Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nikunja-lila

Bandhopadyay,amritalal · 2009/10/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নিকুঞ্জ-লীলা।
শ্রীযুক্ত অমৃতলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
কর্তৃক
প্রণীত ও প্রকাশিত
কলিকাতা
১৩৩ নং মসজিবাড়ী ষ্ট্রীট “হরি-যন্ত্রে”
যোগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত
সন ১৩০৪ সাল।

No text on this page.

বার বলে লভি বল,
**
দ্বিতীয় সংস্করণ।
উৎসর্গপত্র।
মাননীয় শ্ৰীযুক্ত বাবু অবিনাশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
এ, এ, বি, এল।
মহাশয় গরম শ্রদ্ধাস্পদেবু -
মহাশয় !
শ্রীকৃষ্ণ পূজিবংবলি, মন সাধে ধরি তুলি,
আঁকলাম তাহার চরণ।
জীবের সন্তোষ স্থল,
পাইলাম নাম রত্নধন।
পাইয়া পরম ধন;
কারে কব, কে এমন,
প্রাণধন রক্ষণ করিবে ?
কে আশীষ দিবে হায়, প্রাণে প্রাণে ভাবি তাই,
না জানি গো তুমি সখা বে!
প্রিয়তমা প্রথমেতে, দিল নাম শ্রবণেতে,
“নাচ বনমালি” বলি সুখ।
যে নাম সময় গুণে, নাশি মােহ, ও জ্ঞানে,
আনি দিল হরিলীলা মুখে ॥
রচিয়া নিকুঞ্জলীলা, মনে হ’ল ছেলেখেলা,
পূজ্যপাদ দিলাম তােমায়।
যতনে লইলে যত, আশীষে তুষিলে তত,
কি আনন্দে ভাসালে আমায়।
আজি তব পদ স্মরি, নমি শির নত করি,
আরো দুয়া করহ অধমে।
হরি পদে যাহে মন, রহে স্থির সর্বক্ষণ,
পাই যাতে শ্রীহরি চরমে।

No text on this page.

নিকুঞ্জলীলা।
প্রথম সর্গ।
শ্রীরাধিকা।
গহন কাননে, বিজন বিপিনে,
হেরি শ্যাম ধনে তৃষিত নয়নে ;
কোথা বংশীধারী! বিপিন বিহারী !
দেখা দাও, হরি! বাচাও জীবনে।
চরণ নূপুর,
বাজিছে মধুর,
করিছে অস্থির, রাধিকা-মোহন।
বক। শিখিপাখা, দুনয়ন বাঁকা,
কাল অঙ্গ ধাক, কাড়িছে জীবন।
হরি কল্পতরু, জগতের গুরু,
অন্তঃদেবতা, সুন্দর, সুচারু,
কোটি স্বর্গ যেন, সে চারু চরণ,
দীনের তরণ, দেবদে
দেবদেব

নিকুঞ্জলীলা।
কে দেখিবে তারে, নাহি দেখা দিলে,
হৃদয় ভরসা অনন্ত অখিলে ;
সুখ দুঃখ যারে নাহিক পশিলে
সে কেমন ধন নয়নে কি মিলে।
নবীন নীরদ কোলেতে চপা,
আলােকের মালা ধরেছে উজলা,
গরজিছে ঘন, মধুর কেমন,
শ্যাম নব মন দেখে কি উতলা !! •
ডোবো ভেবে রবি, নিরমল ছবি,
পশ্চিম গগনে কি শোভার খেলা,
"অরুণ বরণ, নানারূপ ঘন
কালিমা নীরদ কোলেতে কেমন,
অপূৰ্ব্ব মাধুরী করি প্রকাশন,
হৃদয় অকুল করিছে এখন।
দেখ দেখি সখি কি শোভা গগনে।
হৃদয় বিহারি, বাক। বংশীধারী,
কৰ ধন মাঝে নাচিছে কেমনে,
কাঙিছে নয়ন কাড়িছে চেতনে !!
গজিছে ঘন, মধুর কেমন,
বাজিছে মুরলী, কাড়িছে চেতন,

শ্রীরাধিকা।
ডাকিছে ত্রিভঙ্গ, করি, কত রঙ্গ,
কমনে
কমনে পাইব শ্রীমধুসুদন ?
ওই বকাবলি উঠেছে অম্বরে,
নীরদ গলেতে মালা দেছে পরে,
যেন থামলে, বনমালা দোলে,
কিবা কাল অঙ্গে ফুল শোভা ধরে ।
হাসিছে অম্বরে চপলা কেমন
মুরারি বাঁশরী শােভিছে যেমন;
যেন বংশীধারী, রাধা রাধা করি,
প্রেমে মত্ত হয়ে নাচেন যখন।
যখন।
শূন্যেতে ডাকিছে ময়ূরী চাহিয়ে,
আছ কি মুরারি এস না নাবিয়ে,
বাজবে মুরলী, নাচিৰ কেবলি,
দিবে করতালি হরষিত হয়ে,
খসিবে কদম্ব আনন্দে গলিয়ে।
দেখিতে দেখিতে শ্যাম কোথা গেল,
কাল নিশি আসি কালারে কাড়িল,
কি করি সজনী, বল, গুণমণি-
এ ঘোর নিশিতে কোথা পলাইল,
কৃষ্ণ বিনে প্রাণ বিষাদে ডুবিল।

৬
নিকুঞ্জলীলা।
আমি মরি তাহে কিছু ভেদ নাই,
প্রাণের মুরারি যদি নাহি পাই,
কাল নিশি সাথে মিশ যেন যাই,
লভিতে নারিনু যখন কানাই।
রাগিণী লুম ঝি ঝি ট-তাল যৎ।
কুঞ্জে কুঞ্জে গুঞ্জিছে অলি না হেরি হরি রে।
কোথায় খুজি হৃদয় চাঁদে বিষাদ পূরি রে !
কালিন্দী কয় কালার কথা সবারি কাণে রে ।
ভুবন গায় মাধুরী তার আনন্দ বানে রে।
বিধূর হাসে ভুলায় জ্বালা, তাহারে ভাবি রে ।
বিরহ ব্যথ। বিসরি হেরি প্রলয় ছবি রে ।
কুসুম হাসে মধুর ভাষে হেরিয়া তারে রে।
গােপনে সবে মাধবে লয়ে সুখে বিহরে রে।
ইতি প্রথম সর্গ সমাপ্ত।

দ্বিতীয়
সর্গ।
নিধু-নিকুঞ্জে রাধা।
নাচে বনমালী,
দিয়া করতালি,
রাধা রাধা বলি, নিকুঞ্জ বনে।
যত গােপ নারী, বলে ওগো প্যারি,
চল শিয়া দেখি ত্রিভঙ্গ ধনে,
ওই বাজে গুন,
রুণু রুনু স্বন,
চরণ নূপুর, সােহাগী রাই।
গরবে নীরবে,
থাকিলে কি হয়,
পলাবে গো তাের, প্রাণ কানাই ॥
ভাল গরবিনী,
দেখিতে মানিনী,
পাগলিনী হও, আড়াল হলে।
এমন করিলে,
শ্যামেরে দেখিলে,
কহে দিব তাের এ রীত ছলে।
বলিব হে শ্যাম,
দেখ রাধা নাম,
করিলে ও মান বাড়িয়া যায়।
দেখনা কেমন,
আপনি আপন,
মান ত্যজে সাধে, প্রাণের দায়।
শুন ওগাে প্যারি,
তোর ও শারি,
তােমার মনেতে,সুখী গো নয়।

, নিকুঞ্জলীলা। শ্যামেরে পাইলে, মুখে ভাল মিলে, E শ্যাম কেন গো তাের একাকী নয় ? পাপিয়া ঝঙ্কারে, কোকিল কুহরে, হেরে কালারে, মানিনী রাই। ভ্রমরনিকৰে, নাহিক গুঞ্জরে, রহে মৌনভরে, 'দুঃখে তাই এ এ যে বড় দায়, মরি যে লজ্জায়, আজি এত মান, কিসের থেকে ? ডাকিছেন হরি, তবু এত ভারি, কেন গাে কিশােরি, মরি কে দেখে । মনে তাের নাই, এর চেয়ে রাই, আর কিবা লাজ, জগতে আছে। বংশী-র শুনি, শ্যাম সোহাগিনি। গিয়াছ সে দিন নিকুঞ্জ মাঝে। দেথি বংশীধারী, লুকালাে, কিশোরি । কেমন বিপাকে পড়িলে তকে। রক্ষ বলে হরি, চীৎকার করি, বলিলে শামের সতত হবে। । হেথা নবঘন, সুচারু চিকন, বন ফুলমাল, দুলায়ে রই । আঁকা বাকা গম, সুন্দর সুঠাম, রাই নাই বলে, দিতেছে তাই।

নিধু-নিকুঞ্জে রাধা। মমিরি মরি, আহা দেখি নাই, ওগো শুন রাই, মধুর মুরতি উজল শােভা, ও রাই সুন্দকি নূপুরের ধ্বনি, মধুর কিবা ! তােমায় মঞ্জীর, মুখর, অধ, শুনেছি সতত, ভাল না লাগে। ত্যজগাে মঞ্জীরে, চল ধীরে ধীরে, শ্যাম নটবরে দেখিবে আগে । • নাহি জানি শ্যাম, হেলাইয়া বাম, বাজাছে মুরলী, রাধিকা বলে। চুল গিয়া দেখি, সে বঙ্কিম গাি অর্লিগে জীবন, চরণ তলে । নীলকান্তমণি, সেই চিন্তামণি, নবীন নীরদ বরণ যার। হরি বংশীধারী, রাধিকা বিহারী, বনমালা গলে, মুকুতা হার ৮ জগত পূজিত, সদা হরষিত, গােলোক-বিহারী, বিপিন-বাসী। চিদানন্দময়, ধন্য জন সেই, যে তার আশী। হেন কথা শুনি, রাধ বিনােদিনী, ঈষৎ হাসিল, ঐকৃষ্ণ স্মরি । নিকুঞ্জ মাঝারে, পারিজাত হবে, ছুটিল সুগন্ধ, শ্রীপদ অভয়, হয় পুরি।

নিকুঞ্জলীলা। ফুল্ল ক ৫ কুঞ্জের তিরি, ৫ অভাতে হাসির, নিবিড় বিপিনে ধাইল যেন। কৃষ্ণ সোহাগিনী, কমনী, ডাকিয়া সখীরে কহিল হেন। যাও গো সজনি ! ঐকৃষ্ণ সঙ্গিনি। যথায় মুরলী করিছে রব। যা ও ত্বরা যাও, যদি কৃষ্ণে চাও, * দেখ গিয়া হরি, সঙ্গিনী সব। কিন্তু সখীগণ, হরি কারণ, আমিও কেন গো, ধাইব বনে ? আমারি কাণে, ওন গাে বচন, এসেছেন হরি, এখন বিজনে। হৃদি পদ্মাসনে, রাখিয়া যতনে, ভকতি কুসুম প্ৰদানি সখি। জগত জীবনে, পূজিয়া নির্জনে, চরণ কমলে জীবন রাখি। এ দিনবন্ধু হরি, সতত শিহরি, আমারি প্রেমেতে ব্যাকুল হন। তাই রাধা বলি, কয়ে কুতূহলী, আসেন তুষিতে, সহজে মন । প্রাণ শ্রীচরণে, চেলেছি যতনে, শ্রীহরি ব্যতীত, কিছু না জানি। ক শারি হরি, কিম্বা সহচরী, কৃষ্ণ ভাবি তাই, কহিগো বাণী ।

নিধুবনে শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণ বৃন্দাবন, কৃষ্ণ গােপীগণ, রাধার জীবন, শ্রীকৃষ্ণ পদ। কৃষ্ণ বিনা আর, কিছু না রাধার, শ্রী কৃষ্ণ হৃদয়-আনন্দ প্রদ। কেন ধেয়ে যাব, সময় খুয়া, তার চেয়ে ধ্যানে হেরি না কেন ? পীতাম্বর হরি, সৰ্ব্ব রক্ষকারী, দুর্গতি নাশক, জীবের হেন। বলিয়া কিশােরী, মুখে হরি হরি, অমনি চেতনা রহিত হল। তবে সখীগণ, আনিতে জীবন, নিকট সরসী কূলেতে গেল কেহ দুই হাতে, অনিল ত্বরিতে, পদ্মের সহিত, মৃণাল দল। কমল আননে, কমল নয়নে, কমল ডুবায়ে সিঞ্চিল স্কুল পর পg লয়ে, কেহ ব্যস্ত হয়ে, ব্যজন করিতে লালি ক্ষণে। প্রিয়সথি বৰে, ডাকিল সকলে, বদন ধরিয়া, কাতর মনে। নিধুবনে শ্রীকৃষ্ণ। হেথা নিধুবনে, গভীর নির্জনে, হরষিত মনে, ভকতে স্মরি।

নিকুঞ্জলীলা। বংশী বাজাইয়া, শান্তি উছলিয়া, প্রেমেতে গলিয়া, নাচিছে হরি। ময়ুর ময়ুরী, শুক সহচরী, কোকিল প্রহরী, সকলি নাচে। নিধুবন মাঝে, আনন্দ বিরাজে, প্রফুল্ল সরকাজে, টুপদ সাজে। বিটপী দুলিছে, শিখী নিনাদিছে, বিহাগ করিছে, ললিত রব। স্থির মৃগকুল, নির্ভয় গােকুল, অনিন অতুল, ভুঞ্জিছে সব। লতিকা নাচিয়া, প্রেমেতে গলিয়া, পড়িছে ঢলিয়া, পাদপ গায়। হাসিল বিমল, কুসুমের দল দিতেছে সায়। পুষ্পলতা মিলি, সমীরণে দুলি, হরিনাম বলি, সাদরে ধরে। অভেদ অন্তর, সবে একাকার, লয়ে ব্রজেশ্বর, জীবন হরে । দেখিয়া কমল, গাছে দেবগণ, বেষ্টিত এমন, সে চন্দ্রবদন, চাহিঙ্গা হেন। যেন জ্ঞানহারা, পুত্তলি বা করা, হরি সুধাধার পিতেছে যেন।

নিধুবনে শ্রীকৃষ্ণ। সাধনে সদয়, আহা প্রেমময়, দয়াতে হৃদয়, কোমল যাই। যেবাপ্রেমে হেরে, সেই পায় তারে, নতুবা আঁধারে, বিষাদ সার। আহা কি কোমল, প্রকৃতি বিমল, স্নেহ নিরমল শান্তির ঠাঁই। দুঃখ যায় দুরে, হৃদি সরােবরে, বহে আশা জোরে, আনন্দ পাই । এই প্রেমে গলি, পড়িতেছে ঢলি, যেন শত অলি সরােজ’পরে। এই অন্ধ তারা, কেঁদে হয় সারা, দেব দেব যারা, প্রেমের ভরে। ধূলায় ধূসরি, বলি হরি হরি, হরি পদধূলি তুলিয়া লয়। প্রেমেতে লুটায়, পড়ে কার গায়, মাতােয়ারা হয়ে, আনন্দে রয়। কভু তেজ জ্যোতি, বিষম মুরতি, দেব দেব অপি, চাহিতে নারে। কভু বা ললিত, প্রেমে পুলকিত, আনন্দে গলিত, সুখের ভরে। অখিল কারণ, জ্যো-িপ্রস্রবণ, মুনি অগণন উদ্ভবে যায়। কিরণে কি রণে, ব্রহ্মা জনমে, অসীম কারণে, জীবিত রয়।

১৪ নিকুঞ্জলীলা। দেখিতে দেখিতে, সবে হরষিতে, মুনিগণ যতে’ ধরিল বীণা। মাতিল মেদিনী, শূন্যে সৌদামিনী, সেই রব শুনি, গাইল নানা । অনাদি অনন্ত, বুধ-দেব-ভ্রান্ত, সেই জন অস্ত, এক বুঝে আর ? বুঝে সাধ্য কার, যিনি নিরাকার, মন, অগােচর, বুদ্ধির বার । তবে ভক্তিজলে, যার গুণ গলে, সে হৃদিকমলে, দেখিতে পায়। কোটি চন্দ্র জিনি, নীলকান্তমণি, জীবের জীবনী, অমৃতময় ॥ কিবা মনােহর, অরুণ অধর, আনন্দ অপার, বিরাজে যায়। সম মুক্তাবলী, খেলিছে বিজলী, সতত তায়। বঙ্কিম নয়ন, উজল কেমন, ঈষৎ বঙ্কিম চাহনি যার। প্রেমে ঢল ঢল, বিকচ কমল, যেন পরিমল, উথলে তার । অমিয় অধরে, বাঁশরিটী ধরে, আঁকা বাঁকা ভরে, দাড়ায়ে আছে । মন প্রাণ লোভ, খেলিছে কি শোভা, শশীর সে অভা, মলিন কাছে। কুন্দ দস্তগুলি,

নিধুবনে শ্রীকৃষ্ণ।
সুচারু চরণে,
মঞ্জীর যতনে,
ললিত বাদনে, ডাকিছে যেন।
কে নাসিবি আয়,
যার প্রাণ চায়
এ পদ সহায়, ভকত প্রাণ।
কভু বা দ্বিভুজ,
কভু চতুতু,
কভু ষড়ভুজ প্রকাশ রূপ।
যা ভাবি যখন,
•হের কৃষ্ণধন,
দেখ সেই ধন, অনন্ত রূপ।
বিশ্বরূপ য়ার,
ব্যক্ত চরাচর,
কিরুপ তঁাহার, সম্ভব নয় ?
ভাবনায় বঁার,
অনন্ত আকার,
ভকত মাঝায়, প্রচার হয় ॥
গীত।
কোথা দয়াময়, বিপন্ন আশ্রয়, হও হে সদয়, আজি কৃপা করি।
অগতির গতি, ফিরাও কুমতি, কর জীবগতি, বাঁকা বংশীধারি ।
অসময়ে যদি নাহি দেখা দিবে, অধমতারণ কিসে বল হবে,
ভবভয়হারি কে বল কহিবে, ত্রিভঙ্গ ! ত্ৰিতাপবারি।
কি জানি ভজন, কি জানি পূজন, ভবে যাওয়া আসা সকলি বঞ্চন,
ভাবি চরণ, হে মধুসূদন, যেন না বিপদে পড়ি।
দ্বিতীয় সর্গ সমাপ্ত।

