Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Megdut
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
১)
}
১)
মেঘদুত
""
গ্রন্থকারের সুন্দর কাব্যগ্রন্থ,
অরুণিমা
কোজাগরী (বস্থ)
zে
প্যারীমােহন সেনগুপ্ত
..::::
শ্রীকালীকিঙ্কর মিত্র
ইণ্ডিয়ান পাব্লিশিং হাউস
২২১, কর্ণওয়ালি স্ত্রী
কলিকাতা
মূল্য দুই টাকা
লিটার।
মন্মথনাথ দত্ত
নিউ আটিষ্টিক প্রেস
১, সাকিব পাশের লেন
কলিকাতা
প্রণতি
জগতের সেরা কবি কালিদাস, ভারতের কবি-মালার মণি,
ভারতের প্রেমে যেবা ভরপূর, যে-কবি প্রণয়-সুষমা-খনি,
ক্ষেম-শান্তির অমৃত-ধারার উৎস যে-কবি স্নিগ্ধ-ভাতি,
কাব্যে যাহার রয়েছে বঁচিয়া অতীত ভারত, ভারত-জাতি,
সেই কালিদাসে বুঝিলে বােঝালে, হে নবি, তাহারি প্রতিভূ তুমি ;
ভাব-ভাণ্ডার খুলিয়া তাহার মুগ্ধ করিলে বঙ্গভূমি।
কালিদাসে আজ প্রণতি জানায়ে, তােমারেও, রবি, জানায়ে নতি,
পর্ণের পুটে বহিয়া এনেছি কালিদাস-সুধা সভয়ে অতি।
No text on this page.
সর্গ
আমার কবি-জীবনে প্রীতি ও উৎসাহ-দাতা বন্ধু-
যুক্ত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্ৰীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র সেন
শ্ৰীযুক্ত লক্ষ্মীনারায়ণ হাজরা
শ্ৰীযুক্ত নিৰ্মলপদ চট্টোপাধ্যায়
শ্ৰীযুক্ত ইন্দ্রনারায়ণ মুখােপাধ্যায়
শ্ৰীযুক্ত সুশীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্ৰীযুক্ত বলাই দেবশর্মা
শ্ৰীযুক্ত সুরেশচন্দ্র নন্দী
করকমলেষু
No text on this page.
নিবেন মেঘ যেমন বিরহ-সন্তপ্ত যক্ষের বেদনা-বাণী অলকায় বিরহিণী যক্ষ-প্রিয়ার নিকট বহন করিয়া লইয়া গিয়া আপনাকে গৌরবান্বিত করিয়াছিল, আমিও তেমনি রসস্রষ্টা ও কবিশ্রেষ্ঠ কালিদাসের কবিত্ব-সুধা বাঙলার রস-পিপাসু পাঠকগণের নিকট বহন করার সৌভাগ্য লাভের চেষ্টা করিয়াছি মাত্র। শ্ৰদ্ধাস্পদ পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ-সম্পাদিত ‘পঞ্চপুষ্প’ মাসিক পত্রে আমার মেঘদূত-অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল। সেই অনুবাদ বহু স্থলে পরিবর্তিত করিয়া বর্তমান অনুবাদ প্রকাশ করিলাম। ইহাকে প্রায় নৃতন অনুবাদ বলা চলে। মেঘদুতে কালিদাসের মন্দাক্রান্তা ছন্দ ব্যবহারের বিশেষ অর্থ আছে। মন্দাক্রান্ত ছন্দই যেন বেদনার যথার্থ বাহন। এই ছন্দের গুরু-গম্ভীর ধ্বনি ও বিরহ-ভাব-মন্থর গতি- ভঙ্গী যক্ষের অন্তর বেদনাকে যথার্থ রণিত করিয়া তুলিয়াছে। অনুবাদে এই ছন্দের অনুসরণ না করিলে যক্ষের বেদনাকে যথার্থ ব্যক্ত করা যাইবে না, অর্থাৎ কালিদাসের মন্দাক্রান্তা ছন্দ ব্যবহারের সার্থকতা অস্বীকার করা হইবে। সেইজন্য আমি মন্দাক্রান্তার মাত্রা ও ধ্বনি অনুবাদের ছন্দে যথাসাধ্য রক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়াছি। পূজনীয় মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় আমাকে অনুবাদ সম্বন্ধে বহু স্নেহপূর্ণ নির্দেশ-উপদেশ দান করিয়াছেন। তাহার অনুগ্রহ-প্রদত্ত একটি মেঘদুত- •. পরিচয় আমার গ্রন্থের প্রথমেই দেওয়া হইল। তাহার এই স্নেহের ঋণ পরিশােধ করিতে পারি এমন সামর্থ্য আমার নাই। কাব্যরসিক ঐতিহাসিক বন্ধু শ্ৰীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র সেন অনুবাদের উন্নতি সাধনে আমাকে অক্লান্ত সহায়তা করিয়াছেন। কালিদাসের জীবন-কথা, মেঘদূতের ছন্দ, পাঠান্তর, কাব্য-রূপ, কাব্য-প্রসঙ্গ, দেশ-সংস্থান ইত্যাদি বিষয়ে তিনি এই পুস্তকের গােড়ায় ও শেষে সবিশেষ আলােচনা করিয়াছেন। মেঘের গমন-পথের মানচিত্রও তঁাহারই ঐতিহাসিক গবেষণা-প্রসূত। ১৩২৯ সালের প্রবাসী’তে প্রকাশিত বাঙলা ছন্দ সম্বন্ধে তাহার প্রবন্ধগুলি যাহারা পড়িয়াছেন তাহারা তাহার প্রকৃষ্ট রসজ্ঞতার সহিত পরিচিত আছেন। যাহা হউক, তাহার পাণ্ডিত্যপূর্ণ পরিশ্রমের প্রতিদানে তাহাকে গভীর প্রতি জানাইতেছি। এই পুস্তকের রঙিন ছবিগুলি আঁকিয়া দিয়াছেন বিখ্যাত শিল্পী যুক্ত রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ; কালাে ছবিগুলি আঁকিয়াছেন প্রসিদ্ধ শিল্পীদ্বয় যুক্ত অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রযুক্ত ননীগােপাল দাশগুপ্ত। খুব ছোট ছােট ছবি কয়টি স্নেহভাজন শ্ৰীযুক্ত শচীন্দ্রনাথ মিত্রের অঙ্কিত। ইহাদের সকলের নিকটেই আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ রহিলাম । কলিকাতা, প্যারীমােহন সেনগুপ্ত মাখী পূর্ণিমা, ১৩৩৭ } মেৰদুপরি মেঘদূতকে অলঙ্কার-শাস্ত্রে খণ্ডকাব্য বলে ; ইংরেজেরা লিরিক্ বলেন। কোটা সত্য? খণ্ডকাব্য,-অর্থ যতদূর বুঝা যায়,-টুকরা কাব্য বলিয়াই বােধ হয় ; টুকরা কাব্য বলিয়া মেঘদূতের উল্লেখ করিলে জিনিসটার অবমান করা হয়। মেঘদূত টুকরা নহে—পূর, সর্বাঙ্গে সুশােভিত, সম্পূর্ণ, এবং অপ্রমেয়। সুতরাং মেঘদূত টুকরা কাব্য নহে। ঘােট কাব্য বলিতে চাও বল। দৈর্ঘ্যে ছােট, কিন্তু ফলে ছােট নয়। কিন্তু খণ্ড বলিতে ত ছােট বুঝায় না। লিরিক বলিলে যাহা বুঝায় উত্তর-মেঘে তাহা প্রচুর পরিমাণে আছে ; কিন্তু তথাপি উত্তর-মেঘকে লিরিক্ বলা যায় না। কারণ উহা গানে লিখিত নহে। লিরিক গান না হলে হয় না, কাব্যের বাহ আকার লইয়াই লিরি। তবে উৎকৃষ্ট লিরিকের যে ভাব-তন্ময়তা আছে, উত্তর-মেঘে সেইরূপ ভাব-তন্ময়তা আছে বলিয়া উহাকে লিরিক বলিতে ইচ্ছা কর, বলিতে পার। কিন্তু পূৰ্ব্ব-মেঘের অবাধ কল্পনার রমণীয় সৃষ্টিকে লিরিক বলিবে কিরূপে, তাহা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য। তবে যদি কেহ বলে, খণ্ড শব্দের অর্থ খাড় গুড়,-তখনকার প্রধান মিষ্ট সামগ্রী ; আমাদের রাতাবী মনােহরা ; তন্ময়-কাব্য y খণ্ডকাব্য ; তাহা হইলে কতক রাজী আছি। সেকালে খণ্ড শব্দ এই অর্থে ব্যবহৃত হইত। ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে নৈষধকার খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য রচনা করেন। ষষ্ঠে ব্ৰহ্মগুপ্ত জ্যোতিষে খণ্ড-খাদ্য রচনা করেন। আমরা এখন যেমন বলি অমিয়-নিমাই-চরিত, তেমনি সেকালে খণ্ডকাব্য অর্থে মধুময় অমৃতময় কাব্য। টুকরা বলিলে জমে না। আমি বলি, মেঘদূতের মত একখানা মহা-মহাকাব্য আর রচনা হয় নাই। মহা- কাব্যে নৃতন সৃষ্টি অনেক থাকে, কিন্তু সে কি সৃষ্টি? এই পৃথিবী, এই আকাশ, এই মানুষ, এই মনুষ্য-চরিত্র, এই গাছ, এই পালা—এই সব—তবে সাজান গােজান নূতন করিয়া। না হয় একটা দুটা মানুষ নূতন করিয়া গড়া। কিন্তু মেঘদুতে সব নৃতন সৃষ্টি,-পৃথিবী, গাছ, পালা, বন, জঙ্গল, স্ত্রী, পুরুষ, সমাজ, সামাজিক, সব ছাড়িয়া নূতন সৃষ্টি। মেঘদুত এক অদ্ভুত নূতন সৃষ্টি ; সৃষ্টিছড়া বলিতে চাও বল। অলকা এক নূতন সৃষ্টি। এত বড় ভারতবর্ষটা, ইহাতে কালিদাসের কুলাইল না। তিনি ভারতবর্ষ ছাড়া অনেক দেশ জানিতেন। পারস্য জানিতেন, যবনদেশ জানিতেন, যে-সকল দ্বীপ হইতে লবঙ্গ-পুষ্প কলিতে আনীত হইত, তাহাও জানিতেন ; এসকল দেশে তাঁহার পছন্দমত পাইলেন না। তাই তিনি হিমালয়ের তুঙ্গতম শৃঙ্গে-মনুষের অগম্য—কেবল তাহার কল্পনামাত্রের গম্য-স্থানে অলকা নগর বসাইলেন। তঁাহার নগরে পার্থিব নগরের নিয়ম- বলী খাটিবে না। তাহার নগর তিনি যত ইচ্ছা সুখময়, আনন্দময় করিয়া তুলিতে পারিবেন। আর সেই নগরে যাহারা বাস করিবে, তাহারাও কল্পনা-রাজ্যের লােক, মানুষ তাহাদিগকে দেখে নাই, দেখিবেও না। তাহাদের সমাজনীতি, শাসন-প্রণালী, সব নূতন। সব কালিদাসের অবাধ কল্পনার অমৃতময় ফল। মেঘদূতে সমস্ত জড় পদার্থই চৈতন্যময়। মেঘ চেতন, রামগিরি চেতন, আম্রকুট চেতন, নর্মদা চেতন, বেত্রবতী, নির্বিন্ধ্যা, গম্ভীরা, গন্ধবতী সবই চেতন। নদীগুলি বিশেষ চৈতন্যময়, প্রেমময়, প্রেমােদময়। কালিদাস প্রতি কথায় তাহাদের চৈতন্য, বুদ্ধি, ও হৃদয় দেখাইয়াছেন; তাহারা সকলেই মেঘের প্রেমে আকুল। এইরূপে কালিদাস রামগিরি হইতে আরম্ভ করিয়া অলকা পর্যন্ত সমস্ত জড় জগৎকে চৈতন্যময় করিয়াছেন; যেন এই সমস্ত স্থানের নদ, নদী, পৰ্বত, কন্দর, ভূচর, খেচর, জলচর, এমন কি পুট মাছটা পর্যন্ত যক্ষের দুঃখে দুঃখী,-যক্ষের বিরহে কাতর। যক্ষের দূত হইয়া মেঘ অলকায় যাইতেছে; সকলে মিলিয়া মেঘকে খুসী করিবার চেষ্টা করিতেছে ; কেহ শিখরে স্থান দিতেছে ; কেহ অট্টালিকার অগ্রদেশে ধারণ করিতেছে ; কেহ জল দিয়া উহার দেহে বল জন্মাইয়া দিতেছে; কেহ বা জল বাহির করিয়া উহার গতি লাঘব সম্পাদন করিতেছে। সমস্ত জড় জগতে যেন কেমন একটা একপ্রাণতা জন্মিয়া গিয়াছে। মেঘটী যক্ষের প্রাণ ৩ •• মেঘ যাইতেছে, আমরা যেন দেখিতেছি যক্ষের প্রাণই ছুটিতেছে; আর যাহা কিছু দেখিতেছে আপনার উপযােগী করিয়া—আপনার করিয়া লইতেছে ; আপনার প্রাণের সহিত-প্রেমময় আবেশময় ভাবের সহিত মাখিয়া লইতেছে। তাই জড়ের এত সৌন্দর্য ফুটিয়াছে। মেঘদূত লইয়া যতই আন্দোলন করি, উহার অসীম সৃষ্টি-নৈপুণ্য, উহার ভাবময়, চৈতন্যময়, উচ্ছাসময়, আবেগময় কবিত্ব-লহরী যতই মনােমধ্যে গ্রথিত হয়, ততই উহাতে কালিদাসের অদ্ভূত কবিত্ব-শক্তির বিকাশ দেখিয়া মুগ্ধ হই। (মহামহােপাধ্যায়) শ্রীহরপ্রসাদ শাস্ত্রী - কালিদাস ও মেঘদ্ভুত কবি-পরিচয়।ভারতবর্ষে আর যা-কিছুরই অভাব থাকুক না কেন, কবি ও কাব্য- সাহিত্যের অভাব কখনই ছিল না। বৈদিক ঋষি-কবি এবং ব্যাস-বাল্মীকির যুগ হইতে আরম্ভ করিয়া আধুনিক কাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোনো সময়েই কাব্য-রসচর্চার প্রতি বিরাগ দেখা যায় নাই।. কত কবি যে ভারতবর্ষের সর্বত্র যুগে যুগে কত কাব্য রচনা করিয়া গিয়াছেন তার হিসাব লইতে গেলে অবাক হইতে হয়। কিন্তু এই অসংখ্য কবিদের মধ্যে অধিকাংশেরই কবি-প্রতিভা নিজেদের প্রাদেশিক সীমা ও তৎকালের সীমা ছাড়াইয়া যাইতে পারে নাই। যে কয়জন মহাকবি কবিত্ব-মাধুর্যে সমগ্র ভারতবর্ষকে মুগ্ধ করিতে পারিয়া- ছিলেন ও যাদের কাব্য তৎকালীন যুগের সীমা অতিক্রম করিয়া চিরন্তনতা অর্জন করিয়াছে, তাদের মধ্যে কালিদাসই শ্রেষ্ঠ,-একথা ভারতের আলঙ্কারিক-সমাজে ও কবি-সমাজে চিরকাল একবাক্যে স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে। মহাভারত ও রামায়ণ এই দুইটি সার্বজনীন মহাকাব্যের কথা ছাড়িয়া দিলে একথা না মানিয়া উপায় নাই যে, কালিদাসের কাব্যগুলি ভারতবর্ষের হৃদয়কে যেরূপ নিবিড় ও চিরন্তন রূপে জয় করিয়া লইয়াছে সেরূপ আর কোনাে ( ২ ) কবির কাব্যই পারে নাই। কলিদাসের কাব্য-সাহিত্যের জয়যাত্রা শুধু ভারতবর্ষের চতুঃসীমার মধেই আবদ্ধ থাকে নাই; ভারতের সীমা লঙ্ঘন করিয়া বিশ্বহৃদয়-জয়ের অভিমুখেও তার অভিযান চলিয়াছে। এখন হইতে বহু শতাব্দী পূৰ্বেই কালিদাসের মেঘদূত একদিকে সিংহলী ভাষায় ও অপর দিকে তিব্বতী ভাষায় রূপান্তরিত হইয়া সিংহল ও তিব্বতের হৃদয় হরণ করিতে সমর্থ হইয়াছিল ; আর বর্তমান যুগেও য়ুরােপের কবিকুলগুরু গেটের সময় হইতে এখন পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্য-সমাজে কালিদাস ভারতের শ্রেষ্ঠ কবির আসনই পাইতেছেন। ইহাতেই বােঝা যায়, কালিদাস বিশেষ ভাবে ভারতের কবি হইলেও তার বিশিষ্ট ভারতী-সাধনা সাৰ্বকালীন ও সার্বজনীন ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ভারতের এই মহা-কবির ব্যক্তিগত পরিচয়ের ইতিহাস ভারতবর্ষ কি ভাবে রক্ষা করিয়াছে তার সন্ধান করিতে গেলে হতাশ হইতে হয়। ভারতবর্ষ যেমন নিজের জাতীয় জীবনের সুখ-দুঃখ, লজ্জা-গৌরব ও উত্থান-পতনের ইতিবৃত্ত রাখে নাই, তেমনি কবি, মনীষী ও মহাপুরুষদের জীবন-চরিত রক্ষার প্রতিও তার ঔদাসীন্যের সীমা নাই। তার কারণ যা-ই হােক না কেন, এইজন্যই কিন্তু আজ কালিদাসের জীবন-বৃত্তান্ত দূরে থাকুক, তাঁর সমস্ত জীবনের মধ্যে একটি ঘটনাও সত্যরূপে জানিবার উপায় নাই। কালিদাসের ( ৩ ) কাল এবং জন্মভূমি লইয়া যে-তর্কজালের সৃষ্টি হইয়াছে তাতে সাহিত্য ক্ষেত্র আকীর্ণ হইয়া উঠিল ; কিন্তু কোনাে নিঃসংশয় ও সুনির্দিষ্ট মীমাংসা এখনও হইল । তথাপি এবিষয়ে পণ্ডিত-মহলে যে কয়টি সিদ্ধান্ত বহুসম্মত বলিয়া গৃহীত হইয়াছে সংক্ষেপে তারই পুনরুল্লেখ করিতেছি। * কালিদাসের কাল-নির্ণয়ের সমস্যার কথাই আগে উঠে। কালিদাস যে-যুগে আবির্ভূত হইয়াছিলেন প্রথমেই তার উর্দ্ধতন ও অধস্তন সীমা নির্দেশ করিয়া পরে তার বিশিষ্ট সময়টি নির্ণয়ের চেষ্টা করিব। কালিদাস যে তিনটি নাটক রচনা করিয়া গিয়াছেন তার মধ্যে মালবিকাগ্নিমিত্র অন্যতম। এই নাটকের নায়ক অগ্নিমিত্র উত্তর ভারতের সুবিখ্যাত শুঙ্গ- সম্রাট পুষ্যমিত্রের পুত্র। পুষ্যমিত্র খৃষ্টপূৰ্ব দ্বিতীয় শতকে (১৮৫-১৪৯) রাজত্ব করিয়াছিলেন। তঁার পুৱ অগ্নিমিত্রকে যখন কালিদাস উক্ত নাটকের নায়করূপে গ্রহণ করিয়াছেন তখন কালিদাস যে পুষ্যমিত্র হইতে অন্তত এক শতাব্দী পরবর্তী তাতে সন্দেহ নাই। সুতরাং কালিদাসের আবির্ভাবকালের উদ্ধতন সীমা খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী। দাক্ষিণাত্যে বিজাপুর জিলার অন্তর্গত ঐহােলি গ্রামে কবি রবিকীর্তি-রচিত একটি প্রশস্তি পাওয়া গিয়াছে। এই প্রশস্তিটি দাক্ষিণাত্যের চালুক্য-সম্রাট দ্বিতীয় সত্যাশ্রয়-পুলকেশীর রাজত্বকালে (৬১০-৬৪২) ৫৫৬ শকাব্দে অর্থাৎ ৬৩৪ খৃষ্টাব্দে রচিত হইয়াছিল। ইহাতে রবিকীর্তি, কালিদাস ও ( ৪ ) ভাবিকে প্রসিদ্ধ কবি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হর্ষবর্ধনের (৬০৬-৬৪৭) সুপ্রসিদ্ধ সভাকবি বাণভট্টের হর্ষচরিতেও একজন যশস্বী কবি বলিয়া কালিদাসের নাম উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং কালিদাস খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের পরবর্তী হইতে পারেন না। কালিদাস সম্বন্ধে ভারতবর্ষে যেসমস্ত জনবাদ প্রচলিত আছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রবল মত এই যে তিনি উজ্জয়িনীর সুবিখ্যাত রাজা শকারি বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন। এই জনবাদের মতে উক্ত বিক্রমাদিত্য রাজাই খৃষ্ট-পূৰ্ব ৫৭ অব্দ হইতে প্রচলিত বিক্রম-সংবতের প্রতিষ্ঠাতা; সুতরাং কালিদাসও খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকের লােক। কিন্তু বিক্রমাদিত্য কোনাে রাজার নাম নয়, উপাধিমাত্র, এবং এই উপাধিধারী বহু রাজাই ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে রাজত্ব করিয়াছেন; খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে কোনাে বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনীতে রাজত্ব করিয়াছিলেন এমন কোনাে সংশয়াতীত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নাই। পণ্ডিতেরা দেখাইয়াছেন যে, খৃষ্টপূৰ্ব ৭ অব্দ হইতে প্রচলিত সংবতের আদি নাম “কৃত, বিক্রমসংবৎ নয়; বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে আদিতে ওই সংবতের কোনো যােগই ছিল ; পরবর্তী কালে জনবাদ ঐতিহাসিক ভ্রান্তি বশত ওই ব্য-গণনার সহিত বিক্রমাদিত্যের নাম জুড়িয়া দিয়াছিল। জনশ্রুতি-মতে বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন-সভার নয়টি রত্বের নাম যথাক্রমে-ধরি, ক্ষপণক, অমরসিংহ, শঙ্কু, বেতালভ, ঘটকপর, কালিদাস, বরাহমিহির ও বররুচি। কালিদাসের কথা ছাড়িয়া দিলেও অপর আট রত্নের মধ্যে একমাত্র বরাহমিহির ব্যতীত আর কারও কাল নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না, কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকেও খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকের লােক বলিয়া মনে করার কোনো হেতু নাই। পক্ষান্তরে বরাহমিহির যে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের লােক (৫৫-৫৮৭) সে-বিষয়েও কোনাে সন্দেহ নাই। সুতরাং এই নবরত্নকে সমকালীন বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেও কালিদাসকে খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে ফেলা যায় না। কিন্তু আসল কথা এই যে, এই নবরত্নকে সমকালীন বলিয়া মনে করিবারই কোনাে হেতু নাই ; বিখ্যাত অমরকোষ-প্রণেতা অমরসিংহকে কালিদাসের পরবর্তী কালের লােক বালয়া মনে করিবার হেতু আছে। তা ছাড়া বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন-সভা সম্বন্ধে এই প্রবাদটির সর্বপ্রথম উল্লেখ দেখিতে পাই--জ্যোতির্বিদাভরণ নামে একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক (সম্ভবত’ খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীতে রচিত) জ্যোতিষ-বিষয়ক গ্রন্থে ; তৎপূর্ববর্তী কোনো গ্রন্থে নবরত্নের উল্লেখমাত্রও নাই। সুতরাং কালিদাসের কালনির্ণয় প্রসঙ্গে নবরত্ন-সভার প্রবাদের উপর যে বিন্দুমাত্রও নির্ভর করা যায় না, একথা অতি সুস্পষ্ট। অতএব কালিদাসের কালনির্ণয় করিতে অন্য প্রমাণের উপর নির্ভর করিতে হয়। কিন্তু এস্থলেও কালিদাসের নিজের কাব্যে উল্লিখিত তৎকালীন ভারতীয় অবস্থা ও অন্যান্য ( ৬ ) কবিদের সহিত তঁার ভাব ও ভাষার তুলনা, এই আপেক্ষিক প্রমাণের চেয়ে দৃঢ়তর কোন প্রমাণ নাই। অশ্বঘােষ খৃষ্টীয় প্রথম শতকের শেষাংশ বা দ্বিতীয় শতকের পূর্বাংশের একজন প্রতিভাবান্ কবি ও নাট্যকার। মহাকবি ভাসের আবির্ভাব-কাল সম্বন্ধে মতভেদ আছে। কিন্তু তিনি যে কালিদাসের পূর্বগামী সে-বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নাই,-কালিদাস নিজেই মালবিকাগ্নিমিত্র নাটকে ভাসের নামােল্লেখ করিয়াছেন; পক্ষান্তরে ভাস যে অশ্বঘােযের পরবর্তী সে-বিষয়েও সন্দেহ করা চলে না। সুতরাং ভাস খৃষ্টীয় তৃতীয় কি চতুর্থ শতকের লােক, পণ্ডিতেরা এরূপ মনে করেন। অতএব কালিদাস সে-সময়েরও পরবর্তী লােক, এরূপ মনে করা অসঙ্গত নয়। কালিদাসের কাব্যে কামশাস্ত্রের প্রভাব লক্ষিত হইয়াছে; কিন্তু কামসূত্র-প্রণেতা মল্পনাগ বাৎস্যায়ন কালিদাসের পূর্ববর্তী কি পরবর্তী তা এখনও তর্কের বিষয়, যদিও খৃষ্টীয় তৃতীয় হইতে পঞ্চম শতকের মধ্যে কোনো সময়ে মল্পনাগ আবির্ভূত হইয়াছিলেন বলিয়া নিঃসন্দেহে মনে করা যাইতে পারে। পশ্চিম মালবের অন্তর্গত মন্দশাের নামক স্থানে একটি শিলালিপি পাওয়া গিয়াছে ; উহা ৪৭৩ খৃষ্টাব্দে (৫২৯ সংবৎ) বৎসভ নামে কোনো কবি রচনা করিয়াছিলেন। এই প্রশস্তিটিতে কালিদাসের কাব্যের, বিশেষত’ মেঘদুতের, সুস্পষ্ট প্রভাব রহিয়াছে বলিয়া ম্যাকডােনে, কীথ, প্রমুখ পণ্ডিতেরা মনে করেন। এই যুক্তিগুলির উপর নির্ভর করিয়া এই কথা বলা বােধ হয় অসঙ্গত হইবে ;
