Makardah Saraswat Library, Howrah
Rabindra-sahitye Palli-chitro
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র শ্রীবিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক
রাসবিহারী চক্রবর্তী
নবজীবন পাবলিশিং হাউস,
১৯৫২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা
১৩৪৫, আষাঢ়
মূল্য বারাে আনা
প্রিন্টার-শ্ৰীসমরেন্দ্র
ভূষণ মল্লিক
বাণী প্রেস
১৬নং হেমন্দ্র সেন স্ট্রীট, কলিকাতা।
রবী-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র লেখকের অন্যান্য বই ১। মনের খেলা ২। অগ্রদূত ১। ১, ৩। রিয়লিষ্ট রবীন্দ্রনাথ ৪। স্বর্গের ঠিকানা ৫। কমিউনিজম ৬০ ০ ৬। মরুজয়ের সেনা ॥ ৭। সবহারাদের গান ৪ ৮। ০ ০ ০ ০০ ঘরের মায়া ৯। এয়ী ১০। অভিশাপ না আশীর্বাদ ১১। বঙ্কিমের স্বপ্ন ১২। মানুষের অধিকার ১৩। রাসিয়ার কথা ১৪। সভ্যতার ব্যাধি ১৫। সাম্যবাদের মর্মকথা | ••• | ০ ১০ 10.
২৫;
Gouripur Lodge
Kalimpoing.
কল্যাণীয়েষু ,
প্রতিদিন অন্তবিহীন চিঠি লেখালেখি, আশীর্বাণীর
দাবী, অভিমতের অনুরোধ, বাংলাদেশের নবজাতদের
নামকরণ, আসন্ন বিবাহের সরকারী রসুনচৌকিগিরি আমার
শরীরের স্বাস্থ্য ও মনের শান্তির পক্ষে অসহ্য হয়েছে, দাবী
অসঙ্গত হ'লেও আমি সহজে অস্বীকার করতে পারিনি বলেই
অামার কঁধ থেকে বােঝা নামলনা। যখন শক্তি ছিল তখন
খ্যাত অখ্যাত কাউকেই বঞ্চিত করতে পারিনি,
কিন্তু
প্রণােদ্যমের মিতব্যয়িতা যখন অত্যাবশ্যক হয়েছে তখন বিপন্ন
অবস্থায় জনসাধারণের কাছে নিস্কৃতি চেয়ে সংবাদ পত্রে চিঠি
দিয়েছি এত দিনে হয়তাে ছাপা হয়ে থাকবে, এই মৌনব্রত
আরম্ভ করবার পূর্বে তোমাকে এই চিঠিতে আশীর্বাদ না করে
থাকতে পারলুম না। আমার পল্লীচিত্র সম্বন্ধে তােমার বই
খানি পড়ে বিশেষ খুশি হয়েছি তার কারণ এ নয় যে তুমি
আমাকে প্রশংসা করেছ। বাংলা পল্লী থেকে আমি যে আনন্দ
পেয়েছি এবং যত আনন্দ ঢেলে দিয়েছি তার পরে, যত বিচিত্র
আকারে গছে পথে, আর শেষ পর্যন্ত পল্লীবাসীদের কল্যাণ
সাধনের জন্যে যতটা চেষ্টা করেছি আর কোনো বাঙ্গালী লেখক
বা রাষ্ট্রনেতার জীবনে তার কোনো লক্ষণ দেখেছি বলে
আমিতো মনে করিনে। এতদিন পরে উদাসীন বাঙ্গালী
পাঠকদের হয়ে আমার জীবনের অত্যন্ত সত্য অনুভূতিকে
তুমি যে এমন আনন্দের ভাষায় প্রকাশ করেছ এতে আমি
পুরস্কৃত হয়েছি।
ডাক যােগে তােমার প্রতি এই আমার শেষ অভিনন্দন।
বিশ্রামের চেষ্টায় চলুম-আশাকরি চেষ্টা ব্যর্থ
ব্যর্থ হবে না,
বিএমের আবাদে যদি ফসল ফলে তবে পছন্দ হলে তােমা-
দেরি ঘরে তুলতে পারবে।
ইতি-২৬, ৬, ৩৮
ৰবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূমিকা ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র’ ইতিপূর্বে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘দেশ’-এর পাতায়। সেই ছড়ানাে প্রবন্ধগুলি এতদিন পরে বই হয়ে বেরুলো। পুস্তকের শেষ প্রবন্ধটীর মধ্যে পল্লীর কোনাে পরিচয় নেই, তবুও সেটীকে অন্যান্য প্রবন্ধের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর একটা কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলােচনা উঠলে এমন কথা আজও শুনতে পাওয়া যায়—তিনি শহরের বিলাসী কবি, নগরের অভিজাতসম্প্রদায়ের কৃত্রিম জীবনের সঙ্গেই তাঁর লেখনীর কারবার। এই ধারণা ভুল। কতখানি ভুল, তারই পরিচয় দেবার জন্য একদা লেখা হয়েছিল এই প্রবন্ধগুলি। পল্লীর প্রকৃতি আর পল্লীর মানুষের প্রতি যে বিপুল দরদ প্রকাশ পেয়েছে কবির অসংখ্য গল্পে, প্রবন্ধে ও কবিতায়—তার মধ্যে ফুটে উঠেছে একটি বিশাল সত্য। এই সত্যটী হােলে, দুনিয়ায় যারা অনাদৃত আর শৃঙ্খলিত তাদের প্রতি তাঁর অন্তহীন সমবেদনা। রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্রের শেষের প্রবন্ধটী এই সত্যকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। সেই জন্যই সেটীকে স্থান দেওয়া হয়েছে এই পুস্তকখানির মধ্যে।
No text on this page.
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
( ১ )
;
•
ইংরেজদের কাছে যেমন সেপীয়ার, জার্মানদের কাছে
যেমন গ্যেটে, আমেরিকানদের কাছে যেমন হুইটম্যান,
ইটালিয়ানদের কাছে যেমন দান্তে, বাঙালীর কাছে তেমনি
রবীন্দ্রনাথ। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তিনি হিন্দুর,
তিনি মুসলমানের ; তিনি ব্রাহ্মের, তিনি খৃষ্টানের ; তিনি
বর্তমানের, তিনি ভবিষ্যতের ; তিনি নারীর, তিনি পুরুষের ;
তিনি নবীনের, তিনি প্রবীনের ; তিনি বালকের, তিনি বৃদ্ধের ।
যেখানে বাঙালী আছে এবং বাঙালীর সাহিত্য আছে, গৌরবের
অভ্রভেদী শিখরে সেখানে রবীন্দ্রনাথও আছেন। তিনি আছেন
আমাদের উৎসবে, তিনি আছেন আমাদের শােকে; তিনি
আছেন আমাদের বিরহে, তিনি আছেন আমাদের মিলনে
তিনি আছেন আমাদের কৈশােরের স্বপ্নে, তিনি আছেন
আমাদের যৌবনের উন্মাদনায় ; আমাদের দুর্ববল-মুহূর্তে শক্তির
;
••
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্পী-চিত্র
তিনি উৎস, আমাদের কণ্টকাকীর্ণ চলার পথে তিনি অফুরন্ত
প্রেরণা ; আমাদের অন্ধকারে তিনি আলো, আমাদের অবসাদে
তিনি আশা; তার কণ্ঠে আমাদের অকথিত বাণী, তার সঙ্গীতে
আমাদের প্রাণের স্পন্দন ; আমাদের হাসিতে, আমাদের
অশ্রুতে, আমাদের প্রেমে, আমাদের ঘৃণায়, আমাদের বিস্ময়ে,
আমাদের আকাঙ্ক্ষায়, আমাদের রক্তের কণায় কণায় তার
বাঁশির সুর।
এমন করে আমাদের হৃদয়কে তিনি অধিকার করতে
পেরেছেন—কারণ বাংলার হাট, বাংলার মাঠ, বাংলার আকাশ,
বাংলার বাতাস, বাংলার নদী, বাংলার বন, বাংলার আশা,
বাংলার ভাষা—সব কিছুকেই তিনি সাদরে গ্রহণ করেছেন তার
অন্তরের অন্তঃপুরে। শীতল ছায়া, আমকাঠালের বন, পুকুরের
পাড়, কোকিলের ডাক, আম্রমুকুলের সৌগন্ধ, পাখী-ডাকা
পল্লীপথ, অঘ্রাণের ভরা ক্ষেত, পারে যাবার খেয়াঘাট, পল্লব-ঘন
আম্রকানন, বেণু-বনের ঝিলিমিলি, চখাচখীর কাকলী-কল্লোল
এরি মধ্যে বিরহ-মিলন, হাসি-কান্না নিয়ে শান্ত বাঙালীর যে
জীবনস্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়
অতিশয় নিবিড়। এই পরিচয়ের নিবিড়তা প্রকাশ পেয়েছে
তঁার বহু কবিতায়, বহু গল্পে, বহু রচনায়। তাঁর লেখার মধ্যে
বাংলাদেশের মাটির খাঁটি সুরটীকে আমরা শুনতে পাই বলে
আমাদের তিনি এত প্রিয়। যে কারণে আমাদের কানে
দোয়েল, কোকিল আর বউ-কথা-কও’এর গান এত ভাল লাগে,
যে কারণে কীৰ্ত্তন আর বাউলের সুর শুনলে আমাদের রক্তে
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
তীব্র।
পুলক জাগে, যে কারণে শিউলি ফুলের গন্ধ, পলাশের রক্তিম,
কাশ ফুলের হাসি আমাদের প্রাণকে এত খুসি করে—ঠিক সেই
কারণেই রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রতি আমাদের আকর্ষণ এতখানি
১৮৮৮ খৃষ্টাব্দে লিখিত ছিন্নপত্রের একখানি চিঠিতে
আছে, “বঙ্কিমবাবু উনবিংশ শতাব্দীর পােয্যপুত্র আধুনিক
বাঙালীর কথা যেখানে বলেছেন, সেখানে কৃতকার্য হয়েছেন,
কিন্তু যেখানে পুরাতন বাঙালীর কথা বলতে গিয়েছেন সেখানে
তাকে অনেক বানাতে হয়েছে ; চন্দ্রশেখর, প্রতাপ প্রভৃতি
কতকগুলি বড় বড় মানুষ একেছেন (অর্থাৎ তারা সকল
দেশীয় সকল জাতীয় লােক হতে পারতেন, তাদের মধ্যে জাতির
এবং দেশ-কালের বিশেষ চিহ্ন নেই। কিন্তু বাঙালী আঁকতে
পারেন নি। আমাদের এই চির-পীড়িত, ধৈৰ্যশীল, স্বজনবৎসল,
বাস্তুভিটাবলম্বী প্রচণ্ডকৰ্ম্মশীল-পৃথিবীর এক নিভৃতপ্রান্তবাসী
শান্ত বাঙালীর কাহিনী কেউ ভালো করে বলে নি।” এই
শান্ত বাঙালীর কাহিনী রবীন্দ্রনাথই প্রথম ভালাে করে
আঁকলেন আমাদের সাহিত্যে। তঁার লেখার মধ্যে আমরা
সর্বপ্রথম দেখতে পেলাম সেই চিরদিনের বাঙলাকে, যেখানে
নদীর ঢালু তটে চাষী চাষ করে, ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য
বালুতীরতলে হাঁস উড়ে চলে, যেখানে চোখে জানারকেল
পাতার ঝুরঝুর কাঁপুনি, নাকে আসে প্রস্ফুটিত সর্ষেক্ষেতের
গন্ধ, কানে শােনা যায় ঘাটের মেয়েদের উচ্চহাসি, মিষ্টকণ্ঠস্বর।
ঘুঘু ডাকছে এবং মাঝে মাঝে গরুর গলার হাম্বারব শােনা
যাচ্ছে, কাঠবিড়ালী একবার ল্যাজের উপর ভর দিয়ে বসে
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
মাথা তুলে চকিতের মধ্যে অদৃশ্য হচ্ছে, ছােটো ছােটো ধানের
গাছগুলা বাতাসে ক্রমাগত কাপছে, পাতিহাঁস জলের মধ্যে
নেবে ক্রমাগত মাথা ডুবাচ্ছে এবং চঞ্চু দিয়ে পিঠের পালক সাফ
করছে, বটগাছের তলায় নানাবিধ লােক জড়াে হয়ে খেয়া-
নৌকার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে, বাতাস প্রকৃতির স্নেহ-হস্তের
মত আস্তে আস্তে চুলের মধ্যে আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছে, জল ছল
ছল শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে, নদীর দুইধারে মেয়ের স্নান
করচে, কাপড় কাচচে এবং ভিজে কাপড়ে এক মাথা ঘােমটা
টেনে জলের কলসী নিয়ে ডান হাত দুলিয়ে ঘরে চলেছে,
জেলেদের জাল থেকে মাছ ছোঁ মেরে নেবার জন্যে চিল
উড়চে,
পাঁকের উপরে নিরীহ বক দাড়িয়ে আছে, শৈবালের উপরে
ছােটো ছােটো কচ্ছপ আকাশের দিকে সমস্ত গলা বাড়িয়ে দিয়ে
রােদ পােহাচ্ছে, নদীর নীরব খরস্রোতে ঝুপঝাপ করে পাড়
খসে খসে পড়ছে, পানকৌড়ি সাঁতার দিচ্ছে, রাখাল বালক
গরু চরাচ্চে,—এই তাে আমাদের সােনার বাংলার চিরন্তন
কত সন্ধ্যায়, কত প্রভাতে নিৰ্ণিমেষ নয়নে এই ছবি
দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ আর বিচিত্র ভাষায় বিচিত্র ভঙ্গীতে
প্রকাশ করেছেন এই ছবি দেখার অপূর্ব আনন্দকে।
ছবি।
ফাল্গুনের এ আলােয় এই গ্রাম ওই
শূন্য
মাঠ
ওই খেয়াঘাট
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলী-কল্লোলে
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র যেখানে বসায় মেলা—এই সব ছবি কতদিন দেখিয়াছে কবি । দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর এমন অতৃপ্ত কৌতূহল নিয়ে আর কেউ বােধ হয় বাংলাদেশকে দেখেনি। মুমূষু যেমন করে পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের আগে চেয়ে দেখে এই ধরণীর শ্যামচ্ছবি, কারাগারের গবাক্ষপথে বন্দী যেমন করে চায় আকাশের নীলিমার পানে, তেমনি আগ্রহভরা দৃষ্টির অতৃপ্ত পিপাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন এই বাংলার পল্লী-প্রকৃতিকে। ছিন্নপত্রের পাতায় পাতায় তারই পরিচয় পাই ; গল্পগুচ্ছের কাহিনীর পর কাহিনীতে পল্লীর অসংখ্য চিত্র অম্লান সৌন্দর্যে বেঁচে আছে ; অসংখ্য গীতি-কবিতায় বাংলা দেশের পল্লীর বিচিত্র দৃশ্যগুলিকে তিনি রূপায়িত করেছেন। তাঁর উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এবং পত্রাবলী যখনই আমরা পাঠ করি তখনই বাংলাদেশ তার দিগন্তপ্ৰসার ক্ষেত্রের উদার শান্তি, তার নদীর তরল কল্লোলরােল, তার স্নিগ্ধ পল্লীগৃহ, তার শীতল তরুচ্ছায়, তার অরণ্যের মর্মরধ্বনি, তার মৌমাছির গুন্ গু, তার আকাশের প্রান্তে সূর্যাস্তের দীপ্তি, তার ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা, তার দীর্ঘ ঘন কাশবন, পাটের ক্ষেত, আখের ক্ষেত আর সারি সারি গ্রাম নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে জীবন্ত হয়ে দেখা দেয়। শিলাইদহের সেই অজ্ঞাতবাসের যুগে পল্লী ছিলাে তার দিবারাত্রির সঙ্গিনী।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
পদ্মার নিভৃত পরিচর্যায় পরিতৃপ্ত কবি সেদিন আপনাকে
নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়েছিলেন পল্লীজননীর পদ প্রান্তে।
অপেক্ষাকৃত অখ্যাত ছিলেন বলে কোলাহলময় জনতার হাটে
সেদিন তার ডাক পড়েনি। বােটটাকে নদীর মাঝখানে বেঁধে
রেখেছেন আর সেখানে চুপচাপ করে বসে সারাবেলা কেবল
মুগ্ধনয়নে দেখেছেন বাংলার নিভৃত পল্লীর বিচিত্র রূপ। জীবনে
প্রত্যহ একটি একটি করে দিন এসেছে—কোনটি সূৰ্যোদয়-
সূর্যাস্তে রাঙা, কোনটি ঘনঘাের মেঘে স্নিগ্ধ শীতল, কোনটি
পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় সাদা ফুলের মত প্রফুল্ল। এ দিনগুলির
দিকে লক্ষ্য করে কবি লিখেছেন,—এগুলি কি আমার কম
সৌভাগ্য! জনতার কোলাহল থেকে দূরে উদ্যানগৃহের
নির্জনতায় গ্যেটেরও এমনি বহুদিন কেটেছিল পরম সৌভাগ্যের
মধ্যে। মাটির সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, লতার সঙ্গে গ্যেটের সেই
গভীর আত্মীয়তার যুগে যে আনন্দ তিনি শিরায় শিরায়
অনুভব করেছিলেন তাকে লক্ষ্য করে ডায়েরীতে তিনি
felcsfecla, These most exquisite days continue.