তৃতীয়
সর্গ।
নিধুবনে বৃন্দ।।
বৃন্দা সখি যায়,
শ্রীহরি যথায়,
ভাবে গদ গদ, ভাবি কৃষ্ণপদ।
বলে একি হল, চেতনা হারাল ;
রাধা বিনােদিনী,
*ীবনতােষিণী,
বংশী রব শুনি, হইল বিকল।
আনি গাে কিশােরি, তাের বংশীধারী,
ওই বনমাঝে, বাজায় বাঁশরী ।
রাধা নাম ধরি,
বিনােদবিহারী,
এখনি যাইব, আনিব গাে ধরি।
একি অনুপম,
রম" উপবন,
নিষ্পন্দ নয়ন, নির্বাক্ জ্ঞান !
ঘন বনছায়া,
আলাে আবরিয়া,
ঢাকি বনকায়, বাড়ায় 'মান।
সরসী হাসিছে,
চন্দ্রমা ভাসিছে,
সরোজ শোভিছে, আনন্দ ভরে।
কেলি সরোবর,
কিন্নরী কিন্নর,
বসি তীরে তার, কি শােভা ধরে।

নিধুবনে বৃন্দা। ১৭ ১ কেহ বা হাসিছে, সঙ্গীত গাইছে, কেহ বা নাচিছে, মধুর তালে। কেহ তুলি ফুল, করিতেছে দু কেহ গাঁথি ফুল, পরিছে গলে । অনিন লহরী,, জাগায়ে শর্বরী, উঠিছে আমরি, স্বরগ পানে। জাগি পিককুল, হইয়া আকুল, গাইছে অতুল-সুন্দর-তানে। মলয় অনিল, সহায় হইল, নাচিতে লাগিল, শ্রীহরি নামে। পাদপে মিলিয়া, করতালি দিয়া, লতিকা ধরিয়া, রাখিল বামে । আকাশের চাদ উপরে হাসিছে, সরসীর চাদ, জলেতে নাচিছে, মধুরে মাধুরী, আহা মরি মরি, হাসি কুসুমেরি, তাহাতে মিশিছে ! চন্দ্রমা কিরণ, ঝুরু ঝু ঝরি বাতাসে খসিছে। পাদপ সকল, আনন্দে বিহ্বল, লতিকার সাথে মিলিয়া নাচিছে। নিশির ভূষণ, ১৮ নিকুঞ্জলীলা। মধুর স্বলতে, নাচিছে, হিল্লোলে, কুমুদিনী জলে, দেখি,প্রাণনাথে নিকটে ডাকিছে। *সী হইতে, নিশানাথ তারে সাদরে ধরিছে । বিল্লীর নিনাদ, করি নিৰ্বিবাদ, ঝিনি ঝিনি করি শ্রবণে পাশছে। থাকিয়া থাকিয়া, কাপিয়া কঁাপিয়া, পাপিয়ার স্বরে অম্বর কঁপিছে। চমকি চপলা, হইয়া উতলা, ধরিজে সে কালা, চুমকি চলে। চকি’য় নয়নে, বিমল বদনে, অধর কম্পনে, কি যেন বলে । পাদপের মাঝে, ওই মাঝে মাঝে, অপরূপ সাজে, চলিল ত্বরা। মনে হেন নিল, শশ কি চলিল, কিংবা সৌদামিনী, নাবিল ধরা !! নাচি নাচি যায়, ফিরি ফিরি চায়, পদ কোথা রয়, না দেখে চোখে। নবীন নলিনী, ব্ৰজ কুমুদেরে, সর্বত্র দেখে। কুমুদ-বদনি, ১৯ চারিদিকে যায়, উন্মাদিনী প্রায়, পলকে হারায়, অধীয়ে ধায়। নিকুঞ্জে নির্জনে, বিলাস বিপিতে যমুনা-জীবনে, চোদিকে চায় । কোকিগোতে ডাকে, সহবাস থেকে, জিজ্ঞাসে তাহাকে, নীরব স্বরে। যায় গন্ধ ধরি, কিছু মনে করি, মলয় নিশ্বাস যথায় করে । কভু ফেলে শ্বাস, ক ভু করে হাস, ভারি পীতবাস, তথায় যায়। বলে হায় হায় ! না হেরি তাহায়, যায় পুনরায়, তমাল গায় । কভু গোঠে যায়, কভু মাঠে চায়, নীরব, নিথর চঞ্চল করি। কোকিল কণ্ঠেতে, পিক কাকলিতে, ভাকে ব্যাকুলেতে, বলিয়া হরি। সরমের ডালি, তামৃত পুতলি, কুসুম-বরণ কোমল করে। কুসুমের উলি, ঠেলি তালে তাল, বাজয়ে কঙ্কন, মধুর স্বরে। অহা মরি মরি উজলি শৰ্বরী, মলয়া মরুতে, ঠেলিয়া যায়। মধুরে মাধুরী, মুখপদ্ম তারি, বন দেবী সম, কিশােভা পায় ।

२० নিকঞ্জলীলা কমল চরণে, গজেন্দ্রগমনে, মধুর লয়েতে, ঝাজর বাজে। ফণু রুণু রুণু, করি কানু কানু, লতা পাতা নাচে, সুষম সাজে। রি, ধীরি যায়, ফিরি ফিরি চায়, কালার নুপুর, করিয়া মনে। সে মুখ কমল, বন করে আলো, ও চঁাদেরে বিকল, করে রে ক্ষণে। দেখেছি ত শশী, কত হাসি হাসি, জ্যোৎস্নার রাশি, এলায়ে কিবা। অনন্ত আকাশে, মনের হরষে, যায় ভেসে ভেসে, করিয়া দিবা। কিন্তু হেন রূপ, আরাে অপরূপ, কবরী হতেছে সতত বিরূপ ; আলু থালু কে শ-সৌদামিনী বেশ, নিবিড় কুন্তল শােভিছে বিশেষ ত্বরিত গতিতে, আপন মনেতে, ধাইছে বিপিনে, নাহি ভয়-লেশ। মলয় মরুত সঙ্গেতে ছুটিল- শ্ৰম ঘৰ্ম্ম বিন্দু নিমিষে পুছিল— তবু না শুকাল, স্বেদ বিন্দুজাল, দুই গণ্ড বহি ঝরিতে লাগিল,

২;
কোকিল কুহরনিনাদ শিথিল
নাহি কর্ণে আর সুখ উপজিল,
যেন তরঙ্গিনী, হয়ে উন্মাদিনী,
উথলে উথলে নাচিয়া চলিল ॥
০
মৃদুল মলয়া, করি স্নিগ্ধ কায়া, মৃদু মৃদু মৃদু চলে।
সুনীল বসন, খুলিয়া কসন, মলয়া মারুতে গেলে ।
কুমুদ বরণ, কঁপিয়া কিরণ, আলােকে নয়ন হরে।
এ হেন রূপসী, হেরি কাল শশী, সাদরে সােহাগ করে।
লোহিত অধর, সুধীর আগার, সুখের সরম ফুল।
কুসুম হসন, বিকাশে দশন, করয়ে মরে ভুল।
উরস সরস, বিমল পীযুষ, বিমল কমল ধরে।
প্রেমের আবাস, মন্মথ নিবাস, সুখের সুযাগ করে।
কুসুম কুমারী, কুসুমেতে ঘেরি, কুসুম পরিয়ে গলে।
কুসুম যেমন,সৌরভ তেমন, বিতরে অনিল এলে।
কুসুম হারেতে, ঝলকি শােভাতে, কুসুম মাথায় পরে।
কুসুম সদৃশ, পেলে হৃষীকেশ, চরণে লুটায় ধরে।
প্রেমের বিজলি, প্রেমে পড়ে চলি, প্রেমেতে গলিয়ে রয়।
প্রেমে উন্মাদিনী, প্রেম তরঙ্গিনী, প্রেমেতে উজানে বয়।
অমৃতের বাতি, মােহিনী মূরতি, ভুবন উজল করে।
মদন মােহনে, হৃদয়ে যতনে, পরম প্রেমেতে ধরে
পরম যোগেতে, ভাবিনী ভাবেতে, ভবেশে ভুলায়ে ধরে।
প্রকৃতি লইয়ে, প্রেমেতে গলিয়ে, মদন বন্ধন করে।
০

নিকুঞ্জলীলা।
মদন চাপেতে, কুসুম শবেতে, যােজনা করিয়া দেয় ।
মদন মােহনে, মােহিনীর সনে, সতত মিলায় তায়।
{
.
(বলে) কোপ্লায় মাধব, হৃদয় বল্লভ, কোথায় রহিলে আজ।
তােমার বিরহে, প্রমাদ গণিহে, পড়িছে হৃদয়ে বাজ ।
সে নব নলিনী, বিনা অলিধ্বনি, মুদেছে নয়ন তার।
শ্বাস ঘন ঘন, বহিছে সঘন, নাহিক কিছুই সাড়।
সুবৰ্ণ বরণ, হে নীল রতন, হয়েছে তােমার মত।
নয়নের নীর, হইয়া বাহির, খেলিছে তরঙ্গে কত।
হিম কলেবর, কঁপি থর থর, নিঃসাড়ে পড়িয়া আছে।
কমল ব্যজনে, তার সখিগণে, রহেছে তাহার কাছে ।
সে কৌমুদীময়ী, ভুবন বিজয়ী, রূপের সরোজখানি।
আহা তার দশা, দেখিয়া বিবশ, হতেছে সবার প্রাণি
সুধা প্রবাহিনী, প্রেম তরঙ্গিনী, পাগলিনী প্রেমে তাের।
কি করিলি কালা, তার প্রেম জালা, নিবালিরে মনচোর।
নিশ্বাস প্রশ্বাসে, তােমার আশ্বাসে, সে যেরে জীবনে জীয়ে।
অঙ্কিত অন্তরে, ধরিয়া তােমারে, পূজেরে হৃদয় দিয়ে ।
সদা উন্মাদিনী, রাধা বিনােদিনী, তােমার প্রেমেতে হয়।
সখা সখিগণে, কৃষ্ণ ভাবি মনে, শ্রীকৃষ্ণ বারতা কয়।
‘তমাল শিখরে, কোকিল কুহরে, শুনিয়া শিহরে উঠে।
অই কৃষ্ণ বলে, প্রেমে পড়ি ঢলে,“অমনি চমকি ছুটে।
নিকুঞ্জে কুসুম, নড়িলে বিষম, বিস্ফারি লোচনে দেখে।
নাহেরি শ্রীধর, ঝাপিয়ে অধর, বিষম বিরাগ মাখে।

বৃন্দা।
কোমল শরীরে, বাসর আদরে, বিছায়ে যতন করি।
সুকুসুম রে, অতি সমাদরে, সাজায়ে রেখেছে হরি ॥
কমল উরলে, পরম হরষে, আঁকিয়া চরণ তব।
নয়ন সলিলে, পূজিছে বিরলে, অর্পিয়া তাহার সব।
যদি পুছি যায়, করি হায় হায়, আঁথিরে তাড়া করে।
আবার চন্দনে, আঁকিয়া যতন, চরণ হৃদয়ে ধরে।
শিরিষ যেমন, সে বাহু তেমন, সে কর কমল প্রায়।
তোমারে ধরিতে, ব্যথা পায় চিতে, পাছে তা যাতনা দেয়।
চান যে কেমবে, সে খর সন্ধানে, সঘনে নয়ন বাণ।
যে বিষে এমন, আইনরে মরণ, বিদারি রমণি প্রাণ ।
শ্রীহরি তােমার, পাষাণ আগার, হৃদয় বুঝিহে হয়।
গরল তাহাতে, বিধি কি রাখিতে, নিৰ্মাণ করেছে ?
কুসুম ভ্রমেতে, হৃদয়ে ধরিতে, হায়রে গেলেম সুখ।
কন্টক এমন, করিল দংশন, শেল রে বিঁধিল বুকে।
মলয় অনিলে, অনল আনিলে, পুড়াতে আমার কায়া।
শীতল সলিলে, গরল মিশালে, দহিতে আমার হিয়া।
হয় কমলিনি, নাশিতে রমণী, এসেছে ব্ৰজেতে হরি।
আগে না বুঝিলি, সােহাগে ভুলিলি, মজিলি প্রাণেশ স্মরি।
নব নটবর, কি তুমি নিঠুর, কঠিন তোমার হিয়া।
ওহে তােমা তরে, যার আখি ঝরে, সে নহে তােমার প্রিয়া ?
তােমার কারণ, যে ধরে জীবন, তাহারে কাদাও কেন ।
দয়ার আধার, ব্ৰজ-সুধাকর, সুধা কি তােমার হেন ?

২৪
নিকুঞ্জলীলা।
ভবভয়হারি। নয়নের বারি, যদি হে পড়িবে এত ।
তােমারে পূজিতে, যদি হে ভ্রমেতে, সহিবে যান। শত।
তবে কিসে আর, সুখ আছে কার, বল হে ভবেশ শুনি।
প্রাণ শ্রীরাধার, ত্যজিলে হেলায়, ডাকিবে, কে গুণমণি?
শঠতা পঞ্চা, করােনা করোনা, বিপদ সময়ে হেন।
বিপদ কাণ্ডারি, বিপদেতে স্মর, বিপদে পাই হে যেন ॥
আঁধার অন্তরে, পাইলে তােমারে, আলােক দেখিতে পাই।
নতুবা তাসে, যায় সব মিশে, যেমতি কিছুই নাই।
তোমা লয়ে তাই, হৃদয় জুড়াই, জুড়াই আপিত প্রাণ।
আশার প্রবাহে, মন প্রাণ বহে, পাইহে শান্তির স্থান।
তুমি হে অন্তরে, ভকতি মন্দিরে, আনন্দে উদয় হও।
চিg'নরূপে, জ্যোতির স্বরূপে, আলােক করিয়া রও।
ওহে) চপলা ছড়ায়ে, নীরদের গায়ে, কেন হে পুছায়ে দাও।
কুমুদে ঘুমায়ে, অমর মিলায়ে, কঁাদায়ে, কেন না চাও ?
আঁধার আলোকে, ফুটায়ে পুলকে, আবার নিবাও কেন?
কুসুম গুহার, প্রেমের আকার, কেন সে শুকায় হেন ?
কুসুমের হাস, প্ৰকাশি উল্লাস, কেন, বা মুদিয়া যায়।
মুরলী তােমার, কেন বার বার, ফুকারি নীরব হয় ?
সুখ সুধাকরে, বল কিবা করে, লেপিলে কলঙ্ক তায় ?
সুবাস, মলয়া, বিরহীর হিয়া, কি জন্য পুড়ায়ে যায় ?
কোকিল কুহরে, কেন বিষ ধরে, বাড়ায় বিরহী দুঃখ ?
বিপদ সময়, কেন দয়াময়না দেখ দুঃখীর মুখ ?

নিকুঞ্জবনে ঐকৃষ্ণ। । সম্মুখে আকাশ, লভেছে বিকাশ, • রবি, শশী তাহে কতই হাসে। কোটী কোটী তারা, আছে সবে ধরা, সেই স্বপ্রকাশ নয়ন পাশে। শূন্তে স্থল হয়, নিমিষে উদশ, জড়, জীরচয় ইচ্ছায় তার। জীবের আধার তিনি বিশ্বাধার ; নিজের প্রতিষ্ঠা সৃষ্টিতে যার ॥ স্থূল, সূক্ষ্ম দেহ, জীবাত্মার গেহ, যাঁহারইচ্ছায় উদ্ভব হয়। যাহেঁ স্থিতি হয়, লইয়া মায়ায়, যাহাতে আবার পায় সে লয় । যিনি সৰ্ব্বত্ৰেতে, অনন্ত রূপেতে, অনন্ত স্থানেতে, ব্যাপিত হন। পরমাণু রূপে, ব্রহ্মাণ্ডের কূপে, সৃষ্টি-বীজ রূপে, অলক্ষ্যে রন । গ্রহ চন্দ্র রবি, এ বিশ্বের ছবি, এই পরমাণু প্রকাশ করে। অমর, কিন্নর রক্ষ, যক্ষ, নর, কালের কোলেতে কায়াকে ধরে । নিরাকার হয়ে, আধার আশ্রয়ে, কতই আকার ধরেন হরি। বিশ্ব বিমােহন জগত কারণ, আকারে তাহার মহিমা স্মরি। . * :

১৪ প্রথম সর্গ। । পরমার্থ জ্ঞান, লব্ৰেহ্মাণ্ড, ভ্রান্ত জীবচয়, মায়া মমাহে রম, সেই দেবদেবে ভুলিয়া যায়। করি সন্ধান, ঐহিকের সুখ সতত চায়। কে বুঝে এ কাণ্ড? বুদ্ধির অতীত হইয় রয় । যাহে বিশ্বপতি, আনন্দিত অতি, ভার, লয় স্থিতি অজ্ঞেয় হয়। দেহ কারাগার, পশিয়া আত্মার, ঘোর মােহ হায়! সদ্ভুত ইষ্ট। কিছু সাধ্য নাই, তবু সর্বদাই, কতই প্রভুত্বে নিয়ত রয়। প্রতি রেণু যার, অনিত্য অসার, প্রতিক্ষণে যার, বিধ্বংস আসে। একি চমৎকার, সেই দেহ সার, নিত্য বলি বােধ, হয় রে কিসে কত অহঙ্কার, কত মায়া আর, কত লােভ, ক্ষোভ হৃদয়ে হয়। কত কাম, ক্রোধ, ভ্রমে, নিত্য বােধ, জ্ঞানেতে। তথাপি কেমনে রয় । অহে বিশ্বপতি। ধন্য তব মতি, ইচ্ছামত তব ব্রহ্মাণ্ড হয়। তােমার হে মৰ্ম্ম, জানা নহে কৰ্ম্ম, তােমার ইচ্ছার হউক জয়। '।