( 1 ) যে, কালিদাস খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকের প্রথম ভাগে জীবিত ছিলেন। কালিদাসের কাব্য আলােচনা করিলে নানা দিক হইতে এই অনুমানেরই সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর কাব্যসমূহে দেশব্যাপী যে শান্তি ও ঐশ্বৰ্যশালিতার আভাস পাওয়া যায় একমাত্র গুপ্ত রাজাদের আমলেই তা সম্ভব হইয়াছিল ; তাঁর কাব্যে ব্রাহ্মণ্যধর্মের যে অভ্যুত্থান ও প্রভাবের পরিচয় পাই তাও গুপ্ত যুগের কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়, বিশেষত’ মালবিকাগ্নিমিত্রে উল্লিখিত পুষ্যমিত্রের অশ্বমেধ ও সমুদ্র গুপ্তের অশ্বমেধের কথা একই সঙ্গে মনে উদিত হয়। তা ছাড়া কালিদাসের কাব্য-সমুহে সমগ্র ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একটি অখণ্ড চেতনার সুস্পষ্ট পরিচয় ফুটিয়া উঠিয়াছে ; গুপ্ত যুগের পূর্বে সমগ্র ভারতের এরূপ অখণ্ড ঐক্যবােধ ভারত- বাসীর মনে জাগিয়াছিল কিনা সন্দেহ। রঘুবংশের চতুর্থ সর্গে রঘুর দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গে কালিদাস বঞ (Oxus)তীরে ( পাঠান্তরে সিন্ধুতীরে ) হূণদের উল্লেখ করিয়াছেন, ইহাও গুপ্তরাজত্ব-সময়ে খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকের পূর্বাদ্ধের পক্ষেই বিশেষ ভাবে স্বাভাবিক। কুমার- সম্ভবে একস্থানে জামিত্র শব ব্যবহৃত হইয়াছে ; কোনাে কোনাে পণ্ডিতের মতে এই শব্দটি একটি গ্রীক সংজ্ঞা হইতে উৎপন্ন এবং খৃষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকের পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় এই শব্দের ব্যবহার সম্ভব নয়। যা হােক, কালিদাস যদি খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধের লােক হন তবে তিনি গুপ্তসম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৪) ও তৎপুত্ৰ কুমারগুপ্তের (৪১৫ ( ৮ ) ৪৫৫) সমকালীন। এস্থলে একথা স্মরণ রাখা উচিত যে, এই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের উপাধি ছিল বিক্রমাদিত্য এবং তিনিই ৩৮৮ খৃষ্টাব্দে বা তার পরে কোনো সময়ে উজ্জয়িনীর শকক্ষপ বংশকে নির্মল করিয়া উজ্জয়িনীকে গুপ্তসম্রাজ্যভুক্ত করিয়া লন। উত্তর ভারতের গুপ্তসম্রাটদের রাজধানী ছিল পাটলিপুড ; এই চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের সময় হইতে উজ্জয়িনী গুপ্তসাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানীরূপে পরিণত হইল। এই বিক্রমাদিত্যই কোনো কোনাে স্থানে পাটলিপুরবরাধীশ্বর এবং উজ্জয়িনীপুরবরাধীশ্বর বলিয়াও উল্লিখিত হইয়াছেন। সুতরাং জনবাদ-বিশ্রুত কালিদাসের পৃষ্ঠপােষক উজ্জয়িনীরাজ শকারি বিক্রমাদিত্য ও এই চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়াই মনে হয়। তী বুদ্ধি পণ্ডিতেরা কালিদাসের বিক্রমাের্বশী নাটকের নামটির মধ্যে বিক্রমাদিত্য নামের প্রতি এবং কুমারসম্ভব কাব্যের নামের মধ্যে রাজপুত্ৰ কুমারগুপ্তের প্রতি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের আভাস পাইয়া থাকেন। রঘুর দিগ্বিজয়-কাহিনীর মধ্যেও তারা সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয়ের প্রভাব দেখিতে পান এবং রঘুবংশের ‘আসমুদ্রক্ষিতীশানাং, “কুমারকল্পং সুষুবে কুমারং” প্রভৃতি উক্তির মধ্যে তারা সমুদ্রগুপ্ত, কুমারগুপ্ত প্রভৃতি নামের প্রতিধ্বনি শুনিতে পান। এবিষয়ে আরেকটি মাত্র কথা প্রয়োজন। চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের পুৱ কুমারগুপ্তের উপাধি ছিল মহেন্দ্রাদিত্য এবং কুমারগুপ্তের পুত্র স্কন্দগুপ্তের (৪৫৫-৪৬৭) উপাধিও ছিল বিক্রমাদিত্য।
( ১ ) 4 কেহ কেহ কালিদাসকে চন্দ্র গুপ্ত বিক্রমাদিত্যের সমকালীন মনে না করিয়া স্কন্দগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের সমকালীন মনে করেন। কিন্তু এরূপ মনে করার বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তি এই যে, রঘুবংশের উল্লিখিত হুণরা বজ, বা সিন্ধুতীরেই অবস্থিত ছিল; স্কন্দগুপ্তের সময়ে এরূপ উল্লেখ করার সার্থকতা থাকে না, কারণ তূণরা সে-সময় মধ্যভারত পৰ্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল বলিয়া আমরা জানি। দ্বিতীয়ত, কালিদাস যদি স্কন্দগুপ্তের সমকালীন হন তবে কবি বৎসভটির সময়ের সহিত তার সময়ের বিশেষ ব্যবধান থাকে না, অথচ বৎসভটির সময় হইতে কালিদাস কিছু পূর্ববর্তী বলিয়া মনে করিবার হেতু আছে, তা আমরা পূৰ্বেই দেখিয়াছি। কালিদাসের জন্মভূমি ও জীবন-কথা-কালিদাসের জন্মভূমি লইয়াও বাক-বিতণ্ডার অভাব নাই। আসল কথা এই যে, কালিদাস ভারতবর্ষের কোন্ স্থানে জন্মিয়াছিলেন সে-বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তবে বহুপ্রচলিত জনবাদ মতে তিনি উজ্জয়িনীতে বিক্রমাদিত্যের সভাকবি ছিলেন ; কালিদাসের কাব্যেও ( বিশেষত’ মেঘদুতে) আমরা উজ্জয়িনীর প্রতি তার আন্তরিক আকর্ষণের পরিচয় পাই। সুতরাং চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের আমলে অন্তত’ কিছুকাল তিনি উজ্জয়িনীতে বাস করিয়াছিলেন, এমন মনে করা অসঙ্গত হইবে না। এর বেশি আর কিছুই বলা যায় না।
( ১০ } কালিদাসের কবি-জীবনের ছােট-খাটো ঘটনাটিও জানিবার জন্য সকলের মনেই অসীম ঔৎসুক্য আছে। কিন্তু জাতির ইতিবৃত্ত ও মনীষীদের জীবন-বৃত্ত সম্বন্ধে ভারতবর্ষের যে অতুলনীয় উদাসীনতা ছিল, তার কৃপায় আমরা কালিদাসের জীবন-সম্বন্ধে একটিমাত্র কথাও জানি না। কিন্তু তাই বলিয়া কাব্যরসচর্চায় অসমর্থ নিরক্ষর বা অল্পাক্ষর জনসাধারণও যে ভারতবর্ষের এই শ্রেষ্ঠতম কবির জীবন-বৃত্তান্ত সম্বন্ধে নিজেদের দুনিবার কৌতুহলকে নিবৃত্ত করিয়া রাখিতে পারিয়াছিল, তা নয়। তারা প্রকৃত সত্য-বৃত্তান্তের অভাবে আপনাদের একান্ত ঔৎসুক্যের বশে অজ্ঞাতসারেই নিজেদের মন হইতে কবি কালিদাসের মানসী জীবন- বৃত্তান্ত রচনা করিয়া লইয়াছিল। বিক্রমাদিত্য ও কালিদাসের মহত্বে ভারতবর্ষ অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল ; তাই অচির কাল মধ্যেই ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে পল্লীতে পল্লীতে অসংখ্য কালিদাস-কথা-কোবিদ গ্রামবৃদ্ধদের আবির্ভাব হইল। তাদের এই ঐকান্তিকতার ফলে ভারতবর্ষে আজ বিক্রমাদিত্য ও কালিদাস সম্বন্ধে উপকথা ও উপাখ্যানের অন্ত নাই। তাদেরই কৃপায় আমরা জানিতে পারি যে, কালিদাস বাল্যকালে এমনি নিরেট মূর্ষ ছিলেন যে, গাছের শাখায় বসিয়া সেই শাখার মূল ছেদন করিতেও দ্বিধা করিতেন না, পরে কয়ে জন পণ্ডিতের ষড়যন্ত্রের ফলে কোনাে বিদুষী রাজকন্যার সহিত কালিদাসের বিবাহ হয়, সদ্য বিবাহিতা বিদুষী বধুর নিকট উষ্ট্র উচ্চারণ করিতে একবার র ও একবার ষ লােপ ( ১১ ) করাতে অপমানিত ও বিতাড়িত হইয়া তিনি সরস্বতীর আরাধনা করিয়া অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করেন ও পরে গৃহে ফিরিয়া পত্নীর অনুরােধে কুমারসম্ভব, মেঘদূত, রঘুবংশ প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আধুনিক পণ্ডিতেরা কালিদাস- কথা-কোবিদদের এই সমস্ত কাহিনীকে নিরেট তথ্য বলিয়া স্বীকার করিতে মােটেই প্রস্তুত নন। কালিদাসের কাব্য-কালিদাসের বাস্তব জীবন সম্বন্ধে অতি অস্পষ্ট আভাস মাত্রও পাইলেও কালিদাসের কবি-রূপের সঙ্গে পরিচয়-লাভের পক্ষে যথেষ্ট উপাদানই আমাদের আছে। তিনি আমাদের জন্য যে সাতখানি গ্রন্থ রাখিয়া গিয়াছেন তাতেই তার কবি-মনের পূর্ণাঙ্গ ছবি অতি স্পষ্ট ও সুন্দররূপেই প্রতিফলিত হইয়াছে। ভারতীয় সভ্যতার সম্পূর্ণ রূপটি তার শ্রেষ্ঠ কবির মনের ভিতর দিয়া যে বিশেষ ভঙ্গীতে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে সেই বিশিষ্ট রূপটির অখণ্ড পরিচয় বহন করে বলিয়াই কালিদাসের কাব্য শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমস্ত জগতের কাছেই এমন আদরের বস্তু হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু কালিদাসের কাব্যের রস-বৈশিষ্ট্য ও সেই কাব্যের ভিতর দিয়া ভারতীয় সভ্যতার স্বরূপ কিভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে তার আলােচনার স্থান ইহা নয়। কালিদাস কয়খানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন সে-বিষয়েও সকলে একমত নয়। তবে ( ১২ ) তিনি যে মেঘদূত, কুমারসম্ভব ও রঘুবংশ এই তিনখানা কাব্য এবং মালবিকাগ্নিমিত্র, বিক্রমাের্বশী ও অভিজ্ঞানশকুন্তল এই তিনখানা নাটক রচনা করিয়াছিলেন, সে-বিষয়ে মত- ভেদ নাই। ঋতুসংহার নামক কাব্যটি ভারতবর্ষে চিরকাল কালিদাসের নামেই চলিয়া আসিয়াছে। ইদানীং কেহ কেহ এই কাব্যটি কালিদাসের কি না এবিষয়ে সন্দেহ করিয়াছেন, কিন্তু বড় বড় পণ্ডিতেরা দেখাইয়াছেন এই কাব্যটি যে কালিদাসের এ বিষয়ে সন্দেহ করা চলে না। পক্ষান্তরে নলােদয়, শৃঙ্গারতিলক, শৃঙ্গাররাষ্টক প্রভৃতি কয়েকটি কাব্য এবং বােধ নামে একখানি -শাস্ত্রও কালিদাসের নামে চলিতেছে; কিন্তু আজকাল অনেকেই এগুলিকে কালিদাসের বলিয়া মানিতে প্রস্তুত নন। উক্ত সাতখানা গ্রন্থের রচনার পৌৰ্বাপৰ্য্য সম্বন্ধেও কিছুই ঠিক করিয়া বলা যায় না। তবে কালিদাসের রচনার পরিণতিক্রম লক্ষ্য করিলে মনে হয় তিনখানা নাটকের মধ্যে মালবিকাগ্নিমিত্ৰই কালিদাসের প্রথম নাটক এবং অভিজ্ঞানশকুন্তল তার পরিণত বয়সের লেখা। কাব্য চারখানার পর্যায়ক্রম সম্বন্ধেও মনে হয় যে, ঋতু- সংহার কালিদাসের সর্বপ্রথম রচনা এবং রঘুবংশ তার শেষ কাব্য। মেঘদূত ও কুমারসম্ভবের মধ্যে কুমারসম্ভবকেই অপেক্ষাকৃত পাকা হাতের লেখা বলিয়া বোধ হয়। মেঘদূত।-কালিদাস খুব সম্ভবত' ঋতুসংহারের পরেই মেঘদূত লিথিয়াছিলেন। কারণ, ( ১৩ ) ) মেঘদুতে ঋতুসংহার অপেক্ষা নিপুণতর হাতের যথেষ্ট পরিচয় রহিয়াছে। পক্ষান্তরে কুমার- সম্ভবে ও রঘুবংশে যেরূপ পরিণত বুদ্ধিবৃত্তির ছাপ রহিয়াছে মেঘদুতে সেরূপ নাই। মেঘদূত কবির মধ্য-বয়সের রচনা বলিয়াই মনে হয় ; তাই মেঘদূতেই সবচেয়ে বেশি করিয়া পরিপূর্ণ যৌবনােচিত রচনা-শক্তি, হৃদয়-ঢালা ভাবাবেগ ও মুক্ত কল্পনাশক্তির প্রাচুর্য দেখিতে পাই। কুমারসম্ভবে অবশ্য অধিকতর কল্পনাশক্তি এবং রঘুবংশে দৃঢ়তর রচনাশক্তি প্রকাশ পাইয়াছে; কিন্তু কুমারসম্ভব ও রঘুবংশে মেঘদূতের চেয়ে ভাবাবেগ অধিকতর সংযত এবং বুদ্ধিবৃত্তি অধিকতর সক্রিয়। তাই মেঘদূতের অবল্পিত ভাবাবেগ ও নিছক কল্পনাবৃত্তি কুমারসম্ভব ও রঘুবংশে মন্দীভূত হইয়া আসিয়াছে। এইজন্যই বােধ হয় ভারতবর্ষের নিছক রসপ্রিয় সমাজে মেঘদূতের এত আদর এবং এইজন্যই একথা বলা হইয়াছে যে, কালিদাস যদি শুধু মেঘদূত লিখিয়া আর কিছুই না লিখিতেন তথাপি তার কবি-খ্যাতি অক্ষুন্নই থাকিত। কিন্তু উচ্চতর কাব্য-বিচারের আদর্শে কেহই বােধ করি মেঘদূতকে কুমারসম্ভব বা রঘুবংশের সমকক্ষ মনে করেন না। তথাপি একথা অসঙ্কোচেই বলা চলে যে, কালিদাস যদি মেঘদুত না লিখিয়া শুধু কুমার- সম্ভব ও রঘুবংশই লিখিয়া যাইতেন তবে সংস্কৃত সাহিত্য এবং কালিদাসের কবি-যশ উভয়ই অপূর্ণ থাকিয়া যাইত। মেঘদূতে কবির যে রূপটি ধরা পড়িয়াছে কুমারসম্ভব কিংবা রঘুবংশে ( ১৪) আমরা সে রূপটিকে আর পাই না। কুমারসম্ভব ও রঘুবংশের রচয়িতা মহাকবি ; মেঘদূতের রচয়িতাকে বলিতে পারি গীতিকবি। মেঘদূতকে ঠিক লিরিক বলা যায় না; অথচ লিরিক বা গীতিকবিতার মূলগত যা বিশেষত্ব—কবির ব্যক্তিগত ভাবােচ্ছাসকে চিরন্তনতার রূপ দিয়া প্রকাশ করা-মেঘদূতে তা যথেষ্টই আছে। কিন্তু মেঘদূতের যা বাহরূপ তা মােটেই গীতি কবিতার রূপ নয় ; মেঘদূতকে যে পটভূমিকার উপর চিত্রিত করা হইয়াছে তা লিরিকের নয়, সেটা মহাকাব্যেরই ভূমিকা। গীতি-কবিতা ও মহাকাব্যের এই অপূৰ্ব্ব সংমিশ্রণই মেঘদূতের অনন্যসাধারণ মনােহারিতার একটি কারণ। কাব্য-মাত্রেরই তিনটি রূপ আছে-বিষয় বা বস্তু রূপ, রস বা ভাব রূপ এবং ধ্বনিরূপ। গীতি-কবিতায় ভাবরূপই প্রধান ও প্রবল, ধ্বনি তারই অনুগমন করে, বিষয় উপলক্ষ্য মাত্র হইয়া প্রচ্ছন্ন থাকে। অন্য কাব্যে ভাব ও ধ্বনিই একান্ত হইয়া উঠে না, বিষয়-বস্তুও ভাবের সমকক্ষতা লাভ করে। মেঘদুতে কিন্তু এই তিনটি রূপই সমান গতিতে প্রবল হইয়া চলিয়াছে। যক্ষের বিরহ-বেদনা ও মিলন-কামনাই তার ভাব-রূপ ; মেঘদূতের এই ভাৰ-রূপটিই একান্ত হইয়া মেঘদূতকে গীতি-কবিতার সুর দিয়াছে। অথচ মেঘদূতের বস্তুরূপ, মেঘের ভ্রমণকাহিনী ও অলকা-বৰ্ণনা কবির প্রধান উদ্দেশ্য নয়, একথাও বলা চলে না। এই বস্তুরূপই মেঘদূতকে মহাকাব্যের আসনে স্থাপিত করিয়াছে।
( ১৫ ) রেস-বিচারের দিক হইতে মেঘদূতের অনেক আলােচনা হইয়া গিয়াছে। এখানে সে- তত্ত্বের পুনরালােচনা করা নিষ্প্রয়ােজন। কিন্তু তার বস্তুরূপ ও ধ্বনি-রূপ সম্বন্ধে একটু আলােচনা করা অসঙ্গত হইবে না। মেঘদূতের বস্তুরূপের পরিচয় দিতে গিয়া তার আখ্যান ও বর্ণনার পুনরুল্লেখ করিতে চাই না। বিষয়-বস্তুর বিশ্লেষণ করিলে মেঘদুতের দুইটি স্বতন্ত্র রূপ দেখিতে পাই ; প্রথমত রামগিরি হইতে অলকা পৰ্যন্ত মেঘের পথ-রেখাকে উপলক্ষ্য করিয়া দশা, অবন্তি প্রভৃতি তৎকালীন জনপদসমূহের বর্ণনা ; দ্বিতীয়ত অলকা ও বিরহিণী যক্ষপ্রিয়ার বর্ণনা। বিষয়-বস্তুর এই দুইটি রূপই মেঘদূতকে অপূর্ব সৌন্দৰ্য্য দান করিয়াছে। মেঘদুতে যদি এই দুইটি বিষয়রূপ না থাকিত, কালিদাস যদি যক্ষ ও যক্ষ- প্রিয়ার বিরহ বর্ণনা করিয়া এবং যক্ষকে দিয়া মেঘের নিকট তার প্রণয়-বার্তা বহনের অনুরােধ করাইয়াই ক্ষান্ত হইতেন, তবে মেঘদূতের প্রায় সমস্ত গৌরবটুকুই অন্তর্হিত হইয়া যাইত এবং মেঘদূত একটি অত্যন্ত সাধারণ কাব্য বলিয়া পরিগণিত হইত। মেঘদূতের বিষয়বস্তুর এই দুইটি রূপ ভারতবর্ষে বহুকাল হইতেই লক্ষিত হইয়া আসিতেছে এবং প্রথম রূপটিকে পূৰ্বমেঘ ও দ্বিতীয় রূপটিকে উত্তরমেঘ নাম দেওয়া হইয়াছে। উত্তরমেঘে অলকা ও যক্ষের গৃহ-বর্ণনায় কালিদাসের অসাধারণ কল্পনাশক্তিতে বিস্ময়মুগ্ধ হইতে হয়; কল্পনা যেন এখানে বাস্তবমূর্তি ধারণ করিয়াছে। এইজন্যই যুগে যুগে উত্তরমেঘ এমন একান্ত ভাবে ( ১৬ ) সকলের মনােহরণ করিয়াছে। কিন্তু বর্তমান কালে পূর্বমেঘ আমাদের নিকট বিশেষ কারণে অধিকতর মনােরম হইয়া উঠিয়াছে। পূৰ্বমেঘে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের একান্ত মিলনেই উহা আমাদের নিকট অধিকতর আদরণীয় হইয়াছে। পূৰ্বমেঘে কালিদাস রামগিরি হইতে কনখল পর্যন্ত ভারবর্ষের যে বাস্তবরূপ চিত্রিত করিয়াছেন, তার জন্যই আমরা মেঘদূতকে বিশেষ করিয়া আদর করি। কালিদাস সত্যই ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি, কারণ তিনি শুধু ভারতবর্ষের পত্র-পুষ্প, নদী-গিরি, জীব জন্তু প্রভৃতি সমস্ত প্রকৃতিকেই আপন হৃদয় দিয়া অভিষিক্ত করিয়াছিলেন, তা নয় ; পরন্তু তৎকালীন ভারতবর্ষের বাস্তব-রূপটিকেও তিনি আপন সাধনার দ্বারা একান্ত আপন করিয়া লইয়াছিলেন। পূৰ্বমেঘ, রঘুর দিগ্বিজয়, ইন্দুমতীর স্বয়ংবর প্রভৃতি বহু উপলক্ষে তিনি বারংবার তৎকালীন অখণ্ড ভারতবর্ষকে আপন কাব্যরূপের ভিতর দিয়া অমর করিয়া রাখিয়াছেন। কালিদাসের ব্যক্তি-পরিচয় সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না; কিন্তু তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের যে জীবন্ত ছবি রাখিয়া গিয়াছেন তা থেকে তার অসাধারণ ভারত-প্রীতি সম্বন্ধে কোনাে সন্দেহ থাকে না। তাম্রপর্ণীর মুক্তা, কাশ্মীরের কুঙ্কুম এবং বঙ্গের উৎখাত-প্রতিবােপিত ধান্য, এসব কিছুই তার অজ্ঞাত ছিল না। এইজই পূৰ্বমেধ আমাদের নিকট এত আদরণীয়। বিদিশা, দশা, অবন্তি, গশপুর প্রভৃতি স্থান আমাদের নিকট হয়তাে পুরাতাত্ত্বিকের অনুসন্ধানযােগ্য নাম ( ১৭ ) মাত্রই থাকিয়া যাইত ; কিন্তু পূৰ্বমেঘের কাব্যরূপের ভিতর দিয়া এইসব স্থানের যে মনােহর মূৰ্ত্তি ফুটিয়া উঠিয়াছে তা মেঘদূতের সঙ্গেই চিরকাল অক্ষয় হইয়া থাকিবে। কালিদাসের ব্যক্তি-জীবন আমাদের অজ্ঞাত বটে, কিন্তু তিনি তার যুগের ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপটিকে আমাদের অজ্ঞাত রাখেন নাই। ইহা কালিদাসের একটি বিশেষ দান এবং পূৰ্বমেঘের একটি বিশেষ গৌরব। পূৰ্বমেঘে যার সুচনা, রঘুর দিগ্বিজয়, ইন্দুমতীর স্বয়ংবর প্রভৃতিতে তার পরিণতি। কালিদাস যদি শুধু ঋতুসংহার, উত্তরমেঘ ও কুমারসম্ভব লিখিয়া যাইতেন তবে তিনি আমাদের নিকট অর্ধেক অপরিজ্ঞাতই থাকিতেন ; তার বাকি অর্ধেকের পরিচয় পাইতেছি পূৰ্বমেঘ ও রঘুবংশ হইতে।) মেঘদূতের ছন্দ।-মেঘদূতের ধ্বনি-রূপের আলােচনা করিতে গেলেই মন্দাক্রান্তা ছন্দের কথা বলিতে হয়। মেঘদুতের বিষয়-বৰ্ণনার সহিত মন্দাক্রান্তা ছন্দের গাম্ভীর্য ও ধ্বনি- বৈচিত্র্য এমন ভাবে জড়িত হইয়া গিয়াছে যে, মেঘদূত হইতে মন্দাক্রান্তা ছন্দকে আর বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার উপায় নাই, বিচ্ছিন্ন করিতে গেলে আমাদের বসবােধ নিরতিশয় ভাবে পীড়িত হয়। কাব্য মাত্রেরই ধ্বনি-রূপের একটি বিশেষ সার্থকতা আছে। কবির অন্তরে যে অনির্বচনীয় রসধারা উৎসারিত হইতে থাকে তাকে শুধু ভাষার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ধরাইয়া দেওয়া অসম্ভব ; একদিক্ হইতে দেখিতে গেলে ভাষা জড় বস্তু, ভাব-প্রকাশের ( ১৮ ) স্থাবর আধার মাত্র ; কাব্যের অনির্বচনীয়তাকে, ভাবের ভঙ্গিমা ও গতিবেগকে প্রতিরূপ দিবার ক্ষমতা শুধু ভাষার নাই ; কিন্তু সঙ্গীতের সুর ও তালের মধ্যে, ছন্দের ধ্বনি ও যতির মধ্যে সে ক্ষমতা আছে। তাই শুধু গদ্য-ভাষা কাব্যের বাহন হয় নাই ; কাব্যের বাহন হইবার জন্য ভাষাকে সঙ্গীত বা ছন্দের মধ্যে ধরা দিতে হয় এবং সে- জন্যই বিশেষ ভাবকে মূর্ত করিয়া তুলিবার জন্য করিয়া তুলিবার জন্য কবিকে বিশেষ ছন্দের আশ্রয় লইতে হয়। মন্দাক্রান্তা ছন্দ তেমনি মেঘদূতের বিশেষ বাহন। মেঘদূতের যে ভাব-রূপ ও বিষয়- রূপ, তাকে প্রকাশ করার পক্ষে মন্দাক্রান্তার চেয়েও যােগ্যতর ছন্দ থাকিতে পারে একথা আজ আমরা ভাবিতেও পারি না। মেঘদূত যদি শুধু লিরিক্ বা গীতি-কবিতা হইত তবে মন্দাক্রান্তার চেয়ে লঘুতর, অন্য কোনাে ছন্দ অধিকতর উপযােগী হইত। মেঘদূত যদি লিৰিক্-ভাব-হীন মহাকাব্য মাত্র হইত তবে হয়তাে শার্দল-বিক্ৰীড়িত, অগ্ধরা প্রভৃতি গভীরতর ছন্দ-প্রয়ােগের অবকাশ থাকিত। কিন্তু মেঘদূতে গীতি-কাব্য ও মহাকাব্য উভয়ের অবিচ্ছেদ্য মিলন ঘটিয়াছে, তাই মন্দাক্রান্তাই তার ধ্বনি-ব্যঞ্জনার উপযুক্ত আশ্রয় হইয়াছে। কারণ, মন্দাক্রান্তা ছন্দে ধ্বনির গুরু-গাম্ভীৰ্য্য আছে; গতির দৃঢ় মন্থরতাও আছে, অথচ বেগবত্তাও আছে ; তার গতিক্রমে এবং সুরের উত্থান-পতন ভঙ্গিমায়ও একটি বিশেষ ( ১৯ } বৈচিত্র্য আছে ;-তাই মন্দাক্রান্তা ছন্দ একঘেয়ে হইয়া উঠে নাই। একটি উদাহরণ দিয়া দেখাইলেই বিষয়টা আরও বিশদ হইবে, আশা করি। মেঘলােকে। ভবতি সুখিনাে’ প্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ। কাশ্লেষ- | প্রণযিনি জনে | কিং পুনদূরসংস্থে । উক্ত পঙক্তি দুইটি একটু ভাল করিয়া লক্ষ্য করিলেই মন্দাক্রান্তা ছন্দ সম্বন্ধে পূর্বোক্ত মন্তব্যগুলির সার্থকতা বােঝা যাইবে। প্রথম চারটি অক্ষরই গুরুমাত্রিক ; এখানেই মন্দা- ক্ৰান্তা ছন্দের ধ্বনির গাম্ভীর্য ও গতির দৃঢ় মন্থরতার পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু এইখানেই যতি পড়িল এবং তারপর হইতেই ছন্দের ধ্বনি ও গতি সম্পূর্ণ অন্যরকম হইয়া গেল ; কারণ মন্দাক্রান্তা ছনের দ্বিতীয় পর্বে একেবারে পাচটি অক্ষর লঘুমাত্রিক ও তৎপরে একটি গুরুমাত্রিক-পাচটি লঘু মাত্রায় ছন্দের ধ্বনি অনেকখানি লঘু এবং গতিবেগ প্রখর হইয়া উঠিল ; কিন্তু পাছে ছন্দ হালকা হইয়া যায় তাই তার পরেই একটি অক্ষর গুরুমাত্রিক ; এই গুরু মাত্রার বাধায় প্রহত হইয়া মন্দাক্রান্তার শ্রোতােবেগ যেন সহসা উদ্বেল হইয়া উঠিয়াছে এবং তার ধ্বনির কলনাদও অকস্মাৎ গুরুগম্ভীর হইয়া উঠিল। কিন্তু তার পরেই আবার যতি এবং তৃতীয় পর্বে একেবারে সাত অক্ষর; এই সাত অক্ষরের মধ্যে পাঁচটির মাত্রাই গুরু; কাজেই ধ্বনি গম্ভীর এবং গতি মন্থর হইয়াছে। স্ব ( ২০ ) কিন্তু এই গাম্ভীৰ্য্য ও মন্থরতা যাতে একঘেয়ে হইয়া উঠিতে না পারে, তারই জন্য দ্বিতীয় ও পঞ্চম অক্ষরে লঘু মাত্রার ব্যবস্থা আছে ; তাতে ছন্দের গতি-ভঙ্গী ও ধ্বনি-বৈচিত্র্য অতি চমৎকার ভাবে লীলায়িত হইয়া উঠিয়াছে। মেঘদূতের আদর।