠামশাই অবিনাশ বলিল—কেন ভয় কিসের তােমার-ওরা তােমায় খেয়েও ফেলবে না—কিছুই না—বিয়ে করে নিয়ে যাবে—বেশ ধুমধাম-বাজনা বাজবে—দেখােনা তখন সুধা রাগ করিয়া বলিয়াছিল—না আমি বিয়ে কোরব না ওদের সুধার অনুনয় বিনয়ে সেদিন কাজ হয় নাই—অবিনাশ সেই পলায়নপরা সুধাকে ধরিয়া সাজাইয়া গুজাইয়া বাহিরের ঘরে পাঠাইয়া দিয়াছিল। সেদিন সুধার কী রাগ।-পরদিন ঘুম হইতে উঠিয়া অবিনাশ দেখে তাহার বিছানার কাছে মাথার উপর দেয়ালের গায়ে কে লিখিয়া রাখিয়াছে—“মাষ্টার মশায় ভারী দুষ্টু।” লেই সব দিনের কথা ভাবিতে ভাবিতে অবিনাশ তন্ময় হইয়া গেল। কিন্তু একদিন সত্য সত্যই সুধার বিবাহ হইয়া গেল। সারা বাড়ী ধুমধাম: অবিনাশের সেদিন খুব কষ্ট হইয়াছিল।•••কোনও কারণ নাই- কিন্তু অবিনাশ নিজেই বলিতে পারেনা কেন—যখন সুধা প্রথম শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেল—ষ্টেশনের ধারে দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া অবিনাশ কত কী ভাবিয়াছিল। তারপর দেশে ফিরিয়া অবিনাশের নিজেরই একদিন বিবাহ হইয়া গেল। কিন্তু সেই হইতে অবিনাশ হাসিতে ভুলিয়া গিয়াছে। স্কুলের ছেলেরা তাহাকে পাগল মাষ্টার বলিয়া ডাকে—অবিনাশ তাহা জানে। কিন্তু জানিয়াও অবিনাশ আরও গম্ভীর হইয়া থাকে।হেড পণ্ডিত ঠিকই বলিয়াছে—এই যে তুমি পান খাওনা-তামাক খাওনা—ওইতেই কি কম পয়সা বাঁচে ভেবেছ ?—হিসেব করে দেখলে তাইতেই একটা বাড়ী ভােলা } দিনের পর দিন . যায়-তাই ভাবিছােটবেলায় মার্বেলই খেলেছি কত পয়লা-আৰুে বাজে খেয়েছিই কতকী—চিরস্থায়ী কিছু নয়—তা-ই জমালে কত পয়সা হােত ভাবদিকিনি—ভাবদিকিনি একবার অবিনাশ ভাবিতে লাগিল : বােকামি সে অনেক করিয়াছে—কিন্তু সেই যে দু’টাকা দিয়া একটা বিলাতী পুতুল কিনিয়া সুধাকে দিয়াছিল- সেরূপ বােকামির তুলনা নাই- •••সেই দু’টাকার শােকে আজ অনটনের দিনে অবিনাশের চোখে জল আসিল। তৎক্ষণাৎ তাহার মনে পড়িলদেশে তাহার ছেলেমেয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাইতেছে। এই যে পূজা আসিতেছে—সত্যবালা ভাবিতেছে—স্বামী তাহার কতকি লইয়া যাইবে—বাড়ীর দাওয়া হইতে দুরে ষ্টেশনের পথের বাঁকা কোটি দেখা যায়—সেইদিকে চাহিয়া সত্যবালা দিন গােনে। শীতের সকালবেলা টুকু গায়ে দোলাই বাঁধিয়া মুড়ি খাইতে বসিয়াছে —মি সকালে পান্তাভাত খাইয়াছে সুতরাং মুড়ি সে পায় নাই—টুকুর কাছে আসিয়া আস্তে আস্তে বলিল-ওটুকু তাের খাওয়া হােয়ে গেলে আমায় একটু দিস্ ভাই—দিবি তাে ? টুকু বলিল—দেবো বােস্ এখানে টুকু খাইতে লাগিল--তাহার হাতের ওঠা-নাবার সঙ্গে সঙ্গে মিনুর চোখও উঠিতে নাবিতে লাগিল। কিন্তু সবকটি মুড়ি শেষ করিয়া টুকু খালি বাটিটা আগাইয়া দিয়া বলিল—এই নে—খা- মিনুর রাগিবারই কথা।-রাগের মাথায় মিনু চটাস করিয়া টুকুর গালে এক চড় বসাইয়া দিল—আর কোথায় যায়—টুকু সশকে পাড়া মাতাইয়া কান্না জুড়িয়া দিল। কান্না শুনিয়া মিনু পলাইয়াছে—সত্যবালা দিনের পর দিন আসিয়া ছেলেকে শান্ত করিলেন।—আসুক সে মেয়ে পিঠ আর অন্ত রাখছি নি—তুমি কেঁদোনা টুকু টুকু অমনিতে শান্ত হইল না নুতন করিয়া মুড়ি আসিল মুড়কী আসিল নাডু আসিল। পালাইয়া বেড়াইতে বেড়াইতে মিনুর তখন ক্ষুধা পাইয়াছে-এক ফাকে ঘরে ঢুকিয়া বিছানায় গিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। দুপুর গড়াইয়া গেল—মি কোথায় গেল—সত্যবালা ভাবিয়া অস্থির। তাহার খাওয়া হইল না। এ বাড়ী ও বাড়ী খোঁজা হইল—অভিমানী মেয়ে কোথায় গেল-কে জানে। সত্যবালার চোখে জল আসিল । বাড়ীতে একটা লােক নাই—গিয়া খুঁজিয়া আনিবে । কিন্তু শেষে দেখা গেল ধরে লেপ চাপা দিয়া মিনু শুইয়া আছে। তখন ডাকিয়া তখন ডাকিয়া ঘুম ভাঙাইয়া সাধিয়া খাওয়ানাের পালা। অতি তুচ্ছ দৈনন্দিন ঘটনা—অবিনাশ অন্ধকার ঘরের ভিতর শুইয়া কল্পনা-সৌধ গড়িয়া তুলিল। একটা থার্ডক্লাশ কামরা দেখিয়া অবিনাশ ট্রেনে উঠিয়া পড়িল। হাতের বাণ্ডিলটি একপাশে ভাল করিয়া রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। দেশের ষ্টেশনে যখন এ ট্রেন পৌছিবে তখন রাত্রি।•••সেই রাত্রে তিন ক্রোশ পথ হাঁটিয়। তবে বাড়ী। বাড়ীর বাহিরে গিয়া অবিনাশ ডাকিবে- টুকু, ও টুকু টুকুরেটুকু মিনু সবাই তখন ঘুমাইতেছে। দোর খুলিবে সত্যবালা। হারিকেন জ্বালা হইবে। সত্যবালা ঘটি করিয়া পা ধুইবার জল আনিয়া দিবে-গামছা দিবে—তারপর পাখা আনিয়া বাতাস করিবে। জিজ্ঞাসা দিনের পর দিন করবে কেমন ছিলে–রােগা রােগ দেখাইতেছে যে—শরীরের যত্ন না লইলেক’দিন টিকিবে ইত্যাদি।অবিনাশ গাড়ীতে বসিয়া তখনকার সমস্ত ঘটনাটি কল্পনায় আনিতে পারে। সত্যবালা বলিল—ওতে কি, ওই যে কাগজে মােড়া ? -তােমার কাপড় -কেন আমার আবার কাপড় আনতে কে বললে—সত্যবালা খুব খানিক রাগ করিবে। অবিনাশ বলিবে—কেউ না বলুক—আমার বুঝি দিতে ইচ্ছে কবে না। দিতে ইচ্ছে করলেই বাআব তোমার পায়ে যে জুতাে নেই- তামা ছিড়ে গেছে—সে দিকে দেখেছ- অবিনাশ বলিবে—হাইস্কুল মাষ্টাবেব আবাব জামা কাপড়—আমাকে বাই পাগলা মাষ্টার বলে—তা জান- —বলবেই তাে। সত্যবলা যতই বলুক—শাড়ীটা বার বার কবিয়া ঘুবাইয়া ফিরাইয়া দেখিবে।—পছন্দ তাহার নিশ্চয়ই হইবে। শাড়ীখানি পরিলে সত্যবালাকে কেমন মানাইবে—গাড়ীব এককোণে বসিযা অবিনাশ তাহাই ভাবিতে লাগিল।•• দেশের ছােট বাড়ীখানি ঘিবিয়া, আবার কল-কোলাহল উঠিবে। সকাল সন্ধ্যা দুই শিশুকে লইয়া যতবাজ্যেব গল্প। চাদের আলােয় বসিয়া স্কুলের ছেলেদের গল্প, শহবের গল্প-কত গল্প অবিনাশ বলিবে—ওদিকে সত্যবালা তাড়া দিবে—হারিকেনটা কেন মিছি মিছি জ্বলছে—চাদের আলােয় তত বেশ দিব্যি দেখা যায়। সংসারের স্বচ্ছলতা আনিবার সত্যবালার কি প্রয়াস '••• ছেলেটার জন্য একটা পাঞ্জাবী কিনিয়াছে মেয়েটার একটা ডুরে- দিনের পর দিন । শাড়ী। ষ্টেশনের পর ষ্টেশন চলিয়া যাইতেছে। পান নয়া নয় চুপ করিয়া বসিয়া থাকা—অবিনাশের কোনও অসুবিধা নাই। হঠাৎ কী একটা ষ্টেশনে আসিয়া গাড়ী থামিল-অবিনাশ উকি মারিয়া দেখিল- মধুহাসি। অকস্মাৎ কী হইল কে জানে—অবিনাশ পোটলাটি হাতে করিয়া লইয়া মামিয়া পড়িল। সেই পুরনাে ষ্টেশন—চিনিতে এতটুকু অসুবিধা নাই। সুধা হয়ত পূজার সময় এখানে আসিয়াছে—একবার দেখা করিয়া গেলে হয় ••পরিচিত পথ—অবিনাশ হাটিয়া চলিল। দেখা হইলে প্রথমে কী কথা’হইবে কে জানে। অবিনাশের মনে হইল লোকে যে তাহাকে পাগল বলে—তা ঠিকই। এখন কোথায় সে দেশে যাইবে, দেশে গিয়া আমােদ- আলাদ করিবে তা নয়—কবেকার পরিচিত দূরসম্পর্কের আত্মীয় কে একটি মেয়ে সুধা, তাহাকে দেখিতে সে চট্ করিয়া নাবিয়া পড়িল। জ্যাঠামশায়ের বাড়ীতে পূজা হয়—ধুমধামের সে বাড়ীতে আর অন্ত নাই। একবার শুনিলে হয় যে অবিনাশ আসিয়াছে অমনি-সুধা মাষ্টার মশাই মাষ্টার মশাই বলিয়া ছুটিতে ছুটিতে আসিবে—ঠিক আগেকার মষ্টার মশায়ের হাত ধরিয়া এ পাড়া ও পাড়া সাতপাড়া বেড়াইতে যাইবে। মুক্তটা দিন অবিনাশকে উদ্ব্যস্ত করতুলবে।-অবনণি পা চালাইয়া চলিল।অবিনাশের একটু দুঃখ হইল-সুধার জন্য তো কিছুই আনা হয় নাই—যদি ঠিক থাকিত এখানে নাবিবে তাহা হইলে একটা কিছু অনিত বৈকি। এখন আর উপায় নাই। অবিনাশ স্পষ্ট দেখিতে পাইল সৰ্বাঙ্গ চেলী-মণ্ডিত বধু অবিনাশের খাটের পুরো জড়াইয়া ধরিয়া আছে—যে আসিতেছে অহাকেই মারিতেছে—ঠেলিয়া দিতেছে, আবদার ধরিয়াছে—শশুরবাড়ী সে কিছুতেই মত विमानषिम যাইবে না। যাইবে না—যাইবে না—কে কি করিতে পারে—করুক। ওদিকে পাঝীর ভিতর বর প্রস্তুত-লােকজন হাজির।-আদুরে মেয়েকে লইয়া মহা মুস্কিলেই পড়া গেল। ভিতরে আসিয়া জ্যাঠামশাই পৰ্য্যন্ত সাধিয়া গেলেন—কিন্তু পাথরের শিবকে সাধিলেও বর পাওয়া যাইত-সুধা এতটুকু নড়িল না। শেষে ধরিয়া বঁধিয়া পাল্কীতে তুলিবার ব্যবস্থা হইতে লাগিল—কিন্তু তাহার আর দরকার হইল না—অবিনাশ আসিয়া একবার অনুরোধ করিতেই সুধা রাজী হইল। কিন্তু যাইবার আগে দেয়ালের গায়ে যেখানে লেখা ছিল—মষ্টার মশায় ভারী দুষ্টু।—সেইদিকে চাহিয়া রাগে গটগট করিয়া পা ফেলিয়া চলিয়া গেল। আজ এতদিন পরে সেই সব কথা সুধাকে মনে করাইয়া দিলে সুধা রাগিয়া উঠিবে না হাসিবে অবিনাশ তাহাই ভাবিতে লাগিল। সুধা বা মেয়ে-অবিনাশ পৌছিলে সে একাই হয়ত হুলস্থূল বাধাইয়া দিবে। তাহাকে খুব লজ্জায় ফেলিবে যাহােক। ঠাটাও কি কম করিবে—স্নান করিয়া আসিয়া হয়ত দেখিবে—ফরসা কাপড়টা কে ভিজাইয়া দিয়াছে—ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিবে—জুতাজোড়া কোথায় অন্তর্ধান হইয়াছে।••• দেখিতে দেখিতে বাড়ী আসিয়া গেল। সেই পরিচিত বাড়ী ! ভিতরে জ্যাঠামশাই বসিয়াছিলেন—এখন আরও বৃদ্ধ হইয়াছেন। অবিনাশ গিয়া পায়ের ধূলা লইয়া প্রণাম করিল। জ্যাঠামশাই বলিলেন-যাও অবিনাশ ভেতরে যাও অবিনাশ কম্পিতপদে ভিতরে ঢুকিল। এখনি হয়ত কোন ফাক দিয়া সুধা বাহির হইয়া আসিয়া হৈ চৈ বাধাইয়া দিবে। অবিনাশ প্রতি মুহুর্তে দিনের পর দিন সুধার আবির্ভাব প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। বাড়ীতে কত অগণি অপরিচিত শিশুর আবির্ভাব হইয়াছে—অবিনাশ কাহাকেও চিনিতে পারিল না। নুতন লােক-নুতন মুখ—অথচ উহারা সবাই পুরাতন, অবিনাশই যেন আজ নতন। অবিনাশকে উহারা জানে না। উহার জানে না কতদিন এ বাডীব কোনও কাজ অবিনাশ না হইলে হইত না। অবিনাশ আগন্তুকের মত চারিদিকে ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল। হয়ত এখনি সুধা বাহির হইয়া আসিবে। আসিয়া এতদিন দেখা না করার জন্য কত অনুযােগ অভিযােগ করিবে। তারপর দুষ্টু বলিয়া তিরস্কার করিবে। সেই মধুর তিরস্কার লাভের আশায় অবিনাশ চারিদিক বেড়াইয়া বেড়াইয়া দেখিতে লাগিল। পূজাবাড়ী দালানে একদল ছেলে খেলা করিতেছে। একটি মেয়েকে ঠিক সুধার মত দেখিতে—হয়ত সুধারই মেয়ে।•••অবিনাশ কাছে গিয়া ডাকিল—ও খুকি-খুকি শােন- শুনে যাও। মেয়েটি সুধারই মত দুষ্ট হইয়াছে। অবিনাশের ডাকে এক দৌড়ে পলাইয়া গেল। একবার অবিনাশের মনে সন্দেহ হইল—সুধা আসিয়াছে তত! নিশ্চয় আসে নাই--আসিলে এতক্ষণ তাহার সহিত দেখা হইত নিশ্চয় !...নিশ্চয় আসে নাই—নিশ্চই! হয়ত কাল আসিবে। সুধার সঙ্গে দেখা না করিয়া অবিনাশ যাইতেছে না। শেষকালে সুধা আসিয়া যে বলিবে—মাষ্টার মশাই সে-ই আসিল-আর একটা দিন থাকিয়া দেখা করিয়া যাইতে পারিল না ! ঘুরিয়া, ফিরিয়া অবিনাশ আবার জ্যাঠামশাই-এর কাছে আসিল। বলিল—সুধা এসেছে জ্যাঠামশাই? • জ্যাঠামশাই বলিলেন-কবে !•••ওপরে আছে দেখা করগে- দিনের পর দিন । অবিনাশ আবার ভিতরে আসিল। কিন্তু উপরে যাইতে তাহার যেন কেমন সঙ্কোচ হইতে লাগিল। বাড়ীতে কত নূতন বউ আসিয়াছে- পাড়ার কত স্ত্রীলোেক আসিয়াছে—হট করিয়া সুধা’ ‘সুধা বলিয়া ডাকিলে —লােকেই বা বলিবে কি! অবিনাশেরও এখন সে বয়স নাই। সুধাও এখন হয়ত কত বড় হইয়াছে। নীচের লােক উপরে উঠিতেছে—উপরের লােক নীচে আসিতেছে—সিড়ীর গােড়ায় দাড়াইয়া অবিনাশ যাই কি না যাহ করিতে লাগিল। হয়ত এক পাল মেয়ের মধ্যে সুধা বসিয়া আছে- সেখানে তাহার হঠাৎ যাওয়াটা কেমন যেন দেখাইবে। আর এখানে আসিবার তো তার কোনও ঠিক ছিল না।-কাপড়টাও ময়লা-দাড়ি কামান হয় নাই—জামাটার স্থানে স্থানে ছিড়িয়া গিয়াছে। নিজের দৈন্য নিজের কাছে আজ প্রথম ধরা পড়িল। কাজ কি উপরে গিয়!—সুধা হয়ত এখনই নামিবে। তখনই একটু দেখা করিয়া ব্যাস-সন্ধ্যার গাড়ীতে সে এখান হইতে চলিয়া যাইবে। তবে সুধা ছাড়িলে হয় ? হয়ত বলিবে- পুজার ক’দিন থাকিয়া যাও—যে আদুরে মেয়ে-বলিলেই হইল।—তাহার কথা এড়ায় কাহার সাধ্য।••• উপর হইতে জ্যাঠাইমা নাবিতেছিলেন! অবিনাশ পায়ের ধুল। লইয়া প্রণাম করিল। জ্যাঠাইমা শুধু বলিলেন—এই যে অবিনাশ কখন এলে বেশ বেশ, ভাল আছ তো? হঠাৎ অবিনাশ হাতের বাণ্ডিলটি দেখাইয়া বলিল-এইগুলো সুধার জন্যে এনেছিলাম জ্যাঠাইমা—সুধা কোথায় তাকে দেখছিনে তো? কাপড়ের মােড়কটা জ্যাঠাইমা হাতে করিয়া নিলেন। রলিলেন- দাডাও বাবা—দিচ্ছি তাকে পাঠিয়ে-বলিয়া তিনি আবার উঠিয়া গেলেন।••• । অবিনাশ কম্পিত বক্ষে নীচে দাঁড়াইয়া রহিল। হৈ হৈ করিতে করিতে সারা বাড়ী পাইতে কঁপাইতে সুধা এখনি আসিল বলিয়া! এখনি আসিয়া মাষ্টার মশায়ের দুই হাত ধরিয়া হয়ত উপরে লইয়া যাইবে—তারপর কত কথা।•••এতদিন আসেন নাই কেন-সুধার কথা আর মনে পড়ে না বােধ হয়—পূজার সময় অন্তত একবার আসিলে তাে হয়—ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে অবিনাশ একেবারে বিব্রত হইয়া পড়িবে।••• অবিনাশ একটি ছেলেকে উপরে পাঠাইয়া দিল সুধাকে খবর দিতে, যে তাহার মাষ্টার মশাই আসিয়াছে।অবিনাশ নীচে হইতে শুনিল ছেলেটি চীৎকার করিয়া বলিতেছে—ও সুধাদি সুধাদিতােমার মাষ্টার মশাই এসেছে শােননি। সুধার গলার শব্দ আসিল-এসেছে তাে কি হবে—নাচতে হবে- কতবার শুনবাে ?- অবিনাশের সন্দেহ হইল সে হয়ত ভুল শুনিয়াছে।—কি হয়ত মাষ্টার মশাই বলাতে চিনিতে পারে নাই-নামটা বলিয়া দিলেই হইত । কিন্তু অনেকক্ষণ কাটিয়া গেল-কাহারাে আসিবার নাম নাই। অবিনাশের দাঁড়াইয়া থাকিতে কেমন লজ্জা বােধ হইতে লাগিল। এত স্ত্রীলোক যাতায়াত করিতেছে, এখানে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের দাড়াইয়া থাকা ভাল দেখায় না। অবিনাশ সরিয়া সেই নিজের পুরাতন ঘরখানির ভিতর আসিল। একবার অবিনাশের মনে হইল—সুধার অসুখ হয় নাই ততা। ডাক্তারে হয়ত চলাফেরা বারণ করিয়া দিয়াছে। নিশ্চই তাই। নহিলে খবর পাইয়াছে—মাষ্টার মশাই আসিয়াছে—তবু আসিল কেন ? সন্ধ্যাবেলা বাজনা বাজিয়া উঠিল। জাকজমকে সারা বাড়ী মুখরিত।
বিলের পানি অবিনাশ এদিক ওদিক ঘােরা-ফেরা করিতে লাগিল। মেয়েরা আসা- যাওয়া করিতেছে। একদল ছােট ছেলেমেয়ে খেলা করিতেছিল- অবিনাশ সেই মেয়েটিকে গিয়া ডাকিল-ও-খুকি—শােন-শুনে যাও- ছােট মেয়েটি আসিল না। অবিনাশ ছুটিয়া তাহাকে ধরিতে গেল। মেয়েটি পেয়ারা চিবাইতেছিল—উপায় না দেখিয়া সেই চৰ্বিত পেয়ারা থুথুসমেত অবিনাশের গায়ের উপর নিক্ষেপ করিল। অবিনাশ কাণ্ড দেখিয়া হতবম্ব হইয়া গিয়াছে; নিকট দিয়া কে একজন বাড়ীর লােক যাইতেছিল—দেখিয়া বেশ করিয়া দু’টি কান তাহার মলিয়া দিল। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে যেন প্রলয় হইয়া গেল—সারা বাড়ী মাতাইয়া মেয়েটি এমন চীৎকার সুরু করিল—যেন কে তাহার দু’টি কান সমূলে উৎপাটিত করিয়া দিয়াছে। বাড়ীর যে-যেখানে ছিল—সব সেই উঠানে আসিয়া জড় হইল। জ্যাঠামশাই ছুটিয়া আসিলেন—জ্যাঠাইমা আসিলেন—সকলেরই মুখে এক কথা—কি হয়েছে রে পুটু ?•••পাড়ায় লােকের সহানুভূতির প্রবল্যে মনে হইল সত্যই যেন কে তাহার দু’টি কানকে ছিড়িয়া লইয়াছে। এতক্ষণ পরে পুটুর মা খবর পাইয়া উপর হইতে নাবিয়া আসিল। অবিনাশ দেখিল সুধ। অনেক মােটা হইয়া গিয়াছে—চেনা যায় না--গলার স্বর বদলাইয়াছে—সারা গায়ে গহনা আর ধরিতেছে না—গর্বে দেহের মেদ যেন ফাটিয়া বাহির হইয়া আসিতেছে।অবিনাশের দিকে চাহিয়াও সুধা যেন চাহিল না।-পুটুকে কোলে করিয়া বলিল—অমন আত্মীয়তা কে দেখাতে বলেছিল—পাঁচ টাকার শাড়ী এনে আত্মীয়তা পাতানো- আসতেও কেউ বলেনিনেমন্তন্নও কেউ করেনি—আমার ছেলে অসভ্য আমার মেয়ে অভদ্র-কারুর তো পাচ্ছেনা তারা-কারুর বাড়ীও যাচ্ছেনা ০ । দিনের পর দিন মাষ্টারী ফলাক নিজের বাড়ী গিয়ে—বলিতে বলিতে সুধা আবার উপরে গিয়া উঠিল। কথাগুলি আসিয়া অবিনাশের গায়ে তীরের মত বিধিল। কোথা হইতে কী হইয়া গেল—যেন ভােগবাজি। অবিনাশের মনে হইল—সে যেন দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া স্বপ্ন দেখিতেছে। আর এক মুহূর্তও তাহার এ বাড়ীতে থাকিতে লজ্জাবােধ হইল।—অবিনাশ নিজের ঘরের কাছে গিয়া দেখিল-দয়ালের উপর আজো লেখা রহিয়াছে—‘মাষ্টার মশাই ভারী দুষ্টু-অবিনাশের মনে হইল সুধাকে ডাকিয়া আনিয়া ওই লেখাটি দেখায় -কিন্তু তখনই তাহার মনে হইল-সুধা মরিয়া গিয়াছে—সে সুধা মরিয়া গিয়াছে।বিবাহ হইবার আগেকার সে সুধা আজ বাঁচিয়া নাই। সবার অজ্ঞাতে অবিনাশ পথে বাহির হইয়া আসিল। এ জীবনে সে আর এ বাড়ী আসবে না। তৎক্ষণাৎ তাহার মনে পড়িল পূজার সেই শাড়ী আর দুই ছেলেমেয়ের কাপড় সে ওই সুধাকেই দিয়া আসিয়াছে। অবিনাশ জীবনে অনেক আহাম্মুকী করিয়াছে-দু’টাকা দিয়া বিলিতী মােমের পুতুল কিনিয়া পরকে বিলাইয়া দিয়াছে—কিন্তু এমন বােকামি জীবনে সে করে নাই। এখন আর ফিরিয়া চাওয়া যায় না। সত্যবালা পূজার সময় একখানি ধুলি-মলিন কাপড় পরিয়া কাটাইবে—খুকু আসিয়া বলিবে—বাবা কি এনেছ দেখি ? -আর এ-বাড়ীতে এই ধনীর প্রাসাদে এ-শাড়ীর হয়ত কোনও মুল্যহ নাই। হয়ত কেহ পরিবে—হয়ত পরিবে না। অবিনাশের মাথাটা দুই হাতে টানিয়া ছিড়িয়া পিষিয়া ফেলিতে ইচ্ছা হইল। সুধা মরিয়া গিয়াছে—এ-সুধা-সে-সুধার প্রেতাত্মা।—অবিনাশের মাথার ভিতর সও গােলমাল হইয়া গেল।
দিনের পর দিন ষ্টেশনের প্লাটফর্মের ধার হইতে দূরে নীল কয়েকটা আলাে দেখা যায়। এখনই ট্রেন আসিবে। অবিনাশ দুই চোখ বুজিয়া চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল !•••তাহার মাথাটা রেলের চাকার তলায় গুড়াইয়া যাক--পিষিয়। যা—তবে শান্তি হইবে। কাল ভাের বেলা এ ট্রেন দেশে গিয়া পৌছিবে- বাবলা গাছ-ইউনিয়ন বাের্ডের সাকো—তারপর রায়-দীঘি—সত্যবালার সকালেই ঘুম ভাঙে-দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিবে—আসিয়া দেখিবে হুলুস্থুল কাণ্ড–টুকু উঠিবে মিনু উঠিবে—উঠিয়া শুনিবে—তাহাদের বাবা রেলে কাটা পড়িয়া মারা গিয়াছে••• অবিনাশ চোখ বুজিয়া স্বপ্ন দেখিতে লাগিল।
বিষ অফিসের দেরি হয়ে গেছে, অজয় ঘড়ির দিকে চেয়ে চমকে উঠলো। মার্চেন্ট অফিস—বড় সাহেব বদমেজাজী—দেরি হলে হয়রানির অন্ত থাকে না। আজ পাঁচ বছর অজয় চাকরি করছে—হিসেব করলে দেখা যাবে যে নিয়মিত সময়ে অজয় অফিসে হাজির হয়েছে অর্ধেকেরও কম দিন। কিন্তু অজয় ভাবলে-কপাল জোর তাই চাকরি তার টিকে আছে, নইলে শােভাকে নিয়ে পথে দাড়াতে হােত। পথেই তাে তাকে দাড়াতে হোত! শােভা! নামটা মনে পড়তেই অজয় নিঃশব্দে হেসে উঠলো। শাভাই বটে! অজয় সম্পূর্ণ এক গ্লাস জল এক চুমুকে শেষ করলে। হাতে জল দিতে দিতে আবার ভাবলে—শােভাই বটে ঠিকে লােক ভাত বেঁধে চলে যায়—যাবার আগে অজয়ের জন্যে একখিলি পানও সেজে রেখে যায়। পানটা মুখে পুরে অজয় জুতাের ফিতে বাঁধতে লাগলো। কাল রাত্রে অজয়ের ঘুম হয়নি। আজ চার বছর থরে ভালাে করে কোনও দিন ঘুমােতে পেয়েছে একথা অজয়ের মনে পড়লো না। সারারাত শােভার যন্ত্রণাকাতর গােঙানি অজয়কে এক- দণ্ডের বিশ্রাম দেয় নি। বাড়ীর বাইরে গেলেই অজয় যেন ভালো থাকে। অফিসের ফাইলের খাতায় যেন অজয় মুক্তি খোঁজে। আত্মীয়হীন, স্বজনবান্ধবহীন অবস্থায় অজয় তৃপ্তি চেয়েছিল বিবাহিত জীবনে। একটি প্রীতিমতী বালিকা হবে তার গৃহলক্ষ্মী, তার সহধর্মিণী -যত্নে সেবায় প্রেমে আত্মদানে যে তার জীবনকে বসায়িত করে তুলবে। আরো বেশী করে চেয়েছিল তৃপ্তি—পরিমিত আকাঙ্ক্ষায় যে করবে দিনের পর দিন স্বস্তিবাচন—যার কল্যাণম্পর্শে তার স্বল্প-পলির জীবন হবে কৃতার্থ যার -ইত্যাদি ইত্যাদি-অজয় কল্পনা করেছিল অনেক ঘরের ভেতর ময়লা কাপড়টা কুঁচিয়ে রেখে অজয় পরিপাটি হয়ে দাড়ালাে। চার বছর ধরে অফিস যাবার সময় অজয় যেমন করে শােভার কাছে বিদায় নেয় আজও তেমনি করেই নিতে গেল। স্নেহা স্বরে বললে- তাহলে- অজয়ের কথা শেষ হবার পূর্বেই শােভা বলে—এস- আজ কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটলাে। শােভার গলায় এত শক্তি কোথায় ছিল কে জানে। অজয়ের মনে হােল সে যেন চীৎকার করছে : কাল কত রাত করে এলে-জানাে আমার ভারী ভয় করছিল—আজ একটু সকাল সকাল শােভার আর মিনতিবাচক। কিন্তু অজয়ের মনে হােল এ সুর যেন অক্ষমের বিদ্রোহের সুর। অজয় বললে—সাধ করে কি আর বাড়ী আসি না—অফিসের কাজ ততা আর বউ-এর অনুখ শুনবে না- শােভা শুনলে–মৃদুস্বরে শুধু বললেন, তাই কি বলেছি আমি- হঠাৎ আবার ঘড়ির দিকে চাইতেই অজয় লাফিয়ে উঠলো। আর বাড়ানো যায় না। ঘরের চারদিক দেখে নিয়ে অজয় বেরিয়ে আসছিল। হঠাৎ আলমারির ভেতর ছােট লাল ওষুধের শিশিটা যেন অকষ্মাৎ উজ্জল হয়ে উঠলাে। অজয় শোভার দিকে মুখ ফেরালে। নিরাভ কঠিন জীবন দিনের পর দিন শুধু কঙ্কালচার বছরের বােগশষ্যা আজ রােগিণীকে মুখব্যাদন করে ব্যয় করছে। অজযেব অফুরন্ত যৌবন—অজয়ের দৃষ্টির সামনে সবুজ স্বপ্ন আর লাল কামনা। পঁচবাব হর্দম স্পৃহা অজয়ের শিরায় শিরায় সঞ্চারিত হয়ে গেল। নিরুপদ্রব জীবনে একি অনাবশ্যক অশান্তি। অজরে দুই পায়ে ভর দিয়ে সােজা হয়ে দাড়াতে ইচ্ছে হােল । সােজা হয়ে সে দাড়াবে—দৃডকণ্ঠে সে ঘােষণা করবে যে সে-ও সচল, সে-ও সুখী, সে-ও মানুষ—বিবাহ কবে সে বিড়ম্বিত হতে আসেনি। যা বাহুল্য কিম্বা যা অনাবশ্যক তা সে সর্বান্তঃকরণে ত্যাগ করবে। না, তাব কর্তব্যবােধ নেই—সহানুভূতি নেই—মেহলেশহীন আত্মসুখসর্বস্ব যুবক সে। বিবাহ করেছে বলে সে পাগল নয়। সে স্বার্থপর-আত্মপরায়ণ -বস্তুতান্ত্রিক। আইনানুযায়ী সে নিজের সুখ-পথের বিদ্যুকে অপসারণ করবে—অজয় নির্নিমেষ চোখে শিশির ভেতরে লাল রঙের তরল পদার্থটা লক্ষ্য করলে। চক্ষের পলকে ঘব, বাড়ী, দেয়াল, চেয়াব টেবিল, আকাশ, পৃথিবী—সমস্ত রূপান্তবিত হয়ে গেল। অজয়ের মনে হােল তার অতৃপ্ত-কামনা আজ সারা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হযে গেছে ; অজয় চোখ বুজলে। শােভা এবার কথা বললে—না, অফিস তােমায় কামাই করতে হবে —আজকে ভালই তো আছি- আজ অজয়েব কী হােল কে জানে। চাকরি যদি যায় তাতেও তার আপসোস করবার কিছু থাকবে না। চাকরি হয়ত আবার আসবে কিন্তু এই মুহূর্ত ? মৃদু সহানুভূতিতে ভরিয়ে দিয়ে অজয় বললে—তােমার তত মাথা ধরে বলছিলে না?
