Makardah Saraswat Library, Howrah

Shibshakti Ed. 1st

Bandyopadhyay, Sri Bhupendranath · 2009/07/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শিবশক্তি
(পৌরাণিক নাটক)
মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত
( প্রথম অভিনয়—১১ই ফাল্গুন শনিবার সন ১৩৪১ সাল)
ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নৃত্যলাল শীলস্ লাইব্রেরী
২২, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা
এক টাকা

প্রকাশক–শ্রীননীগােপাল শীল
নৃত্যলাল শীলস্ লাইব্রেরী,
২২ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
(প্রথম সংস্করণ
প্রিন্টার-শ্রীননীগােপাল শীল
‘বিজলী প্রেস’
৯৮৩, আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

উৎসর্গ পত্র
বঙ্গরঙ্গমঞ্চের এবং চিত্রজগতের
খ্যাতনামা প্রয়ােগশিল্পী
পরম স্নেহভাজন
শ্রীমান কালীপ্রসাদ ঘােষ বি, এস-সির
করকমলে
‘শিবশক্তি’
'আমার
আন্তরিক স্নেহ ও প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ
উপহার
দান করিলাম।
ভূপেন্দ্রনাথ

No text on this page.

• ১ “শিবশক্তি” নাটকের প্রথম অভিনয়-রজনীতে অনিয়সংক্রান্ত ব্যক্তিগণ প্রােপ্রাইটর শ্ৰীযুক্ত সলিলকুমার মিত্র বি, কম্। ম্যানেজার জ্ঞানেন্দ্রকুমার মিত্র। প্রযােজক কালীপ্রসাদ ঘােষ বি, এসি। নৃত্যশিক্ষক সাতকড়ি গঙ্গোপাধ্যায় ( কড়ি বাবু)। শ্ৰীমান পরেশচন্দ্র বসু (পটল বাবু)। ঐ সহকারী অনিলপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী। বংশীবাদক ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পিয়াননা-বাদক কালিদাস ভট্টাচার্য। হারমােনিয়ম-বাদক বিদ্যাভূষণ পাল। সঙ্গী সতীশচন্দ্র বসাক। স্মারক বিমলকুমার ঘােষ। ঐ সহকারী সুবােধকুমার বসু। কোকিলকণ্ঠানুকরণকারী তারাপদ দাস। ০ ০ ০ ০ ০ ০ D D ১০ মহাদেবের ভূমিকায় তারকের নারায়ণের ইব্দের মৈনাকের অধর্মের শ্রীমান শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। জয়নারায়ণ মুখােপাধ্যায়। বিজয়নারায়ণ মুখােপাধ্যায় বি, এ। বঙ্কিমচন্দ্র দত্ত। কামখ্যাচরণ মুখােপাধ্যায়। কুসুমকুমার গােস্বামী। সুশীলকুমার ঘােষ। গােপালচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য। সনৎকুমার মুখােপাধ্যায়। ০ ০ ০ ••• কুবেরের । মদনের D নন্দীর চন্দ্রের ভূমিকায় মান উমাপদ বসু। } সূর্যের শরৎচন্দ্র সুর। হতাশনের গিরিরাজের ••• ১ } সনাতন শৰ্ম্মার ••• নন্দকের ••• কুন্তলের ••• পল্লবকুমারের অনাথনাথ মুখােপাধ্যায়। রজনীকান্ত ভট্টাচাৰ্য্য। প্রফুল্লকুমার দাস (হাজু বাবু)। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। গােষ্ঠবিহারী ঘােষাল। রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী। বিষ্ণুচরণ, তারা দাস, বিনয় চক্রবর্তী, সন্তোষ ঘটক, রতন সেনগুপ্ত, কালী- জীবন মজুমদার, জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী, মণি চট্টোপাধ্যায়, প্রভাত মল্লিক, অনিল রায়, ত্রিপুরাচরণ বন্দ্যো- পাধ্যায় প্রভৃতি। মিস্ সুশীলাবালা ( ছােট )। তারকবালা ( লাইট, }। আঙ্গুরবালা। (দবগণের উমার ভূমিকায় শচীর রতির ••• মেনকা ও সত্যােলা । S লােহিতার D দুন্দুভির রাকা মিশ্রা অঘা, মগা, বগা ও দাগার করুণাময়ী (মটর)। তারকবাল (জুনিয়ার) রাজলক্ষ্মী (খেদি)। . . . ••• ••• লীলাবতী, বকুল প্রভৃতি।

নাট্টোলিখিত ব্যক্তিগণ ••• পুরুষগণ মহাদেব স্বর্গচ্যুত দেবরাজ তারকাসুর স্বর্ণাধিপতি धमन রতিপতি গিরিরাজ ••• উমার পিতা মৈনাক গিরিরাজের পুত্র সনাতন শৰ্মা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কুন্তল সনাতনের ভাবী জামাতা পল্লবকুমার শ্রেষ্ঠপুত্র নক গৃহস্থ ব্রাহ্মণ অঘা, মগা, বগা, দাগা নন্দকের পুত্ৰচতুষ্টয় অধৰ্ম্ম, চন্দ্র, সূর্য, হুতাশন, কুবের, কার্তিক, দেবগণ ও অসুরগণ । ••• ••• • • • স্ত্রীগণ ইন্দ্রের পত্নী শচী রতি ••• মদনের পত্নী ••• মেনকার কন্য। উমার সখী পদ্ম ••• দুন্দুভি, ••• সনাতনের স্ত্রী রাকা ঐ কন্যা মিশ্র পল্লবের স্ত্রী লােহিত নন্দকের স্ত্রী পরিচারিকা, উমাসঙ্গিনীগণ, সহচরীগণ, এয়ােগ, বেবীগণ ইত্যাদি।

No text on this page.

শিবশক্তি প্রথম অঙ্ক প্রম শ্য স্ব-দেবরাজসভা সমিত পট মণ্ডৰতল :: {র নিয়ে সূর্য, হতাশন, পবন, বরুণ, এমন প্রভৃতি দেবগণ উপবিষ্ট । চন্দদেব স্বয়ং সকলক ভার্থনা ও তত্ত্বাবধান করিতেছেন। সভার মধ্যস্থলে নৃত্যশালা অঙ্গরাগণ। (দবগণ । (তারকের প্রবেশ ) জয় স্বর্গাধিপতি তারকের জয় ! · জয় প্রবল পরাক্রান্ত বীরশ্রেষ্ঠ তারকের জয় । স্বাগত-স্বাগত হে বীর অমরপ্রধান। প্রভু ! ত্রিদিবাধিপতি। লহ আন্তরিক শ্রদ্ধা ভক্তি পূজা- চল। সমবেত সমগ্র সুরের। কৃতার্থ অমরগণ- প্রভুসনে মিলিবার লভিয়া সুযােগ।

শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক সূৰ্য্য। ন্যায়ধৰ্ম্মে প্রতিষ্ঠিত-- সুশাসনে রক্ষিত এ স্বর্গরাজ্য তব,- মুর্তিমতী শান্তি সুশৃঙ্খলা বিরাজিছে প্রতি ঘরে ঘরে! আমি দাস তব—চন্দ্রলােকস্বামী, আর—আমার অধীন রাজভক্ত প্রজা চন্দ্রলােকবাসী যত, আবালবৃদ্ধবনিতা সবে বন্ধ রবে আজীবন অবিচারে রাজাদেশ করিতে পালন। প্রবল প্রতাপশালী ওহে স্বর্গাধিপ! মিত্রবর চন্দ্রলােকপতিমুখে ব্যক্ত হৃদিভাব আমা সরকার সূৰ্য্যলােকবাসী সমগ্র প্রজার প্রতিনিধি আমি, রাজপদে করি নিবেদন, রব চিরদিন ত্রিদিবপতির সেবক-অধীন–দাস । জয় স্বর্গাধিপতি তারকের জয়! সমবেত দেবতমণ্ডলী বিদ্যাধর গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর- যক্ষ আদি প্ৰজাবর্গ মম, আজি অতি শুভক্ষণে মহোৎসবে মিলিত সকলে, দেবগণ। তারক।

প্রথম দৃশ্য ] শিবশক্তি দেবগণ। তারক । দেবগণ। রাজা-প্রজা—একস্থানে এক চন্দ্রাতপতলে ! আজি এই শুভ সম্মেলনে, সমগ্র প্রজার রাজভক্তিনিদর্শনে, কি আনন্দতে বহিতেছে প্রাণে মম, ভাষা নাহি পারে বর্ণিবারে। জয় স্বর্গাধিপতির জয়। ধন্য ধন্য আমি স্বর্গ-অধিপতি, ধন্য মম প্রজারূপী সুহৃদ-সজ্জন, মম স্বর্গসিংহাসন, তােমাদের পা গুণে, চিরতরে বহিবে অটল, এতদিনে বুনিনু নিশ্চিত। জয় জয় ত্রিদিবাধিপতি তারক মহান! বুঝিলাম এতদিনে তবে, • সার্থক আমার-স্বর্গ অধিকার। রাজ্যে মম শত্রু নাহি কেহ, বিদ্রোহ-পতাকা উড়ান না হবে কভু নিৰ্ম্মল এ রাজনৈতিক আকাশে। আছি প্রভু মহাসুখে তােমার অনে! যথাযােগ্য সম্মান প্রদানে- কৃপাগুণে তুষিয়াছ দেবগণে! কত শান্তিসুখে, করি বাস দৈত্যের রক্ষণে। বল কোন প্রাণে অশান্তি সৃজিব এই শান্তির আরে ! জয় স্বর্গাধিপ্রতি তারক বীরের জয় । তারক। ০ চন্দ। দেগণ।

শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক শচীর প্রবেশ ) শচী। আরও—আরও উচ্চকণ্ঠে বিদারি গগন, ওহে দেবগণ, হে গন্ধ-যক্ষ-রক্ষ-সিদ্ধ বা চারণ, উপস্থিত যে আছ হেথায়, কর জয়গান দানবরাজের। কে-কে-কে এ রমণী রক্ষীগণ দেবগণ। চন্দ্র। শচী । চলবে ! বঙ্গীরে কি প্রয়ােজন? বিতাড়িত করিবে আমারে- এই ঘৃণ্য দাসত্বের সভাস্থল হতে ? চমৎকার চমৎকার-- দেবতার পরিণাম এই পূত-পবিত্র এ স্বর্গপুরী, থে একদিন দেবতার হ’ত অধিষ্ঠান, বিধাতার বিচিত্র বিধান, আজি সেই পুণ্যস্থানে—সর্বোচ্চ আসনে, শােভে এক অস্পৃশ্য অসুর,- আর পদতলে তার, সারি সারি দেবতার দল- ইষ্টদেব জ্ঞানে-যুগল চরণে তার, দাসত্বের ভক্তি-অর্ঘ্য করিছে প্রদান। দূর হও উন্মাদিনী তারক।

প্রথম দৃশ্য } শিবশক্তি ৫ শচী। নহে-রমণীর মর্যাদা না বলে, প্রগল্‌ভতা-সীমা যদি করে সে যেন । চিন্তা নাহি হে ধীমান্ । নরক-সদৃশ এই স্থান সুনিশ্চয় এখনি ত্যজিব। ওঃ-- এতদুর—এতদুর—ভাবি না মনে। এত নিম্নস্তরে পতিত দেবতা.- হেন কথা কল্পনায় ওঠে নাই কত ? চল, সূর্য, বরুণ, পবন, যম, হুতাশন আদি,- ত্রিলােকপূজিত দেবগণ) যত হেরি আজি অসুরের পদলেহী । কহ দেবগণ- কে এই উন্মতা রমণী ? অনুমানি পরিচিতা তােম। সবকরি । তারক। - শচী। এই উন্মাদ রমণী হা-হা-হা-উন্মাদ রমণী? সত্য-সত্য- স্বজাতি স্বদেশবাসী যত দেবতার কুৎসিত আচারহীন ব্যবহার, উন্মাদিনী--জ্ঞানহারা করিয়াছে মােরে । ত্রিলোেকপূজিত এই অমরার পবিত্র আসন,

শিবশক্তি
[ প্রথম অঙ্ক
ক
পুণ্যক্ষেত্র এই স্বর্গপুরী-
হেরি আজি দানবের অধিকার ;-
তাই এই মস্তিষ্ক-বিকার ঘটিয়াছে মম !
যেথা যাই এই স্বর্গপুরে,
হেরি চারিধারে—ঘােরে ফেরে—গৰ্বোন্নত শিরে
কদাকার অসুর প্রহরী,-
আর রাজরাজেশ্বরী আমি, অনাথা রমণী,
পতিপুত্রসনে,
নিরাশ্রয়-অসহায় ভ্রমি পথে পথে !
ক গহন কাননে-শৈলে—মরুভূমে,
অনাহারে অনিদ্রায়-উপায়বিহীন ।
ত্রিদিবের রাণী ছিল যেই একদিন
সৰ্বারাধ্যা পূজনীয়া তােমা সকার,
কহ দেবগণ !
দৈবের বিপাকে--
যদ্যপি সে হয় ভিখারিণী,
উন্মাদিনী সম আচরণবিচিত্র কি তার ?
—সেকি—সেকি ? শচীদেবী?
দেবি—দেবি ! একি দশা হেরি মা তােমার?
চল হেথা হতে
এ দানবসভা-তব যােগ্য স্থান নহে মাতা
দেবগণ ।
এই কি সে ভুবনমােহিনী শচী-
পুরন্দর-পত্নী
তারক।
চন্দ্র।
তারক।

প্রথম দৃশ্য }
শিবশক্তি
রসনা সংযত কর দুরন্ত দানব।
দেবেন্দ্র-মহিষী আমি,-দেবাঙ্গনা,
স্বর্গের ঈশ্বরী।
ঘৃণ্য দানবীয় ভাষা-
প্রয়ােগ না কর মােরে !
ধৈৰ্য্য ধর বরাননে !
স্বর্গাধিপসনে আলাপনে,
আত্মহারা—ধৈৰ্য্যচ্যুত নাহি হও।
কবে একদিন ছিলে তুমি ত্রিদিবের রাণী,
মানি আমি তাহা ।
কিন্তু এবে তুমি সামান্যা রমণী,
দীন-হীনা-ভিখারিণী,
আসিয়াছ মম অধিকারে।
এ দশায় সাজে কি তােমারে
সেই দম্ভ—সেই দর্প—গর্ব-অহঙ্কার?
দৈত্যনাথ !
দম্ভ সাজে তার চিরদিন
পরাধীন নহে যেই জন !
দর্প—গর্ব-অহঙ্কার-তার শােভা পায়,
শত দৈন্য-দুঃখ-তাড়নায়,
যেবা নাহি চায়
দাসত্ব-শৃঙ্খল গলে করিতে ধারণ।
গেছে রাজ্য সিংহাসন,-
সম্পদবৈভব পরহস্তগত,
শচী।

শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক । ত দৈাজ—চিরদিন দেবরাজ, সৰ্বশ্রেষ্ঠ এ তিন ভুবনে,- স্বাধীনতাধনে তিনি নহেন বঞ্চিত। নহে পদানত-বিক্রীত জীবন তঁার- ছার দানবের প্রসাদ লাভের তরে। বীর দম্ভভরে ভ্ৰমিছেন পুরন্দর স্বকাৰ্য্য-সাধনে,- শিরে শােভে স্বাধীনতা-গৌরব-মুকুট, প্রভায় যাহার সমুজ্জ্বল দশ দিশি। আমি সেই দেবেন্দ্রমহিষী, দর্পিত—গতি-বীরের বনিতা। তুচ্ছ গণি তােমা সম দৈত্যের কুটী ! হে অমরগণ ! এই হেতু আজি স্বর্গলােকে মহােৎসব আয়ােজন ? তবে,-সন্দেহ আমার নহে অমুলক ? তারক। প্রাণে প্রাণে গূঢ় উদ্দেশ্য মহান্ চন্দ্র। ছিল সবাকার, অপমান করিতে আমারে কৌশলে সম্মান প্রদর্শনছলে ? প্রভু ! স্বর্গাধিপতি। রাখ রাখ মিনতি দাসের ;- অকারণ কষ্ট নাহি হও— আমা সবাকার প্রতি।

৯
প্রথম দৃশ্য।
শিবশক্তি
ঈশ্বর শপথ কহি-করহে প্রত্যয়
এই দৈব দুর্ঘটনা হেতু,
তিলমাত্র নহি মােরা অপরাধী।
যদবধি রাজ্যচ্যুত পুরন্দর,
দেখি নাই চক্ষে কভু তারে --
কিম্বা পত্নীপুত্রে তার ।
দুর্দৈৰ অপার,-
কোথা হতে অকস্মাৎ ঝটিকার প্রায়
এ সভায় উপনীতা শচীদেবী।
অন্যদেবগণ। সত্য কথা, কিছু নাহি জানি মােরা ?
যাও—ধেয়ে যাও হে অমরগণ !
পড় গিয়ে প্রভু-পদমুলে !
নহে,—তুষ্ট নাহি হবে কঠোর দানব !
হের ঐ আরক্ত নয়ন,
ভস্ম বুঝি করে বা এখনি !
চন্দ্র।
পৰে ধরি—দেবী—
কৃপা করি যাও অন্তরালে,-
নহে কর অন্যত্র প্রয়াণ !
তারক।
কোথা যাবে দুঃশীলা রমণী ?
বন্দিনী করিয়া আমি রাখিব তােমারে !
শিখাইব বিধিমতে—
রাজেশ্বরে সম্ভাষিতে হয় বা কেমনে ?
দেহরক্ষীগণ !
বন্দী কর দুষ্টা ললনারে।

শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক শচী। সাবধান.ফেরুপাল ! একপদ হলে অগ্রসর পদাঘাতে বিচূর্ণিব শির! ( প্রস্থানােতা) তারক। বন্দী কর রমণীরে—আদেশ আমার । দেবগণ। (স্ব স্ব অস্ত্র বাহির পূৰ্ব্বক) কার সাধ্য- ইন্দ্রাণীর করে অপমান ? তারক। ধন্য ধন্য হে অমরগণ - ধন্য তব দেবযােগ্য আচরণ! কত তুষ্ট আমি আজি তােমাদের পরে, ভাষা নাহি পারে বর্ণিবারে ! বন্ধুগণ ! বিস্ময়ের নাহিক’ কারণ কিছু আর ? ন্যায়ধৰ্ম্মে প্রতিষ্ঠিত এ রাজ্য আমার, ভিত্তি তার তােমরা সকলে । শুধু পরীক্ষার ছলে- বাহিক এ কঠোরতা মাের! রমণী-পীড়ন এই অভিনয় মম মাত্র পরীক্ষিতে ধৰ্ম্মবল তােমা সবাকার ! রমণীর মর্যাদারক্ষায়, স্বার্থত্যাগে কতদুর সক্ষম সকলে, কুতূহলে আজি পাইয়াছি পরিচয়। নাহি ভয়, ধার্মিক তারক-চিরদিন শক্তি-উপাসক।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
অজ্ঞাত নহেকে তার,
শক্তি-অংশ-সমুদ্ভুত
রমণী সংসারে !
দেবি !
করহ মার্জনা—এই ছলনা দাসের ।
যাও—যথা ইচ্ছা তব ?
ঘাের শত্রু বটে পুরন্দর মম,
কিন্তু-তুমি সদা মিত্র বলি জানিও আমারে।
[ অভিবাদনপূর্বক প্রস্থান ]
জয় স্বর্গাধিপ তারকের জয় !
( শচী নির্বাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন)
দেবগণ।
দ্বিতীয়দুশ
স্বর্গ-প্রান্ত
অধৰ্ম্ম
( কুবেরের প্রবেশ)
কুবের। জয় দেবতা ! জয় দেবতা ! জয় দেবতা !
( একেবারে অধৰ্ম্মের পদতলে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইয়া পড়িল )
অধর্ম। কে ? কে তুমি?
কুবের। আজ্ঞে—আমি কুবের। মশায়ের সঙ্গে আলাপ করে আমি যে কি
খুসী হয়েছি তা একটা পােড়ার মুখে ঠিক প্রকাশ করতে পারছি না।
অনেকদিন ধরে আমি মশায়ের তল্লাস কচ্ছিলেম, কিন্তু সুবিধে আর
কিছুতেই করে উঠতে পাচ্ছিলেম না। বরাৎ সুপ্রসন্ন,-তাই এখানে

১২
শিবশক্তি
[ প্রথম অঙ্ক
মশাইকে পাইচারী কর্তে দেখে একেবারে চরণ-চুটকীতে এসে
হুমড়ে পড়েছি।
অধৰ্ম্ম। আপনি কি আমাকে চেনেন ?
কুবের। আজ্ঞে চিনি বৈ কি দেবতা! আপনি হচ্ছেন শ্রীশ্রীঅধৰ্ম্মদেব ।
আপনাকে না চেনে কোন শালা !
অধৰ্ম্ম । আমাকে অকস্মাৎ খুজছিলেন কেন?
কুবের। দায়,—বিষম দারে পড়ে তবে আপনাকে ধ্যানে আনতে হয়েছে !
নইলে—কোন আঁটকুড়ির বেটা সাধ করে শ্রীশ্রীঅধৰ্ম্মদেবের শ্রীচর
স্মরণ করে বলুন?
অধৰ্ম্ম। দায়ে পড়ে আমাকে স্মরণ ক'রেছো?
কুবের। আজ্ঞে ! মশায়ের সেবা কল্লে প্রথম প্রথম দুশাে রগড়-সাতশে
মজা,—কিন্তু শেষটা একেবারে গাওয়া ঘিয়ে পাপর ভাজা হয়ে
হিংএর গন্ধে নিজেই প্রাণান্ত হতে হয়। ১
অধৰ্ম্ম । তুমি কি আমার নিন্দাবাদ করার জন্য আমার সঙ্গে আলাপ
কৰ্ত্তে এসেছে?
কুবের। দোহাই—দোহাই মশাই! এতটুকু যে আপনার নিনে করে তার
বাপ নিৰ্ব্বংশ হােক্ ! আরে বাপরে! আপনার নিন্দে ক'ৰ্ব্ব ?
আপনি না থাক্‌লে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে—মুড়ি মিছরীর যে একদর হােতাে।
ধৰ্ম্মের তা হলে ত্রিলােকে কোন কদরই থাকতো না। আমার যদি
প্রাণের কথা শােনেন—তাহলে আমি বড় গলা করে বলি,-তামি
মশায়ের মােলায়েম আশ্রয় নিজে যদিও না নিতে ইচ্ছে করি-
আপনাকে আমি মস্ত লােক বলে মনে মনে কিন্তু খুব ভক্তি করি।
অধৰ্ম্ম। বুঝলেম-তুমি খুব সরল-প্রকৃতি। যা—এখন আমার নিকট
• তােমার প্রয়ােজন কি ব্যক্ত কর।