-এইসব কারণেই কালিদাসের মেঘদূত ভারতবর্ষের কাব্য-প্রিয় জনগণের হৃদয় একান্ত ভাবে অধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিল। মেঘদূতের এই জনপ্রিয়তার একটি প্রমাণ এই যে, পরবর্তী কালে কবি-যশ-প্রার্থী বহু লােক কালিদাসের পদানুসরণ করিয়া মেঘদূতের অনুরূপ বিষয় লইয়া এক নৃতন কাব্য-সাহিত্য-রচনায় প্রবৃত্ত হইল; এই শ্রেণীর কাব্যকে দূত-কাব্য আখ্যা দেওয়া যায়। ভারতবর্ষে আজ পর্যন্ত এই ধরণের অন্তত পঞ্চাশখানা দূত-কাব্য পাওয়া গিয়াছে। তার মধ্যে বাঙলার রাজা লক্ষ্মণ- সেনের (১১৭৮-১২ ০৫) সভাকবি ধােয়ীর পবন-দূত, জৈন কবি বিক্রমের নেমিদূত, রূপগগাস্বামীর হংসত, বিষ্ণুদাসের মনােদূত এবং কৃষ্ণ সার্বভৌমের পদাঙ্ক-দূতের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। সিংহলে মেঘদূতের একটি সিংহলী অনুবাদ এবং তিব্বতের তার গ্রন্থ-সংগ্রহে মেঘদূতের একটি তিব্বতী অনুবাদ পাওয়া গিয়াছে, এ কথা পূর্বেই বলিয়াছি। জৈন কবি জিনসেনের (খৃঃ ৭৮৩) পার্খাদয় নামক কাব্যখানাও মেঘদূতের জনপ্রিয়তার একটি বড় সুন্দর নিদর্শন। এই কাব্যের প্রত্যেকটি শ্লোকই ভারতীয় ( ২১ ) তার মধ্যে সমস্যপুরণ-পদ্ধতি মতে মেঘদূতের একটি বা দুইটি চরণ লইয়া সম্পূর্ণ অন্য অর্থ বােঝায় এমন ভাবে রচিত। কাজেই এই কাব্যখানিতে সমগ্ৰ মেঘদূতখানাই অতি চমৎকার ভাবে প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে। জৈন কবি বিক্রমের কাব্যটিও ঠিক এই ভাবেই মেঘদূত কাব্যকে অনেকটা আত্মসাৎ করিয়াছে। মেঘদূতের জনপ্রিয়তার আর-একটি প্রমাণ এই যে, আজ পর্যন্ত ভারত- বর্ষে অন্তত পঞ্চাশ ষাট জন টীকাকার মেঘদূতের টীকা ও ব্যাখ্যা লিখিয়াছেন। কাশ্মীরী পণ্ডিত বল্লভদেব, দক্ষিণাবর্ত ও মলিনাথ সুরির নামই বিশেষ ভাবে উল্লেখযােগ্য। ইহাদের মধ্যে বল্লভদেবই কালিদাসের প্রাচীনতম টীকাকার বলিয়া মনে হয়। ভারতবর্ষের প্রাদেশিক ভাষাগুলিতেও মেঘদুতের বহু অনুবাদ ও ব্যাখ্যা রচিত হইয়াছে এবং হইতেছে। একমাত্র বাঙলা ভাষায় মেঘদূতের যে-সব অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রকাশিত হইয়াছে তাদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। তথাপি বাঙলায় মেঘদূতের আরও অনুবাদের প্রয়ােজন আছে। (মেঘদূতের অনুবাদ।-কাব্যের অনুবাদ যিনি করেন তাঁর কর্তব্য মােটেই সােজা নয়। কবির ভাষাগত অর্থকে ভাষান্তরিত করিলেই তাকে অনুবাদ বলা চলে না। যদি মাত্র অর্থটিকে ভাষান্তর করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে কবির শব্দগত অর্থকে যথাসম্ভব বজায় রাখিয়া সরল গদ্যে অনুবাদ করাই সঙ্গত। কিন্তু কবির ভাষাকে অনুবাদ করিলেই কাব্যানুবাদ হয় = = ( ২২ ) । যথার্থ কাব্যানুবাদ করিতে হইলে কাব্যের বস্তুরূপ, ভাবরূপ ও ধ্বনিরূপ এই তিনটিকেই ভাষান্তরে ফুটাইয়া তুলিতে হইবে। এই তিনটিকেই যিনি যত অক্ষুন্ন রাখতে পারিবেন তার অনুবাদ ততই সার্থক হইবে। গদ্য-বিষয়ের অনুবাদ করা অপেক্ষাকৃত সােজা; কিন্তু কাব্যানুবাদের মুস্কিলই এই যে , কাব্যের রস-রূপ এবং ধ্বনিরূপকেও যথাসম্ভব অবিকৃত রাখিতে হয়। আজ পর্যন্ত বাঙলায় মেঘদূতের বহু অনুবাদ হইয়াছে। তথাপি এখনও মেঘদূতের আরও বাঙলা অনুবাদ করার প্রয়ােজন আছে। কারণ, এই বহুসংখ্যক অনুবাদের মধ্যে একখানিতেও মেঘদূতের বস্তু, রস ও ধ্বনি এই তিনেরই অবিকল প্রতিরূপ পাওয়া যায়, একথা বলিলে সাহসিকতা দেখানাে হইবে। গদ্যানুবাদগুলির কথা ছাড়িয়া দিয়া পদ্যানুবাদগুলি সম্বন্ধে একথা অসঙ্কোচে বলা যায় যে, এদের অধিকাংশই মামুলি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে অনুবাদ; এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মেঘদূতের ধ্বনিরূপকে প্রতিফলিত করা প্রায় অসম্ভব বলিলে অন্যায় হয় না; আর কাব্য মাত্রেরই ধ্বনিরূপ বিকল হইলে তার রসরূপও অবিকৃত থাকে না ঐ সকল অনুবাদের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিবার প্রয়ােজন নাই। তবে এই পর্যন্ত বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এইসব অনুবাদকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেঘদূতের বিষয়-বস্তুতে নিজেদের প্রয়ােজন-মত অবান্তর ভাবে অনেক সংযােগ-বিয়ােগ করিয়াছেন। এইরূপ সংযােগ-বিয়ােগ করিলে অনুবাদের আদর্শ অক্ষুন্ন থাকে না একথা ( ২৩ } বলাই বাহুল্য। আবার অনুবাদককে এ কথাও স্মরণ রাখিতে হইবে যে, অনুবাদ বা ব্যাখ্যা এক জিনিষ নয়, কবির বক্তব্য বিষয়কে বিশদ করিয়া প্রয়ােজনমত বাড়াইয়া ভাষান্তরে প্রকাশ করাকে অনুবাদ বলা বিড়ম্বনা মাত্র। এ ভাবে ব্যাখ্যা করা ভাষ্যকারের কর্তব্য হইতে পারে, কিন্তু অনুবাদকের নয়। কাব্যানুবাদের আদশ সম্বন্ধে যা বলা হইল তার যদি কিছুমাত্র মূল্য থাকে তবে বাঙলা সাহিত্যে মেঘদূতের অনুবাদ বলিয়া যে কয়খানি বই প্রচলিত আছে তার একখানিকেও আদশ অনুবাদ বলা চলে কি না সন্দেহ। মেঘদূতের অনুবাদ কিরূপ হওয়া উচিত সে-বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আর-একটু খুলিয়া বলা দরকার। কাব্যের ধ্বনিরূপকেই ভাষান্তরে ফুটাইয়া ভােলা সবচেয়ে মুস্কিল এবং অধিকাংশ অনুবাদকই এ বিষয়টিকে এড়াইয়া চলেন। মেঘদূতের ধ্বনির অনুবাদ করিতে হইলে প্রথমেই মন্দাক্রান্তার অনুরূপ একটি বাঙলা ছন্দ বাছিয়া লওয়া দরকার। পূর্বেই বলিয়াছি যে, মামুলি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মেঘদূতের মন্দাক্রান্তা ছন্দের ধ্বনিরূপকে ফুটাইয়া তােল সম্ভব নয় ; যদি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মেঘদূতের অনুবাদ করিতেই হয় তবে পয়ার ত্রিপদী প্রভৃতি মামুলি ছন্দ ছাড়িয়া আট, চার ও ছয় অক্ষরের তিন পর্বে আঠারাে অক্ষরের ছন্দে অনুবাদ করাই উচিত মনে করি। আর চলতি কথার বাঙলা নৃত্য-চপল স্বরবৃত্ত ছন্দে মেঘদূতের অনুবাদ করিতে প্রয়াসী হইলে মন্দাক্রান্তার গুরু-গম্ভীর ধ্বনিটিকেই একেবারে ( ২৪ ) পিষিয়া মারা হয়। পূর্বেই দেখাইয়াছি যে, ধ্বনি-গাম্ভীর্য এবং গতি-মন্থরতাই মন্দাক্রান্তার মৰ্ম্ম-স্বরূপ। অথচ বাঙলার স্বরবৃত্ত ছন্দে ধ্বনিগাম্ভীর্য ও গতি মন্থরতা তাে নাই-ই ; বৰং ধ্বনির লঘুতা এবং গতির নৃত্যপর চপলতাই বাঙলা স্বরবৃত্ত ছন্দের বিশেষত্ব। সুতরাং স্বরবৃত্ত ছন্দে মন্দাক্রান্তাকে রূপান্তরিত করিলে মেঘদূতকে আর মেঘদূত বলিয়া চিনিবারই উপায় থাকে না; তার ধ্বনিরূপের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাব-রূপের বিকৃতি ঘটাও অপরিহার্য হইয়া উঠে। যারা মেঘদূতের স্বরবৃত্ত রূপ দেখিয়া- ছেন রাই একথা স্বীকার করিবেন। কবি সত্যেন্দ্রনাথ যে স্বর-মাত্রিক মন্দাক্রান্তার প্রবর্তন করিয়াছেন তা বাংলা কাব্যে বহুল ব্যবহার করা কত শক্ত সে-কথা না বলিলেও চলে। ঐ ছন্দে স্বতন্ত্র কবিতা রচনা করা বরং চলিতে পারে, কিন্তু ঐ ছন্দে মেঘদূতের অনুবাদ করা একেবারেই অসম্ভব মনে হয়।) কাজেই দেখিতে পাইতেছি, বাঙলা অক্ষরবৃত্ত কিংবা স্বরবৃত্তকে মন্দাক্রান্তার বাহন করিলে ছন্দ-সঙ্গতি রক্ষা হয় না ; অতএব মন্দাক্রান্তার ধ্বনিগত স্বরূপটি যথাসম্ভব বজায় রাখিয়া মেঘদূতের অনুবাদ করিতে হইলে বাঙলা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আশ্রয় লওয়া ছাড়া উপায় নাই। অথচ আজ পর্যন্ত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মেঘদূতের কোনাে অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া জানি না। কিন্তু বাঙলা মাতাবৃত্ত ছন্দেরও শ্রেণীভেদে বহু বিভিন্ন রূপ আছে ; Art — •• ( ২৫ ) তার মধ্যে কোন্ বিশেষ ছন্দটি মন্দাক্রান্তার সবচেয়ে বেশি অনুরূপ, তা বাছিয়া ঠিক করিতে হইলে বিশেষ ছন্দ-নিপুণতা থাকা চাই। কিন্তু এই বাছাই-কার্যে অগ্রসর হওয়ার পূৰ্বে একথা মনে রাখিতে হইবে যে, সুর-প্রাধান্য এবং ধ্বনির তরলতা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের স্বাভাবিক বিশেষত্ব, এইজন্যই মাত্রাবৃত্ত ছন্দ লিরিক বা গীতি-কবিতার পক্ষে বিশেষ ভাবে উপযােগী। কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে গতির বৈচিত্র্য সচরাচর দেখা যায় না। তাই মন্দা- ক্ৰাস্তার মতাে ধ্বনি-বৈচিত্র্যময় ছন্দকে মাত্রাবৃত্তে রূপান্তরিত করিতে হইলে খুব সতর্ক হওয়া প্রয়ােজন ; এমন একটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে বাছিয়া লইতে হইবে যাতে ধ্বনির গতিক্রম একঘেয়ে হইয়া না উঠে এবং এই ছন্দে লঘু ও গুরু মাত্রার সংস্থান এ ভাবে করিতে হইবে যেন মাত্রাবৃত্তের ধ্বনি স্বাভাবিক গীতি-কাব্য-সুলভ তরলতা ও সুর-প্রাধান্য পরিহার করিয়া ভাব-গম্ভীর কাব্যের যােগ্যতা লাভ করিতে পারে। এস্থলে সংস্কৃত মন্দাক্রান্তা ছন্দের ধ্বনি-স্বরূপের একটু বিশ্লেষণ করিলেই তার উপযােগী বাঙলা মাত্রাবৃত্ত ছন বাছিয়া লওয়া কঠিন হইবে না। মন্দাক্রান্তা সতেরাে অক্ষরের ছন্দ এবং সংস্কৃত ছন্দ’-শাস্ত্র মতে যথাক্রমে চার, ছয় এবং সাত অক্ষরের তিনটি পর্বে প্রত্যেক পঙক্তি বা চরণ বিভক্ত, প্রত্যেক পর্বের পরেই যতি। কিন্তু বাঙালীর কানে সাত অক্ষরের তৃতীয় পর্বটি অত্যন্ত দীর্ঘ বলিয়া বােধ হয় ।
( ২৬ ) এবং সুযােগ পাইলেই তৃতীয় পরে চতুর্থ অক্ষরের পরেই আর-একটি যতির জন্য বাঙালীর কান ব্যগ্র হইয়া উঠে। মেঘাললাকে | ভবতি সুখিনাে | পন্যথাবৃত্তি চেতঃ। এখানে তৃতীয় পর্বের চতুর্থ অক্ষরের পরে যতি স্থাপনের কোনাে স্বাভাবিক আশ্রয় নাই। কিন্তু কশ্চিৎ কান্তা- { বিরহ-গুরুণা | স্বাধিকার-1 প্রমত্ত। এখানে সে আশ্রয় পাওয়ায় বাঙালীর কান মন্দাক্রান্তা ছন্দে তিনটির স্থানে চারটি যতি দিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। কবি সত্যেন্দ্রনাথ যে বাঙলা মন্দাক্রান্তা ছন্দের সৃষ্টি করিয়াছেন তাতে তিনিও তৃতীয় পর্বের চতুর্থ অক্ষরের পরে বাঙালী কানের অপরিহার্য এই নূতন যতিটিকে অস্বীকার করিতে পারেন নাই। সুতরাং বাঙলা ছন্দে, মন্দাক্রান্তার ধ্বনিকে ধরিতে গেলে প্রত্যেকটি পঙক্তিকে চারটি পর্বে বিভক্ত করিতেই হইবে। যেহেতু বাঙলা ছন্দে লঘু গুরু মাত্রা স্থাপনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নাই, সেজন্য মন্দাক্রান্তা ছন্দের প্রতি পর্বের মােট মাত্রা পরিমাণকেই বজায় রাখার চেষ্টা করিতে হইবে। উদ্ধত পঙক্তিটির প্রথম পর্বে চারটি গুরুরান্ত অক্ষর,-মােট আট মাত্রা; দ্বিতীয় পর্বে পাঁচটি অক্ষর লঘু-স্বরাষ্ট ও একটি গুরু-স্বান্ত,-সুতরাং মােট সাত মাত্রা ; তৃতীয় পর্বেও তিনটি ( ২৭ ) গুরু স্বরে ও একটি লঘু স্বরে মােট সাত মাত্রাই হইতেছে ; আর চতুর্থ পর্বে দুইটি গুরু ও একটি লঘু স্বরে মােট পাঁচ মাত্রা। অতএব মন্দাক্রান্তা ছন্দকে বাঙলা মাত্রাবৃত্তে রূপান্তরিত করিতে গেলে তার প্রত্যেক পঙক্তির চারটি পর্বে যথাক্রমে আট, সাত, সাত এবং পাঁচটি করিয়া মাত্রা থাকা দরকার ; তা হইলেই অন্তত’ পৰ্ব্বচ্ছেদ বিষয়ে মন্দাক্রান্তার অনুরূপ ছন্দ হইবে। কিন্তু মাত্রাবৃত্তে এক পর্বে আট মাত্রা ও তার পরেই দুইটি সাত-সাত মাত্রার পৰ্ব রচনা করার বিপদ আছে, কারণ তাতে ছন্দের মধ্যে অশােভন রকম ধ্বনি-বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং প্রথম পর্বটি হইতে একটি মাত্রা কমাইয়া দিয়া প্রথম তিনটি পৰ্বকেই সপ্তমাত্রিক করাই সবচেয়ে নিরাপদ; তাতে সংস্কৃতের চেয়ে বাঙলায় মাত্র এক মাত্রার পার্থক্য হইবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনটি সপ্তমাত্রিক ও একটি পঞ্চমাত্রিক পর্বের সাহায্যে বাঙলা ছন্দ যথাসম্ভব সংস্কৃত মন্দাক্রান্তার সারূপ্য লাভ করিবে। প্যারী-বাবু মেঘদূতের অনুবাদ- কালে এই ত্ৰিসপ্ত-পঞ্চমাত্রিক ছন্দের আশ্রয় লইয়া ছন্দ-নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছেন বলিয়াই মনে করি। কারণ, তাতে মন্দাক্রান্তার গতি-ভঙ্গী অনেকটাই রক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু এই সপ্তমাত্রিক ছন্দ ব্যবহারের একটা বিপদের কথাও এখানে চলা প্রয়ােজন। বাঙলায় একটানা অবিচ্ছেদ্য সাতমাত্রার ছন্দ রচনা করা যায় না। সাতমাত্রার ছন্দের প্রত্যেক ( ২৮ } পৰ্বের মধ্যেই একটুখানি ছেদ এবং একটি করিয়া ঈষদ-যতি থাকিবেই ; কারণ, সপ্তমাত্রিক পৰ্ব আসলে সচরাচর তিন ও চার মাত্রার এবং কখনও কখনও চার ও তিন মাত্রার সংযােগে উৎপন্ন। প্যারী-বাবুর ব্যবহৃত সপ্তমাত্রিক ছন্দ আসলে ত্রি-চতুর্মাত্রিক ; প্রতি পঙক্তি পর্বেই তাকে তিন-চারের সমাবেশ করিতে হইয়াছে, অন্য কোনো রকম সমাবেশ সম্ভব নয়। এইজন্যই মূল মন্দাক্রান্তার তুলনায় অনুবাদ কতকটা একঘেয়ে শুনিতে হইয়াছে। নিপুণ শ্রুতি-ধরের নিকট এই ত্রুটিটুকু অলক্ষিত থাকিবে না। কিন্তু সপ্তমাত্রিক ছন্দে এই অসুবিধাটুকু পরিহার করার উপায় নাই। তাই মনে হয়, প্যারী-বাবু যদি সপ্তমাত্রিক ছদ ব্যবহার না করিয়া বাত্রিক ছন্দ ব্যবহার করিতেন, তবে সমস্ত পঙক্তিতে মােট চার মাত্রার অভাব হেতু প্রতি পঙক্তি-পৰ্ব্ব ধ্বনি-দৈর্ঘ্যে কিছু খাটো হইলেও তিনি হয়- তো এই ত্রুটিটুকুকে বাঁচাইয়া চলিতে পারিতেন, কারণ ষম্মাত্রিক ছন্দে মাত্রা-সমাবেশের প্রচুর সুযােগ আছে। যাহােক্, মাত্রাবৃত্তে মন্দাক্রান্তার ধ্বনি-বৈচিত্র্য রক্ষা করিতে হইলে গুরু-লঘু স্বরের সমাবেশ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়ােজন, প্যারী-বাবু একথা বিস্মৃত হন নাই। মাত্রাবৃত্তের প্রথম ও তৃতীয় পর্ব দুইটিকে গুরুষরবহুল, দ্বিতীয় পর্বটিকে লঘুস্ববহুল করা এবং চতুর্থ পর্বের শেষ দুইটি স্বরকে গুরু করা বিশেষ প্রয়ােজন। প্যারী-বাবু প্রত্যেক পঙক্তির শেষ স্বরটিকে প্রায় সর্বত্রই গুরু করিয়াছেন, তাই প্রত্যেকটি ( ২৯ ) পঙক্তি পড়িয়া শেষ করার পরেই যেন মন্দাক্রান্তার ধ্বনির রেশ কানে বাজিতে থাকে। দ্বিতীয় পর্বের লঘুস্বরবাহুল্যও প্রায় সর্বত্রই আছে, যদিও ঈষদ-যতিটির বাধা হেতু ধ্বনি- বেগ যথেষ্ট প্রখর হইয়া উঠিতে পারে নাই। কিন্তু প্রথম ও তৃতীয় পর্বে গুরুস্কর-বাহুল্য, বহু স্থলেই রক্ষিত হয় নাই। অনুবাদে ছন্দের সমস্ত দাবী রক্ষা করা কত কঠিন তা যিনি মন্দাক্রান্তাকে বাঙলা ছন্দে প্রতিধ্বনিত করিতে চেষ্টা করিয়াছেন তিনিই [ তথাপি প্যারী-বাবু অনুবাদে মূলের ধ্বনি বজায় রাখার দুরূহতায় অভিভূত হইয়া হাল ছাড়িয়া দেন নাই, ইহাই সুখের বিষয়। তিনি যদি মেঘদূতের ধ্বনিকে বাঙলায় প্রতি ধ্বনিত করার গুরুত্বে পরাহত হইয়া নিজের সুবিধামত এক-একটি শ্লোককে এক-এক চুদে অনুবাদ করিতেন তবে তা মার্জনীয় হইত বলিয়া মনে করি না; তাতে অনুবাদ যেমন বিকলাঙ্গ হইত, অনুবাদকের ছন’-রক্ষার অক্ষমতাও তেমনি প্রকাশ পাইত। কারণ কালিদাস যখন তার মেঘদূত আগাগােড়া একই ছন্দে রচনা করিয়াছেন, তখন এক- ঘেয়েত্বের অপবাদ দিয়া তাকে নিজের সুবিধা-মত বিভিন্ন ছন্দে অনুবাদ করার অধিকার অনুবাদকের আছে কি না সন্দেহ। কালিদাসকেও সমস্ত মেঘদূতখানা একই মন্দাক্রান্তা ছন্দে রচনা করিতে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছিল, সমঝদার পাঠক মেঘদূতের বহু স্থানেই ( ৩১ ) তার যথেষ্ট পরিচয় পাইবেন। কিন্তু তাই বলিয়া কালিদাস মেঘদূতের সর্বত্র একই ছন্দ- রক্ষার চেষ্টায় বিরত হন নাই। সুতরাং অনুবাদকে মূলানুগত করিবার জন্য অনুবাদকের কষ্ট স্বীকার করিয়া হইলেও সৰ্ব্বত্রই একই ছন্দ ব্যবহার করা সঙ্গত। আর এই একই কারণে প্রত্যেকটি শ্লোকের অনুবাদকেও চারটি পঙক্তির মধ্যেই সমাপ্ত করা প্রয়ােজন। নতুবা অনুবাদের মূলানুগত্য রক্ষা করাই অসম্ভব হইয়া পড়ে। কিন্তু বাঙলায় মেঘদূতের যে কয়খানি পদ্যানুবাদ আছে তাতে দেখা যায় যে, অধিকাংশ স্থলেই প্রত্যেকটি অনূদিত শ্লোক চার পঙক্তির সীমা অতিক্রম করিয়া গিয়াছে। তাতে অনেক স্থানেই অনুবাদ ব্যাখ্যার আকার ধারণ করিয়াছে এবং এই একটি নূতন বিপদ ঘটিয়াছে যে, অতিরিক্ত চরণগুলিকে পূর্ণ করিবার জন্য অনুবাদককে বহু স্থানেই কালিদাসের কথার সঙ্গে নিজেদেরও অনেক কথা জুড়িয়া দিতে হইয়াছে। তাতে অনুবাদ জিনিষটাই যে কতখানি বিকৃত হইয়া যায়, তা বলা নিষ্প্রয়ােজন। প্যারী-বাবু প্রত্যেকটি শ্লোকের অনুবাদকেও চারটি চরণেই সমাপ্ত করিয়াছেন। তাতে অনুবাদ ভাষ্য-ভাবাপন্ন হইয়া উঠে নাই এবং কালিদাসের ভাবটি অনেকখানি জায়গা না জুড়িয়া চার-চরণের সংকীর্ণ-পরিধির মধ্যে সংহত হওয়ায় মূলের মতােই গাঢ়তা পাইয়াছে, আর অনুবাদক ও মূলের কথার সঙ্গে নিজের কথা যােগ করার অপ্রীতিকর দায় থেকে অনেকটা নিষ্কৃতি পাইয়াছেন।
( ৩১ ) অনুবাদে আর-একটি কথা সব-চেয়ে বেশি মনে রাখা দরকার—সেটি হইতেছে অনুবাদের শব্দ-প্রয়ােগকে যথাসম্ভব মূলের অনুগত করা। সংস্কৃত ভাষার বাংলা অনুবাদের একটি সুবিধা এই যে, অনেক মূল সংস্কৃত শব্দকেই বাঙলায় অবিকল ব্যবহার করা যায় । তাতে অনুবাদ-পাঠকেরা মুলের অনেক কথাই জানিতে পারেন। এই সুবিধাটি গদ্যানুবাদেই বেশি ; পদ্যানুবাদে অনুবাদক অনেক সময়েই ছন্দের খাতিরে মূলে নাই এমন অনেক কথাই ব্যবহার করিতে প্রলুব্ধ হন। কিন্তু প্যারী-বাবু অনেক স্থলেই এই লােভ সংবরণ করিয়া কলিদাসের মূল কথাকেই যথাসম্ভব বাঙলায় চালাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। তাতে মুলের মৰ্যাদাও রক্ষিত হইয়াছে এবং অনুবাদেরও গৌরব-বৃদ্ধি হইয়াছে। মূল সংস্কৃত ও বাঙলা অনুবাদ পাশাপাশি দেওয়াতে অনুবাদ মূলানুগত হইয়াছে কি না তা মিলাইয়া দেখিবার বিশেষ সুবিধা হইয়াছে ; সংস্কৃতজ্ঞ পাঠকেরা অনেক সময়ই মূল সংস্কৃত পাঠের অভাব বােধ করিয়া থাকেন। মূলে আছে- মেঘালােকে ভবতি সুখিনাে প্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ কাশ্লেষ প্রণয়িনি জনে কিং পুনদুরসংস্থে। তার অনুবাদ এইরূপ হেরিয়া জলধর সুখীর অন্তর থাকিতে চাহে না যে অচঞ্চল ; কণ্ঠলীন প্রিয় জনেরে ছেড়ে দূরে বহে যে তার দশা কিবা তা বল্ ?