বাংলার পল্লীপ্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথ যে কতখানি ভালাে
বেসেছেন তা দেখাবার জন্য তার ডায়েরী থেকে এখানে
কয়েকটা লাইন উদ্ধৃত করছি। শিলাইদহে লেখা ১৮৯৩
খৃষ্টাব্দের ১৬ মে’র ডায়েরীতে আছে, “এমন সন্ধ্যা হয়তাে
অনেক পেতেও পারি কিন্তু সে সন্ধ্যা এমন নিস্তব্ধভাবে তার
সমস্ত কেশপাশ ছড়িয়ে দিয়ে আমার বুকের উপরে এতে
সুগভীর ভালােবাসার সঙ্গে পড়ে থাকবে না। আমি কি ঠিক
৭ রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র এমনি মানুষটি তখন থাবা ! আশ্চর্য এই, আমার সবচেয়ে ভয় হয়—পাছে আমি ইউরােপে গিয়ে জন্মগ্রহণ করি।•••••• হয়তো একটা কারখানায় নয়তাে ব্যাঙ্কে, নয়তো পালামেন্টে সমস্ত দেহমনপ্রাণ দিয়ে খাটতে হবে।” পদ্মার নিভৃত চরের শান্ত দিন এবং শান্ত সন্ধ্যাগুলিকে তিনি এমন ভাবেই ভালাে বেসেছিলেন যে, মনে তার ভয় হতাে, পাছে পরজন্মে পদ্মার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে এবং ইউরােপে তাকে জন্মগ্রহণ করতে হয় । ইউরােপে জন্মালে তার প্রভাত-সন্ধ্যা এমন অবর্ণনীয় মাধুর্য্যে তাে ভরে উঠবেনা, মাতৃকলকণ্ঠের মত পদ্মার কলধ্বনি তার কানে এমন করে বাঁশি বাজাবে না। লােকে যখন বলে, রবীন্দ্রনাথ অভিজাত-সম্প্রদায়ের কবি, অট্টালিকার বাতায়ন-পাথে দূর থেকে পল্লী-প্রকৃতিকে তিনি দেখেছেন, বাংলার কোমল উর্বরা ভূমির গ্রাম্যসুরটীকে তার বীণার তারে তিনি প্রকাশ করতে পারেন নি, তখন দুঃখ হয় তাদের অজ্ঞতার কথা ভেবে। অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ করে শহুরে আবহাওয়ার মধ্যে জীবনের বহুদিন অতিবাহিত করলেও পল্লীকে তিনি একটি দিনের জন্যও উপেক্ষা করেন নি; তাকে সমস্ত তনুমন দিয়ে তিনি ভালােবেসেছেন—যেমন করে মাকে ভালােবাসে ছেলে। তাঁর চেতনাকে কেবল শহরের অমিত রায় আর লাবণ্য, শশাঙ্ক আর উৰ্ম্মিমালা, আদিত্য আর নীরজার মধ্যে ব্যাপ্ত করে দিয়ে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেন নি। সেই বিশাল দরদী মনের সুতীব্র চেতনা শহরের গণ্ডীকে অনায়াসে অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে পল্লীর অখ্যাতনামা রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৮ অশিক্ষিত, অগণিত নরনারীর মধ্যে। তাদের মধ্যে আপনার সত্তাকে প্রসারিত করে দিয়ে তিনি পল্লী-জীবনের ছােটোখাটো সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখ বলে অনুভব করেছেন, তাদের অন্তরের মহত্ত্বের কাছে নিজের শ্রদ্ধানত হৃদয়ের নৈবেদ্য অকুণ্ঠিতচিত্তে পৌছে দিয়েছেন, তাদের ক্ষুদ্ৰপরিসর জীবনের হাসি ও অশ্রুকে গানে গানে গেঁথে তুলেছেন। তাই দেখতে পাই, তার সাহিত্যের মধ্যে বিলাতফেরৎ মােটর- বিহারী অমিত রায়ের পাশে উলাপুর গ্রামের দরিদ্র পােষ্ট- মাষ্টারটি অনাথা পল্লী-বালিকা রতনকে প্রথমভাগ পড়াচ্ছে। এই পোেষ্টমাষ্টারটির সম্পর্কে ছিন্নপত্রে লেখা আছে, “বাতিটি জ্বালিয়ে টেবিলের কাছে কেদারাটি টেনে বইখানি হাতে যখন বেশ প্রস্তুত হয়ে বসেছি, হেনকালে কবি কালি- দাসের পরিবর্তে এখানকার পােষ্টমাষ্টার এসে উপস্থিত। মৃত কবির চেয়ে একজন জীবিত পােষ্টমাষ্টারের দাবী ঢের বেশী। আমি তাকে বলতে পারলুম না, আপনি এখন যান, কালিদাসের সঙ্গে আমার একটু বিশেষ প্রয়ােজন আছে। বল্লেও সে লােকটি ভালো বুঝতে পারতেন না। অতএব পােষ্টমাষ্টারকে চৌকিটি ছেড়ে দিয়ে কালিদাসকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে হােলাে।” মানুষের জীবনের প্রতি এই যে অপরিসীম শ্রদ্ধা এই শ্রদ্ধা কবির কল্পনাকে শহরের একটা বিশেষ গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। যে-কেউ এসেছে তার দৃষ্টির সম্মুখে, তার দাবীকে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন কালিদাসকে আসন দিতে গিয়ে তিনি গ্রামের
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
অর্ধশিক্ষিত পােষ্টমাষ্টারকে
বিদায় দিতে পারেন
পারেন নি,
তেমনি তিনি অস্বীকার করতে পারেননি গ্রাম্যবালিকা
গিরিবালাকে। অক্সফোর্ডের পাশ-করা কেতকী মিত্রের পাশে
কথামালা ও চারুপাঠখানি হাতে নিয়ে শশিভূষণের ছাত্রী
এবং হরকুমারের কন্যা গিরিবালা সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
কবি যেমন অমিত রায়ের সঙ্গে পােষ্টমাষ্টারকে এবং শহরের
কেতকী মিত্রের সঙ্গে গ্রামের গিরিবালাকে পাশাপাশি একেছেন
তেমনি শেষের কবিতায় যােগমায়ার পাশে গল্পগুচ্ছের দিদিকে
সমান আসন দান করেছেন। শশী পল্লীবাসিনী অশিক্ষিত
নারী হলেও চরিত্রের দৃঢ়তা এবং উদারতার দ্বারা
কবি-হৃদয়ের শ্রদ্ধা অনায়াসে অর্জন করেছে। কুমু, সুমিত্রা
এবং লাবণ্যের উপরে কবি যে প্রশংসার পুষ্পবৃষ্টি বর্ষণ করেছেন,
জয়গােপালের স্ত্রী এবং নীলমণির দিদি গ্রাম্যনারী শশী তার
থেকে বঞ্চিত হয় নি। দিদির ধূলি-ধূসরিত চরণে আমাদের
শির শ্রদ্ধায় বারংবার লুটিয়ে পড়ে। যেমন গিরিবালাকে,
শশীকে, রতনকে, পােষ্টমাষ্টারকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যের
দরবারে গৌরবের আসন দিয়েছেন, তেমনি আসন দিয়েছেন
যাত্রাদলের গৃহত্যাগী ছােকরা তারাপদকে। অন্তরের মধ্যে
সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত এবং মুক্ত তারাপদর ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী
থাকলেও রবীন্দ্র-সাহিত্যে তার সম্মানের আসনটিকে সে
অধিকার করে আছে। নগরের কোনাে অমিত রায় আর
নিখিলেশের চেয়ে তার সম্মান কম নয়। জিমন্যাষ্টিকের
দলের তারপর গল্পগুচ্ছের পল্লীবাসিনী নিরক্ষর
১০
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
বােষ্টমীটীও রবীন্দ্র-সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের
সাহিত্যে পল্লীর এমনি কত অখ্যাতনামা নর-নারী ভীড় করে
দাড়িয়ে রয়েছে। তাদের সকলের কাহিনী এখানে লিপিবদ্ধ
করতে গেলে প্রবন্ধ সুদীর্ঘ হয়ে পড়বে।
এইটুকু বলেই যথেষ্ট হবে, রবীন্দ্রনাথকে যারা অভিজাত
শ্রেণীর শহুরে কবি বলে নিন্দা করে, তারা আপন বুদ্ধিকেই
অপমানিত করে। কোন প্রথমশ্রেণীর জাতীয় কবিই আপনাকে
বিশেষ কোন গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন না।
গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে বাঁধা পড়তে দিলেই প্রতিভার অবনতি
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা প্রথমশ্রেণীর প্রতিভা। তিনি
বাংলার জাতীয় কবি। সেইজন্য তার সাহিত্যে পল্লী এবং
শহর, অট্টালিকা এবং কুটীর, শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত—সবাই
আসন পেয়েছে। পল্লীকে তিনি উপেক্ষা করেছেন তার
সাহিত্যে, জনসাধারণের প্রাণের স্পন্দন নেই তার লেখায়,
মহামানবের বিশাল হাট থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে এনে
শান্তিনিকেতনের শালের ছায়ায় কেবল কল্পনার সােনালী জাল
বুনেছেন তিনি—এসব তাদেরই কথা যারা তার লেখা
ভালাে করে পড়েনি অথবা পড়েও তাকে লােকচক্ষে ঘােট
ঘটে।
করতে চায়।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ( ২ ) একদা সাহিত্য ছিলো অভিজাত সম্প্রদায়ের জীবন-নাট্যের মুকুর। বিরাট মানব-পরিবারের একপ্রান্তে যে একদল মুষ্টিমেয় নরনারী বিলাসের প্রাচুর্যের মধ্যে আপনাদের অস্তিত্বকে বহন করে চলেছে তাদের নিয়ে ছিল সাহিত্যের কারবার। সেদিনের সাহিত্যে ছিলো রাজা-বাদশাদের মুকুট- মণির দীপ্তি, রাজনন্দিনী এবং বাদসা-দুহিতাদের গােপন প্রেমের কাহিনী, পৌরাণিক দেবদেবীগণের অলৌকিক মহিমা, দিগ্বিজয়ী মহারথীদের অসির ঝঙ্কার ও ধনুকের টঙ্কার। মানুষের মধ্যে যারা অসাধারণ, তারাই ছিল সেদিন কাব্যের ও উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা; যারা সাধারণ, তারা ছিল সাহিত্যে অস্পৃশ্য । তারপর এলাে আর একদিন—সাহিত্যের ইতিহাসে যাকে আমরা বলতে পারি যুগান্তকারী বিপ্লবের দিন। এতকাল ধরে যারা ছিল কাব্যের উপেক্ষিত, তারা এসে অধিকার করলে। সাহিত্যিকের কল্পনাকে। এলাে কামার, এলাে ছুতার, এলাে মজুর ; এলে কৃষক, এলাে রাখাল, এলাে ধীবর ; এলাে মিস্ত্রী, এলাে মাঝি, এলো মালাকর ; এলে মুচি, এলাে মেথর, এলাে ঝাড়ুদার ; এলাে নাবিক, এলো গাড়ােয়ান, এলো তবলদার ; এলো পতিতা, এলাে কয়েদী, এলো ক্রীতদাস। সাহিত্যিকের কান এতদিন ধরে শুনে এসেছিলাে নূপুরের নিক্কণ আর কঁকনের কিঙ্কিণী, এসরাজের কান্না আর সেতারের ঝঙ্কার, রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্পী-চিত্র পাপিয়ার সঙ্গীত আর ঝরণার কলগীতি নূতন সাহিত্যিকের কান শুনলে নূতন প্রভাতের মহাসঙ্গীত। তিনি গাইলেন, I hear America singing, the varied carols I hear, Those of mechanics, each one singing his as it should be blithe and strong, The carpenter singing his as he measures his plank or beam, The mason singing his as he makes ready for work, or leaves off work, The boatman singing what belongs to him in his boat, the deck-hand singing on the steamboat deck, The shoemaker singing as he sits on his bench, the hatter singing as he stands, The wood-cutter's song, the ploughboy's on his way in the morning, or at noon intermission or at sundown, The delicious singing of the mother, or of the young wife at work, or of the girl sewing or washig, Each singing what belongs to him or her and to none else, The day what belongs to-day-at night the young fellows, robust, friendly Singing with open mouths their strong party of melodious songs.
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র আমি শুনতে পাচ্ছি আমেরিকা গান করছে, বিচিত্র সঙ্গীতের রেশ আসছে আমার কর্ণকুহরে, আমি শুনতে পাচ্ছি মিস্ত্রীদের কণ্ঠধ্বনি, জোরালো কণ্ঠে তারা প্রত্যেকে গাইছে তাদের পুলক-ভরা গান, গান গাইতে গাইতে সূত্রধর মাপছে তার তক্তা আর কড়ি-বরগা, কাজের শুরুতে অথবা কাজের অবসানে রাজমিস্ত্রী গাইছে তার গান, মাল্লার কণ্ঠ থেকে উৎসারিত হচ্ছে তার নৌকার সঙ্গীত, ইষ্টিমারের ডেক থেকে শােনা যাচ্ছে খালাসীর আনন্দ গান, বেঞ্চিতে বসে গান করছে চৰ্ম্মকার, টুপিওয়ালাও গান গায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে, আমি শুনতে পাচ্ছি তবলদারের গান, সকাল বেলায় কৃষক- বালক গান গাইতে গাইতে চলেছে তার কাজে, দ্বিপ্রহরের অবসরে এবং সন্ধ্যাবেলাতেও তার সঙ্গীতের বিরাম নেই, মাধুৰ্য-ভরা কণ্ঠে জননী গায় তার গান, গৃহকাৰ্যে ব্যস্ত তরুণী বধুর কণ্ঠসঙ্গীত আসছে কানে, সেলাই করতে করতে অথবা কাপড় কাচতে কাচতে বালিকা গান করে মৃদুগুঞ্জনে, নারী এবং পুরুষ—প্রত্যেকে তার নিজের নিজের গান করে, দিবসকে মুখরিত করে জাগছে দিবসের গান, রাতের বেলায় যােয়ান বােয়ান ছেলেরা হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় এবং কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে মুক্তগলায় গাইছে তাদের জোরালাে মধুর সঙ্গীত।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ১৪ সাহিত্যে এতকাল যারা ছিল অস্পৃশ্য—সেই উপেক্ষিত অনাদৃত মহামানবের অখ্যাত জীবনের মধ্যে যিনি প্রথম আবিষ্কার করলেন কাব্যের উপাদান, তার নাম ওয়াল্ট হুইটম্যান। তিনিই প্রথম তারস্বরে ঘােষণা করলেন, সাহিত্য- সৃষ্টির জন্য কল্পনাকে সুদূর অতীতে পৌরাণিক দেব-দেবীদের কাছে পাঠিয়ে দেবার কোনাে প্রয়ােজন নেই ; উচুদরের কাব্য রচনার জন্য অসাধারণ লােকেরা অপরিহার্য নয়। তিনি দেখলেন, কৃত্রিম জীবনের বিলাসিতার মধ্যে অট্টালিকায় যে কবিতা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশী কবিতা রয়েছে মুক্ত আকাশের তলায় কোটী-কোটী সাধারণ নর-নারীর বিচিত্র জীবন-প্রবাহের মধ্যে। বাণীর নিভৃত কমল-কাননের কোমল বীণা-ধ্বনি বাজতে যেখানে, সেখানে তিনি জাগালেন মহা- সাগরের কলকল্লোল। সাধারণ মানুষকে অনাদরের ভস্মস্ত প থেকে তিনি তুলে আনলেন সাহিত্যের দরবারে, তার ধূলিমাখা ললাটে পরিয়ে দিলেন গানের পুষ্পমাল্য। আমেরিকার সাহিত্যে হুইটম্যান যে নূতন সুরটিকে জাগালেন, বাংলার সাহিত্যে সেই সুর জাগিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। হুইটম্যানের কবিতায় আমেরিকা যেমন তার পর্বত এবং সমুদ্র, অরণ্য এবং প্রান্তর, নদী এবং উপত্যকার পটভূমিতে সাধারণ মানুষকে নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেও বাংলাদেশ তেমনি তার পল্লবঘন আম্রকানন, দিগন্ত- ব্যাপী উদার প্রান্তর, নদীতীরের ছায়াময় নীলবনরেখা, জনহীন ভগ্নমন্দির, ঘুঘুর ডাকে মুখরিত বাঁশঝাড়, সন্ধ্যারতির কসর- রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ঘণ্টার সুমিষ্ট শব্দতরঙ্গ, অন্ধকার-জড়িত বনবেষ্টিত সুপ্তপ্রায় গ্রাম, পাখীদের করুণ কলধ্বনিপূর্ণ স্বপ্নাবেশময় শরৎ-মধ্যাহ্ন, জলধারা-প্রফুল্ল শস্যের ক্ষেত, উলঙ্গ ছেলেমেয়েদের খেলার কলরব, রাখালের করুণ উচ্চস্বরে গান, তালগাছ-ঘেরা বড় বড় পুষ্করিণী এবং পদ্মার নিভৃত চরের চখাচখীর কাকলী- কল্লোলের পটভূমিতে সাধারণ বাঙালীকে নিয়ে জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। ছিন্নপত্রের এক জায়গায় আছে, “আমার এই সাজাদপুরের দুপুর বেলা--গল্পের দুপুর বেলা। মনে আছে, ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভাের হয়ে ‘পােষ্টমাষ্টার’ গল্পটা লিখেছিলুম। আমিও লিখছিলুম এবং আমার চারি দিকের আলো, বাতাস ও তরু-শাখার কম্পন তাদের ভাষা যােগ করে দিচ্ছিল।” রবীন্দ্রনাথের অজস্র লেখার মধ্যে আমরা যে এত আনন্দের সন্ধান পাই, তার নিগূঢ় রহস্যটি উপরের লাইন কয়েকটির মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে। বাংলা দেশের অন্তঃপুরচারিণী নদীগুলির কূলে কূলে কেটেছে তার জীবনের বহুদিবস এবং বহুরাত্রি। পদ্মা তাঁর লেখার মধ্যে ভরে দিয়েছে তরল কল্লোল-রােল, স্নানার্থিনী জনপদ- বধুদের উচ্চকণ্ঠের কলধ্বনি মিশে আছে তাঁর রচনায়, শরৎকালের অপর্যাপ্ত জ্যোতির্ময় নীলাকাশ তাঁর কবিতার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে হৃদয়ের অফুরন্ত খুসীকে, বাংলা দেশের ধূ ধূ জনহীন মাঠ এবং তার প্রান্তবর্তী গাছপালার মধ্যে সূৰ্যাস্ত তার ছন্দের মধ্যে ব্যাপ্ত করে দিয়েছে বিশাল শান্তি এবং কোমল করুণা, আমবাগানের ঘনচ্ছায়া, বর্ষাকালের স্নিগ্ধ
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
মেঘাচ্ছন্ন আনত আকাশ, কোকিলের কুহুকুহুরিত বিরহরােদন,
নারকেল পাতার ঝুরঝুর কঁপুনি তাদের ভাষাকে যােগ করে
দিয়েছে তাঁর ভাষার সঙ্গে।
যে সৌন্দৰ্য্য এই ছায়াময় নদী-
স্নেহবেষ্টিত প্রচ্ছন্ন বাংলার একান্তভাবে নিজস্ব সৌন্দৰ্য্য—
রবীন্দ্রনাথের লেখায় তার অপূর্ব প্রকাশ। এইজন্যই বাঙালীর
হৃদয়কে তিনি এমন করে অধিকার করেছেন। তাঁর লেখার
মধ্যে আমাদের চিরপরিচিত সােনার বাংলাকে আমরা নতুন করে
আবিষ্কার করি, তার সাহিত্যে চিরপীড়িত, ধৈৰ্যশীল, স্বজনবৎসল,
বাস্তুভিটাবলম্বী, শান্ত বাঙালীর কাহিনীর সঙ্গে আমাদের গভীর
পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার শিকড় রয়েছে বাংলার
মৰ্ম্মের মধ্যে। বাংলাদেশের পল্লী-প্রকৃতিকে এবং বাংলাদেশের
পল্লীর সাধারণ মানুষকে কত গভীর দরদের সঙ্গে তিনি
পৰ্যবেক্ষণ করেছেন, তারই একটু-আধটু পরিচয় দেবার জন্য
এই প্রবন্ধের অবতারণা। যাকে বলে গণতান্ত্রিক সাহিত্য,
যে সাহিত্যের
উপাদান সংগৃহীত হয়ে থাকে সাধারণ
নরনারীর সুখ-দুঃখের কাহিনী থেকে, যার শিকড় থাকে
দেশের মাটীর মধ্যে নিহিত, যার মধ্যে আমরা শুনতে পাই
সাধারণ মানুষের হৃদয়-স্পন্দন, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে
সেই সাহিত্যের একজন অগ্রদূত বলে আমরা অনায়াসে
ঘঘাষণা করতে পারি।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র আঁকতে গিয়ে প্রথমেই আমরা
যে লাইন কয়টি এখানে উদ্ধৃত করছি—তাদের সঙ্গে
পরিচয় ঘটেছে ‘চিত্রায়। বংলাদেশের পল্লীর এমন একটি
উঠেছে
;
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
নিখুত ছবি এই লাইন কয়টিকে আশ্রয় করে ফুটে
—বাংলা সাহিত্যে যার তুলনা পাওয়া কঠিন।
“ভেসে যায় তরী
প্রশান্ত পদ্মার স্থির বক্ষের উপরি
তরল-কল্লোলে ; অর্ধমগ্ন বালুচর
দূরে আছে পড়ি, যেন দীর্ঘ জলচর
রৌদ্র পােহাইছে ; ভাঙা উচ্চতীর ;
ঘনচ্ছায়াপূর্ণ তরু; প্রচ্ছন্ন কুটীর ;
বক্র শীর্ণ পথখানি দূর গ্রাম হতে
শস্য ক্ষেত্র পার হয়ে নামিয়াছে স্রোতে
তৃষার্ত জিহ্বার মতাে ; গ্রামবধূগণ
অঞ্চল ভাসায়ে জলে আকণ্ঠ মগন
করিছে কৌতুকালাপ ; উচ্চ মিষ্ট হাসি
জলকলস্বরে মিশি পশিতেছে আসি
কর্ণে মাের ; বসি এক বাঁধা নৌকা পরি
বৃদ্ধ জেলে গাথে জাল নত শির করি
রৌদ্রে পিঠ দিয়া ; উলঙ্গ বালক তার
আনন্দে ঝপায়ে জলে পড়ে বারম্বার
কলহাস্যে ; ধৈৰ্যময়ী মাতার মতন
পদ্মা সহিতেছে তার স্নেহজ্বালাতন।
তরী হ’তে সম্মুখেতে দেখি দুই পার ;
স্বচ্ছতম নীলাভ্রের নির্মল বিস্তার ;
মধ্যাহ্ন আলােক প্লাবে জলে স্থলে বনে
;
•
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
১৮
বিচিত্র বর্ণের রেখা; আতপ্ত পবনে
তীর-উপবন হ'তে কভু আসে বহি
আম্রমুকুলের গন্ধ, কভু রহি রহি
বিহঙ্গের শ্রান্ত স্বর।”
বাংলাদেশের এমন একখানি অনবদ্য পল্লী-ছবি আমাদের
সাহিত্যে সত্য সত্যই বিরল। তিনিই কেবল এমন ছবি
আকতে পারেন যিনি পল্লীর সৌন্দর্যের মধ্যে আপনার
চিত্তকে নিঃশেষে ডুবিয়ে দিতে পেরেছেন। এ যেন বাংলার
পদ্মাতীরের একখানি নিখুত ফটোগ্রাফ।
রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকে পদ্মার
আর একখানি ছবি
আপনাদের সামনে উপস্থিত করছি। এই মনােহর ছবিখানি
আছে ‘বলাকা’য়।
“শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে ;
নদীর এপারে ঢালুতটে
চাষী করিতেছে চাষ ;
উড়ে চলিয়াছে হস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
চলে কি না চলে
ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
আধ-জাগা নয়নের মত।
পথখানি বাঁকা
বহু শত বরষের পদ-চিহ্ন-আঁকা
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
চলেচে মাঠের ধারে—ফসল ক্ষেতের যেন মিতা
নদী সাথে কুটীরের বহে কুটুম্বিতা।”
রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, গল্পে, গানে বাঙলার পল্লী-প্রকৃতির
এমন কত যে ছবি মণিমুক্তার মত ছড়িয়ে আছে তার ইয়ত্তা
‘সােণার তরী’তে ‘আকাশের চাদ’ বলে যে কবিতাটি
আছে তার মধ্যে এই লাইন কয়টীতে পল্লীর কি মধুর ছবিটি
ফুটে উঠেছে।
নেই।
সােণার ক্ষেত্রে কৃষাণ বসিয়া
কাটিতেছে পাকা ধান,
ছােটো ছােটো তরী পাল তুলে যায়
মাঝি বসে গায় গান।
দূরে মন্দিরে বাজিছে সর,
বধুরা চলেছে ঘাটে,
মেঠো পথ দিয়ে গৃহস্থ জন
আসিছে গ্রামের হাটে।
==
অথবা-
নমােনমাে নমঃ সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি !
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি ।
অবারিত মাঠ, গগন ললাট চুমে তব পদধূলি,
ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড় ছােট ছােট গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের স্নেহ-গেহ ;
স্তব্ধ অতল দীঘি-কালােজল, নিশীথ-শীতল স্নেহ।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে,
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে।
বাঙলাদেশের এই অপূর্ব-সুন্দর পল্লীচিত্রটী বঙ্গসাহিত্যভাণ্ডারে
কোহিনুরের মতই দীপ্তি পাচ্ছে।
“হের ক্ষুদ্র
নদীতীরে
সুপ্তপ্রায় গ্রাম ; পক্ষীরা গিয়েছে নীড়ে,
শিশুরা খেলেনা, শূন্যমাঠ জনহীন ;
ঘরে ফেরা শ্রান্ত গাভী গুটী দুই তিন
কুটীর-অঙ্গনে বাঁধা, ছবির মতন
স্তব্ধপ্রায়। গৃহকাৰ্য হ’ল সমাপন,
কে ওই গ্রামের বধূ ধরি বেড়াখানি
সম্মুখে দেখিছে চাহি, ভাবিছে কী জানি
ধূসর সন্ধ্যায়।”
বাঙলাদেশের নদীতীরে নিভৃত পল্লীর বুকে
নিভৃত পল্লীর বুকে যখন সন্ধ্যার
ম্লান ছায়া ঘনিয়ে আসে তখন এই ছবিই সেখানে প্রতিদিন
জেগে ওঠে। বাঙলাদেশের পল্লীর সঙ্গে গভীরতম পরিচয়
থাকলে ভাষার যাদুকে আশ্রয় করে সন্ধ্যার এমন নিখুত
ছবি অঙ্কিত করা একান্তই কঠিন।
এবার রবীন্দ্রনাথের গদ্য-সাহিত্য থেকে দুএকটী পল্লী-
চিত্র পাঠকপাঠিকাগণকে উপহার দেবাে। গল্পগুচ্ছের দ্বিতীয়
খণ্ডে ‘অতিথি’ বলে যে কাহিনীটী রয়েছে তারই মধ্যে এই
চিত্রটী আছে।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ‘আকাশে নব বর্ষার মেঘ উঠিল। গ্রামের নদী এতদিন শুষ্ক- প্রায় হইয়াছিল, মাঝে মাঝে কেবল এক একটা ডােবায় জল বাধিয়া থাকিত, ছােটো ছােটো নৌকা সেই পঙ্কিল জলে ডােবানাে ছিল এবং শুষ্ক নদীপথে গরুর গাড়ী চলাচলের সুগভীর চক্র-চিহ্ন খােদিত হইতেছিল—এমন সময় একদিন পিতৃগৃহ- প্রত্যাগত পার্বতীর মতো কোথা হইতে দ্রুতগামিনী জলধারা কলহাস্যসহকারে গ্রামের শূন্যবক্ষে আসিয়া সমাগত হইল—উলঙ্গ বালক-বালিকারা তীরে আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে নৃত্য করিতে লাগিল, অতৃপ্ত আনন্দে বারম্বার জলে ঝাঁপ দিয়া নদীকে যেন আলিঙ্গন করিয়া ধরিতে লাগিল, কুটীরবাসিনীরা তাহাদের পরিচিত প্রিয়- সঙ্গিনীকে দেখিবার জন্য বাহির হইয়া আসিল,—শুষ্ক নির্জীব গ্রামের মধ্যে কোথা হইতে এক প্রবল বিপুল প্রাণহিল্লোল আসিয়া প্রবেশ করিল। দেশবিদেশ হইতে বােঝাই হইয়া ছােটো বড়াে নানা আয়তনের নৌকা আসিতে লাগিল, বাজারের ঘাট সন্ধ্যাবেলায় বিদেশী মাঝির সঙ্গীতে ধ্বনিত হইয়া উঠিল। দুই তীরের গ্রামগুলি সম্বৎসর আপনার নিভৃত কোণে আপনার ক্ষুদ্র ঘরকন্না লইয়া একাকিনী দিন যাপন করিতে থাকে, বর্ষার সময় বাহিরের বৃহৎ পৃথিবী বিচিত্র পণ্যোপাের লইয়া গৈরিকবর্ণ। জল-রথে চড়িয়া এই গ্রামকন্যকাগুলির তত্ত্ব লইতে আসে; তখন জগতের সঙ্গে আত্মীয়তাগবে কিছুদিনের জন্য তাহাদের ক্ষুদ্রতা ঘুচিয়া যায়, সমস্তই সচল, সজাগ, সজীব হইয়া উঠে এবং মৌন নিস্তব্ধ দেশের মধ্যে সুদূর রাজ্যের কলালাপধ্বনি আসিয়া চারিদিকের আকাশকে আন্দোলিত করিয়া তুলে।”
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র বাঙলার নদীতীরস্থ পল্লীগুলিতে নববর্ষার আবির্ভাব বৎসরে বৎসরে যে নব জীবনের চাঞ্চল্য নিয়ে আসে তার এমন অনবদ্য মূর্তি বাঙলা-সাহিত্যে সুদুলভ। এই চিত্র কেবল তারই পক্ষে আঁকা সম্ভব যিনি সমস্তসত্তা দিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বর্ষার পল্লীচিত্রকে পৰ্যবেক্ষণ করেছেন। বাঙলা দেশের বর্ষার এই চঞ্চল নদীর পটভূমিতে তারাপদ নামক যে আসক্তিবিহীন উদাসীন বালকটী দাড়িয়ে আছে তার ভবঘুরে স্বভাবটি নিয়ে, তার ছবিটিও বাঙালা সাহিত্যে একটি অমূল্য সম্পদ। সুভাষিণীর পিতা চণ্ডীপুরের বাণীকণ্ঠ। বাঙলাদেশের একটী নিরলস তন্বী নদীর তীরে বাণীকণ্ঠের ঘর। সেই ঘর- খানির বর্ণনা কি নিখুত। গল্পগুচ্ছের ‘সুভা নামক গল্পটীতে বাণীকণ্ঠের ঘরের বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “বাণীকণ্ঠের ঘর একেবারে নদীর উপরেই। তাহার বাখারির বেড়া, আটচালা, গােয়াল ঘর, ঢেকিশালা, খড়ের স্তুপ, তেঁতুল তলা, আম-কাঠাল এবং কলার বাগান, নৌকাবাহী-মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।” এই গৃহখানির পটভূমিতে সুনাম্নী যে বােবা বালিকাটী ব্যর্থতার অসীম বেদনা নিয়ে দাড়িয়ে আছে, সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতাে শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন। এই পল্লী- বালার নিস্ফল জীবনের অসীম ট্র্যাজেডির ছবি পাঠকের মনে যে বেদনার রেখাপাত করে—তা সহজে মুছে যাবার নয়। পড়া যখন শেষ হয়ে যায় তখনও সুভা পাঠকের হৃদয়ে তার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড় বড় দু’টি কালাে চোখ নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। সুভার পাশে. গোসাইদের অকর্মণ্য ছােটো ছেলে রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র প্রতাপ ছিপটি হাতে মাছ ধরছে। যেমন সুভা, তেমনি প্রতাপ। একটি বােব গ্ৰাম্যবালিকা এবং একটি অকর্মণ্য গ্রাম্যবালকের এই যে দুখানি ছবি পাশা-পাশি আঁকা হয়েছে, বাংলা- সাহিত্যে এদের তুলনা কোথায় ? রবীন্দ্রনাথ কেবল শহরের উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত নরনারীর চিত্র-অঙ্কনে দক্ষতা দেখিয়ে ক্ষান্ত থাকেন নি। তার সুদূরপ্রসারী কল্পনা উদার বাহুর মধ্যে নিখিলের অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত সবাইকে টেনে নিয়েছে। যে লেখনী-মুখে নীরজার, সরলার, এলার, লাবণ্যের, কেতকী মিত্রের, কুমুর, উর্মিলার, সুষমার এবং বাঁশরীর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে—সেই লেখনীই আবার উলাপুর গ্রামের সাব পােষ্টমাষ্টারের পিতৃমাতৃহীন, অনাথা পরিচারিকা রতনের মৌন বেদনাকে ভাষা দিয়েছে। যে শক্তিশালী হস্তের তুলিকা আদিত্য এবং শশাঙ্কের সুন্দর গৃহকে অঙ্কিত করেছে—সেই শক্তিশালী হস্তের তুলিকা-মুখেই আবার পােষ্টমাষ্টারের জীর্ণ ঘরখানি রূপায়িত হয়েছে। পােষ্টমাষ্টারের ঘরখানির বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “মিটমিট করিয়া প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং একস্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ টপ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল। বর্ষায় পল্লীগ্রামের জীর্ণঘরের একখানি অনবদ্য চিত্র! ‘সমাপ্তি' গল্পে মৃন্ময়ীর বাপ ঈশান মজুমদারের বর্ণনাটীও রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লীর একটি নিখুঁত ছবি। ঈশান মজুমদার নদীতীরবর্তী একটি ক্ষুদ্র ষ্টেশনে ষ্টীমার কোম্পানীর কেরাণী।
২৪
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
অপূর্ব যখন মৃন্ময়ীকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় কুশীগঞ্জে পৌছালো
তখন দেখা গেল, “টিনের ঘরে একখানি ময়লা চৌকা-কাঁচের
লণ্ঠনে তেলের বাতি জ্বালাইয়া ছােটো ডেস্কের উপরে একখানি
চামড়ায় বাঁধা মস্ত খাতা রাখিয়া গা-খােল ঈশানচন্দ্র টুলের
উপর বসিয়া হিসাব লিখিতেছিলেন।” বর্ধমান ষ্টেশনে
‘পুরাতন ভৃত্য কৃষ্ণকান্তের ছবিকে যেমন আমরা আজীবন
মনের মধ্যে সযত্নে পােষণ করি, টিনের ঘরে টুলের উপরে বসা
গা-খােল ঈশান মজুমদারের ছবিখানিও তেমনি আমাদের
হৃদয়ের মধ্যে চিরন্তন হয়ে থাকে। রবীন্দ্র-সাহিত্যে কেবল
অমিত রায় নেই, ঈশানচন্দ্রও আছে, কেবল শহরের অট্টালিকা
নেই, পল্লীর কুটীরও আছে। তার সাহিত্য প'ড়ে Lin
Yutangএর এই কথাই বারে বারে মনে জাগে, “Yes, life
which is so poignantly beautiful is worth recording
down to its lowliest details."