গোবিন্দের রূপ দর্শন। ১৫ গােবিন্দের রূপ দর্শন। দেখিল আনন্দে, সেই শ্ৰীগােবশে, যারে ধ্যানে, জ্ঞানে না যায় ধরা। অপরূপ রূপ, আনন্দ স্বরূপ, মদন মােহন, জ্যোতিতে ভরা। • কিবা পত্ন নখে, বিরাজে পুলকে, শশাঙ্কের লেখা, সুধার রাশি। মন মুগ্ধকারী, আনন্দ লহরী, কোকনদ পদে খেলিছে হাসি ॥ বজ্রাঙ্কুশ, হইতে পীযূষ, অবিশ্রান্ত সুখে ক্ষরিছে তায়। যােগন্দ্র, মুনীন্দ্র, বিরিঞ্চি, দেবেন্দ্র, কত সাধনায় সে সুধা পায় । চরণ আলােকে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে, মাতায়ে পুলকে ডাকিছে সদা । তাহে সুমধুর, মন-মুগ্ধকর, আনন্দ প্রদা। রুনু ধু ধ্বনি, প্রবেশে যখনি- হৃদয়ে, তখনি অকশ করে। প্রাণ গলে যায়, শুনিয়া তাহা, অবশ হৃদয় উথলে ধরে । সুবৰ্ণ ৰূপুর, প্রম সর্গ। চাহিনা কিছুই, * চাহি সুধু ওই চরণকমল, কমলা-নিধি । দিবে যদি দাও, হৃদয় জুড়াও, আশা হে পূরাও, বিধির বিধি ! পা প্লীতবাস, নয়ন বিলাস, হৃদয়ে আশ্বাস প্রদান করে। টানে সদা মন, হেরিতে চরণ, অর্পিতে জীবন, প্রেমের ভরে ক্ষীণ কটিদেশ, সুন্দবিশেষ, কনক কিঙ্কিণী কি শোভাধরে। কমনীয় কান্তি, হৃদয়ের ভ্রান্তি, স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে তামস হরে । হিবা মনােহর, ভক্ত তৃপ্তিকর, ভৃগু পদরেখা বক্ষের মাঝে। ভক্তের অধীন, তিনি চিরদিন, এ কথা কেবল তাহাকে সাজে বনমালা গলে, আলােকে উজলে, কাল রঙ্গে ভাল সৌন্দর্য্য ধরে। কৌস্তুভ মণিতে, ভূষিত বক্ষেতে, । দোলে আনন্দেতে, প্রেমের ভরে। মঙ্গল জ্যোতিতে, তঁার চৌদিকেতে, বিজলী লহরী, রেখেছে ঘেরে। নভে, ভবে কিবা, সদা করে দিবা, ভকত মনেতে আনন্দে হেরে ।

গােবিন্দের রূপ দর্শন ১৭ দয়ার আধার, ভবকর্ণধার, যেরূপে যখন প্রকাশ পায়। তাহা বর্ণিবার, সাধ্য আছে কার, যে হেরে, চরণে মিলায়ে যায় । শ্রীমুখমণ্ডলে, কোটী ইন্দু খেলে, মন প্রাণ গলে হেরে সে ছাঁদ। আর কি নয়ন, ছাড়ে সে বদন, সৰ্ব্বস্ব যে ধন, প্রেমের-দ। অলকা, তিলকা, সুধ মাখা মাখা, নয়ন বঙ্কিম মাঝারে তার। ভাবে ঢল ঢল, নয়ন কমল, হাসি মুমধুর বদনে আর । আজি নিরাকার, ধরিয়া আকার, সাকার মাঝারে শােভিত রয়। জানি কি মনে, এসে এই বনে, রাধে! রাধে! করি ঘােষিছে জয় । ধৰ্ম্ম প্রচারিতে, জীব উদ্ধারিতে, মধুর মূরতি ধরিয়া হরি। বংশী বাজাইয়া, মন আকর্ষিয়া, , আছেন বসিয়া কিশােরী স্মরি । • বলয় শশাভিত,, করে সুললিত, লীলা নীলােৎপল সাদরে ধরে। আপনার মনে, আপনি কেমনে, ঘুরা’ছেন তারে প্রেমের ভরে।

প্রথম সর্গ,।
সৰ্ব্ব ভূমণ্ডল,
করেছেন আলো,
* সৰ্ব্ব হৃদয়ের পরম ধন।
করুণা তঁাহার,
অসীম জপার,
বহিছে অনন্ত সাগর বন ।
মদনমােহম,
রূপেতে এখন,
গােপিকার মন ছুলিষ্ঠে হরি।
নিরুপম শােভ,
সৰ্ব্ব মনপােল,
রহিলেন তথা বিকাশ করি ।
প্রথম সর্গ সমাপ্ত।

দ্বিতীয় সর্গ।
ব্রজাঙ্গনাদের সঙ্গীত।
কোথা নটবর, প্রাণের দোসর, দেখা দিয়ে রাখা প্রাণ।
তােমার কারণ, কাতর জীবন, এ বিপদে কর প্রাণ।
সম্পদ বিপদ, পরম অস্প,ও পদে সমান গণি।
না জানি ধরম, না জানি করম, হে প্রাণ-বিভব-খনি।
মিনতি সতত, করি বিধিমত, সপিনু জীবন পদে।
বড় আশা করি, কহিব কি হরি ? না ফেল কলঙ্ক হ্রদে ।
যথায় রাখিবে, অধম রহিবে, শ্রীপদে হইয়েনত।
নাহি দেখা দিবে, হৃদয় কঁদিবে, রহিবে তােমাতে রত ।
দেখি দেখি করি, রতি পথ ধরি, হেরিতে মােহন বেশ ।
কোথা দিয়ে গেলে, রাখি সবে ফেলে, ৰাহিক দয়ার লেশ
বৃন্দার খেদ ও গােপিকার আত্মসমর্পণ।
জয় জগন্নাথ, করি প্রণিপাত, গ্রহণ করুহে সকে।
আজি কথামত, ব্রজাঙ্গনা যত, শ্রীপদে রাখিতে হবে ।
আশ্রয় বিহীন, অতি দীনহীন, তোমারে লভিতে হল।
পৰি পুত্ৰ মুখ, সংসারের সুখ, ত্যজিল আশার হৃঙ্গ৷
বিষাদ সাগরে, অসার সংসারে, চরণ আশ্রয় দেখে।
সর্ব বিসর্জন, করিল এখন, গােপিকা কলঙ্ক মেখে।
আর কেহ নাই, ত্রিজগত ঠাই, দয়াময় তুমি দেখ।
আত্মজন একে, বৈরী সবে ভবে, তুমি হে চরণে রেখ।

২০
দ্বিতীয় সর্গ।
তোমায় লভিতে, সৰ্বস্ব ত্যজিতে, পরম আনন্দ হয়।
অসহু অসুখ, হয় পূর্ণ সুখ, কি কহিব ইচ্ছাময় ।
এ দেই তােমার, তারে উপহার, তােমারি চরণে দিব।
জগতের পতি, অগতির গতি, কলঙ্ক মাথায় নিব।
এই দুই করে, ধরিব আদরে, চরণ কমল দু’টি।
হৃদয়ে লইব, সাধ মিটাইব, সৰ্বাঙ্গ ভূমেতে লুটি।
নয়নে হেরিব, ও পদ বিভব, আর না হেরিব কোন।
মাথার ভূষণে, বাঁধিব যতনে, তােমার চরণ ধন ।
হৃদয়ে ধরিব, আর না ছাড়িব, চরণে মিশিব তব।
সব ভুলে যাব, ওহে শ্ৰীমাধব, ভব ভয় বৃথা সব।
তােমার হইয়ে, এ বিশ্বে আসিয়ে, কেমনে পরের হই ?
তুমি যে আমার, ভুলি সেই সার, অসারে মজিয়া রই ?
হৃদয় মাঝারে, ধবিলে তােমারে, কলঙ্ক ইহাতে হয়।
পতি পুত্ৰ লয়ে, দাসী সম হয়ে থাকা হে কলঙ্ক নয় ।
ঘাের ব্যবহার, মায়া অন্ধকার, তাতেই বিষাদ এত।
মজিয়া থাকিব, তােমারে ভুলিব, মােহের' বাসনা যত ।
সংসার চিন্তায়, হারালে আত্মায়, তাহে না কেহই দোষে।
যত দোষ হায় ! ও পদ সেবায়, জগৎ তাহাতে রােষে।
নিবিড় নিকুঞ্জে, তােমাকে হে ভুঞ্জে, যত যােগীজন সুখে।
কব কি আর, হ’ল অভিসার, সেই কুঞ্জ সৰ্বমুখে ।
তােমায় ভাবিতে, সকল ভুলিতে, হয় হে জগতপতি।
তাই হ’ল কিনা, অধর্ম কামনা, এমনি লােকের মতি।
নারী বলে তাই, কোন কথা নাই, সকল বচন খাটে।
সহ পুরুষে, পরম পুরুষে, মিলিছে কিছু না বটে

বৃন্দার খেদ ও গােপিকার আত্মসমর্পণ ।
২
যার মনে যাহা, সে কহুক,তাহা,কিছু দোষ না আসে।
তবে দুঃখ হয়, হৃদয়ে উদয়, হরি দূৰে যদি হাসে।
দেখ ব্রজাঙ্গন, কিরূপ কামনা, সদাই হৃদয়ে করে।
দেখ তারা কার, ভবকর্ণধার, কাহারে পতিত্বে বরে !
ছার এ জীবন, কি জন্য ধারণ, বল না কাহারি তরে;
যদি না প্রাণেশ, তোমার উদ্দেশ, নাহিক হৃদয়ে করে ?
বহু পুণ্যফলে, নাথ! ধরাতলে, তােমায় সাকার দেখি।
ও রূপ মাধুরী, সৰ্বমুগ্ধকরী, হৃদয়ে চিরিয়া রাখি।
ধ্যানে জ্ঞানে হায়, ধরা নাহি যায়, যাহার সৌভাগ্য ছবি।
সেই নিরুপম, পুরুষ উত্তম, ব্রজের গৌরব রবি ।
কি আছে আমার, দিব উপহার, সকলি পেয়েছি পদে।
তবু দেহ মন, করি সমর্পণ, মিটাইব আঁজি খেদে ।
এ দশ ইন্দ্রিয়, অতি বড় প্রিয়, তােমার চরণে দিব।
বলি হরি বােল, দিব বক্ষ কোল, চরণ পঙ্কজ নিব।
বাক্যতে মনেতে, দেহেতে জ্ঞানেতে, রেণুতে রেণুতে ধরি।
মিশাইয়া, ওরে! আদিব তােরে, এ দেহে ভালরে করি ।
অাজি নিরাকারে, ভুঞ্জিব সাকারে, মিটায়ে মনের সাধ।
মানস নয়ন, করি দরশন, ঘুচাবে উভয় বাদ।
যা হতে উদয়, আজি তাহে লয়, করিব এ দেহ মন।
কৃতার্থ হইব, স্বরগ ভুঞ্জিব, অবনীতে অনুক্ষণ।
দিয়া দেহ মন, করিব সাধন, যে সাধ মনেতে হয়।
চরণের সুধা, মিটাইয়ে ক্ষুধা, আস্বাদ করিব তায়,
তুমি দয়া করি, লবে করে ধরি, তােমার ক্রোড়েতে তবে।
পার্থিব ভুলিয়ে, জ্ঞানে লীন হয়ে, আলিঙ্গিক সুথে সবে।
,

২২
দ্বিতীয় সর্গ।
তুমি, আমি জ্ঞান, আত্মা অভিযান, আর না কিছুই রবে।
আকারে আকারে, জ্ঞানে একাকারে, অনন্ত মিলন হবে ।
তাব্ৰহ্ম রূপে, ঘাের মেহকুপে, আছে যে অধম হরি।
করিবে প্রচার, দয়া সে তােমার, বিশ্বচরাচর ভরি।
নাম তব লয়ে, ঘোষিবে নির্ভয়ে, জগত আনন্দে মাতি।
কিবা রবি শশী, তারকা রূপসী, গাইবে দিবস রাতি।
এই দেখ হরি, তব নাম করি, এ দেহ দিলাম তােরে।
ইচ্ছা হয় নাও, কিম্বা ফেলি দাও, শ্মশানে মশানে এরে।
আসুক দুর্গতি, যথা তব মতি, কাদিব ও নাম ধরি।
হরি দয়াময়, বিপন্ন আশ্রয়, তব নামে যাব তরি।
নামের গুণেতে, অভাগী এ মতে, পাইবে বিপদে ত্রাণ।
অনাথা তারণ, পতিত পাবন, চরণে লইবে স্থান।
অপরাধ কত, করি শত শত, সে সব গণিলে তুমি।
থাকে অামার স্থান রহিবার, জগৎ তােমার ভূমি।
দোষ পদে পদে, করিহে শ্রীপদে, ঘৃণিত অধম হয়ে।
তাহা যদি ধর, ভস্মীভূত কর, এ ছার হৃদয়-ল’য়ে।
সৃজেছ হে তুমি, রক্ষিবে হে তুমি, তােমার ধরম মানি।
কুকৰ্ম্ম সুকৰ্ম্ম, ওহে ধৰ্ম্মাধর্ম, তােমা বই নাহি জানি।
তুমি যাহা কর, ওহে বংশীধর, সেই ত ধরমময়।
তুমি হে রক্ষিলে, অনন্ত অখিলে, ধরম রক্ষিত হয় ।
আজি দীননাথ, করি প্রণিপাত, কৃপা কর অধমের।
দুস্তর সাগর, তুমি পার কর, পদতরি দিয়া মোরে ।
দ্বিতীয় সর্গ সমাপ্ত।

তৃতীয় সর্গ।।
গােপীরা বংশী শ্রবণে
বুঝিয়া হৃদয় জাশ,
গােপীকার সহৰা,
আজি ইচ্ছাময়-ইচ্ছা করি।
অপূৰ্ব্ব বাঁশরী রবে, হৃদয় আকৰ্ষি সরে,
রহিলেন আনন্দে শ্রীহরি।
হৃদয়ে পশিল বেণু,
হ’ল মুগ্ধ মন ত,
আত্মহারা গোপিকা হইল।
গােকুলে যে যথা রও,
কৃষ্ণদাস দাসী হও,
এই রর হৃদয় ভেদিল।
সঘন বেনুর নাদে,
নাচিয়া পরমাকে,
ধন জন ত্যজি লাজ ভয়।
ত্বরায় চলিল তথা,
বাজিছে মুরলী যথা,
করিয়ে ধ্বনিতে বিশ্ব জয় ।
জয় রাধে শ্রীরাধে বলি, মুরলী সঙ্গীত তুলি,
প্রেমে হরি নাচিতে লাগিল।
আপনি মত্ত যে রব,
উন্মত্ত করিল সবে,
তাঁর নৃত্যে সকলে নাচিল ।
রাধা বই নাহি আর, ব্রিকোটী বিশ্বমাঝার,
তাই রাধা বলে মাের বাঁশী।
কেমনে তােমারে পাব, তব ঋণ শােধ দিব,
প্রাণ আছে তব পথ আশি।

২৪ তৃতীয় সর্গ। ৫ বেণু রবে জ্ঞানহারা, ও কৃষ্ণ হৃদে হেরে তারা, * কৃষ্ণ বলি চলিল উল্লাসে। যৈ কাৰ্য্য করিতেছিল, বংশী রবে বিস্মরিল, ছুটিল সব হরিপদ আশে । আছে চৈতন্য কার, ত্যজিল স্বর্ণ সংসার, বারেক না ভাবিয়া তাহায়। এমনি একাগ্র মন, তিলমাত্র বিলম্বন, না সহিল যাইতে তথায় ॥ কোন পথে কোথা যায়, কিছু নাহি জানে তায়, তবু যায় নিরাতঙ্ক চিতে। বিপদ ভঞ্জন হরি, তারে সবে দয়া করি, হাতে ধরি থাকেন রিক্ষিতে। তিনি না দেখালে পথ, কে পায় তাহার পথ, ধন্য গােপী ধরেছ জীবন! সুখে হরি ধরি বুকে, চল তুমি স্বর্গ সুখে, তােরে হরি করিছে রক্ষণ । ওই শুন বাজে বাঁশী, কোথা কৃষ্ণ অভিলাষি। দেখা দিয়ে রাখ ওহে প্রাণ। ওই শুন রাধে বলি, আনন্দে পড়িছে গলি, যেই হরি করে সর্ব ত্রাণ । কৃষ্ণ অভিলাষী যারা, কেমনে রহিবে তারা, আজি হরি ডাকিছে যখন। এই হেতু যেথা যত, ছিল কৃষ্ণ অনুগত, শুনি বংশ ধাবিল তখন।

৪৯
বৃন্দার গোবিন্দ আনয়ন।
-1
দেখিতে তেমন,
হবে কখন,
ধরাধামে আর বিনা কৃষ্ণধন।
এ হেন বনেতে জগত ঈশ্বরী,
সৰ্ব্ব সুখকর শ্রীনাথেকে স্মরি,
চরণ পঙ্কজে,
নয়ন কাজে,
প্রদানি প্রেমেতে হন মুগ্ধকরী।
পূজেন শ্রীপদ লইয়া কিশােরী।
বৃন্দার গোবিন্দ আনয়ন,
আজিগগা কিশােরী ধরেছি হরি,
জুড়ায়ে জীবন,
জুড়ায়ে নয়ন,
জগই কারণ, হৃদয় রঞ্জন,
চরণ কমলে,
নয়ন সলিলে,
মন সাধে সখি পিঞ্চেছি বারি ।
বুঝিতাম নাহি কেমন শ্যাম,
কেন সে ত্রিভঙ্গ বঙ্কিম বাম,
কেমন মুরারি
শিখি পাখাধারী,
কেন বা কিশােরী পুজে সদা হরি, ••
জাগ্রতে নিদ্রাতে লইয়ে শ্যাম ॥
কেন বা চরণে নুপুর বাজে,
জগতের হরি কেম বা সাজে,

নিকুঞ্জলীলা। কিশােরী কারণ, । হরি যে এমন, ভকত অধীন ভাবিনি কখন, যে ভাবে যেমনে, তাহার হেমনে, ভকত অধীন, মনে বিরাজে। . বঙ্কিম নয়ন, করুণা নিধান, বিপদে কাণ্ডারি দয়াল হরি, প্রণাধিক প্রিয়, পরম আত্মীয়, দীন দয়াময় ভব কাণ্ডারি বিশ্বের বিধাতা, ভীবনের পাতা, তবু প্রেমে বাধা প্রেম ভিখারি। i ܪ খাইছে আনন্দে, পেয়ে গােবিন্দে। নিকুঞ্জ হইতে উঠিছে রোল, বাজিছে মৃদঙ্গ বাজিছে ঢােল। বীণার ঝঙ্কার, পাছু করি তার, সুন্দরী সুরেতে কাঁপিছে স্থল। হরির কীৰ্ত্তনে, বিজন বিপিনে, বরগ সমান উঠিছে রােল। বৃন্দা। উঠগো কিশােরি আপিছে শ্রীহরি, চরণ নূপুর, বাজিছে মধুর, বাজিছে বাঁশরী রাধিকা করি। *

