Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kabya-kana
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কাব্য-কণা।
পুলিনবিহারী দত্ত
বিরচিত
সুর নাই, তাল নাই, নাহি মুণ্ডু মাথা,
এলাে মেলাে কতকগুলো পাগলের গাথা।
কত ভাব উঠে মনে, টুটে যায় পরক্ষণে,
জলের বুদ্বুদ প্রায়, হায় রে বিধাতা।
আপনা আপনি হাসি, কভু আঁখি-জলে ভাসি,
লিখে যাই যাচ্ছে তাই বেড়ে যায় খাতা।
কলিকাতা
১৩১৬ সাল।
সুলভ প্রেস যোড়াসাঁকো, কলিকাতা।
উৎসর্গ।
চিরারাধ্য
স্বর্গীয় পিতৃ-চরণ-কমলেষু
কোথা তুমি পিতা মহাশয় !
চরণে শরণ চায় অযােগ্য নয়।
যার বিদ্যা শিক্ষাতরে, কত অর্থ অকাতরে,
কত যত্ন, কত শ্রম করেছিলে ব্যয়।
অধমের ভাগ্যফলে, সকলি পড়েছে জলে,
শিখাতে অক্ষম জড়ে, গুরু বিদ্যালয়।
দুরন্ত চরিত্রে যার, ব্যতিব্যস্ত পরিবার,
উত্যক্ত বিরক্ত যত প্রতিবাসীচয়।
সমযােগ্য সঙ্গী সনে বিগর্হিত আচরণে
উপেক্ষা করিত যেই শাসনের ভয়।
যাহার শােধন তরে, কঠোর শাসন করে,
ঘৃণা ক্ষোভে তব মুখ হােতো অশ্রুময়।
উল সংসার মাঝ, পড়ি সে পামর আজ,
পরিত্রাহি ডাকছাড়ে, জর্জন হৃদয়।
যােড়-করে ভিক্ষা চায়, তুমি কোলে লও তায়
দেহ সনে ঘুচে যাক জ্বালা সমুদয় ।
নিবেদন।
ভাগ্যদোষে লেখক ক্ষীণদৃষ্টি, নানাস্থানে বর্ণাশুদ্ধি
রহিয়া গিয়াছে। পাঠকগণ সে টী মার্জনা করিবেন কি ?
কাব্য-কণা।
পৌরাণিক।
ফুলদোল ।
চামেলি, চম্পক, বেলা, যুথিকা, বকুল,
মালতী, মল্লিকা আদি ফুটে কত ফুল।
বৈশাখের পূর্ণিমায়, কৌমুদী মাখিয়া গায়,
হাসে ধরা রসে ভরা সৌরভে আকুল।
ফুল্লমুখী রাধা সনে,
দোলে শ্যাম ফুল্লমনে,
ফুলে ফুলে পড়ে ঢলে, কি শােতা অতুল।
ফুলের বাজু ফুলের বালা, ফুলের নূপূর ফুলের মালা,
ফুলের অঙ্গ ফুলে ঢাকা, ফুলে বেড়া চুল।
ফুলের আসন ফুলের ভূষণ, ফুলে ভরা কুঞ্জকানন,
ফুলবাস ছড়ায়ে পবন, উল্লাসে ব্যাকুল।
ও যুগল শােভা হেরে, যুড়িয়া যুগল-করে,
যুগল চরণ সেবা চাহে এ বাতুল।
২
কাব্য-কণা।
। "
জামাইষষ্ঠী
.
জষ্টি মাসে ষষ্ঠীবাটা জামাই আসবে ঘরে,
গৃহিণীগণ মনের মতন কতো আয়ােজন করে।
কেউ আছে আমকাঠাল, কেউ সাজাচ্ছে বাটা,
কেউ ভাজছে লুচি কচুড়ি, কেউ বাঁধছে পাঠা ।
কেউ কিনছে মণ্ডামিঠাই, কেউ বা আনারস,
ভাবছে সবাই কিসে জামাই থাকবে মেয়ের বশ।
কেউ পরাচ্ছেন গহনাগাটী, কেউ সাজাচ্ছেন বেশ,
কেউ দিচ্ছেন আতা সিন্দুর, কেউ বাঁধছেন কেশ ।
জামাই বাবু হবে কাবু ভ্যাবাগঙ্গারাম,
দেখলে মেয়ে শােলাম হয়ে রবে অবিরাম।
মনমজাননা প্রেমগজাননা যার যা কিছু আছে,
ছুড়িগুলাে শিখছে সে সব বুড়িদের কাছে।
ছিটে ফোটা যে যা জানে কর্তেছে সবাই,
শাশুড়ীদের তন্ত্রে মন্ত্রে বলিহারি যাই। ২
দশহর।
সুরধনি! বিশ্বপাত। বিষ্ণুর চরণে,
সংগীতে জনম তব ভূভার হরণে।
প্রজাপতি কমুগুলে,
ধরিলা পবিত্র বলে,
মৃত্যুঞ্জয় শিরে বাস জটা আভরণে।
হিমাচল আলিঙ্গিয়া, কত দেশ প্রবাহিয়া,
কলনাদে ধাও মাগাে সাগর মিলনে।
তুমি মা সলিলাকারা, প্রেমের পীযুষ ধারা,
উর্বরা এ বসুন্ধরা তােমারি প্লাবনে।
পৌরাণিক।
৩
.
অশেষ মলনাশিনি, পতিত-জন-তারিণি,
পূণ্যময় তাের কোলে না ডরি মরণে। ৩
স্নানযাত্রা।
(ওই)
'?
মাহেশে কে স্নানযাত্রা দেখতে যাবি আয়,
সােণামুখী পানসী খানি নাচতেছে গঙ্গায়।
চেপে ধরে হাল, তুলে দেন পাল,
দাড়ি মাঝি সবাই আজি হাসিভরা গাল,
( আবার ) ঊজোন বেয়ে ছুটবে ধেয়ে দক্ষিণে হাওয়ায়।
কত বজরা, কতত বােট, কতত ইষ্টিমার।
বামুন, কায়েত, বদ্যি, বেনে, কৈবর্ত, ছুতার,
ঘসে মেজে বাবু সেজে ফুর্তি কততা তায়।
কেউ খাচ্ছে সিদ্ধি, চরস, কারাে গাঁজায় দম
হুইস্কি সেরি ব্রাণ্ডি খাটী, কেউ টানছে রম,
কেউ গড়িয়ে কুপােকাত ভরপুর নেশায়।
(কতত) পদি খেদী বিদু নেদী মিতিন গঙ্গাজল
বাবুর সঙ্গে রসঙ্গে ভাবে টলমল
( আবর) গাচ্ছে মধুর বাজছে ঘুমুর আলতা মাখা পায়।
কোথায় মাহেশ কোথার ঠাকুর কেই বা করে খোঁজ
হাটের মাঝে হাঁড়ি ভেঙ্গে ঘুর্তেছে মগােজ ;
( আবার) কে কত বেহদ্দ বখা জানান দিতে চায়।
বাহিরেতে চকচকানি ভেতর ভরা খড়ে
হদ্দো হলাে হিন্দুয়ানি এদের হাতে পড়ে ;
( মিছে)ব্যাখ্যা করে বােলবাে কত বােঝ ইসারায়। ৪
;
বার)
৪
কাব্য-কণা।
-
রথযাত্রা।
ছেড়ে যেওনা শ্রীপতি,
সকাতরে যােড়করে করি হে মিনতি,
আঁধার করে ব্রজধাম, কোথা যাও হে ঘনশ্যাম ।
ব্যাকূল অবলা কুলে করিয়া দুর্গতি।
তুমি ধ্যান তুমি জ্ঞান, তুমি মান তুমি প্রাণ,
তুমি বিনা শ্রীরাধার নাহি অন্য গতি।
জীবন যৌবন কায়, সঁপিয়াছি তব পায়,
ক্ষণ না দেখিলে তােমায় মরিবে শ্রীমতী।
আমরা লুটাই পথে, চালাইয়া দাও রথে,
ব্রজাঙ্গনাগণে দোলে তবে কর গতি। ৫
রথ রাখ, রথ রাখ হরি, ব্ৰজ ছেড়ে কোথায় যাবে ?
গােকুলে অকুলে ফেলে, বলাে নাকি সুখ পাবে।
অক্রুর নিঠুর অতি, লয়ে পলায় ব্রজপতি,
ব্রজবাসীর কি দুর্গতি বারেক তা নাহি ভাবে।
কাদে সখী, কঁদে রাধা, কাদে নন্দ মা যশো,
সখা বলে রাখালগণে বলনা কার মুখ চাবে। ৬
পুনর্যাত্রা।
ওই যায় যায় শ্যামরায়,
ফিরাইতে প্রাণনাথে কে কে যাবি আয়।
বঁধুরে ধরিয়া বুথে, ফিরাইব অর্ধ পথে,
গলেতে অঞ্চল বাঁধি, লুটাইব পায়।
* -
পৌরাণিক।
৫
জানি কি অপরাধে, ভাঙ্গিয়া প্রেমের বাঁধে,
ব্রজ ছাড়ি ব্ৰজপতি পলাইতে চায়।
একি দেখি কপাল ম. মা যশােদা, পিতা নন্দ,
কেহই কি না পারিল নিবারিতে তায়।
মাঠে গােঠে সহচর,
অভেদাত্মা হরিহর,
ব্রজবালকের। আজি রহিল কোথায়।
যদি না ফিরাতে পারি, সখি লো চরণে তঁারি
তরি নাম গান করি, ত্যজিব এ কায়। ৭
ঝুলন যাত্রা।
ঘন গুরু গুরু গরজে বারিদ
মৃদু ঝুর ঝুরু ঝরে বারি ধারা।
আঁধার যামিনী উজলা করিয়া
হাসিছে দামিনী পাগলিনী পারা।
কি শােভা শ্রবণে আজু কুঞ্জবনে
ঝুলিছে ঝুলনে, শ্যাম রাধাসনে,
লকিত মনে গায় সখীগণে,
করে দিয়া তালি, প্রেমে মাতােয়ারা।
ব্রজাঙ্গনা মন হরণ করে হরি
ভূবন মােহন বাজায় বাঁশরী
শুনিয়া সে রব যমুনা-লহরী
বিলােল কল্লোলে হােললা দিশেহারা।
বিপুল পুলকে ময়ুর ময়ূরী-
কাব্য-কণা।
ছড়ায়ে কলাপ বিকাশে মাধুরি
ঘন কেকা রবে নাচে ফিরি ঘুরি ;
মৃগ-মীনগণ চেতনা হারা।
সুমঙ্গল ধ্বনি করিছে চাতকী,
ছড়ায় সৌরভ কদম্ব কেতকী,
ভাবে গদ গদ এ শােভা নিরখি
বিভাের ভক্তের নয়ন তারা। ৮
জন্মাষ্টমী ।
ভাদ্রমাসে কৃষ্ণপক্ষে নিশাঘাের অন্ধকার,
দৈবকীর কোলে শিশু আলাে করে কারাগার
নবীন নীরদ প্রায়, চতুভূজ শ্যাম কায়,
শ্রীচরণে শশাভা পায় বজাঙ্কুশ পতাকার।
ভক্তি গদগদ স্বরে, বসুদেব স্তুতি করে
পুলকে লােচন ঝরে, ঘুচেছে শৃঙ্খল ভার।
সাধুরে করিতে ত্রাণ, দণ্ডিতে দুষ্টের প্রাণ
যুগে যুগে ভগবান অবনীতে অবতার। ৯
।
বল বল বসুদেব কারে তুমি কর পার ?
ও ছেলে সামান্য নয় গাে ভবার্ণবে কর্ণধার ।
আগে মায়া শিবা ধায়, অনন্ত পশ্চাতে যায়
আনন্দেতে আন্দোলিত কাল জল যমুনার।
অলীক মায়ার বশে,
মুগ্ধ হয়ে স্নেহ-রসে
জগত জকে কেন পুত্র ভাব আপনার?
পৌরাণিক
৭
আজিকে কংশের ভয়ে, পলাইছ যারে লয়ে
একদিন তার হাতে ভারত হবে উদ্ধার।
পাষণ্ড মণ্ডল দলে, কুরুক্ষেত্র রণস্থলে
ধৰ্ম্মের মাহাত্ম্য গীতায় করিবেন সুপ্রচার। ১০
নন্দোৎসব।
কি আনন্দ পােপবৃন্দ আজু নন্দ-ভবনে।
শ্রীগােবিন্দ মুখচন্দ্র হেরি যুগল নয়নে।
আমােদে উন্মাদ প্রায়, কেহ নাচে কেহ গায়
কেহ দধি হরিদ্রায় মাখাইছে যতনে।
কেহ মাখে কাদামাটী, গণ্ডগােল হুটোপাটী
অগুরু চন্দন বাটি ছড়াইছে সঘনে।
নাহি লজ্জা নাহি ত্রাস, আলুথালু ভূষাবাস
রামাগণ সঙ্গে তার, হুলুধ্বনি বদনে।
বাজে করতাল খােল, উচ্চনাদে হরিবােল।
এ উহারে দেয় কোল বিগলিত বসনে। ১১
রাধাষ্টমী।
কনক-কমল-দামে বালার্ক-বরণী।
কৈও বামা নিরূপ ভূবনমােহিনী।
ঘাের মায়াজালে যার, বিজড়িত এ সংসার,
অনাস্থা প্রকৃতিরূপা রাধা বিনোদিনী।
মধুর প্রেমের রসে, ভুলাইলা হৃষীকেশে,
আরাধিকা শ্রীরাধিকা ইন্দুনিভাননী।
হেন কন্যা কোলে আজ, ধন্য বৃষভানু রাজ,
ধন্য হােলো বংশ তাঁর, ধন্য এ ধরণী। ১২
}
••
৮ কাব্য-কণা। ষষ্ঠী আগমনী। বিলম্বে কি কাজ, যাও গিরিরাজ । এনে দাও আমার পরাণ পুতলী। সম্বৎসর গত মুখে কব কত মরমে গুমুরে যে জ্বালায় জ্বলি। উমা যে আমার সরলা ললনা ভাল মন্দ বাছা কিছুই তাে জানেনা ভিখারির ঘরে দারিদ্র যাতনা সবে সে কেমনে-বােঝত সকলি । ভূষণ দূরে যাক, অশন বসন- পায় কি না বাছা জানি না কেমন ; তুমি তাে পাষাণ ভাবনা কখন, মার প্রাণ পােড়ে, তাই তােমায় বলি। সবে মাত্র কন্যা উমা যে আমার বুক চেরা ধন, সংসারের সার, তাই তােমায় যেতে বলি বারবার, কোলে এনে দাও সােনার কমল ক।ি ১৩ সপ্তমী। শারদ সপ্তমী ঊষা গগণেতে প্রকাশিল, দশ দিক আলাে করে দশভূজা মা আইল। কখন আসিবে মেয়ে, ছিলাম তার-পথ চেয়ে এস যাই আনি ধেয়ে হৃদি কমল বিকশিল।
পৌরণিক।
ধূপ দীপ গঙ্গাজল, আম্রশাখা, বিশ্বদল,
পূর্ণ ঘটে সুমঙ্গল, রম্ভা তরু দ্বারে দি লল।
সিংহ পৃষ্ঠে ভবরাণী, গুহ, গজানন, বাণী,
সঙ্গে লয়ে নারায়ণী, বিজয়া জয়া দাসী লল।
চণ্ডীপাঠে শুদ্ধ হিয়া, শঙ্খ ঘণ্টা বাজাইয়া,
চল সখি হলু দিয়া, বরণ করে মা আনি লাে। ১৪
বসরে অসুর তাই, কত জন্ম পুণ্যফলে-
পেয়েছিস আশ্রয় তুইরে জগদম্বার পদতলে।
দেব দেব যা বুকে ধরে,
বিরিঞ্চি যা বাঞ্ছা করে,
হেন পদ রত্ন তােরে, দিয়েছেন মা অবহেলে।
বাঁধ। মায়া নাগপাশে, দুর্ভাগ্য কেশরী-গ্রাসে,
আমি যে রে তােরি মত, বুকে ধরি শােক শেলে।
এক দৃষ্টে মার পাণে, তাকাই কাতর প্রাণে,
তবু তাে মার হয় না দয়, এ জীবন গ্যালাে বিফলে ।
লােকে চোরা বলে তােরে, বলনা কি তপস্যা জোরে ,
অভয়ার করুণা চুরি কণ্ঠে পারি কি কৌশলে ? ১৫
( অষ্টমী)
হের হের গিরিবর তমােহরা তারা ওই।
মহিষ-মর্দিনী রূপে বিরাজে মা ব্রহ্মময়ী।
দশভূজা দশ করে, দশ প্রহরণ ধরে,
নুজ দলন তরে চামুণ্ডা জগত জয়ী।
কাব্যকণা।
দুর্গে দুঃখ বিনাশিনী, ধন বিদ্যা প্রদায়িনী,
অভয়ে সুখ দায়িনী, আদি অন্ত পাই কই।
সুরাসুর নাগ নরে, যােড় করে স্তুতি ক'রে,
এসে গিরি ভক্তিভরে চরণে শরণ লই। ১৬
( নবমী)
যেওনা নবমী নিশা কাদায়ে এ দুখিনীরে।
তুমি গেলে প্রাণের উমা কৈলাসেতে যাবে ফিরে।
কতই না সাধনা করে, পেয়েছি তিন দিনের তত্নে,
কত আশা হৃদে ভরে রেখেছি তা কবো কিরে ।
কি খাওয়াই, কি পয়াই, সদাই আমি ভাবি তাই,
হৃদয় সুস্থির নাই, কিসে তুষি তারিণীরে।
না পুরিতে সাধ মাের,
এ কিরে বিপদ ঘাের,
যামিনী যে হয় ভাের, তাই ভাসি অাঁখিনীরে । ১২
বিজয়া দশমী
নিতান্ত যাইবি যদি বল মা ফিরে আসৃবি কবে,
তারে না হেরিলে উমা এ দেহে কি প্ৰা রবে।
কত জন্ম পূণ্য ফলে, পেয়েছি মা তোরে কোলে,
কঠিন হয়ে যাবি চলে, মা বােলে আর কে ডাকিবে।
তিরপিত নহে অখি, দেখিস্ বাছা দিনি ফকি,
দেখা দিস্ মা হৃদে থাকি, তারা বলে ডাকবাে যবে।
বিশ্বরূপা তুই মা তার, জগদ্বাপ্তা শিবদার,
মেয়ে হই মা জ্ঞানহারা, এ মােহ কি ঘুচাইয়ে। ১৮
পৌরাণিক
১১
( হরগৌরী)
রজত-ভুধর কোলে হের উমা আলাে করে।
সঙ্গে লয়ে বাণী, রমা, ষড়ানন, লম্বােদরে।
শৃঙ্গা আর ডমরু করে, বৃযত বাহনােপরে,
ভূজঙ্গ ভূষিত ভােলা, কটি ঢাকা বাথাম্বরে।
কোটি শশধর জিনি, মাঝে মা বিশ্বজননী,
সলজ্জ বালিকা যেন মৃদু হাসি বিম্বাধরে।
মহিষমর্দিনী রূপে, ভয়ে যে মা প্রাণ কাপে,
হরগৌরী শান্ত মূর্তি, মনের তিমির হরে।
ভিক্ষা চাই মা যােড় করে, বাঙ্গালার ঘরে ঘরে ।
এমতি শান্তির কান্তি বিরাজে ম নারীনরে। ১৯
হের আজ গিরিরাজ কি শােভা ভবনে।
গিরিজারে লয়ে ভােলা বলদ বাহনে।
সরস্বতী পদ্মাবতী, কার্ত্তিক আর গণপতি,
চৌদিকে বেষ্টিত দেখ কত দেবগণে।
স্বস্তির সিন্দুর শাখা, পূর্ণ কুম্ভে আম্রশাখা,
রাঙ্গাসাটী চঁাদমালা নানা আভরণে।
বি জবা গঙ্গাজল,
চণ্ডিপাঠে সুমঙ্গল,
• জয়দুর্গা বলে হােম কর হুতাশনে। ২০
ঐ এলে হরপাৰ্বতী গিরিপুরী আলাে করে।
কার্ত্তিক গণেশ লক্ষ্মী, সরস্বতী বীণা ধরে।
১২
কাব্য-কণা।
পূর্ণঘটে গঙ্গাজল, আম্র-শাখা, বিশ্বদল,
হুলুধ্বনি, শঙ্খঘণ্টা বাজানাে প্রমােদ ভরে।
জ্বেলে দে হােমের কাঠ, শুদ্ধ মনে চণ্ডীপাঠ,
নৈবেদ্য বরণডালা সাজিয়ে দে না থরে থরে।
শখা সাড়ী সিন্দুর দিয়ে, আরতি চামর লয়ে,
পূজিব জামতা মেয়ে, এলাে সংবৎসরের পরে। ২১
কোজাগর লক্ষীপূজা।
ঘুমুনে ভাই খেলনা পাশা দেখনা খাসা চাদ উঠেছে ।
বর্ষা গেছে ফরসা হয়ে, চারিদিকে ফুল ফুটেছে।
ক্ষেতেতে ফলেছে ধান, পােহাবারাে মারবো দান,
নেচে গেয়ে রাত কাটাবাে, মনের মতন লােক জুটেছে।
গােলা খামার মড়াই ভরে, লছমী মারে রাখবো ধােরে
সােণার বাংলায় ঘরে ঘরে হাসি খুসির বান ছুটেছে। ২২
শ্যামাপূজা।
নিষ্ক্রিয় চৈতন্য মাত্র পুরুষের বক্ষোপরে-
কে তুমি মা নাচো শ্যামা দিগম্বরী রঙ্গভরে?
সৃষ্টির আদর্শ সার, গলে নর-শিরাে-হার,
সর্বকর্মে সুনিপুণ কাঞ্চি বেড়া নর করে।
এক দিকে বরাভয়, সৃজন পালন হয়,
অন্য দিকে অসি মুণ্ড জগত ধ্বংসের তরে।
অহংকার রসনায়, রণববলে জানা যায়,
যােগ্যতমের উদ্বৰ্ত্তন জীবন সমরে।
.
পৌরাণিক।
ত্রিনয়নে তিন কাল, অনন্ত ও কেশ জাল,
সাংখ্যমতে তুমি কি মা প্রকৃতীর মূৰ্ত্তি ধরে? ২৩
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।
এস এস দাদা ভাই বােসস এ আসনে।
তােমার ললাটে ফোটা দিব শুভক্ষণে।
হরিদ্রা, চন্দন, চুয়া,
ধর ধর পান গুয়া,
ধান্য দূৰ্বা মাল্য লও প্রফুল্ল বদনে।
ভায়ের কপালে ফেঁটা, যমের দুয়ারে কাটা,
যমুনার প্রীতি বড় ভ্রাতার অর্ডনে।
সুখে বসি অন্ন খাও, দীর্ঘ পরমায়ু পাও,
এই ভিক্ষা মাগি সদা যমের চরণে। ২৪
জগদ্ধাত্রী পূজা।
অতসী কুসুম শ্যামা কে বামা কেশরী’পরে,
প্রমত্ত মাতঙ্গে মাতা হেলায় দলন করে।
স্থিরা সৌদামিনী প্রায়, স্নিগ্ধ জ্যোতির্ময় কায়,
পাপ তাপ দূরে যায়, মনের তিমির হরে।
শক্তিরূপা সনাতনী, নিত্যা, সত্যা, কাত্যায়নী
তুমি মা বিশ্বজননী, দয়া করে এ কিঙ্করে। ২৫
( অন্নকুট যাত্রা)।
নেহার নয়ন আজি কি আনন্দ বৃন্দাবনে।
অন্নকূটে মাতি ছুটে ব্রজাঙ্গনা জনে জনে।
!