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ) যাহা কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়, সকলি দুলভ বলে আজি মনে হয় । দুলভ এ ধরণীর লেশতম স্থান, দুলভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ। এই কয়েকটি লাইনের মধ্যে আমরা রবীন্দ্রনাথের গভীরতম মর্মবাণীর পরিচয় পাবো। রবীন্দ্রনাথ কবি এবং কবি বলেই জীবনকে ভালােবেসেছেন তিনি। ইন্দ্রিয়ের দ্বারগুলিকে রুদ্ধ করে বৈরাগ্যের মধ্যে মুক্তিকে খুঁজে বেড়ায় যারা, রবীন্দ্র- নাথের আসন তাদের দলে নয়। জীবন দুঃখময়, আনন্দ রয়েছে জীবনের পরপারে—এমন কথা বলে যারা, তাদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথকে আমরা পাবােনা। নির্বাণের জয়গান নেই রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। এই মাটির পৃথিবীর প্রতিদিনের দৃশ্যে, গন্ধে, গানে যে সহজ আনন্দ রয়েছে, সেই আনন্দকে তিনি অনুভব করেছেন অন্তরের শিরায় শিরায়। এই জগৎ তার আলো-ছায়া, হাসি-কান্না নিয়ে অপরূপ হয়ে দেখা দিয়েছে তঁার মনের সম্মুখে। চক্ষে লাগে মম প্রশান্ত আনন্দঘন অনন্ত আকাশ ; শরৎ মধ্যাহ্নে পূর্ণ সুবর্ণ উচ্ছাস
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
আমার শিরার মাঝে করিয়া প্রবেশ
মিশায় রক্তের সাথে আতপ্ত আবেশ।
ভুলায় আমারে সবে। বিচিত্র ভাষায়
তোমার সংসার মােরে কঁাদায় হাসায় ;
তব নরনারী সবে দিগ্বিদিকে মােরে
টেনে নিয়ে যায় কত বেদনার ডােরে,
বাসনার টানে। সেই মাের মুগ্ধ মন
বীণাসম তব অঙ্কে করিনু অর্পণ,-
তার শত মােহতন্ত্রে করিয়া আঘাত
বিচিত্র সঙ্গীত তব জাগাও, হে নাথ।
যুগে যুগে কবিদের কণ্ঠ থেকে এই প্রার্থনাই উৎসারিত
হয়ে এসেছে। মানুষের আত্মার আসন বিশ্বের কেন্দ্রে।
চারিদিক থেকে সেই আত্মার কাছে কত যে অহ্বান আসছে
নিমেষে নিমেষে। এই সকল আহ্বান কোন কোন চিত্তে
আশ্চৰ্যরকমের সাড়া জাগাতে পারে। দুলভ হলেও এমন
চিত্ত আছে যা সহস্র-তার-যুক্ত বীণার মত। জীবনের প্রতি-
নিমেষের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সেই চিত্তবীণার তারে তারে বিচিত্র
রকমের সুরকে জাগিয়ে তােলে। মুকুট-পরা রাজা আর
মুকুটহীন সর্বহারা, চরিত্রহীনা নারী আর সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী,
শ্মশানঘাটের বিলাপ আর বাসরঘরের কলহাস্য, সূর্যাস্তের
দীপ্তি আর বর্ষণমুখর শ্রাবণরাত্রি—সব কিছুই সেই চিত্তে এমন
একটি অনুভূতির সঞ্চার করে যার মধ্যে মুক্তি আছে, মাধুৰ্য্য
২৭
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
-
আছে, বিস্তার আছে। এই অনুভূতির মধ্যে চিত্ত আপনার
অসীম ঐশ্বৰ্য্য এবং বিপুলতার সন্ধান পায়।
রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্ত জীবনের প্রভাত থেকেই জগতের
আহ্বানে বিচিত্ৰসুরে বেজে উঠেছে। যখন তার শিশুকাল,
তখন থেকেই মাটির পৃথিবীর প্রতি একটা দুর্বার আকর্ষণ
অন্তরে অন্তরে অনুভব করেছেন তিনি। উত্তরকালে যিনি
লিখেছিলেন,
“বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ। এই বসুধার
মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বারম্বার
তােমার অমৃত ঢালি দিবে অবিরত
নানাবর্ণগন্ধময়। প্রদীপের মতাে
সমস্ত সংসার মাের লক্ষ বর্তিকায়
জ্বালায়ে তুলিবে আলো তােমারি শিখায়
তােমার মন্দির মাঝে।
ইন্দ্রিয়ের দ্বার
রুদ্ধ করি যােগাসন, সে নহে আমার।
যা কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গন্ধে গানে
তােমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে।
অথবা-
“ভালো মন্দ দুঃখ সুখ অন্ধকার আলাে
মনে হয় সব নিয়ে এ ধরণী ভালাে।”
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ২৮ তঁাকে জীবন প্রথম থেকেই বাঁশি বাজিয়ে ডাক দিয়েছিলো। সেই ডাকে তখন থেকেই তার হৃদয় উচ্ছসিত আবেগে বারম্বার সাড়া দিয়েছে—যখন তিনি ছিলেন নিতান্ত বালক। তার বাল্যকালের এই অনুভূতির আমরা পরিচয় পাবো ‘জীবনস্মৃতি’র গােড়ার দিকটায় । সেখানে আছে, “জানালার নীচেই একটি ঘাট-বাঁধানাে পুকুর ছিল। তাহার পূর্বব-ধারের প্রাচীরের গায়ে প্রকাণ্ড একটা চীনা বট, দক্ষিণধারে নারিকেলশ্রেণী। গণ্ডি বন্ধনের বন্দী আমি জানালার খড়খড়ি খুলিয়া প্রায় সমস্ত দিন সেই পুকুরটাকে একখানা ছবির বহির মত দেখিয়া দেখিয়া কাটাইয়া দিতাম।” যে অসীম কৌতূহল নিয়ে যৌবনে তিনি পদ্মাতীরে, পল্লীগুলিকে নিরীক্ষণ করেছিলেন, বাল্যজীবনের এই স্মৃতির মধ্যে সেই কৌতূহলেরই প্রথম পরিচয় পাই। এই অসীম-কৌতূহল নিয়েই বাল্যকালে ছাদের প্রাচীরের রন্ধ্রপথে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তিনি দেখতেন উঠানের কোণের উচ্ছিষ্ট ভাতের উপরে কাকের দলের সভা, বাড়ীর ভিতরের বাগান প্রান্তের নারিকেলশ্রেণী, সিঙ্গিরবাগানপল্লীর পুষ্করিণী এবং সেই পুষ্করিণীর ধারে তারা গয়লানীর গােয়াল ঘর। এই সময়কার মনােভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘জীবনস্মৃতিতে তিনি লিখেছেন, “মাথার উপরে আকাশব্যাপী খর দীপ্তি, তাহারই দূরতম প্রান্ত হইতে চিলের সূক্ষ্ম তীক্ষ্ণ ডাক আমার কানে আসিয়া পৌঁছিত এবং সিঙ্গির- বাগানের পাশের গলিতে দিবাসুপ্ত নিস্তব্ধ বাড়ীগুলার সম্মুখ দিয়া পসারী সুর করিয়া “চাই, চুড়ি চাই, খেলনা চাই” হাকিয়া যাইত—তাহাতে আমার সমস্ত মন উদাস করিয়া দিত।”
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র বিশ্বপ্রকৃতির প্রতি হৃদয়ের এই যে দুর্নিবার টান, গাছপালা, ফুল-ফল, পশু-পক্ষীর প্রতি অন্তরের এই যে সহজ অনুরাগ, পৃথিবীর রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শকে সমস্ত সত্তা দিয়ে উপভােগ করবার এই যে বিপুল ক্ষমতা—এর পরিচয় ‘জীবন-স্মৃতির গােড়ার দিকটার অনেকগুলি পরিচ্ছেদে ফুটে উঠেছে। বাড়ীর ভিতরের বাগানটি তার শৈশবকে যে আনন্দ দান করতো, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “বাড়ীর ভিতরের বাগান আমার সেই স্বর্গের বাগান ছিল—সেই আমার যথেষ্ট ছিল। বেশ মনে পড়ে, শরৎকালের ভােরবেলায় ঘুম ভাঙিলেই এই বাগানে আসিয়া উপস্থিত হইতাম । একটি শিশির-মাখা ঘাস-পাতার গন্ধ ছুটিয়া আসিত, এবং স্নিগ্ধ নবীন রৌদ্রটী লইয়া আমাদের পূর্বদিকের প্রাচীরের উপর নারিকেল- পাতার কম্পমান ঝালরগুলির তলে প্রভাত আসিয়া মুখ বাড়াইয়া দিত।” Child shows the man as morning shows the day—একথা যে কত সত্য, রবীন্দ্রনাথের শৈশবই তার প্রমাণ। এক রকমের লােক আছেন যারা জীবনের ছােট ছােট সহজ আনন্দগুলিকে উপভােগ করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের দৃষ্টি সর্বদাই সুদূরে—নিকটে নয়। তঁারা কাছের জিনিষকে দেখে থাকেন অবজ্ঞার চোখে, বর্তমানকে মনে করেন অর্থহীন। ভবিষ্যৎ তাদের কাছে লােভনীয়। তাদের কারও কণ্ঠে নির্বাণের কথা, কারও কণ্ঠে মুক্তির কথা, কারও কণ্ঠে বা প্রগতির কথা। সক্রেটিস যেমন বলতেন “ঝগড়াটে স্ত্রী স্বামীর
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, তারাও তেমনি বলেন, বর্তমান
জীবনের দুঃখকষ্টের মধ্য দিয়ে মানুষ ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য
তৈরী হয়। জীবন তাদের কাছে কুইনিনের মতাে তেতো
কিন্তু উপকারী। তাদের মধ্যে মুক্তির পূজারী যারা, তাদের
কাছে জীবন একটা অভিশাপ। তাদের সারা জীবনের সাধনা
হচ্ছে—বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়গুলিকে সরিয়ে এনে বাসনাকে
নিৰ্ম্মল করা। প্রগতির কথা বলেন যাঁরা, তারা জীবনকে
অস্বীকার না করলেও জীবনের সহজ আনন্দগুলি থেকে বঞ্চিত।
তারা ক্রমাগত ছুটে চলেছেন তারই দিকে—যা নাগালের
বাহিরে, তাদের দৃষ্টি কেবল উপকরণের পর উপকরণকে সংগ্রহ
করার দিকে। কেবলই ছুটে চলার নেশায় মন যাদের ভাের
হয়ে আছে, জীবনকে কেমন করে ভােগ করতে হয়—
সে কৌশল তাদের কাছে অজ্ঞাত। পরলােকের দিকে যাদের
দৃষ্টি, ইহলােক তাদের কাছে তুচ্ছ। নির্বাণ’ যাদের লক্ষ্য,
জীবন তাদের কাছে উপেক্ষার বস্তু।
এই নির্বাণ, মুক্তি, প্রগতি অথবা আত্মােন্নতির মােহ যাদের
চিত্তকে অভিভূত করে রেখেছে—কবিরা তাদের থেকে স্বতন্ত্র
জীব। কবিদের জীবনের
মূলমন্ত্র
Here and Now, কবিরা
বলেন, আনন্দ দূরে নেই, আনন্দ রয়েছে নিতান্ত কাছে।
বর্তমানের চূড়ায় চূড়ায় সহজ ছন্দে ভেসে চলতে জানে যে, সেই
শুধু আস্বাদন করতে পারে স্বর্গের মাধুৰ্য্যকে। যা নিতান্ত
কাছের, যা নিতান্ত সাধারণ, তার মধ্যে যে সৌন্দর্যকে দেখতে
পারে, আনন্দের উপরে অবাধ অধিকার শুধু তারই। এই
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
সত্যকেই রবীন্দ্রনাথ অপরূপ ভাষায় প্রকাশ করেছেন নিম্নের
কবিতায়।
“ফিরেছি সেই স্বর্গে শূন্যে শূন্য
ফকির ফঁাকা ফানুষ ।
কত যে যুগ যুগান্তরের পুণ্যে
জন্মেছি আজ মাটির পরে ধুলা মাটির মানুষ।
স্বর্গ আজি কৃতার্থ তাই আমার দেহে,
আমার প্রেমে, আমার স্নেহে,
আমার ব্যাকুল বুকে,
আমার লজ্জা, আমার সজ্জা, আমার দুঃখে সুখে।”
০
অথবা-
“ধন্যরে আমি অনন্ত কাল,
ধন্য আমার ধরণী।
ধন্য এ মাটি, ধন্য সুদূর
তারকা হিরণবরণী।
যেথা আছি আমি, আছি তারি দ্বারে,
নাহি জানি ত্রাণ কেন বলো কারে ।
আছে তারি পারে তঁারি পারাবারে
বিপুল ভুবন-তরণী ।
যা হয়েছি আমি ধন্য হয়েছি
ধন্য এ মাের ধরণী।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৩২ এই যে মাটির উপরে ধূলি মাটির মানুষ হয়ে জন্মানােকে একটা প্রকাণ্ড সৌভাগ্য বলে অনুভব করবার ক্ষমতা, মৃত্তিকার কোলে স্বর্গের মহিমাকে দেখবার এই যে দুর্লভ দৃষ্টি, জীবনকে তার রৌদ্র-ছায়া, আলো-অন্ধকার নিয়ে ভােগ করবার এই যে শক্তি—এরই নাম humanism. রবীন্দ্রনাথ এই humanismএর পূজারী এবং সেই জন্যেই দূরের দিকে তাকিয়ে নিকটকে কখনই তিনি অবহেলা করেননি। সহজে যা তিনি পেয়েছেন—সহজেই তাকে তিনি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছেন। অন্তরের একটি বাতায়নকেও তিনি রুদ্ধ করে রাখেননি, তুচ্ছ ব’লে কাকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি। হৃদয়ের মুক্ত বাতায়ন-পথে চঞ্চল সংসার তার যত ভুল, যত ধূলি, যত দুঃখ- শােক, যত ভালাে-মন্দ, যত গীত-গন্ধ নিয়ে অবাধে তার চিত্তলােকে প্রবেশ করেছে। রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লীচিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে এত কথা বলতে হােলাে তার কারণ, তার জীবনের আদর্শকে ঠিকমতাে বুঝতে পারলে, তাকে জানার পথ প্রশস্ত হবে। রবীন্দ্রনাথ পল্লীকে যে এমন করে ভালবাসতে পেরেছেন তার কারণ জীবনের প্রতি তাঁর চিত্তের অপরিমেয় অনুরাগ। কালস্রোতে ভাসতে ভাসতে একদা তাঁর জীবনের তরণীখানি বঙ্গদেশের একটী পল্লীর ঘাটে এসে থেমেছিল। পল্লীর সরল জীবনকে সহজেই তিনি সেদিন গ্রহণ করতে পেরেছিলেন ; কারণ শহরের আবহাওয়ার মধ্যে মানুষ হলেও ছেলেবেলা থেকেই জীবন আলো, বর্ণ আর গন্ধ দিয়ে তাঁর মনকে মুগ্ধ ;
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
করেছিলাে। পৃথিবীর সঙ্গে তার প্রেমের খেলা শুরু হয়েছিল
শৈশবের খেলাঘর থেকেই। তাই দেখি পদ্মা প্রেয়সীর
মত তার হৃদয়কে কখন নিঃশব্দে অধিকার করে বসেছে।
পদ্মার সঙ্গে তার শুভদৃষ্টির পুণ্য মুহূর্তটীকে তিনি অমর করে
রেখেছেন তার ‘পদ্মা’ নামক কবিতায়।
“হে পদ্মা আমার !
তােমায় আমায় দেখা শত শতবার।
একদিন জনহীন তােমার পুলিনে,
গােধূলির শুভলগ্নে হেমন্তের দিনে,
সাক্ষী করি পশ্চিমের সূৰ্য্য অস্তমান,
তােমারে সপিয়াছিনু আমার পরাণ ।
অবসান সন্ধ্যালােকে আছিলে সে দিন
নতমুখী বধূসম শান্ত বাক্যহীন ;-
সন্ধ্যাতারা একাকিনী সস্নেহ কৌতুকে
চেয়ে ছিল তােমা পানে হাসিভরা মুখে !
সেদিনের পর হতে, হে পদ্মা আমার
তােমায় আমায় দেখা শত শতবার।”
পদ্মার সঙ্গে এই যে শত শতবার দেখা, ঋতুতে ঋতুতে
এই যে তার সঙ্গে নির্জনে মুখখামুখী হয়ে থাকা—তবুও নয়ন
তৃপ্ত এবং প্রেম ক্লান্ত নয়। পরজন্মেও যাতে পদ্মার সঙ্গে তার
জীবনের বিচ্ছেদ না ঘটে, এই ব্যাকুল কামনা কান্না হয়ে তার
কণ্ঠ থেকে বারে বারে বেরিয়ে এসেছে।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৩৪ “কত দিন ভাবিয়াছি বসি তব তীরে পরজন্মে এ ধরায় যদি আসি ফিরে, যদি কোনাে দূরতর জন্মভূমি হতে তরী বেয়ে ভেসে আসি তব খরস্রোতে, কত গ্রাম কত মাঠ কত ঝাউঝাড় কত বালুচর কত ভেঙ্গে-পড়া পাড় পার হয়ে এই ঠাই আসিব যখন জেগে উঠিবে না কোনাে গভীর চেতন ? জন্মান্তরে শতবার যে নির্জন তীরে গােপনে হদয় মাের আসিত বাহিরে, আর বার সেই তীরে সে সন্ধ্যাবেলায় হবে নাকি দেখা শুনা তােমায় আমায় ! এই যে নদী আর বন, মাঠ আর ফুল, আলো আর গানের সঙ্গে অন্তরের গভীর আত্মীয়তা—এটি, বােধ হয়, আমাদের বাঙালী জাতির একটি বৈশিষ্ট্য। ফুটবলের পিছনে পিছনে সারা মাঠ দৌড়ে বেড়াতে আমরা তত ভালােবাসি না যত ভালােবাসি অপরাহ্নের ম্লান আলােকে বিলের ধারে সবুজ ঘাসে বেড়িয়ে বেড়াতে। বকুলগাছ থেকে কোকিলের ডাক যখন কানে আসে, আশ্বিনের রাতে শিউলি ফুলের যখন গন্ধ পাই, হেমন্তের মাঠে মাঠে সােনালীধানের প্রাচুর্য যখন চোখের সামনে জেগে ওঠে, অতসী আর গাঁদা, দোপাটি আর টগর ঘরের আঙিনাকে যখন আলাে করে তােলে, উঠানে প্রভাত- সূৰ্যালােকে ফেন-শুভ্র গােবসটি যখন লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
করে, রন্ধনশালায় যখন পরমান্ন আর পিঠাপুলি খাবার ডাক
পড়ে, ভােরের বেলায় সানাইতে যখন ভৈরবীর সুকরুণ সুর
বাজে—তখন আনন্দে আমাদের চিত্ত কানায় কানায় ভরে
যায়। জীবনের প্রতিদিনের ছােটো ছােটো অসংখ্য আহ্বানে
আমাদের শান্তিপ্রিয় চিত্ত অতি সহজেই সাড়া দেয়। ঋতুতে
ঋতুতে তাই আমাদের উৎসবের শেষ নেই। ফানে আমাদের
অরণ্যগুলি যখন শিমূলের আর পলাশের প্রাচুর্যে রাঙা হয়ে
যায়, রিক্ত শাখা-প্রশাখায় দেখা দেয় কচি কচি নতুন পাতা,
আমরা তখন আবীর আর কুঙ্কুম নিয়ে শুরু করি হােলির
উৎসব। আশ্বিনে যখন শিউলির গন্ধে বাতাস আকুল হয়ে
ওঠে, বন এবং পর্বত শিশিরে ঝলমল করে—তখন আমাদের
পল্লীতে পল্লীতে বেজে ওঠে দুর্গোৎসবের নহবৎ। শ্রাবণের
মেঘমেদুর আকাশের তলে নীপের বন যখন অজস্র পুলক-ভরা
ফুলে পূর্ণ হয়, ভরানদীর কূলে কূলে যখন জাগে উচ্ছলজলের
কলরােদন, তখন
আমরা গাই
ঝুলনের গান । জীবন
বড় ক্ষণিক—প্রভাতের ফোটা ফুল সন্ধ্যায় পড়ে ঝরে
শিশুর কাকলী চিরনিদ্রার মাঝে কখন যে নীরব হয়ে যায়
তার ঠিক নেই,—সুখ, যৌবন, সৌন্দৰ্য, গান, গন্ধ, আলাে-
সবই নিমেষে নিমেষে বলছে যাই, যাই। এই ক্ষণস্থায়ী
জীবনের বুকে অজানার পিছনে আমরা ছুটাছুটি করতে
ভালােবাসি নে। আমরা যখন কোন কিছুর মধ্যে আমাদের
অন্তরের যথার্থ তৃপ্তি খুঁজে পাই তখন তাকেই আমরা দুবাহু
দিয়ে আঁকড়ে ধরি—যেমন করে মেঘাচ্ছন্ন ঝড়ের রাতে মা
