Makardah Saraswat Library, Howrah
Sonar Khanir Sandhane
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সােনার খনির সন্ধানে তাপসী, ছোটদের গল্প ও ছেলেদের গল্পের লেখক শ্ৰীঅমৃতলাল গুপ্ত প্রণীত প্রকাশক- শ্ৰীশান্তিবিন্দু গুপ্ত, বি-এসসি পৌষ, ১৩৪০
প্রকাশক
শ্রীশান্তিবিন্দু গুপ্ত, বি-এ-সি
২১০৬ কর্ণ ওয়ালিস ষ্ট্রাট
কলিকাতা
ইউ রায়, এণ্ড সন্স
১১৭১ বহুবাজার দ্বাট কলিকাতা
হইতে শ্রীসুধীরচন্দ্র কায়েত
কর্তৃক মুদ্রিত
নিবেদন
‘সােনার খনির সন্ধানে' গল্পটি মুকুলে ছাপা
হইয়াছিল।
ছেলে ও মেয়েদের, উহা পড়িতে
আগ্রহ দেখা গিয়াছে। গল্পটিকে ছােটদের উপন্যা
বলা যাইতে পারে।
২৩শে এপ্রিল, ১৯৩৩
২১৬ কর্ণওয়ালিস দ্বীট,
কলিকাতা
শ্ৰীঅমৃতলাল গুপ্ত
গ্রন্থকার প্রণীত অন্যান্য পুস্তক ১। তাপসী – ষােলটি বরণীয় নারীর অপূৰ্ব্ব জীবনচরিত ১ly০ আনা। ২। পুণ্যবতী নারী -- তিনটি ধৰ্ম্মশীলা নারীর জীবন- চরিত ৫০ আনা। ছােটদের গল্প - “সন্দেশের ভূতপূৰ্ব সম্পাদক, শিল্পী ও সুলেখক পরলােকগত সুকুমার রায় লিখিয়াছিলেন, “ছােট শিশুদের নিকট তাহাদের উপযােগী ভাষায় গল্প বলিতে লেখক বহুকাল হইতে অভ্যস্ত। সুতরাং তাহার রচিত এই গদ্য ও পদ্য গল্পগুলি শিশুমহলে সমাদর লাভ করিবে সন্দেহ নাই। * * বাংলা সাহিত্যে এই প্রকার গ্রন্থের যথেষ্ট অভাব রহিয়াছে।” ১০০ আনা। ৪। ছােটদের বই –“সঞ্জীবনী”র সম্পাদক বলেন - “গল্পগুলির আখ্যানবস্তু হৃদয়দ্ৰবকারী, ভাষা প্রাণস্পর্শী, * * আমাদের সম্মুখে ৮ বৎসরের একটি বালিক। “অশ্রু অরুণ” পড়িতে পড়িতে কঁদিয়া আকুল হইয়াছিল।” ॥ আনা। ছেলেদের গল্প: -চতুর্থ সংস্করণ, আনা প্রাপ্তিস্থান :- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, ২০৩১১ কর্ণ ওয়ালিস ষ্ট্ৰাট, এবং কমলা বুক ডিপো, ইণ্ডিয়ান পাবলিসিং হাউস প্রভৃতি কলিকাতার পুস্তকালয় ও ঢাকা স্কুল সাপ্লাই পুস্তকালয়ে পাওয়া যায় । -
No text on this page.
সুরেশ ১ পৃষ্ঠা
সােনার খনির
সখ
প্রথম পরিচ্ছেদ
করুণাময় মুখখাপাধ্যায় এম-ডি পাশ-করা ডাক্তার। তাহার
জন্মস্থান রাউলপিণ্ডি, কৰ্ম্মস্থান ডিব্ৰুগড়।. ডিব্ৰুগড় আসামের একটি
বড় সহর। সেখানে তিনি সিবিলসার্জন। তাহার ডাক্তারির চেয়ে
খনি আবিষ্কারের দিকেই মনের একটা ঝোঁক ছিল।
আসামের
কোন্ জঙ্গলে কেরােসিন তেলের খনি, কোন্ পাহাড়ে কয়লার খনি,
সুবিধা পাইলেই তিনি তাহার খোজ করিতে বাহির হইতেন।
একবার যথার্থই তিনি এক বনের মধ্যে কেরােসিন তেলের খনি
খুঁজিয়া বাহির করলেন। ঐ খনি হইতে কেরােসিন তেল, মােম
এবং চমৎকার রং বাহির হইতে লাগিল। তাহার পরেই ডাক্তার
মহাশয়ের মাথায় মস্ত বড় এক খেয়াল চাপিয়া বসিল। যে রকমেই
সােনার খনি তাহাকে আবিষ্কার করিতেই হইবে। এজন্য
তিনি ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে অনেক দূরে চলিলেন। সেইখানে সুবৃহৎ
পাহাড়ের একটি ঝরণার জল পরীক্ষা করিয়া তাহার মন নাচিয়া
উঠিল; তিনি বেশ বুঝিতে পারিলেন, সেই পাহাড়েই কোন একটি
জায়গায় সােনার খনি আছে।
তাহার পরে আশ্বিন মাস আসিল, পূজার সময় আপীস আদালত
বন্ধ হইল। সেই সুযােগে করুণাময় বাবু এক মাসের ছুটি লইলেন
হউক,
২ সােনার খনির সন্ধানে খনি আবিষ্কার করিতে যাওয়ার যখন সকল বন্দোবস্তই এক রকম ঠিক হইল, তখন ডাক্তার মহাশয়ের আট বৎসর বয়সের ছেলে সুরেশ আবদার করিয়া বলিল -“বাবা, সােনার খনি আমাকে দেখতেই হবে। অনেক খানি জায়গা জুড়ে শুধুই সােনা! চারদিকে ঝক ঝক্ কছে কেবলই সােনা ! সে যে দেখতে কি মজা! তােমার সঙ্গে আমাকে নিয়ে যেতেই হবে।” সুরেশের মা মনোরমা দেবী হাসিয়া বলিলেন -- এবার আমাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।” খুব জাকজমকের সহিতই যাত্রার আয়ােজন হইল। করুণাময় বাবু বেশ বড় দেখিয়া একখানা বােট ভাড়া করিয়া, পরিবারের সবাইকে লইয়াই উহাতে আরােহণ করিলেন। মাঝিরা ব্ৰহ্মপুত্র নদীর স্রোতের উল্টা দিকে বােট ভাসাইয়া প্রকাণ্ড পাল তুলিয়া দিল। বােটের সঙ্গে নানা রকম খাবার জিনিস, কয়েকজন গুখ। সৈন্য এবং বন্দুক, বারুদ, গােলাগুলি লইয়া একখানি ছােট নৌকা ও চলিল। দিনের পর দিন যতই বােটখানা সামনের দিকে চলিতে লাগিল, ততই নানা রকম দৃশ্য দেখিয়া সকলেই বড় খুসী হইতে লাগিলেন। দূরে হিমালয়ের তুষারমণ্ডিত শৃঙ্গ সূর্যকিরণে ঝক ঝক্ করিত, দুই তীরের পাহাড়ের গায়ে ছোট বড় অসংখ্য তরুলতা ও কালাে কালো পাথর শোভা পাইত ; কত ঝরণা ঝর ঝর শব্দ করিয়া উচ্চ হইতে নিয় দিকে ছুটিয়া যাইত। নানা রকমের পাখী ঝাঁকে ঝাঁকে উড়িয়া আসিত আবার আকাশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া কোথায় চলিয়া যাইত। ঘােট ছােট হরিণগুলি নাচিতে নাচিতে নদীর তীরে আসিত, আবার মানুষ দেখিয়া বনের ভিতর লুকাইয়া পড়িত। একদিন একটা বড় হরিণ তাহার বাচ্চা লইয়া ঝরণার জল খাইতেছিল; তখন একজন অর্থা গুলি করিয়া হরিণটাকে মারিয়া ফেলিল এবং ছােট বাচ্চাটিকে ধরিয়া একটা বড় হরিণ ও তাহার বাচ্চা -২ পৃষ্ঠা
No text on this page.
প্রথম পরিচ্ছেদ বােটের ভিতরে লইয়া আসিল। সুরেশ ও তাহার একটি বোন বাচ্চাটিকে পাইয়া যে কি করিবে তাহাকে কি খাওয়াইবে সেইজন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। আর একদিন করুণামর বাবু নদীর তীরে বােট লাগাইয়া, সঙ্গের গুখ। সৈন্য কয়েক জনকে লইয়া পাহাড়ে শিকার করিতে গেলেন ; ছােট বড় সারি সারি অসংখ্য বৃক্ষের ভিতর দিয়া পাহাড়ের উপরে উঠিতেই সামনে বনগরুর পাল ! সে কি ভীষণ দৃশ্য ! সাহসী করুণাময় বাবুর বুক কঁপিয়া উঠিল। কেনই বা কঁপিয়া উঠিবে না? আসামের জঙ্গলে যত রকম জানােয়ার আছে, তাহার মধ্যে এই বনগরুই বড় ভয়ঙ্কর! গরুগুলি আকৃতিতেও ভীষণ, প্রকৃতিতেও ভীষণ ! একবার ক্ষেপিয়া গেলে মরণ বাচন তাহারা বােঝে না, হয় ৩ শিকারীকে মারিবে, নয় ত নিজেরা মরিবে । এই বনগরুর পাল দেখিয়াই করুণাময় বাবু গুর্খাদের সঙ্গে বন্দুকের আওয়াজ করিতে লাগিলেন, এক সঙ্গে অনেকগুলি বন্দুকের আওয়াজ শুনিয়া গরুর পাল ছুটিয়া চলিল ; কিন্তু একটি ছােট বাছুর পিছনে পড়িয়া রহিল। গুদের এমন কুবুদ্ধি, তাহারা সেই বাছুরটিকে ধরিয়া বাঁধিয়া ফেলিল। যেমনই বাছুরকে বাধা, অমনি দূর হইতে তাহার মা সেই দৃশ্য দেখিতে পাইয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল। অবশেষে শিং নাচাইতে নাচাইতে বাছুরের কাছে ছুটিয়া আসিল। গুখারা চারি পাঁচ গুলিতে তাহাকে মারিয়া ফেলিল। দূর হইতে বনগরুর পাল যখন দেখিতে পাইল, তখন আর গুখা যায় কোথায়? গরুর পাল ক্ষেপিয়া গেল এবং ছুটিয়া আসিল। করুণাময় বাবু ভয়ে ভয়ে গুর্খাদের লইয়া প্রকাণ্ড এক গাছের উপরে উঠিলেন। পাল শিং দিয়া গুতাইয়া গাছটাকে ক্ষত বিক্ষত করিয়া ফেলিল। তাহাদের এমনই রাগ, যদি কোন রকমে লাফাইয়া উচুতে উঠিয়া, .
৪ সােনার খনির সন্ধানে করুণাময় বাবুদের কাছে যাইতে পারিত, তবে কি আর রক্ষা থাকিত ? গুখারা গাছের উপর হইতে গুলি করিয়া যখন চার পাঁচটা গরুকে মারিয়া ফেলিল, তখন তাহার। নিরুপায় হইয়া দলবল সহ চলিয়া গেল। করুণাময় বাবু বনগরুর বাছুরটিকে লইয়া বােটে ফিরিয়া আসিলেন। ছেলে মেয়েরা সুন্দর বাছুরটিকে পাইয়া খুব খুসী হইল। কিন্তু বাছুরটি কিছুই পাইল না, সে বােট হইতে বনে যাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। এ দিকে আর এক বিপদ উপস্থিত হইল। পাহাড়ের উপরে অসভ্য জাতির বাস। তাহারা স্বাধীন। তাহাদের রাজা ও অসভ্য। রাজা হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। গেল। তাহার পরে সঙ্গে একদল অসভ্য লইয়া করুণাময় বাবুর বােটের কাছে আসিয়া পৌছিল। রাজার মাথায় পাখীর পালকের টুপি, পরণে বেতের তৈরী এক রকম আচ্ছাদন। কঁাধে প্রকাণ্ড কুড়াল ও ধনুক, হাতে মস্তবড় বশী। সঙ্গের অসভ্যদের পরণেও বেতের তৈরী নেংটি, হাতে ধনুক ও বশ বর্শা। রাজা করুণাময় বাবুকে কহিল, “এই পাহাড়ে আমার অনুমতি ছাড়া কেহ বন্দুক ছুড়িতে পারে না । বিনা অনুমতিতে বনগরু মারাও নিষেধ। তােমরা বন্দুক ছুড়ে ও বনগরু মেরে বড় অন্যায় কাজ করেছ। তাই নগদ একশত টাকা, আর তােমাদের বন্দুক, বারুদ, গুলি সবই আমাকে দিতে হবে। নইলে তােমাদের বন্দী করে নিয়ে যাব।” করুণাময় বাবু কহিলেন-“আপনাকে দশ টাকা নজর, আর আপনার সঙ্গের এক এক জনকে এক এক টাকা করে দেব। কিন্তু বন্দুক,বারুদ ও গুলি দিতে পাব না। দেব কেমন করে? এই গুখারা ইংরাজের সৈন্ত। বন্দুক বারুদ সবই ইংরাজ গভর্ণমেন্টের। এ সব জোর করে কেড়ে নিয়ে আমাদের বন্দী করলে, আপনাকে বিপদে পড়তে হবে। ইংরাজ হয়ত
No text on this page.
i.ADH
FILEMONVE
14
MEERTAL
Hist
प्रभात ताजा
अछे।
প্রথম পরিচ্ছেদ এই অপরাধের জন্য কামান পেতে আপনার ক্ষুদ্র রাজ্যের বাড়ী-ঘর সমস্ত তােপে উড়িয়ে দেবেন।” এই কথা শুনিয়া রাজার মেজাজ ঠাণ্ডা হইল। তিনি নিজে দশ টাকা আর সঙ্গের অসভ্যদের পঁচিশ জনের জন্য ২৫, পঁচিশ টাকা পাইয়াই বিদায় হইলেন। করুণাময় বাবু সেই মুহূর্তেই নৌকায় পাল তুলয়াি দিতে মাঝিদের আদেশ করিলেন। পালের নৌকা ছুটিয়া চলিল। কয়েকদিন পরে প্রকৃত বিপদ ঘনাইয়া আসিল। বােট ও তাহার সঙ্গের নৌকা যতই নদীর উজানে যাইতেছিল, ততই ব্ৰহ্মপুত্ৰ ছােট হইয়া আসিতেছিল। তাহার পরে বােট ও নৌকা এমন একটি জায়গায় গিয়া পৌছিল, সেখানে ব্ৰহ্মপুত্ৰ যেন একটা হ্রদের মতন। অনেক দূর ব্যাপিয়া গভীর জল; সেই জলে ভয়ানক স্রোত। অথচ সেইখানেই সন্ধ্যা হইল। আকাশ মেঘে ছাইয়া ফেলিল। করুণাময় বাবু ভয় পাইয়া মাঝিকে বলি- লেন—“মাঝি, মেঘটা যে বড় ভয়ানক। হয় ত এখনি ঝড় হবে। বােটখান কোন ভাল জায়গায় বাঁধা যায় কি না, একবার চেষ্টা করে দেখ ত।” আর ভাল জায়গা ! পনের মিনিট যাইতে না যাইতেই আকাশ পাতাল কঁপাইয়া ঝড় আসিল। নদীর এক একটা ঢেউ বােট ও তাহার সঙ্গের নৌকাটাকে ভাঙ্গিয়া চূরিয়া জলে ডুবাইয়া দিবার জন্য লম্ফ-ঝম্ফ করিতে লাগিল। অল্প সময়ের মধ্যেই বােটও নৌকা ব্রহ্মপুত্রের অতল জলে ডুবিয়া গেল। তিন ঘণ্টা পরে ঝড় আর রহিল না। তাহার পরে মেঘ কাটিয়া গেল, আকাশ পরিষ্কার হইল। রাত্রে জ্যোৎস্নায় চারিদিক ঝলমল করিতে লাগিল। এই সময়ে এক সন্ন্যাসী ব্ৰহ্মপুত্রের তীরে আসিয়া উপস্থিত হই- লেন। তাহার প্রশান্ত মূর্তি, দীর্ঘ কেশ, গৈরিক বেশ। সন্ন্যাসী দেখি- লেন, নদীর তীরের বালির উপরে রাজার ছেলের মতন অতিশয় সুন্দর একটি বালক। বালকটি মৃতবৎ পড়িয়া আছে। দেখিয়া মনে হইতেছে, ৬ সােনার খনির সন্ধানে কোন্ এক অসুর স্বর্গের দেবশিশুকে মর্তের মৃত্তিকায় ছুড়িয়া ফেলিয়াছে। ছেলেটিকে দেখিয়া সন্ন্যাসীর হৃদয় করুণায় গলিয়া গেল। তিনি শরীর পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, ছেলেটি এখনও বাঁচিয়া আছে। তাই সন্ন্যাসী ছেলেটিকে কঁাধে লইয়া আপনার মঠে চলিলেন। পাহাড়ের একটি উচ্চ শৃঙ্গের উপরে তাহার মঠ। মঠে থাকিয়াই তিনি ঈশ্বরকে পাইবার জন্য তপস্যা করেন। সন্ন্যাসী নানা রকম চেষ্টা করায় ছেলেটির জ্ঞান জন্মিল, সে চোখ মেলিয়া চাহিল । তাহার পরে ছেলেটি যখন একটু সুস্থ হইল, আপনার অবস্থা ভাল করিয়া বুঝিতে পারিল, তখন সে তার বাপ মা ও বােনদের জন্য এমন কঁদিতে লাগিল, সেই কান্না শুনিলে পাষাণও বা বুঝি গলিয়া যায়। এই ছেলেটি আর ত কেহ নয়—এ যে করুণাময় বাবুর ছেলে সুরেশ। সন্ন্যাসী তাহার কাছে নৌকাডুবি এবং তাহার বাপ মায়ের কথা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ ব্ৰহ্মপুত্র নদীর তীরে ছুটিয়া গেলেন। তিনি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিতে লাগিলেন। কিন্তু কোথায়ই বা সুরেশের পিতা, কোথায়ই বা তাহার মাতা ? কাহারও ত কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। তঁাহারা যে জলে ডুবিয়। মারা গিয়াছেন, সে বিষয়ে সন্ন্যাসীর কোনই সন্দেহ রহিল না। তিনি মঠে ফিরিয়া আসিয়া সুরেশকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ডিব্রুগড়ের বাড়ীতে তােমাদের আর কে আছে?” সুরেশ। দারােয়ান ও চাকর ছাড়া আর ত কেউ নেই। সন্ন্যাসী। তােমাদের রাউলপিণ্ডির বাড়ীতে কে আছেন, তা তুমি বলতে পার? সুরেশ। সেখানেও ত কেউ নেই। সন্ন্যাসী। তােমাদের আত্মীয় কি আপনার লােক কেউ আছেন? সুরেশ এই কথার কোনই জবাব দিতে পারিল না। সে ত শৈশবকাল হইতে আসামেই বাস করে, আত্মীয় স্বজনের কোন কথাই সে জানে না।
প্রথম পরিচ্ছেদ ৭ কে বলিবে ঈশ্বরের কি ইচ্ছা ? সন্ন্যাসী যখন সুরেশের সব কথা শুনিলেন, তখন তাহার হৃদয়ে করুণ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। তাঁহার মনটা সুরেশের দিকেই ঝুকিয়া পড়িল। তিনি মমতায় পূর্ণ হইয়া ছেলেটিকে আপনারই মেহবক্ষে তুলিয়া লইলেন। সুরেশকে সান্ত্বনা দেওয়া ও সুখী করা ছাড়। তঁাহার যেন আর কোন কাজই রহিল না। সন্ন্যাসী এখন যে মঠে আছেন, সেটি তাহার অল্পদিন বাস করার একটা আড্ডা মাত্র। তঁাহার আসল থাকিবার জায়গা হিমালয় পর্বতের সেখানে বিস্তর পাহাড়ী লােক বাস করে। সন্ন্যাসী পাহাড়ীদের গুরু এবং চালক বলিলেও হয়। সে পাহাড়ের রাজা ও রাণী হইতে সামান্য অবস্থার পুরুষ ও মেয়েরাও তঁাহাকে দেবতার মত মান্য করে। সন্ন্যাসী পাহাড়ীদের শিক্ষা দিয়া, নানা রকম রীতিনীতি শিখাইয়া অনেকটা সভ্য করিয়া তুলিয়াছেন। সন্ন্যাসী এখন সুরেশকে সঙ্গে লইয়া হিমালয়ের দিকে রওনা হইলেন। সেখানকার লােকেরা সুরেশকে দেখিয়া খুসী স্বয়ং রাজা ও রাণী তাহাকে গুরুর ছেলে মনে করিয়া সােনা, রূপা ও আরাে তাদের দেশের অনেক ভাল ভাল দ্রব্যসামগ্রী উপহার দিলেন। একটি উচ্চ শৃঙ্গে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ " কে বলিবে সুরেশের মুখে কি মায়া মাখা ছিল, সন্ন্যাসী ত তাহাকে দেখিয়া একেবারে মুগ্ধ হইয়া গিয়াছেন। তিনি এক এক সময় সুরেশের পানে চাহিয়া মনে মনে বলেন, “তুমি কোন্ দেবতার দেশ হতে আমার কাছে এসেছ? তােমার মুখের পানে চেয়ে আমি যে আমার ঈশ্বরকেই দেখতে পাই।” সুরেশ এই ত সবে কয়েক বৎসর সন্ন্যাসীর কাছে আছে, কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই সন্ন্যাসী তাহার মধুর প্রকৃতিতে অতিশয় আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছেন। একদিন এই ছেলেটিকে না দেখিলে তাহার যেন আর চলে না। পাহাড়ের যে সকল রাজা সন্ন্যাসীর শিষ্য, তাহারা সন্ন্যাসীর কাছে সােনা, রূপা ও টাকা রাখিয়া প্রণাম করিলে, আগে তিনি বলিতেন, “এ সব নিয়ে আমি কি করব? আমার কোন্ কাজে লাগবে ?” রাজার বলিতেন, “কাজে না লাগলে এ সব বরং দানধ্যান করুন, তাতে গরীবদেরও উপকার হবে, আপনিও খুব খুসী হবেন।” কিন্তু এখন ঐ সকল রাজারা সন্ন্যাসীকে সােনারূপা ও টাকা দিতে আসিলে হাসিমুখেই তিনি তাহা গ্রহণ করেন এবং সেই সকল সােনারূপায় সুরেশকেই সাজাইতে চাহেন। সুরেশের মাথায় মেয়েদের মতন লম্বা লম্বা চুল, পরণে স্বর্ণখচিত বস্ত্র, গায়ে আলখেল্লার মতন স্বর্ণখচিত জাম, কাণে সােনার কুণ্ডল, গলায় সােনার হার। সে যেন ঠিক একটি রাজার ছেলে। সন্ন্যাসী তাহাকে রাজার ছেলের মতনই সুখে মানুষ করিয়া তুলিতেছেন। কিন্তু হায়, সুরেশের এ সুখ ও অতি অল্প দিনের জন্য। কেন অল্প দিনের জন্য, সেই কথাই এখন বলিতেছি। এলাহাবাদে কুম্ভমেলা। এই মেলায়, যত রাজ্যের সন্ন্যাসী, সকলে আসিয়া মিলিত হন। আমাদের পাহাড়ের সন্ন্যাসীও সুরেশকে সঙ্গে লইয়া কুম্ভমেলায় উপস্থিত হইলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সেখানে যেমন হাজার হাজার সন্ন্যাসী আসিয়াছেন, তেমনি কত দেশের কত রাজা, কত বড় বােক, কত সাধারণ লােক মেলা দেখিতে আসিয়া- ছেন। কিন্তু সমস্ত মেলার মধ্যে সুরেশই যেন দেখিবার একটি অপূর্ব বস্তু। সকলেই অবাক হইয়া তাহার সুন্দর মুখশ্রী, বিচিত্র পােষাক এবং অঙ্গের অলঙ্কার দেখিত। মেলায় যে সবই ভাল লােক আসিয়াছিল, তাহা নহে। এক দল বােম্বেটে দিব্বি সন্ন্যাসী সাজিয়া, গায়ে ভস্ম মাখিয়া, বাঘের চামড়া পরিয়া মেলায় আসিয়াছিল ; চুরি ডাকাতি করাই তাহাদের মতলব। তাহারা সুরেশকে দেখিয়া বলাবলি করিতে লাগিল,- প্রথম বােম্বেটে। দেখেছি, ছেলেটির গায়ে সােনার গহনা ? দ্বিতীয়। দেখলে কি হবে ? ওকে যে এ পাওয়া যায় না। যে সন্ন্যাসীর হাত ধরেই ঘুরে বেড়ায়। তৃতীয়। একলা পেলেই ওকে কিছু খাবারটাবার দিয়ে ওর সঙ্গে ভাব করা যায়। একবার ভাব করতে পারলে ফাদে ফেলতে আর কত? চতুর্থ। ফাদে ফেলে আমাদের নৌকায় নিয়ে যেতে পারুলেই ফাদের পাখীর মতনই ওর গলা টিপে মেরে ফেলতে পারি। মেরে ফেলতে পারুলেই গায়ের সােনারূপ একটি একটি করে খসিয়ে নেওয়া যায়। পঞ্চম। ভায়, এবার মেলায় পুলিস যে রকম পাহারা দিচ্ছে, ধরা পড়লেই একেবারে ফাসীকাঠে ঝুলতে হবে। প্রথম। হাঁ, ধরা পড়ব না ত আরাে কিছু। সেবার মেলায় তুই ছিলি কোথায়? পুলিস ত পুলিস! কত বেটা সিপাহির চোখে ধুলা দিয়ে এই হাতে আট দশটা মানুষের মাথা ভেঙ্গে, কত টাকা সিন্ধুকে পূরেছি। পঞ্চম। তুমি কত টাকা সিন্ধুকে পূরেছিলে বটে, কিন্তু তােমার খুড়ার কি হয়েছিল, সে কথা বুঝি মনে নেই? বেচারা একটি মেয়েলােকের টাকা কেড়ে নিতেই সে তার পরণের অর্ধেকখানি কাপড় দিয়ে গলায় ফাস লাগালাে। ফাস লাগিয়েই ‘পুলিস পুলিস’ বলে চীৎকার। খুড়া so সােনার খনির সন্ধানে তখন আর যায় কোথায় ? রাঙা পাগড়ি-পরা সিপাহির দল এসে খুড়াকে বেঁধে ফেলে। তার পরে তার নৌকায় যে সব লােক ছিল, তাদেরও গ্রেপ্তার করলে। শুধু কি তাই? খুড়া আট দশ বছর বােম্বেটেগিরি করে যে কিছু টাকা জমিয়েছিল, তা নৌকার ভিতরেই একটি কাঠের সিন্ধুকে রেখেছিল ; সিপাহিরা সেই টাকার সন্ধান পেয়ে, দিব্বি করে লুটে পুটে নিয়ে তাদের মেয়ের গয়না গড়ালাে। তাহার পরে কুম্ভমেলায় কলের হইতে লাগিল। কলেরা-অসুর আমাদের পাহাড়ের সন্ন্যাসীকেই যেন চাপিয়া ধরিল। দুই দিনের অমুখেই তিনি মারা গেলেন। সুরেশ অসহায় হইয়া মাটিতে পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। বােম্বেটে সন্ন্যাসীর দল সুযােগ বুঝিয়া সুরেশের সামনে আচ্ছ। এক ফঁাদ পাতিল, সুরেশ নিরুপায় হইয়া সেই ফঁাদেই পা দিল। বােম্বটে সন্ন্যাসীরা তাহাকে কহিল, “আহা ছেলেটি, তােমার মা বাপ কেউ নেই ? তােমার দুঃখে আমাদেরও বড় কষ্ট হচ্ছে। তুমি আর কোথায় কার সঙ্গেই বা যাবে? তা এস, আমরাই তােমাকে হরিদ্বারে নিয়ে যাই। সেইখানে পাহাড়ের উপরেই আমাদের আশ্রম। আশ্রমে যতটা পারি, তােমাকে সুখে রাখতেই চেষ্টা করব।” সুরেশ বােম্বেটে সন্ন্যাসীদের মিষ্ট কথায় তুষ্ট হইয়া তাহাদের সঙ্গেই চলিল। সন্ন্যাসীরা সুরেশকে আপনাদের নৌকার ভিতরে লইয়া গেল এবং কহিল, “আর এই মেলায় থেকে কাজ নেই বাপু। প্রাণটা বাঁচলে তার পরে ত সব ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম। যে রকম কলেরা লেগেছে, আজই এখান থেকে পালিয়ে না গেলে, এই রােগের কর্তী ঠাকুরাণীটি হয়ত আমাদেরই দুই একটাকে ধরে টানাটানি করূবেন। ঠাকুরাণীটির কঁচা মাংস ও তাজা রক্তের উপরে ভারি লােভ?” সন্ন্যাসীরা নৌকা খুলিয়া হরিদ্বারের দিকে না গিয়া বক্সারের দিকে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১১ চলিল ; সন্ধ্যা হইতেই একটি নির্জন স্থানে জঙ্গলের আড়ালে নৌকা বাঁধিল। রাত্রি এগারটার পরে সুরেশ ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রি দুপুর হইলে পরে নদীতে নৌকা যাওয়া-আসা বন্ধ হইল। তখন, সন্ন্যাসীরা সুরেশের মাথা কাটিবার জন্য খাড়া বাহির করিল। কে বলিবে ঈশ্বরের কি ইচ্ছা, ঠিক সেই সময়ে সুরেশের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সে একজন সন্ন্যাসীর হাতে খাঁড়া দেখিয়াই মনে করি, হয়ত সােনারূপার লােতে তাহাকে হত্যা করিবার জন্যই এই সব আয়ােজন। সুরেশের বয়স চৌদ্দ বৎসর হইলেও শরীর খুব বলিষ্ঠ। সে পাহাড়ের লােকদের কাছে তীর ধনুকের খেলা শিখিয়াছিল। পাহাড়ের বনে জঙ্গলে হিংস্র জানােয়ার এবং তাহাদের চেয়েও হিংস্র বিস্তর অসভ্য আছে বলিয়া, সুরেশের গায়ের আলখেল্লার নীচে ছােট একটি পিতলের ধনুক ও কয়েকটি বিষ মাখানাে তীর লুকানো থাকিত। সুরেশ চোখের নিমিষে সেই ধনুক ও তীর বাহির করিল। সে যাত্রার দলের অভিমন্যুর মতন ঘুরিয়া ঘুরিয়া, বােম্বটে সন্ন্যাসীদের চোখ লক্ষ্য করিয়া বিষাক্ত তীরের ফলাগুলি ছুড়িতে লাগিল। সেই তীরে দুই একটা বােম্বেটের চক্ষু নষ্ট হইল বটে, কিন্তু তাহাতে সুরেশের রক্ষা পাইবার কোনই সুবিধা হইল না। কয়েকটা বােম্বটে পিশাচের মতন দাত বাহির করিয়া হি হি করিয়া হাসিয়া উঠিল ; অবশেষে যমদূতের মতন একটা বােম্বেটে খাড়া উচু করিয়া সুরেশের ঘাড়ের উপরে এক কোপ মারিল। সুরেশের সামনে একটা বাঁশ ছিল, সেই বাঁশ দিয়া সে খাড়ার কোপ অনেকটা ঠেকাইল বটে, কিন্তু ভাল করিয়া ঠেকাইতে পারিল না; খাঁড়ার যে একটুখানি তাহার গায়ে লাগিল, তাহাতেই তাহার অনেকখানি মাংস কাটিয়া ঝর ঝর করিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল। সুরেশ ভীষণ চীৎকার করিয়া নৌকার মধ্যেই অজ্ঞান হইয়া পড়িল। লােকেরা কথায় বলে, “ধৰ্ম্মের কল আপনি নড়ে।” যথার্থই ধৰ্ম্মের কল নড়িয়া উঠিল। একটু দূরে পুলিসের দারােগার একখানা ১২ সােনার খনির সন্ধানে নৌকা বাইতেছিল। সুরেশের চীৎকার দারােগা বাবুর কাণে গিয়া পৌছিল। হার মাঝিরা তীরবেগে নৌকা চালাইয়া সন্ন্যাসীদের কাছে আসিতে লাগিল। তখন সন্ন্যাসীরাও প্রাণপণে নৌকার পাড় বাহিয়া পলাইবার চেষ্টা করিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। দাবােগা বাবুর নৌকা যখন সন্ন্যাসীদের নৌকার অনেকটা কাছে আসিল, তখন আট দশ জন পুলিস বন্দুক হাতে লইয়া দাড়াইল এবং স্বয়ং দারােগা বাবু, বন্দুক হাতে লইয়া কহিলেন—“সাবধান! যেখানকার নৌকা সেখানেই রাখ! পালাতে চেষ্টা করলেই গুলি চালাব, তা হলে তােমাদের প্রাণ বাঁচানাে মুস্কিল হবে।” পুলিসের কনেষ্টবলের গুড়ুম গুড়ুম করিয়া চারি পাঁচটা বন্দুকের আওয়াজ করিল। সন্ন্যাসীরা ভয় পাইয়া নৌকা থামাইল। কিন্তু তাহারা খুব চতুর ! পাছে বা সুরেশের সােনা রূপা সহিতই ধরা পড়ে, সেই জন্য সেগুলি এবং তাহাদের খাড়া গঙ্গার জলে ফেলিয়া দিল, দারােগা বাবু তাহাদের গ্রেপ্তার করিলেন তখন দুষ্ট, সন্ন্যাসীব। অম্লান বদনে মিথ্যাকথা তৈরী করিয়া দাবােগা বাবুকে কহিল- “বাবু, আমাদের ধরে দড়ি দিয়ে কেন হাত বাঁধলেন? আমরা কি ডাকাত? ডাকাত হলে সন্ন্যাসীর পােষাক পরব কেন? অনেক রাত হয়েছে, তাই নদীর তীরে নৌকা লাগিয়ে আমরা নিশ্চিন্তমনে ঘুমাচ্ছিলুম; তখন এই ছােরা চোর, আমাদের নৌকায় উঠে চুরি করার চেষ্টা করছিল। আমরা তাড়াতাড়ি জেগে উঠে ঘুমের চোখে তার ঘাড়ে এক কোপ মেরেছি। দায়ােগা বাবু, তােমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাদের ছেড়ে দাও।” চোর ডাকাত ধরিয়া দারােগা বাবুর মাথার চুল পাকিয়া গিয়াছে। মিথ্যাকথা বলিয়া এখন আর তাহার চোখে ধূলা দিবার যাে নাই। তিনি বোম্বেটেদের বাধিয়া থানায় লইয়া গেলেন এবং সুরেশকে চিকিৎসার জন্য বসারের হাসপাতালে পাঠাইয়া দিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ বসারের হাসপাতালে সুরেশের চিকিৎসা হইতে লাগিল। অনেক দিন পরে সে আরোগ্যলাভ করিল। তাহার শরীর একটু সবল হইল। হাসপাতালের ডাক্তার কহিলেন, “তােমাকে আজই এই হাসপাতাল থেকে চলে যেতে হবে, আর এখানে থাকার সুবিধা হবে না।” সুরেশ কহিল, “আমি কোথায় যাব? আমার ত কেউ নেই।” বক্সারের ডাক্তার ঈশ্বরী প্রসাদ বাদরের মত মুখভঙ্গী করিয়া সুরেশকে কহিল, “আহা কি মজার কথাই বল্লে ! • তােমার কেউ নেই, তবে কি, আমারই ঘাড়ে চড়ে থাকতে চাও নাকি?” সুরেশ ডাক্তারের মুখভঙ্গী দেখিয়া আর সে হাসপাতালে থাকিতে সাহস পাইল না। বাহিরে আসিয়া সে কয়েকজন হিন্দুস্থানী ভদ্রলােকের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়াইল, কোথাও একটু আশ্রয় পাই না। তাহার পরে একটা বড় রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল। কি ভয়ানক বােদ। হওয়া যেন আগুনের মতন। সুরেশ আর কতটুকু রাস্তাই বা চলিবে? সে প্রকাণ্ড এক বট গাছের নীচে শুইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ পরেই সে ঘুমাইল। সুরেশ ঘুমের ভিতরে আশ্চর্য এক স্বপ্ন দেখিল। সে যেন ঘুরিতে ঘুরিতে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরের এক জঙ্গলের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। সে যে কোথায় যাইবে তাহাও বুঝিতে পারে না, কোথাও যাবার পথও দেখিতে পায় না। হঠাৎ তাহার সামনে প্রকাণ্ড এক হাতী আসিয়া দাঁড়াইল। হাতীর পিঠে চমৎকার হাওদা। হাওদার উপরে হাতীর মাহুত। মাহুত সুরেশকে কহিল, “খােকা বাবু, তুমি ত বেশ বড় হয়েছ। আমাকে কি চিনতে পার? আমি যে রতন বাবুর হাতীর ১৪ সােনার খনির সন্ধানে . মাহুত। কতবার তুমি এই হাতীতে চড়েছ, আমাকে অনেক পয়সা জলখাবার জন্য দিয়েছ।” রতন বাবু ডিব্রুগড়ের একজন টাকাওয়ালা লােক। সুরেশের বাবার বাসার কাছেই তাহার বাড়ী ছিল। সুরেশ ছেলেবেলায় অনেক দিন ঐ হাতীতে চড়িয়া বেড়াইয়াছে। আজ সেই হাতী ও মাহুতকে দেখিয়া ছেলেবেলার অনেক কথাই তাহার মনে পড়িল। সে আর কান্না থামাইতে পারিল না। মাহুত কহিল, “তােমার দুঃখ ত আর থাকবে না, তুমি কঁাদ কেন? এই হাতীর পিঠে উঠলেই, হাতী তােমার বাবার কাছে নিয়ে যাবে। হাতী তােমাকে খুব ভালবাসে কি না, তাই দেখ কেমন নীচু হয়েছে। তুমি হাতীর উপরে ওঠ না কেন?” সুরেশ। আমার বাবা কোথায় ? মাহুত। ঐ যে দূরে দূরে সারি সারি নীল রঙের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, ওর আড়ালে সােনার খনি ছিল। তােমার বাবা খুজে খুজে সেই খনির সন্ধান পেয়েছেন। মাটি খুঁড়তে খুড়তে খনির ভিতরে এক সােনার পাহাড় পাওয়া গিয়াছে। তােমার বাবা ত সেই পাহাড়ের উপরেই দাড়িয়ে আছেন। তুমি তার কাছে গেলেই তিনি "তােমাকে নিয়ে পাথর দিয়ে সােনা ভেঙ্গে ভেঙ্গে, সেই সােনা নিয়ে সহরে চলে যাবেন। সুরেশ হাতীর উপরে চড়িল। হাতী ছুটিতে ছুটিতে সােনার খনির কাছে গিয়ে দাড়াইল। চাহিয়া দেখিল, সােনার পাহাড় ঝক ঝক করিতেছে এবং তাহার উপরে যথার্থই তাহার বাবা দাড়াইয়া আছেন। তিনি কোন কথা বলিলেন না, শুধু হাতে ইসারা করিয়া সুরেশকে কাছে বাইতে বলিলেন। কিন্তু হঠাৎ জলের দুই দিক হইতে ভয়ঙ্কর দুই গণ্ডার বাহির হইল ; হাতী ভয় পাইয়া ছুটিয়া চলিল। তাহার পরে হাতী যেখানে গিয়া দাড়াইল, সেখানে একখানি পাতার কুটীর। কুটীরের ভিতর হইতে বার বৎসর বয়সের একটি সুন্দরী বালিকা
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বাহিরে আসিল। সে সুরেশকে কহিল, “অমন করে অবাক হয়ে চেয়ে
রইলে কেন? চিন্তে পালে না? আমি যে তােমার বােন।”
সুরেশের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সে চাহিয়া দেখিল, তাহার খুব
নিকটেই গাছের তলায় একটি ভিধারিণী মেয়ে ! মেয়েটির মিষ্টি মুখখানি
করুণায় ভরা। মেয়েটি সারং বাজাইয়া সুস্বরে গাহিতেছে-
“ওগো, তােমাদের কাছে কিছু পেতে চাই,
দিতেই ত আছে সুখ, নিতে সুখ নাই।
চেয়ে দেখ কূলে কূলে
মধুর লহরী তুলে
তটিনী নিৰ্ম্মল বারি দান করে তাই।
বনে তরু শত শত
ফুল ফল দেয় কত,
পাখীর সুমিষ্ট গানে হৃদয় জুড়াই ;
দিলে মন বড় হয়,
স্বার্থে সুখী কেহ নয়,
তাই সবাকার মনে করুণা জাগাই ;
ওগাে, তােমাদের কাছে কিছু পেতে চাই।”
ভিখারিণী মেয়েটির বয়সও বার বৎসর হইবে। তাহার মধুর গান
শুনিয়া, রাস্তার দয়াবান্ লােকের হাতে পয়সাটি, দু-আনিটি দিয়া যাইতে
লাগিল। সুরেশ স্বপ্নের কথা ভাবিতে ভাবিতে এবং বালিকার গান শুনিতে
শুনিতে অশ্রুতে নয়ন সিক্ত করিল। ভিখারিণী মেয়েটি সুরেশের কাছে
আসিয়া কহিল, “তুমি কে? গাছ তলায় এমন করে শুয়ে আছ কেন?