১৪
কাব্য-কণা।
অধরে মধুর হাসি, বঁধে অন্ন রাণী রাশ,
শাক, সুক্ত, ভাজা পােড়া বাল, ঝােল চচ্চড়ি সনে।
রথে কতাে বড় পিঠা, পরমান্ন বড় মিঠা,
কচুড়ি, খিচুড়ি অম্ল, নানাবিধ আয়ােজনে।
সিঙ্গেড়া পকুড়ি পুরি, চাটনি, আচার ঝুরি,
নিমকি পাপড় ভাজা, দমে বাটা গােটা ধনে।
সন্দেশ, মিঠাই ছানা, খির, সর, দধি নানা
চ চুয্য লেহ্য পেয়, ভিন্ন ভিন্ন আস্বাদনে।
সাজাইয়া থরে থরে, দেখ রাধা দামােদরে,
ভােগ দিয়া ভক্তিভরে বিতরিছে ভক্তগণে। ২৬
রাসযাত্রা।
সুনীল আকাশে, শশধর হাসে,
কৌমুদী বিলাসে বিভাের মেদিনী।
যমুনার জলে, শশীলেখা জ্বলে,
মৃদু কলকলে গায় তরঙ্গিনী।
বিকচ-কুসুম স্তবক-লতায়
মণি রত্ন কত
জ্বলিছে পাতায়
কিবা ঝিকিমিকি চারু তারকায়
সেজেছে যামিনী।
এ সুখ নিশীথে, আজু বৃন্দাবনে
বিসতি শ্যাম ব্রজাঙ্গনা সনে
বাজিছে মুরলী
মিশিতেছে তায় নুপুর কিঙ্কিণী।
উজ্জ্বল মধুরে
মধুর নিস্বনে
পৌরাণিক।
জনে জনে হরি ধরি করে করে,
নাচিছে গাইছে প্রেমানন্দ ভরে,
আমারি ‘এ কান্ত একান্ত অন্তরে
ভাবে মুগ্ধা যত গােপ-সিমস্তিনী।
অনন্ত-সুন্দর, মদন-লাঞ্ছন,
পূত তীর্থাস্পদ, বিশ্ববিনােদন,
অসার সংসার ছার পরিজন,
নাহি চায় আর রাসবিহারিণী ।
সৰ্ব্বভূতে যিনি সদা বিরাজিত
বুঝিতে না পারি মায়ায় মােহিত
জ্ঞামনে কবে হবে উন্মিলিত
অনন্ত-সুন্দরে হৃদে লব চিনি। ২৭
কার্তিক পূজা।
কাঞ্চন লাঞ্ছন কান্তি ময়ুর বাহনে।
বিভূষিত বরবপু বিবিধ ভূষণে।
ছাতে নয়ে ধনুঃশর, তুমি নাকি শক্তিধর
দেব সেনাপতি, রক্ষা কর দেবগণে।
অমর-বন্দের ত্রাস, তারকে করেছ নাশ,
রুদ্র তেজে আবির্ভাব জন্ম হুতাশনে।
ছয় মুখে স্তনপান, বলদৃপ্ত তেজীয়ান,
সুগঠিত কলেবরে জিনেছ মদনে।
কাব্যকণা
চির ব্রহ্মচর্য রত, আজন্ম কৌমার ব্রত
কখনাে ভােলেনি মন, নারী-প্রলােভনে।
ভারতে তােমার মত, জনমে সন্তান যত,
বীর নারী এ সাধনা করে এক মনে। ২৮
পিঠাপাৰ্বণ।
ভােরের বেলা কন্কনে শীত গরম কাপড় গায়,
শিশুরা সব গঙ্গাস্তব বন্দমাতা গায় ।
মকর স্যাংরাণ পিঠে পাৰ্বণ বাঙ্গালীর ঘরে
গিন্নিবান্নি শশব্যস্ত চাল কোটবার তরে ।
নেয়েধুয়ে শুদ্ধ হয়ে ধুচুনি হাতে লয়ে,
ঢেশেলেতে ঢুকচেন সবাই এক জোট হয়ে ।
কেউ দিচ্ছেন কেঁকিতে পাড়, কেউ দিচ্ছেন সেকে,
কেউ দিচ্ছেন গুড়েতে জ্বাল নারকেল কুরি মেখে !
আলুপিঠে, সিদ্ধপিঠে, ভাজাপিঠে আর,
নলেন গুড়ে খিরের পিঠে আস্বাদ চমৎকার।
আস্কে ভাজা সরুচাকলি কতই প্রকার,
শীতের রেতে গরম খেতে তৃপ্তি রসনার।
ভাগ্যিমানের গিন্নি হাসে, অভাগা খায় গাল ;
পেটে খেলে পিঠে সয় জানি চিরকাল।
তাড়াতাড়ি কাজ সারি বাড়ি যাবার ধুম,
শ্যালডালে ঘরে নেবেনা, গিন্নির হুকুম। ২৯
পৌরাণিক।
১৭
শিবরাত্রি।
দেখরে নয়ন আজি কি শােভা কৈলাস থামে।
বসেছেন ধূজ টী ওইরে গিরিজারে লয়ে বামে।
শার্পলের চর্মোপরে, বিম্ব মূল আলাে করে,
জটাজুট বহি ঝরে গঙ্গাবারি অবিশ্রামে।
আধ চাদ শােভে ভালে, বব বম্ রব গালে,
নীলকণ্ঠ বিজড়িত মণিময় ফণী দামে।
পড়িয়া চরণ তলে, ভাসিছে নয়ন জলে,
উন্মত্ত অবােধ ব্যাধ শিব শিব শিব নামে। ৩০
দুমুঠো বেলের পাতা মিশাইয়া গঙ্গাজলে ।
ভক্তিভরে আপন করে খ্যাপার মাথায় দিব ঢেলে।
ভাঙ ধুতুরা সিদ্ধি গাঁজা, পেলে তুষ্ট ভুতের রাজা,
বােম্ ভােলানাথ বগল বাজা (এমন) দয়াল ঠাকুর অার কি মেলে।
চাইনে বিদ্যাবুদ্ধি জ্ঞান, চাইনে তপ জপ ধ্যান,
বিল্বপত্তর করে দান, তরে গেছে বেদের ছেলে। ৩১
শ্রীপঞ্চমী।
বসন্ত পঞ্চমী উষা পূৰ্বাকাশে বিকশিত।
শ্বেত শতদল মাঝে বীণাপাণী বিরাজিল।
মৃদুল মলয় বায়, কোকিল পঞ্চম গায়
কলস্বরে অলিকুল বীণা নাদে ঝঙ্কারিল।
প্রকৃতি সােহগে হাসি, ছড়ায় রূপের রাশী
নব পন্থবিত কত তরুলতা মুঞ্জরিল। ৩২
কাব্য-কণা
ওমা ছাড়লি পাগল করে (ওমা বাণি, বীণাপাণি গাে)
ছেড়া টানা সার করেছি (ও) তোর চরণ পাবার তরে
দারা সুত পরিবার, কতই বলে অনিবার,
তবু কেন কল্পনার, বেড়াই আঁচল ধরে ?
করলে রমার উপাসনা, মিলতাে কতাে রূপােসােণা,
ঘুচে যেত এ যাতনা, সুখে থাকতেম ঘরে।
বীণার ঝঙ্কার শুনে,
প্রকৃতির অন্বেষণে-
ধেয়ে বেড়াই বনে বনে, পেট কাঁদে, চোক ঝরে। ৩৩
দোলযাত্রা।
আনন্দ নিনাদে আজি মুখরিত বৃন্দাবন,
বসন্ত উৎসবে মগ্ন মত্ত ব্রজবাসীগণ।
সুচারু বসন পরি,
পিচকারি করে ধরি,
আবির গুলাব বারি, রঙ্গে করে বরিষণ
আমােদে প্রফুল্ল প্রাণ, নর নারী নাহি জ্ঞান,
আবাল বৃদ্ধ বনিতা উৎসবেতে নিমগন।
বেণু ভক্ষ করতাল,
বাজাইয়া তালে তাল,
নাচে গায় ছােটে লােটে, হাসিভরা চন্দ্রানন।
কমনীয় কণ্ঠ ফুটে, সঙ্গীত লহরী উঠে,
মাধুরী বাড়ায় তার কিঙ্কিণি কঙ্কণ ।
ঘর দ্বার পথ ঘাট, তরু লতা কুঞ্জ মাঠ,
আবিরে রঞ্জিত সব লােহিত বরণ।৩৪
পৌরাণিক।
minen
আবির মাখায়ে রাইকে কি শোভা বাড়াবে তার,
রাইয়ের বরণ তরুণ তপন কাচালােনা মানে হার।
রাইয়ের রূপে জগত আলাে, সকলেই তা জানে ভাল,
গােলাপে অলক্ত ঢেলে, (ছিছি) লােক হাঁসাইও না আর।
(তুমি) নিজের কালাে বরণ ঢেকে, রাঙ্গা হওগে আবির মেখে,
(তখন রায়ের) রাঙ্গা পায়ের যােগ্য হবে যা মাথায় ধরাে বারেবার।
}
-
আবির মেখে কালাে ঢেকে লাল করেছ অঙ্গ,
এখন তােমায় চেনা যে দায়, ও শ্যাম ত্রিভঙ্গ।
তখন ছিলে বংশীধারী, আজ করেতে পিচকারি,
কাচপােকার রূপ ধরেছে আরশুলা পতঙ্গ।
ভাল ফিরাতে তােমার মতন, ত্রিজগতে নাই কো দুজন
এ সংসারে ওলট পালট তােমারি ত রঙ্গ। ৩৬
অন্নপূর্ণা।
অষ্টমীর শশী ভাসে বিমল বসন্তাকাশে।
কেও কান্তিমতী রামা সে চাদের গৌরব নাশে।
স্বর্ণ সিংহাসনে স্থিভা, স্বর্ণ লজ্জাবতী লতা,
সােনার হাতে সােনার হাতা ভিক্ষা দিচ্ছেন কৃত্তিবাসে।
ত্রিলােক আকুল প্রাণে, চেয়ে আছে ওর পানে
ওমা কৃপা কণা দানে তৃপ্ত কর তাের দাসীদাসে ৩৭
কাব্য-কণা।
ঘণ্টাকর্ণ পূজা।
খুদে খুদে ছােক গুলি, মালকোছা মেরে,
ভােরের বেলায় নাছুদরজায় দাঁড়িয়ে লাঠী ধরে।
কানা কড়ি ছুতে হাঁড়ি, গােবর ছেড়াচুল,
নসুর সিদুর হলুদে কানি তায় ঘেটুর ফুল।
বাম হাতে পূজো, সাঙ্গ ধপাস্ লাঠীর ঘায়
খােস পাঁচড়া নিয়ে ঘেটু হচ্চেন বিদায়। ৩৮
চড়কপূজা।
চৈত্তির মাসে, চড়ক পূজো বছাের হােল শেষ,
চড়চড়াচড়, বাদ্যি বাজে, মাতিয়ে তুল্লে দেশ।
বামুন চামার কায়েত কামার শেকরা ছুততার মুটে,
গাজন তলায় সন্ন্যাস করে এক সঙ্গে জুটে।
বাবার কাছে সবাই সমান, জাতের বিচার নাই,
পৈতে বাধা বিপিত্তর গলায় দেছে তাই।
সিদ্ধি গাঁজা চরস তাজা কসে দিচ্ছে টান;
বােম ভােলানাথ, শিবে শিবব, খুলে গেছে প্রাণ।
কাটা বঁটি ঝুল ঝপ কতই মাথা চালা,
বাবার মাথায় দই চন্নন গঙ্গাজল ঢালা।
পুকুর থেকে চড়ক গাছটা আনলে টেনে তুলে,
খাড়া কল্লে মাচা বেঁধে সাজিয়ে ফুলে ফুলে।
পৌরাণিক।
কোমরেতে গামছা বেঁধে, রসি ধরে পাক,
‘দে পাক দে পাক’, বলে ঘন ঘন হক।
গলা কোমর পিট ফোঁড়া এখন গেছে উঠে,
তখন কতাে রক্তপাত হতে ক্ষতত ছুটে।
অসম্ভব লােকের ভিড় ঠেলে চলা দায়,
গােলাপিখিলি চানাচুড় বেধড়ক বিকায়।
টিন মাটী কাঠের খেলনা দোকানের জকি ভারি,
মাগী মিনসে ছেলে বুড়াে কিনছে সারি সারি।
হুটোপাটি ছুটো ছুটি মহা গণ্ডগােল,
সজনে খাড়া পড়ল ফেটে, হরি হরি বােল। ৩৯
অন্যান্য।
মধুর হাসি মধুর বাঁশী মধুর চোখে চায়।
মধুর তানে মধুর প্রাণে মধুর মধুর গায়।
মধুর বসন্ত রাতী,
মধুর চাদের ভাতি,
মাধুরী ছড়ান কত মৃদু তারকায়।
মধুর কদম্বতল, মধুর যমুনা-জল,
সুমধুর কলরবে লহরী খেলায় ।
মাধুরী মাখান ফুলে, মধুর মলয়ে দুলে,
মুগ্ধ মধূপ পুঞ্জ মধু যাচে তায়।
আয়লাে মাধবি ভাই, মধূবনে ত্বরা যাই,
মধুরিপু পদে গিয়া সঁপিব এ কায়। ৪০
২২ কাব্য-কণা বিহঙ্গ কূজনে, কেন বারে বার, নয়ন আমার- ফিরে ফিরে চায় ( ওই চাঁদ পানে ? নিকুঞ্জ কাননে, কার করৰ অনুভব কানে? বিকচ সুহাস, কমলের বাস, কার দেহ গন্ধ ভরি দেয় ঘ্রাণে ? কোমল সুধীর, মলয় সমীর কার সুকোমল স্পর্শ দেহে আনে? অমিয় ধারায়, রসে রসনায়, পুলকিত কায়, কার নাম গানে ? অনন্ত-সুন্দর, বিশ্ব-মনােহর শ্যাম নটবর জাগিছে প্রাণে। শুন সহচরি, আপনা পাসরি, দিবস শৰ্বরী থাকি তার ধ্যানে। ১ শ্যাম সাগরে যে ডুবেছে তার কিবা কলঙ্কের ভয় অন্তর বাহির রাধার শ্যাম গ্রাম শ্যামময় । জীব জন্তু লতা পাতা, সেই শ্যাম সূত্রে গাঁথা, জল স্থল চরাচর শ্যামেতে উদয় লর। রূপভেদে গুণভেদে, শ্যাম নাম গায় বেদে, ভক্ত বিনা কে বুঝিবে শ্যামের স্বরূপ পরিচয়। ৪২
পৌরাণিক।
রাধা মাধব রূপ মজিল পরাণ সই,
আমরা সবাই সেবাদাসী, জানি না সে চরণ বই।
জড়েতে চৈতন্য মেলা, প্রকৃতি পুরুষ খেলা,
রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা, বুঝিতে পারিলাে কই।
দেহ বৃন্দাবন মাঝে, মানস যমুনা আছে,
চিত্ত কুঞ্জ বােসস সেজে, যুগল শােভা হেরে সই।
প্রম, ভক্তি, ভালবাসা, মেহ, সখ্য, দাস-দশা,
সদা তাই করি আশা, অন্য অভিলাষী নই। ৪৩
চল সখি যাই অভিসারে।
দেখলো সজনি, গভীরা রজনী,
আবৃত মেদিনী, নিবীড় আঁধারে।
দিবাচর যভ, সবে নিদ্রাগজ,
আকাশের তারা, তঁার। মেঘাত,
জনহীন তাহে নিকুঞ্জের পথ,
সুমঙ্গল চিতু হের চামিধারে।
খুলে নাও সখি
মুখর
কিঙ্কিণী মেখলা ঘুচাও কটীর,
নীলাম্বয়ে দাও ঢাকিয়া শরীর,
গুরুজন যেন জানিতে না পারে ।
সুবাস কুসুমে গাঁথিয়াছি মালা,
অগুরু চন্দেনে মৃগমদ ঢালা,
কপূর তাম্বুলে সাজায়েছি ডাল,
খারে পূজিব চারু উপহারে।
মঞ্জীর,
২৪ কাব্য-কণা। une নিভৃত নিকুঞ্জে কদম্বের মূলে, বিষাদে মাধব, কালিন্দীর কূলে, ভুবন ভূলান বেণুনাদ তুলে, সঙ্কেতে দাসীরে, ডাকে বারে বারে। নবন্ধুি পিপাসী চাতকীর প্রায়, নবীন নীরদে নিরখিতে চায়, কায়া পিছে যায়, মন আগে ধায়, দ্রুত লয়ে চল অধীরা রাধারে। ৪৪ সখি! শ্যাম আমার। কলঙ্ক বলিয়ে ভেবনা সজনি, সে যে মাথারমণি, হৃদে অলঙ্কার। এ নশ্বর দেহ এ ছার জীবন- যার শ্রীচরণে করেছি অর্পণ ; তার কাছে কিবা গৃহ পরিজন, কূল শীল মান সকলি অসার। অনন্ত-সুন্দর, মদন-লাঞ্ছন, পূত তীর্থাস্পদ, ভূবন-রঞ্জন, আনন্দ-বিগ্রহ, নিত্য নিরঞ্জন, শ্যামকে চিনিবে হেন শক্তি কার ? লােক অপবাদে রাধা নাহি ডরে, রাধা কলঙ্কিনী, বলুক ঘরে ঘরে, ডুবে রব সই কলঙ্ক সাগরে, গতি মতি মুক্তি শ্যাম রাধিকার।
পৌরাণিক
দেহ সনে শুমমের সম্বন্ধ তাে নাই,
হৃদি পদ্ম মাঝে দেবতার ঠাই,
অখিল-প্রেমের মূরতি কানাই,
সগুণ নিগুণ, মুগ্ধ ত্রিসংসার।
সতীত্ব নারীর পরম রতন,
অসুখ, দুঃখ, ধৰ্ম্ম, আত্মা, কায়া, মন,
শ্যাম পদে সই দিয়া বিসর্জন,
আমিত্ব বিহীন হবে আপনার। ৪৫
মা ত্রিগুণ।
সকলি যে দেখি মা তাের বিপরীত কারখান? ।
ও তাের হেলা দোলা লীলা, খেলা বােঝাগেল না।
মেনকার জঠরে জন্ম, তাের যদি অন্তু কেউ জানে না।
পাষাণের মেয়ে তুই মা (কিন্তু) মূর্তিমতী করুণ!
পতির বুকে মারিস লাথি এ কেমন সতীপন।
ত্রিলােকের জননী হয়েও তুমি চির-যৌবনা।
কূলের কুমারী কেন রণমাঝে নগনা?
দৰ্বলােক আছিস্ ব্যেপে, তবু চখে দেখিনা।
কুবের তাের চরণ তলে, তুই ভিখারীর অঙ্গন।
(ও তাের) কালােরূপে ভূবন আলো, মনের কালাে থাকে না।
তাইতাে বলি ওমা কালি, কিছুই বােঝা গেল না। ৪৬
২৬
কাব্য-কণা।
ধন্য যিশু মেরী শিশু ঈশ্বর-নন্দন।
আদর্শ জীবন তব জগতপাবন।
ঘুচাইতে পাপ ভার, অবনীতে অবতার,
সহিষ্ণুতা ক্ষমাগুণে মােহিত ভূবন।
ভ্ৰাতৃভাব পরস্পরে, শিখাইলে নারী-মরে,
আত্মবৎ সৰ্ব্বভূতেষু, নীতির বচন।
‘প্রেম-ভক্তি বিনীতেন, তৃণাদপি সুনীচেন,
ভাগবত কৰ্ম্ম যােগে নিস্কাম সাধন।
আপন শশাণিত দিলে, জীবাধমে শিখাইলে,
‘তবােরিব সহিষ্ণুতা' বাক্য সনাতন।
নৃশংস ঘাতক তরে, নিজে ক্ষমা ভিক্ষা করে,
ক্ষমা গুণে পরাকাষ্ঠা কোথায় এমন ?
পবিত্র চরিত্র বলে,
পূজ্য তুমি মহীতলে,
মর্ত্য ভূমে ছড়াইলে, স্বর্গের কিরণ। ৪৭
শ
নেড়া মাথা, ছেড়া কাঁথা, নবীন যৌবন,
দীনবেশে দেশে দেশে ভ্রম কি কারণ ?
গৃহেতে বিধুরা দারা, শােকে মাতা আত্মহারা,
কোন দুখে গৃহ-মুখে দিলে বিসর্জন।
সুচারু কাঞ্চন কায়, কেন ধূলা মাখি তায়,
ভস্মেতে ঢাকিতে চাও দীপ্ত হতাশন।
জীবে দয়া নামে রুচি, যবনে করিলে শুচি,
পাপী তাপী তরাইলে অধম-তারণ।
আগনি আচরি ধর্ম, জীবেরে শিখালে মৰ্ম্ম,
কি মধুর প্রেমভক্তি, না-সংকীর্তন।
পারমার্থিক।
२१
জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী, ভক্তির পবিত্র বারি
তন্ত্র-দগ্ধ বঙ্গভূমে করিলে সিঞ্চন।
রাজা, রাজ-পারিষদ,
ছাড়ি রাজ্য, ধন-মদ,
তােমার চরণ তলে লইল শরণ।
কত না বৈষ্ণবগণে,
পাঠাইলে বৃন্দাবনে,
লুপ্ততী উদ্ধারিল রূপ সনাতন। ৪৮
পারমার্থিক।
তুমি না ডাকালে হরি, কে তােমারে ডাকতে পারে ?
মায়ার কুহকে পড়ি মত্ত আছি অহঙ্কারে।
অলীক ঐহিক রসে,
মগ্ন থাকি মােহ বসে,
ভাবি না কি হবে শেষে, কে তবে এ পাথারে
রােগ শােক মনঃক্লেশ, জাগায়ে দেয় উপদেশ,
যেমনি আসে অমনি শেষ, পুনঃ ডুবি অন্ধকারে।
ভক্তি শক্তি নাই আমার, কিসে ভবে হবাে পার,
কৃপায় কর উদ্ধার, এ পামর দুরাচারে। ৪৯
ওহে দয়াময় হরি-
আমার মন বােঝেনা কি করি, ?
সরল ধৰ্ম্মের পথে, যেতে চায়না কোন মতে,
অবিরত পাপে রত, তারি ফলে ডুবে মরি।
নাহি মাের পূণ্যবল,
ভরসা ঐ পদ কেবল,
অধম-তারণ তরাও যদি, তবেই তাে তরি। •
কাব্য-কণা।
এসেছি জগতে একা, একাই,আমি যাবাে চলে।
পাপ পুণ্যে সুখ দুঃখ ঘটে বটে কৰ্ম্মফলে।
জানি ধৰ্ম্ম পথ তায়, প্রবৃত্তি না যেতে চায়,
অধৰ্ম্মে নিবৃত্তি নাই, সেই পথে পড়ি ঢলে।
হৃদে থাকি হৃষীকেশ, যাহা দাও উপদেশ,
সেই মত ফিরি আমি, তৃণ সম ভাসি জলে। ৫১
মনে কর শেষের সে দিন শুভঙ্কর।
গঙ্গাতীরে পূণ্যনীরে মগ্ন অৰ্ধ কলেবর।
মুখে হরি হরি রব, শ্মশানে জ্বালাবে শব,
পাঁচে পঞ্চ মিশাইবে, দেহ হবে রূপান্তর।
জানি কায়া মিছে মায়া, পাত্র ভেদে রবিচ্ছায়া,
অনিত্য মিশাবে নিত্যে, কি হেতু কাতর। ৫২
।
কে তুই অনন্ত বিশ্বে ? ক্ষুদ্রকণা বালুকার ।
তবে কেন মনে তাের, আকাশ ষােড়া অহঙ্কার ।
জলেতে বুদবুদ উঠে, নিমিষে যাবিরে টুটে,
ধন, মান, পরিবার, কেবা তাের তুই কার।
আপন সন্ততি রেখে, চলে যাবি হেথা থেকে,
জীব হতে জীব-স্রোত, বহে অনিবার।
সদসত বৃত্তি যত, দেহী সনে হয় গত,
আমা যাওয়া অবিরত, এই মাত্র ভবে সার। ৫৩
পারমার্থিক।
he
মার বাছা মার কোলে যাই।
অলীক ঐহিক ভােগে সুখ কিছু নাই।
ধন, মান, যশ আশে, অৰ্দ্ধাসনে উপবাসে,
এ দেশ সে দেশ করে, কত আর কাটাই।
মিটেছে বিলাস তৃষা, ছুটেছে আশার নেশা,
তবে কেন মরীচিকার পাছু পাছু ধাই।
জীর্ণ দেহ ভেঙে যাক, পুড়ে মন হােক খাক,
স্বরগের সুখ ভােগ, তাও নাহি চাই।
অজ্ঞাত অনন্ত ধামে, মাতৃ ক্রোড় শান্তি নামে,
সংসার সন্তপ্ত প্রাণ যুড়াবার ঠাই। ৫৪
ওমা আমি যে তাের জংলা পাখী।
যেমন পেটের জ্বালায় পাখী চেঁচায়,
আমি তােমায় তেমনি ডাকি।
যখন য়ােগ শােক পরিতাপে, মন পােড়ে কি প্রাণ কাঁপে,
তখনি মা টা টা করি, খাবার পেলেই ভূলে থাকি।
সদা ভাবি অর্থ কাম, না শিখিনু আত্মারাম,
এ সংসারের দাড়ে বসে, মায়ার শেকল ঘুচবে না কি ?৫৫
বিধাতার কি চুলচেরা বিচার,
ধনী, মানী, মূর্খ, জ্ঞানী, কারও নাই নিস্তার।
সদসৎ যে যাহা করে, সদ্য কিম্বা যুগান্তরে,
ফল ভােগ এক দিন কৰ্তে হবে তার।
৩০
কাব্যকণা
সংসারে যাকিছু সুখ, সঙ্গে সঙ্গে আছে দুখ,
সুখে দুঃখে মেশামিশি যেমন আলাে সঙ্গে অন্ধকার। ৫৬
বিধি হে তােমার সৃষ্টি একি চমৎকার।
কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ, বুঝে ওঠা ভার
এক দিকে পূত-কায়া, প্রেম, ভক্তি, দয়া, মায়া,
সম-দুঃখ, স্বার্থ-ত্যাগ, পর-উপকার।
অন্য দিকে অবিরত, জীবন-সংগ্রাম কত,
হিংসা, দ্বেষ, স্বার্থ, লােভ, ঘৃণা, অহঙ্কার।
একত্র শশাঙ্ক রবি, আলােকে পুলক ছবি,
অমানিশা কালাে মেঘে, অন্যত্র আঁধার।
এ জগতে আবিরাম, তুল্য রূপে নিম, আম,
নিজ নিজ কার্যে রত, যাহার যে ভার।
যে যাহার বিপরীত, উভয়েতে সাধে হত,
ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া যােগে, চলে এ সংসার। ৫৭
কে জানে ভাই কেমন ঈশ্বর ?
দর্শন বিজ্ঞানে নাই সঠিক উত্তর।
সাকারবাদীরা যত,
নিজ নিজ মনন মত,
কল্পিত মুরতি কত, গড়ে মনােহর।
আত্মা, জ্যোতি, শক্তি, জ্ঞান, দর্শনের অনুমান,
সগুণ নির্ণদ্বৈত ভেদ বহুতর।
কি যে তিনি, কে বা জানে? যার যা বিশ্বাস প্রাণে,
সেই মত ঠারে দেখে, বিশ্ব-তাদের।
পারমার্থিক।
গায়িত্রী বলেন সার,
ত্রিভূবন নির্মাতার,
বরণীয় ভর্গ ধ্যানে, পবিত্র অন্তর।
সকল শাস্ত্রেতে কয়, সৎ চিৎ আনন্দময়,
মানবের ক্ষীণ বাক্য মনের অগােচর।
এই সীমা হয়ে পার, মানুষের জ্ঞান আর,
পারে নাই পারিবে না, (কভু) হ’তে অগ্রসর। ৫৮
ত্রিভূবনে দুঃখ নাই কার ?