দ্বিতীয় দৃশ্য ! শিবশক্তি । কুবের। আজ্ঞে,—ঈষৎ একটু কষ্ট স্বীকার করে আমাকে আর আমার হতভাগা জাতিভাই দেবতাগুলােকে, ছটাক খানেক কৃপারি প্রদান কৰ্ত্তে হবে। খুব বেশী নয়,—যতটুকু মশায়ের ইচ্ছা। অপৰ্ম্ম। আমার দ্বারা যা সম্ভব হবে—সত্য বলছি তােমার জন্য আমি এখুনি তা কর্তে প্রস্তুত আছি। আমি তােমার কথায় অত্যন্ত তুষ্ট হয়েছি। কুবের। আজ্ঞে, তাতে হবেনই-তাতাে হবেনই। আপনার কাছে একবার বে আসে,--আপনি চিরদিনই তাে তাকে সমাদর করে থাকেন। তা জানি—তা জানি। তা হলে? আমি বছিলেম কি, বলি- ধৰ্ম্ম তাে আপনার মহাশত্র,-এ কথাতো অস্বীকার করবার উপায় নাই ? অধৰ্ম্ম। ধর্ম আমার বৈমাত্রেয় ভ্রাত! কিন্তু ধৰ্ম্ম আমার শত্রু কি মিত্র, এ কথা আমার মুখ থেকে না হয় নাই শুলেন। তবে, এটা বলাই বাহুল্য যে কাৰ্য্যক্ষেত্রে আমরা পরস্পর পরস্পরের বিরােধী। কুবের। ব্যস্-ব্যস, ঐ কথাই আমি একবার ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম, মাত্র । তাহলে শুনে নি কি বলতে চাই। সেই ধৰ্ম্মকে আশ্রয় করে আজ একদল নগণ্য অসুর একেবারে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মস্ত নাম কিনে ধর্মের প্রভাব দেখিয়ে ঢাক বাজিয়ে ধর্মের জয়গান করে বেড়াচ্ছে, আর বলছে যে, একমাত্র ধৰ্ম্মের বলেই ইচ্ছা কলে—আমার মতন ইন্দ্রত্ব পর্যন্ত লাভ করা যায়। আপনার বৈমাত্র ভায়ের এতটা দর্প কি মশাই—শক্তিমান হয়ে সহ কৰ্বেন ? অধৰ্ম্ম। আশ্চৰ্য্য ! সত্য বল তুমি কে ? তুমি কি অন্তর্যামী ? অথবা তুমি কোন কুহকী ? তুমি কেমন করে—আমার অন্তরের কথা জানতে ১৪ শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক কুবের। কিছু মনেকৰ্ব্বেন না। কদিন থেকে হঠাৎ মশায়ের প্রতি আমার কিঞ্চিৎ প্রেমের সঞ্চার হয়েছে। আমি একজন ছােট-খাট স্বর্গবাসী দেবতা! এখন অসুরের তাড়া খেয়ে-পশুর মত চাদ্দিকে লম্ফ দিয়ে বেড়াচ্ছি। অধৰ্ম্ম। তুমি আজ হতে আমার পরম মিত্র বলে পরিগণিত হলে । মিত্রবর! বল—এক্ষেত্রে কি কলে—তােমার আমার উভয়ের কার্যসিদ্ধি হবে। কুবের। সােজা কাজ তাে পড়ে রয়েছে, এর আর বলাবলি কি ? মশাই একটা কিছু বকম করে-ধৰ্ম্মাত্মা তারক অসুরকে বুদ্ধি বিবেচনা মন্ত্রণা দেবার জন্য তার কাছে গিয়ে উপস্থিত হােন ! তঁার স্বর্গরাজ্যের কিসে উন্নতি হয়,—কি কলে দেবতার রাজত্বে তাকে চোরামারি রাজা বলে মানায়,—কি চালে চল্লে যথার্থ প্রবল প্রতাপান্বিত স্বর্গা- ধিপতি বলে সকলে তার নাম নেই ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে, কি ভাবে দুর্বল বিজিত প্রজাদের ধনসম্পত্তি মায় তাদের স্ত্রী- পুত্রদের পর্যন্ত টানাটানি কম্নে রাজ্যে ঠিক্ শান্তি রক্ষা হয়, এই সব মহাশয়ের যা স্বভাববাচিত সূক্ষ্ম কাৰ্যাবলি আছে,সেইগুলি একে একে তার দ্বারা সুরু করুন। ব্যস তারপর দেখি আপনার ধর্মদাদা মশাই কোথায় থাকেন। আর গরীব আমরা—মহাশয়ের গুণ কীৰ্ত্তন কৰ্তে কর্তে মনের সুখে সংসারযাত্রা নির্বাহ কৰ্তে থাকি। অধৰ্ম । একাজ আমার পক্ষে মােটেই শক্ত হবে না। তারক এখন স্বর্গাধিপ,—ঐশ্বৰ্য্যবান্। ঐশ্বৰ্য্যবান্ ব্যক্তিকে করায়ত্ত করা অধর্মের পক্ষে যত সহজ—এক দীনহীন ভিখারীকে করায়ত্ত করা তত সহজ নয়। বন্ধু! তুমি নিশ্চিন্ত হও;-আমি নূতন কার্যক্ষেত্রে চল্লেম। ইচ্ছা হয়,—তুমিও আমার সঙ্গে আসতে পার।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
০
কুবের। আজ্ঞে—আমি বেতাে মানুষ, আপনার মত বগা ঠ্যাং চালিয়ে
ছুটতে তত পিরবােনা। আপনি অগ্রগামী হােন্। যখন আলাপ
পরিচয় হেলাে—দেখা সাক্ষাৎ মধ্যে মধ্যে আমার কৰ্ত্তে হবে
বৈকি!
অধৰ্ম্ম । ভাল-তােমার যা অভিরুচি--
[ অধর্মের প্রস্থান
কুবের। ব্যস্ বাবা—একেবারে কাজের চূড়ান্ত করে দিলুম। আরে
ছাই,-এ নইলে যে আর কোনােদিকে রাস্তাই ছিলনা ! একা দেবরাজ
কদিক্‌ কৰ্বেন বল ? দু একজন আমরা যদি মাথাটাতা না খাটাই,
তাহলে ও দৈত্য বেটারা যে রকম স্বর্গধামে শেকড় গেড়ে বসেছে,---
ওরা কি সহজে ঠাইনাড়া হবে ? যখন বে দিক দিয়ে সুবিধে
হবে, সেই দিক দিয়েই কাজ চালাতে হবে! এই রকম নানা
ফন্দি ফিকির আঁটিতে আঁটতে ঝা করে একটাতে গিয়ে একদিন
একদিন পাত্তা লেগে যাবেই যাবে! বড় ধৰ্ম্ম করেছ বাবা তারক।
এইবার অধৰ্ম্মের ঠ্যালাটী সাল্লাতে পার চাদ—তবে বুঝবাে বাপের
ব্যাটা! আরে—ওটা আবার কে আসে? ষণ্ডা বটে—কিন্তু দৈত্য
বেটাদের মত গণ্ডারের চেহারা নয় তাে! আমাদেরই জাত ভাই
বলে মনে হচ্ছে যে ! একটু গা ঢাকা দিতে হল।
[ অন্তরালে অবস্থান
(মৈনাকের প্রবেশ )
মৈনাক। এ কি ! কোথায় আইমু ?
সত্য কিবা দিভ্রম হইল আমার ?
করি বাস এতকাল সাগর-নিবাসে,
আসি উন্মুক্ত বাতাসে

শিবশক্তি { প্রথম অঙ্ক জ্ঞানহারা-দিশে হারা করিল আমারে? -না—এইতাে সে স্বর্গধাম। কিন্তু—কই হেথা স্বর্গবাসী দেবগণ ? ভীষণদর্শন প্রাণী অগণন- ঘােরে ফেরে চারিধারে। ( কুবেরের প্রবেশ ) কুবের। আজ্ঞে হ্যা—ভীষণদর্শনই বটে। আরও খানিকটা এগুলেই- দেখবেন এক এক বেটা ভীষণদশন । তাদের এক একটা দাত যেন এক একখানি কোদাল । মৈনাক। কেবা তুমি মহাজন ? কুবের। মহাজনই যখন বলছেন—তখন তাে 'পরিচয় জানবার বাকী কিছু রইলাে না! আমি ঐ মহাজন শ্রেণীরই লােক বটে, কেবল পরের ধন আগলে নিয়ে বেড়াচ্ছি। এখন তুমি কে, বল দিকি বাপু ! দিব্বি ভদ্রলােকের মত চেহারা মৈনাক। পরিচয় দিব অতঃপর । কহ মহাশয় হতেছে সংশয়- কি পরিবর্তন ঘটিয়াছে স্বর্গপুরে? বহুকাল পরে এসেছি ত্রিদিবে, তেঁই বিবরণ কিছু নাহি জানি। যে দিকে ফিরাই পাখি দেখি যেন সকলি নূতন। প্রত্যক্ষ নেহারি বটে-

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
১৭
;
সেই সে অমরাবতী পুরী মনােহর,
উপবন নিকুঞ্জ সুন্দর,
সেই মন্দাকিনী বহিছে তটিনী,
দেবতার বাসযােগ্য অট্টালিকাশ্রেণী
কিন্তু তবু মনে হয়,
এ নয় সে পুরাতন স্বর্গধাম—
পুণ্যস্থান দেবের আবাসভূমি ।
কুবের। আর দেবতার আবাস ! স্বচক্ষে দেখছে তাে বাবা, চাদ্দিকে
মােটা মােটা বেউড় বাঁশ ফুলে ফুলে বিরাজ কচ্ছে! স্বর্গে আর
দেবতার পাত্তা বড় পাবেনা,এটা এখন দত্যিদানার কুস্তির
আখড়া !
মৈনাক। মহাশয় !
কহ সমুদয় স্পষ্ট করি,
রহস্যজড়িত বাক্য না পারি বুঝিতে।
কুবের। জানাবই বা কি—আর শুবেই বা কি-আমার গুষ্টির পিণ্ডি !
তারক নামে এক বেটা অসুর,—বিপর্যয় রকম তপস্যার জোরে—ব্রহ্মাকে
তুষ্ট করে—বাগিয়ে বর নিলেন-“আমি স্বর্গ জয় করে—ইন্দ্রকে
তাড়িয়ে—তার জায়গায় বসেখােসমেজাজে ভােগদখল করিতে
রহিব।” ব্রহ্মা বল্লেন—“তথাস্তু।” তারপর এই হা।
মৈনাক। সত্য? সত্য ? নহে মিথ্যা ?
নহে এ কৌতুক ?
সত্য কহরহস্য না কর মাের সনে।
পরাজিত পুরন্দর?
নিৰ্বাসিত বর্গ হতে শৃগালের প্রায় ?

১৮ শিবশক্তি [ প্রথম অঙ্ক = হা-হা-হা-হা——অতি শুভ সমাচার ! সত্য যদি হয়—শুন মহাশয়, আজি হতে দাস আমি দানবরাজের। এই শক্তি—এই ভুজদ্বয় এই কৰ্ম্মক্ষম দেহ মাের, দৈত্যের সেবায় নিয়ােজিত করিব নিশ্চয়। জয় জয় দয়াময় ভগবান- এতদিনে প্রতিহিংসা হইল সাধন। কুবের। আরে মজাতে মন্দ নয় ! আমায় তাে মহাজন বলে নিজেই খাতির কলে,—কিন্তু তুমি তাে দেখছি একেবারে মহাযম ! দয়া করে পরিচয়টী তােমার দাও দিকি চাদ ! ব্যাপার কিবল তাে খােলস। করে। হঠাৎ দেবরাজের সর্বনাশে প্রাণটীতে তােমার আমােদের মালসাভােগ চড়লে কেন? মহাত্মন্ ! কি কহিব দুঃখের কাহিনী মম। হিমাচল-পুত্র আমি মৈনাক আমার নাম ! অনুমানি জান এ কাহিনী, পূৰ্ব্বকালে ছিল পক্ষধারী–সমগ্ৰ পৰ্ব্বতকুল । হয়ে ব্যোমচারী-বিমানবিহারী, অবাধে ভ্ৰমিত যথা তথা ! কি কহিব অঘটন কথা ! পৰ্বত-আশ্রয়ী দৈত্যগণে স্বর্গরাজ্য আক্রমণে করিতে বিরত, - দ্বিতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি ১৯ - দৈত্যভয়ে ভীত পাপী পুরন্দর,- করি পক্ষচ্ছেদ গিরিকুলে সবাকার, গতিশক্তিহীন—জড় সম- সচল পৰ্বতকুল করিল অচল । তদবধি ইন্দ্র প্রতি দারুণ বিদ্বেষ মম । প্রতিহিংসা কেমনে সাধিব, অনুক্ষণ এই চিন্তা অন্তরে আমার ! সুসংবাদ পেয়েছি হে তােমার প্রসাদে ! বিপদে পতিত-দুৰ্ম্মতি সে পুরন্দর, অন্তর আমার তবু তাহে তৃপ্ত নহে ! নিজ হস্তে করিতে দুর্গতি তার, অদম্য বাসনা জাগে চিতে নিরন্তর। যাই আমি স্বৰ্গজয়ী তারকের পাশে, বাসবের সর্বনাশে সহায় হইতে । | মৈনাকের প্রস্থান কুবের। যাঃ চলে ! এ তাে বেজায় গণ্ডগােল করে ফেলুম ! এ হে-হে- হে-এ বেটাকে সঠিক খবরটা না শশানালেই তো ভাল হত। ই- একে এই বেটা তারক অসুর-তার কাছে পাঠালুম অধৰ্ম্মকে, আবার তাদের দলে গিয়ে জুটলাে এই বেটা ষণ্ডা গণ্ডা মৈনাক ! গণ্ডগোেল বেজায় পালাে তে ! [ প্রস্থান ----

তৃতীন্ন দৃশ্য
স্বর্গধাম-প্রান্তর
( ইন্দ্র ও শচীর প্রবেশ)
দেনি । সত্য কহি তােমার সকাশে-
ভগ্নপ্রাণ উৎসাহ-বিহীন আমি !
দিবাযামী অমঙ্গল-ভীতি-
নিমজ্জিত করে মােরে নৈরাশ্য-সাগরে।
স্বরাজ্যলাভের কি আছে উপায় ?
নাহি হেরি সহায় সম্বল,
নাহি দৈববল ।
দেবতা সকল
দাসত্ব-শৃঙ্খল গলে পরেছে স্বেচ্ছায়।
অকাতরে সহে দৈত্যের পীড়ন,
তবু হায় –
মাতৃ-দুঃখ নিবারণে কারও নাহি মন,
একতা-বন্ধনে বদ্ধ কেহ নাহি হয়।
দেবরাজ ! বাক্য মম করহ প্রত্যয়,-
দুর্দশায় তিলমাত্র না হই কাতর ।
নহি আমি ব্যথিত-অন্তর,
হইয়ে বঞ্চিত
স্বর্গসুখ বিলাস-সম্ভোগে !
নিরন্তর জাগে প্রাণে এই মহাদুঃখ,
শর্চ।
==
-

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
২১
ইন্দ্র।
ই
স্বজাতি সুহৃদগণ আত্মজন সবে-
মিলিয়াছে দেশবৈরি দৈত্যগণ সনে ।
অত্যদ্ভূত রহস্যের কথা !
কেহ কেহ আসে মম পাশে,
মিষ্টভাষে উপদেশ দিতে মােরে --
দানবের আনুগত্য করিতে স্বীকার ।
শুন প্রিয়ে—
হয়তাে বা একদিন স্বর্গোদ্ধার হবে ।
কিন্তু চিরকাল রবে-
এই শেল অন্তরে আমার,
স্বৰ্গদেশবাসী স্বদেশী আত্মীয়গণ মাের,-
ঘাের স্বার্থপর-হেন হীনচেতা।
ও বিধাতাহেন বিড়ম্বনা,
স্বপনেও ভাবি নাই কভু !
===
(নারায়ণের প্রবেশ
নারায়ণ। বিধি-বিড়ম্বনা নহে পুরন্দর--
কৰ্ম্মফল সকলি তােমার।
(ইন্দ্র ও শচীর স্তবীতি )
জয় শঙ্খগদাধর-নীলকলেবর—পীতপট্টাম্বর—দেহি পদম্ ।
চন্দনচর্চিত—কুণ্ডলমণ্ডিত-কৌস্তুভলাঞ্ছিত—দেহি পদ।
বিশ্ববিমােহন-মানসমােহন—সংস্থিতিকারণ—দেহি পদম্ ।
ভক্তজনায়—দীনদয়াময়—চিন্ময়-অচ্যুত—দেহি পদম্ ।

२२ শিবশক্তি [ প্রম পামরপাবন—ধর্মপরায়ণদৈত্যনিসূদন—দেহি পদম্ । জয় নিত্যনিরঞ্জন-দুর্গতিভঞ্জন—সজ্জনরঞ্জন—দেহি পদ। (স্তবান্তে উভয়ের প্রণাম ) অন্তর্যামী নারায়ণ ! দীনবন্ধু হরি পতিতপাবন ! আসিয়াছ ? দেবতার অহঙ্কার- চূর্ণ হেরি বিধিমতে, পূরিল কি অভীষ্ট তােমার ? এবে জানিতে বাসনা জনার্দন। দেবতার দুর্দশার কত বাকী আর ? ওহে লীলাধার ! অভাগা ইন্দ্রের এ দুর্গতিভােগ, অভিপ্রায় তব ছিল যদি প্রাণে, স্বর্গ-সিংহাসনে কি কারণে তবে বসাইলে তারে ? কেন বা এ দাস পুরন্দরে অমরত্ব করিলে প্রদান ? নারায়ণ। ধৈৰ্য্য ধর সুবদনে—সময়ে সকলি হবে শচী। হে বাসব- কৰ্ম্মফল সবাকার বলবান ; কেহ নাহি পায় ত্রাণ- ত্রিজগতে কৰ্ম্মফল হতে ! কিন্তু ওহে পুরন্দর !

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
;
অবস্থার হেরি রূপান্তর,
এত কাতরতা কি কারণে?
অনলসংযােগে-
স্বর্ণশুদ্ধ হয় যেই মত,
মলিনত্ব ঘুচে যায় তার,
সেইরূপ এ দারুণ পরীক্ষা-অনল,-,
সৃষ্ট তব কৰ্ম্মফল হতে,
বিদুরিতে হৃদিগ্লানি বিলাসসঞ্জাত।
হােক সে দেবতা ধাতা সৰ্বশক্তিমান্,
সীমাবদ্ধ স্থান—সুখে দুঃখে সবাকার !
স্বর্গসুখে বিলাস বৈভবে,
ছিলে মত্ত হে বাসব নিশ্চিন্ত অন্তরে
কভু ভাব নাই বারেকের তরে,
লুপ্ত হবে ইন্দ্ৰত্ব ইন্দ্রের !
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মােহের বিকারে,
অহঙ্কার আদি রিপুচয়,
অধিকার করিয়া হৃদয়,
জ্ঞানহারা,-উন্মত্ত করিল দেবদলে।
তেঁই কৰ্ম্মফল হইয়া প্রবল,
জ্ঞানচক্ষু ফুটাতে সবার,
সার বাক্য স্পষ্টাক্ষরে দিল বুঝাইয়ে,
“চিরদিন সমান না যায়”
রক্ষিত হইল তায়,
সৃষ্টিস্থিতি-সামঞ্জস্য প্রকৃতি-নিয়ম।

২৪
শিবশক্তি
[ প্রথম অস্ক
শচী।
নারায়ণ।
প্রভু!
ক্ষমা কর অজ্ঞানের শত অপরাধ,
অদৃষ্টের সনে বাদ আর না করিব।
ভুলিব না কভু এ জীবনে আর,--
দুঃখ যেবা যত পায় এতিন ভুবনে,---
শ্রীহরির কৃপালাভ তত হয় তার।
নারায়ণ !
এই মাত্র করি কৃপা কহ দেবগণে,-
কত যুগ-যুগান্তর-পরে-
হবে অবসান পাপ কৰ্ম্মভােগ !
শুন পুরন্দর !
ধৰ্ম্মবল ক্ষুন্ন এবে দেবতামণ্ডলে,
সাধনার বলে বর্ণণী সমগ্র অসুর !
বিনা নব সাধনায়,
বল—সাধ্য কার দমিবে তাদের ?
যদি কভু অলৌকিক কৰ্ম্ম-অনুষ্ঠানে,
শিবশক্তি সম্মেলনে,-
মহাধর্মবল পার করাতে সৃজন
দেবগণ মাঝে,
তাহারি সংঘাতে-
অনিবাৰ্য জেনাে হবে দৈত্যের পতন!
যাও কর অন্বেষণ,
মহাশক্তি কোথা করে অবস্থান ।
শক্তিহারা এবে দেবদেব মহাদেব,-

তৃতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি, কর তারে শক্তিদানের উপায় ! শিবশক্তি-সম্মেলনে—মহাধর্মবল- দেবমাঝে হইলে সৃজিত, হবে তাহে ইষ্টলাভ—তব অবহেলে । [ প্রস্থান প্রণমি পুণ্ডরীকাক্ষ শ্রীপদ-কমলে ,

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
কৈলাস পর্বতের সানুদেশ
নন্দী।
নন্দী।
শুন্য-শূন্যময় কৈলাস-আলয়,
শুন্য-শূন্যময় জগৎসংসার !
ঘাের তমাচ্ছন্ন বিকট আঁধার,
মানাই—মা নাই।
কঁাদ কাওরে কঁাদরে অভাগা-
মাতৃহারা অনাথ সন্তান!
কে ডাকিবে আর স্নেহমাখা স্বরে ?
—মা নাই-মা নাই !
কে তুষিবে আদরে সােহাগে,
–মা নাই-মা নাই।
কই অন্নপূর্ণা-অন্ন কেবা দিবে ?
-মা নাইমা নাই।
কালযজ্ঞে নিমন্ত্রণ হ’ল দক্ষপুরে,-
কত সাধ করে,
গিয়েছিনু সেথা আনন্দময়ীর সাথে,
নারিনু ফিরাতে আর মায়েরে আমার !

প্রথম দৃশ্য ]
শিবশক্তি
২
সে অবধি হাহাকার চারিধারে,
মা আমার নাই-মা আমার নাই।
(ইন্দ্রের প্রবেশ )
নন্দী--নন্দী—কেন মূহ্যমান ?
ছাড় শােক,কৰ্ম্মে হও আগুয়ান।
রহিয়াছ আত্মহারা-আত্মভােলা হয়ে,
রাখ কি সন্ধান,
কোথা মাতা মহামায়া-
নন্দী।
নবরূপে করে অবস্থান ?
কোথা মাতা কে দিবে উত্তর ?
=-
হে বাসব,
“কোথা মাত” এ কথার
কি দিব উত্তর আমি ?
এই মাত্র জানি শুধু,
মাতা নাই কৈলাস-আলয়ে –
আমি মাতৃহারা !
মহামায়া তিনি,
শুনি লােকমুখে--
সবই তার মায়াখেলা
লীলার চাতুরি !
মুখ-জ্ঞানহীন,-
কিছুই বুঝিতে নারি।
বুঝিয়াছি মর্মে মর্মে এই কথা শুধু,
মা আমার নাই—আমি মাতৃহারা !