মুখখানি যে শুক্ননা, সমস্ত দিনে কিছুই খাওনি? চোখে যে জল!
তােমার কি কেউ নেই ?”
সুরেশ। না, আমার কেউ নেই।
সুরেশের কথা শুনিয়া মেয়েটির মুখখানি ম্লান হইয়া গেল। সুরেশ
কোথা হইতে কেন এখানে আসিয়াছে, মেয়েটি তাহা জিজ্ঞাসা করিল
সুরেশের দুঃখের কাহিনী শুনিয়া মেয়েটি তাহার চোখের জল আর রাখিতে
সােনার খনির সন্ধানে পারিল না। সে কহিল, “আমিও বড় দুঃখিনী। আমার বাবা রেলের কাজ করতেন। জাতিতে বামুন ছিলেন কি না, তাই গাড়ীর যে সব যাত্রীদের পিপাসা পেত বাবা তাদের খাবার জল দিতেন। কিন্তু একবার গাড়ীর নীচে পড়ে গেলেন। বাঁচলেন বটে, কিন্তু পা দুখানি কাটা গেল। এখন ত তিনি বুড়ােই হয়েছেন। আমরা হিন্দুস্থানী হলেও কয়েকটি বাঙ্গালী বাবু দয়া করে আমাদের ছােট একটি বাড়ী তৈর করে দিয়েছেন। আমি বােজ গান গেয়ে ভিক্ষা করে কিছু পাই, তাতেই আমাদের দুজনের দিন চলে যায়। আমরা ভিক্ষুক হলেও বামুন ত বটে, চল না আমাদের বাড়ীতে ; ভাত ডাল রান্না করে তােমাকে খেতে দেব।” মেয়েটি বেশ বুদ্ধিমতী। সে সুরেশকে লইয়া নিজের বাড়ীতে বাপের কাছে গেল। তাহার বাবাও বড় ভাল মানুষ। সে সুরেশকে অতিশয় মেহের সহিতই গ্রহণ করিল। মেয়েটি অল্প সময়ের মধ্যেই ডাল ভাত রাঁধিয়া এবং আলু ভাজা করিয়া সুরশেকে খাইতে দিল। মেয়েটির বাড়ীখানি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সুরেশ শুধুই একটি দিন ভিখারিণীর বাড়ীতে রহিল, এই একদিনেই বার বৎসর বয়সের মেয়েটির মেহ-দয়া কাজকর্ম এবং তাহাকে বৃদ্ধ পিতার আশ্চর্য সেবা করিতে দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। একদিন পরে মেয়েটির বাড়ীতে বক্সারের এক ডেপুটি বাবু বেড়াইতে আসিলেন। মেয়েটির উপরে তাহার অত্যন্ত দয়া। তিনি সময় সময় তাহাকে কাপড়, জামা ও খাবার জিনিস দিয়া অত্যন্ত উপকার আজ তিনি ভিখারিণীর কাছে সুরেশের কথা শুনিয়া, তাহার সহিত আলাপ করিলেন। সুরেশ কহিল, “আমি পিতৃমাতৃহীন হয়েছিলুম। এক সন্ন্যাসী আমাকে পুত্রের মতন পালন করেছিলেন। এলাহাবাদের কুম্ভ মেলায় সে সন্ন্যাসীরও মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যুর পরে আমি ডাকাতের হাতে পড়েছি। তারা আমার অল্প বয়সেই
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
১৭
সর্বস্ব হরণ করে খাঁড়ার আঘাতে অজ্ঞান করে রেখেছিল। তার পরে
এখানকার হাসপাতালে আশ্রয় লাভ করে সুস্থ হয়েছি। এখন আর
আমার কোথাও যাবার জায়গাটুকুও নেই।”
ডেপুটি বাবু খুবই মেহ দেখাইয়া সুরেশকে আপনার বাসায় লইয়া
গেলেন। সে সেইখানেই আশ্রয় লাভ করিল। কিন্তু বােম্বেটে
ডাকাতদের কি হইল, এখন সংক্ষেপে সেই কথাই বলি।
পুলিসের দারােগা সন্ন্যাসীদের থানায় লইয়া গিয়া তাহাদের কাছে
জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমাদের বাড়ী ঘর কোথায়?”
একটি চালাক লােক কহিল, “আমরা সাধুসন্ন্যাসী। আমাদের
আবার বাড়ী ঘর কি? যে দিন পাহাড়ের উপরে থাকি, সে দিন
সেই খানেই আমাদের আডডা।”
দাবােগা। চুরি ডাকাতি করে যে সোনা রূপা পাও, তা রাখ
কোথায় ?
বােম্বেটে। চুরিডাকাতি করলে ত সােনারূপা পাব।
দারােগা। এ কোন্ জায়গায় এসেছ তা জান ত? এ স্থানটি
হচ্ছে থানা, আমি হচ্ছি দারােগা। এখানে মিথ্যা বলে চোখে ধূলা
দিলে চলবে না। আমরা মানুষের পেটের মধ্যে ঢুকে নাড়ীর ভিতর
থেকে কথা টেনে বের করি, তা মনে রেখ।
করতে চেয়েছিলে, তাকে কোথায় পেয়েছ, সত্যি করে বল।
বােম্বটে। কোথায় আবার পাব? ও ছােকরা আমাদের নৌকায়
চুরি করতে এসেছিল।
দানােগা। তােমরা ত বল সন্ন্যাসী, ও হােকরা কি তােমাদের
জাতশ্ন চুরি করূতে এসেছিল? কেন ওকে মারতে চেয়েছিলে, সৰ
কথা ভেঙ্গে বল, নইলে ভাল হবে না।
বােৱেটে। প্রাণ গেলেও আমরা মিথ্যা বলি নে।
যে ছেলেটিকে খুন
১৮ সােনার খনির সন্ধানে দারােগা। ব্যাটা যেন ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির ! দেখছি সােজা আঙ্গুলে ঘি বের হবে না। ঘা কতক লাগাতে হবে, তা হলে সত্যই কথা বের হয়ে পড়বে। বােম্বেটে। আপনারা মা বাপ, মালেও মাতে পারেন, রাখলেও রাখতে পারেন। দাবােগা। মা বাপ আমরা কেমন, তা এখনি দেখাচ্ছি। রামদীন, ঐ যে যােল সতের বৎসর বয়সের একটি ছােট সন্ন্যাসী, ওকে নিয়ে গারদ ঘরে চল ত।” রামদন ছেলেটিকে লইয়া একটা বিশ্রী ঘরের মধ্যে গেল। তাহার পরে দারােগা তাহার বাড়ীর ভিতর হইতে শিকলে বাঁধা এক ভীষণ কুকুর লইয়া আসিলেন। তাকে মােটেই কুকুর বলিতে ইচ্ছা হয় না, সে যেন ছােট খাট একটি বাঘ। ছেলেটিকে দেখিয়াই কুকুরটা ভয়ানক শব্দে ঘেউ ঘেউ করিয়া উঠিল। তাহার মুখের পানে চাহিয়া ছেলেটির গায়ে কাঁপুনি ধরিয়া গেল। দারােগা কহিলেন, “ওরে ছােকরা, সত্যি করে বল, তােরা চোর না ডাকাত? মিথ্যা বল্লে এখনি এই কুকুর লিলিয়ে দেব, তাের হাড় মাংস টেনে টেনে ছিড়ে ছিড়ে খাবে।” ছেলেটি ভয় পাইয়া কহিল, “আমরা চুরি ডাকাতি করি, আমাদের বাড়ী ভােজপুরে।” দারােগা সবগুলি চোর ডাকাতকে গারদ ঘরে বন্দী করিয়া রাখিলেন। তার পরে তিনি বিস্তর পুলিস লইয়া ডাকাতদের গাঁয়ে উপস্থিত হইলেন। ডাকাতদের বাড়ীঘর ঘিরিয়া ফেলিয়া তাহাদের কাঠের সিন্ধুকের মধ্যে নানা জায়গার ডাকাতির জিনিস পত্র ও গহনা প্রাপ্ত হইলেন। অবশেষে জজ সাহেবের কাছে ডাকাতদের বিচার হইল। সকল ডাকাতেরই জেল হইয়া গেল।
AR চতুর্থ পরিচ্ছেদ AAA ডেপুটি বাবু দেখিলেন, সুরেশের চৌদ্দ বৎসর বয়স হইয়াছে বটে, কিন্তু সমাজের রীতিনীতি যতটুকু জানা আবশ্যক, তাহা সে জানে না। সে বড় সরল। অথচ তাহার ভিতরে শক্তি প্রচ্ছন্ন আছে। সে সন্ন্যাসীর কাছে চমৎকার সংস্কৃত শিখিয়াছে ; লেখাপড়া শিখাইলে সে সবই খুব ভাল শিখিতে পারিবে। তাই ডেপুটি বাবু সুরেশকে ইংরাজী স্কুলে ভর্তি করিয়া দিলেন। কিন্তু এই সময়ে ডেপুটি বাবুর স্ত্রী কাত্যায়নী ঠাকুরাণী বাপের বাড়ীতে ছিলেন; তিনি এক মাস পরে বক্সারের বাসায় আসিলেন। সুরেশকে দেখিয়া প্রথমে ত রাগিয়া চক্ষু রঙা জবার মত করিয়া বলিলেন,“কোথাকার একটা বে-ওয়ারিশ ছেলে হঠাৎ উড়ে এসে আমার ঘরখানি জুড়ে বসেছে।” তাহার পরে গিন্নিঠাকুরাণীর মাথায় চট্ করিয়া একটা বুদ্ধি খেলিল তাই তিনি আপন মনে বলিতে লাগিলেন-ছােকরা ত শুনছি বামুনের ছেলে। বয়সের তুলনায় শরীরে বেশ শক্তি-সামর্থ্যও আছে। যদি রান্নাবান্না শেখানো যায়, তাহলে ত ছােকরা বেশ কাজে লাগতে পারে। ওকেই ত আমরা বামুনঠাকুর করে কিছু মাইনে দিতে পারি। আরে বাপরে বাপ! এ দেশের গোঁফওয়ালা কড়া মেজাজ বামুনগুলাের সঙ্গে কি পেরে ওঠবার যো আছে ? খাবার সময় খাবে ত এক হড়ী ভাত, আধ সের ডাল। আবার বাড়ী যাবার সময় কবে চুরি। রায়ার সময় ফোড়ন দিতে গিয়ে তরকারি দিবে আলিয়ে, কঁাচা তেলে রাধবে মাছের ঝােল। কিছু বল্লেই গােখরো সাপের লেজে পা দেওয়া হবে, অমনি সে ফোস করে উঠে দু-কথা শুনিয়ে দেবে। তা আমিও সহজে সােনার খনির সন্ধানে আনা কেন? ছাড় বার পাত্রী নই, মাইনে হতে তিন ভাগের এক ভাগ কেটে রেখে তখনি ঐ আপদকে বিদায় করে দি।” আসল কথা গিন্নিঠাকুরাণীর মুখে ক্ষুরের ধার। চাকর বামুনের কাজে সামা একটু ক্ৰট হইলেই মুখের এমন বুলি বাহির হয়, তাহাতে লােকের হাড় মাংস কাটিয়া যায়। তাই ঠাকুরাণীটির বাসায় সাত দিনের বেশি কোন রায়া করিবার বামুনই টিকিয়া থাকিতে পারে না। তা, এই অসহায় ছেলেটিকে রাতারাতি গডিয়া রান্নার কাজে লাগাইতে গাজিলে নাই; তা ছাড়া, দিনরাত মুখচালানো, কাজ শায় করা, এই দুইয়েরই ব্যাঙ্খত ঘটিবার ক্লোনই কারণ দেখা যায় না। সিগিমি মনে মনে এই রয়া প্রকাশ্যে ডেপুটিবাবুকে কহিলেন- নিজের এক পাল ছেলে মেয়ে, তাদের সামলাতে রি নেবার সখ করে পরের ছেলে তবে যদি বল ওর কে কে কোথায়? তা যদি নিতান্তই এখানে থাকে ত রান্নাবান্না শিখুক না কেন? বামুনের ছকে ত বন বয়স অল্প হলেও গায়ে জোর আছে। আমাদের রান্না পy- শুনাও শিখুক শিখুক। তা নয় ওর কেতাব পত্রের জ অল্প কিছু মাইনে ধরে দেওয়া যাবে।” ডেপুট বাবু জিভ কাটিয়া বলিলেন-“আরে ছি! ছি! অমন কথা কি বলতে আছে ? ওর বাপ, যে মস্তবড় চাকুরি করতেন। তার ঘরে ঢের চাকর ও রাধুনী ছিল। ওকে কি রয়ে বামুন করে রাখা যায়?” গৃহিণী কহিলেন-“শুতে পাই তােমাদের পূর্বপুরুষদের জমিদারী ছল। এখন সেই অহঙ্কারে চাকুরি না করে দিব্বি পায়ের উপরে পা রেখে বড় মানুষের মত দিন কাটাতে চাইলে বেলা দশটার সময় ভাত, মাছের ঝােল আর ঘন দুধ, তার পরে রাত্তিরে আবার লুচি, মাংস মিঠা আসত কোথা থেকে? ছেলেটির বাপ বড় লােক ছিল তা ছিলই। এখন !
চতুর্থ পরিচ্ছেদ . ২১ ৭ সে কথা নিয়ে বড়াই করে লাভ কি ? ওকে আমাদের রান্নার কাজটি কতেই হবে, নইলে থালা ভরে একরাশ অন্ন আর বস্ত্র যোগাবে কে? ডেপুটি বাবুর মন বড়ই দুর্বল, তাই গিন্নির কথার মতনই কাজ হইল। সুরেশ তিন মাসের মধ্যেই চমৎকার রান্না করিতে শিথিল। তাহার পরে সে রীতিমত বামুনঠাকুর হইল। সে অত্যন্ত পরিশ্রম করিয়া রাধিয়া স্কুলে যাইত এবং পড়িত। কিন্তু সুরেশের এই পরিবারে কষ্টের আর সীমা রহিল না। ডেপুটি বাবুর একটি সেনা চাকর আছে, তাহার নাম গিরুয়া। এই চারটি বড় ভয়ানক। সত্য কথা যে কেমন করিয়া বলিতে হয়, সে শিক্ষা যেন তাহার হয় নাই। চুরি করিতে পারিলে সে আর ডান দিকে বাঁ দিকে ফিরিয়া চায় না। তবে, এই বাড়ীর গিন্নির চোখে ধূলি দিয়া চুরি-করা কাজটিও বড় সহজ নয়। এখন অসহায় সুরেশকে পাইয়া সে বড়ই উপদ্রব আরম্ভ করিল। গিরু নিজে যে সব অন্যায় কাজ করিত, তাহা সুরেশের মাথায় চাপাইয়া দিত। রান্নাঘরের দ্রব্যসামগ্রী বিষয়ে একটা কিছু অন্যায় কাজ হইলেই, গিরুয়া সুরেশকেই দোষী সাব্যস্ত করিত আর তাহার অপরাধের কপা, গিন্নির কাছে এমন করিয়া ইনাইয়া, বিনাইয়া ও বানাইয়া বলিত, যেন সে পরম সাধু, আর যত নষ্টের গোড়া ঐ সুরেশ ছেলেটি। বক্সারে দুধ বড় সস্তা। তা ছাড়া ডেপুটি বাবুর ছেলেমেয়েও ত কম নয়; তাই গিন্নি মস্ত বড় কড়াই ভরিয়া দুধ রাখেন। যখন সেই খাঁটি দুধ কড়াইতে জল দিয়া রাখিয়া দেয়, তখন এমন পুরু সর পড়ে যে, দেখিলে অনেকেরই লোভ সামলানাে মুস্কিল হয়। বিকাল বেলায় স্বয়ং গিন্নি সেই সর কড়াই হইতে তুলিয়া ছেলেমেয়েদের জলখাবার লুচি ও বেগুন ভাজার সঙ্গে খাইতে দেন। কিন্তু আজ কাল প্রায়ই দুধের সর দেখিতে পাওয়া যায় না। কেমন করিয়া দেখা যাইবে? চাকর ২২ সােনার খনির সন্ধানে গিয়ার চুরিবিদ্যার যাদুমন্ত্রে যে সেই দুধের সর তাহার মুখের ভিতর দিয়া গিয়া পেটের মধ্যে ঢােকে। আবার গিয়া নিজেই গিন্নিকে গিয়া বলে- “মা, আপনাকে বল্লে আপনি বিশ্বাস কবেন না, কিন্তু আমি নিজে রান্নাঘরের বাইরে লুকিয়ে থেকে জানালার ফাক দিয়ে চেয়ে দেখেছি, আজ বামুনঠাকুর দুধের সমস্ত সরখানাই তুলে নিয়ে নিজেই তা খেয়েছে।” গিন্নি সুরেশকে কাছে ডাকেন, তার পরে জজ্ঞাসা করেন—“হ। গ বামুনঠাকুর, সত্যি করে বল, তুমি কি দুধের সর চুরি করে খেয়েছ?” সুরেশ ত এই জঘন্য কথা শুনিয়াই অবাক হইয়া যায়। ছি! ছি! তাহার প্রাণ গেলেও সে কি এমন ঘৃণিত কাজ করিতে পারে? তাহার পরে সুরেশের এমন কান্না পায়, সে চুপটি করিয়া দাড়াইয়া থাকে। তখন গিন্নি তাহার বিষ মাখানাে ভাষায় গালাগালি করিতে থাকেন। ছেলেটির দুই চোখ দিয়া ঝঝর করিয়া জল পড়িতে থাকে। গিন্নি বলেন- “আহাম্মক, ধরা পড়েছে কি না, তাই এই কান্না!” চাকর গিয়ার মাসে মাইনে বটে সাত টাকা, কিন্তু সে যখন রাত্রে কল্কা পেড়ে ধুতি পরিয়া, সুন্দর ছিটের জামা গায় দিয়া, পান খাইয়া, ঠোঁট রাঙ্গা করিয়া বন্ধুদের সঙ্গে ঘূৰ্তি করিতে বাহির হয়, তখন কে বলিবে সে কুয়া হইতে জল তুলিবার, ডেপুটি বাবুর গায়ে তেল মাখিবার, বাজার হইতে মাছ তরকারি কিনিবার চাকর। মনে হয় সে যেন ডেপুটি বাবুরই অতি নিকট সম্পর্কীয় আত্মীয়। কাজেই এই বাবুগিরির দায়ে পড়িয়া তাহার চুরি করিতে হয়। কিন্তু আগে কাত্যায়নী দেবীর কাছে ধরা পড়িবার ভয়ে গিয়ার চুরি করিতে বুক কঁপিয়া উঠিত। এখন ভাল মানুষ সুরেশকে পাইয়া তাহার চুরি করিবার বেশ সুবিধাই হইয়াছে। কাত্যায়নী দেবী নিজেই ভাড়ার ঘরের তালা খুলিয়া সুরেশকে রান্না করিবার চাল, ডাল, তেল, ঘি ও মা বারিহ করিয়া দিয়া যান। কিন্তু দরকারি কাজের অষ্ঠ সুরেশ একটু রান্না ঘরের বাহিরে গেলেই বিপদ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ ২৩ সেই সময়ে গিরুয়া কিছু চাল, কিছু ডাল, কিছু তেল, কিছু ঘি চুরি করি বেই। তাই এক এক দিন খাবার সময় ভাত কম পড়িয়া যায়, ডাল তর- কারিতে ভাল রকম ঘি মঙ্গা পড়ে না, খাবার জিনিসের সুস্বাদ হয় না। ইহা লইয়া প্রায়ই একটা হাঙ্গামা বাধিয়া যায় । গিন্নি রাগিয়া বাঘিনীর মতন গৰ্জন করিয়া বলিতে থাকেন- “বামুন ঠাকুর, আমি নিজের হাতে চাল মেপে দিলুম, তবু ভাত কম হল কেন? অত তেল, ঘি, মা তােমাকে দি, তবু তরকারির ভিতর ঘি মসলার স্বাদ পাওয়া যায় না কেন? ডাল তরকারিগুলো কি ছাই হয়েছে, একবার মুখে দিয়ে দেখ ত ! তুমি না সন্ন্যাসীর কাছে থাকতে ? তিনি বুঝি তােমাকে ধৰ্মকৰ্ম্ম না শিখিয়ে এই চুরি বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন? আমি বলছি, তুমি এখনও সাবধান হও, নইলে একদিন তােমার হাত বেঁধে দবােয়ান দিয়ে থানায় পাঠিয়ে দেব। সেখানে পুলিসের গু’তে খেলে একদিনেই তােমার চুরিবিদ্যা দূর হয়ে যাবে।” অসহায় সুরেশ নির্জনে একলাটি বসিয়া শুধুই কঁাদে আর বলে- যে জঘন্য কাজের কথা মনেও ভাবতে পারি নে, এই বাড়ীর লােকেরা কি না সেই কাজই আমি করেছি বলে বিশ্বাস করে ? আমি ত কোন অন্যায় কাজই করি নে। পরিশ্রম করে এদের রান্নাবান্না করতেই চেষ্টা করি, তবু এরা যখন তখন আমাকে গালাগালি দেয় কেন? তবে কি আমি শুধু দুঃখ সইবার জন্যই জন্মেছি ? আর ত আমি দুঃখ সইতে পারি নে। আমার যার। আপনার ছিলেন, তারা সকলেই মারা গেলেন, আমার কেন মৃত্যু হয় না ? হায়, আমি আর কত দুঃখ সহ্য করূব?” সুরেশের মন যখন ব্যথায় ভরিয়া উঠে, তখনি সে তাহার স্বপ্নের কথা ভাবিতে থাকে। আজ সে আপনা আপনি বলিতে লাগিল- “স্বপ্ন কি সত্য? সত্য হতেও পারে। হয় ত নদীতে নৌকা যাবার পরে বাবা সাঁতার দিয়ে তীরে উঠেছিলেন। তীরে উঠে আমার ২৪ সোনার খনির সন্ধানে একটি বােনকেও খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি মামাকেও দিন কত মাস ধরে খুজেছেন, তা কে জানে? আমাকে কোথাও খুজে না পেয়ে হয় ত মনের কষ্ট আর তিনি ডিব্ৰুগড় ফিরে যান নি। আমার উপরে তার যে বড়ই ভালবাসা ও আশা ভরসা ছিল। বাবা ডিব্ৰুগড় ফিরে না গিয়ে নিশ্চয়ই সােনার খনির সন্ধান করেছেন। কে বলবে, কত দিন খুঁজে খুঁজে কত পরিশ্রম করে সােনার খনি আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু খনি আবিষ্কার করলেই বা কি হবে ? চিনি যে এল।। কেমন করে সােনার পাহাড় থেকে সােনা ভেঙ্গে তেজে সহরে নিয়ে যাবেন? তাই হয় ত মনে মনে ভাবছিলেন, আজ যদি সুরেশ বেঁচে থাক্ ত, আর তাকে কাছে পেতুম, তা হলে আমার কাজের কতই সুবিধা হত। তিনি এই কথা মনে ভেবেছেন বলেই হয় ত তাকে স্বপ্নে দেখেছি।” সুরেশ মনে মনে কি যেন চিন্তা করিল। তার পরে আবার মনে , , বলিতে লাগিল, “আমার বােনকে স্বপ্নে দেখলুম কেন? হয় ত বাবাই জলের ভিতরে একখানি ঘােট ঘর তৈরী করে, সেখানে তাকে রেখেছেন। আমার বােনই হয় ত রান্না করে বাবাকে খাওয়ায়। “কিন্তু আমার বােন ঐ জঙ্গলে একলা থাকে কি করে ? হয়ত আমার মাও বেঁচে আছেন। তাঁকে বাবা নদীর তীরে অথবা আর কোথাও পেয়েছিলেন। মা-ই আমার বােনটিকে নিয়ে ঐ ছােট ঘর- খানিতে বাস করেন। আমার মায়ের যে খুব সাহস। “তবে কি যথার্থই আমার মা বেঁচে আছেন ? একটিবার --- একটিবার আমি যদি মাকে দেখতে পাই, তা হলে যত দুঃখ পেয়েছি, তাকে ত দুঃখ বলেই মনে হবে না। আমার মায়ের মতন এমন মা আর কারই বা আছে ? সমস্ত সরের মানুষ তার প্রশংসা কতেন। নেই ও দয়ার বেন তার সমস্ত হয় পূর্ণ ছিল। বাবা, বিস্তর টাকা চতুর্থ পরিচ্ছেদ উপার্জন কতেন, মা দুই হাত ভরে টাকা দিয়ে মানুষের দুঃখ দুর কতেন। আমি কি আমার মার কথা স্মরণ করে চোখের জল না ফেলে থাকতে পারি ?” সুরেশ যখন তাহার মার কথাই শুধু ভাবিতেছিল, তখন সেই ভিখারিণী মেয়েটি পাশের বাড়ীর এক বৃদ্ধের ফরমাস অনুসারে সারং বাজাইয়া গাহিতেছিল- খুঁজে খুঁজে ঘুরে বেড়া কোথায় আমার মা? কোথায় আমার মা? নয়নের জল যায় যে ঝরে, বারণ মানে না। ওগাে, পথের পানে আছি চেয়ে কবে মায়ের দেখা পেয়ে, ব্যথা আমার চলে যাবে, কেউ তা জানে না। কোথায় আমার মা ?” এ গানটি বুড়াদেরই শুনিবার মতন। এখানে ঈশ্বকেই মা বলা হইয়াছে। কিন্তু সুরেশ মানুষ মায়ের কথাই বুঝি। তাই গান শুনিতে শুনিতে তাহার মন আরো ব্যথায় ভরিয়া উঠিল। সে ভাবিল, যদি আকাশের পাখী হইতে পারিতাম, তবে এখনি উড়িয়া সােনার খনির সন্ধানে যাইতাম। সেখানে বাবার সঙ্গে ত দেখা হইতই, হয় ত আমার মাকে ও দেখিতে পাইতাম।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ সুরেশ যে ডেপুটি বাবুর বাসায় রান্না করে, তাহার নাম নরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়। নরেন্দ্র বাবুর এক দালা আছেন। তঁাহার নাম নগেন্দ্রনাথ, তিনি দার্জিলিং সহরের তিন মাইল দূরে একটি পাহাড়ের উপরে বাস করেন। সেই পাহাড়টি বড় সুন্দর। সেখানে নগেন বাবুর চায়ের বাগান আছে। তিনি বেশ টাকাওয়ালা লােক। হার বাড়ীখানিও বড় চমৎকার। বাড়ীর একদিকে পুপােদ্যান, পুষ্পেষ্ঠানের সামনে একটি লতাকু। আবার আর একদিকে একটি ঝরণা র পার মতন স্বচ্ছ জলরাশি বুকে লইয়া, ঝ ঝর্ শব্দ করিয়া, নীচু হইতে নীচুতে নামিয়া কোন্ সাগরের পানে যে ছুটিয়া চলিয়াছে, তাহা কেহই বলিতে পারে না। বাড়ীর চারিদিকেই সারি সারি বৃক্ষ, তাহার শাখায় শাখায় কত রকম যে পাখী, পাখীর কণ্ঠে কত যে সঙ্গীত, তাহাও বর্ণনা করা যায় না। নগেন বাবুর বাড়ীর একটু : ২ পাহাড়ের গায়ে গায়ে চায়ের গাছগুলি যে কি সুন্দর, তাহাও চোখে না দেখিলে বুঝানাে যায় না। এই সুন্দর স্থানে নগেন বাবুর গৃহের একটি সুন্দর কুঠুরিতে বসিয়া তাঁর মেয়ে সরলা কাঞ্চন-জঙ্গা দেখিতেছিল। তাহার অনুপম শােল দেখিতে দেখিতে সে মুগ্ধ হইয়া যাইতেছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘর মতন সুন্দর দৃশ্য আর কোথাও কিছু আছে কি না, তাহা কে বলিবে? দূরে দূরে নীল রঙের পাহাড়গুলি আকাশে যেন মাথা ঠেকাইয়া আছে, সেই পাহাড়ের উপরে রাশি রাশি বরফ জমিয়া রহিয়াছে ; সেই বরফের উপরে সূর্যের আলােক পড়ায় দেখিতে এমনই সুন্দর হইয়া উঠিয়াছে, যে দেখিয়া মনে হয় যেন দুরৈ এক জ্যোতির্ময় মায়াপুরী শশাভা পাইতেছে। ইহারই নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। সরলা যখন এই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিতে দেখিতে মনে মনে কত কি ভাবিতেছিল, তখন তাহার বাবা নগেন বাবু আসিয়া তাহাকে কহিলেন— পঞ্চম পরিচ্ছেদ ২৭. “সরলা, তুমি কি চিন্তা কছিলে বল দেখি? সরলা। বাবা, তুমি অনুমান করে বল না, আমি মনে মনে কি ভাব ছিলাম?” বাবা। আচ্ছা, শােন তবে বলি। তুমি ভাবছিলে ঐ সামনের বাগানের হরিত, রঙের গােলাপফুল টিই বেশি সুন্দর, না তােমার মুখখানিই বেশি সুন্দর! সরলা। নিজের মুখখানাই দেখতে খুব ভাল, না ফুটিই দেখতে খুব ভাল,—সেই কথা বুঝি বসে বসে কেউ ভাবে? বাবা। তা, প্রথম বারে ভুল হয়ে গেল। দেখ, দ্বিতীয় বারে তােমার মনের কথা কেমন ঠিক বলে দিচ্ছি। তুমি ভাবছিলে, এই কাজটা যদি পরীদের দেশ হত, আর যদি সেখানে সাতমহলা সােনার দালানে পরীদের রাণী সােনার সিংহাসনে বসে থাকতেন, এবং সে জায়গায় শূন্যের উপরে যদি একটি উদ্যান থাক্ত, আর সেই উদ্যানে যদি হীরার গাছে মুক্তা ফল ফলত; আর তুমি যদি এখনি সেই পরীদের দেশে যেতে পারতে, আর পরীদের রাণা যদি তােমার গলায় একটি মুক্তাহার পরিয়ে দিতেন তা হলে মুখে তােমার মন ভেসে যেত। সরলা ফিক্ করিয়া হাসিয়া ফেলিল। তাহার পরে কহিল-“আমি কি এখনাে সাত আট বছর বয়সের ছােট একটি মেয়ে যে রূপকথা শুনে বসে বসে শুধুই পরীদের দেশের যত সব আজগুবি কথা ভেবে ভেবে মাথা বামাবো? বাবা। কি ভাবছিলে তবে তুমিই বল। সরলা। আমিই বলছি। কাল আমার জন্মদিনে মা ভালবেসে কত জিনিসই আমাকে উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তার সঙ্গে যে ছােট একটি কবিতা লিখে দিয়েছেন, সেইটির কথাই ভাবছিলাম। মা লিখেছেন- ০ ২৮ সােনার খনির সন্ধামে সাজ সজ্জ ক্ষুদ্র সুখ মনি করে ও মুখ, বিলাসিতে বাড়ে দুখ মানব জলের। এনে, কাৰ্য্যে, অধ্যয়নে শক্তি আসে দেহ মনে, স্নেহ দয়া প্রতিক্ষণে করে পুণ্য মান ; ধৰ্ম্মই এ ধরণীতে পারে সুখ শান্তি দিতে, জানিবে মা, সেবাব্রতে নারীর সম্মান।” কি চমৎকার কথা! মা হয় ত এই কথার মতনই আমার জীবনটি দেখতে চান।” নগেন্দ্র বাবু কহিলেন—“তুমি ঈশ্বরের নিকটে প্রর্থনা কর, তিনি যেন তােমাকে তােমার মায়ের মনের মতন করেই গড়ে তােলেন। এই সময় ডাকঘরের পিয়ন আসিয়া কহিল-“বাবু, আপনার চিঠি আছে।” নগেন বাবু পিয়নের হাত হইতে চিঠিখানা লইয়া মনে মনে পড়িলেন। তাহার পরে কহিলেন—“সরল, এ যে তােমার কাকা বাবুর চিঠি। নরেন তােমার কাকীমা এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে আজই মেট্রেণে দার্জিলিং এসে পৌছিবেন।” সরলার প্রাণ আনন্দে ভরিয়া উঠিল। সে কহিল, “বাবা, তােমার কথা শুনে সুখে আমার মন নেচে উঠছে। আমি কাকাবাবু, কাকীমা আর তার ছেলেমেয়েদের গল্পই শুনতে পাই, এত বয়স হয়েছে, তবুও একটিবার তাদের দেখতে পাই নি। কেমন করেই বা দেখতে পাব ? তারা এখানে এলে ত?” সরল ছেলেবেলা হইতে নগেন্দ্র বাবুর সঙ্গে দার্জিলিঙ্গের এই পাহাড়েই থাকে। এখানে সাহেব মেম ছাড়া আর কোন বাঙ্গালী থাকেন না। সরলা মেমদেরই স্কুলে পড়ে, সাহেবদের ছেলেমেয়েদেরই দেখিতে পায়। নিজের আত্মীয়স্বজনের সম্বন্ধে হায় কোন জ্ঞানই নাই। গং পঞ্চম পরিচ্ছেদ নগেন বাবু বেলা দুইটার সময়ই সরলাকে সঙ্গে লইয়া দার্জিলিং ষ্টেসনে চলিলেন। বেলা চারিটার সময় মেল ট্রেণ ধীরে ধীরে ষ্টেশনে আসিতে লাগিল আর সুখে যেন সরকার বুক ঝাপিয়া উঠিল। সে বিল, কাকীমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাহার কিছুদিন খুব সুখেই কাটিয়া যাইবে। মেলট্রেণ ষ্টেসনে আসিয়া দাড়াইল। নগেন বাবু ভাইকে এবং ভায়ের ছেলেমেয়েদের যত্ন আদর করিয়া গাড়ী হইতে নামাইলেন। তাঁহারা সকলেই নগেন বাবুর বাসায় আসিয়া পৌছিলেন। কমলা দেবী হর্ষোৎফুল্ল নয়নে সবাইকে আদর আপ্যায়িত করিয়া লুচি, তরকারি, : মিষ্টান্ন ও ফল জলখাবার দিলেন। কিন্তু সরলার হাসিমাখা মুখখানি ম্লান হইয়া পড়িল, তাহার সকল সুখের কল্পনা মনের মধ্যেই মিলাইয়া : গেল। সরলার কাকীমা এবং কাকীমার ছেলেমেয়েরা তাহার সঙ্গে যে হাসিমুখে কথা কহিবে, অথবা তাহাকে যে একটু ভালবাসা দিবে, তাহা ত দূরের কথা, বরং তাহারা অনেকেই এমন এক দৃষ্টিতে সরলার পানে চাহিতে লাগিল, সে দৃষ্টির ভিতরে শুধুই হিংসার বিষ ; সে দৃষ্টি যাহার যাহার উপরে পড়ে, তাহার প্রাণ কাইয়া যায়। সরলা ভাবিতে লাগিল, “আমি কি এদের কাছে কোন রকম অপরাধ করেছি ? এরা আমাকে এমন হীনভাবে দেখছেন কেন? আমি কেমন করেই বা অপরাধ করব ? কোনদিন ত এদের চোখেও দেখি নি।” নরেন বাবুর স্ত্রী কাত্যায়নী এবং তাহার ছেলেমেয়েদের সরলার উপরে এই হিংসা ও বিদ্বেষ কেন? তবে কি ইহার ভিতরে কোন গুপ্তকাহিনী লুকানাে আছে? আছে বই কি! আমরা একটু সুবিধা পাইলেই সে কথা খুলিয়া বলিব। সরলার কাকীমার ছেলেমেয়েরা তাহাকে যে ভাবেই দেখুক না কেন, সে তাদেরই ভাল করিয়া খাওয়াইবার জন্য রানাঘরে মায়ের সােনার খনির সন্ধানে কাছে গেল। তাহার মা ও বামুনঠাকুরাণী নানারকম উৎকৃষ্ট খাদ্যসামগ্রী রান্না করার আয়ােজন করিতেছিলেন। সরলা তাহার মাতাকে কহিল-“মা, তােমার শরীরটা ত আজ তত ভাল নয়, তুমি কাকীমাদের কাছে গিয়ে কথা বল না, আমিই বামুনঠাকুরাণীর সঙ্গে থেকে রান্নাবান্নার আয়ােজন করে দি।” মা। তুমি কি তা কতে পারবে? অনেক রকম জিনিস রান্না করতে হবে। তােমার কাকীমার ছেলেরা রাত্রে খায় লুচি, তার সঙ্গে মাংস ত চাই-ই। কাকীমা সুজির রুটি আর মাগুর মাছের বােল খান, তা ছাড়া অন্য কিছুই তঁার সহ্য হয় না। বামুনঠাকুরাণী। এই রাত্রে মাগুর মাছ আবার কোথায় পাওয়া যাবে ? বামুনঠাকুরাণীর কথা শেষ হইতে না হইতেই কাত্যায়নী দেবী তাহাদের বামুনঠাকুরকে লইয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। বামুনী ঠাকুরটি কে, তাহা কি বলিয়া দিতে হইবে ? সে যে আমাদেরই চিরদুঃখী সুরেশ। সুরেশ সরলাকে দেখিয়াই চমকিয়া উঠিল। কি অশ্চৰ্য্য!' সে যে স্বপ্নে সােনার পাহাড়ের নিকটে বনের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখেছিল, যে মেয়ে বলেছিল, আমাকে কি তুমি চিন্তে পার না আমি যে তােমার বােন ; এই সরলা ত ঠিক সেই মেয়েটির মতন। সুরেশ অবাক হইয়া নীরবে এক পাশে দাঁড়াইয়া রহিল। কাত্যায়নী দেবী কহি- লেন—“এইটি আমাদের বামুনঠাকুর। আমার জন্য সুজির রুটি আর মাগুর মাছের ঝোল এই বামুনঠাকুরই তৈরী করূবে, নইলে অন্য রাধুনী খানিকটা লঙ্কাবাটা আর অনেকখানি মা দিয়ে বােল তৈরী কবে, আমি ত মুখের কাছেও নিতে পারব না।” কাত্যায়নী দেবী ত এই কথা বলিয়াই সরিয়া পড়িলেন। কমলা দেবী অল্পক্ষণ সুরেশের মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন। তাহার কোমল হৃদয় দেহে ভরিয়া উঠিল। তিনি সুরেশকে কহিলেন-“আমি নিজের হাতে ।