দিনের পর দিন শােভা যেন অনেক দিন পরে কৃতার্থ হয়ে উঠলাে—আর সবই তাে গেছে এই মাথা ধরাই এখন রয়েছে কেবল অজয় শিশির ওপর ‘poison' লেখা লেবেলটা নখের আঁচড়ে তুলে ফেলে- শােভা বলে উঠলো—ওগাে দেখ—এই দিকে চেয়ে দেখ—এই হাতটা একটু মােটা হয়েছে না? ও-বাড়ীর বুলীর-মা কি বলছিলাে জানাে= অজয় সমস্ত শক্তি দিয়ে মনে মনে বললে—আমার কোনও অপরাধ নেই ঈশ্বর—আমি নিস্পাপ—আমার কোনও অপরাধ নেই—আমি শুধু নিজের মুক্তির পথ পরিষ্কার করছি।—আমাকে মার্জনা কোনাে শোভা আনন্দে গলে গেছে। বলে--আর দেখ, অনেকদিন পরে সেন বউদি এসেছিল-তা’ দেখ নতুন এক সেট বুঝি গয়না করেছে- তা-ই বার বার হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে-ওমা অফিস যাবে না আজকটা বাজলো হুস আছে ? তাই তাে! অজয়ের যেন এতক্ষণে হুস হােল! -এই নাও—বাড়ীতেই তাে রয়েছে মাথাধরার ওষুধ, আমার অসুখের সময় আনা হয়েছিল-মনে পড়লাে তাই! তা’ ঘণ্টাখানেক পরেই খেয়ে নিও--সবটাই খেওকতটুকুই বা—আজ বাত্তিরে তাহলে ঘুমের জন্যে আরইল এখানে—আসি আমি—কি বল- শােভা যাতে হাত বাড়িয়ে নিতে পারে তাই মাথার কাছেই অজয় শিশিটা রেখে দিয়েছে। রাস্তায় বেরিয়ে অজয় যন্ত্রচালিতের মত ছুটে চলতে চায়। মনে হয়--পেছনে যেন কার আর্তনাদ শােনা যাবে। অজয় চারিদিকে চাইলে। রাস্তার লােক তার মুখ দেখে কি টের পেলে?
দিনের পর দিন চার বছরের সমস্ত যন্ত্রণার আজ পূর্ণচ্ছেদ। অজয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত-নিশ্চয়, শশাভার উচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সমস্তদিন রাত্রির পরিবর্তনের মাঝে মুর্তিমতী অব্যয়ের মত শােভার সেই একঘেয়ে দিনাতিপাত। চারটি বৎসরের ক্লান্তিতে অজয়ের তিরিশটি বৎসরের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অজয় ত্বরিত ক্ষিপ্রতায় বাসে লাফিয়ে উঠলো—শােভার মৃত্যু-কাতর আর্তনাদ যদি এখান থেকে শুনতে পাওয়া যায়দি-যদি আর ঘণ্টাখানেক। তারপর অসহ মাথাধরার উপশম হবে সেই ওষুখে। তরল পদার্থটি কর্থে ঢালতেই সমস্ত শরীর হয়ত রি রি কবে উঠবে। তারপর সে কী যন্ত্রণা-শােভার চীৎকারে প্রতিবেশিনীদের উৎকণ্ঠা। তারপর হয়ত কঠিন শীতল নিস্পন্দ মৃত্যু! শােভা হয়ত মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তাকে দেখতে চাইবে-বাড়ীর ঝি তখন তন্ত্রস্ত হয়ে পাগলের মত হয়ে গিয়েছে। কে তাকে খবর দেবে। দয়া করে যদি কোনও প্রতিবেশী তাকে অফিসে ফোন্ করে ! শােভার মৃত্যু-কাতর মুখখানাকে ভাবতে অজয়ের মুখখানাও ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। অজয়ের মনে হল—শােভার ঘরে দাড়িয়ে সেই দৃশ্য সে দেখছে : বিষের জালায় গলা তার নীল হয়ে এসেছে। কথা বন্ধ হােলফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলে—জল দাও, ওগগা জল দাও-- কান্নায় বাতাস ভারী হেলাে—যেন তার প্রেতাত্মা আজ অজয়ের পেছু নিয়েছে—ল দাও, ওগাে জল দাও; বিষের জ্বালায় তার পাকস্থলী পুড়ে গেল। তার কান্নার শব্দে শহরের সমস্ত শব্দ থেমে গেল। সে কাঁদছে-অজয়ের মনে হােল—সেই কান্না তার সারা জীবনে আর শেষ হবে না।
দিনের পর দিন বাস-কণ্ডাক্টার টিকিট চাইলে। অজয় পকেট থেকে পয়সা বের করে বললে-বিষ বিষ বলেই অজয় সামলে নিয়েছে : না না ডালহৌসি একঠো। কী অভাবনীয় কাণ্ড! আশেপাশে কয়েকজন লােক তার দিকে চাইলে। বিষের কথায় আরেক দিনের এক ঘটনা অজয়েব মনে পড়লো। সকালবেলা অজয খববেব কাগজ পড়ছে। হঠাৎ একটা বিষ খেয়ে আত্ম- হত্যার বিবরণে অজয় আকৃষ্ট হােল। প্রেমের ব্যথায় দুই তরুণ-তরুণীর আত্মহত্যা-কিন্তু শােভাকে খবরটা দিতেই শােভা শিউরে উঠেছিল। বলেছিল—সত্যি কী করে যে বিষ খায় কে জানে--শুনলেই তো আমার বুক কেঁপে ওঠে- বাঁচতে শােভার বড় সাধ ! বড় সাধ সংসার করবার। বড় সাধ স্বামী-সেবা করবার। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সেই যে শয্যা গ্রহণ করেছে-মৃত্যু না হলে হয়ত আর সে ত্যাগ করবে না। এই চারটি বছর প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরবার পথে অজয় প্রার্থনা করেছেন বাড়ী ফিরে সেই দৃশ্য না দেখে—যেন দেখে সুস্থ হয়েছে শোভায্যা থেকে উঠে বসে শােভা যেন তাকে অভ্যর্থনা করে। প্রতিদিনকার স্বপ্ন প্রতিদিন ভেঙে গেছে। অজয়ের কি দোষ। তার যৌবনের চারটি বছর অপচয় করবার কী অধিকার ছিল শোভার। তাকে ঋণ-জালে জড়িত করে পলে পলে মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়াতে কী তার লাভ! একটা দিন নয়- দুটো দিন নয়—চারটি বছর, চার বছরের মৃদুমন্থর পদক্ষেপ অজয়ের যৌবনকে নিঃশেষিত নিষ্পেষিত করে চলে গেছে। অজয়ের সে ইতিহাস বড় মর্মন্তুদ। কী রােগ কে জানে! ওষুধে ডাক্তারে একশেষ হয়ে গেছে। জ্বর হয়- ক ; তখন দিনের পর দিন কিছুদিন থাকে আবার কিছুদিন থাকে না—কিন্তু দিনের পর দিন শরীরকে সম্পূর্ণ শক্তিহীন করে দিয়ে তবে চলে যায়। একদিন অজয়ের আশা ছিল । আশা ছিল : শােভা ভাল হবে-ভাল হয়ে সংসার করবে ; আর পাঁচটি গৃহের মত তার গৃহও আনন্দমুখর হয়ে উঠবে কিন্তু ভাল হবার আশা আর নেই। অজয় আজ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরাশাবাদী। অফিসে নিজের চেয়ারে বসে অজয়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়লাে। যা হয় হবে—ফাইলের মধ্যে অজয় নিজেকে ডুবিয়ে দিলে । ছােটবেলার একটা কাহিনী অজয়ের মনে পড়লাে-- পড়ার ঘরে টিপি টিপি পায় যে এসে তাকে প্রায়ই চমকে দিত সে হচ্ছে খুকী-ডাক নাম তার খুকী—পাশের বাড়ীর মেয়ে । পরীক্ষামনােযােগ দিয়ে অজয় পড়ছে-একবার পেছন ফিরে দেখলে খুকী এসেছে—ছােট কাবলী বেড়ালটা কোলে করে। খেলবার উদ্দেশ্য নিয়ে খুকী এসেছিল কিন্তু অজয় তাকে প্রশ্রয় দিলে না—যেমন পড়ছিল তেমনি পড়তে লাগলাে। খানিকপরে ফিরে দেখে খুকী চলে গেছে দেয়ালের ওপর খড়ি দিয়ে লিখে রেখে গেছে-‘ছােড়দাকে আমার ভারী ভয় করে। অজয় খুব একচোট হেসেছিল। পরের দিন কলেজ থেকে ফেরার পরে অজয় খুকীর কাবলী বেড়ালের জন্যে চমৎকার একটি ঘুমুর-লাগান বগলােস কিনে এনেছে। খুকীকে দিতেই আনন্দে সে নেচে উঠেছে। রাত্রে শুতেখাবার সময় অজয় দেখলে দেয়ালের সেই জায়গাটায় কে অাবারু লিখে গেছে-'ছােড়দা’কে আমার ভারী ভালাে লাগে- তারপর সেই খুকী বড় হল।
দিনের পর দিন বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে। লােকজন হয়ত খুকীকে দেখতে এসেছে—হঠাৎ খুকীকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজাখুঁজি হােল বিব—কোথাও নেই—শেষে দেখা গেল—অজয়ের বিছানায় লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে আছে— লেপটা তুলতেই—কী কান্না মেয়ের। বিয়ের আগের দিন অজয় খুকীকে কী একটা কথা বলতে গিয়েছিল—কিন্তু খুকী মুখ গোঁজ করে সেখান থেকে চলে গিযেছিল। তাবপব বিয়ের পরে একদিন •• হঠাৎ টেলিফোনে ঘণ্টা বেজে উঠলাে পাশেব ঘবে। হয়ত অজয়কেই ডাকছে। এতক্ষণ তাহলে ওষুষেব ক্রিয়া শুরু হয়েছে। অজয চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেল। যন্ত্রণায় ওদিকে এতক্ষণ শােভ। চীৎকার করছে। এতদূর থেকেও যেন অজয় সে চীৎকার শুনতে পেলে। কিন্তু না, তাকে কেউ ডাকছে না—অজয় নিশ্চিন্ত হয়ে আবাব চেয়ারে বসলো। অজযেব পাশের চেয়ারে বসে ভবতােষ। ছােট-খাট বেঁটে কমবয়েসী ছেলে ভবতোষ। অজয় তার দিকে চাইলে-হাতে কলম, সামনে ফাইল খােল। কিন্তু চোখ তব উদাস। অজয় নিজের কাজে মনােনিবেশ করলে —কিছুক্ষণ পরে আবার ফিরে চাইল। ভবতােষ তেমনি উদাস। ঘোষ। অজয় এবার ফিবে চাইলে-ভবতােষ ডাকছে। —ভাবছি ছুটি নেব হে—কালকে নিয়েছি, আজকে নিলে বড়বাবু ক্ষেপে যাবে না তো? অজয় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলাে—কী ব্যাপার বল তাে হে- দিনের পর দিন । ভবতোষ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। চল না একটু ওদিকে, ভারী বিপদে পড়েছি—গলা জড়িয়ে এল ভবতােষের। হলের এককোণে নিরিবিলিতে এসে ভবতােষের কী যে হােল--সে প্রায় কেঁদে ফেললে। --সুলতা বােধ হয় আর টি কিবে না ভাই, কাল তো শেষ চেষ্টা করে দেখেছি—ডাক্তার বলে—আশা আছে বটে কিন্তু আবােল-তাবােল অনেক কিছুই বললে ভবতােষ-অজয় ভাবতে লাগলো: সুলত কেন মরবে—সুলতা বাঁচুক—শােভার অবশিষ্ট আয়ু দিয়েও যদি সুলতাকে বাঁচানো যেতাে! যে অনাবশ্যক তার জন্যে বিধাতার এত দরদ ;-সুলতার জীবন ভবতােষের পক্ষে অনিবাৰ্য্য- সুলত ভবতােষের জীবনে তৃপ্তি দেবে, শান্তি দেবে—আর শােভা ? অজয় আবার চেয়ারে এসে বসলাে। অফিসের কোলাহল, বাইরের রাস্তায় ট্রাম-বাসের শব্দ অজয়ের মস্তিষ্কের তীতে আঘাত করতে লাগলাে। হঠাৎ তার মনে হােল । চারিদিক অন্ধকার করে এসেছে। এত শীগগির সন্ধ্যা এল। ডালহৌসির কর্মব্যস্ত আবহাওয়ায় যেন মস্থরতা নেমে এসেছে। অজয় উঠলো। সেই বাড়ী-শহরতণীর ছােট ভাঙা বাড়ী-বাড়ীর দেয়ালে আব নেই। রাস্তায় গ্যাস জেলে দিয়েছে। পাড়ার ছেলেরা এখন যে-যার বাড়ী ফিরে গেছে। অফিস ফেরত কেরাণীর দল দ্রুত পদে বাড়ী ফিরে চলেছে। অজয় যেন ঘুমন্ত দেহ নিয়ে হেঁটে চলেছে। বাড়ীর দরজা খােলা। স্যাতস্থেতে কলতলার কাছে অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। অজয় কান পেতে রইল। হঠাৎ দুম্ দুম করে কে যেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। শােভা না? অজয় চমকে উঠলো। সুন্দর স্বাস্থ্য—চুল বেঁধে, দিনের পর দিন সিদুর পরে, শাড়ী বদলে—এ যেন আর কেউ। চার বছরের রােগশয্যা- শায়িতা শােভা তাে এ নয়। বিবাহের আগে অজয়ের কল্পিত মানসী। অজয় দু’চোখ আঙুল দিয়ে ভালাে করে মুছলে। ভুল তার হয় নি ভুল হবার কথা নয়। অজয়কে শোভা দেখতে পায়নি। ডাকলে-শােভা। তাড়াতাড়ি ঘােমটা দিয়ে শােভা বিস্ময়ে আনন্দে ফেটে পড়লাে—ওম। তুমি, কখন এলে ; জানো ও-বাড়ীর পিসীমা কি এক ওষুধ দিয়েছিল।' টোটকা ওষুধ—তাই খেয়েই অজয় নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে বইল। সেই ছােটবেলাকার খুকী, সেই ভবতােষের মুমুর্মু সুলতা, আত্মীয় অনাত্মীয়া সকলের ওপর আজ যেন বাহাদুরী নিতে পারে তার শােভা। শােভা বলে উঠলাে—ওমা দাঁড়িয়ে রইল দেখ, কী হােল তােমার-- তােমার বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না, আচ্ছা কী করলে বিশ্বাস হবে বল তাে- বিশ্বাস ! বিশ্বাস আগে হােত, এখন আর হয় না। অজয়ের কৈশাের যৌবনেব সমস্ত স্বপ্ন একে একে যখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে—তখন বিশ্বাস কিসে হবে ? জীবনে শান্তি নেই—চোখে ঔজ্জ্বল্য নেই, ঋণের দায়ে অজয়ের স্বাস্থ্য আজ ক্ষয়িষ্ণু-বাস্তবকে স্বপ্ন বলে তার ভুল হবে বৈকি। -ওকি ছাড, ছাড-অজয়কে জড়িয়ে ধরে মুখেব কাছে শােভা তার। ঠোট এনেছিল—হয়েছে, হয়েছে গো, বিশ্বাস হয়েছে- সেই স্যাতসেতে কলতলায় দাঁড়িয়ে অজয় ভাবলে : হাের্ক স্বপ্ন তবু তাে দুদণ্ডের শান্তি ! শােভা সুস্থ হয়েছে তা কল্পনা করেও আনন্দ।
দিনের পর দিন
শ
শােভা সুন্দরী—শােভা যুবতী এ চিন্তাও সুখপ্রদ। শােভা সুস্থ হয়ে
তার সংসার করছে—তার সহধর্মিণী হয়ে
হঠাৎ কে যেন তার কাঁধে হাত রাখলে
-আরে ঘোষ যে—এদিকে কোথায়-
তাদের অফিসের ননীলাল। অজয় মর্ত্যজগতে ফিরে এল। এ-কোথায়
এসেছে সে। রাত হয়েছে। কলেজ স্ট্রীট! কোথায় ডালহৌসি
থেকে এতদূর এসেছে হেঁটে! এতক্ষণ বুঝি সে স্বপ্ন দেখেছে। কখন
অফিসের ছুটি হয়েছে তাও মনে নেই।
নণীলাল বললে—বাড়ী তাে কালীঘাটে—এদিকে যে
-এই ভাই, কাজ ছিল একটা-তুমি ?
ননীলাল পাশের দোকানের শাে-কেস দেখিয়ে বললে—কাপড়টা
পছন্দ হয় ?
-কাপড় কোথায়—ওতে। শাড়ী
-ওই হােল-বিয়ে করে এস্তো নিজের সখ আর নেই—এখন
কেবল শাড়ীর ভাল ভাল পাড় খুজে বেড়াই
-কার জন্যে ?