২৮ শিবশক্তি [ দ্বিতীয় অঙ্ক -না-নন্দী- নন্দী । এও কি সম্ভব ? অন্তৰ্হিতা বিশ্বমাতা ? মা নাই—মা নাই,—এও কি সম্ভব ? শিবশক্তি ভেদ তবে ? মহাশক্তি লুপ্ত ত্রিজগৎ হতে? অসম্ভব-অসম্ভব- অসম্ভব নেহারি সম্ভব, সকলি অদৃষ্ট দোষে ! কিবা অসম্ভব কি হয় সম্ভব, কে জানিবে—কেমনে বুঝিবে আর ? হের শক্তিহীন শির্ব- শবে পরিণত। চৈতন্যরূপিনী মা নাই আমার, শবে কেবা করিবে চেতন ? মহাশক্তি বিলুপ্ত সংসারে ? -না-না—মানিনা একথা ! শক্তি সুপ্ত সুনিশ্চয় আছে লুক্কায়িত, জাগরণে অপেক্ষা কেবল। নন্দী-নন্দী-খ অনুরােধ, যাচে তব সহায়তা দেবেন্দ্র বাসব,- আমি শক্তিহারা মাতৃহারা আজি - ইন্দ্র।

দ্বিতীয় দৃশ্য শিবশক্তি, ২৯ তােমারি সমান! চল—করিব সন্ধান কোথা মহাশক্তি করে অবস্থান! করি প্রাণপাত- শিবশক্তি মিলাব নিশ্চয়। নহে,—বিশ্বসৃষ্টি জগৎসংসার- লুপ্ত হােক প্রলয়-আঁধারে। [ নন্দীকে লইয়া ইন্দ্রের প্রস্থান দ্বিতীয় দৃশ্য গিরিরাজ ভবন (উমার বাল্যসথীগণের গীত ) লোতে খেলা আস্ব না আর রাজার বাড়ী। দেখলে উমা রাখবে ধরে, এইবেলা চল সরে পড়ি। ( কত) রং বেরংএর পুতুল নিয়ে আমরা করি গেলা,- { ওম) কি ঘেন্না,রাজকন্যা–ঘাটুছে কাদার ড্যাল। গড়ছে ঠাকুর আপন মনে, তার ) ছাদ ছিরি নাই কোনো স্থানে ;- রাজার মেয়ে হলে বুঝি,-সবেতে হয় বাড়াবাড়ি। [ গীতান্তে সখীগণের প্রস্থান

শিবশক্তি
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
(মৃত্তিকা-নিৰ্ম্মিত শিবলিঙ্গ লইয়া গাহিতে গাহিতে
উমার প্রবেশ)
===
আমার মাটীর পুতুল আমার কাছে এই ভালো।
আপন হাতে গড়ে পুতুল,-
খেলতে আমি বাসি ভালাে।
ওরা কেন করে কাপাকাণি ?
এতে দোষ কি তা নাহি জানি।
আমার, প্রাণ বলে সে আছে সাথে সাথে,
চোখ জানে তারে আলো।
উমা। তা,ওর রাগ করে কেন? আমি যে পুতুল নিজের হাতে গড়ে
খেলা কর্তে ভালবাসি। তাতে সখীদের
রাগ হয় কেন ?
পরের হাতে গড়া পুতুলে আমার যে মন ওঠেন! আর,“আমি পুতুল
গড়তে গেলেই,—এই রকম পুতুলটীর আকৃতি হয়ে পড়ে ! কে যেন
আমার কানে কানে বলে,—এই আমার ঠাকুর ! একে ফুলবিল্বপত্র
দিয়ে পুজো কৰ্ত্তে হয় ! যাই,-উপবন থেকে বেলপাতা
নিয়ে আসি।
[ উমার প্রস্থান
( অন্যদিক দিয়া গিরিরাজের প্রবেশ )
গিরিরাজ। উম-উমাশশান্ মা ! কোথায় যাচ্ছিস্?
(মেনকার প্রবেশ)
মেনকা । কেন মহারাজ ! উমার জন্য এত উতলা হন্ কেন ? উমা
আমার,আমাদের না বলে কয়ে—রাজ প্রাসাদ ছেড়ে এক পা’ কোথাও
যাবে না। আপন মনে সঙ্গিনীদের নিয়ে খেলা ধুলাে কচ্ছে,কেন
তাকে বিরক্ত কৰ্তে চান ?

দ্বিতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি ০ ? p গিরি। বিরক্ত কি রাণি ? আমি চাই,“উমা দিনরাত্রি আমার চোখের সম্মুখে থাকুক। আমার কাছে বসে খেলা করুক। আমি উমাকে না দেখলে,সত্যই যেন পলকে প্রলয় জ্ঞান করি! রাজ্ঞি। উমা হতেই আমি মৃতজীবনে পুনরায় প্রাণ লাভ করেছি। একমাত্র বংশধর মৈনাককে হারিয়ে—দগ্ধ মহীরুহের ন্যায় এতকাল জীবন যাপন কচ্ছিলেম! উমাকে যদি কন্যারূপে না পেতেম—তাহলে কি আর সংসারে বাস কৰ্তেম? আর এ রাজ্যের দিকে ফিরেও চাইতেম না ! মেনকা। মহারাজ! উমাকে লাভ করে আমাদের মৃতদেহে জীবন সঞ্চার হয়েছে সত্য,কিন্তু মৈনাক যে আমাদের নয়নতারা । আমরা যে মৈনাককে হারা হয়ে অন্ধ হয়ে রয়েছি। মহারাজ! এখনও কি তার কোনাে সন্ধান কর্তে পাল্লেন না ? গিরি। কি ক’ব্ব রাণি? চারিদিকে”ােক প্রেরণ করেছি,নিজে কত সন্ধান কচ্ছি, তবু মৈনাকের কোনও সংবাদ পাচ্ছিনা! নিষ্ঠুর ইন্দ্র মদগৰ্বে গর্বিত হয়ে আমাদের কি সর্বনাশই কল্লে ? তারই ভয়ে, মৈনাক আমার অজ্ঞাতবাস কচ্ছে ! রাণি ! ধৈর্য ধারণ কর, এইবার মৈনাক নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। ইন্দ্র এখন স্বর্গভ্রষ্ট,—শক্তি- হীন,পথের ভিখারী! ইন্দ্রের দর্প চূর্ণ হয়েছে ! মৈনাক এ কথা শুনলেই মহানন্দে রাজ্যে ফিরে আসবে ! মহিষি ! উমা আমার • কোথায় খেলা কর্তে গেল, তাকে একবার আনতে পাঠাওনা? মেনকা। ব্যস্ত হবেন না মহারাজ ! উমা রাজোদ্যানে ফুল তুলতে গেছে,এখুনি আবার একটা আব্দার নিয়ে আমাদের কাছেই আসবে এখন ! গিরি। রাণি ! যত দিন যাচ্ছে—মায়ার পুতুলি উমা ততই আমাদের শিবশক্তি [ দ্বিতীয় অঙ্ক মায়ার শৃঙ্খলে আবদ্ধ কচ্ছে! উমার বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমার চিন্তার বুদ্ধি,—আশঙ্কার বৃদ্ধি হচ্ছে ! এত যত্নের,এত আদরের,এত সােহাগের প্রাণসমা নন্দিনী আমার,—পাষাণের ঘর আলাে করে রয়েছে,-পাষাণে প্রাণ সঞ্চার করে রয়েছে। রাণি ! আর দুদিন পরে মায়ামমতা বিসর্জন দিয়ে সেই কন্যাধনকে পরের হাতে অর্পণ কৰ্ত্তে পরের গৃহে বিদায় দিয়ে, নিজের গৃহ শ্মশান কৰ্ত্তে হবে। ও-কালাভে পিতামাতার এই যন্ত্রণাদায়ক পরিণাম। মেনকা। মহারাজ! সে জন্য বৃথা চিন্তায় ফল কি বলুন ? মেয়ে দিয়ে ছেলে পাব,—সে তাে সুখের বিষয় ! এখন হ’তে সন্ধান করুন,যাতে উমা আমার সুপাত্রে পড়ে! ঐ দেখুন মহারাজ,-লীলাময়ী ত্রিলােক- মােহিনী উমা আমার,—রূপের সাগরে তরঙ্গ তুলে দশদিক আলাে করে এই দিকেই আসছে ! (উমার পুনঃ প্রবেশ । মেনকা। উমাউমা—কোথায় গিয়েছিলি মা? গিরি। একি মা? তােমার চক্ষু দুটী ছলছল কচ্ছে কেন? মুখখানি বিষন্ন কেন? কি হয়েছে মা আমার ? উমা। বাবা! সখীরা আমার উপর রাগ করে চলে গেছে। ডালুম—তবু এলােনা ? মেনকা। কেন তারা রাগ কল্লে ? গিরি। তােমার মুখখানি দেখলে,-তােমার মিষ্টি কথা শুনলে,—সবাবই যে রাগ দুঃখ শােক দূর হয় উমা ! তবে তােমার সঙ্গিনীদের এ বিরাগ কেন? উমা। বাবা ! তারা সব গয়না পরা,-কাপড় পরা,—রং করা পুতুল নিয়ে ৬ " খেলা করে!

দ্বিতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি উমা। মেনকা। তােমারও তাে সে রকম পুতুল যথেষ্ট আছে, মা! আমার সে পুতুল নিয়ে খেলা কর্তে যে মন ওঠেনা মা! আমি নিজে মাটী মেখে ঠাকুর তৈরি করি,—তাকে পুজো করি,তাতে আমার ভারি আনন্দ হয়! এই দেখ মা-(বক্ষ হইতে মৃত্তিকার শিবলিঙ্গ বাহির করণ ) গিরি। ছি—ছি—কি করেছ মা! হাতময়,–গাময়,কাদা একি ঠাকুর গড়েছ উমা ? উমা । অমন কথা বােলােনা বাবা ! ঠাকুর শুলে রাগ কৰ্বেন ! হা মা- আমার ঠাকুর গড়া কি ভাল হয়নি? মেনকা। বেশ হয়েছে মা,—চমৎকার হয়েছে ! তুমি যাতে আনন্দ পাও,—তাই কর ! উমা। তবে, বাবা আমার ঠাকুরের নিন্দে কচ্ছেন কেন ? তােমার ঠাকুর তাে কই দেখতেই পাচ্ছিনে! ও তত খানিকটা কাদার ড্যালা! তােমার ঠাকুরের নাম কি শুনি ? আমরাও তাহলে তােমার সঙ্গে পুজো ক’ ! উমা। আমার ঠাকুরের নাম- গিরি। ( সন্ন্যাসীবেশে নন্দীর প্রবেশ ) নন্দী। দেব-দেব অনাদিদেব! খানিকটা কাদার ড্যালার ভেতর বিরাজ কচ্ছে ! অমন নির্বিকার তাে আর কোন দেবতা নয় মহারাজ । একটু গঙ্গাজল আর গােটাকতক শুক্ননা বেলপাতায় তুষ্ট হয়ে ত্রিলােক- বাসীকে একেবারে চতুৰ্বর্গ ফলদান কওেঁ-এমন পাগল ঠাকুর তো আর কোথাও নেই। গিরি। কে-কে আপনি প্রভু ?

৩৪
শিবশক্তি
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
নন্দী। সন্ন্যাসী,ভিখারী,-দেখেই বুঝতে পাচ্ছেন তাে!
উমা! ভিখারী ? এস আমি তােমায় ভিক্ষা দিচ্ছি ! বাবা! ভিক্ষা দিতে
আমি বড় ভালবাসি,আমি হাতে করে একে ভিক্ষা দোবাে।
গিরি। দাও মা, তুমিই ভিক্ষা দাও! রাণি ! ভিক্ষাদ্রব্য এনে উমার
পবিত্র হাত দিয়ে অতিথিসৎকার কর। আমি একবার রাজসভা
থেকে এখুনি আসছি।
[ গিরিরাজের প্রস্থান
মেনকা। সন্ন্যাসী ঠাকুর ! একটু অপেক্ষা করুন—আমি ভিক্ষা আছি।
[ মেনকার প্রস্থান
নন্দী। (স্বগত) ওহহ !—কতকাল—কতকাল পরে আবার রাঙ্গা চরণ
দেখতে পেলুম! মা শিবসিমন্তিনি! সতীরাণি ! কৈলাসধাম শূন্য
করে—লুকিয়ে গিরিরাজের ঘর আলাে করে রয়েছ মা?
উমা। সন্ন্যাসি ! তােমার বাড়ী কোথায় ?
নন্দী। কেন? সেখানে যাবার কি সাধ হয়েছে ? যদি তা হয়ে থাকে,
তবে আর বিলম্ব ক’চ্ছ কেন মা?
উমা। তােমার বাড়ী আমি যাব কেন ?
নন্দী। আমায় অন্ন দেবে! ত্রিলােককে অন্ন দেবে যে অন্নপূর্ণা ? এখানে
থাকলে তো তােমার চলবে না। মা--মা—অনেকদিন দেখিনি,
একটু স্থির হয়ে পঁাড়া, তােকে একবার ভাল করে দেখি ।
উম। আমায় আবার কি দেখবে? তুমি কেমন ভিখারী?
নন্দী। আমি মা-হারা—অনাথ—কাঙ্গাল—ভিখারী । আমার বৃদ্ধ ভিখারী
বাপ,-আমার ভিখারিণী মাকে হারিয়ে—পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
ত্রিভুবন ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছেন। তিনি আর তাে ভিক্ষায় বেরুন না !

দ্বিতীয় দৃশ্য। শিবশক্তি নন্দী। সেই বাবার জন্যে আমি মাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। তুমি আমাকে “মা” ভিক্ষা দাও। উমা। যাও,আমি তােমায় ভিক্ষা দেবাে না। দাও,—চলে যাচ্ছি,—কিন্তু স্থির জেনে রাখাে,এই কাঙ্গাল ছেলেকে ভিক্ষে দেবার জন্যে একদিন আকুল প্রাণে তাকে খুঁজতে হবে ! সৰ্ব্বনাশি ! ভিক্ষায় বঞ্চিত করে আর কতকাল এইভাবে লুকিয়ে থাক্‌বি ? উমা। একি সন্ন্যাসি? তুমি অকারণ আমায় গালি দিচ্ছ কেন? আমি তােমার কি করেছি বাছা ? নন্দী। কি না করেছ পাষাণি? মা-অন্ত-প্রাণ এই কাঙ্গাল ছেলেদের সুধামাখা মাতৃস্নেহ হ'তে বঞ্চিত করে পালিয়ে এসেছে ! কতকাল, কতকাল “মা” বলে ডাকতে পাইনি,-মায়ের পা দুখানি পূজা কর্তে পাইনি! দিবারাত্রি কেবল “মা-মা” বলে কেঁদে নয়নজলে বুক ভাসাচ্ছি!এতেও কি তােমার পাষাণ প্রাণে আঘাত লাগছে না? আর,—সেই একজন উন্মাদ ভিখারী সদানন্দ!—তার যে কি দুর্দশা কি দুরবস্থা,-তা একবার চক্ষে দেখে আসবি চল্ মা,-তাহলে বুঝতে পাৰ্বি,কার কতটা সৰ্ব্বনাশ তুই করেছিস্? উম। কে সে সন্ন্যাসি? কই,আমি তো তার কথা শুননি! তাকে তাে চিনি না ! নন্দী। চেন না? প্রতারণাময়ি—ছলনাময়। দিবানিশি বার মুর্তি গড়ে মনে মনে পূজা ক’চ্ছ,—বার মুক্তি বুকে ধরে রেখেছ,-তাকে চেন না? উমা। আমার খেলার ঠাকুরের কথা বচ্ছ? বলবল সন্ন্যাসী,-তার কেমন রূপ ? সে রূপতো আমি কিছুতেই মনে আনতে পাচ্ছি না। '

শিবশক্তি
| দ্বিতীয় অঙ্ক
নন্দী। শিব-শুভঙ্কর,শশাঙ্কশেখর,—বিভূতিভূষিত কলেবর !
তরঙ্গভঙ্গিত, ভুজঙ্গরঙ্গিত, কপর্দমর্দিত মহেশ্বর।
বৃষভবাহন, ত্রিশূলধারণ, শ্মশানচারণ দিগম্বর ।
দীর্ঘ জটাজুট,-কণ্ঠে কালকূটনটনাথ হরগঙ্গাধর।
উমা । আ মরি মরি ! আমার হাতে-গড়া ঠাকুরটী এমন,—তাতো
জানতুম না? ভিখারি! তুমি রাগ কোরােনা,আমি কি বলতে
তােমায় কি বলেছি ! তুমি যা ভিক্ষা চাও,আমি তাই তােমায়
দোবাে ! তুমি একবার আমায় আমার এই ঠাকুরটীকে দেখাবে ?
( ইন্দ্রের প্রবেশ )
ইন্দ্র।
তােমায় দেখা দেবার জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন! তুমি কি
দয়া করে তাকে দেখা দেবে ?
উমা। হা—আমি নিশ্চয় তাকে দেখতে যাবাে। তুমি কে ?
ইন্দ্র। আমিও তােমার আর এক ছেলে !
উমা। আমি বাবা-মার অনুমতি নিয়ে তােমার সঙ্গে যাব। তুমি কবে
আমায় নিয়ে যাবে?
ইন্দ্র। আমি তােত তােমায় নিয়ে যাবার জন্য সকল সময়ই প্রস্তুত।
উমা। সন্ন্যাসি ! দাড়াও তােমায় ভিক্ষা এনে দিই ।
এখন তাে তােমার হাতে ভিক্ষা নােবাে না !
উমা । কেন? কবে তুমি আমার হাতে ভিক্ষা নেবে?
নন্দী।
ববে তুমি আমার মা, হবে। যবে তােমায় আমি প্রাণ ভরে—প্রাণ
খুলে “মা-মা” বলে ডাকতে পাবাে !
উমা।, এখনও তাে আমায় মা বলে ডাকতে পার। আর এই যে কতবার
“মা” বর্ষে-
নন্দী।

দ্বিতীয় দৃশ্য )
শিবশক্তি
নন্দী।
নন্দী। ওতে যে তৃপ্তি হ’ল না । এখন যে তুমি পুরের মেয়ে ;-পরের
মেয়েকে “মা” বলে ফল কি ?
উমা। তােমার মা কেমন করে হব বলে দাও !
আমার মা হতে কি সত্যই তাের ইচ্ছে হয়েছে ? ছলনাময়ি !
তবে আর ছলনা করিনি। আর বৃথা মায়ায় আবদ্ধ হয়ে সকলকে
মায়ার অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রাখিসনি ! মায়াময়ি ! সৃষ্টি রক্ষা ক !
চারিদিকে হাহাকার-চারিদিক শ্মশান-শুন্যময়!—আর লুকিয়ে
থাকিনি মা! আয়—ফিরে আয় ! নিজের সংসার নিজে অধিকার
করে বসে,-ত্রিসংসার রক্ষা কর !
[ নন্দীর প্রস্থান
উমা। একি! ভিখারী যে চলে গেল ? ভিক্ষা নিলে না ? ওগাে !
তুমি ওকে ডাকনা! ভিখারি—ভিখারি । ভিক্ষা নিয়ে যাও!
আমি সত্যই তােমার “মা” হব ।
[ উমার প্রস্থান
করুণাময়ি! এত করুণা তােমার ?—তা নইলে কি তুমি জগতের
মা হতে পার ?
[ ইন্দ্রের প্রস্থান
০

তৃতীয় দৃশ্য
মদনের নিকুঞ্জবন
মদন, রতি ও সহচরীগণ
গীত
স-গণ। এ চাদ হাসে লো কোন্ গগনে ?
প্রেমিকে পাগল-করা সুখ-স্বপনে !
পিয়াসী চকের ওই আকুল তৃষায়,
বিভল নয়নে মুখপানে চায় ;
কভু ফিরে আসে সুধা-লালসায়,
কভু ফেরে নিরাশায় ব্যথিত-প্রাণে।
রতি।
কেনলে সজনি, চমকি দামিনী,
মিশায় অাধার গগনে,-
সুখ কই বল সই মিলনে- ..?
স-গণ। ( আসে) আবার মিলিতে সে তত মধু-মিলনে :
রতি।
প্রণয়ে ঝটিকা উঠে,--হৃদিল দেয় টুটে,--
সুপধ যায় ছুটে জীবনে ;
তবে, সুখ কই বল সই মিলনে ?
মান। ভালবেসে দুঃখ,-
প্রেমে সেই সুখ জীবনে।
( যদি ) বিরহে না দহে-
সুখ রহে কোথা মিলনে ?
এ
মান।
কহ প্রিয়ে,
কেন অকস্মাৎ হেন মানের উদ্ভব
?

তৃতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি রতি। কভু কি সম্ভব মদনের সনে বিচ্ছেদ রতির ? দিবারাতি দাস হয়ে, পড়ে আছি পদতলে তাের ;-- সুকঠিন তব প্রেমভাের, সাধ্য কিবা মাের করিতে ছেদন ? রতি বিনা মদনের অস্তিত্ব কোথায় ? ভ্রম—ভ্ৰমতব ওহে প্রিয়তম ! তুমি বিনা আমি নহি কিছু ! তুমি কায়—আমি মাত্র ছায়া তব ! কিন্তু আমি জানি বিধিমতে, ত্রিজগতে কিবা শক্তি ধরে রতি। তুমি কাৰ্য,আমি লাে কারণ! তুমি প্রিয়ে—সৃষ্টি-মূলাধার, -- আমি মাত্র ভারবাহী অগ্রগামী বাস। মদন। (দ্বৈত গীত ) তুমি বিনা আমি কিছু নই—ওগাে কিছু নই । তমালে মাধবী-লতিকা যেমতি, তোমাতে জড়িত রই। আমি ফুলকলি তুমি সৌরভ। তােমা ছাড়া মম বল কি গৌরব ? (আমি) চন্দ্রমা তুমি স্নিগ্ধ কিরণ- আমি মধুপ মুখ কমলে ওই। রতি। মদন। উভয়ে।

শিবশক্তি [ দ্বিতীয় অঙ্ক (অকস্মাৎ ইন্দ্রের প্রবেশ ) মদন। একি ? অকস্মাৎ দেবেন্দ্র উদয়, এ দীন নিকুঞ্জবাসে মম ? প্রভু ! প্রভু ! জানি কি মহাপুণ্য করেছি সাধন, দেবরাজ-দরশন,- পাইলাম অনায়াসে আপন আবাসে। কহ দাসে—কোন্ আজ্ঞা করিব পালন ? হে মদন- সঙ্গোপনে আছে কাৰ্য্য তব সনে, প্রয়ােজন নিভৃতে আলাপ ! ই। মদন। প্রিয়ে ! ক্ষণতরে মােরে দেহ অবসর। প্রমােদ-আগারে—সখীগণ সনে- কর গিয়ে আলাপন । যথাকালে করিব স্মরণ সবাকারে ! যথা আজ্ঞা নাথ ! [ রতি ও সহচরীগণের প্রস্থান কর দেবরাজ-আসন গ্রহণ ! (ইন্দ্রের আসন গ্রহণ অনুমতি কর প্রভু এ অধীনে, ত্রিভুবনে কোন্ কাৰ্য্য তব করিব সাধন, কৃতার্থ হইবে দাস-লভি সে আদেশ ! ক-কেবা ইন্দ্ৰত্ব-প্রয়াসী হয়ে, মন। = তৃতীয় দৃশ্য ]। শিবশক্তি ৪১ করে সুকঠোর তপস্যা বিজনে, যে কারণে তব প্রাণে বিদ্বেষ উদয় মহাশয় ! কহিনু নিশ্চয়, এই শরাসনে শর করিয়া সন্ধান, করি তারে মদনের দাস, সৰ্ব্বনাশ তার সাধি চিরতরে। কহ দেব-কেবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে তব, সংসার-যাতনা মােচনের তরে, হইয়াছে মুক্তিপথের পথিক ? ববে বিলাসিনী নারী, যুগল করিয়া চঞ্চল, বরষিধে শাণিত কটাক্ষ-শর,- শক্তিধর কেবা কোথা হেন, সেইক্ষণে বদ্ধ নাহি হবে প্রেমপাশে ? অথবা হে পুরন্দর ! কাতর অন্তর তব- কোন্ সে রূপসী লাগি,- পতিরতা—পতিব্রতা হয়ে যেবা, নাহি করে তব বশ্যতা স্বীকার ? যদ্যপি আদেশ মােরে, বিন্ধি তারে এই ফুলশরে,- প্রভাবে যাহার, অকাতরে কুলশীল লজ্জামান ত্যজি- ভজিবে স্বেচ্ছায় আসি তােমারে এখনি । -

শিবশক্তি
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
ত্যজি বিষণ্ণতা—হে বাসব !
অকপটে আত্মকথা ব্যক্ত কর মােরে !
যদি ঘটে থাকে হেন অঘটন,-
অন্য কোন রমণীর সাথে,
শুনি তব নব প্রেমাসক্তি-বিবরণ,
কোপােন্মত্তা তব পূৰ্ব্ব-প্রণয়িণী,
কোনােমতে তুষ্টা নাহি হয় ;
করিয়াছে এ হেন দুর্জয় মান,
পদে ধরি যারে শান্ত না পার করিতে ।
তােমারই সাক্ষাতে, মদন-সন্তাপে তারে,
এতদূর জর্জরিত করিবারে পারি,
সুকোমল পল্লব-শয়ন বিনা,
গত্যন্তর না রহিবে তার।
অমিতবিক্রম—তেজবীর্যের আধার,
নাহি কোন দৈত্য কি অসুর,
ষেবা, নাহি হবে শক্তিহীন
মদনের এই তীবাণে ।
কুসুমে নির্মিত যদিও এ শর,-
গুন পুরন্দর,তােমার প্রসাদে,
মম সখা বসন্ত-সহায়ে,
আমি যদি করি মন,
ত্রিশূল-ধারণ—সেই পিনাকী হরের,
চিত্তের চাঞ্চল্য ঘটাইতে পারি,
এত শক্তি ধরি আমি দেবরাজ !