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৩১ সুজির রুটি আর মাছের ঝােল তৈরী করব, তােমাকে রান্না করতে হবে না। তুমি আমার সঙ্গে এস, তােমার থাবার জন্য একটি ঘর ঠিক করে দিচ্ছি।” সুরেশ কমলা দেবীর সঙ্গে চলিয়া গেল। বামুনঠাকুরাণী সরলাকে কহিল—“তােমার কাকীমাদের খাওয়া দাওয়া ত নবাবী রকমের ; ঐ ঠাকুরটি কি সব রান্না করতে পারে? আহা, ছেলেটির বুঝি কেউ নেই? থাকলে কি এই কঁচা বয়সে দু-বেলা উনানের কাঠ ঠেতে আসে? ওর চেহারাটি যেন রাজার ছেলের মতন। যেন দেবতার ঘরে জন্মেছিল, কোন্ মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীছাড়া মানুষের কাছে এসে পড়েছে। কি বলব? ওর দুঃখেভরা মুখখানির পানে চাইলে যেন বুক ফেটে যায়। আজ যদি আমার ছেলে:অমূল্য বেঁচে থাক্ত, তবে এই ছেলেটির মতনই আঠার উনিশ বছ- বের হতো।” কমলা দেবী ফিরিয়া আসিয়া কহিলেন—“সরলা, ওদের বামুনঠাকুর এই শীতের দেশে এসেছে, অথচ তার এক গরমটি জামা কি গায়ের গরম কাপড় নেই। ওর যে আজ রাত্রেই শীতে ভয়ানক অসুখ করবে। আমার বড় র্যাপার আর গরম কম্বলটা নিয়ে এস ত; ছেলেটিকে এখনি দিয়ে আসি।” সরলা ব্যাপার আর কম্বল আনিয়া মায়ের কাছে দিল। তাহার মাতা উহা সুরেশকে দিয়া আসিলেন। সুরেশ রাত্রে শুইয়া ভাবিতে লাগিল- “আমি ত রান্না করবার বামুনঠাকুর, আমি লােকের জুতাে লাথির নীচেই বাস করি। আমাকে ত কেউ ভালবাসে না। ভালবাসা ত দুরের কথা, আমার পানে কেউ দয়া করে ফিরেও চায় না। তবু কমলা দেবী স্নেহ প্রকাশ করে গরম ব্যাপার আর কম্বল এনে দিলেন কেন? ভয়ানক শীতে আমার যদি মৃত্যুই হত, তাতে কমলাদেবীর কি আত যেত? তাঁর মেয়েকেই বা আমার বােন বলে কেন স্বপ্নে দেখেছিলুম? স্বপ্ন সবই মিথ্যা। আমার বাপ নেই, মা নেই, বােন নেই, কেউ নেই; শুধু আমিই দুঃখ সইবার জন্য বেঁচে আছি।”
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ রাত্রে সরলার শুইতে একটু দেরি হইয়াছিল, তাই সে একট, বেশী বেলায় উঠিল। উঠিয়া দেখিল, সে জন্মিয়া অবধি যে সকল ব্যাপার কখ- নই দেখে নাই, সেই সকল ব্যাপারই তাহাদের বাড়ীতে ঘটিতেছে। প্রথম ব্যাপারটি এই যে, সরলার কাকীমার ছেলে নীরদ আপনার ছােট বোন নলিনীকে ক্ষেপাইবার জন্য বলিয়াছে, “রাগ করাে না নলিনী, রাঙা মাথায় চিরুনী, বর আসবে এখনি।” নলিনী এই কথা শুনিয়াই নীরদের কাপড় ছিড়িয়া দিয়াছে। নীরদ ঠাস্ করিয়া নলিনীর গালে এক চড় মারিয়াছে। তাই নলিনী কখনো কঁদিতেছে, কখনাে বলিতেছে,-“হত- ভাগা, লক্ষ্মীছাড়া। সে দিন শুকিয়ে সন্দেশ 'চুরি করে খাচ্ছিল, আমি দেখতে পেলুম; তখন আমায় বল্লে, লক্ষ্মী বােনটি, তুমি মাকে সন্দেশ চুরির কথা বল না, তা হলে তােমায় খুব ভাল বাসব। আর আমাকে ক্ষেপাচ্ছেন, ধরে মাছেন; চুরির কথা বলে দেব না?” দ্বিতীয় ব্যাপারটি, নীরদের সঙ্গে এক ভূটিয়া স্ত্রীলােকের বিক আমরা স্বীকার করি, সেই খোড়া, সেই বেটে ভূটিয়ানীর ভাবী দেখিলে দুষ্ট ছেলেদের একটু কৌতুক করিবার লােত সামলান কি মুস্কিল হইয়া পড়ে। কিন্তু লােভ সামলাইতে না পারিলেও যে বিপদ কম নয়, তাহা একবার নীরদের কথায়ই বুঝিয়া দেখ। সে খোজ ভূটিয়ানীকে রাস্তা দিয়া যাইতে দেখিয়া কহিল-“খোড়া, তাং জাং, কার বাড়ীতে গেছলি খোড়া, কে ভেঙ্গেছে ঠ্যাং ?” ভূটিয়ানী এই ছড়ার ভাষা বুঝিলে হয় ত ততটা হাঙ্গামা করিত না। িসে কতকগুলি ব্যাং গ্যাং শব্দ শুনিয়া মনে ভাবিল, না জানি এই বাঙ্গালী ছেলেটা আমাকে কি বিশ্রি গালাগালিই দিচ্ছে। তাই সে ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ তাহার হাতের লাঠি উচু করিয়া নীরদকে তাড়া করিয়া একেবারে তাহার বাপের কাছে গিয়া উপস্থিত। নরেন বাবু ছেলের দুখানি কাণ ধরিয়া একটি ঘরের এক কোণায় দাড় করাইয়া রাখিয়াছেন। তৃতীয় ব্যাপারটি—বামুনঠাকুর সুরেশের উপরে নরেন বাবুর বড় ছেলে নবীনের অত্যাচার। নবীনের ঘুম ভাঙ্গিলেই বিছানার মধ্যে তাহাকে গরম গরম এক পেয়ালা চা দিতে হইবে। সে সেই চা খাইয়া, আলস্য ত্যাগ করিয়া বিছানা হইতে উঠিবে। কিন্তু আজ আর সুরেশ তাহার বিছানার মধ্যেই চায়ের পেয়ালা দিয়া আসিতে পারে নাই কেমন করিয়া দিবে? উনানে আগুন জ্বলিবে, তবে ত জল গরম চা তৈরী হইবে। কন্তুি সে কথা কে ভাবিয়া দেখে? নবীন ঠিক সময় চা পায় নাই বলিয়া সুরেশকে গালাগালি দিতে লাগিল। অন্য দিন সুরেশ এই রকম গালাগালি খাইয়া নিঃশব্দে হজম করে। আজ আর সে তাহা পারিল না। তাই সুরেশকে কহিল-“আমাকে এই রকম বিশ্রি গালাগালি দেবেন না, আমি আর সইতে পাব না।” নবীন কহিল—“সইতে না পেরে তুমি কি করূবে? আমাকে ফিরিয়ে আবার গালাগালি দিবে নাকি? এক রাত্তিরে দার্জিলিঙ্গের হাওয়াতেই তােমার এতটা আস্পর্ধা বেড়ে গেল!” নবীন এক ঘুসি মারিয়া সুরেশকে মাটিতে ফেলিয়া দিল। কিন্তু সরলাদের বামুনঠাকুরাণী উহা দেখিতে পাইয়া গর্জিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন—“তুমি বামুনের গায়ে হাত তােল? তােমার সাহস ত দেখছি কম নয়? এসেছ অন্যের বাড়ীতে, তারা যখন চা খায়, তুমিও তখন চা পাবে। তার আগে এই ছেলেটি কেমন করে তােমাকে চা খাওয়াবে?” নবীন কহিল—“রাধুনী হয়ে তুমি কেন এসেছ আমার সঙ্গে কথার কাটাকাটি কতে? তুমি এখান থেকে চলে যাও।”
৩৪ সােনার খনির সন্ধানে । বামুনঠাকুরাণী। আমি এখান থেকে চলে যাই, আর তুমি ছেলেটিকে ধরে মনের সাথে ঠ্যাঙ্গারে ? কেমন ? এই ত তােমার মতলব ? নবীন। তােমার সানেই যদি বামুনঠাকুরকে ধরে মারি, তা হলে তুমি কি কবে ? বামুনঠাকুণী। আমি কি কব ? একবার তােল ত এই ছেলের গায়ে হাত, তােমার কেমন সাহস দেখে নি। কাপুরুষ ! এই অসহায় ছেলেটার উপর জুলুম করূতে লজ্জা করে না? নবীন আর মুখের কথাটি বাহির করিতেও সাহস পাইল না সে মায়ের কাছে গিয়া সব বলিল। মা কি করিবেন ? তিনি এক রাত্রেই বুঝিয়াছেন, এ তাহাদের নিজের বাসা নয়, এখানে বামুনঠাকুরাণীর যথেষ্ট সম্মান আছে। ইহার কিছুক্ষণ পরেই সকলের, চা ও জলখাবার খাইয়া বেড়াইতে বাহির হইবার সময় উপস্থিত হইল। কিন্তু কাত্যায়নী দেবীর ছােট ছেলে- টিকে রাখে কে? পাহাড়ের উচু নীচু রাস্তায় সেই মােটা ছেলেটিকে কোলে লইয়া বেড়াইবার সাধ্য কাহার? তবে সেজন্য চিন্তা করিবার বিশেষ কোন কারণ নাই, বামুনঠাকুরই ত আছে। নিশ্চয়ই সে আর সকাল বেলায় পাহাড়ে বেড়াইবার আশা করিতে পারে না। কাজেই ছেলেটিকে তার ঘাড়ে চাপাইয়া কাত্যায়নী দলবল সহ বেড়াইতে বাহির হইলেন। আরে বাপরে বাপ! সেই একটুখানি ছেলেরই বিক্ৰম কত ! সে মুখে বলিতে লাগিল-“আমি মার সঙ্গে বেনাতে দাব, তােমার কোলে দাব না। আর হাতে বামুনঠাকুরের চুল টানিয়া, কাপড় ছিড়িয়া, তাহার গালে চড় মারিয়া তাহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। সরলা আজ আর বেড়াইতে যায় নাই, যাইতে ইচ্ছাও হয় নাই। দুরন্ত ছেলেটির কাছে গিয়া কহিল—“খােকা, আমি যে তােমার দিদি। আমার কোলে আসবে?" থােকা কহিল-“না, আমি মার কাছে পাব।”
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ '? সরলা হাসিয়া কহিল—“আচ্ছা, কোলে আসার অষুধ নিয়ে আসছি, দেখা যাবে তুমি আমার কোলে আসবে কি না!” সরলা একটি রেকাবে কয়েকটি রসগােল্লা লইয়া আসিয়া কহিল, “খােকা, বলত এ রেকাবে এ সব কি ?” থােক। অসগােল্লা, আমি খাব। সরলা। আমার কোলে না এলে রসগােল্লা খেতে পাবে না। থােকা। তুমি ভালো, আমি তােমার কোলে দাব। সরলা খােকাকে রসগােল্লা খাইতে দিয়া শান্ত করিল। তাহার পরে কতকগুলি খেলা ও পুতুল দেওয়ায় সে খেলাইতে লাগিল। সরলার মনে হইল, সুরেশ চা কি জলখাবার কিছুই খায় নাই। তাই সে ধীরে ধীরে অত্যন্ত সঙ্কোচের সহিত সুরেশের কাছে গিয়া কহিল—“আপনি কি চা খেয়েছেন?” সুরেশ। আমি ত চা খাই নে। সরলা। তা হলে কিছু জলখাবার এনে দিচ্ছি। সুরেশ। জলখাবারও আমি খাই নে। সরলা। এ শীতের দেশ কি না, সকালে কিছু না খেলে অসুখ আমি কিছু খাবার নিয়ে আসি। সুরেশ ভাবিতে লাগিল, আমার বােন সুহাসিনী বদি জলে ডুবে মারা না যেত, তবে ত আজ সে ঠিক এই মেয়েটির মতনই হত। তার যেমন ফুটফুটে রং, সুন্দর মুখ আর সুন্দর দুটি চোখ ছিল, এ বাড়ীর মেয়েটির গায়ের রং, আর চোখ মুখ ঠিক সেই রকম। আমি যদি স্বপ্ন না দেখে, সত্য সত্যই সােনার পাহাড়ের কাছে গিয়ে বাবাকে, আর তার একটু দূরে আমার বােকে দেখতে পেতুম, তা হলে আমার কোন দুঃখই থাকত না। আমার শুধুই ইচ্ছা হচ্ছে, এই সরলাকেই আমার আপনার বােন বলে মনে করি। মেয়েটি যে কি ভাল, তা আর বলতে পারি নে। সরল একটি রূপার পাত্রে লুচি, বেগুন ভাজা আর একটু মিষ্টান্ন সােনার খনির সন্ধানে আনিয়া দিল। সুরেশ উহা খাইতে চেষ্টা কবিল, কিন্তু এতই চোখের জল পড়িতে লাগিল যে, উহা আর সে ভাল করিয়া খাইতে পারিল না। প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়া গেল। তাহার পরে একদিন সরলা স্বপ্নে দেখিল, যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিতর হইতে একখানা সোনার রথে এক জ্যোতির্ময়ী নারী নামিয়া আসিতেছেন। রথখান। ধীরে ধীরে সরলার কাছেই আসিল। সেই রথের ভিতর হতেই দেবীর মতন সেই নারী নামিয়া সরলার মাথায় হাত রাখিলেন এবং আপনার অপার্থিব মেহ সরলার প্রাণে ঢালিয়া দিলেন। এমন সুবিমল স্নেহ সরল। আর যে কোথাও পাইয়াছে, তাহাই তাহার মনে হইল না। সরল। আনন্দে ও বিস্ময়ে পূর্ণ হইয়া সেই দেবীর অনুপম মূর্তির পানে চাহিয়া রহিল। দেবী কহিলেন, “আমিই তােমার মা। আর ঐ যে সুরেশ ছেলেটি, ওটি তােমারই আপনার ভাই। আহা, সে বড় দুঃখী, তাকে একটু যত্ন আদর করে এমন ত কেহ নেই; তুমি তার দুঃখ দূর করতে চেষ্টা করে। আমি আশীর্বাদ করছি, তুমি সুখী হও।”
সপ্তম পরিচ্ছেদ এই ঘটনার কয়েক দিন পরে সরলা তাহার মাতাকে কহিল- আমি ভারি মজার এক স্বপ্ন দেখেছি, তােমাকে তা বলব?” মা। ববে বই কি? * সরলা তাহার স্বপ্নের সমস্ত কথাই মাতাকে বলিল। সে মনে করিয়াছিল, মা স্বপ্নের কথাটা হাসিয়াই উড়াইয়া দিবেন। কিন্তু হঠাৎ কমলাদেবীর মুখ একেবারে স্নান হইয়া পড়িল। সরলা কহিল- সে কি মা, তােমার মুখ বিষন্ন হল কেন? তােমার মতন এমন ভাল মা আর কার আছে? আমি তােমায় ছেড়ে স্বর্গের দেবীকেও মা বলতে চাই নে। একটা মিথ্যা স্বপ্ন দেখলামই বা, তাতে কি হয়েছে?” কমলা দেবী আত্মসম্বরণ করিয়া কহিলেন—“সুরেশের কষ্ট দেখে তােমার বুঝি বড়ই দুঃখ হয়?” সরলা। মা, সেইছেলেটির অবস্থা দেখে তােমার কি দুঃখ হয় না? মা। আমার ত ছেলেটির মুখের পানে চাইলেই ব্যথায় বুক ভরে : উঠে সরলা। তাই বুঝি তাকে সব কাপড় জামা কিনে দিয়েছ ? মা। কিনে না দিলে সে কি তার ছেড়া কাপড় পরে আর ময়লা ছিটের জামা গায়ে দিয়ে দার্জিলিঙ্গের শীতে টিকে থাকতে পার ত? সরলা। আচ্ছা মা, বাবা কি সহর থেকে একটি ভাল বামুন জুটিয়ে দিয়ে কাকীমার হাত থেকে এই সুরেশকে মুক্ত কতে পারেন না? তা পালে সুরেশ হয় ত এখানকার ছেলেদের বাের্ডিংএ থেকে স্কুলে পড়তে পারেন। বাবা কত গরীব ছেলেকেই পড়ার খরচ দিচ্ছেন, সুরেশের খরচটা না হয় তিনিই দিতেন। মা। তা তুমিই তােমার বাবাকে সব কথা কেন বল না। আচ্ছা থাক, আমিই সব বলব।
সােনার খনির সন্ধানে সেই দিনই কমলা দেবী সরলার বাবাকে কন্যার স্বপ্নের কথা এবং আর সকল কথাই বলিয়া, কহিলেন, “আমাদের বানুনঠাকুরাণী বলেন, সুরেশ ছেলেটির গায়ের রং মুখের গড়ন ঠিক যেন সরলার মতন। আমার ত সরলার স্বপ্নের কথাই সত্য বলে মনে হয়। হয় ত যথার্থই এই ছেলেটি সরলার আপনার ভাই। ভাই বলেই তাকে দেখে অবধি তার উপরে সরলার কেমন একটা স্বাভাবিক স্নেহ জন্মেছে।” নগেন্দ্র বাবু গম্ভীর ভাবে একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, “সে দিন সুরেশকে আমি আমার ঘরে ডেকে নিয়ে তার জীবনের সব কথা জানতে চেয়েছিলুম। আয়েশ বলে, তার বাবা ডিব্রুগড়ের সিভিল সার্জন অর্থাৎ ডাক্তার সাহেব ছিলেন। একদিন ঝড়ের রেতে ব্ৰহ্মপুত্র নদীতে তাদের নৌকা ডুবি হয়। তার পরে আর তার বাবা, মা ও ছােট বােনয়ে কোনই খবর পাওয়া যায় নি। কিন্তু যে তারিখে সুরেশদের নৌ ডুবে যায়, তারই এক সপ্তাহ পরে আমরা আসামের পরাম তীর্থে গিয়েছিলুম। তীর্থ হতে ফিরে আসার সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর জেলেদের নৌকায় সরলাকে দেখতে পেয়েছিলুম। জেলের ঝড়ের রাতে সরলাকে নদীর তীরে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিল। তারা অনেক চেষ্টা করেই সরলার জীবন রক্ষা করেছিল। তােমার হয় ত মনে আছে, আমি যে দিন জেলেদের টাকা দিয়ে সরলাকে নিয়ে এলুম, সরলা সে দিন আধ আধ স্বরে বলেছিল, আমার নাম “দুহাসিনী”, তার পরেই ত আমরা তার সরলা নাম রেখেছিলুম। সুরেশ বলছে, সুহাসিনী তার ছােট বোনেরই নাম। তাই ত আমারও মনে হচ্ছে, হয় ত এই সরলা অরণেরই আপনার মায়ের পেটের বােন।” কমলা দেবী। মাগো! তা হলে কি হবে? সুরেশ কি সৰ আনতে পেরে সরলাকে আমাদের বাড়ী হতে নিয়ে যাবে ? নগেন্ত। নিয়ে যাবে কেন? সরলাকে আমরা যেমন রে সপ্তম পরিচ্ছেদ . মেয়ের মতন রেখেছি, তেমনি সুরেশকে ছেলের মতন আমাদের কাছেই রেখে লেখাপড়া শেখাব। তা হলে দুজনেই আমাদের আপনার হয়ে যাবে। এইবার সবার জীবনের একটি রহস্যকথা প্রকাশ হইয়া পড়িল সে যে নগেন্দ্রনাথ ও কমলাদেবীর মেয়ে নয়, তাহাদের পালিতা কন্যা, তাঁহারা যে সরলাকে আসামের এক জেলের কাছে পাইয়া মানুষ করিয়াছেন, তাহা এতদিন পরে বুঝিতে পারিলাম। সরলা যখন এই পরিবারে আসিয়াছিল, তখন তাহার বয়স খুবই কম ছিল কি না, তাই সে জানে নগেন্দ্রনাথ এবং কমলাদেবী তাহার আপনারই পিতা ও মাতা। কিন্তু সরকার কাকীমা কাত্যায়নী এবং তাদের বড় ছেলেরা সরলার সকল কথাই জানিত। সেই জন্যই সরলার উপরে তাহাদের ভয়ানক রাগ এবং কুটিল দৃষ্টি। তাহারা মনে করে, এ উৎপাত কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া নগেনবাবুর সমস্ত হৃদয় খানি জুড়িয়া বসিয়াছে? তার বাড়ী, ঘর, তাহার চা-বাগান, তঁাহার বিস্তর টাকা এ সকল হইতেই তাহাদিগকে বঞ্চিত করিয়া তিনি ঐ মেয়েটাকেই লিখিয়া দিবেন। এই অনুই ত কাত্যায়নী স্বয়ং এবং তার ছেলেরা সরলার পানে সুনজরে চাহিতেও পারে না; মুখে দুটি মিষ্টি কথা বলিয়া তাহাকে যে একটু মেহ দিবে, তাহাও দিতে সমর্থ হয় না। সরলার পিতা নগেন্দ্রনাথ একদিন তাহার ভাই নরেন্দ্রনাথকে নিন স্থানে ডাকিয়া কহিলেন, “তােমার বামুনঠাকুরটির সব কথ ই আমি শুনেছি। এক সময় তার বাবার কত চাকর বামুন ছিল, আর আজ সে চ করেরও অধম হয়ে তােমাদের কাছে বাস কছে। বাক্যের অালী, বার বালা এবং অপমান—এ সকলই তােমাদের কাছে সহ কতে হয়। সেই অনুই ছেলেটিকে আমি আমার কাছে রেখে লেখাপড়া শেখাতে চাই। এ বিষয়ে তােমার কি কিছু আপত্তি আছে ?” নৱেন বাবু কহিলেন, “সুরেশকে তুমি যদি রাখ, তা হলে ওর হাড় ৪০ সােনার খনির সন্ধানে জুড়ায়। ছেলেটিকে আজই আমি তােমার হাতে সপে দিচ্ছি ; অসহায় ছেলেটি তােমার কাছে থেকে সুখী হােক।” ইহার পরে একদিন নগেন্দ্রনাথ সুরেশকে সঙ্গে লইয়া সরলার কাছে উপস্থিত হইলেন এবং কহিলেন, “সরল, সুরেশ যে খুব ভাল সংস্কৃত জানে; আজ থেকে সুরেশই তােমাকে সংস্কৃত পড়াবে। সুরেশ তােমার শিক্ষক হলেও তাকে কিন্তু মাষ্টার মশাই বলে ডেক না, এ যে এখন আমাদের ঘরেরই ছেলে হ’লএকে দাদা বলেই ডেক। সুরেশও তােমাকে আপনার ছােট বােন বলেই মনে করবে।” নগেন্দ্র বাবু সুরেশকে কহিলেন, “তুমি দার্জিলিঙ্গের হয় ত কিছুই দেখতে পাও নি। এস, আজ তােমাকে বােটানিকেল গার্ডেনে নিয়ে যাই।” সুরেশের যথেষ্ট সৌন্দর্য্যজ্ঞান ছিল। সে তরুলতা ও ফুল বড়ই ভাল- বাসিত। তাই সে বােটানিকেল গার্ডেনে যখন একটি রমণীয় পুষ্পোদ্যান। ও তরুকুঞ্জের কাছে গিয়া দাঁড়াইল, তখন, নানা জাতীয় পুষ্পের ও নানা রকম বৃক্ষের সৌন্দর্যে তাহার মন মুগ্ধ হইয়া গেল। নানা রঙে রঞ্জিত এক একটি ফুলের পাপড়ি দেখিয়া সুরেশের মনে হইল, বেন স্বয়ং ঈশ্বর ফুলের উপরে রং ঢালিয়া রাখিয়াছেন। সুরেশ সে দিন আকাশে নানা রকম মেঘের খেলা, পাহাড়ে নানারূপ তরুলতার শােভা এবং উদ্যানের বুকে স্তবকে স্তবকে নূতন রকমের পুষ্প দেখিয়া অতিশয় আনন্দ লাভ করিল। এই সময়ে দার্জিলিঙ্গে ভারতবর্ষের প্রধান সেনাপতি আসিয়াছিলেন। সেই জন্য সেখানে একদিন বিস্তর সৈন্য কৃত্রিম-যুদ্ধ দেখাইয়াছিল। যুদ্ধ হইবার আগেই লােকেরা শুনিয়াছিল, যাহারা যুদ্ধের জায়গায় গিয়া কখনাে লড়াই দেখে নাই, তাহাদের এইকৃত্রিম যুদ্ধের মতন আশ্চৰ্য্য দেখিবার বিষয় আর কিছু নাই বলিলেই হয়। ইংরাজ সৈন্যরাই দুই পক্ষের দুই দল সৈন্য হইয়া কামান বন্দুক তলােয়ার লইয়া যখন যুদ্ধ করে, তখন তাহা দেখিলে একেবারে স্তব্ধ হইয়া থাকিতে হয়। এই কথা শুনিয়া কত সপ্তম পরিচ্ছেদ ৪১ লােকেরই সেই কৃত্রিম যুদ্ধ দেখিতে ইচ্ছা হইয়াছিল। নবীন ত যুদ্ধ দেখিবার জন্য ক্ষেপিয়া গিয়াছিল। কিন্তু কেমন করিয়া যুদ্ধ দেখিবে ? লাট সাহেব যাহাদের নামে এই যুদ্ধ দেখার কার্ড পাঠাইয়াছিলেন, তাহারাই যুদ্ধ দেখিতে পারিয়াছিল। নগেন্দ্র বাবুর নামে তিনখানা কার্ড আসিয়া ছিল। তিনি সরলা ও সুরেশকে সঙ্গে লইয়া যুদ্ধ দেখিতে গিয়াছিলেন। তাই নবীন জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিতে লাগিল। পাঁচ দিন আগে যে বামুন- ঠাকুরের দুটি কাণ মলিয়া দিলেও কিছু বলিবার কেহ ছিল না, আজ সে তারই জেঠামহাশয়ের প্রিয়পাত্র হইয়া পড়িল, জেঠামহাশয় তাহাকে উত্তম পােষাক পরাইয়া যুদ্ধ দেখাইবার জন্য সঙ্গে লইয়া গেলেন ? শুধু কি তাই, বামুনঠাকুরাণী ঠাট্টা করিবার মতলবে মুচকি হাসিয়া বলিল, “কি গাে নবীন বাবু, তুমি কত বড় হাকিমের ছেলে, লড়াই দেখবার জন্য তােমার নামে লাট সাহেব একখানা নিমন্ত্রণ চিঠি পাঠালেন না?” নবীন রাগে ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। সে যদি আজ কোন রকম মন্ত্রের শক্তিতে বনের বাঘ হইতে পারিত, তাহা হইলে সুরেশের হাড় মাংস ছিড়িয়া খাইত। হায়, হায়, তাহার বাঘ হইবারও উপায় নাই, সুরেশকে সে যে কিছু বলিবে তাহার সে পথও বন্ধ হইয়া গিয়াছে। নগেন্দ্র বাবু এখন প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে আপনার সুন্দর একটি ঘরে সুরেশ এবং সরলাকে লইয়া বসেন। প্রথমে সরলা একটি গান করে, তার পরে নগেন বাবু ঈশ্বরের একটি স্তোত্র পাঠ করেন। স্তোত্র পাঠের পরে তিনি সুমিষ্ট ভাষায় নানা দেশের ধার্মিক ও মহৎ লােকদিগের জীবনের কাহিনী বর্ণনা করেন। শুনিতে শুনিতে সুরেশের মন পুলকে ও শ্রদ্ধায় পূর্ণ হইয়া উঠে। সে মনে মনে বলিতে থাকে, “আমি খুব দুঃখ পাইয়াছি বটে, কিন্তু যদি লেখাপড়া শিখে খুব ভাল হতে পারি, তবে আর আমার কোন্ সুখের অভাব থাকবে ?” এক দিন নগেন্দ্র বাবু আর সুরেশ একটি ঘরে বসিয়া কথা ৪২ সােনার খনির সন্ধানে বলিতেছিলেন। এমন সময় সরলা, হাতে একখানি ছবি ও একটু কাগজ লইয়া সেখানে আসিয়া দাড়াইল। নগেন্দ্র বাবু নগেন্দ্র বাবু কহিলেন, “কি সরলা, কে প্রাইজ পেল ?” সরলা। আমি পেয়েছি। সরলা মেমদের কণ ভেন্টে অর্থাৎ আশ্রমস্থ স্কুলে পড়ে। তাহাদের প্রধান শিক্ষয়িত্ৰী একদিন কয়েকটি মেয়েকে বলিয়াছিলেন, সে দিন হাঙ্গেরীর রাজকন্যা তাপসী এলিজাবেথের ছবি দেখায়ে তার জীবনের অপূর্ব হিনী তোমাদের বলেছি। তিনি যখন ছােট মেয়ে, তখনই সবচেয়ে ঈশ্বরকে বেশী ভালবাসতেন। এই রাজ কুমারীই জাৰ্ম্মণীর রাণী হয়ে দুর্ভিক্ষের সময় রাজকোষের সঞ্চিত অর্থ দুঃখীদের বিতরণ করেছিলেন। তার স্বামী রাজা লুই জেরুজলামের যুদ্ধে যাবার সময় জাহাজেই মারা গেলেন। তখন বিধবা রাণীর অল্প বয়স। অথচ সেই বয়সেই তিনি সন্ন্যাসিনীর মতন নির্জনে বাস করে ঈশ্বরের উপাসনা আর কুষ্ঠরােগীদের শুশ্রুষা করতে লাগলেন। কই ? এমন রাণীর কথা আর ত কোথাও শুনতে পাইনে। তোমাদের ক্লাশের যে মেয়ে এই রাণীর ছবি দেখে সব চেয়ে একটি ভাল ছবি আঁকতে আর তার বিষয়ে ছােট একটি কবিতা রচনা করতে পাৰে, তাকে আমি পচিশ টাকা দামের বই প্রাইজ দেব।” সরলা এই প্রাইজটিই পাইয়াছে। নগেন বাবু খুসী হইয়া সরলাৰ আঁকা ছবিটি দেখিলেন এবং কহিলেন, “বেশ মিষ্টি করে তােমার কবিঅটি পড়ত, নি” সরলা পড়িতে লাগিল- “হে রাণী, কিরূপে দিয়ে সবি আপনার, তুমি বলে ঈশ্বরের, ঈশ্বর তােমার ? সুখেরে কবিলে তুচ্ছ কোন্ সুখ পেয়ে ? চাহিলে দুঃখীর পানে, কার পানে চেয়ে ?