ননীলাল হাে হো করে হেসে উঠলো—তােমাকে নিয়ে আর•••প্রথম
পক্ষ যাবার পর এবার ভাই একেবারে যাকে বলে ইয়ে—মানে—ননীলাল
কী বলবে ভেবে পেলে না।
ননীলালের হাত থেকে কোনও রকমে ছাড়া পেয়ে অজয় বাড়ী যাবার
জন্যে ট্রামে উঠলাে। জনবহুল ট্রাম। অজয় এককোণে জায়গা করে
নিলে। এরা সবাই সুখী। এই নীলালের দল। অজয়ের মনে হােল ।
বাড়ীতে এতক্ষণ হৈ চৈ পড়ে গেছে নিশ্চয়ই প্রতিবেশীদের ভিড়ে তাঁর
দিনের পর দিন বাড়ী কল-মুখর। হয়ত ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছে। অজয়ের মাথার ভেতর চিন্তাগুলো পােকার মত কিলবিল করছে। কী হবে তা হ'লে—কী হবে তারপর ? তারপরেই মনে হােল—যদি কেউ জানতে পারে । যদি শােভা কাউকে বলে গিয়ে থাকে। অজয়ের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পৰ্য্যন্ত শি শির করে উঠলো। করে উঠলো। পর পর অনেকগুলো ভয়াবহ দৃশ্য কল্পনা করে অজয় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো। মানুষ এক মুহূর্তেই মরে না। মরবার আগে মৃত্যুযন্ত্রণা! সেই যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ঘরের ভেতর যখন সে ছটফট করছে তখন•••তখন একফোটা জল খেতে চাইবে হয়ত। খানিক পরেই মুখ দিয়ে বেরােবে ফেনা-সাদা সাদা থুথুর ফেনা-চোখ হবে দৃষ্টিহীন-হাতটা এলিয়ে পড়বে ঝুলে কয়েকবার অল্প জ্ঞান হবে—একটু চাইবে চোখ তুলে—তারপর আর জ্ঞান হবে না, আর চোখ তুলে চাইবে না—নিস্পন্দ নিথর•••স্থির••• সেই মুমুধু শােভাকে কল্পনা করতেই নিজের নিষ্ঠুরতায় অজয় নিজেই চমকে উঠলাে। আচ্ছা এমনও তাে হতে পারে-সেটা খায়নি শােভা! যদি না খেয়ে থাকে তবেই যেন ভাল হয়—তবেই যেন অজয় স্বস্তি পায় । কিন্তু এখনও তো সময় আছে—বাড়ী পৌছুতে অজয়ের এখনও প্রায় এক ঘণ্টা। এর মধ্যে যদি অজয় সেই দণ্ডেই ট্রাম থেকে নেমে পড়লো। তারপর কী যে হােল- হাত বাড়িয়ে একটা ট্যাক্সিকে ডাকলে। ট্যাক্সি যখন ছুটছে তখনও অজয়ের মনে হােল-কেন আরাে জোরে যাওয়া যায় না? অজয় একান্ত মনে প্রার্থনা করে—বিষ যেন শােভা না খায়। চিরু। হােক—স্বাস্থ্যহীন হােক—তার জীবন বিড়ম্বনা—তবু তো স্ত্রী। তার দিনের পর দিন উপর অজয়ের এই অহেতুক মায়া অকস্মাৎ কেন যে হােল-কে জানে। মনে হােল-যদি সমস্ত পৃথিবীর পরিবর্তেও তাকে বাঁচানাে যেতাে। যদি তার নিজের জীবনের বিনিময়েও তাকে বাঁচানো যেতো! শােভা তাকে চার বছরের মধ্যে এক দণ্ডের জন্যে কোনদিন শান্তি দেয়নি—সে কী করবে। কী করবে শােভা! শােভা কি তাকে কম ভালবাসে। তার অফিস যাওয়ার পর সারা পৃথিবীতে যদি কেউ উৎকণ্ঠিতচিত্তে অপেক্ষা করে থাকে, তবে সে তো ওই শােভা! শােভার বড় সাধ বাঁচবার-বড় সাধ সংসার করবার-বড় সাধ স্বামী-সেবা করবার শােভার সেই কথাটা অজয়ের মনে বিদ্যুতের মত চমকে উঠলো—কি, করে যে লােকে বিষ খায়—শুনলে আমার বুক কেঁপে ওঠে কিন্তু হু হু করে ট্যাক্সি ছুটছে। অজয়ের পৃথিবীতে এখন ভীষণ ঝড়- সেই ঝড়ে আকাশ-বাতাস-চৌরঙ্গী-এসপ্ল্যানেড,—সব ভূমিসাৎ হয়ে গেল। অজয় ভাবছে—শহরতলীর এক বাড়ীতে একটি প্রাণী যে মুমুধু সে-খবর এরা কেউ রাখে না। যে খুনী সে যে শহরের বুকের ওপর দিয়ে ট্যাক্সি চড়ে চলেছে—সে-খবর এরা কেউ জানে না। ট্যাক্সি গলির ভেতর ঢুকলো। বাড়ীর সামনে যে ভিড়ের আশঙ্কা করা গিয়েছিল তা নেই। তবে হয়ত এখনও সবাই খবর পায়নি। অজয় ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে দিল। আশ্চৰ্য্য হােল অজয় এই দেখে যে সদর দরজা বন্ধ ! তবে কি ডাক্তারকে ডাকা হয়নি? বাড়ীতে যে ঝি-টা আছে সে-ও কি টের পায়নি নাকি ? অজয় সদর দরজায় ধাক্কা দিলে।
দিনের পর দিন দরজা খুলে দিলে ঝি। ঝিব মুখ দেখে অজয় বোঝবার চেষ্টা করলে শােভা কেমন আছে। হকারে ভালো করে তার মুখ দেখা যায় না। জিজ্ঞেস করলে–তাের মা কেমন আছে ? ঝি বললে তেমনি ধারাই আছেন—যেমন রােজকার••• অজয় বিস্মিত হয়ে গেল। ভাল আছে! যেন ভালই থাকে—যেন ভালই থাকে সে। সিড়ি দিয়ে দুমদাম করে গিয়ে উপরে উঠলো। অজয় । ঘরের আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। না, নিঃশব্দ ঘর! ঘরে ঢুকে কি দেখবে কে জানে! ভেতর থেকে শােভা যেন কার পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিল ; বললে--কে ? অজয় ঘরে ঢুকলো।-লাল তরল পদার্থ-ভরা শিশিটা সেখানে নেই- সেটা কোথায় গেল ? সেটা কে সরালে ! যে-ই সরাক—সে আজ অজয়ের পরম উপকার করেছে। -তুমি—শােভা দুর্বল হাতে মাথায় ঘােমটা দেবার চেষ্টা করলে। -কেমন আছ ? অজয় জিগ্যেস করলে। —আজ তুমি খুব শীগগির এসেছ কিন্তু, হঁা গাে, অফিস থেকে পালিয়ে এলে বুঝি ? দেখ তাে আমার জন্যে তােমার কত কষ্ট••• গলা ভারী হয়ে এল শােভার। বললে—ওগো শােন, ভুল করে তুমি মাথাধরার কী ওষুধ দিয়ে গিয়েছিলে ?•••ভাগ্যিস কমলদা’র বউ এসেছিল—বললে-এ যে টিঞ্চার আইডিন-আমি বললাম—মানুষটার কি মাথার ঠিক আছে-কী ওষুধ দিতে কী দিয়ে গেছে। তা’ ভাগ্যিস খাই নি- ১ দিনের পর দিন তারপর গলা আরো ভারী হয়ে এল—আমার জন্যে তােমার যদি, দুদণ্ডের শান্তি থাকে। তােমার শরীর যে দিন দিন কী হচ্ছে সে আমিই •••আমার যেমন•••মরণও হয় না- তারপর সত্যিই শােভা কেঁদে ফেললে। সেই চিরাচরিত কান্না! উ, অসহ-সেই রুগ্ন। স্ত্রী, ঘরে সেই চার বছরের সাতসেতে আব- হওয়া, সেই•••সেই...অজয়ের মন তিক্ত-বিবক্ত হয়ে উঠলো। ঋণের দায়ে তাকে আবার জড়াতে হবে-আবাব চলবে প্রাত্যহিকতাব পুনরাবৃত্তি -আবার ওষুধে ডাক্তারে একশেষ হওয়া—আবার একঘেয়ে ক্লান্তিকর দিনাতিপাত-অজয়ের মন বিষাক্ত হয়ে উঠলো।-শান্তি কি তার জীবনে কোনদিন আসতে নেই! কেন, কে কমলদাদার বউ-কী তার আসবার প্রয়ােজন ছিল! কেন সে বললে-ওটা টিঞ্চার আইডি। কী শত্রুতা করেছিল তার অজয় ? না শােভা মরলেই ভাল হােত--মঙ্গল হােত। অজয় একান্তভাবে প্রার্থনা কবলে—হে ঈশ্বর-মৃত্যু কি নেই শােভার । ওকে মৃত্যু দাও-মৃত্যু দাও ওকে-আমি ওর শুভাকাঙ্ক্ষী—আমি ওর প্রকৃত মঙ্গলকামী-ওকে মুক্তি দাও তুমি।
শত্রু আসছে আবার এই বাড়ীতেই সুবালার চার বছর কেটে গেল। চারটি বছরের অভ্যস্ত অসঙ্কোচ গতি সুবালাকে এতটুকু পীড়িত করতে পারেনি। দৈনন্দিন নিয়মানুসারে পূর্ব দিকে সূর্য উঠেছে-পশ্চিম দিকে সূর্য অস্ত গেছে। এ-পাড়ার প্রত্যেকটি প্রকাশ্য জিনিষের সঙ্গে সুবালার পরিচয় আছে। অনেক দূরে মিত্তিরদের ভাঙ্গা-বাড়ীর ছাদের ওপরে একটা অশ্বথ গাছ আছে—সুবালা দেখে আসছে, প্রত্যেক বছর নিয়মিতভাবে ও-গাছটি গ্রীষ্মকালে সমস্ত পাতা খসিয়ে ন্যাড়া হয়ে যায়—আবার বােশেখ মাসের মাঝামাঝি থেকে কচি কচি পাতায় গাছটার আগাগােড়া ঢেকে যায়। তার ও-পাশের কাদের বাড়ীর বারান্দায় কালাে ছেড়া চটের পর্দা ঝুলছে—বহুকাল থেকে ঝুলছে—বর্ষা গ্রীষ্ম আর শীত কখনও পর্দাটা একটু ওঠেন-ও-পর্দার আড়ালে কি আছে কে জানে! ভাের না হতে হতে এ-পাড়ায় আশপাশের বাড়ী থেকে কলরব শুরু হয়-সারা পাড়ায় প্রাণের নাড়ীতে তখন সে স্পন্দন দ্রুততর হয়ে ওঠে। সবাই এ-পাড়ায় কেরাণী জীবী। সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই আবার সব নিঝুম। নিস্তরঙ্গ নদীর মত এ- পাড়ার আবহাওয়া তখন মন্থর। গলির ভেতর দিয়ে কোনও পথিক হেঁটে গেলে, তার চলার শব্দ সুবালা রান্নাঘরে বসেও শুনতে পায়। দুর থেকে চিলের অদ্ভুত কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসে। সেই অলস অবসরে যখন সব বাড়ীর গৃহিণীরাই পাখা হাতে নিয়ে মেঝের ওপর একটু গড়িয়ে নেয়। তখন হয়তাে আসে বাসন-ওয়ালীরা। হেঁড়া পুরনাে কাপড়ের বদলে তারা দিনের পর দিন দিয়ে যায় নতুন কাসার বাসন-গেলাস-ঘটি–পদ্মকাটা কঁসি, বগী- থালা কত কি! বাড়ীর সুগৃহিণীবা দর কষাকষি করে তাদের সঙ্গে সমস্ত দুপুরটা কাটিয়ে দে-কেউ কেনে—কেউ কেনে না! তারপর বিকেল, কলের জল আসতে আসতে এটো বাসন গুলাে মেজে ফেলতে হয়—কুঁজোয় জল ধরে রাখতে হয়—উনুনে আগুন দিয়ে তখন টপ করে কলতলায় বসে আরাম কবে গা-খুলে দিয়ে সারা গায়ে জল ঢেলে দিতে হয়! কী আরাম,-কী শান্তি তখন! হয়ত ওদিকে তখন উনুন ধরে গেছে-তাড়াতাড়ি সন্ধ্যেটা দেখিয়ে রান্না ঘরে ঢুকতে হবে! আক, অত তাড়াতাড়ি না করলে কি চলে? এখুনি অফিস থেকে কারা ফিরবেন রক্তমূৰ্ত্তি হয়েছেলেরা ফিরবে খেলার মাঠ থেকে-সারা বাড়ীতে সন্ধ্যে পেরােতে না পেরোতে খাই খাই! এ-পাড়ার নাড়ীতে এই স্পন্দন সুবালা বহুদিন থেকে দেখে আসছে—এই এমনি করেই এ-বাড়ীতে সুবালার চার বছর কেটে গেল। পাড়াটা ছােট—বাড়ীগুলাে ছােট-ছোট মানুষ এর সব। তবু এ- বাড়ী ও-বাড়ী সৌহার্দ্য আছে। দুপুর বেলা যখন গলিটা নির্জন মেয়েদের কাজ মিটে গেছে—তখন এ-বাড়ীর লােক ও-বাড়ী বেড়াতে যায়। ছােট ছােট মেয়েরা—যাদের বয়স বাড়ার দরুন ইস্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে-তারা দল বেঁধে এক জনের বাড়ীতে বসে হয় সেলাই করে, নয় সেলাই করার নাম করে মুখরােচক গল্প করে। নতুন বউদের কেউ কেউ লেখাপড়া জানে-লাইব্রেরী থেকে তাদের জন্যে বাঙলা বই আসে—দুপুরটা তাদের কাটে ঘুমিয়ে, বইটা শুধু ঘুমের এক রকম ওষুধ! কোনও বয়স্কা মহিলা বেড়াতে এলেন এ-বাড়ীতেহা- গা বৌমা, ও-পাড়ার স্যান্-বউএর কিততি শুনেছ ?
দিনের পর দিন সুবা। হয়ত তখন সবে খেয়ে উঠেছে—তাড়াতাড়ি বসবার জায়গা করে দিয়ে বলে—কই, কিছু শুনিনি তো মাসীমা- বয়স্কা মহিলাটি তখন আয়েস করে বসেন—কৌতূলটা অধক মাত্রায় বাড়িয়ে দেবার আশায় বলেন—শােননি তো শুনে কাজ নেই বাছা-সে শুনলে পাপ হয়-সদ্য সদ্য পাপ- এক একদিন কেউই আসে না। সুবালা একা একা বসে অনেক কথা ভাবে। বিয়ের কথা, বিয়ের আগের কথা! ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে ; হঠাৎ হয়ত কার ডাকে ঘুম ভেঙে যায়—বৌমা, কী করছো গো ?- —আসুন জ্যাঠাইমা, বলে সুবালা দরজা খুলে দেয়। জ্যাঠাইমা কোন ভূমিকা না করেই বলেন, এই বােলতে এলাম, বলি তােমাদের পাঁচ জনের আশীর্বাদে আমাদের ব্যাপার এই আমার দেওর- পাে ন্যাপার চাকরি হয়ে গেল পঞ্চাশ টাকা মাইনে-মন্দ কি-গা-বউ নেই বেটা নেই-কী বল বাহাত। হােল যেন, হােল এই তােমাদের পাঁচ জনেরই তা’ বলে পঞ্চাশ টাকার কথা সত্যি নয়—তা’ সুবালা জানে! এ পাড়ার লােক অমন বলে থাকে ; তিরিশকে পঞ্চাশ করা এ-পাড়ার লােকের অভ্যাস। এ সুবালা ভাল করেই জানে। জানতে আর সুবালার কিছু বাকি নেই ; অভ্যস্ত আবহাওয়া, পরচিত পরিবেষ্টনী ! উদয়াস্ত দিনের সমস্ত খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে। রাস্তা দিয়ে কখন কোন ফেরিওয়ালাটা যায় কোন বাড়ীতে শাশুড়ী-বউতে বনে না, কোন বাড়ীর বউ-এর কী কেলেঙ্কারী সব, সব ! জানবে বা না কেন? চার বছর ধরে সুবালা। এপাড়ায় রয়েছে, এই বাড়ীতেই সুবালার চর বছর কেটে গেল যে। • দিনের পর দিন তা গুপীনাথ লােক ভাল। মাসকাবারি মাইনেট। এনে সুবালার হাতে দিয়ে দেয়। অফিস যাবার সময় সুবালা। তার হাতে বারােটা করে পয়সা কমালে বেঁধে দেয় ; দশ পয়সা বাস ভাড়া -দু’পয়সা জলখাবার ! দু'পয়সার চানাভাজা খেলেই গুপীনাথের চলে যায়। এক একদিন সুলাব জন্যেও পকেটে করে আনে; রান্নাঘরের ভেতর ধোয়া আর আগুনের মধ্যে সুবালা হয়ত আপাদমস্তক ঘেমে উঠেছে, শাড়ী আর সেমিজের সুবিন্যাস নেই, সেই অবস্থায় গুপীনাথ সরাসরি রান্নাঘরের মধ্যে এসে হাজির ; পায়ে জুতাে, গায়ে জামা, হাতে আফিসের ফাইল সেই বস্থায়, ভাবাে একবার সুবালাকে তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলে রেখে উঠতে হয়; নইলে গুপীনাথ কী কাণ্ড করে বসে কে জানে! হয়ত সেই ঘামসুদ্ধ সেই অফিস ফেরত অবস্থায়, বলা তো যায় না-- গুপীনাথ ঝুকে পড়ে বলে কী রাঁধছো দেখি, সুবালা অস্থির হয়ে রেগে ওঠে। বাইরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, বেরােও বেরােও জুতে পরে সমস্ত একাকার! দেখলে যত সব অনাছিষ্টি, ওমা কোথায় যাবো, কিছুতেই দেবো না, না না- সুবালা পালিয়ে আসে। গুপীনাথ এক একদিন অফিস থেকে আসতে দেরি করে। গুপীনাথের খেলা দেখা বা বায়ােস্কোপের নেশা নেই, তবু দেরি হয় কেন ! সাতবার রাঁধতে রাধতে কড়া নামিয়ে রেখে সুবালা রাস্তার দিকে জানালায় এসে দাড়িয়ে দেখে ; আঁকাবাঁকা গলি এইটুকুন পাড়াটা পাঁচ বার ঘোরা ফেরা করেছে; একটু বেশীদূর অগ্রসর হতে গেলেই বাড়ীর দেয়ালে দৃষ্টি আছাড় খায়। কিন্তু সুবালার ধৈর্য্যের সীমা নেই, কত লােক আসে যায়, অফিস থেকে কেউ বাজার কয়ে দিনের পর দিন ফিরছে—এ-পাড়ারই বাসিন্দা সবাই, সামনে আসতেই সুবালাকে জানালা ছেড়ে আড়ালে লুকোতে হয়, চলে গেলে আবার সেই প্রতীক্ষা ; ওদিকে হয়ত কড়ায় তেল চড়িয়ে এসেছে, পুড়ে গেল বুঝি সব—কিন্তু গুপীনাথের আর দেখাই নেই! পুরুষমানুষ অমন কত কাজ থাকে বাইরে—তা বলে ভাবনা করলে কি চলে? সাতটা তাল মাথায় তার; কিন্তু তবু সুবালার ভয়টা একটু বেশী ! কলকাতার রাস্তায় চলাফেরা এদিক থেকে গাড়ী, ওদিক থেকে গাড়ী-রাস্তা নয়তাে মানুষ মারা ফাদ! এতটুকু অন্যমনস্ক হয়েছে। কি বাস্! এইতো সেবার বেশী দিনের কথা নয়, সুবালা ও-বাড়ীর জ্যাঠাইমার সঙ্গে কালীঘাটে গেছলে। মা'র পূজো দিতে। গেছলাে গঙ্গা পেরিয়ে হেটে-মন্দিরের সামনা-সামনি মােড়ের মাথায় একটা মাগী আর একটু হলেই তো পড়েছিল মােটরের তলায়-পড়েনি ভাগ্যিস মাগীর বরাত জোর, ড্রাইভারটাও ছিল হুসিয়ার—সেই কথাটা মনে হলে আজও সুবালার বুক কেঁপে ওঠে। বাস থেকে নেবে বাড়ী আসার পথে অনেকখানি হাঁটতে হয় গুপীনাথকে। মােটর, গাড়ী, ঘােড়া এড়িয়ে তবে বাড়ী এসে পৌছতে হয় বিপদ ঘটতে কতক্ষণ! সুবালা কতবার গুপীনাথকে বলেছে কাল থেকে তোমার আলাদা চার আনা পয়সা দেবাে রিক্সা করে এসো। ও পয়সায় এতখানি পথ রিক্সা আসে না। গুপীনাথ আপত্তি করে চার আনায় তােমার বর যে, সে আসবে- সুবালার প্রত্যেকটি দিন এমনি সুপরিচিত। প্রাত্যহিক পথ-চলায় নেই পুনরাবৃত্তি। একই গতির একঘেয়েমিতে সুবালার এই চার বছরের জীবন নিঃশব্দে প্রবাহিত! সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আলাে আর অন্ধকারের অদ্ভুত নিয়মানুবর্তিতা ! কিন্তু হঠাৎ পরিবর্তন দিনের পর দিন এল। সুলার এই চার বছরের জীবনে হঠাৎ ছন্দপতন হােল। প্রথম পূর্ণচ্ছেদ- পাশের বাড়ীটি এতদিন খা খা কোরতো—হঠাৎ কলরবে একদিন ভরে উঠলো। ভরে উঠলাে মানুষ আর মানুষের সাজ-সবঞ্জামে ! হক- ডাক আর হৈচৈতে বাড়ীটা হােল সরগরম। একটা বাদামী রংঙের শাড়ী জড়িয়ে বউটি ব্যস্ত হয়ে এপার-ওপার ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বামীটি সুশ্রী-একটু অসাধারণ, অন্ততঃ এ-পাড়ার, এই কেরাণী পাড়ার কারু সঙ্গেই খাপ খায়না তার। দু’জনের বেশ সহজ সম্বন্ধ-স্বচ্ছন্দ গতি! বউটি এতো ব্যস্ত। সকালবেলাই এসেছে, ইতিমধ্যেই এতদিনকার অব্যবহৃত বাড়ীটি বেশ তকতকে—পরিষ্কার। বহুদিন ধরে ভুগে ভুগে কোন রােগী যেন আজ পথ্য করলো। কোমরে কাপড়টা জড়িয়ে বউটি নিজেই ঝটা হাতে জঞ্জাল পরিষ্কারে ব্যস্ত। বৃষ্টির জল পড়ে পড়ে কলতলায় শ্যাওলা জমেছে—রান্নাঘরের ভেতর ঝল আর কাশীর রাজ্য-উঠানে কতদিনকার সঞ্চিত ময়লা-ঘাস আগাছা-আর ইট-পাটকেল। শােবার ঘরটা এখান থেকে স্পষ্ট নজবে পড়ে। একে- বারে স্পষ্ট। একটা তক্তপােশ পড়েছিল তারই উপর বিছানা পাতা হয়েছে-একপাশে দেয়ালের গায়ে তাকের উপর যাবতীয় জিনিষ সাজিয়েছে—দাতের মাজন-বুরুশ চুলের ফিতে—সিদুর কৌটো-তেলের শিশি-এটা আর ওটা। সুবালা লক্ষ্য করলে কোথায় যেন এ-পাড়ার আর সবার থেকে ওর একটু তফাৎ একটু পার্থক্য আছে, বউটি হাসিতে উজ্জ্বল-কথায় প্রখর। নিজের চারিদিকে একটি মধুর চঞ্চল পরিবেষ্টণী রচনা করে রেখেছে। বউটির প্রকৃতির প্রাথৰ্য্য সুবালাকে পর্যন্ত এসে বিঁধছে— বউটির যেন দিনের পর দিন একটু আকর্ষণী শক্তি আছে—এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুবাল। ওই বউটির মধ্যে হারিয়ে গেল—তলিয়ে গেল অজ্ঞাতে আর অসাড়ে- গুপীনাথ নাকে-মুখে গুজে আফিসে ছুটলো। টুকিটাকি দু'একটা কাজ সেরে সুবালাও খেয়ে নিয়েছে। খেয়ে নিয়ে আচারের শিশি আর বড়ির হাঁড়ি শুকোতে দিতে ছাদে উঠেছিল ; ছাদে উঠেই চোখোচোখি- —আপনারা বুঝি এই বাড়ীতে এলেন? কোত্থেকে এলেন? —উলুবেড়ে; চেনেন তাে, হাওড়া লাইনে, বিরশিবপুর, ফুলেশ্বর, উলুবেড়ে -ওমা ; উলুবেড়ে চিনেন আর-সেখেনেই তাে আমার বড়জ। থাকে—আমার ভাসুর যে ওখানকার ইসটিসনের-এই তাে হামেশাই চিঠি লেখে বেড়াতে যাবার জন্যে, তা সংসারের কাজেই দিদি ফুরসুত পাইনে,-তা বেশ হেলে ভাই-একলাটি এক বাড়ীতে থাকি—আমি ‘ভাই মুখ বুজে থাকতে পারিনে-এর জন্যে উনি কত যে- -সে কি কথা, বেশ বেশ-আসবেন আজ দুপুরে? আমাকে ভাই দু’বার বলতে হয়না, দুপুর বেলা একটা লােক পাইনে যে কথা বলি—কিন্তু আজ ভাই থাক, আপনার কাজের ক্ষেত- বউটি ঠোট উল্টোলো ; ঘঁ। কাজ তো ভারীও রয়েছে সব করবে’খন- ইঙ্গিতটা সুস্পষ্ট ; তবু মেয়েলী-মন সুবালার। জিজ্ঞেস করলে উনি কে ভাই আপনার ? -কে আবার!-বউটি চুপ করলে, অর্থাৎ উনি যে কে তাও আবার বলে দিতে হবে? এ প্রশ্ন এ কৌতুহল যেন সুবালার অহেতুক, অন্যায় অসঙ্গত।
দিনের পর দিন যেন নিজের ভুল বুঝতে পেরে সুবালা বললে—ত তাে বটেই-- তা তাে বটেই। সুবালা কথাটা বলে এবং বউটি কথাটা শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে বইলাে। এই পবিচয় আদান-প্রদানই সব চেয়ে নীরস ফল্ম জিনিষ। প্রথম আলাপের মধুর মুহূর্তগুলি মাঝে মাঝে এদের স্পর্শে অশ্লীল হয়ে ওঠে। ভয হব বুঝি ভদ্রতার সীমা পেরিয়ে গেল। এর পরেই যদি স্বামীব কত মাইনে প্রশ্ন ওঠে ? এই সব অনাগত প্রশ্নের ভয়ে দু’পক্ষ শিউরে উঠতে থাকে। তবু যা হােক, এ ক্ষেত্রে কিছুই হােলন।। সুবালা বললে-মানুষটি বেশ ভাই—আপনাদের দুজনের খুব মিল না ? বউটি বুঝতে পাবেনি। বল্লে—কোন মানুষটির কথা বলছেন? আবার কে ? আপনার স্বামী- কথাটা বুঝতে পেরেই বউটি খিল খিল কবে হেসে উঠলো, তা হাসি আসাই স্বাভাবিক। বউটি এমন সুখী! অমন স্বামী, সুবালা ভাবলে দু’টিতে বেশ আছে, একজোড়া পায়রার মতাে! বউটিকে রূপসী বলা লে বৈকি। স্বামিটিও বেশ! কেমন কথাবার্তা—কেমন চাল-চলন । আবার তার মনে হতে লাগলো বেশ আছে ; দু’টিতে বেশ আছে! সকাল বেলাই অত কাজের মধ্যেও সুবালা জানালা দিয়ে লুকিযে লুকিয়ে দেখেছে-দু’জনে কাজ করছে, এটা রাখছে ওটা সাজাচ্ছে, আর এরই ফাঁকে ফাঁকে দু’জনের অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময়ে আর অনর্থক হাস্য-পরিহাসে দু’জনের সান্নিধ্য মধুর হয়ে উঠেছে-হাসিতে আর কথায় ঘরটি মুখর হয়ে উঠেছে,•••দু’জনে বেশ আছে সত্যি -কে বললে আপনাকে আমার স্বামী-বউটি জিজ্ঞেস কবলে ।