( ৩২ ) মূল পাঠ-তেনার্থিত্বং ত্বয়ি বিধিবশাৎ দূরবন্ধুৰ্গতাে’হং যাঙ্ক্ষা মােঘ বরমধিগুণে নামে লব্ধকামা। তার অনুবাদ বঁধুর পাশ হতে হয়েছি দূরগত দৈব-বশে, হও করুণাময় ; বিমুখ করে যদি মহতে তবু মাগি, কামনা পূরালেও অধমে নয়। বন্ধুপ্রীত্যা ভবনশিখিভি দত্তলােপহার, এই কথাটার অনুবাদ হইয়াছে—“বন্ধু-প্রীতি- ভরে ভবন-শিখী দেবে নৃত্য-উপহার”। এই রকম চমৎকার মূলানুগ অনুবাদ অনেক স্থানেই পাওয়া যাইবে। কিন্তু সব জায়গায়ই যে এরূপ মূল-সঙ্গতি রক্ষিত হইয়াছে তা নয়, এবং এরূপ রক্ষা করাও সম্ভব কি না সন্দেহ। যাহােক, মেঘদূতের কাব্যানুবাদের আদর্শ কিরূপ হওয়া উচিত সে-সম্বন্ধে অনেক কথাই বলিলাম। প্যারী-বাবু সেই আদর্শ-রক্ষায় কতখানি সমর্থ হইয়াছেন, তার বিচারের ভার আমার উপর নয়। তার সফলতা ও বিফলতার বিচারের ভার সাহিত্য-রসিক সমালােচকদের উপরেই রহিল। মেঘদূতের কাব্যানুবাদ-কাৰ্য্যে অগ্রসর হইয়া প্যারী-বাবু নিজের সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া অনুবাদের আদর্শকে খাটো করেন নাই, শুধু ইহাই আমার বক্তব্য। মেঘদূতের পাঠ—ইংরাজি ১৮১৩ সালে বিখ্যাত মনীষী হােরেস্ হেম্যান্ উইলসন ইংরাজি অনুবাদ ও প্রচুর টাকা-টপ্পনী সহ মেঘদূতের একটি ইংরাজি সংস্করণ প্রকাশ করেন।
( ৩৩ ) তান্ মহাকবি গ্যটে মেঘদূতের এই ইংরাজি অনুবাদ পড়িয়া মুগ্ধ হন। সেইদিন হইতে কালিদাসের মেঘদূত ও অন্যান্য কাব্য আলােচনার একটি নূতন পর্যায়ের সূত্রপাত হইয়াছে। তখন হইতেই আধুনিক পণ্ডিতেরা তীক্ষ সমালােচনার দৃষ্টি ও ঐতিহাসিক বােধ লইয়া কালিদাস ও তার কাব্য সম্বন্ধে এক নূতন রকম আলােচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ফলে কালিদাসের কাল-নির্ণয় ও কালিদাসের যুগে ভারতের রূপ আবিষ্কৃত হইয়াছে। মেঘদূত এবং কালিদাসের অন্যান্য কাব্যের প্রকৃত পাঠ নির্ণয়ের জন্যও তারা কম চেষ্টা করেন নাই। তাদের চেষ্টায় মেঘদূতের বহু টীকা ও অসংখ্য পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত হইয়াছে এবং এইসমস্ত পাণ্ডুলিপি ও টীকার পারস্পরিক তুলনার ফলে মেঘদূতের প্রচলিত পাঠের অনেক অসঙ্গতি ধরা পড়িয়াছে। পূর্বোক্ত জৈন কাব্য পার্শ্বাভদয়ের ধৃত পাঠও মেঘদূতের প্রকৃত পাঠ নির্ণয়ের পক্ষে অনেক সহায়তা করিয়াছে। প্যারী-বাবুর এই পুস্তকে বাঙলা দেশে প্রচলিত মেঘদূতের পাঠকে নির্বিচারে গ্রহণ করা হয় নাই; আধুনিক বিচারের আলােকে পাঠ-সংস্কারের কতকটা চেষ্টা করা হইয়াছে। সে দায়িত্ব আমারই। এই পাঠ-সংস্কার-কাৰ্যে প্রধানত’ বল্লভদেব ও জিনসেনের ধৃত পাঠের উপরেই নির্ভর করিয়াছি। যে-যে স্থানে আমাদের পাঠ বাঙলায় প্রচলিত মল্লিনাথের পাঠ হইতে পৃথক হইয়াছে তা গ্রন্থের শেষে “মেঘদুত-প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছি। বল্লভদেবের ( ৩৪ ) পাঠ যে অনেক স্কুলে মল্লিনাথের পাঠের চেয়ে অধিকতর সঙ্গত তাও সেখানে দেখানাে হইয়াছে। প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলিকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন না করিয়া মল্লিনাথ-ধৃত বহু-প্রচলিত সমস্ত শ্লোকগুলিই রাখা হইল ; তবে মল্পিনাথ নিজে যেগুলিকে প্রক্ষিপ্ত বলিয়াছেন সেগুলি সবই পরিত্যক্ত হইয়াছে। মল্পিনাথ-গৃহীত শ্লোকপারম্পৰ্যেও কোনাে পরিবর্তন করা হয় নাই। যে-সব জায়গায় বাঙলা দেশের অভ্যস্ত পাঠ গ্রহণ করিলে কাব্যের ভাবগত কোনাে অসঙ্গতি ঘটে না সে-সব স্থানে পাঠ পরিবর্তন করা হয় নাই। যে-সব স্থানে ঐ অসঙ্গতি-দোষ ঘটে কেবল সে-সব স্থানেই পাঠ পরিবর্তন করা হইয়াছে ও “মেঘদুত-প্রসঙ্গে” তা নির্দেশ করা হইয়াছে। সম্পূর্ণরূপে পাঠ-সংস্কার করিয়া বাংলাদেশে মেঘদূতের একটি নূতন সংস্করণ প্রকাশ করিবার বিশেষ প্রয়ােজন এখনও রহিল। ল তেলিনীপাড়া, জিলা গলি ধিচন্দ্র ২। খ ১৩৭ 3
প্রথমে
।
,
মেঘদূত
০ ০
কশ্চিৎ কান্তাবিরহগুরুণ। স্বাধিকারপ্রমত্ত
শাপেনাস্তংগমিতমহিমা বর্ষভােগ্যেন ভর্ত
যক্ষশ্চক্রে জনকতনয়াস্নানপুণ্যোদকেষু
স্নিগ্ধচ্ছায়াতরুষু বসতিং রামগিৰ্যাশ্রমেষু । ।
তস্মিন্নদ্ৰৌ কতিচিদবশাবিপ্রযুক্তঃ স কামী
নী মাসান কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠঃ।
আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানু
বক্ৰীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ। ২।
পূৰ্বমেঘ যক্ষ করে এক আপন কাজে হেলা, কুবের তারে দিল। কঠোর শাপ- “নির্বাসনে রহাে ত্যজিয়া প্রেয়সীরে, দ্বাদশ মাস সহাে বিরহ-তাপ।” দুঃখে রামগিরি- আশ্রমে সে রহে হারায়ে সহজাত মহিমা তার, স্নিগ্ধ ছায়া যেথা বিতরে তরু যত সীতার স্নানে পূত সলিল যার। ১। মাসের পরে মাস শৈলে করে বাস, প্রিয়ার বিরহে সে কান্তিহীন ; খসিয়া ভূমি পরে সােনার বালা পড়ে, নিটোল বাহু হ’ল এমনি ক্ষীণ। আষাঢ় মাস এল প্রথম দিনে তার যক্ষ হেরে সেথা গিরির গা’য় লেগেছে মেঘ এক ঘেরিয়া সামু-দেশে, দস্তাঘাতে রত গজের প্রায়। ২।
মেঘদূত
তস্য স্থিত্বা কথমপি পুর: কেতকাধানহেতাে-
রন্তর্বাস্পশ্চিমনুচরাে রাজরাজস্য দধ্যে।
মেঘালােকে ভবতি সুখিনােহপ্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ
কাশ্লেষপ্রণয়িনি জনে কিং পুনদূরসংস্থে। ৩।
প্রত্যাসন্ন নভসি দয়িতাজীবিতাসম্বনাথ
জীমূতেন অকুশলময়ীং হারয়িষন্ প্রবৃত্তি।
স প্রত্যঃৈ কুটজকুসুমৈঃ কল্পিতর্ঘায় তস্মৈ
প্রীতঃ প্রীতিপ্রমুখবচনং স্বাগতং ব্যাজহার। ৪।
৪
পূর্বমেঘ -মেঘ দরশনে ফুটিয়া উঠি’ সদা কেতকীফুলকুল সুখে দোদুল, ক্ষ তারি আগে নীরবে ভাবে কত, হৃদয় হয়ে ওঠে বাষ্পকুল। হরিয়া জলধর সুখীরে অন্তর রহিতে চাহে না যে অচঞ্চল ; গুলীন প্রিয় জনেরে ছেড়ে দূরে রহে যে তার দশা কিবা তা বল ? ৩। রষা সমাগত হেরিয়া বিরহিণী প্রিয়ারে বাঁচাবারে সে উন্মুখ, রিত মেঘমুখে কুশল আপনার প্রেরিয়া প্রেয়সীর ঘুচাতে দুখ, লিয়া গিরিজাত নবীন মল্লিকা নীরদে নিবেদিয়া অর্ঘ-ভার, ক্ষ মেঘবরে মধুর প্রীতিভরে “স্বাগত” সম্ভাষ জানায় তার। ৪
মেঘদূত
ধূমজ্যোতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাতঃ ক মেঘঃ
সন্দেশার্থাঃ ক পটুকরণৈঃ প্রাণিভিঃ প্ৰাপণীয়া।
ইত্যোৎসুক্যাদপরিগণয়ন্ গুহ্যকস্তং যাচে
কামার্তা হি প্ৰকৃতিকৃপণাশ্চেতনাচেতনেষু। ৫।
জাতং বংশে ভুবনবিদিতে পুষ্করাবর্তকানাং
জানামি ত্বাং প্রকৃতিপুরুষং কামরূপং মঘঘনঃ।
তেনার্থিত্বং ত্বয়ি বিধিবশাৎ দূরবন্ধুৰ্গতােহহং
আজ্ঞা মোঘ বরমধিগুণে নাধমে লব্ধকামা। ৬।
৬
পূর্বমেঘ সলিল বায়ু জ্যোতি ধূম্রে জাত যেই এ যে সে জলধর চেতনহীন, বারতা প্রেরিবারে চাহি যে পটু প্রাণী এ সব ভাবে না সে বেদনলীন। যক্ষ জড় মেঘে ভিক্ষা আপনার জানায় নতিভরে আবেগবান ;- বিরহী জন কভু চেতন-অচেতনে বুঝে না ভেদাভেদ, হারায় জ্ঞান। ৫ যক্ষ বলে—মেঘ, স্বেচ্ছারূপী তুমি, সচিব বাসবের, শােভিলে, ভাই, বিদিত সেই কুল যে-কুলে পুষ্কর আবর্তক সবে লভিল ঠাই। বঁধুর পাশ হতে হয়েছি দুরগত দৈব-বশে, হও করুণাময় ; বিমুখ করে যদি মহতে তবু মাগি, কামনা পূরালেও অধমে নয়। ৬।
মেঘদূত
সন্তপ্তানাং ত্বমসি শরণং তৎ পয়ােদ প্রিয়ায়
সন্দেশং মে হর ধনপতিক্রোধবিশ্লেষিতস্য।
গন্তব্যা তে বসতিরলকা নাম যক্ষেশ্বরাণাং
বাহােদ্যানস্থিতহরশিরশ্চন্দ্রিকাধৌতহা। ৭।
মারূঢ়ং পবনপদবীমুগৃহীতালকান্তাঃ
প্রেক্ষিষ্যন্তে পথিকবনিতাঃ প্রত্যয়াদাসত্য।
কঃ সন্নদ্ধে বিরহবিধুরাং হুযুপেক্ষেত জায়াং
ন স্যান্তোহপ্যহমিব জনাে যঃ পরাধীনবৃত্তিঃ ॥ ৮।
No text on this page.
No text on this page.
পূর্বমেঘ শরণ তুমি, সখা, তাপিত মানবের, আমি যে বড় তাপী, সদয় হও, কুবের-কোপানলে হয়েছি প্রিয়াহারা, প্রিয়ার সুখদায়ী বার্তা বও যক্ষপুরী সেই সুদূর অলকায় ; বাহির-উপবনে মহেশ্বর রহিয়া গৃহ যত ধৌত করি’ দেন ঢালিয়া নিজ শির- চন্দ্র-কর।৭ উঠিলে নভে তুমি পথিকবধূ কত ভাবিবে দেখা হবে প্রিয়ের সাথ, চূর্ণ কেশ তারা সরায়ে মুখ হ’তে করিবে তব প্রতি নয়নপাত। আমার সম যেই অধম পরাধীন যাপিছে ঘাের দুখে দিবস, হায়, সে ছাড়া কেবা আর ছাড়িয়া প্রিয়তমা থাকিতে বল চায় হেরি’ তােমায় ? ৮।
মেঘদূত মং মং মুদতি পবনশ্চানুকূলে। যথা ত্বাং বামশ্চায়ং নদতি মধুরং চাতকস্তোয়গৃধুঃ। গর্ভাধানস্থিরপরিচয় নূনমাবদ্ধমালাঃ সেবিষ্যন্তে নয়ন ভগং খে ভবন্তং বলাকা। ৯। তাঞ্চাবশ্যং দিবসগণনাতৎপরামেকপত্নী- মব্যাপন্নামবিহতগতি ক্ষ্যসি ভ্রাতৃজায়াং। আশাবন্ধঃ কুসুমসদৃশং প্রায়শশা হ্যঙ্গনানাং সদ্যপাতপ্রণয়ি হৃদয়ং বিপ্রয়ােগে রুণদ্ধি । ১০। ১০ পূর্বমেঘ পবন অনুকূল তােমারে ধীরে ধীরে বহিয়া লয়ে যাবে, হে মেঘবর, তােমার বাম পাশে চাতক জললােভী করিবে কত রব হর্ষকর। তােমারে হেরি’ নভে মিলন-কাল জানি’ বলাকা সারি বাঁধি’ সমুৎসুক দুলিবে মালা সম তােমার বুক পরে, তুমি যে সবাকার নয়নসুখ। ৯। গমন-পথে, সখা, পাবে না কোনাে বাধা, হেরিবে পতিপ্রাণা বিরহ-ক্ষীণ ভাতৃবধূ তব আশায় বাঁচি’ রহে, বিরহ-শেষ-আশে গণিছে দিন। রমণী-হিয়া যেন কোমল ফুল হেন, বিরহ-তাপে সদা ঝরিতে চায় ; আশা যে বোঁটা সম ধরিয়া রাখে তারে ;-বিরহী হিয়া বাঁচে শুধু আশায়।১০ ১১ মেঘদূত কর্তৃং যচ্চ প্রভবতি মহীমুচ্ছিলামবন্ধ্যাং তচ্ছ তে শ্রবণসুভগং গর্জিতং মানসােকা। আকৈলাসাদ্বিসকিসলয়চ্ছেদপাথেয়বস্তঃ সম্পৎস্যন্তে নভসি ভবতে রাজহংসঃ সহায়ঃ ॥ ১১। আপৃচ্ছস্ব প্রিয়সখমমুং তুঙ্গমালিঙ্গ্য শৈলং বন্দ্যৈঃ পুংসাং রঘুপতিপদৈরঙ্কিতং মেখলাসু। কালে কালে ভবতি ভবতে যস্য সংযােগমেত্য স্নেহব্যক্তিশ্চিরবিরহজং মুঞ্চতে বাষ্পমুম্ ॥ ১২। ১২ পূর্বমেঘ যে গুরু গরজনে জাগিলে ভুইচাপা, ধরণী ফুলে ফুলে শােভিত হয়, শ্রবণ-সুখকর সে-রব শুনি’ ধেয়ে মানস-অভিমুখী মরালচয় আসিবে তব পাশে পাথেয় করি’ ঠোঁটে মৃণাল-কিশলয় কোমল-দল ; চলিবে কৈলাস অবধি সাথে সাথে সহায় সম, শােভি' আকাশতল।১১। যে গিরি কালে কালে তােমারে লভি' বুকে বিরহ-তাপময় বাষ্পভার উগারি’, স্নেহ তার প্রকাশে তব প্রতি, রয়েছে অঙ্কিত সামুতে যার ভুবন-বন্দিত শ্রীরামপদ-রেখা,- তােমার প্রিয় সেই তুঙ্গকায় শৈলে প্রীতিভরে বাঁধিয়া তব বুকে, মাগিয়া ল'য়ে, সখা, তব বিদায়। ১২। ১৩ মেঘদূত মার্গং তাবচ্ছ কথয়তৎপ্রয়াণানুরূপং সন্দেশং মে তদনু জলদ শ্রোঘসি শ্রোত্রপেয়ং। ভিন্ন ভিন্ন শিখরিষু পদং ন্যস্য গন্তাসি যত্র ক্ষীণঃ ক্ষীণঃ পরিলঘু পয়ঃ স্রোতসাঞ্চোপযুজ্য। ১৩। অদ্রেঃ শৃঙ্গং হরতি পবনঃ কিং স্বিদিত্যুন্মুখীভি- দৃষ্টোৎসাহশ্চকিতচকিতং মুগ্ধসিদ্ধাঙ্গনাভিঃ। স্থানীদস্মাৎ সরসনিচুলাদুৎপােদমুখঃ খং দিঙনাগানাং পথি পরিহরন্ সুলহস্তাবলেপা । ১৪। ১৪ পূৰ্বমেঘ যে-পথে অলকায় যাইবে বলি তায় বিবরি’ ধীরে ধীরে, দাও হে কান ; বার্তা প্রিয়া তরে বলিব শেষে, ভাই, কর্ণ দিয়ে তাহা করিও পান। অলকা বহু দূর, চলিতে পেলে ক্লেশ গিরির শিরে শিরে বসিও থির বরষি’ ঘন ঘন তমুটি ক্ষীণ হলে করিও পান লঘু স্রোতের নীর। ১৩। পবনে গিরিচূড়া উড়াল আজি কি রে, সিদ্ধ-অবলার। তুলিয়া মুখ মুগ্ধ সচকিত চাহনি দিয়ে তােমা’ ভরাবে উৎসাহে তােমারি বুক। গগনে উঠি’ তুমি চলিও উত্তর ছাড়িয়া সেথাকার নব বেতস ; বাড়ায়ে শুড় যবে আসিবে দিঙনাগ, এড়ায়ে তার স্কুল কর-পরশ। ১৪ মেঘদূত রত্নচ্ছায়াব্যতিকর ইব প্রেক্ষ্যমেতৎ পুরস্তা- দ্বল্মীকাগ্ৰাৎ প্রভবতি ধনুঃখণ্ডমাখণ্ডলস্য। যেন শ্যামং বপুৱতিতরাং কান্তিমাপৎস্যতে তে বহেণেব স্ফরিতরুচিনা গােপবেশস্য বিষ্ণোঃ ॥ ১৫। ত্বৰ্য্যায়ত্তং কৃষিফলমিতি বিলাসানভিজ্ঞৈ প্রীতিস্নিগ্ধজনপদবধূলােচনৈঃ পীয়মান। সদ্যঃ সীরােক্কষণসুরভি ক্ষেত্ৰমারুহ মালং কিঞ্চিৎ পশ্চাৎ প্রবলয় গতিং ভূয় এবােত্তরেণ ॥ ১৬।
পূর্বমেঘ ইন্দ্রধনুকের খণ্ড জাগে যেন মাটীর ঢিবি 'পরে ওই হােথায়। রতন কত যেন বিছুরি’ চারু ছায়া মিলিয়া তারি 'পরে মােহন ভায়। তােমার শ্যাম দেহ সে-ধনু পরশিলে তােমাতে উজলিবে শশাভা বহুল ;- শােভিবে যেন, আহা, বিষ্ণু গােপবেশী বেঁধেছে শিখী-পাখা শিরে অতুল।১৫। তােমার কৃপা-ধারা শস্যে ঢালে প্রাণ, তাইত পল্লী বধূ-নিচয় ভােমারে দিবে, ভাই, সরল প্রীতি-দিঠি বিলাসহীন অতি মাধুরীময়। সদ্য হালে-চষা আ মালভূমি ছড়াবে সেঁদা সোঁদা সুরভি বাস ; আবােহি' তাহে তুমি প্রবল করি’ গতি চলিও উত্তর, হে তাপনাশ । ১৬। ১৭ মেঘদূত মাসারপ্রশমিতবনােপপ্লবং সাধু মূর্ধ। বক্ষ্যত্যধ্বশ্রমপরিগতং সানুমানাক্টঃ । ন ক্ষুদ্রোহপি প্রথম কৃতাপেরুয়া সংশ্রয়ায় প্রাপ্তে মিত্রে ভবতি বিমুখ: কিং পুনর্যস্তখােচ্চৈঃ। ১৭। ছগােপান্তঃ পরিণতফলভদ্যোতিভিঃ কাননাত্রৈ- বৃষ্যারূঢ়ে শিরমচলঃ স্নিগ্ধবেণীসবর্ণে। নূনং যাত্যমরমিথুনপ্রেক্ষণীয়ামবস্থা মধ্যে শ্যামস্তন ইব ভুবঃ শেষবিস্তারপাঃ ॥ ১৮।
পূর্বমেঘ উছল জলধারে গিরির দাবানল নিয়ে হবে যবে ক্লান্তকায়, , সাদরে ।।ম।ন যে করে উপকার অধম জনও তারে বিমুখ নহে দিতে শরণ-ঠাই; মহৎ সেই গিরি তােমার দয়া স্মরি শরণ দিবে তােমা, ভুল যে নাই। ১৭। শৈল-ঘেরা বনে পাকিয়া আম যত সােনালি রঙে ভরে গিরি-শরীর, চূড়ায় তার তুমি চিকণ-বেণী-কালো যখন, হে জলদ, রহিবে থির, অমর-দম্পতি স্বরগ-দ্বার হতে পুলকে বিস্ময়ে হেরিবে তা’য়— শিখরে কালাে আর সােনালি দেহে গিরি শােভিছে ধরণীর স্তনের প্রায়। ১৮। ১৯ মেঘদূত স্থিত্ব। তস্মিন্ বনচরবধূভুক্তকুঞ্জে মুহূর্ত তােয়ােসৰ্গততরগতিস্তৎপরং বত্মতীর্ণঃ। রেবাং ক্ষ্যপলবিষমে বিন্ধ্যপাদে বিশীর্ণাং ভক্তিচ্ছেদৈৰিব বিরচিতাং ভূতিমঙ্গে গজস্য । ১৯। তাস্তিক্তৈনগমদৈৰ্বাসিতং বাস্তবৃষ্টি- জম্বষণ্ডপ্রতিহতবয়ং তােয়মাদায় গচ্ছে। অন্তঃসারং ঘন তুলয়িত্বং নানিলঃ শ্যতি ব্যাং রিক্তঃ সর্বো ভবতি হি লঘুঃ পূর্ণতা গৌরবায়। ২০।
পূর্বমেঘ কাননচর-বধু বিহার করে যেথা সেথায় ক্ষণতরে দিও হে ছয় ; বরষি’ যত খুসী কমায়ে জল-ভার চলিও লঘু দেহে ত্বরিত পায়। বিন্ধ্যপদে ক্ষীণ। হেরিবে বহে রেবা, উপলে ধারা তার বহুধা হয়, যেন রে গজদেহে নিপুণ তুলি ধরি কে আঁকে শাদা শাদা লিখনচয়। ১৯। জামের বনে যার রুদ্ধগতি জল বন্যগজমদ- সুবাস গায়, রিক্ত-বারি তুমি সে-রোেজল পিয়ে হইও পুন’, সখা, পূর্ণকায়। পবন পারিবে না উড়াতে যেথা সেথা সলিল-ভারে ভরা তােমারে আর ; পূর্ণ হিয়া যার সে হয় গুরুভার, তাহারা লঘু যারা রিক্ত-সার। ২০। ২১ মেঘদূত নীপং দৃষ্ট। হরিতকপিশং কেশরৈরন্ধরূঢ়ৈ- রাবিভূতপ্রথমমুকুলাঃ কন্দলীশ্চানুকচ্ছ। দগ্ধারণ্যেধিকসুরভিং গন্ধমাদ্রায় চোাঃ সারঙ্গাস্তে জলবমুচঃ সূচয়িষ্যন্তি মার্গং। ২১। উৎপামি দ্রুতমপি সখে মৎপ্রিয়ার্থং যিযামােঃ কালক্ষেপং ককুসুরভো পৰ্বতে পর্বতে তে। শুক্লাপাঙ্গৈঃ সজলনয়নৈঃ স্বাগতীকৃত্য কেকাঃ প্রত্যুতঃ কথমপি ভবা পমা ব্যবসম্যৎ। ২২। ২২ পূর্বমেঘ হেরিয়া আধফোটা সবুজ-পীত-আভ কেশর-যুত যত কদমফুল, নদীর তীরে তীরে প্রথম-ফুটেওঠা কন্দলীর হেরি নব মুকুল, নিদাঘ-দাহ-শেষে সিকত কাননের সুবাস অবিরত করিয়া ঘ্রাণ, ব্যাকুল মৃগদল ছুটিয়া বিঘােষিবে- এ পথে তুমি জল করেছ দান। ২১। আমার প্রতি হেতু যদিও দ্রুত যেতে বাসনা তব, তবু লাগে যে ত্রাস, গিরির পরে গিরি করাবে তব দেরী নিয়ত দিয়ে তােমা ফুলের বাস। ধবল-কোণ-যুত সজল আঁখি তুলি যখন শিখীগুলি কেকা-মুখর তােমারে বরি’ লবে কেমনে তুমি তবে চলিবে আশুগতি, হে মেঘবর? ২২।