তৃতীয় দৃশ্য ]]
শিবশক্তি
১
হে মদন ।
নিজকার্যে ব্যস্ত তুমি অনুক্ষণ,
জান না কি অঘটন
ঘটিয়াছে স্বর্গপুরে ?
করি সুকঠোর তপস্য-সাধন,
জম্বুদ্বীপবাসী তারক অসুর,-
বরলাভ করি পদ্মযােনী-পাশে,
অনায়াসে করিয়াছে স্বর্গ অধিকার !
বিতাড়িত করিয়া আমারে,
বসিয়াছে ত্রিদিবের সিংহাসনে,-
দেবগণে যত করিয়াছে কৃতাস ।
হে দেব ।
অত্যাশ্চর্য্য ভীষণ কাহিনী ;-
হেন সৰ্ব্বনাশ,
কল্পনায় না হয় উদয় ।
বল-বল—প্রভু! উপায় কি হবে ?
স্বর্গরাজ্য কিসে হইবে উদ্ধার ?.
রতিপতি! সম্প্রতি এ বিপদবারণে,
প্রয়ােজন সাহায্য তােমার !
দন।
ইজ।
হে মদন !
তব শক্তি অতুলন,
ত্রিসংসারে অবিদিত কার ?
শক্তিহীন যেথা খঙ্গ তরবারী,
কিম্বা শাণিত কৃপাণ,-ধনুক, ত্রিশুল,-

৪৪
শিবশক্তি
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
তােমার কৃপায়,-তব শরঘায়,
অরাতি-দমন-কাৰ্য্য হয় অনায়াসে !
শুন এবে,
যে কার্যের তরে আসিয়াছি তব পাশে ।
হিমাচলে বােগশৃঙ্গে দেবদারু-মুলে,
মহাযােগে মগ্ন এবে দেব দিগম্বর ।
করহ সত্বর-ধ্যানভঙ্গ তার।
ভবানী জননী,
দক্ষপুরে সতীদেহ করি বিসর্জন,
লভেছে জনম,
উমারূপে গিরিরাজপুরে।
আজি হতে বালিকা-রূপিণী উমা-
শিবব্রত উপলক্ষ করি,
আসিবে পূজিতে নিত্য যােগমগ্ন হরে।
সেই অবসরে,-
ব্ৰহ্মাণ্ডবিজয়ী তব ফুলশরে,-
হ-যােগ-ভঙ্গ করিয়া সাধন,
উমাপ্রতি তার,প্রেমের সঞ্চার,-
প্রধান কর্ত্তব্য শুন হে মদন
শিবশক্তি প্রেম-অনুরাগে,
পরস্পরে হইবে মিলিত
বিহিত পবিত্র শুভবিবাহ-বন্ধনে।
সেই সম্মেলনে,
যেই তেজস্কর জন্মিবে কুমার,
-

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
৪৫
তার করে অনিবাৰ্য দৈত্যের নিধন ।
হে মদন!
শুন কহি স্বরূপ বচন,
এ কাৰ্য্যসাধনে,-
আছে তব বিপদের আশঙ্কা মহান।
কিন্তু হায়,
দেবকুলে এবে কার আছে বা সম্পদ?
পদে পদে বিপদে পতিত সবে!
তবে, এই মাত্র ভরসা হে আমা সবাকার,
দেবতার সখা—তুমি চিরদিন,--
কোমল,উদার প্রাণ,
সদা আগুয়াণ,
দেবগণে—সাহায্য করিতে।
হৃষ্টচিতে কর রক্ষা মম অনুরােধ !
দেখাও জগতে,
স্বার্থত্যাগে—আদর্শ মদন,-
কীর্তিস্তম্ভ করহ স্থাপন বিশ্বমাঝে ।
সুরপতি!
কিবা হেতু মােরে এত অনুরােধ ?
তব আশীর্বাদে,
নির্বিবাদে দেবকার্য কবিব উদ্ধার ।
ফুলশর করিয়া প্রয়ােগ,-
যােগভঙ্গ করিব হরের।
কর প্রভু আশীষ এ দাসে।
মদন।
C

৪৬
শিবশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্গ
চিরমঙ্গ'লনিধান ভগবান,
মঙ্গলবিধান করিবেন সুনিশ্চয় ।
হে মদন ।
ভাগ্যহীন আমি এবে,
কিবা ফল হবে মম আশীৰ্বাদে।
[ উভয়ের প্রস্থান
তুই দৃশ্য
যােগশৃঙ্গ
( বােগমগ্ন মহাদেব )
(কোকিল,ভ্রমর, মলয়, কুসুম, বসন্ত, মদন, রতি প্রভৃতি)
গীত
কর, বিরহের অবসান,কর বিরহের অবসান।
মােরা,-এনেছি কোকিল-তান,---
এনেছি মলয়-গান,
ভাসাতে প্রেমিক প্রাণ নবীন হিল্লোলে।
দেখ কুতূহলে,-চাহ অাঁখি মেলে,-
বসন্ত আগুয়ান।
নচে পল্লব নবান পুলকে,
বহিছে মলয় দ্যুলোকে ভূলােকে।
সুগে মাতােয়ারা; কুসুম ভ্রমরা,
মনােচোরে সঁপে প্রাণ।
( আজি প্রকৃতি পেয়েছে প্রাণ।)
{ গীতান্তে মদন ও রতি ব্যতীত সকলের স্থান

চতুর্থ দৃশ্য ]
শিবশক্তি
৪৭
(ইন্দ্র ও পুষ্পপাত্র হস্তে উমার প্রবেশ ।
মাগাে !
ঐ দেখ দেবদারু-মূলে,-মহাধ্যানে মগ্ন,
মুক্তিমান ইষ্টদেব তাের !
ঘাের তপস্যায় রত,
বাহ্যজ্ঞান-তিরােহিত সমাধি-মগন।
প্রাণ ভরে কর দরশন ;-
কর পুজা সাধ মিটাইয়ে ।
আশুতােষ তুষ্ট হয়ে পূজায় তােমার,
মনােবাঞ্ছা তব করিবে পূরণ ।
যাই আমি-রহি অন্তরালে।
পূজা সাঙ্গ হলে,
লয়ে বাব আবাসে তোমার।
{ ইন্দের প্রস্থান
( ধীরে ধীরে উমা মহাদেবের পাদমূলে গিয়া বসিলেন)
( উমার স্তব )
জয়,-ঈশান শঙ্কর, বৃষধ্বজেশ্বর, মৃগাঙ্কশেখর, দিগম্বর।
জয়,-মশাননাটক, বিষাণবাদক, হুতাশভালক, মহত্তর ।
জয়,-সুরারিনাশন,-ভুজঙ্গভূষণ, বৃষেশবাহন, জটাধর।
জয়,—ত্রিলােককারক, ত্রিলােকপালক, ত্রিলােকনাশক, মহেশ্বর।
(পূজা ও প্রণাম )
মহাদেব । হ’লনা-হ’লনা---শক্তির সধান !
চঞ্চল হৃদয়,-স্থৈর্য ধৈৰ্য্য নাহি মানে ।

৪৮
শিবশক্তি
{ দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রাণে নাহি আসে একাগ্রতা।
কোথা সতী,কোথা সতী,
দিবারাতি এই কথা জাগে মনে।
ধ্যানে জ্ঞানে যােগাসনে,-
পড়ে মনে সতীর সে মুখখানি।
অহরহ' কঁদিছে পরাণী,
সতীর বিরহে শুধু !
হায় নারায়ণ !
কি কারণ বাদী হয়ে মম প্রতি,
স্কন্ধশায়ী সতীদেহ-হার,-
সুদর্শন-চক্রঘায় ছেদি খণ্ডাকারে,
সতীচিহ্ন বিলুপ্ত করিলে চিরতরে?
ভেবেছ কি হরি,
শিব রবে শক্তিহারা কভু ?
দেখুক জগৎ,-
শক্তিময় শিব সদা শক্তির সাধক,
শিবশক্তি ভেদ নাহি হয় !
এইবার বসি পদ্মাসনে,
সতীধ্যানে করি শক্তির সাধনা,
মানিব কোনাে বিঘ্ন আর ।
সতি! সতি।
দেহ শক্তি শক্তিহারা অশক্ত শঙ্করে!
(ধ্যানােপবিষ্ট )
=
=

৪৯ বুতি। তুর্থ দৃশ্য ] শিবশক্তি মদন। 'যা ও প্রিয়ে- রহ দূরে মম অপেক্ষায় ! হের মম আগমনে, বিচলিত হর সমাধি-দশায় । অপরূপ সংঘটন, পঞ্চপুষ্প-শর বরিষণ,- করি এইবার ! দেখাে নাথ-থেকে সাবধানে,-' হরকোপে যেন না হও পতিত ! যাই দুরে রহি আমি সখীগণ সনে। রতির প্রস্থান (যােড়হস্তে )- করুণা নয়নে, চাহ দাজীপানে,—ধর মম পূজা দেব ত্রিলােচন। আমি জ্ঞানহীনা, ভকতি-বিহীনা, কৃপাময় তুমি বলে সৰ্ব্বজন। তুমি অন্তর্যামী, কাতরা হে আমি,-হর হৃদিব্যথা, প্রভু আশুতােষ । কামনা আমার, বিদিত তােমার, দোষী যদি হই, পরিহর রােষ। মহাদেব। ব্যর্থ মম যােগেশ্বর নাম, তপজপ যােগধ্যান, অবসান চিরদিন তরে । সতী-সতী-সতীরে আমার । কোথায় লুকালি- ত্যজিয়া পাগল হরে ? উমা।

শিবশক্তি . [ দ্বিতীয়। দিবারাতি কঁদি আমি—খুজিয়া বেড়াই, তবু তাের না পাই সন্ধান ! ওরে,-কেরে নিলি হরে আমার সর্বস্বধনে ? ওরে,উন্মাদ ভিখারী ভােলা, শ্মশাননিবাসী, এ সংসারে তার কিছু নাহি ছিল ; কিছু না চাহিত, নাচিত আনন্দে ভূতপ্রেতসনে, একমাত্র অমূল্য রতনে- ছিল অধিকারী। ওরে-কেরে মােরে- সেই ধনে করিলি বঞ্চিত ? অকস্মাৎ মদনের হাত হইতে ধনুর্বাণ পড়িয়া গেল। তাড়াতাড়ি ধনুর্বাণ তুলিয়া লইল মদন ক একি ? একি বিপ্ন দেরকাৰ্য্যে করি নিরীক্ষণ ? কেন অকস্মাৎ,-করচ্যুত হ’ল শরাসন ? কঁপে থর থর অঙ্গ সমুদয়, মনে হয়,-অবসন্ন যেন হস্তপদ ! জ্যারােপণ-কি কারণ না পারি করিতে? এ কি? কোথা হতে হাহাকার রব- পশিছে শ্রবণে ?

তুর্থ দৃশ্য ]
শিবশক্তি
কেবা কাদে কাতর করুণ সুরে?
রতি—প্রাণেশ্বরীমদনের প্রিয়া?
এ রােদনধ্বনি কি তাহার ?
-না-দুর্বলতা অবশ্য ত্যজিব।
দেবকাৰ্য্য নিশ্চয় সাধিব !
চারিধারে দেবতামণ্ডলী,
উদগ্রীব হইয়ে—লক্ষ্য করে মােরে !
সােৎসুক নয়নে সবে চায় মম পানে,
কতক্ষণে কাৰ্য শেষ করি।
দৃঢ় করে পুনঃ ধরি ধনুর্বাণ,
হানি ফুলশর যােগমগ্ন হরে,
হয় হােক—অদৃষ্টে যা আছে !
( পুনরায় শরযােজনা )
(স্তব
উমা।
করিয়া যতন, হৃদি-সিংহাসন
পাতিয়াছি প্রভু—তােমারি কারণ।
হে ইষ্ট দেবতা। রাখ মাের কথা,
এস,ব’স,-কর কামনা পূরণ !
সাজিয়া যােগিনী, হইব সঙ্গিনী,
ছায়া সম কাছে রব নিরন্তর ।
ওহে ভবধব,-কি আর কহিব,-
সেবিতে চরণ-আকুল অন্তর ।
মদন। ঐ মেলিয়াছে হর ত্রিনয়ন—

শিবশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
উমা-দরশন হয়েছে এবার,-
আর নহে বিলম্ব উচিত।
(লশর নিক্ষেপ )
৫
মহাদেব । (উমাকে দেখিয়া )
কে তুমি বালিকা
এক মনে পূজিতেছ মােরে ?
মরি-মরি-
একি অলৌকিক রূপরাশি
ত্রিলােক দুলভ,-নেহারি সম্মুখে ?
-না-কি হেতু চঞ্চল হৃদি ?
বিচলিত মহেশের ধ্যান ?
হেন অঘটন-কেমনে সম্ভব হ’ল ?
মম শক্তি-সাধনায়,
বিঘ্ন করে হেন স্পর্ধা কার ?
( মদনকে দেখিয়া )
আয়ে-আরে—অজ্ঞান অধম !
কি সাহসে যােগভঙ্গ করিলি আমার ?
মহাদেবের তৃতীয় নয়ন হইতে অগ্নি বাহির
রক্ষা কর-রক্ষা কর
দগ্ধ হ’ল-দগ্ধ হ’ল কলেবর !
বতিরতি-প্রাণেশ্বরি-
উঃ-উঃ-জ্বলে গেলজ্বলে গেল আপাদমস্তক ।
(মদন ভস্ম )

চতুর্থ দৃশ্য )
শিবশক্তি
রতি।
-
উমা।
(আলুলায়িতকেশে রতির উন্মত্তভাবে প্রবেশ )
কই-ই-কোথা তুমি প্রাণনাথ !
ওরে-কে করিল হেন বজ্রাঘাত শিরে মাের ?
(মুচ্ছিতা)
মহাদেব। বিঘ্ন--বিঘ্নবিঘ্ন চারিধারে !
অন্তরে বাহিরে বিঘ্ন ভয়ঙ্কর।
সংহার-সংহার-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!
সন্যাসি-সন্যাসি !
এসএস ত্বরা,
লয়ে বাও মােরে পিত্রালয়ে,
ভয়ে কথা নাহি সরে মুখে !
মামা—কোথা তুমি,
বড় ভয়-বড় ভয় হেথা,
আর কভু ভুলে না আসিব !
পিতা-পিতা-কই-কোথা তুমি ?
রক্ষা কররক্ষা কর,—ভয়ার্ত তনয়া ।
-

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দস্য
হিমাচল-পাদ-প্রদেশস্থ গ্রাম্যপথ।
-
ব্যর্থ মম অব্যর্থ সন্ধান !
মনস্কাম পূর্ণ নাহি হ’ল !
লুপ্ত আশা স্বর্গ-উদ্ধারের,
আয়ােজন সকলি বিফল ।
হর-কোপানলে,
ভস্ম হােলাে ফামদেব মম বুদ্ধিদোষে !
শিবশক্তি-সম্মেলন-তরে,
ধরেছিনু যেই পপ,-
নহে সৎ-অসৎ সে বুঝি এখন ।
ছি ছি-ছি-ছি-
কেন নাহি বুঝিমু তখন,-
উচ্চকাৰ্য্য সমাধান কামে নাহি হয় ?
এবে কোন্ পথে যাই ?
কি করি উপায় ?
হায় হায়-
স্বার্থসিদ্ধি-আশে -
অবশেষে ত্রিলােকের অনিষ্ট সাধি ?
-

প্রথম দৃশ্য ] শিবশক্তি ৫৫ བ ་ -ঘর- কাম লুপ্ত হ’ল চিরতরে ? সৃষ্টি-সম্ভাবনা তবে হইবে কেমনে? (কুবেরের প্রবেশ) কুবের। আর সৃষ্টি ! দেবরাজ ! সৃষ্টি কি আর আছে ? সৃষ্টিতে একেবারে ওলােট-পালােট বেঁধে গিয়েছে ! গিয়েছে ! স্বামীস্ত্রীতে চুলােচুলি, সংসার আর রইল না ! দেখবেন আসুন দেবতা,বউ যাচ্ছেন বাপের বাড়ী,স্বামী হচ্ছেন বিবাগী,লােটাকম্বল সম্বল করে—ঘর- সংসারের মাথায় মারছে জল-খ্যাংরা। লম্পট যে,-সেও সাধু বনে যাচ্ছে। বারাঙ্গনারা তাে মাথায় হাত দিয়ে বসেছে ! বাবা ! মদন- দেব তো ভস্ম হওয়া নয়,–তরুণ-তরুণীরা পর্যন্ত বাপ মায়ের চোখে ধুলাে দিয়ে গােপনে প্রেম করা ছেড়ে রাতারাতি একেবারে মার্কণ্ডেয় ঋষির নব সংস্করণে দাড়িয়েছে। একি একাকার ? সৃষ্টিমাঝে হেন বিপর্যয় ? হায়-হায়--আমিই কারণ তার! কাম বিনা সৃষ্টি রক্ষা হইবে কেমনে? কুবের। আর আপশােষ করলে কি হবে দেবতা? ইচ্ছে হয় তবে আসুন,একটু’গা-ঢাকা দিই! ওই গাছটার আড়ালে চলুন,তারপর উপায় একটা ঠাওরাতে থাকুন। [ উভয়ের প্রস্থান (সনাতন শৰ্মার প্রবেশ) সনাতন। বলেছিলুম তাে,-মুক্ষু গোয়ার, বর্বর সে বেটার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবাে না ! না-হক অপমানটা হ'তে হ'ল! বিয়ের সমস্ত ঠিক ঠাকু, এখন বেটা বলে কিনা,-“বিয়ে কৰ্ব্বনা” ? যদি দেখতে

শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
( দুন্দুভির প্রবেশ )
সনাতন। শুনেছ।
গিন্নী—
দুন্দুভি। শুনবাে আবার কি ?
সনাতন। তােমার হবু জামাই গােতােমার হবু জামাই-কুন্তল বেটা,
বাপের মুখের ওপাের বল্লে—“আমি বিয়ে টিয়ে কনা”।
দুন্দুভি। বলেছে ? যাক্‌-বাঁচা গেল !
সনাতন। সে কি ? তােমার এত আগ্রহ,—তােমার মেয়েরও তার জন্যে
বুক-যায় প্রাণ-যায়, আর সে বেটা তাে মেয়েটাকে একটীবার
দেখবার জন্য নিজের গলা নিজের হাতে কাটতেও প্রস্তুত ছিল ! এর
মধ্যে সব হ’ল কি ?
দুন্দুভি। হবে আবার কি ?
হবে আবার কি ? মেয়েরও ইচ্ছে নয় ! তা, ইচ্ছে না হয়,
বিয়ে নাই কৰ্ব্বে ।
সনাতন। তার মানে ?
দুন্দুভি। তার মানে-কাজ কি এত ঝঞ্জাটে? বিয়ে করলেই তাে জামাই
দিনরাত্তির মেয়েটাকে কষ্ট দেবে! মানুষের দেহরক্তমাংসে গড়া,
একটু নিশ্চিন্ত হয়ে খাবার,-শােবার,-ঘুমােবার ইচ্ছে কার
না হয় ?
সনাতন। তা বিয়ে কল্লে—কে আর তাকে খেতে-শুতে-ঘুমুতে
বারণ কৰ্ব্বে ?
জামাই—জামাই-জামাই বারণ কৰ্ব্বে ! জ্বালাতন-জ্বালাতন !
স্ত্রীজন্ম আমি দেখছি একটা মহাপাপ !
সনাতন। আর পুরুষজন্মটা বুঝি দেখছ মহাপুণ্যের ?
দুভি। তা নয়ত কি? তােমার সংসারে এসে অবধি তাে শুধু দাসীর
মত খেটেই মচ্ছি! রাত্রে যে একটু আরাম করে শুয়ে দুদণ্ড নিদ্রা

প্রথম দৃশ্য ]
শিবশক্তি
দোবো,তারও উপায় নেই ! এই একটা বিকটাকার মদ্দ তুমি,
গায়ের গন্ধে তােমার ভূত পালায়,-ধপাস্ করে এসে পাশে শুয়ে
পড়লে !
ছ্যাছা-কি করেই যে এই কৰ্ম্মভােগটা এতকাল
করেছি,মনে হলে নিজের ওপােরে ধিক্কার আসে।
সনাতন। বটে ? ওরে মাগী!—তাতে ববিই !-তোকে নিয়ে
আমারই কি কম জ্বালাতন? যতক্ষণ সূর্য্যিদেব না পাটে বসবেন,
ততক্ষণ তাে তাের চিল-চীৎকারের চোটে কান ঝালাপালা ! আহার ?
সে তাে বেড়ালে ডিঙ্গুতে পারেনা। রাত্রে 'একরাশ চুল নিয়ে—ধুপ,
করে গা ঘেঁসে আড় হয়ে পড়লি ! বালিস বিছানা গায়ের ময়লায়
তাে তেল-চিটচিটে । উপরন্তু,-নারকোল
তেলের দুর্গন্ধে অতি
কষ্টে বমি চেপে কোন রকমে আমাকে রাতটা কাটাতে হয় ।
দুন্দুভি। বেশ,—এতদিন বল্লেই তাে পার্তে ! আমি দিনকতক গায়ে
হাওয়া লাগিয়ে বাঁচতুম।
সনাতন। কতবার তাে বলেছি,—যাও—দিনকতক বাপের বাড়ী ঘুরে
এসাে,—আমি একটু রেহাই পাই।
দুন্দুভি। মিথ্যেবাদী,নচ্ছার মিসে ! বলতে লজ্জা কচ্ছেনা? বখুনি
কোথাও যেতে চেয়েছি,-পায়ে ধরে কান্নার কথাটা ভুলে গেছাে ?
সনাতন। ডান হাতে করে-- ছ্যা—ছ্যা—খেয়েছি! যাও,-একটু ঠাই
নাড়া হও দিকি।
দুন্দুভি। এই তো বেরিয়েছি। কিন্তু ফের যদি আমার খোঁজে আমার
ত্রিসীমানায় যাও,—এই মেয়ে নাথিতে নাক ভেঙ্গে তােমায় গঙ্গা
খাদা করে দেবাে।
সনাতন। আর তুমি যদি ফের এ বাড়ীতে ঢুকবে, শ্বশুর মশায়ের পিতার
আশ্রাদ্ধ দেখিয়ে দেবাে।
[ দুন্দুভির প্রস্থান
।