দিনের পর দিন বামী নয় তাে কে তবে? আপনি ভাবছেন আমি বুঝি কিছু দেখিনি? আপনারা তখন ঘরের ভেতর জিনিষপত্তের গুছােচ্ছিলেন- আপনারা দু’টিতে বেশ আছেন ভাই-ছেলেপুলে হয়নি বুঝি ? বউটি একটু হাসলে। সে হাসির অর্থ বােঝা কঠিন। একটু থেমেই বললে -আপনার ? -আমার ? সুবালা মহা সমস্যায় পড়লো। কী বলবে সে? সেই একদিন অন্ধকার অস্পষ্ট ছায়ার মধ্যে কে এসেছিল এই ঘরে—এই বাড়ীতে। নিষ্ঠুর সত্যের মতন সে তেমনি মর্মন্তুদ। দেহ-সমুদ্র আলােড়ন করে বেরিয়েছিল একটি রক্তের ডেলা। শীতের সুৰ্যোদয়ের মত সে কাহিনী স্বপ্নময় আর বর্ষার আকাশের মত তা বিবর্ণ করুণ ! সে কথা সুবালা ভুলে গিয়েছে। এতদিনের বিস্মৃতির তিল তিল ধূলিকণায় সে কথা আজ অবলুপ্ত! মনে হয় বৈকি মাঝে মাঝে ; তবে মনে পড়লে সুবালার কান্না পায়। সে কি যন্ত্রণা—প্রথম চোখ মেলার সঙ্গে সঙ্গে মুবালা দেখেছিল পৃথিবী হঠাৎ যেন এক রক্তপিণ্ডকে কেন্দ্র করে অপ্রতিহত বেগে ঘূর্ণমান ! সেই থেকে আজ পর্যন্ত সুবালা কতবার সেই কথা ভেবেছে এখন এমন হয়েছে, সেকথা সুবালা জোর করে ভুলে থাকে। সেই প্রথম—সেই শেষ! অপরিণত একটি কামনাকণা সুবাকে তাই এমনি করুণ করে তুলেছে, সুবালা বললে আমার কথা বলছেন ?•••বেশ তো আছি নিঝঞ্জাট, আমার এক বড় বােন আছে ভাই হুগলীতে, পিঠোপিঠ বােন আমরা, মাদের দুজনেরই হয়নি। মা বলে ভাই অমুক কর, তমুক কর, মাদুলি, শেকড়, হেমােতেননা কত কী, কিন্তু যা হবার তার হবেই, কি বলেন- ১) দিনের পর দিন ? ! দেখেন না রাস্তার ভিখিরীদের-আপনি মাদুলি-টাদুলি করে দেখেছেন কি ?••• আবার বউটি হেসে উঠল! চোখের দৃষ্টি আর ইঙ্গিতে বউটি যেন কী একটা গোপনীয় কথা বুঝিয়ে দিলে সুবালাকে •••দিয়েই হেসে উঠলাে !••• সুবালা মেয়ে মানুষ ! বেশী তাকে বােঝাবার দরকার করে না। বিস্ময়ে, বিস্ফারিত চোখে বলে উঠলাে, ও মা, তাই নাকি? ক'মাস ? -আট মাস চলছে- বউটি পুলকে উচ্ছল। সুবালা ম্রিয়মান হােলাে না। তেমনি চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল আর ঠোঁটের হাসি মধুর করে বউটির দিকে চেয়ে রইলাে। এতক্ষণ সে বুঝতেই পারেনি ? আশ্চৰ্য। এমন দু’টি সক্রিয় চোখ থাকতে সে অন্ধ হয়েছিল। বউটির দিকে চেয়ে সে তার দেহটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পৰ্যবেক্ষণ সুরু করে দিলে। মুখে সুবালা বললে আট মাস ? তবে তাে আর দেরি নেই ভাই, এই বাড়ীতেই খালাস হবেন তাে? শাশুড়ীকে খবর দিয়েছেন। প্রথম পােয়াতী কি না-করা-কম। করবে কে ?•••ভয় করে বউড়- —এই তো আপনারা আছেন- সুবালা বললে—তা যেন আছি ভাই, কিন্তু আপনার মা কি শাশুড়ী হলে যেমন হয় তেমন কি আর—তবে শুনুন আমাদের এই পাড়াতেই যে দোতলা চিলেকোঠা দেখছেন, ওই বাড়ীর এক বউ ভুগে ভুগে এই হাড়সার, অসুখ তো লেগেই আছে বারাে মাস—গেল বছর এমনি সময়ে পুরো দশমাস হয়েছে—ব্যথা উঠলাে রাততির বেলা, দাঁতে দাঁতে খিল লেগে গেল, মিনিটে মিনিটে ফিট-তা, ভগবানের এমনি লীলা ভাই- দিনের পর দিন ঈশ্বরের লীলা প্রচার ওইখানেই স্থগিত রাখতে হােল। ও-বাড়ীর নীচে থেকে ডাক এলো।•••ডাক শুনেই বউটি চকিত হয়ে উঠেছে।-দুপুর- বেলা আসবেন’-ব’লে দেহ দুলিয়ে দুলিয়ে বউটি সিড়ি দিয়ে নেবে গেল । তার পরদিন থেকে বাড়ীতে আর সুবালার মন টেকে না। গুপীনাথ খেয়ে দেয়ে অফিসে ছুটলাে। সঙ্গে সঙ্গে সুবাও চটপট, নিজের কাজ সেরে নিয়েছে। বাড়ীর দরজায় চাবি দিয়ে এ-বাড়ী এসে দরজার কড়া নাড়ে- বউটি এসে দরজা খুলে দিয়ে বলে—এস ভাই, আজকে কিন্তু ভাই তােমার পনের মিনিট লেট- —ত। কি করবো ভাই, সংসারের কাজ কি আর একটা, জুতাে সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ সব তো সেই আমাকেই, উনি অফিস বেরিয়ে গেলেন, . ছিষ্টি পরিষ্কার-ঝরিস্কার করে খেতে বসেছি, খেতে বসে সাতবার ওঠা, হাত-মুড়কুত একটা লােকও তত নেই—নুন লঙ্কা গুড় এটা ওটা, তারপর খাওয়া সারা হ’ল তাে, এটো বাসনগুলাে কলতলায় ফেলে রেখে পান সাজতে বসলাম–ভাত খাবার পর একটা পান আমার চাই দু’বেলা, তা, ভাই পানের বাজারেও কি আগুন লেগেছে তেমনি—এই দেখ, ঠিক এই এতটুকুন টুকুন তিন গাছি পান—এক পয়সা, অবাক করেছে ভাই- গলাটা একটু নীচু করে সুবালা এবার জিজ্ঞেস্ করে—উনি বাড়ী নেই তো? -থাকলেই বা-বউটি বলে, বাডীতে লােক এলে উনি ওই ঘরটি ছেড়ে বেরুবেন না! দেখেছেন তো--টেবিলের ওপর ঝুকে বসে কেবল পড়া আর পড়া; ওকে পড়ায় পেয়েছে, এই যে আমি ভুগছি— খিদে নেই অরুচি, এটা-ওটা সাতটা ভাল মন্দ খেতে ইচ্ছে করে-করে না দিনের পর দিন ভাই ?-তা আবার লােক পাইনে একটা-তা পুরুষ মানুষের তত বােঝা উচিত ভাই!••• ঘরে বসে দেয়ালের গায়ে দেহ শিথিল করে এলিয়ে দিয়ে সুল। পান খায়। বউটি বলে—এই যেমন কাল—ওঁর খাওয়ার পর ভাতের থালা নিয়ে বসলুম। সন্ধ্যে থেকে খিদে খিদে, খিদের জ্বালায় প্রাণ যাচ্ছিল—খেতে বসে ভাতের থালা নিয়ে কিছু মুখে দিতে পারি না। কোথায় আচার, অমতেল, লঙ্কা, ঝাল, অমুক-তমুক-আমসত্ত্বকে আনে ভাই—ভালো লাগে নিজে সব করতে ?•••বেশ ইচ্ছে করে গবগরে কবে ঝাল দিয়ে চুনাে মাছ-কি পলতাব বড়াত। উনি আবার একটু ঝাল দিলে অসহ- গুক্তনি কি উচ্ছে তো ওঁর ছু তেই নেই—নিজের জন্যে কি আর আলাদা করতে ভাল লাগে? না, এখন, এই শরীরে অত বয় ? সুবালা সহানুভূতিতে গদগদ হয়ে বলে ওঠে--তা তো বটেই— বউটি এবার একটু মধুব হাসি হেসে বলে—হয়ে গেলেই বাঁচি ভাই- কথাটা বলবার ধবণে সারা শরীরে আনন্দের ঢেউ শিউরে ওঠে। নতুন বর্ষার জলে ভরা নদীব মত উচ্ছল! চঞ্চল জল-কল্লোলে নিজেই নিজেকে মুখর করে রাখে; নিজের গর্বে নিজেই আত্মহারা—এক নিজে ছাড়া অন্য সব কিছু অনাবশ্যক, অবান্তর! ঘুরে ফিরে সেই একই কথা বউটির মুখে-ভরা বর্ষার মুখেই তাে ভাই হবে—ভাবনা হচ্ছে একখানা কথা নেই, একখানা কিছু নেই -কী করে যে কী করবাে- সুবালা মাঝে মাঝে বিজ্ঞের মত অভয় দেয়—কিছছু ভাববেন না ভাই-যার জিনিষ তিনি ঠিক দেখবেন—এই তো সেবার ও-পাড়ার বড়- ।
দিনের পর দিন ঝড়ীতে—তবে শুনুন বলি-পুরােপুরি দশমাসে ছেলে বিইয়ে বড় মেয়ে মারা গেল— আহা, কী মেয়েই ছিল ভাই, যেমন ব্যাভার তেমনি :) তা, মারা তো গেল, সেই ছােট একটা পাখীর মতো বাচ্ছা—সবাই ভাবলে সেও যাবে-কিন্তু—রাধে কেষ্ট•••সেই যে কথায় বলে- একটি অনাগত আগন্তুককে কেন্দ্র করে দু'টি সখীর আলােচনা চলতে থাকে। শরীরের বর্ধিষ্ণু অংশটি এবং তারই অভ্যন্তরের রহস্য নিয়ে এদের আলোচনাও যেন শতমুখ হয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত কী হবে! কেমন করে হবে । নিস্তব্ধ ঘরের আবহাওয়ায়, রাত্রির নিবিড় নীরবতায়, একটি চঞ্চল শিশুর কল্পনাময় অস্তিত্ব যেন বাস্তব হয়ে উঠে। অল্ফ ট আর অস্পষ্ট একটি শিশুর ক্রন্দনে সারা বাড়ী থম থম করছে। এখন তাে এই এমন নিরিবিলি দেখছে—কিন্তু কদিন পরেই কাজের জালায় আর এই বসে বসে গল্প করা চলবে না। চলবে না নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে থাকা ! সুবালা এ-বাড়ী এসে এই অনাগতের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে! সমস্ত অভূতপূৰ্ব্ব ! যে আসছে, তার জন্যেই এই এত পৰ্যাপ্ত আয়ােজন-প্রখর প্রতীক্ষা! এই সংসার—মানে এই বউটি, পাশের ঘরের ও-মানুষটি—এ- ঘরের ও-ঘরের প্রত্যেকটি জিনিষ এই দিনগুলি—সমস্ত যেন সেই তার আসার অপেক্ষায় উদ্বেল ! এখানে, এদের এই বাড়ীতে এসে সুবালা বেশ থাকে! মুখে সুবালা ঝল-বেশ সাবধানে থাকবেন ভাই—প্রথম পোয়াতী কিনা- সেই আর একদিন। সুবালা মনে আছে ! এমনি ঠিক ছিল তার প্রতীক্ষমান দিনগুলি! অলস মুহূর্তগুলি! কল্পনার রঙে রাঙা আয় রমণীয়। দুমাস আগের থেকে তার কতগুলো যে কঁাথা সেলাই করছিল দিনের পর দিন দুধ খাবার বাটি আর ঝিনুক টি পর্যন্ত কিনেছিল বাসনওয়ালীদের কাছ থেকে পুরনাে কাপড়ের বদলে—আর গুপীনাথ কিনে এনেছিল দোলনা একটা, দর কষাকষি করেও পাঁচ টাকার কমে কিছুতেই সেটা দেয়নি। কোথায় টাঙাবে সেই নিয়ে ভাবনা হয়েছিল ক’দিন—দুধ গরম করবার লােহার একটি ছােট উনুন-কাজললতা•••আরও কত কী! কত সাবধানতা কত আত্মসেবা—কত উৎকণ্ঠা ! সেই দিনগুলাের স্মৃতি এই এ-বাড়ীতে এসে বসলেই সুবালার আবার মনে পড়ে। মনে পড়ে ছেলে হলে কি নাম রাখবে এই নিয়ে কত রাত মুবালা গুপীনাথের সঙ্গে আলোচনা কবেছে। মনে পড়ে-পাছে কোনও অমঙ্গল হয়, এই ভয়ে অন্ধকারে কোন দিন সুবালা বেরােয় নি। কিন্তু সে সব আয়ােজন সেই সমস্ত সতর্কতা সব নিরর্থক হয়েছিল। দশ মাসের সঞ্চিত তিল তিল প্রয়ােজনীয়তা একদিনে নিঃশেষে ক্ষয় হয়ে গেছলো! এখনও সন্ধ্যার সময় লাল আকাশের দিকে চেয়ে সুবালার সেই রক্ত-পিণ্ডেব কথামনে পড়ে! অর্ধ-অচেতনতাব অন্ধকারের সেই একফোটা একটি ঘটনা আজ পর্যন্ত অক্ষয় হয়ে আছে। এতদিন এই কেরাণী পাড়ার অসঙ্কোচ একঘেয়ে গতি সে কথা বুঝি চাপা রেখেছিল—এবার ক’দিন হােল যেন সেই সমস্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছে। এ বাড়ীতেও একটা দোলনা কেনা হয়েছে-আঁতুড়-ঘরের সাজ- সরঞ্জাম জমছে একে একে! কিন্তু সুবালার কেমন ভয় করতে থাকে। বউটিও যে প্রথম পােয়াতি। বিকেল হতে শুরু হয়েছে—এমন সময়ে সুবালা উঠে পড়ে বলে- আসি ভাই- বউটি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল। সুবালা বললে-বউ ৰাতিরে যদি ব্যথা-ট্যথা ওঠে তো আমায় একবার ডেকো ই-জানালা দিনের পর দিন দিয়ে ডাকলেই শুনতে পাবা-বলা যায় না ভাই, প্রথম পােয়াতী ভয় করে। তা’ খালাস আজ কালকের মধ্যেই হবে আর কী! সময় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে ! আজকাল যেন তার প্রতীক্ষা অসহ হয়ে উঠেছে! অসহ হয়ে উঠছে বেশী করে সুবালার কাছে! কী হবে! কেমন করে হবে? বউটিও যে প্রথম পােয়াতী । সে দিন অফিস থেকে ফিরতে গুপীনাথের অনেক রাত হােল। এমন রাত সচরাচর হয় না। কিন্তু সেই রাত অবধি হাঁড়ি কোলে করে বসে থাকতে থাকতে সুবালার ভারি রাগ হােল। জানালার ধারে এসে পথের দিকে চেয়ে চেয়ে তার চোখে ব্যথা ধরে উঠলাে। রাগ করে সুবালা শুতেই যাচ্ছিল এমন সময় গুপীনাথ এসে পড়েছে । সুবালা গুম্ হয়ে বসে রইল। কথা সে কইবে না। গুপীনাথ হাত-পা ধুয়ে এসে দেখলে সুবাল। ঠিক সেইখানে তেমনি ভাবে চুপ করে বসে আছে। কাছে গিয়ে বললে, কি ভাত দেবে না নাকি, বসে আছ যে বড়। গুপীনাথ বুঝেছিল রাগ হয়েছে ! বললে—রাগ আছে দেখছি যােত আনা। সুবালা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো—কেন, রাগ বুঝি আমাদের করতে নেই, সেই সকাল থেকে সংসারের পেছনে খাটছি, একটু তে ফুরনুৎ পাইনে, তার উপর এই রাত বারােটা পর্যন্ত হাঁড়ি কোলে করে বসে থাকা পারবাে না আমি, মাইনে করে দাসী বাদী রাখােগে, আর পারবাে না আমি, এই বলে রাখছি— পীনাথ শুধু বললে—কী হয়েছে তােমার বল দিকিন-শুনি দিনের পর দিন -কী হয়েছে তুমিই বুঝে দেখ, এই যে দুপুর রাত অবধি বসে আছি। একটু মায়া-দয়া নেই বুঝি তােমাদের শরীরে? তুমি তাে বলবে ভাত বেড়ে চাপা দিয়ে রাখলেই পারতে!•••বতে অমন সকলেই পারে। কাল থেকে আমি আর এ-সব পারবাে না, পারবাে না! পারবাে না। দাসী বাদী দেখাে-আমার শরীবে অত বইবে না। তা বলে রাখছি। এই কথা ! কথাটা সত্যি। গুপীনাথ কথাটা অনেকদিন ভেবেছে। কয়েকদিন থেকেই গুপীনাথ দেখছিল সুবালা রােগ হয়ে গেছে অনেক। আগেকার সে স্বাস্থ্য আর নেই ! একটা ঝি কি বাধুনী রাখা উচিত ! সুবালার স্বাস্থ্য সত্যিই খারাপ হয়ে এসেছে। মেজাজ হয়ে এসেছে খিটখিটে ! একটুতেই চটে ওঠে ! কতদিন থেকে গুপীনাথ লক্ষ্য করে আসছে সুবালা আর সেই আগের সুবালা নেই! কেন এমন হল! অবশ্য খাটুনী যে আগের থেকে খুব বেড়েছে তা তো নয় ! আগেও গুপীনাথ আফিস থেকে ফিরতে কত দেরি করেছে, কিন্তু এমন রাগ কখনও করেনি সুলা! না—গুপীনাথ ভাবলে ভেতরে ভেতরে কোনও অসুখ কবেছে ওর নিশ্চয়ই! সে-অসুখ কোন দিন ভাষণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে হযতো! না, গুপীনাথ কালই ডাক্তার আনবে। অবিনাশ ডাক্তারের হাত-যশ আছে এ-পাডায় ! তাকেই আনতে হবে !••• টাকার মায়া করলে চলবে না ! ক্রমে রাত অনেক হােল! নিস্তব্ধ আবহাওয়া যেন হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। চট করে সুবালার ঘুমটা ভেঙ্গে গেছে। তার মনে হােল কে যেন গুমরে গুমরে কঁদছে। অসহ যন্ত্রণায় বুক তার ভেঙ্গে যাচ্ছে । মনে হােল যে কাদছে সে যেন তার জানালার ওপাশ থেকে ডাকছে তাকে। ‘দিদি ও দিদি! মুহূর্তে বালা উঠে বসেছে। বউটির ব্যথা উঠেছে।
দিনের পর দিন রাত্রির অন্ধকার চিরে বউটি কঁদছে—গুমরে গুমরে কাদছে! একটি অনাগত প্রাণী পৃথিবীতে আসবার জন্যে গলা ছেড়ে কাদছে! দরজা খুলে দাও, খুলে দাও দরজা। সুবালা কান পেতে শুনতে লাগলো ; তার দু'চোখ ফোটেনি—দুটো হাত দিয়ে অন্ধকার হাতড়ে আলাে খুঁজছে সে! আলােড়ন শুরু হয়ে গেছে। আলাে তার চাই। মাটি ভেদ করে একটি তৃণখণ্ড মাথা তুলবে। ছােট একটা কুঁড়ি ফাটিয়ে ফুল বেরিয়ে আসবে। সে আসবে। সুবাল। কান পেতে শুনতে লাগলো। অনেক দিন আগে আর একবার স্পষ্ট প্রত্যক্ষভাবে সে এমনি অনুভব করেছিল। তার শরীরে শিরায় শিরায় সে অনুভব করেছিল ; রক্তে আর রক্তের প্রবাহতে সুবালা শুনেছিল তার পদক্ষেপ। আজ এই রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে সুবালার মনে হােল সে আবার এসেছে। সেদিনকার সেই অপরিণত রক্ত পিণ্ডটি সম্পূর্ণাঙ্গ হয়ে ও-বাড়ীতে ওই বউটির কাছে এসেছে। বিছানার ওপর উঠে বসে সুবালা সেই অন্ধকার নিরুদ্দেশের দিকে চেয়ে রইল। ও-বাড়ীতে একটি ঘরে এতক্ষণ সাড়া-শব্দ পড়ে গেছে। সুবালাকে ছেড়ে কেন সে ও-বাড়ীতে গেল ? সুবালা কী দোষ করেছিল? সুবালাও তাে তার জন্যে দোলনা কিনে রেখেছিল—কিনেছিল দুধ খাবার বাটি, ঝিনুক, কিনে রেখেছিল খেলনা, পুতুল-ওরে কেন সে ও-বাড়ী গেল ! এ-বাড়ী বুঝি তার পছন্দ হয়নি। সুবালা বুঝি ভালবাসতে জানে না! সুবালা বুঝি মা হবার যােগ্য নয়!••• ও-বাড়ী থেকে সেই অস্পষ্ট আওয়াজ আবার ভেসে এল—দিদি, ও দিদি শুবে ও মরুক! সুবালা ভাবলেও মরুক তবে! যেমন দুই ও দিনের পর দিন তেমনি তার শাস্তি। অত যত্ন—অত খাতির—কিছুই যেন কিছু নয়। তার জন্যে সুফলা কত মাস কত দিন ধরে অপেক্ষা করেছিল। কত রাত ঘুমােয় নিবসে বসে কত কথা সেলাই করেছিল-সবই তো তার জতে! কত টাকা নষ্ট—কত সময় নষ্ট-স্বাস্থ্য নষ্ট—তবু সে আসেনি। ও-বাড়ীতে কী আছে? বউটির কাছে ও কেন যাবে? তবে মরু ও! মুবালা ভাবলে—কিছুতেই সে যাবে না। যেমন দুষ্টু সে তেমনি তার শাস্তি হােক। —দিদি ও দিদি-করুণাক্ত স্বরে বউটির ডাক ভেসে আসছে। সুবালার চোখের সামনে সেই রক্তের ভেলাটা ভেসে উঠলাে। সেই তার এত তেজ! সুবালা চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে পড়লো ! এই রাত্রে পরের বাড়ী যেতে তার দায় পড়ে গেছে। সে ঘুমুবে। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে সে ক্লান্ত.••রাত্রে সে ঘুমুবে! কেন সে ও-বাড়ী যাবে। ওবাড়ীতে কী মধু আছে! সুবালা সেই বিছানায় ছটফট করতে লাগলো। না সে কিছুতেই যাবে না। ও মরু এ-বাড়ীতে যে আসেনি বাড়ীতেও তাকে সুবালা আসতে দেবে না! হঠাৎ কান্না যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠলাে । •••বউটি গলা ছেড়ে চীৎকার করছে। সুবালা আবার উঠে বসলো! গুপীনাথকে বার দুই ডাকলে। গুপীনাথের সাড়া নেই। দরজা খুলে আস্তে আস্তে সুবালা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছে। সদর দরজা পার হয়ে ও বাড়ীর দরজা খুলে সুবালা ভেতরে গিয়ে ঢুকলাে। বউটির স্বামী এখনি বুঝি বেরিয়ে গেল বােধ হয় ডাক্তার আনতে। সেই অন্ধকার ভেঙ্গে সুবালা সিড়ি দিয়ে ওপরে গিয়ে উঠলাে। মুহূর্তগুলি স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে! সুবালার চোখের * দিনের পর দিন সামনে সমস্ত ইন্দ্রিয় ভিড় করে দাঁড়ালাে! বউটির গােঙানির শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে! ঘরে গিয়ে সে এখন কী দেখবে কে জানে! যদি দেখে একটা সদ্যজাত শিশু হাত পা ছুঁড়ে খেলা করছে—যদি তাই দেখে সুবালা? দুই হাতের আঙ্গুল দিয়ে তার গলাটা সুবালা টিপে ধরবে। "টিপে ধরবে ততক্ষণ, যতক্ষণ তার নিঃশ্বাস, বন্ধ না হয়। টিপি টিপি পায়ে সুবালা সেই ঘরটায় উকি মারলে !•••উকি দেওয়া মাত্রই এক * অভূতপূর্ব দৃশ্যে সুবালা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠেছে... সেই প্রচণ্ড কান্নার শব্দেই গুপীনাথের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। গুপীনাথ বিছানায় উঠে সুবালার অবিন্যস্ত কাপড় চোপড় সারা শরীরে ঠিক করে দিতে দিতে ঢাকলে--শুনছো, ওগো, শুনছো—আরে শােনেই না যে বলি, ভয় পেলে নাকি ?•••কঁদছিলে কেন? ওগাে এতক্ষণে সুবালার ঘুম ভাঙলো। জড়িয়ে জড়িয়ে কি যেন বললে, চল আমরা চলে যাই এখান থেকে—গুপীনাথ কিছু বুঝতে পারলে না। বললে—কী বলছ কী তুমি—পাগল হলে নাকি ?ষাবো আবার কোথায় ?•••ওঠ ওঠ, উঠে ভাল হয়ে শােও- সুবালার যেন ঘুম ভাঙেনি; তেমনি জড়িয়ে জড়িয়ে বললে—কেন তবে ওরা এসেছিল ? এই দেখ দেখি, অসুখ করেছে নাকি তােমার? কী যা-তা বকছো••• কারা এসেছিল? কে? কার কথা বলছ•••? দেখেছ, ঘুমুলে তোমার কাপড় চোপড়ের হুস থাকে না•••ওঠ ওঠ একেবারে অগাগােড়া খালি••উঠে কাপড় পরে ভালাে হয়ে শােও••• মুখে গুপীনাথ এই কথা বললে বটে, কিন্তু তার মনে হতে লাগলে সুবালার ভেতরে ভেতরে নিশ্চয়ই কিছু একটা দারুণ অসুখ হয়েছে।
দিনের পর দিন কোন দিন শেষকালে হয়ত ভীষণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। না এমন ভাবে ফেলে রাখলে চলবে না। সুবালা সেই আর আগেকার সুবালা নেই। তার মেজাজ হয়ে গেছে খিটখিটে একটুতে চটে ওঠে!•••রাত্রে ঘুমােতে ঘুমােতে কেঁদে ওঠে !•••এ তো ভালো লক্ষণ নয়। না কালই ডাক্তার আনতে হবে। অবিনাশ ডাক্তারের হাত-ষণ নাম-যশ আছে এ-পাড়ায়, তাকেই আনতে হবে। তার ফিস্ কিছু বেশী—তা হােক কেই আনতে হবে—টাকার মায়া করলে চলবে না আর।
মরা পাখীর পালক ; ; স্বভাবতঃ আমি একটু নির্জনতা-প্রিয় ; তাই সবাই আমাকে ভাবে লাজুক। কাউকে আমি আনন্দ দিতে পারিনা; সাধারণ লােকে প্রথম পরিচয়ে আমার সঙ্গ কামনা করেন। নতুন লােকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে হলে আমাকে বিপদে পড়তে হয়। তাই যখন যেখানেই আমি যাই, পরিচিতদের দৃষ্টি-পরিবেষ্টিত হওয়ার কুণ্ঠা আমায় ভােগ করতে হয়না। নিশ্চিন্তে আর নিঃসঙ্কোচে চলাফেরা করি ; অপরিচয়ের অবাধ স্বাধীনতায় আমার দিন কাটে! আমার কোনখানে ত্রুটি কোনখানে ফাকি-তা ধরা পড়ার লজ্জা থেকে আমি বাঁচি! কিন্তু তবু এইবার পুরীতে এসে ভদ্রলােকের সঙ্গে হঠাৎ আলাপ হয়ে গেল। কী জানি প্রসাদবাবু কেমন করে বুঝি জানতে পেরেছিলেন আমি লেখক ! নিজে থেকে এসে পরিচয় যখন ঘনিষ্ঠ করে তুললেন, তখন আর তাকে এড়াতে পারলাম না। এত লােকের মধ্যে আমি কেবল মাত্র একজন সঙ্গী পেলাম। সত্যি কথা বলতে, সেই দিন থেকে তাকে আমার ভালাে লাগতে লাগলো। তার কারণ হয়ত এই যে, আমার লেখার তিনি নিন্দে করতেন। সেদিন হােটেলের বারান্দায় চুপ করে বসেছিলাম। ওদিকে আরাে ওদিকে, যেখানে ভ্রমণবিলাসী ছেলেমেয়েরা সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে চলেছে, সেখানে কত মানুষের ভিড়। সমুদ্রের জলের শব্দে—অস্পষ্ট “অন্ধকারে আর এই বহমান ঠাণ্ডা বাতাসের আবহাওয়ায় আমি নিজেকে বড় আপন বে কাছে পেয়েছিলাম। সারা জীবনের অপরিচিত পথ চলায় কত ;
দিনের পর দিন পরিশ্রান্তি-কত কষ্টার্জিত অভিজ্ঞতা—কত অগণিত উদ্দেশ্যের অর্থহীনতা —সমস্ত আজ নিজের কাছে প্রকট হতে লাগল । এই বিশ্রাম, এ আমার কাছে কত অমূল্য ! চিন্তায় আর পরিশ্রমে সারাজীবন কত স্বার্থ- ত্যাগ করেছি। অনেকদিন আগে কবে কার কাছে জিনিষ কিনে পয়সা দিতে ভুলে গেছি, কবে ট্রেনে কোন্ সহযাত্রীর কাছে বই পড়তে নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি, কবে আমার পায়ের চাপ লেগে এক বোলছানা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল—এই সমুদ্রের অপরিমিত বিশালতার দিকে চেয়ে সেই সব দিনের ছােট ছােট খুঁটিনাটিকে কেন মনে পড়ছে! আরও মনে পড়ছে। একটি দিনের কথা, একটি মেয়ের কথা নিতান্ত আকস্মিকভাবে বিনা চেষ্টায় যাকে কাছে পেয়েছিলাম, কিন্তু চেষ্টা করেও ষাকে ধরে রাখতে পারিনি। ওই প্রশান্ত পটভূমিকার ওপর অলস অপরাহের এই বিশাল বিস্তৃতি এই বর্ণ-সুষমা এ আমার বড় ভালাে লাগছে! পাশেই আর একটা চেয়ার ছিল ; কখন প্রসাদবাবু এসে সেটাতে বসেছিলেন টের পাইনি, একটু পাশ ফিরতেই নজরে পড়ল! কাম-নমস্কার, কখন এলেন? প্রসাদবাবু বললেন-লেখক মানুষ আপনারা, সমুদ্রের দিকে চেয়ে কত কি ভাবছিলেন তাই বিরক্ত করিনি; কিন্তু কী দেখছিলেন বলুন তো? সমুদ্র? দেখে দেখে আমার চোখ ত’ পচে গেল মশাই, অমন মুর্তিমান একঘেয়েমি আর কখনও দেখেছেন। সেই প্রেমের গল্পের মত একঘেয়ে নয়, বলুন? কতবার যে এখানে এসেছি তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু চোদ্দ বছর আগে একদিন যা এসে দেখিছি, আজ এই এখন এই মুহূর্তে সে রূপের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। সত্যি সত্যি, আজ একটা অনুরোধ করব ;