বৃন্দা।
৫১
ওনি বংশীধ্বনি বিহগর কুল,
• মধুর ঝঙ্কারে করিল আকুল, •
নিকুঞ্জ-পূরিল,
অলি গুঞ্জরিল,
কদম্বেরি মূলে ময়ুরী নাচিল,
শ্যামল ধবল আনন্দে ধাবিল,
ধাবিল যতেক গোপিনীর ফুল।
কুসুম আসনে, কুসুম ভূষণে,
রাই কমলিনী রয়েছে শয়নে,
স্থির সৌদামিনী,
চম্পক বরণ,
জগত মােহিনী, পরম পানী,
নিষ্পন্দ শরীরে হৃদয় রতন্তে,
ভাবিছে একান্তে মানস নয়নে।
ধুইছে চরণ নয়ন সলিলে,
পূজিছে প্রেমের কুসুমে বিলে,
মানস নননে,
মদনমোহনে,
হৃদয় আসনে, বায়ে যতনে,
অতুল আননাে রয়েছে বিশ্বলে,
নাচিছেরি মানস কমলে।
সখীরা আনন্দে প্রভাতি গাইছে,
কোকিলা ঝঙ্কারি পঞ্চমে মাতিছে,
পিকের কুজন,
অলির গুঞ্জন,
মঞ্জীর নিক্কণ, সঙ্গীত বাদন,

নিকুঞ্জলীলা।
তরঙ্গে তরঙ্গ উথলি উঠিছে,
সুনামী সুন্দর তালেতে নাচিছে ।।
.
৫
কিবা অনুপম মধুর মাধুরী,
কিবা সুখপূর্ণ আনন্দ লহরি,
অতুল সুন্দরী,
রাধা সহচরী,
সখী সবে ঘেরি, নাচিছে আমরি,
যেমতি চপলা, করিতেছে খেলা,
শারদ চমা চৌদিকেতে' ঘের ।
ই
এ হেন সময়ে মুরলী বাজিল,
শামসহচরী সুখেতে নাচিল,
ময়ুর ময়ুরী,
উচ্চরব করি,
সহকার হতে হরি ডাকিল,
কোকিল কুজনে বিজন পূরিল।
C.
বৃন্দ। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি।
কেন হেন সাধ, এ বিষম বাদ, কহতকহত নি!
কার অনুরােধে, ফেলিয়া প্রমাদে, ফির বনে গুণমণি।
কার অনুরােধে, কহত শ্রীরাধে, রাখিবে জীবন ধরি।
কে আছে রাধরি, কে আছে আমরি, কে ভব দুঃখের করি ।
দীনহীন জনে, অপরাধিগণে, কে ত্রাণ করিতে ফিরে ?
ভবের কাণ্ডারি, বলি তুমি ইরি, কলঙ্ক ল’য়েছি শিরে॥

শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দার প্রতি।
ত্যজেছি সকলে, আত্মীয়-স্বদলে তােমারি চরণ স্মরি।
একুল ওকুল, ঘুচিল দুকুল, অকূলে ভাসিল তরি।
তার নিজ গুণে, হীন অভাজনে, চরণে জীবন আছে।
তব অনুরােধে, নাহি কিছু বাধে, ভবভয় পড়ে পাছে ।
তব প্রেমে গনি, ঘুচেছে সকলি, নাম মাত্র সব আছে।
তুমি দুঃখবারি, তুমি তাপহারি, রাখহে চরণ কাছে।
কত কথা বলে, আত্মীয় স্বদলে, সহি সব পদ স্মরি।
প্রেমবিন্দু দাও, কলঙ্ক ঘুচাও, সুপথ দেখাও হরি।
অভাব তােমার যেন হে রাধার, জীবনে নাহিক হয়।
শেষ দিন যেন, ওই চরণ, পরশে পায় সে লয়।
শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দার প্রতি।
কেন ভাব অকারণ?
হৃদয় যেমন, করে আকিঞ্চন, তেমতি মিলিবে ধন।
মন যারে কয়, বুঝা কষ্ট নয়, মুকুর স্বরূপ যেন।
যে দিকে রাখিবে, সে ছায়া পাইবে, হৃদয়ে এ কথা মেন ।
সুখের আশায়, যার প্রাণ ধায়, ঐহিক সুখেতে মজে।
হয় পুণ্যজন, সে যদি কথন, জগপতি পদ ভজে।
পেয়েছ জীবন, স্বাধীন যেমন, সুজন পথেতে রও।
বিহগের সাথে, ভজ প্রাণনাথে, সুখ দুঃখ সম সও।
ছাড় প্রিয় যত, অনিত্য সতত, সে সুখেতে কিবা ফল।
পদ্মপত্র জল, সতত চঞ্চল, করে সদা টলমল।
হরিনাম করে, বুঝিবে অন্তরে, কি সুধা ইহাতে আছে।
সহস্র নয়নে, দেখিবে কেমনে, নব শোভা ধরিয়াছে ।

নিকুঞ্জলীলা।
শুষ্ক তরুচয়, মঞ্জরিত হয় ফুলে ফুলে শোভা পায় ।
হৃদয় কানন, হঃ তপোবন, তমসে অলোক ছায়।
বৃন্দা ও শ্রীরাধা।
কি ভাবিছ গাে কিশোরি ?
দেখ না। নিরথি, নিকুঞ্জের পাখি,
নীরদ বরণ শ্যামৰ্চাদে দেখি,
হাসি হাসি বলে, বংশীধারী এলে,
বল না কি বলে বাঁশরী বাজালে,
হৃদয় আময় অমৃতে ভাসালে,
করলে স্বরগ পুরি।
= .
*
-
ওরে ফুলকুল, কেনরে আকুল,
কিসের আনন্দ সৌরভে ব্যাকুল,
কেন নড়ে নড়ে,
বলিছ নিঃসাড়ে,
দেখিতে দিবে না হরি !
রাখ না কেমনে ?
রাখিবে বিজনে,
লুকায়ে মাধবে, দেখি ভক্ত তবে,
৩. হরির চরণে,
রাধা যতনে,
বেঁধেছে নুপুর, ধরি।
বনফুল হার, বনে কিবা আর,
দু:খিনী রাধা শ্যামে দিবে তার,

বৃন্দ। ও শ্রীরাধা।
মনুসূদনে,
অর্পিবে যতনে,
মধুসূদনে,
ভকতি চন্দন মাখি।
কহ দালতা,
তব মন কথা
শীহরি দেখিয়ে হাসিছ কি হেথা,
দিয়া ভুজপতা,
বঁধ হরি হেথ,
যাইতে দিও না সখি ।
বনের বিহগ বস বল শুনি,
কাহার সঙ্গীতে মাতা ও মেদিনী,
কে শুনিবে বুল,
মধুর কল্লোল,
কাহার প্রেমেতে হয়েছ আকুল,
গিয়া সিন্ধুপারে,
কভু গিরি’পরে,
কার গুণকথা শুনাও কাহারে ?
আজি দলে দলে, রয়েছ কি বলে,
হরি পাইয়া গেছ বুঝি গলে ?
তাই সুমধুর,
সঙ্গীতে সুন্দর,
হরির কীৰ্ত্তনে হয়েছ অধীর।
প্রাণ ভাসাইছ সে নামে মধুর ॥
পঞ্চম সর্গ সমাপ্ত।

যষ্ঠ সর্গ।
বৃন্দ।।
চেয়ে দেখ, বিনােদিনি !
যে হৃদকমলে,
নাচে হেলে দুলে,
যার প্রেমে গলে, ভাস নেত্রজলে,
এই সে মুরারি, বাকা বংশীধারী,
চেয়ে দেখ চাননি !!
19am
নবীন নীরদ, কেন সাধ বাদ, দেখাতে গােলক হরি।
তাের আবরণে, নীরদ বরণে, রাখেরে গােপন করি।
সাধে কেঁদে কেঁদে, রাই চোক মুদে, হেরিছে হৃদয় শ্যামে!
(ওগাে) মুখ তুলে রাই,দেখ গো কানাই,রেখেছে তােমারে বামে।
চরণ নূপুর, শ্রবণ মধুর, ডাকিছে কিশােরি, শুন।
অন্তরে বাহিরে, দেখ প্রেমভরে, জগপতি শ্রীচরণ।
শ্রীরাধা।
:
আজি এলে বংশীধারী,
বিপিনবিহারী, ভবের কাণ্ডারী, বিতরিতে শান্তি বারি।
তব পদ চেয়ে, কলঙ্কিনী হয়ে, আছি বনে বনমালী।
যদি ঘৃণা কর, করুণা না কর, মরণে ঘুচাব কালি।

.
শ্রীকৃষ্ণ।
কি তুমি নিঠুর, তাই সুরাসুর, তোমারে বুঝিতে নারে।
আমার এআশা, যেন মৃগতৃষা, এ জীবননাশিবারে।
হৃদয় বেদনা কি তুমি জান না, অন্তর্যামী তুমি হরি।
সংসার বিলাসে, বৃথা সুখ আশে, পাছে মঞ্জি ভয় করি।
দেহ হৃদে পদ, ঘুচাও বিপদ, বিপদে বিপদ হারী
অন্তরে বাহিরে, সংসার সাগর, ভরসা চরণ-তরী
অধম তারণ, দিয়া দরশন, ঘুচাও যান। মম।
এ ভব কানন, কুসুম রতন, সব তব প্রতারণ।
ফুলে মধু ঝরে, বাস বিতরে, হৃদয় আকৃষ্ট করে।
কিন্তু কতক্ষণ, সে শােভা এমন কিছু নহে,ক্ষণপরে ।
তাই দয়াময়, ও পদ অক্ষয়, অমারি সহায় হয়।
শোক তাপে মন, হেৰি অলক্ষণ, স্মরণে লতে হে জয়।
শ্রীকৃষ্ণ।
কি জন্য কিশােরী মলিনা রও?
তোমারি অন্তরে,
অবিরাম ভরে,
আছি বিদ্যমান, তবু ম্রিয়মান,
কি জন্ত-কিশােরি প্রকাশ কও?
তােমার কঠোর সাধনে দেখ!
এই শিখিপাখা,
তব নাম লেখ',
ধরেছি শীরষে, পরম হরষে,,
ধরেছি বাঁশরী স্বহস্তে দেখ।

নিকুঞ্জলীলা।
এই দেখ তববনমা গলে,
রাধা রাধা বগি হৃদি’পরে দোলে,
পীতাম্বর ধড়া,
এ মােহ চুড়া,
শ্যামলী ধবলী নহে কাছ ছাড়া।
বরের বলয়,
দেখ মণিময়,
পায়েছ যা রয়েছে নো পরা
।
ওগাে সেই দিন,
নহে বহুদিন,
তজে এই বঁাশী, ধরায়েছ অদি,
নরশিমালা,
তাজি বনমালা,
পরেছি কিশােরী সাধনে তােমারি
কিবা আছে সাধ পূরাত তােমারি।
কোনরূপ ধরি পূরাব কামনা,
আছে কি মনেতে শ্রীরাধা বলনা?
গিরি করে ধরি,
গগাবর্দ্ধন ধারী,
মনে কি মানিবে আমি তব হরি,
তােমারি প্রেমেতে সতত শিহরি।
দেখ চেয়ে দেখ নিমেলি নয়ন,
পরম আনন্দ পূরিত ভুবন,
সব সুশোভন,
সুখে বিমােহন,
আনন্দ দেবের আনন্দ কীৰ্ত্তন,
এক মনে তারে করিছে পূজন।

শ্রীকৃষ্ণ
০
অন্তরে যেমন শ্রীহরি রয়েছে,
তেমতি বাহিরে, ললিত আকারে,
অপরূপ রূপ মাধুরী খেলিছে।
জগপতিরূ,
সম্ভব কিরূপ,
ভকত কল্পিত প্রকাশ সেরূপ,
কভুবা দ্বিভুজ,
কভু চতুভুজ,
কভু ষড়ভুজ আনন্দ স্বরূপ।
মানস জ্ঞানের অন্তরে জাগিছে
ভত মানস নয়নে হেরিছে
যারে ধ্যানে জ্ঞানে, কেহ নাহি জানে,
সে অখিল দেবে প্রেমেতে সেবিছে,
প্রণয় পুলকে চরণ ধরিছে ।
শ্রীকৃষ্ণ।
সরোজ-প্রতিমা, সুষমা সরমা, সুশীলা, বিমলা, কেন ?
বিষাদে মগন হইয়া এখন, বিবশ হয়েছ হেন?
তুমি যে আমার, তাহা কি আবার, কথায় কহিব হায়!
অনন্তরূপিণী, ওগো সনাতনী, বিশ্ব যে তােমার কায়?
তােমার প্রেমেতে অস্থির সভতে, মনেতে হইয়া রই!
হৃদয় মাঝার, আছে কে আবার, তােমার প্রতিমা বই?
কে পূজে এমতে, কায়মন চিতে, কহ কমলিনী শুনি।
কার নয়নেতে, বারিধি এমতে, ঝরে গাে ও বিনােদিনী ?
কে হৃদি মন্দিরে, স্থাপিয়া কাতরে, এমুন অর্চনা করে ?
ভকতি-প্রসূন, আনন্দে এমন কে কর কমলে ধরে?

নিকুঞ্জলীলা।
কে পড়ে লুটায়ে, বিহ্বল হইয়ে আমার নামেতে হায়।
অন্তরে অন্তরে,কে ডাকে আমারে, কে করে শীতল কায়?
কার প্রেম হেন, বহিয়া 'উজান, আমার হৃদয়ে আসে।
কার প্রেম হায় । মাের প্রাণে ধায়, বিল তরঙ্গে ভেসে।
কেবল সত্যুতে, অস্থির করিতে, চিন্তার তড়িৎ ধরে ?
কাপায়ে হৃদয়,ব্যাপি দেহময়, এমতি অসাড় করে ?
স্নায়ুতে স্নায়ুতে, তড়িৎ গতিতে, রেণুতে রেণুতে যায়।
ভাবের আগারে, প্রণয় আকারে, পরাণ ভুলায়ে নয়।
আমি যে আমার, নাহি থাকি আর, তোমার করিয়ে লও।
আমার যে সব, হৃদয় বৈভব, সখিরে ভুলায়ে দাও।
আপনে আপনি হেরিগো যখনি, হেরি ও বদনখানি।
নয়ন মুদিয়ে, হৃদয়ে ধরিয়ে, গলিরে সােহাগ মণি!
সব সমৰ্পণ করিয়া কেমন, ভাসিছ পরম সুখে !
দহ প্রাণ মন, ত্যজি সৰ্বধন, ধরেছ আমারে বুকে।
আমা ছাড়া আর কিছু না তােমার, আমিই তুমিগাে হই।
জীব শিব ভেদ, জগতে প্রভেদ, অভেদ অরে রই।
তােমা ছাড়া হয়ে, রহিব কি প্রিয়ে, বায়ু যে বঁধিয়া রাখে।
মনের তরঙ্গ, করি সদা রঙ্গ, দুকূলে বহিতে থাকে।
আমার মনেতে, তােমার প্রাণেতে, মরুতে বাঁধা যে আছে।
তুমি ভাব যাই, আমি ভাবি তাই, এমতি রহি গাে কাছে ।
দেখা নাহি হ'লে, অন্তর শিকলে, হৃদয় করে টান।
তিষ্ঠান, না যায়, ফেল হেন দায়, অস্থির করিয়া প্রাণ।
আলােক কিরণে, রশ্মি হেন হানে, তােমায় আমায় বাঁধে।
ভুবনমােহিনী; রাই কমলিনি, দেখাও সুঠাম ছাদে

৪৯.
বৃন্দার গােবিন্দ আনয়ন।
দেখিতে তেমন,
ধরাধামে আর বিনা কৃষ্ণধন।
না হবে কখন,
এ হেন বনেতে জগত ঈশ্বরী,
সর্গ সুখকর শ্রীনাথেকে স্মরি,
চরণ পঙ্কজে,
নয়ন অম্বুজে,
প্রদানি প্রেমেতে হন মুগ্ধকরী।
পূজেন শ্রীপদ লইয়া কিশােরী।
বৃন্দার গোবিন্দ আনয়ন।
আজিগাে কিশােরী ধরেছি হরি,
জুড়ায়ে জীবন,
জুড়ায়ে নয়ন,
জগত কারণ, হৃদয় রঞ্জন,
চরণ কমলে,
নয়ন সলিলে,
মন সাধে সখি মিঞ্চেছি বারি ।
কেমন মুরারি,
বুঝিতাম নাহি কেমন শ্যাম,
কেন সে ত্রিভঙ্গ বঙ্কিম বাম,
শিখি পাখাধারী,
কেন বা কিশােরী পূজে সদা হরি,
জাগ্রতে নিদ্রাতে লইয়ে শ্যাম
ফেন বা চরণে নূপুর বা,ে
জগতের হরি কেন বা সাজে,

নিকুঞ্জলীল। { কিশােরী কারণ, হরি যে এমন, ভকত অধীন ভাবিনি কখন, যে ভাবে যেমন, তাহার তেমনে, ভকত অধীন, মনে বিরাজে। : করুণা নিধান, ৩ বঙ্কিম নয়ন, বিপদে কাণ্ডারি দয়াল হরি, প্রাণাধিক প্রিয়, পরম আত্মীয়, দীন দয়াময় ভব কাণ্ডারি ? বিশ্বের বিধাতা, জীশনের পাতা, তবু প্রেমে বাধা প্রেম ভিখারি। . যাইছে আনন্দে, পেয়ে শ্রীগােবিন্দে । নিকুঞ্জ হইতে উঠিছে রোল, বাজিছে মৃদঙ্গ বাজিছে টেলি। বীণার ঝঙ্কার, পাছু কখি তার, সুন্দরী সুরেতে কঁপিছে স্থল। হরির কীৰ্ত্তনে, বিজন বিপিনে, স্বরগ সমান উঠিছে রেল। বৃন্দা। উঠগো কিশােরি জার্সিছে হরি, চরণ নুপুর, বাজিছে বাঁশরী রাধিকা করি। বাজিছে মধুর,