শিবশক্তি [ তৃতীয় অল্প সনাতন। দুত্তোর সংসার ! এত কিসের ? পাপ বিদেয়া হল। পেত্নী বেটী যেন পেয়ে বসেছিল। ঝাটা গাছটা মুখে করে গেলেই বুঝতুম, যথাথই ছাড়লাে ! (রাকার প্রবেশ ) রাকা। যা কোথায় গেল? সনাতন। যম জানে, যে তার ঘাড় ভাঙ্গবে । রাকা। আক্কেল বটে পুরুষ মানুষের! এতকাল দাসীর মত সেবা কলে যে—তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলে এক কথায় ? সনাতন। কে তাড়িয়ে দিয়েছে ? তার যদি এখানে ভাল না লাগে— আমি কি পায়ে ধরে রাখবাে নাকি? রাকা। কিন্তু তখন কথায় কথায় পায়ে ধর্তে দেখেছি। আমার মা, আমি দেখি-মা কোথায় গেল ! আমি তাে আর পুরুষমানুষের মত অকৃতজ্ঞ হতে পারিনা! আমার মা,-দশমাস দশদিন পেটে রেছে- সনাতন। তুই ঘর থেকে বেরুবি কি রকম? সােমােতা মেয়ে,-আজ- বাদে কাল বিয়ে হবে তাের রাকা। হা-হা-হা-হা-বিয়ে কৰ্ব্ব ? আমি ? পুরুষমানুষকে ? সনাতন । মেয়েমানুষকে মেয়েমানুষ বিয়ে করে নাকি ? রাকা। তাতে বরং লাভ আছে। একজন প্রাণের বন্ধুলাভ হয় ! পুরুষ- মানুষ,সেতাে তােমারি জাত ? সনাতন। কি ? যত বড় মুখ সয় তত বড় কথা বলিস্? তুই শুদ্ধ, আমায় অপমান করি—জাত তুলিস্? যা—বেরিয়ে যা—এক্ষুনি বেরিয়ে যা- আমার ভিটে থেকে দুর হ- প্রথম দুই শিবশক্তি রাকা। যাবােই তাে-মা গেছে আমিও যাবে ! পুরুষমানুষের চোখ বাঙ্গানি আর সইব নাকি ? সনাতন। নাঃ-এ পৃথিবীর আর ভদ্রস্থ নেই,-আমি বিবাগী হব—আর এ ভিটেয় থাকবাে না-থাকবাে না-- [ সনাতনের প্রস্থান রাকা! ই’: আমায় বলেছে “বিয়ে কৰ্ব্বনা” ! আরে—তােকেই বা বিয়ে কৰ্তে চায় কে? হা-হা-হা-হা- - (কুন্তলের প্রবেশ ) কুন্তল। বড় যে হাসির ঘটা রাকা সুন্দরি । রাকা। আমায় নাকি বিয়ে কৰ্বে না বলেছ ? হা-হা-হা-হা- কুন্তল। হা-সত্যি কথা বলব তাতে ভয়টাই বা কি? ছিঃ ছিঃ—কি মহাপাতক করেছিলুম! আমি,-আমি বলেছিলুম তােমাকে বিয়ে কৰ্ব্ব ? আরে ছ্যাছা-ছ্যা- রাকা। যা বলেছ ! একটা আকাট-কাট- বলে-কদাকার বিকট বেহায়া ছোড়া,-তাকে চোর বলে-ঝাটা মাৰ্তে মাৰ্তে বিদেয় না করে,বলেছিলুম কিনা “ভালবাসি তােমায়, বিয়ে কৰ্ব তােমায় !” কি গ্রহ-ছা—ছ্যা—-ছ্যাছা ঘেন্নায়-লজ্জায় বাঁচিনে যে গা- ছা—ছা-ছ্যা- কুন্তল। আমি এমন সুপুরুষ,-চেহারা দেখলে কত রাজকন্যা টাউরী খেয়ে পড়ে মরে ! আমি এক বেটী কাকো-ভাঙ্গা ভেটকী মাছের চেহারা দেখে একেবারে গাে-ভূত হয়ে মজেছিলুম? আরে, সেটা কি সত্যি,-না,-স্বপ্ন দেখেছিলুম ? ওয়াকওয়া—সরে যাসরে যা–কাছে আসি নি! চেহারা দেখলে তাে পেটের মধ্যে হাত পা

শিবশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
==
সেধিয়ে যায়, তার ওপাের,মেছুনীর পাটার মত দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে-
বেটীর গা দিয়ে !
রাকা। বেরােও,নচ্ছার—দু-চোর--ছিচকে চোর,বেরােও আমার
সামনে থেকে ! নইলে
( দ্বৈত গীত )
রাকা। সামলাতে রগ পার্ধনা-ক’ কেলেঙ্কারী!
কৰ্য্য এ পুরুষ মুক্তি,সইতে যে না পারি ।
কুন্তল। গা গুলিয়ে উঠছে আমার পালাই পগার থেকে ।
( নইলে )-শাখচুন্নির খপ্পরেতে, অঙ্গ যাবে বেঁকে
রাকা। তুই ভুত, তুই গেভূত, তুই পেঁচো কলকাটা।
কুন্তল। ওরে,-জলার পেত্নি-~-অম্নি যাবি ?
না, নিবি মুখে ঝাটা ?
রাকা। হায় কি কৰ্ম্মভোগ !
কুন্তল। উঃ—গেল কি দুযোগ।
রাক। (এরে) ভালবাসি ক বিয়ে
বলেছি কি ঝকমারী।
কুন্তল। ( এরে ) “ভালবাসি কৰ্ব বিয়ে-
বলেছি কি ঝকমারী।
[ উভয়ের প্রস্থান
( পল্লব ও মিশ্রার প্রবেশ )
পাব। যাকে বলে,—সত্যিই একেবারে গাধা বনে গেছি ! শ্ৰেষ্ঠীরু
ছেলে,-কোটীপতির ছেলে আমি,-পল্লবকুমার ? সেই বিয়ে হ'রে
অবধি—ঠায় একটা বছর-স্ত্রীর কাছছাড়া হইনি!—কাজকর্ম
ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে,-শেষে বৌয়ের
ফেলে,-শেষে বৌয়ের আঁচল ধরে শ্বশুরবাড়ী
এসেছি,আর এক পক্ষ পড়ে আছি শ্বশুরবাড়ী ? গেল--গেলজাত
ধৰ্ম্ম সবই গেল !

প্রথম দৃশ্য ] শিবশক্তি মিশ্রা। তোমার গেল-না—আমার গেল ? আমি বড়লােকের মেয়ে, স্বাধীনভাবে এখানে বেড়াবাে,সেখানে বেড়াবো,—সখীদের নিয়ে নাচবাে, ঘুরবে, ফিরবাে!—তা না হয়ে—কি লজ্জা,—কোথা থেকে এক মেনিমুখাে স্বামী নিয়ে এতদিন ‘আহার নিদ্রা ভুলেছিলুম? কি ঘেন্না ! যেন ছিনে জোঁক !—হাড় জ্বালাতন ! একদণ্ড কাছ থেকে নড়তে চায়না ! আরে যাওনা,-যাওনা ! তাড়ালেও যেতে চাওনা? চক্ষুলজ্জা-ভদ্রতা—মানসম্রম বলে কি কোনাে জিনিষ নেই? “পল্লব। নেই আবার ? বিলক্ষণ আছে,—বিলক্ষণ ছিল। কোথা থেকে বাবা-মা একটা শুটকো ডাইনি ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে, একেবারে পুরুষত্বটাই মাটী ? মিশ্রা। উঃ—কি কলুম-কি কলুম ?—এমন সুখের নারীজন্মটা এই রকম একটা জানােয়ারের সঙ্গে জুটে একেবারে মাটা করে ফেলুম ? সখী- সখী--কোথায়—কোন্ চুলােয় গেলি সব সখীরা আমার ? ( সখীগণের প্রবেশ ) মিশ্রা। কোথায় ছিলি সব ? কোথায় ছিলি ? সখীগণ। কি কৰ্ব্ব সই ? তুমি যে স্বামী নিয়েই উন্মত্ত,—আমাদের যে কাছে আসতেই দাও না- পল্লব। জলার পেত্নীর কাছে না আসাই ভাল। মিশা। তোরা আমার মায়ের পেটের বােনের মত। তােদের প্রাণে কি একটু দয়া মায়া নেই লা ! আমায় না হয় ভূতে পেয়েছিল, তােরা রােজা ডাকিয়ে এ ভূতটা তাে অনায়াসে সর্ষে-পড়া দিয়ে ছাড়িয়ে দিতে পারতিস্! দেখ দিকি—কি করেছে আমার এই সােনার অঙ্গ। একবার দেখলিনি—তােরা একবার খবরও নিলিনি।

শিবশক্তি [তৃতীয় অঙ্ক পল্লব। আর আমি একটা ভদ্রলােকের ছেলে,—এই কচি বয়েস,—এই ভুবন-ভােলানাে চেহারা নিয়ে,বাপের অতুল ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে,এক বেটী ঘুরঘুরে পােকার খপ্পরে পড়ে জ্যান্ত মৰ্বার উপক্রম হয়েছি,-মেয়েমানুষ হয়ে,–এতটুকু দয়া ধর্ম নেই তােমাদের ? আমাকে এর পাল্লা থেকে উদ্ধার করে ঘরের ছেলে ঘরে পাঠাতে পারনি ? এইটে তােমাদের ধর্ম হােললা বাবা ? সখীগণ। তা যাওনা—এখনও পড়ে মর্তে এখানে রয়েছ কেন ? মিশ্রা। মেরে না তাড়ালে ও কি নড়বে ? তােরা না পারিস,ডাক্ ষণ্ডা ঘণ্ডা জমাদার গুলােকে। চ্যাং-দোলা করে একেবারে সদর রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসুক। পল্লব। আসুক কোন্ বেটা জমাদার আছে,—এক এক ঘুষিতে বৈতরণী পার করে দেবে ! আসুক তাের জোচ্চোর বাবা বেটা,আমাকে ভুলিয়ে যাদু করে যে তাের মত একটা গস্তানি পেত্নী গছিয়ে আমার সৰ্ব্বনাশ করেছে !—এক চড়ে তাকে দক্ষযজ্ঞ করে মুণ্ডু উড়িয়ে গাধা- মুণ্ডু করে দেবাে ! মিশ্রা। দেখ হে বর- সখীগণ। তুমি অতি বর্বর মিশ্রা। তুমি আস্ত ধীবর- পল্লব। আর তােমরা সব অনুৰ্ব্বর,-এটেল মাটী । মিশ্র। আমার বাড়ীতে বসে আমার বাবাকে গাল ? সখীগণ। শ্বশুরকে গালাগাল ? এত বড় আস্পর্ধা ? পল্লব। আরে রেখে দে অমন শ্বশুর ! ও শ্বশুরঃ পশুরশ্চৈব শালা সম্বন্ধীনস্তথা ! মিশ্রা। আর তুমি এ বাড়ীতে ঢুকোন!

প্রথম দৃশ্য।
শিবশক্তি
পল্লব। আমি কোন বাড়ীতেই ঢুত্বাে না! আমি ও শালার মেয়ে
জাতেরই মুখ দেখবে না-
[ পল্লবের প্রস্থান
মিশ্রা। আমিও চলুম—সংসার ত্যাগ করে-ভেক নিয়ে বৈষ্ণবী হব।
পুরুষ দেখলে ঝাটার বাড়ী মাৰ্ব ।
সখীগণ। পুরুষ? ছ্যাঃ—তাদের মুখ দেখতে আছে? ছঃ-
( মিশ্রা ও সখীগণের গীত )
০
অতি পরে,—সিদুর পরে,
আর তাে বাহার দোবােনা।
রাঙ্গা চরণ কোথায় পাবে ?
সাধলে পুরুষ শুনবো না।
সাজন-গােজন কিসের তরে?
পুরুষের মুখ দেখবে না !
বেণী দুলিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে,
নয়নবাণ আর হানবাে না!
কস্তা পেড়ে রাঙ্গ। সাড়ী,
নীলাম্বরী ডুরে জরি,-
নূতন ঢংয়ে,-ঘুরিয়ে প'রে,
মন মজাতে নাবাে না।
এলো খোপা কিসের তরে ?
গন্ধতেলে ভুরভুরে ?
কাজল-পরা বাঁকা চোখে,
আর ত মােরা চাইবাে না!
রঙ্গীন dাটে মিষ্টি হাসি,
আর তো মােরা হাসবাে না।

৬৪ শিবশক্তি [ তৃতীয় অঙ্ক ( নন্দক ও পুত্রগণের প্রবেশ) । নক। তাের ছেলের বাপ নিৰ্ব্বংশ হােক ! বল্ কি হােললা নেবুগুলাে? পুত্রগণ ! বােলবাে না। নক। বিয়ে বাড়ীতে তত্ত্ব পাঠাবো বলে কাল এক ঝুড়ি নেবু এনে রাখলুম-আরােজ তার খােসাট পর্যন্ত নেই? সব সাবাড় ? বল, বলছি,-কার হুকুমে নে খেলি ? পুত্রগণ। বারে বা-মা যে খেতে বনে ! নক। তাের মায়ের বাবার নেবু ? পুত্রগণ। মাকে গাল দিচ্ছ ? অঘ। দেখবে এখন মজা ! মগা। কান মুচড়ে কান ছিড়ে দেবে। বগা। আবার পায়ে ধরে কাদতে হবে। দাগা। তখন আমরা কথাটী কইবাে না । নক। রেখে দে তাের মায়ের ডবডবানি! নন্দক শৰ্ম্মা বেটাছেলে,- দস্তুরমত পুরুষমানুষ ! তাের মা বাবা-কোনাে শালাকেই ভয় করেনা। নিয়ে আয় আমার নেবু • পুত্রগণ। অ—মা-এই দেখ,—বাবা আবার ত্যাওড়াচ্ছে- নক। কি কৰ্বে তাের মা ? ভয় দেখাচ্ছি আমাকে?—ওরে গাের- বেটাচ্ছেলেরা ! বাপকে ভয় দেখাস? মেরে বেটাদের বাপের বিয়ে দেখিয়ে দোবাে ! - (লােহিতার প্রবেশ) লােহিতা। ষাড়ের মত দিনরাত্তিরই চেঁচাচ্ছ? তুমি মানুষ না জানােয়ার ?

প্রথম দৃশ্য ]
শিবশক্তি
নক। আমি জানােয়ারের বাবা ! আমি শালা গাধা-গৰু-গিড়
গাং শালিক—গণ্ডার-বাচ্ছা!
লােহিতা। তা জানি!
নন্দক। জান তাে, আমার ঘর জুড়ে বসে রয়েছ কেন ? জানােনায়ারের
ঘরে ঘর কৰ্তে লজ্জা হয়না?
লােহিতা। চলেই তাে যাচ্ছি জানােয়ার তখন জানিনি, তাই
এমন ঝক্‌মারি করেছি। এত দিন পরে চোখ ফুটেছে,-এইবার
নিজের পথ দেখছি।
নক। তাই দেখ—এক্ষুনি দেখ ! মােদ্দাৎ আমার নেবুগুলি দিয়ে
-
যেতে হচ্ছে।
লােহিতা। হাত পাততা,-ছেলেদের সঙ্গে মিলে বমি করে দিই ।
নক। ছি—ছি—এই জাতটাকে—এই নির্ঘিমে মেয়েমানুষকে নিয়ে
এত সােহাগ করে এক ঘরে বাস করেছি ? উঃ—পৃথিবীর ভেতর
ননাংরা জিনিষ যদি কিছু থাকে তাে এই যৎকদৰ্য্য জাতটা।
লােহিতা। আর পৃথিবীতে যদি জল দিয়ে দিয়ে ঢেইয়ে নর্দমায় ফেলে
দেবার কোনাে জিনিষ থাকে তাে এ পুরুষ জাতটা! সৌন্দর্য্য বলে
কোন জিনিষ কি এর কোথাও কিছু নেই ? এই নিয়ে নারীজাতটা
প্রাণ ধরে থাকে কি করে ? মাগাে—ছিঃ-
নক। আহা! প্রাণপ্রেয়সীদের সৌন্দৰ্য্য একেবারে দেহের অন্দরে
অন্দরে বিরাজমান! মাথার ওপাের উকুন-ভরা পাটের গােছ—এক
ঝােড়া চুল ! হাতে, পায়ে, নাকে, কাণে, চান্দিকে বােঝা বয়ে বয়ে
বেড়াচ্ছেন, বিশহাত কাপড়েও সন্ত্রম রক্ষা হয়না!-ঝাটা মারাে--
ঝাটা মারাে-
-

শিবশক্তি
[তৃতীয় অঙ্ক
লােহিতা। আমিও তাের মুখে ঝাটা মেরে চড়ুম! থাক্ তাের গােভাগাড়
সংসার নিয়ে।
[ লােহিতার প্রস্থান
নক। বাঁচা গেল—বাঁচা গেল ! হাড়ে এখন থেকেই একটু একটু
বাতাস লাগছে ! গােয়াল থেকে খানিকটা গােবর এনে সর্বাঙ্গে
মাখিয়ে—দিঘীতে পাঁচশােটা ডুব মেরে শুদ্ধ হই ।
পুত্রগণ। বাবা ! মা কোথায় গেল?
নক। তাইতাে ! তো-বেটারা রয়ে গেছিস্? যা—যা-ছুটে
ধরগে যা-তােদের মাকে ! আরে—
যারে বাবা! শিগগীর মা-
আমি ঝাড়া-হাত-পা হই!
পুত্রগণ। আমরা তােমাকে ছেড়ে যাবনা!
নক। আলবৎ যাবি,না যাবি তাে এই আমিই দিলুম চম্পট—কি
ক িক !
[ প্রস্থান
অঘা। অ বাবা আমি তােমার কাছে থাকবে!
(সকলের প্রস্থান ও নেপথ্যে সকলের “অ বাবা-অ বাবা” চীৎকার)
দ্বিতীয় দৃশ্য
বনপথ
( উন্মাদিনী বেশে রতির গাহিতে গাহিতে প্রবেশ)
গীত
কই কই তুমি,-কই কোথা স্বামী,—হৃদিরঞ্জন জীবনাধার !
এই ছিলে হেথা, চলে গেলে কোথা?

৬৭
দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
এই দেখা দিয়ে—লুকালে আবার ?
এই যে শুনিনু কত কথা কয়ে,-হাসিলে তুষিলে বক্ষেতে লয়ে,
এই ফুলমালা গলে পরাইয়ে,
চুমিলে সােহাগে বারে বার।
[ গাহিতে গাহিতে প্রস্থান
( পাৰ্বতী ও ইন্দ্রের প্রবেশ )
ইন্দ্র।
দেবি !
শিবকৃপা লভিবার তরে,
পঞ্চতপ সঙ্কল্প তােমার,
অপূৰ্ব্ব কঠিন পণ।
নাহি জানি—
কেমনে সাধিবে তুমি
এই দৃঢ় ব্রত,
এই বালিকা বয়সে !
তুমি মহাদেবী,শক্তির আধার,
তােমাতেই সকলি সম্ভব।
বাও দেবী
অগ্রসর হও তব মহীয়ান ব্রতে ।
আমি রহি নিয়ােজিত প্রহরী তােমার,
দিবানিশি রহিব সজাগ,-
যাহে,-তপােবিঘ্ন কোন মতে না হয় তোমার।
( পার্বতী অগ্রসর হইলেন ও অন্তরালে গেলেন।
ইন্দ্র প্রহরীবৎ সেইখানে দাড়াইলেন।

৮ শিবশক্তি [ তৃতীয় অঙ্ক (নেপথ্যে রতির গীত). কই কই তুমি? কোথা তুমি স্বামি ? হৃদিরঞ্জন—জীবনাধার ! ওই কঁাদে শশাকাকুলা রতি ! বিদরে হৃদয়, অসহ্য এ শােকগাথা শুনি নাহি জানি কি সান্ত্বনা দিব দুঃখিনীরে। (রতির প্রবেশ) রতি। প্রাণনাথ ! চিরদিন বলিতে আমায়, তুমি আমি এক প্রাণ, ভিন্ন দুই দেহ মাত্র করিহেঃধারণ ! হায় বিধি! এ কেমন বিধান তােমার, অর্ধপ্রাণ বদ্ধ থাকে দেহে ? হে ঈদিরঞ্জন! রতির জীবনধন । কত সাধে তুমি, নিজ হস্তে করিয়া রচনা, = - যে কুসুম-অলঙ্কারে ছার অঙ্গ মম, দিয়েছিলে সযত্নে সাজারে,- একবার এসে দেখ চেয়ে, সে ফুলভূষণ- এখনাে হে হয়নি মলিন। ওহে চিতচোর ।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি ১৯ - ইন্দ্র। রতি । ছেদি প্রেমাের, কোন্ প্রাণে গেলে পলাইয়ে ? দেবি ! কর শােক সম্বরণ, বিধিলিপি খণ্ডন না হয় ! এবে শুন মম উপদেশ দেবরাজ! আর কিবা উপদেশ আসিয়াছ দিতে ? উপদেশ দিয়াছিলে পতিরে আমার, ফলে তার, কলেবর ভস্মীভূত হর-কোপানলে। এবে-দাও মােরে হেন উপদেশ, যাহে,চিরতরে শেষ হয় রতির এ দেহ । সুলােচনে ! তিরস্কার কর মােরে যত অভিরুচি। সত্য আমি অপরাধী তব পাশে। শিবশক্তি-মিলনের ভার, দিয়েছিনু মদনের 'পরে ভাবি নাই সে সময়, সে কার্যের কিবা পরিণাম। বিধি বাম দেবতার প্রতি। দেবরাজ! হবে তব স্বর্গোদ্ধার। ত্রিদিবের সিংহাসন,-নন্দন কানন, ইন্দ্রত্ব ইন্দ্রের,হবে লাভ। - বুতি।

•
শিবশক্তি
( তৃতীয় অঙ্ক
শিবসনে মিলিবে পার্বতী,
পূরিবে বাসনা যত দেবতার !
সবাকার হবে গাে সকলি,-
মাত্র আমারি কেবল,
নিদারুণ এ বৈধব্য রবে চিরকাল
ওহ,-কোথা যাই?
কেমনে জুড়াই জ্বালা?
আর কোন্ আশে রাখি ছার প্রাণ?
মনােমত পতিলাভ-তরে,
শিবপূজা করে কুমারী বালিকা,
সে পূজায় বিধবার কিবা ফল হবে ?
যাই তবে,—চিতানলে ত্যজি ছার প্রাণ ;-
সতীভস্মে বৃদ্ধি হােক পতি-ভস্মরাশি !
ধৈৰ্য্য ধর—ধৈৰ্য্য ধর বনাননে !
আত্মহত্যা মহাপাপ না কর সাধন
করগাে প্রত্যয় দেবি বচনে আমার ।
যদি মোর বিন্দুমাত্র থাকে পুণ্যবল,
স্বামীসনে তব,
মিলন হইবে পুনঃ।
দেবকাৰ্যে দেহদান,
করিয়াছে পতি তব অবিচারে ;
পুনঃ দেবতার বরে,
উজ্জীবিত হইবে মদন !
তুমি সতী পতিপরায়ণা,-

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
অনন্তকালের তরে সে অনঙ্গসনে,
প্রম-আলাপনে সুখে করিবে বিহার।
এবে যাও সুলােচনে,--তপাচার হেতু !
হের গিরিরাজ-সুতা উমা,
মহাশক্তি বালিকারূপিণী,
হয়ে মনের সহায়তা-হারা,
অনন্য-উপায়ে এবে তপসাধনায়
নিয়ােজিত করিয়াছে আপনারে,-
লভিবারে পতিরূপে দেব দিগম্বরে।
তুমিও তেমতি,
উমা-সম করহ সাধনা,
নিজপতি সনে মিলনের তরে !
সাধনায় সিদ্ধিলাভ অবশ্য হইবে।
[ রতির প্রস্থান
–
(শশব্যন্তে চন্দ্রের প্রবেশ)
চন্দ্র।
চন্দ্র।
দেবরাজ ! দেবরাজ ?
কি সংবাদ চন্দ্রদেব ?
ঘাের সর্বনাশ !
কহিতে সংবাদ না জুয়ায় কথা !
শচী দেবী
কি ? কি হয়েছে তার ?
অপহৃতা,-
বলে নীতা দৈত্য-অন্তঃপুরে -