দিনের পর দিন আপনাকে আপনার আর ওই একঘেয়ে প্রেমের গল্প লিখবেন না, সত্যি- কারের একটু নতুন কিছু লিখুন দিকি, নতুন দিকে চেয়ে দেখুন তো- জীবন আর সমুদ্র অনেক তফাৎ—মানুষের জীবন আপনাদের মত অত একঘেয়ে নয়- প্রসাদবাবু যখন কথা বলেন তার চোখ দুটো উজ্জল হােয়ে ওঠে দাঁতগুলাে নড়ে কপালের শিরাগুলো ফুলে ফুলে ওঠে—আর ঠোঁট দুটো কঁপে! সেই সজীব চেহারার দিকে চেয়ে দেখলে বুঝতে পারি, একদিন কত উৎসাহ কত উত্তেজনা ছিল ওই বুকে—কিন্তু কেন জানিনা মনে হয়। কোথায় অন্তরের প্রান্তদেশে বুঝি তার নিদারুণ দৈন্যকোথায় যেন তার দুর্বলতা! বললেন—আজ আপনাকে একটা গল্প বলব, চলুন বীচের ওপর বেড়াতে বেড়াতে বলি । আমার এক বন্ধুর জীবনী। দেখবেন জীবন কত রূঢ় রুক্ষ, আর আপনাদের গল্প কত মেকি। এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কোথাও লেখেনি, কিন্তু--একটু দাঁড়ান, টর্চটা নিয়ে আসি। চারিদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে; বীচের ওপর ভিড় পাংলা হতে শুরু হােল। সুসজ্জিতা আর কুসজ্জিতা ছেলেমেয়েদের কথাবার্তায় বাতাস ভারী, টুকরাে কথা, গান, সিগ্রেটের ধোঁয়ায় মন বিরস হয়ে উঠলো। এই ভিড় ছেড়ে আমরা চক্ৰতীর্থের দিকে চলেছি। প্রসাদবাবুর মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম। সত্তর কি আশী বছর বয়সের বৃদ্ধ ; আশেপাশের কোনও দিকে তা’র আজ জ্বক্ষেপ নেই। কবেকার কোন বসন্তের বিস্মৃত কথার জালে হয়ত উনি ধরা পড়েছেন—অশ্রুজলের তীর্থে যে কয়টা পূজায় ফুল আজও শুকোয় নি হয়ত সেই সব কথা। সােনামাখা একটি মেয়ে- প্রীতিমতী একখানি মুখ, ভাসা ভাসা দু'টি চোখ, বাঁকা ভুরু আর. রাঙা দিনের পর দিন ঠোট হয়ত পঞ্চাশ বছরের উজান ঠেলে আজ এই বৃদ্ধের মনে উদয় হ’ল ; চুপ করে পাশে পাশে চলতে লাগলাম। প্রসাদবাবু বললেন—মানুষের জীবনে কারো কারাে এমন সময় আসে যখন মনে হয়। এ কিছু না—এই বেঁচে থাকা! দিনের পর দিন প্রাণধারণ আর কুৎসিৎ পৃথিবীর গ্লানি বহন করে বাঁচা! এ কিছু না, কেবল শরীরের একটা ক্ষতচিহ্নের মত রক্তের নিঃসারতা প্রমাণ করা! কেবল ছন্দ-পতন! এক এক সময় সত্যিই এমনি মনে হয় আমাদের অথচ কোনও যুক্তিসঙ্গত উপায় নেই সেই যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পাবার, দিনাদৈনিক সেই অসহনীয় যন্ত্রণা—শুধু চলতে হবে একঘেয়ে পথশ্রমের ক্লান্তি নিয়ে। দীর্ঘ নিঃশ্বাসের তাপে বাতাস হয়ত দূষিত বিষাক্ত হয়ে উঠবে ; আমরা বেচে থাকি—নিঃশ্বাস ফেলি—নিতান্ত যান্ত্রিক অভ্যাসের মতই আমাদের সব করতে হয়, না করলে চলেনা, অথচ প্রতিমুহূর্তে আমরা মৃত্যুর ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করি, আমাদের জীবন বিষময় ফেনার স্পর্শে শিথিল হয়ে আসাত থাকে ; আমরা মরতে চাই, সমস্ত এই বিকৃতির থেকে মুক্তি পেতে চাই, কিন্তু হয় কি আমরা বেঁচেই থাকি, আর জীবনকে অভিশাপ দিই—ঠিক এমনি একটি লােককে আমি চিনতাম, তারই কথা আপনাকে বলব আজ- তখন আমরা সমুদ্রের ধার ধার দিয়ে চলেছি। হঠাৎ এক একট। অতর্কিত ঢেউ এসে আমাদের পা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে অবিমিশ্র সাদা ফেনায় সমুদ্রের ধার শুভ্র হয়ে উঠছে। সেই ঢেউয়ের সঙ্গে চিক চিক করে উঠছে নানা রঙের ঝিনুক—ছােট, বড়, মাঝারি । ভিজে বালির উপর দু'জোড়া পদচিহ্ন রাখতে রাখতে আমরা চলেছি। অনেকদুৱে পূৰ-মুখে ঝাউবন—ছাড়া ছাড়া বাড়ী—স্বাস্থ্য-সঞ্চয়ী বৃদ্ধ-বৃদ্ধ। ;
দিনের পর দিন আর রােমাঞ্চ-সন্ধানী যুবক-যুবতীদের ভিড় এদিকে, পাৎলা হয়ে এল। সমুদ্রের নীল জলে কষ্টুম-পরা শ্বেতাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গীদের দেহ এই অন্ধকারেও স্পষ্ট! সমস্ত কোলাহল আর কল্লোল পেছনে ফেলে আমরা অনেকদূরে চলে এসেছি—অতীত দিনের গল্প বলা আর শোনার পক্ষে একান্ত অনুকূল আবহাওয়া!••• প্রসাদবাবু বলতে লাগলেন—ধরুন সুমতিবাবু তার নাম। নাম শুনে আমরা যে রকম চেহারার কল্পনা করি তার চেহারা তেমন নয়। ছফিট দু’ইঞ্চি লম্বা একটি দেহ-বলিষ্ঠ বাহু-মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবয়বের একটি সুগঠিত সামঞ্জস্য ; প্রথমেই দেখলে মনে হবে লােকটি সবল সুস্থ আর মানসিক শক্তিতে অটুট। সত্যি কথা বলতে, বাঙ্গালীর মধ্যে সে-রকম চেহারা দেখলে দু’দণ্ড চেয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়—সেই উদ্ধত নাসিকা আর দৃঢ় চক্ষুর সামনে অনেককেই মাথা নীচু করতে হবে; কিন্তু আর কেউ না জানুক আমি তাে জানতুম সে মানুষটির ভিতর কী গােপন দুর্বলতা, অহরহ মনের মধ্যে তার কী ব্যাধি-যন্ত্রণা—প্রাত্যহিক মুহুর্ত যাপনে কী প্রবল মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষা। অনেক সময় দেখছি সুন্দর দেখে যে ফুলটি গাছ থেকে তুলতে গেছি সেই ফুলটিতেই পােকা, সূর্যাস্তের রক্তি- মাভার পেছনেই তাে আছে রাত্রির কালো অন্ধকার! চকচকে শান্ দেওয়া ছোরাতেই তো মৃত্যুর অনিবাৰ্যতা! অর্থাৎ এককথায় যেখানে আমাদের সঙ্কোচ আর সন্দেহ কম, ভয় আর বিপদের উৎস সেখানেই লুকিয়ে ; বন্ধুর কাছেই আমরা বিশ্বাসঘাতকতা পাই, শত্রুর কাছে নয়। যাক গে, আসল কথা বলি। এই সুমতিবাবুকে দেখলেও সাধারণ লোকের সেই ধারণাই হবে ! শাও সুন্দর সুস্থ মনের বুঝি একটি সর্বশ্রেষ্ঠ, উদাহরণ! কিন্তু যদি সকলে দেখতে কোথায় তাঁর গলদ-কোথায় কঁাটা।
০ । দিনের পর দিন ফুটছে—বাইরের ছদ্মবেশ খুলে ফেলে যদি কেউ ভেতরে ঢুকতে! কিন্তু সে কেবল আমি জানতুম—খুলেই বলি এবার—তার ছিল কুষ্ঠ-খেত কুষ্ট-ওই নীল আকাশের এককোণে একটুকরাে বিবর্ণ মেঘের মত একটি দাগ অস্পৃশ্য আর অশ্লীল প্রসাদবাবু থামলেন। প্রশান্ত মুখের ওপর নীল জলের ছায়াপাত হয়েছে। সুমতিবাবুকে চিনিনা, সুমতিবাবুকে দেখিনি, সুমতিবাবু আমার কাছে কল্পনা, কিন্তু এই প্রত্যক্ষ লােকটিকে চিনি, এই প্রসাদবাবু—কবেকার বিস্মৃত-কাহিনী আজ এর মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠলো—অভ্রভেদী আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগলাম—এ যেন গল্প শােনা নয়—বাস্তব ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি প্রসাদ বাবু আরম্ভ করলেন- কোরে জানাব আপনাকে কী তঁার যন্ত্রণা—কী তঁাব ব্যথা। বইেরে তিনি হাসতেন—গল্প করতেন—মনে হােত ভেতরটাও বুঝি তঁার অমনি সাদা; কিন্তু বুকের মধ্যে তার সারা জীবন চিতা জ্বলেছে— আপনি বুঝতে পারবেন না কী ছিল তাঁর প্রতিভা ! যদি কোনও দিন তিনি ব্যাধিমুক্ত হতেন তাহলে দেশের লােক বুঝতে কত কাজের লােক তিনি! কিন্তু তা হয়নি নিজের ব্যাধির দুশ্চিন্তা তাঁকে এক মুহূর্তের বিশ্রাম দেয়নি। তার মনে হােত। ভগবানের অভিশাপগ্রস্ত জীব তিনি -গশ মান অর্থ শান্তি পৃথিবীর যা কিছু কাম্য তা তার জন্যে নয়। মনে হয়েছে। এ পৃথিবীর তিনিও তাে একজন মানুষ—ভগবানের সৃষ্ট জীবের তিনিও তাে একজন—এই তৃণ, আকাশ, বাতাস, সুখ, স্বস্তি এতে তাঁরও অধিকার আছে—তারও অধিকার আছে তাদের আলােয়মুক্ত বায়ুতে, অধিকার আছে বেঁচে থাকতে-গী আর সবুজ প্রাণ নিয়ে চলাফেরা করতে—তারও অধিকার আছে আর সকলের বিনের পর দিন মত গানে আর গন্ধে পাগল হতে-হাসি আর কথায় উজ্জ্বল হতে; তিনিও মানুষ, তার প্রতিবেশীর যা আছে যেটুকু আছে তার চেয়ে বেশী আছে তার ; তবু তিনি নিঃস্ব, পৃথিবী তার কাছ থেকে অনেক দূরে। তার যেন নিৰ্বাসন হয়েছে—এদেয় পৃথিবীতে প্রবেশ করবার ক্ষমতা নেই তার। তিনি অস্পৃশ্য—তাঁর দেহ ব্যাধি যুক্ত—তার যে কুষ্ঠ আছে । কী করে আপনাকে বােঝাব সেই দিনাদৈনিক যন্ত্রণার ইতিহাস। তার ব্যাধির অশ্লীল দাগটি যেন তার জীবনের পথে-ঠার বঁচে থাকার পথে একটা বিরাট কলঙ্ক ! অপরিচিত লােকের তীক্ষ-নিবন্ধ দৃষ্টির আঘাতে তার সমস্ত অঙ্গ সমস্ত ইন্দ্রিয় আগুনের মত অসহ্য হয়ে উঠত কেন তার দিকে লােকে চায় ? কী তার পাপ ? রাস্তায় ঘরে বাড়ীতে কোথাও তার শান্তি নেই—সান্ত্বনা নেই—সারা জগতের দৃষ্টি তার ব্যাধিকে অনুসরণ করে অলক্ষ্য ও অশ্রাব্য বিদ্রুপ করছে! সারা পৃথিবীর কোথাও সহানুভূতি নেই। অসংখ্য পথচারী আর পথচারিণীর মধ্যে তাকে—কেবলমাত্র তাকে চিহ্নিত লক্ষ্য করে জগতের সমস্ত লােক যেন অভিশাপ বর্ষণ করছে। তার স্পর্শে বাতাস নাকি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। তার ছােয়ায় মাটি কলঙ্কিত হয়। পরিচিত বন্ধুরা দূর থেকে বিদায় জানায়—তার বাড়ীতে আসতে তাদের হৃৎকম্প হয়! কেন তবে বেঁচে থাকা? তঁার এক একবার মনে হােত-কেন তবে বেঁচে থাকা? আপনাকে প্রথমেই বলেছি—এক এক সময় আমরা মরতে চাই—মৃত্যুর ইচ্ছা আমাদের প্রবল হয়ে উঠে—তবু আমরা পারি না—দিনের পর দিন এই গ্লানি বহন করে আমরা বেঁচেই থাকি-বেঁচে থাকি আর জীবনকে অভিশাপ দিই; ঠিক এমনি হােত সুমতিবাবুর! সারা পৃথিবীর পুঞ্জীভূত বিজ্জপ যেন তার শিরে দিবারাত্রি বর্ষিত হচ্ছে। মানুষ তাকে কাছে দিনের পর দিন = পেতে চায় না। জানালা খুলে কত রাত তার জেগে জেগে কেটেছে কত উঁদ আকাশে জ্বলে গেছে-ব্যাধির দুর্ভাবনায় তার ঘুম উড়ে গেছে। জীবনকে বুঝি তিনি বড় বেশি করে ভালবেসেছিলেন তাই মরণ ছিল তার চিরশত্রু! সারা জীবনে তিনি কোন মানুষের সহানুভূতি পানি- তার দিন কেটেছে তাচ্ছিল্যে আর অবহেলায়! দুর্বিষহ বেদনায় তাঁর জীবন ছিল ভারগ্রস্ত। কল্পনা করুন তো এমন একটি লােককে—পথে চলতে যার ভয়- বাড়ীতে থাকতেও যার অশান্তি। তার ব্যাধি তার ওই অস্পৃশ্য দাগই তাকে এক মুহূর্তের বিশ্রাম দেয় নি। অথচ সত্যি বলতে, সে-ব্যাধির এতটুকু যন্ত্রণা নেই—তবু অনেক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধির চেয়েও এ যেন ভীষণ ! সেই বিবর্ণ সদা দাগ নিয়ে চলাফেরা, দুেই শ্রান্তিহীন দুশ্চিন্তা তাকে যে শেষ পর্যন্ত পাগল করেনি, সে কেবল তার বিশাল ধৈর্য্যের গুণে। তার মনে হােত : যদি ব্যাধিই তাকে ভগবান দিয়েছিলেন—তবে তাকে পাগল করেন নি কেন?কেন সভ্য সমাজে, শিক্ষিত আবহাওয়ায় তাঁর জন্ম হােল। তবে কেন লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে থাকার জ্ঞান র হােল। কেন তাঁর জন্ম হােল না অতি নীচ-শুরের বস্তিতে, যেখানে ব্যাধিকে কেউ ঘৃণা করে না, কারণ ব্যাধিগ্রস্ত সেখানে সবাই-সেখানে জন্মালে এমন নীরব লাঞ্ছনা তাকে ভােগ করতে হােত না-লজ্জায় ম্রিয়মান থাকতে হােত না; বিবাদে আর নিশ্চিন্তে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তঁার আনন্দে কেটে যেত! প্রসাদবাবু এবার থামলেন। বললেন—একটা কথা আমার বলতে ভুল হয়ে গেছে সুমতিবাবুর বিয়ে হয়েছিল। একটি শান্তিময়ী সরলা মেয়ে-কা স্নেহ, কী সেবা নিয়ে সে যে সুমতিবাবুর সংসারে এসেছিল, দিনের পর দিন কী বােলবাে! ব্যাধিগ্রস্ত লােকটিকে কী সে দেবে সান্ত্বনা, কেমন করে দেবে প্রেম•••সেই ছিল তার একমাত্র চিন্তা! এই সত্তর বছর ধরে জীবনে তাে অনেক জায়গাতেই ঘুরেছি-পাহাড়ের আর সমতলের সব জায়গাতেই আমার গতিবিধি, কত লােক, কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হােল-কিন্তু অমন একজন মহিলা আর দেখলুম না। সংসারে দৈন্ত-দারিদ্র আছে—আছে তাে? প্রতি মুহূর্তে আমাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়ে, ক’জন মুখ বুজে সব সইতে পারে বলুন? নীরব হাসি দিয়ে প্রশান্ত মেহদৃষ্টি দিয়ে সমস্ত অনর্থকে কে ক্ষমা করিতে পারে, বলুন তো? অথচ সত্যিই তার অন্তরেও দুর্যোগের ঝড় বইত-তবু যখনই গেছি—মেহ আর আতিথ্যের ত্রুটি কোথাও এতটুকু হতে দেখিনি! সুমতিবাবুর জীবনে যদি কোথাও সান্ত্বনা থাকত তাে সে কেবল তার ওই সহধম্মিণীতে। কিন্তু তবু বলবো : সুমতিবাবু ভুল করেছিলেন•••মস্ত ভুল•••ওই বিয়ে করাই হয়েছিল তার জীবনের চরম ভুল!•••কেন ?--সে কথা পরে বলছি- এবার অনেকক্ষণ ধরে প্রসাদবাবু চুপ করে রইলেন। পাশ্বে এই চঞ্চল সমুদ্র••আর সামনে কেবল বালির রাজ্য—আর এদের কেন্দ্র করে চারিদিকে অন্ধকারের বিশাল বিস্তৃতি !—সমস্ত মিলে এক অভিনব ইন্দ্রজাল রচনা করেছে! দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সমুদ্রের বুকের ওপর একখণ্ড চাৰু উঠেছে মেঘে অর্ধ-আবৃত মলিন চঁাদখানি, জলের উপর তারই আভা দুলছে সেই দোদুল্যমান অস্পষ্ট রেখাটি জলের উপর দিয়ে সােজ। আমাদের পায়ের কাছে পর্যন্ত এসে লুটিয়ে পড়েছে ;-আমরা পূবমুখখা চলেছি••• আবার শুরু হােল•••• প্রাসাদবাবু বললেন-সেইদিনটার কথা আমার আজো মনে আছে। ।
? দিনের পর দিন তখন শেষ-রাত্তির—অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। বাইরের ঘরে আকাশভেদী উৎকণ্ঠা নিয়ে সুমতিবাবু আর আমি বসে আছি। ভেতরে ডাক্তার আর দাই ঢুকেছে। সমস্ত বাড়ীতে ভয় যেন মুক্তি নিয়ে নিঃশব্দ পদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথম প্রসব-উৎকণ্ঠা সে জন্যে ততো বেশী নয়—উৎকণ্ঠার কারণ ছিল অন্য সুমতিবাবুর ধারণা : পৃথিবীতে যে আসছে তার ভাল-মন্দর দায়িত্ব সুমতিবাবুর নিজের। তার যদি কুষ্ঠ হয় ? তার মত সাদা সাদা অস্পৃশ্য দাগ যদি তার গায়েও থাকে? তাহলে কী হবে? কত বােঝালুম ! সত্যি সত্যি শ্বেতকুষ্ঠ তাে আর সত্যিকারের কুষ্ঠ নয়—কী বলেন—লিউ- কোডারমা কি আর কুষ্ঠ ? চামড়ার ওপর সামান্য একটু প্যাচ ছোঁয়াচেও নয়—আর বংশগতও নয় !•••ডাক্তারী বইতে তো তাই বলে । কিন্তু সুমতিবাবু কিছুতেই বুঝবেন না! সেই রাত তির বেলা অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে—সেই ঘরে বসে সুমতিবাবু যেন কেঁদে ফেললেন । কী করে আপনাকে বােঝাবাে তখনকার সেই মনের অবস্থা! সেই বাতাসে দোদুল্যমান উৎকণ্ঠা ! সেই ছুচের মতন সুতীক্ষ্ম আগ্রহ। কী হবে কী হবে প্রতিমুহূর্তের সেই প্রবল আশঙ্কা! সেই জীবন-মরণ সমস্যা। সে কি কেউ ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছে? চুপ করে দুজনে বসে আছি। আর প্রহর গুণছি-হঠাৎ ভেতর থেকে শাধের আওয়াজ এল। দুর্বার কৌতুহল দিয়ে সুমতিবাবু ছুটলেন- ছােট নবজাত ছেলে একটি। ছেলেটির সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তন্ন তন্ন করে দেখা হােল। দেহের গােপনতম আর তুচ্ছতম অংশটি পৰ্য্যন্ত খোজা হােল। কলঙ্কের চিহ্ন কোথাও আছে নাকি? কোথাও সেই ব্যাধির দিনের পর দিন একটি অস্পষ্ট দাগও কি দেখা যাচ্ছে। সেই অন্ধকারে উজ্জ্বল আলাের সাহায্যে সুমতিবাবু ছেলেটির আগাগােড়া পৰ্যবেক্ষণ সুরু করলেন। নেই—কোথাও নেই! সুমতিবাবু দেখলেন—ডাক্তার দাই সবাই তীক্ষদৃষ্টি দিয়ে দেখলে—নেই কোথাও ব্যাধির দাগ নেই। এত আনন্দ সুমতিবাবু কোথায় রাখবেন ? সেদিন সেই মুখে যে প্রফুল্লতার প্রচ্ছায়া দেখেছিলাম জীবনে আর কোনদিন তো দেখলাম না। কিন্তু সত্যি বলতে আমার নিজের ভয় কিন্তু তখনও কাটেনি।—কেন কাটেনি সে কথা পরে বলব। আপাতত এই বলে রাখি : সেদিন সুমতিবাবুর সেই আনন্দে আমিও আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে তাে পারছেন-যে মানুষ জীবনে হতাশ-ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে যে- মানুষের দিন কেটে যাচ্ছে—যার পথ চলায় পাথেয় কেবল বাইরের অজস্র বিপ—তার জীবনে এ কতখানি আনন্দ-তার প্রাণে এ কী সান্ত্বনা। তিনি যেন নতুন করে আবার জন্মগ্রহণ করলেন।-নতুন যেন সূর্যোদয় হােল। সুমতিবাবু পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য নিয়ে বাঁচলেন—তার মনে হােল- পৃথিবীতে বেঁচে সুখ আছে- কিন্তু প্রথম দিনটি থেকে ছেলের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা হােল। সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা ! তার নতুন ঘর—নতুন বিছানা-নতুন আসবাব- এ-বাড়ীর সঙ্গে তার কোনও সংস্রব থাকবে না। এ-বাড়ীর প্রতিটি জিনিষ ও-শিশুর অস্পৃশ্য! এ রােগ ছোঁয়াচে নয়—স্পর্শদোষে এ যােগের ৰে উৎপত্তি হয়না সুমতিবাবু কি আর সে কথা জানতেন না। তবু বলা কি যায়-সাবধানতার মার নেই- আলাদা বাড়ীতে বিজন মানুষ হতে লাগলাে। মা তাকে প্রশৰ করেই খালাস! সুমতিবাবুর হুকুম হয়ে গেল। এবাড়ীর কেউ ওকে দিনের পর দিন ছাতে পারবে না। দাই এল এল ঝি। মাইনে করা লােক এল স্নেহ আর সেবা দিয়ে বিজনকে মানুষ করে তুলতে। মা বাপ তাকে ছুতে পারবে না। সে-বাড়ীর কোন জিনিষও মা’র অস্পৃশ্য। রাত্রিবেলা বিজন হয়ত কেঁদে উঠেছে : এ-বাড়ী থেকে সুমতিবাবু শুনতে পেলেন। ছেলে কাঁদছে—দুধ খাবার জন্যে কাঁদছে। মা কাছে নেই—মাইনে করা আয়া সেও ঘুমােচ্ছে! ছেলে তখনও কাদছে! দু’জনে জেগে উঠলেন। কিন্তু উপায় নেই। খানিক পরে কঁদতে কাঁদতে আপনিই থােকা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে—খুব ক্লান্ত হয়েছে হয়ত ! সুমতি বাবুর চোখে আবার ঘুম নেবে এল।-কাঁদুক আর যাই করুক-এ-বাড়ীর কেউ ওকে স্পর্শ করবে না। সেই ছেলেমার দুধ না খেয়েও যে বেঁচে রইল কেমন করে সেইটেই আশ্চৰ্য্য। এমনি করে সেই ছেলে বড় হােল। দিনের পর দিন-বছরের পর বছর গেল-বিজন বুঝে নিলে বাবা মা’কে ‘তে নেই। আলাদা বাড়ীতে সে আয়ার কাছে মানুষ। ঝি আছে তারাই তার সব কাজ করে দেয়।-বাবা মা দুরে দাড়িয়ে দেখেন। পূজোর সময়-বিজয়ার দিন নতুন জামা কাপড় পরে থােক। এল। এসে সুমতিবাবুর সামনে দাড়াল। নিচু হয়ে মার পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করতে যাচ্ছিল সুমতিবাৰু চেঁচিয়ে উঠলেন—না না-গােন তা বলে-হ্যা দুর থেকেই দূর থেকেই নমস্কার শেষ হােল। এমনি বছরের পর বছর। যখন বয়স হােল-স্কুল পেরিয়ে কলেজে দিনের পর দিন গেল—তখন সে রীতিমত বুঝে নিয়েছে। কলকাতায় নতুন বাড়ীতে নতুন জায়গায় এসে সে আত্মহারা হয়ে উঠলাে। সারা পৃথিবীতে সে একলা। বাড়ীতে শুধু চিঠি যায় আর তার নামে আসে টাকা। এর বেশী সম্বন্ধ সুমতিবাবু রাখতে চাননি। বিজন মানুষ হােক—আকাশের মত বিশাল তার কল্পনা-সমুদ্রের মত অশান্ত তার স্বপ্ন মানুষ তােক সেসুমতিবাবুর নিজের জীবন অস্তিত্বহীন তার ধেন মৃত্যু হয়েছে—ছেলের সাফল্য দেখেই তার শাস্তি। শেষে সুমতিবাবুর আশা হােল : ছেলে মানুষ হবে। মানুষের মত মানুষ হতে সে পারবে। জীবনে কখনও সে দ্বিতীয় হয়নি-স্কুল থেকে কলেজে উঠেছে প্রথম হয়ে। যেন এত ছেলের মাকে প্রথম হবার অধিকার কেবল মাত্র তার একলার। কলেজের সমস্ত অনুষ্ঠানে বিজনের সাহায্য অনিবাৰ্য্যরূপে প্রয়ােজনীয়। ডিবেটিং ক্লাব সরস্বতী পূলো- কোথাও সে বাদ নেই। বছর বছর দেশে বসে সুমতিবাবু খৰব পান এক একটা পরীক্ষার শেষে ছেলে কেবল ওই এক কথাই লেখে—এবার আমিই ফাই হয়েছি বাবা- ঘর থেকে বেরিয়ে সুমতিবাবু এপাশ ওপাশ চেয়ে বলেন-কই, কোথায় গেলে তুমি? সর্বেশ্বরী পাশেই কোথাও ছিলেন হয়ত। সামনে এসে দাঁড়াতেই সুমতিবাবু বলেন-মঙ্গলচণ্ডীতলায় পূজোর সিদে পাঠাও-বি ফা প্রত্যেক ছুটিতে সুমতিৰাৰু লেখেন—দেশে তােমায় আসতে হবে না—দার্জিলিং কি অন্য কোথাও মাওশাদয়কা শিখবে- দিনের পর দিন কেবল চিঠি আর চিঠি। দু’শশা মাইল দূর থেকে একটি সজীব প্রাণের বার্তা বয়ে আনে কেবল ওই একটি চিঠি! দিন গেলে দিন আসে—চিঠির পর চিঠি। সুমতিবাবুর টেবিলে চিঠির পাহাড় জমেছে। নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ কী যেন স্বপ্ন দেখে সুমতিবাবুর ঘুম ভেঙে যায়- নছে ওগাে সর্বেশ্বরী শুনতে পেয়ে উঠে পড়েন।