অকারণ কেন রে মন করিস্ হাহাকার।
পূণ্য শ্লোক ধৰ্ম্মবীর, নলরাজা, যুধিষ্ঠির,
রাম, সীতা, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, যাঁরা অবতার।
স্বর্গবাসী দেবগণ, বিধি, বিষ্ণু, ত্রিলােচন,
এক সূত্রে সবে গাঁথা, কে পেয়েছে পার।
বদান্য বিশুদ্ধ-চিত্ত, আকবর, বিক্রমাদিত্য,
গ্রেট এলফ্রেড, কিম্বা বীর সেকেন্দার।
জগতে যে জন্মিয়াছে, হারি রে দুঃখ আছে,
আলস্য বিলাস দাস, আমি কোন ছার ?
তপ যপ যােগে রত, যােগী, মুনি, ঋষি যত,
ধার্মিক, পণ্ডিত, মূখ কারাে নাই নিস্তার। ৫৯
জ্ঞান, ভক্তি, কৰ্ম্ম যােগে ত্রিবিধ সাধন,
হােলল না কোনটা দিন গেল অকারণ।
কি করিতে এলেম ভবে, এ নেশা ছুটিবে কবে,
মায়াবশে মােহ পাশে বিষয়ে মগন।
৩২
কাব্য-কণা।
কামনার দাস তাই, ত্রিপে সন্তাপ পাই,
চরণে শরণ চাই, পতিত-পাবন।
অহংকৰ্ত্তা মােহ তম, কবে মাের যাবে প্রম,
সুখ দুঃখ তব পদে, করিব অর্পণ ? ৬.
ভকত বৎসল দেব তুমি তাে অন্তরযামী,
সকলি দিয়েছ তুমি, তােমারে কি দিব আমি?
আমি পাপী দুরাচার,
ভক্তি শক্তি নাই আমার,
বিষয় আসক্ত চিত, সতত কুপথ গামী।
নাহি মাের কোন ধন,
কি করিব সমর্পণ ?
সদসত কৰ্ম্ম-ফল, দয়া করে নাও হে তুমি। ৬১
কি কব মহিমা তব ওহে বিভাে পরাৎপর,
তােমার অনন্ত লীলা ব্যক্ত করে চরাচর।
তুমি সর্ব শক্তিময়, সৰ্ব্বব্যাপী সৰ্বাশয়,
মানবের ক্ষীণ বুদ্ধি বচনেরি অগােচর।
রবি শশী গ্রহ তারা, ধূমকেতু বসুন্ধরা,
তােমারি শাসনে শূন্যে ঘুরিতেছে নিরন্তর।
অনল অনিল জল,
গিরি নদী বনস্থল,
ক্ষুদ্র শিশিরের বিন্দু, কিম্বা সিন্ধু ভয়ঙ্কর।
পশু পক্ষী কীট নর, তৃণ লতা তরুবর,
সকলি তােমারি সৃষ্টি, জলে স্থলে শূন্যচর।
কি তােমার সুশৃঙ্খল,
জড় জীব তরুদল,
ও উহার সুমঙ্গল, সদাই সাধে পরম্পর।
মারমার্থকি।
আমার কি ক্ষুদ্র জ্ঞাম, কি করিব গুণ গান,
তােমারি প্রসাদে তােমায়, ডাকিতেছে এ পামর। ৬২
মা, মা, মা বলে, বিভাে, তােমায় ডাকি তাই।
মা বুলিটা মিঠে যত, বাবা পদে সেটা নাই।
শিক্ষা শাসনের ভয়,
জনক কাঠিন্য ময়,
আব্দার যে নাহি রয়, কাছে যেতে নাহি চাই।
লয়া মায়া সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, শান্তি পরিতা,
স্নেহ-প্রস্রবিণী মাতা, যাহা চাই তাহা পাই। ৬৩
ওমা, যেমন নাচাস তেমনি নাচি ।
আমরা যে তাের খেলার পুতুল মায়ার ডােরে বাঁধা আছি।
টানিস্ তুই মা যে ডাের যখন, ঘূরি ফিরি তেমনি তখন,
হাঁসি, কাদি, উঠি, পড়ি, তাের খেলায় মা মরি বাঁচি।
বেউ বা রাজা কেউ ভিখারি, কেউ বা পুরুষ কেউ বা নারী,
মৈন সাজাস তেমনি সাজি, পশু পক্ষী মশা মাছি।
আমরা কিবা শক্তি ধরি, তুই যা করাস তাইতাে করি,
অহং দাতা, অহং কৰ্ত্তা, সে জ্ঞানটা মা মিছামিছি।
ইচ্ছাময়ি তবে কেন--
জীবের সন্তাপ হেন ?
অবুঝ বালিকার মত, পুতুল করিস্ ছেচামেচি।
বল না মা তাের ইচছা হলে, হােতে না কি ধরাতলে,
সুখের অনন্ত ধাম মা, মােক্ষ ধামের কাছাকাছি। ৬৪
অন--
৩৪ কাব্য-কণা ও মা, কখন কি করিস কারে। কারেও হাঁসাস, কারেও কাঁদাস, কারেও ভােবাস পারাবারে। রাজপুত্র যায় মা বনে, রাখাল বসে সিংহাসনে, ইচ্ছাময়ি তােরি ইচ্ছায়, উঠি পড়ি এ সংসারে। তুই যে মা জগদীশ্বরী, ওমা তুই যা করাস তাইতাে করি, আমি আমার ভেবে মরি, মায়ার মােহে অহংকারে। সুখে কি দুঃখে থাকি, মা বলে যেন মা ডাকি, অনুক্ষণ ঐ রাঙ্গা চরণ জাগে যেন হৃদমাঝারে। ৬৫ ও মা, একি খেলা তাের- কারেও কর সাধু সুজন, কারেও ঠগ চোর। কেহ উদরান্ন তরে, পথে পথে কেঁদে মরে, কারাে টাকায় ছাতা ধরে, বিলাসে বিভাের। সবাই তাে মা তাের ছেলে, এ উহারে বাগে পেলে, কেন গাে মা পায়ে দলে, নিৰ্ম্মম কঠোর। হীনবল ক্ষীণকায়, প্রবলে সংহারে তায়, কেন জীবনের হায়, এ সংগ্রাম ঘাের। ৬৬ ওমা, কেন মা পাঠালি ভবে ? ও রাঙ্গা চরণে, বল গাে জননি, কি দোষ করেছি কবে। জীবন-সংগ্রামে কণ্ঠাগত প্রাণ, ভোগ তৃষ্ণা তবু নহে অবসান,
পারমার্থিক ।
৩৫
ছাড়ে না যে মাগাে দম্ভ অভিমান,
আত্ম-সুখে লুব্ধ আমরা যে সবে।
পূণ্যময় শান্ত পথে যেতে চাই,
ঘটনার স্রোতে কেন ভেসে যাই,
দুর্বল হৃদয় কেমনে এড়াই,
পাপ-প্রলােভন, বল করে যবে।
কেন মা করিলি ষড়রিপু দাস
মেটে না যে মাগাে সুখের পিয়াস,
কৰ্ম্মফল কি মা ? না বুঝি আভাস,
ইচ্ছাময়ী নাম কেন তাের তবে ?
কৰ্ম্মফলে কিবা তােমারি ইচ্ছায়,
জীব দেহ লয়ে এসেছি ধরায় ?
কীটাধম আমি, বিমুগ্ধ মায়ায়--
সে জ্ঞান জননি কভু না সম্ভবে।
ভুজঙ্গের মুখে কে দিল গরল ?
বুকে মধু ধরে কেন ফুলদল ?
এ বৈষম্য কেন ? কার কৰ্ম্মফল ?
পিক কাক কেন ডাকে ভিন্ন রবে ?
কোলে নে জননি, সহেনা যে আর,
চাহিনা মা তাের এ ছার সংসার,
নিভাইয়া দীপ দেগাে মা নিস্তার,
শান্তির শয্যায় ঘুমাব নীরবে। ৬৭
কাব্য-কণা।
nh
ভয়ে তৃণ, শেখারে আমায়,
তাের মতন সরল জীবন কিসে পাওয়া যায় ।
মাটিতে পড়িয়া রও,
নীরবে সকলি সও,
জীব জন্তদল তােমায় সদাই দলে পায় ।
পর উপকার তরে, দেহ দাও অকাতরে,
প্রচণ্ড আতপে ঢাকি, রাখ বসুধায়।
জীবন মরণে কেবা, তাের মত করে সেবা ?
কোমল শ্যামল রূপে নয়ন জুড়ায় । ৬৮
(ওমা) এভবের খেলা ঘরে কতই খেলব লুকোচুরি ।
পরের প্রাণে দাগাদিতে নিজের বুকেই লাগে ঢুরি।
ধন বংশ অভিমান, ভ্ৰান্ত গ্রন্থগত জ্ঞান,
অহঙ্কারে দম্ভভরে, মিছে বড়াই করে ঘুরি।
ভােগবিলাসী সৰ্ব্বনাশী, হাসিয়া বিকট হাসি,
অশেষ কলুষ রাশী হৃদয়ে দিতেছে পুরি।
দুর্ভাগ্যের ঝঞ্চাবাতে, বিপত্তির কশাঘাতে,
নিমেষে ভাঙ্গিয়া দেয় মা মানবের জারিজুরি। ৬৯
ওরে পাগল মন,
কেন কামিনী কাঞ্চন মিছে করিস আকিঞ্চন।
যে মজেছে কামের বাণে, যে ভেসেছে লােভের টানে,
অমৃত ভাবিয়ে তার রে গরল ভক্ষণ ।
পারমার্থিক। নশ্বর সুখেতে হায়, নিত্য-বস্তু ভূলে যায়, অলীক ঐহিক রসে থাকে সে মগন। রে মূঢ় অলীক ত্যজ, সৎচিৎ আনন্দে মজ, বিবেক বৈরাগ্যে কর, আনন্দ-সাধন। ৭০ কেমন কেমন করে কেন প্রাণ? বিদ্যা অধ্যয়ন, ধন উপার্জন, যশ অন্বেষণ, বিষ অনুমান। বুঝিতে না পারি কি খুজি কি চাই, বিষয় বিলাসে তৃপ্তি কিছু নাই, সংসার সাগরে ভাসিয়া বেড়াই- কাণ্ডারী বিহীন তরণী সমান। কি মহা উদ্দেশ্য সাধনের তরে, নরদেহ লয়ে আসি ধরা পরে ? আহার বিহারে, বৃথা কাল হরে- এ জীবন কে করি অবসান। তাই বলি মন হও সচেতন, ভােগ সুখ যত দাও বিসর্জন, নিৰ্ব্বিকল্প চিত্তে কররে সাধন, নিত্য নিরঞ্জনে, হয়ে সমাধান। ৭১ মােরবাে বলে কোরবাে কেন ভয়। অনিত্য এ দেহ মানি, আত্মা তো তা নয়। জীর্ণবাস পরিহরে, নূতন বসন পরে, দেহান্তরে রূপান্তর মৃত্যু তারে কয়।
কাব্য-কণা ।।
এ জগত নাট্যশালা, যার যতক্ষণ পালা,
সাজ ঘরে ফিরে যাবাে, হলে অভিনয়।
সরায়ে সরায়ে ঘুরে,
পান্থেরা যেমতি ফিরে,
মিলন বিচ্ছেদ তার মিথ্যা সমুদয়। ৭২
ওরে পাগল মন।
দুখ নৈলে কিসে পেতি সুখের আস্বাদন।
ক্ষুধা না থাকিতে পরে, খাদ্য দ্রব্য কি কাজ করে,
তৃষ্ণা আছে বলে তাই তো, জলের প্রয়ােজন।
আছে বলে অন্ধকার, তাইতে পাওর আলাের বাহার
রােগী বিনা কেবা বুঝে স্বাস্থ্য যে কেমন।
এক ঘেয়ে নিরবধি,
এ জীবন হােতে যদি,
সূধু মধু খেতে ভাল লাগে কতক্ষণ?
সৰ্বজ্ঞানী বিধাতার, এই সৃষ্টি চমৎকার,
চক্র সম সুখ দুখ ভ্রমে অনুক্ষণ। ৩
কেমন মা কে জানে ?
ছেলেটা ককিয়ে সারা ফিরে চায় না তার পানে
পাশের আঙ্গুল দিয়ে মুখে, মােহ-নিদ্রায় ছিলাম সুখে,
পাপ-মশা কামড়ে বুকে, অস্থির করেছে প্রাণে।
মহাঘাের এ সংসারে, একা পড়ে অন্ধকারে,
চেঁচাচ্ছি মা বারে বারে, শুনেও তাে শুনিনে কানে।
পুতিগন্ধি বিছানায়, পড়ে কাঁদি যাতনায়,
মুছিয়ে দিয়ে কোলে নে মা, শান্ত কর তাের শুন দানে। ৭৪
পারমার্থিক।
ওগাে মা, যা পাব না তা কেন মিছে চাই ?
যা পেয়েছি তাহে কেন পরিতােষ নাই।
মনোেমাঝে দুরাশার,
নিরবধি হাহাকার,
নিজে নিজে আপনার অশান্তি বাড়াই।
যত পাই তত লােভ, মিটেনা মনেয় ক্ষোভ,
অনলেতে ঘৃত ঢেলে, কেমনে নিভাই।
সদা খুজি শান্তি সুখ, আসে তায় তৃষা দুখ,
কেঁচো খুড়তে বেরােয় সাপ (মা) এ কিরে বালাই।
মানুষের পােড়া মন, তৃপ্ত নহে কদাচন,
কি মােহিনী মরীচিকার পাছু পাছু ধাই! ৭৫
বলো, বলল, বলো না আমারে,
কেন আলােকে কমল ফুটে, কুমুদ ফুটে অন্ধকারে ?
উভয়েরি স্কুলে বাস,
উভয়েরি ভূল্য অশ,
একের উদয় আয়ের নাশ, কার বিধি অনুসারে ?
তুল্য বর্ণ পিক কাক, কেন ডাকে ভিন্ন ডাক,
কেন হেন দুর্বিপাক নিত্য হেরি এ সংসারে ? ৭৬
ভেঙে দে মা এ দেহ পিঞ্জর,
উড়ে যাক প্রাণ পাখী মায়ার কিঙ্কর।
সহে না সহে না আর, ভােগতৃষ্ণা দুর্নিবার,
ভালবাসার অত্যাচার, দহে নিরন্তর।
সুব্ধ আশা মদীরায়,
তবু মৰ্ত মনাে ধায়,
সুখ লােভে দুখ পায়, পাগল অন্তর।
৪০
কাব্য-কণা।।
কত মা করি রােদন, খুলে দে মা এ বন্ধন,
দিতে চাই মা বিসর্জন, অনন্তে নশ্বর। ৭৭
---
দুখ না থাকিলে ভবে কে ডাকিত মা তােমারে ?
সম্পদের সুখ ভােগে ভুলে থাকি মায়ার ফেরে।
সদা খুজি নিজ স্বার্থ,
টাকাটাই পৰমাৰ্থ,
অহংকারে হয়ে মত্ত, কৰ্ত্তা কি আপনারে।
অশেষ কলুষ পাপে, রােগ শােক পরিতাপে,
কতই উপদেশ দেয় মা, ভূলে যাই তা বারে বারে।
বিষয়-বিমূঢ় বুদ্ধি, কিসে হােতে চিত্ত শুদ্ধি,
কিসে হয় চৈতন্যোদয় মা, দুখ বিনা এ সংসারে ? ৭৮
আমি তাই কাদি।
নিঠুর নিয়তি, কেন মাের প্রতি,
জনম অবধি এত প্রতিবাদী ?
ধৰ্ম্ম পথে রব সদা ভাবি মনে,
দূৰ্বল হৃদয় দুষ্ট রিপু সনে,
কেন পরাজিত হয় প্রতিক্ষণে,
বিনা দোষে কেন হই অপরাধী ?
বুঝিতে না পারি চক্ৰ বিধাতার,
প্রলােভনময় কেন এ সংসার ?
কর্মসূত্র কিবা অদৃষ্ট আমার
মােহ তত্ত্বনেত্রে রেখেছে আচ্ছাদি। ৭৯
পারমার্থিক ।
৪১
ধূলা খেলা সাঙ্গ হােললা যাই চলে ঘরে,
সঙ্গীরা সব একে একে গিয়েছে সরে।
রুগ্ন দেহ ভগ্ন প্রাণ, হােলাে দিবা অবসান,
অশা-লতার পাতাগুলি পড়েছে ঝরে।
ধন মান যশ লাগি, কত দীর্ঘ নিশা জাগি,
করিনু জীবন ব্যয় ক্লান্ত কলেবরে।
এখন জেনেছি সার, আলাের সঙ্গে অন্ধকার,
সুখ সঙ্গে দুখ মাখা সংসার ভিতরে।
ঢের হয়েছে কাজ নাই, ঘরের ছেলে ঘরে যাই
এখন ঘুমাতে চাই, চিতার উপরে। ৮০
হায় হায় সে দিন কোথায় ?
যখন হাসিত প্রাণ উষার ছটায়।
বিমল কোমল চিত যা দেখিত, যা শুনিত,
পিবত্র সৌন্দর্য মাখা, ভাবিত তাহায়।
জটীল কণ্টকময়, ভূগে আজি বােধ হয়,
পলাইতে চাই তাই, কঁাদি যাতনায়। ৮১
বারে বারে কেন গাে মা, (এই) খোড়ার পা টা খানায় পড়ে ?
দূর্বল হৃদয় কেন দিয়াছ এ ভাঙ্গা ধড়ে।
“যে পথে বাঘের ভয়, সেই পথে সন্ধ্যা হয়”
ডুবে যায় সুনীতির ডিঙি, তুচ্ছ প্রলােভন ঝড়ে।
প্রাণটা করে ওলােট-পালােট, পদে পদে খাই মা হোঁচোট,
তবু যায় না আশার মেশা, ভােগবিলাসের কাটায় ছাড়ে। ৮২
82
কাব্য-কণা।
দুখ দাও মা, সব মাথা পাতি।
তােমারে ভূলিয়া থাকি সুখ সম্পদে মাতি।
অতৃপ্ত পিপাসা,
বিষয় লালসা,
মহা জ্বালাতন করে দিবা রাতী।
অলস বিলাসে, ইন্দ্রিয়ের ফলে,
রিপুগণ করে বিষম ডাকাতি।
পাপ প্রলােতনে,
মুগ্ধ লুব্ধমনে,
পারি না করিতে বিবেকের সাথী।
দুখের তাড়নে, শশাকের পীড়নে,
দূর করে দাও মােহের অরাতি।
ইন্দ্রিয় সংযম,
দুখ বিনা কিসে আলে জ্ঞানের বাতি। ৮৩
দুস্কর দুর্দম,
তুমি যা করাে মা তাইতে হবে।
আমরা কেন আকাশ পাতাল, মিছে ভেবে মরি তবে।
তােমারি মা এ সংসার, আমরা পুত্র পরিবার,
বগগা মা সন্তানের ভার, মা বাপ বই আর কেবা লবে।
তােমার কাজ করাে তুমি, আমরা তাবি করি আমি,
অহঙ্কারে অন্ধকারে ডুবে আছি আমরা সবে।
মানবের ভ্রম জ্ঞান, কিসে হবে অবসান,
সকল কাজে তােমার লীলা, দেখিতে শিখিব কবে ৮৪
ওরে মন হোয়ােনা কাতর।
সুখে দুখে মার উপরে করােনা নির্ভ।
পারমার্থিক।
৪৩
যে পাঠালে এ সংসারে, একমনে ডাক তারে,
মাতৃ স্নেহ সন্তানের সাদা হিতকর।
সদা আত্মসুখ খোঁজ, ভাল মন্দ কিবা বােঝ,
নিম কি চিনি কোনটা তােমার মঙ্গল আকর।
কেন মন ভুলে যাও, তাইতাে এত ক্লেশ পাও,
মা জননীর অভয় পদ ভাব নিরন্তর। ৮৫
এত সুখে রেখেছে। মা তবু করি হাহাকার।
একিরে বিষম তৃষা মিটে না যে দুরাশার।
জন্মিয়াছি নরকুলে,
ধৰ্ম্ম জ্ঞান বুদ্ধি মূলে,
পেয়েছি বিভব সনে দারা সুত পরিবার।
ষড় ঋতু বিভূষিতা, ফল পুষ্প প্রসবিতা,
পাইয়াছি বসুন্ধরা, সুখময় এ আগার।
নর নারী তাের মত, হতভাগ্য কত শত,
শােক মগ্ন রুগ্ন ভগ্ন রূপে বহে দেহভার।
উপরে দেখিবি যত, মন রে দুখ পাবি তত,
নিচের পানে দেখলে চেয়ে থাকে না সে ক্লেশ আর। ৮
মুখে বলি তুমি কর্তা, মনে কিন্তু আমি-ময়।
এ জীবনে অহংভ্রান্তি কোন মতে যাবার নয়।
যখন যেটা ভাল করি, আপনারে কর্তা ধরি,
মন্দ হলে দৈবের উপর দিই দোষ সমুদয়
কি মজার মায়ার খেলা, তালাের ভাগটা নিজের বেলা,
বিধি অদৃষ্টের ঘাড়ে যত দোষের পরিচয়। ৮৭ -
৪৪
কাব্য-কণা।
সােজ। পথে যেতে চাই না কেন পড়ি এতে ফেরে।
ঠগ দাগাবাজে কেন বেড়ায় গাে মা তুড়ি মেরে।
সংসার বিষম ঠাই, ভাল মানুষের ভালাই নাই,
শকতের পথ মুক্ত, ধার্মিকে বিপদে ঘেরে।
একি গো মা তাের খেলা, যত গােল কি সাধুর বেলা,
মধুমাখা প্রবঞ্চনা ভুলিয়ে রাখে জগতেরে। ৮৮
(মাগাে তােরে) সুখের সময় ভুলে থাকি দুখের সময় পড়ে মনে,
যখন হালে পাইনা পানি চেঁচাই তখন প্রাণপণে ;
ভােগ বিলাস সম্পদে, মত্ত থাকি অহংমদে,
যখন ভুবি ঘাের বিপদে, ত্রাহি ত্রাহি ঐ চরণে।
এক মা তাের বিষম মায়া, ছাড়বে নাতে থাকতে কায়া,
মুখ তালে, কি দুখ ভালো, বুঝতে নারি এ জীবনে। ৮৯
মনটা আমার পাগলা ঘােড়া কোন মতে বাগ না মানে
উধাও হয়ে ছুটে বেড়ায়, টেনে নেযায় হেঁচল টানে।
নিজের গন্তব্যপথে, যেতে চায়না কোন মতে,
রাস মানেন। সাজ পরেনা, স্থির থাকে না কোনখ'নে।
এতাে চাবুক পিঠে পড়ে, ভবু এক পা নাহি নড়ে,
শুয়ে পড়ে, লাথি ছেড়ে, কানুটী লাগালে কানে। ৯০
পারমার্থিক ।
৪৫
ও তাের লীলা খেলা বােঝে, মাগাে, হেন সাধ্য কার ?
অনন্ত অচিন্ত্য সৃষ্টি অক্ষয় অপার ।
জীব জড় তরুবর, রূপান্তর নিরন্তর,
পরমাণুর নাহি ধ্বংস, নাহিক সংহার ।
এক যায়, আর আসে, এক ডুবে, আর ভাসে,
তােমারি শক্তির ক্রীড়া সংকোচ, বিস্তার।
অবিনাশ তব শক্তি, সৃষ্টির নিয়ম পংক্তি,
লেশমাত্র ব্যতিক্রম, নাহি হয় তার।
পুরাতন হয় গত, নব রূপে পরিণত,
চির পরিবৰ্ত্তময় তাের এ সংসার।
যাহে যার অভুদয়,
তাহাতেই হয় ক্ষয়,
সৃষ্টি স্থিতি ভঙ্গ লয়, বিচিত্র ব্যাপার। ৯১
মা তাের সৃষ্টিতে কেন, হেন অত্যাচার।
প্রবলে দূৰ্বল প্রাণী করে গাে সংহার।
একের নিধন, অন্যের পােষণ,
জীবন সংগ্রাম চলে অনিবার।
ভেক ভুজঙ্গম, মূষিক মার্জার,
শশক শার্দল, শুক শ্যেন আর,
এ উহার মাংস করিয়া আহার,
কেন দেহে পুষ্টি লভে আপনার?
কে করিল সৃষ্টি রাম বা রাবণে,
কৃষ্ণ আর কংসে, তীম দুৰ্য্যোবনে,
কাব্য-কণা।
ইহুদী কৃস্তানে, হিন্দু মুসলমানে,
কেন শত্রু ভাব পুত্রে এক মার?
তােরি সৃষ্টি মা গাে দয়া, প্রেম, ভক্তি,
তােরি সৃষ্টি হিংসা, বিদ্বেষ, বিরক্তি,
পরস্পর দ্রোহী, তােরি তাে মা শক্তি,
বিষম সমস্যা, ভীষণ ব্যাপার।৯২
সকলেই সুখ খোঁজে আমি দুখ তালবাসি।
বিপদ দহনে মনের ঘুচে যায় কলুষ রাণী।
যতক্ষণ বিপদ থাকে, এক মনে ডাকি মাকে,
পাপচিন্তা থাকে নাতে যখন দুখেতে ভাসি।
লােকের চৈতন্য তরে, দিয়াছ দুখ কৃপা করে,
তাই বলি মা মাথা পেতে বিপদ লব হাসি হাসি ।৯৩
আমি কার কাজ করি ?