বৃন্দ।
শুনি বংশীধ্বনি বিগের কুল,
• মধুর ঝঙ্কারে করিল অকুল,
নিকুঞ্জ পূরিল,
অলি গুঞ্জরিল,
কদম্বেরি মূলে ময়ুরী নাচিল,
শ্যামলি ধবল আনন্দে ধাবিল,
ধাবিল যতক গােপিনীর কুল।
কুসুম অসনে, কুসুম ভূষণে,
রাই কমলিনী রয়েছে শয়নে,
স্থির সৌদামিনী,
চম্পক বরণী,
জগত মােহিনী, পরম পাবনী,
নিষ্পল শরীরে হৃদয় রতনে,
ভাবিছে একান্তে মানস নয়নে।
ধুইছে চরণ নয়ন সলিলে,
পূজিছে প্রেমের কুসুমে বিরলে,
মানস নয়নে,
মদনমোহনে,
হৃদয় আসনে, বসায়ে যতনে,
অতুল আনন্দে রয়েছে বিহ্বলে,
নাচিছে মুরারি মানস কমলে।
সখীরা আনন্দে প্রতি গাইছে,
কোকিল ঝঙ্কারি পঞ্চমে মাতিছে,
পিকের কুজন,
অলির গুন,
মঞ্জীর নিক্কণ, সঙ্গীত বাদন,

নিকুঞ্জলীলা
কি কও ।
তরঙ্গে তরঙ্গ উথলি উঠিছে,
সুন্দরী সুন্দর তালেতে নাচিছে।
:
-
কিবা অনুপম মধুর মধুরী,
কিবা সুখপূর্ণ আনন্দ লহরি,
অতুল সুন্দরী,
৭ রাধা সহচরী,
সখী সবে ঘেরি, নাচিছে আমরি,
যেমতি চপল, করিতেছে খেলা,
শারদ চন্দ্রমা চৌদিকেতে ঘের ।
এ হেন সময়ে মুরলী বাজিল,
শামসহচরী সুখেতে নাচিল,
ময়ুর ময়ুরী, ,
সহকার হতে শ্রীহরি ডাকিল,
কোকিল কুজনে বিজন পূরিল।
উচ্চরব করি,
* *
বৃন্দা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি।
কেন হেন সাধ, এ বিষম বাদ, কহত কহত শুনি।
কার অনুরােধে, ফেলিয়া প্রমাদে, ফির বনে গুণমণি।
কার অনুরােধে, কহত শ্রীরাধে, রাখিবে জীবন ধরি।
কে আছে রাধারি, কে আছে আমারি, কে ভব দুঃখের তরি
দীনহীন জনে, অপরাধিগণে, কে ত্রাণ করিতে ফিরে ?
ভবের কাণ্ডারি, বলি তুমি হরি, কলঙ্ক ল’য়েছি শিরে।

শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দা প্রতি।
ত্যজেছি সকলে, আত্মীয় স্বলে, তোমারি চরণ স্মরিন
একুল ওকুল, ঘুচিল দুকুল, অকুলে ভাসিল তরি.
তার নিজ গুণে, হীন অভাজনে, চরণে জীবন আছে।
তব অনুরােধে, নাহি কিছু বাধে, ভবভয় পড়ে পাছে ।
তব প্রেমে গলি, ঘুচেছে সকলি, নাম মাত্র সব আছে।
তুমি দুঃখবারি, তুমি তাপহারি, রাখহে চরণ কাছে।
কত কথা বলে, আত্মীয় স্বদলে, সহি সব পদ স্মরি।
প্রেমবিন্দু দাও, কলঙ্ক ঘুচাও, সুপথ দেখাও হরি
অভাব তোমার যেন হে রাধার, জীবনে নাহিক হয়।
শেষ দিন যেন, ওই চরণ, পরশে পায় সে লয়।
.
শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দার প্রতি।
কেন ভাব অকারণ ও
হৃদয় যেমন, করে অকিঞ্চন, তেমতি মিলিবে ধন্য।
মন যারে কয়, বুঝা কষ্ট নয়, মুকুর স্বরূপ যেন।
যে দিকে রাখিবে, সে ছায়া পাইবে, হৃদয়ে এ কথা মেন ।
সুখের আশায়, যার প্রাণ ধায়, ঐহিক সুখেতে মজে।
হয় পুণ্যজন, সে যদি কখন, জগপতি পদ ভজে।
পেয়েছ জীবন, স্বাধীন যেমন, সুজন পথেতে রও। •
বিহগের সাথে, ভজ প্রাণনাপে, সুখ দুঃখ সমসও।
ছাড় প্রিয় যত, অনিত্য সতত, সে সুখেতে কিবা ফল।
পদ্মপত্র জল, সতত চঞ্চল, করে সদা টলমল।
হরিনাম করে, বুঝিবে অন্তরে, কি সুধা ইহাতে আছে।
সহস্র নয়নে, দেখিবে কেমনে, নব শোভা ধরিয়াছে।

৫৪
নিকুঞ্জলীলা।
শুষ্ক তরুচয়, মঞ্জরিত হয়, ফুলে ফুলে শোভা পায় ।
হৃদয় কানন, হয় তপােবন, তমসে আলােক ছয় ॥
বৃন্দা ও শ্রী রাধা। এ
কি ভাবিছ গো কিশােরি ।
দেখ না নিরখি,
নিকুঞ্জের পাখি,
নীরদ বরণ শ্যামৰ্চাদে দেখি,
হাসি হাসি বলে,
বংশীধারী এলে,
বল নাকি বলে বঁশরী বাজালে,
হৃদয় অমিয় অমৃতে ভাসালে,
করিলে স্বরগ পুরি ! "
ওরে ফুলকুল, কেনরে অকুল,
কিসের আনন্দ সৌরভে ব্যাকুল,
কেন নড়ে নড়ে,,
বলিছ নিঃসাড়ে,
দেখিতে দিবে না হরি !
রাখ না কেমনে ?
রাখিবে বিজনে,
লুকায়ে মাধবে, দেখি ভক্ত তবে,
হরি চরণে,
শ্রীরাধা যতনে,
বেঁধেছে নূপুর, ধরি।
বনফুল হার, বনে কিবা আর,
দুঃখিনী রাধা শ্যামে দিবে তার,

৫৫
বৃন্দা ও রাধা ।
অর্পিবে যতনে,
শ্রীমধুসূদনে,
ভকতি চন্দন মাখি।
কহ বনলতা,
তব মন কথা,
শ্রীহরি দেখিয়ে হাসিছ কি হেথা,
দিয়া ভুজলতা,
বাঁধ হরি হেথা,
যাইতে দিও না সখি ॥
বনের বিহগ বল বল শুনি;
কাহার সঙ্গীতে মাতাও মেদিনী,
কে শুনিবে বল,
• মধুর কল্লোল,
কাহার প্রেমেতে হয়েছ আকুল,
গিয়া সিন্ধুপারে।
কভু গিরি’পরে,
কার গুণ কথা শুনাও কাহারে ?
তাই সুমধুর,
আঙ্গি দলে দলে, রয়েছ কি বলে,
হরি পাইয়া গেছু বুঝি গলে
সঙ্গীতে সুন্দর,
হরির কীৰ্ত্তনে হয়েছ অধীর।
প্রাণ ভাসাইছ সে নামে মধুর ॥
পঞ্চম সর্গ সমাপ্ত।

ষষ্ঠ সর্গ।
বৃন্দ।।
৫
চেয়ে দেখ, বিনােদিনি।
যে হৃদ কমলে,
নাচে হেলে দুলে,
যার প্রেমে গলে, ভাস নেত্ৰজলে,
এই সে মুরারি,
বাকাবংশীধারী,
চেয়ে দেখ চাননি।
নবীন নীরদ, কেন সাধ বাদ, দেখতে গোলক হরি।
তাের আবরণে, নীরদ বরণে, রাখেরে গােপন করি।
সাধে কেঁদে কেঁদে, রাই চোক মুদে, হেরিছে হৃদয় শ্যামে!
(ওগো) মুখ তুলে রাই,দেখ গো কানাই,রেখেছে তোমারে বামে।
চরণ নূপুর, শ্রবণ মধুর, ডাকিছে কিশােরি শুন।
অন্তরে বাহিরে, দেখ প্রেমভরে, জগপতি শ্রীচরণ ॥
শ্রীরাধা।
আজি এলে বংশীধারী,
বিপিনবিহারী, ভবের কাণ্ডারী, বিতরিতে শান্তি বারি।
ওব পদ চেয়ে, কলঙ্কিনী হয়ে, আছি বনে বনমালী।
যদি ঘৃণা কর, করুণা না কর, মরণে ঘুচাব কালি।

৫৭
শ্ৰীকৃষ্ণ।
কি তুমি নিঠুর, তাই সুরাসুর, তােমারে বুঝিতে নারে।
আমার এ আশা, যেন মৃগতৃষা, এ জীবন নাশিবারে ॥
হৃদয় বেদনাকি তুমি জান না, অন্তর্যামী তুমি হরি ।
সংসার বিলাসে, বৃথা সুখ আশে, পাছে মঞ্জি ভয় করি ।
দেহ হৃদে পদ, ঘুচাও বিপদ, বিপদে বিপদ হার্জী।
অন্তরে বাহিরে, সংসা সাগরে, ভরসা চরণ-তরী #
অধম তরণ, দিয়া দরশন, ঘুচাও যামা মম।
এ ভব কানন, কুসুম রতন, সব তব প্রতারণ।
ফুলে মধু ঝরে, সুবাস বিতরে, হৃদয় আকৃষ্ট করে।
কিন্তু কতক্ষণ, সে শোভা এমন, কিছু নহেক্ষণপরে ।
তাই দয়াময়, ও পদ অক্ষয়, আমারি সহায় হয়।
শোক তাপে মন, হেরি অলক্ষণ, স্মরণে লতে হে জয়।
শ্রীকৃষ্ণ।
কি জন্য কিশোরী মলিনা রও?
তোমারি অন্তরে,
অবিরাম ভরে,
আছি বিদ্যমান, তবু ম্রিয়মান,
কি জন্য কিশোরি প্রকাশি কও?
তােমার কঠোর সাধনে দেখ।
এই শিখিপাখা,
তব নাম লেখা,
ধরেছি শীরষে, পরম হরষে,
ধরেছি বাঁশরী স্বহস্তে দেখ ।

( নিকুঞ্জলীল।
এই দেখ তব বনমালা গলে,
রাধা রাধ্য বলি হৃদি’পরে দোলে,
পীতাম্বর ধড়া,
এ মোহন চূড়া,
শ্যামলী ধবলী নহে কাছ ছাড়া।
করে বলয়,
দেখ মণিময়,
পরায়েছ যাহা রয়েছে গো পরা ।
ওগো সেই দিন,
নহে বহুদিন,
ত্যজে এই বশী, ধরায়েছ অসি,
নরশিরমালা,
কজি বনমালা,
পরেছি কিশােরী সাধনে তােমারি
কিবা আছে সাধ পূরাতে তােমারি ।
কোনরূপ ধরি পূরাব কামনা,
আছে কি মনেতে শ্রীরাধা বলনা?
গিরি করে ধরি,
গােবর্ধন ধারী,
মনে কি মানিবে আমি তব হরি,
তােমারি প্রেমেতে সতত শিহরি।
দেখ চেয়ে দেখ নিমেলি নয়ন,
পরম আনন্দ পূরিত ভুবন,
* সব সুশোভন,
সুখে বিমােহন,
আনন্দ দেবের আনন্দ কীৰ্ত্তন,
এক মনে তঁারে করিছে পূজন।

শ্রীকৃষ্ণ
অন্তরে যেমন শ্রীহরি রয়েছে,
তেলতি বাহিরে, ললিত আকারে,
পরূপ রূপ মাধুরী খেলিছে।
জগপতিরূপ,
সম্ভব কিরূপ,
ভকত কল্পিত প্রকাশ সেরূপ,
কভুব। দ্বিভুজ, ও
কভু চতুর্ভুজ,
কভু ষড়ভুজ আনন্দ স্বরূপ।
মানস জ্ঞানের অন্তরে জাগিছে
ভকন্তু মানস নয়নে হেরিছে
যারে ধ্যানে জ্ঞানে, কেহ নাহি জানে,
সে অখিল দেবে প্রেমেতে সেবিছে,
প্রণয় পুলক্লে চরণ ধরিছে ।
D
শ্রীকৃষ্ণ।
সরেজ-প্রতিমা, সুষমা সরমা, সুশীলা, বিমলা, কেন ?
বিষাদে মগন,হইয়া এখন, বিবশ হয়েছ হেন ?
তুমি যে আমার, তাহা কি আবার, কথায় কহিব হয় ।
অনন্তরূপিণী, ওগাে সনাতনী, বিশ্ব যে তােমার কায়?
তােমার প্রেমেতে, অস্থির সততে, মনেতে কইয়া রই ।
হৃদয় মাঝার, আছে কে আবার, তােমার প্রতিমা কই ?
কে পূজে এমতে, কায়মন চিতে, কহ কমলিনী শুনি।
কার নয়নেতে, বারিধি এমতে, ঝরে গাে ও বিনােদিনী ?
কে হৃদি মন্দিরে স্থাপিয়া কাতরে, এমন অর্চনা করে ?
ভকতি-প্রসূন, আনন্দে এমন, কৈ কর কমলে ধরে ?

নিকুঞ্জলীলা।
-~-
কে পড়ে লুটায়ে, বিহ্বল হইয়ে, আমার নামেতে হয় ।
অন্তরে অন্তরে, কে ডাকে আমারে, কে করে শীতল কায়?
কার প্রেম হেন, বহিয়া উজান, আমার হৃদয়ে আসে।
কার প্রেম হয় ! মাের প্রাণে ধায়, বিপুল তরঙ্গে ভেসে ।
কেবল সততে, অস্থির করিতে, চিন্তার তড়িৎ ধরে ?
কপায়ে হৃদয়, ব্যাপি দেহম, এমত অসাড় করে ?
স্নায়ুতে স্নায়ুতে, তড়িৎ গতিতে, রেণুতে রেণুতে যায়।
ভাবের আগারে, প্রণয় আকারে, পরাণ ভুলায়ে লয় ।
আমি যে আমার, নাহি থাকি আর, তোমার করিয়ে লও।
আমার যে সর, হৃদয় বৈভব, সখিরে ভুলায়ে দাও।
আপনে অাপনি, হেরিগাে যখনি, হেরি ও বদনখানি।
নয়ন মুদিয়ে, হৃদয়ে ধরিয়ে, গলিরে সোহাগ মণি।
সব সমৰ্পণ, করিয়া কেমন, ভাসিছ পরম সুখে !
দেহ প্রাণ মন, ত্যজি সৰ্ব্বধন, ধরেছ আমারে বুকে।
আমা ছাড়া আর, কিছু না তােমার, আমিই তুমিগাে হই।
জীব শিব ভেদ, জগতে প্রভেদ, অভেদ অন্তরে রই।
তােমা ছাড়া হয়ে, রহিব কি প্রিয়ে, বায়ু যে বঁধিয়া রাখে।
মনের তরঙ্গ, করি সদা রঙ্গ, দুকুলে বহিতে থাকে ।
আমার মনেতে, তােমার প্রাণেতে, মরুতে বাঁধা যে আছে।
তুমি ভাব যাই, আমি ভাবি তাই, এমতি রহি গাে কাছে ।
দেখা নাহি হলে, অন্তর শিকলে, হৃদয় করে টান।
তিশন না যায়, ফেল হেন দায়, অস্থির করিয়া প্রাণ ।
আলােক কিরণে, রশ্মি হেন হানে, তােমায় আমায় বাঁধে।
ভুবনমােহিনী, রাই কমলনি, দেখাও সুঠাম ছাদে।

শ্রীরাধা।'
০
(তাের) চম্পক বরণ, দেখিয়া যতন, চম্পকে করিতে হয়।
বিমল বদ, চঁাদের যেমন, দেখিতে হৃদয়ায় ।
বিকচ কমল, নয়ন নিটোল, তারকা তাহাতে জলে।
অধর হাসিতে, সুধার রাশিতে, প্রেমের তরঙ্গ খেলে।
(তার) মুকুতা নিশন, কুসুম হসন, নিকুঞ্জ আলোক করে।
ফুলের বসনে, ফুলের শাসনে, হৃদয় শাসন হরে।
ফুলের বন্ধনে, বেঁধেছ এমনে, কে তাহা ধুলিতে পারে?
ফুলের কুমারী, ফুলের মধুরী, মােহিত হৃদয় করে।
শ্রীরাধা।
সাধে কঁাদি কৃষ্ণ পড়ি পদলে ।
হারাই হারাই,
হৃদয়ে সদাই,
বড় ভয় তাই, কি জানি কানাই,
ত্যজিবে আমায় কখন কি ছলে।
কি জানি তোমার কি মনে আছে!
বিপিন বিরি,
গােবর্ধন ধরি,
চরণে তোমারি
দেহাৰ্পণ করি,
তবু ভয়ে মরি দীনবন্ধু করি -
পাছে তুচ্ছ করি তাজ রাধা পাছে।
বঙ্কিম নয়নে,
নিরখি বনে,
কিবা মৃদু মৃদু মৃদু হাসি।

নিকুঞ্জলীলা।
.
৪
পরাণ আমারি,
উঠয়ে শিহরি,
বুঝি ত্যজিবে তাই প্রকাশ।
বাড়াও হে গর্ব, করিতে সে খর্ব,
ওহে, মনে মনে ভাল জানি।
কল যে কার,
বুঝে সাধ্য কার,
ওহে নাহিক ওকথা বলানি।
•
পতিতপাবন, বিঘ্ন বিনাশন, বিপদে ও পদ স্মরি।
কলুষ নাশন, অধম তারণ, চরণ শীষে ধরি।
যেন এ রসনা, করে হে ঘােষণা, তােমার মহিমা জ্যোতি।
সম্পদে বিপদে, যেন তব পদে, অকপটে থাকে মতি।
জীবন মরণে, তােমারি চরণে, দিন যেন করি ক্ষয়।
আদেশ তােমারি, শীরষেতে ধরি, পালন করিতে হয়।
করুণা বিতর, সদা কৃপা কর, পরম করুণাময় ।
ভুবন মােহন, রাধার জীবন, তব পদে পায় লয়।
পাপ পুণ্য গণ্য, তােমা বিনা অন্য কিছুই নাহিক জানি।
জীবন আধার! হৃদয় মাঝার, করহে মুরলী ধ্বনি।
প্রীতি পুষ্প দিয়ে, তােমারে পূজিয়ে, আনন্দ সাগরে ভাসি।
মানসনে, হেৰি তােমা ধনে, মনের আনন্দে হাসি।
কুটিল হৃদয়, কুচিন্তা আলয়, তােমারে ধরিতে নারে।
তাই কৃষ্ণ কঁদি, বহি যায় নদী, রাধা কি সহিতে পারে ?
অকলঙ্ক তুমি, কলঙ্কিনী আমি, মুক্ত কর হৃষিকেশ।
তুমি অন্তর্যামী, ত্রিভুবন স্বামী, নাহি তব মায়া লেশ।