মেঘদূত পাণ্ডুচ্ছায়ােপবনবৃতয়ঃ কেতকৈঃ সূচিভিল্পৈ- নীড়ারম্ভৈগৃহবলিভুজামাকুলগ্ৰামচৈত্যাঃ। ত্বয্যাসম্নে ফলপরিণতিশ্যামজম্ববনাস্তাঃ সম্পৎস্যন্তে কতিপয়দিনস্থায়িহংস দশার্ণাঃ। ২৩। ' তেষাং দিক্ষু প্রথিতবিদিশালক্ষণাং রাজধানীং গত্বা সদ্যঃ ফলমবিকলং কামুকত্বস্য লব্ধ। তীরােপান্তস্তনিতসুভগং পাস্যসি স্বাদু যম্মাৎ সন্ধ্রভঙ্গং মুখমিব পয়গা বেত্রবত্যাশ্চললাৰ্ম্মি ॥ ২৪। ২৪ পূর্বমেঘ তােমার সমাগমে দশার্ণের মাঝে যতেক উপবনে বেড়ার গায় ফুটিবে শাদা কেয়া টুটিয়া কাটা-জাল, ভবনবলিভুক্ পাখী সেথায় গ্রামের চৈত্যেতে বাঁধিবে নিজ নীড়, জামের বনে কালাে পাকিবে জাম ; হংস সেথা যত করিবে উড়ি-উড়ি মানসসরােবরে গমন-কাম। ২৩। সেথায় পাবে তুমি বিদিশা রাজধানী, প্রথিত দেশে দেশে যাহার যশ ; কামনা তব, মেঘ, পুরিবে সেথা সব, করিও পান মধু বিলাস-রস। বেত্রবতী-জলে উর্মিমালা দুলে কূলেতে মৃদু মৃদু সুভাষ কয়, কুটিময় যেন নদীর মুখ তাহা, তা হ’তে করে পান মিষ্ট পয়। ২৪।
মেঘদূত নীচৈরাখ্যং গিরিমধিবসেস্তত্র বিশ্রামহেতো- সম্পৰ্কাৎ পুলকিতমিব প্রৌঢ়পুষ্পৈঃ কদম্বেঃ। যঃ পণ্যস্থীরতিপরিমলােলগারিভিয়াগরাণা- মুদ্দামনি প্রথতি শিলাবেশভিযৌবনানি। ২৫। বিশ্রান্তঃ স জ বননদীতীরজাতানি সিঞ্চ- মুদ্যানানাং নবজলকণৈযুথিকাজালকানি। গগুস্বেদাপনয়নরুজাক্লান্তকর্পোৎপলানাং ছায়াদানাৎ ক্ষণপরিচিতঃ পুষ্পবীমুখানাং । ২৬। ২৬ পূর্বমেঘ সে নদী পিছে রাখি নীচৈ গিরি পাবে, হে সখা, বিশ্রাম করাে সেথায়, পরশ পেয়ে তব পুলকে গিরি যেন উঠিবে শিহরিয়া কদম-গা’য়। শিলার গৃহ হ'তে পণ্য রমণীর বিলাস-রাগ-বাস হতেছে বা’র,- বুঝিবে, নাগরের সেথায় যৌবন হয়েছে উদ্দাম দুর্নিবার। ২৫। জিরায়ে গিরি 'পরে চলিও বন-নদী তীরের উপবনে বরষি জল ; সে নব জলকণা লভিয়া বিকশিবে যুথিকা-কুসুমের মুকুল-দল। কুসুম তুলি’ তুলি’ ক্লান্ত নারী মুছে কানের উৎপলে গণ্ডস্বেদ, তাদের মুখ 'পরে ক্ষণেক দিয়ে ছায়া, হ'য়ে হে পরিচিত, মিটায়ে খেদ। ২৬। ২৭ মেঘদূত বঃ পন্থা যদপি ভবতঃ প্ৰস্থিতলস্যাত্তরাশাং সৌধেৎসঙ্গপ্রণয়বিমুখাে মা স্ম ভূরুজ্জয়িন্যা। বিদ্যদ্দামরিতচকিতৈস্তত্র পৌরাঙ্গনানাং লােলাপাগৈদি ন রমসে লােচনৈর্বঞ্চিতােহসি। ২৭। বীচিক্ষোভস্তনিতবিহগ-শ্রেণিকাঞ্চীগুণায়াঃ সংসৰ্পন্ত্যাঃ স্বলিতসুভগং দর্শিতাবৰ্তনাভেঃ । নিৰ্বিন্ধ্যায়ঃ পথি ভব রসাভ্যন্তরঃ সন্নিপত্য স্ত্রীণামাদ্যং প্রণয়বচনং বিভ্রমাে হি প্রিয়েষু। ২৮। ২৮ পূর্বমেঘ চলেছ উত্তর, তথাপি বাঁকি’ কিছু উজ্জয়িনী যেও, ছাড়ি না যাও; গগন-ছোঁয়া তার সৌধ-ছাদ-কোলে বসিও প্রীতিভরে, ভুলাে না তাও। তড়িৎ-ভরা চোখে পৌর নারী সেথা হানিবে সচকিত কটাক্ষ; চপল দিঠি-সাথে বিজলী দিয়ে, সখা, যদি না খেলে তুমি অভাগ্য। ২৭। ঢেউএর হিল্লোলে বিহগ রব তুলে’ যাহার 'পরে দোলে মেখলা আবর্তের মাঝে দেখায়ে চারু নাভি টলিয়া চলিয়া যে স্খলিয়া যায়, সে নির্বিন্ধ্যার প্রবাহে নামি’ তুমি তাহার রসধারা করিও পান;- এমনি ঠারেঠোরে প্রকাশে কামিনীরা প্রথম-প্রেম-বাণী আবেগবান। ২৮। ২৯ মেঘদূত বেণীভূতপ্রতসলিলাহসাবতীতস্য সিন্ধুঃ পাণ্ডুচ্ছায়া তরুহতরুভ্রংশিভির্জীর্ণপণৈঃ । সৌভাগ্যং তে সুভগ বিরহাবস্থয়া ব্যঞ্জয়ন্তী কাশ্যং যেন ত্যজতি বিধিন স য়ৈবােপপাদ্যঃ ২৯ ॥ প্রাপ্যাবস্তীমুদয়নকথাকোবিদগ্রামবৃদ্ধান পূৰ্বোদ্দিষ্টামনুসর পুরীং বিশালাং বিশালাং। স্বল্পীভূতে সুচরিতফলে স্বর্গিনাং গাং গতানাং শেষৈঃ পুণ্যৈই তমিব দিবঃ কান্তিম খণ্ডমেকং । ৩০।
পূর্বমেঘ সিন্ধু তটিনীর সলিল-ধারা যেন বেণীর সম ক্রমে হয়েছে ক্ষীণ ; তটের তরু হ’তে জীর্ণ পাতা ঝরি’ হয়েছে দেহ তার অতি মলিন। তােমারি বিরহেতে মলিনা সে তটিনী, তুমি যে পতি তার ভাগ্যবান ; বিপুল বরিষণে কৃশতা নাশি’ তার করিও তারে তুমি কান্তি দান। ২৯ গ্রামের যত বুড়া যেথায় উদয়ন- কাহিনী বাখানিতে নিপুণ খুব, অবন্তীরে সেই লভিয়া যেও তুমি উজ্জয়িনী পুরী বিশাল-রূপ। হেরিলে মনে হবে, পুণ্য হলে ক্ষয় স্বরগ হ’তে চ্যুত পুণ্য-অবশেষ ছিল যা’ তারি বলে স্বরগ রচিয়াছে ধর নর মেঘদূত দীর্ঘীকুন্ পটু মদকলং কৃজিতং সারসানা প্রত্যুষে শূটিতকমলামােদমৈত্রীকষায়। যত্র স্ত্রীণাং হরতি সুরভগ্নানিমঙ্গানুকূলঃ শিপ্রাবাতঃ প্রিয়তম ইব প্রার্থনা চাটুকারঃ। ৩১। কেশস বন্ধুপ্রীত্যা ভবনশিখিভিদত্তনৃত্তোপহার। হম্মেম্বস্যাঃ কুসুমসুরভিঘধ্বখিন্নান্তরাত্মা নীহা রাত্রিং ললিতবনিতাপাদরাগান্ধিতে। ৩২। ৩২ পূর্বমেঘ শিপ্রানদী-ছোঁয়া শীতল সমীরণ সারস-কলবর বহিয়া লয় ; ঊষায় বিকসিত কমলে পরশিয়া চলেছে মৃদু মৃদু সুরভিময় ; কাকলি বহি বহি মধুর কথা কহি’ হরে সে তরুণীর দেহের ক্লেশ, যেন রে প্রিয় তার প্রিয়ার প্রতি মাগে মধুর ভাষে করি’ মানের শেষ।৩১। পূরায়াে তব দেহ জানালাবাহী ধূমে, যে-ধুমে করে নারী সুরভি কেশ : বন্ধু প্রীতি-ভরে ভবনশিখী দেবে নৃত্য-উপহার তােমারে বেশ। কুসুম-বাস-ভরা গৃহের মেঝে পরে ললিত-বানতার চরণ-হ।। রয়েছে আঁকা কত, সে-সব গৃহ-শিরে কাটায়ে রাত তুমি দূরিও তাপ।৩২।
মেঘদূত ০ ০ ভঃ কচ্ছবিরিতি গণৈঃ সাদরং দৃশ্যমান পুণ্যং যায়স্ত্রিভুবনগুরােধাম চণ্ডেশ্বরস্য। ধূলােদ্যানং কুবলয়রজোগন্ধিভিৰ্গন্ধবত্যা- স্তোয়ক্রীড়ানিরতযুবতিস্নানতিক্তৈমরুদ্ভিঃ । ৩৩। অপ্যস্মিন্ জলধর মহাকালমাসাদ্য কালে স্থাতব্যং তে নয়নবিষয়ং যাবদত্যেতি ভানু। কুন, সন্ধ্যাবলিপটতাং শূলিনঃ শ্লাঘনীয়া- মামাণালমবিকলং লক্ষ্যসে গর্জিতানাং । ৩৪।
পূর্বমেঘ শিবের কণ্ঠের সমান নীল তােমা’ হেরিবে সমাদরে প্রমথগণ ; ত্রিলােক-গুরু যিনি রুদ্র মহাকাল তাহারি পূত ধামে করে গমন যুবতীদল খেলে গন্ধবতীজলে, অঙ্গরাগ-বাস লুটি’ পবন বহিছে কুবলয়- গন্ধ মাখি’ দেহে মৃদুল দোলা দিয়ে কুঞ্জবন। ৩৩। যদি সে মহাকাল সমীপে যাও তুমি থাকিতে দিবসের আলােক-লেশ, রহিও সেথা, মেঘ, যাবৎ দিবাকর উতরি’ নাহি যান দৃষ্টি-দেশ। দেবেশ-শূলপাণি- সন্ধ্যা-পূজা-কালে করিয়া গুরু গুরু গভীর রব পটহ সম যদি নিয়ত বাজো তুমি, সফল হবে তব মন্দ্র সব। ৩৪।
মেঘদূত পাদন্যাসকৃণিতরশনাস্ত। লীলাবধূতৈঃ রচ্ছায়াখচিতবলিভিশ্চামরৈঃ ক্লান্তহস্তাঃ । বেশ্যাত্তো নখপদসুখান, প্রাপ্য বর্ষাগ্রবিন্দু- নামােক্ষ্যন্তি ত্বয়ি মধুকরশ্রেণিদীর্ঘান, কটাক্ষান। ৩৫ পশ্চাদুচ্চৈভুজতরুবনং মণ্ডলেনাভিলীনঃ সান্ধ্যং তেজঃ প্ৰতিনবজবাপুষ্পরক্তং দধানঃ। নৃত্যারম্ভে হর পশুপতেরাদ্ৰনাগাজিনেচ্ছাং শান্তোগেস্তিমিতনয়নং দৃষ্টভক্তিৰ্ভবা। ৩৬।
পূর্বমেঘ চরণ-তালে-তালে মেখলা কথা বলে, কত না সেবিকার ক্লান্ত কর দুলায়ে লীলাভরে চামর মণিময়, সে মণি-আভা পড়ে উদর পর। তাদের দেহে লেখা যতেক নখরেখা জুড়াবে পেয়ে তব বিন্দুজল, ভ্রমর-সারি সম কটাক্ষেরে হানি’ হেরিবে তােমা’ তারা গগনতল। ৩৫ নৃত্যমুখে শিব ছিড়িয়া নাগাজিন ছুড়িয়া লুফি’ লন শােণিতে লাল ; তঁাহার ভুজ ঘেরি’ জবার সম লাল দাড়াবে তুমি যবে প্রদোষকাল, , অজিন-সাধ তার মিটিবে তােমা’ হেরি’,-নৃত্যে মাতিবেন প্রমথনাথ ; ভকতি হেরি’ তব তুষ্টা উমা তােমা’ হেরিবে থির চোখে স্নেহের সাথ ।৩৬ মেঘদূত গচ্ছন্তীনাং রমণবসতিং যােষিতাং তত্র নং রুদ্ধালােকে নরপতিপথে সূচিভেদ্যৈস্তমােভিঃ । সৌদামিন্যা কনকনিকষস্নিগ্ধয়া দর্শয়ােৰ্ব্বীং তােয়ােৎসর্গস্তনিতমুখরে মা স্ম ভূৰ্বিবাস্তা। ৩৭। তাং কস্যাঞ্চিদ্ভবনবলভৌ সুপ্তপারাবতায়াং নী রাত্রিং চিরবিলসনাৎ খিন্নবিদ্যুৎকলত্রঃ। দৃষ্টে সূৰ্যে পুনরপি ভবান বাহয়েদধ্বশেষং মায়ন্তে ন খলু সুহৃদামভূপেতার্থকৃত্যাঃ ৩৮। ৩ পূর্বমেঘ ভেদিতে পারে সুচি এমনি গাঢ় তম নিশায় করিয়াছে পথেরে গ্রাস ; রমণী একাকিনী চলেছে অভিসারে পূরাতে প্রিয়-পাশে হৃদয়-আশ । নিকষে হেম সম নিবিড় তম পরে বিজলী জ্বেলে পথ দেখায়াে তা’য় ; উঠো না গরজিয়া, ঢেলো না বারিধারা, রমণী অসহায় ভয় যে পায়।৩৭ চমকি’ ঘন ঘন চপলা বধূ তব যখন হবে শ্রমে ক্লান্তিলীন, যাপিও রাত ছাদে যাহার তলে গৃহে ঘুমায় পারাবত কুজনহীন। উদিলে দিনকর চলিও পুন’ তুমি, বাকী যা পথ তব করিও শেষ । লইয়ে মিত্রের করম-ভার, কভু সাধু না শিথিলতা দেখায় লেশ । ৩৮।
মেঘদূত তস্মিন, কালে নয়নসলিলং যােষিতাং খণ্ডিতানাং শান্তিং নেয়ং প্রণয়িভিরতে বত্ম ভানােস্ত্যজাশু। লেয়াং কমলবদনাৎ সােহপি হওঁং নলিন্যাঃ প্রত্যাবৃত্তত্ত্বয়ি কররুধি স্যাদনক্সাভ্যসূয়ঃ । ৩৯। গম্ভীরায়াঃ পয়সি সরিতশ্চেতসীব প্রসন্নে ছায়াপি প্রকৃতিসুভগাে ল্যতে তে প্রবেশম্। তস্মাত্তস্যাঃ কুমুদবিশদান্যহসি ত্বং ন ধৈৰ্যা- মােঘীকৰ্ত্তং চটুলশফরােদ্বৰ্ত্তনপ্রেক্ষিতানি। ৪০। ৪ ০ পূর্বমেঘ ভানুর পথ তুমি প্রভাতে রুধাে নাকো ; হে সখা, সে-সময় প্রণয়ী জন কাটায়ে রাতি কোথা ফিরিয়া আসি’ গৃহে মুছাবে প্রিয়াদের ভিজা নয়ন। ভানুও আসে নিতি মুছাতে নলিনীর বয়ান হতে হিম- নেত্রজল ; নিবােধ কর যদি তাহার কর তুমি জাগিসে তবে তার রোষ প্রবল। ৩৯। • সুধীরা প্রেমিকার তৃপ্ত চিতে যথা ফুটিয়া শােভা পায় প্রেমিক-রূপ, তেমতি গম্ভীরা- স্বচ্ছ-জল-মাঝে শােভিবে তব দেহ অতি সুরূপ। কুমুদ সম শাদা শফরী দেয় লাফ, চটুল চোখে যেন তটিনী চায় ; চপল সে চাহনি করে না নিষ্ফল, থেকো না উদাসীন তুষিতে তা’য়।৪ মেঘদূত তস্যাঃ কিঞ্চিৎ করতমিব প্রাপ্তবানীরশাখং স্বত্বা নীলং সলিলবসনং মুক্তরােধধানিতম্বং। প্রস্থানং তে কথমপি সখে লম্বমান্য ভাবি জ্ঞাতস্বাদো পুলিনজঘনাং কে বিহাতুং সমর্থঃ ॥ ৪১। হুন্নিন্দোচ্ছ সিতবসুধাগন্ধসম্পর্কম্য স্রোতাের স্তনিতসুভগং দন্তিভিঃ পীয়মান। নীচৈৰ্বাস্যত্যুপজিগমিযােদেবপূৰ্ব্বং গিরিং তে শীতে বায়ুঃ পরিণময়িতা কাননােদুরাণাম্॥ ৪২।
পূর্বমেঘ সে নদী-তীর হতে হেলিয়া বেতশাখা পড়েছে জলে,যেন প্রসারি’ কর ধরেছে নদী নীল- সলিল-বাস তার, যে-বাস শ্লথ তীর- কটির পর। সে-বাস হরি’ তুমি ছাড়ি’ কি যাবে তারে? এ হেন হেরি’ তারে কেমনে যাও? রসিক জন যে ত্যজিতে সে কি পারে বিপুল-জঘনারে ?—জানি তাে তাও৪১। তােমার জলে ভেজা মাটীর বাস মাখি’ বহিবে যেই বায়ু শীকরময়, যে-বায়ু পরশনে কানন-ডুম্বুর পাকিয়া বনভূমি সুরভি হয়, মধুর নাসারবে যে-বায়ু করিগণ নিয়ত করে পান টানি’ নাসায়, বীজন করিবে সে তােমারে ধীরে ধীরে চলিবে যবে দেব- গিরির গা’য়।৪২। ৪ মেঘদূত তত্র স্কন্দং নিয়তবসতিং পুষ্পমেঘীকৃতাত্মা পুষ্পসারৈঃ পয়তু ভবান, ব্যোমগঙ্গাজলাদ্রৈ। রক্ষাহেলােনবশশিভূতা বাসবীনাং চমূনা- মত্যাদিত্যং হুতবমুখে সম্ভতং তদ্ধি তেজঃ। ৪৩। জ্যোতিলেখা বলয়ি গলিতং যস্য বহং ভবানী পুত্রপ্রীত্যা কুবলয়দল প্রাপি কর্ণে করােতি। ধৌতাপাঙ্গং হরশশিরুচা পাবকেস্তং ময়ূরং পশ্চাদন্দ্রিগ্রহণগুরুভিজ্জ্বিতৈনৰ্তয়েথাঃ ৪৪। ৪৪ পূর্বমেঘ বাসব-বাহিনীরে করিতে রক্ষণ সূৰ্যজয়ী নিজ তেজের ভার রাখিলা শঙ্কর বহ্নিমুখ 'পরে, সেই সে তেজে জাত তনয় তার কার্তিকেয় রন সে দেবগিরি 'পরে ; আকাশ-গঙ্গায় ভিজায়ে, ভাই, পুষ্পসার বহু তাহার 'পরে ঢেলাে পুষ্পময় দেহে, পূজা যে চাই। ৪৩। চিকণ-উজ্জল- বলয়-রেখা-অাঁকা কলাপ ভূমি পরে খসিলে যার, ভবানী সুত-স্নেহে তুলিয়া রাখি’ দেন কমলদল-পাশে কর্ণে তার ; যে-শিখী-আঁখি-কোণ হরের শির-শশী কিরণ দিয়ে করে ধবলতর, নাচায়াে স্কন্দের সে-শিখীটিরে তুমি কঁপায়ে গুরু গুরু রবে ভূধর। ৪৪। ৪৫ মেঘদূত আরাধ্যৈবং শরবণভুবং দেবমুল্লঙ্ঘিতাধ্ব সিদ্ধদ্বর্জৈলকণভয়াদ্বীণিভিমুক্তমার্গঃ । ব্যালম্বেথাঃ সুরভিতনয়ালম্ভজাং মানয়িষ্যন, স্রোতে মূৰ্ত্তা ভুৰি পরিণতাং রন্তিদেবস্য কীর্তি। ৪৫। ত্বয্যদাতুং জলমবনতে শাৰ্পিণাে বর্ণচৌরে তস্যাঃ সিন্ধোঃ পৃথুমপি তনুং দূরভাবৎ প্রবাহ প্রেক্ষিন্তে গগনগয়ে দূরমাবর্জ্য দৃষ্টী- রেকং মুক্তাগুণমিব ভুবঃ স্থূলমধ্যেন্দ্রনীল। ৪৬। ৪৬ পূর্বমেঘ জাত যে শরবনে সে দেব ষড়াননে পূজিয়া সেই পথ হইও পার সিদ্ধ বীণা হাতে আপন প্রিয়া সাথে ছাড়িবে পথ ডরি’ তব আসার । রন্তিদেব-যশ ঘঘাষিয়া বহে যেন স্রোতের রূপে তাঁর গােমেধ-যাগ ; নামিয়া সেথা, ভাই, দেখায়ে সম্মান, হইবে তাহে তুমি পুণ্যভাক্।৪৫। ১ শ্যামল-রূপ তুমি নামিবে যবে সেই ধবল-নিৰ্ম্মল জলধারায় গগনচারী যত দেবতাগণ সবে হেরিবে তটিনীরে আর তােমায়, সুদূর হ’তে চাহি নামায়ে দিঠি তারা বিতত নদীধারা দেখিবে ক্ষীণ ; হেরিবে, নদী যেন ধরণী-বুকে হার, হারের মাঝে নীল মাণিক লীন। ৪৬। ৪৭ মেঘদূত তামুত্তীৰ্য ব্ৰজ পরিচিতজ্বলতাবিভ্ৰমাণাং পক্ষ্মোৎক্ষেপাদুপরিবিলসৎ কৃষ্ণসার প্রভাণাম কুন্দক্ষেপানুগমধুকরীমুষমাত্মবিম্বং পাত্রীকুৰ্বন, দশপুরবধূনেত্রকৌতূহলনাম। ৪৭। ব্ৰহ্মাবর্তং জনপদমধচ্ছায়য়া গাহমান: ক্ষেত্ৰং ক্ষত্ৰপ্ৰধনপিণ্ডনং কৌরব: তন্তুজেথাঃ রাজধ্যানাং শিতশরশতৈর্যত্র গাণ্ডীবধা ধারাপাতৈমিব কমলান্যভ্যসিঞ্চখানি। ৪৮। ৪৮ পূর্বমেঘ সে-নদী উতরিয়া চলিবে দশপুর, সেথায় বধূদের নয়ন ভায়- উদ্ধে হানে দিঠি, বিকশে কালাে তার, নয়ন খেলে ভুরু- ভঙ্গীমায়। দিঠির পিছে তারা যেন রে কুঁদ ফুল ছুড়েছে, তারি পিছে ভ্রমর-দূল ; সে-সব আঁখি 'পরে তােমার দেহ ধরে মিটায়াে তাহাদের কৌতূহল। ৪৭। ব্ৰহ্মাবৰ্ত্তের পুণ্য জনপদে তােমার অধ’-ছায়ে করায়ে স্নান, ক্ষত্ররণভূমি কুরুক্ষেত্রে সে কুরুক্ষেত্রে সে যেও হে, হানি’ যেথা শাণিত বাণ বিনাশ করেছিলা ক্ষত্ররাজগণে ধরিয়া গাণ্ডীব পার্থ বীর ; যেমন তুমি, মেঘ, কমলবন পরে নিয়ত হানে তব বৃষ্টি-তীর। ৪৮। 8 মেঘদূত হিত্বা হালমভিমতরসাং রেবর্তীলোচনাঙ্কাং বন্ধুপ্রীত্যা সমরবিমুখাে লাঙ্গলী যাঃ সিষেবে কৃত্বা তাসামভিগমমপাং সােম্য সারস্বতীনাম অন্ত:স্বচ্ছমপি ভবিতা বর্ণমাত্ৰেণ কৃষ্ণঃ ॥ ৪৯ স্মাগচ্ছেরনুকনখলং শেলরাজাবতীৰ্ণাং জহোঃ কন্যাং সগরতনয়স্বৰ্গসােপানপঙক্তি। গৌরীবকুটিরচনাং যা বিহস্যেব ফেনৈঃ শন্তোঃ কেশগ্রহণমকররাদিন্দুলগ্নোশ্মিহস্তা। ৫০।
No text on this page.
No text on this page.