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র তার শিশুকে আঁকড়ে ধরে। দক্ষিণ-মেরু আবিষ্কারের জন্য অথবা হিমালয়ের চূড়ায় আরােহণ করবার নিমিত্ত আমাদের কিছুমাত্র উৎসাহ নেই। কোন নারী পরস্ত্রী বলেই নিজের স্ত্রীর চেয়ে সুন্দরী হবে—এরকম ধারণাকে আমরা মনের মধ্যে স্থান দিই নে এবং সেই জন্যই স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সংসার করায় আমাদের এত আনন্দ। দুনিয়ার হাটে আমাদের কোনাে তাড়াহুড়া নেই। পৃথিবীতে রক্ত-সাগরের মধ্যে কত জীর্ণ সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কোটী কোটী নরনারীর হাহাকারের মধ্যে কত নূতন সাম্রাজ্য জেগে উঠছে—সে সব নিয়ে আমরা মাথা ঘামানাে প্রয়ােজন মনে করি নে। চারিদিকের কর্ণ- বিদারী রণহুঙ্কারের মধ্যে আমাদের পল্লীর জীবন-প্রবাহ শান্ত ছন্দে বয়ে চলেছে। নদীতে খেয়া নৌকা প্রতিদিন পারাপার করছে, কেউ ঘরে চলেছে, কেউ ঘর থেকে আসছে, কাদা-খোঁচা পাখী লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে জলের ধারে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সানাইয়ের সুরের মধ্যে টোপর-পরা বর চেলী-পরা বধূকে নিয়ে ঘরে ফিরছে, সূর্যাস্তের স্লান আলােকে মাঠ থেকে আমনধান্য নিয়ে চাষী ফিরে যাচ্ছে গ্রামের পানে। আমাদের জীবন-যাত্রার এই স্বচ্ছন্দগতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই রবীন্দ্রনাথ তঁার ‘খেয়া’ কবিতায় লিখেছিলেন, খেয়া নৌকা পারাপার করে নদী স্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হােতে। দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানা শােনা, সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগােনা।
৩৭. রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব কত সর্বনাশ, নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস ; রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে সােনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে। সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা, উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা। শুধু হেথা দুই তীরে—কেবা জানে নাম- দোহাপানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম । এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে, কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হােতে। এই হােলল আসল বাংলার রূপ। এই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে যদি বলি খাঁটি বাঙালী তবে কিছু মাত্র ভুল হবে না। খাঁটি বাঙালী বলেই জীবনের সহজ সরল আনন্দগুলিকে সমস্ত সত্তা দিয়ে এমন করে তিনি উপভােগ করতে পেরেছেন, খাঁটি বাঙালী বলেই বাঙলা দেশের আকাশ-বাতাস তঁার প্রাণে এমন করে বাঁশি বাজিয়েছে, পদ্মা তাঁর মনকে এমন করে চুরি করেছে, তার অজস্র কবিতায় এবং গদ্য-রচনায় বাংলা দেশের পল্লীর দৃশ্যগুলি এমন জীবন্ত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর, লও যত লৌহ লােষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর হে নব সভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী, দাও সেই তপােবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি, গ্লানিহীন দিনগুলি—সেই সন্ধ্যাস্নান,
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
সেই গােচারণ, সেই শান্ত সামগান,
নীবার ধান্যের মুষ্টি, বল্কল বসন,
মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলােচন
মহাতত্ত্বগুলি। পাষাণপিঞ্জরে তব
নাহি চাহি নিরাপদে রাজভােগ নব ;
চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার,
বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার,
পরাণে স্পশিতে চাইছিড়িয়া বন্ধন
অনন্ত এ জগতের হৃদয় স্পন্দন।
বর্তমান সভ্যতার সুপ্রচুর আড়ম্বর ও চাকচিক্যের প্রতি এই
যে বিতৃষ্ণা, পল্লীর শান্ত সরল জীবনের মধ্যে ফিরে যাবার
জন্য এই যে সুগভীর আকাঙ্ক্ষা, এখানে রবীন্দ্রনাথ খাটি
বাঙালী ছাড়া আর কিছুই নন। এত যে আমাদের বেদনার
দুর্বহ বােঝ, এত যে আমাদের পরাধীনতার দুঃসহ গ্লানি,
তবুও আকাশে যখন পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে—আমরা জানালা
খুলে দিই; গাছের পাতার চালুনীতে ছাঁকা হয়ে সেই চাদের
আলাে যখন ঘাসের উপরে ছায়ার সঙ্গে খেলা করে—আমরা
দাড়িয়ে দাড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখি ; দোয়েলের গান শুনে
আমাদের হৃদয় জুড়িয়ে যায় এবং নদীর ধারে কাশ ফুলের
শশাভা দেখলে আমরা মনে অনির্বচনীয় তৃপ্তি অনুভব করি ।
এইবার রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকে কতকগুলি পল্লী-চিত্র আমরা
পাঠক-পাঠিকাদের উপহার দেবব—যা দেখলে তারা অনায়াসে
উপলব্ধি করতে পারবেন, পল্লীর সঙ্গে কবির হৃদয়ের যােগ
;
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
কত গভীর, কত নিবিড়। চৈতালিতে ‘মধ্যাহ্ন’ বলে একটি
কবিতা আছে। এই সুন্দর কবিতাটিতে পল্লীর একটি চিত্র
ফটোগ্রাফের মত নিখুত হয়ে ফুটে উঠেছে।
বেলা দ্বিপ্রহর ।
ক্ষুদ্র শীর্ণ নদীখানি শৈবালে জর্জর
স্থির স্রোতােহীন। অৰ্দ্ধমগ্ন তরীপরে
মাছরাঙা বসি, তীরে দুটী গরু চরে
শস্যহীন মাঠে। শান্ত নেত্রে মুখ তুলে
মহিষ রয়েছে জলে ডুবি। নদীকূলে
জনহীন নৌকা বাঁধা। শূন্য ঘাট তলে
রৌদ্রতপ্ত দাঁড়কাক স্নান করে জলে
পাখা ঝটপটি। শ্যাম শস্পটে তীরে
খঞ্জন দুলায়ে পুচ্ছ নৃত্য করি’ ফিরে।
চিত্রবর্ণ পতঙ্গম স্বচ্ছ পক্ষভরে
আকাশে ভাসিয়া উড়ে, শৈবালের পরে
ক্ষণে ক্ষণে লভিয়া বিশ্রাম। রাজহাঁস
অদূরে গ্রামের ঘাটে তুলি কলভাষ
শুভ্র পক্ষ ধৌত করে সিক্ত চঞ্চুপুটে।
শুষ্ক তৃণগন্ধ বহি ধেয়ে আসে ছুটে
তপ্ত সমীরণ—চলে যায় বহুদূর।
থেকে থেকে ডেকে ওঠে গ্রামের কুকুর
কলহে মাতিয়া। কভু শান্ত হাম্বার,
কভু
শালিকের ডাক, কখনাে মৰ্ম্মর
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
৪০
জীর্ণ অশথের, কভু দূর শূন্য পরে
চিলের সুতীব্ৰধ্বনি, কভু বায়ুভরে
আশব্দ বাঁধা তরণীর, মধ্যাহ্নের
অব্যক্ত করুণ একতান, অরণ্যের
স্নিগ্ধছায়া, গ্রামের সুষুপ্ত শান্তিরাশি,
মাঝখানে বসে আছি আমি পরবাসী।
প্রবাস বিরহ দুঃখ মনে নাহি বাজে,
আমি মিলে গেছি যেন সকলের মাঝে ;
একদা রবীন্দ্রনাথের চিত্ত এই বাংলাদেশের পল্লীগুলির
মাঝে তাদের বিচিত্ররূপ, বিচিত্ৰসুর, বিচিত্ৰগন্ধের সঙ্গে
ওতপ্রােতভাবে বিজড়িত হয়ে ছিলাে। পল্লীর সঙ্গে তার
সম্পর্ক সেদিন কত যে নিবিড় ছিলো তারই পরিচয় পাবাে
উপরের কবিতায়। বাংলাদেশের দ্বিপ্রহরের
একটি শান্ত
নদীতীর, তার অর্ধনগ্ন তরীর উপরে উপবিষ্ট মাছরাঙা পাখী,
তার স্নানরত দাড়কাকের পাখার ঝটি, তার রাজহাঁসের
কলভাষ, চিলের সুতীব্র ধ্বনি, খঞ্জনের নৃত্য, শালিকের ডাক,
কুকুরের
চীৎকার, গােরুর হাম্বাস্বর, অশথের মর্মর, শুদ্ধতৃণের
গন্ধ, তপ্ত সমীরণের স্পর্শ, বাঁধা তরণীর আত্তশব্দ এবং অরণ্যের
স্নিগ্ধচ্ছায়া নিয়ে আর কার কবিতায় এমন জীবন্ত হয়ে দেখা
দিয়েছে ? রবীন্দ্রনাথের চোখ—চিত্রকরের চোখ ; সে চোখের
দৃষ্টির সামনে একবার যা ধরা দেয়, মনের মধ্যে তার ছবি
আঁকা হয়ে থাকে।
;
৪১
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
‘কল্পনা’য় ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ বলে যে কবিতাটি আছে, তার মধ্যেও
বাংলার পল্লীজননীর একটি অনুপম রূপ ফুটে উঠেছে।
এখানে ঐ কবিতাটি থেকে কয়েকটি লাইন পাঠকপাঠিকাদের
কাছে উপস্থিত করবো। এই লাইন কয়েকটি পাঠ করে
তারা অনায়াসে বুঝতে পারবেন,—রবীন্দ্রনাথ পল্লীকে অবসর
মত ভালােবাসেন নি। বঙ্গের পল্লীলক্ষ্মী অতুলনীয় মাধুৰ্য্য নিয়ে
তার মুগ্ধ নয়ন-সম্মুখে প্রতিভাত হয়েছে আর সেই অবর্ণনীয়
মাধুর্যের পানে চেয়ে চেয়ে কবির চোখদুটি ভাবাবেশে
অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে।
মধ্যাহ্নে পল্লবাঞ্চল প্রসারিয়া ধরি
রৌদ্র নিবারিছ,—যবে আসে বিভাবরী
চারিদিক হতে তব যত নদনদী
ঘুম পাড়াইবার গান গাহে নিরবধি
ঘেরি ক্লান্ত গ্রামগুলি শতবাহুপাশে।
শরৎমধ্যাহ্নে আজি স্বল্প অবকাশে
ক্ষণিক বিরাম দিয়া পুণ্য গৃহকাজে
হিল্লোলিত হৈমন্তিকমঞ্জরীর মাঝে
কপােতকূজনাকুল নিস্তব্ধ প্রহরে
বসিয়া রয়েছে মাতঃ, প্রফুল্ল অধরে
বাক্যহীন প্রসন্নতা; স্নিগ্ধ আখিদ্বয়
ধৈৰ্যশান্ত দৃষ্টিপাতে চতুর্দিকময়
ক্ষমাপূর্ণ আশীর্বাদ করে বিকীরণ।
হেরি সেই স্নেহপ্লুত আত্মবিস্মরণ,
৪২।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
মধুরমঙ্গলচ্ছবি মৌন অবিচল,
নতশির কবিচক্ষে ভরি আসে জল ।
বাংলা সাহিত্যে বঙ্গ লক্ষ্মীর এর চেয়ে মধুরতর ছবির সঙ্গে
আজ পর্যন্ত আমার পরিচয় ঘটেনি। আর কোন দেশের
আর কোন কবি তার জন্মভূমির মাধুৰ্য্যকে এর চেয়ে প্রাণস্পর্শী
ভাষায় প্রকাশ করেছেন কি না, তাও আমার জানা নেই।
মাতার কণ্ঠে শেফালি মাল্য
গন্ধে ভরিছে অবনী।
জলহারা মেঘ আঁচলে খচিত
শুভ্র যেন সে নবনী।
পরেছে কিরীট কনক কিরণে,
মধুর মহিমা হরিতে হিরণে,
কুসুম-ভূষণ
জড়িত চরণে
দাড়ায়েছে মাের জননী।
আলােকে শিশিরে কুসুমে ধান্যে
হাসিছে নিখিল অবনী।
শারদ প্রভাতে বঙ্গ-জননী যে অপরূপ মহিমায় মণ্ডিত হয়ে
বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অন্তরে আনন্দের হিল্লোল জাগায়,
তার এমন ছবি বাংলা সাহিত্যে কি সত্য সত্যই সুদুলভ নয় ?
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ( 8 ) যে সাহিত্যের কাজ কল্পনাকে নিয়ে কেবল বিলাস করা, তার মূল্য খুব বেশী নয়। কালের ললাটে সেই সাহিত্যই কোহিনুরের মত দীপ্তি পায়–য৷ প্রাণের সঙ্গে প্রাণকে মিলিয়ে দেয়, হৃদয়কে হৃদয়ের নিকটে আনে, মানুষকে মানুষের আত্মীয় করে। ভিক্টর হুগাের সাহিত্য অমরত্বের দাবী করতে পারে— কারণ তার 'লা মিজারেবলস্ প'ড়ে চোরকেও আমরা ভায়ের মত ভালােবাসতে শিখি, পতিতার মধ্যেও মনুষ্যত্বের জ্যোতিকে আমরা অবলােকন করি। হুগাের লেখা মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। ঠিক এই জন্যই কি ডসটয়েভস্কির বইগুলি বিশ্বের শ্রদ্ধাকে আকর্ষণ করেনি ? Crime and Punishmentএর নায়ক রাসকলনিকফ যেখানে বারবনিত সােনিয়ার কাছে নতজানু হয়ে বলছে, I bow down to thee, thou suffering humanity—6872767 fafe69 সমস্ত হতভাগিনীদের মর্মবেদনাকে আমরা কি হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করি না? টমাস হার্ডির Tess of the D'Urbervillesএর নায়িকার এবং Jude, the Obcsureএর নায়কের অশ্রুসিক্ত জীবনের গভীর ট্রাজেডি অগণিত দুর্ভাগ্য নরনারীর প্রতি আমাদের চিত্তে কি সমবেদনার সঞ্চার করে না ? টলষ্টয়ের Resurrection প'ডে রাস্তার পতিতা দেখলে ঘৃণায়
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
৪ ৪
করি।
নাসিকা কুঞ্চিত করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। আলেকজান্ডার
কুপ্রিনের Yama the Pitও জগতের চরিত্রহীনাদের প্রতি
আমাদের চিত্তে অপরিসীম সমবেদনার উদ্রেক করে। ওয়াল্ট
হুইটম্যানের Leaves of Grass আমাদের চোখের সামনে
একটা
নূতন জগতের তােরণদ্বার খুলে দেয় আর সেই
নূতন
জগতে প্রবেশ করে আমরা পৃথিবীর অখ্যাতনামা সাধারণ
নরনারীর মধ্যে মনুষ্যত্বের অনির্বচনীয় গরিমাকে আবিষ্কার
ভিক্টর হুগো, ডসটয়েভস্কি, টমাস হার্ডি, টলষ্টয়,
ওয়াল্ট হুইটম্যান, আলেকজাণ্ডার কুনি প্রমুখ প্রথিতযশা
সাহিত্যিকদের রচনা মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তার
যােগকে নিবিড়তর করে, আমাদের চেতনাকে দিগ্দিগন্তে
পরিব্যাপ্ত করে দেয়—এই জন্যই বিশ্বসাহিত্যের দরবারে
তাদের গৌরব এত বেশী । গাের্কির উপন্যাসগুলি পৃথিবীর
সমস্ত জাতির কাছে আজ এত সম্মান পাচ্ছে—তারও কারণ,
তার লেখার মধ্য দিয়ে নিখিলের সর্বহারাদের অবর্ণনীয়
বেদনাকে আমরা নিজের বেদনা বলে উপলদ্ধি করতে পারি।
ঠিক যে কারণে টলষ্টয় আর ডসটয়েভস্কি, গাের্কি আর
কুনি, হুইটম্যান আর হুগাে আমাদের এত প্রিয়, ঠিক সেই
কারণেই রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যেও আমাদের চিত্ত এত
আনন্দ খুঁজে পায়। তাঁর রচনার শুভ্র আলােক-শিখায় মানুষ
মানুষের কাছে আত্মীয়রূপে প্রতিভাত হয়, তাঁর লেখা পড়ে
আমাদের চারিপাশের নরনারীকে আমরা ভালােবাসতে শিখি,
অহমিকার সঙ্কীর্ণ কারাগার থেকে মুক্ত করে উন্মুক্ত আকাশের
৪ ৫
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
তলে মহামানবের মেলায় আমাদের তিনি দাড় করিয়ে দেন।
তিনি আমাদের চোখের পিচুটি মুছিয়ে দিয়ে দৃষ্টির সামনে
নূতন জগত জাগিয়ে তােলেন—আর সেই জগতে আমরা
দেখতে পাই, একই প্রাণের বিপুল-প্রবাহ তরঙ্গিত হচ্ছে
সকলের মধ্যে। কেউ কারও পর নয়।
রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে এই যে গণতন্ত্রের সুর-এর
পিছনে ইতিহাস আছে। ঘটনাপ্রবাহে ভাসতে ভাসতে তার
জীবনের তরী একদা নদীয়া জেলার শিলাইদহের তীর-প্রান্তে
উপনীত হয়েছিল। পল্লীর সঙ্গে তার এই অভাবনীয় যােগ
বঙ্গ-সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অতিশয় উল্লেখযােগ্য ঘটনা
কারণ এই ঘটনাকে আশ্রয় করে বাঙলাদেশের পল্লীপ্রকৃতিকে
এবং পল্লীর জনসাধারণকে নিবিড়ভাবে জানবার তিনি সুযােগ
পেয়েছিলেন আর এই অভিজ্ঞতাই আমাদের সাহিত্যের
ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত ফসল ফলিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে
শিলাইদহের দান সত্যসত্যই অপরিমেয়।
পল্লীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যােগকে অভাবনীয় বলবার
কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম যৌবনে বিলাত গিয়েছিলেন
আইন পড়বার জন্য। ব্যারিষ্টার হবার সাধনায় ব্রতী হবার
যখন তিনি আয়ােজন করছেন, তখন হঠাৎ তার পিতা তাকে
দেশে ডেকে পাঠালেন। আর ব্যারিষ্টারি পড়া হােলো না।
পিতার বিষয়কৰ্ম্ম দেখবার জন্য দেশেই তিনি থেকে গেলেন।
তার কর্মকেন্দ্র হােলাে নদীয়ার শিলাইদহ। পদ্মার নিভৃত
চরে চরে কাটলো তার জীবনের অনেকগুলি বৎসর। দিনের
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
৪৬
পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর পল্লীর মানুষ
আর পল্লীর প্রকৃতিকে অনিমেষনয়নে দেখে দেখে কাটিয়ে
দিলেন তিনি। এই দৃষ্টিই তাে সাহিত্যসৃষ্টির মূলে। ব্যারিষ্টার
হবার চেষ্টা বারম্বার কেমন করে ব্যর্থ হলাে, সে সম্পর্কে
রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, “ব্যারিষ্টার হইব বলিয়া
বিলাতে আয়ােজন সুরু করিয়াছিলাম, এমন সময়ে পিতা
আমাকে দেশে ডাকিয়া আনিলেন। আমার কৃতিত্ব লাভের
এই সুযোেগ ভাঙিয়া যাওয়াতে বন্ধুগণ কেহ কেহ দুঃখিত
হইয়া আমাকে পুনরায় বিলাতে পাঠাইবার জন্য পিতাকে
অনুরােধ করিলেন।
এই অনুরােধের জোরে আবার একবার
বিলাতে যাত্রা করিয়া বাহির হইলাম। সঙ্গে আরও একজন
আত্মীয় ছিলেন। ব্যারিষ্টার হইয়া আসাটা আমার ভাগ্য এমনি
সম্পূর্ণ নামঞ্জুর করিয়া দিলেন যে, বিলাত পৰ্য্যন্ত পৌছিতেও
হইল না--বিশেষ কারণে মাদ্রাজের ঘাটে নামিয়া পড়িয়া
কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতে হইল......যাহা হউক, লক্ষ্মীর
প্রসাদ লাভের জন্য দুইবার যাত্রা করিয়া দুইবারই তাড়া
খাইয়া আসিয়াছি। আশা করি, বার লাইব্রেরীর ভূভার
বৃদ্ধি না করাতে আইন দেবতা আমাকে সদয়চক্ষে দেখিবেন।”
বার লাইব্রেরীর ভূভার বৃদ্ধি না করার জন্য আইন
দেবতা তঁাকে ক্ষমা করেছেন কিনা জানি না, কিন্তু গৌড়জন
তাকে হৃদয়ের মধ্যে সাদরে বরণ করে নিয়েছে—এতে
কোনই সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ ব্যারিষ্টার হয়ে দেশে ফিরলে
বঙ্গসাহিত্যের কি দশা হােতে, তা কি আমরা ভাবতে পারি ?