রাধা।
কিঙ্করী কাতরে, মরে হাহা করে, অভয় চরণ দেহ।
বিজন বিগিন, পাইতে চরণ, করেছি আনন্দ গেহ।
দুঃখ যাতনায়,বিপদ সময়, দরশন যেন পাই।
যেন তব নামে, শ্রীগোলােকধামে, চরমে আনলে যাই।
তােমার নাখেতে সুধা এ জগতে, উথলি উথলি উঠে।
ময়ুর ময়ূরী, ভ্রমর ভ্ৰমণী, তৰু নামে সুখে ছুটে
দিবাকর কর, সুধার আক, সুধাময় সব হয়।
মলয় সঞ্চারে, মধু বৃষ্টি করে, ভুলােক স্বরগময়।
সরিতেতে সুধা, মেঘে মাখা সুধা, চরাচর সুধা রে।
হৃদয় মাঝারে, সাগৰু আকারে, সুধা বহে প্ৰেমাধারে।
,
কেন মাঝে মাঝে,
অপরূপ সাজে,
দিয়া দরশন হে কাল শশী।
হৃদয় আকাশে, লুকাও কি আশে,
ঘন মেঘ পাশে ছড়ায়ে মসী ?
চিরদিন কিসে,
পূরাইয়া আশে,
তােমারে হেরিব অানন্দে ভরি।"
দীনবন্ধু হরি,
ও চরণ ধরি,
এমন সাধন হবে কি করি।
বাক্যেতে মনেতে,
প্রাণেতে চখেতে,
রাখিব কিসেতে কি করি বল।
এত প্রেম কোথা,
পাইবেক রাধা,
তােমারে বাঁধিতে অনন্ত কাল।

৬৪
নিকুঞ্জলীলা।
="
০
শ্রীকৃষ্ণ।
জগতমােহিনী, হৃদয় তেষিণী, রে ননলিনী রাই।
তব প্রেমদায়ে, অধীর হইয়ে, বনে বনে ফিরি তাই ।
নাহি কিছু আর, যা ছিল আমার, সুধিতে তােমার ঋণ,
তাই ক্ষুন্ন মনে হয়েছি নবীনে, প্রেমের ভিক্ষারি দীন।
গােপীদের কাছে, যত প্রেম আছে, মাগিব লইয়া ঝুলি,
সন্ন্যাসী হইব, প্রেম মাগি লব, দ্বারে দ্বারে “রাধে বলি।
সাগর সমান, তব প্রেম প্রাণ, না আছে আধার মাের,
কোথায় রাখিব, সে প্রেম বিভব, এ খেদে কতেছি তাের।
ক্ষুদ্র মাের প্রাণ, তব প্রেমদান, বহিতে ইহারে নারে,
তাই দীনবেশে, যােগী হয়ে শেষে, ফিরিব সবার দ্বারে ৪
চরণ চমিয়া, নেওবারি দিয়া, ধুয়াৰ যতনে তায়,
জ্ঞাখিব হৃদয়ে, প্রাণেতে বাধিয়ে, জুড়াব হৃদয় কায়
সাজাব সুন্দরে, ভালবাসা দিয়ে, কমল বদন তব,
নড়িব চড়িব, ওরূপ দেখিব, দিব গাে মা ছে সব।
রাধ: রাধা কল, নাচিব কেবলি, বাজার মধুর বাঁশী,
তব প্রেমদায়ে, মন প্রাণ দিয়ে, হইব বিপিনবাসি।
ভ্রমি দেশে দেশে, ভিখারির বেশে, তব প্রেম বিওরিব,
জগতভাসিবে, তব প্রেমার্ণবে, বিভাের হইবে সব।
তব নাম ধরি, কি দিবা শর্বরী, সকলে মােহিত হবে,
আনন্দ উৎসবে, জীবন কাটাবে, জয় রাধা বলিবে সবে।
তুমি মনে মনে, যে প্রেম বন্ধনে, আমারে বন্ধন কর,
সাধ্য কি আমার, তােমা* ত্যজিবার, আমি যে তব কিঙ্কর।

শ্রীরাধা
---
ভক্তির যে দাস, করি পূর্ণ আশ, তাহা কি নাহিক জান,
যে আমায় ডাকে, প্রাণ দিয়ে তাকে সুস্থর করি সে প্রাণ ॥
ফিরি প্রাণে প্রাণে তুষি সুধা দানে, ভাসাই আনন্দে মন,
শান্তি নিকেতনে, সুখের মিলনে মিলাই জীবন ধন।
রাধে! তােমা বই, আমি আমি নই, কি কবঅধিক আর,
নিগুণ আমায়, সগুণ নিচয়, করেছে প্রেম তােমার।
চিন্তা বিরহিত, ছিল মোর চি, চিন্তা প্ৰদানিলে তুমি,
ভাবে ভেসে যাই, তব প্রেমে রাই! লভিয়া এ বিশ্বভূমি।
ধরেছ এ কায়া, কি অসীম মায়া, হারিলাম গাে বুঝিতে,
তাই পদ ধরি, সদাতুষ্ট করি, পড়ি তব চরণেতে।
না পেলেম মন, না দিলে চরণ, কেমন এ রীত তব ?
বঞ্চিতে চরণ, তাই কি এমন, করিছ ছলনা সব?
কর যাহা কর, চরণ বিতর, আর না কিছুই চাহি,
রে মনমােহিনী, চারু চন্দ্রাননী, চরণ পঙ্কজ দেহি !
শ্রীরাধা।
* *
বলোনা বলােনা, ও কথা বলোনা, মিনতি তােমার পদে,
পাপের যাতনা, সহেনা সহেনা, সহেনা ও কথা হৃদে।
মনে সদা কর, পাপ পরিহরি, ও পদ হৃদয়ে ধরি,
হে দীন-তারণ, কর কর ত্রাণ, পূরাও বাসনা হরি।
প্রাণ-প্রীতি-ফুল, অতি সুশীতল, বিকাশিছ প্রেমবাসে,
তুলিয়া তাহায়, দিব তব পায়, পূরাইয়ে চির আশে
আছে কি আমার, এই উপহার, লহ জে চরণে তুমি !
তােমারি হে ধনে, তােমারি চরণে, প্রদনি জগত-স্বামি।
.

{
নিকুঞ্জলীলা।
পূর্ণ পরাৎপর, অগম্য অপার, কতই ছলনা জান,
সাধ্য হয় কার, বুঝিতে তোমার, কিরূপ অসীম প্রাণ ।
আমি ভেবে ভেবে, এ প্রাণ সদাই হারায়ে যাই,
জলে স্থলে শূন্থে, রসাতলে ব্যোমে মলাই সকল ঠাই ।
ওহে সুখকরী, ভব-দুঃখহারী, এই ভিক্ষা পদে করি,
পলকে পলকে, প্রভু হে তোমাকে যেন হে সতত স্মরি।
!
বনে ।
।
গীত মূলতান।
অগতির গতি তুমি, ওহে শ্যাম সুশীতল।
ডাকি হরি সকাতরে, দেহ হে চরণে স্থল।
উপায় নাহিক কোন, বিনাতব চরণ,
ও পদে দাও শরণ, ওহে হৃদয় সম্বল।
সুমতি কুমতি তুমি, তুমি শূন্য তুমি ভূমি,
কে বুঝে জগত স্বামি, তুমি স্বর্গ রসাতল।
এমন কি দিন হবে, শ্রীচরণে স্থান দিবে,
রাধা ও চরণ পাবে, প্রাণ সখা হে দয়াল।
যদি কভু কৃপা হয়, এই ভিক্ষা কৃপাময়,
দেহ যেন পার লয়, লভি ও পদকমল
যষ্ঠ সর্গ সমাপ্ত।

সপ্তম সর্গ।
শ্রীরাধা।
হেন স্তব করি জগৎ ঈশ্বরী,
অচল ভক্তিতে চরণ ধরি,
প্রেম অনীরে,
দয়াল ঈশ্বরে, মন মুগ্ধ করি
করিলেন কত অৰ্চনা কিশােরী।
বিগলিত করে,
নিস্তব্ধ হইল সখিরা তখন
দাড়ায়ে রহিল পুত্তলি যেমন,
নির্বাক সকল,
কম্পিত বিকল,
ভাবিতে লাগিল একি অলক্ষণ
জগৎ ঈশ্বরে আমরা কখন,
ভাবিনি এমতে,
ভাবিনি পুজিতে,
কত মহাপাপে ডুবেছি এখন,
যা ছিল হয়েছে অদৃষ্ট লিখন।
ধন্য শ্রীরাধিকা ধন্য পুণ্য তার,
তাই সে বুঝেছে মহিমা অপার,
তাই ভক্তিভাবে,
সদা কৃষ্ণ ভাবে,
আমরা নির্বোধ দোষ ধরি ওার,
মান তার নহে ভজনা তাহার #

নিকুঞ্জলীলা : অমিয় অমৃত, তাই, দিবা নিশি, শ্যাম চঁাদে মিশি, চকোর যেমতি পেয়ে পূর্ণ শশী, দেবের বাঞ্ছিত, পিয়ে অবিরল শ্রীরাধা বিলাসি । তাই দেব দেব দেব, সেই' বাসুদেব, অধীন সতত, শ্রীরাধা নামেতে, ক্ষণ না দেখিলে, প্ৰেমাধিনী বলে, বাঁশরী বাজায়ে ডাকে কাল শশী । আহা কোকন লাঞ্ছিত ও তনু, কুর নয়না ভুরু কাম ধন্থ। চন্দ্রমা সরােজ, বদনে বিরাজে, A অনুপমা বালা ভাবে সদা কামু। শয়নে স্বপনে, নিদ্রা জাগরণে, দেখেন কিশােরী সেই কৃষ্ণ ধনে, ৬াকেন সতত কোথা আছ কমু। শিরীষ কুসুম সদৃশ কোমল, সুবর্ণ সদৃশ কঠিন বিমল, পদ নখ শোভা, সোদামিনী আভা, দেখিতে কমলা অচল। কেবল। ফে বুঝে কখন, মহামায়া মন, কিরূপ কখন প্রকাশিত বল ? মুনি যোগ যাগে, যে হৃদে না জাগে, তাহারে বুঝিতে নহেক সরল ।

শ্রীরাধা।
০
বহু পুণ্যফলে রাখা চরণ,
আমরা সেবিতে জন্মেছি এখন।
থে চল ওরে,
শ্রীহরি কাতরে,
দেহি পদ বলি করে সম্ভাষণ ;
সে পদ টিনিতে, কে পারে পৃথীতে,
প্রেমে মত্ত যাছে শ্রীমধুসূদন
নলিনী-নয়না, চারু চন্দ্রাননা,
জগত মঙ্গলে সতত বিমনা,
কি করি মাধবে,
সেই নিশি দিন করিছে কামনা।
জগওঁ তুষিবে,
কখন কঁদিছে কখন হাসিছে,
হরি হরি করি কখন উঠিছে,
হরি পদে মন,
সঁপি সর্বক্ষণ,
হরির মহিমা জগতে ঘােষিছে,
হরি নাম সুধা সবে বিলাইছে।
শিখিল বিহগে ডাকিতে কৃষ্ণয়ে,
শিথিল শিখিতে নাচিতে সুরে,
নাচিল খঞ্জন,
পেয়ে কৃষ্ণধন,
গােকুল ব্ৰজের চিনিল অন্তরে,
কৃষ্ণগত প্রাণ সবে একেবারে।

নিকুঞ্জলীলা।
:
রাধার প্রেমেতে ব্রঞ্জের রমণী,
ধাবিল দেখিতে কৃষ্ণ শিরােমণি,
যে হেরে তঁাহারে, নাহি যায় ফিরে,
চরণে শরণ লহে সে তখনি,
প্রেমে ঢলি পড়ে,
হরিপদ ধরে,
হরিবােল বলি ভাবে চিন্তামণি
-
ব্ৰজের রাখাল ব্ৰজনাথে মিণি,
চরণে ঢালিল হৃদয় সকলি,
গােলােক ঈশ্বরে,
স্বতিবাদ করে,
কহিল বাজাতে মধুর মুরলী
শুনিল নিঃশব্দে শামলী, ধবলী ।
যে বাণী শুনিল প্রাণ হারাইল,
বংশীধারি-পদে হৃদয় ঢালি,
নিস্পাপ শরীরে,
নিষ্কাম শুনে,
হরিনাম সুধা ৰে বিলাইল,
হরিধ্বনি করি জগত মাতিল।
লতিকা নাচিল, পাদপ গাইল,
সুন্দর সঙ্গীতে মেদিনী পূরিল,
* ভ্রমর ভ্রমরী,
হরি হরি করি,
মাধব মুরলী সহিত গহিল,
বঁশরীর রবে জগত মােহিল ।

সখি সঙ্গীত। তাই রাধা নামে হরি কাতর, রাধ রাধে করি, বনে বনে ফিরি, কদখেরি মুলে যমুনার কূলে, সতত আকুলে ডাকে বংশীধারী। সখি সঙ্গীত। জয় রাসেশ্বর, রাধিকা রমণ, যশােদা জীবন হরি। জয়, নিকুঞ্জবিহারি, পাপ তাপহারি, মধুর মুরলীধারি; জয় হৃষিকেশ, হৃদয় মােহন, সুধাংশু বদন দেব। জয়, মদনমোহন, প্রাণপ্রিয় জন, সুর- নজন সেব। শান্তি নিকেতন, মঙ্গল-সাধন, জীবের জনম দাতা পরম পুরুষ, প্রকৃতি আধার, স্রষ্টা-সংহীরক পাতা। কিবা, কমল বদন, মধুর হসন, গঞ্জিত বিধুর হাস, কিবা রুচিকর, সুধার অধর, আহা কি মধুর ভাষ! কিবা, বঙ্কিম নয়নে, ঈঙ্গিত সঘন, হানিছে হরিত মন, ঢলিয়া পড়িছে, সবে তার কাছে, হারায়ে হৃদয় ধন! কিবা, ঠমকি ঠমকি, মধুর চলনে, নুপুর ঠমকি বাজে, লভিবার আশে, ভুবন উল্লাসে, কমল যে পদে সাজে। দেখ, জ্যোতির মাঝারে জীবন জীবন বিতরিয়া প্রেমে হাসে, ডাকিছে সবায়, আসিবি কে আয়, তাহার হৃদয়কাশে! যদি, চাহ রে চরণ, চাহ পুণ্যধন, আয় রে নাচিয়া আয়, হের ও বদন, ধর শ্রীচরণ, সকলি মিটায়ে যায়।

.
१२
নিকুঞ্জলীলা।
ও, চরণ সুধায়, যে বা স্বাদ পায়, তার কি যাতনা থাকে।
সে যে, সুরতরঙ্গিনী'কেলেতে কেমনি গলিয়া প্রাণেশে ডাকে।
হরি হরি বল, পাপ তাপ ভুল, ডাক তঁারে প্রাণ খুলে।
সংসারের পেলা. করিলে উতলা, তাকিয়ে যাবি রে ভুলে।
স্মরণ লইলে, প্রাণ ঢালি দিলে, কিছু না ভাবনা রবে।
তার চেয়ে প্রিয়, কে হবে দ্বিতীয়, যে তাের হৃদয় লবে।
বল হরি বল, ভুল রে সকল, লহ রে হৃদয় ধন।
বদন ভরিয়া, হৃদয় পুরিয়া, ডাক রে প্রদনি মন!
কিবা, চাচর চিকুর, প্রাণের বিধুর, তাহাতে বন্ধন চূড়া,
কিবা পীতবাসে, দশ দিশ হাসে, আহা কি মােহন ধড়া।
কি বা বনমাল', শােভিতেছে গলা, হরিতে বিশ্বের মন,
তে রতনে,
কি শােভা যতনে, করিতেছে বিমােহন,
কিবা অনুপম, চন্দন বরণ, বিকাশে মধুর বিভা,
নীল কান্তি সনে, দিতেছে যতনে জ্যোৎস্নাসদৃশ আভা।
আহা, মধুর হাসিতে, মােহন রূপেতে, মধুর তরঙ্গ খেলে,
প্রেমে মাতােয়ারা, প্রাণ হয় হারা, প্রেমের হিল্লোলে মিলে।
সুখের সুবাস, ছড়ায়ে উল্লাস, মৃদুল মধুর বহে,
প্রাণসখা সনে, আনন্দিত মনে, সুখ যেন ঘেরি রহে।
করুণা কেমন, হৃদয় রঞ্জন, প্রেম বিতরিতে করে,
সুখ উথলয়, সুবাস মলয়, খেলেরে প্রমোদ ভরে ।
সাধে কি কুসুম, করিয়ে সন্ত্রম, প্রাণেশে তুষিতে ফুটে,
গুঞ্জরিত অলি, হয়ে কুতুলি, সাধে কি সুখেতে জুটে।
=