৭২ শিবশক্তি [ তৃতীয় অঙ্ক কি? কি ? কি কহিলে? ( চন্দ্ৰ নতমস্তক) (সূর্যের প্রবেশ সূৰ্য্য। দেবরাজ। (নতমস্তক ) ৫ ( হুতাশনের প্রবেশ হুতাশন ! সূৰ্য্য। দেবরাজ ! ( নতমস্তক ) কহ,-কহিবার কিবা আছে আর ? দুরাত্মা সে তারক অসুর,-- অধৰ্ম্মের মন্ত্রণায়, ধরিয়াছে অন্যরূপ ! ঘাের বৈরী মৈনাক তােমার, হইয়াছে সহায় তাহার ! নাহি মানি ধৰ্মীধৰ্ম্ম, দেবকুলে দিয়া কালি, বলে দুষ্ট বন্দী করে লয়ে গেছে মাতারে মােদের ! মৈনাক। মৈনাক ! দেবকুলে কলঙ্ক লেপিল ? ওহহা-এইভাবে বৈরি-নিৰ্যাতন। (কুবেরের প্রবেশ) দেবরাজ! দেবরাজ! শাস্তি দিন মােরে । হীনবুদ্ধিবশে দুরাত্মা অধর্মে দ্বিতীয় দৃশ্য শিবশক্তি ৭৩ সূৰ্য্য ! আমিই পাঠায়েছিনু তারক-সকাশে ! ভাবি নাই এতদুর পরিণাম তার, দেবী পরে নির্যাতন করিবে পামর । শুনিতেছি নির্যাতন করিয়া দেবীরে, মৈনাক জানিতে চায়, দেবেন্দ্রের গুপ্ত অবস্থিতি। হুতাশন। প্রতিকার ! চাহি প্রতিকার ! হও দেব অগ্রণী মোদের,- অবিলম্বে শাস্তি দিব দুরাত্মা পামরে নহে,-মায়ে উদ্ধারিতে বিসর্জিব ছার প্রাণ। চন্দ্র। হে দেবেন্দ্র ! করহে উপায়, দেবী-নিৰ্যাতন সহিতে না পারি । -না-না-না-হীনবল আমি ! ব্যর্থ মম প্রচেষ্টা সকলি ! সাধনা-বিহীন, আমা হতে কোন কাৰ্য্য হইবে সাধন আত্মদর্পে হীন ছলনায়, চেয়েছিনু লভিবারে শক্তির আশ্রয়, উপযুক্ত শাস্তি হ’ল তার । আর আত্মবল নাহি গণি, ধৰ্ম্মবল সার, প্রায়শ্চিত্ত প্রয়ােজন আত্মবলিদান। পার্বতীর তপাের-কাজে, এবে নিয়ােজিত আমি,- স্থানত্যাগ করিতে নারিব। (প্রস্থানেদত)

73
শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
কই দেব,
কেমনে হইবে তবে দেবীর উদ্ধার ?
( ফিরিয়া) মহাশক্তি মহামায়া দেখিবেন তারে ।
[ প্রস্থান
{ অধােমুখে দেবগণের প্রস্থান ]
তৃতীন্ন দৃশ্য
কৈলাস পর্বতের সানুদেশ
}
পার্বত্য পথ,-অদূরে যােগশৃঙ্গ
( মহাদেব ও নন্দী।
মহাদেব। কি কহিলে?
ইন্দ্রের আদেশে,
সতীযােগ-ভঙ্গ হয়েছে আমার ?
কই, কোথা ইন্দ্র,—কোথা দেবগণ ?
কি কারণ তপে বিপ্ন মম ?
কেন বার বার হেন মতিভ্রম দেবতার ?
মম সতীদেহ করিয়া ছেদন,-
তবু মােরে না দেয় নিস্তার ?
পুনঃ কোন্ অধিকারে
যােগভঙ্গ করিল ‘আমার ?
যে অনলে বিদগ্ধ মদন,-
ব্ৰহ্মাণ্ডদাহিকা মহাশক্তির আধার,-

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
,
नकी
জ্বলে সেই বহ্নি ললাটে আমার ।
জানে নাকি দেবগণ,
সে নয়নে যদি চাহি একবার,-
হবে ছারখার,
চরাচর স্থাবর জঙ্গম?
চতুর্দশ ভুবন-নিবাসী,
দেবযক্ষরক্ষনরগণ,-
সে অনলে ভস্মস্তপে হবে পরিণত ?
কর প্রভু ক্রোধ সম্বরণ !
ছিলে যােগে মগ্ন বহুকালাবধি,-
বিধি-সৃষ্টি-বিপৰ্যয় জান না সংবাদ !
ভীষণ প্রমাদ স্বর্গপুরে।
ব্রহ্মবলে বলবান তারক অসুর,
স্বর্গরাজ্য করি অধিকার,
করিয়াছে দেবগণে ত্রিদিব-বিচ্যুত।
শিবশক্তি-সম্মেলনে,
মহাশক্তি-মূলাধার জন্মিলে কুমার,
তার করে হবে দৈত্যের নিধন,
দেবগণ স্বর্গরাজ্যে হবে প্রতিষ্ঠিত।
তেঁই দয়াময়,
শক্তিস্বরূপিনী উমাপ্রতি,
তব প্রেম করিতে সঞ্চার,
দেবগণ নিয়ােজিল মদনে হেথায়,
যােগভঙ্গ সাধিতে তােমার।

শিবশক্তি
[ তৃতীয়
মহাদেব ।
শ
বৎস!
অকারণ কেন মাের প্রেম-উদ্দীপনা !
জাননা—জাননা,-
কি জালাজ্বলিছে প্রাণে !
কোথা সতী মম হৃদি-বিলাসিনী ?
কোথা তার পাইৰ সন্ধান ?
নন্দি
-নন্দি!
যায় বিশ্ব বা রসাতলে,
তাহে কিবা আসে যায় মম ?
ওরে,-যােগে মগ্ন ছিনু মহাসুখে,
মহাশােকে শান্তিলাভ হয়েছিল তায় ।
কি জানি কি স্বপ্নঘােরে,
দেখিলাম যেন সতীরে আমার !
জ্যোতির্ময়ী বিমােহিনীরূপে,
উপনীতা আমার সম্মুখে !
যেন, সুকোমল ভুজলতায়--
করি প্রসারণ,
প্রেম-আলিঙ্গন-আশে সাধিছে আমায় ।
যেন, “মৃদু হেসে
মিষ্টভাষে,
তুষিয়া পাগল হরে,
ধীরে ধীরে আসে বক্ষে মিশাতে আমার!
নন্দিনন্দি
কেন বল যােগভঙ্গ হইল আমার ?
আর সতী দেখা নাহি দিবে!

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
৭৭
নন্দী।
• ভােলানাথু !
কেন এ বিস্মৃতি-ভার করিছ বহন ?
জান নাকি ত্রিলােচন,-
ত্রিনয়না মা-জননী মম,
উমারূপে জন্মলাভ করি গিরিপুরে,
কুমারীর বেশে,
এসেছিল তব পাশে পূজিতে তােমায় ?
এখনাে আচ্ছন্ন দেব কি হেতু বিকারে ?
আপন জায়ারে,
চিনিতে না পার প্রভু?
মহাদেব। নন্দিনন্দি !—প্রিয়পুত্র মাের !
বল সত্য অভাগারে,-
এসেছিল যেই তাপসী কুমারী
লাবণ্যপ্রতিমা,
এ নির্জন গিরিশৃঙ্গে মম পাশে,
সে কিরে আমার সতী ?
নন্দিনন্দি!
আমি রে পাগল ভােলা,-
ছলা কলা কিছু নাহি জানি!
কিবা অপরাধে মহামায়া সতী,
মম প্রতি এমন নিদয়া ?
কেন নাহি ধরা দিয়ে ধরা দিল মােরে?
ননি-নন্দি
যা রে গিরিপুরে
০
-

৭৮
শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
নন্দী।
এনে দে রে সতীরে আমার ।
ওরে—মৃত্যুঞ্জয় আমি,
সতী বিনা পড়ি বুঝি মৃত্যুর কবলে !
বাচা নন্দী-বচারে আমায় !
দয়াময়-আশুতােষ
মহিমা অচিন্তনীয় তব চিরদিন ।
সৰ্ব্বদেবারাধ্য তুমি মহাদেব,
তব লীলা দুর্বোধ্য সবার !
নিজ লীলামাহাত্ম্য অপার,
করিতে প্রচার,
দক্ষযজ্ঞ করিলে হে ছারখার।
দক্ষালয়ে সতীদেহত্যাগ,
সেও জানি তব লীলাখেলা-হ্নেছু !
এবে প্রভু আশুতােষ,
পুনঃ নবলীলা করিবারে প্রদর্শন,
সতী লাগি হেন উচাটন
যেই কাৰ্য্য সাধনের তরে,
চতুর্দশ ভুবন মাঝারে,
চিন্তার আকুল সবে ;
যে কারণ ভস্ম হােলাে দুর্ভাগ্য মদন ;
দয়াময় দেব ত্রিলােচন !
যে সতীর তরে,
আজি বিচঞ্চল হৃদয় তােমার,
হের তার কি কঠোর তপাচার,
–

।
তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
==
পতিরূপে লভিতে তােমায় !
হের গিরিরাজসুতা জননী আমার,
কত ক্লেশ সহি করে পঞ্চতপ !
রাজার নন্দিনী,
গৃহ ত্যজি পােবন যাপে নিশিদিন ।
মরি মরি-
কঠোর তপস্যা-ক্লেশে,
সোণার বরণ মার হয়েছে মলিন
সুদীর্ঘ অপাঙ্গদেশে,
নীলবর্ণ রেখা প্রকাশিত।
সুকোমল দেহলতা,
শুষ্কপ্রায়-ক্ষীণ—ক্ষীণতর ক্রমে !
উপেক্ষিয়া শীত, গ্রীষ্ম,
বর্ষার প্রকোপ,
অনাবৃত স্থানে,
শিলাতলে করিয়া শয়ন,
প্রচণ্ড মার্তণ্ডপে বসি একাসনে-
রাজার নন্দিনী,
কেমনে বা দেহে রাখিবে জীবন ?
-
=
চণ দেব--
একবার দেখা দাও জননীরে মম !
।
| মহাদেব ও নন্দীর প্রস্থান

তুই দশ
তপােবন
( তপস্বিনী-বেশে উমা ও প্রধান সখী পদ্ম)
উমার স্তব গীত
পদ্মা।
প্রসীদ প্রসীদ দেব মহেশ্বর,
প্রসীদ প্রসীদ হর বাঘম্বর,
প্রসীদ প্রসীদ হে নিৰ্বাণরূপ,
প্রসীদ প্রসীদ ত্বং ব্রহ্মস্বরূপ !
প্রসীদ প্রসীদ বিভু নির্বিকল্প,
প্রসীদ প্রসীদ নিগুণ ব্যাপক,
প্রসীদ প্রসীদ প্রসন্নাননাে মে,
প্রিয়ং শঙ্করং সৰ্ব্বনাথং ভজামি ।
রাজবালা !
বল কতদিন আর,
গৃহ ত্যজি বনবাসে করিবে যাপন ?
অবহেলি পিতামাতার নিষেধ,
দিয়ে ব্যথা-সে দোহার প্রাণে,
কোমল বয়সে,
অযােগ্য এ যােগ-আরাধনে,
ভেবেছ কি মনে সখী
ইষ্টলাভ হবে তাের ?

চতুর্থ দৃশ্য ]
শিবশক্তি
কথা রাগ মাের,
চল গৃহে ফিরে,
কাজ নাই তপস্যায় আর ।
উমা।
সখি !
কেন বল বৃথা এ প্রয়াস,
মম তপ-আচরণে হ’তে অন্তরায় ?
ইষ্টলাভ-আশে,
এসেছি লাে তপােবনে।
করি সে ইষ্টলা ৎ কোথা যাব আমি ?
যেই মহাব্রতে ব্ৰতী হয়ে,
সহেছি লাে এত কঠোরতা,
কোথা যাব বল লাে সজনি,
সেই মহাব্রত না হইলে উদ্যাপন?
যাও গৃহে ফিরে,
বল গিয়ে জনকে আমার,
দেহপাত সঙ্কল্প উমার ;-
যাহে দেহ-অন্তে,
যােগ্য হই ইষ্ট লভিবার
( পুনরায় স্তব )
নিরাকারমাকারমুলং তুরীয়
গিরাজ্ঞানগােতীতমীশং গিরীশম্।
করালং মহাকালকলিং কপালং
গুণাগার সংসারপারং নতেহহম্।

৮২
শিবশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
চলৎকুণ্ডলং শুভনেত্রং বিশাল,
প্রসন্নাননং নীলকণ্ঠং দয়াল।
মৃগাধীশচৰ্ম্মাম্বরং মুণ্ডমালং
প্রিয়ং শঙ্করং সৰ্ব্বনাথং ভজামি ।
( ব্রহ্মচারী বেশে দূরে মহাদেবের প্রবেশ। রগ-রূপা ইন্দ্রের দ্বার
তাহার প্রবেশে বাধা প্রদান। মহাদেব হস্তচালনা।
ইন্দ্রকে মােহাবিষ্ট করিয়া প্রবেশ করিলেন ।
পদ্মা।
দেখ—দেখ সখী
অপরূপ ব্রহ্মচারী –উদয় সম্মুখে !
মৃগচর্মে আবৃত শরীর,
সুদীর্ঘ পলাশ যষ্টিকরে,
সৌম্য শান্ত মূর্তি মনােহর,
প্রদীপ্ত ব্ৰহ্মণ্য-তেজে ।
শিরে জটাভার—
বিশাল বিরাট দেহ সুন্দর—সুঠাম ।
এস, ভূক্তিভরে করিলে প্রণাম দেহে।
( উভয়ের প্রণাম করণ )
মহাদেব। স্বস্তি-স্বস্তি বরাঙ্গনে।
কহ মােরে—হেথা তব ধৰ্ম্ম-অনুষ্ঠানে,
বিঘ্ন নাহি হয় কোনরূপ ?
উমা।
দেব! কর আশীৰ্বাদ,
ইষ্টলাভ হয় যেন মাের।
মহাদেব। করি আশীৰ্বাদ,
পূর্ণ হােক অভীষ্ট তােমার ?

চতুর্থ দৃশ্য।
শিবশক্তি
.
কিন্তু চন্দানে! হতেছে নিত্য ;
রাজার কুমারী তুমি,
কি কারণে এত ক্লেশ সহ বরদেহে?
দপে গুণে তেমা সম,
তিনলােকে নাহি কেহ কহিনু নিয় ।
নবীন বয়সে তব,
কার তরে পরিয়াছ বল্কল বসন ?
বল কি কারণ,
করেছ ধারণ তপস্বিনী-বেশ ?
মুক্ত কেশপাশ রুক্ষ তৈলহীন,
পাংশুবর্ণ চারুচন্দ্র মুখ,
কিবা সুখ-আশে এত দুঃখভোগ ?
(উমা পদ্মাকে ইঙ্গিতে বলিতে অনুমতি দিল )
অতি উচ্চ অভিলাষ কামনা সখীর !
কৈলাসের পতি,
দেব দেব মহাদেব হর দিগম্বর,
মন্মথের শর নারিল পীড়িতে বারে,
সেই মহেশ্বরে পতি-বাঞ্ছা সখীর আমার !
আশুতোষ-প্রেমে,
উন্মাদিনী বিহালা বালিকা !
শিবজ্ঞান—শিবধ্যান-কোমলা বালার,
শিব বিনা অন্য চিন্তা নাহি কিছু আর ?
শয়নে স্বপনে জাগরণে,
মানস-নয়নে,-শিবমুর্তি হেরে অনুক্ষণ।
পদ্মা।

৮৪
শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
মহাদেব। সুলােচনে !
নীরব থেকোনা আর।
উমা।
—
কহ অতঃপর,
সত্য কিলাে এ কাহিনী তব,-
শুনিলাম সখীমুখে যাহা ?
হে ব্ৰহ্মর্ষি ।
সত্য যাহা শুনিলেন মম সখীমুখে ।
অভাগিনী অতি উচ্চপদ-আকাঙ্খিনী !
হায়-নাহি জানি,-
এ দুরাশা কেমনে মিটিবে মাের।
মহাদেব। বরাননে !
নিতান্ত বিস্মিত আমি শুনি বিবরণ ।
বুঝিতে না পারি,
কি কারণে হেন হীন আকাঙ্ক্ষা তােমার!
তপােকার্যে ভ্রমি দেশে দেশে,
পরিচিত সে শিব আমার!
গুণ গুণ তার,
জানি আমি ভালমতে।
কদাচারী শ্মশানবিহারী শিব,-
তুমি সরলা অবলা,
তিরূপে তারে করি নির্বাচন,
আত্মদান করিয়াছ রাজার কুমারী ?
কেবা দেবদেব?
মহাদেব কারে কহ ?

চতুর্থ দৃশ্য ] শিবশক্তি তিনলােকে সহায়-সম্বল, নাহি কিছু যার,- একি তব মস্তিষ্ক-বিকার, তার গলে মালা দিতে সাধ ? উমা। ব্ৰহ্মচারি । ব্রহ্মচারি ! করি হে মিনতি, স্তব্ধ হও, চাহি শুনিতে আর! মহাদেব। বুঝিলাম,-মজিয়াছ বালা ! অযােগ্যে সপিয়া প্রাণ- বালিকা-বুদ্ধিতে, সহিতেছ অশেষ দুর্গতি। উন্মুক্ত গগন যার আচ্ছাদন, বাঘছাল জঘণ্য বসন; গঞ্জিকা-ধুতুরা-ভাঙ্গ-পানে, অহােরাত্র ঢুলু ঢুলু দুনয়ন ; অস্থিমাল আভরণ-ভুজঙ্গ ভূষণ, ভূত-প্রেত-পিশাচ-সংহতি, ফেরে যেই দিবারাতি শ্মশানে মশানে,- তার সনে তব পরিণয়, হয় কি শােভন কভু রাজার ঝিয়ারী ? কর পরিহার এ দুৰ্ম্মতি বালা ! অস্পৃশ্য সে শিব ত্রিলােকসমাজে, অতি ঘৃণ্য উন্মাদপ্রকৃতি, মতিস্থির নাহি তার তিলেকের তরে ।

শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
( বাধা দিয়া)
সখি ! সখি ! নিবার’ ব্রাহ্মণে!
আবার—আবার সেই দক্ষযজ্ঞ-কথা !
সেই—সেই পুরাতন অভিনয় !
যায় প্রাণ সজনি লাে—
( মুচ্ছিতা )
একি ? একি ? নৃপতি-নন্দিনী !
কিবা হেতু ভূতলে শয়ন ?
সখি—সখি-শান্ত হও-কর আত্মসম্বরণ !
কে ও ব্রাহ্মণ ?
হে তব পরিচিত,
নহে কেহ আত্মপরিজন
যার মুখে শিবনিন্দা শুনি,
অধৈৰ্য্য পরাণী তব !
ও-ওঠ-সখি,
চল যাই প্রাসাদে ফিরিয়া ।
( অকস্মাৎ মহাদেবের স্বরূপ মূর্তি প্রকাশ)
পদ্মা। চারি–কেমন আচার ?
( মহাদেবকে দেখিয়া ) একি! একি! দয়াময় ?
মহাদেব। শান্ত হও সুলােচনে।
বিগতচেতনা সখীরে তােমার,
শুশষায় সুস্থ কর ত্বরা !
পদ্মা। স!ি সখি! মেল লাে নয়ন,
হের ইষ্টদেব সম্মুখে তােমার !

চতুর্থ দৃশ্য শিবশক্তি ৮৭ উমা। উমা। কই–কই—সখি- ইষ্টদেব মাের ? ( উমা অনেকটা সুস্থ হইলেন) মহাদেব । ( উমার প্রতি) তুষ্ট আমি তপস্যায় তব, সিদ্ধ হােক অভীষ্ট কুমারী । (স্তব ) প্রভূমীশমনীশমশেষগুণং গুণহীনমহেশগরাভরণম্ । রণনির্জিতদুজ্জয়দৈত্যপুরং প্রণমামি শিবম শিবকল্পতরুম। নয়নত্রয়ভূষিতচারুমুখং মুখপদ্মবিরাজিতকোটিবিধু। বিধুখগুবিমণ্ডিতভাতটং, প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুন । ( মহাদেব উমাকে হতৃদ্বার উত্তোলন । মহাদেব। উঠ পুরন্দর- ( ইন্দ্রের মসিভঙ্গে উথন ও সম্মন্ধে গমন। একাগ্রতামর সাধনায় ত,- অতি প্রীত আমি । নেহার নয়নে শিবশক্তি-সম্মেলন ! অভীষ্ট তােমার পূর্ণ এতদিনে ! কই কোথা কামদেব ? কোথা রতিপতি ? এস উজ্জীবিত হয়ে পুনঃ নববেশে, রতিপতি রতিসনে হইয়ে মিলিত ।

৮৮
শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
( মদনরতির প্রবেশ ও হরপার্বতীর চরণে প্রণাম )
ইন্দ্র।
জয় বিশ্বনাথ—ত্রিলােকের পতি।
আর কারে ভয়—ত্রিলোেক-মাঝারে ?
৫
( নন্দী ও দেবগণের প্রবেশ
আর কিবা চিন্তা দেবতামণ্ডলী ?
হের,—সাধনায় হইয়াছে সিদ্ধিলাভ ।
সাধনার বলে,
শােকাকুলা রতি,
পতিরূপে পুনঃ পাইল মদনে,-
পুনরুজ্জীবিত কামদেব !
সাধনায় ইষ্টলাভ আমাসবাকার।
(দেবদেবীগণের সমবেত গীত)
কস্তুরীকা-চন্দন-লেপনায়ৈ
শ্মশান-ভস্মাঙ্গ-বিলেপনায় ।
সৎকুণ্ডলায়ৈ মণিকুণ্ডলায়
নমঃ শিবায়ে চ নমঃ শিবায়।
অম্ভোধর-শ্যামল-কুন্তালয়ে
বিভূতিভূষাঙ্গ-জটাধরায়।
গজ্জননন্য জগদেকপিত্রে
নমঃ শিবায় চ নমঃ শিবায়।
সদ। শিবানাং পরিভূষণায়ৈ
সদা শিবানাং পরিভূষণীয়।
শিবান্বিতায়ৈ চ শিবান্বিতায়
নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।
৫

চতুর্থ দৃশ্য ] শিবশক্তি গিরিরাজের প্রবেশ ) গিরিরাজ। কই? কই ? উমা ? উমা মা আমার । একি সত্য কথা ? তুষ্ট মহেশ্বর তপস্যায় তাের ? 'ওরে,এত ভাগ্য মাের ? শিব হ’ল জামাতা আমার ? ( কুবেরের প্রবেশ) কুবের। দেখুন মহারাজ ! ভাল করে চেয়ে দেখুন, কন্যা-জামাতাকে একত্রে দেখে নয়ন সার্থক করুন। ওগাে-ও এয়ােরা! তােমরা সব পেছনে কেন ? এগিয়ে এস ! এখন আর শিব বলে ভয় করলে চলবে ! তােমাদের জামাই, তােমাদের সই! একবার এই দোজ- বরে বুড়ো সয়াকে,প্রাণভরে তােমাদের রং-তামাসায় ডুবিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে চল। ( গৌরীসঙ্গিনী এবং এয়ােগণের প্রবেশ ) গিরিরাজ। এসাে–এসাে—আনন্দ কর-আনন্দ কর ! আজ বড় আনন্দের দিন! বর-কনে নিয়ে তােমরা প্রাণভরে আনন্দ কৰ্ত্তে কর্তে প্রাসাদে চল। ( এয়ােগণের গীত ) আই-আই—ঐ বুড়ে। কি ঐ গৌরীর বর লো? শুনছি নাকি এয়াের মাঝে এলো দিগম্বর ললা ?

৯০
শিবশক্তি
[ তৃতীয় অঙ্ক
৫
উমার কেশ চামর-ছটা,
তামার শলা শিবের জটা,
তায় বেড়িয়ে ফোপায় ফণী,
দেখে আসে অর লো!
উমার মুখে চাদের চূড়া,
শিবের দাড়ী শণের নূড়া,
ছার-কপালে ছাই কপালে,
দেখে পায় ডর লল।
উমার গলে মণির হার,
শিবের গলে হাড়ের ভার,
কেমন করে ওমা উমা,-
কাৰ্বে বুড়াের ঘর লাে ?

চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
মদনের নিকুঞ্জবন
(মদন-রতির দ্বৈত গীত)
মদন।
রতি।
महन।
রতি।
এস,বুকে বুকে, -যুগে মুখে,অনন্ত প্রেম,
'মিশে রই দেহে চিরমিলনে।
এত, যাতনা বিরহে,
জানিনা কেমনে সহে,-প্রেমিক-প্রেমিক। ত্রিভুবনে ?
আবার এসেছি ফিরে, হৃদয়ে ধরিতে তোরে ;-
মিলিতে সুখের মিলনে।
রেছি ফিরেছি কত,কেঁদেছি হে অবিব্রত
সে জ্বালা কি ভুলিব জীবনে ?
কেন দুঃখগাথা আর সুমিলনে ?
(প্রিয়ে) শুভমিলনে ?
চল কুঞ্জবনে-প্রেম-আলাপনে !
এস কুঞ্জবনে,-প্রেম-আলাপনে !
(প্রিয়) দুঃখ ভুলি মাতিগে সুখস্বপনে !
( প্রিয়ে ) দুঃখ ভুলি মাতিগে সুখস্বপনে।
দন।
রতি।
নদন।
রতি।
মন।

দ্বিতীয় দৃশ্য সনাতন শৰ্মার বাটীর প্রাঙ্গন। (সনাতন শৰ্মার প্রবেশ ) সনাতন। নাঃ! এ বৈরাগ্যের অনেক বিপদ! বনের মধ্যে মশার উৎপাত তাে সহ্য হয়না! রাত্রে কোথায় একটু নিশ্চিন্ত হয়ে প্রেমালাপ কৰ্ত্তে কৰ্তে নিদ্রাদেবীর আরাধনা কৰ্ব্ব,—তা নয়, কি যে দুর্বুদ্ধি ঘাড়ে চাপ লাে-রাত্তির বেলা স্ত্রী ছেড়ে,—বিছানা ছেড়ে,-পড়লুম গিয়ে বেট। মশার খপ্পরে!—নাঃ এই নাকমলা— কান মলা!—এমন কৰ্ম্ম আর কক্ষনাে কৰ্ব্বনা ! যাক্,-রাতারাতি বাড়ীতে তাে ফিরলুম ! এখন গৃহিণী তাে গেছেন বাপের বাড়ী,কাল ভােরেই গিয়ে পায়ে ধরে সেধে তাকে ঘরে আনবাে !--ছ্যাঃ—ছ্যাঃ- স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া ভদ্রলােকে করে ? । ( দুন্দুভির প্রবেশ ) দুন্দুভি। আমি গলায় দড়ি দিয়ে মৰ্ব্ব,—আমি জলে গিয়ে ডুবব, আমি তালগাছ থেকে হাত পা ছেড়ে আছাড় খাবাে,- সনাতন। আরে—আরে—তুমি -তুমি? বাপের বাড়ী থেকে এই রাতের দুন্দুভি। আস্বাে না—আস্বাে না? রাত দুপুরে অন্ধকারে ঘরের ভেতর একলাটী শুয়ে থাকা যায় ? হতচ্ছাড়া অনামুখখা মিসে ! একটা কি বেফাস কথা কয়েছি, অমনি সুড়ক করে বাড়ী থেকে উধাও? আমি অবলা স্ত্রীলােক,বাপের বাড়ী থাকি কেমন করে এটা একবার ভাবলে না ?

প্রথম দৃশ্য ]
শিবশক্তি
সনাতন। কি বিভ্রাট! এতটা গড়িয়েছে ? একটিবার মনের ভুলে বাড়ী,
ছেড়ে গেছি—এরই মধ্যে
দুন্দুভি। ফের যদি এই রকম আমাকে না বলে কয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে
যাবে-
সনাতন। যা—আর দুপুর রেতে গােলমালে কাজ নেই—চলল ।
দুন্দুভি। মুখে আগুন,-পোড়াবুদ্ধির মুখে আগুন ! কি পাপই করে-
ছিলুম গা—তাই এই বেরসিক, বব্বলে, বাউণ্ডুলে-বৰ্বর সােয়ামীকে
নিয়ে ঘর কৰ্তে হচ্ছে !
সনাতন। আরে—এমন কি মহা অপরাধটা কলুম যে রাগ আর তােমার
পড়তেই চায়না ?
দুন্দুভি। ফে—ফে বলছ—কি অপরাধ করলুম? জাননা,আমি
অন্ধকারে ঘুমুতে পারিনা, ভয় পেয়ে হঠাৎ ককিয়ে উঠি
সনাতন। ঠিক-ঠিক—আচ্ছা এখন চল—চল—
( উভয়ে গৃহমধ্যে প্রস্থানােস্থত )
(রাকার প্রবেশ )
রাকা। জ্বালাতন ! ঘুমােবারও যাে নেই ! ওমা—এ কে ? মা ? কখ
এলে? বাবা! তুমি ফিরে এসেছ ?
দুন্দুভি। তুই আবার এত রাত্রে বিছানা ছেড়ে উঠে এলি কেন মা?
পদার মা কোথায় ?
সনাতন। সে আর কোন চুলােয় যাবে ?, আমারই ঘরে শুয়ে রয়েছে ?
এত ডালুম, বল্লম,-“পদার মা-একবার যা তাে-বাইরে কিসের
গোলমাল হচ্ছে,-একবার খবরটা নে তাে !” তা, মাগী যেন
মরেছে,—কিছুতেই উঠলো না!

৯৪
নেই।
শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
সনাতন। চ রাকা—শুবি চল্ ! এস গিরি-নার গােলমালে কাজ
দেখ দিকি—কি বিভ্রাট! মেয়েটার শুদ্ধ, রাত্রে ঘুম
হচ্ছে না
দুন্দুভি । কোত্থেকে হবে ? শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে মেরে ফেলে।
পেরিয়ে সতেরােতে পােড়লো !—এখনও একটা বর জুটুতে পালেন।
মেয়ের কখনাে ঘুম আসে ?
রাকা। কি সব বাজে কথা বহু মা? বাবা ! যাও তুমি শশাওগে,
আমি দেখে শুনে দরজা বন্ধ করে যাচ্ছি—
সনাতন। হ—মা—তাই এস,আর রাত জেগােনা।
দুন্দুভি। ন্যাকা মিসে ! চল,—শুবি চল্। যা রাকা
[ সনাতন ও দুন্দুভির প্রস্থান
রাকা। ভারি জ্বালাতন কল্লে কুন্তল ! কিছুতেই ভুলতে পাচ্ছিনা !
কেন মিছে তেজ দেখিয়ে বিয়ে কৰ্ব্বনা বলেছিলুম? দেখছি, মরণ
হলে আর আমার নিস্তার নেই
( কুন্তলের প্রবেশ)
কুন্তল। নিস্তার কারও নেই—যতক্ষণ না-
রাকা। এ-তুমি-তুমি—এত রাত্রে
( কুন্তল তাড়াতাড়ি নিকটে আসিয়া পদতলে বসিয়া
পড়িয়া করজোড়ে )
কুন্তল। দোহাই-দোহাই রাকা! চেঁচিওনা--চেঁচিওনা
রাকা। তুমি—এত রাত্রে পাঁচিল টপকে
কুন্তল। একদম পুরােণাে-বেবাক মামুলি ! পাচিল টপকানাে,গাছে
চড়ে—হাত পা ছেড়ে লাফিয়ে পড়া,—সিঁড়ি বেয়ে জানলায় ওঠা,-

প্রথম দৃশ্য ] শিবশক্তি মান্ধাতার আমল থেকে আমার মত ডকা ছোড়ারা প্রেমের দায়ে করে আছে ! নতুনত্ব এতে মােটেই নেই,—চমকাবার—ভড় কাবার -আশ্চৰ্য্য হবার,-বাহবা দেবার এতে কিছুই নেই। রাকা। তা তাে নেই ! কিন্তু তুমি এ রকমটা ক’চ্ছ কেন? কুন্তল। থাকতে পারলুম না ! দেড় ঘটী সিদ্ধি খেয়ে ভর সন্ধ্যেবেলা তােমার ছবিটী প্রাণের ভেতর একে নিয়ে বিছানায় ধ্যান কর্তে কর্তে শুয়ে পড়েছিলুম- রাকা। ভালই করেছিলে ! নেশা করে শুয়েছিলে,-অঘােরে ঘুমিয়ে পড়বারই ত কথা ! নেশার ঝোঁকে এতটা পথ এসে পাঁচিল টপকালে কি করে? কুন্তল। আরে নেশা করেই তাে এই বিপদ! শালা ভাংএর নেশা অতি পাজি নেশা! সাদা প্রাণে হয়তাে কাহিল হয়ে ঘুমিয়ে পড়তুম! কিন্তু, যত নেশা পা মারতে লাগলো,-ততই তোমার জন্যে দম্ আটকানী শুরু হ’ল ! উঃ-জলে যেতে লাগলাে—প্রাণের ভেতর জলে যেতে লাগলাে ! রাকা—রাকা—একটু জলজল-উঃ- রাকা। জল খাবে? দাঁড়াও—চুপি চুপি একঘটি জল গড়িয়ে কুন্তল। জল আনতে যাচ্ছ? কলসীর জল? রাকা। না,-কুঁজোর জল ! কুন্তল। কুঁজোর জল ? সেই এক ঘটী কুঁজোর জল খেয়ে বিকারে রুগীর তেষ্টা মিটবে রাকা ? (সনাতন শৰ্মার পুনঃ প্রবেশ ) কুন্তল। আমি-আমি-উঃ-আমি মরে গেলুম-মরে গেলুম-রাক। [ রাকার পলায়ন

শিবশক্তি
{ চতুর্থ অঙ্ক
সনাতন। ম—এখুনি মর, আঁটকুড়ির বেটাচার !
কুন্তল। মই তাে! আর মরেই তাে আছি,-নতুন করে মৰ্ব্ব কি?
সনাতন। চল্ বেটা,-তােকে কোতােয়ালীতে নিয়ে যাই চল্ ! বেটা !
মুক্ষু—গোরার–নষ্ট—দুষ্ট-লম্পট! ফের আমার বাড়ীতে ঢুকেছ ?
চলতােকে আজ কোতােয়ালীতে নিয়ে নিকেশ করে দিচ্ছি।
(দুন্দুভির পুনঃ প্রবেশ)
?
.
দুন্দুভি। কতদিন বছি—অনামুখখা মিসে-আর কেলেঙ্কারী বাড়ানি?
সােমােতো ছেলে,-লােমােত্তো মেয়ে,-ভেতরে ভেতরে পছন্দ হয়েছে,
-ভালবাসা হয়েছে,—দুটোর বিয়ে দিয়ে দে! ওরাও নিশ্চিন্দি-
আমরাও ঘুমিয়ে বাঁচি
সনাতন। বল কি গিন্নি ? এই বেটা মুক্ষু—আকাট—গোয়ার,-এর হাতে
মেয়েটাকে দিয়ে জলে ফেলে দোবাে ? সেবারে তােমার কথা শুনে
পাকাপাকি করেছিলুম ! এই বেটাই তাে নিজে বিয়ে কৰ্ব্বনা বলে
সব কঁচিয়ে দিলে ! ভালই হয়েছে, অমন মুক্ষু ছেলের সঙ্গে মেয়ের
বিয়ে না দিলেই ভাল।
দুন্দুভি। মুক্ষু তােমার চেয়ে তাে ও নয় !
সনাতন। কি গৃহিণী,-আমি মুক্ষু ?
দুন্দুভি। নিশ্চয় ! মুক্ষু না হলে রাত দুপুরে উঠোনে দাড়িয়ে কোদাল
কৰ্ত্তে সুরু করে ?
কুন্তল। এই বলুন তাে,-বলুন তাে মা-
(রাকার পুনঃ প্রবেশ)
কা। বাবা-মা,-সত্যি কি তােমাদের জ্বালায় আমি গলায় বঁটি দিয়ে

দ্বিতীয় দৃশ্য। শিবশক্তি ম’ৰ্ব্ব ? রাত দুপুর হয়ে তিন প্রহর হতে চ’র্ল,-এসব কি কচ্ছ বল দিকি ? সনাতন। এ-এ-এ বেটা চোর—তাের জন্যে পাঁচিল টপকাবে- কুন্তল। বেশ তাে! আপনার ইচ্ছা হয়,—আমাকে শাস্তি দিন, কোতােয়ালিতে ধরিয়ে দিন । যা খুশী তাই করুন ! কেলেঙ্কারী কব্বার দরকার কি ? মেয়েত আপনার ঠিকই বলছে- দুন্দুভি। দাও—দুটোর বিয়ে দিয়ে দাও-সকল আপদ চুকে যাক ! দিব্যি ছেলেটী- কুন্তল। বলুন তাে মা-দিব্যিটী নই ? দুন্দুভি। বাপের জমিজমা–টাকাকড়ি কুন্তল। বাড়ী ঘর দোর সবই আছে !—নতুন একটা পুকুর ও কাটিয়েছি— সেদিন ! সনাতন। কিন্তু একেবারে যে নিরেট- কুন্তল। আজ্ঞে—নিরেটই তাে ভাল,—সহজে টোল খাবেনা । সনাতন। হারে রাকা—এই রকম মুক্ষু স্বামী- রাকা। তােমার জামাই হলে কি আর কেউ মুক্ষু থাকে বাবা? তবে তুমি এত বড় পণ্ডিত হয়েছ কেন ? [ প্রস্থান সনাতন। এঁ তাই নাকি? যাক— তাহলে কি বল গিন্নী- দুন্দুভি। তাহলে কালই ভাল দিন আছে—লাগিয়ে দাও সনাতন। এখন তুমি যাও বাবা কুন্তল ! আমি যখন কথা দিচ্ছি- দুন্দুভি। তখন আর তােমায় পাঁচিল টপকাতে হবেনা। কুন্তল। যে আজ্ঞেতা জানি [ প্রস্থান ৭ ৯৮ শিবশক্তি [ চতুর্থ অঙ্ক সখী। দুন্দুভি। বেশ ছেলে! সনাতন। চমৎকার জামাই হবে । [ উভয়ের প্রস্থান দশান্তর মিশ্রা। কি হ’ল বদিকি সই,এখনও উনি আছেন না কেন ? সখী। কি আশ্চার্য্য কাণ্ডকারখানা তােমার ! তুমিই তাে তাড়ালে তাকে ? মিশ্রা। সই। তিনি রাগ করেছেন- এ রাগ থাকবেনা মিশ্রা। না সই । মাকে বলে—বাবাকে বলে-একবার লােক পাঠাও !তার এত দেরী হচ্ছে কেন? ১ম সখী। বড় বাড়াবাড়ি হচ্ছে সই, শাস্তর ছাপিয়ে চলেছে। বৌয়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুরবাড়ী যােড়ে এসেছিলেন। একবার বাড়ী গেছেন, অমনি তােমার প্রাণ এমন উসে উঠল—যে, আর ধৈৰ্য্য মানছে না। মিশ্রা। একবার কি বলছিস্ সই-এ যে অনন্তকাল ! উঃ-বিরহে প্রাণ যায়! ওলল! প্রেমের আস্বাদ যখন একবার পাবি,-তখন বুঝতে পাঝি, বিচ্ছেদের এক মুহূর্ত যুবতীর-ঐ-ঐ আছেন ! হ্যা—আমি যেন তার গলার স্বর শুনতে পাচ্ছি,আমি যেন তার পায়ের শব্দ প্রাণে প্রাণে অনুভব ক’চ্ছি- (পল্লবের শশব্যস্তে প্রবেশ ) পল্লব ! মিশ্র-মিশ্ৰাপ্রিয়তমে— (আলিঙ্গন) মিশ্রা। ( দৃঢালিঙ্গনপূর্বক) এলে-এলে—নিষ্ঠুর ? আর একদণ্ড বিলম্ব হলে-উঃ-সখী-সখী-তােরা বা--- দ্বিতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি ৯৯ ( মিশ্রা ও সখীগণের গীত ) মিশ্রা। ( সখি ) এবার তােদের ছুটী (ওলো। এবার তােদের ছুটী ! মরা দেহে প্রাণ পেয়েছে (এই) প্রাণহারা প্রাণ দুটী ? সখীগণ। তবে চ’ল্ল গুটিগুটি, অবলা এই কটী, (সই) মিটলাে যখন ঝগড়া ঝাটী,- ( কসে) তবলাতে দাও চাটী। [ সকলের প্রস্থান দৃশ্যান্তন নন্দক ও জলকুম্ভ লইয়া লােহিতার প্রবেশ) লােহিতা। আঃ! কি জ্বালাতনেই পড়েছি বাপু, কাপড়টা ছেড়ে আসি,- যাবই তাে,নিতে যখন এসেছ। নক। তুমি আবার কষ্ট করে বইবে কেন ? না—না—দাও, কলসীটা আমার হাতে দাও। এতটা পথ কলসী কাকে করে—হেঁটে কষ্ট পেয়েছ! আঃ আমার মুখে আগুন-আঃ আমার মুখে আগুন- ( নিজের মুখ চড়াইতে লাগিলেন ) লােহিত। কি ছেলেমানুষি কচ্ছ। সবােকলসী রেখে কাপড়টা ছেড়ে আসি! বাবা-মাকে বলতে হবে—তবে তাে যেতে পাব। নন্দক। না—অত দেরী আমার সইবে না—এইখান থেকেই কলসী আমাকে যদি না দেবে তাে আমার বাপের লােহিতা। আঃ ভাল জ্বালা,-নাও (কলসী প্রদান ) নক। কাপড়টা ঘর থেকে দৌড়ে এনে দিচিহ্ন—এইখানেই একপাশে দাড়িয়ে লােহিতা। মুখে আগুন— প্রস্থানােত) শিবশক্তি [ চতুর্থ ও ( অঘা, মঘ, বগা ও দাগা পুত্ৰচতুষ্টয়ের প্রবেশ ) পুত্রগণ। মা- নক। ডাকলে বেটাচ্ছেলেরা-পেছু ডালে। যাও,-পালাও সব- লােহিতা। মতিচ্ছন্ন ধল্ল নাকি? শুধু শুধু বাছাদের ধমকাচ্ছ কেন? নক। ভুলে গিন্নি—ভুলে—মাথার ঠিক থাকেনা! তুমি বাড়ী গেরে চলে এসেছ,আর কি আমার মাথার ঠিক আছে ? আয়, আয়- তােরা সব আয় লােহিতা। কি র্যা ? কেন ডাকছি- পুত্রগণ। এই—এই নক। ওদের বাবার গুষ্টির পিণ্ডি! চলল—চলল তুমি কাপড়চোপ ছাড়বে! ভিজে কাপড়ে থাকলে অসুক কৰ্বে ! থা—গােরবেটা ছেলেরা—দাড়িয়ে দাড়িয়ে ম্যা—ম্যা করে বেরাল ডাকুক। লােহিত। আসছি রে-কাপড়টা ছেড়ে চট করে বাড়ী যেতে হবে - নক। হঁা-হা-তােরাও সব চটপট তৈরী হয়ে নে, [ লােহিতাকে বাহুপাশে টানিয়া লইয়া প্রস্থান অঘা। বাবাটা ভারি দুষ্ট- মঘা। একদণ্ডও মায়ের কাছে আমাদের থাকতে দেয় না- বগা। আমাদের যেন মা নন- দাগা। মাকে দিয়ে আচ্ছা আচ্ছা করে ঠ্যাঙ্গানি খাওয়াবাে !

তৃতীয় দৃশ্য নন-কানন তারক ও অধৰ্ম্মের প্রবেশ তারক। অসম্ভব-অসম্ভব কথা-- হেন অসম্ভব বাণী, বিশ্বাসের যােগ্য নহে কদাচন। কিবা অসম্ভব প্রভু? . তারক। অধুৰ্ম্ম। তারক। কেন অসম্ভব ? নাহি জান তুমি রমণীর মন, তাই দুলিছে সন্দেহ-দোলায়, অবিশ্বাস কর মাের কথা। তাই বলে—শচী—দেবেন্দ্রাণী- ঐশ্বর্যের সহচরী,—বিলাসে বর্ধিতা, সর্বদা কামনা করে বিলাস-বৈভব । নহে—শচী—দেবেন্দ্রাণী । সতীর মর্যাদা ভুলি বহিবে আমায় ? দিবানিশি মনে মনে চাহিছে তােমায় ! স্তব্ধ হ’ রে স্তব্ধ হ’ রে—রে মিষ্টভাষি। চমৎকার—চমৎকার প্রলােভন-জাল- পাতিতেছ সম্মুখে আমার ! কিন্তু ঐ জালে তারক না বদ্ধ হবে কভু। শচী,-দেবেন্দ্রাণী,—ত্রিলােকবাঞ্ছিতা,- নারী-নারী—নারী মাত্র! অধৰ্ম্ম । তারক। অধর্ম।

শিবশক্তি [ চতুর্থ অঙ্ক - তারক। সম্ভোগ-বদ্ধিতা, ত্রিলােক-বাঞ্ছিত যেই, সম্ভোগ-বাসনা তার প্রতি শিরামাঝে। লালসার মাংসপিণ্ড বিলাস-সঙ্গিনী, সম্ভোগের মাঝে হইয়া পালিত, কেমনে সম্ভোগ-তৃষা রাখিবে দমিত ? শচী—দেবেন্দ্রাণী— নবনীত-দেহা, বরবপুমাঝে- লুক্কায়িত মদনের বিলাস-মন্দির। ত্রিলােক-বাঞ্ছিতা, ত্রিলােক-ঈপ্সিতা, স্বর্গ-সুখ-স্বর্গমাঝে । স্বর্ণাধিপ-যােগ্যমাত্র তার, স্বৰ্গাধিপে কেন না কাঙ্কিবে ? বাসনা-অনল করিবারে প্রজ্জ্বলিত, হে-সচিব ! চমৎকার যুক্তি তব তারক। কিন্তু মুঢ়- অধর্ম। তারক। শচী-দেবেন্দ্রাণী- বাসনা-তােমার ! বাসনা-আমার হা,–শচী দেবেন্দ্রাণী-বাসনা তােমার ? মিথ্যা কথা । অধৰ্ম্ম । তারক।

তৃতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি ১০৩ অধৰ্ম্ম । ? তারক। মিথ্যা কথা যদি- কেন তবে আনিয়াছ বন্দী করে, শচী দেবেন্দ্রাণী—সে অবলা রমণীরে কেন তারে রাখিয়াছ কারাগারে নিজ-অধিকারে । আনিয়াছি দেবেন্দ্রের লভিতে সংবাদ । আনিয়াছি মৈনাকের পরামর্শ-মত । নিৰ্যাতন করিয়া শচীরে,- জানিবারে চাই,বাসবের পলায়ন-স্থান। তবে কেন আছ নির্বিকার হাতে পেয়ে তারে ? কেন কর নাই নিৰ্যাতন ? কেন বার বার উপেক্ষিয়া মৈনাকের সকল মিনতি, প্রতিহিংসাব্রত তার অধৰ্ম্ম। । তারক। অধৰ্ম্ম । কর সফল? নারী—সে রমণী রমণী—মােহিনী শাস্তি লভিবার তরে- সম্মুখে দাঁড়াল যবে, মুহূর্তে মােহিয়া গেল- শাস্তিদাতা বীরে! কটাক্ষে জিনিয়া গেল শান্তি নিতে এসে !