৪৭ রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র আইনজীবী হলে বীণা ফেলে দিয়ে কেবল আইন গ্রন্থের মধ্যে তিনি মগ্ন হয়ে থাকতেন—এমন কথা বলি না। তখনও অবসর সময়ে ব'সে ব'সে তিনি বীণায় ঝঙ্কার তুলতেন, কিন্তু সে ঝঙ্কারের মধ্যে বাংলাদেশের মাটির সুরটি কি এমন করে জেগে উঠতাে? তার মধ্যে বাঙলার অন্তঃপুর- চারিণী নদীগুলির কলধ্বনি কি এমন করে ধরা পড়ত? ব্যারিষ্টার রবীন্দ্রনাথ যে সাহিত্য রচনা করতেন, তার মধ্যে বাঙলার প্রকৃতি আর সেই প্রকৃতির পটভূমিতে বাঙলার সাধারণ পল্লীবাসীর সুখদুঃখের ছােট ছােট কাহিনীগুলি কখনও এমন নিখুঁত রূপ নিয়ে ফুটে উঠতে পারতাে না। শহুরে আবহাওয়ায় কৃত্রিম পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে অধিকাংশ সময় যাপন করে সাহিত্যের দর্পণে দেশের পল্লী- জীবনকে নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত করা অসম্ভব। দেশের সত্যিকারের চেহারাকে সাহিত্যে রূপ দিতে হলে, দেশের মর্মমূলে সাহিত্য-সাধনার শিকড়কে প্রবেশ করিয়ে দেবার প্রয়ােজন আছে। দেশের জনসাধারণের জীবনধারাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পৰ্যবেক্ষণ করা চাই। দেশের নদী, বন, প্রান্তরের সঙ্গে এক হয়ে না গেলে সাহিত্য কখনাে জাতীয় সাহিত্যের সম্মান দাবী করতে পারে না। বাঙলা সাহিত্য একদিন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে গৌরবের আসন অধিকার করবে, বঙ্গবাণীর বীণার ঝঙ্কার একদিন সাত সমুদ্রের তীরে তীরে প্রতিধ্বনি তুলবে, বাঙ্গালীর সাহিত্যে গণতন্ত্রের সুর একদিন ধ্বনিত হয়ে উঠবে—তাই, বােধ হয়, রবীন্দ্রনাথকে তার রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৪৮ ভাগ্যবিধাতা বারলাইব্রেরীর দ্বার প্রান্ত থেকে নিয়ে গেলেন গ্রামের নিভৃত বক্ষে। তাকে দেখালেন বাঙলার বিচিত্র পল্লীরূপ, পল্লীর অখ্যাতনামা নরনারীদের জীবনের অন্তঃপুরের সঙ্গে ঘটালেন তার ঘনিষ্ঠ পরিচয়। পল্লীর সঙ্গে কবির পরিচয়ের এই ঘনিষ্ঠতা বাঙলার সাহিত্যে ফলিয়েছে অপর্যাপ্ত সােনালি ফসল, তার মধ্যে নিয়ে এসেছে গণতন্ত্রের উদার সুর। রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্রগুলির মধ্যে গণতন্ত্রের যে সুর জেগে উঠেছে—বর্তমান প্রবন্ধে তারই একটু আধটু পরিচয় দেবে। ইতিপূর্বে রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকে পল্লীর যে চিত্রগুলি পাঠক-পাঠিকার সম্মুখে উপস্থিত করা হয়েছে, তার মধ্যে পল্লীর প্রকৃতির দিকটাই বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এইবার রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লীর সাধারণ মানুষের যে ছবি ফুটে উঠেছে। -তারই পরিচয় দিতে চাই। ‘পণরক্ষা’ গল্পটীতে তন্তুবায় বংশীবদন এবং তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রসিককে কেন্দ্র করে যে করুণ আখ্যায়িকাটী গড়ে উঠেছে—তার মধ্যে বাঙলার পল্লীজীবনের একটী নিখুঁত ছবিরই কি আমরা পরিচয় পাই না ? গল্প পড়তে পড়তে ছবির পর ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে, আর সেই সব ছবির মধ্য দিয়ে আমরা একদিকে যেমন রবীন্দ্র- নাথের গভীর পল্লী-প্রীতির পরিচয় পাই, আর একদিকে তেমনি পল্লীর সাধারণ মানুষকে শ্রদ্ধা করতে এবং ভালােবাসতে শিখি। বংশী নিজের সুখ-দুঃখের কথা ভুলে গিয়ে রসিকের সুখের জন্য তিলে তিলে আত্মদান করছে—গায়ে তার
৪৯
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
শীতবস্ত্র জীর্ণ হয়ে গেছে, শরীর তার রােগে শীর্ণ-তবুও
রােগতপ্ত দেহ নিয়ে গভীর রাত্রি পর্যন্ত সে মিটমিটে প্রদীপে
তাঁত বুনে চলেছে কনিষ্ট ভ্রাতার বিবাহের পণের টাকা ও
তার বাইসিকেল কেনার অর্থ সংগ্রহ করবার জন্য,--রসিক
যখন রাগ করে চলে গেল, তখনও তার জন্য বংশীর পরিশ্রমের
বিরাম নেই। এমন একখানি উদার ভ্রাতৃস্নেহের ছবি
আমাদের গল্প-সাহিত্যে বিরল। এর নামই হােলাে সত্যিকারের
গণ-সাহিত্য এবং এই রকমের গণ-সাহিত্যের মধ্য দিয়েই
মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এই রকম সাহিত্য প'ড়েই আমাদের চারিদিকের অখ্যাতনামা
জনসাধারণের চরিত্রের মহিমাকে আমরা উপলব্ধি করতে শিখি
আর এই উপলব্ধির দ্বারাই আমাদের চিত্ত প্রসার লাভ করে ।
‘পণরক্ষা’ গল্পটীর মধ্যে পল্লীর যে ছবিগুলি ফুটে উঠেছে
—এখানে তাদের কিছু কিছু পরিচয় দেবার লােভ সংবরণ
করতে পারলাম না।
“শীতের মধ্যাহ্ন নিস্তব্ধ, ভাঙা উচু পাড়ির উপর শালিক
নাচিতেছে, পশ্চাতের আমবাগানে ঘুঘু ডাকিতেছে এবং
জলের কিনারায় শৈবালের উপর একটী পতঙ্গ তাহার স্বচ্ছ
দীর্ঘ দুই পাখা মেলিয়া স্থিরভাবে রৌদ্র পােহাইতেছে।”
চন্দনদহের এই বর্ণনার মধ্যে ফুটে উঠেছে পল্লী-প্রকৃতির একটী
নিখুঁত চিত্র।
“একখানি বােঝাইশূন্য গরুর গাড়ীতে গাড়ােয়ান ব্যাপার
মুড়ি দিয়া নিদ্রামগ্ন ; গরু দুটি আপন মনে ধীরে ধীরে
৪
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
বিশ্রামশালার দিকে গাড়া টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। গ্রামের
গােয়ালঘর হইতে খড়জ্বালানো ধোয়া বায়ুহীন শীতরাত্রে
হিমভারাক্রান্ত হইয়া স্তরে স্তরে বাঁশঝাড়ের মধ্যে আবদ্ধ
হইয়া আছে।” বাঙলাদেশে শীতের রাত্রে গ্রামের ছবি কি
এই রকমের নয় ?
কলিকাতায় তঁাতের স্কুলের শিক্ষক রসিক যেখানে মনশ্চক্ষে
গ্রামের ছবি দেখছে, সেখানেও পল্লীর বর্ণনাটা কি সুন্দর ।
রসিক দেখছে, “পুরােহিতের আধপাগলা ছেলেটা; তাহাদের
প্রতিবেশীর কপিলবর্ণের বাছুরটা; নদীর পথে যাইতে রাস্তার
দক্ষিণধারে একটা তালগাছকে শিকড় দিয়া আটিয়া জড়াইয়া
একটা অশ্বথ গাছ দুই কুস্তিগির পালােয়ানের মত প্যাচ
কষিয়া দাড়াইয়া আছে, তাহারই তলায় একটা অনেকদিনের
পরিত্যক্ত ভিটা, তাহাদের বিলের তিনদিকে আমন ধান,
একপাশে গভীর জলের প্রান্তে মাছধরা জাল বাঁধিবার জন্য
বাঁশের খোটা পোতা, তাহারই উপরে একটা মাছরাঙা চুপ
করিয়া বসিয়া ; কৈবৰ্ত্তপাড়া হইতে সন্ধ্যার পরে মাঠ পার
হইয়া কীর্তনের শব্দ আসিতেছে ; ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে নানা
প্রকারের মিশ্রিত গন্ধে গ্রামের ছায়াময় পথে স্তব্ধ হাওয়া
ভরিয়া রহিয়াছে। আর তারই সঙ্গে মিলিয়া তাহার সেই
ভক্ত বন্ধুর দল, সেই চঞ্চল গােপাল, সেই আঁচলের খুটে
পান বাঁধা বড় বড় স্নিগ্ধ চোখ-মেলা সৌরভী; এই সমস্ত
স্মৃতি ছবিতে গন্ধে শব্দে স্নেহে প্রীতিতে বেদনায় তাহার
মনকে প্রতিদিন গভীর আবিষ্ট করিয়া ধরিতে লাগিল।”
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
?
পল্লীর প্রতি এই যে গভীর অনুরাগ—এ অনুরাগ কি শুধুই
রসিকের
রবীন্দ্রনাথের নয় ?
“তখন মাঘের শেষ। শর্ষে এবং তিসির ক্ষেতে ফল
ধরিতেছে, আখের গুড় জ্বাল দেওয়া আরম্ভ হইয়াছে, তাহারই
গন্ধে বাতাস যেন ঘন হইয়া উঠিয়াছে।
গ্রামের ঘরে ঘরে
গােলাভরা ধান এবং কলাই ; গােয়ালের প্রাঙ্গণে খড়ের
গাদা পাকার ।
ওপারে নদীর চরে বাথানে রাখালের।
গরুমহিষের দল লইয়া কুটীর বাঁধিয়া বাস করিতেছে।
খেয়াঘাটের কাজ প্রায় বন্ধ হইয়া গিয়াছে। নদীর জল কমিয়া
গিয়া-লােকেরা কাপড় গুটাইয়া হাঁটিয়া পার হইতে আরম্ভ
করিয়াছে।” বাঙলা দেশে শীতকালে নদীর তীরে গ্রামের
এই যে দৃশ্য বৎসরে বৎসরে চোখের সামনে জেগে ওঠে—তার
এমন নিখুঁত প্রাঞ্জল বর্ণনা আমাদের সাহিত্যে কি বিরল নয় ?
তবুও কি শুনতে হবে রবীন্দ্রনাথ শহুরে কবি, পল্লীর কবি নন ?
এই পল্লী-প্রকৃতির পটভূমিতে গ্রাম্যবালিকা
সৌরভীর
ছবিটিও কি বাণীকণ্ঠের মূক কন্যা সুভার মতই আমাদের
অন্তরকে স্পর্শ করে না? সুভার পাশে ছিপ হাতে দাঁড়িয়ে
আছে গোঁসাইদের অকর্মণ্য ছেলে প্রতাপ, আর সৌরভীর
পাশে ছিপ হাতে চন্দনীদহের তীরে দাড়িয়ে আছে বংশীর
কনিষ্ট ভ্রাতা রসিক। রসিক যেমন সৌরভীর কাছে পাণ
চায়, প্রতাপও তেমনি সুভার কাছে পাণের কাঙাল।
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের মধ্যে সুভা, সৌরভী, মৃন্ময়ী প্রমুখ
গ্রাম্য বালিকাগুলির ছবি এমন সহজ সৌন্দর্য নিয়ে ফুটে
?
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
উঠেছে, যার তুলনা নেই। তাদের জীবনের মৌন বেদনাকে
তিনি যেমন করে ভাষা দিয়েছেন, এমন করে তাদের
বেদনাকে আর কে রূপ দিয়েছে সহানুভূতি কতখানি
ব্যাপক, চারিদিকের
সকলের সঙ্গে নিজের ঐক্যবােধ
কতখানি গভীর, দৃষ্টি কতখানি স্বচ্ছ এবং কল্পনা কতখানি
সুদূরপ্রসারী হলে পল্লী-জীবনের এমন সব নিখুঁত ছবি
আঁকা সম্ভব হয়—সে কথা বলা কি বাহুল্য নয় ?
গল্পগুচ্ছের মধ্যে ছুটী’ বলে যে গল্পটি আছে তার নায়ক
ফটিক একটি গ্রাম্য বালক। এই গ্রাম্য বালকের প্রবাস-জীবনের
বেদনাকে রূপ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ এমন একটি ছবি এঁকেছেন
যার তুলনা বিরল। মাসীর অনাদর এবং শহরের পাষাণ-কারার
বন্ধনের মধ্যে পাড়াগাঁয়ের তেরো বৎসরের বালক যে অপরি-
সীম মৰ্ম্মবেদনা অনুভব করে অবশেষে অকালে ঝরে গেল,
সেই বেদনার মধ্যে পৃথিবীর শতশত অনাদৃত বালকের মৌন
বেদনাকেই তিনি ভাষা দিয়েছেন। পল্লীর অবারিত মাঠের জন্য,
গ্রামের নদীর তীরে মুক্তির মধ্যে ছুটাছুটি করে বেড়ানাের নিমিত্ত
শহরের পিঞ্জরে আবদ্ধ পল্লী বালকেরা যে কত দুঃখ অন্তরের
মধ্যে অনুভব করে—রবীন্দ্রনাথ ছাড়া পাড়াগাঁয়ের ছেলের সে
অবর্ণনীয় দুঃখকে এমন করে আর কে ভাষা দিতে পারতাে ?
‘ছুটি’ গল্পে যেমন পল্লীবালক ফটিকের বেদনা মূর্ত হয়ে
উঠেছে, ‘সমাপ্তি গল্পে শ্বশুরবাড়ীর পিঞ্জরে আবদ্ধ পল্লীর
বালিকাবধূ মৃন্ময়ী’র বেদনাও কি তেমনি করেই মূর্ত হয়ে
ওঠেনি? পৃথিবীতে উপেক্ষিত যারা, অনাদৃত যার-তার
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে জুড়ে আছে। সেখানে অপূর্বর
বালিকাবধূ মৃন্ময়ী শ্বশুরবাড়ীর রুদ্ধ ঘরে গুমরে গুমরে কাদছে,
“বাবা আমাকে তুমি নিয়ে যাও। এখানে আমার কেউ নেই।
এখানে থাকলে আমি বাঁচবে না।” সেখানে বালক ফটিক
মামা বিশ্বম্ভরবাবুর কলিকাতার বাসায় মামীর অনাদরের
মধ্যে নিয়ত দীর্ঘশ্বাস ফেলছে গ্রামের বুকে মাতৃস্নেহের মাঝে
ফিরে যাওয়ার জন্য, আর সেই দীর্ঘশ্বাস পাঠকের চক্ষু দুটিকে
অশ্রুজলে ভরিয়ে তােলে। সেখানে নির্জন দ্বিপ্রহরের মত
শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন বােব মেয়ে সুভা কলিকাতায় যাওয়ার
পূর্বে চিরপরিচিত নদীতটে শষ্পশয্যায় লুটিয়ে লুটিয়ে কঁদে,
“তুমি আমাকে যাইতে দিও না, মা, আমার মত দুটি বাহু
বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।” সেখানে দীপহীন
কুটীরপ্রান্তে হতাশ্বাস ভীত হৃদয় নিয়ে অছিমদ্দিনের বিধবা মাতা
মির্জাবিবি কারারুদ্ধ পুত্রের জন্য নিঃশব্দে অশ্রুমােচন করে।
বাঙলাদেশের জনসাধারণের সুখ-দুঃখের সঙ্গে পরিচিত
হতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে ভালো করে অধ্যয়ন করবার
একান্ত প্রয়ােজন আছে। বাঙলা দেশের পল্লীর প্রকৃতি ও
মানুষের ছবি তার সাহিত্যে যে রূপ নিয়ে ফুটে উঠেছে, তার
সত্য সত্যই তুলনা নেই। তাঁর সাহিত্য চিরদিন বেঁচে থাকবে
—কারণ সেই সাহিত্যের মূল রয়েছে জনসাধারণের জীবনের
মধ্যে, বাঙলাদেশের মাটীর অভ্যন্তরে। তার সাহিত্য অমর
হয়ে থাকবে, কারণ তিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে
মানুষের আত্মীয়তার পথকে প্রশস্ত করেছেন।
রবীন্দ-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ২৪ (৫) সৌন্দৰ্য্যকে, মাধুৰ্য্যকে, শৌৰ্য্যকে আবিষ্কার করবার জন্য দূরে যাওয়ার কি একান্তই প্রয়ােজন আছে ? যা কাছের তাকে আমরা এমন করে অবহেলা করি কেন ? যার নিকটের মানুষ তাদের মধ্যেও কি লুকিয়ে নেই চরিত্রের গরিমা, মনুষ্যত্বের মহিমা, ভালােবাসার নিষ্কলঙ্ক দীপ্তি ? দূরের প্রতি আমাদের কেমন যেন একটা মােহ আছে। এই মােহের জন্যই আমরা বর্তমানকে তুচ্ছ করে ভবিষ্যতকে অযথা মূল্য দান করি, এই মােহের জন্যই আমরা চারিপাশের নিকটতম মানুষ- গুলিকে বিস্মৃত হয়ে সাহিত্য-সৃষ্টির উপাদান সংগ্রহ করি পৌরাণিক কাহিনী থেকে আর রাজপুতানার ও মহারাষ্ট্রের ইতিহাস থাকে। সুখের কথা, এ মােহ আমাদের ভাঙতে আরম্ভ করেছে। আমরা এখন উপলব্ধি করতে আরম্ভ করেছি, যা আমাদের অতি পরিচিত, তার মত মধুর আর নেই কিছু। আনন্দ, জ্ঞান এইখানে—অন্যত্র নয় ; সুখ রয়েছে এই মুহূর্তের বুকে—সুখের জন্য ভবিষ্যতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার মানে হয় না কোনাে। এ চেতনাও আমাদের মনের মধ্যে জাগতে শুরু হয়েছে, সকালবেলা ঘুম ভেঙে যাদের উপরে প্রথম আমাদের দৃষ্টি পড়ে, তাদের উপেক্ষা করবার মত ভ্রান্তি আর নেই 'কিছু।
রবীন্দ-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
যারা আমাদের বন্ধু, সহােদর, নিকটতম প্রতিবেশী তাদের
মধ্যে মনুষ্যত্বের মহিমাকে আবিষ্কার করবার মত দৃষ্টি নেই
যাদের, তারাই তো সত্যিকারের অন্ধ । যারা আমাদের
জননী, ভগ্নী, জায়া—তাদের মধ্যে যারা দেখতে শেখেনি
স্বর্গের জ্যোতিকে, আসল দৃষ্টিহীন তো তারাই।
দূরের মােহকে জয় করে নিকটের মহিমাকে যারা রূপ
দিয়েছেন বঙ্গসাহিত্যে—তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে একজন
অগ্রদূত বলে নিঃসংশয়ে আমরা অভিনন্দিত করতে পারি ।
এ বিষয়ে শরৎচন্দ্রকেও আমরা একজন অগ্রণী বলে অভিনন্দিত
করতে পারি, কারণ যারা আমাদের নিতান্ত কাছের মানুষ
তাদেরই কাছে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিবেদন করে শরংসাহিত্য
বাঙালীর কাছে এত বরণীয় হয়েছে। এই ফ্যাশনের যুগে
ছুটি পেলেই সৌন্দর্যকে উপভােগ করবার জন্য আমরা ছুটে
যাই ওয়ালটেয়ারের সমুদ্রতীরে, নয়তে দার্জিলিংএর গিরি-
শিখরে। প্রকৃতির মাধুৰ্য বলতেই আমাদের কল্পনা দৌড় দেয়
সুইজালাণ্ডের পর্বতবেষ্টিত হ্রদের ধারে, নয়তাে কাশ্মীরের
ভূস্বর্গে। এই সােনার বাঙলার নদী-বন-প্রান্তরে প্রকৃতি
দুহাতে যে সৌন্দৰ্য ছড়িয়ে দিয়েছে—আমাদের দৃষ্টিতে তার
মূল্য
অল্পই, কারণ তার সঙ্গে বাল্য থেকেই আমাদের পরিচয়
সহজে আমরা যা পাই, তার মূল্য সহজে উপলব্ধি
করা আমাদের স্বভাবগত নয়। পেঁয়াে যােগী যে কারণে
ভিখ পায় না, সেই কারণেই যা নিকটের তাকে আমরা
অবহেলা করে থাকি।
ঘনিষ্ট।
।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
কবির দৃষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন যারা, কেবল তাদেরই
মধ্যে আমরা এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখতে পাই।
তাদেরই দৃষ্টিতে তুচ্ছ বলে নেই কিছু পৃথিবীতে। যেখানে
যেখানে সেই দৃষ্টি পড়ে, সেখানে সেখানেই জেগে ওঠে
সৌন্দর্য্যের শতদল। মাধুৰ্য্যকে সর্বত্র উপলব্ধি করবার
এই যে প্রতিভা—এই প্রতিভাই তাে কবিদের জন্য উন্মুক্ত
রেখেছে নিখিলের সমস্ত প্রবেশদ্বার । সব ঋতুই তাদের কাছে
বহন করে আনে আনন্দের অমৃত। তারা পুরুষের যেমন
আত্মীয়, নারীরও তেমনি আত্মীয়। অট্টালিকা আর কুটির
সর্বত্রই তাদের অবারিত দ্বার । শহর আর গ্রাম—সকলের
সঙ্গেই তাদের আত্মীয়তার বন্ধন। তরুণ তাদের মধ্যে দেখে
তারুণ্যের দীপ্তি, প্রবীণ তাদের মধ্যে দেখে জ্ঞানের অতলস্পর্শ
গভীরতা। সৈনিক তাদের গ্রহণ করে সৈনিক ব’লে, শ্রমিক
তাদের মধ্যে দেখে দরিদ্রের অকৃত্রিম সখা। মুসলমান তাদের
মনে করে মুসলমান, হিন্দু মনে করে হিন্দু, ব্রাহ্ম মনে করে
ব্রাহ্ম, ইংরেজ মনে করে ইংরেজ, জার্মান মনে করে জাৰ্মান।
তাদের ভাই-বােন সব জাতির মধ্যে তাদের
মধ্যে তাদের বন্ধু সব
সম্প্রদায়ের
শেলী আর টলষ্টয়, এমাসন আর
বার্ণার্ড শ—এদের আমরা কোন্ সম্প্রদায়ের গণ্ডীর মধ্যে
ফেলবে? সেকষ্পীয়ারের আর ব্রাউনিংএর বন্ধু নেই কোন্
জাতির মধ্যে ?