মায়ার টুলি নে মা খুলি, বুঝে দেখি ও শঙ্করি।
কে আমারে এ সংসারে, পাঠালে মা নরাকারে,
সদসত মনােবৃত্তি হৃদয়ে ভরি।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, তবে উদরান্ন মেলে,
রােগ শােক জ্বরা মৃত্যু দেহেতে ধরি।
দ্বারা সুত পরিবার ভরণ পােষণ ভার,
এ সকল কি মিছে কাজ মা, ভূতের বেগার খেটে মরি।
আঁধার অলকা সাদা কালো, কি বুঝি মা মন ভালাে,
সুখে দুঃখে যেমন রাখ সেই ভাবে কাল হরি।
পারমার্থিক ।
' ৪৭
ক্ষুদ্র জল-বিম্ব প্রায়, জালে উঠে পুনরায়,
জলেতে মিশায়ে যাবে এ সংসার পাশরি ।
তবু করি আমি আমার, মহা-মােহ একি মজার,
তানিত্যেরে নিত্য ভাবি, তত্ত্ব-জ্ঞান পরিহরি।
অহংজ্ঞান মায়া বলে, তােমার সংসার চলে,
তােমার কাজ তুমি করাে মা,
(আমি) কলের চাকা ঘুরি ফিরি।৯৪
ওমা, মােয় দয়াময়ী কে বলে ?
ও তাের ছেলে সকলে, সদা ত্রিতাপে জ্বলে।
এক জীবে করে নাশ, অন্য প্রাণী করে গ্রাস,
জীবন-সংগ্রাম কেন, অহরহ চলে ?
কৃষক প্রাণান্ত করে, বপন রােপণ পরে,
হাজা শুখা হয়ে কেন মরে তা বিফলে?
নানাবিধ পণ্য ভরি, উল্লাসে চলেছে তরি,
অকস্মাৎ ঝড়ে কেন ডােবে তা অতলে ?
বৃদ্ধ পিতা মাতা যার, অবগও পরিবার,
রােজগারী ছেলে যায় কালের কবলে ?
প্রাসাদ মন্দিরময়,
শস্য শালী লোকালয়,
ছিন্ন ভিন্ন করে কেন বৰ্ব্বরের দলে ?
অবােধ জন্তুরা হায় । সুবুদ্ধি মানব প্রায়
রােগ শােক দুঃখ ভােগে কোন কৰ্ম্ম-ফলে ?
ভূকম্প, করকাপাত,
অগ্নিদাহ, বজ্রাঘাত,
জলপ্লাবন, মহামারী, বৈরী জলে স্থলে।
৪৮
কাব্য-কণা।
ত্রিতাপের গণ্ডগােল, অশ্রান্ত ক্রন্দন রােল,
হে বিশ্ব-জননি তাের মন নাহি গলে ? ৯৫
ওমা, তুমি যা করে তা ভালাের তরে।
সন্তানের শুভাশুভ মা বাপ বৈ কি বুঝে পরে ?
অনন্ত তােমার সৃষ্টি, মানবের ক্ষুদ্র দৃষ্টি,
ভবিতব্যে গুপ্ত যাহা জানবো কেমন করে ?
আমরা কেবল স্বার্থ খুজি, শুভাশুভ নাহি বুঝি,
জগতের ভার মা গাে, ন্যস্ত তাের করে।
আমরা যাহা ভাবি হিত, তাহা হয় বিপরীত,
মন্দ হতেও পাই ভালাে, মা গাে তাের বরে। ৯৬
কেন এতাে দেখাস ভয় ? (জগত-জননি গো }
বিনা অপরাধে, মিছে অপবাদে, বিপদে বিষাদে,
কঁদে গাে তনয়।
ঘাের অন্ধকারে, ভব কারাগারে, রিপুর প্রহারে,
জর্জর হৃদয়।
বিষম ভীষণ, কঠোর শাপন, মােহের বাঁধন,
করে দেমা ক্ষয়।
ফেলেছ বিপদে, বল দেমা হৃদে, তাের রাঙ্গা পদে,
লই আশ্রয় ।৯৭
৫
কে বড় মা এ সংসারে ?
ধন বড় কি ধৰ্ম্ম বড় লােকে অধিক মানে কারে।
পারমার্থিক ।
৫৯
টাকার লােভে কত, নরে,
ধর্ম বিসর্জন করে,
ধৰ্ম্ম ভেবে কটা লােক মা সত্য পথে চলতে পারে।
শঠ প্রবঞ্চক যারা, তুড়িমেরে বেড়ায় তারা
ভাল মাসের ভালাই নাই মা, কষ্ট পায় সে কোন বিচারে।৯৮
F
ওরে খ্যাপা মন, মুর্থ কেরে তাের মতন।
নিত্য-ধন ভুলে করিস্ অনিত্যে যতন।
জন্মিয়া মানব-কূলে,
অহঙ্কারে মরিস ফুলে,
কোন কীটাধম তুই, স্থিতি কতক্ষণ।
এসেছ দুদিনের তরে, লীলা সাঙ্গ হলে পরে,
অনন্তে মিশায়ে যাবি, স্রোতের মতন।
পঞ্চভূতে দেহ যাবে, জ্ঞান বিদ্যা লােপ পাবে,
অপরে লুটিবে তাের উপার্জিত ধন।
ঘশ কীৰ্ত্তি কালবশে, বিস্মৃতিতে যাবে খসে,
আমি আমার বলি যায়, তার কি রবে তখন।৯৯
আর কেন মা, দে মা ক্ষমা, ডাকিগাে তাই কাতর প্রাণে।
টের খেলেছি ভবের খেলা, এখন পালাতে চাই মানে মানে
বিষম বিষয় ফাদে, বিষাদে হৃদয় কঁাদে,
মিটেনা সুখের তৃষা, শান্তি পাই না কোন খানে ।
অমৃত করিয়া আশ, গরল করিয়া গ্রাস,
‘অবােধ পতঙ্গ প্রায় মা, ধাই গাে অনল পালে ১০
কাব্য-কণা।
কোথা শান্তি পাই, খুঁজিয়া বেড়াই,
বলে দেনা ভাই, কার কাছে যাই।
লালসার দাস,
অলস বিলাস,
মিটেন পিয়াস, সুখে কাজ নাই।
ধন জন মান, সাধুতার ভান,
পুথিগত জ্ঞান, যশ লােভে দান,
গরল সমান,
কত করি পান,
জ্বর জ্বর প্রাণ, আর নাহি চাই।
বিজন করে,
নগ্ন কলেবরে,
যুক্ত দুই করে, চখে জল ঝরে,
হরে হরে হরে,
ডাকি উচ্চৈস্বরে,
অশান্ত অন্তরে, জুড়াবার ঠাই ১•১
আমি নিজেই কি তা বুঝতে নারি।
{ তােমায় চিনবাে কি মা ও শঙ্করি !}
দার সুত দিয়ে, মায়ায় বাঁধিয়ে
কে আমারে মাগাে করিল সংসারী ?
কেন ধরিয়াছি মানুষের আকার,
আহার বিহার, স্ববংশ বিস্তার,
আমি বলি করে, কে গো মা আমার,
দার। সুত ধনে কেন অহঙ্কারী।
কীট কি পতঙ্গ, পশু কি বিহঙ্গ,
পূৰ্ব জন্মে আমার ছিল কিরূপ অঙ্গ ?
পারমার্থিক।
সৃষ্টির প্রসঙ্গ, জন্ম স্থিতি ভঙ্গ,
জলে, স্থলে, কিবা ছিলাম শূন্যচারী ?
এ দেহ পতনে, যাবাে বা কোথায় ?
স্বর্গে না নরকে, রবাে বা ধরায় ?
কৰ্ম্মফলে কিবা অদৃষ্ট লেখায়
দেহান্তরে হবে কোন রূপধারী ?
জীবাত্মা কি মাগো পরমাত্মার ছায়া ?
জলপাত্রে যেমন হেরি রবি কায়া।
কিম্বা ঘটাকাণ? ঘট শুধু মায়া,
প্রকৃতির তত্ত্ব বুঝিতে না পারি ।
যে হই সে হই, যা হবার তাই হবে,
যে খেলা পেয়েছি তাই খেলি ভবে।
চিনিব তােমায়, সে শক্তি কোথায় ?
ও চরণে সুধু ভক্তির ভিখারী।১০২
কে কোথায় গেল মাগাে, আমি যাবাে কবে ?
ছায়াবাজি প্রায় জীব আসে যায় ভবে।
কোথাগেছে পিতা মাতা, কোথা গুরু জ্ঞানদাতা,
কোথা গেল দারা সুত, ভাই বন্ধু সবে ?
অভাগারে একা ফেলে, একে একে গেছে চলে,
প্রেমের বাঁধন ছিড়ে, কাদি হাহারবে।
মর্মভেদী কি কঠোর, স্মৃতির যাতনা ঘাের,
শূন্য মনে শূন্য প্রাণে, বাঁচিয়া কি হবে।১০৩
কাব্য-কণা।
বল মা তারা দাড়াই কোথা সঙ্কট কালে ?
ঘাের তুফানে, নিরাশ প্রাণে, পানি পাই না হালে ।
যে দিকে ফিরিয়া চাই, কূল কিনারা কিছুই নাই,
আঁধারে ভাসিয়া যাই, যা থাকে কপালে।
এত খাই হাবুডুবু,
অহংদম্ভ যায় না তবু,
রিপুগণ করে কাবু, অকূলে ডুবালে।১০৪
এই কি মা সুখের সংসার ?
অনন্ত দুঃখের যথা উঠে হাহাকার।
বলে দে মা কোন পাপে, কোন দেবতার শাপে,
এ নরকে পাঠায়েছ দিয়ে নরাকার।
নিয়তি কি কৰ্ম্মফলে, এ ভীষণ ধরাতলে,
এসেছি কি ইচ্ছাময়ি, ইচ্ছায় তােমার ?
জীবন সংগ্রামময়, দেহ মাঝে রিপুচয়-
রােগ, শােক, জ্বর, মৃত্যু, দন্ত, অহংকার।
কৌশলে কি ছলে বলে বলবান ক্ষীণে দলে,
একের শােণিতে হয় অন্যের আহার।
প্রেম, ভক্তি, দয়া, মায়া, নামে মাত্র দেখি ছায়া,
স্বার্থ লােভে ভুলে যাই, পর উপকার ।
বিদ্যা, বুদ্ধি, ধন, মান, ক্ষণপ্রভা অনুমান,
শােৰ্য, বীৰ্য্য, যশ, কীর্তি, অস্থায়ী অসার।
জগতে যা কিছু আছে, প্রতিদ্বন্দ্বী পিছে পিছে,
আলোকের তলে তলে, চলে অন্ধকার।
পারমার্থিক।
সুখের প্রয়াসে হায়! সদা ভ্রান্ত মনে ধায়,
পরিণামে পাই দুখ, সহি ক্লেশ ভার।
করিলে মা কি সাধনা, ঘুচে যাবে এ যাতনা,
বলে দে মা কিসে পাবে, এ পাপে নিস্তার ? ১০৫
ওমা কোন দিকে সামালি বল ?
রােগে ভরা বাঙ্গালীর শরীর দূর্বল।
বহু গােষ্টী পরিবার,
উদরান্ন মেলা ভার,
সামান্য গৃহস্থ আমি চাকুরি সম্বল।
প্রভাত না হতে উঠে, মাথার ঘাম পায়ে লুটে,
টাকা টাকা করে ছুটে বেড়াই নিস্ফল।
ভাত জোটে ত কাপড় নাই, কন্যা দায়ের বিষম খাই,
জাত রক্ষা কর্তে গেলে খরচ অনর্গল ।
বাড়ির টেকস্ খাজনায়, ইস্কুলের মাহিনায়,
ডাক্তারের খরচ দিতে, চখে ঝরে জল।
দেশ মধ্যে মন্বন্তর,
ভেজাল জিনিস দ্বিগুণ দর,
মাথা খুড়ে কোন দ্রব্য মেলে না আসল।
বিদেশ যেতে ভয় পাই, ব্যবসায়ের পুজি নাই,
বুদ্ধি মােটা, শক্তি হীন চালাই কোন কল।
ডাইনে আনতে বাঁয়ে নাই, যে সুখে মা কাল কাটাই,
অন্তরযামিনী মাতা জান ত সকল।
ওগাে মা তাের পায়ে ধরি, ক্ষমা দে মা ক্ষেমঙ্করি,
আম হেন অতগার মরণ মঙ্গল।১০ ৬
কাব্য-কণা
গতি কি হবে আমার ?
আমি যে কপট শট পাপী দূরাচার।
দেহ ঝে রিপু ছয়, কেহ তােমা বশ নয়,
সর্বোপরি মনে মনে দন্ত অহংকার।
সদা আত্মসুখ খুঁজি,
টাকাটা সৰ্বস্ব বুঝি,
মােহ-বদ্ধ জ্ঞাননেত্ৰ চির অন্ধকার।
মাদক সেবনে রত, বারনারী পদানত,
ইন্দ্রিয়ের সুখ বুঝি ধরণীর সার।
অপরের সর্বনাশ,
করিতে সতত আশ,
হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা পূর্ণ হৃদয়-ভাণ্ডার।
কুৎসিত তনয় হলে, মা কি তাকে দেয় ফেলে,
কুপুত্রে সুশীল করা মা বাপের ভার।
“কুপুত্র যদ্যপি হয়, কুমাত কখন নয়”
তুমি বিনা এ পামরে কে করে উদ্ধার ।
যত কেন মন্দ হই, জানি না মা তােমা বই,
অধম-তারিণী নাম কেন মা তােমার ?১০৭
বিধি কি দোষে আমার ?
আমি ধৰ্ম্মহীনা, সাধু করে ঘৃণা,
কে দিল জনম গর্ভে গণিকার ?
কে দিল আমারে কুটীল নয়ন ?
কেবা শিখাইল কপট বচন ?
কে করিল মােরে নয়ন-রঞ্জন,-
ভূজঙ্গীর প্রায়, গরল আধার ?
পারমার্থিক।
প্রবঞ্চনারত লম্পটের সনে
বিকায়েছি কায় জঠর ভরণে ;
ইন্দ্রিয়-প্রমােদে, মাদক সেবন,
কার ইচ্ছা বশে জীবন আঁধার ?
ধৰ্ম্ম পথে যেতে ইচ্ছা করি না কি ?
ইচ্ছা করি নাকি সাধু সঙ্গে থাকি ?
নিয়তির গতি রােধ করে রাখি,
হেন শক্তি কোথা ক্ষীণ অবলার?
শশাঙ্ক কলঙ্কী, যার ইচ্ছা বলে,
জলদে কুলীশ, কণ্টক কমলে,
মধুতে মত্ততা, দাহিকা অনলে,
আমি অভাগিনী শাসনে তাহার।
যে করিল সৃষ্টি, পুরিষ চন্দন,
অমৃত গরল, কর্দম কাঞ্চন,
আলােক আঁধার, ধাৰ্মিক দূর্জন,
সেই জানে কিসে পাইব নিস্তার।১• ৮
ওহে দিননাথ ! (আমার) এমন দিন কি হবে ?
জ্ঞানামৃত পানে মুদিত নয়নে-
গও বহি কবে প্রেমধারা ব’বে।
ভক্তি মদে ঢেলে, পথে যাব চলে,
বালকে ডরাবে ঐ জুজু বলে,
করুণার রসে বৃদ্ধ যাবে গলে,
সুজন হাসি ধুলা রাশী গায় দিবে?
কাব্য-কণা।
মলিন দীন কায়, ছেড়া কাঁথা গায়,
চটকের বাসা মাথার জটায়,
বুকেতে অঞ্জলী বসিয়া তাহায়—
নির্ভয়ে বায়সী, ভিক্ষান্ন লুটিবে।১০৯
হরি হে তােমার এ সংসার।
আমি আমার করে, মিছে মরি ঘুরে,
দুদিনের তরে ,কেন হেন অহংকার ।
(হরি হে) তােমার অনন্ত খেলা বুঝি কেমন করে,
অসীম বিক্রম সিংহ সেও ক্ষুধায় মরে ;
( আবার দেখি যে ) অলস অজাগর তার ও পেট ভরে।
কীটনু কীটেরে (হরি হে) তুমিই দাও আহার।
সাগরে পৰ্বত কর, পৰ্বতে সাগর,
নগরে অরণ্য কর, অরণ্যে নগর,
তােমারি শাসনে চলে বিশ্ব চরাচর,
জীবের দম্ভ ছার (হরি হে) তুমিই ভবের কর্ণধার ।১১
ক্ষিতি সাগর-নগর-মরু-নগ-নদী অগণন,
ধরণি, জননী তুমি জীবের সুখ নিকেতন।
ফল পুষ্প শস্য ভরা, তুমি গাে মা বসুন্ধরা,
সুগােল শ্যামল অঙ্গে সমীরণ আচ্ছাদন।
মহাদ্যুতি প্রভাকর, বসুধে, তােমার বর,
তুমি রে প্রদক্ষিণ করিতেছ অনুক্ষণ।
পারমার্থিক
প্রখর তপন করে, ফলবতী করে তােরে,
তব অঙ্গে স্নান কালে ধারা জল বরিষণ।
ছয় ঋতু নানা রঙ্গে,
পরিচ্ছদ তব অঙ্গে,
যখন যা শশাভা পায় সেই মত আভরণ।
বিধু তব সহচরী, নিত্য ফিরে সেবা করি,
বিমল কোমল সুধা দেহে করে বিলেপন।
সর্বংসহা ভূতধাত্রি, যেন আমি দিবারাত্রি,
তােমা সম সহগুণে, কাটাই জীবন। ১১১
}
বিধাতার আদি সৃষ্টি হে জল তােমারে কয়।
কতই বিচিত্র রূপ নেহারি জগতময়।
কখন গগন গায়, নিবিড় নীলিম কায়,
সৌদামিনী হার কণ্ঠে মেধরূপে হও উদয় ।
বায়ুস্তর ভেদ করে, কখনও বা ধারা ঝরে,
ইন্দ্রধনু শিরােভূষা, রম্য সপ্ত বর্ণময় ।
কভূ গিরি শিরােদেশে, রজত তুষার বেশে,
হেরি য়েন ব্যোমকেশে জটাজুট সমুদয় ।
বিমল দর্পণ প্রায়,
কভূ স্বচ্ছ দীর্ঘিকায়,
কৌমুদী মাখিয়া গায়, তখনি কি শােভা হয়।
সায়াহ্রে রবির করে, রক্ত জবামালা পরে,
ক্ষুদ্র বীচি নাচি নাচি তটিনী সুন্দরী বয়।
উত্তাল তরঙ্গ সিন্ধু, শিশিরের মুক্তাবিন্দু,
প্রস্রবণ, কুহেলিকা, কত দিব পরিচয়।
কাব্য-কণা।
যথায় পর-দুঃখ ভরে, সাধুর নয়ন ঝরে,
এতাে যে অতুল শােভা, তার কাছে কিছু নয়। ১১২
অনন্ত গগন প্রান্তে প্রদীপ্ত ভাস্কর,
উত্তাপ জ্যোতির তুমি অক্ষয় আকর।
তৰ মাধ্য আকর্ষণে, বেগে ধায় গ্রহগণে,
ঘূর্ণাবশে দিবা নিশা ঋতু সম্বৎসর।
লতি তব তেজোচয়,
ধরণী উর্বর হয়,
তব কান্তি গায়ে মাখি, শশী মনােহর।
আমরা এ মহীতলে, যা ডাকি অনল বলে,
তােমার কণার কণা, অতি ক্ষুদ্রতর।
ছুটাও গগনময়,
পবনে তরঙ্গ তুলি, নাচাও সাগর।
তােমার তেজের সনে, সলিলের সন্মিলনে,
সুযােগ্য নন্দন শূন্যে, বর্জী জলধর।
তােমার কিরণে চারু, শ্যাম শোভা ধরে তরু,
আলোকে নয়ন পায় পশু পক্ষী নর।
বল দেখি দিনমণি, কত তেজোময় তিনি,
যার প্রভারেণু পেয়ে, তুমি প্রভাকর। ১১৩
ধূমকেতু উল্কাচয়,
মরু-
সসাগরা বসুন্ধরা করিয়া বেষ্টন,
স্বচ্ছ আবরণ তুমি ওহে সমীরণ।
মৎস্য যথা থাকে জলে, বায়ুর সাগর তলে,
স্থলচর জীবপুঞ্জ করে বিচরণ।
পারমার্থিক। ৫৯ তুমি না থাকিলে ক্ষণ, বাচিত না প্রাণীগণ, জগৎপ্রাণ নাম তাই করেছ ধারণ। জীবের প্রশ্বাস লয়ে, বাঁচাও পাদপচয়ে, উদ্ভীদের শ্বাস জীবে কর বিতরণ। এইরূপে পরষ্পরে, আদান প্রদান ক'রে, এক হতে অন্যে পুষ্টি লতে অনুক্ষণ। তােমারি রুপার বলে, অনলের শিখা জ্বলে, সুধু সখা নও তুমি, বন্ধুির জীবন। হুহুঙ্কার কেশরীর, সুধাধার বাঁশরীর, কামিনীর কণ্ঠ-গীতি সাগর গর্জন- তােমারি প্রসাদে শুনি, কঠোর কুলীশ-ধ্বনি, তটিনীর মৃদুগান, ঝিল্লীর কীৰ্ত্তন। প্রচণ্ড মার্তণ্ড করে, আপনার অঙ্গে ধরে, বসুধার তাপভার কর সঙ্কীরণ। কভূ ধীরে কভু বেগে, গগনে ছুটাও মেঘে, সাগর তরঙ্গে খেল, কভূ কর রণ। বিকচ কুসুম-বাস, ছড়াইয়া বারমাস, আনন্দিত কর যত জীবজন্তুগণ । অনিল, তােমার মত, পর উপকারে বৃত, থাকি যেন যত দিন থাকে এ জীবন। ১১৪ ব্যোম - ব্যোম, তুমি সৰ্বব্যাপী, বিশ্বের আলয়, আদি অন্ত সীমা হীন অচিন্ত্য অব্যয়।
কাব্য-কণা।
রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ, রােগ, শােক, হ,
সকলি বিহীন তুমি অজর অক্ষয়।
গ্রহ, তারা, দিবাকর, বসুন্ধরা, শশধর,
তােমার কণ্ঠের হার জ্যোতিষ্ক নিচয়।
অনুক্ষণ অবিরত,
প্রকৃতির ক্রীড়া যত,
তােমারি উদর ভাণ্ডে সংঘটিত হয় ।
গুণাতীত বিধাতার, প্রায় তুমি নিরাকার,
তব অঙ্কে ত্রিভুবন সৃষ্টি স্থিত লয়।
করাল কালের করে, তব শূন্য কলেবরে,
বিন্দুমাত্র কোন রেখা না হয় উদয় ।
কবে আকাশের মত, সংসার বাসনা যত
স্বমপিয়া, বিভূপদে লইব আশ্রয়। ১৯৫
,
কেন প্রাণ বিষাদে মগন ?
চিন্তার নিবিড় মেঘে করে আবরণ।
কেন হৃদে গুরুভার,
চারিদিক অন্ধকার,
আশার বিজলী আর খেলেন তেমন।
কি দোষ করেছি কার, অজানিত আশঙ্কার,
এ বিকট হাহাকার ওঠে কি কারণ।
কি করিব কোথা যাব, কোথা গেলে শান্তি পাক,
হুসা কেবল মাগাে, তাের চরণ। ১১৬
পারমার্থিক ।
তারা সব গেল কোথা, যাদের লাগি আঁখি ঝরে ?
প্রেমের বাঁধন ছিড়ে, মৰ্ম্ম বিদলিত করে।
একাকী এ ভাঙ্গা হাটে, হে বন্ধু হীন মাঠে-
প্রাণ শূন্য কায়া লয়ে ফিরি গাে মা কিসের তরে ?
মিটেছে সুখের সাধ, বেঁচে থাকা পরমাদ,
মানে মানে ঘরের ছেলে ফিরে যেতে চাই মা ঘরে। ১১৭
কি আছে মা তাের মনে, কেবা তাহা বুঝতে পারে ?
নিয়তির গুপ্তলিপি ঢাকা চির-অন্ধকারে।
পৰ্বত করিয়া চূর্ণ, সাগর করিছ পূর্ণ,
এক ভাঙছ আর গড়ছ নিজ ইচ্ছা অনুসারে।
রবি শণ অাসে যায়, পলে পলে আয়ু ধায়,
অনন্ত ঘটনা শ্রোত বহে অলক্ষিত ধারে।
মা গাে তাের ইচ্ছা যাহা, অবশ্য ঘটিবে তাহা,
তুচ্ছ মানবের শক্তি লঘিবে তা কি প্রকারে ? ১১৮
ওমা, লােকে কেন আমায় পাগল বলে ?
কার কি করেছি, আপনি মজেছি,
রূপের প্রভায় গিয়াছি ভুলে।
খুঁজিয়া বেড়াই, কোথা ফুল ফুটে,
মধুর মলয়ে পরিমল ছুটে,
ভ্রমর গুজিয়া কোথ। মধু লুটে,
নব কিশলয় কোথা লতা দোলে?