-সুমতিবাবু বলেন-খারাপ স্বপ্ন দেখেছি একটা-টেলিগ্রাম করতে হবে- এক একদিন বিকেল বেলা আকাশ যখন পরিষ্কার থাকে চেয়ারটা বাইরে বাগানে এনে সুমতিবাবু বসেন। দূরে আমবাগানের মগডালগুলাের ওপর যেখানে আকাশ নিচু হয়ে এসেছে সেই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অনেক সাধ বুকের মধ্যে জমা হয়ে ওঠে। এমন সময় বিজন যদি কাছে থাকতো। যদি সে এই এখন তার পাশে এসে বসতাে! বসে গল্প করতো! ওদেশের গল্প—এদেশের গল্প ! কিম্বা এমনও হতে পারতো এক বাড়ীতে এক সঙ্গে থেকে জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত ছেলের সাহচর্যে কেটে যেতো। যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে চারিদিকে—গুটি গুটি পায়ে অন্ধকার ক্রমে তাকে ঘিরে ফেললে সুমতিবাবু উঠে আসেন। ঘরে এসে বসেন। সর্বেশ্বরী চিরকালই কমকথার লােক ; বসে থাকেন চুপ করে-নয়তাে শুয়ে থাকেন —অথবা কথাও নয় ঘুমও নয়—এটা ওটা নাড়েন চাড়েন। সুমতিবাবু কাছে গিয়ে বলেন—চাবিটা কই আমার? সর্বেশ্বরী তবু একবার জিগ্যেস করেন—চাবি? চাবির এখন কী ; মিটার ভেতরে দরকার আছে আমার , ১ पिटमा पिम চাবি নিয়ে সুমতিবাবু বাক্স খােলেন। ছােটবেলায় বিজন যে স্কুল বুমিটি নিয়ে খেলতে, যে জামাটি পরতাে—তার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত অনেক জিনিষ তার ভেতরে পােরা আছে। সেগুলাে একটা একটা করে বের করেন হাত বুলােন-নাড়েন, আবার রেখে দেন। ছেলেকে তিনি কোনও দিন স্পর্শ করেন নি—তাঁর নিজের ছেলেকে ছোঁবার অধিকার তার নেই---তাই তার ব্যবহৃত জিনিষগুলি অমনি করে কৃপণের মত বাক্সের ভেতর পুরে রেখেছেন—যখন ছেলেকে কাছে পাবার ইচ্ছে হয়, বড় সাধ হয় ছেলের গায়ে হাত বুলােতে, তখন এই বাক্সটা বার করেন, বার করে পুতুল ঝুমঝুমি চুষিকাটি—এটা-সেটা সবগুলাে নিয়ে অতি সাবধানে স্পর্শ করেন। ওইগুলােই তার সান্ত্বনা, বহুমূল্যবান পাথেয়। কিন্তু—যাই হােক—যিজন মানুষ হােল। সবগুলো পরীক্ষার পাশ থেকে মুক্ত হয়ে সে চাকরি পেলে-কোন কলেজের প্রফেসারী তারপর এল সেই দিন—সেই চির পুরাতন দিন—প্রজাপতির পাখার মত রঙিন আর রমণীয়— এতক্ষণ পবে সুমতিবাবু থামলে— বললাম--তার বিয়ের কথা বলছেন? বললেন—ঠিক ধরেছেন। তবে সাধারণ বিয়ের মত ঠিক নয়-এমন সময় আসে জীবনে, যখন মনে হয় পৃথিবী যেন গােলাপের পাপড়ীর মত নরম আর গন্ধময়। পৃথিবীর প্রথম বসন্তের মত রমণীয়! যখন কাউকে ভালবাসি ; ভালবেসে আমরা সৌভাগ্যের উচ্চশিখরে উঠি। তখন আকাশের তারা আমাদের করতলগত সমুদ্রেব রই অামাদের দিনের পর দিন আয়ত্বাধীনে; বাতাসে আলােতে আমরা পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচি! নিজের সৌভাগ্যে নিজের রােমাঞ্চ হয়। তখন আমরা প্রেমে পড়ি। প্রেম-কোনও মেয়ের প্রেমে আমরা উন্মাদ হয়ে যাই। তখন পথে যে আমাদের বাধা দিতে আসে সে আমাদের শত্রু। সেই প্রেমের প্রথম অনিশ্চিত মুহূর্তগুলি—সেই অনাস্বাদিতপূর্ব এর নােমাঞ্চের প্রথম দিনগুলি-কল্পনা করুন সেই প্রথম চোখে চোখে চাওয়াচেয়ে থাকা-অপলক দৃষ্টিতে দণ্ডের পর দণ্ড দু’জনের দিকে চেয়ে থাকা—সেই দীর্ঘ চাহনি, যে চাহনি নিবিড়তম স্পর্শের চেয়েও রােমাঞ্চকর যে চাহনির কেবলমাত্র একটি অর্থ আছে—আত্মদান! সেই চুরি করে চাওয়া—অস্পষ্ট অথচ নিস্তরঙ্গ নদীর জলের মত স্বচ্ছ—সেই সবার চোখ এড়িয়ে একটি পলক দেখে নেওয়া-সে-সব লেখক আপনারা, ভালো করে বর্ণনা করতে পারবেন—এক কথায় বিজনের সঙ্গে শ্ৰীলতার বিয়ের ঠিক কেমন করে বর্ণনা করবাে জীবনের সেই প্রথম বসন্তোদয়ের কথা। যত পারে দুই চোখ দিয়ে দুই চোখের আলাে নিঃশেষ করে দেওয়া কল্পিত আলিঙ্গনের স্বপ্নে শিউরে ওঠা—চিন্তায় আর কল্পনায় বিয়ের পরের সমস্ত ঘটনাগুলাের আনুপূর্বিক চিত্র আঁকা—সে সব আর আমি কত জানি বলুন- পাকাপাকি কথা হয়ে গেছে। সবাই জানে তাদের দুজনের বিয়ে হবে। জিনিষপত্রের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি দিনের শেষে আর একটি নবাগত দিনের উদয়—নিকটতম শুভমিলনের আগ্রহে তার। আগ্রহান্বিত। সন্ধ্যাবেলা বাড়ী ফেরার পথে বিজন বললে—আর দু’দিন- দু’দিন। শীলতা বাড়ী ফিরে যেতে যেতে বললে—দুটো দিন দেখতে দেখতে যাবে- ৭১ দিনের পর দিন সত্যি সত্যিই আর মাত্র দুটি দিন। কিন্তু সে দুটি দিন কী দীর্ঘ। কত অসহ সে দুটি দিনের দীর্ঘসূত্রতা। দুটি দিন—আটচল্লিশ ঘণ্টা। পৃথিবীর ক্রমপরিণতির ইতিহাসে ওই দুটি দিনের মূল্য কত অকিঞ্চিৎকর। প্রত্যেকটি মুহূর্তের গতি কত বিলম্বিত। সূৰ্য্য আর চন্দ্রের আকর্ষণ- বিকর্ষণ—গ্রহমণ্ডলীর সুপরিচালিত গতিবিধি•••সমন্তের যদি নিয়মিত কাৰ্য্য- দক্ষতা সক্রিয় থাকে তবেই তাে দুটি দিন নির্বিঘ্নে কাটবে। বিজনের এই ঘর দেখছে-এই টেবল চেয়ার, আয়না, চিরুনি, লাইব্রেরী সমস্ত জিনিষ দু’দিন পরেও ঠিক এমনি থাকবে। যেমন এখন আছে—অপ্রতি হত অবাধ ! তবুও জিনিষগুলাের অস্তিত্ব দু’দিন পরেই কত সুমঞ্জস ঠেকবে—কত সুন্দর ঠেকবে! শ্রীলতা তখন এই ঘরের চারটি দেয়ালের অবরােধে বন্দী হবে! এক ঘরে, এক প্রতিবেশে। শ্ৰীলতার দেহ স্পর্শ করলে তখন আর বে-আইনী বলা চলবে না। সে তার হৰে- একান্ত তার! নিতান্ত নিরিবিলি ঘরে শ্রীলতা যখন ওই বিছানার ওপর শুয়ে থাকবে-সমুদ্রের ফেনার মত শাদা বিছানার ওপর বাঁকান দেহখানা এলিয়ে—তখন তার কাছে গিয়ে, পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে অলস মধ্যাহ্নের আবহাওয়া বিলাসিতায় কাটিয়ে দিতে পারে! কিম্বা লতা যখন ওই আয়নাটার সামনে দাড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে চুলের বিনুনি করবে, অথবা দুটো হাত উচু করে তুলে খােপার ওপর আঘাত করে করে খােপকে যথাস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে,তখন আর বিজনকে চোখ বুজিয়ে ঘুমােবার ভান করতে হবে না। কেবল মাত্র দুটি দিন! এখন যে বাতাস ঘরে বইছে সে বাতাস তখনও বইবে, কিন্তু তখন তা হবে নূতনতর, প্রতিস্পর্শে রােমাঞ্চকর। সে দুটি প্রতীক্ষমান দিনের বর্ণনা দিতে পারবে তেমন আশা করবেন দিনের পর দিন না আমার কাছে। সে বয়সও নেই—সে অভিজ্ঞতাও নেই! তবু এটুকু বলতে পারি সেই দুটি দিনের প্রত্যেকটি মুহূর্তের পদধ্বনি বিজন কান পেতে শুনতে লাগলাে। আজ যে-সূৰ্য্য আকাশে জ্বলছে, এখন থেকে অবিশ্রান্ত জ্বলার পরও সে আবার জ্বলবে। নূতন উজ্জ্বলতা নিয়ে, পরিপূর্ণ প্রাথৰ্য্য নিয়ে আটচল্লিশ ঘণ্টা পরেও সে উঠবে এই আকাশে। শ্ৰীলতা তা’র—মানে বিজনের অনিবাৰ্য ভাগ্যকে অতিক্রম করে অন্তর্ধান হতে পারবে না। দিনের সমস্ত পরিশ্রমের শেষে পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তি নিয়ে বিজন নিজের নতুন বাড়ীতে ফিরে এল। নতুন একটা বাড়ী সে এই উদ্দেশ্যে ভাড়া নিয়েছে। শ্ৰীলতা একটু আগেই বিজনকে বলে গেছে—“এখন অব ভাগ্যকে ভয় করবাে না—ভাগ্য যদি অস্বীকারও কবে তবু তুমি আর আমি পরস্পরের আরো বলেছে-আমরা দু’জনকে যখন পেযেছি, তখন দরকার হলে ভাগাকে অপমান করতেও দ্বিধা করবাে না-আমি তােমার আছিই— সুতরাং বিজন যখন বাথরুমে ঢুকলাে তখন তার মনকে পরিতৃপ্তই বলতে হবে। বিকেল হয়েছে। পশ্চিমদিকে শার্সির ভেতর দিয়ে সূৰ্যের জাজ্বল্যমানতার প্রমাণপত্র বাথরুমের মেঝের উপর এসে পড়েছে। বিজন এখনি তার সমস্ত শ্রান্তি টবের ভেতরে ধুয়ে ফেলবে! বাঁ হাত দিয়ে কলের মুখটা খুলে ডান হাত দিয়ে জামার বােতামটা খুললে! ছর ছর করে জল পড়ছে••• সমস্ত বাথরুমটা সেই শব্দে মুখর হয়ে উঠলাে। সঙ্গে দিনের পর দিন জামাটা খুলে বিজন সেটা পাশের আলনায় রাখতে উপরে হঠাৎ কেমন করে একটা হাতের দিকে তার নজর পড়লাে! নজর পড়তেই সে চমকে উঠেছে। তারই নিজের হাত! কঁধ আর হাতের সংযােগ স্কুলের একটু নিচে—বিজনের দৃষ্টি হঠাৎ তীক্ষ্ণ নিবদ্ধ হয়ে উঠেছে। দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় সমস্ত ইন্দ্রিয় তার ভয়-সচকিত হয়ে উঠলো। সারা শরীরের কলঙ্কহীন শুভ্রতার পাশে অধিকতর শাদা একটি দাগ আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওটা কী, কী ওটা? সূর্যের সেই আলােটুকুর কাছে হাতটা এনে বিজন দেখতে লাগলাে ওটা কী, কী ওটা ? দুটি চোখের সম্মিলিত দৃষ্টি দিয়েও যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না! তার কি চোখ খারাপ হয়ে এসেছে•••তবে হয়ত ঘর অন্ধকার। সহসা সমস্ত "পৃথিবীটা যেন ঘুরতে সুরু হােল। বাথরুম থেকে সেই অন্ধ-অনাবৃত অবস্থায় বেরিয়ে এসে বিজন ঘরের ভিতর গিয়ে বসলাে। চারিদিকে যেন সমুদ্রের গর্জন, উন্মত্ত আলােড়ন চলছে। একটি ভীরু ভেলায় কে যেন একটি শঙ্কিতপ্রদীপ ভাসিয়ে দিয়েছে। ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে বার বার সে দাগটিকে ঘষছে। মনে হােল যেন চিরস্থায়ী দাগ উঠবে না! শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে আঙ্গুলের ডগায় এনেছে এনে সেই দাগটির ওপর সে সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করলে ! জোরে আরাে জোরে! উঠবে না! ঘষতে ঘষতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে••• তখন সন্ধ্যা উৎরে গেছে। রাত্রির সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পৃথিবী ব্যেপে এক মহা কলরব উঠলাে। সারা জগৎ কল-কল্লোলময়! বিজনের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত দিনের পর দিন সমস্ত ভেসে উঠছে। একটি নির্জন জাহাজের ডেকের ওপর সে দাড়িয়ে জাহাজ মাটির সংস্পর্শ ছাড়িয়ে মৃদুগতিতে দূরে চলে যাচ্ছে। দূরে দূরে দূরে একটি দুটি লােকের ক্ষীণাতিক্ষীণ আকৃতি দেখা যায় ! কলশৰ ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। বিজন সাব ডেকের মধ্যে ছটফট করে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। সে মাটির পৃথিবীতে ফিরে যাবে! সে নির্বাসন চায়না—বৈরাগ্য চায়না-লােকালয়ের সমস্ত বন্ধনের মাঝে বন্দী হয়ে বেঁচে থাকবে। ধীরে ধীরে তীরের ওপর ক্ষীণ মনুষ্যমূর্তিগুলি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে—শ্ৰীলতা, তার বাবা, মা—অস্পষ্টতার কুয়াশায় তারা মিলিয়ে গেল, বিজনের দু’চোখ জুড়ে কান্না এল—তার নিৰ্বাসন হয়েছে সে অস্পৃশ্যতার কুষ্ঠ হয়েছে- বিজন স্বপ্ন দেখলে : আকাশের এককোণে একটা পাখী উড়ে যাচ্ছে, অদৃশ্য এক ব্যাধ তাকে তীর ছুড়লে বিষ মাখানাে তীর! সে- তীর ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে লাগলাে পাখীর পাখায়। অপ্রত্যাশিত আঘাতে পাখী মাটি লক্ষ্য করে পড়তে লাগলাে আর তারই পাখা থেকে একটা পালক খসে এসে উড়তে উড়তে পড়লো বিজনের গায়ে--সে পালকে মরাপাখীর রক্তের দাগ তখন ঘন হয়ে এসেছে। বিজন ভাবলে: আর দুটো দিন! শ্রীলতা জানবে না, কেউ জানবে না, বিয়ে তাদের হয়ে যাক্। সামান্য একটু দাগ সে কোনও রকমে লুকিয়ে রাখবে। শ্ৰীলতা তার। ভাগ্যের প্রতিবন্ধকতা সে সইবে না কখনও। বিজনের একবার মনে হোল : কে আর জানছে—বিয়ে হােয়ে যাক্। আর একবার মনে হােল : সে শ্ৰীলতাকে সমস্ত খুলে বলবে।শ্ৰীলতা কি এতদূর হৃদয়হীন হবে? বিজন নিজের মনে স্বীকৃতি পেলে না।
দিনের পর দিন সে রাত্রে কি বিজন ঘুমিয়েছিল? নিস্তব্ধ রাত্রের আবহাওয়া সচকিত চমকিত করে দিয়ে একটি প্রাণীর বুকফাটা কান্না উর্জে উঠে আকাশে গিয়ে মিলিয়েছিল। এ-কান্না সেই কায়া-শ্রাবণ রাত্রে বর্ষা যা কাদে কেয়াবনে! অশ্রান্ত অস্পষ্ট-অস্থির। সে-কান্না ব্যর্থতার পরিহাসে করুণ। সেই রাত্রের অন্ধকারে বিজন বেরিয়ে এল পৃথিবীর প্রাঙ্গণে। উলঙ্গ বাস্তবতার মুখােমুখি। আত্মীয়, বন্ধু, সমস্ত ছেড়ে সেই রাত্রে সে বেরিয়ে পড়লাে অপরিচয়ের রাজ্যে। সেই দিন থেকে সমস্ত ভারতবর্ষ সে ঘুরে বেড়ায়—তার বিরাম নেই। কত লােকই তাকে দেখেছে, কত লােকের সঙ্গেই তার পরিচয় হয়েছে-কিন্তু তার বুকের মধ্যে কত লােকের সমাধি আত্মগােপন করে আছে তা যদি কেউ দেখতে। অর্থহীন উদ্দেশ্য নিয়ে কতজনই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়—সেও তাদের একজন। যদি কখনও এমন লােকের সাক্ষাতে আসে, এমনি আত্ম- ভােলা—পাগল-পাগল—পৃথিবীর স্নেহ-মমতা বিচ্ছিন্ন এমনি একটি প্রাণী, নিঃসঙ্গ জীবনের ভার বয়ে ক্লান্ত-উদাসীন দৃষ্টি–পথকে আশ্রয় করে জীবনের দিন অতিবাহিত করছে—যদি এমন লােকের সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ হয় আপনার—তাহলে ভাববেন : সে-ও মানুষ হতে পারতাে মানমর্যাদাবান সম্পূর্ণ মানুষ হতে পারতাে—এটুকু মনে করে তাকে কৃপা করবেন যে অনেক দুঃখ পেয়েই সে অমন ঘরছাড়া গল্প শেষ করে প্রসাদবাবু চুপ করলেন। বীচের ওপর রাত্রি ঘন হয়ে এসেছে। চঞ্চল সমুদ্র চঞ্চলতর হয়েছে••• পরিপূর্ণ প্রশান্তিতে আবহাওয়া যেন ঝিমিয়ে এল। যেন কল্পলােকের জাকাশ বেয়ে এসে পৌছুলাম প্রাত্যহিকতার মর্তো। * দিনের পর দিন বললাম-তারপর? প্রাসাদবাবু বললেন-তারপর পূর্ণচ্ছেদ। কমা, সেমিকোল পেরিয়ে একেবারে পূর্ণচ্ছেদে এসে পরিসমাপ্তি। মৃত্যু সুকঠিন, সুপরিচিত, সুশৃঙ্খল মৃত্যু। তবে পরলােকের মাঝে তার আত্মা তৃপ্তি পেয়েছে কি না, কি জানি হােটেলের কাছে এসে পড়েছি। বললাম—পরলােক কি আপনি মানেন? প্রসাদবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। হােটেলের ভেতর নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। বাইরে সমুদ্রের গর্জন তখনও অশ্রান্ত। নিজের ঘরে এসে মনের মধ্যে সমুদ্র-কল্লোলের সঙ্গে সমস্ত স্মৃতি-বিস্মৃতির আনুপূর্বিক ঘটনাগুলাে আবার মুখর হয়ে উঠলাে।••• পররিন সকালে দেখি : প্রসাদবাবু যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন। বাক্সটা বিছানাটা বাঁধা। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন-কাল একটা কথার উত্তর দেওয়া হয়নি আপনার-দেখুন পয়লােক যদি না মানিতা হলে কিছুই যে মানতে পারিনে।-পরলােক মানবোনা—ভগবান মানবােনা—তা হলে নিজেকেই অবিশ্বাস করতে হয় যে তারপর আমার কাছে সরে এসে জামাটা খুলে দেখালেন-এই দেখুন বিজন মরে নিশারীরিক মৃত্যু তার হয়নি—সে বেঁচে আছে--এখন তার নাম শুধু বদল হয়েছে-প্রসাদ।—আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন- কিন্তু আশ্চর্য হবার কিছু নেই—নিজের চোখে দেখুন একটা দাগ পৰ্যন্ত আর শরীরে নেই—আজ আমি মুক্ত কলঙ্কমুক্ত। কিন্তু এখন মুক্ত দিনের পর দিন হয়ে কী হলাে? এখন আর বেঁচে কী হবে? যখন ব্যাধি সারলে শীলতাকে পেতুম—পেতুম বাবাকে—পৃথিবীকে তখন সারল না। আজ সত্তর বছর বয়স, পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার দিন—এখন আমি রােগমুক্ত,-বেঁচে থাকতে যাকে পেলাম না মৃত্যুর পরে তাকে পাবাে এই আশ্বাসেই যে বেঁচে আছি। পরলােক যদি না মানি, তাহলে যে ভগবানকেও মানতে পারিনে আমি ?—আর সব সইতে পেরেছি কিন্তু পরলােক নেই এ-কথা সইতে পারবে না প্রাণে। বিদায় নিয়ে প্রসাদবাবু চলে গেলেন- হােটেলের বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হােল : আকাশের এককোণে একটা পাখী উড়ে যাচ্ছে, অদৃশ্য এক ব্যাধ তাকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁডলে—বিষ মাখানো তীর। সে-তীর ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে লাগলাে পাখীর পাখায়; অপ্রত্যাশিত আঘাতে মাটি লক্ষ্য করে পাখী পড়তে লাগলো—আর তারই পাখা থেকে একটা পালক খসে এসে পড়লে পায়ের ওপর-সে-পালকে মরা পাখীর রক্তের দাগ তখন ঘন হয়ে এসেছে।
রঙ্গিলা নায়ের মাঝি ৭ সন্ধ্যাবেলা বউ ডুবিব চরে নৌকা বাঁধা হইল । আশার আর আনন্দের সীমা নাই। যতদুর চাও কেবল জল-ছল-ছল কল কল শব্দ করিয়া নৌকার গায়ে আসিয়া ঢেউগুলি আছাড় খাইতেছে। পাশের বউ-ডুবির চরে ঘন জঙ্গল। অনেক দিনের পুরাতন চর, জঙ্গলও অনেক দিনের। বালুর চর ঢালু হইয়া জলের উপর নামিয়া আসিযাছে। দেখিতে দেখিতে অশা একেবাবে আত্মহারা হইয়া গেল। মাঝিরা দুইজন নৌকা বাধিষ তামাক সাজিতে বসিয়াছে। চরে নামিয়া হাত-পা ধুইয়াছে, সঙ্গে চি ডা মুড়ি আছে—তাহা দিয়া তাহায়। শেষবারের মত আহার সমাধা করিবে। বিকাল বেলা সূর্যাস্তের সময় এবং তাহার আগেও গান করিয়াছে, হু-হু করা বাতাসের সঙ্গে তাহাদের গান চমৎকার লাগিয়াছিল। বনমালী আব আশা সারা বিকাল ধরিয়া একমনে তাহাই শুনিয়াছিল, চমৎকার গলা; গানটি কাহার রচনা কে জানে কিন্তু বড় করুণ, পাড়াগেঁয়ে গান; ; গানের তাৎপর্য : মাঝিকে ডাকিয়া কোন্ বিরহী বলিতেছে, নাইয়া তুমি তো কত দেশ ঘাের, কত দরিয়া পাডি দাও, তুমি কি আমার বঁধুর খবর রাখ?•••যদি কখনও তার দেখা পাও, তাকে বােললা আমি তার পথের দিকে চেয়ে এখনও বসে আছি ছইয়ের এধারে গলুই-এর কাছে বসিয়া আশা পা দিয়া জল ছিটাইতেছিল, নুতন বউ-বিয়ে হইয়াছে সেদিন—বছরখানেকও হয় নাই—কিন্তু এমন চঞ্চল! বনমালী যদি হুকুম দেয় তো আশা এখনই চৰুে গিয়া বেড়াইয়া আসিতে পারে—তাহার এতটুকু ভয় করিবে না দিনের পর দিন বনমালী মানা করিল—উহু পা দিও না জলে—দিও না বলছি—বঁধু শুনিবে না, জলের উপর পা দিলে কি দোষ হয় তাহ) তাহার বােধগম্য হইতেছিল না। বনমালীর কথা না শুনিয়া আশা তেমনিই পা দিয়া জল নাড়াইতে লাগিল, বনমালী বলিল—দিও না বলছি পা, ও আশা, পা দিও না—তবু যদি কথা শুনবে—যে কথাটি বলব, সেইটি-জলে কত কুমীর-হাঙ্গোর আছে—সাপ-খােপ আছে- আশা হাসিয়া ফেলিল -হ্যা, জলে নাকি আবার সাপ থাকে। বনমালী এবার রাগ দেখাহল—থাকেনা তো থাকে না বেশ-সাপ থাকে , কুমীর থাকে না, কিছু থাকে না—এই সন্ধ্যেবেলা জলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাক—শেষকালে সুরমার মত তােমাকেও কামড়ে দিক- আমি কিচ্ছুটি বলব না আশা তবু পা তুলিল না—কিন্তু বনমালীর মুখের ওপর চোখ রাখিয়া জিজ্ঞাসা করিল—সুরমা কে ? কে সুরমা ? -কে আবার! নিতান্ত তাচ্ছিল্যস্বর বনমালীর ও-ধারে চাহিয়া উত্তর দিল—সুরমার নাম শোেন নি? মার কাছে কোনদিন শােন নি? সুরমা সুরম৷ তিন অক্ষরের সেই অতি প্রিয় নামটি বনমালী স্পষ্ট করিয়া উচ্চারণ করিল দুই দুইবার। -ওঃ দিদির কথা বলছ ?••• এবার আশা বুঝিতে পারিয়াছে। বনমালীর আগের পক্ষের বউ-এর নাম সুরমা। আশা বলিল—দিদিকে ত’ সাপে কামড়েছিল, না? বনমালী চুপ করিয়া গম্ভীর হইয়া ছিল। কি কথা বলিতে বলিতে কি কথা উঠিয়া গেল। কোথা দিয়া কি হইল-আজ এতদিন পরে হঠাৎ দিনের পর দিন কথায় কথায় তার কথা কেন মনে পড়িয়া গেল! অাগে আগে সুরমার কথা ভাবিতে গেলে বনমালী ভারী অন্যমনস্ক হইয়া পড়িত—কাদিয়া ফেলিত এক এক সময়; সুরমার একটা ফটোও বাধাইযা বাখিয়াছিল ঠিক বিছানার উপর দিকের দেওয়ালের গায়, কিন্তু এই আশা আসিবার পর সেটা বনমালী ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে! কি হইবে বাখিয়া ? সাব। জীবন মন খারাপ রাখিলে বাঁচিবে কেমন করিযা ? কিন্তু এতদিন পরে সেই কথাটি আবার কেন মনে পড়িল। বনমালীব মনে হইল, মনে না পড়িলেই বুঝি ভাল হইত। যাহাবা চলিয়া যায় তাহাদেব কেন মনে রাখা। কেন তাহাদের আশায পথ চাহিয়া বসিয়া থাকা! সুষমাকে আর মনে বাথিবার দরকার নাই, সুরমাকে এবার হইতে বনমালী একেবারে ভুলিয়া যাইবে ! সেই বিপুল জলরাশিব দিকে চোখ রাখিয়া বনমালী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, তাই ভাল তাই ভাল--সুরমাকে সে একেবাবে ভুলিবে। আশা বলিল—আচ্ছা আমায যদি সাপে কামডা তুমি কি করবে? বনমালী রাগিয়া উঠিল—কি সব তােমার অলুক্ষণে কথা—আর কোনও কথা নেই তোমার মুখে—তােমার কি হ’ল বলত • ? আশা তাহাব প্রথম প্রশ্নের জেব টানিয়া বলিল—দিদিব মত যদি আমি মরে যাই—তুমি আবার বিযে করবে ত’?-বল না—ওগাে, চুপ করে রইলে কেন-বল—উত্তব দাও বনমালী এবার ভীষণ রাগ করিল, বলিল—কখখনো বলবা না-বলব নাত-কেন, মরা ছাড়া বুঝি তোমার কোনও কথা নেই মুখে-মরা মরা—মরতে তােমার বড় সাধ—আর আমি যদি মবে যাই ? টপ করিয়া আশা বনমালীর মুখে হাত চাপা দিল। ওগো, আর দিনের পর দিন কখখনাে বলব না—কখখনোও না—আমার ঘাট হয়েছে—হ’ল এবার ? মাগো তােমার মুখে কিছু আটকায় না—তুমি সব পারাে এই ঘটনায় বনমালীর আর একটি দিনের কথা মনে পড়িল। সেদিনও সুরমা ঠিক এমনি করিয়া তাহার মুখ চাপা দিয়াছিল। একটি কথাও বলিতে দেয় নাই। তারপর দেশে গিয়া বনমালীর নাম করিয়া চণ্ড-ভৈরবের মন্দিরে পূজা দিয়া আসিয়াছিল। ইহারা সবাই এক রকম। সেদিনকার সুরমার সহিত আজিকার আশার এতটুকু তফাৎ নাই। এই আশা তাহাকে যেমন ভালবাসে সুরমাও ঠিক তাহাকে তেমনি করিয়াই ভালবাসিত, তবে তাহাকে বনমালী এমন করিয়া ভুলিয়া গেল কেন? চোখের আড়ালে যে চলিয়া যায়—মনের আড়ালেও সে যে চলিয়া যায় না সে কথা কে বলিল। মিথ্যা কথা—চিরকাল কেহ কখনও কাহাকে মনে রাখিতে পারে ?-সেও যে সুরমাকে ভুলিয়া গিয়াছে তাহাতে তাহার কি দোষ! ক্রমে চারিদিকে আরও অন্ধকার হইয়া আসিল। অস্পষ্ট কুয়াশার মত চারিদিকের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা অন্ধকারে মিলাইয়া গেল। অন্ধকার-সামান্য একটু চাদের আলো পড়িয়া জায়গায় জায়গায় চিকচিক করিয়া উঠিতেছে ; চরের জঙ্গলে একসঙ্গে অসংখ্য ঝিল্লী কলরব জুড়িয়া দিয়াছে—ইহাদের মধ্যে বসিয়া বনমালী আর আশা সীমাহীন কাল হইতে খসিয়া পড়া এক একটি মুহূর্ত কুড়াইয়া সঞ্চয় করিতে লাগিল-- জোয়ার আসিবে রাত্রি দু’টায়—সেই জোয়াষ্ট্রে নৌকা ছাড়া হইবে। মাথা-ভাঙার উত্তর দিকে খালের ভিতর দিয়া বড় নদীতে পড়িবে—সেখান দিয়া গিয়া বাবুঘাটার জেটিতে ষ্টীমার ধরিতে হইবে। চিড়া মুড়ি বাহির করিয়া মাঝিরা খাওয়া শেষ করিয়াছে-বনমালীও সঙ্গে খাবার আনিয়াছিল দিনের পর দিন দু’জনে মিলিয়া শেষ করিল। খাওয়ার শেষে একজন মাঝি সুর করিয়া গান ধরিয়াছে- •কোন বন্ধুকে লক্ষ্য করিয়া কে যেন বলিতেছে—তোমার লাগিয়া আমার চক্ষের পানি আর বক্ষের ব্যথা বাধা মানে না তােমার আশায়, সারা-জীবন আমি পথের পাশে বসিয়া আছি—তুমি বারেক আসিয়া আমার দরদ জুড়াও••• সুরে কথায় গানটি বনমালীর ভারী চমৎকার লাগিল। আশাও তন্ময় হইয়া গিয়াছে। এই পরিপূর্ণ উন্মুক্ত আবহাওয়ায় আর মনের এই অতি- পরিচিত প্রতিবেশে গানটি বনমালীকে অবশ করিয়া দিল। আশা পাশে বসিয়াছিল। আরও পাশে আসিয়া বলিল—তুমি ত’ বাঁশী বাজাতে এককালে, না ? বনমালী বলিল—কে বললে তােমায়? -কে আবার বলবে! সবাই ত’ জানে। পাড়ার সবাই বলে সেদিন ভঞ্জদের বড়বৌ বলছিল—যাত্রায় নাকি তুমি কেষ্ট সেজে বাঁশী বাজাতে। মার কাছে শুনেছি—এইটুকুন্ বেলা থেকে তােমার নাকি বাঁশীর সখ ছিল—একবার বাঁশ কেড়ে নিয়েছিল বলে কি কান্না—ভাতপৰ্যন্ত খাওনি—আচ্ছা যদি অত সখ ছিল ত’ এখন আর বাজাও না কেন ? বনমালী কথা কহিল না। —হ্যা গাে, সে বাঁশীটা গেল কোথায় ?—আমার বিয়ের পরে তাে দেখতে পাইনি—তুমি নাকি বাঁশী বাজালে পাখীরা ডেকে উঠতাে—সত্যি সত্যি একদিন শুনিও আমাকে, বাঁশী শুনতে আমি ভারী ভালবাসি বশী রেখেছ কোথায় বলতো? বনমালী বলিল—এই গাঙের জলে ভাসিয়ে দিয়েছি
দিনের পর দিন
আশার বিশ্বাস হয় না। বলিল -আহা, সব কথাতেই তােমার ঠাট্টা।
সাধের বাঁশীটা জলে ফেলে দিলে ?—কার ওপর রাগ করেছিলে, শুনি?