সপ্তম পরিচ্ছেদ ৪৩ ? ভালবেসে ভালবাসা পেলে দেবতার, জননী হইলে তুমি কত অনাথার। দুই হাতে ধনরত্ন করিয়াছ দান, জগতে তুমিই রাণী তােমার সমান।” নগেন বাবু। বেশ ত সরলা, কবিতাটি ত মন্দ হয় নাই। কবিতাটি শুনিয়া সুরেশ ও সুখী হইল। এক রকম সুখেই তাহার দিনগুলি কাটিয়া যাইতেছিল। কিন্তু সুরেশের এই সুখ কাত্যায়নী দেবী সহিতে পারিলেন না। তাঁহার চোখ টাটাইতে লাগিল। তিনি বলিতে লাগিলেন, “বামুনঠাকুর যে হঠাৎ নবাব হয়ে পড়লো।” শুধু কি তাই ? কাত্যায়নী শুধুই সুরেশকে জব্দ করিবার একটা মতলবে হঠাৎ দার্জিলিং ত্যাগ করিয়া বক্সারে যাইবার দিন ঠিক করিলেন। যাইবার দিন তিনি সুরেশকে সঙ্গে লইয়া যাইবেনই। তিনি অনেক দিন ধরিয়া সুরেশকে রান্নাবান্না এবং না শিখাইয়াছেন কি? তুমি বাড়ীতে দুজন সাহেব- সুবাকে নিমন্ত্রণ করিবে? তা কর না কেন, সুরেশ প্রথম শ্রেণীর বাবুর্চির মতন খানা তৈরী করিয়া সাহেবকে খাওয়াইবে। তার পরে লুচি বল পােলাও বল, পিঠে পায়েস যা বল না কেন, একবার মুখের কথা বাহির করিলে সে ঠিক ফরমাস মতন জিনিষগুলি তৈরী করিবে। এখন কি না কাত্যায়নী সেই সুরেশকেই পথে কুড়িয়ে পাওয়া একটা মেয়ের মাষ্টার [রিয়া রাখিয়া যাইবেন? তা তােমরা দশজনে তার নিন্দা করিতে হয় কর, ও রকম নিল। তার ঢের শুনা আছে, তিনি কিছুতেই সুরেশকে মার্জিলিং রাখিয়া যাইবেন না। যখন বক্সারে তার বাক্যের বাণ খেয়ে পাড়েঠাকুর পলাইয়া গিয়া হাড়ে বাতাস লাগাইবে, তখন কি তিনি এই সে তাহার প্রকাণ্ড শরীরটি লইয়া উনানের কাছে কাঠ ঠেলিতে ইিবেন? তাহা তিনি পারিবেন না।
৪৪ সােনার খনির সন্ধানে নরেন বাবু নিরুপায় হইয়া দাদাকে কহিলেন, “আমাকে মাপ কর ; সুরেশকে তােমার হাতে সপে দিয়েও আবার ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে। নইলে এখনাে আমার ঘরে যে শান্তিটুকু আছে, সেটুকুও আর থাকবে না, আমায় ঘর ছেড়ে পালাতে হবে।” এ কথার পরে নগেন বাবু আর কেমন করিয়াই বা সুরেশকে আপনার বাড়ীতে রাখিতে পারেন? তিনি অতিশয় দুঃখের সহিত সুরেশকে নরেন বাবুর সহিত বক্সারে যাইতেই অনুরােধ করিলেন । তাহার মহৎ হৃদয় বতই দয়ায় পূর্ণ হােক না কেন, বুঝি বা সেই হৃদয়ের এক কোণে একটু স্বার্থ, একটু ভয় একটু উদ্দেশ্য লুকানো ছিল। সেজন্য তিনি খুব শান্ত হইয়া সুরেশকে আপনার কাছে রাখিতে পারিলেন না। সুরেশ যে দিন দার্জিলিং হইতে নরেন বাবুর সঙ্গে চলিয়া গেল, সে দিন তাহার মনের ভিতর যে কি রকম হইতেছিল, সে কথা তাহার অন্তর্যামী ঈশ্বর ছাড়া আর কে বুঝিতে পারিবে ? সে দিন কমলা দেবীর চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল, সরলা নির্জনে বসিয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইল। সুরেশ ত নরেন বাবুদের সঙ্গে আবার তার সেই পুরাণাে জায়গা বক্সারে আসিয়া পৌছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই এক ঘটনা ঘটিল। এখন সেই ঘটনার কথাই লিখিতেছি। নরেন বাবু একবার লাট সাহেবের সঙ্গে শিকার করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহারা আস্তে আস্তে এক ভীষণ অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করিবার পরে, লাট সাহেব বড়ই বিপদে পড়িলেন। তিনি একটু অসাবধান হওয়ায়, তাহার দুই দিক হইতে প্রকাণ্ড দুই বাঘ আসিয়া তাহাকে আক্রমণ করিল। তখন নরেন বাবু আশ্চৰ্য কৌশলে গুলি করিয়া একটা বাঘ মারিয়া ফেলিলেন। তাহাতেই লাট সাহেবের প্রাণরক্ষা হইল। সেই জন্য তিনি নরেন বাবুকে অনেক টাকা দামের একটি সাদা ঘােড়। উপহার দিয়াছিলেন। সেটি বিলাতের ঘােড়দৌড়ের ঘােড়া; খুব ছুটিতে পারিত। নরেন বাবু ঘােড়াটিকে সপ্তম পরিচ্ছেদ ৪৫ অতিশয় যত্নের সহিত রক্ষা করিতেন। তিনি নিজেই ঐ ঘােড়ার পিঠে চড়িতেন, তাহা ছাড়া আর কাহাকেও চড়িতে দিতেন না। কিন্তু নবীনের ঘােড়দৌড়ের বাতিক ছিল। সে গােপনে ঐ ঘােড় লইয়া সাহেবদের ছেলেদের সঙ্গে বাজি রাখিয়া ঘােড়দৌড় খেলিত। নরেন বাবু তাহার কোনই খবর রাখিতেন না। অবশেষে একদিন নরেন বাবু মফঃস্বলে যাইবার জন্য বেলা তিনটার সময় আপীশ হইতে বাসায় আসিলেন। তিনি বাসায় আসিয়া আস্তাবলে গিয়া দেখিলেন, তাহার ঘােড়া নাই। প্রথমে তিনি বাসার ভিতরে কাত্যায়নী দেবীকে গিয়া কহিলেন, “আমার ঘােড় কে নিয়ে গেল ?” কাত্যায়নী দেবী রাগ করিয়া কহিলেন, “আমি কি তােমার ঘােড়ার সইস? আমার কাছে ঘােড়ার খবর জাতে এসেছ কেন?” নরেন বাবু সুরেশকে কহিলেন, “সুরেশ, তুমি বল ত, কে আমার ঘােড়। নিয়ে গিয়েছে ?” সুরেশ বােবার মতন চুপ করিয়া রহিল। তাহার পরে নরেন বাবুর ধমক খাইয়া বাধ্য হইয়াই সে কহিল, “নবীন বাবু ঘােড় নিয়ে ঘােড়দৌড় খেলতে গিয়েছেন।” নরেন বাবু। সে কি শুধু আজই ঘােড়দৌড় খেলতে গিয়েছে, না প্রায়ই আমার ঘােড় নিয়ে ঘােড়দৌড় খেলতে যায় ? সুরেশ। তিনি যে দশ বার দিন আপনার ঘােড় নিয়ে ঘােড়দৌড় খে ত গিয়েছেন, সেই খবরই আমি জানি। নরেন বাবু আপীশের পােষাক পরিয়াই বৈঠকখানায় বসিয়া রহিলেন। বেলা পাঁচটার সময় যেমন নবীনের ঘােড় লইয়া বাসায় আসা, অমনি নরেন বাবু রাগে কাঁপিতে কাপিতে তাহার কাছে গেলেন। কাছে গিয়াই তিনি ঘােড়ার চাবুক লইয়া শপাং শপাং করিয়া নবীনকে মারিতে লাগিলেন। এদিকে কাত্যায়নী দেবী চীৎকার করিয়া বলিতে - = ৪৬ সােনার খনির সন্ধানে লাগিলেন, “ওগাে কে কোথায় আছ, শীগগির এস, দ্য যে আমার ছেলেকে মেয়ে খুন করলে।” কাত্যায়নীর চিৎকারে নরেন বাবুর বাসায় চারিদিকে লােক আসিয়া জড় হইল। তখন নরেন বাবু বৈঠকখানার ভিতর ঢুকিয়া পড়িলেন। সে দিন ত কোন রকমে কাটিয়া গেল। তাহার পরের দিনই সুরেশের বিপদ ঘনাইয়া আসিল। সে দিন নবীন ঘােড়ার চাবুক হাতে করিয়া সুরেশের সামনে গিয়া দাড়াইল। সুরেশই যে ঘােড়দৌড়ের সকল কথা তাহার পিতাকে বলিয়াছে, তাহা সে মাতার কাছেই শুনিয়াছিল। তাই তাহার প্রতিজ্ঞা, আজ সে এক দুই করিয়া গুণিয়া গণিয়া বামুনঠাকুরকে পঁচিশ ঘা চাবুক লাগাইবে। প্রথমেই সে কদৰ্য ভাষায় সুরেশের বাপ মা তুলিয়া গালাগালি দিতে লাগিল। কিছুদিন আগে হইলে, সুরেশ চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে সমস্ত গালাগালি হজম করিয়া ফেলিত। কিন্তু দার্জিলিং হইতে ফিরিয়া আসার পরে আর সে গালাগালি হজম করিতে পারিতেছে না। সুরেশ নবীনকে কহিল, “যদি আপনার বাবার কাছে সত্য কথা বলে অপরাধ করেই থাকি, তা হলে আমাকে গালাগালি দিন; কিন্তু আমার নির্দোষ পিতামাতার উল্লেখ করে ইতর ভাষায় গালাগালি দিবেন না।” নবীন। গালাগালি দিলে কি করবে? তুমিও আমাকে বাপ মা তুলে গালাগালি দিবে নাকি? সুরেশ। আমার মন তত ছোট নয়। তা ছাড়া আমার বাপ মা আমাকে এমন শিক্ষা দেন নাই যে, অপরের বাপ মা তুলে ইতর ভাষায় গালাগালি দেব। আপনি আবার আমার পিতামাতার কথা বলে মুখ থেকে কৰ্য্য ভাষা বের করলে, আমি এই হাত দিয়েই আপনার মুখ যা করতে চেষ্টা করব।
সপ্তম পরিচ্ছেদ ৪৭ নবীন। বটে। দার্জিলিং গিয়ে বােবার মুখে ভাষা ফুটেছে ? বুকের পাটা বেড়েছে ? রস, তােমাকে দেখাচ্ছি— নবীন সুরেশের চুলের ঝুটি ধরিয়া তাহার গায়ে এক ঘা চাবুক লাগাইল। সুরেশ নবীনের হাত হইতে চাবুক কাড়িয়া কহিল, “হা হতভাগ্য, তুমি জান না যে, আমি পাহাড়ে থাকার সময় পাহাড়ীদের কাছে কুন্তি শিখে আমার হাত পা লােহার মত শক্ত করেছি। এখানে তােমাকে রক্ষা করার মতন পুরুষ মানুষ কেউ নেই ; যদি এখনি গলা চেপে ধরে তােমাকে মেরে ফেলি, কে আমাকে বাধা দিবে, বল ত ? তােমাকে প্রাণে মায়ূব না। কিন্তু যে মুখে জঘন্য ভাষায় মানুষকে গালাগালি দাও, সে মুখের একটি দাত ভেঙ্গে আমি চলে যাব।” ভয়ে নবীনের মুখ হইতে একটি ও কথা বাহির হইল না। কিন্তু সুরেশ বজ্রমুষ্টিতে নবীনের মুখের উপরে এক ঘুষি মারিল। যথার্থই নবীনের একট। দাত ভাঙ্গিয়া গেল, বন্ বন্ করিয়া তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল, সে অজ্ঞান হইয়া পড়িল। সুরেশ তৎক্ষণাৎ বাড়ীর বাহির হইয়া এক গলিতে প্রবেশ করিল। সে ঘুরিতে ঘুরিতে আগের সেই ভিখারিণী বালিকার বাড়ীর সামনে গিয়া পৌছিল। বালিকা গাহিতেছিল- *কত বড় এই ধরণী”, স্নেহভরা কোলে তার, খুঁজলে পরে মিলবে না কি আশ্রয় একটু অভাগার ?” বালিকা অনেক দিন পরে সুরেশকে দেখিয়া তাহার কাছে গিয়া দাড়াইল। বুদ্ধিমতী মেয়েটি সুরেশের মুখ দেখিয়াই বুঝিতে পারি, বিপন্ন। সুরেশ, তাহার কাছে আপনার সকল কথাই বলিল। শুনিয়া বালিকা কহিল, “আপনি এখন ত আমাদের বাড়ীতেই আনুন। পরে ভেবে চিন্তে আর কোথাও চলে যাবেন। আমার বাবার Fাছে থাকলে কেউ আপনার কোন অনিষ্ট করতে পাবে না।” বালিকার দুর্জয় সাহস ও আশ্চৰ্য্য বুদ্ধির কথা সুরেশ ত ভাল করিয়াই p ৪৮ সােনার খনির সন্ধানে করিত। জানিত, তাই সে ভিখারিণীর পিতার কাছেই গেল। নবীনের জ্ঞান হওয়ার পরে সে যখন শুনিল, বামুনঠাকুর ভিখারিণী বালিকার বাড়ীতেই আছে, তখন সে কয়েক জন ভােজপুরী গুণ্ডা লইয়া, বামুনঠাকুরকে মারিবার জন্য সেই মেয়েটির বাড়ীর দরজার কাছে গিয়া উপস্থিত হইল। বালিকার পিতা প্রথম বয়সে পাটনে সিপাহির কাজ একবার যুদ্ধে খুব সাহস দেখাইয়াছিল বলিয়া সে বেশ ভাল একখানা তলােয়ার উপহার পাইয়াছিল। বালিকা বাপের সেই তলােয়ার হাতে লইয়া দ্বারের কাছে ভােজপুরী গুণ্ডার সামনে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার দুই চোখ দিয়া আগুন বাহির হইতেছিল। সে কহিল, “কোন্ গুণ্ডা আমাদের বাড়ীতে ঢুকবে, একবার সাহস করে ঢুকুক ত দেখি, আমি এই তলোয়ারে তার মাথা না কেটে কি আস্ত রাখব? তেমন মেয়েই আমি নই।” ঝড়ে যেমন তা কঁপে ভিখারিণী রাগে তেমনি কাপিতেছিল। গুণ্ডারা তাহাদের জীবনে কত বলবান পুরুষকে মুহুর্তের মধ্যে মারিয়া ফেলিয়াছে, কিন্তু আজ জ্যোতির্ময়ী বালিকার মূর্তি দেখিয়া, তাহাদের মনে হইল, যেন কোন্ দেবী তাহাদের সংহার করিবার জন্য দেবলােক হইতে নামিয়া আসিয়াছে। গুণ্ডারা নবীনকে লইয়া সরিয়া পড়িল। সুরেশ ভিখারিণীর গানের কথা ভাবিতে লাগিল। খুজিলে পরে প্রকাণ্ড ধরণীর কোথাও কি আমার একটুখানি আশ্রয় মিলিবে না- নিশ্চই মিলিবে। আমি কেন অন্যের অধীন হইয়া থাকি? আমি আজ . রাত্রেই ঈশ্বরের নাম করিয়া এই বৃহৎ জগতে বাহির হইয়া পড়িব। কোথাও আশ্রয় একটু পাওয়া যাইবেই। গভীর রাত্রে সুরেশ ভিখারিণীর বাড়ী হইতে বাহির হইয়া কোথায় যে চলিয়া গেল, কোথায় যে অগণ্য অসংখ্য লােকের সঙ্গে মিশিয়া পড়িল, নরেন বাবু বিস্তর সন্ধান করিয়া আর কোনই খোজ খবর পাইলেন না।
.
uৈr
.
দুইটা বনগরু করুণাময় বাবুর একজন সৈন্যকে আক্রমণ করিয়াছে
No text on this page.
অষ্টম পরিচ্ছেদ সুরেশদের নৌকা ডুবির পরে, তাহার মা ও বােনদের কি হইল, সেই বিষয়েই কিছু লিখিব। সুরেশের মা মনােরমা দেবী খুব সাঁতার জানিতেন। নৌকাডুবির সময়ে তিনি তাহার কোলের মেয়ে নির্মলাকে একহাতে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া অন্য হাতে সাঁতার দিতে লাগিলেন। তাহার সুমুখ দিয়াই খুব বড় একখানা কাঠ ভাসিয়া যাইতেছিল, তিনি সেই কাঠখানা ধরিলেন। উহাতে তাহার খুব সুবিধা হইল। জলের ঢেউ তাহাকে কাঠের সঙ্গে ঠেলিয়া ঠেলিয়া এক পাহাড়ের কাছে লইয়া গেল, তিনি তাড়াতাড়ি মেয়েটিকে লইয়া পাহাড়ের উপরে গিয়া উঠিলেন। তখন ভয়ানক ঝড় হইতেছে, চারিদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে, কোথাও কিছুই দেখা যায় না। কোথায় বা তাহার স্বামী, কোথায় বা তাহার আর অই ছেলে মেয়ে, কে সে কথার জবাব দিবে? তাহার পরে ঝড় থামিয়া গেল, রাত্রি প্রভাত হইল ; মনােরমা দেবী চাহিয়া দেখিলেন, চারিদিকে শুধু জল থই থই করিতেছে, তাহারই মাঝখানে তিনি মেয়েটিকে কোলে করিয়া বসিয়া আছেন। মেয়েটি অজ্ঞানের মতনই চাহার কোলে পড়িয়া ছিল, এখন জ্ঞান হওয়ায় সে বলিতে লাগিল, ও মা, বড় শীত, কাপড় জামা যে সবই ভিজে।” মেয়েটি আর একটু পরে কহিল, “মা, বাবা কোথায়? আমার দাদা ও দি কোথায়?” মনােরমা দেবী কঁদিতেছিলেন। মেয়েটিও মায়ের মুখের পানে চাহিয়া ; লাগিল। তাহার পরে একদল অসভ্য মনােরমা দেবীকে দেখিতে ইল, তাহাদের বিস্ময়ের আর সীমা রহিল না। অসভ্য মানুষগুলি মনে মল, নিশ্চয় জলদেবী আমাদের উপরে দয়া করিয়া দেখা দিয়াছেন। • • + ৪ সােনার খনির সন্ধানে তাহারা গ্রামের বিস্তর পুরুষ ও মেয়ের কাছে খবর পাঠাইল। তাহারা জলদেবীকে দেখিতে আসিল। দেবীকে দেখিয়া অনেকেই মাদল বাজাইয়া নাচ গান আরম্ভ করিল। শুধু তাহাই নহে; কেহ কেহ মনােরমা দেবীর সম্মুখে শূয়র বলি দিতে লাগিল। ভয়ে মনােরমা দেবী কঁপিতে লাগিলেন। তাঁহার মেয়েটি মায়ের বুকে মুখ লুকাইয়া রহিল। এই সময়ে অসভ্যদের একজন দোভাষী সেখানে আসিল। তার অসভ্যদের মধ্যে জন্ম হইলেও সে সাহেব ও বাঙ্গালীদের সঙ্গে মিশিয়া একটু সভ্য হইয়াছে। সে একটু বাংলা, একটু ইংরাজী, একটু আসামের ভাষা বলিতে শিখিয়াছে। দরকার হইলে সে দোভাষীর কাজ করে, অর্থাৎ একের কথা অপরকে বুঝাইয়া দেয়। এই লােকটি মনােরমা দেবীর কাছে গিয়া বাংলা ভাষায় সঁহার সকল কথা জিজ্ঞাসা করিল। মনােরমা দেবী নিজের বিপদের কথা। দোভাষীকে বুঝাইয়া বলিলেন। দোভাষী আবার তঁাহার কথা অসভ্যদের বুঝাইয়া দিল। অসভ্যেরা সভ্যতার আলাে পায় নাই বটে, কিন্তু তাহাদের অন্তরে স্নেহ, দয়া ও কোমলতার যে অভাব ছিল, তাহা নয়। অসভ্যদের দলপতি, তখনই সেই দেশের এক রকম পাক্কা লইয়া আসিতে তাহার লােকদিগকে হুকুম করিল। সেই পাল্কীতে মনাে- রমা দেবী অসভ্যদের গ্রামে বাইবেন। গ্রামখানি একটি উঁচু পাহাড়ের অতি উচ্চ শিখরে। অসভ্যেরা সেখানে তাহাদের দেশের অসভ্য রাজার রাজত্বে বাস করে। মনােরমা দেবী নিরুপায় হইয়া কন্যাটিকে লইয়া পাহাড়ের উপরে বাস করিতে সম্মত হইলেন। ছােট একটি পাথরের ঘর তাঁহার জন্য ঠিক হইল । মনােরমা দেবী অসভ্যদিগকে নানা জায়গায় পাঠাইয়া স্বামী পুত্র ও কন্যার অনেক খোঁজ করিলেন, কোথাও তাহাদের সন্ধান পাওয়া গেল না। তাই তিনি মনের দুঃখে আর ডিব্ৰুগড়ও ফিরিয়া যাইবার চেষ্টা করিলেন , পাহাড়ীদের দেশেই কন্যাটিকে লইয়া বাস করিতে লাগিলেন। পাহাড়- অষ্টম পরিচ্ছেদ ৫১ দের মেয়ে পুরুষ সকলেই তাহাকে দেবীর মতন মান্য করিতে লাগিল। তিনি স্বামীর কাছে বই পড়িয়া একটু ডাক্তারি শিখিয়াছিলেন। এখন পাহাড়ীদের অসুখের সময় অষুধ দিতে প্রবৃত্ত হইলেন। পাহাড়ে বাস করিবার তিন মাস পরেই মনােরমা দেবীর আর একটি কন্যা জন্মিল। তাহার নাম হইল সরযূ। পাহাড়ীর চাউল, মাংস, ফল ও দুধ আনিয়া দিত, মনােরমা দেবী উহাই রাঁধিয়া নিজে খাইতেন এবং দুটি মেয়েকে খাওয়াইতেন। পাহাড়ের সকল পুরুষ মেয়ে, এমন কি রাজা ও রাণী তাহাকে দেবীর মতনই মনে করিয়া যত্ন আদর করিতেন, কিন্তু কিছুতেই তিনি সুখী হইতে পারিলেন না। অনেক সময়েই ছেলের কথা, একটি মেয়ের কথা এবং স্বামীর কথা ভাবিতে ভাবিতে চোখের জলে ভাসিয়া যাইতেন। তাঁহার মেয়ে নির্মল বড়ই বুদ্ধিমতী ; সে যতই বড় হইতে লাগিল, ততই মাকে শান্ত করিবার জন্য নানা রকম চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইল। নিৰ্মলা পাহাড়ীদের কাছে তীর ধনুকের যুদ্ধ শিখিত। এক এক দিন সে পুরুষের মতন পােষাক পরিয়া তীর ধনুক লইয়া মায়ের কাছে আসিত ; তাহার পরে মাকে বলিত “মা, চেয়ে দেখ, আজ আমি তােমার ছেলে হয়েছি। আমাকে কেমন দেখাচ্ছে? ঠিক আমার দাদার মতন ? আচ্ছা মা, তুমি মনে কর কেন আমিই তােমার বড় ছেলে সুরেশ। আমি নিশ্চয়ই খুব লেখাপড়া শিখব, তার পরে কলিকাতায় গিয়ে মেয়ে স্কুলে চাকুরি নেব, টাকা উপার্জন করে তােমাকে এবং আমার ছােট বােনকে সুখী করব।” মা মেয়েকে বুকের ভিতরে নিয়া মনের স্নেহ তাহার প্রাণে ঢালিয়া দিতেন। মায়ের স্নেহ পাইয়া নিৰ্মলা তাহাদের সকল দুঃখের কথা ভুলিয়া ইত। কিন্তু হায়, মনােরমা দেবী তাহার মর্মান্তিক দুঃখের কথা ভুলিয়া যাওয়াত দূরের কথা, তিনি দিনরাত ছেলে মেয়ে ও স্বামীর কথা ভাবিতে জবিতে পাগলিনীর মত হইলেন। তঁাহার মাথা এমন খারাপ হইয়া গেল ।
সােনার খনির সন্ধানে বে, একদিন চীৎকার করিয়া নিৰ্মলাকে বলিতেন, “নিৰ্মলা, ঐ চেয়ে দেখ, তােমার দাদা ঘােড়ায় চড়ে কামান বন্দুক নিয়ে পাহাড়ীদের সঙ্গে যুদ্ধ কতে আছে। এস, এস, তার কাছে ছুটে গিয়ে বলি, পাহাড়ীদের সঙ্গে যুদ্ধ করাে না, ওরা যে আমাদের আপনার নােক, ওরা যে আমাদের বড় ভালবাসে। নির্মলা, ঐ যে তােমার দাদা যুদ্ধ আরম্ভ কল, দেখছ না, ঐ যে পাহাড়ীদের গায়ে বন্দুক দুড় ছে? তুমি তােমার দাদাকে বারণ করাে না।” আবার কিছুক্ষণ পরে মনােরমা দেবী বলিতেন, “ঐ দেখ, তােমার দিদি সােনার রথে চড়ে স্বর্গে তােমার বাবার কাছে চলে যাচ্ছে। মারে, তুই আমায় এইখানে ফেলে তাের বার কাছে চলে যানে; আমি যে তাের বড় দুঃখিনী মা ; তােকে না দেখে কেমন করে দিন কাটাব?” নিৰ্মলা আর কি করিবে ? সে তার মার গলা জড়াইয়া ধরিয়া শুধুই দিত। কিন্তু ইহার পরেই বিপদ ঘনাইয়া আসিল। একদিন রাত্রে নিৰ্মলা ও তাহার ছােট বােনটি ঘুমাইয়া আছে, এমন সময় মনােরমা দেবী ঘরের বাহির হইলেন। অবশেষে “ঐ যে আমার বড় ছেলে ও বড় মেয়ে আমায় ফেলে পালিয়ে যায়; যাই-যাই-আমিও ওদের সঙ্গে চলে যাই -বলিয়াই তিনি ছুটিয়া চলিলেন। যখন রাত্রি প্রভাত হইল, তখন মাকে দিখিয়া নিৰ্ম্মল ও সরযূর দুঃখের আর সীমা রহিল না ; দুটি বােন মাটিতে পড়িয়া দিতে দিতে বলিল,ও মা, তুমি কোথায়? ফিরে এস, একবার আমাদের কাছে ফিরে এস, তুমি ছাড়া আর যে আমাদের কেউ নেই।” পাহাড়ের লােকেরা কতই খুজিল, কিন্তু কোথাও মনােরমা দেবীকে পাওয়া গেল না। তখন বালিকা নিৰ্মলাই মায়ের মতন হইয়া ঘােট বােন সরযুকে মানুষ করিতে লাগিল। সে নিজে রান্না করিত, তাহাই দুই বােন খাইত। রাত্রি হইলে নিৰ্মলাই, বােনটিকে বুকের কাছে রাখিয়া এই খাতি।
অষ্টম পরিচ্ছেদ এই রকম করিয়া ত দুটি বােনের কিছুদিন কাটিয়া গেল। তাহার পরে পাহাড়ে এক বিভ্রাট উপস্থিত হইল। পাহাড়ের উপরে পাহাড়ীদের রাজ্য, কিন্তু নীচে ইংরাজের রাজা। ইংরাজ-রাজ্যে বড় বড় গাছ ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তবুও নীচে ইংরাজের একদল প্রখা সৈন্য আর সেই সঙ্গে তাহাদের একজন ইংরাজ সেনাপতি বাস করিত। সেনাপতির পাহাড়ীদের উপরে যে মল ভাব ছিল, তাহা নয়; কিন্তু গুর্খা সৈন্যগণ পাহাড়ের উপরে উঠিয়া পাহাড়ীদের উপরে এক এক সময় বড় জুলুম করিত। তাহারা পাহাড়ীদের বাগান হইতে তরকারি, গাছ হইতে ফল, গােল হইতে গরুর দুধ লইয়া আসিত, পয়সা দেবার সময় এক টাকার জায়গায় চারি আনার বেশী দিতে চাহিত না। গুর্খাদের হাতে বন্দুক। পাহাড়ীদের সম্বল তীর ও ধনু ; কাজেই তাহারা গুর্খাদের বড় ভয় করিত। একদিন পাহাড়ীরা দল বাঁধিয়া ইংরাজ সেনাপতির কাছে গুর্খাদের অত্যাচারের কথা সাহেব বিচার করিয়া, গুর্খাদের মাইনে কাটিয়া কিছু টাকা পাহাড়ীদের দিলেন এবং গুখাদের দশ ঘা বেত লাগাইলেন। ওখার • ভয়ানক চটিয়া গেল। তাহারা সমস্ত গুর্খা একত্র হইয়া পাহাড়ের উপরে উঠিয়া একদিন ছােট একটি গ্রাম লুট করিল। এইবার পাহাড়ীরাও প্রতিশােধ লইবার জন্য দল বাঁধিল। একদিন গুর্খাদের সেনাপতি একটি কাজের জন্য ডিব্ৰুগড় চলিয়া গেলেন, গুর্খারা তাদের একটি পর্ব উপলক্ষে সমস্ত দিন আমােদ প্রমােদ করিয়া রাত্রে নিশ্চিন্ত যনে ঘুমাইয়া পড়িল। সেই রাত্রেই পাহাড়ের লােকেরা দল বাধিয়া নিঃশব্দে আসিয়া প্রথমে গুর্খাদের বন্দুক, কামান অধিকার করিল, তাহার পরে তাহাদের কাটিয়া কুটিয়া চলিয়া গেল। এই ঘটনায় ইংরাজদের সঙ্গে পাহাড়ীদের যুদ্ধ বাধিয়া গেল। পাহাড়ী দর গায়ে যতই জোর থাকুক না কেন, ইংরাজের কামানের সামনে দাড়াইয়া করে এমন সাধ্য কাহার? ইংরাজ সৈন্যগণ কামানের গােলায় পাহাড়কে জানাইল।
৫৪ সােনার খনির সন্ধানে পাহাড় উড়াইয়া দিতে লাগিলেন। পাহাড়ের লােকেরা একদিন মাত্র যুদ্ধ করিল, তাহার পরেই অন্য এক পাহাড়ে পলাইয়া গেল। ইংরাজ সৈন্যগণ পাহাড়ীদের ঘর খুজিতে খুঁজিতে দেখিলেন, একটি ছােট পাথরের ঘরে দুইটি বাঙ্গালী মেয়ে। সৈন্যদের সঙ্গে একজন বাঙ্গালী ডাক্তার ছিলেন, তিনি নিম্মলার সঙ্গে কথা বলিয়া তাহাদের সকল দুঃখের কাহিনীই শুনিলেন। স্বর্গের দেব-বালিকার মতন দুইটি মেয়ের সুন্দর মুখের পানে চাহিয়া তাঁহার হৃদয় করুণায় ভরিয়া উঠিল। তিনি সেনাপতি সাহেবকে বলিয়া দুইটি বালিকার প্রতিপালনের ভার নিজেই গ্রহণ করিলেন। ডাক্তার সেনের নিজের ছেলেমেয়ে ছিল না, তাই তাহার স্ত্রী, নির্মুলা ও সরযুকে পাইয়া অত্যন্ত খুসী হইলেন। তাহারা দুটি বােন মিসেস সেনের কাছে পরম সুখেই বাস করিতে লাগিল। - ।
ইংরাজদের সৈন্য পাহাড়ীদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে যাইতেছে -৫৪ পৃষ্ঠা
No text on this page.