কাব্য-কণা।
খুঁজিয়া বেড়াই গর্জে কোথা সিন্ধু,
তরুণ তপন, শরদের ইন্দু,
চারু ইন্দ্ৰ ধনু, শিশিরের বিন্দু,
আঁধার নিশায় তারা ঝলমলে।
খুঁজিয়া বেড়াই কোথা গায় পাখী,
চমরীর পুচ্ছ, রিণীর আঁখি
নিঝরিণী অঙ্গে চন্দ্র লেখা মাখি-
কি সুঠাম নাচে, মণিমুক্তা জলে।
না জানি দেখিতে কেন ভালবাসি,
তরুণীর ব্রীড়া, শিশুটির হাসি,
হিমাচল শৃঙ্গে তুষারের রাশি,
প্রভাত-হিল্লোল শতদল দলে।
সৌন্দর্য্যের মােহে গিয়াছি গলিয়া,
লােকে কেন হাসে পাগল বলিয়া,
আপমা, সংসার, সকলি ভুলিয়া
বিকায়েছি প্রাণ রূপের পদতলে। ১১৯
(আমি) গরিব বলে ভিক্ষা করি পেটের দায়ে পশু মারি
দুর্জয় কামের বাণে, গমন করি বারনারী।
শিখি নাই মা লেখা পড়া, মােটা বুদ্ধি মেজাজ কড়া,
দিগবিদিগ জ্ঞান শূন্য, নেশার ঘােরে স্বেচ্ছাচারী।
গোয়ার চোয়াড় সঙ্গী, উলঙ্গ স্বভাবে রঙ্গী,
আমিই কি মা জগতের যতই অহিতকারী।
পারমার্থিক।
কল মা যারা ধনের বলে, পরের লুটে, ক্ষীণে দলে,
সুচিকণ সভ্যতার প্রতারণা বেশধারী,
কুটিল আইন ছলে,
শাণিত কৃপাণ বলে,
বীর নামে নরহন্তা, দুৰ্ব্বলের অন্নহারী।
নিরীহ পীড়নে রত, কুলাঙ্গনা লালাইত,
তারাই কি মা সাধু সুজন তােমার কোলের অধিকারী।১২
আমি আমি করি মাগাে আমি কোটা এ জগতে?
দেহটা না প্রাণটা আমি বােঝা যায় না কোন মতে।
সংজ্ঞা-হীন শব দেহ, আমি তো ভাবে না কেহ,
দেহচ্যুত আত্মা কি মা আমি বলে শূন্য পথে ?
প্রাণ যবে কায়া সনে, ঐক্য হয় সম্মিলনে,
তখনি আমির সৃষ্টি প্রকৃতি পুরুষ হতে।
জড়েভে চৈতন্য যােগে,
জীব সুখ দুঃখ লােগ,
অহঙ্কার থাকে না আর, উভয়ে প্রভেদ গতে। ১২১
(আমার) কাঁদে কেন প্রাণ?
কোন্ অজানিত ভয়ে হৃদি ম্রিয়মান।
কি যেন করেছি কার, চিত্তে হেন অন্ধকার,
বিমল শান্তির কান্তি হােলাে অবসান।
জানি কিসের তরে, হৃদয় বিলাপ করে,
থেকে থেকে মনটা যেন করে আনচান। ১২২
৬৪
কাব্য-কণা
(মাগো) জীবন সংগ্রাম, চলে অবিরাম,
এ জগতে এসে কিব। সুখ পাই।
কীট কি পতঙ্গ, মৎস্য কি বিহঙ্গ,
পশু পক্ষী নর, কারাে প্রভেদ নাই।
প্রবলে দুৰ্ব্বলে, সদা হিংসা চলে,
জল স্থল শূন্যে যথা যার ঠাঁই।
দূরে যাক আন, মানুষ জ্ঞানবান,
ভাই হয়ে কেন বধে নিজ ভাই।
স্বার্থ বশে অন্ধ,
সদা করি দ্বন্দ্ব,
কোথা শান্তি সুখ মা গাে তাই চাই। ১২৩
মা তােরে কে চিনতে পারে ?
( তুমি আছ সৰ্ব্বাই ইন্দ্রিয়ে না পাই
এ কাল সে কাল ঘুরি মা আঁধারে।
বৈদিক সময়ে আর্য ঋষিগণ
অনিল, অনল, সলিল, তপন,
সৃষ্ট বস্তু সবে, স্রষ্টার স্থাপম,
যজ্ঞে বলি দিয়া, পূজিল তােমারে।
পৌরাণিক যুগে বীর উপাসনা,
'শিব, দুর্গা, রাম, কৃষ্ণ আদি নানা,
আদর্শ চরিত্র করিয়া রচনা,
পৌতলিক পূজা জগতে প্রচারে।
ষড় দরশন হােলাে তার পরে,
ইন্দ্রিয়-সংযম যােগাভ্যাস ভরে,
পারমার্থিক ।
জ্ঞানের মাহাত্ম শিখাইল নরে,
ধ্যানেতে ধারণা পরম-আহ্বারে।
বুদ্ধ, জাতিভেদ প্রথা ঘুচাইল,
সৰ্ব্ব জীবে দয়া, সাম্য শিখাইল,
অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম বুঝাইল,
দুঃখ নাশে মুক্তি, বাসনা সংহারে।
চৈতন্য, নানক, যিশুখৃষ্ট মতে-
সবে ভাই ভাই মােরা এ জগতে,
কান্ত শান্ত ভাব, মুক্তি ভক্তি পথে,
প্রেমেতে অর্চনা জগত-কর্তারে।
মহম্মদী মতে সকাম সাধনা,
ইহপরলােকে বিলাস কামনা,
কাফের নিধনে, কৃপাণ চালনা
বলের প্রয়ােগ ধৰ্ম্মের বিস্তারে।
ধৰ্ম্মের বিদ্বেষে দেশে দেশে হায় !
কত রক্ত স্রোত বহিল ধরায়,
প্রেম-মার্গ
ভুলে ঘৃণায় হিংসায়,
ভাই হয়ে কেন বধে গাে ভ্রাতারে।
যুগে যুগে মাগাে কত শত নরে—
এ উহুরে ভ্রান্ত ভাবে পরস্পরে ।
যে যেমন বুঝে, পূজে মা তােমারে,
কেহ বা সাকারে, কেহ নিরাকারে।
তোমার স্বরূপ কোন জন জানে
কল্পিত মূরতি, কিম্বা যােগীর ধ্যানে,
কাব্য-কণা ।
অন্তরে বাহিরে, আছ কোন খানে ?
জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম, পাই কি প্রকারে ?
তুমি অপ্রমেয়, না পাই সন্ধান,
তুমি জ্ঞানাতীত, আমরা অজ্ঞান,
হৃদয় কমলে মা গাে তাের স্থান,
সেই ডাকে তােরে, কৃপা কর যায়ে। ১২৪
ওমা, কি খেলা তােমার।
আমরা সবাই ভাবি এক তুমি করাও আর।
মানুষে মন্ত্রণা করে, পাতে ফাদ পরের তরে,
মিজের ফাদে নিজেই পড়ে, একি চমৎকার।
প্রবঞ্চনা দাগাবাজী, করে যেই জয়ী আজি,
প্রতারকের হাতে তার, কালি হবে হার।
পরের প্রাণ করতে চুরি, গােপনে শানায় ছুরি,
সেই ছুরি ঘুরি ফিরি, বুকে বসে তার। ১২৫
কি খেলা খেলিতে আসি কি খেলা খেলিয়া যাই?
অহার, বিহার, নিদ্রা, বিনা কি আর কাজ নাই।
আগে আমি কোথায় ছিলাম, এ জগতে কেন এলাম,
কে পাঠালে, কোথা যাবো, সদাই আমি ভাবি তাই
বিষয়ে সতত মত্ত,
না বুঝিমু আত্ম-তত্ত্ব,
মায়ামুগ্ধ এ সংসারে জানিব তা কার ঠাই। ১২৬
পারমার্থিক ।
কোথা তুমি, কেমন তুমি, (মাগাে) খোঁজে তােমায় চরাচর,
সর্বদা সৰ্বত্ৰ আছ ( কিন্তু ) বাক্য মনের অগােচর।
সৃষ্টির প্রথমাবধি, অন্তকাল পর্যন্ত যদি,
পাই তােমার তত্ত্ব খুঁজে মরি নিরন্তর।
তােমারে ডাকিলে, প্রাণে বিমল আনন্দ আনে,
তাই গাে মা ডাকি তােমায়, জুড়াইতে এ অন্তর। ১২৭
মাগো, কোথা তােরে পাব?
পাজি পুথি ঘেটে কেন জঞ্জাল বাড়াব।
মিছে তীর্থ স্থানে যাই, কোন খানে তুমি নাই।
কে জেনেছে তােরে মাগাে, কারে বা সুধাব?
আঁথার হৃদি-কলরে, আয় গাে মা আলগা করে,
অকপটে ভক্তি ভরে, কঁদিয়া ডাকিব।
স্তুৰ স্তুতি নাহি জানি, আছ তুমি এই মানি,
বাহির ছাড়িয়া মাগাে, অন্তরে দেখিব। ১২৮
মাগাে তাই ডাকি তােমায়।
অসংযত চিত্ত-বৃত্তি, আমি যে মা অসহায়,
দূর্দম ইন্দ্রিয়গণ, করে মহা জ্বালাতন,
কোন পথে যেতে মাগো, কোন পথে লয়ে যায়।
অবােধ শিশুর মত, আঁধারে না পাই পথ,
কৃপা করে জননি গাে, পদাশ্রয় দেহ তায়। ১২৯
৬৮
কাব্য-কণা।
জানি তুমি মঙ্গলময়
সুশৃঙ্খলে গাঁথা মা তাের সৃষ্টি সমুদয় ।
তবু কেন মাঝে মাঝে, সংসারের নানা কাজে,
প্রতিকূল স্রোতে পড়ে উঠে মা সংশয়।
(যখন) দুখ কি দারিদ্রে ভাসি, রােগে শশাকে মােহ আসি,
বিপত্তি-বিকল-চিত্তে থাকে না প্রত্যয়।
সুখে দুঃখে সমজ্ঞান, বাসনার বলিদান,
কত দিনে করিবি মা নিষ্কাম হৃদয় ? ১৩
তােমা হতেই পেয়েছি মা এ জীবন,
সুখ দুঃখ ও চরণে করিতে চাই সমর্পণ ।
তবে কেন অহং জ্ঞানে, মায়া মােহে ভ্রান্তি আনে,
নিষ্কাম হতে না পারি, পরিহরি এ বাঁধন।
দুগ্ধ থাকে যতক্ষণ,
মিশে জল ততক্ষণ,
মাখম হয়ে ভেসে উঠে, দণ্ডে করিলে মন্থন।
তাই যাচি দণ্ড দিয়া, ঘােল দে মা ঘুচাইয়া,
বাসনার সঙ্গে স্বার্থ (যেন) কর্তে পারি বিসর্জন। ১৩১
( আমার) শান্তি নাই মা মনে,
সুখের আশায় পেয়ে বেড়াই স্বার্থ অন্বেষণে।
ধন মান পিপাসায়, ছুটে মরি দুরাশায়,
পরমায়ু ক্ষর পায়, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
বৃথা গেল এ জীবন, হােলো না কোন সাধন,
অকৃতি সন্তানে মাগাে, স্থান দে চরণে।
পারমার্থিক।
বিবেক বৈরাগ্য লয়, থাকি যেন সুখী হয়ে,
সন্তোষ অমৃত-তৃপ্ত, তিতিক্ষা জীবনে। ১৩২
ও মা, আমিত্ব ঘােচাবি কবে ?
দুদিনের তরে,
আমি আমার করে,
বৃথা আস্ফালন মহা কলরবে।
অন্যে দিয়া দুখ, খুজি আপন সুখ,
স্বার্থ লয়ে মত্ত, জীব জন্তু সবে ।
অনিত্য সংসার,
মানুষ কিবা ছার,
দম্ভ অহংকার কতক্ষণ রবে।
অহংদর্প চূর্ণ,
করে দে মা তূর্ণ,
তােমা পরিপূর্ণ দেখি যেন ভবে। ১৩৩
এ দেহ থাকিতে কি মা ভােগ তৃষ্ণা যাবে না?
এ পামর কি এ জীবনে শান্তি সুধা পাবে না?
অলীক সুখেরি তরে, ধেয়ে বেড়াই মােহ-ঘােরে,
বিষম আশার নেশা বাড়ে বই তত কমে না।
ঘত হচ্ছে দিন গত, ভােগস্পৃহা বাড়ছে তত,
প্রবৃত্তির দুর্দম বেগ কোন মতে থামে না।
তাই ডাকি সকাতরে,
জননি গাে দয়া করে,
তিতিক্ষা বৈরাগ্য দে মা, ঘুচে যাক এ ভোগ বাসনা। ১৩৪
৭।
৭০
কাব্য-কণা।
চোকরাঙ্গানি দেখে তাের মা-ভয় করিনা আর।
শাসন বিনা শােধন হয় না জেনেছি মা সার।
আমি যে মা দুষ্ট ছেলে,
নিজের কর্তব্য ফেলে,
তবের খেলায় আছি ভুলে, সদা কদাচার।
প্রমােদে আস্কারা পেয়ে, আদরেতে যাই বয়ে,
নিবৃত্তির পথ ছেড়ে, দাস কামনার।
যতই চাপড় পড়ে পিঠে, ভাবি সে সব বড় মিঠে,
দণ্ড পেলে সুধরে যাই মা, করুণা তােমার । ১৩৫
অদৃষ্টের সনে মাগাে কতই আর করি রণ ?
দেহটা ক্ষতবিক্ষত, জরজর এ জীবন,
বিদ্যা, বুদ্ধি, ধৈৰ্য, বল, বিলুষ্ঠিত সে সকল,
আশার পতাকা ছিন্ন, ধৰ্ম্ম-বৰ্ম্ম অকারণ।
ভােগের শৃঙ্খল রে, বদ্ধ মােহ কারাগারে,
কত দিনে করিবি মা, মুক্তি পথ উনােচন। ১৩৬
কাদিতে দিতে আসি এ জগতে,
কঁদিতে কাদিতে চলিয়া যাই।
দুদিনের তরে, থাকি ধরা’পরে,
কাদিতে কাদিতে জীবন কাটাই।
চক্ষু কর্ণ আদি ইন্দ্রিয় সকল
রূপ রস গন্ধে নিতান্ত পাগল ;
সুধা বােধে ধায়, মিলে মা গরল,
তােগে রােগ ভয়, পরিতৃপ্তি নাই।
পারমার্থিক।
৭১
স্নেহ ভালবাসা বন্ধন-মায়ার--
থাকে যতক্ষণ স্বার্থ আপনার,
বিরাগ বিদ্বেষ তলে তলে তার;
পুড়ে গেলে কাঠ থাকে সুধু ছাই।
নব নব ভোগে ক্ষণেক আহলাদ,
আকাক্ষা মিটিলে মাে তেঁতাে স্বাদ,
সুখ সনে দুঃখ, প্রমােদে প্রমাদ,
কান্না সনে, হাসি মিশে এক ঠাই।
কত কষ্ট ভােগ জনম হইতে,
কতই সংগ্রাম এ দেহ পালিতে,
এ যন্ত্রণা মাগাে পারিনা সহিতে,
শান্তিমাখা মা তাের কোলে যেতে চাই। ১৩৭
বেদ্বেষী করিনে মন নামেতে কি এসে যায়,
যে যেমন বুঝে তারে, সে তেমনি পূজে মায়।
রূপ ভেদে নাম ভেদে, বাইবেল কোরাণ বেদে,
সাকারে কি নিরাকারে মায়েরি মহিমা গায় ।
হিন্দু, বৌদ্ধ, কস্তান,
ইহুদি কি মুসলমান,
মণ, চিনে, নাগা নেংটা সবাই তাঁরি চরণ চায়।
পদ্ধতি কি অনুষ্ঠান, লােক দেখানে মিছে ভান,
অহৈতুকী নির্বিকল্প ভক্তি যার সেই মুক্তি পায়। ১৩৮
৭২ কাব্য-কণা (সুকৰি নীলকণ্ঠের পদানুসরণ) (আমার) কত দিনে হবে সে প্রেম সঞ্চায়? আত্মপর ভুলে, মন প্রাণ খুলে, অভেদ-নয়নে, দেখিব সংসার। দিনেশ, গণেশ, শিব, শক্তি, রাম, বুদ্ধ, যিশু, আল্লা, ব্রহ্ম, রাধাশ্যাম, যে নামে যে ডাকে, পবিত্র সে নাম- শুনে, গণ্ডবহি ব’বে অশ্রুধার। শীখ, শেঠী, মগ, ইহুদী, কৃস্তান, নাগা, নেংটা, পাশী, হিন্দু, মুসলমান, পৃথিবী ভিতরে যথায় যার স্থান- সবে ভ্রাতৃ-জ্ঞান হইবে আমার । কত দিনে দয়া হবে সৰ্ব্ব জীবে, পর দুঃখ দেখে এ প্রাণ কাঁদিবে, পরহিত ব্ৰত এ দেহ সাধিবে, সহিষ্ণু হইব তরু যে প্রকার। কত দিনে ভুলবাে নিন্দা তােষামােদ, অহঙ্কার, লােত, যাবে কাম ক্রোধ, ঘুচে যাবে স্বার্থ, সুখ দুঃখ বােধ, বিশ্ব-প্রেমে কবে হবে মাতুয়া। কবে ঘুচে যাবে জাতি-কুল-ভ্রম, ব্রাহ্মণ যবন, উত্তম অধম, ধনী কি দরিদ্র, দেখবাে এক সম, লােকাচার ঘুচে হবে একাকার। ।
রহস্য।
৭০
জোজিলা, কাশী, মা, বৃন্দাবন,
জনপদ, মরু, সাগর, গহন,
যেথা যাই যেন পাই দরশন,
এ ভব সংসার রচনা যাহার।
সদসং যাহা করেছি জীবনে,
সকলি অর্পিয়া তাহারি চরণে,
তাহারি কৰ্ম্মেতে সাঁপি কায় মনে,
আমিত্ব ঘুচিবে নিষ্কাম আত্মার। ১৩৯
( রহস্য )
টাকারে তাের মহিমা অপার,
স্বত নরনারী, তাের আজ্ঞাকারী,
সিংহাসন তাের নিচেই বিধাতার।
তােমা সম দেবতার, মাঝে কেহ নাহি আর,
নারায়ণের কোলে তাই স্থান কমলার।
কত পুণ্য, কত পাপ, কত সুখ, কত তাপ,
উত্থান পতন ঘঠে, ইঙ্গিতে তােমার।
যার ঘরে তুমি নাই, তাহার কপালে ছাই,
রূপ, গুণ, বিদ্যা, বুদ্ধি, সকলি অসার।
যার ঘরে থাক তুমি, সে স্থান নন্দন ভূমি,
সৰ্ব্ব-গুণান্বিত হয় মূখ দুরাচার।
পিতা মাতা সহােদর, তাের ছলে হয় পর,
• হোেমার কুহকে হয় পর আপনার।
৭৪
কাব্য-কণা।
তাের লাগি রণস্থলে, প্রাণ দেয় বীরদলে,
ধনবলে বলী বলে’ প্রভুত্ব বাজার।
ভূধরে ভূগর্ভে জলে, তুষারে কি মরু-স্থলে,
তাের লােভে ধায় তােক প্রাণ করে ছার।
তােমা সম যাদুকার, অন্য কেবা আছে আর,
বার বার করি তাের পায় নমস্কার। ১৪
টাকারে তুই মজালি আমায়।
তাের প্রেমে মজে,
ধৰ্ম্মপথ ত্যজে,
এ জীবনটা গেলরে বৃথায়।
কি করিব কোথা যাব, কোথা গেলে টাকা পাব,
নিশিদিন গোঙাইনু সেই ভাবনায়।
কত মিথ্যা প্রতারণা, বিধৰ্ম্মীর উপাসনা,
নিত্য করি তাের লাগি ছল রসনায়।
কত হতভাগ্য ভক্তে,
আত্মীয়-স্বজন-রক্তে,
হস্ত কলুষিত করে তাের লালসায়।
স্বার্থপর কত নর,
ভ্রাতৃবধূ, সহােদর,-
পিতৃ-মাতৃ-গুরুঘাতী তাের পিপাসায়।
তাের লাগি চিরকাল, গুপ্ত-হত্যা, চুরি, জাল,
কৃতঘ্ন স্বদেশ-দ্রোহী বিপ্লব ঘটায়।
কত শত রাজবংশ, তাের লাগি হােলাে ধ্বংস,
রণভূমে তাহাদের মুকুট লুটায়।
৫
রহস্য।
৭৫
কত কুলবতী সতী, ত্যজিয়া আপন পতি,
ৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দেয় তাের ছলনায়।
যে সাধনা তাের তরে,
করি নিত্য অকাতরে,
হােত ভাল করিলে তা ঈশ্বর সেবায়।
কেন না বুঝি আগে, মজিনু তাের অনুরাগে,
হায় হায় করে তাই মরি রে ঘৃণায়। ১৪১
{ ও মন) টাকা, টাকা, টাকা করে ঘুরে বেড়াস চরকির মত ।
টাকাতেই কি মনুষ্যত্ব ? টাকাতেই কি সুখ যত ?
রূপার চাকতি পিঠে বাধা, হতে চাস কি সােনার গাধা,
রিপুর দাস মাৎসর্যভরা, অহংকারে জ্ঞানহত।
বল দেখি মন টাকা দিলে, সত্যবন্ধু কয়টা মিলে?
খােসামুদে মােসাহেব সব যােটে বটে শত শত।
ডাক্তার বদ্যি হাকিম ঘিরে, টাকাতে কি আয়ু ফিরে,
মােগ, শােক, জরা, মৃত্যু, নয়তাে টাকার অনুগত।
টাকার লােভে বাগে পেলে, বাপকে মারে পেটের ছেলে,
ভাই ভাই ঠাই ঠাই, খুনােখুনি অবিরত।
টাকা-কি তােক সাথের সাথী ? তার লাগি দিবা রাতি,
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, খেটে মরিস ভূতগত।
কেন রে মন তবু মিছে, ছুটে বেড়াস ধনের পিছে,
যে পাঠালে এ সংসারে, তার পদেতে হওরে নত। ১৪২
প্রভাত।-ৰুণু ঝুণু ৰুণু ঝুণু ময়লা ফেলা গাড়ী ধায়
উঠ উঠ গৃহপক্ষ্মি, যামিনী পােহায়ে যায়।
৭৬
কাব্য-কণা ।
মশা, মাছি, ছারপােকা, তােমার নাক, আর কচি খোকা
ঘুমেতে ও যে সুখ ছিল ঘুচিয়েছে সে দায়।
থােড় বড়ি পুইশাক, ঘুমাে চিংড়ি করাে পাক,
নাকে মুখে গুজে দুটো বেলােবাে ত্বরায়।
তােমার হাতের রান্না, খেলে সুধু আসে কান্না,
মনিবের পদাঘাত অমৃতের প্রায়।
কোমল বুটের চোটে, কবে পিলে যাবে ফেটে,
দুল্লত কেরাণি-জন্ম, করে দেবে সায়। ১৪৩
'
.
রুটি ঘণ্ট খেয়ে,
সন্ধ্যা।-কালি ধুলা মেখে, যখন আফিস থেকে,
ঘরে ফিরে আসি আধমরা হয়ে।
মনিবের গালি, হজম করে ফেলি,
মনে মনে তার বেটার মাথা খেয়ে।
গল করে টা টা, চলে না আর পা টা,
ঘামে চোখের জলে ঝরে বুক বেয়ে।
হাত মুখ ধুয়ে,
কি অ ই কঁাথা পেতে শুয়ে।
হাতে গড়া পান, গৃহিণী যােগান,
এ সংসারে আছি তার মুখ চেয়ে।
সকল ভূলে যাই, হাতে স্বর্ণ পাই,
টিকেটা ধরায়ে হুকায় মুখ দিয়ে ।
কাঙ্গালী জীবন, করি গাে যাপন,
যােগে যুগে যেন রােগী নিম খেয়ে। ১৪৪ •
রহস্য।
৭৭
নথনাড়া আর দিসনে বিধুমুখি।
আমার পেটের ভাত চাল হয়ে গেছে গলা ঠেলে উঠছে উকি।
কলেজের যা লেখাপড়া,
সব হােলাে কচুপােড়,
তােমার হুকুম এমনি কড়া সাধ্যি কি তার একটু খি।
তােমার মধুর গলার চোটে, ফাক করি না দুটি ঠোটে,
পাছে কিছু পড়ে পিঠে, সাক্ষী তার ঐ থােকাখুকী। ১৪৫
মানিনী।-বিগলিত কেশে, আলু থালু বেশে,
কেন কেন চঁাদ পড়িয়া ভূতলে ?
নিশ্বাস পবন, বহে ঘন ঘন,
রবি চ্ছবি মুখে, বুক ভাসে জলে।
কে করেছে দোষ, দাস কিম্বা দাসী,
ভাই বোন মাসী, পিসী, সৰ্ব্বনাশী,
বলাে বলাে তার মাথা খেয়ে আসি,
বাড়ি থেকে দূর করে দিব ছলে।
এত যে গুখুরি চাকুরি করিয়া,
সব সয়ে আছি তােমারি লাগিয়া,
এ সংসারে তুমি জার অব কুষিয়া,
কার মাথা দুটো তােমার হুকুম ঠেলে ।
ওঠো ওঠো প্রাণ ও দুটো কথা,
আফিস থেকে এসে ঘুরে গেছে মাথা,
আর খানিক হলেই ধরবে বুকে ব্যথা,
গড়াগড়ি যাবাে রাঙা চরণ তলে। ১৪৬
৭৮
কাব্য-কণা
বাবু।-বাবু বেরােলেন ফিটফাট,
এলবার্ট কেটে কলার এটে যেন খুন্দর লাট।
গায়ে কোর্ট হাতে ছড়ি, মুখে চুরুট বুকে ঘড়ি,
হাত পা গুলাে দড়ি দড়ি, রঙ টা পােড়াকাঠ।
বাপ করে সদ্দারি মুটে, মা বােনেরা বেচে খুঁটে,
বাবু বেড়ান মজা লুটে, প্রাণটা গড়ের মাঠ।
পেটের মধ্যে ক খ নাই, মুখে ফোটান ফুটুকড়াই
জেলদারগার ঘরজামাই নিত্য কাটেন গাঁট।
আবকারিতে দিগম্বর, পাঁচীর মার নটবর,
চাদমুখীদের নগদা নাগর করেন যােটপাট। ১৪৭
=
ঐ না বদ্দিনাথের এড়ে।
বাহিরের বৈরাগীর ভাব, অঙ্গে ত্রিশূলের ছাব,
পাতের পানা গতাের খানা বেড়ান শিং নেড়ে।
বিনা লাজে হাটের মাঝে, পথেতে শয়ন,
এটে। পাতে, নর্দমাতে, সুখেতে ভােজন,
কারাে কোন কাজে নাই, গাঁ গাঁ হাঁক ছাড়েন তাই,
খোঁজেন পথে চরা গাই, পাছু যান তেড়ে। ১৪-
বল দেখি বিধুমুখি, কেন শতমুখী ধরে ?