সখি সঙ্গীত।
ওরে,সাধে কি কোকিলে, পরাগ ডালে, প্রাণেশের স্তুতি করে,
সাধে শিখিস্বরে, পঞ্চমে শিহরে, গোপিনাথে নাহি হেরে।
কলনাদে সাধে, যমুনা আলাপে, প্রাণেশ বন্দনা গায়,
স্বরগ হইতে, নব ঘন সাধে, পড়ে কি শ্যামের পায় ?
আহা, শ্যাম প্রেম পেতে, উন্মাদ জগতে, কি কব অধিক অার,
নিশিতে নীহার, করে ভিসার, সুধিতে শ্যামের ধার ।
কিবা সুবহু সুলয়ে, কিরণ বিলায়ে, মনােরম প্রেমে খেলে,
যাহা সাদরেতে, রাধার গলেতে, মালিকা হইয়া দোলে !
যে করে বলয়া, শোভিছে মােহিয়, যে করে বঁশরী সাজে,
প্রাণ সদা চায়, রাখিতে তাহায়, তাশি হৃদয় মাঝে!
আহা, কদম্ব মালাতে, বঁধু বিধিমতে, সেজেছ ভাল হে করে,
দাও একবার, ওই রত্নহার, রাখি হে রবে ধরে।
বঁধু, এ জনম মত, এ প্রাণ নিয়ত, যেন হে ও পদ স্মরে,
ভজে দিবানিশি, রাথে প্রাণে মিশি, মজিয়া প্রেমের ভরে ;
বাসনা অামার, যেন প্রেমধার,তোমাতে সতত রয়,
যেন এ রসনা, করে হে’ ঘোষণা, তোমার নামের জয় ;
বঁধু, যেন তোমা ধনে, হৃদয়ে যতনে, সতত রাখিতে পারি,
চঞ্চলা রমণি, কি করি না জানি, জানত অধম নারী।
ওহে, পরের কারণ, প্ৰদানি আপন, কতই যাতনা লও,
পরেরে তুষিতে, হরি বিধিমতে, পরের পসরা বও।
পর হিতে রত, হে বঁধু নিয়, ফিরিছ অদৃশ্যে জানি,
পরব্রহ্ম ব'লে, তাকে হে সকলে, জীবিত যতেক প্রাণি ।
০

৭৪
নিকুঞ্জলীলা।
{
ওহে, পরের কারণে, কতই যতনে,কতই কাৰ্য হে কর,
পরের নিমিত্ত, হে বৈধি সতত, প্রাণ দিয়ে জানি ঘাের।
পরেরে তুষিতে, আকার ধরিতে, তুমি হে কাভা নও,
পর তরে মন, কর সমর্পণ, দুঃখে দুঃখ কত সও।
বঁধু, তব গুণ কত, আছে শত শত, আমি কি কহিব তায়,
এ আশীষ কর রসনা আমার, ও নম চরমে গায়।
সখা, এস সযতনে, হৃদয় আসনে, তোমায় অর্চনা করি,
বাসনা চন্দন, গলায়ে কেমন, রেখেছি প্রণয় ভরি।
ওহে, মন প্রাণ তােরে, পরম আদরে, প্রীতি পুষ্প দান করে,
পীযুষ তাহারি, ল’য়ে ভূরি ভূরি, পিষে হে প্রেমের ভরে
কল্পনা মাঝারে, লইয়ে তােমারে, কি সুখে যে সদা ভাসি,
মল্লিকার দামে, বিনােদিনী বামে, হেরিয়া কতই হাসি।
চামর দুলায়ে, নাচিয়ে নাচিয়ে, চৌদিকে বেড়াই ঘেরে,
বলি, শ্যাম বড়, রাধা কি সুন্দর, অসীম সৌন্দর্য্য হেরে ।
মানস ষটপদ, সদ। ওই পদ-কমলে গুঞ্জরে সুখে,
গুণ গুণ স্বরে, কি বলে অধীরে, পীযুষ লইয়া মুখে !
শ্যাম, দাড়াও বিভঙ্গে, মধুরিমা রঙ্গে, প্রেমের কিশােরী ধরি,
জুড়াই এ তাখি, প্রাণ ভরি দেখি, সার্থক জনম করি।
ওহে রাখ রাখ, হৃদে মোের রাখ, এ শুধু মুরতি তব !
আমি, নব চড়িব, ও রূপ হেরিব, করিব মধুর রব।
নিদ্রায় নীরবে, প্রাণ সখা তবে, প্রাণের ভিতরে রাখি,
মধুরিমা যত, ভুঞ্জিব সতত, মুদিয়া চঞ্চল আঁখি।
উপাধান করে, হৃদয়েতে ধরে, রহিব প্রেমের ভরে,
প্রেমের চুম্বন, বিশ্ব বিমোছন। লভিব যতন করে।

সখি সঙ্গীত
তোমার অাদরে, অসায় সংসারে, আর না যাতনা রবে,
হাসিতে দিতে, সঞ্চিতে বঞ্চিতে, আর না জীবন রবে।
সখা, যদি কৃপা করে, হীন অধমারে,তারিতে চরণ দিলে,
শিখাইয়া দাও, যাহা তুমি চাও, রাখ যদি এ অখিলে।
তােমার হইয়া, তােমার লইয়া, সতত বিহানি যেন,
শ্রীমুখ মাধুরী, হৃদয় বিহারি করি যেন সদা পান।
তােমার বদন, রূপ নিরূপম, আরো রূপ তাহে হেরি,
ভালবাসা দিয়ে, তাহে সাজাইয়ে, হৃদয় জুড়ায়ে ধরি।
আমার নয়ন ধন্ত প্রিয়জন! সে তব বদন হেরে,
আমার এ কর, সুখের আকর, ধন্য! ও চরণ ধরে।
আমার এ হৃদ, সুখের অস্পদ, যাহাতে বিরাজ কর,
আমার রসনা, পূরায় কামনা, করেছ ধন্য শ্রীধর।
ধন্য রে ইন্দ্রিয়, তোদের আশ্রয়, ভুঞ্জি সে পরম ধন
মন প্রাণ এবে, লতে তােম ভবে, তোমার অস্বিাদ এন।
রয়েছি মন্দিরে, যেন কারাগারে, নাহিক সহায় কেহ,
সুখ বা সম্পদ বিষাদ বিপদ, ভুঞ্জিছি লভি এ দেহ।
এসেছি বা কোথা, যাইব বা কোথা, নাহিক কিছুই জানি,
কেবারে আত্মীয়, কে হয় অপ্রিয়, কাহারে নাহিক চিনি।
সখা ! অকুল পাথারে, বিপুল সাগরে, এমতি সতত ভাসি,
তােমার মায়াতে, হেন বিপদেতে, তথাপি সুখেতে হাসি।
এসেছি একলা, যাইব একলা, কিছুই না সহিত যাবে,
কিসে অন্য জন, হয় হে আপন, বুঝাও আমারে তরে।
জগতের পতি, দীনহীন গতি, তুমি হে দেখায়ে দাও,
হৃদয় মন্দিরে, আসি প্রেম ভরে, মায়া মােহ হে ঘুচাও।

৭৬
নিকুঞ্জলীলা।
৫
-
তুমি ভক্তাধিন, ভক্ত চিরদিন, তোমায় দেখিতে পায়,
প্রাণের রতন! দীনের তারণ! প্রাণ যেন তােমা চায়।
সখা ! ব্রততী মাঝারে, ত্রিভঙ্গ আকারে, দাড়াতে মুরলী লয়ে,
তব বিম্বধির, যেন সুধাকর, উজলে প্রকাশ হয়ে।
কালের মাঝারে, চিকণ কালােরে, রিমিঝিমি শোভা পায়,
নাচিয়া নাচিয়া, হৃদয় মােহিয়া, প্ৰা মন গলি দেয়।
আঁধার আগারে, হৃদয় করে, তুমিরে আঁধার আলো,
প্রেমের কমলে, প্রাণ সখা ওরে, তুমি হে পীযূষ ভাল।
ভালবাসা দিয়ে, হৃদয়ে সাজায়ে, কত ভাল তােম। দেখি,
চরণ রেণুতে, অঙ্গেতে অঙ্গেতে, পরম সুখেতে মাখি।
কৃষ্ণ তােমা বই, নাহিরে কেহই, এ যেন মনেতে থাকে,
সাধে কি তােমায়, ডাকি দয়াময়,.কে আছে বিপদে রাখে।
কিবা নয়নেতে, কিবা হৃদয়েতে, যখন যথায় থাক,
স্বরুপ সন্তোষ, পাই আশুতােষ, চরমে গােলকে রাখ।
আমি, তোমায় লভিয়া, সকল ভুলিয়া, লভি হে আঁধারে আলাে,
জগতের সুখ, ওহে চন্দ্রমুখ, নাহিক লাগে হ ভাল।
আমি, সৰ্বস্ব ত্যজিয়া, তােমায় লইয়া, বনেতে রহিব সুখে,
বলি হরি হরি, দিবা বিভাবরি, কাটাব আনন্দ মুখে।
মাের ভালবাসা, হৃদয় পিপাসা, কিরূপ বুঝিবে তবে,
নিজবনিময়ে, তােমায় সইয়া, রহিব তোমার ভবে।
নমি চরণেতে, দাসি বিধিমতে, কৃপা করি পদে রেখ,
অগতির গতি, ওহে ভবপতি, অন্তিমে নয়নে দেখ।

সখিগণ।
৭৭
সখিণণ।
মধুর সময় মদনমােহন,
দলে দেখা যদি কমললােচন,
পূর্ণ কর স্নাশ,
ঘুচাও নিরাশ,
ভকত অধীন দেথাও কেমন,
রাখহে চরণে দিয়া চরণ।
আমরা ব্ৰজের অধম। রমণী,
কি করি বুঝিব তাে’রে চিন্তামণি।
ভব পারাবারে,
দিও পার করে,
ভবের কাণ্ডারী, ভব শিরােমণি,
দীনের দয়াল, গুণে গুণমণি!
পরম পুরুষ, পতিত পাবন,
গ্নি বিনাশন, দেব সনাতন,
ভক্তিতে, প্রেমেতে, লুঠি চরণেতে,
ফিরাও প্রকৃতি দেব নারায়ণ ।
ঙাকি, হে কারে,
বন্দি প্ৰেম ভয়ে,
ব্যাকুল অন্তরে, বিশ্বাধার ততরে,
রাধার রমণ,
নর নারায়ণ,
পরম পুরুষ করি নিরীক্ষণ,
যে পদ পঙ্কজে,
দেব দেব ভজে,
সে পদ কমলে ঢালি প্রাণ মন

৭৮ নিকুঞ্জলীলা। হে শ্যাম সুন্দর, রসিক নাগর, বৃন্দাবন-ধামে রাধিকা-বিহারী । গগাপিজনগণ, মানারঞ্জন, গিরি গােবর্ধন:ভবভার-ধারী। দানব ঘাতন, নর্দেরি নন্দন, কালেয় কংসাদিরপুনশি কারী। হৃদয় বিহারী; পপি তাপহারী, ভক্তির উদয় প্রসাদে তােমারি। হে রাসবিহারী, মোহ নাশকারী, মধুর মুরলী মধুধ্বনি কারী । মধুর হাসে, গােপিনী-মানস-প্রমোদিত-কারী। নটবর বেশে, দীনহীন জনে, ক্ষ হে চরণে, দীনজনপতি ভবের কাণ্ডারী। হে নারায়ণ, রমণীমােহন, রূপ অনুমি সুখময় হেরি। না.ফিরে নয়ন, নাহি ফিরে মন, সদা আকিঞ্চন মুখ নেহারি । দেহি বর হেন, গোপি প্রাণধন, যেন শ্রীচরণ সাধ পূরি ধরি। মুখে তব নামসদা যেন করি।

সখিগণ।
৭৯
শ্যাম সুকুমার,
সূখের আকর,
প্রাণ নিরন্তর তব
তব কৃপা অশে'।
তোমাৰ নামেতে,
গলি হৃদয়েতে,
স্বরগ সম্ভোগ তব সহবাসে।
বদন কমল,
মুখ বিনিৰ্ম্মল,
সম পরিমল বিতরে বিলাসে।”
পিয়ে মুখে অতি, নাহি ফিরে মতি,
রহে সদা রতি অতি সুখ আশে ।
ওহে সুধাকর,
রূপের সাগর,
তেহেনিরন্তর মন অভিলাষে।
পলকে প্রলয়,
হরি জ্ঞান হয়,
ঘুচা ও পলক পূরাইয়া আশে
কে হে সুধাকর,
তুমি গুণধর,
প্রণ নিরন্তর তব মুখ চাহে।
তুমি বিশ্বপতি,
তুমি মতি গতি,
দেহি পদে রতি ঘুচাও বিরহে
সপ্তম সর্গ সমাপ্ত।

অষ্টম সর্গ।
শ্রীরাধা।
সাধ কি পূবে হরি ?
চরণ ঘেরিয়ে, নূপুর হইয়ে, থাকিব চরণ ধরি।
হয়ে পীতাম্বর, ঘেরিব সুন্দর, শ্যামল কোমল অঙ্গ।
হইব মুরলা, অধর বিজলী, ত্রিভুবন মােহ ভঙ্গ ।
হই বনমালা, বড় সাধ কালা, শােবি হৃদয়ােপরে।
চন্দন হইয়ে, প্রেমেতে গলিয়ে, রঞ্জিব ও কলেবরে।
অলকা হইয়ে, শ্রমুখ শােভিয়ে, শোভাতে ডুবিয়া রই।
রূপের সাগরে ডুবি একেবারে, অরূপ তােমাতে হই ।
মুকুর কুণ্ডল, শ্রবণ উজল, অপরূপ জ্যোতি তায়।
প্রাণ সদা চায়, শােভিতে আভায়, কর দেব তার উপায়।
কিবা চূড়া’পর, জগ-মুগ্ধকর, শিখিপুচ্ছ শোভাময়।
অমল চন্দ্রম; তাহে নিরুপমা, প্রকাশিত জ্যোতি রয়।
প্রাণ ভরি দেখি, প্রাণ চিরি রাখি, করি মাখামাখি প্রাণে।
মানসে নেহারি, ওরূপ মাধুরী, অপার সাধনা সনে।
দেখুক নয়ন, ও চন্দ্রবদন, মিটুগ উহারি আশ।
দেখিবার ধন, নাহি আর কোন ব্যতীত ও চারু হাসি।
বুণ বিবরে, মুরলীর স্বরে, আনন্দ লহরী নাচে।
মধুর তানেতে, দেহ ভিতরেতে, সুধা পিয়ে প্রাণ বাঁচে।

শ্রীরাধার স্তব । রাধাৰ রি স্তব। D মাধব মুরলীধর, সুকুমার সুখকর, মুরলী সঙ্গীতে হর মন। বিভূহে সে গন শুনে, বিশ্ব শুদ্ধ সুর গুণে, ধন্য দেব অলীম কারণ। ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিম রূপ, নামে রূপে একরূপ, আহা কিবা দেখি মিশামিশি। গলের কুসুমলা, অম্বরে তারকা খেলা, আলোমাল ঘেরে যথা শশী ॥ শিখিপুচ্ছ বদ্ধ চূড়া, মুকুতা মণ্ডলে বেড়া, আধ আধ আধ বামে হেলা। শ্রীমুখমণ্ডল আভা, অলকা তিলকা শোভা, নীলাম্বরে বিজলীর খেলা। শ্রুতিযুগে মনােহর, মকর কুণ্ডল বর, সুধাকর অংশের সমান। রাজীব লােচনদ্বয়, আছে ব্যাপ্ত বিশ্বময়, প্রেমময় প্রেমে মাতোয়ান। কভু শ্যাম কভু খামা, পুরুষ কখন বাম, নানা লীলা কে বুঝে তােমারি। কভু বিবসন কটী, এলােচুল, চূড়া বংশীধারী ॥ আপন ইচ্ছায় নর, রমণীর বেশ ধর, আধ নর কভু আধা মারী। কভু পর। পীত ধটী, ৮২ নিকুঞ্জলীলা। কুটিল অপাঙ্গ ধরি, যোহলে গো ত্রিপুরারি, বঙ্কিম নয়নে ব্রজনারী। ছিল ঘন ঘন হাস, ত্রিভুবন জন ত্রাস, এ যে হাসে মজে ব্রজবালা। শােণিক সাগরে নেচে, সর্বনাশি এলে বেঁচে, নেচে নেচে গােঠ কম ছলা। শ্যাম চতুভুজা ছিলে, দ্বিভুজ শ্যাম হইলে, রণময়ী হলে রসময় । হুঙ্কার কোথায় গেল, মধুর বাঁশী বাজিল, অট্ট হাসি হলাে রসময়। ঢলিয়া চলিয়া আসে, গলিত চিকুর ভাসে, দৈত্যাশে উন্মাদিনী প্রায়। এ যে শান্ত বিমােহিত, প্রেমসিন্ধু উথলিত, প্রেম যেন ধরিয়াছে কায় । ব্ৰজের বালক সনে, খেলিলে শ্রীবৃন্দাবনে, মজাইলে যত ব্রজনারী। • কোথা দুন্ধৰা দুন্ধবী, কোথা যোগিনী ভৈাবী, পদতলে কোথ। ত্রিপুরারি। আধা গৌরী অধা হর, রষভ বহলােপর, ধর কত মধুর মুরতি। মরকত কান্তি ছটা, অচল তাড়িত ঘটা, নর সুর সংশয় সংহতি ॥ তামরূপে ও চরণ, হর করেছে হয়, তাই ব্ৰজে শুাম কি হইলে। ও

শ্রীরাধার স্তব।
দিবে বলি পদছায়া, প্রকাশ করিলে মায়া,
ব্রজধাম আনন্দে পূরিলে।
আয়ানে তুষিতে, হরি, 'রক্ষিতে তব কিঙ্করী,
হর মনােমােহিনী হইলে।
নবীন নীরদ ফয়,
রুধিরে ভাসি যায়;
ভাসে যথা কিংশুক সলিলে ।
বনমালা যেথা ছিল, মুণ্ডমালা সুশােভিল,
কুমকুম্ মিশাল শােণিতে।
ঘন ঘোর নিনাদিনী, সমরেতে উন্মাদিনী,
তড়ি জড়িত সে হাসিতে
গলিত চিকুর ঘটা,
নব জলধর ছটা,
অমানিশি পড়িল ঝাপিয়ে।
নানারূপ মায়া ধরে, অসুর নিপাত করে,
হর হৃদি উঠিলে নাচিয়ে ।
ক্ষণে ধরাতলে ছুট,
ক্ষণেক আকাশে উঠ,
সৃষ্টি যেন দীপ্ত রসাতলে।
প্রলয় অনল জ্বলে,
প্রবল দনুজ দলে,
হাস বামা বিকট বিলে ।
রবি শশী দুটি আঁখি, ভালে শশী শশিমুখী,
পদনখে শােভে শশিরাশি।
কালাগ্নি তৃতীয় নেত্রে,
জ্বলিত বিবিধ ছত্রে,
বিভুবন জন সবে ত্রাসি ।
ভৈরবী বাজায় গাল, যযাগিনী ধরিল তাল,
মহাকাল চরণে বিকাশে।