পূর্বমেঘ নেন । বন্ধু-প্রীতি-হেতু আহবে প্রতিহীন হইয়া হলধর যাহার নীর করিল সুখে পান ত্যজিয়া রেবতীর লােচন-বিম্বিত মধু মদির ; সরস্বতী সেই তটিনী পূত-বারি, সৌম্য মেঘ, তুমি সেৰিলে তা’য়, তােমার হৃদিতল হইবে নিরমল, বাহিরে রবে শুধু কৃষ্ণ কায়। ৪৯ হেরিবে কনখল, শৈলরাজ বাহি’ সেথায় জাহ্নবী নিম্নে ধায় ; সগর-সুতগণে স্বরগে তুলিবারে সােপান-শ্রেণী যেন রচিয়া যায়। সতীন উমা তারে কুটি করে বলে ফেনায় হেসে করে সে উপহাস, উৰ্ম্মি-করে ছুয়ে ভালের শশী-লেখা ধরে সে শঙ্কুর কেশের রাশ। ৫০ মেঘদূত তস্যাঃ পাতুং সুরগজ ইব ব্যোগ্নি পূৰ্বাৰ্ধলম্বী ত্বঞ্চেদচ্ছস্ফটিকবিশদং তর্কয়েস্তিৰ্য্যগম্ভঃ। সংসর্পত্য সপদি ভবতঃ স্রোতসিচ্ছায়য়া সা স্যাদস্থানােপনত যমুনাসঙ্গমেবাভিরাম। ৫১। আসীনানাং সুরভিতশিলং নাভিগন্ধৈগণং তস্যা এব প্রভবমলং প্রাপ্য গৌরং তুষারৈঃ। বক্ষ্যস্যধ্বশ্রমবিনয়নে তস্য শৃঙ্গে নিষঃ শােভাং রম্যাং ত্রিনয়ন-বৃষােৎখাত-পঙ্কোপমেয়াম্ ॥ ৫২।
পূৰ্বমেঘ স্ফটিক-নিরমল শুভ্র সেই জল, হে বারিবাহ, তুমি করিতে পান তােমার দেহটিরে ঐরাবত সম শূন্য হ’তে করি’ লম্বমান, জাহ্নবীর বুকে ঝুকিয়া পড় যদি, তাহার জলে তব কৃষ্ণ ছায় যমুনা-ধারা সম ােভিবে, মনে হবে মিলেছে যমুনা ও গঙ্গায়। ৫১। শায়িত হরিণের নাভির বাস লাগি’ যেথায় সুরভিত শিলাপ, সে-গিরি অচলেরে লভিবে পরে তুমি তুষারে সদা সে যে ধবল-রূপ। হরের শাদা বৃষ পঙ্ক খুড়ি’ যথা শৃঙ্গে আপনার মাখায়ে দ্যায়, পঙ্ক সম তুমি শােভিবে মনােরম জিরাবে যবে শাদা গিরির গা’য়। ৫২।
মেঘদূত তঞ্চেদ্বায়ে সরতি সরলস্কন্ধসংঘট্রজন্ম বাধেতােল্কাক্ষপিতচমরীবালভারাে দবাগ্নিঃ । অহঁস্যেনং শময়িতুমলং বারিধারাসহ-ৈ রাপন্নাৰ্ত্তিপ্রশমনফলাঃ সম্পদো হু্যত্তমনাম। ৫৩। যে ত্বাং মুক্তধ্বনিমসহনাঃ কায়ভঙ্গায় তস্মিন দর্পোৎসেকাদুপরি শরভা লঙ্ঘয়িষ্যন্ত্যলঘ্যম্। তান্ কুব্বীথাস্তুমুলকরকাবৃষ্টিহাসাবকীর্ণা কে বা ন সু পরিভবপদং নিস্ফলারম্ভযত্নঃ ॥ ৫৪। ৫৪ পূৰ্বমেদ পবনে দেবদারু ঘসিয়া কঁাধে কঁাধে সেথায় যদি রচি’ কাননানল উল্কা দিয়ে জালে চমরী-রােমজাল, তবে তাে বিচলিত হিম-অচল,- তখন তুমি, মেঘ, হাজার ধারা দিয়ে নিয়ে দাবানল, মহৎ জন আৰ্ত্তে রক্ষিতে নিয়ােগ করে সদা যতেক সম্পদ, গুণ আপন। ৫৩ { তােমারে লঘিতে সহজ নহে তবু দর্পভরে যদি শরভ-দল তােমার ধ্বনি শুনি’ লাফায়ে পড়ি সেথা অঙ্গ ভাঙি ফেলে শিলার তল, তুমুল শিলাপাতে করিও উপহাস মূখ মৃগগণে অবিশ্রাম ; হেরি’ পরিণাম যাহার করে কাজ লভে যে অপমান-ব্যর্থকাম। ৫৪।
মেঘদূত তত্র ব্যক্তং দৃষদি চরণন্যাসমৰ্দ্ধেন্দুমৌলের শশ্বৎ সিদ্ধৈরুপহৃতবলিং ভক্তিনঃ পরীয়া। যস্মিন্ দৃষ্টে করণবিগমাদূদ্ধ মুদধূতপাপা কল্পন্তেহস্য স্থিরগণপদপ্রাপ্তয়ে শ্রদ্ধানঃ ॥ ৫৫। শব্দায়ন্তে মধুরমনিলৈঃ কীচকাঃ পূৰ্য্যমাণাঃ সংরক্তাভিস্ত্রিপুরবিজয়ে গীয়তে কিন্নরীভিঃ। নিদী তে মুরজ ইব চেৎ করাসু ধ্বনিঃ স্যাৎ সঙ্গীতার্থে ননু পশুপতেস্তত্র ভাবী সমস্তঃ ৫৬।
পূর্বমেঘ সেই সে হিমাচলে শিখরে শিলাতলে বিরাজে মহেশের চরণ-দাগ, সিদ্ধগণ সবে নিয়ত তারে পূজে ; ভক্তিভরে হ’তে পুণ্যভাক্ পূজিও তারে তুমি বেড়িয়া বার বার ; সে-পদ হেরি’ সদা ভক্ত নর কলুষ হতে তরে, ত্যজিয়া মর দেহ অমর দেহে হয় শিবানুচর। ৫৫ কীচক-বেণু সেথা অনিল-পরশনে মধুর বাজি’ উঠে মুরলী প্রায় ; যতেক কিন্নরী নৃত্য সাথে সদা ত্রিপুরজয়ী-শিব- কীর্তি গায়। মন্দ্র তব, মেঘ, ভূধর-করে ধ্বনিয়া যদি তােলে মুরজ-রব, তবে সে-সঙ্গীত মিলিয়া একতানে হবে যে সঙ্গত অঙ্গে সব। ৫৬।
মেঘদূত প্রালেয়াদ্রেরুপতটমতিক্রম্য তাংস্তান্ বিশেষা হংসারং ভৃগুপতিযশােবষ্মযৎ ক্রৌঞ্চরন্ধম। তেনােদীচীং দিশমভিসরেস্তিৰ্য্যগায়ামশােভী শামঃ পাদো বলিনিয়মনাভদ্যতবে বিষ্ণোঃ ॥ ৫৭। গত্বা চোৰ্দ্ধং দশমুখভুজোচ্ছাসিতপ্রস্থসন্ধেঃ কৈলাসস্য ত্রিদশবনিতাদর্পণস্যাতিথিঃ স্যাঃ শৃঙ্গোচ্ছায়ৈঃ কুমুদবিশদৈর্যে বিতত্য স্থিতঃ খং রাশীভূতঃ প্রতিদিনমিব ত্র্যম্বকস্যাট্টহাসঃ। ৫৮।
পূৰ্বমেঘ হেরিয়া বহু-রূপ অচল-মহিমায় লভিবে ভার্গব- কীৰ্ত্তি-পথ ক্রৌঞ্চর সে, বলাক সেই পথে প্রবেশি’ চলে যায় মানস হ্রদ। চলিতে উত্তর সে-পথে প্রবেশিও তােমার দেহটিরে হেলায়ে, ভাই, বলিরে ছলিবারে বিষ্ণু-শ্যাম-পদ যেমন হেলেছিল, শােভিবে তাই। ৫৭। উর্ধে উঠি’ কিছু হেরিবে কৈলাস-রাবণ-ভুজ-বলৈ শিথিল-মূল, অমর-নারীদের যেন সে দর্পণ, অতিথি হয়ে তার, সে যে অতুল। ব্যাপিয়া নভতল কুমুদ সম শাদা শিখর তােলে গিরি অতি ধবল ; শিবের রাশীভূত অট্টহাস যেন জমিয়া রচিয়াছে গিরি অচল। ৫৮। ৫৯ মেঘদূত উৎপশ্যামি ত্বয়ি তটগতে স্নিগ্ধভিন্নাঞ্জনাভে সদ্যঃ কৃত্তদ্বিরদদশনচ্ছেদগোরস্য তস্য। লীলামদ্রেঃ স্তিমিতনয়ন-প্রেক্ষণীয়াং ভবিত্রী- মংসন্যস্তে সতি হলভৃতে মেচকে বাসসীব। ৫৯। হিত্বা নীলং ভুজগবলয়ং শম্ভুনা দত্তহস্তা ক্রীড়াশৈলে যদি চ বিহরেৎ পাচারেণ গৌরী। ভঙ্গীভক্ত্যা বিরচিতবপুঃ স্তম্ভিতান্তর্জলােহস্যাঃ সােপানত্বং কুরু সুখপদস্পর্শমারােহণেষু ॥ ৬০। ৬ পূৰ্বমেঘ সদ্যছিন্ন যে দ্বিরদ-রদ সম শুভ্র গিরিবর সে কৈলাস ; কাজল-কালাে তুমি স্নিগ্ধ রূপে যবে লাগিয়া রবে তার সানুর পাশ, তখন মনে হবে গৌর হলধর শ্যামল বাস কঁাধে, দীপ্যমান ; যে-চোখ হেরিবে তা নিমেযহীন হবে অতুল সেই শােভা করিয়া পান। ৫৯। গৌরী যদি সেথা ধরিয়া মহেশের সাপেরবালা-খােলা শােভন কর ভ্ৰমেন সুখভরে ক্রীড়ার পৰ্বতে করিয়া পদচার সুমন্থর, তােমার জলবেগ বুকেতে চাপি’ রাখি’ তাঁহার পদতলে করি’ শয়ন ভকতি-ভরে তুমি সােপান সম হয়, গৌরী ফেলিবেন সুখে চরণ। ৬০। ৬১ মেঘদূত তাবশ্যং জনিতসলিলােগারমন্তঃপ্রবেশান্ নেয়ন্তি ত্বাং সুরযুবতয়াে যন্ত্র ধারাগৃহত্বং। তাভ্যো মােক্ষস্তব যদি সখে ঘৰ্ম্মলব্ধস্য ন স্যাৎ ক্রীড়ালােলা: শ্রবণপরুর্গৈর্জিতৈর্ভায়য়েস্তাঃ ॥ ৬১। হেমান্তোজ'প্রসবি সলিলং মানসস্যাদদানঃ কুন্ কামাৎ ক্ষণমুখপটপ্রীতিমৈরাবণস্য। ধুন্ বাতৈঃ সজলপৃষতৈঃ কল্পবৃক্ষাংশুকানি ছায়াভিন্ন স্ফটিক-বিশদং নিৰ্বিশে: পর্বতং তম্ ॥ ৬২। ৬২ পূর্বমেঘ ৫ সেথায় গৃহ-মাঝে প্রবেশি’ যবে তুমি ঝরাবে ঝুরুকুৰু শীকর-জাল, অমর-যুবতীরা ফোয়ারা সম তােমা ধরিয়া রাখি’ সুখে কাটাবে কাল নিদাঘে জরজর তাহারা পেয়ে তােমা ছাড়িতে চাবে নাকো সহজে আর; ; ভীষণ নিনাদিয়া তাদেরে চমকিয়া ভাঙায়ে দিও লীলা, হয়ে হে বার। ৬১। মানস-জলে ফোটে কনক-পঙ্কজ, সে-জল করাে পান, হে জলধর, তুষিও ক্ষণকাল ঐরাবতে তুমি শীতল বাস হয়ে বদন পর। শীকরময় বায়ে কল্প-বৃক্ষের কঁপায়াে কিশলয় অতীব ক্ষীণ ; তুমি ও তব ছায়া দোহায় করা ভােগ শুভ্র গিরিবরে মহিমালীন। ৬২। ৬৩ মেঘদূত ভস্যোৎসঙ্গে প্রণয়িন ইব স্রস্তগঙ্গাদুগুলাং ন ত্বং দৃষ্টান পুনরলকাং জ্ঞাস্যসে কামচারিন। যা বঃ কালে বহতি সলিলােদগারমুচ্চৈর্বিমানা মুক্তাজালগ্রথিতমলকং কামিনীবাভ্রবৃন্দ। ৬৩। ৬৪ পূৰ্বমেঘ দেখােনি তারে তবু তুমি যে কামচারী, চিনিয়া লবে তুমি সে-অলকায় কৈলাসের কোলে যেন সে প্রণয়িনী, গঙ্গা-বাস তার খসিয়া যায়। কামিনীগণ-শিরে যেমন শােভা পায় মুকুতা-জলি-গাঁথা কেশ-কলাপ, তেমনি বরষায় উচ্চ শিরে তার শােভিছে জল ঝরা মেঘের চাপ। ৬৩ /| ৬৫ 주 Cill ll GBACHOS মেঘদূত বিদ্যুত্বম্ভং ললিতবনিতাঃ সেচাপং সচিত্রাঃ সঙ্গীতায় প্রহতমুরজাঃ স্নিগ্ধগম্ভীরঘােষ। অন্তস্তোয়ং মণিময়ভুবস্তুঙ্গমভ্রংলিহাগ্ৰাঃ প্রাসাদাস্ত্ৰাং তুলয়িতুমলং যত্র তৈস্তৈৰ্বিশেষৈঃ ১। হস্তে লীলাকমলমলকং বালকুন্দানুবিদ্ধং নীতা লােপ্ৰপ্ৰসবরজসা পাণ্ডুমাননশ্রী। চূড়াপাশে নবকুরুবকং চারু কর্ণে শিরীষং সীমন্তে চ দুপগমজং যত্ৰ নীপং বধূনাম্। ২। ৬৮ উত্তরমেঘ তুলনা করি যদি মিলিবে তব সাথে প্রাসাদগুলি, ভাই, সে অলকার,- তােমাতে বিদ্যুৎ, ললিত নারী সেথা, ইন্দ্ৰচাপ তব, চিত্র তার, গীতির সাথে সেথা মুরজ বাজি’ উঠে, স্নিগ্ধ-গম্ভীর তােমার রব, তােমার বুকে জল, মণির মেঝে সেথা, উচ্চ তুমি, উচু শিখর সব। ১। সেথায় বধূদের হস্তে শশাভা পায় কত না কমনীয় লীলাকমল, অলকে নবফোটা কুন্দ রহে বেঁধা, লােখ্র-রেণু মেখে মুখ ধবল ; তাদের চূড়া-পাশে নূতন কুরুবক, শ্রবণে মনােরম শিরীষ ফুল, সীথিতে তারা সবে তােমারি বিকশিত কদমফুল পরি’ শােভে অতুল।২ ৬৯ মেঘদূত যতক্রান্মত্তভ্রমরমুখরাঃ পাদপা নিত্যপুষ্পঃ হংসশ্রেণীরচিতরশনা নিত্যপদ্মা নলিন্যঃ। কেকোৎকণ্ঠা ভবনশিখিনাে নিত্যভাষকলাপাঃ নিত্যজ্যোৎস্নাঃ প্রতিহততমােবৃত্তিরম্যাঃ প্রদোষাঃ । ৩। আনন্দোথং নয়নসলিলং যত্র নান্যৈর্নিমিত্তৈ- নান্যস্তাপঃ কুসুমশরজাদিষ্টসংযােগসাধ্যাৎ। নাপ্যন্যস্মাৎ প্রণয়কহাদ্বিয়ােগােপপত্তি- বিশােনাং ন চ খলু বয়াে যৌবনাদন্যদস্তি । ৪। ৭৭ উত্তরমেঘ নিত্য ফোটে সেথা পাদপে ফুল-দল, মত্ত অলি করে গুঞ্জরণ ; নলিনী শত দলে নিত্য ঝলমলে, মেখলা সম বসে মরালগণ। ভবনশিখী সেথা কলাপ বিথারিয়া নিত্য কেকা-রবে নৃত্যপর ; প্রদোষকালে নিতি সেথায় হরে তম শুভ্র রমণীয় শশীর কর। সেথায় আঁখিজল হরষে ঝরে শুধু কাহারে চিত নহে দুঃখময় ; মদন-শরে শুধু দহে যে অন্তর, ইষ্ট জনে পেয়ে তুষ্ট হয়। প্রণয়-কলহেতে বিরহ ঘটে শুধু, নাহিক বিরহের কারণ আন ; যক্ষদের নাহি বয়স কোনাে আর, কেবল যৌবন কান্তিমান । ৪।
মেঘদূত যস্যাং যক্ষাঃ সিতমণিময়ান্যেত্য হর্মস্থলানি জ্যোতিচ্ছায়াকুসুমরচনাত্তমস্ত্রীসহায়াঃ। আসেবন্তে মধুরতিফলং কল্পবৃক্ষপ্রসূতং ত্বদগম্ভীরধ্বনি শনকৈঃ পুরোহতেষু । ৫। মন্দাকিন্যাঃ সলিলশিশিরৈঃ সেব্যমান মরুদ্ভি মন্দারাণামতট রুহাং ছায়য়া বারিতােষ্ণাঃ। অন্বেষ্টব্যৈঃ কনকসিকতামুষ্টিনিক্ষেপগূঢ়ৈঃ সংক্রীড়ন্তে মণিভিরমরপ্রার্থিতা যত্র কন্যাঃ ৬। ৭২ উত্তরমেঘ তারার ছবি পড়ি মণির গৃহ-শিরে ফুটেছে যেন ফুল, তুলনা নাই ; তােমার নির্ঘোষে সেথায় ধীর ভাষে বাজিবে পাখােয়জ যেমনি, ভাই, যক্ষগণ তবে অতুল নারী লয়ে সেথায় উল্লাসে করিবে পান কল্পদ্রুম-জাত প্রীতির মধু-ভরা স্বরগ-সুধা-রস-- মত্তপ্রাণ। ৫ ! মন্দাকিনী-ছোঁওয়া শীতল সমীরণ সেথায় বহে যবে মৃদুল ধীর, দেবতা-বাঞ্ছিতা যক্ষ-তনয়ারা মন্দারের তলে নদীর তীর শােভিয়া, করে লয়ে রতন মুঠি মুঠি ছুড়িয়া ফেলি’ দেয় বালুকা’পর, হারানাে মণি পুন’ খুঁজিয়া করে বা’র, এমনি চলে খেলা নিরন্তর। ৬। ৭৩ মেঘদূত নীবীবন্ধোচ্ছ,সনশিথিলং যত্র যক্ষাঙ্গনানাং বাসঃ কামাদনিভৃতকরেক্ষিপৎসু প্রিয়ে। অর্দিস্তুঙ্গানভিমুখমপি প্রাপ্য রত্ন-প্রদীপ হীমূঢ়ানাং ভবতি বিফল-প্রেরণশ্চর্ণমুষ্টিঃ। ৭। নেত্রা নীতঃ সততগতিনা যদ্বিমানাগ্রভূমী- রালেখ্যানাং নবজলকণৈদোষমুৎপাদ্য সদ্যঃ। শঙ্কাম্পৃষ্টা ইব জলমুচাদৃশ যত্র জালৈ- ধূমােগারানুকৃতিনিপুণং জর্জরা নিষ্পত্তি। ৮। ৭৪ উত্তরমেঘ সেথায় প্রিয়গণ সােহগে প্রিয়াদের টানিয়া ল’তে চায় দেহের বাস ; চপল করে যবে নীবীর বন্ধনে খুলিয়া ফেলি’ দেয় ছড়ায়ে হাস, সরমে নারীগণ নিবাতে আলাে তবে ফাগের মুঠি ছোঁড়ে দীপশিখায় ; সে কাজ বৃথা হায়, নেবে না মণি-দীপ ঘুচাতে রমণীর সে-লজ্জায়। ৭। সেথায় অলকায় উচ্চতম গৃহে প্রবেশি’ তব সম জলদ-দল, বরষি জল-কণা চিত্রাবলী যত করিয়া অপচয় ভয়-বিকল পলায় ত্বরা তারা জানালা-পথ দিয়া, জানিতে পারে পাছে গৃহের লােক ধূমের সম করি’ দেহেরে জরজর উঠিয়া পড়ে তারা আকাশ-লােক। ৮। ৭৫ মেঘদূত যত্র স্ত্রীণাং প্রিয়তমভুজালিঙ্গনেচ্ছাসিতানা- মঙ্গগ্লানিং সুরতজনিতাং তন্তুজালাবলম্বা। ত্বৎসংবােধাপগমবিশদৈশ্যোতিতাশ্চন্দ্রপাদৈ- বাম্পন্তি স্ফুটজলবন্দিনশ্চন্দ্রকান্তা। ৯। অক্ষয্যান্তৰ্ভবননিধয়ঃ প্রত্যহং রক্তক-ৈ রুদগায়প্তিধনপতিযশঃ কিরৈর্যত্র সার্ধ। বৈভ্রাজাখ্যং বিবুধবনিতাবারমুখ্যাসহায়াঃ বদ্ধালাপা বহিরুপবনং কামিননা নিৰ্বিশস্তি। ১০।
উত্তরমেঘ চন্দ্রাতপে সেথা মণির মালা ঝােলে, তাহাতে মেঘহীন চাদের কর নিশীথে শশাভা পায়, সে-মণিমাল হতে ঝরিয়া ঝিরিঝিরি জল-শীকর হরিছে অবিরাম প্রিয়ের বাহু-পীড়া- পীড়িতা রমণীর দেহের ক্লেশ, যখন তারে প্রিয় শিথিল করি’ বাহু ছাড়িয়া দেয় হ’তে বক্ষদেশ। ৯। অশেষ নিধিচয় যাদের গৃহে রয় বিলাসীগণ হন নিতি সেথায় কুবের-যশােগীতি গায়ক সুস্বর যতেক কিন্নরে করি’ সহায়, লইয়া মনােহরা বনিতা অপ্সরা বাহিরি’ নগরীর সীমার শেষ কানন বৈভ্রাজে বিহরে তারি মাঝে, পরম সুখে কাল কাটায় বেশ। ১০। ৭৭ মেঘদূত গত্যুকদলপতিতৈর্যত্র মন্দারপুস্পৈঃ কুপ্ত্যচ্ছেদৈঃ কনককমলৈঃ কর্ণবিভ্রংশিভিশ্চ । মুক্তালগ্নস্তনপরিমলৈচ্ছিন্ন ত্ৰৈশ্চ হারৈ- নৈশো মার্গঃ সবিতুরুদয়ে সুচ্যতে কামিনীনাম্। ১১। মত্বা দেবং ধনপতিসখং যত্র সাক্ষাদ্বসন্ত প্রায়শ্চাপং ন বহতি ভয়ান্মন্মথঃ ষট্পদজং। সভঙ্গপ্রহিতনয়নৈঃ কামিলক্ষ্যেমােঘৈ- স্তস্যারম্ভশ্চতুরবনিতাবিভ্রমৈরেব সিদ্ধঃ ॥ ১২। ৭৮ উত্তরমেঘ • গতির দোলনেতে অলকভার হ'তে ঝরিয়া মন্দার ধূলায় রয় ; শ্রবণ হ'তে ঝরি’ শিথিল রহে পড়ি কমল-কিশলয় কনক-ময় ছিন্ন হার হ’তে স্তনের রাগ-মাখা মুকুতা রহে ভূমে,- প্রভাতে তা’য় হেরিয়া বুঝি’ লবে কামিনী কোন পথে নৈশ অভিসারে নিয়ত ধায়। ১১। কুবের-বান্ধব মহান্ মহাদেব রহেন সেথা, তাই সভয় কাম ধরিয়া ফুলধনু মধুপ-ছিল 'পরে জুড়িতে ফুল-শর নিয়ত বাম। তথাপি মদনের মনের অভিলাষ নারীর আঁখি পরে সফল হয়, বনিতা সুচতুরা অমােঘ লীলা-ভরা দৃষ্টি দিয়ে জিনে কামী-হৃদয়। ১২। ৭৯ মেঘদূত বাসশ্চিত্ৰং মধু নয়নয়াের্বিমাদেশদক্ষং পুস্পােদ্ভেদং সহ কিশলয়ৈভূষণানাং বিকল্পান্। লাক্ষারাগং চরণকমন্সন্যাসযােগ্যঞ্চ যস্যা- মেকঃ সূতে সকলমবলামণ্ডনং কল্পবৃক্ষ । ১৩। তত্রাগারং ধনপতিগৃহানুত্তরেণাস্মদীয়ং দূরাল্লক্ষ্যং সুরপতিধনুশ্চারুণা তােরণেন। যস্যোপান্তে কৃতকতনয়ঃ কান্তয়া বর্ধিতে মে হস্তপ্রাপ্যস্তবকনমিতে বালমন্দারবৃক্ষঃ ॥ ১৪। ৫ কল্পতরু একা সেথায় করে দান যতেক অবলারে দিতে হরষ- বসন বহুবিধ, নয়নে বিভ্রম জাগাতে সুনিপুণ মধুর রস ; দেহের আভরণ করিতে কত ফুল তাহার সাথে নব পত্ৰ-দল, লাক্ষারাগ দেয় অতীব মনােরম করিতে সুশােভিত পদ-কমল। ১৩। এ হেন অলকায় কুবের-গৃহ হ’তে রহে যে উত্তরে আমার ঘর ; তাহারে দূর হ’তে চিনিবে হেরি’ চারু ইন্দ্রধনু সম তােরণবর। গৃহের পাশে শােভে তরুণ মন্দার, পালিত ভুত যেন মাের প্রিয়ার, তাহারি স্নেহে গড়া, স্তবকে নত তরু, হস্তে ধরা যায় স্তবক-ভার। ১৪। ৮১ মেদূত বাপী চাস্মিন্মরকতশিলাবদ্ধসােপানমার্গা হৈমৈছুন্না বিকচকমলৈঃ স্নিগ্ধ-বৈদূৰ্য্যনালৈঃ যস্যাস্তোয়ে কৃতবসতঘয়া মানসং সন্নিকৃষ্ট নাধ্যাস্যন্তি ব্যপগতশুচস্বামপি প্রেক্ষ্য হংসা। ১৫। তস্যাস্তীরে রচিতশিখরঃ পেশলৈরিনীলৈ ক্রীড়াশৈলঃ কনককদলীবেষ্টনপ্রেক্ষণীয়। মদেগহিন্যাঃ প্রিয় ইতি সখে চেতসা কাতরেণ প্রেক্ষ্যোপান্তস্ফুরিততড়িতং ত্বাং তমেব স্মরামি। ১৬। ৮২ উত্তরমেঘ সরসী শােভে সেথা, গঠিত মরকতে দীপ্তি পায় তার সােপান-চয় ; ঢাকিয়া তার জল স্বর্ণ-শতদল বৈদূৰ্য-নালে বিকচ রয়। সে-জলে সুখভরে মরাল কেলি করে, তােমারে হেরিয়াও নহে ব্যাকুল, মানসে যেতে আর মানস করিবে না, যদিও নিকটেতে মানস-কূল। ১৫ ক্রীড়ার গিরিবর বিরাজে তীরে তার- ইন্দ্রনীলমণি- গঠিত শির ; কনক-কদলীর বৃক্ষ ঘেরে তারে, শােভন গিরি প্রিয় সে প্রেয়সীর। প্রান্তভাগে তব তড়িৎ জ্বলজ্বল হেরিলে মনে পড়ে শৈল সেই ;- স্মরিলে তার কথা কাতর চিত অতি, আমার বেদনার সীমা যে নেই। ১৬। ৮৩ মেঘদূত রক্তাকেশ্চলকিসলয়ঃ কেসরশ্চাত্ৰ কান্তঃ প্রত্যাসমৌ কুরবকবৃতেমাধবীমণ্ডপস্য। একঃ সখ্যাস্তব সহ ময়া বামপাদাভিলাষী কাত্যঙ্গো বদনমদিরাং দোহদচ্ছদ্মনাস্যাঃ ১৭। তন্মধ্যে চ স্ফটিকফলকা কাঞ্চনী বাসষষ্টি: মূলে নদ্ধা মণিভিরনতিপ্রৌঢ়বংশপ্রকাশৈঃ। ভালৈঃ শিলয়সুভগৈৰ্নৰ্ত্তিতঃ কান্তয়া মে যামধ্যাস্তে দিবসবিগমে নীলকণ্ঠঃ সুহৃদ্ধঃ ॥ ১৮। cp ৮৪ উত্তরমেঘ সেথায় কুরুবকে ঘিরেছে মাধবীর- কুঞ্জ, তারি পাশে দুইটি গাছ-- অশােক তরু রয় কঁপায়ে কিশলয়, বকুল মনােরম করে বিরাজ। আমার সাথে মাের প্রিয়ার বামপদ- তাড়ন পেতে সেই অশােক চায় ; বকুল কুতূহলে দোহদ-ছলে চাহে প্রিয়ার বদনের মদ-ধারায়। ১৭। সে দু’টি তরু মাঝে স্ফটিক-ফলকেতে সােনার খোঁটা পোতা, গােড়ায় নবীন বাঁশ সম প্ৰভায় অনুপম খচিত মণিরাশি চমৎকার। দিবস-অবসানে তােমার প্রিয় সখা কলাপী নীল-গ্রীবা নিবসে তায় ; প্রিয়ার করতালে নাচে সে তালে তালে, বলয় রুণুঝুনু মৃদুল গায়। ১ মেঘদূত এভিঃ সাধে হৃদয়নিহিতৈলক্ষশৈলক্ষণীয়ং দ্বারােপান্তে লিখিতবপুষৌ শঙ্খপদ্মে চ দৃষ্ট।। ক্ষামচ্ছায়ং ভবনমধুনা মদ্বিয়ােগেন নূনং সূৰ্য্যাপায়ে ন খলু কমলং পুষ্যতি স্বামভিখ্যাম্। ১৯। গত্বা সদ্যঃ কলতনুং শীঘ্ৰসম্পাত-হেতােঃ ক্রীড়াশৈলে প্রথমকথিতে রম্যনৌ নিষঃ। অহস্যন্তৰ্ভবনপতিতাং কৰ্ত্ত মল্লাল্পসং খদ্যোলীবিলসিতনিভাং বিদ্যুদুন্মেষদৃষ্টি । ২০।
উত্তরমেঘ হে সাধু জলধর, গৃহের পরিচয় দিমু য’ তাহা তব হৃদয়ে থাক্ ; দ্বারের এক পাশে পদ্ম রহে আঁকা অপর পাশে আঁকা হেরিয়া শাখ চিনিয়া লবে তুমি আমার গৃহটিরে বিরহে মাের তাহা কিছু মলিন ; জান তাে দিবাকর অস্তাচলে গেলে কমল হয় সদা কাষহীন। ১৯। তরুণ গজ প্রায় ক্ষুদ্র করে কায় ত্বরিত প্রবেশিতে ভবনে মাের ; ক্রীড়ার গিরি-পাশে রম্য সানুদেশে বসিও বিদূরিতে শ্রমের ঘাের। যেমন থাকি থাকি জোনাকি জ্বলি’ উঠে, তেমনি মেলি’ তব তড়িৎ-চোখ হেরিও মিটিমিটি গৃহের মাঝে মাের, ফেলিয়া সেথা মৃদু তড়িতালােক।২০। ৮৭ মেঘদূত তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষমা চকিতহরিণপ্রেক্ষণী নিম্ননাভিঃ। শ্রোণীভাৱাদলসগমনা স্তোকনা স্তনভ্যাং যা তত্র স্যাদযুবতিবিষয়ে সৃষ্টিরাছেব ধাতুঃ। ২১। তাং জানীয়ঃ পরিমিতকথাং জীবিতং মে দ্বিতীয় দূরীভূতে ময়ি সহচরে চক্রবাকীমিবৈকা। গাঢ়োৎকণ্ঠাং গুরুষু দিবসেম্বেষু গচ্ছৎসু বালাং জাতাং মধ্যে শিশিরমথিং পদ্মিনীং বাহরূপাং। ২২। beb উত্তরমেঘ বিরাজে সেথা যেই তরুণী কৃশ-তনু, দশনগুলি যেন মুকুতা-সার, বিম্বাধরা যেবা, মাঝাটি অতি ক্ষীণ, চকিত হরিণীর নয়ন যার, গভীর নাভি, তনু স্তনেতে কিছু নত, শ্রোণীর ভারে ধীরে অলস যায়, ধাতার গড়া যেন প্রথম যুবতী সে আমার প্রিয়তমা অতুল ভায়। ২১। তাহার মুখে, ভাই, বেশী যে কথা নাই, জানিও তারে মাের দ্বিতীয় প্রাণ, আমি এ সহচর সুদুরে এলে পর চক্রবাকী সম একাকী ম্লান। গভীর উদ্বেগে দিবস যেন তার অতীব গুরু, নাহি কাটিতে চায়, শিশির-বিমথিত যেন সে কমলিনী, তাহার রূপে পড়ে মলিন ছায়। ২২। ৮৯ মেঘদূত নূনং তস্যাঃ প্রবলরুদিতােচ্ছননেত্রং বহুনাং নিশ্বাসানামশিশিরতয়া ভিন্নবর্ণাধরৌষ্ঠ। হস্তন্যস্তং মুখমসকল ব্যক্তি লম্বালকত্বা- দিন্দোদৈন্যং দুপসরণক্লিষ্টকান্তের্বিভৰ্তি । ২৩। আলােকে তে নিপতি পুরা সা বলিব্যাকুলা বা মৎসাদৃশ্যং বিরহতনু বা ভাবগম্যং লিখন্তী। পৃচ্ছন্তী বা মধুরবচনাং সারিকাং পঞ্চরস্থা কচ্চিদ্ভৰ্ত্তঃ স্মরসি রসিকে ত্বং হি তস্য প্রিয়তি। ২৪।
উত্তরমেঘ প্রবল আঁখিজল ঝরিয়া অবিরল ফুলায়ে দেছে তার দু’টি নয়ন ; ওষ্ঠাধর তার হয়েছে পাণ্ডুর নিশাস-তাপ লেগে অনুক্ষণ ; ঝুলিয়া কেশরাশি ঢেকেছে মুখশশী, সে-মুখ করতলে ন্যস্ত হয় ; আধেক যায় দেখা, যেমন তুমি, সখা, ঢাকিলে চন্দ্রমা যে-শােভা হয়।২৩। হয়ত হেরিবে সে রয়েছে পূজারতা- আমারি শুভ মাগে দেবতা-পাশ ; অথবা আঁকে বসি’ বিরহী মাের ছবি কল্পনায় লভি’ তারি আভাস; হয়ত পিঞ্জর- নিবাসী মধুভাষী সারীরে কহে সেই মধুর বাক্, “রসিকা লো সারিকা, মনে কি পড়ে তারে, করিত যেবা তােরে অতি সােহাগ?”২৪ ৯১ মেঘদূত উৎসঙ্গে বা মলিনবসনে সােম্য নিক্ষিপ্য বীণাং মদেগাত্রাঙ্কং বিরচিতপদং গেয়মুগাতুকামা। তন্ত্রীরা নয়নসলিলৈঃ সারয়িত্ব কথঞ্চি ভূয়াে ভূয়ঃ স্বয়মপি কৃতাং মূচ্ছনাং বিস্মরন্তী। ২৫। শেষান্মসাত্ গমনদিবসপ্রস্তুতস্যাবধেবা বিস্যম্ভী ভুবি গণনয়া দেহলীদত্তপুস্পৈঃ। সংযােগং বা হৃদয়নিহিতারম্ভমাস্বাদয়ন্তী প্রায়েণৈতে রমণবিরহেনানাং বিনােদাঃ । ২৬। ৯২
No text on this page.
No text on this page.