কেন এ চামুণ্ডা মূর্তি কোন দানবে বধ তরে।
ঘূর্ণমান রাঙা আঁখি, হুহুঙ্কার থাকি থাকি,
অঞ্চলে নিবদ্ধ কটী, দশম-দংশিতাধরে ?
রহস্য!
বিগলিত কেশ পাশ, আলুথালু ভূষ বাস,
ঘন ঘন বহে শ্বাস, ঘেসিতে না পারি ডরে।
সম্বর সম্বর রােষ, ক্ষম ক্ষেমঙ্করি দোষ,
চরণ-রাজীব দেহ এ কিঙ্কর বক্ষোপরে। ১৫৯'
কোন পুণ্য ফলে,
এ মহীমণ্ডলে,
বাবু রূপে জীব হ’ন অবতার ?
নানা রূপ ধরি, বলল মা শঙ্করি,
কলিকা ধানে করেন বিহার ?
কেহবা কেরাণি, কেহবা মােক্তার,
কেহবা উকিল, কেহবা ডাক্তার,
রাজাবাহাদুর কিম্বা ব্যারিষ্টার,
মহাজন কিম্বা গ্রাম্য জমিদার।
পােষ্যপুত্র কিম্বা ঘরজামাই হ'লে,
পরের বিভবে ধনশালী বলে,
নিরুদ্বেগে তার দিন যায় চলে,
জন মাঝে গণ্য, মান্য সবাকার।
ল্যাভেণ্ডার মেখে, মধুপানে পেকে,
মটোর চেরেট ল্যাণ্ডে জুড়ি হেঁকে,
পাশে বারাঙ্গনা বসিয়াছে বেঁকে,
চলে যান বাবু বেহদ্দ বাহার।
রাজপথ পার্শ্বে বসে বারান্দায়,
অপাঙ্গরঙ্গিনী বিদ্যাধরী প্রায়,
নয়নের ঠারে বাবুরে ভুলায়,
বিলাস-তরঙ্গে আনন্দে সাতার।
কাব্য-কণা।
প্রমােদ ভবনে, গণিকার সনে,
বিলুষ্ঠিত কায় মদীরা সেবনে,
মুখে উড়ে মাছি, পড়ে অচেতনে,
ভেবেছেন বাবু জীবনের সার।
নাহি ঘৃণা লজ্জা, পশুর সমান,
ইন্দ্রিয় সেবায় মগ্ন দেহ প্রাণ,
এই কি নরের উদ্দেশ্য মহান,
এ কারণে কি মা এ সৃষ্টি তােমার ?
কোথা মনুষ্যত্ব, প্রবৃত্তি দমন ?
বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান সব অকারণ,
ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি, নীতি বিসর্জন,
একি! বিষময় ফল সভ্যতার। ১৫
চার্বাক।-সঙ সাজা সার কেবল এ সংসার,
খাও দাও, মজা উড়াও, চক্ষু বুজলে কেবা কারা?
যতক্ষণ আছ বেঁচে, গাও, বাজাও, বেড়াও নেচে,
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম সকল মিছে, দুনিয়াদারি ফকিকার ।
পাঁচ মকারে রাখ মন, হাঁস খেল অনুক্ষণ,
চলে গেলে এ জীবন ফিরে তাে পাবে না আর। ১৫১
কৃউ কুউ করিস কারে তুই বেটাই তাে কুয়ের গােড়া।
পরের অন্ন খেয়ে বেড়াস (তবু) দেহটা তাের কয়লা পােড়া।
চক্ষু দুটো নেশায় লাল, কুকথায় পাড়িস গাল,
মানি না কো সাজ সকাল, দুনিয়াতে নাই তাের জোড়া।
রহস্য।
(কোকিল রে) পুষ্যিপুত্তর কাকের ঘরে, তবু বেড়াস গরব করে,
(ও তাের) বাক্যবাণে প্রাণে মরে, দো কত ছুড়ী ছোঁড়া ১৫২
দি, তুমি ঐ নীলাম্বয়ে-
হেঁসে চলে যাচ্চ চলে রূপের ভরে গরব করে।
মন মজানাে প্রাণ মাতানাে, কতই ঠাট্ ছলা জাননা
চক্চকে ঐ রূপ দেখিয়ে পাগল কর অবােধ নরে।
নিজে তুমি নীরস কঠিন, পাষাণ সমান, জীবন বিহীন,
গিটি করা কান্তি টুকু রয় না চিরদিনের তরে।
বুকেতে আগুন ঢাকা, সর্বাঙ্গে কলঙ্ক মাখা,
তরল হৃদয় বলে সাগর উথলে উঠে তােমায় হেরে। ১৫৩
দুর্গাবিপত্তি।-কে বলে আনন্দময়ী দুর্গানামে দুখ হরে ?
অভাগার দুর্গাবিপত্তি আশ্বিন মাসটা এলে পরে।
আমি গরিবের ছেলে, চাকরিতে সংসার চলে,
ভাত কাপড় যােগান দায় তায় দেশ ডুবেছে মন্বন্তরে।
দারা ত কন্যা জামাই, করে গো মা বিষম হাঁকাই,
কিসে জামাজুতা যােগাই, মান রাখি মা কেমন করে?
যখন চায় গহনাগাটী, ঘরে উঠে কান্নাহাটী,
মিছে ভুতের বেগার খাটি, সুখ নাই একদিনের তরে।
পাষাণে তুই জন্মেছিলি, সন্তানে আগুনে দিলি,
দুর্গতিনাশিনী বলে মিছে চেঁচাই সকাতরে।
যার ঘরে তুই করিস ঘর, ভিখারি সে দিগম্বর,
আমার মত তাের ও দশা, কি দিবি মা অন্যেপুরে। ১৫৪
৮২
কাব্য-কণা।
-
তাই বুঝি রণরঙ্গিনী মূৰ্ত্তি মা তােমার।
জীবন সংগ্রামে মত্ত তাের এ সংসার।
জীবে জীবে সদা রণ, যােগ্যতমের উদ্বর্তন,
ঘাত প্রতিঘাতে চলে সৃষ্টির ব্যাপার।
দশদিকে দশকরে, দশপ্রহরণ ধরে,
শক্রদমি আত্মরক্ষা বর্বরে (১) সংহার।
ধন (২) বিদ্যা (৩) শক্তি (৪) ফলে, সিদ্ধি (৫) লাভ ভূমগুলে,
তুমি কি চরমােন্নতি আৰ্য সভ্যতার?
মূষিক (৬) ময়ুর (৭) সর্প, (৮) পশুরাজ (৯) হীনদর্প,
পঞ্চভূত ভৃত্যভাবে বহে আজ্ঞাভার।
শিয়রে চৈতন্য (১০) বসে, বিভাের আনন্দ রসে,
নব-পত্রিকায় (১১) ন্যস্ত ঔষধ আহার।
দশভুজা মূর্তি দেখে, খ্যাপা কবি ব্যাখ্যা লেখে,
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে, ভারত উদ্ধার !! ১৫৫
প্ৰেম-গীতি ।
প্রাণে খেলে অনুক্ষণ, (ও রূপ মােহন)
সুষুপ্ত শিশুর মুখে হাসির মতন।
বিমল সরসী-জলে, কোমল কৌমুদী খেলে,
নিদাঘের সায়ংকালে মলয় পবন।
১ অসুর, ২ লক্ষ্মী, ৩ সরস্বতী, ৪ কার্তিক, ৫ গণেশ, ৬ ক্ষুদ্রজীব, ৭ পক্ষিজাতি,
* সরীসৃপ জাতি, ৯ পরাক্রান্ত পশু, ১• আত্মা, ১১ রম্ভা, কচু, হরিদ্রা, জয়স্তি,
বি, দাড়িম, অশােক, মান, ধান্য।
প্রেম-গীতি । নিশীথে মুরলী রব, করি যেন অনুভব, শৈশবের চিরস্থত সুখের স্বপন। ১৫৬ কে বলে প্রেম প্রাণের বিনিময় ? এতাে মুখের খেলা সুখের মেলা নয়। কে কিনেছে রূপাের জোরে ? কে বেঁধেছে রূপের ভোরে ? (যখন) আপনি মরে পরের তরে, তবেই প্রেমের পরিচয়। ১৫৭ বুক ফেটে যায় মুখ ফুটেতাে বলতে পারি না। প্রাণের ব্যথা মনের কথা। বাহির করি না। গুমুরে গুমুরে প্রাণ, সদাই করে আনচান, মানে মানে রাখি মান, সাধতে জানি না। শাষাণী পাষাণ দিয়া, চাপিয়া রেখেছি হিয়া, নারীর ধরম তেয়াগিয়া, সরম ছাড়ি না। ১৫৮ কে তুমি সুন্দরি, বন আলাে করি , তরু মূলে বসি ভাব কায় লো? হেরে ও বদন, তরুণ তপন- শরহের শশী লজ পায় লো । বিগােল কুন্তল, দোলে দল দল, নিরুপম কান্তি খেলে ঢল ঢল। কেন বিনােদিনি আঁখি ছল ছল ? হিয়া মাঝে ধরি আয় আয় সাে।
৮৪
কাব্য-কণা।
মদন দহনে তনু জর জর,
নয়নেরি বাণে কঁপি থর থর,
তুয়া রূপে ধনি প্রাণে মর মর,
দাসে রাখাে রাখাে রাঙ্গা পায় লাে। ১৫৯
যখন এলাে সেধে কেঁদে কেঁদে তখন ফিরে চাইলাম না ।
কঠোর প্রাণে অভিমানে কেন কথা কইলাম না।
কতনা কাতর স্বরে,
যেচে ছিল পায়ে ধরে,
তখন কেন সােহাগ করে বুকে নিলাম না।
এখন সে তাে গেছে চলে, তবু কেন মরি জ্বলে,
আপনি ভাসি আঁখি জলে, মন বােঝে না। ১৬০
পরের তরে ধরফর করে কেন মরে প্রাণ ?
যারে চিনতাম না, কভু জানতাম না,
দুদিনের আলাপে কেন তার ওপর হয় এত টান।
এতে প্রাণের গরজ ভারি, তারে ছেড়ে রইতে নারি,
করি তারি এন্তাজারি, খুইয়ে আপন লমান। ১৬১
ওলাে ফচকে চুড়ি, বুকে ছুরি হানিসনে লাে আর,
ও তাের বাক্যিবাণে জ্বলি প্রাণে যেন খুরের ধার।
আড়নয়নে ঘুনিয়ে ঘেসে, কথা কও মুচকে হেঁসে,
প্রাণটা করে ওলোট পালট চেপে রাখা ভাব। ১৬২
প্রেম-গীতি।
৮৫
কি বুঝাব প্রাণসখি কেন তারে ভালবাসি।
মরমে অমিয়া ঢালে সে মুখের মৃদু হাসি।
গােলাপের পরিমল, বীণা ধ্বনি সুকোমল,
লয়ার বায়ু বহে, ভাবিলে সে রূপরাশী।
হেরে অন্য প্রমদায়, সে যদি গাে ভুলে যায়,
মােরে ফিরে নাহি চায়, আমি তবু তার দাসী। ১৬৩
কূটি-কুটিল নাথে কোনাে না কো ও বদন।
আমি দাসী, তাই তো আসি হেরিতে ঐ চরণ।
বিদায় হইয়া যাই, আর কিছু নাহি চাই,
হাস তুমি, হেসে আমি প্রাণ দিব বিসর্জন। ১৬৪
ঐ বুঝি সে পাগলা ছোড়া আসে আমায় জ্বলাতে,
এত যে হেনস্তা করি নিরস্ত নয় কথাতে।
কেন ওটা অবাক হয়ে, থাকে আমার মুখে চেয়ে,
আঁখি ঝরে বুকবয়ে, বােবার মত জোড়হাতে।
যত বলি যেতে চলে, সঘনে নিশ্বাস ফেলে,
দেখে আমি যাই গলে, থাকি না আর আমাতে। ১৬৫
(ও তাের) মুখ দেখে বুক চমকে ওঠে,
প্রাণের ভেতর কেমন করে।
মুখ ফুটে তা বলতে নারি চোক ফুটে জল আপনি ঝরে।
তাইতে লাে তাের মুখের পানে, চেয়ে থাকি আকুল প্রাণে,
কি জানি কিসের টানে, ভাসি যেন ভােলােপরে। ১৬৬
কাব্য-কণা।
বােঝাব কি প্রাণসখি, আপনি বুঝিতে পারি,
কি দেখে গিয়েছি ভুলে কেন তার আজ্ঞাকারী?
কি মােহিনী শক্তি বলে,
এ প্রাণ পড়ে উথলে,
বিধু দরশনে যেন আকুল সাগর বারি। ১৬৭
ভালবাসি, ভালবাসে, সেত লেনা দেনা।
দোকানেতে সওদা যেমন হয় বেচা কেনা।
চাহিনা তার ভালবাসা, রাখিনা দেখিবার আশা,
ভালবাসার সুখ কত, কি বুঝিবে প্রেমিক যে না ? ১৬৮
হৃদয়-মন্দিরে যারে রেখেছি প্রতিষ্ঠা করে।
পরম-দেবতা তিনি, নিত্য পূজি ভক্তিভরে।
অন্য দেবতার ঠাই, এ ক্ষুদ্র হৃদয়ে নাই,
আমার সর্বস্ব তিনি, ইহলােকে লােকান্তরে।
কাছে কিম্বা দূরে থাকি, বনে সিংহাসনে বা কি,
সেই নাম জপমালা, সে নামে অমৃত ঝরে।
অভাগীর এ কপালে, যা ছিল তা গেছে ফলে,
নিঠুর বােলােনা তারে, পাপ হবে শুনলে পরে। ১৬
।
পাপিয়া-চো গেল’ বলে সখি, দেখ না লাে কেবা কাঁদে।
ও বুঝি আমার মত মজেছে রূপেরি কঁাদে।
তাই লাে নিরাশ মনে, গােপনে বিজন বনে,
প্রাণের উচ্ছাস ছাড়ে বিনাইয়া নানা ছাদে।
আমি ও লাে চখে দেখে, প্রেমের গরল মেখে,
মরমে গুমুরে মরি, না পেয়ে হৃদয় চাদে। ১৭০
প্রেম-গীতি।
৮৭
পাপিয়া-রূপেরি কিরণে কার ঝলসিয়া গেছে আঁখি ?
‘চোক গেল’ বলে তাই কেঁদে ওঠে থাকি থাকি।
কে বুঝি প্রেয়সী তরে, মধুর কোমল স্বরে-
করুণ বিলাপ করে ও নহে বনের পাখী।
কেন ওর কথা শুনি, প্রাণে ওঠে প্রতিধ্বনি ?
ও যে প্রেমিক চুড়ামণি (ওরে) আদরে হৃদয়ে রাখি।১৭১
৫
কোকিল-এ নিশীথে কুইরবে কেরে ও জাগায়ে দিল।
সেকেলে কাহিনী যাহা হৃদয়ে ঘুমায়ে ছিল।
কে যে ছিল, কি যে নাই, কারে খুজি, কিবা চাই,
কেন আছি, কোথা যাই, আঁধারেতে কি ডুবিল।
সলিলে পড়িল ঢেলা,
বীচিমালা করে খেলা,
ভেঙ্গে দিল শান্তি-বেলা, সরসী করি পঙ্কিল। ১৭২
কার পিরীতে এ নিশীথে প্রাণটা করে’ উচাটন,
‘বউ কথা কও'বলে সখে! ঘন ঘন এ রােদন।
চাদ বদনে ঘােটা দিয়ে, বসেছে কি তাের প্রিয়ে,
কেন এত লােকচলিয়ে চেঁচিয়ে মরিস অকারণ?
নারীর কঠিন প্রাণ, সহজে যাবেনা মান,
গলায় বসন করে দান, ধরগে দুটো শ্রীচরণ। ১৭৩
কাব্য-কণা
গাছের ফুল গাছেতে থাক্ ঘােচাসনে সই ওর মাধুরী।
তরুলতা পাবে ব্যথা প্রাণের ধন তার করলে চুরি।
যাহা ভাল সাজে যারে, বিধাতা দিয়াছেন তারে,
গােলাপে অলক্ত ঢেলে দেখাসনে সই কারিগরি ।
পরের ভূষণ কেড়ে লয়ে,
নিজের অঙ্গ সাজাইয়ে,
পরচুলের খোঁপা বেঁধে, বলনা কি তায় বাহাদুরী ? ১৭৪
(আমার) ছেলে মেয়ে তরু লতা,
কেমন মাথা নেড়ে খেলা করে।
(ওদের) ফুলের রাশী মধুর হাসি,
হাসে কেমন আমােদ ভরে।
বাতাসী ধাই হেলে দুলে, নাচায় কেমন কোলে তুলে,
(আবার) আব্দার করে কঁদে যখন পত্র-নেত্রে শিশির ঝরে।
নাহি হিংসা, নাহি দ্বেষ, কোমল শ্যামল বেশ,
শীতাতপ হিম বর্ষা সহে অকাতরে।১৭৫
এক দিন সন্ধ্যার সময়,
ছড়ায়ে ফুলের বাস ধীরে বায়ু বয়।
সরসীর তীরে একা, তার সনে হােলাে দেখা,
স্বর্গের প্রতিমা যেন ভূতলে উদয়।
আর কেহ নাহি কাছে,
পাখীরা ডাকিছে গাছে,
অপূৰ্ব্ব সােন্দর্যে ভরা যেন বিশ্বময়।
কি মধুর মূৰ্ত্তি একে, হৃদয়ে গিয়েছে রেখে,
এ জীবনে আর তাহা ভুলিবার নয়। ১৭৬
প্রেম-গীতি । ও অতুল রূপে, আকুল পরাণ- সপেছি হৃদয় চরণে তােমার। জানি ও মুখে কি মােহিনী আছে, • অতৃপ্ত-নয়নে হেরি বার বার। চাহিনা তােমার ভালবাসা কণা, দূরে থাকি সদা হেরিতে বাসনা, কোরাে না কোরাে না সে সুখে বঞ্চনা, এ দগ্ধ হৃদয় নৈরাশ্যে আঁধার। তাও নাহি পাই, নিভৃত করে, ও প্রতিমাখানি পরম আদরে, দিবানিশি ধ্যান করিব অন্তরে- যত দিন প্রাণ রবে অভাগার। জানি ভালবাসা সুখ পুণ্যময়, ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি, ক্ষুধা সেততা নয়, এ হৃদয় নাহি চাহে বিনিময়, অন্য সুখ যত হােক ছারখার। ১৭৭ বিলােল কটাক্ষ চটুল নয়নে, মুখে মৃদু মৃদু রসময়ী ভাষা। মধুর অধরে টিপি টিপি হাসি, কেন লো চপলে বাড়াও পিপাসা ? মুখে বল না না, ভাবে যায় তাে জানা, হৃদয়ে লুকানা, গূঢ় ভালবাসা। কি কাজ সরমে, মজেছি মরমে, দাসে মনােরমে, কোনাে না নিরাশা। ১৭৮
৯
কাব্য-কণা
চাঁদপানা সেই মূখখানা তার সদাই আমার পড়ে মনে।
চকিতে চপলা যেন খেলে প্রাণে সঙ্গোপনে।
দুজনাতে সকাল বেলা, করেছিলাম কতই খেলা,
এখন সে লুকাল কোথায়, পাব কি তায় এ জীবন
হৃদয়ে উচ্ছাস বহে, গুমুরে মরম দহে,
চেতনা রহেনা দেহে, ধারা ঝরে দুনয়নে। ১৭৯
চোক দুটি তার পটোলচেরা জোড়া ভুরু তায়।
আড় নয়ন চায় সে যখন মুণ্ডু ঘুরে যায়।
কোঁকড়া চুলে বাঁধা খােপা, রঙটী যেন কনক চাপা,
টুক্ টুকে তার গাল দুটীতে গােলাপ লজ্জা পায়।
মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলাে, নাকে নােলােক বয়স ষােল,
যৌবনেতে ঢল ঢল, তরঙ্গ খেলায়।
এক দিন দেখা দিয়ে, কোথা গেল পলাইয়ে,
মন প্রাণ কেড়ে লয়ে মজিয়েছে আমায় । ১৮
মরি হায় ! সুখ যায় স্মৃতি টুকু কেন যায় না?
নিরুপায় মনোধায় যাহা চায় তাহা পায় না।
ছিড়েছে বীণার তার,
উঠে না ত সে ঝঙ্কার,
প্রাণে গাঁথা সুরটুকু কেন রে লুকায় না।
গােপনেতে থরে থরে,
মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে দগ্ধ করে,
সে অনল গেছে নিতে, জ্বালাতে জুড়ায় না।.
হৃদয় উদাস করে, শাণিতের ধারা ঝরে,
সে ক্ষত শুকায়ে গেছে, দাগ তাে মিলায় না। ১৮১
প্রেম-গীতি ।
অনিমিষ চোখে তুয়া মুখ পানে,
চেয়ে আছি বলে হেঁস না সুন্দরি।
বেণীটি দুলায়ে,
অধর ফুলায়ে,
টিপি টিপি অত হেঁসনা সুন্দরি।
ভেবনা লবনে, কামের ছলনে,
এ পামরের মন লইয়াছ হরি।
হাসি চাহনিতে, পরে মজাইতে,
এত মত্তা কেন আপনা পাশরি।
যেই রূপ টুকু দেহেতে তােমার,
কেন মিছে তুমি গৰ্ব্ব কর তার।
হ্রাস বৃদ্ধি হয় কি ইচ্ছায় আপনার ?
পার কি রাখিতে চিরদিন ধরি?
তুচ্ছ তৃণ গুচ্ছ, শুক্তি, সেহলায়,
শিশিরের বিন্দু, পতঙ্গের কায়,
উচ্চ দূরে থাক অতুল শােভায়
হেন হেয় বস্তু রহিয়াছে ভরি।
যহার প্রসাদে এ বিশ্ব সংসার,
অনন্ত অসীম শােভার ভাণ্ডার,
তােরে দেখে তার মহিমা অপার,
মনে পড়ে তাই অন্তরেতে স্মরি। ১৮২
পিরীত কি সরেস।
এতে নাইকো সুখ লেশ।
এ চিত-দিল্লির লাড়ু, ভেতর দু ?
বাইরে মজার বেশ।
কাব্য-কণা।
পিরীতে-জাহ খোজেনা, রূপ দেখেনা,
মানেনা বয়েস।
পিরীতে—কেঁদে হাসায়, হেসে কাঁদায়,
কি মজার আয়েস।
পিরীতে—ভিচ্চ আমীর, বাসা ফকীর,
বহুরূপীর বেশ।
পিরীতে—অাপনা তােলে, পরকে তােলে,
নাজেহাল এক শেষ।
পিরীতে-বাঁচায় মারে, মড়া বাঁচায়,
(যেন) যাদুকর বিশেষ।
পিরীতের দিব কি নিকেস। ১৮৩
প্রেম পিরীতি, ভালবাসা, সে সব সুধুই চখের নেশা।
যৌবনের তরঙ্গ ভঙ্গ, কিম্বা লাে সই রূপের পেশা।
আমােদ প্রমােদ ভরে, হাসা খেলা পরস্পরে,
জোয়ারের বেগ বয়ে গেলে, ভাটাতে হয় যে তেসা।১৮৪
অমন করে দাসীর তরে ফেলােনাকো চখের জল,
স্মৃতির মন্দিরে ছিছি পুষােনাকো হলাহল।
ফুরায়ে এসেছে বেলা, সাঙ্গ জীবনের খেলা,
এখনি চলিয়া যাবে, ছাড়ি জীর লীলাস্থল।
না হেরিলে হাসি মুখ, মরণেও নাহি সুখ,
হাঁস তুমি হেঁসে আমি মন মাঝে পাই বল।
সময় আসিবে যবে, লােকান্তরে দেখা হবে,
অনন্ত-মিলনে সেথা প্রাণ হবে সুশীতল। ১৮৫
প্রেম গীতি ।
ওকি টিপি টিপি হাসি! ওকি আড়ে আড়ে চাওয়া!
মন মজালে বাঁশীর গানে, পাগল কল্পে ফুলের হাওয়া।
নিয়ে গেল কোন দেশে, এ সংসার গেল ভেসে,
রূপেতে ভরিল প্রাণ, ঘুচিয়ে দিলে নাওয়া খাওয়া।১৮৬
ভালবাসার এ কেমন বিচার?