৮৪ নিকুঞ্জলীলা। - মহাযােগী মহাথে, রেখে সে চরণ বুকে; কৃতার্থ হইয়া সুখে হাসে ! কে বুঝে তোমার মৰ্ম্ম, তুমি বেদ তুমি ধৰ্ম, তুমি আদি অনাদি কেবল। পরমা প্রকৃতি তুমি, তুমি শূন্য তুমি ভূমি, এক তুমি তোমাতে কল। প্রচণ্ড প্রতাপে হায়, সৃষ্টি রসাতলে যায়, সব দেব দেখে কম্পমান। বলে কেন অকারণে, করালরূপিণী রণে, অকালেতে নাশিবেন । আসিলে চতুরানন, লইয়া হংসবাহন, করঘোড়ে কই স্তব করে। কেহ গরুড় আসনে, করে স্তুতি এক মনে, তুমি বলে মনে হয় রে। বৃষভ বাহনে কেহ, দানব প্রমথ সহ, তথা আসি হলেন উদয় ।। করযােড় করে স্তব, সংহারিক্তে মুক্তি তব, অসময়ে সৃষ্টিনাশ হয়। সথিরা দেখিয়া সবে, মুহূৰ্ত্ত মূৰ্ছিতা সবে, কৃষ্ণ বলি ধরাতে লুটিল। ঘন মেঘ রূপ ধরি, শত ৰ শব্দ করি, মহালােকে দিগন্ত পূরিল । অম্বরে উঠিল জ্যোতি, ব্যাপিল দিগন্ত মাতি, দেবাসুরে কলি ব্রাসিল।

শ্রীরাধার স্তব। ৮৫ বিঘাের ঝটিকা সঙ্গে, বিপুল তরঙ্গ রঙ্গে, শূন্যে গিয়া কোথায় মিশিলঃ প্রকৃতি হইল স্তব্ধ, ত্রিভুবন হলো মুগ্ধ, কিছু নাহি পারিল বুঝিতে। হায্যমুখ দিনণি, হাস্যমুখী কমলিনী, হাস্যমুখী কুসুম শােভাতে। মধুর মঙ্গল ছবি, প্রকাশ করিল রবি, আনন্দে পূরিল কুঞ্জবন। বিহগ মধুর স্বরে, বৈতালিক গান করে, হাষিত সবাকার মন অয়ান পলায়ে গেল, তব মায়া না বুঝিল, সখি সবে চেতনা পাইল। মে সকলে উঠি, মুছিল নয়ন দুটি, কি হয়েছে কিছু না বুঝিল। দেখিল সন্মুখে তারা, পিনাক মােহিনী তারা, কোটি চন্দ্র ঝলকৃত আভা। নাহি ভয়ঙ্করী রূপ, ভুবনমোহিনীরূপ, অভয় চরণ হর শোভা । সুহার লন্ত্রিত গলে, অপূৰ্ব্ব হীরক জ্বলে, শান্তিময়ী শান্তির বিকাশ । বামে খজ নরশির, দ্বিকর হয়েছে স্থির, দক্ষিণ দ্বি করে স্নেহ ভাষ। চণ্ডমুণ্ড হার গলে, অসুর নিপাত বলে, অভয়ার আনন্দ প্রকাশ ।

নিকুঞ্জলীলা। ( 1 । বিকট হাস্যের স্থলে, আনন্দ লহরী খেলে, প্রফুল্ল বদনে দুঃখ নাশ । অভয়-চরণদ্বয়, স্যাম কি শামার হয়, ধ্যানে জ্ঞানে নাহি যায় জানা। ধ্বজ বাঙ্কুশ চিন্তু, ধিরে করেছে ভিন্ন, মুপুরেতে নাহি যায় না। গ্রামের চরণধ্বনি, কণু রুনু ঝুনু শুনি, ভ্রমর গুঞ্জরে তাহা শুনি। শ্যামা যে সুস্থিরা আজি, কেমনে নুপুর রাজি, করিবেক রণমত্ত ধ্বনি। যেরূপ ধর না কেন, চরণ বিভিন্ন যেন, করোনা করােনা হৃষীকেশ। দিয়াছ ভক্তেরে যাহা, বঞ্চিত করােনা তাহা, এই ভিক্ষা চরণে প্রাণেশ ! থামিলেন রাসেশ্বরী, হৃদয় সুসিক্ত করি, নয়ন সলিলে, কত স্তবে। নয়ন নিমীলি তবে, হৃদয়ে হেরিতে দেবে, রহিলেন অতি মৌনভাবে। f ৫ সখীরা সকলে আনন্দে উথলে, অভিষিক্ত হয়ে সুখনের জলে, গদ গদ ভাবে দিয়া বস্তু গলে, নমিল মস্তক শ্রীকৃষ্ণ চরণে

চন্দ্রাবলী।
৭
যতনে প্রশ্নম করি বহুক্ষণ
করযোড় করি উঠিল তখন
প্রাণ ভরি পুন দেখে চরণ
কহিতে লাগিল কাতর বচনে।
ললিতা।
ধন্য কমলাক্ষ! বৃন্দাবন ধন!
ব্রজবালরূপী নন্দের নন্দন,
বিশ্বের আরাধ্য অগতির গতি,
সৃষ্টির নিয়ন্তা তুমি প্রজাপতি ;
তুমি সৃষ্টি স্থিতি, তােমাতে প্রলয়,
মহাকাল তুমি, বিশ্ব করলয়,
তুমি নিরাকার রূপের আধার,
তােমার মহিমা বুঝে সাধ্য কার,
তুমি সৰ্ব্ব আদি, তুমিই অনাদি,
তোমাতে উত্তর দেবদেব বিধি ॥
চন্দ্র সূৰ্য্য তুমি পুরুষ প্রকৃতি ;
মানব কখন বরাহ আকৃতি,
অনন্ত মহিমা অসাধ্য সাধন।
দেহি জগদ্গুরো দেহি শ্রীচরণ ।
চন্দ্রাবলী।
বিশ্বের ঐশ্বর্য গােপিকাবল্পত,
তব শ্রীচরণ দেব। দুভ।

নিকুঞ্জলীলা
কিশোর, যৌবনে সুশে আকৃতি,
সুধী'র সুশীল অমৃতের বাতি
সাক্ষাৎ অনন, প্রত্যক্ষ স্বরগ,
হৃদয় আলােক, দুর্লভ সংসর্গ ;
নীলকান্ত প্রভা দেবদীপ্ত জেটতি,
বহুপুণ্য তাই এহন মূরতি,
উদিত নয়নে, উদিত চৈতন্যে,
বিকল করিয়া হিতাহিত জ্ঞানে,
আশ্বাসিছে সবে করি বরদান,
সম্মুখে দাড়ায়ে সর্ব মোক্ষ, স্থান।
লীন হয়ে যাই ও রাঙ্গা চরণে,
ভবেশ, প্রাণেশ এই সাধ, মনে।
.
মাধবী।
পরম পুরুষ ব্রহ্মের স্বরূপ
ত্রিগুণ অতীত তুমি বিশ্বরূপ,
অদ্ভুত অব্যয়, ব্যাপ্ত বিশ্বময়,
অখণ্ড কালের তােমাতে উদয়?
তুমি বিশ্বময় বিশ্বের আরাধ্য,
দেবের দেবতা বোধের অসাধ্য,
পবিত্রের তুমি পবিত্র সাধক।
ত্রিজগত সৰ্ব্ব তব উপাসক।
নবীন নীরদ, বরণ তোমার।
প্রশান্ত সুন্দর মিল আকার ।

শশীকলা।
।
আহা কি প্রফুল্ল শ্রীমুখ কমল।
কুঞ্চিত কুন্তলে করে টল টল ।
মানস মধুপ চঞ্চল সপ্তত,
পিবে বলি সুখে অমৃত নিয়ত :
শশী কলা।
মস্তক উপরি চূড়া মনােহর,
বিবিধ রতনে রঞ্জিত সুন্দর,
শিখণ্ডি পুচ্ছেতে, অপূৰ্ব্ব শােভাতে
আছে বিরাজিত মুকুতা মালাতে।
অলকা আবৃত শ্রীমুখ কমল,
কোটি শশী সম মধুর উজ্জ্বল।
ললাটে কস্তুরী তিলক ঝলকে,
নাসাগ্ল শােভিত মুকুতা ন'লকে।
নীল ইন্দিবর, সুদীর্ঘ লোচন,
বঙ্কিম উন্নত প্রযুগ শােভন,
ওষ্ঠ অধরেতে শােভিত অরুণ, •
অতি মনােরম কমল বরণ !
কুঞ্চিত অধরে মোহন মূরলী
শোভিত যেমতি অম্বরে বিজলী।
মকর কুণ্ডল শ্রবণ শোভন,
মন্দার কুসুম জগবিমোহন,
ত্রৈলােক্য সৌন্দর্য্য একাধারে অজি
শ্রীকৃষ্ণ পাইয়া রয়েছে বিরাজি।

নিকুঞ্জলীল।
বিশাখা :
কণ্ঠরেখা ত্রয়ে দর্শন শােভন,
বক্র গ্রীবাদেশ অতীব মােহন।
শ্রীবৎস কৌস্তুত হৃদয় শােভিছে,
“তারা মুক্তা হার এলায়ে পড়িছে।
কদম্বমন্দার মঞ্জু কুসুমেতে,
বিভূষিত দেহ নানাবিধ মতে।
করেতে কঙ্কন কেয়ুর শোভিত,
কটিতে কিঙ্কিনী কাঞ্চি গুণযুত।
কপূর অগুরু কস্তুরী চন্দন,
গােরােচনা রাগে শ্ৰী অঙ্গ শোভন।
সুবলিত জানু পাদপদ্ম আহা,
ধ্বজাঙ্কুশ স্বর্গখ্যাত তাহা।
মঞ্জু মঞ্জীরেতে সদা মনােহর,
নখেন্দু কিরণে অপূর্ব সুন্দর।
দেবেন্দ্র যােগী চিন্তিত আকৃতি,
পূর্ণব্রহ্মরূপ এহেন মূরতি ।
লীন হয়ে যাই ও রাঙ্গা চরণে,
একান্ত বাসনা জীবন ধারণে ॥
বৃন্দা।
ওগাে মহামায়া, ছাড় ছাড় মায়া, কর দয়া কৃপা করি।
তুমি অদ্যা শক্তি, অনাদ্ধা প্রকৃতি, ইচ্ছাময়ী ও কিশােরি

বৃন্দা।
কিরূপে কখন, মহিমা স্থাপন, জগতে প্রকাশ কর।
অনন্তরূপিণী, ত্ৰিতাপ হারিণী, ধ্যানে নাহি জানে হর।
কোটি বিশ্ব হয়, ইচ্ছাতে উদয়, কোটিরূপে মায়া ধর !
কভু কৃষ্ণ কালী রাধা বনমালী, আধা নারী অধা নর।
কভু হর হরি, শঙ্কর শঙ্করী, আধা আধা রূপে আলো।
কভু গো পদ্মিনী, ভার নন্দিনী, শ্রীকৃষ্ণ সুঙ্গিনী ভাল।
ভক্তি স্বরূপিণী, ভক্তি বিধায়িনী, ভক্তিরূপ। বরাননে।
তারিতে জগত, হতে কৃষ্ণ গত, শিখালে জগত জনে ।
প্লাবিলে ভক্তিতে, প্রাণ ভিতরেতে, অমিয় অমৃত রসে।
ক্ষণ ভঙ্গু দেহ, বিশ্বনাথ গেহ, করে দিলে ভক্তি রসে।
দেহীদের মন, সম বৃন্দাবন, তুমি গাে করিয়া দিলে।
হেথা কৃষ্ণ ধনে, লইয়া গোপনে, বিহারিতে শিখাইলে।
উঠ চন্দ্রাননে, বস:পদ্মাসনে, গােবিন্দের বাম পাশে।
আশা পূর্ণ করি, হেরি প্রাণ ভরি, হরি প্রিয়া শ্ৰীনিবাসে ।
মরি কি যুগল রূপ,
ত্রিভুবনে অপরূপ,
নাহি হেম রূপ মনােহর।
এক রূপে রক্ষা নাই,
যুগল রূপের ঠাই,
নাহি ধরে ব্রহ্মাণ্ড ভিতর।
স্বর্গ মর্ত্য রসাতলে,
যেরূপ মায়ার বলে,
কোটিরূপে বিরাজিত হয়।
এই সে রূপের আদি, অনন্ত মহিমা বাদি,
যুগল রূপেতে উজলয়।

নিকুঞ্জলীলা।
-
অপরূপ মনোহর,
হেরি স্যাম কলেবর,
নবজলধর জ্যোতি তায়।
কোটি চন্দ্র জিনি শােনা, শ্ৰীমতী বরণ আ,
শ্যাম বামে আরো শোভা পায় ।
যাহারে দেখিতে চায়, নয়ন বাঁধিয়া যায়,
ফিরে নাহি ধায়, অন্য পানে।
যদি দেখে শ্যাম চাদে, পড়ে যায় সেই ফাঁদে,
আর নাহি চায় রাধা পানে।
কেবল আলোক প্রায়, শ্যাম বামে দীপ্তি পায়,
এইরূপ হয় তব মনে।
রাধা মুখ নিরখিত, ভুলে যায় জন্ম মতে,
স্থির হয়ে কৃষ্ণ সুধা পানে।
রাধা পানে যদি চায়, দুই হস্ত নেত্রে দেয়,
তবে দেখে, কমলা বদন।
কম এ মর্ত্যধামে, আবিভূতা রাধা নামে,
জ্যোতি তঁার ব্যাপ্ত ত্রিভুবন।
রাধা রূপ নেহারিলে,
নীল কাস্তে যায় ভুলে,
এ যে রূপ রূপের ঈশ্বরী।
পদ নখ শশী তঁার,
কমল চরণধার,
রূপ তঁার, বিশ্ব মুগ্ধকরী।
ভক্তের বাসনা জানি, তাই কৃষ্ণ কমলিনী,
অাধা রাধা আধ। বংশীধারী।
দুইরূপ এক হয়ে, ভক্ত বাঞ্ছা পূবাইরে,
ভক্তাধীন খোলেন হরি।

দেবগণের আগমন। দেবগণের আগমন। প্রকৃতি আনন্দ ভরে, লইয়া জগদীশ্বরে, বৃন্দাবন আজি শোভমান। ব্ৰহ্ম। আদি দেবগ, হেরিতে ( চঞ্জানন, ধরা ধামে হলো দীপ্তিমান ॥ ছাইল বিমান পথ, আলোকে উজিল রখ, জ্যোতির্ময় মূরতি সুন্দর। নবেদিত দিনকর, শতপূর্ণ-শশধর, চারিদিকে অতি মনােহর ॥ নামিল দেবেন্দ্র লয়ে, যত দেব, সবিস্ময়ে, করবোড়ে সম্মুখে দাঁড়ায়। বহিল মার বায়, সর্গ যাহে মুগ্ধ পায়, মৰ্ত্ত যেন হলো স্বর্গ প্রায় ॥ কর যোড় করি তারা, বলে মাগাে মাগাে তারা, আজি একি অপরূপ হেরি। অাধা রাধা আধা হরি, কিছু গো বুঝিতে নারি, কার মম তুষিলে শঙ্করি। অমর চরণ দাস, পূরালে কি মন আশ, বুঝিলাম মাগো তোর মন। যেই রাধা সেই হরি, সেই গাে তুমি শঙ্করী, দেখে ভ্রম ঘুচিল এখন। তুমি মা প্রলয়কালে, ভাসিয়াছিলে গো জলে, অনন্তরূপিণহামায়া।

নিকুঞ্জলীলা। . ব্ৰহ্মা বিষ্ণু শিবে তব, সৃজিলে নিজ প্রভাবে, তিনগুণ প্ৰ'ভদ করিয়া । সত্ত্ব রজ তম তবে, তিনরূপ ধরি ভবে, মহাতপে আবিষ্ট হইল । তুমি তবে মহামায়া, ধরিয়া গাে শব কায়া, পচা গন্ধে করিলে কিল। পচা গন্ধ পেয়ে হায়, বিষ্ণু তবে উঠি যায়, বিধিও ফিরান তার মুখ। মহেশ্বর পেয়ে ঠাই, মহা সুখ গণি তাই, মুখে বসে না হয়ে বিমুখ। পরম পুরুষ তিনি, পরম প্রকৃতি তুমি, তোমা হতে উদ্ভব সকল। স্থল জল তবে করি। ওগো মা তুমি শঙ্করী, স্বর্গ মর্ত্ত সৃজ রসাতল । তোমারু বিভূতি যত, প্রকাশিলে বিশেষত, সুষমা সৌন্দর্য্যে সাজাইয়ে। চন্দ্র সূৰ্য্য তারাগণে, দিলে জ্যোতি ফুলমনে, দিলে বল প্রভঞ্জনে লয়ে ॥ অগ্নিতে যে তেজ তব, দিয়াছ তা কিবা কব, তুমি জান তোমার সৃজন। আমরা মা বলি তােরে, পূজি কত জোড় করে, সন্তানে মা করনা হেলন। ছিলে শামা হ'লে শ্যাম, শিবেরে লইলে বাম, করি নাই তাহারে তুষিলে।

দেবগণের আগমন।
।
কে বুঝে তােমার মায়া, কভু পতি কভু জায়া,
নাহি পাই জ্ঞান বুদ্ধি কোলে।
যেরূপ ধরনা কেন,
দেখ মা সন্তানে যেন,
নাহি ক’র বঞ্চনা কখন।
তোমার চরণদ্বয়
দেখ সে এ হৃদয়,
নাহি ভুলে ত্যজিয়া জীবন ।
নেহারি এ হেন,
মূলতানী-জলদ একতালা।
প্রাণ গারে! মন গারে।
যুগল মিলন,
যাহা না স্বর্গে হেরে ।।
বল হরি, রাধা হরি
গ। রসনা হৃদয় ভরি।
ধরা পুরী স্বর্গ পুী পাবি একাধারে।
ভাসিবি সুধা-সাগরে, ধরিবি হৃদে তারে।
অষ্টম সর্গ সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nikunja-lila

Author
Bandhopadyay,amritalal
Title
Nikunja-lila
File name
Nikunja-lila
Text
OCR done
Citation
1897
Published
2009/10/24
Publisher
Amritalal Bandhopadyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
106
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Nikunja-Lila
DLI number
512994
Barcode
4990010020014.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
59wj4HK3rWk
Download PDF

Nikunja-lila