—তােমার দিদির ওপর
আশা বুঝিতে পারে নাই, বলিল—দিদি কে ?
সুরমা-
কথাটা বলিয়াই বনমালী বুঝিল মিথ্যা কথাটা বলা তাহার উচিত হয়
নাই। সত্যসত্যই সুরমার উপর রাগ ত’ সে করে নাই। রাগ হইয়াছিল
বাঁশীর উপর—সেই রাগেই সে বাঁশী বাজানাে ছাড়িয়া দিয়াছে।—নিশীথরাত্রে
বনমালীর যখন ঘুম আসে না—বন-তুলসীর গন্ধে বাতাস উন্মত্ত হইয়া উঠে-
তখন সেই সময় ছাদে উঠিয়া বাঁশী বাজাইতে তাহার ইচ্ছা করে-ইচ্ছা করে,
বাঁশীর ফুটা দিয়া প্রাণের সমস্ত গােপন কথা আকাশে এবং আকাশের
তারকালােকে ছড়াইয়া দেয়। যেখানে মর্ত্যলােকের বাণী পৌছায় না, সেই
গ্রহ হইতে গ্রহান্তরে তাহার বাঁশী কঁদিয়া কাদিয়া মাথা কুটিয়া মরুক।
আশা বলিল—চুপ করে রইলে যে বড়-বললে না তাে ?
—কি বলব?
আশা বলিল—কেন দিদির ওপর রাগ করেছিলে—
--সে অনেক কথা-
আশা বলিল—হােক অনেক কথা, বলতেই হবে—না বললে শুছিনে
-আমাকে বলতে তােমার কি হয়েছে—আমি ত’ তােমার পর নই—
সে আজ চার বছব আগের কথা। গ্রীষ্মকাল, জমিদারীর কাজে
বনমালীকে শহরে আসিতে হইবে। অনেক বুঝাইয়া-সুঝাইয়া সুরমাকে
১৩১
দিনের পর দিন । ; বনমালী শান্ত করিয়াছিল। বাহিরে গরুরগাড়ী দাঁড়াইযাছিল—পোটলা- পুটলি লইয়া বনমালী উঠিতে যাইবে, এমন সময় বলা-নাই কওয়া-নাই একগলা ঘােমটা দিয়া সুরমা সরাসরি গাড়ীতে আসিয়া বসিল তখন আর কেইবা বােঝে—আর কেইবা বােঝয় ; সে সময় নাই তখন। বনমালী শুধু বলিয়াছিল-কোথায় যাবে তুমি ? কি জানি কেন—বােধ হয় অকারণেই—সুরমা বলিয়াছিল—“চুলল”— বনমালীও রসিকতা করিয়া বলিয়াছিল—চল সেখানেই তােমায় নিয়ে যাচ্ছি— শহরের তিন মাইল দুরে সুরমার বাপের বাড়ী, সেখানেই যাওয়া আপাতত স্থির হইল। নৌকায় পথে দু’দিন কাটাইতে হয়। ঢেউয়ের দোলায় দুলিতে দুলিতে একটা গােটা দিন বেশ কাটিয়া গেল। চঁাদের আলােয়—আর অবাধ খােলা হাওয়ায় সুরমার কি ঘূৰ্ত্তি—কোলে মাথা রাখিয়া বাখিযা শুইয়া শুইয়া আকাশ দেখা—মাঝিব গান শােনা ; রাত্রি- বেলা দুবে অন্ধকারের মাঝে টি টিম্ করিয়া দুই একটা আলাে জ্বলে— কোন নৌকার আলো হয়ত, এই তীর—এই একেবারে অকূল-পাথার। পৃথিবীর কোনও ভাবনা নাই—দুঃখ দৈন্যময় পৃথিবীকে এড়াইয়া যেন তাহারা অমত্ত লােকে আসিয়াছে।••• দ্বিতীয় দিন ভােরবেলা মাঝির একটা চরে নৌকা বাঁধিল। চারিদিক তখনও বেশ অন্ধকার—সকাল ভাল করিয়া হয় নাই। রাত্রে বনমালীর ভাল ঘুম হয় নাই তাই আর মিছামিছি ঘুমাইবার চেষ্টা না করিয়া বাঁশীটা লইয়া বাহিরে আসিয়া বসিল। সামনে কেবল জঙ্গল। চরের উপর কতদিনকার গাছপালা নদীর জল পাইয়া বড় হইয়া উঠিয়াছে ঠিকানা নাই। কত ভয়ানক জীবজন্তু উহার দিনের পর দিন ভিতর আছে কে জানে? ঘন-সন্নিবিষ্ট ডালপালায় দৃষ্টি যায় না। এক একবার হাওয়া আসে, সারা বনস্থলীতে একটা থথ আলােড়ন হয়। বনমালী বাণী লইয়া বাজাইতে লাগিল। সুরে আরম্ভ হইয়া উঠিতে পড়িতে কোমল রেখাব, কোমল গান্ধার, চুইয়। চুইয়া ভৈরবী উপরে চড়িতে লাগিল ; কোমল ধৈবতে দাড়াইয়া হেলিতে-দুলিতে কোমল নিখাদ ছুঁইল -তারপর কত পথে সুর চলিল। অপরূপ রূপ-লাবণ্যময়ী একটি পাহাড়ী মেয়ে কোমরে কলসী লইয়া আঁকিয়া বাঁকিয়া পাহাড়ী পথে ঘুরিতে ফিরিতে সােজা ও নীচু হইয়া গ্রামে চলিয়াছে। তাহারই চলিয়া যাওয়ার ছন্দ তাহারই বিরহ-বিধুর অন্তরের দ্বন্দ্ব-তাহার গতিভঙ্গীর সরস ব্যঞ্জনা লইয়া বাঁশীর গান বাজিয়া চলিল। সুরের শরজালে আকাশের আবহাওয়া আচ্ছন্ন হইয়া চলিল। নিবিড় অনুভূতি লইয়া বাতাস চুপ করিয়া কান পাতিয়া আছে—জলের তরঙ্গ যেন নিশ্চল হইয়া গিয়াছে—আকাশ মাটির উপর ঝুকিয়া পড়িয়া মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া গিয়াছে। নৌকার ভিতর সুরমা ঘুমাইতেছিল—কখন বাঁশীর শব্দে জাগিয়া উঠিয়া পাশে আসিয়া বসিয়াছে। মাঝিরাও ঘুম হইতে উঠিয়া বসিয়াছে। পৃথিবীর জড় জীবজন্তু সমস্ত যেন সুরের মন্ত্রে অবশ হইয়া আছে। জলের মৃদু-স্রোতের উপর দিয়া ভাসিতে ভাসিতে সুর চলিল। সেই ভােরবেলা সমস্ত বনস্থলী যেন সুরের মােহে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল, সুরের ঢেউ ভাসিতে ভাসিতে দূরে অনেক দূরে কোন গ্রামান্তের কোন তীরে, কোন গৃহকোণে কোন বিরহীর বক্ষে কঁদিয়া কুটিকুটি হইতে লাগিল, সীমা নাই—শাস্তি নাই-নূতন নূতন বেদনা-সম্ভার লইয়া সেই ভরা-বুক নদীর দুই কিনারা ভাসাইয়া দুই কূল ছাপাইয়া সুরের জোয়ার ছুটিল। এ সুরে যেন নেশা আছে—এ যেন মানুষকে বড় দুৰ্বল করিয়া দেয়। তখন সব ভুলিতে হয় ১৩ দিনের পর দিন -এই পৃথিবীর শ্রান্তি, ক্লান্তি, ব্যর্থতা, নীচতা, দৈন্য—সব সেই বাঁশীর সুরে মিলাইয়া যায়, সুরের মােহিনীমায়ায় অতিবড় দুর্ধর্ষ জন্তুও কেমন নিজের অজ্ঞাতে মাথা নীচু করে, এ বাঁশীর কাছে আত্মসমর্পণ করিতে পারিলে জীবন ধন্য হয়। সেদিন সেই নদীপারের চরের উপর বাঁশী এক অপূর্ব কান্না কাদিতে লাগিল— সকলেই চুপ,হঠাৎ সুরমার কি হইল কে বলিবে—একটা পা নৌক হইতে ঝুলাইয়া দিল।—আরাম করিয়া বসিবার জন্য হয়ত।••• কিন্তু পা ঝুলাইবার সঙ্গে সঙ্গে সুরমা মাগাে” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। বাশী ফেলিয়া রাখিয়া বনমালী সুরমাকে ধরিতে গেল—সুরমাকে ধরিল —কিন্তু মুহূর্তেই দেখা গেল একটা সাপ কিলবিল করিতে করিতে চরের উপর দিকে চলিয়া গেল। অভাবনীয় কাণ্ড! বেদনায় চীৎকার করিতে করিতে সুরমা নৌকার উপর ছটফট করিতে লাগিল। খুব বিষাক্ত সাপ নিশ্চয়ই—অন্ধকারে যতটা দেখা যায় সাপের চেহারা দেখিয়াই বনমালী তাহা বুঝিতে পারিয়াছে। ক্ষতস্থানের ঠিক উপরেই বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছিল—কিন্তু হইলে কি হয়—সারা শরীর ক্রমে নীল হইয়া আসিতে লাগিল। চোখের দৃষ্টি ঘােল। হইতেছে ; সে কী যন্ত্রণাকাতর চীৎকার-অত যে লাজুক মেয়ে সে-ও গলা ছাড়িয়া আকাশ-বাতাস কঁপাইয়া চেঁচাইতেছে। দেখিতে দেখিতে ক্রমে এক ঘণ্টার মধ্যেই সব যেন ঠাণ্ডা হইয়া গেল—বনমালীর চোখের সামনে, তাহার কোলের উপর মাথা রাখিয়া সুরমা মরিতে চলিল- তারপর সেই নৌকা করিয়াই যতশীঘ্র পারা যায় কাছাকাছি কোন গ্রামে ;
দিনের পর দিন তাহাকে আনা হইল-বাচাইবার চেষ্টা যথাসাধ্য হইল—কোথায় ডাক্তার কোথায় বদ্যি-ওই যে অনেক দূরে একটা কালাে জঙ্গল মতন দেখিতেছ, -এইখানে শ্মশানে তাহাকে পােড়াইয়া বনমালী একলা নৌকা করিয়া ফিরিয়াছিল। গল্প শেষ করিয়া বনমালী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। আশা এতক্ষণ তন্ময় হইয়া শুনিতেছিল। বনমালী থামিতেই বলিল- তারপর?-বাঁশী বাজান সেই দিন থেকেই ছেড়ে দিলে ? সেদিন থেকে নয়—তার পরদিন থেকে—সুরমা মারা যাবার পর একদিন শুধু বাজিয়েছিলাম, তার পরদিন সন্ধ্যেবেলা- আশা ছেলেমানুষের মত কাছে ঘেষিয়া জিজ্ঞাসা করিল-কেন- সেদিন কি ছিল? তবে শােন-আবার গল্প আরম্ভ হইল- সব কাজ শেষ হইয়াছে-ভােরবেলা শ্মশান হইতে বনমালী বাড়ী ফিরিয়া যাইবে, সমস্ত ঠিক বন্দোবস্ত হইয়া আছে। এমন সময় মাঝি আসিয়া বনমালীকে তাহার বাঁশীটি ফিরাইয়া দিয়া গেল। বনমালী ভুলিয়া আগের দিন নৌকার উপরেই ফেলিয়া রাখিয়া আসিয়াছিল। যাক, বাঁশীটি হাতে আসিতেই বনমালী ঠিক করিল আবার একবার সেই চরে যাইতে হইবে। দুইজন মাঝি ছাড়া আরও দুইজন লােক চলিল লাঠি-শড়কি লইয়া। বিকাল বেলা আবার সেই চরে গিয়া তাহারা পৌছিয়াছে। আগের দিনের মত ঠিক সেই জায়গায় নৌকা বাঁধা হইল। সন্ধ্যা আরম্ভ হইয়াছে কি হয় নাই —এমন সময় সেই দুইটি লােককে লইয়া বনমালী চরে নামিল। তেমনি সুরের মূচ্ছনায় মীড়ে তানে অপরূপ হইয়া বনস্থলী সচকিত দিনের পর দিন হইয়া উঠিল। বনমালীর বুকে যত বেদনা, যত কান্না আছে সব বাশীর ফুটোতে নিঃশেষে ঢালিয়া দিল—হৃদয়ের অন্তঃস্থল পর্যন্ত কে যেন বড় নিষ্করুণ ভাবে মােচড় দিতে লাগিল। সন্ধ্যার অন্ধকার যেন ধরণীর মাঝপথে আসিয়া বিল হইয়া পড়িয়াছে। কেহ আসিতেছে না, তাহার পাশের দুইটি লােক দুই জোড়া সন্ধানী চক্ষু দিয়া আশেপাশে নজর দিতে লাগিল কেহ তাে আসিতেছে না। অন্ধকার তখনও তরল। সুর বিনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিতেছে। বনমালী মরিয়া হইয়া উঠিল—তাহার সমস্ত শক্তি একত্র করিয়া একমনে বাঁশী বাজাইয়া চলিল। বাঁশী বাজিতেছে-এখনই বুঝি আকাশ গলিয়া পড়িবে-নদীর জল সমস্ত বুঝি চর ভাসাইয়া লইয়া যাইবে —আরও—আরও করুণ করিয়া বনমালীর বাঁশী কাদিয়া চলিল- তিন জনেই দেখিল-ফল ফলিয়াছে••• সাপ আসিতেছে : বনমালীর মনে হইল যেন ঠিক সেই সাপটাই। আসিতেছে—আসিতেছে—আসিয়া পড়িল; কিছু দূরে আসিয়া সাপ চুপ করিয়া দাড়াইয়া গেল। স্থির নিশ্চল মুর্তির মত—কেবল সুরের তালে তালে যেন একটু মাথা দেলাইতেছে ; উহার চোখে ঘাের লাগিয়াছে— সুরের নেশ। উহাকে পাগল করিয়াছে .. লােক দুইটি ইঙ্গিতে পরস্পরে একসঙ্গে প্রস্তুত হইতেছিল। আর এমন সুযােগ নষ্ট করা উচিত নয়, লাঠি হাতে লইয়া ঠিক মারিতে যাইবে—এমন সময় বনমালী দেখিল সাপ একটি নয় দুইটি। এক জোড়া দম্পতি উহারা। পাশাপাশি এ উহার গায়ে হেলান দিয়া রহিয়াছে। লােক দুইটিও দেখিল সাপ একটি নয় দুইটি ! মারিতে হইলে দুটিকে একসঙ্গেই শেষ করিতে হইবে। লােক দুটি পুনর্বার প্রস্তুত হইয়া উঠতে উদ্যত হইয়াছে- দিনের পর দিন - হঠাৎ বনমালী ইঙ্গিতে তাহাদের বসিতে বলিল। বনমালী বঁশী বাজাইতে বাজাইতে আস্তে আস্তে পিছনে হটিতে লাগিল। লােক দুইটিও সঙ্গে সঙ্গে পিছাইয়া আসিতে লাগিল। তারপর নৌকার কাছে আসিতেই বনমালী নৌকার উপর লাফাইয়া উঠিয়াছে ; লােক দুইটিও উঠিল। নৌকাতে উঠিয়া দেখা গেল—বহুদূরে সাপ দুইটি বনের মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল—নৌকা ছাড়িয়া দিল। নৌকায় উঠিয়া বনমালী একটিও কথা বলে নাই। চুপ করিয়া গলুইয়ের কাছে উদাসদৃষ্টিতে আকাশের দিকে চাহিয়া বসিয়াছিল। লােক দুইটি বনমালীর অসঙ্গত আচরণ বুঝিতে পারে নাই। কাছে আসিয়া বলিল—কি হ’ল বাবু—মারলেন না যে? বনমালী বলিল -ওদের কি মারতে আছে ? এক জোড়া এসেছিল ওরা যে স্বামী-স্ত্রী- সত্যসত্যই প্রাণ গেলেও উহাদের বনমালী কখনও মারিতে পারি না। একটি যদি আসিত তবে হয়ত মারা সহজ ছিল। কিন্তু এক জোড়া স্বামী-স্ত্রী উহারা-জন্তু হউক আর যাহাই হউক-উহাদের মার বড় নিষ্ঠুর কাজ। কবে এক ব্যাধ কোন এক পক্ষী-মিথুন মারিয়া ঋষিব শাপে ত সারা জীবন ভবঘুরে হইয়া বেড়াইল—ঘর পবিবার নীড় রচিবার অধিকার তাহার জীবনে হইল না; শেষে কি বনমালীও তেমনিই অভিশাপ কুড়াইবে, উহারা দুইজনে সুখে থাকুক--মনুষ্য-বিবর্জিত দেশে উহার। স্বাধীন চিত্তে ঘুরিয়া বেড়াক—মানুষ কেন উহাদের দেশে আসিয়া অনধিকার প্রবেশ করিবে! মানুষেরই অন্যায় - গল্প শেষ করিয়া বনমালী চুপ করিল। আশা বলিল—তারপর ?
দিনের পর দিন —তারপর বাঁশীটা নিয়ে অনেক দূরে নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম । সেই থেকে বাঁশী আর ছুই নিও সর্বনেশে বাঁশী আর বাজাই নি!••• ইহার পর আশা আর বনমালী দুইজনেই খানিকক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। রাত্রি অনেক হইয়াছে। জলের স্রোত প্রায় স্থির হইয়া আসে আর ঘণ্টা-দুই পরেই জোয়ার আসিবে। আকাশের গায় শুক্লা-একাদশীর ঈদ সারা নদীটিকে রুপালী পাতে মুড়িয়া দিয়াছে ; থমথমে আবহাওয়া; মাঝিরা গল্প করিতেছে আস্তে আস্তে। এবারে আশার একান্ত কাছাকাছি বসিয়া আছে বনমালী। কাছাকাছি বসিয়া আছে বটে, কিন্তু মন তাহার চার বছরের উজান ঠেলিয়া বহুদূর পশ্চাতে চলিয়া আসিয়াছে!••• লােকান্তরের প্রান্তসীমায় একটি চঞ্চল প্রতিমতী মুখ স্মরণ করিয়া বন- মাশীর বুকখানা ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। তবু আজ সে সুরমাকে ভুলিতে বসিয়াছে—আশা আসিবার পর হইতে সুরমাকে তাহার খুব কমই মনে পড়ে আশা হঠাৎ কথা বলিল—আচ্ছা, দিদি তােমাকে খুব ভালবাসতো না? বনমালী কি উত্তর দিত কে জানে! হঠাৎ ওধার হইতে একজন মাঝি সুর করিয়া গান ধরিল। আগেকার সেই গানটি ! কোন্ বিরহী যেন বলিতেছে—ওগো রঙ্গিলা-নায়ের মাঝি, তুমিতাে কত দরিয়া পাডি দাও—তুমি কি আমার বন্ধুব খবর রাখি ? যদি তাহার দেখা পাও ত’ বলিও-আমি তাহার পথের দিকে চাহিয়া এখনাে বসিয়া আছি—তাহাকে আমি ভুলিতে পারি নাই—আর বলিও, তাহার জন্য আমি সারা জীবন এমনই বসিয়া থাকিব- গান শুনিতে শুনিতে হঠাৎ বনমালী মনে মনে গর্জন করিয়া উঠিল, মিথ্যা কথা ! সমস্ত মিথ্যা! কেহ কাহারও জন্য বসিয়া থাকে না!•••কেহ ১৩ দিনের পর দিন কাহাকে চিরকাল মনে রাখে না—সবাই ভুলিয়া যায় ; ভুলিয়া যায় সবাই—চোখের আড়াল হইলেই সব ভালবাসা, সব প্রেম ধূলিসাৎ হইয়া যায়। সুরমা যাইবার পর আশা আসিয়াছে, আশা চলিয়া গেলে আর একজন আসিবে! বিরহ মিথ্যা—প্রেম মিথ্যা—সব মিথ্যা—সব মিথ্যা কেহ কাহারও নয়—সবাই একক অননুভূত এক বিচ্ছেদ-বেদনা আসিয়া কখন অজ্ঞাতসারে বনমালীর সমস্ত মনকে একেবারে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল।
প্রেম নয় এমন মানুষের প্রয়ােজনের হয়ত শেষ নাই। আমি দেখিয়াছি কত অদ্ভুত প্রয়ােজনের তাগিদ মানুষকে পাগল করিয়া দিয়াছে। সে প্রযােজনের কোনও মানে নাই, সাধারণের চোখে সে প্রযােজন যেমন অর্থহীন তেমনি অস্বাভাবিক। আকাশের দিশাহীন মেঘের মত প্রয়ােজন আমাদের জীবন ব্যাপিয়া বিরাজ করে—তবু জীবন যাপনের পক্ষে তাহাদের তাগিদ কত হাস্যকর! আমরা বাঁচিয়া থাকি পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তিতে নিঃশ্বাস ফেলি -মনে করি আমাদের দিন-যাপনের পক্ষে কত কিছুই অপরিহার্য্য, প্রয়ােজনহীনত। আমরা কল্পনা করিতে পারি না। অতি সামান্য প্রয়াে- জনকে কেন্দ্র করিয়া মানুষের জীবন কত পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। কিছুই নয়, শুধু মাত্র একটি আবশি ! রচির পাগল-গারদে আমি দেখিয়াছি একটি লোক বলে—একটা আরশি দেবেন—একটা আরশি- তার জীবনধারণের পক্ষে একট। আরশি যেন অনিবার্য। অথচ এমন কি-ই বা তার মুল্য ! সেই একটা মাত্র আরশি চাওয়ার পিছনে এমন কি ইতিহাস থাকিতে পারে—একদিন আমার কৌতুহল হইয়াছিল। রেলিঙের বাহির হইতে বলিয়াছিলাম—আরশি কি করবে ? পাগল উত্তর করিয়াছিল--মুখ দেখব। যে মুখ দেখিবার জন্য সে এত আকুল সেই মুখের দিকে চাহিলাম। অমানুষিক এক চাহনি মুখের দুইদিকে মাংসের মত ঝুলিয়া পড়া অংশগুলি বীভৎস। দেখিবার মত এমন কিছুই তাহাতে নাই। আরশি তাহাকে দিই নাই—দেওয়া দিনের পর দিন নিষেধ বলিয়া! কিন্তু লােকটির এই অস্বাভাবিক আকাঙ্খার পিছনে যে রহস্য পুঞ্জিত ছিল তাহা আমি সংগ্রহ করিয়াছিলাম! সেই কাহিনীই আজ বলিতেছি ভূপতি নাম না হইয়া যদি তাহার নাম হইত শ্যামলাল, কি রাধানাথ, তাহাতে এমন কিছুই আসিয়া যাইত না। মােট কথা ভূপতি নিজের নাম লইয়া কোনও দিন মাথাও ঘামায় নাই। ভূপতি নামের যে একটি অর্থ আছে এবং সেই অর্থের সঙ্গে তাহার নামের সামঞ্জস্য রাখিতে গেলে যে হাস্যকর ব্যাপার সৃষ্টি হয় তাহাও কোনদিন তাহার মনে পড়ে নাই। মনে পড়ে নাই তাহার নাকটা ছোেট—চোখ দুটি ঢোকা। তা সে লইয়া তাহার কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। দিন তাহার চলিয়া যায়। চলিয়া যায় স্বচ্ছল গতি-প্রবাহে। মাথা নীচু করিয়া কাজ করিতে করিতে এখন আর তাহার ভাল করিয়া সােজা হয় না। ছাপাখানার কাজে ভূপতি এখন ওস্তাদ হইয়া গিয়াছে। নিকেল করা চশমাটিকে কানের সঙ্গে আঁটিয়া ভূপতি নিজের নির্দিষ্ট টুলটিতে গিয়া বসে। মাথা নীচু করিয়া অক্ষর বাছিয়া বাছিয়া কথার সৃষ্টি করে—একবার উপরের দিকে বা সামনের দিকে চাহিয়াও দেখে না। কেমন স্বচ্ছ পরিবেশ সুপরিচিত আবেষ্টনী—উদয়াস্ত দিনের সুসম্বন্ধ গতিবিধি—একটুকু বাধা কোথাও নাই। সকাল হইতে সমস্ত দিনটা কেমন নিৰ্বিয়ে কাটিয়া যায়, নিশ্চিন্ত আরামে-নীরব কৰ্ম্মানুশীলনে। রাত্রি আটটায় ছাপাখানা বন্ধ হইবার সঙ্গে সঙ্গে ভূপতি ওঠে—চশমাটি খুলিয়া পকেটে রাখে—হাত, মুখ ধুইয়া—চটি জুতা জোড়া পায়ে গলাইয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়ে।