দূরে থেকে দেখব তারে, সে দেখাটাও মেলা ভার।
শুনলে দুটো মুখের কথা, ঘুচে যায় মরমের ব্যথা,
কেমনই সে মৌনবতী মুখ তত ফোটেনা তার।
আমি তাে সপেছি প্রাণ, চাহি না তার প্রতিদান,
(সে) সুখে থাকলেই আমি সুখী, এই মাত্র বুঝি সার ।১৮৭
চোখে চোখে প্রেমের কথা, বােঝাবুঝি প্রাণে প্রাণে,
যে মজেছে সেই বুঝেছে, অন্য পরে কিবা জানে।
মুখেতে ফুটেনা ভাষা,
দর্শনে মিটেনা আশা,
ৰে বাহার ভালবাসা, অলক্ষ্যে তাহারে টানে। ১৮৮
যখন রােগে মােগে ছটফট করে প্রাণ।
দেহেতে থাকেন বল, আরে না জান।
বমি, কৃমি, বিষ্ঠা মেখে, মূৰ্ছা যাই কি উঠি কে কে,
বােধ হয় চারিদিকে নরক সমান।
কোমলা মহিলা বেশে, তখন কোন্ দেবতা এসে,
হাত বুলায়ে নুধা রসে, শান্তি করে দান।
বিলাসের সামগ্রী নারী, যে বলে সে মুখ ভারি,
অনন্ত সন্তাপহারী, অর্মের সােপান।১৮
কাব্য-কণা
যাতে তুমি সুখী থাক, সেই সুখেতে আমি সুখী।
তবু কেন এ অধীনে ভিন্ন ভাব বিধুমুখি।
নিরবধি কত সাধি, এতে পায়ে ধরে কঁদি,
তবু যে তাের পাইনা রে মন, কেমন তুমি পাথর-বুকী ?১৯০
মন হারাননা, প্রাণ খােয়ানাে, নবীন যৌবনে।
কমারী পিরীতি করা যুবতীর সনে।
কথায় কথায় অভিমান, পলকে প্রলয় জ্ঞান,
ক্ষণেকে আকাশে উঠি, জলে পড়ি ক্ষণে ১৯১
(আমি) চাইনে রূপের চকানি দুদিনের তরে।
বসন্তে ফুটন্ত ফুল তত আজ বাদে কাল যাবে ঝরে।
যার বুকেতে প্রেমের মধু, কোরবাে তারে প্রাণের বঁধু,
হবে না তায় ছাড়াছাড়ি এ দেহে কি দেহান্তরে।
কপটে সপিলে হিয়ে, পালায় প্রাণে দাগা দিয়ে,
মরে তখন ছটফটিয়ে, বিষম বিরহ শরে।১৯২
=
রূপ দেখে যে সােহাগ করে ভালবাসা কোথায় তার ?
পেট ভরূলে দুদিন পরে, মােগা তেঁতাে সে ক্ষুধার।
রূপের ঝলক যতক্ষণ,
ততদিন আকর্ষণ,
রূপ ফুরালে পালায় ফেলে ফিল্পে তাে চাহেনা আর।
প্রেমে আত্ম বিসর্জন, প্রাণে প্রাণে সম্মিলন,
• সে সুধার গন্ধমাত্র মাংসপিণ্ডে মেলা ভার।১৯৩
নানা বিষক।
আগে চাই রূপের আকর্ষণ,
গুণের পরিচয়ে শেষে প্রাণের সম্মিলন।
মৃত্তিকা, উত্তাপ, জলে, তবে তাে অঙ্কুর ফলে,
সুধু বীজে কোন কাজ হয় না কখন।
আগে রূপে, আলাপনে, লালসা উগজে মনে,
সুচারু প্রেমের তরু গুণেতে সুজন।১৯৪
ভালবাসা নয়তো কারাে হাতধরা, ৭
বেছেগুছে, যেচে খুজে, হয় কি লাে সই প্রেম করা?
ইচ্ছামত ঘসে মেজে, রূপ আভরণে সেজে,
সেতত রূপের দোকানদারী, বাহিরে নয়ন-হরা।
প্রাণে প্রাণে মেলে প্রাণ, অন্তরে অন্তরে টান,
তারেই বলি ভালবাসা, দুজনাতে আধমরা।১৯৫
নানা বিষয়ক।
বসে’ গাই আপন মনে, প্রাণের সনে মুখোমুখী,
এলােমেলাে কতকগুলাে ছায়া মারে উকিঝুকি।
সংসারের নানা আলা, করে যখন ঝালা পালা,
কবিতা মদিরা পানে কতক মতক ভালাে থাকি।
চিন্তা-প্রবিণ ফুটে, কত ভাব মনে উঠে,
কল্পনা রঙ্গিণী খেলে, জাগিয়ে স্বপন দেখি।
ধুধু করে মরুভূমি, ক্লান্তপদে ধাই আমি,
মরীচিকার জল দেখে, মনে মনে হই সুখী।১৯৬
কাব্য-কণা।
আশা কনক-মৃগ পাছু পাছু সদা খাই।
ধরি ধরি, ধরি করি, খরিবারে কই পাই।
কন্তু ধীরে কভূ ধায়, কভু বা লুকায় কয়,
আশেপাশে পুনরায়, এই আছে, এই নাই।
ছড়িয়ে ছিড়িছে কায়, ফোটে কাটা পায় পায়,
হৃক্ষেপ করিনা তায়, কভু ফিরে নাহি চাই।১৯৭
স্পর্শে, অমৃত
সিঞ্চন।
কোথা নিদ্রে ! সুকালে এখন?
বিরামদায়িনি দেবি, দাও দরশন।
এসে দাসে দয়া করে, শান্তিময় অঙ্কোপরে,
চিন্তাক্লান্ত মাথা মাের করি সমর্পণ।
রােগী যবে যাতনায়, অস্থির লুষ্ঠিত কায়—
তােমার মধুর
কঠোর শৃঙ্খল ভারে,
বদ্ধ যেই কারাগারে,
তুমি যাদু মন্ত্রে তার ঘুচাও বন্ধন।
পক্ষপাত নাহি গণি, কি দরিদ্র কিবা ধনী,
তুল্যরূপে আশীর্বাদ ক বিতরণ।
ৰূপন বুঙ্গিনী সনে, খেল নয়ে কত জমে,
কারে বা হাসাও, কে করে গাে রােদন।
তাই ডাকি এসে দেবি, তােমার চরণ সেবি'—
সংসারের হলাহল ভুলি কিছুক্ষণ।১৯৮
নানা বিষয়ক।
ওই যে সুন্দরী ঊষা পূরব গগনােপরে,
আরক্ত বদন কান্তি, মৃদু হাসি বিম্বারে।
নিদ্রিতা ধরণী প্রতি, নেহারিছে লজ্জাবতী,
হৈমময়ী যবনিকা সরাইয়ে উকি মেরে।
পাখীগণ কলস্বরে,
আবাহন গান করে,
শিশির বিধৌত পুষ্প তকদল আছে ধরে। ১৯৯
হের সখি শশীর কিরণ।
এলাইয়ে বেলা ভূমে ঘুমে অচেতন।
সুষুপ্তা বসুধা গায়, শুভ্র আস্তরণ প্রায়,
প্রকৃতির যাদু মন্ত্র করে আচ্ছাদন।
প্রেমের পীযুষ কিবা, যশের বিমল বিভা,
ময়ার কুহক যেন, আশার স্বপন।২••
প্লেগ।-কেউ বলছে পেলে গাে, কেউ বলছে পালাগো,
কলকেতা তােপাড়।
রামনাম আর হরিবােলে, কার সাধ্য পথে চলে,
নিমতলা গুলজার।
তাল মানুষ এলো জ্বর, বেহুস কাপে থর থর,
গলা, কুচকি, বগল ফুলে একদম সাবাড়।
হিন্দু, জৈনী, মুসলমান, ইহুদী কি কেরেস্তান,
চীনে, মগ, শিখ, শেঠী, কারাে নাই নিস্তার।
হাকিম বদ্যি ডাক্তার যাঁরা, কিছুই হদিস পান না তাঁর,
*দেখেন করে নাড়া চাড়া, ভিজিটের জোগাড়।
১৮
কাব্য-কণা
বিদেশেতে যাদের বাড়ী, খােটা কিম্বা মাড়ােয়ারী
পালাচ্ছে সব তাড়াতাড়ি, খালি বড়বাজার।
ধনীলােকে হাসি মুখে, বাগানে কাল কাটা সুখে,
গৃহস্থেরা শশব্যস্ত, গরিব নাচার।
হাকে ডাকে গগন ছেয়ে, ফেনি দিয়ে বাড়ি ধুয়ে,
বেড়া গোঁফে চাড়া দিয়ে, মুন্সপালের অফিসার।
7
বাজিছে বৃটীশ বাদ্য, বাঝ র ঝ ঝ।
কুলীশ নিনাদে তােপ গর্জে অগণন।
ভীষণ কেশরী আঁকা, উড়িছে রাজ-পতাকা,
সম্রাটের অভিষেক করিছে ঘােষণ।
কহিনুর বিনিন্দিত, জ্ঞান জ্যোতি বিস্ফারিত,
বিশাল লােচনে চারু প্রসন্ন বদন।
সুদৃঢ় দক্ষিণ করে, দীপ্ত রাজদণ্ড ধরে,
কটীতে কৃপাণ দোলে শত্রু বিমর্দন।
সখা রাজবৃন্দ সনে,
অধিষ্ঠিত সিংহাসনে,
অতি মুকুট-মণি রঞ্জিত চরণ।
সুবিশাল রাজ্য খান, ভানু নাহি অস্ত যান,
ভিক্টোরিয়া জননীর সুযোগ্য নন্দন।
সম্রাটে হে দয়াময়! দীর্ঘ আয়ু, দেহ জয়,
রাম রাজ্য সম হােক ভারতে শাসন।২০২
ছেলে বেলা করিতাম মনে
বড় হলে কত সুখ ধন উপার্জনে
নানা বিষয়ক।
সবে বাবু বাবু কয়,
লেখা পড়ার নাহি ভয়,
খাওয়া পরা চলা ফেরা আপন শাসনে।
যতই বয়স যায়, বুক ফাটে ভাবনায়,
তখন করি হায় হায়, শৈশব স্মরণে।২৩
হায় রে! সে আমি কই ?
আগেতে যে আমি ছিলাম আজ আমি সে আমি নই।
শিরীষ কুসুম তুল্য, সুকোমল সুপ্রফুল্ল,
চঞ্চল মাধুরী মাখা, সেই শিশু আমি কই ?
তরুণ অরুণ সম,
উদিয়ান মনােরম,
জ্ঞান বিদ্যা লালায়িত, সে বালক আমি কই ?
চুম্বুক পাথর মত,
পন্নি, বন্ধু অনুগত,
প্রণয় প্লাবিত চিত, সে কিশোর আমি কই ?
রণােন্মুখ বীর প্রায়,
বল-দৃপ্ত দৃঢ় কায়,
ধন মান যশশা লিপসু সে যুবক আমি কই ?
শিথিল ইন্দ্রিয়চয়, প্রগলভ রসনাময়,
গভীর শিক্ষক কল্প, সেই প্রৌঢ় আমি কই ?
রােগ শােক, জ্বরা জীর্ণ, কপট সংশয়াকীর্ণ,
দুরদৃষ্ট চক্রপিষ্ট বার্ধক্যে সে আমি নই।২০৪
পােড় চোখে ঘুম এলেনা জেগে রাত কাটাই।
পড়ে পড়ে আবােল তাবােল তাবি ভস্ম ছাই ॥
কল্পনার ঘাড়ে চড়ি, কত রাজ্য ভাঙ্গি গড়ি,
মিল্টন হাফেজ, ডান্টে, কালিদাসের মাথা খাই।
১০০
কাব্য-কণা।
।।
ইন্দ্রধনু সেতু ধরে, চলে যাই স্বগোপরে,
নারদের সঙ্গে মিলে কোন্দল বাধাই।
দেবাসুৰে লাগে দ্বন্দ্ব,
স্বার্থবশে ভাল মন্দ,
তারাও মানুষের মত মরি কি বালাই।
দ্বেষ, হিংসা, অহঙ্কার, থাকে যদি দেবতার,
তা হলে দেবতা নরে প্রভেদ কি ভাই ?
কভু যাই যমপুরে,
সে আঁধারে ঘুরে ঘুরে,
দেখি কোথা আমা সম পাপীদের ঠাই।
ধৰ্ম্মরাজ নিক্তি ধরে, পাপ পুণ্য ওজন করে,
যে জনের যাহা প্রাপ্য তারে দেন তাই।
শাস্ত্র বলে মরে গেলে, তবে ভােগাভাগ মেলে,
মৰ্তে থাকি কৰ্ম্মবশে ফলাফল কি নাই ?
তবে কেন ইহলােকে,
হাসি কাদি হর্ষে শােকে ?
জন্মান্তরে কৰ্ম্মবাদ, অদৃষ্ট দোহাই !!!২০৫
চিন্ময়ি! মৃন্ময়ী-রূপে পূজি মা তােমারে।
অনন্ত অচিন্ত্য ভাব বুঝি কি প্রকারে ?
তবেদরে বিশ্বডিম্ব, আমি ভঙ্গুর জলবিদ্ধ,
তুমি জ্যোতিঃ স্বরূপিণী, আমি অন্ধকারে।
তুমি সৰ্ব্বসীমাতীত, আমি রেণু পরিমিত
শ্ৰদ্ধাপুষ্প, ভক্তিচন্দন, দিব কোন্ আধারে ?
শিলা কাষ্ঠ মৃত্তিকায়, রচি মূৰ্ত্তি কল্পনায়,
যথা জ্ঞান, যথা শক্তি, অৰ্চনা সাকারে।
তুমি যে মা অন্তর্যামী, হীন মূঢ়মতি আমি,
তুরা’বে কি কৃপাময়ি! ভ্রান্ত দুরাচারে ?২৬
নাৰ বিষয়ক।
sos
হায় রে । কেন আমি ধনীর সন্তান ?
লােকে বলে ক্ষণজন্মা মহা ভাগ্যবান।
সোনার ঝিনুক মুখে,
শৈশব কাটানু সুখে,
সবে ধন নীলমণি বংশে মিশান।
অকালেতে বাবা মােললা, লেখাপড়া সাঙ্গ হলো
বিষয়ের সুখভােগে দিলাম গা ভাসান।
নানারঙ্গে সঙ্গীগণ, নেশায় মজিল মন,
বার-বিলাসিনী হােলাে স্বর্গের সােপান।
যৌবন, ধন-সম্পত্তি, অশাসিত চিত্তবৃত্তি,
দশচক্রে করে তুঙ্গে ‘ভূত ভগবান”।
দেহে মনে নানা রােগ, একে একে দিল যােগ,
বিষয় জড়িত ঋণে, হাতে বড় টান।
শেষে মিথ্যা এবঞ্চনা, গঞ্জনা লাঞ্ছনা নানা,
ঘৃণা লজ্জা অনুপে জর জর প্রাণ।
জননী কাদেন দুঃখে,
:ত্নী সদা ম্লান মুখে,
তবুতাে বিলাস তৃষা, নহে অবসান।
মাতিয়া যৌবনে ধনে, পশুসম আচরণে,
অবাধে পাপের স্রোত বহানু উজান।
হায়! পূৰ্ব পিতৃগণে,
করিতেন যেই ধনে-
স্বগোপম পবিত্র ধর্ম অনুষ্ঠান।
কি খেদ! পামর আমি, হইয়া বিপথগামী,
সেই ধনে কিনিলাম নরকেতে স্থান।
মম সম পাপাত্মারে, সৃষ্টি করি এ সংসারে,
বল মাগাে কোন ই হয় সমাধান ?২০৭
১০২
কাব্য-কণা
.
মধুপুর।-বাঙ্গালীর দাঙ্গীলিঙং ধন্য মধুপুর,
অধরাত্রে মেলট্রেনে আসি এতাে দূর।
পাথুরে সহর তার, পথ ঘাট পরিষ্কার,
জলে লোহা, মিঠে হাওয়া লােগ করে চুর।
সুচারু বাসের স্থান, চারি দিকে বিদ্যমান,
বাংলাে, লজ, কেম্প, কট, ব্যারাক কুঙুর।
স্মিথহল সুবিশাল, দত্তজার হাসপাতাল,
দাতব্যে ঔষধ পায় গরীব অতুর।
সরুচাল, ভালাে ডাল, পাওয়া যায় আজ কাল,
মাছ নাই, মুর্গী মট বাজারে প্রচুর।
রুগ্ন দেহ ভগ্ন মন, হেথা আসে বাবুগণ,
কেরাণী, উকিল, জজ, রাজাবাহাদূর।
গায়ে ওড়না বঙ্গনারী, পায়ে জুতা সারি সারি,
দুবেলা মাঠের হাওয়া খান সুমধুর।
খোলা প্রাণ সাদা মন, বাসীন্দা সাঁওতালগণ,
নরনারী মিলে নাচে, গায় একসুর।২০৮
==
বৈদ্যনাথ।-এখানে আসিলে হােতো রােগের নিপাত,
তাই বাবা লােকে তােমায় বলে বৈদ্যনাথ।
পাণ্ডাদের ভিড়, পুরাণ মন্দির,
শিবগঙ্গা গলি দেখে চক্ষু স্থির,
আঁকা বাঁকা বাড়ি না চলে সমীর,
দমফেটে যাত্রী হয় কুপােকাত।
নানা বিষয়ক।
১০৩
পেঁড়া দই ছাড়া ভালাে খাবার নাই,
দুর্গন্ধের চোটে প্রাণ করে পালাই,
বাহিরে সাহেবী সহরেছে যাই,
দূর থেকে বাবার পায় প্রণিপাত ২০৯
উপােবন।রমা তপােবন গিরি, পাথরে গাঁথানাে সিড়ি,
গর্ভবতী রমণীও সুখে উঠে যায়।
বিরলে ধ্যানের স্থান, কত গুহা বিদ্যমান,
খুজে কেহ নাহি পান লুকাইলে তায়।
নিচেতে কৃপের জল, সুবিমল সুশীতল,
শ্রান্ত পান্থে ক্লান্তি দূর করে পিপাসায়।
উপরে মােহস্তের মঠ, ঠিক যেন চিত্রপঠ,
কলি দেওয়া সুসজ্জিত বিলাস সজ্জায়।
রূপার গেলাস থাল, লালপেড়ে বাঘছাল,
তাপােষ আচ্ছাদিত কোমল শষ্যায় ।
আধ ইঞ্চি সরপড়া, প্রকাণ্ড দুধের কড়া,
চেলারা নিযুক্ত সবে গুরুর সেবায়।
সংসার বিবাগী যােগী, এত যদি সুখ ভােগী,
বিষয়ীর কিবা দোষ ভােগ লালসায় ?২১০
পুরুলিয়া-পুরুলিয়া পরিষ্কার সাহেবী সহর,
হাসপাতাল, আদালত, জেল, ভাকর।
কতই দোকান বাটী, কত বাংলা পরিপাট,
• বিশাল সাহেবা, পৃথ মনােহর।
১০৪
কাব্য-কণা।
বাঙ্গালীর যাহা চাই, যাহ। পরি, যাহা খাই,
মাছ, দুধ, চাল, ডাল, সন্দেস বিস্তর।
বাউড়ি সাঁওতাল ধরে, চা বাগানে কুলি করে,
মানুষের ঠেলা গাড়ি পুণ্ডুষ সুন্দর।২১১
পঞ্চকোট।গিরিবর পঞ্চকোট বিশাল শরীর।
অঙ্গে কত আম্রবন, দেউল, মন্দির।
ভাঙ্গামঠ দেবালয়, কাল দন্তে হয় ,
শােকে তিনধারা বয় চোখে যেন নীর।
মেটেদূর্গ, রাজবাটি, নবরত্ন পরিপাটি,
উলুবনে হয় মাটী, ভাঙ্গিয়া চৌচির।২১২
গয়া।—যত কিছু তীর্থ আছে সকলের সার।
গয়ার সমান তীর্থ দুটী নাই আর ।
নিজের কামনা নাই, অন্যের মঙ্গল চাই,
পিতা, মাতা, জ্ঞাতি, গােষ্টী, ভগিনী, ভ্রাতার।
নমাতা পিতা জনে, পুত্র বন্ধু হীন গণে,
বিষ্ণুপদে ভিক্ষা যাতি করিতে উদ্ধার ।
মানুষ দুরেতে থাক, পশু, পক্ষী, কীট, নাগ,
সবার সদগতি খুজি, মুক্তি জীবাত্মার।
মা, বৃদ্ধ, যুবা সবে,
পিণ্ডদান করে যৰে,
স্মৃতির পবিত্র নদী চক্ষে ঝরে তার।
এ হেন নিষ্কাম কর্ম, হেন পবিত্র ধর্ম,
হক্তিমাখা হিন্দু বিনা, আছে অন্য কার ২১৩
নানা বিষয়ক।
বারাণসী-গঙ্গাতীরে কিবা শােভা নয়ন-রঞ্জন,
গিরিশ্রেণী সম ঘাট, মন্দির, ভবন।
ইহার তুলনা নাই, লােকে বুঝি বলে তাই,
শিবের ত্রিশূলােপরে কাশী নিকেতন।
ভিতরেতে কিন্তু তার,
পুতিগন্ধ অন্ধকার,
সংকীর্ণ মলিন পথ না চলে পবন।
কতই মন্দির, ঘাট, বিপণি, বাজার, হাট,
ছড়াছড়ি শিবলিঙ্গ না যায় গণন।
জয়সিংহ নৃপতির প্রাচীন মানমন্দির,
সারনাথে বৌদ্ধ কীর্তি, অতি পুরাতন।
শিয়ােলে সাহেব পাড়া, সেফাই সঙ্গিন খাড়া,
নগরের নানাবিধ উন্নতি সাধন।
অন্নপূর্ণা বিশ্বেশ্বর, দুর্গাবাটী, লম্বােদর,
বিবিধ শাস্ত্রের চর্চা, কালেজ ভবন।
ভাঙ্গি বেণীমাধাে শিব, পিতৃদ্রোহী আরংজীব,
কীৰ্ত্তি বা কলঙ্ক ধ্বজা করেছে স্থাপন ?
পরমহংস, দণ্ডী, যতি, কত সাধু পুণ্যমতি,
হেথায় কাটাতে আসে অন্তিম জীবন।
কত ভণ্ড দুরাচার, বারাঙ্গনা, কুলাঙ্গার,
কত মতে পপি-স্রোত করিছে বর্ধন।
শুনি কাশী
পুণ্যধাম, হায়! একি পরিণাম,
অশেষ কলুষ পঙ্কে মলিন এখন।২১৪
কাব্য-কণা।
এয়াগ।-প্রয়াগে যমুনা সনে গঙ্গার মিলন।
আর নির্মিত দুর্গ বিশাল ভীষণ।
সুড়ঙ্গে অক্ষয় বট,
মুকুন্দ যােগীর মঠ,
অশােকের জয়স্তম্ভ সুঠাম গঠন।
খসরুবাগ মনােরম, ভরদ্বাজ পুণ্যাশ্রম,
বেণীঘাটে করে লোেক মস্তক মুণ্ডন।
যাদের মাথায় টাক,
বেণীঘাটে তারা যাক,
বেণী-বিননাদিনী যেন না যায় কখন।
পূৰ্বেতে সঙ্গমে আসি, মুক্তি পদ অভিলাষী,
করিত বর্বর লােকে, আত্ম বিসর্জন।
কলের জল পথে আলাে, রেলের কারখানা ভালো,
বােম্বাই যাইতে হলে দক্ষিণে গমন।২১৫
আগ্রা।-আকবর পাতশার সখের সহর,
আগরা মসীদ দুর্গে, বড়ই সুন্দর।
শ্যাম যমুনার জলে,
প্রতিবিম্ব কত স্থলে,
পথ, ঘাট, বাটী, ঘর, বিপণি বিস্তর।
গগনে ঠেকেছে মাথা, লােহিত পাথরে গাঁথা,
উঠেছে সুদৃঢ় দুর্গ রম্য থরে থয়।
দেখগে ভিতরে তার, আম, খাস, দরবার,
মতিমসী, সীসমহল, কিবা মনােহর।
মানসিংহ, টোডরমল, যােবাই, বীরবল,
এখনাে দেখিবে সেথা, তাহাদের ঘর।
নানা বিষয়ক।
পত্নি, বন্ধু, সেনাপতি, সখ্যতাব হিন্দু প্রতি,
সৰ্ব্বধর্মে সমদর্শী নৃপ আকবর।
অদূরে সেকেন্দ্রাবাগে, নগরের প্রান্তভাগে,
সুশঠিত সপ্ততল তাহার কবর।
অন্য দিকে সমুজ্জ্বল, সুবিখ্যাত তাজমহল,
যাহার তুলনা নাই ধরণী ভিতর।
এমাদ উদ্দৌলার,
পীতবর্ণে শবাগার
ফতেপুর শিকরিতে দৃশ্য বহুতর।২১৬
তাজমহল।যখনি তােমারে দেখি ফিরে না নয়ন।
কল্পনায় গঠা যেন সদাই নুতন।
বেদাগ ধবল কায়, মণি রত্ন কত তায়,
চারুশিল্পে বিরচিত কোরাণ বচন।
দানবে পাষাণ আনি,
গঠিল ও তনুখানি,
জহুরিরা কারুকার্যে কৈল সমাপন।
প্রভাতে রবির করে, অপরূপ শােভা ধরে,
শশীর কিরণে যেন মর্মরে স্বপন।
রাখিতে পত্নীর মান,
প্রেমের মূরতি বুঝি করেছে স্থাপন।
এ জগতে মেলা ভার,
অকৈতব প্রণয়ের পবিত্র স্মরণ।২১৭
প্রেম-মুগ্ধ সাজিহান,
ইহার তুলনা আর,
১০৮
কাব্য-কণা।
মথুরা।-প্রাচীন মথুরা তুমি শূরঃসেন পুরি।
বিগত-যৌবন যেন নাহি সে মাধুরী।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান,
আজি যেন ম্রিয়মান,
দৈবকীর সম দশা কংস-রােষে ঝুরি।
দুর্দান্ত নামুদ আসি, দেবমূৰ্ত্তি রাশি রাশি,
মণিরত্ন সহ সব করিয়াছে চুরি।
কালের করাল রেখা, তব অঙ্গে যায় দেখা,
অতীতের ইতিহাস চিহু ভূরি ভূরি।
তপন বসিলে পাটে, আরতি বিশ্রান্ত-ঘাটে,
কামিনী কুসুম লয়ে করে রাহুরি।২১৮
বৃন্দাবন।এই কি সে কবিতার নিত্য প্রবণ,
ভূতলে অতুল ধাম সুখ বৃন্দাবন ?