জগতের শ্রেষ্ঠ কবি বলে যারা ইতিহাসে পূজা পেয়ে
আসছেন, রবীন্দ্রনাথ তঁাদেরই অন্যতম।
এই কথাটী মনে
বুকে।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী চিত্র
রাখলে আমরা সহজেই বুঝতে পারবে—কেন তার সাহিত্যে
গণতন্ত্রের শঙ্খ এমন করে বেজে উঠেছে, কেন পল্লীর সৌন্দর্য্য
তার গল্পে, কবিতায় এবং অজস্র রচনায় এমন অপূর্ব হয়ে
প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যদি তৃতীয় শ্রেণীর কবি হতেন তবে
অবশ্যই তার সহানুভূতির মধ্যে উদারতার অভাব ঘটতো।
কিন্তু যে প্রতিভা নিয়ে একজন কালিদাস অথবা একজন
সেক্সপীয়ার জন্মগ্রহণ করেন সেই প্রতিভারই অগ্নিশিখা
রবীন্দ্রনাথে। শ্রেষ্ঠ কবির যা কিছু বৈশিষ্ট্য, রবীন্দ্রনাথ ও
সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তার উদার দৃষ্টি এই জন্যই
কোনখানে এসে থেমে যায় নি, প্রেমের বিশালতা কোন
কিছুকেই অস্বীকার করেনি। তার গল্পের নায়ক-নায়িকা
যেমন অট্টালিকা থেকে এসেছে, তেমনি কুটির থেকেও এসেছে।
তার লেখার মধ্যে যেমন সহরের চিত্র পাই, তেননি পল্লীর চিত্রও
পাই। বিলাতফেরত পণ্ডিত এবং গ্রামের অশিক্ষিত চাষী—
দুজনেই তার সাহিত্যে গৌরবের স্থান পেয়েছে। তিনি
ব্রাহ্মকেও যেমন আঘাত করেছেন, হিন্দুকেও তেমনি আঘাত
করেছেন, ব্রাহ্মের মধ্যে যেমন ভালাে দেখেছেন, হিন্দুর মধ্যেও
তেমনি ভালাে দেখেছেন। যারা ঈশ্বর মানে তাদেরও যেমন
তিনি বড় করেছেন, যারা ঈশ্বরকে মানে না তাদেরও তেমনি বড়
করেছেন। পতিতাকে যেমন কোল দিয়েছেন, সতীকেও
তেমনি কোল দিয়েছেন। দেশাত্মবােধের জয়গান তঁার
সাহিত্যে যেমন করে বেজে উঠেছে, আন্তর্জাতিকতার জয়গানও
তেমনি করেই তার সাহিত্যে বেজে উঠেছে।
কোনাে গণ্ডীরই
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৫৮ সঙ্কীর্ণতার মধ্যে তার প্রতিভাকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এই জন্যই জগৎ জুড়ে তার অসংখ্য ভক্তের প্রাচুর্য্য। যারা নারী তার যেমন রবীন্দ্রনাথকে পরমাত্মীয় বলে মনে করে, যারা পুরুষ তারাও তেমনি রবীন্দ্রনাথকে আত্মীয়ের চাইতেও আত্মীয় বলে জানে। যারা বিদ্রোহী তরুণ, তারা যেমন পথে চলার প্রেরণা খুঁজে পায় তার সাহিত্যে—যার শান্ত প্রবীণ, তারাও তেমনি সান্ত্বনা পায় তার লেখায়। পল্লীর লােকে তার রচনায় দেখতে পায় তাদেরই জীবনের ছবি, শহরের লােকে তার লেখার মধ্যে দেখে তাদেরই সুখ-দুঃখের চিত্র। শিখেরা তাকে মনে করে শিখ বলে, মারাঠার ললাকে মনে করে তিনি মারাঠার, রাজপুতেরা মনে করে তিনি রাজপুত। হিন্দুরা তাকে মনে করে হিন্দু—ব্রাহ্মরা মনে করে ব্রাহ্ম । যারা শিশু ভােলানাথ, তারা তাঁর লেখা পড়ে মনে করে তিনি শিশুদেরই ; যারা বৃদ্ধ তারা তঁার ধৰ্ম্ম-সঙ্গীত শুনে অশ্রু-মােচন করে । রাশিয়ায় যেমন তার ভক্তের সংখ্যা অগণ্য, চীনেতেও তাই। তিনি সর্বজাতির, সর্বসম্প্রদায়ের, সর্বদেশের এবং সর্বকালের। অনুভূতির এই গভীরতা এবং ব্যাপকতার জন্যই রবীন্দ্র-প্রতিভা একদিকে যেমন কাঞ্চনজঙ্ঘার আলো-ঝলমল শিখরদেশকে আলিঙ্গন করে আছে, আর একদিকে তেমনি মৃত্তিকার প্রতি অণু-পরমাণুকেও আত্মীয়রূপে গ্রহণ করেছে। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় স্বর্গ-মর্ত্য একত্র মিলে গেছে। এই জন্যই যারা তাঁকে শহরের অভিজাত শ্রেণীর বিলাসী কবি ব’লে বিদ্রুপ করে থাকে, তারা সত্যকেই আঘাত করে। অভিজাত-শ্রেণীর রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র শিক্ষিত নরনারীর জীবনের চিত্র তার সাহিত্যের মুকুরে অবশ্যই প্রতিফলিত হয়েছে। মার্জিতরুচি আদব-কায়দা-দুরস্ত শহুরে ভদ্রলােক এবং শহুরে ভদ্রমহিলাকে তিনি সযত্নে তার সাহিত্যে আসন দান করেছেন। কিন্তু নগর-প্রাচীরের প্রান্তে এসে তার কল্পনার ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায় নি। সে কল্পনা শহরের সীমাকে অতিক্রম করে, অট্টালিকার সুসজ্জিত কক্ষ এবং উদ্যান- বাটিকাকে পিছনে ফেলে ব্যাপ্ত হয়ে গেছে সেইখানে, যেখানে মরা নদীর বাঁকে দাম জমেছে বিস্তর, বক দাড়িয়ে থাকে ধারে, আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খচিল, বড়াে বড়াে বাঁশ পুতে জাল পেতেছে জেলে, বাঁশের ডগায় বসে আছে মাছরাঙা, পাতিহাঁস ডুবে ডুবে গুলি তােলে। তিনি আমাদের চেতনাকে ব্যাপ্ত করে দিয়েছেন তাদের মধ্যে—যারা যাত্রাদলের ছােকরা, পল্লীর অশিক্ষিতা রমণী, যারা সকলের নীচে, সকলের পিছে। গ্রামের কত যে ছবি সুনিপুণ তুলিকায় এঁকেছেন তিনি তার সংখ্যা নেই। সেই সব ছবির সঙ্গে পাঠক-পাঠিকাদের আগেই কিছু কিছু পরিচয় করে দিয়েছি। এখানে আর একটি ছবি তুলে দেবার লােভ সম্বরণ করতে পারলাম না। এই ছবিটি বাঙলা দেশের গ্রামের ছবি নয়, পশ্চিমের কোন পল্লীর ছবি। উত্তর দিকে সিসুগাছের তলা দিয়ে চলেছে সাদামাটির রাস্তা, উড়ছে ধূলো, খর রৌদ্রের গায়ে হাল্কা উড়নির মতাে।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
সামনের চরে গম অড়র ফুটি তরমুজের ক্ষেত,
দূরে ঝকমক করছে গঙ্গা,
তার মাঝে মাঝে গুণটানা নৌকা
—কালির আঁচড়ে আঁকা ছবি যেন।
বারান্দায় রূপাের কঁাকন-পরা ভজিয়া
গম ভাঙছে জাতায়,
গান গাইছে একঘেয়ে সুরে,
গিরধারী দরােয়ান অনেকখন ধােরে তার পাশে বােসে আছে,
জানি না কিসের ওজরে।
বুড়াে নিমগাছের তলায় ইদারা,
গােরু দিয়ে জল টেনে তােলে মালী,
তার কাকুধ্বনিতে মধ্যাহ্ন সকরুণ,
তার জলধারায় চঞ্চল ভুট্টার ক্ষেত।
গরম হাওয়ায় ঝাপসা গন্ধ আসছে আমের বােলের,
খবর আসছে মহা-নিমের মঞ্জরীতে মৌমাছির বসেছে মেলা।
পশ্চিমের পল্লীর এমন নিখুঁত ছবি আর কেউ কি এঁকেছে ?
পল্লী প্রকৃতির নিখুত বর্ণনায় আমরা রবীন্দ্রনাথের যে বৈশিষ্ট্য
দেখতে পাই, পৃথিবীর অজ্ঞাতনামা অনাদৃত নরনারীদের
জীবন-নাট্যকে সাহিত্যে রূপ দেবার বেলায় তিনি সেই
একই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন। এই বৈশিষ্ট্য হােলো
যা কাছের, যা আমাদের অতিপরিচিত, তারই মধ্যে সৌন্দৰ্য্যকে,
আবিষ্কার করবার প্রতিভা। বাঙলাদেশের পল্লী-প্রকৃতির
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র সেই শূন্যমনে বাঙলার মধ্যে কত যে সৌন্দৰ্য্য লুকিয়ে আছে—সে সন্ধান দিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের মন ছিলো শূন্য। রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত করলেন সােনার অনবদ্য মূর্তিখানিকে। শব্দের যাদুকে আশ্রয় করে তিনি আমাদের মনের মধ্যে জাগিয়ে তুললেন বাঙলাদেশের পল্লী-প্রকৃতির চিত্রের পর চিত্র। সে সব চিত্র যেমন জীবন্ত, তেমনি মনােরম। আমরা তার চোখ দিয়ে নৃতন করে আবিষ্কার করলাম আমাদের জন্মভূমির অপরূপ ছবিটিকে। পল্লী-প্রকৃতির যে সব সৌন্দর্য্য এতদিন ধরে উপেক্ষিত হয়ে ছিলো আমাদের চোখে, তাদের ছবিকে রবীন্দ্রনাথ যেমন নব গরিমায় উদ্ভাসিত করে তুললেন, তেমনি করেই তিনি সাহিত্যের দরবারে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এলেন সেই সব মানুষগুলিকে—যারা অত্যন্ত নিকটের বলেই আমাদের কাছ থেকে পেয়ে এসেছে কেবল অনাদরের পর অনাদর। এই সব অনাদৃত মানুগুলির কারও কারও সঙ্গে পাঠক- পাঠিকাগণের আগেই পরিচয় ঘটেছে। এখানে আরও দুই একজনের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেবার লােভ সম্বরণ করতে পারলাম না। গল্পগুচ্ছের মধ্যে আপদ' বলে যে আখ্যায়িকাটি আছে, সেখানে আমরা যাত্রার দলের একটী ছােকরার পরিচয় পাই। ছােকরাটির নাম নীলকান্ত। নীলকান্ত মাতৃহীন। মাতৃহীন বালকের অভিশপ্ত জীবনের নিঃশব্দ বেদনাকে রূপ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সতীশের দোয়াত চুরির অপবাদ নিয়ে রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র নিষ্কলঙ্ক নীলকান্ত সকলের অজ্ঞাতসারে যেখানে গৃহত্যাগ করে চলে গেল, সেখানে তার গ্রাম্য পােষা-কুকুরটির সঙ্গে পাঠকের হৃদয়ও কি বেদনায় কেঁদে ওঠে না ? গল্পের সমাপ্তি ঘটলেও আমাদের চিতপট থেকে ঝাকড়াচুলওয়ালা, সুকণ্ঠ নীলকান্তের স্লানমূৰ্তি কিছুতেই মুছতে চায় না। নীলকান্তকে বিস্মৃত হওয়া আমাদের পক্ষে যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব রহম কাবুলিয়ালাকে স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলা। মানুষকে ছােরা মারতে হাত যার কঁাপেন, তার মধ্যেও স্নেহপ্রবণ পিতৃহৃদয়ের এ কি করুণ-কোমলতা ! তার পর্বত-গৃহবাসিনী কন্যার স্মরণ-চিহ্নটুকুকে কত যত্নে সে বুকের কাছে রেখে দিয়েছে ! তারই মুখখানিকে স্মরণ করে সে মিনির জন্য নিয়ে আসে কিসমিস আর বাদাম। গল্প শেষ হয়ে গেলেও কানের কাছে কাবুলিওয়ালার কণ্ঠস্বর বাজতে থাকে, ‘খোঁখী, তােমি সসুর বারি যাবিস?' রবীন্দ্র- সাহিত্য যে পৃথিবীর সর্বত্র আজ সমাদর লাভ করেছে, সে হচ্ছে তার কল্পনার এই ঔদার্যের জন্য। যারা অতিসাধারণ, তাদের মধ্যেও সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করার মত দৃষ্টি আছে যাদের—তারাই শুধু পারেন উচুদরের সাহিত্য সৃষ্টি করতে। রবীন্দ্রনাথের চোখে এই এই দৃষ্টি এবং এই জন্যই সাহিত্যে রসসৃষ্টির ক্ষেত্রে তার যুড়ি মেলা কঠিন। কাবুলিওয়ালাকে সৃষ্টি করে রবীন্দ্রনাথ বাঙলা-সাহিত্যে গণতন্ত্রের যে নূতন সুর জাগিয়েছেন, সেই সুরেরই সাধনা করেছেন শরৎচন্দ্র। শরৎ-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তার গণতান্ত্রিকতায়। অতি কাছের
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-ছিত্র
--
যারা, তাদেরই নিকটে তিনি পৌছে দিয়েছেন তার শ্রদ্ধার
এবং প্রীতির অর্ঘ্য-সাহিত্যকে আশ্রয় করে।
নীলকান্তের এবং রহমং কাবুলিওয়ালার সঙ্গে আর একটি
মানুষকেও আমরা যেন স্মরণ করি ।
এই মানুষটি পুরুষ
নয়, নারী। নারীটির নাম চন্দরা। চন্দর ছিদামের স্ত্রী-
নূতন-তৈরী নৌকার মত বেশ ছােট এবং সুডোেল। বড়
বৌকে হত্যা করার দায়িত্বের বােঝা স্বামী যখন তার স্কন্ধে
চাপিয়ে দিলো, সে অস্বীকার করলো না। ফঁাসিকে স্থির
জেনেও সে খুনের দায়িত্বকে স্বীকার করে নিলো সতেরো
আঠারাে বছরের এই গ্রাম্য তরুণীর চিত্তের দৃঢ়তা আমাদের
অবাক করে দেয় বিস্ময়ে । সমস্ত পরিচিত লােকের চোখের
উপর দিয়ে কলঙ্কিনী চন্দরা বন্দিনীর বেশে যেখানে চিরকালের
মত গ্রাম ছেড়ে চলেছে—সেখানে পাঠকের চক্ষু হতভাগিনীর
জন্য সমবেদনায় সজল হয়ে ওঠে
রবীন্দ্র-সাহিত্যে নীলকান্ত, রহমৎকাবুলিওয়ালা এবং
চন্দরার মত সাধারণ নর-নারীর ছবি আরও অনেক আছে।
এই সব ছবির সঙ্গে পরিচিত হতে চান যার—তাদের
অনুরােধ করি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে ভাল করে অধ্যয়ন
করতে। বাঙলা সাহিত্যের ললাটে গণতন্ত্রের জয়মাল্য
পরিয়েছেন যিনি, এই গণতান্ত্রিক যুগে তার সাহিত্যকে নূতন
দৃষ্টি নিয়ে অধ্যয়ন করবার দিন এসেছে।
-
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৬৪ ( ৬ ) ‘পলাতকা’য় কবির কল্পনাকে নাড়া দিয়েছে যারা, তাদের আসন দুনিয়ার দুর্ভাগাদের দলে। অনাদরের মধ্যে অবাঞ্ছিত শৈলবালার জীবন হয়েছে সুরু। একে একে তিনটী মেয়ের পরে চতুর্থ মেয়ে হয়ে সে যখন জন্মালে তার বাপের ঘরে, জনক-জননীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তারা তাে মেয়ে চায়নি সংসারে ; চেয়েছিলো একটি পুত্ররত্নের আবির্ভাবকে। সে আশা যখন বিফল হােলো তখন বাপ-মায়ের সমস্ত আক্রোশ পড়লে অনাহূত কন্যাটীর উপরে। বিনাদোষের অপরাধে অপরাধিনী শৈলবালার লাঞ্ছনার অন্ত নেই। পদে পদে তার ত্রুটী! মা তাকে বলে ‘সর্বনাশী’, ‘পােড়ারমুখী’ ; বাপ তাকে করে শাসন। এমনই অভিশপ্ত তার কুমারী-জীবন! শৈলবালার পরে আমাদের দৃষ্টিপথে কবি যাকে দাড় করিয়েছেন সে বাঙলার যৌথ পরিবারের অন্তঃপুরচারিণী একটা বধূ। রােগে দেহ তার জীর্ণ, মৃত্যু দাড়িয়েছে তার শিয়রে। পতি- গৃহে প্রথমে সে এসেছিল যেদিন—সেদিন ছিল সে নয় বছরের একটী ক্ষুদ্র বালিকা। তার পর একটি একটি করে তার জীবনের সুদীর্ঘ বাইশ বৎসর কেটে গেল সংসারের একটানা কাজের মধ্য দিয়ে। দশের ইচ্ছা বােঝাই-করা বন্দিনীর অর্থ- হীন জীবন ! ছিল না অবকাশ, ছিল না স্বাতন্ত্র, ছিল না
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
আনন্দ। সেখানে শুধু রাধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে
রাধা—এই ছিল তার কাজ। ঋতুর পর ঋতু আসতে কেবল
পঞ্জিকার পাতে; বসন্তের পর বসন্ত কোথা দিয়ে যে চলে যেত
-বধূ জানতে পারতাে না তার কিছুই। তার পর এল দুরন্ত
ব্যাধি ; কবিরাজী, মুষ্টিযােগ—অনেক রকমের চিকিৎসার
অত্যাচার হােলাে সুরু। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ
করে মৃত্যু আগিয়ে আসতে লাগলো ধীরে ধীরে। জীবন
যাকে কেবলই বঞ্চিত করে এসেছে আনন্দের প্রাচুর্য থেকে,
মরণ তার কানে বহন করে এনেছে মুক্তির কলধ্বনি। যে
বাঁধন-ডােরে সংসারের একঘেয়ে কাজের চাকায় জীবন ছিল
তার বাঁধা, সেই বাঁধন-ডাের কেটে দেবার জন্যই তো আসছে
মৃত্যু ! আসন্ন মুক্তির সম্ভাবনায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে মৃত্যু-
পথযাত্রী নারী বলে উঠেছে,
মধুর ভুবন, মধুর আমি নারী,
মধুর মরণ, ওগো আমার অনন্ত ভিখারী!