১০৪ শিশক্তি [ চতুর্থ অঙ্ক তারক। অধৰ্ম্ম। তারক। মন্ত্রী-মন্ত্রী (হাসিয়া) হাঃহাঃ- কেন বিচলিত ? ইথে দোষ কিবা ? পুরুষের অপরাধ ইথে নাহি গণি। বীরভােগ্যা বসুন্ধরা জানে সৰ্ব্বলােকে। বীর কাম্য রমণীর-বীরভােগ্যা নারী! তুমি যথা বিচলিত হেরিয়া শচীরে, এ নহে কল্পনা মম, ওহে স্বর্গাধিপ, শচীও তােমারে হেরি বিকলা তেমতি । বার বার ঐ কথা শুনি তব মুখে ! এত যদি অনুরক্ত শচী মম প্রতি, আভাষে ইঙ্গিতে, । কেন নাহি প্রকাশ তাহার ? হে বীরেন্দ্র বাসব-বিজয়ী! আছে কথা চিরপ্রচলিত, বক্ষ যদি প্রেমাবেগে ফাটে রমণীর, তবু কভু পুরুষেরে,- নারে প্রকাশিতে মুখে মনােভাব তার ! প্রেমিক পুরুষ, প্রেমভিক্ষা করে যবে রমণীর পাশে, নানা ছলভাষে‘সেই প্রেমিকা রমণী, প্রত্যাখ্যান করে সে প্রেমের ; কভু কাঁদে,-কভু বা জানায় হৃদয়ের ব্যথা ! অধৰ্ম্ম ।

তৃতীয় দৃশ্য ] শিবশক্তি কভু দুরে সরে যায়, নানা রঙ্গে ভঙ্গে- অসম্মতি জানায় পুরুষে ! কিন্তু, একবার হলে বদ্ধ প্রেম-আলিঙ্গনে,- অতঃপর সে ভাব না রয়,- পরিণামে হয় শেষে প্রণয়ে বন্দিনী ;- ধরা দেয় নির্বিরােধে প্রেমিক পুরুষে । নহে প্রভু রচনা আমার ! নারীতত্ত্বে সুপণ্ডিত আমি, বার পরীক্ষিত এ বাক্য আমার। হে সুযােগ্য মিত্র মন্ত্রীবর । উৎসাহিত অন্তর আমার, প্রেম-উদ্দীপক বচনে তােমার ! সুধাপাত্র দেহ ভরি, প্রাণ হাে উল্লসিত। (সুধাপান) যাও- লয়ে এস শচীরে হেথায়, কেন বহি বৃথা আর বিরহ-ব্যথায় ? [ অধর্মের প্রস্থান শচী-দেবেন্দ্রাণী,-বাসনা আমার ? সত্য কহিয়াছ তুমি,-তীক্ষ্ণ লক্ষ্য তব। অন্তরের গােপন বাসনা, জানি নাই আমি,—জানায়েছ তুমি ! নিমেষেও তাবিতে যে কথা করিনি সাহস,-

শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
অযাচিত সেই সৌভাগ্যের রাশি
চাহিছে আমায়?
আর আমি,
স্নিগ্ধ সুশীতল বারি রাখিয়া সম্মুখে,
পিপাসায় আৰ্ত্ত হয়ে,
সহিতেছি বিকারযন্ত্রণা ।
বিড়ম্বনা কিবা অতঃপর ?
(সুধাপান)
(শচী ও অধর্মের প্রবেশ )
তারক।
শচী।
এস লাে সুন্দরি
দিবসশর্বরী—কেন মনটদুঃখে
করিছ যাপন ?
এস-এস-লত প্রাণধনে তব !
একি দৈত্যরাজ ?
একি তব নবভাব আজি ?
আশ্বাস প্ৰদানি মােরে,
কেন পুনঃ ভীতি উৎপাদন ?
নহে নীচ অন্তর তােমার,
দেবরাজদ্রোহী সেই মৈনাকের মত !
জান নাকি সুহাসিনি-
চিরদিন কভু সমান না যায় ?
ছিল, সুপ্ত প্ৰেম গুপ্তভাবে স্বর্গাধিপ-প্রাণে,
এবে, জাগরিত তাহা—অনঙ্গ-কৃপায়,
প্রয়ােজন তােমারে লাে সে কারণ '

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
তারক।
শুন বরাননে
ছিনু প্রতীক্ষায়,
কবে তুমি আপন ইচ্ছায় আসি,
প্রেমদানে তুষিবে আমারে?
বুঝিয়াছি অবশেষে,
রমণী-সুলভ লজ্জা-মান-অভিমানে,
সেধে যেচে প্রেমদানে
অসমৰ্থা তুমি !
এসএস–প্রেমময়ী-প্রেমিকের পাশে
শচী।
কেন ত্রাসে কম্পিত ও দেহলতা ?
কোথা পাবে তব যােগ্য প্রেমিকপ্রবর—
আমার সমান এ তিন ভুবনে ?
স্বর্ণজয়ী আমি দেবরাজ,
পুনঃ দেবরাজরাণী—হবে তুমি বালা।
দানবের দানবত্ব প্রকাশিত এবে।
বুঝিলাম তবে,
এইবার নিজমুৰ্ত্তি করেছ ধারণ'!
দৈত্য-অত্যাচার অবলার প্রতি,
আজি হতে হলাে সূত্রপাত !
নাহি তব দোষ দৈত্যপতি।
বার যেই রীতি—
সেইমত তার আচরণ
প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কাৰ্য কেহ করে কভু
দানবে মহত্ত্ব-শৈত্য অনলের মাঝে-
:

তারক।
-
'শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
কিম্বা লৌহে কোমলতা আকিঞ্চন, .
বাতুলের বাতুলতা,অসম্ভব উপকথা মাত্র এ সকল !
বিধুমুখে মৃদুমন্দ তিরস্কার-বাণী—
ওহে-এত মধুরতমাখা তায়?
মরি মরি—
সদ্য সুধাবরিষণ যেন বা শ্রবণে !
চন্দ্রাননে,-কর পুনঃ তিরস্কার ভৎসনা আমারে।
কহ কটু কথা যত ইচ্ছা মনে ।
অথবা মানিনী—ধরি চরণে,
কর ধন্য পদাঘাতে এ ছার শরীর।
মুঢ় দৈত্যপতি।
আমি শচীদেবী,
পতি মম দেবরাজ স্বর্গ-অধিপতি।
এ প্রাণের প্রেম-ভালবাসা আছে যত,
অর্পিত সে দেবরাজ-পদে !
বল কি সাহসে মম পাশে –
হেন অবৈধ আকাঙ্ক্ষা তর ?
দৈত্য-কারাগারে বন্দী বটে এ পাপ শরীর,-
কিন্তু প্রাণ মম
ফেরে পতি সনে।
শচী।
--
শয়নে স্বপনে জাগরণে-
ধ্যানে জ্ঞানে হেরি দিবানিশি,--
দেবরাজ-মুৰ্ত্তি সদা !
অবােধ ললনা-কোথা রােজ ?

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
১০৯
আমি দেবরাজ—সম্মুখে তােমার!
কি হেতু বলনা,ব্যর্থ কর রমণীজীবন তব ?
হৃদয়ের ও অগাধ প্রেমরাশি
কেন নিরর্থক রেখেছ সঞ্চিত,-কার তরে ?
যারে এ জীবনে কভু তুমি আর
পারিবে দিতে উপহার,
কিম্বা কভু না করিবে দরশন,-
কেন, তারে এত আকিঞ্চন ?
এ জীবনে হবে কি মিলন তার সনে,
মুক্তিলাভ করি মম পাশে ?
তেঁই কহি,—পরিহার করি বাতুলতা,-
এস এস এই ভুজলতা-পাশে
বদ্ধ কর প্রেমাতুর নব দেবরাজে।
দৈত্যপতি-বীর তুমি—সতীরে না কর অপমান
হাঃহাঃহাঃ,-অপমান ?
তােমারে কে করে অপমান?
শচী।
তারক।
তােমা সম মহামান্যা-
তিন লােকে কেবা আছে আর ?
স্বর্ণজয়ী দেবরাজ বীরেন্দ্র তারক,
দাস তব পদতলে !
লাে সুন্দরি।
তব প্রেম লভিবার আশে,
সম্পদ-বিভব-যা আছে এ স্বর্গপুরে,
অকাতরে রাঙ্গা পায়ে দিব লুটাইয়ে,

শিবশক্তি [ চতুর্থ অঙ্ক সদয় হইয়ে বারেকের তরে, ফিরে যদি চাহ এ অধীনে। শচী। রে বৰ্বর দানব দুৰ্ম্মতি ঘৃণায় যেমতি হীন কুকুরের প্রতি, ফিরে নাহি চায় কেহ, জানিহ নিশ্চয়,-- ততােধিক অবজ্ঞার ভরে, পদাঘাতে দূরে নিক্ষেপিয়া তােরে, চাহিব না ফিরে আর -দৃষ্টি মম করি কলুষিত মনে মনে ভেবেছ কি স্থির পাপ দৈত্যরাজ্য রবে চিরস্থায়ী । আকাশ-কুসুম করিয়ে কল্পনা, আরে নীচমনা- এ ধারণা তব বদ্ধমুল প্রাণে, ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী শচী- প্রেমদান করিবে তােমারে ? তারক। বুঝিলাম, মিষ্টভাবে প্রবােধ বচনে ইষ্টলাভ না হইবে মম। কুভাষিণী—দুর্পিত রমণি ! “দেবরাজ” বলি মােরে না কর স্বীকার, “দানব” “দুৰ্ম্মতি” “দৈত্য” কহ বারবার ? ভাল,তবে দানবীয় নিষ্ঠুর আচার- দৈত্যোচিত অত্যাচার- এইবার সহ দুষ্টা শক্তি যদি হয়, দৈত্য-আলিঙ্গন-বা দৈত্য-বাহুপাশে। •

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
১১১
অধৰ্ম্ম।
নাহি চিন্তা ত্রিদিব-ঈশ্বর,
প্রেমদানে অসম্মতি প্রেমপ্রার্থীজনে—
প্রথম প্রণয়-সম্ভাষণে,-
জেনাে স্থির মনে,
ভাণ মাত্র রমণীর,-পুরুষের কামতৃষা করিতে প্রবল !
অবলার প্রেমছল,-মহাবল তার
বধিতে পুরুষ-প্রাণ ।
মতিমান্ ! দেখিবে সত্বর,
এইবার গত্যন্তর না দেখি যুবতী,
প্রতিভরে আত্মদান করিবে তােমারে,--
যেই দণ্ডে আকর্ষণ করিবে বালায় ।
--
{ অধর্মের প্রস্থান
তারক।
অবােধ ললনা !
হের এইবার কাৰ্য্য দানবের,
ভদ্র ব্যবহার যার,মনঃপূত নহেকো তােমার !
ছিল জ্ঞান চিরদিন,সরলে সরল ব্যবহার,
কোমলের সনে কোমল মিলন,
অতি সুশােভন !
তেঁই কোমলতা করিয়া আশ্রয়,
তুষিতে তােমায়—করেছি যতন !
যদি তুষ্টা তাহে নহে প্রাণমন তব,
এস তবে কোমল-কলিকা-
কঠোর দানব-করে হইবে পেষিত ।
এস লাে মাধবীলতা-

শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
দানবের শৈল-অঙ্গে লইবে আশ্রয় !
প্রেমভিক্ষা চেয়েছি কাতরে,
বিনিময়ে পদাঘাতে দূরে ফেলে মােরে,-
চলে যেতে চাও ফিরায়ে বদন ?
এবে সঞ্চিত সে প্রেমসুধারাশি
হে রূপসি !
এইমত অধিকার করিয়া সবলে,
নিজ পরিতৃপ্তি-মত করি উপভােগ !
সাবধান দুৰ্ম্মতি দানব
সতী-অঙ্গ স্পর্শ নাহি কর !
শচী।
( তারক সবলে শচীকে আকর্ষণ করিয়া)
তারক হা-হা-হা-হা-
কঠোরে কোমলে অপরূপ সম্মেলন।
এস এস চন্দ্রাননে—এ বাহুবেষ্টনে মাের !
আমি পিয়াসী চকোর
থাকি লাে বিভাের তব ওসুধাপানে।
( শচীকে বাহুবেষ্টন করিয়' মুখ চুম্বনের উদ্যোগ )
শচী।
ওঃ-ওঃ—ছাড়—ছাড়, রে পিশাচ
চূর্ণ হল দেহ লৌহদেহের পেষণে—
(সবলে মুক্ত হইবার চেষ্টা)
( অকস্মাৎ তরবারি হস্তে মৈনাকের প্রবেশ)
মৈনাক। স্তব্ধ হােন্ দৈত্যরাজ !
( শশব্যস্তে শচীকে ত্যাগ করিয়া অতন্ত বিরক্ত হইয়া
তারক মৈনাকের সম্মুখে আসিল)

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
তারক। একি সেনাপতি ?
তুমি কেন অকস্মাৎ নন্দন-কাননে-
বিরামের কালে মাের?
মৈনাক। আসিয়াছি রাজকাৰ্য্য সাধিবারে,
নহে নিজ-প্রয়ােজনে !
শচীদেবি ।
বন্দিনীর স্থান কারাগারে ;-
কোন অধিকারে নন্দনকাননে তুমি ?
এস মাের সাথে।
(শচীর অগ্রসর )
তারক।
স্থানত্যাগ না কর ইন্দ্রাণি—
আমার আদেশ বিনা।
মৈনাক। চলে এস ত্বরাদুর্ভাগা রমনি !
তারক। সেনাপতি।
আমি বাসব-বিজরী স্বর্গরাজ্যেশ্বর
ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী আমার বন্দিনী ;
আমি তারে আনিয়াছি হেথা
কারাগার হতে
মৈনাক। দানবের পশুবৃত্তি চরিতার্থ হেতু !
চমৎকার-স্বর্গজয়-বীরত্বের পরিচয়।
তারক। বিশ্বাসঘাতক-রাজদ্রোহি !
ভুলেছ কি আমি রাজা-প্রভু তব,-
তুমি ভৃত্য মাের?
মৈনাক। অসহায় অবলায় নিজায়ত্তে পেয়ে,
সতীত্বহরণে তার যে করে প্রয়াস,

১১৪
শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
অতি দৃণ্য হীন সেই কামুক কুকুরে,-
মৈনাক কখনাে
রাজা বলি—প্রভু বলি—গ্রাহ্য নাহি করে ।
এসএস শচী দেবী-
( তরবারি কোষমুক্ত করিয়া শচীকে অগ্রসর হইতে দিয়া মৈনাক
পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল)
তারক।
দাড়াও ইন্দ্রাণি !
চমৎকার অভিনয় দেখালে মৈনাক,
চিরবৈরী-প্রতি উদারতা,অতি চমৎকার !
কিন্তু, উদারতা সাজে তারে—শক্তি আছে যার !
বীৰ্যপণে উদ্ধারিতে পার যদি ইন্দ্রাণীরে,
লয়ে যাও তারে,
নতুবা রে প্রভুদ্ৰোহী—কৃতঘ্ন পামর ।
লহ শাস্তি শােণিতরেখায় !
( অস্ত্রাঘাত)
( মৈনাক পড়িয়া গেল।
মৈনাক। উঃ-
মাতা! নাহি ভয়,
মৃত্যুপণে পুত্র তব রক্ষিবে তােমায় ।
হা-হা-হা-নারিবে রক্ষিতে কোনােমতে,
রে বাতুলতারকের হাত হতে
তারকের গ্রাস!
ব্ৰহ্মবলে বলী আমি,
শিবশক্তি-সম্মেলন

তীয় দৃশ্য ) শিবশক্তি ১১৫ হলে ঘটন,- পরাজয় নাই মম কভু কারও হাতে ! (কার্তিকের প্রবেশ) শচী। কার্তিক। ন কাত্তিক। শিবশক্তি-সম্মেলন হয়েছে ঘটন,- ফল তার নেহার সম্মুখে ! এসেছ কুমার ? মুক্ত তুমি মাতঃ । রে দানব-দুৰ্ম্মতিপ্রধান এসেছে কাত্তিক আজি-শমন তােমার। তারক। চমৎকার ! চমৎকার-বিধির বিধান ! ধৰ্ম্মরাজ্যে তারকের অধৰ্ম্ম আচার, নারী-প্রতি অত্যাচার, যেইক্ষণে হ’ল অনুষ্ঠিত,-- অমনি শমন ডাকে পশ্চাতে তাহার ! -না-না-কোন ক্ষোভ নাই মাের ? এতটুকু নাহিক বিদ্বেষ তােম। প্রতি ! তুমি যদি নিয়তি আমার, হে বালক- তােমারে বরিয়া লব আমি সমাদরে । কিন্তু-কিন্তু-ওরে শিশু- সত্য যদি শিবৰীৰ্যে জনম তােমার, কেন তবে তারকে ভেটিতে এলে— এই অবজ্ঞেয় শিশুরূপে ?

শিবশক্তি { চতুর্থ অঙ্ক } কার্তিক। মাতৃগর্ভে জন্ম লয়ে- যে পারে করিতে মাতৃ-অপমান, তার মৃত্যুবাণ, এ নহে অধিক কথা, সপ্ত দিবসের শিশুকরে রবে বিদ্যমান। ইথে কি বিস্ময় ? রে তারক। নিবার এ বাণ যদি সাধ্য তব! (তারকের বক্ষে শরত্যাগ) তারক। ওঃ-মাতঃ--ক্ষম অপরাধ ( আহত ও পতন ) কার্তিক। লভেছে উচিত শাস্তি দুরাত্মা দানব ! (মৈনাকের প্রতি) মাতৃভক্ত বীর! লহ তুমি প্রণাম আমার ! মৈনাক। মধুমাখা কথা তব কে তুমি বালক ? একি! একি মম ভাবান্তর ! ওই মুখ—ওই দীপ্ত আঁখি, ওই দৃষ্টি কমল-নয়নে,- যেন কত জনমের পরিচিত মাের। যেন মনে হয়, কোন জন্ম-জন্মান্তর হতে আমি অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা এ শিশুর সনে। কেবা তুমি কার বংশধর? কার্তিক। পিতা মাের দেবদেব মহাদেব ভােলা । মৈনাক। আর মাতা তব ? - ==

তৃতীয় দৃশ্য
শিবশক্তি
১১৭
কার্তিক। নগেন্দ্ৰনন্দিনী গিজিসুতা-জননী আমার ।
মৈনাক। উমাউমা
কাত্তিক। মাতা মাের জগজ্জননী।
ত্রিসংসারে কে না চেনে তারে ?
মৈনাক।
কুমার-কুমার ? উমার কুমার?
আয়-আয়-
বক্ষে ধরি তােরে প্রাণভরে,
স্নেহ-আলিঙ্গনে বদ্ধ রাখি ক্ষণকাল !
সরলতাময়ী স্নেহের সােদর উমা,-
তার পুত্র তুই যাদুমণি,-
জানি কেমনে
কোন সুকঠিন প্রাণে,
এতদিন ভুলেছিনু তােম সবাকারে !
ওরে বৎস-এতকাল পরে,
শুষ্ক প্রাণে ভাব-বন্যা এনে দিলি তুই ।
পাষাণে ফুটেছে বারি,
যাদুময় পরশে রে তাের !
(কার্তিককে আলিঙ্গন )
কান্তিক। একি প্রহেলিকা ?
তুমি? তুমি নিরুদ্দিষ্ট মাতুল আমার?
হে মাতুল ! কার্তিকের লহ নমস্কার।
( ইন্দ্রের প্রবেশ )
ইন্দ্র।
শচীশচী-প্রাণেশ্বরি।

১১৮
শিবশক্তি
[ চতুর্থ অঙ্ক
শচী।
পরাজিত দানবমণ্ডলী,
বহুভাগ্যে মিলিনু আবার।
জয় উমাপতি ।
বলজয়'উমাপতি!
জয় উমাপতি
( অধৰ্ম্মকে ধরিয়া কুবেরের প্রবেশ )
কুবের। জয় উমাপতি।
অধৰ্ম্ম ।
( সভয়ে ) রক্ষা কররক্ষা কর বােধােনা আমায়,
আমি হে শরণাগত তব !
দুৰ্ম্মতি দানব ! ঘৃণ্য নারকীয় জীব !
মৃত্যুভয় এত তোর প্রাণে ?.
অধৰ্ম্ম।
হে দেবেন্দ্র! শুনিয়াছি চিরদিন,
ভয়ার্ন বিপন্নে রক্ষা ধৰ্ম্ম দেবতার !
কুবের। তাে বেটাকে বধ ক’—তার আবার ধর্ম অধর্ম কি? তােমর
সবাে-আমি ওকে নিকেশ করি।
বন্ধুবর ! ভুলিলে আমারে ?
কুবের। তােমায় ভুলবাে আঁটকুড়ির বড় বেটা? উঃ কি নাকালটাই
করেছ আমাকে ! শুনুন দেবরাজ !-ওরই পরামর্শে দৈত্যরাজ বেট
শচীঠাকরুণকে এত নাস্তানাবুদ করেছে ।
শান্তি-শাস্তি ওর প্রাণদণ্ড !
এই দণ্ডে নিজহস্তে করি সমাধান !
অধর্ম।
ইন্দ্র।
( অধর্মকে বধ করিতে উদ্যত)

তৃতীয় দৃশ্য ]
শিবশক্তি
( শিবের প্রবেশ)
--
ক্ষান্ত হও শচীপতি ।
অধৰ্ম্ম ।
অকারণ অধৰ্ম্মেরে করােনা তাড়ন !
ধৰ্ম্মের মহিমা শুধু করিতে প্রচার,
অধৰ্ম্মের সৃষ্টি এ সংসারে !
তারকের অধৰ্ম্ম না হইলে সহায়,
কার সাধ্য সে দানবে বিনাশে সংগ্রামে ?
হে অধৰ্ম্ম ।
দেখায়েছ অত্যদ্ভুত প্রভাব তোমার ?
এবে, স্বর্গধাম কর পরিহার,
লহগে 'আশ্রয় তার,
পতনের দিন যার সমানুত!
প্রণিপাত দেবদেবী-পদতলে !
কাৰ্যান্তরে কুতূহলে করিহে প্রয়াণ ।
[ অধর্মের প্রস্থান
দেবদেব মহাদেব !
আসিয়াছ মৃত্যুকালে-
সম্মুখে আমার ?
অপরাধী দেব—আমি তব পায়,
নহি যােগ্য মার্জনার !
কিন্তু প্রভু
শুনি লােকমুখে,
“শিবশক্তি-সম্মেলন
আমিই কারণ তার ।
তারক।
-

শিবশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
হেন শুভ-সম্মেলন,
জগতের চিরহিত সাধিত যা হতে,
আমি যদি কারণ তাহার,-
একবার দিব্যদৃষ্টি পেয়ে,
দেখিব না আমি তাহা প্রভু ?
অন্তিমের এ কামনা পূরাও ভবেশ ।
অন্তিমের এ কামনা পূরাব তােমার !
হের বীর-শিবশক্তি-সম্মেলন
অন্তে হােক্ কৈলাসেতে গতি ।
জয় শিবশন্তে !
জয় মা জগজ্জননী আদ্যাশক্তি।
শিব ।
তারক।
( দেবদেবীগরে সমবেত গীত)
কোরাস
কি এ নিরুপম-শােভ| মনােরম
হরগৌরী একশরীরে !
দেবগণ।
শ্বেতপীতকায়—রাঙ্গ দুটা পায়-
নিছনি লইয়া মবিরে।
আধ বাঘছাল অঙ্গে বিরাজে,
আধ পট্টম্বর মােহন সাজে,
আধ মণিময় কিঙ্কিণা বাজে।
অব ফণী ফণা ধরিরে !
দেবীগণ।
দেবগণ।
যবনিকা.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shibshakti Ed. 1st

Author
Bandyopadhyay, Sri Bhupendranath
Title
Shibshakti Ed. 1st
File name
Shibshakti Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2009/07/16
Publisher
Sri Nanigopal Shil, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
134
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama. Plays.
Keywords
Poetry based mythological drama
DLI number
551597
Barcode
4990010021150.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
5YNOzM0butn
Download PDF

Shibshakti Ed. 1st