অলি, পীক, শুক, সারী, কলরবে চিত্তহারী,
কুসুম-পল্লব-রম্য কোথা কুঞ্জগণ ?
ললিত লবঙ্গলতা', পরিমলে আমােদিতা,
কোথা কালিন্দীর সেই বিলােল নৰ্ত্তন
প্রেম-ভক্তি পরায়ণা, কোথা সেই ব্রজাঙ্গনা,
মধুর মুরলী গানে বিমােহিত মন ?
করি শৃঙ্গা বেণুরব, লয়ে ধেনু রস সব,
কোথ। গােপ বালকেরা সরল জীবন ?
এখন যে দিকে চাই, সে সকল কিছু নাই,
ভেঙ্গে গেছে কল্পনার মােহন স্বপন।
নানা
বিষয়ক।
বিপণি, মন্দির, ঘাট ঘিরেছে পুলিন মাঠ,
প্রকৃতির চারু-শােভা করেছে হরণ।
যাত্রীর শশাষণে রত, এবে ব্রজবাসী যত,
লুব্ধ শাখামৃগ সহ করে জ্বালাতন।
বিদ্যা চর্চা অষ্টরম্ভা, কুড়ােজালী তিলক লম্বা,
পরকীয়া প্রেমামৃত পান পরায়ণ।
যাত্রী কিম্বা তীর্থ-বাসী, কত লােক হেথা আসি,
যুগল বিনা রইতে নারে মাহাত্ম এমন।
অনেকেরি তলে তলে,
নানা লীলা খেলা চলে,
গােপনে পুণ্যের নামে পাপ আচরণ।
এই কি সে, হা চৈতন্য । বৈষ্ণবের বৃন্দারণ্য,
কোথা ব্রহ্মচর্য, কোথা ইন্দ্রিয় দমন ?
ভক্তি-মাখা, দৈন্য-নত, কোথা সে সাধক যত,
হরিদাস, রঘুনাথ, রূপ, সনাতন ?২১৯
জয়পুর।-জয়পুর ভারতের প্যারিস যেমন।
অট্টালিকা সমুদয় লােহিত বরণ।
রাজপথ সুবিস্তৃত, ফুটপাথে সুশােভিত,
নিশাকালে গ্যাসালােকে তমাে নিবারণ।
স্বাস্থ্যপ্রদ সুবিমল, দুধারে জলের কল,
পাষাণে রচিত স্থল, স্নানের কারণ।
বালক বালিকাগণ, করে বিদ্যা অধ্যয়ন,
হাসপাতাল, শিল্পশাল, বিচার-ভবন।
কাব্য-কণা।
মধ্যস্থলে রাজবাটী, কারুকার্য্যে পরিপাটী,
স্বৰ্গশূলি, মানমন্দির সুচারু গঠন।
দুষ্ট আরুংজীব ভয়ে, বৃন্দাবন হতে লয়ে, ।
গগাবিন্দ গােপীনাথে করেছে স্থাপন।
অম্বরেতে শিলা-দেবী,
গলতানে সূৰ্য্যেরে সেৰি,
ঘাট পর্বতেতে শেভে কুসুম কানন।
পাষাণের শিল্প কাজে, অগণ্য বিপণি সাজে,
রাম-নিবাসে যাদুঘর, পশু-নিকেতন।২২•
পুষ্কর।-পুষ্কর দুষ্কর তীর্থ রাজপুতানায় ।
বিষম বন্ধুর পথ পাহাড়ের গায়।
চৌদিকে পৰ্বতময়, মাঝে দীর্ঘ জলাশয়,
দুর্গন্ধ মলিন জল পদ্মের পাতায়।
ব্ৰহ্মার মন্দির তীরে, সাবিত্রী পৰ্বত শিরে,
বালিতে আকীর্ণ পথে, চলা বড় দায়।
ভাল খাদ্য মেলা ভার, রম্য দৃশ্য চারিধার,
শ্রদ্ধ দান করে যাত্রী তীর্থ দীর্ঘিকায়।২২১
দিল্লি চন্দ্রবং রাজাদের আদি বাসস্থান।
ইন্দ্রপ্রস্থ আজি দিল্লি, নগর প্রধান।
কত রাজা এলাে গেলো,
কত বংশ ধ্বংস হােলো,
চৌহান, রাঠোর, জাঠ, মােগল পাঠান।
কালাে জল যমুনার, লাল হােলাে কতবার,
উত্তপ্ত-শােণিত স্রোতে বহিল উজান।
নানা বিষয়ক ।
আত্মীয় স্বজন হত, বীর-মুণ্ড কত শত,
গড়াইল এই স্থানে বিধির বিধান।
কত রূপ গুণবতী, স্বদেশী বিদেশী সতী,
কেহ ধৰ্ম্মচ্যুতা, কেহ হারাইল প্রাণ।
ছুরি, ছােরা, তীর, শর, ঝনিল পরস্পর,
কৃপাণ, কুঠার, বর্ষা, বন্দুক, কামান।
কত অশ্ব, গজ, রথ, সুবিস্তৃত রাজপথ,
মণি-মুক্তা-রত্ন-দীপ্ত সিংহাসন যান।
কত দুর্গ ভয়ঙ্কর, অট্টালিকা মনােহর,
মসীদ, মিনার, বাপী, মন্দির, উদ্যান।
সুখমুগ্ধ মানবের, যাহা ভােগ-বিলাসের,
একদিন সে সকলি ছিল বিদ্যমান।
তপােযজ্ঞ, কবি-গীতি, সিংহনাদ, রাজনীতি,
একে একে উঠি কালে হােলাে অবসান।
পাষাণে অঙ্কিত রেখা, সম আজও যায় দেখা,
হিন্দু-মুসলমান-কীর্তি অন্তিম-শ্মশান।
আজি কালচক্র বশে, বিপিয়া পূৰ্ব্ব যশে,
সদর্পে উড়িছে ওই বৃটীশ-নিশান ২২২
অমৃতসর।—শিকের অমৃতসরে পুণ্যতীর্থ বলে।
মার্বেল-মন্দির শােতে হ্রদ মধ্যস্থলে।
সােনালা গম্বুজ তার, সেতুযােগ হয় পার,
গুরু নানকের গ্রন্থ খ্যাত ধরাতলে।
১১২
কাব্য-কণা
নিশিদিন শান্তিময়, গীত-বাদ্যে পূজা হয়,
হালােয়া প্রসাদ পায় ভিক্ষুকের দলে।
একদিকে ঘণ্টাঘর, রামবাগ মনােহর,
সুপ্রশস্ত জনাকীর্ণ পথে লােক চলে।
সহরে দোকান নানা, শাল-পশমের কারখানা,
কেনা বেচা করে সবে, পূর্ণ কোলাহলে ২২৩
হরিদ্বার।-কেহ বলে হরদ্বার কেহ হরিদ্বার।
শৈব বৈষ্ণবেরা দ্বন্দ্ব করে অনিবার।
বন্ধুর পৰ্বত হতে, নামি গঙ্গা এই পথে,
সমতল ক্ষেত্রে আসি মিশিল ধরার।
বিষ্ণুপদ ঘাটে যাত্রী, স্নান করে দিবারাত্রি,
পিণ্ডদানে করে কত বংশের উদ্ধার।
দ্বাদশ বৎসর পরে, বৃহস্পতি কুম্ভ ঘরে,-
প্রবেশিয়া কুন্তযােগ করেন প্রচার।
নাগা, খাকী, মায়াচারী, রামানুজী, জটাধারী,
আসে কত সম্প্রদায় গুণে উঠ৷ ভার।
দক্ষের যজ্ঞের স্থল, অদূরেতে কনখল,
সতীকুণ্ড দক্ষেশ্বর সাক্ষী মাত্র তার ২২৪
---
অযােধ্যা।-অযােধ্যা তােমারে দেখে ঝরে দুনয়ন।
বাল্মীকি-বর্ণিত-শােভা কোথায় এখন ?
‘শয্যাগৃহে সুপ্তজনে', কুশ সবিস্ময় মনে,
হিমষ্টি। মৃণালিনী দেখিল যেমন।
নানা বিষয়ক।
আজো তুমি সেই মত, বিগলিত কান্তি যত,
প্রােষিতভর্তৃকা যেন, বিলুপ্ত-যৌবন।
কালিদাস কি চোখে দেখে, রঘুবংশে গেছে লিখে ?
ক্ষরিল বিক্রমাদিত্য সংস্কার যখন।*
ভগ্নচিত্তে যত ঘুরি, কাগত কোশলা পুরী ?
কোথা রামচন্দ্র, কোথা প্রিয়-নিকেতন ?
ওই সে সরযু বয়,
মৃদুগতি স্রোতচয়,
করুণ বিলাপে যেন করিছে যােদন।
গােপ্রতার ঘাটে যবে, লয়ে পৌরজন সবে,
করিলেন রঘুপতি স্বর্গে আরােহণ,
শােভা কান্তি ছিল যত, তার সনে হ’লাে গত,
কালের করাল দন্তে চৰ্বিতা এখন।
কোথা তুমি জিতেন্দ্রিয়, হে লক্ষ্মণ, তব প্রিয়,
পবিত্র লক্ষ্মণাবতী বিলাসে মগন।
ভােগাসক্ত নবাবের, কত শত বেগমের,
নামে খ্যাত আজি তার কানন ভবন।২২৫
ভুবনেশ্বর-পুরাণে ভুবনেশ্বর একাম্রকানন।
ললাটে-কেশরীর শৈব নিকেতন।
সুদীর্ঘ মন্দির মাঝে, ভৈরব লিঙ্গ বিরাজে,
দীপ বিনা দ্বিপ্রহরেও না যায় দর্শন।
ভগবতী, গজমুণ্ড,
দেব দেবী কত কুণ্ড,
দিব্য কারুকার্য করা পাষাণে গঠন।
এবাদ, বিক্রমাদিত্য এক অযযাধ্যার জীর্ণ সংস্কার করিয়াছিলেন
।
১১৪
কাব্য-কণা।
মনে হেন অনুমানি, পরিত্যক্ত রাজধানী,
বিন্দুসরােবরে, মাঠে, পাই নিদর্শন।
দূরে গন্ধবতী তীরে, উদয়, খণ্ড, গিরিশিরে,
বিচিত্র খনিত গুহা না যায় গণন।
হস্তি, ব্যাঘ্র, জয়, বিজয়, অলকাদি গুহা চয়,
দুইতাল রাণীহংস, স্তম্ভে সুশােভন।২২৬
জগন্নাথ পুরী।—উত্তাল জলধি কূলে, ফেনিল লহরী দুলে,
অনন্ত আকাশ মরি ও মাথার উপর।
কনক বালুকা বেলা, অনিলে সলিলে খেলা,
তরুণ অরুণ কালে দৃশ্য মনােহর।
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, কত হৰ্ম্ম অগণিত,
দেউল, মন্দির, মঠ প্রাসাদ, চত্বর।
অসংখ্য বিপণিমালা,
অদূরে আঠারবালা,
ইন্দ্রদ্যুম্ন, শ্বেতগঙ্গা, চন্দন সরােবর।
মাঝেতে বিশাল কায়, ধ্বজচক্রে শােভা পায়,
পাষাণে রচিত কারু মন্দির সুন্দর।
সিংহদ্বারে দেখ লম্ব, অশােকের জয়ন্ত,
প্রাচীরে বেষ্টিত পুরী, মণ্ডপ বিস্তর।
নানা দেব দেবী তায়, মধ্যে রত্নবেদিকায়,
সুদর্শন, জগন্নাথ, ভদ্রা, হলধর।
দক্ষিণে অক্ষয় বট, বিমলা দেবীর মঠ,
হনুমান, নৃসিংহের মূর্তি ভয়ঙ্কর।
নানা বিষয়ক ।
চৈতন্যের প্রিয় স্থান, আজও আছে বিদ্যমান,
পাদুকা, করঙ্গা, কন্থা, গম্ভীরা ভিতর।
শৈব ধৰ্ম্ম পরিচয়, ভূমি গর্ভে দেবালয়,
কপালমােচন, লােকনাথ, যমেশ্বর।
নানক, শঙ্করাচার্য, বিদুর, কবিরের কাৰ্য্য,
হরিদাসের সিদ্ধ বকুল আজিও অমর।
ব্রাহ্মণ চণ্ডাল তায়, একত্রে প্রসাদ খায়,
চন্দ্রভাগা তীরে পূজে কোনার্কে ভাস্কর।২২৭
}
দারজিলিঙ-শাস্ত্রে বলে হিমাচলে অমর-সদন।
যে দেখেছে দারজিলিঙ বুঝে সেই জন।
নিচে শিলিগুড়ি হতে,
ধায় রেল উৰ্দ্ধ পথে,
আঁকা বাঁকা ঘাের ফেরা বিচিত্র গঠন।
শালবন মধ্য দিয়া, চলিলাম এড়াইয়া,
একদিকে শৈলমালা অটল ভীষণ
অন্যদিকে ফিরে চাই, নিচে বুঝি কিছু নাই,
ধোয়াধোঁয়া অন্ধকার, যেন আচ্ছাদন।
ক্রমে ঠাণ্ডা হাওয়া পায়, গরম কাপড় গায়,
মধ্য পথে কাসিয়াঙে, হােটেলে ভােজন।
ঘুম ছাড়াইয়া গেলে, নিম্ন পথে রেল চলে,
উচু নিচু দারজিলিঙে পাই এষ্টেসন।
সারাপথ জনশূন্য,
হেথা দেখি লােকারণ্য,
কত জাতি কত বেশ না যায় গণন।
১১৬
কাব্য-কণা।
প্রাসাদ, বিপণি মালা,
রাজপথ, নাট্যশালা,
সুচারু পাদপ শ্রেণী, রম্য উপবন।
টেলিগ্রাফ, ডাকঘর,
হাসপাতাল পরিসর,
জিনিয়া অমরাবতী সুবরী ভবন।
রজত-তুষার কায়,
কাঞ্চনজঘা দেখা যায়,
ভূতলে অতুল দৃশ্য, নয়ন-রঞ্জন।
অহহ! ভিটোরিয়া ফল, ক্ষীর ঝরে অবিরল,
অদূরে ভুটীয়া বস্তি বৌদ্ধ নিকেতন।
লেপচা, লিভাে, ভূটীয়া, খাসী, তিব্বতীরা আদিবাসী,
ইংরেজ বাঙ্গালী বাস করিছে এখন ২২৮
বঙ্গের নন্দন বন ইডেন উদ্যান।
বিজলীর আলাে হেরি শশী লজ্জা পান।
ফলে ফুলে সুশােভিত, তরুলতা অগণিত,
বৰ্মার পেপােলা তায় বিজয় নিশান।
সর্পগতি জলাশয়, উচু নিচু পথচয়,
ক্রীড়া শৈল, জলযন্ত্রে করে বারিদান।
শ্বেতকান্তি নর নারী, বিহরিছে সারি সারি,
নানা জাতি নাগরিক আসি হাওয়া খান।
যুনানীয় শিশুগণ, নাচে পুলকিত মন,
সন্ধ্যায় বিলাতি ব্যাও করে বাদ্যগান।২২৯
নানা বিষয়ক।
চিৎপুর রােড।-একা চিৎপুর রােডে সহর গুলজার।
অসংখ্য বিপণিমালা, কতই বাজার।
গৃহসজ্জা, পরিধেয়,
ঔষধ. কি খাদ্য-পেয়,
মাদক, বিলাস দ্রব্যে অক্ষয় ভাণ্ডার।
কত রকম, কত ফেসান, কার্ট, ল্যাণ্ডো, বগি, ফিটান,
গাে, অশ, মহিষনে পথে চলা ভার।
তারেতে তড়িতযােগে, ট্রামগাড়ি ধায় বেগে,
মটোর, সাইকেল ছােটে, বায়ু মানে হার।
দুধারেতে ফুটপাথে. ছড়ি, ব্যাগ, ছাতিহাতে,
নানাদেশী জনস্রোত বহে অনিবার।
ফিরিঙ্গী, তেলেঙ্গা, উড়ে, শ্যাম, শিখ, চিনে, নেড়ে,
ইরাণী, তুরাণী, ভােট, মগ, মালাবার।
ইংরেজ, ফরাসী, ডচ, আর্মাণী, জাৰ্মাণী, স্কচ,
ইহুদী, মার্কিন, কাফ্রী, গুর্খা, মাড়ােয়ার।
লুচি, কচুড়ি, মিঠাই, মণ্ডা, ফল, ফুলু, সরবৎ ঠাণ্ডা,
মাছ, মাংস, ভাজা-এণ্ডা, যা চাও খাবার।
গরম চা আর নাখাতাই, তামাক, চুরুটু কি বার্ডসাই,
কুপিবরফ, চেনাচুর কেয়া মজাদার।
মামার বাড়ি সারিসারি, ব্ৰাণ্ডী, জীন, সানি, সেরী,
রামানন্দ, তাড়ি, খাঁটী, দোয়ান্তা, বাহার।
চাটের দোকানে তাজা,
ছােলা, মটর, কলাইভাজা,
বেগুণি ফুলুরীর সঙ্গে চচ্চড়ি কাঁকড়ার।
সিদ্ধি, গাঁজা, চরস, আফিম, আবকারি মাল কাটতি অসীম,
কোকেন, গুলি, চখাের বিবিধ প্রকার।
১১
কাব্য-কণা।
কামিজ, সেমিজ, বডি, বনে, পিরাণ, মেজই, কোর্ট, জ্যাকেট
লঙ, সঞ্জ, চীনে, পার্শী, ওভার, অলষ্টার।
কোরা, ধােয়া, রঙিন, ডুরে, ঢাকাই, কলমে, শান্তিপুরে,
মাদ্রাজ, বােম্বাই, কাশী, ফরাসীডাঙ্গার।
সােণা, রূপা, পিত্তল, কাসা, জাৰ্মাণ সিভারের খাসা,
নানা কারুকার্য করা দ্রব্য অলঙ্কার।
সেতার, বেহালা, এজাজ, বয়া, তবলা, পাথােয়াজ,
হার্মানিয়ম্, গ্রামােফোন, বীণ, সুরবাহার।
বাক্স, পেঁটরা, খড়ম, জুতো, তালা, চাবি, ছুচ, সুতাে,
বই, খাতা, কাগজ, কলম, মােয়রাব্বা, আচার।
নানা রােগের ঔষধ নানা, হাকিম, বৈদ্য, ডাক্তারখানা,
এলাে, হােমাে, কত মত বিধান চিকিৎসার।
নীল, পীত, লাল, কালো, সন্ধ্যার সময়ে ভালাে,
বিদ্যাধরী করে আলাে, পথের দুধার।
বিলােল কটাক্ষে চায়,
কোমল কণ্ঠেতে গায়,
ভুলে যায় দেবতায় মানুষ কি ছার।
বড় দায় পথে হাঁটা, ঠগ, চোর, গাঁটকাটা,
ভিখারী কি ফেরীওয়ালা কাতারে কাতার।২৩০
সাগর-সঙ্গম।শুনেছি পুরাণে, সেকালে এখানে,
সগর সন্ততি যত
অহংকার পাপে, কপিলের শাপে,
হােলাে ভস্মে পরিণত।
নানা বিষয়ক
১১৯
নানা দেবতার আরাধনান্তরে,
পাতকী নারকী তরাবার তরে,
সুরধুনী মাতা এলেন ধরা’পরে,
কালজয়ী হােলো শিশু ভগীরথ।
সে অবধি হেথা, কত ব্রহ্মচারী,
সন্ন্যাসী, সংসারী, নাগা, তিলকধারী,
কত নেড়ামাথা, কত চাপ-দাড়ি,
আসে পূণ্য আশে পৌষ হলে গত ।
কত কুলবধু, (সধবা, বিধবা,)
কত বারনারী, কত বৃদ্ধ, যুবা,
রােগী, ভােগী, যােগী, কহিব কতবা,
কত দেশ হতে আসে অগণিত।
লঞ্চ, ইষ্টিমার, কতই বজরা বােট,
নৌকা, পানসি, ভাউলে, ডােঙ্গা, ডিঙ্গি, ছােট,
আসে সারি সারি, মাঝি মাল্লার ঘোঁটি
উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, চট্টগ্রামাগত।
কেহ ঢেউ খায় সঙ্গমের জলে,
কেহ শ্রদ্ধ করে, কেহ মন্ত্র বলে,
কেহ কাপড়ের কাণ্ডারের তলে,
কপিলদেবেরে হতেছে প্রণত।
বােটের মাস্তুল কিম্বা ঈড় হালে,
কাছি দিয়ে বাঁধা, ঢাকা চটের পালে,
শুষ্ক গেদারমালা বিভূষিত গলে,
পাষাণের ত্রিমূৰ্ত্তি সিন্দুরে মণ্ডিত।
১২০
কাব্য-কণা।
সপ্তাহ পূৰ্বেতে সৈকত-বেলায়,
জনপ্রাণী মাত্র ছিল না যথায়,
লক্ষ জনপূর্ণ, বিপণিমালায়,
নানাবিধ পণ্যে আজি সুসজ্জিত।
গরাণের খুটি হােগলায় ছাওয়া,
নিবারণ আয় হয়না শীতের হাওয়া,
সারি সারি দেখি যে দিকে যায় চাওয়া,
বালিতে গড়ায় যাত্রী শত শত।
সাহেবের সঙ্গে নেটিব খৃষ্টান,
মােডেমােড়ে গায় যিশুগুণ গান,
ঝুড়িঝুড়ি বই বিনা
মূল্যে দান,
করুণা করিয়া দেথান আলাের পথ।
শঙ্খ, ঘন্টা বাজে, করতাল, খােল,
নেড়ানেড়ী গায় দিয়ে হরিবােল,
নাগা সন্ন্যাসীরা করে গণ্ডগােল,
ভিখারীর দায়ে যাত্রীরা বিব্রত।
কার পায়না ঘটী, কার হারালাে ছেলে,
যুবতীর গায় কেউ পড়ছে ঢলে,
অরাজক যেন, কেবা কারে বলে,
গাঁজা ভাঙ, খাটী চলছে অবিরত।
কত বাবু ভায়া অলষ্টার গায়,
সঙ্গে মহামায়া, লজ্জা নাহি তায়,
বিলাতি জিনিস ঢালেন গলায়,
সঙ্গে সঙ্গে মােক্ষ করতলগত।
:
নানা বিষয়ক।
কত হিন্দুস্থানি ধৰ্মগত প্রাণ,
ভাৰ্য্যার সহিত ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠান,
কাপড় কম্বল করিতেছে দান,
কেহ অন্নজল দেয় সাধ্যমত।
রঞ্জিত পাটের জটা মাথায় ঢেকে,
কত ভণ্ড যােগী, গায় ভষ্ম মেখে,
উৰ্দ্ধবাহু কেহ,কিম্বা মৌনী থেকে,
উপার্জন বেশ করে দস্তুরমত।
মাসা, বােনাে করে সিদ্ধ আলােচাল,
কাচকলা ভাতে, কিম্বা খুড়ের দাল,
চিড়ে, গুড়, ছাতু, লঙ্কা লাল লাল,
অনেকেরি খাদ্য কদিনের মত ।
তেলে ভাজা লুচি, কচুড়ি, মেঠাই,
দুদরে বিক্রী করিছে হাওয়াই,
কি যে তার, তার বলিহারি যাই,
খেলেপরে প্রাণ সদ্য কণ্ঠাগত।
এত অত্যাচারে কলেরা রাক্ষসী,
পারে না থাকিতে দেখা দেয় আসি,
ছেলে বুড়াে সব খায় রাশি রাশি,
সঙ্গে সঙ্গে যায়, যাত্রী পলায় যত
গঙ্গার ওপারে, ধবলাট গ্রামে,
জাগ্রত-দেবতা বিশালাক্ষী নামে,
রাধাকান্ত, শিব, প্রসাদ-গড় ধামে,
উচ্চ মৃত্তিকার প্রাকারে বেষ্টিত।২৩১
সম্পূর্ণ।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। 1975 ette optai শ্রদ্ধাস্পদ নাট্যাচাৰ্য শ্ৰীযুত বাবু গিরিশচন্দ্র ঘােষ মহাশয়ের উক্ত কাব্য সম্বন্ধে eyperpfafa- 13, BoserarRAH LANE. Calcutta, 27th February 1890. Aly DEAR POOLIN BABOO, Myself and our mutual friend Baboo Debendra Nath Mozoomdar, read together your Hredoh Protidhony, and spent a couple of pleasant hours over it. It is not a "School boy freak" as you modestly call it. The book's a book with something solid in it. I found in it much to "praise". Our friend Debendra Baboo, I mean the brother of the late lamented Soorendro Nath, the poet was also very deeply impressed as myself, with your fluent lines. They were all spontenious flow of a poetic heart, and not couplets of syllable-counting rymers. Within the compass of a letter I can not fully dilate on its merits although it would be a very agreeable task to do it. I could say a great deal. There is much to say on the chastity of the style and thought, the soberness of melancholy pervading the work, the adoration of Naturc, the rapture of Love, the Religious ecstasy and the grateful tribute of respect to the ſeparted soal who watched or your tender years. All these I could dwell with pleasure but my space forbids and I reluctantly close with a hearty thanks for your valuable present and your kindness to wards me throughout. Yours very Sincerely GRISH CHUNDER GHOSE
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.