ত্তরমেঘ মলিন-বসনা সে হয়ত প্রিয়তমা আমারি নামে রচি’ ব্যথার গীত, বীণাটি লয়ে কোলে সে-গীতি গাহিবারে হতেছে উন্মুখ সুর-সহিত ; নয়ন-বারিধার ভিজায় বীণা-তার, মাজিয়া বীণা পুন” গাহিতে চায়; হায় রে বৃথা চাহে, ভুলিছে বারবার আপন হাতে তােল মূচ্ছনায়। ২৫। বিরহ-দিন হ'তে প্রেয়সী প্রতিদিন দ্বারের পাশে রাখে একটি ফুল ; বিরহ-অবসানে বাকী বা কয় মাস কুসুম গণি’ দেখে বিরকুল। অথবা হিয়া-মাঝে মূরতি আঁকি’ মম করে সে উপভােগ মিলন-সুখ ; এমনি বিরহিণী নিয়ত মনে মনে পতির ধ্যানে ভুলে বিরহ-দুখ। ২৬। ৯৩ মেঘদূত সব্যাপারামহনি ন তথা খেয়েদ্বিপ্রয়ােগঃ শঙ্কে রাত্রে গুরুতরশুচং নিৰ্বিনােদাং সখীং তে। মসন্দেশৈঃ সুখয়িতুমতঃ পশ্য সাধ্বীং নিশীথে মুন্নিামবনিশয়নাসন্নবাতায়নস্থঃ ২৭। আধিক্ষামাং বিরহশয়নে সন্নিষকৈপার্শ্বাং প্রাচীমূলে মুমিব কলামাত্ৰশেষাং হিমাংশােঃ। নীতা রাত্রিঃ ক্ষণ ইব ময়া সাৰ্ধমিচ্ছারতৈর্যা তামেবােষ্ণৈবিরহমহতীমভির্যাপয়ন্তীম্ । ২৮। ৯৪ উত্তরমেঘ দিবসে নানা কাজে ততটা নাহি বাজে তাহার হিয়া-মাঝে বিরহ মাের ; নিশায় বেদনায় বুক যে ফেটে যায়, তাহার যাতনার নাহিক ওর। নয়নে নাহি ঘুম, অবনী:শয্যায় জানালা-পাশে রহে করি’ শয়ন ; তখন বাতায়নে বসিয়া, সখা, তা’য় বারতা দিয়ে মাের তুষিও মন।২৭। বিরহ-শয্যায় হেরিবে কৃশকায় প্রেয়সী এক পাশে করিয়া ভর ; যেন রে কলা-শেষ ইন্দু রহে পড়ি প্রভাতে প্রাচীমূলে মলিন-কর। বিহরি’ সুখ-সাধে আমার সনে নিতি ক্ষণেক সম যার কাটিত রাত, বিরহ-রাতি তার কাটে না যেন আর, করে সে তাপময় অশ্রুপাত। ২৮। ৯৫ মেঘদূত পাদানিন্দোরমৃতশিশিরান, জালমার্গপ্রবিষ্টান, পূৰ্ব্বপ্রীত্যা গতমভিমুখং সন্নিবৃত্তং তথৈব । চক্ষুঃ খেদাৎ সলিলগুরুভিঃ পভিশূদয়স্তা সাহেব স্থলকমলিনীং ন প্রবুদ্ধাং ন সুপ্তাম্ ॥ ২৯। নিশ্বাসেনাধরকিশলয়ক্লেশিনা বিক্ষিপন্তী শুদ্ধমানাৎ পরুষমকং নূনমাগণ্ডলম্বম্। মৎসংযোগঃ কথমুপনমেৎ স্বপ্নজোপতি নিদ্রা- মাকান্তীং নয়নসলিলােৎপীড়রুদ্ধাবকাশা। ৩০।
উত্তরমেঘ শীতল সুধাময় ইন্দু-কর যবে জানালা-পথে করে ঘরে প্রবেশ, পূৰ্ব্ব-প্রীতি-ভরে নয়ন দু’টি তার পাঠায়ে তারি পানে, লভিয়া ক্লেশ, সলিল-ভারে নত পক্ষ্মজাল দিয়া ঢাকে সে আপনার অখি-যুগল ; যেমন জলধর ঢাকিলে দিবসেরে না ফুটে নাহি মুদে স্থল-কমল। ২৯। রুক্ষ স্নানে তার অলক অচিকণ, ঝুলিয়া রহে তাহা গণ্ড পর, দোলায়ে সে-অলক দীরঘ শ্বাস তার দহিছে কিশলয় সম অধর। নিদ্রা মাগে প্রিয়া স্বপনে যদি মিটে আমার সাথে তার মিলন-সাধ ; অস্রোত আসি’ নিদ্রা-পথ রােধে, তাহার সুখ-সাধে ঘটায় বাদ। ৩০। ৯৭ মেঘদূত আদ্যে বদ্ধ। বিরহদিবসে যা শিখাদাম হিত্বা শাপস্যান্তে বিগলিতশুচা যা ময়ােন্মােচনীয়া। স্পর্শক্লিষ্টামযমিতনখেনাসকৃৎ সারয়ন্তীং গণ্ডাভােগাৎ কঠিনবিষমদেকবেণীং করেণ। ৩১। স। সন্ন্যস্তাভরণমবল পেলবং ধারয়ন্তী শয্যাৎসঙ্গে নিহিতমসকৃদুঃখদুঃখেন গাত্র। ত্বামপ্যং নবজলময়ং মােচয়িষ্যত্যবশ্যং প্রায়ঃ সৰ্বো ভবতি করুণাবৃত্তিরার্জান্তরাত্মা। ৩২।
ত্তরমেঘ মােদের বিরহের প্রথম দিনে বালা বেঁধেছে যেই বেণী চূড়া-বিহীন, খুলিব আমি তারে হরষে সুখভরে বিগত হলে পরে বিরহ-দিন । হয়ত প্রিয়া মাের শুষ্ক রাগহীন গণ্ড হতে তার বারংবার নখর-যুত করে রুক্ষ এক-বেণী সরায়, ক্লেশকর পরশ তার। ৩১। হয়ত মাের, ভাই, প্রেয়সী অবলার ভূষণহীন সেই দেহ কোমল অশেষ বেদনায় নহেক থির কভু, লুটায় বারবার শয্যাতল। হেরে সে দুখিনীরে কঁদিয়া জলধারে সদয় হ’য়াে তুমি কোমল-বুক ; করুণাময় যারা তাদের চিত সদা আপনি গলি’ যায় হেরিয়া দুখ। ৩২। ৯৯ মেঘদূত . জানে সখ্যাস্তব ময়ি মনঃ সম্ভতস্নেহমম্মা- দিথতাং প্রথমবিরহে তামহং তর্কয়ামি। বাচালং মাং নখলু সুভগম্মন্যভাবঃ করােতি প্রত্যক্ষন্তে নিখিলমচিরাৎ ভ্রাতরুক্তং ময়া যৎ ॥ ৩৩। রুদ্ধাপাঙ্গপ্রসরমলকৈরঞ্জনস্নেহশূন্যং প্রত্যাদেশাদপিচ মধুনাে বিস্মৃতবিলাস। ত্বয্যাসন্ন নয়নমুপরিস্পন্দি শঙ্কে মৃগাক্ষ্যাঃ মীনক্ষোভাকুলকুবলয়শ্রীতুলামেষ্যতীতি। ৩৪। ১০ ৫ উত্তরমেঘ আমার প্রিয়তমা কত যে মনে-প্রাণে আমারে ভালবাসে জানি তাে, ভাই ; প্রথম-বিরহিণী মূরতি তার আমি অকিন্তু মনে মনে এমনি তাই । প্রণয়-ভাগ্যের বড়াই নাহি করি, বলিনু বহু বটে, • বাচাল নই ; সকলি নিজ চোখে অচিরে তুমি, ভাই, হেরিবে যাহা আমি তােমারে কই।৩৩ কাজলহীন তার চোখের কোণ দু’টি ঢাকিয়া দেছে ঝুলে অলক-জাল ; মদিরা পান আর করে না তাই তার ভুরুর লীলা নাহি খেলায় ভাল। নিকটে হেরি’ তােমা’ হরিণ-আঁখি তার উপরে দিঠি হানি’ হবে অথির,- শােভিবে আঁখি দু’টি কমল কঁপে যেন মীনের গতি লেগে মৃদুল ধীর ।৩৪। ১০১ মেঘদূত . বামশ্চাস্যাঃ কররুহপদৈমুচ্যমাননা মদীয়ৈ- মুক্তাজালং চিরপরিচিতং ত্যাজিতে। দৈবগত্যা। সম্ভোগান্তে মম সমুচিতে হস্তসংবাহনানাং যাস্তৃরু: সরসকদলীস্তম্ভগৌরশ্চলত্ব। ৩৫। তস্মিন্ কালে জলদ দয়িতা লনিদ্রা যদি স্যা- দাস্যৈনং স্তনিতবিমুখাে যামমাত্রং সহ। মা ভূদস্যাঃ প্রণয়িনি ময়ি স্বপ্নলব্ধে কথঞ্চিৎ সদ্যঃ কণ্ঠচ্যুতভুজলতাগ্রন্থি গাঢ়োপগূঢ়ম। ৩৬। ২ উত্তরমেঘ দিতাম নখে কাটি প্রিয়ার বাম উরু, আজিকে নাহি সেথা নখের দাগ ; মুকুতা-জালে তাহা আবৃত র’ত নিতি, নাহিক সেথা আজি মুকুতা-রাগ ; ; ক্লান্তি বিদূরিতে যে বাম উরু 'পরে বুলায়ে কর আমি দিতাম, সেই কদলী-তরু সম গৌর উরু-দেশ কাপিবে মৃদু, তােমা’ হেরিবে যেই। ৩৫ যদি সে সে-সময় নিদ্রাগত রয়, বসিয়া তার পাশে, হে জলমুক্, প্রহর-কাল তুমি নীরব থেকো, ভাই, করাে না গরজন ভাঙায়ে সুখ। হয়ত স্বপনে সে আমারে লভি’ বুকে জড়ায় ভুজ-লতা কণ্ঠে মাের ; এহেন কালে যদি ডাকিয়া ওঠ তুমি, শিথিল হবে দৃঢ় বাহুর ডাের। ৩৬।
মেঘদূত তামুখাপ্য স্বজলকণিকাশীতলেনানিলেন প্রত্যাশ্বস্তাং সমমভিনবৈৰ্জালকৈর্মালতীনাম্। বিদ্যুদগর্ভে নিহিতনয়নাং ত্বৎসনাথে গবাক্ষে ২ ধীরস্তনিতবচনৈর্মানিনীং প্রক্রমেথাং । ৩৭। বক্ত ভমিত্রং প্রিয়মবিধবে বিদ্ধি মামম্বুবাহং তৎসন্দেশানসি নিহিতাদাগতং ত্বৎসমীপম্ । যাে বৃন্দানি ত্বরয়তি পথি শ্ৰাম্যতাং প্রােষিতানাং মস্তিস্খৈধ্বনিভিরবল বেণিমােক্ষোৎসুকানি। ৩৮। ১০ ৪ উত্তরমেঘ তােমার জলকণা- শীতল অনিলের পরশে ধীরে ধীরে তুষিয়া তায়, মালতী-কলিকার বিকাশ সাথে তুমি জাগায়ে দিও, ভাই, মাের প্রিয়ায়। বসিয়া বাতায়নে খেলায়াে চপলায়, অমনি হেরিবে সে তুলিয়া চোখ, তখন মানিনীরে মৃদুল স্বরে তুমি বলিও এই কথা দূরিতে শােক। ৩৭।- “সধবা, শােন তুমি, অম্বুবাহ আমি তােমার ভর্তার সখা যে হই ; বারতা বহি’ তার এসেছি বহু দূর তােমার পাশে আজ সে-কথা কই। স্নিগ্ধ ধ্বনি মাের শুনিয়া করিবারে আপন প্রিয়াদের বেণী মােচন যতেক পরবাসী প্রণয়ী-সুখভরে ত্বরিত পদে যায় গৃহে আপন।” ৩৮।
মেঘদূত ইত্যাখ্যাতে পবনতনয়ং মৈথিলীবােম্মুখী সা মুৎকণ্ঠোচ্ছসিতহৃদয় বীক্ষ্য সম্ভাব্য চৈব। শ্রোষ্যত্যস্মাৎ পরমবহি সােম্য সীমন্তিনীনাং কান্তোদ সুহৃদুপনতঃ সঙ্গমাৎ কিঞ্চিদূনঃ ৩৯ ৷ তামায়ুষ্মম্মম চ বচনাদাত্মনা চোপকৰ্ত্ত ক্রয়া এবং তব সহচররা রামগিৰ্য্যাশ্রমস্থ। অব্যাপন্নঃ কুশলমবলে পৃচ্ছতি ত্বাং বিযুক্তঃ পূৰ্বাশাস্তং সুলভবিপদাং প্রাণিনামেতদেব ৪০।
উত্তরমেঘ মারুতি-মুখে যথা শুনিয়া রাম-কথা জানকী উন্মুখ হেরিল তায়, তেমনি সমাদরে তােমারে জলধর, হেরিবে প্রিয়া মাের আকাশ-গা’য়। তােমারে হিয়া-মাঝে বরণ করি’ প্রিয়া শুনিবে দিয়ে মন তব বচন ;- মিত্র-মুখে শুনি প্রিয়ের শুভ বাণী মিলন প্রায় মানে অবগণ। ৩৯। আমার অনুরােধে অথবা তুমি তার সাধিতে উপকার বলে এ ভাষ তােমার সহচর কুশলে রহে জেনাে, সে রামগিরি 'পরে করিছে বাস। দুঃখ শুধু তার বিচ্ছেদের ভার, আমার মুখে তব কুশল চায় ; প্রাণীরা পদে পদে পড়ে যে পরমাদে, কুশল তাই সবে আগে শুধায়। ৪০। ১০৭ মেঘদূত অঙ্গেনাঙ্গং তনু চ তনুন। গাঢ়তপ্তেন তপ্তং সাণােস্ৰদ্ৰবমবিরততাৎকণ্ঠমুৎকন্ঠিতেন। উষ্ণোচ্ছাসং সমধিকতরােচ্ছাসিনা দূরবর্তী সঙ্কল্পৈস্তৈৰ্বিশতি বিধি বৈরিণা রুদ্ধমার্গঃ ৪১। শব্দাখ্যেয়ং যদপি কিল তে যঃ সখীনাং পুরস্তাৎ কর্ণে লােলঃ কথয়িতুমভূদাননস্পর্শলােভা। সােহতিক্রান্তঃ শ্রবণবিষয়ং লােচনাভ্যামগম্য- মুৎকণ্ঠাবিরচিতপদং মন্মুখেনেমাহ। ৪২।
উত্তরমেঘ আপনি কৃশ তাই ভাবিছে তুমি কৃশ, আপনি তাপী, ভাবে- তুমিও তাই ; নয়নে ঝরে জল, ভাবিছে অবিরল তােমারাে আঁখি ঝরে- বিরাম নাই। উষ্ণ শ্বাসে দহে, ভাবিছে তুমিও তা, এমনি মনে মনে মিলায়ে লয় অঙ্গ সব তার তােমার অঙ্গেতে, নিকট-মিলনে যে বিধি নিদয়। ৪১। যে-কথা সখীদের সমুখে বলা যায়, বদন পরশিতে করিয়া লােভ, বলিতে চাহিত যে সে-কথা কানে কানে, আজি সে পতি তব লভিয়া ক্ষোভ শ্রবণাতীত রহে দৃষ্টি হতে দূরে ; আমার মুখে আজ পাঠায় এই বারতা তব তরে বিরহ-ব্যথা-ভরা, অতীব উদ্বেগে কাতর সে-ই। ৪২।
মেঘদূত শ্যামাস্বঙ্গং চকিতহরিণীপ্রেক্ষণে দৃষ্টিপাতং বক্তচ্ছায়াং শশিনি শিখিনাং বহভারেষু কেশান্। উৎপশ্যামি প্রমুষু নদীবীচিষু জ্ববিলাসা হকৈস্মিন্ কচিদপি ন তে ভীরু সাদৃশ্যমস্তি। ৪৩। ক্বামালিখ্য প্রণয়কুপিতাং ধাতুরাগৈঃ শিলায়া- মাত্মানং তে চরণপতিতং যাবদিচ্ছামি কৰ্ত্ত অস্রৈস্তাবহুরুপচিতৈদৃষ্টিরালুপ্যতে মে ক্ররস্তম্মিপি ন সহতে সঙ্গমং নৌ কৃতান্তঃ॥ ৪৪। ১১০ উত্তরমেঘ “তােমার অঙ্গের হেরিতে পেলবতা শ্যামা সে লতিকার পাশে যে যাই; চন্দ্রে হেরি, প্রিয়া, তােমারি মুখছবি, হরিণী-চোখে তব নয়ন পাই ; শিখীর কলাপেতে তােমার কেশভার, নদীর ঢেউএ তব ভুরু-বিলাস ; তথাপি এক ঠাই কভু না হেরি, সখি, তােমার সে মূরতি, সে লীলা হাস।৪৩ “কুপিতা তুমি যেন রয়েছ মানভরে, শিলায় ধাতুরাগে অকিয়া, সই, যেমনি আপনারে তােমার পদমূলে আঁকিতে আমি ধীরে নিরত হই, উছলি’ অখি-ধার ঝরে যে বারবার, দৃষ্টি-পথ মাের করে যে বােধ ; বিধাতা নিরমম, চিত্রে দু’জনার মিলন তাও সে যে করে বিরােধ। ৪৪। ১১১ মেঘদূত মামাকাশপ্রণিহিতভুজং নির্দয়াশ্লেষহেতাে লায়াস্তে কথমপি ময়া স্বপ্নসন্দর্শনেষু। পশ্যন্তীনাং ন খলু বহুশাে ন স্থলীদেবতানাং মুক্তাম্বুলাস্তরুকিশলয়েধলেশা পন্তি। ৪৫। ভিত্ত্বা সদ্যঃ কিশলয়পুটান্ দেবদারুমাণাং যে তৎক্ষীরশ্রুতিসুরভয়ে দক্ষিণেন প্রবৃত্তাঃ। আলিঙ্গন্তে গুণবতি ময়া তে তুষারাদ্ৰিবাতাঃ পূৰ্ব্বসৃষ্টং যদি কিল ভবেদঙ্গমেভিস্তবেতি। ৪৬। ১১২ উত্তরমেঘ “স্বপনে কোনাে দিন যদি বা, প্রিয়তমা, দরশ লভি তব, তখন হায়, বিথারি’ দিই আমি শূন্যে বাহু-যুগ’ তােমারে বাঁধিবারে বাহু-কারায় ; আমার দশা হেরি’ কানন-দেবতার মুকুত সম ঝরে নয়ন-জল কত না ফোটা ফোটা তরুর কিশলয়ে আমার প্রতি যেন কৃপা-বিকল।৪৫। “টুটিয়া দেবদারু পত্রপুট যত, মাখিয়া রস-বাস অঙ্গময় সুরভি বায়ু আসে দখিণ-মুখে ছুটি’ পরশি’ হিমাচল তুষারালয় ; হয়ত তােমারে সে পরশ করি’ আসে, হে প্রিয়া, মনে মনে ভাবিয়া তা সকল অঙ্গেতে সে-বায়ু মাখি’ লয়ে পরশ তব যেন তাহাতে পাই। ৪৬। ১১৩ মেঘদূত সংক্ষিপ্যেত ক্ষণ ইব কথং দীর্ঘযামা ত্রিযামা সর্বাবস্থাস্বহরপি কথং মন্দ মন্দাতপং স্যাৎ। ইথং চেতশ্চটুলনয়নে দুলভ-প্রার্থনং মে গাঢ়োত্মাভিঃ কৃতমশরণং ত্বদ্বিয়ােগব্যথাভিঃ। ৪৭। নত্মানং বহু বিগণয়ন্নাত্মনৈবাবলম্বে তৎ কল্যাণি মপি সুতরাং মা গমঃ কাতরম্। কাত্যন্তং সুখমুপনতং দুঃখমেকাতো বা নীচৈৰ্গচ্ছত্যুপরি চ দশা চক্রনেমিক্ৰমেণ। ৪৮। ১১৪ ত্তরমেঘ “চটুল-নয়না গাে দীর্ঘ রজনীরে কেমনে ছােট করি নিমেষ প্রায়, সকল কালে আমি কেমনে দিবসেরে কাটাতে পারি নিতি শীতলতায়, এ হেন দুর্লভ বাসনা পূরাবারে এ হিয়া দুরাশায় , কাটায় দিন । তােমার বিচ্ছেদে গভীর সন্তাপে রহে যে জরজর উপায়হীন। ৪৭। “শুন গাে কল্যাণী, ভাবনা বহু সহি হৃদয় অবশেষে করি যে থির ; কাতর হ’য়াে নাকো, দহন ভুলে থাকো, চিত্ত করাে তব শান্ত ধীর। কে বলল এ ধরায় নিয়ত সুখ পায়, কে বলল লভে সদা দুঃখদায়? ভাগ্য অবিরত চক্রনেমি মত উপরে উঠে, পুন’ নিয়ে যায়। ৪৮। ১১৫ মেঘদূত শাপান্তো মে ভুজগশয়নাদুথিতে শাঙ্গপাণে মাসানন্যান্ গময় চতুরে লােচনে মীলয়িত্ব। পশ্চাদাবাং বিরহগুণিতং তং তমাত্মাভিলাষ নির্বেক্ষ্যাবঃ পরিণতশরচ্চন্দ্রিকা ক্ষপাসু। ৪৯। ভূয়শ্চাহ মপি শয়নে কণ্ঠলগ্না পুরা মে নিদ্রাং গত্বা কিমপি রুদতী সম্বনং বিপ্রবুদ্ধা। সান্তাসং কথিতমসকৃৎ পৃচ্ছতশ্চ ত্বয়া মে দৃষ্ট স্বপ্নে কিতব রময় কামপি ত্বং ময়েতি। ৫০ ১১৬ উত্তরমেঘ “ভুজগ-শয্যায় ত্যজিয়া হৃষীকেশ উঠিবে যবে তবে কাটিবে শাপ ; রহাে এ চারি মাস হৃদয়ে বহি’ আশ, নয়ন মুদে আর ভুলিয়া তাপ। বিরহকালে, প্রিয়া, মােদের দুটি হিয়া করেছে অবিরাম যে-অভিলাষ, শারদ-পূর্ণিমা- নিশায় দোহে মােরা পূরাব সব সাধ সকল আশ।” ৪১ “অবলা, শুন পুন”, বলেছে স্বামী তব–“একদা নিশাকালে শয়নে মাের কণ্ঠে ছিলে লীন, সহসা হেনকালে কঁদিলে তুমি হ’তে ঘুমের ঘোর ; কাদিলে কেন তুমি, যখন শুধানু তা, কহিলে মনে মনে হেসে মৃদুল- ‘স্বপনে হেরি একি অপর কামিনীরে সােহাগ করাে তুমি শঠ চটুল।৫ ১১৭ মেঘদূত এতস্মান্মাং কুশলিমভিজ্ঞানদানাদ্বিদি মা কৌলীনাদসিতনয়নে ময্যবিশ্বাসিনী ভূঃ । স্নেহানাহুঃ কিমপি বিরহাসিনস্তে হ্যভােগা- দিষ্টে বস্তুপচিতরা প্রেমরাশীভবন্তি। ৫১। T আশ্বাস্যৈবং প্রথমবিরহােদশােকাং সখীং তে শৈলাদাশু ত্রিনয়নবৃষােৎখাতকূটান্নিবৃত্ত। সাভিজ্ঞানপ্রহিতকুশলৈস্তদ্বচোভিৰ্ম্মমাপি প্রাতঃকুন্দপ্রসবশিথিলং জীবিতং ধারয়েথাঃ ॥ ৫২। ১১৮ উত্তরমেঘ “হে কালো-অাখি প্রিয়া, এ গুঢ় পরিচয়ে জানিও বেঁচে আছি, মাের কুশল ; অশুভ নানা কথা ক'রাে না প্রত্যয়, রাখিয়াে চিত তব অচঞ্চল । লােকে যে বলে—হায়, বিরহ-কালে সদা প্রণয় পায় হ্রাস, প্রীতির ক্ষয় ; অসার কথা এই জানিও প্রিয়তমা, বিরহে ভালােবাসা অগাধ হয়।”৫১। ভ্রাতৃজায়া তব প্রথম-বিরহিণী, তাহারে প্রবােধিতে বলি’ এ বাক্, ত্যজিয়া এস গিরি, শিবের বৃষ যেথা শৃঙ্গে খোঁড়ে সদা শিখর-ভাগ। অভিজ্ঞান সহ, শুন হে বারিবাহ, কুশল-সমাচার প্রিয়া যা দ্যায়, বহিয়া এনে তাহা বাঁচাতে মম প্রাণ, শিথিল এ যে প্রাত' কুন্দ প্রায় ৫২। ১১৯ মেঘদূত কচিৎ সােম্য ব্যবসিতমিদং বন্ধুকৃত্যং ত্বয়া মে প্রত্যাদেশান্ন খলু ভবতাে ধীরতাং তর্কয়ামি। নিঃশফোহপি প্রদিশসি জলং যাচিতশ্চাতকেভ্যঃ প্রত্যুক্তং হি প্রণয়িষু সমীপ্সিতার্থক্রিয়ৈব। ৫৩। এতৎ কৃত্বা প্রিয়ম চিতপ্রার্থনাবৰ্ত্তিনাে মে সৌহাদাদ্বা বিধুর ইতি বা ময্যমুক্রোশবুদ্ধ্যা। ইষ্টান্ দেশান্ জলদ বিচর প্রাবৃষা সম্ভ মাভূদেবং ক্ষণমপি চ তে বিদ্যুতা বিপ্রয়ােগঃ ॥ ৫৪। ১২০ উত্তরমেঘ সৌম্য জলধর, রাখিয়া অনুরােধ ল’বে না বন্ধুর এ সংবাদ ? মৌন হেরি’ তােমা’ বুঝেছি আমি, সখা, আছ যে অভিলাষী পূরাতে সাধ। কথা না কহি’ তুমি চাতকে বারি দাও যেমনি যাছে তারা তব আসার ; সাধিয়া প্রিয়জন- করম সাধু জন দেন যে উত্তর প্রার্থনার। ৫৩। বন্ধু-প্রীতি-ভরে অথবা মাের দুখে দুখিত হয়ে, মেঘ, হৃদয়-মাঝ, যদিও হেন কাজ তােমারে সাজে নাকো, তথাপি করে মাের এ প্রিয় কাজ। বরষা-সম্ভারে শােভন রূপ ধরি’ ঘুরিও দেশে দেশে যেথায় চাও; বিজলী-বধূ সাথে ক্ষণেক যেন তব বিরহ নাহি ঘটে, দুখ না পাও। ৫৪। ১২১ *** #### উত্তরমন ১} ক শেষ M E । ।
y০ পূৰ্বমেঘ ও উত্তরমেঘ-অতি প্রাচীনকাল হইতেই কালিদাসের মেঘদুত শুধু মেঘ নামেই পরিচিত হইয়া আসিতেছে। সেইজই মেঘদুতের পূর্বাংশকে পূর্বমেঘ এবং উত্তরাংশকে উত্তরমেঘ বলা হয়। কিন্তু কালিদাস ইহা দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া পূর্বমেঘ ও উত্তরমেঘ নাম দিয়াছিলেন কি না সন্দেহের বিষয়। পূৰ্বমেঘ যক্ষ (১)- এক শ্রেণীর দেবতা। সংস্কৃত অলঙ্কার-শাস্ত্রে নিয়ম আছে যে, কাব্যে অভিশপ্ত ব্যক্তির নাম নির্দেশ করিতে নাই। তাই কালিদাস যক্ষের নাম না বলিয়া শুধু “কশ্চিৎ যক্ষ” বলিয়াই নিরস্ত হইয়াছেন। বক্ৰীড়া (২)—ব মানে উচ্চভূমি। হাতী, যাড় প্রভৃতি দাত বা শিঙ দিয়া মাটি খুঁডিয়া যে-খেলা করে তাকে বলে এ-ক্রীড়া। কেতকাধানহেতােঃ (৩)—সাধারণত কৌতুকাধানহেতাে পাঠের চেয়ে কেতকাধানহেততঃ পাঠই অধিকতর সঙ্গত মনে হয়। বর্ষাকালে কেতকী বা কেয়া-ফুল ফোটে বর্ষাকালে কেতকী বা কেয়া-ফুল ফোটে। (পূর্বমেঘ ২৩ শ্লোকও স্রষ্টব্য।) পুরাবর্তক (৬)—পুর ও আবর্তক পুরাণ-বিখ্যাত মেঘ বিশেষের নাম। তােয়গুধুঃ (৯)—প্রচলিত পাঠ “তে সগন্ধঃ”। তােয়খৃঃ, পাঠ অধিকতর সঙ্গত মনে হয়। চাতক- পক্ষী মেঘের জল পান করে বলিয়া প্রসিদ্ধি । তােয়, কথাই লিপিকরের এমাদের ফলে তে সগণ হইয়া থাকিবে।