দিনের পর দিন রাস্তায় বাহির হইতেই নিতাই পিছনে আসিয়া বলিল-পান খাবে ভূপতি দা? ভূপতি তখন দক্ষিণমুখাে চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। বলিল —দূর, নেশা-টেশার মধ্যে আমি নেই—ওতে কেবল পয়সার শ্রাদ্ধ। ছােট বেলায় ভূপতি একবার বিড়ীর নেশা করিয়াছিল। দূর সম্পর্কের এক কাকার বাড়ীতে থাকিত, খাইত, সংসারের কাজ করিত আর অবসর মত লেখাপড়া করিত ;-সেই সময়ে গােপনে দুই একটা বিড়ী সে টানিয়াছিল। কিন্তু কাকার এক প্রচণ্ড চাটিতে সে নেশা সেই যে ছাড়িয়া গেল আর ধরিবার অবসর পায় নাই। শুধু বিড়ীই না, ছােট-বড় করিয়া চুল ছাটা, লম্বা ঝুলের কাপড় পড়া, এবং চুলগুলিকে সুবিন্যস্ত করিয়া টেরী-কাটা আর পান খাওয়া—এ সবই কাকা ভীষণভাবে বারণ করিয়া দিয়াছিল। কাকার নিষেধ ভূপতি মন দিয়া শুনিয়াছিল। তবে এখন ভূপতির সব অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে। এখন আর চেষ্টা করিয়া কৃচ্ছসাধন করিতে হয় না! ভূপতির মনেই পড়েন। আরশিতে কতদিন মুখ দেখা হয় নাই। চুলে হাত দিয়া ভূপতি বুঝিতে পারে টাক এখনও পড়ে নাই। পিঠের দিকের একটা আলমারীর গায়ে পেরেক ছিল। অসাবধানে বসিতে গিয়া জামার একটি দিক তাহাতে লাগিল-লাগিয়া ছিড়িয়া গেল। নিতাই পাশে ছিল। দেখিতে পাইয়া বলিল-এ হে হেগেল- ছিড়েচে–কাজ করিতে করিতে ভূপতির মাথা তুলিতে নাই। বলিল- আর একটা তালি দিলেই চলবে—জামাটা নতুনই— নিতাই হাসিল। বলিল—কটা হােল? ভূপতি বুঝিতে পারে নাই। বলিল—কি ক’টা হােল ? এই জামার তালি। ১২ দিনের পর দিন ভূপতি বলিল—তুই কাজ কর দিকিনি, নিজের কাজ,—পাঁচ লাইনের একটা কপি নিয়ে সমস্ত দিন কাটিয়ে দিলি—কেবল কথা— রাত্রে মেসের ঘরে আসিয়া ভূপতি বিছানার উপর চিৎ হইয়া শুইয়া পড়ে না—কিম্বা কলতলায় গিয়া চৌবাচ্চার জলে স্নান করিয়াও ফেলে না। কিছুই করে না। সারাদিনের পরিশ্রমের পর যাহা করা উচিত তাহার কিছুই ভূপতি করে না। কুলুঙ্গি হইতে একটা শিশি পড়িয়া দুই পায়ে বেশ করিয়া তেল মাখিতে থাকে। সরিষার তেল। মশার উপদ্রব হইতে রেহাই পাইবার এমন অব্যর্থ প্রতিষেধক আর নাই কিন্তু। শুইবার আগে ভূপতি এটা ওটা নড়িয়া চড়িয়া রাখিল। দরজায় খিল দিল। তারপর নজর পড়িল তক্তপােশের ঠিক উপরে টাঙানো একটি ছবির উপর। ঠিক ছবি নয়—ক্যালেণ্ডার। বছর তিন চার পূর্বের ক্যালেণ্ডারকে যে কবে টাঙাইয়া ছিল তাহা মনে নাই। তবে নির্ধারিত সময়ের শেষে ওটি আর ফেলিয়া দেওয়া হয় নাই। ছবিখানি এমন কিছুই নয়--কদম্বমূলে একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর মান করিয়া বসিয়া আছেন রাধা—আর তাহারই সম্মুখে শ্রীকৃষ্ণ বাঁশীটি লইয়া রাধার পায়ের কাছে উৎসর্গ করিতেছেন। পিছনে একটি পুচ্ছ-বিস্তৃত ময়ূর। ছবির বিষয়- বস্তু এই। কিন্তু আষ্টেপৃষ্ঠে কোন এক ঔষধ বিক্রেতার বিজ্ঞাপনের সুবিস্তৃত বিবরণ জাৰ্মানীতে ছাপা, এই ছবিটি লইয়া ভূপতি কোনও দিন মাথা ঘামায় নাই। তবে চারিপাশের ছাপা বিষয়বস্তুর উপর ভূপতি অনেকবার চোখ বুলাইয়াছে। যে যাই বলুক ছাপার মধ্যে ভূপতি বহু দোষ-ত্রুটি বাহির করিয়া ফেলে। জাৰ্মাণীতে ছাপা হইলেই একেবারে সাত-খুন-মাপ হয় না। । ১৪৩ দিনের পর দিন কথায় কথায় সকলকে শুনাইয়া ভূপতি বলে—সায়েবদের ছাপার মধ্যেই হাজর গণ্ডা ভুল বের করে দিতে পারি—সায়েব বলেই কি পীর নাকি ? ভূপতির কথার কেহ প্রতিবাদ করে না। করিলে ভূপতি নিজেই দেয়াল হইতে সেই পুরাতন ঔষধ বিক্রেতার ক্যালেণ্ডারটি পাড়িয়া আনিয়া দেখাইত। বলি দেখে যাও-সায়েব হলেই পীর হয় না আর—কিন্তু সে যা হােক—ভূপতির দিন চলিয়া যায়—চলিয়া যায় স্বচ্ছল গতি প্রবাহে। দক্ষিণের জানালা দিয়া যেদিন হুহু করিয়া হাওয়া আসে, ভূপতি সর্দি হইবার ভয়ে জানালাটি বন্ধ করিয়া দেয়। শীতকালে বেশ করিয়া আপাদ- মস্তক মুড়িয়া ভূপতি কাজ করিতে যায়, আবার ফিরিয়া আসে সেই ভাবে। হঠাৎ দেখিলে বিশেষ পরিচিত লােকও চিনিতে পারে না। কোন গলি দিয়া ঢুকিয়া, কোন রাস্তায় পড়িয়া, কোন চৌমাথা পার হইয়া—কাথায় কাহার দোকানের পাশ দিয়া দু’মাইল হাঁটিয়া ভূপতি ছাপাখানায় গিয়া ঢােকে। নিতান্ত পরিচিত পথ-বিরাট পৃথিবীর সঙ্গে কেবল তাহার এই পথেরই পরিচয়। মাথা নীচু করিয়া কাজ করিতে করিতে ভূপতি এখন রাস্তা দিয়া হাঁটে তাও মাথা নীচু করিয়া । একটা কিছু দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে, মটর আসিয়া ঘাড়ে পড়িতে পারে, পারে বৈকি। অন্ধকার রাস্তার একপাশ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে ভূপতির মনে হয় ছাপার কথা! সায়েব কোম্পানীতে কাজ করিয়া সুখ আছে যা হােক। সাহেবরা • গুণের কদর বােঝে। বেলস কোম্পানীর বড় সায়েব বলিয়াছেন—আমি যতদিন আছি ভূপতিবাবু, ততদিন তােমার ভাবনা নাই। ভূপতিরও ভাবনা ছিল না। কিন্তু ভাবনা হইল সায়েব সাইবার ১ঃ দিনের পর দিন পর। একদিন সায়েব বুকে গুলি মারিয়া আত্মহত্যা করিয়া মরিল। নিজে নিজে মরিল কিন্তু ভূপতিকেও মারিয়া গেল। রাম না থাকিলে রাম-রাজত্বও থাকে না। না থাকুক-ভূপতির তাহাতে এমন বিশেষ কিছুই আসে যায় না। ছেলেমেয়ে নাই, পরিবার নাই। তাহার আবার ভাবনা কি? একটি মাত্র পেট চলিয়া যাইবেই। সেই যে কথায় আছে—জীব দিয়াছেন যিনি আহার••• এমনি করিয়াই ভূপতির দিন কাটিতেছিল। কিন্তু প্রথম বাধা আসিল একদিন রাত্রে। ভূপতির জীবনে সে দিনটি অক্ষয় হইয়া আছে। তাহার কুমার জীবনের প্রথম স্থলন। আদিম মানবের প্রথম পাপ! সে পাপ এখন তাহার জীবনে জড়াইয়া গিয়াছে।••• মাথা নীচু করিয়া ভূপতি আসিতেছিল। রাত্রের অন্ধকারে রাস্তার এক পাশ দিয়া ভূপতি আসিতেছিল।••• যেমন করিয়া আর পাঁচ জনে আসে তেমন করিয়া নয় ভূপতি আসিতেছিল মাথা নীচু করিয়া হঠাৎ সম্মুখ হইতেই একটা দুর্ঘটনা ঘটিল। একটি লােক সাইকেল লইয়া আসিয়া পড়িল একেবারে ভূপতির শরীরের উপর। আচমকা আঘাত—ভূপতি চিৎ হইয়া পড়িয়া গেল। তা যা বেশি। লাগে নাই। আবার উঠিয়া ধূলা বালি ঝাড়িলেই সব বেদনা চলিয়া যায়। সাইকেলের তলায় চাপা পড়িলে এমন কিছু লাগে না। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটিল অন্য রকম। পড়িয়া যাইতেই ভূপতির কানে গেল যেন কাহার উচ্ছ্বসিত হাসি। উঠিয়া ভূপতি দেখিল—তাহার কিছু দূরেই একটি মেয়ে দাড়াইয়া খিল খিল করিয়া হাসিতেছে। হাসিটা তাহাকে দেখিয়াই, ভুপতি আবার দিনের পর দিন তাহর দিকে চাহিল-একটি মেয়ে—নিতান্ত কুৎসিতকুৎসিত তাহাকে বলা যায়—কিন্তু রূপসী হইবার চেষ্টা আছে। রীতিমত সাজগােজ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। রূপ-যৌবনের পসরা খুলিয়া পণ্য সাজাইয়াছে। কিন্তু মানায় নাই--যে ভূপতি কোনও দিন কোনও কিছু লইয়াই মাথা ঘামায় নাই—ভাল-মন্দর তফাৎ যে করিতে পারে না--চোখ তুলি কোনও মেয়ের দিকে যে একবার চাহিয়াও দেখে নাই—সেই ভূপতিরও মনে হইল যেন তাহাকে মানায় নাই। ওই সাজ-পােষাক, জাঁক-জমক তাহাকে যেন সাজে না। লজ্জায় ভূপতির নীচু মাথাটা আরও নীচু হইয়া গেল। একটা কুৎসিত মেয়েমানুষও তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া অস্থির। সাইকেলে চাপা পড়িবার মধ্যে হাসির কি আছে ? তাহার চেহারা দেখিয়া হাসিল, না সাইকেল চাপা পড়িয়াছে বলিয়া হাসিল—কে জানে! মেসে আসিয়া ভূপতির মনটা একটু চঞ্চল হইয়া রহিল। আজই প্রথম ভূপতি নারীর দিকে চোখ মেলিয়া চাহিল। তক্তপােশের উপর সেই দেয়ালের সেই ক্যালেণ্ডারটির দিকে চাহিল। ছাপা কথাগুলির দিকে নয়—ছবিটির উপর। শ্রীকৃষ্ণ রাধার পায়ের কাছে হাতের বাঁশীটি উৎসর্গ করিতেছেন। মনে হইল—উহার মধ্যে এক নতুন রহস্য আবিষ্কৃত হইয়া গিয়াছে। কথাটা সকাল বেলা আর মনে থাকিবার কথা নয়। খাইয়া উঠিয়া ছুটিতে ছুটিতে কাজে যাওয়া—কোনও দিকে দৃকপাত করা নয়। কোনও রকমে ঠিক সময়ে গিয়া কাজ আরম্ভ করিয়া দেওয়া। কিন্তু রাত্রে আসিবার সময় হঠাৎ দেখা হইয়া গেল আবার—চোখ পড়িয়া গেল। পড়িতেই দেখে—সেই জায়গাটিতে ঠিক দিনের পর দিন তেমনি করিয়া হাসিতেছে। তাহার দিকে চাহিয়া হাসিতেছে--চোখে চোখ রাখিয়া- ভূপতি সারা শরীরে এক অননুভূত চেতনা অনুভব করিল। শিরায় শিরায় যেন কে সঞ্চরণ করিতেছে। মৃদু শিহরণ—সারা গা বহিয়া ঘাম ঝরিতেছে। প্রতি রােমকূপে যেন অভূতপূর্ব জাগরণ। পায়ের তলায় পৃথিবী যেন কঁপিতেছে। কী এক আবেশ। ঠিক বুঝা যায় না-বুঝান যায় না। ভূপতির সারা দেহে সারা মনে এক অদ্ভুত আলােড়ন সুরু হইল। ভূপতির মনে হইল তাহার জ্বর হইল নাকি? কপালে হাত দিয়া ভাল করিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিল—যেন গরম বােধ হইতেছে। এমন কখনও তাহার হয় না। শরীর তাহার কখনও খারাপ হ’ল না। ভূপতির মনেই পড়ে না কবে তাহার অসুখ হইয়াছিল—তাহাকে শয্যাশায়ী হইয়া কখনও পড়িয়া থাকিতে হয় নাই। ছাপাখানায় তাহার একটি দিনের জন্যও কামাই কখনও হয় নাই। স্বাস্থ্য তাহার চিরকালই সুস্থ। কিন্তু আজ এ তাহার কি হইল ? রাত্রে মেসে গিয়া ভূপতি ভাত খাইল না। একটা দিন উপবাস দিলে, শরীর ভাল থাকিতে পারে। তারপর জানালা দরজা চারিদিক ভাল করিয়া বন্ধ করিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল। সারারাত ভাল করিয়া ঘুম হইল না। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে যেন কে বারে বারে আসিতে লাগিল। পাশ ওপাশ করিতে করিতে ভাের বেলার দিকে তা আসিয়াছিল। -সে ঘুম ভাঙ্গিল দেরিতে! ভূপতি উঠিল—কিন্তু রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি যেন তাহার সমস্ত শরীরে জড়িত। ছাপাখানায় গিয়া মনোেযােগ দিয়া কাজ করিয়া তবে যেন ভূপতির দিনের পর দিক একটু শান্তি আসিল। রাত্রিবেলা চশমাটি খুলিয়া চটি-জোড়া পায়ে দিয়া ভূপতি আবার রাস্তায় নামিল। আজ একেবারে সােজা গিয়া বিশ্রাম। তক্তপােশের উপর গিয়া শুইয়া পড়া। কিন্তু কি জানি কি হইল—সেই জায়গাটিতে আসিয়া ভূপতি চোখ তুলিয়া চাহিতেই আবার চোখে পড়িল—তেমনি কুৎসিত হাসি। কুৎসিত হােক—তবু ভূপতির শরীরে বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। আবার তেমনি রােমাঞ্চতেমনি করিয়া শিহরণ-দেহ গরম হইয়া উঠিল। ভূপতি চোখ বুজিয়া একমিনিট কি ভাবিল, তারপর নিজের পথেই চলিতে যাইবে এমন সময় ভূপতির মনে হইল যেন মেয়েটি তাহাকে ডাকিতেছে—রাস্তা ছাড়িয়া ভূপতি একেবারে তাহার সামনে গিয়া দাঁড়াইল। অন্য কোনও দিকে তখন তাহার জ্ঞান নাই। ছাতাটা কাধ হইতে নামাইয়া ভূপতি প্রথমে কি বলিবে ভাবিয়া পাইল না। কথা যেন তাহার হারাইয়া গিয়াছে। মেয়েটির কিন্তু লজ্জা নাই—মুখে কাপড় চাপা দিয়া হাসিতেছে ভূপতি বলিল-হাসছ যে? হাসছ কেন, শুনি? মেয়েটি হাসি থামাইয়া বলিল—তােমাকে দেখে। -আমাকে দেখে ?—প্রশ্ন করিল ভূপতি; তাহার পর নিজের । চেহারার দিকে একবার চাহিয়া লইল। তাহাকে দেখিয়া হাসিবার কি থাকিতে পারে ? আর পাঁচজন যেমন সে-ও তো তেমনি। ভাল করিয়া চাহিতে ভূপতির নজরে পড়িল—সত্যই তো, কাপড়টা ময়লা-বাহির হইতে সেলাইগুলি দেখা যায়। হাঁটুর উপর উঠিয়াছে। জামায় তালির উপর তালি—বিশেষ করিয়া সেদিন পেরেক লাগিয়া ছিড়িয়া : গিয়াছিল, সে আর সেলাই করা হয় নাই। চারিদিকে দৈন্ত । নিজের ;
দিনের পর দিন দৈন্য দেখিয়া ভূপতির আজ নিজেরই লজ্জা হইতে লাগিল। মনে হইল সে যদি এখনই নিজেকে লুকাইয়া ফেলিতে পারিত- ভূপতি চলিয়া আসিতেছিল মেয়েটি ডাকিল ভূপতি আবার ফিরিল—কি ? ধরে চল না-বসবে- ভূপতি বলিল—চল। মেয়েটির পিছন পিছন ভুপতি চলিতে লাগিল কিন্তু গলিটার ভিতর ঢুকিতেই ভূপতির হঠাৎ গ্যাসের আলােয় তাহার পােষাকের দৈন্য ভাল করিয়া আবার নজরে পড়িল। শতচ্ছিন্ন জামা কাপড় আজ যেন প্রথম তাহার চোখে প্রকট হইল। মেয়েটির রঙ-চড়া শাড়ীর কাছে তাহাকে বড় করুণ দেখাইতেছিল। মেয়েটি আগে আগে চলিতেছিল—ভূপতি নিঃশব্দে পিছন দিকে ফিরিল। তারপর হন্ হন্ করিয়া সােজা একেবারে রাস্তায় আসিয়া নামিল। আর কোন দিকে দৃষ্টি নাই—একেবারে মেসে গিয়া উঠিতে পারিলে হয়। নিজের ঘরে গিয়া ভূপতি দক্ষিণের জানালাটা খুলিয়া দিল। খুলিতেই হুহু করিয়া বাতাস আসিয়া ভূপতির চোখে মুখে লাগিল। ভূপতির মনে হইল—এতক্ষণে যেন সে সজীবতা পাইয়াছে। এমন করিয়া জানালা খুলিয়া দিয়া ভূপতি আগে কখনও দেখে নাই। বিরাট পৃথিবীর দিকে আজ ভূপতি মুখখামুখি চাহিয়া রহিল। চাদ উঠিয়াছে—সারা আকাশটা আলােয় আলো। এদিকটা শহরতলী। টিম টি আলো-আকাশ দিগন্ত ব্যাপিয়া বনের শ্রেণী। শহরের শেষের ? দিনের পর দিন ক্ষীণায়মান কোলাহল ভূপতির কানে আসিয়া বাজিতে লাগিল। অন্ধকারের অভ্যন্তরে যেন কোন রহস্যলােক অনাবিষ্কৃত রহিয়াছে। ভূপতি বঞ্চিত—ভূপতির সমস্ত ইন্দ্রিয় বঞ্চিত। এতদিন কেবল কোনও রকমে দিনাতিপাত করিয়াছে।তাহার মধ্যে না ছিল রঙ, না ছিল বস। শুষ্ক কঠিন মরুভূমির উপর শুধু কোনক্রমে নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিয়াছে। প্রাণ-ধারণের পক্ষে যাহা নিতান্ত প্রয়ােজন তাহার অতিরিক্ত সে কিছুই করে নাই। এই পৃথিবীতে দক্ষিণ হাওয়ার দাক্ষিণ্য আছে, নারীর মােহণীয়তা আছে, সে কথা কে ভাবিয়াছিল। বিছানায় শুইয়া রাস্তার মেয়েটিকে তাহার মনে পড়িল। হাসিয়াছে সে। সেই হাসিটি ভূপতি একবার মনে করিতে চেষ্টা করিল। তাহার জামা কাপড় দেখিয়া হাসিয়াছে। তাহার দারিদ্র্য দেখিয়া হাসিয়াছে- তাহাকে বিদ্রুপ করিয়া ? ভূপতির মনে হইল প্রতিশােধ লইতেই হইবে। তাহাকে ভূপতিও দেখাইবে। ভূপতিও ইচ্ছা করিলে বাবুয়ানা করিতে পারে কিনা তাহাকে তাহা দেখাইবে। তার পরদিন হইতে সে-রাস্তা দিয়া ভূপতি আর যায় না। অনেক ঘুরিয়া অনেক সময় নষ্ট করিয়া ভূপতি কাজ করিতে যায়। তাহোক যেদিন সময় হইবে সেদিন দেখাইবে তাহাকে। চোখে তাহার ধাধা লাগাইবে। সেদিন নিতাই পর্যন্ত চমকিয়া উঠিয়াছে। প্রথম চিনিতেই পারে নাই। বলিল, আমাদের ভূপতি দা’ না? '১৫০ দিনের পর দিন ভূপতি হাসিয়া বলিল-জামাটা কেমন হয়েছে বল দিকি ? দু’টাকার কমে ছাড়লে না নিতাই বলিল—এইবার কিন্তু বেশ মানিয়েছে তােমাকে—একটা বিয়ে করে ফেল ভূপতি সে কথায় কান না দিয়া বলিল—এইবার একটা কাপড় আর এক জোড়া জুতাে হলেই বাস—কি বল ? একটা কাপড় আর এক জোড়া জুতো—কিন্তু তাহাই কি অত শীঘ্র হয় ? প্রথম মাসটা কাটিয়া গেল—মেসের দেনা দিতে—এটা-ওটা করিতে করিতে। কাপড়টা আর সে মাসে হইল না। পরের মাসে হইবে। কিন্তু সে মাসটাও টাকাগুলা যে কোথা দিয়া চলিয়া গেল—ঠিক নাই। কাপড় কেনা হইল না। অনেক দিন পরে কাপড় হইল—একখানা নয়—একেবারে এক জোড়া। অনেক দিন তাহার সঙ্গে আর দেখা নাই। প্রথম যে দিন সাজ- গােজ করিয়া ভূপতি যাইবে, সেদিন প্রথম তাহার চোখে বিস্ময় লাগাইবে। নিশ্চয় আশ্চৰ্য সে হইবেই। একদিন যাহাকে দেখিযা হাসিয়াছিল—বিদ্রুপের হাসি, একদিন যে করিয়াছিল কৃপা-কটাক্ষ—সে তাহাকে আদর-আপ্যায়ন করিয়া ডাকিবে, অভ্যর্থনা করিবে। ভূপতি নিজের ঘরখানার চারকোণে চাহিয়া দেখে। এর আগে এতদিন তাে এসব চোখে পড়ে নাই। এই জঞ্জাল-অপরিচ্ছন্নতা। নিজেকে যেন তাহার দয়া করিতে ইচ্ছা হয়। দক্ষিণের জানালাটা দিয়া ** দিনের পর দিন যখন খােলা আকাশটা দেখা যায়—আকাশের উপর খণ্ড চাদের আলাে ঘরের ভিতর আসিয়া পড়ে, আর রাত জাগা কোনও পাখীর সঞ্চরমান ডাক যখন নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রতিধ্বনি করিয়া ফেরে—ভূপতির কেমন এক অহেতুক আনন্দ বােধ হয়। এই পৃথিবীতে এত স্বাদ আছে—এত গন্ধ আছে, এত আশা আছে। এই পৃথিবীতে বাঁচিয়া এত সুখ আছে। রাস্তায় চলিতে চলিতে ভূপতি আজকাল চোখ তুলিয়া চাহিয়া দেখে। বিচিত্র মানুষের সমারােহ-বিচিত্র জীবনের জনতা। সকলের চোখে কি রহস্য—কি অস্পষ্টতা-কী মাধুৰ্য্য। মানুষের চোখের ভাষা কত অদ্ভুত। কেহ কাহাকে চেনে না—অথচ কত সামঞ্জস্য-কত আত্মীয়। ভূপতি এত কথা কোনদিন ভাবে নাই। কিন্তু নিজের মনে রাস্তা চলিতে চলিতে হাজার হাজার কথা তাহার মনে আসে। সব চেয়ে আশ্চর্য লাগে- তাহার নারীকে। নারী দেখিলে ভূপতির চোখ আর ফিরিতে চায় না। মনে হয়, তাহার মুখের দিকে চাহিয়া জীবনটা কাটাইয়া দেয়। পৃথিবীতে এমন জিনিষও আছে। নারী দেখিলে ভূপতির সমস্ত শরীরে মৃদু শিহরণ খেলিয়া যায়। এতদিন ধরিয়া বঞ্চিত থাকিয়া আজ যেন ভূপতি নূতন চেতনা লাভ করিয়াছে। ভূপতি নূতন করিয়া যেন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিল। ছাপাখানা হইতে সকাল সকাল বাহির হইয়া ভূপতি আসিয়া রাস্তায় নাবিল। পৃথিবীকে আজ যেন বড় নুতন ঠেকিতেছে। নিজেকেও তাহার এত ভাল কোনও দিন লাগে নাই। নিজের চারিপাশে যাহাকে ভূপতি দেখিতেছে সবাই যেন আজ নূতন। এই রাস্তা দোকান-পাট আজই যেন সব সৃষ্টি। এত আনন্দ পৃথিবীতে আছে। ।
দিনের পর দিন আসিতে আসিতে ভূপতি অনেক দিন পরে সেই পুরাতন রাস্তায় আসিয়া পড়িল। সেই সব তেমনি আছে সব তেমনি। কিন্তু তবু সবই যেন নূতন বলিয়া চোখে লাগিতেছে। ভূপতি রাস্তার মােড় হইতে ফুল কিনিল—তাহার চুলে পরাইয়া দিবে। দূর হইতে দেখা যায়—মেয়েটি সেখানেই তেমনি করিয়া দাঁড়াইয়া । আছে ! ভূপতি আস্তে আস্তে গিয়া সামনে দাঁড়াইল। মেয়েটি চিনিতে ঠিক পারে নাই। না পারিবারই কথা। এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পােষাক- পরিচ্ছদ জুতা জামা সমস্ত মিলিয়া ভূপতি যেন নূতন মানুষ হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু চিনিতে পারিয়াই হাসি। কিন্তু এ-হাসি নারী-সুলভ হাসি। ভূপতি বলিল—চিনতে পার ? মেয়েটি উঠিয়া বলিল—এস, ঘরে চল—অনেক দিন যে তােমার দেখা নাই- ভূপতি কোন উত্তর দিল না—সমস্ত শরীরের শিরায় শিরায় রক্তের চলাচল সে শুনিতে লাগিল ! এত আনন্দও আছে পৃথিবীতে—এত স্বাদ, এত গন্ধ ! ভূপতির বুকের ভিতর নুতন আবিষ্কারের আনন্দ উদ্বেল হইয়া উঠিতে লাগিল। ঘরে গিয়া ভূপতি বিছানার উপর বসিল। একখানি ঘরের মধ্যে একটি পরিপূর্ণ সংসার। আলমারীর কাচের ভিতর খেলনা পুতুল। দেয়ালে ছবি। ভূপতির চোখে এমন সংসারের চিত্র নিতান্ত নূতন। হঠাৎ কি হইল কে জানে! ওদিকের দেয়ালে একটা মস্ত বড় আরশি টাঙানাে ছিল। ভূপতি গিয়া সামনে দাঁড়াইল। দাড়াইতেই নিজের দিনের পর দিন প্রতিবিম্ব দেখিয়া ভূপতি চমকিয়া উঠিল! এ কী ? ভূপতি আরশির কাছে মুখ আনিয়া অধীর আগ্রহে দেখিতে লাগিল। এ কী ? নিজেকে যেন ভূপতি চিনিতে পাবিল না। এ কী ? এ তাহার কি হইল? চোখ দুইটি উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে—এই কি সে নাকি ? ভূপতি আরো কাছে মুখ আনিয়া ভাল করিয়া দেখিল—চুল তাহার পাকিতে সুরু হইয়াছে—মুখের দুইপাশের চামড়া ঝুলিতে আরম্ভ করিয়াছে। কপালে বেখা পড়িয়াছে! কোথায় গেল যৌবন। যৌবন তাহার কোথায় গেল? কোথায় গেল ভূপতি দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সেইখানেই বসিয়া পড়িল। তারপর কি হইল কে জানে ? সেই ঘবের ভিতর হাউ হাউ করিয়া কাদিযা উঠিল। কান্না আর থামিতেই চাহে না। মেয়েটি আশ্চর্য হইয়া গিয়াছে। এমন অদ্ভুত মানুষ সে দেখে নাই কোনও দিন ভূপতি আবার দাঁড়াইয়া উঠিল। উঠিয়া আর একবার নিজেকে ভাল করিয়া দেখিতে লাগিল। এতদিন ত’ কই নজরে পড়ে নাই ? তারপর—তারপর যেন পাগলের মত ঘরে যা কিছু ছিল সব দুম-দাম করিয়া আরশির উপর ছুঁডিয়া মারিতে লাগিল। মেযেটি চীৎকার করিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সে কথা কে শােনে- ভূপতি ঘটি বাটি সব ছুড়িয়া কাচের উপর মারিতে লাগিল।•••ষখন আর কিছু নাই—সেই ভাঙা কাচের উপর ভূপতি দুই হাতে ঘুষি মারিতে লাগিল। -মিথ্যাবাদী-আরশি মিথ্যাবাদী।
দিনের পর দিন রাচীর পাগলাগারদে রেলিঙের ভিতর হইতে একটি পাগল বলে- একটা আরশি দেবেন একটা আরশি ও সেই ভূপতি। ভূপতিকে তােমরা আরশি দিও না। আরশি দিলে ভাঙ্গিয়া হাত পা কাটিয়া রক্তাক্ত করিয়া ফেলিবে •••ষে মুখ দেখিবার জন্য সে অত ব্যস্ত—সে মুখ এখন আরাে বীভৎস হইয়া উঠিয়াছে। মাথার চুল পাকিয়া গিয়াছে—এখন আর সে ভূপতি নাই- তবু যাহাকে দেখে তাহাকেই বলে—একটা আরশি দেবেন— ভুপতিকে আরশি দেওয়া নিষেধ। ইতি আমাদের প্রকাশিত কয়েকখানি সর্বজনপ্রশংসিত বই ০ ০ ০৫। ০ ০ ০ পদ মুখােপাধ্যায়ের নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ৩• ভাঙা যার 1 ! তাবতী দেবী সরস্বতীর ফানী মুখােপাধ্যায়ের পেন (২য় সংস্করণ) ২। দুদয় দিয়ে হৃত্বি.. আশালতা সিংহের মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাকী বাস্তব ও কল্পনা হলুদ পােড়া শৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়ের অসমঞ্জ মুখােপাধ্যায়ের কলি গরল তেল ক্রৌঞ্চ-মিথুন (চতুর্থ সংস্করণ) ২০ ২ ব্যোমকেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মায়া-মুক্তি ছেলেদের পড়বার প্রসাদ ভট্টাচার্যের পৃথিবীর হল বিশু মুখােপাধ্যায়ের নতার ইঙ্গিত ২। সমুদ্রে যারা ঘুরে বেড়ায় স বিশু মুখােপাধ্যায় অনুদিত (Toilers of the Sea) আলস নদের অমর উপাস তৃতীয় সংস্করণ সুধাংশুকুমার দাশগুপ্তের রাধাচরণ চক্রবর্তীর লাসার অভিশাপ কো-এডুকেশন • বুদ্ধদেব বসুর সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়ের কান্তিকুমারের পঞ্চকাণ্ড • Fতলে অন্ধ বালিকা ১০ সরােজকুমার রায়চৌধুরীর আশালতা দেবীর কলমে ফুল ভাকাতের সর্দার ১০ আশাপূর্ণা দেবীর প্রেমেন্দ্র মিত্রের ন ও প্রয়ােজন ২১ আকাশের আতঙ্ক • ০ ০ ০ # ০ ০ ০ ০ ০ কমলাপালিশিং হাউস ৮১, হরি পাল লেন, পােঃ বিভন স্ট্রাট; কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.