নবম পরিচ্ছেদ - । । ডাক্তার সেন একটি বড় সহরে বাস করেন। তঁাহার ঘরের ভিতরে নিৰ্ম্মল। বসিয়াছিল। ডাক্তার সেনের স্ত্রী কল্যাণী দেবী তাহাকে রামায়ণের লবকুশের কথা শুনাইতেছিলেন। সে ছেলেবেলা হইতে পাহাড়ের অসভ্যদের কাছে রহিয়াছে, এ সব কথা কিছুই জানে না। এ সব কথা বলিয়া কেন, সভ্য সমাজের সে কিই বা জানে ? নিৰ্মলা প্রথমে শুনিল, লবকুশ তাদের মা দুঃখিনী সীতার সঙ্গে বাল্মীকির তপােবনে থাকিত, গাছের ছাল পরিত, ফুল খাইয়া বাচিত তার পরে দুটি ভাই অযােধ্যার রাজপুরীতে আসিল। রামচন্দ্র দুইটিকে পুত্র বলিয়া কোলে তুলিয়া লইলেন তাহাদের প্রাণে ভালবাসা ঢালিয়া দিলেন ; সেখানে তাহাদের জন্য লক্ষ রকমের সুখের আয়ােজন হইল। এ সবই নির্মুলার ভাল লাগিল। কিন্তু সীতার পাতালপুরীতে প্রবেশের কথা শুনিয়াই তাহার মন দুঃখে ভরিয়া উঠিল। সে কল্যাণী দেবীকে কহিল, “লবকুশ আর কি তাদের মাকে দেখতে পারে না? সীতা কি আর পাতাল হতে ফিরে আসবেন བ། ༣༧ কল্যাণী দেবী। না, আর ত মা ফিরে আসবেন না। এই কথা শুনিয়াই নিলার চোখ জলে ভাসিতে লাগিল। কল্যাণী দেবী ভাবিলেন, নিম্মলার হয় ত নিজের মায়ের কথাই মনে পড়িয়াছে। তিনি কহিলেন, “লবকুশের মা সীতা আর পাতালপুরী হতে ফিরে অযােধ্যায় আসেন নাই, লবকুশ আর তাদের মাকে দেখতে পায় নাই বটে; কিন্তু তােমার মা অসভ্যদের দেশ থেকে ফিরে এলেও আসতে পারেন, তাঁর সঙ্গে তােমাদের দেখা হতেও পারে। তিনি পাগলের মত ছুটে যদি নূতন এক অসভ্যজাতির গ্রামে গিয়ে পৌছে থাকেন, সেই অসভ্য জাতির সােনার খনির সন্ধানে লােকেরা যদি তাকে যত্ন আদর করে রেখে থাকে, তিনি যদি ভাল হয়ে, তােমাদের সন্ধান করূতে কতে এখানে এসে পড়েন, তা হলে কি সুখের কথাই হয়।” এই সময় সরযূ ছুটিয়া আসিয়া কল্যাণী দেবীকে কহিল, “মা, রাস্তায় কি মজা, একবার এসে দেখুন না । সব ভূত বাজনা বাজারে চলে যাচ্ছে। দিদি, ভূত দেখবে ত আমার সঙ্গে এস না।” সরযু জন্মিয়। অবধি পাহাড়ের উপরে অসভ্যদের দেশেই ছিল। এখন সভ্যদেশের সহরের যা কিছু দেখে, তাহাই তাহার আশ্চর্য বলিয়া মনে হয়। চড়কপূজার একদল সং বাজনা বাজাইয়া গান গাহিয়া নাচিতে নাচিতে যাইতেছিল, সরযুর তাহাদেরই ভূত বলিয়া মনে হইয়াছে। নিৰ্ম্মল ও সরযূ দুজনেই বালিকা। তবু ছােট বােনটির আনন্দ দেখিলে নিৰ্মলার প্রাণ আনন্দে ভরিয়া উঠে। এই ত সেদিন সরযুর জন্মদিন গেল। কল্যাণী দেবী সরযূকে চমৎকার সিল্কের পােক পরাইয়া, নিজের হাতেই লুচি, তরকারি, মিষ্টান্ন তৈরী করিয়া খাওয়াইতে- ছিলেন, তাহা দেখিয়া বালিকা নিম্মলার মনে যে আনন্দ উচ্ছ্বসিত হইয়াছিল, তাহা কে বর্ণনা করিবে? যে সরযু পাহাড়ে থাকিতে মাসের মধ্যে একদিন স্নান করিত, ধূলায় গা ভরিয়া থাকিত, আধসিদ্ধ মাংস ও ফল খাইত, আজ সে কি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ! তাহার মাধুরীভরা মুখখানি দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। কিন্তু হায়, যাহারা নির্যাতন সহিয়া, দুঃখ পাইয়া, চোখের জল ফেলিয়াই দিন কাটাইবে তাহাদের এই সুখ আর কতদিনই বা থাকিবে ? হঠাৎ জ্বর হইয়া কল্যাণী দেবীর মৃত্যু হইল। ডাক্তার সেন নিরূপায় হইয়া নিৰ্মলা এবং সরযূকে তাঁহাদের কলিকাতার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলেন। তিনি নিজে বহুদিনের ছুটি লইয়া বিলাতে বাস করিতে লাগিলেন। ডাক্তার সেনের বড় ভাই আছেন, তিনি বিদেশে চাকুরী করেন। ।
নবম পরিচ্ছেদ তাহার স্ত্রী মাতঙ্গিনী দেবী ছােট ছেলে মেয়ে আর চাকর চাকরাণী লইয়া কলিকাতার বাড়ীতেই থাকেন। তিনি বাড়ীর কর্তী। নির্মল ও সরযুর ভার এখন তাহারই উপরে। তিনি সম্পর্কে কাত্যায়ণী দেবীর কেহ হন কি না, জানিতে বড় ইচ্ছা হয় ; কারণ, তাহার মনটি কাত্যায়ণী দেবীর মতনই যেন শক্ত লােহা দিয়া তৈরী; নচেৎ যে নিৰ্মলা সরযুর মুখের পানে চাহিলে পাষাণ গলিয়া যায়, তাহাদের দেখিয়া মাতঙ্গিনী দেবীর মন গলে না কেন? তিনি দুটি মেয়েকে ঝি-চাকরাণীর মত হীন অবস্থায় রাখিয়াছেন কেমন করিয়া? তাহারা কলিকাতা সহরে আসিয়া কড়া শাসনে ভয়ে ভয়েই থাকে। এই বাড়ীতে নিৰ্মলার উপরে বিশেষভাবে, একটি কাজের ভার পড়িয়াছে, সে গিন্নির ছােট ছেলেটিকে রাখে। তা, ছেলে ছােট হইলে হয় কি? তাহার জুলুম যে বড় কম, তাহা নহে। তাহার যত হিংসা ও যত রাগ ঐ সরযূর উপরে। সরযুর এক দিদি ছাড়া আর কে আছে? সে ভয়ে ভয়ে দিদির আঁচল ধরিয়া থাকিতে চায়, কিন্তু সরযু নিৰ্ম্মার কাছে আসিলেই সেই দুরন্ত ছেলে রাগে ফুলিতে থাকে। তাহার পরে নির্মলা যদি সরযুকে কাছে ডাকিয়া একটু আদর করে ;-ওরে বাপরে, সে ছেলে তখনি সরযূকে কামড়াইবে, তাহার চুল টানিয়া ছিড়িবে, তাহাকে ঠেলিয়া ফেলিবে, অবশেষে বলিবে, “তুই এখানে মরুতে এসেছিস্ কেন ? তাের ঘরে যা না।” দৈবাৎ কোন দিন সেই আন্ধারে ছেলেকে সরযূ যদি কিছু বলে, অমনি তার কান্না। কান্না শুনিয়া তাহার মা ছুটিয়া আসিয়া বলেন, “বাবা, তােমাকে কে কি বলেছে ? কে মেরেছে?” ছেলে বলে, “ঐ সরযু আমাকে মেরেছে।” মা সেই মিথ্যাবাদী ছেলের কথাই বিশ্বাস করেন এবং সরযূর গালে ঠাস করিয়া চড় মারিয়া বলিতে থাকেন—“বটে ! তােমার এমনি • ৫৮ সােনার খনির সন্ধানে সাহস, তুমি আবার আমার ছেলের গায়ে হাত তোল? ফের যে দিন হাত তুলবে, সেদিন ঐ হাত উনানের জলন্ত কাঠ দিয়ে পুড়িয়ে দেব না?” সরযু এখন আর দিনের বেলায় দিদির কাছে আসে না। আসে না ভয়েও বটে, অন্য কারণেও বটে। বাড়ীর ঝি হরিমতী অতটুকু মেয়েকে ধরিয়াই বাসন মাজায়। না মাজিলে আর কি রক্ষা আছে ? তাহার কাছে চড় চাপড় খাইতে হয়। তা সরযুর কথাই বা বলি কেন? নিৰ্মলাও হরিমতী ঝিকে ভয় করিয়া চলে, তাহার হুকুমে মাছ কোটে, মা বাটে, কয়লার উনান ধরায়, আবার বাসনও মাজে। দুটি বােন বে-ওয়ারিস, বাড়ীর যার খুসী, সে-ই দুজনের দ্বারা কাজ করাইয়া ল। তবু যদি দুটি বােন ভাল খাইতে পরিতে পারি, তাহা হইলেও তত দুঃখের কথা ছিল না। একবার চাহিয়াই কেন দেখ না, দুটি মেয়ের পরণে ময়লা দুইখানি কাপড় ; গায়ে সেমিজ কি জামা কিছুই নাই। খাবার, সকালবেলা কিছু মুড়ি, আর বেলা বারটায় ও রাত্রি দশটায় দুটি ভাত। বিকালে মেয়ে দুটির ভাগ্যে কিছুই জোটে না। তবে রাত্রিটি যে তাহাদের মুখে কাটে, সে কথা অস্বীকার করিবার যো নাই। নিৰ্ম্মল। বিছানায় শুইয়া, ছোট বােনটিকে বুকের কাছে টানিয়া তাহার সমস্ত ভালবাসা সরযুর প্রাণে ঢালিয়া দেয়। তখন ছােট- বােনের পুলকভরা মুখখানি নিৰ্মলার কাছে বড়ই মিষ্ট বলিয়া মনে হয়। একবার সরযূর জর হইল। সকাল হইতে বেল। চারিটা পর্যন্ত সে জলটুকুও স্পর্শ করিল না। বেলা সাড়ে চারিটার সময় ঘাম হইয়া তাহার জর ছাড়িল। তখন তাহার ভয়ানক ক্ষিদে পাইল। নিৰ্মলাকে কহিল, “দিদি, আমাকে কিছু খাবার দাও।” নির্মলা বাড়ীর কত্রীকে কহিল, “গিন্নিমা, সরযুর আজ জর হয়েছিল। এখন আর জর নাই। তার বড় ক্ষিদে পেয়েছে। একটু সাবু মিছরি দিন না, তাকে খেতে দেব।” . ০ নবম পরিচ্ছেদ গিন্নি ঝঙ্কার দিয়া বলিলেন, “আমার বাড়ীতে সাবু মিছরি জন্মায় নাকি যে, তুমি তা যখন চাবে তখনি পাবে। মিছরির দরকারই বা কি? আজই ত জ্বর হয়েছে, আর এখনি খাবার চাই ? দুই এক দিন কিছুই না খেয়ে থাকুক না, তা হলে আর ডাক্তার ডাকতে হবে , আপনা হতেই জ্বর সেরে যাবে।” এ কথার পরে নির্মলা আর কি বলিবে ? কিন্তু সরযু ক্ষুধার জ্বালায় বড়ই কাদিতে লাগিল। তখন নিৰ্ম্মল। এক মতলব করিয়া সাহসে বুক বাঁধিল। এই বাড়ীরই একটি স্নেহময়ী মেয়ে কয়েকদিনের জন্য শ্বশুর বাড়ী হইতে বাপের বাড়ী আসিয়াছিল। সে নিৰ্মলাকে উলের সূতায় মােজা এবং আরও কয়েক রকম জিনিষ তৈরী করিতে শিখাইয়া, কয়েক টাকার সূতা কিনিয়া দিয়াছিল। নিৰ্ম্মল। সেই সূতায় কয়েক জোড়া মােজা তৈরী করিয়াছিল। সে শুনিয়াছিল তাহাদের বাড়ীর একটু দূরেই। মেয়েদের একটি বাের্ডিং আছে। আজ নিৰ্মলা কয়েক জোড়া মােজা হাতে লইয়া বিক্রির জন্য, বাের্ডিংয়ের বাড়ীতে ঢুকিয়া পড়িল। সে দিন রবিবার, ছুটির দিন। বাের্ডিংয়েব মেয়েরা বসিয়া নানা কথা বলিতেছিল। একটি মেয়ের নাম নলিনী। সে অন্য মেয়েদের কহিল, “এবার বাড়ীতে যে হাসির ব্যাপার হয়েছিল, তা আর কাকে বলি? জানই ত, আমাদের রাম ও হরে এই দুইটি চাকর খুব ঘৃত্তি টুক্তি কতে ভাল বাসে। পূজার ছুটিতে আমার দাদা কলেজে কি অভিনয় করবার জন্যে এক দোকান থেকে রাজার পােক ভাড়া করে এনে ছিলেন। তিনি সেই পােষাক দোকানে পাঠাবার জন্য রামার হাতে দিলেন। রাম সেই পােষাক দোকানে না দিয়ে আপনার ঘরেই রেখে দিল। তার পরে একদিন দুপুর বেলায় পুরুষ মানুষ কেউ বাড়ীতে নেই, আমরা মেয়ের ভিতর বাড়ীতে শুয়ে আছি। এমন সময় রাম। বৈঠকখানায় পাড়ার চাকরদের ডেকে অভিনয় আরম্ভ করে দিল।
সােনার খনির সন্ধানে নিজে রাজার পােষাক পরে রাজা সেজেছে, আবার বৌদিদি তার চমৎকার একখানা রেশমি শাড়ী ধােপর বাড়ী পাঠাবার জন্যে রামার হাতে দিয়েছিলেন ; রাম। সেই শাড়ী হরেকে পরিয়ে তাকে রাণী সাজিয়েছে। অভিনয় আরম্ভ হবার পরেই হঠাৎ আমাদের কেরাণী বাবু এসে উপস্থিত। আর রামা যায় কোথায়? কেরাণী বাবু বাঘের মতন গর্জন করে বলে উঠলেন, “তবে রে নিলজ্জ বেহায়া, দুপুর বেলায় যাত্রা আরম্ভ করে দিয়েছি।” ননী বলে একটি মেয়ে কহিল, “তার পরে কি হল?” নলিনী কহিল, “কেরাণী বাবুর চীৎকার শুনেই আমরা বৈঠকখানা ঘরে গেলাম। সেখানে গিয়ে হেসে আর বাঁচিনে। হরে ছেলেটা দেখতেও বেশ সুন্দর, আর তার মাথায় ও লম্বা চুল। বৌদিদির শাড়ীখানা পরায়, ঠিক তাকে রাজবাড়ীর মেয়ে বলেই মনে হচ্ছিল।” ঠিক এই সময়ে নিম্মল। সেই মেয়েদের সামনে আসিয়া উপস্থিত হইল। মেয়েরা দেখিল, ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটি, কিন্তু পরণে অত্যন্ত মলিন একখানি কাপড়, গায়ে ত কিছুই নাই। দুঃখিনা মেয়েটির উপরে সকলেরই দয়া হইল। কয়েকটি মেয়ে আসল দামের চেয়েও কিছু বেশী দিয়া, নির্মলার হাতের মােজা কিনিয়া রাখিল। শুধু তাহাই নহে; মেয়েরা নিৰ্মলার বােনটির জ্বরের কথা শুনিয়া, বােডিং হইতেই কিছু পয়সা সংগ্রহ করিল; সেই পয়সায় কমলানেবু, বেদানা, বিস্কুট ও মিছরি কিনিয়া নিৰ্মলার হাতে দিল। নিল। বাড়ীতে পৌছিয়া ঐ সকল যখন সরযূকে খাইতে দিল, তখন তাহার আর সুখের সীমা রহিল সে কহিল, “দিদি কমলানেবু, বেদানা ও বিস্কুট শুধু আমিই কেন খাব? তুমিও খাও।”
দশম পরিচ্ছেদ নিৰ্মলা ও সরযূ যে বাড়ীতে থাকে, তাহারই নিকটে এক বাড়ীতে যাত্রা হইতেছিল। সেখানকার বাজনা ও গান শুনিয়া বাড়ীর আকারে ছেলেটি যাত্রা শুনিতে যাইবার জন্য আব্দার আরম্ভ করিল। অমনি মায়ের হুকুম হইল, “নিৰ্মলা, এখনি থােকাকে যাত্রা শুনাতে নিয়ে যাও।” তা, যাত্রা শুনিতে যায় ত যাউক না, তাহার গলায় আবার সােনার হার পরাইয়া ভিড়ের মধ্যে পাঠানাে কেন ? গিন্নির যে কি রকম বুদ্ধি, তাহা কে বলিবে? নিৰ্ম্মল সেই আকামে ছেলে আর নিজের বােন সরযূকে লইয়া যাত্রা শুনিতে গেল। তাহারা অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলিয়া যাত্রার আসরে ঢুকিল। সে দিন ‘রামরাবণের যুদ্ধ’ যাত্রা হইতেছিল। প্রথমে জন কয়েক লােক গায়ে লােম লাগাইয়া, মুখে কালি মাখিয়া, পেছন দিকে একটি লেজ জুড়িয়া হনুমান সাজিয়া আসরে আসিল। তার পরেই রাক্ষসের দল দেখা দিল। 'তাহাদের মুখে, রঙমাখা দাত বাহির করা রাক্ষসের মুখােস। বাজনা বাজিল, সেই সঙ্গে রাক্ষস আর হনুমানের দল হাতে এক একখানা গাছের ডাল লইয়া ধেই ধেই নাচিতে লাগিল। নাচের পরে দুই দলের কথা কাটাকাটি চলিল। এক রাক্ষস এক বানরকে কহিল- “কোথায় সে হনুমান রয়েছে পালায়ে, যে দিল সােনার শঙ্কা আগুনে জ্বালায়ে । সে ব্যাটার রক্ষা নাই রাবণের রাগে, কাণ ধরে নেব তারে সকলের আগে।
সােনার খনির সন্ধানে
রাঙা রক্ত খাব এই দাতে পেট চিরে,
দেখিব কেমন তোেরা ঘরে যাস্ ফিরে ?”
একটা বানর ঐ কথার জবাবে কহিল,
“কি বলিস্? রক্ত খাবি? হায়, হায়, হায়,
বীর হনুমান সে কি রাবণে ডরায় ?
গালে চড় মেরে দেব দাত ভেঙ্গে তাের ;
সীতারে করিল চুরি দশানন চোর।
জানে কি সে রামচন্দ্র এই ধরণীর,
ধাম্মিক মহৎ শ্রেষ্ঠ দয়াবান্ বীর ?
সীতা বরণীয় নারী দেবীর মতন,
দেবর দেবতা সম সাহসী লক্ষণ।
কোথায় রাবণ ? দশ মুণ্ড ছিড়ে তার,
রামের চরণপদ্মে দেব উপহার।”
আবার বাজনা বাজিল, দুই দলে লড়াই আরম্ভ হইল। নিৰ্মলা ও
সরযু উহা দেখিয়া হাসিয়াই অস্থির। অবশেষে দুঃখিনী সীতা আসরে
আসিলেন, রাক্ষুসীরা তাহার কোমল অঙ্গে প্রহার করিতে লাগিল
সীতার দুঃখ দেখিয়া নিৰ্ম্মল। আর চোখের জল রাখিতে পারিল না।
যাত্রা শেষ হইলে পরে, মানুষ গুলি ঠেলাঠেলি করিয়া আসর হইতে
বাহিরে আসিতে লাগিল। এই গােলমালের ভিতর কখন কে যে, বাড়ীর
দুরন্ত ছেলেটির গলার হার চুরি করিল, নিৰ্ম্মা তাহা বুঝিতে পারিল না।
সে ছেলেকে লইয়া বাড়ীতে আসার পরে গিন্নি বললেন, “খােকার সােনার
হার কি হল?”
আর হার কি হইল? সে ত চুরি গিয়াছে। কিন্তু গিন্নি নির্মল
ও সরযুকে কহিলেন, “ও হার তােমৱাই চুরি করেছ, এখনি তােমাদের
ধরে পুলিশের হাতে দেব।”
।
দশম পরিচ্ছেদ সমস্ত দিন এই কথা শুনিয়া ভয়ে নির্মলার মুখ শুকাইয়া গেল। সে কহিল, “গিন্নি মা, সত্যি বলছি, আমরা হার চুরি করি নি ; আপনার দুটি পায়ে পড়ি, আমাদের পুলিশের হাতে দিবেন না; পুলিশ যে মেরে আমাদের খুন করূবে।” গিন্নি বলিলেন-“খুন ককূলে আমার কি হবে? পুলিসের হাতে না দিলে আমিই কি ছেড়ে কথা বলব নাকি? মেরে হাড় গুড়ো করে দেব না?” গিন্নি একখানা লােহার হাতা হাতে লইয়া দুটি মেয়েকে খুব মারিলেন, তাহার পরে একটি ছােট ঘরে তাহাদের বন্ধ করিয়া রাখিলেন ; বলিলেন, “আজ আর তােমাদের নাইতেও দেব না, খেতেও দেব না। এই ঘরেই দুজনকে বন্ধ করে রাখব।” দুটি বােন অনাহারে বেলা চারিটা পর্যন্ত ঘরের ভিতরেই বন্ধ রহিল। তাহার পরে কি জানি কি ভাবিয়া গিন্নি ঘরের দরজা খুলিয়া দিলেন। কিন্তু কিছু খাইতে দেবার নামও করিলেন না। অথচ তিনি মনে মনে বেশ বুঝিয়াছেন, ঐ দুটি মেয়ের কেহই হার চুরি করে নাই, তেমন স্বভাবই তাদের নয়; ভিড়ের মধ্যে চোরই হার চুরি করিয়াছে। নিৰ্মলা আজ আবার তাহার ছােট বােনটিকে সঙ্গে লইয়া মােজা বিক্রি করিবার জন্য সেদিনকার সেই মেয়েদের বাের্ডিংয়ে চলিল। আমরা অনেক দিন আগে যে সরল মেয়েটির কথা বলিয়াছি, সে পড়াশুনা করিবার জন্য দার্জিলিং হইতে কলিকাতা আসিয়াছে এবং মেয়েদের বাের্ডিংয়েই আছে। আজ ছুটির দিন কি না, তাই সে একটি ঘরে বসিয়া ছবি আঁকিতেছিল। এমন সময়ে তাহারই ঘরের কাছে নিৰ্মলা ও সরযু গিয়া দাড়াইল। সরলা চাহিয়া দেখিল পরীর মতন সুন্দর দুটি মেয়ে, অথচ তাহাদের পরণের মলিন কাপড় দেখিয়া মনে হয়, তাহারা বড়ই দুঃখিনী।.সরলা মেয়ে দুটিকে কাছে ডাকিয়া, বড় মেয়েটিকে কহিল, “তোমার নাম কি ?
৬৪
সােনার খনির সন্ধানে
নিৰ্মলা। আমার নাম নির্মলা।
সরলা। তােমরা কোন্ জাত ?
নিলা। বামুন।
সরলা। তুমি কি কর ?
নিৰ্ম্মল।। ছেলে মেয়ে রাখি।
সরলা। তােমাদের আর কে আছেন ?
নিৰ্মলা। কেউ নেই ।
সরল। সে কি ? তােমাদের কেউ নেই? তবে তােমরা কোপায়
থাক ?
নিৰ্ম্মল তাহাদের সমস্ত কাহিনী সরলাকে বলিল।
সরল। শুনিয়া
চমকিয়া উঠিল। সে নিৰ্মলাকে কহিল, “তুমি বলছ, তােমাদের এক দাদা
ছিলেন, তিনি জলে ডুবে মরেছেন, সে দাদার নাম কি ছিল ?”
নিৰ্মলা। সুরেশ।
সরলা আপন মনে বলিল, “কি আশ্চৰ্য্য ! এই দুটি মেয়ে তা হলে
সুরেশ দাদারই বােন্। তিনি ত আমাকে তার জীবনের কাহিনী
বলার সময় বলেছেন, নির্মলা নামে তার একটি বােন ছিল।
চেহারা দেখলে ত সুরেশ দাদার কথাই মনে পড়ে।
সরলা তৎক্ষণাৎ মেয়ে দুইটিকে লইয়া বাের্ডিংয়ের কত্রীর কাছে গেল।
অনেক মেয়ে সেখানে আসিয়া ভিড় করিয়া দাড়াইল। সরলার অনুরােধে
নিৰ্মলা আবার করুণরে তাহাদের সমস্ত কাহিনী বলিয়া গেল। সরণ
কহিল, “মেয়ে দুটি তাদের যে দাদার কথা বলছে, তিনি বেঁচে আছেন।
কিছুদিন দার্জিলিঙ্গে আমাদের বাড়ীতে তিনি ছিলেন। আমার মা তাকে
আপনার ছেলের মত এবং আমি তাকে ভাইয়ের মতনই মনে করতু।
কিন্তু এখন তিনি নিরুদ্দেশ, কোথায় যে আছেন, আমরা তা কিছুই
জানি না।
দশম পরিচ্ছেদ বাের্ডিংয়ের কী কহিলেন, “সরল, আর এক আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই দুটি মেয়ের চোখ মুখ একেবারে তােমারই মতন। মেয়ে দুটি যেন তােমারই ৰােন।” দুটি মেয়ের উপর সরলার মনটা যেন একেবারে ৰুকিয়া পান, ভালবাসায় তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। সরলা কহিল, “তােমাদের মুখ দেখে মনে হয়, তােমরা দুজনেই খুব কেঁদেছ; কি হয়েছিল, বল ত?” আজ তােমরা কিছু খেয়েছ ?” নিৰ্মলা। আজ আমরা কিছুই খেতে পাই নি। গিন্নির ছেলের হার চুরি গিয়াছে কি না,-আমরাই তা চুরি করেছি মনে করে গিন্নি আমাদের একটি ঘরে সমস্ত দিন বন্ধ করে রেখেছিলেন। বােডিংয়ের মেয়েরা কহিল, “মাগাে মা ! গিন্নি কি রকম মানুষ? তােমরা আবার হার চুরি করবে? এমন মিথ্যা কথায় কার বিশ্বাস হবে ? সয়লার দুই চক্ষু হইতে অশ্রু ঝরিতে লাগিল। সে এই কয়েক মাস হইল এখানে আসিয়াছে, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তাহার মহলের পরিচয় পাইয়া শিক্ষয়িত্রী ও ছাত্রীগণ অবাক হইয়া গিয়াছেন। আজ সরলার জন্মদিন। তাই বাের্ডিংয়ের সবাইকে খাওয়াইবার ও তাহার পিতা টাকা পাঠাইয়া দিয়াছেন। সকলের খাবার জন্য লুচি, তরকারি, মাংস ও মিষ্টান্ন রান্না করা হইয়াছে ; দই, সন্দেশ, রসগােল্লা ও নানা রকম সুমিষ্ট ফল বাজার হইতে কিনিয়া আনা হইয়াছে। সরলা স্বহস্তে দুখানি থালায় ও রোবে খাদ্যসামগ্রী সাজাইয়া খাবার ঘরে লইয়া গেল, তাহার পরে মেয়ে দুটিকে সেখানে ডাকিয়া, সে তাদের কাছে বসিয়া নানা রকম খাবার খাওয়াইতে লাগিল। এই দৃশ্য দেখিয়া বােডিংয়ের ছাত্রী শােভা সুধাকে কহিল- “সত্যি তাই, সরলা দিদি যে কি রকম ভাল মেয়ে, আমি যেন তা বলে বােঝাতে পারি নে। রাজার মেয়ের মত দেখতে সুন্দরী, বাড়ীর অবস্থাও সােনার খনির সন্ধানে খুব ভাল, অথচ বাবুগিরি কি অহঙ্কার একটুকু নেই; মুখে একটি মিষ্টি হাসি লেগেই আছে। পড়াশুনাতে ত সকলের চেয়েই ভাল।” নিৰ্ম্মল ও সরযূর খাওয়ার পরে, সরল দুটি বােনকে আপনার ঘরে লইয়া গেল এবং তাহাদের কাছে বসাইয়া কহিল, “আমাকে দিদি বলে প্রত্যেক রবিবার বিকালে আমার কাছে এস।” সরযূ অবাক হইয়া সরলার মুখের পানে চাহিয়া রহিল। নিৰ্ম্মল যে কি বলিবে, কিছুই ভাবিয়া পাইল না। তাহার মা নিরুদ্দেশ এবং ডাক্তার সেনের স্ত্রীর মৃত্যু হওয়ার পরে, আর কাহার কাছে সে এমন প্রাণভরা ভালবাসা পাইয়াছে ? সরলার সুকুমার হৃদয় মেয়ে দুটির উপরে ঝুকিয়া পড়িল । সে প্রতি রবিবার তিনটার সময় তাহাদের জন্য পথের পানে চাহিয়া থাকিত। নিৰ্ম্মল ও সরযূ কাছে আসিলে তাহাদের মুখ দেখিয়া সরলার চক্ষু যেন জড়াইয়া যাইত। সে প্রথমে দুটি মেয়েকে মিষ্ট দ্রব্য ও ফল খাওয়াইত তাহার পরে বই পড়াইত ও গান শিখাইত। এক এক দিন তাহার সরলার কাছে গল্প নিত। এক রবিবার নির্মুলা ও সরযু সরলার কাছে আসিয়া কহিল, “দিদি আজ একটা গল্প বলুন।” সরলা হাসিয়া গল্প আরম্ভ করিল- এক যে ছিল রাজা, তার ছিল দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়েটির নাম অমুখী। সে দেখতে টুকটুকে ক্ষীরের পুতুল, আর সে খুব ভাল মেয়ে। তাই সকলেই তাকে ভালবাসত, শুধু তার সৎমা ছোটরাণী তাকে দুই চোখে দেখতে পারতেন না। তার পরে অশ্রুমুখীর নিজের মা মরে গেল।” নিৰ্মলা। তাই নাকি? নিজের মা মরে গেল? কেন ? : সরলা। 'ছােট রাণী তাকে যন্ত্রণা দিত বলে। শেষকালে কি হল, শােন। রাজা নিজেই অশ্রুকে ভালবেসে মানুষ কতে লাগলেন। তার দশম পরিচ্ছেদ দুই ভায়েরও বােনটির উপরে খুব ভালবাসা ছিল। কিন্তু হােট-রাণী অশ্রুকে রাজবাড়ী থেকে তাড়াবার চেষ্টা করূতে লাগলেন। সরযু। ছােট রাণী ত তা হলে ভয়ানক দুষ্ট, সরলা। দুষ্ট, বই কি! অশ্রুর উপরে অত হিংসা কেন, তা জান ? তার নিজের মেয়েটি দেখতে ভারি কুৎসিত; তার গায়ের রং একেবারে দোয়াতের কালি, বড় বড় এক একটা দাত যেন রাঙা মূলো, মস্ত কাণ দুটি যেন দুখানি কুলল। চোখের ভুরু নেই বল্লেও হয়। মাথার চুলগুলি সুমুখের দিক থেকে উঠেই যাচ্ছে। নিৰ্মলা। দিদি, তা হলে ত অমন মেয়েকে কোন রাজার ছেলেই বিয়ে করূবে না। সরলা। তা ত করবেই না, সেই জন্যেই ত ছােট রাণীর আরাে রাগ। কেউ তার নিজের মেয়েকে বিয়ে কতে চায় না, কোন মানুষই সে মেয়েকে ভাল বলে না, আর কি না এক গুণবান রাজপুত্রের সঙ্গেই অশ্রুর বিয়ে হবে, রাজ্যের সমস্ত লােক তার প্রশংসা করে ;-এ সব ঘােট রাণীর মােটেই সহ্য হয় না। তাই তিনি এক মায়াবিনী স্থীলােককে গােপনে ডেকে বল্লেন, “তাের মায়া মন্ত্রে রাজকুমারী অশ্রুমুখীকে একটা হরিণ করুতে পাবি কি না বল্ দেখি? তা পালে আমার গলার মুক্তাহার তােকে বকশিস্ দেব।” নিৰ্মলা। মানুষ আবার হরিণ হয় কি করে ? মিথ্যা কথা। সরল। তা ত বটেই, এ যে গল্প। তার পরে কি হল শােন। মায়াবিনী তার আশ্চর্য মায়ামন্ত্রে রাজকন্যাকে একটি সােনার হরিণ কল। হরিণটি রাজবাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। তবুও দুষ্ট রাণীর নিজের লােক হরিণটিকে জঙ্গলের ভিতরে এক পাহাড়ের উপরে রেখে এল। এ দিকে রাজবাড়ীতে হৈ চৈ পড়ে গেল। অমুখী কোথায় ? রাজার সিপাহি কেউ বা ঘােড়ায় কেউ বা হাতীতে চড়ে তার সােনার খনির সন্ধানে কত খোঁজ করে বেড়াতে লাগলাে কিন্তু কোথাও রাজকন্যার খোঁজ পাওয়া গেল না। ভায়েরা ত বােনটির জন্ধ কেঁদেই সরা। রাজও মনের দুঃখে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। সরযু। দিদি, অশ্রুর জন্যে আমার বড় কষ্ট হচ্ছে। সরলা। অনেক দিন পরে অশ্রুর দুই ভাই, হাতী, ঘোড়া, তীর, ধনুক ও তলােয়ার নিয়ে বনে হরিণ শিকার করতে চল্লেন। জলে পাহাড়ের কাছেই ঝরণা। একটি সুন্দর হরিণ সেই ঝরণার জল খাচ্ছিল। দুই রাজপুত্র হরিণটিকে দেখে ধনুক হাতে নিলেন, যখন দুজনেই হরিণের গায়ে তীর ছুঁড়ে মাবেন, তখন হরিণটি দুই রাজপুত্রের পানে চেয়ে বল্লে- মেরো না মেরাে না আমায় ভাই, আমার মতন দুঃখিনী কেউ নাই। দুই রাজপুত্র হরিণের মুখে মানুষের মতন কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। তারা হরিণটিকে ধরে রাজবাড়ীতে নিয়ে চল্লেন। দুজনে যে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন, তার এক গাছের উপরে ছিল শুক আর শারী; অর্থাৎ একটি পুরুষ টিয়ে আর একটি মেয়ে টিয়ে। শারী শুককে বলো, “দেখেছ, দুই রাজপুত্র কেমন একটি সুন্দর হরিণ নিয়ে যাচ্ছে? শুক বল্লো, “তুই বড় বােক কি না, তাই বলছিস্ ওটা হরিণ।” শারী বল্লো, “মা গাে, ওটা হরিণ নয় ত কি? চোখ নেই নাকি? আবার শুক বল্লো, “আসল কথাটা কি জানি? অমুখী নামে এক রাজকন্যা তার সৎকার কাছে মুক্তাহার বকশিস্ পেয়ে, এই রাজ্যের এক মায়াবিনী তাকে হরিণ করে রেখেছে। সয়যু। দিদি তার পরে কি হল? একের কথা শুনে দুই রাজপুত্রের বিয়ের আর সীমা রইল না। তারা রাজার কাছে হরিণটিকে নিয়ে গেলেন এবং তা শামীম কথাও রানাকে বলেন। হরিণটিকে দেখেই আমার মনে যে দশম পরিচ্ছেদ ৬৯ উথলে উঠলাে। তিনি সেটিকে কাছে নিয়ে গায়ে হাত বুলাতে লাগলেন। রাজার হুকুমে সিপাহিরা তখনি মায়াবিনীর দুই হাত বেঁধে রাজসভায় নিয়ে এল। রাজা বল্লেন, “ওরে মায়াবিনী, তুই এই হরিণকে এখনি রাজকন্যা করে দে, নইলে ঐ যে জল্লাদ তলােয়ার নিয়ে দাড়িয়ে আছে, সে তাের মাথা কেটে রক্ত নিয়ে কুকুরকে খাওয়াবে।” মায়াবিনীর মন্ত্রে হরিণ আগের মতনই রাজকন্যা হয়ে রাজার পাশে দাড়ালাে। তখন রাজা বল্লেন, “এস মা, আমার আরাে কাছে এস, তুমিই আমার কন্যা অশ্রুমুখী ? তােমাকে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।” দুই রাজপুত্র বল্লেন, “তুমি আমাদের স্নেহের বােন? তােমাকে পেয়ে মনে যে আনন্দ ধরে না।” হরিণই রাজকন্যা হয়েছে শুনে রাজবাড়ীতে দলে দলে লোেক ছুটে আসতে লাগলো, সকলেই রাজকন্যাকে দেখে খুব সুখী হলাে। আচ্ছা, কার ভয়ানক দুঃখ হল, বল ত ? নির্মল।। দুঃখ হল দুষ্ট, ছােট রাণীর। আমার ত মনে হয়, রাজা রাণীকে আর মায়াবিনীকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হুকুম দিবেন। সরলা। ঠিক বলেছ, রাজার হুকুমে জল্লাদ মাটির ভিতর প্রকাণ্ড গর্ত করে, দুষ্ট, রাণীর ও মায়াবিনীর হাত পা বেঁধে, তার মধ্যে ফেলে দিল। তার পরে সে মাটি দিয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করল। সরযু। বেশ হল, আমি খুসী হলুম।
একাদশ পরিচ্ছে দেখিতে দেখিতে এপ্রিল মাস আসিয়া পড়িল। সেই সময়ে গ্রীষ্মের ছুটি হইবে, সরলা দার্জিলিং চলিয়া যাইবে। যাওয়ার দিন সরযূ সরলাকে কহিল-“দিদি, আপনি দার্জিলিং যাবেন না।” সরলা। গেলে কি তােমার কষ্ট হবে ? সরযূ কিছুই বলিতে পারিল না, তাহার মুখখানি ম্লান হইল। সরল কহিল-“চল না সরযূ, তােমাকেও আমার সঙ্গে নিয়ে যাই।” সরযু। তা হলে আমার দিদির যে বড় কষ্ট হবে। নিৰ্মলা। আমি যে সরযূকে ছেড়ে থাকতে পারি নে। সরলা যেদিন দার্জিলিং চলিয়া গেল, সে দিন দুটি মেয়ের জন্য তাহার ত কষ্ট হইলই, কিন্তু নিৰ্মলা ও সরযু বড়ই কাদিতে লাগিল। সরলা দার্জিলিঙ্গে পিতামাতার নিকটে গিয়া পৌছিল। তাহার পরে এক সপ্তাহ ধরিয়া দিনরাত বৃষ্টি। যে দিন বৃষ্টি থামিয়া গেল, খুব রৌদ্র উঠিল, সে দিন সরলার মা, মেয়েকে কহিলেন, বাক্স খুলে কাপড় জামাগুলি বন্দরে দাও ত।” সরলা কয়েকটি বড় বড় বাক্স খুলিল এবং তাহার ভিতরের কাপড় গুলি রৌদ্রে শুকাইতে দিল। একটি ঘরে অনেক দিনের একটি পুরাতন বা পড়িয়াছিল। সকলেই মনে করিত, সেই বাক্সটির মধ্যে কতকগুলি অনাবশ্যক পুরাতন জিনিষ পড়িয়া আছে। কিন্তু সরলা সেই বাক্সটি খুলিয়া, তাহার ভিতরে ছােট একটি ফ্রক দেখিতে পাইল। কটির উপরে রাঙা সূতায় যা লেখা রহিয়াছে, তাহা পড়িয়া সরলা এ কম বিস্মিত হইল যে, কোন মায়াবীর মায়ামন্ত্রে তাহাদের অবৎ টিনের একাদশ পরিচ্ছেদ ৭১ ঘর হঠাৎ স্বর্ণ অট্টালিকায় পরিণত হইলেও সে তেমন আশ্চর্যান্বিত হইত না। সরলা দেখিল, ফ্রকের গায়ে রাঙা সূতায় লেখা আছে— “সুহাসিনীর জন্মদিনে উপহার। সুরেশ দাদা, ডিব্ৰুগড়।” সরলা ছােট ফ্রকটি হাতে লইয়া তখনি মায়ের কাছে গেল এবং কহিল, “মা, সুরেশদাদার যে দুটি বােন জলে ডুবে মরেছে, তার বড়টির নাম ছিল সুহাসিনী। কি আশ্চর্য ! সুহাসিনীর একটি ফ্রক আমাদের বাক্সে এল কি করে ?” সরলার মাতা কমলাদেবী ফ্ৰকটি দেখিলেন এবং তাহার লেখাটিও পড়িলেন। তাহার মুখ একেবারে বিষন্ন হইয়া গেল। তিনি কহিলেন, “সরলা, তােমার বাবাকে একটিবার এখানে ডেকে নিয়ে এস ত।” সরলা তাহার পিতা নগেন্দ্রনাথকে মায়ের কাছে ডাকিয়া আনিল। তিনি ফ্রকটি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিয়া গম্ভীর ভাবে কি চিন্তা করিলেন। তাহার পরে সরলাকে কহিলেন, “মা, এক বিষয়ে তােমার কাছে আমাদের বড় অপরাধ আছে। তুমি কি সেই অপরাধ মাপ করতে পাবে? তুমি কি বাপ মা মনে করে আমাদের কাছেই থাকবে, না অন্য কোথাও চলে যাবে?” সরলা। বাবা, তুমি কি বলছ ? আমার কাছে তােমাদের আবার অপরাধ ? আমিই ত দিনের মধ্যে দশবার তােমাদের কাছে অপরাধ করে থাকি। তােমাদের কাছে না থাকলে, আমি আর যাৰ কোথায়? নগেন্দ্রনাথ। তুমি আমাদের আপনার মেয়ে নও। আমরা একবার আসামের পরশুরাম তীর্থে গিয়েছিলাম ; তীর্থ হতে ফিরে আসার সময়ে, ব্ৰহ্মপুত্র নদীর এক জেলের নৌকায় তােমাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তােমার পরীর মতন সুন্দর চেহারা দেখেই মনে হয়েছিল, তুমি জেলের মেয়ে নও, তারা তােমাকে কোথাও পেয়ে কুড়িয়ে এনেছে। কে বলবে তােনাকে দেখেই কেন আমাদের স্নেহের উদয় হল? তাই অনেক টাকা ৭২ সােনার খনির সন্ধানে দিয়ে জেলেদের বশ করলেন এবং তাদের নৌকা হতে তােমাকে আমরা নিয়ে এলাম। তার পরে আমারাই তােমাকে লালন পালন করে মানুষ করেছি। যে ঝড়ের রাত্রে সুরেশদের নৌকা ডুবে যায়, জেলেরা সেই রাত্রেই নদীর তীরে বালির উপরে তােমাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিল। এই কটি তােমারই। তােমার নাম কি, তখন আমরা তা জিজ্ঞেস করেছিলুম, তুমি আধ আধ ভাষায় বলেছিলে, আমার নাম সুহাসিনী, শেষকালে আমরাই তােমার নাম সরল রেখেছিলুম। তুমি যে আমাদেরই মেয়ে, এই কথাটা আমরাই তােমাকে বলে বলে শিখিয়েছিলুম। এতদিন তােমার এই কটির কথা মনেই ছিল না। আর এইটি পেয়ে একটি হষ্ণকথা বুঝতে পারা গেল। তুমি যে সুরেশ এবং নির্মলা ও সরযুরই বােন, সে বিষয়ে আর কোন সংশয়ই রইল না। এখন সুরেশ ইচ্ছা কলেই তােমাকে আমাদের নিকট হতে নিয়ে যেতে পারে।” সরলা আর কি বলিবে? সে উর্ধদিকে চাহিয়া, দুখানি হাত ঘােড় করিয়া কহিল, “করুণাময় ঈশ্বর, আমার যা স্বপ্ন ছিল, তা আজ সত্য হয়ে গেল! আমাকে সুরেশদাদার বােন বলে কল্পনা করতুম, তুমি যথার্থই আমাকে তার বােন কলে? আর প্রাণের দুটি বালিকা নিৰ্ম্মল ও সরযুও আমার আপনার বােন হল ? আমি অবােধ বালিকা, তােমাকে ধন্যবাদ কর উপযুক্ত ভাষা ত আমার নেই।” সরলার দুই চোখ দিয়া ঝ ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। কমলাদেবী তাহাকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া বলিতে লাগিলেন, মা, আমাদের সমস্ত, ভালবাসা দিয়ে তােকে মানুষ করেছি, তুই আমাদের ছেড়ে কোথাও যাস্ নে।” সরলা কমলাদেবীর বুকে মাথা রাখিয়া কহিল, “মা, আমি কি তােমাদের ছেড়ে আর কোথাও যেতে পারি ? তােমরা কেন বলছ, আমি তােমাদের মেয়ে নই? স্বয়ং ঈশ্বরই আমাকে তােমাদের যেয়ে একাদশ পরিচ্ছেদ , ৭ করে দিয়েছেন, কে আমাকে তোমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাবে ? এমন শক্তি কার? আমি শুধু মাঝে মাঝে সুরেশদাদাকে আর নির্মল ও সরযূকে দেখতে চাই, তাদের ভালবাসা দিতে চাই, তা ছাড়া আর ত কিছুই আমি চাই নে।” সরলা নগেন্দ্রনাথকে কহিল, “বাবা, তুমি খবরের কাগজে সুরেশদাদার জন্য একটি বিজ্ঞাপন দাও। তার বােনদের যে পাওয়া গিয়াছে, সে কথাও যেন বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে। আমার আশা হয়, তা হলেই তিনি এখানে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন।” নগেন্দ্রনাথ সেই দিনেই কয়েকখানি সংবাদপত্রে সুরেশের সন্ধান পাওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন ছাপিতে পাঠাইলেন। কিন্তু সুরেশ যে কোথায় কি ভাবে গিয়া উপস্থিত হইয়াছিল, তাহার পরে তাহার জীবনের কি কি ঘটনা ঘটিয়াছিল, এখন সে বিষয়ে বর্ণনা করিব। সুরেশ ঘুরিতে ঘুরিতে পাটনা সহরে আসিয়া পৌছিল। পাটনা সহর খুব বড়, সেখানে বিস্তর লােক; কিন্তু সুরেশ কোথায় যাইবে ? কাহাকেও ত সে জানে না। তাই সে তৃষ্ণায় কাতর হইয়া গঙ্গার তীরে গেল, গঙ্গার নির্মল জল পান করিয়া পিপাসা নিবারণ করিল। গঙ্গার ধারেই পাটনা কলেজের বৃহৎ অট্টালিকা। সেই কলেজ-গৃহের বারান্দায় শত শত কলেজের ছেলে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। সুরেশ তাহাদের পানে চাহিয়া মনে মনে বলিল- “আমার বাবা বেঁচে থাকলে, আজ আমিও বি-এ পাশ করে, এম-এ ক্লাশে পড় তুম। আমার কি দুর্ভাগ্য! যে সন্ন্যাসী আমাকে পালন করে- ছিলেন, তিনিও যদি বেঁচে থাকতেন, তা হলে তার কাছে ধর্মশিক্ষা পেয়ে ঈশ্বরকে কত ভাল করে জানতে পারতুম। সন্ন্যাসী বলতেন, ‘ঈশ্বরকে ভালবেসে তার প্রিয় হতে পারলে যে সুখ, তেমন সুখ আর কিছুতেই নেই। হে আমার ঈশ্বয়, আমার ত লেখাপড়া শিখে সুখী হবার আর ৭৪ সােনার খনির সন্ধানে আশা নেই, আমি কি তােমাকে ভালবেসে, তােমার ভালবাসা পেয়ে সুখী হতে পারি নে ?” সুরেশ একটু পরে আবার মনে মনে বলিল-“ঈশ্বরের করুণা হলে কি না হয় ? তার দয়া হলে, এখনো আমার লেখাপড়া শিখে সুখী হবার আশা আছে। আমি আপনাকে এত হীন মনে করি কেন? ঈশ্বর আমার শরীরে আশ্চর্য্য পরিশ্রমের শক্তি দিয়েছেন, আমি কুলিমজুর হয়ে অর্থ উপার্জন করে কেন লেখাপড়া করিনে ? শুনেছি, আমেরিকার কত অসহায় ছেলে রাস্তা পরিষ্কার করে, পয়সা রােজগার করে লেখাপড়া শেখে। আমার প্রতিজ্ঞা, পড়াশুনা আমি করবই, তা যেমন করেই হােক। আমি আজ থেকে এই পাটনা সহরেই মুটের কাজ করব। মানুষের বােঝা বয়ে পয়সা উপার্জন করূতে আমার লজ্জা কি? তাতে আর আমার কারাে অধীন হতে হবে না। স্কুলে যাবার সময়ে স্কুলে যাব, অন্য সময় মুটের কাজ করব। ঈশ্বর আমাকে এমন শক্তি দিয়েছেন, অন্য ছেলেরা একদিন পরিশ্রম করে যে পড়া তৈরী করে, আমি তিন ঘণ্টা পরিশ্রম করেই তা কতে পারি। আমি কাল থেকেই স্কুলে ভর্তি হব, আর এখনি বাজারে গিয়ে মুটের কাজে লেগে যাব।” (সাধু যাহার ইচ্ছা, ঈশ্বর তাহার সহায়” এ এ কথা বড়ই সত্য। সুরেশ মহৎ সংকল্প করিয়া বাজারে গেল; সে দেখিল, একটি ভদ্রলােক দোকানে চাউল কিনিতেছেন। সুরেশ তাহাকে কহিল, “আমি বড় অসহায়, আমার কেহ নেই, দয়া করে যদি অনুমতি করেন, তা হলে আমিই মুটে হয়ে এই চালের বােঝা মাথায় নিয়ে আপনার বাড়ীতে পৌছিয়ে দিব।” ভদ্রলােকটি কলেজের অধ্যাপক। তিনি সুরেশের সুন্দয় মুখের পানে চাহিয়, তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। সুরেশ সংক্ষেপে আপনার জীবনের কাহিনী বর্ণনা করিল। অধ্যাপক কহিলেন, “তােমাকে আর বােঝ বইতে হবে না, আমার বাড়ীতে চল, সেখানে থেকে পড়াশুনা করূবে।”
সার্কাসের সিংহ রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িয়াছে •৭৫ পৃষ্ট।
No text on this page.