শিলী (১১)-ব্যাঙের ছাতা। ইহা জন্মাইলে পৃথিবী প্রচুর-শস্যশালিনী হয় বলিয়া জনবাদ ছিল। সিদ্ধ (১৪)—সিদ্ধও যক্ষের মত এক শ্রেণীর দেবতা। ইহারা পাহাড়ে থাকিয়া তপস্যা করিতেন, কিন্তু বিবাহও করিতেন। এদের পত্নীরা অতি-সরল প্রকৃতির ছিল। নিচুল ও দিঙনাগ (১৪)-নিচুল মানে বেতগাছ। আটটি হাতী পৃথিবীর আট দিক রক্ষা করে বলিয়া পূর্বে বিশ্বাস ছিল। এই আটটি হাতীকে বলা হইত দিগগজ বা দিও নাগ। মল্লিনাথ বলেন যে, এই শ্লোকে প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ নৈয়ায়িক দিঙ নাগ ও কালিদাসের সহাধ্যায়ী মহাকবি নিচুল সম্বন্ধে একটু ইঙ্গিত রহিয়াছে। মলিনাথের মতে দিও নাগ কালিদাসের প্রবল প্রতিপক্ষ ছিলেন, সেইজন্যই এখানে “জুলহস্তাবলেপ” শব্দ ব্যবহারের দ্বারা দিঙনাগের প্রতি কালিদাসের বিরাগ প্রকাশ পাইয়াছে ; এবং “সরস” শব্দের দ্বারা নিচুলের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করা হইয়াছে। কালিদাসের টীকাকার দক্ষিণাবর্তও এই শ্লোকে বৌদ্ধাচাৰ্য দিঙনাগের প্রতি ইঙ্গিত আছে বলিয়া মনে করেন। মল্লিনাথের এই উক্তির উপর নির্ভর করিয়া কেহ কেহ কালিদাসের কাল নির্ণয়ের চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু মল্লিনাথের এই উক্তি গ্রাহ নয়। কারণ এই শ্লোকে কোনাে শ্লেষ বা দ্ব্যর্থবােধক ধ্বনি আছে বলিয়া মনে হয় না। মল্লিনাথের এই উক্তি ছাড়া নিচুল সম্বন্ধেও আর কিছুই জানা যায় না। মেঘদূতের প্রাচীনতম টীকাকার বল্লভদেব কিন্তু এই শ্লোকের টীকায় দিনগচাৰ্য্য সম্বন্ধে কোনো কথাই বলেন নাই। এই শ্লোকে সিঙনাগাচার্যের প্রতি প্রচ্ছন্ন খোঁচা রহিয়াছে | ধরিয়া লইলেও কালিদাসের কাল সম্বন্ধে আমাদের পূর্বোক্ত সিদ্ধান্তের কোনো ব্যতিক্রম ঘটে না। কারণ, দিঙনাগাচাৰ্যকে খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকের প্রথম ভাগের পরবর্তী বলিয়া মনে করিবার কোনো হেতু নাই। কলী (২১)—ভূমিচম্পক বা ভুইচাপা। দগ্ধারণ্যে (২১)—প্রচলিত জগ্ধারণ্যে পাঠের চেয়ে এই পাঠই অধিকতর সঙ্গত মনে হয়। গ্ৰামচৈত্য (২৩)-গ্রামের পথের উপরে যে বড় বড় গাছ থাকে সেগুলিকে বলে গ্রাম-চৈত্য । পরিমল (২৫)-সুগন্ধ মাত্ৰকেই পরিমল বলে না। চন্দনাদি যে-সমস্ত সুগন্ধ দ্রব্য মর্দন করিয়া ব্যবহারােপযােগী করিতে হয় তাকে বলে পরিমল। এই পরিমল দেহে মাখিত বলিয়া তার আর-এক নাম অনুলেপন। উদয়নকথা (৩০ - চণ্ডপ্রদ্যোত মহাসেন ছিলেন অবস্তির রাজা। তার পরমা সুন্দরী এক কন্যা ছিল, নাম বাসবদত্তা। বৎস 'দেশ বা কৌশাম্বীর (প্রয়াগের নিকটে বর্তমান কোসাম) রাজা ছিলেন উদয়ন। ঘটনাচক্রে বাসবদত্তা ও উদয়নের মধ্যে প্রণয় হয় এবং উদয়ন অবন্তি-রাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বাসবদত্তাকে হরণ করিয়া বিবাহ করেন। ইহাই উদয়ন-কথার সংক্ষিপ্ত মৰ্ম্ম। উদয়নের এই কাহিনী কালিদাসের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সাহিত্যের বহু স্থানেই পাওয়া যায়। কালিদাসের সময়ে অবন্তির গ্রাম-বৃদ্ধদের মধ্যে পুরুষ-পরম্পরা ক্রমেই এই গল্প চলিয়া আসিতেছিল ; গল্পটিও অস্বস্তিরই এক রাজকন্যা সম্বন্ধে। তারা বৃহৎকথা হইতেই ঐ পর শিখিয়াছিল এমন মনে করার কোনাে কারণ নাই । •• . কেশসংস্কারধূম (৩২)- প্রচলিত গাঠে আছে 'ধূপ'। কিন্তু জালেদগীর্ণৈ এবং উপচিত- বপুঃ এই দুইটি কথায়ই বােঝা যায় যে, ধূমই সঙ্গত পাঠ। মেয়েরা অগুরু প্রভৃতি গন্ধ-ব্য পুড়াইয়া তার ঘুমের দ্বারা কেশ মুরভিত করিত। নী রাত্রিং (৩২)—প্রচলিত পাঠে আছে “লক্ষ্মী পন”। কিন্তু লক্ষ্মীং পত্য পাঠে সঙ্গত অর্থই হয় না। অধ্যাপক কে, বি, পাঠকও মলিনাথের এই প্রচলিত পাঠ গ্রহণ করিতে পারেন নাই। চণ্ডেশ্বর ( 33 )পরবর্তী শ্লোকে উল্লিখিত মহাকাল ; উভয় নামই শিবকে বুঝায়। উজ্জয়িনীর মহাকালের মন্দির কালিদাসের সময় হইতেই প্রসিদ্ধ। ঐ মন্দির গন্ধবতীর তীরে অবস্থিত ছিল। অবেরুণীর ভারত-বিবরণেও এই মহাকালের উল্লেখ আছে। এখনও বহু যাত্রী মহাকালের মন্দিরে পূজা দিতে যায়। আনাগাজিনেচ্ছা (৩৬)- গজাসুরকে বধ করিয়া মহাদেব তার রক্তাক্ত চখালা (অজিন) দুই হাতে তুলিয়া ধরিয়া তাণ্ডব নৃত্য করিয়াছিলেন। পূৰ্বাৰ্ধলম্বী (৫১)—এই পাঠ সুস্পষ্ট কারণ বশত’ পক্ষালম্বী পাঠের চেয়ে অধিকতর সঙ্গত। শরভ (৫৪)অষ্টপদবিশিষ্ট কাল্পনিক মৃগ । কীচক (৫৬)এক-প্রকার বাঁশ। তার ছিদ্রে বায়ু প্রবেশ করিলে বঁশীর মত শব্দ হয়। জনিতসলিল ইত্যাদি (৬১)—এই পাঠ প্রচলিত “বলকুলিশােৰঘটনােদগীর্ণতােরং” পাঠের iyo চেয়ে অনেক স্বাভাবিক ও সঙ্গত মনে হয়। হিমালয়ের নানাস্থাসই মেঘ ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া বৃষ্টিপাত করে-তাতে ঐ গৃহ সত্যসত্যই যম্ভধারাগৃহত্ব প্রাপ্ত হয়। উত্তরমেঘ চন্দ্রকান্ত (৯)-মণি বিশেষ। চাদের কিরণ লাগিলে এই মণি হইতে ফোটা ফোটা জল ঝরিত বলিয়া কবি-প্রসিদ্ধি আছে। মুক্তালগ্নস্তনপরিমলৈচ্ছিন্ন ত্রৈঃ (১১)—এই পাঠ, মুক্তাজালৈঃ শুনপরিসরচ্ছিন্ন ত্রৈ। এই পাঠের চেয়ে অধিকতর সঙ্গত ও স্বাভাবিক। পরিমল মানে চন্দনপঙ্ক প্রভৃতি মন্দন-জাত সুগন্ধ অনুলেপন (পূর্বমেঘ, ২৫ শ্লোক দেখ)। মেয়ের স্তনেও পরিমল লেপন করিত। গতি-কম্পনে সুতা ছিড়িয়া যাওয়ায় পথে হারের মুক্তা পড়িয়া রহিয়াছে এবং ঐ মুক্তায় স্তনের পরিমল লাগিয়া রহিয়াছে। আশােক ও কেসর (১৭)-কেসর বকুল। সুন্দরীদের বামপদ-তাড়নে অশােক গাছ এবং তাদের মুখের মদ্য-গণ্ডুষ-সেচনে ৰকুল গাছ কুসুমিত হয় বলিয়া কৰি-প্রসিদ্ধি ছিল। শিখৰদশনা (২১)-তীক্ষশনা। মুক্তার মত তীক্ষ ক্ষত নারীদের সৌন্দর্য্য ও কল্যাণের লক্ষণ বলিয়া গণ্য হইত।
lelo একবেণী ( ৩১ )—প্রোষিতভর্তৃকার। একবেণী ধারণ করিতেন, খোপা বাধিতেন না, চোখে কাজল পরিতেন না, নখ কাটিতেন না, মদ্যপান করিতেন না এবং স্নানাদির সময় তেল ব্যবহার করিতেন না। বিরহের অবসানে ভৰ্ত্তা স্বহস্তে ঐ বেণী খুলিয়া দিতেন। এই বেণী-মােচনই বিরহাবসানের প্রথম ও প্রধান কাজ। পেলবং (৩২)-প্রচলিত পেশল পাঠ মােটেই সঙ্গত নয়। অধ্যাপক পাঠকেরও এই মত। ভীরু (৪৩)—প্রচলিত পাঠে আছে চণ্ডি। চণ্ডির চেয়ে ভীরু কথা অনেক সঙ্গত। শাপান্ত ইত্যাদি ( ৪৯ )—শাপাণি (নারায়ণ ) যে-দিন অনন্তশয্যা ত্যাগ করিয়া উঠিবেন সে-দিন যক্ষের শাপের অবসান হইবে। নারায়ণ আষাঢ়ের শুক্লা একাদশী তিথিতে অনন্ত-শয্যায় শয়ন করেন ; কার্তিকের শুক্লা একাদশীতে উত্থান করেন। সুতরাং উত্থান-একাদশী বা কাৰ্তিকী শুক্লা একাদশী যক্ষের শাপাবসানের তিথি। শরচ্চন্দ্রিকা (৪৯)—তৎকালে কার্ত্তিক মাসকে শরৎকাল বলিয়া ধরা হইত। সে-সময়ে চান্দ্র মাস প্রচলিত ছিল। দেশ-পরিশ্ন রামগিরি (১)—বল্লভদেব ও মলিনাথ উভয়েই রামগিরিকে রামায়ণের চিত্রকুট পৰ্বত (প্রয়াগের নিকটে ) হইতে অভিন্ন মনে করিয়াছেন। কেহ কেহ রামগিরিকে মধ্যভারতের সরওজা রাজ্যের অন্তর্গত রামগড় পাহাড় বলিয়া মনে করেন। অনেকে রামগিরিকে বর্তমান নাগপুরের কিছু উত্তরে অবস্থিত রামটেক { নামক স্থানের সহিত অভিন্ন মনে করেন। এই শেষােক্ত মতই সমীচীন বলিয়া বােধ হয়; কারণ তাতে মেঘের গতিপথের সহিত সঙ্গতি থাকে। মেঘকে রামগিরি হইতে উত্তর দিকে ( উদঙ মুখঃ) যাইতে বলা হইয়াছে। রেবা বা নর্মদা চিত্রকুট হইতে দক্ষিণ দিকে এবং সরগুজার অন্তর্গত রামগড় হইতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। সুতরাং চিত্রকূট বা রামগড় রামগিরি হইতে পারে না। কিন্তু রামটেক্ হইতে রেবা উত্তর দিকেই অবস্থিত। মালক্ষেত্র (১৬)-কোনো কোনো পণ্ডিত এস্থলে মাল নামক কোনো বিশেষ স্থান বুঝাইতেছে বলিয়া মনে করেন। কিন্তু সদ্যমীরেৎকষণসুরভি এই বিশেষণের দ্বারাই বােঝা যায়-এখানে সাধারণ মাল- ভূমিকেই বুঝাইতেছে ; আবার কেহ কেহ মনে করেন, মালক্ষেত্র দ্বারা মালবদেশকে বুঝাইতেছে। কিন্তু মালব নামের সহিত মালভূমির কোনো যােগ নাই ; মালব জাতির বাসভূমি বলিয়া ঐ দেশের নাম হইয়াছে, মালব। আর এই মালক্ষেত্র রেবা নদীর দক্ষিণে এবং আম্রকূট পাহাড়েরও আসন্ন দক্ষিণে অবস্থিত। মালবদেশ বিন্ধ্যপর্বতের উত্তর দিকে ; সুতরাং এই মালক্ষেত্রের সঙ্গে মালবদেশের কোনো সম্বন্ধ নাই। আম্রকূট (১৭)—অনেকেই ইহাকে বিলাসপুর ও রত্নপুর শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত অমর-কণ্টক নামক পৰ্বত-শৃঙ্গের সহিত অভিন্ন মনে করেন। নাম-সাদৃশ্য এবং নর্মদার সান্নিধ্য ছাড়া আম্রকূট ও অমরকন্টককে এক মনে করার কোনো হেতু নাই। আম্রকূট রামগিরি হইতে উত্তরে, একথা মেঘদূতেই আছে ; অথচ, অমর- কণ্টক চিত্রকূট, রামগড় বা রামটেক কোনাে স্থান হইতেই উত্তরে নয়-রামগড় হইতে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
সুতরাং অমরকন্টককে মাম্রকূট মনে করা যাইতে পারে না। রামটেক্ যদি রামগিরি হয়, তবে আম্রকুট বর্তমান রামটেকের উত্তরে এবং নর্মদার দক্ষিণে কোনাে পর্বত হইবে একথা বলা যায়। রেবা (১৯)-সুপ্রসিদ্ধ নর্মদা নদীরই অপর নাম রে । বিন্ধ্য (১৯)—-বর্তমান বিন্ধ্যপর্বত ও প্রাচীন বিন্ধ্যগিরি সম্পূর্ণ এক নয়। মধ্যভারতের ভিতর দিয়া যে পৰ্বত-শ্রেণী এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে আজকাল তাকেই বিন্ধ্য পর্বত বলা হয়। কিন্তু ভোপাল এবং ভিসার নিকট হইতে এই পৰ্বত-শ্রেণীর পূর্বাংশ মাত্র পুরাকালে বিন্ধ্য নামে পরিচিত ছিল এবং পশ্চিমাংশকে পারিযাত্র বা পারিপাত্র বলা হইত। তৎকালখ্যাত সাতটি কুলাচলের মধ্যে বিস্ক্য ও পারিষাত্র দুইটি। তবে কখনও কখনও বৃহত্তর অর্থে বিন্ধ্য ও পারিযাত্ৰ এই দুইটিকে একত্রে বিন্ধ্য বলা হইত, একথাও মনে রাখা উচিত। দশার্ণ (২৩)—বর্তমান মালবের পূর্বাংশেরই প্রাচীন নাম দশাণ। বেত্রবতী (আধুনিক বেতােয়া) ও শুক্তিমতী ( আধুনিক কে), এই দুইটি নদীর মধ্যবর্তী স্থানে আর-একটি নদী প্রবাহিত হইতেছে ; তার প্রাচীন নাম দশার্ণা, আধুনিক নাম বসান। বেত্রবতী ও শুক্তিমতী এই নদীদ্বয়ের মধ্যবর্তী এবং দশর্ণা নদীর উভয় পার্শ্ববর্তী প্রাচীন নাম দশার্ণ। মহাভারতে ও অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থে এই দশার্ণের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। বিদিশা ( ২৪ )-বিদিশা দশাদেশের রাজধানী। প্রাচীন বিদিশা নগরীর বর্তমান নাম বেস্নগর । ;
{{pe परे বেনগর বর্তমান ভােপাল রাজ্যের অন্তর্গত ভিসা নামক স্থানের নিকটেই অবস্থিত। শুঙ্গ রাজাদের আমলে বিদিশা উত্তর ভারতের দ্বিতীয় রাজধানীরূপে গণ্য হইত। গুজ-সম্রাট পুষ্যমিত্র যখন পাটলিপুত্রে রাজত্ব করিতেছিলেন তখন তাঁর পুত্র অগ্নিমিত্ত বিদিশার শাসনকর্ত্তা ছিলেন ; কালিদাসের মালাবিকাগ্নিমিত্র নাটক হইতেই এই কথা জানা যায়। বিদিশা নামে একটি নদীও আছে, তার বর্তমান নাম বেস ; উহা বে- নগরের নিকটেই বেতোয়া বা বেত্রবতীতে পড়িতেছে। বেত্রবতী (২৪)-বর্তমান বেতােয়া। এই নদী পারিযাত্ৰ পৰ্বতে উৎপন্ন হইয়া যমুনায় পতিত হইতেছে। বেত্রবতী ও বিদিশা নদীর সঙ্গমস্থসেই প্রাচীন বিদিশা নগরী অবস্থিত ছিল। নীচৈঃ (২৫)বিদিশার নিকটবর্তী একটি ছােট পাহাড়। অনুচ্চ বলিয়াই সম্ভবত এর নীচৈঃ না হইয়াছিল। আম্রকূট পর্বতটি উচ্চ ছিল বলিয়া তাকে উচ্চৈঃ বলা হইয়াছে। নিৰ্বিন্ধ্যা (২৮)—বায়ু পুরাণে এই নদীর নাম দেওয়া হইয়াছে নির্বন্ধ্যা। নির্বিন্ধ্যার আধুনিক নাম নিঝ। এই নিবাঝ নামটি নির্বন্ধ্যা নামেরই রূপান্তর বলিয়া মনে হয়। বিদিশা হইতে উজ্জয়িনী যাওয়ার পথে এখনও এই নিবাঝ নদী পার হইয়া যাইতে হয়। নিবাঝ পারিযাত্ৰ পৰ্বতে উৎপন্ন হইয়া কালীসিন্ধু নদীতে পড়িতেছে । সিন্ধু (২৯)-মলিনাথ এই সিন্ধুনদীকে পূর্বোক্ত নির্বিন্ধ্যা হইতে অভিন্ন বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন- “অসৌ পূর্বোক্তা সিন্ধু নদী নির্বিন্ধ্যা ৭” উইলসন প্রমুখ অনেকেই এই সিন্ধুকে নির্বিন্ধ্যা হইতে স্বতন্ত্র বলিয়া }}va ধরিয়াছেন। যদি তাদের এই অনুমান সত্য হয় তবে এই সিন্ধু আর বর্তমান কালীসিন্ধু সম্ভবত একই নদী। কালীসিন্ধু পারিযাত্ৰ পৰ্বত হইতে চৰ্ম্মতী বা চম্বলে পড়িয়াছে। আজকাল রেল লাইনে বে-নগর হইতে উজ্জয়িনী যাইতে যে-পথে যাইতে হয় মেঘদূতের মেঘও প্রায় সেই পথেই বিদিশা হইতে উজ্জয়িনী গিয়াছিল। রেলপথে বাইতে আজকাল এই দুই স্থানের মধ্যে পার্বতী, নিবাঝ ও কালীসিন্ধু এই তিনটি বড় নদীর উপর দিয়া যাইতে হয়। অবন্তি (৩০ )—বর্তমান মালবের পশ্চিমাংশের প্রাচীন নাম ছিল অবন্তি। পূৰ্বাংশের নাম দশার্ণ বা আকর। অবন্তি একটি বহু-প্রাচীন জনপদ। বিশালাপুরী (৩০)—বিশাল। উজ্জয়িনীরই নামান্তর। ইহা অবন্তি জনপদের রাজধানী ছিল। শিপ্রা (৩১)—এই নদী এখনও শিপ্রা নামেই পরিচিত আছে। উহা পারিযাত্ৰ পৰ্বত হইতে চৰ্ম্মণী বা চম্বলে পড়িয়াছে। এই শিপ্রা নদীর উপরেই উজ্জয়িনী অবস্থিত। গন্ধবতী (৩৩)—ইহা শিপ্রানদীর একটি ক্ষুদ্র শাখা। উজ্জয়িনীর নিকটেই শিপ্রায় পড়িয়াছে। ইহার তীরেই উজ্জয়িনীর সুবিখ্যাত চণ্ডেথর বা মহাকালের মন্দির অবস্থিত ছিল। ইহার বর্তমান নাম গন্ধনালা। গম্ভীরা (৪০)—ইহা শিপ্রানদীর আর একটি শাখা। উজ্জয়িনী হইতে কিছু দূরে শিপ্রায় পড়িয়াছে। দেবগিরি (৪২)--- আধুনিক দেবগড়। এই ছােট পাহাড়টি উজ্জয়িনী হইতে দশপুর (বর্তমান মশাের) যাওয়ার পথে চম্বল নদীর দক্ষিণে অবস্থিত। কালিদাসের বর্ণনায় মনে হয়, তৎকালে এই গিরি উপরে স্কন্দ বা কার্তিকের মন্দির ছিল। এখনও দেবগড়ে একটি কার্তিকের মন্দির আছে। চৰ্ম্মতী (৪৫)—বমান চম্বল। পারিযাত্ৰ পৰ্বত হইতে উৎপন্ন হইয়া যমুনায় পড়িয়াছে। কালিদাস কিন্তু মেঘদূতে নাম ধরিয়া এই নদীটির উল্লেখ করেন নাই। তিনি শুধূ “রস্থিদেবের স্রোতেমুৰ্ত্তি কীৰ্ত্তি” বলিয়াই এই নদীটিকে নির্দেশ করিয়াছেন। মহাভারতে (দ্রোণ, ৬৫ অধ্যায় ; শান্তি, ২৯ অধ্যায়। কথিত আছে যে, পুরাকালে রন্তিদেব নামে এক রাজা ছিলেন । তিনি এই গােক নিহত করিয়া যজ্ঞ করিতেন ও ঐ মাংস দিয়া অতিথি সৎকার করিতেন। এই উপলক্ষে এত গেৰু নিহত হইত যে, তাদের সুপীকৃত চর্মের রস হইতে একটি বৃহৎ নদীর সৃষ্টি হয়। চর্মর হইতে উৎপন্ন বলিয়া নদীর নাম হইল চণতী। মহাভারতে কিন্তু রহিদেবকে দশপুরের রাজা বলা হয় নাই। প্রসঙ্গটির ভাবে বােধ হয় চৰ্ম্মণহীর উৎপত্তিস্থলেই রস্থিদেবের রাজধানী ছিল বলাই মহাভারতকারের অভিপ্রায় ? দশপুর চণতীর উৎপত্তিস্থলে তাে নয়ই, উহার তীরবর্তীও নয়। সিন্ধু (৪৬)-এখানে সিন্ধু স্পষ্টই চর্মতীকেই বুঝাইতেছে। সিন্ধু কথার একটি সাধারণ অর্থ নদী। দশপুর (৪৭)একশো বছরের উপর হইল, মল্লিনাথের টীকায় রন্তিদেবকে দশপুরপতি বলা হইয়াছে দেখিয়া উইলস সাহেব রিত্তিমপুর নামক স্থানকেই দশপুর বলিয়া অনুমান করিয়াছিলেন। জায়গাটির নাম মিস্তিমপুর নয় ; উহার প্রকৃত নাম রণ স্টোর-আলাউদ্দীন খিলজি ও আকবরের ইতিহাসে বিশেষ প্রসিদ্ধ। এই নামটি সম্ভবত রণস্তপুর শব্দের বিকৃত রূপ। রন্তিদেবের সহিত উহার কোনো সম্বন্ধই নাই। রন্তিপুর নামে ভারতবর্ষে কোনো জায়গা আছে বলিয়া জানি না। দশপুরের বর্তমান নাম দশাের ; মানচিত্রে যে-শহরটি মন্দশাের বলিয়া লেখা থাকে উহাই দশাের বা প্রাচীন দশপুর। মন্দশার সিন্ধিয়া রাজ্যের মন্দশাের জেলার প্রধান শহর। ব্ৰহ্মাবর্ত (৪৮)—সরস্বতী ও দৃষগতী এই দুইটি অতি-প্রাচীন ও পবিত্র নদীর মধ্যবর্তী পবিত্র দেশ। সরস্বতীর আধুনিক নাম সরসুতী। হিমালয়ে উৎপন্ন হইয়া রাজপুতানার মরুভূমিতে বিলুপ্ত হইয়াছে। আর বর্তমান চিটাঙ, নদীকেই প্রাচীন দৃষহী বলিয়া পণ্ডিতেরা মনে করেন। চিটাঙ, সারসুতী ও যমুনার মধ্যে প্রবাহিত। কনখল (৫০)-এখনও এই নামেই পরিচিত। মূরিদ্বার ( প্রাচীন নাম গঙ্গাঘার) হইতে দুই মাইল দূরে গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত। এই স্থানেই গঙ্গা হিমালয় হইতে সমতল ভূমিতে অবতরণ করিতেছে। আলেয়াদ্রি (৫৭)- হিমাদ্রি । আলেয়াদ্রি মানে প্রয়গিরি নয়। আলেয় মানে হিম। সেইজন্যই হিমালয়কে প্রালেয়াত্রি বলা হয়। আলেয় কথার সহিত প্রলয়ের কোনাে সম্বন্ধ নাই। ক্রৌঞ্চর (৫৭)—হিমালয় পর্বতশ্রেণীর উত্তর-প্রান্তবর্তী (উপতটম্) একটি পর্বতের নাম ক্রৌঞ্চ। একটি পৌরাণিক কাহিনী মতে পরশুরাম (ভূপতি) কৈলাস পর্বতে মহাদেবের নিকট ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করিতেন। কোনো সময়ে দেব-সেনাপতি স্কুলের সহিত স্পর্ধা করিয়া তিনি তীক্ষ্ণ শরাঘাতে ক্রৌঞ্চ পৰ্বত ভেদ করিয়া সেই পথে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন। ইহাই ক্রৌঞ্চঙ্গু। কিন্তু আসল কথা এই যে, ক্রৌঞ্চৱন্ধু, হিমালয় পর্বত yo শ্রেণীর ভিতর দিয়া তিব্বতে যাইবার একটি পাস বা গিরিসঙ্কট। বদরীনাথের কিছু উত্তরে হিমালয়ে “নিতি” নামে যে-গিরিসঙ্কট আছে তাকেই কেহ কেহ প্রাচীন ক্রৌঞ্চর বলিয়া মনে করেন। মানস সরােবরে যাওয়ার সময় হংসরা পূর্বোক্ত ক্রৌঞ্চন্ধে র ভিতর দিয়াই হিমালয় অতিক্রম করে বলিয়া উহার নাম হংসার। কৈলাস ও মানস (৫৮, ৬২)-কৈলাস গিরি ও মানস সরােবর তিব্বতের অন্তর্গত। অলকা (৬৩)—কৈলাসের কোলে কবি-কল্পিত নগরী, কুবেরের রাজধানী। মানলি মেঘদূতে উক্ত নবী, পর্বত, জনপদ প্রভৃতির প্রকৃত সংস্থান দেখাইবার জন্য একটি মানচিত্র দেওয়া হইল। এমন কোনো কোনো স্থানও ইহাতে দেখানো হইয়াছে যা কালিদাসের সময়ের নহে অথচ প্রাচীন ভারতের ভৌগােলিক অবস্থা বুঝিবার পক্ষে সহায়ক। মেৰ যে-সমস্ত নদী, পর্বত, জনপদ প্রভৃতির উপর দিয়া গিয়াছিল তাদের নাম এবং মেষের পথরেখা লাল কালিতে ছাপা হইল। শ্রীপ্রবােধচন্দ্র সেন Amrita rakas
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.