দাও, খুলে দাও দ্বার !
ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাবার ।
মৃত্যু নারীর কাছে কেবল যে মুক্তির দূত হয়ে দেখা দিয়েছে
তা নয়। তার আলােয় সে দেখতে পেয়েছে আপনার জ্যোতির্ময়
রূপ। সংসারের অসংখ্য কাজ জগদ্দল-শিলার মতাে চেপে নেই
আর জীবনে; শ্বশুর নেই, শাশুড়ী নেই, দেবর নেই, ভাসুর
নেই, চাকর-বাকরের কলরব নেই, চোখ নামিয়ে, ঘােমটা টেনে
অবগুণ্ঠিত ক্লান্ত জীবনকে টেনে টেনে চলবার বিড়ম্বনা নেই;
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
•
ভাঁড়ার ঘরের দেওয়াল মিলিয়ে গেছে নীলাভ দিগন্তের
অসীমে ; দশের হুকুম পৌছায় না যেখানে-সেখানে যাওয়ার
ডাক এসেছে এতদিন পরে। এই নিঃসীম মুক্তির মধ্যে বসন্তের
রূপ সর্বপ্রথম জাগলাে তার চোখে।
বনের আঙিনায়
যে এসেছে বারে বারে, এতদিন পরে সে এসে দাড়ালাে তার
মনের আঙিনায়। বিহ্বল ফান মৰ্ম্মে দিলো তার দোল,
রক্তে জাগালাে তার সুরের তরঙ্গ। আনন্দের এই অভূতপূর্ব
অনুভূতির মধ্যে নারী হঠাৎ আবিষ্কার করল, অন্তঃপুরচারিণী
শৃঙ্খলিতা বন্ধুর মধ্যে তার যে রূপটী প্রকাশ পেয়েছে সে
হােললা তার খণ্ডিত বিকৃত রূপ। তার সত্যিকারের মিল হচ্ছে
চাদের সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, তারার সঙ্গে। একটী মূল সুরের
যে অন্তঃসলিল প্রবাহ চলেছে ফুলের আর চঁাদের আর নক্ষত্রের
মৰ্ম্মতলে, নারীর মর্মতলেও সেই একই প্রবাহ। আপনার
গভীরতর জীবন-ধারার গৌরবময় অস্তিত্বের সঙ্গে সদ্যপরিচিত।
বধুর থেকে উৎসারিত হয়েছে,
কণ্ঠ থেকে
প্রথম আমার জীবনে এই বাইশ বছর পরে
বসন্তকাল এসেছে মাের ঘরে।
জাল্লা দিয়ে চেয়ে আকাশ পানে
আনন্দে আজ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে প্রাণে
আমি নারী, আমি মহীয়সী,
আমার সুরে সুর বেঁধেছে জ্যোৎস্না-বীণায়
নিদ্রাবিহীন শশী।
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
আমি নইলে মিথ্যা হ'ত সন্ধ্যাতারা ওঠা,
মিথ্যা হত কাননে ফুল ফোটা।
এর পরেই যে মেয়েটা তার রুগ্নদেহ নিয়ে আমাদের ছল-ছল
নয়নের সম্মুখে এসে দাড়িয়েছে সে বিনু। বয়স তার মাত্র
তেইশ। এই অল্প বয়সেই রােগে ধরলে তাকে। বছর দেড়েক
চিকিৎসার পর ডাক্তারের পরামর্শে স্বামী তাকে নিয়ে
চলেছে হাওয়া বদল করতে। নিবিড় ঘন পরিবারের মধ্যে
যেখানে শ্বশুর ভাসুর সামনে পিছে, ডাইনে বাঁয়ে, সেখানে
আড়ালে আবডালে স্বামীর সঙ্গে বিনুর মিলন ছিল অসম্পূর্ণ।
চেঞ্জে যাওয়ার পথে বিনু যখন প্রথম পেল তার স্বামীকে একান্ত
আপনার করে, তার গা মুখের মস্ত বড়ো দুটি চোখে
ফুটে উঠলো।
আনন্দের জ্যোতি। পাঠক-পাঠিক।
আনন্দোদ্ভাসিত মুখখানির ছবি কিছুতেই ভুলতে পারে না।
তারপরে বিলাসপুর ষ্টেশনে দেখি, কুলি-নারী রুমিনীর দুঃখ
দূর করবার জন্য বিনু পঁচিশ টাকা দিতে অনুরােধ করছে তার
স্বামীকে। পথে যেতে যেতে কী তার আনন্দ ! প্রত্যেকটী দৃশ্য
অনির্বচনীয় মহিমা নিয়ে তার সামনে দেখা দিয়েছে। কিন্তু
হায় ! চেঞ্জ থেকে বিনু আর ফিরে এল না। বিনুর কাহিনীর
উপরে কবি যেখানে সমাপ্তির রেখা টেনেছেন, সেখানে
নয়নের অশ্রুজলকে কিছুতেই আমরা চেপে রাখতে পারিনে।
এমন এক সুন্দর জীবন পারিবারিক কর্তব্যের অন্ধকূপের মধ্যে
অকালে শুকিয়ে গেল ! জীবন তার কাছে অফুরন্ত সৌন্দর্যের
আর আনন্দের ডালি নিয়ে যখন উপস্থিত হয়েছে, তখন
৬৮
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
বির জীবন-প্রদীপ নির্বাণােম্মুখ। বিলাসপুর ষ্টেশনে
যাত্ৰীশালার দুয়ার খুলে বিনু যেখানে স্বামীকে বলছে,
“দেখ, দেখ, একাগাড়ি কেমন চলে !
আর দেখে বাছুরটিরে ঐ, আ মরে যাই, চিকণ নধর দেহ,
মায়ের চোখে কী সুগভীর স্নেহ।
ঐ যেখানে দিঘির উচু পাড়ি,
সিসুগাছের তলাটিতে পাঁচির-ঘেরা ছােট্টবাড়ি
ঐ যে রেলের কাছে,
ইষ্টেশনের বাবু থাকে ?—আহা ওরা কেমন সুখে আছে।”
—আমাদের মন তরুণীর জীবনের ব্যর্থতার কথা
সমবেদনায় হায় হায় করে ওঠে। জীবনের পথে এই যে সহজ
আনন্দগুলি ছড়িয়ে রয়েছে—বনের কিনারায় চঁাদ দেখার
আনন্দ, পশ্চিম আকাশে সান্ধ্যমেঘের বর্ণচ্ছটা দেখার সুখ,
বৃহত্তর জগতের জীবন-প্রবাহের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার পুলক,
এই সহজ আনন্দগুলি থেকে বিনুর জীবনকে এতকাল বঞ্চিত
রাখবার কি অধিকার ছিল তার শ্বশুরবাড়ীর অভিভাবক আর
অভিভাবিকাদের ? আবিসিনিয়ার দুঃখে আমরা অশ্রুমােচন
করি, ইটালির ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাই,
সাইমন কমিশনের সম্মুখে আমরা কালাে-পতাকা উড়াই,
‘সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস হােক বলে আকাশে আকাশে আমরা
হুঙ্কার তুলি,—কিন্তু আমাদের পারিবারিক জীবনের আন্দামানের
দুর্ভেদ্য জেলখানাগুলিতে সহস্র সহস্র মেয়ের জীবনকে আমরা
যে পঙ্গু করে দিচ্ছি—এই অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ:তো
-
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
এখনও প্রবল হয়ে ওঠে নি ! বিনু তাে একজন নয় ; হাজার
হাজার বিনুকে আমরা কর্তব্যের বুলি কপচিয়ে ক্রীতদাসী করে
রেখেছি পর্দার আড়ালে।
বিনুর অস্তিত্বের উপরে যেখানে যবনিকাপাত হয়েছে-
সেখানে কবির কল্পজগতে জন্ম নিয়ে আর একটী নারী দেখা
দিয়েছে পলাতকার মধ্যে। এই মেয়েটীর
এই মেয়েটীর নাম মঞ্জুলিকা।
শৈলবালা কুমারী, বিনু পরিণীতা -মঞ্জুলিক। কিন্তু বিধবা।
মঞ্জুলী যখন কচিমেয়ে তখনই তার বাপ পঞ্চাননের সঙ্গে মেয়ের
বিয়ে দিলেন। পঞ্চাননের বয়স মঞ্জুলীর চেয়ে পাঁচগুণ বেশী ।
মঞ্জুলীর মা আপত্তি জানালেন অনেক, কিন্তু প্রতিবাদ টি কলো
। বিয়ের অল্পদিন পরেই পঞ্চানন মারা গেল। মঞ্জুলিকা
সিদুর মুছে বাপের ঘরে ফিরে এল। দুঃখে সুখে বালবিধবার
দিন কাটতে লাগলাে। অবশেষে বালিকার বয়স মােলয় গিয়ে
পৌছাল। তরুণীর শূন্য হৃদয়কে জুড়ে বসলাে তার ছেলেবেলার
খেলাঘরের সাথী পুলিন। মা বুঝতে পারলেন মেয়ের মনের
গােপন ভালােবাসার কথা। মঞ্জুলিকার বাবাকে অনেক করে
তিনি বুঝালেন মেয়ের আবার বিয়ে দেবার জন্য। কিছুতেই
কিছু হােলো না। অবশেষে মঞ্জুলিকাকে দিয়ে মায়ের
একদিন মৃত্যু হােলাে। বাপের সেবার ভার পড়লাে মেয়ের
উপরে। মঞ্জুলিকা প্রাণপণে পিতার পরিচর্যা করে । মায়ের
মৃত্যুর পর এগারো মাস কেটে গেছে। ইতিমধ্যে গুজব শােনা
গেল, বাড়ীতে ঘটকের আনাগােনা শুরু হয়েছে। সংসারে
মায়ের আসন আর একজন এসে দখল করবে—এই কথা ভেবে
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র ৭০ মঞ্জুলিকার প্রাণ ভেঙে পড়ল। গুজব অবশেষে সত্যে পরিণত হ’ল। বাবা বিয়ে করতে চলে গেলেন বাখরগঞ্জে। বৌকে নিয়ে ফিরে এসে দেখলেন, মঞ্জুলিকা ঘরে নেই। পুলিন তাকে বিয়ে করে ফরাক্কাবাদ চলে গেছে। সন্তানের ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে বাপ অভিশাপ দিলেন বটে, কিন্তু মঞ্জুলিকার দাম্পত্য- জীবনের মাধুর্যের ছবি কল্পনা করে পাঠক-পাঠিকার চিত্ত আনন্দের আতিশয্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে মঞ্জুলিকাকে পুলিন ডাক্তারের সঙ্গে ফরাক্কাবাদে পাঠিয়ে দিয়ে কবি যাকে আমাদের দৃষ্টির সামনে উপস্থিত করেছেন সে হ’ল কালােমেয়ে নন্দরাণী। তার বিয়ের জন্য ভেবে ভেবে বাপের মনে দুশ্চিন্তার অবধি নেই। নন্দরাণী বুঝতে পারে— রং তার কালাে বলে কি রকম একটা উদ্বেগের সঞ্চার করেছে সে গৃহের মধ্যে। একটী ভাঙা জাল্লার মরচে-পড়া গরাদে ধ'রে নন্দরাণী একা একা বসে থাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে। বাতাস তার চুল নিয়ে করে খেলা। নন্দরাণী একা বসে বসে কি ভাবে ? কালো মেয়েটীর ছবির সঙ্গে আর একজনের ছবি আমাদের মনের সম্মুখে ধরেছেন কবি। নন্দরাণীদের বাড়ীর সামনে ‘মেস’এ থাকে সে। বেকার যুবক-দারিদ্র্যের দুশ্চিন্তায় চাকরীর সন্ধানে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় । তার সঙ্গী একটী বাঁশী আর বাঁশীর সুরের মধ্যে তার চিত্ত পায় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি। কালো-মেয়ে নন্দরাণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর কবি আর একটী মানুষকে আমাদের চোখের সামনে ধরেছে।
৭১
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
এই মানুষটি হােলাে পাগল মহেশ। মহেশ তার খোঁড়া কুকুর
ভূতে আর কুড়িয়ে-পাওয়া মেয়ে সুম্মিকে নিয়ে এমন এক
সংসার পাতিয়েছে যার আড়ম্বরহীন সরল মাধুৰ্য্য আমাদের
মনকে মুগ্ধ করে।
পলাতকার কবিতাগুলি পড়ে আমাদের মনে যাদের ছবি
থেকে যায় চিরদিনের জন্য--সেই শৈলবালা আর নন্দরাণী,
বিনু আর মঞ্জুলিকা, ভােলা আর মহেশ আমাদের আশে পাশে
হাজারে হাজারে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। আমাদের দৃষ্টি নেই,
তাইতাে তারা আমাদের কাছে চির-উপেক্ষিত হয়ে আছে।
চামড়ার চোখ দিয়ে দেখি, সমস্ত চৈতন্য দিয়ে তাে দেখি না।
মঞ্জুলিকার বেদনা তাই আমাদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যায়,
মহেশকে পাগল বলে উপেক্ষা করি, কৰ্ম্মের নেশায় বিভাের
হয়ে ‘মনু’র চিঠি না পড়েই ছিড়ে ফেলি, ‘ভােলা’ কাছে এলে
বিরক্ত হয়ে উঠি, অন্তঃপুর-চারিণী বধূর মৌন ক্রন্দনের প্রতি
উদাসীন থাকি। আমাদের বাহিরের দুটী চর্মচক্ষু ছাড়া আরও
একটী চোখ আছে। এই চোখটী হােললা আমাদের ভিতরের
চোখ। বাহিরের চোখে যাকে আমরা দেখেও দেখি না,
অন্তরের চোখে সে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় নূতনরূপ
নিয়ে। এই চোখ নিয়েই টলষ্টয় দেখেছিলেন ম্যালােভাকে,
ডটয়েভস্কি দেখেছিলেন সােনিয়াকে, হুগাে দেখেছিলেন
কসেটকে আর জিন ভ্যালজিনকে, হার্ডি দেখেছিলেন টেকে,
খৃষ্ট দেখেছিলেন মেরী ম্যাগডেলেনকে।
অন্তরের চোখ নিয়ে
যখন তাকাই মানুষের দিকে, চোখ তার কাছ থেকে ফেরাতে
৭
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
१२
we
must
ইচ্ছা করে না। যে ছিল সুদূরের, সে হয়ে যায় আত্মীয়ের
চাইতেও আত্মীয়, পর হয়ে যায় ভাই, সকলের কাছে যে
উপেক্ষিত সে এসে জুড়ে বসে হৃদয়ের আসন। পৃথিবীর সব
কিছুই আমাদের কাছে বিপুল মহিমার মধ্যে এক নিমেষে
জেগে উঠবে যদি দেখার মত করে সব কিছুকে দেখতে পারি ।
মেটালিঙ্কের মধ্যে সেদিন পড়ছিলাম, But
accustom ourselves to live like an angel who has
just sprung to life, like a woman who loves,
or a man on the point of death. sferat 6257
চিরবিদায়ের আগে মুমূষু মানুষ যে দৃষ্টি নিয়ে নিরীক্ষণ
করে এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে -নারী যখন প্রথম ভালােবাসে
কোন পুরুষকে, যে চোখ দিয়ে সে অবলােকন করে তার
প্রিয়তমের মুখচ্ছবিকে—সেই দৃষ্টি নিয়ে কবিরা যুগে যুগে
দেখে এসেছে মানুষকে, প্রকৃতিকে, সংসারের সমস্ত কিছু
ঘটনাকে। তাই তাে তারা কোন কিছুকে ছােট বলে
অবহেলা করতে পারেনি, সব কিছুর মধ্যে দেখেছে এমন
একটা অপার্থিব সৌন্দৰ্য্য যাকে কোন কিছুই করতে পারে
ম্লান। সমস্ত মানুষের মধ্যে সেই অদৃশ্য মাধুৰ্য্যকে
যখন উপলব্ধি করি, তখন সবাইকে না ভালােবেসে আর
উপায় থাকে না। To learn to love one must learn
to see. সেই সৌন্দর্য দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ কালাে মেয়ে
নন্দরাণীর মধ্যে আর সেই উপলব্ধির গভীরতা থেকে লিখেছেন
তিনি
}
;
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
আমি যে ওর হৃদয়খানি স্পষ্ট দেখি আকা;
ও যেন যুঁই ফুলের বাগান সন্ধ্যা-ছায়ায় ঢাকা ;
একটুখানি চাদের রেখা কৃষ্ণপক্ষে স্তব্ধ নিশীথরাতে
কালো জলের গহন কিনারাতে।
যে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে নন্দরাণীর দিকে চেয়েছেন কবি, সেই দৃষ্টি
নিয়েই অচেনা বালক ভােলার মধ্যে তিনি দেখলেন এই
ভুবনের চিরকালের দুরন্ত ভােলাকে। ‘আমি ভােলা'—
শুধু এইমাত্র পরিচয় দিয়ে অপরিচিত বালক যখন তার
সম্মুখে এসে দাড়ালাে—তিনি তাকে দু'হাত দিয়ে বক্ষে চেপে
বললেন,
ওরে ওরে বুঝে নিলেম আজ
ফুরােয়নি মাের কাজ !
আমার রাজা, আমার সখা, আমার বাছা আজো
কত সাজেই সাজো।
নতুন হয়ে আমার বুকে এলে,
চিরদিনের সহজ পথটী আপনি খুঁজে পেলে !
ঠিক এই দৃষ্টির বলেই কবি পাগল মহেশের মধ্যে দেখতে
পেয়েছেন এমন একটা অসীম সৌন্দৰ্য্য যা অন্যত্র দুর্লভ।
তারার মত আপন আলো নিয়ে বুকের তলে—
যে মানুষ যুগ হতে যুগান্তরে চলে,
প্রাণখানি যার বাঁশির মতাে সীমাহীনের হাতে
니
সরল সুরে বাজে দিনেরাতে,
রবীন্দ্র-সাহিত্যে পল্লী-চিত্র
৭৪
যার চরণের স্পর্শে
ধূলায় ধূলায় বসুন্ধরা উঠলাে কেঁপে হর্ষে
আমি যেন দেখতে পেতেম তারে
দীনের বাসায়, এই পাগলের ভাঙাঘরের দ্বারে।
এই যে দুলভ দৃষ্টি
দৃষ্টি—যার কাছে ছােট আর ঘৃণ্য বলে নেই
কিছু পৃথিবীতে, যার সামনে জগতের সব কিছু ফুটে ওঠে
অপার্থিব মহিমা নিয়ে—এই দৃষ্টির পরিচয় পাই পলাতকায়
আর সেই জন্যই পলাতকার আকর্ষণ আমাদের কাছে এত
গভীর।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.