একাদশ পরিচ্ছেদ ৭৫ । সুরেশ। অমার মাথায় বােঝা তুলে দিতে যদি আপনার কষ্ট হয়, হলে আমাকে আপনার রান্নাবান্নার বামুনঠাকুর করে রাখুন । নিজের মুখেই বলছি, আমি চমৎকার রান্না করতে পারি।” “এখন ত আমার সঙ্গে এস, তার পরে যা হয়, ভেবে দেখা যাবে।” অধ্যাপক এই কথা বলিয়া সুরেশকে আপনার বাড়ীতে লইয়া গেলেন। সুরেশ দুই তিন দিন অধ্যাপকের বাড়ীতে বাস করিল। অধ্যাপক আর তাহার স্ত্রী সুরেশের ভাল ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া গেলেন। অধ্যাপকের স্ত্রী কহিলেন, “আচ্ছা সুরেশ, তুমি যদি খুব ভাল রান্না কতে পার, তা হলে প্রত্যেক রবিবার মাংস ও মিষ্টান্ন তৈরী করে আমাদের খাওয়াবে। তা ছাড়া অন্য সময় আমাদের বাড়ীতে থেকে পড়াশুনা করবে।” সুরেশ অধ্যাপক এবং তাহার স্ত্রীর সুমধুর স্নেহে ও সুমিষ্ট ব্যবহারে যথার্থই সুখী হইল। সে খুব মন দিয়া স্কুলে পড়িতে লাগিল। সুরেশ তাহার পরে এন্টেশ পরীক্ষা দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিল এবং কুড়ি টাকা মাসিক বৃত্তি পাইল। কিন্তু হায়, এই আনন্দের মধ্যেও আবার দুঃখ বিকট মূর্তি ধরিয়া সুরেশের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। সুরেশ পরীক্ষার সংবাদ পাইয়া দানাপুরে একটি বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়াছিল। সেই সময়ে এক সাকাসওয়ালা সাহেব দলবল লইয়া সেখানে আসিয়া আজ্ঞা করিয়াছিলেন। তিনি তার দুই দিকে প্রকাণ্ড সিংহ লইয়া খেলা দেখাইতেন। সেইজন্য বিস্তার লােক সার্কাস দেখিতে আসিত। একদিন সার্কাসওয়ালাদের অসাবধানতায় এক সিংহ লােহার খাচা হইতে বাহির হইয়া পড়িল। তখন তাহার দুর্জয় শক্তি কে দেখে? সে প্রকাশ্য রাস্তায় আসিয়া পড়িল এবং গর্জন করিতে করিতে, যাহাকে সামনে পাইল, তাহাকেই কামড়াইয়া পলাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। “ঐ সিংহ আসছে, ঐ সিংহ আসছে” বলিয়া লােকেরা ভয়ে ছুটাছুটি ৭৬ . সােনার খনির সন্ধানে আরম্ভ করিল। সার্কাসের সাহেব বন্দুক ও তলােয়ার লইয়া সিংহের পশ্চাতে ছুটিল। সুরেশ এই দৃশ্য দেখিতে পাইয়া মনে মনে ভাবিল, “আমি মরলে কারই বা কি লােকসান হবে? আমিই কেন সিংহটাকে মারিবার চেষ্টা করি না? সুরেশ সার্কাসওয়ালা সাহেবের নিকট হইতে তলােয়ার চাহিয়া লইল এবং সিংহের পিছনে পিছনে ছুটিল। সুরেশের আশ্চৰ্য্য দৌড়াইবার শক্তি। সে সিংহের সামনে গিয়া গঁড়াইল। বৃহৎ সিংহ ভীষণ গৰ্জন করিয়া তাহার উপরে পড়িল। সিংহের মাথায় তলােয়ারের আঘাত করিয়াই সুরেশ অজ্ঞান হইল। ইতিমধ্যে দানাপুরের ব্যারাকের কয়েকজন ইংরেজ সৈন্য বাহির হইয়া সিংহকে গুলি করিল। সিংহ মরিল বটে, কিন্তু সুরেশকেও অর্ধেক মারিয়া গেল। তখনই সুরেশকে দানাপুরের হাসপাতালে লইয়া যাওয়া হইল।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ সুরেশ রাস্তার লােকের প্রাণ রক্ষা করিতে গিয়া নিজের প্রাণ হারাইতে বসিয়াছে, এজন্য দানাপুরের সাহেব ডাক্তার স্বয়ং তাহার চিকিৎসা করিতেছেন। পাটনার স্কুলের ছেলেরা সুরেশের সদগুণে মুগ্ধ হইয়াছিল, তাহার দানাপুরে আসিয়া সুরেশের শুশ্রুষা করিতে লাগিল। কিন্তু কিছুতেই তাহার গায়ের ঘা শুকাইল না, সে রক্তহীন ও শীর্ণ হইয়া পড়িল। তাহার যখন আর বাঁচিবার আশা রহিল না, তখন কি জানি কি ভাবিয়া সে দার্জিলিঙ্গে সরলার পিতা নগেন্দ্রনাথের নিকট একটি টেলিগ্রাম করিল। নগেন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাইয়া চমকিয়া উঠিলেন। হায়, তবে কি মৃত্যুর পথেই ভায়ের সঙ্গে বােনের পরিচয় হইবে? নগেন্দ্রনাথ সরলার কাছে কোন কথাই খুলিয়া বলিলেন না। তিনি কহিলেন, “সরলা, খবর পেয়েছি, সুরেশ দানাপুরে আছে। আজকের গাড়ীতেই তােমাকে নিয়ে দানাপুর যাত্রা ক'।” স্বাভাবিক রক্তের সম্পর্কের কি আশ্চৰ্য্য আকর্ষণ ! যে কমলাদেবী সরলাকে এতদিন মায়ের মতন মানুষ করিয়াছেন, আজ সরলাকে চোখের আড়াল করিতে তাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছিল, কিন্তু সরলা যে দানাপুরে গিয়া ভাইকে দেখিতে পাইবে, সেই কল্পনায় তাহার মন আনন্দে উৎফুল্ল। তার পরে সরলা যখন দানাপুরে যাত্রা করিবে, তখন কমলাদেবী চোখের জলে ভাসিয়া কহিলেন, “লক্ষ্মী মা আমার, আমার কথা ভুলাে না, আমার কাছে ফিরে এস।” সয়লা কহিল, “তােমায় কি আমি ভুলতে পারি? আজ যদি আমার নিজের মা এসে উপস্থিত হন, আর আমায় নিয়ে যেতে চান, তা হলেও ৭৮ সােনার খনির সন্ধানে আমি বলব, আপনি আমার নিজের মা সত্য, কিন্তু আমি ত আপনার কাছে থাকি নি, যিনি আমাকে ছেলেবেলা হতে বুকের রক্ত দিয়ে মানুষ করেছেন, তাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাব ?” নগেন্দ্রনাথ সরলাকে সঙ্গে লইয়া রেলগাড়ীতে উঠিলেন। রাত্রে সরলার চোখে আর ঘুম কোথায়? সে মনে মনে শুধুই সুখের কল্পনা করিতে লাগিল। সে ভাবিল, “আমি দানাপুরে গিয়ে যখন দাদাকে প্রণাম করব, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে আমার পানে চেয়ে থাকবেন। আমি হেসে বল্, বলুন ত আমি কে? দাদা ববেন, ‘তুমি সরলা। আমি বলব, ‘কই আমাকে চিনতে পারুলেন? আমি ত সরল। নই, আমি সে আপনার বােন সুহাসিনী। দেখুন ত কি আশ্চর্য! আমি যমের পুরী হতে ফিরে এসেছি। দাদা আমার কথা শুনে হয় ত মনে কবেন, তিনি জেগে স্বপ্ন দেখছেন। আমি তার মনের কথা বুঝতে পেরে বলব, বাঃ, আপনি বুঝি মনে করছেন জেগে স্বপ্ন দেখছেন? স্বপ্ন কেন? এ যে সবই সত্য।” তার পরে দাদার কাছে যখন সকল কথা খুলে ব, তখন পুলকে তাঁর সুন্দর মুখখানি আরাে সুন্দর হয়ে উঠবে, আমার পানে চেয়ে তার সমস্ত হৃদয় ঈশ্বরের কাছে লুটিয়ে পড়বে; তিনি সুখের আবেশে শুধুই ঈশ্বরের করুণা স্মরণ করবেন।” সরলা এই রকম কত কি কল্পনা করিয়া দানাপুরে আসিয়া পৌছিল এবং সুরেশের কাছে গিয়া দাড়াইল। সরলাকে দেখিয়া সুরেশের মৃত্যুশয্যা যেন সুখের কুসুম শয্যায় পরিণত হইল। সুরেশ দুখানি হাত বােড় করিয়া কহিল, “করুণাময় ঈশ্বর, তােমারই করুণায় মৃত্যুকালে সরলাকে দেখতে পেলেম। আমার মনে যে সুখ আর ধরে না।” কিন্তু হায়, সরলার সকল কল্পনা মিথ্যা হইয়া গেল, সে সুরেশকে দেখিয়া শিহরিয়া উঠিল এবং কহিল, “দাদা, প্রাণভরা আনন্দ নিয়ে দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ৭১ তােমাকে বলতে এসেছিলুম, আমিই তােমার স্নেহের বােন সুহাসিনী । বড় আশা করেছিলুম, বহুদিনের পরে অতি আশ্চৰ্য্য ভাবে ভায়ের সঙ্গে বােনের মিলন হবে । হায়, এ যে চিরজীবনের মতন বিচ্ছেদ। বল দাদা, তুমি কি যথার্থই আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?” নগেন্দ্রনাথ সুরেশকে সকল রহস্য কথা বুঝাইয়া বলিলেন। কহিল—“সরলা, তুমি আমারই বােন সুহাসিনী ? তবে এস ত, ভাল করে তােমার মুখখানি একবার দেখি । যে দিন প্রথমে তােমাকে দার্জিলিঙে দেখেছিলুম, সেই দিনই আমার মনের ভিতর হতে কে যেন বলেছিলেন—এ যে তোমারই বােন। আজ বিশ্বাস হচ্ছে, মনের ভিতরের সেই ঈশ্বরের বাণী। ঈশ্বরই করুণা করে তােমাকে আমার কাছে নিয়ে এলেন। সরলা, তুমি সরলা, তুমি যদি আমার আর দুটি বােনকেও সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতে, তবে তাদের দেখে আমার কতই আনন্দ সুরেশ কথা বলিতে বলিতে অবসন্ন হইয়া পড়িল। একটু নীরব থাকিয়া সে কহিল—“সরলা, তুমি শুনূলে অবাক হবে, আমি মরব এই কথা ভেবে বড়ই খুসী হয়েছিলুম। আমার মনে হয়েছিল, ঈশ্বরের কাছে গিয়ে আমার বাবাকে ও মাকে দেখতে পাব ; আমায় দুটি বােনের সঙ্গে একটি মধুর স্নেহের সম্পর্ক স্থাপিত হবে। কিন্তু এখন যে আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে। দয়াময় ঈশ্বর, তুমি কি আমাকে বাঁচাতে পার না? আমি অনেক দিন ধরে সুখ কাকে বলে তা ত জানি নে ; আজ মনে হচ্ছে আমার তিনটি বােনের সঙ্গে মিলিত হয়ে, তাদের ভালবাসা পেয়ে তাদের স্নেহ দিয়ে এবং তাদের জন্য কিছু করে এ জীবনকে সার্থক করতে পারব।” সুরেশ প্রায় পনের মিনিট নীরবে সরলার মুখের পানে চাহিয়া মহিল। তাহার পরে কহিল “সরলা আমার চোখের দৃষ্টি শক্তি চলে সােনার খনির সন্ধানে যাচ্ছে। একটু পরে তােমার মুখখানি আর দেখতে পাব না। আমার জিত আড়ষ্ট হয়ে পড়ছে, আর কথা বলতেও পারব না। আমার প্রাণ যখন বের হয়ে চলে যাবে, তখন তােমার মধুর কণ্ঠে ঈশ্বরের নামের একটি গান করো। গানটি শুনতে শুনতে আমি বিশ্বজননীর কাছে চলে যাব।” সরলার চীৎকার করিয়া দিতে ইচ্ছা হইতেছিল। কিন্তু সে তাহার কান্না বুকের ভিতরে চাপিয়া রাখিয়া, শুধুই প্রার্থনা করিতে লাগিল। “দয়াময় ঈশ্বর, তুমি দয়া করে আমার দাদাকে বাঁচাও।” নগেন্দ্রনাথেৰ মহৎ হৃদয়। তাই তিনি বিস্তর টাকা খরচ করিয়া খুব বড় ডাক্তার আনাইলেন। সরলার দিনরাত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ও শুশ্রুষার এই যেন সুরেশের অবস্থা ভাল হইয়া দাড়াইল। সুরেশ এক মাসের মধ্যেই আরােগ্য লাভ করিল। নগেন্দ্রনাথ সুরেশ ও সরলাকে লইয়া দার্জিলিং গমন করিলেন। স্বাস্থ্যকর স্থানে বাস করায় সুরেশের শরীর সুস্থ ও সবল হইল। নগেন্দ্রনাথ সুরেশকে কহিলেন-“সরলাকে কন্যারূপে পেয়ে আমরা বড়ই সুখী হয়েছিলুম। কিন্তু তবুও মনে হত, আমাদের একটি ছেলে থাকলে আর কোনই অভাব থাকত না। ঈশ্বর দয়া করে আজ তােমাকেই পুত্র রূপে কাছে নিয়ে এলেন। আমার সমস্ত টাকাকড়ি ও বিষয় সম্পত্তি তােমাদেরই লিখে দিয়ে যাৰ। তােরা লেখা পড়া শিখে ঈশ্বরের করুণায় চিরদিন মুখে থাক।”
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ সুরেশ ও সরল। দুজনেরই নিৰ্ম্মল ও সরযূকে কাছে পাইবার জন্য মন বড় ব্যাকুল হইয়া পড়িল। সুরেশ বাডন স্ট্রীটের’ সেই রাক্ষুসী গিন্নির হাত হইতে দুইটি বােনকে উদ্ধার করিবার জন্য কলিকাতায় গেল। কিন্তু কোথায় নিৰ্ম্মল ও সরযূ ? তাহারা ত আর কলিকাতায় নাই, গিন্নি তাহাদের লইয়া স্বামীর কর্মস্থানে চলিয়া গিয়াছেন। তাঁহার স্বামীর কৰ্ম্মস্থান আসামের শেষ সীমায একটি চা-বাগানে। সুরেশ সেই চা-বাগানে যাইবার জন্য আসামে যাত্রা করি। আসামের রেলের দুই পাশে ছােট বড় পাহাড়, ঝরণা এবং ভীষণাকৃতি বৃক্ষ সকল দেখিতে দেখিতে, সুরেশ একটি চা-বাগানে উপস্থিত হইল। ‘বীড়ন ষ্ট্রাটের গিন্নির স্বামী বলাই বাবু সেখানকার বড় একজন কর্মচারী। সুরেশ তাহার বাসার কাছে গিয়া দেখিতে পাইল, মলিন কাপড় পরা সুন্দরী একটি বালিকাকে গিন্নি একখানা কাঠের চেলা দিয়া অতি নিষ্ঠুর ভাবে মারিতেছেন, আর বলিতেছেন—“আমায় না বলে তারিণী বাবুর বাসায় গিয়েছিস্ এখন তার মজাটা দেখ, দেখি । মেরে আজ তাের হাড় ভেঙ্গে দেব, তারিণী বাবুর স্ত্রী এসে ঠেকায়ে রাখুক, দেখি।” তারিণী বাবু চা-বাগানের একটি ছােট কেরাণী। তার স্ত্রী দুঃখিনী সরযূকে বড় ভালবাসেন, কাছে ডাকিয়া খাবার দেন, আদর যত্ন করেন। গিন্নির তা সহ্য হয় না। আজ সরযু তারিণী বাবুদের বাসায় গিয়াছে এবং তার স্ত্রী সরযূকে একটু মিষ্টান্ন খাইতে দিয়াছেন, ইহাই সরষুর মস্ত বড় অপরাধ। সরযূকে মারিতে দেখিয়া নিম্মল। কহিল, “গিন্নি মা, আপনার পায়ে পড়ি, আপনি অমন করে ওকে মারবেন না, ও যে মরে যাবে।”
সােনার খনির সন্ধানে গিন্নি। নিৰ্ম্মল। ; মরুক না, এখুনি মরুক, ওকে যম ভুলে আছে কেন ? রাজ্যে এত মানুষের মরণ হয়, আর এই মেয়েটা মরে না কেন? ওর ত কোন দোষ নেই, আমারই দোষ, আমিই ত সরযূকে তারিণী বাবুদের বাড়ী পাঠিয়েছিলাম । ওকে ছেড়ে দিয়ে আমাকেই ঐ কাঠের চেলা দিয়ে মারুন না। সরযূ । না গিন্নি মা, আমাকেই মারুন ; দিদিকে মারবেন না। সুরেশ রাস্তায় দাড়াইয়া দূর হইতে এই দৃশ্য দেখিয়াই বুঝিতে পারিলেন, এই দুটি মেয়ে তাহারই দুঃখিনী দুটি বােন। সুরেশ ভাবিতে লাগিল, “হায়, কিছুতেই দুঃখবিপদ আমাদের ত্যাগ করে যাবে ? আমরা কি চির অপরাধী হয়েই জন্মেছি ? কেবল দুঃখ সয়ে, কেবল চোখের জল ফেলেই আমাদের এই সংসারে বাস করতে হবে?” সুরেশ বলাই বাবুর বৈঠকখানায় গিয়া উপস্থিত হইলেন। অনেক ক্ষণ পরে বাবুটি আসিয়া সুরেশের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। সুরেশ তাহার কাছে আপনার জীবনের কাহিনী সমস্তই বলিল এবং কহিল- “আমি দাজিলিং হতে অনেক কষ্ট করে এই সুদুর আসামের চা-বাগানে এসেছি। আপনি দয়া করে দুটি বােনকে আমার হস্তে অর্পণ করলে আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ অন্তরে অাপনার উপকারের কথা স্মরণ করব।” বলাই বাবু কহিলেন-“বাপু হে, তুমি জলজুয়াচুরি করবার আর জায়গা খুজে পেলে না? এসেছ আমার কাছে ? আমি এই চা-বাগানে কুড়ি বৎসর হাজার কুলির চালক হয়ে মাথার চুল পাকাতে বসেছি। তুমি কি মনে করেছ, আমার চোখে ধূলা দিয়ে এই দুটি সুন্দরী মেয়েকে হাত কতে পাবে? তা ত কিছুতেই পারবে না। আমি বিশ্বাস করি না যে তুমি এই দুটি মেয়ের ভাই; কাজেই মেয়ে দুটিকে তােমার হাতে ছেড়ে দিতে পারব না।” বলাই বাবু একটু পরে ঘড়ি খুলিয়া কহিলেন, “আর আমার কথা ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ৮৩ বলার সময় নেই, এখনি বড় সাহেবের কাছে যেতে হবে। তুমি আমার বর থেকে চলে যাও। জান ত এ চা-বাগান, এখানে যাকে তাকে ঢােকার অনুমতি দিই নে।” সুরেশ। আমার বােন দুটিকে না দেখে কিছুতেই এই ঘর ছেড়ে যাব না। বলাই বাবু। বটে! তুমি যাবে না? দয়ােয়া, এখনি এই ছােকরাকে গলাধাক্কা দিয়ে চা-বাগানের বাইরে রেখে এস। দারােয়ান যথার্থই অপমান করিয়া সুরেশকে চা-বাগানের বাহিরে রাখিয়া আসিল। সুরেশ নিরুপায় হইয়া ডিব্ৰুগড় সহরে আসিয়া পৌছিল। তাহার পিতা যে বাড়ীতে বাস করিতেন, সে এক ধনবান্ মাড়ােয়ারির বাড়ী। সেই বাড়ীতে এখন উমাচরণ বাবু উকিল বাস করেন। তিনি খুব ভদ্র এবং সহৃদয় ব্যক্তি। সুরেশ সেই উমাচরণ বাবুর সঙ্গে দেখা করিয়া, আপনার পরিচয় প্রদান, করিল। উমাচরণ বাবু তরুণ বয়সে বড়ই পীড়িত হইয়া পড়িয়াছিলেন । সুরেশের পিতার সুচিকিৎসায় তিনি আরোগ্যলাভ করিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন, তিনি জানিতেন, নৌকাডুবির সঙ্গে সুরেশদের সকলেরই মৃত্যু হইয়াছে। আজ সুরেশের মুখে তাহার সকল কথা শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। তিনি সুরেশকে আদর-যত্ন করিয়া গৃহের ভিতরে লইয়া গেলেন। সুরেশদের বিস্তর দ্রব্যসামগ্রী ঐ বাড়ীর একটি ঘরে সাজানাে ছিল। সুরেশ সেই সকল জিনিস দেখিয়া চোখের জল ফেলিতে লাগিল। যে চেয়ারখানায় বসিয়া পড়িত, সেখানা ও তাহার পড়ার বইগুলি এখনো রহিয়াছে। এখনো তাহার পিতামাতার এবং তাহার নিজের ও দুই বােনের ফটো সেই ঘরখানির মধ্যেই আছে। ঐ সকল দেখিয়া সুরেশের মন একেবারে উদাস হইয়া গেল। সুরেশ রাত্রে তাহাদের সেই প্রিয় ঘরখানির ভিতরে তাহারই পিতার ৮৪ সােনার খনির সন্ধানে চৌকির উপরে শয়ন করিল। রাত দুপুরের সময় সে স্বপ্নে দেখিল, তাহার স্নেহময় পিতা তাহার অতি নিকটে। তিনি বলিলেন “আমার প্রিয়পুত্র, শুধু তােমাকে দেখার জন্যই পরকাল হতে এখানে এসেছি। তােমার নির্মল চরিত্রের কথা জেনে আমি বড়ই সুখী। কিন্তু তােমার একটি কাজে আমি বড় ব্যথা পেয়েছি। তুমি ত জান, আমি জীবনে কখনো মানুষের অন্যায় অনুগ্রহ গ্রহণ করতে সম্মত হইনি। নগেন্দ্রনাথ নিজে উপার্জন করে যে অর্থসঞ্চয় করেছেন, সেই অর্থে তিনি দেশের কোন মহৎ কাৰ্য্য সম্পন্ন করবেন। তুমি কেন তার টাকায় ধনী হতে চাও? তুমি আমার কথা শােন। তা হলেই তােমার কল্যাণ হবে এবং সুপুত্রের কাৰ্য্যও করা হবে। তুমি আমার অসম্পূর্ণ কাৰ্য্য সম্পূর্ণ কর। তুমি আমারই মতন সােনার খনির সন্ধানে হিমালয়ের দিকে যাত্রা কর । আমি সােনার খনির সন্ধান পাই নি, কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই সন্ধান পাবে। সােনার খনি আবিষ্কার করতে পারলে দেশযােড়া তােমার নাম হবে, তখন কত টাকাই তােমার হাতে এসে পড়বে।” সেই টাকায় তুমি নিজে সুখী হয়ে লক্ষ লােকের দুঃখ দারিদ্র্য দূর করূতে পাবে। সেই সময়ে বলাই বাবুর মতন মানুষ নিৰ্মলা ও সরযূকে আপনি নিয়ে এসে তােমার পায়ের কাছে রেখে যাবে। তুমি কাল সকালেই সােনার খনির সন্ধানে যাত্রা কর ।” সুরেশের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সে মনে মনে কহিল, “মানুষ স্বপ্নকে যতই মিথ্যা বলুক না কেন, আমার ত সত্য বলেই মনে হচ্চে। আমার পিতা স্বর্গ হতে, এসে, আমার যা করা দরকার, সেই কথাই বলে গেলেন। আমি কি পিতার আদেশ অমান্য করতে পারি ?” সুরেশ নগেন্দ্রনাথ ও সরলাকে দুখানি চিঠি লিখিয়া সােনার খনির সন্ধানে হিমালয় পাহাড়ের দিকে চলিল। সরলা চিঠি পড়িয়া শিহরিয়া উঠিল। সে কহিল,-“নিষ্ঠুর মৃত্যুর সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে, তার কঠিন ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ৮৫ হস্ত হতে দাদাকে রক্ষা করেছিলুম। এখন আবার তিনি একটা মিথ্যা স্বপ্নকেই সত্য মনে করে সােনার খনির সন্ধানে চল্লেন ? বাবা ত এই খনির সন্ধানে গিয়েই আর ফিতে পারলেন না, দাদাও আর ফিরে আসতে পারবেন কিনা তা কে বলবে ? হায়, অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখের পরে সবে কয়েকটি দিন মাত্র দুই ভাই বােন স্নেহসূত্রে বাঁধা পড়তেছিলুম, আজ সেই সূত্র ছিন্ন হয়ে গেল? বলে দাও ঈশ্বর, এমন কেন হল ?”
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ ভীষণ জঙ্গল ! সুরেশ সােনার খনির সন্ধানে বাহির হইয়া দিনের পর দিন চলিতে লাগিল। কয়েক দিন পরে সে দেখিল, তাহার সম্মুখেই হিমালয় পর্বত যেন আকাশে মাথা ঠেকাইয়া, সমস্ত দেশ জুড়িয়া দাড়াইয়া আছে। সুরেশ সেই পাহাড়ের উপরে উঠিতে প্রবৃত্ত হইল। চারিদিকে কি কত জানােয়ার সেই জঙ্গলে বাস করে তাহা কে বলিবে ? সুরেশকে সােনার খনির নেশায় ধরিয়াছিল, তাই সে মরণ-বচন তুচ্ছ করিয়া এক পাহাড়ের উপর হইতে আর এক পাহাড়ের উপরে এবং এক জঙ্গল হইতে আর এক জঙ্গলে প্রবেশ করিতে লাগিল। সুরেশ চলিতে চলিতে এক অসভ্যদের দেশে উপস্থিত হইল। তাহার সম্মুখেই কি ভয়ানক দৃশ্য ! সেখানে ছােট ছােট দুইটি অসভ্য জাতির মধ্যে যুদ্ধ হইতেছে । সুরেশ পাহাড়ের আড়ালে লুকাইয়া সেই যুদ্ধ দেখিতে লাগিল। এক এক দলে প্রায় ছয় সাত শত লােক তীর ধনুক লইয়া যুদ্ধ করিতেছে। কি চমৎকার তাহাদের তীর নিক্ষেপ ! চোখের পলকে শত শত তীরন্দাজ ধনুক হইতে বিষমাখানো তীর শত্রুদের গায়ে ছুড়িয়া মারিতেছে। সেই তরের আঘাতেই অনেক লােক পাহাড়ের উপর পড়িয়া ছটফট করিতেছে। কয়েক ঘণ্টা পরে এক দল অসভ্য যুদ্ধে হারিয়া পলাইয়া যাইতে আর এক দল অসভ্য অনেকগুলি শত্রুকে বন্দী করিল। তাহার পরে, অসভ্যের দল ভীষণ চীৎকার করিয়া বন্দীগুলিকে বাঁধিয়া লইয়া চলিল। সুরেশ জঙ্গলের মধ্য দিয়া চলিতে প্রবৃত্ত হইল। তাহাকে কোন অসত্যই দেখিতে পাইল না। অসভ্যগণ একটি স্থানে উপস্থিত হইয়া, প্রত্যেকটি বন্দীর হাত পা গাছের সঙ্গে বাধিয়া রাখিল। লাগিল।
ই দল অসভ্য যুদ্ধ
করিতেছে
—৮৬ পৃষ্ঠা
No text on this page.
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ ৮৭ তাহারা দূর হইতে বন্দীদের গায়ে ঝাঁকে ঝকে তীর ছুড়িবে, আর ঐ সকল হতভাগ্যের যাতনায় ছটফট করিয়া মারা যাইবে। নিষ্ঠুর ব্যাপার সুরেশ কেমন করিয়া দেখিবে ? সুরেশ বন্দীদের প্রাণ রক্ষার জন্য নিজের প্রাণ দিতে প্রস্তুত হইল। সে খুব তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গিয়া অসভ্যদের সম্মুখে দাড়াইল। সুরেশ এখনাে পাহাড়ীদের ভাষা ভুলিয়া যায় নাই। তাই সে অসভ্য ভাষায় কহিল-“তােমাদের কি মনে আছে, এই পাহাড়ে এক সন্ন্যাসী ছিলেন ? তিনি তােমাদের বিস্তর উপকার করেছেন। এ দেশে এমন কোন্ অসভ্য রাজা ছিলেন, যিনি তাকে গুরু বলে মান্য করতেন না? সেই সন্ন্যাসীই আমাকে সন্তানের মতন মানুষ করেছেন। এখন তিনি পরলােকে। আমি আজ তার নাম করে বছি, তােমরা এই বন্দীদের নিদ্দররূপে হত্যা না করে বন্দী করে রাখ। হত্যা করলে এই কথা ইংরাজ রাজার কাণে যাবে। তা হলেই তােমাদের দুর্দশার আর সীমা থাকবে না। তারা বিচার করে তােমাদের কঠোর শাস্তি দেবেন।” অসভ্যেরা উত্তেজিত হইয়া কহিল, “তুমি তা হলে নিশ্চয়ই ইংরাজের গুপ্তচর ? তােমাকেই আগে হত্যা করার দরকার।” অসভ্যেরা সুরেশকে ধরিয়া একটি গাছের সঙ্গে বাধিল। তাহার চারিদিকে দাড়াইয়া, গায়ে বিষাক্ত তীর ছুড়িয়া মারিবার জন্য ধনুক হাতে সুরেশ চীৎকার করিয়া কহিল, “করুণাময় পরমেশ্বর, সকল বিপদ হতে তুমিই আমাকে রক্ষা করেছ, আজ তুমি ছাড়া আর কে আমাকে রক্ষা করবে ? আমি তােমারই দয়া ভিক্ষা করছি।” এই সময়ে হঠাৎ কোথা হইতে এক জ্যোতির্ময়ী সন্ন্যাসিনী আসিয়া সুরেশের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। তাহার অপূৰ্ব্ব মূর্তি স্বর্গীয় আলােকে মণ্ডিত। তাঁহার পরণে গৈরিক বস্ত্র, হাতে দীর্ঘ ত্রিশূল। তিনি আকাশ কম্পিত করিয়া “জয় জগদীশ্বর” এই বাক্য উচ্চারণ করিলেন। অসভের লইল।
bb সােনার খনির সন্ধানে দল ভয়ে ভীত হইয়া সন্ন্যাসিনীর পানে চাহিয়া রহিল। সন্ন্যাসিনী তেজের সঙ্গে কহিলেন, “এখনি তােমরা এখান হতে ছুটে ঘরে চলে যাও, নইলে তােমাদের বিপদ ঘনিয়ে আসতে আর বড় বেণী বিলম্ব হবে না।” অসভ্যের এই সন্ন্যাসিনীকে স্বর্গের দেবী বলিয়া মনে করে। তাই তাহার আদেশ মান্য করিয়া সকলেই প্রস্থান করিল। সন্ন্যাসিনী সুরেশের এবং বন্দী অসভ্যদের বাধন খুলিয়া দিলেন। বন্দীগণ পলাইয়া গেল। সুরেশ সন্ন্যাসিনীর স্নেহমাখা মুখের পানে চাহিয়া কহিল, “মা, আপনি কে ? স্বয়ং ঈশ্বরই কি আমাকে বাঁচাবার জন্য, আপনাকে এই পাহাড়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন ?” সন্ন্যাসিনী কহিলেন—“এস পূত্র, নিকটেই আমার মন্দির। সেই মন্দিরে এসে বিশ্রাম কর।” সন্ন্যাসিনীর সুরেশকে সঙ্গে লইয়া একটি মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করিলেন। সুরেশ চমকিয়া উঠিল এই মন্দিরেই সন্ন্যাসীর সঙ্গে বাস করিত। এখনো ত মন্দিরের গায়ে তাহার হস্তাক্ষর রহিয়াছে ; ঐ যে লেখা আছে-“সুরেশ—সুহাসিনী-নিৰ্ম্মল” সন্ন্যাসিনীই এখন এই মন্দিরে বাস করেন। তিনি সুরেশকে দুধ আর ফল খাইতে দিলেন। উহা খাইয়া সে একটু সুস্থ হইল। তখন সন্ন্যা- সিনী কহিলেন, “তুমি কে? কোথা হতে কেমন করে এই পাহাড়ে এলে ?” মা, আমি একদিন পিতৃমাতৃহীন হয়ে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে এই মন্দিরেই ছিলম। আপনি কেমন করে এখানে এলেন? আপনার সব কথা শুনার জন্য আমার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সন্ন্যাসিনী। আমি সন্ন্যাসিনী, তবু তােমার পানে চেয়ে স্নেহ যেন উথলে উঠছে; মনে হচ্ছে, তােমার সঙ্গে যেন কত কালের কি একটা সম্পর্ক আছে। আমি তােমাকে খুব সংক্ষেপে আমার জীবনের কাহিনী ।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ বলছি। আমার স্বামী ডিব্রুগড়ের বড় স্বামী ডিব্রুগড়ের বড় ডাক্তার ছিলেন। তিনি নৌকায় আমাকে এবং সন্তানদের নিয়ে সােনার খনির সন্ধানে যাচ্ছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভয়ানক ঝড় আরম্ভ হল, তাই আমাদের নৌকা ডুবে গেল। আর সকলেই জলে ডুবে মরুলেন, শুধু আমিই কোলের দুটি মেয়ে নিয়ে বেঁচে রইলুম। তার পরে একটি অসভ্যদের রাজ্যে আশ্রয় পাওয়া গেল। সেখানে দুঃখে দুশ্চিন্তায় আমার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গেল। আমি দুটি কন্যাকে সেই পাহাড়ে ফেলে, পাগল হয়ে, এক রাত্রে জঙ্গলে ঢুকে পড়লুম। জানি না, কেন বনের জানােয়ারের আমার রক্ত খেতে ইচ্ছা হল না। আমি ঘুরতে ঘুতে এক অসভ্য জাতির রাজ্যে উপস্থিত হলাম। তারা আমাকে উন্মাদ দেখে বেঁধে রাখলাে। সেইখানেই এক বৎসর কেটে গেল। অবশেষে কোথা হতে এক সন্ন্যাসী এসে ওষুধ দিলেন তাতেই আমার অসুখ ভাল হয়ে গেল। আমি অভাগিনী, আমার কুটীরে ফিরে এসে দুটি মেয়েকে আর দেখতে পেলেম না। সেই হতেই আমি মনের দুঃখে সন্ন্যাসিনী। এই মন্দিরে থেকেই ঈশ্বরের নাম করি।” সুরেশ আর থাকিতে পারিল না, সে সন্ন্যাসিনীর পায়ে লুটাইয়া পড়িল এবং কহিল, “স্নেহময়ী মা আমার, আমি সােনার খনির সন্ধানে বের হয়েছিলুম, কিন্তু তােমাকে পেয়ে যা লাভ কলুম, তার কাছে শত সােনার খনি অতি তুচ্ছ সামগ্রী। রাগ মা, একবার তােমার মেঃ হস্ত আমার বুকের উপর রাগ, জীবনে যত দুঃখ কষ্ট পেয়েছি, তার স্মৃতি আজ হৃদয় হতে মুছে যাক। রাখ মা, তােমার কলাণ হস্ত একবার আমার মাথার উপরে রেখে আশীৰ্বাদ কর। 'আমার জন্ম আজ সাথক হােক।” সন্ন্যাসিনী বুঝিতে পারিলেন, এই সুরেশই তাহার প্রাণাধিক সন্তান। তাই তিনি আর সুস্থির থাকিতে পারিলেন না, সুরেশের মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, “পুত্র আমার, পরম স্নেহের পাত্র আমার, ঈশ্বর আমার তপস্যায় তুষ্ট হয়ে, তােমাকে কি স্বর্গ হতে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন?” ।
সােনার খনির সন্ধানে
সুরেশ। শুধু যে আমাকে দেখতে পেলে, তা নয়, সুহাসিনী,
নিৰ্ম্মল, সরযূ সবাইকেই দেখতে পাবে।
মা। বল কি সুরেশ ? তারা কি বেঁচে আছে ? তুমি কোথায়
তাদের দেখনা? কেমন করে তাদের কথা জানলে ?
সুরেশ মাতার কাছে আপনার এবং সরলা, নিম্মল ও সরযূর সমস্ত
কাহিনী বর্ণনা করিল। তখন মাতার প্রাণে যে অনুপম আনন্দ, তাহা
কে বর্ণনা করিবে ?
সুরেশ মাতাকে সঙ্গে লইয়া মনের আনন্দে ডিব্ৰুগড় যাত্রা করিল।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ সুরেশের ছােট দুটি বােন নির্মল ও সরযূ যে চা বাগানের বড় বাবু বলাই চাটুৰ্য্যের বাসায় আছে, সে কথা আমরা আগেই বলিয়াছি। বলাই বাবুর কলিকাতার বিডন স্ট্রাটের বাড়ীতে একটি বিবাহ। সে জন্য তিনি সপরিবারে গরুর গাড়ীতে ডিব্ৰুগড় যাইতেছেন। ডিব্ৰুগড় হইতে ষ্টিমারে গােয়ালন্দ, আবার সেখান হইতে রেলগাড়ীতে কলিকাতা যাইবেন। তঁাহার সঙ্গে নিম্মল। ও সরযূ কলিকাতা যাইতেছে । এজন্য দুটি বােনেরই মনে আনন্দ আর ধরে না। তাহারা তাবিতেছে, কলিকাতা গেলেই মেয়েদের বােডিংয়ে, সরলার সঙ্গে আবার দেখা হইবে, আবার তাহার ভালবাসা পাইবে । বলাই বাবুর গরুর গাড়ী, ভয়ানক জঙ্গলের পথ দিয়া যাইতেছিল। তিনি সঙ্গে যে খাবার জল আনিয়াছিলেন, তাহা ফুরাইয়া গিয়াছে ; তাই সঙ্গের ছেলেটি জল পিপাসায় চীৎকার করিয়া দিতে লাগিল। একটু দূরেই একটা ঝরনা দেখিতে পাওয়া গেল। তাহার জল অতি নিম্মল। বলাইবাবু ঝরণা দেখিয়াই জল নেবার জন্য গাড়ী থামাইলেন। কিন্তু কে জল আনিতে যাইবে? এই জঙ্গলে বিস্তর বাঘ, রাত্রে ভয়ে কোন গরুর গাড়ী এই পথ দিয়া চলে না। বলাইবাবু নিজে বাঘের: ভয়ে গাড়ী হইতে নামিলেন না; গাড়ােয়ান জাতিতে বড় ছােট, তাই সে যে জল ছু ইবে, গৃহিণী তার ছেলেকে তাহা খাওয়াইবেন না। কাজেই তিনি হুকুম করিলেন-“নিম্মল, তুই এই ছােট কলসীটি নিয়ে ঝরণার কাছে যা, তাড়াতাড়ি কক্সীতে জল ভরেই গাড়ীর কাছে ছুটে আসি।” ভয়ে নির্মলার প্রাণ কাপিয়া উঠিল। কিন্তু গিন্নির হুকুমেয় মত কাজ না করিলে কি আর রক্ষা আছে? কাজেই সে একটি বার ছােট বােন সােনার খনির সন্ধানে সরযুর মুখের পানে কাতর দৃষ্টিতে চাহিয়া, জল আনিতে চলিল। সরযু কহিল, “দিদি, আমিও তােমার সঙ্গে যাব।” গিন্নি মুখভঙ্গী করিয়া বলিলেন, “কোথায় যাবে? বাঘের মুখে ?” সরযূর আর কথা কহিতে সাহস হইল না, সে দিদিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল। নিৰ্ম্মল ঝরণার কাছে গিয়া যখন কলসীতে জল ভরিল, তখনই এক বাঘিনী বিকট গৰ্জন করিয়া, সঙ্গে বাচ্চা লইয়া লেজ নাড়িতে নাড়িতে জঙ্গল হইতে বাহির হইল। গাড়ীর দুই গরু দেখিতে ত প্ৰকাণ্ড কিন্তু এমনই ভয় যে, একটিবার বাঘের পানে চাহিয়াই ছুটিয়া চলিল। আর কাহার সাধ্য সেই দুই গরুকে থামাইয়া রাখে? সরযূ “দিদি দিদি”, বলিয়া চীৎকার করিয়া দিতে লাগিল। কিন্তু সে কান্নায় গাড়ােয়ান গাড়ী থামাইল না। সে গরীবের ঐ গরু দুটিই সম্বল; বাঘ আসিয়া গরুর উপর লাফাইয়া পড়িলে, সে কেমন করিয়া গরু দুটিকে বাঁচাইবে ? গাড়ােয়ান গাড়ী খুব ছুটাইয়া চলিল, নিৰ্ম্মল ঝরণার কাছেই পড়িয়া রহিল। বলাই বাবু মনে করিলেন, যে প্রকাণ্ড বাঘ, আবার তার সঙ্গে একটি বাচ্চা; নিশ্চয়ই সে বাচ্চা লইয়া খাবার জন্য শিকার খুঁজিয়া বেড়াইতে বাদের কাছে মানুষের রক্ত যেমন উপাদেয় খাদ্য, এমন আর কিছুই নয়, কাজেই বাঘিনী এবং তাহার বাচ্চা এতক্ষণে নিশ্মলার তাজা রক্ত খাইয়া হাড় মাংস খাইতে আরম্ভ করিয়াছে। এখন গাড়ী ফিরাইয়া নিলার কাছে গিয়া আর লাভ কি ? কিন্তু নির্মুলাকে স্বয়ং ঈশ্বরই রক্ষা করিলেন। সে, বাঘ বাহির হইয়াছে দেখিয়াই, সামনের পাহাড়ের এক গহরে গিয়া লুকাইল এবং গম্বরের মুখ পাথর দিয়া বন্ধ করিল। সামনের মানুষ পলাইয়া গেল দেখিয়া, বাঘিনী হরিণ খুঁজিতে খুজিতে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। নিৰ্ম্মল। অনেকক্ষণ পরে, সাহস করিয়া গম্বরের বাহিরে আসিল, কিন্তু কোথায় গরুর গাড়ী? অসহায় বালিকা সেই ওঙ্গলে পাগলের মতন ছুটাছুটি ছিল।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ , এমন করিয়া কঁদিতে লাগিল। সময়ে কয়েক জন কাঠুরিয়া কাঠ কাটিবার জন্য সেই বনে আসিয়া পড়িল। নিৰ্মলাকে তাহার একটি রেলওয়ে ষ্টেসনে পৌছাইয়া দিল। দুঃখিনী বালিকা সেইখানে চোখের জলে ভাসিয়া বলিতে লাগিল—“সরযু, তুমি কোথায় ? তােমায় না দেখে আমি কেমন করে পাকব?” একটি পরীর মতন সুন্দর বালিকাকে এই ভাবে দিতে দেখিয়া, ষ্টেসনের লােকজন আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া দাড়াইল। সকলেই তাহার কথা শুনিয়া দুঃখ প্রকাশ করিল। ঠিক এই সময়ে একখানি রেলগাড়ী ষ্টেসনে আসিয়া পৌছিল। সেই গাড়ীতেই সুরেশ এবং তাহার মা ডিব্ৰুগড় যাইতেছিলেন। সুরেশ গাড়ী হইতে নিৰ্মলাকে দেখিয়াই চমকিয়া উঠিল। সে তু চা-বাগানের বলাই বাবুর বাড়ীতে ঢুকিয়া এই মেয়েটিকে দেখিয়াছিল। তার বােন ছাড়া এত দুঃখ আর কাহার হইতে পারে? আর কোন ভদ্রলােকের মেয়ে অসহায় অবস্থায় একটি ষ্টেশনে পড়িয়া কঁদিতে পারে ? সুরেশ গাড়ী হইতে নামিয়াই বালিকার সামনে গিয়া দাঁড়াইল এবং কহিল—“তােমার নামই কি নিৰ্ম্ম লা? তােমর। দুই বােনেই কি চা-বাগানে বলাইবাবুর বাড়ীতে ছিলে ? করে এলে ? তােমার ছােট বােনটি কোথায় ?” নিৰ্মলা কহিল, “আমারই নাম নিৰ্ম্মল, আমিই বলাইবাবুর বাড়ীতে ছিলাম। তিনিই আমাকে বাঘের মুখে ফেলে দিয়ে, আমার ছােট বােনটিকে নিয়ে ডিব্ৰুগড় গিয়েছেন।” সুরেশের মা গাড়ীতে বসিয়া নিৰ্মলার সকল কথাই শুনিতেছিলেন। তিনি আর সুস্থির হইয়া থাকিতে পারিলেন না; তাড়াতাড়ি নিম্মলার কাছে আসিয়াই, সেই বার তের বৎসর বয়সের মেয়েটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন এবং তাহাকে কোলে লইয়া গাড়ীতে উঠিলেন। মা তাহার সমস্ত স্নেহই মেয়েটির প্রাণে ঢালিয়া দিয়া কহিলেন, “নিম্মলা আমার, এখানে কেমন ৯৪ সােনার খনির সন্ধানে দুঃখিনী কন্যা আমার, তুমি কি অভাগিনী মাকে চিনতে পার? এস, এস, আমার প্রাণের ভিতরে এস, আমার সমস্ত হৃদয় জুড়িয়ে যাক।” নিৰ্ম্মল অবাক হইয়া একবার মায়ের মুখের পানে, আর একবার সুরেশের মুখের পানে চাহিতে লাগিল। ষ্টেসনের মানুষগুলির কাছে সকলই যেন ভেীবাজির মতন মনে হইল। মা নিৰ্মলাকে বলিলেন, “এই তােমার দাদা সুরেশ, আশ্চর্য্য ভাবে এর প্রাণ রক্ষা হয়েছে; এবং আশ্চৰ্য্য ভাবেই এর সঙ্গে আমার মিলন হয়েছে।” নিৰ্ম্মল যে কি বলিবে, ভাষাই খুঁজিয়া পাইল না। সে অনেকক্ষণ মায়ের মুখের পানে চাহিয়া তাহাকে চিনিতে পারিল। কিন্তু সুরেশকে কেমন করিয়া চিনিবে ? তাহার ত কোন কথাই সে মনে করিতে পারে না। তাহাদের নৌকা ডুবির সময়ে সে যে অতি ক্ষুদ্র একটি বালিকা ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর বালিকাকে মা নিজের হাতেই ফল ও মিষ্টান্ন খাওয়াইতে লাগিলেন। কিন্তু বােন সরযুর জন্য নির্মুলার চোখের জল ঝরিতে লাগিল। সে ভাবিল, “আমার সঙ্গে সরযু যদি মাকে আর দাদাকে দেখতে পেত, তবে তার মন যে পুলকে পূর্ণ হয়ে যেত। কে বলবে আর তার সঙ্গে দেখা হবে কি না?” সুরেশ কহিল, “লক্ষ্মী বােন আমার, তুমি সরযুর জন্য কেঁদ না। তুমি কি বুঝতে পারছ না, আমাদের মস্তকে কেমন আশ্চর্য্যভাবে ঈশ্বরের করুণার ধারা নেমে এসেছে। তার করুণা না হলে কি এইখানে মার সঙ্গে আর আমার সঙ্গে তােমার দেখা হত? বলাইবাবু সরযূকে নিয়ে নিশ্চয়ই আজ ডিব্ৰুগড় থাকবেন। কাল ছাড়া ত তার ষ্টিমার পাবার আর যো নেই। আমি আজ ডিব্ৰুগড় পৌছেই, যেমন করেই হােক না কেন, সরযুকে খুজে বের করবই।” সুরেশের মাতা কহিলেন, *সয়যুকে চোখের সামনে দেখে, প্রাণ পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ . জুড়াবার জন্য আমারও মন আকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু আজ না হােক, কাল তাকে পাবই। এখন যে তুমি আমার সামনে রয়েছ, তােমার মুখে কি হাসি দেখতে পাব না? সেই তুমি যেমন মিষ্টি করে আমাকে ‘মা’ ‘মা’ বলে ডাকতে, তেমনি কি আমায় মা বলবে না? আমাকে বুঝি এখনাে তােমার মা বলে বিশ্বাস হচ্ছে না?” নিৰ্মলা। বিশ্বাস হবে না কেন মা? সরযূর জন্য আমার মনটা কেমন হয়ে গিয়েছে, সেই জন্যই আমি তােমাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারি নি। আচ্ছা মা, সরযুর কথা কি তােমার মনে পড়ে? না, না, আমি কি কথা বলছি ? তুমি সরযুকে ভুলবে কি করে? সে যে সকলের চেয়েই ছােট। তবে তুমি তাকে দেখলে কিছুতেই চিনতে পাবে না। কেমন করে চিনবে? তুমি যে তাকে একটুখানি রেখে চলে গিয়েছ। মা। লক্ষ্মী মা আমার, তুমিই ত কত ছােট, বল ত কেমন করে বােনটিকে মানুষ ককূলে ? সুরেশ। মা, সে দুঃখের কাহিনী শুনলে পাষাণ ও গলে যায়। মা। সুরেশ, তুমি বুঝি সবই সুহাসিনীর কাছে শুনেছ ? নিৰ্মলা। সুহাসিনী কে ? আমার দিদি? তিনি কি বেঁচে আছেন ? দাদা যে বেঁচে আছেন, তা সরলাদিদির মুখে শুনেছিলুম। তিনি বলেছিলেন, নিশ্চয়ই তােমার সুরেশ দাদার সঙ্গে দেখা হবে। তা দেখা ত আজ হ’ল। কিন্তু আমার বাবা আর দিদি মরে গেলেন কেন? তাদের সঙ্গে দেখা হলে আর সরযু কাছে থাকলে আজ কি সুখই হত । সুরেশ। নিম্মল, তােমার দিদির কথা কিছু মনে হয় ? নিৰ্মলা। কিছুই না। কেমন করে মনে হবে ? আমার শুধু মার কথাই মনে ছিল। আপনার কথাও আমার মনে ছিল না। পাহাড়ে অসভ্যদের দেশে একটু বড় হয়ে মার কাছে শুধু আপনার আর দিদির গল্প নতাম।
সােনার খনির সন্ধানে সুরেশ। তাই বুঝি মাকে পেয়েই তুমি খুসী হয়েছ ? আমাকে দেখে খুসী হও নি ? নিৰ্মলা। আপনাকে দেখে খুব খুসী হয়েছি। যে দিন কলকাতায় সরল। দিদি বল্লেন, আপনি বেঁচে আছেন, সেই দিন থেকে কতবার ইচ্ছা হয়েছে যে আপনাকে একবার দেখি । তা, কেমন করে দেখব? আপনি যে কোথায় আছেন, তা সরলাদিদি ও জানতেন না। তিনিও যে আপনাকে খুব ভালবাসেন। কতদিন আপনার কথা বলতে বলতে চোখের জল ফেলতেন। সুরেশ। সরলার কাছে শুনেছি, তােমরা তাকে খুবই ভালবাস। নিৰ্ম্মল। আপনার সঙ্গে তার কবে দেখা হল ? তার কাছেই বুঝি আমাদের সব কথা শুনেছেন ? সুরেশ। হঁা, তারই কাছে আমি তােমাদের কথা সব শুনেছি। কিন্তু নিৰ্ম্মল, ডিব্ৰুগড় গিয়েই সরযূকে যখন তােমার কাছে নিয়ে আস্ব, যখন তােমরা দুটি বােন মিলিত হবে, যখন তােমাদের দুজনকে দেখে মা’র মনে আনন্দ আর ধরবে না, তখন এমন একটা আশ্চয্য কথা বলব, যা শুনে তােমরা সুখে একেবারে ভেসে যাবে। নিৰ্মলা। সে কথা এখনি বলুন না। সুরেশ। না, তা এখন ও বলব না। মা। নিৰ্মলা, তুমি ত দাদার সঙ্গেই কথা বলছ? আমার সঙ্গে মন খুলে কথা ত বলছ না ? তবে বুঝি আমার চেয়ে দাদাকে বেশী ভাল বাসবে? নিৰ্মলা। মা, তােমার চেয়ে দাদাকে কেমন করে বেশী ভালবাসতে পাব? বড় হয়ে দাদাকে ত দেখতে পাই নি, তােমাকেই দেখেছি, তােমার কাছেই দাদার সব কথা শুনেছি। এখনাে মনে পড়ে, দাদার কথা আর দিদির কথা বলতে বলতে তুমি চোখের জলে ভেসে যেতে।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ ৯৭ নে।” মা। তখন তুমি যে কি করূতে তা আমার পরিষ্কার মনে আছে। তুমি বলতে “মা, তুমি কেঁদ না, তােমার চোখের জল ত দেখতে পারি তার পরে আমার যখন অসুখ হল, তখন তুমি অতি ছােট মেয়ে হয়েও আমার যে রকম সেবা করতে, তা দেখে অবাক হয়ে যেতুম ; মনে হত, তুমি আমার মেয়ে নও, কোন্ দেবলােক হতে যেন আমারই কাছে নেমে এসেছ। নিৰ্ম্মল।। মা, আপনি ত পাগল হয়ে রাত্রে ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের রেখে চলে গেলেন। তার পরে কেমন করে ভাল হলেন? ভাল হয়ে কোথায় ছিলেন? কেমন করেই বা দাদার সঙ্গে আপনার দেখা হল ? সুরেশের মা একটি একটি করিয়া আপনার সকল কথা বলিলেন। নিৰ্মলা কহিল-“মা, আপনি চলে যাবার পরে পাহাড়ের পুরুষ মেয়ে সকলেই আমাদের যে কত ভালবেসেছে, তা কেমন করে বলব? তারা নানা রকম খাবার জিনিষ এনে আমাদের দিত, আর বস্ত, তােমাদের মা নিশ্চয়ই আবার ফিরে আসবেন। এখন ত দেখছি পাহাড়ীদের কথাই সত্য হল, তােমাকেও ফিরে পেলুম, দাদার সঙ্গেও দেখা হল। ঈশ্বর করুন ডিব্ৰুগড় গিয়েই যেন সরযূকে কাছে পাই। তাকে না পেলে কোন সুখেই ত সুখী হতে পারব না।” সুরেশ। পাহাড়ীদের কথার চেয়ে ও আমার কথা সত্য হবে। না থােক, কাল যে সরযুকে কাছে পাবে, সে কথা আমি নিশ্চয় করেই বলতে পারি। শুধু শুধু কি তাই, কিছু দিন পরে যে তােমাদের দিদিকেও দেখতে পাবে। নিৰ্মলা। আপনার কথা শুনে আমার মন যে কি রকম করূছে, আমি তা ভাল করে বুঝতেই পাছি নে। মা। সরযু আমাকে দেখলে মােটেই চিনতে পাবে না। নিৰ্মলা। তা আর কেমন করে চিবে?
৯৮ সােনার খনির সন্ধানে মা। তার চেহারা কি এখন তোমারই মতন হয়েছে ? নিৰ্মলা। আমি তা ঠিক বলতে পারি নে। কিন্তু মা, হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। কলকাতার মেয়েরা বত, আমার চেহারা নাকি ঠিক সরলা দিদির মতন। মা, তুমি নিশ্চয়ই দাদার কাছে সরল। দিদির কথা শুনেছ। সুরেশের মাতা ছেলেকে আর মেয়েকে লইয়া যতক্ষণ গাড়ীতে রহিলেন, ততক্ষণ কতই সুখদুঃখের কথা হইতে লাগিল। আজ যদি সরযু তাহাদের কাছে থাকিত, তাহা হইলে না জানি এই মাতা পুত্র ও কন্যার মনে কি অপূর্ব আনন্দ উচ্ছসিত হইয়া উঠিত। রেলগাড়ী ডিব্রুগড়ে আসিয়া পৌছিল। সুরেশ মাতাকে এবং নিৰ্মলাকে লইয়া তাহাদের আগের বাড়ীতেই উঠিলেন। সে বাড়ীতে যে এক উকিল বাবু বাস করিতেছিলেন, আমরা তা পূৰ্বেই বলিয়াছি। উকিল বাবু অত্যন্ত সমাদর করিয়া সবাইকেই আপনার গৃহে লইয়া গেলেন। সুরেশের মাতা একদিন দেবতার মতন স্বামী ও সন্তানদের লইয়া পরম সুখে এই বাড়ীতে বাস করিতেন। আজ একে একে কত সুখ ও দুঃখের কথাই তাহার মনে পড়িল। তিনি একটু বিশ্রাম করিয়া, কিছু জলখাবার খাইয়া বাড়ীটির চারিদিক ঘুরিয়া দেখিতে লাগিলেন। নিৰ্ম্মল সরযূকে কাছে পাইবার জন্যই অস্থির হইয়া উঠিল। সুরেশ একটু বিশ্রাম করিয়াই বলাইবাবুর সন্ধানে বাহির হইল। কিন্তু সে দিন আর তাহাকে খুজিয়া পাওয়া গেল না। সরযুর জন্য সমস্ত রাত্রি কাহারও আর ঘুম হইল না। সরযুকে যদি কোথাও খুঁজিয়া না পাওয়া যায়, তাহা হইলে কি হইবে? সরকে আর পাওয়া যাইবে না, এই কথা ভাবিতেও যে সকলের হৃদয় শিহরিয়া উঠে ।
No text on this page.
p
নির্মল নিনে ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতেছে
-১৮
পৃষ্ঠ।
যােড়শ পরিচ্ছেদ সুরেশ খুব ভােরবেলায় উঠিয়াই ছােট বােন সরযুর খোঁজ করিতে বাহির হইল। সে ঘুরিয়া ঘুরিয়া, হয়রাণ হইয়া, অবশেষে শুনিতে পাইল, বলাইবাবু সরযুকে লইয়া ষ্টিমার-ঘাটে চলিয়া গিয়াছেন। সুরেশ তখনি সহরের সব চেয়ে ভাল ঘােড়ার গাড়ীখানি ভাড়া করিয়া ষ্টিমার ঘাটে রওনা হইল। গাড়ীর প্রকাণ্ড দুই কালো ঘােড়া নক্ষত্রবেগে ছুটিয়া চলিল। গাড়ী আধ ঘণ্টার মধ্যেই ব্ৰহ্মপুত্ৰনদের তীরে ষ্টিমারের কাছে গিয়া দাড়াইল। ইহার একটু আগেই বলাইবাবু তাহার স্ত্রীকে লইয়া ষ্টিমারে উঠিয়াছেন। কিন্তু সরযূ প্রকাণ্ড এক কাপড়ের বােঝা ঘাড়ে লইয়া, যখন সিড়ির তিনখানা কাঠের তক্তার উপর দিয়া ষ্টিমারে উঠিতেছিল তখন তক্তা নড়িয়া যাওয়ায় সে নদীর জলের ভিতরে পড়িয়া গিয়াছে। ষ্টিমারের নিকটেই পড়িয়াছিল, কিন্তু জলের এমন ভয়ানক স্রোত যে, দেখিতে দেখিতে সরযূ অনেক দূরে ভাসিয়া গেল। তাহাকে উঠাইবার জন্য খালাসীরা ছােট একখানি বােট ষ্টিমার হইতে জলে নামাইতে লাগিল, কিন্তু বােট কাছে যাইবার আগেই সুরেশ নদীর মধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং সরযূকে লইয়া তীরে উঠিয়া দাঁড়াইল। বলাইবাবুর কাপড়ের বােঝাটি জলের স্রোতে ভাসিয়াই চলিল। তাই তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হইয়া ষ্টিমার হইতে নামিয়া পড়িলেন এবং সরযুর গালে প্রকাণ্ড এক চড় মারিয়া কহিলেন, “হতভাগা মেয়ে, তুমি একথালা করে ভাত খাও, আর কাপড়ের বােঝাটা নিয়ে ষ্টিমারে উঠতে পালে না? আমার দশ টাকার কাপড় জলে ভেসে গেল ; এস একবার ষ্টিমারে, মেরে হাড় গুড়াে করে দেব না?” বলাইবাবু মুখের কথা শেষ করিয়াই সরযূকে টানিয়া ষ্টিমারে লইয়া ১০০ সােনার খনির সন্ধানে যাইবার জন্য তাহার হাত ধরিলেন। কিন্তু সুরেশ আর সহিতে পারিল না, সে বলাইবাবুকে ধাক্কা মারিয়া পাঁচ হাত দূরে ঠেলিয়া দিল। তাহার পরে সরযূকে লইয়া গাড়ীতে উঠিল। বলাইবাবু গাড়ীর সামনে গিয়া যেমনি সুরেশকে কৰ্য্য ভাষায় গালাগালি দেওয়া, অমনি তাহার পিঠে শপাং শপাং চাবুক। সুরেশ গাড়ােয়ানের হাতের চাবুক কাড়িয়া লইয়া বলাই- বাবুকে মারিল। তিনি বুঝিলেন, এ তঁাহার চা-বাগান নয়, এখানে অভদ্র ভাষায় গালাগালি দেওয়া চলিবে না। তাই তিনি চেঁচাইয়া বলিতে লাগিলেন-“ও সারেং, তুমি চেয়ে দেখ, কোথাকার এক দস্যু আমাকে মেরে, আমার চাকরাণীর মেয়েকে জোর করে কোথায় নিয়ে ষ্টিমারের সারেং কহিল—“ষ্টিমারের ভিতরেই আমার অধিকার, বাহিরে নদীর তীরে কে কাকে মারে, কে কার মেয়ে কেড়ে নেয়, সে সব দেখ বার ভার পুলিসের উপরে। আপনি থানায় গিয়ে পুলিসে খবর দিন, আমি এখনি জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছি।” সুরেশ গাড়ী হাঁকাইয়া সহরে চলিল। বলাইবাবু ষ্টিমারে উঠিয়া পড়িলেন। ষ্টিমারের লােকেরা তাহাকে কহিল--“সে কি মশাই, আপনার কাপড়ের পুটলীটি ও ভেসে গেল, মেয়েটিকেও দিনেদুপুরে দস্যুতে কেড়ে নিল? দস্যু কি কখনো দিনের বেলায় গাড়ী হাঁকিয়ে ষ্টিমার-ঘাটে আসে? আসল ব্যাপারটা কি বলুন ত আমরা শুনি !” বলাইবাবু। ব্যাপার আমার মাথা আর মুণ্ড,। ঐ জোচ্চোর-বে মেয়েটিকে কেড়ে নিয়ে গেল, সে বলে মেয়েটি ওর ছােট বােন। মানুষগুলি কহিল –“তা হলে এটি আপনার চাকরাণীর মেয়ে নয়, ভদ্রলােকের মেয়ে।” বলাইবাবুকে মেয়েটির সমস্ত কাহিনী বলিতে হইল। ষ্টিমারের বাবুরা বলিলেন-“মশাই, আর আপনি বামুন বলে পরিচয় দিবেন না,
-
মােড়শ পরিচ্ছেদ
১০১
মেয়েটির উপরে মুচির মতন ব্যবহার করেছেন। তা, ঐ মেয়েটি আপনার
হাত ছাড়া হয়ে রক্ষা পেয়েছে।”
গাড়ীর ভিতরে সরযূ অবাক হইয়া সুরেশের মুখের পানে চাহিয়া রহিল।
সুরেশের প্রাণ স্নেহে ভরিয়া উঠিল। সে সরযূর দুটি গালে হাত বুলাইয়া
কহিল, “আমার প্রাণের বােন, আমিই যে তােমার দাদা, আমার নামই
যে সুরেশ। আমার কথা ত তােমাদের সরলা দিদির কাছে শুনেছ।
এখন আমি তােমাকে নিয়ে যাচ্ছি কোথায় তা জান ? তােমার নির্মলা
দিদির কাছে।
সরযূ সুরেশের মুখের পানেই চাহিয়া রহিল। তাহার পরে কাদিয়া
গিয়েছে।”
সুরেশ। কে বল্লে মারা গিয়েছে ? তােমার দিদিকে বাঘে মাতে
পারে? ঈশ্বরই যে দয়া করে তাকে রক্ষা করেছেন। নিৰ্ম্মল বাঘের
মুখ থেকে আমাদের কাছেই ফিরে এসেছে। আর একটু পরেই নিৰ্ম্মলা
দিদিকে দেখতে পাবে।
সরযু।
দিদিকে
দেখতে পাব এ কথা কি সত্য?
সুরেশ। সত্যিই তাকে দেখতে পাবে। আমি যে তারও দাদা।
সে বেঁচে না থাকলে আমি কি হাসিমুখে তােমার সঙ্গে কথা বলতে
পারতুম ? আমি ত সরলার কাছে শুনেছি, দিদিকে না দেখলে তােমার
মােটেই চলে না। কেমন করেই বা চলবে ? দিদিই ত তােমাকে এত
বড়টি করে তুলেছে।
তা শুধু দিদিকে নয়, সেখানে আর একটি আশ্চৰ্য্য
মানুষকে দেখতে পাবে। তার ভালবাসা পেয়ে তুমি নিৰ্মলার চেয়েও
তাকে বেশী ভালবাসবে।
সরযু। দিদির চেয়ে আমি কাকে বেশি ভালবাসব? তিনি কে?
তিনি কি সরলা দিদি ?
সােনার খনির সন্ধানে পাই। সুরেশ। সরলা ত কলকাতায়। আচ্ছা সরযু, আমরা যদি আমাদের মাকে দেখতে পেতুম, তা হলে কেমন হত ? সরযু আবার অবাক হইয়া সুরেশের মুখের পানে চাহিয়া রহিল। সমস্ত ব্যাপার তাহার কাছে যেন কি রকম মনে হইতে লাগিল। সে কহিল, “মাকে কি আর দেখতে পাব ? তবে দিদি যখন মাকে মনে করে কানতেন, তখন সরলা দিদি বলতেন, তােমরা ঈশ্বরের কাছে বল, হে ঈশ্বর, আমাদের মাকে, দাদাকে আর সুহাসিনী দিদিকে যেন দেখতে তা হলেই ঈশ্বরের করুণায় সবাইকেই দেখতে পাব।” সুরেশ। সে ত ঠিক কথা। সবাইকেই দেখতে পাবে। গাড়ী সহরের ভিতরে প্রবেশ করিল। সুরেশ এক দোকানের কাছে গাড়ী থামাইয়া সরযুর জন্য খুব সুন্দর কাপড় আর জামা কিনিল। এতক্ষণ সরযু ভিজা কাপড় পরিয়াই গাড়ীতে বসিয়াছিল। বৃষ্টিতে কাপড় ভিজিলে এমন ত সে অনেক দিনই ভিজা কাপড় পরিয়া থাকে। তাই তাহার বেশি কষ্ট হয় নাই, কিন্তু সুরেশের বড় কষ্ট হইতেছিল। এইবার যখন সরযূ নূতন কাপড় পরিল এবং জামা জ্যাকেট গায় দিল, তখন তাহার সুন্দর চেহারা বড়ই সুন্দর দেখাইতে লাগিল। সুরেশ কহিল, “সরযু, তুমি ত আমাকে কখনো দেখ নি, কেমন করে বুঝলে আমি তােমার দাদা? সরযু । আপনি যে বলছেন, আমার দাদা। সুরেশ। তােমাকে ভুলায়ে কোথাও নেবার জন্য যদি মিছে কথা বলে পাকি? সরযু। আপনি যে খুব ভাল। যারা ভাল, তারা ত মিছে বলে না। সুরেশ। কেমন করে বুঝলে আমি খুব ভাল? সরযু। আপনাকে দেখলেই যে বেশ ভাল লাগে। সুরেশ সরযুকে নানা কথায় ভুলাইয়া বাসায় আসিয়া পৌছিল। ০ ষােড়শ পরিচ্ছেদ ১০৩ নিৰ্মলা সরযূকে দেখিয়াই তাহার গলা জড়াইয়া ধরিল। তাহার পরে কহিল—“সরফু, আমার লক্ষ্মী বােন, তােমাকে যে আবার দেখতে পাব, তা ত মনেই হয় নি। বল ত দুদিন আমায় না দেখে কেমন করে থাকলে ? খুব বুঝি কেঁদেছ ?” সরযূআর কিছু বলিতে পারিল না, সে দিদির বুকে মুখ লুকাইয়া চোখের জল ফেলিতে লাগিল। সুরেশের মাতা ধীরে কন্যার কাছে আসিলেন। নির্মলা কহিল, “সর চেয়ে দেখ, এই যে আমাদের মা। মাকে কি চিনতে পার? আগে মাকে প্রণাম কর, তার পরে তার কোলে যাও।” সরযু কিছুক্ষণ আশ্চর্যান্বিত হইয়া মায়ের মুখের পানে চাহিয়া রহিল। তাহার পরে মাকে প্রণাম করিল। মা তাহাকে কোলে করিয়া ঘরের ভিতরে গেলেন। প্রথমে তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম করিয়া কহিলেন, “দয়াময় ঈশ্বর, আজ তােমাকে কি বলে আমি ধন্যবাদ করব ? এই দুঃখিনীকেও তুমি যে এত ভালবাস, তা আমি ভাবতেই পারি নি। তুমি আশ্চর্যভাবে আমার পুত্র কন্যদের সঙ্গে মিলন করে দিলে ! আমি যেন চিরদিনই তােমার এই দয়া মনে রেখে তােমাকে ভক্তি অর্পণ করতে পারি।” মায়ের ভালবাসার মতন আর কি কিছু আছে ? এই জগতে এমন আর কিছুই নাই। সরযূ নির্মুলার ও সরলার কাছে কতই ত ভালবাসা পেয়েছিল, কিন্তু আজ মায়ের ভালবাসায়, মায়ের স্নেহভরা কথায়, মায়ের অঙ্গের সুবিমল স্পর্শে যাহা পাইল, ছােট মেয়ে বলিয়া তাহা সে ভাল করিয়া বুঝিতে পারিল না, কিন্তু তাহার মনে সুখও যে আর ধরিতেছে না। এমন সুখ সে ত আর কিছুতেই পায় নাই। নিলা কহিল, “সরযু, আমি যখন বতুম, মাকে দেখতে পেলে, আর কিছুই পেতে চাই নে তখন ত তুমি বলতে আমারও মাকে দেখতেই
১০৪
সােনার খনির সন্ধানে
বড় ইচ্ছা হয় । এখন তুমি মার কোলেই বসে আছ, মা তােমাকে কত
ভালবাসা দিচ্ছেন। কই? তুমি ত মাকে একবার মা বলে ডাকতেও
পারলে না? মাকে মা বলে ডাক না, তা হলে মা বড়ই খুসী হবেন।”
সরযু। মা, আপনি কার কাছে আমাদের কথা শুনলেন? কেমন
করে এখানে এলেন ?
মা। মনে কর ঈশ্বরের কাছেই তােমাদের কথা শুনেছি, তার
করুণায়ই এখানে এসেছি। ঐ যে খাবার আছে। লক্ষ্মী মা, এখনােত
তুমি কিছু পাও নি, আজ আমিই এই লুচি, বেগুনভাজা মিষ্টান্ন
তােমাদের মুখে তুলে দেব। কেমন, তাতে তােমার এই খাবারগুলি
খুব ভাল লাগবে না ?
নিৰ্মলা।
বল না, মার হাতে গেলে তা আবার ভাল লাগবে না ?
সুরেশ কহিল, “মা, আজ এই মিলনের, এই সুখের দিনে, আমি
নিজেই বাজারে বাব। ভাল ভাল জিনিষ কিনব, তার পরে নিজের
হাতেই নানা রকম রান্না করে সবাইকে খাওয়াবাে। আমি যে
ছেলেবেলা থেকে বামুন ঠাকুরের কাজ করে করে চমৎকার রান্না করতে
শিখেছি।”
মা। তুমি যে দুঃখের আগুনের মধ্য দিয়া চলে এসেছ, আজ এই
সুখের দিনে সেই দৃশ্য আর দেখতে চাই নে। না সুরেশ, আমি
নিজেই আজ রান্না কর। তুমি কোন্ জিনিষ খেতে ভালবাস, বল ত !
সুরেশ। মা, দুঃখের ভিতর দিয়ে আমার দিন কেটে গিয়েছে, আমি
যা পাই, তা খাই, সব জিনিসই আমার ভাল লাগে ।
মা। সরফু, তােমার কি খেতে ভাল লাগে ?
নিৰ্মলা। মানুষের গালাগালি ছাড়া ভাল জিনিষ ত বেশি খায়
নি, তাই সরযু “কোন জিনিষেরই নাম করতে পারবে না। ওকে তুমি
যা রান্না করে দেবে তাই ওর ভাল লাগবে।
ষােড়শ পরিচ্ছেদ
সুরেশের মা ছেলেমেয়েদের লইয়া যে বাসায় ছিলেন সেই বাসার
মেয়েরাই তাহাদের রান্নার আয়ােজন করিতেছিলেন। কিন্তু সুরেশের
মার নিজের হাতে রান্না করিয়া ছেলেমেয়েদের খাওয়াইতে বড়ই ইচ্ছা
হইয়াছিল, তাই তিনি স্বহস্তে ডাল, আলু-পটলের ডানা, মাছের
বােল, কিসমিসের চাটনি ও মিষ্টান্ন রান্না করিলেন ।
সুরেশ খাইতে
বসিয়া কহিল, “মা, তুমি প্রত্যেক জিনিষটির ভিতর তােমার ভালবাসা
দিয়া রান্না করেছ, তাই আজ মনে হচ্ছে এমন চমংকার রান্না আর কখনো
খাই নি।”
মায়ের
প্রাণ আনন্দে ভরিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, “আজ
যদি সুহাসিনীও এই সঙ্গে থাকত, তবে এই সুখের মিলন আরাে
কতই সুখের হত।”
মা, দিদি কি সত্যই মারা গিয়াছেন? একদিন তােমার
মতন তাকেও কি দেখতে পাব না?
সুরেশ। সেই যে তােমাকে একটা আশ্চর্য্য কথা বলব বলেছিলুম,
এইবার তা বলি। বলবার আগে জিজ্ঞাসা করি । তােমাদের সরলা
দিদিই যদি সুহাসিনী অর্থাৎ তােমাদের আপনার দিদি হন তা হলে কি
খুব খুসী হও ?
সরযু। তিনি যদি আপনার দিদি হন, আর আমাদের সঙ্গেই
থাকেন, তা হলে খুব মজা হয়।
মা আপনি ত সরল। দিদিকে দেখেন
নাই, তিনি যে কি ভাল, তা আর আমি বলতে পারি নে।
নিৰ্মলা। দাদা, তবে কি সরল। দিদিই আমাদের আপনার বােন ?
তাঁর নামই কি সুহাসিনী ছিল ? তাই হােক, তাই হােক। মেয়েরা
ত দেখে বলত, সরলা দিদির চেহারা অনেকটা আমাদেরই মতন।
দাদা, কি আশ্চর্য কথা বলবেন, শীঘ্র বলুন, আমার যে শুনতে
বড়ই ইচ্ছা।
০
১০৬
সােনার খনির সন্ধানে
মা। সরলাই সুহাসিনী। সে তােমাদের আপনার দিদি।
নিৰ্মলা। মা, আপনি ত তাকে দেখেন নি, কি করে বলছেন,
তিনিই আমার দিদি ?
সুরেশ। সুহাসিনীর নাম এখন সরলা। আমাদের নৌকাডুবি
হবার পরে জেলেরা তাকে নদীর তীরে পেয়েছিল। নগেনবাবু.জেলেদের
কাছ থেকে নিয়ে তাকে মানুষ করেছিলেন। সরলা আগে সে সব কথা
জান্তনা। অল্পদিন হয় সবই জাতে পেরেছে।
নিৰ্ম্মল।
শুনে আমার কি সুখই হচ্ছে ! এখনি যদি তাকে একবার
দেখতে পেতুম ! সরযু, লক্ষ্মী বোন, শুনলে ত আমরা সরলা দিদিরই
ছােট বােন।
সরযু। দাদা, আমরা সরক। দিদির কাছে কবে যাব?
মা। সুরেশ, কি বল? মনের আনন্দে আজ যেন আমিও
ছেলেমানুষের মতন হয়েছি। মনে হচ্ছে, 'খী হতে পারলে এখনি উড়ে
সুহাসিনীর কাছে যেতুম ।
বর্ষাকালে জলে যেমন পুকুর ও খাল বিল ভরিয়া যায়, তেমনি মুখে
সুরেশের মাতার ও সন্তানদের মন ভরিয়া গিয়াছে। তাই তঁাহার। অনেক
সময় বসিয়া শুধু আপনাদের সুখ-দুঃখের কাহিনীই বলিতে লাগিলেন।
অবশেনে সুরেশের মাতা মনােরমা দেবী কহিলেন, “দেখ সুরেশ, তােমার
বাবা যখন সােনার খনির সন্ধানে যাত্রা করেন, তখন এই সহরে বড়ই
চোরের ভয় ছিল। তাই তিনি আমার এবং সুহাসিনীর অনেক টাকা
দামের গহন', মূল্যবান বস্ত্র এবং টাকাকড়ির হিসাব,-তা ছাড়া তােমার
দাদামহাশয়ের সময়ের অনেক সােনার মােহর লােহার সিন্ধুকে ভরে মাটির
ভিতর পুতে রেখেছিলেন। মাটি খুঁড়লে হয় ত সিন্ধুক পাওয়া যাবে।”
সুরেশ। এখনি মাটি খুড়ে দেখা যাক না কেন।
সেই বাড়ীতে যিনি ছিলেন, তার অনুমতি লইয়া সুরেশ নিজের হাতেই
ষােড়শ পরিচ্ছেদ ১০৭ মাটি খুড়িল। কয়েক হাত মাটির নীচে সিন্ধুকটি পাওয়ায় তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। তখনি তালা ভাঙ্গিয়া সিন্ধুকটি খােলা হইল। কি আশ্চৰ্য্য ! সােনার গহনা, রত্নহার, টাকা ও সােনার মােহর সবই ত রহিয়াছে, শুধু মূল্যবান কাপড়গুলিই খারাপ হইয়াছে। গহনা মােহরগুলি সিন্ধুকের ভিতর ঝকঝক্ করিতেছিল। দেখিয়া আর সকলের আনন্দ হইল, কিন্তু মনােরমা দেবীর, সুরেশের বাবার কথা মনে পড়ায় চোখ দিয়া ঝরঝক্ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। হিসাবের খাতাখানিতে দেখা গেল, সুরেশের পিতার ব্যাঙ্কে বিস্তর টাকা ছিল। তাহা ছাড়া তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকার জীবনবীমা করিয়াছিলেন। নগদ ও প্রায় দশ হাজার টাকার সােনার মােহর আছে। সুরেশ মনে ভাবিল, পিতার জীবনবীমার ও ব্যাঙ্কের টাকা হাতে আসিলে আর নগেনবাবুর টাকা গ্রহণ করিবার আবশ্যকই হইবে না। সুরেশের পিতা নামজাদা বিলাত ফেরত ডাক্তার ছিলেন। সহরের বিস্তর লােক তাহার কাছে নানারকমে উপকার পাইয়াছে। তাহাদের বিশ্বাস হইয়াছিল, ঝড়ে নৌকা ডুবিয়া যাওয়ায়, সুরেশদের সকলেরই মৃত্যু হইয়াছে। আজ যখন সহরের লোেক শুনিল, তাহাদের পরম উপকারী ডাক্তার মুখােপাধ্যায়ের স্ত্রী এবং পুত্রকন্যাগণ এখনাে জীবিত, তাহারা এই সহরে আসিয়া তাহাদের আগের বাসাতেই বাস করিতেছে, তখন দলে দলে পুরুষ ও স্ত্রীলােক সুরেশের মাতা এবং তাহার ছেলেমেয়েদের দেখিতে আসিলেন। সুরেশ করুণ ও প্রাণস্পর্শী ভাষায় আপনাদের জীবনের সমস্ত কাহিনীই বর্ণনা করিল। শুনিয়া সকলেরই বিস্ময়ের আর সীমা রহিল না। তখন সহরের অনেক সাহেব মেম ও কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তাহাদের পূর্ব সিবিল সার্জনের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের দেখিতে আসিলেন।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ আমরা অনেক দিন সরলার কথা কিছুই বলি নাই, আজ তাহার কথাই বলিব। সরল, তাহার বাবা ও মা-অর্থাৎ নগেনবাবু ও কমলা দেবীর সঙ্গে কলিকাতায় ছিল। তাহারা এই দুই মাস কলিকাতায় একটি বাড়ী ভাড়া করিয়া বাস করিতেছিলেন। নগেনবাবুর কাছে হঠাৎ টেলিগ্রাম আসিল, বক্সারে তাহার ভাইয়ের স্ত্রী কাত্যায়নী দেবীর কঠিন পীড়া, বাঁচিবার আর আশা নাই। সেই জন্য নগেনবাবু ও কমলাদেবী সরলাকে বামুন ঠাকুরাণীর কাছে রাখিয়া বক্সারে চলিয়া গেলেন। সরলা বাপ মা ছাড়া হইয়া বােডিংয়ে রহিয়াছে বটে, কিন্তু কলিকাতা সহরের একটা প্রকাণ্ড বাড়ীর ভিতরে আর কখনই থাকে নাই। বামুন ঠাকুরাণী তাহাকে মায়ের মতনই ভালবাসেন এবং আদর-যত্ন করেন, কিন্তু তা হইলেও আজ বাবা মায়ের জন্য তার প্রাণ যেন অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিল। সরলাদের পাশের এক বড় লােকের বাড়ীতে বিবাহ ছিল, সেখানে অনেক রাত্রি পর্যন্ত কত লােকের আসা-যাওয়া, কত গান, কত বাজনা, কত বাজি পােড়ান, কত কোলাহল ;-এই সকলের জন্য সরলার ভাল ঘুম হইল না। তাহার মনে কত চিন্তাই জাগিল, সে ভাবিতে লাগিল । “আমার জীবনের কাহিনী ঠিক যেন একটা গল্পের মতন। শুনতে পাই আমার প্রকৃত পিতা মাতা যারা ছিলেন, তারা নাকি মানুষের পরম শ্রদ্ধার পাত্র ও প্রগার পাত্রী ছিলেন। কিন্তু তারা আজ কোথায় ? আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যারা বাপ-মা না হয়েও কন্যার মতন আমাকে মানুষ কবুলেন, তাঁরা আমাকে সকল সুখেই সুখী করেছেন। দুঃখ কাকে বলে আমি ত তা জানতেই পারি নি। হায়, তার পরে কোথা হতে সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ১০৯ আমার আপনার ভাইবােন এসে আমার মনের উপরে মায়া বিস্তার কল? আজ যে তাদের জন্য আমি কোন সুখেই সুখী হতে পারি নে ? আজ কোথায় সেই অনাথিনী চিরদুঃখিনী বালিকা দুটি ? কোথায়ই বা আমার ভাই ?” সরলা একটু নীরব থাকিয়া আবার আপন মনে বলিতে লাগিল—“দাদা কি আর বেঁচে আছেন? সােনার খনির সন্ধান করূতে গিয়ে হয়ত বনের জানোয়ারের মুখে পড়েছেন, নয় ত রাক্ষসের মতন অসভ্য জাতির লােকেরাই তাঁকে হত্যা করেছে। নইলে এমন ও ত হতে পারে যে, তিনি যথার্থই সােনার খনির সন্ধান পেয়েছেন, তার পরে তার পরে গরুর গাড়ী বােঝাই করে যখন সােনা নিয়ে আসছিলেন, তখন পাহাড়ী দস্যরা তাকে কেটে কুটে সব সােনা লুটপাট করে নিয়েছে।” সরলা বিস্তর গল্পের বই পড়িয়াছে। তাই সে মনে মনে তার দাদার বিষয়ে অনেক রকম কল্পনা করিয়া চোখের জলে ভাসিতে লাগিল। অনেক রাত্রে সে ঘুমাইয়া পড়িল । সকাল বেলায় বিয়ে বাড়ীর সানাইএর বাজনায় তাহার ঘুম ভাঙ্গিল। সে আপনার ঘরে বসিয়া শুধুই দাদার আর দুটি বােনের কথা ভাবিতে লাগিল। এই সময় বামুন ঠাকুরাণী ছুটিয়া আসিয়া সরলার কাছে কহিলেন, “সরলা, ঐ দেখ ত চেয়ে কে তােমার কাছে আছে ?” সরলার বিস্ময় ও আনন্দের আর সীমা রহিল না! সে চাহিয়া দেখিল, তাহারই দাদা সুরেশ। সরলা সুরেশকে প্রণাম করিয়া কহিল, “দাদা, তুমি যে বেঁচে আছ, আমি ত তা মনে করতেই পারি নি। তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? কোন খবর না দিয়ে, এখন কোথা হতে এখানে এলে? বামুন ঠাকুরাণী কহিলেন, “এই কয়মাস ধরে সরলা তােমার কোন খবর না পেয়ে নির্জনে বসে শুধু চোখের জল ফেলেছে। তা আমি ছাড়া আর ত কেউ দেখতে পায় নি।”
১১০
সােনার খনির সন্ধানে
সুরেশ কহিল, “সরলা, তুমি যে আমাকে বড়ই ভালবাস, আমার কোন
খবর না পেলে তােমার ত কষ্ট হবেই। কিন্তু কোন খবর পাঠাইনি বলে
আমি কি তােমাকে খুব ভালবাসি নে? লক্ষ্মী বােন আমার, তুমি যে
আমারই ছেলেবেলার সেই পরম আদরের সুহাসিনী, তা মনে কলেও
মন আনন্দে নৃত্য করে ওঠে। তবে দুঃখ পেয়ে পেয়ে আমার মনের
একটা দিক যেন পাষাণ হয়ে গিয়েছে, তাই তােমাকে আমার কোন
খবর পাঠাই নি।”
সরলা।
দাদা, তুমি আমাকে ভালবাস না ত কে আমাকে
ভালবাসে?
সরল, ঐ চেয়ে দেখ না, তােমার অতি স্নেহের নির্মুলা ও
সরযূকে যে নিয়ে এসেছি।
নিৰ্ম্মল ও সরযু আসিয়া সরলাকে প্রণাম করিল। সরলা স্নেহের
আবেগে দুটি বােনের হাত ধরিয়া কাছে বসাইয়া কহিল,-“এস এস,
তােমরা প্রাণের কাছে এস। তােমাদের দেখে আমার মন যে সুখে
ভেসে যাচ্ছে। এতদিন ত জাতুম না, তােমরা আমারই আপনার
ধােন। তােমরা কি দাদার কাছে শুনেছ, আমি তােমাদেরই আপনার
দিদি ?”
নিৰ্মলা। শুনেছি বই কি? দাদার কাছে যেদিন শুলুম, আপনি
আমাদেরই দিদি, সেদিন থেকে শুধুই ভাবছি, কবে আপনার কাছে এসে
আপনাকে দেখতে পাব ?
সরযু। দিদি, আর ত আমরা কোথাও যাব না, এখন থেকে আপনার
কাছেই থাকব।
সরলা। তা থাকবে বই কি! তুমি যে আমাদের সকলের চেয়ে
ছােট। তােমার মতন আমাদের আদরের পাত্রী আর কে আছে ?
নির্মলা। দিদি, আপনি ত জানেন না, সরযু আবার ব্রহ্মপুত্র নদীতে
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ১১১ পড়ে ডুবে যাচ্ছিল। ভাগ্যে দাদা তা দেখতে পেয়েছিলেন। তিনিই নদীতে লাফিয়ে পড়ে সরযূকে উপরে তুলে এনেছেন। সরলা। মাগো! তাই নাকি? ব্রহ্মপুত্র নদীটার নামেই যে আমার শরীর শিউরে ওঠে। সরযূ। দিদি, আপনি ত এখনো মাকে দেখতে পান নি, তিনিও যে আমাদের সঙ্গেই এসেছেন। মনােরমা দেবী ধীরে ধীরে সরকার সরে আসিয়া দাড়াইলেন। সমস্ত ঘর যেন আলােকে আলােকময় হইয়া উঠিল। সরলার মনে হইল, স্বর্গ হইতে যেন এক জ্যোতির্ময়ী নারী নামিয়া আসিয়াছেন। স্বয়ং ঈশ্বর সরলার মাতাকে এমনই দেবী প্রতিমা করিয়া গড়িয়াছেন যে, তাহার মুখের পানে চাহিয়া ভক্তিতে সরলার প্রাণ ভরিয়া উঠিল। সুরেশ কহিল- “সরলা, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ কর যে আমি সােনার খনির সন্ধানে গিয়েছিলুম। সােনা পাই নি বটে, কিন্তু তুচ্ছ সােনার চেয়ে লক্ষ গুণে শ্রেষ্ঠ যে আমাদের মা, তার দেখা পেয়েছি। বল ত এমন করে ঈশ্বরের অপার করুণা কয় জন মানুষ পেয়ে থাকে ? আজ এই দেবীর মতন মাতার কাছে দাড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমার জীবন সার্থক।” মায়ের মুখ হইতে একটিও কথা বাহির হইল না, তিনি যত সহজে নিৰ্ম্মল ও সরযুকে কোলে তুলিয়া লইয়াছিলেন, সরলাকে সেরকম করিতে পারিলেন না। শুধুই পাথরের মূর্তির মতন দাড়াইয়া সরলার সরলতা মাখা সুন্দর মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন। সরলা মায়ের পায়ে মাথা রাখিয়া প্রণাম করিল। মনােরমা দেবী সরলাকে কহিলেন- “সুরেশের কাছে তােমার দয়াধম্মের অনেক কথা শুনেছি। যারা তােমাকে পালন করেছেন, তারা আশ্চর্য্যভাবে তােমাকে সকল রকম শিক্ষাই দিয়াছেন। আমি আজ আশীর্বাদ করি, ঈশ্বর তােমাকে আরাে ভাল করুন, তিনিই তােমাকে সুখে রাখুন।”
১১২ সােনার খনির সন্ধানে সরলা মার হাত ধরিয়া তাহাকে লইয়া একখানা বড় চৌকিতে বসিল। মায়ের চোখ জলে ভরিয়া আসিতে লাগিল। সরযু ধীরে ধীরে দুই হাতে মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “মা দিদিকে আদর করুন, ভালবাসা দিন।” সরযু সকলের ছোট কি না, তাই এই কয়েকদিনের মধ্যেই মায়ের সঙ্গে তাহার খুব ভাব হইয়াছে। মা সরযূকে কোলের ভিতর টানিয়া লইলেন। এই দৃশ্য দেখিয়া সরল। মনে মনে কহিল—“হায় দুঃখিনী বালিকা, এতদিন লােকের লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করে আজ মায়ের স্নেহে এ কি তােমার আনন্দ? ঈশ্বর মাকে যে কি স্নেহময়ী করেছেন তা ভাবলেও অবাক হয়ে যেতে হয়।” সরযু আবার কহিল, “মা আমি ত এই কয়দিনে আপনার কতই ভালবাসা পেয়েছি, আপনি দিদিকে আমারই মতন আদর করুন।” মা এইবার সরলার খুব কাছে আসিয়া তাহার দুখানি হাত বুলাইতে লাগিলেন। সরলার প্রাণ যেন সুখে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। এই সময়ে বামুন ঠাকুরাণী জলখাবার লইয়া সেই ঘরে আসিলেন। সরলা কহিল, “বামুনঠাকরুণ, আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, আমার সামনে আমারই ম!। ঈশ্বর দয়া করে এতকাল পরে মায়ের সঙ্গে আমার মিলন করে দিলেন। এমি করে যদি বাবার সঙ্গেও দেখা হত ?” বামুনঠাকুরাণী সরলার মাকে নমস্কার করিয়া কহিলেন, “আপনাকেই সরলার মা বলে মনে হয় বটে; যেমন সরলার সুন্দর চেহারা তেমনি আপনার।” সরলার মা। আমাকে সরলার মা না বল্লেও হয়। শুনেছি আপনি ঠিক মায়ের মতনই সরলাকে ভালবাসেন। বামুনঠাকুরাণী। সে আপনার মেয়ের স্বভাবের গুণে। শুধু কি আমি, দার্জিলিঙে আমাদের পাড়ার অনেক মেম সরলাকে মেয়ের মতন ভালবাসেন।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ১১৩ সরলার মা। সরলাকে যারা প্রতিপালন করেছেন, আজ যদি তাদের দেখতে পেতুম, তা হলে তাদের চরণে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে পড়ত। বামুনঠাকুরাণী জলখাবার লুচি ও সন্দেশ আনিয়া রাখিয়াছিলেন। সরলার মা কহিলেন, “তােমাদের আজ আমিই জলখাবার পরিবেশন ক।” সরলা। দাদার কাছে শুনলুম, কালরাত্রে আপনি কিছুই খান-নি, আপনি এখন খান না, বামুনঠাকুরুণ পরিবেশন করবেন। মা। আমি স্নানের পর ঈশ্বরের নাম না করে ত কিছুই খাই নে। এই কথা শুনিয়া সরলার মার উপুরে অতিশয় ভক্তি হইল। মা সবাইকেই জলখাবার পরিবেশন করিলেন। সরলা ও সুরেশ সেই খাবার সামগ্রীর মধ্যে মাতার অনুপম স্নেহ অনুভব করিয়া বড়ই সুখী হইল। সমস্ত দিনটি মায়ের সঙ্গে সন্তানদের নানা কথায় কাটিয়া যাইতে লাগিল। সুরেশ এবং তাহার মা সরলার নিকট তাঁহাদের সকল কথা বলিতে লাগিলেন। সমস্ত বাড়ীর ভিতরে যেন এক আনন্দের স্রোত প্রবাহিত হইয়া চলিল। এই আনন্দের মধ্যে বাহিরে কাহার সুমিষ্ট গান শুনা গেল। তাহা শুনিয়া সুরেশ চমকিয়া উঠিল। এ যে তাহারই পরিচিত গলা। সুরেশ বাড়ীর বাহিরে আসিয়া দেখিল,বক্সারের সেই ভিখারিণী। ভিখারিণীই মধুরকণ্ঠে গান গাহিতেছিল। সুরেশ ভিখারিণীর কাছে গিয়া কহিল –“ব! এ যে তুমি ! এই কলিকাতা সহরে আমাদের বাড়ীর কাছেই যে তােমায় দেখতে পাব, এ ত স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। এস, তােমাকে আমাদের বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাই। তুমি দেখে অবাক হবে, আমার মা, আমার তিন বােন এই বাড়ীর ভিতরেই আছেন। এক বাবা ছাড়া আর সকলের সঙ্গেই আমার মিলন হয়েছে।”
১১:3
সােনার খনির সন্ধানে
সা।
।
সুরেশ ভিখারিণীকে লইয়া বাড়ীর ভিতরে গেল এবং মাতাকে কহিল,
“মা, যে ভিখারিণীর কথা তােমায় বলেছিলুম, এই দেখ সেই মেয়েটি।”
এস এস, তুমিও যে আমার মেয়ে। তুমিই ত আমার সন্তানকে
আশ্রয় দিয়ে বিপদ হতে রক্ষা করেছ।
সরলা উঠিয়া ভিখারিণীর গলা জড়াইয়া ধরিল। তাহার পরে কহিল,
“এ যে বেশ হল, তুমিও বােন হয়ে আমাদের কাছেই পাবে।"
তার পর সুরেশ একে একে বােনদের ভিখারিণীকে চিনাইয়া দিল
এবং কহিল, “তুমি কেমন করে কলিকাতায় এলে ? এখানে
কোথায় আছ ?”
ভিখারিণী। আমার বাবা, ত আর বেঁচে নেই। তঁার মরণের
পরেই আমি কাশীতে গিয়ে এক মাতাজীর আশ্রয় নিয়েছিলুম। তিনি
বাঙ্গালা দেশের এক জমিদারের বিধবা স্ত্রী। তার কয়েক হাজার
টাকা ছিল। তিনি সেই টাকা নিয়ে কাশীতে সন্ন্যাসিনীর মতনই দিন
কাটাচ্ছিলেন। । তার পরে তার মনে হল, তিনি পিতৃমাতৃহীন ছেলে-
মেয়েদের জন্য একটি আশ্রম খুলবেন। তিনিই আমাকে নিয়ে কলি-
কাতায় এসে বালিগঞ্জে পিতৃমাতৃহীন ছেলেমেয়েদের জন্য একটি আশ্রম
খুলেছেন। পঁচিশটি ছেলেমেয়ে সেখানে আছে। তার টাকায় ৩
সব খরচ চলে না। তাই আমি লােকের বাড়াতে বাড়াতে গান করে
আশ্রমের জন্য টাকা সংগ্রহ করি।
সরলা।
সে ত বেশ ভাল কাও। তা ভিখারিণা দিদি, তােমাকে
আমাদের বােন হয়েই এখানে থাকতে হবে। এখান হতে তােদের
আশ্রমের জন্য যে টাকা আমরা দিতে পারি তা দেব। আর বাকী
টাকা তুমি লােকের বাড়াতে গান করে করে সংগ্রহ করাে ।
ভিখারিণী। না বােন, তাকি আর হয়? আমি যে আশ্রমের
অনেক কাজ করে থাকি। আর তাদের উপরে আমার এমনই একটা
দশ পরিচ্ছেদ ভালবাসা জন্মেছে, একদিন আশ্রমের ছেলেমেয়েদের না দেখলে আমার চলে না। ভিখারিণীকে সরলা নানাকিম জলখাবার খাওয়াইল এবং আশ্রমের জন্য কুড়িটাকার একখানি এ দিল। সুরেশের মা মনে ভাবিলেন, তাহার গয়নাগুলি তিনি আশ্রনে কাজেই দান করিবেন। কয়েকদিন সকলেরই খুব অল কাটিয়া গেল। তাহার পরে নগেনবাবু ও কমলা দেবী কলিকাতা হলন। তাঁহাদের সমাদরে সুরেশের মাতা চোখে আর জল রাখিতে এলেন না। কমলা দেবী হার দুটি ছােট মেয়েকেও 'আপনার কন্যার ৭ই মনে করিতে লাগিলে। কয়েক মাস পরে সুরেশের মাদিন ভিখারিণীদের অ ম দেখতে গেলেন। আশ্রমের মাতাকে হার দেবী বলিয়া নে হইল। তিনিও আশ্রমে থাকিয়া পিতুমার ছেলেমেয়েদের সেবা করিবেন বলিয়াই সংকল্প গ্রহণ করিলেন। ই তাহাকে সে সংকল্প হইতে টলাইতে পারিল না। আশ্রমে যাইবেন, সে দিন নগেন: বাবুর স্ত্রী কমলা দেবীকে কহিলেন,- “আপনি কি শুধু সরলারই এ তা ত নয়। আপনি সুরেশ, নিৰ্ম্মল, সরযু—সকলেরই মা। {ার উপরেই এই সন্তানদের সমস্ত ভার। আমি প্রতি সপ্তাহে মানে এসে একদিন ছেলেমেয়েদের ভালবাসা দিয়ে যাব।” সুরেশের মা যেদিন আশ যা সে দিন সব ছেলেমেয়েদের একত্র করিয়া বলিলেন, “ঈশ্বরের কমাদের টাকাকড়ির কোনই অভাব নেই, তােমরা ভাল করে তেল শিখবে, আর সকল বিষয় ভাল হতে চেষ্টা করবে। তােমাদের ব যে আর কখনাে দেখতে পাবে, তার কোনই আশা নেই। আমি আর একটি কথা তােমাদের বলছি, তােমরা সেই কথাটি সকল সময়ই নখ ; তিনি বলতেন- থেকে
১১৬
সোনার খনির সানৈ
“লেখাপড়া শেখাতেই, মানুষের শtি নির্ম।
সৌন্দৰ্য, ঈশ্বরকে ভালবাসাতেই মানুষের এr "।
দেশের এবং দশের উপকার করাতেই মানু! মহত্ব।**
সুরেশের মাতা আশ্রমেই বাস করি লাগিলেন।
মধ্যে যে দিন তিনি ছেলেমেয়েদের কছ আসিতে
আসিবেন বলিয়া সকলেই পথের পা চাহিয়া থা'
মা আসিয়া যখন অতিশয় ভালবাসিয়া মেয়েদের না
তখন ছেলেমেয়েদের মনে হইত, এ জগতে মায়ের
আর কিছুই নাই।
সঞ্চ